মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮ 


৩৫ 

দুপুরের খাওয়ার পর ভল্লা আর রামালি গেল এদিকের মহড়ার মাঠে। ছেলেরা ঘাম আর মাটি মাখা শরীরে পূর্ণ উদ্যমে মহড়া করে চলেছে। ভল্লা কিছু বলল না, ওদের পাশে গিয়ে বসল। বিনেশ আর দীপান রণপা চেপে দৌড়তে দৌড়তে ভল্ল ছোঁড়ার মহড়া দিচ্ছিল। ভল্লা মন দিয়ে দেখল। খুশিই হল। চেঁচিয়ে বলল, “তোরা আগের মহড়াটা একবার করে দেখা তো। দেখি কেমন শিখেছিস, ভুলে গেলি কিনা?”

দুজনেই রণপা থেকে নেমে আগের মহড়াটা তিনবার করে দেখাল। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ না হলেও, প্রায় নিখুঁত বলা যায়। ভল্লা ওদের ডাকল, বিনেশ আর দীপান হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসল ভল্লার সামনে। এবার রামালি, মইলি আর সুরুল নামল মহড়ায়। ভল্লা ভুরু কুঁচকে বলল, “রামালি বলছিল, তোরা নাকি ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করতে পারছিস, কিন্তু কই একটু ফস্কে যাচ্ছে যে?” দীপান বিনেশের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল, “সে তো তোমার জন্যে -তুমি সামনে এসে দাঁড়ালেই বুকের ভেতরটা কেমন দুরদুর করে – তোমার মতো ঠিকঠাক পারবো তো?”

ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে, বলল, “বোঝো, আমার ভয়ে তোদের হাত কাঁপছে! কিন্তু যুদ্ধে যখন নামবি, ওই সূক্ষ্ম ভুলের ওপরই তোদের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে রে হতভাগা! লক্ষ্যভেদের সময় যুধিষ্ঠির এবং অন্য সকলে – ওখানে উপস্থিত সব্বাইকে দেখতে পাচ্ছিল – গুরুদেব দ্রোণকে, নিজেদের ভাইদের। আকাশ, গাছপালা, পাতা, ফুল – সবকিছু। আর অর্জুন দেখেছিল শুধু পাখির চোখ – আর কিচ্ছু না। অর্জুনের লক্ষ্যভেদের গল্প শুনিসনি?”

ভল্লার পাশে বসা ছেলেরা সকলেই ভল্লার কথা শুনল। কেউ কিছু বলল না। কথাবার্তার ফাঁকে সে রামালি, মইলি আর সুরুলের মহড়া দেখছিল মন দিয়ে। তিনজনেই নিখুঁত – প্রতিবার। ভল্লা খুব খুশি হল, বলল, “মনে হচ্ছে তোরা আজ দুপুরে খেতে যাসনি?”

“নাঃ যাইনি। আজ থেকে আর যেতে হবে না। বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যাবে”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল, “তার মানে?”

আহোক বলল, “প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা গ্রামের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভল্লাদাদা। বাবা-কাকাদের তো বটেই, বিশেষ করে মা-কাকিমাদেরও। বলেছেন এতটা পথ হেঁটে তোরা খেতে আসবি, ফিরে যাবি...অকারণ সময় নষ্ট। তোদের আসতে হবে না, ঠিক সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে। চাষের সময় ঠিক যেভাবে মাঠে খাবার পাঠায় বাড়ির মেয়েরা...সেভাবে”

ভল্লা অস্ফুট স্বরে বলল, “কী বলছিস”?  অনেকক্ষণ কেউই কোন কথা বলল না। মহড়া শেষে রামালি, মইলি আর সুরুলও এসে বসল ওদের সঙ্গে। “সকলের এই আশীর্বাদের মর্যাদা যে আমাদের রাখতেই হবে...” ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “...সে কথা ভুলিস না। আয়, এবার ভাবনা চিন্তার মহড়া করা যাক”। ভল্লা মাঝখানে কিছুটা জায়াগা রেখে সকলকে গোল হয়ে ঘিরে বসতে বলল।

তারপর উঠে গিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল, গাছের ছোট একটা ডাল দিয়ে। চৌকো ঘর কেটে বলল, “এই হচ্ছে ধর আস্থানের সীমানা। চারপাশেই কাঠের বেড়া আছে – আর দুপাশে আছে আস্থানে ঢোকার দরজা। পশ্চিমে রাজপথের সামনের দরজাটাই প্রধান, সারা দিন-রাত ওখানে কড়া প্রহরা থাকে। রাত্রে ছজন প্রহরী থাকবেই থাকবে। কিন্তু পূবের দরজাটা প্রায় সবসময়েই বন্ধ থাকে। একমাত্র পণ্যবাহী গোযান ঢোকা বা বেরোনোর সময়, ওই দরজা খোলা হয়। রাত্রে ওদিকেও প্রহরী থাকে, কিন্তু কম – খুব বেশি হলে দু-তিনজন। তারাও গভীর রাত্রে অন্ধকার কোনায় বসে ঝিমোয়।

এবারে লক্ষ্য কর। পূবদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডানদিকে রক্ষীদের থাকার জন্যে এই রকম বড়ো বড়ো দুটো ঘর আছে। তার পাশে পশুশালা। সেখানে থাকে বেশ কিছু ঘোড়া, কয়েকটা গাধা আর বলদ, কিছু দুধেল গাইও। তার পরেই কিছুটা জায়গা জুড়ে থাকে করাধ্যক্ষের পালকি, কিছু কাঠের শকট, গোশকট আরও অনেক ধরনের হাবিজবি কাজের দ্রব্য-যন্ত্রপাতি।

এবার আসছি এই উত্তরদিকে – এখানে পরপর বেশ কিছু ঘর আছে, যেখানে থাকে করণিক আর কাছারির কর্মচারীরা। তারপরেই এইখানে আছে বিশাল রান্নাঘর, আর তার পাশেই পাচক এবং নানান ভৃত্যদের থাকার জায়গা।

এবারে চলে আসছি এই পশ্চিমের দিকে। এদিকে আছে কোষাধ্যক্ষ, তার সহকারী কর্মচারী এবং একটু উচ্চপদের কর্মীদের থাকার জায়গা। ওখানে রক্ষীসর্দার উপানুও থাকে। কোষাধ্যক্ষ আর উপানুর ঘরের ঠিক মাঝখানে আছে কোষাগার। এই যে এইখানে একটু জায়গা ছেড়ে আরেকটা পাকশালা আছে এবং তার পাশেই ছোটছোট ঘরে থাকে পাচক ও বিশেষ ভৃত্যরা। এগুলো সবই করাধ্যক্ষ ও অন্য উচ্চপদের আধিকারিকদের জন্যে।

এবারে আসছি দক্ষিণ দিকে। এদিকে তিনখানা বড়োবড়ো ঘর আছে যেখানে শস্য জমা রাখা হয় – প্রয়োজন মতো ঘরের সামনেই বিশাল দাঁড়ি-পাল্লা খাড়া করা হয়। তাই দেওয়ালের ধারে ধারে রাখা থাকে ভারি ভারি লোহার ওজন। এক থেকে চল্লিশ সেরের। অন্ধকারে চট করে চোখে পড়বে না, কিন্তু পায়ে লেগে হোঁচট খেলেই সর্বনাশ। এই তিনটে শস্যভাণ্ডারের পাশেই – এই দক্ষিণপশ্চিম কোনায় - আছে বন্দীশালা। অবশ্য এই বন্দীশালাতে কবিরাজমশাইকেও রেখেছে কিনা আমি জানি না – সেটা দেখতে হবে। কারণ বন্দীশালায় সাধারণতঃ কর না দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো লোকদেরই শাস্তির জন্যে রাখা হয়।

এবার আসি মাঝখানের খোলা জায়গাতে। এই যে এইখানে বসানো হয় করাধ্যক্ষের বিশাল শিবির। তার মধ্যেও তিনটে কক্ষ থাকে। একটায় ওঁনার কার্যালয়। এটা সভাকক্ষ – গোপন কথাবার্তার জন্যে। আর অন্যটা ওঁনার শয়ন এবং প্রসাধন কক্ষ। এই শিবিরের চারধারে বুক সমান উঁচু শক্ত বেড়া, তার বাইরে সাজানো ফুল গাছের সারি।

এই শিবির ছাড়া আস্থানের অন্যান্য সব ঘরই ইঁটের ঘর। অর্থাৎ স্থায়ী। কিন্তু শিবিরটা করাধ্যক্ষের সঙ্গে আসে এবং চলে যায়। করাধ্যক্ষের সঙ্গে অনেক লোকজন যেমন আসে, তাঁর সঙ্গে তারা চলেও যায়। কিন্তু কিছু কিছু লোক সারা বছরই থাকে। আস্থানের দেখাশোনা, টুকটাক কাজকম্ম করে...”।

  ভল্লা কথা শেষ করে বসল, বলল, “নকশাটা মাথার মধ্যে গেঁথে নে। একজায়গায় বসে দেখিস না। ঘুরে ঘুরে দেখ। তাতে দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে কোনটা ডানদিকে কোনটা – মাথার মধ্যে বসে যাবে। দুটো কথা বলে রাখি – আমরা আস্থানে ঢুকব পূবের দরজা দিয়ে কারণ ওদিকের প্রহরা বেশ দুর্বল…। আর করাধ্যক্ষের শিবিরে আমরা ঢোকার চেষ্টাও করব না”।

ভল্লা চুপ করে বসে ছেলেদের লক্ষ্য করছিল আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ছেলেদের প্রশ্নের। ওরা যদি নকশা দেখে নিয়ে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভল্লার এতদিনের পরিশ্রম এবং প্ররোচনার অনেকটাই বৃথা গিয়েছে।

প্রথম প্রশ্নটা করল, মইলি, “পূবের দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের ঘরগুলো রক্ষীদের বললে না?”

সুরুল বলল, ”হুঁ রক্ষীদের। ভল্লাদাদা ওদের ঘরের চালগুলো কি টালির?”

ভল্লা হাসল, বলল, “হ্যাঁ। কেন পাতার ছাউনি হলে আগুন ধরাতিস? ওকথা ভুলেও ভাবিস না, আগুন লাগলে আস্থানের ওইটুকু জায়গায় এমন হুটোপাটি শুরু হবে – আমাদের আসল কাজই পণ্ড হয়ে যাবে”।

সুরুল বলল, “রক্ষীগুলোকে শুরুতেই কিছুটা জব্দ করতে পারলে…”

রামালি বলল, “ঘোড়াগুলোকে দড়ি কেটে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভল্লাদাদা?”

আহোক বলল, “উঁহু, সেটা শুরুতে করা যাবে না। মাঝ রাত্রে আচমকা ঘোড়ার দল ছুটতে শুরু করলে, তাদের ক্ষুরের শব্দে আস্থানের সকলেই সজাগ হয়ে যাবে। ঘোড়াদের তাড়াতে গেলে আমাদের কাজ সেরে বেরিয়ে আসার ঠিক আগে করতে হবে…”।

রামালি বলল, “হুঁ ঠিকই বলেছিস। কিন্তু ঘোড়ার সামনে গিয়ে দড়ি কাটবে কে? শুনেছি ওরা ভয় পেলে পেছনের জোড়াপায়ে এমন লাথি ছোঁড়ে - বুকে লাগলে – পাঁজর ভেঙে মৃত্যু অনিবার্য”।

সুরুল বলল, “আচ্ছা, আস্থানে ঢোকার পর আমরা দু তিনজন গিয়ে সব ঘরের শিকল তুলে দিই যদি… ব্যাটারা থাক না ভেতরে। রাত্রে কজন রক্ষী প্রহরায় থাকবে ভল্লাদা – জনা দশ-বারো?  সে আমরা সামলে নেব”।

বিশুন বলল, “বাঃ এটা ভালো বুদ্ধি”।

ভল্লা মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “তোদের ভাবনা-চিন্তাগুলো বেশ ভালই ঠেকছে। এক কাজ কর – তোদের সবাইকে কালকের পুরো দিনটা সময় দিলাম। পরিকল্পনাটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে চিন্তা কর। কে কোন কাজের দায়িত্ব নিবি সেটাও ঠিক করে ফেল। আজ রাত্রে আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাবো…ফিরবো কাল রাত্রে। আমাদের পরশু সকালে আবার দেখা হবে। তা বলে মহড়ায় যেন এতটুকু ফাঁক না পড়ে। পরশু সন্ধের পর নতুন মহড়া শুরু হবে”।

“সে কি? অন্ধকারে দেখব কী করে?” দলের চার-পাঁচজন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

ভল্লা হাসল, বলল, “আলোর জন্যে মশালের ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা তো অন্ধকারেই আস্থান আক্রমণ করব, তাই না? আধো অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করাটাও শিখতে হবে না?”

কেউ কিছু বলল না। ভল্লা একটু পরে বলল, “বিকেল শেষ হতে চলল, এবার তোরা বাড়ি যা। আর মনে রাখিস আজকের এই আলোচনার কথা ভুলেও কারও সঙ্গে আলোচনা করবি না। শল্কুর সঙ্গেও না। মনে থাকবে? যাবার আগে নকশাটা ভালো করে মুছে ফেল”।

মইলি বলল, “থাক না ভল্লাদাদা। ওটা থাকলে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধে হবে তো”।

ভল্লা বলল, “উঁহু, মুছে ফেলতে হবে। যখন দরকার এঁকে নিবি, কিন্তু আলোচনার শেষে প্রত্যেকবার মুছতেই হবে। আমরা চলে যাবার পর কারো চোখে পড়ে গেলে – এবং সে যদি চতুর হয় – বুঝে ফেলবে সব”।

মইলি মাথা চুলকে বলল, “মুছে ফেললে, আঁকব কী করে – সবটা কী আর মনে আছে?”

বিশুন পাতা সমেত গাছের একটা ডাল নিয়ে এসেছিল, সেটা দিয়ে দাগগুলো মুছতে মুছতে বলল, “চিন্তা করিস না, আমার মনে আছে”। “আমারও” একে একে বলল, সুরুল, আহোক এবং আরও দু-একজন।

ভল্লা খুশি হয়ে হাসল, মইলির কাঁধে হাত রেখে বলল, “এবার বাড়ি যা। পরশু দেখা হবে”।

রামালি বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের সঙ্গে মইলি, বিশুন আর আহোক যাবে। ভল্লর জন্যে বাঁশের টুকরোগুলো কাটা আছে - নিয়ে যাবো সবাই মিলে”।

“কাটা হয়ে গেছে? বাঃ, এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে”।

 ভল্লারা বাসায় ফিরে দেখল বালিয়া বসে আছে, বসে আছে বটতলির মিলা, জনারাও। জনাদের নিয়ে রণপাগুলো লুকিয়ে রাখার জায়গাটা দেখাতে নিয়ে গেল রামালি। আর ভল্লা তার পাথরের আসনে বসে বলল, “বালিয়া, এসে গেছিস? ভালই হয়েছে। রণপার কাজটা এখন কদিন বন্ধ থাক…তার আগে এই টুকরো বাঁশগুলোর আগায় ফলা বসিয়ে ভল্ল বানিয়ে দে তো চটপট…। কতগুলো আছে রে মইলি?”

“এখন ছাব্বিশ জোড়া আছে, আর দশ জোড়া হবে… ওগুলো পরে দেব”।

“ছাব্বিশ জোড়া – মানে বাহান্নটা ফলা, কতদিনে করতে পারবি, বালিয়া?”

“দিন চারেক”।

“বাঃ, তারপর রণপার কাজ শুরু করে দিবি, কেমন? তুই আহোক-মইলিদের সঙ্গে যা – বাঁশগুলো নিয়ে যেতে সুবিধে হবে। তোরা একটু বস, আমি আসছি – যাবো আর আসবো”।

ভল্লা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। একটু পরেই রামালি ফিরে এল, ওদের দেখে বলল, “কী রে তোদের বসিয়ে রেখে ভল্লাদাদা কোথায় গেল?”

“জানি না। ভল্লাদাদা বলল, যাবো আর আসবো, তোরা বস”। রামালি প্রদীপ জ্বালাল, উনুনের সামনে কাঠকুটো যোগাড় করে রাখল। তারপর মাটিতে বসল ওদের সঙ্গে।

“কমলিমা কেমন আছে রে, আহোক?”

“ভালো না। আমি তো যেতে পারিনি। মা আর দিদির মুখে শুনেছি। কেমন যেন হয়ে গেছেন। প্রধানমশাই মারা যাওয়ার পর একবারের জন্যেও কাঁদেননি। ভাবতে পারিস?”

ভল্লা এসে ঢুকলো, ওদের কথার শেষটুকু শুনে জিজ্ঞাসা করল, “কে কাঁদেনি রে, আহোক?”

“কমলিমায়ের কথা বলছিলাম, ভল্লাদাদা”। ভল্লা হাতের বটুয়া থেকে চারটে রূপোর মুদ্রা বের করে, বালিয়ার হাতে দিয়ে বলল, “কমলিমা কাঁদবেন, ভাবিস না। তিনি আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছেন। এই চারটে রূপো আপাততঃ রাখ, বালিয়া। লোহার জন্যে কাজ যেন না আটকায়। আর দেখছিস তো, এরা কী রকম লড়ছে… তোরা তাড়াতাড়ি অস্ত্র দিতে না পারলে…আমাদের সব কাজই আটকে যাবে”।

“জানি ভল্লাদাদা”, বালিয়া বলল।

চারজনে চার বোঝা বাঁশের টুকরো পিঠে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে মিশে গেল রণপা চড়ে।

ওরা চলে যেতে রামালি বলল, “পুকুর থেকে ঘুরে আসছি, ভল্লাদা”।

“আজ পাঁচজনের রান্না করিস। কাল সকালে আমাদের লাগবে”। রামালি বেরিয়ে গেল - তাকে রান্নার যোগাড় করতে হবে। 


চলবে...

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৫ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৬


৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস

বাস্তবিক আমাদের হিন্দুদের এমন কোন বিষয় – সমাজনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি ও দর্শন, সংস্কৃতি, ধর্ম বিশ্বাস এবং মানব চরিত্রের যাবতীয় প্রবৃত্তি - প্রেম, ঘৃণা, সারল্য, ক্রূরতা, নৃশংসতা, অহিংসতা, বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা – নেই, যা মহাভারতে নেই। এছাড়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, একমাত্র মহাভারতেই ভারতীয় সমাজের প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে গুপ্ত রাজত্বের সমসাময়িক কালের হিন্দু যুগ হয়ে ওঠার পর্যায়গুলির সুস্পষ্ট রূপরেখাটি খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব মহাভারত যে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

যদিও মহাভারতের আলোচনায় তিনটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে, প্রথমতঃ মহাভারতের সর্বশেষ পরিমার্জিত ও সংযোজিত সংস্করণ রচিত হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, গুপ্তযুগ বা তার কাছাকাছি সময়ে। যে মহাভারত আজ আমরা পড়ি। দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় আর্য জাতিগোষ্ঠীগুলিকে নিয়ে, আর্য জাতিগোষ্ঠীর জন্যে, আর্য এবং পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য ঋষি এবং হিন্দু পণ্ডিতরা মহাভারত রচনা করেছিলেন। অতএব ভারতীয় প্রাচীন অনার্য গোষ্ঠীর মানুষেরা এই গ্রন্থে কদাচিৎ[1] তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা পেয়েছেন। তৃতীয়তঃ মহাভারতের যাবতীয় কাহিনী রাজা, রাজপরিবার এবং তাঁদের ঘিরে থাকা মুনি-ঋষি বা রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষের কাহিনী, সেখানে সাধারণ মানুষজনের কথা নেই বললেই চলে। এই তিনটি কথা মাথায় রেখে আমরা মহাভারত চর্চায় প্রবেশ করব।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মে মানব জীবনের সার্থকতার জন্যে তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য, যাকে ত্রিবর্গ বলে, অনুসরণ করা আবশ্যিক ছিল। এই তিনটি বর্গ হল ধর্ম, অর্থ ও কাম। পরবর্তী কালে, অর্থাৎ মহাভারত সংকলনের সময় অথবা আরও স্পষ্ট করে বললে, হিন্দুধর্মে সেটিকে চতুর্বগ করে তোলা হল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। অতএব হিন্দুধর্মের সার্থকতার লক্ষ্য হয়ে উঠল চতুর্বর্গ।

এই চতুর্বর্গ ধর্ম কি এবং কেমন হওয়া উচিৎ সেই ধর্মাচরণ, তার সারাংশ আমরা পাই বনপর্বের ৩১২ অধ্যায়ে - বকরূপী এক যক্ষের সঙ্গে রাজা যুধিষ্ঠিরের সুদীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে, সেই আলোচনাতেই এখন চোখ রাখা যাক।

দ্বাদশ বর্ষ বনবাসের শেষ পর্যায়ে পাণ্ডবেরা একবার বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে প্রথমে নকুল গেলেন কাছাকাছি এক সরোবর থেকে জল আনতে। বহু সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু তিনি জল নিয়ে ফিরলেন না। এরপর উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে একে একে সকলেই জল আনতে গেলেন, কিন্তু কেউই ফিরে এলেন না। তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজা যুধিষ্ঠির নিজেই গেলেন, ভাইদের সন্ধানে। সরোবরের সামনে গিয়ে দেখলেন, তাঁর অপরাজেয় ভাইয়েরা সকলেই, সরোবরের তীরের মাটিতে সংজ্ঞাহীন নিশ্চল শুয়ে আছে। বিস্মিত ও আতঙ্কিত রাজা যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, সরোবরের পাড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বক। সেই বক বললেন, “হে কুন্তীপুত্র, আমি এই সরোবরের অধিকারী। আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর না দিলে, এই সরোবরের জল আমি কাউকে স্পর্শ করতে দিই না। তোমার ভাইয়েরা আমার কথা অবহেলা করে, জলস্পর্শ করতে গিয়েছিল বলেই, তাদের সকলকে আমি শমনসদনে পাঠিয়েছি। তোমাকেও বলছি, আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলে, তোমারও একই দশা হবে”।

বিস্মিত রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই সাধারণ কোন বক নন। একটি পাখির পক্ষে আমার মহাবীর ভাইদের এভাবে পরাস্ত করা, কোন মতেই সম্ভব নয়। আপনি কে?” রাজা যুধিষ্ঠিরের কথায়, বক খুশি হলেন, বললেন, “তোমার মঙ্গল হোক, আমি সত্যিই কোন জলচর পক্ষি নই, আমি যক্ষ, আমিই তোমার পরাক্রমশালী ভাইদের নিহত করেছি”। যক্ষ এবার নিজমূর্তি ধারণ করাতে, রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, আপনার কী প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞাসা করুন, আমি যথাসাধ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করব”।

যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা

যক্ষ একের পর এক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন, “কে আদিত্যকে উচ্চে প্রতিষ্ঠা করেন? কারা তাঁর চারদিকে থাকেন, কে বা তাঁকে বশীভূত করেন এবং তিনি কোথায় প্রতিষ্ঠিত আছেন?”

রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “ব্রহ্ম আদিত্যকে উচ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবতারা তাঁর চারদিকে ঘুরে বেড়ান, ধর্ম তাঁকে বশীভূত করতে পারেন এবং তিনি সত্যে প্রতিষ্ঠিত আছেন”।

“কী থেকে শ্রোত্রিয়[2] হওয়া যায়, কিসের থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, কিসের থেকে পুত্রবান এবং কিসের থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়?”

“শ্রুতি থেকে শ্রোত্রিয় হওয়া যায়, তপস্যা থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, যজ্ঞ থেকে পুত্রবান এবং বৃদ্ধসেবা থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়”।

“ব্রাহ্মণদের দেবত্ব কি? তাঁদের কোন ধর্ম সাধু ধর্ম? তাঁদের মনুষ্যভাব কি? তাঁদের অসাধু ভাবই বা কি?”

“বেদপাঠ ব্রাহ্মণদের দেবত্ব, তপস্যা সাধুধর্ম, মৃত্যু মনুষ্যভাব। পরীবাদ[3] তাঁদের অসাধুভাব”।

“ক্ষত্রিয়দের দেবভাব, সাধুভাব, মনুষ্যভাব এবং অসাধুভাব কি?”

“ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র-শস্ত্র দেবভাব, যজ্ঞ সাধুভাব, ভয় মনুষ্যভাব এবং যুদ্ধ পরিত্যাগ অসাধুভাব”।

“যজ্ঞীয় সাম কি? যজ্ঞীয় যজুঃ কি? কে যজ্ঞ বরণ করে এবং কাকে সে অতিক্রম করে না?”

“প্রাণ যজ্ঞীয় সাম; মন যজ্ঞীয় যজুঃ, ঋক যজ্ঞকে বরণ করে এবং যজ্ঞ ঋককে অতিক্রম করে না”।

“আবপনকারী, নিবপনকারী, প্রতিষ্ঠমান এবং প্রসূতিকারী, এদের মধ্যে কি কি শ্রেষ্ঠ?”

“আবপনকারীদের বৃষ্টি, নিবপনকারীদের বীজ, প্রতিষ্ঠমানদের[4] ধেনু এবং প্রসূতিকারীদের পুত্রই শ্রেষ্ঠ”।

“কোন ব্যক্তি ইন্দ্রিয়সুখ অনুভবে সমর্থ, বুদ্ধিমান, সম্মানিত, তবু প্রাণীর মতো জীবন থাকতেও জীবিত নয়?”

“যে ব্যক্তি দেবতা, অতিথি, ভৃত্য, পিতৃলোক ও আত্মাকে শ্রদ্ধা ও অর্চনা করে না, সে জীবন থাকতেও জীবিত নয়”।

“পৃথিবীর থেকেও কে মহৎগুরু, আকাশের থেকেও কে উচ্চতর, বায়ুর থেকেও কে দ্রুতগামী, আর কার সংখ্যা তৃণের থেকেও বেশী?”

“মাতা পৃথিবীর থেকেও মহৎগুরু, পিতা আকাশের থেকেও উচ্চতর, মন বায়ুর থেকেও দ্রুতগামী আর চিন্তা তৃণের থেকেও বহুতর”।

“কে ঘুমিয়ে থাকলেও চোখ খোলা রাখে? জন্মানোর পরেও কার স্পন্দন হয় না, কার হৃদয় নেই এবং কে দ্রুত বেড়ে ওঠে?[5]

“মাছ ঘুমোলেও চোখ খোলা রাখে, অণ্ড (ডিম) জন্মালেও তার স্পন্দন হয় না, পাষাণের হৃদয় নেই এবং নদী দ্রুত বেড়ে ওঠে”।

“প্রবাসীর মিত্র কে, গৃহবাসীর মিত্র কে? আতুর ও মুমূর্ষু ব্যক্তির মিত্র কে?”

“প্রবাসীর সঙ্গী সহযাত্রী, গৃহবাসীর ভার্যা, আতুরের চিকিৎসক ও মুমূর্ষু ব্যক্তির দানই মিত্র”।

“কে সর্বভূতের অতিথি, সনাতন ধর্ম কি, অমৃত কি এবং সমুদয় জগৎ কি পদার্থ?”

“অগ্নি সর্বভূতের অতিথি, জ্ঞানযোগ সনাতন ধর্ম, সলিল ও যজ্ঞশেষ অমৃত, বায়ু সমুদয় জগৎ”।

“কে একা বিচরণ করেন, কে বার বার জন্ম নেয়, হিমের ঔষধ কি এবং কে প্রধান বপনক্ষেত্র?”

“সূর্য একা বিচরণ করেন, চন্দ্রমা বার বার জন্ম নেয়, অগ্নি হিমের ঔষধ এবং পৃথ্বী প্রধান বপনক্ষেত্র”।

“ধর্মের একমাত্র আশ্রয় কি, যশের একমাত্র আশ্রয় কি, স্বর্গ এবং সুখের একমাত্র আশ্রয় কি কি?”

“দাক্ষ্য[6] ধর্মের, দান যশের, সত্য স্বর্গের এবং শীল (সদাচরণ) সুখের একমাত্র আশ্রয়”।

“মানুষের আত্মা কে, দৈবকৃত সখা কে, উপজীবিকা কি এবং প্রধান আশ্রয়ই বা কি”?

“পুত্র মানুষের আত্মা, ভার্যা দৈবকৃত সখা, মেঘ উপজীবিকা এবং দান প্রধান আশ্রয়”।

“ধন্যে[7]র মধ্যে উত্তম কি, ধনের মধ্যে উত্তম কি, লাভের মধ্যে এবং সুখের মধ্যেই বা উত্তম কি কি?”

“দাক্ষ্য ধন্যের মধ্যে, শাস্ত্র ধনের মধ্যে, আরোগ্য লাভের মধ্যে এবং সন্তোষই সুখের মধ্যে উত্তম”।

“প্রধান ধর্ম কি, কোন ধর্ম সর্বদা ফলবান, কাকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর কার সঙ্গে সন্ধি করলে সন্ধি ভেঙে যায় না”?

“অনৃশংসতা প্রধান ধর্ম, বৈদিক ধর্ম সর্বদা ফলবান, মনকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর সাধুর সঙ্গে সন্ধি করলে, সন্ধি ভঙ্গ হয় না”।

“কী ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, কী ত্যাগ করলে শোক হয় না, কী ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং কী ত্যাগ করলে সুখী হয়?”

“অভিমান ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না, কামনা ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং লোভ ত্যাগ করলে সুখী হয়”।

“ব্রাহ্মণ, নট ও নর্তক, ভৃত্য এবং রাজাকে দান করার প্রয়োজনীয়তা কি?”

“ধর্মের জন্য ব্রাহ্মণকে, যশের জন্যে নট ও নর্তককে, ভরণের জন্য ভৃত্যকে এবং ভয়ের কারণে রাজাকে দান করা প্রয়োজন”।

“লোকেরা কিসে আবৃত থাকে, কিসে আচ্ছন্ন থাকে, মিত্রদের কেন পরিত্যাগ করে, আর কেনই বা স্বর্গে যেতে অসমর্থ হয়?”

“লোকেরা অজ্ঞানে আবৃত, তমোগুণে আচ্ছন্ন থাকে। লোভের জন্যে মিত্রদের পরিত্যাগ করে এবং সঙ্গদোষে স্বর্গে যেতে পারে না”।

“মৃত পুরুষ কে, মৃত রাষ্ট্র কি, মৃত শ্রাদ্ধ এবং মৃত যজ্ঞই বা কি?”

“দরিদ্র পুরুষই মৃত, অরাজক রাষ্ট্র মৃত, শ্রোত্রিয়হীন শ্রাদ্ধ মৃত আর দক্ষিণাহীন যজ্ঞ মৃত”।

“দিক কি, জল কি, অন্ন কি, বিষ কি এবং শ্রাদ্ধের কালই বা কি?”

“সাধুরা (যে পথ দেখান, সেটাই) দিক, আকাশই জল, ধেনু অন্ন, অনুগ্রহ বিষ এবং ব্রাহ্মণই শ্রাদ্ধের কাল”।

“তপ, দম, ক্ষমা ও লজ্জার লক্ষণ কী?”

“নিজের ধর্মে আস্থাই তপ, মনের সংযম দম, দ্বন্দ্ব সহ্য করাই ক্ষমা, অনাচার থেকে নিবৃত্ত থাকাই লজ্জা”।

“জ্ঞান, শম, দয়া ও আর্জব কাকে বলে?”

“তত্ত্বের অর্থবোধকে জ্ঞান, মনের প্রশান্তি শম, সকলের সুখ ইচ্ছে করা দয়া, এবং সমদর্শীতাই আর্জব[8]”।

“পুরুষের কোন শত্রু দুর্জয়, কোন ব্যাধি অনন্ত, কি রকম লোককে সাধু কিংবা অসাধু বলা যায়?”

“ক্রোধ পুরুষের দুর্জয় শত্রু, লোভ অনন্ত ব্যাধি, সকল প্রাণীর মঙ্গলকারী ব্যক্তিই সাধু এবং নির্দয় ব্যক্তি অসাধু”।

“মোহ, মান, আলস্য ও শোকের লক্ষণ কি?”

“ধর্ম বিষয়ে অনভিজ্ঞতা মোহ, আত্ম-অহংকারই মান, ধর্ম আচরণ না করাই আলস্য এবং অজ্ঞানই শোক”।

“ঋষিরা স্থৈর্য, ধৈর্য, স্নান ও দানের কী কী লক্ষণ বলেছেন?”

“নিজ ধর্মে স্থিরতা স্থৈর্য, ইন্দ্রিয়ের সংযম ধৈর্য, মনের মালিন্য দূর করাই স্নান এবং প্রাণীদের রক্ষা করাই দান”।

“পণ্ডিত কে, নাস্তিক কে? মূর্খ কে, কাম কি, ঈর্ষা কি?”

“ধর্মজ্ঞই পণ্ডিত, নাস্তিকেরা মূর্খ এবং মূর্খরাই নাস্তিক। সংসারে আসক্তি কাম এবং প্রবল বাসনাই ঈর্ষা”।

“অহংকার, দম্ভ, দৈব এবং পৈশুন্য (খলতা, ক্রূরতা) কি?”

“অজ্ঞানতা অহংকার, নিজেকে ধার্মিক বলে প্রচার করাই দম্ভ, দানের ফল দৈব, এবং অন্যকে দোষারোপ পৈশুন্য”।

“ধর্ম, অর্থ ও কাম – এরা তো পরষ্পরবিরোধী; তাহলে ত্রিবর্গে এদের সমাবেশ কিভাবে হয়?”

“যখন ধর্ম ও ভার্যা, পরষ্পরের বশীভূত হয়, তখনই ধর্ম, অর্থ ও কামের সমাবেশ ঘটে”।

“হে রাজন, কোন কর্ম করলে অক্ষয় নরকে যেতে হয়?”

“যে ব্যক্তি প্রার্থী দরিদ্র ব্রাহ্মণকে দান করার জন্যে নিজেই ডেকে এনে, পরে “নেই” বলে বিদায় করে, যে ব্যক্তি বেদ, ধর্মশাস্ত্র, দ্বিজ, দেবতা ও পৈতৃক ধর্মকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করে, যে ধনবান ব্যক্তি “নেই” বলে অর্থাৎ কার্পণ্যবশতঃ, দান ও ভোগ না করে, তাদেরই অক্ষয় নরকে যেতে হয়”।

“হে রাজন, কুল, বৃত্ত (আচরণ, চরিত্র), স্বাধ্যায় এবং শ্রুত এর মধ্যে কোনটি ব্রাহ্মণত্বের কারণ, নিশ্চিত করে বল”।

“হে যক্ষ, কুল, স্বাধ্যায় বা শ্রুত কিছুতেই ব্রাহ্মণত্ব জন্মায় না। একমাত্র বৃত্তই ব্রাহ্মণত্বের কারণ। যাঁরা শুধুমাত্র অধ্যয়ন, অধ্যাপন বা শাস্ত্রচিন্তা করেন, তাঁরা সকলেই মূর্খ এবং শাস্ত্রজীবী। কিন্তু যিনি বিধিমতো নিত্য ধর্ম আচরণ করেন, তিনিই বৃত্ত, তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ”।



[1] উদাহরণে বলা যায়, নিষাদ রাজপুত্র একলব্যের ঘটনাটির বিবরণ মহাভারতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।    

[2] শ্রোত্রিয় - বেদজ্ঞ।

[3] পরীবাদ বা পরিবাদ – পরনিন্দা, অপবাদ (শব্দকোষ)।

[4] আবপনকারী–দেবতর্পণকারী, নিবপনকারী - পিতৃতর্পণকারী, প্রতিষ্ঠমান–যশ বা প্রতিপত্তি লোভী। (শব্দকোষ)।

[5] এই প্রশ্নগুলি ধর্ম সম্পর্কে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক – কিছুটা কুইজ কনটেস্ট ধরনের – অতএব অনুমান করা যায় অবান্তর এই প্রশ্নগুলি প্রক্ষিপ্ত। 

[6] দাক্ষ্য – ১. দক্ষভাব, কৌশল, পটুতা; ২. কর্মোৎসাহ, উৎসাহ। (শব্দকোষ) এক্ষেত্রে কর্মোৎসাহ, উৎসাহ অর্থই যুক্তিযুক্ত।

[7] ধন্য – ধনবান বা ধনলাভকারী; সুকৃতী, পুণ্যবান। (শব্দকোষ)

[8] আর্জব – ১. ঋজুভাব, অবক্রতা; ২. সরলতা, অকপটতা, প্রতারণারাহিত্য; ৩. বিনয়গ্রাহিতা, বিনীতভাব। (শব্দকোষ)। এক্ষেত্রে অকপটতা ও প্রতারণারাহিত্য অর্থটিই মনে হয় উপযুক্ত।

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...