বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮ "

প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্ব

অনাচারী কলির পদপাত ও নিরোধ

শ্রীসুত বললেন, “এরপর মহাভাগবত পরীক্ষিৎ বিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের পরামর্শ অনুযায়ী পৃথিবী পালন করতে লাগলেন এবং তাঁর সম্পর্কে জ্যোতিষী ব্রাহ্মণেরা যেমন বলেছিলেন তাঁর মধ্যে তেমনই গুণাবলী দেখা গিয়েছিল। তিনি উত্তরের কন্যা ইরাবতীকে বিয়ে করলেন এবং জন্মেজয় প্রমুখ চার পুত্র লাভ করলেন। একবার মহারাজ পরীক্ষিৎ দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে একজায়গায় দেখতে পেলেন, একজন রাজবেশধারী শূদ্র, এক বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছে। তিনি সেই শূদ্ররাজাকে কলি বলে চিনতে পেরে তাকে দমন করলেন”

শ্রীশৌণক বললেন, “রাজবেশধারী কলি অতি কুৎসিত শূদ্র, তার ওপর সে আবার বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছিল, মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে শুধু দমন করলেন, হত্যা করলেন না কেন? হে মহাভাগ, যদি এই ঘটনায় শ্রীবিষ্ণুর অথবা তাঁর ভক্তদের কথাপ্রসঙ্গ থাকে, তাহলে বর্ণনা করুন। নচেৎ বৃথা আলাপে কাল হরণের কী প্রয়োজন?”

[এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও  “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি।  কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। এবং তাঁর আক্ষেপ বীর ক্ষত্রিয় রাজা পরীক্ষিৎ, কলি নামক কুৎসিত ওই শূদ্রকে হত্যা করলেন না কেন? আর্যদের আরোপিত ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের পক্ষপাত দুষ্ট প্রভাব কাটিয়ে, সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ – শূদ্রদের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই যে তাদের প্রতি ঋষি শৌণকের এই ঘৃণা, ক্রোধ ও বিরক্তি বুঝতে বাকি থাকে না।]         

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ কুরুজাঙ্গলে বাস করার সময়েই শুনতে পেলেন, কলি তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এই অশুভ সংবাদ শোনামাত্র তিনি রথে চড়লেন এবং অশ্ব, হাতি, রথ ও পদাতি এই চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হলেন। তিনি ভদ্রাশ্ব, কেতুমাল, উত্তরকুরু ও কিংপুরুষ ইত্যাদি রাজ্য সকল জয় করে, সেই রাজাদের থেকে কর আদায় করলেন। ওই সকল রাজ্যের লোকমুখে তিনি শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য, তাঁর পূর্বপুরুষদের যশ, অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ থেকে নিজের পরিত্রাণের কাহিনী, সব শুনলেন। তিনি আরও শুনলেন যাদব ও পাণ্ডবদের মধ্যে আন্তরিক সখ্যতার কথা; কেশবের প্রতি পাণ্ডবদের একান্ত ভক্তির কথা শুনে, তিনিও কৃষ্ণের পাদপদ্মে একান্ত ভক্ত হয়ে উঠলেন। এইভাবে রাজা পরীক্ষিৎ যখন তাঁর পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে রাজ্য শাসন করছিলেন, এমন সময় এক অদ্ভূত ঘটনা ঘটে গেল, সে কথা বলছি, আপনারা শুনুন।

 একদিন বৃষরূপী ধর্ম একটি মাত্র পায়ে ঘুরতে ঘুরতে, গোরূপধারিণী পৃথিবীকে সন্তানহীনা মায়ের মতো কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মাতা, আপনার শরীর কুশল তো? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব কষ্টে আছেন? আপনি কী আমাকে এক পায়ে চলাফেরা করতে দেখে দুঃখ পাচ্ছেন? ভবিষ্যতে শূদ্ররাজারা আপনাকে ভোগ করবে ভেবে আপনি কী ব্যাকুল হয়েছেন? আজকাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান প্রায় লোপ পেয়ে গেছে, দেবতারা যজ্ঞভাগ পান না, অতএব দেবরাজ ইন্দ্র সময় মতো বর্ষণ দেন না। আপনি কী প্রজাদের এই শোচনীয় পরিণাম দেখে ক্লেশ পাচ্ছেন?

হে পৃথিবী, আজকাল এমনই দুঃসময়, পতি স্ত্রীকে, পিতা সন্তানকে রক্ষা করে না, বরং নিষ্ঠুর রাক্ষসের মতো অত্যাচার করে। সরস্বতীদেবী দুরাচারী ব্রাহ্মণদের আশ্রয় নিয়েছেন, কুলীন ব্রাহ্মণরাও রাজার সেবায় দাসের মতো আচরণ করতে লজ্জাবোধ করছে না। বীর ক্ষত্রিয়েরা রাজ্য সকল উৎসন্নে দিয়েছে, শাস্ত্রের নিয়ম অবহেলা করে সর্বত্র পান, ভোজন ও নারীসঙ্গ উপভোগ করতে দ্বিধা করে না।

হে মাতা, আপনি কী এই সব দেখে বিষণ্ণ হয়েছেন? একসময় আপনার সৌভাগ্যে স্বর্গের দেবতারাও ঈর্ষা করত, বলবান কাল কী আপনার সেই সৌভাগ্য হরণ করে নিয়েছে? আপনার ক্লেশের কথা যথাযথ আমাকে বলে আমার উৎকণ্ঠা নিবারণ করুন”

ধরিত্রীদেবী উত্তর দিলেন, “হে ধর্ম, আপনি যা জিজ্ঞাসা করলেন, সে সব কথা আপনিও জানেন, তাও আমি আমার দুঃখের কারণ বর্ণনা করছি। যিনি ছিলেন বলে আপনার চারটি পা বর্তমান ছিল এবং যাঁর কারণে সকল মহাজন ও সাধারণ মানুষের মনে মহাগুণ বিরাজ করত, সেই অনন্ত গুণের আকর শ্রীনিবাস এই লোক থেকে চলে যাওয়ায় পাপের আকর কলি আমাকে আক্রমণ করেছে। হে ধর্ম, শ্রী ভগবানের বিরহ দুঃসহ। ভগবানের শ্রীচরণচিহ্ন আমার সর্ব অঙ্গে ধারণ করে, আমি সৌভাগ্যের গর্বে অহংকারী হয়েছিলাম। মনে হয় সেই অপরাধেই তিনি আমাকে পরিত্যাগ করলেন। যে নির্বিকার পুরুষ অসুর কুলে জাত অত্যাচারি রাজাদের হত্যা করে আমার ভার লাঘব করেছিলেন, যিনি আপনার তিনটি খঞ্জ পায়ের দুর্গতি থেকে উদ্ধার করে আপনাকে পূর্ণাঙ্গ সুস্থ করে তুলেছিলেন, কোন ভক্ত তাঁর বিরহ সহ্য করতে পারবে? যাঁর প্রেমদৃষ্টি, মধুর হাস্য ও মনোহর আলাপ সত্যভামা প্রমুখা মানিনীদের মান ও ধৈর্য হরণ করেছিল, যাঁর পায়ের ধুলিকণা আমার অঙ্গের শোভা বাড়িয়েছিল, সেই পুরুষোত্তমের অন্তর্ধান কিভাবে সহ্য করা যায়?”

এইভাবে ধর্ম ও পৃথিবী যখন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন, সেই সময় রাজর্ষি পরীক্ষিৎ কুরুক্ষেত্রে পূর্ববাহিনী সরস্বতী নদীর তীরে উপস্থিত হলেন” 

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, রাজা পরীক্ষিৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, এক রাজবেশধারী শূদ্র হাতে লাঠি নিয়ে এক বৃষ ও এক ধেনুকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাদা পদ্মের মতো ধবল বৃষটি ভয়ে মূত্রত্যাগ করছে ও এক পায়ে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। যজ্ঞের গব্য প্রসবিনী ধেনুটিও ক্ষুধায় ক্ষীণদেহ, শূদ্রের লাথিতে শোচনীয় অবস্থায় সন্তানহারা গাভির মতো বিলাপ করছে।

রাজা রথ থেকে এই দৃশ্য দেখে তাঁর ধনুতে তির স্থাপন করলেন, তারপর মেঘের মতো ক্রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বললেন, “দুরাচারি, তুই কে? আমার শাসনাধীন রাজ্যে থেকে বল দর্পে তুই দুর্বলকে অত্যাচার করছিস? তুই নটের মতো রাজবেশ ধরেছিস, কিন্তু তোকে দেখে তো শূদ্র বলেই মনে হয়! কৃষ্ণ ও অর্জুন অন্তর্হিত হয়েছেন দেখে তুই নির্জনে এই দুই দুর্বল প্রাণিদের নিধনে উদ্যত হয়েছিস? তোর প্রাণ বধ করলে এই পাপের উচিত শাস্তি হতে পারে”

তারপর তিনি বৃষকে ডেকে বললেন, “তুমি কে? তোমার শরীর পদ্মের মতো শুভ্র, কিন্তু তোমার তিনটি পা নেই কেন? তুমি কী কোন দেবতা, আমাদের ক্লেশ দেবার জন্যে বৃষরূপ ধারণ করেছ? এই রাজ্য পাণ্ডবদের বিশাল বাহুবলে শাসিত হয়, এখানে তোমরা দুইজন ছাড়া আর কাউকে শোক করতে দেখা যায় না। হে সুরভিপুত্র, শোক করো না, এই শূদ্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। হে মাতঃ, আমি যখন দুষ্ট লোকের শাসনে আছি, তখন তোমার মঙ্গল হবেই। তুমিও রোদন করো না। যে রাজার রাজ্যে প্রজারা অসাধু লোকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়, সেই রাজার আয়ু, কীর্তি, ভাগ্য ও সম্পদ সকলই বিলুপ্ত হয়। হে সুরভিনন্দন, তোমার অন্য তিনটি পা কে ছিন্ন করেছে, আমাকে বলো, যাতে আমি তার উচিৎ প্রতিকার করতে পারি”

শ্রীধর্ম বললেন, “যাঁদের গুণে বশীভূত হয়ে স্বয়ং ভগবান দৌত্য, সারথ্য ইত্যাদি কর্ম করেছিলেন, আপনি সেই পাণ্ডবদের বংশধর, বিপন্নদের প্রতি আপনার এই অভয়বাণী সুসঙ্গতই হয়েছে। আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, আমাদের ক্লেশের কারণ কে? কিন্তু প্রাণীদের ক্লেশ কে দেয়, তা আমাদের পক্ষে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, ভিন্ন ভিন্ন মতের বিভিন্ন তর্কজালে আমরা বিভ্রান্ত। কেউ বলেন দেবতারা কর্মের অধীন এবং কর্ম আত্মার অধীন, অতএব আত্মা বা দেবতা কেউই দুঃখের কারণ নয়, সুতরাং আত্মাই আত্মাকে সুখ দুঃখ প্রদান করে। দৈবজ্ঞগণ বলেন, গ্রহরূপ দেবতারা সুখদুঃখের কারণ, আবার মীমাংসার পণ্ডিতরা বলেন, যাবতীয় সুখদুঃখ নিজের কর্মেরই ফল। যারা লোকায়ত* মতে বিশ্বাসী, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখের কোন কর্তা নেই, জীবের স্বভাব থেকে এর সৃষ্টি। যাঁরা বাক্য ও মনের অগোচর এক স্বতন্ত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখ যাবতীয় বিষয় ঈশ্বররূপ মূল কারণ থেকে উৎপন্ন হয়। মহারাজ, আপনি উপরের সবকটি মতের মধ্যে যেটি সবথেকে সমীচীন মনে করেন, সেই মতটিই গ্রহণ করুন”

[এই লোকায়ত মতের বিশ্বাসীরাই ছিলেন নিরীশ্বরবাদী মহাভারতে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি চার্বাক যিনি দুর্যোধনের মিত্র ছিলেন। আবার রামায়ণে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি জাবালি, যিনি শ্রীরামচন্দ্রকে পিতৃসত্য পালনের জন্যে বনবাসে না যাওয়ার উপদেশ দেওয়াতে, শ্রী রাম তাঁকে ধিক্কার দিয়ে তিরষ্কার করেছিলেন]।      

“হে বিপ্রগণ, ধর্মের এই উত্তর শুনে সম্রাট পরীক্ষিতের মন শান্ত ও সংশয়মুক্ত হল, তিনি বললেন, “হে ধর্মজ্ঞ, আপনি নিজের ঘাতকের নাম নির্দেশ না করে, বিবিধ ধর্ম তত্ত্ব নির্দেশ করায় আপনাকে বৃষরূপধারী সাক্ষাৎ ধর্ম বলেই মনে হচ্ছে। হে ধর্ম, আপনি সত্যযুগে তপস্যা, শুদ্ধি, দয়া ও সত্য এই সম্পূর্ণ চার পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ত্রেতাযুগে অধর্মের অংশ গর্ব দিয়ে তপস্যার, কুসঙ্গ দিয়ে শুদ্ধির, নেশাগ্রস্ত উন্মত্ততায় দয়ার ও অসত্য দিয়ে সত্যের চতুর্থাংশ বিনাশ হয়েছিল। এরপর দ্বাপরে অর্ধাংশ, ও কলিতে তিন অংশ বিনাশ হয়েছে। অতএব সত্যই কলিযুগের অবশিষ্ট একপাদ ধর্ম বলে নির্দিষ্ট হয়েছে। হে ধর্ম, এখন একমাত্র সত্যই আপনার জীবনধারণের উপায়, কিন্তু অসত্যে বাড়বাড়ন্ত কলি আপনার অবশিষ্ট পদটিকেও হরণ করতে চায়। ভগবান পরষ্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে, পৃথিবীর ভারভূত রাজাদের ও যাদবদের সংহার করেছিলেন এবং তাঁর শ্রীচরণস্পর্শে সর্বত্র মঙ্গল বিরাজিত ছিল। কিন্তু এখন শান্তশীলা পৃথিবীও শ্রীকৃষ্ণের বিরহে নিজেকে হতভাগ্যা মনে করছেন এবং রাজবেশী শূদ্রেরা তাঁকে ভোগ করবে, এই আশঙ্কায় চোখের জল ফেলছেন”

“মহারথ পরীক্ষিৎ ধর্ম ও ধরিত্রীকে এইভাবে সান্ত্বনা দিয়ে অধর্মের মূল কলিকে হত্যা করবেন বলে ভয়ংকর খড়্গ তুললেন। রাজাকে ক্রুদ্ধ দেখে ভয়ার্ত কলি রাজবেশ ফেলে দিয়ে, মহারাজ পরীক্ষিতের দুই পায়ে মাথা রেখে প্রাণভিক্ষা করতে লাগলেন।

কলির এই দুরবস্থা দেখে দীনবৎসল মহারাজ পরীক্ষিৎ হেসে বললেন, “আমরা মহাবীর অর্জুনের বংশে জন্ম নিয়ে তাঁর যশ অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতিজ্ঞা করেছি। অতএব তুমি যখন আমার সামনে করজোড়ে তখন তোমার আর ভয় নেই, কিন্তু আমার রাজ্যে তোমার মতো অধর্মের কোন ভাবেই স্থান হবে না। তুমি রাজগণের মনে প্রবেশ করায়, লোভ, মিথ্যে, চুরি, দুষ্টতা, নীচতা, অলক্ষ্মী, কপটতা ও অহংকার বেড়ে উঠেছে। এখানে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে, জনগণ যজ্ঞেশ্বরের অর্চনা করেন, যজ্ঞমূর্তি শ্রীহরিও তাঁদের সিদ্ধি ও মঙ্গল করেন। অতএব এই ব্রহ্মবর্তে তোমার স্থান হবে না”

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ এই আদেশ দেওয়াতে কলি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হে সার্বভৌম, আমি আপনার আদেশে যেখানেই বাস করি না কেন, আপনাকে অস্ত্র হাতে সর্বদাই দেখতে পাব। অতএব, হে মহারাজ, আপনি আমাকে এমন একটি স্থান নির্দেশ করুন, যেখানে আমি বাস করে, আপনার আজ্ঞাপালন করতে পারি”

“কলি এই প্রার্থনা করায়, রাজা পরীক্ষিৎ, তাকে দ্যূত অর্থাৎ পাশাখেলায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রী ও প্রাণীহিংসা এই চারটি স্থান নির্দেশ করে দিলেন। এই চারটি স্থান অসত্য, অহংকার, অশুচি ও নিষ্ঠুরতা, এই চারটি অধর্মের আবাস হয়ে উঠল। কলি আরো একটি স্থান অনুনয় করলে, রাজা পরীক্ষিৎ তাঁকে সুবর্ণ দান করলেন। এই সুবর্ণে অসত্য, গর্ব, কাম, হিংসা ও কলহ পাঁচটি অধর্ম একসঙ্গে বাস করে। সেই থেকে সকল অধর্মের স্বরূপ কলি ওই পাঁচটি স্থানে বাস করতে লাগল। অতএব যে ব্যক্তি নিজের মঙ্গল কামনা করে, বিশেষ করে যাঁরা লোকপালক, তাঁদের ওই সকল বিষয় ভোগ করা একান্তই অনুচিত।

[অতএব সেই থেকে কলির বাসা হল পাশাখেলা অর্থাৎ জুয়ায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রীভোগে, প্রাণীহিংসায় ও সুবর্ণে – অর্থাৎ মিথ্যা, অহংকার, বাসনা, হিংসা ও কলহে। এই সব বিষয় যাঁরা ভোগ করেন না, তাঁরা কলির খপ্পর থেকে মুক্ত!]

এইভাবে রাজা কলির নিগ্রহ করে, বৃষের শরীরে তপস্যা, শৌচ ও দয়া এই তিনটি নষ্টপাদ আবার উদ্ধার করে দিলেন, অর্থাৎ ওই সকল ধর্ম আবার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ধরণীকে আশ্বস্ত করলেন। মহারাজ পরীক্ষিতের প্রভাবেই আজ আপনারা এই যজ্ঞে উপস্থিত থেকে দীক্ষিত হতে পেরেছেন”। 

চলবে...      


বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

অলীক পুরুষ

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " হাত-পা বাঁধা "

তিনি কোথা থেকে এলেন কে জানে। সরোবরে অবগাহন স্নান সেরে যখন তিনি উঠে এলেন, তখনই তাঁকে চোখে পড়লতাঁর ভেজা শরীর থেকে ঝরে পড়ছে জল। ভোরের সোনালী আলোয় চিকমিক করছে ঝরে পড়া জলের বিন্দু। দুইহাতে মুখের ওপর থেকে তিনি সরিয়ে দিলেন ভিজে চুলের গুচ্ছ। কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়া চুল থেকেও জল ঝরতে লাগল তাঁর পিঠ বেয়ে। মেদহীন সুপ্রশস্ত পিঠ আর বুক। অশ্বত্থপাতার সুসমঞ্জস বলিরেখার মতো তাঁর উদর। পাড়ে উঠে তিনি উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকালেন। বুকের কাছে জোড় হাত রেখে তিনি উচ্চারণ করলেন –

“জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্‌

ধ্ব্যান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণোতোস্মি দিবাকরম”।

তাঁর সুস্পষ্ট অথচ অনুচ্চ কণ্ঠস্বর আর উচ্চারণে জেগে উঠতে লাগল আশেপাশের সমস্ত প্রকৃতি। গাছপালা, লতাগুল্ম, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, পাখি, সরীসৃপ। আকাশ, বাতাস, এমনকি এই ভোরের আলোও। যে দিবাকরকে তিনি এইমাত্র প্রণাম করলেন, সেও ধন্য হয়ে, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। প্রথম সূর্যের রশ্মি স্পর্শ করল তাঁর মুখমণ্ডল। তাঁর উজ্জ্বল দুই চোখে এখন করুণার আলো, স্নিগ্ধ আনন্দের আবেশ। তাঁর ওষ্ঠ ও অধরে ইষৎ হাসির রেশ, সে হাসিতে অকুণ্ঠ মায়া।

উড়ে এল একটি পাখি, তার ডানায় সবুজ পাতার সজীব রং, ঠোঁটদুটি অরুণ রাঙ্গা। তাঁর মাথার উপর কিছুক্ষণ উড়ে, সে এসে বসল তাঁর কাঁধে। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি সেই পাখির চোখে চোখ রাখলেন। কিছু বলবি? নাঃ। কিছু চাইবি? নাঃ। যা চাই সবই তো দিয়েছো। কিচ্ছু চাই না আর, শুধু তোমাকে চাই, চাই তোমাকে স্পর্শ করতে। তোমার ওই দুই চোখে চোখে রাখতে চাই। ব্যস। তুমি যে আছো আমাদের সঙ্গে, সেটুকুতেই আমাদের আনন্দ। হে পরমপুরুষ, তুমি চিরদিন বাস করো আমাদের অন্তরে। স্মিত আস্যে তিনি পাখির পিঠে হাত রাখলেন, স্পর্শ করলেন তার দুই পক্ষপুট, যেখানে স্পর্শ করলেন সেখানে ফুটে উঠল সোনালী আলো। সোনালী তিলকে উজ্জ্বল সেই পাখি উড়ে গেল জঙ্গলের দিকে। তার কণ্ঠে এখন সব পেয়েছির সুর।

দৌড়ে এল কাঠবিড়ালি, দৌড়ে এল হরিণ, দৌড়ে এল খরগোশ। সামনে এসে আগ্রহে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের দিকে। তিনি হাঁটু মুড়ে বসলেন তাদের সামনে। হরিণ এগিয়ে এসে তাঁর বুকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। দুরন্ত কাঠবিড়ালি এক ছুট্টে উঠে পড়ল তাঁর কাঁধে, দৌড়ে বেড়াতে লাগল তাঁর পিঠে, মাথায়। খরগোশটি তাঁর বাড়িয়ে ধরা হাতের তালুতে জিভের আলতো ছোঁয়া দিল, বুক ভরে নিল তাঁর ঘ্রাণ। প্রত্যেককেই তাঁর করস্পর্শে ধন্য করে, তিনি মৃদু কণ্ঠে বললেন তোরা কি কিছু চাস আমার থেকে? কেউ কোন কথা বলল না, শুধু ঘাড় নেড়ে বলল, না, না, কিচ্ছু না। খরগোশ রুবিরাঙা চোখে, কাঠবিড়ালি আর হরিণ কাজল চোখে তাকিয়ে রইল তাঁর দুই চোখের দিকে। গভীর মায়ায় করুণাঘন চোখে তিনিও তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে।

এমনি করেই এক এক করে সেখানে এসে জুটতে লাগল সেই অরণ্যের যত অরণ্যবাসী। সোনালী তিলক পাওয়া সেই পাখি অরণ্যের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দিয়েছে তাঁর সংবাদ। শাখা প্রশাখার ধ্বজা নিয়ে বারশিঙা, দীঘল পায়ের নীলগাই, শক্তিধর গাউর, ডোরাকাটা বাঘ, অজস্র টিপ পড়া চিতা, লেজ ফোলানো শেয়াল, কাঁটায় মোড়া সজারু, আরো আরো অনেকে। আরো এসে জুটল সব পাখি। সরু পায়ের বক, সারস, তীক্ষ্ণ ঠোঁটের চিল আর বাজ, সেজেগুজে এল ময়ুর, বনমোরগ। আরো কত পাখি এল রংবাহারি সাজে আর রকমারি ঠোঁট নিয়ে। সক্কলে চায় তাঁর স্পর্শ তাঁর আদর। তিনি সক্কলকে স্পর্শ করলেন, অনুভব করলেন সকলের প্রাণের উত্তাপ আর আবেগ। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, কিছুই কি চাই না তোদের? সব্বাই বলল না, না, যা পেয়েছি তাই ঢের, কিচ্ছু চাই না আর। তুমিই তো রয়েছ, তুমিই থেকো চিরদিন। আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু চাই না আর।

সরোবরের যতো কুমুদ সকল পাপড়ি মেলে মৃদু দুলতে লাগল আনন্দে। গাছে গাছে বিকচ কুসুমরাশি ঝরে ঝরে পড়তে লাগল তাঁর মাথায়, তাঁর পদতলে। যে সব গাছে ফুল নেই তারা পাতাভরা শাখা দুলিয়ে ঝিরিঝিরি শীতল হাওয়ায় অস্ফুট উচ্চারণে বলল, তুমি আছো। তুমি আছো। তুমি আছো আমাদের অন্তরে, তুমি আছো আমাদের বাহিরে। সমস্ত সুগন্ধ নিয়ে সুরভিত বাতাস বইতে লাগল তাঁরই আশেপাশে।  

 

“ইট্‌স্‌ টু মাচ”। রথীন বলল।

“এক্স্যাক্টলি, এত কস্টলি, কোন মানে হয় না”। প্রমথ বিরক্ত হয়েই সায় দিল রথীনের কথায়।

“কিসের রে?” অগ্নি জিগ্যেস করল, সে কাউন্টারে যায়নি, সে জানে না। এই ফরেস্টে ঢোকা, সাফারির জিপ রিজার্ভ করা আর সঙ্গে মুভি ক্যামেরা থাকার চার্জ কতো। রথীন আর প্রমথই ওদিকটা সামলাচ্ছিল। সত্যি বলতে ওরা অগ্নিকে এসব ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেয় না, ওর মতামত নেওয়ার কোন মানেও হয় না। কারণ অগ্নির অবস্থাটা তারা দুজনে ভালোভাবেই জানে।

ওরা তিনজন একই স্কুলে, একই ক্লাসের সহপাঠী ছিল। স্কুলে পড়ার দশবারোটা বছর তাদের যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল, সেটা আজও আছে, শুধুমাত্র রথীন আর প্রমথর জন্যেই। সমাজের যে উঁচু স্তরে ওরা এখন উঠে গেছে, তার তুলনায় অগ্নি এখন নেহাতই নগণ্য। তারা অগ্নিকে অনায়াসে ইগনোর করতে পারত, সব সম্পর্কের ইতি টেনে দিতেই পারত, কিন্তু তা করেনি। সেটা ওদের মহানুভবতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

লেখাপড়ায় ওরা তিনজনে প্রায় একই রকম ছিল, উনিশবিশ। হায়ার সেকেণ্ডারির পর ওরা তিনজনে ছিটকে গিয়েছিল তিনদিকে। রথীন গেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, প্রমথ ডাক্তারি আর অগ্নি চান্স পেয়েও সব ছেড়েছুড়ে চরম বোকামি করল, পড়তে গেল বাংলা অনার্স নিয়ে। বছর পাঁচেকের মধ্যেই অনিবার্য তফাতটা নজরে আসতে লাগল। কলেজের পড়া সাঙ্গ করে ওরা যখন সাফল্যের সিঁড়িতে প্রথম পা রাখল, অগ্নি তখন মফস্বলের এক স্কুলে বাংলার টিচার হয়ে চলে গেল। আর খাতা ভরে তুলতে লাগল কবিতা আর গল্পে। সে সব লেখা কেউ কেউ ছাপে। ক্বচিৎ কখনো কেউ ফেরত পাঠায়, আর অধিকাংশই নিরুত্তর থাকে, তার লেখাগুলি ছিঁড়ে ফেলে দেয় ওয়েস্ট বাস্কেটে।

কলকাতায় থাকার কারণে প্রমথর সঙ্গেই অগ্নির যোগাযোগটা বেশি। কলকাতায় এলে অগ্নি তার বাড়িতেই ওঠে, কারণ অগ্নি কলকাতার পাট বহুদিন চুকিয়ে দিয়ে বুড়ি মাকে নিয়ে চাকরি স্থলেই বাসা বেঁধে থাকত। বছর তিনেক আগে ওর মা মারা যাবার পর এখন আর কোন পিছুটানও নেই অকৃতদার অগ্নির।

সাফারি জিপদুটো ওদের সামনে এসে দাঁড়াতে, রথীন তাড়া লাগালো সকলকে, “কুইক, কুইক। সবাই উঠে পড়ো। সামনেরটায় আমরা আর পিছনেরটায় ছোটরা সবাই”।

তাই হল, সামনের জিপে উঠল ওরা তিন বন্ধু, রথীনের স্ত্রী সোনিয়া আর প্রমথর স্ত্রী পলা। পিছনের জিপে উঠল প্রমথর দুই মেয়ে, আর রথীনের এক ছেলে এক মেয়ে, আর কাজের মেয়ে রুক্কি। রথীন বিয়ের পর থেকে প্রায় বছর পনের হল জব্বলপুরেই সেটেল্‌ড্‌, সে এর আগেও এই ফরেস্টে এসেছে কয়েকবার। এখানকার অনেক নিয়মকানুনই তার জানা।

“একটু পরেই আমরা ফরেস্টের ভিতরে ঢুকবো। কেউ চেঁচামেচি করবে না। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলবে। গাড়ি থেকে নামবার চেষ্টা করবে না। ড্রাইভার আঙ্কেল কিন্তু শুধু ড্রাইভারই নয়, উনি জঙ্গলের গাইডও। উনি যেমন বলবেন, সেভাবে চলবে। নো দুষ্টুমি। ওকে?”

ছোটদের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সকলকে নির্দেশ দিল রথীন। তারপর এগিয়ে গিয়ে সামনের গাড়িতে উঠে বসল, সামনের সিটে। তার পাশে অগ্নি, ওপাশে ড্রাইভার। ওদের গাড়িটা ছেড়ে দিতেই, অনুসরণ করল দ্বিতীয় গাড়িটাও। 

 

পাস দেখিয়ে দু নম্বর গেট পার হয়ে ঢুকতে ঢুকতে ড্রাইভার বলল, “এইবার আমরা কোর জংগলে ঢুকে পড়লাম, স্যার। সকলে চারপাশে সতর্ক নজর রেখে চলুন, যে কোন সময়ে যে কোন অ্যানিমাল চোখে পড়তে পারে”। গাড়ি খুব ধীর গতিতে চলতে লাগল, জঙ্গলের ভিতর সরু রাস্তা দিয়ে। দুপাশে শাল, পলাশ, তেন্ডু, মহুয়ার গভীর জঙ্গল। কিছু কিছু টিকও চোখে পড়ছে

পুব আকাশে ভোরের আলোর আভাস দেখা গেলেও এখনো ভোর হয় নি। ঘন জঙ্গলের নীচে এখনো চাপচাপ অন্ধকার, রহস্যময় করে রেখেছে চারিপাশ। অগ্নি খুব জোরে শ্বাস নিল, বলল, “শ্বাস নিয়ে দেখ। সুন্দর না গন্ধটা?”

“কিসের গন্ধ? ফুলের?” রথীন জিগ্যেস করল।

“জঙ্গলের গন্ধ”।

রথীন আর প্রমথ হো হো করে হেসে ফেলেই, সামলে নিল নিজেদের, “সরি, সরি। হাসিটা জোর হয়ে গেছিল। তুই এমন ছড়াস না, অগ্নি, সত্যি”, প্রমথ বলল।

“এই জন্যেই তো অগ্নিকে ভালো লাগে। আস্ত একপিস খোরাক”। নিঃশব্দে হাসতে হাসতে রথীন আরো বলল, “ও সংগে থাকলে ইউ নেভার ফিল বোর। শালা, জঙ্গলের গন্ধ”।

“সে কিরে, তোরা পাচ্ছিস না? তোমরাও পাচ্ছো না?” পিছন ফিরে পলা আর সোনিয়াকে জিগ্যেস করল অগ্নি।

“না, অগ্নিদা। আমরা তো কবি নই”। পলা উত্তর দিল। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি। সোনিয়ার গায়ে কনুই দিয়ে মৃদু ঠেলা দিয়ে আবার বলল, “প্রকৃতির গন্ধ-টন্ধ কবিদের নাকেই ধরা দেয়। “আকাশের গায়ে যেন টকটক গন্ধ। টকটক থাকে নাকো হলে পরে বৃষ্টি, তখন দেখেছি চেটে একদম মিষ্টি” সুকুমার রায়ের ছড়া ছিল না? তা অগ্নিদা, আপনার এই গন্ধটা কেমন?”

ড্রাইভার আর অগ্নি ছাড়া সকলেই হাসছিল। অগ্নির কোন বিকার নেই, সে আনমনে বলল, “ওভাবে তো বলতে পারব না, কিন্তু আছে, গন্ধটা পাচ্ছি। ড্রাইভারসাব, থোড়া রুকিয়ে তো, গাড়িকা স্টার্টভি বন্ধ করিয়ে না”।

ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দিল। ইঞ্জিনের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যেতে, শোনা গেল একটানা ঝিঁঝির ডাক, ভোরের পাখিদের কাকলি। গাছের পাতায় পাতায় ঝিরঝির শব্দদমকা বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাওয়ার শব্দ। সব মিলিয়ে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ। কান পেতে শুনতে লাগল অগ্নি। তার সমস্ত শরীরে অদ্ভূত শিহরণ লাগল।  

“গাড়ি থামালি কেন?” রথীন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।

“মন দিয়ে শোন না, জঙ্গলের নিজস্ব একটা শব্দ আছে শুনতে পাচ্ছিস না?”

“এ মাকালটা মাইরি, এত বোর করবে জানলে নিয়েই আসতাম না”। প্রমথ বলল। “ড্রাইভারজি আপ চলিয়ে। উনকা বাতোঁ মে মত আইয়ে, আপকা দিমাক ঘুম জায়েগা”।

গাড়ি আবার স্টার্ট করে চলা শুরু করতে অন্য সব শব্দই আড়াল হয়ে গেল।

রথীন বলল, “ওটা ঝিঁঝিঁর ডাক। শালা, থাকিস তো তুই মফস্বলে, গেঁয়ো ভুত একখানা। কোনদিন ঝিঁঝিঁর আওয়াজ শুনিসনি? ঝিঁঝিঁ উচ্চিঙ্গের মতো এক রকমের পোকা। ডানা কাঁপিয়ে আওয়াজ বের করে। কখন করে জানিস? শালা, মেটিংয়ের সময়”।

“তুইও পারিস, রথীন, সারাটা জীবন ওর কেটে গেল হ্যাণ্ডেল মেরে, ওকে তুই মেটিং বোঝাচ্ছিস”! চাপা হাসির রোল উঠল আবার, খুক খুক করে।

পলা বলল, “তোমার মুখের কোন লাগাম নেই, ওভাবে কেউ বলে? ছিঃ। তাও আমাদের সামনে?”

পলার উরুতে আদুরে চিমটি কেটে সোনিয়া বলল, “এমনিতেই তো অগ্নিদা দুখী আত্‌মা, তার ওপর নমক মত ছিড়ক না, প্লিজ”।

সোনিয়ার বাবা বহুদিনের প্রবাসী বাঙালী এবং এ অঞ্চলের প্রতিপত্তিশালী কন্ট্রাক্টর। তাঁর লওতি বেটি হিসেবে সে জব্বলপুরেই বর্ন এণ্ড ব্রটআপ। কাজেই তার বংলায় রাষ্ট্রভাষার মিশেল। দেহান্ত হওয়া শ্বশুরের দামাদ হিসেবে রথীন এখন রাজ্য ও রাজকন্যের অধীশ্বর।

“দুখী আতমা? বাঃ বেড়ে বলেছো তো সোনিয়া”। প্রমথ বলল। “এদিকে তো জঙ্গলে একটা বেড়ালও  দেখা যাচ্ছে না, মাইরি। এতগুলো টাকা গচ্চা দিয়ে, আমরাও কি দুখী আতমা হয়ে বাড়ি ফিরব নাকি রে, রথীন”?

“তাই তো দেখছি। আগেরবার বাঘ না দেখলেও বাইসন, নীলগাই, অনেক হরিণটরিণ  দেখেছিলাম সত্যি, এবারে তাও চোখে পড়ছে না। আধঘন্টা তো হয়ে গেল আমরা ফরেস্টে ঢুকেছি। কেয়া, ড্রাইভারজি, আভি তক কুছভি দিখাই নেহি দিয়া কিঁউ”?

“কুছ সমঝ মে নেহি আ রহা হ্যায়, স্যার। অ্যায়সা তো কভি হোতা নেহি হ্যায়”।

“তোদের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, সবাইকে গান্ডু বানাচ্ছে, বুঝেছিস রথীন”? প্রমথ মন্তব্য করল।

 ড্রাইভার কিষুণলাল খুব ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিল। এ জঙ্গলে বাঙালি টুরিস্ট এতো আসে, তাদের কথা শুনে শুনে সে চলনসই বাংলা বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না। তার তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞ চোখ দুপাশে খুঁজে চলেছে কোন না কোন জ্যান্ত প্রাণী। যাতে তার সায়েবদের পয়সা উশুল হয়ে যায়। সে জানে কোন ওয়াইল্ড প্রাণী না দেখে এরা ফিরে গেলে ফরেস্টের বদনাম। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যদিও তার কোন ভূমিকা নেই, তবুও এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তার নিজেরও খুব শরমিন্দা লাগে। টুরিস্টরা এখানে আসে, পয়সা খরচ করে, জঙ্গলের প্রাণী দেখার জন্যে। সেটা না হলে বাস্তবিক তার মনে হয়, সেই যেন বুরবক বানিয়ে দিল এই টুরিস্টগুলোকে। আজ কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না, কী হল? একটাও প্রাণী চোখে পড়ছে না কেন?

ওয়াকি-টকি চালু করে সে যোগাযোগ করল অন্যান্য সাফারি জিপের ড্রাইভারের সঙ্গে।             

“তাজ্জব কি বাত হ্যায়, ইয়ার। অ্যায়সা কভি নেহি দেখা”।

“কেয়া হ্যায়, কাঁহা”?

“চার নম্বর বিট মে যো বড়ি তালাও হ্যায় উধার আ যা। ফটাফট”। ওয়াকি-টকি অফ করে কিষুণলাল গাড়ি ডানদিকে মোড় নিয়ে ঢুকে পড়ল গহনতর জঙ্গলের মধ্যে।

“কুছ পতা চলা?” রথীন জিগ্যেস করল।

“অ্যায়সাই কুছ বোল রহা হ্যায়। চলিয়ে, দেখতে হ্যাঁয়। লেকিন একদম শান্ত রহিয়ে, কোই আওয়াজ হোনা নেহি চাহিয়ে”।           

 

তাদের সামনে আরো পাঁচটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বলে, জায়গাটা ওদের চিনতে অসুবিধে হল না। বনপথ থেকে বাঁদিকে কিছুটা ঘাস জমি পেরিয়ে সেই সরোবর। আর সরোবরের তীরে একসঙ্গে এতগুলি প্রাণীর সহাবস্থান দেখে ওদের বিস্ময়ের অবধি রইল না। বাঘ ও হরিণ। সাপ ও নেউল। খরগোশ আর বাজ। একইসঙ্গে পাশাপাশি বসে আছে, ঘুরছে, ফিরছে, উড়ছেকোন ভয় নেই। তারা কেউ যেন খাদক নয়। খাদ্যও নয় কেউতাদের এই নিশ্চিন্ত অবসর যাপনের দৃশ্য, মানুষগুলোর আজীবন গড়ে তোলা সমস্ত ধারণাকে ঝাঁকিয়ে দিল। কী করে সম্ভব, অদ্ভূত, এমন এক অদ্ভূত ঘটনা! মানুষগুলো উত্তেজিত। যতই শান্ত আর নিঃশব্দ থাকার চেষ্টা করুক মানুষগুলো, কিছুতেই পারল না। তাদের অস্ফুট বিস্ময় আর চাপা কথাবার্তাও পাল্টে দিল জঙ্গলের নিজস্বতা। তাদের উজ্জ্বল প্রসাধন। তাদের আধুনিক রঙিন পরিধান, তাদের বহুমূল্য ক্যামেরার অজস্র ক্লিক। পুরো পরিবেশটাকেই খুব বেমানান করে তুলল     

তিনি বসেছিলেন এবং ছোট বড়ো সকল প্রাণীই তাঁকে এতক্ষণ ঘিরে ছিল বলে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। প্রথমে তিনিও লক্ষ্য করেননি। কিন্তু একে একে সাতটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে তিনি টের পেলেন এই টুরিস্টদের উপস্থিতি। তিনি অধৈর্যে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর উজ্জ্বল ও সুঠাম নগ্নতায় শিউরে উঠল সকল নারী ও পুরুষ। ব্যাকুল হল উপস্থিত নারীরা, পুরুষরা অনুভব করল হীনমন্য ঈর্ষা। প্রভাত সূর্যের মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর শরীর ও মুখ। তিনি চোখ তুলে তাকালেন একবার। এতদূর থেকেও তাঁর নিবিড় দৃষ্টির অভিঘাতে সমস্ত মানুষ আচ্ছন্ন হয়ে রইল বহুক্ষণ।

অতঃপর তিনি পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন সরোবরের দিকে। তাঁর নিরুদ্বেগ চলার সঙ্গী হল সমস্ত প্রাণী, পশু, পাখি। সরোবরের তীরে তিনি দু হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। সমস্ত প্রাণীই যেন একান্ত অনিচ্ছাতে তাঁকে ছেড়ে ঢুকে যেতে লাগল অরণ্যের ভিতর। সমস্ত প্রাণী যখন চলে গেল দৃষ্টির অন্তরালে, তিনি নেমে গেলেন সরোবরের মধ্যে। তিনি সম্পূর্ণ অবগাহন করার পর, সোনালী তিলক আঁকা সবুজ ডানার সেই পাখিটিও শিস দিয়ে উড়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। তিনি আর উঠলেন না, তাঁকে আর দেখা গেল না

 “মালটা কে বলতো?” এতক্ষণে রথীন মুখ খুলল।

“কে জানে - পাগল-টাগল হবে হয়তো”। প্রমথ উত্তর দিল।

“যাঃ জলে নেমে গেল যে, তুই কি এটাকে সুইসাইড কেস বলতে চাইছিস?”

“তা নাহলে, কোন সাধু, জংলী বাবা – টাবা হবে”।

“আর এই জানোয়ারগুলো, সবাই যে ওর চারদিকে ঘুরছিল পোষা কুকুরের মতো, কেন?”

“বিভূতি!”

“যাই বলো হেভি দেখতে কিন্তু। কেমন জানি একটা ফিলিংস হচ্ছিল”। পলার স্বরে মুগ্ধতা।

“তাতো হবেই। শালা, ল্যাংটো, জঙ্গলের মধ্যে ভয়ারিজ্‌ম্‌। এতগুলো মহিলা দেখেও লজ্জাশরমের কোন বালাই নেই”। রথীন উত্তর দিল।

“আমি বলছি তোকে, এ হচ্ছে একজন নাগা সন্ন্যাসী। যাদের কুম্ভমেলায় দেখা যায়, হি ইজ ওয়ান অব দেম। প্লাস হঠযোগী। এখন জলে নেমেছেপাব্লিক সরে গেলে, চুপচাপ উঠে জঙ্গলের ভিতরেই কোথাও সান্টিং হয়ে যাবে”। নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেবার সুরে প্রমথ বলল।

“কিন্তু চোখমুখের ওই উজ্জ্বলতা। সম্পূর্ণ নগ্ন অথচ কি সহজ। এই পরিবেশে একবারের জন্যেও বেমানান মনে হল না”! সোনিয়া আনমনে বলল।

 আর কিছু দেখার ছিল না। সাতখানা গাড়িই লাইন ধরে একসঙ্গে ফিরছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ফিরতে পারবে অভ্যস্ত জীবনে। রথীন তার ক্যামেরা রিওয়াইণ্ড করে একটু আগেই তোলা ছবিগুলো চেক করছিল। আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রমো, তোর ক্যামেরাটা চেক করতো, এতগুলো শট নিলাম, একটাও ওঠেনি। খালি গাছপালা আর লেকের ছবি। ফ্রেমে কেউ নেই, না ওই লোকটা, না কোন জানোয়ার। দুটো ভিডিও তুলেছিলাম, সেম কণ্ডিসান”।

“কি বলছিস? দাঁড়া, দাঁড়া, আমারটা চেক করছি”।

 এতক্ষণ কোন কথাই বলেনি অগ্নি। চুপচাপ বসে কিছু ভাবছিল, বলল, “পাবি না। এ ছবি কোন ক্যামেরাতেই আসবে না। আমরা যাঁকে দেখেছি তিনি আমাদের মতো কোন মানুষ নন। নাগা সন্ন্যাসী, হঠযোগী, জংলী বাবা, কেউ নন। ইনি আমাদের সমস্ত ধারণার অনেক ঊর্ধে। পুরোটাই একটা অনুভব”।

“নাঃ রে, আমার ক্যামেরাতেও সেম অবস্থা। শুধুই জঙ্গল”। হতাশ স্বরে প্রমথ বলল।

“লে, এবার অগ্নির বাতেলা শোন। ওর এই ডায়ালগগুলোও রেকর্ড হবে না, দেখিস, রিপ্লে করলে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ শোনা যাবে, ঝিঁঝিঁর ডাক”। রথীন পিছন ফিরে বলল।

“ছিঃ বাতেলা, বলিস না, রথী, বল বাণী, বাব অগ্নিদেবের বাণী”। প্রমথ আওয়াজ দিল।

ওদের এই কথায় হাসল অগ্নি, আবার বলল, “খুব সহজ কথাটা আমাদের মাথায় কিছুতেই বসতে চায় না। তার কারণ, তাতে মাটি হয়ে যাবে আমাদের অহং, ভেঙে পড়বে আমাদের এতদিনের বানিয়ে তোলা সভ্যতার ধারণাগুলো। অত ভাবনায় কাজ কি গুরু, তার চেয়ে নিট রেজাল্টটা ভাব না, যে আশায় অনেক টাকা খরচ করে তোরা চাপে ছিলি, সেটা উশুল হয়ে গিয়েছে সুদ সমেত সোনিয়া ম্যাডাম, হিন্দীতে কি যেন বলে বেশ, ব্যাপারটাকে?

“পয়সা বোসুল”।

“এক্স্যাক্টলি। প্লাস সারা জীবন লোককে শোনানোর মতো একটা গপ্পোও পেয়ে গেলি। কিন্তু দুঃখ, কোন প্রমাণ রইল না। যারা এই গপ্পো শুনবে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাস করবে, বলবে তিনি আছেন। অধিকাংশই বলবে, গত রাতে ক’ পেগ চড়িয়েছিলে, গুরু? খোঁয়াড়িটা সকাল পর্যন্ত রয়ে গেল! নিজেদের চোখে দেখেও আমরা বিশ্বাস করি বা নাই করি, তিনি আছেন আমাদের সকলের অন্তরে, তিনি থাকবেনও চিরদিন”!  

-*-




মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯ 


২৬ 

গতকাল দুপুরে নোনাপুর এবং সুকরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আস্থানের রক্ষীরা যে ব্যবহার করেছে, তারপরে আজকের ভোরটা ভল্লার কাছে অত্যন্ত সঙ্কটজনক। যদিও গতকাল রাত্রে সে আর রামালি দুই গ্রামেরই কিছু ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাতের গোপন অন্ধকারে বড়ো বড়ো কথা বলা, আর প্রকাশ্য দিবালোকে নিজের নিজের পরিবার - মা-বাবা-ভাই-বোনদের সামনে দিয়ে হেঁটে, ভল্লার কাছে মহড়ায় যোগ দিতে আসার অন্য মাত্রা আছে। তার জন্যে প্রয়োজন প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভয়হীন বুকের খাঁচা।  

ছেলেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সকলেই এখন সন্ত্রস্ত। তাদের চোখে-মুখে অসহায় বিপন্নতা। একে তো আস্থানের রক্ষীরা অভিযোগ করেছে, এই গ্রামের ছেলেরাই আস্থানে ডাকাতি করেছে। তিনজন রক্ষীকে মেরে ফেলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, এসবই ঘটেছে, রাজার দণ্ড পাওয়া অপরাধী ভল্লার উস্কানিতে। কোন ঘটনা এবং অভিযোগেরই প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই – সবটাই অনুমান নির্ভর। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই গতকাল তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। বন্দী করে নিয়ে গেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজকাকাকে। বীভৎস প্রহারে মৃতপ্রায় করে দিয়েছে গ্রামপ্রধান জুজাককে। তারপরেও গ্রামের ছেলেরা যদি ভল্লার কাছেই যায় শরীর চর্চা করতে, পরিবার-পরিজনদের এবং প্রতিবেশীদের আতঙ্ক বাড়বে। বাড়বে নিজের নিজের ছেলেদের প্রতি সন্দেহ। যারা বিশ্বাস করত, আমাদের ছেলেরা কোন কুকাজ করতে পারে না। তারাও এবার সন্দিহান হয়ে উঠবে। ছেলেদের এখন লড়তে হবে ঘরে এবং বাইরে। ঘরের লড়াইটাই বেশি কঠিন - স্নেহ-মমতাপ্রবণ পরিবারের সঙ্গে মানসিক লড়াই। তার থেকে বাইরের লড়াইটা অনেক বেশি স্পষ্ট।   

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নোনাপুর গ্রাম থেকে এল চোদ্দজন। আর সুকরা থেকে আটজন। ভল্লা সকলকে বসতে ইশারা করল। সকলে বসার পর ভল্লা বলল, “কী করে এলি তোরা? মা-বাবা, ভাই বোনরা কেউ মানা করল না?”

শল্কু হাসতে হাসতে বলল, “করেনি আবার? আমার মা তো হাতে পায়ে ধরতেই যা বাকি রেখেছেন। বোনদুটো এমন কাঁদছিল বেরোনোর সময়”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? পারবি? এই বাধা রোজ পেরিয়ে, লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে?”

শল্কু বলল, “ভল্লাদাদা, কে কী করবে আমি জানি না। আমি তো আসবোই। রক্ষীদের নাম শুনলেই,  ছোটবেলা থেকে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের দেখেছি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে। তোমার এখান থেকে গতকাল ফিরে গিয়ে যা দেখলাম, যা বুঝলাম, রক্ষীরাও ভয় পায়। এতদিন ওদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি, ওরা যা খুশি করে গেছে। ওদের গায়ে আমরা একবার হাত তোলাতেই – ওরা ভয়ে দৌড়ে চলে আসছে গ্রামে গ্রামে। অপমান করছে গুরুজনদের। কবিরাজকাকাকে ধরে নিয়ে গেল...তিনি কি আমাদের ডাকাতি করতে শিখিয়েছেন? নাকি ডাকাতি করতে আমাদের উস্কেছেন? আসলে এবার ওরাও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে ভল্লাকে। ভয় পেয়েছে ভল্লার দলকে। আমরা যদি ভয়ে সিঁটিয়ে আবার গিয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকি, ওরা তো আমাদের সকলের ঘাড়ে বসে হাগবে, ভল্লাদাদা! যে পথে আমরা এগিয়েছি...সেখান থেকে আমি অন্ততঃ ফিরে আসবো না, ভল্লাদাদা। হয়তো মরবো, কিন্তু মরার আগে ওদের টের পাইয়ে দিয়ে মরবো”।

ভল্লা লক্ষ্য রাখছিল, শল্কু্র কথাগুলো বাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে। তাদের মনে হয়তো কিছু দ্বিধা ছিল, সেটা ফিকে হয়ে উঠছে শল্কুর প্রত্যয়ী কথায়। তাদের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠছে। তাদের চোখে ফুটে উঠছে ক্রোধ।

ভল্লা সবাইকে ভাবতে একটু সময় দিল, তারপর বলল, “তোরাও কি শল্কুর সঙ্গে একমত? মনে কোন ভয় বা দ্বিধা নেই তো?”

ছেলেরা প্রায় একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাদের লড়তে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়বো”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ। আমি শেখাবো। নিজে হাতে ধরেই শেখাবো। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কোনদিন বিশ্বাস ভাঙবে না। প্রাণ দিতে হলেও না। একটা কথা মনে রাখিস – তোদের এই ভল্লাদাদাও কম নিষ্ঠুর নয়। চাপে পড়ে বা ভয়ে কেউ যদি রাজসাক্ষী হয়েছিস – কিংবা আমাদের কথা এই দলের বাইরের কাউকে বলেছিস, অন্য কেউ নয় - আমার হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাজি?”

“রাজি”! সকলের সমবেত চিৎকার, জঙ্গলের মধ্যে গর্জনের মতো শোনালো।

ভল্লা সুকরা গ্রামের সুরুলকে বলল, “সুরুল, গতকাল রাত্রে তোর সঙ্গে কথা বলার সময়, তোর মধ্যে যে জেদ আর রাগ দেখেছিলাম, সেটা কি এখনো আছে? নাকি একটু ভয় ভয় করছে”?

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে গতকাল ওরা যেভাবে অকারণ আঘাত করল, তার শোধ তো আমি তুলবই, ভল্লাদাদা। আমাদের সকলের মনের জোর আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু রক্ষীদের সঙ্গে লড়ার দক্ষতা নেই...তুমি আমাদের শেখাও ভল্লাদাদা।

“তবে, মনে রাখিস, লড়াই শিখতে গেলে জরুরি হচ্ছে, ধৈর্য আর জেদ। এ দুটো যার যত বেশী, সে শিখবে তত তাড়াতাড়ি। চল, তাহলে এখনই শুরু করা যাক”।  

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, আমাদের রণপাগুলো বের কর। আজ রণপার খেলা শেখাই সবাইকে”। রামালি দুজোড়া রণপা এনে ভল্লার হাতে দিল। ভল্লা একজোড়া রেখে অন্য জোড়াটা দিল রামালিকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাঁশের এই লাঠি দুটোয় চড়ে আমরা আজ হাঁটতে শিখব। আমাদের ঘোড়া নেই...ঘোড়ার বদলে আমাদের আছে রণপা। এই রণপা শুধু যে আমাদের পা দুটোকে লম্বা করে দেবে তাই নয়, প্রয়োজনে এই রণপা আমাদের অস্ত্রও হয়ে উটবে। এই লাঠির আঘাতে শত্রুর মাথাও ফাটানো যাবে অনায়াসে। কাজেই রণপা বড়ো কাজের জিনিষ। এখন আমি আর রামালি তোদের দেখাব – কীভাবে এতে চড়তে হয়, কীভাবে হাঁটতে হয়। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে দৌড়তেও হবে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই রণপায়ে চড়ল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখাল সবাইকে। আহোক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী করে শিখলি, রামালি?” রামালি স্বচ্ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বলল, “গতকাল ভোরে ভল্লাদাদা শেখাল। কাল সারাদিনে হাঁটতে শিখেছি...এবার দৌড়তেও শিখব”।

ভল্লা বলল, “সুকরার ছেলেরা ছাড়া, তোরা সবাই জানিস, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কোথায় লুকোনো আছে...চল সবাই ওদিকে যাই...ওখান থেকে রণপা নিয়ে এখনই মহড়া শুরু করব। রামালি তুই আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে আয়, আমি এগিয়ে যাচ্ছি”।

পলক ফেলার আগেই রণপা চড়ে ভল্লা যেন উধাও হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর। দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত ছেলেরা। শুধু একজোড়া লাঠি নিয়েই এত দ্রুত চলাফেরা করা যায়? তাও এই জঙ্গলের রাস্তায়? রামালি ওদের পাশে রণপায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, “শল্কু, কাকার কী অবস্থারে?”

শল্কু খুব মন দিয়ে রামালির হাঁটা দেখতে দেখতে বলল, “আজ ভোরে শুনলাম একটু ভাল আছেন। উঠে বসেছেন। তবে তোর কাকি একদম চুপ মেরে গেছে, জানিস তো? চাইলে তুই আবার ফিরে আসতে পারিস। মনে হয় না, তোর ওপর কাকি আর কোন চোটপাট চালাবে।”

রামালি হেসে বলল, “ধূর কী হবে, কাকার সংসারের বোঝা হয়ে থেকে? আমাকে কিছু না বললেও, কাকাকে ছেড়ে দেবে? এই ভালো – ছোটবেলা থেকে বহু সহ্য করেছি... খুব ভয়ে ভয়ে বড়ো হয়েছি। আর না...এবার বাঁচবো...তার জন্যে যদি মরতে হয়...তাও। মরার আগে এটুকু অন্ততঃ জেনে যাবো... বসে বসে মার খাইনি, চেষ্টা করেছিলাম...”!

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “কাল তোমাদের গাঁয়ে এসে রক্ষীরা কী করেছে, শল্কুদাদা?”

শল্কু বলল, “গ্রামে এসেই তো শুয়োরের বাচ্চারা যাকে সামনে পেয়েছে চাবুক মেরেছে। কেউ কেউ তো আবার বল্লমের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়েছে। বাচ্চা, বুড়ো, মেয়েছেলে কাউকে ছাড়েনি। ভাবলেই মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, কার কার বাড়িতে ডাকাতির মাল রাখা আছে...বার করে দে...নয়তো আগুন ধরিয়ে দেব সব কটা বাড়িতে। সেই সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন কবিরাজকাকা। আর পৌঁছুলেন গ্রামপ্রধান জুজাককাকা...”।

আহোক বলল, “ভল্লাদাদা আমাদের গাঁয়ে ঢুকতে মানা করেছিল। আমরা থাকলে, ভয়ংকর কাণ্ড হয়ে যেত। আমার ছোটকাকার কাছে শুনলাম, প্রধানমশাই ওদের সামনে গিয়ে, বলার মধ্যে বলেছিলেন, “আমি এই গ্রামের প্রধান, আপনাদের কোন অভিযোগ থাকলে, আমাকে বলুন...যাকে তাকে সবাইকে এভাবে আপনারা মারতে পারেন না...দেশে কি রাজা নেই নাকি? এটা কি অরাজক দেশ?” ব্যস্‌, আর যায় কোথায়, গুয়োর ব্যাটারা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমশাইয়ের ওপর। কী মার কী মার। বল্লমের বাঁট, লাথি, চড় ঘুঁষি। কবিরাজকাকা গ্রাম প্রধানকে বাঁচাতে গিয়েছিল, তাকেও বেধড়ক মারল। লাথি মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

এই সময়েই বেরিয়ে এসেছিল রামালির কাকি। গলার শির ফুলিয়ে নাকি চেঁচাচ্ছিল, “ওদের মারছো কেন? ওরা কী করেছে? ডাকাতি তো করেছে, বাপ-মা খেগো রামালি আর ওই আঁটকুড়ির বেটা ভল্লা। তাদেরকে ধরো না। ওদের কাছেই পেয়ে যাবে সব লুঠের মাল। এ গাঁয়ে কোন বাড়িতে কিচ্ছু নেই।

রামালির কাকির চিৎকারে রক্ষীরা একটু থমকে গিয়েছিল। না হলে গ্রামপ্রধান কালকেই শেষ হয়ে যেত। অকথ্য গালাগাল দিয়ে রক্ষীদের সর্দার বলল, এই রামালিটা আবার কোন বেজন্মা? রামালির কাকা গিয়েছিল, বউকে সামলাতে, সে বলল, আজ্ঞে আমার দাদার ছেলে, আমরা গতকালই ঝ্যাঁটা মেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এবার শুরু হল রামালির কাকার ওপরে মার...শুয়োরের বাচ্চা, কে তোদের তাকে তাড়াতে বলেছে?  সে এখন কোথায়? কাকাকে বাঁচাতে, কাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে আর এই গ্রামে নেই... হাভেতে ভল্লার সঙ্গে গিয়ে জুটেছে।

রক্ষীরা যখন রামালির কাকা আর কাকিকে নিয়ে ব্যস্ত, ওদিকে প্রধানমশাইয়ের তখন জ্ঞান নেই, মাটিতে পড়ে আছেন মড়ার মতো। কবিরাজকাকা ধুলো থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গেলেন প্রধানমশাইয়ের কাছে, ওখানেই তিনি নাড়ি পরীক্ষা করে দেখছিলেন প্রধানমশাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে। রক্ষীসর্দারের চোখ শালা শকুনের মতো, ঠিক দেখেছে। রাক্ষসটা কবিরাজকাকার কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাকে ওঠাল, বলল, অ তুই বুঝি সেই কবিরাজ? আশপাশের গাঁগুলোতে তোর কথাও তো খুব শুনেছি...তুইই শালা সবাইকে খেপাচ্ছিস। ঢ্যামনা ঢকঢকে বুড়ো তুই আমাদের সঙ্গে চল...তোর পেটে পা দিলেই, ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসবে গোপন সব কথা।

লোকটা কবিরাজকাকাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল রামালির বাড়ির সামনে। প্রধানমশাইয়ের রক্তাক্ত দেহটা পড়ে রইল মাঠেই। রামালির বাড়ি তছনছ করে কী খুঁজল, দেখল কে জানে। যাবার সময় রামালির কাকাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেল ওদের উঠোনে। তারপর বাইরে এসে সকলে ঘোড়ায় চড়ল, কবিরাজকাকার দুই হাত আর কোমরে দড়ি বাঁধল। রওনা হওয়ার আগে গাঁয়ের সবাইকে শাসিয়ে গেল, ভল্লা আর রামালিকে যদি না পায়, ওরা আবার আসবে। ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। কবিরাজকাকার পা দুটো ঘষটাতে লাগল মাটিতে, ঠোক্কর খেতে লাগল, পথের ধারের পাথরে, ঝোপঝাড়ে”।  

আহোক বর্ণনা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। আহোক আবার বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে এইসব ঘটনার কথা যখন শুনছি, সবাই ছিল সামনে - বাবা, জ্যাঠা, অন্য কাকারা...মা কাকিমারা...ভাইবোনগুলোও...আমি বললাম গাঁয়ের এতগুলো মানুষ রয়েছো – কেউ বেরিয়ে গিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে না? জ্যাঠা গম্ভীর গলায় বলল, জুজাক তো গিয়েছিল। কবিরাজদাদাও গিয়েছিল...ওদের কী হয়েছে সবই তো শুনলি...আমরা গেলেও একই দশা হত...কী আর বলবো...বয়স্ক গুরুজন... রাজরক্ষীদের ভয়ে এরা কোনদিন মাথা তুলে বাঁচতেই শেখেনি...”

সুরুল বলল, “এসব দেখে শুনেও আমাদের রক্ত যদি গরম না হয়...যদি এর শোধ না নিই...রক্তখেকো রক্ষীদের যদি এখনই উচিৎ শিক্ষা না দিই...তাহলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না, আহোকদাদা...রোজ রোজ তিলে তিলে মরার থেকে...ওদের অন্ততঃ একজনকে মেরে যদি মরি...সেটাই হবে প্রকৃত বাঁচা...”।

তেইশজন ছোকরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের পথে।

চলবে...

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৬ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

সপ্তদশ পর্বাংশ  


৪.৮.৭ কদম্ব

কদম্বদের সম্পর্কে শোনা যায়, তাঁরা মানব্য গোত্রের ব্রাহ্মণ ছিলেন। শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা এক ব্রাহ্মণ, নাম ময়ূরশর্মা, একবার পল্লব রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চীতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কর্ণাটকে একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং রাজধানী ছিল বনবাসীতে। এই ঘটনা ঘটেছিল খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এরপরে সমুদ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য অভিযানে পল্লবরাই বিধ্বস্ত এবং গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। অতএব প্রায় অস্তিত্বহীন কদম্ববংশের ইতিহাসে প্রথম সাড়া পাওয়া গেল, রাজা ককুস্থবর্মনের সময়। এই সময় কদম্ব রাজ্যের পরিসীমা এবং প্রভাব চোখে পড়ার মতো পর্যায়ে এসেছিল। তারপর ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দশকে যখন রবিবর্মন রাজা হলেন, গঙ্গ এবং পল্লবদের সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তিনি তাঁর নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, হালসীতে (বেলগাম জেলা)। কিন্তু এরপর বাতাপির চালুক্য বংশের উত্থানে কদম্বরা আবার অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই কদম্বদের আবার দেখা পাওয়া যায় দশম শতাব্দীর শেষদিকে, রাষ্ট্রকূট রাজ্যের পতনের সময়। এই কদম্বদের ছোট ছোট শাখা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে তাঁদের অস্তিত্ব স্থানীয় ভাবে বজায় রেখেছিলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত!

 

৪.৮.৮ তলকড়ের গঙ্গ

গঙ্গদের উৎপত্তি শোনা যায় পৌরাণিক ইক্ষ্বাকু বংশ থেকে, এমনও শোনা যায় তাঁদের আদি নিবাস ছিল গঙ্গার তীরে অথবা তাঁরা মুনি কণ্বর উত্তরসূরি। মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে গঙ্গদের রাজ্য ছিল এবং সেই সময়ে তাঁদের রাজ্যকে গঙ্গবাড়ি বলা হত। মোটামুটি চতুর্থ শতাব্দীর কোন সময়ে, এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দিদিগ বা কোঙ্গনিবর্মন এবং মাধব। প্রথম দিকে এই রাজ্যের রাজধানী ছিল কুলুবলে (কোলার?)। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি গঙ্গরাজা হরিবর্মা রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন কাবেরী নদীর তীরে, তলবনপুর বা তলকড়ে। গঙ্গদের এক রাজা দুর্বিনীত পল্লবদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে গঙ্গদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষায় “পৈশাচী বৃহৎ-কথা” রচনা করেছিলেন। গঙ্গদের আরেক বিখ্যাত রাজা ছিলেন শ্রীপুরুষ (৭২৬-৭৬ সি.ই.)। তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রকূটদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিলেন এবং পল্লবদের পর্যুদস্ত করেছিলেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে গঙ্গরাজাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন ভেঙ্গির চালুক্যরা এবং মালখেড়ের রাষ্ট্রকূটরা। এই সময় গঙ্গরাজ শিবমার বন্দী হয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব নিরুপম। এরপর থেকে গঙ্গ রাজারা নানান শক্তিশালী রাজ্যের সামন্তরাজা হিসেবেই রাজ্য পরিচালনা করতেন, যেমন রাষ্ট্রকূট, হোয়সল এবং চোল।

গঙ্গ রাজারা সাধারণতঃ জৈন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এই বংশের রাজা দুর্বিনীত জৈন আচার্য পূজ্যপাদের শিষ্য ছিলেন। এই বংশের আরেক রাজা চতুর্থ-রাজমল্ল এবং তাঁর সেনাপতি ও মন্ত্রী চামুণ্ডরায় ৯৮৩ সি.ই.-তে শ্রবণবেলগোলার সুবিখ্যাত গোমতেশ্বর মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

৪.৮.৯ দ্বারসমুদ্রের হোয়সল

হোয়সল বা পোয়সলরা দাবি করেন, তাঁরা “যাদবকূলতিলক” বা “চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়”। তবে এঁদের সম্বন্ধে আরেকটি প্রবাদ শোনা যায়, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীর সাল কোন এক মুনির নির্দেশে, লৌহশূল দিয়ে একা একটি বাঘকে হত্যা করেছিলেন। তার থেকেই এই বংশের নাম হোয়সল বা পোয়সল (হোয় বা পোয় কথার অর্থ হত্যা এবং সাল থেকেই সল)।

হোয়সল রাজত্বের উন্নতির সূচনা একাদশ শতাব্দীর শুরুতে। তার আগে এঁরা মহীশূরের ক্ষুদ্র অঞ্চলের রাজা ছিলেন। এই সময় তাঁরা চোল বা কল্যাণের চালুক্য রাজাদের অনুগত রাজ্য হয়ে নিজেদের শক্তি এবং প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছিলেন। মোটামুটি ১০৪৫ সি.ই.-তে এই বংশের রাজা বিনয়াদিত্য এবং তাঁর পুত্র এরিয়ঙ্গ, চালুক্য রাজাদের সহযোগী হয়ে অনেক যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। এরপর রাজা বিত্তিগ বিষ্ণুবর্ধনের (১১১০-৪০ সি.ই.) সময় হোয়সল রাজ্য দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই রাজা তাঁর রাজধানী ভেলাপুর (বেলুর, হাসান জেলা) থেকে সরিয়ে দ্বারসমুদ্রে (হালেবিদ, হাসান জেলা) নিয়ে আসেন। এই সময় তিনি চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, প্রায় স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু কখনই কোন “রাজা” উপাধি গ্রহণ করেননি। চালুক্য রাজাদের প্রতিনিধি হয়ে, তিনি সমসাময়িক, চোল, মাদুরার পাণ্ড্য, মালাবার, দক্ষিণ কানারার তুলুব, গোয়ার কদম্ব সকলের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই সময় রাজা বিষ্ণুবর্ধন সম্পূর্ণ মহীশূর এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলের অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ জৈন ছিলেন, কিন্তু পরে আচার্য রামানুজের সংস্পর্শে এসে তিনি বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

রাজা বিষ্ণুবর্ধনের পর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন, তাঁর নাতি প্রথম-বীরবল্লাল (১১৭২-১২১৫ সি.ই.)। তিনিই প্রথম নিজেকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি চালুক্য এবং যাদবদের পরাজিত করে, স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর থেকেই হোয়সল রাজত্বের পতনের শুরু এবং শেষ হোয়সল রাজা তৃতীয়-বীরবল্লাল ১৩১০ সি.ই.তে সেনাপতি মালিক কাফুরের হাতে পরাজিত হন এবং তাঁকে বন্দী করে দিল্লি আনা হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হোয়সল বংশ লুপ্ত হয়ে যায়।

হোয়সল রাজাদের স্থাপত্য কীর্তি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁদের রাজত্ব কালে অজস্র মন্দির ও স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে বেলুর ও হালেবিদের স্থাপত্যগুলি শিল্প সুষমায় অনবদ্য।

 

৪.৮.১০ কাঞ্চীর পল্লব

পল্লবদের উৎস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ আছে। অনেকে বলেন, তাঁরা আদিতে পহ্লব অর্থাৎ পার্থিয়ান, দক্ষিণ ভারতে এসে পল্লব হয়ে গিয়েছিলেন। পৌরাণিক কথায় শোনা যায়, তাঁরা দ্রোণাচার্য এবং অশ্বত্থামার বংশধর –অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-যোদ্ধা। অনেকে বলেন তাঁরা দক্ষিণ ভারতের দেশীয় গোষ্ঠী। তবে তাঁরা যে উত্তরভারত থেকেই দক্ষিণে গিয়েছিলেন, তার কিছু যুক্তি আছে, যেমন, পল্লবদের প্রাচীন রাজভাষা ছিল প্রাকৃত এবং পল্লবরা শুরু থেকেই সংস্কৃতের পৃষ্ঠপোষক। এর আগে কদম্ববংশের প্রতিষ্ঠাতা ময়ূরশর্মার লিপি থেকে আমরা জেনেছি, “পল্লবক্ষত্রিয়”, অতএব পল্লবরা উত্তরভারতের ক্ষত্রিয় এমন অনুমান হয়তো করা যায়।

খ্রীষ্টিয় তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীতে কিছু প্রাকৃত লিপি থেকে পল্লবদের প্রথম ইতিহাস জানা যায়। এই লিপিতে বেশ কয়েকজন রাজার নাম পাওয়া যায়, যেমন বপ্পদেব, শিবস্কন্দবর্মন, বুদ্ধি (বা অঙ্কুর) এবং বীরবর্মন। রাজা বপ্পদেব পল্লব বংশের প্রতিষ্ঠাতা কিনা সঠিক জানা না গেলেও, তিনিই এই রাজবংশকে দক্ষিণে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাঁর সময়ে তেলুগুর “অন্ধ্রপথ” এবং তামিলদের “তোণ্ডামণ্ডলম”- তাঁর রাজ্যের দুই প্রধান অঞ্চল ছিল এবং এই দুই অঞ্চলে তাঁর প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল ধ্যানকটা (ধরণীকোট্টা, অমরাবতীর কাছে) এবং কাঞ্চী (কাঞ্জিভরম)। তাঁর পুত্র শিবস্কন্দবর্মন এই রাজত্ব হয়তো আরো দক্ষিণে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন, নচেৎ তিনি অশ্বমেধ, বাজপেয় এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের আয়োজন করতে পারতেন না। আরেকজন পল্লব রাজার নাম পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ লিপিতে, কাঞ্চীর রাজা বিষ্ণুগোপ। দাক্ষিণাত্য অভিযানে সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে এই রাজার যুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজা বিষ্ণুগোপের সময় কাল চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামঝি কোন সময়ে। অতএব পল্লবদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর্ব সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের সময় থেকে একথা সহজেই অনুমান করা যায়।


    গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে পল্লবদের দ্রুত উত্থান শুরু হয়েছিল, মোটামুটি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে। এই সময় থেকেই পল্লবরা দক্ষিণভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলেন।

রাজা সিংহবিষ্ণুঃ পল্লবদের এই পর্যায়ে রাজা সিংহবিষ্ণু চোলদের পরাস্ত করে, কাবেরি নদী পর্যন্ত এবং তারপরেও আরও দক্ষিণে পাণ্ড্য, কালাভ্র এবং আরও কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন।

রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে পিতা সিংহবিষ্ণুর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন। তাঁর সময় থেকেই পল্লব এবং চালুক্যদের মধ্যে নিরন্তর বিবাদ শুরু হয়েছিল, দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভারতে অবিসম্বাদিত প্রতিপত্তি স্থাপনা। এই সময়ের উভয় পক্ষীয় শিলালিপিতেই অন্যপক্ষকে পরাজিত করার বিবরণ বারবার লেখা হয়েছে। রাজা মহেন্দ্রবর্মন প্রথম দিকে জৈন ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে স্বামী আপ্পার প্রভাবে শৈব হয়েছিলেন। তাঁর সময়েই পাহাড় কেটে প্রচুর মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। তিনি নিজে “মত্তবিলাস-প্রহসন” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার কথা আগেই বলেছি।

প্রথম নরসিংহবর্মনঃ প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র, পিতার মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকের কোন সময়ে। ভীষণ শক্তিশালী এবং সাহসী এই রাজা চালুক্যদের ভয়ংকর আক্রমণ করেছিলেন, এবং ৬৪২ সি.ই.-র যুদ্ধে তিনি চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তাঁর সময়ে তিনি দুবার নৌ-অভিযান করে সিংহলও আক্রমণ করেছিলেন। নরসিংহবর্মন শুধু যুদ্ধ নয়, মন্দির স্থাপত্যেও অনবদ্য নিদর্শন রেখে গেছেন, তাঁর পিতার মতো তিনিও পাহাড় কেটে অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যার মধ্যে মহাবলিপুরম বা মামল্লপুরম সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নরসিংহবর্মনের রাজত্বকালেই চীনের বৌদ্ধ পর্যটক হুয়ান সাং কাঞ্চী গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছুদিন ছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় কাঞ্চী শহরে প্রায় শতাধিক সংঘারাম ছিল এবং সেখানে প্রায় দশ হাজার মহাযানী সন্ন্যাসী বিদ্যাচর্চা করতেন। শহরে প্রায় আশিটি দেবমন্দির দেখেছিলেন এবং শহরে অনেক নির্গ্রন্থ (জৈন) সন্ন্যাসীও বাস করতেন।

প্রথম পরমেশ্বরবর্মনঃ মোটামুটি ৬৫৫ সি.ই.-তে পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করা ছাড়া তাঁর তেমন কোন কীর্তির কথা জানা যায় না।

দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শেষ দশকে তিনি পিতার সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকাল শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্যে বিখ্যাত। তিনি অনেকগুলি বিখ্যাত মন্দির, যেমন রাজ সিংহেশ্বর এবং কাঞ্চীর “ঐরাবতেশ্বর” মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মামল্লপুরমের সমুদ্রতট মন্দিরে তাঁরও অবদানের কথা শোনা যায়। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভার অলংকার ছিলেন দণ্ডিন, যাঁর কথা আগেই বলেছি। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ পরিবারের মধ্যেই তীব্র বিবাদ এবং কলহ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় বেশ কিছুদিন বিশৃঙ্খলার পর, জনগণের বিপুল সমর্থনে রাজা হয়েছিলেন, নন্দিবর্মন। তাঁর পিতা হিরণ্যবর্মন ছিলেন, সিংহবিষ্ণুর ভাইয়ের বংশধর। নন্দিবর্মনের রাজত্বকালের শুরুতেই চালুক্যরা আবার পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, যদিও নন্দিবর্মন তাঁদের প্রতিহত করে, পল্লব রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। নন্দিবর্মন প্রায় পঁয়ষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। নন্দিবর্মণের পর রাজা হয়েছিলেন দন্তিবর্মন। শোনা যায় তিনি রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা রেবার পুত্র। এই রাজকুমারী রেবা ছিলেন দন্তিদুর্গার কন্যা। কিন্তু এই বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চালুক্যরাজ তৃতীয় গোবিন্দ ৮০৪ সি.ই.-তে কাঞ্চী আক্রমণ করেছিলেন এবং দন্তিবর্মনকে পরাজিত করেছিলেন। দন্তিবর্মনের (৭৭৬-৮২৮সি.ই.) রাজত্বকালে পাণ্ড্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী রাজারা হলেন নন্দি (৮২৮-৫১ সি.ই.), নৃপতুঙ্গবর্মন (৮৫১-৭৬ সি.ই.) এবং অপরাজিতবর্মন (৮৭৬-৯৫ সি.ই.)। তাঁর সময়েই চোলরাজা প্রথম আদিত্য পল্লবরাজ্যে চরম আঘাত হানেন এবং পল্লবদের রাজ্যচ্যুত করেছিলেন। এরপর দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস থেকে পল্লবদের যুগ সমাপ্ত হল।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড ...