বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের একাদশ পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব 


২৫

 

মন্ত্রণাকক্ষে নিজের আসনে বসার পরেও মহামন্ত্রী বিমোহন মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলেন, আসলে এই মন্ত্রণা কক্ষে অকস্মাৎ সকলকে আমন্ত্রণ করার কী কারণ তিনি জানেন না! কী বিষয়ের মন্ত্রণা সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন। মহর্ষি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, মন্ত্রণার কাজ শুরু করুন, আপনি কী আর কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”

“না মহর্ষি, এখানে সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। এই বিশেষ সভার আহ্বায়ক আপনি, অতএব আপনার শুরু করাই সমীচীন”। 

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি উত্তম। তবে তাই হোক”। তারপর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আপনাদের সকলকেই আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদন জানানোর পর আমি এই বলতে চাই যে, রাজাবেণের আকস্মিক অসুস্থতায় আমাদের রাজ্য যে গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, সে কথা আপনারা সকলেই অবগত আছেন। কিছুদিন আগে রাজসভার এক মন্ত্রণায় আমরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যতদিন রাজাবেণ সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন রাজমাতা আপনাদের আন্তরিক সহায়তায় রাজ্যের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করবেন!”

উপস্থিত মন্ত্রীমণ্ডলী একবাক্যে সমর্থন করল, “হ্যাঁ মহর্ষি, এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল”। মহামন্ত্রী বিমোহন কিছু বললেন না, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির দিকে।

“আজ রাজাবেণ ও রাজমাতার সন্দর্শনে গিয়েছিলাম, দেখলাম, রাজাবেণ অনেকটাই সুস্থ, তাঁর প্রাণসংশয় আর নেই! কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, তিনি জীবিত হয়েও পুত্তলিবৎ জড় হয়ে গেছেন! তাঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!” 

সকলে একই সঙ্গে বলল, “সে অত্যন্ত বেদনার কথা আমরা সকলেই শুনেছি, মহর্ষি”!

“রাজাবেণের এই অসুস্থতায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি, কিন্তু আশা ছাড়িনি। রাজমাতাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করবো, সেখানে যবন, ম্লেচ্ছ কিংবা চৈনিক প্রাজ্ঞ চিকিৎসকদের সাহায্য নেব, রাজা বেণের এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিকার করার যথাসাধ্য প্রয়াস করব!” 

এক যোগে সবাই উচ্ছ্বসিত উত্তর দিল, “সাধু সাধু, মহর্ষি, অত্যন্ত সাধু প্রস্তাব। এই কাজে আপনিই এই রাজ্যের যোগ্যতম”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “এ বিষয়ে আপনাদের মনে কোন দ্বিধা নেই তো? এই প্রস্তাবে আপনারা সকলেই সম্মত?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই প্রশ্ন কেন করলেন, মহর্ষি? আপনার এই প্রস্তাবে সর্বসম্মত না হওয়ার কোন কারণ তো ঘটেনি!” 

মহর্ষি ভৃগু তাঁর দিকে এবং অন্য সকলের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “সে কথায় পরে আসছি, বৎস বৃহচ্চারু। এখন দ্বিতীয় যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, সে কথায় আসি। তরুণ পুত্রের এই নিদারুণ অসুস্থতা, দিনের পর দিন চোখের সম্মুখে দেখা, একজন মাতার পক্ষে কতোটা বেদনাময় সেকথা আমাদের কারও না বোঝার কোন কারণ নেই”!

সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, “এ বেদনা অসহ্য, মহর্ষি!”

“এই বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনের দায়িত্ব! রাজ্য পরিচালনায় একান্তই অনভিজ্ঞা এক প্রৌঢ়া নারীর কাঁধে, বিশেষ করে এই মানসিক অবস্থায়, প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরু ভার অর্পণ করা আমাদের উচিৎ হচ্ছে কী না, সেটা সকলে ভেবে দেখবেন কী?”

“সত্যই, মহর্ষি, এ আমাদের কাছে গ্লানির, আমাদের অনুপযুক্ত কাজ”।

“রাজমাতা স্বয়ং আমাকে সবিশেষ অনুরোধ করেছেন - রাজ্য শাসনের এই গুরু দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি চেয়েছেন। সমস্ত মাতৃহৃদয় দিয়ে, তিনি পুত্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। তাঁর আশা, তাঁর ঐকান্তিক সেবায়, ঈশ্বর মুখ তুলে চাইবেন, তাঁর পুত্র সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাঁকে আমি কথা দিতে পারিনি, আপনাদের সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না”। মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে মাথা নত করে চুপ করে রইলেন, সকলেই চিন্তাগ্রস্ত। তাঁদের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীগণ, আপনারা সবাই নিরুত্তর কেন?”

কিছুক্ষণ পর বিদেশ মন্ত্রী পদ্মনাভ বললেন, “আমরা দ্বিধাগ্রস্ত, হে মহর্ষি। একদিকে পুত্রের সুস্থতার আশায় মাতার আকুল আবেদন, অন্যদিকে মহারাণির উপর পূর্ণ আস্থাবান রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসী। বঞ্চিত করবো কাকে”?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীমণ্ডলি, ঠিক এই কারণেই আমি এই বিশেষ সভার অধিবেশন আহ্বান করেছি। অত্যন্ত গোপন এই অধিবেশনে আমাদের একান্ত মত বিনিময়, আমার জরুরি বলে মনে হয়েছিল”।

এতক্ষণ নির্বাক মহামন্ত্রী বিমোহন কথা বললেন, “কিন্তু রাজা কোথায়? কে হবেন পরবর্তী রাজা? যাঁর হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে রাজমাতা নিশ্চিন্তে পুত্রসেবায় নিরত থাকবেন?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু বললেন, “সত্যি এ এক অদ্ভূত সংকট, মহর্ষি। রাজা কোথায়?” কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “আপনারা সকলেই হয়তো শুনে থাকবেন, গোটা রাজ্য জুড়ে চারণকবিরা যে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির গান তো? হ্যাঁ, সে আমি নিজের কানেই শুনেছি, বেশ কয়েকবার! আমাদের গুপ্তচর সূত্রেও সংবাদ পেয়েছি, এই গান এখন রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে গানের কথা যেমন সুন্দর, সুরও মধুর।  মনের মধ্যে রূপকথার মাধুরী বয়ে আনে!”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাস্যে বললেন, “সে চারণ কবিদের কথা আমিও শুনেছি, তবে নিজের কানে সেই সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য হয়নি। সে গানে এমন কী জাদু আছে, যার মায়ায় সেই গান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নিশ্ছিদ্র নিরাপদ অন্তরেও প্রবেশ করে গেল?”

মন্ত্রী বৃষভান্‌ হাসলেন, “সত্যিই মহর্ষি, কল্পনা হোক, আর যাই হোক, শুনতে বড়ো সুন্দর। কিন্তু আমার মতো নীরস মানুষের পক্ষে সে গানের বক্তব্য ব্যাখ্যা সম্ভব নয়! তবে আমাদের কলামন্ত্রী চারুশীল, কবি মানুষ, তিনি অবশ্যই বলতে পারবেন। মিত্র চারুশীল, মহর্ষিকে আপনি বলুন না, সে গানের কী বক্তব্য?”

কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “সে গানে রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে! তাঁরা মহারাজা অঙ্গ এবং রাজাবেণের বংশধর”!

মহামন্ত্রী বিমোহন বিরক্ত মুখে বললেন, “আমিও সে কবিদের কথা শুনেছি, কিন্তু গান শুনিনি। কিন্তু কলামন্ত্রী চারুশীলভদ্রের কথায় মনে হচ্ছে, এ কোন গঞ্জিকাসেবীর দিবাস্বপ্নের গান! রাজাবেণ কবে সুস্থ হবেন, কবে তাঁর বিবাহ হবে? কবে তাঁর বংশধর আসবে?”

মাথা নেড়ে কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “না, না, মহামন্ত্রী মহাশয়, তাঁদের জন্ম সাধারণ নয়, সে এক অসাধারণ – অলৌকিক ঘটনা ঘটবে! তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন। তাঁরা মহারাজা বেণের ঔরসজাত পুত্রকন্যা নন, তাঁরা তাঁর মানস সন্তান! রাজা পৃথু ভগবান বিষ্ণুর এবং রাণি অর্চ্চি সনতানী লক্ষ্মীর অংশ!”

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কী আশ্চর্য! কিন্তু সে গানে শুধু কী তাঁদের জন্মবৃত্তান্তই আছে, মন্ত্রী চারুশীলভদ্র?”

“না মহর্ষি! সে গানে আছে স্বপ্নপূরণের অদ্ভূত বৃত্তান্ত। মহারাজ পৃথুর রাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র প্রত্যেক বৎসর প্রচুর মেঘ দেবেন, দেবেন প্রচুর বর্ষা। সেই বর্ষার স্নিগ্ধ স্পর্শে রজঃস্বলা হবে মেদিনী, হরিৎ শস্যে ভরে উঠবে ক্ষেত্র। লেবুগন্ধী সবুজ পুষ্ট ঘাসে তুষ্টা গাভীদের পালানে আসবে দুধের প্লাবন। সুখে সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে গৃহীদের মায়ার সংসার! খরা, বন্যা, ঝঞ্ঝা, প্লাবন, মহামারি ও পঙ্গপালহীন এই রাজ্যের আপামর সুস্থ সবল ও বিনীত জনসাধারণ, আনন্দে খুশিতে দেবালয়ে দেবালয়ে দেবতাদের নিবেদন করবে সুসজ্জিত অর্ঘ। শঙ্খ, ঘন্টা ও পটহের নিশ্চিন্ত ধ্বনিতে মুখর হয়ে থাকবে সকল মন্দির”!

কথা বলতে বলতে কলামন্ত্রী চারুশীলের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান, মিত্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মহর্ষি, আপনি স্বকর্ণে না শুনলে উপলব্ধি করতে পারবেন না, সে গানের মাধুর্য! কথায় ও সুরে সে এক অদ্ভূত অনুভূতি। গ্রামের বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, গৃহবধূ, বিধবা নারী, কিশোর-কিশোরী সেই চারণ কবিদের গান শুনছে মুগ্ধ হয়ে, অশ্রু বিগলিত চক্ষে! সে গান শুনে পুরুষরাও আনমনে বসে থাকছে চণ্ডিমণ্ডপে, মাঠের আলে, হাটে বাজারে। তারা হুঁকোতে টান দিতে ভুলে যাচ্ছে !”

মহর্ষি ভৃগু খুবই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই গান তারা পেল কোথায়? কে তাদের শেখাল? এমন অদ্ভূত ঘটনার সূত্রপাত হল কী ভাবে?”

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “সে সন্ধানও আমি নিয়েছি, মহর্ষি। এ গান তারা নিজেরাই রচনা করেছে! কিন্তু এই কাহিনী শুনিয়েছেন এক তপস্বী। হিমালয়ের কোলে গভীর অরণ্যবাসী সেই মহাতপস্বী নাকি কোন এক চারণদলকে এই কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই রাজ্যের দুঃখের দিন অতিক্রান্ত প্রায়! অচিরেই এক মাহেন্দ্রক্ষণে অবতীর্ণ হচ্ছেন, স্বয়ং ভগবান, তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে নিয়ে! যাঁর নাম পৃথু। তাঁর নামেই এই জগৎ সংসারের নাম হবে পৃথিবী। সসাগরা ধরিত্রী হবে তাঁর রাজ্য। তিনি এই মর্ত্য জগতে প্রতিষ্ঠা করবেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও সনাতন ধর্ম! মহাতপস্বীর অদ্ভূত সেই ভবিষ্যবাণী শুনে সেই চারণদল যে গান বেঁধেছিল, সেই গানই এখন অন্য চারণদলের মুখে মুখে। তাদের কথা ও সুর কিছুটা ভিন্ন হলেও বক্তব্য এক!”

মহর্ষি ভৃগু কোন কথা বললেন না। নত মস্তকে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলেন। অন্য মন্ত্রীরা সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। মহামন্ত্রী বিমোহন নিজের মন্ত্রীমণ্ডলীর এই আবেগের কথা কোনদিন জানতে বা বুঝতেও পারেননি। তিনিও নির্বাক বিস্ময়ে সকলের মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলেন। 

চলবে ...


মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছোট্ট হওয়া

বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



এর আগের ছোট গল্প - " একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা "


নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে যত সুখ আমার...। বিশ্বাসবাবুরও তাই বিশ্বাস। তাঁর বাড়ির গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়ালে, ওপারেই যতো সুখের সন্ধান। শ্যামলের চপ-ফুলুরি-পেঁয়াজি-বেগ্‌নির দোকান। কচুরি, সিঙাড়া, নিমকি আর হরেক মিষ্টির ট্রে নিয়ে বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভান্ডার। এমনকি বিহারি রামপূজনের ভূজিয়ার দোকানটাও ওপারেবিকেলের দিকে রামপূজন যখন বড় লোহার কড়ায় গরম বালিতে ছোলা ভাজে, সে গন্ধ এপারে তাঁর নাকে ঝাপটা মারে। জিভে জল চলে আসে, যদিও এ বয়সে ছোলাভাজা খাওয়ার মতো দাঁতের জোর আর বিশ্বাসবাবুর নেইতবু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়।

ফতুয়ার পকেটে পার্স নিয়ে বিশ্বাসবাবু বেরিয়েছেন, মনে একটা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। আজ যে করেই হোক, শ্যামলের চপ-ফুলুরি খেয়ে মুখের তার বদলাবেন। সকালে দুধের সঙ্গে শুকনো মুড়ি কিংবা খই, দুপুরে করলাসেদ্ধ, ভাত আর পেঁপে-কাঁচকলা-বেগুনের গুণপনাযুক্ত চারাপোনার ঝোল, টকদইবিকেলে চারপিস শসা, কয়েক পিস পাকা পেঁপের টুকরো, চিনি ছড়ানো একটু ছানা! রাত্রে রুটি আর পটলের তরকারি সঙ্গে একটু দুধ। দিনের পর দিন এই খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু আনন্দে থাকতে পারে কী? বিশ্বাসবাবুর বিশ্বাস, পারে না। আর এসবের জন্যে দায়ি নিষ্ঠুর – নির্মম একটি মেয়ে! মেয়েটি একদিকে যতটা ভালো, অন্য দিকে ঠিক ততটাই নিষ্ঠুরমেয়েটি তাঁর বৌমা। অবিশ্যি এটাও ঠিক, বৌমার কড়া শাসনে তাঁর শরীরের ভাবগতিক এখন বেশ ভালোই। অম্বল-টম্বল হয় না বহুদিন, খিদে পায়, রাত্রে ঘুম হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি পেটরোগা মানুষ, সে সময় তাঁর মা এবং পরবর্তী কালে তাঁর বউ, কিছুতেই সেই রোগের স্থায়ী সুরাহা করতে পারেননি।

তার অবিশ্যি কারণও আছে। তাঁর মা কিংবা স্ত্রী, কেউই তাঁকে এমন পরাধীন করতে পারেননি। ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে হজমি, বনকুল, আলুকাবলি, ফুচকা, চপ, সিঙাড়া...। বড় হয়ে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে রোল, মোগলাইপরোটা, মোমো, তেলচিটে নুড্‌ল্‌স্‌...! চাকরিস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে বিরিয়ানি, লাচ্চা পরোটা, চিকেন ভর্তা...। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পর যখন থেকে এই হৃদয়হীনা বৌমার পাল্লায় তিনি পড়েছেন, তাঁর সেই স্বাধীনতা চুলোয় গেছে। তবে নিয়মিত পেটখারাপের ব্যাপারটা সুদূর অতীতে ফেলে আসা স্মৃতি হিসেবেই রয়ে গেছে।

ফুটপাথের কিনারায় দাঁড়িয়ে রাস্তাটা পার হতে গিয়ে বারবার পিছিয়ে আসছেন বিশ্বাসবাবু। শহরের যতো গাড়ি এই সময়ে এই রাস্তা দিয়ে যাবার জন্যেই যেন, একসঙ্গে দল বেঁধে বেড়িয়ে পড়েছে। বাস, প্রাইভেট কার, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ট্যাক্সি, অটো, বাইক, স্কুটার, সাইকেল রিকশ, ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে আর তাঁর সামনে দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। এতটুকু বিরাম নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পা দিলেই, বাইকওয়ালা ছোকরারা, তাদের পেছনে ছুকরি নিয়ে একদম ঘাড়ের ওপর চলে আসছে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসা ছাড়া বিশ্বাসবাবুর উপায় কী?

ঘড়ির কাঁটা ওদিকে ছুটছে যেন বনবন করে। পৌনে চারটে বেজে গেল। নাতি বিট্টুকে নিয়ে বৌমা স্কুল থেকে ফিরবে চারটে কুড়ি থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে। তার আগে বাড়ি ফিরতে না পারলে বৌমার কাছে অনেক জবাবদিহি করতে হবে। বৌমার সেসব প্রশ্নও আবার ভাববাচ্যে! কোথায় যাওয়া হয়েছিল? কী কিনতে? কিছু কিনতে যদি নাই হয়, এসময়ে বেরোনোর কী দরকার ছিল? রাস্তায় অনেক গাড়িঘোড়া, একটা বিপদ না ডেকে আনলে কী চলছে না? ভোরে বেড়াতে যেতে বললে, তখন তো নানান বাহানা খাড়া করা হয়, কিন্তু এখন এমন কী দরকার পড়ল? বৌমার এই সব প্রশ্নে খুব অসহায় বোধ করেন বিশ্বাসবাবু। এই বয়সে এসে একটু আজাদির জন্যে তিনি তৃষ্ণার্ত!  

কিন্তু নাঃ, আর দেরি করলে সত্যিই বৌমার খপ্পরে পড়তে হবে। এরপর আবার বলা যায় না, ওপারে গিয়ে হয়তো দেখবেন, শ্যামল এখনো গামলায় বেসন ফ্যাটাচ্ছে, কড়াইতে তেল ঢেলেছে, কিন্তু স্টোভের আগুন জ্বালেনি। জিগ্যেস করলে বলবে, একটু দাঁড়ান না, কাকু, এক্‌খুনি হয়ে যাবে, দু মিনিট। শ্যামলের আবার দু মিনিট হয় আধঘন্টায়। কড়াইয়ের তেল দাউদাউ গরম হবে, তাতে গোটা বিশেক চপ ছাড়বে। আধ-পাকা চপগুলো বড়ো ছান্তায় ছেঁকে কড়াইয়ের ধারে তুলে, আবার নতুন চপ ছাড়বে, সেগুলো আধপাকা হলে, তার মধ্যে ডুবিয়ে দেবে পুরোনো চপগুলো। তারপর তেলের মধ্যে হাবুডুবু দিতে দিতে চপের গায়ে আসবে আরশোলার রঙ। ততক্ষণ কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকো, আর নিঃশব্দ ঢোঁকে গিলতে থাকো জিভের জল!

একটু ফাঁক বের করতে পেরে কোনরকমে আধখানা রাস্তা পার হয়ে বিশ্বাসবাবু, ডিভাইডারে দাঁড়ালেন। এখন পিছনের গাড়িগুলো যাচ্ছে ডানদিকে, আর সামনের গাড়িগুলো বাঁদিকে। অপেক্ষা করতে করতে গলা তুলে একবার ডানদিকে তাকালেন বিশ্বাসবাবু, এখান থেকে শ্যামলের দোকানটা ঠিক দেখা যায় না। চারটে বাজতে পাঁচ। হাতে খুব সময় নেই। শ্যামলের চপ-টপ ভাজা যদি হয়েও থাকে, সেসব উবু জ্বলন্ত চপ কিংবা ফুলুরি, খেতেও তো সময় লাগবে নাকি? ওসব কী আর গবগবিয়ে খাওয়া যায়? ফুঁ দিতে দিতে ধীরে সুস্থে খেতেই না মজা! তারপর খাওয়ার পরে আঙুল আর ঠোঁটের তেল মুছতে মুছতে “কত হল গো, শ্যামল?”, জিগ্যেস করার যে তৃপ্তি...তার কোন বিকল্প আছে? বিশ্বাসবাবু হঠাৎ যেন শিউরে উঠলেন। না তেলেভাজা খাওয়ার আনন্দ কল্পনা করে নয়, তাঁর কানে এল বৌমার ডাক।

“বাবা, বাড়ি চলো। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো এখানে?” ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বিশ্বাসবাবু। দেখলেন তাঁর পিছনে বৌমা আর সঙ্গে বিট্টু। বিট্টু অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দাদুর দিকেই।  

সমস্ত সংকল্প জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাসবাবু হতাশ মুখে হাসি এনে বললেন, “খি ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল?”

সে কথার উত্তর না দিয়ে বৌমা বললেন, “তাড়াতাড়ি এসো না, বাবা, রাস্তাটা পার হয়ে যাইগাড়ি ঘোড়ার যা ভিড়।”ডিভাইডার থেকে নেমে বিশ্বাসবাবু সুবোধ বালকের মতো বৌমার সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে ফিরে এলেন। আশ্চর্য এখন তাঁদের রাস্তা পার হতে দেখে সমস্ত গাড়িই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ হর্ন বাজিয়ে ধমকও দিল না। ফুটপাথে পা দিয়ে গভীর শ্বাস ফেললেন বিশ্বাসবাবু, পরাধীনতার গ্লানি তাঁর সমস্ত মুখে।

 

 

বাড়ি ফিরে কেউ কোন কথা বললেন না। বিশ্বাসবাবু বসার ঘরে গুম হয়ে বসে রইলেন।  বিট্টুকে নিয়ে বৌমা গেলেন নিজেদের ঘরে, বিট্টু স্কুলের জামাপ্যান্ট বদলাবে। বৌমাও। সোফায় বসে বসে একদিকে তাঁর যেমন রাগ হচ্ছে, তেমনি ভয়ও হচ্ছে। অল্পের জন্য তপ্ত চপের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হবার জন্যে রাগ। অন্যদিকে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাওয়ার জন্যে বৌমার প্রশ্নমালার মুখোমুখি হওয়ার ভয়। বিশ্বাসবাবু মনে মনে জম্পেশ একটা মিথ্যে অজুহাতের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। আচ্ছা, যদি বলা যায় ইলেক্ট্রিশিয়ান মিন্টুর কাছে যাচ্ছিলেন! কিন্তু বাড়িতে পাখা কিংবা লাইটের কোন গণ্ডগোল তো নেই! গণ্ডগোল নেই তো কী হয়েছে?  “কাকাবাবু, বছরে এক দুবার গোটা বাড়ির ওয়্যারিং চেক করে নেওয়াটা খুব দরকার, তাতে হঠাৎ বিপদের ভয় থাকে না”, একথা বলেছিল বৌমারই ভাই – পেশায় সে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। এ বাড়ির হেড হিসেবে, তিনি তো আর এতগুলো প্রাণীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারেন না!  তাই মিন্টুকে খবর দিতে যাচ্ছিলেন! কিন্তু সমস্যাটা হল, মিন্টুর ইলেক্ট্রিকের দোকান, বড়ো রাস্তার এপারে, ওপারে নয়। কাজেই রাস্তা পার হওয়ার গল্পটা ভাল দাঁড়াচ্ছে না...!

 আচ্ছা, যদি বলা হয়, বিট্টুর জন্যে গল্পের বই কিনতে যাচ্ছিলেন। ঠাকুমার ঝুলি, কিংবা, আবোল-তাবোল, অথবা ক্ষীরের পুতুলহতে পারে না? লোকনাথ গ্রন্থাগার দোকানটা রাস্তার ওপারে, সেদিক থেকেও কোন সমস্যা নেই। বৌমা যদি জিগ্যেস করে, বিট্টুর জন্মদিন তো অনেক দেরি, সেই নভেম্বরে – এখন বই কেন? বিশ্বাসবাবু আবেগমথিত স্বরে বলবেন, ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে বিট্টুটা বাংলা গল্প-সল্প তেমন কিছুই পড়ল না। দাদু হিসেবে আমি কী দু-একটা বই নাতিকে উপহার দিতে পারি না? তার জন্যে জন্মদিনের অপেক্ষা করতে হবে? এই কথায় বৌমা কী উত্তর দেবে, শুনি? বিশ্বাসবাবু বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে মনে মনে গুছিয়ে নিতে লাগলেন, বৌমার সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং তার উত্তরগুলি।

হঠাৎ তীব্র তেলেভাজার গন্ধে বিশ্বাসবাবুর চিন্তায় বাধা পড়ল, তাকিয়ে দেখলেন, স্কুলে যাওয়ার শাড়ি-টাড়ি ছেড়ে বৌমা কাপ্তান পরে সামনে দাঁড়িয়ে, তার হাতের প্লেটে অনেকগুলি তেলেভাজা, গন্ধটা আসছে সেখান থেকেই। বৌমার হাতে আকাশের চাঁদ দেখলেও এতটা অবাক হতেন না, যতটা হলেন, তেলেভাজা দেখে!

প্লেটটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বললেন, “এসব কী? এসব আবার কেন? তেলেভাজা খেলে আমার আবার যদি পেট ভুটভাট...”

বৌমা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, “হুঁ, তাই বৈকি! ছুটছিলে তো শ্যামলের দোকানে, তখন পেট ভুটভাটের কথা মাথায় আসেনি না?  মিতালি বানিয়েছে, গরম গরম বেগুনি খেয়ে দেখো!” মিতালি বিশ্বাসবাবুদের বাড়ি রান্নার কাজ করে, সকালে আর বিকেলে আসে। রান্নার হাত বেশ ভালোই।

কিন্তু বৌমার সরাসরি অভিযোগে বিশ্বাসবাবু একটু এলোমেলো হয়ে পড়লেন, তবুও সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “আমি শ্যামলের দোকানে ছুটছিলাম? কে বলল তোকে? যত্তোসব...তোরা সব একধাতের...তুই, তোর শ্বাশুড়ি মা, তোর দিদিশ্বাশুড়ি...মনগড়া কথায় তোদের জুড়ি নেই!” বলতে বলতে গরম বেগ্‌নিতে হাল্কা কামড় দিলেন, “বাঃ ...” তারপর ফুঁ দিতে দিতে বললেন, “ফুউউউ...ফুউউউ...তুই আমাকে কী পেয়েছিস বল তো? বাচ্চা ছেলে? নিজের ভালো বুঝবো না?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে জিগ্যেস করলেন, “নুন-টুন ঠিক আছে?”

“হুঁ...ঠিকই আছে, ভালোই হয়েছে”।

“তুমি খাও, আরো আনছি”। বৌমা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। আর তারপরেই বিট্টু ঢুকল হাতে প্লেট নিয়ে, দাদুর পাশে বসতে বসতে বলল, “ও দাদু, আমি মাত্র দুটো বেগ্‌নি পেলাম”

নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু বললেন, “শুরু কর না। দেখিস গরম আছে কিন্তু, জিভ পুড়ে যাবে। তোর মা আরো আনতে গেছে।  সেখান থেকে আরো পাবি”।

বিট্টু একটা কোণা কামড়ে দেখল খুব গরম, প্লেটে আবার নামিয়ে রেখে ম্লান মুখে বলল, “না গো দাদু, মিতালিমাসি চারটে দিয়েছিল, মা তার থেকে দুটো তুলে নিয়েছে! আমাকে আর দেবে না।”

নাতির বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাকে কোলের আরো কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “মায়েরা বড়ো নিষ্ঠুর হয় রে, বিট্টু। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের প্রতি তাদের এতটুকু মায়াও যেন থাকতে নেই!”

বিট্টু কী বুঝল কে জানে, সে দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে সহানুভূতি মাখা স্বরে বলল, “কিন্তু তুমি তো আর ছেলে নও দাদু, তুমি তো অনেক বড়ো !” বিট্টু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, বেগনিটা অনেকটাই ঠাণ্ডা হয়েছে, এবার খাওয়া চলবে। নাতি ও দাদু দুজনেই বিরস মুখে বেগ্‌নি চিবোতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর বিশ্বাসবাবু বললেন, “বড়ো আর নেই রে, তোর মা আমাকে ছেঁটে তোর থেকেও ছোট্ট করে নিয়েছে”! এই সময়েই বউমা ঘরে এলেন, এক প্লেট বেগনি আর ফুলুরি নিয়ে। বিশ্বাসবাবু এবং বিট্টুর প্লেটে আরো কখানা তেলেভাজা দিয়ে, সামনের সোফায় বসলেন। তাঁর হাতের প্লেটেও কয়েকটা তেলেভাজা। সেগুলি খেতে খেতে মুচকি হেসে বললেন, “আমার বিরুদ্ধে দাদু আর নাতি মিলে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, শুনি?”

বিট্টু মায়ের থেকে আরো দুটো বেগনির প্রশ্রয় পেয়ে খুব খুশি, বলল, “দাদু বলছিল, তুমি নাকি আমার থেকেও দাদুকে ছোট্ট করে দিয়েছো?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “আমায় মা বলে যে ডাকো - ছোট্ট হয়েই থাকো না, বাবা, তাতে তোমাকে শাসন করতে আর প্রশ্রয় দিতে আমার সুবিধে হয় যে”!

বিশ্বাসবাবুর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।   

..০০.. 

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - পর্ব ৩

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ২ "


ব্রাহ্মী লিপি

    আগেই বলেছি ভারতবর্ষের প্রাচীনতম লিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সিন্ধুসভ্যতার অবশেষে। কিন্তু ওই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব না হওয়াতে, পণ্ডিতদের অনেকেই ওগুলিকে লিপি বলে মানতে রাজি নন। আমাদের দেশে তারপর যে লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সময়কাল মোটামুটি ৩০০-২৫০ বি.সি.। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে প্রথম যে লিপির দেখা পাওয়া যায় তাকে পণ্ডিতরা ব্রাহ্মী লিপি বলেন। ১৮৩৭ সালে সম্রাট অশোকের এই শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন বিশিষ্ট প্রত্নবিদ এবং ভাষাবিদ জেমস প্রিন্সেপ। যদিও প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু বহুদিন আগে থেকেই যে এই ব্রাহ্মী লিপির চর্চা চলছিল, সে বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত নেই। তা না হলে সম্রাট অশোকের শিলালিপির এত পরিণত বর্ণ বিন্যাস সম্ভব হত না। কেউ কেউ বলেন, ব্রাহ্মীলিপির উদ্ভব সিন্ধু সভ্যতার ওই অপঠিত লিপির থেকেই এবং অন্য কোন সভ্যতার প্রভাবে নয়, ব্রাহ্মী লিপির উদ্ভব আমাদের দেশেই। ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, তার বিন্যাস এবং উচ্চারণ পদ্ধতির কথা বেদের “তৈত্তিরিয় প্রতিশক্য” অংশে বর্ণনা করা আছে। যার থেকে অনেকে মনে করেন, ব্রাহ্মীলিপির সূত্রপাত অনেকটাই প্রাচীন।


সম্রাট অশোকের ষষ্ঠ শিলালিপিতে ব্রাহ্মী লিপির নমুনা (৩০০ বি.সি.ই)

    ব্রাহ্মীলিপির উল্লেখ প্রাচীন হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে এবং তাদের চৈনিক অনুবাদেও বারবার পাওয়া যায়।  “ললিতবিস্তার সূত্র” গ্রন্থে বলা আছে সিদ্ধার্থ, যিনি পরে গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন, এক ব্রাহ্মণ লিপিকারের কাছে ব্রাহ্মী লিপি শিক্ষা করেছিলেন এবং বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৫০০ বি.সি। জৈন ধর্মশাস্ত্র “সমবায়াঙ্গ সূত্র” (সময়কাল ৩০০ বি.সি.) গ্রন্থে সেকালে প্রচলিত অন্যান্য লিপির মধ্যে ব্রাহ্মীলিপির নাম আছে প্রথমে এবং খরোষ্ঠী লিপির নাম আছে চতুর্থে। কাজেই ব্রাহ্মীলিপি যে, এই সময়ের অনেক দিন আগে থেকেই ভারতে বহুল প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত লিপি পদ্ধতি, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

    অনেক পণ্ডিত মনে করেন, প্রাচীন কালের ভারতে পাথরে খোদাই করে লেখার পদ্ধতি হয়তো জানা ছিল না। তার আগে নরম মাটিতে অথবা তালপাতা, কলাপাতা এবং ভূর্জপাতায় লেখার প্রচলন ছিল। কালের প্রভাবে সেই সব লিপির নমুনা আমাদের সময় পর্যন্ত পৌঁছোয়নি। অতএব, সম্রাট অশোকের শিলালিপিই আমাদের কাছে প্রথম ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন।


খরোষ্ঠী লিপি

ভারতের উত্তরে এবং উত্তর পশ্চিমে ব্রাহ্মীলিপির সমসাময়িক খরোষ্ঠী লিপিরও প্রচলন ছিল। এই লিপির উদ্ভব হয়েছিল গান্ধারে [যেখানকার রাজকুমারী ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী] - বর্তমান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল। সমসাময়িক কালের খরোষ্ঠী লিপির কিছু প্রভাব, ব্রাহ্মী লিপিতে থাকতেই পারে, কিন্তু দুই পদ্ধতির মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। যেমন খরোষ্ঠী লিপি প্রধানতঃ ডাকদিক থেকে বাঁদিকে লেখা হত, এখনকার উর্দু লেখার মতো। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপি বাঁদিক থেকে ডানদিকে লেখা হত, যে পদ্ধতিতে আমরা আজও লিখি।  

    

খরোষ্ঠীর সংখ্যা

মান

0

0

00

000

লিপি

Kharosthi 1.svg

Kharosthi 2a.svg

Kharosthi 3a.svg

Kharosthi 4a.svg

Kharosthi 10.svg

Kharosthi 20.svg

Kharosthi 100.svg

Kharosthi 1000.svg


 তাছাড়া ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় খরোষ্ঠী লিপির বর্ণবিন্যাস বেশ কিছুটা জটিল। আর সংখ্যা লেখার দিক থেকেও খরোষ্ঠী ছিল অনেকটাই গোলমেলে ব্যাপার। ওপরের টেব্‌লে দেখ, খরোষ্ঠী সংখ্যাতে ৫ থেকে ৯ এবং ০ -র জন্যে কোন লিপি ছিল না। ১,২,৩, ৪ সংখ্যাগুলি ছাড়া বাকি গুলি যোগ করে লেখা হত, যেমন ধর ৮ লিখতে গেলে দুবার ৪ লিখতে হত - অথবা ৯ লিখতে হলে পাশাপাশি ৪৩২ লিখতে হত। উদাহরণ হিসেবে যদি ২০১৮ লিখতে যাই তাহলে এভাবে লিখতে হবে - ১০০০ ১০০০ ১ ৪৪ - উঁহুঁ হল না - খরোষ্ঠী লিপি ডানদিক থেকে বাঁদিকে আসে - তাহলে ব্যাপারটা হবে ৪৪ ১০ ১০০০ ১০০০ - এইভাবে !  লিপি অনুযায়ী লিখতে হলে - 


Kharosthi 4a.svgKharosthi 4a.svgKharosthi 10.svg Kharosthi 1000.svgKharosthi 1000.svg 

এই সব কারণেই খরোষ্ঠী লিপি ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকল। মোটামুটি ৭০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আঞ্চলিক লিপি হিসেবে ব্যবহার চালু থাকলেও, পরে এই পদ্ধতি পুরোপুরি অবলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তাহলেও মানব সভ্যতায় এই লিপির গুরুত্ব এতটুকু কমে না, কারণ আধুনিক লিপি পদ্ধতির পথে এটিও একটি বিশেষ ধাপ।


 


কাঠের টুকরোর ওপর লেখা খরোষ্ঠী লিপি, ২০০-৩০০ বি.সি.র গান্ধার অঞ্চল থেকে পাওয়া।


ভারতে আঞ্চলিক লিপির বিকাশ

    সেই সময় এদেশের আদি বাসিন্দা দ্রাবিড় হোন কিংবা বাইরে থেকে আসা আর্য, সকলেরই জ্ঞান চর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই ব্রাহ্মী লিপি। আর্য ঋষিদের স্মৃতিনির্ভর বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থ ফুটে উঠতে লাগল রেখায়। যে লিপি শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত ঋষিদের মধ্যে সীমিত ছিল, সম্রাট অশোকের সহযোগিতায় সেই লিপি রাজকীয় লিপি হয়ে উঠল এবং রাজকার্যে ব্রাহ্মীলিপির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল সাম্রাজ্যের চারদিকে। ব্রাহ্মীলিপি সাধারণ মানুষেরও আয়ত্তের মধ্যে এসে গেল। ব্যাপ্ত এই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও বাড়তে লাগল শিক্ষা এবং জ্ঞানের চর্চা। তাঁরা নিজস্ব বাক্য বিন্যাস, শব্দসম্ভার এবং উচ্চারণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বদলে নিতে লাগলেন, লিপির বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় আত্মিক জ্ঞানের লিখিত রূপ আমাদের সময় পর্যন্ত বয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে, নতুন নতুন ভাষার বিকাশ হতে শুরু করল। 

    দেশ জুড়ে বহুল ব্যবহারের ফলে, ব্রাহ্মীলিপির আঙ্গিকে অনেক পরিবর্তন আসতে লাগল। সম্রাট অশোক যে ভাষায় শিলালিপি লিখেছিলেন, সেটি মাগধী। মগধের প্রাকৃত ভাষা এবং সংস্কৃতের মিশ্রণের এই মাগধী ভাষাতেই তখনকার আম জনতা কথা বলতেন। যদিও রাষ্ট্রভাষা কিংবা রাজসভার ভাষা ছিল সংস্কৃত। দক্ষিণ ভারতের তামিল ব্রাহ্মীলিপি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তামিল ব্রাহ্মীলিপির কিছু কিছু নিদর্শন, সম্রাট অশোকের শিলালিপির থেকেও প্রাচীন। কিছুদিন আগে শ্রীলংকার অনুরাধাপুরে  একটি পাত্রের গায়ে কিছু ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া গেছে। পণ্ডিতেরা অনুমান করছেন, এটি ৪৫০-৩৫০ বি.সি.র। অতএব ব্রাহ্মীলিপির শুরুর থেকেই অঞ্চলভেদে তার পরিবর্তন চালু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।

    গুপ্ত রাজাদের আমলে যে ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া যায়, তাকে “গুপ্ত লিপি” বলা হয়। এই সময় কাল মোটামুটি পঞ্চম শতাব্দী সি.ই.তে। মূল ব্রাহ্মীলিপি থেকে এই লিপির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছিল। এই গুপ্তলিপি থেকে দেবনাগরি এবং রঞ্জনা বা কুটিলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। দেবনাগরি লিপি আজও আমরা হিন্দি লিপি হিসেবে দেখতে পাই। কুটিলা প্রভাবিত লিপি আজও নেপাল, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, জাপান, মায়ানমার, সমুদ্রতীরবর্তী চিনের বৌদ্ধ বিহারগুলিতে দেখা যায়। এমনকি আমাদের বাংলা লিপিও অনেকটাই কুটিলা লিপির অনুসারী।  

ওপরের দুটি চার্টের একদম বাঁদিকের ২য় কলমে ব্রাহ্মীলিপির ৩য় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের নমুনা আর ডানদিকের শেষ
কলমটি আধুনিক বাংলা লিপির 


    এই সময় থেকেই হিন্দু এবং বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড়ো বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা শুরু হয়েছিল, যেখানে মেধাবী ছাত্ররা রাজপুত্র কিংবা ব্রাহ্মণ না হয়েও উচ্চশিক্ষার অধিকার পেতেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু মহাবিহার দেশের বাইরেও বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। যেমন নালন্দা মহাবিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার, রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারএই মহাবিহারগুলি ছাড়াও অনেক বিহারের সন্ধান পাওয়া যায় নানান গ্রন্থে, কিন্তু কালের প্রভাবে সে সবই আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই বিহার এবং মহাবিহারগুলিতে ছাত্রদের শিক্ষা চর্চার জন্যেই অজস্র পুঁথি রচনা করা হত। সংস্কৃত কিংবা পালি ছিল শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু নানান অঞ্চল থেকে আসা মেধাবী ছাত্রদের সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সুবিধার জন্যেও আঞ্চলিক ভাষার পুঁথি রচনা জরুরি হয়ে উঠল।

    তা ছাড়াও বদলে যেতে লাগল, ভারতবর্ষের সার্বিক রাজনৈতিক চালচিত্র। মৌর্য সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২১ বি.সি. থেকে ১৮৫ বি.সি.) পতনের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২০ এ.ডি. থেকে ৫৫০ এ.ডি.) প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরে সুলতানি আমল পর্যন্ত সর্বভারতীয় প্রভাবশালী তেমন কোন সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে পারেনি। মধ্যবর্তী সময়ে  ইন্দো-গ্রীক, ইন্দো-পারস্য, কুষাণ, সাতবাহন বংশের রাজাদের এবং গুপ্তযুগের পর পাল, পূষ্যভূতি, মৌখরী, রাষ্ট্রকূট বংশের রাজাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সীমিত। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গীও হয়ে উঠছিল কিছুটা আঞ্চলিক। যার ফলে বিভিন্ন রাজার সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাই হয়ে উঠছিল রাজভাষা। উপরন্তু নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁরা নিজেদের সভাপণ্ডিতদের উৎসাহ দিতেন নানান শাস্ত্রগ্রন্থ রচনার। অতএব আঞ্চলিক ভাষাগুলিও নিজ নিজ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত। গুপ্তযুগকে ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণ যুগ বলা হয়, পণ্ডিতেরা বলেন, এই সময়েই প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ - বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারত দেবনাগরি লিপিতে সংকলিত হয়েছিল। মনুসংহিতা এবং বেশ কয়েকখানি পুরাণও এই সময়ে রচনা করা হয়েছিল। ব্রাহ্মীলিপি যদি হয় মা, তাহলে দেবনাগরি লিপি তার কন্যা। অতএব এই সময় থেকেই ব্রাহ্মীলিপি তার মাতৃত্বের গৌরব হারাতে লাগল, কন্যা দেবনাগরির হাতে। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় দেবনাগরির মহিমাও বেশিদিন টিকে থাকতে পারল না। পুজোপার্বণে, উচ্চশিক্ষায় সংস্কৃত চালু থাকলেও, নিত্য রাজকাজে, প্রশাসনিক কাজে এমনকি সাহিত্যেও মাথা চাড়া দিতে থাকল আঞ্চলিক ভাষাগুলি। কিছু কিছু পরিবর্তন নিয়ে এই আঞ্চলিক ভাষাগুলির নিজস্ব লিপিও তৈরি হয়ে উঠতে লাগল।

    এভাবে ব্রাহ্মীলিপির দুটি প্রধান শাখাকে যদি দক্ষিণ ভারতীয় এবং উত্তর ভারতীয় হিসেবে ভাগ করে নেওয়া হয়, তাহলে উত্তর ব্রাহ্মী থেকে দেবনাগরী, অসমিয়া, বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দি, গুরুমুখী – উত্তর ভারতের প্রায় সমস্ত লিপিরই উদ্ভব। আর দক্ষিণ ব্রাহ্মী থেকে তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়লম লিপির সৃষ্টি হয়েছিল।

 

বাংলা লিপি




    মনে করা হয় বাংলা লিপির চর্চা জোরদার হয়ে উঠেছিল মহারাজ শশাঙ্কর আমলে – মোটামুটি ৫৯০ থেকে ৬২৫ এ.ডি.। মহারাজ শশাঙ্ক গুপ্তরাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গের মহাসামন্ত থেকে গৌড় রাজ্যের রাজা হয়ে ওঠেন। তাঁর সমসাময়িক কিছু তাম্রলিপিতে বাংলা লিপি নিজস্ব রূপ নিতে শুরু করে। এরপর বাংলা লিপির বহু নিদর্শন পাওয়া যায় পালবংশের রাজাদের আমলে – বিশেষ করে বিগ্রহপাল (আনুমানিক ৮৫০-৮৫৩ এ.ডি.) ও নারায়ণ পালের ( আনুমানিক ৮৫৪-৯০৮ এ.ডি.) রাজত্ব কালে। নিচের পাণ্ডুলিপিটি পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল রাজবাড়ির সংগ্রহশালা থেকে  উদ্ধার করেছিলেন। আনুমানিক অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে লেখা “চর্যাপদ”-এর পাণ্ডুলিপি এটি। বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া এবং মৈথিলি ভাষার পূর্বসূরী “অবহট্ট” ভাষাতে লেখা। তালপাতা ছেঁটে সাজিয়ে তোলা এই পুঁথিটি রাখা আছে বাংলাদেশের রাজশাহী কলেজের সংগ্রহশালায়। বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার গোপন রীতি নিয়ে লেখা এই পদগুলি অনেক বৌদ্ধ তান্ত্রিকের লেখার সংকলনপণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে “সান্ধ্যভাষা” বলেছেন। তার কারণ আপাত দৃষ্টিতে পদগুলির নিহিত অর্থের আড়ালে অন্য কোন বক্তব্যের ইশারা পাওয়া যায়। বাংলা থেকে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনা অবলুপ্ত হয়ে গেছে বহুদিন, সে কারণে এই পদগুলির গূঢ় অর্থ আজও জানা যায়নি।

    পালরাজাদের (আনুমানিক ৭৩০ – ১০২৩) আমলেই বাংলা ভাষা এবং লিপি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, তারপর সেন রাজাদের আমলেও (আনুমানিক ১০৭০ – ১২৩০ এ.ডি.) বাংলা ভাষা এবং লিপির চর্চা অব্যাহত রইল। সেন আমলেই বাংলা ভাষা তার নিজস্ব লিপিসহ এক স্বতন্ত্র সম্পূর্ণ ভাষার রূপ পেল। 

      


বাঁদিকে হরিকেল রাজবংশের আনুমানিক নবম/দশম শতাব্দীর রূপার মুদ্রায় বাংলা লিপি। 

ডানদিকে  চতুর্দশ শতাব্দীর সুলতানী আমলের রূপার মুদ্রার বাংলা লিপি। 

[এখানে হরিকেল রাজবংশের পরিচয় ছোট করে বলে নিই - আধুনিক বাংলাদেশের শ্রীহট্ট অঞ্চল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা জেলার অনেকটা এবং ভারতের ত্রিপুরা জুড়ে এই হিন্দু রাজ্যের শাসক ছিলেন হরিকেলের রাজবংশের রাজারা। আনুমানিক সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই রাজবংশের আধিপত্য বজায় ছিল। এই অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের অধিকারে ছিল, যেমন খড়্গ, দেব, চন্দ্র প্রমুখ। ]     


বাংলা সাহিত্য

    কোন ভাষা যতোই রাজকাজে কিংবা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হোক না কেন, সেই ভাষা সার্থক হয়ে ওঠে সাহিত্যের ছোঁয়ায়। কারণ সাহিত্যের ভাষা পাঠকের মন স্পর্শ করে, স্পর্শ করে তার অনুভূতি। মানুষের অন্তরের অনুভব, লিখিত ভাষায় প্রকাশ করার মতো সাবলীল শক্তি যে ভাষা অর্জন করে, সে ভাষা অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়।  অতএব বাংলা ভাষায় সাহিত্যের শুরু কবে থেকে হল, অর্থাৎ লেখকেরা কবে থেকে বাংলা ভাষাকেও মনের ভাব প্রকাশের নিজস্ব মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন, সেটা দেখে নেওয়া দরকার।   

    বাংলা ভাষায় সাহিত্যের বিকাশকে প্রধানতঃ তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রাচীন পর্যায় মোটামুটি ৯৫০ – ১৩৫০ এ.ডি., তারপর মধ্যবর্তী পর্যায় মোটামুটি ১৩৫০ থেকে ১৮০০ এ.ডি. এবং সর্বশেষে আধুনিক পর্যায় ১৮০০ থেকে আজকের দিন অব্দি।

    প্রাচীন পর্যায়ে সাহিত্য বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না। একমাত্র ‘চর্যাপদ’-এর কথাই আবার বলতে হয়। বৌদ্ধতন্ত্রে পণ্ডিতদের লিখিত রহস্যময় ৪৮টি পদের সংকলন। যেগুলির রচনা করেছিলেন লুইপা, ভুসুকুপা, কাহ্নাপা, শবরপা প্রমুখ কয়েকজন বৌদ্ধ তন্ত্র পণ্ডিত।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে সাহিত্যচর্চার অবস্থা যথেষ্ট ভাল। এই সময়ের সাহিত্য সৃষ্টিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- বৈষ্ণব সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য সাহিত্য এবং অনুবাদ সাহিত্য দ্বাদশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলীর বহু পদ লিখে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। তাঁর পরবর্তী সময়ে আরো অনেক চণ্ডীদাস, যেমন আদি চণ্ডীদাস, কবি চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস এবং দীন চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন সন্দেহ নেই। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের তুল্য কেউই হতে পারেননি। এরপর নাম করতে হয় মঙ্গলকাব্যগুলির। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিজয় গুপ্তের প্রথম মঙ্গলকাব্য “মনসামঙ্গল”, বিপ্রদাস পিপলাইয়ের “মনসাবিজয়” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের মহিমার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের আবেগ, মায়া, মমতা, ভাব, ভালবাসা, অহংকার, ঈর্ষা, দ্বেষ নিয়ে অনবদ্য মানসিক টানাপোড়েনের ছবি পাওয়া যায়। একই কথা বলা যায় মানিক দত্ত, মাধবাচার্য, দ্বিজমাধব কিংবা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্য নিয়েও।

    অনুবাদ সাহিত্যে প্রথমেই নাম করতে হয় কৃত্তিবাস ওঝার বাংলা রামায়ণের অনুবাদ এবং কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারত। এই সেদিনও আমাদের ছোটবেলায়, পঞ্চদশ শতাব্দীর রচনা কৃত্তিবাসী রামায়ণের দেখা মিলত বাঙালীর ঘরে ঘরে। পাঁচশো বছর ধরে এমন জনপ্রিয়তা যথেষ্ট ঈর্ষার বিষয় সন্দেহ নেই! কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অনেক ঘটনাই কৃত্তিবাসী কল্পনা, অনেক আচার-আচরণই মমতাময় বাঙালী পারিবারিক সম্পর্কমাখা। সেই কারণেই হয়তো মূল রামায়ণের থেকেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার ঘরে ঘরে এত জনপ্রিয় হয়েছিল। সুলতানী আমলে আরবী এবং পারসিয়ান সাহিত্যের অনুবাদ বাংলা ভাষাকে আরও ঋদ্ধ করে তুলেছিল। মধ্যযুগে শা মুহম্মদ সাগির, জৈনুদ্দিন, মুজাম্মিন, সৈয়দ সুলতান, শেখ ফইজুল্লা প্রমুখ ছিলেন বাংলার বিখ্যাত মুসলিম কবি।  মুহম্মদ সাগিরের “ইউসুফ-জুলেখা”, সৈয়দ সুলতানের “নবিবংশ” অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

    অষ্টাদশ শতকের প্রধান কবি ছিলেন ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তাঁর লেখা “অন্নদামঙ্গল” কাব্য বহুদিন অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্রের লেখা অন্নদামঙ্গলের প্রকাশকাল ১৭৫২ সাল। এই গ্রন্থের তিনটি অংশ। প্রথম অংশ- অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণার মহিমা বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশে বিদ্যা ও সুন্দরের কাহিনী, এই অংশের নাম কালিকামঙ্গল। তৃতীয় অংশে মোগল সম্রাট আকবরের বিশ্বস্ত সেনাপতি মান সিং এবং ভবানন্দ মজুমদারের কাহিনী – এই অংশের নাম অন্নপূর্ণামঙ্গল। ভারতচন্দ্র শুধু যে কাব্যচর্চাতেই প্রতিভাধর ছিলেন তা নয়, সঙ্গীতেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। শ্রীরাধা-কৃষ্ণ বিষয়ে লেখা এবং নিজের সুরে গাওয়া পদাবলী গান, যাকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বলা হত, বাংলার সঙ্গীতজগতে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেছিল। যে ধারা অনুসরণ করে রামপ্রসাদ সেন (১৭২১-১৭৮১)-এর শাক্তপদাবলী এবং শ্যামাসঙ্গীত, তিনশবছর ধরে, আজও সমান সজীব!

    ১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধে, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার বীভৎস পরাজয়ের পর, বাংলা এবং ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাদীক্ষার প্রেক্ষাপটই দ্রুত বদলে যেতে লাগল। ব্রিটিশ রাজত্বের রাজধানী হয়ে নতুন শহরের পত্তন হল কলকাতায়। ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রাচীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি থেকে কলকাতায় সরে এল। বদ্ধ জলাশয়ের মতো মধ্যযুগের পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সমাজে এসে ধাক্কা দিল, ইওরোপের- বিশেষ করে ইংল্যাণ্ডের আধুনিক শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া এবং রেনেশাঁ যুগের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা। কলকাতা রাজধানী হওয়াতে দেশের অন্য প্রান্তের থেকে বাংলার বুদ্ধিজীবিরা পশ্চিমের এই চমক লাগানো আধুনিকতায় ডুবে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল খুব সহজেই। একই সঙ্গে সদ্য কৈশোর পার হওয়া বাংলা ভাষা এবং বাংলা লিপি ইওরোপের আলোর স্পর্শে হঠাৎ যেন যুবক হয়ে উঠল। বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপি পা রাখল আধুনিক বিশ্ব-দরবারের অঙ্গনে। সে কথায় আসব পরবর্তী ও শেষ পর্বে। 


চলবে..

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ " 


১৩

 

শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।

শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”

জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।

শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।

জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।

শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে”।

জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর, শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”

ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।

শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্‌গির সম্ভব, সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান, ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”

শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!

ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটা বুঝে নিতে চাই”। একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য মুদ্রা হলে ভালো হয়”।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।

“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব। তাতেই আপাতত চলে যাবে”।  

শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ? আশ্চর্য!”

“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর ডাকাতি করব”।

“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না, হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি, ভল্লা?”

“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।

শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির স্থাপনা করেন...”।

শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে! রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় নেই।”

“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।

শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”

“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।

আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।

“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।

“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।

এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড। মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস, তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে – সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”

লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ! 

চলবে...      



নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...