শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১০

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের নবম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৯ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দশম পর্বাংশ 


৪.৫.৫ সাহিত্য - কাব্য

সাহিত্যে এবং মনীষায় এ যুগের অন্যতম নক্ষত্র অবশ্যই মহাকবি কালিদাস। তাঁর সময় অনুমান করা হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এবং প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্ব কালে। তাঁর কাব্যগুলি সমসাময়িক সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। যদিও তাঁর সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না, কিন্তু তাঁর লেখা থেকে অনুমান করা যায়, তিনি দুঃখীর সমব্যথী, শিশু ও নারী মনস্তত্বে অভিজ্ঞ, ফুল, গাছপালা, পশুপাখিপ্রেমী এবং রাজসভার আড়ম্বরে অভ্যস্ত হলেও, সুখী এবং প্রশান্ত মানুষ ছিলেন। তিনি তিনটি নাটক লিখেছিলেন, “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”; দুটি দীর্ঘ কাব্য, “কুমারসম্ভব” ও “রঘুবংশম্‌” এবং দুটি ছোট কাব্য “মেঘদূত” ও “ঋতুসংহার”। এছাড়াও তাঁর অনেকগুলি রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কালিদাস ছাড়াও মোটামুটি সমকালে অথবা সামান্য পরবর্তী কালে অনেকেই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, কিন্তু কেউই মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেননি। যেমন কুমারদাসের, “সীতাহরণ” কিংবা ভারবির “কিরাতার্জুনীয়”। সপ্তম শতাব্দীতে শ্রীরামের জীবন নিয়ে লেখা ভট্টির “ভট্টিকাব্য”। এই সময়েই আরেক কবি মাঘ রচনা করেছিলেন, “শিশুপালবধ”। মাঘ তাঁর কাব্যে অক্ষর, শব্দ এবং ছন্দ নিয়ে বেশ কিছু অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, যেমন একটি মাত্র ব্যঞ্জন-ধ্বনি “দ” ব্যবহার করে এই শ্লোকটি,

        দাদদোদুদ্দ-দুদ্‌-দাদী / দাদাদোদুদো-দী-দ-দোঃ।

        দুদ্‌-দাদম্‌ দাদাদেদুদ্দে / দদ-আদদ-দদো দ-দঃ”।।

বেশ কিছু অপ্রচলিত এবং অস্পষ্ট-অর্থ-শব্দ নিয়ে এই শ্লোকটির অর্থ হতে পারে,

“(যিনি) দান-দাতা, অরিদের (যিনি) দুঃখদাতা,

(যিনি) পুণ্যদাতা, যাঁর বাহু দুঃখদাতার বিনাশ করেন,

(যিনি) দানবদলনকারী, ধনাঢ্য এবং দরিদ্রকে সমদান দেন,

অরিদলনে (তিনিই) উদ্যত করলেন তাঁর অস্ত্র”[1] (ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

এমন অদ্ভুত অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য সেকালে এবং পরবর্তী কালেও অনেকেই রচনা করেছিলেন। হয়তো তাঁদের অনেকেরই মনে হয়েছিল, মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়, অতএব তাঁরা চমকদার কিছু লিখে, মানুষের মনে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সমকালে তাঁরা নিশ্চয়ই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে এই ধরনের কাব্যগুলি দুর্বোধ্য এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

এরকম আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য পাওয়া যায়, যাকে “দ্বৈয়াশ্রয়-কাব্য” বলা হত। বিভিন্ন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ এবং পংক্তি নিয়ে এই কাব্যগুলিতে একই সঙ্গে দুটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দ্বাদশ শতাব্দীর সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”। এই কাব্যটি একই সঙ্গে অযোধ্যার শ্রীরামচন্দ্র এবং বঙ্গের পাল রাজা রামপালের জীবনীর ওপর লেখা, কবি সন্ধ্যাকর রামপালের সভাকবি ছিলেন।

সপ্তম শতাব্দীর কোন সময়ে আরেক জন কবি ছিলেন ভর্তৃহরি। তিনি কোন কাব্য রচনা করেননি, কিন্তু চার পংক্তির ছোট ছোট প্রায় তিনশ কবিতা রচনা করেছিলেন। এই কবিতাগুলি, পার্থিব জ্ঞান, ত্যাগ, প্রেম, আদিরস ইত্যাদি নানান বিচিত্র বিষয়ের ওপর এবং অধিকাংশ কবিতাই বেশ রসোত্তীর্ণ। যেমন,

“(হয়তো)       কুমীরের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নিতে পারো মণি,

                        সাগর পার হতে পারো সাঁতরে ঢেউয়ের সার,

                   মালা করে চুলে জড়াতেও পারো কাল-ফণী,

(কিন্তু)                  ঘোচাতে কী পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার!

অথবা,

(হয়তো)             বালু পিষে তেল পেতে পারো বহু ক্লেশে,

                             মরীচিকা হতে জল পেতে পারো তৃষ্ণার

                      শশকের শিং যদিও বা দেখ কোনো দূরদেশে

(কিন্তু)                     ঘোচাতে কি পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার![2]

(ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

 

হয়তো ভর্তৃহরির সমসাময়িক আরেকজন কবির একই রকমের চার পংক্তির কবিতাগুচ্ছ পাওয়া যায় তাঁর নাম অমরু। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বিষয় প্রেম, আবেগ এবং তীব্র কামনা। একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি কবি বিলহনের লেখা “চৌরপঞ্চাশিকা”ও উল্লেখযোগ্য কাব্য। এক চোর এবং রাজকুমারীর গোপন প্রেম নিয়ে পঞ্চাশ স্তবকে লেখা এই কবিতাগুলির আবেগ ও অনুভূতি যথেষ্ট কাব্যময়। তবে দ্বাদশ শতাব্দীতে জয়দেবের লেখা সংস্কৃত কাব্য “গীতগোবিন্দ” বাংলায় এবং বিশেষ করে বাংলার বৈষ্ণব মহলে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। মূলতঃ রাধা ও কৃষ্ণের ভালোবাসার আবেগ-ঘন অনুভূতি এই কাব্যের বিষয়। 

কাব্য এবং কবিতা ছাড়াও বর্ণনাভিত্তিক জনপ্রিয় গল্প-সংগ্রহ লিখেছিলেন সোমদত্ত, তাঁর বইয়ের নাম “কথাসরিৎসাগর”- সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীর কোন সময়ের রচনা। দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের কলহন রচনা করেছিলেন “রাজতরঙ্গিণী”- এই গ্রন্থটি কোন কাব্য গ্রন্থ নয়, বরং বলা চলে ঐতিহাসিক উপাখ্যান। কাশ্মীরের প্রাচীন রাজবংশের প্রচলিত কাহিনি এবং সমসাময়িক রাজাদের স্তুতি নিয়ে এই গ্রন্থটি রচিত। কাশ্মীরের সমসাময়িক রাজাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং রাজাদেরও অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। অতএব কাব্য হিসেবে এই গ্রন্থের গুরুত্ব না থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনচরিত নিয়ে লেখা, তাঁর বন্ধু ও কবি বাণভট্টের কথা আগেই বলেছি, তাঁর গ্রন্থের নাম “হর্ষচরিত”। এর পরে চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের (১০৭৫-১১২৫ সি.ই.) জীবন নিয়ে লেখা বিলহনের “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত” উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বাংলার কবি সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”-এর কথা আগেই বলেছি। সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত সাহিত্যের গ্রন্থটির নাম “হাম্মীর-মহাকাব্য”। এটির রচনাকার এক জৈন সন্ন্যাসী, নাম ন্যায়চন্দ্র সূরি। এই গ্রন্থটি খুব পরিচিত না হলেও, এর কাব্যগুণ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। চাহমান রাজা হাম্মীরের জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি, ১৩০১ সালে আলাউদ্দিন খিলজির হাতে রণস্তম্ভপুরার (আধুনিক রণথম্ভোর) যুদ্ধে হাম্মীরের পরাজয় এবং নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাকে কবি অত্যন্ত মহিমময় করে তুলেছিলেন।

 ৪.৫.৬ সাহিত্য – নাটক

সংস্কৃত সাহিত্যে নাটকের শুরু কবে থেকে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায় না। তবে কথোপকথনের বহুল প্রচলন উপনিষদগুলিতে পাওয়া যায়। যেমন কঠোপনিষদ, কেনোপনিষদ, বৃহদারণ্যকোপনিষদ ইত্যাদি। এই কথোপকথন অবশ্য কোন নাটক গড়ে তোলেনি, ধর্ম এবং বিশেষ করে ব্রহ্মজ্ঞানের চর্চায় গুরু-শিষ্যের আলাপ অথবা উন্মুক্ত সভার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের সংলাপ। যেমন কঠোপনিষদে যমদেবের সঙ্গে নচিকেতার সংলাপ, কিংবা বৃহদারণ্যকে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্ডিতদের তর্ক-বিতর্ক।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংস্কৃতে নাটকের ধারণা এসেছে গ্রিক সংস্কৃতি থেকে। তাঁদের যুক্তি হল সংস্কৃত নাটকে মঞ্চের সামনে এবং পিছনে যে পর্দার ব্যবহার হয়, সংস্কৃতে তাকে “যবনিকা” বলে, এই যবনিকা শব্দটি এসেছে “যবন” থেকে। সংস্কৃতে “যবন” শব্দ গ্রিক অর্থে ব্যবহৃত হত। এই যুক্তি অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ। কারণ সংস্কৃতে নাটকের ধারণা যদি সম্পূর্ণতঃ গ্রিক প্রভাবেই এসে থাকে, সেক্ষেত্রে যবনিকা ছাড়াও আরও অনেক শব্দ পাওয়া যেত, যার উৎস হত গ্রিক। সেরকম কোন উদাহরণ প্রাচীনতম নাটকেও পাওয়া যায় না। বরং আমার ধারণা, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নাটকীয় ভাবে গল্প বলার – যাকে পালাগান বা যাত্রা বলা যায় - প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতের এই ধরনের লোকশিল্প বা যাত্রার অভিনয় সর্বদাই মুক্তমঞ্চে অভিনীত হত, অর্থাৎ দর্শকরা মঞ্চের চারদিকে বসে যাত্রা দেখতে পারতেন, একদিকে কুশীলবদের যাওয়া আসার জন্যে ছোট একটি পথ ছেড়ে দিয়ে। গ্রিক প্রভাবে সেই মুক্তমঞ্চ পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলা হল এবং দর্শক শুধুমাত্র সামনে থেকেই অভিনয় দেখতে পারতেন। মঞ্চ ব্যবহারের এই দুই ধরণ অনুযায়ী অভিনেতাদের অভিনয়ের ধরণও বদলে যেতে বাধ্য - সেকথা অভিনেতারা অবশ্যই স্বীকার করে নেবেন। কারণ মুক্তমঞ্চের অভিনেতাদের চারদিকের দর্শকের কথা মাথায় রেখে ঘুরেফিরে-হেঁটেচলে অভিনয় করতে হত, সেখানে পর্দাঘেরা মঞ্চে তাঁদের অভিনয় করতে হয় একমুখী দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। অতএব মুক্তমঞ্চে পর্দার ব্যবহারের এই গ্রিক প্রভাবকেই সংস্কৃত নাটক “যবনিকা” নাম দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছিল।

যাই হোক বিতর্ক এড়িয়ে আমরা এবার সংস্কৃত নাটকের দিকে চোখ ফেরাই। সংস্কৃত নাটকের প্রথম যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার রচয়িতা অশ্বঘোষ, যাঁর কথা আগেই বলেছি। যদিও তাঁর লেখা পূর্ণ নাটক একটিও পাওয়া যায়নি, কিছু কিছু অংশ পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ার মরু অঞ্চলে। যাঁর লেখা প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ নাটক আমাদের কাল অব্দি এসে পৌঁচেছে, তাঁর নাম, ভাস। ভাসের সময় কাল সঠিক জানা যায় না, তবে বিশেষজ্ঞরা তাঁকে কালিদাসের নিশ্চিত পূর্বসূরি বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। তাঁর লেখা তেরটি নাটকের মধ্যে দুটি মহানাটকের নাম, “স্বপ্নবাসবদত্ত” এবং “প্রতিজ্ঞাযৌগণধরায়ন”। এ ছাড়া তিনি অনেকগুলি ছোট নাটকও লিখেছিলেন।

কিন্তু গুপ্তযুগের কালিদাস একদিকে যেমন মহাকবি ছিলেন, তেমনই ছিলেন মহানাট্যকার। কালিদাসের মাত্র তিনটি নাটক আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যেমন “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”। প্রথমটি শুঙ্গ রাজত্ব-কালে রাজপ্রাসাদে হারেমের অন্তঃপুর-চক্রান্ত নিয়ে লেখা। দ্বিতীয়টি পৌরাণিক রাজা পুরুরবা ও ঊর্বশীর প্রেমের কাহিনি নিয়ে। তৃতীয়টি পৌরাণিক রাজা দুষ্মন্ত এবং মুনি কণ্বর পালিতা কন্যা শকুন্তলার কাহিনি। এই তিনটি নাটকের মধ্যে “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌” ভারত তো বটেই বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম। কাহিনিবিন্যাস, নাটকীয় ঘটনার মোড়, নানান চরিত্র গড়ে তাদের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের মানসিক দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয় তুলে ধরায়, মহাকবি কালিদাস নাটকটিকে উৎকর্ষের চরম সীমায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

কালিদাসের প্রায় সমসাময়িক নাট্যকার শূদ্রক, তাঁর লেখা মাত্র একখানি নাটকই পাওয়া যায়, যার নাম “মৃচ্ছকটিক” (মৃৎ+শকটিক- মাটির খেলনাগাড়ি)। এই নাটকের বাস্তবমুখী গল্প, জটিল মনস্তত্ব এবং নাটকীয়তার জন্যে এই নাটক আজও বহুল জনপ্রিয়। সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নাট্যকার বিশাখদত্তর দুটি রাজনৈতিক নাটক পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি “মুদ্রারাক্ষস”। এই নাটকের গল্পের বিষয়, শেষ নন্দরাজা ধননন্দকে উৎখাত করে, চাণক্যের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসানোর কূট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। প্রসঙ্গতঃ ধননন্দের প্রধান অমাত্যের নাম ছিল “রাক্ষস”। আরেকটি নাটক হল “দেবীচন্দ্রগুপ্ত”। এই নাটকের বিষয় বড়ো ভাই রামগুপ্তকে সরিয়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনে বসার ঘটনা, যে ঘটনার কথা আগেই বলেছি।

রাজা হর্ষবর্ধনের (অথবা তাঁর নামে উৎসর্গ করা) লেখা তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “রত্নাবলী”, “প্রিয়দর্শিকা” এবং “নাগানন্দ”। প্রথম দুটির নায়িকা অন্তঃপুর-নারী, তাঁদের নামেই নাটকের নাম এবং বিষয় অন্তঃপুরিকাদের নানান মজাদার ঘটনা। তৃতীয় নাটকটির নায়ক রাজকুমার জীমূতবাহন, গল্পের বিষয় নিজের জীবন দিয়ে আর্তের উদ্ধার। রাজা হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক আরেক রাজা, পল্লবরাজ মহেন্দ্র বিক্রমবর্মণ একখানি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন, যার নাম “মত্তবিলাস”। নাটকটি প্রহসনধর্মী এবং তীব্র বিদ্রূপাত্মক। এক শৈব সন্ন্যাসী মদ্যপানে মত্ত হয়ে, তাঁর ভিক্ষাপাত্রটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই ভিক্ষাপাত্রটি ছিল একটি “কপাল” (অর্থাৎ নরখুলির উপরাংশ)। নেশাভঙ্গের পর, তাঁর এই কপালটি চুরি করার জন্যে তিনি দোষী সাব্যস্ত করলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে। এই নিয়ে বহু বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ল গ্রামের উভয় পক্ষীয় মহিলা এবং পুরুষরাও। অবশেষে দেখা গেল কপালটি মুখে নিয়ে একটি কুকুর পালিয়েছিল। এই নাটকটির সাহিত্যগুণ যাই হোক সমসাময়িক সমাজের একটি স্পষ্ট খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে।

কালিদাসের পরেই বিখ্যাত সংস্কৃত নাট্যকারের নাম, ভবভূতি। বিদর্ভের ভবভূতির সময়কাল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে, তিনি কনৌজের রাজা যশোবর্মনের সভাকবি ছিলেন। তাঁর তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “মালতী-মাধব”, “মহাবীরচরিত” এবং “উত্তর-রামচরিত”। প্রথম নাটকটির বিষয় নায়ক ও নায়িকার প্রেম। পরের দুটি নাটকেরই নায়ক শ্রীরামচন্দ্র।

৪.৫.৭ সাহিত্য - গদ্য

ভারতীয় ভাষায় এবং সংস্কৃতে কাব্য কিংবা নাটকের তুলনায় গদ্য রচনা খুবই কম। প্রথম সংস্কৃত গদ্য রচনা কিছু পাওয়া যায় উপনিষদে, ব্রাহ্মণে। তাছাড়া পালি ভাষায় গদ্য গ্রন্থ “জাতক” – ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনিগুলি। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে তিনজন লেখক কিছু গদ্য রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন, দণ্ডিন, সুবন্ধু এবং বাণ। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক লেখক দণ্ডিন, তাঁর গ্রন্থের নাম “দশকুমারচরিত”। এই গ্রন্থের দশটি গল্প দশজন রাজকুমারের ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে। দশজন রাজকুমারের দেশভ্রমণের বর্ণনা থেকে উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা– তার মধ্যে আছে বণিক, চোর, বারবনিতা, রাজকুমারী, কৃষক এবং বন্য উপজাতি। এই অভিজ্ঞতা কখনো মজার, কখনো ভয়ংকর, কখনো অনৈতিক কিন্তু মোটামুটি বাস্তব। সমাজের নিম্ন স্তরের এমন সাবলীল এবং প্রায় বাস্তব চিত্র, সংস্কৃত সাহিত্যে আর পাওয়া যায় না।

চলবে...



[1] The Wonder that was India – A. L. Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

[2] The Wonder that was India – A. L. Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগে গীতার শেষ অধ্যায়ঃ মোক্ষযোগ গীতা - ১৮শ পর্ব "




প্রাককথা 

    ভারতীয় সনাতন ধর্মের অসংখ্য ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে বহু সংখ্যক পুরাণ প্রচলিত ছিল। তাদের মধ্যে অনেক পুরাণই কালপ্রবাহে অবলুপ্ত। অনেক পুরাণ অত্যন্ত অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কারণে বর্জিত। সনাতনী পণ্ডিতগণ বর্তমানে আঠারোটি পুরাণকে মহাপুরাণের মর্যাদা দিয়ে থাকেন। এই মহাপুরাণগুলি হল, অগ্নি, ভাগবৎ, ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মবৈবর্ত, গরুড়, কূর্ম, লিঙ্গ, মার্কণ্ডেয়, মৎস্য, নারদ, পদ্ম, শিব, স্কন্দ, বামন, বরাহ, বায়ু, বিষ্ণু।  

    প্রত্যেকটি পুরাণেরই প্রধান বিষয় ত্রিদেব অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এছাড়াও নানান কাহিনী, বিচিত্র তত্ত্বকথা - সেগুলি প্রায়শঃ অবান্তর আবার কখনো কখনো পরষ্পরবিরোধী – বিষয় নিয়েও পুরাণগুলি বিরচিত। এই আঠারোটি মহা পুরাণের মধ্যে ভাগবত – যার পূর্ণ নাম শ্রীমদ্ভাগবত - সবথেকে জনপ্রিয়। প্রকৃতপক্ষে জনপ্রিয়তার বিচারে রামায়ণ-মহাভারতের পরেই থাকবে এই পুরাণ গ্রন্থটি।

    মূলতঃ শ্রীবিষ্ণুর মহিমাগাথা এই বিশাল পুরাণটি, রামায়ণ যেমন সাতটি কাণ্ডে ও মহাভারত যেমন আঠারোটি পর্বে, তেমনি বারোটি স্কন্ধে বিভক্ত। প্রতিটি স্কন্ধ অনুসরণ করে শ্রীবিষ্ণুর কীর্তিগাথা সহজভাষায় আন্তরিকভাবে আমি বর্ণনা করেছি, যদিও প্রতিটি অধ্যায়ের অন্তে থাকা শ্রীবিষ্ণুর সুদীর্ঘ মহিমাগাথা পাঠে পাঠকের জীবনে কী কী অত্যাশ্চর্য ফললাভ হবে – সেই পুনরুক্তিগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি বর্জন করেছি।

    আমার এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য ভক্তি-প্রচার নয় – বরং বিভিন্ন যুগে ভারতের সামাজিক বিন্যাস, রাজা ও প্রজার সম্পর্ক কিংবা উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের ভেদাভেদ এবং মানবিক মূল্যবোধসূচক ঘটনা বা কাহিনীগুলিই বর্ণনা করেছি। জন্মসূত্রে হিন্দু হওয়ার কারণে সুপ্রাচীন ও মহৎ এক ঐতিহ্যের অংশীদার হয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। কিন্তু আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলির কোনটাই না পড়ে, না জেনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী যেন হয়ে না উঠি - এটাই আমার এই প্রচেষ্টার প্রকৃত উদ্দেশ্য।         

       

 

প্রথম স্কন্ধ - প্রথম পর্ব 

গ্রন্থ পরিচয়

আমরা সত্যস্বরূপ সেই পরমেশ্বরকে প্রণাম করি। এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় যাঁর নিয়ন্ত্রণে, যিনি কারণরূপে অবস্থান করছেন বলে, নিখিল বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে; যাঁকে প্রকাশের জন্য অন্য আলোকের প্রয়োজন হয় না, বস্তুত যিনি নিজেকে নিজেই প্রকাশ করে থাকেন; যে বেদতত্ত্ব উপলব্ধি করতে জ্ঞানীগণের বুদ্ধিও পরাস্ত হয়, সেই বেদতত্ত্বকে আদি কবি ব্রহ্মার অন্তরে যিনি ব্যক্ত করেছিলেন; ত্রিগুণের অতীত হয়েও, যাঁর তমোগুণ থেকে ক্ষিতি, জল প্রভৃতি ভূতসমূহ, রজোগুণ থেকে সকল ইন্দ্রিয় ও সত্ত্বগুণ থেকে দেবতাগণ সৃষ্টি হয়েছে, আমরা সত্যস্বরূপ সেই পরমেশ্বরের ধ্যান করি।

এই মনোহর শ্রীমৎভাগবত মহামুনি শ্রী নারায়ণ প্রথম সংক্ষেপে বলেছিলেন। এই গ্রন্থে শ্রীহরির আরাধানাই পরমধর্ম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ধর্মের বিশেষত্ব এই যে, অন্যান্য ধর্ম যে স্বর্গলাভকেই মুক্তি হিসেবে জীবের চরম লক্ষ্য বলে নির্দেশ করেছে, এই ধর্মে সেই মুক্তিকে, অনেক কামনার মধ্যে তুচ্ছ আরেকটি কামনার মতোই অবহেলা করা হয়েছে। যাঁরা সর্বদা জীবের হিতকামনায় নিরত, সেই সাধু ব্যক্তিরাই এই পবিত্র ধর্মের অনুষ্ঠান করেন। মায়াময় এই জগতে যিনি একমাত্র সত্য এবং যিনি নিরন্তর প্রাণীদের মঙ্গল সাধন করছেন, এই গ্রন্থ পাঠে সেই সত্য তত্ত্ব উপলব্ধি করা যায়। শ্রীভগবানের তত্ত্ব জানতে পারলেই জীবের সংসার জ্বালা দূর হয়ে যায়।

বেদ কল্পবৃক্ষ, শ্রীমৎভাগবত সেই বৃক্ষের ফল। শুকপাখির চঞ্চু থেকে যেমন মধুর ফল খসে পড়ে, তেমনই এই সুধাময় শ্রীমৎভাগবত ফল মহাযোগী শ্রীশুকদেবের মুখ থেকে জগতে আবির্ভূত হয়েছে। আম ইত্যাদি ফলের খোসা ও বীজ ফেলে দিয়ে ফলের রস আস্বাদন করতে হয়, কিন্তু এই ফলের কোন অংশই পরিত্যাগ করার যোগ্য নয়, এই ফলের সমগ্র অংশই রসস্বরূপ। হে রসজ্ঞ, ভাবুকগণ, আপনারা এই গ্রন্থের সুধারস পান করতে থাকুন। 

 

 একবার শৌনক প্রমুখ ঋষিগণ, ভগবানকে লাভ করার আশায় বিষ্ণুক্ষেত্র নৈমিষারণ্যে সহস্র বছর তপস্যায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেন রোমহর্ষণপুত্র সূত। সমবেত ঋষিরা তাঁকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা করে, সম্মানীয় আসন দান করলেন এবং বললেন, “হে মহাত্মন, আপনি বেদজ্ঞগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আপনি মহাভারত, ইতিহাস, পুরাণ ও অন্যান্য সকল শাস্ত্র পাঠ ও ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি ভগবান বেদব্যাস ও অন্যান্য মুনিদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। উক্ত শাস্ত্রসমূহে জীবের পক্ষে আশু ফলপ্রদ ও একান্ত কল্যাণকর যে তত্ত্ব আপনি উপলব্ধি করেছেন, আপনি আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। এই কলিযুগে মানুষের আয়ু অত্যন্ত অল্প, তার উপর ব্যাধি ও বিঘ্নে মানুষ অত্যন্ত আকুল। অন্যদিকে নানাবিধ শাস্ত্রে নানান কর্ম ও ধর্মের নির্দেশ দেওয়া আছে; সুতরাং ওই সকল শাস্ত্রের যা সার, অর্থাৎ যা শুনলে জীবের মঙ্গল হয় ও চিত্ত প্রসন্ন হয়, সেই সার-সংক্ষেপ বর্ণনা করুন। শ্রীভগবানের নামের অপার মহিমা। ঘোর সংসারী পতিত অবস্থায়, অবশভাবেও তাঁর নাম গ্রহণ করলে, সেই ব্যক্তির শীঘ্র মুক্তি লাভ ঘটে। জীবকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে ও তাদের সুখের জন্যে ভগবান যুগে যুগে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। তাঁর সেই সব লীলা কথা শুনতে আমরা সকলে উন্মুখ, আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন”

রোমহর্ষণপুত্র সূত ঋষিদের এই অনুরোধে অত্যন্ত প্রীত হলেন, তিনি বললেন, “যাঁর কর্মের সকল বন্ধন অবসান হয়েছিল, সর্বভূতের অন্তর্যামী ব্যাসদেবপুত্র মুনি শুকদেবকে আমি প্রণাম করি। আমি আপনাদের কাছে শ্রীমৎভাগবত শোনাবো। এই গ্রন্থ সকল পুরাণের থেকেও শ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থ পাঠ করলে এবং শুনলে সকল বেদের সার তত্ত্ব জানা হয়ে যায়। সংসারের অজ্ঞান অন্ধকার থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্যে যিনি এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, মুনিদের গুরু সেই ব্যাসদেবপুত্র শুকদেবকে আমি প্রণাম করি। নর ও নরোত্তম নারায়ণ এই গ্রন্থের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। দেবী সরস্বতী এই গ্রন্থের শক্তি ও ব্যাস এই গ্রন্থের ঋষি। প্রথমেই এঁদের সকলকে প্রণাম করে, এই গ্রন্থ উচ্চারণ করা উচিৎ”

গুরু ও ইষ্টদেবতাদের প্রণাম করে, সূত আবার বললেন, “হে মুনিগণ, আপনারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিষয় প্রশ্ন করে, অত্যন্ত উত্তম কাজ করেছেন। এই বিষয়ে জগতের মঙ্গল হয়, চিত্ত সুশীতল হয়। আপনারা আরও জিজ্ঞেস করেছেন, সার ধর্মতত্ত্ব কী? আমি বলছি, আপনারা দয়া করে শুনুন। যে ধর্ম থেকে শ্রীভগবানে এমন ভক্তি উৎপন্ন হয় যে, সেই ভক্তিতে কোন কামনার লেশমাত্র থাকে না, কোন বিঘ্ন সেই ভক্তিকে অভিভূত করতে পারে না এবং সেই ভক্তিতে প্রাণে পরম শান্তি লাভ করা যায়; সেই ধর্মই জীবের পক্ষে উৎকৃষ্ট ধর্ম।

নিষ্ঠাভরে ধর্ম আচরণ করেও, যদি সেই ধর্মে ভগবানের কথা শুনে মনে হর্ষ ও প্রীতি অনুভব না করা যায়, তাহলে সেই ধর্ম আচরণ ব্যর্থ। ধর্ম অনুষ্ঠানের ফলে স্বর্গলাভ ইত্যাদি ফল পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু সেই ফল যথার্থ ফল নয়। যে পুণ্যের বলে স্বর্গলাভ হয়, সে পুণ্য চিরদিন থাকে না, অতএব স্বর্গবাসও নিঃশেষিত হয়। শ্রী হরির চরণে ভক্তি হলে, বৈরাগ্য লাভ হয় এবং আত্মা কী সেই স্বরূপ উপলব্ধি হয়। জ্ঞানীরা এই অবস্থাকেই অপবর্গ অর্থাৎ মুক্তি বলে থাকেন। ভক্তি থেকে শুরু করে মুক্তি পর্যন্ত যে মার্গ, এই শাস্ত্রে তাকেই পরধর্ম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জীবের প্রাণধারণের জন্য অর্থ, কামনার বস্তু ও ইন্দ্রিয়সুখের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঘটবেই, কিন্তু ওই সকল বিষয়ে আসক্ত না হয়ে, পদ্মপাতায় জলের মতো নির্লিপ্তভাবে ওই সকল বিষয়কে ভোগ করতে হয়। নানা রকম কর্মের অনুষ্ঠান করে স্বর্গলাভ করা এই ধর্মের উদ্দেশ্য নয়, তত্ত্ববিষয়ের অন্বেষণ ও জ্ঞান লাভই এই ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য।

যাঁরা তত্ত্বজ্ঞ, তাঁরা বলেন, এক অদ্বিতীয় জ্ঞানই এই তত্ত্ববিষয়। এই জ্ঞানকে জ্ঞানীগণ বলেন ব্রহ্ম, যোগীগণ বলেন পরমাত্মা আর ভক্তগণ বলেন ভগবান শ্রীহরি। মুনিগণ প্রথমতঃ শ্রদ্ধার সঙ্গে বেদান্ত শুনে আত্মার অস্তিত্ব জানতে পারেন। এই জ্ঞানকে পরোক্ষ জ্ঞান বলে। পরে বৈরাগ্য আশ্রয় করেন। অতঃপর জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ভক্তি দিয়ে তাঁরা নিজের আত্মায় পরমাত্মাকে অনুভব করেন। সেই উপলব্ধিকেই প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলেন। ভক্তিহীন যে কোন ধর্ম আচরণই পণ্ডশ্রম মাত্র। অতএব একাগ্রমনে সর্বদা ভক্তবৎসল শ্রীহরির নাম, রূপ ও গুণের বিষয় শ্রবণ, কীর্তন, ধ্যান ও পূজা করাই এই তত্ত্বের সার অংশ।

কৃষ্ণকথা শুনলে ও কীর্তন করলে চিত্ত পবিত্র হয়। কৃষ্ণ সাধুগণের পরম বন্ধু। যে ব্যক্তি তাঁর কথা শোনে, ভগবান তার মনে অবস্থান করেন এবং তার মন থেকে কামনা ইত্যাদি দোষ দূর করে থাকেনতখন সেই ব্যক্তির রজঃ ও তমোগুণ থেকে উৎপন্ন কাম, লোভ, অহংকার ইত্যাদি ভাবসমূহ তার চিত্তকে আর বশ করতে পারে না। সুতরাং সত্ত্বগুণের প্রকাশ হওয়ায় মন প্রসন্ন হয় এবং চিত্তে শান্তি অনুভব হয়। এইভাবে ভক্তি যোগে মন প্রসন্ন হলে, মানুষ সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্তি পায় এবং তখন ভগবানের তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে। মনের মলিনতা দূর করতে ভক্তির মতো উত্তম উপায় আর দ্বিতীয় নেই।

হে বিপ্রগণ, মাটি দিয়ে যেমন মাটির পাত্র, কলস ইত্যাদি তৈরি হয়, তেমনই যে বস্তু দিয়ে এই ব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছে তাকে প্রকৃতি বলে। সত্ত্ব, রজঃ আর তমঃ এই তিন প্রকৃতির গুণ। এই তিনটি গুণ আশ্রয় করে পরমপুরুষ ভগবান সৃষ্টি, পালন ও প্রলয় করে থাকেন। সত্ত্বগুণে যখন তিনি পালন করেন তখন তিনি বিষ্ণু, রজোগুণে যখন তিনি সৃষ্টি করেন, তখন তিনিই ব্রহ্মা এবং তমোগুণে যখন তিনি প্রলয় করেন, তখন তিনিই হর। মূলত এক হলেও এই তিন ঈশ্বর ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন। এই তিনের মধ্যে সত্ত্বদেহ বাসুদেব বিষ্ণুই আমাদের মঙ্গলসাধন করেন। তার কারণ, তমোগুণ বস্তুকে অচেতন জড় করে রাখে। কাষ্ঠে তমোগুণ প্রবল, তাই জড়। রজোগুণ বিষয়কে অস্থির ও চঞ্চল করে। ধোঁয়াতে রজোগুণ প্রবল, তাই গতিশীল। সত্ত্বগুণ বস্তুকে প্রকাশ করে। অগ্নিতে সত্ত্বগুণ থাকায়, অগ্নি নিজে প্রকাশ হয় এবং অন্ধকারে অন্যকেও প্রকাশ করে। অতএব কাঠের থেকে ধোঁয়া এবং ধোঁয়ার থেকেও অগ্নি শ্রেষ্ঠ। সত্ত্বগুণ ব্রহ্মের প্রকাশক বলে, সত্ত্বতনু ভগবান বিষ্ণু বাসুদেবই, জীবের বিশেষ ভজনার পাত্র। পুরাকালে মুনিগণ বিশুদ্ধ সত্ত্বমূর্তি ভগবান অধোক্ষজের ভজন করতেন। অক্ষ অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভগবানকে অনুভব করা যায় না বলেই ভগবান বাসুদেবের নাম তাঁরা “অধোক্ষজ” রেখেছিলেন।

সংসারে দেখতে পাওয়া যায়, যাঁর যেমন প্রকৃতি তিনি সেই রকম দেবতার ভজনা করেন। যাঁদের প্রকৃতিতে রজো ও তমোগুণ প্রধান, তাঁরা ধন, ঐশ্বর্য ও সন্তান কামনায় দেবতাদের ভজনা করেন। বেদ, যজ্ঞ, আসন, প্রাণায়াম প্রভৃতি যোগশাস্ত্রের ক্রিয়া, জ্ঞানশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র এবং দান ও ব্রত ইত্যাদির ফল স্বর্গলাভ। কিন্তু এই সকলেরই একমাত্র লক্ষ্য ভগবান বাসুদেব। ভগবান বাসুদেব কোন নির্দিষ্ট গুণের বশীভূত নন, তাই তিনি নির্গুণ। তন্তুরূপ কারণ থেকে যেমন বস্ত্ররূপ কার্য হয়, তেমনি সৃষ্টির আদিতে ভগবানের প্রকৃতি থেকেই এই বিশ্ব চরাচরের সৃষ্টি হয়েছিল। সকল বস্তু, বিষয় ও জীবের মধ্যে তিনি অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করছেন। অগ্নি এক হলেও বহু কাঠের মধ্যে যেমন বহুরূপে প্রকাশ পায়, তেমনি বিশ্বের আত্মা ভগবান এক হয়েও অসংখ্য ভূত ও জীবের অন্তর্যামী হওয়ার কারণে, বহুরূপে বিরাজিত বলে মনে হয়।

চলবে...


 

বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৬শ পর্ব "


৩০

 বৈকালিক পদচারণা সেরে মহর্ষি ভৃগু যখন নিজের কক্ষে ফিরলেন, সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়। তাঁর কক্ষে প্রদীপ জ্বলছে। কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করছিল শিষ্য বিশ্বপ্রভ। বিশ্বপ্রভ বিনীত কণ্ঠে বলল, “আচার্যগণ সকলেই এসে গেছেন, গুরুদেব, তাঁরা আপনার কক্ষে প্রতীক্ষা করছেন”। মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে কক্ষে প্রবেশ করতেই, সকলেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, মহর্ষিকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল তো, গুরুদেব? এর আগে নিরন্তর দশ দিবস আপনি রাজপ্রাসাদে কখনো অবস্থান করেননি”।

মহর্ষি আসন গ্রহণ করার পর সকলেই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন।

মহর্ষি উত্তর দিলেন, “সংবাদ কুশল এবং এখনও পর্যন্ত নির্বিঘ্ন। প্রাসাদের বিলাসে দীর্ঘদিন আমি স্বস্তি লাভ করি না, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সকল কথা বলবো বলেই আজ আমি এই মন্ত্রণা সভার আহ্বান করেছি। আমার অনুপস্থিতিতে এখানকার পরিস্থিতি কেমন, সে বিষয়েও পর্যালোচনা করবো। তারপর আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা। আশা করি, তোমরা সকলেই বুঝতে পারছো, আমরা ক্রমশঃ লক্ষ্যের কাছাকাছি চলে আসছি! অতএব আমাদের আজকের পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম”। আচার্যদের কেউ কোন কথা বললেন না, সকলেই মহর্ষির মুখের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন।

তাঁদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “মহারাণি নিজেই রাজ্য পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছিলেন”।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানাচার্য সুনীতিকুমার অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন বলুন তো, গুরুদেব? উনি কি কিছু সন্দেহ করেছেন?”

“সঠিক জানি না, বৎস সুনীতি! মহারাণি বললেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি ক্লান্ত - পুত্রের সেবায় তিনি পূর্ণ মনোনিবেশ করতে চান। মন্ত্রীমণ্ডলীর বিশেষ অধিবেশনে তাঁর সেই অভিলাষ অনুমোদিত হয়েছে, তিনি এখন দায়িত্ব মুক্ত!”

সমরাচার্য রণধীর বললেন, “মন্ত্রীমণ্ডলী এত সহজে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে দিল? এ আপনার পক্ষেই সম্ভব, গুরুদেব”!

“না, না বৎস রণদেব, এর মধ্যে আমার কোন প্রভাব নেই, মহারাণির বার্তা আমি মন্ত্রমণ্ডলীর সামনে উপস্থাপন করেছিলাম মাত্র। এক মহামন্ত্রী ছাড়া মণ্ডলীর অন্য সদস্যরা খুব সহজেই পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাঁদের সর্বসম্মতিতেই এই বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে মহামন্ত্রী আমাদের প্রতি সন্দিগ্ধ, দ্বিধাগ্রস্ত। তাঁর প্রতি আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে”। সামান্য বিরতির পর মহর্ষি আবার বললেন, “দাস-দাসীসহ রাজাবেণ এবং রাজমাতা এখন নতুন উদ্যানবাটিকায় অবস্থান করছেন”।

সমরাচার্য রণধীর বললেন, “নতুন উদ্যানবাটিকায়? কেন? তাহলে প্রবোধন যজ্ঞের অনুষ্ঠান কোথায় হবে?”

“নতুন উদ্যানবাটিকাতেই হবে! বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে, এই স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আমিই গ্রহণ করেছি, বৎস! সঙ্গীতাচার্য সুনন্দর চারণগীতিতে অধিকাংশ রাজ্যবাসীই মুগ্ধ – এমন কি মন্ত্রীমণ্ডলীর অধিকাংশ মন্ত্রীও অভিভূত। অতএব রাজাবেণের দেহ থেকে মানসপুত্র ও কন্যার অবতীর্ণ হওয়ার বিরল দৃশ্য চাক্ষুষ করার কৌতূহল আপামর জনসাধারণের পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক। তোমরা সকলেই জানো, মহারাণি সুনীথার সঙ্গে তাঁর প্রজাদের মাতা-সন্তানের সম্পর্ক। সেক্ষেত্রে প্রবোধন যজ্ঞে বিপুলসংখ্যক জনসাধারণের উপস্থিতি যদি রাজমাতা অনুমোদন করে দেন, আমাদের পরিকল্পনার কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছো?”

উপস্থিত আচার্যদের সকলেই একবাক্যে বললেন, “সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যাবে, গুরুদেব”!

“ঠিক তাই। মহারাণি সপুত্র নতুন উদ্যান বাটিকাতেই অবস্থান করবেন, আমরা সেখানেই প্রবোধন যজ্ঞের অনুষ্ঠান করবো। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের বর্জন করা হবে। আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধু, রাজবৈদ্য মৈত্রেয়, সেবিকারা থাকবেন, থাকবেন রাজপুরোহিত, তাঁকে সাহায্য করার জন্য থাকবেন আমাদের কয়েকজন মাত্র। আর কেউ নয়!”

“আর আপনি? আপনি থাকবেন না?” বাণিজ্যাচার্য রত্নশীল জিজ্ঞাসা করলেন।

তার উত্তরে মহর্ষি বললেন, “আমি থাকবো রাজসভায়। যজ্ঞ সমাপ্তির বার্তা দিয়ে, দ্রুতগামী অশ্বে বিশ্বস্ত দূত পাঠাবে রাজসভায়, তারপর তোমরাও পৃথু ও অর্চ্চিকে নিয়ে বেরিয়ে আসবে, যত দ্রুত সম্ভব। রাজমাতার সঙ্গে তাদের আলাপ যত সংক্ষিপ্ত হয়, ততই মঙ্গল। দূতের বার্তা পেয়ে মহামন্ত্রী বিমোহন এবং মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলকে নিয়ে, আমি তোমাদের প্রত্যুদ্গমনে যাবো! আমাদের সাক্ষাতের পর আমি ওঁদের সকলের সামনে পৃথুর অবতারত্বের পরীক্ষা গ্রহণ করবো”।

“অবতারত্বের পরীক্ষা?” উপাধ্যক্ষ বিকচ বললেন, “সে কী রকম?”

স্মিতমুখে মহর্ষি উত্তর দিলেন, “আমাদের শাস্ত্রে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার-শরীরে দৈবী লক্ষণের কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন দক্ষিণ করতলে রেখাঙ্কিত চক্রচিহ্ন এবং দুই পদতলে অরবিন্দচিহ্ন! এই দুই লক্ষণ বিচার করে, পৃথুর অবতারত্ব পরীক্ষিত হবে”!

আচার্য বেদব্রত উত্তেজিত স্বরে বললেন,  “কিন্তু, অর্চন, অর্থাৎ যিনি রাজা পৃথু  হবেন, তাঁর করতলে এবং পদতলে এরকম কোন চিহ্ন যদি না থাকে?”

মহর্ষি হাস্যমুখে বললেন, “শান্ত হও বৎস বেদব্রত! জানি, অর্চনের শরীরে এমন কোন চিহ্ন নেই! কিন্তু অস্থায়ী চিহ্ন কী বানিয়ে তোলা যায় না? বৎস সুনন্দ, অঙ্গসজ্জার জন্যে, যাযাবর জাতি উল্লিখ ব্যবহার করে। আমরা তেমন কিছু করতে পারিনা, সেই বিদ্যা আমাদের জানা নেই?”

শিল্পাচার্য সুনন্দ উত্তর দিলেন, “আমাদের জানা আছে, গুরুদেব। একটু যন্ত্রণাদায়ক হবে, তবে এমন চিহ্ন বানিয়ে তোলা সম্ভব”।

মহর্ষি বললেন, “সেই চিহ্ন দুই তিন মাস স্থায়ী হলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। রাজা হিসাবে পৃথু একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, কেউ তাঁর শরীরের চিহ্ন পরীক্ষা করতে আসবে না, বৎস”!

আচার্য সুনন্দ বললেন, “ওরা এখান থেকে কবে প্রাসাদে যাবে, গুরুদেব? উল্লিখ অঙ্কনে কিছুক্ষণ লাগবে, কিন্তু তার যন্ত্রণা থেকে যায় দু-তিনদিন।”

একটু চিন্তা করে মহর্ষি বললেন, “ধরো, কার্তিকের শুক্লা অষ্টমীতে আমরা সকলেই যাবো, তুমিও যাবে”।

“তার আগেই আমি অর্চনকে প্রস্তুত করে দেব, গুরুদেব”।

“উত্তম, চিহ্ন যেন অতিরিক্ত বর্ণময় না হয়, অথচ চোখে পড়ার মতো স্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়। আরেকটি দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে সুনন্দ, রাজা ও রাণির উপযুক্ত অলংকার ও বস্ত্রসম্ভার সংগ্রহ! অত্যন্ত গোপন এই কার্যটিতে তুমি বাণিজ্যাচার্য রত্নশীলের সহায়তা নেবে। কিন্তু এরাজ্যের কোন বণিক নয়, ভিন্ন রাজ্যের সম্পন্ন বণিকের থেকে সংগ্রহ করাই বাঞ্ছনীয়। মনে রেখো প্রবোধিনী একাদশীর পূর্বেই আমাদের এই বসন, ভূষণ সংগ্রহ করতে হবে!”

আচার্য সুনন্দ ও আচার্য রত্নশীল বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহর্ষি, একাদশীর আগেই সংগ্রহ হয়ে যাবে”।

স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, “মন্ত্রীমণ্ডলীতে আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রবোধন যজ্ঞের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমাদের, রাজ্য প্রশাসন অভিষেকের আয়োজন করবে! বৎস, রণধীর, যজ্ঞের আগেই আমাদের আশ্রমের বিশ্বস্ত কিছু সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীকে, ওখানে নিযুক্ত করতে চাই। অন্ততঃ পঞ্চাশজন, অধিকতর হলে অতি উত্তম। যজ্ঞের চারদিন আগে থেকে আমাদের রক্ষীগণ, উদ্যানবাটিকার নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।” আচার্য রণধীর মাথা নত করে, দায়িত্ব স্বীকার করলেন। মহর্ষি ভৃগু আবার বললেন, “বৎস রণধীর, পৃথু ও অর্চ্চিকে রাজপ্রাসাদে বহন করার মতো সুসজ্জিত রথ, সঙ্গে পর্যাপ্ত অশ্বারোহী সশস্ত্র রক্ষী আবশ্যক। কিন্তু রথের সারথ্য কে করবে?”

আচার্য নিলয় উৎসাহের সঙ্গে বললেন, “আমি এই দায়িত্ব নিলাম, গুরুদেব”।

মহর্ষি হাসলেন, আচার্য নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি জানি তুমি অতি উত্তম সারথি, রথচালনায় অতীতে তুমি বহু পুরষ্কার অর্জন করেছো, কিন্তু দীর্ঘদিনের অনভ্যাস...”।

“আপনি নিশ্চিন্তে হোন মহর্ষি, আমি পারবো”।

বেশ, তোমার উপরেই আস্থা রাখলাম। এবার যজ্ঞের প্রসঙ্গে আসি, প্রবোধন যজ্ঞের দায়িত্ব আমি আচার্য যজ্ঞশীল, বেদব্রত ধর্মধরকে অর্পণ করতে চাই। তোমরা রাজপুরোহিতের সঙ্গে যজ্ঞের কাজ সুসম্পন্ন করবে। উপাধ্যক্ষ বিকচের দায়িত্ব যজ্ঞের অগ্নি থেকে অপরিমিত ধূম্রজাল সৃষ্টি করা, যার মধ্যে থেকে প্রকটিত হবেন, পৃথু অর্চ্চি মহর্ষি ভৃগু একটু থামলেন, সকলের দিকে তাকিয়ে, তাঁদের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করলেন, তারপর বললেন, “আশা করি সমস্ত বিষয়টি তোমাদের কাছে স্বচ্ছ হয়েছে! যদি কারো মনে কিছু প্রশ্ন বা প্রস্তাব থাকে জিজ্ঞাসা করতে পারো!

আচার্য রণধীর বললেন, “গুরুদেব, আমি বলছিলাম, পৃথু, অর্চ্চি এবং আমাদের বন্ধুবর নিলয়ের জন্যে লৌহকবচের ব্যবস্থা করে দিই। গানের মহিমায় মুগ্ধ সহস্র জনগণ, ওদের দেখতে পথের দুপাশে সমবেত হবেই, সেই সমাবেশে গা ঢাকা দিয়ে দুর্জনেরা আঘত হানতে পারে!”

মহর্ষি ভৃগু একবাক্যে সম্মত হয়ে বললেন, “অতি উত্তম প্রস্তাব, বৎস রণধীর”। 

আচার্য সুনীতিকুমার বললেন, “গুরুদেব, মহারাণি কি জানেন, তাঁর পুত্র বেণের অঙ্গ থেকে পৃথু ও অর্চ্চি অবতীর্ণ হবেন?”

“জানেন, আমিই তাঁকে সবিস্তার জ্ঞাত করিয়েছি”।

“তিনি কী বললেন?”

“শুরুতে অবিশ্বাস করছিলেন, পরে যখন মহারাজ অঙ্গের পূর্বসূরীদের ঐশ্বরিক সংযোগের কথা বললাম, তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন”।

“মেনে নিলেন?”

“প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনন্যোপায় মানুষের মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য উপায় যে আর থাকে না, বৎস সুনীতি”! সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি ভৃগু আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের আর কোন জিজ্ঞাস্য আছে?”

আচার্য সুনন্দ বললেন, “গুরুদেব, আশ্রম কন্যাদের তিন-চারজন অর্চ্চির সঙ্গীনী থাকা উচিৎ”।

“অবশ্যই বৎস। এ বিষয়ের উল্লেখই নিষ্প্রয়োজন! আর কোন জিজ্ঞাস্য?” উপস্থিত সকলেই মহর্ষির মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, আর কোন জিজ্ঞাস্য নেই।

মহর্ষি স্মিতমুখে বললেন, “উত্তম! আমাদের উদ্দেশ্য সফল হোক। এতক্ষণ সকলেই কিছু না কিছু দায়িত্ব পেয়েছে, অবশিষ্ট আছে বৎস সুনীতি। কোন দায়িত্ব না পেয়ে, বৎস সুনীতি তুমি কি ক্ষুণ্ণ?”

আচার্য সুনীতি হেসে বললেন, “আমাকে দায়িত্বহীন রাখবেন, এমন হতে পারে না, গুরুদেব। আপনার নির্দেশের অপেক্ষা করছি”।

মহর্ষি উচ্চহাস্য করে উঠলেন, বললেন, “তোমাকে আগামীকাল প্রত্যূষেই রাজভবনে যেতে হবে! আসন্ন যজ্ঞের অনুষ্ঠান ও অভিষেক পর্যন্ত তুমি সেখানেই অধিষ্ঠান করবে। মহামন্ত্রী বিমোহন, মন্ত্রীমণ্ডলী এবং মহারাণির সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করবে এবং সকলের প্রাত্যহিক মনোভাব উপলব্ধির চেষ্টা করবে। অযাচিত কোন বিষয়কেই সামান্য জ্ঞানে অবহেলা করবে না, তৎক্ষণাৎ তার নিষ্পত্তি করবে। সাহায্যের প্রয়োজন হলে, সংবাদ দেবে, আমিও উপস্থিত হবো। যোগ্য বিবেচনা করে, দুতিনজন সহকারীকে সঙ্গে নিও। মনে রেখো, তোমার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তোমার পর্যালোচনার উপর আমাদের পরবর্তী কার্য-পরিকল্পনার পরিবর্তন করতে হতে পারে!” আচার্য সুনীতি মাথা নত করে, মহর্ষির নির্দেশ পালনের সম্মতি জানালেন।

সভার সমাপ্তি করে মহর্ষি বললেন, “বৎস বিশ্বপ্রভ, আমাদের নৈশাহারের ব্যবস্থা কোথায় করেছিস? ধরণীকে বল, এখানেই পরিবেশন করুক। আহার করতে করতেও যদি কোন বিষয়ে প্রশ্ন জাগে, তার মীমাংসা হয়ে যেতে পারে”!

“আমি, এখনই তার আয়োজন করছি, গুরুদেব”। বিশ্বপ্রভ কক্ষের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।

চলবে...

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১০

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...