রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

নামকরণ

    

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


    শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের একটু বেশি হল তিনি মা হয়েছেন – কন্যাসন্তান। তিনি ও মেয়ের বাবা বিজন আপাততঃ মেয়েকে ফুটকি বলে ডাকছেন। আর শ্বাশুড়িমা ডাকেন “জলি”। জলি নামটা খারাপ নয়, তাঁর মেয়ে খুবই হাসিখুশি – কান্নাকাটি নেই বললেই চলে – হাত-পা ছুঁড়ে যখন হাসে বিজলির মাতৃহৃদয় টইটুম্বুর ভরে ওঠে। শ্বশুরমশাই তাঁর ও বিজনের নামের আদ্যক্ষর দুটি নিয়ে “বিবি” ডাকেন।      

কিন্তু এগুলি সবই অস্থায়ী – মেয়ের জন্যে বেশ ভালো দেখে দুটো নাম ঠিক করতে হবে। তাড়াতাড়ি। তা নাহলে এই নামগুলিই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মুখে মুখে বসে যাবে। তখন ভাল নাম যাই রাখা হোক, এই নামগুলিই তাদের মনে গেঁথে রইবে। বিজনের অফিসের একজন লেখক কলিগ আছেন। ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু লেখেন। অবিশ্যি বইমেলায় ফিবছর বই ছাপা হলেই যে কেউ লেখক হয়ে যায় – এটা বিজলি বিশ্বাস করেন না। যদিও প্রতিবার বইমেলা গিয়ে ভদ্রলোকের বই তাঁদের কিনতে হয়, ঘরে এনে সাজিয়ে রাখতেও হয়। কিন্তু তিনি বা বিজন কেউই এতবছর ধরে ভদ্রলোকের একটা বইও পড়ে উঠতে পারেননি। সময় কোথায়? তাছাড়াও আছে ধৈর্যের অভাব। অবিশ্যি শ্বশুর-শাশুড়ি ভদ্রলোকের সব বই পড়েছেন, ওঁনাদের নাকি ভালোই লেগেছে পড়ে। বইমেলা কাছাকাছি এলেই শাশুড়িমা বিজনকে মনে করিয়ে দেন, হ্যারে তোদের নবীনবাবুর কোন নতুন বই এবার বেরোচ্ছে না?

সেই নবীনবাবুই বিজনের অনুরোধে, বারোটি নামের লিস্ট পাঠিয়েছেন। তার সঙ্গে জুড়েছে, তাঁর নিজের, বিজনের, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ পূজালি এবং দেওর সুজনের প্রস্তাবিত নামসমূহ। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত আটত্রিশটা নাম জড়ো হয়েছে। সুজন বিজলিকে বৌদি বলে না, বলে দিদিমণি। সে বলে, বৌদি ডেকে কানমলা খাওয়ার থেকে, দিদিমণি ডেকে কানমলা খাওয়া ঢের ভালো। তাতে নিজেকে এখনো স্কুল-বয় টাইপ মনে হয়।

বিজনরা তিন ভাইবোন। বোন পূজালি, তার বিয়ে হয়ে গেছে। সুজন সবার ছোট, কলেজে পড়ে। খুব পাকা আর ফক্কোর, বিজলির হাতে সত্যিসত্যিই কানমলা খায় প্রায়ই। এই তো গতকাল রাত্রে খেতে বসে ফুটকির নাম নিয়ে যখন কথা উঠল, সুজন ফক্কুরি করে বলল, আটত্রিশটা হয়ে গেছে, দাদা, আর মাত্র সত্তরটা হলেই...ব্যস্‌। বিজলি প্রথমে বুঝতে পারেনি, জিজ্ঞেস করেছিল, কী হবে, আরও সত্তরটা হলে? বিজন গম্ভীর মুখে বলেছিল অষ্টোত্তরশত নাম। এ কথায় বিজলির গা জ্বালা করবে না? তিনি কষে কান-মলে দিয়েছিলেন সুজনের।

 

স্কুলে ঢুকেই বিজলি হেডমিস্ট্রেস কনকদির ঘরে গেলেন। বিজলিকে দেখেই কনকদি উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে বিজলিকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, “সুকন্যা ভালো আছে তো রে? সাবধানে রাখবি, ঠাণ্ডা-ফাণ্ডা না লেগে যায়। অবিশ্যি তোর শাশুড়ি-মা আগেকার দিনের মানুষ, নাতনিকে উনি বুকে করে আগলে রাখবেন”। কনকদির আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বিজলি উল্টোদিকের চেয়ারে বসলেন। কনকদিও চেয়ারে বসে, বেল টিপে বললেন, “তুই চা খাবি তো? মা হয়ে তোর কেমন লাগছে, চা খেতে খেতে শুনব”। বেল শুনে মল্লিকা দরজায় এল, কনকদি বললেন, “আমাদের দুজনকে দুটো ফার্স্টক্লাস চা খাওয়াবি, মল্লিকা?”

মল্লিকা হাসিমুখে বলল, “এক্ষুণি আনছি, বড়দি। ওঃ বিজলিদি, আজ জয়েন করলে? আহা, কি মিষ্টি মেয়ে গো তোমার। শুধুই হাসে! আমি তো নাম দিয়েছি “হাসি”। আজ মিষ্টি খাওয়াবে না? না খাওয়ালে, ছাড়ব না কিন্তু।”

বিজলি লাজুক হেসে বললেন, “নিশ্চয়ই খাওয়াবো”।

মল্লিকা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে কনকদি বললেন, “এবার তুই কেমন আছিস বল। এসময় তোকেও খুব সাবধানে থাকতে হবে”। বিজলি বললেন, “ভালই আছি। তবে ওই একটু দুর্বল লাগে। তাছাড়া অনেকদিন শুয়ে-বসে কাটালাম তো, একটু...”। কনকদি গম্ভীর হয়ে বললেন, “হুঁ। মেয়ে পড়ানো নেই। উইকলি টেস্ট নেই, খাতা দেখার চাপ নেই...আমার বকাঝকা নেই, একটু খালিখালি তো লাগবেই”। বিজলি হেসে ফেলে বললেন, “সত্যিই তাই, বিশেষ করে আপনার ওই বকুনি...”।

“থাক থাক বুঝে গেছি। সিনিয়র হিসেবে কিছু উপদেশ দিই। বাইরের খাওয়া এড়িয়ে, ঘরেই ভালোমন্দ পুষ্টিকর খাবার খাবি। আর নিজেও হাসিখুশি থাকবি, মেয়ের সামনে রাগারাগি, ঝগড়াঝাঁটি করবি না। জেনে রাখিস, নাড়ির যোগ ছিন্ন করেই, সন্তানগর্বের আহ্লাদে অনেক আনাড়ি মা, যা খুশি শুরু করে দেয়। তারা বোঝে না, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও বহুকাল মায়ের ওপর নির্ভর করে থাকে। মাকেই অনুসরণ করে। সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের শাস্ত্রে মেয়েদের “প্রকৃতি” বলে, জানিস নিশ্চয়ই। শ্যামা কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি...শুনেছিস গানটা? মা আমাদের হৃদয়ে আলো দেন, সব মেয়েরাই, সব মায়েরাই অলোকসামান্যা আলোকিনী!”

মল্লিকা চা নিয়ে ঘরে আসাতে কনকদির আবেগঘন উপদেশে ছেদ পড়ল। কনকদির কথায় বিজলি বেশ বোর হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়ের জন্যে কয়েকটি সম্ভাব্য নাম পেয়ে যাওয়ায় বেশ উত্তেজিতও হচ্ছিল। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কনকদি নিজের আবেগ কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, “নে চা খা। তোর ক্লাস কখন থেকে?”

বিজলি বললেন, “সেকেণ্ড পিরিয়ড থেকে। আজ মোট তিনটে ক্লাস আছে – সিক্স, সেভেন আর এইটের”।

“প্রথম দিনেই বেশি চাপ নিস না। দুটো ক্লাস নে, এইটেরটা স্নিগ্ধা সামলে নেবে। কিন্তু কী ব্যাপার বল তো, তোকে কিছুটা আনমনা দেখছি যেন? কী হয়েছে? কোন প্রবলেম?”

“না, না, কোন প্রবলেম নেই”।

“তাহলে? কিছু একটা ভাবছিস মনে হচ্ছে?”

বিজলি একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, “না, তেমন কিছু নয়...মেয়ের কী নাম রাখা যায় সেটাই সারাক্ষণ ভাবছি...”।

কনকদি উচ্চস্বরে হেসে ফেললেন, তারপর বললেন, “এই সময়ে এর থেকে বড়ো সমস্যা আর কিছু হয় না রে। আমার দুই ছেলেমেয়ের নাম নিয়ে, ওদের বাবা আর আমি কত বিনিদ্র রজনী যে কাটিয়েছি, তার হিসেব নেই। আমার নামটাই ধর না। আমার ঠাকুমা জেদ ধরেছিলেন, আমার নাম চাঁপা রাখতে হবে। তার উত্তরে দাদু নাকি বলেছিলেন, ছ্যাঃ, চাঁপা? হাটে গিয়ে ‘চাঁপারাণি’ হাঁক পাড়লে, শতখানেক মেয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে। শেষমেষ আমার কনকচাঁপা নাম সাব্যস্ত করে, দাদু গৃহযুদ্ধ আটকেছিলেন”।

 

আরও কিছুক্ষণ কনকদির সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিজলি গেলেন টিচার্স রুমে। টিচার্স রুম ফাঁকা সকলেই ক্লাস নিতে বেরিয়ে গিয়েছে। বিজলি মল্লিকাকে ডেকে টাকা দিয়ে বললেন, সক্কলের জন্যে মিষ্টি আনবি, কেউ যেন বাদ না পড়ে। গেটের সুখরামজি, চারজন আয়া, সুষমা, মুকুল, তুই - কেউ যেন ছুটে না যায়। আর একরকমের মিষ্টি আনবি না, রসগোল্লা আর সন্দেশ। যা দিয়েছি হয়ে যাবে তো?” মল্লিকা বলল, “যথেষ্ট। হয়ে বেশি হবে - তোমার মিষ্টি মেয়ে আরও মিষ্টি হয়ে উঠুক দিদি”।

বিজলি বললেন, “ঠিক আছে তুই এখন যা। মিনিট দশ পরেই ঘন্টা পড়বে, আমার ক্লাস আছে। টিফিনের সময় মিষ্টিগুলো সবাইকে ভাগ করে দিবি, কেমন?” মল্লিকা চলে যেতে ব্যাগ থেকে পেন আর ফুটকির নামের লিস্টিওয়ালা কাগজটা বের করে, বিজলি কয়েকটা নতুন নাম লিখল। সুকন্যা, প্রকৃতি, আলোকিনী, হাসি, মিষ্টি। লেখার পর পুরো তেতাল্লিশটা নামের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল একবার। বিজলির চোখ অনেকক্ষণ আটকে রইল, শেষ পাঁচটা নামে। ফার্স্ট পিরিয়ড শেষের ঘন্টা পড়ল। আজই সন্ধেবেলা বিজন আর সুজন ঘরে ফিরলে সবার সঙ্গে বসে, ফাইন্যাল করে ফেলতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।      

 

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বিজলিরা সকলে মিলে বসলেন তাঁদের শোবার ঘরে। শাশুড়ি আর বিজলি বসলেন বিছানায়। বাকি তিনজন সামনের চেয়ারে। ও আরেকজন – যার জন্যে এই আয়োজন – সেও রয়েছে। ফুটকি।  খাটের ওপরেই গোলাপি বেবি-মশারির মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। মুগ্ধ চোখে মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, বিজলি মনে মনে আদর করলেন কন্যাকে – আমার হাসি ছোনাটা, মিষ্টি ছোনাটা...।

বিজন মেয়ের তেতাল্লিশটা নামের লিস্ট প্রথম থেকে শেষ অব্দি সবাইকে পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন, “এর মধ্যে আমার পছন্দের নাম দুটি হল, নবীনবাবুর দেওয়া ছন্দা আর কনকদির আলোকিনী”।

বিজলি বললেন, “ছন্দার জায়গায় হাসি হলে খারাপ হয়? কিংবা মিষ্টি?”

সুজন বলল, “আমার মনে হয় হাসি নামটাই বেটার। কারণ আমার ভ্রাতুষ্পুত্রীটি এমনিতেই দারুণ মিষ্টি।  তারওপর সারাদিন মিষ্টি-মিষ্টি ডাক শুনলে আমাদের সকলেরই সুগার ধরে যাবে...”।

বিজলি সুজনের দিকে একবার চোখ পাকিয়ে তাকালেন, তারপর সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাসি, ছন্দা না মিষ্টি?” সকলেই একসঙ্গে হাসিতেই সায় দিলেন। বিজন বললেন, “গুড। সকলের সম্মতিতে “হাসি” নামটা ডাক নাম হিসেবে ফাইন্যাল হল। তাহলে ভালো নামটা হোক আলোকিনী”?

বিজলি বললেন, “কেন? প্রকৃতি নামটা খারাপ? কিংবা সুকন্যা?”

সুজন বলল, “তুমি খেপেছ দিদিমণি। তুমি জানো, বাংলা ভাষা থেকে আজকাল র-ফলা, ঋ-ফলা সব উধাও হয়ে যাচ্ছে? প্রবলেম হয়ে যাচ্ছে পব্লেম। প্রশাসন হয়ে উঠেছে পোশাসন। তেমনি প্রকৃতি হয়ে যাবে পোকিতি। ও যদি বড়ো হয়ে প্রকৃতিপ্রেমিক হয়, লোকে বলবে পোকিতি পোকিত পোকিতিপেমিক। অসম্ভব। তার থেকে আলোকিনী অনেক সুন্দর, আন্‌কমন্‌”।

কেউ কিছু বললেন না। সকলেই সুজনের কথাগুলো মনে মনে ভাবছিলেন। সেই সময় সুজন আবার বলল, “তুমি হয়তো রেগে গিয়ে আমার কানমলে দেবে, কিন্তু তাও আমি বলব। বড়ো হয়ে হাসি যখন জানবে প্রকৃতির ডাকের ইংরিজি ‘নেচার’স কল’, তখন ও কাউকে ডাকবে? নাকি ওর বন্ধুরা কেউ ওর ডাকে সাড়া দেবে? মানছি প্রকৃতি শব্দটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রাচীন এবং মিনিংফুল। আমাদের সনাতন দর্শন মতে প্রকৃতি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের মুখ্য কারণ। কিন্তু লালমুখো ব্রিটিশদের জন্যে ওই শব্দটা তুমি নাম হিসেবে ব্যবহার করতেই পারবে না। আমাদের ময়ূর-সিংহাসন বা কোহিনুর ওরা যেরকম ঝেড়ে দিয়েছে, তেমনি শেষ করে দিয়েছে প্রকৃতি শব্দটার মাহাত্ম্য”।

সুজনের কথার উত্তরে কেউ কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পরে বিজলি বললেন, “ঠিক আছে প্রকৃতি চলবে না। কিন্তু সুকন্যা নামটা কেমন?”

বিজন বললেন, “বেশ ভালই তো”।

সুজন আবার বলল, “দাদা, তুই সব ভুলে গেছিস। বাবাকে জিজ্ঞেস কর, বাবা জানে। বাবাদের সময়ে শাম্মি কাপুরের বিখ্যাত গান ছিল সুকু-সুকু। তাই না, বাবা? মনে পড়ছে?”

সুজনের বাবা একটু অস্বস্তি অনুভব করলেও, ইতস্তত করে বললেন, “মনে নেই আবার – আই আই আ করুঁ ম্যায় কেয়া, সুকুসুকু। সুকু ছিল এক নর্তকীর নাম। সে গান যা হিট করেছিল! পাড়ায় পাড়ায় পুজো-প্যাণ্ডেলে চোঙা-মাইকে সারাদিন ওই গান বাজত – কান মাথা ঝাঁঝাঁ করত আমাদের”।

বিজন বললেন, “তার সঙ্গে সুকন্যার কী সম্পর্ক?”

সুজন বলল, “স্কুল-কলেজে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা সর্বদাই নাম ছোট করে ডাকে। তোমাকে ডাকত বিজু। দিদিকে ডাকত পূজা। আমাকে ডাকে সুজি। সেরকম হাসিকে ওর বন্ধুরা ডাকবে সুকু। তারপর, ওর ডেঁপো বয়ফ্রেণ্ডরা ওই গান গেয়ে নেচে নেচে পেছনে লাগবে...ইস্‌, মেয়েটা যে তখন আমাদেরই দুষবে, দাদা”।

সুজনের কথায় সকলেই গম্ভীর হয়ে যাওয়াতে, বিজলি অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আমার মেয়ের ভালো নাম কী হবে?”

সুজন বলল, “কেন? আমাদের ঘর আলো করে এসেছে যে মেয়েটি। আমাদের সক্কলের মনে যে এনে দিয়েছে খুশি এবং হাসির আলো, তার নাম আলোকিনী ছাড়া আর কী হতে পারে? বন্ধুরা ওর নাম ছোট করে দেবে? দিক না, সে নামও হবে আলো। আমাদের রবিঠাকুর আলো নিয়ে গান রচনা করতে কোনদিনই ক্লান্তি অনুভব করেননি। সেই স্নিগ্ধ আলো আমাদের চোখের সামনেই ফুটে উঠুক না, দিদিমণি”।

বিজলির চোখ ছলছল করে উঠল আবেগে। বিছানা থেকে নেমে সুজনের কাছে যেতেই, সুজন দুই হাতে কান ঢেকেছিল। কিন্তু না, সুজনকে জড়িয়ে ধরে, তার মাথায় চুমো দিল বিজলি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “সত্যিই তুই সুজন”।

 -০০-

     

                            

           

                                                  


শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬ " 


 

বেষ্পতিবার/ দুপুরঃ ২:

 সুনুদা,

 শুধু কথা আর কথা। এত কথাও তুমি বলতে পারো।

তোমার কথার জালে জড়িয়ে পড়ে অনেক সময়েই আমার মনে হত, সত্যি সত্যি তুমি কতটা সিরিয়াস? তোমার কথায় এমন একটা অদ্ভূত সুন্দর স্বপ্ন-রাজ্যের হদিশ দিতে, মনে হত আমি যেন এক পরি। ডানাকাটা নয় আস্ত দুটো ডানাওলা। মনে হত, আমি এই দুটো ডানা ছড়িয়ে তোমার মনের দাঁড়ে ঠিকঠাক বসতে পারবো তো? শেষে এমন তো হবে না, বাস্তবের ঝিঙে, পটল, তেল নুন মশলার অভিঘাতে তোমারই স্বপ্নের ডানা খসে পড়ল! আর আমি তোমার কাছে হয়ে উঠলাম রোঁয়া ওঠা পালক ঝরা অপয়া এক শালিক।

সেদিন তোমার ডাকে সাড়া দিইনি, সে ঐ বাস্তবের চিন্তায়। আমাদের ভালোবাসার জন্যে মূল্য বড়ো কম দিতে হত তুমি ভেবেছিলে? তোমার বাড়ি, আমার বাড়ি - আমাদের এই পথচলা - কেউ কি মেনে নিত, বলো? শুধু সপ্তপদ নয়গো, তুমি কি জানো আমি তোমার সঙ্গে লক্ষ যোজন পথ চলতেও উন্মুখ ছিলাম। জীবনতো শুধু পথচলা নয় সুনুদা, এটা তো মানবে? জীবন মানে নির্জনে তোমার বাহুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত শুয়ে থাকা। জীবন মানে আমার কোলে তোমার মাথা রাখা, আর তোমার চুলে আমার করাঙ্গুলির বিলি কাটা। জীবন মানে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে বসে থাকা।

তোমার ওই কুয়োর জলে ঝপ্‌পাস করে ফেলে দেওয়া ছোট্ট সিন্দুকের মধ্যে, আমাকে কাছে পাওয়ার কতোখানি স্বপ্ন আর কতোখানি বাসনা তুমি ভরতে পেরেছিলে আমি জানি না। আমি কিন্তু সবুজ ঘাসের জমিনে আমার আঁচলের মতো আজও বিছিয়ে রেখেছি, তোমাকে ঘিরে থাকা আমার সমস্ত সত্ত্বা। তোমরা ছেলেরা বড়ো অধৈর্য আর আউপাতালে, একটুতেই হাল ছেড়ে দাও। কেন বলো তো?

একদিন চলো না, সেই কুয়োটার পাড়ে। যে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছিলে তোমার স্মৃতিভরা সিন্দুক। কুয়োতে পড়ে যাওয়া জিনিষ তোলার জন্যে লোক পাওয়া যায়, জানো তো? তাদের একজনকে ধরে তুলে আনি তোমার সিন্দুকটা। কোন চাবিওলা ডেকে সিন্দুকটা না হয় আমিই খুলিয়ে নেব। দেখে নিও, তোমার ক্ষুব্ধ হৃদয়টিকে খুব আদরে আর খুব যত্নে বুকের মধ্যে আজীবন ধরে রাখবে,

 তোমারই কনি।

 বেষ্পতিবার/ রাত ১২:৩৫

আমার কনি, 

আমাকে কি তোর সেই রূপকথার রাক্ষস বলে মনে হয়? যার প্রাণভোমরা লুকিয়ে রাখা থাকত গোপন চাবির সিন্দুকের মধ্যে। তুই কি কোন রাজকন্যা, কুয়োর জল ছেঁচে তুলে আনবি আমার হৃদয়, তারপর তোর বুকে নিয়ে  তাকে পুষবি শুকপাখির মতো? শুকপাখি নাকি সুখ-পাখি? তোর বুকের বাসায় থাকার চির দিনের আশ্বাসেও, সে যদি কোনদিন বিশ্বাস হারায়? যদি সে আঁচড়ে দেয়, ঠুকরে দেয় তোর নরম নরম বুক? বললি না, আমরা ছেলেরা খুব আউপাতালে? আমি যদি ধৈর্য হারাই? এরপর যেদিন যাবো, তোর জন্যে এটিএস নিয়ে যাবো তিন ফাইল। প্রথমটার চব্বিশঘন্টা পরে দ্বিতীয় আর দ্বিতীয়ের বাহাত্তর ঘন্টা পরে তৃতীয়সুখ পাখির নখ এবং চঞ্চুর আঁচড়ে সেপটিক হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

অথবা এমনও তো হতে পারে, তুইই একদিন বিরক্ত হয়ে আমার প্রাণভোমরাটাকে নিজের উরুর ওপর রেখে টিপে মেরে ফেললি, এতটুকুও রক্ত ঘরের মেঝেতে পড়তে না দিয়ে। থোড়ের মতো তোর মসৃণ উরুতে একটা হালকা দাগ হয়ে রয়ে গেলাম কিছুদিন। তারপর সুগন্ধী সাবান, অলিভ অয়েল আর বডি লোশনের প্রাত্যহিক প্রয়োগে সেই দাগটুকুও আর থাকবে না কোথাও। তারপর কোন এক শীতের একান্ত সন্ধ্যায় হঠাৎ আমার কথা মনে হলে, বসন সরিয়ে খুঁজতে থাকবি আমায়। বাম উরু নাকি ডান উরু – কোথায় যেন ছিল সেই দাগটা। তোর মনে হবে, জীবনে কোথাও এতটুকু দাগও রেখে যেতে না পেরে শেষে হয়তো হারিয়েই গেল,

 তোর সুনুদা।

শুক্রবার/ দুপুর ১২:৫৫

সুনুদা,

 আমার ছোটবেলায় আমার এক ব্যাচেলার দাদুর বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। তিনি আমার বাবার দূর সম্পর্কের মামা আর থাকতেন উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এক বাড়ির উত্তর-পশ্চিম টেরে। দি মোস্ট শ্যাবি অ্যান্ড স্যাঁতসেঁতে কর্ণার দ্যাট আই হ্যাভ এভার সিন ইন মাই লাইফ। তাঁর মালিকানায় ছিল দুটো মাত্র ঘর – একটা বসার, আরেকটা শোবার আর একটা বাথরুম-টয়লেট। তাঁর খাবার আসত পাড়ার একটি দোকান থেকে। আমরা ওঁর বাড়িতে গেলেই খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন, কিছুক্ষণ কথা বার্তার পর তিনি বেরিয়ে যেতেন পাড়ার দোকানে, কিনে আনতেন অনেক খাবার দাবার, আমার জন্যে গাদাখানেক চকলেট, লজেন্স। একবার উনি যখন ছিলেন না, কি খেয়াল হতে আমি ওঁনার শোবার ঘরে ঢুকেছিলাম। বিছানায় ওঁনার তেলচিট ময়লা মাথার বালিশের নীচে দেখেছিলাম একটি বাংলা পর্নোগ্রাফির বই। বইটার দু এক পাতা উল্টে দেখেছিলাম, কি জঘন্য সব ছবি আর লেখা। তাঁর ঘরে অনেক দেয়াল আলমারি, কাঠের আলমারি ছিল, সবকটাই নানান জিনিষে ঠাসা। কিন্তু সেখানে কোথাও একটাও পাঠযোগ্য গল্প উপন্যাসের বই দেখিনি। কি মনে হতে বিছানার তোষক তুলে দেখেছিলাম, তাঁর বিছানার তলায় সাজানো অজস্র বই, সবই ওই রকম অশ্লীল আর অপাঠ্য।

ভদ্রলোক কি ভীষণ আমুদে আর অমায়িক ছিলেন, তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা সকলেই তাঁকে বেশ রেসপেক্ট করতাম, কিন্তু সেদিনের পর তাঁর চোখের দিকে আর কোনদিন তাকাতে পারিনি। তাঁর বাড়িতেও আর কোনদিন যাইনি তারপর থেকেকয়েকবছর পর তাঁর যখন মৃত্যুসংবাদ এসেছিল, প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, তাঁর ঘরের সেই বইগুলির কথা। আমরা কেউ যাইনি, বাবা গিয়েছিলেন। বাবাকে জিজ্ঞেসও করতে পারিনি, শয্যার নীচে তাঁর ওই অজস্র বইয়ের কী গতি হয়েছিল!

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার ওই দাদু প্রথম যৌবনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেনউচ্চবংশ ও ধনী বাড়ির সেই মেয়েটির সঙ্গে আমার দাদুর নাকি সঠিক অর্থে আলাপও ছিল না। বিয়ের প্রস্তাব করা তো অনেক দূরের ব্যাপার। মেয়েটির যথাসময়ে বিয়ে হয়ে যাবার পর, আমার দাদু ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন আর বিয়ে থা না করে সারা জীবন কুমার থাকবেন। তাই ছিলেন – তবে তাঁর সঙ্গী হয়েছিল ওই ইতর বইগুলো!

এত কথা বললাম, তোমার ওই চিঠিটা পড়ে। কি জঘন্য আর কদর্য। তোমাকে আমার সেই ব্যাচিলার দাদুর মতোই লাগছে, অস্পষ্ট এক ভালোবাসার কল্পনায় যিনি নিজেকে বিকৃত করে তুলেছিলেন দিন কে দিন।

কোন একটি মেয়ে তার নিখাদ কিন্তু অক্ষম ভালোবাসা দিয়ে যে তোমার জীবন, কোন একদিন ভরে তুলেছিল, সেকথাটা তোমার এখন ভুলে যাওয়াই উচিৎ। প্লিজ, তোমার ওই নোংরা মুখে আর কোনদিন যেন না শুনি, আমার ওই একান্ত আপনার নামটি-

“কনি”

শুক্রবার/রাত্রি ২:১৫

 ওরে আমার কনকনানি,

 দেখলি তোর হুমকিতে ত্রস্ত হয়ে তোকে আর “কনি” বলে ডাকতে ভরসা পেলাম না।

বাপরে, ইৎনা গুস্‌সা? এত রেগে গেলি আমার ওই চিঠিটা পড়ে? তোকে আর ডাকতেও দিবি না, “কনি” বলে? এতটুকু মায়াও কি তোর হল না তোর সুনুদার ওপর? তোর দাদু না হয়, হলেও হতে পারতেন ঠাকুমার সঙ্গে আলাপটুকুও করে উঠতে পারেননি। আমাদের তো তা নয়? আমি তো তোকে বিয়ের প্রস্তাবও করেছিলাম। করিনি বল? হে আমার কনি, সুকন্যা দত্ত, তোকে তো এও বলেছিলাম আমাদের বিয়ের পর তুই একদম আমার হয়ে যাবি, মিসেস সুকন্যা বসু। সে নাম শুনে তুই কি লিখেছিলি মনে আছে, কনি? লিখেছিলি “সুকন্যা বসু” নামটা শুনেই তোর সমস্ত শরীর যেন শিরশির করে উঠেছিল অদ্ভূত এক অজানা আবেগে বলিসনি বল?

তোর দাদুর একান্তই ব্যাডলাক, তিনি যে সময়ের লোক, তখন না ছিল, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, না ছিল ইন্টারনেট। থাকলে তাঁকে তোর কাছে ধরা পড়তে হত না। অথবা তাঁর মৃত্যুর পর বিছানার তলায় সাজানো বই নিয়েও তাঁর পরিজনদের আতান্তরে পড়তে হত না। মিচকে হেসে পাড়ার ফক্কোর ছেলেদের বলতেও হত না, “বুড়ো শালার খুব রস ছিল তো, কোনদিন বোঝাই যায়নি”। বরং নেট সার্ফিং করে যখন তখন কল্পনার নীল জগতে ঢুকে পড়তে পারতেনভদ্রলোক সারাটা জীবন তাঁর সেই একটিমাত্র মহিলার মধ্যেই ডুবে রইলেন, কল্পনার একটু সুবিধের জন্যে সাহায্য নিয়েছেন ওই বইগুলির। কিন্তু যাই করুন না কেন, আমি দৃঢ় নিশ্চিত, তাঁর একা একা চরম আনন্দের মুহূর্তগুলিতে ওই বই তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। তাঁর মনেও আসত না ওই বইয়ের ছবির শরীর আর মুখগুলো, তাঁর স্বপ্নে আসত তোর সেই হলেও হতে পারত ঠাকুমারই মুখটাই। এটাও কি কম একনিষ্ঠতা? সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এটা ভীষণ অদ্ভূত এক বিকৃতি। কিন্তু সত্যিই বিকৃতি কি?

তোর এই দাদু ভদ্রলোকটি কোনোদিন দুষ্টু পাড়ামুখো হয়েছেন বলেও আমার মনে হয় না। অন্ততঃ আমার তাই বিশ্বাস। যদি হতেন, বাস্তব নারীর সংসর্গে তিনি কবেই ভুলে যেতেন তাঁর সেই মনের মানুষটিকে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে চরম লজ্জাকর হবে জেনেও, তাঁকে এত বইও কিনতে হত না। তোরা মেয়েরা কেন যে এত একবগ্‌গা, বাঁধা পথে ভাবিস, বুঝি না। এরকম অদ্ভূত কিন্তু নিষ্ফল ভালোবাসা নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া, এমন একজন বেচারা মানুষ তোর থেকে শ্রদ্ধা না পান, একটু মায়া কিন্তু পেতেই পারতেন। এভাবে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে তোলা, এবং মনটাকে এমন নিবিড় স্বপ্নের গহীনে ডুবিয়ে রাখার মানসিকতা - আজকাল কেউ কল্পনাও করতে পারে কি? না, পারে না।

আজকাল কেউ মুখে অ্যাসিড ছোড়ে, কেউ হত্যা করে। কেউ কেউ হত্যা করে, দেহটাকে কুচি কুচি করে কেটে, স্যুটকেশে ভরে গঙ্গায় ফেলে দিতে যায়...।

আমি কিন্তু পেরেছিআমি জানি এই চিঠিটা পড়ে, তুইও স্বীকার করবি, তোকে “কনি” বলে ডাকার অধিকার, ন্যায্যতঃ যদি কারোর থাকে, আর কারও নয়, সে শুধু থাকবে

তোর সুনুদার

শনিবার/সকাল ১১:৩৫

সুনুদা,

আমি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলাম, ভাঙা আয়নার মতো। ঘরের মেঝেতে আমার অজস্র সত্ত্বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে।

আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

তোমার কনি।

পুনশ্চঃ ঘরে সাবধানে পা ফেল, আয়নার কাচে পা কেটে না যায়।


চলবে...




বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১



দ্বিতীয় স্কন্ধ - প্রথম পর্ব

ভাগবত পুরাণের মাহাত্ম্য 

শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনি যে প্রশ্ন করলেন, সেই প্রশ্ন নরলোকের হিতকর, মুক্ত আত্মা জ্ঞানীগণের সম্মত এবং মানুষের শোনার মতো যা কিছু আছে তার মধ্যে এই বিষয়ই সার ও শ্রেষ্ঠ। গৃহস্থাশ্রমে গৃহীর পিপীলিকা, কীট, পতঙ্গ ইত্যাদি প্রাণীহিংসা অনিবার্য এবং বিষয়ে আসক্তি থাকায় আত্মতত্ত্ব জানতে পারে না। সুতরাং এই ধরনের মানুষের শোনার মতো এবং অনুষ্ঠান করার মতো হাজার হাজার বিষয় আছে। যিনি মোক্ষলাভ করার ইচ্ছা করেন, তাঁর সকলের অন্তর্যামী ও নিয়ন্তা ভুবনসুন্দর শ্রীহরির চরিত্র কথা শ্রবণ, স্মরণ ও কীর্তন করা কর্তব্য। যে মানুষের অন্তিমকালে শ্রীনারায়ণ স্মরণে আসেন, তাঁর মানবজন্মলাভ সার্থক। যা আত্মা নয়, তার থেকে আত্মাকে পৃথক জানার যে জ্ঞান তাকে সাংখ্য বলে। ইন্দ্রিয়দমন প্রভৃতি আট প্রকার সাধনার নাম অষ্টাঙ্গযোগএই সাংখ্য ও যোগ অনুষ্ঠানে এবং নিজের বর্ণ ও আশ্রমের কর্তব্য অনুষ্ঠানে যদি নারায়ণ স্মৃতিপথে উদিত হন, তবেই মানবজন্মের সবথেকে উৎকৃষ্ট লাভ বিবেচনা করা হয়।

যে সকল মুনি শাস্ত্রের নিয়ম ও নিষেধের অতীত নির্গুণ ব্রহ্মলাভ করেছেন, তাঁরাও শ্রীহরির গুণকীর্তন শুনে অতুল আনন্দ উপভোগ করেন। আমি দ্বাপর যুগের শুরুতে আমার পিতা দ্বৈপায়ণের কাছে একটি গ্রন্থ পাঠ করেছিলাম, শ্রীমৎভাগবত। এই ভাগবতপুরাণ শ্রীহরির নামে ও বিষয়ে পরিপূর্ণ এবং সমস্ত বেদের সমতুল্য। আমি নির্গুণ ব্রহ্মে সম্যক অবস্থান করেও, শ্রীহরির লীলা মাধুর্যের জন্য আমি এই আখ্যান পাঠে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। আপনি বিষ্ণুভক্ত, অতএব আমি আপনার কাছে এই আখ্যান বর্ণনা করব। যিনি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পুরাণ শোনেন, তাঁর মনে অতি দ্রুত মুকুন্দের প্রতি অহৈতুকী মতির উদয় হয়। যাঁরা শ্রীহরির কাছে অভয়ফল কামনা করেন, কিংবা যাঁরা মোক্ষলাভ করতে চান তাঁরা হরিনামকীর্তন সাধনে ওই সকল ফল লাভ করতে পারেন। আর যাঁরা জ্ঞানী, নামকীর্তনই তাঁদের কাছে জ্ঞানের ফল। সুতরাং সিদ্ধ হোন কিংবা সাধক, এর থেকে ভালো কোন উপায় আর দ্বিতীয় নেই।

এই জগতে মানুষের অজান্তে বহুবছর ব্যর্থ যায়, মানুষের মনে এক মূহুর্তও বৃথা যাচ্ছে এই বোধ যখন আসে, সেটাই বহু বছরের থেকে বেশী ফলদায়ক। কারণ ওই জ্ঞান এলে, মানুষ নিজের মঙ্গলের চিন্তা শুরু করে। খট্টাঙ্গ নামে এক রাজর্ষি দেবগণের থেকে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর মূহুর্তকাল মাত্র আয়ু অবশিষ্ট আছে, তৎক্ষণাৎ সকল আসক্তি বিসর্জন দিয়ে, ওই রাজর্ষি শ্রীহরির অভয়পদ লাভ করেছিলেন। হে কুরুকুলতিলক, আজ থেকে আপনার এখনও সপ্তাহকাল পরমায়ু অবশিষ্ট আছে, আপনি ইতিমধ্যে পরলোকের পক্ষে যা হিতকর তার অনুষ্ঠান করুন”

শ্রীশুকদেব আরো বললেন, “হে রাজন, পুরুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হলে, নির্ভয়ে পুত্রকলত্র ইত্যাদি থেকে সমস্ত আসক্তি  মুছে ফেলতে হবে। ঘরে থাকলে এই আসক্তি বিনাশের পরেও আবার ফিরে আসতে পারে, সেই কারণে ঘর ছেড়ে তীর্থস্থানে গিয়ে, নির্জন পবিত্র স্থানে কুশ, মৃগচর্মের আসনে বসতে হবে। তারপর অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের প্রণবরূপ ব্রহ্মবীজ মনে মনে জপ করতে হয়। জপ করতে করতে প্রাণায়ামে শ্বাস জয় করে মনকে বশীভূত করতে হবে। তারপর স্থির বুদ্ধি দিয়ে মনের থেকে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয়ের যোগ ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম বিধিকে প্রত্যাহার বলে। কর্মবাসনায় মন আবার যদি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাহলে বুদ্ধি দিয়ে শ্রীভগবানের রূপ ধারণা করতে হয়। শ্রীভগবানের সমগ্র রূপ চিত্তে ধারণার পর, তাঁর চরণ ইত্যাদি এক একটি অঙ্গের ধ্যান করলে, মন বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তাশূণ্য হয়। মনের এই অবস্থায় পরমানন্দের স্ফূর্তি ও পরমা শান্তি লাভ করা যায়। মনের এই অবস্থাকে বলে সমাধি এবং এই ভাবেই শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ লাভ করা যায়। রজোগুণে আবার যদি মন আক্ষিপ্ত অর্থাৎ চঞ্চল হয়, অথবা তমোগুণে মন বিমূঢ় অর্থাৎ নিদ্রিত হয়, তাহলে আবার প্রত্যাহার ও সমাধির ধারণায় মনকে শোধণ করতে হয়। এই ধারণাই মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণের বিনাশ করে এবং এই ধারণা দৃঢ় হলে শ্রীভগবানের অমল মূর্তি দেখতে দেখতে মনে ভক্তিযোগ আসে”

মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রহ্মন, যে ভাবে ও যে ধারণায় মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণ আশু দূর হয়, আপনি সেই ধারণার কথা উপদেশ করুন”

ঈশ্বরের দেহতত্ত্ব 

শ্রীশুকদেব বললেন, “প্রথমে পদ্মাসন কিংবা অন্য আসন অভ্যাস করে, প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণবায়ু জয় ও আসক্তি ত্যাগ করে, সকল ইন্দ্রিয়কে সংযত করবেন। তারপর ভগবানের স্থূলরূপ মনের মধ্যে ধারণা করবেন। এই যে ব্রহ্মাণ্ড দেখছেন, এটিই ভগবানের বিরাট দেহ। এই দেহ স্থূল বস্তুর থেকেও স্থূল। ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু অতীত হয়েছে, বর্তমানে যা কিছু আছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু সৃষ্টি হবে, সব এই স্থূল দেহেই আশ্রয় পায়। এই বিরাট দেহের ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশ - এই পঞ্চভূত, অহঙ্কারতত্ত্ব ও মহত্তত্ত্ব অর্থাৎ সমষ্টিবুদ্ধি, এই সাতটি আবরণ আছে। এই দেহের মধ্যে অন্তর্যামী হয়ে যে ভগবান বিরাজ করছেন, তাঁকে বৈরাজ পুরুষ বলে। সাধক আসলে এই পুরুষেই মনের ধারণা করে থাকেন।

হে মহারাজ, এই বিশ্বের স্রষ্টা পুরুষের বিরাট দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিভাগ কীর্তন করছি মন দিয়ে শুনুন। পাতাল এঁর পায়ের তলা। রসাতল পায়ের পিছন ও সামনের অংশ। মহাতল দুই গোড়ালি ও তলাতল এঁনার দুই জঙ্ঘাসুতল এই বিশ্বমূর্তির জানু, বিতল ও অতল দুই উরু, মহীতল জঘনদেশ এবং নভস্তল অর্থাৎ ভুবর্লোক বা প্রেতলোক এঁনার নাভি সরোবর। স্বর্লোক অর্থাৎ স্বর্গলোক এঁনার বক্ষ, মহর্লোক গ্রীবা, জনলোক মুখ, তপোলোক কপাল এবং সত্যলোক এই পুরুষের মস্তক। ইন্দ্র প্রমুখ তেজস্বী দেবতারা এই আদিপুরুষের বাহু, অশ্বিনীকুমারদুইজন নাসিকা ও ঘ্রাণ শক্তি, প্রদীপ্ত অগ্নি এঁনার মুখ। অন্তরীক্ষ শ্রীবিষ্ণুর নেত্র গোলক ও সূর্য দর্শনের শক্তি, দিন ও রাত্রি চোখের রোম, ব্রহ্মপদ ভ্রূভঙ্গী, জল এঁনার রসনা ও রস গ্রহণের শক্তি। সমস্ত বেদ এই অনন্ত পুরুষের ব্রহ্মরন্ধ্র, যম এঁনার দন্ত ও স্নেহ দাঁতের শক্তি, মায়া এঁনার হাসি এবং অপার সংসার এঁর নয়নের কটাক্ষ। লজ্জা এই পুরুষের উত্তরোষ্ঠ, লোভ অধরোষ্ঠ, ধর্ম স্তন, অধর্ম পৃষ্ঠদেশ, প্রজাপতি জননেন্দ্রিয়, মিত্রাবরুণ দুইকোষ, সমুদ্রসকল এঁনার কুক্ষিদেশ এবং গিরিসমূহ অস্থিহে নৃপেন্দ্র, সমস্ত নদী এঁনার নাড়ী, বৃক্ষসমূহ শরীরের রোমরাজি, অনন্তশক্তি বায়ু এঁনার শ্বাস, কাল এঁনার গমন এবং প্রাণীগণের সংসার এই পুরুষের ক্রীড়া। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, মেঘসমুহ এঁনার কেশ, সন্ধ্যা এঁনার বস্ত্র, প্রকৃতি হৃদয় এবং সকল বিকারের আশ্রয় চন্দ্রমা এঁনার মন। মহত্তত্ত্ব  এই সর্বাত্মার চিত্ত অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির আধার, শ্রীরুদ্র এঁনার অহঙ্কার, অশ্ব, অশ্বেতরী উট, হাতি এঁনার নখ এবিং মৃগ ইত্যাদি সকল পশু এঁনার কটিদেশ বলা হয়। পক্ষসমূহ এঁনার শিল্পনৈপুণ্য, স্বায়ম্ভূব মনু এঁনার বুদ্ধি, মানুষ এঁনার নিবাস। গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ ও অপ্সরাগণ এঁনার স্বর এবং অসুরশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ এঁনার স্মৃতি। ব্রাহ্মণ এই পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয় হাত, বৈশ্য উরু ও তমঃপ্রধান শূদ্র এঁনার চরণ এবং যজ্ঞই এই পুরুষের কর্ম।

হে মহারাজ, আমি ঈশ্বরদেহের যে অবয়ব বিন্যাস বললাম, এ ছাড়া অন্য কোন বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, মুক্তিকামী ব্যক্তিরা নিজের বুদ্ধিতে ভগবানের এই স্থূলতম দেহে মনের ধারণা করে থাকেন। সত্যস্বরূপ আনন্দনিধি ভগবানে এই স্থূল বিশ্ব ও জীবসমূহকে লীন করে তাঁর ভজনা করাই বিধেয়, নয়তো অন্য বস্তুতে আসক্তি হলে, জীবাত্মার সংসাররূপ অধোগতি লাভ হয়।

চলবে...

 


বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ২

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


এর আগের পর্ব - "  ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "


পর্ব - ২


সূর্য ঘড়ি, জল ঘড়ি দিয়ে যে সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ করা যায় না, তাছাড়া তাদের নানান সমস্যার কথা গত পর্বেই লিখেছি। সে সব সমস্যা মিটিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে সময়ের পরিমাপ করার চেষ্টা কম হয়নি সে যুগে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এমন ঘড়ি তৈরি সম্ভব হল এই সেদিন, মোটামুটি ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে। এই ঘড়িগুলিই প্রথম দিককার যান্ত্রিক ঘড়ি। এই ঘড়ি বানানোর বিষয়ে সে যুগে কাদের অবদান সবথেকে বেশি, সেটা জানলে ভীষণ আশ্চর্য হবে! সে যুগে যান্ত্রিক ঘড়ি বানানোর ব্যাপারে সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল চার্চের monk বা সন্ন্যাসীদের। ৯৯৬ সালে আবিষ্কার করা প্রথম যে যান্ত্রিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করলাম, সেই ঘড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী কালে জার্মানের ম্যাগড়েবুর্গ (Magdeburg) শহরের পোপ হয়েছিলেন, নাম পোপ সিলভেস্টা টু (Pope Sylvester II) চার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রীতিনিয়মের জন্যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ এতটাই জরুরি ছিলে যে, ধর্ম আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি বানানোতেও তাঁরা গভীর মনোনিবেশ করতেন। তবে সে ঘড়ির আর অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে প্রাচীন যে যান্ত্রিক ঘড়ি লণ্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে রাখা আছে, সেটি চতুর্দশ শতাব্দীর এক সন্ন্যাসীর বানানো। তাঁর নাম পিটার লাইটফুট (Peter Lightfoot), তিনি গ্ল্যাসটনবেরির (Glastonbury) সন্ন্যাসী ছিলেন।

যান্ত্রিক ঘড়ির রহস্যটা বুঝতে গেলে প্রথমেই এস্কেপমেন্ট (Escapement) ব্যাপারটা বোঝা দরকার। ইংরিজিতে to escape মানে পালানো, সে তো জানোই। যান্ত্রিক ঘড়ির মধ্যে পালানো আর ধরে ফেলা এই  চলতে থাকে নিরন্তর। পাশের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।

ছবিতে দেখ অনেক খাঁজকাটা একটা লোহার চাকা রয়েছে, যার কেন্দ্রে একটা পিন দিয়ে তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। ধরে আছে মানে চাকাটা নড়াচড়া করতে পারবে না, কিন্তু পিনটাকে অক্ষ করে ঘুরতে পারবে।  এই চাকার পিছনে ঝোলানো থাকে তিরের ফলার মতো দেখতে লম্বা লোহার একটা কাঠি, ওই তিরের ফলার দুই ধারে হুকের মতো খাঁজ কাটা আছে। ওই তিরের মতো কাঠিটাও নড়বে চড়বে না, কিন্তু তার ভরকেন্দ্রে, মাথার কাছে ছোট্ট ছিদ্রটাকে অক্ষ করে দু পাশে দুলতে পারবে।

এইবার ওই লোহার কাঠিটাকে নির্দিষ্ট মাপে যদি দোলানো যায়, তাহলে তার হুকের ধাক্কায় লোহার চাকাটা ঘুরবে, কিন্তু দুলতে থাকা তিরের অন্য হুকের জন্যে চাকাটা মাত্র এক ঘাটের বেশি ঘুরতে পারবে না। অর্থাৎ তিরের ধাক্কায় চাকাটা যেন পালাতে চাইছে, কিন্তু অন্য ঘাটটা চাকাটাকে পালাতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই এস্কেপমেন্টের মূল তত্ত্ব।

এবার তীরের মতো কাঠিটাকে দোলানোর জন্যে প্রথমদিকে ভারি ওজন ঝোলানো হত, পরের দিকে স্প্রিংয়ের সঙ্গে পেণ্ডুলাম এবং তারও পরে ব্যলান্স-হুইল (balance wheel) ব্যবহার করা হত। খাঁজকাটা ওই চাকার নাম হুইল গিয়ার (wheel gear) দুলতে থাকা ওই কাঠি আর হুইল গিয়ারের ধাক্কার থেকেই আওয়াজ হত “টিক-টক” বা “টিক-টিক” আর সেই থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্ত, ঘড়ি আর ওই আওয়াজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

ভারি ওজন ঝোলানো ঘড়িগুলো আকারে বিশাল বড়ো আর ভারি হত। এই ঘড়িগুলি সাধারণতঃ বড় বড়ো চার্চের মাথায় কিংবা শহরের প্রধান জায়গায় বেশ উঁচু ঘড়িঘর বানিয়ে তার মাথায় বসিয়ে রাখা হত। ওই সব ঘড়িতে প্রহর ঘোষণার জন্যে ঘড়ির সঙ্গে বড় বড় ঘন্টাও রাখা হত। প্রতি ঘন্টায় সে সব ঘন্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বাজত, ঢং ঢং। শহরের লোক নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘন্টা শুনে বুঝতে পারতো কটা বাজে। আমাদের দেশে সময়ের পরিমাপ ঘটিকা বা ঘন্টা (hour) এইভাবেই পেতল বা অন্য ধাতু দিয়ে বানানো ঘন্টা (bell)-র সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।

 

পেণ্ডুলাম ঘড়ি

এতদিন ধরে যে যান্ত্রিক ঘড়ি চলছিল, সেগুলো বেশ জবড়জং জটিল আর খুব ভারি লোহা, ইস্পাত দিয়ে বানানো ভজকট ব্যাপার। ওপরের ছবিটা দেখ না, দেখে কী মনে হচ্ছে, যে ওটা একটা ঘড়ির অন্দরমহল!  কাজেই এই ঘড়িকে আরো উন্নত করে, কীভাবে আরো সহজ সরল যন্ত্র তৈরি করা যায়, যা দিয়ে আরো সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব করা সম্ভব, সে প্রচেষ্টা চলছিলই!  তাছাড়া দেশের ধনী ব্যক্তিরাও চাইছিল, তাদের প্রাসাদে এবং সম্ভব হলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সুন্দর সাজিয়ে রাখার মতো একটা করে ঘড়ি হোক, যাতে সাধারণ মানুষের মতো ঘড়িঘরের ঘন্টার আওয়াজ শুনে সময়ের হিসেব করতে না হয়।


    ১৫৮০ সালে ইটালির গ্যালিলিও গ্যালিলি পেণ্ডুলাম আবিষ্কার করলেন এবং তিনি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য এক তত্ত্ব। একটি সাধারণ পেণ্ডুলাম বলতে সুতোয় ঝোলানো একটি বল বা ওজনকে বোঝায়, ওই সুতো যতো সূক্ষ্ম ও হাল্কা হবে পেণ্ডুলাম তত ভালো কাজ করবে, অবিশ্যি সুতোটা যথেষ্ট শক্তও হতে হবে, যাতে বলটি ছিঁড়ে না পড়ে যায়। এবার ওই সুতোর অন্য প্রান্তটি কোন একটি কীলক বিন্দুতে (pivot point) ঝুলিয়ে, যদি দুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুতোয় বাঁধা বলটি নির্দিষ্ট গতিতে ডান থেকে বাঁদিকে সমান দূরত্বে  দুলতে (oscillate) থাকে।  আদর্শ শর্ত (ideal conditions) অনুযায়ী এই বলটির অনন্তকাল একই দূরত্বে, একই গতিতে দুলতে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, কারণ, সূক্ষ্ম ভরহীন সূতো (mass-less rod or thread) দিয়ে ভরগোলক (mass bob) ঝোলানো অসম্ভব, যাকে কেন্দ্র করে পেন্ডুলাম দুলবে, সেই কীলকটি ঘর্ষণহীন (frictionless pivot) হওয়াও অসম্ভব।  তাছাড়া আছে বাতাসের ঘর্ষণ।

পেণ্ডুলামের এই নির্দিষ্ট সময়ের দোলাকে (oscillation) কাজে লাগিয়ে যে ঘড়ি বানানো সম্ভব, সে কথা গ্যালিলিও আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এবং ঘড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানাতে পারেননি। তার পরিবর্তে ১৬৫৬ সালে ক্রিস্টিয়ান হিউজেন্স (Christiaan Huygens) নামে একজন ডাচ অংকবিদ ও বিজ্ঞানী প্রথম এই পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানিয়েছিলেন। 

      

ওপরের ছবিদুটি হিউজেন্স সায়েবের বানানো প্রথম পেণ্ডুলাম ঘড়ির ছবি। বাঁদিকের ছবিটি বাইরে থেকে ঘড়ির চেহারা, আর ডানদিকের ছবিটি ঘড়ির অন্দরের কলকব্জার ছবি। দুটি ছবিতেই পেণ্ডুলামের গোলকদুটি চিনতে পারছো নিশ্চয়ই। ওই পেণ্ডুলামের সাহায্যে এস্কেপমেন্ট সিস্টেম কাজে লাগিয়ে এই ঘড়ি বানানো হয়েছিল। প্রথম দিকের এই ঘড়িতে দিনে মাত্র এক মিনিটের ভুল (error) হতো!

গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক 


একবার পেণ্ডুলাম ঘড়ি চালু হয়ে যাওয়াতে, ইংল্যাণ্ডে এই ঘড়ি বানানোর যেন হিড়িক পড়ে গেল। ১৬৭০-৭১ সালে উইলিয়াম ক্লিমেন্ট নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক, বিশাল বাক্সের মধ্যে  পেণ্ডুলাম ঘড়ি বানিয়ে ফেললেন, সে ঘড়ির নাম ঠাকুরদাদা ঘড়ি (Grandfather clock)।

১৭০০ সালের এরকমই একটি গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক দোরাব টাটাজি মুম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েল্‌স্‌ মিউজিয়ামে দান করেছিলেন। এই ঘড়ির ডায়ালে তামিল ভাষায় ১ থেকে ১২ সংখ্যা লেখা আছে। মনে করা হয়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মাদ্রাজের শিল্পকলা স্কুল থেকে এটির বাইরের বাক্সটি বানানো হয়েছিল, সেই সময়েই তামিল ভাষায় সংখ্যাগুলি লেখা হয়েছিল।



ক্লিমেন্ট সায়েবের পরে কয়েক বছরের মধ্যে পেণ্ডুলাম ও এস্কেপমেন্ট পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়ে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানোর মতো সুদৃশ্য ছোট ঘড়ি, প্রচুর পরিমাণে বানানো শুরু হয়ে গেল। সে সব ঘড়ি আমাদের ছোটবেলাতেও অনেক উচ্চবিত্ত বাড়িতেই দেখা যেত। এইগুলিকেই আমরা দেওয়াল-ঘড়ি (wall clock) বলতাম   





আকারে বড়ো হোক কিংবা ছোট, পেণ্ডুলাম ঘড়ি, বড় হল ঘরের মেঝেয় বসিয়ে কিংবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সময় দেখার জিনিষ। পথে ঘাটে, দূর বিদেশের অপরিচিত জায়গায় সময় জানতে গেলে সে ঘড়ি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাছাড়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভালো কাজ করে, একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অথবা ঝুলে থাকলে, একটু নড়াচড়া হলেই ঘড়ি বিগড়ে যেত। অতএব, আকারে ছোট্ট, পকেটে রাখা যায় এবং ঠিকঠাক সময়ও দেখা যায় এমন ঘড়ির ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে গেল।

ক্রিশ্চিয়ান হিউজেন্স, যাঁর উন্নত পেণ্ডুলাম ঘড়ি আবিষ্কারের কথা আগেই বলেছি, তিনি পেণ্ডুলামের পরিবর্তে ব্যালান্স স্প্রিং (Balance Spring) এবং ব্যালান্স হুইল (Balance Wheel) দিয়ে ছোট্ট ঘড়ি যে বানানো সম্ভব সেই আবিষ্কারের কথা তখনকার দিনের বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। এবং  ১৬৭৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, স্পাইর‍্যাল ব্যালান্স স্প্রিং (Spiral balance spring) বা স্পাইর‍্যাল হেয়ার স্প্রিং (spiral hair-spring) ব্যবহার করে, সর্বদা কাছে রাখার মতো ছোট্ট ঘড়ি বানিয়ে ফেলে নতুন যুগের সূচনা করে ফেললেন!  এই ঘড়িরও মূল তত্ত্ব সেই এস্কেপমেন্ট তত্ত্ব, যার কথা তোমাদের আগেই বলেছি। এর পরের পর্বে আসবে টাইম পিস (time piece) এবং পকেট ঘড়ি (Pocket watch) নিয়ে আলোচনা। 

তথ্য ও চিত্র ঋণঃ - আই আই টি, কানপুর ও উইকিপিডিয়া। 

চলবে...



নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...