সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১২ "]

৫.৪.১.২ কৃষ্ণের ইন্দ্র বিরোধ

একবার রাম-কৃষ্ণ গোকুলে যাওয়ার পথে দেখলেন, গোপেরা ইন্দ্রযজ্ঞ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি পিতাকে এই যজ্ঞের কথা জিজ্ঞাসা করায় গোপরাজ নন্দ বললেন, “বৎস, ভগবান ইন্দ্র মেঘের দেবতা। বর্ষায় মেঘ থেকে তিনি বৃষ্টি দেন বলেই আমাদের ক্ষেত্র, নদী, সরোবর সরস হয়, আমাদের সমৃদ্ধি আসে। এই কারণেই আমরা দেবরাজ ইন্দ্রের প্রীতির জন্যে এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করি”। এর উত্তরে কৃষ্ণ যে কথাগুলি বললেন, সেগুলিকে বৈপ্লবিক বললেও কম বলা হয়। তিনি বললেন, “পিতা, নিজের কর্মবশেই জীব সুখ, দুঃখ, ভয় বা মঙ্গল ভোগ করে। যদি কর্মফল দাতা কোন ঈশ্বর থেকে থাকেন, তিনি কর্মকর্তাকেই সমর্থন করবেন। কারণ যে কোন কর্মই করে না, তাঁকে তিনি ফল দেবেন কী করে? চতুর্বণ অনুযায়ী কর্ম নির্দিষ্ট করা আছে। ব্রাহ্মণরা বেদপাঠ ইত্যাদি, ক্ষত্রিয়রা পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ, বৈশ্যরা বার্তা অর্থাৎ কৃষি-বাণিজ্য এবং শূদ্ররা তিনবর্ণের সেবা করে জীবিকা নির্বাহ করবে। বৈশ্যবৃত্তি চার ধরণের কৃষি, বাণিজ্য, গোরক্ষা ও কুসীদ[1]। এর মধ্যে আমরা গোপালন করে থাকি।

তাছাড়া সৃষ্টি, স্থিতি ও ধ্বংসের কারণ যথাক্রমে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ। মেঘরাজি রজোগুণে পরিচালিত হয়ে, বর্ষা ঘটায়, তার থেকে শস্যাদি উৎপন্ন হয় এবং মানুষ শস্য দিয়ে জীবনধারণ করে। এখানে ইন্দ্রের ভূমিকা কোথায়? আমরা বনবাসী, আমাদের নগর ও জনপদ কিছুই নেই। অতএব আমাদের কর্তব্য গো, ব্রাহ্মণ ও পর্বতের উদ্দেশে যজ্ঞ করা। পিতা, এই আমার অভিমত। আপনি যদি ভালো মনে করেন, তাহলে ইন্দ্রযজ্ঞ ছেড়ে এই যজ্ঞের অনুষ্ঠান করুন। এই যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের এবং আমারও অভিপ্রেত”। গোপরাজ নন্দ খুশি মনেই গো, ব্রাহ্মণ ও পর্বত যজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন।

ওদিকে স্বর্গে বসে ইন্দ্র শুনলেন, ব্রজে তাঁর যজ্ঞ স্থগিত হয়ে গেছে। তিনি কৃষ্ণ ও গোপরাজ নন্দের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে সংবর্তক নামের ভয়ংকর মেঘকে পাঠালেন, প্রবল বর্ষণ ও বজ্রপাতে ব্রজের গোষ্ঠকে প্লাবিত করার জন্যে। তিনি বললেন, “কৃষ্ণ কে? একজন সাধারণ মানব। সে অবিনীত, অজ্ঞ, বাচাল, বালকমাত্র। ঐশ্বর্যের অহংকারে গোপেরা উদ্ধত হয়ে, আমার অপ্রিয় আচরণ করল? সংবর্তক, যাও, তুমি গোপদের ঐশ্বর্য এবং তাদের পশু সম্পদ ধ্বংস করে এসো”।

সংবর্তকের প্রভাবে গোকুলে প্রবল ঝড়, ঝঞ্ঝা ও শিলাবৃষ্টি শুরু হল। প্রবল বর্ষণে নদীতে বন্যা দেখা দিল। কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, ইন্দ্রের যজ্ঞ না করাতে, ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তিনি নিজের হাতে গোবর্ধন পর্বত তুলে নিলেন এবং ব্রজবাসী সবাইকে বললেন, সমস্ত পশুদের নিয়ে, সেই পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিতে। ব্রজবাসীরা তাই করলেন এবং সাতদিন প্রবল বর্ষণের মধ্যে তাঁরা সকলেই নিরাপদে সেই পর্বতের অন্দরে বাস করলেন। সাতদিন ধরে গোবর্ধন পর্বতকে হাতে ধারণ করে থাকা শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভূত বিক্রমে ইন্দ্র হার মানলেন, তিনি বর্ষণে ক্ষান্ত হলেন। মেঘ সরে গিয়ে উজ্জ্বল সূর্যের উদয় হল। ব্রজবাসীরা গিরি কন্দর ছেড়ে বের হয়ে এলেন, শ্রীকৃষ্ণও গোবর্ধন পর্বতকে আবার যথাস্থানে স্থাপনা করলেন।

ইন্দ্র পূজা ছেড়ে, গো-ব্রাহ্মণের পূজা করার মধ্যে, ব্রাহ্মণ্যধর্মকে অবহেলা করে হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠা বলেই আমি মনে করি। হিন্দু ধর্মে ভগবান কৃষ্ণ-গোবিন্দের স্তবের মন্ত্রই হল “ওঁ ব্রহ্মণ্যদেবায়, গো-ব্রাহ্মণ হিতায় চ, জগদ্ধিতায় শ্রীকৃষ্ণায়, গোবিন্দায় নমোনমঃ”। আরও একটা বিষয়ে খটকা লাগে, দেবরাজ ইন্দ্র যখন শুনলেন, ব্রজবাসীরা তাঁর পূজা বন্ধ করেছেন এবং এর পিছনে আছেন কৃষ্ণ, তখন তিনি কৃষ্ণকে “অবিনীত, অজ্ঞ, বাচাল, বালক” বললেন কেন? দেবরাজ হয়েও তিনি কী জানতেন না, কৃষ্ণরূপে ভগবান বিষ্ণুই মর্তে আবির্ভূত হয়েছিলেন? পৃথিবীতে ধর্ম সংস্থাপনের জন্যে কৃষ্ণ হয়ে ভগবান বিষ্ণুর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই স্বর্গের দেবমহলে এর প্রস্তুতি হয়েছিল, শ্রীরামচন্দ্রের আবির্ভাবের পূর্বপ্রস্তুতির মতো। যেমন, ব্রজরাজ নন্দ, তাঁর দুই রাণি – রোহিণী ও যশোদা, বলরাম (যিনি বিষ্ণুর অংশ-অবতার) এবং ব্রজের সকল গোপ ও গোপীগণ স্বর্গ থেকে আবির্ভূত, তাঁরা কৃষ্ণের আগে জন্ম নিয়েছিলেন, শিশু ও বালক কৃষ্ণকে লালন-পালনের জন্য। রাজা কংসের চোখে ধুলো দিতে, কৃষ্ণের সঙ্গে একই সময়ে আবির্ভূতা হয়েছিলেন, দেবী যোগমায়া। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গের এই সব সংবাদ কিছুই জানতেন নাকেমন দেবরাজ তিনি? নাকি পুরাণকারেরা কাহিনী কল্পনার সময়, এই দিকটি খেয়াল রাখেননি? নাকি অনার্য বা হিন্দু দেবতার কাছে বৈদিক দেবরাজের লাঞ্ছনার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ভাবেই উপস্থাপিত করেছেন

 ৫.৪.১.৩ রাস উৎসব

মহিলা মহলে কৃষ্ণের আধিপত্য ছিল প্রবল। ব্রজের বয়স্থা মহিলাদের আদর্শ ছিলেন মা যশোদা, তাঁদের সকলেই দুরন্ত শিশু ও বাল-কৃষ্ণের দৌরাত্ম্য অনুভবের স্বপ্ন দেখতেন। বালক-কৃষ্ণের মুখ দর্শনেই তাঁদের কুচযুগ পয়স্বিনী হয়ে উঠত। আবার ব্রজের কিশোরী থেকে যুবতীরাও তাঁর দর্শন এবং স্পর্শ লাভের জন্যে ব্যাকুল। এমন কি বিবাহিতা রমণীরাও কৃষ্ণ প্রেমে উন্মাদিনী। তাঁদের এই গণ উন্মাদনার কারণ কৃষ্ণের রূপ, তাঁর অপ্রচলিত বেশভূষা, তাঁর অলৌকিক কীর্তির প্রবাদ এবং তাঁর মোহন-বাঁশির সুরের জাদু। সবার উপরে রয়েছে তাঁর কোমলে-কঠোর মেশা অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

মহিলা মহলে কৃষ্ণের এই গণ সম্মোহনকে ভাগবত শাস্ত্রে রাস-উৎসব, রাস-যাত্রা বা রাস-ক্রীড়া বলা হয়েছে। রাস শব্দের উৎপত্তি রস থেকে, আবার রাস শব্দের অর্থ শব্দ, ধ্বনি বা কোলাহল। অর্থাৎ রাস-উৎসব রসময় কোলাহল। 

সেদিন কার্তিকমাসের পূর্ণিমা তিথি। পূর্ণ চন্দ্র উদিত হয়েছে পূর্ব আকাশে। সামান্য হিমের পরশ লাগা স্নিগ্ধ বাতাস বহমান। যমুনার তীরে একাকী ভ্রমণ করতে করতে, কৃষ্ণ তাঁর বাঁশিতে তুললেন অদ্ভূত মোহন সুর। গোপপল্লীগুলিতে সেই মোহিনী সুরের মন-কাড়া জাদু বয়ে নিয়ে গেল হেমন্তের মনোরম বাতাস। নির্মেঘ  আকাশ প্লাবিত নির্মল জ্যোৎস্নায়। বাতাসে ভেসে আসা সূরমূর্ছনা, আকাশের মোহিনী আলোক গোপনারীদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করল। কেউ রান্না করছিলেন, কেউ শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছিলেন, কেউ স্বামীসেবা করছিলেন। যাঁর যা কিছু হাতের কাজ ফেলে, তাঁরা দৌড়ে চললেন যমুনার তীরে। তাঁদের পিতা, মাতা, স্বামী, পুত্র, ভ্রাতারা নিষেধ করলেন বারবার, কিন্তু ওই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাঁদের যে অন্য কোন উপায় নেই! তাঁরা সমবেত হলেন যমুনা পুলিনে।

বাঁকুড়া - বিষ্ণুপুরের শ্যামরাই মন্দিরের দেওয়ালে "রাসযাত্রা"-র টেরাকোটা মোটিফ। চিত্র - লেখক।  

সমবেত ব্রজবালাদের দেখে লীলাপুরুষ বললেন, “এত রাত্রে তোমরা এখানে কেন? তোমরা কী জানো না, নির্জন এই যমুনাতটে এখন নিশাচর পশুরা ঘুরে বেড়ায়? তোমরা এখনই ব্রজপল্লীতে ফিরে যাও, সেখানে তোমাদের মাতা-পিতা-পতি-ভ্রাতারা তোমাদের দেখতে না পেয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তোমাদের আচরণে বন্ধু ও আত্মীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করো না”। গোপললনারা কৃষ্ণের কথায় হতাশ হলেন, তাঁরা প্রণয়-অভিমানে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ স্মিতমুখে আবার বললেন, “তোমরা কি, যমুনার তীরে পূর্ণ-জ্যোৎস্নার শোভা দেখতে এসেছ? তাহলে বলি, দেখা তো হয়েছে, এবার গৃহে ফিরে যাও। হে কল্যাণি, তোমরাই গৃহের ঐশ্বর্য, তোমরা ঘরে ফিরে পতি, পিতা-মাতা-সন্তান-শিশুদের সেবায় মনোনিবেশ করো। হে কুলকামিনীগণ, আমার ধ্যান, চিন্তা বা আমার কথাতে যেমন প্রীতিবন্ধন হয়, আমার স্পর্শে তেমন হয় না। অতএব তোমরা এখনই ঘরে ফিরে যাও”।

গোপললনারা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, “হে প্রভো, এমন কঠিন কথা তোমার বলা উচিৎ হচ্ছে না। স্বামী-পুত্র-সংসার সব ছেড়েই আমরা তোমার কাছে এসেছি। তোমার সেবা করলেও স্বামী-পুত্রেরই সেবা হবে। আমাদের যে মন ও হাত এতদিন সংসারের কাজে সতত লিপ্ত ছিল, সেই মন ও হাত তুমি কেড়ে নিয়েছ। আমরা জেনেছি, তুমিই সেই আদি পুরুষ, যিনি দেবতাদের রক্ষা করেন, এখন এসেছ আমাদের ব্রজভূমির দুঃখনাশ করতে। আমরা তোমার কিংকরী, তোমার করকমল আমাদের তপ্ত স্তনে এবং মাথায় অর্পণ করো, আমাদের তৃপ্ত করো”। এর পর কৃষ্ণ মনোরম যমুনা পুলিনে গোপললনাদের আলিঙ্গন করলেন, তাঁদের হাতে, চুলে, উরুতে, কোমরে, স্তনে হাত রাখলেন। শতাধিক গোপরমণী তাঁর স্পর্শে মানিনী হয়ে উঠলেন। তাঁরা সকলেই নিজেকে জগতের শ্রেষ্ঠ নারী বলে মনে করলেন। গোপীদের এই গর্ব, অভিমান ও তূরীয় অবস্থা দেখে কৃষ্ণ সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

কৃষ্ণ অদৃশ্য হয়ে যেতে গোপ কামিনীরা তাঁর বিরহে অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁরা বনের তৃণ, গাছপালা, নদীর জল, বালুতট সকলের কাছে উন্মাদিনীর মতো, জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, তারা কৃষ্ণকে দেখেছে কিনা? তাঁদের মধ্যে কেউ নিজেই কৃষ্ণ হলেন, কেউ হলেন বৎসাসুর, কেউ হলেন পূতনা। তাঁরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় মত্তা হলেন। কেউ হামাগুড়ি দিয়ে বালকৃষ্ণের মতো আচরণ করতে লাগলেন। এক কথায় তাঁরা কৃষ্ণময় হয়ে নিজেদের মধ্যেই মত্ত হয়ে উঠলেন। এক সময়ে তাঁরা কৃষ্ণ বিরহে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে গান ধরলেন।

এই সময়েই হঠাৎ উপস্থিত হলেন কৃষ্ণ। তাঁর অকস্মাৎ আবির্ভাবে গোপললনাদের মধ্যে আনন্দের স্রোত বয়ে গেল, গোপরমণীদের অবসন্ন শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এল। তাঁরা সকলে কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে, মাঝখানে বসিয়ে, চারদিকে ঘিরে রাখলেন। একজন গোপকামিনী কৃষ্ণের প্রতি কটাক্ষ করে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে কৃষ্ণ, কেউ ভজনা করলে, তাঁকেও অন্য কেউ ভজনা করেন। আবার তাঁকে কেউই ভজনা করেন না। অথবা কেউই কাউকে ভজনা করেন না। হে সখে, এই ব্যাপারটা কেমন, আমাকে বুঝিয়ে দাও তো!”

কৃষ্ণ বললেন, “সখীরা, যাঁরা পরষ্পরের ভজনা করেন, তাঁরা স্বার্থের জন্যেই ভজনা করেন, সেখানে ধর্ম বা বন্ধুত্বের কোন উদ্দেশ্য থাকে না। যাঁরা ভজনা করেন না, অথচ তাঁদের যাঁরা ভজনা করেন, তাঁরা পিতামাতার মতো দয়ালু ও স্নেহ অনুসারে দুই প্রকারের ভজনা করেন। দয়ালু ভজনায় নিষ্কৃতি লাভ হয় এবং যাঁরা স্নেহময় হয়ে ভজনা করেন, তাঁরা বন্ধুত্ব লাভ করেন। দরিদ্র ব্যক্তি হঠাৎ ধন লাভ করে, সে ধন যদি হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে যেমন সর্বদা এই নিয়েই চিন্তায় মগ্ন থাকে, তেমনি তোমরাও সব ভুলে এতক্ষণ আমার চিন্তাতেই মগ্ন ছিলে। তোমরা গৃহের কঠিন শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমার কাছে এসেছ, এই মিলন অনিন্দনীয়। আমি তোমাদের এই উপকারের কোন প্রতিদান দিতে পারবো না। সুতরাং প্রত্যুপকার করে আমি অ-ঋণীও হতে পারলাম না, আমার ঋণ মোচনের একমাত্র সহায় তোমাদের এই প্রেমবন্ধন”।

গোপীরা ভগবান কৃষ্ণের এই সান্ত্বনা বাক্যে, বিরহের কথা ভুলে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন এবং তাঁরা পরমানন্দে নিজেদের হাতে হাত রেখে কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্য ও গীত শুরু করলেন। কৃষ্ণ-গোবিন্দ রমণীবেষ্টনে আবদ্ধ হয়ে রাসলীলা করতে লাগলেন। রাস-উৎসব শুরু হল। কৃষ্ণ প্রতি দুই জন গোপীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত দুই গোপীর কাঁধে রাখলেন। প্রত্যেক গোপ রমণীরই মনে হল, কৃষ্ণ তাঁর পাশেই আছেন, তাঁর কণ্ঠে হাত রেখে তাঁর মুখের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। এই রাস উৎসবে বিভোর হয়ে রইলেন গোপরমণীরা, তাঁদের সকলের অঙ্গেই কৃষ্ণের মোহন স্পর্শের অনুভব। রাত্রি শেষ প্রহরে কৃষ্ণের আদেশে তাঁরা যখন অনিচ্ছায় নিজ নিজ ঘরে ফিরলেন, কৃষ্ণ মায়ায় মোহিত ব্রজবাসীরা মনে করলেন, তাঁদের পত্নী, মা, ভগিনী ও কন্যারা সারারাত তাঁদের পাশেই ছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যভারত এবং মথুরার মতো বেশ কিছু অঞ্চলের পশুপালক অনার্য গোষ্ঠীদের মধ্যে কৃষ্ণ নামে এক বংশীধারী রাখাল বালক ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন এবং বালদেবতা হিসেবে পূজিত হতেন। মহিলা মহলে তাঁর প্রভাব ছিল ঈর্ষণীয়। সেই অনার্য কৃষ্ণের নানান প্রবাদ কাহিনীকে আরও রমণীয় এবং কামোদ্দীপক (erotic) করে তুলেছিলেন পুরাণকারেরা। হয়তো তাঁরা মনে করেছিলেন, ধর্মরসের মধ্যে কিছুটা দৈবী আদিরস সঞ্চার করলে, সাধারণ জনসমাজ কৃষ্ণ সম্পর্কে আরও কৌতূহলী হয়ে উঠবে, বাড়বে ভাগবত ধর্মের প্রভাব। আজকাল শেভিং ক্রিম অথবা পুরুষের বেনিয়ানের বিজ্ঞাপনে পুরুষের পাশে যেমন লাস্যময়ী তরুণী থাকেন, তেমনই এই দৃষ্টি-আকর্ষণী বিজ্ঞাপনটিও রচনা করেছিল পুরাণকার। সেকালে বিজ্ঞাপন-শিল্পে আমরা যে মোটেই পিছিয়ে ছিলাম না, এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।      

চলবে...



[1] কুসীদ মানে সুদ, কুসীদজীবী মানে যাঁরা সুদের বিনিময়ে ঋণ দেন, এখানে শ্রেষ্ঠী অর্থাৎ Banker।  


শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৯ 


২০

 

রাতের খাওয়ার সময় অন্যদিন শম্পাদিদির সঙ্গে তার দু চারটে কথা হয়, নিতান্তই সাংসারিক কথা। যেমন আগামীকাল দাদাবাবুর জন্যে কি কি রান্না করা যাবে, তার পরিকল্পনা। অথবা দাদাবাবু, আজকে নতুন সিলিণ্ডার চালু করলাম, কাল -পরশুর মধ্যে একটা গ্যাস বুক করে দিও। অথবা বাজারে কদিন ধরেই টাটকা মৌরলা উঠছে, কালকে ভাবছি আনব।

আজ সেরকম কোন কথা হল না, কারণ সন্ধ্যার আলাপের পর দুজনেই খুব গম্ভীর। দুজনের কেউই অতি তুচ্ছ সাংসারিক কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই।

অতএব রাতের খাওয়াদাওয়া সাঙ্গ হলে, রান্নাঘরের কাজ সেরে শম্পাদিদি বাড়ি যাওয়ার সময়, “আসছি, দাদাবাবু” বলার পর, সুনেত্র সদর দরজাটা বন্ধ করে বেশ নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলল। ভাবল, শম্পাদিদি তার জীবনের এমন অনেক সংবাদ জানে – যার অনেকটাই সে জানে না। সেই তথ্যগুলি কী, না জানা পর্যন্ত শম্পাদিদির সামনে দাঁড়াতে তার অস্বস্তি তো হবেই।

সুনেত্র টেবিলে বসে ল্যাপটপ চালু করল। কনি কি সারাদিনে আর কোন মেল লেখার সময় পেয়েছে? হ্যাঁ মেল করেছে...অধীর আগ্রহে সুনেত্র মেলটা খুলল –

সুনুদা,

সকাল এগারোটা নাগাদ বাবা-মায়ের সঙ্গে নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরলাম। সারাটা পথ মা বুকে করে জড়িয়ে রেখেছিলেন আমার পুত্রকে। খুব সুখী হয়ে ওঠার যথেষ্ট কারণ ছিল, সুনুদা। কিন্তু হইনি। মঞ্জরীম্যাডাম আমাকে মিষ্টি খাওয়ানোর আবদার করেছিলেন, আমার ‘প্রমোশন’ হওয়ার জন্যে। আমার মনে হল, আমার প্রমোশন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা আধাখেঁচড়া ধরনের। কারণ বাম্বাইয়ের বাবা ও তার দিকের সম্পর্কগুলো সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলছে। এবং সেই সময় আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি, সেই সুতোটুকু আমাকে ছিঁড়তেই হবে।            

 ওই দিন সন্ধের দিকে পিন্টুর বাবা এসেছিলেন। শুনেছি, যে কদিন আমি নার্সিং হোমে ছিলাম, উনি প্রতিদিনই বিকেলের দিকে ওখানে যেতেন। অপেক্ষা করতেন আমার বাবা-মায়ের জন্যে। ওঁদের থেকে আমাদের সব সংবাদ নিয়ে উনি বাড়ি ফিরতেন। ওই প্রথমদিন ছাড়া, উনি আর একদিনও আসেননি আমার সঙ্গে দেখা করতে।

উনি বাড়ি আসাতে, আমি হাল্কা অনুযোগের সুরে জিজ্ঞেস করলাম, “প্রথম দিনের পর, আমাদের দেখতে আর ওপরে যাননি কেন?”

“কোন মুখে যাবো বল দেখি, মা? তোর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে, তোদের দুজনের সব খবর রোজ নিয়েছি...কিন্তু যেতে পারিনি লজ্জায়। সেদিন পিন্টু আর ওর মা নীচেয় যে কেলেংকারিটা ঘটাল, তাতে তোর এবং তোর পরিবারের মাথাগুলো কতটা হেঁট হয়ে গেল, সে কি আমি বুঝিনি, মা?”

ঘরে বাবা আর আমি ছিলাম বাম্বাইকে নিয়ে। ওঁনার কথার কেউই কোন উত্তর দিতে পারলাম না, আমরা, চুপ করে রইলাম। উনিও অনেকক্ষণ চুপ করে বসেই রইলেন।

একটু পরে মা ঢুকলেন, দুটো সন্দেশ - দুটো সিঙাড়া আর চায়ের কাপ নিয়ে, মুখে হাসি নিয়ে বললেন, “বেয়াই মশাই, একটু চা খান। ওদের নিয়ে আজই বাড়ি এলাম তো...ওদের ঘর গোছগাছ করে, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সারতেই বেলা গড়িয়ে গেল, তাই আর ঘরে কিছু বানাতে পারিনি। আমি জানি বাইরের তেলেভাজা-টাজা আপনি খান না...তবু আজকে এছাড়া অন্য আর উপায় ছিল না”।

পিন্টুর বাবা, ম্লান হাসলেন, বললেন, “আজ সব খেয়ে নেব, বেয়ান, আপনি নিজে হাতে এনেছেন, আপনাদের ঘর আলো করে এসেছে আপনাদের নাতি...। এই আনন্দের দিনে ওটুকু অনিয়মে কিছু এসে যাবে না”।

মা আমাদের জন্যে এবং নিজের জন্যেও সিঙাড়ার প্লেট আর চায়ের কাপ নিয়ে এসে আমার পাশে বসে বললেন, “ও কথা বলছেন কেন? নাতি তো আপনারও। কিন্তু সিঙাড়াগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেলে, ভালো লাগবে না, বেয়াই মশাই, শুরু করুন”।

খুব সংকোচের সঙ্গে উনি খাওয়া শুরু করলেন। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “নাতি যে আমারও, সে কথা একশবার, বেয়ান। কিন্তু আমার পরিবার তার মাকেই যে সঠিক সম্মানে গ্রহণ করতে পারল না। নিজেকে ওই শিশুটির দাদু বলে দাবি করব, কোন অধিকারে”?

আমরা তিনজনেই কেউ কোন কথা বললাম না, ওঁর কথার উত্তরে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে উঠে পড়লেন ভদ্রলোক। করজোড়ে আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ তবে আসি? আমি কিন্তু মাঝে মধ্যেই তোদের বিরক্ত করতে চলে আসব, সুকু মা, আমার দাদুভাইকে একবার চোখের দেখা দেখতে...”।

উনি চলে গেলেন। আমরা তিনজনেই অনুভব করলাম, ওঁনার অসহায়তা।  

এর পাঁচ-ছদিন পরেই এক সকালবেলা, প্রভাতকাকু, বাবার এক অ্যাডভোকেট বন্ধু আমাদের বাড়ি এলেন। আমার পীড়া-পীড়িতে বাবাই ওঁনাকে ডেকেছিলেন। সাধারণ কথাবার্তার পর তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি সত্যিই ডিভোর্স চাইছ, সুকন্যা”।

আমি বললাম, “চাইছি, প্রভাতকাকু”।

“সব দিক ভেবেচিন্তে, মানে তোমার পুত্রের ভবিষ্যৎ, তোমাদের পরিবারের সুনাম, মানসম্মান...”।

“ভেবেছি”।

“কি জানো মা, একটা সম্পর্ক ভেঙে ফেলতে কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু গড়তে লাগে দীর্ঘ সময়...। আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী, সুকু মা? আজ নয় ছমাস-একবছর পর – দেশে আইন যখন আছে, তখন বিবাহ-বিচ্ছেদ তো যে কোন সময়েই করে ফেলা সম্ভব। কিন্তু একবার ভেঙে গেলে, সেটাকে জোড়া দেওয়া...”।

আমি কিছুটা রূঢ় স্বরেই বলে ফেললাম, “জোড়া দেওয়ার ভাবনা, আমি কোনদিনই ভাবতে যাবো না, কাকু”।

উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, “তোমার বাবার কাছে তোমাদের সব কথাই শুনেছি, মা। এবং একথা সত্যি, এই ঘটনার ভালো-মন্দ ব্যক্তিগতভাবে একলা তোমাকেই ভোগ করতে হয়েছে। আমাদের – এমন কি তোমার বাবা-মাকেও ভোগ করতে হয়নি। এবং একথাও সত্যি, এই জীবনটাও একলা তোমারই – আমরা কেউই তোমার সেই দৈনন্দিন জীবনের অংশীদার হতে পারব না। কিন্তু, তোমার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে, তুমি কি হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত, মা?”

“হ্যাঁ কাকু। হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট”।

“বারবার আমি জিজ্ঞেস করছি বলে, বিরক্ত হয়ো না, মা। রাগের মাথায় অনেক সময় ডিভোর্স কেস ফাইল তো হয়ে যায় – তারপর কোর্ট যখন উভয়পক্ষকে ডাকে... তখন, আমার অভিজ্ঞতায় বহুবার দেখেছি, কমপ্লেন্যান্টের মন অনেকটাই সফ্‌ট্‌ হয়ে যায়।  কেস চলাকালীন অপোনেন্ট সেটা বুঝতে পারলে, তাদের উকিল ব্যাপারটাকে বিশ্রীভাবে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করে..। তারা তোমার যাবতীয় অভিযোগকে মিথ্যা অপবাদ বলে, মানহানির অভিযোগ করতে পারে...। আমি কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছো মা? কোর্টে কেস যখন চলবে, অনেক আজে-বাজে, অপ্রাসঙ্গিক কুৎসা, তর্কবিতর্ক চলবে, সেসময় দৃঢ় থাকতে পারবে তো? তাতে তুমি এবং তোমার পরিবার হাস্যাস্পদ হয়ে উঠতে পারো...”।

একটু চিন্তা করে আমি বলেছিলাম, “আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে... আমি কোন ভাবেই সফ্‌ট্‌ হবো না, কাকু”।

আমার কথাশুনে প্রভাতকাকু তাঁর ফোল্ডার ফাইল থেকে একগোছা কাগজ বের করে বললেন, “বেশ, তবে তাই হোক। তুমি কি অ্যালিমনি ক্লেম করতে চাও?”

“না”।

“না কেন? এবার একটু ছেলেমানুষি করে ফেলছ, মা। তোমার একটা ভবিষ্যৎ আছে। তার থেকেও বড়ো বিষয় তুমি এখন আর একলাটি নও। তোমার ছেলেকে সুস্থভাবে বড়ো করে তোলা, তার লেখাপড়া...অনেক খরচ মা। তুমি যেখানে কোন ভাবেই আপোস করতে চাইছ না, সেখানে ওদের থেকে অ্যালিমনি ক্লেম করতে আপত্তি কোথায়?”

“আমি চাই না, একজন মাতালের পয়সায় আমি এবং আমার ছেলে বেঁচে থাকি...। ছেলে একটু বড়ো হলেই আমি যে কোন একটা কাজ জুটিয়ে নেব...তাতে আশা করি আমাদের দুজনের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে উঠবে না”।

মৃদু হেসে প্রভাতকাকু বললেন, “বেশ তাই হোক, তোমার যেমন ইচ্ছে...”। 

এভাবেই, সুনুদা, কেস ফাইল হয়ে গেল, এবং মোটামুটি মাস ছয়েকের মাথায় আমি ডিভোর্সও পেয়ে গেলাম নির্বিঘ্নে। আমার শাশুড়ি কিছুটা লড়াই দেওয়ার চেষ্টা করলেও, জ্যোতিষ এবং আমার শ্বশুরমশাই লড়ার কোনরকম চেষ্টাই করলেন না। আমি স্বস্তির শ্বাস ফেললাম ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে আরেকটা ঘটনা ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠল।

আমরা ডিভোর্স কেস রুজু করার দিন পনের পর, হঠাৎ জ্যোতিষের কোম্পানির মালিক, শশাঙ্ক মিত্র আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। তুমি তো দেখেছ শশাঙ্ককে, যথেষ্ট সুদর্শন, সুপুরুষ, বয়সে জ্যোতিষের তুলনায় চার-পাঁচ বছরের বড়ো। ওর থেকেই জানলাম শশাঙ্ক আর জ্যোতিষ একই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাস আউট, যদিও জ্যোতিষের তুলনায় ও পাঁচ বছরের সিনিয়ার।

শশাঙ্কর কোম্পানিটা ওর পৈতৃক কোম্পানি – কন্সট্রাকশনের ব্যবসা। বাংলা করে বললেন, ঠিকাদারি সংস্থা। ওর বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, সাধারণ গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরে কোম্পানিটাকে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। অতএব তাঁর ইচ্ছে, তাঁর বানিয়ে তোলা রাজ্যটাকে, তাঁর ইঞ্জিনিয়ার পুত্র সাম্রাজ্য বানিয়ে তুলুক। অতএব কলেজ থেকে বেরিয়ে শশাঙ্ক বাবার কোম্পানিতেই ঢুকেছিল। এবং সে জয়েন করার দশ বছরের মধ্যেই, সে নাকি তার বাবার কোম্পানির টার্নওভার এবং প্রফিট মার্জিন অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিল। সে সময় ওদের কোম্পানি নাকি কলকাতা ছাড়াও, দিল্লি এবং চেন্নাইতেও ব্র্যাঞ্চ অফিস খুলে ফেলেছিল। 

সে যাগ্‌গে, মিঃ মিত্র (মিঃ মিত্রই বলি, কারণ আমার জীবনে তার শশাঙ্ক হয়ে উঠতে বেশ কয়েকবছর পার হয়ে গিয়েছিল) একদিন আমাদের বাড়িতে উদয় হয়ে, নিজের পরিচয় দিয়ে, বাবা এবং আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। সব কথা বলে তোমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না, কিন্তু আলাপের শুরুটা তোমার জেনে রাখা ভালো। কেন সেকথা তুমি পরে বুঝতে পারবে। 

পরিচয় পর্ব শেষ হয়ে আলাপের শুরুতেই মিঃ মিত্র বললেন, “কলেজের ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে আমিই জ্যোতিষকে তুলেছিলাম। যেহেতু আমিও ওই কলেজেই পড়েছি, ওই কলেজের ছেলেদের ওপর আমার সর্বদাই একটা সফ্‌ট্‌ কর্নার ছিল, আজও আছে। আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে। কলেজে পড়তে, হস্টেলে থাকতে সকল ছাত্রই, বাড়ির বাইরে এসে কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে, এবং কমবেশি নেশা-ভাংও করে। সেটাকে আমরা খুব একটা  বড়ো ব্যাপার বলে ভাবি না। এবং আমরা এও দেখেছি সব ব্যাচেই কয়েকজন ছেলে অ্যাডিক্টেড হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ ছেলেই পাস করার পর, কর্মজগতে এসে অনেকটাই শুধরে যায়। জ্যোতিষকে যখন আমি সিলেক্ট করি, ওর মধ্যে অ্যাডিকশনের কোন লক্ষণ আমি বুঝতে পারিনি – অবশ্যই সেটা আমার ভুল।

লাস্ট সেমেস্টার পাস করে গেল জ্যোতিষ। কলেজ থেকে মার্কশীট এবং সার্টিফিকেট পেয়ে আমাদের অফিসে জমা করল এবং নিয়ম-মাফিক আমাদের কোম্পানিতে যথা সময়ে জয়েনও করে গেল। অবশ্য ইন্টারভিউয়ের সময়েই আমার প্রথম খটকা লেগেছিল ওর মার্কশীটের প্যাটার্ন দেখে। ফার্স্ট থেকে সেভেন্থ সেমেস্টার পর্যন্ত ওর নাম্বারগুলো ছিল কনসিস্ট্যান্টলি ডিক্লাইনিং। ইন্টারভিউতে ওকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম, এর কারণ কি? ও উত্তরে বলেছিল, ওর বাড়িতে নানান দুর্ঘটনা, মায়ের অসুস্থতা, বাবার চাকরি চলে যাওয়া...ইত্যাদি নানা কারণে ও খুব মানসিক উদ্বেগে ছিল, তাই রেজাল্ট ভালো হয়নি। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, এবং সিম্প্যাথেটিক হয়েও উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম, পাশ করে বেরিয়েই একটা জব এনশিয়োর করতে পারলে, ওর এই উদ্বেগটা নিশ্চয়ই কমবে। ইন্টারভিউয়ের পরে ওর লাস্ট সেমেস্টার ছিল প্রায় মাস তিনেক পরে। আমি ভেবেছিলাম এবং ওকে বলেওছিলাম, আশা করি তোমার লাস্ট সেমেস্টারের মার্কস যথেষ্ট ভালো হবে। জ্যোতিষ সেদিন কৃতজ্ঞ চোখে আমাকে কথাও দিয়েছিল, “আপনি যেভাবে আমাকে হেল্প করলেন, আমার ফাইন্যাল সেমেস্টারে আমি সবাইকে দেখিয়ে দেব”।

মিঃ মিত্র একটু থেমে মৃদু হেসে বলেছিলেন, “ও কথা রাখেনি। আমাদের কোম্পানিতে ওর জয়েন করার খবর যখন সবাই জেনে গেল। অনেকেই আমাকে বলেছিল, “শশাঙ্কদা, আপনি আর ছেলে পেলেন না, শেষ পর্যন্ত জ্যোতিকে”? ওর থেকে এক, দুই বা তিন বছরের সিনিয়র ছাত্রদের কয়েকজন আমাদের সঙ্গেই রয়েছে, দে আর ফেয়ার এনাফ, অ্যান্ড উই আর রিয়্যালি হ্যাপি হ্যাভিং দেয়ার সিনিসিয়ার সার্ভিসেস টিল দিস ডেট – তারাই বলল। এমনকি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন এবং আমাদের বিজ্‌নেসের ব্যাপারে খুবই সাহায্য করেন, কলেজের এমন কয়েকজন প্রফেসরও আমাকে একই কথা বলেছিলেন। ভুলটা বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু তখনই কোন উপায় ছিল না, কারণ একজনকে অ্যাপয়েন্ট করার কয়েকদিনের মধ্যেই, উইদাউট এনি ভ্যালিড রিজ্‌ন্‌, তাকে ডিসমিস করলে, আমার এবং কোম্পানির বদনাম হয়ে যেত। সে সময় ওকে আলাদা ডেকে এই সব কথাই বলেছিলাম। জ্যোতিষ আমাকে কথাও দিয়েছিল, ও শুধরে যাবে। কিন্তু ও কথা রাখেনি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম ও কথা রাখে না”।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন মিঃ মিত্র। আমরা কেউই এতক্ষণ কোন কথা বলিনি। বাবা উদাস চোখে তাকিয়ে ছিলেন জানালার বাইরে, আর আমি মেঝের দিকে। 

চলবে...


শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

 উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধ ঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনের মাধ্যমে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]       


বারোই জুলাই, ২০২৬ শনিবার  

শনিবার সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ উঠে অহীন দাঁত ব্রাশ করছিল, বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সামনের বাগানে প্রচুর ফুল এসেছে। নয়নতারা, টগর, রঙ্গন, সূর্যমুখী, দোপাটি – কেউই তেমন নামকরা ফুল নয়। কিন্তু সজীব সবুজ পাতার সঙ্গে সদ্যফোটা ফুলের ঔজ্জ্বল্যে চোখ এবং মন ভরে ওঠে। খুব মন দিয়ে দেখছিল অহীন, পিছনে এসে দাঁড়ালেন অহীনের বাবা নবীনবাবু, তাঁর হাতে চায়ের কাপ। ছেলেকে ব্রাশ করতে দেখে বললেন, “এতক্ষণে উঠলি? রাত করে শুবি, তারপর বেলা করে উঠবি”।

মুখে ফেনা নিয়েও অহীন হেসে ফেলল, মুখটা ওপর দিকে তুলে বলল, “সকাল সাড়ে ছটাও তোমার কাছে বেলা হয়ে গেল, বাবা?”

নবীনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “মুখে ফেনা নিয়ে বক বক করিস না, যা চট করে মুখটা ধুয়ে আয়। বাবা আজ সকালে মিটিং ডেকেছেন, ভুলে গেলি? গতকাল রাত্রে আমাকে বললেন, আমরা সবাই মিলে, ওঁনার ঘরে যেন যাই, আজ ঠিক সকাল ছটায়। তোর জন্যে দেরি হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে এখন আমাকে বকা খেতে হবে”।

অহীন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাল, বলল, “পি, প্যাপা পও পো?” কথাটা, কি ব্যাপার বলো তো? কিন্তু মুখভরা পেস্টের ফেনা নিয়ে প-বর্গের আদ্যাক্ষর ছাড়া কিছুই বোঝা গেল না। নবীনবাবু এবার বিরক্ত হলেন, বললেন, “প-প না করে মুখটা ধুয়ে আয় না, তাড়াতাড়ি”। অহীন কথা না বাড়িয়ে বেসিনের দিকে গেল, নবীনবাবু ছেলেকে বললেন, “আমি বাবার ঘরে যাচ্ছি, মুখ ধুয়ে বৌমার থেকে চা নিয়ে তুই তোর মা, আর বৌমাকে নিয়ে সোজা চলে আসবি”। অহীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

মুখটুক ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মা আর বৌদির সঙ্গে দাদুর ঘরে ঢুকল অহীন। ঠাকুমা ঘরেই ছিলেন, বিছানায় বসেছিলেন তাঁর পাশে অহীনের মা আর বৌদি গিয়ে বসলেন, অহীন বসল বাবার পাশে সোফায়, দাদুর উল্টোদিকে।

প্রবীণবাবু পুত্র নবীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ ১২ই জুলাই। আর ঠিক সাতদিন পর, আমার ছোটকা, তোর ছোড়দাদু অবিনের সমাধি ভঙ্গ এবং জাগরণ দিবস, মনে আছে?”

অহীন আকাশ থেকে পড়ল, ছোটবেলা থেকে সে মা-দাদু-ঠাকুমার কাছে শুনেছে বটে। ঠাকুরদাদার ছোটকাকা তাদের প্রাচীন বাড়ির কোন এক পাতালঘরে নাকি বন্দী হয়ে বহুদিন ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন আছেন। সেই ছোড়- প্রপিতামহর একশ বছর পূর্ণ হলেই তিনি আবার নাকি ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন। কথাটা সে মোটেই বিশ্বাস করেনি। এমন আবার হয় নাকি? আজগুবি গল্প বলেই, সে মন থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা। কিন্তু আজ সাতসকালে তার দাদুর মুখে সে কথাটা শুনে সে বেশ তাজ্জব হয়ে গেল। দাদু তার মানে এ কথাটা বিশ্বাস করেন শুধু নয়, সেই দিনটি তিনি সিরিয়াসলি মনেও রেখেছেন! অহীন কিছু বলল না, দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

নবীনবাবু মুচকি হেসে বললেন, “ওসব কথা এখনও তুমি মনে করে রেখে দিয়েছ, বাবা? ওসব কথা কি আর সত্যি? স্বদেশী করা ছোটদাদু হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন বলে, ও রকম একটা গুজব রটেছিল। অনেককে তো বলতে শুনেছি, ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ তাঁকে মেরে ফেলেছিল। আবার কেউ কেউ বলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সুদূর হিমালয়ে চলে গেছিলেন – পরে সেখানেই দেহরক্ষা করেছেন”।

প্রবীণবাবু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পুত্রের কথা শুনছিলেন, কথা শেষ হতে বেশ রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি চিরকালই পরের মুখে ঝাল খেতে ভালোবাস। বাবা-মা, গুরুজনদের কথা কোনদিনই তোমার কানে ঢোকেনি আর কোনদিন ঢুকবেও না। নিজের চোখে আমি যা দেখেছি, তুমি তাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চাও?”

ব্যাপারটা বেশ রাগারাগির দিকে চলে যাচ্ছে দেখে, আর দাদুর কাছে নিজের বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে অহীনের খুব খারাপ লাগছিল। সে বলল, “দাদু তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”

প্রবীণবাবু নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “একরকম ভাবে নিজের চোখেই দেখা বলতে পার। তবে আমাকে কি আর সেই পাতালঘরে কেউ ঢুকতে দিয়েছিল? আমি যে তখন বছর সাতেকের বালক মাত্র!”

অহীন খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “পুরো ঘটনাটা বলো না, দাদু। ঠাকুমার কাছে ছোটবেলায় শুনেছিলাম, মনে নেই তেমন”।

নাতির আগ্রহে প্রবীণবাবু খুশিই হলেন। পাশের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।  হয়তো পুরোনো সেই সব দিনের স্মৃতিগুলি তিনি মনের মধ্যে গুছিয়ে তুলছিলেন।  তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন।

“১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। আর যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি, সে ঘটনা ঘটেছিল তেতাল্লিশ সালে। আমার ছোটকা তখন বছর সতেরর টগবগে তরুণ, আর আমার বয়স সাত। আমার বাবা এবং আমার দাদু দুজনেই ছিলেন জাঁদরেল সরকারি অফিসার। অবিশ্যি দাদুকে আমার মনে পড়ে না। কারণ তিনি যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন দেড় কি দু বছর। গোরা সায়েবদের সঙ্গে তাঁদের বেশ ভালই দহরম-মহরম ছিলআরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, ওই রকম সাহেবঘেঁষা পরিবারের ছেলেদের অনেকেই কেমন করে  যে স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন, কে জানে? আমার মেজকা, সেজকা দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মেজকা পুলিশের গুলিতে মারা যান তাঁর ছাব্বিশ বছর বয়সে। কাকিমা চার বছরে মেয়ে আর দুবছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন।  আর সেজকা নিরুদ্দেশ হয়ে যান ঊণিশ বছর বয়সে। তার পর থেকে তাঁর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। দুই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, এক সময় ছোটকাও স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিল

তবে বড়ো হয়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বিশাল পরিবারের সব ঠাট-বাট বজায় রাখতে গিয়ে আমার বাবাকে বাধ্য হয়েই ব্রিটিশদের গোলামি করতে হয়েছিল। সায়েবদের সঙ্গে কিছুটা আমড়াগাছিও যে করতেন না, তা নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁর মনে কোথাও একটা প্রশ্রয় এবং সহানুভূতি ছিল। আর সেই কারণেই, স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে মেতে ওঠা ছোটভাইদের তিনি কোনদিনই তেমন কঠোরভাবে নিষেধ করেননি।

বিয়াল্লিশ সালে মহাত্মাজির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছিল। শিক্ষিত যুবক এবং ছোকরারা দলে দলে স্বদেশী বিপ্লবে নাম লেখাল। ছোটকাও সে দলে ভিড়ে গেল আর কিছুদিনের মধ্যেই তার নাম জড়িয়ে গেল একটি ডাকাতির কেসে। ছোটকা হয়ে গেল স্বদেশী ডাকাত”।

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “স্বদেশী ডাকাত মানে?”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রবীণবাবু বললে, “দেখ বাপু, বিপ্লব, আন্দোলন কিংবা সংগ্রাম যাই বলো না কেন – একটা সংগঠন গড়ে, ছেলেপুলেদের শিখিয়ে পড়িয়ে দেশের কাজে নামাতে গেলে, অনেক খরচা আছে। এসবের জন্যে ভাল রকম টাকাকড়ির যোগাড় রাখতে হয়। বিশেষ করে সে আন্দোলন যদি আবার সশস্ত্র সংগ্রাম হয়। টাকা ছাড়া বন্দুক, গোলাগুলি, বোমা বানানোর সরঞ্জাম কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও সাধারণ খরচ-খরচাও তো কম নয়। এদিক-সেদিক যেতে আসতে ট্রেনের ভাড়া, লঞ্চের ভাড়া, খেয়ার পারানি, খাইখরচ

কিছু কিছু ধনী মানুষ – শুনেছি আমার বাবাও - সে সময় গোপনে দান-টান করতেন ঠিকই, কিন্তু সে টাকায় সংকুলান হত না। অতএব ডাকাতি করতে হত। কোন কৃপণ দেশীয় বড়োলোক মহাজনের বাড়িতে হোক, কিংবা পোস্ট অফিস বা সরকারি ট্রেজারিই হোক।

সরকারি ট্রেজারি লুঠ করার ভয়ংকর ঝুঁকি ছিল ঠিকই। কিন্তু করতে পারলে, অনেক দিক থেকেই লাভ হত। এক, টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। দুই, গোরা প্রশাসনের মুখে ঝামা ঘষে তাদের ওপরে বেশ একটা চাপ সৃষ্টি করা যেত। এবং তিন, এই ধরনের কাজ দু চারটে ঠিকঠাক করতে পারলে, স্বদেশী করা ছেলেদের মনোবল বাড়িয়ে তোলা যেত। নতুন নতুন তরুণ এবং যুবকদের স্বদেশী দলে টানা সহজ হত। অতএব যারা এই ধরনের লুঠপাটের কাজ করত তাদেরকে “স্বদেশী ডাকাত” বলা হত”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কারা বলত? নিশ্চয়ই ব্রিটিশরা এবং তাদের ধামাধরা ভারতীয় অফিসাররা?”

প্রবীণবাবু হাসলেন, বললেন, “ইংরেজরা তাদের এক্সট্রিমিস্ট বলেছে, টেররিস্ট বলেছে। তারা ওসব বলতেই পারে, কারণ তাদের ট্রেজারি লুঠ হলে, তাদের গায়েই তো সব থেকে বেশী জ্বালা ধরত। কিন্তু “স্বদেশী ডাকাত” নামটা দিয়েছিল দেশীয় সাধারণ মানুষরাই! যারা বিশ্বাস করত সায়েবরা হল রাজার জাত, আর আমরা সবাই মহারাণির প্রজা। তাদের কাছে আমরা কৃপা বা করুণা ভিক্ষা করতে পারি। ইংল্যাণ্ডে রাণির কাছে দরবার করতে পারি। তা না করে, গোরাদের কোষাগার লুঠ করা, সায়েবদের পেটানো বা খুন করে ফেলা। এ সবই সাধারণ মানুষদের চোখে ঘোরতর অন্যায় মনে হত। তারা বলত, যারা এসব করে, তারা স্বদেশী আন্দোলনের নামে আসলে ডাকাতি করছে”।

প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, আবার বললেন, “সাতচল্লিশে ভারত যখন স্বাধীন হল, আমার বয়স তখন এগারো বা সাড়ে এগারো। তখন দেখেছিলাম, স্বাধীনতার উৎসবে ওই সাধারণ মানুষগুলোই সব থেকে বেশি নাচানাচি শুরু করেছিল। পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে তখন প্রত্যেকটি লোকই নিজেদের “স্বাধীনতা-সংগ্রামী” ঘোষণা করে দিয়েছিল। পাড়ার কুকুর-বেড়ালগুলো নেহাত অবলা নাহলে তারাও বলে উঠত “জয় হিন্দ”। আর এই ডামাডোলের সুযোগেই, রাতারাতি গজিয়ে উঠল অনেক ডান ও বাম নেতা, যারা কোনদিন স্বদেশী তো করেইনি, বরং বহুক্ষেত্রে তারা স্বদেশীদের ঢিট করতে ব্রিটিশ পুলিশকে সাহায্য করেছিল। এবং তারাই স্বাধীনতা অর্জনের সমস্ত গৌরবটা চেঁটেপুটে খেল”।  

অহীন বলল, “প্রকৃত স্বদেশী নেতারা এসব মেনে নিলেন কেন?”

প্রবীণবাবু বিষণ্ণ হাসলেন, বললেন, “কী জানো দাদুভাই। স্বদেশীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করা। স্বাধীনতার জন্যে তাদের সকলের মনে ছিল আশ্চর্য এক আবেগ আর আদর্শ। তাঁরা তো কেউ নেতা হয়ে নিজের আখের গোছানোর কথা চিন্তা করেননি। তাছাড়া আগেই যে বললাম, সাধারণ জনগণ এই স্বদেশী কর্মীদের আবেগটা কোনদিন বুঝতেই পারেনি। স্বদেশীরা ডাকাতি করে, সায়েবদের বোমা মারে। দলে দলে মিছিল করেজেলে যায়, জেল থেকে অসুস্থ হয়ে ফেরে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তারা পুলিশের নজরে থাকে। এই সব লোকের সংস্রব সাধারণ মানুষ কোন ভরসায় রাখবে? তার থেকে, যাদের সঙ্গে থানার কিংবা প্রশাসনের অফিসারদের নিত্য ওঠাবসা, সেই সব মুরুব্বি-মাতব্বর নেতাদের তারা দিব্যি বুঝতে পারত। তাদের মান্যিগণ্যি করে কৃতার্থ হত।

স্বাধীনতার পর প্রশাসনের ব্রিটিশকর্তারা তো চলে গেল, কিন্তু দেশীয় অফিসাররা? যারা এতদিন ব্রিটিশ সরকারের হয়ে কাজ করছিল, স্বাধীন ভারতে তারাই তো হয়ে উঠল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা! তারাই বা স্বদেশী করা নেতাদের ভরসা করবে কোন মুখে? স্বাধীনতার কয়েকদিন আগেও তো তারা ওই স্বদেশী নেতাদের থানায় ধরে এনে উত্তম-মধ্যম ঠেঙিয়েছে! রাতবিরেতে তাদের গ্রেফতার করতে গিয়ে বাড়ির মা-বোনদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে! দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে, সেই অফিসারদের পক্ষে, রাতারাতি সেই সব স্বদেশী নেতাদের “স্যার, স্যার” বলা সম্ভব? আমলারা যতই আমড়াগাছির চেষ্টা করুক না, তেলে-জলে কোনদিন মিশ খায়?      

বরং এতদিন যাদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা ছিল। যাদের হাত থেকে তারা নিয়মিত ডুডুও খেত, তামুকও খেত।  সেই সব মাতব্বরদের সাহায্য করাই তাদের পক্ষে তখন অনেক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠল! অতএব বলা যায় স্বাধীনতার পরদিন থেকেই প্রশাসন আর ধান্দাবাজ নেতা ও বণিকদের মধ্যে গড়ে উঠল নিখুঁত আদান-প্রদানের সখ্যতা। দু পাঁচজন ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সামিল। আর স্বদেশী করা, পুলিশের মার খাওয়া, জেলখাটা বিপ্লবের নেতারা হয়ে উঠলেন অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের তাম্রফলক আর সাম্মানিক শংসাপত্র দিয়ে। অনেক দুস্থ সংগ্রামীকে মাসিক ভাতা-টাতা দিয়ে, আসলে দূরে ঠেলে দেওয়া হল।

অহীন গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝলাম”।

গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদু বললেন, “যাগ্‌গে, সে সব কথা এখন থাক, ছোটকার কথায় ফিরে আসি। যে স্বদেশীরা আমাদের জেলার ট্রেজারি লুঠ করেছিল, শুনেছি সেই দলে ছোটকাও ছিল। ওই ঘটনায় নাকি দুজন দেশীয় সেপাই মারা গিয়েছিল এবং এক গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। যার ফলে, পুলিশের দল ঘেয়ো কুকুরের মতো খুঁজতে বের হল স্বদেশী ডাকাতদের ধরতে। ছোটকার নামে অনেক কিছু শুনেছিলাম। ছোটকার কাছে নাকি দেশি পিস্তল ছিল আর সেই পিস্তলের গুলিতেই নাকি ওই গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। অতএব, ছোটকা ধরা পড়লে ফাঁসি না হলেও, দ্বীপান্তর-বাস ছিল বাঁধা”।

“দ্বীপান্তর মানে – আন্দামান? সেলুলার জেল?”

“সেলুলার জেল। এই খবরে আমার ঠাকুমা তো ভেঙে পড়লেন। এর আগেই তিনি দুটি ছেলেকে হারিয়েছেন। এবার ছোট ছেলের শোকে তিনি নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন সব কিছু যে বুঝতে পেরেছিলাম, তা নয়। তবে বাড়িতে বড়োদের সবার আচরণেই ভয়ানক দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের লক্ষণগুলো বুঝতে পারছিলাম। এই সময়েই এক দুপুরে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন, দাদু ও ঠাকুমার গুরুদেব, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ। তাঁর কাছে আমার বাবা-মাও দীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং সকলেই তাঁকে সাক্ষাৎ শিবজ্ঞানে ভক্তি করতেন।

ঠাকুর সিদ্ধানন্দ আমার ঠাকুমা আর মায়ের কাছে সব শুনে বললেন, “কিচ্‌ছু চিন্তা করিস না, মা। সন্ধে বেলা বড়োখোকা সুধীন সেরেস্তা থেকে ফিরলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস”। তখনকার দিনের মানুষরা যে কোন সরকারি দপ্তরকেই সেরেস্তা বলতেন। আর আমার বাবা হলেন বড়োখোকা - বাড়ির বড়ো ছেলে।

বাবা অফিস থেকে ফিরে অফিসের ধরাচূড়ো না ছেড়েই সোজা গেলেন গুরুদেবের ঘরে। বাবা আর ঠাকুমা ছাড়া সে সময় তিনি কাউকেই ঘরে থাকতে দিলেন না। কাজেই তাঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হল, বাড়ির আর কেউ জানতে পারলেন না।

তবে বড়ো হয়ে শুনেছি। ছোটকা সে সময় কোন গোপন জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিল। সে জায়গার হদিশ বাবা নাকি খুব ভাল করেই জানতেন। অতএব গুরুদেবের সঙ্গে কথাবার্তার পরেই, তিনি সেই সন্ধেতেই অফিসের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, ম্যজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করতে। গোপনীয়তার জন্যে, তাঁর গাড়ির ড্রাইভার বলাইকাকুকেও সঙ্গে নিলেন না বাবা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে গেলেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করে বাবা নাকি কথা দিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং এরপরে অবিন কোনভাবেই কোন স্বদেশী দলের সঙ্গে সংস্রব রাখবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে যেন অন্ততঃ চব্বিশ ঘন্টা সময় দেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলেন এবং কথাও দিয়েছিলেন। তারপর বাবা ছোটভাইকে তার গোপন ডেরা থেকে তুলে আনতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।   

ওদিকে ঠাকুমা আর আমার মা ঠাকুরঘরে জপ করতে বসলেন। অন্যদিকে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ তাঁর দুই সেবক শিষ্যকে নিয়ে যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরের দরজায় খিল দিয়ে যোগাড়-যন্ত্র শুরু করলেন। সারা বাড়ি তখন উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তায় থমথম করছে। আমরা ছোটরা অর্থাৎ আমরা চার ভাইবোন এবং খুড়তুতো ভাই-বোনরাও সবাই সেদিন অবস্থা বুঝে পড়ার ঘরে চুপটি করে বই খুলে বসে পড়লাম। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম ফিসফিস করে। এটুকু বুঝেছিলাম, সেদিন বড়োদের বিরক্ত করলে আমাদের পিঠ বাঁচাতে ঠাকুমা আসতে পারবেন না।

সেদিন রাত প্রায় সাড়ে নটা নাগাদ, বাবা বাড়ি ফিরলেন। তাঁর পিছনে পিছনে এল একজন লোক। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার কালো চাদরে ঢাকা। চেনবার কোন জো ছিল না। আমরা সবাই গাড়ির শব্দ পেয়ে কৌতূহলে দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারলাম না। লোকটিকে নিয়ে বাবা সোজা গুরুদেবের ঘরের বন্ধ দরজায় দুবার টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “গুরুদেব, আমরা এসেছি”। গুরুদেবের ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক হল এবং কালো কাপড় পরা লোকটিকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ বললেন, “তোমাকে এখন আর দরকার নেই, সুধীন। দুশ্চিন্তা করো না। খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম কর। রাত সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ আমিই তোমাদের ডাকব। তার আগে কেউ যেন আমাদের বিরক্ত না করে”।

বাবা দোতলায় গিয়ে মা আর ঠাকুমার সঙ্গে চাপাস্বরে কিছুক্ষণ কথা বললেন, তারপর বললেন “সকলকে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে বল। গুরুদেবকে এখন বিরক্ত করা যাবে না, তাঁর কাজ শেষ হলে তিনিই আমাদের ডাকবেন”। এতক্ষণ গোটা বাড়িতে কিছুটা হলেও যেন প্রাণ ফিরল। মা-মেজকাকিমা, পিসিমারা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কাজের মাসি, রান্নার ঠাকু্ররাও চঞ্চল হয়ে উঠল। সদর দরজায় তালা পড়ে গেল। পালোয়ান সুভগরাম – আমাদের দারোয়ান - অন্যদিন শোয়ার আগে রামসীতার ভজন গাইত, সেদিন একদম নিস্তব্ধ। আমরা ছোটরাও কাকিমার তত্ত্বাবধানে চুপচাপ খেয়ে উঠে ঠাকুমার ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, ঠাকুমা কখন তাঁর কাজ সেরে ঘরে ফিরবেন। তখন কিছু খবর অন্ততঃ পাওয়া যাবে।

তা কিন্তু হল না। অপেক্ষা করতে করতে কখন আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। ঠাকুমার ডাকে আমাদের যখন ঘুম ভাঙল তখন ভোর। দেখলাম প্রত্যেকদিনের মতোই তিনি স্নান সেরে ফেলেছেন। তাঁর হাতে ফুলের সাজি - পুজোয় বসার আগে আমাদের ডাকতে এসেছেন।

ঘুম থেকে উঠে আমরা গোটা বাড়িটাই এক চক্কর ঘুরে এলাম। চার জন মানুষের কোন সন্ধান পেলাম না। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ও তাঁর দুই শিষ্য এবং কালো চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা সেই লোকটি। বলা বাহুল্য সেই লোকটিই আমার ছোটকা”।


চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/১৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...