শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৫

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?] 



৫০

 

বিকেলে ভল্লা নোনাপুর গ্রামে গেল বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলতে। আর সেই একই সময় রাজধানী কদম্বপুরের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয়ের কর্মব্যস্ততা আচমকাই কিছুটা বেড়ে উঠল। অন্যান্য আধিকারিকদের সঙ্গে রাজ্যাধিকারিক গভীর কিছু আলোচনা সেরে, হন্তদন্ত হয়ে দেখা করতে গেলেন, মহামন্ত্রীর কার্যালয়ে। মহামন্ত্রী তাঁর নিভৃত কক্ষে একলাই বসে কাজ করছিলেন। কক্ষের দ্বার ঈষৎ ফাঁক করে রাজ্যাধিকারিক বিধিবন্ত অনুমতি চাইলেন, “মান্যবর, ভেতরে আসতে পারি?”

মহামন্ত্রী মুখ তুলে বিধিবন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এস বিধিবন্ত। বস। মনে হচ্ছে খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছ? কী ব্যাপার?”

পুরু গদির ওপর দুধসাদা চাদর বিছানো তক্তপোশের এক প্রান্তে বসেছিলেন মহামন্ত্রী। বিধিবন্ত সেই তক্তপোশের অন্য  প্রান্তে বসে বললেন, “আজ্ঞে মান্যবর, রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তের আস্থান থেকে ওখানকার করাধিকারিকের একটি দীর্ঘ পত্র পেলাম একটু আগে। ওদিকের অবস্থা সাংঘাতিক”।

মহামন্ত্রী নিরুদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রকম?”

“আজ্ঞে, মান্যবর বিগত সোমবার, ঘোর অমাবস্যার রাত্রিতে – আশেপাশে গ্রামের কিছু উদ্ধত ছোকরা মধ্যরাত্রে আস্থান আক্রমণ করেছিল। সশস্ত্র ছোকরার দল প্রায় এক ঘটিকা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে, হত্যা করেছে আস্থানের রক্ষীসর্দার উপানুকে এবং আস্থানের চোদ্দজন রক্ষীকে। ছোকরার দল চলে যাবার পরেই, অবশিষ্ট রক্ষীরা আতঙ্কে আস্থান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার ভোর থেকে করাধিকারিক শষ্পকের ব্যক্তিগত রক্ষীরাই আস্থানের সুরক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। মান্যবর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখানে অনেক বেশি সংখ্যক নতুন রক্ষী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে – নচেৎ আস্থানে সঞ্চিত রাজসম্পদ আর রক্ষা করা যাবে না”।

“এতে এত উত্তেজিত হয়ে উঠলে কেন, বিধিবন্ত? এরকম যে ঘটতে চলেছে, সে তো আমাদের জানাই ছিল”।

“মান্যবর, তা ছিল। কিন্তু এতগুলি রক্ষীসহ রক্ষী-সর্দারের মৃত্যু - আমাদের সুরক্ষা মন্ত্রক সহজে মেনে নেবে না। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে এটা প্রশাসনিক দুর্বলতা। গ্রামের ছাপোষা ঘরের ছেলেপুলের দল কীভাবে এত অস্ত্র পেল? এবং কীভাবেই বা তারা প্রশিক্ষিত রক্ষীদের আক্রমণ করার সাহস পেল? এ সব তো একদিনে হয়নি, মান্যবর। ওরা বলবে, আগে থেকে আমাদের গুপ্তচরবাহিনী এই ঘটনা যে ঘটতে পারে, আঁচ করতে পারেনি কেন?”

মহামন্ত্রী কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন, “বিধিবন্ত, স্বীকার করছি, প্রশাসন এই ঘটনার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কিন্তু রাজ্যে কোথায় কোন গ্রামে কী ধরনের ক্ষোভ বা অশান্তি ঘনিয়ে উঠছে – তার সংবাদ রাখার প্রধান দায়িত্ব সুরক্ষা মন্ত্রকের। তাই না?” একটু বিরতি দিয়ে তিনি আবার বললেন, “রাজধানী থেকে অস্ত্র বিপণন করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে তুমি অবহিত বিধিবন্ত। সোমবারের ঘটনা যে সেই পরিকল্পনারই অঙ্গ – একথাও তোমার না বোঝার তো কোন কারণ নেই। এ বিষয়ে আমরা সুরক্ষামন্ত্রক এবং সেনামন্ত্রককে কিছুই জানাইনি – অন্ধকারে রেখেছি। তার কারণ এ ধরনের পরিকল্পনা সকল মন্ত্রককে জানিয়ে, সকলের অনুমোদন নিয়ে করতে গেলে – গোটা কাজটাতেই বিলম্ব হত এবং নানান বিঘ্ন এবং বিরুদ্ধ মতামত উপস্থিত হয়ে ভেস্তে যেতে পারত”।

“সে কথা সত্যি, মান্যবর। এবং একথাও সত্যি – আমাদের পরিকল্পনা যে সফল হতে চলেছে, এ ঘটনা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ”।

“তাহলে? তুমি এত উতলা হয়ে উঠছো কেন বলো তো? সুরক্ষা মন্ত্রক এই প্রসঙ্গ নিয়ে আমার কাছে আসার আগেই, আগামীকাল মন্ত্রীসভায় আমি নিজেই এ প্রসঙ্গে তুলবো। সুরক্ষা মন্ত্রককে কোনভাবেই মাথা তুলতে দেওয়া যাবে না। নচেৎ আমার তো বটেই স্বয়ং মহারাজের পক্ষেও ব্যাপারটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে”।

একটু চিন্তা করে মহামন্ত্রী বললেন, “তোমার ওই ছোকরা আধিকারিক – কী নাম বললে যেন?”

“আজ্ঞে শষ্পক, মান্যবর”।

“হ্যাঁ শষ্পক। তার পাঠানো যাবতীয় পত্রাদি তোমার কাছে আছে?”

“আছে মান্যবর”।

“এখনই আমার কাছে নিয়ে এস। আমরা আবার বসব। তার মধ্যে আমি মহারাজার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। তাঁকে এই সাম্প্রতিক ঘটনার সংবাদটা দিয়ে, আগামী কাল মন্ত্রীসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুমোদনটাও নিয়ে আসি। আর শোন, তোমার কার্যালয়ে অকারণ আতঙ্ক, উদ্বেগ ছড়িও না। তোমার অধীনস্থ যে দু’জন দক্ষ গুপ্তকর্মী এই কাজে নিযুক্ত – তাদের বিশ্বস্ততা নিয়ে তুমিই আমাকে একসময় যথেষ্ট আস্থা জানিয়েছিলে। সে বিশ্বাস তোমার থাকা উচিৎ”।

“ঠিকই মান্যবর। হঠাৎ সংবাদটা পেয়ে আমি কিছুটা...মানে এত হত্যা, তাও আমাদেরই রক্ষীদের...আমি বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম, সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যদি”?

মহামন্ত্রী হাসলেন, “তুমি যাও পত্রগুলো তাড়াতাড়ি নিয়ে এস...আর আমিও মহারাজের সঙ্গে দেখা করে আসি”।

 

পরদিন প্রথম প্রহর সমাপ্তির দণ্ডখানেক আগেই সভাঘরে আহুত মন্ত্রীগণ একে একে উপস্থিত হলেন। তাঁদের সঙ্গে এলেন সকল মন্ত্রকের মুখ্য আধিকারিকগণও। পারষ্পরিক কুশলবার্তা বিনিময় করে, প্রত্যেকেই মর্যাদা অনুযায়ী নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তারপর মৃদু গুঞ্জনে আলাপ শুরু করলেন, বিশেষ এই অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় কী? আকস্মিক এই সভা আহ্বানের কারণই বা কী?

একমাত্র রাজ্যাধিকারিক ছাড়া উপস্থিক কেউই এই সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত নন। এবং রাজ্যাধারিকও সকলকে অবহিত করায় আদৌ উৎসাহী ছিলেন না। অতএব উপস্থিত মন্ত্রী ও মুখ্যাধিকারিকদের অনুমান এবং কৌতূহলী আলোচনার গুঞ্জন চলতেই থাকল।

রাজসভার বাইরে প্রহরী প্রথম প্রহর সমাপ্তির তৃতীয় ঘন্টা বাজিয়ে দিতেই – গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। সভাঘরে উপস্থিত সকলেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর ঠিক তখনই রাজান্তঃপুরের দিকের দরজা খুলে সভাঘরে প্রবেশ করল রাজরক্ষীর দল। ঘোষণা করল রাজার আগমনবার্তা। রক্ষীদলের পিছনে মহারাজা এলেন। তাঁর পিছনে এলেন মহামন্ত্রীও। সশস্ত্র রক্ষীরা নিয়মনিষ্ঠ শৃঙ্খলায় দাঁড়িয়ে পড়ল সিংহাসনের পিছনে ও দুপাশে এবং সভাঘরের প্রত্যেকটি দরজায়। মহারাজ সিংহাসনের সামনে এবং মহামন্ত্রী নিজ আসনের সামনে দাঁড়িয়ে সকলকে অভিবাদন করলেন। তারপর মহারাজ সিংহাসনে বসে সকলকে বসার অনুরোধ করতে, সকলেই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তারপর মহারাজের ইঙ্গিতে, জনৈক প্রহরী মৃদু কিন্তু গম্ভীর একটিমাত্র ঘন্টাধ্বনি দিয়ে সভার শুরু ঘোষণা করল।

মহারাজা অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন, “মহামন্ত্রী মহোদয়, আজকের এই বিশেষ অধিবেশনের আহ্বায়ক আপনিই। অতএব আপনার বক্তব্য দিয়েই আজকের সভার সূচনা করুন”।

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন, মহারাজাকে অভিবাদন করে সভাস্থ সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাননীয় সহমন্ত্রীবৃন্দ এবং আদরণীয় আধিকারিকদের সকলকেই আমার শুভেচ্ছা জানাই। গতকাল অপরাহ্নে মুখ্যাধিকারিক, বিধিবন্ত মহাশয় আমাকে ভয়ানক একটি সংবাদ শোনালেন। বার্তাটি শুনে আমি যেমন বিচলিত তেমনই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। তৎক্ষণাৎ রাজপুরীতে গিয়ে আমি মহারাজ সকাশে বার্তাটি নিবেদন করে, মহারাজের অনুমতিক্রমে আজকের এই বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করি।

বার্তাটি সংক্ষেপে বলি। বিগত সোমবার মধ্যরাত্রে, স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল সশস্ত্র যুবক বিনা প্ররোচনাতেই আমাদের পশ্চিম-সীমান্তবর্তী আস্থানে আচমকা হানা দিয়েছিল। এই আক্রমণে নিহত হয়েছেন ওই আস্থানের রক্ষীপ্রধান এবং তাঁর সহকর্মী চোদ্দজন রক্ষী”।

সভায় উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে এবং আতঙ্কে অস্ফুট আওয়াজ করে উঠল।

“যতদূর জানা গেছে হিংস্র ওই যুবকদলের উদ্দেশ্য ছিল, আস্থানে বন্দী প্রাজ্ঞ ও বৃদ্ধ এক কবিরাজকে মুক্ত করা। কিন্তু ওই বৃদ্ধ কবিরাজকে আস্থানের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করার আগেই, তিনি ইহলোকের মায়া থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু ঠিক কী কারণে হয়েছিল – স্পষ্ট জানা যায়নি। তাঁর মৃত্যুর জন্যে কারা দায়ী সে কথাও স্পষ্ট হয়নি”। সামান্য বিরতি দিয়ে মহামন্ত্রী আবার বললেন, “ওই যুবকের দল আস্থানে যদৃচ্ছা তাণ্ডব করার পর এবং কবিরাজের মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ভীত-সন্ত্রস্ত অবশিষ্ট রক্ষীদের সকলেই আস্থান ত্যাগ করে চলে গেছে। অর্থাৎ এখন আস্থান প্রায় অরক্ষিত। করাধিকারিকের ব্যক্তিগত প্রশাসনিক রক্ষী আছে আটজন। তারাই আপাততঃ রয়েছে সম্পূর্ণ আস্থানের দায়িত্বে।

আমাদের আশু কর্তব্য - যত শীঘ্র সম্ভব আস্থানের পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রশাসনের সদ্ভাব ফিরিয়ে আনা। যাতে এরকম চরম অপ্রীতিকর ঘটনা ভবিষ্যতে কোন ভাবেই আর না ঘটে। এই অধিবেশনে এই বিষয়েই পর্যালোচনা করে, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট করতে চাই”।

বক্তব্য শেষ করে মহামন্ত্রীমশাই আসন গ্রহণ করা মাত্র, আন্তঃরাজ্য সুরক্ষা মন্ত্রী উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মহামান্য মহারাজ এবং সম্মাননীয় মহামন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন – এতগুলি রক্ষী এবং স্বয়ং রক্ষীপ্রধানের হত্যার ঘটনা ভুলে গিয়ে – আঞ্চলিক লোকদের সঙ্গে কী ভাবে সদ্ভাব ফিরিয়ে আনা সম্ভব? নিহতরা এই জঘন্য হত্যার কোন প্রতিকার পাবে না?”

মহামন্ত্রী বললেন, “কী ধরনের প্রতিকার আপনি আশা করছেন, মন্ত্রীমশাই? যে যুবকেরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট পরিচয় পাওয়া সম্ভব হবে কি? যদি সম্ভব হয় তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তিবিধান করা যেতেই পারে। আর যদি তা না করা যায় আমরা কি সন্দেহের বশে গ্রামবাসী সকল মানুষকেই উত্যক্ত করবো? ভুলে যাবেন না ওই মানুষগুলিও আমাদেরই রাজ্যবাসী। হাতে গোনা কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের জন্যে – নিরীহ গ্রামবাসীদের সকলকে বিক্ষুব্ধ করে তুললে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।   যতদূর জানি প্রথম থেকেই উভয়পক্ষের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়েছিল। আমি চাই সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন, “আমি মাননীয় মহামন্ত্রীর সঙ্গে পূর্ণতঃ একমত। ওই গ্রামগুলি এমনিতেই সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল অঞ্চল। তার ওপর যতদূর জানি – অনুর্বর ও রুক্ষ ওই অঞ্চলটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত দুর্বল। অতএব অধিবাসীদের আরও ক্ষুব্ধ না করে তুলে – মীমাংসা করে শান্তি স্থাপনা করাই এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায় সুরক্ষামন্ত্রী বেশ উষ্মা নিয়েই বললেন, “আমিও মীমাংসার পক্ষেই রয়েছি, মহারাজ। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত কোন পক্ষের থেকে শুরু হয়েছিল - এই মন্ত্রীসভার সেটাও জানা প্রয়োজন”।

মহারাজ বললেন, “এই সভা আহুত হয়েছে সব কথা পর্যালোচনার জন্যেই – আপনি বলুন, মন্ত্রীমশাই”।

সুরক্ষামন্ত্রী বেশ উৎসাহিত হয়ে বললেন, “এই যুবক দলটি এর আগেও একবার আস্থানে হানা দিয়েছিল মহারাজ – প্রায় মাস দেড়েক আগে। সেবারও আমাদের তিন রক্ষীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ওই আক্রমণে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র অপহৃত হয়েছিল, এবং কোষাগার থেকে কিছু রৌপ্যমুদ্রাও চুরি গিয়েছিল”।

মহামন্ত্রী রাজ্যাধিকারিক বিধিবন্তকে বললেন, “আধিকারিকমশাই,  আপনি এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারেন কি?”

বিধিবন্ত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে প্রণাম করে বললেন, “হ্যাঁ মন্ত্রী মহোদয় ওই ঘটনার পর আমাদের আস্থানের আধিকারিকমশাই, যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তার সংক্ষিপ্তসার হল – ওই অঞ্চলের নোনাপুর গ্রামের গ্রামপ্রধান আমাদের আধিকারিককে রাজস্ব হার কিছুটা কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়। কারণ ওই গ্রামপ্রধান নির্বাসন দণ্ড পাওয়া এক অপরাধীকে, নিজের বাড়িতে বেশ কিছুদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, ওই ঘটনাতেই গ্রামবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আস্থান আক্রমণ করে”।

মহারাজ বললেন, “বুঝলাম, তারপর?”

বিধিবন্ত বললেন, “আস্থান আক্রমণের পর আধিকারিক রক্ষীপ্রধানকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, অপরাধী যুবকদের চিহ্নিত করতে এবং চুরি যাওয়া অস্ত্রশস্ত্রগুলির সন্ধান করতে। তাঁর ধারণা ছিল, চুরি যাওয়া রৌপ্যমুদ্রা গোপন করা সহজ হলেও, অতগুলি অস্ত্র রাতারাতি গোপন করা সহজ হবে না”।

মহারাজ বললেন, “নিঃসন্দেহে উচিৎ সিদ্ধান্ত। তারপর?”

বিধিবন্ত বললেন, “মান্যবর মহারাজ, কোন যুবককেই চিহ্নিত করা যায়নি – এবং কোন অস্ত্রশস্ত্রেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি”।

মহারাজ বিস্মিত হয়ে সুরক্ষামন্ত্রীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। সুরক্ষামন্ত্রী ইতস্ততঃ করে বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের রক্ষীপ্রধান গ্রামগুলিতে একবার অনুসন্ধানে গিয়েছিল – কিন্তু সফল হয়নি… তারপর আধিকারিকমশাইও এই ব্যাপারে তাদের আর কোন নির্দেশ দেননি”।

বিধিবন্ত অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, “মান্যবর মন্ত্রীমশাই, আমাদের আধিকারিক রক্ষীপ্রধানকে আর কোন নির্দেশ দেননি – এই কথাটি ঠিক নয় – প্রকৃতপক্ষে তিনি নির্দেশ দিতে ভয় পেয়েছিলেন”।

মহারাজ অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আধিকারিক ভয় পেয়েছিলেন? কেন?”

“রক্ষীপ্রধান ও তাঁর সঙ্গীদল প্রথম দিন গ্রামে গিয়েই অনুসন্ধান করার নামে সাধারণ বয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের ওপর যে বীভৎস অত্যাচার করেছিলেন – আপনার রাজত্বকালে ওরকম লজ্জাজনক ঘটনা এর আগে কোনদিন কোথাও হয়নি, মহারাজ। রক্ষীপ্রধান নিজের হাতে পাশের সুকরা গ্রামের শ্রদ্ধেয় এক বয়স্ক ব্যক্তিকে অকারণ এমনই প্রহার করেছিলেন - সে ব্যক্তি আজও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। রক্ষীপ্রধান ও সঙ্গীরা নোনাপুর গ্রামের বৃদ্ধ প্রধানকে এমনই মেরেছিলেন – অসহায় বৃদ্ধ আটদিন অচৈতন্য থাকার পর দেহরক্ষা করেছেন। রক্ষীপ্রধান ওই অঞ্চলের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় এবং প্রাজ্ঞ ও বৃদ্ধ কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে। প্রয়োজনে অত্যন্ত মাননীয় ব্যক্তিকেও বন্দী করতে হয় মহারাজ, কিন্তু তার মধ্যেও যথেষ্ট শালীনতা বজায় রাখাই বিধি – কারণ তিনি সাধারণ উঞ্ছ প্রবৃত্তির চোর নন। তাঁর পক্ষে আস্থানে নিজে গিয়ে ডাকাতি করা অথবা যুবকদের ডাকাতি করতে প্ররোচিত করা – একেবারেই অসম্ভব। একথা বুঝেও রক্ষীপ্রধান তাঁর ঘোড়ার পিঠে বৃদ্ধকে ঝুলিয়ে প্রায় চারক্রোশ দূরের আস্থানের বন্দীশালায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধ কবিরাজমশাইয়ের দুটি পা পথের পাথরে, ঝোপেঝাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। আস্থানের বন্দীশালায় তিনি নিজেই নিজের চিকিৎসা করছিলেন ঠিকই, কিন্ত সুস্থ হলেও, তাঁর পক্ষে কোনদিনই আর নিজের পায়ে হাঁটা-চলা করা সম্ভব হত না। আমরা সংবাদ পেয়েছি - গত সোমবারের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ওঁনাকে ওই আস্থানের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করা…”।

দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ বিবৃতির পর বিধিবন্ত চুপ করলেন। মহারাজ খুব বিরক্তমুখে তাকালেন সুরক্ষা মন্ত্রীর দিকে, বললেন,  “আপনার এ বিষয়ে কোন বক্তব্য আছে মন্ত্রী মহোদয়?”

সুরক্ষামন্ত্রী কিছুটা ইতস্ততঃ করে বললেন, “রক্ষীরা আস্থানে যখন থাকে তখন আধিকারিকই তাদের একমাত্র পরিচালক, মহারাজ। হয়তো তাঁর নির্দেশেই …”।

বিধিবন্ত বললেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, আধিকারিকের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল অনুসন্ধান করার এবং প্রয়োজনে কিছুটা আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করে গ্রামবাসীদের উপর মানসিক উদ্বেগ সৃষ্টি করা। তার অর্থ এই নয় গ্রামপ্রধানকেই হত্যা করতে হবে, কিংবা বৃদ্ধ কবিরাজকে বিকলাঙ্গ করে তুলতে হবে। সত্য বলতে মান্যবর, এই দুই ব্যক্তির প্রতি আমাদের রক্ষীদের এই চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার, শুধু ওই কয়েকটি গ্রামেই নয়। সুদূর বীজপুর জনপদের জনগণ – এমনকি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের সংলগ্ন গ্রামবাসীরাও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং বিচলিত”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “মাননীয় মহারাজ, আমাদের রক্ষীরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে একথা সত্যি – তার জন্যে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া যেত”।

মহামন্ত্রী বললেন, “এ সব ঘটনা প্রায় দেড়-দু’মাস আগেকার, তাই না বিধিবন্ত? এতদিনেও তাদের বিচার বা শাস্তি কিছুই না হওয়াতেই, সাধারণ প্রজা ক্রুদ্ধ হচ্ছে, হিংস্র হয়ে উঠছে…”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “আস্থানের আধিকারিক রক্ষীপ্রধানের কোন পরামর্শই গ্রহণ করতেন না, মহামন্ত্রী মহোদয়। এই তো – সম্প্রতি নোনাপুর গ্রামের কোন এক যুবক রক্ষীপ্রধানের কাছে এসেছিল রাজসাক্ষী হয়ে – সে বলেছিল – গ্রামের যুবকদের মধ্যে কারা কারা ডাকাতি করেছে এবং অস্ত্রশস্ত্র কোথায় রাখা থাকে সব দেখিয়ে দেবে। রক্ষীপ্রধানের সে কথায় কর্ণপাতই করেননি আধিকারিক। বরং তিনি রক্ষীপ্রধানকে এই বলে নিরস্ত করেছিলেন – ওই যুবক মিথ্যা আশ্বাসে ভুলিয়ে রক্ষীদের গ্রামে নিয়ে যেতে চাইছে – এবং সেখানে ফাঁদে ফেলে সকলকেই বিপদে ফেলবে…। সেদিন রক্ষীপ্রধান আধিকারিকের সহযোগীতা পেলে, সোমবারের ভয়ানক ঘটনা হয়তো ঘটতোই না”।

বিধিবন্ত বললেন, “এ কথা যথার্থ মন্ত্রী মহোদয় – কারণ আমাদের আধিকারিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রক্ষীপ্রধানের থেকে অনেক বেশী অবহিত – এবং তাঁর দায়িত্ব গ্রামবাসীদের সঙ্গে লড়াই করা নয় – বরং গ্রামবাসীদের সহযোগীতায় প্রশাসনের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া… তাঁর কাছে নিশ্চয়ই কিছু তথ্য ছিল – যার ভিত্তিতে তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তাছাড়া আরও একটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ, আমি এই সভায় প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি, মাননীয় মহারাজ। আমার ধারণা সুরক্ষামন্ত্রীমহোদয় এই তথ্যটি জানেন না – কিন্তু আমার মাননীয় সহকর্মী সুরক্ষাধিকারিক জানেন। আমি নিজেই তাঁকে ওই রক্ষীপ্রধানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার অভিযোগ জানিয়েছিলাম।

আস্থানের রক্ষীপ্রধান একজন কদর্য চরিত্রের ব্যক্তি। তিনি আস্থানের ভিতরেই একটি বালকের সঙ্গে নিত্য ব্যাভিচারে লিপ্ত ছিলেন। শোনা যায় দূর কোন গ্রামের অনাথ ওই বালকটিকে তার অভিভাবকের থেকে কিনে এনেছিলেন রক্ষীপ্রধান – এবং প্রায় প্রতি রাত্রেই তিনি ছেলেটিকে বলাৎকার করতেন। ছেলেটি বেশ কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেছিল – কিন্তু রক্ষীবাহিনীর কেউ না কেউ তাকে আবার ধরে এনেছে। মাননীয় মহারাজ, এই ঘটনার কথা আশেপাশের গ্রাম ও জনপদগুলিতে সকলেই জানে – এবং এই নিয়ে তারা রাজ্য প্রশাসনকে রীতিমতো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে…।  মাননীয় মহারাজ, এই ধরনের উদ্ধত, অহংকারী, দূরদৃষ্টিহীন, নির্বোধ এবং চরিত্রহীন রক্ষীপ্রধানকে আমাদের আধিকারিক ভরসা করতে পারেননি – সেটা তাঁর দুর্ভাগ্য হতে পারে – কিন্তু অপরাধ নিশ্চয়ই নয়”।

বিধিবন্ত কথা শেষ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর মহারাজ বেশ দৃঢ়স্বরে বললেন, “মহামন্ত্রী মহোদয়, যা হয়ে গেছে – তা নিয়ে বিচার-বিবেচনা যা করার পরে করা যাবে। কিন্তু এই ভয়ংকর অচলাবস্থার অবসান করে স্বাভাবিক অবস্থায় কী ভাবে ফেরা যায়?”

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীমহোদয়কে – এখনই এক গুল্ম সশস্ত্র সেনা ওই অঞ্চলে পাঠাতে অনুরোধ করব। তবে হাতি এবং রথ যাবে না – সাতাশটি ঘোড়া সহ মোট নব্বই জনের দল। সেনাদের উপস্থিতি গ্রামবাসীদের মনে কিছুটা ভয় এবং ভরসা দুইই দেবে। ভয় – সেনাদের সঙ্গে চট করে কোন যুবকই লড়তে চাইবে না। আর ভরসা – আস্থানের রক্ষীবাহিনী আচমকা তাদের আক্রমণ করতে পারবে না।

আর সুরক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ – রক্ষীপ্রধান সহ, বেশ ভালো একটি সুরক্ষা দল পাঠানোর ব্যবস্থা করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কারণ হয়তো আর একমাসের মধ্যেই ওখান থেকে আস্থান গুটিয়ে আধিকারিককে উত্তরের দিকে যেতে হবে”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন, “ঠিক কতদিনের জন্যে আপনি সৈন্যবাহিনী চাইছেন মহামন্ত্রী মহোদয়?”

মহামন্ত্রী একটু চিন্তা করে বললেন, “অন্ততঃ মাস ছয়েকের জন্য তো বটেই। কারণ ওই অঞ্চলের উন্নতিবিধানের জন্য রাজশ্যালক রতিকান্ত মহোদয়কে বিষয়াধিপতি করে পাঠানোর পরিকল্পনা আমাদের আছে। তাঁর বাসভবন নির্মাণও প্রায় শেষের দিকে। কার্যভার নিয়ে তিনি সুস্থিত না হওয়া পর্যন্ত, ওঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষাবাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীকে থাকতে হবে”।

মহারাজ বললেন, “উত্তম। আজকের সভা তাহলে এখানেই সমাপ্ত হোক। মহামন্ত্রী মহোদয় আপনি সকলের সঙ্গে কথা বলে, আগামীকাল সকালে আমাকে জানাবেন – সর্বশেষ পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে। এমন লজ্জাজনক অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের রাজ্যে আর কখনও যেন না হয় – সে দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে”।  

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “যথা আজ্ঞা মহারাজ”। অন্যান্য মন্ত্রী ও আধিকারিকরাও সসম্ভ্রমে মাথা নত করে মহারাজাকে বিদায় জানালেন।  


চলবে...


মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২১"]


৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব (আগের পর্বের পরে) 

সুষুম্না নাড়ীতে ছটি পদ্ম আছে, একদম নিচে মূলাধার, তারপর ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা। তন্ত্রমতে এই ছটি পদ্মকে বলে চক্র – ষট্‌চক্র ভেদই তন্ত্র সাধনার মূল উদ্দেশ্য, বেদে এই ছটি পদ্মকে বলা হয় ভূমি। মূলাধারের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি, স্বাধিষ্ঠান চক্রের অবস্থান উপস্থের, মণিপুর নাভিমণ্ডলের, অনাহত হৃদয়ের, বিশুদ্ধ কণ্ঠের এবং আজ্ঞা চক্র ভ্রূর সমান্তরালে অবস্থান করে। সাধনার বিভিন্ন পর্যায়ে সুষুম্নানাড়ী পথে কুণ্ডলিনী শক্তি এক একটি চক্র ভেদ করে উপরের দিকে উঠতে থাকে। কুণ্ডলিনী যখন হৃদয়ের অনাহত চক্র স্পর্শ করে তখন সাধকের মন থেকে সমস্ত কামনা বাসনার অবসান হয়, সাধক অদ্ভূত এক জ্যোতি দেখতে পান। এরপর কুণ্ডলিনী বিশুদ্ধ চক্র স্পর্শ করলে সাধকের মন ঈশ্বর চিন্তায় ব্যাকুল হয়, তখন ঈশ্বরের বিষয় ছাড়া অন্য কথা বলতে পারেন না, অন্য কথা শুনলেও অসহ্য বোধ হয়। এরপর কুণ্ডলিনী ষষ্ঠ চক্র আজ্ঞাভূমি স্পর্শ করলে, সাধক ঈশ্বরকে দেখতে পান, কিন্তু একটু আড়াল থাকে – যেমন লণ্ঠনের আলো, দেখা যায়, কিন্তু কাচের জন্যে স্পর্শ করা যায় না। ষষ্ঠ চক্র অতিক্রম করে কুণ্ডলিনীশক্তি যদি সপ্তমভূমিতে সহস্রার অর্থাৎ সহস্রদল পদ্মে মিলিত হয়, তখন সাধকের সমাধি হয়। সমাধিস্থ হলে সাধকের বাহ্যজ্ঞান লোপ পায়, সাধক দেহ রক্ষা করতে পারেন না, একুশ দিনের মধ্যে তাঁর দেহের অবসান হয়। সপ্তমভূমির এই সহস্রদল পদ্মের অবস্থান, মাথার ব্রহ্মতালুতে। এই সহস্রার পদ্মেই সচ্চিদানন্দ শিব অবস্থান করেন, সাধকের শক্তি শিবের সঙ্গে মিলিত হন। শিব-শক্তির এই মিলনই তন্ত্রের পরমার্থ লাভ, উপনিষদের ব্রহ্ম লাভ।

যাঁরা ঈশ্বরকোটি সাধক অর্থাৎ অবতার, তাঁরা লোকশিক্ষার জন্যে সমাধি অবস্থা থেকেও আবার নেমে আসতে পারেন। তাঁদের অবস্থান থাকে ষষ্ঠ ও সপ্তমভূমির মাঝখানে। তাঁদের মধ্যে ভক্তভাবের অথবা দাসভাবের সামান্য অহংটুকু – ভক্ত আমি, দাস আমি - থাকে। যেমন হনুমান ছিলেন, দাসভাবে; নারদ, সনক, সনন্দ, সনাতন, সনৎকুমার প্রমুখ ছিলেন ভক্তভাবে, যেমন শ্রীশ্রীচৈতন্য ছিলেন প্রেমভাবে এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সন্তানভাবে।       

তন্ত্র সাধনার নিম্ন স্তরে - মূলাধার থেকে অনাহত চক্র স্পর্শ করার আগেই সাধকের আটটি দৈব ক্ষমতার সিদ্ধি ঘটতে থাকে। এই সিদ্ধিকে বিভূতিও বলে - আটটি সিদ্ধি এরকম – অণিমা (সূক্ষ্ম হয়ে ওঠা), লঘিমা (পালকের মতো হাল্কা হওয়া), গরিমা (অস্বাভাবিক ভারি হয়ে ওঠা), মহিমা (বিশাল চেহারা), প্রাপ্তি (ইচ্ছেমতো যে কোন বস্তু হাতে আনা), প্রাকাম্য (ইচ্ছেমতো যে কোন বিষয় অর্জন করা), বশিত্ব (যে কোন মানুষ বা জীবকে বশ করা), ঈশিত্ব (সৃষ্টি বিষয়ে নাক গলাতে পারা!)।

সেকাল থেকে আজ পর্যন্ত, তীর্থে-তীর্থে এবং কলকাতা বা যে কোন বড়ো শহরের রত্নব্যবসায়ীদের চেম্বারে প্রায়ই স্বঘোষিত সিদ্ধ সাধকদের দেখা যায়। তাঁদের অনেকে আবার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত – এই পদক কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে জানা যায় না। তবে এঁরা বশীকরণ করতে পারেন, আপনাকে যে কোন কাজে সার্থক করে তুলতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল বৈদেশিক আক্রমণের সময় এঁদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোদ্ধাদেরই সীমান্তে লড়তে হয়ে। তাঁরা বশিত্ব দিয়ে বিপক্ষ সৈন্য বা সেনাপতিদের বশ করে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারতেন, কিন্তু কোনদিন করেননি। অথবা সাধারণ আকৃতির সাধক মহিমা সিদ্ধি দিয়ে হঠাৎ বিশাল শরীর বানিয়ে, গরিমা সিদ্ধিতে তাঁদের পায়ের তলায় পিষে একজন শত্রুকেও বিনাশ করতে পেরেছেন - এমন শোনা যায় না।     

তন্ত্রসাধনায় এই আটটি সিদ্ধিলাভকে খুবই তুচ্ছ এবং অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে। এই বিভূতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে অবাক করে, যাঁরা অর্থ, যশ বা প্রতিপত্তি উপার্জন করেন, তন্ত্রশাস্ত্র তাঁদের খুবই নীচু স্তরের সাধক বলেছেন।

৫.৬.৫ তন্ত্রশাস্ত্র

তন্ত্রে বেদ - বেদান্ত সর্বশাস্ত্রকে একত্রে বলা হয় নিগম এবং তন্ত্র-শাস্ত্রকে বলা হয় আগম। উভয়ের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মতো। পুত্র পিতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে, কিন্তু যুগোপযোগী হতে গিয়ে তার মতের সঙ্গে পিতার মতের অমিল হয়। আবার পিতা অর্থাৎ বৈদিক মতের সনাতন পণ্ডিতেরা, তন্ত্রকে তাচ্ছিল্য করেন, বলেন, হতভাগা এত লেখাপড়া শিখেও উচ্ছন্নে গেল?

মহানির্বাণ তন্ত্র চোদ্দটি পর্বে বিভক্ত, এই পর্বগুলিকে “উল্লাস” বলা হয়েছে। প্রথম উল্লাসে জগজ্জননী পার্বতী সাধারণ মানুষের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পতিদেব শিবকে বলছেন, “হে সর্বভূতেশ, তুমি সকলের অন্তর্যামী, চারবেদ তোমার দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বেদ থেকেই বর্ণাশ্রমাদি  প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সত্যযুগে মানুষ সত্যবাদী, ধার্মিক ছিল, তারা অতিলোভী বা কামুক ছিল না, সকলেই সর্বদা আনন্দে থাকত। সত্যযুগের পরে, মানুষ বেদ অনুসরণ করে, সব কর্ম করতে পারত না, বৈদিক কর্ম তাদের কাছে কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তবুও তারা বেদ ত্যাগ করেনি। তখন তুমি পৃথিবীতে বেদার্থযুক্ত স্মৃতিশাস্ত্র প্রকাশ করেছিলে, সেই শাস্ত্র অনুসরণ করে, মানুষ দুঃখ-শোক-রোগ-তাপ থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। তারপর দ্বাপরে মানুষ স্মৃতির সুকর্মও ত্যাগ করে, মনোকষ্ট এবং ব্যাধিতে আকুল হয়ে উঠেছিল। তখন তুমি ব্যাসাদি ঋষি হয়ে সংহিতাশাস্ত্র (পুরাণাদি) উপদেশ দিয়ে মানুষকে উদ্ধার করেছ।

[লক্ষ্য করার বিষয়, এখানে দেবী পার্বতী বললেন, মহেশ্বর শিবই চারবেদের প্রকাশক, তিনিই মনু হয়ে স্মৃতিশাস্ত্র রচনা করেছেন, আবার তিনিই বেদব্যাসের মতো ঋষি হয়ে পুরাণাদি রচনা করেছেন! শ্রীশ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভূতি যোগের মহিমাকেই তিনি যেন খণ্ডন করলেন!]  

তারপর পাপরূপী, সর্বধর্ম-বিলোপকারী কলিযুগ এসে গেল। এখন দেবতারা শক্তিহীন, স্মৃতি এখন স্মৃতিহীন, নানা পথ প্রদর্শনকারী পুরাণাদির বিনাশ হতে চলেছে। মানুষ মন্দমতি, শঠ, নীচ, পরের সম্পদ চুরি করে। ব্রাহ্মণেরা সন্ধ্যা-বন্দনাদি ছেড়ে শূদ্রের মত আচরণ করে। মানুষের মনে কখনো সৎচিন্তা, সৎকথা শোনা যাবে না। এই নরাধমদের উদ্ধারের জন্যেই তুমি সকল তন্ত্র রচনা করেছ এবং ভোগ ও মুক্তিপ্রদ আগমশাস্ত্র সৃষ্টি করেছ। কিন্তু এখনকার লোক কলির পাপযুক্ত, সর্বদাই অস্থিরমতি, নিদ্রা ও আলস্যে আসক্ত, এদের ভাবশুদ্ধি কী ভাবে হতে পারে?

দেবী পার্বতীর মানবের প্রতি এই মাতৃসুলভ ব্যাকুলতার উত্তরে সদাশিব দ্বিতীয় উল্লাসে বলেছেন, “হে মহাভাগে, তুমিই জগতের কল্যাণকারিণী, তুমি খুবই ভাল প্রশ্ন করেছ, এমন প্রশ্ন আগে কেউ করেনি। হে প্রিয়ে, তুমি সর্বজ্ঞা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ বিষয়ে তুমি যা যা বললে, সবই যথার্থ। হে প্রিয়ে, আমি সত্য সত্য পুনঃ সত্য বলছি, কলিকালে আগমোক্ত পথ ছাড়া অন্য পথ নেই।  কলিকালে বেদের মন্ত্রসকল বিষহীন সাপের মতো নির্বীর্য হয়ে পড়েছে, যে মন্ত্র সত্যাদি যুগে ফলদায়ী ছিল, কলিতে তারা সকলেই মৃতের মত নিষ্ফলা হয়ে গেছে।  হে দেবেশি, বেদ, আগম, বিশেষতঃ বহু তন্ত্রের সার আমি তোমাকে সংক্ষেপে বলছি। যেমন, মানুষের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞানী শ্রেষ্ঠ, নদীর মধ্যে গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, দেবতাদের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ, তেমনি সমস্ত আগম শাস্ত্রের মধ্যে এই মহানির্বাণ তন্ত্রই শ্রেষ্ঠ। এই মহাতন্ত্র বিশেষ ভাবে জানলে, জীব সর্বসিদ্ধি লাভ করে।

হে পরমেশ্বরি, বিশ্বের হিত করলে বিশ্বের ঈশ্বর প্রীত হন, কারণ তিনিই বিশ্বের আত্মা, বিশ্ব তাঁকেই আশ্রয় করে রয়েছে। তিনি এক, অদ্বিতীয়, সত্য, পরাৎপর, স্বপ্রকাশ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ। তিনি নির্বিকার, নির্বিশেষ, গুণাতীত, সর্বাত্মা, সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, বিভু ও সনাতন। হে মহেশ্বরি, সেই পরমেশ্বরই সর্বপ্রাণীর একমাত্র কারণ; তাঁর নিযুক্তিতেই ব্রহ্মা জীব সৃষ্টি করে স্রষ্টা পদবী পেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বিষ্ণু এই জগৎকে পালন করে, পালয়িতা হয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই সংহারকারী হয়ে, আমি জগতে সংহর্তা আখ্যা পেয়েছি। তুমিই তাঁর পরমা প্রকৃতি, সেহেতু তুমি ত্রিভুবনে পূজ্যা”।

চতুর্থ উল্লাসে ভগবান সদাশিব বলেছেন, “হে মহাভাগে, হে দেবি, তোমার থেকেই এই নিখিল জগৎ উৎপন্ন হয়েছে। হে শিবে, তুমিই এই নিখিল জগতের জননী। তুমি সকলের আদ্যা অর্থাৎ আদিভূতা। সকল বিদ্যা এবং আমরা সকলেও তোমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছি। তুমি জগতের সকল বিষয় জান, কিন্তু তোমাকে কেউ জানতে পারে না। তুমি কালী, তুমি তারিণী, তুমি দুর্গা, তুমিই ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ধূমাবতী, তুমিই বগলা, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, তুমিই অন্নপূর্ণা, বাগ্‌দেবী, তুমিই কমলালয়া লক্ষ্মী, তুমি সর্বশক্তিস্বরূপা এবং তুমিই সর্বদেবময়ী। তুমি সাকারা হয়েও নিরাকারা। তুমি মায়া দিয়ে বহুরূপ ধারণ কর, তুমিই সকলের আদি, অনাদি, কর্ত্রী, হর্ত্রী (হননকারিণী) এবং পালিকা। হে দেবি, এই কারণেই তোমাকে বলছি, ব্রহ্মমন্ত্রে দীক্ষিত সাধক যে ফল লাভ করে, তোমার সাধনা করেও সে একই ফল লাভ করতে পারে”।

তৃতীয় উল্লাসে দেবীর প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব শঙ্কর বলেছেন, “হে দেবি, কুলাচার বিনা শক্তিমন্ত্র সিদ্ধিপ্রদ হয় না, অতএব কুলাচারে নিরত হয়েই শক্তিসাধন করতে হবে। হে আদ্যে, শক্তিপূজা বিধানে মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন এই পঞ্চতত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। পঞ্চতত্ত্ব ছাড়া সাধকের ইষ্টসিদ্ধি হয় না, পদে পদে বিঘ্ন ঘটে”।

আবার ষষ্ঠ উল্লাসে, মহাদেব শঙ্কর পঞ্চতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন,

মদ্য - “উত্তম মদ্য বা সুরা তিনপ্রকার– গৌড়ী, পৈষ্টী এবং মাধ্বী, এই সুরা তাল, খেজুর, মধু থেকে সঞ্জাত। এই সুরা যেভাবেই তৈরি হোক এবং যেই নিয়ে আসুক, এ বিষয়ে কোন জাতিভেদ নেই, শোধন করলে সর্বসিদ্ধি দান করে। শুদ্ধি বিনা মদ্যপান, বিষপানের তুল্য – সাধক চিররুগ্ন এবং স্বল্পায়ু হয়।

মাংস – তিন প্রকারের – জলচর, ভূচর, খেচর। এই মাংস যেখান থেকেই আনা হোক বা যে ব্যক্তিই সে প্রাণীর ঘাতক হোক, শোধনের পর কিছু আসে যায় না।  বলিতে পুরুষ-পশু বিহিত, স্ত্রী-পশু হত্যা নিষিদ্ধ।

মৎস্য– শাল, বোয়াল, রুই মাছ – এই তিন মাছ উত্তম। অন্যান্য কাঁটাহীন মাছ মধ্যম, বেশি কাঁটাযুক্ত মাছ অধম।

মুদ্রা –চাঁদের মতো শুভ্র, যব অথবা গম থেকে তৈরি এবং ঘিয়ে ভাজা, মনোহর মুদ্রা (লুচি বা পুরি) উত্তম। ধান থেকে তৈরি মুদ্রা মধ্যম। অন্য শস্য (ছোলা, মটর) ভেজে তৈরি মুদ্রা অধম।

মৈথুন – নিজের দীক্ষিতা পত্নী অথবা শক্তিরূপা দীক্ষিতা পরকীয়া নারী সঙ্গম”।

সাধারণ জন এই পঞ্চতত্ত্বকেই “পঞ্চ-ম” বলে জানেন এবং বিশেষতঃ এই পঞ্চ-ময়ের কারণেই তাঁদের মনে তন্ত্র-সাধনা সম্পর্কে একটা বিভীষিকা কাজ করে, তাঁদের মনে হয়, তন্ত্রসাধনা মানেই যেন এই “পঞ্চ-ম”-এর অনাচার ও ব্যাভিচার। সাধারণের মন থেকে এই আতঙ্ক ও বিরূপভাব দূর করার জন্যে পরবর্তী অনেক তন্ত্রতত্ত্বে এই পঞ্চতত্ত্বের যে ব্যাখা করা হয়েছে, তার কথাও এখানে বলে রাখি। প্রসঙ্গতঃ বলি, ওপরের পঞ্চ-ম-এর তত্ত্ব বিবৃত করেছেন, স্বয়ং ভগবান মহাদেব, অন্ততঃ মহানির্বাণতন্ত্রে তাই দাবি করা হয়েছে। কিন্তু নিচের এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করেছেন পরবর্তী পণ্ডিতগণ -  

ইড়া ও পিঙ্গলার শ্বাসবায়ুকে একত্র করে, ধীরে ধীরে বায়ু গ্রহণ করতে হয়, তারপর মূলাধার সংকুচিত করে, “হংসঃ”[1]-মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে কুম্ভক করলে, মৎস্য সাধনা হয়। মৎস্য এখানে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্যে ঊর্ধমুখী কুল-কুণ্ডলিনী শক্তি।

এরপর কুণ্ডলিনী শক্তিকে হৃদয়ের অনাহত-পদ্মে এনে পূজা, জপ ও হোম কার্য করতে হবে, তারপর সহস্রার মহাপদ্মের ভেতর পারদের মতো উজ্জ্বল বিন্দুরূপ শিবস্থানের কল্পনা করতে হয়, এরই নাম মুদ্রা সাধনা।

এর পর সাধক কল্পনায় হৃদয়পদ্ম থেকে ষোড়শী, স্থির যৌবনা, পীন পয়োধরা, সর্বালঙ্কারভূষিতা, রক্তবর্ণা, সুন্দরদর্শনা, মৃদুহাস্যবদনা ইষ্ট দেবীকে সহস্রারপদ্মে ভগবান শিবের কাছে উপস্থিত করবেন। সাধক মৌনী হয়ে আরও চিন্তা করবেন, ওই দেবী ভগবতী ভগবান শিবের কাছে বসে, তাঁর মুখপদ্ম চুম্বন করছেন। এই চিন্তনই মাংস সাধনা।

এরপর সাধক চিন্তা করবেন, দেবী ভগবতী ভগবান শিবকে আলিঙ্গন করে সঙ্গমে নিরত রয়েছেন, এই সময় সাধক নিজেকে শক্তির সঙ্গে অভিন্ন চিন্তা করে নিজেকে পরমসুখী ও আনন্দময় জ্ঞান করবেন, এই সাধনার নাম মৈথুন।

এরপর সাধক তাঁর জিহ্বাগ্র দিয়ে তালু কুহর রোধ করে ধ্যান করবেন যে, শিব ও শক্তির মিলন ও বিহারে সুধাক্ষরণ হচ্ছে, সে সুধার স্বাদ তিনি জিহ্বাগ্রে যেন অনুভব করছেন। এই সাধনাই মদ্য সাধনা। এই সময় সাধকের নেশাগ্রস্তের অবস্থা হয়, এই অবস্থাকেই সমাধি বলে। সমাধি অবস্থার যে আনন্দ – সে আনন্দ শরীর ও মনের অব্যক্ত – ভাষায় তার বর্ণনা করা যায় না ।


চলবে...



[1] “হংসঃ” - শাক্ত ও শৈব তত্ত্বে একে অজপা মন্ত্র বলে – অর্থাৎ জীবকে এই মন্ত্র জপ করতে হয় না, তার শ্বাস – প্রশ্বাসের সঙ্গে স্বতঃই অহোরহ এই মন্ত্র জপিত হয়। নিশ্বাসের সময় “হং” শব্দে বায়ু শরীর থেকে বের হয়ে আসে, এবং “সঃ” শব্দে বায়ু শরীরে প্রবেশ করে। প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া হয় ধরে নিলে সারাদিনের ২৪ ঘণ্টায় আমরা নাকি ২৪ x ৬০ x ১৫ = ২১,৬০০ হংসঃ মন্ত্র জপ করে থাকি।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৮"


২৯

 

সুনুদা,

 প্রথমেই তোমাকে একটা চিঠি পড়াই। আমার পুত্রের লেখা প্রথম চিঠি তার মাকে,

 “আমি ভালো আছি, মা। আমার জন্যে চিন্তা করবে না। আমার থাকা-খাওয়াতে একদম কষ্ট হচ্ছে না। লেখাপড়াও মন দিয়ে করছি। টিচাররা খুব ভাল, বেশ সুন্দর পড়ায়। সদাশিবস্যার আমার অঙ্ক খাতায় তিনদিন ভেরিগুড লিখে দিয়েছে। দিদিমার দেওয়া আচারটা আমার সাতজন বন্ধু মিলে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। ওদের খুব ভালো লেগেছে আচারটা। তুমি আসার সময় আরেকটা আচার নিয়ে এসো। দাদু কেমন আছে? দাদু-দিদিমাকে আমার প্রণাম দিও। তুমিও আমার প্রণাম নিও।

ইতি বাম্বাই”।

 কার্সিয়াং থেকে ফেরার দিন দশ পরে চিঠিটা বাড়ি পৌঁছেছিল। প্রথমে পড়েছিলেন মা। তারপর বাবাকে চিঠিটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমি সন্ধ্যের সময় বাড়ি ফিরতে আমার হাতে চিঠিটা পড়তে দিয়ে বললেন, “বাম্বাই সোনা কি সুন্দর চিঠি লিখেছে পড়ে দেখ। তোকে তখনই বলেছিলাম, দু বোতল আচার নিয়ে যা। কথা শুনলি না। এক বোতল আচার ওর বন্ধুরাই খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। বেচারা এখন কি খাবে?”

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর তাঁর কথা শুনে আমি বেশ খুশিই হলাম। অনেকদিন পর মাকে বেশ স্বাভাবিক লাগল। মায়ের সেই রুক্ষ-খিটখিটে মেজাজটা তখন অনেকটাই শান্ত। বাম্বাইয়ের চিঠিটা বুকের কাছে ধরে, আমি আমার ঘরের দিকে যেতে যেতে হেসে বলেছিলাম, “বেশ তো এবার তিন বোতল দিও, দিয়ে আসব”।

“কবে যাবি তুই?”

“তিন মাস পর”।

“তিন মাস? সে তো অনেক দেরি। কেন সামনের হপ্তায় শনি-রবি করে যেতে পারবি না? ছেলেটার ওপর তোর কি একটুও টান নেই? কেমন মা তুই, সুনু?” মায়ের স্বর আগের মতোই আবার কর্কশ হয়ে উঠল।

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, “এটা স্কুলের নিয়ম, মা। আমার কিছু করার নেই। বাড়ির লোকরা বারবার গেলে বাচ্চাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ভেবেই, ওরা এই নিয়ম বানিয়েছে”।

মা বুঝলেন না, উল্টে আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রয়োজন মত ছেলের সঙ্গে মা দেখা করতে যেতে পারবে না? আর মা বুঝি বাড়ির লোক? কী যে বলিস সুনু, তোর মাথা-ফাথা খারাপ হয়েছে মনে হয়”।

আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চিঠিটা দু হাতে মেলে ধরলাম। মনে হল, বাম্বাইয়ের দুটো হাত যেন আমার দু হাতের মুঠোয়। টেবিলে বসে ঘাড় নীচু করে চিঠিটা যে হাতে লিখেছে, সেই হাতেরই স্পর্শ আমি যেন পেলাম ওর চিঠির প্রতিটি অক্ষরে। কিন্তু প্রতিটি অক্ষর কেমন ঝাপসা ঠেকল আমার দু চোখে। এমন অসময়েই কি আমার দুচোখে ভরে উঠতে হয় অশ্রুবিন্দুতে? মাথার বালিশের তলায় চিঠিটা রেখে দিলাম। ফ্রেশ হয়ে বাইরের জামা-কাপড় বদলে চলে গেলাম বাবার পাশটিতে। বাবা চোখ তুলে তাকালেন, তাঁর মুখটা হাসির প্রচেষ্টায় কিছুটা বেঁকে গেল। খুব শান্ত স্বরে বললেন, “ছেলেটা ভালই আছে, বল?”

রাত্রে খাওয়ার দাওয়ার পর নিজের ঘরে যখন শুতে গেলাম, বালিশের তলা থেকে নিশ্চিন্তে বের করলাম বাম্বাইয়ের চিঠিটা। খুব মন দিয়ে পড়লাম চিঠিটা। আগেকার বাংলা সিনেমায় যেমন দেখাত, চিঠির মধ্যেই ফুটে উঠত লেখকের মুখ এবং তিনিই সুন্দর আবৃত্তি করে পড়ে দিতেন চিঠিটা। আমার মনে হল, আমিও সেরকম পোস্টকার্ডের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম বাম্বাইয়ের মুখখানি এবং সেই যেন পড়ে শোনাল চিঠিটা। অনেকবার পড়লাম চিঠিটা – এবং ওই ছোট্ট চিঠিতেও যেন খুঁজে পেলাম ওর জীবনের কিছু কিছু পরিবর্তনের শুভ সূচনা। ওর অঙ্কের স্যার সদাশিববাবুকে ও ভালবেসে ফেলেছে – তিনি শুধু যে ভালো পড়ান তাই নয়, অঙ্ক ঠিকঠাক পারলে, খাতায় “ভেরিগুড” লিখে ছাত্রদের উৎসাহও দেন। ওর নতুন বন্ধুদের সঙ্গেও বাম্বাই অনেকটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছে। তা নাহলে ওর আচারে তারা নির্দ্বিধায় ভাগ বসাত না। চিঠিটা বারবার পড়েও তৃপ্তি হচ্ছিল না কিছুতেই। মনে হচ্ছিল, চিঠিটার বিটুইন দ্য লাইন্‌স্‌ অনেক কিছু বোঝার আছে, উপলব্ধির আছে। সেই অর্থ বুঝতে বুঝতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানতেও পারিনি।

সকালে ঘুম যখন ভাঙল, নিজেকে খুব চাঙ্গা আর হাল্কা অনুভব করলাম। এমন গভীর ঘুম কত দিন যে ঘুমোইনি। আমার শরীরে ও মনে বাম্বাইয়ের ওই ছোট্ট চিঠিটাই যে নতুন এনার্জি সঞ্চার করেছে, বেশ বুঝতে পারলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে, বাম্বাইয়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর না দিলে, ও যদি অভিমান করে, ভাবে, “মা কি এতই ব্যস্ত যে আমার চিঠির উত্তর দিতে পারল না?” আমার যে এমন চিঠি অনেক অনেক চাই, প্রতি সপ্তাহে, অন্ততঃ একটা! অতএব নিজের স্বার্থেই আমার যে বিলম্বে উত্তর দেওয়া চলবে না।

অফিসে গিয়েই আমাদের অফিসের পিওন রতনদাকে চিঠিটা পোস্ট করতে পাঠালাম। পাড়ার ডাকবাক্সে নয়, সবথেকে কাছের পোস্ট-অফিসের মেলবক্সে।

তারপর আমাদের এইচআরের রজতকে ডাকলাম। তাকে বললাম, যে ক্যুরিয়ার সার্ভিসে আমাদের রেগুলার চিঠিপত্র যায়, তাদের কি কার্সিয়াংয়েও সার্ভিস আছে? জেনে নাও তো ভাই। আর যদি থাকে, তারা কি কাচের বোতলে আচার পাঠালে ডেলিভারি করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে অন্য উপায় কিছু আছে কি?

রজত খুব স্মার্ট ছেলে, এতটুকু চিন্তা না করে উত্তর দিল, “ক্যুরিয়রের সঙ্গে কথা আমি বলে নিচ্ছি। কিন্তু তার থেকেও তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবে ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস সার্ভিস। আজ বিকেলে ধর্মতলায় পার্সেল ডেলিভারি দিলে, আগামীকাল বিকেলের মধ্যে কার্সিয়াং পোঁছে যাবে নিশ্চিন্তে”।      

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এরকম হয় নাকি?”

রজত মুখে বোদ্ধার মতো হাসি নিয়ে বলেছিল, “এই তো করছি আমরা, ম্যাডাম। উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, নর্থ বেঙ্গল, আপটু গুয়াহাটি - বাস সার্ভিসের মতো প্রম্পট আর হেল্পফুল সার্ভিস আর কিছু হয় না”।

যাই হোক ওই ব্যবস্থাতেই বাম্বাই ও তার বন্ধুরা, দিদিমার আচারের স্বাদ পেতে লাগল নিয়মিত এবং মা তাঁর নাতির জন্যে কিছু একটা করতে পেরে বেশ খুশিই হয়ে উঠলেন।

 তিনমাস পূর্ণ হওয়ার প্রথমদিনেই আমি মাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম কার্সিয়াংয়ের উদ্দেশে। ওইসময় বাবাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে। এই পরামর্শটা আমাকে চুপিচুপি দিয়েছিলেন তোমার মা। মামিমা। বলেছিলেন, “যাওয়া-আসা নিয়ে খুব জোর তিন চারদিনের ব্যাপার, মা কে সঙ্গে নিয়ে যা সুনু। তোর মায়ের সঙ্গে তার নাতির দেখাও হবে, দেখা হবে বাম্বাইয়ের স্কুল, তার পরিবেশ। আর দু একদিন বেশি থেকে দারজিলিং, টাইগার হিল, এসবও ঘুরিয়ে আনতে পারিস। তোর মায়ের মনটা কিছুটা হাল্কা হবে। একভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকে, দিন রাত তোর বাবার সেবায় ব্যস্ত। একমাত্র রিলিফ ছিল বাম্বাই, সেও চলে গেল কার্সিয়াং। বেচারা খিটখিটে হবে না কেন, আমাকে বুঝিয়ে বল তো?”

হোটেলে লটবহর রেখে আমরা স্কুলে গিয়ে যখন দেখা করলাম, সাড়ে চারটে বাজে - তখনও সূর্য অস্ত যায়নি। বিকেলের রোদে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতায় মোড়া চারপাশের পাহাড়ের চূড়াগুলো আশ্চর্য সুন্দর। আর নীচের পাইন বন থেকে উঠে আসছে হালকা কুয়াশা। আমাদের গায়ে হাল্কা সোয়েটার ছিল, শিরশিরে বাতাসের স্পর্শে পাচ্ছিলাম শীতলতার আমেজ। মাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “জায়গাটা কেমন লাগছে, মা?”

মুগ্ধ চোখে চারদিক দেখতে দেখতে মা বললেন, “এ তো স্বর্গ রে। ভাল করেছিস, তুই বাম্বাইসোনাকে এখানে পাঠিয়ে। আমি ভেবেছিলাম, জেলখানায় কয়েদিদের মতো বন্দী বুঝি”।

অ্যাডমিন অফিসের সামনের লনের দুধ সাদা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে মিনিট পনের অপেক্ষার পরই বাম্বাইয়ের গলা পেলাম – “মা...দিদিমা...”। দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। কলকাতায় থাকতে কেমন যেন চুপচাপ, ভীতুভীতু হয়ে থাকত বাম্বাই। তিনমাসের অদর্শনে আমার তৃষিত মাতৃত্বের চোখ দুটো যেন সার্থক হয়ে উঠেছিল সেদিন। কি প্রাণোচ্ছল, আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ছেলেটা। সঙ্কোচহীন আনন্দ ওর দুই চোখে। কাছে এসে আমাদের দুজনকেই জড়িয়ে ধরল। মা তো ওকে নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। চুমো খাচ্ছিলেন, আদর করছিলেন, অনর্গল বলছিলেন “আমার সোনাবাবাটা, আমার সোনাবাবাটা। এই তিনমাসেই কত বড়ো হয়ে গেছে আমার বাবাটা”।

সে সময় মামিমার কথা মনে পড়ছিল খুব। মামিমা না বললে এবং তিনি আমার বাবার দেখভালের দায়িত্ব না নিলে, মাকে সঙ্গে আনার কথাটা আমার মাথাতেই আসত না। আর এখন আমি দুচোখ ভরে দেখছি – মা আর তাঁর নাতির প্রাণখোলা আনন্দের প্রকাশ। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। কার্সিয়াংয়ের এই সন্ধ্যেয় সুন্দর সবুজ লনের বেঞ্চে বসে আছি আমরা তিন প্রজন্ম। মাঝের প্রজন্মের এই আমি – অন্য দুই প্রজন্মের আলাপ শুনে খুশিতে আনন্দে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। বাম্বাইকে দেখে ভালো লাগছিল তো বটেই, ভালো লাগছিল মাকে দেখেও। বহুদিন ঘড়ি ধরে স্বামীর সেবা, পথ্য, ওষুধ-পত্র নিয়ে ডুবে থাকা মা, অতি শীর্ণ নদীর মতোই নিষ্প্রাণ প্রাণটাকে বয়ে চলেছিলেন নিঃশব্দে। আজ সেই নদীতেই দুকূল ভাসানো আবেগ মাখা প্রাণবন্ত জোয়ার।

কোথা দিয়ে যে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বোঝাই গেল না। অফিস থেকে একজন মহিলা আমাদের ডেকে বললেন, “টাইম ইজ আপ। ছটা বেজে গেছে। সুধন্বা তোমার রুমে চলে যাও। আপনারা কালকেও রয়েছেন তো?”

আমি বললাম, “কাল তো রোববার, কাল কি সুধন্বাকে নিয়ে আমরা দার্জিলিং শহরটা ঘুরে আসতে পারি?”

“নিশ্চয়ই পারেন – কিন্তু সকাল নটা থেকে সন্ধ্যে ছটা। ছটা পনের পর্যন্ত না ফিরলে কিন্তু প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে রিপোর্ট চলে যাবে। তাতে নেক্সট ভিজিটের সময় আপনাদেরই অসুবিধে হবে”।

আমি বিনীতভাবে প্রমিস করলাম, “ছটার আগেই আমরা সুধন্বকে নিয়ে ফিরে আসব ম্যাডাম”।

সত্যি বলতে, সুনুদা, এই কবছরে বাম্বাইয়ের জন্যে কার্সিয়াং গিয়েছি বহুবার। এরকম দেখা করতে। কিংবা ওর স্কুলের ভেকেশনের সময় ওকে বাড়ি আনতে। বহুবার। কিন্তু সেই প্রথমবারে যে আনন্দ আর আশ্চর্য এক স্বস্তির আস্বাদ পেয়েছিলাম, পরে আর কোনদিন অনুভব করিনি। মাত্র ওই কয়েকটা দিন আমার জীবন-স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। থেকেও যাবে আমৃত্যু।

সমপরিমাণ দুঃখ আর সুখ মিলিয়ে-মিশিয়ে গড়ে নিতে হয় আমাদের জীবনের সবটুকু, আজ এই কথাটা বুঝে গিয়েছে,

তোমার কনি। 

চলবে...  

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৫

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...