সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২  



 বটতলির ছোকরা পাঁচজন চলে যাওয়ার পর, ভল্লা চুপ করে বসেই রইল দণ্ড তিনেক। জঙ্গলের অন্ধকারে চুপচাপ বসে নানান চিন্তাভাবনা করতে তার ভালই লাগে। আঁধারে চোখের কাজ সীমিত হয়ে যায়। অবশ্য আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। জঙ্গলের বাইরে পূর্ণিমার মতোই জ্যোৎস্না ফুটেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জঙ্গলে ঘন গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে তার ঝিলিমিলিটুকুই চোখে পড়ে। সেই আলো-আঁধারী ছায়া-প্রচ্ছায়াতে চোখে বেজায় বিভ্রম সৃষ্টি করে। এ সময় ভল্লা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার কানের ওপর। ভল্লার মনে হয়েছিল এসময় রামালি আসতে পারে। কিন্তু সন্ধের পর প্রায় তিন দণ্ড পার হয়ে গেল, রামালি এল না দেখে, সে রান্নার যোগাড়ে লাগল।

কিছু কাঠকুটো জ্বেলে গুঁজে দিল উনুনের গর্তে। তারপর পোড়া মালসায় জল নিয়ে তিন মুঠো ভুট্টার দানা ঢেলে দিল তাতে। চাপিয়ে দিল আগুনের ওপর। শুকনো পাতা আর গাছের ডালের টুকরো ঠেলে দিল জ্বলন্ত উনুনের গর্তে। আগুন উলসে উঠল ভালোই। তারপর ঘর থেকে আনল একটু নুন আর গোটা পাঁচেক গোলমরিচের দানা। আর কাঁচা লঙ্কা ভেঙে ফেলে দিল উষ্ণ হতে থাকা মালসার জলে। এখন তার আর কিছু করার নেই, আগুনটাকে উস্কে তোলা ছাড়া। জল ফুটবে। ভুট্টার দানা সেদ্ধ হবে, সময় নেবে – দণ্ড খানেক তো বটেই।

হঠাৎ তার পিঠে কেউ হাত রাখল, কর্কশ শক্তিশালী হাত। ভল্লা বিদ্যুৎ বেগে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলল আঘাত করার জন্যে, আগন্তুক ভয় পেয়ে মাথা নামিয়ে বলল, “আরেঃ শালা, মারবি নাকি রে?” ভল্লা চিনতে পারল, মারুলা। হেসে ফেলে হাত নামিয়ে বলল, “ওঃ তুই”?

“তা নয়তো কাকে ভেবেছিলি? এই জঙ্গলে তোকে সেই কখন থেকে খুঁজছি জানিস? কিছুতেই আর ঠাহর করতে পারছিলাম না। শেষে ওই আগুনের আলোয় বুঝতে পারলাম তুই এখানে। কী রাঁধছিস? ভুট্টার ঝোল? আমার জন্যেও দু মুঠো ফেলে দে, ভল্লা। খিদে পেয়েছে বেশ”।

“তুই এখানে হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলি, হতভাগা”? বলতে বলতে ভল্লা উঠে ঘরে গেল, মুঠো তিনেক ভুট্টা এনে মালসায় ঢেলে দিয়ে, আরও একটু নুনের ছিরিক মেরে দিল। “আমি এখানে আছি সে বার্তা তোকে কে দিল?”

মারুলা বলল, “তোকে এখানে যারা পাঠিয়েছে, তারাই আমাকে বলেছে তোর পোঁদে লেগে থাকতে। এঁটুলির মতো। কিন্তু একটা কথা ভল্লা, তুই কিন্তু বেশ ভোঁদা মেরে গেছিস। আমি তোর এত কাছে চলে এলাম, তোর পিঠে হাত রাখলাম, তার আগে পর্যন্ত তুই টেরই পেলি না? যে ভল্লাকে আমরা সবাই চিনি, সে ভল্লা তো তুই নোস। কী হয়েছে, ভল্লা?”

ভল্লা একটু লজ্জাই পেল। মারুলা অত্যন্ত দক্ষ গুপ্তচর। ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছে। নিঃশব্দ চলাফেরায় মারুলা তার মতোই দক্ষ। কিন্তু তার এত কাছে এসে পড়া সত্ত্বেও ভল্লা টেরই পেল না, এটা আদৌ স্বস্তির বিষয় নয়। ভল্লা নিজেও চিন্তিত হল। বলল, “ঠিকই বলেছিস, মারু। আমার আরো সতর্ক থাকা উচিৎ ছিল”।

মারুলা একটু হাল্কা সুরেই বলল, “ঠিক আছে...হয়তো আগুন জ্বলার শব্দ, জল ফোটার শব্দ, তার ওপর মাথায় চিন্তার জট পাকানোর শব্দ – কিছুটা আনমন হয়ে গিয়েছিলি। আচ্ছা, একটা কথা মনে পড়ে গেল, তুই কোনদিন জঙ্গলে হাতির কাছাকাছি গিয়েছিস?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “বেশ কয়েকবারপ্রাণ হাতে করে, চুপটি করে লুকিয়ে থেকেছি ঝোপের আড়ালে। তখনই শুনেছি হাতির পেটের শব্দ। সাত-আট হাত দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায় – বড়ো জালার মধ্যে জল ফোটার মতো, কিংবা তার থেকেও ভয়ংকর। সেই শব্দের কথাই বলছিস তো?

“আমাদের কিংবা আমাদের কর্তাদের মগজে যখন নানান কুবুদ্ধি খেলা করে বেড়ায় তখনও নিশ্চয়ই ওরকম আওয়াজ হয় – ভুটভাট, শোঁ শোঁ...”।

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তুই কি আমাকে হাতির বাতকম্মো শোনাতে এসেছিস? কী ব্যাপার বল তো?”

মারুলা একটু চাপা স্বরে বলল, “অনেক কথা আছে, পরে বলব, এখানে নয়, অন্য কোথাও। তোর এই ঘরে আমি জানি অনেক লোকের যাতায়াত...। ততক্ষণ একটু ফকড়েমি করি না। তুই আর শালা কোনদিন শুধরোবি না। চব্বিশ ঘন্টা পোঁদে আটা লাগিয়ে কাজ আর কাজ। তাও যদি মুতিকান্ত না হয়ে একটু রতিকান্ত হতে পারতিস...” বলে খিঁক খিঁক করে ফিচেল হাসতে লাগল। ভল্লাও হেসে ফেলল, বলল, “তুই শালা পারিসও বটে”।

রতিকান্ত আর মুতিকান্ত রাজধানীর রক্ষী শিবিরে প্রচলিত অত্যন্ত চালু রসকথা – অবশ্যই আদিরসাত্মক। দীর্ঘদিন নারীসঙ্গবর্জিত রক্ষী শিবিরের একঘেয়ে জীবনে শব্দদুটি অত্যন্ত অর্থবহ। পুরুষের একটি বিশেষ প্রত্যঙ্গ দুটি কর্মে ব্যবহৃত হয়, প্রস্রাব কর্মে এবং রতিকর্মে। অধিকাংশ পুরুষ প্রাকৃতিক কারণেই দ্বিতীয় কর্মে সেই প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার কামনা করে। কিন্তু রক্ষীরা সে ভাগ্য করে আসেনি। রাজ্য-রাজধানীর সুরক্ষার জন্যে তাদের প্রায়ই মাঠে-ঘাটে, জঙ্গলে-পাহাড়ে, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। অতএব তাদের পুরুষাঙ্গটি শুধুমাত্র যত্রতত্র প্রস্রাব করাতেই ব্যবহার হয়। অতএব তারা সকলেই মুতিকান্ত। কিন্তু রাজার শ্যালক রতিকান্ত সারারাত প্রস্রাবের থেকে রতিকর্মেই বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাই তিনি সার্থকনামা।

কাঠের হাতা দিয়ে দু-তিনটে ভুট্টার দানা তুলে, ভল্লা টিপে টিপে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। হয়নি, আরেকটু হবে। দানাগুলো মালসার জলে ছেড়ে দিয়ে তাকাল মারুলার দিকে। আগুনের কমলা রঙে, মারুলার মুখটাও লালচে দেখাচ্ছে। ভল্লার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মারুলা এক চোখ টিপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভুট্টার দানা টিপেই টিপেই রাত কাটাবি, ভল্লা?”

মারুলার ইশারাটা বুঝে ভল্লা মিচকে হাসল, বলল, “সে হিসেব তোকে দেব নাকি রে, মদনা? এমন ভাব করছিস, তুই যেন রোজ রাতে টিপতে পাস?”

মারুলা নিরীহ মুখে বলল, “সে টেপাটেপি তো করতেই হয়, বন্ধু। সারাদিন হেঁটেহেঁটে পায়ে যা ব্যথা হয়, রেড়ির তেল নিয়ে পাদুটো টিপলে বেশ ভালই লাগে। তুই কোন টেপার কথা বলছিস, ভল্লা?”

ভল্লা মুখ বেঁকিয়ে হাসল, বলল, “ন্যাকা, তুই শালা পা টেপার কথা বলছিলি, বুঝি?”

মারুলা আকাশ থেকে পড়ল, বলল, “তুই কী ভেবেছিলি? এ রাম, ছি ছি, তোর মনটা শালা মাছির মতো, গুড়ের কলসি দেখলেই ভনভন করে জুটে যাস...”। ভল্লা এবার উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো বের করে হাসতে হাসতে মারুলার দিকে এগিয়ে নিয়ে বলল, “আজ তোকে ষাঁড়-দাগা করেই ছাড়বো, হতভাগা ধর্মের ষাঁড়”।

দুহাত বাড়িয়ে আত্মরক্ষার ভঙ্গি করে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে দুটো রসের কথা বললাম বলে তুই ষাঁড় বললি? তোর সঙ্গে কাজের কথা ছাড়া আর কোন কথাই বলব না”। কপট অভিমানে মুখ গোমড়া করে বসে রইল মারুলা। ভল্লা জ্বলন্ত কাঠটা উনুনে গুঁজে দিতে মারুলা বলল, “তুই ছোটবেলায় পাঠশালে গেছিলি ভল্লা”?

মারুলা কথাটা কোনদিকে নিয়ে যেতে চায় বুঝতে না পেরে, ভল্লা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল মারুলার দিকে, বলল, “গিয়েছি বৈকি, বছর দুয়েক মতো”।

মারুলা বলল, “দু-বছর? তাহলে তুই তো পণ্ডিত রে? আমি তো শালা ছমাসের মাথায় পণ্ডিতমশাইয়ের হাতে এমন গোবেড়েন খেয়েছিলাম, তারপর আর ওই মুখো হইনি”।

“কেন?”

“সে আর বলিস না। আচ্ছা, তুই বল, ভল্লা, ষণ্ড মানে ষাঁড়, ভণ্ড থেকে ভাঁড়, তাহলে গণ্ড থেকে যে গাল হবে আমি কী করে বুঝবো বল তো? পণ্ডিতমশাই শুধোলো – গণ্ড মানে কি? বললাম। আমার উত্তর শুনে পাঠশালের অন্য ছেলেরা হ্যা হ্যা করে এমন হাসলে – পণ্ডিতমশাই একেবারে জ্বলে উঠল। তারপর গাল দিয়ে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে ছড়ি দিয়ে এমন পেটাল, বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছিল শালা...”।

ভুট্টার মালসা নামিয়ে, ঘরের ভেতর থেকে থেকে দুটো মাটির সরা আনল ভল্লা। গরম ভুট্টাসেদ্ধ সমান দুভাগ করে ঢালল সরায়, তারপর মারুলার হাতে একটা সরা তুলে দিয়ে বলল, “কোথায় পেটাল, তোর গণ্ডে?”

মারুলা খুবই বিষণ্ণ মুখে বলল, “তুই আর সেই ভল্লা নেই রে। আগে বন্ধুদের জন্যে তোর কত দরদ ছিল, আজ তুই আমার দুর্দশার কথায় ঠাট্টা করছিস?”।

ভল্লা কিছু বলল না, ভুট্টা খেতে লাগল মন দিয়ে। মারুলা ঝোলে চুমুক দিয়ে বলল, “বেড়ে বানিয়েছিস তো শালা? দুদিন আগে জনাইয়ের চটিতে গমের রুটি আর এরকমই ভুট্টার ঝোল খেয়েছিলাম। অ্যাঃ সে শালা মুখে তোলা যায় না। আর তুই এখানে এই জঙ্গলে, হাতের কাছে মশলাপাতি কিছুই নেই, এমন ঝোল বানালি কী করে?”

দুজনেরই খাওয়া সাঙ্গ হতে উনুনের আগুন নিভিয়ে দিয়ে ভল্লা ঝোপের মধ্যে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করল। একজোড়া মারুলাকে দিয়ে বলল, “এবার চল, কোথাও গিয়ে বসে কাজের কথাগুলো সেরে ফেলে যাক।  কিন্তু তার আগে নোনাপুর গ্রামের সর্বশেষ পরিস্থিতি কেমন সেটা জানা দরকার। আজ সারাদিন নোনাপুর গ্রামের ছেলেরা কেউই আসেনি। তাদের আসা সম্ভবও নয়। তাই ভাবছি একবার নোনাপুর গ্রামে যাবো”।  

“পাগল হয়েছিস নাকি? এত রাত্রে কে তোর জন্যে বসে থাকবে?”

ভল্লা হাসল, বলল, “আছেন, একজন আছেন, আমার কমলিমা। যে সংবাদ আমি জানতে চাইছি, তাঁর থেকে ভাল আর কেউ বলতে পারবে না”।

“কমলিমা? মানে গ্রামপ্রধানের বউ? বোঝ, গ্রামপ্রধানের বুড়ি বউ তোকে কী খবর দেবে? তোকে দেখলে হয়তো খানিক কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তুলবে”।

“না রে, বুড়ি মোটেই আউপাতালে নয়, বেশ শক্ত মনের মানুষ। কমলিমার থেকে গ্রামের আজকের পরিস্থিতিতে জুজাক কী ভাবছে, কী বলছে, সেটা সহজেই জেনে যাব। সেই সঙ্গে, ভাগ্য ভাল হলে, আরেকজনার কথাও”।

“আরেকজন কে?”

“কবিরাজ”।

“কবিরাজ! হ্যাঁ কবিরাজের কথা আস্থানেও শুনেছি। শুনেছি বুড়োটা খুব ধূর্ত”!

ভল্লা বলল, “ধূর্ত বলিস না, বল বিচক্ষণ, দূরদর্শী। আমি যদি রাজরক্ষী না হয়ে, এই গ্রামের লোক হতাম, বুড়োকে বুকে করে রাখতাম। বুড়োর গায়ে এতটুকু আঁচও লাগতে দিতাম না। কিন্তু কে জানে… হয়তো আমাদের কাজের স্বার্থে... হয়তো আমরাই কোনদিন ..."। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আবার বলল, "যাগ্‌গে পরে কী হবে পরে দেখা যাবে, এখন শোন, বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। তুই গাঁয়ের বাইরেই কোথাও আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাক। কমলিমায়ের সঙ্গে দেখাটা সেরেই – আমি তোর কাছে আসছি...”।

“তাই হোক”

দুজনেই রণপায়ে চড়ে জঙ্গলের পথে রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। 

চলবে...



রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ২

  


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "





 

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্কুল শুরু। এরমধ্যে অচ্যুত একদিন গিয়ে স্কুলের নিয়ম কানুন, ফর্ম ফিল-আপ, টাকা-পয়সা জমা দেওয়া সব করে এসেছেন। তার সঙ্গে ক্লাসের রুটিন, বুকলিস্ট, কেমন জামাপ্যান্ট পরতে হবে সব জেনে এসেছেন, পাছে কোন কথা ভুলে যান তাই লিখেও এনেছেন। সেদিন পান্নাও স্কুলে গিয়েছিল বাবার সঙ্গেতার বয়সি আরো কিছু ছেলে ছিল সেখানে। তাদেরও সঙ্গে ছিল বাবা, কিংবা বাবা-মা দুজনেই। নিজের নিজের ছেলেদের সঙ্গে বাবা-মায়েরা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁরা খুশি খুশি মুখে বললেন, “তোরা সব একই ক্লাশে পড়বি। বন্ধু হবি, এখন থেকেই পরিচয় করে নে”! কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তো বন্ধুত্ব হয় না। অচেনা সমবয়সীদের সামনেও কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগে, বাধো বাধো ঠেকে!

বাবা যতক্ষণ স্কুলের কাজকর্ম সারছিলেন, পান্না স্কুলের সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। এই আমার স্কুল! বিরাট চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে, সে অবাক হয়ে গেল। এই স্কুল আমার! উঠোনের দু ধারে বেশ কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পাতায় ভরা মাথাগুলো স্কুলের চারতলা বাড়ির প্রায় সমান। উঠোনের ওপারে, বিশাল মোটা মোটা থামওয়ালা উঁচু ছাদের বাড়ি। অবাক হয়ে পান্না সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাদের স্কুলের একতলায় এখন খুব ব্যস্ততা। কিন্তু বিশাল এই বাড়িটা একদম নির্জন। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে সিমেন্টের বিরাট চাতাল, চাতালের পরে বিরাট দরজা। সে দরজা কত্তো উঁচু – হাতিও যেন ঢুকে যাবে সেই দরজা দিয়ে। পান্না সিঁড়ি দিয়ে উঠে চাতালে পা দিল, তারপর ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল! ভীষণ কৌতূহল - কী আছে ভেতরে?

“উঁহুহুঁহুঁ...ওপটে যিবে না, ওপটে যিবে না”। পান্না পেছন ফিরে দেখল, একজন লোক তাকেই বলছে কথাটা। তার গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি আর পরনে ফুলপ্যান্ট। কিন্তু পেটের কাছে গেঞ্জিটা খুব ফুলে আছে, বেশ বড়োসড়ো ভুঁড়ির জন্যেপান্না লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে কোন রাগ বা বিরক্তি দেখতে পেল না, কিন্তু ভেতরের দিকেও আর গেল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল স্কুলের উঠোনে। নিচেয় নেমে আসতে লোকটা তার কাঁধে হাত রাখল, বলল, “কী নাম তোমার? আজ ভর্তি হচ্ছ স্কুলে?” পান্না ঘাড় নাড়ল। কিন্তু নিজের নাম বলতে বেশ বেগ পেল। অপরিচিত লোক তার নাম জিগ্যেস করলেই, তার এমন হয়। কথা আটকে যায়। লোকটা ধৈর্য ধরে শুনল, তারপর হেসে বলল, “মোরঅ নাম দুর্যোধন অছি। দুর্যোধনদা কহিবা, কেমন? মু তম সবকু দেখিবি, আউ।  আউ দুষ্টুমি করিলে কঁড় হব দেখিবা ...।” কথা শেষ করল না, কিন্তু চোখ বড় বড় করে হাসল, বলল, “সঙ্গরে কউ অছন্তি, বাপঅ, না মা?”

“ব্‌-বাবা” দুর্যোধনদা তার হাত ধরে বলল, “চলো তোমাকে স্কুলটা দেখাই”।

 

পান্নার স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত মর্নিং সেশন।  অতএব তাকে এখন রোজ সকালবেলা বাবার হাত ধরে, স্কুলে যেতে হয়। তার পরনে স্কুলের ড্রেস, সাদা হাফ-প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পায়ে নটিবয় শু।  জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন স্কুল শুরু হল, তখন গায়ে ছিল শীতের সোয়েটার, তার রং বট্‌ল্‌ গ্রিন। আর হাতে স্টিলের চারচৌকো স্যুটকেশ। তার মধ্যে স্কুলের রুটিন অনুযায়ী ভরে নেয় বই খাতা, পেন্সিল বক্স, রবার, পেন্সিল ছোলার কল, একফুট লম্বা কাঠের স্কেল

শ্রী গোপাল মল্লিকের গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তা মির্জাপুর স্ট্রিটের ওপারে আছে বিহারি দেবলালকাকুর মনিহারি দোকান। বাবা স্কুল যাবার পথে, সে দোকান থেকে রোজ কিনে দেন, চারটে বিস্কুট আর রাংতায় মোড়া দুটো লজেঞ্চুস বা চকোলেট, কোনদিন বাপুজি কেকদেবলালকাকু কাগজের ঠোঙায় টিফিন ভরতে ভরতে মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন, “এতেই হয়ে যায়, খোখাবাবা? ভুখ লাগে না?” স্টিলের বাক্সের মধ্যে ঠোঙাটা নিতে নিতে পান্নার রোজই মনে হয়, স্কুলের টিফিন হতে এখনও অনেক দেরি, তিনটে পিরিয়ড শেষ হলে তারপর। তার তো এখনই খিদে পাচ্ছে, বিস্কুট আর লজেঞ্চুসের খিদে!

কিন্তু সে উপায় তো নেই, বাড়ি থেকে সেদ্ধ চিঁড়ে, চিনি আর লেবু মেখে খেয়ে এসেছে। কারণ সে বড্ডো পেটরোগা, কালমেঘ দেওয়া “কুমারেশ” সিরাপ কিংবা থানকুনি পাতার রস এখন তার নিত্য সেব্য। তার সঙ্গে ওই চিঁড়ে! অতএব এখনই বিস্কুটে কামড় দিলে, বাবার হাতে তার কানটা আর আস্ত থাকবে না।

বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রিট ধরে এগিয়ে, মহাবোধি সোসাইটির উল্টোদিকের গেট দিয়ে ঢুকে, কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে, স্কুলের রাস্তাটা বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। সোজা গিয়ে ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউটের কাছে মোড় নিয়ে, বাঁদিকে সোজা গেলেও কফি হাউসের উল্টোদিকের গেট দিয়ে স্কুলে যাওয়া যায়, কিন্তু সে পথটা কিছুটা ঘুরপথ। তাছাড়া সকাল-সকাল কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে বিস্তর মজা পাওয়া যায়। কত মোটা-সোটা মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন হাঁস-ফাঁস করতে করতে। বেঞ্চে বসে বৃদ্ধরা গল্প করছেন। সাঁতারের ক্লাবের বাগানের ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে সাজি ভরে তুলছেন দু একজন বয়স্কা মহিলা। বড়রা ঝুপুস ঝুপুস ঝাঁপ মারছেন গোলদীঘির জলে, জলছিটিয়ে সাঁতার কাটছে অনেকে। সে সব সাঁতারের নানান স্টাইল – চিৎসাঁতার, বাটারফ্লাই, ফ্রিহ্যান্ড - পান্না এসব নাম অবিশ্যি শিখেছে অনেক পরে। কিন্তু তার স্কুল যাওয়ার পথে – এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায় পান্না। কোন কোন দিন স্কুল পৌঁছতে দেরি হবার আশঙ্কায়, বাবা ধমকান, “কী দেখছিস কি হাঁ করে, স্কুলের ঘন্টা পড়ে গেলে আর ঢুকতে দেবে না যে! তাড়াতাড়ি পা চালা”!

প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়েছিলএকতলাতেই বাবার হাত ছেড়ে দিতে হল, প্রভাকরদা হাত ধরল। বলল, চল তোমাকে ক্লাশে পৌঁছে দিই। বাবা নিচেয় দাঁড়িয়ে রইলেন, পান্না চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে বার বার দেখছিল বাবার দিকে, তার বুকের মধ্যে এখন জমে উঠছে ভয় আর কেমন এক কান্না-কান্না অনুভূতি। বাবা স্মিতমুখে হাত নাড়লেন বার দুয়েক। শক্ত হাতে পান্নার হাত ধরে প্রভাকরদা বলতে বলতে চলল, “ভয় পাচ্ছো কেন? কেলাসে গিয়ে দেখবে তোমার বয়সি কত্তো বন্ধু ... লেখাপড়া করে বাবার মতো হতে হবে না...”? সিঁড়ির ল্যাণ্ডিংয়ে উঠে দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠতে বাবাকে আর দেখতে পেল না পান্না, দোতলার দীর্ঘ করিডরে উঠে, ডানদিকের প্রথম ঘরটাতেই ক্লাস ওয়ানের ঘর, পান্নাকে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল প্রভাকরদা। ক্লাসের ছেলেরা নিজের নিজের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বেঁটেখাটো সুদর্শন মাস্টারমশাইও দাঁড়িয়ে দুই চোখ বন্ধ করে, জোড়হাতে গান করছেন, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্যসুন্দর”প্রভাকরদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় পান্নাকে চুপ করে দাঁড়াতে বলল এ গানটা পান্নার বেশ পছন্দের গান, বহুবার তার মাকে এই গান গাইতে শুনেছে। কিন্তু আজ স্কুলের প্রথম দিনে,  শীতের সুন্দর এই সকালে, তারই সমবয়সি একঘর ছেলেদের সঙ্গে তন্ময় মাষ্টারমশাইয়ের গাওয়া সমবেত গান, পান্না মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। তার খুবই পরিচিত গানটিই আজ যেন নতুন মহিমা নিয়ে পান্নার জীবনকে উদ্ভাসিত করে তুলল।

একটু পরেই গান শেষ হলে, প্রভাকরদা পান্নাকে মাস্টারমশাইয়ের হাতে সমর্পণ করে চলে গেল, আর পান্না নিজের অজান্তেই তার সমস্ত শৈশব সমর্পণ করে দিল, এই স্কুলের মাতৃক্রোড়ে। পান্নাকে তার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আর ডেস্ক দেখিয়ে দিলেন, মাস্টারমশাই। প্রথম দিন স্কুলে এসেই, নিজের অধিকারে একটি ডেস্কের অর্ধেক আর বসার বেঞ্চের অর্ধেক পেয়ে, পান্না আনন্দ ও উত্তেজনায়, খুব কষ্ট করে বলল, “গুডমর্নিং, স্যার”মাস্টারমশাই সস্নেহে তার মাথায় হাত রাখলেন, মৃদু হেসে বললেন, “বসো”।

প্রথম কটাদিন কেটে গেল স্কুল এবং তার নিয়ম কানুন বুঝতে। মাস্টারমশাই এবং দিদিমণিদের চিনতে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারি ভালো, পড়া না পারলে বা হোমটাস্ক করে না আনলে বকা দেন, কিন্তু সে বকার মধ্যে কোন ভয় লাগে না। বরং তাঁরা যখন মাথায় হাত রেখে জিগ্যেস করেন, “কেন পড়িসনি রে?”, অথবা “হোমটাস্ক করতে ভালো লাগে না?” তখন পান্নার বেশ লজ্জাই লাগে। আর যাঁরা খুব বকাবকি করেন, চেঁচামেচি করে বলেন, “তোদের বাবা-মায়েরা কেমন রে? ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত, তার লেখাপড়ার কোন খোঁজখবর রাখে না?” তাঁদের অনেকেই কষ কষ করে কান মলে দেন, ক্লাসের বাইরে কানধরে নিল-ডাউন করিয়ে রাখেন, দুই আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল রেখে চিপে ধরেন পান্নাদের ছোট্ট ছোট্ট আঙুল। একজন বয়স্ক মাস্টারমশাই আবার জুলপির চুল ধরে, এমন টেনে দেন, ব্যথায় ঝনঝন করে ওঠে মাথা!

প্রথমদিন এবং প্রত্যেকদিন যে মাস্টারমশাই “আনন্দলোকে...” প্রার্থনা গেয়ে ক্লাস শুরু করেন, তাঁর নাম পান্না জেনেছে, পূর্ণেন্দুবাবু। পূর্ণেন্দুবাবু পান্নার খুব প্রিয় মাস্টারমশাই, শান্ত-ধীর-স্থির মানুষটি যেমন সুন্দর পড়ান, তেমন ভালোবাসেন প্রত্যেক ছেলেকে। হোমওয়ার্ক হোক বা ক্লাসের খাতা, সুন্দর নির্ভুল উত্তর লিখলে তিনি “ভেরি গুড” লিখে দেন খাতার পাতায়। তাছাড়াও খাতা বিচার করে, তিনি “গুড”, “ফেয়ার”, “ব্যাড”ও লিখে দিতেন। পান্না আপ্রাণ চেষ্টা করত রোজ, “ভেরি গুড” বা “গুড” অর্জন করতে, যেদিন বড়সড় ভুলচুক করে “ব্যাড” জুটত, সেদিন তার মনটাই খারাপ হয়ে থাকত সারাটা দিন। ছেলেদের খাতায় “ব্যাড” লিখতে পূর্ণেন্দুবাবুও যে খুব কষ্ট পেতেন, সেটা বোঝা যেতে তাঁর মুখের দিকে তাকালে আর তাঁর চোখের চাউনিতে।

যে দুজন দিদিমণি পান্নার খুব প্রিয়, তাঁরা হলেন, কনকদিদি আর ইন্দিরাদিদি। ইন্দিরাদিদি তাও মাঝে মধ্যে একটু রেগে যেতেন, কিন্তু সে ছেলেরা যখন দুষ্টুমি করত তখন। পড়ানোর সময় কাটাকুটি খেললে, কিংবা তাঁর পড়ানোর সময় পাশের বন্ধুর সঙ্গে নিচু গলায় গল্প করলে, কিংবা পাশের বন্ধুকে ঢিসুম করে ঘুঁষি মারলে, ইন্দিরাদিদি খুব রেগে যেতেন। বলতেন, “সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক, হনুমান”।  আর কনকদিদি ছিলেন পরম মমতাময়ী, পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সুন্দর গল্প করতেন, কাউকে কক্‌খনো উঁচু গলায় ধমকাতেন না, কিন্তু তাঁর ক্লাশে সব্বাই চুপ করে পড়া শুনত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত তাঁর মুখের দিকে। তিনি কখনো নিজের চেয়ার-টেবিলে বসতেন না, পড়ানোর সময় সারাক্ষণ পায়চারি করতেন, ঘরের এধার থেকে ওধার।

            

 

স্কুল কী শুধু লেখাপড়া শেখায়? নানারকম খেলাধুলো, ড্রিল-পিটি শেখায়। ছবি আঁকতে শেখায়। গান গাইতেও শেখায়। ক্লাস-টু থেকে নাচ-গানের ক্লাশ ছিল সপ্তাহে দুদিন। সে দুটো দিন বড়ো মজার। মীনাদিদি গান শেখাতেন, শেখাতে চেষ্টা করতেন নাচের নানান অঙ্গভঙ্গি। ক্লাশের সব ছেলে মিলে ধুপধাপ শব্দে “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে...”, “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে...” অথবা “আজি ধানের ক্ষেতে...” গান গাইতে গাইতে যখন নাচের প্রচেষ্টায় হাত-পা নাড়ত, সে এক আশ্চর্য অনুভব। বসে বসে গান না গেয়ে নাচের চেষ্টা করতে করতে গানগাওয়ার মধ্যে সে বিস্তর ফারাক টের পেত। মজা লাগত বেশ। ওই নাচ-গানের ক্লাশ থেকে, মীনাদিদি গান গাওয়ার জন্যে দুজনকে বেছে নিলেন, একজন পিনাকী আর অন্যজন পান্না। পিনাকী বড়ো ভালো গাইত, আর পান্নার কাজ ছিল পিনাকীর গলায় গলা মেলানো। ওইভাবেই ক্লাস টু থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, প্রাইমারি সেশনের, যে কোন অনুষ্ঠানে – বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী বা পুজোর ছুটির আগে শারদোৎসবে - পিনাকী আর পান্নার দু-চারটে যৌথগান অবধারিত ছিল।           

পনেরই আগষ্টের দিন স্কুলে ফ্ল্যাগ তোলা হত, পতাকার নিচেয় দাঁড়িয়ে হেডস্যার ওজস্বিনী ভাষায় দেশভক্তি, স্বাধীনতা আর ছাত্রদের কর্তব্য নিয়ে সেদিন বক্তৃতা দিতেন। সেদিন সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হত, বন্দে মাতরম আর জোড়হাতে একসঙ্গে গাইতে হত “জনগণমন অধিনায়ক...” জাতীয় সঙ্গীত। তারপরেই হুটোপুটি করে লাইনে দাঁড়াতে হত পুঁটিরামের সিঙাড়া আর দরবেশের বাদামী প্যাকেট সংগ্রহের জন্যে।

এর কিছুদিন আগেই কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার কাছে পাহাড়ের মতো জমে উঠত ইয়া মোটা মোটা শালের খুঁটি আর অজস্র বাঁশ। স্কুলে যাওয়ার পথে বাবা, আর ফেরার পথে মাকে জিগ্যেস করে জেনেছিল ওগুলো দিয়ে মা দুগ্‌গার প্যাণ্ডেল হবে। শালের খুঁটি আর বাঁশের ধাঁচা বানিয়ে তার ওপর ত্রিপল আর রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি হবে ওই প্যান্ডেল। তার মানে পুজো আসতে আর দেরি নেই? মা বলতেন, “এই তো আর মাস দেড়েক পরেই পুজো, এসেই তো গেল, দেখতে দেখতে কেটে যাবে দিনগুলো”।

তারপর থেকে রোজ স্কুলে যাওয়া আসার পথে চোখের সামনে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল মা দুগ্‌গার বিশাল প্যাণ্ডেল। বেশ কিছুদিন ধরে গড়ে উঠল অজস্র বাঁশের হাড়গোড় বের করা কঙ্কালের মতো খাঁচার কাঠামো। তারপর একদিন সে কাঠামো ঢাকা পড়ে যেত ত্রিপলের আস্তরেএরপর শুরু হত কাপড়ের কাজ। স্কুলে যাওয়ার তাড়ায়, সকালে না হলেও, ফেরার সময় মাকে বায়না করে প্যাণ্ডেলের ভেতর ঢুকত এক একদিন। অজস্র রঙিন আর সাদা কাপড় আর কাপড়ের ফালি ঝুলছে চারদিকে, তার সঙ্গে সুতো আর দড়ি। অনেক অনেক লোক একসঙ্গে বসে কাপড় কুঁচিয়ে তুলছেন, অন্য অনেকে সেই কুঁচি দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন প্যাণ্ডেল। সেই কাপড়ের সাজে অপরূপ হয়ে উঠতে লাগল দিনের পর দিন, ঠিক পান্নার স্বপ্নের মতো। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত পান্না, ওখান থেকে পা সরত না, কিন্তু মায়ের তাড়া থাকত, ঘরে ফিরে তাঁর কাজের শেষ নেই যে!

পান্না বড় হয়ে উঠতে উঠতে স্কুলের সঙ্গে ওই কলেজ স্কোয়ারটাও তার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল। বাল্য থেকে কৈশোর, কৈশোর পার হয়ে তারুণ্য পর্যন্ত তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে রইল তার স্কুল আর কলেজ স্কোয়ার।

-০০-



শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৪

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৩ 


চতুর্থ পর্ব  


সুলতানি আমলের মুদ্রা

পৃথিবীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, আরবদেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের আবির্ভাব। তাঁর জন্ম মোটামুটি ৫৭০ সি.ই.-তে এবং ৬১৩ সি.ই. থেকে তিনি একেশ্বরবাদী ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু করেছিলেন। ৬৩২ সি.ই.-তে তিনি যখন দেহরক্ষা করলেন, আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গিয়েছিলেন। এই নতুন ধর্ম প্রচারের উদ্দীপনা এবং উদ্দাম আগ্রাসী উদ্যোগে ইসলাম ধর্মী আরবের মানুষরা দিকে দিকে তাঁদের প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করলেন।

প্রথমেই তাঁরা পারস্য সাম্রাজ্য জয় করলেন। প্রায় চার শতাব্দী (২২৪-৬৫১ সি.ই.) ধরে প্রচণ্ড শক্তিশালী রোমান এবং বাইজ্যান্টাইন সাম্রাজ্যের পাশাপাশি সগৌরবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য – ইতিহাসে যার নাম সাসানিড (Sassanid) বা সাসানিয়ান (Sasanian Empire) সাম্রাজ্য। ৬৫১ সি.ই.-তে সেই সাম্রাজ্যের পতন ঘটাল আরবের দুর্ধর্ষ ইসলামী সৈন্যরা।

ইসলামি সৈন্যরা ৭১২ সি.ই.-তে অধিকার করে নিল ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমতম প্রান্ত – আফগানিস্তান, বালুচিস্তান ও সিন্ধ অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলি খলিফার অধীনে থাকা আরবের প্রদেশ (province) হিসাবেই গণ্য করা হত এবং এই প্রদেশগুলির শাসনকর্তা ছিল ইসলামি প্রশাসক (governor)। এইভাবেই শুরু হল ভারতে ইসলামি রাজত্বের পথচলা। যদিও নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরবের খলিফার অধীনতা ছেড়ে, এই প্রশাসকরা স্বাধীন সুলতান হয়ে উঠেছিল।

৭১২ সি.ই.তে সিন্ধ অঞ্চল অধিকার করলেও তুর্কিদের হাত ধরে দিল্লীর সুলতানী আমল শুরু হল আরো ছশ বছর পরে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। দিল্লিকে রাজধানী করে ভারতবর্ষে শুরু হল সুলতানী আমল। চালু হল নতুন শাসন প্রণালী, নতুন ধরনের সমাজ ব্যবস্থা এবং নতুন ধরনের বাণিজ্য ও অর্থনীতি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এসে গেল নতুন শাসকের প্রচলন করা নতুন ধরনের মুদ্রাব্যবস্থাও। এই সুলতানি আমলের সময় কাল মোটামুটি ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সি.ই.।

সেই সিন্ধু সভ্যতার কাল থেকে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে প্রচলিত নানান সংকেত, চিত্র ও লিপি সম্বলিত ভারতীয় মুদ্রাগুলির পরিবর্তে এসে গেল শুধুমাত্র আরবি ক্যালিগ্রাফি মুদ্রিত নতুন মুদ্রা। কারণ ইসলাম ধর্ম একেশ্বরবাদী এবং সে ধর্মে কোনরকম চিত্র অঙ্কন হারাম – অর্থাৎ বিষবৎ পরিত্যাজ্য।

অবশ্য সোনা বা রূপোর মুদ্রার নাম আগের মতো ‘টংক’ই রইল, কম মূল্যের যেমন তামা বা আরও নিরেস ধাতু-মুদ্রার নাম হল ‘জিত্তল’। সুলতানী আমলে সোনা ও রূপোর দামের অনুপাত ছিল মোটামুটি ১:১০ অর্থাৎ সম-ওজনের একটি সোনার মুদ্রার মূল্যমান প্রায় দশটি রূপোর মুদ্রার সমান। খিলজি শাসকরা প্রচুর মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। এবং সেই মুদ্রাগুলিতে প্রায়শঃ সুলতানদের গালভরা উপাধির বর্ণনা থাকত, যেমন ‘সিকান্দার -আল-সানি’ যার আক্ষরিক অর্থ “দ্বিতীয় আলেক্সাণ্ডার”। অথবা দিল্লির টাঁকশালের নাম ছিল - ‘হযরত-দার-আল-খিলাফত’ – যার অর্থ হল খলিফা সাম্রাজ্যের শাসনকেন্দ্র। প্রসঙ্গতঃ মহানবী হযরত মোহাম্মদের উত্তরাধিকারী আরবি মুসলিম উম্মাহদের শাসনকর্তাদের “খলিফা” বলা হত। মুসলিম উম্মাহ মানে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী।

[দিল্লির এই সুলতানদের সঙ্গে আধুনিক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মনোভাবের আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সুলতানরাও নিজেদের “খলিফা” বা সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর শাসনকর্তা ভাবতেন, আজ পাকিস্তানও তাই ভাবে।]           

   

নাসিরু-উ-দিন-মামুদের (১২৪৬ – ১২৬৬ সি.ই.) মুদ্রা।  

গিয়াসু-উ-দিন বলবনের (১২৬৬ – ১২৮৭ সি.ই.) মুদ্রা। 


খিলজি আমলের (১২৯০ – ১৩২০ সি.ই.) মুদ্রা

 তুঘলক আমলের (১৩২০ -১৪১২ সি.ই.) মুদ্রা খিলজি আমলের তুলনায় গুণমানে উৎকৃষ্ট ছিল। মুদ্রা প্রচলনের ব্যাপারে মহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫ – ১৩৫১ সি.ই.) ব্যক্তিগতভাবে মনোযোগ ও গভীর চিন্তাভাবনা করেছিলেন। যদিও তাঁর সেই অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার পরীক্ষা-নিরীক্ষা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রাথমিক পরীক্ষা ছিল সোনা-রূপোর আনুপাতিক বাজার মূল্য অনুযায়ী মুদ্রার প্রচলন। এই পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আগের প্রচলিত ১১ গ্রাম ওজনের সোনা এবং রূপোর মুদ্রার প্রচলন আবার শুরু করেছিলেন।

প্রায় সমসাময়িক কালে বিশ্বে প্রথম কাগজের টাকার ধারণা ও প্রচলন করেছিল চিন। এই প্রসঙ্গে পরের পর্বে আলোচনা করব। চিনের এই উদ্যোগের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। চিনের সেই উদ্যোগের অনুপ্রেরণায় মহম্মদ বিন তুঘলক দ্বিতীয়বার নতুন পরীক্ষায় উৎসাহী হলেন। তিনি ১৩২৯ - ১৩৩২ সি.ই.-তে জিমেদারি বা ন্যাসরক্ষা (fiduciary) পদ্ধতিতে মুদ্রা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজালেন। তিনি কাঁসা (brass) এবং তামার ছোট ছোট ধাতুফলকের প্রচলন করলেন। এই ফলকগুলিতে লেখা হল – “পঞ্চাশ টংকার মান অনুযায়ী চিহ্নিত”। এর সঙ্গে আরও একটি আবেদন লিখে দেওয়া হল – “যে সুলতানকে মান্য করে, সে করুণাময়(রসুল)-কেই সম্মান করে”। কিন্তু এই আবেদন সত্ত্বেও ব্যাপক জালিয়াতির কারণে এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়েছিল এবং বিন তুঘলক সমস্ত ধাতুফলক – আসল এবং নকল নির্বিশেষে – বাজার থেকে তুলে নিয়ে, প্রাপকদের সমস্ত টাকা ফেরত দিয়েছিলেন।

 Coin of Muhammad Bin Tughluq - World History Encyclopedia

   মহম্মদ বিন তুঘলকের স্বর্ণমুদ্রা।

 মহম্মদ বিন তুঘলকের শাসন কালে বাজারে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করা হয়েছিল কিন্তু তার পরবর্তী কালে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন বিরল হয়ে ওঠে। লোদিদের আমলে যে মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল তার প্রায় সবই ছিল তামা কিংবা বিলন (billon) সংকর ধাতুর।

বিলন সংকর ধাতু সম্বন্ধে দু চার কথা এখানে বলে রাখি। যে কোন ধাতুমুদ্রা – সে স্বর্ণমুদ্রা হোক বা রূপোর – ১০০% খাঁটি সোনা বা রূপো দিয়ে বানানো হত না। কারণ সোনা বা রূপো নিত্য ব্যবহারের জন্যে মোটেই কঠিন ধাতু নয় – সহজেই ক্ষয়ে যায়। অতএব চিরদিনই সোনা বা রূপোর সঙ্গে তামা বা কখনো কখনো সীসা মেশানো সংকর ধাতু দিয়েই মুদ্রা বানানো হত। গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রায়  সোনার শতকরা পরিমাণ থাকত ৯০% থেকে ৮৩%। পরবর্তী কালে এই পরিমান ৭৫-৭০% পর্যন্তও হতে দেখা গেছে, এর কারণ স্পষ্টতঃই অর্থনৈতিক।

প্রাচীন গ্রীসে – ষষ্ঠ -পঞ্চম শতাব্দী বি.সি.ই-তে বিলন সংকর ধাতুর প্রচলন ছিল – সেখানে রূপোর মুদ্রার ক্ষেত্রে রূপো থাকত ৪০% এবং তামা থাকত ৬০%। অর্থাৎ মূল্যবান ধাতুর তুলনায় সস্তা ধাতুর পরিমাণ বেশি মিশিয়ে যে সংকর ধাতু বানানো হয় তাকে বিলন বলা হয়।  

বর্তমান বিশ্বে বিলন সংকর ধাতু দিয়েই মুদ্রা বানানো হয়ে থাকে – তাতে বিভিন্ন ধাতুর শতকরা অস্তিত্ব হল – রূপো ১০%, ৭০% তামা, ১০% নিকেল এবং ১০% জিংক। অবশ্য দেশে দেশে বিভিন্ন ধাতু এবং তার শতকরা হিসেবের সামান্য তারতম্য হতে পারে।

মূল প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। শুধু যে দিল্লির সুলতানরাই মুদ্রা বের করতেন তা কিন্তু নয়, আঞ্চলিক সুলতান বা নবাবরাও - যেমন বাংলার সুলতান, জৌনপুরের সুলতান, দক্ষিণের বাহমনি, মালব্যের সুলতান, গুওরাটের সুলতানরাও নিজ নিজ পরিচয়ে মুদ্রা প্রকাশ করেছিলেন।

 

মালব্য সুলতানের রূপোর মুদ্রা

 

বিজয়নগরের মুদ্রা                   

দিল্লির সুলতানি আমল এবং পরবর্তী মুঘল জমানার সমসাময়িক দক্ষিণভারতের বিজয়নগর হিন্দু সাম্রাজ্য (১৩৩৬ – ১৬৪৬ সি.ই.) তার নিজস্ব ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও গরিমা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণে এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা হরিহর এবং বুক্কা। সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে তখন বিজয়নগরই ছিল এমন রাষ্ট্র যাদের মুদ্রা ব্যবস্থা, সাম্রাজ্যের অর্থনীতির সঙ্গে সঠিক সাযুজ্যে প্রতিষ্ঠিত। বিজয়নগরে বহু ইউরোপিয় বণিকের আসা যাওয়া ছিল - বিশেষ করে পর্তুগীজদের। রাজা কৃষ্ণদেবরায় বিদেশীদের বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন এবং সেই প্রয়োজনেই বিজয়নগরের মুদ্রা ব্যবস্থাকে দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিজয়নগরের মুদ্রাগুলি প্রধানতঃ সোনা ও তামার হত। বিজয়নগরের সোনার মুদ্রাগুলির সামনের দিকে একজন দেবতার চিত্র থাকত, এবং পিছনের দিকে থাকত রাজার পরিচয়। অধিকাংশ স্বর্ণমুদ্রার দেবতা ছিলেন তিরুপতি দেব অর্থাৎ ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর – কখনো তিনি একলা, আবার কখনো সঙ্গে থাকতেন তাঁর দুই পত্নী শ্রীদেবী ও ভূদেবী।

বিজয়নগরের মুদ্রা ব্যবস্থায় ইউরোপিয়ান বণিকরা এতটাই সন্তুষ্ট ছিল যে, তাদের অনেকগুলি সংস্থা এই মুদ্রাগুলিকে প্রায় অনুকরণ করেছিল। যাদের মধ্যে ডাচ ও ফরাসী কোম্পানিগুলির ‘Single Swami Pagodas‘ মুদ্রা আর ইংরেজদের ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মুদ্রাগুলি ‘Three Swami Pagodas’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। বলা বাহুল্য এখানে “একক স্বামী” মানে তিরুপতিদেব এবং “স্বামী ত্রয়” মানে তিরুপতিদেব ও তাঁর দুই পত্নী।  


Vijaynagar Coins

Vijaynagar Coins

  Vijaynagar Coins

Vijaynagar Coins

       বিজয়নগরের তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রা

        

Three Swami Pagoda

‘Three Swami Pagoda’ মুদ্রা – ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি।

 

মুঘল আমলের মুদ্রা

ভারতে মুঘল আমলের শুরু বাবরের হাত ধরে ১৫২৬ সি.ই.-তে, দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করার পর। আর মুঘল জমানার সমাপ্তি হয় ১৮৫৭ সি.ই.-তে ব্রিটিশদের হাতে - শেষ মুঘল শাসক বাহাদুর শা জাফরের পরাজয় এবং বর্মাতে তাঁর (আধুনিক মায়ানমার) আমৃত্যু নির্বাসনে।

মুঘলদের মুদ্রা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সাম্রাজ্যের সর্বত্র একই মুদ্রার প্রচলন এবং কঠোরভাবে মুদ্রা ব্যবস্থার সংহতি রক্ষা করা। এই ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরেও দীর্ঘদিন টিকে ছিল। যদিও প্রকৃতপক্ষে এই নিবিড় ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কোন মুঘল সম্রাট নয়, বরং শের শা সুরি (১৫৪০ – ১৫৪৫ সি.ই.) একজন আফগান শাসক যিনি হুমায়ুনকে পরাজিত করে পাঁচ বছরের জন্য দিল্লির মসনদে বসেছিলেন।

শের শা যে রূপোর মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন “রুপিয়া”- এই শব্দ থেকেই আধুনিক  ভারতে কারেন্সির নাম হয়েছে রুপি (rupee)। এই রৌপ্য মুদ্রাগুলির ওজন ছিল ১৭৮ গ্রেন (১ গ্রেন = ৬৪.৭৯৯ মিলিগ্রাম, ১৭৮ গ্রেন = ১১.৫৩ গ্রাম)। ব্রিটিশ ভারতেও, বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত এই রুপোর মুদ্রার ওজনে কোন পরিবর্তন করা হয়নি – যদিও সেই মুদ্রায় ব্রিটিশ রাজা বা রাণির ছবি এবং ইংরিজি লিপি থাকত।  শের শা রূপোর মুদ্রা ছাড়াও স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন “মোহর”, তার ওজন ছিল ১৬৯ গ্রেন = ১০.৯৫ গ্রাম। তাঁর প্রবর্তিত তামার মুদ্রার নাম ছিল “দাম”। দশটি রুপিয়ার সমান ছিল একটি মোহরের দাম। চল্লিশটি দামের সমান ছিল একটি রুপিয়া। অর্থাৎ মানের দিক থেকে দামের মূল্য ছিল অত্যন্ত কম।  

মজার কথা হল ইংরিজির “ড্যাম” শব্দটির উৎপত্তি নাকি এই দাম থেকে, “I don’t care a damn” ইংরিজিতে প্রচলিত বাক্যবন্ধটি আমরা সকলেই শুনেছি। এখানে “ড্যাম” বা “দাম” শব্দের অর্থ প্রায় মূল্যহীন। এর সঙ্গে তুলনীয় আমাদের বাংলাতেও একটি প্রচলিত বাক্যবন্ধ “এর মূল্য আমার কাছে এক কানা-কড়িও নয়”!  আরেকটি কথাও মনে রাখতে হবে, আজও আমরা জিনিষ পত্রের দাম নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকি – “কত দাম”? “এত দাম কেন?” ইত্যাদি। এই দাম শব্দটিও এসেছে শের শার প্রচলিত “দাম” মুদ্রা থেকে। যদিও এখন এই দাম কথার সমার্থক শব্দ মূল্য।      

মুঘল আমলে মুদ্রার গঠন এবং মুদ্রণ এর ব্যাপারে কর্মীদের দক্ষতা ছিল অত্যন্ত উন্নত। এই দক্ষতার চরম উৎকর্ষতা আসে মহান আকবরের সময়। সেই সময়ে মুদ্রায় কিছু কিছু নকশা, কিছু ফুলপাতার আলপনার সূচনা হয়েছিল। জাহাঙ্গির তাঁর প্রচলিত মুদ্রায় চিত্র, যেমন পিতা আকবরের ছবি, রাশিচক্র (Zodiac signs), ছোট ছোট কবিতা, বিচিত্র নকশা, এবং অত্যন্ত সুন্দর লিপিরও প্রচলন করেছিলেন। শাহজাহানও মুদ্রার সৌন্দর্যে কোন কার্পণ্য করেননি। কিন্তু ঔরংজেব সম্রাট হওয়ার পর মুদ্রা থেকে এই সমস্ত সৌন্দর্য বর্জন করে, মুদ্রার সামনের দিকে কলমা অর্থাৎ ইসলামি বিশ্বাসের কথা এবং পিছনের দিকে শাসকের নাম, টাঁকশালের ঠিকানা এবং মুদ্রা প্রচলনের তারিখ লিপিবদ্ধ করিয়েছিলেন।

হুমায়ুনের মোহর 

        

শের শা সুরির রুপিয়া

      

আকবরের মোহর 
                                       

জাহাঙ্গীরের মোহর 

                                 

                                              ঔরঙজেবের মোহর


গুপ্ত পরবর্তী যুগে ভারতবর্ষের অজস্র হিন্দু রাজা এবং রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা তো অনেক দূরের কথা – পরষ্পরের মধ্যে সর্বদাই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকত। যে কারণে খণ্ডখণ্ড রাজ্যগুলি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেকটাই দুর্বল। এই কূপমাণ্ডুক্যতার কারণে দেশের বাইরে থেকে আসা বিপদগুলিকে তার চিনতেও পারেনি – বুঝতেও পারেনি। আরব কিংবা তুর্কের ইসলামি সৈন্যরা মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে যত সহজে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যকে গ্রাস করতে পেরেছিল, সে তুলনায় ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলকে আয়ত্তে আনতেই তাদের সময় লেগেছিল প্রায় ছশ বছর। এটাও হয়তো ঘটত না, যদি তৎকালীন হিন্দু রাজারা কিছুটা দূরদর্শী হয়ে এবং সাময়িকভাবে হলেও এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারতেন। নন্দবংশের যে প্রবল রাজশক্তি দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারকে ভারত সীমান্ত থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল, সেই ভারতকেই প্রায় বারোশ বছর নিমগ্ন থাকতে হল, ধর্মান্ধ, সতত অবিশ্বাস-নির্ভর, বাস্তব-জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চাহীন শাসকদলের অধীনে।

অবশেষে ১৭৫৭ সালে উপস্থিত হল আরেক বিদেশী শক্তি – ইংরেজ। তারা বুঝতে পেরেছিল, সে সময় একদিকে সংখ্যাগুরু হিন্দু জনগণ ইসলামি শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং অন্যদিকে মুসলমান রাজ-সম্প্রদায়ও একান্তভাবে দুর্বল ও বহুধা বিভক্ত। পরিস্থিতি বিচারে তারা ভুল করল না, হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সহায়তা নিয়ে, ঠিক একশ বছর পর ১৮৫৭ সালে দিল্লির মসনদ থেকে মুঘলদের সরিয়ে, তারা অত্যন্ত সহজে গ্রাস করল আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত সমগ্র ভারতভূমিকে। ভারতবর্ষ হয়ে উঠল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে অত্যন্ত ধনী এবং অপরিমিত লাভজনক একটি অঙ্গরাজ্য। এই নব-বিজিত “সোনার খনিটি”-কে শোষণ করে ধনী হয়ে উঠতে লাগল সুদূর ইউরোপের ক্ষুদ্র একটি দ্বীপরাজ্য – যার নাম ইংল্যাণ্ড।

পরাধীন ভারতে এ হেন নতুন ব্রিটিশ রাজতন্ত্রর মুদ্রা ব্যবস্থা কেমন ছিল সে আলোচনা আসবে পরের পর্বে।


চলবে ... 

কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩

    এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...