প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯"
৩০
স্নেহের
সুকন্যা,
পর পর চারটে চিঠিই পড়লাম। প্রথম তিনটি চিঠিতে তোর জীবনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মাখা দিনগুলির কথা পড়তে পড়তে মনটা বড়ো বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিল। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম বারবার। প্রাত্যহিক নৈকট্য না থাকলেও, কলকাতায় যখনই এসেছি আমি তো তোর এবং তোদের সকলের আশেপাশেই ছিলাম। তোর একক লড়াইয়ের চিত্রগুলি আমার যে চোখে পড়েনি, এমন কথা বললে চরম মিথ্যাই বলা হবে। কিন্তু কী এক অদ্ভূত অহংকারী মায়ায় নিজেকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলাম, ভাবলে আজ আমার মাথা হেঁট হয়ে আসছে লজ্জায়। দেখেও না দেখার ভান করেছি। কিছু কিছু বুঝেও – আরও গভীরে বোঝার প্রয়াস করিনি নির্মম উদাসীনতায়। পাঁচ-সাতদিনের জন্যে কলকাতায় গিয়ে কিছু কিছু উপদেশ এবং অনেক হাসি-ঠাট্টা-ফাজলামি দিয়ে ভুলিয়ে রাখা বসন্তের মধুকণ্ঠ কোকিলের মতোই ছিল আমার আচরণ। তোর লড়াইয়ের নিত্য সঙ্গী হয়ে বাস্তবের কর্কশ বায়স হয়ে উঠতে চাইনি।
বিগত
কয়েকমাসের ঘনিষ্ঠতায়, তোর কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে কখনো কখনো উপস্থিত হয়েছি আমি।
কিন্তু ওই তিনটি চিঠি পড়ার পর নিজেকে চূড়ান্ত মতলববাজ আর ধান্দাবাজ মনে হচ্ছে,
বিশ্বাস কর। বহুদিন আগে জীবনসঙ্গিনী রূপে তোকে আমি পেতে চেয়েছিলাম যখন, আমাকে তুই
প্রত্যাখ্যান করেছিলি। তার জন্যে মনে মনে ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, অভিমান
করেছিলাম। পৃথিবীর সমস্ত মেয়েদের প্রতিই আমার মনে একধরণের তুচ্ছতা এসে গিয়েছিল।
মনে হয়েছিল প্রকৃত ভালোবাসার মর্ম বোঝার মত গভীর মনোভাব মেয়েদের থাকতে নেই। তারা
সর্বদাই সস্তা- চটকদার জিনিষের প্রতি নিবিষ্ট থাকতে ভালোবাসে। এক কথায় মহিলা জাতির
প্রতিই আমার কেমন যেন অনীহা উপস্থিত হয়েছিল।
তোর ওই
দুঃসহ সময়ে নিত্য পাশে ছিলেন যিনি, সেই শশাঙ্কবাবুকেও মনে হত – হাল্কা মনের মানুষ।
মেয়েদের প্রতি উদার সহায়তা বিলিয়ে তোর মন জয় করাতেই তার যেন যাবতীয় বাহাদুরি।
তাচ্ছিল্য করতাম তাঁকেও। মাঝে মধ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ যে আমার হয়নি তা নয়,
কিন্তু কোনদিনই তাঁকে মনে রাখার মতো আলাপ-পরিচয় করার বিষয়ে এতটুকু উৎসাহ খুঁজে
পাইনি আমার মনের গভীরে।
আজ তোর চিঠি
পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে, কী আশ্চর্য গভীর মানসিকতা নিয়েই না তিনি সেসময় তোর পাশে থেকেছেন
সর্বদা – সুখে-সম্পদে, দুঃখে-বিপদে। আমার মনের সেই সব সঙ্কীর্ণতা দূরে ঝেড়ে ফেলে
দিয়ে আজ আমি তোদের দুটিকে – তোর ও শশাঙ্কর দাম্পত্যকে সশ্রদ্ধ চিত্তে বরণ করে
নিলাম। তাঁর সমস্ত পিতৃত্ব দিয়ে তোর বাম্বাইকে তিনি যেভাবে নিজের বুকে টেনে
নিয়েছেন, অত দরাজ বক্ষ আমার কোনদিনই হবার নয়।
তোর জীবনের সঙ্কটময়
নানান ঘটনার কথা জেনে ও বুঝে, আজ তোদের ছোট্ট সুখী পরিবারটিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা
জানাই। আর আমার ঈর্ষা-জর্জরিত দৃষ্টি ও মনের বিষ-বাষ্প যেন কোন ভাবেই তোদের সংসারকে
স্পর্শ করতে না পারে – সেই কামনা করি সর্বান্তঃকরণে। আমার দায়-বোধহীন বন্ধ্যা
ভালোবাসার মোহ তোকে যেন কোনভাবেই গ্রাস না করে।
তোরা সক্কলে
আনন্দে থাকিস। খুব ভালো থাকিস। বাম্বাইকে আমার আশীর্বাদ জানাস।
তোর
সুনেত্র
দাদা।
গত পরশু অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সুকন্যার চিঠিগুলো পড়ছিল সুনেত্র। চিঠি পড়ার পর মাথার মধ্যে ভিড় করে এসেছিল নানান ভাবনা চিন্তা। বিছানায় শুয়েও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার উঠে সিগারেট ধরিয়ে সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়েই প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছিল সুনেত্রকে।
গতকাল
রাত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারত, কিন্তু হয়নি। কারণ গত দু’রাতের সুদীর্ঘ
চিন্তা-ভাবনার পর, ওপরের চিঠিটি সুকন্যাকে পাঠিয়ে প্রায় আড়াইটে নাগাদ, শুতে
গিয়েছিল সুনেত্র। এবং গতকাল রাতের ঘুমে আর কোন বিঘ্ন ঘটেনি।
আজ রবিবার
তার চেম্বার বন্ধ। আলস্য মাখা সকাল সাড়ে নটার দ্বিতীয় কাপের চায়ে প্রথম চুমুক
দিয়েই তার মনে হল, গত রাত্রে তার অমন গভীর ঘুমের কারণ কি? সে কারণ কি,
প্রত্যুত্তরে লেখা তার ওই চিঠিটা? নিজেকে অলীক এক সম্পর্কের মোহ-মায়া থেকে মুক্ত
করতে পেরেছে বলে? এবং তার বুনে চলা নিপুণ ও নিবিড় স্বপ্নজালে বদ্ধ হতে কনিকেও নিরন্তর
প্ররোচনা দেওয়া থেকে বিরত হওয়ার জন্যে?
চায়ের কাপটা
শেষ করে একটা সিগারেট ধরাল সুনেত্র এবং নিজেকে খুব তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট মনে হল। কি
সহজেই না সে শেষমেষ পারল – বহু বছর ধরে মনের মধ্যে লালন করে আসা এক স্বপ্নকে নিষ্প্রাণ
করে তুলতে। কিছুটা আত্মশ্লাঘাও অনুভব করল মনে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় তার বাগানে উজ্জ্বল
ফুটে থাকা নানা বর্ণের ফুলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, পৃথিবীটা বেশ সুন্দর।
এই মনে
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়ল, হলদিয়া আসার পথে তার বিগড়ে যাওয়া গাড়ির কারণে,
বহুদিন পর তার সঙ্গে কনির ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার পরের দিন সকাল সকাল বাড়ি ফিরে এমনই
চা খেতে খেতে তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা বড়ো সুন্দর।
সুনেত্রর
মনে হল, ঠিক কোন পৃথিবীটা তার কাছে সুন্দর? সেদিন কনিকে বহুদিন পরে ফিরে পাওয়া। বহুদিন
অবদমিত থাকা মনের বাসনা-কামনা পূরণের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে যাওয়া। সেদিনের সেই মানসিক
পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছিল, এতদিনে বুঝি জীবনের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হল। তাই সেদিন পৃথিবীটাকে
ভারী সুন্দর লেগেছিল।
আর আজ, সে
যখন কনির জীবনের সব সত্য জেনেছে। মেল লিখে কনির সামনে নিজের মুখোসটা খুলে ফেলে নিজের
নির্লজ্জ মুখটা সে মেলে দিয়েছে। নিজের মনটাকে সংযত করে উদাসীন হয়ে উঠতে পেরেছে। আজও
তার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা বেশ ভালোরকমের সুন্দর! আশ্চর্য না?
আসলে পৃথিবীটা
তার নিজের নিয়ম মতো বারো মাস ছয় ঋতুতে সর্বদাই সুন্দর থাকে। কিন্তু মানুষের মনোদৃষ্টির
কারণেই বদলে যায় তার সৌন্দর্য। অর্থাৎ সেদিন সুনেত্রর যে মনটা রোমান্টিসিজ্মের আগুনে
পুড়ছিল, আর আজ সেই মনের আগুনে জল ঢেলে দেওয়ার পরে, সে যখন নিঃস্ব - তাও সে দেখছে
পৃথিবীটা একই রকম সুন্দর! সুনেত্র কি সত্যিই সুন্দর দেখছে পৃথিবীটাকে? নাকি নিজের
মনকেই সে চোখ ঠারছে? এই যে সে ঢাকঢোল বাজিয়ে কনিকে নিয়ে তার সকল রোমান্টিক
স্বপ্নের গলায় ফাঁস জড়ালো, তাতে সত্যিই কি তার মন হার মেনে নিল? নাকি, মনের গোপন
কুঠিতে তার রোমান্টিসিজ্মকে অবদমিত রেখে, কনি এবং তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের চোখে সে
মহান হতে চাইল?
সুনেত্রর
অলস মস্তিষ্ক যখন তার এই মানসিক দ্বন্দ্বের মীমাংসায় নিমগ্ন, শম্পাদিদি এল চায়ের খালি
কাপটা তুলে নিতে। যাওয়ার সময় বলল, “মাসকাবারি কিছু জিনিষ ফুরিয়ে গিয়েছে, দাদা, আজ
একবার মার্কেটে যাবেন?”
সুনেত্র বাস্তবে
নেমে এল আচমকা, বলল, “ওঃ তাই? ফর্দ বানিয়েছ? তাহলে এখনই বেরিয়ে গিয়ে বাজারটা সেরে
আসি – ফর্দটা দাও দেখি”।
“সে দিচ্ছি।
কিন্তু এখনই যাবেন? না জলখাবার খেয়ে বেরোবেন? ফিরতে যদি দেরি হয়?”
“কত দেরি
হবে – ঘন্টাখানেক ম্যাক্সিমাম – এগারোটার মধ্যে চলে আসব”।
“রোববারগুলোতে
মার্কেটে বড্ডো ভিড় হয় কিন্তু”।
সুনেত্র
হাসল, বলল, “তা হোক, আজ ব্রেকফাস্টে কী খাওয়াবে গো, শম্পাদিদি?”
“তোমার
প্রিয় লুচি আর সুজির হালুয়া”। ভেতর থেকে ফর্দটা এনে সুনেত্রর হাতে দিতে দিতে শম্পাদিদি
বলল।
“ওঃ গ্রেট,
তাহলে ফিরে এসেই খাব - আরাম করে হাতে সময় নিয়ে”। বলতে বলতে সুনেত্র নিজের ঘরে গেল
জামা কাপড় বদলাতে।
অন্য রোববারের তুলনায় আজ ভিড়টা অনেকটাই বেশি ছিল। রবিনকে সঙ্গে নিয়ে সে যখন রাস্তার পার্কিংয়ে রাখা গাড়ির সামনে এল, ঘড়িতে তখন পৌনে বারোটা বাজছে। রবিন নামের ছেলেটি বসাকবাবুর দোকানে কাজ করে, বছর চোদ্দ-পনের বয়েস হবে বড়ো জোর। কেনাকাটার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে, বসাকবাবু ওকে পাঠান, গাড়িতে থলেগুলো তুলে দিয়ে আসতে।
ডিকি খুলে
দিতেই রবিন থলেদুটো ভেতরে রাখল, এবং সুনেত্র তার হাতে একশ টাকার একটা নোট গুঁজে
দিয়ে বলল, “টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নাও, রবিন, বাড়ির জন্যে কিছু...”। কোন কথা না বলে
মুখে অত্যন্ত মলিন একটু হাসি নিয়ে রবিন দৌড়ে ফিরে গেল ওদের দোকানের দিকে।
সেদিকে
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডিকি বন্ধ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। রবিনদের মতো
ছেলেদের জন্যে আগে তার বেশ কষ্ট হত, এখন আর হয় না। স্বাধীনতার পর প্রায় আশি বছর পার
হতে চলল, কত রকমের সরকার এল এবং গেল – বুর্জোয়া সরকার, সেকুলার-সমাজতান্ত্রিক সরকার,
মা-মাটি-মানুষের সরকার। রবিনদের মতো ছেলেদের অবস্থা দিন-কে-দিন আরো সঙ্গীন হয়ে
চলেছে। এই ছেলেগুলো সারাদিন কি কঠিন পরিশ্রম করে সেকথা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে
সুনেত্র। বসাকবাবু ক’টাকাই বা মাইনে দেয়? কিন্তু সেই টাকাকটার জন্যেই কত যে অপমান ওদের
সহ্য করতে হয়। আর চাকরি-হারানোর ভয়ে সর্বদা সিঁটিয়ে থাকতে তো হয়ই। লেখাপড়া নেই,
স্কুল নেই, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা নেই, বাবা-মায়ের কাছে দামি স্মার্টফোন
কিনে দেওয়ার বায়না নেই। সারাক্ষণ মোবাইলে চোখ রেখে ফেসবুক, হোয়াট্স্অ্যাপ, ইনস্টাগ্রামের
রিলস স্ক্রোল করে যাওয়া নেই। রবিনদের মতো ছেলেদের আছে শুধু অন্নচিন্তা ও ভবিষ্যৎহীন
অস্তিত্বরক্ষার দুশ্চিন্তা।
সিগারেটে
শেষ টান দিয়ে গাড়িতে উঠতে যাওয়ার মুহূর্তে, একদম তার পাশেই আচমকা ব্রেক মেরে
দাঁড়াল একটা অটো। অটো ড্রাইভার চেঁচিয়ে উঠল, “ওই তো ডাক্তারবাবু। স্যার, স্যার, এই
ছেলেটি আপনারই বাড়ি যাচ্ছে...”।
অটো ড্রাইভারকে
চিনতে পারল সুনেত্র, ভদ্রলোকের মা তার নিয়মিত পেশেন্ট। যদিও নামটা মনে করতে পারল
না। আর পিছনের যাত্রীটি পনের ষোল বছরের একটি ছেলে – একলা। মুখটা কোথায় যেন দেখেছে
সুনেত্র, চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক চিনতে পারছে না।
পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক নিয়ে ছেলেটি
অটো থেকে নেমেই সুনেত্রর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। সুনেত্র বেশ হতভম্ব হয়ে বলল,
“আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না, ভাই”।
ছেলেটি খুব সপ্রতিভভাবেই বলল, “আপনিই ডাক্তার সুনেত্র বসু তো?”
“হ্যাঁ। কিন্তু...”
“আমি সুধন্বা বসু। ডাক নাম বাম্বাই”। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুনেত্র। সুকন্যা দত্ত অথবা শশাঙ্ক মিত্রর পুত্র মিত্র নয়, দত্ত নয়, বসু হয়ে গেল কী করে? তার অন্তরে এখন আবেগের প্রবল স্রোত। সেই স্রোতের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যেতে লাগল সযত্নে বেঁধে রাখা তার মনের ঘাটখানা। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কিছু বলার আগেই, বাম্বাই আবার বলল, “দাঁড়াও, ভাড়াটা মিটিয়ে আসছি”।
চলবে...