এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আমার
বলা এই ধারণা সামান্য নয়, এই ধারণা থেকে বিশ্বসৃষ্টির সামর্থ হয়ে থাকে। সৃষ্টির
শুরুতে ব্রহ্মা এই ধারণা দিয়েই নিশ্চিত বুদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং শ্রীহরিকে
পরিতুষ্ট করে, প্রলয়কালে তাঁর যে সৃষ্টির স্মৃতি লোপ পেয়েছিল, তা আবার ফিরে
পেয়েছিলেন। এই ভাবে অব্যর্থ সৃষ্টিশক্তির বলে তিনি পূর্বকল্পের মতোই এই বিশ্ব
সৃষ্টি করেছেন।
এই কারণে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বুদ্ধি স্থির রেখে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে সুখের লেশমাত্র না রেখে, শুধু দেহধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংগ্রহে চেষ্টা করবেন এবং যদি ওই দ্রব্য অন্য কোনভাবে পাওয়া যায়, তাহলে অতিরিক্ত সংগ্রহের চেষ্টাকে পণ্ডশ্রম মনে করে, সে বিষয়ে বিরত থাকবেন। ভূমিশয্যা থাকতে অন্য শয্যার প্রয়োজন কী? স্বাভাবিক বাহু থাকতে উপাধানের কী দরকার? যখন অঞ্জলি আছে, তখন নানা ধরনের তৈজসপত্রের কী দরকার? দিক-বল্কল থাকতে পট্টবস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা পণ্ডশ্রম নয় কী? যারা নিজেদের ফলে অন্যের পুষ্টি সাধন করে, সেই বৃক্ষরাজি কী ফল ভিক্ষা দানে বিমুখ হয়েছে? নদীসমূহ কী শুকিয়ে গিয়েছে? সমস্ত গিরিগুহার মুখ কী বন্ধ হয়ে গিয়েছে? ভগবান অজিত কী শরণাগতদের রক্ষা করেন না? বিনা কষ্টে পাওয়া এই সমস্ত বস্ত্র, ভোজন, পান ইত্যাদি সুলভ থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কিসের জন্য ধনগর্বে অন্ধ ধনীদের ভজন করেন? অতএব শ্রী ভগবান জীবের মনে নিজেই প্রকাশিত আছেন, তিনিই জীবের ভজনার ধন, তিনিই নিত্য সত্য আত্মা, এবং প্রিয়তম বিষয়; সংসারে আসক্তি ত্যাগ করে তাঁর ভজনা করলে পরমানন্দ অনুভব হয় এবং সংসাররূপ অনর্থের মূল অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞান দূর হয়ে থাকে।
হে রাজন, এর আগে আপনাকে আমি বৈরাজ পুরুষের ধারণার কথা বলেছি।
[বৈরাজ শব্দটির অর্থ ব্রহ্মসম্বন্ধীয়। আমাদের শাস্ত্রে ব্রহ্মকে বলা হয় ধারণাতীত, অবাঙ্মনসোগোচর - অর্থাৎ তাঁকে আমাদের মননে উপলব্ধি করা যায় না, কিংবা তাঁকে কথা দিয়েও বর্ণনা করা যায় না। তবুও তিনি যে আছেন সে সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। তিনি এই বিশ্বের শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি বিশ্বের পালয়িতাও। তিনি একদিকে যেমন এই জগতের সমস্ত উদ্ভিদ, জীব ও জড় সৃষ্টি করেছেন, আবার তেমনই তাদের জীবন ধারণের জন্যে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল আশ্চর্য এক বাস্তুতন্ত্রও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে আমরা তাঁর স্থূল অস্তিত্ব বুঝতে পারি না। কিন্তু আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি সর্বত্র টের পাওয়া যায়। এই ধারণাকেই "বৈরাজ পুরুষের ধারণা" বলা হয়েছে।]
ঈশ্বরের মূর্তিধারণা
এখন ভগবানের শ্রীমূর্তির ধারণা বর্ণনা করছি
শুনুন। কোন কোন ভক্ত হৃদয়ের আকাশে প্রাদেশ-প্রমাণ অর্থাৎ তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের
অগ্রভাগের ব্যবধান পরিমাপের চতুর্ভুজ পুরুষকে ধারণা করে থাকেন। তাঁর চারটি হাত শঙ্খ,
চক্র, গদা ও পদ্মে সুশোভিত, প্রসন্ন মুখ, আয়ত কমললোচন ও কদম্বকেশরের মতো পীতবর্ণ
বসন। তাঁর বাহু মহারত্নখচিত সোনার অঙ্গদে কমনীয়, মাথায় উজ্জ্বল মহারত্নময় সোনার
কিরীট, কানে সোনার কুণ্ডল নিরুপম শোভায় মণ্ডিত। যোগেশ্বরগণ তাঁদের হৃদয় কমল আসনে
তাঁর পায়ের পল্লব স্থাপন করেন। তাঁর বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন আঁকা, তাঁর গলায় সোনার
সুতোর গ্রন্থিতে কৌস্তুভ মণি এবং অম্লানকান্তি বনমালা বিরাজিত। তিনি মেখলা,
অঙ্গুরীয় ও নূপুর, কঙ্কণ ইত্যাদি ভূষণে বিভূষিত এবং তাঁর স্নিগ্ধ অমল কুঞ্চিত নীল
কেশে কমনীয় মুখের হাসির আভায় ভুবন মুগ্ধ। তাঁর উদার লীলাময় হাস্য দৃষ্টিতে অনন্ত
করুণার উদ্রেক।
হে মহারাজ, শ্রীহরির চরণযুগল
থেকে শুরু করে হাস্য পর্যন্ত সকল অবয়ব ধ্যান করবেন, যে যে অঙ্গ অনায়াসে স্ফূরিত
হবে, সেই অঙ্গ ত্যাগ করে অন্যান্য অঙ্গ ধ্যান করতে হবে। এইভাবেই মন থেকে চঞ্চলতা
দূর হয়ে মন নির্মল হয়। শ্রীভগবান পরাবর; পর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা প্রমুখ এঁনার
অবর অর্থাৎ কনিষ্ঠ। ইনি বিশ্বেশ্বর ও সর্বসাক্ষী; যতদিন পর্যন্ত এই ভগবানের প্রতি প্রেমভক্তির
উদয় না হয়, ততদিন প্রত্যেকদিনের প্রয়োজনীয় কর্মের অনুষ্ঠান সেরে, নিষ্ঠা ভরে, এই
পুরুষের স্থূলরূপ চিন্তা করবেন। আসন্নমৃত্যু ব্যক্তির যা কর্তব্য, আমি বর্ণনা
করলাম। এখন ওই ব্যক্তি যদি নিজের দেহত্যাগের সঙ্কল্প করে থাকেন, তা হলে
পুণ্যক্ষেত্র অথবা উত্তরায়ণ কালের দিকে মন না দিয়ে, স্থির ও সুখকর আসনে উপবেশন করে
প্রাণায়ামে পঞ্চপ্রাণ জয় করবেন এবং মনে ইন্দ্রিয়দের সংযত করবেন। তারপর নিজের
নির্মল বুদ্ধি দিয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বুদ্ধিকে ক্ষেত্রজ্ঞে লয় করবেন। যে
আত্মা বুদ্ধি প্রভৃতিকে নিজের দৃশ্য বিষয় ও নিজেকে তাদের দ্রষ্টা বলে মনে করেন,
সেই আত্মা কে ক্ষেত্রজ্ঞ বলে। ক্ষেত্রজ্ঞের শুদ্ধ স্বরূপ আছে, তাঁকে শুদ্ধ
জীবাত্মা বলে। ক্ষেত্রজ্ঞ আত্মাকে শুদ্ধ জীবাত্মায় লয় করে, জীবকে ব্রহ্মে লয় করতে
হয়। তারপর পরমা শান্তি লাভ করে, সকল কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত থাকবেন, কারণ মুক্ত
ব্যক্তির সকল কর্তব্যের অবসান হয়ে থাকে।
মহারাজ, যে দেবতারা জগৎ ও
প্রাণীদের উপর আধিপত্য করে থাকেন, তাঁরাও কালের বশীভূত। কিন্তু ওই কাল, যে
ব্রহ্মস্বরূপের কথা আপনাকে বললাম, তার উপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ নয়, সুতরাং
দেবতারা কার উপর আধিপত্য করবে? শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, অহঙ্কার,
বুদ্ধিতত্ত্ব বা প্রকৃতি কিছুই অবস্থান করতে পারে না। যিনি আত্মস্বরূপ লাভ করতে
ইচ্ছা করেন, তিনি জগতের যাবতীয় বস্তুকে, “এতে আত্মা নেই, এতে আত্মা নেই” বলে
পরিত্যাগ করেন এবং দেহকেই আত্মা বলে যে ভ্রান্ত জ্ঞান হয়েছিল, সেই জ্ঞানকেও ত্যাগ
করেন, তারপর তিনি শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ নিত্য আলিঙ্গন করেন। যদি তিনি দেহ ত্যাগ করে
সদ্য মুক্তি পেতে চান, তাহলে, প্রথমে পাদমূল দিয়ে মূলাধার অর্থাৎ গুহ্যদ্বার নিরুদ্ধ
করে, অক্লান্তভাবে প্রাণবায়ুকে ছটি স্থানের মধ্যে দিয়ে ঊর্ধে উন্নীত করবেন। প্রথমে
নাভি অর্থাৎ মণিপূরচক্রে অবস্থিত প্রাণবায়ুকে হৃদয় অর্থাৎ অনাহতচক্রে তুলে এনে,
উদান বায়ুর গতি অনুসরণ করে কণ্ঠের নীচে অবস্থিত বিশুদ্ধচক্রে তুলে আনবেন। পরে মনকে
সংযত করে ওই বায়ুকে ধীরে ধীরে তালুমূলে অর্থাৎ বিশুদ্ধচক্রের আগে নিয়ে আসবেন।
তারপর চোখ, কান, নাক ও মুখ এই সাতটি দ্বার রুদ্ধ করে প্রাণকে ভ্রূমধ্যে অবস্থিত
আজ্ঞাচক্রে তুলে আনবেন। ভোগবাসনা যদি একান্তই ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে
অর্ধমূহুর্তকাল অপেক্ষা করে, ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে পরব্রহ্মে মিলিত হবেন এবং সেই
মূহুর্তেই দেহ ও ইন্দ্রিয় সকল পরিত্যাগ করবেন।
হে রাজন, যোগেশ্বরগণের লিঙ্গশরীর
বায়ুর থেকেও সূক্ষ্ম; তাঁরা লিঙ্গশরীরে ভূলোক, প্রেতলোক ও স্বর্গলোক এই ত্রিভুবনের
মধ্যে অবস্থিত যে কোন লোকে অথবা এর বাইরে মহর্লোকে, এমনকি ব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও
যেতে পারেন। তাঁদের শক্তি অতুলনীয়, তাঁরা উপাসনা, তপস্যা, অষ্টাঙ্গযোগ ও
সমাধিজ্ঞান দিয়ে যে শক্তিলাভ করেন, মানুষ সাধারণ কর্ম দিয়ে সেই শক্তি লাভের
কল্পনাও করতে পারে না।
মহামুক্তি ও ঈশ্বর-লীন
মহারাজ, সুষুম্না নামে একটি নাড়ী
দেহস্থ সকল চক্র ভেদ করে সহস্রার পর্যন্ত গিয়েছে, তারপর সেই নাড়ী আকাশপথ পার হয়ে
ব্রহ্মলোক পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। যোগী ওই জ্যোতির্ময় ব্রহ্মপথ ধরে, প্রথমে
অগ্নিলোকে উপস্থিত হন, সেখানে নির্মল হয়ে অর্থাৎ আসক্ত না হয়ে আরো উঁচুতে
শিশুমারচক্র অর্থাৎ তারারূপ নারায়ণের অধিষ্ঠানভূমি লাভ করেন, অর্থাৎ সূর্য থেকে
আরম্ভ করে ধ্রুবলোক পর্যন্ত যেতে পারেন। শ্রীবিষ্ণুর এই চক্র, বিশ্বের নাভি
স্বরূপ, কারণ ওই জ্যোতিশ্চক্রই সূর্য ইত্যাদি নক্ষত্রের আশ্রয়স্থান। যোগী এই স্থান
পার হয়ে নির্মল লিঙ্গশরীরে ব্রহ্মবিদদের বন্দনীয় মহর্লোকে যেতে পারবেন। এই স্থানে
যাওয়ার সামর্থ স্বর্গবাসীদেরও নেই। এই স্থানে মহর্ষিরা কল্পান্তকাল পর্যন্ত
মহানন্দে বাস করেন। ওই যোগী যদি ওই লোকে বাস করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে এক কল্প কাল
পর্যন্ত বাস করতে পারেন, পরে কল্পের অবসানে যখন অনন্ত ভগবানের মুখের আগুনে বিশ্ব
দগ্ধ হতে থাকে, তখন সেই লোক পর্যন্ত সেই উত্তাপ অনুভব করা যায়। তখন তিনি
দ্বিপরার্ধকাল স্থায়ী ব্রহ্মলোকে অর্থাৎ সত্যলোকে যেতে পারেন। এই লোকে শোক, জরা,
মৃত্যু বা অন্য কোন বিষয়ে উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকে না। সত্যলোকবাসিদের শুধুমাত্র
মানসিক দুঃখের অনুভব থাকে। “সংসারী লোক শ্রীভগবানের ধ্যানপথ ভুলে এই মনোহর লোকে
আসতে পারছে না এবং সংসারের দুঃখে পীড়িত হচ্ছে” এই চিন্তাই তাঁদের চিত্তে করুণার
সৃষ্টি করে ও মানসিক ক্লেশ উৎপন্ন করে। তা না হলে অন্য কোন দুঃখ তাঁদের অনুভব হয়
না।
হে মহারাজ, যাঁরা এই সত্যলোকে
আসেন, তাঁদের তিন রকমের গতি আছে। যাঁরা উৎকৃষ্ট পুণ্যের বলে এই লোকে আসেন, তাঁরা
অন্য কল্পে যাঁর যেমন পুণ্য, সেই পুণ্যের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। যাঁরা
হিরণ্যগর্ভ নারায়ণের উপাসনাবলে এই লোক লাভ করেন, তাঁরা দ্বিপরার্ধকাল শেষ হলে
ব্রহ্মার সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন। আর যাঁরা ভগবানের ভক্ত, তাঁরা স্বেচ্ছায়
ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করে বৈষ্ণবপদ অর্থাৎ বিষ্ণুলোকে চলে যেতে পারেন। হে মহারাজ, তাঁদের
ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করার প্রক্রিয়া কিরকম, বলছি শুনুন।
ভগবানের ভক্ত প্রথমে লিঙ্গদেহকে
পার্থিব অর্থাৎ পৃথিবীতত্ত্বে নির্মাণ করে, নির্ভয়ে ব্রহ্মাণ্ডের পার্থিব আবরণ ভেদ
করেন। তারপর জলময় মূর্তিতে জলের আবরণ, অনলমূর্তিতে অগ্নিলোক, বায়ুমূর্তিতে
বায়ুলোক, ও আকাশমূর্তিতে পরমাত্মার আকাশরূপ আবরণ ভেদ করে থাকেন। এই সকল আবরণ ভেদ
করার সময়, তাঁরা ওই সকল লোক ভোগ করতে করতেই যান। যোগী ঘ্রাণ দিয়ে গন্ধ, জিহ্বা
দিয়ে রস, দৃষ্টি দিয়ে রূপ, চর্ম দিয়ে স্পর্শ ও কান দিয়ে আকাশগুণ শব্দ উপভোগ করতে
থাকেন এবং কর্ম ইন্দ্রিয় দিয়ে কাজও করতে থাকেন। এইভাবে তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূত
অতিক্রম করে তাদের আবরণস্বরূপ অহঙ্কারতত্ত্বে পৌঁছে যান। এই অহঙ্কারতত্ত্ব তিন
প্রকারের, তামস, রাজস ও সাত্ত্বিক। তামস থেকে জড় সূক্ষ্ম ভূতসমূহ, রাজস থেকে
বহির্মুখ দশ ইন্দ্রিয় এবং সাত্ত্বিক থেকে মন ও ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের
সৃষ্টি হয়। এই তিন অহঙ্কারের সঙ্গে নিজের লিঙ্গদেহকে এক করে, তিনি বিজ্ঞানতত্ত্ব
অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব লাভ করেন। এই মহত্তত্ত্বের সঙ্গে নিজের লিঙ্গশরীরকে এক করে,
তিনি নিখিল গুণের লয়স্থান প্রকৃতিতে পৌঁছে যান। তারপর প্রকৃতিরূপে আনন্দময় হয়ে সকল
উপাধি অর্থাৎ দেহ পরিত্যাগ করে শান্ত ও পরমানন্দস্বরূপ অবিকৃত পরমাত্মাকে লাভ
করেন। যিনি এই ভাগবতী গতি লাভ করতে পারেন, তাঁকে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না”।
তারপর শ্রীশুকদেব বললেন,
“মহারাজ, আপনার কাছে সদ্যমুক্তি ও ক্রমমুক্তি, দুটি পথের কথাই বর্ণনা করলাম। এই
বর্ণনা আমার নিজের কল্পনা থেকে বানিয়ে বলা নয়। এই দুই সনাতন পন্থা বেদেও বলা
হয়েছে। আগে ভগবান বাসুদেব, ব্রহ্মার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন।
সংসারবদ্ধ জীবের মুক্তির জন্য তপস্যা, যোগ ইত্যাদি নানান পথ আছে, কিন্তু এর মতো
সুখকর ও নির্বিঘ্ন পথ আর দ্বিতীয় নেই। এই পথ অনুসরণ করলে, ভগবান বাসুদেবে ভক্তিযোগ
উৎপন্ন হয়।
হে রাজন, যে বিষয় আমাদের পরিচিত
অর্থাৎ যাকে আমরা আগেই অনুভব করেছি, সেই বিষয়েই আমাদের রতি হতে পারে। কিন্তু যে
বিষয় কোনদিন আমাদের অনুভব হয় নি, সে বিষয়ে রতি হওয়া অসম্ভব। সুতরাং শ্রীহরি আগে
আমাদের অনুভবে না এলে, কিভাবে তাঁর প্রতি রতি আসা সম্ভব এমন চিন্তা করবেন না। এর
কারণ আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, মন দিয়ে শুনুন।
আমাদের বুদ্ধি প্রভৃতি যা কিছু
দেখা যায়, সবই জড়, তা হলে এই যে সব জড় পদার্থ রয়েছে, তার সাক্ষ্য কে দিচ্ছে?
শ্রীহরিই একমাত্র দ্রষ্টা বা সাক্ষী; তিনিই সর্বভূতের অন্তর্যামীরূপে থেকে বুদ্ধি
প্রভৃতিকে প্রকাশ করছেন। অতএব তিনি না থাকলে জড় বুদ্ধির প্রকাশ হত না, এই প্রমাণে
আমরা আমরা শ্রীহরিকে অনুভব করতে পারছি। এছাড়া অন্য এক প্রমাণেও শ্রীভগবানের
অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। আমরা দেখতে পাই, কুঠার বা অন্য কোন যন্ত্র নিজে নিজে কোন
কাজই করতে পারে না, তাদের ব্যবহারের জন্য অন্য একজন পৃথক কর্তার প্রয়োজন হয়। সেই
রকম, আমাদের বুদ্ধি কিংবা অন্যান্য বৃত্তি যন্ত্র ভিন্ন আর কিছুই নয়, অথচ এরা
সকলেই জড়। তাহলে কে এই বুদ্ধি নামক যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে, জ্ঞান নামক কর্মটিকে
সম্পন্ন করছেন? এই ভাবে অনুমানের প্রমাণ দিয়েও একজন স্বতন্ত্র কর্তা ঈশ্বর আছেন,
এই অনুভব করা যায়। সাধুব্যক্তিরা শ্রীভগবানকে আত্মরূপে প্রকাশমান বলে সর্বদাই
অনুভব করে থাকেন। যাঁরা এই ভগবানের কথামৃত শ্রবণরূপ ওষ্ঠ দিয়ে পান করেন, তাঁদের
বিষয়ের স্পর্শে মলিন চিত্ত পবিত্র হয় এবং তাঁরা শ্রীভগবানের চরণপদ্মে অবস্থান করে
থাকেন।
মানুষের কর্তব্য
শ্রীশুকদেব বললেন, “হে মহারাজ,
জীব বহু যোনিতে জন্ম নিতে নিতে দৈবযোগে মনুষ্যত্ব লাভ করে। তাদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী এবং
জ্ঞানীদের মধ্যেও যাঁরা মুমুক্ষু অর্থাৎ মুক্তির ইচ্ছা করেন, তাঁদের কর্তব্য
সম্বন্ধে আপনি যা প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে শ্রীহরিকথা শোনা একটি অবশ্য কর্তব্য
বলেই আমি উল্লেখ করলাম। যাঁদের মন্দবুদ্ধি তাঁরা নানা দেবতার ভজনা করেন। যিনি
ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, তিনি বেদপতি ব্রহ্মার উপাসনা করেন। এইভাবে, যাঁরা
ইন্দ্রিয়ের দক্ষতা কামনা করেন তাঁরা ইন্দ্রের, সন্তান কামনায় দক্ষ ও অন্য
প্রজাপতির, ঐশ্বর্যকামী শ্রীদুর্গার, তেজ কামনাকারী অগ্নির, ধনের প্রত্যাশীরা
বসুগণের ও বীরত্বের কামনায় রুদ্রগণের উপাসনা করে থাকেন। যাঁরা অন্নের প্রার্থী
তাঁরা অদিতির, স্বর্গ কামনায় দ্বাদশ আদিত্যের, সুষ্ঠু রাজ্যপরিচালনায়
বিশ্বদেবগণের, কৃষি ও বাণিজ্যের কামনায় সাধ্যগণ, আয়ুর বাসনায় অশ্বিনীকুমারদ্বয়,
পুষ্টির জন্যে পৃথিবীদেবী, প্রতিষ্ঠার কামনায় লোকমাতা দ্যাবাপৃথিবীর, রূপের সাধনায়
গন্ধর্বগণের, স্ত্রীর কামনায় অপ্সরা উর্বশীর ভজনা করেন। সকলের উপর আধিপত্যকামী
পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার, যশ প্রার্থী যজ্ঞেশ্বের বিষ্ণুর, ধনসঞ্চয়ের জন্য প্রচেতার,
বিদ্যার জন্য গিরীশের, দাম্পত্যসুখের কামনায় সতী উমাদেবীর, ধর্মের জন্য উত্তমশ্লোক
বিষ্ণুর, বংশবিস্তারের জন্য পিতৃগণের, বিঘ্ন নিবৃত্তির জন্য যক্ষগণের উপাসনা করেন।
রাজত্বের কামনায় মন্বন্তরের অধিপতি দেবগণের, শত্রুবিনাশের জন্য রাক্ষসগণের, ভোগের
ইচ্ছায় সোমের এবং বৈরাগ্য কামনায় প্রকৃতির প্রকৃত অধিষ্ঠাতা ঈশ্বরের যজনা করেন।
কিন্তু যিনি উদারবুদ্ধি, একান্ত ভক্ত, তাঁর এই সকল কামনা থাকুক কিংবা না থাকুক, অথবা তাঁহার মোক্ষলাভের অভিলাষ থাকুক, তিনি তীব্র ভক্তিযোগে পরমেশ্বরের ভজনা করেন। হে রাজন, হরিকথা শুনতে শুনতে প্রথমে জ্ঞানের উদয় হয়, এই জ্ঞানে রাগ, দ্বেষ প্রভৃতি নিবৃত্ত হয়, এবং সকল বিষয়ে বৈরাগ্য জন্মায়। বৈরাগ্যের উদয়ে চিত্তে প্রসন্নতা আসে ও ভক্তিযোগের উদয় হয়, এই পন্থাকেই শাস্ত্রে কৈবল্য পথ বলা হয়ে থাকে”।
শ্রী শৌণক বললেন, “ভরতকুলতিলক
রাজা পরীক্ষিৎ এইসব কথা শোনার পর বেদজ্ঞ ও পরমব্রহ্মদর্শী শুকদেবকে আর কী জিজ্ঞাসা
করলেন, আমাদের শুনতে ইচ্ছা হয়। পাণ্ডুকুলতিলক পরীক্ষিৎ ও ব্যাসনন্দন শ্রী শুকদেব
দুজনেই ভগবান বাসুদেব পরায়ণ। অতএব এই দুই সাধু ব্যক্তির উরুগায় অর্থাৎ মহাযশা
ভগবানের গুণাবলীপূর্ণ মহৎ কথার প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। সূর্যদেব প্রত্যেকদিন
উদিত ও অস্তমিত হয়ে মানুষের আয়ুক্ষয় করছেন, অতএব ভগবান বাসুদেবের পুণ্যকথা ছাড়া অন্য
সকল প্রসঙ্গই বৃথা কালক্ষয় করে। তরুসমূহ কি জীবন ধারণ করে না? কর্মকারের ভস্ত্রা
অর্থাৎ বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র কি শ্বাসক্রিয়া করে না? গ্রামের অন্যান্য পশু কি ভোজন
ও রতিক্রিয়ায় কাল হরণ করে না? অতএব কেবল জীবনধারণ, শ্বাসক্রিয়া, ভোজন ও মিথুন মানব
জীবনের উদ্দেশ্য নয়। শ্রীকৃষ্ণের মধুরিমা যে মানুষের কানে পৌঁছায়নি, সে ব্যক্তি
কুকুরের মতো অবজ্ঞার পাত্র, গ্রাম্য শূকরের মতো মলিন বিষয়ে আসক্ত, উটের মতো বিষয়রূপ কষ্টকর কাঁটা চর্বণে ব্যস্ত এবং গাধার
মতো অপরের ভার বৃথা বহন করে।
হে সূত, মানবের যে দুই কান
শ্রীহরির গুণকথা না শোনে, সেই কান দুইটি ছিদ্র মাত্র। যে জিহ্বা ভগবানের মধুর
চরিত্র কীর্তন না করে, সেই জিভ ব্যাঙের জিভের মতো। যে উত্তমাঙ্গ অর্থাৎ মাথা
মুকুন্দের পায়ে অবনত না হয়, সেই মাথা মূল্যবান মুকুটে শোভিত হলেও বৃথা ভারের মতো। যে
হাত ভগবানের সেবায় ব্যবহৃত হয় না, সেই হাত কঙ্কন-বলয় শোভিত হলেও, শবদেহের হাতের
মতোই কুৎসিত। যে চোখ শ্রীহরির মূর্তি লক্ষ্য করেনা, সেই চোখ ময়ুরপুচ্ছের মতো, যে
পা শ্রীহরি ক্ষেত্রে গিয়ে ধন্য হয় না, সেই পা গাছের শিকড়ের মতো। যে ব্যক্তি
মুকুন্দের চরণধুলা মাথায় নেয়নি কিংবা তাঁর চরণের তুলসীপাতার গন্ধের ঘ্রাণ নেয়নি,
সেই মানুষ জীবন্মৃত। যে হৃদয় শ্রীকৃষ্ণ নামে বিগলিত হয়ে আনন্দের অশ্রুধারা ও অঙ্গে
পুলক সৃষ্টি না করে, সন্দেহ নেই, সেই হৃদয় পাথরের মতোই নিষ্প্রাণ।
হে সূত, অভক্তের সমস্তই ব্যর্থ
হয়ে যায়। ভক্তচূড়ামণি ব্যাসনন্দন আর যা যা বলেছিলেন, আপনি আমাদের সবিস্তারে বর্ণনা
করুন”।
চলবে...