মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২ 

 

সন্ধের মুখোমুখি মহড়ার মাঠ থেকে রামালি ফিরল, ওর সঙ্গে এল বালিয়া। ভল্লা বালিয়াকে দেখে খুশি হল, বলল, “আয় বালিয়া, বস। আজকাল তুই আর মহড়ায় যাস না। রামালির থেকে শুনলাম, লড়াই-টড়াই করা তোর নাকি পোষাবে না”। বালিয়া মাটিতে বসল, ইতস্ততঃ করে বলল, “হ্যাঁ ভল্লাদাদা, আমার বাড়ির যা পরিস্থিতি, সেটাই একটা বড়ো লড়াই। তারওপর বাইরের লড়াই আর পেরে উঠবো না”।

“কেন? কী পরিস্থিতি বাড়ির?”

“সংসারে আমরা তিনভাই, চারবোন, ভল্লাদাদা – আর বাপ-মা, বুড়ি ঠাকমা। ভাইবোনদের মধ্যে আমিই সবার বড়ো। বছর খানেক আগে, বাবার ডান কাঁধে একটা ফিক ব্যথা হয়েছিল, তারপর থেকে ওই হাতে আর ভারি কাজ করতে পারে না। তুমি তো জানো, ভল্লাদাদা, কামারের কাজই হল গরম লোহায় ভারি হাতুড়ির ঘা মারা। সে কাজটা বাবা আর পারছে না। এখন আমাকেই বাবার কাজগুলো করতে হচ্ছে। বাবা সঙ্গে থাকে, সাহায্য করে। আমি যদি সারাদিন তোমার এখানে মহড়ায় থাকি, আমাদের এতগুলো পেট উপোস করে মরবে, ভল্লাদাদা”।

“ঠিকই করেছিস, বালিয়া। আমি তো পরিবারকে ডুবিয়ে লড়াইয়ে নামতে বলিনি। কিন্তু তাও তুই আমাদের সাহায্য করতে পারিস করবি?”

“আমি করব সাহায্য?” বালিয়া অবাক হয়ে রামালির দিকে তাকাল, “কী সাহায্য, ভল্লাদাদা”?

“আমাদের রণপাগুলো দেখেছিস তো? ওর তলার দিকে লোহার খুড়ো লাগাতে হবে। এই ধর আঙুল চারেক গভীর লোহার এমন বাটি বানাতে হবে, যার মধ্যে রণপার ডগাটা একদম সেঁটে বসে যাবে। পারবি?”

“পারব, বল্লমের ফলা তো আমরা বানাই। এক্ষেত্রে ফলাটা থাকবে না শুধু বাঁশের মাথায় চেপে বসার মুণ্ডিটা তোমার লাগবে”।

“একদম ঠিক। ব্যাপারটা তুই বুঝেছিস, পারবি। ওই সঙ্গে কিন্তু বল্লমের ফলাও লাগবে”।

“কতগুলো?”  

“অনেক, আপাততঃ ধর পঁচিশ জোড়া। প্রত্যেকটা রণপা – একদিকে যেমন তাড়াতাড়ি চলতে-ফিরতে কাজ দেবে, তেমনি, মাটিতে নেমে পড়লে, সেটা বল্লম হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে”।

“অনেক লোহা লাগবে, লোহা কিনতে যে প্রচুর অর্থও লাগবে ভল্লাদাদা?”

ভল্লা রামালির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “বালিয়া কী বলছে রে, রামালি?”

রামালি হেসে ফেলল, বলল, “ভল্লাদাদা তোকে কি বিনা মূল্যে দিতে বলেছে? অর্থ না দিলে, তুই করবি কী করে কাজটা?”

বালিয়া একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “না মানে, ভল্লাদাদা বলল, সাহায্য করতে হবে, তাই ভাবলাম...সাহায্য করে তো আর অর্থ নেওয়া যায় না”।

ভল্লা হো হো করে হেসে উঠল, বলল, “কত লোক জনগণকে সাহায্য করে, জনগণের সেবা করে বড়োলোক হয়ে যাচ্ছে রে, বালিয়া...আর তুই...। সে যাকগে, এক একটা রণপা বানাতে কত খরচ হবে, এবং কতদিন লাগবে, সেটা আমাকে বল। লোহা তোকেই কিনতে হবে...ভালো লোহা - ভেজাল মেশানো নয়...আমরা শুধু মুল্য ধরে দেব। কবে বলতে পারবি?”

একটু চিন্তা করে বলল, “একটা দুটো রণপা কি এখন পাওয়া যাবে? তাহলে আমি বাবার সঙ্গে কথা বলে, কাল জানিয়ে দিতে পারব”।

রামালি বলল, “তুই যে দুটো চড়ে আমার সঙ্গে এলি, সে দুটোই নিয়ে যা। কিন্তু গ্রামে রণপা চড়ে ঢুকবি না। হাতে করে নিয়ে যাবি তোদের ভাটিতে”।

ভল্লা দুটো ব্যাপারে অবাক হল এবং খুশিও হল। বালিয়া রণপা চড়া শিখে নিয়েছে! আর রামালি নিজে থেকেই কিছু কিছু সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। এটা ভল্লার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভল্লা বলল, “রামালি যেমন বলল, তাহলে তাই কর। আর মনে রাখবি, কাজটা গোপনে করতে পারলে ভালো হয়। যা কিছু আদান-প্রদান, রাত্রে করাই ভালো। দিনের আলোয় কক্ষণো নয়। তোদের ভাটিতেও কাজটা যতটা সম্ভব লুকিয়ে করতে হবে – এতগুলো বল্লমের ফলা বানাতে দেখলে – সকলের মনেই সন্দেহ হবে – সাবধান”।

“সাবধানেই করব, ভল্লাদাদা। দুটো রণপার নমুনা নিয়ে, আমি কাল একটু রাত্রের দিকেই আসব, তুমি পরীক্ষা করে দেখে নিও। ঠিক-ঠাক থাকলে পরেরগুলোও বানাতে শুরু করব”।

“তাই আসিস”।

বালিয়া উঠে পড়ল, ঝোপের ওপাশ থেকে দুটো রণপা বের করে চড়ে পড়ল, বলল, “আসি গো ভল্লাদাদা, রামালি আসছি”। এই অন্ধকারেও বালিয়া খুব সাবলীল হেঁটে গেল বনের পথে, ভল্লা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া রণপায়ে এমন হাঁটা কবে শিখল রে, রামালি? এই অন্ধকারের মধ্যেও দিব্যি চলে গেল তো...”!

রামালি উনুন জ্বালিয়ে রান্নার যোগাড় করতে করতে মুচকি হেসে তাকাল ভল্লার দিকে, বলল, “কেউ কেউ এমন থাকে গো, ভল্লাদাদা – যারা চুপচাপ কাজ করতে এবং শিখতে ভালোবাসে”। প্রদীপের ম্লান আলোতেও রামালির চোখমুখের উজ্জ্বলতা ভল্লার দৃষ্টি এড়ালো না, কিছু বলল না। মনে মনে ভাবল, সে তো তোকে দেখেই বুঝছি, রামালি।

 

বালিয়া চলে যাওয়ার দণ্ড দুয়েক পরেই মারুলার ডাক শোনা গেল। “ভল্লা আছিস? নাকি কোথাও চড়তে বেরিয়েছিস?” নিঃশব্দে উঠোনে ঢুকে মারুলা ভল্লার পাশেই বসল। রামালিকে দেখে বলল, এ ছোকরা কবে থেকে তোর রান্না করছে ভল্লা? দেখি কেমন রাঁধতে পারিস”! রামালি হাসল, বলল, “আচ্ছা। একটু দেরি হবে কিন্তু”।

“সে হোক, আমার কোন তাড়া নেই”।

ভল্লা বলল, “ও রামালি। আমার নিত্য সহচর, ডানহাত। চৌখস ছেলে। ওকে তুই রাঁধুনি ভেবে বসলি নাকি?”

মারুলা বলল, “আচ্ছা? সে কথা আমি কী করে জানব? আমি ভাবলাম, সাক্ষীগোপালের মতো বসে বসে তুই বুঝি আমোদ করছিস”।

ভল্লা বলল, “গতকালকেই বণিক অহিদত্ত এসেছিল, আর আজ তুই উদয় হলি। ভাবছি তোদের মতলবটা কী? শালা নির্বাসনে এসেও তোদের জন্যে একটু শান্তি পাবো না? আস্থানের কী খবর বল। কবিরাজমশাই কেমন আছে? কবে ছাড়া পাবেন কিছু জানিস?”

মারুলা উত্তর দেওয়ার আগে রামালির দিকে ইঙ্গিত করে ইশারায় জিজ্ঞাসা করল, ওর সামনে বলা যাবে? ভল্লা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল, বলা যাবে। মারুলা তাও কিছুটা চাপা স্বরে বলল, “শষ্পকমশাই তো  তোদের কবিরাজকে ছেড়ে দিতে পারলেই বাঁচেন। সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা। না পারছেন গিলতে – না পারছেন ফেলতে। এই গ্রাম বা প্রতিবেশী গ্রামগুলি নয়, পাশের রাজ্যের লাগোয়া গ্রামগুলিতেও কবিরাজের অসম্ভব জনপ্রিয়তা। অতএব তাঁকে বিনা দোষে দীর্ঘদিবন্দী রাখলে চারদিকেই বিরূপ সমালোচনায় পড়তে হবে শষ্পককে। সেই ভয়ে শষ্পক তাঁর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলেন। আপনাকে আমি এখনই ছেড়ে দেব, একটা মাত্র শর্তে, আপনি যা জেনেছেন, যা বুঝেছেন, সে সব কথা বাইরের কাউকে বলা চলবে না। কেউ কিছু জানতে চাইলেও বলবেন, আমি ওসবের কিছুই জানি না। আমি আদার ব্যাপারী জাহাজের কথা কী করে জানব?

ভল্লা লক্ষ্য করল, রান্নার ব্যস্ততার মধ্যেও রামালি মন দিয়ে মারুলার কথা শুনছে। ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজমশাই কী বললেন?”

“ঘাড়ত্যাড়া বুড়োর ভয়ানক গোঁ। বললেন, মিথ্যা কথা তো আমি বলতে পারব না, বাবা শষ্পক। কেউ যদি জানতে চায় - সব জেনেবুঝে আমাদের গ্রামের আসন্ন বিপদের কথা তাদের বলব না? এ হতে পারে? সে বাবা তোমরা আমায় মেরেই ফেল আর কেটেই ফেলএ কথাগুলো বলতে বুড়োর গলা এতটুকু কাঁপল না, তাঁর চোখেমুখে এতটুকু ভয়ের লেশমাত্র দেখলাম না। শান্ত ধীর কণ্ঠে শষ্পকের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো উনি বললেনঅতএব এই পরিস্থিতিতে কবিরাজবুড়োকে শষ্পক মুক্ত করতেও পারছেন না”।

মারুলা কথা শেষ করার পরে কেউ কোন কথা বলল না। অনেকক্ষণ পর মারুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এত জায়গায় ঘুরে বেড়াই, কত রকমের মানুষ দেখেছি।  কিন্তু রাজ্যের এত দূর প্রান্তে, রুক্ষ দরিদ্র এই গ্রামে এসে, এমন একজন মানুষের দেখা পাবো, ভাবতে পারিনি রে ভল্লা”।

তিনজনেই বসে বসে নিজের মনে ভাবতে লাগল কবিরাজমশাইয়ের কথা। একটু পরে মারুলা হঠাৎ বলে উঠল, “আরে রামালি, তোর রান্না কদ্দূর, আমার তো পেটে আগুন জ্বলছে রে…”।

“রান্না তো হয়ে গেছে, খাবার বাড়বো?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ বেড়ে ফেল। খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা তিনজনে বেরোব। অনেক কাজ আছে”।

খাওয়াদাওয়া সেরে ভল্লা বলল, “বালিয়া তো একজোড়া রণপা নিয়ে গেল, আমাদের তো তাহলে হেঁটেই যেতে হবে রে, রামালি”। রামালি বলল, “রণপা আছে। চিন্তা করো না ভল্লাদাদা। আমাকে একটু সময় দাও পুকুর থেকে রান্নার বাসনগুলো চট করে ধুয়ে আনি”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “সে তুই ঘুরে আয়। কিন্তু রপা তো আমাদের দুজোড়াই ছিল…”। ভল্লা পুকুরের দিকে যেতে যেতে বলল, “আমি আসছি, একটু দাঁড়াও না, ব্যস্ত হচ্ছো কেন?”। রামালি চলে যেতে মারুলা বলল, “ছেলেটা বেশ সপ্রতিভ তো, ভল্লা! একে পেলি কোথায়”।

“নোনাপুরের ছেলে। ছোটবেলায় বাপ-মাকে হারিয়েছে। কাকা-কাকির কাছে মানুষ। দিনকয়েক আগে দজ্জাল কাকি ওকে তাড়িয়ে দেওয়াতে, আমার সঙ্গে রয়েছে। দারুণ কাজের ছেলে তো বটেই, তার ওপর বুদ্ধিমানও। সব কিছু ঠিকঠাক চললে, ওই এই দিকের নেতা হয়ে উঠবে, এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি”।

“বলিস কী? তুই এতটা ভরসা করছিস?”

“শুধু আমি না, তুইও করবি – দুএকদিন দেখ, ভালভাবে পরিচয় হোক”। রামালি পুকুর থেকে ফিরে এল। ঘরের মধ্যে বাসনপত্র গুছিয়ে রেখে, বাইরে বেরিয়ে গেল। ফিরে এল তিন জোড়া রণপা নিয়ে। ভল্লা এবং মারুলার হাতে দুজোড়া দিয়ে বলল, “চলো এবার, কোথায় যাবে”। রণপায়ে চড়তে চড়তে ভল্লা বলল, “তুই কি জানতিস নাকি আজ মারুলা আসবে? এনে রেখেছিলি?”

তিনজনেই রণপায় চড়ে হাঁটতে শুরু করার পর রামালি বলল, “মহড়ার পর ছেলেদের সবাইকে আমি এখানেই রণপা রেখে যেতে বলি – সামান্য দূরে একটা বড়ো গাছের ওপর”। ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কেন?”

রামালি একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আমাদের কাছে রণপা চড়ে ঘোরাঘুরি করাটা একটা আশ্চর্য কৃতিত্বের ব্যাপার, ভল্লাদাদা। তুমি যতই মানা কর, আমাদের মধ্যে দুচারজনের মনে, রণপা চড়ে গ্রামের সবাইকে অবাক করে দেওয়ার লোভ আসতেই পারে। আমি তাই ঝুঁকি নিইনি। গ্রামের লোক আমাদের চালচলনে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। তারওপর তাদের সামনে রণপা চড়ে ছুটোছুটি করলে আর দেখতে হবে না…”।

বণিক অহিদত্তকে নিয়ে যে খোলা জায়গায় গিয়েছিল, ভল্লা ওদের নিয়ে সেখানেই গেল। তিনজনে মুখোমুখি বসল। ভল্লা বলল, “এবার বল, মারুলা”।

“এক এক করে, বলি। অহিদত্ত এসেছিল যখন, নিশ্চয়ই জানিস, ওর হাত দিয়েই রাজধানী থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আসছে। রওনা হয়ে গেছে, আট-দশ দিনের মধ্যেই মনে হয় এখানে চলে আসবে”।

“হুঁ, বলেছে”

“ওগুলো রাখার জন্যে বেশ বড়ো একটা অস্ত্রাগার বানানো হচ্ছে, তোর বাসা থেকে মোটামুটি ক্রোশ চারেক দূরে। প্রশাসন থেকে তার জন্যে একজন করণিক এবং পর্যাপ্ত রক্ষী নিয়োগ করবে। কিন্তু অস্ত্রাগারের দায়িত্ব থাকবে তোর হাতেই। তোর অনুমতি ছাড়া অস্ত্রাগারের থেকে একটা ছুঁচও বেরোবে না”।

মারুলা একটু অপেক্ষা করল, কিন্তু ভল্লা কোন কথা না বলাতে, আবার বলল, “আস্থানের পাশেই বিস্তীর্ণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে নির্মাণ হবে রতিকান্তর শীতাবাস”।

“শীতাবাস?” ভল্লা একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করল।

“হুঁ, শীতাবাস। রাজধানী কদম্বপুরের শৈত্যপ্রবাহ রতিকান্তর সহ্য হচ্ছে না। তাই তাকে এই পশ্চিম সীমান্তে পাঠানো হবে, কারণ এদিকে শীতের প্রকোপ অনেকটাই কম। রাজধানী থেকে লোকজন নিয়ে দুজন স্থপতি এসে গেছে, তারা আস্থানে আছে। কাজ শুরু হল বলে। কথা আছে, শষ্পক এখান থেকে উত্তরে রওনা হওয়ার আগেই, শীতাবাসের প্রধান কক্ষগুলি শেষ করে যাবে। কদম্বপুরে তার প্রমোদভবনটি নাকি আজকাল তার আর তেমন পছন্দ হচ্ছে না। অতএব রতিকান্ত এখানে আসছে শষ্পক আস্থান ছেড়ে যাওয়ার কয়েকদিন আগে। সে এসে কক্ষগুলির রূপচর্চা এবং প্রসাধনী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করাতে চায়”। কথা শেষ করে মারুলা ফিচেল হাসল খিঁক খিঁক করে।

ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, তারার আবছা আলোয় তার মুখভাব তেমন বোঝা গেল না। ভল্লা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “বাঃ”!

মারুলা রীতিমতো ঝেঁজে উঠল, “তুই মাকড়া “বাঃ” বলছিস? আমি শালা একটা সুযোগ পেলে, ওকে কিন্তু প্রাণে মারব না, শুয়োরের বাচ্চাকে খাসি করে ছেড়ে দেব। ঢ্যামনা ভাদুরে কুত্তা, শুধুমাত্র রাজার বউয়ের ভাই বলে, এভাবেই সর্বত্র ফূর্তি লুঠবে?”

ভল্লা বলল, “আঃ মারুলা, রামালি রয়েছে – ছোট ছেলে...ওর সামনে এত গালাগাল করিস না...”।

মারুলা বলল, “ছোট আছে তো কী হয়েছে? বড়ো হবে না? সব কথাই ওর জানা উচিৎ, শোনা উচিৎ - এই গালাগালিগুলোও...”।

“হতভাগাকে মেরে ফেলার চিন্তা আমি অনেকদিন ধরেই করছি, কিন্তু তোর এই বুদ্ধিটা মন্দ নয়, শালা...”।

“কোন বুদ্ধিটা...?”

“খাসি করে দেওয়াটা”।

“তবে? হতভাগার চারপাশে নগ্ন রমণীরা ঘোরাফেরা করছে... আর রতিকান্ত নিজের ওইটা ধরে হাউহাউ করে কাঁদছে...ব্যাপারটা ভাবতে পারছিস ভল্লা? রতিকান্ত আমাদের থেকেও বড়ো মুতিকান্ত হয়ে যাবে, রে ভল্লা, – মোতা ছাড়া অন্য আর কিচ্‌ছু হবে না ওটা দিয়ে...” ভল্লার সমর্থনে উত্তেজিত হয়ে উঠল মারুলা।

ভল্লা হাসল। রামালির দিকে তাকাল। রামালি হাসছে না, শুনছে...। ভল্লা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “রতিকান্তকে এখন ছাড়। তার আগে বল, অস্ত্রাগারের রক্ষণাবেক্ষণ করবে প্রশাসন, সেখান থেকে দু-দশখানা হাওয়া হয়ে গেলে, আমি তো জানতেই পারব না, কিন্তু তার দায় তো আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে...”।

মারুলা বলল, “না রে বাবা, সে সব কি আর রাজধানীর মাথারা ভাবেনি? রাজধানী থেকে যা সরঞ্জাম পাঠাবে, তার বিবরণ তোর কাছে চলে আসবে, চলে যাবে অহিদত্তের কাছেও। রাজধানী থেকে আসার পথেও চুরিচামারি হতে পারে তো। অতএব অস্ত্রাগারে পৌঁছনোর পর গোনাগুণতি করে যা পাওয়া যাবে – সে বিবরণও তোর কাছে চলে আসবে। এরপর তো তুই যেমন যেমন বলবি, সেভাবেই...”।

“বুঝলাম। অস্ত্র-শস্ত্রের দর-টর কিছু ঠিক হয়েছে?”

“না। ওটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে...রাজধানী থেকে অহিদত্ত কত দামে কিনেছে সেটা পাঠাচ্ছে।  তারওপর শষ্পক যোগ করবে অস্ত্রাগার নির্মাণ, কর্মচারীদের মাসোহারা, পরিবহনের ব্যয়, অহিদত্তের লভ্যাংশ এবং আরও হয়তো টুকটাক কিছু। এসবের পর আমরা ঠিক করব, মোট কত মূল্য হওয়া উচিৎ। সবশেষে আমরা বসব অহিদত্তের সঙ্গে। কারণ অহিদত্তের টাকা এবং লভ্যাংশ আমাদেরই দিতে হবে”।  মারুলা একটু থেমে রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “কথাগুলি কিন্তু অত্যন্ত গোপনীয়, রামালি। এই ছয়কান ছাড়া আর কোন কানে যেন না যায়”।

রামালি এতক্ষণ মন দিয়েই সব কথা শুনছিল এবং আঁচ করতে চেষ্টা করছিল গভীর ও ব্যাপ্ত এই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য কি? তার ধারণায় ষড়যন্ত্র সবসময়েই শত্রুর বিরুদ্ধেই করতে হয়। এখানে শত্রুপক্ষ কে? ঠিক কার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র? এই চিন্তার মধ্যে মারুলার আচমকা সতর্কবার্তা শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “ছয়কান কেন, বলছো মারুলাদাদা – আমরা তো তিনজন এখানে”।

রামালির কথায় মারুলা হেসে উঠল হো হো করে। ভল্লাও হেসে, রামালির কাঁধে হাত রেখে বলল, “তিনজনের কটা কান থাকে? মারুলা ওরকমই – গম্ভীর কথার মধ্যেও চ্যাংড়ামি করাটা ওর চিরকালের স্বভাব”। নিজের বোকামিতে যদিও একটু লজ্জা পেল রামালি, কিন্তু আনন্দও পেল। আজ কিছুক্ষণ আগেই তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়, এর মধ্যে তার সঙ্গে ফক্কুড়ি করছে মারুলাদাদা! এর অর্থ মারুলাদাদা তাকে বিশ্বাস করছে। এর পেছনে ভল্লাদাদার হাত নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু কিছুটা হলেও তার কৃতিত্বও কম নয়।

ভল্লা বলল, “এদিকে পাশের রাজ্য থেকেও তো আমাদের কিছু ক্রেতা জুটছে। তারা অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে চায়। তাদের কী করবি?”

মারুলা ভল্লার উরুতে চাপড় মেরে বলল, “কী আবার করবি? বেচবি। আমাদের খরচ-খরচা বাদে তিনগুণ দামে! কত চাই তাদের?”

“বলছে তো অনেক কিছু। লম্বা লম্বা বিপ্লবের কথা। কদ্দূর কি দাঁড়াবে জানি না। বলছে আমাদের লড়াই করতে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়ব”।

“অহিদত্ত জানে?”

“হ্যাঁ, আমিই বলেছি”।

“ধ্যাৎ শালা, অহিদত্তকে বলতে গেলি কেন? ও ব্যাটা তো, ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবে। শালা সরাসরি বেচে ভাল পয়সা কামাবে”।

“আমি না বললে, ও বুঝি জানবে না? কী যে বলিস না? তবে অহিদত্ত ও রাস্তায় হাঁটবে না। এ কি ধান-গমের ব্যবসা? যাকে খুশি বেচে দিতে পারবে? উলটে সে ভয় পেয়েছে। এ রাজ্য থেকে অস্ত্র কিনে, ও রাজ্যের ছেলেদের অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করলে, ওদের প্রশাসন একসময় জানতে পারবেই। আর জানতে পারলে, ওর পাছার চামড়া খুলে নিতে কতক্ষণ”?

“আবে, তুই এত ভদ্রলোক কবে হলি রে, ভল্লা? বল পোঁদের খোসা…। তাহলে আর চিন্তা কিসের? শষ্পক যা দাম ঠিক করে দেবে, চোখ বুজে তার ওপর তিনগুণ চাপিয়ে আমরা বেচব...

“হুঁ। তবে কালনেমির লঙ্কাভাগ করে লাভ নেই, ওরা আসুক, পাকা কথাবার্তা হোক। টাকাকড়ির ব্যবস্থা কী করছে, বুঝি, তারপর ভাবব...”।

“ওরা কবে আসবে আবার?”

“হয়তো কাল বা পরশু বা তার পরেরদিন। কিন্তু ওরা যদি সত্যি সত্যি টাকা-পয়সা সঙ্গে নিয়ে চলে আসে, বিপদে পড়ে যাবো”।

“যা শালা, বিপদ আবার কিসের? টাকা আনলে নিয়ে নিবি”।

“আবে গাড়ল, সে টাকা রাখব কোথায়? আমাদের সিন্দুক আছে, নাকি আস্থানের মতো সুরক্ষিত কোষাগার আছে?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “দাঁড়া শষ্পকের সঙ্গে কথা বলে, কাল রাত্রের মধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। আচ্ছা ধর, বড়সড় একটা সিন্দুক যদি নিয়ে আসি, তালা-চাবি সমেত। সেটাকে মাটিতে কোথাও পুঁতে রাখা যাবে না? নিরাপদে?”

ভল্লা বলল, “মাটিতে পোঁতা থাকবে? কেউ টাকা দিলে বা দরকারে টাকা তোলার সময় আমি আর রামালি কোদাল বেলচা দিয়ে মাটি খুঁড়ব? এমন কথা বলিস না গেঁড়ের মতো”!

মারুলা ফিচেল হাসল, বলল, “আহা কতদিন পর তোর মুখ থেকে একটা গাল শুনলাম রে, হতভাগা – তাও গেঁড়ে বলেই ছেড়ে দিলি, পুরোটা বললি না?”  

ভল্লাও হেসে ফেলল, মারুলার কাঁধে একটা থাবড়া মেরে বলল, “চ্যাংড়ামি নয়, মারুলা - তোরাও ভাব, আমরাও ভাবছি। তাছাড়া আরো একটা সমস্যা আছে। ওরা যদি ডাকাতি করে টাকা যোগাড় করে, তাহলে সোনার গয়না, মণিমুক্তো এনেও হাজির করতে পারে। সে সোনার কতটা খাঁটি, কতটা খাদ, কত রতি, কত ভরি, তার মূল্য কত, কে ঠিক করবে? শষ্পকের সঙ্গে কথা বল। শুধু একখানা সিন্দুক নিয়ে আমরা কী করব? যাক, বার তুই কেটে পড়, অনেক রাত হল। আমি আর রামালি যাবো গ্রামপ্রধানের বাড়ি

মারুলা বলল, “তোর সমস্যার কথাগুলো শুনলে শষ্পকের… হে হে হে… রাতের ঘুম চটকে যাবে!  কাল একটু বেলার দিকে যেতে পারবি? যেখানে অস্ত্রাগার বানানো হচ্ছে?”

“কোথায়, কতদূরে?”

“বললাম যে, তোর বাসা থেকে দক্ষিণে মোটামুটি ক্রোশ চারেক দূরে...কালই চলে আয় না। শষ্পককেও বলব। ওখানে বসে, শষ্পকের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বললে...কাজের সুবিধে হবে...আমিও থাকব”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা বলল, “কথাটা মন্দ বলিসনি, ঠিক আছে কাল যাবো”।

“সেই ভাল, তাঁতের মাকুর মতো, তোর আর শষ্পকের বার্তা নিয়ে ঘুরছি...”

“কিন্তু কাল রাত্রেও তোকে কিন্তু আসতে হবে মারুলা। দরকার হবে”।

“সে তো আসবই। এখন তো মনে হচ্ছে আমায় রোজই আসতে হবে। এখন চলি রেএই রামালি, রণপা জোড়া নিয়ে যাবো রে? তোদের মহড়ায় কোন অসুবিধে হবে না তো? কাল রাত্রে আসার সময়, আমার রণপা জোড়া নিয়ে আসব, আর তোদের জোড়া ফেরত দিয়ে যাবো”। রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “নিয়ে যাও, মারুলাদাদা, চালিয়ে নেব কালকের দিনটা”।

চলবে...


সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৯ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

শেষ পর্বাংশ  

৪.৮.৫ দীর্ঘ এই ভারত-পরিক্রমায় প্রাপ্তি

প্রায় সাড়ে ছশো বছরের ভারত-পরিক্রমা শেষ হল। এর মধ্যেও বাকি রয়ে গেল আরও অনেক বংশ এবং রাজরাজড়াদের নাম। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই নামমাত্র শোনা যায়, ইতিহাসে তেমন কোন দাগ রেখে যেতে পারেননি। যাঁদের কথা বললাম, তাঁরাই বা কী এমন দাগ রেখে গেছেন, বেশ কিছু সুন্দর আর অনবদ্য স্থাপত্য নির্মাণ ছাড়া? এঁরা সক্কলেই নিজেদের মধ্যে নিরন্তর লড়াই করে, যুদ্ধ করে, অপচয় করেছেন জীবনীশক্তি, নিজেরা দুর্বল হয়েছেন, প্রতিবেশীকে দুর্বল করেছেন। প্রত্যেকটি রাজ্য জয় অথবা বিজয় অভিযানে তাঁরা অন্য রাজ্য থেকে লুঠ করে এনেছেন সম্পদ, সেই সম্পদে জমকালো মন্দির বানিয়েছেন অজস্র। তার পিছনে যত না ভক্তি, তার থেকে অনেক বেশি ছিল, বৈভব প্রদর্শনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাদের ঈর্ষান্বিত করে তুলে, ক্ষমতার উষ্ণতা উপভোগ করা। তারপর কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা তাঁদের বানিয়ে তোলা বংশমর্যাদা নিয়ে মিলিয়ে গেছেন, কালের গহ্বরে। এমনই ঘটেছে বারবার, প্রত্যেকটি রাজবংশের ক্ষেত্রে।

দীর্ঘ সাড়ে ছশ বছরের এই ইতিহাস থেকে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে আমার কয়েকটি উপলব্ধি হয়েছে, সেগুলি সংক্ষেপে এখানে বর্ণনা করি।

১) বীর রাজারা তাঁদের প্রতিবেশী রাজাদের যত সহজে বারবার পরাস্ত করতে পেরেছেন, সেই বীরত্ব বিদেশী আক্রমণের সময় বারবার লোপ পেয়েছিল তাঁদের অদূরদর্শী কূপমাণ্ডুক্যের জন্যে।

উদাহরণে বলা যায়, গুপ্ত সম্রাটরা, বিশেষ করে কুমারগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্ত রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী ছোট রাজ্যগুলির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা বিদেশাগত দুর্ধর্ষ হুণ জাতিকে প্রতিরোধের জন্যে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিলেন, সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হচ্ছে জেনেও। কারণ তাঁদের কাছে খুব স্পষ্ট ছিল – আন্তর্দেশিক প্রতিবেশী রাজ্যের শত্রুদের তুলনায় বহিরাগত হুণরা - ভারতের সাংস্কৃতিক, ধার্মিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে সম্রাট স্কন্দগুপ্তের অকাল মৃত্যুর কারণে হুণদের বিরুদ্ধে সেই প্রতিরোধ সফল হতে পারেনি।      

কিন্তু আলোচ্য সাড়ে ছশ বছরে, প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে অহরহ যুদ্ধরত রাজন্যবর্গ মুসলিম আক্রমণের প্রকৃত বিপদটা কোথায় এবং কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে - সেটা উপলব্ধিই করতে পারেননি। তাঁরা বিশ্বাস রেখেছিলেন – “যাক শত্রু পরে পরে” এই প্রবাদে এবং নিজ নিজ প্রতিবেশী-শত্রু যখন আক্রান্ত হয়েছে, তাঁরা মুচকি হেসেছেন। আশ্চর্য হল, আরেকটি প্রবাদ তাঁদের মাথায় আসেনি – “ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে”। কয়েকটি উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে।   

ক) চৌহান বংশের রাজা পৃথ্বীরাজ যখন সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরীকে প্রতিরোধ করলেন, তখন প্রতিবেশী গাড়োয়াল বংশের রাজা জয়চন্দ্র ব্যক্তিগত আক্রোশে উদাসীন রইলেন। আক্রোশের কারণ তাঁর অমতে রাজা পৃথ্বীরাজ রাজা জয়চন্দ্রের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এই আক্রোশের হেতু কী তাঁর জ্যাত্যাভিমান, বংশমর্যাদা? তিনি ভুলে গেলেন, কয়েকবছর আগেই তাঁর পিতা রাজা বিজয়চন্দ্রকেও খুসরু মালিকের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। সে সময় তিনি হয়তো যুবরাজ ছিলেন। তাঁর এই নির্বুদ্ধিতা ও অহংকারের মূল্য চোকাতে হয়েছিল, সুলতান সিহাবুদ্দিনের হাতে নিজের প্রাণ ও রাজ্য খুইয়ে। (অধ্যায় ৪.৭.১.৪ ও ৪.৭.১.৫)

খ) চান্দেলরাজ ধঙ্গ নাকি “খেলার ছলে অধিকার করেছিলেন, কালঞ্জর (কালিঞ্জর দুর্গ –বুন্দেলখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ), সুদূর মালব নদীতটের ভাস্বত (?), যমুনার তীর, চেদি রাজ্যের সীমানা, এমনকি গোপগিরি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল”। কিন্তু তিনি শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টাতেও সবুক্তিগিনের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। এরপর গজনির সুলতান মামুদের আক্রমণের সময়, রাজা ধঙ্গের পুত্র রাজা গণ্ড ও শাহী রাজা আনন্দপালের সঙ্গে যৌথ প্রয়াসও ব্যর্থ হয়েছিল। (অধ্যায় ৪.৭.৭)

পরপর এই দুটি পরাজয়েও চান্দেলরাজ গণ্ড এবং ভাটিণ্ডার শাহী রাজারা কিন্তু সতর্ক হলেন না। কেনই বা তাঁরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বারবার পরাস্ত হচ্ছেন, সেই বিশ্লেষণও করলেন না। উল্টে, সুলতান মামুদের ভয়ে পলাতক কনৌজের প্রতিহাররাজ রাজ্যপালকে খুঁজে, তাঁর কাপুরুষতার “উচিৎ শিক্ষা” দিতে তাঁকে হত্যা করলেন। এই সংবাদ পেয়ে গজনির সুলতান মামুদ পরের বছর ফিরে এলেন রাজা গণ্ডকেই “উচিৎ শিক্ষা” দিতে। এবার রাজা গণ্ড নিজেই ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে কোন ক্রমে প্রাণরক্ষা করলেন। কিন্তু নিস্তার পেলেন না, বছর তিনেক পরে সুলতান মামুদ আবার ফিরে এসে তাঁকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করলেন এবং রাজা গণ্ডকে বশ্যতা স্বীকার করিয়ে প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। (অধ্যায় ৪.৭.৭)

গ) গজনির সুলতান যখন গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের সম্পদ লুঠ করতে এসেছিলেন, তখন চালুক্য বা সোলাংকিরাজ প্রথম ভীম ভয় পেয়ে রাজধানী অনহিলওয়াড়া (গুজরাটের আধুনিক পাটন) ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সুলতান মামুদ সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করে এবং সমস্ত সম্পদ নিয়ে যখন ভারত ছাড়লেন, রাজা প্রথম ভীম “সগৌরবে” রাজধানীতে ফিরে সিংহাসনে বসলেন। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবেশী রাজ্য আবুর (রাজস্থান) সামন্তরাজাকে আক্রমণ করে তাঁকে পরাস্ত করলেন! (অধ্যায় ৪.৭.৯)।

মোটামুটি সাড়ে ছশ’ বছরের ভারতীয় ইতিহাসে, এমনই অনেক বীর রাজাদের কাহিনী আমাদের গর্বের হিন্দু রাজত্বের ঐতিহ্য!        

২) এঁনাদের কূপমণ্ডুক বলেছি, তার কারণ বারবার মুসলিম আক্রমণ থেকে তাঁরা কোনদিন কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেননি। যুগের সঙ্গে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রণকৌশল, সামরিক দক্ষতা, সামরিক সম্ভার কিছুই বদল করেননি। এই পর্যায়ে হিন্দু রাজত্বগুলির মুসলিম প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার কয়েকটি কারণ, আমার মনে হয়,

ক) ভারতের শস্য-শ্যামল, সম্পদ-সমৃদ্ধ পরিবেশে হিন্দু রাজা এবং তাঁদের সেনাদল ছিল অনেকটাই নরম-সরম, শ্লথ, এবং বেশ আত্মতুষ্ট। প্রতিবেশী সমমনস্ক সৈন্যদলকে পরাস্ত করতে পারলেই, নিজেদেরকে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা বলে মনে করতেন। অন্যদিকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার রুক্ষ ও ঊষর অঞ্চলের মুসলিম যোদ্ধারা ছিলেন বিপরীত প্রকৃতির। তাঁরা একদিকে ছিলেন কষ্টসহিষ্ণু, নির্মম, ক্ষিপ্র, আর অনমনীয় জেদের অধিকারী। তাঁরা অশ্বচালনায় যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি তলোয়ার চালনাতেও ছিলে অত্যন্ত নিপুণ। এমনকি তাঁদের তীক্ষ্ণ তলোয়ারগুলিও হত ভারতীয় অস্ত্রগুলির থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা, কিন্তু অনেক বেশি ঘাতসহ।

খ) রণকৌশলেও মুসলিম যোদ্ধারা ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত। তাঁরা প্রচলিত ভারতীয় রণনীতি এবং বিধি-বিধানের ধার ধারতেন না। সরাসরি যুদ্ধে তাঁরা যেমন ভারতীয় রাজাদের অধিকাংশ সময়েই পর্যুদস্ত করেছিলেন, তেমনি শোনা যায় অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা বিদেশী বণিকদলের বেশে রাজধানীতে ঢুকে কিছুদিন রাজধানীতে বাস করতেন। তারপর একদিন আচমকা আক্রমণ করে, রাজধানীর সুরক্ষা-ব্যবস্থা ধ্বংস করে দুর্গ ও তার সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতেন। তারপর অসীম ধৈর্যে অপেক্ষা করতেন সপ্তাহ এমন কি মাসাধিক কাল। দুর্গের সঞ্চিত রসদ ফুরিয়ে গেলেই, দুর্গের সকল অধিবাসীদের প্রাণ রক্ষার জন্যেই রাজারা বাধ্য হতেন দুর্গের প্রধান দরজা খুলে দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে। এই সংবাদে প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা কখনো কাউকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, এমন শোনা যায় না। বরং নিজেদের বিলাসী প্রাসাদে বসে তাঁরা অমাত্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা করতেন, মুসলিম যোদ্ধারা লুঠপাট করে ফিরে গেলেই, ভগ্নকটি ওই দুর্বল রাজ্যের থেকে কোন কোন উর্বর অঞ্চল অতি দ্রুত হস্তগত করে ফেলা যায়।

গ) এবারে অধ্যায় ৪.৪.২ অধ্যায় থেকে গুপ্ত রাজাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে একবার চোখ রাখা যাক। রাজধানীর বাইরের সাম্রাজ্যকে তাঁরা কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে, নাম দিয়েছিলেন ভুক্তি। প্রত্যেকটি ভুক্তি বিভক্ত করেছিলেন কয়েকটি বিষয় অর্থাৎ জেলায়। জেলার অধীনে থাকত গ্রাম পঞ্চায়েত বা গ্রামসভা। ধরে নেওয়া যায় গুপ্ত পরবর্তী হিন্দু যুগেও এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল।

রাজ্যের বা সাম্রাজ্যের রাজা যদি, প্রধান অমাত্য ও সেনাধ্যক্ষদের নিয়ে সর্বদাই যুদ্ধে – সে নিজের রাজ্য রক্ষার জন্যেই হোক অথবা অন্য রাজ্য জয়ের জন্যেই হোক – ব্যস্ত থাকেন, প্রদেশ থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা আসতে বাধ্য। প্রশাসনিক দুর্বলতার পিছনে অবধারিতভাবে আসে দুর্নীতি। অর্থাৎ প্রাদেশিক থেকে গ্রামিক আধিকারিকরা মিলিতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মগ্ন হয়ে পড়তেন। অতএব একদিকে যেমন প্রশাসনিক আধিকারিকরা হয়ে উঠতেন অত্যাচারী আঞ্চলিক রাজা, অন্যদিকে সাধারণ প্রজাদের দুর্গতির সীমা থাকত না। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে রাজা কখনো-সখনো রাজধানীতে বসে প্রজাদের খবরাখবর জানতে চাইলে, প্রশাসনের লোকজন রাজাকে নিশ্চিন্ত রাখত, বলত “আপনার শাসনে দেশে রাম-রাজত্ব চলছে, মহারাজ, প্রজারা সুখে শান্তিতে, নিরাপদে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করছে”।

ঘ) আরও একটি বিষয় নিশ্চিত ভাবেই অনুমান করা যায়। রাজধানীর সিংহাসনে দশ বা বিশ বছর অন্তর নতুন-নতুন রাজা বসলেও, এই প্রশাসনিক কর্তাদের এতটুকুও ক্ষতি হত না, বরং লাভ হত। কারণ বিজয়ী রাজার পক্ষে, বিজিত রাজ্যের প্রশাসনের সর্ব স্তরে, রাতারাতি নিজস্ব আধিকারিক নিয়োগ করা কখনোই সম্ভব ছিল না। অতএব বিজয়ী রাজাকেও রাজধানীর বাইরের রাজ্য পরিচালনার জন্যে, পরাজিত রাজার কর্মচারীদের ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, প্রশাসনিক আধিকারিকরাও অত্যন্ত নিশ্চিন্তে দুর্নীতির সাগরে ডুবে থাকতেন।

ঙ) ওপরের (খ) ও (ঘ) কারণের জন্যেই সফল গুপ্তচর ব্যবস্থাও এই সময়কার রাজ-প্রশাসনে ভয়ংকর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আমরা মৌর্য যুগে চাণক্য রাজনীতিতে, প্রশাসনিক কাজের সহায়ক যে নিবিড় গুপ্তচর চক্রের হদিস পাই, সে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই গুপ্ত যুগেও ছিল। তা নাহলে গুপ্ত সম্রাটদের পক্ষে এতদিন ধরে, এত বড়ো সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হত না। এই গুপ্তচর চক্র সক্রিয় না থাকার ফলেই, দেশের রাজারা কেউই মুসলিম যোদ্ধাদের সম্যক শক্তি ও তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কোনদিনই বুঝতে পারেননি। যার ফলে তাঁরা মুসলিমদের সঙ্গে অধিকাংশ যুদ্ধেই পরাজিত হয়েছেন, কখনো বা অতিরঞ্জিত গুজবে বিশ্বাস করে আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়েছেন। এই কারণেই হয়তো আঠারো জন যোদ্ধা সঙ্গী নিয়ে বখতিয়ার খিলজি – অশ্ব ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ঢুকে নদীয়ার প্রাসাদ থেকে বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পালাতে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।                         

দেশ জোড়া টুকরো টুকরো অজস্র রাজ্য বা সাম্রাজ্যের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ (অর্থাৎ আমরা) এবং নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র কর্মী বা শ্রমিক সমাজের মানুষের অবস্থা কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। তা না থাক, এ বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা তৈরি করাই যায়। সে প্রসঙ্গ নিয়েই পর্যালোচনা করব পঞ্চম ও অন্তিম পর্বে।

চতুর্থ পর্ব সমাপ্ত।

  

চিত্র ঋণঃ https://commons.wikimedia.org/wiki

মানচিত্র ঋণঃ https://en.wikipedia.org/wiki

গ্রন্থ ঋণঃ

১. ধর্মপুস্তক – পুরাতন ও নূতন নিয়ম - The Holy Bible – Bengali – The Bible Society of India, Bangalore.

২. The Unknown Life of Jesus Christ – Nicolas Notovitch – translated in English by - J. H. Connelly and L. Landsberg.

৩. কাশ্মীর ও তিব্বতে – স্বামী অভেদানন্দ– শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ, কলকাতা।

৪. Jesus Lived in India (His unknown life before and after the Crucifixion) – Holger Kersten.

৫. Schools and Sects of Buddhism – by P. V. Bapat and Nalinaksha Dutta – from The Cultural Heritage of India (Volume I) – published by Swami Lokeswarananda, The Ramkrishna Mission Institute of Culture, Kolkata under the board of eminent scholars like, Dr. Sarvepalli Radhakrishnan (Chairman), R.C. Majumdar, Suniti Kumar Chatterji, Humayun Kabir, U.N. Ghoshal, A.D. Pusalker, Niharranjan Ray, et al.

৬. History of Ancient India – Rama Shankar Thripathi.

৭. Penguin History of Early India – Dr. Romila Thapar.

৮. The Wonder that was India – A. L. Basham.

. The Bŗhdāraņyak Upanișada – Translated by Swami Madhavananda, Advaita Ashram, Mayavati, Almora.

১০. অপরূপা অজন্তা – শ্রী নারায়ণ সান্যাল।

    ১১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ – বাংলায় গদ্য অনুবাদ – তারাকান্ত কাব্যতীর্থ ভট্টাচার্য।


এর পরে আসবে - "ধর্মাধর্ম" - পঞ্চম পর্ব - পর্বাংশ ১


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...