শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

 উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধ ঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনের মাধ্যমে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]       


বারোই জুলাই, ২০২৬ শনিবার  

শনিবার সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ উঠে অহীন দাঁত ব্রাশ করছিল, বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সামনের বাগানে প্রচুর ফুল এসেছে। নয়নতারা, টগর, রঙ্গন, সূর্যমুখী, দোপাটি – কেউই তেমন নামকরা ফুল নয়। কিন্তু সজীব সবুজ পাতার সঙ্গে সদ্যফোটা ফুলের ঔজ্জ্বল্যে চোখ এবং মন ভরে ওঠে। খুব মন দিয়ে দেখছিল অহীন, পিছনে এসে দাঁড়ালেন অহীনের বাবা নবীনবাবু, তাঁর হাতে চায়ের কাপ। ছেলেকে ব্রাশ করতে দেখে বললেন, “এতক্ষণে উঠলি? রাত করে শুবি, তারপর বেলা করে উঠবি”।

মুখে ফেনা নিয়েও অহীন হেসে ফেলল, মুখটা ওপর দিকে তুলে বলল, “সকাল সাড়ে ছটাও তোমার কাছে বেলা হয়ে গেল, বাবা?”

নবীনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “মুখে ফেনা নিয়ে বক বক করিস না, যা চট করে মুখটা ধুয়ে আয়। বাবা আজ সকালে মিটিং ডেকেছেন, ভুলে গেলি? গতকাল রাত্রে আমাকে বললেন, আমরা সবাই মিলে, ওঁনার ঘরে যেন যাই, আজ ঠিক সকাল ছটায়। তোর জন্যে দেরি হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে এখন আমাকে বকা খেতে হবে”।

অহীন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাল, বলল, “পি, প্যাপা পও পো?” কথাটা, কি ব্যাপার বলো তো? কিন্তু মুখভরা পেস্টের ফেনা নিয়ে প-বর্গের আদ্যাক্ষর ছাড়া কিছুই বোঝা গেল না। নবীনবাবু এবার বিরক্ত হলেন, বললেন, “প-প না করে মুখটা ধুয়ে আয় না, তাড়াতাড়ি”। অহীন কথা না বাড়িয়ে বেসিনের দিকে গেল, নবীনবাবু ছেলেকে বললেন, “আমি বাবার ঘরে যাচ্ছি, মুখ ধুয়ে বৌমার থেকে চা নিয়ে তুই তোর মা, আর বৌমাকে নিয়ে সোজা চলে আসবি”। অহীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

মুখটুক ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মা আর বৌদির সঙ্গে দাদুর ঘরে ঢুকল অহীন। ঠাকুমা ঘরেই ছিলেন, বিছানায় বসেছিলেন তাঁর পাশে অহীনের মা আর বৌদি গিয়ে বসলেন, অহীন বসল বাবার পাশে সোফায়, দাদুর উল্টোদিকে।

প্রবীণবাবু পুত্র নবীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ ১২ই জুলাই। আর ঠিক সাতদিন পর, আমার ছোটকা, তোর ছোড়দাদু অবিনের সমাধি ভঙ্গ এবং জাগরণ দিবস, মনে আছে?”

অহীন আকাশ থেকে পড়ল, ছোটবেলা থেকে সে মা-দাদু-ঠাকুমার কাছে শুনেছে বটে। ঠাকুরদাদার ছোটকাকা তাদের প্রাচীন বাড়ির কোন এক পাতালঘরে নাকি বন্দী হয়ে বহুদিন ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন আছেন। সেই ছোড়- প্রপিতামহর একশ বছর পূর্ণ হলেই তিনি আবার নাকি ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন। কথাটা সে মোটেই বিশ্বাস করেনি। এমন আবার হয় নাকি? আজগুবি গল্প বলেই, সে মন থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা। কিন্তু আজ সাতসকালে তার দাদুর মুখে সে কথাটা শুনে সে বেশ তাজ্জব হয়ে গেল। দাদু তার মানে এ কথাটা বিশ্বাস করেন শুধু নয়, সেই দিনটি তিনি সিরিয়াসলি মনেও রেখেছেন! অহীন কিছু বলল না, দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

নবীনবাবু মুচকি হেসে বললেন, “ওসব কথা এখনও তুমি মনে করে রেখে দিয়েছ, বাবা? ওসব কথা কি আর সত্যি? স্বদেশী করা ছোটদাদু হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন বলে, ও রকম একটা গুজব রটেছিল। অনেককে তো বলতে শুনেছি, ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ তাঁকে মেরে ফেলেছিল। আবার কেউ কেউ বলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সুদূর হিমালয়ে চলে গেছিলেন – পরে সেখানেই দেহরক্ষা করেছেন”।

প্রবীণবাবু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পুত্রের কথা শুনছিলেন, কথা শেষ হতে বেশ রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি চিরকালই পরের মুখে ঝাল খেতে ভালোবাস। বাবা-মা, গুরুজনদের কথা কোনদিনই তোমার কানে ঢোকেনি আর কোনদিন ঢুকবেও না। নিজের চোখে আমি যা দেখেছি, তুমি তাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চাও?”

ব্যাপারটা বেশ রাগারাগির দিকে চলে যাচ্ছে দেখে, আর দাদুর কাছে নিজের বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে অহীনের খুব খারাপ লাগছিল। সে বলল, “দাদু তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”

প্রবীণবাবু নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “একরকম ভাবে নিজের চোখেই দেখা বলতে পার। তবে আমাকে কি আর সেই পাতালঘরে কেউ ঢুকতে দিয়েছিল? আমি যে তখন বছর সাতেকের বালক মাত্র!”

অহীন খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “পুরো ঘটনাটা বলো না, দাদু। ঠাকুমার কাছে ছোটবেলায় শুনেছিলাম, মনে নেই তেমন”।

নাতির আগ্রহে প্রবীণবাবু খুশিই হলেন। পাশের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।  হয়তো পুরোনো সেই সব দিনের স্মৃতিগুলি তিনি মনের মধ্যে গুছিয়ে তুলছিলেন।  তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন।

“১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। আর যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি, সে ঘটনা ঘটেছিল তেতাল্লিশ সালে। আমার ছোটকা তখন বছর সতেরর টগবগে তরুণ, আর আমার বয়স সাত। আমার বাবা এবং আমার দাদু দুজনেই ছিলেন জাঁদরেল সরকারি অফিসার। অবিশ্যি দাদুকে আমার মনে পড়ে না। কারণ তিনি যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন দেড় কি দু বছর। গোরা সায়েবদের সঙ্গে তাঁদের বেশ ভালই দহরম-মহরম ছিলআরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, ওই রকম সাহেবঘেঁষা পরিবারের ছেলেদের অনেকেই কেমন করে  যে স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন, কে জানে? আমার মেজকা, সেজকা দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মেজকা পুলিশের গুলিতে মারা যান তাঁর ছাব্বিশ বছর বয়সে। কাকিমা চার বছরে মেয়ে আর দুবছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন।  আর সেজকা নিরুদ্দেশ হয়ে যান ঊণিশ বছর বয়সে। তার পর থেকে তাঁর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। দুই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, এক সময় ছোটকাও স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিল

তবে বড়ো হয়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বিশাল পরিবারের সব ঠাট-বাট বজায় রাখতে গিয়ে আমার বাবাকে বাধ্য হয়েই ব্রিটিশদের গোলামি করতে হয়েছিল। সায়েবদের সঙ্গে কিছুটা আমড়াগাছিও যে করতেন না, তা নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁর মনে কোথাও একটা প্রশ্রয় এবং সহানুভূতি ছিল। আর সেই কারণেই, স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে মেতে ওঠা ছোটভাইদের তিনি কোনদিনই তেমন কঠোরভাবে নিষেধ করেননি।

বিয়াল্লিশ সালে মহাত্মাজির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছিল। শিক্ষিত যুবক এবং ছোকরারা দলে দলে স্বদেশী বিপ্লবে নাম লেখাল। ছোটকাও সে দলে ভিড়ে গেল আর কিছুদিনের মধ্যেই তার নাম জড়িয়ে গেল একটি ডাকাতির কেসে। ছোটকা হয়ে গেল স্বদেশী ডাকাত”।

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “স্বদেশী ডাকাত মানে?”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রবীণবাবু বললে, “দেখ বাপু, বিপ্লব, আন্দোলন কিংবা সংগ্রাম যাই বলো না কেন – একটা সংগঠন গড়ে, ছেলেপুলেদের শিখিয়ে পড়িয়ে দেশের কাজে নামাতে গেলে, অনেক খরচা আছে। এসবের জন্যে ভাল রকম টাকাকড়ির যোগাড় রাখতে হয়। বিশেষ করে সে আন্দোলন যদি আবার সশস্ত্র সংগ্রাম হয়। টাকা ছাড়া বন্দুক, গোলাগুলি, বোমা বানানোর সরঞ্জাম কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও সাধারণ খরচ-খরচাও তো কম নয়। এদিক-সেদিক যেতে আসতে ট্রেনের ভাড়া, লঞ্চের ভাড়া, খেয়ার পারানি, খাইখরচ

কিছু কিছু ধনী মানুষ – শুনেছি আমার বাবাও - সে সময় গোপনে দান-টান করতেন ঠিকই, কিন্তু সে টাকায় সংকুলান হত না। অতএব ডাকাতি করতে হত। কোন কৃপণ দেশীয় বড়োলোক মহাজনের বাড়িতে হোক, কিংবা পোস্ট অফিস বা সরকারি ট্রেজারিই হোক।

সরকারি ট্রেজারি লুঠ করার ভয়ংকর ঝুঁকি ছিল ঠিকই। কিন্তু করতে পারলে, অনেক দিক থেকেই লাভ হত। এক, টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। দুই, গোরা প্রশাসনের মুখে ঝামা ঘষে তাদের ওপরে বেশ একটা চাপ সৃষ্টি করা যেত। এবং তিন, এই ধরনের কাজ দু চারটে ঠিকঠাক করতে পারলে, স্বদেশী করা ছেলেদের মনোবল বাড়িয়ে তোলা যেত। নতুন নতুন তরুণ এবং যুবকদের স্বদেশী দলে টানা সহজ হত। অতএব যারা এই ধরনের লুঠপাটের কাজ করত তাদেরকে “স্বদেশী ডাকাত” বলা হত”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কারা বলত? নিশ্চয়ই ব্রিটিশরা এবং তাদের ধামাধরা ভারতীয় অফিসাররা?”

প্রবীণবাবু হাসলেন, বললেন, “ইংরেজরা তাদের এক্সট্রিমিস্ট বলেছে, টেররিস্ট বলেছে। তারা ওসব বলতেই পারে, কারণ তাদের ট্রেজারি লুঠ হলে, তাদের গায়েই তো সব থেকে বেশী জ্বালা ধরত। কিন্তু “স্বদেশী ডাকাত” নামটা দিয়েছিল দেশীয় সাধারণ মানুষরাই! যারা বিশ্বাস করত সায়েবরা হল রাজার জাত, আর আমরা সবাই মহারাণির প্রজা। তাদের কাছে আমরা কৃপা বা করুণা ভিক্ষা করতে পারি। ইংল্যাণ্ডে রাণির কাছে দরবার করতে পারি। তা না করে, গোরাদের কোষাগার লুঠ করা, সায়েবদের পেটানো বা খুন করে ফেলা। এ সবই সাধারণ মানুষদের চোখে ঘোরতর অন্যায় মনে হত। তারা বলত, যারা এসব করে, তারা স্বদেশী আন্দোলনের নামে আসলে ডাকাতি করছে”।

প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, আবার বললেন, “সাতচল্লিশে ভারত যখন স্বাধীন হল, আমার বয়স তখন এগারো বা সাড়ে এগারো। তখন দেখেছিলাম, স্বাধীনতার উৎসবে ওই সাধারণ মানুষগুলোই সব থেকে বেশি নাচানাচি শুরু করেছিল। পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে তখন প্রত্যেকটি লোকই নিজেদের “স্বাধীনতা-সংগ্রামী” ঘোষণা করে দিয়েছিল। পাড়ার কুকুর-বেড়ালগুলো নেহাত অবলা নাহলে তারাও বলে উঠত “জয় হিন্দ”। আর এই ডামাডোলের সুযোগেই, রাতারাতি গজিয়ে উঠল অনেক ডান ও বাম নেতা, যারা কোনদিন স্বদেশী তো করেইনি, বরং বহুক্ষেত্রে তারা স্বদেশীদের ঢিট করতে ব্রিটিশ পুলিশকে সাহায্য করেছিল। এবং তারাই স্বাধীনতা অর্জনের সমস্ত গৌরবটা চেঁটেপুটে খেল”।  

অহীন বলল, “প্রকৃত স্বদেশী নেতারা এসব মেনে নিলেন কেন?”

প্রবীণবাবু বিষণ্ণ হাসলেন, বললেন, “কী জানো দাদুভাই। স্বদেশীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করা। স্বাধীনতার জন্যে তাদের সকলের মনে ছিল আশ্চর্য এক আবেগ আর আদর্শ। তাঁরা তো কেউ নেতা হয়ে নিজের আখের গোছানোর কথা চিন্তা করেননি। তাছাড়া আগেই যে বললাম, সাধারণ জনগণ এই স্বদেশী কর্মীদের আবেগটা কোনদিন বুঝতেই পারেনি। স্বদেশীরা ডাকাতি করে, সায়েবদের বোমা মারে। দলে দলে মিছিল করেজেলে যায়, জেল থেকে অসুস্থ হয়ে ফেরে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তারা পুলিশের নজরে থাকে। এই সব লোকের সংস্রব সাধারণ মানুষ কোন ভরসায় রাখবে? তার থেকে, যাদের সঙ্গে থানার কিংবা প্রশাসনের অফিসারদের নিত্য ওঠাবসা, সেই সব মুরুব্বি-মাতব্বর নেতাদের তারা দিব্যি বুঝতে পারত। তাদের মান্যিগণ্যি করে কৃতার্থ হত।

স্বাধীনতার পর প্রশাসনের ব্রিটিশকর্তারা তো চলে গেল, কিন্তু দেশীয় অফিসাররা? যারা এতদিন ব্রিটিশ সরকারের হয়ে কাজ করছিল, স্বাধীন ভারতে তারাই তো হয়ে উঠল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা! তারাই বা স্বদেশী করা নেতাদের ভরসা করবে কোন মুখে? স্বাধীনতার কয়েকদিন আগেও তো তারা ওই স্বদেশী নেতাদের থানায় ধরে এনে উত্তম-মধ্যম ঠেঙিয়েছে! রাতবিরেতে তাদের গ্রেফতার করতে গিয়ে বাড়ির মা-বোনদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে! দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে, সেই অফিসারদের পক্ষে, রাতারাতি সেই সব স্বদেশী নেতাদের “স্যার, স্যার” বলা সম্ভব? আমলারা যতই আমড়াগাছির চেষ্টা করুক না, তেলে-জলে কোনদিন মিশ খায়?      

বরং এতদিন যাদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা ছিল। যাদের হাত থেকে তারা নিয়মিত ডুডুও খেত, তামুকও খেত।  সেই সব মাতব্বরদের সাহায্য করাই তাদের পক্ষে তখন অনেক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠল! অতএব বলা যায় স্বাধীনতার পরদিন থেকেই প্রশাসন আর ধান্দাবাজ নেতা ও বণিকদের মধ্যে গড়ে উঠল নিখুঁত আদান-প্রদানের সখ্যতা। দু পাঁচজন ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সামিল। আর স্বদেশী করা, পুলিশের মার খাওয়া, জেলখাটা বিপ্লবের নেতারা হয়ে উঠলেন অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের তাম্রফলক আর সাম্মানিক শংসাপত্র দিয়ে। অনেক দুস্থ সংগ্রামীকে মাসিক ভাতা-টাতা দিয়ে, আসলে দূরে ঠেলে দেওয়া হল।

অহীন গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝলাম”।

গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদু বললেন, “যাগ্‌গে, সে সব কথা এখন থাক, ছোটকার কথায় ফিরে আসি। যে স্বদেশীরা আমাদের জেলার ট্রেজারি লুঠ করেছিল, শুনেছি সেই দলে ছোটকাও ছিল। ওই ঘটনায় নাকি দুজন দেশীয় সেপাই মারা গিয়েছিল এবং এক গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। যার ফলে, পুলিশের দল ঘেয়ো কুকুরের মতো খুঁজতে বের হল স্বদেশী ডাকাতদের ধরতে। ছোটকার নামে অনেক কিছু শুনেছিলাম। ছোটকার কাছে নাকি দেশি পিস্তল ছিল আর সেই পিস্তলের গুলিতেই নাকি ওই গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। অতএব, ছোটকা ধরা পড়লে ফাঁসি না হলেও, দ্বীপান্তর-বাস ছিল বাঁধা”।

“দ্বীপান্তর মানে – আন্দামান? সেলুলার জেল?”

“সেলুলার জেল। এই খবরে আমার ঠাকুমা তো ভেঙে পড়লেন। এর আগেই তিনি দুটি ছেলেকে হারিয়েছেন। এবার ছোট ছেলের শোকে তিনি নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন সব কিছু যে বুঝতে পেরেছিলাম, তা নয়। তবে বাড়িতে বড়োদের সবার আচরণেই ভয়ানক দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের লক্ষণগুলো বুঝতে পারছিলাম। এই সময়েই এক দুপুরে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন, দাদু ও ঠাকুমার গুরুদেব, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ। তাঁর কাছে আমার বাবা-মাও দীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং সকলেই তাঁকে সাক্ষাৎ শিবজ্ঞানে ভক্তি করতেন।

ঠাকুর সিদ্ধানন্দ আমার ঠাকুমা আর মায়ের কাছে সব শুনে বললেন, “কিচ্‌ছু চিন্তা করিস না, মা। সন্ধে বেলা বড়োখোকা সুধীন সেরেস্তা থেকে ফিরলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস”। তখনকার দিনের মানুষরা যে কোন সরকারি দপ্তরকেই সেরেস্তা বলতেন। আর আমার বাবা হলেন বড়োখোকা - বাড়ির বড়ো ছেলে।

বাবা অফিস থেকে ফিরে অফিসের ধরাচূড়ো না ছেড়েই সোজা গেলেন গুরুদেবের ঘরে। বাবা আর ঠাকুমা ছাড়া সে সময় তিনি কাউকেই ঘরে থাকতে দিলেন না। কাজেই তাঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হল, বাড়ির আর কেউ জানতে পারলেন না।

তবে বড়ো হয়ে শুনেছি। ছোটকা সে সময় কোন গোপন জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিল। সে জায়গার হদিশ বাবা নাকি খুব ভাল করেই জানতেন। অতএব গুরুদেবের সঙ্গে কথাবার্তার পরেই, তিনি সেই সন্ধেতেই অফিসের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, ম্যজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করতে। গোপনীয়তার জন্যে, তাঁর গাড়ির ড্রাইভার বলাইকাকুকেও সঙ্গে নিলেন না বাবা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে গেলেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করে বাবা নাকি কথা দিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং এরপরে অবিন কোনভাবেই কোন স্বদেশী দলের সঙ্গে সংস্রব রাখবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে যেন অন্ততঃ চব্বিশ ঘন্টা সময় দেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলেন এবং কথাও দিয়েছিলেন। তারপর বাবা ছোটভাইকে তার গোপন ডেরা থেকে তুলে আনতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।   

ওদিকে ঠাকুমা আর আমার মা ঠাকুরঘরে জপ করতে বসলেন। অন্যদিকে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ তাঁর দুই সেবক শিষ্যকে নিয়ে যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরের দরজায় খিল দিয়ে যোগাড়-যন্ত্র শুরু করলেন। সারা বাড়ি তখন উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তায় থমথম করছে। আমরা ছোটরা অর্থাৎ আমরা চার ভাইবোন এবং খুড়তুতো ভাই-বোনরাও সবাই সেদিন অবস্থা বুঝে পড়ার ঘরে চুপটি করে বই খুলে বসে পড়লাম। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম ফিসফিস করে। এটুকু বুঝেছিলাম, সেদিন বড়োদের বিরক্ত করলে আমাদের পিঠ বাঁচাতে ঠাকুমা আসতে পারবেন না।

সেদিন রাত প্রায় সাড়ে নটা নাগাদ, বাবা বাড়ি ফিরলেন। তাঁর পিছনে পিছনে এল একজন লোক। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার কালো চাদরে ঢাকা। চেনবার কোন জো ছিল না। আমরা সবাই গাড়ির শব্দ পেয়ে কৌতূহলে দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারলাম না। লোকটিকে নিয়ে বাবা সোজা গুরুদেবের ঘরের বন্ধ দরজায় দুবার টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “গুরুদেব, আমরা এসেছি”। গুরুদেবের ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক হল এবং কালো কাপড় পরা লোকটিকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ বললেন, “তোমাকে এখন আর দরকার নেই, সুধীন। দুশ্চিন্তা করো না। খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম কর। রাত সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ আমিই তোমাদের ডাকব। তার আগে কেউ যেন আমাদের বিরক্ত না করে”।

বাবা দোতলায় গিয়ে মা আর ঠাকুমার সঙ্গে চাপাস্বরে কিছুক্ষণ কথা বললেন, তারপর বললেন “সকলকে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে বল। গুরুদেবকে এখন বিরক্ত করা যাবে না, তাঁর কাজ শেষ হলে তিনিই আমাদের ডাকবেন”। এতক্ষণ গোটা বাড়িতে কিছুটা হলেও যেন প্রাণ ফিরল। মা-মেজকাকিমা, পিসিমারা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কাজের মাসি, রান্নার ঠাকু্ররাও চঞ্চল হয়ে উঠল। সদর দরজায় তালা পড়ে গেল। পালোয়ান সুভগরাম – আমাদের দারোয়ান - অন্যদিন শোয়ার আগে রামসীতার ভজন গাইত, সেদিন একদম নিস্তব্ধ। আমরা ছোটরাও কাকিমার তত্ত্বাবধানে চুপচাপ খেয়ে উঠে ঠাকুমার ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, ঠাকুমা কখন তাঁর কাজ সেরে ঘরে ফিরবেন। তখন কিছু খবর অন্ততঃ পাওয়া যাবে।

তা কিন্তু হল না। অপেক্ষা করতে করতে কখন আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। ঠাকুমার ডাকে আমাদের যখন ঘুম ভাঙল তখন ভোর। দেখলাম প্রত্যেকদিনের মতোই তিনি স্নান সেরে ফেলেছেন। তাঁর হাতে ফুলের সাজি - পুজোয় বসার আগে আমাদের ডাকতে এসেছেন।

ঘুম থেকে উঠে আমরা গোটা বাড়িটাই এক চক্কর ঘুরে এলাম। চার জন মানুষের কোন সন্ধান পেলাম না। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ও তাঁর দুই শিষ্য এবং কালো চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা সেই লোকটি। বলা বাহুল্য সেই লোকটিই আমার ছোটকা”।


চলবে...

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৭

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৬ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৭

দুই বিষ্ণু-পারিষদের শাপগ্রস্ত হওয়া 

মৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতি কশ্যপের তেজ, দিতির গর্ভে একশ বছর ধরে বাড়তে থাকল। ঐ তেজ এতই তীব্র যে অন্যান্য দেবতাদের তেজ ম্লান হতে লাগল। সেই তেজে সূর্য্য, চন্দ্রের জ্যোতিও ম্লান মনে হতে লাগল। চারদিক তমাসাচ্ছন্ন হয়ে আসতে লাগল দেখে, দেবতারা এবং লোকপালগণ ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে জগত বিধাতা, আপনাকে আমরা প্রণাম করি। আপনিই সকলের নিয়ন্তা, আপনাকে প্রণাম করি। হে দেব, দিতির গর্ভে কশ্যপের বেড়ে ওঠা তেজে চারদিক অন্ধকার হয়ে উঠছে, দিন ও রাতের পার্থক্যও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। আমরা সকলে বিপন্ন, হে দেব, দিনের বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান অসম্ভব হয়ে উঠছে। আপনি আমাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দিয়ে আমাদের উদ্ধার করুন”

[পুরাণকারদের অল্পে সন্তুষ্ট হতে দেখা যায় না। তপস্বীদেরকে তাঁরা শত-শত বৎসর, এমনকি সহস্রাধিক বছরও তপস্যা করান। এখন দৈত্য-জননীকেও তাঁরা একশ বছর ধরে গর্ভধারণ করালেন! এবং তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের তেজে সূর্য পর্যন্ত আবছা হয়ে গেলেন, চাঁদের কথা তো আর না বলাই ভালো - তিনি চির-অমাবস্যায় ডুবে গেলেন। এই সব দেখে স্বর্গের অসহায় দেবতারা অন্ধকারে ব্রহ্মার কাছে উপস্থিত হলেন] 

তাঁদের অনুরোধ শুনে ভগবান ব্রহ্মার, দিতির সেই কুকর্মের কথা মনে পড়ে গেল, তিনি স্মিত হেসে বললেন, “আমি তোমাদেরও আগে আমার সংকল্প দিয়ে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার নামে চার পুত্রকে সৃষ্টি করেছিলামনিখিল বস্তুতে অনাসক্ত হয়ে, নানা লোকে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা একদিন ভগবান বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠলোকে গিয়ে পৌঁছলেনএই বৈকুণ্ঠলোকে আদিপুরুষ ভগবান বিশুদ্ধসত্ত্ব রূপে বাস করেন ও ভক্তদের পরম আনন্দ বিধান করেন। নিষ্কাম ধর্মে ও একান্ত ভক্তিতে  শ্রীহরির আরাধনা করে, যাঁরা তাঁর পরমপদে আশ্রয় পেয়েছেন, তাঁদের সকলেই এই বৈকুণ্ঠধামে বাস করেন। এই ধামে একটি কানন আছে, তার নাম নৈঃশ্রেয়স। কৈবল্য অর্থাৎ মোক্ষই যেন সেই কাননে মূর্তিরূপে বিরাজ করছে, এমন মনে হয়। সেই কাননের গাছগুলি কল্পতরু, সারাবছর সে গাছে ছয় ঋতুর ফুল ফোটে। সেই ফুলের গন্ধ কাননের সর্বত্র বহন করে নিয়ে যায় সুরভিত সমীরণ। সেখানে ভ্রমরের গুঞ্জনে শ্রীহরির নাম শোনা যায়। সেখানে পাখিরা কূজন করে না, ভজন করে। ভগবানের পার্ষদেরা সর্বদাই শ্রীহরির ভজনায় নিরত। সেখানে ক্ষীণকটি গুরু নিতম্ব ললনাগণ শত পরিহাসেও, বৈকুণ্ঠবাসীদের হরিবিলাসী মনকে বিচলিত করতে পারে না। বৈকুণ্ঠধামেই শ্রীহরির গৃহে অচঞ্চল হয়ে বাস করেন লক্ষ্মীদেবী। তাঁর হাতে লীলাকমল, তাঁর রাতুলচরণে সোনার নূপুর।

যাই হোক সনকেরা অষ্ট যোগের প্রভাবে বিষ্ণুপদ লাভ করে, সেই বৈকুণ্ঠধামে উপস্থিত হলেন। তাঁরা শ্রীহরির দর্শন লাভের জন্যে ব্যাকুল হয়েছিলেন। তাঁরা নন্দন কানন নিন্দিত নৈঃশ্রেয়স কানন পার হয়ে, ছয়টি প্রাচীরের দ্বার পার হয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁদের চোখে ঐ কাননের কোন সৌন্দর্যই ধরা পড়ল না। কারণ তাঁদের চিত্ত তখন শ্রীহরির পাদপদ্ম দর্শনের জন্যে উদ্গ্রীব। যে ছয়টি দ্বার তাঁরা  এতক্ষণ পার হয়ে এলেন, সেই সব দ্বারেও দ্বাররক্ষী ছিল, কিন্তু তাঁদের কেউ বাধা দেয় নি। কারণ সকলেই জানে শ্রীবিষ্ণুর বিশেষ কৃপা ছাড়া বৈকুণ্ঠধামে পৌঁছনো সম্ভব নয়তাছাড়া এই চারজন তত্ত্বজ্ঞ ঋষি বৃদ্ধ হলেও বালকের ন্যায় দিগম্বর, সমদর্শী ও পবিত্র, তাঁদের বাধা দেওয়ার কথা কেউ চিন্তাই করেনি।

কিন্তু সপ্তম দ্বারে এসে তাঁরা বাধা পেলেন। সেই দ্বারের দুই দ্বারপাল তাঁদের নিবারণ করে, অবহেলা ভরে বলল, “এইভাবে যখন তখন ভগবানের অন্তঃপুরে ঢুকবেন না”সনকেরা চারজনেই শ্রীহরির দর্শনের জন্যে উন্মুখ হয়েছিলেন, তাঁরা এই হঠাৎ বাধায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “দেখ হে, যাঁরা বহুজন্ম ভগবানের সেবা করেছেন, তাঁরাই ভগবানের করুণায় এই বৈকুণ্ঠে আসতে পারে। আমরা তাঁর একান্ত ভক্ত বলেই এতদূরে আসতে সমর্থ হয়েছি, তাহলে কিসের ভয়ে, কিংবা কোন বৈরিতার আশঙ্কায়, তোমরা আমাদের ঢুকতে দিচ্ছ না? বৈকুণ্ঠলোকে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা সকলেই শ্রীহরির শরণাগত, অতএব সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন, তাঁদের অন্তরে কোন ভেদবুদ্ধি থাকে না। তোমরা সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণুর কিঙ্কর হয়েও কিভাবে এমন অদ্ভূত আচরণ করতে পারলে? আমাদের বিশ্বাস, এই বৈকুণ্ঠলোকে বাস করার কোন যোগ্যতাই তোমাদের নেই। তোমাদের যেমন মন্দবুদ্ধি, তোমাদের মনে এখনো যেমন ভেদভাব বর্তমান, তোমাদের অচিরেই বৈকুণ্ঠলোক ছেড়ে যেতে হবে। তোমাদের স্থান হবে সেই সব লোকে, যে লোকে জীব কাম, ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা ও শত্রুভাব নিয়ে কালাতিপাত করে”

ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি সনকদের এই কথায় সেই দুই দ্বাররক্ষী ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল কি ভয়ংকর ভুল তারা করে ফেলেছে। ভগবান শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং এই রকম তেজস্বী ব্রাহ্মণদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন। তাদের দুজনকে, এই ঋষিরা যে অভিশাপ দিয়েছেন তার খণ্ডন স্বয়ং ভগবানও করবেন না। তারা দুইজনে ঋষিদের চরণ বুকে নিয়ে অনুতপ্ত স্বরে বলল, “হে মহর্ষিগণ, আমরা অপরাধী, অতএব আপনাদের দেওয়া শাস্তিবিধান ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। আপনাদের কাছে এই অনুরোধ, আমাদের যে মূঢ়যোনিতেই জন্ম হোক না কেন, সকল জন্মেই যেন আমাদের ভগবানের প্রতি অচলা ভক্তি থাকে, আমরা কোনভাবেই যেন তাঁকে ভুলে না যাই”

এদিকে তাঁরই দ্বারপ্রান্তে চার মহর্ষির অপমান হয়েছে এই ঘটনা শুনে স্বয়ং শ্রীভগবান পায়ে হেঁটে উপস্থিত হলেন। সনকেরা মুগ্ধ নেত্রে প্রত্যক্ষ দেখলেন তিনি আসছেন। তাঁর দুইপাশে হংসশুভ্র ব্যজন দুলছে। তাঁর মাথার ওপর শুভ্রছত্র, তার পরিধিতে বাঁধা সাদা মুক্তোর মালা চলার ছন্দে দুলছে। তাঁর নিতম্বে পীতাম্বর মেখলা, তাঁর কণ্ঠে দুলছে বনমালা। তাঁর মণিবন্ধে মণিময় বলয়। তাঁর এক হাত গরুড়ের কাঁধে ন্যস্ত, অন্য হাতে লীলাকমল। তাঁর দুই কানে মকর আকারের কুণ্ডল। তাঁর মাথায় মণি মাণিক্য খচিত মুকুট। তাঁর বক্ষস্থলে মনোহারি হারগুচ্ছ। তাঁর কণ্ঠলগ্ন হারে গাঁথা অনন্য কৌস্তুভ মণি তাঁর বুকের উপর দুলছে। সনক কুমারেরা ভগবানের সেই মূর্তি দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে গেলেন, তাঁরা ভগবানকে নত মস্তকে প্রণাম করলেন। ভগবানের রূপ একবার দেখেও তাঁদের তৃপ্তি হল না, তাঁরা মুগ্ধনেত্রে ভগবানের রূপ সুধা পান করতে করতে ভাবলেন, শ্রী ভগবানের করুণাঘন প্রেম দৃষ্টি, তাঁর মধুর অমৃতময় হাসি, তাঁর লাবণ্যময় শরীর, তাঁর কমনীয় সুন্দর মুখমণ্ডলের জন্যে কোন অলংকারের প্রয়োজনই ছিল না। তাঁর অঙ্গের স্পর্শে ও ঐশ্বর্যে অলংকারই বরং অলংকৃত হয়েছে।

ভক্তি ব্যাকুল স্বরে, কুমারগণ বললেন, “হে অনন্ত, যদিও তুমি সকল অন্তরেই ব্যাপ্ত, কিন্তু দুরাত্মাদের কাছে কখনো প্রকাশিত হও না। অথচ আমাদের মতো ভক্তদের অন্তর থেকে তুমি কোনদিন অদৃশ্য হও না। পিতা ব্রহ্মার উপদেশে তুমি আমাদের হৃদয়ে অধিষ্ঠান করেছিলে, আজ তোমার দর্শন পেলাম। তোমার দর্শন পেয়ে আমরা পরমাত্মতত্ত্বের সাক্ষাৎ পেয়েছি, তোমার এই বিশুদ্ধসত্ত্ব শ্রীমূর্তি আমাদের হৃদয়ে সারাজীবন অক্ষয় থাকবে। কিন্তু, হে ভগবান, একটু আগে পর্যন্ত আমাদের কোন অপরাধ ছিল না, কিছুক্ষণের জন্যে ধৈর্য হারিয়ে আমরা একটি অন্যায় কর্ম করে ফেলেছি। তোমার দুই ভক্তকে আমরা অভিশাপ দিয়ে ফেলেছি যে, অবিলম্বে তারা বৈকুণ্ঠলোক থেকে বিচ্যুত হবে। এই অপরাধে যদি আমাদের নীচযোনিতেও জন্ম হয়, তাতেও আমাদের দুঃখ থাকবে না। ভ্রমর যেমন কাঁটার আঘাতে বারবার কষ্ট পেলেও ফুলের বন পরিত্যাগ করে না, সেই রকম যে কোন পরিস্থিতিতে আমাদের মন সর্বদাই তোমার শ্রীচরণেই নিবদ্ধ থাকবে। আজ তোমার এই অপরূপ দেখে আমরা পরমানন্দ সাগরে ডুবে রইলাম, হে ভগবান, তুমি আমাদের প্রণাম নাও”

 

দুই বিষ্ণু-পারিষদের শাপমোচনের বিধান  

তাঁদের বাক্যে প্রীত হয়ে বৈকুণ্ঠবিহারী শ্রীহরি বললেন, “জয় ও বিজয় আমার এই দুই পারিষদ আপনাদের অপমান করেছে, এই অপমান আমারই অপমান। আপনারা দেবতার মতো শ্রদ্ধেয় ও পূজ্য। আমি ব্রাহ্মণকে সর্বদাই পরমদেবতা বলে বিশ্বাস করি। অতএব ওদের এই অপরাধের জন্যে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। শরীরে কুষ্ঠ ব্যাধি যেমন ধীরে ধীরে ত্বকের বিনাশ করে, সেইরকম ভৃত্যের অপরাধে প্রভুও বিনষ্ট হয়। গো, ব্রাহ্মণ ও অসহায় জীব আমার দেহ। হে মুনিগণ, ব্রাহ্মণদের সেবা করেই আমি এই উৎকৃষ্ট চরিত্র লাভ করেছি। পরমপাবন ভগবান হয়েও, আমার মুকুটে আমি ব্রাহ্মণের পবিত্র চরণরেণু ধারণ করে থাকি। আমার এই ভৃত্য দুইজন আমার মনের কথা না বুঝে আপনাদের অপমান করে অপরাধ করে ফেলেছে। তার জন্যে আপনারা যে শাস্তিবিধান করেছেন, সে শাস্তি আমি অনুমোদন করি। তবে বৈকুণ্ঠলোক থেকে তাদের নির্বাসন কাল তাড়াতাড়ি সমাপ্ত করে, তারা যাতে আমার সঙ্গে আবার মিলিত হতে পারে, আপনারা অনুগ্রহ করে সেই বিধানের অনুমতি দিন”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “শ্রীহরির এই মধুর কথায় কুমারেরা প্রথমে বুঝতে পারলেন না, ভগবান তাঁদের কাজের প্রশংসা করলেন, না নিন্দা করলেন। তাঁরা ঐ দুই পারিষদের যে শাস্তিবিধান করেছেন, তাতে ভগবান সায় দিলেন, নাকি সেই শাস্তি হ্রাস করলেন। তাঁরা উপলব্ধি করলেন ভগবানের কাছে সকল ভক্তই সমান। ভগবানের দ্বার রক্ষার দায়িত্বে থাকা জয় ও বিজয়ের সামান্য অপরাধে, তাদের অভিশাপ দিয়ে, তাঁরা অনেক বেশী অপরাধ করে ফেলেছেন। কিন্তু শ্রীভগবান এসব সত্ত্বেও তাঁদের অনুগ্রহ চাইছেন, এই কথায় তাঁরা আপ্লুত হয়ে বললেন,

“হে ভগবান, তুমি ত্রিগুণের অতীত ও তুমিই বিশ্বের পালন কর্তা। তুমিই ব্রহ্মণ্যদেব, ব্রাহ্মণ ও দেবের রক্ষকতোমার থেকেই সনাতন ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। যে ব্রাহ্মণগণ দেবতাদের পূজ্য, তুমিই সেই ব্রাহ্মণদের আত্মা ও আরাধ্য দেবতা। অতএব তুমি সর্বেশ্বর হয়েও আমাদের “অনুগ্রহ করে অনুমতি দিন” এই বাক্য প্রয়োগ করায়, তার সঠিক মর্ম আমরা প্রথমে উপলব্ধি করতে পারিনি। তুমি ধর্মরক্ষার জন্যে এবং লোক শিক্ষার জন্যেই ব্রাহ্মণের কাছে অবনত হলে, এতে তোমার গৌরব এতটুকুও ক্ষীণ হয় নি। হে ত্রিযুগ, সকল যুগেই তুমি পরমপুরুষ। ধর্ম তোমার পরমরূপ; তপস্যা, শুচিতা ও দয়া তোমার স্বরূপ। তুমি ব্রাহ্মণ, দেবতাদের সঙ্গে এই নিখিল বিশ্ব চরাচরের পালন করছো। হে দেব, তুমিই আদর্শ পুরুষ, সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। তোমার আচরণ অনুসরণ করেই আমরা ধর্ম অনুসরণ করি। তোমার এই দুই নিরপরাধ পার্ষদকে অভিশাপ দিয়ে আমরাই অপরাধ করেছি, অতএব তোমার যে কোন আদেশ ও উপদেশে আমরা সম্মত আছি। তোমার যা উচিৎ মনে হয়, তুমি তাই করো”

শ্রী ভগবান বললেন, “হে বিপ্রবর, আপনারা আমার এই দুই পার্ষদকে যে অভিশাপ দিয়েছেন, জেনে রাখুন তা আমার প্ররোচনাতেই করেছেন। জয় ও বিজয় এখনই আসুরীযোনি লাভ করবে; জন্ম থেকেই আমার প্রতি ওদের ক্রোধের আবেশ, আমাকে ওদের কাছে আকর্ষণ করবে এবং ওরা তাড়াতাড়ি আবার আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে”ভগবানের এই কথার পর সনক কুমারেরা তাঁর কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। ভগবানকে প্রদক্ষিণ ও তাঁকে প্রণিপাত করার পর, তাঁরা আনন্দ চিত্তে  বৈকুণ্ঠলোকের শোভা দেখতে দেখতে ফিরে এলেন।

এরপর ভগবান জয় ও বিজয়কে বললেন, “তোমরা যাও, ভয় পেয়ো না, তোমাদের মঙ্গলই হবে। আমি ব্রহ্মশাপ নিবারণ করতেই পারতাম, কিন্তু করলাম না। সনক কুমারদের ক্রোধ, তোমাদের মতো পার্ষদের সঙ্গে ব্রাহ্মণের প্রতিকূল আচরণ, এই সবকিছু আমার ইচ্ছেতেই ঘটেছে, এমনই উপলব্ধি করো। আমার নিজের ভক্তদের মধ্যে উপেক্ষা, বৈকুণ্ঠবাসীদের পুনর্জন্ম এমন ঘটনা সম্ভব নয়, কিন্তু তাও যে এমন ঘটল তার কারণ বলছি শোন। আমার যেমন সৃষ্টি করতে আনন্দ হয়, তেমনি যুদ্ধ বিগ্রহ করতেও ইচ্ছে হয়। অন্যান্য সকলে আমার থেকে অনেকটাই হীনবল, কিন্তু তোমরা দুজনেই আমার তুল্য বলের অধিকারী। অতএব, তোমাদের দিয়ে ব্রাহ্মণের বাধা সৃষ্টি করিয়ে, তোমাদেরকে ব্রহ্মশাপে আমার প্রতিপক্ষ করে তুললাম। আমার প্রতি বৈরীভাবে অল্প দিনের মধ্যেই তোমরা ব্রহ্মশাপ উত্তীর্ণ করে আমার কাছেই আবার ফিরে আসবে”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “হে দেবগণ, এই কথা বলে ভগবান তাঁর নিজের ভবনে ফিরে গেলেন আর দেবশ্রেষ্ঠ জয় ও বিজয়, ব্রহ্মশাপে গর্বহীন হয়ে বিষ্ণুলোক থেকে পতিত হতে হতে শ্রীহীন হয়ে গেলেন। সেই দুই পার্ষদ কশ্যপের তেজকে নিজের দেহরূপে স্বীকার করে, এখন দিতির গর্ভে বেড়ে উঠছে। সেই দুই অসুরের তেজেই তোমাদের তেজ দিনে দিনে ম্লান হতে থাকবে; এ সবই স্বয়ং ভগবানের ইচ্ছা, এ বিষয়ের প্রতিকার একমাত্র তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব এবং তিনিই আমাদের মঙ্গলের জন্যে সঠিক সময়ে এর প্রতিকার করবেন, এবিষয়ে আমাদের কোন কার্য বিচারে কোন ফলোদয় সম্ভব হবে না”

[এমনটা যে হবে সেকথা ব্রহ্মা বহু যুগ আগে থেকেই জানতেন। দিতির গর্ভস্থ সন্তানরা কারা - সে কথাও তিনি জানতেন। তিনি এও জানতেন এই দুই দৈত্যকে জন্মগ্রহণের পরেও কয়েকশ' বছর সময় দিতে হবে, যাতে বড়ো হয়ে তারা দেবতাদের অত্যন্ত অতিষ্ঠ করে তোলে। তারপরেই না ভগবান বিষ্ণু এসে ওই অজেয় দৈত্যদের হত্যা করে ভূভার হরণ করবেন!]       

চলবে...


মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪ 

৪০

 

ভল্লা উঠে গিয়ে প্রদীপটা নিয়ে এসে উঠোনে বসল, বলল, “মারুলা এদিকে আয়”। তারপর মাটিতে কাঠি দিয়ে আস্থানের রেখাচিত্র আঁকতে লাগল। আঁকা শেষ হওয়ার আগেই রামালিও এসে ভল্লার পাশে বসল। মারুলা কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখল, বলল, “আস্থানে তুই দুবার গিয়েছিলি, না? একবার দিনে আরেকবার রাত্রে…নিখুঁত এঁকেছিস। কিন্তু তোর ছেলেদের আক্রমণের পর – শষ্পককে বলে, উপানু চার কোনে চারটে প্রহরী-স্তম্ভ বানিয়ে তুলেছে। কাঠের কাঠামো - বারো হাত উঁচুতে বাঁধা মাচায় একজন করে রক্ষী সারারাত পাহারা দেয়”। মারুলা খিঁকখিঁক করে একটু হাসল, বলল, “অবিশ্যি মাঝরাতে পেচ্ছাপ ফিরতে উঠে – ব্যাটাদের প্রতিদিনই  নিশ্চিন্তে ঝিমোতে দেখেছি…। যাগ্‌গে এবার তোর পরিকল্পনাটা শুনি। ঠিক কিসের জন্যে আক্রমণ করতে চলেছিস”?

ভল্লা মুখ তুলে তাকাল মারুলার দিকে, বলল, “মুখ্য উদ্দেশ্য শোধ নেওয়া – বেশ কিছু রক্ষীকে যমের দুয়োরে পাঠানো – পারলে উপানুকেও!”

মারুলা উত্তেজিত হয়ে বলল, “শালা উপানুকেও? শষ্পক শুনলে তোকে মাথায় করে নাচবে”।

“তার মানে? তার রক্ষী-সর্দারকে মারলে সে খুশি হবে?”

“রক্ষী-সর্দার না, ব্যাঙের মাথা। ওর ধামাধরা জনা আষ্টেক রক্ষী ছাড়া, অন্য রক্ষীরাই সুযোগ পেলে শালাকে মাটিতে পুঁতে দেবে। উপানু কোন ঘরে শোয় জানিস?” ভল্লা রেখাচিত্রের ওপর আঙুল দিয়ে উপানুর ঘরটা দেখাল। মারুলা আবার খিঁক খিঁক করে হাসল খানিকক্ষণ, তারপর বলল, “ঠিকই দেখিয়েছিস…কিন্তু বেজন্মটা একটু রাত হলেই – এই যে এই ঘরে...”, আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে মারুলা বলল, “এই ঘরে পীরিত করতে যায়?”

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই অবাক হয়ে বলল, “তার মানে?” রামালি বলল, “আস্থানে মেয়েরাও থাকে নাকি”?

মারুলা রামালির কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোকে এসব কথা বলতে লজ্জা করে, রামালি। কিন্তু না বলারও কোন মানে হয় না। বড়ো হচ্ছিস, নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো একটা জায়গা তৈরি করছিস। জগৎটাকে জানতে এবং চিনতে তো হবেই। জেনে রাখ, ছেলেতে ছেলেতেও পীরিত হয় – বিরল ঘটনা যদিও – কিন্তু হয়। মাস ছয়েক আগে উপানু এই ছেলেটিকে ওর নিজের সহকারী বলেই আস্থানে এনেছিল। দেখতে-শুনতে ভালো, একটু নাদুস-নুদুস ধরনের। কত বয়েস হবে – চোদ্দ-পনের? কিছুদিনের মধ্যেই উপানুর দুর্মতি টের পাওয়া গেল। ওই ঘরটিতেই সে ছেলেটিকে থাকতে দিল এবং রাত্রে নিয়মিত ছেলেটির বিছানায় যাওয়া শুরু করল। প্রথম দিকে ছেলেটি চেঁচামেচি করত, কান্নাকাটি করত। উপানু মারধোর করত। দু’-তিনবার পালাবার চেষ্টাও করেছিল। পারেনি – উপানুর আমড়াগেছো রক্ষীরা তাকে ঘাড় ধরে আস্থানে ফিরিয়ে এনেছে। উপানু মরলে অসহায় ছেলেটাও পিশাচের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে”

ভল্লা বলল, “শষ্পক জানে না? সে কিছু করছে না কেন?”

মারুলা বলল, “তুই তো জানিস, ভল্লা। শষ্পক প্রসাশনের লোক আর উপানুরা হল, নগরকোটালের অধীন। এখানে শষ্পকের নির্দেশ মানতে উপানু বাধ্য – কিন্তু উপানুর ব্যক্তিগত বিষয়ে কিংবা ওর অধীনস্থ কোন কর্মচারীর ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার অধিকার শষ্পকের নেই। সেই সুযোগটাই উপানু নিয়ে যাচ্ছে”। মারুলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আমার হাতেই উপানুর মৃত্যু লেখা আছে…একবার সুযোগ যদি পাই…”।

“না মারুলাদাদা, উপানু আমার শিকার, আমার হাতেই ও মরবে…”। রামালি দাঁতে দাঁত চেপে মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “কবে থেকে আমি ওর আয়ু গুনছি…”। মারুলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রামালির চোখের দিকে, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ঠিক আছে, তোকেই দিলাম… পাঁঠাটাকে তুইই বলি দিবি…কিন্তু আমি তোর কাছাকাছি থাকবো…শালা ভয়ানক ঘুঘু…একটু ঊণিশ-বিশ হলেই ফস্কে যাবে”।

অনেকক্ষণ পর ভল্লা বলল, “উপানুর স্থায়ী ব্যবস্থা তো তোরা করেই ফেললি। এবার মূল পরিকল্পনাটা বলছি, শোন মারুলা। আমরা ঢুকবো পূবের দরজা দিয়ে। যতদূর জানি মাঝরাত্রে ওই দরজায় প্রহরা কিছুটা দুর্বল থাকে”।

একদম ঠিক। আমি বলব, পূব দিকের দুই স্তম্ভের দুই প্রহরীকে প্রথমেই টপকে দে। অন্ধকারে বেড়ার বাইরের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভল্ল বা তীর ছুঁড়ে। তারপর তিন থেকে চারজন বন্ধ দরজা টপকে নিঃশব্দে ঢুকে পড়, আর প্রহরীগুলোকে ঝপাঝপ সাবড়ে দে। রাত্রে ওদিকে জনা তিন-চার থাকে সবকটাই ঢ্যাঁড়স, সুযোগ পেলেই ঝিমোয়। তারপর বাঁদিকের রক্ষীদের ঘরের চারটে দরজায় শেকল তুলে দে। ব্যাটারা থাক বন্দী হয়ে, হঠাৎ কেউ বেরিয়ে পড়লেই বিপদ। এবার পশুশালা পার হয়ে পশ্চিমদিকে যেতে যেতে করণিক আর পাকশালার দরজাগুলোও বন্ধ করে দে। তারপর প্রথমে চল উপানুর অভিসার ঘরে। সেখানে উপানুকে শেষ করে, চারজন ছোট পাকশালার ঘুপচিতে গা ঢাকা দিয়ে প্রস্তুত থাক। সুবিধে হল, ওখান থেকে দুটো দিকেই লক্ষ্য রাখা যাবে”।

এইবার আমাদের সব থেকে কঠিন কাজটার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। পাকশালার ঘুপচিতে ঢুকেই বাইরের ছেলেদের সংকেত দিতে হবে। তারা আগের মতোই বাইরে থেকে দুই স্তম্ভের দুই প্রহরীকে শেষ করবে। এবং একই সময়ে পশ্চিমের প্রধান দরজার উল্টোদিকে - রাজপথের ওপাড়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে থাকা ছেলেরা আক্রমণ করবে। ওখানে দরজার সামনে থাকা দু-তিনজন রক্ষীকে মারতে পারলে, বাকি রক্ষীরা পিছিয়ে যেতে যেতে আস্থানের অন্যান্য রক্ষীদের বেরিয়ে আসার সংকেত দেবে...কিন্তু রক্ষীদের ঘর বন্ধ এবং ততক্ষণে উপানু টেঁশে গেছে – আমাদের পেছনে চট করে কেউ আসতে পারবে না। এইসময় আমাদের ছেলেরা ঘুপচি থেকে হঠাৎ বেরিয়ে পিছিয়ে আসা রক্ষীদের আক্রমণ করবে। এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোনের প্রহরা-স্তম্ভে উঠেও আমাদের ছেলেরা রক্ষীদের আক্রমণ করতে পারবে।

এই কাজটা যত অল্প সময়ে যত নিখুঁত আমরা করতে পারবো, ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল”।  

    

   ভল্লা আর রামালি ছবিটার দিকে তাকিয়ে মারুলার পুরো পরিকল্পনাটা নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “আমার তো ভালই লাগছে পরিকল্পনাটা। তুই খেয়ে দেয়ে কেটে পর মারুলা। কালকে দিনের বেলা ছেলেদের সঙ্গে একটু আলোচনা করে, কাল রাত্রে আবার তোর সঙ্গে বসব...। দক্ষতা অনুযায়ী কোন ছেলে কোথায় থাকবে – সেটা আমাদের কালকেই ঠিক করে নিতে হবে”।

রামালি খাবার বাড়তে বসে গেল দেখে, মারুলা বলল, “আমাকেও তোর দলে নিতে পারিস, তবে আমি বাইরে থাকব, আস্থানে ঢুকব না। আমি উত্তরের দুটো প্রহরা-স্তম্ভের প্রহরীকে মেরে পশ্চিমের দরজার উল্টোদিকে ঝোপের আড়ালে থাকবো। সংকেত পেলেই দরজার সামনে থাকা কম করে দুটো রক্ষীকে তো আমি খসাবোই! ভালো কথা সংকেতটা কী হবে? সেটাও ভেবে ঠিক করে নিস”।

“বাঃ তুমি যে বললে, উপানুকে মারার সময় তুমি পাশে থাকবে?” রামালি ভল্লা আর মারুলার হাতে খাবারের থালা দিতে দিতে বলল।

ভল্লা বলল, “না রে, আমাদের সঙ্গে আস্থানের ভেতরে ঢুকলে মারুলাকে ওরা চিনে ফেলবে। তোর পাশে আমি থাকবো রামালি, তোর পাঁঠাকে তুই কাট না – তবে লেজ নয় – ব্যাটার মুড়োটাই কাটিস”।

মারুলা খেতে খেতে বলল, “তোদের ছেলেরা সাদা ধুতি পরলে – অন্ধকারেও কিন্তু বোঝা যাবে ভল্লা, বেশি সময় নেই – তা নাহলে কালো ধুতি যোগাড় করতে বলতাম”। ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, কিছু বলল না। রামালি হেসে বলল, “কালো ধুতি আমরা কিনেছি তো, বীজপুর থেকে”।

মারুলা বলল, “জানি ভল্লাব্যাটার সব দিকেই লক্ষ্য, তবু একবার মনে করালাম। আচ্ছা শোন, তোর জন্যে শষ্পক চার বটুয়া রূপো পাঠিয়েছে…খেয়ে উঠে দিচ্ছি। শষ্পককে বলেছিলাম – তোরা বীজপুর গেছিস, ঘর-টর বানাতে হবে – শুনেই বলল, ভল্লার টাকা চাই তো…নিয়ে যাও… আরও দুটো বটুয়া থাকল আমার কাছে...। তোর ওই গচ্ছিত টাকার জন্যে শষ্পকের রাত্রে ঘুম হয় না, মনে হয়”।     

ভল্লা বলল, “ঠিক আছে, দিয়ে যাকিন্তু মারুলা, আমি ভাবছিলাম, আমাদের একজন কবিরাজ বা বৈদ্যকে দরকার – কিছুদিনের জন্যে। কী করা যায় বল তো?”

“কিসের জন্যে?”

“ধর আমাদের মধ্যে ওই দিন কেউ কেউ আহত হলাম, চিকিৎসার জন্যে কাউকে তো দরকার…”।

মারুলা বলল, “হ্যাঁ দরকার তো বটেই – কিন্তু হুট করে বিশ্বাসযোগ্য পাবি কাকে? যে ব্যাটাকে আনবি সে ব্যাটা হয়তো তোদের ওই শল্কুর মতো আস্থানে চলে গেল… তখন? তাকে ঘুম পাড়াতে আবার এই মারুলার খোঁজ পড়বে!

রামালি বলল, “একজন আছে ভল্লাদাদা, আমাদেরই গ্রামে – নাম বড়্‌বলা।  আমাদের গ্রামে আরেকজন বলা আছে, তাকে আমরা ‘ছোট্‌বলা’ ডাকি। আমাদের কবিরাজমশাইয়ের সঙ্গে বড়্‌বলা দীর্ঘদিন ছিল। কবিরাজ নয় কিন্তু কিছু কিছু শিখেছে - ক্ষত সেলাই, প্রলেপ বানানো, কিছু কিছু জড়িবুটি বানানো...কবিরাজমশাই না থাকাতে, এখন তো তাকেই ডাকছে গ্রামের লোকরা”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে করবে?”

“কেন করবে না? এখন আমাদের আর সুকরা গ্রামের সমস্ত লোক আমাদের সাহায্য করার জন্যে মুখিয়ে আছে – করবে না মানে? আরেকজন আছেন সুকরা গ্রামের কুশানকাকা – বলার থেকে কুশানকাকা ভালো কবিরাজি করে – তবে কুশানকাকা, সুরুলের মুখে শুনেছি, একটু বেশি রাজভক্ত। কাজেই কুশানকাকাকে দিয়ে আমাদের চলবে না

“বড়্‌বলাকে কাল একবার ডাক না, কথাবার্তা বলি”। ভল্লা বলল।

সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। রামালি এঁটো বাসন তুলতে তুলতে বলল, “ঠিক আছে”।

রামালি পুকুরের দিকে চলে যেতে ভল্লা মারুলাকে বলল, “ভাবছি, পরশু ছেলেদের নিয়ে একবার অস্ত্রভাণ্ডার থেকে ঘুরে আসব। কোন সময় যাওয়া ঠিক হবে বল তো”?

“দিনের বেলায় যা – আলো থাকতে থাকতে। কুলিকপ্রধানকে আমি বলে দেব - পরশু কেউ যেন কাজে না আসে। নিশ্চিন্তে ঘুরে আয় – সামনের দরজা নয়, পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকবি। কোন সময় যাবি – আমিও থাকব তাহলে”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা বলল, “উঁহু। এখনই ছেলেদের সঙ্গে তোর পরিচয় হওয়াটা ভয়ানক ঝুঁকি হয়ে যাবে। এই দলটার মধ্যে থেকে যদি আরেকজন শল্কু বেরিয়ে পড়ে – তুই এবং শষ্পক দুজনেই বিপদে পড়ে যাবি। এবং আমাদের আস্থান আক্রমণের পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যাবে”।

এই সময় রামালি ফিরে এল পুকুর থেকে। ঘরের মধ্যে থালাবাটি হাঁড়িকুড়ি রেখে দিয়ে বাইরে এল।

মারুলাও চিন্তা করে বলল, “ঠিকই বলেছিস”।

ভল্লা তারপর রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “এক কাজ করতে পারিস। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করেই পরশুদিন রামালি চলে যাক। ওর সঙ্গে তুই ওখানে দেখা করে নে। আমি ছেলেদের নিয়ে বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাবো”।

“কিন্তু রামালি চেনে না, তো”!

“ধ্যার ব্যাটা। জঙ্গলের পথে সোজা দক্ষিণে – অতখানি জায়গা জুড়ে অস্ত্রভাণ্ডার – রামালি চিনতে পারবে না? কী যে বলিস!”      

“ঠিক আছে, তাহলে ওই কথাই রইল। আমি এবার কেটে পড়ি। এই নে শষ্পকের দেওয়া বটুয়া চারটে রাখ”।

“যা। আমি আর রামালি এখন কমলিমায়ের বাড়ি যাবো”।

চলবে...


সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১২

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১১ "]


৫.৩.৩ মহাভারতের অশুদ্ধি

মহর্ষি বেদব্যাস বেদের সংকলন এবং মহাভারত রচনা তখন সমাপ্ত করেছেন। তিনি তখন বৃদ্ধ। সমগ্র দেশের পণ্ডিতমহলে তাঁর অশেষ যশ ও সম্মান। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি নেই। মহর্ষি বেদব্যাস অদ্ভূত এক মানসিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার কারণ তাঁর যুবক পুত্র শুকদেব, যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক সিদ্ধযোগী ব্রহ্মর্ষি। সে কখনো কখনো শিশুর মতো নগ্ন অবস্থায় বিচরণ করে, তার থাকা-খাওয়ার কোন স্থিরতা নেই। মহর্ষি এই পুত্রের জন্যে বড়ো বিব্রত বোধ করেন। একদিন আশ্রম থেকে নগ্ন হয়ে শুকদেব বেরিয়ে পড়লেন, তাঁকে আটকাতে তিনিও দৌড়লেন পুত্রের পিছনে। পথের ধারে এক সরোবরে কয়েকজন অপ্সরা স্নান করছিল, যুবক শুকদেব নগ্ন অবস্থাতেই ওই সরোবরের পাশ দিয়ে যখন হেঁটে গেলেন, অপ্সরাগণ এতটুকু বিচলিত হল না। কিন্তু বৃদ্ধ বেদব্যাস পুত্রকে অনুসরণ করে সরোবরের কাছাকাছি যেতেই অপ্সরা কন্যারা লজ্জায় সচকিতে তাদের অঙ্গ আবৃত করল। মহর্ষি বেদব্যাস বিস্মিত হলেন, তিনি অপ্সরাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তারা সলজ্জ নতমুখে বলল, “দয়া করে অপরাধ নেবেন না, মহর্ষি বেদব্যাস, আপনার পুত্র শুকদেব শিশুর মতো, তাঁর নির্মল দৃষ্টিতে স্ত্রী-পুরুষে প্রভেদ নেই, কিন্তু আপনার...”।

মহর্ষি বেদব্যাস আরও বিষণ্ণ হলেন। তিনি চার বেদের সংকলন করেছেন, অজস্র শিষ্যকে বেদের পাঠ দিয়েছেন। শূদ্র এবং নারীদের বেদপাঠ নিষিদ্ধ বলে, তিনি পঞ্চম বেদস্বরূপ মহাভারত রচনা করে, সকলের কাছে বেদের জ্ঞান প্রকাশ করেছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সত্ত্বেও, তিনি পূর্ণ ব্রহ্মলাভ করতে পারেননি। সামান্য অপ্সরাগণও তাঁর মতো জ্ঞানবৃদ্ধের দৃষ্টিতে সমদর্শন দেখতে না পেয়ে, লজ্জিতা হয়, তাঁকে সাধারণ মানুষ বলেই মনে করে! সেদিন সরস্বতী নদীর তীরে বসে, নির্জন গোধূলিতে তিনি চিন্তা করতে বসলেন, তবে কী আমার জ্ঞান অসম্পূর্ণ এবং অপরিণত?

সেখানে উপস্থিত হলেন ত্রিকালজ্ঞ দেবর্ষি নারদ। তিনি মহর্ষিকে তাঁর বিষণ্ণতার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। মহর্ষি তাঁর মানসিক অবস্থার কথা সবিস্তারে যখন বললেন, দেবর্ষি মনোযোগে শুনলেন। তারপর দেবর্ষি বললেন, “হে মুনিবর, মহাভারতে আপনি নানাবিধ অলঙ্কার ও উপমায় ধর্ম সাধনার কথা বলেছেন, ধর্ম ও অধর্মের বিচার করেছেন, তার কর্মফলের নির্দেশ দিয়েছেন। এক কথায় মহাভারতের কাহিনীসমূহ বায়স-চিত্ত-বাসনাগ্রস্ত মানুষের উপযুক্ত হয়েছে। তারা কাকের মতোই ওই গ্রন্থের অলংকার, উপমা এবং সুরচিত কাহিনীগুলি ঠুকরে উপভোগ করে, অন্যত্র উড়ে যাবে। ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসেরা কখনো মহাভারতে বিহার করবেন না। কারণ মহাভারতে ভগবানের যশোগান নেই, মহিমাগাথা নেই। অশুদ্ধপদে, ভ্রান্ত উপমায় বাসুদেবের মহিমা কীর্তন করে লেখা নিরলঙ্কার গ্রন্থও মহান গ্রন্থ, কিন্তু ভক্তিহীন জ্ঞানের আকর গ্রন্থ মূল্যহীন। কারণ ওই গ্রন্থপাঠে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। আপনি দৃঢ়ব্রত, সত্যনিষ্ঠ, পুণ্যকীর্তি, বহুদর্শী ও বেদশাস্ত্রে পারদর্শী। আপনি অখিল বিশ্বের বন্ধনমুক্তির জন্যে শ্রীহরির লীলা কীর্তন করুন। যা পাঠ করলে, বিদ্বান ব্যক্তিদের জানার আর কোন বিষয় অবশিষ্ট থাকে না, আপনি সেই ভগবানের মহিমা কীর্তন করুন। 

উপরের ঘটনাটি শ্রীমদ্ভাগবত-সংহিতার (পুরাণ) প্রাক-কথনের সংক্ষিপ্তসার। এরপরেই মহর্ষি বেদব্যাস এই গ্রন্থ রচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্পষ্টতঃই এই কাহিনী কল্পিত এবং আরোপিত। কারণ আমরা আগেই দেখেছি, মহর্ষি বেদব্যাসের সময়কাল, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমসাময়িক, মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-তে। বিশেষজ্ঞরা বলেন পুরাণগুলির সম্ভাব্য রচনা কাল খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত। এবং আমার মনে হয় শ্রীমদ্ভাগবত সম্ভবতঃ গুপ্তযুগের সমকালীন রচনা, কারণ সে সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সম্পূর্ণ হিন্দুধর্ম হয়ে উঠেছে। আমার এই অনুমানের আরও কারণ, অন্যান্য পুরাণ গ্রন্থগুলির তুলনায় শ্রীমদ্ভাগবত অনেক পরিণত রচনা এবং বক্তব্যের দিক দিয়েও অত্যন্ত স্বচ্ছ। মহাভারত রচনার প্রায় পনেরশ’ বছর পরে মহর্ষি বেদব্যাসের বিষণ্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কোথায়

 অতএব এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, মহাভারত রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাসের যশ ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে, পুরাণকাররা, তাঁর নামের আড়ালে প্রায় সকল পুরাণ রচনা করেছেন। পৌরাণিক ভক্তিতে ভারতভূমিকে প্লাবিত করার আগে, উপরে বর্ণিত কাহিনীর একটি প্রেক্ষাপট রচনা তাঁদের প্রয়োজন ছিল। কাল্পনিক এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাঁরা মহর্ষি বেদব্যাসের রচিত মহাভারতকেও ছেড়ে দেননি। কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে, হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরের জন্যে মহাভারতে তাঁরা বহু অধ্যায়েরই অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। 

 

৫.৪.১ শ্রীমদ্ভাগবতের কৃষ্ণ

শ্রীমদ্ভাগবত পূর্ণতঃ বিষ্ণুর মহিমা বর্ণন। তার মধ্যে অবশ্যই সিংহভাগ দখল করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এই পুরাণে শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলার যাবতীয় ঘটনার কথা জানা যায়। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বিবরণের কথা ভারতীয় হিন্দুদের অতি পরিচিত, সে বর্ণনায় যাচ্ছি না। একটিমাত্র বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কৃষ্ণের জন্মের পরেই মাতা যশোদার কন্যার সঙ্গে মাতা দেবকীর পুত্রের বদলাবদলি ঘটিয়ে ছিলেন পিতা বসুদেব। মাতা দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান ভেবে, রাজা কংস এই কন্যাটিকে যখন হত্যা করতে গেলেন, দেখা গেল, এই কন্যা কোন সাধারণ শিশু নয়, তিনি দেবী যোগমায়া। তিনি অষ্টভুজা দেবী, তাঁর হাতে ধনু, শূল, বাণ, চর্ম, খড়গ, অসি, চক্র ও গদা। তিনি দিব্যমালা, বসন ও রত্ন-অলংকারে ভূষিতা। পুজোর অর্ঘ নিয়ে তাঁর সঙ্গীরা - সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, কিন্নর, অপ্সরা ও উরগগণ - তাঁর স্তুতি করছিল। বলা বাহুল্য, এই দেবী অনার্য দেবী, কৃষ্ণের জন্মের নিরাপত্তার জন্যেই তিনি মাতা যশোদার গর্ভে আবির্ভূতা হয়েছিলেন।

এরপর কৃষ্ণের শৈশব, বাল্য ও কৈশোরের নানান আশ্চর্য লীলার কথা আমরা সকলেই জানি, তবুও আরেকবার সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক।

রাজা কংস দেবকীর কন্যা সন্তানের দেবী রূপ দেখেও নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না, কারণ অন্তর্হিত হওয়ার আগে দেবী ঘোষণা করেছিলেন, “রে দুষ্ট কংস, আমাকে মেরে তুই কী করবি? তোর শত্রু তোর মৃত্যুরূপে কোথাও না কোথাও জন্ম নিয়েছেন। অতএব, এরপর তুই আর অন্য নিরাপরাধ শিশুদের অকারণ বধ করিস না”। কংসের মন্ত্রণাদাতারা সকলেই ছিলেন, রাক্ষস বা দৈত্য-দানব। তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করে, তিনি স্থির করলেন, মথুরা, ব্রজ (বৃন্দাবন) এবং আশেপাশের গ্রামের শিশুদের, যাদের বয়স দশদিনের আশেপাশে, তাদের হত্যা করবেন। ভোজরাজ কংসের এই “কৃষ্ণ-হত্যা” সিদ্ধান্তের সঙ্গে রোম প্রশাসক হেরডের “যিশু-হত্যা” ঘোষণার আশ্চর্য মিল। দুই কাহিনীর কোনটি মূল এবং কোনটি অন্যকে প্রভাবিত করেছিল, আজ তার হদিশ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

শ্রীকৃষ্ণ শৈশব থেকেই অলৌকিক শক্তির অধিকারী, আর হবে নাই বা কেন, মানুষের রূপে তিনিই যে পরমপুরুষ পুরুষোত্তম ঈশ্বর বিষ্ণু। তাঁর নিত্য সঙ্গী ছিলেন তাঁর বৈমাত্রেয় দাদা, বলরাম, গোপরাজা নন্দর পত্নী রোহিণীর পুত্র। তিনিও বিষ্ণুর অংশ-অবতার। দুই ভাইকে একত্রে রাম-কৃষ্ণও বলা হত। শৈশব থেকে বাল্য বয়েসের মধ্যেই তিনি অনেকগুলি কীর্তি করে ফেললেন। কৃষ্ণকে বধ করতে রাজা কংস তাঁর যে অনুচরদের পাঠাচ্ছিলেন, যেমন পূতনা রাক্ষসী, দৈত্য তৃণাবর্ত বা চক্রবাত, বৎসাসুর, বকাসুর, ধেনুকাসুর, অঘাসুর বা অজগর অসুর, অরিষ্টাসুর, কেশী দৈত্য, প্রলম্ব– সকলেই কৃষ্ণের হাতে নিহত হলেন। তরুণ বয়সে তিনি দমন করলেন কালিয় নাগকে।

এই কাহিনীগুলিতে অলৌকিক রোমাঞ্চ অনুভব করা ছাড়া আর কোন তাৎপর্য নেই।  অবশ্য চিন্তা করলে একটি তাৎপর্য মনে আসে, শ্রীকৃষ্ণের মামা রাজা কংস নিশ্চয়ই অনার্য? তা নাহলে তাঁর মন্ত্রণাদাতা পারিষদ থেকে শিশু কৃষ্ণকে বধ করতে আসা অনুচরী/অনুচররা রাক্ষসী, দৈত্য, অসুর কেন? সদ্যজাত শ্রীকৃষ্ণকে রক্ষা করতে শিশুকন্যা রূপে জন্ম নিলেন অনার্য দেবী যোগমায়া, আবার তাঁকে হত্যা করতে রাজা কংস “সুপারি” দিলেন অনার্য খুনীদের! অতএব শ্রীকৃষ্ণর সঙ্গে মাতুল কংস ও মাতুলের শ্বশুর জরাসন্ধের সঙ্গে যে দীর্ঘ বিবাদ সেটি আসলে ছিল অনার্য যদু, বৃষ্ণি, শূরসেন, ভোজ, অন্ধক ও চেদি গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব। সে কথা আগেও বলেছি, এই গ্রন্থের ২.৬.২ অধ্যায়ে।

এবার শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলার দুটি ঘটনা, আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে, সে দুটির উল্লেখ এখানে করছি। 

 

৫.৪.১.১ ব্রাহ্মণযজ্ঞে অন্ন প্রার্থনা

একবার যমুনা তীরে গোচারণের সময় রাম-কৃষ্ণ সহ সকল গোপবালক ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ গোপবালকদের বললেন, “একটু দূরেই দেখ, ব্রাহ্মণরা দেবযজ্ঞ করছেন। সেখানে গিয়ে তোরা দাদা আর আমার নাম করে বল, আমরা সবাই ক্ষুধার্ত আমাদের অন্নদান করুন”। গোপবালকরা যজ্ঞস্থলে গিয়ে ব্রাহ্মণদের সেকথা বলাতে, ব্রাহ্মণেরা “হ্যাঁ” বা “না” কোন উত্তর দিলেন না। গোপবালকরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে শ্রীকৃষ্ণকে সব কথা বলাতে, কৃষ্ণ হাসলেন, বললেন, “এবার তোরা ব্রাহ্মণীদের কাছে যা, সেখানে গিয়ে একই কথা বলবি”। গোপবালকরা এবার ব্রাহ্মণীদের কাছে গিয়ে রাম ও কৃষ্ণের নামে অন্ন প্রার্থনা করল।

ব্রাহ্মণীরা কৃষ্ণের অনেক কথা আগেই শুনেছিলেন। তিনি কাছেই যমুনাতীরে রয়েছেন শুনে, তাঁরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। প্রচুর অন্ন এবং সুস্বাদু খাদ্যের সম্ভার নিয়ে তাঁরা প্রায় দৌড়ে এলেন। কৃষ্ণের শ্যামলবরণ[1] কান্তি, পীতবসন, গলায় বনমালা, মাথায় শিখীপুচ্ছ দেখে তাঁরা বিহ্বলা হয়ে কৃষ্ণকে আলিঙ্গনও করে ফেললেন। রাম-কৃষ্ণ ও গোপবালকদের অন্ন ও খাদ্য নিবেদন করে, তাঁরা কিছুক্ষণ কৃষ্ণের সঙ্গে আলাপ করলেন। কিন্তু ফেরার সময় তাঁরা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন, কারণ আসার সময় তাঁরা স্বামীদের অনুমতি না নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছিলেন। উপরন্তু আবেগের বশে তাঁরা গোপবালক কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে ফেলেছিলেন। তাঁরা আশংকা করছিলেন, তাঁদের স্বামীরা হয়তো তাঁদের গ্রহণ করবেন না। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁদের আশ্বাস দিলেন, সেরকম কিছু ঘটবে না, বললেন, “আপনারা আমাতেই সমর্পিত চিত্ত, নিবেদিত প্রাণ, অতএব কেউ আপনাদের কোন দোষ দেখবে না”। ব্রাহ্মণীরা যজ্ঞস্থলে ফিরে যেতে, সত্যিই কেউ কিছু বললেন না। ব্রাহ্মণরা নিজ নিজ পত্নীদের সঙ্গে যথারীতি যজ্ঞে আহুতি দিয়ে, যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে আহুতি দেওয়ার সময়, পত্নীদের পতির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকত না। সেই বুঝেই কী কৃষ্ণ এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তিনি কী অনুমান করেছিলেন, ব্রাহ্মণরা যজ্ঞের ব্যস্ততায় গোপবালকদের কথায় গুরুত্ব না দিলেও, অলস বসে থাকা দ্বিজপত্নীরা তাঁর নাম শুনলেই, তাঁকে দেখার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠবেন? আশৈশব তাঁর অতিনায়কোচিত অলৌকিক কীর্তির সৌরভ যে মহিলা মহলে তাঁকে প্রবাদে পরিণত করেছে, সেটাও কী তিনি বুঝতে পেরেছিলেন? এও কী বুঝেছিলেন, নায়কের প্রতি মহিলাদের উদ্বেল আবেগকে তাঁদের স্বামীরা তেমন দোষাবহ মনে করেন না? ধন্য বটে তাঁর নারী ও নর-চরিত্র বিশ্লেষণ। 

চলবে...  



[1] ভালোবেসে আমরা যতই “শ্যামলবরণ” বা “রঙটা একটু চাপা” বলি না কেন, এই গাত্রবর্ণ অনার্য লক্ষণ। আদতে তিনি কৃষ্ণবর্ণই ছিলেন, তাই তাঁর নামও কৃষ্ণ। তাঁর কৃষ্ণবরণ বলিষ্ঠ কান্তিতে উজ্জ্বল পীতবসন, গলায় বনফুলের মালা, অঙ্গে হাল্কা স্বর্ণালঙ্কার এবং কেশে শিখীপক্ষ – অসাধারণ এক স্টাইল স্টেটমেন্ট। আর্য বা অনার্য – সে যে সভাতেই তিনি উপস্থিত হোন না কেন –তাঁর উপস্থিতি সর্বদাই প্রত্যয়ী পৌরুষরূপে অনন্য এক ঔজ্জ্বল্য সঞ্চার করে। এর সঙ্গে ছিল শৈশব থেকে আবাল্য, তাঁর নানান কীর্তির মহিমা। বাস্তবিক, এমন একজন ব্যক্তিত্ব সামনে এসে দাঁড়ালে, হয় মুগ্ধ হতে হয় অথবা ঈর্ষায় দগ্ধ হতে হয়, কিন্তু কোনমতেই অবহেলা করা যায় না। মহিলাদের আর দোষ কি?    


নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজ...