বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৫

 ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা (আগের পর্বে শুরু হয়েছিল, তারপর...)  

এরপর ব্রহ্মা একদিন চিন্তা করতে লাগলেন, পূর্ব কল্পের মতো কিভাবে লোকসকলকে যথাযথ সৃষ্টি করব? এই রকম ভাবতে ভাবতে ব্রহ্মার চার মুখ থেকে চার বেদের সৃষ্টি হল। তাঁর চার মুখ থেকে চার যজ্ঞকারী,  হোতা, উদ্গাতা, অধ্বর্য্যু ও ব্রহ্মার সৃষ্টি হল। এই চার যজ্ঞকারীর কর্ম, কর্মতন্ত্র, অর্থাৎ যজ্ঞবিস্তার, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি উপবেদ সকল, নীতিশাস্ত্র, ধর্মের চার পাদ, চার আশ্রম ও তার বিধি বিধান সকল সৃষ্টি হল।  এই ভাবে তিনি ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব, এই চার বেদ; আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ অর্থাৎ সঙ্গীতবিদ্যা, স্থাপত্য অর্থাৎ বিশ্বকর্মশাস্ত্রের সৃষ্টি করলেন। এরপর তিনি ইতিহাস ও পুরাণরূপ পঞ্চম বেদ সৃষ্টি করলেন। তারপর তাঁর পূর্বমুখ থেকে সৃষ্টি করলেন ষোড়শী ও উক্‌থ নামক দুইটি যজ্ঞের নিয়ম। তারপর দক্ষিণ মুখ থেকে পুরীষী ও অগ্নিষ্টোম; পশ্চিমমুখ থেকে আপ্তোর্যাম ও অতিরাত্র এবং উত্তর মুখ থেকে বাজপেয় ও গোসব নামে যজ্ঞের নিয়ম সৃষ্টি করলেন। এইভাবেই তিনি বিদ্যা, দান, তপস্যা ও সত্য ধর্মের এই চারটি পাদ সৃষ্টি করলেন।

এর পর যথাযথ বৃত্তি অনুযায়ী চারটি আশ্রম সৃষ্টি করলেন। প্রথম ব্রহ্মচর্য আশ্রমের চারটি প্রকার আছে। উপনয়নের পর ব্রহ্মচারী সংযত হয়ে যখন ত্রিরাত্রি গায়ত্রী পাঠ করেন, সেই ব্রহ্মচর্যকে বলে সাবিত্র ব্রহ্মচর্য। যখন সেই ব্রহ্মচারী সংযমের সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ বছর ব্রত আচরণ করেন, তাকে বলে প্রাজাপত্য ব্রহ্মচর্য। ব্রহ্মচারী যতদিন সংযত থেকে বেদচর্চা করেন, তাকে ব্রাহ্ম ব্রহ্মচর্য বলে। আর আমরণ সংযত থাকলে, তাকে  বৃহৎ ব্রহ্মচর্য বলে। দ্বিতীয় গৃহস্থ আশ্রমও চার প্রকারের হয়, কৃষি ইত্যাদি বৃত্তিকে বলে বার্তাযাজন ইত্যাদি বৃত্তিকে বলে সঞ্চয়জমিতে পড়ে থাকা শস্যের শীষকে শীল বলে, যে গৃহস্থ এই শীল সংগ্রহকেই বৃত্তি করে, তাকে বলে শালীনআর জমিতে পড়ে থাকা এক একটি শস্য দানা সংগ্রহ করার যে বৃত্তি তাকে উঞ্ছ বৃত্তি বলে। তৃতীয় বাণপ্রস্থ আশ্রমেরও চার বিভাগ আছে। পতিত জমিতে গাছে পাকা ফল দিয়ে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁকে বৈখানস বলে। যিনি নতুন অন্ন পেলে, সঞ্চিত অন্ন ত্যাগ করেন, তাঁদের বালখিল্য বলেযিনি ভোরে উঠে প্রথম যে দিক দেখেন, শুধু সেই দিক থেকেই ফল আহরণ করে জীবন ধারণ করেন, তাঁকে ঔড়ুম্বর বলে। আর যাঁরা শুধুমাত্র গাছের তলায় পড়ে থাকা ফল আহরণ করেন, তাঁদের ফেনপ বলে। চতুর্থ সন্ন্যাস আশ্রমও চার রকমের হয়। যিনি প্রধানতঃ নিজের আশ্রম অনুযায়ী ধর্মের অনুষ্ঠান করেন, তিনি কূটীচকযিনি কর্মকে গৌণ বিবেচনায়, প্রধানতঃ জ্ঞানচর্চা করেন, তিনি বহেবাদযিনি শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চায় রত, তিনি হংস আর যিনি পরমতত্ত্ব লাভ করে নিষ্ক্রিয়ভাব ধারণ করেন, তিনি পরমহংসপ্রত্যেক আশ্রমীদের মধ্যে যাঁদের নাম পরে উল্লেখ করলাম, হে বিদুর, তাঁরা তাঁর আগের আশ্রমীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।

তারও পর ব্রহ্মার চার মুখ থেকে যথাক্রমে আন্বীক্ষিকী অর্থাৎ আত্মজ্ঞানরূপ মোক্ষবিদ্যা, ত্রয়ী অর্থাৎ স্বর্গ, মর্ত ও নরক লাভের কারণস্বরূপ কর্মবিদ্যা, বার্তা অর্থাৎ জীবিকার উপায় হিসাবে কৃষিবিদ্যা এবং দণ্ডনীতি অর্থাৎ রাজনীতির সৃষ্টি হল। তারপর ব্রহ্মার হৃদয় আকাশ থেকে প্রণব, রোমরাজি থেকে উষ্ণিকছন্দ, ত্বক থেকে গায়ত্রী ছন্দ, মাংস হইতে ত্রিষ্টুপছন্দ, স্নায়ু থেকে অনুষ্টুপছন্দ, অস্থি থেকে জগতী ছন্দ, মজ্জা থেকে পঙ্‌ক্তিছন্দ এবং প্রাণ থেকে বৃহতীছন্দের সৃষ্টি হল।

হে বিদুর, আগেই বলেছি মহাকল্পকালে ব্রহ্মা শব্দব্রহ্মরূপ অর্থাৎ বেদময় ছিলেন। ক হইতে ম পর্যন্ত সমস্ত স্পর্শবর্ণ তাঁর জিভ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। স্বরবর্ণের সৃষ্টি তাঁর দেহ থেকে। তাঁর ইন্দ্রিয় থেকে উষ্মবর্ণের উদ্ভব আর অন্তস্থবর্ণ সমূহ তাঁর শক্তি। তাঁর খেলার থেকে সৃষ্টি হয়েছে সুর সপ্তক – ষড়জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত ও নিষাদশব্দের দুইটি রূপ, জিভ দিয়ে যার উচ্চারণ করা যায়, সেই ব্যক্তরূপে বৈখরী ও অব্যক্তরূপে প্রণব।  ব্রহ্মা শব্দব্রহ্মময় হওয়ায় তিনি উভয়রূপেই বিরাজ করেন, প্রণবরূপে তিনি অব্যক্ত পরমেশ্বর এবং ব্যক্তরূপে নানা শক্তির আধার ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ।

আত্মজা সরস্বতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে একবার ব্রহ্মা কামার্ত হয়ে পড়েনতাই দেখে তাঁর পুত্র মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ তাঁকে নিরস্ত করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে, শ্রীনারায়ণের শরণ নিলেন। তাঁরা বললেন, যিনি নিজের অন্তরে অবস্থিত বিশ্বকে নিজের তেজে প্রকাশ করছেন, সেই ভগবানের কাছে আমাদের প্রার্থনা, তিনি ধর্মকেও রক্ষা করুন। শ্রীনারায়ণের কাছে সমবেত পুত্রদের এই প্রার্থনা শুনে, ব্রহ্মার চৈতন্য হল, তিনি লজ্জিত হয়ে নিজের কলঙ্কিত তনু ত্যাগ করে নিত্য বিশুদ্ধ শব্দব্রহ্ম তনু ধারণ করেছিলেন।

মরীচি প্রমুখ মহর্ষি হলেও তাঁদের প্রজা সৃষ্টির বিস্তারে ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, তাই তিনি আরেকবার তাঁর তনুকে দুভাগে ভাগ করলেন। ব্রহ্মার রূপের আরেক নাম, “ক”, তাই তাঁর দেহ থেকে বিভক্ত অন্য ভাগের নাম হল কায়সেই কায়ের এক অংশ হল পুরুষ, আরেক অংশ হল নারী। ওই পুরুষই স্বয়ং উদ্ভূত মনু এবং ওই স্ত্রী তাঁর মহিষী শতরূপাসেই থেকেই স্ত্রী ও পুরুষের মিলনে প্রজা সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল”

[ব্রহ্মার কীর্তি ও কুকীর্তির সীমা নেই - অথচ আমাদের এত বড়ো দেশে ব্রহ্মার মন্দির আছে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর সরোবরের তীরে; রাজস্থানের বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)। এমন কীর্তিমান দেবতাকে অবহেলা করে আমরা বিষ্ণু, কৃষ্ণ আর শিবের মন্দির গড়ে তুললাম পাড়ায় পাড়ায়! অতএব আমরা ধার্মিক ও ভক্ত ঠিকই কিন্তু বোকা ভাববার কোন কারণ নেই।]  


বরাহ অবতারের পৃথিবীর উদ্ধার

শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ, বিদুর মহামুনি মৈত্রেয়র মুখে পুণ্যতম বাণী শুনে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুনিবর, স্বয়ম্ভূর পুত্র সম্রাট স্বায়ম্ভূব মনু প্রিয়া পত্নী লাভ করে কী করলেন? সেই আদিরাজ ও রাজর্ষির চরিত্র কথা শুনতে আমার অত্যন্ত ইচ্ছা হচ্ছে। তিনি শ্রীহরিকে আশ্রয় করেছিলেন, এবং জ্ঞানীরা বলেন, যাঁদের হৃদয়ে মুকুন্দের চরণপদ্ম বিরাজ করে, তাঁদের গুণের কথা শুনলে সকল শাস্ত্র পাঠের থেকেও বেশ সুফল লাভ করা যায়”শ্রীশুকদেব বললেন, “মহাত্মা বিদুরের সৌভাগ্যের সীমা নেই, তাঁর কোলে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমভরে শ্রীচরণ স্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রশ্নে মহামুনি ভগবৎকথায় আনন্দপুলকিত অঙ্গে বললেন।”

শ্রীমৈত্রয় বললেন, “ব্রহ্মার শরীর থেকে স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর পত্নী শতরূপার জন্মের পর, তাঁরা বেদগর্ভ ব্রহ্মাকে প্রণাম করে বললেন, “আপনি সকল ভূতের জন্মদাতা ও পালনকর্তা, অতএব আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন এবং আমাদের নির্দেশ করুন আমরা আপনার কি সেবা করতে পারি এবং কী ধরনের কর্ম অনুষ্ঠান করলে জগতে আমাদের যশ ও পরলোকে সদ্গতি লাভ করা সম্ভব”

প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁদের আশীর্বাদ করে বললেন, “হে বৎস, তোমাদের দুজনের মঙ্গল হোক। তোমাদের এই কথায় আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। কারণ পিতার প্রতি পুত্রের এইরকম শ্রদ্ধাই থাকা উচিৎ। কখনো পিতার আদেশ এবং নির্দেশ কেন পালন করব, এমন চিন্তা মনে স্থান দেওয়াও বিধেয় নয়। হে পুত্র তুমি তোমার পত্নীর গর্ভে তোমার মতোই গুণসম্পন্ন সন্তান সৃষ্টি করো, রাজধর্ম অনুযায়ী প্রজাপালন করো এবং যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে শ্রী বিষ্ণুর আরাধনা করো। তোমার প্রজাপালন ও প্রজারক্ষাতেই আমার  প্রতি তোমার সেবা সম্পূর্ণ হবে, ভগবান জনার্দনও তোমার প্রতি প্রসন্ন থাকবেন” 

এই কথায় স্বারম্ভূব মনু বললেন, “হে বেদগর্ভ পিতা, আপনার আদেশ আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। কিন্তু সকল ভূতের বাসস্থান যে ধরিত্রীদেবী, তিনি এখন মহাসাগরের তলায় বন্দিনী। তাঁর উদ্ধার না হলে আমরা থাকব কোথায়, আর কোথায় থাকবে আমার প্রজারা? আপনি দয়া করে, তাঁর উদ্ধারের উপায় দেখুন”

গভীর উদ্বিগ্ন মুখে ব্রহ্মা বললেন, “আমি যখন পৃথিবীর সৃষ্টি করছিলাম, সেই সময় হঠাৎ প্লাবনে পৃথিবী রসাতলে চলে গেছে। আমি এই বিপদের থেকে উদ্ধারের জন্যে করুণাসিন্ধু শ্রীবিষ্ণু ছাড়া আর কার সাহায্য পেতে পারি? একমাত্র তিনিই আমাদের এই পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারেন”এই চিন্তায় যখন তিন ব্যাকুল, সেই সময় তাঁর নাক থেকে বেরিয়ে এল, ছোট্ট আঙুলের মতো এক বরাহ মূর্তি। সেই বরাহ মূর্তি দেখতে দেখতে পাহাড়ের মতো বিশাল আকার ধারণ করল।

এই আশ্চর্য ঘটনায় ব্রহ্মা ও তাঁর পুত্রেরা চিন্তা করতে লাগলেন, এই বরাহ কে? আমার নাকের ভিতর থেকে সামান্য আকার নিয়ে  আবির্ভূত হয়ে, কিভাবেই বা এই বরাহ এমন ভীষণ আকার ধারণ করতে পারলে? তবে কি ইনিই শ্রী ভগবান বিষ্ণু? সকলেই যখন এই বিতর্কে ব্যস্ত, তখন সেই বরাহ মূর্তি প্রচণ্ড গর্জনে সমস্ত দিক কাঁপিয়ে তুললেন। সেই মায়াময় বিশাল শূকরের গর্জন, অবিকল শূকরের মতোই, সেই গর্জনে সকলেই আশ্বস্ত হলেন, যে ইনিই ভগবান শ্রীবিষ্ণু। স্বয়ং ব্রহ্মা ও উপস্থিত মরীচি প্রমুখ ঋষিরা আনন্দে ভগবানের স্তুতি করে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। বেদমন্ত্র শুনে সেই অদ্ভূত বরাহ আর একবার গর্জন করে, বিশাল লাফ দিলেন, তারপর জলের মধ্যে ডুব দিলেন। তাঁর ক্ষুরের আঘাতে আকাশের মেঘ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাঁর চোখের জ্যোতিতে চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ভয়ংকর করাল তাঁর দাঁতের সারি। তাঁর দাঁত করাল হলেও, তাঁর চোখে তীব্র জ্যোতি থাকলেও, বেদ উচ্চারণ রত ঋষিদের প্রতি তাঁর দৃষ্টি প্রসন্নই রইল। এই বরাহমূর্তি আসলে তাঁর ছলমাত্র, তিনিই স্বয়ং যজ্ঞমূর্তি, বরাহরূপে এসেছেন রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করার জন্যে



[মালব (মধ্য প্রদেশ) অঞ্চলে অনার্যদের মধ্যে বরাহ পূজার প্রচলন ছিল। এরান অঞ্চলে বরাহ মূর্তি পাওয়া গেছে।  সেই বরাহকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে, হিন্দু ধর্ম অনার্য প্রথাকেই নিজের অন্তর্ভুক্ত করে নিল। তার জন্যেই এত গল্প বানানো, স্তব-স্তুতি, বেদমন্ত্র উচ্চারণ ইত্যাদি। ওপরে রইল এরানের (মধ্যপ্রদেশ) বরাহ মূর্তি - সৌজন্য গুগ্‌ল্‌। ]

চলবে...

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩২ 


৩৯ 

জনাই চমকে উঠে বলল, “ওরে বাবা। দশহাত মাপের ধুতিই যদি ধরি। চল্লিশখানা মানে – চারশ হাত কাপড়? তাও কালো? অসম্ভব বীজপুরের বিপণিতে একসঙ্গে এত কালো কাপড় পাওয়া যাবে না। আমি বলি কি চল্লিশখান সাদা ধুতি কিনে নে না – তারপর সেগুলো কালো রঙে ছুবিয়ে নিবি ... চলবে না?”

দিনের প্রথম প্রহরের সমাপ্তি ঘোষণা করে, প্রহরী চটির পেটা ঘন্টায় আওয়াজ তুলল ঢং।    

কিন্তু রঙ উঠে গেলে?”

“ধুর ব্যাটা। রঙ উঠবে কেন? আমি তো তাই করি। চটিতে নানান ধরনের লোকজন আসে। অনেকে বিছানাতে বসেই নেশা করে – খায় দায় – আর বিছানার চাদরে ছোপ ধরিয়ে চলে যায়। সে ছোপ না উঠলে সুবিধেমতো রঙে ছুবিয়ে নিই। সে রঙ তো ওঠে না – তবে হ্যাঁ,  কালো রঙ কোনদিন ব্যবহার করিনি”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে তাই কর – চল্লিশটা সাদা ধুতি – আর পর্যাপ্ত কালো রঙের ব্যবস্থা কর। কত ব্যয় হবে?”

“আমি আনিয়ে নিচ্ছি – যা ব্যয় হবে দিয়ে দিবি”।

“আচ্ছা, এবার বল – বারো হাত লম্বা, দশ হাত চওড়া ইঁটের ঘর বানাতে কত ব্যয় হতে পারে? তোর কোন ধারণা আছে? সব কিছু নিয়ে – ভিত থেকে ছাদ অব্দি”।

“দ্যাখ, এই চটিতে ভৃত্যদের থাকার ঘরগুলো মোটামুটি ওই মাপেই বানাই, তার ব্যয় হয় ঘর প্রতি তিনটে রূপো। কিন্তু তোদের নোনাপুরের ব্যয় অনেকটাই বেশি পড়বে – এখান থেকে ইঁট-চুন-সুরকি-বালি নিয়ে যাবে, কাজের লোকরাও অতটা দূরে গিয়ে থাকবে – তাদের থাকা, খাওয়া-দাওয়া...। আমি ডেকে পাঠাচ্ছি – দেখি না কত বলে। আর কিছু?”

“না আর কিছু না। আজ সন্ধের একটু পরেই আমরা কিন্তু বেরিয়ে পড়ব – কাল সকাল সকাল নোনাপুরে ঢুকতে হবে”।

ঠিক আছে – আমি হাটে লোক পাঠাচ্ছি, আর সুমেরকেও বার্তা পাঠাচ্ছি। একটু বস”।  

জনাই উঠে দাঁড়াতে, রামালিও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, আমি হাট থেকে একটু ঘুরে আসব? জনাইদাদার লোকটির সঙ্গে?”

ভল্লা রামালির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে কিছু চিন্তা করল, তারপর বলল, “ঠিক আছে - যা ঘুরে আয়”।

চটির কিছু কাজকর্ম সেরে জনাইয়ের ঘরে ফিরতে একটু দেরিই হল। ঘরে এসে দেখল, ভল্লা মাটিতে শুয়ে আছে। অবশ্য জনাইয়ের পায়ের শব্দে ভল্লা উঠে বসল, বলল, “বসে থাকতে থাকতে চোখটা একটু লেগে এসেছিল...”।

জনাই মাটিতে ভল্লার মুখোমুখি বসে বলল, “তোর খবর মাঝেমাঝেই পাই। তুই তো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিস চারদিকের গ্রামগুলোতে। তবে একথাও বলব, আস্থানের রক্ষীরাও এর জন্যে দায়ী। তারা মোটেই ঠিক কাজ করছে না - গ্রামপ্রধানকে পিটিয়ে মেরে ফেলল? তার ওপর কবিরাজমশাইকে মেরেধরে বন্দী করে রেখে দিল আস্থানে? ফসল ভালো হয়নি বলে, রাজকর কিছুটা কম করার অনুরোধ করেছিল। সেটা তাদের অপরাধ হয়ে গেল? ছি ছি তার জন্যে এরকম নৃশংস হত্যা? বড্ডো বাড়াবাড়ি করছেন আস্থানের আধিকারিক।

আমাদের এই অঞ্চলের লোকরাও ক্ষেপে উঠছে, জানিস? এরকম চললে, নোনাপুর কিংবা সুকরা নয় আরও অনেক গ্রামেই এরকম আগুন ছড়িয়ে পড়বে। বীজপুরে তোর নাম এখন বীজমন্ত্র হয়ে উঠেছে, রে শালা”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে শুনছিল জনাইয়ের কথা। রাজধানীর নিবিড় ষড়যন্ত্রের কথা জনাই জানে না। ভল্লার এ অঞ্চলে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তার ধারণা ভাসা-ভাসা। কিন্তু জনাই যেহেতু এই চটির অধ্যক্ষ, বহুলোক - ধনাঢ়্য তীর্থযাত্রী, সম্পন্ন বণিক এবং এই জনপদের সকল মানুষের সঙ্গেও তার নিত্য ওঠাবসা। বলা বাহুল্য সকলের সঙ্গেই তাকে সদ্ভাব রাখতে হয়। জনাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গী তার পরিচিত সকল মানুষের ধারণার প্রতিচ্ছবি। অতএব ভল্লার কাছে জনাইয়ের মন্তব্য অমূল্য।

“শুনেছি গ্রামের লোকরা একবার আস্থানে হানা দিয়েছিল। আবার দেবে না তো? এখানকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ছোকরার দল, কিন্তু চাইছে – নোনাপুরের ছেলেরা উচিৎ শিক্ষা দিক – আস্থানের রক্ষীদের। আর ওই যে উপানু – ও হতভাগা রক্ষীদলের সর্দার হল কী করে। ব্যাটা মাথামোটা, হোঁৎকা! শুনেছি আস্থানের অধিকারী শষ্পক সজ্জন-ভদ্র মানুষ – তিনি কী পারবেন এই পরিস্থিতি সামলাতে?”

ভল্লা আলস্যে আড়মোড়া ভেঙে, বড়ো করে হাঁই তুলে বলল, “আমাকে বলছিস কেন? শষ্পককে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর। আমি নির্বাসনে থাকা অপরাধী – আমি কী করব?”

জনাই তীক্ষ্ণ চোখে ভল্লাকে দেখল, বলল, “শালা, এমন ভাব করছিস ভাজা মাছ যেন উলটে খেতে জানিস না? চল্লিশটা কালো ধুতি নিয়ে কী করবি – তুই আর তোর ওই সেনাধ্যক্ষ রামালি? কী ভাবিস – আমি কিছুই বুঝি না?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “না রে - তুই কী ভাবছিস জানি না। গ্রামের কিছু ছোকরা ঠিক করেছে – এখন থেকে তারা সাদা ধুতি পরবে না। সাদা ধুতি ময়লা হয় বেশি – দাগছোপ ধরে তাড়াতাড়ি – তার চে কালো ধুতি পরা ভালো। ওরা সবাই দরিদ্র – জানিস তো? প্রতিদিন ক্ষার-সোডা দিয়ে  কাপড় কাচাও ওদের কাছে বিলাসিতা”।

জনাই মুখের সামনে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলল, “তোকে আমি আজ থেকে চিনি ভল্লা? সেই ছোকরা বয়েসের ডামল থেকে চিনি। তুই কোনো গোপন কাজে, গোপন নামে এখানে এসেছিস, সে আমি জানি। কিন্তু কাজটা কী – সেকথা তুই বলবি না, সেও জানি। আর আমিও জানতে চাই না। কিন্তু তাও বলব, এদিকের সাধারণ লোক চাইছে – তোরা কিছু একটা কর, রক্ষীদের গুমোর ভেঙে দে”।

“পাগল হয়েছিস? আমি ওসবের মধ্যে জড়াবো কেন? আর আস্থানের রক্ষীরা জব্দ হলে, রাজধানী থেকে সেনাবাহিনী পাঠাবে। সে ধাক্কা গ্রামের সাধারণ এই ছোকরার দল সামলাতে পারবে”? জনাই ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভল্লা হেসে জনাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমার কাজের কোন কথাই তোকে বলতে পারব না, বন্ধু। কিন্তু ধৈর্য ধরে দেখতে থাক – আগে আরও কী কী হয়। এটুকু বলতে পারি – নোনাপুরের ছেলেরা তোকে এবং বীজপুরবাসীদের হতাশ করবে না। যাগ্‌গে ওসব ছাড় – আমার মাছের ঝোল কী হল?”

“শালা তোর কপালটা ভালো – প্রায় দুসেরের একটা রহু পেয়েছি – একদম জ্যান্ত – এতক্ষণে মনে হয় রান্না শুরু হয়ে গেছে”। হাসতে হাসতে জনাই বলল।

“ওফ্‌, সেই পিপুলতলা ছাড়ার পর এই প্রথম মাছের ঝোল আর ভাত খাবো। ভুট্টার রুটি আর সেদ্ধ ভুট্টা খেতে খেতে জিভে চড়া পরে গেছে, রে জনাই”।

ওদের কথার মধ্যে রামালি ঘরে ঢুকল। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “বীজপুরের হাট দেখলি?”

“হ্যাঁ, ভল্লাদাদা - কী না পাওয়া যায় হাটে, বাস্‌ রে – অর্ধেকের বেশি পসরা এই প্রথম চোখে দেখলাম”! রামালি মেঝেয় বসতে বসতে একটু উচ্ছ্বসিত হয়েই বলল।

ভল্লা হাসল, বলল, “ধুতি পেয়েছিস?”

রামালি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ধুতি – কালো রঙ সবই পাওয়া গেছে। শাম্‌লা – যার সঙ্গে আমি হাটে গেলাম – বলল এখানেই কালো রঙ করে দেবে...”।

জনাই বলল, “হ্যাঁ আমাদের বাঁধা রজক আছে – বড়বড়ো মাটির গামলায় রঙ গুলে একসঙ্গে সব ছুপিয়ে দেবে। আমার এখানে শুকোতে দেওয়ার অনেক জায়গা – রোদ্দুরে মেলে দিলে দণ্ড দুয়ের মধ্যে শুকিয়েও যাবে। তোরা ওসব করেছিস কখনো? গণ্ডগোল হয়ে গেলে শালা পুকুরের জলই কালো হয়ে কেলেংকারি কাণ্ড হবে – একবার ডুব দিলে কেলেকাত্তিক হয়ে উঠে আসবি... তুই মাছ খাস তো রামালি?”

রামালি বলল, “কয়েকবার খেয়েছি – তবে আমাদের দিকে তেমন কেউ খায় না”।

জনাই হেসে বলল, “ব্যস্‌ ব্যস্‌, ওতেই চলবে। তুই ভাই নিরিমিষ খেলেও আমার কোন অসুবিধে নেই – চটিতে সব ব্যবস্থাই রাখতে হয়…”।  

চটির ঘন্টা দুবার বাজল ঢং ঢং করে। জনাই ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে বলল, “ওঃ দুই প্রহর শেষ হয়ে গেল…ভল্লা, আমি একটু ঘুরে আসি রে - জনা চারেক মাননীয় অতিথি আছে – মাঝে মাঝে গিয়ে আমার মুখটা না দেখালে – তাদের রাগ হয়ে যাবে। বড়োলোকের পীরিত – শালা ক্ষণে রঙ্গ, ক্ষণে ভঙ্গ... ”। জনাই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “খাওয়ার সময় চলে আসব, একসঙ্গে খাবো”।

চলবে...


সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১০

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৯ "]

৫.৩.২.২ বিষ্ণু - ভাগবত

হিন্দুধর্মে সব থেকে বর্ণময় এবং জনপ্রিয় দেবতা বিষ্ণু, তিনি অনন্ত লীলাময়। বিষ্ণু ভক্তদের মতে তিনিই পরমপুরুষ, পুরুষোত্তম। তিনি অক্ষয়, অনাদি, অনন্ত ঐশ্বর্যবান, নির্বিকার ব্রহ্ম। তিনিই বেদস্বরূপ, তিনি চৈতন্যস্বরূপ, তিনিই এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের কারণ স্বরূপ। তিনি সকল কার্য ও ক্রিয়ার কারণ, কিন্তু তিনি কর্তা নন, কারণ তিনি কখনও কোন কর্মফল ভোগ করেন না, তিনি অব্যয় এবং অক্ষর। কর্তা না হয়েও, প্রকৃতির সঙ্গে যখন তাঁর সংশ্লেষ ঘটে, তখনই তাঁর কারণরূপে কার্যসকল ঘটতে থাকে। প্রকৃতির তিনগুণ, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। প্রকৃতির এই তিনগুণের আশ্রয় থেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ হতে থাকে। সত্ত্বগুণের প্রভাবে যখন তিনি বিষ্ণু, তখন তিনি পালন করেন। রজোগুণের প্রভাবে যখন তিনি সৃষ্টি করেন, তখন তিনিই ব্রহ্মা। আবার তমোগুণের প্রভাবে যখন তিনি বিনাশ করেন, তখন তিনিই হর।

এতদিন ব্রহ্মলাভ অর্থাৎ মুক্তির উপায় ছিল যজ্ঞ, তপস্যা, ধ্যান। মন থেকে সমস্ত কামনা, বাসনা, ঘৃণা, হিংসা, ঈর্ষা, মোহ, অহংকার মুছে ফেলে নিরন্তর চিন্তন করতে হবে, এই দেহ আত্মা নয়। চরাচর বিশ্বে, যা কিছু আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করি, ব্রহ্ম সবকিছুর সঙ্গেই ওতপ্রোত জড়িত, কিন্তু সেগুলির কোনটিই তিনি নন। এই চিন্তা করতে করতে সাধক যখন নিজের আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে কোন প্রভেদ দেখতে পান না বরং পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মাকে একীভূত করতে পারেন, তখনই সাধকের পরমমোক্ষ লাভ হয়। সাধনার এই পথকে জ্ঞানযোগ বলে।

ব্রহ্মলাভের আরও একটি পথ কর্মযোগ। কর্মযোগেও জ্ঞানযোগের মতো মনের সমস্ত বিকার দূর করতে হয়। তারপর ফলের কামনা না করে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হয়। এই যজ্ঞ শুধুমাত্র অগ্নিতে ঘৃত আহুতি দেওয়া নয়, মনের সকল কামনা, বাসনা ও প্রত্যাশা ত্যাগের অগ্নিতে আহুতি দেওয়া। নিজের জীবন ধারণের জন্যে নিত্যকর্ম ছাড়া, অন্য সমস্ত কর্মই নিষ্পৃহ চিত্তে ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণ করতে হয়। এই নিষ্কাম কর্ম সাধনা থেকেও সম্যক জ্ঞান উপলব্ধি হয়, জীবাত্মা ও পরমাত্মার রহস্য ভেদ করা যায়।

পৌরাণিক বা হিন্দু যুগে আরেকটি পথ এল ভক্তিযোগ। বলা হল, যেহেতু কলিযুগে একদিকে মানুষের আয়ু স্বল্প, অন্যদিকে জীবনে রয়েছে বহু বাধা-বিঘ্ন। উপরন্তু তারা বড়ো অলস ও মন্দবুদ্ধি। তাদের পক্ষে বহু শাস্ত্রের বহু জ্ঞান ও কর্মের উপদেশ মেনে ধর্মাচরণ করা সম্ভব নয়। অতএব তাদের পক্ষে অনেক সহজ এবং আশু ফলদায়ী পথ হল ভক্তিযোগ। এই ভক্তিযোগই হয়ে উঠল হিন্দু সাধারণ সমাজের প্রধানতম ধর্মপথ। সে কথায় আসছি একটু পরে।

এখানে খুব সহজ কথায় বলা হল, জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি ভাবনা-চিন্তা ঈশ্বরে সমর্পণ করো। সাধনা বা তপস্যা করতে পারলে ভাল, না পারলে পরমভক্ত হও। তাঁর কথা সর্বদা চিন্তা করো, যখনই মনে হবে, তাঁর মহিমার কথা অন্যকে শোনাও, নিজেও শোনো। তাঁর চিন্তা ছাড়া অন্য সব চিন্তা পরিত্যাগ কর। তাঁর কথা ছাড়া অন্য সব কথা বলা বা শোনা, বিষের মতো ত্যাগ কর। এভাবেই পরমভক্তিতে তাঁর শ্রীচরণে নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারলে, তিনি নিজেই এসে ধরা দেবেন ভক্তের হৃদয়ে। যেহেতু তিনি ভক্তপাবন, কোন ভক্তই তাঁর চোখের আড়ালে থাকে না। তিনি ভক্তের ভগবান, ভক্তের জন্যে তিনি বৈকুণ্ঠলোকের সুখ ও স্বস্তি ছেড়ে বারবার নেমে এসেছেন ধূলিমলিন পৃথিবীতে। ভক্তের আর্ত প্রাথনায় তিনি বারবার অবতীর্ণ হয়েছেন এই ধরাতলে, অধর্মের বিনাশ করে, প্রতিষ্ঠা করেছেন ধর্ম।

এই সহজ সরল ভক্তিযোগের তত্ত্ব সর্বস্তরের মানুষের মনে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলল। সমাজে নানান বর্ণ থাক, নানান জাতি থাক, কিন্তু নিজের ঘরে বসে ভক্ত হতে তো কোন বাধা নেই। সেখানে কোন পুরোহিতের দরকার হয় না, যজ্ঞের বেদি বানাতে হয় না, কলসি কলসি ঘি ঢালতে হয় না। শুধু নাম জপ করতে হয়। সারাদিন যতবার খুশি।

ভক্তি যোগ এবং বিষ্ণু তত্ত্বের উদ্ভব সম্ভবতঃ ভাগবত শাখার জনপ্রিয়তা থেকে। নচেৎ বৈদিক ইন্দ্র, সূর্য, অগ্নি সকলকে ছাড়িয়ে আদিত্যদের সর্বকনিষ্ঠ বিষ্ণুকে নিয়ে ধর্ম তত্ত্ব রচনার চিন্তা আসবে কেন? ভাগবত শাখার দেবতার নাম হয়তো বিশদেব>বিশ্ ছিল, যার ফলে বিশ্‌কে – বৈদিক বিষ্ণুর সঙ্গে যুক্ত করতে বেগ পেতে হল না। যেভাবেই হোক এই মহিমা প্রচারের সাফল্য পণ্ডিতদের আরও বেশি উৎসাহী করে তুলল। তাঁরা ভাগবত শাখার বিস্তৃতির জন্যে আরও বহু অঞ্চলের বিভিন্ন অনার্য দেবতা, দেব-আত্মার প্রতীক (totem), পশু-পূজা (Zoolatry বা theriomorphism), পশু-মানব পূজা (anthropomorphism) এবং তাঁদের কাহিনীগুলি কিছু কিছু গ্রহণ করলেন, কিছু কিছু সম্পূর্ণ নতুন কাহিনী কল্পনা করে বিষ্ণুর সঙ্গে জুড়ে ফেললেন। এভাবেই এসে গেল ভগবান বিষ্ণুর অবতার কাহিনী।

আদিম ভারতের বিশেষ একটি অঞ্চলের তিনজন অনার্য দেবদেবীর কাহিনী আমি অনুমান করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে খুব স্বাভাবিক ভাবেই, বিস্তীর্ণ ভারতের ব্যাপ্ত অঞ্চলে এই দেবদেবী ও দেব-আত্মাদের সংখ্যা ছিল অজস্র। কারণ এক একটি অঞ্চলের সমাজগুলি বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছিল। দূর দূর অঞ্চলের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বণিকসম্প্রদায় ও তাদের বাণিজ্যের মাধ্যমে। কিন্তু তাতে পারষ্পরিক ধর্মীয় বিশ্বাস খুব একটা প্রভাবিত হয়নি, তার কারণ সেই যুগে কোন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না। আর্যদের বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মও, আর্যাবর্তের বাইরের বিস্তীর্ণ অনার্য সমাজকে তেমন প্রভাবিত করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু হিন্দুধর্মের বিষ্ণু এবং শিব-তত্ত্ব সেটাই শুরু করল এবং সাফল্যের সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করল। হিন্দুধর্ম যত দূর দূর অঞ্চলে প্রসারিত হতে লাগল, সেখানকার সমাজের বিশ্বাস ও আস্থাকে তারা ততই নিজেদের ধর্মতত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত করতে থাকল।

এবার বিষ্ণুর দশ অবতার তত্ত্বের দিকে একবার চোখ রাখা যাক। নিচের সারণিতে দশাবতারের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলাম, মনে রাখতে সহজ হবে।

অবতার সারণি -  রিচয়, বিবরণ ও পৌরাণিক কাজ   

১. বরাহ - মালব, মধ্য প্রদেশ। এরান অঞ্চলে বরাহ মূর্তি পাওয়া গেছে। (সত্য যুগ) - রসাতল থেকে পৃথিবী উদ্ধার।

২. মৎস্য - পূর্বভারতের টোটেম, এই অঞ্চলে আজও মাছ অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য এবং যে কোন শুভ অনুষ্ঠানে মাছ শুভ প্রতীক। (সত্য যুগ) - প্লাবনের সময় বৈবস্বত মনুর নৌকা পরিচালনা।

৩. কূর্ম - সঠিক জানা যায় না, তবে বিশেষজ্ঞরা সিন্ধু সভ্যতায় কচ্ছপের প্রতীক এবং কচ্ছপের ছোট মূর্তি পেয়েছেন, পশ্চিম ভারতের ধর্মীয় প্রতীক হতে পারে। (সত্য যুগ) - সাগর মন্থনের সময় মন্দরপর্বতের আধার।  

৪. নৃসিংহ - এ.ডি.-র দ্বিতীয়-চতুর্থ শতাব্দীতে অন্ধ্রর বেশ কিছু নরসিংহ মন্দির থেকে ধারণা করা যায় ওই অঞ্চলে নৃসিংহ অনার্য দেবতা হিসেবেই পূজিত হতেন।  যদিও সমসময়ে উত্তর ও মধ্য প্রদেশেও নৃসিংহ মন্দির পাওয়া গেছে। (সত্য যুগ) - দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু বধ।

৫. বামন - ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতার মাতা অদিতির পুত্র।  (সত্য যুগ) - বলির দর্প নাশ।

৬. পরশুরাম - মুনি জমদগ্নির পুত্র, মাহিষ্মতী নগরের কাছে আশ্রমবাসী। (সত্য যুগ) - ক্ষত্রিয়দের গর্ব নাশ। 

৭. শ্রীরাম - অযোধ্যার রাজা, অনার্য বিজয়। (ত্রেতা যুগ) - রাবণ বধ, সীতা উদ্ধার।

৮. কৃষ্ণ - মথুরা – দ্বারকা। (বিস্তারিত আলোচনা পরে)। (দ্বাপর যুগ) - ভূভারহরণ ও ধর্ম স্থাপন।

৯. বুদ্ধ - সব থেকে গুরুত্বহীন অবতার। (কলিযুগ)

১০. কল্কি - এখনও আসেননি, অতএব মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। (কলিযুগ)

 বরাহ অবতার – পরমেষ্ঠী ব্রহ্মা, যখন বিষ্ণুর নির্দেশে জগতের সৃষ্টি কর্মে ব্যস্ত ছিলেন, তখন পৃথিবী তাঁর হাত থেকে পিছলে প্রবল জলের তোড়ে পড়ল গিয়ে রসাতলে। এমন অবস্থায় সৃষ্টি হতে থাকা সকল জীব ও জড়ের আশ্রয় কোথায় হবে? এই চিন্তায় তিনি যখন ব্যাকুল, তখন তাঁর নাক থেকে বেরিয়ে এলেন সূক্ষ্ম বরাহ এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বরাহ বিশাল বলিষ্ঠ আকার ধারণ করলেন (ঠিক যেন মধ্যপ্রদেশের এরান জেলার বরাহ মূর্তির মত)। সেই বিশাল বরাহরূপী বিষ্ণু রসাতলের জলে নিমগ্ন পৃথিবীকে অনায়াসে তুলে নিলেন নিজের দুই দাঁতে। কিন্তু সেখানেও তাঁকে বাধা দিয়েছিলেন পাতালে[1]-র অধিপতি দৈত্যরাজ হিরণ্যাক্ষ। বরাহরূপী বিষ্ণু হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন এবং পৃথিবীকে স্বস্থানে প্রতিষ্ঠা করলেন।

মৎস্য অবতার – ব্রহ্মার দিবাবসানে এক একটি কল্পের অবসান হয় এবং রাত্রিতে তিনি নিদ্রামগ্ন হন। শ্রীহরি বর্তমান কল্পের শুরুতে ছোট্ট শফরী মাছ হয়ে আবির্ভূত হলেন রাজর্ষি সত্যব্রতর অঞ্জলিবদ্ধ জলে। সেই শফরী রাজর্ষিকে বললেন, “মাছেরা সাধারণতঃ নিজ নিজ জ্ঞাতিকে বধ ও ভক্ষণ করে, অতএব আপনি আমাকে আশ্রয় দিন, আমাকে রক্ষা করুন”। দয়ালু রাজর্ষি সত্যব্রত সেই মাছকে প্রথমে একটি ছোট পাত্রে রাখলেন, কিন্তু একরাত্রের মধ্যেই সেই মাছ এমনই বেড়ে উঠল সে পাত্রে তার সংকুলান হল না। এরপর রাজর্ষি মাছটিকে বড়ো পাত্র, তারপর সরোবর, বিশাল হ্রদে স্থাপনা করলেও, সেই মাছ অচিরেই এতটাই বেড়ে উঠতে লাগল যে সেই সব জলাশয়ও মাছটির পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে উঠল। রাজর্ষি সত্যব্রত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি নিশ্চয়ই কোন সাধারণ মৎস্য নন, আপনি কে? আপনিই কী ভগবান শ্রীহরি?”

মৎস্যরূপী শ্রীবিষ্ণু বললেন, “এখন ব্রহ্মার নিদ্রাকাল - আজ থেকে সাতদিন পরে সমস্ত ত্রিলোক প্রলয় সমুদ্রে ডুবে যাবে। সেই সময় এক বিশাল নৌকা তোমার সামনে উপস্থিত হবে। সেই নৌকায় তুমি সপ্তর্ষি ও সকল জন্তুদের নিয়ে চড়ে বসবে, সঙ্গে নেবে সমস্ত উদ্ভিদ ও শস্যের বীজ। প্রলয় সমুদ্রের আলোড়নে তোমার তরণী যখনই চঞ্চল হয়ে উঠবে, বাসুকি[2]-রূপ রজ্জু দিয়ে আমার শৃঙ্গে বেঁধে নেবে। যতদিন ব্রহ্মার রজনী থাকবে অর্থাৎ তিনি নিদ্রামগ্ন থাকবেন, ততদিন আমি প্রলয় সমুদ্রে তোমাদের পরিচালনা করব”। 

কূর্ম অবতার – সমুদ্রমন্থনের সময় মন্দর পর্বত হয়েছিল মন্থন দণ্ড এবং সর্পরাজ বাসুকি হয়েছিলেন মন্থন রজ্জু। দেব ও অসুরগণের মন্থনে যে প্রবল ঘর্ষণের সৃষ্টি হল, সেই ভার পৃথ্বী বহন করতে পারছিলেন না - মন্দর পর্বত ভূমিতে প্রোথিত হয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় ভগবান বিষ্ণু কূর্ম হয়ে সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করলেন এবং মন্দর পর্বতের আধার হয়ে তাকে নিজের পিঠে ধারণ করলেন।

চলবে...                       


[1] পৌরাণিক মতে পাতালের সাতটি বিভাগ আছে – অতল, বিতল, সুতল, তলাতল,  মহাতল, রসাতল, পাতাল – এই রসাতলেই পৃথ্বীর পতন ঘটেছিল! পাতাল ছিল দৈত্যদের রাজ্য – হিরণ্যাক্ষ, হিরণ্যকশিপু, প্রহ্লাদ, বিরোচন, বলি ও বাণ এই কয়েকজন বিখ্যাত দৈত্যরাজার নাম পুরাণে পাওয়া যায়।  

[2] বাসুকি সর্পরাজ বসুকের পুত্র। তাঁর বোনের নাম জরৎকারু (পরবর্তী কালে তিনিই মা মনসা), ভগ্নীপতি মুনি জরৎকারু এবং ভাগিনেয়র নাম আস্তিক। সর্পযজ্ঞের অনলে সকল সর্পকে বধ করা থেকে রাজা জন্মেজয়কে বিরত করেছিলেন এই আস্তিক মুনি। সর্পরাজ বাসুকিকে দু’বার রজ্জু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, একবার রাজা সত্যব্রতর নৌকা এবং আরেকবার সমুদ্রমন্থনের সময় মন্দর পর্বতকে বাঁধতে।


রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬

লিলির বিয়ে

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " মহীরূহ "


 

ছোটকা ছাদে এসেছেন একটা সিগারেট খাবেন বলে। নীচেয় আজ গুরুজনদের সমাবেশ। বৌদি কিংবা বড়দি, ছোড়দিরা ম্যানেজেব্‌ল্‌। কিন্তু দাদা, বড়জাঁইবু ছোটজাঁইবু শুদ্ধ সাত্ত্বিক মানুষ। জীবনে কোনদিন পান-সুপুরিও দাঁতে কাটেননি। সিগারেট-বিড়ি তো তাঁদের কাছে চরম অধঃপতনের সূত্রপাত। তাঁরা যদি ভাইকে কিংবা ছোট শালাকে নাক-মুখ থেকে ফুঁ মেরে ধোঁয়া ছাড়তে দেখেন বা গন্ধ পান – ব্যস্‌। তাঁরা গহন-গম্ভীর হিমালয় হয়ে যাবেন। হিমালয়ের ঝর্ণাগুলোও থমকে থমকে অশ্রু হয়ে নামবে নিঃশব্দে।

কিন্তু ছাদে এসেও শান্তি নেই মনে হচ্ছে। ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে ছোটকা সবে দেশলাই জ্বালাতে যাবেন, তাঁর কানে এল ভাইঝি লিলির চাপা কণ্ঠস্বর। লিলি বড়দার একমাত্র কন্যা, ভাল নাম আনন্দিতা। দেশলাই জ্বালালেন না, পাছে লিলির আলাপে বিঘ্ন ঘটে। সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, চিলেকোঠা ঘরের বাইরে এককোনায় দাঁড়িয়ে লিলি ফোনে কথা বলছে। পিছন ফিরে থাকায় ছোটকাকে দেখতে পেল না, ছোটকাও দেখা দিলেন না। আড়ালে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন। ফোনে অন্যপ্রান্তের কথা শুনতে পেলেন না, একা লিলির কথাতেই তিনি মন দিলেন।  

“আজ আমাদের বাড়িতে সবাই আসবে তোকে বলিনি? আজ সকালে তোর ফোন ধরতে পারব না, বলিনি?” “তাহলে? সকাল থেকে তুই চারবার ফোন করেছিস। কেন? কিসের জন্যে?” “দ্যাখ, তোর ওই আদিখ্যেতার কথা অনেক শুনেছি। একই কথা আবার বলার জন্যে কেন ফোন করছিস, বারবার?” “কাল সারারাত তোর ঘুম হয়নি তো আমি কী করব? আমি গিয়ে আম্রুতাঞ্জন মাখিয়ে তোর মাথা টিপে...”। “শোন, ঝাঁপান। সবার আগে একটা চাকরি চাই। মাস-পয়লায় নিয়মিত কিছু টাকার আমদানি চাই। চাল-ডাল-নুন-তেল-গ্যাস চাই”। “আমি চাকরি করছি, তাতে তোর কী? তুই কি আমার ঘাড়ে বসে খাবি নাকি?” “দ্যাখ, মায়েরা ঘর সামলাতেন আর বাবারা রোজগার করতেন সে সব জমানা চলে গেছে”। “হ্যাঁ মায়েরা গৃহিণী – হোম-মেকার হতেন, তো?” “তুই গৃহস্বামী হয়ে ঘর সামলাবি, আর আমি চাকরি করে... বাঃ অ্যাদ্দিনে তোর চরিত্রটা বোঝা গেল। তুই ঢ্যাঁড়স একটা, তুই... তুই বুনো ওল একটা। খেতেও অখাদ্য, তার ওপর গলা চুলকোয়। যাগ্‌গে অনেকক্ষণ হল, ছাদে এসেছি। আমি নীচেয় যাচ্ছি। মা, পিসিমারা সন্দেহ করবেন”।

লিলি ফোনটা কেটে দিয়ে পিছন ফিরতেই ছোটকাকে দেখতে পেল। ধরা পড়ে যাওয়া ফ্যাকাসে মুখে জিগ্‌গেস করল, “ছোটকা, তুমি? কতক্ষণ এসেছ ছাদে”?

ছোটকা খুব শান্তভাবে সিগারেটটা ধরিয়ে, লিলির মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্‌গেস করলেন, “ঝাঁপানের জন্মদিন চৈত্র সংক্রান্তির দিন। তাই না? এই সব ছেলেপুলেরা হয় শিরে-সংক্রান্তি নিয়ে আসে, নয়তো ক্রান্তিকারী হয়ে ওঠে।”

লিলি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, “ছোটকা তুমি তার মানে সব শুনেছ...এম্মা, আমি নীচেয় যাচ্ছি...মা ডাকছেন”।

ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন, “এখান থেকে এক পা নড়ে দ্যাখ, আগে আমি তোর ঠ্যাং ভাঙবো। বৌদির সঙ্গে বোঝাপড়াটা তার পরে সেরে নেব। কিন্তু ছেলেটি কে?”

“ছেলে কোথায়? ও তো আমার বান্ধবী”।

“বলিস কী? তার মানে সমকামী প্রেম? তোর বান্ধবী তোকে বিয়ে করে, তোর গৃহস্বামী হতে চায়? বয়ফ্রেণ্ড হলে ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে আমার অসুবিধে হত না, কিন্তু গার্লফ্রেণ্ড হলে আমাকে অনেক বেশি কাঠ-খড় পোড়াতে হবে, সমাজ এখনও অতটা, বিশেষ করে তোর বাবা-মা, পিসিমারা এখনও অতটা প্রগ্রেসিভ হয়ে উঠতে পারেননি, রে...। যাগ্‌গে গুপ্তকথা যা আছে, এই বেলা বলে ফেল”।

লিলি ছোটকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এই মানুষটাকে সে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে কিন্তু ভয় করে না। আশৈশব এই কাকুর কাছে কত যে প্রশ্রয় আর আদর পেয়েছে। এককথায় কাকুই তার হিরো। তার মনে হল, তার পরিবারে কাকুর যে অবস্থান, তাতে এই এক কাকুই তাকে উদ্ধার করতে পারেন এই সঙ্কট থেকে। কাকু এ বাড়িতে সকলের ছোট হলেও, গুরুজনেরা কাকুকে সমীহ করেন, কিছু বললে না করতে পারবেন না কেউই। মেঝেতে পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে, মুখ নামিয়ে লিলি বলল, “ঝাঁপান আর আমি একই কলেজে পড়ছি। আমার থেকে এক ক্লাসের সিনিয়র”।

“মানে সিনিয়র দিদি?”

“যাঃ, ছেলে... দিদি হবে কেন?”

“অ, তাই বুঝি? একটু আগেই যেন বললি তোর বান্ধবী? আমি কি ভুল শুনলাম”?  সিগারেটটা মেঝেয় ফেলে চটির তলা দিয়ে নিভিয়ে, লিলির মুখের দিকে ছোটকা এমন তাকালেন, লিলির মনে হল তার সামনে উত্তমকুমার দাঁড়িয়ে আছেন। সেই ঠোঁটের কোনে হাল্কা হাসি। সেই চাউনি। ছোটকা জিগ্‌গেস করলেন, “তা, ওই ইয়ে, মানে বুনো ওল বা ঢ্যাঁড়স বা ঝাঁপান, কী করে?”

এবার লিলি নিশ্চিন্তে ছোটকার কাছে আত্মসমর্পণ করে বলল, “ওটাই তো সমস্যা - এমএসসি করে বসে আছে, কোন চাকরি পাচ্ছে না।”

“বলিস কী? ইতিহাসে এমএ করে তুই চাকরি পেয়ে গেলি, আর এদিকে সায়েন্সের এমন দুরবস্থা? কী সাবজেক্ট?”

“কেমিস্ট্রি”।

“কেমিস্ট্রি? আচ্ছা? ভেরিগুড। তা লিলিসোনা তুমি ঝাঁপানের জীবনে কি সত্যিই ঝাঁপ মারতে চাও? নাকি বুনো ওলের মতো তাকে ত্যাগ করতে চাও”। লিলির চোখ ছলছল করে উঠল, কাকুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো চাই। তিন বচ্ছর হয়ে গেল ও চাকরি পাচ্ছে না, এদিকে বাবা-মা আমার বিয়ের জন্যে তাড়া দিচ্ছেন। ওর কোথাও একটা চাকরি হলে...”।

“হুঁ” বলে ছোটকা হাত বাড়িয়ে লিলির ডান কানটি মলতে মলতে বললেন, “সবই তো বুঝলাম, মা। কথাগুলো এতদিন বলা হয়নি কেন? আমাকে না পারিস, কাকিমাকে বলতে কী হয়েছিল? তাহলে আজকের এই ঝামেলাগুলো পাকতেই দিতাম না। যাগ্‌গে, তোর ওই ঢ্যাঁড়শটিকে বলে দে, একটা সিভি আর সমস্ত সার্টিফিকেটের কপি নিয়ে, আজই বিকেল চারটে-সাড়ে চারটে নাগাদ আমার সঙ্গে যেন দেখা করতে আসে। তুই ফোন করেই নীচেয় আয়, আমি যাচ্ছি”।

ফিক করে হেসে ফেলে লিলি ডান কানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কাকু, ওর ভালো নাম ঋচীক, ঝাঁপানটা ডাক নাম। কিন্তু চোত সংক্রান্তিতে ওর জন্ম কী করে জানলে?” ছোটকা কোন উত্তর না দিয়ে উত্তমকুমারসুলভ এক টুকরো হাসি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচেয় নেমে গেলেন।     

 

লিলিদের বাড়িতে আজ এই আত্মীয় সমাগম লিলির কারণেই। বড়দা-বৌদি অর্থাৎ লিলির বাবা-মা আর দেরি না করে, লিলির বিয়ে দিতে চাইছেন। সেই সূত্রেই দু’সপ্তাহ আগে রবিবারের কাগজে “পাত্র চাই” কলামে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। সেই বিজ্ঞাপনের উত্তরে গতকাল অব্দি বাহাত্তরটি উত্তর এসেছে। আজ সকাল থেকে পারিবারিক সমাবেশে তার থেকে মাত্র ছটি বিজ্ঞাপন নির্বাচিত হয়েছে। এবার সেই ছটি চিঠির উত্তর দেওয়া থেকে পরবর্তী সকল কর্মবিধির দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে সুতো অর্থাৎ সুতীর্থর ওপর। এই সুতীর্থই লিলির প্রিয় ছোটকা। কেমিস্ট্রির নামকরা অধ্যাপক, রাসায়নিক শিল্পজগতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ রসায়ন।

 

মধ্যাহ্ন ভোজের সময় দুই ভাই এবং দুই ভগ্নীপতি একত্রে খেতে বসেছিলেন। মেয়েরা বসবেন পরে। আহারের শেষ পর্বে বড়ো জাঁইবাবু বললেন, “সামনের বোশেখেই দিনস্থির করে ফেলুন, দাদা। সেই সুতোর বিয়ের পর অনেকদিন এ বাড়িতে কোন শুভকাজ হয়নি”।

অমায়িক বড়দা বললেন, “তোমরা সবাই সঙ্গে থাকলে আমার আর ভাবনা কি?”

সুতো চাটনির বাটি চাঁটতে চাঁটতে বলল, “জাঁইবু, বাহাত্তরটি থেকে ছটি ছেলেকে আমরা শর্ট-লিস্ট করলাম ঠিকই, কিন্তু মন থেকে যেন সায় পাচ্ছি না। চেনা নেই, জানা নেই, আজকাল কতরকমের অঘটন হচ্ছে, ভয় লাগে খুব”।

“সে কথা তো একশবার, লিলির এমন কিছু বয়সও হয়নি। চাকরি করছে। সবদিক বিবেচনার জন্যে আরেকটু সময় আমরা নিতেই পারি”। ছোটজাঁইবু সুতোকে সমর্থনই করলেন।

সুতো বললেন, “আমাদের পরিচিত-পরিজনদের মধ্যে ভালো ছেলে কী পাওয়া যাবে না, দাদা?”

লিলির পিতৃদেব বললেন, “দেখ, না। দেখতে তো ক্ষতি নেই কোন।” সুতো বললেন, “তাহলে এই ছটি ছেলেকে আমি সাত-দশ দিনের জন্যে হোল্ডে রাখছি, দেখা যাক এর মধ্যে কিছু ঘটে কিনা”। সকলেই সম্মত হলেন, এবং আহার পর্ব সমাধা করে, লিলির পিতৃদেব বললেন, “বেলা হল অনেক, মেয়েরা এবার বসে যাও”।

 

চারটে পনেরোতে লিলির ফোনটা বেজে উঠতেই, লিলি কাকিমাকে বলল, “এসে গেছে, কাকিমা”। লিলি কাকু-কাকিমার ঘরেই ছিল। কাকু গম্ভীর হয়ে বললেন, “যা গিয়ে নিয়ে আয়। কিন্তু একটা কথা আমি যখন আলাপ করব, কেউ কোন কথা বলতে পারবে না, লিলিও না। ফিচ-ফিচ নাকে কান্না একদম বরদাস্ত করব না”। লিলি দৌড়ে নীচে গিয়ে, সন্তর্পণে কাকুর ঘরে নিয়ে এল ঝাঁপানকে।

একটু নার্ভাস, তবে মোটামুটি সপ্রতিভ ছেলেটিকে কাকুর ভালই লাগল। ঝাঁপান কাকু ও কাকিমাকে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে রইল চুপটি করে। লিলি গিয়ে বসল কাকিমার পাশে। কাকু গম্ভীর গলায় বললেন, “তোমার সিভি আর সার্টিফিকেটগুলো এনেছ?” ঝাঁপান হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল কাগজগুলো। কাকু মন দিয়ে দেখলেন তারপর বললেন, “তোমাকে ঠিকানা দিয়ে একজনের কাছে পাঠাবো। আগামীকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ। আশা করি চাকরিটা তোমার হয়ে যাবে”।

মাখোমাখো গলায় ঝাঁপান বলল, “থ্যাংকিউ স্যার, আপনার এই ঋণ শোধ করা যাবে না...অনেক অনেক থ্যাংকিউ”।

উদাস চোখে ঝাঁপানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “উঁহুঁ, ঋণ শোধ করা যাবে না, এমন নয় – এটুকু ঋণ শোধের অনেক উপায় আছে”।

ঝাঁপান কিছু বলল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছোটকার দিকে।

ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন, “ছোট্ট একটা শর্ত। চাকরিটি পেয়ে আমার এই ভাইঝিটির সঙ্গে তোমার সব সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে - ব্যস্‌ তাহলেই তোমার ঋণ শোধ”। কাকুর কথায় কাকিমা এবং লিলি চমকে গেল। কিন্তু কিছু বলা যাবে না, কাকু আগেই বলে দিয়েছিলেন।

কাকু আবার বললেন, “লিলির বিয়ের কথাবার্তা মোটামুটি পাকা হয়ে গেছে। হয়তো সামনের বোশেখেই...খুব ভালো ছেলে, দুর্দান্ত কেরিয়ার। সে পাত্রটিকে আমরা কোনভাবেই হাতছাড়া করতে চাই না”।

কাকু লক্ষ্য করলেন, ঝাঁপানের মুখ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরে উত্তর দিল, “তাহলে স্যার, আপনার দেওয়া চাকরিটি আমি চাই না”।

কাকু রেগে গিয়ে সোজা হয়ে বসলেন, কর্কশ কাকের কণ্ঠে বললেন, “তুমি জান, তুমি কী বলছো? একটি মেয়ের জন্যে নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিতে চাও”? কাকু এখন আর উত্তমকুমার নন, যেন কমল মিত্র।

ঝাঁপান ম্লান মুখে গভীর আবেগের সঙ্গে বলল, “লিলিকে না পেলে শুধু আমার জীবন নয়, আমার বাবা-মার জীবনগুলিও ধূলি হয়ে যাবে, স্যার”। স্তম্ভিত হয়ে কাকু ঝাঁপানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, ঝাঁপান আবার বলল, “আগামীকাল সকাল দশটায় আর দুপুর আড়াইটেতে দুটো ইন্টারভিউ আছে, একটা না একটা লেগে যাবেই, স্যার। তারপরে আমি আবার আসব। আমার বাবা-মাও আসবেন স্যার”।

কাকু কমল মিত্রর মতোই বললেন, “এর আগে কটা ইন্টারভিউ দিয়েছ?  সেগুলোর মতো এ দুটোও যদি না হয়?” ঝাঁপান উত্তর দিল, “তা হোক স্যার। কিন্তু লিলির বিনিময়ে কোন চাকরিই আমি নিতে পারব না”। ঝাঁপান কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে হাত তুলে নমস্কার করে বলল, “আসছি, স্যার”।

কাকু কিছু বললেন না, ঝাঁপান পিছন ফিরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কাকু কাকিমা আর লিলির অবাক স্তম্ভিত মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, “ওহে বুনো ওল ঝাঁপানচন্দ্র, চললে কোথায়?”

ঝাঁপান অবাক হয়ে কাকুর মুখের দিকে ফিরে তাকাল। কাকুর মুখে আশ্চর্য হাসি, বললেন, “রাগ করে চললে কোথায়? বসো, বসো, সেই থেকে তো দাঁড়িয়েই রইলে”। ঝাঁপান অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে বিস্মিত মুখে চেয়ারে বসল, তার নিতম্বের অতি সামান্য অংশই চেয়ারে ঠেকে রইল, অধিকাংশই ঝুলে রইল বাইরে। কাকু বললেন, “আচ্ছা, তোমার ওই ঝাঁপান নামটা কে রেখেছিলেন বলো তো?”

ঝাঁপান আরো বিব্রত হয়ে বলল, “আমার ঠাকুমা, স্যার। চৈত্র সংক্রান্তির দিন জন্মেছিলাম। আমাদের ওদিকে ঝাঁপান বলে, এদিকে বলে গাজন”।

কাকু আবার চোখ ছোট করে মুখ কুঁচকে বললেন, ““আনন্দিতা ওয়েড্‌স্‌ ঝাঁপান”, তোমাদের বিয়েতে এরকম একটা ব্যানার ঝোলালে, লোকের মধ্যে কী রকম প্রতিক্রিয়া হবে, বুঝতে পারছো? যাদের নিমন্ত্রণ নেই, সেই সব উটকো লোকেই বাড়ি ভরে উঠবে”।

ঝাঁপান এবং লিলি দুজনেই অভিভূত। লিলি মুখ লুকোলো কাকিমার পিঠে। কাকিমা লিলিকে টেনে নিলেন বুকে। ঝাঁপান কিছুক্ষণ সময় নিল নিজেকে সামলাতে, তারপর বলল, “আমার ভালো নাম স্যার ঋচীক”।

কাকু স্মিত মুখে বললেন, “আই নো, ঝাঁপান। তোমার সিভি, সার্টিফিকেট দেখেছি। সকালে লিলিও বলেছিল। বাট আই লাইক ঝাঁপান। একটা ইন্ডিজেনাস উৎসবের স্মৃতি। একটা অরিজিনাল নাম”। কাকু ঝাঁপানের থেকে সিভিটা আরেকবার নিয়ে, তার ওপরে অফিসের নাম ঠিকানা লিখে, সই করে দিলেন। তারপর বললেন, “এই অফিসে গিয়ে এটা দেখাবে। তারপর কী হয় লিলিকে জানাবে, আমি জেনে যাব”।   

--00--

 

                              


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...