সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৫ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৬


৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস

বাস্তবিক আমাদের হিন্দুদের এমন কোন বিষয় – সমাজনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি ও দর্শন, সংস্কৃতি, ধর্ম বিশ্বাস এবং মানব চরিত্রের যাবতীয় প্রবৃত্তি - প্রেম, ঘৃণা, সারল্য, ক্রূরতা, নৃশংসতা, অহিংসতা, বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা – নেই, যা মহাভারতে নেই। এছাড়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, একমাত্র মহাভারতেই ভারতীয় সমাজের প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে গুপ্ত রাজত্বের সমসাময়িক কালের হিন্দু যুগ হয়ে ওঠার পর্যায়গুলির সুস্পষ্ট রূপরেখাটি খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব মহাভারত যে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

যদিও মহাভারতের আলোচনায় তিনটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে, প্রথমতঃ মহাভারতের সর্বশেষ পরিমার্জিত ও সংযোজিত সংস্করণ রচিত হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, গুপ্তযুগ বা তার কাছাকাছি সময়ে। যে মহাভারত আজ আমরা পড়ি। দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় আর্য জাতিগোষ্ঠীগুলিকে নিয়ে, আর্য জাতিগোষ্ঠীর জন্যে, আর্য এবং পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য ঋষি এবং হিন্দু পণ্ডিতরা মহাভারত রচনা করেছিলেন। অতএব ভারতীয় প্রাচীন অনার্য গোষ্ঠীর মানুষেরা এই গ্রন্থে কদাচিৎ[1] তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা পেয়েছেন। তৃতীয়তঃ মহাভারতের যাবতীয় কাহিনী রাজা, রাজপরিবার এবং তাঁদের ঘিরে থাকা মুনি-ঋষি বা রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষের কাহিনী, সেখানে সাধারণ মানুষজনের কথা নেই বললেই চলে। এই তিনটি কথা মাথায় রেখে আমরা মহাভারত চর্চায় প্রবেশ করব।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মে মানব জীবনের সার্থকতার জন্যে তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য, যাকে ত্রিবর্গ বলে, অনুসরণ করা আবশ্যিক ছিল। এই তিনটি বর্গ হল ধর্ম, অর্থ ও কাম। পরবর্তী কালে, অর্থাৎ মহাভারত সংকলনের সময় অথবা আরও স্পষ্ট করে বললে, হিন্দুধর্মে সেটিকে চতুর্বগ করে তোলা হল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। অতএব হিন্দুধর্মের সার্থকতার লক্ষ্য হয়ে উঠল চতুর্বর্গ।

এই চতুর্বর্গ ধর্ম কি এবং কেমন হওয়া উচিৎ সেই ধর্মাচরণ, তার সারাংশ আমরা পাই বনপর্বের ৩১২ অধ্যায়ে - বকরূপী এক যক্ষের সঙ্গে রাজা যুধিষ্ঠিরের সুদীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে, সেই আলোচনাতেই এখন চোখ রাখা যাক।

দ্বাদশ বর্ষ বনবাসের শেষ পর্যায়ে পাণ্ডবেরা একবার বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে প্রথমে নকুল গেলেন কাছাকাছি এক সরোবর থেকে জল আনতে। বহু সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু তিনি জল নিয়ে ফিরলেন না। এরপর উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে একে একে সকলেই জল আনতে গেলেন, কিন্তু কেউই ফিরে এলেন না। তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজা যুধিষ্ঠির নিজেই গেলেন, ভাইদের সন্ধানে। সরোবরের সামনে গিয়ে দেখলেন, তাঁর অপরাজেয় ভাইয়েরা সকলেই, সরোবরের তীরের মাটিতে সংজ্ঞাহীন নিশ্চল শুয়ে আছে। বিস্মিত ও আতঙ্কিত রাজা যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, সরোবরের পাড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বক। সেই বক বললেন, “হে কুন্তীপুত্র, আমি এই সরোবরের অধিকারী। আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর না দিলে, এই সরোবরের জল আমি কাউকে স্পর্শ করতে দিই না। তোমার ভাইয়েরা আমার কথা অবহেলা করে, জলস্পর্শ করতে গিয়েছিল বলেই, তাদের সকলকে আমি শমনসদনে পাঠিয়েছি। তোমাকেও বলছি, আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলে, তোমারও একই দশা হবে”।

বিস্মিত রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই সাধারণ কোন বক নন। একটি পাখির পক্ষে আমার মহাবীর ভাইদের এভাবে পরাস্ত করা, কোন মতেই সম্ভব নয়। আপনি কে?” রাজা যুধিষ্ঠিরের কথায়, বক খুশি হলেন, বললেন, “তোমার মঙ্গল হোক, আমি সত্যিই কোন জলচর পক্ষি নই, আমি যক্ষ, আমিই তোমার পরাক্রমশালী ভাইদের নিহত করেছি”। যক্ষ এবার নিজমূর্তি ধারণ করাতে, রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, আপনার কী প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞাসা করুন, আমি যথাসাধ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করব”।

যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা

যক্ষ একের পর এক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন, “কে আদিত্যকে উচ্চে প্রতিষ্ঠা করেন? কারা তাঁর চারদিকে থাকেন, কে বা তাঁকে বশীভূত করেন এবং তিনি কোথায় প্রতিষ্ঠিত আছেন?”

রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “ব্রহ্ম আদিত্যকে উচ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবতারা তাঁর চারদিকে ঘুরে বেড়ান, ধর্ম তাঁকে বশীভূত করতে পারেন এবং তিনি সত্যে প্রতিষ্ঠিত আছেন”।

“কী থেকে শ্রোত্রিয়[2] হওয়া যায়, কিসের থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, কিসের থেকে পুত্রবান এবং কিসের থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়?”

“শ্রুতি থেকে শ্রোত্রিয় হওয়া যায়, তপস্যা থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, যজ্ঞ থেকে পুত্রবান এবং বৃদ্ধসেবা থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়”।

“ব্রাহ্মণদের দেবত্ব কি? তাঁদের কোন ধর্ম সাধু ধর্ম? তাঁদের মনুষ্যভাব কি? তাঁদের অসাধু ভাবই বা কি?”

“বেদপাঠ ব্রাহ্মণদের দেবত্ব, তপস্যা সাধুধর্ম, মৃত্যু মনুষ্যভাব। পরীবাদ[3] তাঁদের অসাধুভাব”।

“ক্ষত্রিয়দের দেবভাব, সাধুভাব, মনুষ্যভাব এবং অসাধুভাব কি?”

“ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র-শস্ত্র দেবভাব, যজ্ঞ সাধুভাব, ভয় মনুষ্যভাব এবং যুদ্ধ পরিত্যাগ অসাধুভাব”।

“যজ্ঞীয় সাম কি? যজ্ঞীয় যজুঃ কি? কে যজ্ঞ বরণ করে এবং কাকে সে অতিক্রম করে না?”

“প্রাণ যজ্ঞীয় সাম; মন যজ্ঞীয় যজুঃ, ঋক যজ্ঞকে বরণ করে এবং যজ্ঞ ঋককে অতিক্রম করে না”।

“আবপনকারী, নিবপনকারী, প্রতিষ্ঠমান এবং প্রসূতিকারী, এদের মধ্যে কি কি শ্রেষ্ঠ?”

“আবপনকারীদের বৃষ্টি, নিবপনকারীদের বীজ, প্রতিষ্ঠমানদের[4] ধেনু এবং প্রসূতিকারীদের পুত্রই শ্রেষ্ঠ”।

“কোন ব্যক্তি ইন্দ্রিয়সুখ অনুভবে সমর্থ, বুদ্ধিমান, সম্মানিত, তবু প্রাণীর মতো জীবন থাকতেও জীবিত নয়?”

“যে ব্যক্তি দেবতা, অতিথি, ভৃত্য, পিতৃলোক ও আত্মাকে শ্রদ্ধা ও অর্চনা করে না, সে জীবন থাকতেও জীবিত নয়”।

“পৃথিবীর থেকেও কে মহৎগুরু, আকাশের থেকেও কে উচ্চতর, বায়ুর থেকেও কে দ্রুতগামী, আর কার সংখ্যা তৃণের থেকেও বেশী?”

“মাতা পৃথিবীর থেকেও মহৎগুরু, পিতা আকাশের থেকেও উচ্চতর, মন বায়ুর থেকেও দ্রুতগামী আর চিন্তা তৃণের থেকেও বহুতর”।

“কে ঘুমিয়ে থাকলেও চোখ খোলা রাখে? জন্মানোর পরেও কার স্পন্দন হয় না, কার হৃদয় নেই এবং কে দ্রুত বেড়ে ওঠে?[5]

“মাছ ঘুমোলেও চোখ খোলা রাখে, অণ্ড (ডিম) জন্মালেও তার স্পন্দন হয় না, পাষাণের হৃদয় নেই এবং নদী দ্রুত বেড়ে ওঠে”।

“প্রবাসীর মিত্র কে, গৃহবাসীর মিত্র কে? আতুর ও মুমূর্ষু ব্যক্তির মিত্র কে?”

“প্রবাসীর সঙ্গী সহযাত্রী, গৃহবাসীর ভার্যা, আতুরের চিকিৎসক ও মুমূর্ষু ব্যক্তির দানই মিত্র”।

“কে সর্বভূতের অতিথি, সনাতন ধর্ম কি, অমৃত কি এবং সমুদয় জগৎ কি পদার্থ?”

“অগ্নি সর্বভূতের অতিথি, জ্ঞানযোগ সনাতন ধর্ম, সলিল ও যজ্ঞশেষ অমৃত, বায়ু সমুদয় জগৎ”।

“কে একা বিচরণ করেন, কে বার বার জন্ম নেয়, হিমের ঔষধ কি এবং কে প্রধান বপনক্ষেত্র?”

“সূর্য একা বিচরণ করেন, চন্দ্রমা বার বার জন্ম নেয়, অগ্নি হিমের ঔষধ এবং পৃথ্বী প্রধান বপনক্ষেত্র”।

“ধর্মের একমাত্র আশ্রয় কি, যশের একমাত্র আশ্রয় কি, স্বর্গ এবং সুখের একমাত্র আশ্রয় কি কি?”

“দাক্ষ্য[6] ধর্মের, দান যশের, সত্য স্বর্গের এবং শীল (সদাচরণ) সুখের একমাত্র আশ্রয়”।

“মানুষের আত্মা কে, দৈবকৃত সখা কে, উপজীবিকা কি এবং প্রধান আশ্রয়ই বা কি”?

“পুত্র মানুষের আত্মা, ভার্যা দৈবকৃত সখা, মেঘ উপজীবিকা এবং দান প্রধান আশ্রয়”।

“ধন্যে[7]র মধ্যে উত্তম কি, ধনের মধ্যে উত্তম কি, লাভের মধ্যে এবং সুখের মধ্যেই বা উত্তম কি কি?”

“দাক্ষ্য ধন্যের মধ্যে, শাস্ত্র ধনের মধ্যে, আরোগ্য লাভের মধ্যে এবং সন্তোষই সুখের মধ্যে উত্তম”।

“প্রধান ধর্ম কি, কোন ধর্ম সর্বদা ফলবান, কাকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর কার সঙ্গে সন্ধি করলে সন্ধি ভেঙে যায় না”?

“অনৃশংসতা প্রধান ধর্ম, বৈদিক ধর্ম সর্বদা ফলবান, মনকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর সাধুর সঙ্গে সন্ধি করলে, সন্ধি ভঙ্গ হয় না”।

“কী ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, কী ত্যাগ করলে শোক হয় না, কী ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং কী ত্যাগ করলে সুখী হয়?”

“অভিমান ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না, কামনা ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং লোভ ত্যাগ করলে সুখী হয়”।

“ব্রাহ্মণ, নট ও নর্তক, ভৃত্য এবং রাজাকে দান করার প্রয়োজনীয়তা কি?”

“ধর্মের জন্য ব্রাহ্মণকে, যশের জন্যে নট ও নর্তককে, ভরণের জন্য ভৃত্যকে এবং ভয়ের কারণে রাজাকে দান করা প্রয়োজন”।

“লোকেরা কিসে আবৃত থাকে, কিসে আচ্ছন্ন থাকে, মিত্রদের কেন পরিত্যাগ করে, আর কেনই বা স্বর্গে যেতে অসমর্থ হয়?”

“লোকেরা অজ্ঞানে আবৃত, তমোগুণে আচ্ছন্ন থাকে। লোভের জন্যে মিত্রদের পরিত্যাগ করে এবং সঙ্গদোষে স্বর্গে যেতে পারে না”।

“মৃত পুরুষ কে, মৃত রাষ্ট্র কি, মৃত শ্রাদ্ধ এবং মৃত যজ্ঞই বা কি?”

“দরিদ্র পুরুষই মৃত, অরাজক রাষ্ট্র মৃত, শ্রোত্রিয়হীন শ্রাদ্ধ মৃত আর দক্ষিণাহীন যজ্ঞ মৃত”।

“দিক কি, জল কি, অন্ন কি, বিষ কি এবং শ্রাদ্ধের কালই বা কি?”

“সাধুরা (যে পথ দেখান, সেটাই) দিক, আকাশই জল, ধেনু অন্ন, অনুগ্রহ বিষ এবং ব্রাহ্মণই শ্রাদ্ধের কাল”।

“তপ, দম, ক্ষমা ও লজ্জার লক্ষণ কী?”

“নিজের ধর্মে আস্থাই তপ, মনের সংযম দম, দ্বন্দ্ব সহ্য করাই ক্ষমা, অনাচার থেকে নিবৃত্ত থাকাই লজ্জা”।

“জ্ঞান, শম, দয়া ও আর্জব কাকে বলে?”

“তত্ত্বের অর্থবোধকে জ্ঞান, মনের প্রশান্তি শম, সকলের সুখ ইচ্ছে করা দয়া, এবং সমদর্শীতাই আর্জব[8]”।

“পুরুষের কোন শত্রু দুর্জয়, কোন ব্যাধি অনন্ত, কি রকম লোককে সাধু কিংবা অসাধু বলা যায়?”

“ক্রোধ পুরুষের দুর্জয় শত্রু, লোভ অনন্ত ব্যাধি, সকল প্রাণীর মঙ্গলকারী ব্যক্তিই সাধু এবং নির্দয় ব্যক্তি অসাধু”।

“মোহ, মান, আলস্য ও শোকের লক্ষণ কি?”

“ধর্ম বিষয়ে অনভিজ্ঞতা মোহ, আত্ম-অহংকারই মান, ধর্ম আচরণ না করাই আলস্য এবং অজ্ঞানই শোক”।

“ঋষিরা স্থৈর্য, ধৈর্য, স্নান ও দানের কী কী লক্ষণ বলেছেন?”

“নিজ ধর্মে স্থিরতা স্থৈর্য, ইন্দ্রিয়ের সংযম ধৈর্য, মনের মালিন্য দূর করাই স্নান এবং প্রাণীদের রক্ষা করাই দান”।

“পণ্ডিত কে, নাস্তিক কে? মূর্খ কে, কাম কি, ঈর্ষা কি?”

“ধর্মজ্ঞই পণ্ডিত, নাস্তিকেরা মূর্খ এবং মূর্খরাই নাস্তিক। সংসারে আসক্তি কাম এবং প্রবল বাসনাই ঈর্ষা”।

“অহংকার, দম্ভ, দৈব এবং পৈশুন্য (খলতা, ক্রূরতা) কি?”

“অজ্ঞানতা অহংকার, নিজেকে ধার্মিক বলে প্রচার করাই দম্ভ, দানের ফল দৈব, এবং অন্যকে দোষারোপ পৈশুন্য”।

“ধর্ম, অর্থ ও কাম – এরা তো পরষ্পরবিরোধী; তাহলে ত্রিবর্গে এদের সমাবেশ কিভাবে হয়?”

“যখন ধর্ম ও ভার্যা, পরষ্পরের বশীভূত হয়, তখনই ধর্ম, অর্থ ও কামের সমাবেশ ঘটে”।

“হে রাজন, কোন কর্ম করলে অক্ষয় নরকে যেতে হয়?”

“যে ব্যক্তি প্রার্থী দরিদ্র ব্রাহ্মণকে দান করার জন্যে নিজেই ডেকে এনে, পরে “নেই” বলে বিদায় করে, যে ব্যক্তি বেদ, ধর্মশাস্ত্র, দ্বিজ, দেবতা ও পৈতৃক ধর্মকে মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করে, যে ধনবান ব্যক্তি “নেই” বলে অর্থাৎ কার্পণ্যবশতঃ, দান ও ভোগ না করে, তাদেরই অক্ষয় নরকে যেতে হয়”।

“হে রাজন, কুল, বৃত্ত (আচরণ, চরিত্র), স্বাধ্যায় এবং শ্রুত এর মধ্যে কোনটি ব্রাহ্মণত্বের কারণ, নিশ্চিত করে বল”।

“হে যক্ষ, কুল, স্বাধ্যায় বা শ্রুত কিছুতেই ব্রাহ্মণত্ব জন্মায় না। একমাত্র বৃত্তই ব্রাহ্মণত্বের কারণ। যাঁরা শুধুমাত্র অধ্যয়ন, অধ্যাপন বা শাস্ত্রচিন্তা করেন, তাঁরা সকলেই মূর্খ এবং শাস্ত্রজীবী। কিন্তু যিনি বিধিমতো নিত্য ধর্ম আচরণ করেন, তিনিই বৃত্ত, তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ”।



[1] উদাহরণে বলা যায়, নিষাদ রাজপুত্র একলব্যের ঘটনাটির বিবরণ মহাভারতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।    

[2] শ্রোত্রিয় - বেদজ্ঞ।

[3] পরীবাদ বা পরিবাদ – পরনিন্দা, অপবাদ (শব্দকোষ)।

[4] আবপনকারী–দেবতর্পণকারী, নিবপনকারী - পিতৃতর্পণকারী, প্রতিষ্ঠমান–যশ বা প্রতিপত্তি লোভী। (শব্দকোষ)।

[5] এই প্রশ্নগুলি ধর্ম সম্পর্কে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক – কিছুটা কুইজ কনটেস্ট ধরনের – অতএব অনুমান করা যায় অবান্তর এই প্রশ্নগুলি প্রক্ষিপ্ত। 

[6] দাক্ষ্য – ১. দক্ষভাব, কৌশল, পটুতা; ২. কর্মোৎসাহ, উৎসাহ। (শব্দকোষ) এক্ষেত্রে কর্মোৎসাহ, উৎসাহ অর্থই যুক্তিযুক্ত।

[7] ধন্য – ধনবান বা ধনলাভকারী; সুকৃতী, পুণ্যবান। (শব্দকোষ)

[8] আর্জব – ১. ঋজুভাব, অবক্রতা; ২. সরলতা, অকপটতা, প্রতারণারাহিত্য; ৩. বিনয়গ্রাহিতা, বিনীতভাব। (শব্দকোষ)। এক্ষেত্রে অকপটতা ও প্রতারণারাহিত্য অর্থটিই মনে হয় উপযুক্ত।

চলবে...

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১২ 


১৩  

বেডের পাশে রাখা টুলটায় বসে মা আমার মাথায় মুখে, হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “কেমন আছিস?”

আমি বললাম, “ভালো আছি, মা। বাবা তুমিও বসো না। আরেকটা টুল আছে তো”।

“দাঁড়া, দাঁড়া আমার দাদুভাইকে একবার দেখি, ঘুমোচ্ছে নাকি?” শেষ কথাটি তিনি সিস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন। সিস্টার হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “ঘুমোনো, খাওয়া ছাড়া, আপনার দাদুভাইয়ের এখন আর কাজ কী?”

বাবা ঝুঁকে পড়ে দৌহিত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একদম মায়ের মতোই হয়েছ, দাদুভাই, তোমার মাও সারাদিন-রাত ঘুমোত...”।

আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর উপস্থিতি, সিস্টার-ম্যাডামের মনে যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল, বাবা-মায়ের আলাপ-আলোচনায় সিস্টার বোধহয় অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। তিনি আমাকে বললেন, “আমি একটু ঘুরে আসছি, ম্যাডাম, কোন দরকার মনে হলেই মাথার পাশে ওই বেলটা টিপে দেবেন, আমি চলে আসব”।

আমি হাসিমুখে সম্মতি দিতেই সিস্টার বেরিয়ে গেলেন। আর আমিও মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে গো, মা? তোমাদের দুজনেই এমন গোমড়ামুখো হয়ে ঢুকলে কেন”?

“হবে আবার কি? কিছুই হয়নি, দাঁড়া আমিও একটু আদর করে আসি দাদুসোনাকে...” মা উঠে গিয়ে আমার পুত্রের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর হাত বাড়িয়ে আমার পুত্রের গাল, চিবুক আর নাকের ডগাটা স্পর্শ করে বললেন, নাকটা কিন্তু তোর বাবার মতো হয়েছে – বুঁচকু”।

আমি বাবার দিকে তাকালাম, বাবা সামান্য বিরক্তি মিশ্রিত প্রশ্রয়ের সুরে বললেন, “আহাঃ এসময় বাচ্চাদের গায়ে হাত দিতে নেই, আমাদের হাতে-টাতে জার্ম-ফার্ম থাকতে পারে...”।

মা ফিরে এসে আবার টুলেই বসে বললেন, “ঠিকই বলেছ, সুকু ঘরে যাওয়ার আগেই, ওর ঘরটাকেও ঝেড়েমুছে, ফিনাইল-ডেটল দিয়ে সাফ করে রাখতে হবে”।

বাবা বললেন, “কালকে চলো গাড়িটা নিয়ে একবার সুপারমার্কেট থেকে ঘুরে আসি। সুধন্বা-সায়েবের জন্যে ডজনখানেক মনোমত ড্রেস আর কসমেটিক্স নিয়ে আসি। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরোব, ওখান থেকেই সুকুর কাছে চলে আসব”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সুধন্বা-সায়েবটা আবার কে?”

বাবা বললেন, “সে আছেন আমার এক সায়েব, এখন থেকেই তিনিই আমার বড়োসায়েব”।

মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসলেন কিছুক্ষণ, বললেন, “তোর বাবা, তোর ছেলের নাম রেখেছে, সুধন্বা, আমি নাম রেখেছি, বাম্বাই”।

কথা বলতে বলতে দেখলাম, মা ও বাবার মুখের (এবং আপাততঃ ওঁদের মন থেকেও) বিষণ্ণ-গম্ভীরতা মুছে গিয়েছে, দুজনেই এখন স্নিগ্ধ প্রসন্নতায় বিভোর। ওঁদের আনন্দের কারণ যে আমার পুত্র এবং সে কথা অনুভব করে, আমিও খুব তৃপ্তি অনুভব করছিলাম। অতএব, তীব্র কৌতূহল হলেও, আমার অসাক্ষাতে কী এমন ঘটেছিল, যার জন্যে ওঁনারা গোমড়ামুখে এসে ঘরে ঢুকেছিলেন, সে কথা জিজ্ঞেস করে ওঁদের কোন বিড়ম্বনায় ফেললাম না।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “সুধন্যা? ওটা তো মেয়েদের নাম – যে মেয়ে নিজে খুব ভালোভাবে ধন্য হয়েছে, কিংবা অন্যকে ধন্য করেছে...”।

বাবা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “কথাটা সুধন্বা, দন্ত্য-সয়ে হ্রস্ব-উ, ধ, দন্ত্য-ন-এ বফলা, আকার। মানে হচ্ছে, যিনি তির-ধনুক চালনায় অত্যন্ত দক্ষ, বীর ধনুর্ধর। অবশ্য এ নামে পৌরাণিক এক রাজাও ছিলেন। উচ্চারণের তফাৎটুকুও লক্ষ্য কর – আমরা লিখি ধন্য, কিন্তু বলি, ধোন্য, লিখি অন্য, বলি ওন্য। কিন্তু অন্ন লিখি, বলি অন্ন, তেমনি ধন্ব লিখব এবং ধন্ব বলব। নিয়মটা হচ্ছে পাশের ব্যঞ্জনবর্ণে য-ফলা ঝোলালেই, আগের বর্ণে একটা ও-কার জুড়ে দিই উচ্চারণের সময়। যেমন, অন্নের জোন্য ওন্যের ভরসায় না থেকে, নিজেই উপার্জন করা উচিৎ...”।

“ব্যস্‌, শুরু হল তোর বাবার কলেজের লেকচার...”, মা বাবাকে খোঁচা দিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুখে গর্বমিশ্রিত একটা হাসিও লক্ষ্য করলাম।

আমিও হাসলাম, বললাম, “লেকচার হোক, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং তো, নিয়মটা জানতাম না”।

বাবা বললেন, “জ্ঞানের কথা থাক, নামটা পছন্দ হয়েছে তোর? তোর মায়ের তো পছন্দ হয়েছে”। মা “হুঁঃ” বলে তাচ্ছিল্যসূচক একটা শব্দ করলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে প্রমাণ হল না যে, মায়ের নামটা পছন্দ হয়নি। আমি হাসি মুখে বললাম, “হয়েছে। তোমরা ভালোবেসে নাতির নাম রেখেছ, আমার পছন্দ না হয়ে পারে”। এ সময়েই করিডরের ওয়ার্নিং বেলটা বেজে উঠল, অর্থাৎ ভিজিটারদের থাকার মেয়াদ ফুরালো।

মা-বাবা দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন। বাবা আরেকবার বেবিকটের দিকে গিয়ে কিছুক্ষণ সুধন্বার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি ঘুম রে বাবা, ঘরে এত লোকের আসা-যাওয়া, আমার এত লেকচার – কোন কিছুতেই দৃকপাত নেই?”

মাও বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, “সত্যি রে, টালুক-টালুক চোখদুটো, পাতলা দুই ঠোঁটের ভঙ্গি, হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়...বাম্বাইটা সেই থেকে ঘুমিয়েই চলেছে?”

সিস্টার ঘরে এসে, মায়ের কথা শুনলেন, তারপর হেসে বললেন, “তাই তো, দিদিয়া এল, দাদাই এল, ছেলের ঘুম ভাঙল না?” বেবিকটের কাছে গিয়ে, কাপড়ে জড়ানো সুধন্বাকে সিসটার কোলে তুলে নিল। আর হয়তো এই নড়াচড়াতেই তার ঘুম ভাঙল, চোখ মেলে তাকাল, তার মুঠি করা হাতগুলো ছড়িয়ে দিল”।

বাবা-মা দুজনেই আনন্দে হেসে উঠলেন, মা বললেন, “এই তো আমার বাম্বাই সোনা তাকিয়েছে...”, মায়ের হাত নিসপিস করছিল বাম্বাইকে ধরার জন্যে, বুঝতে পেরে সিস্টার বললেন, “কোলে নেবেন? নিন না”।

মা বাবার দিকে তাকিয়ে ইতস্ততঃ করে বললেন, “ না, ইয়ে... মানে আমার তো বাইরের কাপড়চোপড়...”।

সিস্টার হেসে বললেন, “কিচ্ছু হবে না, আপনারা গেলেই ন্যাপি বদলে দিয়ে, আমি ওকে মায়ের কোলে দেব। ভিজিটিং আওয়ারের শুরুতেই খেয়েছিল, তারপর এতক্ষণ ঘুমোলো এবার ওর খিদে পাবে নিশ্চয়ই...”।

মা সযত্নে বাম্বাইকে কোলে নিলেন, বাম্বাই হাত বাড়াল তার দিম্মার মুখের দিকে। কোলে নিয়ে বার কয়েক দোলা দিয়ে বললেন, “বাম্বা সোনা, চাঁদের কণা... নিজের লোককে ওরা ঠিক চিনতে পারে, নারে? ও বাবা, কি সুন্দর হাসি...ফোকলা দাঁতের হাসি, আমি বড্ডো ভালোবাসি...”, বলে মা আরও কয়েকবার বাম্বাইকে দোলা দিলেন। বাইরে করিডরে থার্ড বেল পড়ে গেল।

সিস্টার বললেন, “এবার কিন্তু আপনাদের যেতে হবে...”। সিস্টার আমার মাথার কাছে ছোট্ট ক্যাবিনেট থেকে,  একটা থলি বের করে বললেন, “ম্যাডামের কাপড়গুলো নিয়ে যাবেন, আর কাল সকালের দিকে বাড়িতে কাচা কিছু ড্রেস দিয়ে যাবেন।

বাবা থলিটা হাত নিয়ে বললেন, “সকালে আমাকে ভেতরে আসতে দেবে?”

“না, মেসোমশাই, তা দেবে না। আপনি নীচের রিসেপশনে ব্যাগটা দিয়ে, কেবিন নম্বর আর পেশেন্টের নাম বলবেন। ওরাই ওপরে পাঠিয়ে দেবে।”

“ঠিক আছে”।

মায়ের কোল থেকে বাম্বাই আবার সিস্টারের কোলে চলে গেল, শুয়ে পড়ল বেবিকটে। বাম্বাই হাত-পা ছুঁড়ে অদ্ভূত আওয়াজ করতে লাগল মুখে।

মা-বাবা বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে, বাবা বললেন, “আমরা কাল আবার আসব, বিকেলে। একটু ইতস্ততঃ করে আবার বললেন, “ওদের ওখান থেকে আর কেউ আসবে বলে মনে হয় না”।

মা বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, “আসছি রে, মন খারাপ করিস না, ভালো থাকিস”।

সিস্টার দ্রুত হাতে বাম্বাইকে ফ্রেশ করে তুলে, আমার কোলে দিয়ে বললেন, “ব্রেস্ট ফিডিংয়ের সময় হয়ে গেছে, ম্যাডাম, উঁহু, ওভাবে নয় এ হাতটা ওর পাছার কাছে ধরুন, আর মাথাটা ধরুন অন্য হাতে...অ্যাই, এবার ঠিক হয়েছে...”। এরপর শিশু নিজেই যেন খুঁজে নিল তার মায়ের স্তন, আমার সমস্ত চেতনা তখন বাম্বাইয়ের মুখের দিকে, তার দুই চোখের দিকে। আমার বৃন্তে ঠোঁট রেখে যখন ও স্তন্যপান শুরু করল, বুকে আশ্চর্য এক তৃপ্তি আর শান্তি অনুভব করলাম, আর বাম্বাইয়ের দু চোখেও লক্ষ্য করলাম অদ্ভূত এক নির্ভরতা। আমার দু চোখ ঝাপসা হয়ে এল অশ্রুতে।

 

 

স্তন্যপান শেষ হতে না হতেই বাম্বাই ঘুমিয়ে পড়ল, গোলাপের পাপড়ির মতো ওর কোমল অধরোষ্ঠ খসে পড়ল আমার বৃন্ত থেকে। সিস্টার আমার কোল থেকে পরমযত্নে তুলে নিল ওকে, তারপর আলতোহাতে শুইয়ে দিল বেবিকটে। এর আগেই ও বেবিকটের বিছানার চাদর-টাদর পালটে, একদম পরিপাটি করে রেখেছিল।

শিশুকে শোয়ানোর পরেও বিছানার চাদর টান-টান করতে সিস্টার বলল, “আপনার শাশুড়ি এখান থেকে যাওয়ার পর নীচেয় কী হয়েছে জানেন? আপনার মা-বাবা কিছু বলেননি?” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম চুপ করে।

“আপনি বকাবকি করাতে আপনার বর তো ঘর থেকে বেরিয়ে নীচের রিসেপশনের চেয়ারে বসেছিল, ওঁর মায়ের পাশে। ওঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে জানি না, কিন্তু উনি এসে রাগারাগি করে আপনাকে তো নানান কথা শোনালেন এবং বেরিয়েও গেলেন। নীচেয় গিয়ে উনি নাকি ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিলেন, কিন্তু আপনার বর যেতে চাইছিলেন না। ছেলেকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একরম জোর করেই তিনি বার করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আপনার বর সিঁড়ি দিয়ে নীচেয় নামতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়েছিলেন রাস্তায়।

মাথায় এবং হাতে নাকি চোট পেয়েছেন, রক্তও বেরিয়েছিল। কিন্তু তার থেকেও যেটা বিশ্রী ব্যাপার, ফুটপাথে পড়ে গিয়ে গুচ্ছের বমি করেছেন। সে বমিতে নাকি বিশ্রী দুর্গন্ধ। আপনার বাবা-মা এবং নীচের সিকিউরিটির দুজন দৌড়ে গিয়েছিলেন, আপনার বরকে তুলতে... কিন্তু আপনার শাশুড়ি আপনার বাবাকে হাত লাগাতে দেননি, উলটে বিচ্ছিরি গালাগাল দিয়েছেন, পাড়া মাথায় করে। আর হবি তো হ, ঠিক সেই সময়েই ফুটপাথের ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে, ফুটপাথে পা দিয়েছেন আমাদের বড়দি।

বড়দি সিকিউরিটি দুজনকে সঙ্গে সঙ্গেই নির্দেশ দিলেন, আপনার বরকে ফার্স্ট-এড করিয়ে দেওয়ার জন্যে, তারপর রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে এই ছোকরা আর মহিলা?”

রিসেপশনের ম্যাডাম তো তখন ভয়ে তটস্থ, কোন রকমে বলল, “ম্যাডাম, ওঁরা ‘থ্রিই’ কেবিনের সুকন্যা ম্যাডামের বাড়ির লোক”।

“বাড়ির লোক?” রিসেপশনের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা, আপনার মা আর বাবার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকালেন বড়দি।

আপনার বাবা সামনে এসে বললেন, “হ্যাঁ ম্যাডাম, আমাদের জামাই”।

“জামাই? স্ট্রেঞ্জ। লাভ ম্যারেজ, বুঝি?”

“না, ম্যাডাম, দেখে-শুনে আমরাই...”। আপনার বাবা বললেন।

সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বড়দি রিসেপশনে বললেন, “সুইপারকে এখনই বলো সমস্ত জায়গাটা ভালো করে স্যানিটাইজ করতে... আর ওই ছোকরাটির ফার্স্ট-এড হয়ে গেলেই ছেড়ে দিও, কোন বিল চার্জ করবে না”। তারপর আপনার বাবাকে বললেন, “আপনারা ওপরে যাবেন তো? একটু ওয়েট করুন - মিনিট পাঁচেক - আমার ভিজিটটা আগে সেরে নিই”।  বড়দি আজ আপনার কেবিনেই প্রথম এসেছিলেন”।

মা-বাবার উপস্থিতি এবং তারপর বাম্বাইকে নিজের হাতে নাড়াচাড়া করে, আমার মনটা তখন খুশিতে ভরে উঠেছিল, সুনুদা, কিন্তু সিস্টারের বর্ণনা শুনে আবারও ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। এবং তখনই মনে পড়ল পিন্টুর বাবার সহৃদয় পরামর্শ এবং সতর্কবাণী। সেই মুহূর্তেই আমি স্থির করলাম, আমি ডিভোর্স নেব। জীবনটা একান্তই আমার – কে কী ভাবল, কে কী মনে করল। কে সুখী হল, কে দুঃখ পেল, সে আমার মাথাব্যথা নয়। আমি শান্তি চাই আমার জীবনে – তাতে সুখ যদি নাও মেলে ক্ষতি নেই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মঞ্জরীম্যাডাম যখন এসব বলছেন, তখন আমার শাশুড়ি কোথায় ছিলেন?”

“তা তো জানি না, ম্যাডাম, নীচের সিকিউরিটি একবার ওপরে এসেছিল, আমাদের মেট্রনদিদিকে সব বলে গেছে। আমি ওই দিদির মুখেই সব শুনলাম। একটা কথা বলবো ম্যাডাম, কিছু যদি মনে না করেন”?

“বলুন, না”।

“আপনার বাবা-মাকে দেখলাম, আপনাকেও সারাক্ষণ দেখছি গতকাল থেকে, ও বাড়ির সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক মানায় না। আপনার শ্বশুরমশাই মনে হয়, ভালো মানুষ, তিনি যা বলছিলেন, সে কথাটাই আমাদের মনের কথা”।

“আমাদের মানে?”

“এ নার্সিং হোমে  - একতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত – এখন আপনাকে নিয়েই তো আলোচনা চলছে...ম্যাডাম। এমন মুখরোচক সংবাদ শুনতে, আলোচনা করতে সকলেই ভালোবাসে কিনা!” 

আজ এই পর্যন্তই থাক, সুনুদা। জানি তুমি রাত জেগে এ লেখা পড়ছো। বাকিটা কাল বলব, সময়মতো। অধৈর্য হয়ে আবার ফোন কোর না, বা চলে এস না আমার কাছে।

এটুকু বলতে পারি, সেদিন আমি আমার জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আবার আজও তেমনি দাঁড়িয়েছি আমার জীবনের আরেক সন্ধিক্ষণে। এই সময়টুকু আমাকে নিবিষ্ট থাকতে দাও - আমার জীবনের কথাগুলো আমাকে নিঃশেষে বলতে দাও, প্লিজ। কোনভাবেই বাধা দিও না। 

তোমার কনি।  

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...