এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের একাদশ পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব "
২৫
মন্ত্রণাকক্ষে নিজের আসনে বসার পরেও মহামন্ত্রী বিমোহন
মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলেন, আসলে এই মন্ত্রণা
কক্ষে অকস্মাৎ সকলকে আমন্ত্রণ করার কী কারণ তিনি জানেন না! কী বিষয়ের মন্ত্রণা সে
সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন। মহর্ষি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহামন্ত্রী
বিমোহনভদ্র,
মন্ত্রণার কাজ শুরু করুন, আপনি কী আর কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”
“না মহর্ষি, এখানে সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। এই বিশেষ সভার আহ্বায়ক আপনি, অতএব আপনার শুরু করাই সমীচীন”।
মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি
উত্তম। তবে তাই হোক”। তারপর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “উপস্থিত সুধীবৃন্দ,
আপনাদের সকলকেই আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদন জানানোর পর আমি এই বলতে চাই যে,
রাজাবেণের আকস্মিক অসুস্থতায় আমাদের রাজ্য যে গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, সে
কথা আপনারা সকলেই অবগত আছেন। কিছুদিন আগে রাজসভার এক মন্ত্রণায় আমরা সর্বসম্মত
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যতদিন রাজাবেণ সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন রাজমাতা আপনাদের আন্তরিক
সহায়তায় রাজ্যের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করবেন!”
উপস্থিত মন্ত্রীমণ্ডলী একবাক্যে সমর্থন করল, “হ্যাঁ
মহর্ষি, এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল”। মহামন্ত্রী বিমোহন কিছু বললেন না, তীক্ষ্ণ চোখে
তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির দিকে।
“আজ রাজাবেণ ও রাজমাতার সন্দর্শনে গিয়েছিলাম, দেখলাম, রাজাবেণ অনেকটাই সুস্থ, তাঁর প্রাণসংশয় আর নেই! কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, তিনি জীবিত হয়েও পুত্তলিবৎ জড় হয়ে গেছেন! তাঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!”
সকলে একই সঙ্গে বলল,
“সে অত্যন্ত বেদনার কথা আমরা সকলেই শুনেছি, মহর্ষি”!
“রাজাবেণের এই অসুস্থতায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি, কিন্তু আশা ছাড়িনি। রাজমাতাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করবো, সেখানে যবন, ম্লেচ্ছ কিংবা চৈনিক প্রাজ্ঞ চিকিৎসকদের সাহায্য নেব, রাজা বেণের এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিকার করার যথাসাধ্য প্রয়াস করব!”
এক যোগে সবাই উচ্ছ্বসিত উত্তর দিল, “সাধু সাধু, মহর্ষি, অত্যন্ত সাধু
প্রস্তাব। এই কাজে আপনিই এই রাজ্যের যোগ্যতম”।
সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “এ বিষয়ে আপনাদের
মনে কোন দ্বিধা নেই তো? এই প্রস্তাবে আপনারা সকলেই সম্মত?”
বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই প্রশ্ন কেন করলেন, মহর্ষি? আপনার এই প্রস্তাবে সর্বসম্মত না হওয়ার কোন কারণ তো ঘটেনি!”
মহর্ষি ভৃগু তাঁর দিকে এবং অন্য সকলের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “সে
কথায় পরে আসছি, বৎস বৃহচ্চারু। এখন দ্বিতীয় যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, সে কথায় আসি।
তরুণ পুত্রের এই নিদারুণ অসুস্থতা, দিনের পর দিন চোখের সম্মুখে দেখা, একজন মাতার
পক্ষে কতোটা বেদনাময় সেকথা আমাদের কারও না বোঝার কোন কারণ নেই”!
সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, “এ বেদনা অসহ্য, মহর্ষি!”
“এই বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনের
দায়িত্ব! রাজ্য পরিচালনায় একান্তই অনভিজ্ঞা এক প্রৌঢ়া নারীর কাঁধে, বিশেষ করে এই
মানসিক অবস্থায়, প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরু ভার অর্পণ করা আমাদের উচিৎ হচ্ছে কী না,
সেটা সকলে ভেবে দেখবেন কী?”
“সত্যই, মহর্ষি, এ আমাদের কাছে গ্লানির, আমাদের
অনুপযুক্ত কাজ”।
“রাজমাতা স্বয়ং আমাকে সবিশেষ অনুরোধ করেছেন - রাজ্য
শাসনের এই গুরু দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি চেয়েছেন। সমস্ত মাতৃহৃদয় দিয়ে, তিনি
পুত্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। তাঁর আশা, তাঁর ঐকান্তিক সেবায়, ঈশ্বর মুখ
তুলে চাইবেন, তাঁর পুত্র সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাঁকে আমি কথা দিতে পারিনি, আপনাদের
সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না”। মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে মাথা নত করে চুপ
করে রইলেন, সকলেই চিন্তাগ্রস্ত। তাঁদের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীগণ, আপনারা
সবাই নিরুত্তর কেন?”
কিছুক্ষণ পর বিদেশ মন্ত্রী পদ্মনাভ বললেন, “আমরা
দ্বিধাগ্রস্ত, হে মহর্ষি। একদিকে পুত্রের সুস্থতার আশায় মাতার আকুল আবেদন,
অন্যদিকে মহারাণির উপর পূর্ণ আস্থাবান রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসী। বঞ্চিত করবো কাকে”?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীমণ্ডলি, ঠিক
এই কারণেই আমি এই বিশেষ সভার অধিবেশন আহ্বান করেছি। অত্যন্ত গোপন এই অধিবেশনে
আমাদের একান্ত মত বিনিময়, আমার জরুরি বলে মনে হয়েছিল”।
এতক্ষণ নির্বাক মহামন্ত্রী বিমোহন কথা বললেন, “কিন্তু
রাজা কোথায়? কে হবেন পরবর্তী রাজা? যাঁর হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে রাজমাতা নিশ্চিন্তে
পুত্রসেবায় নিরত থাকবেন?”
বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু বললেন, “সত্যি এ এক অদ্ভূত
সংকট, মহর্ষি। রাজা কোথায়?” কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “আপনারা সকলেই হয়তো
শুনে থাকবেন, গোটা রাজ্য জুড়ে চারণকবিরা যে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন?”
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্ বললেন, “রাজা পৃথু আর রাণি
অর্চ্চির গান তো? হ্যাঁ, সে আমি নিজের কানেই শুনেছি, বেশ কয়েকবার! আমাদের গুপ্তচর
সূত্রেও সংবাদ পেয়েছি, এই গান এখন রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে
গানের কথা যেমন সুন্দর, সুরও মধুর। মনের
মধ্যে রূপকথার মাধুরী বয়ে আনে!”
মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাস্যে বললেন, “সে চারণ কবিদের কথা
আমিও শুনেছি, তবে নিজের কানে সেই সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য হয়নি। সে গানে এমন কী
জাদু আছে, যার মায়ায় সেই গান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নিশ্ছিদ্র নিরাপদ অন্তরেও প্রবেশ
করে গেল?”
মন্ত্রী বৃষভান্ হাসলেন, “সত্যিই মহর্ষি, কল্পনা হোক,
আর যাই হোক, শুনতে বড়ো সুন্দর। কিন্তু আমার মতো নীরস মানুষের পক্ষে সে গানের
বক্তব্য ব্যাখ্যা সম্ভব নয়! তবে আমাদের কলামন্ত্রী চারুশীল, কবি মানুষ, তিনি
অবশ্যই বলতে পারবেন। মিত্র চারুশীল, মহর্ষিকে আপনি বলুন না, সে গানের কী বক্তব্য?”
কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “সে গানে রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির
মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে! তাঁরা মহারাজা অঙ্গ এবং রাজাবেণের বংশধর”!
মহামন্ত্রী বিমোহন বিরক্ত মুখে বললেন, “আমিও সে কবিদের
কথা শুনেছি, কিন্তু গান শুনিনি। কিন্তু কলামন্ত্রী চারুশীলভদ্রের কথায় মনে হচ্ছে,
এ কোন গঞ্জিকাসেবীর দিবাস্বপ্নের গান! রাজাবেণ কবে সুস্থ হবেন, কবে তাঁর বিবাহ
হবে? কবে তাঁর বংশধর আসবে?”
মাথা নেড়ে কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “না, না,
মহামন্ত্রী মহাশয়, তাঁদের জন্ম সাধারণ নয়, সে এক অসাধারণ – অলৌকিক ঘটনা ঘটবে!
তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন। তাঁরা মহারাজা বেণের
ঔরসজাত পুত্রকন্যা নন, তাঁরা তাঁর মানস সন্তান! রাজা পৃথু ভগবান বিষ্ণুর এবং রাণি
অর্চ্চি সনতানী লক্ষ্মীর অংশ!”
মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কী আশ্চর্য! কিন্তু সে গানে শুধু কী
তাঁদের জন্মবৃত্তান্তই আছে, মন্ত্রী চারুশীলভদ্র?”
“না মহর্ষি! সে গানে আছে স্বপ্নপূরণের অদ্ভূত বৃত্তান্ত।
মহারাজ পৃথুর রাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র প্রত্যেক বৎসর প্রচুর মেঘ দেবেন, দেবেন প্রচুর
বর্ষা। সেই বর্ষার স্নিগ্ধ স্পর্শে রজঃস্বলা হবে মেদিনী, হরিৎ শস্যে ভরে উঠবে
ক্ষেত্র। লেবুগন্ধী সবুজ পুষ্ট ঘাসে তুষ্টা গাভীদের পালানে আসবে দুধের প্লাবন।
সুখে সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে গৃহীদের মায়ার সংসার! খরা, বন্যা, ঝঞ্ঝা, প্লাবন, মহামারি
ও পঙ্গপালহীন এই রাজ্যের আপামর সুস্থ সবল ও বিনীত জনসাধারণ, আনন্দে খুশিতে দেবালয়ে
দেবালয়ে দেবতাদের নিবেদন করবে সুসজ্জিত অর্ঘ। শঙ্খ, ঘন্টা ও পটহের নিশ্চিন্ত
ধ্বনিতে মুখর হয়ে থাকবে সকল মন্দির”!
কথা বলতে বলতে কলামন্ত্রী চারুশীলের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ
হয়ে এল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান, মিত্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মহর্ষি, আপনি
স্বকর্ণে না শুনলে উপলব্ধি করতে পারবেন না, সে গানের মাধুর্য! কথায় ও সুরে সে এক
অদ্ভূত অনুভূতি। গ্রামের বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, গৃহবধূ, বিধবা নারী, কিশোর-কিশোরী সেই
চারণ কবিদের গান শুনছে মুগ্ধ হয়ে, অশ্রু বিগলিত চক্ষে! সে গান শুনে পুরুষরাও
আনমনে বসে থাকছে চণ্ডিমণ্ডপে, মাঠের আলে, হাটে বাজারে। তারা হুঁকোতে টান দিতে ভুলে
যাচ্ছে !”
মহর্ষি ভৃগু খুবই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই গান
তারা পেল কোথায়? কে তাদের শেখাল? এমন অদ্ভূত ঘটনার সূত্রপাত হল কী ভাবে?”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্ বললেন, “সে সন্ধানও আমি
নিয়েছি, মহর্ষি। এ গান তারা নিজেরাই রচনা করেছে! কিন্তু এই কাহিনী শুনিয়েছেন এক
তপস্বী। হিমালয়ের কোলে গভীর অরণ্যবাসী সেই মহাতপস্বী নাকি কোন এক চারণদলকে এই
কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই রাজ্যের দুঃখের দিন অতিক্রান্ত প্রায়! অচিরেই
এক মাহেন্দ্রক্ষণে অবতীর্ণ হচ্ছেন, স্বয়ং ভগবান, তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে নিয়ে! যাঁর
নাম পৃথু। তাঁর নামেই এই জগৎ সংসারের নাম হবে পৃথিবী। সসাগরা ধরিত্রী হবে তাঁর
রাজ্য। তিনি এই মর্ত্য জগতে প্রতিষ্ঠা করবেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও সনাতন ধর্ম!
মহাতপস্বীর অদ্ভূত সেই ভবিষ্যবাণী শুনে সেই চারণদল যে গান বেঁধেছিল, সেই গানই এখন
অন্য চারণদলের মুখে মুখে। তাদের কথা ও সুর কিছুটা ভিন্ন হলেও বক্তব্য এক!”
মহর্ষি ভৃগু কোন কথা বললেন না। নত মস্তকে গভীর চিন্তায়
মগ্ন হয়ে রইলেন। অন্য মন্ত্রীরা সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। মহামন্ত্রী
বিমোহন নিজের মন্ত্রীমণ্ডলীর এই আবেগের কথা কোনদিন জানতে বা বুঝতেও পারেননি। তিনিও
নির্বাক বিস্ময়ে সকলের মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলেন।
চলবে ...