এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১৮
সাড়ে ছটায়
ফোনের অ্যালার্মটা বেজে উঠতেই সুনেত্র ফিরে এল বর্তমানে। অ্যালার্মটা বন্ধ করে,
মেঝেয় পা রাখল। শুয়ে থেকে লাভ নেই, ঘুম হবে না – মাথার মধ্যে অনবরত ভিড় করে আসবে
অজস্র তিক্ত স্মৃতি। সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল, দাঁত ব্রাশ করতে করতে। নিদ্রাহীন
রাতের গ্লানি এখন তার মাথায় এবং সারা শরীরে। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে, এবং সামনের
সবুজ বাগানে ফুটে থাকা নানান ফুলের বিচিত্র বর্ণে তার দুই চোখ এবং মস্তিষ্ক
অনেকটাই শান্তি পেল।
মাকে নিয়ে মুম্বাই
থেকে ফিরে এসে খুব দ্রুত তিনটে কাজ সেরে ফেলেছিল সুনেত্র। কাজগুলো করে তৃপ্তিও
পেয়েছিল খুব। যতদিন সে বাইরে বাইরে ছিল, মাসের শুরুতে বাবাকে কয়েক হাজার টাকা পাঠানোর
পরে, তার আয়ের অধিকাংশটাই জমা হত ব্যাংকের সেভিংস এবং ফিক্সড্ ডিপোসিটে। কারণ চিরকুমার
সুনেত্রর নিজের জন্যে কত আর খরচ করবে? মাসের শুরুতে পেস্ট, শেভিং ক্রিম, সেফটি
রেজার, আফটার শেভ লোশন, গায়ে মাখা সাবান, শীতকালে বোরোলিন কিনতেই বা কটা পয়সা যায়? দিল্লির যে গেস্ট-হাউসে সে এবং তার কিছু কলিগ থাকত, সেখানে তাদের ফুডিং এবং
হাউসকিপিং ছিল ফ্রি। এর পর কত
জামা-প্যান্ট-জুতো কিনবে? তার সিগারেট ছাড়া অন্য কোন নেশাও নেই। দামি দামি বোতল কেনা
অথবা বারে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রঙিন পানীয়ে অবগাহনের ব্যয় তার কোনদিনই ছিল না। কিন্তু
মাকে নিয়ে হলদিয়া আসার পর, বিশেষ করে দাদার ওখানে তার সেই আধঘন্টার ভিজিটের পর, তার
মনে হয়েছিল, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমে ওঠা টাকায় শ্যাওলা জমিয়ে লাভ কি? পৈতৃক সম্পদের
অধিকার নিয়ে জন্মানো তার ছেলে-মেয়ে থাকলে, কিছুটা সান্ত্বনা মিলত। কিন্তু সে গুড়েও
তো বালি ঢেলেছে সে নিজেই!
অতএব
মুম্বাই থেকে ফেরার দিন দশেক পরে, এক অপরাহ্ন বেলায় মাকে নিয়ে গিয়েছিল গাড়ির
শোরুমে। ঘটনাচক্রে সেই শোরুমের ম্যানেজার মিলনের মা ছিলেন তার পেশেন্ট। তার
চিকিৎসায় তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। অতএব সুনেত্রর খাতিরের কোন ত্রুটি রইল না।
ছেলেটি তার মাকে
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানান রঙের নানান আকারের গাড়ি দেখাতে লাগল। একটা গাড়ি পছন্দ করে, মা
সুনেত্রকে বললেন, “হ্যারে, সুনু, এই গাড়িটা বেশ, না? হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি আরামে
বসা যাবে, রঙটাও ভারি সুন্দর – যেন নীলকণ্ঠী ময়ুর। এটাই আমার পছন্দ। কিন্তু আমি তো
গাড়ির আর কিছুই বুঝি না, বাকিটা তুই বুঝে নে”।
ম্যানেজারের
সঙ্গে কথা বলে, ওই মডেলটির টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি জেনে নিল সুনেত্র। ম্যানেজার
ছোকরা বলল, “এটা লোয়ার ভার্সানের মডেল, আপনার জন্যে আমি এর থেকে হায়ার ভার্সানের
একটা মডেল সাজেস্ট করব, স্যার, আপনার জন্যে একদম পার্ফেক্ট হবে। কিন্তু তার রঙটা
মাসিমার মনোমত হচ্ছে না। আমাদের স্টকে যেটা আছে সেটার রঙ ডিপ ব্রাউন। অবশ্য আপনি দিন
সাতেক ওয়েট করলে কলকাতা থেকে মাসিমার পছন্দের রঙের সেম মডেল, আমি আনিয়ে দিতে পারি”।
“ওয়েট করব, মিলন,
কিন্তু মায়ের পছন্দের রঙটাই চাই। তবে দাম কী রকম পড়বে?”
“আপনার
জন্যে ম্যাক্সিমাম ডিসকাউন্ট করে দেব, স্যার, ও নিয়ে ভাববেন না। লোনে কিনবেন না,
ফুল পেমেন্ট?”
“ফুল
পেমেন্ট”।
“বাঃ তাহলে
তো আরো ডিসকাউন্ট দিতে পারবো স্যার”।
শোরুমের এসি
রুমে বসে দুজনে কফি খেতে খেতেই, মিলন ইনভয়েস জেনারেট করে ফেলল, হিসেবপত্র সব
বুঝিয়ে দিল সুনেত্রকে। সুনেত্র শোরুমের নামে চেক লিখতে লিখতে বলল, “আমি কিন্তু আপনার
এখান থেকে গাড়ি নিয়ে যাবো – আমাকে যেন কোন কিছুর জন্যে দপ্তরে দপ্তরে দৌড়োদৌড়ি না
করতে হয়...”।
“হবে না,
স্যার। সব কিছু রেডি করেই আপনাকে গাড়ি হ্যাণ্ড-ওভার করব। আমরা কি জানি না,
হসপিট্যালে সারাদিন আপনাদের কী প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়, আমাদের সুস্থ
করে তোলার জন্যে?”
মিলন সব কথাই রেখেছিল। গাড়িটা সুনেত্রর
হাতে এসেছিল সাতদিন পরে, দিনটা ছিল শনিবার। তার সঙ্গে ছিলেন মা ও শম্পাদিদি। মাকে
সামনে বসাল সুনেত্র, শম্পাদিদি বসল পিছনে তারপর নিজে বসল ড্রাইভারের সিটে।
“তুই গাড়ি
চালাতে পারিস, সুনু?”
“পারি একটু
একটু...তেমন বলার মতো কিছু নয়”। হেসে বলেছিল সুনেত্র, তারপর মায়ের এবং নিজের সিট-বেল্ট
বেঁধে গাড়ি স্টার্ট করেছিল। দুহাত জোড় করে মা বলেছিলেন, “দুর্গা-দুর্গা”। পিছনের
সিটে বসে শম্পাদিদিও দু হাত জোড়া করে কপালে ঠেকিয়েছিল।
শোরুমের
প্রাঙ্গণ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার পর, সুনেত্রকে মা বলেছিলেন, “আগে একটা কোন মন্দিরে
চল, সুনু। একটু পুজো দিয়ে আসি, কাছাকাছি কালীমন্দির নেই কোন?”
“মুক্তিধামেই
যাচ্ছি, মা। একসাথ সবাইকে পেয়ে যাবে, মা কালী, রাধাকৃষ্ণ, বজরংবলি এবং শিবঠাকুর”।
“মুক্তিধাম?
এখানে আসার পর সেই যেখানে দু’বার নিয়ে গেছিলি? বড়ো সুন্দর জায়গা, রে। কিন্তু
সে তো অনেক দূর”।
“বোঝো, ইচ্ছেমতো
দূরে দূরে বেড়াবার জন্যেই তোমায় গাড়িটা দিলাম, মা। নইলে কি বাড়ির সামনের রাস্তায় ঘুরঘুর করার জন্যে...?”
মা এবং
শম্পাদিদি দুজনেই প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন। খুশিতে উচ্ছ্বল মা বললেন, “তোর দাদাবাবুর
কথা শুনছিস, শম্পা? এবার থেকে ছুটির দিন হলেই সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়ব সবাই মিলে...
আমার গাড়ি নিয়ে...”।
“ড্রাইভারটিও
তো তোমারই মাসিমা, তুমি যেমন চালাবে, তেমনি চলবে”।
এবার
সুনেত্রও হেসে উঠল হো হো করে। কটা টাকাই বা দাম এই গাড়িটার – কিন্তু যে খুশি আর
আনন্দ এনে দিল এই গাড়িটা – তার হিসেব কে করবে...”?
সুনেত্র
আবার বর্তমানে ফিরতে বাধ্য হল, কারণ লোহার গেট খুলে শম্পাদিদি ঢুকল। শম্পাদিদিকে
দেখেই তার মনে পড়ল সে প্রায় আধঘন্টা ধরে ব্রাশ করে চলেছে, এবং বেচারা দাঁতগুলির
“ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি” অবস্থা হয়েছে। দ্রুত ওয়াশ রুমে গিয়ে নিজে তো বটেই, তার
দাঁতগুলিও পরিত্রাণ পেল ব্রাশ করার অত্যাচার থেকে।
অন্যদিন
শম্পাদিদির হাতের এক কাপ চা খেয়ে সে মিনিট কুড়ির জন্যে হাঁটাহাঁটি করতে বেরোয় – আজ
আর ইচ্ছে হল না। বড্ডো ক্লান্ত লাগছে, এ হল গতকাল রাত্রে ভাল ঘুম না হওয়ার এফেক্ট।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে সে বসল বাইরের বারান্দায় – বাগানটা রইল তার চোখের
সামনে। হঠাৎ তার মনে হল, যতক্ষণ সে বদ্ধ ঘরের মধ্যে শুয়েছিল, তার যত তিক্ত স্মৃতির
কথাই মনে পড়ছিল। অথচ এখন বাইরে এই খোলা হাওয়ায়, বাগানের সামনে এলেই তার কেন
আনন্দের স্মৃতি মনে আসছে?
এই যেমন এখন
মনে আসছে...
তার চিন্তায়
ছেদ ঘটাল শম্পাদিদি, “দাদাবাবু, চা”। সুনেত্রর হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস
করল, “ব্রেকফাস্টে পরোটা করি দাদাবাবু? সঙ্গে আলুভাজা?”
“করো”।
শম্পাদিদি
চলে যেতে চায়ে চুমুক দিতেই সুনেত্রর মনে পড়ল, গাড়িটা কেনার দিন দশ-বারো পরেই মাকে
নিয়ে গিয়েছিল একটা জমি দেখতে। সেটা এই জমিটাই। কর্নার প্লটে পাঁচ-কাঠা জায়গার সুন্দর
আয়তক্ষেত্র। জমির মালিক প্রমোদ নায়ক ও তাঁর পরিবারের সকলেই তার দীর্ঘদিনের
পেশেন্ট। কথাবার্তার শুরুতেই সুনেত্র জেনে নিয়েছিল, “জমিটায় কোন শরিকানা গণ্ডগোল
নেই তো? জমির কেনার পর কোন আইনি জটিলতায় পড়তে হবে না তো?”
এক হাত জিভ
কেটে প্রমোদবাবু বলেছিলেন, “ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, ডাক্তারবাবু। এ জমির
মালিক আমার স্ত্রী। স্ত্রীর নামেই এই জমিটা কিনেছিলাম, হলদিয়া টাউন যখন সবে শহর হয়ে
উঠছে – সেই কালে। আমরা ব্যবসাদার মানুষ, ডাক্তারবাবু। আমরা ঠিক টের পাই কোথায় কোন
জমি রাংতা দিয়ে কিনলে, দশ বছরে তার দাম রূপো হয়ে উঠবে আর বিশ বছরে বিকোবে সোনার দরে।
নিজের নামে যত খুশি জমি তো আর কেনা যায় না আজকাল, তাই স্ত্রীর নামে কেনা। কিছু জমি
ছেলেমেয়ের নামেও আছে। আপনার বাজেট শুনে মনে হচ্ছে, এই জমিটাই আপনি খুঁজছেন। মাসিমাকে
নিয়ে এই রোববারেই চলে আসুন, খুব একটা দূর নয়। সিটি সেন্টার থেকে গাড়িতে মিনিট
দশ-বারোর বেশি সময় লাগবে না”।
“দাম?”
“ওই যে
বললাম, রাংতার দামে কিনেছিলাম, এখন সে প্রায় সোনার দাম ছুঁইছুঁই। কিন্তু আপনাকে আমি
রূপোর দরেই ছেড়ে দেব। আপনাকে যাবতীয় দলিলের কপি দিয়ে দেব, এই জমির প্রেজেন্ট
ভ্যালু কত, যাচাই করে দেখে নেবেন। আপনাকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার জো কোথায়,
ডাক্তারবাবু?”
ব্রেকফাস্ট
সেরে পরের রোববারেই মাকে নিয়ে বেরিয়েছিল সুনেত্র, হ্যাঁ নিজের গাড়িতেই। সিটি
সেন্টারে অপেক্ষা করছিলেন প্রমোদবাবু, সেখান থেকে তিনিই গাইড করে নিয়ে এলেন। প্রায়
পাঁচফুট উঁচু ইঁটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা জমি। লোহার গেটের তালা খুলে তিনজনে ঢুকল।
প্রমোদবাবু
বললেন, “এই হচ্ছে জমি। পূব আর দক্ষিণদিকে বিশফুটের রাস্তা। এখন আগাছায় ভরে উঠেছে,
আপনি ফাইন্যাল করলেই, সব ছেঁটে ফেলে জমির মাপ আপনাকে বুঝিয়ে দেব। তবে মাপলে জমির
মাপ সামান্য কম পাবেন, কারণ চার ধারেই ধরুন প্রায় দশইঞ্চি করে জমি খেয়ে বসে আছে
পাঁচিলটা। এই পাঁচিলটার কথা আমার সেদিন মাথায় ছিল না – ওটা আপনাকে ফ্রি-গিফ্ট্ করছি, ডাক্তারবাবু। আজকের দিনে নতুন পাঁচিল গড়তে কত খরচ হবে, যে কোন ভালো
রাজমিস্ত্রির থেকে যাচাই করে নিতে পারেন”।
সুনেত্রর
পছন্দ হল, প্রমোদবাবু যে দাম বলেছেন, সেও তার বাজেটের মধ্যেই। সে এবার মায়ের দিকে
তাকাল। মা ঝোপ-ঝাড় ডিঙিয়ে যতটা পারা যায়
ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। প্রমোদবাবু বললেন, “ভেতরের দিকে বেশি যাবেন না, মাসিমা,
বলা যায় না, সাপ-টাপ থাকতে পারে...তাছাড়া পোকামাকড়, বিছে-টিছে তো থাকবেই...।
আপনারা রাজি হলে কালই আমি লোক লাগিয়ে সাফ করে দেব"।
প্রমোদবাবুর
সতর্কতায় মা আর ভেতরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন না, কিন্তু তাঁর মুখ দেখে
সুনেত্রর মনে হল মায়ের পছন্দ হয়েছে। কিন্তু খুব মন দিয়ে তিনি কিছু চিন্তা করছেন,
জমিটার চারদিকে তাকিয়ে।
সকলে বেরিয়ে
আসতে প্রমোদবাবু লোহার গেটে তালা লাগালেন। সুনেত্র বলল, “আপনাকে এক-দুদিনের মধ্যেই
আমি ফাইন্যাল জানাচ্ছি, প্রমোদবাবু, মোটামুটি পজিটিভই ধরে রাখুন”।
“ব্যস, আমিও
ওদিকে জমির কাগজপত্র সব রেডি করে ফেলি। আপনি তো নিশ্চয়ই হোম-লোন নেবেন, কোন
ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছেন? আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না, ওরাই কাগজ-পত্র, জমির
মাপজোক সব চেক করে নেবে – সব ঠিকঠাক না হলে ওরা লোন অ্যাপ্রুভই করবে না”।
প্রমোদবাবু চলে
যেতে, সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “জমিটা কেমন লাগল, মা?”
মা বললেন, “শোন, সুনু, সামনে কিছুটা আর পেছনে অনেকটা জায়গা ছেড়ে বাড়ি করবি। আমি বাগান করব – পেছনে সবজি, আর
সামনে ফুলের”।
মায়ের কথায় হেসে
ফেলল সুনেত্র, বলল, “আগে জমিটা পছন্দ কিনা বলো, তার পর তো বাড়ির প্ল্যানিং করবে...”।
“পছন্দ
মানে, একশবার পছন্দ – এই জমিটাই আমার চাই। পূব-দক্ষিণ খোলা এমন জমি - তবে বড্ডো
ধূলো আর আওয়াজ হবে, সুনু - দুপাশেই রাস্তা তো। আমাদের কলকাতার বাসার সামনেই একটা
টিউবওয়েল ছিল, মনে আছে তোর সুনু?”
হাসি মুখে
মায়ের খুশিটা উপভোগ করছিল সুনেত্র, বলল, “হুঁ, মনে থাকবে না?”
“আমি যখন
প্রথম ওই বাসায় এলাম গ্রাম থেকে, তুই তখন একবছরের, আর সুমুর ছয়। রাত্রি
বারোটা-একটা পর্যন্ত কারা সব ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে ওই কল টিপে চান করত, বালতি ভরে
জল নিয়ে যেত। আবার রাত সাড়ে-তিনটে, চারটে থেকে কিছু লোকের চান শুরু হত, তাদের
মধ্যে অনেকে আবার চানের শেষে গায়ত্রী জপ করত, কেউ হরিনাম করত। প্রথম প্রথম ওই
গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে যেত, খুব বিরক্ত লাগত। কিন্তু সপ্তাহ তিনেক কি একমাস পরে,
এমনই অভ্যাস হয়ে গেল, ওই সব শব্দ আর টেরই পেতাম না, ঘুমের কোন ব্যাঘাতও ঘটত না”
চলন্ত গাড়ির
জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তাঘাট-গাছপালা দেখতে দেখতে মা আবার বললেন, “শরীরের নাম
মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়। মনে আছে, তুই বাবাকে আর আমাকে নিয়ে সেবার মানালিতে এক
বন্ধুর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলি? পাহাড়ের কোলে, বিপাশার পাশে সেই জায়গাটিতে প্রথম পা
দিয়েই মনে হয়েছিল, আহা কি সুন্দর, নিরিবিলি, নির্জন জায়গা। পাখির ডাক আর নদীর
কুলু-কুলু জলের শব্দ বড়ো ভালো লেগেছিল। সন্ধে হতে না হতেই জায়গাটা কেমন নিঝ্ঝুম
হয়ে যেত। আমরা তিনটি প্রাণী ছাড়া এ জগতে যেন আর কেউ নেই। ও মা তেরাত্তির না পোয়াতেই
হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। না বাপু এ জায়গা আমাদের জন্যে নয়। রাস্তার উল্টোদিকে টিউবওয়েল
বসানো আমাদের সেই কলকাতার বাসাটিই খাসা – অমন আর হয় না”।
কিছুক্ষণ
চুপ করে থেকে মা বললেন, “কাগজপত্র, দাম-দস্তুর সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিস। ঠিকঠাক
থাকলে জমিটা নিয়ে নে, সুনু। বাড়িটাও শুরু করে দে তাড়াতাড়ি। তোর দাদার ওই ঝাঁজালো,
জমকালো বিত্তের দম্ভ-মাখা ফ্ল্যাট নয়, সুন্দর পরিপাটি একটা স্বাধীন বাড়ি। ঠিক আমার মনোমত”।
ডাক্তার
হবার সুবাদে সবকিছুই দ্রুত মিটে গেল, লোন অ্যাপ্রুভ্যাল, জমি হস্তান্তর, জমি
রেজেস্ট্রি, বাড়ির প্ল্যান স্যাংশান - সব। এতদিন ধরে সুনেত্র ডাক্তারি করছে, কিন্তু
সমাজে ডাক্তার হবার প্রিভিলেজগুলো সে কোনদিন উপলব্ধিই করেনি। ডাক্তার শুনলেই সজ্জন ভদ্রলোক থেকে ইতর, গুণ্ডা, বদমাশ সকলেই কেমন যেন বদলে যায়, সমীহ করে।
প্রমোদবাবুর
চেনা বিশ্বাসী ঠিকাদার সনৎ নস্কর ভিত-পুজোর পর যখন তার বাড়ির কাজে হাত দিল, পাড়ার
কিছু ছোঁড়া এসে হানা দিয়েছিল। বলেছিল, “তাদের থেকেই ইঁট-বালি-স্টোনচিপ্স্ লিতে
হবে”। কিন্তু তারা যখনই জানতে পারল, সে নাকি বেশ নামজাদা ডাক্তার, তখন তারাই বলল,
“কোন অসুবিধে হলে, কেউ ব্যাগড়া দিতে এলে, আমাদের বলবেন, কাকু। আমরাই সব সামলে
নেব”।
এ কথাটা
প্রমোদবাবুকে বলেছিল সুনেত্র। প্রমোদবাবু বলেছিলেন, “আমি ওদের নেতাকে বলে দেব, ওরা
আপনাকে আর জ্বালাবে না। তবে হাজার কুড়ি-তিরিশ খরচ করতে হবে আপনাকে। একবারে দেবেন
না। এই ধরুন স্ল্যাব ঢালার পর দশ। গৃহপ্রবেশের সময় পনের। আর ধরুন পুজোর
চাঁদা-টাঁদা...। ওরা একটু মদ-টদ খাবে, পার্টি-ফার্টি করবে। কিন্তু দেখবেন, ওরা
আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকবে। ওদের নেতাও শুনে খুশি হবে, তার চ্যালারা একেবারে
বঞ্চিত হয়নি”।
বাড়িটা হয়েই
গেল নির্বিঘ্নে। পরের বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় গৃহপ্রবেশ হল। কলকাতা থেকে পিসিমা আর
পিসেমশাইকে সে নিজেই গিয়ে নিয়ে এসেছিল, অনুষ্ঠানের তিনদিন আগে। সেরিব্র্যাল
অ্যাটাকের পর পিসেমশাই অনেকটাই অথর্ব হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অফিসের কলিগ, তার স্কুলের
এবং কলেজের দশ-বারোজন বন্ধু, বেশ কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী, সপরিবার প্রমোদবাবু, সনৎ
ও তার সব সাঙ্গ-পাঙ্গ, এমনকি গাড়ির শোরুমের ম্যানেজার মিলনকেও ডেকেছিল। সব মিলিয়ে
প্রায় একশ-কুড়ি জন নিমন্ত্রিত ছিল সেই অনুষ্ঠানে। নিজের ছোট পুত্রের বিবাহ-আয়োজনের
আনন্দ থেকে বঞ্চিতা তার মা, সেদিন যেন অপার্থিব শক্তির অধিকারিণী হয়ে উঠেছিলাম। এই
অনুষ্ঠান তাঁকে উজ্জীবীত করেছিল। সকাল থেকে হোম ও পূজার যোগাড় থেকে শুরু করে সমস্ত
কাজে, এবং সন্ধ্যায় সকল অতিথি-বিদায় পর্যন্ত – তাঁর অনলস উদ্যমের কোন অভাব দেখেনি
সুনেত্র। এই অনুষ্ঠানে দাদাকেও চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল সে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে
আসার অনুরোধ করে। দাদা আসেনি, চিঠির উত্তরও দেয়নি।
শম্পাদিদি
বারান্দায় এসে বলল, “তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো, দাদাবাবু? হাঁটতে গেলে না। একভাবে
চেয়ারে বসে কী ভাবছো? আটটা-দশ হয়ে গেছে, চানে যাবে না?”
লজ্জিত মুখে
সুনেত্র উঠে পড়ল, চানে যেতে যেতে বলল, “ইস্ আটটা-দশ হয়ে গেছে? আজ সব কিছুই যেন
গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, শম্পাদিদি। তুমি রেডি করো, আমি আসছি”।
চলবে...