বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


ভীষ্মের কৃষ্ণবন্দনা ও দেহত্যাগ

সূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরার উদ্যোগে ভেঙে পড়লেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁর মন ধর্ম থেকে বিচলিত হয়ে গেল।

তিনি স্নেহ ও মোহের বশে বিলাপ করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না। আমি ভীষণ পাপ করেছি। এই যুদ্ধে আমি কত ব্রাহ্মণ, বন্ধু, জ্ঞাতি, ভাই, গুরু এবং পিতৃতুল্য ব্যক্তিকেও হত্যা করেছি। হাজার হাজার বছর নরকবাসেও আমার এই পাপমুক্তি হবে না। আমি তো কোনদিনই রাজা ছিলাম না, হে কৃষ্ণ। অতএব, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে এই যুদ্ধ করেছি, তাও বলা চলে না। আমি এই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র রাজ্যলোভে। এই যুদ্ধে আমি বহু নারীর স্বামী, পুত্র, ভ্রাতা কিংবা পিতাকে হত্যা করে, তাদের গৃহস্থ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন শাস্ত্রকথায় আমার আর বিশ্বাস নেই। কাদা দিয়ে যেমন দূষিতজলকে শুদ্ধ করা যায় না, তেমনি অশ্বমেধের যজ্ঞে ঘোড়াকে আহুতি দিলেই, এতগুলি নরহত্যার পাপ খণ্ডন হতে পারে না

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে, কুরুক্ষেত্রে দেবব্রত ভীষ্ম যেখানে শরশয্যায় শুয়ে আছেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন সমবেত মুনি, ঋষি ও পাণ্ডবদের চার ভাই। ভরতবংশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখার জন্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, বৃহদশ্ব, ভরদ্বাজ, অনেক শিষ্য নিয়ে পরশুরাম, বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম, অত্রি, কৌশিক, সুদর্শন, শুকদেব, কশ্যপ, আঙ্গিরস। সেখানে আমিও সেদিন উপস্থিত ছিলাম। সকল মুনি ঋষিদের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে ভীষ্মের চোখে জল চলে এলতিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সকলকে প্রণাম জানালেন। বন্দনা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই মহামতি ভীষ্মকে প্রণাম করে তাঁর পাশে বিষণ্ণ মুখে বসলেন।

তাঁদের ম্লানমুখে বসে থাকতে দেখে, মহামতি ভীষ্ম স্নেহস্বরে বললেন, হে পাণ্ডুর পুত্রেরা, সারা জীবন তোমরা ব্রাহ্মণ, ধর্ম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেও, এমন বিষাদগ্রস্ত কেন? মহাবীর পাণ্ডু যখন মারা যান, তোমরা তখন শিশুমাত্র। বধূমাতা পৃথা তোমাদের মানুষ করার জন্যে কি কষ্টই না সহ্য করেছেন! এসবই ঘটেছে কালের নিয়মে। কালের নিয়মেই জীবের সুখদুঃখের দিন আসে আবার চলেও যায়। তোমাদের সঙ্গে আছে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবল, ভীমের বাহুবল, অর্জুনের অস্ত্রবল আর সবার উপরে আছেন সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণের মিত্রবল। এর চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে?

হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমাদের বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমিই যোগ্য রাজা এবং রাজ্য চালনায় তুমি যথেষ্ট দক্ষ। এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন, মনে এই বিশ্বাস রেখে তুমি প্রজাপালন করো। তোমাদের একান্ত মিত্র এই শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম ঈশ্বর, তাঁর প্রতি ভক্তি রেখে তোমরা নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করো। এই শ্রীকৃষ্ণের মনের কী ইচ্ছে, সে কথা তিনলোকের কেউই বুঝতে পারেন না, তোমরা কী করে বুঝবে? ইনি যে এখন যাদবদের মধ্যে যাদব হয়েই রয়েছেন, এ কথা খুব কম লোকেই জানেন। একথা জানেন দেবর্ষি নারদ এবং কপিলমুনি, আর কয়েকজন। ইনি সকলের আত্মা, ইনি সকলকে সমান ভাবে দেখেন। এঁনার মনে অহংকার নেই, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তাঁকে তোমরা সাধারণ মামাতো ভাই মনে করেছ। ভালোবেসেছ, বিশ্বাস করেছ, ভরসা করেছ। যখন যে কাজে তোমরা ওঁনাকে নিয়োগ করেছ, উনি বিনা দ্বিধায় সে কাজ করেছেন। কখনো তোমরা সম্মানীয় মন্ত্রী হিসেবে ওঁনার মন্ত্রণা নিয়েছ। কখনো রাজদূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঠিয়েছ। আবার রথের সামান্য সারথিপদেও তোমরা ওঁনাকে নিযুক্ত করেছ! লক্ষ্য করে দেখ, ওঁনার মনে উঁচু কাজ, নীচু কাজ এমন কোন দ্বিধা নেইওঁনার দৃষ্টিতে সবাই সমান; আপন-পর, শত্রু-মিত্র, উঁচু-নীচু কোন ভেদ নেই”

[এইখানে মহামতি ভীষ্ম ভারতের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। ভারতের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়রূপে বিরাজও করেন।]              

মহামতি ভীষ্ম সামান্য বিরামের পর, শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আবার বললেন, “হে পাণ্ডুর পুত্রগণ, তোমরা ওঁনার মহিমা উপলব্ধি করো যদিও আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের, তাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছে এসেছেন। উনি জানেন আমি ওঁনার একান্ত ভক্ত এবং আমি আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছিতাই ভক্তের প্রতি একান্ত করুণায়, উনি নিজে এসেছেন আমায় দেখা দিতে! আমি তোমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল জেনে উনি তোমাদেরকেও এখানে নিয়ে এসেছেন। এই যুদ্ধের কারণে তোমরা যে মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছ, আমার সান্নিধ্যে সে সব মুছে যাক, এও ওঁনার মনের ইচ্ছা। 

হে কৃষ্ণ, তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আর তোমার ঐ করুণাঘন দৃষ্টিতে আমি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম হে কৃষ্ণ, আমি ধন্য, আমি কৃতার্থ, পরম আনন্দে আমি আপ্লুতআমার একটাই নিবেদন, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু আসে, তুমি আমার এই শরশয্যার পাশে প্রতীক্ষা করো, আমি দু চোখ ভরে তোমায় যেন দেখতে পাই”

এরপর মহামতি ভীষ্ম মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম, স্ত্রীধর্ম, ভগবৎ ধর্ম এবং আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিলেন। এই সব আলোচনা হতে হতেই মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর সময় উত্তরায়ণের কাল ঘনিয়ে এল। কথাবার্তা শেষ করে মহামতি ভীষ্ম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে এবং সমস্ত মন প্রাণ তাঁকেই সমর্পণ করলেন।

কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর তিনি আবার বললেন, “হে যাদব শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান পরমানন্দ স্বরূপ। আমি তোমাতে আমার কামনাহীন মতি সমর্পণ করলাম। হে অর্জুনের সারথি, তোমার তমালকান্তি অপরূপ দেহে নতুন সূর্যের মতো উজ্জ্বল পীত বসন অপূর্ব মানিয়েছে। তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। হে কৃষ্ণ, তোমার প্রতি আমার অহৈতুকি ভক্তি যেন সর্বদা অচল থাকে, এই প্রার্থনা করি।

হে কৃষ্ণ, যুদ্ধের সময় তুমি অর্জুনের রথে ছিলে। আমার ছোঁড়া তিরে তোমার গায়ের কবচ বার বার ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তোমার চুলের থেকে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো মিশে তোমার মুখে অদ্ভূত আলপনা সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার।

হে কৃষ্ণ, বন্ধু অর্জুনের কথায়, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের দুই পক্ষের মাঝখানে তুমি রথ স্থাপনা করেছিলে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রোণ আর আমাকে দেখে, বিষণ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধে বিরত হয়েছিল, তুমি ওকে পরমাত্মা তত্ত্ব উপদেশ দিয়ে ওর মোহ দূর করেছিলে। আর উপদেশ দেওয়ার সময়, তোমার নিষ্ঠুর কালদৃষ্টি দিয়ে আমাদের আয়ু নাশ করেছিলে।

হে মধুসূদন, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এই যুদ্ধে তুমি নিজে অস্ত্র ধরবে না। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আমি অস্ত্র ধরাবোই। আমার তিরের আঘাতে অর্জুন যখন ব্যতিব্যস্ত, অস্থির। তুমি হঠাৎ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে এলে মাটিতে, তারপর দুই হাতে রথের চাকা তুলে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো দৌড়ে আসছিলে আমাকে হত্যা করতে। আমার তিরের আঘাতে তোমার কবচ ছিন্নভিন্ন হল, তোমার শরীর হল রক্তাক্ত। তবু তোমার কি ক্রোধ! তোমার পায়ের চাপে তখন মাটি কাঁপছে থর থর করে, তোমার গায়ের উড়নি উড়ে গেল কোথায়। লোকে বলে তুমি অর্জুনের পক্ষ নিয়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে। আমি জানি হে নাথ, তুমি তোমার ভক্তের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যেই নিজের প্রতিজ্ঞাও বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেভক্তের প্রতি তোমার এই করুণার কোন তুলনা হয় না, হে মধুসূদন।

হে কৃষ্ণ, অর্জুনের রথে ঘোড়ার লাগাম আর চাবুক হাতে তোমার সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি, এখনো আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। সীমাহীন তোমার ঐশ্বর্য, অনন্ত তোমার লীলা। হে জনার্দন, আমার শেষের সময় ঘনিয়ে এল, এখন দয়া করে তোমার চরণ কমলে স্থান দাও  বর দাও, তোমাতে আমার যেন অবিচল ভক্তি থাকে চিরদিন”

মহামতি ভীষ্ম এইভাবে, তাঁর মন, বাক্য, কর্ম ও বৃত্তির সমাপ্তি করলেন। তারপর নিজের আত্মাকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় পড়ে রইল তাঁর নশ্বর দেহ।  যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই এবং উপস্থিত ঋষি মুনিরা সমবেত ভাবে পবিত্র সেই মরদেহের সৎকার করলেন।

মহামতি ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টির পর সকলে হস্তিনাপুর নগরে ফিরে এলেন। সেখান থেকে সমবেত ঋষি, মুনিরা ফিরে গেলেন তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে। যুধিষ্টির জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র ও পুত্রশোকে দুঃখিনী গান্ধারীকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, তারপর ধৃতরাষ্ট্র ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করে, যথা বিধি রাজসিংহাসনে বসে প্রজাপালন শুরু করলেন”    


শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরা

শৌনক বললেন, “হে সূত, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শত্রুদের বধ করে অনুজদের সঙ্গে কিভাবে রাজ্যপালন করলেন, সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “জ্ঞাতিবিরোধের আগুনে কুরুবংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার পর, লোকপালক শ্রীহরি পরীক্ষিতের প্রাণ রক্ষা করে সেই কুরুবংশকেই আবার অঙ্কুরিত করলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে আবার প্রতিষ্ঠা করে পরমপ্রীতি লাভ করলেন। মহামতি ভীষ্ম ও শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠিরের চিত্তে আবার দিব্যজ্ঞানের উদয় হল এবং তাঁর মন থেকে “আমিই এই যুদ্ধের কর্তা”, “আমিই সকল জ্ঞাতিহত্যার জন্য দায়ী” এই ভ্রান্ত মোহ দূর হয়ে গেল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করে, সকল ভ্রাতাদের সঙ্গে সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তাঁর রাজ্যে মেঘ সুষ্ঠু বৃষ্টি উপহার দিল, পৃথিবী প্রচুর শস্যশালিনী হয়ে উঠল এবং গাভীরা প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করল। নদী, সমুদ্র ও পর্বত সকলেই সুস্থ জীবনের অনুকূল হয়ে উঠল। অরণ্যের বনষ্পতি, লতা ও ওষধি প্রচুর ফল ও পুষ্পে সুশোভন হয়ে উঠল। দেশের রাজা অজাতশত্রু হওয়ার কারণে, জীবের মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ত্রিতাপ দূর হয়ে গেল।          

অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়সখা পাণ্ডব ও ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থেকে, সকলকে পরিতুষ্ট করে, যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। তিনি যেদিন দ্বারকার উদ্দেশে রওনা হলেন, হস্তিনাপুরের সকল নর নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠল। মহারাজ যুধিষ্ঠির ও চার ভাই তাঁকে বিদায়কালে আলিঙ্গন করলেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা, গান্ধারী, সত্যবতী সকলেই তাঁর আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে ব্যাকুল হলেন। ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, আচার্য ধৌম্য সকলেই অশ্রুসজল চোখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শ্রীকৃষ্ণকথা ভক্তিভরে একবার মাত্র শুনলে তাঁকে আর ভোলা যায় না। সেই শ্রীকৃষ্ণকে হস্তিনাপুরবাসী এতদিন দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তাঁর স্পর্শও পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের এই বিদায়ক্ষণটিকে সহ্য করা কীভাবে সম্ভব?

শ্রীকৃষ্ণ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পদব্রজে চললেন নগরের রাজপথে। পথের দুপাশের সুন্দর বাড়িগুলির ছাদ থেকে পুরনারীগণ তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি নিবেদন করতে লাগলেন। পথের দুপাশে জোড়হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, সব বয়সের শহরবাসী। বিদায়কালে চোখের জলে যদি তাঁর কোন অমঙ্গল হয়, সেই ভয়ে পুরনারীরা কষ্ট হলেও চোখের জল সংবরণ করলেন।

তারপর তিনি তাঁর  রথে উঠলেন। তাঁর মাথায় সাদা ছাতা ধরলেন তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন। সে ছাতার দণ্ড মণিময়, ছাউনি মুক্তামালায় সাজানো। উদ্ধব আর সাত্যকি তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করতে লাগলেন। শুভক্ষণে চারদিকে বেজে উঠল শাঁখ, মৃদঙ্গ, ভেরী, ঘন্টা, দুন্দুভি।  শ্রীকৃষ্ণের রথ চলতে লাগল, কিন্তু গতি খুব ধীর। তাঁকে বিদায় দিতে, শহরের রাজপথ জনাকীর্ণতাঁর মুখে মোহন হাসি, সকলের দিকে তাঁর করুণাঘন দৃষ্টিসুন্দর রথের ওপর তাঁর অপরূপ মনোহর রূপের দিকে, নারী পুরুষ সকলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

তাঁর কানে এলো, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুরুনারীদের আলাপ, “ওলো, ইনি কে জানিস, ইনিই সেই কৃষ্ণভগবান। সৃষ্টির আগে, জগতে একা ইনিই স্বরূপে থাকেন। এঁনার থেকেই সমস্ত বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি। আবার প্রলয়ের কালে, জগৎ যখন ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত জীবের আত্মা এঁনার মধ্যেই মিশে যায়। ইনিই সেই সনাতন পরমপুরুষ। যাঁর শুরু নেই, শেষও নেই। সামনে থেকে প্রণাম করার এমন সু্যোগ আর পাব কিনা জানি না আয় লো, আয়, এঁনাকে আমরা প্রণাম করি।

প্রিয়সখি, এঁনার ওই করুণা দৃষ্টিতে আমাদের মনের সব ময়লা মুছে যাচ্ছে। সাধু-মুনিরা যুগ যুগ তপস্যা করে, যোগসাধনা করে, ওঁনার পদ্মের মতো পা দুটোই শুধু দেখতে পান। অথচ আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি ওঁর ওই মোহন রূপ, ওই মধুর হাসি আর করুণাসিন্ধু ওই দুই চোখের দৃষ্টি। আমরা কি কম ভাগ্যবতী, বল?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি, বেদমন্ত্রে জীবকে ধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কর্ম কর্তব্য, কোন কর্ম অন্যায় তাও তিনি নির্দেশ করেছেনএই সবই তিনি জীব পালনের জন্যেই করেছেন। তমোগুণে আচ্ছন্ন রাজারা যখন প্রজাদের অমঙ্গল করে, ক্ষতি করে, ধর্মনাশ করে; তাঁদের বিনাশের জন্যে এই কৃষ্ণভগবানই বারবার জগতে জন্ম নেনসত্ত্বমূর্তিতে তিনি নিজে আসেন সকলের সামনে, জগতে ঐশ্বর্য আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে।  করুণাময় ভক্তবৎসল ভগবান, সাধারণ ভক্তদের মনে সঞ্চার করেন ভক্তি, ভরসা, বিশ্বাস আর ধর্ম।

ওলো, আমার খুব হিংসে হয় যদুবংশের ওপর, মধুবন আর দ্বারকাপুরীর ওপর। কেন জানিস। ওই বংশেই যে উনি জন্ম নিয়েছেন! ধন্য হয়ে গেছে যাদবরা, তাঁর লীলায় ধন্য হয়েছে মধুবন, ধন্য হচ্ছে দ্বারকাপুরী। কি ভাগ্য বলতো দ্বারকার প্রজাদের? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ তারা সকাল সন্ধ্যে রোজ দেখে। প্রত্যেকদিন তারা সামনে থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনার সুযোগ পায়।

আরো ভাবতো, সখি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসব পত্নীদের কথা! কত যুগের কঠিন তপস্যা করে, তবেই না তাঁরা পরমপুরুষকে স্বামীরূপে পেয়েছেন! নিজের হাতে শিশুপালদের মতো নৃশংস রাজাকে হত্যা করে, তিনিই উদ্ধার করেছিলেন, রুক্মিণী, জাম্ববতী, নাগ্নজিতীকে। তাঁরা এখন প্রদ্যুম্ন, শাম্ব ও আম্বের মতো গুণবান পুত্রের জননী। নরকাসুরকে হত্যা করেও তিনি উদ্ধার করেছিলেন সহস্র রমণী। তাঁরা নরকাসুরের অধীনে কি দুঃখের জীবন কাটিয়েছে, বল। তাঁদের সকলের হারানো সম্মান, যোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

সই, এমন ভাবিস না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু ভক্তবৎসল করুণাসাগর। ভগবান ভালোবাসা ও প্রেমেরও রাজা। এই কৃষ্ণভগবান প্রেমেরও পারাবার। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে স্বর্গ থেকে পারিজাত এনেছিলেন, কার জন্যে জানিস? আমি জানি লো, আমি জানি, পরমপ্রিয়া রুক্মিণীর জন্যে...”

(সূত বললেন,) "নগরের মহাতোরণের কাছে এসে পড়ায়, কুরুললনাদের সেই আলাপ আর তিনি শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে মৃদুহাস্যে তাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর রওনা হলেন দ্বারকার পথে। তাঁর সঙ্গে রইল উদ্ধব আর সাত্যকি। সামনে আর পিছনে রইল চতুরঙ্গ সেনার দুটি দল। মহারাজা যুধিষ্ঠির, তাঁর পথের নির্বিঘ্ন নিরাপত্তার জন্যে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন”

[মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায় সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে।] 

চলবে... 

                  

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

পয়লা বৈশাখ

 

এর আগের রম্যকথা - " বিচিত্র ঐক্য " 


পয়লা বৈশাখ, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ

    সেই কালে মোকাম কলকেতার নানান অঞ্চলে চড়কের মেলা বসিত। আমাদের শৈশবে কিংবা বাল্যে দেখা আমাদের গেরামের মেলার সহিত তাহার বিস্তর ফারাক। কলকেতার মেলায় অনেক বেশি জাঁকজমক। কাঠের নাগরদোলা। কাঠের হাতিঘোড়ায় বসিয়া বন বন করিয়া ঘুরিবার মেরি-গো-রাউণ্ড। চোখধাঁধানো মনোহারি পসরা কিংবা খাদ্যসামগ্রী, সব ব্যাপারেই কলকেতার মেলা বিশিষ্ট। কাঁচের ও চিনামাটির তৈরি সায়েব-মেম পুতুল। রূপার তবক দেওয়া মিঠা পান। নানান রঙের সিরাপ দেওয়া, বরফ শীতল রঙিন সরবৎ। মালাই কুলফি। যুবা বয়েসে বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়িয়া কলকেতার মেলা বেশ কয়েকবার দেখিয়া অবাক হইয়াছিলাম, কিন্তু তাহাতে প্রাণের সাড়া পাই নাই। বরং মজা পাইয়াছিলাম অন্যত্র।

    কলকেতার চেতলার হাট মশারি আর মাছের জালের জন্যে বহুদিন হইতেই বিখ্যাত। কিন্তু আমি চেতলার যে মোহজালে মুগ্ধ হইলাম তাহা সংয়ের সাজ। পয়লা বোশেখের আগে ও পয়লা বোশেখের দিন চেতলার সং দেখিতে জন সমাগম হইত বিস্তর। কার্বাইড গ্যাসের চোখধাঁধানো উজ্জ্বল আলোয় বিচিত্র বেশে বেশ কিছু লোক সাজিয়া উঠিত কলকেতার বাবুদের নষ্টামি, আখড়ার মহারাজদের ধ্যাষ্টামি, কূলবধুদের গোপন ভ্রষ্টামি, মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ; এসব নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ তো ছিলই। তাহার উপর আরো থাকিত নির্ভেজাল হাসির উপস্থাপন। বুকফাটা কান্না, দমফাটা হাসি, আহ্লাদে আটখানা, কাজের ভারে কুঁজো। সন্ধ্যার পর জেলেপাড়ার সঙদের সেই মিছিল সমাবেশ, উপস্থিত জনগণের সহিত আমরাও অত্যন্ত উপভোগ করিতাম।

    পয়লা বোশেখের দিন সকালে ভৃত্যের মাথায় বেতের ধামায় লাল শালুমোড়া জাব্দা খাতা, শ্রীগণেশ ও শ্রীলক্ষ্মীর মূর্তি, লক্ষ্মীদেবীর ঝাঁপি লইয়া বাবুদের কেরানীরা দলে দলে আসিতেন কালীঘাটের কালী মন্দিরে। মন্দিরে পুজার ভিড়ে রীতিমতো হট্টগোল উপস্থিত হইত। দাপুটে বাবুদের কেরানীরা অর্থের দাপট দেখাইতে কসুর করিতেন না, তাঁহাদের উৎকোচে মন্দিরের পুরোহিতগণের মধ্যে হুড়াহুড়ি পড়িয়া যাইত। এই পুরোহিতগণ মাকালীর সহিত সরাসরি যোগাযোগ ঘটাইয়া সম্বৎসরের ব্যবসার সুবন্দোবস্ত করিয়া দিবার আশ্বাস দিতেন। পুজার পর তাঁহারা জাব্দা খাতায় আলতাকালিতে উপরে ‘ওঁমা’, তাহার নিচে ‘শ্রীশ্রীকালিমাতা সহায়’ লিখাইয়া লইতেন। তাহার নিচে স্বস্তিকা চিহ্ন আর একদম নিচের দুই কোণায় আলতায় ডোবানো রৌপ্যমুদ্রার দুই পিঠের মোহর।

    কলকেতা শহরে সে সব মেলা আজিকালি আর তেমন দেখি না। লোকে আজিকালি অন্ধকার ঘরে টিকিট কাটিয়া বায়োস্কোপ দেখে। তাহারা নায়ক নায়িকাদের গান আর মেকি হাসিকান্নায় মজিয়া থাকে। শুনিয়াছি কলকাতার নব্য বাবুরা এখন চড়কের মেলা, সং ইত্যাদির আনন্দকে “ছোটলোকি” বলে। বলে এসব সেকেলে ফক্কুড়ি দেখিয়া সময় নষ্ট করিবার মতো সময় তাহাদের নাই। হবে হয়তো। আমাদের যৌবনে আমরা তো এসব খুবই উপভোগ করিতাম। আজিকালি বয়স হইয়াছে, এ যুগের ছোকরাদের মতিগতি আর বোধগম্য হয় না।  

    আমার গিন্নি পয়লা বোশেকের ছুটির দুপুরে বড়োই তরিবতে রন্ধন করেন। সজনে ডাঁটার শুক্ত, রুই মাছের মুড়ো দেওয়া ভাজা মুগের ডাল, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, পটল-আলুর মাখোমাখো তরকারি, রক্তরাঙা ঝোলের মধ্যে দুইখানি অর্ধগোলক আলু সহ অনেকটা কচিপাঁঠা, কাঁচা আমের পাতলা অম্বল। সবার শেষে মিঠে দধি। এইরূপ আকণ্ঠ মধ্যাহ্ন ভোজের পর, গালে গিন্নির হাতের পান লইয়া, পয়লা বোশেখের দুপুরটি দিবানিদ্রায় অতিবাহিত করি, জানালা দরোজা বন্ধ প্রায় অন্ধকার ঘরে।

    দিবানিদ্রা সারিয়া বারান্দায় যখন বসি, পথের আলো জ্বালাইবার জন্য পুরসভার কর্মচারিরা লম্বা আঁকশি হাতে দৌড়াইয়া চলে। পাড়ার যতো বাড়ির দরোজায় দরোজায় বেলফুলের মালা লইয়া ফিরিওয়ালা ডাক পাড়ে “বেইলফুউউল”। তাহার চিকন কণ্ঠের সুরে ও বেলফুলের সৌরভে প্রথম বৈশাখের সন্ধ্যাটি বড়ো মধুর হইয়া উঠে। তাহার পশ্চাতে আসে মালাইবরফ এবং কুলফি মালাইয়ের ফিরিওয়ালা। পাড়ার বখাটে ছোকরার দল তাহাকে আড়ালে ডাকিয়া সিদ্ধি মিশ্রিত কুলফি মালাই খাইয়া অকারণ হাসিতে পাড়া মাতায় তোলে।

    সন্ধ্যা একটু গড়াইলে, পাটভাঙা ধুতি আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি পড়িয়া রাশভারি মুখে বাহির হই। পায়ের পাম্পশুতে মচ মচ ধ্বনি তুলিয়া যখন হাঁটি নিজের ভারিক্কি চালে নিজেই অবাক হই। গেরামে থাকিতে যাহারা আমাকে ‘আত্তাঁ’ বলিয়া চিনিত, তাহারা আমার এই ‘আত্মারামবাবু’ মার্কা চেহারা দেখিলে কিরূপ ভিমরি খাইত কল্পনা করিয়া, বড়ো আল্লাদ পাই।

    কালেজ স্ট্রিটের মেডিক্যাল কলেজের বিপরীতে কল পাইপের বিপণিগুলির অধিকাংশই আমাদের দেশজ সুহৃদদের মালিকানা। হালখাতা উপলক্ষে এই সব বিপণির উদার হৃদয় মালিকেরা অতিথি আপ্যায়নের বিপুল আয়োজন করিয়া থাকে।

    দোকানের প্রবেশ পথেই একজন কর্মচারী পিচকারি হইতে মাথায় মুখে গায়ে ফ্যাঁস ফ্যাঁস করিয়া গোলাপজল ছিটাইয়া দেয়। সদ্য গ্রাম হইতে আসিয়া কলকেতা নিবাসী হইবার পর যেবার প্রথম হালখাতা অনুষ্ঠানে আসিয়াছিলাম, এই ঘটনায় অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছিলাম। বলা নাই কওয়া নাই, খামোখা আমার গাত্রে জল ছিটাইয়া দেওয়া, এ কী ধরনের রসিকতা? সৌভাগ্যক্রমে সেই ক্ষণে বিপণির মালিকপুত্র “আসুন খুড়ামহাশয়” বলিয়া আমার হাতে ঝাউপাতায় মোড়া গোলাপকলি উপহার দিয়া ভিতরে বসাইয়াছিল। নচেৎ সেদিন হয়তো কুরুক্ষেত্র বাধাইয়া নিজেকেই হাস্যাস্পদ করিতাম। বসিবার পর দেখিয়াছিলাম ওই কর্মচারি সকলকেই ওই জল ছিটাইতেছে, ও তাহাতে গোলাপের সুবাস। ক্রোধ প্রশমিত হইলে, নিজ গাত্রেও ওই গোলাপজলের সুবাস উপলব্ধি করিয়া চমকিত হইয়াছিলাম।

    বিপণির ভিতরের প্রাত্যহিক ব্যবসায়িক পরিবেশ আজ নাই উজ্জ্বল আলোর নিচে ফরাস পাতা, তাহাতে ধবধবে চাদর বিছানো। ফরাসে বসিয়া অশীতিপর এক মুসলিম বৃদ্ধ সানাই বাজাইতেছেন। তাঁহার সহিত তবলায় একজন সঙ্গত করিতেছেন। সেই সানাইয়ের মাঙ্গলিক সুর যেন নতুন বর্ষের শুভদিনের সূচনা করিতেছে। কিন্তু আশ্চর্য, সেই সুরের প্রতি উপস্থিত কাহারো মনোযোগ নাই। সকলেই নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপে ব্যস্ত। সকলের হাতেই কি এক পানীয়ের বোতল, তাহাতে সরু পাইপ বসানো। সেই পাইপে ঠোঁট লাগাইয়া হাল্কা চুমুকে সকলে পানীয়ের মজা লইতেছে। এই পানীয় কি সুরা জাতীয় কিছু? কলকেতার বাবুরা কি প্রকাশ্য সন্ধ্যালোকে নির্লজ্জের মতো মদ্যপান করিয়া থাকে?

    এই সব ভাবিতে ভাবিতে বিপণির মালিক অমিয়ভূষণ মহাশয়, আমার কাছে আসিয়া নমস্কার করিয়া বলিলেন, ‘সব ভালো তো আত্তাঁ, কোন রকম সংকোচ করবা না। আরে একি, তোমাকে কোল্ডিংক দেয় নি? অ্যাই ব্যাচা, এদিকে একটা কোল্ডিংক নে আয়। বাড়ির সব খপর ভালো? বাচ্চা পরিবার, সবাই? হে হে হে, খুব ভালো। আরে আসুন আসুন বিপত্তারণবাবু, আজকাল আপনার আর দ্যাকাই পাওয়া যায় না, আমি ওদিকটা একবার দেকে আসি, যেদিকটা না দেকবো, সেকানেই ...বোয়লে না?” অমিয়ভূষণবাবু অন্যদিকে যাইবার পরেই ব্যাচা নামের ছোকরাটি আমার হাতে এক বোতল শীতল পানীয়ের মধ্যে সরু পাইপ ডুবাইয়া দিয়া গেল। অন্যদের দেখাদেখি কায়দা করিয়া আমিও পাইপে অধর চাপিয়া পানীয় টানিয়া লইলাম। স্বাদ মন্দ নয়। স্বাদ ও গন্ধে মদ বলিয়াও মনে হইল না, কারণ ইহার পূর্বে ছোকরাকালে কুসঙ্গে পড়িয়া দু একদিন ব্রান্ডির স্বাদ লইয়াছিলাম।    

    কিন্তু ও কী ও, আমার এ কী হইল? পানীয় গলাধঃকরণের পরই পেটের মধ্যে বিশাল উদ্গারের উদ্গম হইল। আমি রোধ করিতে পারিলাম না, আমার কণ্ঠ হইতে অদ্ভূত এক শব্দ নির্গত হইল। মনে হইল আমার উদরের অজ বালক পুনর্জীবন পাইয়া তাহার মাতার সন্ধানে ডাকিতেছে। আমার আশেপাশে উপবিষ্ট, বিশিষ্ট জনের দুই চারিজন আমার বাণীতে চমকিত হইলেন, ঘাড় ফিরাইয়া আমার আপাদমস্তক মাপিয়া লইলেন। ইহার পর ওই ভুল আর করি নাই, পাইপে হাল্কা টানে অল্প পানীয় পান করিতে লাগিলাম। তাহাতেও ছোট ছোট উদ্গার উঠিতেছিল, কিন্তু আমি সেগুলিকে নাসিকা পথে ছাড়িতে লাগিলাম। তাহাতে নাসিকা জ্বলিতে লাগিল, কিন্তু সম্মান রক্ষা হইল। এমন পানীয় মনুষ্যজাতির সভ্যতায় কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত করিবে, বলিতে পারি না।

    অমিয়ভূষণবাবুর বিপণি হইতে দুইখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই বাস্কো মিষ্টান্ন লইয়া বিদায় লইলাম। তাহার পর আরো ছয়খানি পরিচিত বিপণিতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া টানা রিকশয় গৃহে ফিরিলাম। আমার বগলে তখন পাঁচখানি বাঙ্গালা ক্যালেণ্ডার ও দুই হাতে নয় বাস্কো মিষ্টান্ন। আরো দুইখানি হাত থাকিলে, আরো কয়েকটি বিপণিতে যাইতে পারিতাম ভাবিয়া আক্ষেপ হইল। কিন্তু বিধির বিধানে হাত মাত্র দুইখানি!

    রাত্রের রন্ধন হইতে মুক্তি পাইয়া আমার গৃহিণী আনন্দিতা হইলেন। দুই পুত্র ও দুই কন্যা সহ আমরা সকলে নয়খানি বাস্কো উদরসাৎ করিয়া পরিতৃপ্ত হইলাম। গৃহিণীর বানানো একখানি পান গালে লইয়া বাহিরের বারান্দায় দাঁড়াইলাম। ভাবিলাম পয়লা বোশেখের মঙ্গলরাত্রি বড়ো আনন্দে যাপিত হইল।

    জানি না কেন এই সময় মনে পড়িল সেই শীর্ণ বৃদ্ধ সানাইশিল্পীর কথা। তাঁহার সানাইবাদনের প্রতি আমাদের কাহারো বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। একদল শূকরের সম্মুখে ছড়ানো মুকুতার মতো তাঁহার শিল্প প্রয়াস তিনি বিতরণ করিতেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁহার নিজের ও পরিবারের উদরপূর্তির প্রত্যাশায়। একজন শিল্পীর, নামজাদা নাই বা হইলেন, এ হেন অবহেলা আমরা না করিলেও পারিতাম।

    পয়লা বৈশাখে নববর্ষের এই শুভ দিনটিতে তাঁহার সানাইয়ের সেই মাঙ্গলিক সুর কলকেতার স্বার্থ সন্ধানী মানুষের অন্তরে এতটুকুও দাগ রাখিতে পারিল না। আগামী কল্য দোসরা বৈশাখ, আর পাঁচটা সাধারণ কর্মব্যস্ত দিনের সহিত এতটুকুও ফারাক থাকিবে না। সকালে গৃহিণীর প্রস্তুত মৎস্যের ঝোল-ভাত নাকে মুখে গুঁজিয়া দপ্তরে যাইব। দিনগত পাপক্ষয় করিতে করিতে আরও একটি বৎসর পার হইয়া জীবনে আরও এক পয়লা বৈশাখ আসিবে, ভাবিতে ভাবিতে কখন ঘুমাইয়া পড়িলাম মনেও নাই।

-   ০০ –


[আত্মারাম বাগচি মহাশয়ের স্মৃতিকথার আংশিক পরিমার্জিত রূপ “পয়লা বৈশাখ"; বানান ও শব্দ ব্যবহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাগচি মহাশয়ের জন্ম প্রাক-স্বাধীনতা যুগে, কর্ম উত্তর-স্বাধীনতার দিনগুলিতে।] 

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৭

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬  


 

খট খট আওয়াজে ভল্লার কাকনিদ্রা টুটে গেল। উপুড় হয়ে মাচার কিনারা থেকে দেখল, ব্যাপারটা কি? রামালি রণপা চড়ে ফিরল। তার কাঁধে ছোট্ট একটা ঝোলা। ভল্লা খুশি হল, হতভাগা ভালই রপ্ত করেছে। এরপর ওকে রণপা নিয়ে ছোটাতে হবে। ভল্লা কোন সাড়া না দিয়ে চুপ করে দেখতে লাগল।

রামালি তার কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। ছোট্ট লাফ দিয়ে মাটিতে নামল রণপা থেকে। রণপাজোড়া তার দেখানো ঝোপের মধ্যেই লুকিয়ে রাখল। তারপর তার ঘরের মধ্যে উঁকি দিল। তারপর পুকুরের দিকে গেল। একটু পরে আবার ফিরে এল। ফিরে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। বকের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিকে তাকাল। ভল্লাকেই খুঁজছে, হতভাগা। পাখির মতো রামালির কার্যকলাপ দেখতে ভল্লার বেশ মজা লাগছিল। শুধু যে মজা লাগছিল তাই নয়, নিজেকে ভগবান বলে মনে হচ্ছিল।

বহুদিন আগে দূরের কোন এক গ্রামের একটি মন্দিরে তাকে রাত কাটাতে হয়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত তাকে মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি। কারণ সে শূদ্র। ভল্লা মিথ্যে করে নিজেকে ক্ষত্রিয় বলতেই পারত। বলেনি। পুরোহিতের দেওয়া প্রসাদ খেয়ে মন্দিরের বাইরে চাতালে শুয়ে রাত কাটিয়েছিল। সেই পুরোহিত তাকে বলেছিল, “জাত-পাত নিয়ে দুঃখ করিসনি, বাপু। এসব তো আর আমরা বানাইনি, বানিয়েছেন ভগমান। তোকে যদি মন্দিরে থাকতে দিই, ভগমান ঠিক দেখতে পাবেন। তিনি ওপর থেকে সবার দিকে সবসময়ই লক্ষ্য রাখেন কিনা? তাঁর বিচারে আমাদের যে নরকে ঠাঁই হবে, বাপু”। দুঃখ করার লোক ভল্লা নয়। সে দুঃখ পায়ওনি।

পরেরদিন সূর্যোদয়ের আগেই তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, এবং দৈবাৎ তার চোখে পড়েছিল মন্দিরের দরজা ফাঁক করে চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসছে একটি মেয়ে। মেয়েটির চটকদার চেহারা, চালচলন, পোষাক-টোষাক দেখে, তাকে পতিতা গোত্রের রমণী বলেই মনে হয়েছিল ভল্লার। ব্রাহ্মণী হতেই পারে না নিশ্চয়ই কোন অন্ত্যজবাসিনী।  দেখে হাসি চাপতে পারেনি, হো হো করে হেসে উঠেছিল। তার হাসির শব্দ শুনে বেরিয়ে এসেছিল পুরোহিত ব্যাটাও। ভ্রূকুটি করে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এই সাতভোরে হ্যা হ্যা করে হাসছিস কেন রে, শূদ্দুরের পো?” ভল্লা হাসতে হাসতেই বলেছিল, “আপনার ব্রাহ্মণীটি কিন্তু বেশ পুরুতমশাই। আপনার ভগমান দেখেছেন। চিন্তা করবেন না, আপনার জন্যে নরকে নয়, স্বর্গেই পাকা বাসা তৈরি হচ্ছে...”। পুরুতটা দাঁতে দাঁত চেপে তার বাপান্ত করেছিল, বেশি চেঁচামেচি করতে পারেনি - লোক জানাজানি হওয়ার ভয়ে।          

সেই ভগবানের মতোই দেখছিল ভল্লা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রামালি ঘরে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এল, বড়ো কলসিটা হাতে নিয়ে। ভল্লা জানে ওটা খালি। খালি কলসি নিয়ে রামালি পুকুরের দিকে গেল। এবার নীচেয় নেমে এল ভল্লা। পুকুর থেকে ফেরার আগেই ভল্লা তার কুটিরের সামনে গিয়ে বসল। রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরল। তার একহাতে ভরা কলসি আর অন্য কাঁধে বেশ কিছু শুকনো ডালপালা।

রামালি জিজ্ঞাসা করল, “কোথায় গেছিলে, ভল্লাদাদা?”

“ঘুমোচ্ছিলাম। তোর রণপার আওয়াজে ঘুম ভাঙল”।

“ঘরে ঘুমোও না? কোথায় ঘুমোও তাহলে?”

“না রে, ঘরে ঘুমোনোর কপাল কী আর আমাদের?”। রামালি উনুনের সামনে ডালপালাগুলো ঢেলে দিয়ে ঘরে গেল কলসিটা রাখতে। বেরিয়ে এসে উনুনের সামনে বসে কাঠকুটোয় আগুন ধরিয়ে, উনুনে গুঁজে দিল। কিছু ডালপালাও গুঁজে দিল তার মধ্যে। ভল্লা বলল, “তুই রান্না চাপাবি নাকি”?

মালসায় জল ভরে ঘরের বাইরে এল রামালি, মালসাটা উনুনের ওপর চাপিয়ে বলল, “কী খাবে? গ্রাম থেকে কিছু আনাজ এনেছি। লওকি, মেটেকন্দ আর কুঁদরি”।

“কোথা থেকে আনলি?”

“কেন আমাদের বাড়ি থেকে? আমাদের বাড়ির পেছনে অনেকটা জায়গা, সেখানে ভালই আনাজ-টানাজ হয়।”

“বলিস কী? তোর কাকি কিছু বলেনি?”

“বলেনি আবার? আমিও বললাম, এ বাড়ি-জমির অর্ধেক ভাগ তো ছেড়েই দিলাম, দুটো আনাজ নিয়েছি...উরে বাব্বা...”, রামালি হাসতে লাগল খুব, হাসির বেগ কিছুটা কমিয়ে বলল, “যা বুলি ছোটাল না, ভল্লাদাদা...যত গাল দেয় আমিও হাসি...”, আবারও হাসতে হাসতে বলল রামালি।

ভল্লা বেশ অবাক হল, রামালির সঙ্গে যেদিন থেকে তার পরিচয়, কোনদিন ওকে হাসতে দেখেনি। সেই ছেলেটা এক রাত্তিরে এমন বদলে গেল কী করে? এই ছেলেটাই সেদিন গভীর শীতলতায় এতদিনের বন্ধুকে নির্দ্বিধায় হত্যা করেছে। তার মুখে চোখে আচরণে কোথাও সে ঘটনার জন্যে কোন গ্লানি নেই। এই যে হাসছে ও, ভল্লার মতো মানুষও আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে...এত সুন্দর সরল হাসি হাসতে পারে ছেলেটা? সাংঘাতিক তো!

“যাগ্‌গে কী খাবে বলো। খিচড়ি বানাবো? তোমার ঘরে দেখলাম, চাল-ডাল আছে। তার সঙ্গে মেটেকন্দ আর কুঁদরি ভাজা...”

ভল্লা উদাস সুরে বলল, “বানা, আজকে তুই যা খাওয়াবি, সব খাবো। এমনিতেই আমি তো হেরে ভূত হয়ে গেছি”।

“কার কাছে”? অবাক হয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল।

“তোর কাছে রে হতভাগা। রণপা জোড়াও গেল, চকচকে একটা বল্লমও গেল”।

“সত্যি, ভল্লাদাদা”? উচ্ছ্বসিত আনন্দে রামালি চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল ভল্লাকে।

ভল্লা তার পিঠে চাপড় মেরে বলল, “এ তো সবে শুরু রে রামালি, এর থেকেও অনেক বড়ো বড়ো কাজ তোকে করতে হবে...। কিন্তু শল্কুরা কখন আসবে”?

“আসছে। ওরা ছজন আসছে। দুপুরের খাওয়ার পর ওদের আসতে বলেছি...” একটু ইতস্ততঃ করে আবার বলল, “তোমার এদিককার অবস্থা তো জানি, ওরা সবাই না খেয়ে এলে, তুমি সামলাতে কী করে?”

ভল্লা হাসল, কিছু বলল না।

রান্না করতে করতে, তাঁতের মাকুর মতো রামালি ঘর-বার করছিল, সে সময় হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা তুমি তো ঘুমোচ্ছিলে - কেমন করে জানলে আমি রণপায়ে হাঁটা শিখে গেছি?”

ভল্লা বলল, “ঘুম ভাঙল তোর রণপায়ের খট খট আওয়াজে… তারপর ভগবানের মতো ওপর থেকে সব দেখলাম…”।

“ভগবানের মতো? তার মানে”?

ভল্লা তার সেই মন্দিরের পুরোহিত আর তার ভগবানের গল্পটা রামালিকে শোনালো। রামালি হাসতে হাসতে বলল, “তুমি খুব বেঁচে গেছ ভল্লাদাদা। আমাদের এদিককার পুরোহিতরা, রেগে গিয়ে পৈতে ছিঁড়ে কাউকে অভিশাপ দিলে, সে নাকি সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। চিন্তা করো, লোকটা অভিশাপে মরল বটে, কিন্তু বেঁচে গেল তার যাবতীয় শ্মশান-খরচ!”।

রামালি হাসল না, কিন্তু তার কথার ভঙ্গীতে ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে। কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “অনেকদিন পর এমন হাসলাম, বুঝলি রামালি। সারাদিন নানান কূটকচালি চিন্তা, লোকজনের বজ্জাতি সামলাতে সামলাতে হাসি উপে গিয়েছিল। পুকুরে জল খেতে গিয়ে দেখতাম, মুখখানা দিন-কে-দিন হাঁসের পোঁদের মতো হয়ে উঠছে”।

অনেক হাসাহাসি হল, ফচকেমি হল। ভল্লা এবার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল,”গ্রামের পরিস্থিতি কেমন?”

রামালি খিচড়ির মালসা নামিয়ে, উনুনে একটা সরা চাপিয়ে একটু তেল ঢালল, বলল, “আমি তো তেমন কিছু বুঝলাম না, ভল্লাদাদা। আমাদের দলের ছেলেরা ছাড়াও বড়দের সঙ্গেও দেখা হল। কারও মনে তোমার ওপরে কিংবা আমাদের ওপরে কোন রাগ আছে বলে মনে তো হল না। বরং জিজ্ঞাসা করল, শুনলাম তোর কাকি তোকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে? তা এখন রয়েছিস কোথায়?” গরম তেলে, জিরে আর শুকনো লংকা ছেড়ে কাঠের হাতা দিয়ে নাড়তে নাড়তে রামালি বলল, “বললাম, বাড়ি থেকে কাকি তো আমাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে – অতএব রয়েছি আরেকজন নির্বাসনের সাজা পাওয়া অপরাধীর সঙ্গে”। ভাজা হয়ে যেতে রামালি সরা থেকে গরম তেলটা ঢেলে দিল খিচড়ির মালসায় – ফোড়নের দেওয়ার শব্দে আর রুচিকর গন্ধে ভরে উঠল বনস্থলী।

“এতদিনে আমাদের এই জঙ্গলের বাসাটাকে গেরস্থ বানিয়ে তুললি রে, রামালি। খিচড়িতে আবার ফোড়ন!”

রামালি কোন উত্তর দিল না, সরাটাকে আবার উনুনে বসিয়ে আরো তেল দিল, উনুনে গুঁজে দিল আরও কিছু কাঠ। তেল গরম হতেই তাতে ছেড়ে দিল কুঁদুরির ফালিগুলো। একটু নুন, আর হলুদগুঁড়ো দিয়ে, বার কয়েক নাড়াচাড়া করে, মাটির থালা চাপা দিয়ে দিল সরার ওপর। তারপর বলল, “গ্রামের বয়স্কদের মধ্যে দু-তিনজন অনেক কথাই বলছে, তোমার নামে, আমাদের নামে। কিন্তু বাকি সবাই, আমার মনে হয়, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। ওরা হয় ওদের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারেনি। নয়তো কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারেনি”।

“কিন্তু খুব শিগ্‌গির বুঝতে পারবে। আজকে না হলেও, কালকে রক্ষীদের দলবল গাঁয়ে আসবে, জঙ্গলের ঢোলের মতো

“ঢোলটা কী বস্তু ভল্লাদাদা?”

“ওরে বাপরে, বস্তু না রে, জন্তু। আমাদের রাজ্যের মাঝের বিষয়গুলোতে গভীর জঙ্গল তো! সেখানে তারা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। এক একটা দলে পঁচিশ- তিরিশটা – ওদের সামনে পড়লে কেঁদো বাঘও লেজ গুটিয়ে পালায়”।

“আচ্ছা? বাঘও তাদের ভয় পায়? তবুও বলব, রাজার রক্ষীদল ঢোল হোক বা হায়না, আমার মনে হয় গ্রামের মানুষ মনে মনে প্রস্তুত হয়ে উঠছে। বললে বলবে, আমি তোমার আমড়াগাছি করছি... কিন্তু একথা সত্যি যে, তুমি এই গ্রামের নির্জীব মানুষগুলোর মনে কম-বেশি একটা আলোড়ন তুলে দিয়েছ। আগে রক্ষীরা এসে ক্যাঁৎক্যাঁৎ করে লাথি মারলেও, এরা যেন কৃতার্থ হয়ে যেত। তারা বিশ্বাস করত আমাদের পালন করতে ভগবান, রাজা বানান। সেই রাজার রক্ষী মানে তারাও ভগবানেরই অংশ। অতএব রক্ষীদের লাথি ছিল, প্রকৃতপক্ষে ভগবানের আশীর্বাদ – বাপ-মা যেমন ছেলেমেয়েদের পেটায়।  কিন্তু কিছুদিন দেখছি, বয়স্ক মানুষদের মনে সেই বিশ্বাস কিছুটা টুটেছে – তাদের মনেও কেমন যেন ধন্দ জাগছে”।

ভল্লা খুব মন দিয়ে রামালির কথা শুনছিল। আজ শেষরাত থেকে তার যত পরিচয় সে পাচ্ছে, তার মতামতের গুরুত্ব ভল্লার কাছে ততই বাড়ছে। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজবুড়োর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”

“নাঃ। বোধহয় বাড়িতেই ছিল। ভাগ্যে দেখা হয়নি, হলেই এক ঝুড়ি উপদেশ ঝাড়ত”।

“কবিরাজবুড়ো আর তোদের গ্রামপ্রধান জুজাক। তারা তো আমার বিরুদ্ধেই সবাইকে তাতাচ্ছে!”

ভল্লার কথায় রামালি হাসল। সরার ঢাকা সরিয়ে কুঁদরিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে সামান্য জলের ছিটে দিল।  সরার মুখ আবার ঢেকে দিয়ে বলল, “তাতাবে না? এতদিন গ্রামপ্রধান আর কবিরাজের কথা সকলে বেদবাক্যের মতো মানত। এখন তারা তোমার কথা শুনছে। আমরা – গ্রামের ছেলেপুলেরা - তোমার কথায় উঠছি বসছি। তাদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে... এত সহজে তারা ছেড়ে দেবে? রাখালের হাত থেকে পাঁচন-বাড়ি কেড়ে নিলে – তার আর থাকল কি?”

ভল্লা আবারও অবাক হল। এভাবে তো সেভাবেনি! এভাবে চিন্তা করলে, জুজাক এবং কবিরাজের আচরণের যুক্তি মেলে বৈকি! আরেকটু স্পষ্ট করার জন্যে ভল্লা বলল, “তার মানে?”

“এতদিন আমরা ছিলাম, ছাগল-ভেড়ার পাল। ওরা দুজন ছিল আমাদের রাখাল। আমরা ভাবতাম, ওরাই বুঝি আমাদের রক্ষাকর্তা। তুমি এসে বোঝালে আমাদের এবং ওই রাখালদেরও প্রকৃত প্রভু হল রাজার আধিকারিক আর তার রক্ষীরা। ওদের হাতে কিস্‌সু নেই। তোমার বিরুদ্ধে ওরা আমাদেরকে তাতাবে না তো, কী করবে?”

রামালি কুঁদরির সরা নামিয়ে, অন্য এক সরায় জল নিয়ে উনুনে চাপাল। তার মধ্যে ছেড়ে দিল মেটেকন্দর বেশ কিছু টুকরো। উনুনের গর্তে বেশ কিছু শুকনো পাতা আর ডালপালা গুঁজে, আগুনটা উস্কে দিয়ে বলল, “কখন খাবে ভল্লাদাদা? আমার রান্না কিন্তু শেষের দিকে। চান করে খেতে বসলেই হল”।

রামালির কথাগুলোই চিন্তা করতে করতে ভল্লা বলল, “তুই যা, চান করে আয়”।

“ঠিক আছে, তাই যাই। তাহলে তোমাকে একটু লক্ষ্য রাখতে হবে, সরার জল যেন শুকিয়ে না যায়, আর উনুনের আগুন যেন ঝিমিয়ে না যায়”।

খালি কলসি এবং আরও কিছু বাসনকোসন নিয়ে রামালি পুকুরে গেল। ভল্লা গাছের ছায়ায় বসে এক মনে উনুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তলায় তলায় আগুন জ্বলছে। সেই তাপে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হচ্ছে মানুষজনের মন। 

চলবে...      

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৪

    ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৩ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

চতুর্দশ পর্বাংশ 


৪.৭.৪ আসাম

আসামের পৌরাণিক নাম পাওয়া যায় কামরূপ এবং কোন একসময় নরক ছিলেন কামরূপের রাজা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম মতে রাজা নরক ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ অসুর, যাঁকে সাধারণ ক্ষত্রিয় সৈন্যবাহিনী দিয়ে পরাজিত করা যায়নি, ভগবান বিষ্ণুকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। সে যাই হোক সেই রাজা নরকের পুত্র ছিলেন ভগদত্ত, যিনি মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নাকি কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন।

তবে কামরূপের প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে, যেখানে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে কামরূপের উল্লেখ করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের পর, পরবর্তী গুপ্তরাজা মহাসেনগুপ্তের অন্য একটি লিপি থেকে জানা যায় তাঁর রাজত্বের সীমা লোহিত্য নদীর (ব্রহ্মপুত্র) তটভূমি পর্যন্ত এবং তিনি কামরূপ রাজা সুস্থিতবর্মনকে পরাস্ত করেছিলেন। এই কামরূপের রাজা সুস্থিতবর্মনের পুত্র ভাস্করবর্মনের কথা ইতিহাসে বারবার উঠে এসেছে। ৬৪৩ সি.ই.-তে হুয়ান সাং যখন কামরূপ গিয়েছিলেন তখন কামরূপের রাজা ছিলেন ভাস্করবর্মন। ভাস্করবর্মন প্রতিবেশী কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের আতঙ্কে, শুরু থেকেই রাজা হর্ষের সঙ্গে “অনন্ত মৈত্রী”-তে আবদ্ধ ছিলেন। রাজা হর্ষের আয়োজিত দুটি মহামৈত্রী সম্মেলনে, একটি কনৌজ এবং অন্যটি প্রয়াগে, তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। হর্ষের মৃত্যুর পরে তাঁর সিংহাসনে বসা অযোগ্য রাজাকে সরানোর ব্যাপারেও তিনি চীনের রাষ্ট্রদূতকে পূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ জয় করেছিলেন।

ভাস্করবর্মণের পর কামরূপের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি শ্রীহর্ষ নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়, যিনি গৌড়, ওড্র (উড়িষ্যা), কলিঙ্গ, কোশল এবং আরও অনেক অঞ্চল জয় করেছিলেন। আবার একাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রত্নপাল নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়, যিনি গুর্জরদের রাজধানী, গৌড়রাজ, দাক্ষিণাত্যের রাজা (হয়তো চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য, যিনি কামরূপ অভিযান করেছিলেন), কেরালেশ ( হয়তো চোল বংশের প্রথম রাজেন্দ্র), বাহিকা এবং তৈকদের পরাজিত করেছিলেন।

 যদিও এর মধ্যে বাংলার পালবংশের রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.), তাঁর ভাইপো জয়পালকে প্রাগজ্যোতিষ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন এবং পাল রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত প্রাগজ্যোতিষ রাজা কুমারপালের অধীনেই ছিল এবং তাঁর প্রতিনিধি মন্ত্রী বৈদ্যদেবের যথেষ্ট কর্তৃত্ব ও প্রভাব সেখানে ছিল।

কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে আসাম অধিকার করে নিয়েছিলেন, অহোম নামের শান উপজাতিদের একটি শাখা। যাঁদের থেকে গোটা রাজ্যের নাম অহোম বা আসাম বলা হয়ে থাকে। আসামে মুসলিম অভিযান সাফল্য পেয়েছিল অনেকটাই পরে, মুঘল সম্রাট ঔরংজেব তাঁর বিখ্যাত সেনাপতি মিরজুমলাকে (১৬৬২ সি.ই.) পাঠিয়ে প্রথম আসাম অধিকার করেছিলেন।

৪.৭.৫ উড়িষ্যা

প্রাচীন কলিঙ্গ সীমানার ধারণা হল গোদাবরী থেকে মহানদী পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল। যদিও এই সীমানা কখনোই ধরাবাঁধা ছিল না। কোন কোন সময় কলিঙ্গ রাজ্য, উৎকল, ওড্র এবং কলিঙ্গ নামেও একই বা তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। আবার অনেক সময়েই দক্ষিণবঙ্গের তাম্রলিপ্তি বন্দর সহ মেদিনীপুর কলিঙ্গের অন্তর্গত ছিল, আবার কোন কোন সময় উড়িষ্যার গঞ্জাম পর্যন্ত বঙ্গের সীমানার মধ্যে ছিল।

ঐতিহাসিক সময় থেকে কলিঙ্গ নন্দ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তারপর সম্রাট অশোক কলিঙ্গকে মৌর্যসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মৌর্যদের পর কলিঙ্গের রাজা হয়েছিলেন শক্তিশালী খারবেল, তিনি একসময়ে মগধ এবং  অন্ধ্রের বেশ কিছুটা অংশ কলিঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এরপর কলিঙ্গের স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। গুপ্তরাজাদের সময় কলিঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের মধ্যেই ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকে কলিঙ্গের রাজা ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গবংশীয় রাজারা। 

৪.৭.৫.১ প্রাচ্য গঙ্গ

গঙ্গবংশের উৎপত্তি মহীশূরের কোলার অঞ্চলে, তাঁদের একটি শাখা পূর্বদিকে কলিঙ্গে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এই কারণে তাঁদের প্রাচ্য গঙ্গ বলা হয়। রাজা ইন্দ্রবর্মন ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রাজধানী ছিল গঞ্জাম জেলার কলিঙ্গপতনম বা মুখলিঙ্গম। এই প্রাচ্য গঙ্গ বংশ প্রায় চারশ বছর রাজত্ব করেছিলেন। খ্রীষ্টিয় দশম শতাব্দীতে চালুক্য ও চোলরাজাদের আক্রমণে কলিঙ্গ রাজ্য বারবার বিধ্বস্ত হয় এবং প্রাচ্যগঙ্গ বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়েন।

১০৭৭ সি.ই.তে গঙ্গবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গর রাজত্বকালে, কলিঙ্গ আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর নাম চোড়গঙ্গ হয়েছিল, কারণ তাঁর পিতা রাজারাজগঙ্গ বিবাহ করেছিলেন, রাজেন্দ্র চোড়ের কন্যা রাজসুন্দরীকে। চোড়গঙ্গ দীর্ঘ সত্তর বছর রাজত্ব করেছিলেন (১০৭৭-১১৪৭ সি.ই.)। এই অনন্তবর্মনই পুরীর জগন্নাথ মন্দির এবং আরও অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর গঙ্গবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাংলার সেনরাজা কলিঙ্গ রাজ্যের কিছুটা অধিকার করে নিয়েছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিমরা বঙ্গের সেনবংশকে উৎখাত করতে পারলেও, গঙ্গরাজারা মুসলিমদের আরও প্রায় একশ বছরের ওপর ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুসলিমরা কলিঙ্গ জয় করেছিলেন।

এর মধ্যে কেশরী রাজবংশও দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন, সম্ভবতঃ উৎকল রাজ্যে, তাঁদের রাজধানী ছিল ভুবনেশ্বর। মন্দির শহর ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত মন্দিরগুলির অধিকাংশই কেশরী রাজাদের প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্টিয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র উড়িষ্যা জুড়ে অজস্র মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যার আদর্শ ছিল ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ, পুরীর জগন্নাথধাম এবং কোনার্কের সূর্য মন্দির।  

৪.৭.৬ ত্রিপুরির কলচুরি

শোনা যায় কলচুরি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ছিলেন, পৌরাণিক রাজা কার্তবীর্যাজুন, হৈহয় বংশের শাখা, যাঁরা নর্মদা উপত্যকায় রাজত্ব করতেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল মাহিষ্মতী বা মান্ধাতা। কলচুরি বংশের উত্থান যে রাজার হাত ধরে, তাঁর নাম প্রথম কোকল্ল, তিনিই ত্রিপুরী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর অঞ্চলে। তাঁর রাজত্বকাল নবম শতাব্দীর শেষ দশক থেকে দশম শতাব্দীর শুরুর দুই দশক। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে বৈবাহিক সম্পর্কও থাকতে পারে। তিনি চান্দেল রাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণের (৮৭৫ - ৯১১ সি.ই.) কন্যা রাজকুমারী নট্টদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় তাঁর জামাই ছিলেন রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজকুমার। অতএব এই তিনটি রাজবংশীয় মিলিত শক্তি নিয়ে, তিনি চালুক্য, ভোজ এবং প্রতিহার রাজবংশের রাজাদের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে গেছেন। একসময় তাঁর সম্বন্ধে, “জগজ্জয়ী” উপাধিও ব্যবহার করা হত।

প্রথম কোকল্লের পর কলচুরি বংশের আরেক রাজার নাম পাওয়া যায়, তাঁর নাম গাঙ্গেয়দেব (১০১৯-১০৪১ সি.ই.)। ইনি “বিক্রমাদিত্য” উপাধি নিয়েছিলেন, এবং তাঁকেও “জগজ্জয়ী” বলা হত। রাজা গাঙ্গেয়দেব, প্রতিহার বংশের রাজাদের পতনের পর উত্তর ভারত অভিযান করেছিলেন এবং কীর দেশ (কাংড়া উপত্যকা), প্রয়াগ এবং বারাণসী জয় করেছিলেন। যদিও পরবর্তী কালে পরমার বংশের ভোজরাজার হাতে তিনি পরাস্ত হয়েছিলেন। গাঙ্গেয়দেবের পুত্র লক্ষ্মী-কর্ণ (১০৪১-৭২ সি.ই.), কলচুরি বংশের সব থেকে প্রতিপত্তিশালী রাজা ছিলেন। রাজা কর্ণ কয়েক বছরের জন্যে কাংড়া থেকে বারাণসী এবং কনৌজ নিজের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। বারাণসীতে তিনি একটি শৈব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাকে “কর্ণ-মেরু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর কলচুরি বংশের রাজা হন রাজা লক্ষ্মীকর্ণর পুত্র যশকর্ণ (১০৭৩-১১২০ সি.ই.)। শোনা যায় যশকর্ণের মাতা ছিলেন হুণ জাতীয়া। যশকর্ণকেও প্রায় সারাজীবনই যুদ্ধবিগ্রহে লেগে থাকতে হয়েছিল। তাঁর সময়ে উত্তরের এলাহাবাদ, বারাণসী এবং কনৌজ জয় করে নিয়েছিলেন গাড়োয়ালরা, এমনকি তাঁরা ত্রিপুরী রাজধানীও আক্রমণ করেছিলেন। চান্দেল, চালুক্যদের সঙ্গে তাঁর নিত্য যুদ্ধ তো ছিলই। যশকর্ণের পুত্র গয়া-কর্ণের পর কলচুরি রাজবংশ ইতিহাসে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। 

৪.৭.৭ জিজাকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল

চান্দেল বংশের উৎপত্তি পূর্ণচন্দ্র এবং ব্রাহ্মণ কন্যার বিবাহ থেকে! অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, তাঁরা প্রাচীন ভারতের ভর বা গোণ্ড জাতির শাখা, যাঁদের আদি নিবাস ছিল ছতরপুর রাজ্যের মানিয়াগড়ে, কেন নদীর ধারে। নবম শতাব্দীর শুরুর দিকে চান্দেল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন, নান্নুক। তাঁর নাতির নাম জিজা বা জয়শক্তি– তাঁর নাম অনুসারেই তাঁদের রাজ্যের নাম হয় জিজাকভুক্তি। অনুমান করা হয়, চান্দেল বংশের প্রথম দিকের বেশ কিছু রাজা ছিলেন, কনৌজের প্রতিহার সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজা। তাঁদের মধ্যে হর্ষদেব চান্দেল তাঁর প্রভাব এবং ক্ষমতা বাড়িয়ে তুললেন, প্রতিহার রাজ মহীপালের সৎভাই দ্বিতীয় ভোজকে সরিয়ে, তাঁকে কনৌজের সিংহাসনে বসতে সাহায্য করে। এরপর কনৌজের রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, চান্দেলরা আরও বেশি স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। এইসময় রাজা হলেন, হর্ষদেবের পুত্র ধঙ্গ (৯৫০-১০০২ সি.ই.)। শোনা যায় তাঁর সময়ে কনৌজ কিছুদিনের জন্য চান্দেল রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। খাজুরাহোর একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় “রাজা ধঙ্গ খেলার ছলে অধিকার করেছেন, কালঞ্জর (কালিঞ্জর দুর্গ –বুন্দেলখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ), সুদূর মালব নদীতটের ভাস্বত (?), যমুনার তীর, চেদি রাজ্যের সীমানা, এমনকি গোপগিরি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল”। ধঙ্গ কোন এক সময় বারাণসী জয় করেছিলেন, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। ৯৮৯ অথবা ৯৯০ সি.ই.তে সবুক্তিগিনকে প্রতিরোধ করার জন্যে শাহী রাজা জয়পাল যখন রাজা ধঙ্গের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন, রাজা ধঙ্গ তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন এবং আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন।

একইভাবে রাজা ধঙ্গের পুত্র গণ্ডের কাছে আনন্দপাল শাহী ১০০৮ সি.ই.-তে গজনির সুলতান মামুদের আক্রমণ প্রতিরোধের সাহায্য চাইলে রাজা গণ্ডও সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই হিন্দু যৌথশক্তির পরাজয় হয়েছিল। এরপর সুলতান মামুদের ভয়ে (কাপুরুষের মতো?) পালিয়ে যাওয়া কনৌজের প্রতিহাররাজা রাজ্যপালকে শাস্তি দিতে, রাজা গণ্ড ও শাহী যুবরাজ বিদ্যাধর, ১০১৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজ্যপালকে হত্যা করেন। এই সংবাদ যখন গজনিতে সুলতানের কানে পৌঁছল, রাজা গণ্ডকে শাস্তি দিতে সুলতান মামুদ ১০১৯ সালে চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করলেন। এবার রাজা গণ্ড সুলতানের সামরিক শক্তি দেখে কোন ঝুঁকি নিলেন না, রাতের অন্ধকারে (বীরের মতো?) পালিয়ে জীবন রক্ষা করলেন। এরপর সুলতান মামুদ ১০২২ খ্রীষ্টাব্দে আবার চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করেন এবং গোয়ালিয়র দুর্গ ও কালিঞ্জর দুর্গ অধিকার করে নিলেন। এই সময় রাজা গণ্ড সুলতান মামুদের (বীরের মতো?) বশ্যতা মেনে নিয়েছিলেন। সুলতান মামুদ রাজা গণ্ডকে দুর্গদুটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, বদলে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে গজনি ফিরে গিয়েছিলেন।

এরপর চান্দেল বংশের উল্লেখযোগ্য রাজারা হলেন, কীর্তিবর্মন, মদনবর্মন, পরমার্দি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.) প্রমুখ। তাঁরাও প্রতিবেশী রাজ্যগুলি কখনো জয় করেছেন, কখনো আবার পরাজিতও হয়েছেন। এই সময়ে ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে কুতব-উদ্দিন আইবক কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করেন এবং চান্দেল রাজত্বের অবসান ঘটান। অবশ্য এরপরেও প্রায় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ছোট রাজ্যের শাসক হয়ে, চান্দেল বংশের অস্তিত্ব ছিল।

চান্দেল রাজাদের অন্যতম কীর্তি খাজুরাহো মন্দির, কালিঞ্জর দুর্গ এবং মাহোবা নগর। সমসাময়িক কালে এমন সুসজ্জিত দুর্গ এবং সুন্দর শহর ভারতে কমই ছিল। চান্দেল রাজারা বেশ কিছু মন্দির এবং সুন্দর সরোবর বানিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুলেছিলেন বুন্দেলখণ্ড এবং মাহোবা শহর। মাহোবার এরকমই একটি সরোবরের নাম মদনসাগর, যেটি নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজা মদনবর্মন।  

৪.৭.৮ মালবের পরমার বংশ

শোনা যায়, পরমার বংশের উৎপত্তি হয়েছিল পৌরাণিক বশিষ্ঠ মুনির যজ্ঞবেদী থেকে। কিন্তু সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি শিলালিপি থেকে জানা গেছে, পরমার বংশ দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশের একটি শাখা।

সেকালের উজ্জয়িনী নগর বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিচারে, মধ্যভারতের সব থেকে উন্নত শহর ছিল। গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের পর বহু রাজবংশই এই শহরে আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তাঁদের  মধ্যে অন্যতম ছিলেন, রাষ্ট্রকূট, কিন্তু তাঁরা উজ্জয়িনীর ওপর অধিকার ধরে রাখতে পারেননি। পরবর্তী কালে প্রতিহার বংশের রাজারা বেশ কয়েক বছর উজ্জিয়িনী তাঁদের অধিকারে রেখেছিলেন। অনুমান করা হয়, প্রতিহার রাজাদের সামন্তরাজা হিসাবেই উজ্জয়িনী বা মালবের পরমার বংশের সূত্রপাত। পরমার বংশের প্রথম যে শাসকের নাম জানা যায়, তিনি শিয়াক-হর্ষ, তিনি ৯৪৯-৭২ সি.ই. পর্যন্ত উজ্জিয়িনীর শাসক ছিলেন। কিন্তু এই পর্যায়ে প্রতিহার বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়াতে, শিয়াক-হর্ষ সামন্ত রাজা থেকে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শিয়াক-হর্ষ রাজা হয়ে ওঠায় রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ (৯৫৫-৭০ সি.ই.), উজ্জয়িনী আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু শিয়াক-হর্ষ তাঁকে পরাজিত করেন। শিয়াক-হর্ষ কিছু হুণ গোষ্ঠী রাজাদেরও পরাজিত করে, অবন্তী রাজ্য এবং উজ্জিয়িনী নগরে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র বাকপতি অথবা মুঞ্জা রাজা হয়েছিলেন ৯৭৪ সি.ই.-তে। শোনা যায়, কলচুরি, কর্ণাট, চোল এবং কেরালার রাজারা তাঁর তলোয়ারের সামনে মাথা নত করেছিলেন। তবে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব, চালুক্য রাজা দ্বিতীয় তৈলপের আক্রমণ তিনি অন্ততঃ ছবার প্রতিহত করেছিলেন। জৈন গ্রন্থকার মেরুতুঙ্গের “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, সপ্তমবার চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বাকপতি-মুঞ্জ, তাঁর মন্ত্রীদের পরামর্শ না শুনে, গোদাবরী পার হয়ে চালুক্য রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। সেখানেই তিনি বন্দী হন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কাল অনুমান করা হয় ৯৯৩-৯৪ সি.ই., এর কিছুদিন পরেই ৯৯৭-৯৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় তৈলপের মৃত্যু হয়। বাকপতি মুঞ্জ শুধু রণদক্ষ রাজাই ছিলেন, তা নয়, তিনি প্রজাদের হিতের জন্যে অনেক সরোবর এবং মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। ধারা শহরের মুঞ্জসাগর সরোবর, তাঁরই স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে। তাঁর সভায় কবি ও বিদ্বানরা অত্যন্ত সম্মানীয় ছিলেন, যেমন পদ্মগুপ্ত, ধনঞ্জয় (“দশরূপ” গ্রন্থ প্রণেতা), ধনিক (“দশরূপাবলোক” গ্রন্থ প্রণেতা) এবং ভট্ট হলায়ুধ, যাঁর রচনা দুই বিখ্যাত গ্রন্থ,“মৃতসঞ্জীবনী” এবং “অভিধান-রত্নমালা”।

বাকপতি-মুঞ্জের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ছোট ভাই সিন্ধুলা বা সিন্ধুরাজা বা নবশশাঙ্ক। তিনিও কলচুরি, হুণ এবং চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। সিন্ধুলার সংক্ষিপ্ত রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, বাকপতি-মুঞ্জের পুত্র ভোজ। তিনি রাজধানী সরিয়ে আনেন ধারাতে। উদেপুর প্রশস্তিতে তাঁকে “সার্বভৌম” বলা হয়েছে, এবং তিনি কৈলাশ থেকে মলয় পর্বত পর্যন্ত “সমগ্র পৃথিবীর রাজা” বলেও দাবি করা হয়েছে। তিনি পিতার হত্যার প্রতিশোধে চালুক্যদের আক্রমণ করে পঞ্চম বিক্রমাদিত্যকে পরাস্ত এবং হত্যা করেন, ১০০৮ সি.ই.-তে। যদিও দাক্ষিণাত্যের এই সাফল্য তাঁকে হারাতে হয়েছিল ১০১৯ এ.ডি-তে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় জয়সীমার (১০১৬-৪২ সি.ই.) কাছে। এরপরেও তিনি নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে, উত্তরের কনৌজ অধিকারের জন্যে, এমনকি “তুরুষ্কু” (মুসলিম)-দের সঙ্গেও। এই মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনটি রাজ্য একত্র হয়েছিলেন, কলচুরিরাজ লক্ষ্মীকর্ণ, পরমার-রাজ ভোজ এবং অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম। এই যুদ্ধের সময়েই প্রায় পঞ্চান্ন বছর রাজত্বের পর রাজা ভোজের মৃত্যু হয়। রাজা ভোজের মৃত্যুর পর এই মিত্র রাজ্যগুলিই রাজধানী ধারা এবং মালব অধিকার করে নিয়েছিল।

রাজা ভোজ যেমন অসি চালনায় দক্ষ ছিলেন, তেমনই দক্ষ ছিলেন বিদ্যাচর্চায়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অন্ততঃ চব্বিশটি গ্রন্থ লিখেছিলেন, যেমন “আয়ুর্বেদ-সর্বস্ব”, “রাজমৃগাঙ্ক”, “ব্যবহার-সমুচয়”, “শব্দানুশাসন”, “সমরাঙ্গণ-সূত্রধর”, “সরস্বতী-কণ্ঠাভরণ”, “নাম-মালিকা”, “যুক্তি-কল্পতরু”, ইত্যাদি। তিনি ধারা শহরে “ভোজ-শালা” নামে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে বিদ্যার্থীরা পড়তে আসতেন। পরবর্তী কালে মুসলিম রাজত্বের সময় এটিকে মসজিদ বানিয়ে তোলা হয়েছিল। রাজা ভোজ শৈব ছিলেন, সমস্ত রাজ্য জুড়ে তিনি অজস্র সুন্দর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। আধুনিক ভূপালের দক্ষিণে নতুন ভোজপুর শহর নির্মাণ করিয়েছিলেন।

রাজা ভোজের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন মালব নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিলেন, চালুক্য, কলচুরি এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা। অবশেষে মালব থেকে ১৩০৫ সি.ই.-তে পরমার বংশের নাম মুছে দিলেন, আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি আইন-উল-মুল্‌ক্‌।

৪.৭.৯ অনহিলওয়াড়ার চালুক্য (সোলাংকি) বংশ

অনহিলওয়াড়া বা অনহিল-পাটককে আধুনিক গুজরাটের পাটন বলে চিহ্নিত করা হয়। চালুক্য বা সোলাঙ্কি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মূলরাজ। এই চালুক্যদের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের (যাঁদের কথা পরের অধ্যায়ে আসবে) কোন সম্পর্ক ছিল কিনা অথবা তাঁরাই সৌরাষ্ট্রর (কাথিয়াওয়াড়) চালুক্য গোষ্ঠী কিনা, সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে গুজরাটের লোককথা থেকে জানা যায়, মূলরাজের পিতা ছিলেন, রাজি, কনৌজের এক রাজকুমার কল্যাণকটকের পুত্র। এবং তাঁর মাতা ছিলেন চাবড় বা চাপোটক বংশের কন্যা, যাঁরা চালুক্যদের আগে গুজরাটের ছোট কোন অঞ্চল শাসন করতেন। লোককথায় এমনও শোনা যায়, মূলরাজ তাঁর মাতুলকে হত্যা করে, চাপোটকের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। এই ঘটনা মোটামুটি ৯৪১ সি.ই.-র। সিংহাসনে বসেই মূলরাজ রাজ্য অধিকারে মন দিলেন। তিনি কচ্ছের লক্ষরাজাকে পরাজিত ও হত্যা করলেন। সৌরাষ্ট্রের বামনস্থলীর (আধুনিক ওয়ানথালি) চূড়াসামা গোষ্ঠীর রাজা গ্রহরিপুকে বন্দী করলেন। দক্ষিণ গুজরাটের লাট অঞ্চলের বারাপ্পা এবং শাকম্ভরীর চাহমান রাজা বিগ্রহরাজকেও আক্রমণ করলেন। যতদূর জানা যায়, ৯৯৫-৯৬ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়।

চালুক্য বংশের পরবর্তী রাজা প্রথম ভীম, ইনি মূলরাজার নাতি দুর্লভরাজের ভাইপো ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল মোটামুটি ১০২১ সি.ই. থেকে ১০৬৩ সি.ই. পর্যন্ত। প্রথম ভীমের রাজত্বকাল গজনির সুলতান মামুদের বীভৎস অভিযানের জন্যে অবিস্মরণীয়। ১০২৫ সি.ই.-তে সুলতান মামুদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গুজরাটের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন। তিনি শুনেছিলেন, যুগ যুগ ধরে ওই মন্দিরে বিপুল সোনা, মণিরত্ন-সম্পদ সঞ্চিত আছে। সুলতান মামুদ রাজস্থানের মরু অঞ্চল পেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছলেন অনহিলওয়াড়ার সীমান্তে। রাজা প্রথম ভীম সুলতান মামুদের সেনাবাহিনী দেখে আতঙ্কিত হয়ে, কোন রকম প্রতিরোধ না করে, পালিয়ে গেলেন। সুলতান মামুদ বিনা বাধায়, সোমনাথ নগর, সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করলেন এবং নগরের ব্রাহ্মণ ও সাধারণ মানুষ, যাঁরা দুর্বল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের গণহত্যা করলেন। তারপর মন্দিরের সমস্ত সম্পদ লুঠ করে, সোমনাথের মূর্তি ভেঙে গজনি ফিরে গেলেন। শোনা যায়, এই ভাঙা মূর্তির টুকরো দিয়ে তিনি জামা-মসজিদের প্রবেশের সিঁড়ি বানিয়েছিলেন।

সুলতান মামুদ ফিরে যাওয়ার পর, প্রথম ভীম আবার তাঁর রাজ্য এবং রাজধানীতে ফিরে এলেন। অনতিবিলম্বেই তিনি আবুর পরমার প্রশাসককে পরাজিত করলেন, কিন্তু পরমার ভোজের সেনাপতি কুলচন্দ্রের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কলচুরিরাজ লক্ষ্মী-কর্ণের সঙ্গে জোট বেঁধে মালব রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি করেছিলেন। রাজা ভোজের মৃত্যুর পর কলচুরিদের সঙ্গে প্রথম ভীমের সখ্যতা ভেঙে যায়, এবং প্রথম ভীম লক্ষ্মী-কর্ণকে পরাজিত করেন। এই সুযোগেই মালবের পরমার রাজারা আবার স্বাধীন রাজ্য হয়ে উঠেছিল।

প্রথম ভীমের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র কর্ণ (১০৬৩-৯৩ সি.ই.)। তাঁর সময়ে পরমার রাজত্ব আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, কারণ পরমার রাজা উদয়াদিত্য রাজা কর্ণকে পরাস্ত করেছিলেন। রাজা কর্ণ অজস্র মন্দির এবং সরোবর নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং নিজের নামে নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে শহর এখন আমেদাবাদ। রাজা কর্ণের পরবর্তী রাজা জয়সিংহ সিদ্ধরাজ, তাঁর রাজত্বকাল ১০৯৩ সি.ই. থেকে ১১৪৩ সি.ই.। প্রথমদিকে তিনি নাবালক থাকায়, রাজ্য শাসন করতেন তাঁর মাতা মিয়াংল্লা দেবী। জয়সিংহ ক্ষমতায় এসে নাদোলের (যোধপুর রাজ্য) চৌহান এবং সৌরাষ্ট্রের চূড়াসামা রাজাকে পরাস্ত করে, দুটি রাজ্য অধিকার করেন। এরপর তিনি পরমার রাজা নরবর্মন এবং যশোবর্মনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মালব জয় করে “অবন্তীনাথ” উপাধি নিয়েছিলেন। জৈনগ্রন্থ “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, রাজা জয়সিংহ ত্রিপুরির কলচুরি রাজ এবং কাশীর রাজার সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করেছিলেন।

জয়সিংহ তাঁর পিতার মতোই অনেক মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, তিনি ধর্মসহিষ্ণু এবং শিক্ষা বিষয়েও উৎসাহী ছিলেন। তিনি হয়তো শৈব ছিলেন, কিন্তু জৈন আচার্য হেমচন্দ্রকে রাজসভায় সম্মানের স্থান দিয়েছিলেন। জয়সিংহের কোন পুত্র না থাকায়, তাঁর দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়, কুমারপাল সিংহাসন অধিকার করেন। শোনা যায়, তিনি সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ করিয়েছিলেন। তিনি হয়তো প্রথমদিকে শৈব ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে আচার্য হেমচন্দ্রের প্রভাবে জৈন হয়েছিলেন। সম্ভবতঃ এই কারণের তিনি তাঁর বিস্তীর্ণ রাজ্যে পশুহত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সময়ে আচার্য হেমচন্দ্র অজস্র জৈন গ্রন্থ এবং ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। রাজা কুমারপালের মৃত্যু হয় ১১৭২ সি.ই.-র কিছু আগে। তারপর রাজা হয়েছিলেন অজয়পাল।

এরপর গুজরাটের রাজাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না, কিন্তু ১১৭৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় ভীম (বা ভোলা ভীম) রাজা হয়ে প্রায় ষাট বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই ঘুরের সুলতান গুজরাট আক্রমণ করেছিলেন, যদিও ভয়ংকর যুদ্ধের পর ঘুরের সুলতান পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১১৯৭ সি.ই.তে কুতব-উদ-দিন অনহিলওয়াড়া জয় করে নিয়েছিলেন, কিন্তু সম্ভবতঃ কুতব-উদ-দিন স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে এরপরে মালবের রাজা এবং দেবগিরির যাদবদের আক্রমণে গুজরাটের চালুক্যরা বিশেষভাবে দুর্বল পড়েছিলেন। এই সময়ে বাঘেলা পরিবার গুজরাটের ক্ষমতা অধিকার করল। এই বাঘেলা পরিবার, শোনা যায়, রাজা কুমারপালের বোনের বংশধর। শোনা যায়, জনৈক লবণপ্রসাদ, রাজা ভোলা ভীমের বাঘেলা সামন্তরাজা, দক্ষিণ গুজরাটে স্বাধীন উঠেছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁরা সমগ্র গুজরাট অধিকার করে নিয়েছিলেন।

১২৯৭ সি.ই.-তে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি যখন তাঁর শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী দিয়ে দুই সেনাপতি উলুঘ খান এবং নসরত খানকে পাঠিয়েছিলেন, তখন বাঘেলা রাজ করণ বা করণদেব রাজধানী ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিনের সেনাবাহিনী এরপর গুজরাটের প্রধান শহরগুলি অধিকার করে নেওয়ার পর, গুজরাট থেকে হিন্দু শাসন মুছে গেল।

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...