রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " স্তন্য-ডাইনী "


আমাদের এই শহর – পথিকপুরের শহীদ জগবন্ধু স্টেডিয়ামে আসছেন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় জিকাল্ডো। কোন দেশে থাকেন ঠিক জানি না। পর্তুগাল, ইটালি কিংবা ব্রাজিল এমনকি চিলি হলেও হতে পারে। সত্যি বলতে এই দেশগুলোও ঠিক কোনদিকে, মানে আমাদের দেশের পূর্বে না উত্তরে, নাকি কিছুটা দক্ষিণ দিক ঘেঁষে – সেটাও সঠিক বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি আমি তাঁর অন্ধ ভক্ত। জিকাল্ডোকে আমি আদর করে বলি জিকুদা। জিকুদার খেলা টিভিতে দেখাই যায়, কিন্তু সে খেলাও যে আমি খুব দেখেছি তা নয়। তবে খবরের কাগজে ছাপানো তাঁর সব ছবির কাটিং আমি সাঁটিয়ে রেখেছি আমার ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে।

আমি নিজে ফুটবল সেভাবে খেলি না, ছোটবেলায় গলিতে খেলতাম, রবারের বলে। সেই পর্যন্তই। অতএব খোলা মাঠে ফুটবল খেলাটা কী ভাবে খেলতে হয় সে বিষয়েও আমার তেমন ধারণা নেই। তার কারণ মাঠে গিয়ে আমাদের এদিকের ভাল ভাল টিমের খেলা দেখতে আমি তেমন উৎসাহ পাই না। লাইন দিয়ে টিকিট কাট, দুঘন্টা আগে থেকে মাঠের গ্যালারিতে সিট আগলে বসে থাক। আর বসে বসে খেলা দেখা? ইস্‌ সে খেলার যা ছিরি - অখাদ্য যত প্লেয়ার নিজেদের মধ্যে বল নিয়ে ঝুটোপুটি করছে। একবার বাঁদিকে ছুটছে তো পরক্ষণেই আবার উল্টোমুখে ছুটছে। এ আবার কি, মাঠের মধ্যে আনতাবড়ি ছুটোছুটি করলেই ফুটবল খেলা হয়ে গেল? তবে আমার বন্ধুদেরও বলিহারি। তাদের সবাই এবং গ্যালারির সব দর্শকও ওই খেলা দেখেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, গোল-টোল হলে তিড়িং বিড়িং লাফায়। আর নিজের দল গোল খেয়ে গেলে মাথা চাপড়ে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি গালাগাল দেয়।

সেখানে জিকুদাকে দেখ – কি শান্ত, সৌম্য চেহারা, যেন দেবদূত। দেখিনি কোনদিন, তবে শুনেছি জিকুদার পায়ে আঠা আছে, একবার বল এলে জিকুদার শ্রীচরণে সেটা চিপকে যায় – সে আঠা ছাড়ে বিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে – গোওওওল হলে। সেই জিকুদা আমাদের শহরের স্টেডিয়ামে আসছে আর আমি মাঠে যাবো না তাকে একবার চোখের দেখা দেখতে?

আমাদের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার দশেক মতো সিট। প্রথমে ভেবেছিলাম, আরামসে টিকিট পেয়ে যাব, এই পোড়া শহরে কপিস লোক আর আছে – যারা জিকুদার কদর বোঝে? তাই প্রথম দিকে একটু গড়িমসি করে, দিন তিনেক পরে টিকিট কাটতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! শুনলাম প্রথম দিনেই টিকিট সব শেষ, টিকিটের খুদ-কুঁড়োও এখন আর মিলবে না।

পরদিন সকালেই রওনা হলাম শানুদার বাড়ি। আমাদের এলাকার নেতা, তাঁর নাম শুনলে আগে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত। ইচ্ছা থাকলেও আজকাল অবশ্য খেতে পারে না  – কারণ বাঘগুলো থাকে সুদূর অভয়ারণ্যের ভেতর আর গরুরা গোমাতা হয়ে আমাদের সঙ্গে। শানুদার পুরো নাম শান্তিরঞ্জন, তবে তাঁর চারপাশে এবং তাঁর কীর্তিকলাপে সর্বত্রই অশান্তি বিরাজ করে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে আড়ালে বলে শানু মানে সেয়ানা – নিজের স্বার্থটি তিনি ষোলআনা বোঝেন কিনা।

কী সব জরুরি মিটিং-টিটিং চলছিল বলে, তাঁর বৈঠকখানা ঘরে আমি ডাক পেলাম ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর। আমাকে দেখেই আধবোজা চোখে বললেন, “কিরে তোর আবার কী হল, গতি? টিকিট পেলি না? তাহলে কী হবে? জিকাল্ডোকে দেখবি কী করে?”

আমার নাম গৌতম পল্লে, সংক্ষেপে গতি। কিন্তু গতি নাম হলে কী হবে – শানুদার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও আমার আজ পর্যন্ত কোন গতি হয়নি। তবে আশা আছে আজ আর শানুদা আমাকে হতাশ করবেন না, কিছু একটা গতি করে দেবেনই।

কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, “বুঝতেই তো পারছেন, দাদা। কোন গতিকেই সুবিধে করতে পারলাম না। তাই আপনার কাছে আসা। কিছু একটা করে দিতেই হবে দাদা, আমাদের শহরে জিকুদা আসছেন আর আমি দেখতে পাবো না, এ হতেই পারে না। বিশেষ আপনি থাকতে”।

“বুঝি রে সব বুঝি, তোরা আমায় এত ভক্তি-শোদ্দা করিস, ভরসা করিস, বিশ্বাস করিস। তোরা ছাড়া আমার কী আছে বল তো? সমাজের পাঁচ জনের জন্যে কিছু করতে পারলে, আমি মনে করি, তোদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারলাম। টিকিট আমার কাছে আছে, কিন্তু যা দাম, তুই কি দিতে পারবি, গতি?”

আমি খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কত দাম, শানুদা?”

“দুরকম টিকিট আছে - পঁচিশ আর চল্লিশ হাজার। চল্লিশের টিকিটে বসলে মনে হবে, তুই মাঠের মধ্যেই বসে আছিস – গ্যালারিতে নয়”।

“কিন্তু শুনেছি, গ্যালারির টিকিট দু রকমের? পিছনের দিকের সিটের দাম পনেরশ আর সামনের দুহাজার...”।

“ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু এখন তার ওই রকমই দাম...কিছু পড়ে আছে... খুব চাপ চলছে রে, হয়তো আজ কালের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে”।

আমি রীতিমত চমকে গিয়ে বললাম, “এত দাম দিয়ে কারা কিনছে, শানুদা?”

“নেবার লোকের অভাব নেই রে, গতি – ওই দামেও লোকে হা হা করে কিনছে। এ রাজ্যের লোক তো বটেই – ভিন রাজ্যের লোকরাও...। বর্ষার সন্ধ্যেয় চপ-ফুলুরির দোকানে কেমন ভিড় হয় দেখিসনি? তার থেকেও বেশি – সাত হাজার টিকিট আমার হাতে এসেছিল – শ তিনেক বাকি আছে...”

খুব কাকুতির সুরে বললাম, “আমার জন্যে দামে-দামে একটা দিন না, দাদা”।

“ফাগল হয়েছিস? এ টাকার হিসেব দিতে হবে না আমায়? এই টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতার এদিকে ওদিকে। তুই কী ভাবছিস, আমি ঝাড়ছি টাকাটা? এমনটা ভাবতে পারলি, গতি? তোদের সঙ্গে এতদিন উঠছি বসছি, এই বুঝি তার পোতিদান?”

আমি লজ্জায় কুঁজো হয়ে বললাম, “তোমাকে আমরা দেবতার মতো ভক্তি করি, দাদা। এমন কথাটা তুমি ভাবলে কী করে? আমার বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে সারদায় পাঁচলাখ লাগালো, সবটাই গেল জলে। তোমায় আমরা কিছু বলেছি? এ পাড়া - সে পাড়ার কত গরু যে পাচার হয়ে চলে গেল সীমান্ত পেরিয়ে – তুমি তার কী করবে বলো? মায়ের গয়না বেচা আট লাখ টাকা গেল আমার ক্লাস ফোর পাস ভাইয়ের হাইস্কুলের টিচার হতে গিয়ে। তাতেই বা তোমার কী করার ছিল, বলো। আমাদের ভক্তিতে কোনদিন কোন খাদ দেখেছ? রেশনে চাল পাইনি, চিনি পাইনি – তাতে কি? বাজার থেকে সেই চাল- চিনি কিনেই তো ভাত খেয়েছি, চা খেয়েছি। বলো খাইনি – চুপ করে, মুখ বুজে। আমরা তো জানি – সব দিক দিয়েই তোমার হাত-পা বাঁধা। আমি একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে সিকিউরিটির কাজ করি, মাস গেলে হাজার ছয়েক পাই। তাতেই কোন মতে আমাদের দিন চলে যাচ্ছে...। তোমার কাছে কোনদিন কিছু চেয়েছি? কোন অভিযোগ করেছি? আমরা জানি, তুমি যখন আছ মাথার ওপরে, আমরা টিকে থাকব ঠিক...”। বলতে বলতে আমার চোখে জল ভরে এল। গলা বুঝে এলেও বললাম, “তোমাকে আমরা অবিশ্বাস করতে পারি, একথা তোমার মনে হল কী করে, দাদা?”

শানুদাও চশমা খুলে চোখটা মুছল রুমালে, বলল, “আমিই বা কী পেয়েছি বল? সারাটা জীবন দলের জন্যেই তো প্রাণপাত করে দিলাম। একফালি এই জমিতে ধারদেনা করে ছোট্ট এই বাড়িটা করেছি – কোন মতে। তিনতলা বাড়ি, মোটে বারোখানা ঘর। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথ, ব্যালকনি। এসি। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে সবজি বাগান। মাথাগুঁজে এ বাড়িতে থাকার এত কষ্ট যে, ছেলে-মেয়ে দুটোকে চোখের সামনে রাখতে পারলাম না। কলকাতায় রেখে আসতে হল তাদের লেখাপড়ার জন্যে। তাও ইংরিজি মিডিয়াম, প্রাইভেট স্কুলে। গাড়ি রাখতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে – কিন্তু তাও দলের কাজের জন্যেই তিনটে গাড়ি রাখতে হয়েছে। আরও দুটো হলে ভালো হত – কী করব উপায় নেই... টাকার বড়ো টানাটানি, রে গতি...”।

আমি নিজেকে সামলে শানুদার সামনে মেঝেয় বসে পড়ে বললাম, “সে কি আর আমরা জানি না, বুঝি না, শানুদা? বুকের রক্ত দিয়ে, কী ভাবে তুমি দলটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ? ছাতা হয়ে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছ আমাদের মাথার ওপর – ঝড়-ঝাপটা-রোদ-বৃষ্টি সামলে। আমাদের এতটা অকিতজ্ঞ ভেব না, শানুদা। তোমাকে দাদার মতো মনে করি বলেই না, তোমার কাছে একটা টিকিটের আবদার নিয়ে এসেছিলাম। এ ব্যাপারেও যে তোমার হাত-পা বাঁধা, সেকথা বুঝতে পারিনি গো দাদা। বুঝলে কি আর আসতাম, তোমাকে দুঃখ দিতে?”

শানুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, বলল, “সত্যিই রে, আমার হাত-পা বাঁধা, কিচ্‌ছু করার নেই। এভাবে ফেরাতে আমারও কি মন চাইছে? একদম না। কিন্তু... একটা উপায় বলতে পারি, যদি পাঁচকান না করিস”।

অসহায় হাত-পা বাঁধা শানুদার হাত হয়তো কোনভাবে খোলার আশায় আমি খুব উদ্গ্রীব হয়ে বললাম, “কী উপায়, দাদা?”

চারদিকে তাকিয়ে, ঘরে উটকো কেউ নেই দেখে, শানু দুহাতের আট আঙুলের আটটা আংটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “ঠোঁটকাটা নেপালকে নিয়ে থানায় যা, ওখানে স্টেডিয়ামে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু সাবধান, ঘুণাক্ষরেও কেউ যেন জানতে না পারে”।

“কেউ জানবে না, দাদা। ওফ্‌, তোমাকে কী বলে যে শোদ্দা জানাবো, শানুদা। কী যে আনন্দ হচ্ছে, চোখের সামনে জিকুদাকে দেখব, হেঁটে চলে বেড়াতে – ভাবা যায় না। আমি তাহলে এখন আসি, দাদা?”

“আয়”।

 

 

শানুদার বাড়ি থেকে বেরোতেই সামনের চায়ের দোকানে ঠোঁটকাটা নেপালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নেপাল বলল, “কি রে, দাদার সঙ্গে দেখা করলি? কী বলল, দাদা?”

“খুব গোপন কথা, বাইরে আয়, বলছি”। নেপাল দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াতে বললাম, “দাদার কাছে গিয়েছিলাম, একটা টিকিটের জন্যে। বলল, তোর সঙ্গে থানায় যেতে...”।

“জিকুদার টিকিট? আবে আমাকে বলবি তো”!

“আমি আমতা-আমতা করে বললাম, “ভেবেছিলাম, দাদাকে বলে, স্টেডিয়ামের একটা টিকিট যদি যোগাড় হয়ে যায়...”।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে নেপাল বলল, “তা কি বলল, শানুদা?”

“যা দাম বলল, তাতে আমাকে বাপের ভিটেমাটি বেচতে হবে... পঁচিশ আর চাল্লিশ হাজার”।

“তুই কি বললি?”

“বলার আর আছেটা কী? দাদা তো আমার অবস্থা জানেই। তোর সঙ্গে থানায় যেতে বলল, ওখানে নাকি মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে?”

“তা হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানেও কিছু টাকা খসাতে হবে – দুহাজার পার হেড। তোর কটা লাগবে?”

“একটাই...কিন্তু দু হাজার? কমসম হবে না?”

শানুদার মতোই দুখু-দুখু উদাসমুখে নেপাল বলল, “কমের কথা মুখেও আনিস না, গতি। আমাদের হাত-পা বাঁধা। জানিস তো সবই – এ টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতায়। তোর কী মনে হয় – থানার সঙ্গে সাঁট করে আমরা ঝাড়ছি টাকাটা?”

“আরে না না, তা কেন ভাবব? তোর সঙ্গে কি আমার সেই সম্পক্কো?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেপাল বলল, “সেই...শানুদাকে তো চিনিস, সবার জন্যেই কত চিন্তাভাবনা করে। তোদের মতো কাছের ছেলেদের জন্যেই, নানান রকম ফন্দি-ফিকির বানিয়ে রেখেছে। সাধ্যের মধ্যেই যাতে তোদেরও সাধ মেটে। মাঝে মাঝে খুব ধিক্কার দিই নিজেকে, জানিস তো? এতদিন ধরে পাটি করে কী পেয়েছি বল? তুই তো জানিস চার কাঠা জমিটা কীভাবে যোগাড় করলাম। তারপর কীভাবে চারতলা বাড়িটা পোমোট করলাম। বদলে কী পেলাম? মোটে দুখানা ফ্ল্যাট আর একতলার দোকানটা”।

সবটা না জানলেও কিছু কিছু জানি। নেপালরা বছর পাঁচেক আগেও থাকত রেললাইনের ধারে জবরদখল জমিতে। এর মধ্যেই বিধবা এক বুড়িকে ধমকে-চমকে চার কাঠার ওই জমিটা হাতাল, আর রাতারাতি তুলে ফেলল চারতলা বাড়িটা। নিজের জন্যে, রাস্তার ধারে একটা দোকানঘর, আর দোতলায় দুটো ফ্ল্যাট রাখল, বুড়িকেও দিল একটা। বাকি তেরটা ফ্ল্যাট বেচে দিল। রাস্তার ওপরেই নেপালের মনিহারি দোকানটা এখন চালায়, ওর বৌ আর মা। রমরমিয়ে চলছে দোকানটা। সত্যিই তো, কী এমন পেল এত বছর পাটি করে?

নেপাল একটু চুপ করে থাকার পর আবার বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোদের মতোই একটা চাকরি নিয়ে সারাজীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু পারি না ওই শানুদার জন্যে। মানুষটা এত ভাল, আর উদার সমাজসেবী – মনে হয় – ওকে দেখে আমাদের সকলের শেখা উচিৎ। শুধু নিজেরটুকু নিয়ে থাকলেই হয় না – সবার জন্যেই কিছু না কিছু করা দরকার। তা নইলে সমাজে থেকে আর লাভ কি, বল? সে দুঃখের কথা যাগ্‌গে, থানায় কখন যাবি...আজই বিকেলে, নাকি কাল সকালে?”

“বিকেলে ... আজ ডিউটি থেকে ছুটি নিয়েছি। পরপর দুদিন ছুটি নিলে চাকরিটাই...”

“ঠিক আছে, সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ এখানেই আয় – দু হাজার টাকা নিয়ে... একসঙ্গে থানায় যাব, ঠিক আছে?”

 

 

সেদিন দুহাজার টাকা নিয়ে, থানা থেকে আমাকে একটা চুটকা কাগজ দিয়েছিল। সে কাগজের মাঝখানে গোল স্ট্যাম্প মারা। সেই কাগজটা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের গেটে যেতেই, গেটে থাকা পুলিশরা কাগজটা পকেটে পুরে, আমাকে মাঠে ঢুকিয়ে দিল। সেদিন থানাতেই বলেছিল, এই কাগজ কিন্তু গ্যালারিতে বসার জন্যে নয় – শুধু মাঠে ঢোকার জন্যে। মাঠে ঢুকে কোথায় দাঁড়াব, কী করব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তবে হ্যাঁ – থানা থেকে দেওয়া চুটকার কথা বাইরের লোকের কানে যেন কোন মতেই না যায়।

পোগ্‌গামের ঘন্টা দুয়েক আগে আমি মাঠে ঢুকে দেখলাম, স্টেডিয়ামের গ্যালারির অনেক সিটই ফাঁকা। আর গ্যালারির নীচে আমরা বেশ কজন ঘোরাঘুরি করছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার চেনাজানা, যেমন পদা, রতন, সমু, বাপি। কাজেই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। রতনই প্রথম কথা বলল, “কি বে, থানার চোথা?”

আমি ভয়ে ভয়ে নীচু গলায় বললাম, “চুপ বেটা, কেউ যেন জানতে না পারে”। আমার কথায় ওরা সবাই হো হো করে হেসে উঠল, পদা বলল, “শহরের সব কচি বাচ্চারাও জানে, আর তুই আমাদের চুপ করতে বলছিস?”

সমু বলল, “শুনেছি, মোটামুটি হাজার তিনেক চোথা ছেড়েছে থানা থেকে”।

রতন বলল, “শানুদা বলছিল গ্যালারির টিকিট সব বিক্রি হয়ে গেছে, তার ওপর আমাদের মত থানার চোথাধারীরা, মাঠে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যাবে না, মাইরি”।

দেখলাম ওরা ভেতরের খবর সব জানে, সে খবরের কিছু কিছু যে আমিও জানি, সেটা দেখাবার জন্যে বললাম, “তা তো হবেই, পনেরশর টিকিট পঁচিশে আর দুহাজারের টিকিট চল্লিশ হাজার ব্ল্যাকে বিক্রি হয়েছে, এমন ডিম্যাণ্ড”।

পদা ফিচেল হেসে বলল, “এমন এঁটো-কাঁটা বাসি খবর কেন ছড়াচ্চিস, গতি? লাস্টের দিকে পনেরশ বিক্রি হয়েছে পঁচাত্তরে আর দু হাজার এক লাখে”।

আমি চমকে উঠলাম, “বলিস কি?” তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “অবিশ্যি শানুদা আর কী করবে? হাত-পা বাঁধা, কলকাতা যেমন বলবে...”।

সমু বলল, “তুই চিরকাল সেই একই রকম ক্যালানে কাত্তিকই রয়ে গেলি, গতি। কোনকালে আর মানুষ হবি না! তোকে ওই সব ভুজুং দিয়েছে বুঝি?”

রতন আমার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে বলল, “চ গ্যালারির নীচে কোথাও বসি, বাপি, বাবার পেসাদ এনেছিস, নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?”

আমরা গ্যালারির তলায় মাথা নীচু করে ঢুকলাম, নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বসলাম গোল হয়ে। রতন পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে সবাইকে দিল, বাপি নিল না। বাপি জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল, তারপর সিগারেটের পেট টিপে তামাক বের করে, থানার চুটকাতে জমা করতে লাগল। আমি বললাম, “সে কি রে? চুটকাটা গেটে দাঁড়ানো পুলিশগুলো নেয়নি?” বাপি কোন উত্তর না দিয়ে, বিচ্ছিরি একটা মুখভঙ্গি করল, যার অর্থ হতে পারে, আমার বাপ-মা তো বটেই –  আমার চোদ্দ পুরুষকেও উদ্ধার হয়ে গেল। আমি গুম হয়ে বিড়ি টানতে লাগলাম।

 

 কোথা দিয়ে যে সময়টা কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এটুকু বুঝলাম গ্যালারি তো বটেই - বেড়ার এদিকের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরে গেছে। এমনকি আমাদের আশেপাশেও প্রচুর লোক গিজগিজ করছে। রতন বলল, “আর না, এবার চল, সামনের দিকে যাই। সওয়া চারটে বাজে, চারটের মধ্যে পৌঁছনোর কথা না?” কিন্তু তখন আর সামনের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই – ঠাসাটাসি ভিড়। তার মধ্যেও আমরা কোনমতে কিছুটা এগোতে পারলাম, কিন্তু বেড়ার ধার অব্দি পৌছনো গেল না। ওদিকে মানুষের দুর্ভেদ্য পাঁচিল। এর মধ্যেই গ্যালারির মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তারস্বরে চিৎকার করছে “জি কাল্ডো, জি কাল্ডো”। আমরা ডিং মেরে মাঠের দিকে তাকালাম। এক জায়গায় অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে ভনভন করছে – মৌচাকে জমে ওঠা মৌমাছি। তারা সব দামি দামি চকচকে নানান রংদার পোষাক পরা। তাদের মধ্যে মহিলারাও রয়েছে। মৌচাকটাকে চেপে বেঁধে রেখেছে গাদা-গাদা বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীরা। যেমন তাদের দশাসই চেহারা তেমনি তাদের হেক্কড়। আর রয়েছে, ফটো তোলার লোকেরা। ওরা ওই মৌচাকের চারপাশে উড়ছে – কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে, শরীর দুমড়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে চলেছে অবিরাম। কিন্তু জিকুদা কোথায় – দেখতে পাচ্ছি না তো?

আমার থেকে বেশ কিছুটা ঢ্যাঙা রতন, পাশেই দাঁড়িয়েছিল, তাকে বললাম, “জিকুদা কোথায় রে? দেখতে পাচ্ছিস?”

“আছে, মনে হচ্ছে ওই ভিড়ের মাঝখানে। ভিআইপিরা ওকে ঘিরে ধরে প্রচুর সেলফি তুলছে। তাদের মধ্যে আমাদের শানুদাও রয়েছে – দেখতে পাচ্ছিস? আর আছে কলকাতা থেকে আসা বেশ কিছু নেতা। বেশ কিছু ফিলিম-এস্টারও এসেছে...”।

অধীর ব্যাকুলতায় আমি ওই দিকেই তাকিয়ে রইলাম, চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেলাম। একবার – একঝলক দেখা দাও জিকুদা...তোমার কাছে ওই ভিআইপিরাই বুঝি সব? আমরা এই যে এত মানুষ এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ট্যাঁকের পয়সা খসিয়ে – মাস শেষের দিনগুলো কী করে কাটাবো জানি না...কিন্তু তোমাকে একবার দেখতে পেলে – সে দুঃখের কথা মনেও পড়বে না, জিকুদা একবারটি সামনে এসো। কিন্তু মৌচাক ভাঙল না, বরং আরও যেন জমাট বাঁধতে লাগল।

হঠাৎ আমাদের মাথার ওপরে গ্যালারি থেকে অজস্র জলের বোতল উড়ে গিয়ে পড়তে লাগল মাঠের মধ্যে। যেগুলো খালি, সেগুলো বেশি দূর গেল না। তবে যেগুলো খালি নয়, সেগুলোর বেশ কিছু গিয়ে পড়ল ভিআইপিদের গায়ে, মাথায়। ভিআইপিদের ফুলের গায়ে মুচ্ছো যাওয়ার অবস্থা। রীতিমতো চিড়বিড়িয়ে উঠে তিড়িংবিড়িং লাফাতে শুরু করল। তাই না দেখে টনক নড়ে উঠল তাদের ঘিরে থাকা যত নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশদের। এরই মধ্যে আমাদের ওপর চড়াও হল একদল পুলিশ, হাতের ডাণ্ডা উঁচিয়ে। “শালা, হারামীর বাচ্চারা, বোতল ছুঁড়ছিস?” বলেই সপাসপ ডাণ্ডা হাঁকাতে লাগল। আমরা চেঁচালাম অনেক, “আমরা বোতল কোথায় পাবো, যে ছুঁড়বো? আমরা কি কেউ জল কিনে খাই?” কেউ বলল, “বোতল ছুঁড়েছে গ্যালারির একলাখি সিটের লোকেরা, তাদের গিয়ে ক্যালান না...”। তাতে ফল হল আরও মারাত্মক। “শালা, অন্যের নামে ঢপ দিচ্ছিস ? আমরা দেখলাম তোদের ছুঁড়তে...” বলামাত্র পুলিশদলের লাঠির দাপট বারবার টের পেতে লাগলাম আমাদের পিঠে কাঁধে, ঘাড়ে...।

বাস্তবিক বোতলের জল কোনদিন আমরা কিনে খেয়েছি? মনে তো পড়ে না। আজকাল বিয়েবাড়িতে প্রায়ই পুঁচকে পুঁচকে জলের বোতল দেয়, সেগুলোর কিছু বাড়িতে চলে আসে। সেই বোতলেই জল ভরে, আমার বাবা এবং আমি, কাজে বেরোই। আমাদের কাঁধের ছোট্ট ব্যাগ, টিফিন কৌটো আর ওই তেলচিটে ময়লা জলের বোতলটা আমাদের নিত্যসঙ্গী। সেই সঙ্গীকে আমরা ছুঁড়বো ভিআইপিদের দিকে?

বুঝলাম, পুলিশরা একলাখি টিকিটওয়ালাদের কিছুই করতে পারবে না, কারণ ওদেরও হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আমরা? মার খেতে খেতে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে আমরা গেট দিয়ে ছুটে পালাচ্ছিলাম, তার মধ্যে বেনোজলে কই মাছ ধরার মতো আমাদের কজনকে কপাকপ ধরে ভ্যানে তুলে দিল পুলিশরা। তারপর আমাদের নিয়ে গেল থানায়, ভরে দিল লকআপে। আমার চেনা বলতে বাপিও ছিল আমার সঙ্গে।

সন্ধে গেল, রাত্রি হল। আমার বাবা থানায় এলেন আমাকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কিছুই হল না, শুনলাম, শানুদা থানায় আসছেন, তিনি যা বলবেন তাই হবে। ভরসা পেলাম, শানুদা নিশ্চয়ই...।

শানুদা এল রাত বারোটার একটু আগে। লকআপের সামনে শানুদা এসে দাঁড়াতেই, বন্ধ লোহার দরজায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম, “শানুদা, আমরা কিচ্ছু করিনি, বিশ্বাস করো...শুধুমুধু আমাদের ধরে এনেছে...”।

শানুদা গম্ভীরমুখে আমাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী যে করিস না, তোরা। তোদের জন্যে আমার মাথাটা কাটা গেল। যাতে দেখতে পাস বলে অনেক কষ্টে মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলাম, তোরা এই করলি?”

“কিচ্ছু করিনি, শানুদা, মাইরি বলছি”।

“সে কথা তোরা বা আমরা বললেই তো কেউ মেনে নেবে না রে। এটা এখন কেন্দ্রের হাতে, তারাই তদন্ত করে দেখবে, কারা আসল দোষী। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে তোরা শিগ্‌গিরি ছাড়া পেয়ে যাস। তবে বুঝতেই তো পারছিস...”।

“আপনার হাত-পা বাঁধা...” দু হাতে লোহার দরজার শিক ধরে বাপি উত্তর দিল।   

--০০-- 


শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

মানিকজোড়

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব 


 

প্রত্যেকবার পুজোর সময় বড়দাদু এবং ছোড়দাদুর এই বাড়িতে আত্মীয় পরিজনের বিরাট এক জমায়েত হয়। নাতি-নাতনি, ছেলে, মেয়ে, বৌমা এবং জামাইদের উপস্থিতিতে এই জমায়েত হয়ে ওঠে জমজমাট। পুজোর কটাদিন হইহুল্লোড়, আনন্দ, খাওয়াদাওয়া তো হয়ই – সে আর নতুন কি? সব বাড়িতেই হয়। তাছাড়াও হয় অন্তাক্ষরী, ধাঁধার খেলা, ভাষায় ভাসো, শব্দজব্দের মতো নানান মজার মজার খেলা। আর সবার শেষে হয়, ছোড়দাদুর গল্প। সে গল্পটা উনি বলেন, মা দুগ্‌গার বিসর্জনের পর। পুজোর আনন্দ যখন শেষ, সকলেরই মন-টন খারাপ। আগামীকাল ভোরে সব্বাইকে চলে যেতে হবে যার যার নিজের নিজের কাজের জায়গায়। কেউ যাবে ব্যাঙ্গালুরু, কেউ পুনে। কেউ বা সিঙ্গাপুর, আবার কেউ লণ্ডন।

এবারও তাই হয়েছে। আজ সন্ধের পর বিজয়া দশমীর প্রণাম-ট্রণাম সেরে, কুচো নিমকি, ঠাম্মিদের বানানো নারকেলের নাড়ু আর নিরিমিষ ঘুগনি খেয়ে সব্বাই গোল হয়ে ঘিরে বসল, ছোড়দাদু আর বড়দাদুকে। ছোড়দাদু গল্প শুরু করেছিলেন। মিঠুর মতো ক্লাস টুয়ে পড়া পুঁচকে থেকে বড়োরা সবাই মন দিয়ে শুনছিল সে গল্প। ছোড়দাদুর গল্প বলার এমনই জাদু, সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায়। এমনকি বড়ো ঠাম্মি আর ছোট ঠাম্মিও, সিঁথিঁতে একগাদা সিঁদুর, কপালে এত্তো বড়ো সিঁদুরের টিপ পরে, মাথায় লাল নকশাপাড় শাড়ির আল্গা ঘোমটা টেনে চুপ করে বসে সে গল্প শোনেন। ছোট ঠাম্মি নাকের ডগায় নেমে আসা চশমার উপর দিয়ে, নিজের কত্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর পানখাওয়া রাঙা টুকটুকে ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে গল্পের মজা নেন।

আজকে গল্প শুনতে শুনতে, একদম শেষের দিকে ঘরের সব্বাই এমন চমকে উঠল, অথবা বলা ভাল আঁতকে উঠল, সে আর বলার নয়। সে সময় রঘুনাথদা ঘরে এসেছিল কী একটা জিগ্‌গেস করতে, কথা শেষ করতে পারল না, “কত্তাবাবুরা, দাদা-দিদিমণিদের আগে খাবে, নাকি...” বলেই, চোখ উল্টে ধড়াস করে পড়ল দরজার সামনেই। তারপর সে এক হুলস্থূল ব্যাপার!

নাঃ এভাবে নয়, শুরু থেকে না বললে, ব্যাপারটা কী সাংঘাতিক, বোঝা যাবে না।

 

*    *    *

 

শান্তিপুর শহর থেকে পশ্চিমে সাত আটমাইল গেলেই বড়হুজুরপুর গ্রামে সান্যালদের বিশাল বাড়ি। একসময়ে এই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন, এই সান্যালদের প্রপিতামহ, বৃদ্ধপ্রপিতামহরা। আশেপাশের গ্রামের প্রজারা, তাঁদের বড়হুজুর বলত, আর তার থেকেই এই গ্রামের নাম বড়হুজুরপুর। তা সে জমিদারি প্রথা বহুদিন আগেই লোপ পেয়ে গেলেও, এই গ্রামের নামটা আর ওই বড় বাড়িটা রয়ে গেছে একই রকম। আর রয়ে গেছে দুর্গাপুজো, একই রকম একচালা ঠাকুর। হাতের আর বুকের গুলি পাকানো সবুজ রঙের অসুর। আর অসুরের ডান হাত কামড়ে ধরা ঘোড়ার মতো দেখতে লাল টুকটুকে সিঙ্গি।

বড়দাদু আর ছোড়দাদু এই বাড়িরই ছেলে। যমজ। বড়দাদু আর ছোড়দাদুর বয়েসের তফাৎ মাত্র তিন মিনিট। আর সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ এই বৃদ্ধ বয়েস পর্যন্ত বড়দাদুর দুঃখ, ছোড়দাদু তাঁকে “দাদা” বলেন না। ওঁদের দাদু, ঠাম্মা, বাবা-মা সকলেই অনেকবার ছোড়দাদুকে বকাবকি করেছেন, বলেছেন, তিন মিনিটই হোক আর তিন বছর, আগে জন্মেছে, মানেই অগ্রজ, অর্থাৎ দাদা। দাদা বলবি। তাতে ছোড়দাদু বলতেন এবং আজও বলেন, ছোঃ বোঁচা আমার তিন মিনিট আগে জন্মে কী এমন বেশি শিখে ফেলেছে, যে ওকে দাদা বলতে হবে? তাও যদি আমার থেকে দুটো চারটে হাত-পা বেশি গজিয়ে যেত তো বুঝতাম! বড়োদাদুর ডাক নাম বোঁচা, ভাল নাম নৃপেন্দ্রনাথ। আর ছোড়দাদুর নাম খ্যাঁদা, ভাল নাম খগেন্দ্রনাথ।

বড়োদাদুর যতোই দুঃখ-টুঃখ থাক, দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাব-ভালোবাসার কখনো অভাব হয়নি। যাকে বলে গলায়-গলায়। ওঠা-বসা, খাওয়া-ঘুমোনো, স্কুলে যাওয়া কলেজে যাওয়া, সবই একসঙ্গে। তবে লেখাপড়ার শেষে চাকরি জীবনে তাঁদের আলাদাই থাকতে হয়েছিল। বড়দাদু রেলের বড়ো অফিসার ছিলেন, আজ দিল্লি, কাল চেন্নাই, পরশু মুম্বাই করে বেড়াতেন। আর ছোড়দাদু ছিলেন একটি ব্যাংকের জাঁদরেল ম্যানেজার। তিনিও এদেশের এদিক সেদিক কম ঘোরাঘুরি করেননি। চাকরি জীবনে সারা বছরে তাঁদের দেখা সাক্ষাৎ হত কমই, মেরেকেটে বছরে বার তিন চারেক। এক হত পুজোর সময় এই বাড়িতে, তাছাড়া ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজের ছুটিছাটাতে, এক ভাই অন্য ভাইয়ের বাড়িতে কদিনের জন্যে ছুটি কাটিয়ে আসতেন সপরিবারে।

রিটায়ারমেন্টের পর তাঁদের ছেলেমেয়েরা প্রস্তাব করেছিল, কলকাতা কিংবা দিল্লিতে বাড়ি বা ফ্ল্যাট নিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে থাকতে। দুভাই সে কথায় কানই দেননি, বলেছিলেন, পাগল না মাথা-খারাপ? এতদিন পেটের দায়ে এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে মাথার মধ্যে চক্কর লেগে গেছে, এবার বড়োহুজুরপুরে থিতু হয়ে সেটাকে বাগে আনতে হবে। তাছাড়া এমন সবুজ মাঠ-ঘাট, আকাশ-বাতাসের নির্মল শ্বাস-প্রশ্বাস ছেড়ে কলকাতা-দিল্লীর ধোঁয়া গিলতে যাওয়ার কোন মানে হয়? এই গ্রামে ফিরে আসার আগেই দুই ভাইয়ের ছেলে মেয়েদের সকলেই চাকরি বাকরি নিয়ে, বিয়ে থা করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে বিভিন্ন শহরে। অতএব দুই ভাই তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে  গ্রামে ফেরার সময় খুব কড়া করে ছেলে-মেয়েদের বলে দিয়েছিলেন, সারা বছর বাইরে থাকো, ক্ষতি নেই, কিন্তু পুজোর সময় বাড়ি না এলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে। কী খারাপ হবে, তাঁরা বলেননি। তবে বাচ্চাদের নিয়ে পুজোর সময়, সকলে মিলে এত আনন্দ আর হৈ হুল্লোড় হয়, যে না এলে যে খুব খারাপ লাগবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

সেই হৈ হুল্লোড়ের শেষদিকে, একাদশীর সন্ধ্যেয় ছোড়দাদুর দায়িত্ব সক্কলকে একটা গল্প শোনানো। সে গল্প এমন হতে হবে, সবারই যেন শুনতে ভালো লাগে, বাচ্চা থেকে বয়স্কবড়োরা যেন মনে না করে, এটা তো বাচ্চাদের জন্যে। অথবা ছোটরা যেন মনে না করে, এটা বড়োদের জন্যে। ব্যাপারটা খুবই শক্ত, কিন্তু ছোড়দাদু এই বড়োহুজুরপুরে আসার পর থেকে, আটবছর ধরে এমন গল্পই বলে চলেছেন, যে গল্পে সকলেই মজা পায়, কিংবা চমকে ওঠে।

আজও তিনি শুরু করলেন, “তখন আমরা, মানে বোঁচা আর আমি এখানকার ষোড়শীবালা স্মৃতি বিদ্যামন্দিরে ক্লাস সেভেনে পড়ি। লেখাপড়ায় খুব খারাপ ছিলাম না। বোঁচা আর আমার মধ্যেই ক্লাসের ফার্স্ট আর সেকেণ্ড পজিসনটা নিয়ে খুব লড়ালড়ি হত। কোনবার বোঁচা, কোনবার আমি ফার্স্ট হতাম। সেকেণ্ড হলে বোঁচা আমাকে মুখ ভেঙিয়ে জিভ বের করে বলত, হতভাগা, আমার হোমটাস্কের খাতা মুখস্থ করে তুই ফার্স্ট হয়েছিস! আর আমি বলতাম, য্যাঃ য্যাঃ, আমার হোমটাস্কের খাতা এবার থেকে তোকে আর দেখাবই না, দেখি কেমন করে তুই পরের বার সেকেণ্ড হতে পারিস!

তখন আমরা ক্লাস সেভেনে পড়িকলকাতা বা শহরের স্কুলে যেমন গরমের ছুটি পড়ে, আমাদের এই গ্রামের দিকে তখন বর্ষার ছুটি পড়ত। বর্ষার সময়ে জলে কাদায় কাঁচা রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যেত, মাঠ-ঘাট, খাল-বিল-পুকুর জলে ডুবে একাকার হয়ে থাকত। তাছাড়া গ্রামের লোকদের প্রধান কাজ তো চাষবাস, ওই সময় স্কুল ছুটি থাকলে তাঁদেরও কাজের সুবিধে হত।

তবে আমাদের এই বর্ষার সময়টা খুব একঘেয়ে লাগত। বৃষ্টি আর বৃষ্টি, চারদিকেই থৈথৈ করছে জল। ফুটবল-নিয়ে জলভরা মাঠে আর কতক্ষণ খেলা যায়? ঘরে বসে পড়ার বই কিংবা গল্পের বই পড়ে কাঁহাতক সময় কাটানো যায়? বাড়িতে বসে থেকে থেকে, আমাদের মাথায় নানারকম দুষ্টুমির বুদ্ধি আসত আর দুষ্টুমি করে ঠাকুমার তুলতুলে হাতে মার খেয়ে, প্রচুর মোয়া আর পাটালি খেতাম”

বড়দাদুর বড় নাতি, মিন্টু বলল, “ও ছোড়দাদু, ঠাকুমার হাতে মারও খেতে, তারপরে আবার মোয়া আর পাটালিও খেতে?”

ছোড়দাদু চোখ মটকে হেসে বললেন, “ওইটেই তো মজা ছিল রে, মিন্টু। ঠাকুমা রেগে-টেগে গিয়ে পিঠে গুপ গুপ করে কিল দিতেন, দু চারটে। তারপরেই মনের দুঃখে প্রায় কেঁদে ফেলতেন, আহা, খ্যাঁদাটাকে মারলাম! ভাঁড়ার ঘর থেকে মুড়ি বা খইয়ের মোয়া, কিংবা গুড়ের পাটালি বের করে এনে, কোলের কাছে বসিয়ে খাওয়াতেন। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস  করতেন, হ্যা রে, খুব লাগেনি তো? সারাদিন এত ফচকেমি করিস কেন, বল তো মুখপোড়া! আরেকটা মোয়া দিচ্ছি, আস্তে আস্তে খা”। রান্নাঘরের পিঁড়ে থেকে মা-কাকিমারা আমাদের দেখতেন, আর মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হেসে খুন হতেন।

সেবার এরকম বর্ষার ছুটিতে আমরা যখন ঘরে বসে বসে দুর্দান্ত দুষ্টু হয়ে উঠছি, সে সময় খবর এল, পিসিমার বাড়িতে ওঁর গুরুদেব এসেছেন। পিসিমা আমাদের সকলকেই একবার যেতে বলেছেন। ঠাকুমা, বাবা, কাকা, মা, কাকিমাদের মধ্যে জোর আলোচনা চলল, পুঁটু যখন যাওয়ার জন্যে খবর পাঠিয়েছে, তখন কারো একবার যাওয়া উচিৎ। আমাদের পিসিমার ডাকনাম পুঁটু। আমাদের বাবারা ছিলেন তিনভাই আর এক বোন - এই পুঁটুপিসিমা। পিসিমা সবার ছোট বলে দাদাদের খুব আদরের বোন ছিলেন। বাবা তো পিসিমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। পিসিমার এই গুরুদেব ছিলেন, একেবারে সিদ্ধ পুরুষ। পাঁচ-ছ বছর অন্তর তিনি পিসিমার বাড়ি আসতেন। দিন পনের থেকে অন্য কোথাও চলে যেতেন। তবে পিসিমা বলতেন, উনি হিমালয় থেকে আসতেন এবং আবার হিমালয়েই ফিরে যেতেন”

বড়োদাদুর ছোট নাতি, পিকলু বলল, “সিদ্ধ মানে? আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ হয় শুনেছি, সেরকম কিছু?”

ছোড়দাদু হা হা করে হাসলেন খানিক, তারপর বললেন, “আমরাও তাই ভেবেছিলাম প্রথমে। কিন্তু ইনি হলেন সিদ্ধ, সেদ্ধ নয়। সিদ্ধ পুরুষ মানে অনেকদিন নির্জনে তপস্যা, ধ্যানট্যান করে যিনি নানান অলৌকিক সব ক্ষমতা পেয়েছেন। এক কথায় সিদ্ধপুরুষ মানে সাংঘাতিক ব্যাপার একটা। তিনি সন্তুষ্ট হলে, যা চাইবি, তাই পেয়ে যাবি। আর রেগে গেলে, হয়তো ছাই হয়ে পড়ে থাকবি, তাঁর পায়ের কাছে”!

ছোড়দাদুর কথা শুনে, বড় ঠাম্মি এবং ছোট ঠাম্মি দুজনেই জোড়হাত কপালে ঠেকালেন। তারপর ছোট ঠাম্মি একটু চাপা গলায় বললেন, “এসব নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করা মোটেই ভাল কথা নয়। একবার তো ফল পেয়েছ, তাতেও তোমার  শিক্ষা হল না?”

ঠাম্মির কথায় কোন উত্তর না দিয়ে ছোড়দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, “অনেক আলোচনার পর সাব্যস্ত হল, পিসিমার বাড়ি আমরা দুজন যাবো। আর কারো পক্ষেই এসময় পুঁটুর বাড়ি যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা তো জানতাম, আমরা যাবোই, কিন্তু একা একা আমরা দুভাই যাবো, এটা কল্পনাও করতে পারিনি। পিসিমা আমাদের দুই ভাইকে খুবই ভালোবাসতেন। তাছাড়া তাঁর ছেলেমেয়ের সঙ্গেও আমাদের খুব ভাব ছিল। অতএব এমন একটা সুযোগ পেয়ে আমরা দুজনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।

ঠিক হল আমরা পরশুদিন ভোর বেলা গরুর গাড়িতে রওনা হবো। যাদবকাকা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবেন এবং তিনিই হবেন যাওয়া-আসার পথে আমাদের একমাত্র গার্জেন! পিসিমার বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে খুব দূরে নয়, এখনকার হিসেবে পনের-ষোলো কিলোমিটার। মাঝে গোটা দুই গ্রাম পড়ে, সেই দুটো পেরিয়ে আরো ছ-সাত কিলোমিটার গেলেই, পিসিমার গ্রাম। মাঝে খুব বেশি সময় নেই, আমাদের যাওয়ার আয়োজন নিয়ে, আমরা ছাড়া, বাকি সকলেরই হঠাৎ ব্যস্ততা বেড়ে উঠল

ঠিক সময়েই আমরা রওনা হলাম, গাড়ি বোঝাই জিনিষপত্র নিয়ে। গাড়িতে যা জিনিষপত্র ছিল, তাতে গ্রামের হাটে একটা মুদির দোকান অনায়াসে খুলে বসা যেতগুড়ের টিন দুটো, পিসেমশাই ভালোবাসেন। ঘানিতে বানানো দুটিন খাঁট সরষের তেল, পিসিমার শ্বশুরমশাইয়ের এই তেল খুব পছন্দের। গোবিন্দভোগ চাল এক বস্তা, পিসিমার শাশুড়ি, এই চালের পায়েস খেতে খুব ভালোবাসেন। এছাড়া আমাদের গাছের গোটা দশেক নারকেল, আমাদের ক্ষেতের গোটা পাঁচেক কুমড়ো, লাউ, ছাঁচিকুমড়ো। তার সঙ্গে আমাদের গ্রামের নানুকাকার দোকানের রসগোল্লা একটিন, ঘরে বানানো কুলের আচার, মোয়া, পাটালি, তিলকুট। এ ছাড়া আমাদের রাস্তায় খিদে পেলে, চালভাজা, পাটালি, মোয়ার পুঁটলি। আমাদের তেষ্টা পেলে খাওয়ার জলের কুঁজো। গরুরগাড়ির ছইয়ের ভেতর জিনিষপত্রে বোঝাই হয়ে গেল, আমরা দুভাই বসলাম, যাদবকাকার দু পাশে। 

২ 

আমাদের গাড়ি পিসিমার গাঁয়ের সীমানায় ঢুকতেই পিসিমাদের রাখাল ছেলেটি, নাম কুঞ্জ, আমাদের দেখে চিনতে পেরেছিল। “অ মাঠাকরেণ , আপনার ভাইপো এয়েচে বটে” বলেই সে ছুট লাগাল পিসিমাদের বাড়ি। কাজেই যাদবকাকা বেলা এগারোটা নাগাদ, আমাদের গরুর গাড়িটা যখন পিসিমাদের খামার বাড়িতে ঢুকিয়ে দিল, তখন সেখানে অনেক লোক দাঁড়িয়ে গেছে। পিসিমা নিজে, পিসতুতো দাদা আর বোন, ওদের দুই কাকা, খুড়তুতো ভাইবোনেরা, তাছাড়া পাড়ার প্রচুর বউ, মেয়ে আর বাচ্চাবাচ্চা ছেলেমেয়ের দল। গাড়ি থামতেই আমরা দু ভাই লাফ দিয়ে মাটিতে নামলাম। পিসিমাকে দুজনেই প্রণাম করলাম। পিসিমা আমাদের চিবুক ছুঁয়ে আঙুলের ডগায় চুমো খেয়ে, আশীর্বাদ করলেন।

তারপর একটু রাগ-রাগ গলায় বললেন, “হাতপা-দুলিয়ে দু ভাই চলে এলি, মাকে নিয়ে আসতে পারলি না? কটা দিন আমার কাছে থেকে যেত!” পিসিমা এরপর গাড়ু থেকে জল ঢেলে দিলেন, দুই গরুর চার চার খুরে। ওদিকে যাদবকাকা ওদের কাঁধ থেকে গাড়ির জোয়াল খুলে নেওয়াতে, গরুদুটো বেশ আরাম পেল। তারপর যে কাণ্ডটা করল, তাতে আমাদের লজ্জায় মাথা কাটা গেল!”

মিন্টু খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস  করল, “কেন? কী করেছিল ওরা?”

ছোড়দাদু মুচকি হেসে বললেন, “এতটা রাস্তা জিনিষপত্র সমেত আমাদের টেনে আনতে গরুদুটোর খুব কষ্ট হচ্ছিল। এখন কাঁধের ভার নেমে যাওয়াতে, আর খুরে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে, দুটোই আরামে গোবর নেদে দিল। পিসিমাদের খামারের একেবারে মাঝখানে! আমরা লজ্জা পাবো না?”

মিন্টু ঠিক বুঝল না, জিজ্ঞেস  করল, “নেদে দিল, মানে?” বড় ঠাম্মি, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে খুব হাসতে লাগলেন। ছোট ঠাম্মি বললেন, “ছোটদের সামনে ও আবার কী কথা? তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে যাচ্ছে”!

ছোড়দাদু খুব গম্ভীর মুখে বললেন, “বেশ তবে তোদের ভাষাতেই বলি, গরুদুটো একইসঙ্গে আরামে পটি করে ফেলল”

ছোড়দাদুর মেয়ে, নীহারিকা হাসতে হাসতে বললেন, “বাবা, তুমি না Zআআআতা”।

পুঁচকি নাতনী মিঠু নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “ইস্‌, এম্যাঅ্যাঅ্যা, ছিঃ”।

ছোড়দাদু চোখ বড়ো বড়ো করে মিঠুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছিঃ নয় রে, মিঠু মা। গরুদুটো উঠোনের মাঝখানে পটি করে দেওয়ার জন্যে পিসিমা যে কী খুশি হয়েছিলেন, সে আর বলার নয়। পিসিমার কাজের মেয়ে ভামিনীদিদি সামনেই ছিল। পিসিমা হৈচৈ করে তাকে বললেন, “অ ভামি, চট করে গোবরের ঝুড়িটা এনে, গোবরের তাল দুটো তুলে রাখ, মা। এ আমার দাদার গোবর...”।

এতক্ষণ পিসেমশাই বাড়িতে ছিলেন না, এখন ঢুকলেন। ঢুকেই পিসিমার কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “বলো কী? তোমার দাদার গোবর?”

আমাদের সরল পিসিমা পিসেমশাইয়ের ঠাট্টাটা বুঝতে পারলেন না, চোখ ঘুরিয়ে বললেন, “তা নয় তো, কী?” ছোড়দাদুর এই কথায়, বড়দাদু থেকে বড়োরা সব্বাই, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন। ছোটঠাম্মিও কিছুক্ষণ খুব হাসলেন, তারপর ছোড়দাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত বানিয়ে বানিয়েও বলতে পারো...”!

সবাই হাসলেও ছোড়দাদু হাসেননি, তিনি ছোটঠাম্মির কথার উত্তরে বললেন, “বানিয়ে বললাম? বোঁচা তো রয়েছে, ওকেই জিজ্ঞেস  কর না, বানিয়ে বললাম কী না? সে যাগ্‌গে, আমরা দুভাই পিসেমশাইকে এবং বাড়ির বড়োদের সকলকে প্রণাম করলাম, তাঁরাও আমাদের আশীর্বাদ করলেন।

মুখ হাত ধোয়ার পর, আমরা জলখাবার খেলাম। তারপর পিসতুতো দাদা আর বোনের সঙ্গে একটু এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করলাম। আমাদের সঙ্গে ওদের খুড়তুতো ভাই-বোনেরাও ছিল। দুপুর দেড়টা নাগাদ পিসিমাদের বাড়ির পিছনের পুকুরে আমরা সব ভাইবোন মিলে অনেকক্ষণ সাঁতার কাটলাম। তারপর টানা বারান্দায় সার দিয়ে শতরঞ্চিতে বসে, পুকুরের টাটকা রুইমাছের ঝোল ভাত, আলুপোস্ত, চুনোমাছ আর তেঁতুল দিয়ে বানানো টক খেলাম, খুব মজা করে। আমাদের খাবার পর, পিসেমশাইয়ের মা, তাঁকে আমরা ভালোঠাম্মা বলতাম, কড়া নির্দেশ দিলেন, ছোটরা সব্বাই ওপরের বড়ো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। ফচকেমি, ফাজলামি করলে কিন্তু সবার পিঠ ফাটাবো।

ভালো ঠাম্মার ভয়ে, ওপরের বড়ো ঘরে আমরা গিয়ে শুলাম। ছোটরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু আমাদের দুই ভাইয়ের আর পিসতুতো দাদা, কানুদার ঘুম এল না। উসখুস করতে লাগলাম, কতক্ষণে বড়োদের আর ভালো ঠাম্মা, পিসিমাদের খাওয়া হবে, আর তাঁরা ঘুমোতে যাবেন। আমরা ওপরের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে নীচেয় লক্ষ্য করছিলাম, আর তিনজনে খুব গুরুতর বিষয়ে গম্ভীর আলোচনা করছিলাম”।

ছোটঠাম্মি বললেন, “তোমরা গম্ভীর আলোচনা করছিলে? বাবা, তা কী গুরুতর আলোচনা হচ্ছিল, শুনি?”

ছোড়দাদু বললেন, “কানুদার থেকে পিসিমার গুরুদেবের খবর-টবর নিচ্ছিলাম, আর কী! তিনি ভোর চারটের সময় ওঠেন। উঠেই মুখে এত্তোবড়ো একটা নিমের দাঁতন, আর হাতে জলভরা গাড়ু নিয়ে মাঠে বেরিয়ে যান। ফেরেন একেবারে চান-টান সেরে। আসার সময় গাড়ুতে জল ভরে আনেন। আর চিৎকার করে গান করেন। শ্যামাসঙ্গীত। কানুদা বলল, “গুরুদেবের গলাখানা হেঁড়ে, আর সুরের কোন বালাই নেই। ওর থেকে আমাদের ছিদাম কাকা, দারুণ গান করেন, শুনতে বেশ ভালো লাগে”। এই ছিদাম কাকার আসল নাম, শ্রীদাম ভট্টাচার্যি, কানুদাদের গাঁয়েই থাকেন, মা কালীর খুব ভক্ত।

আমাদের মধ্যে এই সব নিয়ে আলোচনা যত হচ্ছিল, ততই আমাদের কৌতূহল বাড়ছিল। একসময়, নীচেয় সকলের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেল। পিসিমাদের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। রান্নাঘরে ওঠার সিঁড়ির পাশে এঁটো থালাবাসনের স্তূপের ওপর একদল কাক ঝটাপটি করছিল, আর খুঁটে খুঁটে এঁটো-কাঁটা খাচ্ছিল। আমরা বুঝতে পারলাম, এবার সময় হয়েছে।

আস্তে আস্তে আমরা উঠে পড়লাম। কাঠের ভারি দরজাটা অল্প ফাঁক করে, তিনজনে বাইরে এলাম। দরজাটা আবার চেপে দিলাম। তারপর তিনজনে সিঁড়ি দিয়ে চুপিচুপি নামতে লাগলাম। কানুদা আগে, আমরা পিছনে। কানুদা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিল, আর চারদিকে মাথা তুলে দেখে নিচ্ছিল, কেউ দেখে ফেলল নাকি! গণ্ডগোল কিছু হল না, আমরা তিনজনে নিঃশব্দে ভেতরবাড়ি ছেড়ে, বারবাড়িতে চলে এলাম। ওখানেই বসার ঘরে পিসিমার গুরুদেব অবস্থান করছেন”

 

৩ 

“গুরুদেবের ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজাটা বন্ধ। কানুদা হালকা চাপ দিল খুলল না। কানুদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে, ফিসফিস করে বলল, ওদিকের জানালায় চল, দেখা যায় কী না দেখি। বারান্দা দিয়ে আমরা ঘরের ডানদিকে গেলাম। পরপর দুটো জানালা। প্রথমটা চেপে বন্ধ করা, অন্যটার পাল্লাদুটো অল্প ফাঁক করে আলগা ভেজানো। লোহার গরাদের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কানুদা একটু ঠেলতেই, পাল্লাদুটো আর একটু ফাঁক হয়ে গেল। আর ঘরের ভেতর থেকে খুব চিকন গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠল, “কে রে, ওখানে?”। তারপরেই গুরুগম্ভীর আওয়াজে আরেকজন বলল, “ওদের আসতে দে”। চিকনগলা লোকটির মুখ উঁকি দিল জানালায়, বলল, “দরজার দিকে আয়, বাবা ডাকছেন”।

আমরা ফিরে চললাম, দরজার দিকে। কানুদা ফিসফিস করে বলল, “যে লোকটা উঁকি মারল, ও হল তারানাথ আর যিনি গম্ভীর গলায় আমাদের ঘরে আসতে বললেন, তিনিই মায়ের গুরুদেব”।

দরজা খুলে তারানাথ দাঁড়িয়েছিল, আমরা তিনজনে ঘরে ঢুকতেই সে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরে ঢুকেই আমরা গুরুদেবকে একটু দূর থেকেই প্রণাম করলাম। ঘরের মধ্যে আবছা আলো। গুরুদেব মেঝেয় পাতা একটা আসনে বসে আছেন, পদ্মাসনে, টানটান শরীর। দুটো চোখই বন্ধ। অন্যান্য সাধু মহারাজ, বা গুরুদেবদের মতো এঁনার কোন সাজসজ্জা নেই। মানে মাথায় জটা, রক্তাম্বর, গলায় হাতে রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে গাঢ় সিঁদুরের টিপ, কিচ্ছু নেই। গায়ে সাধারণ একটা ফতুয়া, তার রঙ গেরুয়া, আর পরনে খুব সাধারণ সাদা ধুতি। কাজেই সাধুমহারাজদের চেহারা দেখেই যে ভয় জেগে ওঠে সেটা হল না। আবার খুব একটা যে ভক্তি হল, তাও না। আসলে আমাদের মনে বোধহয় ভয় না জাগলে, ভক্তিভাব আসে না। যাঁর চেহারা, আচার-আচরণ যত ভয়ংকর হয়, তাঁর প্রতি আমাদের ভক্তির মাত্রাটাও তত বাড়তে থাকে।

আমাদের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, পিসিমার গুরুদেব বললেন, “কাছে এসে বস, তোরা পুঁটি মায়ের আদরের ভাইপো, বোঁচা আর খ্যাঁদা, তাই না?”

আমরা গুটিগুটি পায়ে আরেকটু সামনে এগিয়ে মেঝেতেই বসলাম। পিসিমার গুরুদেব চোখ বন্ধ করেই বসেছিলেন। আমরা বসার পর হঠাৎ বললেন, “হাওয়াতে মিশে ছিল দুটো গ্যাস, সেই দুটো গ্যাস মিলে কী যে হয়ে গেল, ও ছাড়া আমাদের জীবন বাঁচে না!”

বোঁচা আমার মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর বলল, “জল - এইচটুও”গুরুদেব মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। তারপর আবার বললেন, “ব্যাটারি থাকলে টর্চ জ্বলে, রেডিও বাজে। ব্যাটারি হল শক্তির উৎস। ব্যাটারি না হলে তো টর্চ জ্বলবে না, রেডিও চলবে না। আবার কিছুটা মাটি, জল, বাতাস আর সূর্যের আলো মিলিয়ে এমন ব্যাটারিও হয়, যা দিয়ে এই সমস্ত জীবজগৎ চলছে তো চলছেই, হাজার লক্ষ বছর ধরে”

বোঁচা আমার কানেকানে কিছু বলল, যা শুনে আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম, তারপর বোঁচা বলল, “সালোকসংশ্লেষ”।

“ঠিক। ফটোসিন্থেসিস। এটা বিজ্ঞান। সায়েন্স। আর যদি বলি, মাটি, জল, উত্তাপ, বায়ু আর আকাশ নিয়েই আমাদের শরীর, তাহলে সেটা আর বিজ্ঞান বা সায়েন্স থাকে না, তাই না? সেটা বুজরুকি!”

আমরা দুভাই একটু থতমত খেয়ে গেলাম। আমাদের এই গুরু-টুরু ব্যাপারে যে বিশ্বাস নেই সেটা ঠিকই। কিন্তু গুরুদেব সেটা বুঝেই যে আমাদের এসব কথা বলছেন, সে কথা বুঝতে বাকি রইল না।

বোঁচা বলল, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম – পঞ্চভূত”।

“পঞ্চভূত। আর পঞ্চভূত মানেই ভুত, প্রেত, দত্যি, দানো, রাক্ষস, খোক্কস, আত্মা-টাত্মা – সবই আজগুবি ব্যাপারস্যাপার। সেখানে বিজ্ঞান নেই, সায়েন্স নেই”।

আমাদের আর উত্তর দেবার কিছু নেই। মাথা নীচু করে, চুপচাপ বসে রইলাম।

“সিদ্ধ মানে আলুসেদ্দ, পটল সেদ্দ কিংবা ডিম সেদ্দ! ভাতের মধ্যে কিংবা গরম জলে ফুটছে ফুটছে...সেদ্দ হচ্ছে, নাকি সিদ্ধ হচ্ছে!” একটু থেমে আবার বললেন, “আমরা সাধকরাও সিদ্ধ হই। তার অনেকরকম আছে। মোটামুটি আট রকমের। প্রথমে অণিমা। সাধকরা অণুর মতো ছোট্ট হয়ে যেতে পারে, তাকে আর দেখাই যাবে না। আমাকে দেখতে পাচ্ছিস”?

গুরুদেবের কথায় আমরা মুখ তুলে তাকালাম। তাঁর আসন শূণ্য - শুধু ফতুয়া আর ধুতি পড়ে আছে আসনের ওপর। আমরা হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম, হাঁ করে।

একটু পরেই তিনি আবার সশরীরে আগের মতোই আসনে বসে বললেন, “দ্বিতীয় সিদ্ধি, নাকি তোরা সেদ্ধ বলবি, লঘিমা। সাধক হাল্কা হয়ে হাওয়ায় ভেসে থাকতে পারে, এই দ্যাখ আমি এখানে”।

গুরুদেবের ডাক শুনে আমরা তিনজনে হাঁ করে ছাদের দিকে তাকালাম, গুরুদেবের মাথা ছাদের থেকে একটু নীচে, ভেসে রয়েছেন শূণ্যে! সেখান থেকেই বললেন, “তৃতীয় সিদ্ধি গরিমা, এতে সাধক নিজের ভার বাড়িয়ে তুলতে পারেন। ঠাকুমার কাছে শিবি আর সেই পায়রার গল্প শুনিস্‌নি?”

আমি বেশ ভয়ে ভয়ে বললাম, “হ্যাঁ শুনেছি, মহাভারতে আছে। ধর্মরাজ, শিবির পরীক্ষা নিতে এসেছিলেন”।

গুরুদেব ওই অবস্থাতেই বললেন, “শুনেছিস কিন্তু বুঝিসনি। দাঁড়িপাল্লায় উঠেও মহারাজ শিবির ওজন, পায়রার ওজনের সমান হয়নি! কেন? ধর্মরাজ সিদ্ধ পুরুষ, তিনি গরিমা সিদ্ধিতে পায়রা হয়েও নিজের ভার রাজা শিবির থেকেও বাড়িয়ে তুলেছিলেন”।

বলতে বলতে গুরুদেব মেঝেয় নেমে এলেন, তাঁর পায়ের চাপে চকচকে কাঁসার ঘটিটা চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে রইল, যেন একটা কাঁসার পাত। আসনে একইভাবে বসে গুরুদেব আবার বললেন, “চতুর্থ মহাসিদ্ধির নাম মহিমা। এর প্রভাবে যোগী পাহাড়ের মতো বিশাল হয়ে উঠতে পারে। বলতে না বলতে তিনি বেলুনের মতো যেন ফুলে উঠলেন, তাঁর মাথা ছাদের সিলিং ছুঁইছুঁই। পদ্মাসনে বসা, তাঁর ভাঁজ করা দুই হাঁটু, ঘরের দুপাশের দেওয়ালে ঠেকে গেল। ওই অবস্থাতেই বললেন, “পঞ্চম মহাসিদ্ধির নাম প্রাপ্তি। এই অবস্থায় সাধক বহু দূর থেকে যে কোন বস্তু তুলে আনতে পারেন। এই নে, দেখ তো এ দুটো তোদের প্রিয় ফাউন্টেন পেন কী না?”

গুরুদেব লম্বা হাত বাড়িয়ে আমাদের সামনে মুঠি খুলতেই আমরা পেনদুটো দেখলাম, কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে নিলাম পেনদুটোএই পেনদুটো আমাদের দুই ভাইয়েরই খুব প্রিয়। গতবছর জন্মদিনে আমাদের বড়োমামা দিয়েছিলেনআমাদের ঘরের আলমারির ড্রয়ারে একটা বাক্সের মধ্যে পেনদুটো রাখা ছিল, কারণ ওদুটো আমরা রোজ ব্যবহার করতাম না! সেই পেন এখন গুরুদেবের হাতে...!

আমাদের অবাক হওয়ার পালা তখনও শেষ হয়নি, গুরুদেব নিজের আসনে বসে, চোখ বন্ধ রেখেই বলে চলেছেন, “আটটি মহাসিদ্ধির ষষ্ঠটি হল প্রাকাম্য। এই অবস্থায় সাধক বা যোগী যেমন ইচ্ছে তেমন অর্থ বা ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সপ্তম হল বশিত্ব। বশিত্ব সিদ্ধি লাভ করলে, সাধক যে কোন মানুষকে নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করিয়ে নিতে পারে”।

কানুদার কাছে আমরা পরে জেনেছিলাম, ওই সময় “ধনধান্যে পুষ্পেভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটি, আমি আর বোঁচা, গুরুদেবকে নেচে নেচে গেয়ে শুনিয়েছিলাম। আমাদের অবিশ্যি কিছুই মনে নেই! পিসিমার গুরুদেব আমাদের দুজনের ওপর বশিত্ব প্রয়োগ করে, বশ করেছিলেন, কানুদাকে করেননি”!

ছোড়দাদু এই সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু চুপ করে রইলেন। ঘরের সব্বাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছোড়দাদুর দিকে। মিন্টু অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস  করল, “ও দাদু, তারপর? তারপর কী হল বল না”!

ছোড়দাদু একবার বড়দাদুর দিকে তাকালেন। তারপর বেশ করে কেশে গলাটা সাফ করে নিলেন। বড়দাদুও গলাটা ঝেড়ে নিলেন বেশ কয়েকবার।

তারপর ছোড়দাদু বললেন, “এর পর গুরুদেব বললেন “মহাসিদ্ধির আট নম্বর হল ঈশিত্ব। এই অবস্থায় যোগী বা সাধক ঈশ্বরের অংশ হয়ে ওঠেন। মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেনঅন্ধকে দৃষ্টি দিতে পারেন। এমনকি মানুষের মাথাটা খুলে নিয়ে, তার হাতে ধরিয়েও দিতে পারেন...”

এই সময়েই দরজায় এসে দাঁড়াল রঘুনাথদা, তার একহাতে কেটলি, আর অন্য হাতের বিশাল ট্রেতে অনেকগুলি খালি কাপ, হাসি হাসি মুখে বলল, “বড়দের জন্য চা এনেছি। বড়দের চা দিয়ে, ছোটদের জন্যে চিকেন সুপ আনছি...বব্‌ড়রা ক্‌কী ব্ব্‌বাচ্চাদের আগে খ্‌খাবে...” কিন্তু বড়দাদু আর ছোড়দাদুর দিকে তাকিয়ে শেষের কথাগুলো বলতে বলতে, ভয়ে রঘুনাথদার চোখদুটো কেমন উলটে গেল, কথাগুলোও জড়িয়ে গেল, তারপর ধড়াম করে পড়ে গেল মেঝেতে! তার হাতের কেটলি থেকে চা উল্টে মেঝেয় গড়াতে লাগল, ঝনঝন শব্দে ট্রে আর কাপ উলটে, ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল কাপগুলো। এত আওয়াজের মধ্যেও ঘরের সব্বাই স্থির আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে নিশ্চল বসেই রইল নিজের নিজের জায়গায়, সকলের দৃষ্টি বড়দাদু আর ছোড়দাদুর দিকে

বড়দাদু খুলে ফেলা নিজের মাথাটি গলার ওপর বসাতে বসাতে বললেন, “এ গল্পটা বাচ্চাদের সামনে না বললেই পারতিস, খ্যাঁদা। তুই আর কোনদিন মানুষ হবি না, হতভাগা”।

ছোড়দাদু ততক্ষণে নিজের খুলে-ফেলা মাথাটি নিজের গলায় সেট করে নিয়ে বললেন, “সারা জীবন রোজ রোজ অল্প অল্প ভয়ে অস্থির হওয়ার থেকে, একবার বেশ জমিয়ে ভয় পাওয়া ভাল। ওতে ভ্যাক্সিন, মানে টিকার কাজ দেয়। পিকু, দ্যাখ দ্যাখ রঘুনাথদার কী হল দ্যাখ, বাবা। আর টুকলি, চট করে একটু জল আর গরম দুধ নিয়ে আয় না, মা, রঘুনাথদার জন্যে!”

                                                    ..০০..

      

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


"@শুধু _তুই .কম" উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১


২য় পর্ব 

ছোটবেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুনেত্রদের বিরাট পরিবারের একত্র জমায়েত হতো তাদের দেশের বাড়িতেইকাজেকর্মে, পুজোপার্বণের অনুষ্ঠানে তাদের দেশের বাড়িটা জমজমাট হয়ে উঠত পিসতুতো মামাতো খুড়তুতো অনেক ভাইবোনদের হৈ চৈ হট্টগোলে। সুনেত্ররা দুভাই – বোন নেই আর ওদিকে সুকন্যারা দু বোন – কোন ভাই নেই। কাজেই সুনেত্র আর সুকন্যার বাড়তি ঘনিষ্ঠতা সকলেরই চোখে পড়ত। একটু বাড়তি খুনসুটি, একটু আলাদা রকমের পিছনে লাগা। এরকম হতেই পারে, অনেক ভাইবোনের মধ্যে এমন একটু পক্ষপাতিত্বের ভালো লাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেভাবে কিছু মনেও হয়নি কোনদিন।

সেবার ছোটকার বিয়ের সময় তাদের পরিবারের জমায়েতটা খুব জমে উঠেছিল। ওরকম আনন্দ আর হুল্লোড়ময় জমায়েত আর কোনদিন হয়নি তাদের পরিবারে। এরপরেও আরেকবার জমায়েত হয়েছিল ঠিকই – কিন্তু সেটা সুনেত্রর ঠাকুমার মৃত্যুর পর তাঁর কাজে। সেটা তো কোন আনন্দ অনুষ্ঠান নয়। কাজেই ছোটকার বিয়েটাই তাদের দেশের বাড়ির সর্বশেষ আনন্দ সম্মিলন বললে ভুল বলা হয় না।  সুনেত্র তখন উণিশের কোঠায়। স্কুলের গণ্ডি ছেড়ে সবে কলেজে ঢুকেছে - মেডিকেলে ফার্স্ট ইয়ার। সে তখন কৃতী ছাত্র আর হবু ডাক্তার হিসেবে পরিবারের সকলেরই চোখের মণি। আগে থেকেই পুত্রহীনা পিসিমার তার প্রতি আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল, সেটা আরো বেড়ে গিয়েছিল সুনেত্রর এই সাফল্যে।

সেবার সুকন্যার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তার দুই আঁখিতে সুনেত্র হদিস পেয়েছিল অদ্ভূত এক অনুভবের। সুকন্যার সঙ্গে ছেলেমানুষী খুনসুটি করতে এবারে আর তার একটুও ইচ্ছে হচ্ছিল না। তার মনে হয়েছিল সুকন্যা অন্ততঃ তার সঙ্গে একটু ধীর স্থির হোক, বাচালতা কম করুক আর তার চোখের তারায় নেমে আসুক গভীর আলোর উদ্ভাস। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি, সুকন্যা আগের মতোই চঞ্চল আর হাল্কা হাসির পিছনে লাগাতেই ব্যস্ত ছিল সারাটাক্ষণ

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতে সকলেই ফিরে গিয়েছিল নিজের নিজের জায়গায়। সুনেত্রও তার হস্টেলে ফিরে গিয়েছিল। সারাটাদিন ক্লাসের ব্যস্ততার পর হস্টেলে ফিরে গ্রে”জ অ্যানাটমির বিশাল বইয়ের পৃষ্ঠায় সে চোখ রাখত ঠিকই, কিন্তু পড়া হত না এক লাইনওতার মনে আসত সুকন্যাকে।  অবুঝ এক রাগ হত তার মনে, সুকন্যা কেন বুঝল না, সুকন্যা কেন সাড়া দিল না তার অনুভবে। সুকন্যা এতটা অবুঝ কেন? কেন সে বুঝতে পারল না, সুনেত্র তাকে বিশেষভাবে পেতে চেয়েছিল! এরকম ভাবনা তার যেমন হত, তেমনই আবার এক পাপবোধও উঠে আসত তার মনে। পিসিমা কী ভাববেন, সুনেত্রর মা কী ভাববেন? একথা যদি তাঁরা জানতে পারেন তাঁরা কি “ছিঃ” বলবেন না। বলবেন না, “সুনু, তোকে যে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, বাবা, শেষ অব্দি তুই এমন করলি”? দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র ভাবত – “এই ভালবাসা গোপনই থাক তার অন্তরে, সুকন্যা বোঝেনি সে এক দিক থেকে ভালই হয়েছে”। মা ও পিসিমার বিশ্বাস নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার মানে হয় না কোন।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। সুকন্যার প্রতি অস্ফুট ভালোবাসার সঙ্গে মাখামাখি সুপ্ত এক পাপবোধ - দুটোই জিইয়ে নিয়ে সুনেত্র কাটিয়ে দিতে পেরেছিল বছর দুয়েক। সেবার সুকন্যা হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় তাদের বাড়িতে এসে ছিল বেশ কদিন। সুনেত্র তখন হস্টেলে। বাড়ি থেকে মা ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লিখতেন, তার মধ্যেই সুকন্যাও লিখেছিল। চিটিটা এরকম,   

 

“কল্যাণীয়েষু,

স্নেহের সুনু,

পত্রপাঠ কেমন আছিস জানাবিঈশ্বরের নিকট তোর সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস

তোর লেখাপড়ার চাপ কেমন জানাবিলেখাপড়ায় একদম ফাঁকি দিবি না। মনে রাখিস এখন তুই আর বাড়িতে নেই। কাজেই পড়তে বসার জন্যে আমি আর নিত্য তাগিদ তোকে দিতে পারব না। এখন তোকেই নিজের ভালো মন্দ বুঝে চলতে হবে। মন দিয়ে নিয়মিত লেখাপড়া করিসতাই বলে বেশি রাত্রি জাগিস না। রাত্রি এগারোটার পর আর পড়বার প্রয়োজন নেই। পরেরদিন কলেজের ক্লাস করাও একান্ত জরুরি মনে রাখিস

খাওয়াদাওয়া সময়মতো নিয়মিত করবিহস্টেলের রান্না তোর মনঃপূত হয় না নিজের কাছে বাটার, পাঁউরুটি এনে রাখবি। গতবার যে আমের জেলি নিয়ে গেছিলি সেটা কি ফুরিয়ে গেছে? এবার বাড়ি এলে আবার দেব, চিন্তা করিস না।

কদিন হল সুকু এসে আমাদের কাছে রয়েছে। বলছে ওর পরীক্ষা মোটামুটি হয়েছে। রেজাল্ট বের হলেই বোঝা যাবে – কেমন হয়েছে। দিনরাত পায়ে পায়ে ঘুরছে, আর বক বক করছে - তোর কথা খুব হয়।

যদি লেখাপড়ার খুব ক্ষতি না হয়, সুকু থাকতে থাকতে একবার আসতে চেষ্টা করিস। দু” একদিন থেকেই চলে যাবি। মেয়েটা সারাদিন আমার সঙ্গে একঘেয়ে কাটায় – তুই এলে খুশি হবে।

আজ আর বেশি লিখব না, সুকুর জন্যে জায়গা রাখতে হবে, ও কিছু লিখবে বলছে।

ভালোবাসা নিস, আদর নিস। সাবধানে থাকিস।

ইতি

আশীর্বাদিকা মা।

 

কি ডাকবাবু,

এখনও তো পুরো ডাক্তার হও নি, তাই ডাকবাবু ডাকলাম। পুরো হলেই তারটা জুড়ে দেব। সে তার, বিনার তার না ইলেকট্রিকের তার সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু এই যে আমি হায়ার সেকেণ্ডারির মতো কঠিন এক পরীক্ষা দিয়ে তোমাদের বাড়ি থানা গেড়েছি আজ প্রায় দিন চারেক হতে চলল, তোমার টিকি দেখা যাচ্ছে না কেন? দেশে কি আর কেউ ডাক্তার হচ্ছে না নাকি? নাকি ওখানে কোন ডাক্তারনির কুনজরে পড়েছ। বাড়ির কথা মনেই পড়ছে না? আমার মতো পচা মেয়ের কথা না হয় নাই শুনলে, মামীমার কথাটা তো ভাবতে হয় নাকি? চটপট চলে এসো দেখি কদিনের জন্যে, তোমার চুলের মুঠি আর কানের জন্যে আমার হাত একদম নিসপিস করছে। তাই বলে আবার ভয় পেয়ো না যেন। “ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না, সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব নামনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই, তোমায় আমি চিবিয়ে খাব, এমন আমার সাধ্যি নেই”

তোমাকে অবিশ্যি কচমচিয়ে চিবিয়ে খাওয়াই যেত, যদি তুমি অখাদ্য না হতে,

ইতি তোমার সুকু”।

শুক্রবার দুপুরে বাস ধরে ধর্মতলা, সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে সুনেত্রর রাত হয়ে গেল। শনিবারটা থেকে রবিবারের দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বাস ধরে হস্টেলে ফিরে এসেছিল সুনেত্র। কিসের জন্যে গিয়েছিল সুনেত্র শুধুমাত্র মায়ের ডাকে? নাকি দোলাচলে থাকা তার মনের মধ্যে, ভালোবাসার পাল্লাটাই ভারি কিনা সেটা পরখ করতে গিয়েছিল? নাকি খুঁজতে চেয়েছিল সুকুর মধ্যেও কোন নতুন ভাবনার সঞ্চার?

শুক্রবার রাত্রে বাবা, মা, দাদা সকলেই ছিলেন।  হস্টেলে থাকা এবং খাওয়া নিয়ে মায়ের জেরার জবাব দিতেই জেরবার সুনেত্র। সেদিন তাই কথাবার্তা হল না। কিন্তু সুকন্যার চোখে এবার অদ্ভূত এক আলো আবিষ্কার করেছিল সুনেত্র। যে আলোর সন্ধান সে করেছিল সেই ছোটকার বিয়ের সময়, সেদিন ছিল না - আজ আছে। কিসের যেন সংকোচ - সরাসরি কথা বলতে পারছিল না তারাব্যাপারটা  মায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি, মা বলেছিলেন, “কি ব্যাপার রে তোদের? এই এত ভাব, এত ঝগড়া, এখন আবার কোন কথাবার্তা বলছিস না”?

“মামীমা, ডাক্তার হলে না, ছেলেদের লেজ গজায়, তাই কথাবার্তাও কম বলে”মা আর বাবা খুব হাসলেন। তার দাদা সুমিত্রও।

সুনেত্র অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কী কথা বলব? কী চিঠি লিখেছে দেখনি, মা? আমাকে বলেছে ডাকবাবু, পুরো ডাক্তার হলে নাকি আমার তারটা ও জুড়ে দেবে। সে তার বীণার না ইলেকট্রিকের সে পরে দেখা যাবে। বীণার বানানটা কি জানো – লিখেছে বএ হ্রস্বই, দন্ত্য নএ আকার...”। সুনেত্র ছাড়া সকলেই খুব হাসল।

সুকন্যা লাজুক হেসে বলেছিল, “এঃমা। বীণা বানানটা ভুল হয়েছিল বুঝি, তাহলে ঠিক বানানটা কি”? সুনেত্রর দাদা সুকন্যার মাথায় হালকা টোকা মেরে বলেছিল, “বএ দীর্ঘঈ মূর্ধ্য ণএ আকার – হ্যারে, হায়ার সেকেণ্ডারিতে পাস করতে পারবি তো”?

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...