শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫ " 


ষষ্ঠ পর্ব


সোমবার/রাতঃ এগারোটা বিয়াল্লিশ।

 আদরের কনি,

ঘরের একটা জানালা দীর্ঘদিন না-খোলা ছিল, গতকাল তুই সেটা খুলে দিলি। খোলা হাওয়ায় বুকটা ভরে উঠল আর চোখে এসে লাগল আলোর উদ্ভাস। এত ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ননিজেকে এমনিতেই মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত, তাই শশাঙ্কবাবু বার বার বলা সত্ত্বেও হুইস্কির নেশায় সেটাকে কাটাতে মন চাইছিল না। শশাঙ্কবাবু কী ভাবলেন কে জানে, তুই সামলে নিস।

ত হপ্তার শেষ দুটো দিন ছিলাম না, তাই আজ চেম্বারে খুব চাপ ছিল। তোদের ওখান থেকে ফিরে মাথার তলায় হাত রেখে টানটান বিছানায় শুয়ে তোর কথা যে দু দণ্ড ভাবব তার অবকাশই পেলাম না। মিনিট পনের ঘরে ছিলাম টয়লেটে একটু ফ্রেশ হবার জন্যে, তার মধ্যেই দু দুবার তাগাদা দিয়ে গেল রিসেপশনের মেয়েটি। মানুষ যে কেন এত অসুখে ভোগে কে জানে? নিজেদের সুখের জন্যেই একটু সুস্থ থাকতে পারে না? আজ যদি এরা না ভুগত, চিন্তা করে দ্যাখ, তোর চিন্তার বন্দরে আমি নোঙর ফেলে মাপতে পারতাম বিস্তর জলের তল – একে বাঁও, দুইয়ে বাঁও হয়তো বা। সে যাক শেষমেষ যেতেই হল চেম্বারে। সকলা নটা থেকে দুপুর একটা, কুড়ি জনের বেশি সাধারণত দেখি না। আজ একেবারে পঁয়ত্রিশজন! ধমকে ওঠার আগেই মিলকি বলে উঠেছিল – বকবেন না স্যার, কিচ্‌ছু করার নেই। শুক্রবার, শনিবার থেকে সব্বাই ফোন করে করে এমন রিকোয়েস্ট করে রেখেছিল যে ফেরাতে পারিনি। মিলকি আমার রিসেপসনিস্ট।

সকলের নিরাময়ের বিধান দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর কি! ঘরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। চান খাওয়া করে একটু রেস্ট না নিতেই আবার ডাক পড়ল নার্সিং হোমে, সেখানে দুজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট অ্যাটেণ্ড করে আবার সন্ধ্যের চেম্বার সাতটা থেকে।

এখন রাত এগারোটা আট। পাশের বাড়ির টিভিতে কোন বাংলা সিরিয়াল চলছে, নাটকীয় মুহূর্তে উচ্চৈঃস্বর মিউজিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নিশ্চিন্ত শব্দহীন চারিপাশ। এখন শুধু তুই আর আমি। আর কেউ নেই আমার সময়ে ভাগ বসাতে।

কি করছিস এখন? ঠিক একখুনি? ঘুমিয়ে পড়েছিস? নাকি উল্টোদিকের সোফায় পা তুলে দিয়ে সিরিয়াল দেখছিস? দুই জা, ননদ আর শাশুড়ির লাগাতার ক্যাঁচাল মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চলেছিস? নাকি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিস? কি বই? ইন্টারেস্টিং না একটু বোর? বই পড়তে পড়তে কি আমার কথাও তোর মনে আসছে? যে পাতাটা খুলে পড়া শুরু করেছিলি, সেই পাতাতেই কি আটকে রয়েছিস অনেকক্ষণ – আমার ভাবনায়? ভাবিস কী না ভাবিস, আমার ভাবতে ভাল লাগছে যে তুই আমার কথা ভাবছিস। এই যে আমি তোকে মেল লিখছি, তার মানে তোর কথাই তো ভাবছি। তুইই তো রয়েছিস আমার সারাটা মন জুড়ে। এর কি কোন টেলিপ্যাথিক এফেক্ট হতে পারে না?

আমার কাজের মাঝে, কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে। আমায় পরশ করে প্রাণ সুধায় ভরে তুমি যাও যে সরে – বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো, ওগো দুখজাগানিয়া।

এখনো কি তুই দাঁড়িয়ে আছিস, কনি? অন্ততঃ মনে মনে হলেও! আমার কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে তুই আজও যেন দাঁড়িয়ে আছিস শুধু আমারই জন্যে।

 ভালোবাসা নিস।

 তোর সুনুদা

 

মঙ্গলবার/রাতঃ বারোটা দশ

প্রিয় কনি,

শীতের শীর্ণতোয়া পাহাড়ি নদী দেখেছিস খুব কাছ থেকে? তরতরিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যায়। জলের মধ্যে খেলে বেড়ানো ছোট্ট ছোট্ট মাছ, জলের নীচেয় নুড়ি পাথর সব - সব দেখা যায়। উজ্জ্বল রোদ্দুরে চিক চিক করে স্বচ্ছতা। আর বর্ষার প্লাবনে সেই নদীই যখন জলপ্রবাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তার বুকে তখন ঘোলা জল। জলের মধ্যে, জলের নীচে কী কী রহস্য জমা করা আছে কিছুই দেখা যায় না।

এতদিন অদর্শনে শীর্ণ স্মৃতির বহতায় যা ছিল স্বচ্ছ, সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হবার পর কেমন যেন সব ঘেঁটে ঘুলিয়ে ঘ হয়ে গেল। দেখা না হলেই বুঝি ভালো ছিল। বেশ তো ছিলাম/ছিলি – কেন যে সেদিন গাড়িটা খারাপ হল মাঝ রাস্তায়! উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে সব চিন্তা আর ভাবনা। কত কথাই যে বলতে ইচ্ছে জাগছে – কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না হে আমার কনি, পরস্ত্রী!

গতকাল আমার মেলের উত্তর দিসনি। মেল খোলার অবকাশ হয়নি, নাকি উত্তর দিবি না ঠিক করেছিস?

 ভালো থাকিস, ভালোবাসা নিস।

তোর সুনুদা।

 

বুধবার/দুপুরঃ দুটো বত্রিশ

 সুনুদা,

 ভালোই তো আছো, বস, একদম রসে ভরা রসবড়া। এতটুকুও টসকাওনি।  

তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় – দুটো মেলই পড়েছি যথাযথ সময়েই। এমনিতেই তোমার সঙ্গে (নাকি তোমার প্রিয় রবিঠাকুরের ভাষায় “তোমার সনে” বলব?) এতদিন পর দেখা হবার একটা হ্যাং ওভার তো ছিলই, তার ওপর তোমার ওরম মেল, বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আজও তুমি এভাবে ভাবতে পারো? আজও কি আমি তোমার কাছে একই রয়ে গেলাম! মনে হল তাই আর বুকের মধ্যে জমাট বাঁধল দীর্ঘশ্বাস – কী কথা ছিল বলবার? কী কথা আর আছে বলবার? সমস্ত ভাবনা আমাকে বোবা করে দিল, সুনুদা।

 তোমার স্বভাবটা আর পাল্টালো না, সুনুদা। এমন মন আকুল করা বক্তব্য শেষ করলে “পরস্ত্রী” দিয়ে? হেমন্তের চাঁদনি রাতে কাশবনে হারিয়ে যাবার লোভ দেখাও আবার মাথায় হিম লেগে ঠান্ডা লাগার ভয়ও দেখাও। শীতের ঝরাপাতার বনে হারিয়ে যাওয়ার ডাক দাও কিন্তু পথ হারানোর ভয়ে বনে ঢুকতেও মানা করো। আমি তো হারাতে চেয়েছিলাম তোমার ডাকে – কিন্তু বারবার তুমিই দিয়েছ পিছুটান।

পিছুটান ভুলে একবার ডেকেই দেখো আমায়, আমি আজও আছি শুধু

 তোমারই কনি।

 

বুধবার/রাতঃ ১১:৪৫

কনি,

তোকে ডাকিনি একথাটা তোর মুখে মানায় নাডেকেছিলাম, তোকেই ডেকেছিলাম, সমস্ত অন্তর থেকে। এমন আহ্বান, নাঃ আহ্বান নয়, আবাহন আর কেউ কোনোদিন করতে পেরেছে বলে আমার অন্ততঃ বিশ্বাস হয় না। তুই সেদিনের সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিলি। হয়তো তেমন ভরসা করতে পারিসনি। অথবা আমার ডাকে সেসময় সাড়া দিলে তোকে এবং আমাকে যে ঝঞ্ঝার মুখে পড়তে হতো, সে আশঙ্কায় বিকল হয়েছিলি তুই। সেই ঝড়ের রাতে তোর নিরাপদ ঘরের দুয়ার রুদ্ধ রেখেছিলি। খিড়কির দরজাতেও এতটুকুও ফাঁক রাখিসনি। পাছে উড়ে যায় সব বাঁধনের শিকল, এলোথেলো হয়ে যায় তোর সহজ জীবনের যাবতীয় পথচলা।

সেই ঝড় থেমে গেছে কবেই। পিছল পথে পা টিপে টিপে আমি পৌঁছে গিয়েছি, একা এক নির্জন পথের পরিত্যক্ত পান্থশালায়। আমি তোকে আমার সঙ্গে সেদিন মাত্র সাত পা হাঁটতে বলেছিলাম, কনি, তাহলেই আমরা জীবনের অনন্ত পথচলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারতাম। সে তো হয়ে উঠল না কনি। সেদিন আমার সেই ডাকে তুই মুখ ফিরিয়েছিলি, কনি, আজ কোন অধিকারে তোকে ডাকি বল তো? তোকে খুব কাছে পাবার লোভটুকুও এখন রয়ে গেছে বহুদিন পিছনে ফেলে আসা অস্ফুট স্মৃতিতে। যে স্মৃতি একটা লোহার সিন্দুকে ভরে, শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছিলাম গভীর এক কুয়োর জলে। সে সিন্দুকটা জলে পড়ার সময় আওয়াজ উঠেছিল - ঝপ্‌পাস। আমার স্মৃতিতে এখন রয়ে গেছে শুধু ওই আওয়াজটুকুই!

আজ তোকে ডাকতে গেলে, আমার একা এই নির্জন ঘরে সেই শব্দটাই কানে আসছে বারবার। এই শব্দটুকু ছাড়া আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, 

তোর সুনুদার।

চলবে...

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১০

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯ "

প্রথম স্কন্ধ - দশম পর্ব

অভিশপ্ত পরীক্ষিৎ

শ্রীসূত বললেন, “যিনি ভগবান কৃষ্ণের অনুগ্রহে মাতৃগর্ভে অশ্বত্থামার অস্ত্রের থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং যিনি ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণের অভিশাপে, তক্ষকের দংশনে মৃত্যুর পরিণাম জেনেও, ভগবানে নিবেদিত চিত্তে কোন মোহ বা ভয় অনুভব করেননি, সেই রাজা পরীক্ষিৎ ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেবের শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। তারপর সর্ব বিষয়ে আসক্তি পরিত্যাগ করে শ্রীহরির পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করার পর, গঙ্গার জলে নিজের দেহ ত্যাগ করেছিলেন। ভগবান যে দিন যে ক্ষণে পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন, সেই ক্ষণেই অধর্মের মিত্র কলি পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু সম্রাট পরীক্ষিৎ যতদিন পৃথিবী শাসন করেছেন, কলি নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তিনি বুঝেছিলেন, কলি যদিও অবিবেকী মানুষের কাছে বীরের মতো আচরণ করে, কিন্তু শান্তশীল ব্যক্তিদের ভয় পায়। কলির অনেক দোষের মধ্যে একটি মহান গুণ এই যে, মানুষের মনে শুভ সঙ্কল্প করলেই পুণ্যলাভ হয়, কিন্তু অসাধু সঙ্কল্পের কাজ না করলে পাপের ভাগী হতে হয় না। এই কারণে তিনি কলিকে সম্পূর্ণ বিনাশ করেননি।

হে বিপ্রগণ, আপনারা যা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেই বাসুদেবের কথায় পূর্ণ মহারাজ পরীক্ষিতের পবিত্র চরিত্র আপনাদের কাছে বর্ণনা করলাম। যে কথা প্রসঙ্গে ভগবানের গুণ ও কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়, সেই কথা সকলের পক্ষেই মঙ্গলকর ও সেই কথা শোনা, সকলেরই একান্ত কর্তব্য”

ঋষিগণ বললেন, “হে সূত আপনি অনন্তকাল বেঁচে থাকুন। কারণ, আমাদের মতো মরণশীল মানুষের কাছে, আপনি অমৃতস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের নির্মল যশের কথা কীর্তন করছেন। আপনি জ্ঞানী ও ভগবৎ ভক্ত। আমরা ভক্তবৎসল ভগবানের কথা আপনার মুখে আরো শুনতে চাই। মহাজ্ঞানী ও মহাভাগবত পরীক্ষিৎ যোগীশ্রেষ্ঠ শুকদেবের যে জ্ঞান ও উপদেশ লাভ করলেন, সেই আখ্যানও আমাদের কাছে বর্ণনা করুন”

শ্রীসূত বললেন, “আহা, আমি নীচ বংশে জন্মেও, আজ আমার জন্ম সার্থক হল। কারণ আপনাদের মতো জ্ঞানবৃদ্ধরা আমাকে সম্মান দিলেন। হে ঋষিগণ, আপনারা আমাকে যা জিজ্ঞাসা করেছেন, সে সম্বন্ধে আমি যতটুকু জানি আপনাদের কাছে বর্ণনা করব। কারণ পাখিরা যেমন নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী বিশাল আকাশের অতি অল্প অংশেই উড়তে পারে, পণ্ডিতরাও স্বীয় বুদ্ধিমতো শ্রীবিষ্ণুর অনন্ত লীলা বর্ণনা করতে পারেন।

একবার মহারাজ পরীক্ষিৎ মৃগয়া করতে গিয়ে, অরন্যে হরিণের সন্ধান করতে করতে ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়েছিলেন। তিনি পানীয় জলের সন্ধান করতে করতে কাছাকাছি একটি আশ্রমে প্রবেশ করে দেখলেন, এক প্রশান্ত মুনি চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে আছেন। সেই মুনির ইন্দ্রিয়, মন, প্রাণ সকল বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়েছে, এবং তিনি নির্বিকার ব্রহ্মরূপ লাভ করেছেন। তাঁর দেহ রুরু মৃগের চর্মে আচ্ছাদিত এবং মাথায় বিক্ষিপ্ত জটাজাল। এদিকে মহারাজ পরীক্ষিৎ পিপাসায় কাতর, তিনি  মুনির কাছে জল প্রার্থনা করলেন। কিন্তু ধ্যানস্থ মুনির থেকে বসবার আসন, অর্ঘ্য অথবা কুশল বাক্য কিছুই না পেয়ে মহারাজ নিজেকে অপমানিত মনে করলেন। রাজা এর আগে কোনদিন এমন রাগ ও বিদ্বেষ অনুভব করেননি, কিন্তু সেদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে অকস্মাৎ তাঁর মনে মুনির উপর অত্যন্তু ক্রোধ ও বিদ্বেষ জন্ম নিল। তিনি আশ্রম থেকে বেরোনোর সময় ধনুর ডগায় একটি মৃত সাপ নিয়ে, মুনির কাঁধে রেখে নিজের প্রাসাদের দিকে চলে গেলেন। ওই মুনি সত্যিই সমাধিস্থ ছিলেন, নাকি ক্ষত্রিয় রাজাকে দেখে ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা করার জন্যেই সমাধির কপটতা করলেন, মনে এই সন্দেহ হওয়াতেই রাজা সেইদিন ওই আচরণ করেছিলেন।

এদিকে, ওই মুনির পুত্র তপস্বী শৃঙ্গী, বালকদের সঙ্গে কিছুটা দূরে খেলা করছিল। তিনি অত্যন্ত তেজস্বী। রাজা পরীক্ষিৎ আশ্রমে এসেছিলেন এবং রাজা পিতাকে দুঃখ দিয়েছেন শুনেই তিনি বালকদের বললেন, “কি আশ্চর্য, রাজারা প্রজাদের অর্থেই সমৃদ্ধ হয়ে, কি রকম অধর্ম করে, দেখ। প্রভুর অন্নে বেঁচে থাকা কুকুর আর কাক যেমন প্রভুরই অনিষ্ট করে, তেমনি এই রাজাও আমার পিতার অনিষ্ট করে গেল! ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের দ্বারপাল কুকুর বলেই মনে করে, তাদের উচিৎ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা, তারা কিভাবে আশ্রমে প্রবেশ করে? ভগবান কৃষ্ণ কুপথগামী ব্যক্তিদের শাসনকর্তা ছিলেন, তিনি আর নেই। এখন যে ধর্ম পথের অসম্মান করেছে, তাকে আমি কী শাস্তি দিই, দেখ”

ঋষি পুত্র বালকদের এই কথা বলতে বলতে, তাঁর দুই চোখ ক্রোধে তামার বর্ণ হয়ে উঠল। তারপর তিনি কৌশিকী নদীর জলে আচমন করে, বজ্রের মতো অভিশাপ দিলেন, “যে পাপিষ্ঠ, শাস্ত্র নিয়ম না মেনে আমার পিতার গায়ে মরা সাপ দিয়ে অপমান করেছে, আমার বাক্যে আজ থেকে সাত দিনে, তক্ষক তাকে দংশন করবে”

তারপর সেই বালক আশ্রমে এসে পিতার গলায় জড়ানো মরা সাপ দেখে অত্যন্ত দুঃখ পেলেন ও উচ্চ কণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন। পুত্রের কান্নায়, মহর্ষি অঙ্গিরার বংশের ঋষি শমীকের সমাধি ভেঙে চোখ মেলে তাকালেন। তিনি দেখলেন, তাঁর গলায় মরা সাপ রয়েছে, তিনি সেই সাপকে দূরে ফেলে দিলেন, তারপর পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বৎস, কে তোমার কী অনিষ্ট করেছে, তুমি কাঁদছো কেন”?

ঋষি শমীকের প্রশ্নে শৃঙ্গী, পিতাকে সমস্ত কথাই বললেন। রাজা অভিশাপের যোগ্য নয়, তাও পুত্র তাঁকে অভিশাপ দিয়েছে শুনে, পুত্রকে তিনি সমর্থন করলেন না, বললেন, “হায়, তুমি লঘুপাপে গুরু দণ্ড দিয়ে নিজেই মহাপাপে পতিত হয়েছ। নৃপতি বিষ্ণুস্বরূপ, তাঁকে সাধারণ মানুষ ভেবে অভিশাপ দেওয়া অত্যন্ত অনুচিত হয়েছে। রাজর্ষি পরীক্ষিৎ ধর্ম অনুসারে প্রজাদের পুত্রের মতো পালন করে থাকেন। তিনি মহাভক্ত ও অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে যশ লাভ করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই ক্ষুধা তৃষ্ণায় অত্যন্ত কাতর হয়ে আশ্রমে এসেছিলেন, তাঁকে অভিশাপ দেওয়া আমাদের অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে”। 

ঋষি শমীক পুত্রের পাপ কর্মের কোন প্রায়শ্চিত্ত না দেখে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন, “হে ভগবান, আমার পুত্র বালক। তার বুদ্ধি এখনও কাঁচা। সে নিরপরাধ রাজার প্রতি যে অনিষ্ট আচরণ করেছে, সর্বভূতের অন্তর্যামী প্রভু তাকে ক্ষমা করুন। ঋষি মনে মনে চিন্তা করলেন, যদি রাজা প্রতিশাপ দেন, তাহলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হতে পারত। কিন্তু মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীহরির পরম ভক্ত, তিনি সেরকম কিছু করবেন না। কারণ সামর্থ থাকলেও হরির ভক্তেরা তিরষ্কার, অভিশাপ, প্রতারণা কিংবা অপমানেও অপরের অনিষ্ট চিন্তা করেন না। মুনি শমীক পুত্রের কাজে এতই অনুতপ্ত হলেন, রাজা যে তাঁর কাছে অপরাধ করেছিলেন, সে কথা মনেও স্থান দিলেন না। সাধারণ লোকে প্রায়ই সাধুজনকে সুখ বা দুঃখ দিয়ে থাকে, কিন্তু তাঁরা সেই ব্যবহারে হর্ষ বা দুঃখ অনুভব করেন না, কারণ সুখ দুঃখ আত্মার ধর্ম নয়”

 

অনুতপ্ত পরীক্ষিৎ

শ্রীসূত বললেন, “এদিকে মহীপতি পরীক্ষিৎ নিজের নিন্দনীয় কাজের চিন্তা করে অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে বললেন, হায়, আমি অনার্যের মতো কী হীন কাজই করেছি! ব্রাহ্মণ তেজের আধার, আমি নিরপরাধ সেই ব্রাহ্মণের প্রতি অন্যায় কাজ করেছি। ঋষি ঈশ্বরস্বরূপ, তাঁর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে আমি ঈশ্বরের অপমান করেছি। এই অপরাধে আমার যে ভীষণ বিপদ ঘটবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই হোক, অজস্র দুঃখ আমাকে আক্রমণ করুক, কিন্তু ওই দুঃখ আমার সন্তানদের কোনভাবেই যেন প্রভাবিত না করে। আমার পাপের সমুচিত শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে আমার এই রকম কাজে আর প্রবৃত্তি না আসে। রাজা নিজের বিপদ প্রার্থনা করে আবার বললেন, আজই আমার এই রাজ্য, শক্তি ও ধন সম্পদে ভরা রাজকোষের বিনাশ হোক, আমার মতো নীচমনা ব্যক্তির, গো, ব্রাহ্মণ ও দেবতার অনিষ্ট করতে, আর যেন পাপ বুদ্ধির উদয় না হয়।

রাজা এই রকম যখন চিন্তা করছেন, সেই সময় ঋষি শমীকের এক শিষ্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে, সপ্তম দিনে তক্ষক দংশনে তাঁর মৃত্যুর বিষয় জানালো। সেই কথা শুনে, রাজা তক্ষকের বিষকেও মঙ্গলদায়ক মনে করলেন, কারণ বিষ বিষয়ে আসক্ত ব্যক্তিদের মনে বৈরাগ্য আনতে সাহায্য করে। পার্থিব ও স্বর্গীয় সুখ উপভোগ যে পরিত্যাগের বিষয়, এ কথা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। এখন শ্রীকৃষ্ণের চরণপদ্মের সেবাই সকল ধর্মের সার, এই চিন্তায় তিনি অনশনে জীবন ত্যাগের সঙ্কল্প নিয়ে ভাগিরথীর তীরে গিয়ে আসন গ্রহণ করলেন। ভাগিরথীর পুণ্যসলিল ঐশ্বর্যময়ী তুলসীর রেণু ও কৃষ্ণপদরেণু বহন করে, অদ্ভূত পাবনী শক্তি লাভ করেছেনএই সলিল স্পর্শে লোকপালদের সঙ্গে ত্রিলোকের অন্তর ও বাহির পবিত্র হয়ে থাকে, অতএব আসন্ন মৃত্যু কোন ব্যক্তি অন্তিমকালে তাঁর তীরে আশ্রয় না করবে?”

পাণ্ডুবংশধর পবিত্র গঙ্গাতীরে অনাহারে প্রাণত্যাগের ব্রত নিয়ে সমস্ত সঙ্গ ত্যাগ করলেন এবং একাগ্র মনে মুকুন্দের চরণযুগল ধ্যান করতে লাগলেন। তাঁকে দেখার জন্যে মহানুভব মুনি ও ঋষিরা শিষ্যদের সঙ্গে সেখানে উপস্হিত হলেন। কারণ সাধুজনেরা প্রায়ই তীর্থ দর্শনের ছলে তীর্থস্থানকেই পবিত্র করে তোলেন। অত্রি, বশিষ্ঠ, চ্যবন, শরদ্বান, অরিষ্টনেমি, ভৃগু, অঙ্গিরা, পরাশর, গাধিসুত বিশ্বামিত্র, পরশুরাম, উতথ্য, ইন্দ্রপ্রমহ, সুবাহু, মেধাতিথি, দেবল, আর্ষ্টিষেণ, ভরদ্বাজ, গৌতম, পিপ্পলাদ, মৈত্রেয়, ঐর্ব, কবষ, কুম্ভযোনি, অগস্ত্য, বেদব্যাস, শ্রীনারদ ও অন্যান্য দেবর্ষি ও মহর্ষিরা এবং অরুণা প্রমুখ রাজর্ষিগণও সেখানে উপস্থিত হলে, মহারাজ পরীক্ষিৎ তাঁদের সকলের অর্চনা করে, সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।

সকলে সেই ভাগিরথী তীরে আসন গ্রহণ করলে, মহারাজ পরীক্ষিৎ করজোড়ে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনারা আমার এই অনশন ব্রত অনুমোদন করে আমাকে ধন্য করেছেন। ব্রাহ্মণেরা তাঁদের পা ধোয়া জল নিজেদের গৃহ থেকে অনেক দূরে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু যে রাজকুলে নিন্দিত কর্মের অনুষ্ঠান হয়, সেই রাজাকে তার থেকেও অনেক বেশি দূরে পরিত্যাগ করেন। সুতরাং আপনারা মহাজন হয়েও আজ আমার প্রতি যে কৃপা দেখালেন, তাতে আমি নৃপতিদের মধ্যে সবথেকে বেশি ধন্য হলাম। আমার প্রতি যে ব্রহ্মশাপ হয়েছে, এও শ্রীহরির অনুগ্রহ। তিনি পাপিষ্ঠ আমাকে সর্বদা গৃহে আসক্ত দেখে, ব্রাহ্মণশাপরূপে আমার অন্তরে বৈরাগ্য উৎপন্ন করেছেন এবং বৈরাগ্যই শ্রীহরির চরণ লাভের একমাত্র উপায়”

তারপর রাজা আরও বললেন, “হে ঋষিগণ, আপনারা আমাকে শরণাগত বলে অস্বীকার করুন ও গঙ্গাদেবী আমাকে আশ্রয় দান করুন, আমি শ্রী ভগবানের চরণে আত্মসমর্পণ করলাম। ব্রাহ্মণের পাঠানো মায়া কিংবা তক্ষক আমাকে তার ইচ্ছামতো দংশন করুক, আপনারা বিষ্ণুগাথা কীর্তন করুন। পরজন্মে আমি যে যোনিতেই জন্মগ্রহণ করি না কেন, আমার যেন ভগবানে অনন্ত রতি, তাঁর ভক্ত সাধুজনের সঙ্গলাভ হয় এবং সর্ব জীবে প্রীতিভাব উৎপন্ন হয়। হে দ্বিজগণ, আপনাদের সকলকে আমার নমস্কার”

রাজা পরীক্ষিৎ পুত্র জনমেজয়ের হাতে রাজ্যভার সমর্পণ করলেন, তারপর ধীরভাবে, গঙ্গার দক্ষিণকূলে, উত্তরমুখী হয়ে কুশাসনে বসলেন। রাজা এইভাবে প্রায়োপবেশনে অর্থাৎ অনশন ব্রত নিয়ে আসন গ্রহণ করলে, স্বর্গের দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করলেন, আনন্দে দুন্দুভিধ্বনি করলেন। উপস্থিত মহর্ষিরাও রাজার সঙ্কল্পের অনুমোদন করে, তাঁকে অজস্র সাধুবাদ দিয়ে বললেন,“হে রাজর্ষিশ্রেষ্ঠ, আপনার পূর্বপুরুষ যুধিষ্ঠির প্রমুখ, ভগবানের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যে রাজসিংহাসন ও রাজমুকুট ত্যাগ করেছিলেন। আপনারা শ্রীকৃষ্ণে একান্ত অনুরক্ত, অতএব এই কাজ আপনাদের পক্ষে কিছু মাত্র বিচিত্র নয়”

তারপর তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে স্থির করলেন, এই ভক্তচূড়ামণি পরীক্ষিৎ যতদিন না নিজের দেহ ত্যাগ করে মায়ার অতীত ও শোক রহিত অমৃতলোক লাভ করেন, ততদিন তাঁরা এই গঙ্গাতীরেই রাজার সঙ্গ দান করবেন। রাজা তাঁদের এই পক্ষপাতহীন সুমধুর সত্য ও গম্ভীর কথা শুনে, শ্রীবিষ্ণুর চরিত্র গাথা শোনার ইচ্ছায়, তাঁদের সংযত চিত্তে অনুরোধ করলেন, “হে বিপ্রগণ, এই ক্ষণে সমস্ত বেদ যেন সত্যলোকে মূর্তিধারণ করে অবস্থান করছেন, আমার প্রতি সদয় হয়ে আপনারা যখন এখানে উপস্থিত রয়েছেন, আপনাদের সকলের কাছে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই। কারণ অন্যের প্রতি অনুগ্রহ করাই আপনাদের আত্মার স্বভাব এবং এ ছাড়া ইহলোকে কিংবা পরলোকে আপনাদের অন্য কোন প্রয়োজনই দেখা যায় না। সকল অবস্থায়, বিশেষ করে মুমূর্ষুকালে মানুষের বিশুদ্ধ অনুষ্ঠানের কাজ কী, আপনারা সকলে বিবেচনা করে আমার মনের সংশয় দূর করুন”

মহারাজার প্রশ্ন শুনে উপস্থিত ঋষিদের মধ্যে মতের অমিল উপস্থিত হল। তাঁদের মধ্যে কেউ বললেন যোগ, কেউ বললেন, যাগ, আবার কেউ কেউ বললেন, মুমূর্ষু ব্যক্তিদের বিশুদ্ধ কর্তব্য তপস্যা। এই বিষয়ে তাঁরা যখন বিবাদ করছেন, সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, ব্যাসপুত্র ভগবান শুকদেব।

ভগবান শুকদেবের বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছিল, অবহেলা করে তাঁকে যেন সকলে পরিত্যাগ করেছে। তাঁর সঙ্গে কোন বর্ণ বা কোন আশ্রমের লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল না। তিনি যখন এলেন, তাঁকে ঘিরে নগরের যত বালকের দল কৌতুক করছিল। তাঁর কোনও ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি আসক্তি ছিল না, তিনি যে পরমানন্দ লাভ করেছিলেন, সেই আনন্দেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি ষোড়শবর্ষীয় তরুণ, তাঁর হাত, পা, উরু, বাহু, কাঁধ, গাল ও ত্বক সুকুমার; তাঁর সুন্দর আয়ত নয়ন, উন্নত নাক, দুই কর্ণ সমান এবং সুচারু ভ্রূযুগলে মুখমণ্ডল অপূর্ব সুন্দর। তাঁর কণ্ঠে শঙ্খের মতো আঁকা তিনটি রেখা; তাঁর বক্ষ বিশাল ও উন্নত, তাঁর নাভি আবর্ত, অর্থাৎ গভীর। তিনি দিগম্বর। তাঁর দুই বাহু দীর্ঘ এবং কান্তি দেবদেব শ্রীহরির মতোই মনোহর। তাঁর শ্যাম অঙ্গের যৌবন ও তাঁর অধরের মধুর হাসি দেখে রমণীরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন।

[এর পর থেকে সৌম্য-সুন্দর ও নগ্ন কিন্তু অহিংস্র কোন পাগল-মানুষকে দেখে অবহেলা করবেন না, বারেক চিন্তা করে নেবেন, তিনি শুকদেবের মতো সিদ্ধযোগী নন তো? অবশ্য একথাও সত্যি শুকদেবকে চিনতে পারতেন সেকালের তপস্বী ও জ্ঞানী মুনি-ঋষিরা - কিন্তু আমরা তো বিষয়াসক্ত অজ্ঞান-অর্বাচীনের দল - সিদ্ধযোগীকে চেনা আমাদের সাধ্য কি?]       

তাঁর ব্রহ্মতেজ গুপ্ত থাকলেও, মুনিগণ তাঁর লক্ষণ দেখে, তাঁকে চিনতে পারলেন। সকলে নিজ নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। মহারাজ পরীক্ষিতের পুজো গ্রহণ করে, ভগবান শুকদেবকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসার পর, তাঁকে ঘিরে সকলে আসন গ্রহণ করলেন। সকল ব্রহ্মর্ষি, রাজর্ষি ও দেবর্ষিদের সভায়, নক্ষত্রবেষ্টিত চাঁদের মতোই তিনি উজ্জ্বল ও মনোহর শোভা ধারণ করলেন। 

মহারাজ পরীক্ষিৎ অবনত মস্তকে, করজোড়ে, ভগবান শুকদেবের সামনে গিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি কৃপা করে আমাদের সভায় এসে পড়ায়, আমরা তীর্থের মতোই পবিত্র হলাম। আজ আমার অত্যন্ত শুভদিন। সামান্য ক্ষত্রিয় হয়েও আপনার মতো সাধুসেবার অধিকারী হলাম। হে যোগীবর, বিষ্ণুর সামনে অসুরদের যেমন তৎক্ষণাৎ বিনাশ হয়, তেমনি আপনার সামনে মহাপাতকের সকল পাপ ক্ষয় হয়ে যায়। ভগবান কৃষ্ণ পাণ্ডবদের প্রেমে চির আবদ্ধ, আমি তাঁদের বংশধর, আমার প্রতি শ্রীভগবানের করুণাতেই, আজ এই স্থানে আপনার উপস্থিতি; নয়তো আপনার দর্শনলাভ একান্তই দুর্লভ। আপনি যোগ সিদ্ধ, আপনি কখন কোথায় ভ্রমণ করেন, কেউ জানে না। আমার মৃত্যু সমাগত প্রায়, অতএব আপনি যে আমার মনের ইচ্ছা পূরণের জন্যই স্বয়ং এসে দর্শন দিলেন, এ ভগবান কৃষ্ণর অনুগ্রহ ছাড়া কিছুই নয়। আপনি যোগীদেরও গুরু, আপনার শ্রী চরণে আমার প্রার্থনা, মানুষের অন্তিমকালে কর্তব্য কর্ম কী, সে বিষয়ে আমাকে উপদেশ দিন। মানুষের যা কিছু শ্রবণ, জপ, অনুষ্ঠান, স্মরণ ও ভজন করা কর্তব্য এবং যে সকল কর্ম নিষিদ্ধ, সে সকল বিষয় এখনই বলতে অনুরোধ করছি, আপনি গৃহস্থের গৃহে গোদোহন কালের বেশি অবস্থান করেন না”

[রাজা পরীক্ষিতের অভিশপ্ত হওয়া এবং সর্প দংশনে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি মহাভারত সবিস্তারে বর্ণনা করেছে, এই পুরাণের বর্ণনার মতো ভাসা-ভাসা ভক্তিরসে মাখা নয়। আগ্রহী পাঠকরা এই ব্লগের "ওঁ শান্তিঃ (নাটিকা)"-টি পড়ে নিতে পারেন - পরীক্ষিতের মৃত্যুর পিছনে কী যেন এক রহস্য ছিল, সে কথা মহাভারত তুলে ধরেছে।]        

শ্রীসূত বললেন, “মহারাজ পরীক্ষিৎ মধুর বাক্যে ব্যাসপুত্র ধর্মজ্ঞ শুকদেবকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করায়, ভগবান শুকদেব অমৃত বাক্য বলতে শুরু করলেন”।  

প্রথম স্কন্ধ সমাপ্ত

পরের সংখ্যায় দ্বিতীয় স্কন্ধের শুরু। 


বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


পর্ব - ১

এই লেখাটা পড়ার সময় কী তোমাদের হবে? সকাল থেকে উঠে হোমটাস্ক, স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে ক্রিকেট কোচিং, নয়তো সাঁতার, নয়তো নাচ শেখা! সেটা সেরে আবার টিউশন যাওয়া! ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে আটটা-নটা! সত্যি বলতে তোমাদের সকলের প্রতিটা দিন এবং রাত ঘন্টা-মিনিটের ঘড়ি ধরে হিসেব করা সেখান থেকে একচুলও এদিক সেদিক হবার জো নেই সময়কে এভাবে ঘন্টা মিনিটে যদি ভাগ করা না যেত, তাহলে কী হত, আমাদের প্রত্যেকদিনের কার্যপ্রণালী? যাকে ইংরিজিতে বলে ডেলি শিডিউল!

 আদিম মানুষের সময়ের হিসেব ছিল খুবই সহজ আর সাধারণ দিন আর রাত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত হল কাজের সময়কাজ বলতে ছিল খাদ্যের সন্ধান আর খাওয়া তারপর সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাত্রের কাজ ছিল অল্পস্বল্প গল্পগাছা, বিশ্রাম আর গভীর ঘুম সময়ের এইটুকু অভিজ্ঞতা দিয়েই তাদের দিব্যি চলে গেছে হাজার হাজার বছর, অন্য কোন শিডিউল দরকারই হয়নি। প্রথমে আগুন জ্বালাতে শেখা, তারপর কৃষি এবং পশুপালন শিখে ফেলার পর, তাদের কাছে সময়ের একটা হিসেব মনের মধ্যে গড়ে উঠতে লাগল। কীভাবে গড়ে উঠল তাদের এই বোধ?

আদিম মানুষদের দলে কিছু বৃদ্ধ মানুষ থাকতেন, যাঁদের শিকার করতে যাওয়ার মতো কঠিন পরিশ্রমের সাধ্য হত না। তাঁরা গুহা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়েই থাকতেন, দলের শিশু, বালকদের দেখাশোনা করতেন, অসুস্থ কিংবা আহত সঙ্গীদের দেখভাল করতেন।  তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ লক্ষ্য করলেন, সূর্য উঠলে দিন হয়, সূর্য অস্ত গেলে রাত আসে। কিন্তু সূর্যটা এক জায়গায় স্থির নেই। সূর্য যেদিক থেকে ওঠে, সেদিকের নাম যদি পূর্ব দেওয়া হয়, তাহলে সূর্য অস্ত যায় তার উল্টোদিকে, সে দিকটার নাম দেওয়া হল পশ্চিম। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, সূর্যের আলোর উল্টোদিকে গাছপালা, খুঁটি এমনকি নিজেদেরও ছায়া পড়ে। সেই ছায়ার রকমসকম সারা দিনে একই থাকে না। ছোট হয়, লম্বা হয়, মানুষের সামনে অথবা পিছনে পড়ে থাকে। আর সূর্য যখন মধ্য আকাশে থাকে, তখন ছায়া পড়ে থাকে পায়ের নিচে – ছোট্ট হয়ে তেমনই রাত্রের চাঁদটাও সব দিন সমান থাকে না। পুরো চাঁদ দেখা যায় যে রাতে, সেই রাতকে যদি পূর্ণিমা বলা যায়, তারপরের রাত থেকেই রোজই চাঁদের আকার কমতে থাকে। কমতে কমতে এমন হয়, এক রাত্রে চাঁদকে দেখাই যায় না, সে রাতের নাম দেওয়া হল অমাবস্যা।             

 এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করতে করতে আদিম মানুষের বিজ্ঞ জনেরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব পেতে শুরু করলেন। তাঁরা দেখলেন পনেরদিন অন্তর চাঁদটা একবার পূর্ণিমা হয়, পরের পনেরদিনে হয় অমাবস্যা! এক একটা পনেরদিনের তাঁরা নাম দিলেন পক্ষ। অমাবস্যার পরের পনেরদিন শুক্লপক্ষ, পূর্ণিমার পরের পনেরদিনের নাম দিলেন কৃষ্ণপক্ষ। শুক্ল মানে সাদা, অমাবস্যার পর চাঁদ রোজই বাড়ে, প্রতি রাত্রিতে বাড়ে চাঁদের উজ্জ্বলতাও, তাই নাম শুক্লপক্ষ। আর পূর্ণিমার পর চাঁদ যতো ছোট হতে থাকে, প্রতি রাত্রে চাঁদের উজ্জ্বলতা কমতে থাকে, অন্ধকার হতে থাকে রাত্রের আকাশ, তাই তার নাম কৃষ্ণপক্ষ!

তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, বছরের সব সময় সূর্য পূর্ব দিকের একই জায়গা থেকে উদয় হয় না, আবার পশ্চিমের একই জায়গায় অস্তও যায় না, কিছুট করে সরে যায়। যার ফলে, বছরের কিছুদিন সূর্যের তেজ প্রখর হয়, সেই সময়ের নাম দেওয়া হল গ্রীষ্ম (summer)। এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে দীর্ঘতম হয়ে ওঠে। আর যে সময়ে সূর্যের তেজ বেশ কম থাকে সেই সময়ের নাম দেওয়া হল শীত (winter) এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে হ্রস্বতম হয়ে ওঠে।

নির্মল রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, আকাশের অজস্র নক্ষত্র, কিছু কিছু গ্রহ। অজস্র সেই নক্ষত্রের মধ্যে তাঁরা কয়েকটি নক্ষত্র চিনে ফেললেন! কয়েকটি নক্ষত্রের সমষ্টিকে একত্রে এক একটা বিশেষ আকার কল্পনা করে তাদের নামও রাখতে শুরু করতে লাগলেন। যেমন কালপুরুষ (Orion) এবং তার পায়ের কাছে থাকে একটি কুকুর এবং একটি শশক। এইভাবেই তাঁরা খুঁজে নিতে পারলেন, আরো বেশ কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী, যেমন সপ্তর্ষিমণ্ডল (Great bear), তুলা (Libra), মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), ধনু (Sagittarius) ইত্যাদি। তাঁরা আরো লক্ষ্য করলেন, এই নক্ষত্রমণ্ডলীগুলির কোনোটিই আকাশের এক জায়গায় স্থির থাকেনা। এক এক সময় আকাশে কিছু কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী দেখা যায়। তারা প্রতিদিন অল্প অল্প সরে সরে যায়, কিছুদিন পর তাদের আর দেখাই যায় না। তখন আকাশে উদয় হয় নতুন কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী। আরো আশ্চর্য ব্যাপার বেশ কিছুদিন, মোটামুটি প্রতি ৩৬৫ দিনের পর পর, নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীগুলিই আকাশের নির্দিষ্ট অবস্থানে বার বার ফিরে আসে।


বিভিন্ন মাসের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থান 

দীর্ঘ দিন লক্ষ্য করতে করতে তাঁরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব গড়ে তুলতে পারলেন। তাঁরা সেই নির্দিষ্ট সময়ের নাম রাখলেন বর্ষ বা বছর। আকাশে নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রের নির্দিষ্ট উপস্থিতি অনুযায়ী, তাঁরা আরও একটা হিসাব করে ফেললেন, সেটির নাম দিলেন মাস। যেমন বিশাখা নক্ষত্র, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, আষাঢ়, শ্রবণা, ভদ্রা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা ইত্যাদি। নক্ষত্র অনুযায়ী মাসের নাম রাখলেন বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক। এরকমই পুষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

তাঁরা বুঝতে পারলেন, আমাদের এই ধরিত্রী এবং আকাশের ওই সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সকলেই নির্দিষ্ট নিয়মের এক শৃঙ্খলে বাঁধা। সূর্য, গ্রহ-তারাদের নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্যই পৃথিবীতে গ্রীষ্ম আসে। মাস দুয়েক সময় সূর্যের প্রখর তাপে জলাশয়ের জল শুকিয়ে যায়, জলের অভাবে কাতর হয়ে ওঠে সকল জীব, প্রাণী, গাছপালা প্রকৃতি। তারপরেই আকাশ জুড়ে ভেসে আসে ঘন মেঘ, প্রখরতাপে তপ্ত মাটি ভিজিয়ে নেমে আসে বৃষ্টি ধারা। দুই মাস ধরে চলা নিয়মিত বর্ষণে মাঠ ভরে ওঠে সবুজ শস্যে। গাছপালা প্রকৃতি পুষ্টি পায়, নদী নালা, খাল, বিল জলে ভরে ওঠে। এইভাবেই গড়ে উঠল ঋতুর ভাবনা। এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে প্রকৃতির পরিবর্তনগুলোও তাঁদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। তাঁরা বুঝতে শিখলেন বর্ষচক্র (Wheel of the year)। এই বর্ষচক্রর ধারণা থেকেই তাঁরা কৃষিকাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত, বীজ বপন থেকে ফসল তোলা - সমস্ত কাজের সঠিক সময় নির্দিষ্ট করে ফেললেন। তাঁরা নির্দিষ্ট করে ফেললেন মৃগয়া ও শিকার উৎসবের সময় শরৎ, ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উৎসবের সময়!

সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রদের পর্যবেক্ষণ করে, পক্ষ, মাস, ঋতু এবং বছরের হিসেব বুঝতে মানুষের কয়েক হাজার বছর লেগে গিয়েছিল। প্রাচীন যুগে খালি চোখে পর্যবেক্ষণের যে হিসেব, তার সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হিসেবে কিছু কিছু ভুল ভ্রান্তি ধরা পড়েছে, কিন্তু সেগুলো খুব একটা মারাত্মক নয়। সে কথায় পরে আসবো।

 

প্রাচীন যুগের মানুষেরা দিন ও রাতের হিসেব, সূর্যোদয় – সূর্যাস্ত – সূর্যোদয়, এই নিয়মেই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কৃষি, ও বাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানান বৃত্তি ও পেশার সৃষ্টি হল, তার সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামাজিক জটিলতা যতো বাড়তে লাগল, ততই সময়ের সূক্ষ্মতর পরিমাপ জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। প্রথম দিকে দিনও রাতকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হত, এভাবে - ভোর, সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যে, মধ্যরাত্রি, শেষরাত্রি। প্রাচীন ভারতে দিন ও রাতকে ৬০ ভাগে ভাগ করা হত, প্রত্যেকটি ভাগকে বলা হত ঘড়ি। দিন ও রাত প্রত্যেককে আবার চারটি প্রহরেও ভাগ করা হত। আমাদের আধুনিক যে নিয়মে দিন ও রাতকে পরিমাপ করা হয়, সেই ২৪ ঘন্টার নিয়মের সূত্রপাত করেছিলেন ব্যবিলনের বাসিন্দারা - ১৯০০-১৬৫০ বিসিইতে। ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা এবং ৬০ সেকেণ্ডে এক মিনিট – এই নিয়মও তাঁরাই শুরু করেছিলেন। 

 

সূর্যঘড়ি (Sun clock or Sun dial)

সব থেকে প্রাচীন ও সহজ যে সময় মাপার যন্ত্রের কথা জানা যায়, তার নাম সূর্য ঘড়ি। এই ঘড়ি সারা বিশ্বেই বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ছিল। সমতল মাটিতে একটি লম্বা খুঁটি পুঁতে, দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোয়, তার ছায়ার অবস্থান ও দৈর্ঘ থেকে সময়ের আন্দাজ পাওয়া যেত। তবে ঘড়ি হিসেবে সূর্যঘড়ির ব্যবহার সর্বপ্রথম মিশরে শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

মিশরের ভ্যালি অব কিংস থেকে পাওয়া প্রথম সূর্যঘড়ির নিদর্শন (১৫০০ বিসিই) - 


চিনের হান সাম্রাজ্যের সমসাময়িক সূর্যঘড়ি (৩০০ - ২০০ বিসিই)


 

ওপরের ছবিতে ইংল্যাণ্ডের সেন্ট মাইকেল’স মাউন্ট পাহাড়ে অবস্থিত দুর্গের প্রাচীরে রাখা মধ্যযুগের উন্নত সূর্যঘড়ি। মাঝের কোনাকুনি খাড়া করা খুঁটির ছায়া দেখে সময় বুঝতে কোন অসুবিধে হত না। 

সূর্য ঘড়ি পরিষ্কার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের পরিমাপ করতে খুবই উপযোগী ছিল, কিন্তু সমস্যা হত মেঘলা দিনগুলিতে। কারণ সূর্যের আলোয় ছায়া না হলে, এই ঘড়ি অচল! 

 

জলঘড়ি (Water Clock)

প্রাচীন মিশর সভ্যতায় প্রথম জলঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। এই ঘড়ি পরবর্তীকালে প্রাচীন গ্রীসেও বহুল ব্যবহৃত হত। নির্দিষ্ট আকারের একটি পাত্রের নিচের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে, পাত্রে ভরা জল যতক্ষণে খালি হয়ে যেত, সেই সময়কে একঘন্টা ধরা হতো। চিনের ঝাউ রাজাদের আমলে (মোটামুটি ২০০০ বিসিই) এই ধরনের ঘড়ি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।      

আমাদের দেশে প্রাচীনতম যে জলঘড়ির নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার নাম “ঘটিকা যন্ত্র”। ঘটিকা, ঘড়ি শব্দগুলির উৎপত্তি একই শব্দমূল থেকে। লক্ষ্য করে থাকবে আমরা আজও আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ পত্রে এবং পূজার নির্ঘন্টে “ঘটিকা” কথা ব্যবহার করে থাকি। প্রাচীন রাজাদের প্রাসাদে এই ঘটিকা যন্ত্রের প্রচলন ছিল। যে রাজকর্মচারীরা এই ঘড়ি ব্যবহার করে সময় ঘোষণা করত, তাদের বলা হত “ঘড়িয়ালি”। নিচের দিকে ছোট্ট ছিদ্রওয়ালা একটি খালি পাত্র, জলভরা একটি বড়ো পাত্রের মধ্যে রেখে দেওয়া হত। বড় পাত্রের জল, ছোট্ট ছিদ্রপথে ছোট পাত্রের ভেতরে ঢুকে, ছোট পাত্রটি জলে ভরে উঠে ডুবে গেলেই – নির্দিষ্ট সময়ের হিসেব পাওয়া যেত। পাত্রের আকার অনুযায়ী, সে সময়ের মাপ হত, কোথাও অর্ধ প্রহর, কোথাও পূর্ণ প্রহর। ঘড়িয়ালিরা ঘটিকা যন্ত্রের হিসেব অনুসারে, কাঠের হাতুড়ি দিয়ে উঁচুতে ঝোলানো কাঁসা বা পেতলের বড়ো ঘন্টা বাজিয়ে প্রাসাদের সকলকে প্রহর বা অর্ধপ্রহর সম্পর্কে অবহিত করত।

 

বালু ঘড়ি (Sand clock or Hour Clock)

বালু ঘড়িতে কিছু মিনিট অথবা ঘণ্টা খানেক সময়ের পরিমাপ করা চলত। এই ঘড়ির প্রথম কোথায় প্রচলন হয়েছিল বলা শক্ত, তবে মধ্য যুগের শুরুতে সারা বিশ্বেই এই ঘড়ির বহুল প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ছবিতে দেখানো দুটি কাচের ফানুস (Glass Bulbs), কাঠ বা সুদৃশ্য ধাতব ফ্রেমে বসানো থাকত। কাচের ফানুসদুটি মুখোমুখি জোড়া থাকত এবং তার মধ্যে থাকত খুব ছোট্ট একটি ছিদ্র। কাচের ফানুস বানানোর সময়েই তার মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে শুকনো দানাদার বালু ভরে দেওয়া হত। এবার ওপরের ফানুস থেকে সমস্ত বালু নিচের ফানুসে ঝরে পড়তে যে সময় লাগত, সেই সময়কেই ঘন্টা বা কয়েক মিনিটে পরিমাপ করা যেত। ওপরের ফানুসের বালি নিঃশেষ হয়ে গেলে, যন্ত্রটিকে উলটে বসিয়ে দিলেই, আবার চালু হয়ে যেত পরবর্তী সময়ের পরিমাপের জন্যে! 

    

বাতি ঘড়ি (Candle Clock)

চিনা কবি ইউ জিয়ানফুর (৫২০ সিই) কবিতায় প্রথম বাতি ঘড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। এই ঘড়ি বিশেষতঃ রাত্রের সময় পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হত। জাপানে এই ধরনের বাতি-ঘড়ির প্রচলন মোটামুটি দশম শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এই ঘড়িতে সারাদিনের জন্য সাধারণতঃ ছটি উৎকৃষ্ট মোমের বাতি ব্যবহার করা হত এবং প্রত্যেকটি বাতি চার ঘন্টা করে জ্বলত। প্রত্যেকটি বাতির আকার নির্দিষ্ট হত এবং তাতে বারোটি করে সমান ভাগ করা থাকত। এক একটি ভাগ পুড়তে সময় লাগত মোটামুটি কুড়ি মিনিট। বাতি জ্বালানোর পর পুরো যন্ত্রটিকে কাঠের ফ্রেম দিয়ে বানানো কাচের বাক্সে রেখে দেওয়া হত, যাতে বাইরের হাওয়া লেগে, মোমবাতি তাড়াতাড়ি না জ্বলে যায়।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নানা রকমের ঘড়ির প্রচলন ছিল। তার মধ্যে  দীপ-ঘড়ি (Oil-lamp clock), গন্ধ-ঘড়ি (Incense clock) উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশেও প্রাচীন কালে এই দুই ঘড়ির বহুল প্রচলন ছিল। বাতি ঘড়ির মোমের পরিবর্তে, দীপ ঘড়িতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হত এবং নির্দিষ্ট সলতে দিয়ে দীপ জ্বালানোর ফলে, তেলের পরিমাণ কমে যাওয়া অনুযায়ী সময়ের পরিমাপ করা হত!

             দীপ ঘড়ি                                              গন্ধ বা ধূপ ঘড়ি

গন্ধ ঘড়িকে সহজ ভাষায় ধূপ-ঘড়িও বলা যায়। চন্দন কাঠের গুঁড়ো, ধুনো, গুগ্‌গুল, রজন (Resin)-এর সঙ্গে মিশিয়ে লম্বা এবং মোটা কাঠি বানানো হত। সময়ের হিসেবের জন্যে সেই কাঠির গায়ে নির্দিষ্ট দাগ কেটে দেওয়া হত।       

পরবর্তী সময়ে সেই দাগের ওপর সুতোয় বাঁধা ছোট্ট ছোট্ট ধাতুর বল ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ধুপ পুড়তে পুড়তে এক একটি দাগে পৌঁছোলেই দাগের ওপর রাখা সুতো আগুনে পুড়ে যেত এবং ধাতব বলটি পড়ে যেত গন্ধ-ঘড়ির তলায় রাখা ধাতব থালায়। তাতে যে ঠং বা টুং শব্দ হতো তাতে ঘরের লোক সময় সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠত। 

পণ্ডিতেরা বলেন, এই ধূপ-ঘড়ির প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ভারতে এবং বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে এই ধুপ-ঘড়ির প্রযুক্তি তিব্বত ও চিনেও বহুল প্রচলিত হয়েছিল। বৌদ্ধ গুম্ফাতে আজও এই ধূপ-ঘড়ি ব্যবহার হয়ে থাকে, সময়ের পরিমাপ করার জন্যে ততটা নয়, বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপকরণ হিসেবে!

বাতি ঘড়ি কিংবা দীপ ঘড়ির থেকে ধূপ ঘড়ি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল, তার কারণ ঘরের মধ্যে বাতি বা দীপের আগুনের তুলনায় ধূপের আগুন অনেক নিরাপদ। উপরন্তু ধূপের পবিত্র গন্ধ দীর্ঘ সময়ের জন্যে, ঘরের পরিবেশকে বদলেও দিতে পারে।

এতক্ষণ যে ঘড়িগুলির কথা বললাম, তার মধ্যে ধূপ-ঘড়িটিই আমার খুব পছন্দের! কিন্তু এই ঘড়ির ভরসায় শেয়ালদা থেকে সন্ধে ৭-৪২ এর বনগাঁ লোকাল, অথবা দমদম থেকে সকাল ৬-১৫-র দিল্লির ফ্লাইট ধরা যাবে কি? মনে হয় না, সেক্ষেত্রে অন্য রকম ঘড়ি দরকার, সে সব ঘড়ির কথা বলবো পরের পর্বে।

চলবে...          

নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...