এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
অভিশপ্ত পরীক্ষিৎ
শ্রীসূত বললেন, “যিনি ভগবান
কৃষ্ণের অনুগ্রহে মাতৃগর্ভে অশ্বত্থামার অস্ত্রের থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং যিনি
ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণের অভিশাপে, তক্ষকের দংশনে মৃত্যুর পরিণাম জেনেও, ভগবানে নিবেদিত
চিত্তে কোন মোহ বা ভয় অনুভব করেননি, সেই রাজা পরীক্ষিৎ ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেবের
শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। তারপর সর্ব বিষয়ে আসক্তি পরিত্যাগ করে শ্রীহরির পরমতত্ত্ব
উপলব্ধি করার পর, গঙ্গার জলে নিজের দেহ ত্যাগ করেছিলেন। ভগবান যে দিন যে ক্ষণে
পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন, সেই ক্ষণেই অধর্মের মিত্র কলি পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল।
কিন্তু সম্রাট পরীক্ষিৎ যতদিন পৃথিবী শাসন করেছেন, কলি নিজের প্রভাব বিস্তার করতে
পারেনি। তিনি বুঝেছিলেন, কলি যদিও অবিবেকী মানুষের কাছে বীরের মতো আচরণ করে,
কিন্তু শান্তশীল ব্যক্তিদের ভয় পায়। কলির অনেক দোষের মধ্যে একটি মহান গুণ এই যে,
মানুষের মনে শুভ সঙ্কল্প করলেই পুণ্যলাভ হয়, কিন্তু অসাধু সঙ্কল্পের কাজ না করলে
পাপের ভাগী হতে হয় না। এই কারণে তিনি কলিকে সম্পূর্ণ বিনাশ করেননি।
হে বিপ্রগণ, আপনারা যা জিজ্ঞাসা
করেছিলেন, সেই বাসুদেবের কথায় পূর্ণ মহারাজ পরীক্ষিতের পবিত্র চরিত্র আপনাদের কাছে
বর্ণনা করলাম। যে কথা প্রসঙ্গে ভগবানের গুণ ও কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়, সেই কথা
সকলের পক্ষেই মঙ্গলকর ও সেই কথা শোনা, সকলেরই একান্ত কর্তব্য”।
ঋষিগণ বললেন, “হে সূত আপনি
অনন্তকাল বেঁচে থাকুন। কারণ, আমাদের মতো মরণশীল মানুষের কাছে, আপনি অমৃতস্বরূপ
শ্রীকৃষ্ণের নির্মল যশের কথা কীর্তন করছেন। আপনি জ্ঞানী ও ভগবৎ ভক্ত। আমরা
ভক্তবৎসল ভগবানের কথা আপনার মুখে আরো শুনতে চাই। মহাজ্ঞানী ও মহাভাগবত পরীক্ষিৎ
যোগীশ্রেষ্ঠ শুকদেবের যে জ্ঞান ও উপদেশ লাভ করলেন, সেই আখ্যানও আমাদের কাছে বর্ণনা
করুন”।
শ্রীসূত বললেন, “আহা, আমি নীচ
বংশে জন্মেও, আজ আমার জন্ম সার্থক হল। কারণ আপনাদের মতো জ্ঞানবৃদ্ধরা আমাকে সম্মান
দিলেন। হে ঋষিগণ, আপনারা আমাকে যা জিজ্ঞাসা করেছেন, সে সম্বন্ধে আমি যতটুকু জানি
আপনাদের কাছে বর্ণনা করব। কারণ পাখিরা যেমন নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী বিশাল আকাশের
অতি অল্প অংশেই উড়তে পারে, পণ্ডিতরাও স্বীয় বুদ্ধিমতো শ্রীবিষ্ণুর অনন্ত লীলা
বর্ণনা করতে পারেন।
একবার মহারাজ পরীক্ষিৎ মৃগয়া
করতে গিয়ে, অরন্যে হরিণের সন্ধান করতে করতে ক্লান্ত এবং ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর
হয়েছিলেন। তিনি পানীয় জলের সন্ধান করতে করতে কাছাকাছি একটি আশ্রমে প্রবেশ করে
দেখলেন, এক প্রশান্ত মুনি চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে আছেন। সেই মুনির ইন্দ্রিয়, মন,
প্রাণ সকল বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়েছে, এবং তিনি নির্বিকার ব্রহ্মরূপ লাভ করেছেন।
তাঁর দেহ রুরু মৃগের চর্মে আচ্ছাদিত এবং মাথায় বিক্ষিপ্ত জটাজাল। এদিকে মহারাজ
পরীক্ষিৎ পিপাসায় কাতর, তিনি মুনির কাছে
জল প্রার্থনা করলেন। কিন্তু ধ্যানস্থ মুনির থেকে বসবার আসন, অর্ঘ্য অথবা কুশল
বাক্য কিছুই না পেয়ে মহারাজ নিজেকে অপমানিত মনে করলেন। রাজা এর আগে কোনদিন এমন রাগ
ও বিদ্বেষ অনুভব করেননি, কিন্তু সেদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে অকস্মাৎ তাঁর মনে
মুনির উপর অত্যন্তু ক্রোধ ও বিদ্বেষ জন্ম নিল। তিনি আশ্রম থেকে বেরোনোর সময় ধনুর
ডগায় একটি মৃত সাপ নিয়ে, মুনির কাঁধে রেখে নিজের প্রাসাদের দিকে চলে গেলেন। ওই
মুনি সত্যিই সমাধিস্থ ছিলেন, নাকি ক্ষত্রিয় রাজাকে দেখে ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা করার
জন্যেই সমাধির কপটতা করলেন, মনে এই সন্দেহ হওয়াতেই রাজা সেইদিন ওই আচরণ করেছিলেন।
এদিকে, ওই মুনির পুত্র তপস্বী শৃঙ্গী, বালকদের সঙ্গে কিছুটা দূরে খেলা করছিল। তিনি অত্যন্ত তেজস্বী। রাজা পরীক্ষিৎ আশ্রমে এসেছিলেন এবং রাজা পিতাকে দুঃখ দিয়েছেন শুনেই তিনি বালকদের বললেন, “কি আশ্চর্য, রাজারা প্রজাদের অর্থেই সমৃদ্ধ হয়ে, কি রকম অধর্ম করে, দেখ। প্রভুর অন্নে বেঁচে থাকা কুকুর আর কাক যেমন প্রভুরই অনিষ্ট করে, তেমনি এই রাজাও আমার পিতার অনিষ্ট করে গেল! ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের দ্বারপাল কুকুর বলেই মনে করে, তাদের উচিৎ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা, তারা কিভাবে আশ্রমে প্রবেশ করে? ভগবান কৃষ্ণ কুপথগামী ব্যক্তিদের শাসনকর্তা ছিলেন, তিনি আর নেই। এখন যে ধর্ম পথের অসম্মান করেছে, তাকে আমি কী শাস্তি দিই, দেখ”।
ঋষি পুত্র বালকদের এই কথা বলতে বলতে, তাঁর দুই চোখ ক্রোধে তামার বর্ণ হয়ে উঠল। তারপর তিনি কৌশিকী নদীর জলে আচমন করে, বজ্রের মতো অভিশাপ দিলেন, “যে পাপিষ্ঠ, শাস্ত্র নিয়ম না মেনে আমার পিতার গায়ে মরা সাপ দিয়ে অপমান করেছে, আমার বাক্যে আজ থেকে সাত দিনে, তক্ষক তাকে দংশন করবে”।
তারপর সেই বালক আশ্রমে এসে পিতার গলায় জড়ানো মরা সাপ দেখে অত্যন্ত দুঃখ পেলেন ও উচ্চ কণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন। পুত্রের কান্নায়, মহর্ষি অঙ্গিরার বংশের ঋষি শমীকের সমাধি ভেঙে চোখ মেলে তাকালেন। তিনি দেখলেন, তাঁর গলায় মরা সাপ রয়েছে, তিনি সেই সাপকে দূরে ফেলে দিলেন, তারপর পুত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বৎস, কে তোমার কী অনিষ্ট করেছে, তুমি কাঁদছো কেন”?
ঋষি শমীকের প্রশ্নে শৃঙ্গী, পিতাকে সমস্ত কথাই বললেন। রাজা অভিশাপের যোগ্য নয়, তাও পুত্র তাঁকে অভিশাপ দিয়েছে শুনে, পুত্রকে তিনি সমর্থন করলেন না, বললেন, “হায়, তুমি লঘুপাপে গুরু দণ্ড দিয়ে নিজেই মহাপাপে পতিত হয়েছ। নৃপতি বিষ্ণুস্বরূপ, তাঁকে সাধারণ মানুষ ভেবে অভিশাপ দেওয়া অত্যন্ত অনুচিত হয়েছে। রাজর্ষি পরীক্ষিৎ ধর্ম অনুসারে প্রজাদের পুত্রের মতো পালন করে থাকেন। তিনি মহাভক্ত ও অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে যশ লাভ করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই ক্ষুধা তৃষ্ণায় অত্যন্ত কাতর হয়ে আশ্রমে এসেছিলেন, তাঁকে অভিশাপ দেওয়া আমাদের অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে”।
ঋষি শমীক পুত্রের পাপ কর্মের কোন প্রায়শ্চিত্ত না দেখে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন, “হে ভগবান, আমার পুত্র বালক। তার বুদ্ধি এখনও কাঁচা। সে নিরপরাধ রাজার প্রতি যে অনিষ্ট আচরণ করেছে, সর্বভূতের অন্তর্যামী প্রভু তাকে ক্ষমা করুন। ঋষি মনে মনে চিন্তা করলেন, যদি রাজা প্রতিশাপ দেন, তাহলে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হতে পারত। কিন্তু মহারাজ পরীক্ষিৎ শ্রীহরির পরম ভক্ত, তিনি সেরকম কিছু করবেন না। কারণ সামর্থ থাকলেও হরির ভক্তেরা তিরষ্কার, অভিশাপ, প্রতারণা কিংবা অপমানেও অপরের অনিষ্ট চিন্তা করেন না। মুনি শমীক পুত্রের কাজে এতই অনুতপ্ত হলেন, রাজা যে তাঁর কাছে অপরাধ করেছিলেন, সে কথা মনেও স্থান দিলেন না। সাধারণ লোকে প্রায়ই সাধুজনকে সুখ বা দুঃখ দিয়ে থাকে, কিন্তু তাঁরা সেই ব্যবহারে হর্ষ বা দুঃখ অনুভব করেন না, কারণ সুখ দুঃখ আত্মার ধর্ম নয়”।
অনুতপ্ত পরীক্ষিৎ
শ্রীসূত বললেন, “এদিকে মহীপতি
পরীক্ষিৎ নিজের নিন্দনীয় কাজের চিন্তা করে অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে বললেন, হায়, আমি
অনার্যের মতো কী হীন কাজই করেছি! ব্রাহ্মণ তেজের আধার, আমি নিরপরাধ সেই ব্রাহ্মণের
প্রতি অন্যায় কাজ করেছি। ঋষি ঈশ্বরস্বরূপ, তাঁর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে আমি
ঈশ্বরের অপমান করেছি। এই অপরাধে আমার যে ভীষণ বিপদ ঘটবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই
হোক, অজস্র দুঃখ আমাকে আক্রমণ করুক, কিন্তু ওই দুঃখ আমার সন্তানদের কোনভাবেই যেন
প্রভাবিত না করে। আমার পাপের সমুচিত শাস্তি হোক, যাতে ভবিষ্যতে আমার এই রকম কাজে
আর প্রবৃত্তি না আসে। রাজা নিজের বিপদ প্রার্থনা করে আবার বললেন, আজই আমার এই
রাজ্য, শক্তি ও ধন সম্পদে ভরা রাজকোষের বিনাশ হোক, আমার মতো নীচমনা ব্যক্তির, গো,
ব্রাহ্মণ ও দেবতার অনিষ্ট করতে, আর যেন পাপ বুদ্ধির উদয় না হয়।
রাজা এই রকম যখন চিন্তা করছেন,
সেই সময় ঋষি শমীকের এক শিষ্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে, সপ্তম দিনে তক্ষক দংশনে তাঁর
মৃত্যুর বিষয় জানালো। সেই কথা শুনে, রাজা তক্ষকের বিষকেও মঙ্গলদায়ক মনে করলেন,
কারণ বিষ বিষয়ে আসক্ত ব্যক্তিদের মনে বৈরাগ্য আনতে সাহায্য করে। পার্থিব ও
স্বর্গীয় সুখ উপভোগ যে পরিত্যাগের বিষয়, এ কথা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। এখন
শ্রীকৃষ্ণের চরণপদ্মের সেবাই সকল ধর্মের সার, এই চিন্তায় তিনি অনশনে জীবন ত্যাগের
সঙ্কল্প নিয়ে ভাগিরথীর তীরে গিয়ে আসন গ্রহণ করলেন। ভাগিরথীর পুণ্যসলিল ঐশ্বর্যময়ী
তুলসীর রেণু ও কৃষ্ণপদরেণু বহন করে, অদ্ভূত পাবনী শক্তি লাভ করেছেন। এই সলিল স্পর্শে লোকপালদের সঙ্গে
ত্রিলোকের অন্তর ও বাহির পবিত্র হয়ে থাকে, অতএব আসন্ন মৃত্যু কোন ব্যক্তি
অন্তিমকালে তাঁর তীরে আশ্রয় না করবে?”
পাণ্ডুবংশধর পবিত্র গঙ্গাতীরে
অনাহারে প্রাণত্যাগের ব্রত নিয়ে সমস্ত সঙ্গ ত্যাগ করলেন এবং একাগ্র মনে মুকুন্দের
চরণযুগল ধ্যান করতে লাগলেন। তাঁকে দেখার জন্যে মহানুভব মুনি ও ঋষিরা শিষ্যদের
সঙ্গে সেখানে উপস্হিত হলেন। কারণ সাধুজনেরা প্রায়ই তীর্থ দর্শনের ছলে তীর্থস্থানকেই
পবিত্র করে তোলেন। অত্রি, বশিষ্ঠ, চ্যবন, শরদ্বান, অরিষ্টনেমি, ভৃগু, অঙ্গিরা,
পরাশর, গাধিসুত বিশ্বামিত্র, পরশুরাম, উতথ্য, ইন্দ্রপ্রমহ, সুবাহু, মেধাতিথি,
দেবল, আর্ষ্টিষেণ, ভরদ্বাজ, গৌতম, পিপ্পলাদ, মৈত্রেয়, ঐর্ব, কবষ, কুম্ভযোনি,
অগস্ত্য, বেদব্যাস, শ্রীনারদ ও অন্যান্য দেবর্ষি ও মহর্ষিরা এবং অরুণা প্রমুখ
রাজর্ষিগণও সেখানে উপস্থিত হলে, মহারাজ পরীক্ষিৎ তাঁদের সকলের অর্চনা করে,
সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
সকলে সেই ভাগিরথী তীরে আসন গ্রহণ
করলে, মহারাজ পরীক্ষিৎ করজোড়ে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনারা আমার এই অনশন
ব্রত অনুমোদন করে আমাকে ধন্য করেছেন। ব্রাহ্মণেরা তাঁদের পা ধোয়া জল নিজেদের গৃহ
থেকে অনেক দূরে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু যে রাজকুলে নিন্দিত কর্মের অনুষ্ঠান হয়, সেই
রাজাকে তার থেকেও অনেক বেশি দূরে পরিত্যাগ করেন। সুতরাং আপনারা মহাজন হয়েও আজ আমার
প্রতি যে কৃপা দেখালেন, তাতে আমি নৃপতিদের মধ্যে সবথেকে বেশি ধন্য হলাম। আমার
প্রতি যে ব্রহ্মশাপ হয়েছে, এও শ্রীহরির অনুগ্রহ। তিনি পাপিষ্ঠ আমাকে সর্বদা গৃহে
আসক্ত দেখে, ব্রাহ্মণশাপরূপে আমার অন্তরে বৈরাগ্য উৎপন্ন করেছেন এবং বৈরাগ্যই
শ্রীহরির চরণ লাভের একমাত্র উপায়”।
তারপর রাজা আরও বললেন, “হে
ঋষিগণ, আপনারা আমাকে শরণাগত বলে অস্বীকার করুন ও গঙ্গাদেবী আমাকে আশ্রয় দান করুন,
আমি শ্রী ভগবানের চরণে আত্মসমর্পণ করলাম। ব্রাহ্মণের পাঠানো মায়া কিংবা তক্ষক
আমাকে তার ইচ্ছামতো দংশন করুক, আপনারা বিষ্ণুগাথা কীর্তন করুন। পরজন্মে আমি যে
যোনিতেই জন্মগ্রহণ করি না কেন, আমার যেন ভগবানে অনন্ত রতি, তাঁর ভক্ত সাধুজনের
সঙ্গলাভ হয় এবং সর্ব জীবে প্রীতিভাব উৎপন্ন হয়। হে দ্বিজগণ, আপনাদের সকলকে আমার
নমস্কার”।
রাজা পরীক্ষিৎ পুত্র জনমেজয়ের হাতে রাজ্যভার সমর্পণ করলেন, তারপর ধীরভাবে, গঙ্গার দক্ষিণকূলে, উত্তরমুখী হয়ে কুশাসনে বসলেন। রাজা এইভাবে প্রায়োপবেশনে অর্থাৎ অনশন ব্রত নিয়ে আসন গ্রহণ করলে, স্বর্গের দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করলেন, আনন্দে দুন্দুভিধ্বনি করলেন। উপস্থিত মহর্ষিরাও রাজার সঙ্কল্পের অনুমোদন করে, তাঁকে অজস্র সাধুবাদ দিয়ে বললেন,“হে রাজর্ষিশ্রেষ্ঠ, আপনার পূর্বপুরুষ যুধিষ্ঠির প্রমুখ, ভগবানের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যে রাজসিংহাসন ও রাজমুকুট ত্যাগ করেছিলেন। আপনারা শ্রীকৃষ্ণে একান্ত অনুরক্ত, অতএব এই কাজ আপনাদের পক্ষে কিছু মাত্র বিচিত্র নয়”।
তারপর তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে স্থির করলেন, এই ভক্তচূড়ামণি পরীক্ষিৎ যতদিন না নিজের দেহ ত্যাগ করে মায়ার অতীত ও শোক রহিত অমৃতলোক লাভ করেন, ততদিন তাঁরা এই গঙ্গাতীরেই রাজার সঙ্গ দান করবেন। রাজা তাঁদের এই পক্ষপাতহীন সুমধুর সত্য ও গম্ভীর কথা শুনে, শ্রীবিষ্ণুর চরিত্র গাথা শোনার ইচ্ছায়, তাঁদের সংযত চিত্তে অনুরোধ করলেন, “হে বিপ্রগণ, এই ক্ষণে সমস্ত বেদ যেন সত্যলোকে মূর্তিধারণ করে অবস্থান করছেন, আমার প্রতি সদয় হয়ে আপনারা যখন এখানে উপস্থিত রয়েছেন, আপনাদের সকলের কাছে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই। কারণ অন্যের প্রতি অনুগ্রহ করাই আপনাদের আত্মার স্বভাব এবং এ ছাড়া ইহলোকে কিংবা পরলোকে আপনাদের অন্য কোন প্রয়োজনই দেখা যায় না। সকল অবস্থায়, বিশেষ করে মুমূর্ষুকালে মানুষের বিশুদ্ধ অনুষ্ঠানের কাজ কী, আপনারা সকলে বিবেচনা করে আমার মনের সংশয় দূর করুন”।
মহারাজার প্রশ্ন শুনে উপস্থিত
ঋষিদের মধ্যে মতের অমিল উপস্থিত হল। তাঁদের মধ্যে কেউ বললেন যোগ, কেউ বললেন, যাগ,
আবার কেউ কেউ বললেন, মুমূর্ষু ব্যক্তিদের বিশুদ্ধ কর্তব্য তপস্যা। এই বিষয়ে তাঁরা
যখন বিবাদ করছেন, সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন, ব্যাসপুত্র ভগবান শুকদেব।
ভগবান শুকদেবের বেশভূষা দেখে মনে
হচ্ছিল, অবহেলা করে তাঁকে যেন সকলে পরিত্যাগ করেছে। তাঁর সঙ্গে কোন বর্ণ বা কোন
আশ্রমের লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল না। তিনি যখন এলেন, তাঁকে ঘিরে নগরের যত বালকের দল
কৌতুক করছিল। তাঁর কোনও ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি আসক্তি ছিল না, তিনি যে পরমানন্দ
লাভ করেছিলেন, সেই আনন্দেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি ষোড়শবর্ষীয় তরুণ, তাঁর হাত, পা,
উরু, বাহু, কাঁধ, গাল ও ত্বক সুকুমার; তাঁর সুন্দর আয়ত নয়ন, উন্নত নাক, দুই কর্ণ
সমান এবং সুচারু ভ্রূযুগলে মুখমণ্ডল অপূর্ব সুন্দর। তাঁর কণ্ঠে শঙ্খের মতো আঁকা
তিনটি রেখা; তাঁর বক্ষ বিশাল ও উন্নত, তাঁর নাভি আবর্ত, অর্থাৎ গভীর। তিনি
দিগম্বর। তাঁর দুই বাহু দীর্ঘ এবং কান্তি দেবদেব শ্রীহরির মতোই মনোহর। তাঁর শ্যাম
অঙ্গের যৌবন ও তাঁর অধরের মধুর হাসি দেখে রমণীরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন।
[এর পর থেকে সৌম্য-সুন্দর ও নগ্ন কিন্তু অহিংস্র কোন পাগল-মানুষকে দেখে অবহেলা করবেন না, বারেক চিন্তা করে নেবেন, তিনি শুকদেবের মতো সিদ্ধযোগী নন তো? অবশ্য একথাও সত্যি শুকদেবকে চিনতে পারতেন সেকালের তপস্বী ও জ্ঞানী মুনি-ঋষিরা - কিন্তু আমরা তো বিষয়াসক্ত অজ্ঞান-অর্বাচীনের দল - সিদ্ধযোগীকে চেনা আমাদের সাধ্য কি?]
তাঁর ব্রহ্মতেজ গুপ্ত থাকলেও, মুনিগণ তাঁর লক্ষণ দেখে, তাঁকে চিনতে পারলেন। সকলে নিজ নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। মহারাজ পরীক্ষিতের পুজো গ্রহণ করে, ভগবান শুকদেবকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসার পর, তাঁকে ঘিরে সকলে আসন গ্রহণ করলেন। সকল ব্রহ্মর্ষি, রাজর্ষি ও দেবর্ষিদের সভায়, নক্ষত্রবেষ্টিত চাঁদের মতোই তিনি উজ্জ্বল ও মনোহর শোভা ধারণ করলেন।
মহারাজ পরীক্ষিৎ অবনত মস্তকে, করজোড়ে, ভগবান শুকদেবের সামনে গিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি কৃপা করে আমাদের সভায় এসে পড়ায়, আমরা তীর্থের মতোই পবিত্র হলাম। আজ আমার অত্যন্ত শুভদিন। সামান্য ক্ষত্রিয় হয়েও আপনার মতো সাধুসেবার অধিকারী হলাম। হে যোগীবর, বিষ্ণুর সামনে অসুরদের যেমন তৎক্ষণাৎ বিনাশ হয়, তেমনি আপনার সামনে মহাপাতকের সকল পাপ ক্ষয় হয়ে যায়। ভগবান কৃষ্ণ পাণ্ডবদের প্রেমে চির আবদ্ধ, আমি তাঁদের বংশধর, আমার প্রতি শ্রীভগবানের করুণাতেই, আজ এই স্থানে আপনার উপস্থিতি; নয়তো আপনার দর্শনলাভ একান্তই দুর্লভ। আপনি যোগ সিদ্ধ, আপনি কখন কোথায় ভ্রমণ করেন, কেউ জানে না। আমার মৃত্যু সমাগত প্রায়, অতএব আপনি যে আমার মনের ইচ্ছা পূরণের জন্যই স্বয়ং এসে দর্শন দিলেন, এ ভগবান কৃষ্ণর অনুগ্রহ ছাড়া কিছুই নয়। আপনি যোগীদেরও গুরু, আপনার শ্রী চরণে আমার প্রার্থনা, মানুষের অন্তিমকালে কর্তব্য কর্ম কী, সে বিষয়ে আমাকে উপদেশ দিন। মানুষের যা কিছু শ্রবণ, জপ, অনুষ্ঠান, স্মরণ ও ভজন করা কর্তব্য এবং যে সকল কর্ম নিষিদ্ধ, সে সকল বিষয় এখনই বলতে অনুরোধ করছি, আপনি গৃহস্থের গৃহে গোদোহন কালের বেশি অবস্থান করেন না”।
[রাজা পরীক্ষিতের অভিশপ্ত হওয়া এবং সর্প দংশনে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি মহাভারত সবিস্তারে বর্ণনা করেছে, এই পুরাণের বর্ণনার মতো ভাসা-ভাসা ভক্তিরসে মাখা নয়। আগ্রহী পাঠকরা এই ব্লগের "ওঁ শান্তিঃ (নাটিকা)"-টি পড়ে নিতে পারেন - পরীক্ষিতের মৃত্যুর পিছনে কী যেন এক রহস্য ছিল, সে কথা মহাভারত তুলে ধরেছে।]
শ্রীসূত বললেন, “মহারাজ পরীক্ষিৎ মধুর বাক্যে ব্যাসপুত্র ধর্মজ্ঞ শুকদেবকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করায়, ভগবান শুকদেব অমৃত বাক্য বলতে শুরু করলেন”।
প্রথম স্কন্ধ সমাপ্ত
পরের সংখ্যায় দ্বিতীয় স্কন্ধের শুরু।