শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

৩০শে জুলাই, ২০২৬ রবিবার – সকাল সাতটা

ডাক্তার সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী অহীনরা নার্সিং হোম থেকে বিনুদাকে বাড়ি আনতে গেল রবিবার সকাল সাতটা নাগাদ। সব ফর্মালিটি সম্পূর্ণ করে ডিসচার্জ করাতে আধঘন্টা মতো সময় লাগল। নার্সিং হোম থেকে বিনুদাকে নিয়ে তারা রওনা হল সাড়ে সাতটা নাগাদ। গণেশদা, গাড়ির ড্রাইভার, ছাড়াও ওরা চারজন। সর্বজিৎ সামনের সিটে, পিছনে দুপাশে অহীন আর নবীনবাবুকে নিয়ে মাঝখানে বিনুদা। এই বসার ব্যবস্থাও ডাক্তার সরকারেরই পরামর্শে। তিনি বলেছিলেন তিরাশি বছর আগে এই শহরের যে পরিবেশ ছিল, আজকের সঙ্গে তার আকাশপাতাল তফাৎ। আমাদের চোখে সেটা বিসদৃশ না হলেও, বিনুদা অর্থাৎ অবিনদাদুর পক্ষে সেটা মোটেই সুপাচ্য হবে না।

ডাক্তার সরকার বলেছিলেন, “আমি আজন্ম পঞ্চান্ন বছর এই শহরেই রয়েছি। এই শহরের নানান উন্নতি দেখেছি, দেখেছি নানান সামাজিক অবনতিও। কিন্তু আমি এ সব পরিবর্তন ঘটতে দেখেছি ধীরে ধীরে। সেই পরিবর্তনে কখনো আনন্দ পেয়েছি – কখনো বিরক্ত হয়েছি। কিন্তু সেই সব ঘটনা কোনদিনই আমার মনে বড়োসড়ো কোন ধাক্কা দিয়ে যায়নি। কিন্তু তিরাশি বছর বাদে ঘুম থেকে জেগে অবিনদাদু অকস্মাৎ প্রত্যক্ষ করবেন এই সব পরিবর্তনের নমুনা। এই ধাক্কাটা ওঁর কাছে কতটা বড় হয়ে উঠতে পারে, সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণাই নেই। অতএব, যতটা সম্ভব ধীরে সুস্থে রয়ে সয়ে – আমাদের বর্তমান রূপটা প্রকাশ্যে আনাই ভাল”।

নার্সিংহোমটা মাঝারি একটা গলির মধ্যে। স্টার্ট দিয়ে গাড়ির চলা শুরু হতেই, শুরু হল বিনুদার প্রশ্নমালা।

“আচ্ছা, আমি এই হাসপাতালটায় যে এতদিন রইলাম, কেমন খরচ হল?”

নবীনবাবু বললেন, “তা খরচ একটু বেশিই। এটার মালিক আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু, ডাক্তার সরকার। সেই খাতিরে তিনি আমাদের জন্যে অনেকটাই কমে করে দিয়েছেন”।

বিনুদা বললেন, “অ, তার মানে এটা সরকারি হাসপাতাল নয়? ব্যক্তিগত হাসপাতাল?”

নবীনবাবু বললেন, “হ্যাঁ, আমরা বলি প্রাইভেট নার্সিং হোম বা হসপিট্যাল”।

বিনুদা বললেন, “তা সরকারি হাসপাতালগুলো কী দোষ করল? আমাকে সেখানে রাখলি না কেন?”

নবীনবাবু বললেন, “সরকারি হাসপাতালের অবস্থা তেমন সুবিধের নয় গো। প্রচণ্ড ভিড়, বেড খালি পাওয়া যায় না। অনেক রোগীকে মেঝেতেই শুইয়ে চিকিৎসা করতে হয়। আরও নানান অব্যবস্থা...”।

যে কথাটা নবীনবাবু বলতে পারলেন না, সেটা হল - অবিনদাদু তিরাশি বছর ধরে সমাধিতে ছিলেন। সমাধি শেষে তিনি সবে বাস্তব জগতে ফিরে এসেছেন। তাঁর মতো আশ্চর্য পেশেন্টকে সরকারি হাসপাতাল অ্যাডমিট করবে কিনা, সেটাই তো তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না। ডাক্তার সরকার পইপই করে সকলকে বলে দিয়েছেন, এ কথাটা তাঁর মুখের সামনে যত কম উচ্চারণ করা যায় ততই মঙ্গল। তাঁর মতে, অবিনদাদু নিজে নিজেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যদি ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারেন, সেটাই হবে আমাদের সত্যিকারের সাফল্য।      

 অবিনদাদু বিরক্ত মুখে বললেন, “কী যে বলছিস, কিছুই বুঝলাম না। সরকারি ব্যবস্থার থেকে ব্যক্তিগত ব্যবস্থা ভাল? আচ্ছা, আমরা কি, আমাদের সেই কৃষ্ণপুর শহরেই রয়েছি, নাকি কলকাতায় এসেছি?”

গাড়িটা নার্সিং হোমের গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়তেই বিনুদার প্রশ্নের ধরন বদলে গেল।

অহীন বলল, “না গো, এটা কলকাতা হবে কেন, কৃষ্ণপুরই”।

“বাবা, এত চওড়া রাস্তা? দুপাশে এত দোকান? আর ওই ওইগুলো কি? সাইকেলের মতো দুটো চাকা – কিন্তু সাইকেল তো নয়? লোকগুলো প্যাডেল চালাচ্ছে না তো!”

অহীন বলল, “না সাইকেল নয়। ছোটগুলোকে স্কুটার, আর বড়োগুলোকে বলে মটর সাইকেল। ইঞ্জিন বসানো আছে, পেট্রলে চলে”।

“বটে? আমার বাবার একটা গাড়ি ছিল। সে গাড়িটার কী হল? এটা তো নতুন গাড়ি বুঝতে পারছি”।

নবীনবাবু বললেন, “সে গাড়ি আমি দেখিনি, তবে বাবার মুখে শুনেছি সেটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল”।

“সে গাড়ি বেচে দিয়ে এই ফঙ্গবেনে গাড়ি কেনা হল? ছ্যাঃ। তবে রাস্তাতেও যত গাড়ি দেখছি, সেগুলো কোনটাই তো আমাদের সেই গাড়ির মতো নয়”। অবিনদাদু একটু হাসলেন, বললেন, “সে সব বনেদি গাড়ি কেনার মতো লোকই মনে হয় কমে গেছে, তাই না? আরে, ওটা আবার কি?”

“কোনটা?”

“আরে ওই যে রাস্তার ওধারে দাঁড়িয়ে আছে। জানালায় লোকজনের মুখ দেখা যাচ্ছে। ওটা কি?”

সর্বজিৎ বলল, “ওটা মোটর বাস। ওতে চড়ে অনেক লোক এক জায়গা থেকে নানান জায়গায় যেতে পারে”।

“ওটার চেহারা তো গোদা একটা ঘরের মত - ওটাও চলে? বলিস কি?”

“চলে বৈকি। প্রচুর বাস চলে। এক শহর থেকে অন্য শহরে। কম খরচে যাওয়া-আসার জন্যে বাসের কোন জুড়ি নেই”।

“কম খরচে মানে?”

“কম খরচ মানে বাসের ভাড়া। ধর তুমি এখান থেকে তারকেশ্বর যাবে – তার ভাড়া পনেরটাকা”।

“প-নে-র টাকা? সেটা কম খরচ হল? দশ-পনেরটাকা বেতনে ছোট সংসারের মাস চলে যায়!”

সর্বজিৎ মৃদু হাসল, বলল, “বিনুদা তোমাদের সময় চালের দাম কত ছিল, মনে আছে?”     

অবিনবাবু বললেন, “একটু ভাল চাল হলে দু টাকা মণ, আর সাধারণ চালের মণ, খুব বেশি হলে একটাকা বা পাঁচসিকেই ধর”।

নবীনবাবু বললেন, “এক মণ মানে প্রায় সাঁইত্রিশ কেজি। আমি বাড়িতে যে চালটা কিনি, তার দাম ষাট টাকা কেজি। তাহলে এক মণের কতদাম হবে সর্বজিৎ?”

সর্বজিৎ বলল, “ষাট টাকা দরে, এক মণের দাম হবে বাইশ শ’ কুড়ি টাকা”।

অবিনবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “তোরা মাইনে পাস কত? তোদের সংসার চলে কী করে?”

নবীনবাবু মুখটা ব্যাজার করে বললেন, “ওই আর কি - চলে যায় একরকম করে”।   

এর মধ্যেই অহীনের পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। অহীন ফোন বের করে দেখল, বৌদি ফোন করেছে। কানেক্ট করে বলল, “হ্যাঁ বৌদি, নার্সিং হোম থেকে আমরা বেরিয়ে পড়েছি, মিনিট পনের হল। আর মিনিট পাঁচ-দশের মধ্যেই পৌঁছে যাবো...আচ্ছা”।

অবিনদাদু অহীনকে লক্ষ্য করছিলেন অবাক চোখে। অহীন ফোনটা অফ করে কান থেকে নামাতেই জিজ্ঞাসা করলেন, “ওটা আবার কী বস্তু?”

অহীন হাতের তালুতে ফোনটা মেলে ধরে বলল, “ফোন। মোবাইল ফোন”।

“ফোন? আমাকে বোকা বানাচ্ছিস? ওই পাৎলা বাক্সটা ফোন? আমি ফোন দেখিনি? বড়দার আপিসে ফোন ছিল। ফোন হলে তো তার লাগবে, তার কই? তারপরে শোনার জন্যে আর কথা বলার জন্যে, অনেকটা ডাম্বেলের মত দেখতে, যে যন্ত্রটা - সেটা কই? নম্বর ডায়াল করে অপারেটরকে যে নাম্বার চাইবি, সে যন্ত্রটাই বা কোথায়?”

অহীন হেসে ফেলে বলল, “তোমাকে বোকা বানাবো কেন, বিনুদা? এটা সেই ফোন নয় ঠিকই, তবে ফোন – মোবাইল ফোন। আজকাল প্রায় সবার কাছেই থাকে। দেখবে? আমি দাদু মানে তোমার খ্যাঁদাকে ফোন করবো?” অহীন ফোন আনলক করে, দাদুর নাম্বার বের করে ডায়াল করে, স্পিকার মোড অন করল। দাদুর ফোনে রিং হচ্ছে, গান বাজছে, “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল পার করো আমারে, আমি দীন ভিখারি নাই কো কড়ি, দেখ ঝুলি ঝেড়ে...হ্যালো”। দাদু কথা বলল।

অহীন বলল, “দাদু, বিনুদা তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। কথা বলো, বিনুদা...”

অবিনবাবু হকচকিয়ে রয়েছেন, বললেন, “ইয়ে, মানে...খ্যাঁদা বলছিস?”

“হ্যাঁ কাকা, খ্যাঁদা বলছি। বৌমা বুকুনকে একটু আগেই ফোন করেছিল, বলল, তোমরা নাকি প্রায় এসে পড়েছো? এস আমরা সবাই তোমার অপেক্ষাতেই বসে আছি। তুমি এলে একসঙ্গে জলখাবার খাবো”।

অহীন বলল, “কিছু বলো, বিনুদা”। অবিনবাবু মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে তাকিয়ে রইলেন ফোনটার দিকে, কিছু বললেন না। অহীন ফোনে উত্তর দিল, “দাদু আমরা চলে এসেছি। আর দু মিনিট। রাখছি এখন”।

“আচ্ছা। আয়”।

অহীন ফোনটা অফ করে দেওয়ার পর, অবিনবাবু বললেন, “দেখি তোর যন্তরটা”। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন কিছুক্ষণ, গম্ভীর মুখে বললেন, “বুজরুকি করার আর জায়গা পাসনি, হতভাগা? তুই বললেই আমি বিশ্বাস করে নেব?”

ওরা বাড়ির সামনে চলে এসেছিল। লোহার গেটের সামনে গাড়ি থামতে, সর্বজিৎ নেমে গেটটা খুলে দিল। গণেশদা গাড়ি ঘুরিয়ে ব্যাক গিয়ারে ঢুকিয়ে দিল ভেতরে।

অহীন গাড়ির দরজা খুলে নেমে, নীচু হয়ে বিনুদাকে ডাকল, “নেমে এস, বিনুদা”।

অবিনবাবু ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে মাটিতে পা দিয়ে, বাড়িটার দিকে তাকালেন, বললেন, “এ কোথায় নিয়ে এলি আমায়? এই আমাদের বাড়ি?”

গেট খোলা আর গাড়ির আওয়াজে সকলেই বাড়ির বাইরে এসে পড়েছিলেন। প্রবীণবাবু এগিয়ে এসে কাকার হাত ধরে বললেন, “এস, কাকা। এ বাড়ি আমাদের কে বলল? এ বাড়ি তোমার। এস ভেতরে এস”। প্রবীণবাবু কাকার হাত ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে বসিয়ে বললেন, “একটু বস। তারপর তোমার ঘরে নিয়ে যাব। হাসপাতালের জামা কাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে নেবে চলো, তারপর আমরা একসঙ্গে জলখাবার খাবো”।

অবিনবাবু প্রবীণবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, “তোরা সবাই আমাকে বোকা বানাচ্ছিস কেন বল তো? এ বাড়ি তো আমাদের নয়, এ বাড়ি কাদের বাড়ি? তুই সত্যিই খ্যাঁদা তো? আমার কিন্তু এখন সন্দেহ হচ্ছে। তুই যদি সত্যিই খ্যাঁদা হস, তুই তো জানিস এ বাড়ি আমাদের নয়। সেখানে না গিয়ে, আমাকে এ কাদের বাড়িতে তুই নিয়ে এলি?”

প্রবীণবাবু একটু রেগেই গেলেন, বললেন, “আমি যদি খ্যাঁদা না হই, তিরাশি বছর পরে তোমার সমাধি ভাঙবে, এ কথা জানলাম কী করে? তিরাশি বছর সময়টা বড়ো কম নয়, ছোটকা। তুমি আমাকে শেষ দেখেছিলে আমার যখন সাত-আট বছর বয়েস। তুমি সেই বয়সেই আটকে রয়েছ, তাই বলে আমিও কী সেই বালক বয়সেই আটকে রয়েছি? আমার বয়েস এখন প্রায় নব্বই হতে চলল। কেন বুঝছো না, এই তিরাশি বছরে সব কিছুই বদলে গেছে। প্রত্যেকদিন বদলে চলেছে এই পৃথিবী, মানুষজন, গ্রাম, শহর...সব”।

অবিনবাবু কিছু বললেন না, তাকিয়ে রইলেন প্রবীণবাবুর মুখের দিকে। প্রবীণবাবু একটু শান্ত হয়ে বললেন, “মনটাকে শক্ত করো, ধৈর্য ধরো। এই বাড়ি আমিই বানিয়েছিলাম, আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে। এই জমি আমাদের সেই পৈতৃক জমির সীমানার বাইরে কিন্তু একদমই লাগোয়া। বিকেলে অহীন তোমাকে আমাদের পুরোন বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাবে। দেখে এস। বুঝতে পারবে সব। এখন চলো, নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। শুরু হোক তোমার নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা”।

প্রবীণবাবু উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেন। অবিনবাবু কোন কথা না বলে, ভাইপোর হাত ধরলেন। দুজনে এগিয়ে গেলেন দোতলার সিঁড়ির দিকে।

ওঁরা দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নবীনবাবু একটু তিক্ত স্বরে বললেন, “যত বয়েস হচ্ছে, বাবা ততই খেঁকটে হয়ে যাচ্ছে। ছোড়দাদুকে ওভাবে কথাগুলো বলাটা কি উচিৎ হল?”

সর্বজিৎ বলল, “না, মেসোমশাই, আমার মনে হয় দাদু যা করেছেন, একদম ঠিক করেছেন। ডাক্তার সরকার ঠিকই বলেছেন, বিগত আট দশকে আমাদের জীবনে এত পরিবর্তন এসেছে, বিনুদার পক্ষে একদিনে সে সব বুঝে ওঠা অসম্ভব। গাড়িতে আসতে আসতে, গাড়ি নিয়ে, অহীনের ফোন নিয়ে ওঁনার মন্তব্যগুলো শুনলেন না? যে সময় ওঁনাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল, সেই সময়কার আভিজাত্যের ধারণাতেই তিনি আটকে রয়েছেন। বড়ো বড়ো থামওয়ালা প্রাসাদোপম বাড়ি। সেই সময়কার গাড়ি। সেই সময়কার ভারি ভারি জগদ্দল ফোন। কিন্তু স্বাধীন ভারতে আমরা এখন যে আর অভিজাত নই, সেটাই উনি বুঝতে পারছেন না। আমরা মধ্যবিত্ত হয়ে গেছি। সেই মাপে এখন আমাদের সবকিছুই অনেক ছোট, ওঁনার ভাষায় “ফঙ্গবেনে” করে ফেলতে হয়েছে। এই বাড়ি, ওই গাড়ি…সব। এই ব্যাপারটা ওঁনাকে বুঝতে হবে, আমাদের বোঝাতে হবে। তার জন্যে…”। সর্বজিৎ একটু থামল।

নবীনবাবু সর্বজিতের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন, বললেন, “ঠিকই বলছ, থামলে কেন, বলো?”

সর্বজিৎ একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “তার জন্যে মাঝে-সাঝে একটু জোর করতে হবে, ধমক-ধামকও দিতে হবে। তবে হ্যাঁ, সেটা দাদুর পক্ষেই করা সম্ভব। কারণ দাদুর সঙ্গে বিনুদার বয়সের তফাৎ খুব বেশি নয়। বিনুদার পরিচিত পরিজনের মধ্যে একমাত্র দাদুই জীবিত। আমাদের মধ্যে একমাত্র দাদুর সঙ্গেই বিনুদার প্রত্যক্ষ স্নেহের সম্পর্ক। দাদুই হলেন বিনুদার শ্রদ্ধেয় বড়দা ও বড়বৌদির প্রত্যক্ষ স্মৃতি। সেই অধিকারে তিনি ছোটকাকে খুচরো ধমক দিতেই পারেন। তাতে আমার মনে হয় ভালই হবে”।

ঘরে উপস্থিত সকলেই সর্বজিতের কথা মন দিয়ে শুনছিল। নবীনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে সর্বজিতের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ঠিক কথা সর্বজিৎ। কিন্তু আস্তে আস্তে তিনি যখন সবই জানতে পারবেন, তখন কী যে হবে, ভাবতেই…”। নবীনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “যাগ্‌গে যা হবার হবে, এখন চলো আমরাও একটু ফ্রেশ হয়ে আসি, যতই হোক আমরাও তো নার্সিং হোমের ভেতরে গিয়েছিলাম…”।

চলবে... 


বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ  স্কন্ধ - পর্ব ৪

দক্ষের আরেকবার যজ্ঞ অনুষ্ঠান

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “এইভাবে প্রজাপতি দক্ষ মহাদেবকে প্রসন্ন করার পর, ব্রহ্মার অনুমতি নিয়ে উপাধ্যায় ও ঋত্বিকদের সঙ্গে নিয়ে আবার যজ্ঞ শুরু করলেন। ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞের সূচনা করলেন এবং যজ্ঞের বিঘ্নদোষ দূর করার জন্যে বিষ্ণুর উদ্দেশে যজ্ঞের আগুনে ঘি প্রয়োগ করলেন। যজমান দক্ষ তাঁদের সঙ্গে শুদ্ধচিত্তে এমন গভীর ধ্যান করলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যে সেই যজ্ঞস্থলে শ্রীহরির আবির্ভাব হল। যাঁর পক্ষপুটে বেদের দুটি শাখা বর্তমান, সেই পক্ষীরাজ গরুড়, তাঁকে বহন করে নিয়ে এলেন। শ্রীহরির প্রভায় দশদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তাঁর কোমরে সোনার চন্দ্রহার, তাঁর শ্যামকান্তি বর অঙ্গে পীতাম্বর। তাঁর মাথায় সূর্যের মতো উজ্জ্বল মুকুট, তাঁর কমলের মতো সুকুমার মুখের চারপাশে ভ্রমরের দলের মতো কেশরাশি শোভা পাচ্ছিল। সোনার অলংকার শোভিত তাঁর আট হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, তির,ধনুক, অসি আর চর্মের ঢাল। তাঁর বুকে লক্ষ্মীদেবী, গলায় বনমালা, দুপাশে রাজহাঁসের মতো শুভ্র ব্যজন ও চামর; মাথার উপর চাঁদের মতো সুশোভন শ্বেত ছত্র। তাঁর মুখের হাসিতে ও দু চোখের দৃষ্টিতে মুগ্ধ বিশ্ব।

শ্রীভগবানকে সামনে দেখে ব্রহ্মা, রুদ্র, ইন্দ্র এবং উপস্থিত দেবতা, ঋষি, মুনি ও ব্রাহ্মণেরা সকলে উঠে দাঁড়ালেন ও তাঁকে প্রণাম করলেন। তাঁরা সকলে সসম্মানে, জোড়হাতে শ্রীহরির স্তব ও বন্দনা শুরু করলেন।

প্রজাপতি দক্ষ বললেন, “ভগবান, আপনি সমস্ত জীবের চৈতন্যস্বরূপে অবস্থান করেন। আপনি শুদ্ধ এবং এক অর্থাৎ অদ্বিতীয়, সুতরাং আপনি অভয়স্বরূপ। আপনি কখনও মায়ায় অভিভূত হন না, অথচ জগতের লোকশিক্ষার জন্যে, মায়ার প্রভাবে আপনি বারবার মানুষরূপে অবতীর্ণ হন”।

রুদ্র বললেন, “হে বরদ, আপনার চরণপদ্মে অখিলার্থ লাভ করা যায়। আপনার শ্রীচরণে আমার চিত্ত নিবেশিত আছে, অজ্ঞ ব্যক্তি আমাকে আচারভ্রষ্ট বলে নিন্দা করলেও, আপনার প্রসাদে আমি বিচ্যুত হই না”।

ভৃগু বললেন, “যাঁর গভীর মায়ায় আত্মতত্ত্ব আবৃত হয়ে যায়, মোহনিদ্রায় আচ্ছন্ন দেহিরা তাঁদের আত্মায় বিরাজিত আপনার তত্ত্ব কোনদিনই বুঝতে পারেন না, আপনার একান্ত ভক্ত ও বন্ধুদের আত্মাস্বরূপ আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হোন”।

ব্রহ্মা বললেন, “আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে সকল পদার্থের পার্থক্যজ্ঞান উপলব্ধি সম্ভব। পুরুষ এই ভাবে যে যে বস্তুর রূপ অনুভব করে, তার মধ্যে কোনটাই আপনার স্বরূপ নয়, অর্থাৎ আপনি সকল ইন্দ্রিয়ের অগোচর। আপনি এই বিশ্বের সকল চরাচরের আশ্রয় হয়েও, নিখিল মায়াময় বস্তু থেকে ভিন্ন”।

ইন্দ্র বললেন, “হে অচ্যুত, অসুর বিনাশী অস্ত্রে শোভিত আপনার এই অষ্টভুজ মূর্তি, আমাদের মন ও নয়নের পক্ষে আনন্দকর, বিশ্বের উৎপত্তি স্বরূপ আপনার এই যে শ্রীবিগ্রহ, এই মূর্তি মায়ার মতো মিথ্যা নয়, বরং সনাতন সত্য”।

দক্ষপত্নী প্রসূতি বললেন, “হে ঈশ, আপনার শুভাগমন হোক, আপনি প্রসন্ন হোন, আপনাকে প্রণাম করি। মাথাহীন দেহ যেমন সুন্দর হাত, পা ও অন্যান্য অবয়ব সংযোজনাতেও অর্থহীন হয়, তেমনি আপনার অধিষ্ঠান রহিত যজ্ঞানুষ্ঠানও শোভা পায় না। হে শ্রীনিবাস, আপনি আমাদের রক্ষা করুন”।

অগ্নি বললেন, “যাঁর তেজে আমি প্রদীপ্ত হয়ে, ঘৃতের সঙ্গে হবিঃ দেবতাদের উদ্দেশে বহন করি, যিনি অগ্নিহোত্র, দর্শ, পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য ও পশুসোম এই পাঁচ  যজ্ঞস্বরূপ এবং পাঁচ যজুঃ মন্ত্রে যিনি পূজিত হয়ে থাকেন, সেই যজ্ঞপালক যজ্ঞমূর্তির বন্দনা করি”।

শ্রীভগবান বললেন, “আমিই জগতের পরম কারণ। আমিই আত্মা, ঈশ্বর ও সাক্ষী। আমি স্বপ্রকাশ ও আমার কোন উপাধি নেই। আমাকেই ব্রহ্মা ও শিব বলে জানবে। হে দ্বিজ, আমি আমার গুণময়ী মায়ায় সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের অনুষ্ঠান করি এবং সেই কর্ম অনুযায়ী নাম ধারণ করে থাকি। আমিই পরম আত্মা ও অভিন্ন অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। যারা অজ্ঞ, তারাই ব্রহ্মা, রুদ্র ও অন্যান্য ভূতকে আমার থেকে পৃথক মনে করে। প্রাণিগণ যেমন নিজদের মাথা, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে নিজের থেকে আলাদা মনে করে না, তেমনি আমার ভক্তরা ভূতসকলকে আমার থেকে ভিন্ন মনে করেন না। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র সর্বভূতের আত্মা, এই তিনের স্বরূপ এক, যিনি এই তিনের মধ্যে ভেদ দর্শন করেন না, তিনিই শান্তি লাভ করেন””।

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতিশ্রেষ্ঠ দক্ষ ভগবানের এই আদেশ লাভ করে, ত্রিকপাল যজ্ঞে তাঁর অর্চনা করলেন, তারপর প্রধান ও অপ্রধান যজ্ঞ করে দেবতাদের অর্চনা করলেন। পরে সমাহিত চিত্তে বিশিষ্ট যজ্ঞভাগে রুদ্রের ভজনা করে যজ্ঞ সমাপ্ত করলেন এবং অন্যান্য সোমপায়ী দেবতাদেরও অর্চনা করলেন। যজ্ঞ শেষ করে ঋত্বিকদের সঙ্গে অবভৃথস্নান অর্থাৎ যজ্ঞ শেষের অবগাহন স্নান করলেন। এইভাবে ভগবানের কৃপায় দক্ষ, যজ্ঞে সিদ্ধিলাভ করায়, দেবতারাও তাঁকে “ধর্মে মতি হোক” এই আশীর্বাদ করে স্বর্গে ফিরে গেলেন।

অন্যদিকে দক্ষকন্যা সতী, নিজের কলেবর ত্যাগ করার পর, হিমালয় ও মেনকার কন্যা রূপে জন্ম নিলেন। প্রলয়ের সময় সুপ্তা শক্তি যেমন আবার ঈশ্বরকেই আশ্রয় করেন, তেমনই অম্বিকা একনিষ্ঠ ভক্তগণের একান্ত গতি মহাদেবকে পতি রূপে ভজনা করেছিলেন।

হে বিদুর, মহেশ্বরের এই পবিত্র চরিত্রের কথা শুনলে যশ হয়, আয়ুবৃদ্ধি ঘটে এবং পাপ নাশ হয়। যে ব্যক্তি মহেশ্বরের এই কীর্তি পরমভক্তিভরে নিত্য শ্রবণ করে ও কীর্তন করে, সে নিজেকে ও অপরকে সংসারের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়”। 

অধর্মের বংশকথা 

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “ব্রহ্মার পুত্রদের মধ্যে সনক প্রমুখ চার কুমার, নারদ, ঋভু, হংস, অরুণি ও মতি জন্মসিদ্ধ ছিলেন, তাঁরা কেউই দার পরিগ্রহণ করেননি। অধর্মও ব্রহ্মার পুত্র, তাঁর ভার্যা মৃষা, তাঁদের পুত্রের নাম দম্ভ এবং কন্যার নাম মায়া। অপুত্রক নিঋতি এই উভয় সন্তানকেই গ্রহণ করেছিলেন। দম্ভ ও মায়া সহোদর যমজ হলেও, তারা অধর্মের অংশ বলে, পতিপত্নী ভাবে লিপ্ত হয়। তাদের লোভ ও নিকৃতি অর্থাৎ শঠতার জন্ম হল। লোভ ও নিকৃতির সংযোগে ক্রোধ ও হিংসার জন্ম হল। ক্রোধ ও হিংসার থেকে কলি অর্থাৎ কলহ ও তার বোন দুরুক্তির জন্ম হল। কলি ও দুরুক্তির সন্তান মৃত্যু ও ভীর জন্ম হল এবং মৃত্যু ও ভীর থেকে নিরয় ও যাতনার উৎপত্তি হল। হে বিদুর, আমি অধর্মের বংশের কথা তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। এই কথা তিনবার শুনলে মানুষের মলিনতা দূর হয়, কারণ অধর্মের বংশকে পরিত্যাগ করলে, অশেষ পুণ্য অর্জন হয়ে থাকে।   

হে বিদুর, ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর স্ত্রী শতরূপার এক কন্যা দেবহূতি ও অন্য কন্যা প্রসূতির আখ্যান, তোমাকে বর্ণনা করলাম। এবার তাঁর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদের কথা বলি শোনো।

 ধ্রুবর উপাখ্যান

সুনীতি ও সুরুচি ছিলেন রাজা উত্তানপাদের দুই পত্নী, দুজনের মধ্যে সুরুচিই ছিলেন রাজা উত্তানপাদের প্রিয়তমা। একদিন রাজা উত্তানপাদ সুরুচির পুত্র উত্তমকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন, তাই দেখে সুনীতির পুত্র বালক ধ্রুবও পিতার কোলে চড়ার জন্যে বায়না করতে লাগল। কিন্তু রাজা ধ্রুবকে প্রশ্রয় দিলেন না। সুরুচি রাজার এই ব্যবহারে অত্যন্ত গর্বভরে সতীনপুত্র ধ্রুবকে বললেন, “বৎস, তুমি রাজপুত্র হলেও আমার সন্তান নও বলেই, রাজার আসনে বসবার তুমি যোগ্য নও। তোমার যদি রাজার আসনে বসার একান্তই ইচ্ছে হয়, ঈশ্বরের তপস্যা করে, তাঁর অনুগ্রহে আমার সন্তান হয়ে জন্ম লাভ করো। নতুবা এই দুর্লভ বাসনা ছেড়ে দাও”।

সাপ যেমন ক্রোধে হিস হিস শব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকে, বিমাতার কথায় অসহায় ধ্রুবও দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, বিমাতার দুর্বাক্য শুনেও পিতা কোন মন্তব্য করলেন না, তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন, তাঁর মা সুনীতির কাছে। সুনীতি তাঁর ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর তিনি অন্তঃপুরনারীদের থেকে জানতে পারলেন তাঁর সতীন সুরুচির কুবাক্যেই তাঁর পুত্র কাঁদছে। পুত্রের শোকে তিনিও ব্যথিত হলেন, জলভরা চোখে তিনি বললেন, “বৎস, তুমি আমার গর্ভে জন্মেছ, আমার স্তন্যেই তুমি বড়ো হয়েছ, কিন্তু আমার এমনই দুর্ভাগ্য, রাজা আমাকে পত্নীর মর্যাদাটুকুও দেন না। তবে বৎস একটা কথা মনে রেখো, যে ব্যক্তি তোমাকে দুঃখ দেয়, সে সেই দুঃখই নিজের জীবনেই ভোগ করে থাকে। এবং বিমাতা হলেও সুরুচি তোমাকে সুপরামর্শই দিয়েছেন, তুমি শ্রীহরির পাদপদ্ম বন্দনা করো। অন্য সকল বস্তুর থেকে আসক্তি ত্যাগ করে, স্বাভাবিক ভক্তি ও পবিত্র চিত্তে নিজেকে তাঁর চরণে সমর্পণ করে দাও, তাঁর ভজনা করো। পদ্মপলাশলোচন শ্রীহরিই তোমার সকল দুঃখ হরণ করতে পারেন, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত”।

ধ্রুব মায়ের বিলাপ এবং মায়ের এই উপদেশ শুনে পিতার গৃহ তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করলেন। অন্তর্যামী নারদ সমস্ত কথা শুনে এবং ধ্রুবের প্রতিজ্ঞার কথা জেনে সেই স্থানে উপস্থিত হলেন। তিনি বালক ধ্রুবের মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখে চিন্তা করলেন, ক্ষত্রিয়দের কি আশ্চর্য প্রভাব! ধ্রুব বালক মাত্র, কিন্তু বিমাতার কুবাক্য এবং পিতার অবহেলার অপমান তার সহ্য হল না। তারপর বললেন, “বৎস তোমার এখন খেলার বয়েস, এই বয়সে মান-অপমানের কোন কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। মান ও অপমানের পার্থক্য আছে ঠিকই, কিন্তু তোমার এই অসন্তোষ মোহ ছাড়া আর কিছুই নয়। মায়ের উপদেশে যোগ সাধনা করে তুমি যে ঈশ্বরের কৃপালাভ করার চেষ্টা করতে যাচ্ছো, বাস্তবে তাঁর কৃপালাভ করা দুঃসাধ্য। নিঃসঙ্গ মুনিরা যোগ ও সাধনায় বহুজন্ম চেষ্টা করেও ঈশ্বরকে জানতে পারেন না। অতএব তুমি এখন এই নিষ্ফল চেষ্টা ত্যাগ করো, বরং বৃদ্ধবয়সে এই সাধনার চেষ্টা করো। ঈশ্বর যার জন্যে যেমন সুখ কিংবা দুঃখ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তার সেই অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকা কর্তব্য। মনে রেখো, সুখের সময় উপস্থিত হলে পুণ্য ক্ষয় হয়, আর দুঃখের দিনে পাপ-ক্ষয় হয়। এইভাবেই দেহধারী মানুষ সংসার পার হয়ে মোক্ষ লাভ করতে পারে। নিজের থেকে বেশি গুণবান ব্যক্তির দর্শনে প্রীতি, গুণে নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে দয়া, আর সমগুণের ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে, অপমান সহ্য করতে হয় না”।

ধ্রুব বললেন, “আপনি দয়া করে, আমাদের মতো ব্যক্তি যা লাভ করতে অক্ষম এবং সুখদুঃখে অভিভূত ব্যক্তিদের সন্তোষলাভের জন্যে শমগুণের উপদেশ করলেন। কিন্তু ক্ষত্রিয় স্বভাবের জন্যে আমি অধৈর্য ও অবিনীত হওয়ায়, আমার বিমাতা সুরুচির কুবাক্যের জ্বালা আপনার ঐ উপদেশে প্রশমিত হচ্ছে না। আমার পিতৃপুরুষেরা যা কোনদিন লাভ করতে পারেন নি, এই ত্রিভুবনে যা শ্রেষ্ঠ পদ, আমি সেই পদ জয় করার ইচ্ছে রাখি। হে ব্রহ্মণ, পরমেশ্বরের অঙ্গ থেকে আপনার জন্ম,  জগতের মঙ্গলের জন্যে আপনি বীণা বাজিয়ে সূর্যের মতো জগতকে প্রদক্ষিণ করেন, অতএব, আপনিই আমাকে সাধু পথ নির্দেশ করুন”।

ধ্রুবর কথায় দেবর্ষি নারদ সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “বৎস, তোমার মা তোমাকে সঠিক উপদেশ দিয়েছেন। ভগবান বাসুদেবই তোমার মনের ইচ্ছা পূরণের একমাত্র পথ, তুমি একাগ্রচিত্তে তাঁর ভজনা করো। তোমার মঙ্গল হোক, আমি এই আশীর্বাদ করি। তুমি পবিত্র যমুনার তীরে যাও, শ্রীহরি সর্বদা সেখানেই বিরাজ করেন। ঐ স্থানের নাম, মধুবন। মধুবনে তোমার আসন প্রতিষ্ঠা করো,  পবিত্র কালিন্দীর জলে তিনসন্ধ্যা স্নান করে, দেবতাদের প্রণাম করবে। তারপর রেচক, পূরক ও কুম্ভক এই তিন রকমের প্রাণায়াম করে মনের চাঞ্চল্য দূর করে, শান্ত চিত্তে শ্রীহরির ধ্যান করো।

হে বৎস্য, মনে রেখ, ভক্তকে কৃপা করার জন্যে শ্রীহরি সব সময়েই উদ্গ্রীব থাকেন। তাঁর মুখভাব ও দৃষ্টি সদাপ্রসন্ন। তাঁর নাক, ভ্রূ ও কপোল সুকুমার। সকল দেবতাদের মধ্যে তিনি পরমসুন্দর ও সদাতরুণ। তাঁর অঙ্গ শ্যামবর্ণ, তাঁর বুকে শ্রীবৎসচিহ্ন, তাঁর গলায় বনমালা ও কৌস্তুভ মণি। তাঁর চারহাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, সোনার কেয়ুর ও বলয়, কানে সোনার কুন্ডল। তাঁর পরনে পীত পট্ট বস্ত্র। শ্রীভগবানের এই পরম মঙ্গলরূপ ধ্যান করতে করতে মন যখন পরম আনন্দে ডুবে যায়, তারপর মন তাঁর চরণেই লিপ্ত হয়ে থাকে।  হে রাজপুত্র ধ্রুব, এখন আমি তোমাকে মহামন্ত্র বলব, মন দিয়ে শোনো, “সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়কারী ভগবান বাসুদেবকে নমস্কার”। পবিত্র জল, ফুলের মালা, ফলমূল, দুর্বা ও তুলসী পাতা দিয়ে ভগবানের অর্চনা করবে। এইভাবে সমস্ত মনপ্রাণ সমর্পণ করে অখণ্ডভক্তি দিয়ে শ্রীহরির ধ্যান ও পরিচর্যা করলে, তিনি মানুষের পক্ষে যা শ্রেষ্ঠ তাই প্রদান করে থাকেন”। দেবর্ষির উপদেশ শুনে রাজপুত্র ধ্রুব আনন্দ চিত্তে তাঁকে প্রদক্ষিণ করলেন ও প্রণাম করলেন। তারপর দেবর্ষির অনুমতি নিয়ে শ্রীহরির পদরেণু সমৃদ্ধ মধুবনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

ধ্রুব রওনা হওয়ার পর, দেবর্ষি নারদ গেলেন মহারাজ উত্তানপাদের অন্তঃপুরে। রাজার দেওয়া পাদ্য অর্ঘ্য স্বীকার করে দেবর্ষি নারদ মহারাজ উত্তানপাদকে বললেন, “মহারাজ, আপনার মুখ দেখছি, চিন্তায় মলিন! কোন বিঘ্ন ঘটেনি তো?” মহারাজ বললেন, “হে ব্রহ্মণ, আমি স্ত্রৈণ এবং চূড়ান্ত নিষ্ঠুর। আমার পাঁচবছরের বালক পুত্র আমার কোলে চড়তে চেয়েছিল, আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমি আমার এই পুত্রকে এবং তার মাকে নির্বাসিত করেছি। আমার শিশুপুত্র এখন ম্লান মুখে, ক্লান্ত পায়ে, ক্ষুধায় কাতর হয়ে, একা একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি বাস করছি এই রাজপ্রাসাদে। আমি মূর্খ এবং আমি পত্নীর সম্পূর্ণ বশীভূত। আমার নিষ্ঠুর এই ব্যবহার আপনি লক্ষ্য করুন, দেব”।

দেবর্ষি নারদ মহারাজের এই কথায় বললেন, “হে মহারাজ, আপনার পুত্রকে আপনি বুঝতে পারেননি, তাকে দেবতারা রক্ষা করবেন। আপনার পুত্র অসাধারণ, অতএব আপনি পুত্রের জন্যে শোক করবেন না। একদিন এই ত্রিভুবন ঐ শিশুর বশীভূত হবে। লোকপালেরাও যে দুঃসাধ্য কর্ম করতে পারে না, আপনার পুত্র সেই কর্ম সুসম্পন্ন করবে। তারপর জগতে আপনার যশ বিস্তার করে, আপনার পুত্র খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে, আপনি চিন্তা করবেন না”।

চলবে...


বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

রাঘব বোয়াল

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - "অপূর্ব কোপি"


রাঘব বোয়াল গল্পটি শারদীয়া একপর্ণিকা ওয়েবপত্রিকার নীচের লিংক থেকেও পড়ে নিতে পারেন সঙ্গে পাবেন অনেক লেখকের নানান স্বাদের গল্প।


  

১ 

দিন সাতেক আগে প্রফুল্লনগর থানার ছোটবাবু সুনন্দ হাজরার কানে একটা সংবাদ এসেছে। খবরটা খুব মারাত্মক নয় ঠিকই – তবে সন্দেহজনক তো বটেই। শশীপদ মণ্ডল নামে জনৈক ভদ্রলোক টাকা গোনার যন্ত্র কেনার জন্যে খোঁজখবর করছে। শশীপদ একেবারেই যে সাধারণ লোক তা ঠিক নয় – ওপর মহলে তার একটু চেনাজানা আছে। আর সেই সুবাদে নিজের পাড়ায় এবং এলাকায় সে একটু হাঁকডাক করে, হইচই করে। অন্যের বিবাদে নাক গলিয়ে মাতব্বরি ফলানোর চেষ্টা করে। সে তো অনেকেই করে। তবে এখনো পর্যন্ত সে এমন কিছু করেনি, যার জন্যে সে থানা-পুলিশের মাথা-ব্যথার কারণ হয়ে উঠবে। ভদ্রলোক বেসরকারি অফিসে কাজকর্মও যা করে, তাতে মধ্যবিত্ত সংসারের মোটামুটি দিন গুজরান হয়ে যায়। এ হেন শশীপদ মণ্ডল আচমকা টাকা গোনার মেশিন কেনার জন্যে হন্যে হয়ে উঠল কেন? সে কি লটারির টাকা পেয়েছে? নাকি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে? কিন্তু গল্পে উপন্যাসে যত গুপ্তধনের সংবাদ পাওয়া যায়, সে সব হয় মোহর বা রূপোর মুদ্রা কিংবা হীরে, মণি, জহরত। স্বাধীন ভারতে সরকারী কারেন্সি নোটের গুপ্তধনের কথা কেউ কোনদিন শুনেছে? সুনন্দবাবু তো শোনেননি।

এত ভাবনা চিন্তা না করে শশীপদবাবুকে ডেকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হয়। সে কথা সুনন্দবাবু যে ভাবেননি তা নয়, তবে এখনই সে সব করার যুক্তিও তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। কোন মানুষ উদ্ভট কিছু খুঁজলেই তাকে থানায় ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করাটা কোন কাজের কথা নয়। কত লোক কত কী খোঁজে – আজকাল নেট হয়ে তো সে খোঁজখবর করারও সীমা নেই। যে দীঘা বা দার্জিলিং বেড়াতে যেতেই অনেক ভাবনা চিন্তা করে, সে হয়তো নেটে ইওরোপ-আমেরিকা বেড়ানোর খোঁজ নিচ্ছে। পোড়াবটতলার আশেপাশে দুকাঠা জমি কিনে বসতবাড়ি করার যে স্বপ্ন দেখছে, সেই হয়তো কলকাতার নিউটাউনে বাংলো বা ভিলার দরদাম নিয়ে খুব চিন্তিত। অতএব মাস গেলে নগদ মাইনে গুনতে যার মিনিট খানেকের বেশী সময় লাগে না, সে যদি নোট গোনার মেশিনের খোঁজ করে, তাতে ক্ষতি কী হয়েছে? শশীপদবাবু হয়তো স্বপ্ন দেখেন, একদিন তিনি প্রচুর টাকা করবেন এবং সেই বাণ্ডিল বাণ্ডিল টাকা হাতে গোনা সম্ভব হবে না বলেই হয়তো, টাকা গোনার যন্ত্র খুঁজছেন!

তবু সুনন্দবাবুর মনে একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। তিনি তাঁর পরিচিত গুপ্তচরদের বলে রেখেছেন ভদ্রলোককে নজরে রাখতে। তিনি কোথায় যান, কাজের বাইরে তিনি কার সঙ্গে দেখা করেন। সকালে কটায় বাড়ি থেকে বের হন, রাত্রে কখন বাড়ি ফেরেন। যদিও তাঁর লোকদের উপর তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে, কিন্তু সাত দিন হয়ে গেল তাঁর লোকজনেরা যে সংবাদ আনছে, তাতে শশীপদবাবুর কোন আচরণই আপত্তিকর বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু অন্যদিকে তিনি খবর পেয়েছেন, শশীপদবাবু অনলাইনে একটি টাকা গোনার যন্ত্রের অর্ডার দিয়েছিলেন, এবং গতকাল তিনি সেটি রিসিভ করেছেন। বাড়িতে নয়, অফিসে।

অনলাইনের পার্সেল আসাতে অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। সহকর্মীরা জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বলেছেন, পার্সেলে কী আছে তিনি জানেন না, হয়তো তাঁর মেয়ে কোন অর্ডার দিয়ে থাকবে। বাড়ি গিয়ে মেয়েকে দেবেন, সে পার্সেল খুলবে। সহকর্মীরা কৌতূহল দমন করলেও, সুনন্দবাবুর কৌতূহল আরও বেড়েছে। শশীপদবাবুর কন্যা ক্লাস সিক্সের ছাত্রী, পুত্র সবে ক্লাস টুতে পড়ে। শশীপদবাবুর স্ত্রী সাদাসিধে সাধারণ গৃহবধূ, বাবা-মা দুজনেই পুরোন দিনের মানুষ। তাঁদের কারও পক্ষে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে জিনিষ কেনা সম্ভব নয়। অতএব শশীপদবাবুকে না জানিয়ে কোনও জিনিষ তাঁরা কী করে কিনলেন? অবিশ্যি এমনও হতে পারে শশীপদবাবুর আত্মীয় বা কোন বন্ধু-বান্ধব, ওঁনার মেয়েকে কোন গিফ্‌ট পাঠিয়েছে। যার কথা তিনি জানেন না। কিন্তু সহকর্মীদের তিনি কেন বললেন, “হয়তো তাঁর মেয়ে কোন অর্ডার দিয়ে থাকবে”? মেয়ের নামে মিথ্যে কথা বললেন কেন? সুনন্দবাবুর মনের খটকাটা আরও বেড়ে গেল।

কিন্তু খটকা দিয়ে তো আর কাউকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না। সুনন্দবাবু তাঁর লোকজনদের বললেন, শশীবাবুর ওপরে দিন-রাত সর্বদা নজর রাখতে। আরও পাঁচদিন চলে গেল, কিন্তু সুনন্দবাবুর লোকেরা তেমন কিছু হদিস করতে পারল না। তবে তাঁর কাছে আরেকটা রিপোর্ট এল, শশীবাবুর নিচের তলার একটা ঘরে মাঝে মাঝে অনেকরাত অব্দি আলো জ্বলে – কিন্তু রাস্তার দিকের সবকটা জানালা বন্ধ থাকার দরুন – সে ঘরে কে বা কারা কী করছে কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না।

এখানে শশীবাবুর বাড়ি সম্পর্কে দুচার কথা বললে বিষয়টা একটু পরিষ্কার হবে। প্রফুল্লনগরের একটু বাইরে রাস্তার ধারে শশীবাবুর এই বাড়িটা বেশ পুরোন আমলের। তাঁর ঠাকুরদা এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন। দোতলা বাড়ি। দোতলার তিনটে ঘরে শশীবাবুরা থাকেন। নিচের একটা বসার ঘর, অন্য ঘরে খাওয়াদাওয়া করেন। রান্নাঘরও নিচে, বাথরুম-টয়লেট দুটো তলাতেই রয়েছে। নিচের আরেকটা ঘর সর্বদা তালাবন্ধই থাকে। সে ঘরে  যত রাজ্যের পুরোন আর ভাঙাচোরা জিনিষপত্র থাকে। সেই ঘরের দরজার শিকলে এতদিন একটাই ছোট তালা লাগানো থাকত, তার মানে সে ঘরে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। কিন্তু ইদানীং সেই দরজাতে - এই দিন পনের হল, নতুন ও বড়ো বড়ো দুটো তালা ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। একটা শিকলে, অন্যটা দরজার কড়ায়। অর্থাৎ ইদানীং সে ঘরের গুরুত্ব হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। অবিশ্যি রাত্রে নিচের সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, দুটো তালা খুলে কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে – বাইরে থেকে দেখতে পাওয়ার কোন উপায় নেই।

শশীবাবুর নিচের ঘরের এই নতুন দুই তালার রহস্যের কথা সুনন্দবাবুর কানে তুলেছে খবরের কাগজওয়ালা এবং দুধের প্যাকেটওয়ালা। ওরা রোজই সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ – যখন সদর দরজা খোলা থাকে – দুধ আর কাগজ দিতে শশীবাবুর নিচের দালানে ঢোকে। অতএব সুনন্দবাবুর সন্দেহ আরও বাড়ল। কিন্তু সে সন্দেহের নিরসন কী ভাবে হতে পারে – তাঁর মাথাতে কিছুতেই আসছে না।

আরও দুদিন নজর রেখেও সুনন্দবাবু তেমন কিছু এগোতে না পেরে, ফোন করলেন, সরুদা অর্থাৎ সর্বজিৎকে। এই সর্বজিৎ মানে সরুদাকে তোমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই – সেই যে টুম্পি আর রুন্টি-ঝুন্টির মাসতুতো দাদা। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ফোন করে সুনন্দবাবু বললেন, “সর্বজিৎ, প্রফুল্লনগর থানা থেকে আমি সুনন্দ হাজরা বলছি, চিনতে পারছো”?

[সরুদার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে এই ব্লগের এই গল্পগুলি পড়ে নিতে পারেন, 

"ছোট্ট হওয়া" এবং "পেত-ন-তাৎ-তিক"]

“হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার নাম্বার তো আমার ফোনে সেভ করা আছে। কেমন আছেন, কাকু?”

“খবর ভালোই। কিন্তু তোমার কী খবর বলো। তুমি এখন রয়েছ কোথায় কানপুরে, কলকাতায় নাকি প্রফুল্লনগরে”?

হেসে ফেলে সরুদা বলল, “আমি এখন কানপুরে রয়েছি, কাকু। এই স্নান করতে যাচ্ছি, ব্রেকফাস্ট করে ক্লাসে যাবো”।

সুনন্দবাবু একটু হতাশ হয়ে বললেন, “অ। তার মানে তুমি এখন সময় দিতে পারবে না”।

সরুদা বলল, “কোন সমস্যা হয়েছে নাকি কাকু? এক কাজ করছি, সকালের দুটো ক্লাসের পর – আজ থার্ড পিরিয়ডটা আমাদের অফ আছে। আপনাকে আমি সে সময় ফোন করব, এই ধরুন এগারোটা পাঁচ-দশ নাগাদ। ওই সময়ে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারব। ঠিক আছে, কাকু?”      

সুনন্দবাবু বললেন, “ঠিক আছে, তাই করো, একটা ব্যাপারে তোমার একটু হেল্প চাই, ভাই”।                      

ফোনটা কেটে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, মাত্র ঘন্টা তিনেকের তো ব্যাপার, কিছু একটা উপায় বেরোবেই। এই ছেলেটির ওপর তাঁর ভরসা আছে। 

২ 

সরুদার সঙ্গে কথা বলার দিন চারেক পরে সুনন্দবাবু থানায় তাঁর চেম্বারে ঢুকতেই, হাবিলদার সুখনরাম বলল, “স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে একজন অনেকক্ষণ বসে আছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে বলুন। কিছুতেই বলল না, বলল, ছোটবাবুর সঙ্গেই দেখা করতে চাই”।

সুনন্দবাবু বললেন, “কে? কী নাম কি?”   

“আজ্ঞে, নাম বলল শশীপদ মণ্ডল, স্যার”।

বেশ অবাক হয়ে সুনন্দবাবু সুখনরামের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “পরিতোষকে একগ্লাস জল দিতে বল, আর ওই ভদ্রলোককে পাঠিয়ে দাও”।

পরিতোষ আর শশীপদ একই সঙ্গে সুনন্দবাবুর চেম্বারে ঢুকল। সুনন্দবাবু চোখের ইশারায় শশীবাবুকে সামনের চেয়ারে বসতে বললেন, তারপর পরিতোষের গ্লাসের জল শেষ করে খালি গ্লাস ফেরত দিয়ে বললেন, “পরিতোষ, দরজার পর্দাটা টেনে দিয়ে যাও, আর দেখ এখন কেউ যেন এ ঘরে না ঢোকে”।

পরিতোষ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে সুনন্দবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললেন, “বলুন কী বলতে চান”।

শশীবাবু খুব ভয় পাওয়া স্বরে বলল, “আপনি তো সবই জানেন, স্যার”।

সুনন্দবাবু ধমকে উঠলেন, “কী জানি না জানি সে কথায় আপনার দরকার কি? কী বলতে চান চটপট বলে ফেলুন”। সুনন্দবাবুর ধমকানিতে শশীবাবু আরেকটু ভড়কে গেল, হাতজোড় করে বলল, “নমস্কার, স্যার। আমি শশীপদ মণ্ডল, স্যার। ইয়ে মানে, আমি, আরেকটু হলেই, একটা খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, স্যার। আপনার লোকরা ঠিক সময়ে আমাকে সতর্ক না করলে, আমার যে কী হত, স্যার, ভগমানই জানেন”।

সুনন্দবাবু কিছু বললেন না, ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন শশীবাবুর দিকে।

ভয়ে শশীবাবুর পেটটা একটু গুরগুর করে উঠল, খুব মিয়োন গলায় বলল, “গত পরশু রাতে, তখন কটা হবে, এই সাড়ে বারোটা পৌনে একটা, আমার ঘরে আমি কিছু কাজ করছিলাম, হঠাৎ একজনের গলা শুনলাম। বিশ্বাস করুন স্যার, জানালা দরজা বন্ধ, কী করে আপনার লোকটি ঘরে ঢুকল, জানি না। তাকে দেখতেও পাইনি, কিন্তু স্পষ্ট কথা শুনলাম। ভয়ে তো আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার দশা”।

ভীষণ গম্ভীর স্বরে সুনন্দবাবু বললেন, “কী কথা?”

“মানে, ইয়ে আপনি সবই জানেন, তবু...  লোকটি আমাকে বলল, ‘এত টাকা কোথা থেকে পেলেন, শশীবাবু? আজ আপনার অফিসের মাইনে হল বুঝি? আপনাদের মাইনে মাসের শেষ দিকে হয়’? বাড়ির সদর দরজা বন্ধ, ওই ঘরের দরজাতেও আমি খিল দিয়ে কাজ করছিলাম। সেখানে আমার পাশ থেকে ওই কণ্ঠস্বর শুনে আমার তো সাংঘাতিক অবস্থা। আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, কে, কে? এ ঘরে ঢুকলেন কী করে”?

লোকটি খুব শান্ত স্বরে ফিসফিস করে বলল। “আহা, চেঁচাচ্ছেন কেন? বাড়ির লোকজন জেগে উঠে নেমে আসবে, সেটা কি ভাল হবে? তাঁরা, মানে আপনার স্ত্রী, মা, বাবা আপনাকে মাঝরাতে বন্ধ ঘরে বসে এত এত টাকা গুনতে দেখলে... যাকগে, যা বলছি মন দিয়ে শুনুন, থানার ছোটবাবু আমাদের পাঠিয়েছেন...”।

সুনন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ ‘আমাদের’ বলল? ওরা কজন ছিল?”

“কাউকে তো দেখতেই পাইনি, স্যার। কজন কী করে বলব? দুজন বা দশজন হলেই বা ওদের আটকাবে কে?”

“ঠিক আছে, তারপর? ওরা কী বলল?”

“বলল, ‘এ টাকা আপনি যাঁর থেকে নিয়ে আসেন, আমরা তাঁকে চিনি। তিনি রাঘব বোয়াল। অনেক জায়গা থেকে অনেক টাকার লেনদেন করেন তিনি। সে সব নগদ টাকার কিছু আপনার জিম্মায় তিনি রাখতে দিচ্ছেন, দরকার মতো আবার নিয়ে নেবেন, তাই তো? ওঁনার মতো ব্যস্ত মানুষের পক্ষে এত টাকা গোনা তো আর সম্ভব নয়, অতএব তিনি আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছেন গুনে-গেঁথে হিসেব করে যত্ন করে রাখার জন্যে। আর আপনিও টাকা-গোনার যন্ত্র-টন্ত্র কিনে একেবারে সেই দায় মাথায় তুলে নিয়েছেন, তাই না?’

আমি তো অবাক, স্যার। ওরা দেখি সব জানে! আমি আর অস্বীকার করি কী করে? আমি বললাম, “হুঁ”।

ওরা বলল, “এখন কত গুনছেন?”

“মোটামুটি দশ লাখ হবে”।

“টাকা গোনার যন্ত্র থাকতে মোটামুটি কেন?”

“আজ্ঞে, উনি তাই বলেছেন। এখনও গোনা শেষ হয়নি কি না, তাই মোটামুটি বললাম”।

“তা বেশ। এর আগে আজ পর্যন্ত কত পেয়েছেন?”

“আজ্ঞে ছত্রিশ লাখ পঁচাত্তর হাজার”।

“বলেন কি? আচ্ছা শশীবাবু, কথায় বলে দেওয়ালেরও কান আছে। আপনার এই ঘরে এত এত নগদ টাকা জমাচ্ছেন, বিপদ ঘটতে কতক্ষণ?”

“বিপদ মানে?”

“ধরুন, বজ্জাত লোকরা আপনার ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে সব টাকা লুঠ করে নিল। আপনার সেই রাঘব-বোয়াল দাদা, আপনাকে ছেড়ে দেবে তো? কিংবা ধরুন পুলিশের লোক খবর পেয়ে আপনার বাড়িতে হানা দিল। আপনার ঘর থেকে এত টাকা উদ্ধার হলে, আপনার রাঘব বোয়াল দাদা আপনাকে বাঁচাবে তো? এত বেআইনি টাকার দায়ে আপনার তো জেল হয়ে যাবে শশীবাবু! আপনার ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মা তাঁদের কী হবে? আর আপনি যদি বলেন এ টাকা আপনার নয়, আপনার সেই দাদার – দাদার লোকেরা আপনাকে হয়তো লরির তলায় চাপা দিয়ে মেরেই ফেলবে...”।

শশীবাবুর চোখে এখন জল, মাথা নিচু করে রুমালে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ কান্না সামলাল, তারপর চোখ মুছে ধরা ধরা গলায় বলল, “আপনি আমায় ভয়ানক এক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন, স্যার। আমি পরের দিন সকালে উঠেই বড়দার বাড়ি গেলাম...”।

“বড়দা মানে – সেই রাঘব বোয়াল?”

“হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার... তাঁর কাছেই - তাঁকে গিয়ে বললাম, দাদা পাড়ার লোকরা কিছু একটা সন্দেহ করেছে…  নানা রকম কথাবার্তা কানে আসছে…আমার বাড়িতে টাকা রাখা আর বোধ হয় নিরাপদ নয়…আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন ওগুলো সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন”।

“আপনার বড়দা কিছু ব্যবস্থা করলেন কি?”

“হ্যাঁ স্যার, সেদিনই সকাল এগারোটা নাগাদ আমার বাড়িতে একটা মেটাডোর আর চারপাঁচজন লোক পাঠিয়েছিলেন। তারা আমার ঘর থেকে বেশ কিছু ভাঙাচোরা আসবাব আর পুরোনো লোহার আলমারিটা নিয়ে চলে গেল। ওই আলমারিতেই সব ছিল, নগদ টাকা- টাকা গোনার মেশিন…সব”।

“ভালই হয়েছে। বড়ো একটা বিপদের থেকে খুব জোর বেঁচে গেছেন”।

“সে কথা আর বলতে, স্যার? আর মাঝের থেকে আমার নিচের ঘরের জঞ্জালগুলোও মোটামুটি সাফ হয়ে গেছে। আমি এখন মুক্ত”।

“আপনি যে টাকা গুনেছিলেন, তার হিসেব কি দিয়ে দিয়েছেন?”

“হিসেব আর দেবো কী করে? পুরোটা তো গোনাই হল না”।

“হুঁ। আপনি এ কাজ আর করবেন না বলাতে আপনার দাদা কী বলল?”

“বললেন, আমি থাকতেও তুই ভয় পেয়ে গেলি রে, শশী? চেনাশোনা বিশ্বস্ত লোক বলে তোকে ভরসা করেছিলাম। এখন দেখি কাকে আবার পাই। এত টাকা আমার বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয়। তাছাড়া যারা টাকা পাঠায় তারা ঠিকঠাক দিচ্ছে কিনা, সেটাও তো চেক করা দরকার। তোর চেনাশোনা কেউ যদি থাকে, দেখিস তো। তবে সে যেন বেশ ডাকাবুকো লোক হয় - তোর মতো ভিতু হলে চলবে না”।

“আচ্ছা? আপনি কী বললেন?”

“বললাম, বিশ্বাসী লোক হলে নিশ্চয়ই জানাবো দাদা”।      

“আশা করি, ভবিষ্যতে এরকম ফাঁদে আর কখনো পা দেবেন না। বাড়ি যান – উটকো দুটো পয়সার লোভে সংসারের শান্তি নষ্ট করবেন না”।

“না স্যার, খুব শিক্ষা হয়েছে আর ও পথে যাব না। আমি তবে আসি, স্যার”?

“না দাঁড়ান। বসুন, চা খান। আমার আরও কিছু কথা আছে”।  

চা আসার পর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শশীবাবু বললেন, “একটা কথা জিগ্‌গেস করব স্যার”।

সুনন্দবাবু আবার ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন, কিছু বললেন না।

“না ইয়ে মানে, আপনি বড়দার নাম জিজ্ঞাসা করলেন না তো”?

“শশীবাবু, দেওয়ালেরও কান থাকে – আপনার মুখ থেকে শুনতে গিয়ে – যদি সে নাম পাঁচ কান হয়ে যায়? আপনার বড়দার নাম আমাদের জানতে বাকি নেই…”।

বিগলিত হেসে শশীপদবাবু বললেন, “সে তো বটেই স্যার। আরেকটা কথা - আপনার সেই লোকদের কথা শুনলাম পষ্টো, কিন্তু দেখতে পেলাম না কেন? আর তাঁরা বন্ধ দরজা দিয়ে ঢুকলেনই বা কী করে?”

খুব গম্ভীর গলায় সুনন্দবাবু বললেন, “তারা সব ভীষণ ট্রেনিং পাওয়া লোকজন – আমরাও সবসময় তাদের হদিশ পাই না…। এর বেশি কিছু বলা যাবে না। এবার আমার কিছু কাজ আপনাকে করে দিতে হবে। যে কাজের কথা বলব, সে কথা আমরা দুজন ছাড়া অন্য কেউ যেন জানতে না পারে। পাঁচকান হলে কিন্তু আপনিই ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবেন”।

“আপনি নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারেন স্যার, কাকপক্ষিও টের পাবে না”।      

সুনন্দবাবু টেবিলের ওপর ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে শশীবাবুর সঙ্গে গোপন কথাবার্তা শুরু করলেন। কিছুই শোনা গেল না। মিনিট কুড়ি পর, শশীবাবু সুনন্দবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

৩ 

সুরেশ তোপদারকে এ তল্লাটের রাজাই বলা যায়। মাথায় তাঁর রাজমুকুটটাই যা নেই। সকালবেলায় তিনি তাঁর বাড়ির সামনের বাগানে বসে এক পট চা খান। যে সে চা নয় – দার্জিলিংয়ের খাঁটি কুয়াশা মেশানো চা। সকালের স্নিগ্ধ রোদ্দুরে, তিনি জানেন, বাগানের সবুজ ঘাস আর গাছপালা থেকে প্রচুর অক্সিজেন বের হয়। তার সঙ্গে মেশে নানান ফুলের বিচিত্র সুবাস। আরাম কেদারায় বসে সকালটা তিনি এভাবেই উপভোগ করেন। এরপর সারাদিন – সেই রাত দশটা, সাড়েদশটা অব্দি - তিনি চরম ব্যস্ত থাকেন। এই অঞ্চলের নানান মঙ্গল ও উন্নয়নের কাজে। নানান রকমের মিটিং, সভা, সমাবেশ তো সারাদিন লেগেই থাকে।

এই সময় কোন কাজের লোকের সঙ্গে তিনি দেখা করেন না। তাঁর দেহরক্ষী ও বাড়ির পাহারাদারদের এই বিষয়ে তাঁর কড়া নির্দেশ আছে। তবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই তা নয়। যেমন কোন কোন দুঃস্থ, দীন-দুঃখী মানুষকে তিনি দেখা করার অনুমতি দেন। কারণ, এই সময় কিছু দান-টান করলে, তিনি দেখেছেন, মনটা বেশ হাল্কা ফুরফুরে হয়ে যায়। নিজেকে বেশ “মহানুভব” মনে হয়। যেমন, কোন মেয়ের বিয়ের জন্যে হয়তো সেই মেয়েটির বাবার টাকার অভাব হচ্ছে। কিংবা কোন ছেলে বা মেয়ে হয়তো তার অসুস্থ মা বা বাবার চিকিৎসার জন্যে টাকা যোগাড় করতে পারেনি। এরকম আর কি। তাঁর কর্মসচিব অবিশ্যি সব দুঃখী লোককেই সুরেশবাবুর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয় না। তার আগে সে লোকটির সব কথা শোনে, তার বাড়িঘর, তার পরিবার সম্পর্কে খুঁটিয়ে সমস্ত খবর নেয়। সেই সব জেনে কর্মসচিব যদি সন্তুষ্ট হয়, তবেই তার সুরেশবাবুর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি মেলে।

এই যেমন আজ সকাল ছটা নাগাদ ঢ্যাঙা রোগা চেহারার একজন লোক খুব কাঁচুমাচু মুখ করে সুরেশবাবুর বাড়ির মেনগেটে উপস্থিত হল। পাহারদার দুজন গ্রামভারি গলায় হুঙ্কার দিল, “ক্যা মাংতা? ভাগো হিঁয়াসে”। লোকটি হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে গেটের সামনেই বসে পড়ল। পাহারাদার দুজন বেজায় ঝামেলায় পড়ল। তারা কিছুক্ষণ তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল, কেন কাঁদছে জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু লোকটির সেই একই উত্তর, ভেউ ভেউ করে কান্না। পাহারাদার দুজন গেটের পাশের গুমটি থেকে ফোন করল কর্মসচিবকে। কর্মসচিব দীননাথবাবু ধীরেসুস্থে এগিয়ে এলেন মেন গেটের কাছে। তিনিও লোকটিকে ধমকে বললেন, “এই যে শুনছেন, কী হয়েছে কি? সকাল বেলা এখানে কেন কাঁদতে এসেছেন? সরে যান গেট থেকে, তা নইলে পুলিশ ডাকব”।

এবার লোকটি মুখতুলে তাকাল, দুচোখ বেয়ে তখনও তার জল ঝরছে। জোড়হাত করে লোকটি কান্নাভেজা গলায় বলল, “বাবু আমার একটি মাত্র মেয়ে। সামনের ফাল্গুনে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

“সে তো খুব আনন্দের কথা। কিন্তু এখানে এসে সকাল সকাল মড়াকান্না জুড়লেন কেন?”

লোকটি কান্নাভেজা গলায় যা বলল, তার সারাংশ হল, লোকটি মেয়ের শাড়ি, জামা, সামান্য কিছু গয়না কেনার মতো টাকা যোগাড় করে ফেলেছে। সে টাকায় জামাইয়ের জন্যে সোনার আংটি কেনাও হয়ে যাবে। যদিও পাত্রপক্ষের কোন দাবিদাওয়া নেই, কিন্তু তাদের একটাই আবদার। বরযাত্রী আসবে পনের জন, তাদের যেন ঠিকঠাক সমাদর করা হয়। লোকটি তারপর করুণ মিনতি নিয়ে বলল, তার নিজের আত্মীয়-কুটুম মিলে সত্তর-পঁচাত্তর জন হবে। তার ওপর পনেরজন বরযাত্রী। সব মিলিয়ে এই আশি-নব্বুই জনের খাওয়ার আয়োজন করার মতো সংস্থান তার কিছুতেই হচ্ছে না। বড়োবাবু যদি কিছু একটা সুরাহা করে দেন, চিরজীবনের মতো সে কৃতজ্ঞ থাকবে। এবং যে ভাবেই হোক, বড়োবাবুর এই ঋণ সে ধীরে ধীরে শোধও করে দেবে”।

দীননাথবাবু লোকটির সবকথা শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার নাম কি? বাড়ি কোথায়?”

লোকটি হাতজোড় করে বলল, “প্রতিপদ মণ্ডল। বাড়ি তেহাটা, গোবিন্দপুরে”।

নামটা শুনে দীননাথবাবুর মনে পড়ল, বড়োবাবু গতকাল সন্ধেতে এই লোকটির কথাই বলেছিলেন। আজ সকালে দেখা করতে আসবে। দীননাথবাবু দারোয়ানদের গেট খুলে দিতে বলে, প্রতিপদকে বললেন, “আপনি ভেতরে আসুন”।

 সুরেশবাবুর সামনে প্রতিপদকে নিয়ে গিয়ে দীননাথবাবু নিচু হয়ে বললেন, “স্যার, গতকাল সন্ধেয় যার কথা বলেছিলেন, সেই প্রতিপদবাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন”।

সুরেশবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে এক ঝাঁক পায়রার ওড়াউড়ি দেখছিলেন, চোখ নামিয়ে প্রতিপদকে নিরীক্ষণ করে বললেন, “অ এই সেই প্রতিপদ মণ্ডল? আচ্ছা, তুমি এখন যাও, দরকার পড়লে আমি ডাকব। দাঁড়িয়ে রইলে কেন প্রতিপদ, বসো”।

প্রতিপদ মাথা নিচু করে নমস্কার করল সুরেশবাবুকে, বলল, “আমি এই বেশ আছি, বড়োবাবু। তবে আপনার আদেশ অমান্য করতেও সাহস হয় না...” বলে সে ঘাসের উপর উবু হয়ে বসল।

“তোমার নাকি মেয়ের বিয়ের জন্যে কিছু টাকার ঘাটতি হচ্ছে? শশীবাবু আমায় কাল ফোন করেছিল”।

“শশীবাবু আমাকে খুবই স্নেহ করেন, বিশ্বাসও করেন, বড়োবাবু। আমার দুঃখের কথা শুনে বললেন, বড়োবাবুর দয়ার শরীর তাঁর কাছে সব কথা খুলে বল, তিনি কিছু একটা সুরাহা করে দেবেন”।

প্রতিপদের কথায় সুরেশবাবু খুবই খুশি হলেন, বললেন, “শশী তোমাকে আর কিছু বলেনি?”

“আজ্ঞে বলেছেন বৈকি। বলেছেন, আপনার গৃহে মা লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান। তাঁর কৃপা নগদ টাকা হয়ে নেমে আসে আপনার এই বৈকুণ্ঠে। সেই বিপুল অর্থের কিছুদিনের সুরক্ষা আর হিসেব রাখার দায়িত্ব পেলে আমার দুহিতার বিবাহটি সুসম্পন্ন হয়”।

প্রতিপদের চেহারাটা সুরেশবাবুর তেমন পছন্দ হয়নি। তবে তার বিনয়ী কথাবার্তায় তিনি খুবই খুশি হলেন। মনে হল, এ লোককে দিয়ে তাঁর কাজ হবে। বেশ বুদ্ধিমান, কথাবার্তা বলতে জানে এবং বিনয়ী। শশী বিশ্বাসী বটে কিন্তু একটু মাথামোটা আর ভিতু। শশীর থেকে সব কথা শুনেও, লোকটি ভয় পায়নি, অতএব ধরে নেওয়া যায় লোকটির সাহসও আছে।

সুরেশবাবু যতক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে এসব চিন্তা করছিলেন, প্রতিপদ জোড় হাতে ধৈর্য ধরে বসে রইল একই ভাবে। কিছুক্ষণ পর সুরেশবাবু বললেন, “দেখ, প্রতিপদ টাকার অঙ্কটা একটু বেশিই। শশী আমাকে ফেরত দিয়েছে, ছেচল্লিশ লক্ষ পঁচাত্তর হাজার টাকা। গত দুদিনে আমার কাছে আরও এসেছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। আমার লোক গিয়ে এই সমস্ত টাকাই তোমার বাড়িতে পৌঁছে দেবে। টাকা গোনার মেশিনও দিয়ে আসবে। কিন্তু তোমার বাড়িতে নিরাপদ ঘর আছে তো? বুঝতেই পারছো, এতগুলো টাকা”।

প্রতিপদ খুব সঙ্কোচের সঙ্গে বলল, “আজ্ঞে বড়োবাবু, আপনি আমার এখনকার অবস্থা দেখে মনে হয় দুশ্চিন্তা করছেন। আমার ঠাকুরদা জমিদারবাবুর নায়েব ছিলেন এবং বিস্তর অর্থ কামিয়েছিলেন। তিনিই আমাদের দোতলা দালান বাড়িটি বানিয়েছিলেন। সে বাড়ির নিচেয় একটি চোরা কুঠুরি আছে। সে ঘরটির কথা বাইরের লোকজন তো দূরস্থান, আমার পরিবারেও তেমন কেউ জানে না। ঘরটি আমার শোয়ার ঘরের লাগোয়া – ছোট্ট ঠাকুর ঘরের নিচে। সে ঘরের কথা জানেন আমার বাবা, আর আমি”।

নিজের বাড়িতে এত টাকা জমিয়ে রাখা সুরেশবাবুর কাছে অতীব বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাঁর বাড়িতে হরেক লোকের আনাগোনা। সকলেই যে তাঁর শুভার্থী এমনও নয়। কার মনে কী আছে, কবে কী বিপদ ঘটিয়ে দেয়। সেই দুশ্চিন্তা তাঁর মাথায় সর্বদাই ঘুরছে। প্রতিপদের কথার সবদিক বিবেচনা করে তিনি বললেন, “প্রতিপদ আমার গাড়ি গিয়ে তোমার বাড়িতে সবকিছু পৌঁছে দিয়ে আসবে। এখনই যাবে? নাকি পরে? কখন তোমার পক্ষে সুবিধে হয়?”

“আজ্ঞে আধঘন্টা বাদে যদি আপনার গাড়ি পাঠান”।

“তুমি গাড়িতে না গেলে তোমার বাড়ি চিনবে কী করে?”

“না, বড়োবাবু, আপনার গাড়ি এ তল্লাটে সবাই চেনে। সে গাড়ি আমার বাড়ির সামনে গেলে, সবারই কৌতূহল হবে”। সুরেশবাবু বেশ আশ্চর্য হলেন প্রতিপদের বিচক্ষণতায়। জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে?”

“বুড়িমাতলার মোড়ে আপনার গাড়িটাকে একটু দাঁড়াতে বলবেন, চোখের নিমেষে আমি পাচার করে দেব”।

সুরেশবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, “কিন্তু ওর পাশেই তো থানা!”

প্রতিপদ নিশ্চিন্ত মুখে বলল, “আজ মঙ্গলবার। বুড়িমায়ের কাছে পুজো দিতে যাওয়া ভক্তদের আজ খুব ভিড় হয়। ওই ভিড়ে কার গাড়ি, কিসের গাড়ি, কোথাকার জিনিষ কোথায় যাচ্ছে, কেউ লক্ষ্য করার আগেই, আমি কাজ সেরে ফেলব, বড়োবাবু। কিচ্ছু ভাববেন না”।

সুরেশবাবুর একটু দুশ্চিন্তা যে হচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু প্রতিপদের বিচক্ষণতার দিকটা বিবেচনা করে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, “ঠিক আছে, ওই কথাই রইল। নীলরঙের ০০০২ নাম্বারের গাড়িটা আমার ড্রাইভার জেবর সিং নিয়ে যাবে। খুব বিশ্বাসী ছেলে। ওকে বলব, বুড়িমাতলায় আটটাপাঁচ-দশ নাগাদ যেন পৌঁছে যায়”।

প্রতিপদ উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাতে নমস্কার করে বলল, “তাহলে এখন আমি আসি, বড়োবাবু? আমাকে যেভাবে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করলেন, আপনার এই করুণার কথা আমি আমরণ ভুলতে…” প্রতিপদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, চোখের কোলে জল জমে উঠল।

সুরেশবাবু গদ্গদ স্বরে বললেন, “ও ভাবে বলতে নেই, প্রতিপদ। করুণা করছেন ওপরওয়ালা, আমি তো তাঁরই সেবক…আচ্ছা এসো তাহলে”?  

৪ 

ড্রাইভার জেবর সিং বুড়িমাতলার মোড়ে নীল রঙের ০০০২ নাম্বারের গাড়িটা পৌঁছল পাক্কা আটটা দশে। বিশাল ও প্রাচীন বটগাছের ঝুড়ি দিয়ে ঘেরা মায়ের প্রাকৃতিক মন্দির। মায়ের প্রতিমা বলতে লালপাড় শাড়ি পরানো বেশ বড়োসড়ো একটি কালো পাথর। তার গায়ে তিনটি চোখ আঁকা। ফুলের মালা, কুচো ফুল আর তেলসিঁদুরে মায়ের মূর্তি আজ প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। আজ মঙ্গলবার বলে ভক্ত সমাগমও হয়েছে বিস্তর। গোটা রাস্তাটিই ভক্তজনেরা অধিকার করে রেখেছেন। বক্সে গমগম করে গান বাজছে, “জয় জগদম্বে মাতা…”।

নীলগাড়িটা এসে দাঁড়াতেই চারজন ভক্ত গাড়িটা ঘিরে দাঁড়াল। ডানপাশের একজন জানালায় টোকা মেরে ইশারায় বলল, গাড়ির কাচ নামান। জেবর সিং গাড়ির কাচ আধখানা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে?”

ডানপাশের লোকটি একটু ধমকের সুরে বলল, “হবে আবার কী? গাড়ির দরজা খোল”।

জেবর সিং বিপদের গন্ধ পেয়ে বলল, “কেন? এটা সুরেশস্যারের গাড়ি, পুজো দিতে এসেছি”।

ডানপাশের লোকটি নিমেষের মধ্যে একটি রিভলবার হাতের আড়ালে ধরে, খুব বিনয়ী সুরে বলল, “হতভাগা সেই জন্যেই তো বলছি, দরজাগুলো খোল। আমরাও পুজো দেব। বুড়িমা রক্তপাত একদম পছন্দ করেন না। জানিস তো?”

জেবর সিং রিভলবার দেখে কিছু বলতে পারল না। গাড়ির লক খুলে দিল, এবং চারজন লোক চটপট উঠে পড়ল গাড়ির ভেতর। ড্রাইভারের পাশে এসে যে লোকটি বসল, সে বলল, “গাড়ি স্টার্ট কর। তার আগে তোর মোবাইল ফোনটা দিয়ে দে। কটা ফোন তোর - একটা না দুটো?” জেবর সিং দুটো ফোন ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিতে ভদ্রলোক বললেন, “নে গাড়ি স্টার্ট কর…সুরেশস্যার ড্রাইভারদের কত মাইনে দেয় রে? দু-দুখানা স্মার্টফোন! পুলিশে চাকরি করে আমাদের একটা ফোন…”।

ভিড়ের মধ্যে হর্ন দিতে দিতে নীল গাড়িটা খুব ধীরে ধীরে মোড়টা পেরিয়ে এল। পাশের ভদ্রলোকটি বললেন, “থানা চিনিস তো? থানার মধ্যে ঢুকিয়ে দে গাড়িটা”।

থানার কম্পাউণ্ডের মধ্যে ঢুকতেই। ড্রাইভারের পাশের লোকটি গাড়ির চাবিটা খুলে নিল, তারপর চারজন একসঙ্গে ঝটপট নেমে, জেবর সিংকে টেনে গাড়ি থেকে নামাল।

জেবর সিং তেমন বাধা না দিলেও প্রতিবাদ করে বলল, “লেকিন হামারা কসুর কেয়া হ্যায়”?

পেছন থেকে একজন ভদ্রলোক বলল, “হতভাগা, অসুর বলছে মেরা কসুর ক্যা হ্যায় – পালাবার বা কোনরকম বাঁদরামি করার চেষ্টাও করিস না। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবি”।

ছোটবাবু সুনন্দ হাজরা থানার বারান্দা থেকে নিচেয় নেমে এলেন, জেবর সিংকে দেখলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “এটাকে ঝটপট লকআপে ভরে গাড়ি খালি করো। টাকার ব্যাগগুলো ভল্টে রেখে, চলো তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। এটা তো মোটে পুঁটি – রাঘব বোয়ালটাকে ধরতে হবে”।

জেবর সিংকে লক আপে ভরে এবং টাকার ব্যাগ থানার ভল্টে রেখে, সকলে আবার বেরিয়ে এলেন। বড়ো ভ্যান গাড়িতে চারজন অফিসার এবং চারজন হাবিলদারকে নিয়ে, সামনের সিটে বসলেন সুনন্দ হাজরা। গাড়ি স্টার্ট হতেই, সুনন্দবাবুর ফোন বাজল। সর্বজিতের ফোন। কানেক্ট করে সুনন্দবাবু বললেন, “বলো, আমি একটু ব্যস্ত”।

“জানি তো, রাঘব বোয়ালটাকে ধরতে যাচ্ছেন। ভাববেন না, বাড়িতেই আছে, এখনও কিছু টের পায়নি”।

“কিন্তু তুমি কী করে টের পেলে?”

“সে আপনি জানেন কাকু। আমার ছেলেরা বদমাস লোকের সন্ধান পেলে, সহজে ছাড়ে না। তবে আজ সকালে রাঘবোয়ালের সামনে আপনি ছদ্মবেশে যা অভিনয় করেছেন শুনলাম…শুনে আমি আপনার ভক্ত হয়ে উঠেছি”।

“তাই? শুনে খুশি হলাম। কিন্তু তুমি কি সারাক্ষণ আমার পেছনে তোমার সেই ছেলেদের লাগিয়ে রেখেছ?”

“না, না। রাঘববোয়ালটা ধরা পড়লেই ওরা সরে যাবে। গুড লাক, কাকু। রাখছি”।

“থ্যংক ইউ ভাই”।  সুনন্দবাবুর ফোনটা অফ করে মৃদু হাসলেন, এরকম সাহায্য পেলে দেশের সব বদমাসকে তিনি অচিরেই শায়েস্তা করতে পারবেন। সুরেশবাবুর বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্যানটা তীব্র হর্ন দিল। তারপর ভ্যান থেকে সদলবলে নেমে, সুনন্দবাবুরা নিজেরাই মেনগেট খুলে ঢুকে পড়লেন সুরেশ তোপদারের বাড়িতে।     

 --০০--


নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা...