মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪০"


৪৬

 

সকলেই বাইরে এল। ভোরের আলো ফুটছে – পাখিদের ডাকে টের পাওয়া যাচ্ছে সকালের আগমনী।  কমলিমা দাওয়ায় বসলেন। তাঁর কোলের কাছে বসল ভুটিক আর পাশে বসল, সুরমা আর পালি। ছেলেদের সঙ্গেই বসল কবিরাজ বড়্‌বলা। কমলিমা বললেন, “সবাই মিলে চেঁচামেচি না করে একজন কেউ বল, কী রাজ্য জয় তোরা করে এলি”।

“শুরুটা তাহলে আমিই করি”, আহোক বলল, “দক্ষিণ-পূর্ব কোনের স্তম্ভে আমি ছিলাম – অতএব শুরুটা আমি সবটাই দেখেছি”। ছেলেরা কেউ কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল আহোকের মুখের দিকে।

“ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, ওরা চারজন – ভল্লাদাদা, সুরুল, মইলি আর রামালি – পূবদিকের দরজার উল্টোদিকে ঝোপের ভেতর ঘাপটি দিয়ে বসল। ওদের সঙ্গে আমি ছিলাম, কিশনা ছিল আর গোলোকদাদা ছিল…”

“গোলোকদাদাটি আবার কে? কোথা থেকে জুটল”? কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো জানিনা জেঠিমা। ভল্লাদাদার বন্ধু এইটুকুই জানি”।

“ঠিক আছে বল”।

“কথা ছিল, গোলোকদাদা স্তম্ভের ওপরে থাকা প্রহরীদের মারলেই, আমি আর কিশনা চটপট সেই স্তম্ভে উঠে চারদিকের পরিস্থিতি দেখে সংকেত দেব। তারপর ভল্লাদারা ভেতরে ঢুকবে। আমি উঠে গেলাম দক্ষিণপূর্ব স্তম্ভে, কিশনাও নির্বিঘ্নে উত্তর-পূর্ব স্তম্ভে চড়ে পড়ল। আমি উঠে দেখলাম, ওখানে মাত্র চারজন প্রহরী রয়েছে – অথচ আমাদের কাছে নিশ্চিত সংবাদ ছিল, ওই দরজার কাছে ছজন থাকে। একটু  সন্দেহ হলেও আমি সংকেত দিলাম – এবং ওপর থেকে ভল্লা ছুঁড়ে এক জনকে, শেষ করলাম। ভল্লাদাদারা শেষ করল দরজার সামনের দুজনকে। বাকি একজন বিপদ বুঝে রক্ষীদের ঘরের দেওয়ালের দিকে সরে গিয়েছিল, তাকে মারল কিশনা। এরপর ভল্লাদাদারা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখল, দরজায় তালা নেই – আলগা ভেজানো। ওরা ভেতরে ঢুকে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল। আমাদের সন্দেহ হল – রক্ষীদের দুজন হয়তো বাইরে গিয়েছে…এখনই ফিরে আসবে। হলও তাই – একটু পরেই দেখলাম একজন রক্ষী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছে। ভল্লাদাদাদের হাতেই তার মরণ হল। প্রায় একই সময়ে অন্য আরেকজন বেরিয়ে এল রক্ষীদের ঘরের প্রথম দরজাটা দিয়ে এবং সে ব্যাটাও মারা পড়ল সঙ্গে সঙ্গে”।

এরপরের ঘটনাগুলো আমি দেখতে পাইনি, দেখেছে কিশনা। ও ভাল বলতে পারবে”।

 

এবার সকলে কিশনার মুখের দিকে উদ্গ্রীব হয়ে তাকাল। কিশনা বলল, “আমাদের প্রথম লক্ষ্যটা নির্বিঘ্নেই শেষ হল, এবং আমরা ওপর থেকে দেখলাম ভল্লাদাদারা নিঃশব্দে – কী বলব – একদম বেড়ালের মতো দ্রুত গতিতে পূব আর উত্তরের গলির মধ্যে দৌড়ে সবকটা ঘরের শেকল তুলে দিল। তারপরের লক্ষ্য উপানুর ঘর। মইলি উপানুর অভিসার ঘরের দরজায় টোকা দিল দুবার”।

“অভিসার ঘর মানে?” কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আস্থানে অভিসারের ব্যবস্থাও আছে নাকি”!

কথাটা বলে ফেলে কিশনা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সকলের সামনে জ্যেঠিমাকে কী করে সে বলবে উপানুর জঘন্য কীর্তির কথা। তাই বলা যায় নাকি?

কিশনা বলল, “সে বড়ো নোংরা কথা। আমি তোমায় বলতে পারব না, জেঠিমা। ভল্লাদাদার থেকে জেনে নিও। এখন যা হয়েছে সে কথা বলি শোনো - ভেতর থেকে উপানুর সাড়া পেতেই – মইলি পিছিয়ে এল – রামালি আর সুরুল অস্ত্র হাতে দাঁড়াল দরজার দুপাশে আর ভল্লাদা রইল – উল্টোদিকের বাগানের ঝোপের আড়ালে।

দরজা খুলে ব্যাটা বেরোল, ওর কথা কানে এল, “কী হয়েছে - এত রা…” কথা শেষ করতে পারল না, সুরুল বল্লমের ফলাটা সজোরে বিঁধিয়ে দিল হতভাগার মুখের ভেতর – তারপর সুরুল বল্লমটা টেনে নিতে উপানুর মুখ ছেৎরে গেল। পরিকল্পনার সময় ভল্লাদাদা বলেছিল, উপানু অভিজ্ঞ রক্ষী আর ব্যাটার শক্তিও ভয়ংকর। বললে বিশ্বাস করবে না জেঠিমা…ওই অবস্থাতেও উপানু ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল – আহত পশুর মতো চিৎকার করে দৌড়ে চলল দক্ষিণ দিকে। তার চিৎকার শুনে পশ্চিমের দরজার দুই রক্ষী ধেয়ে এল – তাদের একজন ভল্লাদাদার ভল্লর আঘাতে ছিটকে পড়ল – আর অন্যজনকে ভল্ল ছুঁড়ে শেষ করল সুরুল। কিন্তু তার আগেই দ্বিতীয় রক্ষীটা হাতের ভল্ল ছুঁড়ে মেরেছিল মইলির দিকে। সেই দেখে রামালি একধাক্কায় সরিয়ে দিল মইলিকে আর লাফিয়ে উঠে ওর বল্লমের ফলায় গেঁথে নিল উপানুর মাথা – উপানু মরল। কিন্তু দ্বিতীয় রক্ষীর ছোঁড়া ভল্লটা মইলির দাবনার একটা পাশ ছিঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। রামালি যদি ওই মোক্ষম সময়ে মইলিকে ধাক্কাটা না দিত – হয়তো মইলির বুকেই বিঁধত ভল্লটা। খুব জোর বেঁচে গেছে মইলি”।

সকলেই রুদ্ধশ্বাসে কিশনার কথা শুনছিল, কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর?”

লোহার দরজা ঠেলে এই সময়েই ভেতরে এল দুজন। সম্পৎ আর দেবান। সম্পৎ আর দেবানের কাঁধে খাটুলা। দুজনেই অবসন্ন, ক্লান্ত এবং ক্লিষ্ট।

কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন উদ্বেগে, বললেন, “আমাদের কেউ কি মারা গেছে, সম্পৎ? কে… কে মারা গেল?”

সম্পৎ আর দেবান উত্তর দিল না, সাবধানে খাটুলা নামাল বাঁধানো দাওয়ায়। মৃতদেহ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সবাই। আহোক আর কিশনার বর্ণনায় শ্রোতারা যে আনন্দ ও উত্তেজনায় এতক্ষণ মগ্ন ছিল – তারাও এখন ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে রইল শবদেহ ঘিরে।  

 

 

একটু পরে শবদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের ভিড়ের মধ্যে পথ কেটে ভেতরে এল ভল্লা, সুরুল আর রামালি। ভল্লা কাছে এসে কবিরাজমশাইয়ের দেহটার পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল, বলল, “পারলাম না, রে মা। কবিরাজমশাইকে গ্রামে ফিরিয়ে আনার জন্যেই আমাদের এত দিনের আয়োজন, সে সব বৃথা হয়ে গেল”।

কমলিমায়ের দু চোখেও এখন অশ্রুর প্লাবন, বললেন, “কী করে এমন হল? ওদের রক্ষীরাই কি…”।

সুরুল বলল, “ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, আস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভের রক্ষীকে গোলোকদাদা ভল্লা ছুঁড়ে মারল – অন্য স্তম্ভের রক্ষীরা কেউ পড়েনি – কিন্তু ওই ব্যাটা ওপর থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল বন্দীশালার চালে। বিকট শব্দে টালি ভেঙে নীচেয় পড়ল রক্ষীর হুমদো দেহটা। তখন কি আর জানতাম – ওই ঘরেই বন্দী আছেন কবিরাজমশাই? বাইরের অন্য রক্ষীদের শেষ করে, আমরা বন্দীশালায় ঢুকলাম। খুঁজতে খুঁজতে ওঁনাকে পেলাম ভাঙাচোরা টালি আর ওই রক্ষীর মৃতদেহের নীচে। সে সব সরিয়ে ওঁনাকে যখন বের করলাম…উনি আর নেই…”।

কমলিমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “ভল্লা কাঁদিস না। ওঠ - ওঁনার সৎকারের ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে তো”।

কান্নাভাঙা হতাশ চোখে ভল্লা তাকাল কমলিমায়ের দিকে, বলল, “তা তো করতেই হবে। ওঁনাকে প্রথমে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাই, মা। তারপর গ্রামের লোকেরাই ওঁর উচিৎ মতো সৎকারের ব্যবস্থা করবেন”।

সুরুল বলল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাবো ভল্লাদাদা। যাবার সময় আমাদের গ্রাম হয়ে যাবো – আমাদের সকলের কাছেও উনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন”।

ভল্লা বলল, “চল, কিন্তু সবার যাওয়ার দরকার নেই – আমরা পাঁচ-ছজন গেলেই হবে। তার আগে সবাই কালো ধুতি ছেড়ে নিজেদের ধুতি পরে নে। মুখের কালিঝুলি ধুয়ে নে। সকাল হয়ে গেছে, এই চেহারা নিয়ে বাইরে বেরোন যাবে না। যারা যারা যাবি – চটপট প্রস্তুত হয়ে নে। ওরা কেমন আছে মা, মইলি, দীপান, বিশুন”।

বড়্‌বলা বলল, “চিন্তা করার কিছু নেই, ভল্লাদাদা, ওরা ভালোই আছে – ঘুমের ওষুধ দিয়েছি – ঘুমোচ্ছে।   তোমাদের সঙ্গে আমিও এখন চলে যাই ভল্লাদাদা। আজকে আমার আর কোন কাজ নেই, কাল একটু বেলা করে আসব। ক্ষত পরিষ্কার করে, নতুন প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে যাবো”।

ভল্লা বলল, “ঠিক আছে চলো। আমিও ততক্ষণ কালিঝুলি ধুয়ে ধড়া-চূড়ো বদলে নিই”।


চলবে...



সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৭"]


৫.৫.৫ হরি-হর

খ্রীষ্টপূর্ব শেষ শতাব্দী এবং পরবর্তী দুই শতাব্দীতে আমরা হিন্দু ধর্মের ভাগবত এবং শৈব দুই শাখারই সুস্পষ্ট অস্তিত্ব দেখেছি।  ভাগবত শাখার প্রধান দেবতা বিষ্ণু, যাঁর আরেক নাম হরি। এবং শৈব শাখার প্রধান দেবতা শিব, যাঁর আরেক নাম হর। প্রাথমিক পর্যায়ে এই দুই শাখার মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও কিছুটা রেষারেষি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতার আভাস পাওয়া যায় পুরাণগুলিতে। যেমন বিষ্ণু-মহিমার পুরাণগুলিতে, বিষ্ণুকেই পরমব্রহ্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং অন্যান্যরা তাঁর তুলনায় কিছুটা হলেও গৌণ।

যেমন শ্রীমদ্ভাগবতের সৃষ্টিতত্ত্বে বলা হয়েছে, যখন এই বিশ্ব একার্ণব[1] জলে নিমগ্ন ছিল, সেই সময় শ্রীনারায়ণ[2] অনন্তশয্যায় যোগনিদ্রায় শুয়ে ছিলেন। তাঁর এই যোগনিদ্রার অর্থ, তাঁর চিৎ-শক্তি মায়া বিরহিত হয়ে, স্বরূপানন্দে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বিরাজ করছিল। যোগনিদ্রায় সহস্র চতুর্যুগ পরিমিত কাল পার হওয়ার পর কালশক্তির প্রভাবে তিনি সৃষ্টিক্রিয়ায় নিযুক্ত হলেন। প্রলয়ের সময় সমস্ত লোকসকল সূক্ষ্মভাবে তাঁর শরীরেই লীন হয়ে থাকে, এখন সেই সূক্ষ্মতত্ত্ব তাঁর নাভি থেকে পদ্মকোষের আকারে উঠে এল। সেই পদ্মকোষেই আবির্ভাব হল বেদময় ব্রহ্মার। তিনি সেই পদ্মাসনে বসে, চতুর্মুখে চারদিক নিরীক্ষণ করেও কোন ভুবন বা জগৎ দেখতে পেলেন না। তিনি বিস্মিত হয়ে চিন্তা করলেন, এই পদ্মের কোথা থেকে সৃষ্টি হল? তিনি বহু কাল অন্বেষণ করেও, এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি সেই পদ্মাসনে যোগসমাধিতে প্রবৃত্ত হলেন।

দীর্ঘ শত বৎসর পর তাঁর যোগ সম্পন্ন হলে, তিনি নিজের হৃদয়ে উপলব্ধি করলেন, এক পুরুষ শেষনাগের শয্যায় এবং অনন্তনাগের সহস্রফণার আচ্ছাদনে, প্রলয়-জলের উপরে শুয়ে আছেন। তাঁরই নাভি থেকে সৃষ্ট পদ্মের উপর তিনি বসে আছেন। এবার ব্রহ্মা তাঁকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন এবং বুঝতে পারলেন ভগবান হরির লোকসৃষ্টির ইচ্ছাতেই, এই নাভিপদ্ম এবং তিনি সৃষ্ট হয়েছেন। ব্রহ্মা এবার একনিষ্ঠ মনে ভগবানের স্তব শুরু করলেন। দীর্ঘ তপস্যার পর, প্রকৃতি ও পুরুষের অধিপতি পদ্মনাভ শ্রীহরি, ব্রহ্মাকে সৃষ্টির তত্ত্ব সকল বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন, “তুমি আমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছ, অতএব তুমিও জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তির আধার। তুমি সর্ববেদময়। অতএব পূর্বকল্পের মতো সমগ্র ত্রিলোক, যা এখন আমার মধ্যেই নিহিত আছে, সেই সব আবার সৃজন কর এবং প্রকাশ কর”। এরপর পদ্মনাভ ভগবান শ্রী নারায়ণ রূপে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (শ্রীমদ্ভাগবত/৮, ৯)।

শিব-মহিমা বর্ণিত লিঙ্গপুরাণের কাহিনী মূলতঃ একই, কিন্তু সেখানে অদ্ভূত এক মোচড় আছে, সেটাই লক্ষ্য করার বিষয়। সেখানে বলা হয়েছে, পাদ্ম-কল্পের শুরুতে এই জগৎ অতি ভয়ংকর ও অন্ধকারময় বিভাগশূণ্য একার্ণব ছিল। সেই একার্ণব জগতে একমাত্র প্রভু হরি সহস্রফণাবিশিষ্ট অনন্তনাগের দেহ-শয্যায় অনির্বচনীয় যোগ আশ্রয় করে শুয়ে ছিলেন। অনন্তশয্যায় শয়ান জগৎকারণ বিষ্ণু খেলাচ্ছলে নিজের নাভিদেশে একটি পুষ্কর সৃষ্টি করলেন, সেই পদ্ম শতযোজন বিস্তীর্ণ। এই সময় সেখানে উপস্থিত হলেন চতুর্মুখ ব্রহ্মা, তিনি সুগন্ধি দিব্যপদ্ম নিয়ে খেলায় নিরত দিব্য পুরুষকে দেখে বিস্মিত হলেন, এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সৌম্য, আপনি কে? জলের মধ্যে অনন্ত শয্যায় শুয়ে আছেন কেন?” তখন বিস্মিত ভগবান অচ্যুত হরি শয্যা থেকে উঠে বসলেন এবং বললেন, “আমি জগন্নিবাস, প্রতি কল্পেই আমার এই আশ্রয়। আমিই স্বর্গ ও পৃথিবী; আমিই পৃথিবীর পরমস্থান। কিন্তু তুমি কে? তুমি কোথা থেকে আমার কাছে এলে, যাবেই বা কোথায়? তোমার আশ্রয় কোথায়?” ভগবান হরি এই কথা বলায়, পিতামহ তাঁকে বললেন, “শম্ভুর মায়ায় মুগ্ধ হয়ে আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, আপনিও আমায় চিনতে পারেননি। আপনি যেমন সৃষ্টিকর্তা ও প্রজাপতি, আমিও তেমনই সৃষ্টিকর্তা ও প্রজাপতি”।

দুজনের এই রকম নানান কথোপকথনের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হলেন শূলপাণি মহাদেব, তিনি অনন্তশয্যার কাছে উপস্থিত হলেন। তাঁর পায়ের আঘাতে সমুদ্রের বিক্ষিপ্ত জলকণা হয়ে উঠল মেঘ, স্থির বাতাসও হয়ে উঠল চঞ্চল বহমান। ভগবান ভবকে সামনে দেখে বিষ্ণু বললেন, “আপনার পদভারে সমুদ্রের জল থেকে আকাশমণ্ডলে জলধর সৃষ্টি হয়েছে। ঘ্রাণজ-বায়ু স্পন্দিত হয়ে উঠেছে। আপনি অনাদি অন্তকৃৎ[3] ও প্রভু, আপনিই ঈশ্বর। আমি আপনার স্তব ও উপাসনা করি। আপনিই মহাযোগের ইন্ধন, আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম ও বরদাতা, এই জগতের হেতু। আপনি পুরাণপুরুষ ও অব্যয়। আপনিই বীজবান, ব্রহ্মাই বীজ, আমি যোনি ও সনাতন”। বিষ্ণুর এই স্তববাক্য শুনে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যোনি, আমি বীজ, মহেশ্বর বীজবান– এই বিষয়ে আমার সংশয় হচ্ছে, হে বিষ্ণু, তুমি আমার সংশয় দূর কর”। বিষ্ণু বললেন, “আত্মা দুই প্রকার – নির্গুণ ও সগুণ, এর মধ্যে নির্গুণ আত্মা অব্যক্ত এবং সগুণ আত্মাই মহেশ্বর। হে ব্রহ্মা, মহেশ্বরের লিঙ্গ থেকে উৎপন্ন প্রথম বীজ তুমি। বীজস্বরূপ তুমিই আমার যোনিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, কালপর্যায়ে হিরণ্ময় অণ্ড জন্ম নিয়েছিল। জলের মধ্যেই অধিষ্ঠিত সেই অণ্ড সহস্র বছর পর দুইভাগে বিভক্ত হল, উপরের খণ্ড হল স্বর্গ, এবং অন্য খণ্ড হল পৃথিবী। এইভাবেই জগতের সৃষ্টি সম্পাদন হয়”। (লিঙ্গপুরাণ/২০)

দুই পুরাণের সৃষ্টি কাহিনী থেকে স্পষ্টতঃই অনুমান করা যায়,

১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের রচনাকাল লিঙ্গপুরাণের অনেকটাই আগে। ভাগবত পুরাণের সৃষ্টিতত্ত্বে বিষ্ণুই পরমেশ্বর, ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ সৃষ্টিকর্তা। মহেশ্বরের কোন উল্লেখই নেই। লিঙ্গপুরাণ যখন রচনা করা হয়েছিল, সেসময় আগের পুরাণটি যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচারিত হয়ে গেছে। সে কারণেই লিঙ্গপুরাণের পুরাণকারকে, ভাগবত পুরাণের বিষ্ণু ও ব্রহ্মার কাহিনী-কাঠামোর মধ্যে মহেশ্বরকে অনুপ্রবেশ করাতে হয়েছে।

২.  লিঙ্গপুরাণ রচনার আগেই বিষ্ণু পুরুষোত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন, অতএব লিঙ্গপুরাণে সেই বিষ্ণুকে দিয়েই বলাতে হয়েছে, মহেশ্বর পুরুষোত্তম এবং বিষ্ণু ও ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ।

অতএব এমত পরিস্থিতিতে সমাজে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভাগবতদের সঙ্গে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া শৈবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘটতে থাকা খুবই স্বাভাবিক। এই কারণেই এই পর্যায়ের শৈবরা বেশ কয়েকবার ভয়ংকর আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন এবং সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে তাঁদের “রুদ্র-ভৈরব”-আতঙ্কের একটা আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে অজস্র অসুর, দৈত্য, রাক্ষস, নর নিধনের কাহিনী থাকা সত্ত্বেও, মানুষের মনে কোনদিনই তাঁর যোদ্ধা ইমেজ গড়ে ওঠেনি, অথচ গুটিকয়েক অসুর নিধন করে, মহেশ্বর রূদ্র যোদ্ধারূপে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। অতএব বুঝতে অসুবিধে হয় না, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেতে ভাগবতদের তুলনায় শৈবদের অনেকবেশি আগ্রাসী হতে হয়েছিল, সেই স্মৃতিই সাধারণের মনে শিবের রুদ্ররূপটি গেঁথে দিয়েছে। 

যদিচ হরি ও  হর ভক্ত গোষ্ঠীদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সম্ভবতঃ কোনদিনই ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ছোটখাটো বিবাদ ও সংঘর্ষের ঘটনা লেগেই থাকত। যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বের অবসান করেছিলেন যুগপুরুষ শঙ্করাচার্য। মূলতঃ তাঁর প্রচেষ্টাতেই হরি ও হর প্রায় অভিন্ন দেবতা হরি-হর আত্মারূপে হিন্দু ভক্তদের মনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনিই হিন্দুধর্মের গঠন সম্পূর্ণ এবং সম্পন্ন করলেন, যার মূল তত্ত্ব আজও হিন্দু সমাজে একইভাবে প্রবহমান। সেকথা সংক্ষেপে আসবে একটু পরেই।



[1] একার্ণব–এক+অর্ণব - গোটা পৃথিবী একটিমাত্র সমুদ্রের জলে ডুবে ছিল।

[2] নারায়ণ – নার মানে জল, আর অয়ণ মানে আশ্রয় – একার্ণব জলের মধ্যে তিনিই একমাত্র আশ্রয় বলে, তাঁর নাম নারায়ণ।

[3] অন্তকৃৎ - অন্তকারক, নাশক । “অনাদি অন্তকৃৎ” - যাঁর শুরু নেই অথচ যিনি প্রলয়কারী বিনাশক – অর্থাৎ ভগবান মহাদেব।

চলবে...

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

খুঁজে ফিরি - পর্ব ১

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



অন্যান্য রম্য রচনা - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


১

১৯৮৪ সালের একটা ডেট মনে করার চেষ্টা করে চলেছি বেশ কয়েকদিন। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না দেখে কড়া নাড়লাম, উইকির দরজায়। উইকি বাড়ি আছো? সাড়া পেলাম, এবং উইকি বলল, 

“১৯৮৪ সালে এই দেশে আমাদের মনে রাখার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল।

১২ই মার্চ – আজকের সুগায়িকা অত্যন্ত জনপ্রিয়া শ্রেয়া ঘোষালের জন্মদিন, আজ প্রায় বছর কুড়ি ধরে যিনি আপামর ভারতীয় সঙ্গীতরসিকের হৃদয়ে বিরাজ করছেন।

২রা এপ্রিল - স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মার মহাকাশ যাত্রা।

২৩শে মে – শ্রীমতি বাচেন্দ্রি পাল প্রথম ভারতীয় মহিলা অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেছিলেন।

৪ঠা জুন – ভারতীয় সেনা অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার শুরু করেছিল।

৭ই জুলাই – দূরদর্শনে অশোককুমার অভিনীত “হামলোগ” সিরিয়াল শুরু হয়েছিল। বেশ কয়েকবছর ধরে একটানা চলা এই সিরিয়ালটি সে সময় ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

৮ই আগস্ট – মাত্র ১/১০০ সেকেণ্ড পিছিয়ে থাকার জন্যে পি টি ঊষাকে অলিম্পিকের মেডেল হারাতে হয়েছিল।

২৪শে আগস্ট – ভারতে প্রথম ৩ডি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, মালায়লী ভাষায় ছোটদের জন্যে বানানো এই সিনেমার নাম - My Dear Kuttichathan।

২৪শে অক্টোবর – ভারত তো বটেই, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মেট্রো রেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতায়, ভবানীপুর থেকে এসপ্ল্যানেড।

২৭শে অক্টোবর – ভারতের অন্যতম সেরা পেস বোলার ইরফান পাঠানের জন্মদিন। বড় হয়ে ওই তরুণ ইরফান বল করতে এলে বহু বিরোধীপক্ষীয় ব্যাটারের মুখ শুকিয়ে যেতে।   

৩১শে অক্টোবর – নিজেরই দুই নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে নিহত হলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছিল শিখ নিধন যজ্ঞের বীভৎস তাণ্ডব।  

৩রা ডিসেম্বর – ভূপাল গ্যাস-লিক ট্র্যাজেডি – ইউনিয়ন কার্বাইডে মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস লিক হওয়ার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়া ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া।

 কিন্তু যে তারিখটি আমি খুঁজছিলাম সেটা পেলাম না। সঠিক তারিখের সন্ধান না পেলেও, এটা স্বীকার করতে কোন বাধা নেই – এই বছরটি আমাদের দেশের পক্ষে – সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে আমাদের ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া জগতের পক্ষেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার মতো ম্যাংগো-মানুষের কথা উইকির স্মরণ করার দায় থাকতে পারে না। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পরিসরে এই বছরটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমার পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব অপরিসীম।

প্রথমটি হল আমার কর্মজীবনে প্রথম রাখা। সম্ভবতঃ তারিখটি ছিল ১৯৮৪-র ২৩ বা ২৪শে ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ইন্টারভিউ দেওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হাতে পেয়েছিলাম আমার নিয়োগপত্রটি। সেই অনুভূতি আজও আমার মনে অম্লান। এরপর আমার জয়েনিং ডেট ছিল পয়লা মার্চ, ১৯৮৪ – সেদিনটাও আমার কাছে ছিল এক আশ্চর্য স্বপ্নপূরণের দিন।

আর দ্বিতীয়টি হল আমার মাতৃবিয়োগ – ৪ঠা ডিসেম্বর সকালে নিত্যপূজা সেরে নিজের জন্যে এক কাপ চা বানাতে গিয়ে তিনি কেরোসিন স্টোভ বার্স্ট করে দগ্ধ হয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তাঁকে পিজি হসপিট্যালে ভর্তি করানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাক্তারদের মতামত ছিল – মোর দ্যান ৮৫% বার্ন ইনজুরি, এক ঈশ্বর ছাড়া এ মানুষকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। দুদিন পর ৬ই ডিসেম্বর, তিনি বিকেলের দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যুর অভিঘাত আজও আমি বহন করে চলেছি প্রতি নিয়ত। জীবনের অজস্র সাফল্য, আনন্দ কিংবা আনুকূল্যের দিনে তাঁর অনুপস্থিতি যেমন অনুভব করেছি। তেমনই জীবনের প্রতিটি ব্যর্থ, বেদনা এবং প্রবঞ্চনার দিনে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে করেছি, তুমি যদি থাকতে....”।

প্রতিটি দিন গুনতে গুনতে আজ এগিয়ে চলেছি মহামুক্তির দিকে। কিন্তু যাওয়ার আগে আজ এটুকু বুঝেছি - মন্দিরের দেববিগ্রহে ঈশ্বর থাকেন না, কোনদিনই ছিলেন না। তিনি আমাদেরই পাশে থাকেন - মাতৃ ও পিতৃরূপে - কখনো প্রকাশ্যে কখনো অন্তরে।

চলবে...


শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৫

  প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৪"


২৫ 

সুনুদা, 

তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? বিগত কয়েকদিন ধরে সময় পেলেই তোমাকে পাতার পর পাতা মেল লিখে চলেছি। তার কোন উত্তর বা মন্তব্য দিচ্ছ না? তুমি যে মেলগুলো পড়ছো, কিংবা পড়ছো না, সেটাই তো বুঝতে পারছি না, ছাতার মাথা। নাকি আমার জীবনের সুদীর্ঘ দুঃখের কথা, যাকে সাদা বাংলায় ভ্যাজর-ভ্যাজর করা বলে, তোমার পড়তে ভালো লাগছে না? বোর হচ্ছো? সে কথাটাও তো স্পষ্ট করে বলে দিতে পারো, তাহলে অকারণ এত সময় নষ্ট করতাম না।

কলকাতায় ফিরে আজ অনেকদিন পর অফিসে যেতে হয়েছিল। একটু কাজের চাপও ছিল অফিসে। একটু আগে অফিস থেকে ফিরে ডিনার সারলাম। ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবলাম মেলটা চেক করি – তুমি যদি কিছু লিখে থাকো।

ঘোড়ার ডিম - দেখলাম, কিছুই লেখনি।

ঘুম পাচ্ছে খুব। 

কনি।

 রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ মেলটা খুলে সুনেত্র সুকন্যার ছোট্ট মেলটা পড়ে বেশ হতাশ হল, আবার একটু মজাও পেল। কদিন ধরেই হৃদয় খুঁড়ে নিজের জীবনের লড়াইয়ের ইতিহাস লিখে চলেছে কনি। এত কথা একসঙ্গে সামনাসামনি বসে বলার বা শোনার অবসর দুজনের কারো হত কিনা সন্দেহ। তাছাড়া সামনে বসে এভাবে মন খুলে সব কথা বলাও শক্ত হয়ে ওঠে। মনে দ্বিধা আসে, সঙ্কোচ আসে। সেদিক থেকে যদিও চিঠির কোন বিকল্প নেই, তবুও এই চিঠি চালাচালির মধ্যে কিছুটা যেন প্রতিবন্ধীতা আছে। সামনাসামানি আলাপে - কথা শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে 'হুঁ', 'হ্যাঁ' অথবা 'তাইতো' ধরনের কিছু শব্দ প্রয়োগ করে বক্তাকে জানান দেওয়া যায় যে, সে শুনছে। অন্যমনস্ক থেকেও! কিন্তু মেলে বা চিঠিতে - 'হুঁ' বা 'হ্যাঁ' লিখে উত্তর দেওয়াটা বড় বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে বৈকি। মেলের উত্তরে একটু বেশিই কথা বলতে হবে - তাতে ছিন্ন হয়ে যেতে পারে কনির সাবলীল স্মৃতিচারণের প্রবহমানতা।    

 কাগজে কলমে চিঠি লেখা আজকাল উঠেই গেছে, বদলে এসেছে এই ইমেল। খটখটে একান্ত কাজের জিনিষ ইমেলকেও যে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার মতোই এমন প্রাণবন্ত করে তোলা যায়, সেটা কনিই করে দেখাল। কনির কত অজানা কথা যে সে জানল। ওর ওই ডিঙা-ভাঙা জীবনে কনি যখন ভেসে চলেছিল অজানা জীবন-তটিনীতে – সে সময়েই সে  কনিকে এড়িয়ে চলত। তার প্রতি নির্লিপ্ত আচরণ করত। এর সবটাই ছিল তার দেখনদারি। মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাইদের কাছে তুলে ধরতে চাওয়া, যে সুনেত্র আর কোনভাবেই সুকন্যার প্রতি দুর্বল নয়। তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

অথচ কী আশ্চর্য, কনির সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাতে সে নিজের ভেতরে ভেতরে যতটুকু ভেঙেছে, বাইরে চেষ্টা করেছে এতটুকুও না মচকাতে। কিন্তু আরো আশ্চর্যের ব্যাপার, তার এই কাঁচা অভিনয় ধরা পড়ে গেছে সবার কাছে। বিশেষ করে মা, পিসিমা এবং সবার উপরে কনির কাছেও! যে অহমিকা নিয়ে সেদিন ওই সব দিনের নাট্যমঞ্চে সে নিজেকে সেরা নট বলে ভেবে এসেছে এতদিন, আজ বুঝতে পারছে সে একেবারেই ধরা পড়ে গেছে। কলে পড়া ইঁদুরের মতো। সাধারণ গৃহস্থ রাত্রে পেতে রাখা কলে ইঁদুর ধরে, কিন্তু পরের দিন সকালে তাকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না। ইঁদুরের দুই চোখের দিকে তাকিয়ে, তারা নির্মম হাতে বধ করতে পারে না। আবার বাইরে খোলা মাঠে তারা ছেড়েও দিতে পারে না, পাছে কাক-চিল এসে ছোঁ মেরে তাকে তুলে নিয়ে যায়!

স্লিপ মোডে চলে যাওয়া ল্যাপটপের অন্ধকার পর্দার দিকে তাকিয়ে সুনেত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবল, এভাবে স্লিপমোডে থেকে তার নিজের এবং কনির জীবনটাকে অন্ধকার করে রাখার সময় আর নেই। সেকথা শম্পাদিদিও সেদিন বলেছিল, রীতিমতো অভিযোগের সুরে।

কনির প্রথম বিবাহের জন্যে সুনেত্রকে নিশ্চয়ই দায়ী করা যায় না। কারণ দুই পরিবারের কেউই এমনকি কনি নিজেও তাদের সম্পর্কটাকে কোন আনুষ্ঠানিক বন্ধনে বাঁধতে চায়নি। সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান দিয়েই সুনেত্র কনির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়েছিল এবং খুব আন্তরিকভাবেই কনির জীবনে তার ছায়াটুকুও পড়ুক, এমনটা চায়নি। কিন্তু ডিভোর্স পরবর্তী জীবনে তাদের দুই পরিবার এবং কনি নিজেও যে মত বদলেছিল সে কথা সুনেত্র জানবে কী করে? কেউই কোন আভাসও তো দেয়নি। 

নাকি সকলেই আশা করেছিল অন্ধকারের মধ্যে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ুক সুনেত্র? কনির সংকটের সময় কোন একদিন সুনেত্র বুক চিতিয়ে কনির সামনে এসে দাঁড়াক এবং গভীর প্রত্যয় নিয়ে বলুক, “যা হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। জীবন নিয়ে তোর এই ছিনিমিনি পুতুলখেলার আসর ছেড়ে উঠে আমার পাশে আয়, কনি। সমাজ যা খুশি বলুক, আজ থেকে আমি তোর পূর্ণ দায়িত্ব নিলাম। তোর যত সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দ, আমি গ্রহণ করলাম। এবার তোর বাকি জীবনটুকু নাহয় আমাকেই সমপর্ণ কর”। নারী চরিত্র বিষয়ে সুনেত্র একেবারেই আনাড়ি। তবে অনেকের কাছে শুনেছে বা কোথাও কোথাও পড়েছে, মেয়েরা পুরুষদের থেকে জোর প্রত্যাশা করে। হ্যাঁ, ভালোবাসার জোর। আর সেই জোরেই নাকি মনের জোড় পোক্ত হয়।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবল, কিন্তু এখন আর সে চিন্তা করে লাভ কি? প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন বেরিয়ে গেছে বহুক্ষণ। সিগ্‌ন্যালের অপেক্ষায় ট্রেনটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও। দেরিতে হলেও সে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেওছিল, কিন্তু দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে উঠতে পারেনি। আজ কোনভাবেই সেই ছুটে যাওয়া জীবনটাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

কিন্তু কনিও তো তার ওপর তখন জোর করতে পারত। তার হাত চেপে ধরে বলতে পারত, “সুনুদা, তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। তোমাকে শুনতেই হবে। যদিও আমার সব কথা শোনার পর তুমি কী করবে বা না করবে, সে সিদ্ধান্ত একান্ত তোমারই। তার ওপর আমি কোন জোর খাটাতে যাবো না। কিন্তু সব কথা তোমাকে জানতেই হবে”।  কনি তো তেমন কিছুই বলেনি কোনদিন।    

তাহলে, আজ এতদিন পরে এত কথা হঠাৎ বলতে শুরুই বা করল কেন? সে কি শুধু তার মনের ভার লাঘব করার জন্যে? নাকি তার মনে কোন প্রত্যাশা আছে? সে প্রত্যাশাটা কিসের?

দীর্ঘ অসাক্ষাতের পর সেদিন সন্ধেয় হাইওয়ের মাঝখানে দেখা হয়ে যাওয়ায়, কনির সঙ্গে তার সম্পর্কটা এখন অনেকটাই সাবলীল। সত্যি বলতে আজ তার জীবনে কনি উপস্থিত হয়েছে নিজের সমস্ত মাধুরীর ডালা নিয়ে - সে কথাও অনস্বীকার্য। তার জীবনের বাকি প্রত্যেকটি দিন কনি যদি এমনই মাধুর্য মিশিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেটাই সুনেত্রর কাছে অশেষ পাওনা। এবং সেই পাওনাটুকু সে আদায় করে নিতে চায় – অত্যন্ত নির্লজ্জভাবেই, চরম স্বার্থপরের মতো।

কিন্তু তার বেশি সে আর কী আশা করতে পারে? নিজের জীবনের সঙ্গে কনির জীবনটাকে জুড়ে নেওয়ার স্বপ্ন তার মনে আগেও  যেমন ছিল, আজও তেমনই আছে। কিন্তু সব স্বপ্ন তো পূরণ হয় না। এমনকি কনির জীবনের এখন যা পরিস্থিতি, তাতে সুনেত্র বিশ্বাস করে – সে স্বপ্ন কোন ভাবেই পূরণ না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

শশাঙ্ককে বিয়ে করে কনি তো সুখেই আছে। অন্ততঃ সুনেত্র ওদের দুজনকে একসঙ্গে যতখানি দেখেছে, তাতে সুনেত্রর তাই ধারণা। তার পুত্র সুধন্বার পিতৃত্বও স্বীকার করে নিয়েছে শশাঙ্ক। সুনেত্রর যদিও ধারণা নেই কনির পুত্রের এখন সঠিক কত বয়েস? কোন ক্লাসে পড়ছে? তবু আন্দাজ করে নেওয়া যায় চোদ্দ-পনেরতো বটেই। সেক্ষেত্রে তার এখন ক্লাস নাইনে বা টেনে পড়া উচিৎ। কাজেই অনেকটাই বড়ো হয়েছে এমন ধরে নেওয়াই যায়। সুধন্বা নামক মোটামুটি প্রি-সাবালক পুত্রের তরফেও তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চয়ই কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। অর্থাৎ ওদের এখন নিবিড় সংসার।      

এই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে কীভাবে বলা সম্ভব “এতদিন পরে যখন তোর সঙ্গে দেখা হয়েই গেল কনি, তুই আমাকে বিয়ে করে, নতুন এক জীবনের সন্ধানে, আয় নতুন পথে বেড়িয়ে পড়ি?” এরকম একটা বোকাবোকা মেলোড্রামাটিক প্রস্তাবের কথা ভাবতেও নিজেকে অত্যন্ত হাস্যকর মনে হল সুনেত্রর। এমন একটা প্রস্তাবে, অবধারিত ভাবেই তার কনির পক্ষ থেকে একমাত্র পাওনা হবে চরম প্রত্যাখ্যান। এবং এখনকার এই প্রত্যাখ্যান তাকে সাংঘাতিক এক সঙ্কটের মধ্যে ঠেলে দেবে নাকি? যে মাধুরী নিয়ে কনি আজ তার জীবনে এসে পৌঁছেছে, সে সবই শুকিয়ে যাবে বাস্তবের নিষ্ঠুর দাবদাহে। সুনেত্রর জীবনে পাওয়ার মতো কিছুই আর থাকবে না।     

সুনেত্র এখন প্রচণ্ড লোভী – তার লোভ কনির মাধুরী মাখানো স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় অবগাহনে। সমূলে উচ্ছিন্ন করে সামাজিক ও সাংসারিক ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে কনিকে টেনে আনায় নয়। সুখী, শান্ত, নিরিবিলি একটা জীবন থেকে তাকে তুলে, গভীর রাত্রের তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় বিক্ষুব্ধ দিগন্ত বিস্তৃত এক উন্মুক্ত মাঠের মধ্যে সে যেন কনিকে হিঁচড়ে টেনে আনতে চাইছে।

প্রথমেই কনিকে তার সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে শশাঙ্ককে ডিভোর্স দিতে হবে। শশাঙ্কর পত্নী হিসেবে সে আজ আর নিশ্চয়ই শশাঙ্কর অফিসে একজন সাধারণ কর্মতৎপর সহকর্মী নয়। তার অধিকার সূত্রে সে এখন শশাঙ্কর কোম্পানীরও নিশ্চয়ই সমান অংশীদার।

তার থেকেও বড়ো কথা কনির পুত্র সুধন্বা তো আর কচি শিশুটি নয়, সে এখন কিশোর। এতদিনে তার মা ও বাবার সম্পর্ক নিয়ে সে এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এতদিন পরে হঠাৎ তার মায়ের জীবনে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন এক সুনেত্র বসুকে কেন সে মেনে নেবে? কেন সে মুখ বুজে সমর্থন করবে অথবা মেনে নেবে তার মায়ের এই আজগুবি উতলতা? তার কিশোর মনেও কি পুঞ্জীভূত হবে না, তার মায়ের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং ক্রোধ? সেই অভিঘাতে সে হয়তো এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে পারে, যা তাদের দুজনের কাছে আদৌ কাম্য নয়। তেমন কিছু ঘটলে  সুনেত্র নিজেকে কি কোনদিন কোনভাবে ক্ষমা করতে পারবে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র আবার একটা সিগারেট ধরাল। তারপর স্লিপ মোডে চলে যাওয়া ল্যাপটপের ঘুম ভাঙিয়ে উত্তর দিতে বসল, 

প্রিয় কনি,

তোর সব লেখাই পড়েছি, একবার নয় – বেশ কয়েকবার। তোর জীবনের এই কথকতা আমার অজানা ছিল এতদিন। কিছু কিছু আভাস হয়তো পেয়েছিলাম কিন্তু একথাও সত্যি অভিমানী অহংকারে আমি তোর জীবনের এই চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝখানটিতে কোনদিনই অনুপ্রবেশের চেষ্টাও করিনি। নিরুদ্বিগ্ন উদাসীনতায় নিজেকে পাথর বানিয়ে রেখেছিলাম।

আজ এই চিঠিগুলি পড়ার পর ঠিক কী উত্তর দেব। সমবেদনা জানাতে ঠিক কতখানি আবেগ ও বিস্ময় মিশিয়ে “ইস্‌” কিংবা “আহা রে”, বলে নিজের দায়িত্বভার লাঘব করব। সেটাই তো বুঝতে পারছি না রে, কনি।

আমার শুষ্ক স্তোকবাক্য অথবা সমবেদনার প্রত্যাশায় তুই থেমে যাস না। তোর মনের সব কথা প্রকাশ করে তুই হাল্কা হ। আর কিছু পারি বা না পারি, আমি তোর সব কথা যে শুনছি – সমস্ত অন্তর দিয়ে, এটুকু বিশ্বাস করতেই পারিস,

তোর সুনুদাকে।

চলবে...

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৬

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

চব্বিশে জুলাই, ২০২৬, সোমবার

আজ পাঁচদিন হল অবিনদাদু ডাক্তারকাকুর নার্সিং হোমে, রয়েছেন। ঊণিশ তারিখ সকালেই তাঁকে নার্সিং হোমের ভর্তি করা হয়েছিল। তিনদিন মানে বাহাত্তর ঘন্টা নার্সিংহোমের আইসিইউতে ছিলেন। ওই তিনদিন ডাক্তারকাকু দিনে প্রায় কুড়ি ঘন্টা নার্সিং হোমেই থাকতেন। বলা বাহুল্য তার অধিকাংশ সময়টাই থাকতেন অবিনদাদুর পাশে।  উনি প্রতিনিয়ত দাদুর স্বাস্থ্যের অবস্থা মনিটর করতেন। এই পাঁচটা রাত অহীন নার্সিংহোমের লবিতেই কাটিয়েছে, এবং লক্ষ্য করেছে ডাক্তারকাকুর উদ্বেগ আর ব্যস্ততা। প্রথম তিনদিন মহীন তার সঙ্গে ছিল। কিন্তু গত পরশু তাকে ফিরে যেতে হয়েছে নিজের কর্মস্থলে।

গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় আইসিইউ থেকে বেরিয়ে ডাক্তারবাবু ওঁনার চেম্বারে যখন অহীনকে ডাকলেন, অহীনের বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। এসময় ডাক্তারকাকু তো ডাকেন না। কিছু খারাপ খবর নয়তো?  

অহীন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে ডাক্তারকাকুর চেম্বারে ঢুকতেই, ডাক্তারকাকু উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “এস এস অহীন, তোমার দাদু তো মিরাক্‌ল্‌ দেখিয়ে দিলেন! ভাবা যায় না। সেই ঠাকুর, সিদ্ধানন্দ না কী যেন, প্রবীণকাকুর বাবা-মার গুরুদেব, তাঁর এলেমও অসাধারণ। সে যুগে এমন একটা কীর্তি করে ফেললেন – ভাবলেই কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে – প্রাচীন ভারতের আয়ুর্বেদশাস্ত্র বা ভেষজবিজ্ঞান বা তুকতাক যাই বল, এত উন্নত ছিল? নিজের চোখে সবকিছু দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না, মনে হচ্ছে স্বপ্ন... ”।

অহীন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ডাক্তারকাকুর মুখের দিকে। সে বুঝতে পারছিল, তেমন কোন দুশ্চিন্তার খবর নয়। নিজের আবেগ আর উত্তেজনায় তিনি এতটাই ডুবে আছেন যে, আসল খবরটা সরাসরি বলে দিলে, অহীন যে নিশ্চিন্ত হয়ে যায় – সে কথাটাই ভুলে গেছেন। অহীন খুব শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করল, “দাদু এখন কেমন আছেন, কাকু?”

উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন ডাক্তার সরকার, বললেন, “ভাল আছেন মানে? সত্যি বলতে নবীনদা, মানে তোমার বাবার থেকেও অনেক ভালো এবং সুস্থ আছেন। নবীনদার তো হার্টের ব্যারাম, রক্তে গ্লুকোজের হিসেবটাও মাঝে মাঝে গোলমাল করে ফেলছেন। কিন্তু অবিনদাদু একদম চাঙ্গা...। দাঁড়াও চা বলি, তুমি খাবে তো”? টেবিলের পাশে কলিংবেলের সুইচ টিপে বললেন, “কটা দিন যা গেল না, দেখেছ তো! খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম...”। বেলের আওয়াজে প্রভাকরদা ঘরে ঢুকতে ডাক্তার সরকার বললেন, “প্রভাকর, ভালো করে চা খাওয়াও তো ভাই...দুটো...”।      

প্রভাকরদা চলে যেতে, ডাক্তার সরকার, টেবিলে রাখা পেপার ওয়েটটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, “সব থেকে আশ্চর্য কী জান?  অবিনদাদুর বয়েস বাড়েনি।  প্রবীণকাকু বলেছিলেন, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ অবিনদাদুকে যখন সমাধিস্থ করেন, তখন ওঁনার বয়েস সতের/আঠারো। এখনও ওঁনার বয়েস ওই আঠারোতেই থমকে আছে”। একটু থেমে অহীনের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বললেন, “অহীন, তোমাদের দাদুর বয়েসের হিসেব একশ হতে পারে, কিন্তু শরীর স্বাস্থ্যে তোমার সমবয়সী। কেমন লাগছে”?    

অহীন বলে উঠল “কি বলছেন, কাকু? এ তো অবিশ্বাস্য! আপনার ডাক্তারি শাস্ত্রে এর কোন ব্যাখ্যা নেই?” ডাক্তার সরকার অহীনের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন, আর দুহাতের বুড়ো আঙুল তুলে “কাঁচকলা” দেখিয়ে বললেন, “লবডংকা, কিস্‌সু নেই। রোবোট, এআই, ক্লোনসেল-টেল নিয়ে, খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে আমরা বাহাদুরি দেখাচ্ছি বটে, কিন্তু তোমাদের ওই ঠাকুর সিদ্ধানন্দর কাছে ও সব নস্যি”।

প্রভাকরদা একটা ট্রেতে চা এনে দুজনের সামনে দুটো কাপ রাখল, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার সরকার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “এবার কাজের কথায় আসি। আজ থেকে ওঁনাকে সলিডফুড খাওয়ানোর চেষ্টা করব, একদম সিম্পল্‌ নরম নরম ভাত, ডাল, আর নানারকম সবজি দেওয়া মাছের পাৎলা ঝোল। আর একটু পরেই আইসিইউ থেকে জেনেরেল কেবিনে শিফ্‌ট্‌ করে দেব। আমার আশা, কাল থেকে উনি উঠে বসবেন, এবং দু একদিনের মধ্যে হাঁটতেও পারবেন। আমি আজ থেকে একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে বলে দেব। সকালে-বিকেলে দুবার হাত-পা গুলো ম্যাসাজ করে দেবে”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কথাবার্তা বলছেন?”

“বলছেন বৈকি! তবে খুবই দুর্বল আর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। তাছাড়া, আমার মনে হয়, উনি নিজের অবস্থাটা ঠিক বুঝতে পারছেন না। চেনাজানা কাউকেই তো পাশে দেখছেন না। তার ওপর আইসিইউতে নানান যন্ত্রপাতি, হাতে পায়ে নানান টিউব... নাকে অক্সিজেনের মাস্ক ...এসব তো উনি কোনদিনই দেখেননি... এ সবের সঙ্গে নিজেকে ঠিক রিলেট করতে পারছেন না। তিরাশি বছর যে বড্ডো বেশি সময় অহীন। গত দশ-বিশ বছরে আমাদের জীবনে যা পরিবর্তন হয়েছে, সে কথা চিন্তা করে আমরাই অবাক হয়ে যাই। আর ইনি তো তিরাশি বছর পার করে হঠাৎ চোখ মেলেছেন”।  

“বাড়িতে কবে নিয়ে যেতে পারব?”

ডাক্তার সরকার একটু চিন্তা করে বললেন, “দিন সাতেক দেখি...তারপর। তবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের আরও অনেক কিছু চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এখন থাক, সে সব কথা পরে হবে। এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও, নবীনদা, প্রবীণকাকুকে খবর দাও। মহীনকেও খবর দিও। আমিও এখন একবার বাড়ি যাব..ফ্রেশ হয়ে দশটার মধ্যেই ফিরে আসব...আজকে আমার আবার দুটো অপারেশন আছে”।

অহীন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “সত্যি এ কদিন আপনার যা চলছে... আমি তাহলে আসছি, কাকু”।

ডাক্তার সরকার হাসলেন, কিছু বললেন না। ফোন তুলে কাউকে ডাকলেন।

বাড়ি ফিরে অবিনদাদুর খবর দিতেই রীতিমতো সোরগোল পড়ে গেল। সকলেই বিকেলে নার্সিং হোমে যেতে চান। এমনকি প্রবীণবাবুও। অনেক তর্কবিতর্কের পর নবীনবাবু সাব্যস্ত করলেন, আজ তিনি নিজে অহীনের সঙ্গে অবিনদাদুকে দেখতে যাবেন। পরিস্থিতি বুঝে আগামীকাল বাকি সবাই যাবে। এই ব্যবস্থা অবশ্য প্রবীণবাবুর মোটেই পছন্দ হল না। তিনি অস্ফুটস্বরে বললেন, এমন ডেঁপো ছেলে, তিনি কোনদিন কোথাও নাকি দেখেননি। হতভাগা নিজের বাপকেই তোয়াক্কা করে না!     

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব...