প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

ভারতের নির্বাচনে সুকুমার সেন

  


এর আগের প্রবন্ধ " চোদ্দ শাক " 

[প্রত্যেকটি লেখা সরাসরি আপনার মেলে পেতে চাইলে, ডান দিকের কলমে "ফলো করুন" 👉 

 বক্সটি ক্লিক করে নিজের নাম ও মেল আইডি রেজিস্টার করে নিন]


 

এই ২০২৬ সালে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। এই নির্বাচন নিয়ে অন্যান্যবারের মতোই রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক উত্তেজনা ছিল চরম সীমায়। ছিল নির্বাচনী প্রচারের নামে রাজনৈতিক দলগুলির কদর্য কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং তীব্র আকথা-কুকথার নিবিড় চাষ। জনগণ নির্ভয়ে ভোট দেবে নাকি সভয়ে ঘরে বসেই শুনবে, তার হয়ে কারা যেন ভোট দিয়ে দিয়েছে। মুগ্ধ বা বিভ্রান্ত কিংবা ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিক কার পক্ষে দাঁড়ালেন – সেকথা আমরা জেনে গেছি ৪ঠা মে, ২০২৬ তারিখ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘটে গেছে নিঃশব্দ বিপ্লব – জনগণের রায়ে উল্টে গেছে বিগত পনের বছর ধরে মৌরসী-পাট্টা বিছানো সরকার। নব নির্বাচিত সরকার হাতে তুলে নিয়েছে নতুন শাসন ও প্রশাসন ব্যবস্থা।     

বিগত ৪৯ (৩৪ + ১৫) বছরে পশ্চিমবঙ্গ-নির্বাচন মানেই ছিল – ভোটের আগে এবং ভোটের পরে বিরোধী সমর্থকদের হত্যা, ধর্ষণ, ব্যাপক মারধোর, ঘরে ঘরে আগুন জ্বালানো এবং সমর্থক পুরুষদের ঘর ছাড়া করার সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বঙ্কিম, সত্যজিৎ, নেতাজী সুভাষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ-বিলাসী বাঙালীর সংস্কৃতি-গর্বের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল, বাংলার প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনোত্তর বীভৎস মারণ ও ধ্বংস লীলার সংস্কৃতিও। সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়টাই আমাকে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে  - নানান রাজ্যে কাটাতে হয়েছে। সুদূর কেরালা থেকে হিমাচল, কিংবা গুজরাট থেকে কাছাড় (আসাম) – প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই সর্বত্র শুনতে হয়েছে – আমরা এত হিংস্র কেন? নিজের পড়শি-প্রতিবেশীদের প্রতি বাঙালীরা কেন এত নির্মম-নৃশংস হয়ে ওঠে “নির্বাচন” নামক মৌসুমী-বায়ুর প্রভাবে?     

লজ্জায় মাথা নত করে চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উত্তর দিতে পারিনি কোনবার। কিন্তু দীর্ঘ ৪৯ বছর পর এই ২০২৬-এর নির্বাচনে আমাদের সেই রাহু-কেতু ও শনির দশা কাটিয়ে তোলা গেছে – কেন্দ্রীয় বাহিনীর চুলচেরা পর্যবেক্ষণে। যৎসামান্য কিছু ঘটনা ছাড়া, এবারের নির্বাচন ঘটে গেছে শান্তিতে। যদিও বাঙালীর অগৌরবের চরিত্রটি আবার ফুটে ওঠে কিনা – সেকথা বোঝা যাবে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে। সে পৌরসভা, পঞ্চায়েত, লোকসভা, বিধানসভা, যাই হোক না কেন।     

 এই প্রসঙ্গে বাংলার আরও এক কৃতী সন্তান - যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) হয়ে শুধু সূচনা করেননি, গণতান্ত্রিক ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দাঁড় করিয়েছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় এক ভিত্তিতে। তাঁর সেই গৌরবজনক কৃতিত্বের কথাই এখন বলব।

 ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে ভারতবাসীর হাত ও পায়ের শেকল ভেঙে আমাদের দেশ স্বাধীন হল। স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে দেশের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জওয়াহরলাল নেহরু আপামর জনতার উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially.

At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom. A moment comes, which comes but rarely in history, when we step out from the old to the new, when an age ends, and when the soul of a nation, long suppressed, finds utterance....”।

   তাঁর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম হল, ভারত নামক সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণপ্রজাতন্ত্রী একটি শিশু-দেশের। পণ্ডিত নেহেরুর তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা গড়ে, শুরু হল শিশু রাষ্ট্রের পথ চলা। সেই মন্ত্রীসভার প্রধান হলেন পণ্ডিত নেহরু।

সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক একটি দেশ শাসনের জন্যে প্রথমেই দরকার পাকাপোক্ত একটি সংবিধান। আর দরকার সাধারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, কেন্দ্রীয় স্তরে সংসদ এবং রাজ্য স্তরে বিধানসভার পরিকাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সংবিধান নির্দিষ্ট না হলে তো নির্বাচন করা যায় না, অতএব প্রথমেই শুরু হল সংবিধান রচনার  প্রক্রিয়া।  

২৯শে আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে ভারতীয় সংবিধানের খসড়া রচনার জন্যে সাতজন সভ্য নিয়ে একটি কমিটি গড়া হয়েছিল। সে কমিটির চেয়ারম্যান হলে বাবা ভিমরাও আম্বেদকার। সংবিধানের প্রথম খসড়াটি, অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভার কাছে জমা পড়েছিল ৪ঠা নভেম্বর ১৯৪৮। অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা, নানান আলোচনা এবং তর্কবিতর্কের পর ২৬শে নভেম্বর ১৯৪৯ সালে - সংবিধানটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করল। এরপর ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি, স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হলেন বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, এবং সেই দিনটি থেকেই শুরু হল গণতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক পথ চলা।  সেই দিনটি আজও আমরা মহাড়ম্বরে স্মরণ করি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে।

এরপর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা এবং অনুমতি নিয়ে শুরু করলেন সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের পরামর্শে, অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নেহরুজি শ্রী সুকুমার সেনকে ডেপুটেশনে দিল্লি নিয়ে গেলেন এবং শ্রী সেনের হাতে তুলে দিলেন প্রথম সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর দায়িত্ব – অর্থাৎ তিনিই হলেন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঐতিহাসিক সেই দিনটি ছিল ১৯৫০ সালের ২১শে মার্চ – অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ছিয়াত্তর বছর আগে।    

 কিন্তু কে এই সুকুমার সেন? তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের আলোচনায় যাওয়ার আগে, শ্রীসেনের পরিচয়টা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

এক বাঙালী বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে, সুকুমার সেনের জন্ম। তাঁর জন্ম তারিখ দোসরা জনুয়ারি ১৮৯৯। তিনি তাঁর পিতা, সরকারী আধিকারিক, শ্রী অক্ষয় কুমার সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর লেখাপড়া কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে, এবং তারপর তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্যে যান ইউনিভার্সিটি অব লণ্ডনে। সেখানে অঙ্কে বিশেষ কৃতিত্বের জন্যে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (ICS) যোগ দেন এবং বিভিন্ন জেলায় আইসিএস আধিকারিক এবং বিচারক পদে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয়, সে সময় তিনি ছিলেন বেঙ্গল প্রভিন্সের প্রধান সচিব। ব্রিটিশ জমানায় এই পদটিই ছিল যে কোন ভারতীয় আইসিএস আধিকারিকের পক্ষে সর্বোচ্চ পদ। স্বাধীনতার পরেও তিনি এই পদেই কর্মরত ছিলেন।

শ্রী সেনের অনুজ শ্রী অশোক কুমার সেন (১৯১৩-১৯৯৬) ছিলেন বিখ্যাত ব্যারিষ্টার এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৭ ও ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত – সুদীর্ঘ দিন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী পদেও আসীন ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর আরেক ভাই শ্রী অমিয় কুমার সেন, ছিলেন প্রথিতযশা ডাক্তার এবং রবীন্দ্রনাথের অন্তিম-যাত্রা পথে তিনিই তাঁর সঙ্গী ছিলেন।

 

 

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর, শ্রী সেন মাত্র ৫৮৩ দিন – মোটামুটি দেড় বছরের মাথায় - ভারতের প্রথম নির্বাচনের প্রথম পর্যায় শুরু করতে পেরেছিলেন ১৯৫১-র ২৫শে অক্টোবর। এবং এই নির্বাচনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে শেষ করতে পেরেছিলেন ১১৯ দিনের মাথায়  ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি।

আজকের প্রযুক্তি-সম্পৃক্ত জীবনপ্রবাহের প্রবল স্রোতে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, একটা সাধারণ নির্বাচন শুরু করতে কেন লাগল দীর্ঘ ৫৮৩ দিন?  এবং সেটাও শেষ হল আরো চারমাস পর!  কেন এতটা সময় লাগল সে কথাই এবার আলোচনা করা যাক।

  ১৯৫১ সালের জন গণনা অনুযায়ী ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬.১০ কোটি, তার মধ্যে ১৭.৩২ কোটি মানুষের বয়স ছিল একুশ বছর বা তার বেশী। সে সময় একুশ বছর বয়সকেই ভোটাধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত করা হয়েছিল। এই ১৭.৩২ কোটি ভারতবাসীর মধ্যে প্রায় ৮৫% ছিলেন নিরক্ষর। এই মানুষগুলিকে ভোটাধিকার কি? স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ভোট দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? এবং ভোট দিলে তাদের জীবনে কোন মোক্ষলাভ ঘটবে? এই সব তত্ত্বকথা বুঝিয়ে প্রতিটি ভোটারকে বুথ-মুখী করে তোলাই ছিল নিঃসন্দেহে শ্রীসেনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।   

টিভি, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়াহীন সেই যুগে এই চ্যালেঞ্জটির সমাধান করা হয়েছিল, রেডিওয় অনবরত প্রচারের মাধ্যমে এবং সিনেমা শোয়ের আগে ডকুমেন্টরি দেখিয়ে। সারা দেশে তখন প্রায় ৩০০০ সিনেমা হল ছিল, সেখানে “ইণ্ডিয়ান নিউজ রিল” নামের নানান আঞ্চলিক ভাষার ডকুমেন্টরিতে ভোটারদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বারংবার বোঝানো হত। মূল সিনেমা শুরুর আগে এই ডকুমেন্টরিগুলি দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এছাড়া ভোটার লিস্ট বানানোর সময় সরকারি প্রতিনিধিরা গ্রামে-গ্রামে, শহরের পাড়ায়-পাড়ায় ব্যক্তিগতভাবেও এই প্রচার যথাসম্ভব চালিয়ে গিয়েছিলেন।

তখনকার সামাজিক সংস্কার ও রীতিনীতি এমনই ছিল, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে, ভোটার লিস্ট বানানোও হয়ে উঠেছিল মস্তো বড়ো এক চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে বিষয়টা। সর্বধর্ম নির্বিশেষে গ্রামের মহিলারা নিজেদের পরিচয় দিতেন, “শ্যামলের মা”, কিংবা, “সামসুদ্দিনের বউ” হিসেবে। মহিলাদের এই রকম নাম সম্বলিত খসড়া ভোটার লিস্ট যখন সুকুমার সেনের কাছে জমা পড়েছিল, তিনি এই লিস্ট বাতিল করেছিলেন এবং তাঁর প্রতিনিধিদের আবার গ্রামে গ্রামে পাঠিয়েছিলেন মহিলাদের নির্দিষ্ট নামগুলি নতুন করে রেকর্ড করার জন্যে। এর পরেও প্রায় পঁচিশ লক্ষ মহিলা তাঁদের নিজস্ব নাম নথিভুক্ত করেননি – অর্থাৎ যুগ-প্রাচীন সংস্কারের বাইরে তাঁরা বেরিয়ে আসতে পারেননি। কিন্তু শ্রী সেন এবার আর কোন রকম আপোস না করে, এই পঁচিশ লক্ষ মহিলার নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন এবং ১৯৫১-৫২ সালের নির্বাচনে তাঁরা কেউ ভোটের অধিকার পাননি।  

আজকের সোশাল মিডিয়ার যুগে এরকম ঘটনা ঘটলে – শ্রীসেনকে সারা দেশ জুড়ে অজস্র “মিম” এবং “ট্রোল”-এর সামনে পড়তে হত এবং তাঁকে স্বৈরাচারী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হিসেবেও চিহ্নিত করে ফেলত আজকের সমাজ-সচেতন নেটিজেন জনগণ।

কিন্তু শ্রী সেনের এই কড়া পদক্ষেপের কারণে, মহিলারা দ্রুত সচেতন হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী নির্বাচনের অর্ত্থাৎ ১৯৫৭ সালের ভোটার লিস্টে তাঁরা নিজ-নিজ নামই নথিভুক্ত করেন এবং ভোট দিতেও তাঁদের কোন অসুবিধে হয়নি। প্রসঙ্গতঃ ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও শ্রী সেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন।  অতএব, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রী সেন যে অজস্র ভারতীয় নিরক্ষর মহিলাকে নিঃশব্দে যথেষ্ট আত্মসচেতন করে তুলতে পেরেছিলেন, একথা আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়।

যেহেতু প্রায় ৮৫% ভোটার সেই সময় নিরক্ষর ছিলেন, নির্বাচনে লড়তে নামা রাজনৈতিক দলগুলির নাম অথবা দলের প্রার্থীদের নাম তাঁদের পক্ষে পড়া সম্ভব ছিল না। তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নাম বা দলের নাম লিখে, ব্যালট বক্সে সেই কাগজ জমা দেওয়ারও। শ্রী সেন এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন প্রতিটি দলের জন্য আলাদা প্রতীক (Symbol)-এর ব্যবস্থা করে। সে সময় সারা দেশে মোট যে চোদ্দটি দল নির্বাচনে লড়েছিল, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ দলের জন্যে আলাদা আলাদা প্রতীক বেছে নিয়ে জমা দিয়েছিল নির্বাচনী কমিশনের কাছে। যেমন জোড়া-বলদ, কাস্তে-ধানের শিষ, উদিত-সূর্য, গাছ, ইত্যাদি। নীচের চার্ট থেকে সেদিনের চোদ্দটি দলের নাম ও প্রতীকগুলি দেখে নিতে পারেন। জানা যাবে তখনকার চোদ্দটি জাতীয় দলের নামও।

১৯৫১-৫২ সালে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন দলের প্রতীক 
 

এই প্রথম নির্বাচনেই শ্রী সেন প্রত্যেকটি বুথে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিহ্নিত আলাদা আলাদা ব্যালট বক্স রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এতে নিরক্ষর হলেও, কোন মানুষেরই তাঁর সমর্থিত দলের নির্দিষ্ট বক্সে, তাঁর সমর্থনের কাগজটি ফেলতে কোন অসুবিধে হয়নি।

আজকের দিনের নির্বাচনে “ছাপ্পা ভোট” শব্দটি আমাদের কাছে বহুল প্রচলিত গা সওয়া ব্যাপার। কিন্তু প্রথম নির্বাচনের আগেই শ্রী সেনের মাথায় এই আশঙ্কা এসেছিল যে, একই চতুর ভোটার নিজের দলের বক্সে অনেকগুলি ভোট দিয়ে ফেলতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে ভোটারদের আঙুলে ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক (indelible ink) লাগানোর ব্যবস্থা করেন। আজও সেই কালিই ব্যবহার হয় এবং আমরা সকলেই জানি, এই কালি একবার লাগিয়ে দিলে, অন্ততঃ দিন সাতেকের আগে আঙুল থেকে এই কালি মোছা যায় না।

প্রথমবারের সেই নির্বাচনী লড়াই হয়েছিল ৪৫০০ আসনের জন্যে, তার মধ্যে সংসদের আসন ছিল ৪৮৯ এবং বাকিগুলি ছিল রাজ্য বিধানসভার আসন। প্রায় ৫৬০০০ নির্বাচনী অফিসার নিযুক্ত ছিলেন, সারা ভারতের ২,২৪,০০০ বুথ পরিদর্শনের জন্য। ১৬,৫০০ করণিককে ছমাসের জন্যে নিযুক্ত করা হয়েছিল সারা ভারতের ভোটার লিস্ট বানানো, নির্বাচনী বিধি-বিধান রচনা, আরও বিবিধ নথিপত্র বানানোর জন্যে। ৮২০০ টন ইস্পাত থেকে, প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ ব্যালট বক্স বানানো হয়েছিল। প্রায় ৩,৮৯,৮১৬ ফাইল ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক ব্যবহার হয়েছিল ১৯৫১-৫২-র সেই নির্বাচনে। বক্সগুলি বুথে বুথে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ২,৮০,০০০ শ্রমিক এবং বক্সের সুরক্ষার জন্যে ২,২৪,০০০ পুলিশ কর্মী নিযুক্ত হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে সেসময়, এক্সপ্রেসওয়ে, হাইওয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনার মতো প্রকল্প বহুদূরের স্বপ্ন – ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তের বুথগুলিতে ব্যালটবক্স সহ নির্বাচনী কর্মীদের পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ছিল গরুরগাড়ি কিংবা ঘোড়ার গাড়ি।

১৯৫১-৫২ নির্বাচনের পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনেও শ্রীসেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন। প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ব্যয় কমেছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এর কারণ হল প্রথমবারে বানানো সমস্ত ব্যালট বক্সই, দূরদর্শী শ্রী সেন সযত্নে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।

 ভারতের প্রথম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাফল্য সে সময় গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বিশ্বের তৎকালীন গণতান্ত্রিক দেশগুলি, যেমন আমেরিকা কিংবা ইওরোপের কোন দেশের সাহায্য ছাড়াই, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশ যে এত নির্বিঘ্নে এমন সার্বিক নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবে, একথা তথাকথিত সুসভ্য শ্বেতবর্ণ মানুষদের পক্ষে হজম করা নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল বৈকি!  অনুমান করে নেওয়া যায় সদ্য ভারত ছেড়ে যাওয়া ইংরেজ শাসকরাই ঈর্ষান্বিত হয়েছিল সব থেকে বেশি। কারণ যে দেশের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কই ছিল নিরক্ষর। যে দেশে মাত্র বছর চারেক আগেই ১৯৪৬-৪৭ সালে ধর্ম নিয়ে এবং দেশভাগ নিয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে ঘটে গেছে অজস্র গণহত্যার বীভৎস ঘটনাসমূহ। স্বাধীনতা লাভের পরেই যে দেশকে ১৯৪৭-৪৮ সালে, সদ্যজাত প্রতিবেশী দেশের উদ্ধত আক্রমণকে শক্ত হাতে দমন করতে হয়েছে। যে দেশের ৭০% - ৮০% মানুষ জীবনযাপন করতেন  দারিদ্রসীমার নীচে। এই সকল প্রতিকূলতাকে নিপুণ হাতে সামলে, নবজাত একটি দেশের এমন সার্বিক সাফল্যের মূল্যায়ন - আজকের অত্যাধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে তার আন্দাজ করাও অসম্ভব।

১৯৫২ সালের স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, 


Nehru's haste [in wanting India's first general election] was understandable, but it was viewed with some alarm by the man who had to make the election possible, a man who is an unsung hero of Indian democracy. It is a pity we know so little about Sukumar Sen. He left no memoirs and, it appears, no papers either. ...

It was perhaps the mathematician in Sen, which made him ask the prime minister to wait. No officer of State, certainly no Indian official, has ever had such a stupendous task placed in front of him. Consider, first of all, the size of the electorate: 176 million Indians aged 21 or more, of whom about 85 per cent could not read or write. Each voter had to be identified, named and registered. This registration of voters was merely the first step. For how did one design party symbols, ballot papers and ballot boxes for a mostly unlettered electorate? Then, polling stations had to be built and properly spaced out, and honest and efficient polling officers recruited. Voting has to be as transparent as possible, to allow for the fair play of the multiplicity of parties that would contest. Moreover, with the general election would take place elections to the State Assemblies. Working with Sukumar Sen in this regard were the election commissioners of the different provinces, also I.C.S. men.

 নবীন ভারতের প্রথম নিরপেক্ষ এবং সাবলীল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল, বিশ্বের বহু উন্নতিশীল  গণতন্ত্রকামী দেশ। তাদের মধ্যে একটি দেশ হল সুদান। সে দেশের ১৯৫৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করার জন্যে, ১৯৫১-৫২-র সাধারণ নির্বাচনের পরেই সুদান থেকে শ্রী সেনের কাছে আমন্ত্রণ আসে। ১৯৫৭ সালে সুদানের প্রথম যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়, তার অধিকাংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনগুলি ভারতীয় নিয়মের অনুসারী ছিল।

১৯৫২ সালের পাঁচ বছর পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও তিনিই ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং ১৯৫৮ পর্যন্ত তিনি ওই পদেই নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে “পদ্মভূষণ” সম্মানে ভূষিত করেন। নির্বাচন কমিশনের পদ ছাড়ার পর  ১৯৬০ সালে বর্ধমানের রাজবাড়ি, গোলাপবাগে নব প্রতিষ্ঠিত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হয়েছিলেন সুকুমার সেন।

জিটি রোড থেকে গোলাপবাগ পর্যন্ত প্রধান রাস্তাটি তাঁর নামেই চিহ্নিত করা হয়। আবার তাঁর অবদানের কথা মনে রেখে সুদূর সুদানের রাজধানী খার্তুম শহরেও তাঁর নামাঙ্কিত একটি প্রধান রাস্তা আছে। কিন্তু যৎসামান্য এই স্মৃতিরক্ষার প্র্য়াসটুকু ছাড়া এমন একটি কৃতী বাঙালীকে আমরা আজ ভুলেই গেছি। এই কলকাতা শহরে কোন আয়োজন নেই তাঁর স্মৃতি রক্ষার।

১৯৬৩ সালের ১৩ই মে তাঁর পরলোক যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সূচনা পর্বটি।

গুগ্ল সার্চ করে উইকিপিডিয়া এবং কয়েকটি সর্বভারতীয় পত্রিকার ওয়েবসাইট থেকে যেটুকু তথ্য তাঁর সম্বন্ধে জানা যায় – সেটুকুই এই প্রবন্ধে তুলে ধরতে পারলাম। এই লেখাটি পড়ে আশা করি কোন উৎসাহী গবেষক, তাঁর সম্বন্ধে আরও বেশী তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের সামনে তুলে ধরবেন। এবং সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের এতদিনের অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত।      

 --০০--

 চিত্রঋণঃ উইকিপিডিয়া।

 


সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫

চোদ্দ শাক

 


এর আগের প্রবন্ধ " শ্রীমদ্ভাগবৎ কৃষ্ণ


[প্রত্যেকটি লেখা সরাসরি আপনার মেলে পেতে চাইলে, ডান দিকের কলমে "ফলো করুন" 👉 

 বক্সটি ক্লিক করে নিজের নাম ও মেল আইডি রেজিস্টার করে নিন]


মা-কালীর মর্ত্যে আবির্ভাব দিবস কার্তিক মাসের অমাবস্যায়। তাঁর আসার আগের দিন চতুর্দশী তিথিতে পৃথিবীতে নাকি ভূত-প্রেত-পেত্নী-শাঁকচুন্নি, ব্রহ্মদৈত্য প্রমুখদের উৎপাত বাড়ে। (পৃথিবী বলতে অবশ্য সনাতন-ধর্ম বিশ্বাসী পৃথিবী বুঝতে হবে, কারণ ইসলাম এবং খ্রিস্টিয় ধর্মে বিশ্বাসী দুনিয়ায় কিংবা ওয়ার্ল্ডেও এমন ঘটনা ঘটে তবে ঠিক এই দিনটাতে নয়, অন্য কোন বিশেষ বিশেষ দিনে।) মা কালীর চ্যালা-চামুণ্ডা, ডাকিনী-যোগিনীদের অকস্মাৎ এই উৎপাত বাড়ার কারণটা সিকিউরিটি রিজ্‌ন্‌ হতে পারে কি? দিল্লি থেকে আমাদের রাজ্যের কোন শহরে ভিভিআইপি আসার আগের কয়েকদিন যেমন নিরাপত্তা রক্ষীদের তৎপরতা বাড়ে – সেরকম!

না, তাও নয়। কারণ নিরাপত্তা-বলয় গড়ে তোলার তাগিদে শহরের কিছু কিছু অঞ্চল বা কয়েকটি প্রধান সড়ক যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়, আমরা উদ্ভট রকমের জ্যাম-জটে জড়িয়ে থাকি – গুড়ের নাগরিতে আটকে থাকা মাছি বা পিঁপড়ের মতো। কিন্তু মা কালীর অদৃশ্য অশরীরী ভূত-প্রেতদের কারণে আমাদের সামাজিক বা নাগরিক জীবন-যাত্রায় তেমন কোন প্রভাব লক্ষ্য করি না। অতএব, সুরক্ষার কারণে চতুর্দশীর দিন মা কালীর চতুর সাঙ্গোপাঙ্গোরা আমাদের কোনভাবেই উৎপাত করে না।

তাহলে আমাদের শাস্ত্র-পুরাণে ভূত-চতুর্দশীতে ভূতেদের কেন চতুর ও দোষী বানানো হল? কেনই বা বিধান দেওয়া হল এই দিন চোদ্দ-শাক খেতেই হবে। শাক খেয়ে ভূত তাড়ানো যায় – এমন কথা আবহমানকাল থেকে যত ভূতের গল্প আমরা শুনেছি বা পড়েছি -  কোথাও কোন ভূতের ওঝা বা গুণিনকে কখনো বলতে শোনা যায়নি।                

এই চোদ্দ শাক নিয়ে আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তাঁর “চিরঞ্জীব বনৌষধি (২য় খণ্ড)” গ্রন্থে কী বলেছেন, দেখে নেওয়া যাক -

 “চোদ্দশাক খেলে নাকি কার্তিকের টান থেকে রেহাই পাওয়া যায়; কারণ এই মাসে যমের বাড়ির ৮টি দরজা খোলা থাকে -  এই প্রবাদটি আজও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

যদি এটিকে গেঁয়ো বাচস্পতি শাস্ত্রের কথা বলে উড়িয়ে দেওয়াও যায়, কিন্তু এ কথাটার যে একটা মৌল কারণ আছে এবং তার পিছনে বিজ্ঞানও যে আছে, সেটার অনুসন্ধান অগোচরেই বা থাকে কেন? এটা তো ঠিক যে তখনকার যুগের চিকিৎসা-বিজ্ঞানে এবং ষোড়শ শতাব্দীর রঘুনন্দনের গ্রন্থাবলীতেও এটিকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে”।

কে এই রঘুনন্দন? রঘুনন্দন ভট্টাচার্য চৈতন্য মহাপ্রভুর সমসাময়িক যুগের বিখ্যাত বাঙালী শাস্ত্রজ্ঞ, স্মার্ত (স্মৃতি > স্মার্ত) পণ্ডিত এবং লেখক ছিলেন। বলা হয় ষোড়শ শতাব্দীতে – চৈতন্যদেবের জন্মের পঁচিশ বছর পর – নবদ্বীপে তাঁর জন্ম হয়। বাংলা তথা পূর্বভারতের অধিকাংশ হিন্দু সমাজ নানান অনুষ্ঠান, পূজা, পার্বণ, ব্রত পালন এবং পঞ্জিকা রচনার বিধি-বিধান তাঁর রচিত গ্রন্থ থেকেই অনুসরণ করে থাকে।

এই প্রসঙ্গে ‘স্মৃতি’ নিয়েও দু চার কথা বলে নিই।

আমরা সকলেই জানি আর্যরা এদেশে এসে তাদের মৌরসী-পাট্টা বসানোর সময় ঋগ্বেদ এবং অন্য তিনটি বেদ ছিল তাদের সকল রকম বিধি-বিধান – নিয়মকানুনের একমাত্র শাস্ত্র। এই বেদ অপৌরুষেয় – অর্থাৎ কোন মানুষের রচনা নয়, অতএব তার কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংস্কার ইত্যাদি করার কোন প্রশ্নই উঠত না। বেদ প্রসঙ্গে কদাচ কেউ কোন সংশয় বা দ্বিধা প্রকাশ করলে তার পরিণতি হয়ে উঠত সাংঘাতিক।

কিন্তু বেদ নামক গ্রন্থগুলি নিত্য-পরিবর্তনশীল মানুষের সমাজ-জীবনকে চিরকাল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এমন হতে পারে না এবং হয়ওনি। মহাভারতের যুগ পার হয়ে, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ভারতীয় সমাজে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল যে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে, বেদ নামক গ্রন্থগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে লাগল। সত্যি বলতে বৈদিক-ব্রাহ্মণ্য সমাজপতিরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন এই ভেবে যে, এভাবে চললে, রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা কেউই যদি বেদকে আর গণ্যিমান্যি না করে, তাহলে তাঁদের কী হবে?         

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে মনু নামের কোন একজন ঋষি বা ঋষিবৃন্দ “স্মৃতি-সংহিতা” নামক বিশাল এক শাস্ত্র রচনা করলেন। এই শাস্ত্র সমসাময়িক সমাজের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় নিয়েই নানা বিধি-বিধান, কী করণীয়, কী অকরণীয়, কোনটা পাপকর্ম আর কোনটাই বা পুণ্যকর্ম – সব কিছু নির্ধারণ করে দিল।

এর ফলে কি বেদ পুরো বাতিল হয়ে গেল? মোটেই না, বরং বলা হল শ্রুতি ও স্মৃতি এক অপরের পরিপূরক, স্মৃতিতে যদি কোন বিষয়ে কোন সংশয় ঘটে – তার সমাধান করতে হবে বেদ থেকে। অর্থাৎ শ্রুতি স্মৃতির থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ কথাটি যে বিভ্রান্তিমূলক, সেটা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। প্রথম কারণ বেদের রচনাকাল স্মৃতির রচনাকাল থেকে প্রায় বারোশ থেকে চোদ্দশ বছর আগে। দ্বিতীয় কারণ বেদের সমকালীন সামাজিক পরিস্থিতি ও স্মৃতির সামাজিক অবস্থানের মধ্যে ঘটে গেছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। অতএব স্মৃতির কোন বিষয় যদি স্পষ্ট না হয়, তার সমাধান বেদ থেকে কী করে হতে পারে?

তবে শ্রুতি বা বেদ যেমন চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়, স্মৃতি কিন্তু তা নয়। মনুসংহিতার পরেও ভারতবর্ষের বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন অঞ্চলে নানান নামে বহু স্মৃতি-গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম আমাদের বাংলার স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য।

 এবার ধান ভানতে শিবের গীত ছেড়ে আবার চোদ্দ শাকেই ফিরে আসি।

আমাদের দেশে বিশেষ করে বাংলা এবং পূর্ব ভারতে ঋতুগুলি বড় বেশি প্রকট। কোন ক্যালেণ্ডার না দেখেও প্রকৃতি-পরিবেশ ও শারীরীক অনুভব থেকেও কোন সময় কোন ঋতু বেশ টের পাওয়া যায়। যেমন খুব স্পষ্ট টের পাই বর্ষা শেষ হয়ে শরতের আগমন। কিংবা শরৎ শেষ হয়ে সামান্য হিমের ছোঁয়া লাগা হেমন্তকে চিনতেও আমাদের অসুবিধা হয় না। অথবা শীত শেষে মধুকালের আগমন।

এই ঋতু-পরিবর্তন আমাদের মনে এবং শরীরে নানান ভাবে প্রভাব ফেলে। বর্ষা শেষে শরতের – বিশেষ করে ভাদ্রের - ভ্যাপসা ক্লান্তিকর ঘেমো গরমের পর হেমন্তের বিকেলে সামান্য হিমের পরশ-লাগা বাতাস আমাদের মন-প্রাণ যেমন জুড়িয়ে দেয়, তেমনি তার সঙ্গে উড়ে এসে জুড়ে বসে নানান ব্যাধিও। বিজ্ঞানীরা বলেন বিশেষ বিশেষ ঋতু-পরিবর্তনের সময় নানান ভাইরাস – যারা অন্য সময় নিষ্ক্রিয় জড়পদার্থ হয়ে থাকে – তারা অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভাইরাসের কাহিনী ষোড়শ শতাব্দীর স্মার্ত পণ্ডিতের জানার কথা নয় – কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তাঁরা জানতেন – আশ্বিন-কার্তিকের ঋতু পরিবর্তনের সময়টা আমাদের শরীরের পক্ষে মোটেই অনুকূল নয়। তাঁরা এই সময়টাকে বলেছেন “যমদংষ্ট্রা কাল” – অর্থাৎ মৃত্যু-দংশনের কাল।

ভয়ংকর এই কালের প্রতিষেধক হিসাবে বাংলার নব্য-স্মৃতিকার রঘুনন্দন চোদ্দশাক খাওয়ার বিধান দিয়েছেন। তাঁর গ্রন্থের শ্লোক থেকে পাওয়া যায়, কার্তিক মাসে ভূত-চতুর্দশীর দিনে অর্থাৎ দীপান্বিতা অমাবস্যার আগের দিন, চোদ্দটি বিশেষ শাক খেলে যমের দংশন এড়িয়ে ভালোভাবেই বেঁচে-বর্তে থাকা যায়। এই চোদ্দটি কোন কোন কোন শাক – দেখে নেওয়া যাকঃ-

 

 

শাকের নাম

উপকারিতা

ওলের পাতা

কোষ্ঠ সাফ করায়, পিত্ত নাশ করে।

কেঁউ

কৃমিকে প্রতিহত করে।  

বেতো বা বেথুয়া

লিভারকে শাসন করে।

কালকাসুন্দে

কাশি এবং কফ নাশ করে।

সরিষা

কোষ্ঠ সাফ হওয়ার সহায়ক।

নিম

পিত্তজ চর্মরোগ নাশ করে।

জয়ন্তী

ঠাণ্ডা লাগা বা কাঁচা সর্দি প্রতিহত করে।

শালিঞ্চ বা শাঞ্চি

দুর্বলতা ও আলস্য দূর হয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

গুড়ুচি বা গুলঞ্চ পাতা

বায়ুবিকার দূর করে।

১০

পলতা – পটোল পাতা

পিত্তদোষকে সংশোধন করে।

১১

শেলকা বা শুলফা

ক্ষিধে বাড়ায়, মুখে রুচি আনে।

১২

হিঞ্চে বা হেলেঞ্চা

হজম শক্তি বাড়ায়, রক্তে লোহিত কণিকা বাড়ায়।

১৩

ভাঁট বা ঘেঁটু পাতা

কৃমিকে প্রতিহত করে।

১৪

সুষুনি বা সুশনি

স্নায়ুকে শান্ত রাখে, সুনিদ্রা হয়।

        

আবার অন্য মতে*, ওপরের সারণির তিনটি শাক নেই – যেমন ওল, কেঁউ, শেলকা, তার জায়গায় যে তিনটি শাকের নাম পাচ্ছি –

১) থানকুনি – রক্তসঞ্চালন বাড়ায় ও চর্মরোগ উপশম করে।

২) কুলেখাড়া - রক্তাল্পতা দূর করে।

৩) পুনর্নবা বা পুনকে – কোষ্ঠ সাফ করায়, কিডনিকে সুস্থ রাখে।      

আজকের দিনে কলকাতা শহরে এই সবকটি শাক একত্রে পাওয়া দুঃসাধ্য, প্রায় অসম্ভব। যাঁরা মফস্বল শহরে বা গ্রামে থাকেন এবং অনেক ধরনের গাছগাছড়া চেনেন, তাঁরা চোদ্দটি না হলেও অন্ততঃ আট-দশটি শাক অনায়াসে যোগাড় করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু বিগত দুদিন বাজারে চোদ্দ শাক বলে বহুমূল্য যে পাঁচমিশালী টুকরো পাতার সম্ভার বিক্রি হতে দেখেছি, তাতে বড়ো জোর পাঁচটি শাকই পেয়েছি। তার মধ্যে দুটি পাতা খুব চেনা সাদা নটে আর লাল নটে। দু একজনের কাছে আবার এই মিশ্রণে ফুলকপির ছেঁড়াপাতাও দেখেছি। নটে বা ফুলকপির পাতায় কোন ভেষজ গুণ নেই তা বলছি না, কিন্তু শাস্ত্রীয় চোদ্দ শাকের মধ্যে এদের স্থান নেই। অতএব কলকাতা মহানগরে বাস করে, চোদ্দ শাক খেয়ে নিশ্চিন্তে ভূত-চতুর্দশী পালন করে ফেলেছেন, এমন ভাবনার অবকাশ আপনার নেই।

এখানে আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে। এই চোদ্দ শাকের সবকটি যদি পাওয়াও যেত, সেটা কি মাত্র একদিন খেলেই যম দংশন থেকে মুক্তি পাওয়া যেত?

না ব্যাপারটা এত সহজ নয়, বরং শাস্ত্রীয় মতে এই দিন থেকে শুরু করে, এই শাকগুলি অন্ততঃ সপ্তাহ দুই বা তিনেক খাওয়া চলুক। পরিমাণে কম হোক, ক্ষতি নেই – কিন্তু নিয়মিত। উপরন্তু একসঙ্গে চোদ্দটি শাক না পেলেও, অন্য কয়েকটি শাক – যেমন হিঞ্চে, পলতা, নিম, কালকাসুন্দে, বেথুয়া, থানকুনি, কুলেখাড়া, পুনকে শাক মোটেই দুষ্প্রাপ্য নয়। সহজলভ্যতা অনুযায়ী একটি বা দুটি শাক বা পাতার ব্যঞ্জন নিয়মিত খাওয়ার পাতে থাকলে ক্ষতি তো নেই। চেষ্টা করে দেখা যেতেই পারে সামনের কিছু দিন – অন্ততঃ কার্তিক মাসটা।

 ---০০---

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ –

১) চিরঞ্জীব বনৌষধি (দ্বিতীয় খণ্ড) – আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য।              

২) *শ্রীমতী সম্রাজ্ঞী ভট্টাচার্য – বোটানির অধ্যাপিকা ও বিশিষ্ট প্রকৃতিবিদ।    

পরের প্রবন্ধ - " ভারতের নির্বাচনে সুকুমার সেন

শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মহালয়ায় মহা-স্মরণ

 

এই কিছুক্ষণ আগে স্বপনদা ফোন করেছিল, আমি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলাম। এমন অসময়ে স্বপনদা ফোন করে না তো! কোন বিপদ-আপদ হল নাকি? ফোনটা তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, “কী খবর স্বপনদা, এত রাতে?”

“লে, ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি? ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম?”

“না। না। ঘুমোইনি, বই পড়ছিলাম”।

“অ। তোর তো আবার বইপড়ার নেশা – আমার যেমন মালের। শোন না, কাল তো মহালয়া বলে আমাদের অফিস ছুটি। তোর কি প্রোগ্রাম? চলে আয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতে দিতে মাল খাওয়া যাবে”।

“কখন?”

“মাল খাওয়ার আবার কখন কিরে? তিথি নক্ষত্র দেখতে হবে নাকি? সকালেই চলে আয়, ব্রেকফাস্টের সঙ্গে হাল্কা বিয়ার...”।

আমি ইতস্তত করে বললাম, “না, মানে স্বপনদা, হয়েছে কি? কাল মহালয়া তো, তাই ওই একটু...”

“তর্পণ? তুই সেই চিরকেলে মাকড়াই রয়ে গেলি, মানুষ হলি না। আচ্ছা, এত বছর তর্পণ করে কী পেয়েছিস বল তো, কটা হাত পা গজিয়েছে?”

হেসে ফেললাম, বললাম, “তর্পণ করি আর না করি নতুন হাত-পা কোনভাবেই গজায় না। বরং যে কটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি, সে কটা আবার জমা করে যেতে হবে যাওয়ার সময়...”।

“একদম হক কথা বলেছিস। লোকে পুজো-আচ্চা করে কিছু পাওয়ার ধান্ধায় – টাকা দাও, ক্ষ্যামতা দাও, নামজাদা করে দাও, গুচ্ছের বাচ্চা-কাচ্চা দাও, চাকরি দাও, মেয়ের জন্যে ঘ্যামা বর দাও, ছেলের জন্যে টুকটুকে আত্মীসূয়ো বউ দাও...খালি শালা দাও, দাও...যেন ভিখিরির বাচ্চা। তুই কিসের জন্যে পুজো করবি, রে হতভাগা?”

আমি হাসলাম, বললাম, “আমি পুজো তো করব না, তর্পণ করব”।

“আবে ছাড়, যারে কই চালভাজা তারেই কয় মুড়ি। কিছু অংবং মন্ত্র ঝাড়া, আর গঙ্গা থেকে হাতে জল নিয়ে গঙ্গাতেই হাত ঝেড়ে ফেলা। ব্যাপারটা একই। মরে হেজে যাওয়া পূর্বপুরুষদের তেল দিয়ে কিছু কামাই করার ছক”।    

“না স্বপনদা, তর্পণ মানে কাউকে কোন তেল-টেল দেওয়া নয় – পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা – জাস্ট স্মরণ করা”।

“আচ্ছা লে, তোর কথা মেনে নিলাম, স্মরণ করা। ওসব করে কী পাস কি”?

“আশ্চর্য এক তৃপ্তির অনুভূতি। সেটাই আমার পাওনা”।

“অ তুই তো আবার লিখিস-টিখিস, আবেগ আর অনুভূতি তো তোর লেখার মূলধন। তার মানে তর্পণ করে তুই গল্পের প্লট পেয়ে যাস”?

“না, স্বপনদা, এ অনুভূতি কৃতজ্ঞতার অনুভূতি। ব্যস্‌, তার বাইরে আর কিচ্ছু পাই না”।

“কৃতজ্ঞতা? যা শালা, কার প্রতি কৃতজ্ঞতা? কিসের জন্যে কৃতজ্ঞতা”?

আমি হেসে ফেললাম, বললাম, “এখনও পর্যন্ত তোমার ক পেগ হল? কার প্রতি এবং কিসের কৃতজ্ঞতা -  সেটা বোঝাতে একটু সময় লাগবে”।

“আবে, চার পেগ চলছে, আরও না হয় দু পেগ মেরে দেব। কালকে ছুটি – বেলা পর্যন্ত হোগ্‌গা উলটে ঘুমোব – কোন ব্যাপার না। তুই যখন বলছিস, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বলে যা শুনছি”।

“বেশ। তোমার মেয়ে ঝিমলি প্রমিসিং সায়েন্টিস্ট, থাকে মিউনিখে। তোমার ছেলে অলোক একজন আইএএস, থাকে দিল্লিতে”।

“অ্যাই তুই ভাঁট বকছিস। তার সঙ্গে তর্পণের কি সম্পর্ক, বে?”

“আরে বলতে দেবে তো? ধর ঝিমলি এবং অলোক তোমাকে কাল থেকে আর স্বীকার করল না। বাবা হিসেবে তোমাকে, এবং মা হিসেবে বৌদিকে পাত্তাই দিল না, বলল বাবা-মা কী করেছে কি আমাদের জন্যে?”

স্বপনদা বেশ ক্ষুব্ধ হল, বলল, “কী আলবাল বকছিস? তাই কোনদিন হতে পারে? আমরা ওদের জন্ম দিলাম, ঠিকঠাক গাইড করে বড়ো করলাম। অস্বীকার করব না, ওরাও ব্রিলিয়ান্ট, উই আর প্রাউড অফ দেম। তাই বলে, আমাদের স্বীকার করবে না?”

“রেগে গেলে তো? স্বাভাবিক, রাগ হবারই কথা। ভয় নেই, ঝিমলি এবং অলোক সেরকম ছেলেমেয়েই নয়। এবার বলি তুমিও ভালই ছাত্র ছিলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে কর্পোরেটে অফিসের অনেক উঁচুতে উঠে এসেছ। তোমাকে বড়ো করার পেছনে তোমার বাবা-মার অবদানকে, তুমি কি অস্বীকার করতে পারবে?”

“আলবাৎ না। কিন্তু তখন থেকে তুই কী ধানাইপানাই করছিস বলতো? কী বোঝাতে চাইছিস?”

“তোমার হাতের গ্লাসটা কি খালি হয়ে গেছে? হয়ে গেলে আর এক পেগ ঢাল”।

“আবে, তোর কথামতো চলব নাকি, অলরেডি আমার ঢালা হয়ে গেছে”।

“গুড। তাহলে ধৈর্য ধরে শোন। তোমার বাবা যখন তোমাদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন, তোমার দাদু সেটা মেনে নেননি। দাদুর কথা না শুনেও তোমার বাবা এসেছিলেন, শহরে এসে লেখাপড়া শিখতে সুবিধে হবে বলে। তাও তোমার বাবা-মা কি তোমার দাদু-ঠাকুমাকে কোনদিন অশ্রদ্ধা করেছেন?”

“কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমি একটু বড় হতেই দাদু-ঠাকুমা সব রাগ-অভিমান ঝেড়ে ফেলে আমাদের কাছেই এসে থেকে গিয়েছিলেন”।

“ঠিক, তুমি তোমার দাদুর থেকে তাঁর বাবা, কিংবা তাঁর দাদুর কথা কোনদিন শোননি? অথবা তোমার ঠাকুমার থেকে তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তাঁর বাবা-মা-ভাই-বোনদের গল্প”?

“ওফ, সে সব দিনের কথা মনে করিয়ে মনটা খারাপ করিয়ে দিলি, মাইরি। ছোটবেলায় পাশে বসিয়ে ঠাকুমা আর দাদু এমন গল্প করতেন, বাবার – ছোটবেলাটা যেন চোখের সামনে দেখতে পেতাম। মাঠ-ঘাট, পুকুরপাড়, তালগাছের সারি, গাঁয়ে ঢোকার মুখে বড় একটা অশ্বত্থ গাছ...আহা ফ্ল্যাশব্যাকে সিনেমা দেখার মতো...”

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে স্বপনদার কথা শুনতে লাগলাম – স্বপনদা আপন মনে কথা বলেই চলেছে। কিছুক্ষণ পরে স্বপনদার টনক নড়ল, বলল, “হতভাগা, চুপ করে গেলি, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি, শালা?”

আমি হাসলাম, বললাম, “না রে, বাবা, তোমার স্মৃতিচারণ শুনছিলাম মন দিয়ে। সে যাক, এ ভাবেই তুমি যদি পিছিয়ে যেতে থাক... আমাদের পারিবারিক ইতিহাস কেউই মনে রাখেনি, লিখেও রাখেনি...কিন্তু ভারতের বা বাংলার ইতিহাস তো জানি...। আমাদের বা তোমাদের এই পূর্বপুরুষরা কত বিপদ-আপদ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ঝড়-ঝাপটা, বন্যা, খরা, সামলেছেন, চিন্তা করতে পারো? ইংরেজ শাসন, তার আগে পলাশীর নবাবী আমল, বর্গী আক্রমণ, তারও আগে পাঠান রাজত্বের শুরু, সেনরাজাদের পতন...। অনুমান করার চেষ্টা কর, এই সমস্ত রাজনৈতিক পালাবদলের সময় তাঁদের সুদীর্ঘ জীবনসংগ্রামের ইতিহাস! সে কথা কোথাও লেখা নেই...তাই বলে ভুলে যাবো?”

“কী বলছিস রে, আমার তো গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠছে...দাঁড়া, দাঁড়া...একটু সামলাতে দে...”

আমি চুপ করে রইলাম। আওয়াজে মনে হল স্বপনদা খালি গ্লাসে আরেক পেগ ঢালল, তারপর বলল, “নেশাটা জমে আসছিল, কিন্তু এমন সব চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দিলি... নে আর কী বলবি বল”।  

“আর তো বেশি কিছু বলার নেই, স্বপনদা, এইটুকুই বলার যে আমাদের এই জীবন যাঁদের সুদীর্ঘ জীবন-সংগ্রামের জন্য আমরা আজ পেয়েছি, সেই সব অজানা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা জানানোটা কি কুসংস্কার – নাকি অন্ধ ধর্মবিশ্বাস”?

“বুঝলাম। কিন্তু সংস্কৃত ওই মন্ত্রগুলো”?

“তোমার কি সংস্কৃততে এলার্জি, তাহলে কোনটা শুনতে বা বলতে তোমার সুবিধে হবে, বাংলা না ইংরিজি?”

“প্যাঁক দিচ্ছিস? দে। কিন্তু বাংলাতেই বল”।

“আচ্ছা শোন। অন্য সব বিধিবিধান বাদ দিয়ে পিতৃতর্পণ দিয়ে শুরু করি? তর্পণ মানে জানো তো? তৃপ্তি সাধন অর্থাৎ পূর্বপুরুষদের তৃপ্তি দান। সে তৃপ্তি কী আর গঙ্গাজল আর কালোতিলের অঞ্জলি দিয়ে হয়? না, ওটা বহিরাচার – তুমি যে তাঁদের স্মরণ করছ, তাতেই তাঁরা তৃপ্ত হবেন। বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমা বেঁচে থাকলে কিন্তু তাঁদের নামে তর্পণ হবে না, হবে শুধুমাত্র মৃত ও মৃতাদের উদ্দেশে। তোমার পূর্বপুরুষদের কতজনের নাম জানো?”

“আমি? ধুস্‌, দাদু-ঠাকুমার নাম জানি, তার আগেকার কিছুই জানি না। বাবা জানতেন, মনে হয় বাবার কোন ডায়েরিতে লেখা আছে”।

“দেখে নিতে পারো। সাতপুরুষের নাম – মানে বাবার তরফে দাদু ও ঠাকুরমাদের নাম, মায়ের তরফে দিদিমা, দাদামশাইদের নাম। বুঝতেই পারছ, এক এক জনের নাম বলে, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ পিতামহ, প্রবৃদ্ধপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ ইত্যাদি এবং একইভাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে পিতামহী, প্রপিতামহী, মাতামহী, প্রমাতামহী এরকম। প্রত্যেকের জন্যেই তিনবার করে, না পারলে অন্ততঃ একবার করে বলবে, “হে পিতামহ/ পিতামহী, আমার এই সতিল জলাঞ্জলি গ্রহণ করে তৃপ্ত হও বা তৃপ্তা হও”। কি, খুব শক্ত কিছু?”

“না, আগে আমাকে নামগুলো যোগাড় করতে হবে”।

“সে কাল সকালে খুঁজে দেখ। কিন্তু এরপর যা বলব শুনে আশ্চর্য হবে, আমাদের ইতিহাসের কিছু কিছু টুকরোও হয়তো খুঁজে পাবে...”।

“কিরকম?”

ওঁ নমঃ আ-ব্রহ্মভুবনাল্লোকা, দেবর্ষি-পিতৃ-মানবাঃ ,

তৃপ্যন্তু পিতরঃ সর্ব্বে , মাতৃ-মাতামহাদয়ঃ

এর মানে হচ্ছে, ব্রহ্মলোক থেকে শুরু করে, সকল লোকে বাস করা জীবগণ ( যক্ষ, নাগাদি), দেবর্ষি (মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরাদি ), পিতৃগণ, মনুষ্যগণ ( সনক, সনন্দ প্রভৃতি ), পিতা-পিতামহাদি এবং মাতা-মাতামহাদি সকলে তৃপ্ত হোন”

“সেই তো তুই ঘুরেফিরে ব্রহ্মা আর ঋষি এনে হাজির করলি”।  

“বাঃ, এই ঋষি, মনীষীরা না থাকলে ভারতীয় সংস্কৃতি থাকত কোথায়? আচ্ছা বেশ, পৌরাণিক মনীষীদের ছেড়েও যদি দাও – কালিদাস, বরাহমিহির, আর্যভট্ট, বিষ্ণুগুপ্ত থেকে সেদিনের রবিঠাকুর, বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ এমনকি সত্যজিৎ রায় – এঁরাও কি মনীষী নন? তাঁদের শ্রদ্ধা জানালে খুব কুসংস্কার হয়ে যাবে?”

“হতভাগা, তুই বেজায় ধুরন্ধর। আচ্ছা, তারপর বল”।     

আমি হাসলাম, বললাম, “অতীত-কুলকোটীনাং, সপ্তদ্বীপ-নিবাসিনাং

                        ময়া দত্তেন তোয়েন, তৃপ্যন্তু ভুবনত্রয়ং ।

অর্থাৎ অতীতের কোটি কোটি কুলের মানুষ, সপ্তদ্বীপের বাসিন্দা (জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলি, কুশ, ক্রৌঞ্চ, শাক, পুষ্কর, এই সপ্তদ্বীপ) সমুদয় মানুষ এবং ত্রিভুবনের সব্বাই আমার এই জলে তৃপ্ত হোন”।

“আবার ঢপের গল্প এনে ফেললি, সপ্তদ্বীপ আর ওই ত্রিভুবন”।

“ঠিক আছে, ওসব বাদ দিয়ে অখণ্ড ভারতভূমির সমুদয় মানুষ বল, তাহলে হবে তো?”

“চলবে, এগো”।

“এরপরেই, যে কথা আগে বলেছিলাম, আসছে ইতিহাসের সামান্য আভাস।

ওঁ নমঃ যে বান্ধবা অবান্ধবা বা, যে অন্য জন্মনি বান্ধবাঃ

তে তৃপ্তিং অখিলাং যান্ত, যে চ অস্মৎ তোয়-কাঙ্খিণঃ ।

যেমন, আমার যে আত্মীয়রা কখনো অবান্ধব হয়েছেন, পরে আবার কখনো বান্ধব হয়েছেন, তাঁরাও আমার জলের অর্ঘ্যে তৃপ্ত হোন”।

“এতে ইতিহাসের আভাস কোথায় পেলি?”

“ধরো, অতীতে দেশ ও সামাজিক পরিস্থিতিতে, আমাদের কোন জ্ঞাতি-আত্মীয় হয়তো শত্রুতা করেছিলেন বা শত্রুপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিই হয়তো পরে নিজের ভুল বুঝে আবার মিত্র হয়েছেন...তাঁরাও আমার হাতের জলে তৃপ্ত হোন”।

“বড্ডো গোঁজামিল দিচ্ছিস মনে হচ্ছে”।

“বোধ হয় না, পরেরটা শুনলে আরও স্পষ্ট হবে।

ওঁ নমঃ অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে জীবা, যেহপ্যদগ্ধাঃ কুলে মম

ভূমৌ দত্তেন তৃপ্যন্তু, তৃপ্তা যান্ত পরাং গতিং ।

যেমন, যাঁদের মৃতদেহের দাহ হয়েছে, অর্থাৎ সৎকার হয়েছে, আবার যাঁদের মৃতদেহের সৎকার হতে পারেনি, তাঁরাও আমার হাতের জলে তৃপ্ত হোন। অবশ্য এই জল সিঞ্চিত করতে হবে মাটিতে - জলে নয়। মৃতদেহ সৎকার হতে পারেনি, এর অর্থ অনেককিছু হতে পারে। মহামারী, দুর্ভিক্ষ, প্লাবন, ঝড়-ঝঞ্ঝার পরে অজস্র মৃতদেহের যে সৎকার হয় না, এ কথা আমরা সকলেই জানি। করোনা কালে এমন ঘটনা আমরা অজস্র দেখেছি। কাজেই এমনটা যে আগেও ঘটেছে, সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। আবার বর্গী, হার্মাদ দস্যুদের, শত্রুরাজ্যের আক্রমণে গ্রামকে গ্রাম যখন ধ্বংস হয়েছে, সেক্ষেত্রে কে করবে আত্মীয়দের দেহ সৎকার? আমরা সেই মানুষদেরও স্মরণ করে যদি দু-বিন্দু জল অর্পণ করি, সেটাকে তুমি বোগাস, কুসংস্কার বলবে?”

“আর কেউ আছে?”

“আছে বৈকি।

ওঁ নমঃ যে চাস্মাকং কুলে জাতা, অপুত্রা-গোত্রিণো মৃতাঃ

তে তৃপ্যন্তু ময়া দত্তং, বস্ত্র-নিষ্পীড়নোদকং ।

এঁরা হলেন, আমাদের বংশের সন্তানহীনা নারীরা। সন্তানহীনা নারী বন্ধ্যা হতে পারেন অথবা তিনি বাল-বিধবাও হয়ে থাকতে পারেন। অভাগী সেই নারীদের স্বামীর মৃত্যুর অনেক কারণ থাকতে পারে, অসুখ, দুর্ঘটনা, অথবা ওই আগের মন্ত্রে মহামারী, দুর্ভিক্ষ, প্লাবন ইত্যাদি যা যা বললাম, যে কোন একটা হতে পারে। তবে এঁদের জল দেওয়া হচ্ছে পরনের ভিজে কাপড় নিংড়ানো জল দিয়ে”।  

“কাপড় নিংড়ানো জল? ছ্যাঃ, কেন?”

“জানি না গো, স্বপনদা, মন্ত্রকার কী চিন্তা করে এমন লিখেছিলেন। তোমার পছন্দ না হলে, তোমার যেমন পছন্দ সেভাবেই দিও। ক্ষতি কি?” 

“হুঁ। তুই বেশ ভাবিয়ে তুললি, সংস্কৃত বুঝতাম না, বা বলা ভাল সেভাবে বুঝতে চেষ্টাও করিনি কোনদিন। তোর কথায় বুঝলাম এটা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান তো নয়”।

“একটা জাতের মানসিক ব্যাপ্তিটা বুঝতে পারছ, স্বপনদা? হাজার-হাজার বছরের আত্মীয়-অনাত্মীয় সকল মানুষকে মনে করে, বিশেষ দিনে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো... এই আশ্চর্য ঐতিহ্যকে আমরা অন্ধ বিশ্বাস বা কুসংস্কার বলে অবহেলা করব...?”  

দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বপনদা বলল, “না রে, অন্ধ সংস্কার বলে মনে তো হচ্ছে না। বছরের একটা দিন মিনিট পনের-কুড়ির জন্যে পূর্বপুরুষদের কথা মনে না করার, তেমন কোন যুক্তিও খুঁজে পাচ্ছি না। তাতে আমাদের পূর্বপুরুষরা তৃপ্তি পাবেন কিনা জানি না, আমি তো নিশ্চিত পাব। রাখছি রে, বাবার ডাইরিটা বের করে, কাল সকালে তোকে আবার ফোন করব। গুড নাইট”।

 ...০০...

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...