মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯ 


২৬ 

গতকাল দুপুরে নোনাপুর এবং সুকরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আস্থানের রক্ষীরা যে ব্যবহার করেছে, তারপরে আজকের ভোরটা ভল্লার কাছে অত্যন্ত সঙ্কটজনক। যদিও গতকাল রাত্রে সে আর রামালি দুই গ্রামেরই কিছু ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাতের গোপন অন্ধকারে বড়ো বড়ো কথা বলা, আর প্রকাশ্য দিবালোকে নিজের নিজের পরিবার - মা-বাবা-ভাই-বোনদের সামনে দিয়ে হেঁটে, ভল্লার কাছে মহড়ায় যোগ দিতে আসার অন্য মাত্রা আছে। তার জন্যে প্রয়োজন প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভয়হীন বুকের খাঁচা।  

ছেলেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সকলেই এখন সন্ত্রস্ত। তাদের চোখে-মুখে অসহায় বিপন্নতা। একে তো আস্থানের রক্ষীরা অভিযোগ করেছে, এই গ্রামের ছেলেরাই আস্থানে ডাকাতি করেছে। তিনজন রক্ষীকে মেরে ফেলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, এসবই ঘটেছে, রাজার দণ্ড পাওয়া অপরাধী ভল্লার উস্কানিতে। কোন ঘটনা এবং অভিযোগেরই প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই – সবটাই অনুমান নির্ভর। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই গতকাল তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। বন্দী করে নিয়ে গেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজকাকাকে। বীভৎস প্রহারে মৃতপ্রায় করে দিয়েছে গ্রামপ্রধান জুজাককে। তারপরেও গ্রামের ছেলেরা যদি ভল্লার কাছেই যায় শরীর চর্চা করতে, পরিবার-পরিজনদের এবং প্রতিবেশীদের আতঙ্ক বাড়বে। বাড়বে নিজের নিজের ছেলেদের প্রতি সন্দেহ। যারা বিশ্বাস করত, আমাদের ছেলেরা কোন কুকাজ করতে পারে না। তারাও এবার সন্দিহান হয়ে উঠবে। ছেলেদের এখন লড়তে হবে ঘরে এবং বাইরে। ঘরের লড়াইটাই বেশি কঠিন - স্নেহ-মমতাপ্রবণ পরিবারের সঙ্গে মানসিক লড়াই। তার থেকে বাইরের লড়াইটা অনেক বেশি স্পষ্ট।   

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নোনাপুর গ্রাম থেকে এল চোদ্দজন। আর সুকরা থেকে আটজন। ভল্লা সকলকে বসতে ইশারা করল। সকলে বসার পর ভল্লা বলল, “কী করে এলি তোরা? মা-বাবা, ভাই বোনরা কেউ মানা করল না?”

শল্কু হাসতে হাসতে বলল, “করেনি আবার? আমার মা তো হাতে পায়ে ধরতেই যা বাকি রেখেছেন। বোনদুটো এমন কাঁদছিল বেরোনোর সময়”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? পারবি? এই বাধা রোজ পেরিয়ে, লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে?”

শল্কু বলল, “ভল্লাদাদা, কে কী করবে আমি জানি না। আমি তো আসবোই। রক্ষীদের নাম শুনলেই,  ছোটবেলা থেকে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের দেখেছি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে। তোমার এখান থেকে গতকাল ফিরে গিয়ে যা দেখলাম, যা বুঝলাম, রক্ষীরাও ভয় পায়। এতদিন ওদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি, ওরা যা খুশি করে গেছে। ওদের গায়ে আমরা একবার হাত তোলাতেই – ওরা ভয়ে দৌড়ে চলে আসছে গ্রামে গ্রামে। অপমান করছে গুরুজনদের। কবিরাজকাকাকে ধরে নিয়ে গেল...তিনি কি আমাদের ডাকাতি করতে শিখিয়েছেন? নাকি ডাকাতি করতে আমাদের উস্কেছেন? আসলে এবার ওরাও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে ভল্লাকে। ভয় পেয়েছে ভল্লার দলকে। আমরা যদি ভয়ে সিঁটিয়ে আবার গিয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকি, ওরা তো আমাদের সকলের ঘাড়ে বসে হাগবে, ভল্লাদাদা! যে পথে আমরা এগিয়েছি...সেখান থেকে আমি অন্ততঃ ফিরে আসবো না, ভল্লাদাদা। হয়তো মরবো, কিন্তু মরার আগে ওদের টের পাইয়ে দিয়ে মরবো”।

ভল্লা লক্ষ্য রাখছিল, শল্কু্র কথাগুলো বাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে। তাদের মনে হয়তো কিছু দ্বিধা ছিল, সেটা ফিকে হয়ে উঠছে শল্কুর প্রত্যয়ী কথায়। তাদের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠছে। তাদের চোখে ফুটে উঠছে ক্রোধ।

ভল্লা সবাইকে ভাবতে একটু সময় দিল, তারপর বলল, “তোরাও কি শল্কুর সঙ্গে একমত? মনে কোন ভয় বা দ্বিধা নেই তো?”

ছেলেরা প্রায় একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাদের লড়তে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়বো”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ। আমি শেখাবো। নিজে হাতে ধরেই শেখাবো। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কোনদিন বিশ্বাস ভাঙবে না। প্রাণ দিতে হলেও না। একটা কথা মনে রাখিস – তোদের এই ভল্লাদাদাও কম নিষ্ঠুর নয়। চাপে পড়ে বা ভয়ে কেউ যদি রাজসাক্ষী হয়েছিস – কিংবা আমাদের কথা এই দলের বাইরের কাউকে বলেছিস, অন্য কেউ নয় - আমার হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাজি?”

“রাজি”! সকলের সমবেত চিৎকার, জঙ্গলের মধ্যে গর্জনের মতো শোনালো।

ভল্লা সুকরা গ্রামের সুরুলকে বলল, “সুরুল, গতকাল রাত্রে তোর সঙ্গে কথা বলার সময়, তোর মধ্যে যে জেদ আর রাগ দেখেছিলাম, সেটা কি এখনো আছে? নাকি একটু ভয় ভয় করছে”?

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে গতকাল ওরা যেভাবে অকারণ আঘাত করল, তার শোধ তো আমি তুলবই, ভল্লাদাদা। আমাদের সকলের মনের জোর আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু রক্ষীদের সঙ্গে লড়ার দক্ষতা নেই...তুমি আমাদের শেখাও ভল্লাদাদা।

“তবে, মনে রাখিস, লড়াই শিখতে গেলে জরুরি হচ্ছে, ধৈর্য আর জেদ। এ দুটো যার যত বেশী, সে শিখবে তত তাড়াতাড়ি। চল, তাহলে এখনই শুরু করা যাক”।  

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, আমাদের রণপাগুলো বের কর। আজ রণপার খেলা শেখাই সবাইকে”। রামালি দুজোড়া রণপা এনে ভল্লার হাতে দিল। ভল্লা একজোড়া রেখে অন্য জোড়াটা দিল রামালিকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাঁশের এই লাঠি দুটোয় চড়ে আমরা আজ হাঁটতে শিখব। আমাদের ঘোড়া নেই...ঘোড়ার বদলে আমাদের আছে রণপা। এই রণপা শুধু যে আমাদের পা দুটোকে লম্বা করে দেবে তাই নয়, প্রয়োজনে এই রণপা আমাদের অস্ত্রও হয়ে উটবে। এই লাঠির আঘাতে শত্রুর মাথাও ফাটানো যাবে অনায়াসে। কাজেই রণপা বড়ো কাজের জিনিষ। এখন আমি আর রামালি তোদের দেখাব – কীভাবে এতে চড়তে হয়, কীভাবে হাঁটতে হয়। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে দৌড়তেও হবে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই রণপায়ে চড়ল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখাল সবাইকে। আহোক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী করে শিখলি, রামালি?” রামালি স্বচ্ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বলল, “গতকাল ভোরে ভল্লাদাদা শেখাল। কাল সারাদিনে হাঁটতে শিখেছি...এবার দৌড়তেও শিখব”।

ভল্লা বলল, “সুকরার ছেলেরা ছাড়া, তোরা সবাই জানিস, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কোথায় লুকোনো আছে...চল সবাই ওদিকে যাই...ওখান থেকে রণপা নিয়ে এখনই মহড়া শুরু করব। রামালি তুই আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে আয়, আমি এগিয়ে যাচ্ছি”।

পলক ফেলার আগেই রণপা চড়ে ভল্লা যেন উধাও হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর। দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত ছেলেরা। শুধু একজোড়া লাঠি নিয়েই এত দ্রুত চলাফেরা করা যায়? তাও এই জঙ্গলের রাস্তায়? রামালি ওদের পাশে রণপায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, “শল্কু, কাকার কী অবস্থারে?”

শল্কু খুব মন দিয়ে রামালির হাঁটা দেখতে দেখতে বলল, “আজ ভোরে শুনলাম একটু ভাল আছেন। উঠে বসেছেন। তবে তোর কাকি একদম চুপ মেরে গেছে, জানিস তো? চাইলে তুই আবার ফিরে আসতে পারিস। মনে হয় না, তোর ওপর কাকি আর কোন চোটপাট চালাবে।”

রামালি হেসে বলল, “ধূর কী হবে, কাকার সংসারের বোঝা হয়ে থেকে? আমাকে কিছু না বললেও, কাকাকে ছেড়ে দেবে? এই ভালো – ছোটবেলা থেকে বহু সহ্য করেছি... খুব ভয়ে ভয়ে বড়ো হয়েছি। আর না...এবার বাঁচবো...তার জন্যে যদি মরতে হয়...তাও। মরার আগে এটুকু অন্ততঃ জেনে যাবো... বসে বসে মার খাইনি, চেষ্টা করেছিলাম...”!

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “কাল তোমাদের গাঁয়ে এসে রক্ষীরা কী করেছে, শল্কুদাদা?”

শল্কু বলল, “গ্রামে এসেই তো শুয়োরের বাচ্চারা যাকে সামনে পেয়েছে চাবুক মেরেছে। কেউ কেউ তো আবার বল্লমের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়েছে। বাচ্চা, বুড়ো, মেয়েছেলে কাউকে ছাড়েনি। ভাবলেই মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, কার কার বাড়িতে ডাকাতির মাল রাখা আছে...বার করে দে...নয়তো আগুন ধরিয়ে দেব সব কটা বাড়িতে। সেই সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন কবিরাজকাকা। আর পৌঁছুলেন গ্রামপ্রধান জুজাককাকা...”।

আহোক বলল, “ভল্লাদাদা আমাদের গাঁয়ে ঢুকতে মানা করেছিল। আমরা থাকলে, ভয়ংকর কাণ্ড হয়ে যেত। আমার ছোটকাকার কাছে শুনলাম, প্রধানমশাই ওদের সামনে গিয়ে, বলার মধ্যে বলেছিলেন, “আমি এই গ্রামের প্রধান, আপনাদের কোন অভিযোগ থাকলে, আমাকে বলুন...যাকে তাকে সবাইকে এভাবে আপনারা মারতে পারেন না...দেশে কি রাজা নেই নাকি? এটা কি অরাজক দেশ?” ব্যস্‌, আর যায় কোথায়, গুয়োর ব্যাটারা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমশাইয়ের ওপর। কী মার কী মার। বল্লমের বাঁট, লাথি, চড় ঘুঁষি। কবিরাজকাকা গ্রাম প্রধানকে বাঁচাতে গিয়েছিল, তাকেও বেধড়ক মারল। লাথি মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

এই সময়েই বেরিয়ে এসেছিল রামালির কাকি। গলার শির ফুলিয়ে নাকি চেঁচাচ্ছিল, “ওদের মারছো কেন? ওরা কী করেছে? ডাকাতি তো করেছে, বাপ-মা খেগো রামালি আর ওই আঁটকুড়ির বেটা ভল্লা। তাদেরকে ধরো না। ওদের কাছেই পেয়ে যাবে সব লুঠের মাল। এ গাঁয়ে কোন বাড়িতে কিচ্ছু নেই।

রামালির কাকির চিৎকারে রক্ষীরা একটু থমকে গিয়েছিল। না হলে গ্রামপ্রধান কালকেই শেষ হয়ে যেত। অকথ্য গালাগাল দিয়ে রক্ষীদের সর্দার বলল, এই রামালিটা আবার কোন বেজন্মা? রামালির কাকা গিয়েছিল, বউকে সামলাতে, সে বলল, আজ্ঞে আমার দাদার ছেলে, আমরা গতকালই ঝ্যাঁটা মেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এবার শুরু হল রামালির কাকার ওপরে মার...শুয়োরের বাচ্চা, কে তোদের তাকে তাড়াতে বলেছে?  সে এখন কোথায়? কাকাকে বাঁচাতে, কাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে আর এই গ্রামে নেই... হাভেতে ভল্লার সঙ্গে গিয়ে জুটেছে।

রক্ষীরা যখন রামালির কাকা আর কাকিকে নিয়ে ব্যস্ত, ওদিকে প্রধানমশাইয়ের তখন জ্ঞান নেই, মাটিতে পড়ে আছেন মড়ার মতো। কবিরাজকাকা ধুলো থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গেলেন প্রধানমশাইয়ের কাছে, ওখানেই তিনি নাড়ি পরীক্ষা করে দেখছিলেন প্রধানমশাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে। রক্ষীসর্দারের চোখ শালা শকুনের মতো, ঠিক দেখেছে। রাক্ষসটা কবিরাজকাকার কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাকে ওঠাল, বলল, অ তুই বুঝি সেই কবিরাজ? আশপাশের গাঁগুলোতে তোর কথাও তো খুব শুনেছি...তুইই শালা সবাইকে খেপাচ্ছিস। ঢ্যামনা ঢকঢকে বুড়ো তুই আমাদের সঙ্গে চল...তোর পেটে পা দিলেই, ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসবে গোপন সব কথা।

লোকটা কবিরাজকাকাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল রামালির বাড়ির সামনে। প্রধানমশাইয়ের রক্তাক্ত দেহটা পড়ে রইল মাঠেই। রামালির বাড়ি তছনছ করে কী খুঁজল, দেখল কে জানে। যাবার সময় রামালির কাকাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেল ওদের উঠোনে। তারপর বাইরে এসে সকলে ঘোড়ায় চড়ল, কবিরাজকাকার দুই হাত আর কোমরে দড়ি বাঁধল। রওনা হওয়ার আগে গাঁয়ের সবাইকে শাসিয়ে গেল, ভল্লা আর রামালিকে যদি না পায়, ওরা আবার আসবে। ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। কবিরাজকাকার পা দুটো ঘষটাতে লাগল মাটিতে, ঠোক্কর খেতে লাগল, পথের ধারের পাথরে, ঝোপঝাড়ে”।  

আহোক বর্ণনা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। আহোক আবার বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে এইসব ঘটনার কথা যখন শুনছি, সবাই ছিল সামনে - বাবা, জ্যাঠা, অন্য কাকারা...মা কাকিমারা...ভাইবোনগুলোও...আমি বললাম গাঁয়ের এতগুলো মানুষ রয়েছো – কেউ বেরিয়ে গিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে না? জ্যাঠা গম্ভীর গলায় বলল, জুজাক তো গিয়েছিল। কবিরাজদাদাও গিয়েছিল...ওদের কী হয়েছে সবই তো শুনলি...আমরা গেলেও একই দশা হত...কী আর বলবো...বয়স্ক গুরুজন... রাজরক্ষীদের ভয়ে এরা কোনদিন মাথা তুলে বাঁচতেই শেখেনি...”

সুরুল বলল, “এসব দেখে শুনেও আমাদের রক্ত যদি গরম না হয়...যদি এর শোধ না নিই...রক্তখেকো রক্ষীদের যদি এখনই উচিৎ শিক্ষা না দিই...তাহলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না, আহোকদাদা...রোজ রোজ তিলে তিলে মরার থেকে...ওদের অন্ততঃ একজনকে মেরে যদি মরি...সেটাই হবে প্রকৃত বাঁচা...”।

তেইশজন ছোকরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের পথে।

চলবে...

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৬ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

সপ্তদশ পর্বাংশ  


৪.৮.৭ কদম্ব

কদম্বদের সম্পর্কে শোনা যায়, তাঁরা মানব্য গোত্রের ব্রাহ্মণ ছিলেন। শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা এক ব্রাহ্মণ, নাম ময়ূরশর্মা, একবার পল্লব রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চীতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কর্ণাটকে একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং রাজধানী ছিল বনবাসীতে। এই ঘটনা ঘটেছিল খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এরপরে সমুদ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য অভিযানে পল্লবরাই বিধ্বস্ত এবং গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। অতএব প্রায় অস্তিত্বহীন কদম্ববংশের ইতিহাসে প্রথম সাড়া পাওয়া গেল, রাজা ককুস্থবর্মনের সময়। এই সময় কদম্ব রাজ্যের পরিসীমা এবং প্রভাব চোখে পড়ার মতো পর্যায়ে এসেছিল। তারপর ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দশকে যখন রবিবর্মন রাজা হলেন, গঙ্গ এবং পল্লবদের সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তিনি তাঁর নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, হালসীতে (বেলগাম জেলা)। কিন্তু এরপর বাতাপির চালুক্য বংশের উত্থানে কদম্বরা আবার অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই কদম্বদের আবার দেখা পাওয়া যায় দশম শতাব্দীর শেষদিকে, রাষ্ট্রকূট রাজ্যের পতনের সময়। এই কদম্বদের ছোট ছোট শাখা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে তাঁদের অস্তিত্ব স্থানীয় ভাবে বজায় রেখেছিলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত!

 

৪.৮.৮ তলকড়ের গঙ্গ

গঙ্গদের উৎপত্তি শোনা যায় পৌরাণিক ইক্ষ্বাকু বংশ থেকে, এমনও শোনা যায় তাঁদের আদি নিবাস ছিল গঙ্গার তীরে অথবা তাঁরা মুনি কণ্বর উত্তরসূরি। মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে গঙ্গদের রাজ্য ছিল এবং সেই সময়ে তাঁদের রাজ্যকে গঙ্গবাড়ি বলা হত। মোটামুটি চতুর্থ শতাব্দীর কোন সময়ে, এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দিদিগ বা কোঙ্গনিবর্মন এবং মাধব। প্রথম দিকে এই রাজ্যের রাজধানী ছিল কুলুবলে (কোলার?)। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি গঙ্গরাজা হরিবর্মা রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন কাবেরী নদীর তীরে, তলবনপুর বা তলকড়ে। গঙ্গদের এক রাজা দুর্বিনীত পল্লবদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে গঙ্গদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষায় “পৈশাচী বৃহৎ-কথা” রচনা করেছিলেন। গঙ্গদের আরেক বিখ্যাত রাজা ছিলেন শ্রীপুরুষ (৭২৬-৭৬ সি.ই.)। তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রকূটদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিলেন এবং পল্লবদের পর্যুদস্ত করেছিলেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে গঙ্গরাজাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন ভেঙ্গির চালুক্যরা এবং মালখেড়ের রাষ্ট্রকূটরা। এই সময় গঙ্গরাজ শিবমার বন্দী হয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব নিরুপম। এরপর থেকে গঙ্গ রাজারা নানান শক্তিশালী রাজ্যের সামন্তরাজা হিসেবেই রাজ্য পরিচালনা করতেন, যেমন রাষ্ট্রকূট, হোয়সল এবং চোল।

গঙ্গ রাজারা সাধারণতঃ জৈন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এই বংশের রাজা দুর্বিনীত জৈন আচার্য পূজ্যপাদের শিষ্য ছিলেন। এই বংশের আরেক রাজা চতুর্থ-রাজমল্ল এবং তাঁর সেনাপতি ও মন্ত্রী চামুণ্ডরায় ৯৮৩ সি.ই.-তে শ্রবণবেলগোলার সুবিখ্যাত গোমতেশ্বর মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

৪.৮.৯ দ্বারসমুদ্রের হোয়সল

হোয়সল বা পোয়সলরা দাবি করেন, তাঁরা “যাদবকূলতিলক” বা “চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়”। তবে এঁদের সম্বন্ধে আরেকটি প্রবাদ শোনা যায়, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীর সাল কোন এক মুনির নির্দেশে, লৌহশূল দিয়ে একা একটি বাঘকে হত্যা করেছিলেন। তার থেকেই এই বংশের নাম হোয়সল বা পোয়সল (হোয় বা পোয় কথার অর্থ হত্যা এবং সাল থেকেই সল)।

হোয়সল রাজত্বের উন্নতির সূচনা একাদশ শতাব্দীর শুরুতে। তার আগে এঁরা মহীশূরের ক্ষুদ্র অঞ্চলের রাজা ছিলেন। এই সময় তাঁরা চোল বা কল্যাণের চালুক্য রাজাদের অনুগত রাজ্য হয়ে নিজেদের শক্তি এবং প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছিলেন। মোটামুটি ১০৪৫ সি.ই.-তে এই বংশের রাজা বিনয়াদিত্য এবং তাঁর পুত্র এরিয়ঙ্গ, চালুক্য রাজাদের সহযোগী হয়ে অনেক যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। এরপর রাজা বিত্তিগ বিষ্ণুবর্ধনের (১১১০-৪০ সি.ই.) সময় হোয়সল রাজ্য দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই রাজা তাঁর রাজধানী ভেলাপুর (বেলুর, হাসান জেলা) থেকে সরিয়ে দ্বারসমুদ্রে (হালেবিদ, হাসান জেলা) নিয়ে আসেন। এই সময় তিনি চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, প্রায় স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু কখনই কোন “রাজা” উপাধি গ্রহণ করেননি। চালুক্য রাজাদের প্রতিনিধি হয়ে, তিনি সমসাময়িক, চোল, মাদুরার পাণ্ড্য, মালাবার, দক্ষিণ কানারার তুলুব, গোয়ার কদম্ব সকলের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই সময় রাজা বিষ্ণুবর্ধন সম্পূর্ণ মহীশূর এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলের অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ জৈন ছিলেন, কিন্তু পরে আচার্য রামানুজের সংস্পর্শে এসে তিনি বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

রাজা বিষ্ণুবর্ধনের পর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন, তাঁর নাতি প্রথম-বীরবল্লাল (১১৭২-১২১৫ সি.ই.)। তিনিই প্রথম নিজেকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি চালুক্য এবং যাদবদের পরাজিত করে, স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর থেকেই হোয়সল রাজত্বের পতনের শুরু এবং শেষ হোয়সল রাজা তৃতীয়-বীরবল্লাল ১৩১০ সি.ই.তে সেনাপতি মালিক কাফুরের হাতে পরাজিত হন এবং তাঁকে বন্দী করে দিল্লি আনা হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হোয়সল বংশ লুপ্ত হয়ে যায়।

হোয়সল রাজাদের স্থাপত্য কীর্তি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁদের রাজত্ব কালে অজস্র মন্দির ও স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে বেলুর ও হালেবিদের স্থাপত্যগুলি শিল্প সুষমায় অনবদ্য।

 

৪.৮.১০ কাঞ্চীর পল্লব

পল্লবদের উৎস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ আছে। অনেকে বলেন, তাঁরা আদিতে পহ্লব অর্থাৎ পার্থিয়ান, দক্ষিণ ভারতে এসে পল্লব হয়ে গিয়েছিলেন। পৌরাণিক কথায় শোনা যায়, তাঁরা দ্রোণাচার্য এবং অশ্বত্থামার বংশধর –অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-যোদ্ধা। অনেকে বলেন তাঁরা দক্ষিণ ভারতের দেশীয় গোষ্ঠী। তবে তাঁরা যে উত্তরভারত থেকেই দক্ষিণে গিয়েছিলেন, তার কিছু যুক্তি আছে, যেমন, পল্লবদের প্রাচীন রাজভাষা ছিল প্রাকৃত এবং পল্লবরা শুরু থেকেই সংস্কৃতের পৃষ্ঠপোষক। এর আগে কদম্ববংশের প্রতিষ্ঠাতা ময়ূরশর্মার লিপি থেকে আমরা জেনেছি, “পল্লবক্ষত্রিয়”, অতএব পল্লবরা উত্তরভারতের ক্ষত্রিয় এমন অনুমান হয়তো করা যায়।

খ্রীষ্টিয় তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীতে কিছু প্রাকৃত লিপি থেকে পল্লবদের প্রথম ইতিহাস জানা যায়। এই লিপিতে বেশ কয়েকজন রাজার নাম পাওয়া যায়, যেমন বপ্পদেব, শিবস্কন্দবর্মন, বুদ্ধি (বা অঙ্কুর) এবং বীরবর্মন। রাজা বপ্পদেব পল্লব বংশের প্রতিষ্ঠাতা কিনা সঠিক জানা না গেলেও, তিনিই এই রাজবংশকে দক্ষিণে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাঁর সময়ে তেলুগুর “অন্ধ্রপথ” এবং তামিলদের “তোণ্ডামণ্ডলম”- তাঁর রাজ্যের দুই প্রধান অঞ্চল ছিল এবং এই দুই অঞ্চলে তাঁর প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল ধ্যানকটা (ধরণীকোট্টা, অমরাবতীর কাছে) এবং কাঞ্চী (কাঞ্জিভরম)। তাঁর পুত্র শিবস্কন্দবর্মন এই রাজত্ব হয়তো আরো দক্ষিণে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন, নচেৎ তিনি অশ্বমেধ, বাজপেয় এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের আয়োজন করতে পারতেন না। আরেকজন পল্লব রাজার নাম পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ লিপিতে, কাঞ্চীর রাজা বিষ্ণুগোপ। দাক্ষিণাত্য অভিযানে সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে এই রাজার যুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজা বিষ্ণুগোপের সময় কাল চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামঝি কোন সময়ে। অতএব পল্লবদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর্ব সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের সময় থেকে একথা সহজেই অনুমান করা যায়।


    গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে পল্লবদের দ্রুত উত্থান শুরু হয়েছিল, মোটামুটি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে। এই সময় থেকেই পল্লবরা দক্ষিণভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলেন।

রাজা সিংহবিষ্ণুঃ পল্লবদের এই পর্যায়ে রাজা সিংহবিষ্ণু চোলদের পরাস্ত করে, কাবেরি নদী পর্যন্ত এবং তারপরেও আরও দক্ষিণে পাণ্ড্য, কালাভ্র এবং আরও কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন।

রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে পিতা সিংহবিষ্ণুর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন। তাঁর সময় থেকেই পল্লব এবং চালুক্যদের মধ্যে নিরন্তর বিবাদ শুরু হয়েছিল, দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভারতে অবিসম্বাদিত প্রতিপত্তি স্থাপনা। এই সময়ের উভয় পক্ষীয় শিলালিপিতেই অন্যপক্ষকে পরাজিত করার বিবরণ বারবার লেখা হয়েছে। রাজা মহেন্দ্রবর্মন প্রথম দিকে জৈন ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে স্বামী আপ্পার প্রভাবে শৈব হয়েছিলেন। তাঁর সময়েই পাহাড় কেটে প্রচুর মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। তিনি নিজে “মত্তবিলাস-প্রহসন” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার কথা আগেই বলেছি।

প্রথম নরসিংহবর্মনঃ প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র, পিতার মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকের কোন সময়ে। ভীষণ শক্তিশালী এবং সাহসী এই রাজা চালুক্যদের ভয়ংকর আক্রমণ করেছিলেন, এবং ৬৪২ সি.ই.-র যুদ্ধে তিনি চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তাঁর সময়ে তিনি দুবার নৌ-অভিযান করে সিংহলও আক্রমণ করেছিলেন। নরসিংহবর্মন শুধু যুদ্ধ নয়, মন্দির স্থাপত্যেও অনবদ্য নিদর্শন রেখে গেছেন, তাঁর পিতার মতো তিনিও পাহাড় কেটে অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যার মধ্যে মহাবলিপুরম বা মামল্লপুরম সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নরসিংহবর্মনের রাজত্বকালেই চীনের বৌদ্ধ পর্যটক হুয়ান সাং কাঞ্চী গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছুদিন ছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় কাঞ্চী শহরে প্রায় শতাধিক সংঘারাম ছিল এবং সেখানে প্রায় দশ হাজার মহাযানী সন্ন্যাসী বিদ্যাচর্চা করতেন। শহরে প্রায় আশিটি দেবমন্দির দেখেছিলেন এবং শহরে অনেক নির্গ্রন্থ (জৈন) সন্ন্যাসীও বাস করতেন।

প্রথম পরমেশ্বরবর্মনঃ মোটামুটি ৬৫৫ সি.ই.-তে পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করা ছাড়া তাঁর তেমন কোন কীর্তির কথা জানা যায় না।

দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শেষ দশকে তিনি পিতার সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকাল শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্যে বিখ্যাত। তিনি অনেকগুলি বিখ্যাত মন্দির, যেমন রাজ সিংহেশ্বর এবং কাঞ্চীর “ঐরাবতেশ্বর” মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মামল্লপুরমের সমুদ্রতট মন্দিরে তাঁরও অবদানের কথা শোনা যায়। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভার অলংকার ছিলেন দণ্ডিন, যাঁর কথা আগেই বলেছি। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ পরিবারের মধ্যেই তীব্র বিবাদ এবং কলহ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় বেশ কিছুদিন বিশৃঙ্খলার পর, জনগণের বিপুল সমর্থনে রাজা হয়েছিলেন, নন্দিবর্মন। তাঁর পিতা হিরণ্যবর্মন ছিলেন, সিংহবিষ্ণুর ভাইয়ের বংশধর। নন্দিবর্মনের রাজত্বকালের শুরুতেই চালুক্যরা আবার পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, যদিও নন্দিবর্মন তাঁদের প্রতিহত করে, পল্লব রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। নন্দিবর্মন প্রায় পঁয়ষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। নন্দিবর্মণের পর রাজা হয়েছিলেন দন্তিবর্মন। শোনা যায় তিনি রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা রেবার পুত্র। এই রাজকুমারী রেবা ছিলেন দন্তিদুর্গার কন্যা। কিন্তু এই বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চালুক্যরাজ তৃতীয় গোবিন্দ ৮০৪ সি.ই.-তে কাঞ্চী আক্রমণ করেছিলেন এবং দন্তিবর্মনকে পরাজিত করেছিলেন। দন্তিবর্মনের (৭৭৬-৮২৮সি.ই.) রাজত্বকালে পাণ্ড্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী রাজারা হলেন নন্দি (৮২৮-৫১ সি.ই.), নৃপতুঙ্গবর্মন (৮৫১-৭৬ সি.ই.) এবং অপরাজিতবর্মন (৮৭৬-৯৫ সি.ই.)। তাঁর সময়েই চোলরাজা প্রথম আদিত্য পল্লবরাজ্যে চরম আঘাত হানেন এবং পল্লবদের রাজ্যচ্যুত করেছিলেন। এরপর দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস থেকে পল্লবদের যুগ সমাপ্ত হল।

চলবে...


রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নিত্যযাত্রী

  

এর আগের রম্যকথা - " অবিচলিত থাকা "


হেউ।

মুখে ভাজা মৌরির দানা ফেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই ঢেঁকুরটা উঠল। লোহার গেটের হাঁসকল বন্ধ করতে করতে বললাম ‘শুনছো, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিও, বেরোলাম’।  ‘দিচ্ছিইইই, দুগ্‌গা, দুগ্‌গা’, ভেতর থেকে বউয়ের কণ্ঠ শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। 

বউয়ের হাতের রান্না; কুচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি। আর ফালি ফালি লম্বা দুটো আলু ডোবানো চারাপোনার পাতলা ঝোল দিয়ে চারটি ভাত খেয়ে বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল। গেট থেকে বের হলাম নটা ছেচল্লিশে। তরিবতের রান্না জুত করে খেতে একটু সময় লাগেই। আর খাওয়াটাও বেশী হয়ে যায়। তার ওপর কাঁধে আছে রেক্সিনের ছোট ব্যাগে লাঞ্চ বক্স। তাতে তিনটে রুটি আর আলু-কুমড়োর ছেঁচকি। ছাড়ানো শসা দু’ ফালি।

চিন্তা হচ্ছে, নটা বাহান্নর মিনিটা পাবো কিনা। ওটা না পেলে কপালে আজ দুঃখ আছে। এমনিতে আমাদের অফিস শুরু দশটা থেকে তবে এগারোটা পর্যন্ত ঢুকলেও চলে। এই মিনিটা পেলে আরামসে পৌঁছে যাওয়া এগারোটার আগেই। কিন্তু এটা না পেলে যদি পরেরটায় যাই, সেটা দশটা আঠেরোয়। সেটাতে অফিস পৌঁছতে সাড়ে এগারোটা হয়েই যায়। কেউ কিছু বলে না, তবে কান্তিদুলালবাবু ভুরু তুলে, একবার আমাকে দেখেন, তারপর দেখেন হলের দেয়ালঘড়িটা। কান্তিদুলালবাবু আমার বড়োবাবু।

আমাদের বাড়ি থেকে বড়োরাস্তা পর্যন্ত গলিতে দুটো ভাঁজ আছে। অন্যদিনের চেয়ে আজকে একটু বেশ জোরেই পা চালাচ্ছি, তবে চালাবো বললেই কি আর চালানো যায়? শরীরের ওজনটি তো আর কম নয়। তারওপর সবে খেয়ে উঠে ভরা পেটের ভরটা শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে চাইছে। আমার পেটটি, কি আর বলব, মোশায়, আমার মধ্যে তো আর নেই, ঠেলে বেড়ে উঠছে দিন কে দিন। শীতকালে ছাদে উঠে রোদ্দুরে বসে, সারা গায়ে সরষের তেল মেখে বড়ো আনন্দ পাই। বাবা বলতেন, ‘শীতকালে নাভিতে অবশ্যই তেল দিবি রে, পটোল, পেটটা শীতল থাকবে’। বাবার কথা মতো নাভিতে তেল মাখাতে হাতড়াতে হয়, নাভিটা কোনখানে। চোখে তো আর খুঁজে পাই না।

গলির লাস্ট ভাঁজটা ঘুরলে, বড়ো রাস্তাটা চোখে পড়ে। অটো যাচ্ছে, গাড়ি যাচ্ছে, বাইক যাচ্ছে হুস হুস করে। ঘড়িতে দেখলাম তিপ্পান্ন হয়ে গেছে। মিনিটা কি চলে গেলো। দু’ পাঁচ মিনিট দেরি তো হামেশা করে, আজ কি আর করবে না? ব্যাটারা আমার যেদিন দেরি হয় সেদিনই রাইট টাইমে বেরিয়ে যায়। আর আমি রাইট টাইমে এলে, লেট করে। বাস পাবো কি পাবো না, এই দ্বিধায় যখন দুলছি, কানে এল, সেই চেনা ডাকটি- ‘আই, টালিগঞ্জ, মেট্রো, মেট্রো, রাসবিয়ারি, হাজরা, ভওয়ানিপুর, এক্সাইড, পাকিস্টিট, ডালহাউসি’

বাঁশির সুরে শ্রীমতীর কি হতো ঠিক জানি না, কিন্তু ওই ডাক শুনে আমি ব্যাকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘অ্যাই মিনি, রোককে। রোককে’।  মিনির হেল্পারটা শুনতে পেয়েছে। ‘আস্তেপ্পাসেঞ্জার’ বলে নেমে পড়ল রাস্তায়। আগের মতোই ডাক পাড়তে পাড়তে বলল, ‘একটু পা চালিয়ে, কাকু’।

ঠিক চুয়ান্নতে বাসের পাদানি বেয়ে উঠতেই বিপত্তি। ওপরে ওঠার জায়গা নেই। হেল্পার আমার পশ্চাতে গুঁতো দিচ্ছে ভেতরে ঢোকার জন্যে। ঢুকবো কোথায়? ভর্তি বাস! সকলেই দুর্যোধন। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গাও কেউ ছাড়বে না। কন্ডাকটার অনবরত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে, ‘পিছনের দিকে এগিয়ে যান। গেটের মুখটা ছেড়ে দিন’। সারা জীবন শুনে এলাম, পিছনে তাকিও না, সামনে এগিয়ে যাও। মিনিবাসে নিয়ম উলটো পিছনের দিকে এগোতে হয়। গুঁতোগুঁতি করে ঠেলে ধাক্কা মেরে ঢুকেই গেলাম। আমার চোখ দু দিকের সিটে বসা লোক ও মেয়েদের মুখগুলোর দিকে। চেনামুখ যদি পাওয়া যায়, যারা মেট্রো কিংবা রাসবিহারী মোড়ে নামবে, তাহলে সেই সিটটার সামনে দাঁড়াবো।

পেয়েও গেলাম, এক ছোকরাকে কানে হেড ফোন নিয়ে রোজ গান শোনে, আর মাথা নীচু করে মোবাইলে মহাভারত লিখে চলে। এই ছোকরা রোজ টালিগঞ্জ মেট্রোতে নামে। সিটটার কাছে আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তার ঘাড়ে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে, মুচকি হেসে বললাম, ‘সরি ভাই, যা ভিড়। ভদ্রভাবে দাঁড়ানো যাচ্ছে না’। তার ওপর আমার উদ্ধত ও উদ্গত পেটটি দিয়ে চেপে ধরলাম, উটকো লোকটিকে। উটকো লোকটি আহাম্মক ও ভদ্রলোক, সরে গিয়ে আমায় জায়গা ছেড়ে দিয়ে পিছনের দিকে চলে গেল। আমি সযত্নে নিজেকে ছোকরার সিটের পাশে প্রতিষ্ঠা করলাম। যাক বাবা, আজ সব কিছু ভালোয় ভালোয় চলছে। আর পাঁচটা স্টপেজ পরেই মেট্রো, ছোকরা নেমে গেলে, সিটটাতে বসে একটু চোখ বুজবো।

এতক্ষণ অন্যদিকে খেয়াল করিনি, এখন শুনলাম অনেক যাত্রী বাসের ড্রাইভার আর কণ্ডাকটারের খুব পেছনে লেগেছে

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’? ‘কণ্ডাক্টার, বাসটা এবার চালাতে বলো, সেই থেকে লোক তোলা হল তো’। ‘আধাঘন্টা হয়ে গেল, এইটুকু আসতে। এবার একটু টান, বাপ’। ‘এ শালা, গরুর গাড়ির ড্রাইভার নাকি রে?’ আমারও খুব মজা লাগে পেছনে লাগতে। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে। মেঘের আড়াল থেকে তির ছোঁড়ার মজাই আলাদা। আর হবি তো হ, সুযোগ চলে এল হাতের মুঠোয়। কোন স্টপেজ নেই, বাসটা খামোখা থেমে পড়ে দুটো প্যাসেঞ্জার তুলল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার লোক আমি অন্ততঃ নই। গলাটা একটু ভারি করে বললাম, ‘কিরে, এবার কি লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক তুলবি নাকি? যেখান সেখান থেকে লোক তুলছিস’? আমিই একটু আগে তাই করেছি, অস্টপেজে না দাঁড়ালে, এ বাসে আমার আজ চড়াই হত না। কিন্তু তাতে কি? আমারটা তো গুছোনো হয়ে গেছে! আশেপাশের দু’ চারজন আমার দিকে তাকালো, একজন শুঁটকে টাকমাথা বুড়ো বলল, ‘যা বলেছেন, ভাই’।

 আমি একটু জোর পেয়ে গেলাম, আবার বললাম, ‘এরা মানুষকে মানুষ বলেই গণ্যি করে না, ছোটলোকের দল। ছাগল ভেড়ার মতো লোক গাদাই করেই চলেছে’।  আমার কথায় কাজ হল বেশ, আরো কিছু লোক খুব তেতে উঠে তেড়ে গালাগাল দিতে লাগল ড্রাইভার আর কণ্ডাক্টারকে। দু’তিনজন বাসের গায়ে ধপ ধপা ধপ চাপড় মারতে শুরু করল। বাসের ভিড়টা বেশ খেপে উঠেছে। বাসটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল, এইসময় আমি আর একটা দিলাম ছোট্ট করে, ‘দেখলেন, শালারা সেই থেকে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে এসে কিরম সিগন্যালটা খেলো? এখন দাঁড়িয়ে থাকুন পাঁচমিনিট’। একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘আমাদের কি কাজকম্মো নেই নাকি রে, শালা’? ‘এই ড্রাইভারটা কী করে লাইসেন্স পেল রে’? ‘লাইসেন্স আছে কিনা, তাই বা কে জানে’? 

জনগণের এই সব কথা বার্তায় আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠতে লাগল বারবার। নিজেকে মনে হচ্ছে জব্বর ন্যাতা, যার উস্কানিতে খেপে উঠছে জনতা। কি আনন্দ, কি আনন্দ! এদিকে আমার সামনের সিটে বসা ছোকরা কানের হেডফোন গুটিয়ে ব্যাগে রাখলপরের স্টপেজ হচ্ছে, টালিগঞ্জ মেট্রো। ছোকরা নামার জন্যে রেডি হচ্ছে। তার মানে এবার আমার সিটে বসার পালা। আমাদের ছোটবেলায় স্লেট পেন্সিলে অ আ ক খ লিখতাম, ছোকরা স্লেটের মতো ঢাউস মোবাইলটা চাপা জিন্সের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সিট ছাড়ল। আমি তেরছা হয়ে দাঁড়িয়ে ছোকরাকে বেরোনোর রাস্তা করে দিলাম, আর উল্টোদিকটা ব্লক করে দিলাম, যাতে অন্য কেউ ঢুকে পড়ে, আমার সিটটা দখল না করে নেয়। বাসে চলা ফেরা করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার রে ভাই? অনেক স্ট্রাটেজি, বিবিধ কৌশল, বিস্তর কায়দা।

সিটে বসে পড়ে নিজেকে মনে হল, এ সিট যেন বাসের আসন নয়, যেন রাজ্যসভা, লোকসভা কিংবা নিদেনপক্ষে বিধানসভার সিট। কাঁধ থেকে নামিয়ে বউয়ের রান্না ভরা ব্যাগটা কোলে নিয়ে জুত করে বসলাম। মেট্রো স্টেশান চলে এসেছে, হুড় হুড় করে লোক নেমে, প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল বাসটা। সিটগুলো সব দখল, চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার সামনে দাঁড়ানো সেই আহাম্মক ভদ্রলোক। মনে হল, ওর কাটা ঘায়ে একটু নুনের ছিটে দিই। চোখাচোখি হতে বললাম, ‘এতো সিট খালি হল, আপনি একটা সিট পেলেন না’? ভদ্রলোক হাসলেন একটু, বোকার হাসি। ভাবখানা, ঠিক আছে, কী আর করা যাবে। আহাম্মক ভদ্রলোক আর কাকে বলে?

মেট্রোতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করেও তেমন প্যাসেঞ্জার হল না, বাস আবার ছেড়ে দিল। ফাঁকা বাসে আমার এবার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ভিড়ের মধ্যে আমি যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর অনেক কথাই যে আমি বলেছিলাম, কণ্ডাক্টারটা বুঝতে পারেনি তো? বাস ছাড়ার পরই কন্ডাকটার আমার কাছেই দৌড়ে এল দেখে আমি চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, এখন ও যদি কিছু বলে? দেখলাম সেরম কিছু নয়, ব্যাটা টিকিট চাইতে এসেছে। কন্ডাক্টারের হাতে দশটাকা দিয়ে বললাম, আটটাকা। আসলে আমার গলির মুখ থেকে ভাড়া হয় দশ টাকা। ও কি আর অতো মনে রেখেছে? জিগ্যেস করলে বলব, মেট্রোর একটা স্টপেজ আগে উঠেছি। 

আট টাকার টিকিট আর দুটাকা ফেরত নিতে নিতে খুব দরদ ভরা গলায় বললাম, ‘কি হল হে? বাস তো একদম খালি, লোসকান হয়ে যাবে যে, ভাই’। 

আমার সহানুভূতিতে কণ্ডাকটার গলে গেল, বলল, ‘কি বলব বলেন, কাকু। স্ট্যান্ড থেকে মেট্রো অব্দি যা প্যাসেঞ্জার পাই, ওতেই আমাদের দুটো পয়সা থাকে। তা পাব্লিক এমন গালাগাল দেয়...’  

আমি মাখো মাখো গলায় বললাম, ‘সব লোক কি আর সমান হয় রে, ভাই? হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? তবে? ও সব কথা কানে দিও না’।

নিশ্চিন্ত হয়ে গুছিয়ে বসে আমি চোখ বুজলাম, মনে মনে বললাম, আর বকিস না বাপ, এবার একটু ঝিমোতে দে                                                                  

                                                            -০০- 

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

আগুনের পরশমণি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


শেষ পর্ব 


 


    পাথরে ঠোকাঠুকি করলে ছোটখাটো যে আগুনের ফুলকি দেখা যায়, তা দিয়ে কিন্তু আগুন জ্বালানো যায় না। আগুন জ্বালানোর জন্য অনেক বড়ো ফুলকির দরকার হয়, আর যে দুটো পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর মতো ফুলকি তৈরি করা যেত তারা প্রধানতঃ হল ফ্লিন্ট (Flint) আর পাইরাইট (Pyrite) পাথর। এই পাইরাইট যদি লোহা মিশ্রিত হয়, তবে তার ফুলকি হয় সবচেয়ে জোরদার। চক বা চুণাপাথরের (Lime stone) মধ্যে কেলাসিত (crystallized)  একটি বিশেষ কোয়ার্জ (Quartz) পাথরকে ফ্লিন্ট বলে। উপরের ছবিটি প্রস্তর যুগের একটি ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র।  এই ফ্লিন্ট পাথরের বিশেষত্ব হল, একটা বিশেষ দিক থেকে আঘাত করলে, বেশ পাতলা, মসৃণ অথচ শক্ত স্তরে ভেঙে যায়। তারপর একটু ঘষাঘষি করলে, পাথরের ধারালো অস্ত্র বানিয়ে তোলা যেত সহজেই। প্রস্তর যুগের মানুষেরা যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্রই বহুল ব্যবহার করত, তাদের কাছে ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র ছিল সব থেকে কাজের জিনিষ। পাইরাইট একধরনের খনিজ পাথর, প্রধানত লোহা বা তামার সালফাইড; পাললিক (sedimentary) পাথরের স্তরে মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। বহুদিন পরে মানুষ যখন লোহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল, তখনও লোহা আর এই ফ্লিন্ট পাথরের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ব্যবহার করেই আগুন জ্বালাত। সত্যি বলতে আজও আমরা যে গ্যাসলাইটারে লোহার চাকায় চাপ দিয়ে আগুন জ্বালি, তার নিচেয় থাকে ফ্লিন্ট পাথরের ছোট্ট একটা কুচি, যাকে চলতি বাংলায় আমরা চকমকি পাথর বলি।

তখনকার দিনে এই ফ্লিন্ট পাথর আর আয়রন পাইরাইট দিয়ে আগুন জ্বালানোতেও কিন্তু অনেক ঝামেলা ছিল। প্রথমতঃ জরুরি ছিল দক্ষতা এবং ধৈর্য, দ্বিতীয়তঃ শুকনো ঘাসপাতা, ডালপালার যোগাড়। সারা বছরের সামান্য কয়েকটি মাস ছাড়া, বৃষ্টি বা শিশিরের প্রকোপে শুকনো ঘাসপাতা যোগাড় করা এবং সঞ্চয় রাখা কম মুস্কিল ছিল না। তার থেকে আগুনকে না নিভিয়ে, স্তিমিত অবস্থায় জ্বালিয়ে রাখা অনেক সহজ ছিল এবং আগুনের নিয়ন্ত্রণ শিখে যাওয়ার পর, তখনকার মানুষ তাই করত। যদিও এতে বিপদ এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল বিস্তর।

আগুনকে না নিভিয়ে, তাকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে জ্বালিয়ে রাখার চিন্তা ভাবনা থেকেই এসে গেল, জ্বালানি তেলের আবিষ্কার। পৃথিবীতে প্রথম জ্বালানি তেল পশুচর্বি। বড় পাথরের পাত্রে, অনেকটা চর্বিতে ভিজিয়ে রাখা শুকনো ঘাস বা শুকনো শ্যাওলায় আগুন ধরালে, দাউদাউ করে জ্বলে না উঠে, ছোট্ট শিখায় আগুন অনেকক্ষণ জ্বালিয়ে রাখা যেত। এরপর আরো অনেক ভাবনা চিন্তার হাত ধরে, এই আবিষ্কার প্রদীপ হয়ে উঠল। কারণ ততদিনে মানুষ চাষবাস শিখে গিয়ে তৈলবীজের সন্ধান পেয়ে গেছে, তারা জেনে গেছে, তিল, নারকেল, রেড়ি, সরষে এমন নানান বীজ থেকে তেল বের করা যায়, এই তেল রান্নার জন্যেও যেমন ভীষণ উপযোগী, তেমনি স্নিগ্ধ শিখার প্রদীপ জ্বালাতেও দারুণ কার্যকর। আগুনের ভয়ংকর লকলকে শিখাকে সুন্দর স্নিগ্ধ নরম আলোর শিখায় রূপান্তর করাও একটা দারুণ আবিষ্কার। এই প্রদীপ উৎসব, ধর্ম অনুষ্ঠান এবং প্রত্যেকদিনের মঙ্গল আচরণের সঙ্গেও জুড়ে গেল। সেই তেলের প্রদীপের আলোর এমনই মাহাত্ম্য, প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে, আমাদের জীবনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে, আজ এই এত উন্নত বিদ্যুতের আলোর যুগেও!

 

আগুন নিয়ন্ত্রণের পর মানুষের উন্নতির প্রথম ধাপ যদি হয় শীতে হাত-পা সেঁকা, অন্ধকার দূর করা আর রান্না করা, তাহলে তার পরের ধাপ অবশ্যই ধাতু আবিষ্কার। আগুনের ব্যবহার শিখে, প্রথম যে ধাতু তারা নিষ্কাশন করে ব্যবহার করতে শিখল, তার নাম তামা। তামা প্রধান ধাতু হলেও, তার সঙ্গে টিনের মিশ্রণে সংকর ধাতু ব্রোঞ্জেরও বহুল ব্যবহার শুরু হয়, আজ থেকে মোটামুটি হাজার ছয়েক বছর আগে। এই দুটি ধাতুই অস্ত্রশস্ত্র, চাষবাস এবং গেরস্থালির নানান উপকরণে অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এই কারণে মানবসভ্যতার এই পর্যায়টাকে তাম্রযুগ বলা হয়। আগুনের ব্যবহার না জানলে, এই ধাতুর ব্যবহার, খনিজ পাথর থেকে তামা ও টিন নিষ্কাশন, ব্রোঞ্জের মতো সংকর ধাতু তৈরি, কোনাটাই সম্ভব হত না। এই যুগেই মানুষের সামাজিক কাঠামোটাও দ্রুত বদলে জটিল হতে শুরু করল। দক্ষতা ও কাজ অনুযায়ী মানুষের নতুন নতুন পেশা তৈরি হয়ে উঠতে লাগল। যেমন তামা, ব্রোঞ্জের মতো ধাতু দিয়ে, যারা অস্ত্রশস্ত্র, উপকরণ কিংবা অলংকার তৈরি করত, তারা হয়ে উঠল কারিগর বা শিল্পী, তাদের চাষবাস কিংবা শিকার করতে হতো না। স্থানীয় অঞ্চলে তামার খনিজ না পাওয়া গেল, দূর দেশ থেকে যারা সেই খনিজ কিনে নিয়ে আসত, তারা হয়ে উঠল বণিক। কারিগরদের দক্ষতায় বানানো উপকরণের চাহিদা অনুযায়ী, এই বণিকরাই অঞ্চলের বাইরে, এমনকি দেশের বাইরেও এই সব উপকরণ বিক্রি করত। অর্থাৎ, মানব সভ্যতার দ্রুত উন্নতিতে আগুনের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক এবং সত্যি বলতে আমরা যত ভালোভাবে আগুনকে ব্যবহার করতে শিখেছি, ততই আমাদের সভ্যতা দ্রুত উন্নত হয়েছে।

কিছু মানুষ চিরকালই থাকেন, যাঁরা যে কোন আবিষ্কারের পরেও আরো চিন্তা ভাবনা দিয়ে, মানবজাতির উন্নতির চিন্তা করে যান, আর কিছু মানুষ সেই সব আবিষ্কারকেই অন্য মানুষের ক্ষতি করার কাজে ব্যবহার করে। আগুনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, আগুনের ব্যবহার শিখে মানুষ, অন্য দলের বা শত্রুদের সর্বনাশ করার এক অতি সহজ উপায় হাতে পেয়ে গেল। শত্রুদের বাড়িতে, গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তিরের ডগায় চর্বি মাখানো কাপড়ে আগুন লাগিয়ে, দূর থেকেই গ্রামে আগুন লাগানো। এমন সব যুদ্ধের ভয়ংকর উপকরণও আবিষ্কার করে ফেলল, তখনকার মানুষ। এমন সব তিরের কথা মহাভারতে অনেক আছে। তারপর যখন বারুদ আবিষ্কার করে ফেলল, তখন বারুদ আর আগুন দিয়ে ভয়ংকর সব যুদ্ধের অস্ত্রও বানিয়ে ফেলতে শুরু করল। এরকম অস্ত্র ব্যবহারে যে যত দক্ষ, সেই দেশ বা রাজ্য তত শক্তিশালী হয়ে উঠল।

 

 আগুন ব্যাপারটাকে বেশ ভালোভাবে রপ্ত করে, তাকে নানান কাজে সফল ব্যবহার শুরু হতে কিন্তু আরো অনেকদিন পার হয়ে গেল। আসলে আগুন জ্বলা, তার তাপ আর আলো দেওয়ার ক্ষমতাকে ঠিকঠাক বুঝতেই মানুষের এতদিন সময় লেগে গিয়েছিল। কাজেই আগুন ব্যাপারটা কী, সেটা অল্প কথায় একটু বুঝে নেওয়া যাক।

বিশেষ এক ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া থেকে আমরা যে তাপ আর আলো পাই, সেই তাপ আর আলোকেই আগুন বলি, আর ওই রাসায়নিক প্রক্রিয়াটিকে বলি দহন (combustion)দহনের জন্য তিনটি বিষয় থাকতেই হবে, জ্বালানি (fuel), বাতাসের অক্সিজেন (O2), আর দহন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ।

জ্বালানি বলতে এতক্ষণ আমরা কাঠ-কুটো, শুকনো পাতা, পশুচর্বি, নানান ভেষজ তেলের কথা উল্লেখ করেছি। এই সমস্ত জ্বালানির মধ্যেই অনেক পদার্থের সঙ্গে একটি মৌল পদার্থ প্রচুর পরিমাণে থাকে, তার নাম কার্বন। মোটামুটি ১৫০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, কাঠের মধ্যে কার্বনের যে যৌগ থাকে, সেটি অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করে এবং তার ফলে আমরা পাই তাপ, প্রচুর জলীয় বাষ্প (H2O), কার্বন ডায়ক্সাইড (CO2), কার্বন মনক্সাইড (CO) এবং আরো নানা ধরনের গ্যাস তৈরি হয়। অক্সিজেনের সঙ্গে এই বিক্রিয়াকে অক্সিডেশান (oxidation) বলে, এই বিক্রিয়া তাপদায়ী (exo-thermic), তার কারণ এই বিক্রিয়া থেকে আমরা তাপ আর আলো পাই।  দহন শুরু করার জন্যে যে জরুরি তাপমাত্রার দরকার হয় তাকে জ্বলন উত্তাপ (ignition temperature) বলা হয়, কাঠের ক্ষেত্রে এই তাপ ১৫০ সেলসিয়াস আগেই বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির জন্য এই তাপ ভিন্ন হয়ে থাকে।

একবার এই দহন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে, আগুন নিভবে না, কারণ দহনের জন্য যে তিনটি বিষয়ের কথা আগে বলেছি, তার মধ্যে জ্বালানি আর অক্সিজেন যদি থাকে, আগুন তার নিজের উত্তাপেই দহন চালিয়ে যেতে থাকে, অর্থাৎ আগুনের জ্বলতে থাকা একটি শৃঙ্খল-বিক্রিয়া (chain reaction)এই বিক্রিয়াকে বন্ধ করার অর্থ, আগুন নেভানো; সেক্ষেত্রে ওই তিনটি বিষয়ের কোন একটি বিষয়কে সরিয়ে ফেলতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। যেমন, যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, অথবা পাথর, বালি কিংবা বড়ো পাত্র চাপা দিয়ে যদি বাতাসের অক্সিজেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। অথবা জল বা অন্য কোন অদাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ঢেলে, আগুনের উত্তাপকে যদি শীতল করে দেওয়া যায়।

এই লেখার প্রথম পর্বের সেই আদিম যুবক, যে প্রথম আগুন নেভাতে এবং জ্বালাতে শিখেছিল, সে এত সব জানতই না এবং সত্যি বলতে আগুন জ্বলা ও নেভার এই রহস্য বুঝতে বুঝতে আমাদের প্রায় একলাখ পঁচিশ হাজার বছর পার হয়ে গেল!

আগুনের এই রহস্য বুঝে ফেলার পর মানুষ উন্নত মানের জ্বালনির সন্ধান শুরু করল। বহুদিন পর্যন্ত আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাঠ, নানান ভেষজ তেল, পশুচর্বির ব্যবহার হত, একথা আগেই বলেছি। তার থেকে অনেক ভাল জ্বালানি হল কয়লা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাটির ওপরেই পাওয়া কিছু কিছু কয়লার ব্যবহার মোটামুটি তিন হাজার বছর আগে থেকে চালু হলেও, খনির মধ্যে কয়লার সন্ধান এবং সেখান থেকে কয়লা তুলে, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার শুরু হল মোটামুটি দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। সেই সময় অবশ্য কয়লা প্রধানতঃ ব্যবহার হত ঘরের কাজে, চূণভাটি আর ধাতু নিষ্কাশনের ছোটখাটো কারখানায়কিন্তু কয়লার ধোঁয়ার দূষণ থেকে বহুলোকের শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়াতে, ১৩০৬ সালে কয়লার ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সময়, মোটামুটি ১৭৬০ থেকে ১৮২০ বা ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ধরা হয়।  জলকে বাষ্প করে তার শক্তিতে নানান ইঞ্জিন চালানো, সেই ইঞ্জিন দিয়ে বড়ো বড়ো কারখানা তৈরি হতে লাগল। কারখানা ও উন্নত যন্ত্রপাতি বানাতে বেড়ে গেল লোহার ব্যবহার। লোহা ও অন্যন্য ধাতু নিষ্কাশনের জন্যেও বিশাল বিশাল কারখানার প্রতিষ্ঠা হতে লাগল। সেই সময় ইউরোপে শিল্পের এই অদ্ভূত উন্নতির জন্য সবথেকে বেশি জরুরি ছিল উচ্চ তাপমাত্রার আগুন, আর সেই আগুনের জন্যেই সারা বিশ্ব জুড়ে খনি থেকে কয়লা তোলার কাজও শুরু হয়ে গেল।

ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের মাঝামাঝি সময়েই কয়লা-পোড়ানো আগুনে জল ফুটিয়ে বাষ্পশক্তির প্রয়োগ করে সূচনা হল রেল ব্যবস্থার ইঞ্জিন। বেশ কম খরচে বহু যাত্রী ও পণ্য বহন করা শুরু হল লোহার রেলপথ বিছিয়ে, তার ওপর দিয়ে ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি ছুটিয়ে। সারা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই রেলপথ ও রেলগাড়ি। বিশ্বজুড়ে হিড়িক পড়ে গেল রেলগাড়ি চালানোর। এমনকি এই বাষ্প-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের জাহাজ এবং নদীতে স্টিমারও চালু হয়ে গিয়েছিল। শেষ হয়ে গিয়েছিল দাঁড়-টানা বৈঠা-বাওয়া পালতোলা জাহাজের যুগ।     

         

আজ যে বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের সভ্য জীবন অচল হয়ে উঠেছে, এর পেছনেও আগুনের অবদান সব থেকে বেশি। আজ সারা বিশ্বে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তার অধিকাংশই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Thermal Power Station)সেই তাপ বিদ্যুৎ কারখানাতেও কয়লা পুড়িয়ে আগুন জ্বালতে হয়, জলকে বাষ্প করার কাজে। আর সেই বাষ্পের তীব্র ধাক্কায় টার্বো জেনারেটর ঘুরিয়ে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে যায় আমাদের ঘরে ঘরে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই শুরু হয়ে গেল রেল চলাচল ব্যবস্থাও। সারা বিশ্বে এখন বাষ্প-চালিত ইঞ্জিনের রেলগাড়ি প্রায় উঠে গেছে, অধিকাংশই এখন ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। ইলেক্ট্রিক ট্রেনে যাত্রা করার সময়েও মনে রেখো, তার বিদ্যুৎটি সরবরাহ হচ্ছে তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের  কয়লা পুড়িয়ে জল ফোটানো বাষ্প দিয়ে চালিত টার্বো জেনারেটর থেকে।

 বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কয়লার বিকল্প হিসেবে আগুন জ্বালানোর নতুন ইন্ধন এসে গেল - খনিজ তেল। ভূগর্ভের অনেক নীচে জমে থাকা প্রাকৃতিক এই খনিজ তেলকে তুলে এনে, পরিশ্রুত করে আমরা উৎপন্ন শুরু করলাম, নানা ধরনের ইন্ধন-তেল, যেমন অ্যাভিয়েশন ফুয়েল, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ইত্যাদি। অ্যাভিয়েশন ফুয়েল দিয়ে – উড়োজাহাজ চালানো হয়। পেট্রল, ডিজেলে চলে ছোট গাড়ি বড়োগাড়ি, এমনকি দুরন্ত গতি রেলের ইঞ্জিনও। আর গৃহস্থালির আগুন জ্বালাবার কাজে লাগে কেরোসিন। খনিজ ইন্ধনের আরেকটি প্রকার হল, প্রাকৃতিক গ্যাস। ভূগর্ভের ভাণ্ডার থেকে এই গ্যাস তুলে এনে, লোহার সিলিণ্ডারে ভরে আমাদের ঘরে ঘরে সরবরাহ করা হয় রান্নার জন্যে।         

  অতএব, আজ আমাদের সভ্যতা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা মানুষ হিসেবে যে বিজ্ঞানের জন্যে এত গর্ব অনুভব করি, তার পিছনে সেই আদিম লোকগুলির অবদান আমরা যেন ভুলে না যাই। তাদের সেই কৌতূহল বা আগ্রহ যদি না থাকত, আমরা হয়তো কোন গুহার অন্ধকারে আজও ভয়ে মায়ের কোল ঘেঁষটে শুয়ে থাকতাম। এই লেখা পড়ে মজা পাওয়াটা তোলা থাকত আরো কয়েক হাজার বছর পরে!  

-০-


 

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...