মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৭

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬ "


৪২ 

দিনের প্রথম প্রহরটা এখন মিলাদের মহড়ার মাঠেই নিয়মিত থাকে ভল্লা। প্রথম-প্রথম তার মনে হয়েছিল ছেলেগুলোর আসল উদ্দেশ্য দ্রুত অর্থ উপার্জন করা – সে ডাকাতি করেই হোক বা সার্থবাহদের গো-শকটবাহিনীর ওপর আচমকা আক্রমণ করেই হোক।  কিন্তু জনা এবং মিলাদের সঙ্গে এই কদিনের ঘনিষ্ঠতায় ভল্লার সে ভুল ভেঙেছে। দুনীতিগ্রস্ত রাজকর্মচারী এবং আঞ্চলিক প্রশাসকদের দমন করা এবং প্রয়োজনে নিকেশ করাই যে জনাদের মুখ্য উদ্দেশ্য সেটা এখন বুঝেছে ভল্লা।

ওদের জন্যে মাত্র ছটা রণপাই দিতে পেরেছে ভল্লা। ভল্ল দিয়েছে কুড়িটা আর বল্লম চারটে। উপকরণের স্বল্পতা সত্ত্বেও ছেলেদের শেখার উৎসাহে ঘাটতি নেই এবং বটতলির দল দ্রুত উন্নতি করছে। ভল্লার ধারণা সকলের জন্যে পর্যাপ্ত অস্ত্র এসে গেলে – বটতলির দলও, মাসান্তে, নোনাপুরের ছেলেদের মতোই দক্ষ হয়ে উঠবে।

ছেলেদের কিছু কিছু মহড়া দেখিয়ে দিয়ে ভল্লা মাঠের একধারে বসল। ডেকে নিল মিলা আর জনাকে। বলল, “আমাদের অস্ত্রসম্ভার গত রাত্রেই বীজপুর পৌঁছে গেছে। দু-তিনদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্র ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। আমাদের কাছে দুটো হাতে-টানা শকট আছে, তোরা ওগুলো নিতে পারিস – অস্ত্র-শস্ত্র বয়ে আনতে সুবিধে হবে। কাজ হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে দিবি”।

“বাঃ, সে তো ভালোই হবে। কিন্তু তোমাদের অস্ত্রভাণ্ডার মানে? কোথায় বানিয়েছ? এত তাড়াতাড়ি বানালে কী করে?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুরের মহড়ার মাঠটা তোরা চিনিস তো? ওখান থেকে ক্রোশ দুয়েক দূরে – সোজা দক্ষিণে। জঙ্গলের ভেতর। চিনতে অসুবিধে হবে না। আমাদের লোকজন থাকবে – ভাণ্ডারে অস্ত্র ঢুকুক। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।

জনা বলল, “অস্ত্রগুলো হাতে পেলে, রামালিদের মতো আমরাও দিন-রাত এক করে মহড়া দেব ভল্লাদাদা। তারপর প্রথম আঘাতটা হানব গ্রামপ্রধানের বাড়িতে”।

“গ্রামপ্রধানের বাড়ি? তোদের বটতলি গ্রামের?”

“তাকে তুমি নোনাপুরের গ্রামপ্রধানমশাইয়ের মতো ভাবছো, ভল্লাদাদা? হুঁঃ - সে হচ্ছে শকুন – গ্রামের লোকেদের রক্ত চুষে খায়। তার বাড়ি-ঘর, বিলাসিতা, আর উৎসবের জমক দেখলে মনে হবে – ছোটখাটো রাজাই বোধ হয়। এরকম বহু আছে আশেপাশের সব গ্রামেই”।

“কী করবি?”

মিলার চোখ যেন ঝলসে উঠল, বলল, “ভিখিরি করে দেব – ওর গোলার শস্য বিলিয়ে দেব গ্রামের গরীব মানুষগুলোকে। পেতল-কাঁসার বাসন-পত্র, কাপড়-চোপড় – যা পাবো সব বিলিয়ে দেব। আর টাকাকড়ি গয়না-গাঁটি যা পাবো – কিছুটা রাখব – কিছুটা গ্রামের কাজে লাগাবো। ওই প্রধানের বাড়িতেই একটা পুকুর আছে, ভল্লাদাদা, সেখানে গ্রামের কাউকে নামতে দেয় না। সেটাকে আরও বড়ো করে কাটাবো, কাছাকাছি লোকেরা ওই পুকুরের জল ব্যবহার করুক না – টুকটাক সেচের কাজে কিংবা নিত্য প্রয়োজনে…”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “সামনের অমাবস্যায় আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই – এ কটাদিন আমি আর রামালি একটু ব্যস্ত থাকব। ওটা হয়ে গেলে, আমি তোদের সঙ্গেই বেশি থাকব। শুধু দক্ষতা দিয়ে লড়াই জেতা যায় না, মিলা – তার জন্যে আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়। সেটাও তোদের শিখতে হবে”।

“পরিকল্পনা মানে”।

ভল্লা একটু হেসে বলল, “এখনই পুরোটা বলব না – শুরুটা বলছি। তোদের ওই প্রধানের বাড়িতে দিনে-রাতে দুটো চালাক-চতুর ছেলে লাগিয়ে রাখ – পারলে, কোন কাজের ছুতোয় বাড়িতে ঢুকিয়ে দে। তারা সব কিছু জেনে নিক। কোন ঘরে কে থাকে? কোন ঘরে টাকা-কড়ি গয়না-গাঁটি রাখা থাকে? সিন্দুকের চাবি কার কাছে থাকে?  রাত্রে কজন পাহারা দেয় – তাদের ভাবগতিক কেমন? এরকম আর কি – এই সন্ধানগুলো আগে থেকে জানলে – খুব কমসময়ে কাজটা মনোমত ভাবে সেরে ফেলা যায়। নিজেদের বিপদও কমানো যায়”।

জনা আর মিলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, বলল, “বাস্‌ রে, ঠিক তো…, বুঝতে পারছি একটু একটু…”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “এখন এটুকুই কর - বাকি পরে বলব। এখন চলি রে। ওঃ মনে আছে তো, কাল সকালে কুলিকপ্রধান তার লোকজন নিয়ে আসবে তোদের ঘর বানানোর কাজ শুরু করতে। এলেই আমি বা রামালি নিয়ে আসব এখানে…”।

ভল্লা রণপায়ে চড়ে দৌড়ে চলল নোনাপুরের মহড়া-মাঠের দিকে।  

মহড়া-মাঠে পোঁছে ভল্লা একধারে বসল। দেখল ছেলেরা তির ছোঁড়া অভ্যেস করছে। ভল্লাকে দেখেই আহোক আর বিশুন দৌড়ে এল, বলল, “ভল্লাদাদা, শুনেছো? সেদিন থেকে শল্কুর তো কোন সন্ধান পাওয়াই গেল না, তার ওপর আজ ভোর থেকে কমলিমাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”।

“শল্কুর মামাবাড়িতে যারা গিয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে?”

“হ্যাঁ ভল্লাদাদা, শল্কুর দুই দাদা গিয়েছিল। ওখানে শল্কু যায়নি”।

“যাচ্চলে – গেল কোথায় ছেলেটা? আশ্চর্য ব্যাপার! সন্ন্যাসী হয়ে কোথাও চলে যায়নি তো, নেড়ামুণ্ডিদের সংঘে? আমাদের ওদিকের ছেলেপুলেরা খুব যায়”।

“কিন্তু কমলিমায়ের কী হল?”

ভল্লা হাসল, বলল, “কমলিমায়ের আবার কী হবে? কিছুই হয়নি। গতকাল মাঝরাত্রে কমলিমাকে আমি আর রামালি গিয়ে তুলে এনেছি। আমার বাসাতেই আছে…আমাদের জন্যে দুপুরের রান্না করছে”।

“তোমরা? কমলিমাকে তুলে এনেছ?”

“হ্যাঁ – কেন? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি? কালকে দেখতে গিয়েছিলাম – দেখেই বুঝলাম কমলিমায়ের বাঁচার কোন ইচ্ছে নেই। চান নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই…কী দশা হয়েছে আমার কমলিমায়ের! বললাম, আমার সঙ্গে চল - কিছুতেই আসবে না। তারপর জোর করে ধরে এনেছি। বাসায় ফিরে রামালি রান্না করল। ওই রাত্রেই কমলিমা পুকুরে গেল চান করতে – কতদিন পরে নাইল কে জানে? ফিরে এসে রামালির রান্না খেয়ে কেঁদেকেটে একসা। আজ ভোরে বেরোনোর সময় দেখি – বেড়ার দরজায় – জলছড়া দিচ্ছে। বুঝলাম কমলিমা আবার “কমলিমা” হয়ে উঠছে”।

“ইস্‌, এত কাণ্ড করেছো – কিন্তু রামালি কিছু বলল না কেন?”

“রামালিকে চিনিস না? সাত চড়ে রা কাড়ে? হতভাগার কথা বলতে, গায়ে যেন জ্বর আসে। কিন্তু শল্কুটা গেল কোন চুলোয়? ছেলেটা ভাবিয়ে তুলল তো…”। কথা বলতে বলতেও ভল্লা ছেলেদের দিকে লক্ষ্য রাখছিল – তির ছোঁড়াটা ওরা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে। “বাঃ তির ছোঁড়াটাও ভালোই শিখছিস”।

বিশুন বলল, “তোমার ওই বল্লম বা ভল্ল ছোঁড়ার থেকে তির ছোঁড়া অনেক সহজ। তুমি যে আগেই কেন তির ছোঁড়াটা শেখাওনি…!”

ভল্লা বিশুনের মাথায় হাল্কা চাঁটি মেরে বলল, “তোর মুণ্ডু। তির ছোঁড়াটাই সব থেকে কঠিন – ওটা প্রথমে শুরু করলে – আজও তির ছোঁড়াতেই আটকে থাকতিস। ভল্ল আর বল্লমের অভ্যাস করার জন্যে তোদের হাত আর চোখের তাল-মিলটা তৈরি হয়ে গেছে। সেই জন্যেই সহজ লাগছে তির ছোঁড়াটা। মহড়া তো ভালই হচ্ছে -  এখন সবাইকে ডাক, একটু উপদেশ দিই”।

আহোক আর বিশুন ডাকতে সকলে ওদের কাছে এল, ভল্লা বলল, “সবাই বস, কাল রাত্রে কতক্ষণ মহড়া দিলি?”

আহোক বলল, “প্রায় এক প্রহর”।

“বাঃ। কিন্তু অতক্ষণ এখানে থাকলে বিশ্রাম নিবি কখন? মহড়ার শেষে তোদের বাড়ি ফিরতেও তো দণ্ড দুয়েক লাগে…। রাত্রের মহড়াউদ্দেশ্য হল আলো-ছায়াতে চোখের দৃষ্টিটাকে তীক্ষ্ণ করা। দিনেরবেলায় সূর্যের আলোতে দৃষ্টিবিভ্রম হয় না বললেই চলে। কিন্তু আলো-আঁধারে খুব হয় – বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাতে। মাঠের দিকে তাকালে একটু দূরের ঝোপঝাড়গুলোকে মনে হয় কোন জন্তু। এমনও মনে হয় সেগুলো বুঝি চলে ফিরে বেড়াচ্ছে – একটু আগে ওটা কি এত কাছে ছিল? একটু দূরে ছিল না? ঝোপঝাড়কে জন্তু ভাবলে কোন ক্ষতি নেই – কিন্তু একটা লোক একটু অন্ধকারে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে – তোর চোখে পড়ল – কিন্তু তুই ভাবলি - ধুর গাছের ছায়াটাকে মানুষ মনে হচ্ছে। সেটা কিন্তু মারাত্মক হতে পারে। অন্ধকারে তীক্ষ্ণ নজরের অভ্যাস সেই বিভ্রমটা কাটিয়ে দেয়। রাত্রের দিকে যখনই ঘরের বাইরে বেরোবি – একটু দূরের অন্ধকারের যে কোন বস্তুকে সঠিক চিনতে চেষ্টা করবি। তাহলেই দেখবি অন্ধকারেও চোখ চলবে…। বোঝা গেল?”

একটু থেমে ভল্লা সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “এতদিন আমিই লক্ষ্যভেদ বলতে মানুষের হৃৎপিণ্ডের কথা বলেছি তোদের – তোরাও সেভাবেই অভ্যাস করেছিস। আজ বলছি – লক্ষ্যটা প্রয়োজনে বদলাতেও পারে। অনেক সময় রাজরক্ষীরা গায়ে লোহার কবচ পড়ে – তার বুকে ভল্ল ছুঁড়লে ঠিকরে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য বদলাতে হবে। একটা লোককে মারতে আর কোথায় কোথায় চরম আঘাত হানা যায়? মাথায়, চোখে, কানে, গলায় এবং পিছন থেকে হলে ঘাড়ে। মাথাতেও অনেকসময় রক্ষীরা কবচ পরে – তার নাম শিরস্ত্রাণ। সেক্ষেত্রে বাকি রইল চোখ, কান, গলা অথবা ঘাড়। বল্লমের অথবা তিরের বা ভল্লর ফলা এই মোক্ষম জায়গাগুলিতে গেঁথে দিতে পারলেই – শত্রুর শেষ। বল্লমটা লাগে সামনাসামনি লড়াইয়ের সময়। একটা বল্লম আমাকে দে – দেখাই। এই দ্যাখ বল্লমের ফলাটা যখন ঢোকে – খুব সহজেই ঢুকে যায় – কিন্তু বের করার সময় –ফলার এই কানদুটো – আশেপাশের মাংসপেশী এবং ধমনী বা শিরাকে ছিঁড়ে নিয়ে বের হয় – সেটা আরও বেশি মারাত্মক। কাজেই বল্লমে কাউকে গাঁথলে অবশ্যই গায়ের জোরে টানবি। ভল্ল বা তির অনেকটাই দূর থেকে ছোঁড়া হয় বলে, সহজে টেনে নেওয়ার উপায় নেই – শত্রু মরেছে নিশ্চিত হলেই কাছে গিয়ে টেনে তোলার প্রশ্ন আসবে”।

সুরুল বলল, “শত্রু নিশ্চিত মরেছে কিনা জানার কোন উপায় আছে, ভল্লাদাদা?”

“ভালো প্রশ্ন করেছিস, সুরুল। সহজ কোন উপায় নেই। তোর আঘাতে শত্রু ধর মাটিতে পড়ে ছটফট করছে – অথবা টলতে টলতে দৌড়ে পালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সন্তর্পণে এগিয়ে যাবি এবং শেষ আঘাতে শত্রুকে শেষ করবি। কিন্তু খুব সাবধান – তুই হয়তো একজনের দিকে লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছিস – কিন্তু তোর আশেপাশে বা পিছনে অন্য শত্রু হয়তো এগিয়ে আসছে – সেক্ষেত্রে আহত শত্রুকে তখনকার মতো ছেড়ে দে – অন্য শত্রুর দিকে মন  দে। এখানে আরও বলি – আস্থানের ছবিটা তোদের নিশ্চয়ই মনে আছে – সে ঘরগুলোর কিছু ঘরে ছাদ আছে, কিছু ঘরে টালির চাল। সেক্ষেত্রে তোর শত্রু ওপরেও থাকতে পারে। অতএব একজনকে লক্ষ্য রাখছিস বলে – অন্যদিকে চোখ রাখবি না – এমন যেন কখনোই না হয়। যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ”।

সকলকে কিছুটা সময় দিয়ে ভল্লা আবার বলল, “কিছু কিছু অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের আবার আশ্চর্য মানসিক নিয়ন্ত্রণ থাকে – তারা মরণ আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করেও মাটিতে মরার মতো নিশ্চল শুয়ে থাকতে পারে। কাজেই তোর আঘাতের পরেই কেউ মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেল দেখে – চট করে তার কাছে যাবি না – সে হয়তো অপেক্ষাতে আছে – মরার আগে তোকে একটা শেষ আঘাত হানার জন্যে। আবারও বলি - যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ। মনে রাখিস - নিজের জীবনের থেকে মূল্যবান, জগতে আর কিচ্ছু হতে পারে না”।

সকলেই চুপ করে রইল ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে। ভল্লা হাসল, বলল, “কী হল? সবাই ভয়ে ভেবলে গেলি নাকি? প্রথম দিন থেকেই তোদের বলেছিলাম, ভালো যোদ্ধা হতে হলে দরকার শক্তি, দক্ষতা এবং মস্তিষ্ক। মনে আছে? তোরা দক্ষ হচ্ছিস, তোদের শক্তি বাড়ছে – সেই সঙ্গে বাড়িয়ে তোল মস্তিষ্কের দক্ষতাও! তবে না লড়াইয়ের মজা”।

একটু সময় দিয়ে প্রসঙ্গ বদলাতে ভল্লা বলে উঠল, “হ্যারে রামালি, তোদের সেই কবিরাজ ছেলেটি, বড়্‌বলাকে বার্তা পাঠিয়েছিস?”

“না গো ওদের খাবার আনতে গ্রাম থেকে যারা আসবে, তাদের বলে দেব - সন্ধ্যে বেলায় তোমার বাসায় যেন দেখা করে”।

“ঠিক আছে”। তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা মজা পাওয়া মুখে বলল, “কিন্তু ছেলেটি আমাদের বাসায় গিয়ে চমকে উঠবে, বল? কমলিমা বেরিয়ে এসে যখন বলবেন – কেমন আছিস, বাবা?”

তিনজন ছাড়া সকলেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তোমার বাসায় কমলিমা?”

“কেমন দিলাম বল? রামালি তো সবটাই জানে – আহোক আর বিশুনকে একটু আগেই সব বলেছি – ওদের থেকে শুনে নিস। কিন্তু শল্কুটার কী হল বল তো? বিশুন বলছিল ও নাকি মামাবাড়িতেও যায়নি”।

সুরুল বলল, “সত্যি কিনা জানি না। আমাদের গ্রামের এক রাখাল বলছিল, ওই দিন একজন লোককে নাকি সে – আমাদের গ্রামের পিছনদিকের মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণদিকে যেতে দেখেছিল। মোটামুটি প্রথম প্রহরের শেষ কিংবা দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে। রাখালটা নাকি জিজ্ঞাসাও করেছিল – কোথা থেকে আসা হচ্ছে কত্তা – যাবেই বা কোথায়? তাতে লোকটা নাকি কোন সাড়া না দিয়ে – মুখটা গামছায় ঢেকে দৌড়তে শুরু করেছিল। রাখাল ছেলেটি লোকটার চেহারার যা বর্ণনা দিল, সে শল্কু হলেও হতে পারে। আমাদের গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণে আস্থান ছাড়া ও আর কোথায় যাবে, ভল্লাদাদা? ওদিকে কাছাকাছি বলতে, পাঁচ-ক্রোশের আগে আর তো কোন গ্রাম নেই!”

“একা একা আস্থানে গিয়েছিল? কী বলছিস? এতটা সাহস ওর হবে? আমার মনে হয় না, সুরুল। ও অন্য কেউ হবে…। কিন্তু… যদি শল্কুই হয়, আর যদি সত্যিই ও আস্থানে গিয়ে থাকে…তাহলে এতদিনেও ফিরল না কেন? ওকে কি বন্দী করে রেখে দিয়েছে? শল্কু যদি গিয়ে থাকে – কী করতে গিয়েছিল? আমরা কী করছি না করছি - সব কথা জানাতে গিয়েছিল? তাহলে তো সে এখন রাজসাক্ষী। তার মানে, ও কি এখন আস্থানেই আছে?  কিন্তু আস্থানের রক্ষীরা এই কদিনে এদিকে এল না কেন? যে কোনদিন এলেই তো রক্ষীরা আমাদের সকলকে এই মহড়া মাঠে পেয়ে যেত – আস্থান থেকে লুঠ করে আনা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র সহ…। উঁহু। আমার মনে হচ্ছে শল্কু আস্থানে যায়নি। অন্য কোথাও গিয়েছে”।

ছেলেরা ভল্লার যুক্তিতে কোন ফাঁক খুঁজে পেল না। চুপ করে সবাই ভাবতে লাগল। ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এখন চলি রে। খেয়ে এসে আমাদের পরিকল্পনাটা আরেকবার ঝালিয়ে নেব। শল্কুর কথা চিন্তা করে লাভ নেই – ও নিজে না ফিরলে আমাদের আর কী করার আছে? রামালি চল। কমলিমা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন…”।

চলবে... 


সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৪

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৩ "]

৫.৪.১.৪ দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ

দ্বারকা ও রাজস্থানে কৃষ্ণ “রণছোড়জী” নামেই প্রসিদ্ধ। এই নামটি সম্ভবতঃ মধ্যযুগ থেকে প্রচলিত হয়েছিল। যেমন আমাদের পূর্বভারতে, কৃষ্ণ নামটি কাহ্ন, কানু, কানাই নামেও জনপ্রিয় হয়েছে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদকর্তাদের প্রভাবে।

অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ “রণছোড়” শব্দটির অর্থ – যিনি যুদ্ধ ছেড়ে এসেছেন। মথুরায় কংসবধের পর, রাজা কংসের শ্বশুর পরাক্রান্ত চেদিরাজ জরাসন্ধ, কৃষ্ণ-নিধনের জন্যে বারবার (পৌরাণিক মতে আঠারোবার) মথুরা আক্রমণ করেছিলেন। সে যুদ্ধে কোন পক্ষই জয়ী হতে পারেননি, কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধেই দুই পক্ষের বহু নিরীহ সৈন্য নিহত/ আহত এবং অজস্র সম্পদ হানি হত। এই অকারণ রক্তপাত এবং শক্তি ও সম্পদ-ক্ষয় এড়াতে কৃষ্ণ যুদ্ধ ছেড়ে সুদূর দ্বারকায় সরে গিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এ তাঁর অসাধারণ দূরদর্শীতা, ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয়। কারণ পরবর্তীকালে তিনি মধ্যম পাণ্ডব ভীমের সঙ্গে একক যুদ্ধে প্ররোচিত করে জরাসন্ধকে নিহত করিয়ে শত্রুমুক্ত হয়েছিলেন, সেখানে কোন নিরীহের রক্তপাত হয়নি। প্রতিকূল সময়ে যুদ্ধ ছেড়ে আসা যে আসলে অনুকূল সময়ে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি, সে কথাটাই শ্রীকৃষ্ণের “রণছোড়জি” নামের মহিমা।                

দ্বারকাধীশ কৃষ্ণের দশজন প্রধানা পত্নীর নাম শোনা যায় - রুক্মিণী, সত্যভামা, জাম্ববতী, নাগ্নজিতী, কালিন্দী, মাদ্রী, মিত্রবৃন্দা, ভদ্রা। প্রাগজ্যোতিষপুরের ভৌমাসুর বহু রাজাকে পরাস্ত করে ষোল হাজার রাজকন্যাকে বন্দী করে রেখেছিলেন। প্রাগজ্যোতিষপুরের নরকাসুরকে বধ করে, কৃষ্ণ ভৌমাসুরের অন্তঃপুরে যান এবং বন্দিনী রাজকন্যাদের মুক্ত করার আদেশ দিলে, ষোল হাজার রাজকন্যা তাঁকেই পতিরূপে বরণ করেছিলেন। কৃষ্ণও সানন্দে তাঁদের গ্রহণ করে, দ্বারকায় পাঠিয়েছিলেন, এবং প্রত্যেক পত্নীর জন্যে সুন্দর গৃহ নির্মাণ করিয়েছিলেন। প্রধানা দশ মহিষীর প্রত্যেকের গর্ভে ভগবান কৃষ্ণের দশটি করে পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন, প্রদ্যুম্ন, চারুদেষ্ণ, ভানু, শাম্ব, সুমিত্র, পুরুজিৎ, বীর, সুবাহু, প্রঘোষ, বৃক, হর্ষ, সংগ্রামজিৎ, বৃহৎসেন প্রমুখ। শোনা যায় তাঁর মোট পুত্রসংখ্যা নাকি সহস্রাধিক।

ব্রজবাসী কৃষ্ণের আরও একটি বহুল জনপ্রিয় প্রেমের উপাখ্যানের উল্লেখ মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবতে পাওয়া যায় না। সেটি হল পরবর্তী কালের বহুল জনপ্রিয় রাধা-কৃষ্ণ উপাখ্যান। মহাভারতের পরিপূরক গ্রন্থ “খিলহরিবংশ”-এ – কৃষ্ণের রাসলীলার বর্ণনায় কৃষ্ণের মুখে দুটি মাত্র নামের উদ্দেশে বিরহ ভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়, “হা রাধে! হা চন্দ্রমুখি!” (খিল হরিবংশ, অধ্যায় ৭৬), কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে আর কোন বিবরণ বা তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ পরবর্তী কালের কবিকুল, বিশেষত বঙ্গের কবিকুল এই যুগলকে নিয়ে অজস্র ভাবের ও আবেগের গান ও পদাবলী রচনা করেছেন। কৃষ্ণভক্ত যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর (১৪৮৬-১৫৩৩ সি.ই) আবির্ভাবের পর, বঙ্গদেশে রাধা-কৃষ্ণই অন্যতম প্রধান উপাস্য হয়ে উঠেছিলেন।  

৫.৪.২ ভক্তিযোগের ঐক্য

জ্ঞানযোগ, কর্মযোগের পর যে ভক্তিযোগের কথা আগে বলেছিলাম, গুপ্তযুগের সমসাময়িক কালে সেই ভক্তিযোগ সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং প্রধানতঃ এই ভক্তি আন্দোলনের বিপুল জনপ্রিয়তাই সমগ্র ভারতবর্ষে পূর্ণতঃ হিন্দুধর্মকে প্রতিষ্ঠা করল। হিন্দু ধর্ম এই সময়ে শুধু যে রাজন্য বর্গের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করল তাই নয়, দেশের সাধারণ জন সমাজ, আর্য এবং অনার্য উভয়েই, হিন্দু ধর্মের প্লাবনে একই সূত্রে বাঁধা হয়ে গেল। আর্য-অনার্যের প্রধান বিভেদটা দূর হয়ে গেল, অর্থাৎ আর্যরা ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্তের অনার্যদের সঙ্গে মিশে যেতে পারল। কিন্তু এই সময় থেকেই জন্মগত বর্ণভেদ অনেকটা নমনীয় হলেও অর্থনৈতিক বর্ণভেদটা আরও প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। অর্থাৎ তখন থেকে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বৈশ্য এবং শূদ্ররাও সমাজে সম্মানীয় হয়ে উঠল, কিন্তু সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্র বৈশ্য এবং শূদ্ররা হয়ে উঠল অন্ত্যজ, অস্পৃশ্য বা অচ্ছ্যুৎ। চার বর্ণের থেকেও ভয়ংকর হয়ে উঠল “জাতি” এবং “বর্গ” – সে কথা পরে আলোচনা করা যাবে।

ভাগবত ধর্মে অনার্য এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সমন্বয় বিধান করেছেন, স্বয়ং কৃষ্ণ - শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার বিভূতি যোগে এবং শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধের ষোড়শ অধ্যায়ে। প্রথম ক্ষেত্রে তিনি প্রিয়সখা অর্জুনকে বলেছিলেন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আরও সবিস্তারে বলেছেন ভাগবত উদ্ধবকে। তিনি বলছেন, “উদ্ধব, আমি সর্বভূতের সুহৃদ, আত্মা, ঈশ্বর; আমিই সর্বভূতস্বরূপ এবং আমিই সর্বভূতের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহার-হেতু”। তিনি আরো বলছেন,

১. সকল দেবতাদের মধ্যে তিনিই হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্ম), বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ। অতএব সকল দেবভক্তদের মধ্যে তিনিই পরম উপাস্য, তাঁর উপাসনা করলে সকলেরই উপাসনা হয়ে যায়।

২. সকল তত্ত্বের মধ্যে তিনিই মহৎ-তত্ত্ব, তিনিই ওঁকার, তিনিই অ-কার, তিনিই গায়ত্রী ছন্দ। অতএব তিনিই সকল তত্ত্বের আধার।

৩. সকল ঋষিদের মধ্যে তিনিই মহর্ষি ভৃগু, রাজর্ষি মনু, দেবর্ষি নারদ, সিদ্ধেশ্বর কপিল, মুনিদের মধ্যে নারায়ণ, ব্রহ্মচারীদের মধ্যে সনৎকুমার।

৪. সকল প্রাণী - গবাদি পশুর মধ্যে তিনিই কামধেনু, পাখিদের মধ্যে গরুড়, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, ঐরাবত হাতি, বাসুকি সাপ, অনন্ত নাগ, তৃণভোজীদের মধ্যে কৃষ্ণসার হরিণ এবং মাংসাশীদের মধ্যে সিংহ। জলচর প্রাণীদের দেবতা তিনিই বরুণ। এই প্রাণীদের মধ্যে অনেকগুলিই অনার্য মানবগোষ্ঠীদের দেব-আত্মা হিসেবে পূজিত হতেন, যেমন গরুড়, হাতি, সাপ, নাগ, সিংহ ইত্যাদি - তাঁরা সকলেই এখন হয়ে গেলেন কৃষ্ণের স্বরূপ। মাত্র কয়েকবছর আগে সংবাদে এসেছিল রাজস্থানের কিছু জনগোষ্ঠী “কৃষ্ণসার” হরিণকে দেবতা বলে মান্য করেন।

৫. উপদেবতাদের মধ্যে তিনিই অর্যমা (পিতৃদেব), দক্ষ (প্রজাপতি)।

৬. বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী – তিনিই দৈত্য ও অসুরদের প্রহ্লাদ, যক্ষ ও রাক্ষসদের কুবের। অর্থাৎ এতদিন রাক্ষস, দৈত্য, দানবদের সম্বন্ধে আর্যদের যে উদ্ভট বৈরীভাব ছিল, সেটাও দূর হয়ে গেল। তিনিই গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের মধ্যে বিশ্বাবসু ও পূর্বচিত্তি, (বানরগোষ্ঠীর) হনুমান।

৭. পণ্ডিত ব্যক্তি -  তিনিই ধীর ব্যক্তিদের মধ্যে অসিত, (ইনিই বুদ্ধদেবের জন্মের পর রাজা শুদ্ধোদনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন), দ্বৈপায়ন বেদব্যাস, দেবগুরু বৃহষ্পতি ও দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য। স্ত্রীগণের মধ্যে শতরূপা, পুরুষদের মধ্যে স্বায়ম্ভূব মনু। পুরোহিতদের মধ্যে বশিষ্ঠ।

৮. গুণ ও দোষ – তিনিই ক্ষমাশীলদের ক্ষমা, সত্ত্বশীলদের সত্ত্ব, বীরদের জিগীষা, বণিকদের সম্পদ-আহরণ। তিনিই ধূর্তদের ছল, পাশাখেলার চাতুরি।

৯. বীরত্ব ও যুদ্ধ – তিনিই বীর শ্রেষ্ঠ অর্জুন, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়।

১০. প্রকৃতি – তিনিই নদীর মধ্যে গঙ্গা, জলাশয়ের মধ্যে সমুদ্র, দুর্গম পর্বতের মধ্যে হিমালয়, বৃক্ষের মধ্যে অশ্বত্থ, শস্যের মধ্যে যব। গঙ্গানদী, হিমালয় পর্বত এবং অশ্বত্থে দেবত্ব আরোপ বহু প্রাচীন প্রচলিত বিশ্বাস। প্রধান ফসল উৎপাদনে নবান্ন উৎসব কৃষিজীবনের শুরুর থেকে ওতপ্রোত জড়িত, অঞ্চল ভেদে সে গম, যব বা ধান যাই হোক না কেন।

ভাগবত ধর্ম তথা হিন্দুধর্ম ভগবান কৃষ্ণের বিভূতি অর্থাৎ তাঁর ঐশ্বর্য দিয়ে জয় করে ফেললেন সমগ্র ভারতের সমাজ। হিন্দু ধর্মের এই প্রবল প্রসারের ফলে ভারতবর্ষের জনসমাজ থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে লাগল। তবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবকে দুর্বল করার আরও একটি কারণ হল, বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে তোলা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম বিদ্বেষী বা বিরোধী প্রাচীন অনার্য সমাজ, যাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাঁদের বোঝানো হল, ভগবান বুদ্ধও ভগবান বিষ্ণুর অবতার। অতএব ভগবান বুদ্ধও যখন হিন্দুধর্মেরই একজন দেবতা, তখন না হক বৌদ্ধধর্মে গ্রহণে তাঁরা উৎসাহ হারালেন। তবে বিষ্ণু-অবতারের সাম্মানিক পদটুকু ছাড়া হিন্দুধর্ম থেকে ভগবান বুদ্ধ, কোনদিন আর কিছুই পাননি।   

কিন্তু হিন্দু ধর্ম হঠাৎ এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠল কী করে? এর উত্তর একটাই ভক্তিযোগ। হিন্দুধর্মের নতুন শাস্ত্র ও পুরাণে রাজা-রাজড়াদের জন্যে যজ্ঞ অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও, সাধারণ মানুষের জন্যে প্রচলন হল সহজ পুজো পার্বণের, আর তার সঙ্গে যাঁরা মুক্তি বা মোক্ষ পথের পথিক, তাঁদের বলা হল, নিঃস্বার্থ অর্থাৎ অহৈতুকী ভক্তি করো। সে ভক্তিরও নানান পথ আছে, যার যেমন পছন্দ, যার যেমন বিশ্বাস। পুরাণে বলা হয়েছে, ভক্তিভাবের পাঁচটি প্রকার আছে, যাদের একত্রে পঞ্চভাব বলে। যেমন,

১. শান্ত ভাব – বিষ্ণুর প্রতি একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা ও জ্ঞান - সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার, শুকদেব, দেবর্ষি নারদ।

২. দাস্য ভাব – কোন উদ্দেশ্য ছাড়া বিষ্ণুর সেবা করাই দাসের কর্তব্য, যেমন জয়-বিজয়, হনুমান, উদ্ধব।

৩. সখ্য বা ভ্রাতৃত্ব ভাব – নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে ভক্তি, যেমন বলরাম, ব্রজের গোপ বালকেরা, অর্জুন, দ্রৌপদী, সুদামা, বিদুর, অক্রুর।

৪. বাৎসল্য ভাব – পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব ভাব, মা-বাবা যেমন কোন স্বার্থ ছাড়াই সন্তানের সেবা করেন, যেমন মাতা যশোদা, গোপরাজ নন্দ, বসুদেব, মাতা দেবকী, মাতা কুন্তী, বিদুর।      

৫. মধুর বা প্রেমভাব– প্রেমিকা হিসেবে নিঃস্বার্থ ভালবাসা, যেমন শ্রীরাধিকা, গোপরমণীগণ, কুব্জা, দেবী মীরা, শ্রীচৈতন্যদেব।

এই পাঁচটি ভক্তিভাবের মধ্যে পঞ্চমটি শ্রেষ্ঠ ও সহজতম ভক্তি পথ এবং প্রথমটি জ্ঞানীর তপস্যাজনিত কঠিন পথ।  

এছাড়াও আরেকটি ভাবের কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, যদিও সেই ভাব কখনোই সাধারণের আচরণীয় নয়, সেটি হল শত্রুভাব। চরম বিষ্ণু-বিদ্বেষী হয়েও বিষ্ণুকে খুব দ্রুত লাভ করা যায়। যেমন, সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ-হিরণ্যকশিপু, ত্রেতাযুগে রাবণ-কুম্ভকর্ণ এবং দ্বাপরে শিশুপাল-বক্রদন্ত ভয়ংকর বিষ্ণু-বিদ্বেষী ছিলেন। এঁরা সকলেই স্বয়ং বিষ্ণুর অবতারের হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে, সকলেই সরাসরি বিষ্ণুতে লীন হয়ে বৈকুণ্ঠলোকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। অবিশ্যি এর পিছনে যে পৌরাণিক কাহিনী আছে, সেটি হল,-

বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুলোকের দুই বিষ্ণুভক্ত দ্বারপাল ছিলেন জয় ও বিজয়। একবার যোগসিদ্ধ ও পরম বিষ্ণুভক্ত চার কুমার – সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার (এঁরা সকলেই শান্তভাবের ভক্ত) বৈকুণ্ঠে গিয়েছিলেন বিষ্ণুর সঙ্গে দেখা করতে। সিদ্ধযোগী অর্থাৎ বালকের মতোই সরল ও নগ্ন ওই চারকুমারকে জয়-বিজয়, বিষ্ণু-নিবাসের দ্বারে প্রবেশের অনুমতি দেননি। তাতে চার কুমার তাঁদের অভিশাপ দিয়েছিলেন, জয়-বিজয়কে মর্ত্যে জন্ম নিতে হবে।

প্রধান দ্বারে গোলমালের সংবাদ শুনে স্বয়ং বিষ্ণু এসে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর পরমভক্ত চার কুমারকেই সমর্থন করলেন এবং জয়-বিজয়ের মর্ত্যে পতনকে, তিনি যদিও রদ করতে পারতেন, কিন্তু করলেন না। তিনি জয়-বিজয়কে প্রস্তাব দিলেন, তাঁরা যদি মর্ত্যে গিয়ে মিত্রভাবে বিষ্ণুর উপাসনা করেন, তাহলে তাঁদের বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার আগে বহুজন্ম মর্ত্যেই কাটাতে হবে। আর যদি শত্রুভাবে বিষ্ণুকে বিদ্বেষ করেন, তাহলে মাত্র তিন জন্মেই তাঁদের উদ্ধার হওয়া সম্ভব। জয়-বিজয় বিষ্ণুর পরমভক্ত ছিলেন, তাঁরা চাইছিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বৈকুণ্ঠে ফিরে ভগবান বিষ্ণুর সেবা করতে এবং প্রত্যেকদিন তাঁর দর্শন পেতে। অতএব তাঁরা দ্বিতীয় প্রস্তাবেই রাজি হয়েছিলেন। এই জয়-বিজয়ই তিন যুগে তিন বিষ্ণু-বিদ্বেষী ভাই হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং সরাসরি বিষ্ণু অবতারের হাতে নিহত হয়ে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন।

এই কাহিনীর গূঢ় তত্ত্ব হল, বেদ-ব্রাহ্মণ্য তথা বিষ্ণু-বিরোধী অনার্য বা আর্য রাজাদের হত্যাকে যুক্তিসিদ্ধ করা। আদতে এঁরা যেন সকলেই ছিলেন বিষ্ণুর পরমভক্ত জয়-বিজয়ের শাপগ্রস্ত জাতক, তাঁরা সকলেই বিষ্ণুর বিরোধীতা করেছিলেন, বিষ্ণুর হাতেই নিহত হয়ে দ্রুত বিষ্ণুলোক অর্জনের লক্ষ্যে। অনার্য গোষ্ঠীদের মনে কোথাও কোন বিদ্বেষভাব যদি থেকেও থাকে – এই কাহিনী তাতে সান্ত্বনাময় প্রলেপের কাজ করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু বিদ্বেষ-ভক্তির এই পথ অবশ্য পরিত্যাজ্য। কারণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা কেউই শাপভ্রষ্ট জয়-বিজয়ের জাতক নই। অতএব বিষ্ণুবিরোধী ভক্তিপথে গেলে, বিষ্ণুর অবতারের হাতে নয়, তাঁর ধর্মরক্ষকদের হাতে গণধোলাইতেই নিহত হতে হবে।

চলবে...


শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২১

প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০ "  


২১ 

একটু পরে মিঃ মিত্র আবার বললেন, “এনিওয়ে, অতীতের কথা ছেড়ে বর্তমানে ফিরি। দিন দশেক আগে জ্যোতিষ আমাদের ঝাড়খণ্ডের সাইটে ভিজিট করতে গিয়েছিল। এখন সে মোটামুটি আট-ন বছরের এক্সপিরিয়েন্সড্‌ গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। তার থেকে আমরা রিজনেব্‌ল্‌ রেস্পনসিব্‌লিটি এক্সপেক্ট করি, অধিকাংশই ক্ষেত্রে তাই হয়েও থাকে। যেমন ওই সাইটেরই আমাদের যে প্রজেক্ট ম্যানেজার, তার নাম সুদীপ্ত – সে জ্যোতিষেরই ব্যাচমেট। এই প্রজেক্টটা শুরুর থেকেই সুদীপ্ত খুব ভালো ম্যানেজ করছে। আমাদের কাস্টমার – ওখানকার হেলথ ডিপার্টমেন্টও ওর পারফর্ম্যান্সে বেশ খুশি।

এই সোমবারের আগের সোমবার, আমাদের খুব ক্রিটিক্যাল একটা স্ল্যাব কংক্রিটিংয়ের শিডিউল ছিল। আর আগের সপ্তাহে, বুধবার আমি নিজেই ওই সাইটে গিয়েছিলাম, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম জ্যোতিষকে। ভেবেছিলাম জ্যোতিষ থাকলে সুদীপ্তর খানিকটা হেল্প হবে। দুজনে মিলে কাজটা সাকসেসফুলি কমপ্লিট করতে কোন অসুবিধে হবে না। আমি নিজে দুদিন সাইটে থাকার পর বেষ্পতিবার রাত্রে রওনা হয়ে আমি কলকাতায় পৌঁছই শুক্রবার ভোরে। বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হতে না হতেই, আমার কাছে সুদীপ্তর ফোন এল, “শশাঙ্কদা, জ্যোতিষ কাল রাত্রেই কলকাতা চলে গেছে”। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?” তার উত্তরে ও বলল, “আপনি বেরিয়ে যাওয়ার পরেই, জানি না কোথা থেকে এক পেট ড্রিংক করে এসে, তপন, জগন্নাথ, ত্রিদিবদের সঙ্গে বিশ্রী দুর্ব্যবহার করেছে। আপনার আর আমার নামেও নাকি অশ্রাব্য গালাগাল দিয়েছে”। তপন, জগন্নাথ এরা আমাদের নন টেকনিক্যাল এমপ্লয়ি, যেমন তপন স্টোর সামলায়, জগন্নাথ লেবারদের রেকর্ড মেনটেন করে, আর ত্রিদিব হচ্ছে আমাদের সাইট-অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

আমি সেই শুক্রবার অফিসে গিয়েই জ্যোতিষের খোঁজ করলাম, অফিসে আসেনি। ওর বাড়িতে লোক পাঠালাম। সে ফিরে এসে বলল, “জ্যোতিষের মা নাকি বলেছে জ্যোতিষের খুব শরীর খারাপ, সাইটে গিয়ে রোদে-গরমে খেটে ওর শরীর নাকি ঝলসে গিয়েছে”। আমাদের লোকটিকে ওর সঙ্গে দেখা করতেও দেয়নি। যাই হোক আমার লোকটি বলে এসেছিল, জ্যোতিষকে আমি ডেকেছি, অতি অবশ্যই যেন সেদিন বিকেলের মধ্যে দেখা করে।

জ্যোতিষ এসেছিল। নেশাক্রান্ত মানুষ সারারাত অপরিমিত নেশা করার পর, পরেরদিন বেলা বারোটা-একটা পর্যন্ত বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকার পর যখন উঠে দাঁড়ায় – ঠিক সেরকম চেহারা ওর। ঘৃণায় আর বিরক্তিতে আমার মনটা ভরে উঠল। কিছুক্ষণ কথা-বার্তা বলেও বুঝলাম, ওর থেকে অবান্তর এবং উদ্ভট মিথ্যা কথা ছাড়া আর কিছু শোনার নেই। ওকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, আমি আমার এইচ-আর অফিসার বিভাসকে ডাকলাম। ওর টার্মিনেশন লেটারের ড্রাফ্‌ট্‌ আগেই করে রাখতে বলেছিলাম, অতএব বিভাস সেই ফাইলটা নিয়েই আমার চেম্বারে এল।

বললাম, “লেটারটা এখনই ইস্যু করে দাও, জ্যোতিষকে। আর ওর ফুল এণ্ড ফাইন্যাল পেমেন্টও আজই হয়ে যাওয়া চাই”।

“হয়ে যাবে, স্যার। ওর পেমেন্ট স্টেটমেন্টটা আমি রেডি করেই নিয়ে এসেছি, একবার দেখে নেবেন স্যার”।

দেখলাম, খুবই সামান্য - পঁচিশ-হাজার সামথিং ডিউ হচ্ছে। দেখে আমি একটু অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম, “অ্যামাউন্টটা এত কম কেন, বিভাস? ওকে তো আমরা নোটিস না দিয়েই টার্মিনেট করছি, অতএব তিনমাসের স্যালারি তো ওর এমনিই পাওনা হয়। তার ওপর আছে এ মাসের প্রায় ষোল দিনের স্যালারি, লিভ এনক্যাশমেন্ট, পার্ট অফ এক্সগ্রাসিয়া...”।

বিভাস বলল, “জ্যোতিষবাবু মোটামুটি আটবছর সাড়ে চারমাস আমাদের এখানে রয়েছেন। এতগুলি বছরে উনি যে ভাবে ছুটি নিয়েছেন, তাতে এখনও পর্যন্ত ওঁনার ছুটির হিসেব নেগেটিভে রান করছে - মাইনাস একশ সাত দিন। সেই হিসেবে ওঁনার লিভ এনক্যাশমেন্ট তো হচ্ছেই না, বরং নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর আছে ওঁনার অনেক আন-অ্যাডজাস্টেড অ্যাকাউন্ট্‌স্‌। সাইট থেকে উনি বেশ কয়েকবার টাকা তুলেছেন, কিন্তু ফেরত দেননি। ওঁর অ্যাকাউন্টে ট্র্যাভেলিং অ্যাডভান্সে জমা হয়ে আছে বহু টাকা, কিন্তু তার এগেনস্টে যে বিল জমা দিয়েছেন, প্রত্যেক বিলেই রয়েছে অজস্র ডিসপিউট। প্রতি ফিনান্সিয়াল ইয়ারেই এই ব্যাপারটা নিয়ে ওঁনার সঙ্গে আমাদের লড়তে হয় স্যার...”।

“ডিসপিউট মানে?”

“সব সাইটেই আমরা একটা-দুটো হোটেলের সঙ্গে টাই-আপ রাখি স্যার, সে তো আপনি জানেন। এয়ারপোর্ট বা স্টেশন থেকে পিক-আপের জন্যে অথবা সাইটে যাওয়ার জন্যে গাড়িও ওই হোটেল থেকেই ঠিক করে দেয়। তার জন্যে ওরা আমাদের অনেকটাই ডিসকাউন্ট দেয়, এবং বেশ কিছু প্রিভিলেজও দেয়। সাইটে গেলে আপনিও স্যার ওই সব হোটেলেই ওঠেন...”।

“তাই তো। তাতে ডিসপিউটের কী আছে”?

“জ্যোতিষবাবু ওই হোটেলগুলিতে প্রায় কোন সময়েই যান না। খবর নিয়ে জেনেছি, তিনি অত্যন্ত সস্তা - লো বাজেটের হোটেলে ওঠেন। তাদের থেকে ব্ল্যাংক-বিল তুলে, নিজের খুশি মতো বিল বানিয়ে জমা দেন, উইথ হিজ ওন হ্যাণ্ডরাইটিং...”।

“কী বলছো, বিভাস? এতদিন এসব আমায় জানাওনি কেন?”

“আপনাকে এসব নিয়ে বিরক্ত করিনি স্যার, কারণ আমরা ওঁকে প্রথম ছমাসের মধ্যেই চিনে গেছিলাম, এবং ওঁনাকে কিভাবে হ্যাণ্ড্‌ল্‌ করতে হবে সেটাও বুঝে গেছি। এই ক’বছরে আপনি যত বার আমাদের জন্যে এক্স-গ্রাসিয়া বা ইন্সেন্টিভ ডিক্লেয়ার করেছেন, তার থেকেই আমরা ওঁনার যাবতীয় ডিসপিউট নিউট্রালাইজ করে নিয়েছি। ওঁর এই ফুল অ্যাণ্ড ফাইন্যাল সেট্‌ল্‌মেন্টেও, ওঁনার যাবতীয় গোঁজামিল ক্লিয়ার হয়ে যাবে”।

শশাঙ্কবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “সেই দিনই ওকে বিদেয় করলাম, বা বলা ভালো করতে বাধ্য হলাম। কিন্তু গত পরশুদিন বিভাস আপনার সংবাদটা আমাকে দিল – আপনি নাকি জ্যোতিষের বিরুদ্ধে ডিভোর্স ফাইল পুট-আপ করেছেন। শুনেই মনে হল, মস্তো বড়ো একটা ভুল হয়ে গেছে আমার। জ্যোতিষের জীবনের সঙ্গে আপনি যে জুড়ে আছেন, এবং সম্প্রতি জুড়ে গিয়েছে আপনার শিশু পুত্রটির জীবনও, সে কথাটিই আমি রাগের মাথায় ভুলে গিয়েছিলাম”।

বাবা এবং আমি দুজনেই এতক্ষণ শুধু শ্রোতা হয়েই ছিলাম, একটা কথাও বলিনি। কিন্তু বাবা এবার বেশ বিরক্ত স্বরে বললেন, “কথাটা আপনার মনে থাকলে আপনি কী করতেন, চাকরি থেকে ওকে তাড়াতেন না? এবং ওর চাকরি থাকলে আমরা ওর এগেনস্টে ফাইল পুট-আপ করতাম না, এরকমই আপনার ধারণা?

আচ্ছা শশাঙ্কবাবু, সুকন্যার সঙ্গে বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে, আপনাদের অফিসে আমি নিজে গিয়েছিলাম জ্যোতিষের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নিতে। সেদিন আপনাদের এইচ-আর হেড, খুব সম্ভবতঃ ওই বিভাসবাবুই, আমাকে কিন্তু বলেছিলেন, জ্যোতিষ অত্যন্ত সচ্চরিত্র, ব্রাইট ইয়ংমেন। তার ফিউচারও খুব ব্রাইট...। অথচ আজ আপনি এসে বলছেন, আপনারা প্রায় শুরুর থেকেই সকলে জানতেন, জ্যোতিষ নানান গুণের গুণী। তাহলে সেদিন আপনাদের অফিস থেকে আমাকে কেন মিথ্যা কথা বলা হয়েছিল? আমার একমাত্র কন্যার জীবনটাকে এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার পিছনে আপনাদের ওই নির্জলা মিথ্যাচারও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ - তাই নয় কি, শশাঙ্কবাবু?”

অনেকক্ষণ শশাঙ্কবাবু কোন কথা বললেন না, মাথা নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ব্যাপারটা আমি যদিও জানতাম না, কিন্তু তাতেও আমি বা আমার কোম্পানি কোনভাবেই এই দায় এড়াতে পারি না। আমি আপনাদের দুজনের কাছেই আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। তার সঙ্গে আরও বলি, যে উদ্দেশে আজ আপনাদের কাছে আমার আসা, এই ঘটনাটি জানার পর আমার সেই উদ্দেশ্যটি আরও দৃঢ় হল।

কাকাবাবু, আপনার মেয়ে ও নাতির কথা মনে পড়লে জ্যোতিষকে আমি বিদায় করতাম না। আমি তাকে বিদায় না করলে আপনারা ডিভোর্স স্যুট করতেন না, একথা বলার জন্যে আমি আসিনি। আমি এসেছি, সুকন্যা এবং ওর শিশু পুত্রের কথা ভেবে...কোন ভাবে যদি কিছু সাহায্য করতে পারি”।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কিভাবে?”

“সুকন্যার যদি একটা কাজ বা একটা স্থায়ী চাকরি হয়ে যায়, সুকন্যার পক্ষে জীবনটা যথেষ্ট সম্মানজনক হবে। আপনার ওপর ওকে পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হবে না”।

শশাঙ্কবাবুর এতক্ষণ ধরে, এত কথা শুনতে খুব বিরক্ত বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এসব কথা এখন আর শুনে লাভ কি? যে ঘূণধরা জীবনটা আমি পেরিয়ে এলাম, এসব কথায়, সে জীবনটা কি মুছে যাবে? কিন্তু এই কথাটা, সত্যি বলতে আমার খুব মিনিংফুল মনে হল। আমি বললাম, “আপনাদের কোম্পানিতে? কী ধরনের চাকরি? আমি তো আর ইঞ্জিনিয়ার নই। আমি কমার্স নিয়ে পড়েছিলাম – এম.কম”।

শশাঙ্কবাবু আমাদের বাড়ি আসার পর থেকে, এই প্রথম হাসলেন, বললেন, “এম.কম? তাহলে তো হয়েই গেল। ভাগ্যিস ইংলিশ বা হিস্ট্রি নিয়ে এমএ করেননি, সেক্ষেত্রে আমাকে একটু বেগ পেতে হত। ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের মতো কোম্পানির মূল স্তম্ভ সুকন্যা, কিন্তু আমাদের অ্যাকাউন্টস বা কমার্স ডিপার্টমেন্টটা হল সেই স্তম্ভের মাথায় ছাদ। রেগুলার অ্যাকাউন্টস্‌ ছাড়াও আজকাল এত রকমের ট্যাক্স এবং তার সঙ্গে যুক্ত এত নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান মেনে চলতে হয়...যার সব কিছু আমি বুঝিও না। তবে এটুকু বুঝি ও জানি, এই নিয়ম-কানুনের একটি দুটি ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেই, কোম্পানির ঘাড়ে নেমে আসবে প্রশাসনিক খাঁড়া। সে বিপদ থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে ইঞ্জিনিয়াররা নয়, আপনাদের মতো কমার্সের লোকরাই। মাথার ওপর ছাদ না থাকলে, প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে কতদিন টিকে থাকতে পারবে এই কোম্পানি ও তার স্তম্ভগুলো?”

এই প্রথম শশাঙ্কবাবুকে আমার বেশ লাগল, আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনিও কিছুটা প্রসন্ন। একটু বিরতি দিয়েই শশাঙ্কবাবু বললেন, “আপনি কবে থেকে জয়েন করতে পারবেন, সুকন্যা?”

আমি আঁতকে উঠে বললাম, “এখনই জয়েন? এখনও একমাসও হয়নি আমি নার্সিং হোম থেকে ফিরেছি...”।

শশাঙ্কবাবু আবারও হাসলেন, বললেন, “আমি কি বলেছি কালই আপনাকে জয়েন করতে হবে? টেক ইয়োর টাইম...ধরুন মাস তিনেক পর... সরকারি নিয়মে ডেলিভারির পর আঠারো উইকের মেটার্নিটি লিভ পাওনা হয়, তার মধ্যে অলরেডি চারটে উইক ধরুন চলে গেছে...আশা করি অসুবিধে হবে না”।

এবার বাবা উত্তর দিলেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে – মানে ওর মায়ের সঙ্গেও একটু আলোচনা করে আপনাকে কয়েকদিনের মধ্যেই জানাবো”।

“অবশ্যই”। শশাঙ্কবাবু ওঁনার পকেট থেকে কার্ড-হোল্ডার বের করে, বাবার হাতে একটা কার্ড দিয়ে বললেন, “এখানে আমার নাম্বার আছে... ফোনে জানিয়ে দেবেন। আশা করি পজিটিভ রিপ্লাইই পাবো...পেলে বাকি ব্যবস্থা আমি করে নেব...”।

শশাঙ্কবাবু চলে গেলেন। তারপরে ক’দিন ধরে, আমাদের তিনজনের মধ্যে চলল নানান বিশ্লেষণ। আমি তো রাজি ছিলামই – বাবাও  ছিলেন মোটামুটি অনুকূল। মা ছিলেন বড্ডো প্রতিকূল, বলেছিলেন, “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেই ডরায়। আমার বাপু ভালো লাগছে না। চেনা নেই, শোনা নেই, হঠাৎ গায়ে পড়ে, বাড়ি বয়ে এসে চাকরি দিতে চাইছে তোকে... লোকটা ভদ্র নাকি ওই জ্যোতিষের মতোই মুখোশ-পরা অভদ্র – কী করে বুঝবো বল তো? আজকাল কে যে কোন মতলব পুষে রেখেছে মনে মনে...কে জানে?” অনেক পর্যালোচনা করার পর, পাঁচদিন পর আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, আমি জয়েন করবো...।

এর পিছনেও ছিল, সুনুদা, তোমার প্রিয় রবি ঠাকুর। কথাটা বাবা উল্লেখ করেছিলেন - “সভ্যতার সংকট” নামে একটি প্রবন্ধে রবি ঠাকুর নাকি বলেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ”। অতএব আমরা সেই পাপ কর্মটি করতে পারলাম না। আমি ফোন করে শশাঙ্কবাবুকে বললাম, “আমি মাস তিনেক পর জয়েন করতে রাজি আছি”।

আমার কথা শুনে শশাঙ্কবাবু উত্তর দিলেন, “আমাদের কোম্পানিতে মোস্ট ওয়েলকাম ম্যাডাম। আশা করি দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব। আমি দু’-তিনদিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একটি ছেলেকে পাঠাবো, ইদার বিকাশ অর অতুল। তার হাত দিয়ে আপনি একটা অ্যাপ্লিকেশন পাঠাবেন, আর তার সঙ্গে দেবেন, মাধ্যমিক থেকে এম.কম পর্যন্ত আপনার কোয়ালিফিকেশন সার্টিফিকেটের ফটোস্ট্যাট কপি। ঠিক আছে?”

হ্যাঁ অতুল নামে একটি ছেলে এসেছিল, তার হাতে আমি তুলেও দিয়েছিলাম আমার বিদ্যের পুরো জাহাজটা। তার দিন পনের পরে, আমার নামে বাড়িতে একটা চিঠি এল, শশাঙ্কবাবুর কোম্পানির নাম-ছাপানো খামে। খুব খুশি হয়েছিলাম, নিজেকে বেশ একটা কেউকেটাও মনে হয়েছিল। কারণ এর আগে তুমি ছাড়া খামে বা ইনল্যাণ্ডে, সরাসরি আমাকে কেউ কোনদিন চিঠি দেয়নি। কিন্তু মামিমার কাছে, আমার বিয়ে ফাইন্যাল হয়ে গেছে শুনে, তোমার সেই দুরন্ত কলমের মিষ্টি কালি শুকিয়ে গিয়েছিল। তুমি আমাকে চিঠি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলে। একদিক থেকে অবশ্য ভালই করেছিলে। আমার উপকারই করেছিলে। শ্বশুরবাড়ি গিয়েও নিয়মিত তোমার চিঠি পাওয়াটা, ওদের হাতে একটা অস্ত্র হয়ে উঠত। তোমার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্কের একটা কল্প-গল্প গড়ে তুলে, আমার এবং আমার বাবা-মায়ের মুখগুলো পুড়িয়ে দিতে পারলে ওরা খুব আনন্দ পেত। অনায়াসে ঢেকে ফেলতে পারত ওদের সুপুত্রের কীর্তিকলাপ।

যাগ্‌গে, তোমার সঙ্গে বোঝাপড়াটা এখন নয়, সামনাসামনি বসেই সারব। এখন আবার আমার অতীতেই ফিরে যাই।

খামটা খুলে পড়লাম, সুন্দর টাইপ করা বেশ কয়েক পাতার চিঠি...অনেক ক্লজ, অনেক টার্ম্‌স্‌ এণ্ড কণ্ডিশন্‌স্‌। সবটা পড়ার ধৈর্য ছিল না, পড়তে পারিওনি, কারণ আমার চোখটা আটকে গিয়েছিল, রেমিউনারেশনের পৃষ্ঠাটায়। অনেকগুলি সংখ্যা জুড়ে, আবার অনেক সংখ্যা কেটে আমার হাতে এসে যে টাকাটা জমবে...সেটা হল চব্বিশ হাজার সামথিং। বেশ কিছুক্ষণ, আদর করার মতো আঙুল বুলিয়েছিলাম সংখ্যাটার ওপর। সে সময় মনে হয়েছিল এ যেন সেই চিচিং ফাঁক - আলিবাবার গুহার সন্ধান।

বাবার হাতে তুলে দিলাম চিঠিটা। বাবা গোটা চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন। তারপর মাকে বললেন, “মনে হচ্ছে সুনুর কোম্পানিটা বেশ ভালই, বুঝেছ? ওদের নিয়ম-কানুনগুলো বেশ বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো এমনকি সরকারি চাকরির নিয়মের মতোই অনেকটা। পিএফ আছে, গ্র্যাচুইটি আছে, গ্রুপ ইন্সিওরেন্স আছে, তারপর ধরো, বছরে ৩০ দিন পিএল, ১০টা সিএল, ১৫টা এমএল...। তিনমাসের নোটিস পিরিয়ড। মাইনেপত্রও নেহাৎ মন্দ নয়, আমাদের সুকুর পড়াশোনা আছে ঠিকই, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা নেই একটুও। সে তুলনায় ভালই বলতে হবে...”।

 

মায়ের জিম্মায় পুত্রকে রেখে, প্রথম দিন বাবার সঙ্গে আমি অফিসে রওনা হলাম। বাবা অফিসের সামনে আমায় ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আমি এবার চলি। তুই ভেতরে যা, দেখ কেমন লাগে, কোন অসুবিধে হলেই ফোন করবি...”। শুরু হল যেন আমার একটা আনকোরা জীবন। 

চলবে...     



নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৭

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...