এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯ "
৩৬
রামালি রান্না বসানোর কিছুক্ষণ পরেই নিঃশব্দে ঢুকল মারুলা। ভল্লার
পাশে বসেই বলল, “তোদের নোনাপুরে শল্কু বলে কেউ আছে? চিনিস, রামালি?” ভল্লা এবং রামালি
দুজনেই চমকে ঘাড় ঘোরালো মারুলার দিকে। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “আছে বৈকি। কিন্তু তুই তাকে
চিনলি কী করে?”
“আজ দুপুরে আস্থানে গিয়েছিল যে, তোদের নামে অভিযোগ জানাতে…”।
রামালি ঘুরে বসল, “অভিযোগ জানাতে আস্থানে গিয়েছিল? কী বলছো?
এত সাহস?”
ভল্লা শল্কুর পরিচয় দিল এবং শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত তার সব
আচরণের কথা মারুলাকে বলল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “কার কাছে অভিযোগ করেছে?”
“উপানুর কাছে”।
“উপানু কী বলল?”
“সে ব্যাটা আমাকে সব কথা বলে নাকি? আমি শষ্পককে গিয়ে বলতে, শষ্পক
উপানুকে ডেকে পাঠিয়েছিল। সেখানে আমিও ছিলাম। শল্কু নাকি তোদের দলের কথা। তোরাই যে আস্থানে
ডাকাতি করতে গিয়েছিলি এবং সে দলে ও নিজেও যে ছিল সে কথাও নাকি স্বীকার
করেছে। বলেছে চুরি করা অস্ত্র-শস্ত্র তোরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ও দেখিয়ে দিতে
পারবে”।
“তারপর?”
“শষ্পক উপানুকে বেশ কড়া করেই ধমক দিয়ে বলল, “ওই ছোকরার কথায়, এবার আর তোমার ওপর কোন দায়িত্ব আমি দেব না, উপানু।
গতবার বলেছিলাম গাঁয়ের লোকদের একটু রগড়ে ভয় দেখাতে। তোমরা গ্রামপ্রধানকে এমন মারলে,
বেচারা বৃদ্ধ মারাই গেল! আর ভীলক নামের একজনকে এমন মেরেছো,
শুনতে পাই তারও অবস্থা ভাল নয়। কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আনতে বলেছিলাম, তার পা
দুটোর কী অবস্থা করেছো, উপানু? এতদিন পরেও সোজা পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না! এমন কাণ্ড
বাধালে যে – আমার
কাছে রাজধানী থেকে প্রায় রোজই দূত আসছে গ্রামের পরিস্থিতি কী জানার জন্যে। তার উত্তর দিতে দিতে আমার দোয়াতের কালি ফুরিয়ে
যাচ্ছে। নাচার বুড়োগুলোর ওপরেই তোমার যত বীরত্ব, না? তোমার ভরসায় আর কোন ঝুঁকি আমি নিতে পারব না”।
ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজমশাইয়ের পায়ে কী
হয়েছে?”
“জানিস না? উপানু শুয়োরের বাচ্চা তাকে ঘোড়ার পাশে
ঝুলিয়ে এমন করে নিয়ে গেছে, দুটো পায়েরই চেটো দুটোয় হাড় কখানা ছাড়া কিছুই প্রায় অবশিষ্ট
ছিল না। বেচারা নিজেই নিজের চিকিৎসা করছেন, এখন কিছুটা ভালোর দিকে। কিন্তু জীবনে
কোনদিন আর হাঁটতে পারবেন বলে, আমার মনে হয় না”।
ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, রামালিও - কেউই
কোন কথা বলল না।
মারুলা বলল, “তারপর শোন না, শালা উপানু কুকুরের
মতো কুঁইকুঁই করে বলল, “এমন সুযোগটা ছেড়ে দেব, সরকার”? কথাটা শুনে শষ্পক উপানুর
দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের এমন একটা হাসি দিল না, উপানুর পোঁদ জ্বলে গেল মনে হয়,
নাকে যেন চামড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম। তারপর বলল, “বুঝতে পারছ না,
উপানু, ওরা ফাঁদ পেতেছে? তোমরা ওর সঙ্গে গেলে তোমাদের ঘিরে ধরে, পিটিয়ে মারবে। দু-তিনটে
গ্রামের লোক জড়ো হলে সামলাতে পারবে, উপানু? তার ওপর ওদের ছোকরাদের হাতে আমাদের অতগুলো
অস্ত্র আছে...আর পেছনে আছে হতভাগা ভল্লা...না উপানু, আমি কোন ঝুঁকি নেব না।
রাজধানীতে সংবাদ পাঠাচ্ছি, সেখান থেকে সেনাদল পাঠাক। তারা যা করার করবে”।
উপানু ভিজে বেড়ালের মতো উঠতে যাচ্ছিল, শষ্পক
জিজ্ঞাসা করল, “ছোকরা এসেছে কখন?” উপানু বলল, “আজ্ঞে, মধ্যাহ্নের একটু আগে, সরকার”।
“এখন তো মধ্য অপরাহ্ন - খেতে-টেতে দিয়েছিলে?” উপানু ঘাড় নেড়ে না বলল। ব্যস্ আর
যায় কোথায়, শষ্পক আবার ধমক দিল, “একটা ছোকরা সেই কোন সকালে গ্রাম থেকে বেরিয়ে
তোমার কাছে এসেছে গোপন সংবাদ নিয়ে। তার কথায় নেচে তুমি দৌড়চ্ছিলে গ্রামের লোকদের
ঢিট করতে, বেচারাকে দুমুঠো খাওয়াতে পারলে না? রক্ষীসর্দার হয়েছ বলে, স্বাভাবিক
মানবিকতাও ভুলে যেতে হয়, উপানু? এখনই যাও, আগে ওকে খাওয়াও। তারপর ওকে বুঝিয়ে বাড়ি
পাঠাও। কিন্তু সন্ধের পর ছাড়বে...আর বলবে, প্রশাসন সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা নেবে।
বুঝেছ? কথাটা বললেই দেখবে ছোকরার মুখ শুকিয়ে যাবে, ওদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল
বলে...”।
ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “তারপর”?
“তারপর আর কী? উপানু চলে যেতে শষ্পক আমার দিকে
তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, তারপর বলল, “পিপীলিকার পাখা ওঠে…”। আমি বললাম, “হয়ে যাবে, মান্যবর। কেউ জানতেও পারবে না””।
তিনজনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মারুলা বলল, “রামালি,
কিছু মনে করিস না, ভাই। শল্কু এখন ঘুমিয়ে আছে মাটির তলায়, শীতল শান্তিতে”। রামালি কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্না শেষ করায় মন দিল।
ভল্লা আর মারুলা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “আজ মাঝ রাত্তিরে
আমরা দুজন বীজপুর যাচ্ছি মারুলা, ফিরতে ফিরতে কাল শেষ রাত হয়ে যাবে”।
মারুলা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হঠাৎ বীজপুর
কেন?” বীজপুরে যাওয়ার কারণগুলো ভল্লা বলল মারুলাকে। তারপর বলল, “এছাড়া আরও কিছু
কাজ আছে। কিছু কেনাকাটা আছে। রামালিরও চেনা-জানা হবে জায়গাটা। জনাইয়ের সঙ্গে পরিচয়
হবে”।
রামালি চুপ করে বসে ওদের কথা শুনছিল, হঠাৎ বলল, “মারুলাদাদা
কারা যেন আসছে - দৌড়ে”। মারুলা দ্রুত সরে গেল বাসার পিছনে
ঝোপের আড়ালে। একটু পরে উঠোনে এসে ঢুকল, বিশুন, আহোক আর মইলি।
হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, “শল্কুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ভল্লাদাদা, এদিকে
আসেনি তো?”
“না, তোরাই তো এখান থেকে গেলি সন্ধের পর। বস না।
কী হয়েছে বল তো”?
বিশুন বলল, “আমরা গ্রামে
ফিরে যে যার বাড়ি ফেরার দণ্ড দেড়েক পরে আমার বাড়ি এসেছিল শল্কুর দিদি। বলল, তোরা
সবাই ফিরে এলি, শল্কু কোথায়? ও ফেরেনি কেন! আমি বললাম, শল্কু তো আজ যায়নি। আমাদের
সঙ্গে সারাদিন ওর দেখাই হয়নি। গেছে কোথায়? কিছু বলে যায়নি? দিদি বলল, না কিছুই বলে
যায়নি। তোরা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই ও বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, আমরা ভেবেছি তোদের
ওখানেই... তাহলে গেল কোথায়? আমি বললাম, তুমি বাড়ি যাও দিদি, আমরা দেখছি। দিদিকে
বাড়ি পাঠিয়ে আমি বেরোলাম, আমাদের সবাইকে ডাকলাম। তারপর খুঁজতে বেরিয়েছি। গ্রামের সব
বাড়িতেই খোঁজা হচ্ছে। সুকরাতে গিয়েছে চারজন। আমরা এলাম তোমার কাছে।
কোথায় যেতে পারে বলো তো?”
“কী করে বলি বল তো! কয়েকদিন ধরেই দেখছিলাম মহড়ায় ওর মন ছিল না – হয়তো এসব লড়াই-টড়াই ওর ভালো লাগছিল না...কিন্তু সে
কথা তো বলতে পারত আমাদের, যেমন বালিয়া বলেছে। কিন্তু চলে গেল কেন? আর গেলই বা কোথায়?
ওর মামার বাড়ি কোথায়? সেদিকে চলে যায়নি তো”?
রামালি বলল, “ওর মামার বাড়ি কমলিজেঠিমার
বাপের বাড়ি থেকে আরও তিনক্রোশ উত্তরে। গ্রামের নাম যদ্দূর মনে পড়ছে ধুলোট। শল্কুর দিদিকে
জিজ্ঞাসা করলেই বলে দেবে”।
ভল্লা বলল, “আজ অনেক রাত হল, কাল ভোরে, গ্রামের দু-তিনজন চলে যাক না। চিন্তা করিস না। গিয়ে দেখবি, শল্কু হয়তো মামার
বাড়ির আদর খাচ্ছে”।
আহোক বলল, “ঠিক আছে, দেখা যাক। আমরা এখন চলি ভল্লাদাদা। এখানে
যদি ও আসে…”।
ভল্লা বলল, “সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেব, সে কথা আর বলতে?”
মারুলা খেতে খেতে বলল, “বড়ো রাস্তা ছাড়াও বীজপুর যাওয়ার অন্য একটা পথ আছে, সেটা জানিস তো ভল্লা?”
“তাই নাকি? জানি না তো। রামালি জানিস?”।
“সুকরা গ্রাম পার হয়ে, বাঁদিকে চড়াইয়ের পথটা তো? কোনদিন যাইনি,
শুনেছি, ওটা কোনাকুনি গিয়ে রাজপথে মিশেছে”।
“হুঁ। ওই দিক দিয়ে গেল ক্রোশ তিনেক পথ
কম হয়। আমার সঙ্গে চল, আমি তো ওইদিকেই যাবো, দেখিয়ে দেব। অন্ধকারে ঠাহর করতে না পারলে,
বিপদে পড়ে যাবি। ও হ্যাঁ, শষ্পক বলছিল, তোর টাকাকড়ি কিছু লাগবে কিনা…পরশু রাত্রে তাহলে
নিয়ে আসব”।
“এখন লাগবে না, আমার কাছে যা আছে তাতে চলে যাবে কিছুদিন…লাগলে
বলব”।
“কিন্তু তুই এতদিন চালাচ্ছিস কী করে? যতদূর
জানি তোকে তো রাজধানী থেকে পিটিয়ে আধমরা করে পাঠিয়েছিল। এখানে এসে প্রধানমশাই আর
কমলিমায়ের ছায়ায় যদ্দিন ছিলি, চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু তারপর? এই যে জঙ্গলে এতদিন
রয়েছিস, এই ব্যয় যোগাচ্ছে কে? আজ আবার বীজপুর যাচ্ছিস...”
“প্রথম কয়েকদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। তারপর বণিক অহিদত্তের
সঙ্গে পরিচয় হওয়াতে, আমায় কিছু বলতেও হয়নি, ও বেশ কিছুদিন সাহায্য করেছিল। মনে হয়
রাজধানী থেকে ও নির্দেশ নিয়েই এসেছিল। তারপর আস্থানে ডাকাতি করার দিন শষ্পকের
কোষাগার থেকে চারটে বটুয়া ঝেড়ে দিয়েছিলাম। একসঙ্গে এত রূপোর মুদ্রা কোনদিন হাতে
পেয়েছি, শালা? ওইদিন থেকেই তো আমি বড়লোক। ওখান থেকেই অহিদত্তের ধার শোধ করেছি। নোনাপুর
আর সুকরার চাষের জন্যে চার মণ বীজ কিনেছি। অহিদত্তের কাছে কিছু রূপো জমা আছে।
পনেরদিন অন্তর গভীর রাত্রে একটা গাধার পিঠে চাপিয়ে, আমার আর রামালির জন্যে ভুট্টা,
জোয়ার, চাল, ডাল, নুন-তেল-মশলার ঝোলা পৌঁছে যায়। যে লোকটা নিয়ে আসে, তাকে আমি
দেখিনি, সেও আমাদের চেনে না”।
রামালি বলল, “আজ সন্ধেতে বালিয়াকে চারটে রূপো
দিলে, ভল্লর ফলা বানাতে...”।
ভল্লা বলল, “ঠিক”।
“তাই বল। তোদের ওই ডাকাতির পরে, শষ্পক একদিন বলছিল
রাজধানীতে সে সংবাদ পাঠিয়েছে, কোষাগার থেকে দশটা বটুয়া খোয়া গেছে। আরও বলেছিল,
ভল্লার জন্যে ছটা বটুয়া রাখা আছে, টাকার দরকার হলেই যেন জানায়। সেদিন আমি শষ্পককে
মনে মনে বেশ কিছু কাঁচা গালাগাল দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দশটার মধ্যে
চারটে বটুয়া নিজে ঝেড়ে, ছটা তোকে দেবে...। ছ্যাঃ কী ভুলই করেছিলাম - আজ তোর আর
শষ্পকের খেলাটা বুঝতে পারলাম”।
“ছাই বুঝেছিস, তুই চিরকেলে মাথামোটা। চল অকারণ
সময় নষ্ট না করে, বেরিয়ে পড়ি। এখনই বেরোলে, কাল সকাল সকাল জনাইয়ের চটিতে পোঁছে
যাবো”।
এঁটো থালা নিয়ে উঠতে উঠতে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে
আরও কবছর থাকলে, আমার মাথাও সরু হয়ে, ভোমরার হুল হয়ে উঠবে। যার পোঁদে ফোটাবো, সাতদিন
যাবে তার টাটানি সারতে...”।
রামালি হেসে ফেলল মারুলার কথায়, তারপর বলল, “আমি
এক্ষুণি আসছি, ভল্লাদাদা, এঁটো থালাবাটিগুলো ধুয়ে আনি। দুদিন পড়ে থাকলে বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ
হবে...”
রামালি চলে যেতে, মারুলা নীচু স্বরে বলল, “তোর
চোখ শালা জহুরির চোখ, এতগুলো ছোকরার মধ্যে সেরাটাকেই বেছেছিস। শল্কুকে মেরে ফেলার
কথাটা শুনে ভেবেছিলাম, কী না কী করে বসবে। ব্যাটার চোখের পাতা অব্দি পড়ল না?”
ভল্লা হাসল, “হানো বলে আমাদের একটা ছেলে এর আগে মারা
গেছে শুনেছিস তো”?
“শুনেছি। সাপের কামড়ে”।
“সেই সাপটাকে তার গর্ত থেকে
তুলে এনেছিল রামালি। কাজ হয়ে যেতে নিঃশব্দে সরিয়েও ফেলেছিল সাপটাকে”।
মারুলা কিছু বলল না, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার
হাসিমাখা মুখের দিকে।
চলবে...