সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৮ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

ঊণবিংশ পর্বাংশ  


৪.৮.১২ মাদুরার পাণ্ড্য

পাণ্ড্যদের উৎপত্তি নিয়েও কাহিনী ও বিতর্কের শেষ নেই। পৌরাণিক মতে তাঁরা কোরকাইয়ের তিনভাইয়ের বংশধর, যাঁদের থেকে পাণ্ড্য, চোল এবং চেরা বংশের উৎপত্তি। আবার আরেকটি মতে তাঁরা মহাভারতের পাণ্ডবদের বংশধর। পাণ্ড্য রাজারা যদিও নিজেদের চন্দ্র বংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করেছেন। কাহিনী যাই হোক, পাণ্ড্যরা দক্ষিণ ভারতের প্রাক-আর্য জাতি, পরবর্তী কালে দক্ষিণ ভারতে আর্যদের উপনিবেশ গড়ে তোলার সময়, তাঁরা আর্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, নিজেদের গৌরব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

পাণ্ড্যরা দক্ষিণভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে এবং তার পূর্ব উপকূলে রাজত্ব করতেন। যদিও পাণ্ড্য বংশের রাজাদের পরাক্রম অনুযায়ী তাঁদের এই রাজ্যের সীমানা কখনো বেড়েছে, কখনো ছোট হয়েছে। সাধারণতঃ তাঁরা আধুনিক তিনটি জেলা, মাদুরা, রামনাদ, তিন্নেভেল্লি এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে রাজত্ব করেছেন। তাঁদের রাজধানী ছিল মধুরা (মাদুরা), যাকে দক্ষিণের মথুরা বলা হয়ে থাকে। তাঁদের প্রাচীন বাণিজ্যিক বন্দর ছিল তাম্রপর্ণী নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলের কোরকাই, পরবর্তীকালে নদীর ভৌগোলিক পরিবর্তন হওয়াতে, কয়ল হয়ে ওঠে তাঁদের প্রধান বন্দর।

পাণ্ড্যদের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন, কাত্যায়নের (বি.সি.ই চতুর্থ শতাব্দী) পাণিনি-ভাষ্যে পাণ্ড্যদের নাম প্রথম পাওয়া যায়। এরপর রামায়ণ ও মহাভারতেও তাঁদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিংহলের “মহাবংশ” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সিংহলের রাজকুমার বিজয়ের সঙ্গে পাণ্ড্য রাজকুমারীর বিবাহ হয়েছিল, ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের কিছুদিন পরেই। এরপর কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র”-এ বিশেষ এক ধরনের মুক্তার উল্লেখ করা হয়েছে, যার উৎস ছিল পাণ্ড্যকাবটক। আবার মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে পাওয়া যায়, পাণ্ড্যরাজ্য নাকি পরিচালনা করতেন মহিলারা। তবে সব থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে। যেখানে বলা হয়েছে, মৌর্য সাম্রাজ্যের দক্ষিণতম সীমার বাইরে পাণ্ড্যদের স্বাধীন রাজ্য ছিল। এরপর কলিঙ্গরাজ খারবেলের শিলালিপি থেকে জানা যায়, পাণ্ড্য রাজারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং তিনি পাণ্ড্যদের থেকে ঘোড়া, হাতি, রত্ন, রুবি এবং অজস্র মুক্তা উপহার পেয়েছিলেন। এরপর রোমান ঐতিহাসিক স্ট্রাবোর লেখায় “রাজা পাণ্ডিয়ন”-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি ২০ বি.সি.ই-তে রোম-সম্রাট অগাস্টাস সীজারের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন। এরপর গ্রীক পর্যটক টলেমির গ্রন্থেও দক্ষিণভারতে “পাণ্ডিনোই” নামে এক রাজ্যের নাম পাওয়া যায়, যাদের রাজধানী ছিল “মোদৌরা” (মধুরা) ।

অতএব প্রাচীন কাল থেকেই পাণ্ড্যরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব থাকলেও, তাঁদের সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন কিছু উল্লেখ ছাড়া, নির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। ইতিহাসের পরিধিতে তাঁদের প্রথম প্রবেশ ষষ্ঠ শতাব্দীতে, পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণুর উত্থান এবং কালাভ্র গোষ্ঠীর হাতে তাঁদের পরাজয়ের ইতিহাস দিয়ে। শোনা যায় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে রাজা কাড়ুঙ্গন পাণ্ড্যরাজ্য পুনরুদ্ধার করে, পাণ্ড্যরাজকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।  এই পাণ্ড্যরাজ কাড়ুঙ্গন এবং তাঁর পুত্র মারবর্মন অবনিশূলামণির সঙ্গে পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণুর বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়েছিল, কারণ দুই পক্ষই তাঁদের রাজ্যের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে অরিকেশরী মারবর্মন, তাঁর উত্তরসূরি কোচ্চড়য়নরণধীর (সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে), মারবর্মন প্রথম-রাজসিংহ এবং নেড়ুঞ্জড়য়ন প্রথম-বরগুণ, প্রধানতঃ চোল এবং কেরালা রাজ্যের অংশ জয় করে পাণ্ড্য রাজ্যের সীমানা বিস্তার করেছিলেন। রাজা নেড়ুঞ্জলয়ন কোঙ্গুদেশ (কোয়মবাটোর এবং সেলম জেলা) এবং বেনাড়া (দক্ষিণ ত্রিবাঙ্কুর); তাঁর পুত্র শ্রীমারশ্রীবল্লভ (৮১৫-৬২ সি.ই.) সিংহল জয় করেছিলেন এবং পল্লব, গঙ্গ এবং চোলদের সঙ্গে যুদ্ধ করে কুড়মুক্কু (কুম্বকোনম) অধিকার করেছিলেন। যদিও পাণ্ড্যরাজা দ্বিতীয়-বরগুণ ৮৮০ সি.ই.তে চোলরাজ প্রথম-আদিত্যের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

এরপর থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন চোল রাজারা। শোনা যায় পাণ্ড্যরাজা মারবর্মন দ্বিতীয়-রাজসিংহ, সিংহলের রাজার সঙ্গে মিলিত শক্তিতে চোলরাজা প্রথম-পরান্তককে আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু সুবিধে করতে পারেননি। বরং পরবর্তী চোলরাজ পাণ্ড্যরাজ্যের রাজধানী অধিকার করে, “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এভাবেই পাণ্ড্যরাজ্য মোটামুটি ৯২০ সি.ই.-তে চোলদের অধীন রাজ্য হয়ে গেল এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত দক্ষিণভারতে পাণ্ড্যরাজ্য তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। যদিও পাণ্ড্যদের কয়েকজন রাজা বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, চোলদের আধিপত্য খর্ব করার বারবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু খুব একটা সফল হতে পারেননি। চোলরাজ তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গের মৃত্যুর (১২১৬ সি.ই.) পর চোলরাজ্য যখন শক্তিহীন হয়ে পড়ল, সেই সময় পাণ্ড্যরাজাদের প্রতিপত্তি আবার বেড়ে উঠল।

        মানচিত্র ঋণ ঃ https://www.mapsofindia.com

পাণ্ড্যরাজ জাতবর্মন কুলশেখর ১১৯০ সি.ই.-তে রাজা হওয়ার পর পাণ্ড্যরাজ্যের ভাগ্যের চাকা আবার অনুকূল ঘুরতে শুরু করেছিল। এরপর প্রায় শতাধিক বছর পাণ্ড্যরাজ্যের গৌরব অম্লান ছিল। জাতবর্মন কুলশেখরের পুত্র মারবর্মন সুন্দর প্রথম-পাণ্ড্য (১২১৬-১২৩৮ সি.ই.) চোলদের আক্রমণ করে, তাঁদের প্রধান দুই শহর তাঞ্জোর এবং উরায়ুর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, এবং চোলরাজ তৃতীয় রাজরাজ বশ্যতা স্বীকার করায়, তাঁকেই সিংহাসন ফেরত দিয়েছিলেন। তার পরের পাণ্ড্যরাজা ছিলেন মারবর্মন সুন্দর দ্বিতীয়-পাণ্ড্য (১২৩৮-১২৫১ সি.ই.), তাঁর সময়েও চোল–পাণ্ড্য–হোয়সল সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়নি। তার পরের পাণ্ড্যরাজা জাতবর্মন সুন্দর পাণ্ড্য (১২৫১-১২৭২ সি.ই.) পরাক্রমী রাজা ছিলেন, তাঁর সময়েই পাণ্ড্যরাজ্য তার সমৃদ্ধির শীর্ষে উঠেছিল। তিনি চোলদের বিপর্যস্ত করে কাঞ্চী অধিকার করে নিয়েছিলেন, এবং চের রাজ্য এবং সিংহলেও আধিপত্য বিস্তার করেন। উপরন্তু তিনি হোয়সলরাজ বীর-সোমেশ্বরকে এবং কাকতীয়রাজ গণপতিকেও চূড়ান্ত পরাস্ত করে, তাঁদের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এভাবেই জাতবর্মন সুন্দর পাণ্ড্য দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে কুডাপ্পা এবং উত্তরের নেল্লোর পর্যন্ত অবিসম্বাদিত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে “মহারাজাধিরাজ-শ্রীপরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন মারবর্মন কুলশেখর তিনিও বেশ কিছু নতুন অঞ্চল অধিকার করে সাম্রাজ্যের সীমানা অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে ১২৯৩ সি.ই.-তে ভেনেসিয় পর্যটক মার্কো পোলো দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পাণ্ড্য রাজাদের কথা, শাসন ব্যবস্থা, শহর ও গ্রামের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি পাণ্ড্যরাজাদের সমৃদ্ধি, সম্পদ ও বাণিজ্য সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।

মারবর্মন কুলশেখরের শেষ জীবন খুব একটা শান্তির ছিল না। তাঁর দুই পুত্র, তাঁদের মধ্যে একজন অবৈধ, বীর পাণ্ড্য এবং অন্যজন সুন্দর, বৈধ পুত্র ছিলেন। দুজনেই দীর্ঘদিন– যথাক্রমে ১২৯৬ সি.ই. এবং ১৩০৩ সি.ই. থেকে পিতার প্রশাসনের অন্যতম সহায় ছিলেন। পিতা মারবর্মন কুলশেখরের জীবনের শেষদিকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে তীব্র বিরোধ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় মারবর্মন কুলশেখর কোন এক পুত্রের হাতে নিহত হন এবং তাঁর বৈধ পুত্র সুন্দর সিংহাসন অধিকার করার জন্যে আলাউদ্দিন খিলজির কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। সত্য ঘটনা যাই হোক, পারিবারিক এই বিবাদের মধ্যে, আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুরের পক্ষে মাদুরা জয় করে পাণ্ড্যদের উচ্ছেদ করতে কোন বেগ পেতে হয়নি।  অতএব ১৩১০ সি.ই. এবং তার কয়েক বছরের মধ্যে পাণ্ড্য সাম্রাজ্যের গৌরব ধূলিসাৎ হয়ে, মুসলিম আধিপত্য স্থাপিত হয়েছিল।

 

৪.৮.১৩ চের

চের বা কেরালাদের উৎপত্তি নিয়ে তেমন কোন বিতর্ক শোনা যায় না। তাঁরা দক্ষিণ ভারতেরই প্রাক-আর্য অধিবাসী এবং তাঁদের রাজ্যের সীমানা ছিল আধুনিক মালাবার, ত্রিবাঙ্কুর এবং কোচিন জেলা। কখনো কখনো কোয়মবাটোর এবং সেলম জেলার দক্ষিণাংশও তাঁদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। চের রাজ্যের পশ্চিম উপকূলে প্রাচীন কাল থেকেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর ছিল। একটি পেরিয়ার নদীর মোহনায় মুজিরি এবং বৈক্করাই। এ দুটির মধ্যে মুজিরি থেকেই অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হত। সুদূর গ্রীস, রোম ও মেসোপটেমিয়ায় প্রাচীন কাল থেকেই নানারকমের মশলা, মুক্তা এবং রত্ন রপ্তানি হত, যার ফলে অনেক গ্রীক ও রোমান বণিক এই অঞ্চলে বসবাস করতেও শুরু করেন এবং তাঁরা তাঁদের দেবতা অগাস্টাসের মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই অঞ্চলে ইহুদীদেরও একটি উপনিবেশ ছিল, যাঁদের চেররাজা ভাস্কর রবিবর্মন দশম শতাব্দীর শুরুতে সনদ দান করেছিলেন।

চের রাজ্যের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়, সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে, যেখানে চোড় (চোল) এবং পাণ্ড্যদের সঙ্গে, তাঁদের কেরলপুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। গ্রীক পর্যটক টলেমির গ্রন্থেও চেরদের উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও এই সময়ের চেরদের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট। তবে সেনগুট্টুবন নামে এক চের রাজার নাম পাওয়া যায় বিখ্যাত তামিল “শিলপ্পাদিকরম” গ্রন্থে। শোনা যায় এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তাঁর সন্ন্যাসী ভাই, ইলঙ্গবদিগল। তাঁর গ্রন্থ থেকে অনুমান করা হয়, চেররাজা সেনগুট্টুবন হয়তো পাণ্ড্যরাজা নেড়ুঞ্জলয়ন এবং চোল রাজা করিকালের নাতির সমসাময়িক।

অতএব রাজা সেনগুট্টুবনকেই প্রথম ঐতিহাসিক চের রাজা বলা যায়। তাঁর পরবর্তী রাজাদেরও চোল ও পাণ্ড্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিরন্তর লড়তে হচ্ছিল। কিন্তু তাঁদের কেউই সম্ভবতঃ পরাক্রমী বা উদ্যোগী রাজা ছিলেন না, অতএব বেশ কয়েক শতাব্দী চের রাজারা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের আবার প্রকাশ ঘটল অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে। এই সময় জনৈক চেররাজার সঙ্গে পল্লবরাজ পরমেশ্বরবর্মনের যুদ্ধ করতে দেখা গিয়েছিল। এই শতাব্দীর শেষ দিকে পাণ্ড্যরাজাদের সঙ্গেও তাঁদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তাঁদের দক্ষিণ ত্রিবাঙ্কুর হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ে চেররাজাদের সঙ্গে চোলরাজাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা গড়ে ওঠে, চোলরাজ প্রথম-পরান্তক চের রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দশম শতাব্দীর শেষদিকে চেররাজাদের সঙ্গে চোল রাজাদের সখ্যতা ভেঙে যায়, এবং চোলরাজ প্রথম-রাজরাজ চেরদের রাজত্বের অনেকটাই অধিকার করে নিয়েছিলেন। এই সময় থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরু অব্দি চের রাজ্য চোল রাজাদের অধীনে ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে চোল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে চের রাজারা, বিশেষ করে ১২৯৯ সি.ই.তে রাজা রবিবর্মনকুলশেখর, চের রাজ্যকে স্বাধীন করলেন এবং তারপর পাণ্ড্য এবং চোলরাজাদের পরাজিত করে বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই পরাক্রমও প্রতিরোধ করেছিলেন কাকতীয় রাজা প্রথম-রুদ্র। সে যাই হোক, রাজা রবিবর্মনকুলশেখরের পর চেররাজ্য আবার গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল।

চলবে...


রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২

   

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১ " 


 শেষ পর্ব 

ডাক্তাররা বর্ষায় আর শীতে খুব খুশি হয়ে ওঠেন – কারণ রুগীর সংখ্যা বেড়ে ওঠে। উকিলরা বড়োলোক বখাটে ছোকরাদের কেলোর কিত্তির কেস হাতে এলে আনন্দিত হন – রাতকে দিন করতে প্রচুর অর্থ আমদানি হয়। ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার, বড়োলোকের আদুরি বউ চারহাজার ব.ফু.র ফ্ল্যাট সাজিয়ে মনের মতো বানিয়ে দেওয়ার বায়না নিয়ে এলে খুশি হন। অভিনেতারা নতুন ছবিতে অভিনয়ের জন্যে প্রযোজকের ফোন পেলে নেচে ওঠেন। লেখা মনোনীত হয়ে বিখ্যাত পত্রিকার সম্পাদকের দপ্তর থেকে ফোন পেলে, উঠতি লেখক আনন্দে আত্মহারা হয়ে আরেকটি গল্প লিখতে বসে যান।

ঠিক তেমনি, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বাবা কাত্যায়ন, আজ একটু হাল্কা মেজাজে রয়েছেন। বাবা কাত্যায়ন এখন রত্নধরের আসার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেনসদরের দরজা এখন বন্ধ। তাঁর চেম্বারের লাগোয়া দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে তিনি ধরাচূড়ো ছেড়ে, ফ্রেস হয়ে এসেছেন। তাঁর পরনে একখানা বারমুডা। খালি গা। মাথার জটা উধাও হয়ে, মাথা ভর্তি টাক, অল্প আলোতেও চকচক করছে। কপালের সিঁদুরের টিপ ধুয়ে এসেছেন। রুদ্রাক্ষের মালা, রঙিন পাথরের মালা সবই খুলে রেখে এসেছেন বাড়িতে। এই বেশে দেখলে, কেউ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বলে মনে করবে না, সে তিনি ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু তাও সারাদিন রাত ওই ধরাচূড়ো পড়ে বসে থাকা তাঁর পোষায় না।        

তাঁর স্বনামধন্য বাবা, তারাপীঠ-কামরূপ-কংকালীতলাখ্যাত বাবা জটেশ্বরের মাথায় কিন্তু অরিজিনাল জটা ছিল। আর সারাদিন রক্তাম্বর আর ধরাচূড়ো সব পড়ে থাকতেনতাঁর দাপটও ছিল আলাদারকমের। অনেক তাবড় তাবড় তালেবর মানুষজন তাঁর পায়ে এসে বডি ফেলত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার অনেক রাত করে লুকিয়ে আসত; যাতে পাব্লিক না দেখতে পায়।

আজকালকার মতো তখনো গয়নার দোকানের ভেতর বুকচাপা খুপরি চেম্বারে জ্যোতিষী বসার এত হিড়িক পড়েনি। এখনকার জ্যোতিষীরা সবাই অরিজিনাল। পরশুরাম, অগস্ত্য, কপিল, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ -  পুরাণের কাল থেকে সবাই উঠে এসেছেন কলির কলকাতায়। কলকাতার বুদ্ধিমান, বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিবান বাঙালীকে ভাগ্য বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর জন্যে। তাতেও হচ্ছিল না, এখন আবার শুরু হয়েছে কম্পিউটারের ঠিকুজি বানানো, তিনশ পঁচাশি টাকা আর জাতকের ডি.ও.বি., জন্মক্ষণ আর নার্সিংহোমের ঠিকানা বলে দিলেই হল। পনের মিনিটের মধ্যে এ-ফোর সাইজে পনের পাতার ঠিকুজি হাতে পাওয়া যায়। অষ্টোত্তরি দশা, বিংশোত্তরি দশা, ফলাফল, উপকার, প্রতিকার কিচ্ছু বাকি থাকে না।

 বাবা জটেশ্বরের সময় একশ টাকার ঠিকুজি বানাতে পনের-বিশ দিন লেগে যেত। তখনকার একশ টাকা আজকের হাজার দুয়েকের সমান। ঠিকুজি বানাতেন ভটচাজ্জি আর চক্কোত্তি কাকুরা। তাঁদের সঙ্গে বাবার হিসেব ছিল ঠিকুজি প্রতি চল্লিশটাকা। আমাদের ষাট টাকা নিট লাভ। ভটচাজ্জি আর চক্কোতি কাকুরা সরকারি আপিসে চাকরি করতেন, মাইনে ছিল মাস গেলে দেড়শ দুশো টাকা। ঠিকুজি বানানোটা ছিল তাঁদের উপরি রোজগার। একএকটা ঠিকুজি বানাতে দিন পাঁচ-ছয় সময় লাগত, রাত জেগে হলুদ হ্যান্ডমেড পেপারের ওপর ফাউন্টেন পেনে লিখে রোল পাকিয়ে দিয়ে যেতেন সকালবেলা। এগরোল নয় – ভাগ্য-রোল।         

সে সময় দিনকালই ছিল অন্যরকম। লোকের মনে ভক্তি-ছেদ্দা ছিল। ভীতি-প্রীতি ছিল। এমন দিন আসছে, বাবা জটেশ্বর বুঝতে পারতেন। এই লাইনে না এসে, তিনি তাঁর ছেলে কাত্যায়নকে লেখাপড়া করে, চাকরি বাকরি দেখারই পরামর্শ দিতেন বারবার। কিন্তু হল না। বাবা জটেশ্বরবাবার দেওয়া মাদুলি, তাবিজ, পাথর, রত্ন ধারণ করেও, কাত্যায়ন কিছুতেই আর ক্লাস এইটের গণ্ডি পেরোতে পারল না। অগত্যা, জীবনে করে খাওয়ার পৈতৃক এই পথটাই কাত্যায়নবাবাকে বেছে নিতে হল। রক্তাম্বর পড়ে বসতেই হল বাবার রেখে যাওয়া তেলচিটে রোঁয়াওঠা হরিণের চামড়ার আসনে!

সামনের দেয়ালে বাবার বড়ো একটা ছবি টাঙানো। মেঝেতে পাতা অজিনাসনের ওপর পদ্মাসনে বসা, জটাজুটধারী যোগী।  সোজাসুজি তাকিয়ে আছেন বাবা কাত্যায়নের দিকে।

বাবা কাত্যায়নের মনে হল, বাবা যেন বলছেন, “বারবার তোকে বলেছিলাম রে, কেতো, এ লাইনে আসিস না। এসব জিনিষ লোকে আর তেমন খাচ্ছে না, পুজো-টুজো, তন্ত্র-মন্ত্রকে লোকে বুজরুকি ভাবে। তাছাড়াও তুই একটু মেনিমুখো টাইপ, আমাদের লাইনে একটু গলাবাজি, হম্বিতম্বি করলে লোকে ভয় পায়, সমঝে চলে, ভক্তি করে। তোর দ্বারা এসব হবে না। এখনো বলছি, সময় আছে, কাউকে ধরে-টরে কোন নামকরা রত্ন বা গয়নার দোকানে ঢুকে পড়, বেঁচে যাবিএ.সি. লাগানো, ঝাঁ চকচকে চেম্বার, রোজগারের থার্টি পার্সেন্ট কমিসন দিয়েও, যা পাবি মন্দ নয়। তার সঙ্গে এটাও থাক না সাইড বিজনেস হয়ে। আমার ভয় হচ্ছে রে, কেতো আর কদিন এই ধান্দা চালাতে পারবি!”

বাবা কাত্যায়ন মনে মনে বললেন, “আমার ভবিষ্যৎটা কী দাঁড়াবে একটু বলে দাও না, বাবা”। পিঠের ওপর কি যেন একটা পড়ল থপাস করে। অবাক হয়ে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাবা কাত্যায়ন, যেন বাবার বাজখাঁই গলা শুনতে পেলেন, “চটি পেটা করবো, হতভাগা বাঁদর। তুই জানিস না, ভবিষ্যতের কথা আমাদের দু একটা বাই চান্স লেগে গেলেও, আমরা ভবিষ্যৎ বদলাতে পারি না”।

ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা কাত্যায়ন দেখলেন, তাঁর বাঁদিক দিয়ে গোদা একটা টিকটিকি সরসরিয়ে চলে গেল, মা কালীর মূর্তির আড়ালে। অ, ওই ব্যাটাই তবে সিলিং থেকে তাঁর পিঠে পড়েছিল, আর তিনি ভাবলেন কিনা তাঁর বাবার চটির চাপড়! বাবা কাত্যায়ন মুখে হাল্কা হাসি নিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন, আটটা বেজে ছেচল্লিস। মান্ধাতার আমলের ঘড়িটার সেকেণ্ডের কাঁটা এক এক ঘর চলার সময় খুব চাপা একটা শব্দ শোনা যায়, ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ওই শব্দটা কানে এলেই, তাঁর মনে হয়, ঘড়িতো নয়, শালা বিবেক!

রত্নধর পাশের ঘরের দরজা ঠেলে, ঘরে ঢুকলো। বাবা কাত্যায়ন খেঁকিয়ে উঠলেন একটু, “কী করছিলি, কি, এতক্ষণ”?

“ব্যাটা টাকা নিয়ে আসেনি। মোটে পাঁচশ টাকা অ্যাডভান্স ঠেকাতে এসেছিল। বাকি অ্যাডভান্স কাল দিয়ে যাবে”।

“তুই কত চেয়েছিল?”

“দশ হাজার”।

“দঅঅঅঅশ হাআআআআজার? রতনা, দিন দিন তুই একটা চামার হয়ে উঠছিসতা শেষমেষ কত দিল?”

“দশই দিল, বউকে বসিয়ে রেখে, এটিএম থেকে তুলে আনল”। ঘড়ির ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ আওয়াজটা আবার যেন বাবা কাত্যায়নের কানে এল।

বাবা কাত্যায়ন খ্যাঁ খ্যাঁ করে হেসে নিলেন খানিকটা, বললেন, “তুই পারিস ও বটে”। তক্তপোশের তলা থেকে একটা বোতল আর দুটো গেলাস বের করতে করতে রত্নধর বলল, “না পারলে হবে, কেতোদা? তুমি যা পাইকারি হারে রত্ন ধারনের কথা বললে, কাল বিকেলে যদি কোন গয়নাদোকানের জ্যোতিষীর কাছে যেত, সে আর ফিরে আসত তোমার কাছে”?  দুটো গেলাসে পরিমাণ মতো মদ ঢেলে রত্নধর তেলচিটে খাবার জলের ঢাউস বোতল থেকে জল ঢালল, কলকল আওয়াজে।

বাবা কাত্যায়নের দিকে একটা গেলাস এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “তুমি মুরগি যখন ধরেছ, কেতোদা, আমি জবাই না করে ছাড়ি? এই যে আজ দশহাজার টাকা নিয়ে ওদের গেঁথে ফেললাম, যাক না কোথায় যাবে? ঠিক ফিরে আসবে দেখে নিও”।

বাবা কাত্যায়ন, গেলাসের মদে অনামিকা ডুবিয়ে, মাটিতে তিনবার ছিটে ফেললেন। তারপর বললেন, “চিয়ার্স”। রত্নধরও চিয়ার্স বলল, তারপর দুজনে একসঙ্গেই গেলাসে চুমুক দিলেন।

চুমুক দেওয়ার পর গেলাস মেঝেয় রেখে রত্নধর বলল, “একসঙ্গে এতগুলো রত্ন না দিলেই পারতে, কেতোদা, কাস্টমার চমকে যায়। নেহাত বউটা বোকা-সোকা, নইলে এ মাল নিগ্‌ঘাত কেটে পড়ত”।

তক্তপোষের তলা থেকে একটা কাঁচা লংকার প্যাকেট আর নুনের ডাব্বা বের করল রত্নধর। একটা খবরের কাগজ এনে তার মধ্যে গোটা বিশেক লংকা আর এক খাবলা নুন রাখল।

কচমচিয়ে দুটো লংকা চিবিয়ে, বাবা কাত্যায়ন বলল,  “ধ্যাত শালা, তোরা ওসব বুঝবি না, আমি বুঝিকেটে যাবে বলে, এ মক্কেল ধরা দেয়নি। বেটাদের সাধ্যি নেই কিন্তু সাধ অনেক। নিজেদের মনে মনেই সারাটাদিন এরা ঘ্যানর ঘ্যানর করে, বুঝেছিস? বিকাশদার মতো একটা ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট চাই, কিন্তু বিকাশের মতো দারুণ কাজ করে প্রমোশন পাওয়ার ক্ষমতা নেই। পরিমলদার মতো একটা গাড়ি চাই, পরিমলদা চাকরি ছাড়াও অনলাইনে শেয়ার কেনাবেচা করে। অনুপদার মতো দু বছরে একবার ফরেন ট্যুর করতে চাই, অথচ অনুপদার মতো ঠিকাদার কিংবা সাপ্লায়ারদের থেকে কমিসন খাওয়ার সাহস নেই। মিলনের ছেলেটা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, তুখোড় ইংরিজি বলে আর হেবি স্মার্ট, স্কুলের ফিজ বছরে সাড়েচার লাখ...”

অবাক হয়ে রত্নধর বললে, “তুমি গুরু এ লোকগুলোর নাম জানলে কি করে, কেতোদা? তুমি এত ভালো হাত দেখতে পারো, বন্ধুবান্ধব, কোলিগদের নামও বলে দিতে পারো? তুমি, মাইরি জিনিয়াস”।

বাবা কাত্যায়ন গেলাসে আর এক চুমুক দিয়ে বললেন, “আরে বাবা নামটা ছাড় না, নাম অন্যকিছু হতে পারে; ধরে নে, এক্স, ওয়াই জেড, কি আসে যায়? আসল ব্যাপারটা হল, ওদের মতো ও সবকিছু পেতে চায়। আর সেটা না পাওয়ার জন্যে মনের মধ্যে ভরপুর হতাশা। আমার কাছে এসেছে, অলৌকিক কোন রাস্তায় যদি পাওয়া যায়! যজ্ঞ-টজ্ঞ করে, কিংবা হাতে রত্ন ধারণ করে...”।

“হুঁ, বুঝলাম। কিন্তু ওর ছোটবেলায় কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, এটা কি করে ধরলে”?

গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে কাত্যায়ন মুখে দারুণ বোদ্ধার মতো মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “একটা ছেলে দুরন্ত বয়সে কিছু বিপদই যদি না ঘটায়, তো সে ছেলে ছেলেই নয়, ম্যাদামারা ঢ্যাঁড়স। তেমন কিছু না হলেও, ছোটবেলায় জমিয়ে পক্স হয়নি, বা হাম-মিলমিলে হয়নি, অথবা টাইফয়েড হয়নি, কিংবা টনসিল অপারেশন হয়নি, এ হতেই পারে না। ছোটবেলায় সাইকেল চড়া শিখতে গিয়ে আমি দাঁত ভেঙেছিলাম, এই দ্যাখ। সবারই হয়। তোর ছোটবেলায় কিচ্ছু হয়নি”?

“হয় নি আবার, স্কুলের সাতফুট পাঁচিল টপকে পালাতে গিয়ে, মেরেছিলাম লাফ, বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড় সরে গিয়ে কেলেংকারি কাণ্ড। আজও পূর্ণিমা অমাবস্যায়, বাঁ পাটা কন কন করে”

গেলাসে চুমুক দিতে দিতে বাবা কাত্যায়ন তাকিয়ে রইলেন, রত্নধরের দিকে, তারপর বললেন, “শেষমেষ কতোয় রফা করলি”?

রত্নধর খুঁ খুঁ করে হেসে, গেলাসে লম্বা চুমুক দিল, বলল, “একলাখ আশি দিয়ে শুরু করেছিলাম, একলাখ পঞ্চান্নয় ফাইন্যাল হল”।

“একলাখ পঞ্চান্ন? তুই তো ডাকাত রে, রত্নধর। এত দাম?”

“লাও, যার জন্যে করি চুরি, সেই বলে চোর। সাতখানা রত্ন, তার সঙ্গে সোনার আংটি, রূপোর আংটি, রূপোর চেন, বাণি, তুমি কি ভাবছ বিশ-পঁচিশে হয়ে যাবে”?

বাবা কাত্যায়ন একটু উৎসুক হয়েই জিগ্যেস করলেন, “তা, ফেলে থুয়ে, আমাদের কত থাকবে মনে হয়”?

মৃদু হেসে রত্নধর বলল, “চল্লিশতো থাকা উচিৎ, কাল “রত্নখনি”তে কথা বললে ফাইন্যাল বোঝা যাবে”।

বাবা কাত্যায়নের গলায় এখন যেন একটু অসহায় সুর, তিনি বললেন, “দ্যাখ কি হয়। চল্লিশও নেহাত মন্দ নয়। এল.আই.সি.র একটা প্রিমিয়াম বাকি পড়ে গেছে, ওটা দিয়ে দেওয়া যাবে”।

 

দুজনের খালি গেলাসে আবার মদ আর জল দিয়ে ভরে তুলল রত্নধর, বাবা কাত্যায়নের দিকে গেলাস বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, “বউয়ের হাত দেখে স্বামীর জন্মমাসটা কি করে ঠিকঠাক বলে দিলে বলো তো, কেতোদা”?   

“ধুর ব্যাটা, ঠিকঠাক বলতে পারলাম কই? আন্দাজ করেছিলাম, চোত নয়তো মাঘ। মিলল না, বলল আষাঢ়”।

“সে ঠিক আছে, কিন্তু চোত, মাঘ, আষাঢ় - তিনমাসের ফল যে একই, সেটা তো ধরে ফেলেছিলে”!

গেলাসে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেলেন, বাবা কাত্যায়ন। সামলে নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে বললেন, “ও ওই শ্লোকটা? “চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”? ও শ্লোকের রচয়িতা কে জানিস? বাবা কাত্যায়ন শাস্ত্রী। হে হে হে হে। সংস্কৃত শ্লোকটোক শুনলে পাব্লিক খুব বিশ্বাস করে ফেলে, ভাবে শাস্ত্রে আছে। মোক্ষম কাজ দেয়। ও যদি ভাদ্র বলতো, তাহলে শ্লোকটা হত “চৈত্রভদ্রামাঘ মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”!

রত্নধর বাবা কাত্যায়নের কথায় খুব হাসতে লাগল খুঁ খুঁ করে, বাবা কাত্যায়নও হাসতে হাসতে গেলাসে লম্বা চুমুক দিলেন, তারপর শসা চিবোনোর মতো কচকচিয়ে চারটে কাঁচালংকা চিবিয়ে, এক চিমটি নুন ফেললেন জিভে, তারপর বললেন, “মানুষের আর একটা বড়োগুণ কী বলতো, নিজেকে সবসময় “একঘর” ভাবা। যে কোন বিষয়ে ব্যাপক জানে। বোকা, হাঁদা বললে রেগে যাবে, কিন্তু সাধাসিধে ভালোমানুষ বল, হেবি খাবে। ঘরে বউ, অফিসে বস - যা বলে, মেনে নেয়, তেলকে জল বললে কিংবা জলকে তেল বললে, যা বলেছেন, স্যার বলে। কিন্তু তাকে তুই স্পষ্টবাদী বল, হেবি ভাও খাবে। দুটো পয়সার জন্যে আর নিজের ধান্দার জন্যে, লোক যা খুশি করে, কিন্তু তাকে ন্যায়বাদী, বিবেকি বল, বুক ফুলে এই অ্যাত্তোটা “ক্যাও” খেয়ে নেবে”       

লম্বা চুমুকে গেলাস খালি করে, বাবা কাত্যায়ন হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলেন। রত্নধর বলল, “আরেকটু দেব নাকি, কেতোদা, তুমি আজ মাইরি চোঁ চোঁ করে টানছো। নেশা হয়ে গেলে, বউদি খুব রাগ করবে”।

“চোপ শালা। তান্ত্রিকদের কোনদিন নেশা হয় না। আমায় কি পেঁচো পেয়েছিস, যে গন্ধ শুঁকলেই মাতাল! মাই ফাদার ওয়াজ এ তান্ত্রিক, আই অ্যামি হিজ সান, ওনলি সান, আমিও তান্ত্রিক। আমাদের মদে নেশা হয় না, রে ব্যাটা। “সুরা পান করিনে আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে” “হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে উঠলেন বাবা কাত্যায়ন। রত্নধর চমকে উঠে, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আস্তে গাইতে বলল।

“কেতোদা, কি হচ্ছে কি? বৌদি শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না!”

বৌদির কথায় বাবা কাত্যায়ন একটু যেন ঝিমিয়ে গেলেনতাঁর বৌ পুতুলরাণিদেবী তাবিজ-মাদুলি, তন্ত্র–টন্ত্রের ধার ধারেন না। কোমরের কষিতে শক্ত করে শাড়ির আঁচল বেঁধে সামনে এসে দাঁড়ালে, বহুলোকের ঘাড় থেকে ভুত-প্রেত নেমে যায়। বাবা কাত্যায়নের মা নমিতাদেবীও এমনই ছিলেন। সত্যি বলতে তিনিই স্বর্গে যাবার আগে বৌমাকে পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এই ভুরুংগে বজ্জাত পুরুষদুটোকে কিভাবে জব্দ করে রাখতে হয়।

তিনি বলতেন, “বৌমা, আমার ছেলে বলে, কোলে ঝোল টেনে বলবো, এমন শাউড়ি আমায় পাওনি। ওই বাপ-বেটাকে একটু ঢিলে দিয়েছ কি, নাগালের বাইরে চলে যাবে। ত্যাকন আর কেঁদেও কূলকিনেরা পাবে না, বৌমা। সংসারটা তোমার, এতটুকু বেচাল দেখলেই শক্ত হাতে ন্যাজ চেপে ধরবে”। বাবা কাত্যায়ন দেখেছেন, তাঁর মায়ের হাতে বাবার ন্যাজ কেমন ধরা ছিল। কাজেই বৌকে তিনি খুব সমঝে চলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে ভেতর বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার, ভেজানো আছে দেখে একটু নিশ্চিন্ত হলেন।

গেলাসে হাল্কা একটা  চুমুক দিয়ে বললেন, “হ্যারে, রত্না, টাকা পয়সার হিসেব কিছু বলছিস না যে, বড়ো?”

“বললাম যে, কেতোদা। তোমার কাছে কিচ্ছু লুকোই নি তো”।

“অ্যাডভান্স থেকে হাজার পাঁচেক ছাড়”।

“অসম্ভব কেতোদা, “রত্নখনি”কে অন্ততঃ আট না দিলে ওরা কিচ্ছু বানাবে না। তোমার মক্কেলের কাছে কথার খেলাপ হয়ে যাবে। তুমি এখন দেড়হাজার রাখো, দাদা, আমি পাঁচশ” রাখছি। তোমারও চলুক, আমারও চলুক। তোমার তো তাও মায়ের দান-পেটি আছে, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো দেখি, দাদা?” রত্নধর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেড়হাজারটাকা তুলে দিল, বাবা কাত্যায়নের হাতে। বাবা কাত্যায়ন টাকাকটা গুণে নিয়ে, বারমুডার পকেটে ঢোকালেন।

তারপর গেলাসে আরেক চুমুক দিয়ে বললেন, “পার্টিকে কবে আসতে বলেছিস?”

“পরের মঙ্গলবার বলেছি। কাল দেখি “রত্নখনি” কি বলে? রত্নখনির মালিক আঢ্‌ঢিবাবুর আজকাল বড্ডো খাঁই জানো, দাদা। দোকানে সব রেডিমেড মাল আছে, একটু পালিশ করে দেবে, ব্যস। কিন্তু এমন কথা বলবে যেন, আমাদের থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে খাদানে লোক নামাবে রত্ন তুলতে, আর সাগরে ডুবুরি ডোবাবে মুক্তো তুলতে। ক’বছর আগেও নিজে ফুৎনলে ফুঁ মেরে মুর্শিদাবাদের চোরাই সোনা দিয়ে নাকছাবি বানাতো আজ তার দোকানে দুজন কর্মচারী, পাঁচজন কারিগর, চারজন জ্যোতিষী, চার শিফটে দুনিয়ার লোকের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আঢ্‌ঢিবাবু কোনদিন কাউকে হাতও দেখায় না, আর হাতে বিয়ের আংটি ছাড়া কোন আংটিও পড়ে না। অথচ দেখ, ব্যাটার কি রকম ভাগ্য ঘুরে গেল। এখন ক্যাশ কাউন্টারে বসেবসে টাকা গোনে, আর ঠ্যাং নাচায়”।

রত্নধরের এই কথায় বাবা কাত্যায়নও একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিলেন। বললেন, “ভাগ্য কি আর বদলানো যায় রে, রত্না? যায় না। তাই যদি হতো ক্লাসে সবাই ফাস্ট হতো। সেকেণ্ড বলে কিছু থাকতো না। দেশের সব লোক প্রধানমন্ত্রী হতো কিংবা টাটা-আম্বানি হতো, অথবা রবি ঠাকুর হতো। ওসব হতে গেলে এলেম লাগে রে, ক্ষ্যাপা, সে কি আর ওই আঙুলে পাথর ঘষলে হয়? আমার বাবাই কি আমার আঙুলে কম পাথর পড়িয়েছিলেন, কী হয়েছে? সেই তো তান্ত্রিক সেজেই লোককে ভুজুং দিচ্ছি”। গেলাস খালি করে, আবার বললেন, “বাড়ি যা রত্না, অনেক রাত হলো। তবে অন্য কিছু ভাব, এইসব করে বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না”।

“তোমার মতো ন্যায়বাদী, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং  ক্ষণ-ক্রোধী ব্যক্তিও যদি এমন কথা বলে, তাহলে আমাদের কী হবে, দাদা”? রত্নধরের এই কথায় বাবা কাত্যায়ন কটমট করে তাকালেন, কিছু বললেন না।

বোতল, গেলাস, লংকা, নুন তক্তপোশের তলায় আবার চালান করে দিয়ে রত্নধর মুচকি হেসে বলল, “আসছি, তাহলে, দাদা? কাল বিকেলে আবার দেখা হবে”।

 

বাবা কাত্যায়ন নিঃশব্দ ঘরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। বিবেকী ঘড়িটা সুযোগ বুঝে একভাবে বলে চলেছে ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ...। চেম্বারের আলো নিভিয়ে বাবা কাত্যায়ন ভেতরে গেলেন, তাঁর হাতে কড়কড়ে দেড়হাজার টাকা। ছোট্ট উঠোন পেরোতে পেরোতে ডাক দিলেন, “কই রে মিনু, তোর মা কোথায় গেল রে...”।  

--০০--


শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

প্রসাদী ফুল

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



এর আগের ছোট গল্প - " অলীক পুরুষ "


আমরা বলি সতুদা, কিন্তু তাঁর নাম সইত্যব্রত চট্টরাজ, এমএসসি পাশ। শুনেছি তাঁর প্যাশান ছিল স্কুলের শিক্ষকতা। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাঁর কপালে শিক্ষকের চাকরির শিকে ছেঁড়েনি। অতএব তিনি চাকরি করেন না। ভাগ্যিস করেন না, করলে আজ হয়তো তাঁকে দাগি অথবা নির্দাগি-শিক্ষক হয়ে, কলকাতার পথেঘাটে ধর্ণা মঞ্চে বিরাজ করতে দেখা যেত - বছরের পর বছর। কপালে জুটত পুলিশের যুগপৎ লাঠি ও লাথি। তবে একটা কথা মানতেই হবে – ছোটবেলা থেকে আমরা দাগি চোরের কথা বিস্তর শুনেছি – কিন্ত দাগি শিক্ষক নৈব নৈব চ। এদিক থেকে দেখলে আমাদের সভ্যতার উন্নয়ন পথের ধারেই বসে আছে – নির্দাগি শিক্ষকরূপে! এ কি কম উন্নয়ন?    

চাকরি না করলেও সইত্যদা নিজের বাড়িতেই কোচিং ক্লাস খুলে ছেলে মেয়েদের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথস পড়ান। তাঁর ক্লাসঘরের বাইরে সকাল ছটা থেকে রাত্রি দশটা পর্যন্ত সাইকেল আর খোলা চটির সংগ্রহ দেখলেই তাঁর হাতযশের আঁচ পাওয়া যায়। পিতৃদত্ত নাম সত্যব্রত হলেও, তিনি ইদানীং নিজের পরিচয় দেন এবং সই করেন সইত্যব্রতই নামেই। এর পিছনেও গূঢ় রহস্য আছে। সেটা হল বিখ্যাত এক নিউমেরোলজিস্ট সতুদাকে বলেছিল, “খাঁটি সত্য বলে তো আজকাল কিছু হয় না, ভেজাল মেশাতে হয়”। তারপর সমাধান দিয়েছিলেন “SAITYA বা সইত্য নামটাই আপনাকে সুট করবে, আপনার জীবন পাল্টে দেবে”।       

সেই সতুদাই আমাদের পাড়ার পুজোকমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর আমাদের জন্যে প্রত্যেকবার চোখ ধাঁধানো চাঁদাও একদম বাঁধা থাকে। কবছর আগে খবরের কাগজে পড়ে আইডিয়াটা সতুদার মাথায় এসেছিল এবং গতবার সতুদা প্রস্তাব দিয়েছিল - এবার আমাদের পুজোর থিম হবে জ্যান্ত ঠাকুর। নো কাঠ-খড়-মাটির বানানো পুতুল বিজনেস। টানা তিনদিন তর্কবিতর্কের পর ফাইন্যাল সিদ্ধান্ত হল।

ঠিক হল আমাদের গলির মোড়ে “মধুমাখা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের” মালিক বোঁদে কাকুর ভাইপো হবে গণেশ। কমবয়সী ছেলে – কাকুর দোকানে বছর দুয়েক বসছে, এর মধ্যেই ঈর্ষা জাগানো সুন্দর একটা ভুঁড়ি বাগিয়ে নিয়েছে। কাজেই গণেশ হিসেবে তার থেকে উপযুক্ত আর কেউ হতেই পারে না। এখানে বলে রাখি বোঁদে কাকুর আসল নাম বৈদ্যনাথ – কিন্তু বোঁদে বানানোয় হাত পাকিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন বোঁদে নামে।   

বলিউডের স্বপ্নে বিভোর, দিনে দুবার জিম করা নিমাইকে দেওয়া হল কার্তিকের ভূমিকা।

আমাদের পাড়ার কদমাদির বোন মিছরি হবে সরস্বতী। মিছরি হল এ পাড়ার উঠতি ছোকরাদের চিরস্থায়ী দীর্ঘশ্বাসের উৎস। এক চিমটি চোরা চাহনি কিংবা এক ফোঁটা মুচকি হাসিতে সে আমাদের আকাশে ওরা ঘুড়ির মতো কচি কচি হৃদয়গুলিকে নিঃশব্দে ভোকাট্টা করে দিতে পারে। আমাদের জামার বুকপকেটগুলো রক্তক্ষরণে মোরগফুলের মতো রাঙা হয়ে ওঠে। নাঃ, দেখা যায় না, আমরা অনুভব করি প্রত্যহ।   

স্বপ্না কাকিমা হবেন, মা দুর্গা। তিনি দেখতেও যেমন ভারিক্কি, তেমনি তাঁর মুখে চোখে বেশ একটা ইয়ে আছে – মানে মা, মা ভাব। লতিকা বৌদি বিয়ে করে আমাদের পাড়ায় এসেছেন বছর খানেক হল – তাঁকে মা লক্ষ্মীর ভূমিকায় সাব্যস্ত করা হল।    

মহিষাসুরের জন্যে কমিটি প্রথমে সাব্যস্ত করেছিল আমাদের পাড়ার তোলাবাজ ও মাস্তান ঠোঁটকাটা পটলদাকে।  ঠোঁটকাটা অর্থে পটলদা কিন্তু মোটেই স্পষ্টবক্তা নয়। আসলে তাঁর ঠোঁটের বাঁদিকে বেশ গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন আছে। শোনা যায় বেশ বড় একটা ছোরার ধারালো ফলা ঠোঁটে চেপে পটলদা আগে খুব তোলাবাজি করত। ঠোঁটে ধরা ওই ছোরার ফলা দেখিয়েই পটলদা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। একদিন কোন এক নিরীহ চিকেন-ব্যাপারী – প্রতিহপ্তায় হপ্তার টাকা গুনতে গুনতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে আচমকা এক ঘুঁষি চালিয়েছিল তোলাবাজ পটলদার মুখে। ব্যস, পটলদার ঠোঁট কেটে প্রবল রক্তারক্তি – প্রায় দেড়মাস চিকিৎসার পর ঠোঁট সেরে উঠলেও নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ঘটনাটা।

ঠোঁটকাটা পটলদার বেশ হাট্টাকাট্টা জবরদস্ত চেহারা – গায়ের রং, মাথার চুলও অনেকটা মহিষাসুরের মতোই। কিন্তু পটলদা কিছুতেই রাজি হল না। বলল, “পাগল নাকি, আমি ভোলেভালা সাতেপাঁচে না থাকা মানুষ...আমায় কখনো মইষাসুর মানায়?” শেষমেষ “বাঙালি খাসির” দোকানের হেল্পার সুকুলদা রাজি হওয়াতে মহিষাসুরের জ্যান্ত প্রতিমার ঝামেলাটাও মিটল।  

প্রথমে প্ল্যান হয়েছিল, প্রতিমার মতো, তাঁদের বাহনরাও সবাই জ্যান্ত হবে। কিন্তু জ্যান্ত ইঁদুর-পেঁচা-রাজহাঁস যোগাড় হলেও, অচিরেই বোঝা গেল, ময়ূর-কাটামোষ-সিংহ যোগাড় করার বাড়াবাড়িটা কোনভাবেই সামলানো যাবে না। অতএব মাটির পুতুল দিয়েই বাহনের কাজ সারতে হল।

পুজোর কটা দিন বেশ নির্বিঘ্নে আর আনন্দেই সম্পন্ন হল। আজ বিসর্জন। আমাদের ভাসান দেওয়ার প্ল্যানটাও খুব কুলমাদুগ্‌গা সপরিবার উইথ মহিষাসুর যাবেন স্করপিওতে। তাঁরা গঙ্গাঘাটে স্নান সেরে, ঠাকুরের সাজসজ্জা ছেড়ে পুনর্মনিষ্যি হবেন। আর আমরা মেটাডোরে গিয়ে গঙ্গাতে বিসর্জন দেব ঘট আর মাটির বাহনগুলো

বিকেলে শুরু হল সিঁদুরখেলা, বিদায়বরণ এতদিন মাথায় আসেনি, কিন্তু নিদারুণ সমস্যাটা ঘনিয়ে এল অন্যদিক থেকে।

প্রত্যেকবার আমরা যারা গোবর মাথা, লরিতে তোলার আগে মাসরস্বতীর চরণে মাথা ঠুকতাম আর তাঁর প্রসাদীফুল রাখতাম পকেটে। এবারে মিছরি হয়েছে সরস্বতী। তার চরণতলে ফুলের পাহাড়! কিন্ত কে তাকে প্রণাম করবে, তার চরণের ফুল কুড়োবে? যে করবে তার নামটা তো মিছরির সম্ভাব্য বয়ফ্রেণ্ড লিস্ট থেকে কাটা পড়বে! কিন্তু অন্যদিকে মা সরস্বতীর চরণ না ছুঁলে পরীক্ষাগুলো পাসই বা করব কী করে?

আমাদের সকলের মাথায় তখন একটাই চিন্তা - পরীক্ষা আগে না, প্রেস্টিজ আগে? পরীক্ষায় একবার ফেল করলেও পরেরবার উৎরোনো যায়। কিন্তু প্রেস্টিজ কি সাইকেলের টায়ার, পাংচার হলেও, তাকে সারিয়ে নেওয়া যাবে?

আজ মিছরিকে ব্যাপক দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে পরি, শুধু ডানাদুটো নেই। ডানাজোড়া ওয়াশিং মেশিনে কেচে যেন ছাদের দড়িতে শুকোতে দিয়ে এসেছে! পায়ের ওপর পা, হাতে বীণা, ঘ্যাম পোজ মেরেছে। আমাদের চোখ ফেরানো দায় হয়ে উঠেছেনিখিল আর বাচ্চু ভেজাভেজা গলায় আমাকে বলল, “কিছু একটা কর, ভল্টু”

কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, “ভাবিস না, উপায় বের করেছি। আমার ঘরের সরস্বতীমূর্তিটা, চুপচাপ নিয়ে আয়, তারপর আমি দেখছি”

ওরা সরে যেতে আমি মিছরিকে গিয়ে বললাম, “মিছিমিছি বসে সময় নষ্ট করছিস কেন, মিছরি? এই সময় টুক করে একবার গিয়ে “পরাণ তরী যাক ভাসিয়া”-টা দেখে আয়। আজকের এপিসোডটা শুরু হল বলে”। “পরাণ তরী যাক ভাসিয়া” সিরিয়ালের হিরো সমীর মহাপাত্র। মিছরি সমীরের হেব্বি ফ্যান।

মিছরি চমকে উঠে বলল, “এম্মা, তাইতো, ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু এসময় কেটে পড়লে কেলো হবে না”?

“আধঘন্টার ব্যাপার, মিছরি কোন চাপ নিস না, তুই আলতো করে পাতলা হয়ে যা, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি”

বীণা রেখে প্যান্ডেলের পিছন দিয়ে মিছরি সরে পড়ল। আর প্রায় তখনই বাচ্চুরাও পৌঁছে গেল আমার ঘরের সরস্বতীপ্রতিমা নিয়ে। প্রতিমাটিকে বেদিতে বসিয়ে চটপট সেরে নিলাম প্রণামপর্ব। প্রসাদীফুল কুড়োনোর পর্ব। আমরা দশবারোজন ছোকরা মা সরস্বতীর বেদিটাকে ঘিরে রেখে, ‘সরস্বতীমায়িকি, জয়’ রব তুলতে লাগলামবরণ করতে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে আমার মাও ছিলেন, খুব খুশি হলেন আমাদের মতিগতি দেখে। মাদুগ্‌গা সাজা স্বপ্নাকাকিমাতো বলেই ফেললেন, “ছোঁড়াগুলো দুগ্‌গাপুজোর সময়েও মাসরস্বতীর ভক্তিতে কি সুন্দর মেতে আছে। দ্যাখ দ্যাখ, পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে মিছরি কেমন ছোঁড়াগুলোর ঘাড় ধরে প্রণাম আদায় করছে”!

আমার চোখ ছিল ঘড়ির দিকে, আধঘন্টা হতেই বাচ্চুরা চুপিচুপি মাসরস্বতীর প্রতিমা আবার আমার ঘরে রেখে এল মিছরিও ফিরে এসে, বীণাহাতে বসে পড়ল বেদিতে। আমার দিকে ডাগর চোখের কটাক্ষ হেনে মিছরি ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংকু, ভল্টুদা। আজ না গেলে বিচ্ছিরি মিস করতাম। আজ সমীরের সঙ্গে মেঘনার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল, সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হল সমীরের প্রথম পক্ষের বউ – তার কোলে আবার একটা মেয়ে...। চিন্তা করো ভল্টুদা, কি সাস্পেন্স!”

আমি হাসলাম, বললাম, “ভল্টু ছাড়াও আমার নাম তিমির, জানিস তো? সমীরের থেকে চোখ ফিরিয়ে, তোর আঁখির টর্চ এদিকে ফেললে, মাইরি বলছি, আমার হৃদয়ের সব তিমির ঘুঁচে যেত রে, মিছরি”!

আঁখিপাখির ডানা ঝাপটে মিছরি উত্তর দিল, “য্‌য্যাঃ। ভল্টুদা তুমি না একটা Zআআতা। এমন ফচকেমি করো না...”।    

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বুকে হাত রাখলাম। মা সরস্বতীর আশীর্বাদী ফুল রয়েছে আমাদের বুক পকেটে। আমার হৃদয়ের ক্ষরিত রক্তে প্রসাদী ফুলগুলিও যেন রাঙা হয়ে উঠল।  

-০০-


শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫ " 


ষষ্ঠ পর্ব


সোমবার/রাতঃ এগারোটা বিয়াল্লিশ।

 আদরের কনি,

ঘরের একটা জানালা দীর্ঘদিন না-খোলা ছিল, গতকাল তুই সেটা খুলে দিলি। খোলা হাওয়ায় বুকটা ভরে উঠল আর চোখে এসে লাগল আলোর উদ্ভাস। এত ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ননিজেকে এমনিতেই মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত, তাই শশাঙ্কবাবু বার বার বলা সত্ত্বেও হুইস্কির নেশায় সেটাকে কাটাতে মন চাইছিল না। শশাঙ্কবাবু কী ভাবলেন কে জানে, তুই সামলে নিস।

ত হপ্তার শেষ দুটো দিন ছিলাম না, তাই আজ চেম্বারে খুব চাপ ছিল। তোদের ওখান থেকে ফিরে মাথার তলায় হাত রেখে টানটান বিছানায় শুয়ে তোর কথা যে দু দণ্ড ভাবব তার অবকাশই পেলাম না। মিনিট পনের ঘরে ছিলাম টয়লেটে একটু ফ্রেশ হবার জন্যে, তার মধ্যেই দু দুবার তাগাদা দিয়ে গেল রিসেপশনের মেয়েটি। মানুষ যে কেন এত অসুখে ভোগে কে জানে? নিজেদের সুখের জন্যেই একটু সুস্থ থাকতে পারে না? আজ যদি এরা না ভুগত, চিন্তা করে দ্যাখ, তোর চিন্তার বন্দরে আমি নোঙর ফেলে মাপতে পারতাম বিস্তর জলের তল – একে বাঁও, দুইয়ে বাঁও হয়তো বা। সে যাক শেষমেষ যেতেই হল চেম্বারে। সকলা নটা থেকে দুপুর একটা, কুড়ি জনের বেশি সাধারণত দেখি না। আজ একেবারে পঁয়ত্রিশজন! ধমকে ওঠার আগেই মিলকি বলে উঠেছিল – বকবেন না স্যার, কিচ্‌ছু করার নেই। শুক্রবার, শনিবার থেকে সব্বাই ফোন করে করে এমন রিকোয়েস্ট করে রেখেছিল যে ফেরাতে পারিনি। মিলকি আমার রিসেপসনিস্ট।

সকলের নিরাময়ের বিধান দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর কি! ঘরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। চান খাওয়া করে একটু রেস্ট না নিতেই আবার ডাক পড়ল নার্সিং হোমে, সেখানে দুজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট অ্যাটেণ্ড করে আবার সন্ধ্যের চেম্বার সাতটা থেকে।

এখন রাত এগারোটা আট। পাশের বাড়ির টিভিতে কোন বাংলা সিরিয়াল চলছে, নাটকীয় মুহূর্তে উচ্চৈঃস্বর মিউজিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নিশ্চিন্ত শব্দহীন চারিপাশ। এখন শুধু তুই আর আমি। আর কেউ নেই আমার সময়ে ভাগ বসাতে।

কি করছিস এখন? ঠিক একখুনি? ঘুমিয়ে পড়েছিস? নাকি উল্টোদিকের সোফায় পা তুলে দিয়ে সিরিয়াল দেখছিস? দুই জা, ননদ আর শাশুড়ির লাগাতার ক্যাঁচাল মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চলেছিস? নাকি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিস? কি বই? ইন্টারেস্টিং না একটু বোর? বই পড়তে পড়তে কি আমার কথাও তোর মনে আসছে? যে পাতাটা খুলে পড়া শুরু করেছিলি, সেই পাতাতেই কি আটকে রয়েছিস অনেকক্ষণ – আমার ভাবনায়? ভাবিস কী না ভাবিস, আমার ভাবতে ভাল লাগছে যে তুই আমার কথা ভাবছিস। এই যে আমি তোকে মেল লিখছি, তার মানে তোর কথাই তো ভাবছি। তুইই তো রয়েছিস আমার সারাটা মন জুড়ে। এর কি কোন টেলিপ্যাথিক এফেক্ট হতে পারে না?

আমার কাজের মাঝে, কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে। আমায় পরশ করে প্রাণ সুধায় ভরে তুমি যাও যে সরে – বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো, ওগো দুখজাগানিয়া।

এখনো কি তুই দাঁড়িয়ে আছিস, কনি? অন্ততঃ মনে মনে হলেও! আমার কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে তুই আজও যেন দাঁড়িয়ে আছিস শুধু আমারই জন্যে।

 ভালোবাসা নিস।

 তোর সুনুদা

 

মঙ্গলবার/রাতঃ বারোটা দশ

প্রিয় কনি,

শীতের শীর্ণতোয়া পাহাড়ি নদী দেখেছিস খুব কাছ থেকে? তরতরিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যায়। জলের মধ্যে খেলে বেড়ানো ছোট্ট ছোট্ট মাছ, জলের নীচেয় নুড়ি পাথর সব - সব দেখা যায়। উজ্জ্বল রোদ্দুরে চিক চিক করে স্বচ্ছতা। আর বর্ষার প্লাবনে সেই নদীই যখন জলপ্রবাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তার বুকে তখন ঘোলা জল। জলের মধ্যে, জলের নীচে কী কী রহস্য জমা করা আছে কিছুই দেখা যায় না।

এতদিন অদর্শনে শীর্ণ স্মৃতির বহতায় যা ছিল স্বচ্ছ, সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হবার পর কেমন যেন সব ঘেঁটে ঘুলিয়ে ঘ হয়ে গেল। দেখা না হলেই বুঝি ভালো ছিল। বেশ তো ছিলাম/ছিলি – কেন যে সেদিন গাড়িটা খারাপ হল মাঝ রাস্তায়! উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে সব চিন্তা আর ভাবনা। কত কথাই যে বলতে ইচ্ছে জাগছে – কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না হে আমার কনি, পরস্ত্রী!

গতকাল আমার মেলের উত্তর দিসনি। মেল খোলার অবকাশ হয়নি, নাকি উত্তর দিবি না ঠিক করেছিস?

 ভালো থাকিস, ভালোবাসা নিস।

তোর সুনুদা।

 

বুধবার/দুপুরঃ দুটো বত্রিশ

 সুনুদা,

 ভালোই তো আছো, বস, একদম রসে ভরা রসবড়া। এতটুকুও টসকাওনি।  

তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় – দুটো মেলই পড়েছি যথাযথ সময়েই। এমনিতেই তোমার সঙ্গে (নাকি তোমার প্রিয় রবিঠাকুরের ভাষায় “তোমার সনে” বলব?) এতদিন পর দেখা হবার একটা হ্যাং ওভার তো ছিলই, তার ওপর তোমার ওরম মেল, বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আজও তুমি এভাবে ভাবতে পারো? আজও কি আমি তোমার কাছে একই রয়ে গেলাম! মনে হল তাই আর বুকের মধ্যে জমাট বাঁধল দীর্ঘশ্বাস – কী কথা ছিল বলবার? কী কথা আর আছে বলবার? সমস্ত ভাবনা আমাকে বোবা করে দিল, সুনুদা।

 তোমার স্বভাবটা আর পাল্টালো না, সুনুদা। এমন মন আকুল করা বক্তব্য শেষ করলে “পরস্ত্রী” দিয়ে? হেমন্তের চাঁদনি রাতে কাশবনে হারিয়ে যাবার লোভ দেখাও আবার মাথায় হিম লেগে ঠান্ডা লাগার ভয়ও দেখাও। শীতের ঝরাপাতার বনে হারিয়ে যাওয়ার ডাক দাও কিন্তু পথ হারানোর ভয়ে বনে ঢুকতেও মানা করো। আমি তো হারাতে চেয়েছিলাম তোমার ডাকে – কিন্তু বারবার তুমিই দিয়েছ পিছুটান।

পিছুটান ভুলে একবার ডেকেই দেখো আমায়, আমি আজও আছি শুধু

 তোমারই কনি।

 

বুধবার/রাতঃ ১১:৪৫

কনি,

তোকে ডাকিনি একথাটা তোর মুখে মানায় নাডেকেছিলাম, তোকেই ডেকেছিলাম, সমস্ত অন্তর থেকে। এমন আহ্বান, নাঃ আহ্বান নয়, আবাহন আর কেউ কোনোদিন করতে পেরেছে বলে আমার অন্ততঃ বিশ্বাস হয় না। তুই সেদিনের সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিলি। হয়তো তেমন ভরসা করতে পারিসনি। অথবা আমার ডাকে সেসময় সাড়া দিলে তোকে এবং আমাকে যে ঝঞ্ঝার মুখে পড়তে হতো, সে আশঙ্কায় বিকল হয়েছিলি তুই। সেই ঝড়ের রাতে তোর নিরাপদ ঘরের দুয়ার রুদ্ধ রেখেছিলি। খিড়কির দরজাতেও এতটুকুও ফাঁক রাখিসনি। পাছে উড়ে যায় সব বাঁধনের শিকল, এলোথেলো হয়ে যায় তোর সহজ জীবনের যাবতীয় পথচলা।

সেই ঝড় থেমে গেছে কবেই। পিছল পথে পা টিপে টিপে আমি পৌঁছে গিয়েছি, একা এক নির্জন পথের পরিত্যক্ত পান্থশালায়। আমি তোকে আমার সঙ্গে সেদিন মাত্র সাত পা হাঁটতে বলেছিলাম, কনি, তাহলেই আমরা জীবনের অনন্ত পথচলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারতাম। সে তো হয়ে উঠল না কনি। সেদিন আমার সেই ডাকে তুই মুখ ফিরিয়েছিলি, কনি, আজ কোন অধিকারে তোকে ডাকি বল তো? তোকে খুব কাছে পাবার লোভটুকুও এখন রয়ে গেছে বহুদিন পিছনে ফেলে আসা অস্ফুট স্মৃতিতে। যে স্মৃতি একটা লোহার সিন্দুকে ভরে, শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছিলাম গভীর এক কুয়োর জলে। সে সিন্দুকটা জলে পড়ার সময় আওয়াজ উঠেছিল - ঝপ্‌পাস। আমার স্মৃতিতে এখন রয়ে গেছে শুধু ওই আওয়াজটুকুই!

আজ তোকে ডাকতে গেলে, আমার একা এই নির্জন ঘরে সেই শব্দটাই কানে আসছে বারবার। এই শব্দটুকু ছাড়া আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, 

তোর সুনুদার।

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...