মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২০"]


৫.৬.৩ তন্ত্র ধর্মের উৎপত্তি

শিব এবং শক্তির পূজা ভারতের প্রাচীনতম পূজা পদ্ধতি, ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে এঁনাদের সকলেই অনার্যদের মাতৃকা দেবী এবং বেশ কিছু অনার্য গোষ্ঠীর মধ্যে এঁদের পূজার যে বহুল প্রচলন ছিল, তার প্রত্ননিদর্শণ পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতার অবশেষ থেকে। অনুমান করা যায় এই দেবীদের সকলেই নারী যোদ্ধা, হয়তো মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রধানা ছিলেন। অথবা বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইতে কোন গোষ্ঠীর অধিকাংশ পুরুষের মৃত্যু হওয়াতে, সেই গোষ্ঠীর নারীরাই ভয়ংকর যোদ্ধা হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। যার ফলে তাঁরা একটু বেশি মাত্রায় নৃশংস হয়ে, নরমুণ্ডমালিনী এবং হাতে রক্ত-ঝরা কাটা মুণ্ড ধারণ করেছিলেন।

ভারতের অনার্য মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃকুলীয় সমাজের অস্তিত্ব যে ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আজও মেঘালয়ের খাসি, জয়ন্তিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর মানুষদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। শোনা যায়, কেরালার নায়ার গোষ্ঠীর মানুষদের সমাজও মাতৃতান্ত্রিক ছিল। এই সমাজের মানুষদের, টিপু সুলতানের এতই উদ্ভট লেগেছিল, তিনি উঠে পড়ে লেগেছিলেন, এই গোষ্ঠীর মানুষদের নিকেশ করার জন্যে। এই নায়ার গোষ্ঠীর পুরুষরা কিন্তু যোদ্ধা হিসেবে দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনজাতি। এঁদের উপাস্য দেবতা ছিলেন নাগ বা সর্প। যে সাপ মহাদেব এবং দেবী তারার অঙ্গভূষণ। পৌরাণিক মতে, দেবী সতীর শবদেহের টুকরো থেকে যে একান্নটি শক্তিপীঠের সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলি ভারতের একান্নটি অনার্য অঞ্চলের মাতৃকাদেবী, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। তাঁরা সকলেই দেবী সতীর বিভিন্ন রূপ হয়ে হিন্দুধর্মে অন্তর্ভুক্তা হয়েছেন।

তন্ত্রপুজোর প্রচলন অতি প্রাচীন। আগেই বলেছি, প্রাথমিক ভাবে তাঁদের পুজোর উপচার এবং পদ্ধতি খুবই সরল ছিল। উপচারের মধ্যে ছিল ফুল-পাতা। নৈবেদ্যর মধ্যে ছিল, মানুষের যা যা খাদ্য তার সবকিছুই। ফলমূল, মিষ্টান্ন, ভাত-ডাল-সব্জি-মাছ-মাংস, সাধারণ মানুষের যা যা প্রিয় খাদ্য, সবই দেবতার নৈবেদ্য। আর মন্ত্র ছিল দেবতার কাছে মনের যাবতীয় ইচ্ছে বা স্বপ্ন নিবেদন। এই পূজায় তাঁরা কিছু প্রতীকও ব্যবহার করতেন, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আকার, স্বস্তিক এবং নানান চিত্রলিপি – যা দিয়ে প্রকৃতিকে চিনে নেওয়া যায়, যেমন পর্বত, গাছ, গাছের পাতা – অশ্বত্থের পাতা, নদী, নানান পশু-পাখির আকার, এমনকি মানুষের আকারও। এই প্রতিটি প্রতীকেরই নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নাবশেষ থেকে।

অনার্য দেবদেবী এবং তাঁদের পূজাপদ্ধতি হিন্দু ধর্মে অন্তর্ভুক্তির সময়েই তাত্ত্বিক তন্ত্র শব্দের উৎপত্তি হল। সংস্কৃত এই শব্দটির উৎপত্তি, পণ্ডিতেরা বলেন, যে শব্দ থেকে তন্তু এবং তাঁত শব্দের উৎপত্তি, সেই শব্দ থেকে। অর্থাৎ এই অর্থ ধরলে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনে ওতপ্রোত জড়িত বিভিন্ন পূজাপদ্ধতির তত্ত্ব নিয়ে বুনে তোলা একটি তত্ত্বই তন্ত্র। আবার অনেকে বলেন, তত্ত্ব আর মন্ত্র নিয়ে তন্ত্র। অর্থাৎ অনার্যদের সাধারণ যে মনোবাসনার মন্ত্র ছিল তার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব জুড়ে তন্ত্র শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল।

আগেই বলেছি, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাথমিক স্তরে, জীবনের তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য ছিল, ধর্ম, অর্থ ও কাম। অর্থাৎ ধর্ম পথে থেকে সুস্থ জীবিকা উপার্জন করা আর সংসার জীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য কামনা, বাসনা উপভোগ করা। ব্রহ্মলাভ, ব্রহ্মজ্ঞ হওয়া বা মোক্ষলাভ বিষয়টা সাধারণের জন্যে নয়, সেটা ছিল তপস্বী বা সাধকদের জন্যে, যাঁরা জন সমাজের বাইরে - অরণ্যে তপস্যা বা সাধনা করে থাকেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ এবং জৈনধর্ম এই মোক্ষলাভ বা মুক্তি বিষয়টাকে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুললেন। সেই অনুসরণে ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতরাও মুক্তি বিষয়টিকে জীবনের লক্ষ্যে স্থির করে দিলেন, চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। বেদ ও উপনিষদে এই মোক্ষলাভের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করাই ছিল। পরবর্তী কালের হিন্দু পুরাণকাররা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চতুর্বর্গ এবং উপনিষদের মোক্ষলাভের সাধনার পথই অনুসরণ করলেন, একটু অন্যভাবে। ভাগবত ধর্মে বিষ্ণু এবং শৈবধর্মে শিব হলেন পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম। ব্রহ্মত্ব-লাভের মতো বিষ্ণুত্ব-লাভের জন্যে ভক্তি সাধনার কথা আগেই বলেছি, এবার তন্ত্রমতে শিবত্বলাভের সাধনার কথা বলব।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তন্ত্র বা শক্তি সাধনায় তো দেবীদের প্রাধান্য, সেখানে দেবীত্ব লাভ না হয়ে শিবত্ব লাভ হবে কেন? এর উত্তর, এই সাধনায় দুটোই হবে। কারণ দেবীরা হলেন আদ্যাশক্তি প্রকৃতি - মহামায়া, আর শিব হলেন পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম। সাধনার উচ্চতম স্তরে অনুভব করা যাবে শিব ও শক্তি –অর্থাৎ পরমপুরুষ ও পরমাপ্রকৃতি একাকার হয়ে আছেন।

তন্ত্রশাস্ত্রের বহু গ্রন্থের কথাই শোনা যায়, তার মধ্যে অধিকাংশই অবলুপ্ত হয়ে গেছে, আমাদের কাল পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে সবথেকে নির্ভরযোগ্য যে গ্রন্থটি তার নাম “মহানির্বাণ তন্ত্র”। এই গ্রন্থের লেখকের নাম পাওয়া যায় না, তবে এই গ্রন্থের সৃষ্টি কর্তা স্বয়ং শিব ও পার্বতী। তাঁদের ধর্মতত্ত্বের আলোচনা থেকেই তন্ত্রধর্ম সম্বন্ধে বিশদে জানা যায়।

 

৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব

তন্ত্রের শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে আলোচনার আগে, তন্ত্র সাধনতত্ত্ব বিষয়ে একটু বিশদে আলোচনা করা যাক, নচেৎ আধুনিক হিন্দুধর্মের ভিত যে তন্ত্রধর্ম সেটার উপলব্ধি অধরা থেকে যাবে।

আগেই বলেছি নানান তত্ত্ব ও মন্ত্র নিয়ে তন্ত্রের সৃষ্টি। তন্ত্র তত্ত্বের মূল সাংখ্য দর্শন, যার কথা আগেই বলেছি। পঁচিশটি তত্ত্ব নিয়ে যে সাংখ্য তত্ত্ব, সেখানে আমরা দেখেছি তার চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান সম্যক আয়ত্ত্ব করতে পারলে, পঁচিশতম তত্ত্বটি আপনিই উপলব্ধি করা যায়, সেই জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, পরমজ্ঞান।

তন্ত্র মতে এই চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান অর্জনের জন্যে নিবিড় আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজন, আর সেই সাধনার অন্যতম সহায় হল আধ্যাত্মিক কিছু শব্দের বারবার ব্যবহার – এই শব্দগুলিকেই বীজমন্ত্র বলে, যেমন, ওঁ, হ্রীং, ক্লীং, বষট্‌ ইত্যাদি। অতএব মন্ত্র দিয়ে যে তত্ত্বজ্ঞানের সাধনা, তাকেই তন্ত্র বলে। তন্ত্রদর্শন ছাড়া অন্য দর্শনে মন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে, কিন্তু এই মন্ত্র ছাড়া তন্ত্র অচল।

তন্ত্র-তত্ত্বের মূল কিন্তু বেদ, উপনিষদ এবং সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শন। বেদের কর্মকাণ্ডে যত যাগ-যজ্ঞের বিধিনিয়ম আছে, তন্ত্র-তাত্ত্বিকেরা নিজেদের মত করে সে সবই আত্মসাৎ করেছিলেন। উপনিষদের মূল বক্তব্য হল ত্যাগ এবং বিবেক বিচারে “নেতি” “নেতি[1]”  করতে করতে পরমার্থ লাভ। অর্থাৎ পার্থিব সব বিষয়কে ত্যাগ করতে করতে পরমার্থ সাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া। তন্ত্র এই বিষয়টিকেও তাঁদের তত্ত্বে যুক্ত করে নেওয়ায়, বৈরাগ্যও তন্ত্রের একটি তত্ত্ব হয়ে গেল। রাজযোগের যে দর্শন শরীর ও মনকে পবিত্র করা, তন্ত্র সেটাও গ্রহণ করেছে। পুরাণের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হল বৈধী ভক্তি এবং পরাভক্তি। বৈধী ভক্তি আনুষ্ঠানিক, যেমন গঙ্গা স্নান, তুলসী পাতা খাওয়া, চন্দনের তিলক আঁকা, ষোড়শোপচারে পূজা করা, ইত্যাদি। আর পরাভক্তি হল, ঈশ্বরে পরম আস্থা, অহৈতুকী নিঃশর্ত ভক্তি। তন্ত্র এই দুই ভক্তির মধ্যে পরাভক্তিকে গ্রহণ করেছে, তন্ত্রের ভক্তি ঈশ্বরকে নিবিড় ভালোবাসা। খুব সংক্ষেপে বললে, তন্ত্রতত্ত্ব অনুযায়ী, তন্ত্রসাধককে পার্থিব বিষয়সমূহ ত্যাগ করে সাধনা করতে হবে, ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে এবং আকুল ভক্তিতে ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থনা করতে হবে।

তন্ত্রমতে জীবনের উদ্দেশ্য ভোগ আর অপবর্গ। ভোগ মানে এই জগতের ভোগ আর অপবর্গ মানে মুক্তি বা মোক্ষ। এই ব্যাপারেও তন্ত্রের সঙ্গে বেদ বা মহাভারতের কোন পার্থক্য নেই। বেদ বা মহাভারত বলেছেন, জীবনের উদ্দেশ্য চারটে– ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ। তন্ত্র বলছে, মোক্ষ ছাড়া সবকিছুই ভোগ।

তন্ত্রমতে যাঁরা সাধনা করেন, একই সাধনায় তাঁরা ভোগ এবং অপবর্গ দুটোই পেতে পারেন, শুধু সংকল্প স্থির করতে হবে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে আমরা দেখি রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি একই দৈবীসূক্তম্‌ মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। দীর্ঘ সাধনার পর দেবী শ্রীচণ্ডী দুজনকেই বর দিতে আবির্ভূতা হলেন। রাজা সুরথ বললেন, আমি সমগ্র ভূমণ্ডলের রাজা হতে চাই, দেবীর বরে তিনি তাই হলেন, অর্থাৎ রাজা সুরথের ভোগ লাভ হল। অন্যদিকে বৈশ্য সমাধি বললেন, আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু মুক্তি চাই, দেবী তাঁকে মুক্তিই দিলেন, অর্থাৎ তাঁর অপবর্গ লাভ হল। অতএব তন্ত্রমতে মন্ত্র এবং সাধনা একই থাকবে, শুধু সংকল্প স্থির করতে হবে। পুরাণের থেকে তন্ত্রের আরেকটি পার্থক্য হল, পুরাণে অনেক ক্ষেত্রেই বলা আছে, ঈশ্বরের অহেতুক করুণা বা কৃপা হলেও মুক্তি হয়ে যায়। যেমন অজামিলের কাহিনী আছে, অজামিল জীবনে কোনদিনই সাধনা-টাধনার ধার ঘেঁষেননি, তিনি শুধু নিজের পুত্রের নাম রেখেছিলেন “হরি”। মৃত্যুকালে তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে পুত্র হরিকে ডেকেছিলেন, “হরি, ও হরি, আমার পাশটিতে একবার আয়” - তাতেই অজামিলের মুক্তি হয়ে বৈকুণ্ঠলোক লাভ হয়েছিল, কারণ তিনি মৃত্যুকালে “হরি” নাম করেছিলেন! তন্ত্র এই ফাঁকি স্বীকার করে না।

তন্ত্র সাধন তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রাণবায়ু বা প্রাণ এবং নাড়ী।  উপনিষদ বলছে, প্রাণ পাঁচটি – অপান, প্রাণ, সমান, ব্যান, উদান। পায়ু ও উপস্থে যে প্রাণবায়ু অবস্থান করে, তার নাম অপান। চোখ, কান, নাক ও মুখে প্রাণ অবস্থান করে এবং দুইয়ের মাঝখানে অর্থাৎ নাভি মণ্ডলে অবস্থান করে সমান। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তাকে পরিপাক করে, শরীরে শক্তি ও পুষ্টি বিধান করে সমান বায়ু।  আমাদের আত্মা অবস্থান করেন আমাদের হৃদয়ে। সেই হৃদয়ে একশ একটি নাড়ী আছে, সেই নাড়ীর প্রত্যেকটিতে আবার একশটি করে শাখা নাড়ী আছে। প্রত্যেক শাখা নাড়ীতে আছে বাহাত্তর হাজার করে প্রতিশাখা নাড়ী। তার মানে আমাদের সারা শরীরে মূল নাড়ী ১০১টি; শাখা নাড়ী = ১০১ x ১০০ = ১০,১০০;  প্রতিশাখা নাড়ী = ১০,১০০ x ৭২০০০ = ৭২,৭২,০০,০০০। অতএব মোট নাড়ী সংখ্যা = ৭২,৭২,১০,২০১![2] এই সমস্ত নাড়ীর মধ্যে অবস্থান করে ব্যানবায়ু অর্থাৎ আমাদের সারা শরীরেই ব্যানবায়ু ব্যাপ্ত রয়েছে। এর মধ্যে মূলনাড়ীর ঊর্ধমুখী একটি নাড়ীতে উদান বায়ু অবস্থান করে, এই উদানবায়ুই আমাদের পুণ্যকর্ম থেকে পুণ্যলোক, পাপকর্ম থেকে পাপলোক এবং উভয়কর্ম থেকে মনুষ্যলোক প্রাপ্ত করায়। ঊর্ধমুখী ওই নাড়ীকেই তন্ত্রে সুষুম্না বলে।

তন্ত্র সাধন পদ্ধতিতে প্রাণায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের ভিতরে প্রাণবায়ু গ্রহণ অর্থাৎ পুরক, শরীরে তাকে রুদ্ধ করা অর্থাৎ কুম্ভক এবং শরীর থেকে সেই বায়ু ত্যাগ করা অর্থাৎ রেচকের পদ্ধতিকেই প্রাণায়াম বলে। তন্ত্রে তিনটি নাড়ীও খুব গুরুত্বপূর্ণ – ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। মেরুদণ্ডের কেন্দ্রে যে সূক্ষ্মনাড়ী তার নাম সুষুম্না, তার বাঁয়ে থাকে ইড়া আর ডানদিকে পিঙ্গলা। সুষুম্নার শুরু মূলাধার থেকে – মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে গুহ্যের কাছাকাছি জায়গায়। আবার এই মূলাধারেই থাকে কুণ্ডলিনীশক্তি। তন্ত্র মতে আমাদের সাধারণ অবস্থায় এই কুণ্ডলিনীশক্তি সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, সেই সময় মানুষের মন সুখ-দুঃখ-শোক-আনন্দ-কামনা-বাসনায় জর্জরিত থাকে। সাধনা শুরুর সঙ্গে এই কুণ্ডলিনী জেগে ওঠে এবং সুষুম্না পথে ওপরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

চলবে...



[1] সন্ধি বিচ্ছেদে নেতি শব্দ হয় ন + ইতি। অর্থাৎ সাধক নিজের চারপাশে এবং তাঁর অন্তরেও ব্রহ্মের স্বরূপ সন্ধান করতে একেকটি বিষয় চিন্তন করবেন, আর একসময় উপলব্ধি করবেন, না এটি নয় – ন ইতি। এইভাবেই ধীরে ধীরে তিনি পৌঁছে যাবেন তাঁর লক্ষ্যে এবং যখন উপলব্ধি করবেন,  “এই আত্মাই ব্রহ্ম” অথবা “আমিই ব্রহ্ম” তখনই তাঁর মোক্ষ ঘটে যাবে।       

[2] প্রশ্নোপনিষদ – তৃতীয় প্রশ্নের ৫ থেকে ৭ সংখ্যক শ্লোক – অনুবাদঃ লেখক।


সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৮

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৭"


২৮

সুনুদা,

এপ্রিলের সেই তারিখটা আমার আজও মনে আছে। বাম্বাইকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে এসে, গাড়িতে চড়ে যখন এনজিপি স্টেশনের দিকে রওনা হলাম, এতটুকু কান্না পায়নি, জানো? বুকের ভেতরে শুধু অনুভব করেছিলাম, ধূ ধূ মরু প্রান্তর। সীমাহীন শূণ্যতা – নির্জনে আমি একা – কেউ রইল না আমার কাছাকাছি। হয়তো এক বুক কাঁদতে পারলে কিছুটা হাল্কা হতাম। কতদিন ছোট-বড়ো নানান ঘটনায় কতবার চোখের জল ফেলেছি। সেদিন মনে হয়েছিল, তুচ্ছ কারণে অপচয় হয়ে যাওয়া সেই সব অশ্রু, আমাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে বোধ হয়। সেই কারণেই আজ বাম্বাইকে ছেড়ে এসে, বুকের ভেতরে যখন তপ্ত বালুর ঝড়, তখন একবিন্দু অশ্রুও ঝরল না।

গাড়িতে পাশে বসে শশাঙ্ক বেশ কয়েকবার বলেছিল, “মন খারাপ করবেন না, সুকন্যা। ছেলের মঙ্গলের জন্যে মা হয়ে যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। দেখবেন সুধন্বা একদিন অনেক বড়ো হবে, সফল হবে। সেদিন ছেলের গর্বে আপনি খুশি হবেন খুব। তার জন্যে আজকের এইটুকু ত্যাগের কষ্ট তো আপনাকে মেনে নিতেই হবে। মনকে শক্ত করতেই হবে”।

ভবিষ্যতের কথা কে জানে, সুনুদা? বর্তমানকে পাশে সরিয়ে রেখে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা কত কী না করি। আমিও আজ যেমন করলাম। ভবিষ্যতে কী হবে কিছুই জানি না, কিন্তু সেদিনের বর্তমানটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল।

মনে আছে সারাটা রাস্তা – সেই কার্সিয়াং থেকে কলকাতা – একটা কথাও বলিনি। শশাঙ্ক যখন আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিল, আমি খুব শান্ত কণ্ঠে শশাঙ্ককে বলতে পেরেছিলাম, “কিছুই ভালো লাগছে না শশাঙ্কবাবু, মনটা একদম ভালো নেই...। কালকে অফিসে কথা হবে”।

শশাঙ্ক গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে আমি বাড়ির কলিং বেল দেওয়ার একটু পরেই মা দরজা খুললেন। মায়ের মুখ ভয়ংকর গম্ভীর। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, কেমন আছে মা?”

“ভালই আছে। তুমি তো আমাদেরই শান্তির জন্যে বাম্বাইকে বাড়ি ছাড়া করলে। ভালো না থেকে আমাদের আর উপায় কি? আর শান্তি মানে যে শাস্তি পাওয়া – সে এই বুড়ো বয়সে এসে তোমার থেকেই জানলাম, মা”।

মায়ের এই অবুঝ বিরক্তি এবং শ্লেষে আমি যে কতখানি আঘাত পেলাম, সেটা মা বুঝলেন না। বোঝার চেষ্টাও করলেন না। অবশ্য মাকে দোষই বা দিই কেন? বাবার চরম অসুস্থতা তাঁকে দুশ্চিন্তার শেষ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। তার ওপর আমার মতো মেয়ে, দুজনে মিলে একসঙ্গে যাকে আদরে-যত্নে মানুষ করে তুলেছেন ভেবে বড়ো আনন্দে ছিলেন। সেই মেয়ে যে একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে, আমৃত্যু তাঁদের ঘাড়ে বোঝা হয়েই থেকে যাবে, সে কথা তাঁরা ভুলে যাবেন কী করে? সব মিলিয়ে সে সময় মা কেমন যেন নিষ্ঠুর, রুক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।          

 মায়ের কথার উত্তর দেওয়া অর্থহীন, তাই দিলাম না। নিজের ঘরে ব্যাগ আর স্যুটকেশ রেখে এসে আমি বাবার কাছে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছো, বাবা?”  বাবা কোন উত্তর দিলেন না, বড়ো বড়ো চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে ডান হাতটা রাখলেন, আমার হাতে। বাবার হাতের সেই স্পর্শ আমার দু চোখে এনে দিল রুদ্ধ অশ্রুর বন্যা। মাথা নীচু করে বাবার হাতের ওপর আমার বাঁহাতটা রাখলাম। একটা কথাও না বলে, বাবা যে ভাবে সেদিন আমার প্রতি তাঁর সহমর্মীতা প্রকাশ করেছিলেন – সেকথা মনে পড়লে আজও আমার শরীরে আশ্চর্য এক শিহরণ জাগে। বিশ্বাস কর, সেদিনের কথা তোমাকে এই যে লিখছি, চোখে জল ভরে এসেছে... ঝাপসা হয়ে আসছে ল্যাপটপের পর্দা, কিবোর্ডের অক্ষর বিন্যাস...।

আসলে নিজের পারিবারিক বৃত্তের মধ্যেও একজন সুস্থ-সবল মানুষের কিছুতেই অহং যায় না। সে তার সন্তানের প্রতিই হোক, অথবা দাম্পত্যে, কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি কর্তব্যে। এমনকি সান্ত্বনা দেওয়ার সময়েও কথার আড়ালে ফুটে ওঠে তাদের সরব আত্মাভিমান। কিন্তু শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত একজন পরনির্ভরশীল মানুষই, সমস্ত অহংকার মুছে ফেলে সঠিক অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান পায়। নিকট জনের মর্মবেদনার কথা সে টের পায় নিজের মনের গভীরে। সমবেদনায় ব্যকুল হয়ে ওঠে তার মন, কিন্তু সেকথা সে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। আমার বাবার ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছিল বলেই আমার মনে হয়। আর সেই সময় বাবাই আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন ছায়াময় বিশাল এক বটবৃক্ষ। তিনি মুখে তেমন কিছু বলতে না পারলেও, তাঁর পাশটিতে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলেই মনের মধ্যে অনুভব করতাম তাঁর স্নেহ মাখা আশীর্বাদ।

আরেকজনের কথাও না বললেই নয়, মামিমা। মামারও তখন শরীর বেশ খারাপ – কিছু না কিছু অসুস্থতা তাঁর লেগেই ছিল - হাই ব্লাড প্রেসার, সুগার…সে সব তো আমার থেকে তুমিই ভালো জানো। আমি আর তোমাকে কী বলব? কিন্তু সেই সব কিছু সামলে কী আশ্চর্য ধীর-স্থিরই না তিনি থাকতে পারতেন! আবার সুযোগ পেলেই আমাদের বাড়ি চলে আসতেন, ঘন্টা দুই-তিনের জন্যে। মামিমাকে পেলেই মা আমার প্রতি তাঁর অনুযোগের ঝুলি খুলে উজাড় করে দিতেন। মামিমা শান্ত হয়ে অসীম ধৈর্যে সেসব শুনতেন – দু একটা মন্তব্য করতেন। সংসারের সারাদিনের উদ্বেগের বাষ্পে মায়ের মস্তিষ্কটি সেসময় যেন প্রেসার কুকার হয়ে উঠত। আর সেই প্রেসারটাকে রিলিজ করে মনকে একটু হাল্কা করার মানুষ ছিল তাঁর আদরের নাতিটি। কিন্তু তাকেও যখন আমি তাঁর অমতে বাড়ি ছাড়া করলাম, আমার ওপর তাঁর ক্ষোভ বাড়ল। এবং মনের কথা বলার জন্যে একমাত্র মানুষ রইলেন তোমার মা। মামিমা সেটা বুঝতেন, তাই প্রায় প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই চলে আসতেন দুপুরের দিকে। মায়ের সঙ্গে হাতে হাতে টুকটাক নানান কাজ সারতে সারতে, তিনি মায়ের কথা শুনতেন অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে।

আমিও সে সময় কম উদ্বেগে ছিলাম না। বাম্বাইকে একার সিদ্ধান্তেই কার্সিয়াং পাঠয়েছিলাম। এই সিদ্ধান্ত বাম্বাইয়ের পক্ষে ভালো হবে না মন্দ হবে, সে কথা তখন ভবিষ্যতের অন্ধকারে। যদি ভাল হয়, আমার মতো খুশি আর কেউ হবে না, কিন্তু মন্দ হলে বাম্বাইয়ের সঙ্গে আমার জীবনটাও যে নিঃশেষ হয়ে যাবে, সেটা নিশ্চিত ভাবেই জানতাম। এবং সেই দায় হবে পূর্ণতঃ আমারই।

দিনের অনেকটা সময় এই উদ্বেগ থেকে আমাকে মুক্তি দিত – আমার অফিস, আমার কাজ। কিন্তু দিনের শেষে ঘরে ফেরার কথা মনে হলেই, নিজেকে খুব ক্লান্ত আর একা মনে হত। আমি বাড়িতে ঢোকা মাত্র আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মায়ের একঘেয়ে অবিরাম অভিযোগের গজগজানি কানে আসত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এবং পরদিন সকালে। রোববার আর অফিসের ছুটির দিনগুলোতে বাড়িতে বসে থাকাটা আমার কাছে হয়ে উঠেছিল বিভীষিকা। ওই দিনগুলোতে তাই মাঝেমাঝেই মাকে মিথ্যে বলতাম। প্রচুর কাজ আছে, ছুটির দিনেও অফিস যেতে হবে বলে, আমি মামিমার কাছে সারাটা দিনে কাটিয়ে আসতাম। মামিমা আমার করুণ অবস্থাটা খুব ভালো ভাবেই বুঝতেন। তিনি কোনদিন মুখ ফস্কেও মাকে বলে ফেলেননি, “এই তো গত রোববার সুনু আমার কাছে গিয়েছিল”, কিংবা “ছাব্বিশে জানুয়ারির ছুটিতে একটা গাড়ি ভাড়া করে সুনু আমাদের দক্ষিণেশ্বর নিয়ে গেল”। বললে, কী যে ভয়ানক কাণ্ড হত, সে কথা ভাবলে আজও ভয় লাগে।

ওই সময় একমাত্র মামিমার কাছেই নিজের মনের কথা বলার সুযোগ পেতাম। বলা ভালো, মামিমাই আমার পেট থেকে অনেক কথা টুকটুক করে বের করে নিতে পারতেন।

বাম্বাইকে কার্সিয়াংয়ে রেখে এসে পরের রোববারেই মামিমার কাছে গিয়েছিলাম। দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে বললেন, “হ্যারে স্কুলে ভর্তি-টর্তি সব নির্বিঘ্নে হয়েছে তো? বাম্বাই খুব বেশি কান্নাকাটি বা মন খারাপ করেনি তো?”

“না গো, কান্নাকাটি একদমই করেনি। মন খারাপ তো একটু হবেই, তবে মনে হয় নতুন পরিবেশে ও মানিয়ে নেবে”।

“আর তুই?”

মামিমার এই প্রশ্নে, আমি হেসে ফেলেছিলাম। আর অনেকদিন পর আমি হাসতে পেরে, আমার মনটা যেন তুলোর মতো হাল্কা হয়ে উঠল। বললাম, “আমিও কাঁদিনি, একটুও না। তবে ওকে ছেড়ে আসার পর সারাক্ষণ মন খারাপ করেছিলাম”।

“ও কিছু না, মন খারাপ তো হবেই। ওইটুকু ছেলেকে কাছ-ছাড়া করা কি চাট্টিখানি কথা? তা হ্যারে, তোকে তো এখন মাঝে মাঝেই কার্সিয়াং যেতে হবে”।

“না গো মামিমা, সে গুড়ে বালি। স্কুল থেকে বলে দিয়েছে, আগামী তিন মাস বাড়ি থেকে কেউ গিয়ে দেখা করতে পারবে না”।

“ও মা, সে কি রে? তাহলে এই তিন মাসে ওর কোন খবরই পাবি না? কেমন আছে, কি খাচ্ছে। রাতে একলা একলা ঘুম হচ্ছে কি না, ভয় পাচ্ছে কি না – কিচ্ছু জানতে দেবে না”?

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, “না তা নয়, আমি ওদের স্কুলে ফোন করতে পারি। ওদের হস্টেলের যে ফ্লোর সুপারভাইজার আছে, তাকেও মাঝে মাঝে ফোন করে বাম্বাইয়ের সঙ্গে কথাও বলতে পারি। তাছাড়া বাম্বাই ও আমি চিঠিও লিখতে পারি। বাড়ির ঠিকানা লিখে আমি বাম্বাইকে তিরিশখানা পোস্টকার্ড দিয়ে এসেছি। বলেছি সপ্তাহে অন্ততঃ একটা করে চিঠি যেন লেখে”।

“হুঁঃ ওইটুকু ছেলে আবার চিঠি লিখবে কী রে? সে যাগ্‌গে, ও নিয়ে মন খারাপ করে থাকিস না। খুব কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস – তোদের মা-বেটা দুজনকেই অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। আর চার-পাঁচটা বছর কিছুই নয়, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। বাম্বাই তার মায়ের কাছে ফিরে আসবে মানুষের মতো মানুষ হয়ে। কথাটা আজ আমি তোকে বলে রাখলাম, পরে মিলিয়ে নিস”। একটু থেমে আবার বললেন, “এখানকার স্কুলে ওর একটুও মন বসছিল না, সুনু। বেচারা বড়ো মনোকষ্টে ছিল”।

“কেন বলো তো? বাম্বাই তোমাকে কিছু বলেছিল?”

“ধুস্‌ ওইটুকু ছেলে আবার বলবে কি? ওদের স্কুল নিয়ে, ওর ক্লাসের সহপাঠীদের নিয়ে অনেক কথাই বলেছে আমাকে... তার থেকেই আমি আন্দাজ করেছি। ওর সঙ্গে তেমন কেউ মিশত না, খেলতেও ডাকত না। টিফিনের সময় ভাগাভাগি করে কেউ টিফিনও খেত না ওর সঙ্গে”।

আমি অবাক হলাম বেশ, আমার ধারণা ছিল দিদিমার সঙ্গে বাম্বাই অনেক কথা বলে, কিন্তু মা আমাকে এরকম কোনদিন বলেননি তো? মামিমাই বা আমায় আগে কেন বলেননি?

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি আমাকে আগে বলনি কেন?”

“পাগল হয়েছিস? তোর মা আমাকে আস্তো রাখতো তাহলে? তোর মাও কিছু কিছু জানত, এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে বলত, ও কিছু না, ছেলেমানুষী খেয়াল। একটু বড়ো হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে আমি বুঝি কারণটা কি। তোদের পাড়ার কাছাকাছি ওই স্কুলটাতে, তোদের পাড়ার ছেলেপিলেদের অনেকেই পড়ত। তোর ডিভোর্সের খবর তাদেরই মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছিল স্কুলের সকল সহপাঠীদের মধ্যে। সেটা বাম্বাইসোনাও বুঝত – কাউকে কিছু খুলে বলত না। কিন্তু মন খারাপ করে থাকত সর্বদা।

তোর থেকেই শুনেছি, কার্সিয়াংয়ের এই স্কুলে নানান জায়গা থেকে অনেক ছেলেমেয়ে পড়তে আসে। তাদের মনের মধ্যে তাদের বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীরা কোন বিষবীজ বপন করতে পারেননি। অতএব বাম্বাই সোনার সঙ্গে প্রথম আলাপেই তারা বন্ধু হয়ে উঠবে – এ আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি”।

অনেক রাত হয়ে গেল, আজ এখানেই শেষ করি। তবে শেষ করার আগে বলি, মামিমার সেই ভবিষ্য-কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। তিনি আজ আমাদের মধ্যে আর নেই, কিন্তু তাঁর প্রতি সকল কৃতজ্ঞতা আমি সমর্পণ করলাম তাঁর পুত্র, আমার সুনুদাকে।

তোমার ক।।

চলবে...




রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

ভাদু শেয়ালের আত্মকথা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " লিলির বিয়ে "


১

সন্ধে নেমে এল প্রায়। শেষ বিকেলের মনখারাপি আলো গাছের মাথায় মাথায় এখনও কিছুটা লেগে আছে বটে, কিন্তু নিচেয় এই পোড়ো জঙ্গলের মধ্যে আধো অন্ধকার তার আঁচল বিছিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরু কাঁথার মতো ঘন অন্ধকার ছেয়ে ফেলবে সমস্ত বনাঞ্চল। আর এই সময়েই আমার মনটা বিচ্ছিরি রকমের খারাপ হয়ে যায়।  

আমার বয়েস হয়েছে ঢের, নাম ভাদু। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে, এখন রোজই আমি শালগাছের এই মোটাগুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসি। সমস্ত আলো ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অন্ধকারের বেনো জল কীভাবে জঙ্গলের মধ্যে মৌরসী পাট্টা বিছিয়ে দেয়, বসে বসে দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু যৌবনে এই সময়টাতেই আমার, এই ভাদু শেয়ালের শরীরটা সমস্ত দিনের আলসেমি ঝেড়ে ফেলে একেবারে, চনমনে চাঙ্গা হয়ে উঠত! অন্ধকার মানেই শিকারে বেরোনোর সময়। রাতের অন্ধকারে এই জঙ্গলের আনাচেকানাচে ছোটখাট শিকার হোক। কিংবা লোকালয়ের কাছাকাছি ঘর-হারানো হাঁস মুরগী হোক, অথবা এক একদিন দলছুট ছাগলছানা, বাছুর পেয়ে গেল, সেদিন হতো মহাভোজ। পুরো দলটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার করার আনন্দ আর উত্তেজনাই আলাদা। তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি, শব্দ চেনার দক্ষতা আর সঠিক ধূর্তামির জন্যেই আমি বড়ো একটা দলের সর্দার হয়েছিলাম বহুদিন। কিন্তু হলে কী হবে? চিরকাল কী আর সমান যায়? যায় না।

আমার এখন অনেক বয়েস। আজকাল শরীরে তেমন জুত পাই না, চোখে কম দেখি, কানেও কম শুনি। ইদানীং নাকেও কিছু গণ্ডগোল হয়ে থাকবে, গন্ধটাও আর আগের মতো মালুম পাচ্ছি না। আসলে শরীরের সঙ্গে ইন্দ্রিয়গুলো তালমিল হারিয়ে ফেলছে, বেইমানি করছে। তবু এই সময়টার টানেই আমি গর্তের বাইরে এসে বসি, জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে নিজের পুরোন জীবনের কথা ভাবি, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি বারবার। আমি এখন দাদু, আমাকে দেখে, গর্তের বাইরে চলে আসে আমাদের দলের যতো ছানাগুলোও। দাদুকে ঘিরে তারা লাফালাফি করে, নিজেদের মধ্যে নকল লড়াই করে। কখনো কখনো তারা আমার কাঁধে, পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমার লেজ নিয়ে খেলা করে। আমি কিছু বলি না, মজা পাই। খুব খানিক বিরক্ত করলে, মৃদু ধমক দিই, কা হুয়া? ব্যস ওই পর্যন্তই।

আমার মতোই আমার ছেলে নাদুও বেশ ডাকাবুকো আর ধুরন্ধর, চৌখস। আমার এই ছেলের জন্যে আমার গর্বই হয়। ছেলেমেয়ে মিলে আমাদের সতের জনের দলে, নাদুই এখন সর্দার! কিছুক্ষণ পরেই নাদু এল, পিছনে তার দলবল নিয়ে।

“বাবা, বেরোচ্ছি, আশীর্বাদ করো, আজকে যেন ভাল শিকার পাই। গর্তে আর এককুচি মাংসও নেই। কাল থেকে ছানাগুলোই বা কী খাবে? আর তোমাকেই বা কী দেব”?

“বেরোচ্ছি, বলতে নেই, আসছি বল। আর ভাবিস না, মা শিবানী কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক করে দেবেন। অনেক শিকার পেয়ে যাবি। দুশ্চিন্তা করে বেশি ঝুঁকি নিস না। বিপদ বাড়াস না”।

“ও নিয়ে তুমি ভেবো না, বাবা। আমরা ঠিকই থাকবো। আসি এখন”?

“আর শোন, যাবার সময়, স্বপনবেড়ে গ্রামের পাশ দিয়েই একবার ঘুরে যাস। ওদিকের গোচারণের মাঠে এক আধটা দলছুট ছাগল-টাগল পেয়ে গেলে, তোদের আর বেশি খাটতে হবে না। আর হ্যাঁ, ওই পিচের রাস্তাটা খুব সাবধান – দলের সবাইকে নিয়ে সাবধানে পার হবি। খুব ভয় লাগে আমার। ওই জানোয়ারগুলো গাঁকগাঁক করে, চোখে আলো ফেলে এমন দৌড়ে আসে...কত শেয়াল যে বেঘোরে মারা পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই”।

“মনে রাখবো, বাবা, তুমি ভেবো না। ছানাগুলোর দিকে একটু নজর রেখো। এত বদমাইশ আর ধূর্ত হয়েছে...আসছি, বাবা”।

“তোরা এমন সব কথা বলিস, তার মানে হয় না। শেয়ালের ছানা ধূর্ত হবে না তো কি, ছাগলছানা ধূর্ত হবে? আয়, বাবা, আয়। ভোরের আলো ফোটার আগে ফিরে আসবি কিন্ত।”

আমার কথায় নাদু খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলল, “তোমার আদরে আদরে ছানাগুলো খুব শয়তান হচ্ছে। যাগ্‌গে দেরি হয়ে যাচ্ছে, আসছি বাবা”।

ওদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, আমি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ঘাড় ঘুরিয়ে ছানাগুলোর দিকে তাকিয়ে, স্নেহ মাখা স্বরে একবার ধমকে দিলাম, “অ্যাই, কা হুয়ারে? তোরা সব ধূর্ত হুয়া? আচ্ছা হুয়া, বেশ হুয়া!” ছানারা আমার দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে, কিছুক্ষণ শান্ত থেকে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর যে কে সেই, চঞ্চল হয়ে খেলতে লাগল নিজেদের মধ্যে।

 এই জঙ্গলটা শুরু হয়েছে এদিকে ঝিমলি নদীর ধার থেকে, সেই সেপাশের চুমকি নদীর ধার অব্দি। এক সময় এক রাতের মধ্যে পুরো জঙ্গলটাই চষে বেড়াতে পারতাম আমি। আমার দলের অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে ছুটতে ছুটতে হাঁফিয়ে জেরবার হয়ে পড়ত। এত বড়ো জঙ্গলের মধ্যে শিকারের অভাব হত না। এই জঙ্গলের মধ্যে, গোটা চারেক গ্রাম আছে, বসতি আছে। গ্রামের লোকেদের ক্ষেতের জমি আছে, গরুছাগল চড়ানোর ঘেসো গোচারণ আছে। এ পাশের গ্রামে সন্ধের দিকে ঘণ্টা বাজত ঢং ঢং, জঙ্গলের মধ্যে বসেও আমার কানে সে শব্দ এসে পৌঁছতো। এখনও সে ঘন্টা হয়তো বাজে, কিন্তু আমার কানে সে শব্দ আর পৌঁছোয় না। বয়েসের দোষ, কানে কম শুনি। সারারাত শিকার করে, যখন ক্লান্তি আসত, ওপাশের গ্রাম থেকে ফজরে নামাজের আজান শোনা যেত। সেই আজানের শব্দ শুনেই আমি সতর্ক হয়ে উঠতাম, দলের সকলকে ডেকে দ্রুত ফিরে আসতাম, নিজেদের এই বাসায়। যেখানে ছানাদের নিয়ে অপেক্ষায় থাকত, আমার বুড়োবাপ আর বুড়িমা। এখন সে আজানও আর শুনতে পাই না।

বেশ কবছর হল, এই জঙ্গলের বুক চিরে, প্রচুর গাছপালা কেটে তৈরি হয়েছে পিচ ঢালা সদর রাস্তা। গোটা জঙ্গলটাই দু আধখানা হয়ে গেছে। ওই রাস্তা দিয়ে রাতের বেলা দৌড়ে দৌড়ে যায় বড়ো বড়ো জন্তু, তাদের চলায় যেমনি গাঁ গাঁ আওয়াজ, তেমনি ভয়ংকার তাদের ডাক। আর তার চেয়েও ভয়ংকর তাদের দুটো চোখ! সে চোখ থেকে আলো ঠিকরে পড়ে, সেই চোখে চোখ পড়লে আর রক্ষে নেই, মাথা গুলিয়ে যায়। সামনে যাবো, না পিছনে যাবো ভাবতে ভাবতেই পিষে দিয়ে যায় তাদের পায়ের তলায়। নিজের চোখের সামনে এমন দু বার দেখেছি আমি। কী বীভৎস আর ভয়ংকর। এখনও সে কথা ভাবলে ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। তবে একটা ব্যাপার আমি অনেক ভেবেও বুঝতে পারিনি। ওই দৌড়ে চলা জন্তুগুলো দৌড়েই চলে, আর সামনে যা পড়ে, পায়ের তলায় পিষে দিয়ে যায়। কিন্তু একবারের জন্যে ফিরেও তাকায় না, কিংবা মরা জন্তু খায়ও না। তাহলে ওরা মারে কেন? ওই জন্তুগুলো দোপেয়ে নয়, কিন্তু স্বভাবটা যেন দোপেয়েরই মতো। দোপেয়েও শেয়াল দেখলেই মেরে ফেলতে চায়, কিন্তু খায় না। কী যে ওদের প্রবৃত্তি কে জানে? খাবিই না যদি, মারিস কেন?

অনেকদিন আগে এই ঘটনাটাও আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল। ওপাশে চুমকি নদীর ধারে সাজাদবাগ গ্রাম। সেদিন শিকারের আশায়, দলবল নিয়ে আমরা সাজাদবাগের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। মাঠের ধারে একটা খামারে বড়সড়ো একটা মোরগ দেখে লুগিশেয়ালনী লোভ সামলাতে পারল না। বেড়ার ফাঁক গলে, খামারের ভেতরে ঢুকে তাড়া করে গেল মোরগটাকে। মোরগগুলো খুব তেজিয়াল হয়। কঁক কঁক করে ডেকে উঠে দৌড়ে দৌড়ে পালাতে লাগল খামারের উঠোনময়। লুগিশেয়ালনীর মাথায় তখন জেদ চড়ে গিয়েছিল, সেও ছাড়বে না। নিজের বিপদের কথা সে ভুলেই গেল। বেড়ার বাইরে বসে আমি দেখছিলাম, বেশ কবার ডাকলাম। বললাম, ছেড়ে দে পালিয়ে আয়। লুগিশেয়ালনী আমার কথায় কানই দিল না।

এদিকে মোরগের ডাক আর হুটোপুটির শব্দে পাঁচজন দোপেয়ে বেরিয়ে এল খামার ঘর থেকে, হাতে তাদের মোটা মোটা লাঠি। তারা ঘিরে ধরল লুগিশেয়ালনীকে। এতক্ষণে লুগি বুঝতে পারল, কী বিপদে সে পড়েছে!  দোপেয়েগুলো একবার ঘিরে ফেললে, সেখান থেকে চট করে বেরিয়ে আসা কঠিন ব্যাপার! শরীর টানটান করে লুগি ডাক দিল, সেই ডাকে কী ভয়ানক আতঙ্ক ছিল সে আমিই জানি। এক ঝলকের জন্যে সে আমার দিকে তাকাল, তার দু চোখে তখন কী ভয়, আর বাঁচার কী আগ্রহ! সে সব কথা মনে পড়লে আজও আমার মনটা ভারি হয়ে যায়। দোপেয়েগুলো একসঙ্গে লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল লুগির দিকে। লুগি তখন বেড়ার দিকে দৌড়তে শুরু করেছে, বাইরে এসে আমাদের দলে ফিরে আসার জন্যে। বেড়া টপকানোর একটু আগেই একজনের লাঠির ঘা পড়ল লুগির ঠিক কোমরে। বীভৎস আর্ত চিৎকার করে লুগি মাটিতে পড়ে গেল। উঠতে পারল না আর, বেচারার কোমর ভেঙে গিয়েছিল। শুয়ে শুয়েই হাঁচোড় পাঁচোড় করছিল বেড়ার দিকে এগোনোর জন্যে। কিন্তু সে আর হল না, সবকটা দোপেয়ে মিলে পিটিয়ে শেষ করে দিল লুগিশেয়ালনীকে। লুগি আমার দ্বিতীয় বউ, আমার নাদু, সেই লুগির ছেলে।  

তারপর দোপেয়েগুলো লুগির মড়া থ্যাঁতলানো শরীরটা, এক ঠ্যাং ধরে তুলে এনে, বেড়ার বাইরে ফেলে দিল, আর ফিরে গেল তাদের খামারঘরে। লুগিকে ওরা খেলও না। আচ্ছা, যদি ওরা আমাদের নাই খায়, তাহলে এভাবে মারল কেন? বেচারা লুগি নিশ্চিত ছিল, বেড়াটা টপকাতে পারলে, বেঁচে যাবে। বেড়াটা সেই টপকাল, কিন্তু তখন সব শেষ। কিছুক্ষণ পর যখন সব শান্ত হয়ে গেছে, চারদিক নিঝুম নিস্তব্ধ, আমরা সবাই গেলাম লুগির মড়া শরীরটার কাছে। শুঁকে শুঁকে নিশ্চিত হলাম, ওর শরীরে আর কোন সাড়া নেই। মনের দুঃখে আকাশের দিকে মুখ তুলে ডেকে উঠলাম কয়েকবার, হে মা শিবানী, অকারণ এই মৃত্যু কেন দিলে লুগির?  

২ 

এখন বসে এ সব কথা ভাবলেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে। কী সব দিন ছিল, আর এখন কী হয়েছে! সে সব কথা এখন মনে পড়লে, স্বপ্ন মনে হয়। আহা, কি ঘন জঙ্গলই না ছিল, এই গোটা এলাকাটা! এই বিশাল এলাকায় আনন্দে দিন কাটত শেয়ালদের। ঝোপঝাড়ের আড়ালে গর্তের মধ্যে কত যে শেয়ালদের দল ছিল, সে গুনে শেষ করা যেত না। বর্ষাকালে আগাছা আর পরগাছা গজিয়ে জঙ্গল যখন আরো অনেক নিবিড় হয়ে উঠত, কখনো সখনো চিতাও চলে আসত, সেই দূরের জঙ্গল থেকে। তখন শিকারে গিয়েও নিশ্চিন্তে থাকা যেত না। আমাদের ছানাদের ওপর চিতার খুব লোভ। সেই সময়ে অনেক শেয়ালের দল থেকে একজন দুজন করে থেকে যেত বাসায়, সারারাত পাহারা দিত নিজের নিজের দলের ছানাদের। শেয়ালদের দলে দলে ঝগড়াও যেমন হত, মিলমিশও ছিল। এখন শেয়ালদের দল দু চারটেতে এসে ঠেকেছে, চিতার ভয় আর নেই, কিন্তু দোপেয়েদের ভয় বেড়েই চলেছে দিন-কে-দিন।      

তখনকার দিনে ঝিমলি নদীর চড়া থেকে কাঁকড়া ধরে, কিংবা বুনো খরগোশ ধরে এনে, বাচ্চা ছেলেপুলেদের জন্যে নিশ্চিন্তে নিয়ে আসার জো ছিল না। পথে কোন না কোন বজ্জাত ডাকাতে শেয়াল হামলা করত। হতভাগারা, একদম যেন দোপেয়ের বাচ্চা! সবাই নয়, কিন্তু কিছু কিছু দোপেয়ে আছে, নিজেরা কোন কাজকম্মোর ধারে কাছে যায় না। কিন্তু অন্যে কিছু একটা যোগাড় করেছে দেখলেই, কেড়ে নেবার জন্যে হামলে পড়বে। এমন শয়তান!  

আমি ছানাগুলোর দিকে নজর দিলাম। সব মিলিয়ে সাতটা। সবকটাই সমান দুষ্টু আর চঞ্চল। ওদের দেখতে দেখতে বুকটা ভরে ওঠে, আবার খুব দুশ্চিন্তাও হয়। আমাদের জীবনটা তো মোটামুটি কেটেই গেল প্রায়। ওদের কী হবে? দোপেয়েগুলো যে ভাবে গ্রাম বাড়াচ্ছে, বসতি বাড়াচ্ছে। এটুকু জঙ্গলও আর থাকবে বলে মনে হয় না। অথচ শুনেছি আমাদের সংরক্ষণের জন্যে দোপেয়েদের চোখে নাকি ঘুম নেই! সেদিন নাদুকে বলছিলাম কথাটা, বিশ্বাসই করে না। না করারই কথা। নাদু বলেছিল, “আজও দোপেয়েগুলো আমাদের দলকে দেখলে কিছু বলে না, দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। কিন্তু একলা দেখলেই রে রে করে দৌড়ে আসে লাঠিসোঁটা নিয়ে। আর তুমি বলছ, আমাদের বাঁচানোর জন্যে দোপেয়েরা কাঁদছে? তুমি অনেক দেখেছ ঠিকই বাবা, কিন্তু দোপেয়েকে এখনো, চিনতে পারোনি। আমাদের শেষ করার জন্যে রাস্তার দুধারে বেড়া দিয়েছে দেখনি? লোহার খুঁটি আর ঘন জালের সেই বেড়া টপকানোও যায় না, ভেঙে পার হবার তো প্রশ্নই নেই! কেন করেছে জানো?”

“রাতে আমরা রাস্তা পার হয়ে, ও পারের জঙ্গলে যেতে গিয়ে, সেই আলো-চোখো জন্তুটার পায়ের তলায় চিপটে যাতে মারা না পড়ি, সেই জন্যে। দেখবি রাস্তার ধারে ধারে লেখাও আছে, “অভয়ারণ্য”,  “বন্যপ্রাণী বাঁচান”। এসব কাদের জন্যে, আমাদের জন্যে নয়?”

“কাদের জন্যে জানি না। তবে আমাদের জন্যে নয়। আমি তো তখন ছোট্ট ছানা ছিলাম। তোমার মুখেই শুনেছি, বাবা। আমাদের মাকে কীভাবে অকারণ পিটিয়ে মেরেছিল, মনে নেই? তুমিই বলেছিল, দোপেয়েরা মোরগ, মুরগি পোষে খাবার জন্যে। দোপেয়েরা শেয়াল খায় না। কিন্তু সেই মোরগটাকে বাঁচানোর জন্যে, ওরা মাকে মেরেছিল। দোপেয়েরা আমাদের হিংস্র জন্তু বলে, কিন্তু আমরা তো এমন করিনা, বাবা। যাকে খাই না, তেমন কাউকেই তো মারি না”।

“সে সব অন্য দিন ছিল রে, নাদু। এখন দিন অনেক বদলে গেছে। দোপেয়ে তো অন্য দোপেয়েকে খায় না। কিন্তু ওই ঝিমলি নদীর ধারে কম দোপেয়ে মরতে দেখেছি? সে দোপেয়েদের মারত, কিছু ডাকাত দোপেয়ে। কেন মারত ঠিক বুঝিনি। কিন্তু বিস্তর মারত। বর্ষার পর নদীর জল কমে গেলে, পথ ঘাট যখন আবার সুগম হত। ঝিমলি নদীর চর দিয়ে কত দোপেয়ে যাওয়া আসা করত। দিনের বেলা কিছু হত না, কিন্তু রাত্রে পথচলা এক আধটা ছোটখাটো দল দেখলেই, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা আরেকদল দোপেয়ে তাদের ধরে মেরে ফেলত। খেতও না, কিছুই করত না। মরা দোপেয়েগুলোর কাপড়চোপড় ঘেঁটে কী পেত কে জানে, আর তাদের পোঁটলা-পুঁটলি, বাক্সগুলো ছিনিয়ে নিত। তারপর নদীর চরায় বালি খুঁড়ে পুঁতে দিত মরা শরীরগুলো। আমাদের অবশ্য তাতে ভালই হতো। নরম বালি খুঁড়ে, সেই মরা দোপেয়েগুলো দিয়ে আমাদের বেশ ভোজ হত কটাদিন”।

“তবে? তারপরেও তুমি ওই দোপেয়েদের কথায় বিশ্বাস করো”? নাদুর এই কথায় আমি সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তবুও বলছিলাম, “ওরা আমাদের পুজো করে, তা জানিস?”

“জানি তুমি বলবে, শিবানীমায়ের মূর্তির দুপাশে আমাদের যে পুতুল রাখে, তার কথা, তাই তো?”

“ঠিক তাই। দোপেয়েরা আমাদের শেয়ালও বলে, আবার শিবাও বলে জানিস তো?”

“জানি”।

“তবে? শিবানীমায়ের হাতে ধরা দোপেয়ের কাটামুণ্ডু থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে, আর সেই রক্ত খাবার জন্যে আমাদের কোনও পূর্বপুরুষশেয়াল, মুখ তুলে মায়ের পাশে থাবা গেড়ে বসে আছেন, দেখিসনি?”

“দেখেছি, স্বপনবেড়ে গ্রামে কালীপুজোর সময় দেখেছি। সে সময় ধারে কাছে যাওয়া যায় না। এত ঢাকের আওয়াজ আর বাজির আলো আর শব্দ। সেখানে আমাদের জায়গা কোথায়, যে আমাদের পুজো হবে? আমাদের ওই পূর্বপুরুষশেয়ালটি নেহাত খড়-মাটির পুতুল, তা নইলে উনিও কানে থাবা চেপে পালিয়ে এসে তোমার পাশেই বসতেন, বাবা!”

আজকালকার ছেলে ছোকরারা কোন কথাই চট করে মেনে নেয় না। আমরা এমন ছিলাম না, আমাদের বাবা, মা, দাদুরা যা বলতেন আমরা শুনেও নিতাম আর মেনেও নিতাম।

আমার পাশে খেলতে থাকা ছানাগুলো হঠাৎ সবাই মিলে আমার কাছে চলে এল। ছোট্টু, নাদুর ছোটছেলেটা, আমাকে বলল, “দাদু, দাদু। বাবা আসছে। পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি”।

আমি খুব অবাক হলাম, বিশ্বাসই হল না, বললাম, “ধুর, কী শুনতে কী শুনেছিস, এই তো গেল, এর মধ্যে ফিরবে কী করে”? আমি কান পাতলাম, ঝিঁঝিঁর ডাক, আর বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না। হঠাৎ আমার মাথায় অন্য চিন্তা এল, ছোট্টু শিশু শেয়াল, ওর এখন শোনার ক্ষমতা প্রখর, ও যদি ঠিক শুনে থাকে, নাদু যদি সত্যিই ফিরে আসে, তার মানে আমাদের দলের কারও ভয়ংকর বিপদ হয়েছে! দুশ্চিন্তায় আমার পিঠের রোম খাড়া হয়ে উঠল, আমাদের কী কেউ রাস্তায় চাপা পড়ল? কিংবা দোপেয়ের খপ্পরে পড়ে প্রাণ খোয়ালো? আমি উদ্বেগে আর বসে থাকতে পারলাম না, উঠে দাঁড়ালাম, তারপর ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম। আমার পিছনে ছানাগুলোও আসতে লাগল। ওরা এখন আর খেলা করছিল না, আমার অস্থিরতা টের পেয়ে, শান্ত কিন্তু টানটান সতর্কতায়, নিঃশব্দে পিছনে আসছিল। কিছুটা এগোতেই নাদুকে দেখতে পেলাম। দৌড়তে দৌড়তে আসছে, পিছনে আরো জনা পাঁচেক।

আমাকে দেখতে পেয়ে নাদু বলল, “কী হল, বাবা? কোথায় চললে তুমি, ছানাদের নিয়ে”? কথা বলার আগে নাদু কিছু একটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। আমার ভোঁতা নাকেও কাঁচা রক্তমাংসের গন্ধ পেলাম - মাংসের টুকরো? সামনে খাবার দেখে ছানাগুলো চঞ্চল হয়ে উঠল আবার।

আমি বললাম,  “এই অসময়ে তোরা ফিরে এসেছিস, ভাবলাম, নির্ঘাৎ কোন বিপদ হয়েছে”!

নাদু হুয়া হুয়া করে হাসল, “না গো, বাবা, না, গর্তে চলো। দারুণ খবর। আজ মা শিবানীর কৃপায় আমাদের কপাল খুলে গেছে। এসো এসো, আমরা আবার ফিরে যাবো, তাড়াতাড়ি এসো”।

নাদু দৌড়ে চলে গেল, গর্তের দিকে। ওর পিছনে দলের পাঁচজন আর আমাদের ছানাগুলোও। তাজা মাংসের গন্ধে ওদের আর তর সইছিল না। আমিও ফিরে চললাম ওদের পিছনে।

দলের পাঁচজন ছানাদের মাংস খেতে দিয়ে আবার ফিরে গেল। নাদু ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা এগিয়ে চল, বাবার সঙ্গে কথা সেরে আমি এখনই আসছি। কিন্তু খুব সাবধানে, কোন ঝুঁকি নিবি না”।

“না, না, তুমি এসো সর্দার, আমরা এগোচ্ছি”।

ওরা চলে যেতে, নাদু আমার সামনে বড়ো মাংসের টুকরোটা নামিয়ে দিয়ে বলল, “খেয়ে দেখ তো, বাবা, কিসের মাংস এটা”? নাদুর চোখে মুচকি হাসি। টুকরোটা চেঁটে দেখলাম, জিভে কাঁচা রক্তের স্বাদ নিয়ে বুঝতে বাকি রইল না, এটা কিসের মাংস। নাদু, আমার ছেলে, সে আমার পরীক্ষা নিচ্ছে?

আমি খুব ভারিক্কি চালে হাসলাম, বললাম, “হেঃ তুই খুব তালেবর হয়েচু, না? বাপের পরীক্ষা নিচ্চু? এ মাংস কমই পাওয়া যায়। এরা দুপায়ে হাঁটে, খুব বুদ্ধি...সবাইকে মারে, নিজেদের মধ্যেও মারামারি করে মরে...কি, ঠিক বললাম কিনা?”

নাদু হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল, ওকে এত আনন্দ পেতে অনেকদিন দেখিনি, বললাম, “কি রে? এত হাসছিস?”

“ঠিক বলেছো, মানে? তুমি আমার বাবা, আর তুমি ভুল বলবে? প্রচুর...প্রচুর দোপেয়ে মরে পড়ে আছে, দুটো গ্রামে। আমরা গিয়েছিলাম, স্বপনবেড়ে গ্রামে, আর ওদিকের শেয়ালের দলটা সাজাদগড়ে। গ্রামের সবাই প্রায় শব। বুড়ো-বুড়ি, বাচ্চা-কাচ্চা, ছেলে-মেয়ে...কত খাবে খাও না...একমাস খেলেও মাংস শেষ হবে না”।

প্রথমে খুব আনন্দ হলেও হঠাৎ একটা কথা আমার মাথায় এলো। বললাম, “এত দোপেয়ে কী করে মারা গেল, জানিস? মড়ক নয় তো?” নাদু থমকে গেল। ইদানীং মড়ক খুব একটা হয় না। আমাদের সময় মাঝে মাঝে হত, অনেক দোপেয়ে পরের পর মারা যেত, প্রায় একসঙ্গে। মরা দোপেয়ের ঢের লেগে যেত গ্রামে গ্রামে। নাদু তেমনটা দেখেনি। ও জানে না। ও আমার চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করল, “মড়ক কি?”

“কিছু একটা রোগ বা অসুখ, যাতে লাগাতার অনেক দোপেয়ে মারা যায়। আর রোগটা ভীষণ ছোঁয়াচে। গ্রামে এক দুজনার হলে, সে রোগ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। বুড়োবুড়ি আর বাচ্চারা সব চেয়ে আগে মরে, তারপর  জোয়ানরা। প্রাণের দায়ে তাই জোয়ানরা অনেক সময় গ্রাম ছেড়ে পালিয়েও যায়। সে রকম কিছু নয় তো? তুই যেমন বললি আমার তেমনই মনে হচ্ছে। মড়কের মরা, বেশি খাওয়া ভালো নয়। আমরা পেটের মাংস খেতাম না। কাঁধ, বুক, পিঠ, পাছা...এরকম বেছে বেছে খেতাম”।

“আর যদি গলাকাটা, মাথা থ্যাঁতলানো, হাত-পা কাটা হয়? সেটা কী মড়ক হতে পারে”?

নাদুর এই কথায় আমি উত্তেজিত হয়ে, খুব হাসতে হাসতে বললাম, “তা যদি হয়, কোন চিন্তা নেই। নিশ্চিন্তে ভরপেট খাওয়া চলে। এটা তার মানে দাঙ্গা, খুনোখুনি। দুপেয়েরা এটা খুব করে, নিজেদের মধ্যে কাটাকাটি। নানান কারণে। কেউ বলে, হর হর মহাদেও। কেউ বলে আল্লা হো আকবর। কখনো বলে, লাল সেলাম। কখনো বলে বন্দে মাতরম, কখনো বলে জয় বজরংবলী। আবার কেউ বলে, মাও! ব্যস, দলে দলে বেরিয়ে পড়ে কাটতে আর মারতে। গ্রামকে গ্রাম প্রায় সাফ করে দেয়”।

“যাক বাবা, যা চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে। মড়ক হলে খুব বিপদে পড়তাম না? আমাদের দলের সবাই তো ভরপেট খেয়ে ফেলেছে”।

আমি আবার খুব ভারিক্কি চালে হাসলাম, বললাম, “বিপদ আর কী? সে রকম হলে তার দাওয়াইও আমার জানা আছে। তুই কি তোর বাবাকে তোর থেকে কম ধূর্ত ভাবিস?”

লম্বা লম্বা কান চুলকে নাদু লজ্জা লজ্জা মুখে হাসল, বলল, “কী যে বলো, তোমার মতো অভিজ্ঞতা আর ধূর্তামি শিখতে আমাকে আরো কয়েক জন্ম নিতে হবে”।

আমি আলতো পায়ে নাদুর পিঠ আর মাথায় থাবা বুলিয়ে বললাম, “আরে না, না। তুই আমার ছেলে, তোর ওপর আমার গর্ব হয়। খারাপ, বিষাক্ত কিংবা অসুখের মাংস খেয়ে যদি কোন অস্বস্তি হয়, কচি কচি দুর্বো ঘাসের ডগা খাবি”।

“কচি ঘাস? ওতো ছাগলে খায়। শেয়াল হয়ে ঘাস খাবো?”

“হ্যাঁ। ঠিক তাই। শেয়াল হয়ে কচি কচি ঘাস খাবি। দেখবি পেটের মধ্যে থেকে হজম না হওয়া মাংস সব বমি হয়ে বেরিয়ে আসবে। তারপর নদী থেকে একপেট জল খেয়ে নিবি। ব্যস, পেট সাফ, অস্বস্তি সাফ!”

“বাঃ। এটা বেশ ভালো টোটকা দিলে তো! মনে রাখবো, বাবা। নাও, এখন তুমি বসে আরাম করে মাংসটা খেয়ে নাও, আমি আরেকবার যাই। নিজে ভরপেট খেয়ে আসি, আর ফেরার সময় যতটা পারি নিয়ে আসবো। আচ্ছা, বাবা, একটা কথা। অনেকে মিলে যদি একটা গোটা শব টেনে নিয়ে আসি কেমন হয়? এখানে রেখে দেব। চার পাঁচদিন আমাদের সকলের চলে যাবে”।

“মোটেই না! অমন কাজ ভুলেও করিস না। গ্রামের যে সব দুপেয়েরা মারা গেছে, সেখান থেকে খাবলে খুবলে খেয়ে আয়। কিন্তু গোটা শব নিয়ে এলে, কাল সকালেই ওরা বুঝে যাবে। রক্তের দাগ, তোদের পায়ের দাগ আর শব টেনে আনার দাগ ধরে ধরে, ওদের অন্য দুপেয়েরা এখানে চলে আসবে। তারপর আমাদের সক্কলকে পিটিয়ে মারবে”।

“ঠিক বলেছো। এদিকটা তো চিন্তা করিনি! ঠিক আছে, তুমি খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম করো বাবা, আমি আসছি”।

“তুই আয়, তুই এলে একসঙ্গে বসে খাবো। ছানাগুলো সবাই খেয়ে দেয়ে কেমন ঢুলছে, দেখ। বেচারারা, অনেকদিন পর ভরপেট খেয়ে বেশ আরাম পেয়েছে। আয়, তুই চট করে ঘুরে আয়। সাবধানে যাবি, সহজ মাংসের লোভে সতর্ক থাকতে কক্ষনো ভুলিস না যেন! দলের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আসিস”।

“আচ্ছা, বাবা”।

নাদুর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমার আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। নাদু ছেলেটা খুব ধূর্ত হয়ে উঠছে, দিন দিন। কিছুদিনের মধ্যে আমার থেকেও ধুরন্ধর হয়ে উঠবে নির্ঘাৎ। আজ লুগি থাকলে খুব আনন্দ করত, সে যেমন ছিল সুন্দরী, তার তেমনি ছিল দেমাকে, বলত, আমার ছেলে, হবে না? আশেপাশে ছানাগুলো সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, দু একজন একটু দূরে শুয়ে ছিল, তাদের আমার কাছটিতে টেনে আনলাম। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লুগির কথা খুব মনে পড়তে লাগল। মাংসের টুকরোটা ঘাসের ওপর রেখে শালের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আবার বসলাম।   

৩ 

নাদু আর আমি খাওয়া দাওয়া সেরে ঘাসের ওপর যখন শুলাম, তখনও ভোরের আলো ফুটতে দেরি আছে। আজ একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেল, নাদুর জোরাজুরিতে। আজকাল হাড়গোড় তেমন চিবোতে পারি না, দাঁতে ব্যথা হয়।

পাশে শুয়ে নাদু বলল, “সবাই মিলে যা মাংস এনেছি, তাতে দিন দু তিনেক আরামসে চলে যাবে, বাবা”।

“আরো কটাদিন মাংস পাওয়ার আরেকটা উপায় আমি জানি”।

নাদু তড়াক করে উঠে বসে, আমার দিকে মুখ ফেরাল, “কী রকম?”

“দু গ্রামের দুপেয়েরাই কাল সকালে ফিরে আসবে। অনেক শোক-টোক করবে, কান্না-কাটি করবে, তারপর সৎকার করার ব্যবস্থা করবে”।

“সৎকার করলে আর আমাদের কী লাভ হবে? একদল পুড়িয়ে দেবে আর এক দল গোর দেবে”।

“ধুর বোকা, এতগুলো দোপেয়েকে একসঙ্গে পোড়ানো, কিংবা গোর দেওয়া কী চাট্টিখানি কথা নাকি? একদল নদীর ধারে বড়ো চিতা জ্বেলে সব মরা একসংগে পোড়াতে যাবে। দেখে নিস, পুরো পুড়বে না, আধপোড়া হলেই নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। তক্কে তক্কে থাকিস, যা বললাম তাই হবে। একটু দূরে ভাঁটির দিকে গিয়ে দাঁড়াবি, জল থেকে তুলে  আধপোড়া লাশ টেনে খা না কত খাবি”। 

“আর অন্যদল?”

“ওদল বড়ো একটা গর্ত করে, সবকটা মরাকে ফেলে, ওপর থেকে কিছু মাটি চাপা দিয়ে ঢিবি বানিয়ে রেখে চলে যাবে। রাত্রের দিকে ওই ঢিলে মাটি সরিয়ে ছোট ছোট গর্ত বানিয়ে, মরা তুলে ফেলতে কতক্ষণ লাগবে?”

“সত্যি এমন হলে, আমাদের ছানাগুলোর গায়ে একটু গত্তি লাগবে, বাবা”।

“লাগবেই তো। এরপর আরো আছে”।

“আরো আছে? বলো কী, বাবা? এবার তুমি কিন্তু বেশি স্বপ্ন দেখে ফেলছো”।

“না রে, বাবা না। যা বলছি শোন, পরে মিলিয়ে দেখে নিস। এই সবের মধ্যে, দুদলেরই কিছু কিছু দোপেয়ে প্রতিশোধ নেবার শপথ নেবে। তারা আবার চার-ছজন মিলে ছোট ছোট দল গড়বে। আর সুযোগ সুবিধে পেলেই অন্য দলের এক দু জনকে মাঝে মাঝেই মেরে ফেলে রেখে দেব, নদীর ধারে, মাঠের মাঝখানে, কিংবা পথের নয়ানজুলির জলে। একটু সতর্ক থাকিস। যেমনটা বললাম তেমনই হবে। হতেই থাকবে”।

“ওফ, অ্যাদ্দিনে তবে মা শিবানী মুখ তুলে চেয়েছেন। ওই কালীমূর্তি যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। মায়ের হাতে ধরা দোপেয়েদের কাটামুণ্ডু থেকে রক্ত টুপিয়ে ঝরছে, আর শিবার দল মুখ আকাশের দিকে করে, সে রক্ত পান করছে। আনন্দে নাদু চেঁচিয়ে উঠল, “হুক্কা হুয়া, হুয়া, হুয়া”। ওর দেখাদেখি আমদের দলের সকলেই, এমনকি আমিও, দলের সর্দার শ্রীমান নাদুশেয়ালের বাবা ভাদুও, চেঁচিয়ে উঠলাম একসঙ্গে, “হুয়া হুয়া, আচ্ছা, হুয়া”।

নাদু খুশিতে হাসতে হাসতে বলল, “বাবা, তুমিও”?

আমি হাসতে হাসতে নাদুকে জড়িয়ে ধরলাম, “কেন? জানিস না, দোপেয়েরা বলে, সব শেয়ালের এক রা?”

ভোর হয়ে আসছে দেখে, ছানাগুলোকে গর্তে পাঠিয়ে, আমরা ঘন ঝোপের নিশ্চিন্ত আড়ালে, আরামে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমাদের সেবার জন্যে, আমাদের সংরক্ষণের জন্যে দোপেয়েরা নিজেরাই দলে দলে মরতে লেগেছে! আমাদের আর ভাবনা কী?

--০০--



নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...