প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৫"
২৬
সুনুদা,
অবশেষে তোমার সাড়া পেলাম এবং নিশ্চিন্ত হলাম।
আজকাল প্রায়ই শুনি আমাদের কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোনগুলির ওপর
কেউ বা কারা যেন এ আই নামক কোন এক উচ্চমার্গীয় সফ্টওয়ারের সাহায্যে সর্বক্ষণ নজর রেখে
চলেছে। আমরা কোথায় কোথায় যাচ্ছি, কোথায় কোন হোটেলে উঠছি, কার সঙ্গে অত্যধিক কথা বলছি,
অথবা কাকে মেলা মেল করছি। কিংবা অনলাইন শপিং-অ্যাপ থেকে কী কী ধরনের জিনিষপত্র
কিনছি বা খুঁজছি – সব নাকি তারা লক্ষ্য রেখে চলেছে। এবং সেই অনুযায়ী তারা নির্ভুল
দক্ষতায় আমাদের সতত সচেতন করে রাখতে – এলোপাথাড়ি নানান বিজ্ঞাপন পাঠাতে শুরু করে।
এমনকি অনেক সস্তায় আরও মনোহর ও লোভনীয় পরিষেবা ও জিনিষপত্র কোথায় এবং কীভাবে কত
সহজে আমরা পেতে পারি, তার সন্ধান তারা দিতে থাকে প্রতিনিয়ত।
বিশ্বাস করো, আমার ভয় হচ্ছিল, সেরকমই কোন এ আইয়ের এয়ারকিতে আমি
ধরা পড়লাম বুঝি – তোমাকে লেখা আমার সব মেলগুলি তারাই হয়তো বেমালুম গায়েব করে
দিচ্ছে মাঝপথে। আমার এত কথা সবই বোধহয় ভেসে বেড়াচ্ছে অনন্ত এক ভার্চুয়াল জগতে –
তোমার কাছে সে সব কিছুই পৌঁছচ্ছে না।
খুব ভয় লাগে সুনুদা, বিশ্বাস করো। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের
অর্থাৎ সাধারণ মানুষের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য এবং তত্ত্ব নিয়ে সত্যিসত্যিই কি ছিনিমিনি
খেলবে হাতে গোনা কিছু মানুষ? মানুষের বানানো প্রযুক্তি কি প্রতিটি মানুষকেই অহরহ,
তিনশ পঁয়ষট্টি দিন, ব্ল্যাকমেল করে তাদের ব্যবসা বাড়াবে? এটাই কি হতে চলেছে আমাদের
সুসভ্য উন্নত বিজ্ঞানের আলোমাখা জীবনের ভবিতব্য? কে জানে? আমার মনে হয় আমাদের এই
সভ্যতার থেকে বহু দূরের গ্রামে গঞ্জে খেটে খাওয়া তথাকথিত অনগ্রসর নারী ও পুরুষরাই
আজকের দিনে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। আপাত অদৃশ্য অনন্ত ও অসীম প্রভাবশালী কিছু বেওসাদারের
হাতের পুতুল হয়ে উঠছি আমরা প্রতিদিন এবং অচিরেই
আমরা হয়ে উঠব তাদের একান্ত দাসানুদাস।
যাগ্গে, এসব ভাবনায় মাথা খারাপ করে লাভ নেই, গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে আপাততঃ ভালই আছি, হয়তো ভালই থাকব...যেভাবে ব্রিটিশ রাজত্বে আমাদের রায়বাহাদুররা সব জেনে-বুঝেও দিব্যি সুখে স্বচ্ছন্দে থাকতেন।
তার থেকে আমার নিজের জীবনের কথাতেই ফিরে আসি।
সেবার প্রায় চোদ্দ দিন হসপিট্যালে থাকার পর, বাবাকে নিয়ে আমরা ঘরে এলাম। কিন্তু এই বাবা আর আমার আশৈশবের দেখা সুস্থ-কর্মঠ বাবা রইলেন না। তিনি অসুস্থ, আংশিক স্থবির। তাঁর শরীরের বাঁদিকটা প্যারালাইজ্ড্। মুখের একটা পাশও বিকৃত। নিজে নিজে হাঁটা চলা করতে পারেন না – বিছানা থেকে টয়লেটে যাওয়াটাও তাঁর কাছে তখন দুরূহ পথযাত্রা। তাঁর চোখের নিস্তেজ দৃষ্টি অনেকটাই নির্বাক, তাঁর জিহ্বাও কিছুটা অসাড় হয়ে যাওয়াতে, তার কথাবার্তাও অস্পষ্ট কখনও কখনও দুর্বোধ্যও মনে হয়।
খুব সংক্ষেপে বললে, বাবার মাত্র ওই কয়েকদিনের অসুস্থতাতেই আমাদের
সাংসারিক স্থিতাবস্থাটা টলে গেল। এবং আমরা মুখে স্বীকার না করলেও মনে মনে সকলেই টের
পাচ্ছিলাম, সংসারটাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়।
একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোজ আসতেন বাবাকে নড়াচড়ায় সাহায্য করতে।
অসীম ও অলৌকিক আশায় মা তাঁকে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “উনি আগের মতো চলাফেরা করতে পারবেন
তো, বাবা?” ভদ্রলোক বলতেন, “কেন পারবেন না, কিন্তু একটু সময় লাগবে, ধৈর্য ধরতে হবে।
আপনি একদম টেনশন করবেন না, মেসোমশাইয়ের মত অন্ততঃ পঁচিশ জন পেশেন্টকে আমি সুস্থ করে
তুলেছি, তাঁরা সকলেই এখন একা একা রোজ পার্কে যান মর্নিং ওয়াক করতে। তাঁদের এখন আর কোন
অসুবিধেই নেই। ডক্টর বিশ্বাসের মতো বিজি ডাক্তাররা তো ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা করে হসপিট্যাল
থেকে ছেড়ে দেন এই ভরসাতে, যে বাকি ফিজিক্যাল ট্রিটমেন্টটা বিকাশ হালদার ঠিক সামলে নেবে”।
বাবাকে যিনি রোজ ফিজিওথেরাপি করাতে আসতেন, তাঁরই নাম বিকাশ হালদার।
সুদীপবাবুর কথায় মা বুক বাঁধতেন, বলতেন, “তাই যেন হয়, আমি কালীঘাট
আর ঠনঠনে কালীমায়ের কাছে ডাব-চিনির মানত মেনেছি, বাবা…”।
আমার সরলমতি মা যতই মাকালীর চরণে মানত মানুন। অথবা বিকাশবাবুর
মুখের বিকশিত কাষ্ঠ-হাসিতে মুগ্ধ হন না কেন, আমি কিন্তু টের পাচ্ছিলাম আমাদের সংসারের
ওপর ঘনিয়ে উঠছে গভীর সংকট। অসুস্থ বাবা, তাঁর সেবায় প্রায় চব্বিশঘন্টা প্রাণপাত পরিশ্রম
করতে করতে ও মানসিক উদ্বেগের ব্যাকুলতায় মায়ের পক্ষেও আর বেশিদিন সুস্থ থাকা সম্ভব
হবে না। তার ওপর আছে আমার বালক পুত্রের দেখভাল। তার স্কুল যাওয়া, তার লেখাপড়া, তার
নাওয়া-খাওয়া, তার সুস্থতা-অসুস্থতা…। আর সবার শেষে কিন্তু সবার উপরে আছি আমি – বিয়ে ভেঙে বাবা-মায়ের ঘাড়ে চেপে থাকা নিজের কন্যা…।
আসলে আজও আমাদের মা-বাবারা যতই বলুন, ছেলে আর মেয়েতে কোন তফাৎ
নেই। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু তফাৎ একটা থাকেই। আমি যদি সুখী বিবাহিত হতাম, আমার সঙ্গে এসে
আমার বর যদি “বাবা, বাবা” কিংবা “মা, মা” করে শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল করার পূর্ণ দায়িত্ব
নিত, তাহলে ব্যাপারটা বেশ আনন্দ ও স্বস্তিদায়ক হত। কিন্তু পতি-বিচ্ছিন্না কন্যা? সেও তো
নিরন্তর এক দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তির বোঝা! সে কন্যা যতই উপার্জনক্ষম স্বনির্ভর হোক না
কেন!
আমাদের বাড়ির এই রকম পরিস্থিতিতেই আমার জীবনে শশাঙ্কর উপস্থিতিটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা প্রথমবার টের পেলাম। এবং এটাও উপলব্ধি করলাম, যেহেতু বাবা কোনদিনই আর আগের মতো সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন না, অতএব ভবিষ্যতেও শশাঙ্কর নিরন্তর সহায়তার প্রয়োজন আমার থেকেই যাবে। কাজে কাজেই শশাঙ্কর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুবই স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। যদিচ একথাও আমাকে স্বীকার করতে হবে, আমার অসহায়তার এমন সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে শশাঙ্ক আমাকে কোনরকম ভাবেই আর কোনদিন কোন প্রেমবার্তা বা ওই প্রসঙ্গের কোন আভাস-ইঙ্গিতও দেয়নি। অতএব এতদিনে হৃদয়ঙ্গম করলাম শশাঙ্ক লোকটি যথেষ্ট ভদ্রলোক এবং অত্যন্ত আত্মাভিমানীও! অর্থাৎ শশাঙ্কের প্রতি আমার হৃদয়-দৌর্বল্যের সমস্ত লক্ষণই প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু সেই দৌর্বল্যটাকে আমি প্রেম বা ভালবাসা ভাবতে বা বলতে নারাজ, তবে একথাও ঠিক শশাঙ্কের উপর আমি খুব নির্ভরশীল হয়ে উঠতে লাগলাম।
সেই সময় বাড়ির সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে আমি খুব একটা কঠিন
সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা চিন্তা করতে লাগলাম। আর সেটি হল বাম্বাইকে কলকাতার স্কুল থেকে ছাড়িয়ে বাইরে
কোথাও রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠানো। ভাবলাম বাম্বাই
কলকাতায় না থাকলে মায়ের এবং আমারও অনেকটাই দুশ্চিন্তা ও কাজের ভার লাঘব হবে। উপরন্তু
পরিবেশের চাপে ওর লেখাপড়াটাও অনেকটাই কম বিঘ্নিত হবে।
সিদ্ধান্তটা নিঃসন্দেহে কঠিন, কারণ কথাটা মাথায় আসার পর
বাম্বাই ছাড়া আমার নিজের জীবনটা কেমন হবে? রোজ সকালে উঠেই ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখতে
পাব না? অফিস থেকে ফিরে রাতে শুয়ে পড়া পর্যন্ত ওকে জড়িয়ে থাকা আমার জীবনের প্রাত্যহিক
মাধুর্য্যটুকুও আমাকে হারাতে হবে?
তাছাড়া কলকাতায় ওর স্কুল, ওর ক্লাসের বন্ধুদের এবং টিচারদের
ছেড়ে যেতে বাম্বাই রাজি হবে কিনা। ওই স্কুলে বাম্বাই ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ছে, অতএব তার
শৈশব ও বাল্যের বছরগুলোর সঙ্গে ওই স্কুল ওতপ্রোত জড়িত। আমি নিজের ছোটবেলার কথা মনে
করলাম। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়, আমাকে যদি আমার মা-বাবা বলতেন, “সুকু কাল থেকে তোকে
অনেক দূরের এক স্কুলে গিয়ে পড়তে হবে”। আমি কি এক কথায় মেনে নিতাম? মনে হয় না। তবে
আমার দুই বন্ধুকে দেখেছি, তাদের বাবা সরকারি অফিসার ছিলেন। তাঁদের প্রায়ই এক-দেড়
বছর অন্তর এক শহর থেকে অন্য শহরে ট্রান্সফার হয়ে যেত। সেই সঙ্গে আমার ওই বন্ধুদের
স্কুলও এক শহর থেকে অন্য শহরে বদলে যেত। ওই বন্ধুরা দিন কয়েক খুব কান্নাকাটি করত,
আমরাও তাদের সঙ্গে গলা মেলাতাম। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সেই আবেগটা থিতিয়েও আসত
নির্বিঘ্নে।
এক রাত্রে বাম্বাইকে সব কথা খুলে বললাম। আমার গলা জড়িয়ে
ধরে, বাম্বাই মন দিয়ে সব কথা শুনল। কথাগুলো বলতে গিয়ে আমি নিজেই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে
উঠেছিলাম। চোখে জল এসে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমার গলা জড়িয়ে ধরে থাকা ঘুমন্ত
বাম্বাইয়ের এমন স্পর্শ আর কোনওদিনই হয়তো পাব না। রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের নিয়ম-কানুনে
বাঁধা পড়ে বাম্বাই একলা একলা বড়ো হয়ে উঠতে থাকবে, স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। তখন হয়তো
মায়ের সঙ্গে একত্র শুতেও ওর অস্বস্তি হবে। গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকা তো অনেক দূরের কথা।
যাই হোক আমার সব কথা শুনে বাম্বাইয়ের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া
দেখলাম না, শুধু জিজ্ঞেস করল, “কবে যেতে হবে মা?”
আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে ওর চুলে
হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “ক্লাস ফাইভের মাঝ সেশনে নিশ্চয়ই সম্ভব হবে না, ধরে নে
ক্লাস সিক্সের শুরু থেকে...”।
একথার পর বাম্বাই নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল, এবং অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি এতই বিস্মিত হলাম, সে আর বলার কথা নয়। মনে হল বাম্বাইয়ের ছোট্ট মনটা কি পাথর দিয়ে গড়া? ওর মা, দিদিমা, দাদু, ওর স্কুলের বন্ধুরা, এই ঘরবাড়ি, এই পাড়া – সব কিছু ছেড়ে ওকে চলে যেতে হবে বুঝেও ও এত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল কী ভাবে? ওর এই নিষ্ঠুর উদাসীনতার কথা ভেবে ভেবে – হ্যাঁ সুনুদা, সে রাত্রে আমার ওই কথাটাই মনে হয়েছিল। আমিই কেঁদে ভাসালাম সারা রাত, ও নিশ্চিন্তে ঘুমালো। বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে ভোরে উঠে যখন নিজের জন্যে এক কাপ চা করে আনলাম, বাম্বাইয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে, নিজের মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম, “বাচ্চা ছেলে, সারাদিন স্কুলে লেখাপড়া – দৌড়োদৌড়ি খেলাধুলো করে ক্লান্ত তাই হয়তো... সকালে ঘুম ভেঙে উঠে কাল রাত্তিরের কথা মনে পড়লেই... নিশ্চয়ই বলবে, না মা, আমি কখনও যাবো না, তোমাকে ছেড়ে...”।
চলবে...