বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১০

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ১০

শৌনক বললেন, “স্বয়ং জন্মরহিত অর্থাৎ ভগবান মানুষের কাছে নিজের তত্ত্ব জানাবার জন্যই সাংখ্য প্রবর্তক কপিলরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। ভগবান পুরুষোত্তম এবং সকল যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যিনি এই কীর্তির কথা শোনেন, ভগবান তাঁর মধ্যে প্রকাশ হন”

সূত বললেন, “আত্মবিদ্যা বিষয়ে মহামতি বিদুর, ভগবান মৈত্রয়কে জিজ্ঞাসা করলেন।

  মায়ের কাছে মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “পিতা কর্দম অরণ্যে চলে যাওয়ার পর, শ্রীভগবান মায়ের কাছেই বিন্দুসর আশ্রমে বাস করতে লাগলেন। একদিন মাতা দেবহূতি দেখলেন, তত্ত্বমার্গের পথ প্রদর্শক তাঁর পুত্র সকল কর্ম ত্যাগ করে বসে আছেন। তাঁর মনে পড়ল, ব্রহ্মা বলেছিলেন, তাঁর এই পুত্র ভগবান শ্রীহরির অংশ। অতএব তিনি পুত্রের কাছে গিয়ে বললেন, “হে প্রভু, পরমেশ্বর, আমার মন ও ইন্দ্রিয় সর্বদাই বিষয়ের দিকে দৌড়ে চলেছে। বিষয়বাসনা পূর্ণ করতে করতে আমি সংসারের ঘোর অন্ধকারে ঢুকে পড়েছি। তুমিই জীবগণের নিয়ন্ত্রণকারক আদি ভগবান, তুমি অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবলোকের চোখে সূর্যের আলোর মতো উদয় হয়েছ। অতএব, হে ভগবান, আমার এই মোহ থেকে তুমি আমাকে মুক্তির পথ দেখাও। তোমার মায়ার প্রভাবেই আমার মধ্যে “আমি” ও “আমার” এই আসক্তি এবং সেই আসক্তি থেকেই আমার মধ্যে রাগ, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, শোক, তাপ ইত্যাদির সৃষ্টি হয়েছে। এই সংসারী পুরুষ কে, আর যার জন্যে পুরুষের এই সংসারভোগ, সেই প্রকৃতিই বা কে? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্যে আমি তোমারই শরণাপন্ন হলাম। প্রভু, আমি জানি, তুমি শরণাগতের আশ্রয়, তোমাকে আমি প্রণাম করি”

জননীর এই প্রশ্নে ভগবান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন, মৃদু হেসে বললেন, “মাতঃ, আমার মতে আত্মনিষ্ঠ যোগই মানুষের মুক্তির পথ। এই যোগে চিরকালের মত সুখ দুঃখের নিবৃত্তি হয়। জীবের চিত্তই হল তার বন্ধন বা মুক্তির কারণ। চিত্ত বিষয়ে আসক্ত হলে বন্ধনের কারণ হয়, আর পরমেশ্বরে আসক্ত হলে মুক্তি লাভ করা যায়। এই দেহ “আমি” আর এই স্ত্রীপরিবার, ঘর বিষয়আশয় “আমার”, এই অভিমান থেকেই কামনা, লোভ ও মনের মলিনতার সৃষ্টি হয়।  যখন এই মলিনতা মুছে গিয়ে মন শুদ্ধ হয়, তখন সুখে-দুঃখে সমান ভাবনা আসে। তখন জীবের অন্তরে শুদ্ধ আত্মার উপলব্ধি আসে। তিনি উপলব্ধি করেন এই আত্মা শুদ্ধ, ভেদজ্ঞানহীন, সূক্ষ্ম, নিখিল বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম ও নিজের রূপে উজ্জ্বল। যোগীগণের ব্রহ্মলাভ বিষয়ে, অখিল আত্মা ভগবানে নিরত ভক্তির মতো সুচারু পথ, অন্য আর কোন পথ নেই।  জ্ঞানীগণ বলেন, অসৎসঙ্গই জীবের বন্ধন, সাধুসঙ্গে মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। হে মাতঃ, সাধুব্যক্তির লক্ষণ কি, মন দিয়ে শোন। সাধুদের ধৈর্য রাখতে হয়, সকল জীবের প্রতি তাঁর করুণা ও বন্ধুভাব থাকতে হবে। তাঁর কোন শত্রু থাকবে নাতিনি শান্ত, শাস্ত্র বিশ্বাসী এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী হবেন। তাঁরা আমাকেই একান্ত ভক্তি করবেন এবং আমার জন্যেই সকল কর্ম ও স্বজন বন্ধুপরিজন ত্যাগ করবেনআমার প্রতি তাঁদের মন সর্বদা নিযুক্ত থাকার জন্যে, তাঁরা সংসারের জ্বালাযন্ত্রণায় বিব্রত হন না। হে মাতা, তোমার এই রকম সাধুসঙ্গই একান্ত প্রয়োজন, এই সঙ্গ থেকে সমস্ত দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই সৎসঙ্গ যে ভক্তির অঙ্গ তাও বলছি, শোন।

সাধুদের মুখে আমার কথা শুনলে অন্তরে পরমসুখ অনুভব করা যায়। আমার কীর্তির কথা শুনতে শুনতে আমার প্রতি প্রথমে শ্রদ্ধা, তারপরে অনুরাগ ও শেষে ভক্তির উদয় হয়। তারপর আমার সৃষ্টিলীলার কথা চিন্তা করতে করতে ইহলোকের ও পরলোকের ইন্দ্রিয়সুখের বাসনা দূর হয়ে যায়। এইভাবে জীব প্রকৃতির তিনগুণ ও বিষয়ের বাসনা থেকে নিবৃত্ত হয়ে জ্ঞান, বৈরাগ্য, অষ্টাঙ্গ যোগ ও আমাতেই অর্পিত ভক্তি দিয়ে আমাকে আত্মস্বরূপে লাভ করে থাকে”। 

[পণ্ডিতেরা বলেন সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক ঋষি কপিলের আবির্ভাবকাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। সে সময় তিনি নিজেকে ভগবান শ্রীহরি বলে জানতেন না, এবং তাঁর এই দর্শনে ঈশ্বর বা ভগবানের কোন উল্লেখ নেই। প্রায় হাজার বছর পর খ্রিস্টাব্দ চতুর্থ/ পঞ্চম শতাব্দীতে ভাগবত রচনার সময় (পুরাণকারের মহিমায়) তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে, তিনি শ্রীহরির অবতার - অতএব তাঁর দর্শনে ঘটে গেল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন - ঈশ্বরের অস্তিত্ব!]  

[কৌতূহল মেটাতে এই ব্লগের এই সূত্র "ধর্মাধর্ম - ৫/১" থেকে পড়ে নিতে পারেন মূল সাংখ্য দর্শনের সংক্ষিপ্ত  বক্তব্য।]       

মাতা দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন, “যে ভক্তি তোমাতে অর্পণ করতে হয়, সে কেমন ভক্তি? যে ভক্তির পথে আমার মতো নারী তোমার নির্বাণপদ খুব সহজেই লাভ করতে পারে, সেই ভক্তির পথ আমাকে দেখাও। হে ভগবান, আমি স্বল্পবুদ্ধি নারী, যে যোগের লক্ষ্য শুধুমাত্র তুমি এবং যে পথে পরমতত্ত্বজ্ঞান লাভ হয়, সেই যোগ কেমন এবং কতভাগে বিভক্ত? তোমার অনুগ্রহে আমি এই দুর্বোধ বিষয় যাতে সহজে উপলব্ধি করতে পারি, সেইভাবে তুমি আমাকে বলো।”

শ্রীভগবান জননীর জ্ঞানের প্রতি এই আগ্রহ দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং যে জ্ঞানে সকলতত্ত্ব নির্দিষ্ট জানা যায়, যে শাস্ত্রকে জ্ঞানীগণ সাংখ্যশাস্ত্র বলেন, সেই বিস্তৃত ভক্তি ও যোগের নির্ণায়ক শাস্ত্র বর্ণনা করার জন্য বললেন, “যাঁরা বেদ অনুযায়ী অহংকারহীন নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান করেন, তাঁদের আর কিছু করতে হয় না। তাঁদের জ্ঞান ও সমস্ত কর্মের ইন্দ্রিয় স্বাভাবিকভাবেই শ্রীহরির সত্ত্বমূর্তির প্রতি অনুরক্ত হয়। এই নিষ্কাম, একনিষ্ঠ চিত্তবৃত্তিই উত্তমা ভক্তি। এই ভাগবতী ভক্তি, মুক্তির থেকেও অনেক বড়ো। ভোজনের পর পেটের মধ্যে অন্ন নিজে নিজেই হজম হয়ে যায়, তার জন্যে জীবকে যেমন কোন চেষ্টা করতে হয় না। সেই রকম এই ভক্তি নিজে নিজেই লিঙ্গশরীরকে আত্মস্থ করে ফেলে, সুতরাং ভক্তকে আর মুক্তির জন্য কোন প্রয়াস করতে হয় না। যাঁরা আমার উদ্দেশে কর্মের অনুষ্ঠান করেন, নিরন্তর আমার চরণসেবা করেন এবং পরষ্পর মিলিত হয়ে আমার কীর্তিগাথা আলোচনা করেন, তাঁরা আর মোক্ষের জন্য অভিলাষ করেন না। সেই ভক্তেরা আমার প্রসন্নবদন ও  বরপ্রদ আমার দিব্যরূপ দর্শন করে থাকেন এবং ওই মূর্তির সঙ্গে মনোহর আলোচনা করতে থাকেন। অতএব জ্ঞান ও যোগের থেকে ভক্তিপথের শ্রেষ্ঠতা এই যে, এই পথে নিত্য পরমশ্বরের অনুভবসুখ লাভ করা যায়। আমাকে যাঁরা ভজনা করেন, আমার কমনীয় অবয়ব, মধুর লীলা, হাস্য, কটাক্ষ ও মধুরবচন তাঁদের সকল ইন্দ্রিয় ও চিত্তকে অভিভূত করে রাখে; তাঁরা ইচ্ছা না করলেও তাঁদের ভক্তিই তাঁদের মুক্তি দান করে।

[কপিল মুনির অন্তরে যেন শ্রীহরি নিজেই ভর করেছেন, তিনি তাঁর মুখ দিয়েই নিজের লীলা-মহিমা কীর্তন করছেন! ভাগবত পুরাণকারের ইচ্ছাতে কপিল মুনি যেন শ্রীহরির তোতাপাখি হয়ে উঠেছেন।] 

অবিদ্যার নিবৃত্তি হলে, ভক্তরা যদিও সত্য ইত্যাদি লোকের ভোগ সম্পত্তি, অণিমা ইত্যাদি অষ্ট ঐশ্বর্য অথবা বৈকুণ্ঠের সম্পদ কিছুই বাসনা করেন না, তবুও আমার বৈকুণ্ঠলোকে তাঁরা সব কিছুই পেয়ে যান। যে সকল ভক্ত আমাকে আত্মার মতো প্রিয়, পুত্রের মতো স্নেহপাত্র, সখার মতো বিশ্বাসী, গুরুর মতো উপদেষ্টা, সুহৃদের মতো হিতকারী এবং ইষ্টদেবতার মতো পূজ্য মনে করে আমার ভজনা করেন, আমার কালচক্র কখনও তাঁদের গ্রাস করে না। এই কারণে শুদ্ধসত্ত্বরূপ বৈকুণ্ঠে, তাঁরা কোন ভোগ্য বিষয় থেকেই বঞ্চিত হন না। আমিই প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষের নিয়ন্তা, সর্বভূতের আত্মা ভগবান। আমাকে ছাড়া অন্য বিষয়ে ভক্তি স্থাপন করলে জীবের মৃত্যুভয় দূর হয় না। আমার ভয়ে বাতাস বইছে, সূর্য উত্তাপ দিচ্ছে, ইন্দ্র বর্ষণ দিচ্ছে, অগ্নি দগ্ধ করছে ও মৃত্যু বিচরণ করছে। এই কারণে যোগীরা জ্ঞান ও বৈরাগ্যের সঙ্গে ভক্তিযোগে আমার পাদমূলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন এবং তাঁদের কোন ভয় ও সংশয় থাকে না। তীব্র ভক্তিতে জীবের চিত্ত যদি আমাতে অর্পিত হয় এবং আমাতেই অচঞ্চল থাকে, সেই জীবের পরমপুরুষার্থ লাভ হয়, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই”

 শ্রীভগবান বললেন, “এখন আমি তোমাকে সকল তত্ত্বের আলাদা আলাদা লক্ষণের কথা বলছি, যা বুঝতে পারলে পুরুষ প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে। পুরুষের আত্মদর্শনের জ্ঞান থেকে অহংকারের নিবৃত্তি ঘটে, পণ্ডিতেরা বলেন, এই জ্ঞান নিঃশ্রেয়স অর্থাৎ মুক্তির জন্য একান্ত জরুরি।  “আত্মাই পুরুষ, ইনি বিষয়ের বিপরীতে অবস্থান করেন। আত্মা অনাদি, এঁনার শুরু ও শেষ বলে কিছু নেই, ইনি ক্ষণস্থায়ী নন, ইনি সনাতন। আত্মা প্রকৃতির ঊর্ধে থাকেন, অতএব অসঙ্গ, সুতরাং স্বভাবতঃ সংসারী নন। ইনি নির্গুণ, সত্ত্ব, রজো ও তমঃ এই তিন গুণের অতীত। ইনি নিজেই প্রকাশিত হন, অতএব ইনি জ্ঞানের বিষয় বা জ্ঞানের আধার নন। এই বিশ্বে আত্মা বিরাজিত বলেই এই বিশ্বের প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতি বিষ্ণুর অব্যক্ত গুণময়ী শক্তি। প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের সঙ্গতেই এই সৃষ্টিলীলা ঘটে থাকে। এই প্রকৃতি নিজের গুণের অনুরূপ পদার্থ সকল সৃষ্টি করতে আরম্ভ করলে, পুরুষ এই জ্ঞানের আবরণকারিনী প্রকৃতিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ নিজের স্বরূপ ভুলে যায়। এই মোহ আবরণে আচ্ছন্ন হয়ে পুরুষ প্রকৃতিকেই “আমি” বলে মনে করতে থাকে। সকল কর্ম প্রকৃতির তিনগুণের কারণে অনুষ্ঠিত হলেও, পুরুষ নিজেকে সেই সব কর্মের কর্তা বলে মনে করেপুরুষ অকর্তা অর্থাৎ সাক্ষীস্বরূপ হয়েও যে কর্তার অভিমানে আচ্ছন্ন হয়, তাকেই  বন্ধন বলে। এই কর্মবন্ধন থেকেই স্বাধীন ও নির্বিকার পুরুষ, সুখ-দুঃখ, শোক-তাপ ইত্যাদি ভোগের অধীন হয়ে জন্ম মৃত্যুর শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে।

এই শরীরকে কার্য, ইন্দ্রিয়কে কারণ ও দেবতাদেরকে কর্তা বলা হয়ে থাকে।  অর্থাৎ স্বভাবতঃ নির্বিকার পুরুষ যে এই বিকার স্বভাব পায়, তার কারণ প্রকৃতি। অন্যদিকে সুখদুঃখ ইত্যাদির যে ভোগ হয়, তার কারণ প্রকৃতির পরস্থিত পুরুষ। অতএব সিদ্ধান্ত এই যে, দেহ ইত্যাদি প্রকৃতির পরিণাম, সেই দেহতে কর্তৃত্বের অনুভব আনে অহংবুদ্ধি। তবে যে পুরুষকে ভোগের কারণ বলে নির্দেশ করা হল, তার কারণ, চৈতন্য ছাড়া ভোগ হয় না”। 

দেবহূতি বললেন, “হে পুরুষোত্তম, সংসারী পুরুষ ও তার কারণ স্বরূপ প্রকৃতির বিষয়ে জানলাম। এখন আপনি সেই ঈশ্বর ও প্রকৃতির বিষয়ে বলুন, যাঁর থেকে জগতের সকল সূক্ষ্ম ও স্থূল বিষয়ের সৃষ্টি হয়েছে”

ভগবান বললেন, “প্রকৃতি স্বভাবতঃ বিশেষত্বহীন হলেও বিশ্বের সকল বিষয়ের আশ্রয়। এই প্রকৃতির তিনগুণ, অতএব নির্গুণ ব্রহ্ম নয়। প্রকৃতি কোন পরিণাম নয়, প্রকৃতি অব্যক্ত। প্রকৃতির কার্যকরণেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, সুতরাং প্রকৃতি কাল নয়। প্রকৃতিও নিত্য, অতএব সনাতন।

প্রধান থেকে অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগে চব্বিশটি তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই তত্ত্বসমূহকেই কার্য্যাত্মক ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড বলা হয়ে থাকে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু ও আকাশ এই পাঁচটি মহাভূত। এদের সূক্ষ্ম অবস্থার নাম পঞ্চতন্মাত্র, যেমন গন্ধতন্মাত্র, রসতন্মাত্র, রূপতন্মাত্র, স্পর্শতন্মাত্র ও শব্দতন্মাত্র। দশটি ইন্দ্রিয় হল, চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক, বাক-ইন্দ্রিয়, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ অর্থাৎ জনন-ইন্দ্রিয়। অন্তরের চাররকম বৃত্তির জন্যে চার ভাগ লক্ষ্য করা যায়, যেমন, মনঃ, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্ত। এই যে সগুণ ব্রহ্মের চব্বিশটি প্রপঞ্চ তত্ত্বের কথা বললাম, এছাড়াও আরেকটি তত্ত্ব আছে, তাকে কাল বলা হয়। কেউ কেউ বলেন, ঈশ্বরের প্রভাবই কাল, এই কাল পঁচিশতম তত্ত্বযারা প্রকৃতির বশীভূত হয়ে, দেহের অহংকারে “আমিই কর্তা” এমন অভিমান করে, তাদের কাছে কাল ভয়ংকর সংহারক মূর্তিতে দেখা দেয়। আবার অনেকে বলেন, যিনি প্রকৃতির তিনগুণের বিভেদকে সাম্য অবস্থায় প্রতিষ্ঠা করেন, তিনিই ভগবান কাল। এই ভগবান কে? যিনি নিজের মায়ায় সমস্ত জীবের অন্তরে নিয়ন্তারূপে এবং বাইরে কালরূপে বিরাজ করেন, তিনিই ভগবান।

চলবে...



মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮

প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৭ "


 

“খিদেয় পেট জ্বলে গেল রে, মা। কখন খেতে দিবি?” বেড়ার ওপাশ থেকে ভল্লা চেঁচিয়ে উঠল। তারপর দরজা দিয়ে ঢুকেই দেখল কমলিমা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে।

দরজা থেকে হাঁকডাক করে বলা ভল্লার ছদ্ম অভিযোগ কমলিমা বেশ উপভোগ করলেন। বহুদিন পর তিনি যেন সংসারের কেন্দ্রে অধিষ্ঠিতা হয়েছেন। হোক না সে সংসার বাউণ্ডুলেদের সংসার। তাঁর চোখে ভ্রূকুটি – কিন্তু মুখে হাল্কা হাসির আভাসটুকু টের পাওয়া যাচ্ছে। ভল্লা এবং রামালি দুজনেই যেমন আশ্চর্য হল, তেমন খুশিও হল।

কমলিমা কোমরে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, “বেলা সাড়ে তিন প্রহরে বাবুদের খাওয়ার কথা মনে পড়ল? যা গিয়ে মুখ-হাত-পা ধুয়ে আয়, আমি খাবার বাড়ছি”।

গতকাল রাত্রে কমলিমাকে তারা যে অবস্থায় দেখেছিল – একরাত্রেই তাঁর আমূল পরিবর্তন। একলা ঘরে যে মানুষটি শোকাচ্ছন্ন হয়ে, বেঁচে থাকার অর্থ হারিয়ে ফেলেছিলেন – সেই মানুষটিই আজ নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। ভল্লা আর রামালি ব্যাকুল হয়ে তাঁর কাছে মাতৃত্বের আশ্রয় দাবি করেছিল। দাবি বললেও ভুল হবে – গায়ের জোরে সে মাতৃত্ব তারা আদায় করার চেষ্টা করেছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাত্রের অন্ধকারে তিনি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন, ভোর হলেই তিনি ফিরে যাবেন নিজের ঘরে। কিন্তু ভোরের আলো স্নিগ্ধ বাতাস। গাছের নিবিড় পাতায় পাতায় মর্মরধ্বনি। অজস্র পাখির ডাক। উঠোনে ঘুমিয়ে থাকা দুরন্ত ভল্লার মুখ। আশৈশব মায়ের মমতা-বঞ্চিত রামালির ঘুমন্ত মুখের সরলতা। এই...এই সমস্ত কিছু নিয়ে উদয় হচ্ছে নতুন একটি দিন...। তাঁর অন্ধকার এবং অবসন্ন মনটি যেন জেগে উঠল। মনে হল, যেতে তো হবেই... সবাইকেই একদিন চলে যেতে হয়। ঈশ্বর তাঁকে জীবন দিয়েছেন, দিয়েছেন খুশি, আনন্দ এবং পাশাপাশি তীব্রতম শোকসমূহ। দেখাই যাক না, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর জন্যে কী রেখেছেন ঈশ্বর? তার জন্যে এত তাড়াহুড়ো কিসের?

গতকাল রামালির বাঁধা পুঁটলি খুলে তিনি কাচা শাড়ি আর গামছা নিয়ে নিঃশব্দে পুকুরে গিয়েছিলেন। নিত্যকর্ম সেরে ফিরে এসেছিলেন জল-ভরা কলসি নিয়ে। বেড়ার দুয়ারে জলছড়া দিয়ে তিনি ডেকেছিলেন, ভল্লা ওঠ। রামালি উঠে পড় – আর কতক্ষণ ঘুমোবি, বাবা?

ভল্লা আর রামালি পাশাপাশি বসে খাচ্ছিল। সামনে বসে পরিবেশন করছিলেন কমলিমা। খেতে খেতে ভল্লা বলল, “রামালি কিন্তু ভালই রান্না করে, জানিস মা? ছেলের অনেক গুণ, হ্যাঁ। তবে যাই বলিস রামালি – মায়েদের হাতে রান্নার যে স্বাদ খোলে – তেমনটি হয় না”।

কমলিমা ভল্লার পাতে একটা রুটি আর একটু ব্যঞ্জন তুলে দিয়ে বললেন, “হয়েছে, আমাকে ভালাই বুলিয়ে লাভ নেই, ভল্লা। তাড়াতাড়ি খেয়ে ওঠ – বিকেল হতে আর বাকি নেই”।

“ওই দ্যাখ আবার রুটি দিলি? বেশি হয়ে গেল। কিন্ত আমি বলি কি মা, তুইও আমাদের সঙ্গে বসে পড় না মা। সবাই মিলে গল্প করতে করতে খাওয়া যাবে”।

“ঠিক। জেঠিমা, তুমিও বসে যাও – সত্যিই বেলা তো পড়ে এল”। রামালিও বলে উঠল।

“তোদের হোক আমি খেয়ে নেব”।

ভল্লা থালা থেকে হাত তুলে নিয়ে বলল, “আমি আর খাবোই না। তুই খেতে শুরু কর, তারপর আমিও খাবো, নয়তো এই উঠলাম থালা ছেড়ে”।

কমলিমা যেন খুব বিরক্তভরেই থালায় রুটি আর ব্যঞ্জন বাড়লেন নিজের জন্যে। তারপর এক গ্রাস মুখ তুলে বললেন, “খুশি? সব ব্যাপারেই এমন জেদ করিস না ভল্লা, আমার একদম ভাল্লাগে না”।

ভল্লা গম্ভীর মুখ করে বলল, “কোনটা ভাল্লাগে না, রুটি-ব্যঞ্জন নাকি আমাদের দুজনকে?”

রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন কমলিমা – হেসে উঠল ভল্লা এবং রামালিও।

 মাঠে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ সকলের মহড়া দেখল ভল্লা। খুশিই হল ভল্লা। সকলকে ডেকে বলল, “চল আজকে আরেকবার আমাদের সেই পরিকল্পনাটা নিয়ে বসি। আজ কে আঁকবি – বাপালি আঁক – দেখি তোর কেমন মনে আছে?”

সকলে গোল হয়ে বসল মাঠের একধারে। সবার মাঝখানে নকশা আঁকল বাপালি। ভল্লা দেখে বলল, “বাঃ একবারেই ঠিকঠাক এঁকেছিস তো! কিন্তু এখানে একটা বিষয় জুড়তে হবে – আস্থানে আমাদের হানা দেওয়ার পর, চার কোনায় চারটে প্রহরা স্তম্ভ খাড়া করেছে উপানু। বারো হাত উঁচু মাচাতে দাঁড়িয়ে রাত্রে চারজন চার কোনা পাহারা দেয়। এটা আমরা জানতাম না, এখন জেনেছি। অতএব আমাদের পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন করতে হবে।

গত দুদিনের আলোচনায় আমাদের পরিকল্পনাটা মোটামুটি ঠিক হয়েই গেছে, তবু আরেকবার খুব সংক্ষেপে আমরা সেটা আলোচনা করে নিই।

১। পূবদিকের দরজা দিয়ে আমরা ঢুকব। অতএব পূবদিকের দুই স্তম্ভের দুই প্রহরীকে আগে মারতে হবে। কাজটা যে করবে – তার নাম এখন আমি বলব না – ধরা যাক গোলোক। আমাদের দলের বন্ধু। আমাদের সঙ্গেই সে থাকবে।

২। এই দুই স্তম্ভে উঠে যাবে আমাদের দুজন আহোক আর কিশনা। ওরা উঠে সব দিক দেখে সংকেত দেওয়ার পরে পূবের দরজা দিয়ে ঢোকা হবে। 

৩। আমরা চারজন – সুরুল, মইলি, রামালি, আমি – পূবের দরজা দিয়ে ঢুকে ওখানকার প্রহরীদের শেষ করব।

৪। প্রহরীদের থেকে চাবি নিয়ে দরজার তালাটা খুলে রাখব – কিন্তু দরজাটা হাট করে খুলে রাখব না। অন্য দিকের প্রহরীরা দেখতে পেলে তারা সন্দেহ করবে।

৫। উত্তর-পূর্ব কোনের স্তম্ভের প্রহরীকে গোলোক মারবে – স্তম্ভে উঠে যাবে মিকানি। মিকানি এবং আহোক সংকেত দিলে,  

৬। ডানদিকে রক্ষীদের ঘরের দরজায় শিকল তুলে দেব – পরে সব ঘরেরই শিকল তুলে দেব।

৭। উপানুকে – সে নিজের ঘরে বা অন্য ঘরে যেখানেই থাকুক, দরজা খুলিয়ে তাকে শেষ করবো। তারপর আমরা সংকেত দেব।

৮। পশ্চিম দিকে রাস্তার ওপারে ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে বিনেশ, দীপান, অমরা, বিশুন, বিনাই, কিরপা, বিঠল আর সুদাস। ওদের একটু পিছনে ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকবে আরও সাতজন। এদের কাজ হবে বিনেশদের মধ্যে কেউ আহত হলেই তার স্থানে একজন চলে যাবে। ওদের আরও একটু পেছনে থাকবে বাকি দশজন। এদের মধ্যে থেকে দুজন সঙ্গে সঙ্গে আহত ছেলেদের খাটুলায় তুলে – দ্রুত রওনা হয়ে পড়বে। কোথায় যাবে সে কথা পরে বলছি।  

৯। আমাদের সংকেত পেলে গোলোক দক্ষিণ-পশ্চিম কোনের প্রহরীকে মারবে এবং সেখানে উঠে যাবে বাপালি। আর গোলোক বিনেশদের সঙ্গে যোগ দেব।

১০। বাপালি আর মিকানির থেকে সংকেত পেলে বিনেশরা ঝোপের মধ্যে থেকেই পশ্চিমের তিন বা চার - যত জনকে হয় মারবে বা গুরুতর আহত করবে। ওপর থেকে বাপালি এবং পিছন থেকে আমরা ওদের একই সঙ্গে আক্রমণ করবো।

১১। পশ্চিম দরজার প্রহরীদের শেষ করে, আমরা বন্দীশালায় ঢুকব। কবিরাজমশাকে মুক্ত করে আনব। এর মধ্যে বিনেশরা সামনে চলে আসবে। গোলোক দরজা টপকে ঢুকে চাবিটা বের করবে – ও জানে চাবি কার কাছে থাকে। দরজা খুলে আমরা বেরিয়ে আসব। আমরা বেরিয়ে এলেই স্তম্ভের চারজনও দ্রুত নেমে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে। তারপর রণপা চড়ে আমরা নোনাপুরের দিকে নয় – যাবো অন্যদিকে। কোনদিকে যাবো, এবং কোথায় গিয়ে আমরা গা ঢাকা দেব – সে জায়গাটা আমরা কাল দেখতে যাবো”।

কথা শেষ করে ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ছেলেদের কিছুটা সময় দিল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, “কারো মনে কোন প্রশ্ন আছে?”

দীপান বলল, “কে কোথায় থাকবে যখন তুমি নাম ধরে ধরে বললে, তখন আমার একটু রাগ হয়েছিল – আমাকে কেন তোমাদের দলে রাখলে না? তারপর পুরোটা শুনে বুঝতে পারলাম – সবাই মিলে ভিতরে ঢুকে গুঁতোগুঁতি করে লাভের থেকে ক্ষতিই হবে বেশি… ভেতরে বাইরে সকলের অবস্থানই সমান গুরুত্বপূর্ণ”।

ভল্লা হাসল, বলল, “তোদের প্রত্যেকের ওপরে আমাদের প্রত্যেকের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে দীপান। সামান্য ভুল হলেই পুরো পরিকল্পনাটা ভেস্তে যাবে – আমাদের অনেককেই হয়তো প্রাণ দিতে হবে। আর কেউ আহত হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাপদ স্থানে পৌঁছে সে যেন চিকিৎসা পায় – সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার একজন ছেলেকেও হারাতে চাই না। আর কেউ কোন প্রশ্ন করবি?”

সুরুল বলল, “উপানুকে কে মারবে, ভল্লাদাদা, তুমি?”

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নাঃ। সে পুণ্য কাজটা রামালি আমায় করতে দেবে না। রামালি বলছে ও মারবে”।

সুরুল বলল, “রামালিদাদা কেন মারবে? ওর সঙ্গে উপানুর কিসের শত্রুতা? আমি ওকে মারব না রামালিদাদা – ওর মুখ আমি থেঁৎলে দেব – ভীলককাকাকে কীভাবে মেরেছিল আমি চোখের সামনে দেখেছি যে”।  

রামালি সুরুলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, বলল, “ঠিক আছে – তুই তোর মতো কর, আমি শুধু ওর হাত দুটো কাটবো, যে হাত দিয়ে ও আমাদের প্রধানমশাই, ভীলককাকা, কবিরাজমশাইকে মেরেছে – সে হাতদুটো আমি নেব”।

সুরুল রামালিকে বলল, “এইবার ঠিক হয়েছে, তারপর হতভাগা বাঁচবে কি মরবে, সে তার ভাগ্য”।

সুরুল আর রামালির এই নিষ্ঠুর আলোচনার মধ্যে ভল্লা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল অন্যান্যদের মুখভাব। বিকেলের মরা আলোয় ঠিক বোঝা গেল না – কিন্তু সকলেরই চোয়াল শক্ত এবং সকলেই সুরুল আর রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে ওদের বিবাদের বিষয় শুনছিল মন দিয়ে।

ভল্লা বলল, “সুরুল, রামালি, তোদের দুজনকেই বলছি। উপানু কিন্তু দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং ধূর্ত রক্ষী – তোরা যত সহজ ভাবছিস – ততটা সহজ নাও হতে পারে। তোদের কারও বিপদ দেখলে আমি কিন্তু হাত চালাবো…উপানু মরবেই – কিন্তু সে যেন মরার আগে কোন মতেই চিৎকার করে ওর রক্ষীদের সতর্ক করতে না পারে - তাতে আমরা মরবো… মনে রাখিস”।

সুরুল বলল, “নিশ্চয়ই”। রামালি বলল, “সে তুমি যা ভালো বুঝবে”।

“পরিকল্পনা নিয়ে আমার এখন আর কিছু বলার নেই। কাল আবার আলোচনা…ও না কাল আমরা তো সকলে মিলে আমাদের গোপন আস্তানা দেখতে যাবো… হ্যাঁ জায়গাটা দেখে কিছু হয়তো পরিবর্তন করতে হতে পারে। কিন্তু এখন আমি কয়েকটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা বলব, সকলেই খুব মন দিয়ে শুনবি,

আমরা কেউ কারো নাম ধরে ডাকবো না…আমরা সবাই সবাইকে “জুজাক” বলে ডাকবো – আমিও “জুজাকদাদা” নই – শুধু জুজাক। গোলোকেরও নাম হবে - জুজাক। আমরা এখন থেকেই অভ্যাস শুরু করব। কেন? কোনভাবেই আমাদের আসল নাম বা পরিচয় আস্থানের কেউ যেন জানতে না পারে। ঠিক আছে?

আমরা সকলেই কালো ধুতি পড়ব। আমাদের সকলের কোমরে গোঁজা থাকবে দা – পেটের দিকে নয় – পিঠের দিকে। শত্রু কাছাকাছি চলে এলে দা চালাতে আশা করি তোদের অসুবিধে হবে না।

আমরা সকলেই মুখে কালিঝুলি মাখব – যাতে আমাদের মুখগুলো চট করে কেউ মনে রাখতে না পারে।

রণপা নিয়ে আমরা সবাই যাবো – একটু দূরে নির্দিষ্ট জায়গায় সেগুলো রেখে পায়ে হেঁটে আস্থানের কাছাকাছি যাব। ফিরে এসে সেখান থেকেই যার যার রণপা নিয়ে দ্রুত ফিরে আসব।

চার-পাঁচটা কাঠের হাল্কা খাটুলি বানাতে হবে – কে দায়িত্ব নিবি? কবিরাজমশাইকে বয়ে আনতে হবে – উনি হাঁটতে পারছেন না। তাছাড়া আমাদের মধ্যেও যদি কেউ আহত হয় – তাকেও ফেলে আসা যাবে না”।

সুরুল বলল, “বুঝেছি জুজাক, আমাদের গ্রামের ছেলেরা বানাবে – কাল দুপুরের মধ্যে দিয়ে যাবে – পাঁচখানা”।

“বাঃ। কিন্তু জুজাক – খাটুলিটা একটু অন্যরকম বানাতে হবে – রণপা চড়ে চারজনের কাঁধে খাটুলি বওয়া সম্ভব হবে না। মাঝখানটা ঠিক থাকবে – কিন্তু মাথার দিকটা ছোট হয়ে আসবে – যাতে একজনেরই দুই কাঁধে ঠিকঠাক বসে যায়। বোঝা গেল? চারজন নয় – সামনে পিছনে দুজন খাটুলি কাঁধে একসাথে দৌড়বে”।

সুরুল বলল, “বুঝে গেছি, ওভাবেই বানিয়ে দেব”।

ভল্লা বলল, “তোদের বাড়িতে পরিষ্কার পুরোনো কাপড় আছে? পারলে কালকেই সবাই একটা করে নিয়ে আসবি। সাদা যেন না হয় – গভীর রঙ - কালো হলে খুব ভালো। ওগুলো ছিঁড়ে মোটা ফালি করে আমরা সবাই মাথায় মুখে বাঁধব – আবার প্রয়োজনে কারো ক্ষতও বাঁধা যাবে”।

আমাদের চলাফেরা, গোপনে বসে থাকা যতটা নিঃশব্দে করতে পারবো, আমরা ততই নিরাপদ থাকবোঅতএব হাঁচি, কাশি, আওয়াজ করে হাঁই তোলা, ঢেঁকুর তোলা, বাতকম্মো করা - সব নিষিদ্ধ। ধরা যাক প্রহরী স্তম্ভে আমাদের যে জুজাক বসে আছে – সে হঠাৎ হ্যাঁচ্চো করল – নীচেয় আমরা চমকে উঠবো, আর প্রহরীরা সতর্ক হয়ে উঠবে

ভল্লা একটু থেমে বলল, “আজ এই অব্দিই থাক। বেশি দেব না, মাথা ঝিমঝিম করবে”।

রামালি বলল, “হ্যাঁ জুজাক, আমাদেরও এবার ফিরতে হবে, বালিয়া আসবে, বড়্‌বলা এসে বসে থাকবে”।

ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আস্থানের নকশাটা মুছে ফেল। বেশি রাত করিস না। বাড়ি ফিরে ঘুমটাও জরুরি। চলি রে, কাল সকালে আসব, আর একটু বেলা করে আমরা যাব আমাদের গোপন আস্তানা দেখতে”।


চলবে... 



সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৫

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৪ "]


৫.৪.৩ শিব - শৈব

শিবের উদ্ভব বৈদিক দেবতা রুদ্র থেকে। রুদ্র পৃথ্বীলোকের দেবতা এবং তিনি একাদশ রুদ্র অর্থাৎ অগ্নিরূপে তাঁর এগারোটি রূপ – অতএব তিনি ভীষণ তেজোময় ও শক্তিশালী। কিন্তু তাঁর প্রকৃতি বিষ্ণুর একেবারেই বিপরীত। তিনি শ্মশানে-মশানে থাকেন। তাঁর ত্রিনয়ন, তাঁর মাথায় বিশাল জটা, পরনে বাঘের ছাল, সারা গায়ে ভস্ম মাখা। সাধারণ মানুষের কাছে যা কিছু ভয়ংকর সে সবই তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। যেমন তাঁর অলঙ্কার সাপ, তাঁর সঙ্গী সাথীরা সকলেই ভূত, প্রেত, পিশাচ। অথচ তাঁর জটাতেই স্বর্গ থেকে মন্দাকিনীর পতন এবং সেখান থেকে মঙ্গলময়ী গঙ্গার উৎপত্তি। তাঁর জটায় চন্দ্রকলা শোভা পায়। পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি ত্রিদেবের মহেশ্বর – ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, মহেশ্বর হয়ে তিনি ধ্বংস করেন। অতএব তিনিই মহাকাল, রুদ্র ভৈরব। তবে অধিকাংশ সময়েই তিনি শিব, পরম মঙ্গলময়, রক্ষাকর্তা।  তিনি যখন শিব – তিনি আশুতোষ - খুব অল্পেই তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যান। কিন্তু ক্রুদ্ধ হলে তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে ঝলসে ওঠে অগ্নি।

হিমালয়ের কৈলাস পর্বতেই তাঁর স্থায়ী অধিষ্ঠান এবং সর্বদাই তিনি ধ্যান করতে থাকেন। তিনি মহাযোগী তপস্বী, যোগ সমাধিতেই তিনি জগতের মঙ্গলামঙ্গল নিয়ন্ত্রণ করেন। ভারতের সকল যোগীদের তিনি যোগগুরু, তাঁর অনুসরণেই সকলে যোগ অনুশীলন করেন। একদিকে তিনি যেমন সকল তপস্বীদের যোগ-সমাধি গুরু আবার অন্যদিকে তিনি নৃত্যগুরুও। তিনি নৃত্যের স্রষ্টা নটরাজ। তিনিই ভারতের নৃত্যকলার স্রষ্টা। কিন্তু ক্রুদ্ধ হয়ে যখন তিনি নৃত্য করেন, তখন ধ্বংস হতে থাকে সৃষ্টি, সে নৃত্যের নাম প্রলয় বা তাণ্ডব নৃত্য।

 ৫.৪.৩.১ দক্ষ-যজ্ঞ

ভগবান শিবের দক্ষ-যজ্ঞ কাণ্ডটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন পুরাণে এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাভারতেও এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন স্বয়ং কৃষ্ণ। প্রথমে শ্রীমদ্ভাগবত (চতুর্থ স্কন্ধ, অধ্যায় ২, , , , ৬) থেকে ঘটনাটির সংক্ষেপে বিবরণ দিচ্ছি। 

সত্যযুগে প্রজাপতি দক্ষ একবার “শিব-হীন” যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, অর্থাৎ সেই যজ্ঞে রাজা দক্ষ সকল দেবতাদের নিমন্ত্রণ করলেও শিবকে নিমন্ত্রণ করেননি। এই দক্ষের কন্যা ছিলেন সতীদেবী, শিবের প্রথমা পত্নী। শিবের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও, সতীদেবী এই যজ্ঞের সময়েই পিতৃগৃহে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পিতা দক্ষ, কন্যা সতীদেবীর সামনেই, শিবের কঠোর সমালোচনা এবং নিন্দা করলেন। স্বামীর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে, দক্ষের যজ্ঞ সভাতেই সতীদেবী অগ্নি-সমাধিযোগে[1] নিজের প্রাণ আহুতি দিলেন।

এই সংবাদ যখন কৈলাসে শিবের কাছে পৌঁছল, ভগবান শিব রুদ্র-ভৈরব হয়ে উঠলেন, তিনি জটা থেকে একগাছি চুল ছিঁড়ে মাটিতে ফেলা মাত্র বীরভদ্র নামে তাঁর ভয়ংকর এক অনুচর উপস্থিত হলেন। তাঁর আকাশস্পর্শী দেহ, সহস্র বাহু, তিনটি চোখ যেন সূর্যের মতো উজ্জ্বল, গলায় নরকপাল মালা, গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। বীরভদ্রকে ভগবান ভৈরব বললেন, “তুমি অতীব রণদক্ষ, তোমার সমস্ত অনুচরদের সঙ্গে নিয়ে যাও, দক্ষের যজ্ঞে অনর্থ ঘটাও এবং দক্ষকে বধ করো”। বীরভদ্র প্রভুর আদেশে তাঁর অনুচরদের নিয়ে দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। তাদের কেউ বেঁটে, কারও গায়ের রং পিঙ্গল, কারও হলুদ, কারও কারও মুখ ও উদর মকরের মত। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই যজ্ঞস্থল লণ্ডভণ্ড করে দিল এবং বীরভদ্র দক্ষের শিরশ্ছেদ করে, কাটা মুণ্ড যজ্ঞের আগুনে দগ্ধ করে, কৈলাসে ফিরে এলেন।

এই যজ্ঞে নিমন্ত্রিত হয়েও ব্রহ্মা ও বিষ্ণু উপস্থিত ছিলেন না, কারণ শিব-হীন যজ্ঞে তাঁদের অনুমোদন ছিল না। কিন্তু দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত যে দেবতা ও মুনি-ঋষিরা বীরভদ্র ও তার সঙ্গীদের হাতে আহত হয়েছিলেন, তাঁরা ব্রহ্মার কাছে এসে অনুরোধ করলেন, ভগবান শিবকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক এবং অসম্পূর্ণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ করা হোক। ব্রহ্মা সদলবলে কৈলাসে গেলেন শিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

স্বয়ং ব্রহ্মাকে সামনে উপস্থিত দেখে দেবাদিদেব শিব আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং নতমস্তকে ব্রহ্মার বন্দনা করলেন। তার উত্তরে, ব্রহ্মা সহাস্যে বললেন, “তুমি যদিও আমাকে প্রণাম করলে, তবুও আমি তোমাকেই এই বিশ্বের ঈশ্বর বলেই জানি। যেহেতু এই জগতের যোনিরূপা প্রকৃতির ও বীজস্বরূপ পুরুষের তুমিই একমাত্র কারণ। তৎসত্ত্বেও তুমি নির্বিকার ব্রহ্মরূপে বিরাজ করে থাক। হে ভগবন, তুমি নিজের অংশ থেকে জাত এই প্রকৃতি ও পুরুষ থেকেই, খেলার ছলে ঊর্ণনাভি[2]-র মতো এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক।  বেদ-ধর্ম রক্ষার জন্যে তুমিই যজ্ঞের সৃষ্টি করেছিলে, তুমিই এই যজ্ঞের বিধি বিধান নির্দিষ্ট করেছিলে। হে মঙ্গলময়, যারা শুভকার্যের অনুষ্ঠান করে, তুমি তাদের স্বর্গ বা মোক্ষ দান করে থাক, আর যারা পাপ আচরণ করে তুমি তাদের নরক বিধান করে থাক। হে রুদ্র, তুমি প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করায়, ওই যজ্ঞ অসমাপ্ত রয়েছে। তুমি সর্বজ্ঞ, অতএব তুমি ওই যজ্ঞে উপস্থিত থেকে, ওই যজ্ঞ সম্পন্ন করাও। যজমান দক্ষ আবার জীবিত হোক, অন্যান্য দেবতা, মুনি-ঋষিদেরও সুস্থ করে দাও”। আশুতোষ ব্রহ্মার কথায় সন্তুষ্ট হলেন, বললেন, “সকলেই সুস্থ হোক। কিন্তু দক্ষের মাথা, যজ্ঞের আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছে, অতএব এখন তাঁর দেহে ছাগলের মুণ্ড সংযুক্ত করতে হবে। আর আরব্ধ যজ্ঞ সম্পাদনের আয়োজন শুরু হোক”।

অন্য পৌরাণিক কাহিনী থেকে পাওয়া যায়, সতীদেবীর দেহত্যাগের সংবাদ পেয়ে ভগবান রুদ্র নিজেই এসেছিলেন তাঁর অনুচরদের নিয়ে। দক্ষের যজ্ঞস্থল লণ্ডভণ্ড করে দেওয়ার পর, পত্নীর শোকে সতীদেবীর মৃতদেহ নিজের কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেছিলেন। সেই ভয়ংকর নৃত্যের নামই “তাণ্ডব”। সেই নৃত্যে জগতে প্রলয় শুরু হয়ে যাওয়াতে, বিষ্ণু তাঁর চক্র দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন, সতীদেবীর শব। সেই শব মোট একান্নটি টুকরো হয়ে দেশের যেখানে যেখানে ছড়িয়ে পড়েছিল, সে স্থানগুলিই হয়ে উঠেছিল শক্তিপীঠ। তাঁরা সকলেই হয়ে উঠলেন আদ্যাশক্তি মহামায়ার একান্নটি মাতৃকামূর্তি - ভগবান শিবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ দেবীসতীর অবিনশ্বর রূপ। সে কথা পরে আসবে।

এবার মহাভারতের দক্ষযজ্ঞ পর্বের (অনু/১৬০) দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাজা যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, “প্রজাপতি ব্রহ্মা বহুকাল তপস্যা করে, ভগবান ভূতপতির মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছেন। ভবানীপতি এই স্থাবর-জঙ্গমাত্মক পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। এই ত্রিলোকে তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর সমতুল্য আর কেউ নেই। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে রণক্ষেত্রে দাঁড়ালে, শত্রুরা তাঁর গায়ের গন্ধেই ভয়ে কাঁপতে থাকে, জ্ঞান হারায়, অনেকে মারাও যায়। একবার প্রজাপতি দক্ষ বিপুল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন কিন্তু সেখানে তিনি ভবানীপতির যজ্ঞভাগ বিবেচনা করেননি। ভবানীপতি ক্রুদ্ধ হয়ে ভয়ংকর গর্জনে যজ্ঞস্থল বিদ্ধ করলেন। ওই সময় মহাদেবের জ্যা[3]শব্দে উপস্থিত দেবতা, অসুর সকলেই আতঙ্কিত এবং পৃথিবীও কেঁপে উঠল। এরপর রুদ্রদেব দেবতাদের দিকে দৌড়ে গিয়ে ভগের দুই চোখ উপড়ে নিলেন এবং লাথি মেরে পূষা[4]-র দাঁত ভেঙে দিলেন। দেবতারা রুদ্রের এই ভয়ংকর রূপ দেখে তাঁকে প্রণাম করতে লাগলেন, করজোড়ে শতরুদ্রীয় মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। তাতে দেবাদিদেব কিছুটা শান্ত হয়েছেন দেখে দেবতারা তাঁর জন্যে বেশ বড়ো রকম যজ্ঞভাগ নির্দিষ্ট করলেন। ভগবান ভূতভাবন এবার সন্তুষ্ট হয়ে, যজ্ঞের প্রতিষ্ঠা করলেন এবং নষ্ট হওয়া উপচারের সংস্থাপন করলেন”।

 এই কাহিনীর পৌরাণিক এবং মহাভারতীয় বর্ণনা থেকে অনেকগুলি বিষয়ে সন্দেহ আসে, যেমন,

১. পুরাণে ব্রহ্মা এবং মহাভারতে কৃষ্ণ দুজনেই বলছেন, মহাদেব এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। তাহলে দক্ষ তাঁকে যজ্ঞে আমন্ত্রণ করলেন না বা যজ্ঞভাগ নির্দিষ্ট করলেন না কেন? মহাদেবকে তিনি কি দেবতা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি? মহাদেব কি, বৈদিক রুদ্র হিসেবে তখনো পূর্ণ দেবত্বে অধিষ্ঠিত হননি? প্রতিপত্তিশালী অনার্য দেবতা হিসেবে ব্রাহ্মণ্য সমাজের অভিজাত মহলে তখনও তিনি পূর্ণ স্বীকৃতি পাননি? তাহলে তাঁর হাতে দক্ষ নিজের কন্যাকে দান করেছিলেন কেন? কিন্তু সতীদেবীর আচরণে মহাদেবের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং ভালোবাসার কোন ত্রুটি তো দেখা যায়নি।

২. পুরাণ এবং মহাভারতের বর্ণনায় দক্ষের যজ্ঞস্থলে ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু উপস্থিত ছিলেন না। দক্ষের সিদ্ধান্তের কথা তাঁরা দুজনেই জানতেন এবং মহাদেব যে ছেড়ে কথা বলবেন না, এটা বুঝেই তাঁরা বিপদ এড়িয়ে গিয়েছিলেন?

৩. ভগবান কৃষ্ণ তাঁর পরাক্রমের বর্ণনায় “গায়ের গন্ধ"-র উল্লেখ করলেন কেন? কোন বীরের বীরত্বের বর্ণনায় এখনও পর্যন্ত গায়ের গন্ধেই শত্রু নিপাত হয় এমন শোনা যায়নি। মহাদেবের সঙ্গী বা অনুচরেরা ভূত, প্রেত, তাঁদের চেহারার বর্ণনার মধ্যেও ব্রাহ্মণ্য শ্লেষ ধরা পড়ছে। অনার্য মানুষদের তাঁরা যেমন রাক্ষস, দানব এবং দৈত্য বলে বিকট এবং ভয়াল চেহারার বর্ণনা দিয়ে থাকেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম করেননি। 

৪. অতএব, দক্ষযজ্ঞ ঘটনার বিশ্লেষণ করলে এমন অনুমান করাই যায়, মহাদেব ছিলেন, শৈব বা পাশুপত্যধর্মে বিশ্বাসী পরাক্রমী অনার্য গোষ্ঠীপতি, তাঁর অনুগত অনার্য সেনারা দুর্ধর্ষ, দুর্দান্ত এবং বেশ নৃশংসও। অবশ্য ব্রাহ্মণ্য সমাজের থেকে অধিকার আদায়ের জন্যেই সম্ভবতঃ তাঁকে একটু অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক হতে হয়েছিল। এই প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর, তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর থেকে তিনিই মহাদেব, তিনিই রুদ্র, তিনিই শিব, তিনিই মহেশ্বর ও পশুপতি।  ব্রহ্মা ও কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর সমান্তরাল দেবতা হয়ে উঠেছিলেন।


[1] অতি উচ্চকোটির যোগীদের পক্ষেই নাকি অগ্নি-সমাধি যোগে দেহত্যাগ করা সম্ভব, অতএব সতীদেবী তাঁর পতির মতোই মহাযোগিনী।   

[2] ঊর্ণ বা ঊর্ণা মানে জাল, জাল নাভিতে যার সেই ঊর্ণনাভি – অর্থাৎ মাকড়সা। মাকড়সা যেমন নিজেরই নাভির রস থেকে জাল বুনে তোলে, তেমনি ব্রহ্মও তাঁর নিজের অংশ থেকে ব্যাপ্ত এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছেন।

[3] জ্যা – ধনুকের ছিলা।

[4] দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে দুই আদিত্য ভগ ও পূষা বা পূষণ – সূর্য - দুজনেই বৈদিক দেবতা।

চলবে ...

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১০

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...