এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
তারপর শব্দতন্মাত্র আকাশ থেকে
কালশান্তির প্রভাবে স্পর্শতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। তার থেকে বায়ু উৎপন্ন হয়ে ত্বক
ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে স্পর্শের সম্পর্ক ঘটে। মৃদু, কঠিন, শীত, উষ্ণ এবং বায়ুর সূক্ষ্ম অবস্থা
হল স্পর্শের লক্ষণ। বায়ু বৃক্ষশাখাদের চঞ্চল করে, তৃণদের মিলিত করে, সকল বস্তুর
সঙ্গে সংলিপ্ত থাকে এবং গন্ধদ্রব্যের গন্ধকে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের কাছে, শীত ও উষ্ণতা
প্রভৃতিকে ত্বক ইন্দ্রিয়ের কাছে এবং শব্দকে শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কাছে বহন করে। এই
সমস্ত কর্মে বায়ুর লক্ষণ উপলব্ধি হয় এবং বায়ু সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজীব রাখে। এইভাবে
স্পর্শতন্মাত্র ও বায়ুর দৈবযোগে রূপতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। রূপ তন্মাত্র থেকে চক্ষুর
সম্বন্ধ ঘটে। রূপ বস্তুর সঙ্গে অনুভব করা যায়, স্বতন্ত্র অনুভব করা যায় না। বস্তুর
যেমন আকার স্থূল, সূক্ষ্ম, ঋজু বা বক্র, রূপেরও তেমন অনুভূতি; সুতরাং এই সকল রূপের
লক্ষণ।
তেজ আহার পাক করে, ক্ষুধাতৃষ্ণার
উদ্রেক করে ভোজন ও পান করায়, শৈত্য নিবারণ করায়, উষ্ণতা শোষণ করায়। এই স্কল কার্য
তেজের লক্ষণ। রূপ তন্মাত্র তেজ কাল প্রভাবে রসতন্মাত্র সৃষ্টি করে। রসতন্মাত্র
থেকে জলের সৃষ্টি হলে জিভের সঙ্গে রসের সম্পর্ক ঘটে। রস সাধারণতঃ মধুর, কিন্তু যে
সব ভৌতিক পদার্থের সঙ্গে সংসর্গ ঘটে, সেই অনুসারে কষায়, মধুর, তিক্ত, কটু, অম্ল ও
লবণ, এই ছয় প্রকারের রসের অনুভব হয়। জল পদার্থকে সিক্ত করে, জীবকে তৃপ্তি দিয়ে
তাদের জীবিত রাখে, পিপাসা ও তাপের নিবৃত্তি করে; সুতরাং এই সমস্তই জলের বৃত্তি
অর্থাৎ কার্য। তারপর রসতন্মাত্র জল কালের প্রভাবে গন্ধতন্মাত্রের সৃষ্টি করে এবং
তার থেকে পৃথ্বী উৎপন্ন হলে ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে গন্ধের সংযোগ স্থাপন করে।
ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন গন্ধের অনুভব হয়, মিশ্রগন্ধ,
দুর্গন্ধ, কর্পূর ইত্যাদির সৌরভ, পথ্য ইত্যাদির শান্তগন্ধ, লশুন ইত্যাদির উগ্রগন্ধ
ও অম্লগন্ধ। পৃথ্বীতত্ত্বের লক্ষণ এই যে, এর থেকে প্রতিমারূপে ব্রহ্মের সাকারতা
সাধিত হয়। পৃথ্বী স্বতন্ত্র ভাবে অবস্থান করতে পারে, জল ইত্যাদির মতো অপরের নির্ভর
করে না। এই পৃথ্বীতত্ত্ব জল ইত্যাদির আধার ও আকাশ ইত্যাদির বিভাজক; পৃথ্বী থেকে
সমস্ত জীবের আকার প্রকাশ পেয়ে থাকে।
হে মাতঃ এখন তোমাকে জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের লক্ষণসমূহ বলছি, শোন। কান দিয়ে আকাশের অসাধারণ গুণ শব্দ শোনা যায়। ত্বক দিয়ে বায়ুর অসাধারণ গুণ স্পর্শ অনুভব হয়, চোখ দিয়ে তেজের অসাধারণ গুণ রূপ দেখা যায়, জলের অসাধারণ গুণ রস গ্রহণ করা যায় জিভে, ভূমির অসাধারণ গুণ গন্ধ যে ইন্দ্রিয় গ্রহণ করে, তার নাম নাক। এইভাবে আগেকার সকল মহাভূতের গুণ পরের মহাভূতে সংযুক্ত হওয়ার কারণে, পৃথ্বীতত্ত্বে আকাশ ইত্যাদি সকল ভূতের অসাধারণ গুণ অনুভূত হয়। সৃষ্টির শুরুতে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সকল তত্ত্ব যখন অমিশ্রিত অবস্থায় অবস্থান করছিল, তখন জগতের আদি কারণ ঈশ্বর কাল অর্থাৎ গুণ সমূহে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী শক্তি, কর্ম অর্থাৎ জীবের অদৃষ্ট ও গুণ অর্থাৎ প্রকৃতি; এই তিন কারণে অধিষ্ঠিত হয়ে, ওই সকল তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন।
এই ব্রহ্মাণ্ড শ্রীহরির রূপ। কারণ সলিলে অবস্থিত এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ভগবান উত্থিত হলেন অর্থাৎ উদাসীন অবস্থা পরিত্যাগ করে অধিষ্ঠিত হলেন ও অনেক ইন্দ্রিয় ছিদ্র প্রকাশ করলেন। প্রথমতঃ এই বিরাট পুরুষের মুখ প্রকাশিত হল এবং বাক্য ইন্দ্রিয়ের দেবতা অগ্নির তার মধ্যে প্রবেশ করল। তারপর প্রাণের অন্বয়ে নাক প্রকাশ হলে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের দেবতা বায়ু তার মধ্যে আশ্রয় নিল। এইভাবে অক্ষিগোলকে চোখের দেবতা সূর্য, কানের প্রকাশ হলে শ্রবণের দেবতা দিগ্দেবতা প্রবেশ করলেন। তারপর বিরাট পুরুষের ত্বক, রোম ও শ্মশ্রু প্রকাশে ত্বকের ঔষধি দেবতাগণ, শিশ্নর প্রকাশ হলে বীর্যের দেবতা অব্দেবতা, পায়ু প্রকাশিত হলে, অপান ইন্দ্রিয়ের দেবতা মৃত্যুর অধিষ্ঠান হল। হাত ও পায়ের প্রকাশে, বল ও গতির দেবতা ইন্দ্র ও বিষ্ণু, নাড়িসকল প্রকাশিত হলে শোণিতর দেবতা নদীর অধিষ্ঠান হল। তারপর উদর প্রকাশিত হলে, ক্ষুধা ও পিপাসা ইন্দ্রিয়ের দেবতা সমুদ্রদেবের সঙ্গে অধিষ্ঠিত হল। পরে বিরাট পুরুষের হৃদয়ে মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত, যথাক্রমে চন্দ্র, ব্রহ্মা, রুদ্র ও চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞর সঙ্গে অধিষ্ঠান করতে লাগল। দেবতা চৈত্ত ছাড়া অন্য সকল দেবতাই বিরাট পুরুষকে জাগরিত করার জন্যে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় স্থানে অধিষ্ঠান করলেও, বিরাট পুরুষ জাগ্রত হলেন না। তারপর চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞ চিত্ত তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করামাত্র তিনি কারণ বারিধি থেকে উত্থিত হলেন। যে ক্ষেত্রজ্ঞ ছাড়া প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সুপ্ত পুরুষকে জাগ্রত করতে পারে না, সেই ক্ষেত্রজ্ঞকে চিন্তা করতে হবে। প্রথমতঃ পরমেশ্বরে ভক্তি, দ্বিতীয়তঃ অন্যত্র সকল বিষয়ে বৈরাগ্য, তারপর যোগ অনুষ্ঠানে একাগ্র চিত্ত হলে যে জ্ঞান সৃষ্টি হবে, সেই জ্ঞানের সাহায্যে এই দেহে ক্ষেত্রজ্ঞকে আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হবে।
শ্রীভগবান বললেন, “যাঁকে পুরুষ
বলে উল্লেখ করলাম, ইনি স্বভাবতঃ নির্গুণ; এই নিমিত্ত তিনি অকর্তা, সুতরাং
নির্বিকার। জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া পড়লে যেমন সেই ছায়া কাঁপে, কিন্তু আকাশের
সূর্য কাঁপে না, তেমনই প্রকৃতিতে অর্থাৎ দেহে অবস্থান করে, এই পুরুষ এই দেহের সুখদুঃখের
অংশীদার বলে মনে হলেও, বস্তুতঃ তিনি নির্লিপ্ত থাকেন। যখন এই পুরুষ প্রকৃতির
গুণসমূহে একান্ত আসক্ত হন, তখন প্রকৃতির কার্যকে “আমি করছি” এই অভিমানে বিমূঢ় হয়ে
থাকেন। এই অভিমানে পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের জন্য পাপ ও পুণ্য অর্জন করে এবং
সেই কর্মদোষে সৎ অর্থাৎ দেবযোনি, মিশ্র অর্থাৎ মনুষ্যযোনি অথবা অসৎ অর্থাৎ
তির্যকযোনিতে বারবার জন্মমৃত্যুর দশা লাভ করে, কখনো পরমানন্দ স্বরূপ লাভ করতে পারে
না। পুরুষের কর্ম না থাকলেও কর্তার ভ্রান্ত অভিমানে, সংসারের বিষয়ে আসক্ত হয়ে
অনর্থ দশা পায়। অতএব বিষয়ের প্রতি একান্ত আসক্ত মনকে, কঠোর ভক্তি ও বৈরাগ্য দিয়ে
ধীরে ধীরে বশীভূত করাই কর্তব্য।
হে মাতঃ, যে ভাবে আত্মলাভ হয়, সে
কথা বলছি শোন। শ্রদ্ধার সঙ্গে যোগ অবলম্বন করে মনকে বার বার একাগ্র করবে, অকপট
আচরণ করবে, আমার প্রতি একান্ত ভক্তি নিয়ে, আমার কথা শুনবে। সর্বভূতে সমদর্শীতা,
শত্রুতা ত্যাগ, সঙ্গ ত্যাগ, ব্রহ্মচর্য, মৌনতা, নিজের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী কর্ম
ঈশ্বরে অর্পণ, যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তোষ, পরিমিত আহার, একাগ্র চিন্তা,
নির্জনে বাস, রাগদ্বেষ পরিত্যাগ, সর্বভূতের মঙ্গল চিন্তা, করুণা, ইন্দ্রিয়জয়,
স্ত্রীপুত্রকন্যা ও নিজের দেহের প্রতি “আমি” ও “আমার” এই অভিমান ত্যাগ, এই সমস্ত
সৎগুণ থাকতে হবে। এইভাবে প্রকৃতি ও পুরুষ বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞান হলে, জাগ্রত অবস্থার
নিবৃত্তি হয়ে অন্তরের দিকে দৃষ্টি যায়, তখন আর অন্য বস্তুর দিকে লক্ষ্য যায় না।
যোগীব্যক্তি নিজের অবিচ্ছিন্ন আত্মা দিয়ে শুদ্ধ আত্মাকে লাভ করেন এবং শেষে
প্রকৃতির আবরণহীন, মিথ্যা অহঙ্কারে সত্যরূপে ভাসমান ব্রহ্মকে লাভ করতে পারেন।
শুদ্ধ জীবস্বরূপের থেকে ব্রহ্মের পার্থক্য এই যে, ইনি প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতির
অধিষ্ঠান; চোখের মতো নিখিল সৃষ্টির প্রকাশক এবং নিখিল কার্য-কারণের সম্পর্কযুক্ত
অদ্বয় অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপে বিরাজিত।
হে জননি, জীবাত্মা কিভাবে
শুদ্ধব্রহ্মকে লাভ করতে পারে একটি উদাহরণ দিয়ে বলি শোন। কখনো কখনো জলে সূর্যের
ছায়া পড়লে, সেই ছায়া আবার ঘরের দেওয়ালেও দেখা যায়। তখন সেই গৃহে থাকা ব্যক্তি,
ঘরের মধ্যে সূর্যের ছায়া কোথা থেকে এল, সন্ধান করতে করতে প্রথমে জলের মধ্যে
সূর্যের ছায়া এবং অবশেষে আকাশের সূর্যের সন্ধান পায়। একই ভাবে সাধক প্রথমতঃ ভূত,
ইন্দ্রিয় ও মনে আত্মা অর্থাৎ চৈতন্যের ছায়া অর্থাৎ প্রকাশ দেখতে পান। জড়বস্তুতে ঐ
ছায়া কোথা থেকে এল, অনুসন্ধান করতে গিয়ে ত্রিগুণ অহঙ্কারে চৈতন্যের প্রকাশ দেখতে
পান। তারও পরে কারণ অনুসন্ধান করতে
করতে স্বপ্রকাশ ব্রহ্মচৈতন্য উপলব্ধি করতে পারেন।
হে মাতঃ, এই আত্মাকে কিভাবে
সুষুপ্তির সাক্ষিরূপে অনুভব করা যায়, তাও তোমাকে দেখাচ্ছি। সুষুপ্তিকালে স্থূলভূত,
সূক্ষ্মভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অব্যক্ত প্রকৃতিতে লয় অবস্থায় থাকে। তখন আত্মা
বিনিদ্র ও অহঙ্কারহীন অবস্থায় অবস্থান করে। যদি বলো, আত্মা যদি বিনিদ্রই থাকে, তবে
জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্নদর্শনের মতো আত্মার স্ফূরণ দেখা যায় না কেন? তার কারণ হল,
জাগ্রত ও স্বপ্নকালে আত্মা দ্রষ্টা থাকেন, দৃশ্য বিষয়ের সঙ্গে পার্থক্যের জন্য,
নিজেকে দ্রষ্টা হিসেবে বুঝতে পারেন। কিন্তু সুষুপ্তিকালে অহঙ্কারের সকল বিষয় ভূত
ইত্যদি বিলীন হয়ে যায় এবং অহঙ্কারও বিনষ্ট হয়; তখন আত্মা নিজে নষ্ট হন না, কিন্তু
নিজেকে নষ্ট ভেবে বিভ্রান্ত হন। ধনী ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হলে, সেই ব্যক্তি যেমন
নিজে নষ্ট না হয়েও, নিজেকে ধ্বংস মনে করে ব্যাকুল হয়, আত্মারও সেই একই অবস্থা ঘটে।
জীবের দেহ, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি অহঙ্কারের সমন্বয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে, অতএব অহঙ্কারকেও
দৃশ্য পদার্থের মধ্যে গণ্য করা হয়; কিন্তু আত্মা দ্রষ্টা, অহঙ্কার ও সকল দেহের
আশ্রয় ও প্রকাশক। এই কারণে সুষুপ্তিকালে নিখিল
দৃশ্যপদার্থ থেকে ভিন্ন আত্মা নিজেই প্রকাশ পায় এবং শুদ্ধ সাক্ষিচৈতন্যরূপে
অবস্থান করেন”।
মাতা দেবহূতি বললেন, “হে প্রভু,
তুমি বললে প্রকৃতি ও পুরুষ পরষ্পরের মধ্যে নিত্য আশ্রয় ও আশ্রিতভাব। মনে ভক্তি ও
বৈরাগ্য আনলেও, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়, তাহলে কিভাবে মুক্তি হওয়া সম্ভব?
পুরুষ অকর্তা হলেও, প্রকৃতির যে সমস্ত গুণের কারণে পুরুষের কর্মের বন্ধন হয়, সেই
সমস্ত গুণ বর্তমান থাকলে পুরুষের কৈবল্য প্রাপ্তি কিভাবে সম্ভব? আমার মনে হয়, এই
কারণেই কোন কোন পুরুষ তত্ত্ববুদ্ধি দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করলেও, তাঁর মধ্যে
প্রচ্ছন্ন ভয় থেকেই যায় এবং সেই কারণে আবার মৃত্যুভয় উপস্থিত হয়”।
শ্রীভগবান বললেন, “হে মাতঃ,
কামনাহীন ধর্ম আচরণ, নির্মল অন্তর, আমার কথা শোনার ফলে মনে সুদৃঢ় ভক্তি, তত্ত্ব
উপলব্ধির প্রগাঢ় জ্ঞান, তীব্র বৈরাগ্য, তপস্যা ও আত্মসমাধি যোগে প্রকৃতি দিন
রাত্রি জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যন্ত বিনষ্ট হয়। এই ভাবে বিনষ্ট প্রকৃতি, স্বতন্ত্র ও
পরমানন্দে অধিষ্ঠিত পুরুষের কোন অশুভ করতে পারে না। বহুবার জন্মগ্রহণ করে জীব যখন
আত্মনিষ্ঠ হন এবং নিখিল ভুবনে বৈরাগ্যযুক্ত হন, তখন আমার প্রসাদে কৈবল্যনামক
স্বরূপ প্রাপ্ত হন এবং আত্মজ্ঞান লাভ করে মনের সকল সংশয় ছিন্ন করতে সমর্থ হন। তারপর
লিঙ্গশরীর বিনষ্ট হলে, সেই যোগী সংসারে আর ফিরে আসেন না। হে মাতঃ, এই অবস্থায়
যোগের আনুষঙ্গিক ফল, অণিমা ইত্যাদি সিদ্ধিসকল, বাধা হয়ে উপস্থিত হয়। সিদ্ধযোগী যদি
ওই প্রলোভনে আকৃষ্ট না হন, তবে তিনি পরামুক্তি লাভ করেন এবং তাঁর মৃত্যুভয় চিরতরে
দূর হয়ে যায়”।
মাতা দেবহূতি সাংখ্যজ্ঞানের প্রবর্তক সেই ভগবানকে প্রণাম করে স্তব করতে করতে বললেন, “ব্রহ্মাণ্ড স্বয়ং যাঁর নাভি মণ্ডল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যিনি নিখিল কার্য ও কারণ। যাঁর মধ্যে সত্ত্ব প্রভৃতি তিনগুণের প্রবাহ বর্তমান। সেই তুমিই এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমি নিষ্ক্রিয় ও সত্য সঙ্কল্প, এই কারণে তুমি প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি না করেও, নিজের শক্তিকে তিন গুণের প্রবাহে বিভক্ত করে জীবগণকে ভোগের জন্য সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমিই এক হয়ে এই অসংখ্য বিচিত্র ভোগের বিধান দাও। তোমার অনন্ত অচিন্ত্য শক্তির কে ইয়ত্তা করতে পারবে? হে নাথ, প্রলয় কালে এই বিশ্ব যাঁর জঠরে ছিল, তাঁকে আমি কী ভাবে গর্ভে ধারণ করেছিলাম? অথবা যেমন কল্পের অন্তে, তোমার মায়ার প্রভাবে তুমি শিশুরূপ ধারণ করেছিলে এবং একটিমাত্র বটপাতায় শুয়ে নিজের পায়ের আঙুল পান করেছিলে, এও তোমার সেই রকমই কোন মায়া? অথবা তুমি দুষ্টগণের শাসন, ভক্তদের সমৃদ্ধি ও জ্ঞানমার্গের পথ দেখানোর জন্য, তোমার নানান অবতার মূর্তির মতো আরেক মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছ? হে ভগবান, যাঁরা তোমার নাম গ্রহণ করেন, তাঁরা তপস্যা, হোম, তীর্থদর্শন ও বেদপাঠের সমান ফল লাভ করেন। যদি চণ্ডালের জিহ্বাতেও তোমার নাম উচ্চারণ থাকে, শুধুমাত্র সেই কারণেই সে সদাচার পবিত্র হয়ে ওঠে, সন্দেহ নেই। তুমি ব্রহ্ম, তুমি পরমপুরুষ। মন বিষয় থেকে নিবৃত্ত হলে, তোমাকে চিন্তা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। নিখিল বেদ তোমার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। হে প্রভু, তুমিই কপিলরূপী বিষ্ণু, আমি তোমাকে প্রণাম করি”।
তৃতীয় স্কন্ধ সমাপ্ত
এর পর শুরু হবে চতুর্থ স্কন্ধের প্রথম পর্ব।