প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৮"
২৯
সুনুদা,
ইতি বাম্বাই”।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর তাঁর কথা শুনে আমি বেশ খুশিই
হলাম। অনেকদিন পর মাকে বেশ স্বাভাবিক লাগল। মায়ের সেই রুক্ষ-খিটখিটে মেজাজটা তখন
অনেকটাই শান্ত। বাম্বাইয়ের চিঠিটা বুকের কাছে ধরে, আমি আমার ঘরের দিকে যেতে যেতে
হেসে বলেছিলাম, “বেশ তো এবার তিন বোতল দিও, দিয়ে আসব”।
“কবে যাবি তুই?”
“তিন মাস পর”।
“তিন মাস? সে তো অনেক দেরি। কেন সামনের হপ্তায় শনি-রবি করে
যেতে পারবি না? ছেলেটার ওপর তোর কি একটুও টান নেই? কেমন মা তুই, সুনু?” মায়ের স্বর
আগের মতোই আবার কর্কশ হয়ে উঠল।
আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, “এটা স্কুলের নিয়ম, মা। আমার কিছু
করার নেই। বাড়ির লোকরা বারবার গেলে বাচ্চাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ভেবেই, ওরা
এই নিয়ম বানিয়েছে”।
মা বুঝলেন না, উল্টে আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রয়োজন মত ছেলের
সঙ্গে মা দেখা করতে যেতে পারবে না? আর মা বুঝি বাড়ির লোক? কী যে বলিস সুনু, তোর
মাথা-ফাথা খারাপ হয়েছে মনে হয়”।
আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে
চিঠিটা দু হাতে মেলে ধরলাম। মনে হল, বাম্বাইয়ের দুটো হাত যেন আমার দু হাতের মুঠোয়।
টেবিলে বসে ঘাড় নীচু করে চিঠিটা যে হাতে লিখেছে, সেই হাতেরই স্পর্শ আমি যেন পেলাম ওর
চিঠির প্রতিটি অক্ষরে। কিন্তু প্রতিটি অক্ষর কেমন ঝাপসা ঠেকল আমার দু চোখে। এমন
অসময়েই কি আমার দুচোখে ভরে উঠতে হয় অশ্রুবিন্দুতে? মাথার বালিশের তলায় চিঠিটা রেখে
দিলাম। ফ্রেশ হয়ে বাইরের জামা-কাপড় বদলে চলে গেলাম বাবার পাশটিতে। বাবা চোখ তুলে
তাকালেন, তাঁর মুখটা হাসির প্রচেষ্টায় কিছুটা বেঁকে গেল। খুব শান্ত স্বরে বললেন,
“ছেলেটা ভালই আছে, বল?”
রাত্রে খাওয়ার দাওয়ার পর নিজের ঘরে যখন শুতে গেলাম, বালিশের
তলা থেকে নিশ্চিন্তে বের করলাম বাম্বাইয়ের চিঠিটা। খুব মন দিয়ে পড়লাম চিঠিটা।
আগেকার বাংলা সিনেমায় যেমন দেখাত, চিঠির মধ্যেই ফুটে উঠত লেখকের মুখ এবং তিনিই
সুন্দর আবৃত্তি করে পড়ে দিতেন চিঠিটা। আমার মনে হল, আমিও সেরকম পোস্টকার্ডের মধ্যে
দেখতে পাচ্ছিলাম বাম্বাইয়ের মুখখানি এবং সেই যেন পড়ে শোনাল চিঠিটা। অনেকবার পড়লাম
চিঠিটা – এবং ওই ছোট্ট চিঠিতেও যেন খুঁজে পেলাম ওর জীবনের কিছু কিছু পরিবর্তনের
শুভ সূচনা। ওর অঙ্কের স্যার সদাশিববাবুকে ও ভালবেসে ফেলেছে – তিনি শুধু যে ভালো
পড়ান তাই নয়, অঙ্ক ঠিকঠাক পারলে, খাতায় “ভেরিগুড” লিখে ছাত্রদের উৎসাহও দেন। ওর নতুন
বন্ধুদের সঙ্গেও বাম্বাই অনেকটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছে। তা নাহলে ওর আচারে তারা
নির্দ্বিধায় ভাগ বসাত না। চিঠিটা বারবার পড়েও তৃপ্তি হচ্ছিল না কিছুতেই। মনে
হচ্ছিল, চিঠিটার বিটুইন দ্য লাইন্স্ অনেক কিছু বোঝার আছে, উপলব্ধির আছে। সেই
অর্থ বুঝতে বুঝতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানতেও পারিনি।
সকালে ঘুম যখন ভাঙল, নিজেকে খুব চাঙ্গা আর হাল্কা অনুভব
করলাম। এমন গভীর ঘুম কত দিন যে ঘুমোইনি। আমার শরীরে ও মনে বাম্বাইয়ের ওই ছোট্ট
চিঠিটাই যে নতুন এনার্জি সঞ্চার করেছে, বেশ বুঝতে পারলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে,
বাম্বাইয়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর না দিলে, ও যদি অভিমান করে,
ভাবে, “মা কি এতই ব্যস্ত যে আমার চিঠির উত্তর দিতে পারল না?” আমার যে এমন চিঠি অনেক
অনেক চাই, প্রতি সপ্তাহে, অন্ততঃ একটা! অতএব নিজের স্বার্থেই আমার যে বিলম্বে
উত্তর দেওয়া চলবে না।
অফিসে গিয়েই আমাদের অফিসের পিওন রতনদাকে চিঠিটা পোস্ট করতে
পাঠালাম। পাড়ার ডাকবাক্সে নয়, সবথেকে কাছের পোস্ট-অফিসের মেলবক্সে।
তারপর আমাদের এইচআরের রজতকে ডাকলাম। তাকে বললাম, যে
ক্যুরিয়ার সার্ভিসে আমাদের রেগুলার চিঠিপত্র যায়, তাদের কি কার্সিয়াংয়েও সার্ভিস
আছে? জেনে নাও তো ভাই। আর যদি থাকে, তারা কি কাচের বোতলে আচার পাঠালে ডেলিভারি করতে
পারে? যদি না পারে, তাহলে অন্য উপায় কিছু আছে কি?
রজত খুব স্মার্ট ছেলে, এতটুকু চিন্তা না করে উত্তর দিল,
“ক্যুরিয়রের সঙ্গে কথা আমি বলে নিচ্ছি। কিন্তু তার থেকেও তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবে
ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস সার্ভিস। আজ বিকেলে ধর্মতলায় পার্সেল ডেলিভারি দিলে,
আগামীকাল বিকেলের মধ্যে কার্সিয়াং পোঁছে যাবে নিশ্চিন্তে”।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস
করেছিলাম, “এরকম হয় নাকি?”
রজত মুখে বোদ্ধার
মতো হাসি নিয়ে বলেছিল, “এই তো করছি আমরা, ম্যাডাম। উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, নর্থ
বেঙ্গল, আপটু গুয়াহাটি - বাস সার্ভিসের মতো প্রম্পট আর হেল্পফুল সার্ভিস আর কিছু
হয় না”।
যাই হোক ওই
ব্যবস্থাতেই বাম্বাই ও তার বন্ধুরা, দিদিমার আচারের স্বাদ পেতে লাগল নিয়মিত এবং মা
তাঁর নাতির জন্যে কিছু একটা করতে পেরে বেশ খুশিই হয়ে উঠলেন।
হোটেলে
লটবহর রেখে আমরা স্কুলে গিয়ে যখন দেখা করলাম, সাড়ে চারটে বাজে - তখনও সূর্য অস্ত
যায়নি। বিকেলের রোদে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতায় মোড়া চারপাশের পাহাড়ের চূড়াগুলো আশ্চর্য
সুন্দর। আর নীচের পাইন বন থেকে উঠে আসছে হালকা কুয়াশা। আমাদের গায়ে হাল্কা সোয়েটার
ছিল, শিরশিরে বাতাসের স্পর্শে পাচ্ছিলাম শীতলতার আমেজ। মাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“জায়গাটা কেমন লাগছে, মা?”
মুগ্ধ চোখে
চারদিক দেখতে দেখতে মা বললেন, “এ তো স্বর্গ রে। ভাল করেছিস, তুই বাম্বাইসোনাকে
এখানে পাঠিয়ে। আমি ভেবেছিলাম, জেলখানায় কয়েদিদের মতো বন্দী বুঝি”।
অ্যাডমিন
অফিসের সামনের লনের দুধ সাদা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে মিনিট পনের অপেক্ষার পরই
বাম্বাইয়ের গলা পেলাম – “মা...দিদিমা...”। দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। কলকাতায় থাকতে
কেমন যেন চুপচাপ, ভীতুভীতু হয়ে থাকত বাম্বাই। তিনমাসের অদর্শনে আমার তৃষিত
মাতৃত্বের চোখ দুটো যেন সার্থক হয়ে উঠেছিল সেদিন। কি প্রাণোচ্ছল, আর উজ্জ্বল হয়ে
উঠেছে ছেলেটা। সঙ্কোচহীন আনন্দ ওর দুই চোখে। কাছে এসে আমাদের দুজনকেই জড়িয়ে ধরল। মা
তো ওকে নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। চুমো খাচ্ছিলেন, আদর করছিলেন, অনর্গল বলছিলেন
“আমার সোনাবাবাটা, আমার সোনাবাবাটা। এই তিনমাসেই কত বড়ো হয়ে গেছে আমার বাবাটা”।
সে সময়
মামিমার কথা মনে পড়ছিল খুব। মামিমা না বললে এবং তিনি আমার বাবার দেখভালের দায়িত্ব
না নিলে, মাকে সঙ্গে আনার কথাটা আমার মাথাতেই আসত না। আর এখন আমি দুচোখ ভরে দেখছি –
মা আর তাঁর নাতির প্রাণখোলা আনন্দের প্রকাশ। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলাম আর
ভাবছিলাম। কার্সিয়াংয়ের এই সন্ধ্যেয় সুন্দর সবুজ লনের বেঞ্চে বসে আছি আমরা তিন
প্রজন্ম। মাঝের প্রজন্মের এই আমি – অন্য দুই প্রজন্মের আলাপ শুনে খুশিতে আনন্দে
অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। বাম্বাইকে দেখে ভালো লাগছিল তো বটেই, ভালো লাগছিল মাকে দেখেও।
বহুদিন ঘড়ি ধরে স্বামীর সেবা, পথ্য, ওষুধ-পত্র নিয়ে ডুবে থাকা মা, অতি শীর্ণ নদীর
মতোই নিষ্প্রাণ প্রাণটাকে বয়ে চলেছিলেন নিঃশব্দে। আজ সেই নদীতেই দুকূল ভাসানো আবেগ
মাখা প্রাণবন্ত জোয়ার।
কোথা দিয়ে
যে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বোঝাই গেল না। অফিস থেকে একজন মহিলা আমাদের ডেকে
বললেন, “টাইম ইজ আপ। ছটা বেজে গেছে। সুধন্বা তোমার রুমে চলে যাও। আপনারা কালকেও
রয়েছেন তো?”
আমি বললাম,
“কাল তো রোববার, কাল কি সুধন্বাকে নিয়ে আমরা দার্জিলিং শহরটা ঘুরে আসতে পারি?”
“নিশ্চয়ই পারেন
– কিন্তু সকাল নটা থেকে সন্ধ্যে ছটা। ছটা পনের পর্যন্ত না ফিরলে কিন্তু
প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে রিপোর্ট চলে যাবে। তাতে নেক্সট ভিজিটের সময় আপনাদেরই
অসুবিধে হবে”।
আমি বিনীতভাবে প্রমিস করলাম, “ছটার আগেই আমরা সুধন্বকে নিয়ে ফিরে আসব ম্যাডাম”।
সত্যি বলতে,
সুনুদা, এই কবছরে বাম্বাইয়ের জন্যে কার্সিয়াং গিয়েছি বহুবার। এরকম দেখা করতে।
কিংবা ওর স্কুলের ভেকেশনের সময় ওকে বাড়ি আনতে। বহুবার। কিন্তু সেই প্রথমবারে যে আনন্দ আর আশ্চর্য এক স্বস্তির আস্বাদ পেয়েছিলাম, পরে আর কোনদিন অনুভব করিনি। মাত্র
ওই কয়েকটা দিন আমার জীবন-স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। থেকেও যাবে আমৃত্যু।
সমপরিমাণ দুঃখ আর সুখ মিলিয়ে-মিশিয়ে গড়ে নিতে হয় আমাদের জীবনের সবটুকু, আজ এই কথাটা বুঝে গিয়েছে,
তোমার কনি।
চলবে...