শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১০ " 


১১ 

আজ ছিল রবিবার। রবিবারে তার চেম্বার বন্ধ থাকে। তবুও তার রাতের খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে সাড়ে দশটা বেজেই গেল। রান্নাঘরে শম্পাদিদির কাজ শেষ করে বেরোতে আরও মিনিট পনের সময় লাগল। সদর দরজা বন্ধ করে, শোবার ঘরের টেবিলে একটু শান্তিতে বসে সুনেত্র যখন ল্যাপটপ চালু করল, তখন রাত প্রায় সোয়া এগারোটা। বেশ কিছুদিন সুনেত্র সুকন্যাকে কোন মেল করেনি। আজ ইচ্ছা হচ্ছিল, বেশ লম্বা একটা মেল করবে। আজ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সুকন্যা তার কাছেই ছিল, এই ঘরে, শোবার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে, এমনকি রান্নাঘরেও। দুজনের জন্যে দুপুরের খাবার বানাতে ব্যস্ত শম্পাদিদির সঙ্গে ছিল অনেকক্ষণ।

মূল্যবান ধূপ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তার সুগন্ধ যেমন টের পাওয়া যায় ঘরের প্রতিটি কোণে, সুনেত্র আজ সেভাবেই যেন টের পাচ্ছিল সুকন্যার অস্তিত্ব – তার মনের অন্দরে তো বটেই – এমনকি এই বাড়ির সমগ্র আবহে। খুব সম্ভবতঃ শারদীয় উল্টোরথে ছোটবেলায় সুচিত্রা সেনের পরপর কয়েকটি বিশেষ মুডের পৃষ্ঠা-জোড়া সাদাকালো ফটো দেখেছিল সুনেত্র। সেগুলির নীচে লেখা ছিল নানান ক্যাপশন - বিস্মিতা, শঙ্কিতা, আনন্দিতা, লজ্জিতা, বিরহিনী, উৎকণ্ঠিতা... ঠিকঠাক মনে নেই, তবে এরকম ধরনের। আজ সারাটা দিন সুকন্যার মুখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিল সুনেত্র। এত দীর্ঘ সময় ধরে, সুকন্যাকে এতটা কাছে কোনদিন পায়নি সুনেত্র। হয়তো অনেকের মধ্যে ওকে খুঁজে নিয়ে চকিত চোখের কথা শুনেছে এবং বলেছে। কিংবা আধো-আলো-আঁধারি গঙ্গার ধার ধরে হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা, সদা-শঙ্কিত মনে। এই বুঝি চেনা কেউ দেখে ফেলবে, আচমকা বলে উঠবে – আরে সুনু, তুই এখানে? ওটা কে? তোর পিসতুতো বোন না? এসময় এখানে কী করছিস?

কিন্তু আজ? ধরা পড়ে যাওয়ার শঙ্কাহীন মনে অনেকক্ষণ - অনেক কথা দুজনের। যদিও সব কথা মুখ ফুটে বলা হল না, বলার দরকারও ছিল না তেমন। শব্দময় কথোপকথনের থেকে নিঃশব্দ আলাপন যে কতটা গভীর হয়, সে কথা সুনেত্র জানে। মুখ ফুটে অজস্র কথা বলার চেয়েও প্রতিটি কথা কান পেতে শোনা ও অনুভব করার মধ্যেই যে লুকিয়ে থাকে অনন্ত মাধুর্য - সে কথাটাও আজই প্রথম জানল সুনেত্র – তার এই মধ্য বয়সের উপান্তে।

ল্যাপটপে মেলবক্স খুলে খুব অবাক হল সুনেত্র, কনির দুটো মেল এসেছে – একটা প্রায় দেড়ঘন্টা আগে, আরেকটা মিনিট কুড়ি আগে। আগের মেলটাই প্রথম খুলল সুনেত্র। ছোট্ট চিঠি, 

“সুনুদা,

আজকের দিনের স্মৃতিটা মনের গভীরে কী ভাবে সাজিয়ে রাখা যায় বলো তো? দোহাই তোমার, “সোনার ফ্রেমে” বলো না। অথবা মনের মণিকোঠায় বলো না – অন্য কিছু ভাবো। যতদিন না আমার মনোমত ফ্রেমটা তুমি খুঁজে এনে আমার হাতে তুলে দেবে, ততদিন আমার নিরিবিলি মনের বাঁধা ঘাটেই রয়ে যাবে আজকের সকল স্মৃতি।

তোমার কনি”। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র পরের মেলটা খুলল, সুদীর্ঘ চিঠি। এত বড়ো চিঠি কনি কোনদিন লেখেনি – সেই কাগজ-কলমের যুগেও। অভিযোগ করলে বলত, তোমার বাগানে তুমি যেমন কথার চাষ করো, আমি তো তেমন করি না। তাই তোমার আছে কথার ঝুড়ি, আমার আছে একটি বা দুটি শিশিরে ভেজা সদ্যফোটা ফুল। সেটাকে তোমার যদি যৎকিঞ্চিৎ মনে হয়, তাহলে আমি নাচার। সেই কনি কী এত লিখল? ইন্টারেস্টিং! সুনেত্র চিঠিটা শুরু করার আগে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর... 

“সুনুদা,

শুনেছি সিদ্ধির নেশায় মানুষের মুখে নাকি তুবড়ি ছোটে। আবোলতাবোল কথা আর অকারণ হাসিতে নিজের মধ্যে নিজেই মজে থাকে আনন্দে। তুমি কি সিদ্ধি পুড়িয়ে ঘরে ধোঁয়া ভরে রেখেছিলে? নয়তো আজ আমার এমন ভূতে পাওয়া দশা হল কেন? আমার বাচাল বকবকানিতে কিংবা তুচ্ছমুচ্ছ কারণে হেসে গড়িয়ে পড়ার বাড়াবাড়ি দেখে তোমার মাথা ধরেনি? অবশ্য মাথা ধরলেও তুমি কী আর বলবে? নিজেই ডাক্তার – সকলের চোখের আড়ালে একটা ট্যাবলেট, ঘুট করে কখন জলের সঙ্গে মেরে দেবে – কেউ টেরও পাবে না।

আজ গোটা দিনটা – সেই তুমি যখন অনিমেষকে বাড়ি পাঠিয়ে, আমার হাত ধরে তোমার নির্জন নীড়ে আমায় টেনে নিয়ে গেলে। আর সন্ধেবেলায় তোমার গাড়িতে করে আমার বাড়িতে তুমি যখন পৌঁছে দিয়ে গেলে। বিশ্বাস কর সুনুদা, এই দুটো মাত্র ঘটনা ছাড়া, সারাটা দিন আমি কী করেছি, কী বলেছি, কতবার হেসেছি – কিচ্ছু মনে নেই। তুমি কি জান, সুনুদা - এই দুবারই আমি আকাশে-বাতাসে শুনেছি শঙ্খ ধ্বনি? তুমি শুনতে পাওনি, না? কিন্তু আমার দুই কান অত্যন্ত লোভীর মতো শুনেছে সেই শঙ্খ রব। তখন মনে হয়েছিল এই ধ্বনি মাঙ্গলিক, কিন্তু এখন তোমাকে এই মেল লিখতে বসে মনে হচ্ছে সে ধ্বনি অমঙ্গলের সংকেত। মনে হচ্ছে আমার জীবনে আবার আসছে নতুন এক ভাঙনের পর্ব...।

তুমি ভাবছ, আমার জীবনে আগে এক বা একাধিক ভাঙনের পর্ব ঘটেছিল নাকি, যে আবার আসছে নতুন একটা? এসেছিল, সুনুদা, এসেছিল। অন্ততঃ দু’বার তো বটেই – কখনো কখনো মনে হয় আরও বেশি। সেই ভাঙনে শেকড়-ছেঁড়া গাছের মতো যে ভেঙে পড়েছি তা নয়, তাহলে তো একদিক থেকে ভালই হত, সব ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু সেটাও হয়নি – আমার জীবন-তরুর প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ বাসা বেঁধেছে। নিশুতি রাতে ঘুণ পোকার আওয়াজ শুনেছ, সুনুদা? আমি শুনেছি। আমাদের বাড়িতে, তোমার মনে আছে কিনা জানি না, বাইরের ঘরে আম বা জামকাঠের একটা চৌকি ছিল। সেই চৌকির কাঠে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছিল। নিশুত রাত্রে কখনো কোন কারণে ওই ঘরে ঢুকলেই আমি শুনতে পেতাম ঘুণদের কাঠ কাটার শব্দ। দিনের বেলায় কাঠের গায়ে থাকা ক্ষুদ্র ছিদ্রে কাঠি ঢুকিয়ে দেখেছি – আশ্চর্য গভীর রন্ধ্র। কাঠির খোঁচায় বেরিয়ে আসত পাউডারের মতো কাঠের গুঁড়ো – হয়তো তার মধ্যেই থাকত দু একটা ঘুণপোকা! সে পোকাকে চিনতে পারিনি, তার চেহারা কেমন জানি না। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হল, অহোরাত্র আমার ভিতরে সেই আওয়াজ শুনতে পাই।

তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার বিয়ের সময় তুমি বড়ো উদাসীন হয়ে গিয়েছিলে, সুনুদা। তুমি তখন পি.জি. করতে গিয়েছিলে চণ্ডীগড়ে। আমাকে তুমি কিছু জানাওনি, কিন্তু মামীমার থেকে শুনেছিলাম – তোমার নাকি একদম ছুটি নেই – ইন্টার্নশিপ না হাউস্টাফশিপের ডিউটি নাকি এমনই ভয়ংকর। আমার বিয়ের আটমাস আগেই তোমার প্রস্তাব আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম বলে, তীব্র অভিমানে তুমি আমার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগই রাখোনি। অতএব আমার দিক থেকে তোমার প্রতি অভিমান করাটা হয়ে উঠেছিল অকারণ অপচয়।

আবার এটাও ঠিক, তুমি না আসাতে বেশ স্বস্তি পেয়েছিলাম। তুমি কাছাকাছি থাকলেই, তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হত। এক-আধবার তোমাকে স্পর্শ করার ইচ্ছে যে জাগত না, সে কথাই বা বলি কী করে? তুমি যে আমাকে তোমার জীবনের পথে একসাথে চলার আবাহন করেছিলে! তোমার সেই আহ্বানকে আমি যে বুকে পাথর বেঁধে (এ কথাটা যথেষ্ট নাটকীয় হয়ে উঠল জেনেও লিখলাম) প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, সে কথাও মনে পড়ত বারবার। এবং কে জানে ছাদনাতলায় তোমার হয়তো ডাক পড়তো আমার পিঁড়ি তুলে ধরে আমাকে সাতপাক ঘোরানোর জন্যে। পিঁড়িতে বসে তোমার কাঁধে ভর রেখে শুভদৃষ্টির সময় – আমি কি পারতাম তোমার দিকে একবারও না তাকিয়ে বরের মুখের দিকে তাকাতে?

আমার যে দেহ ও জীবনের ভার তুমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলে সুনুদা, সেই কাঁধে ভর রেখে আমি কোন আনন্দে শুভদৃষ্টি করতে পারতাম বলো তো? সে সময় তোমার কাঁধে আমার দেহের আংশিক ভারটুকুও কি তোমার কাছে তখন অসহনীয় মনে হত না? আমি তোমাতে আমার জীবন সমর্পণ করতে পারিনি, কিন্তু তাই বলে তোমার কাঁধে আমার দেহের ভার কোন লজ্জায় চাপাতাম বলো তো?

 

আমার বিয়েটা নির্বিঘ্নেই ঘটে গেল। আমাদের পক্ষের বয়স্কা মহিলারা প্রায় সকলেই বললেন, “অনেক ভাগ্যি করে এমন বর পেয়েছিস, সুকু। দেখিস খুব সুখী হবি তুই।” তখন ভেবেছিলাম, তাঁরা আমায় আশীর্বাদ করলেন, কিন্তু আজ মনে হয় তাঁরা অজান্তে আমার ভাগ্যকে বিদ্রূপই করেছিলেন।

অষ্টমঙ্গলা পার হল, নিয়ম মেনে আমি বাপের বাড়ি এলাম সাত দিনের জন্যে। আমার বর আমাকে আমাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল – শুধু সেইদিন নয়, আমার বর একটিও রাত্রিবাস করেনি তার শ্বশুরবাড়িতে। নির্দিষ্ট সপ্তাহ পার হয়ে গেল, আমাকে নিতে বর এল না। ওদের বাড়ি থেকে খবর এল, আমাদের বাড়ি থেকেই কেউ যেন আমাকে ওবাড়িতে পৌঁছে দেয়। অপ্রত্যাশিত এই সংবাদে বাবা-মা দুজনেই হতবাক এবং উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন – নানান দুশ্চিন্তায় তাঁদের ঘুম টুটল। মা আমাকে নির্জনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, অনেক কথা, শাশুড়ি কেমন, শ্বশুর কেমন, জামাই কেমন। আমার এক বিবাহিতা ননদ ছিল, সেই বা কেমন? তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যারে সত্যি করে বল তো, তোর সঙ্গে জামাইয়ের বা ও বাড়িতে কারো সঙ্গে কোন বচসা বা মনোমালিন্য হয়নি তো?”

কি বলি বলো তো, সুনুদা? যে কোন বাড়িতে বিয়ের পরেও তার উৎসবীয় রেশ চলে বেশ কিছুদিন। ও বাড়িতে সাতদিন যে ছিলাম, প্রকৃত অর্থে কার সঙ্গে আমার ঘরোয়া বেশে এবং পরিবেশে পরিচয় হওয়া সম্ভব ছিল বলো তো? সারাদিন সকলে মিলে, অন্ততঃ একশ বার জিজ্ঞেস করেছে – “কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো, বৌমা/ অথবা বৌদি?” এই প্রশ্নসমুহে সত্যিই কি কোন আন্তরিকতা থাকে? সকলেই তো জানে, অপরিচিত পরিবেশে নতুন বধূ হয়ে এসেছে পরের ঘরের যে কন্যাটি – তার নানান অসুবিধে, অস্বস্তি হবেই। তা বলে, সে কি সবাইকে সাতকাহন করে বলতে বসবে, হ্যাঁ আমার এইএই-ওইওই অসুবিধে হচ্ছে?  আর তুমি তো জানো, সুনুদা, যথেষ্ট কারণ থাকলেও, কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই। আমার মা এবং বাবাও কি সেকথা জানতেন না?

আমাকে সঙ্গে নিয়ে ও বাড়িতে বাবা নিজেই গেলেন। সকাল দশটা-সাড়ে দশটা হবে। বাবা আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে বাইরের ঘরে বসে আলাপ শুরু করলেন – সে আলাপ কিছুটা শুনেই আমার মনে হল যেন অতিরিক্ত সহৃদয়-হৃদ্যতায় মাখামাখি। উপস্থিত গুরুজনদের প্রণামপর্ব সেরে আমি শোবার ঘরে (সেই ঘরটার কথা মনে পড়লে, আজও আমার শরীর ঘৃণায় শিউরে ওঠে, সুনুদা) ঢুকলাম, দেখলাম আমার বর শ্রীমান জ্যোতিষ – বিছানায় আশ্চর্যরকমের বিশ্রীভাবে শুয়ে আছে। ঘরের সবকটি জানালা বন্ধ, যার ফলে বেশ ছায়াচ্ছন্ন  – ঘরের মধ্যে কদর্য গন্ধময় বদ্ধ বাতাস। আমার সঙ্গে ছিলেন শাশুড়ি, তিনি আমার বরের কাঁধে ঠেলা দিয়ে ডাকলেন, “অ্যাই, পিন্টু, ওঠ কত বেলা হল, উঠে দেখ বৌমা এসেছে...ওঠ, উঠে পড়”। পিন্টু হল তোমার ভগ্নীপতির ডাকনাম বুঝতেই পারছ।  

বার তিনেক ধাক্কা খেয়ে পিন্টু কোন রকমে চোখ মেলে তাকাল – কিছুটা ঘোলাটে লাল চোখ, নির্বিকার চোখের দৃষ্টি - কোন কিছুই যেন তার দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে না। ধরা দিলেও তার মস্তিষ্কে পাঠানো চোখের চিত্রগুলি স্পষ্ট হচ্ছে না। আমি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এবং কিছুটা ক্রুদ্ধ হয়েই ঘরের তিনটে বন্ধ জানালাই হাট করে খুলে দিলাম।

শাশুড়ি বললেন, “কাল থেকেই ওর শরীরটা খারাপ, কিনা...”।

আমি পিন্টুর দিকে তাকালাম, সকালের উজ্জ্বল আলোয় তার চোখ কুঁচকে গেছে। ভুরুর কাছে বাঁ হাতে তুলে আড়াল করছে আলো। আর সেই হাতে দেখলাম, কব্জির ওপর থেকে কনুই পর্যন্ত শুকনো রক্তমাখা একটা কাটাদাগ।  

“জানালাগুলো খুললে কেন?” পিন্টু বিরক্ত হয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠল। কিন্তু উঠে বসতে চেষ্টা করল না, হয়তো উঠে বসার অবস্থা তখনও ওর হয়নি।  

সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, “এমন শরীর খারাপ কি ওর প্রায়ই হয়? ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”।

উনি আমতা আমতা করে বললেন, “না...ইয়ে মানে প্রায়ই হবে কেন... তাই আবার হয় নাকি? এবারই হল...সেরে উঠবে সন্ধে পর্যন্ত...ডাক্তার ডেকে... ডাকব? ডাক্তার ডেকে লাভ হবে কি?”

বিছানায় বসতে প্রবৃত্তি হল না। ছোট একটা টুলে বসে আমি শাশুড়ির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞ্রেস করলাম, “শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন, মা, তাতে কারো কোন উপকার হয় না – কাল কত রাত্রে ফিরেছে?”

আমার সরাসরি প্রশ্নে উনি ভেতরে ভেতরে টলে গেলেন, নিজের এবং নিজের পুত্রটির আত্মরক্ষার্থে একটু রূঢ় স্বরে বললেন, “কী বলতে চাইছ, বৌমা? পিন্টু নেশা করেছে? বললাম না, একটু শরীর খারাপ হয়েছে...”?

“নেশার কথা তো আমি বলিনি, মা?”

“তাই তো বলতে চাইছ? বলতে আর বাকি কী রাখলে?”

“বেশ। আপনি কি এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে চাইছেন? আমাদের তর্কাতর্কিতে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, মনে করছেন? খুব ভালো, তাহলে আমিও প্রস্তুত হয়ে নিই...” বলে আমি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে বেঁধে নিলাম শক্ত করে, যাকে গাছ-কোমর বলে আর কি। তারপর আবার বললাম, “এক মিনিট আমি আসছি, আমার বাবাকে আমি বিদায় জানিয়ে আসি...আজ এখনই আপনাদের স্বরূপটা বাবা জেনে যাবেন...এটা আমার মনঃপূত হচ্ছে না”। ওঁনার উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। বসার ঘরে বাবার সামনে গিয়ে বললাম, “তুমি বাড়ি যাও বাবা, বেলা বাড়ছে...এরপর রোদ চড়া হয়ে উঠবে...একটা ট্যাক্সি ধরে নিও...”।

বাবা রীতিমতো থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। ঝড়ের বেগে আমার ঘরে ঢোকা, ওভাবে বাবাকে সেদিন চলে যেতে বলা আমার উচিৎ হয়নি মোটেই।

আমার কথাটা আমি উইথড্র করে নিলাম, সুনুদা, ওই যে বলেছিলাম, “কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই”। কথাটা ভুল বলেছিলাম – এর আগে এমন দেয়ালে-পিঠ-ঠেকে-যাওয়া পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়িনি, কাজেই আমার এই গুণের (নাকি দোষের?) বার্তাটি আমার কাছে কোনদিন ধরা দেয়নি যে!

আমার আচরণে বাবা চূড়ান্ত আশ্চর্য হলেন। মুখ তুলে তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর মুখটা, স্পষ্ট দেখলাম, পাণ্ডূর-বর্ণ হয়ে উঠল। এই “পাণ্ডূর” কথাটা শরৎচন্দ্রের বইতে অনেকবার পেয়েছি। অভিধানে দেখেছি এর অর্থ মলিন, বিষণ্ণ। আজন্ম তাঁর পরমস্নেহে লালিত কন্যার চোখের দিকে চেয়ে, আমার অন্তরে ঘটে চলা গভীর যন্ত্রণার অভিব্যক্তি অনুভব করে, তাঁর মন সেদিন নিছক বিষণ্ণ বা মলিন হয়নি – সত্যিই পাণ্ডূর হয়ে উঠেছিল। আমি জানি একথা তিনি বাড়ি ফিরে তাঁর কন্যার মাতা – অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও সহজে ভাগ করে নিতে পারবেন না। নিজের অন্তরেই তিনি দগ্ধ হতে থাকবেন অহরহ, সারাজীবন ধরে।

বাবা আমার চোখে চোখ রেখেই অস্ফুটে বললেন, “তুই কি আমার সঙ্গে ফিরে যাবি, মা?”

“না, বাবা, এখন আর তা হয় না”।

“ঠিক আছে, আমি তাহলে চলি, বেয়াইমশাই” আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সাবধানে থাকিস্‌, মা...কোন অসুবিধে হলে, কোন দ্বিধা করিস না, আমায় বলতে...”। এই কথা বলে, বাবা বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। আমি তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, দুই চোখ ভরে উঠতে চাইছিল অশ্রুতে, রুদ্ধ করলাম। এখন তো কান্নার সময় নয়”।

 

সুনেত্র সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা নিয়ে উঠে গেল, ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির লাইট জ্বালিয়ে ছাদে গেল। অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঝলমল করছে আকাশ এবং কিছুটা অস্পষ্ট ছায়াপথ। তার বাবা-মা, কনির বাবা-মা কেউই আর ইহলোকে নেই। লোককথা বলে তাঁরা নাকি তারা হয়ে বিরাজ করছেন ওই আকাশে। তাকিয়ে আছেন তাঁদের সন্তানদের দিকে...। সুনেত্র একটা সিগারেট ধরালো।

কনির সঙ্গে আর কোনদিনই সে ভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি সুনেত্র। সে ভেবেছিল কনি এখন পরস্ত্রী, তার সংসারে কোনভাবেই উঁকি মারা তার উচিৎ নয়। উচিৎ নয় তার সাংসারিক কোন ব্যাপারে নাক গলানো। কিন্ত মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে তো তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁরা কেউ কনির এই দুঃসহ জীবনের কথা কেন কোনদিন তাকে বলেননি? কনির কথা জিজ্ঞেস করলে, তাঁরা এড়িয়ে যেতেন, বলতেন, ভালোয়-মন্দয় মিশিয়ে সংসারে যেমন থাকা যায়...। অবশ্য এ কথার পরে সুনেত্রও কোনদিন কনির সংবাদ আরও গভীরে জানতেও চায়নি।

সে জানলেই বা কী করত? কনিকে তার সংসার থেকে উপড়ে তুলে আনত। কনি নিজেই কি তাতে রাজি হত? যে মেয়ে বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ পুড়বে ভেবে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। সেই মেয়ে তার ভরা সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামীকে ছেড়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে এলে, তার বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ কি একটু কম পুড়ত? নাকি অনেক বেশি পুড়ত?

সুনেত্র দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়ল অনেকটা। এবং হঠাৎ তার মনে পড়ল প্রথম দিন কনির গাড়িতে যার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল তার নাম তো শশাঙ্ক মিত্র। এদিকে কনি তার বরের নাম লিখেছে জ্যোতিষ, ডাকনাম পিন্টু। জ্যোতিষের সঙ্গে কনির কি ডিভোর্স হয়েছিল? শশাংক কি কনির দ্বিতীয় বর? সিগারেটটা মাটিতে ফেলে চপ্পলের নীচে পিষে দিয়ে নীচেয় নামল সুনেত্র।   

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৫

   এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - পঞ্চম পর্ব

 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণু-লীলা বর্ণন (আগের পর্বের শেষাংশ)     

একবার সরোবরের জলের মধ্যে এক কুমীর এক গজেন্দ্রকে আক্রমণ করেছিল। কুমীরের কবল থেকে পরিত্রাণের জন্য, সেই হস্তী তাঁর শুঁড়ে একটি পদ্মফুল নিয়ে শ্রীহরির স্তব করে বলেছিলেন, “হে আদি পুরুষ, অখিল লোকের নাথ, তোমার সমস্ত কীর্তিই পবিত্র এবং তুমি ভুবনের মঙ্গল সাধন করে থাকো”অচিন্ত্যশক্তি ভগবান, শরণাগত সেই হস্তীবীরের প্রার্থনায়, গরুড়ের পিঠে চড়ে সেই স্থানে এসেছিলেন, এবং নিজের চক্র দিয়ে সেই কুমীরকে হত্যা করে সেই হস্তীর প্রাণরক্ষা করেছিলেন। তারপর সেই হাতীর শুঁড় স্পর্শ করে তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন।

তারপর তিনি অদিতির গর্ভে জন্ম নিয়ে বামনরূপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি দ্বাদশ আদিত্যের  মধ্যে সবথেকে কনিষ্ঠ হয়েও গুণে সবার শ্রেষ্ঠ ছিলেন, কারণ তিনি তিন পদক্ষেপে ত্রিভুবন জয় করেছিলেন। ভগবান এই বামনরূপে দৈত্যরাজ বলির থেকে তিনপদ পরিমাণ ভূমি ভিক্ষার ছলে ত্রিভুবন গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই নিখিল বিশ্বের প্রভু, তিনি ইচ্ছা করলে বলির থেকে শক্তি প্রয়োগে এই ত্রিলোক জয় করে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ ভক্ত বলি নিজের ধর্মমাগেই অবস্থান করছিলেন এবং প্রভু তাঁর ভক্তকে প্রাপ্য পদ থেকে বিচ্যুত করা উচিৎ মনে করেননি। এই কারণে তিনি ভিক্ষার অছিলায় বলিকে রাজ্যভ্রষ্ট করেছিলেন। হে নারদ, গুরু শুক্রাচার্য তাঁকে নিবারণ করলেও, মহারাজ বলি নিজের প্রতিজ্ঞায় অচল রইলেন, এবং শ্রীহরির দুই পদক্ষেপে স্বর্গ ও মর্ত অধিকার হতে দেখেও নিরস্ত হলেন না, বরং নিজের দেহ শ্রীহরির তৃতীয় পদ রাখার জন্য সমর্পণ করলেন। যিনি শ্রীবিষ্ণুর চরণতলে নিজের মাথা সমর্পণ করতে পারেন, তাঁর মতো ভক্তের কাছে ত্রিলোকের রাজত্ব তুচ্ছ বিষয় সন্দেহ নেই। বস্তুতঃ, ভগবান তাঁর অকিঞ্চিৎকর রাজ্য হরণ করে, তাঁর অনিষ্ট করেননি, বরং তাঁকে নিজের শ্রীচরণে আশ্রয় দিয়ে তিনি তাঁর মহা উপকার করেছিলেন।

হে নারদ, হংস অবতারে সেই ভগবান তোমার অখণ্ড ভক্তিভাবে পরিতুষ্ট হয়ে, তোমাকে ভাগবত নামক জ্ঞানযোগ উপদেশ দিয়ে তোমার আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করিয়েছিলেন। তারপর শ্রীহরি ধন্বন্তরিরূপে অবতীর্ণ হয়ে নিজের নামের প্রভাবেই মহারোগগ্রস্ত জনগণের রোগ আশু উপশম করেছিলেন। আগে দৈত্যরা অমৃতময় যজ্ঞভাগ রুদ্ধ করে রেখেছিল, তিনি এই অবতারে তার উদ্ধার সাধন করলেন ও পৃথিবীতে আয়ুর্বেদের প্রবর্তন করলেন। একবার ক্ষত্রিয়গণ মতিভ্রমে বেদ ও ব্রাহ্মণের বিদ্বেষী হয়ে, পৃথিবীর বিনাশে উদ্যত হয়েছিলেন। উগ্রবীর্য পরশুরাম অবতারে তিনি তীক্ষ্ণ পরশু দিয়ে একুশবার ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করে, পৃথিবীকে নির্বিঘ্ন করেছিলেন।

শ্রী ব্রহ্মা কর্তৃক শ্রীবিষ্ণুর অবতার লীলার ভবিষ্যবাণী 

[এতক্ষণ শ্রীব্রহ্মা নারদকে সত্য যুগে শ্রীবিষ্ণুর নানান অবতার লীলার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করলেন। এবার তিনি নারদের কাছে ত্রেতা যুগ থেকে শুরু করে দ্বাপরের শেষ পর্যন্ত শ্রীবিষ্ণুর বিচিত্র অবতার লীলারও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ তাঁর ও নারদের মধ্যে এই যে কথোপকথন হচ্ছে সেই ঘটনাগুলি ভবিষ্যতে ঘটবে!]         

একবার আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, মায়াপতি শ্রীভগবান নিজের অংশে চারভাইয়ের সঙ্গে শ্রীরামরূপে, ইক্ষ্বাকুবংশে জন্ম গ্রহণ করবেন। পিতৃসত্যপালনের জন্য ভাই লক্ষ্মণ ও ভার্যা সীতাদেবীর সঙ্গে তিনি বনগমন করবেন এবং সেখানে দশানন রাবণ তাঁর সঙ্গে বিবাদ করে বিনষ্ট হবেন। ত্রিপুর দহনকারী শ্রীরুদ্রের মতো শ্রীরামচন্দ্র শত্রুপুরী লঙ্কাকে ধ্বংস করার জন্য সমুদ্রতীরে উপস্থিত হলে, সমুদ্র তাঁকে লঙ্কা যাবার পথ করে দেবেন। দশদিকের অধিপতি রাবণ সীতা হরণের মতো অপরাধ করেও, নিজের শক্তির অহংকারে নিজের ও শত্রুসৈন্যদের মধ্যে নির্ভয়ে বিচরণ করবেন এবং শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে অনায়াসে হত্যা করবেন।

তারপর অসুরেরা রাজবংশে জন্ম নিয়ে, নিজের দুর্ধর্ষ সৈন্যদলের সাহায্যে পৃথিবীতে অশেষ অত্যাচার করবে। সেইসময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের অংশ বলরামের সঙ্গে জগতের ভূভারহরণের জন্যে জন্মগ্রহণ করবেন। এই কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শৈশবে, পূতনা রাক্ষসী বধ, তিনমাস মাত্র বয়সে শকটভঞ্জন এবং যমলার্জুন ভঙ্গ করবেন। একবার যমুনার বিষজল পান করে ব্রজের বালকগণ ও গবাদি মূর্ছিত হয়ে পড়লে, কৃষ্ণ তাঁর সুধাময় দৃষ্টিপাতে সকলকে সুস্থ করে তুলবেন। তারপর কালিন্দীর বিষজল পরিশোধনের জন্য উগ্রবীর্য ও লোলজিহ্বা মহাসর্প কালিয়কে দমন করে, যমুনার জলে বিহার করবেন। একবার জননী যশোদা, কৃষ্ণকে বাঁধার জন্যে যত রশি নিয়ে আসবেন, সবই কম পড়ে যাবে, কিছুতেই শিশু কৃষ্ণকে বাঁধতে পারবেন না। একবার কৃষ্ণ হাই তোলার ছলে জননী যশোদাকে নিজের মুখের মধ্যে চোদ্দভুবন দেখাবেন, মাতা যশোদা ওই দৃশ্যে ভয় পেয়ে যাবেন এবং কৃষ্ণের অচিন্ত্য মহিমার পরিচয় লাভ করবেন।

ইনি নন্দ মহারাজকে বরুণের বন্ধন থেকে মুক্ত করবেন। ময়দানবের পুত্র ব্যোমাসুর পাহাড়ের গুহায় গোপদের লুকিয়ে রাখলে, তিনি তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবেন। গোপগণ কোন সাধন, ভজন করেন না, তাঁরা দিনের বেলায় কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং রাত্রে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনকৃষ্ণ তাঁদের বৈকুণ্ঠে স্থান দান করবেন। এর চেয়ে অলৌকিক লীলা আর কী হতে পারে? নন্দ প্রমুখ গোপগণ ইন্দ্রের উদ্দেশে যজ্ঞ করতেন। কৃষ্ণের উপদেশে তাঁরা ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করবেন ও তাতে ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে, বৃন্দাবন বিনাশ করার জন্য  সাতদিন ধরে অবিরল ধারায় প্রবল বর্ষণ করবেন। কৃষ্ণের তখন মাত্র সাত বৎসর বয়স, তিনি বাম হাতে সাতদিন ধরে ছাতার মতো গিরি গোবর্ধনকে ধরে থাকবেন, এবং পাহাড়ের নীচে বৃন্দাবনের সমস্ত মানুষ ও গবাদি পশুকে বৃষ্টির প্রকোপ থেকে রক্ষা করবেন।

চাঁদের জ্যোৎস্নামাখা এক রজনীতে রাসকেলি করার সময়, কৃষ্ণর মূরলীর অপূর্ব সূরের মূর্ছনায় ব্রজকিশোরীরা অনঙ্গ বাণে পীড়িত হয়ে ঘরের বাইরে বের হলে, কুবেরের অনুচর শঙ্খচূড় তাদের সকলকে হরণ করবে। তখন কৃষ্ণ সেই শঙ্খচূড়ের মস্তক ছিন্ন করে গোপিনীদের উদ্ধার করবেন। এছাড়া, বলভদ্রের হাতে প্রলম্ব, ধেনুক, দ্বিবিদ বানর, বল্কল ও রুক্মি প্রভৃতির মৃত্যু ঘটবে। ভীম ও অর্জুনদের সঙ্গে থেকে কৃষ্ণ, বলদৃপ্ত ধনুর্ধর কাম্বোজ, মৎস্য, কুরু, সৃঞ্জয় ও কৈকয়দের জীবন অবসান করবেন। তাঁর পুত্র শম্বরাসুর, মুচুকূন্দ যবনকে সংহার করবেন। তিনি নিজে বকাসুর, কেশী, বৃষাসুর, চানুর মুষ্টিকা প্রমুখ মল্লবীর, কুবলয়াপীড় গজ, কংস, পৌণ্ড্রক সাল্ব, নরকাসুর, দম্ভবক্র, সপ্তবৃষ ও বিদূরথকে সংহার করবেন। বৎস নারদ, এই বিষয়ে কোন সংশয় করো না। কৃষ্ণই সর্বময়, এই হেতু বলদেব, ভীম, অর্জুন প্রমুখ বীরশ্রেষ্ঠ তাঁরই মূর্তিভেদ। তিনি ভিন্ন ভিন্ন রূপে সকল অসুর ও রাজাদের সংহার করবেন, সকলকে বৈকুণ্ঠধাম প্রদান করবেন।

তারপর কালের প্রভাবে মানবের বুদ্ধির হ্রাস ও পরমায়ু অল্প হতে থাকলে, বেদশাস্ত্র তাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হবে। তখন সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসরূপে অবতীর্ণ হয়ে, বেদ বৃক্ষকে বহু শাখাতে বিভক্ত করবেন। তারপর দেবদ্বেষী অসুরগণ বেদমার্গ অবলম্বন করে, তার প্রভাবে ময়দানবের সাহায্যে অদৃশ্য মায়াপুরী বানিয়ে লোকসকলের উপর অত্যাচার করবে। তখন তাদের মতিভ্রম সৃষ্টি করার মানসে শ্রীহরি নয়নশোভন বুদ্ধবেশ ধারন করে বহু রকমের উপধর্মের উপদেশ করবেন। যখন সজ্জন ব্রাহ্মণের ঘরেও আর শ্রীহরি কথা শোনা যাবে না, ব্রাহ্মণেরা বেদদ্বেষী পাষণ্ডী হয়ে উঠবেন, শূদ্রেরা নরপতির আসন গ্রহণ করবে এবং স্বধা, স্বাহা, বষট্‌ প্রভৃতি মন্ত্র উচ্চারণ হবে না, তখন ভগবান যুগের শেষে কল্কিরূপ ধারণ করে কলির নিগ্রহ করবেন।


নারদকে ভাগবত প্রচারে শ্রীব্রহ্মার আদেশ 

সৃষ্টিকালে তপস্যা, আমি ব্রহ্মা, নয় প্রজাপতি ঋষি; স্থিতিকালে ধর্ম, বিষ্ণু, মনুগণ, অমরগণ ও ক্ষত্রিয় ভূপালগণ এবং সংহার কালে অধর্ম, হর, ক্রোধের বশীভূত সর্প ইত্যাদি ও অসুর প্রভৃতি যা কিছু আবির্ভূত হয়, তার সবই সর্বশক্তিমান শ্রী হরির মায়া বিভূতি অর্থাৎ অচিন্ত্য মায়ার বিচিত্র প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

হে নারদ, শ্রী ভগবানের মহিমা আমি সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম; বিস্তারিত বর্ণনা কেউই করতে পারবে না। যদি কোন জ্ঞানীব্যক্তি পৃথিবীর যাবতীয় ধুলিকণা গুণতে সমর্থ হন, তাঁর পক্ষেও শ্রীবিষ্ণুর অচিন্ত্য বিভূতির গণনা করা সম্ভব হবে না। আমি ও তোমার অগ্রজ ঋষিগণ এই মায়াময় পুরুষের মহিমার সীমা খুঁজে পাইনি, অন্যদের কথা আর কী বলব? এই অনন্ত ভগবান যাঁদের প্রতি করুণা করেন, তাঁরা যদি অকপট চিত্তে তাঁর শ্রীচরণকে একমাত্র আশ্রয় ভাবেন, তাহলেই তাঁরা এই দেবমায়া জানতে ও উপলব্ধি করতে সমর্থ হন। এই শেয়াল, কুকুরের খাদ্য দেহের প্রতি তখন তাঁদের, “আমি” বা “আমার” এই মমতা আর থাকে না।  অতএব শ্রীভগবানের করুণাই জীবের মুক্তিলাভের একমাত্র উপায়, অন্য কোন পথ আর দেখা যায় না।

বৎস নারদ, সৎসঙ্গ ঘটলে সকলেই তাঁর মায়া উপলব্ধি করতে পারে। স্ত্রী, শূদ্র, হূন, শবর প্রভৃতি পাপজীবও ত্রিবিক্রম হরির ভক্তদের চরিত্র অনুকরণ করে, তাঁর মায়া জানতে পারেন ও বুঝতে পারেন। এমনকি হংস, গজ, শুক, সারিকা প্রভৃতি তির্যক জাতিও ভক্তের কৃপায় তাঁর মায়া অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। অতএব, মানুষ, যারা তাঁর রূপ, মনে ধারণা করতে পারে, তাদের কথা আর কী বলব? ভগবানের যে রূপ মনে ধারণা করা উচিৎ, সে বিষয়ে তোমায় বলছি শোনো। মুনিরা যাঁকে ব্রহ্মা বলে জানেন, তিনিই ভগবানের স্বরূপ। ওই স্বরূপ নিত্য আনন্দময় ও শোকরহিত। ওই স্বরূপে নিরন্তর পরমা শান্তি বিরাজিত থাকায়, নিত্য সুখের কখনো ব্যাঘাত হয় না এবং সম অর্থাৎ ভেদরহিত হওয়ায় ভয়রহিত। কারণ “আমি” ও “তুমি” এই ভেদজ্ঞান না থাকলে ভয় উৎপন্ন হয় না। বস্তুর বিভিন্ন বর্ণ ও আকার হওয়ায় এবং আমাদের ইন্দ্রিয়সকল আলাদা আলাদা হওয়ায়, আমাদের সর্বদা যে জ্ঞান আহরণ হচ্ছে,  সেই জ্ঞান বিচিত্র অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বলে বোধ হচ্ছে। কিন্তু পরমজ্ঞান স্বরূপে এই বিভিন্নতার বোধ হয় না, কারণ ওই জ্ঞান বিশুদ্ধ অর্থাৎ মলিনতাহীন। বৎস, এই বিষয়ে একটি গভীর সিদ্ধান্ত আছে, মন দিয়ে শোনো।

আমাদের অন্তঃকরণ বিষয় সম্পর্কে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে, ওই পরিবর্তনের অবস্থাকে অন্তঃকরণের বৃত্তি বলে। বিষয়ের যা কিছু মলিনতা, তা বৃত্তিতেই থাকে, সেই বৃত্তি শুদ্ধ জ্ঞানকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি কখনও নিজেকে আমার থেকে আলাদা বলে ভাবতে পারি না। বেদ ব্রহ্মের পরিচয় দেয়, কিন্তু সেই স্বরূপকে শব্দ দিয়ে জ্ঞেয় বলা যায় না; কারণ তাহলে ব্রহ্ম শুধু জ্ঞানস্বরূপ নয়, জ্ঞেয়স্বরূপ হয়ে পড়েন অতএব বেদ শব্দদিয়ে আমাদের ভ্রম নিবৃত্তি করে মাত্র, ব্রহ্মের বোধ উৎপন্ন করে না। যা আত্মা ও সত্য নয়, সেই ব্রহ্মাণ্ড ও তার মধ্যে স্থিত দেহকে আমাদের আত্মা ও সত্য বলে ভ্রম আছে, বেদ সেই ভ্রমকে সংশোধন করে এবং তখন আত্মস্বরূপ নিজেই প্রকাশিত হয়। তূষ অপসারণ করে, যেমন তণ্ডুলকণার সংস্কার করা যায়, তেমনি রূপ মায়া অপসারণ করে ব্রহ্মস্বরূপের সংস্কার করতে হয়, নয়তো সঠিক উপলব্ধি হয় না। ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হলে, অন্য কোন বিষয় বা বস্তু পাওয়ার থাকে না এবং করার উপযুক্ত কোন কর্মও অবশিষ্ট থাকে না। ওই অবস্থা লাভের আগে শ্রীভগবানই সব কর্মের ফল দান করে থাকেন এবং সকল কর্মের প্রবৃত্তি দান করে থাকেন।

ব্রাহ্মণেরা শম, দম প্রভৃতি গুণের অনুসরণে যে সব শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, শ্রীভগবানই সেই সমস্ত কর্মের প্রবর্তক। তিনি শুভ কর্মের ফল স্বরূপ স্বর্গ ইত্যাদি ফল দান করে থাকেন। যিনি শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, কালক্রমে তাঁর মৃত্যু হলে স্বর্গলাভের সম্ভাবনা কোথায়, এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। কারণ যে সকল ভূতবস্তুতে দেহ নির্মিত হয়, মৃত্যুতে সেই দেহ বিনষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে জীবত্মার কোন অনিষ্ট হয় না। কারণ জীবাত্মা অজ অর্থাৎ দেহের সঙ্গে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু হয় না। এই জীবাত্মাই দেহান্তে, শ্রীভগবানের কৃপায় স্বর্গ ইত্যাদি নানান ফল ভোগ করে থাকেন”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, বিশ্বভাবন শ্রীহরির স্বরূপ ও মহিমা তোমার কাছে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। শ্রীভগবান স্বয়ং আমাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, এই সেই ভাগবতএই ভাগবতে ভগবানের বিভূতি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি, তুমি বিস্তারিতভাবে এর প্রচার করো। সকলের আত্মা ও অখিল বিশ্বের আধার শ্রীহরির পাদপদ্মে যাতে মানুষের ভক্তি সঞ্চার হয়, তুমি সেইভাবে শ্রীহরিলীলা বর্ণনা করো, শুধু তত্ত্বের আলোচনা করে, ভক্তিরসের ব্যাঘাত করো না। যদিও ভগবানের লীলা মায়া ছাড়া ঘটে না, তবুও যিনি এই ভগবানের সেই সব মায়ার বর্ণনা করেন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেন, তাঁদের সেই মায়া মুগ্ধ করতে পারে না”

চলবে...

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৫ 


৩২  

বেশ কিছুটা দূর থেকেই ভল্লা অস্ত্রাগারের কাঠামোটা দেখতে পেল। ভল্লা রণপা থেকে নামল। ফতুয়াটা খুলে ফেলল, গলার গামছাটা জড়িয়ে নিল মাথায় আর ধুতিটা গুটিয়ে তুলে নিল কুঁচকির কাছাকাছি। তারপর উঁচু একটা গাছে উঠে তুলে দিল রণপা জোড়া আর ফতুয়াটা। গাছ থেকে নেমে এসে জঙ্গল এবং ঝোপঝাড়ে আড়ালে আড়ালে এগোতে শুরু করল অস্ত্রাগারের দিকে।

কাছাকাছি গিয়ে সন্তর্পণে উঠে পড়ল একটা বড়ো গাছে। মোটা ডালে বসে, পাতার আড়াল থেকে দেখতে লাগল, নির্মীয়মাণ অস্ত্রাগারটা। মোটা ইঁটের দেওয়াল গাঁথা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চারটে কুঠুরি পাশাপাশি, লাগোয়া। ওদিকের দুটো ঘর বেশ বড়োবড়ো আয়তাকার আর এদিকের দুটো কিছুটা ছোটো। ঘরগুলোর ছাউনির জন্যে কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, মোটা মোটা কাঠের কড়িবরগা দিয়ে। পাশাপাশি চলছে, মানুষ-সমান উঁচু ইঁটের পাঁচিলের কাজও। কিন্তু ভল্লা একটু আশ্চর্য হলকোথাও কোন কুলিক, তার যোগাড়ে – মুনিষ, কাউকেই দেখতে পেল না। আজ কি এখানে কাজ বন্ধ? কেন?

ওপর থেকে শস্ত্রাগারের প্রবেশ দ্বার বলে যেদিকটা তার মনে হল, সেদিকে দেখল মারুলা দাঁড়িয়ে আছে হাতে বল্লম আর ঢাল নিয়ে। তার পাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। পোশাক দেখে মনে হচ্ছে বণিক। ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে চারজন প্রহরী, রীতিমতো বল্লম, ঢাল, তীর ধনুক নিয়ে।

ভল্লা গাছ থেকে নেমে এল। নির্মীয়মাণ পাঁচিলের একটা ফাঁক দিয়ে ভল্লা ঢুকে পড়ল, অস্ত্রাগারের সীমানার ভেতরে। প্রবেশদ্বারের দিকেই সে এগোতে লাগল সন্তর্পণে। চলতে চলতে এক জায়গায় বেশ কিছু ঝুড়ি, কোদাল বেলচা এবং কুলিকের যন্ত্রপাতি পড়ে থাকতে দেখল ভল্লা। সেখান থেকে একটা ওলন-দড়ি আর মাটাম তুলে নিয়ে আবার ধীরে সুস্থে এগিয়ে চলল। শস্ত্রাগারের ডানদিকের দেওয়াল ধরে সে এতক্ষণ চলছিল, সে দেয়াল শেষ হতেই সে পৌঁছে গেল শস্ত্রাগারের কোনায়। তাকে দেখামাত্র চারজন প্রহরী হইহই করে উঠল, “অ্যাই তুই ওখানে কে রে? কী করছিস ওখানে? পিছনে যা, এদিকে আসবি না”। ভল্লা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

প্রহরীদের চেঁচামেচিতে মারুলা আর সেই বণিক লক্ষ্য করল ভল্লাকে। কিছুক্ষণ দেখে মারুলা বণিকের কানে কানে বলল, “আরেঃ কী আশ্চর্য, ও তো ভল্লা। কী চেহারা বানিয়ে এসেছে দেখুন, মান্যবর।”

বণিক নীচু স্বরে বললেন, “তুমি ঠিক চিনেছ? আমি তো চিনতে পারছি না, ভল্লাকে”!

মারুলা বলল, “আমি নিশ্চিত, মান্যবর। কাছে আসতে দিন, চিনতে পারবেন”।

মারুলা প্রহরীদের বলল, “ওকে আসতে দাও”। প্রহরীরা ভল্লার দিকে হাত তুলে ডাকল, একজন বলল, “এই-ই, এদিকে আয়, সরকার ডাকছেন”।

ভল্লা ধীরে ধীরে ভয়ে ভয়ে সামনে এল। তার পা যেন কাঁপছে। সামনে এসে দুজনেই দুজনকে চিনতে পারল। ভল্লা জোড়হাতে নীচু হয়ে প্রণাম করল, বণিকবেশী শষ্পককে এবং মারুলাকেও।

মারুলা প্রহরীদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “বড়ো দেরি করে এলে কুলিকভাই, বণিকমশাই সেই থেকে অপেক্ষা করছেন তোমার জন্যে। চলো আমরা একটু ভেতরে যাই, কিছু কথা আছে”। মারুলা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বণিকমশাইকে নিয়ে আমরা একটু ভেতরে যাচ্ছি রক্ষীভাইরা, দেখো কেউ যেন এখন না ঢোকে। কেউ কাছাকাছিও যেন না আসতে পারে”।  রক্ষীদের সর্দার বলল, “একটা মাছিও ঢুকতে পারবে না, মারুলাভাই, নিশ্চিন্তে যান”।

প্রথমে শষ্পক এবং পিছনে ভল্লা আর মারুলা ঢুকল সামনের ঘরটিতে। এই ঘরটি বাঁদিক থেকে তৃতীয় ঘর। ঘরে ঢুকে শষ্পক ঘরের মাঝখানে দাঁড়ালেন, ভল্লার মুখোমুখি হয়ে চাপা স্বরে বললেন, “কি চেহারা বানিয়ে এসেছ, ভল্লা? মারুলা না বললে তো আমি চিনতেই পারতাম না”।

ভল্লা হেসে বলল, “আপনিও কম যান না, মান্যবর। ছদ্মবেশ ধরাটা আমাদের কাজের মধ্যেই পরে, কিন্তু আপনার তো তা নয়”।

শষ্পক হাসলেন, “দরকার পড়লে, সবই শিখে নেওয়া যায় ভল্লা। যাগ্‌গে চটপট কাজের কথাগুলো সেরে নিই। ভল্লা, এই অস্ত্রাগারে মোট চারটে কক্ষ আছে”।

ভল্লা বলল, “আমি আগেই দেখে নিয়েছি, মান্যবর। আমাদের এদিকে আছে দুটো বড়ো ঘর, আর ওপাশে আছে একটা ঘর। কিন্তু কোন কুলিক বা শ্রমিককে কাজ করতে দেখলাম তো! আজ কী ওদের অবসর?”। শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার দিকে তাকালেন। মারুলা বলল, “আমাদের এই সাক্ষাতের জন্যেই সবাইকে আসতে মানা করা আছে। কিন্তু তুই কখন দেখলি?”

ভল্লা মুচকি হাসল, “আসার সময়, গাছের ওপর থেকে”।

শষ্পক খুশি হয়ে বললেন, “বাঃ ভালই হয়েছে, কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল”।

ভল্লা বলল, “আমার মনে হয় বড়ো ঘর দুখানায় অস্ত্রাগার করার পরিকল্পনা করেছেন, তাই না মান্যবর?”

শষ্পক বললেন, “ঠিক আর এই ঘরটা হবে কায়স্থ ও পুস্তপালের কার্যালয়। মারুলা বলছিল, তোমার একটা কোষাগার প্রয়োজন…”।

“হ্যাঁ মান্যবর, ভীষণ প্রয়োজন, অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রির অর্থ আমি রাখব কোথায়? আরও একটা অনুরোধ, মান্যবর, পুস্তপালের এখানে কী করণীয়? একজন অভিজ্ঞ কায়স্থই সামলে নিতে পারবে। কিন্তু আমার প্রয়োজন একজন জহুরি-স্বর্ণকার”।

শষ্পক বিস্মিত হয়ে বললেন, “জহুরি-স্বর্ণকার? সে এখানে কী করবে?”

“মান্যবর, মারুলা নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছে, পাশের রাজ্যের বটতলি গ্রামের কিছু ছেলে অস্ত্র-শস্ত্র কিনবে”।

“হ্যাঁ, বলেছে”।

“তারা অস্ত্র কেনার অর্থ যোগাড় করবে হয়তো ডাকাতি করে। ডাকাতি মানে, মান্যবর, কড়ি কিংবা রূপো বা সোনার মুদ্রা হতে পারে। আবার গয়না-গাঁটি, মণি-রত্নও হতে পারে। সে সবের মূল্য নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে তো সম্ভব নয়। সোনা বা মণিরত্নের ওজন, সোনায় খাদের পরিমাণ, মণি-রত্নের গুণাগুণ যাচাই করতে পারবে একজন অভিজ্ঞ জহুরি-স্বর্ণকারই”।

“হুঁ। বুঝেছি। তুমি তাহলে কী করতে চাইছ?”

“মান্যবর, মাঝখানে একটি দেওয়াল তুলে দিয়ে, এই ঘরটিকেই দুটি ঘরে ভাগ করে দিলে কেমন হয়? একটু ছোট ঘরটা পিছন দিকে, ওটাই হবে কোষাগার। মাঝের দেওয়ালে একটি মাত্র লোহার দরজা থাকবে কোষাগারে ঢোকার জন্যে। ওই ঘরের পিছনে কোন জানালা থাকবে না। জানালা থাকবে উঁচুতে, পাশের অস্ত্রাগারের দেওয়ালে। আর সামনের দিকে হবে কার্যালয়। সেখানে একদিকে বসবে কায়স্থ তার পুঁথিপত্র, কলম দোয়াত নিয়ে। আর অন্যদিকে বসবে স্বর্ণকার তার যাবতীয় সরঞ্জাম ও তুলাযন্ত্র নিয়ে”।

এ ব্যবস্থা মন্দ নয়, কোষাগারের ঘরে আমি আপাতত দুটো সিন্দুক দিয়ে দেব। কিন্তু তোমার কি মনে হয়, ওই ছোকরারা কি এতই ডাকাতি করবে, যে এখানে একজন স্বর্ণকারের স্থায়ী নিয়োগ অর্থবহ হবে?”

“না, মান্যবর তা হয়তো হবে না,  মাসে - দুমাসে হয়তো একবার, কি দুবার। কিন্তু এছাড়া অন্য উপায় কী”?

একটু চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “বীজপুর চেন তো, যেখানে জনাইয়ের চটি। বীজপুরে আমাদের একটি অভিবাসন ও আন্তর্শুল্ক দপ্তর আছে। ওখানে আন্তর্দেশীয় বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের থেকে কর আদায় হয়। ওখানে, ওই তুমি যেমন বললে, বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে মাঝেমাঝেই সোনার ভূষণ, মণি-রত্নও মেলে। সেগুলির সঠিক মূল্যায়নের জন্যে আমরা ওই বীজপুরেরই নিবাসী রাজনা স্বর্ণকারের সাহায্য নিই। অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ব্যক্তি। আমি ভাবছি, আমাদের প্রয়োজন মতো, দু-একদিনের জন্যে, তাকে যদি এখানে ডেকে নিই, তাহলে কেমন হয়?”

ভল্লা নির্দ্বিধায় বলল, “সঠিক সিদ্ধান্ত মান্যবর। একজন স্থায়ী স্বর্ণকারকে মাসের পর মাস এখানে বসিয়ে বসিয়ে পোষার থেকে – এই ব্যবস্থাই সমীচীন”।      

“উত্তম, তাহলে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করছি। মারুলাকে আমাদের শুল্কদপ্তরে পাঠিয়ে দেব – ওদের মাধ্যমেই কথাবার্তা পাকা করে আসবে। এদিকটা মিটল, এবার এই অস্ত্রাগার নিয়ে তোমার আর কোন বক্তব্য আছে?”

“পাশের ঘরটি কিসের জন্যে মান্যবর?”

“ও ঘরে আমাদের রক্ষীদের এবং কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা হবে। আপাততঃ মোট আটজন সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা রাখছি, দিনে চারজন, রাত্রে চারজন”।

“ঠিক আছে। এবার চলুন অস্ত্রাগারদুটি দেখে নিই, মান্যবর”।

শষ্পক, ভল্লা ও মারুলা তৃতীয় ঘর থেকে বেরিয়ে, এবার দ্বিতীয় ঘরটিতে গেল। প্রশস্ত ঘরটি দেখে ভল্লা খুশিই হল, বলল, “বাঃ অস্ত্রাগারের পক্ষে উপযুক্ত ঘরই বটে। কিন্তু মান্যবর, অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম রাখা হবে কোথায়? মেঝেয়?”

শষ্পক একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, মেঝেয় – নয়তো আর কোথায়?”

“তিন দিকের দেওয়ালে মোটা কাঠের পাটা দিয়ে তাক বানিয়ে দিন না। সেখানে প্রত্যেকটি অস্ত্র আলাদা আলাদা ভাবে সাজিয়ে রাখা যাবে। মেঝেয় রাখলে, কিছুদিনের মধ্যেই সব এলোমেলো হয়ে যাবে। ভারি জিনিষের তলায় চাপা পড়ে হাল্কাগুলি বেঁকে যাবে, ভেঙে যাবে। এদিকের দেওয়ালের তিনটি তাকে শুধু বল্লম থাকবে। ওদিকের দেওয়ালের তিনটি তাকে ভল্ল, তীর ধনুক, ছোরা-ছুরি। পিছনের দেওয়ালের তাকে রইল রণপা। এইরকম সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলে জিনিষগুলি ভালো থাকবে, মান্যবর”।

“হুঁ। বুঝেছি। মারুলা তুমি প্রথম থেকেই এই নির্মাণ দেখছ, এ কথাটা তোমার মাথায় এল না? রাজধানী থেকেও যে নকশা করে পাঠিয়েছে, তার মধ্যে কি রয়েছে? আস্থানে গিয়ে আবার দেখব। সে যাক, ভল্লা এই তাকগুলো দেয়ালে লাগাবে কী করে?”

“দেওয়ালে লোহার মোটামোটা কীল গেঁথে দেবে। প্রতিটি তাকের জন্যে চারটে বা পাঁচটা – দেড় হাত অন্তর-অন্তর। তার ওপর মোটা তক্তা বিছিয়ে দেবে – ব্যস্‌ এটুকুই। কুলিকপ্রধানকে বলবেন, মান্যবর, ওরা সব জানে, ওরা করে দেবে। আপনি চিন্তা করবেন না”।

ভল্লা কথা শেষ করতে, শষ্পক জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু বক্তব্য আছে, ভল্লা? তুমি আসাতে খুব ভাল হল। তা না হলে নির্মাণ শেষে আবার ভাঙাভাঙি – জোড়াজুড়ি করতে হত”।

“নাঃ মান্যবর। আমার আর কিছু বক্তব্য নেই। তবে ওরাজ্যের ছোকরাগুলো হয়তো আজ বা কাল আসবে। ওরা যদি কিছু লুঠের টাকাকড়ি আনে আমি মারুলার হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেব। আপনি আস্থানের কোষাগারেই আপাততঃ রেখে দেবেন”।

শষ্পক বললেন, “সে রেখে দেব। কিন্তু যে গতিতে তুমি এগিয়ে চলেছ ভল্লা, রাজধানীর পরিকল্পনা তার থেকে পিছিয়ে পড়ছে। বণিক অহিদত্তর গোশকটগুলি, খবর পেয়েছি, সবে অনন্তপুর পৌঁছেছে। তার মানে এখানে আসতে আরও অন্ততঃ দশদিন। ছেলেগুলো তোমায় টাকা দিয়ে দিলে, তুমি ওদের অস্ত্র দেবে কী করে?”

“অস্ত্র পেতে দেরি হোক না, মান্যবর – চিন্তা নেই। আগে তো ওদের অস্ত্র চালাতে শিখতে হবে। এতগুলো অস্ত্র ওরা কোথায় রাখবে, ভাবতে হবে...সময় পেয়ে যাবো। তার আগে প্রতিটা অস্ত্র-শস্ত্রের ন্যূনতম মূল্য কী হবে, সেটা ঠিক করে দিন, মান্যবর। ওটাই এখন জরুরি। তাম্রমুদ্রায় হোক বা রূপোর মুদ্রায় হোক, ওরা প্রতিটি অস্ত্র এবং শস্ত্রের সঠিক মূল্য জানতে চাইবে”।   

“ঠিক। রাজধানী থেকে অহিদত্তের সঙ্গে বিক্রয়-শর্তের পূর্ণ বিবরণ আমার কাছে আজ সকালে এসে পৌঁছেছে। আমি এখান থেকে ফিরে গিয়েই ওগুলো নিয়ে বসব। সন্ধের পর মারুলা তো তোমার কাছে যাবেই, ওর হাত দিয়েই আমি পাঠিয়ে দেব। তবে ন্যূনতম মূল্য কত হতে পারে, সেটুকুই আমি তোমাকে জানাবো। কাকে কোন মূল্যে বিক্রয় করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। ঠিক আছে”?  

“ঠিক আছে, মান্যবর”।

“আচ্ছা, এবার বলো তো তোমার কবিরাজমশাইকে নিয়ে কী করব? মারুলার কাছে শুনেছো তো, আমার পক্ষে খুব সমস্যা হয়ে উঠছেন উনি। কী করা উচিৎ?”

“একটু – এই ধরুন দিন দশেক অপেক্ষা করুন, মান্যবর। আমাদের ছেলেরা আস্থানে আরেকবার হানা দিতে চাইছে...”।

“আবার? এত তাড়াতাড়ি?” শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ, আপনার রক্ষীরা গ্রামপ্রধান আর ভীলকমশাইকে পিটিয়ে আধমরা করে এল, কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আনল, ছেলেরা তার শোধ তুলবে না? কবিরাজমশাইকে মুক্ত করতে হবে না? না হলে আর বিপ্লব কিসের?”

“তা করুক, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কবিরাজকে মুক্ত করলে, আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো যে”।

“ওই দিন কবিরাজমশাই দু’ভাবেমুক্ত হয়ে যাবেন, মান্যবর। আমার ছেলেরা তাকে বন্দীশালা থেকে মুক্ত করে আস্থানের বাইরে কিছু দূর আসার পরেই, তিনি ইহজগৎ থেকেও মুক্তি পাবেন - পিছনে ধাওয়া করে আসা আপনার রক্ষীদের ভল্লর আঘাতে! মনে রাখবেন মান্যবর, ভল্লর আঘাতে - তিরের আঘাতে নয়। কারণ, আমাদের ছেলেদের তির-ধনুক চালাতে এখনো শিখিয়ে উঠতে পারিনি। দেখা যাক এর মধ্যে শেখাতে পারি কি না।  

তারপর রাজধানী এবং সর্বত্র আপনি বার্তা পাঠাবেন, ডাকাতের সঙ্গে রক্ষীদের খণ্ডযুদ্ধের সময়, ডাকাতের হাতে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজমশাইয়ের নৃশংস মৃত্যুতে আমরা সকলেই মর্মাহত। দোষী ডাকাতদের আমরা খুঁজে বের করবই, এবং প্রশাসন প্রত্যেকটি অপরাধীর চরম দণ্ডের প্রতিজ্ঞা করছে। এদিকে আমাদের ছেলেরাও গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেবে, রাজার অত্যাচারী রক্ষীদের হাতে অকারণে প্রাণ গেল সর্বজনশ্রদ্ধেয় নিরপরাধ কবিরাজমশাইয়ের! প্রতিশোধ নিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গর্জে ওঠো, হে তরুণদল”।

শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার দিকে তাকালেন, বললেন, “আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি, ভল্লামশাই, রাজধানীর প্রশাসনিক মহলে, কিন্তু কী বলব... সে যে এরকম...জানি না, ঠিক কী বলব...”!

মারুলা বলল, “যদি অভয় দেন তো আমি বলি, মান্যবর?”

শষ্পক কৌতুক চোখে ভল্লার দিকে একবার তাকিয়ে মারুলাকে বললেন, “বলো”।

মারুলা বলল, “তিলে খচ্চর, মান্যবর। একথা আমরা ওকে প্রায়ই বলি”।  

চলবে ...

নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...