এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১৬
নির্দিষ্ট দিনে মা রওনা হয়ে যাওয়ার পরেই, বাড়িটা বড়ো শূণ্য
মনে হল সুনেত্রর। প্রতিটা ঘরের প্রত্যেকটি কোনায় কোনায় সে অনুভব করল মায়ের হাতের
স্পর্শ – মায়ের মমতা। কথায় বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ বোঝে না। আজ যেন
খুব স্পষ্টভাবেই সে কথাটির মর্ম উপলব্ধি করল সুনেত্র। তার মনে যে এখন শূণ্যতার বোধ
তাই নয়, বারবারই তার মনে হল, দাদার কাছে মায়ের এই যাওয়াটা সুখকর হবে না। বরং এই
স্মৃতি বড়ো বেদনাদায়ক হয়েই থাকবে মায়ের বাকি জীবনের অবশিষ্ট বছরগুলিতে।
মায়েরা তাঁদের সকল সন্তানের প্রতি কখনোই পক্ষপাতহীনা হয়ে
উঠতে পারেন না। প্রথম সন্তান যে কোন নারীর জীবনে এনে দেয় জীবনের পূর্ণতা। প্রথম মাতৃত্বের
পরম অনুভূতি। পরবর্তী সন্তান না আসা পর্যন্ত, প্রথম সন্তানই হয় মাতৃহৃদয়ের একচ্ছত্র
অধিরাজ। মায়ের সবটুকু মাতৃত্ব – আদর, প্রশ্রয়, মমতা– প্রথম সন্তানই এককভাবে আদায়
করে নেয়। পরবর্তী সন্তান এলে, প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অনেকটাই খণ্ডিত হয়ে
যায় ঠিকই – কিন্তু সেই খণ্ডিত মমতার পুরোটাই বদলে যায় প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের নির্ভরতায়
ও আশা-ভরসায়।
মায়ের মনের এই পরিবর্তনটুকু, বড়ো হতে হতে প্রথম সন্তান
কিভাবে গ্রহণ করবে, তার ওপরেই নির্ভর করে ভবিষ্যতে দাদা-ভাই, দাদা-বোন, কিংবা
দিদি-ভাই এবং দিদি-বোনের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে। ছোটভাই বা বোনকে বিছানায় ঘুম
পাড়িয়ে মা যদি প্রথম সন্তানকে বলেন, “ভাইকে (বা বোনকে) একটু দেখ তো, তোর বাবার চান
হয়ে গেল মনে হয়, ভাতটা বেড়ে দিয়ে আসি”। অথবা “ভাইয়ের (বা বোনের) সামনে ওই
ঝুমঝুমিটা বাজা তো, বাবু, কিছুতেই খেতে চাইছে না, একটু ভুলে থাকবে”। প্রথম
সন্তানদের কেউ কেউ মায়ের দেওয়া এই দায়িত্ব পেয়ে খুশি হয়, ভাবে আমি বড় হয়ে গেছি, মা
আমাকে ভরসা করছে। আবার কেউ কেউ মনে করে, মা সারাক্ষণ ভাইকে (বোনকে) নিয়েই ব্যস্ত।
ভাইয়ের জন্যে আমি নিজে মায়ের সঙ্গে খেলতে পারছি না, উলটে তার জন্যে আমাকে
খিদমদগারি করতে হচ্ছে। প্রথম সন্তানের মনে আসতে থাকে প্রবল ঈর্ষা বোধ।
প্রথম সন্তান আরও বড়ো হওয়ার পর, তার হাতে টাকা আর ছোট্ট
ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে মা বলতেই পারেন, “যা তো বাবা, সাধনের দোকান থেকে এই জিনিষগুলো চট
করে নিয়ে আয় তো”। সে ছেলে উত্তর দিতে পারে,
“আমি এখন ঘুড়ি ওড়াচ্ছি, ভাইকে (বোনের একটা বয়স পর্যন্ত
দাদারা তাকে একটু প্রিভিলেজ দিতে তেমন কার্পণ্য নাও করতে পারে) পাঠাও না”।
“ধুর, ও পারে নাকি তাই? ছেলেমানুষ – টাকার হিসেব বুঝবে? ছোট
পেয়ে সাধন ওকে কী দিতে কী দিয়ে দেবে...”।
“তবে? সে এখন ছোট নাকি, মা তার ওপর সব কিছুতেই ভরসা করছেন”,
এই চিন্তায় কিছু দাদা আত্মশ্লাঘা অনুভব করবে, আর ছোট ভাইকে করবে করুণা, ভাববে
“ভাইটা চিরকাল বাচ্চাই রয়ে গেল”। আবার
কিছু দাদা ভাববে, “ছেলেমানুষ না হাতি, মা ওকেই বেশি ভালোবাসে, কাছে কাছে রাখতে চায়
– আর আমাকে খেলতে না দিয়ে, নানান কাজে সারাদিন খাটিয়ে মারে”। অর্থাৎ তার মনে গেঁথে
যেতে থাকবে ভাইয়ের প্রতি তীব্র ঈর্ষা।
সুনেত্র বড় হতে হতে তার প্রতি দাদার এই ঈর্ষাটি টের পেয়েছে
বারবার। তার কথায়-বার্তায়, আচরণে। একটা ঘটনার কথা মনে পড়লে, দাদার প্রতি সুনেত্রর মনটা আজও বড্ডো সংকীর্ণ
হয়ে ওঠে।
সুনেত্র তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে, ইলেভেনে বা টুয়েলভে।
কলকাতা বইমেলা তখন বসত পার্কস্ট্রিটের মোড়ের কাছে ময়দানে। সে আর তার খুব প্রিয়
বন্ধু ও ক্লাসমেট অনিমেষ ঠিক করল, সামনের শনিবার স্কুলে হাফ ছুটির পর একসঙ্গে বইমেলায়
যাবে। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে অনিমেষ প্রস্তাব দিয়েছিল, সেদিন তুই
আমাকে একটা বই উপহার দিবি, আমিও তোকে একটা বই দেব। প্রস্তাবটি শুনেই অনিমেষ প্রমাদ
গুনল, সে জানত মায়ের কাছে সংসার চালানোর টাকা ছাড়া উদ্বৃত্ত তেমন কিছুই থাকে না।
কারণ সেই সময় বাবা কলকাতা ছেড়ে দিনাজপুরে ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছিলেন, এবং সেখান
থেকে খুব অনিয়মিতভাবে মানি অর্ডার আসত। তবে তার ভরসা ছিল, স্কুল থেকে নগদ পাওয়া,
তার মাধ্যমিকের সরকারি স্কলারশিপের বাৎসরিক টাকাটা মায়ের কাছে অনেকটাই জমা আছে। মাকে
বললে, তার থেকে কুড়িটা টাকা কি আর দেবেন না?
সুনেত্র জানত, মায়ের অনেকদিনের সাধ ছিল টুকটুকে লাল, চওড়া পাড়ওয়ালা,
সাদা আর মুগা সুতোয় বোনা বেশ ভালো একখানি শাড়ি নেওয়ার। সরকারি স্কলারশিপের ওই টাকাটা
হাতে আসার একদিন পরেই মাকে সঙ্গে নিয়ে বিখ্যাত এক শাড়ির দোকান থেকে কিনে দিয়েছিল
মায়ের পছন্দের শাড়িটা। সেসময় টাঙ্গাইল বা ধনেখালি তাঁতের শাড়ি পাওয়া যেত ৫০/৬০
টাকায়, মায়ের এই শাড়িটার কত দাম ছিল – এখন আর মনে নেই - সাড়ে তিন/ চারশ হবে বড়ো
জোর। শাড়িটা কিনে খুব খুশি হয়েছিলেন মা, কয়েকদিন পরেই মা ওই শাড়িটা পরে সেজমাসিমার
বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে গর্ব করে বলেছিলেন, শাড়িটা সুনু আমায় কিনে দিয়েছে – ওর
স্কলারশিপের টাকায়। মায়ের এই গর্ব করাটা দাদার যে সহ্য হয়নি মোটেই, সেটা ওই বইমেলায়
যাওয়ার দিন সকালে টের পাওয়া গেল।
বইমেলা যাওয়ার দিন সকালে, স্কুলে বেরোনোর আগে মাকে টাকার
কথা বলতে, মা বললেন, “দেখছিস তো সংসারের এই হাল। তোর বাবার পাঠানো টাকা কবে আসে,
ঠিক নেই। এসময় ওরকম শখ-আহ্লাদ না করলেই নয়?”
সুনু মায়ের কাছে খুব স্বাভাবিক বায়নার স্বরেই বলেছিল, “তোমার
ওখান থেকে কুড়িটা টাকা দাও না, মা”।
পাশে দাদা বসেছিল, বলল, “তোমার ওখান থেকে মানে? তোর ওই স্কলারশিপের
টাকা থেকে? ওই টাকা কটা মায়ের হাতে ফেলে দিয়েছিস বলে, তোকে যখন খুশি টাকা ওড়াতে
দিতে হবে? তুমিও পারো বটে মা, ওর কথায় নেচে তুমি শাড়ি কিনতে চলে গেলে? আমি কি
স্কলারশিপ পাইনি, তোমার হাতে তুলে দিইনি? আমি কি তোমাকে কখনো এমন কথা বলার সাহস
পেয়েছি? ওই শাড়িটা দিয়ে মনে হচ্ছে ও তোমাকে উদ্ধার করে দিয়েছে?” দাদার কন্ঠস্বর
ধীরে ধীরে চড়তে লাগল, ঠিক যাত্রার রাবণ বা হিরণ্যকশিপুর মতোই। “ওই টাকা আর ওই শাড়ি
তুমি ছুঁড়ে ফেলে দাও মা। ওই শাড়ি পরেও তোমার কাজ নেই...আর কাজ নেই ওর ওই টাকাতেও”।
সুনু খুব আশ্চর্য হয়েছিল, মা কী করে তাকে ভুল বুঝলেন? মা
সঙ্গে সঙ্গেই স্টিলের আলমারি খুলে শাড়িটা আর টাকার খামটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন মেঝেয়। খামের
মুখটা মেঝেয় পড়ে খুলে গিয়েছিল, বেরিয়ে পড়েছিল গোটা কয়েক পাঁচ-দশ টাকার নোট। সুনেত্র
সেই খাম থেকে কুড়িটা টাকা নিয়ে, খামের মুখ বন্ধ করে টেবিলে তুলে রাখল, আর পাটভাঙা
শাড়িটা মেঝে থেকে সযত্নে তুলে রাখল মায়ের বিছানায়। তারপর একবার মায়ের মুখের দিকে
আরেকবার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল – পায়ে জুতো পরে আর কাঁধে বইখাতার ব্যাগ
নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে, “আসছি, মা”, বলে।
সদর দরজা পেরোতে পেরোতে সে শুনতে পেল, “দেখলে, দেখলে মা, কী
রকম আস্পর্ধা হয়েছে? টাকার গরম হয়েছে? এত কাণ্ডের পরেও ও তোমার সামনে দিয়েই টাকা
নিয়ে বেরিয়ে গেল?”
চারটে ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেল, ছুটির পর অনিমেষের
সঙ্গে বাসে উঠল সুনেত্র। যাওয়ার পথে অনিমেষ কথা বলছিল অনর্গল। বইমেলা নিয়ে। নানান
সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে। রিসেন্টলি কোন কোন বই ওকে মুগ্ধ করেছে। সুনেত্র এমনিতেই
কথা কম বলে, সেদিন যেন তাকে বোবায় পেয়েছিল। অনিমেষের সঙ্গে কোন মতে সায় দিয়ে
কথাবার্তা চালাচ্ছিল, আর তার বারবার মনে পড়ছিল মায়ের আজকের মুখটা। সেজমাসীমার বাড়ি
গিয়ে লালপেড়ে মুগা-শাড়ি পরা মায়ের – মা দুর্গার মতোই - গর্বিতা মুখটাও। সে কি
সত্যিই মাকে অপমান করল?
বাস থেকে নেমে মেলাগামী জনস্রোতে মিশে অনিমেষের সঙ্গে মেলার
গেটের দিকে যেতে যেতে সুনেত্রর নিশ্চিত মনে হল, না সে কোন অন্যায় করেনি। তার
নাটুকে দাদাটি তার মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা ঈর্ষার বিষটা মায়ের মনে নাটকীয়ভাবে ঢেলে
দিতে পেরেছে। সুনেত্র নিশ্চিত, মায়ের মনের এই আকস্মিক অভিঘাত অচিরেই দূর হবে এবং
মা চিনতে ভুল করবেন না, তাঁর গর্ভজাত দুই সন্তানের মনোভাব।
না, মা ভুল করেননি। সন্ধের মুখে সুনেত্র বাড়ি ফিরল। সন্ধে
দেওয়ার জন্যে মা প্রস্তুত হচ্ছিলেন। দরজা খুলে দিয়ে প্রসন্ন মুখেই বললেন, “আয়,
মেলা ঘোরা হল?”। কিন্তু তাঁর মুখটা, চোখের কোলদুটো একটু যেন ফোলা-ফোলা। এতক্ষণ
সুনেত্রর মনের মধ্যে কোন অভিমান ছিল না, ছিল দাদার প্রতি তীব্র বিরক্তি। কিন্তু
এখন মায়ের ওই কথায় তার মনে এল অভিমানের জোয়ার। মাথা নীচু করে জুতো খুলতে লাগল
দীর্ঘসময় নিয়ে। তারপর পিঠের ব্যাগ নামাল পড়ার টেবিলের ওপর। তারপর ব্যাগ থেকে
অনিমেষের দেওয়া বইটা বের করে রাখল সামনে। শীর্ষেন্দুর আশ্চর্য ভ্রমণ, মূল্য ছটাকা
(প্রথম সংস্করণ- ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)।
সন্ধে দেওয়া
সারা হলে, মা কাছে এলেন সুনেত্রর, মাথায় হাত রেখে বললেন, “কিরে, মায়ের ওপর অভিমান
করেছিস?”
উদ্গত
কান্নার আবেগ সামলাতে সামলাতে সুনেত্র বলেছিল, “অনিমেষ পরশুদিন বলেছিল, আজকে
বইমেলা গিয়ে দুজনে দুজনকে, প্রিয় সাহিত্যিকের লেখা একটা বই উপহার দেব। এই দেখ,
অনিমেষ আমাকে আজ এই বইটা উপহার দিল। আমি ওকে দিয়েছি শীর্ষেন্দুর ঘুণপোকা, দাম
সাতটাকা। আমি যদি ওকে বইটা না দিতে পারতাম, যদি বলতাম, আমার পয়সা নেই রে - খুব
ভালো দেখাত, মা? আমার তো লাগত না, ও মনে মনে ভাবত – সুনেত্রদের দেখে তো বোঝা যায়
না, ওরা এতটা গরিব। ভাবত, আসলে আমার মনটাই ছোট – বন্ধুকে একটা বই কিনে দিতে হবে
বলে, সুনেত্র গরিবি কান্না কাঁদছে...”। সুনেত্র পকেট থেকে ন’টা টাকা বের করে মায়ের
হাতে দিয়ে বলল, “বইয়ের দাম সাত, যাতায়াতের বাসভাড়া, আর মেলাতে চা-সিঙাড়া খেয়েছিলাম,
সব মিলিয়ে এগারোটাকা খরচ হয়েছে, মা”।
সুনেত্রর
মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়ে মা কেঁদে ফেললেন, সুনেত্রও। সুনেত্রর মাথার ওপর গাল চেপে,
মা বললেন, “সুমুটা ভয়ানক হিংসুটে – আজ আরও একবার তার প্রমাণ পেলাম। তুই বেরিয়ে
যাওয়ার সময়, আমার দিকে যে তাকিয়েছিলি, তখনই আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম, সুনু...। তুই
তো কিছু নিয়ে বায়না করিস না কোনদিন...। যত
ভেবেছি, ততই কেঁদেছি সারাদিন। তুই কাঁদিস না, অভিমান করে থাকিস না...”।
“জামা-কাপড়ের
ছাঁট, জুতোর ডিজাইন, চুলের ফ্যাশান নিয়ে বাবাকে কতবার কত চেঁচামেচি করেছে, অপমান
করেছে দাদা, সে তুমি জানো না মা? সে এখন আমার আস্পর্ধা দেখছে? আমি কোনদিন কোন
বিষয়ে একদিনও তোমাকে বা বাবাকে কিছু বলেছি মা? আমি বুঝি বাবা কত কষ্ট করছেন আমাদের
জন্যে...আজ তুমি আমার দেওয়া শাড়িটা, দাদার কথায় – মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলে দিলে, মা?”
“ও শাড়ি আমার
বুকেই আছে, রাখব সারা জীবন। আর কাঁদিস না, সুনু, বলছি তো ভুল হয়েছে... এবার কিন্তু
আমার হাতে মার খাবি...জামাকাপড় ছেড়ে মুখ-হাত ধুয়ে আয়, তোর জন্যে পরোটা আর হালুয়া
বানিয়েছি – এখনও গরম আছে...”।
“হালুয়া?”
চোখ-টোখ মুছে সুনেত্র হেসে ফেলল। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, “আমাকে দেওয়ার
সময় বইতে আজকের তারিখটা লিখে সই করে দিয়েছে অনিমেষ – ১০ই মার্চ ১৯৭৯। এই বইটাও
আমার কাছে সারাজীবন থাকবে, থাকবে এই দিনের সব স্মৃতিও...সেটা তুমি আমার মন থেকে কিছুতেই
মুছতে পারবে না, মা”।
মুখ হাত
ধুয়ে, ঘরে পড়ার পাজামা পরে, টেবিলে বসে, সুনেত্র বলল, “খিদে পেয়েছে মা, খাবার কই?”
বলতে না বলতেই মা কাঁসার রেকাবিতে পরোটা আর বাটিতে করে হালুয়া এনে দিলেন। ভাজা পরোটার
রঙে আর ঘিয়ের গন্ধমাখা হালুয়ার গন্ধে সুনেত্রর খিদেটা চনমনে হয়ে উঠল আরও। পরোটার
টুকরো ছিঁড়ে তার মধ্যে একটু হালুয়া তুলে, মুখে তোলার সময়েই সে থমকে গেল, বলল, “মা,
দুপুরে তুমি ভাত খেয়েছ?”
“বোঝো, খাবো
না কেন? খেয়েছি...তুই শুরু কর আরও আনছি...”।
সুনেত্র
রেকাবিতে পরোটার টুকরোটা নামিয়ে রেখে, দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের মেঝেয় রাখা
ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা তুলে দেখল, তরকারির বাটিগুলোর ঢাকনা তুলেও দেখল। দুপুরে মা কিছুই
খাননি। সারা দুপুর কেঁদেছেন, খাবেন কখন?
“ও আবার কি,
সুনু? বলা নেই কওয়া নেই ভাতের সকড়ি ঘাঁটতে এলি...?”
সুনেত্র
মায়ের হাত ধরে মাকে টেনে আনল টেবিলের সামনে। রেকাবি থেকে পরোটার টুকরো তুলে মায়ের
মুখের কাছে তুলে বলল, “তুমি না খেলে, আমি খাবো না, মা”।
“আমার আছে,
আমি খাবো, খিদে পেয়েছে বলছিলি, তুই খা না”।
“তোমার বড়ো
ছেলের মতো আমি চিৎকার করতে পারি না। কিন্তু আমার জিদ কেমন সে তুমি আমার থেকেও ভালো
জানো, মা”। মায়ের চোখে চোখ রেখে, খুব গম্ভীর গলায় বলেছিল সুনেত্র। “বড়ো করে হাঁ
করো দেখি”।
“আমি কি
রাক্ষুসী নাকি, বড়ো করে হাঁ করব?” হাসি হাসি মুখে, হাঁ করেছিলেন মা। সুনেত্র খাইয়ে
দিয়েছিল মাকে। তারপর বলেছিল, “এখানে বসো, একগ্রাস নয় – আমার সঙ্গে তোমাকেও খেতে
হবে...”।
“কী যে জেদ
করিস না...গা জ্বালা করে...” মা বললেন, কিন্তু বাধ্য মেয়ের মতো বসেও পড়লেন সামনের
চেয়ারে। দুজনে মিলেই খাওয়া শুরু করলেন। খেতে খেতে মায়ের মনে হল, একই গর্ভে জাত
তাঁর দুই সন্তানের আচরণে এত পার্থক্য হয় কী করে? আজ সুনু বেরিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক
পরে, সুমু চান করে বেরিয়েই মাকে ধমকে বলেছিল, “ভাত দাও মা, আমার দেরি হয়ে
যাচ্ছে...ছোট ছেলের জন্যে কান্নাটা পরে কেঁদো, সারা দুপুর পড়ে আছে...”। মায়ের দু
চোখ জলে ভরে উঠেছিল আবার, কী করে তিনি সুমুর কথায়, এত বড়ো আঘাতটা দিতে পারলেন,
সুনুকে?
“আবার
কাঁদছো কেন, মা? ঈর্ষা ব্যাপারটাতে কোন যুক্তি থাকে না। দাদার থেকে সব ব্যাপারেই
আমি যে নীরেস, সবাই জানে...লেখাপড়ায়, বুদ্ধি-শুদ্ধিতে, কথাবার্তায়... তবুও...।
কেঁদো না, মা। খাও। বলছিলে আরও পরোটা আছে, নিয়ে এস না, মা”।
চলবে...