রাঘব বোয়াল গল্পটি শারদীয়া একপর্ণিকা ওয়েবপত্রিকার নীচের লিংক থেকেও পড়ে নিতে পারেন সঙ্গে পাবেন অনেক লেখকের নানান স্বাদের গল্প।
১
দিন সাতেক আগে প্রফুল্লনগর থানার ছোটবাবু সুনন্দ হাজরার কানে একটা সংবাদ
এসেছে। খবরটা খুব মারাত্মক নয় ঠিকই –
তবে সন্দেহজনক তো বটেই। শশীপদ মণ্ডল নামে জনৈক ভদ্রলোক টাকা গোনার যন্ত্র কেনার
জন্যে খোঁজখবর করছে। শশীপদ একেবারেই যে সাধারণ লোক তা ঠিক নয় – ওপর মহলে তার একটু
চেনাজানা আছে। আর সেই সুবাদে নিজের পাড়ায় এবং এলাকায় সে একটু হাঁকডাক করে, হইচই
করে। অন্যের বিবাদে নাক গলিয়ে মাতব্বরি ফলানোর চেষ্টা করে। সে তো অনেকেই করে। তবে এখনো
পর্যন্ত সে এমন কিছু করেনি, যার জন্যে সে থানা-পুলিশের মাথা-ব্যথার কারণ হয়ে উঠবে।
ভদ্রলোক বেসরকারি অফিসে কাজকর্মও যা করে, তাতে মধ্যবিত্ত সংসারের মোটামুটি দিন
গুজরান হয়ে যায়। এ হেন শশীপদ মণ্ডল আচমকা টাকা গোনার মেশিন কেনার জন্যে হন্যে হয়ে
উঠল কেন? সে কি লটারির টাকা পেয়েছে? নাকি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে? কিন্তু গল্পে
উপন্যাসে যত গুপ্তধনের সংবাদ পাওয়া যায়, সে সব হয় মোহর বা রূপোর মুদ্রা কিংবা
হীরে, মণি, জহরত। স্বাধীন ভারতে সরকারী কারেন্সি নোটের গুপ্তধনের কথা কেউ কোনদিন
শুনেছে? সুনন্দবাবু তো শোনেননি।
এত ভাবনা চিন্তা না করে শশীপদবাবুকে ডেকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হয়।
সে কথা সুনন্দবাবু যে ভাবেননি তা নয়, তবে এখনই সে সব করার যুক্তিও তিনি খুঁজে
পাচ্ছেন না। কোন মানুষ উদ্ভট কিছু খুঁজলেই তাকে থানায় ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করাটা
কোন কাজের কথা নয়। কত লোক কত কী খোঁজে – আজকাল নেট হয়ে তো সে খোঁজখবর করারও সীমা
নেই। যে দীঘা বা দার্জিলিং বেড়াতে যেতেই অনেক ভাবনা চিন্তা করে, সে হয়তো নেটে
ইওরোপ-আমেরিকা বেড়ানোর খোঁজ নিচ্ছে। পোড়াবটতলার আশেপাশে দুকাঠা জমি কিনে বসতবাড়ি
করার যে স্বপ্ন দেখছে, সেই হয়তো কলকাতার নিউটাউনে বাংলো বা ভিলার দরদাম নিয়ে খুব
চিন্তিত। অতএব মাস গেলে নগদ মাইনে গুনতে যার মিনিট খানেকের বেশী সময় লাগে না, সে
যদি নোট গোনার মেশিনের খোঁজ করে, তাতে ক্ষতি কী হয়েছে? শশীপদবাবু হয়তো স্বপ্ন
দেখেন, একদিন তিনি প্রচুর টাকা করবেন এবং সেই বাণ্ডিল বাণ্ডিল টাকা হাতে গোনা
সম্ভব হবে না বলেই হয়তো, টাকা গোনার যন্ত্র খুঁজছেন!
তবু সুনন্দবাবুর মনে একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। তিনি তাঁর পরিচিত গুপ্তচরদের
বলে রেখেছেন ভদ্রলোককে নজরে রাখতে। তিনি কোথায় যান, কাজের বাইরে তিনি কার সঙ্গে
দেখা করেন। সকালে কটায় বাড়ি থেকে বের হন, রাত্রে কখন বাড়ি ফেরেন। যদিও তাঁর লোকদের
উপর তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে, কিন্তু সাত দিন হয়ে গেল তাঁর লোকজনেরা যে সংবাদ আনছে,
তাতে শশীপদবাবুর কোন আচরণই আপত্তিকর বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু অন্যদিকে তিনি খবর
পেয়েছেন, শশীপদবাবু অনলাইনে একটি টাকা গোনার যন্ত্রের অর্ডার দিয়েছিলেন, এবং গতকাল
তিনি সেটি রিসিভ করেছেন। বাড়িতে নয়, অফিসে।
অনলাইনের পার্সেল আসাতে অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল হওয়া
স্বাভাবিক। সহকর্মীরা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলেছেন, পার্সেলে কী আছে তিনি জানেন না,
হয়তো তাঁর মেয়ে কোন অর্ডার দিয়ে থাকবে। বাড়ি গিয়ে মেয়েকে দেবেন, সে পার্সেল খুলবে।
সহকর্মীরা কৌতূহল দমন করলেও, সুনন্দবাবুর কৌতূহল আরও বেড়েছে। শশীপদবাবুর কন্যা
ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, পুত্র সবে ক্লাস টুতে পড়ে। শশীপদবাবুর স্ত্রী সাদাসিধে সাধারণ
গৃহবধূ, বাবা-মা দুজনেই পুরোন দিনের মানুষ। তাঁদের কারও পক্ষে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে
জিনিষ কেনা সম্ভব নয়। অতএব শশীপদবাবুকে না জানিয়ে কোনও জিনিষ তাঁরা কী করে কিনলেন?
অবিশ্যি এমনও হতে পারে শশীপদবাবুর আত্মীয় বা কোন বন্ধু-বান্ধব, ওঁনার মেয়েকে কোন
গিফ্ট পাঠিয়েছে। যার কথা তিনি
জানেন না। কিন্তু সহকর্মীদের তিনি কেন বললেন, “হয়তো তাঁর মেয়ে কোন অর্ডার দিয়ে
থাকবে”? মেয়ের নামে মিথ্যে কথা বললেন কেন? সুনন্দবাবুর মনের খটকাটা আরও বেড়ে গেল।
কিন্তু খটকা দিয়ে তো আর কাউকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না। সুনন্দবাবু
তাঁর লোকজনদের বললেন, শশীবাবুর ওপরে দিন-রাত সর্বদা নজর রাখতে। আরও পাঁচদিন চলে গেল, কিন্তু সুনন্দবাবুর
লোকেরা তেমন কিছু হদিস করতে পারল না। তবে তাঁর কাছে আরেকটা রিপোর্ট এল, শশীবাবুর নিচের
তলার একটা ঘরে মাঝে মাঝে অনেকরাত অব্দি আলো জ্বলে – কিন্তু রাস্তার দিকের সবকটা জানালা
বন্ধ থাকার দরুন – সে ঘরে কে বা কারা কী করছে কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না।
এখানে শশীবাবুর বাড়ি সম্পর্কে দুচার কথা বললে বিষয়টা একটু পরিষ্কার হবে।
প্রফুল্লনগরের একটু বাইরে রাস্তার ধারে শশীবাবুর এই বাড়িটা বেশ পুরোন আমলের। তাঁর ঠাকুরদা
এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন। দোতলা বাড়ি। দোতলার তিনটে ঘরে শশীবাবুরা থাকেন। নিচের একটা
বসার ঘর, অন্য ঘরে খাওয়াদাওয়া করেন। রান্নাঘরও নিচে, বাথরুম-টয়লেট দুটো তলাতেই রয়েছে। নিচের আরেকটা
ঘর সর্বদা তালাবন্ধই থাকে। সে ঘরে যত রাজ্যের
পুরোন আর ভাঙাচোরা জিনিষপত্র থাকে। সেই ঘরের দরজার শিকলে এতদিন একটাই ছোট তালা লাগানো
থাকত, তার মানে সে ঘরে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। কিন্তু ইদানীং সেই দরজাতে -
এই দিন পনের হল, নতুন ও বড়ো বড়ো দুটো তালা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। একটা শিকলে, অন্যটা
দরজার কড়ায়। অর্থাৎ
ইদানীং সে ঘরের গুরুত্ব হঠাৎ করেই
বেড়ে গেছে। অবিশ্যি রাত্রে নিচের সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, দুটো তালা খুলে কে ঢুকছে,
কে বেরোচ্ছে – বাইরে থেকে দেখতে পাওয়ার কোন উপায় নেই।
শশীবাবুর নিচের ঘরের এই নতুন দুই তালার রহস্যের কথা সুনন্দবাবুর কানে তুলেছে
খবরের কাগজওয়ালা এবং দুধের প্যাকেটওয়ালা। ওরা রোজই সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ – যখন
সদর দরজা খোলা থাকে – দুধ আর কাগজ দিতে শশীবাবুর নিচের দালানে ঢোকে। অতএব সুনন্দবাবুর
সন্দেহ আরও বাড়ল। কিন্তু সে সন্দেহের নিরসন কী ভাবে হতে পারে – তাঁর মাথাতে কিছুতেই
আসছে না।
আরও দুদিন নজর রেখেও সুনন্দবাবু তেমন কিছু এগোতে না পেরে, ফোন করলেন, সরুদা অর্থাৎ সর্বজিৎকে। এই সর্বজিৎ
মানে সরুদাকে তোমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই – সেই যে টুম্পি আর রুন্টি-ঝুন্টির মাসতুতো দাদা। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ফোন
করে সুনন্দবাবু বললেন, “সর্বজিৎ, প্রফুল্লনগর থানা থেকে আমি সুনন্দ হাজরা বলছি, চিনতে
পারছো”?
[সরুদার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে এই ব্লগের এই গল্পগুলি পড়ে নিতে পারেন,
"ছোট্ট হওয়া" এবং "পেত-ন-তাৎ-তিক"]
“হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার নাম্বার তো আমার ফোনে সেভ করা আছে। কেমন আছেন, কাকু?”
“খবর ভালোই। কিন্তু তোমার কী খবর বলো। তুমি এখন রয়েছ কোথায় কানপুরে, কলকাতায়
নাকি প্রফুল্লনগরে”?
হেসে ফেলে সরুদা বলল, “আমি এখন কানপুরে রয়েছি, কাকু। এই স্নান করতে যাচ্ছি,
ব্রেকফাস্ট করে ক্লাসে যাবো”।
সুনন্দবাবু একটু হতাশ হয়ে বললেন, “অ। তার মানে তুমি এখন সময় দিতে পারবে
না”।
সরুদা বলল, “কোন সমস্যা হয়েছে নাকি কাকু? এক কাজ করছি, সকালের দুটো ক্লাসের
পর – আজ থার্ড পিরিয়ডটা আমাদের অফ আছে। আপনাকে আমি সে সময় ফোন করব, এই ধরুন এগারোটা
পাঁচ-দশ নাগাদ। ওই সময়ে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারব। ঠিক আছে, কাকু?”
সুনন্দবাবু বললেন, “ঠিক আছে, তাই করো, একটা ব্যাপারে তোমার একটু হেল্প চাই,
ভাই”।
ফোনটা কেটে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, মাত্র ঘন্টা তিনেকের তো ব্যাপার,
কিছু একটা উপায় বেরোবেই। এই ছেলেটির ওপর তাঁর ভরসা আছে।
২
সরুদার
সঙ্গে কথা বলার দিন চারেক পরে সুনন্দবাবু থানায় তাঁর চেম্বারে ঢুকতেই, হাবিলদার
সুখনরাম বলল, “স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে একজন অনেকক্ষণ বসে আছে। আমরা
জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে বলুন। কিছুতেই বলল না, বলল, ছোটবাবুর সঙ্গেই দেখা করতে
চাই”।
সুনন্দবাবু
বললেন, “কে? কী নাম কি?”
“আজ্ঞে, নাম বলল শশীপদ মণ্ডল, স্যার”।
বেশ অবাক হয়ে সুনন্দবাবু সুখনরামের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ,
তারপর বললেন, “পরিতোষকে একগ্লাস জল দিতে বল, আর ওই ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দাও”।
পরিতোষ আর শশীপদ একই সঙ্গে সুনন্দবাবুর চেম্বারে ঢুকল। সুনন্দবাবু
চোখের ইশারায় শশীবাবুকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন, তারপর পরিতোষের গ্লাসের জল শেষ
করে খালি গ্লাস ফেরত দিয়ে বললেন, “পরিতোষ, দরজার পর্দাটা টেনে দিয়ে যাও, আর দেখ এখন
কেউ যেন এ ঘরে না ঢোকে”।
পরিতোষ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে সুনন্দবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন,
“বলুন কী বলতে চান”।
শশীবাবু খুব ভয় পাওয়া স্বরে বলল, “আপনি তো সবই জানেন, স্যার”।
সুনন্দবাবু ধমকে উঠলেন, “কী জানি না জানি সে কথায় আপনার দরকার কি? কী
বলতে চান চটপট বলে ফেলুন”। সুনন্দবাবুর ধমকানিতে শশীবাবু আরেকটু ভড়কে গেল, হাতজোড়
করে বলল, “নমস্কার, স্যার। আমি শশীপদ মণ্ডল, স্যার। ইয়ে মানে, আমি, আরেকটু হলেই, একটা খারাপ কাজে
জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, স্যার। আপনার লোকরা ঠিক সময়ে আমাকে সতর্ক না করলে, আমার যে
কী হত, স্যার, ভগমানই জানেন”।
সুনন্দবাবু কিছু বললেন না, ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন শশীবাবুর দিকে।
ভয়ে শশীবাবুর পেটটা একটু গুরগুর করে উঠল, খুব মিয়োন গলায় বলল, “গত পরশু
রাতে, তখন কটা হবে, এই সাড়ে বারোটা পৌনে একটা, আমার ঘরে আমি কিছু কাজ করছিলাম,
হঠাৎ একজনের গলা শুনলাম। বিশ্বাস করুন স্যার, জানালা দরজা বন্ধ, কী করে আপনার
লোকটি ঘরে ঢুকল, জানি না। তাকে দেখতেও পাইনি, কিন্তু স্পষ্ট কথা শুনলাম। ভয়ে তো
আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার দশা”।
ভীষণ গম্ভীর স্বরে সুনন্দবাবু বললেন, “কী কথা?”
“মানে, ইয়ে আপনি সবই জানেন, তবু... লোকটি আমাকে বলল, ‘এত টাকা কোথা থেকে পেলেন,
শশীবাবু? আজ আপনার অফিসের মাইনে হল বুঝি? আপনাদের মাইনে মাসের শেষ দিকে হয়’? বাড়ির
সদর দরজা বন্ধ, ওই ঘরের দরজাতেও আমি খিল দিয়ে কাজ করছিলাম। সেখানে আমার পাশ থেকে
ওই কণ্ঠস্বর শুনে আমার তো সাংঘাতিক অবস্থা। আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, কে, কে? এ
ঘরে ঢুকলেন কী করে”?
লোকটি খুব শান্ত স্বরে ফিসফিস করে বলল। “আহা, চেঁচাচ্ছেন কেন? বাড়ির
লোকজন জেগে উঠে নেমে আসবে, সেটা কি ভাল হবে? তাঁরা, মানে আপনার স্ত্রী, মা, বাবা
আপনাকে মাঝরাতে বন্ধ ঘরে বসে এত এত টাকা গুনতে দেখলে... যাকগে, যা বলছি মন দিয়ে শুনুন,
থানার ছোটবাবু আমাদের পাঠিয়েছেন...”।
সুনন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ ‘আমাদের’ বলল? ওরা কজন ছিল?”
“কাউকে তো দেখতেই পাইনি, স্যার। কজন কী করে বলব? দুজন বা দশজন হলেই বা
ওদের আটকাবে কে?”
“ঠিক আছে, তারপর? ওরা কী বলল?”
“বলল, ‘এ টাকা আপনি যাঁর থেকে নিয়ে আসেন, আমরা তাঁকে চিনি। তিনি রাঘব
বোয়াল। অনেক জায়গা থেকে অনেক টাকার লেনদেন করেন তিনি। সে সব নগদ টাকার কিছু আপনার
জিম্মায় তিনি রাখতে দিচ্ছেন, দরকার মতো আবার নিয়ে নেবেন, তাই তো? ওঁনার মতো ব্যস্ত
মানুষের পক্ষে এত টাকা গোনা তো আর সম্ভব নয়, অতএব তিনি আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছেন
গুনে-গেঁথে হিসেব করে যত্ন করে রাখার জন্যে। আর আপনিও টাকা-গোনার যন্ত্র-টন্ত্র
কিনে একেবারে সেই দায় মাথায় তুলে নিয়েছেন, তাই না?’
আমি তো অবাক, স্যার। ওরা দেখি সব জানে! আমি আর অস্বীকার করি কী করে?
আমি বললাম, “হুঁ”।
ওরা বলল, “এখন কত গুনছেন?”
“মোটামুটি দশ লাখ হবে”।
“টাকা গোনার যন্ত্র থাকতে মোটামুটি কেন?”
“আজ্ঞে, উনি তাই বলেছেন। এখনও গোনা শেষ হয়নি কি না, তাই মোটামুটি
বললাম”।
“তা বেশ। এর আগে আজ পর্যন্ত কত পেয়েছেন?”
“আজ্ঞে ছত্রিশ লাখ পঁচাত্তর হাজার”।
“বলেন কি? আচ্ছা শশীবাবু, কথায় বলে দেওয়ালেরও কান আছে। আপনার এই ঘরে এত
এত নগদ টাকা জমাচ্ছেন, বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?”
“বিপদ মানে?”
“ধরুন, বজ্জাত লোকরা আপনার ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে সব টাকা লুঠ করে নিল।
আপনার সেই রাঘব-বোয়াল দাদা, আপনাকে ছেড়ে দেবে তো? কিংবা ধরুন পুলিশের লোক খবর পেয়ে
আপনার বাড়িতে হানা দিল। আপনার ঘর থেকে এত টাকা উদ্ধার হলে, আপনার রাঘব বোয়াল দাদা আপনাকে
বাঁচাবে তো? এত বেআইনি টাকার দায়ে আপনার তো জেল হয়ে যাবে শশীবাবু! আপনার ছেলেমেয়ে,
স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মা তাঁদের কী হবে? আর আপনি যদি বলেন এ টাকা আপনার নয়, আপনার
সেই দাদার – দাদার লোকেরা আপনাকে হয়তো লরির তলায় চাপা দিয়ে মেরেই ফেলবে...”।
শশীবাবুর চোখে এখন জল, মাথা নিচু করে রুমালে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ কান্না
সামলাল, তারপর চোখ মুছে ধরা ধরা গলায় বলল, “আপনি আমায় ভয়ানক এক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে
দিয়েছেন, স্যার। আমি পরের দিন সকালে উঠেই বড়দার বাড়ি গেলাম...”।
“বড়দা মানে – সেই রাঘব বোয়াল?”
“হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার... তাঁর কাছেই - তাঁকে গিয়ে বললাম, দাদা
পাড়ার লোকরা কিছু একটা সন্দেহ করেছে… নানা
রকম কথাবার্তা কানে আসছে…আমার বাড়িতে টাকা রাখা আর বোধ হয় নিরাপদ নয়…আপনি যত তাড়াতাড়ি
পারেন ওগুলো সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন”।
“আপনার বড়দা কিছু ব্যবস্থা করলেন কি?”
“হ্যাঁ স্যার, সেদিনই সকাল এগারোটা নাগাদ আমার বাড়িতে একটা মেটাডোর আর চারপাঁচজন
লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা আমার ঘর থেকে বেশ কিছু ভাঙাচোরা আসবাব আর পুরোনো লোহার আলমারিটা
নিয়ে চলে গেল। ওই আলমারিতেই সব ছিল, নগদ টাকা- টাকা গোনার মেশিন…সব”।
“ভালই হয়েছে। বড়ো একটা বিপদের থেকে খুব জোর বেঁচে গেছেন”।
“সে কথা আর বলতে, স্যার? আর মাঝের থেকে আমার নিচের ঘরের জঞ্জালগুলোও মোটামুটি
সাফ হয়ে গেছে। আমি এখন মুক্ত”।
“আপনি যে টাকা গুনেছিলেন, তার হিসেব কি দিয়ে দিয়েছেন?”
“হিসেব আর দেবো কী করে? পুরোটা তো গোনাই হল না”।
“হুঁ। আপনি এ কাজ আর করবেন না বলাতে আপনার দাদা কী বলল?”
“বললেন, আমি থাকতেও তুই ভয় পেয়ে গেলি রে, শশী? চেনাশোনা বিশ্বস্ত লোক
বলে তোকে ভরসা করেছিলাম। এখন দেখি কাকে আবার পাই। এত টাকা আমার বাড়িতে রাখা নিরাপদ
নয়। তাছাড়া যারা টাকা পাঠায় তারা ঠিকঠাক দিচ্ছে কিনা, সেটাও তো চেক করা দরকার। তোর
চেনাশোনা কেউ যদি থাকে, দেখিস তো। তবে সে যেন বেশ ডাকাবুকো লোক হয় - তোর মতো ভিতু
হলে চলবে না”।
“আচ্ছা? আপনি কী বললেন?”
“বললাম, বিশ্বাসী লোক হলে নিশ্চয়ই জানাবো দাদা”।
“আশা করি, ভবিষ্যতে এরকম ফাঁদে আর কখনো পা দেবেন না। বাড়ি যান – উটকো দুটো
পয়সার লোভে সংসারের শান্তি নষ্ট করবেন না”।
“না স্যার, খুব শিক্ষা হয়েছে আর ও পথে যাব না। আমি তবে আসি, স্যার”?
“না
দাঁড়ান। বসুন, চা খান। আমার আরও
কিছু কথা আছে”।
চা আসার পর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শশীবাবু বললেন, “একটা কথা জিগ্গেস
করব স্যার”।
সুনন্দবাবু আবার ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন, কিছু বললেন না।
“না ইয়ে মানে, আপনি বড়দার নাম জিজ্ঞাসা করলেন না তো”?
“শশীবাবু, দেওয়ালেরও কান থাকে – আপনার মুখ থেকে শুনতে গিয়ে – যদি সে নাম
পাঁচ কান হয়ে যায়? আপনার বড়দার নাম আমাদের জানতে বাকি নেই…”।
বিগলিত হেসে শশীপদবাবু বললেন, “সে তো বটেই স্যার। আরেকটা কথা - আপনার সেই
লোকদের কথা শুনলাম পষ্টো, কিন্তু দেখতে পেলাম না কেন? আর তাঁরা বন্ধ দরজা দিয়ে ঢুকলেনই
বা কী করে?”
খুব গম্ভীর গলায় সুনন্দবাবু বললেন, “তারা সব ভীষণ ট্রেনিং পাওয়া লোকজন –
আমরাও সবসময় তাদের হদিশ পাই না…। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। এবার আমার কিছু কাজ আপনাকে
করে দিতে হবে।
যে কাজের
কথা বলব, সে কথা আমরা দুজন ছাড়া অন্য কেউ যেন জানতে না পারে। পাঁচকান হলে কিন্তু
আপনিই ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবেন”।
“আপনি নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারেন স্যার, কাকপক্ষিও টের পাবে না”।
সুনন্দবাবু টেবিলের
ওপর ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে শশীবাবুর সঙ্গে গোপন কথাবার্তা শুরু করলেন। কিছুই শোনা
গেল না। মিনিট কুড়ি
পর, শশীবাবু
সুনন্দবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন।
৩
সুরেশ তোপদারকে এ তল্লাটের রাজাই বলা যায়। মাথায় তাঁর রাজমুকুটটাই যা নেই। সকালবেলায় তিনি তাঁর
বাড়ির সামনের বাগানে বসে এক পট চা খান। যে সে চা নয় – দার্জিলিংয়ের খাঁটি কুয়াশা মেশানো
চা। সকালের স্নিগ্ধ রোদ্দুরে, তিনি জানেন, বাগানের সবুজ ঘাস আর গাছপালা থেকে প্রচুর
অক্সিজেন বের হয়। তার সঙ্গে মেশে নানান ফুলের বিচিত্র সুবাস। আরাম কেদারায় বসে সকালটা
তিনি এভাবেই উপভোগ করেন। এরপর সারাদিন – সেই রাত দশটা, সাড়েদশটা অব্দি - তিনি চরম ব্যস্ত
থাকেন। এই অঞ্চলের নানান মঙ্গল ও উন্নয়নের কাজে। নানান রকমের মিটিং, সভা, সমাবেশ তো
সারাদিন লেগেই থাকে।
এই সময় কোন কাজের লোকের সঙ্গে তিনি দেখা করেন না। তাঁর দেহরক্ষী ও বাড়ির
পাহারাদারদের এই বিষয়ে তাঁর কড়া নির্দেশ আছে। তবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম যে একেবারেই
নেই তা নয়। যেমন কোন কোন দুঃস্থ, দীন-দুঃখী মানুষকে তিনি দেখা করার অনুমতি দেন। কারণ,
এই সময় কিছু দান-টান করলে, তিনি দেখেছেন, মনটা বেশ হাল্কা ফুরফুরে হয়ে যায়। নিজেকে বেশ “মহানুভব” মনে
হয়। যেমন,
কোন মেয়ের বিয়ের জন্যে হয়তো সেই মেয়েটির বাবার টাকার অভাব হচ্ছে। কিংবা কোন ছেলে বা
মেয়ে হয়তো তার অসুস্থ মা বা বাবার চিকিৎসার জন্যে টাকা যোগাড় করতে পারেনি। এরকম আর
কি। তাঁর কর্মসচিব অবিশ্যি সব দুঃখী লোককেই সুরেশবাবুর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়
না। তার আগে সে লোকটির সব কথা শোনে, তার বাড়িঘর, তার পরিবার সম্পর্কে খুঁটিয়ে সমস্ত
খবর নেয়। সেই সব জেনে কর্মসচিব যদি সন্তুষ্ট হয়, তবেই তার সুরেশবাবুর সঙ্গে দেখা করার
অনুমতি মেলে।
এই যেমন
আজ সকাল ছটা
নাগাদ ঢ্যাঙা রোগা চেহারার একজন লোক খুব কাঁচুমাচু মুখ করে সুরেশবাবুর বাড়ির মেনগেটে
উপস্থিত হল। পাহারদার দুজন গ্রামভারি গলায় হুঙ্কার দিল, “ক্যা মাংতা? ভাগো হিঁয়াসে”।
লোকটি হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে গেটের সামনেই বসে পড়ল। পাহারাদার দুজন বেজায় ঝামেলায়
পড়ল। তারা কিছুক্ষণ তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, কেন কাঁদছে জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু লোকটির
সেই একই উত্তর, ভেউ ভেউ করে কান্না। পাহারাদার দুজন গেটের পাশের গুমটি থেকে ফোন করল
কর্মসচিবকে। কর্মসচিব দীননাথবাবু ধীরেসুস্থে এগিয়ে এলেন মেন গেটের কাছে। তিনিও লোকটিকে
ধমকে বললেন, “এই যে শুনছেন, কী হয়েছে কি? সকাল বেলা এখানে কেন কাঁদতে এসেছেন? সরে যান
গেট থেকে, তা নইলে পুলিশ ডাকব”।
এবার লোকটি মুখতুলে তাকাল, দুচোখ বেয়ে তখনও তার জল ঝরছে। জোড়হাত করে লোকটি
কান্নাভেজা গলায় বলল, “বাবু আমার একটি মাত্র মেয়ে। সামনের ফাল্গুনে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
“সে তো খুব আনন্দের কথা। কিন্তু এখানে এসে সকাল সকাল মড়াকান্না জুড়লেন
কেন?”
লোকটি কান্নাভেজা গলায় যা বলল, তার সারাংশ হল, লোকটি মেয়ের শাড়ি, জামা,
সামান্য কিছু গয়না কেনার মতো টাকা যোগাড় করে ফেলেছে। সে টাকায় জামাইয়ের জন্যে
সোনার আংটি কেনাও হয়ে যাবে। যদিও পাত্রপক্ষের কোন দাবিদাওয়া নেই, কিন্তু তাদের
একটাই আবদার। বরযাত্রী আসবে পনের জন, তাদের যেন ঠিকঠাক সমাদর করা হয়। লোকটি তারপর
করুণ মিনতি নিয়ে বলল, তার নিজের আত্মীয়-কুটুম মিলে সত্তর-পঁচাত্তর জন হবে। তার ওপর
পনেরজন বরযাত্রী। সব মিলিয়ে এই আশি-নব্বুই জনের খাওয়ার আয়োজন করার মতো সংস্থান তার
কিছুতেই হচ্ছে না। বড়োবাবু যদি কিছু একটা সুরাহা করে দেন, চিরজীবনের মতো সে কৃতজ্ঞ
থাকবে। এবং যে ভাবেই হোক, বড়োবাবুর এই ঋণ সে ধীরে ধীরে শোধও করে দেবে”।
দীননাথবাবু লোকটির সবকথা শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার নাম কি? বাড়ি
কোথায়?”
লোকটি হাতজোড় করে বলল, “প্রতিপদ মণ্ডল। বাড়ি তেহাটা, গোবিন্দপুরে”।
নামটা শুনে দীননাথবাবুর মনে পড়ল, বড়োবাবু গতকাল সন্ধেতে এই লোকটির কথাই
বলেছিলেন। আজ সকালে দেখা করতে আসবে। দীননাথবাবু দারোয়ানদের গেট খুলে দিতে বলে,
প্রতিপদকে বললেন, “আপনি ভেতরে আসুন”।
সুরেশবাবুর সামনে প্রতিপদকে নিয়ে গিয়ে দীননাথবাবু নিচু হয়ে বললেন, “স্যার,
গতকাল সন্ধেয় যার কথা বলেছিলেন, সেই প্রতিপদবাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন”।
সুরেশবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে এক ঝাঁক পায়রার ওড়াউড়ি দেখছিলেন, চোখ
নামিয়ে প্রতিপদকে নিরীক্ষণ করে বললেন, “অ এই সেই প্রতিপদ মণ্ডল? আচ্ছা, তুমি এখন
যাও, দরকার পড়লে আমি ডাকব। দাঁড়িয়ে রইলে কেন প্রতিপদ, বসো”।
প্রতিপদ মাথা নিচু করে নমস্কার করল সুরেশবাবুকে, বলল, “আমি এই বেশ আছি,
বড়োবাবু। তবে আপনার আদেশ অমান্য করতেও সাহস হয় না...” বলে সে ঘাসের উপর উবু হয়ে
বসল।
“তোমার নাকি মেয়ের বিয়ের জন্যে কিছু টাকার ঘাটতি হচ্ছে? শশীবাবু আমায়
কাল ফোন করেছিল”।
“শশীবাবু আমাকে খুবই স্নেহ করেন, বিশ্বাসও করেন, বড়োবাবু। আমার দুঃখের
কথা শুনে বললেন, বড়োবাবুর দয়ার শরীর তাঁর কাছে সব কথা খুলে বল, তিনি কিছু একটা
সুরাহা করে দেবেন”।
প্রতিপদের কথায় সুরেশবাবু খুবই খুশি হলেন, বললেন, “শশী তোমাকে আর কিছু
বলেনি?”
“আজ্ঞে বলেছেন বৈকি। বলেছেন, আপনার গৃহে মা লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান। তাঁর কৃপা
নগদ টাকা হয়ে নেমে আসে আপনার এই বৈকুণ্ঠে। সেই বিপুল অর্থের কিছুদিনের সুরক্ষা আর হিসেব
রাখার দায়িত্ব পেলে আমার দুহিতার বিবাহটি সুসম্পন্ন হয়”।
প্রতিপদের চেহারাটা সুরেশবাবুর তেমন পছন্দ হয়নি। তবে তার বিনয়ী কথাবার্তায়
তিনি খুবই খুশি হলেন। মনে হল, এ লোককে দিয়ে তাঁর কাজ হবে। বেশ বুদ্ধিমান, কথাবার্তা
বলতে জানে এবং বিনয়ী। শশী বিশ্বাসী বটে কিন্তু একটু মাথামোটা আর ভিতু। শশীর থেকে সব কথা শুনেও,
লোকটি ভয় পায়নি, অতএব ধরে নেওয়া যায় লোকটির সাহসও আছে।
সুরেশবাবু যতক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে এসব চিন্তা করছিলেন, প্রতিপদ জোড় হাতে
ধৈর্য ধরে বসে রইল একই ভাবে। কিছুক্ষণ পর সুরেশবাবু বললেন, “দেখ, প্রতিপদ টাকার অঙ্কটা
একটু বেশিই। শশী আমাকে ফেরত দিয়েছে, ছেচল্লিশ লক্ষ পঁচাত্তর হাজার টাকা। গত দুদিনে
আমার কাছে আরও এসেছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। আমার লোক গিয়ে এই সমস্ত টাকাই তোমার বাড়িতে
পৌঁছে দেবে। টাকা গোনার মেশিনও দিয়ে আসবে। কিন্তু তোমার বাড়িতে নিরাপদ ঘর আছে তো? বুঝতেই
পারছো, এতগুলো টাকা”।
প্রতিপদ খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, “আজ্ঞে বড়োবাবু, আপনি আমার এখনকার অবস্থা
দেখে মনে হয় দুশ্চিন্তা করছেন। আমার ঠাকুরদা জমিদারবাবুর নায়েব ছিলেন এবং বিস্তর অর্থ
কামিয়েছিলেন। তিনিই আমাদের দোতলা দালান বাড়িটি বানিয়েছিলেন। সে বাড়ির নিচেয় একটি চোরা
কুঠুরি আছে। সে ঘরটির কথা বাইরের লোকজন তো দূরস্থান, আমার পরিবারেও তেমন কেউ জানে না।
ঘরটি আমার শোয়ার ঘরের লাগোয়া – ছোট্ট ঠাকুর ঘরের নিচে। সে ঘরের কথা জানেন আমার বাবা,
আর আমি”।
নিজের বাড়িতে এত টাকা জমিয়ে রাখা সুরেশবাবুর কাছে অতীব বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
তাঁর বাড়িতে হরেক লোকের আনাগোনা। সকলেই যে তাঁর শুভার্থী এমনও নয়। কার মনে কী আছে,
কবে কী বিপদ ঘটিয়ে দেয়। সেই দুশ্চিন্তা তাঁর মাথায় সর্বদাই ঘুরছে। প্রতিপদের কথার সবদিক
বিবেচনা করে তিনি বললেন, “প্রতিপদ আমার গাড়ি গিয়ে তোমার বাড়িতে সবকিছু পৌঁছে দিয়ে আসবে।
এখনই যাবে? নাকি পরে? কখন তোমার পক্ষে সুবিধে হয়?”
“আজ্ঞে আধঘন্টা বাদে যদি আপনার গাড়ি পাঠান”।
“তুমি গাড়িতে না গেলে তোমার বাড়ি চিনবে কী করে?”
“না, বড়োবাবু, আপনার গাড়ি এ তল্লাটে সবাই চেনে। সে গাড়ি আমার বাড়ির সামনে
গেলে, সবারই কৌতূহল হবে”। সুরেশবাবু বেশ আশ্চর্য হলেন প্রতিপদের বিচক্ষণতায়। জিজ্ঞাসা
করলেন, “তাহলে?”
“বুড়িমাতলার মোড়ে আপনার গাড়িটাকে একটু দাঁড়াতে বলবেন, চোখের নিমেষে আমি
পাচার করে দেব”।
সুরেশবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, “কিন্তু ওর পাশেই তো থানা!”
প্রতিপদ নিশ্চিন্ত মুখে বলল, “আজ মঙ্গলবার। বুড়িমায়ের কাছে পুজো দিতে যাওয়া
ভক্তদের আজ খুব ভিড় হয়। ওই ভিড়ে কার গাড়ি, কিসের গাড়ি, কোথাকার জিনিষ কোথায় যাচ্ছে,
কেউ লক্ষ্য করার আগেই, আমি কাজ সেরে ফেলব, বড়োবাবু। কিচ্ছু ভাববেন না”।
সুরেশবাবুর একটু দুশ্চিন্তা যে হচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু প্রতিপদের বিচক্ষণতার
দিকটা বিবেচনা করে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, “ঠিক আছে, ওই কথাই রইল। নীলরঙের ০০০২
নাম্বারের গাড়িটা আমার ড্রাইভার জেবর সিং নিয়ে যাবে। খুব বিশ্বাসী ছেলে। ওকে বলব, বুড়িমাতলায়
আটটাপাঁচ-দশ নাগাদ যেন পৌঁছে যায়”।
প্রতিপদ উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাতে নমস্কার করে বলল, “তাহলে এখন আমি আসি, বড়োবাবু?
আমাকে যেভাবে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করলেন, আপনার এই করুণার কথা আমি আমরণ ভুলতে…” প্রতিপদের
কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, চোখের কোলে জল জমে উঠল।
সুরেশবাবু গদ্গদ স্বরে বললেন, “ও ভাবে বলতে নেই, প্রতিপদ। করুণা করছেন ওপরওয়ালা,
আমি তো তাঁরই সেবক…আচ্ছা এসো তাহলে”?
৪
ড্রাইভার জেবর সিং বুড়িমাতলার মোড়ে নীল রঙের ০০০২ নাম্বারের গাড়িটা পৌঁছল
পাক্কা আটটা দশে। বিশাল ও প্রাচীন বটগাছের ঝুড়ি দিয়ে ঘেরা মায়ের প্রাকৃতিক মন্দির।
মায়ের প্রতিমা বলতে লালপাড় শাড়ি পরানো বেশ বড়োসড়ো একটি কালো পাথর। তার গায়ে তিনটি চোখ
আঁকা। ফুলের মালা, কুচো ফুল আর তেলসিঁদুরে মায়ের মূর্তি আজ প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। আজ
মঙ্গলবার বলে ভক্ত সমাগমও হয়েছে বিস্তর। গোটা রাস্তাটিই ভক্তজনেরা অধিকার করে রেখেছেন।
বক্সে গমগম করে গান বাজছে, “জয় জগদম্বে মাতা…”।
নীলগাড়িটা এসে দাঁড়াতেই চারজন ভক্ত গাড়িটা ঘিরে দাঁড়াল। ডানপাশের একজন জানালায়
টোকা মেরে ইশারায় বলল, গাড়ির কাচ নামান। জেবর সিং গাড়ির কাচ আধখানা নামিয়ে জিজ্ঞাসা
করল, “কি হয়েছে?”
ডানপাশের লোকটি একটু ধমকের সুরে বলল, “হবে আবার কী? গাড়ির দরজা খোল”।
জেবর সিং বিপদের গন্ধ পেয়ে বলল, “কেন? এটা সুরেশস্যারের গাড়ি, পুজো দিতে
এসেছি”।
ডানপাশের লোকটি নিমেষের মধ্যে একটি রিভলবার হাতের আড়ালে ধরে, খুব বিনয়ী
সুরে বলল, “হতভাগা সেই জন্যেই তো বলছি, দরজাগুলো খোল। আমরাও পুজো দেব। বুড়িমা রক্তপাত
একদম পছন্দ করেন না। জানিস তো?”
জেবর সিং রিভলবার দেখে কিছু বলতে পারল না। গাড়ির লক খুলে দিল, এবং চারজন
লোক চটপট উঠে পড়ল গাড়ির ভেতর। ড্রাইভারের পাশে এসে যে লোকটি বসল, সে বলল, “গাড়ি স্টার্ট
কর। তার আগে তোর মোবাইল ফোনটা দিয়ে দে। কটা ফোন তোর - একটা না দুটো?” জেবর সিং দুটো
ফোন ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিতে ভদ্রলোক বললেন, “নে গাড়ি স্টার্ট কর…সুরেশস্যার ড্রাইভারদের
কত মাইনে দেয় রে? দু-দুখানা স্মার্টফোন! পুলিশে চাকরি করে আমাদের একটা ফোন…”।
ভিড়ের মধ্যে হর্ন দিতে দিতে নীল গাড়িটা খুব ধীরে ধীরে মোড়টা পেরিয়ে এল।
পাশের ভদ্রলোকটি বললেন, “থানা চিনিস তো? থানার মধ্যে ঢুকিয়ে দে গাড়িটা”।
থানার কম্পাউণ্ডের মধ্যে ঢুকতেই। ড্রাইভারের পাশের লোকটি গাড়ির চাবিটা খুলে
নিল, তারপর চারজন একসঙ্গে ঝটপট নেমে, জেবর সিংকে টেনে গাড়ি থেকে নামাল।
জেবর সিং তেমন বাধা না দিলেও প্রতিবাদ করে বলল, “লেকিন হামারা কসুর কেয়া
হ্যায়”?
পেছন থেকে একজন ভদ্রলোক বলল, “হতভাগা, অসুর বলছে মেরা কসুর ক্যা হ্যায়
– পালাবার বা কোনরকম বাঁদরামি করার চেষ্টাও করিস না। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবি”।
ছোটবাবু সুনন্দ হাজরা থানার বারান্দা থেকে নিচেয় নেমে এলেন, জেবর সিংকে
দেখলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “এটাকে ঝটপট লকআপে ভরে গাড়ি খালি করো। টাকার ব্যাগগুলো
ভল্টে রেখে, চলো তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। এটা তো মোটে পুঁটি – রাঘব বোয়ালটাকে ধরতে হবে”।
জেবর সিংকে লক আপে ভরে এবং টাকার ব্যাগ থানার ভল্টে রেখে, সকলে আবার বেরিয়ে
এলেন। বড়ো ভ্যান গাড়িতে চারজন অফিসার এবং চারজন হাবিলদারকে নিয়ে, সামনের সিটে বসলেন
সুনন্দ হাজরা। গাড়ি স্টার্ট হতেই, সুনন্দবাবুর ফোন বাজল। সর্বজিতের ফোন। কানেক্ট করে
সুনন্দবাবু বললেন, “বলো, আমি একটু ব্যস্ত”।
“জানি তো, রাঘব বোয়ালটাকে ধরতে যাচ্ছেন। ভাববেন না, বাড়িতেই আছে, এখনও কিছু
টের পায়নি”।
“কিন্তু তুমি কী করে টের পেলে?”
“সে আপনি জানেন কাকু। আমার ছেলেরা বদমাস লোকের সন্ধান পেলে, সহজে ছাড়ে না।
তবে আজ সকালে রাঘবোয়ালের সামনে আপনি ছদ্মবেশে যা অভিনয় করেছেন শুনলাম…শুনে আমি আপনার
ভক্ত হয়ে উঠেছি”।
“তাই? শুনে খুশি হলাম। কিন্তু তুমি কি সারাক্ষণ আমার পেছনে তোমার সেই ছেলেদের
লাগিয়ে রেখেছ?”
“না, না। রাঘববোয়ালটা ধরা পড়লেই ওরা সরে যাবে। গুড লাক, কাকু। রাখছি”।
“থ্যংক ইউ ভাই”। সুনন্দবাবুর ফোনটা
অফ করে মৃদু হাসলেন, এরকম সাহায্য পেলে দেশের সব বদমাসকে তিনি অচিরেই শায়েস্তা করতে
পারবেন। সুরেশবাবুর বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্যানটা তীব্র হর্ন দিল। তারপর ভ্যান
থেকে সদলবলে নেমে, সুনন্দবাবুরা নিজেরাই মেনগেট খুলে ঢুকে পড়লেন সুরেশ তোপদারের বাড়িতে।
--০০--