বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৮

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের সপ্তম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

অষ্টম পর্বাংশ 


৪.৪.৯ সামাজিক পরিস্থিতি

বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সমাজের শাস্ত্রীয় মতে যদিও মূলমন্ত্র ছিল অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগ, কিন্তু বাস্তব সমাজে তার প্রচলন ছিল বলে মনে হয় না। আড়ম্বর করার মতো অর্থনৈতিক সাধ্য যাদের ছিল না, তারাই বাধ্য হয়েই অনাড়ম্বর, মিতব্যয়ীতা এবং ত্যাগের মন্ত্র মেনে চলত, অর্থাৎ সমাজের নিম্নস্তরের মানুষেরা। শাস্ত্র রচয়িতা ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণী যজ্ঞের আয়োজন করে, রাজাদের থেকে দানগ্রহণ করে প্রভূত সম্পদের অধিকারী এবং রীতিমতো বিত্তশালী হয়ে উঠতেন। তাছাড়াও ব্রাহ্মণশ্রেণি রাজকর্মচারী পদে এমনকি বাণিজ্য করেও যথেষ্ট সম্পদশালী হয়ে উঠতেন। অতএব, ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা পরবর্তী হিন্দু ধর্মে যে চতুর্বর্গ অর্থাৎ জীবনের চারটি লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – তাদের মধ্যে অর্থ উপার্জনেই বেশি নজর ছিল।

প্রাথমিক ব্রাহ্মণ্য সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি। কিন্তু পরবর্তী কালে অক্ষত্রিয় এবং শূদ্র রাজাদের আমলে সমাজে বৈশ্য এবং শূদ্রদের প্রভাব এবং সম্মান যথেষ্ট বেড়ে উঠেছিল। তার কারণ অবশ্য নিবিড় বৈদেশিক এবং আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য। বিশেষ করে মৌর্য আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষ যখন একই প্রশাসনিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, সেসময় বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ কারিগর ও শিল্পী এমনকি কৃষকরাও তাদের পরিশ্রম বা দক্ষতার যোগ্য মূল্য পেতে শুরু করেছিল। যার ফলে সৃষ্টি হল দক্ষ শূদ্র কারিগরদের বিভিন্ন জাতি। যেমন, স্বর্ণকার, মণিকার, তন্তুকার, তৈলকার, কর্মকার, সূত্রধর, স্থপতি, ভাস্কর, এমন বহু জাতি। গোপ ও আহির - যারা গোপালন করত এবং দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত দ্রব্যের বাণিজ্য করত। সম্পন্ন কৃষিজীবিরা আগেই বৈশ্য ছিলেন এখন তাঁদের মধ্যেও নানান বিশেষজ্ঞ (Specialist) জাতির উদ্ভব হল, যেমন যাঁরা রেশমের গুটি কিংবা সুপুরি বা পানের চাষ করতেন। এই চাষের উৎপাদন ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক (cash crop)সমাজে আরেকটি জাতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন – তাঁরা হলেন নাপিত। হিন্দু সমাজের নানান অনুষ্ঠানে নাপিতের গুরুত্ব তখন এবং আজও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

মৌর্যদের সময় থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের কাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সেই বাণিজ্যের ফলে, দেশে প্রভূত সম্পদের আমদানি হচ্ছিল, রাজ্য এবং সাম্রাজ্যগুলির রাজস্ব আয়ের বড়ো অংশ আসত এই বাণিজ্য থেকে। আগেই বলেছি, এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত বণিক সম্প্রদায় এবং শ্রেষ্ঠী সমিতিগুলি। রাজ্যের রাজনীতি এবং প্রশাসনেও তাঁদের প্রভাব কিছু কম ছিল না। অতএব তাঁদের বর্ণ বৈশ্য হলেও, সামাজিক অবস্থানে তাঁরা ক্ষত্রিয়ের সমতুল্যই হয়ে উঠলেন।

অতএব চতুর্বর্ণের একমাত্রিক বর্ণের সমাজ এখন হয়ে উঠল বহুমাত্রিক জটিল সামাজিক বিন্যাস। এর সঙ্গে মানানসই করে সামাজিক বিধি-বিধানেও অনেক আপোষ করতে হল, নতুন নিয়ম বানিয়ে তুলতে হল বারবার।

সমাজে মহিলাদের অবস্থান সম্পর্কে খুব প্রত্যক্ষ আভাস তেমন পাওয়া যায় না। যদিও ব্রাহ্মণ্যধর্মে বা স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, মহিলারা সর্বদাই পুরুষ-নির্ভর। বাল্যাবস্থা পর্যন্ত তাঁরা পিতার অধীন, বিবাহের পর স্বামীর এবং বার্ধক্যে তাঁদের পুত্রের অধীন থাকতে হবে। তবে মহিলারা অন্তঃপুরবাসিনী পর্দানশীন ছিলেন এমনও মনে হয় না। নানান সাহিত্যে, চিত্রকলায় মহিলাদের যে বর্ণনা বা চিত্র পাওয়া যায়, আচরণে বা জীবনযাত্রায় তাঁরা হয়তো মোটামুটি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। বহু উচ্চবংশীয় মহিলাই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দিয়েছিলেন, একথা আমরা আগেই দেখেছি। তাঁদের মধ্যে শিক্ষার প্রচলনও ছিল বোঝা যায়। অনেক উচ্চশিক্ষিতা ব্রাহ্মণ্য মহিলাদেরও নাম পাওয়া যায়, তার মধ্যে বৃহদারণ্যক উপনিষদের “গার্গী”ই হয়তো ছিলেন অন্যতমা। তিনি ঋষি গর্গবংশীয়া, তাঁর পিতার নাম বাচক্‌নু। ব্রহ্ম প্রসঙ্গে তাঁর ও যাজ্ঞবল্ক্যের তর্কের ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহদারণ্যকের তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ ব্রাহ্মণের উদ্ধৃতি থেকে দেখে নেওয়া যাক, -

তারপর গার্গী, বচক্‌নুর কন্যা, জিজ্ঞাসা করলেন, “যাজ্ঞবল্ক্য, জগতের সবকিছুই যদি জলের সঙ্গে ওতপ্রোত[1] জড়িত থাকে, তাহলে জল কার সঙ্গে জড়িত?”

বায়ুর সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বায়ু কার সঙ্গে জড়িত?”         আকাশের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে আকাশ কার সঙ্গে জড়িত?”       গন্ধর্বলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু গন্ধর্বদের জগত কার সঙ্গে জড়িত?” “সূর্যের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে সূর্য কার সঙ্গে জড়িত?”          চন্দ্রের সঙ্গে, গার্গি”।

কিন্তু চন্দ্র কার সঙ্গে জড়িত?”            নক্ষত্রদের সঙ্গে, গার্গি”।

নক্ষত্ররা কার সঙ্গে জড়িত?”             দেবলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে দেবলোক কার সঙ্গে জড়িত?”     ইন্দ্রলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

ইন্দ্রলোক কার সঙ্গে জড়িত?”            বিরাজলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

তাহলে বিরাজলোক কার সঙ্গে জড়িত?”   হিরণ্যগর্ভলোকের সঙ্গে, গার্গি”।

হিরণ্যগর্ভলোক তাহলে কার সঙ্গে জড়িত?”

যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, “আর না, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না, যাতে তোমার মাথা দেহচ্যুত হয়। তুমি এমন এক দেবতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছ, যাঁর বিষয়ে কোন প্রশ্ন চলতে পারে না। অতএব, গার্গি, তোমার প্রশ্ন নিয়ে আর এগিও না”। এই কথা শুনে বচক্‌নু-কন্যা গার্গী চুপ করে গেলেন”। (স্বামী মাধবানন্দ কৃত বৃহদারণ্যক উপনিষদের ইংরিজি অনুবাদ থেকে – বাংলা অনুবাদ লেখক।)

হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মের আরেক নাম। জগতের যাবতীয় বিষয়ের আদি হলেন ব্রহ্ম, কিন্তু তিনি নিজে অনাদি ও অনন্ত, অতএব তাঁর আগে এবং পরে আর কিছুই নেই, কোন প্রশ্নও নেই, কোন উত্তরও নেই। এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের রাজসভায়। এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্য নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞ বলে দাবি করেছিলেন, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাবড় তাবড় বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে জরৎকারু বংশের আর্তভাগ, লাহ্যায়নি ভুজ্যু, উষস্ত, কহোল কৌষীতকেয়, গার্গী, উদ্দালক আরুণি, বাচরুবী এবং আরও অনেকে। সেই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রাজা জনক, যিনি নিজেও ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞ এবং রাজর্ষি। ভারতের বৈদিক রাজাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ব্রহ্মজ্ঞ রাজার মধ্যে রাজা জনক ছিলেন অন্যতম। এই রাজা জনকই সীতাদেবীর পালকপিতা এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্বশুর।

এই সভায় গার্গী কি অব্যয়, অনির্বচনীয়, অপ্রশ্ননীয় ব্রহ্মতত্ত্বকে খোঁচা দেওয়ার জন্যেই শেষ প্রশ্নটি রেখেছিলেন?  কারণ রাজর্ষি জনকের নক্ষত্র সভায় আমন্ত্রিত একজন ব্রহ্মজ্ঞ বিদূষী হয়ে - ব্রহ্মের পরে আর কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না - এ তত্ত্ব তাঁর অজানা থাকার তো কথা নয়! উত্তরে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য সাধারণ ভাবে বলতেই পারতেন, ব্রহ্মের পরে আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে না। তা না বলে “মাথা দেহচ্যুত” হওয়ার (নাকি করার?) ধমক দিতে হল কেন? তিনি কি বিদূষী গার্গীর প্রশ্নে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতি সন্দেহের আভাস পেয়েই এমন কঠোর উত্তরে, প্রকাশ্য সভায় সম্ভাব্য সকল বিরোধী প্রশ্নকে সমূলে বিনাশ করলেন? কে জানে?  

মহিলাদের প্রচুর দানের স্বীকৃতি পাওয়া যায় বৌদ্ধ শাস্ত্র থেকে। সাঁচী, ভারহুতের শিলালিপিতে অনেক মহিলার দানের কথা লেখা আছে। তবে মহিলারা এই অর্থ কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তাঁদের নিজস্ব আয়, নাকি পৈতৃক বা স্বামীর সম্পত্তি ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্রাট অশোকের পত্নী কারুবাকীও বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়েছেন এবং প্রচুর দান করেছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি।

৪.৪.১০ শিল্প-দক্ষতা                          

৪.৪.১০.১ পাথরের স্তম্ভ

সম্রাট অশোকের স্তম্ভ-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার এই স্তম্ভগুলির বিশেষত্ব নিয়ে দুচার কথা বলা প্রয়োজন। এই স্তম্ভের পাথরগুলির অধিকাংশই বেনারস থেকে প্রায় চল্লিশ কি.মি. দক্ষিণ পশ্চিমের চুনার অঞ্চল থেকে, কিছু মথুরা অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় তিরিশটি স্তম্ভ বা তার ধ্বংসাবশেষ এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অতএব চুনার কিংবা মথুরা থেকে এই পাথরগুলি, উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি নেপালের তরাই অঞ্চলেও বহন করে নিয়ে যাওয়া, আশ্চর্য দক্ষতার পরিচয়। কারণ, স্তম্ভের পাথরগুলিতে কোন জোড় (joint) ছিল না, দৈর্ঘে প্রায় চল্লিশ ফুট (প্রায় বারো মিটার) মনোলিথিক (monolithic) পাথর। প্রত্যেকটির ওজন প্রায় পঞ্চাশ টন। কোন হাইওয়ে ছিল না, বারো বা ষোল চাকার লো-বেড (Low bed) ট্রেলার ছিল না, ক্রেনও ছিল না। তবুও এই পাথরগুলি কয়েকশ কিলোমিটার বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলদ বা মোষে টানা গাড়িতে – অসমান পাথর কিংবা ইঁট বিছানো রাস্তা দিয়ে। সেতু ছাড়াই পার করতে হয়েছিল বেশ কিছু বড়ো এবং ছোট ছোট অজস্র নদী! তারপরেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে, ভারি এই পাথরগুলিকে স্থাপনা (erection) করা হয়েছিল নিখুঁত। এই কারিগরি দক্ষতা মিশরের পিরামিড বানানোর থেকে খুব কম কী?

 

৪.৪.১০.২ লৌহ স্তম্ভ

দিল্লির কাছেই মেহেরোলিতে কুতুব মিনারের সামনে একটি লৌহ স্তম্ভ স্থাপনা করিয়েছিলেন, খুব সম্ভবতঃ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য। এর কথাও আগেই বলেছি। এই স্তম্ভটি শিল্পের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য না হলেও, কারগরি দক্ষতায় অবশ্যই অনন্য। এটির উচ্চতা প্রায় তেইশ ফুট (প্রায় সাত মিটার) এবং এটির মধ্যেও কোন জোড় নেই। তার থেকেও বড়ো কথা, প্রায় ষোলশ বছরের রোদ-বৃষ্টি উপভোগ করে এই লোহার স্তম্ভ আজও অটুট দাঁড়িয়ে আছে এবং তার গায়ে জং বা মর্চের (rust) চিহ্নমাত্র নেই! এমন নয় যে ভারতীয় কারিগররা তখন স্টেনলেস স্টিল বানানো আবিষ্কার করে ফেলেছিল। কিন্তু প্রায় একশভাগ বিশুদ্ধ লোহা বানানোর দক্ষতা যে তাঁরা অর্জন করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আধুনিক লৌহ শিল্পে যাঁরা আছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, লৌহ-আকর (iron ore) থেকে বিশুদ্ধ লোহা বানাতে কতখানি দক্ষতা এবং কারিগরি জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

 

৪.৪.১১ স্থাপত্য

আগেই বলেছি হরপ্পা সভ্যতা এবং মৌর্যযুগের মধ্যে ভারতবর্ষে উল্লেখযোগ্য কোন স্থাপত্য নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সে রাজা যুধিষ্ঠিরের চোখ ধাঁধানো ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাসাদ হোক, কিংবা শ্রীরামচন্দ্রের অযোধ্যার প্রাসাদ বা লঙ্কেশ্বর রাবণের প্রাসাদ এবং তাঁর স্বর্ণপুরীই হোক। পরবর্তীকালে এই ধরনের বর্ণময় প্রাসাদগুলির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া গেলে, ভারতের ইতিহাস হয়তো আরেকটু ঋদ্ধ হবে।

 

৪.৪.১১.১ স্তূপ

আদিম যুগ থেকেই ভারতবর্ষের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃতদেহ সমাধি দেওয়া হত। সম্ভবতঃ অনার্যদের মধ্যে মৃতদেহ সমাধি দেওয়ার প্রচলন ছিল, এবং মৃতদেহ দাহ-সংস্কারের প্রচলন শুরু হয়েছিল আর্য সমাজে।  এই সমাধিগুলি মাটি দিয়ে ছোট আকারের অর্ধ-গোলকাকৃতি ঢিবি[2] বা স্তূপের মত বানানো হত। পরবর্তীকালে সমাধির পাশে পাথরের বড় ফলক (Menhir) খাড়া করে রাখা হত মৃতের স্মৃতির ও তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার উদ্দেশে। বৌদ্ধরা সম্ভবতঃ প্রাচীন ভারতের এই রীতিটাই গ্রহণ করেছিলেন, তবে অনেক শিল্পসম্মতভাবে। ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দেহভস্ম অনেকগুলি রাজ্যই নিয়ে গিয়েছিল, এবং সকলেই তাঁদের রাজ্যে স্তূপ বানিয়েছিল। সেই স্তূপগুলির অস্তিত্ব এখন আর নেই এবং পরবর্তী কালে ভগবান বুদ্ধের অস্থি বৃহত্তর স্তূপগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

সম্রাট অশোকের সময়ে বানিয়ে তোলা সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং কৃষ্ণা উপত্যকার অমরাবতীর স্তূপগুলিকে পরবর্তী কালে অনেক বড়ো করে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। মোটামুটি ২০০ বি.সি.ই-তে সাঁচীস্তূপ, অশোকের স্তূপের আকারের প্রায় দ্বিগুণ করে বানানো হয়েছিল। স্তূপের অর্ধগোলকের ব্যাস প্রায় একশ কুড়ি ফিট। এই স্তূপের চারদিকে পুরোনো কাঠের রেলিং সরিয়ে পাথরের রেলিং বানানো হয়েছিল, যার উচ্চতা প্রায় ন ফিট। পাথরের গায়ের অলংকরণে বুদ্ধের জীবনের নানান ঘটনা ও সমসাময়িক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনেক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তারও পরে মোটামুটি ১০০ বি.সি.ই-তে বানিয়ে তোলা হয়েছিল সাঁচীস্তূপের চার দিকের চারটি তোরণ দ্বার। পাথরে বানানো দ্বারগুলি সারা বিশ্বেই বিখ্যাত, তাদের অদ্ভূত সুন্দর অলংকরণ এবং পাথরে খোদিত অনবদ্য চিত্রগুলির জন্য। পাথরের কাজে ভারতীয় ভাস্করদের দক্ষতা এবং সূক্ষ্ম শিল্পবোধের সূচনা হয়তো এই সময় থেকেই। একই কথা প্রযোজ্য মোটামুটি একই সময়ে অনেক বড়ো করে বানানো ভারহুত স্তূপের ক্ষেত্রেও। অমরাবতী স্তূপ ২০০-৩০০ সি.ই.তে সম্পূর্ণ হয়েছিল, এই স্তূপের আকার সাঁচি স্তূপের থেকেও বড়ো এবং আরও বিশদে অলংকৃত। সারনাথের প্রথম বানানো স্তূপের ওপর বারবার নির্মাণ হয়ে, শেষ নির্মাণ হয়েছিল গুপ্তদের সময়ে। অন্যগুলির তুলনায়, এই স্তূপের উচ্চতা অনেক বেশি, এবং নিচের অর্ধগোলক ডোমের (dome) ওপরে একটি বেলনাকার (cylindrical) ডোম এই স্তূপের বিশেষত্ব।

চলবে...



[1] ওতপ্রোত শব্দের অর্থ সমস্ত দিক দিয়েই পরষ্পর জড়িয়ে থাকা। যে কোন বস্ত্রের প্রত্যেকটি সুতো অন্য প্রত্যেকটি সুতোর সঙ্গে যেমন ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে, তেমনই পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোমের সঙ্গে জগতের যাবতীয় বস্তু ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে।

[2] ঢিবি” শব্দটি অবশ্যই অনার্য শব্দ। বাংলার রাঢ় অঞ্চলের পরিত্যক্ত জনপদের ধ্বংসস্তূপের প্রচলিত নাম “পাণ্ডুরাজার ঢিবি”। এই শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ স্তূপ।


বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৫শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব "



২৮

 বিলম্বিত মধ্যাহ্ন ভোজনের পর প্রাসাদের অতিথিশালায় কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করছিলেন মহর্ষি ভৃগু। আচার্য বিশ্ববন্ধু ছিলেন, সংলগ্ন কক্ষে। এখন সূর্য অস্তগামী, দ্বিপ্রহরের রৌদ্রতাপের পর, মধ্য আশ্বিনের বৈকালিক পরিবেশ আরামদায়ক ও মনোরম। মহর্ষি ভৃগু গবাক্ষ পথে সম্মুখের উদ্যানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, আচার্য বিশ্ববন্ধুকে ডাকলেন। তাঁর ডাক শুনে আচার্য বিশ্ববন্ধু মহর্ষির কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, “আদেশ করুন, মহর্ষি”!

স্মিতমুখে আচার্য বিশ্ববন্ধুর দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “যতই বিলাসবহুল হোক বৎস, কক্ষ আমাদের আবদ্ধই রাখে! সামনের ওই মুক্ত উদ্যানে চলো স্বল্প পদচারণা করে আসি। শরতের স্নিগ্ধ বাতাস অঙ্গে নিয়ে, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি পরামর্শ সেরে নিই। সন্ধ্যার পর আমি মহারাণির সাক্ষাৎ প্রার্থী হবো, তুমিও যাবে আমার সঙ্গে। অত্যন্ত গোপন সেই আলোচনার পক্ষে, এই কক্ষ আদৌ নিরাপদ নয়!”

কক্ষ থেকে বেরিয়ে সম্মুখের উদ্যানের পথে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে, আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “রাজ অতিথিশালা অত্যন্ত সুরক্ষিত, সেই কক্ষের মধ্যে গোপন আলোচনা নিরাপদ নয় কেন, মহর্ষি?”

স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “স্বদেশ এবং বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অস্থায়ী বাসের জন্য এই কক্ষগুলি নির্মিত হয়েছে, বৎস। সেই অতিথিদের সকলেই সরল এবং নিরীহ হবেন, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁদের গতিবিধি এবং আলাপের উপর গোপন পর্যবেক্ষণের জন্য এই কক্ষের দেওয়ালগুলি বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে নিভৃত ও নিরাপদ মনে হলেও, হতে পারে, বিশ্বস্ত কোন গুপ্তচর অসীম ধৈর্যে দেওয়ালের ওপাশে কান পেতে বসে আছে, অথবা সূক্ষ্মছিদ্র পথে লক্ষ্য রাখছে আমাদের গতিবিধি ও আচরণ!”

“কী সাংঘাতিক, মহর্ষি! কিন্তু আমাদের উপর পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন কী?”

“বলো কী, বৎস, প্রয়োজন নেই? যতদিন পৃথু রাজা না হচ্ছেন, এই রাজ্যের সিংহাসনের প্রত্যাশী অনেকেই!”

“অনেকেই? আমার ধারণা ছিল, একজনই - রাজাবেণের মিত্র শক্তিধর”!

মহর্ষি হেসে ফেলে বললেন, “তোমরা বৈদ্যরা অত্যন্ত সরল, শত্রু হোক বা মিত্র, তাদের ইষ্ট ছাড়া তোমরা কিছুই চিন্তা করো না। সিংহাসন লাভের দৌড়ে শক্তিধর আছে, কিন্তু সে আপাততঃ অনেকটাই পিছিয়ে! এখন তার লোকবল সীমিত, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করাও তার পক্ষে কষ্টসাধ্য! তার থেকে অনেক শক্তিশালী দাবিদার মহামন্ত্রী বিমোহন”।

“মহামন্ত্রী বিমোহন?” অবাক হয়ে বিশ্ববন্ধু মহর্ষির মুখের দিকে তাকালেন, বললেন, “তিনি মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন, উপরন্তু তিনি নিজেও এখন যথেষ্ট বৃদ্ধ, এই বয়সে তাঁর রাজ্যলাভের ইচ্ছা? আশ্চর্য?”

“তাঁর নিজের জন্য কেন হবে, বৎস বিশ্ববন্ধু? তুমি ভুলে যাচ্ছো, তাঁর একটি পুত্র আছে। সে যুবক। সে আমাদের আশ্রমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন কৃতী ছাত্র এবং বর্তমানে দক্ষিণের একটি রাজ্যের মন্ত্রীপদে আসীন”।

“হ্যাঁ মহর্ষি, মনে পড়েছে। আমাদের থেকে একাদশবর্ষের অনুজ – নাম শ্রীগোত্রপাদ! মহামন্ত্রী তাঁকে সিংহাসনে বসাতে চাইছেন?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, বললেন, “রাজনীতির অন্দরমহলে নিঃস্বার্থ বলে কিছু হয় না, বৎস! কিন্তু এখন ওসব কথা থাক। আজ সন্ধ্যাকালে মহারাণির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তাঁকে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতির কথা জানাবো। ওই সঙ্গে জানাবো, রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে, নব নির্মিত উদ্যানবাটিকায় তাঁদের বাস করার কথা!”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “বাঃ, তার অর্থ রাজমাতার প্রস্তাবে মন্ত্রীমণ্ডলী সম্মত? রাজ্যশাসন থেকে অব্যাহতি পেলে, রাজমাতা স্বস্তি পাবেন, কিন্তু প্রাসাদ ত্যাগে সম্মত হবেন কী? এই সুখ, এই বিলাস, ত্যাগ করা সামান্য বিষয় নয়”!

মহর্ষি ভৃগু হাসলেন, বললেন, “তোমার তাই ধারণা, বৎস? আমার ধারণা তিনি যদি প্রথম প্রস্তাবে স্বস্তি পান, তবে নির্দ্বিধায় উদ্যানবাটিকায় যেতেও সম্মতা হবেন”।

অবাক হয়ে আচার্য বিশ্ববন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, “শাসনভার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি স্বস্তি পাবেন না, গুরুদেব? সকালে স্বয়ং তিনিই তো আপনাকে এই অনুরোধ করেছিলেন!”

“ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এবং না থাকার পার্থক্য মহারাণি সুনীথা, খুব ভাল করেই জানেন, বৎস। তিনি রাজকন্যা, এবং বিবাহের পর রাজরাণী হওয়ায়, সুদীর্ঘকাল ক্ষমতার মাহাত্ম্য খুব নিকট থকে উপভোগ করেছেন। কিন্তু মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের পর, তিনি রাজমাতা হয়ে, কিছুকাল ক্ষমতাচ্যুতির অসহায় যন্ত্রণাও ভোগ করেছেন। তিনি সকালে যখন আমাকে শাসনভার থেকে মুক্তি চাইলেন, আমার ধারণা, পুত্রের অসুস্থতার হতাশা থেকে, আবেগে বলে ফেলেছেন, অন্তর থেকে বলেননি। অথবা এমনও হতে পারে, তিনি আমাদের পরীক্ষা করতে চাইছিলেন!”

“পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা, গুরুদেব?”

“জড়বৎ এবং দুরারোগ্য অসুস্থ এক পুত্রের প্রৌঢ়া মাতার হাতে রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত রাখতে, আমরা সকলেই সত্য সত্যই আগ্রহী কী না?  আগ্রহী হলেও সে আগ্রহ কতদিনের?”

“তাহলে উপায়? মহারাণি যদি রাজ্যভার ত্যাগ করতে সম্মতা না হন”? উদ্যানের মধ্যে পায়ে চলা পথে, দুজনে শ্লথ গতিতে পাশাপাশি হাঁটছিলেন, গভীর চিন্তায় মহর্ষি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, “সম্মতা না হওয়ার কোন সুযোগ আমি তাঁকে দেব না, বৎস। আমি মন্ত্রীমণ্ডলীর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করবো। সে সিদ্ধান্ত সাধারণতঃ অনড় এবং সেই সিদ্ধান্তের অন্যথা করতে হলে, পুনরানুমোদনের জন্য মন্ত্রীমণ্ডলকেই আবার অনুরোধ করতে হবে! সেই অনুরোধ কি, মহারাণি এবং রাজমাতা সুনীথার মর্যাদার হানি ঘটাবে না?”

“অবশ্যই ঘটাবে, গুরুদেব!”

“অতএব, ওই বিষয়ে আমি বিশেষ চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত তাঁর স্থান পরিবর্তনের অভিমত নিয়ে। আর এই বিষয়ে তোমার সহায়তা আমার একান্ত প্রয়োজন”।

“আমার সহায়তা, গুরুদেব? কী সাহায্য আমি করতে পারি?”

“দেশব্যাপী সুখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধুকে রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস এনে দিতে হবে, উদ্যানবাটিকার নতুন পরিবেশ রাজাবেণের স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল। নিজের একান্ত অভিলাষ অনুযায়ী নির্মিত এই উদ্যানবাটিকায় বাস করলে, রাজাবেণের মনে উদ্দীপন হতে পারে। ধীরে ধীরে তাঁর স্নায়ুবৈকল্যের নিরাময় হতেও পারে”।

“বুঝেছি মহর্ষি। আপনি সহায় হলে, রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস অবশ্য সঞ্চার করতে পারবো”!

“অতি উত্তম, বৎস। শুরুটা তুমিই করবে, তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের ভাবনায় পরিবর্তন আনা যাবে! এখন চল, আমরা ফিরে যাই, প্রস্তুত হয়ে মহারাণি সুনীথার সাক্ষাতে যেতে, আমাদের বিলম্ব না হয়ে যায়!” ফেরার পথে অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললেন না।

উদ্যান থেকে বের হবার একটু আগে আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, মহর্ষি?”

স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সপুত্র মহারাণি সুনীথাকে আমি প্রাসাদ থেকে দূরে নিয়ে যেতে চাইছি, কেন, তাই তো?” আচার্য বিশ্ববন্ধু অবাক হলেন না, গুরুদেবের এই ক্ষমতার জন্যেই তিনি সকলের গুরুদেব, সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি হেসে সম্মতির ঘাড় নাড়লেন। মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অনেক কারণ, বৎস, অনেক। ক্ষমতাহীনা মহারাণিকে প্ররোচিত করে, আমাদের বিপক্ষীয়রা আমাদের বিরোধীতা করতে পারে! প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করা যাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস, তিনি সুযোগ পেলেই, তাঁর অভিমত প্রকাশ্যে আনতে দ্বিধা করবেন না। তাঁর সঙ্গে সাধারণ প্রজাদের দীর্ঘদিনের মাতা-পুত্র সম্পর্ক, তাঁর কাছে তাদের অবারিত দ্বার। প্রশাসনিক দায়িত্ব না থাকায়, তিনি এখন তাদের প্রতি আরও বেশি উদার হস্ত হয়ে উঠবেন। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে, তিনি অপমানিতা বোধ করবেন, প্রজারা বিক্ষুব্ধ হবে, তারা আমাদের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় সন্দিহান হয়ে উঠবে! কারণ তিনি যে রাজমাতা ও মহারাণি! তাঁর জ্ঞাতে এবং অজ্ঞাতেও - প্রশাসন বারবার বিপন্ন হবে!

উপরন্তু তিনি এখন এই রাজভবনের অন্দরমহলে সর্বময়ী কর্ত্রী এবং এর পরেও তিনি তাই থাকবেন! এ বিষয়ে মন্ত্রীমণ্ডলীর কোন নিয়ন্ত্রণ চলে না! অতএব অন্দরমহলের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ থাকবেই। তাতেও পরিস্থিতি ক্রমাগতঃ জটিল হয়ে উঠতে থাকবে! আমাদের নবীন রাজা ও নবীনা রাণির জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে খুব দেরি হবে না। খুব সংক্ষেপে যদি শুনতে চাও, বৎস, তাহলে বলি, আমি মহারাণি সুনীথাকে এই রাজভবনের অন্দরমহল ও বারমহলের সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন রাখতে চাই!”

চলবে...



মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২

    ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১


দ্বিতীয় পর্ব 

 

আগেই বলেছি সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা দ্রব্য বিনিময় প্রথা (barter system) এবং অর্থ বিনিময়  প্রথা (money transaction system) দুটোতেই অভ্যস্ত ছিল, তা না হলে দেশের ভেতরে এবং বিদেশেও নিয়মিত বাণিজ্য করা সম্ভব হত না।  এই সভ্যতার মানুষেরা তামা, রুপো, সোনা প্রভৃতি ধাতুর ব্যবহারও যে জানত, সে প্রমাণ বহুল পাওয়া যায়। অতএব, অনুমান করা যায় যে অর্থ বিনিময়ে তারা ধাতুর ব্যবহারও শুরু করতে পেরেছিল। সেই সময় যে অঞ্চল থেকে রুপো আমদানি করা হত, তাদের মধ্যে প্রধান দেশ ছিল সুমের (এখন সে অঞ্চল ইরাকের মধ্যে), এ সুমেরের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্কের অনেক হদিশ পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে মহেঞ্জোদরোতে পাওয়া এগারোটি রুপোর টুকরোর কথা উল্লেখ করা যায়। একটি রুপোর বাক্সের মধ্যে কিছু গয়নার সঙ্গে এই এগারোটি রুপোর টুকরো পাওয়া গিয়েছিলএদের মধ্যে দুটি ছাড়া, অন্যগুলির আকার গোল কিংবা আয়তাকার। এই নটি ধাতুখণ্ডের ওজন, সিন্ধুসভ্যতার তৌল ও ওজন রীতি (weighing system)- সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু যে দুটি ধাতুখণ্ড  সিন্ধুসভ্যতার ওই প্রচলিত ওজনের সঙ্গে মেলে না, তাদের গায়ে কীলক (cuneiform) আকারের লিপি খোদাই করা আছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশেষ করে দেখেছেন, এই আলাদা ধাতুখণ্ডদুটি সুমের থেকে এখানে এসেছিল। এই উদাহরণ থেকে ধরে নেওয়া যায়, আমাদের দেশে ধাতুকে বিনিময় মাধ্যম (medium of exchange) হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবেই শুরু হয়েছিল, যদিও তার গুণ মান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়।

 

সিন্ধু সভ্যতার অবলুপ্তির অনেক কারণ অনুমান করা হয় এবং সে নিয়ে নানান বিতর্কেরও শেষ নেই। কিন্তু সিন্ধুসভ্যতার উন্নত নাগরিক সভ্যতার পর, আর্যভাষীদের সামাজিক কাঠামোর যে সন্ধান আমরা পাই, সে সভ্যতা পুরোপুরি গ্রাম নির্ভর। সেক্ষেত্রে তাদের দ্রব্য বিনিময় প্রথাই (barter system) হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঋগ্বেদের একটি সূত্রে ‘নিষ্ক’ ব্যবহারের যে কথা বলা হয়েছে, সেটি ধাতব খণ্ড বিশেষ করে সোনার খণ্ড ছাড়া কিছুই নয়। এই ‘নিষ্ক’ সাধারণতঃ সোনার ছোট ছোট টুকরো জুড়ে গয়নার কথা বোঝাতো। কিন্তু যেখানে ‘নিষ্ক’র বিশেষণে শত ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট ওজনের একশটি সোনার খণ্ডের কথাই বলা হয়েছে মনে করা যায়। সেক্ষেত্রে আর্যভাষী সমাজেও নির্দিষ্ট ওজনের ধাতব খণ্ডকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হত, এ কথা বলাই যায়। ঐতিহাসিকেরা বলেন, বৈদিক যুগের শেষের দিকেই অর্থাৎ ৮০০/৭০০ বি.সি.ই-র কোন সময়েই নির্দিষ্ট ওজনের ধাতবখণ্ড বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ছিল।

এই সময়েই উত্তরপশ্চিম থেকে, পূর্বে গঙ্গার উপনদী ও শাখানদীর অববাহিকা ধরে, আর্যভাষীদের সমাজ ও সভ্যতার প্রসার হচ্ছিল। এই অঞ্চলের ষোড়শ মহাজনপদের হাত ধরেই আর্যভাষীদের নগরায়ণ ও নাগরিক সভ্যতার সূত্রপাত। সুতরাং সেই সময়েই উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিভিন্ন নগরে বেড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। এই বাণিজ্যের প্রয়োজনেই নির্দিষ্ট ওজন এবং নির্দিষ্ট গুণমানের ধাতুখণ্ডের নির্ধারিত মূল্য এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। জরুরি হয়ে উঠল এই ধাতুখণ্ড তৈরির নির্দিষ্ট পদ্ধতি। কোন রাজ্যের শক্তিশালী রাজা বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোন বণিকসভা ছাড়া এই ধাতবখণ্ডের নির্দিষ্ট মূল্যমান নিয়ন্ত্রণের কঠিন দায়িত্ব নেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধাতব মুদ্রা বা টাকা অপরিহার্য হয়ে উঠতে লাগল।

ভারতবর্ষে ঠিক কবে থেকে টাকার প্রচলন শুরু হয়েছিল, আজ তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে বৌদ্ধ কাহিনী ও বুদ্ধদেবের জীবনী, জাতকের নানান কাহিনীতে এই টাকা ও মুদ্রার ব্যবহারের ইঙ্গিত প্রচুর পাওয়া যায়। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের মোটামুটি ৬০০ থেকে ৫০০ বছর আগে, ঐতিহাসিকেরা এই সময়টাকে নির্দিষ্ট করেন। এই প্রসঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ বিনয়পিটকের একটি কাহিনী শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়।

শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ স্বর্ণমুদ্রা বিছিয়ে জেতবন বিহারের জমি কিনছেন 

সে সময়কার একজন ধনী ব্যবসায়ী বা শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ ছিলেন বুদ্ধের একান্ত ভক্ত। তিনি একবার মনস্থ করলেন, ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর সকল শিষ্যদের থাকার জন্যে একটি সঙ্ঘবিহার নির্মাণ করাবেন। উপযুক্ত জমির খোঁজ করতে করতে তিনি শ্রাবস্তী (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের সাহেত-মাহেত) নগরের কাছে মনোমত বেশ অনেকটা জমির সন্ধান পেলেন। সেই জমির মালিকের নাম জেত। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ জেতের কাছে ওই জমি কিনে নেবার প্রস্তাব দিলে, শুরুতে জেত কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর জেত রাজি হলেন, কিন্তু জমির যে দাম দাবি করলেন, তা শুনলে চমকে উঠতে হয়। তিনি দাবি করলেন, জমির দাম হিসেবে, পুরো জমিটা সোনার ধাতুখণ্ড দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ রাজি হয়ে গেলেন এবং গরুর গাড়িতে হাজার হাজার সোনার খণ্ড এনে, প্রচুর লোক দিয়ে সেই খণ্ড বিছিয়ে, ঢেকে দিতে লাগলেন সেই জমি। শ্রেষ্ঠীর এই অদ্ভূত ভক্তি দেখে জেত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ অব্দি তিনি কোন দাম না নিয়ে জমিটি শ্রেষ্ঠীকে দান করে দিয়েছিলেন। সেই উপকারের কথা মনে রেখে শ্রেষ্ঠী সেই বিহারের নাম জেতবনবিহার রেখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। এই আশ্চর্য ঘটনার কথা অজানা কোন শিল্পী ছবির ভাষায় লিখে রেখে গেছেন মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার ভারহুত স্তূপের কাছে, একটি স্তম্ভের গায়ে।

বৌদ্ধ কাহিনীর বর্ণনা এবং উপরের চিত্র দেখে অনুমান করা যায়, চারকোণা এই সোনার পাতের টুকরোগুলিই মুদ্রা, আর এই মুদ্রার নাম ছিল কার্ষাপণ। প্রথমে ধাতুকে গলিয়ে ছাঁচের মধ্যে সমান উচ্চতায় (thickness) ঢালাই (casting) করে লম্বা পাত বানানো হতো। অন্যদিকে নানান চিহ্ন এবং নকশা উলটো খোদাই করে, ছোট ছোট ছাঁচ বানানো হত। মিষ্টির দোকানে আজও সন্দেশ বানানোর যেমন ছাঁচ থাকে, অনেকটা সেরকম। এবার ঢালাই করা ধাতুর পাত, সমান মাপে কেটে ফেলে, একটু গরম করে, ধাতুকে সামান্য নরম করে নেওয়া হত। তারপর ওই ছোট ছাঁচ নরম ধাতুর পাতের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে জোরে ঘা দিলেই, নরম পাতের টুকরোতে ছাপা হয়ে যেত সোজা চিহ্ন বা নকশা। তৈরি হয়ে যেত মুদ্রা (coin)এই ধরনের মুদ্রাকে ছাপদেওয়া মুদ্রা (punch marked coin) বলা হত। সোনার কার্ষাপণ আজ পর্যন্ত উদ্ধার না হলেও রুপোর অজস্র কার্ষাপণ উদ্ধার করা গেছে। প্রাচীনতম রুপোর যে কার্ষাপণ পাওয়া গেছে, সেগুলি মৌর্য আমলের, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময়কাল মোটামুটি ৩২০ থেকে ২৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ধরা হয়।

    

সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং তার বাইরের প্রতিবেশী কিছু দেশও সেই সময় মৌর্য রাজাদের অধীনে ছিল। বিশাল এই সাম্রাজ্যের সর্বত্র মুদ্রার ঠিকঠাক প্রচলন করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। জাল বা নকল মুদ্রার প্রচলন ঠেকাতে, মৌর্য রাজারা বিশেষ কয়েকটি রাজকীয় প্রতীক ব্যবহার করতেন। নিচের এই নকশাগুলির মধ্যে বাঁদিক থেকে প্রথম চারটি চিহ্ন বা সংকেত মৌর্য আমলের পাওয়া, প্রায় সব মুদ্রাতেই দেখা যায়, এই চারটি ছাড়াও নানান সময়ের নানান মুদ্রায় আরো কিছু চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধান চারটি চিহ্ন ছিল রাজা কিংবা রাজ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নির্দিষ্ট চিহ্ন, আর অন্যগুলি হয়তো স্থানীয় প্রশাসন কিংবা নানান সময়ের মুদ্রা হিসেবে অথবা কোন বিশেষ উৎসবের সংকেত হিসেবে ছাপ দেওয়া হত।    

 


 


মৌর্য যুগের রৌপ্যমুদ্রায়  মুদ্রিত নানান সংকেত চিহ্ন  

 

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ও মহামন্ত্রী কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে, মুদ্রার গুণমান এবং তার নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কানুন নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর মতে মুদ্রা তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব লক্ষণাধ্যক্ষের – ইনি রাজকোষ বা টাঁকশালের অধ্যক্ষ। লক্ষণাধ্যক্ষই রাজ্যের প্রয়োজন অনুসারে, পণ (কার্ষাপণ), অর্ধপণ, পাদপণ ও অষ্টভাগপণ মুদ্রা তৈরি করাবেন। এক পণ মানে ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেন কিংবা ৩.৭৩২ গ্রাম। যদিও এখনকার হিসাবে ৩২ রতি মানে ৩.৮৮৮ গ্রাম ধরা হয়। অর্ধপণ মানে ১৬ রতি, পাদপণ মানে ৮ রতি, আর অষ্টভাগপণ মানে ৪ রতি। খাঁটি রুপো কিন্তু বেশ নরম ধাতু। [কাঠের হাতুড়ি পিটিয়ে বানানো অতি পাতলা রুপোর তবক দেওয়া ভালো সন্দেশ তোমরা নিশ্চয়ই খেয়েছ] খাঁটি রুপোর মধ্যে খাদ অর্থাৎ অন্য ধাতু মিশিয়ে, মুদ্রার জন্যে উপযোগী শক্ত সংকর ধাতু বানানো হত। কৌটিল্যের নির্দেশ ছিল, একটি ৩২ রতি মুদ্রার মধ্যে ২২ রতি খাঁটি রুপো থাকতেই হবে, আর বাকি ১০ রতি হবে তামা। প্রচলিত মুদ্রার গুণমান পরীক্ষা এবং নকল মুদ্রা ধরার জন্যে ‘রূপদর্শক’ নামে মুদ্রা পরীক্ষক নিযুক্ত হতেন। ‘রূপদর্শক’-এর দায়িত্বে গাফিলতি ধরা পড়লে ১০০০ পণ জরিমানার নির্দেশ ছিল এবং রাজকোষে নকল মুদ্রা চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লে, রূপদর্শকের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তিরও নির্দেশ ছিল।

মৌর্যযুগে মুদ্রা তৈরির অধিকার ছিল শুধুমাত্র রাজা ও রাজসরকারের। সে সময় আসমুদ্র হিমাচল বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্যের সকল জনসাধারণ এই সমস্ত মুদ্রাই ব্যবহার করত। সাম্রাজ্যের সকল রাজকর্মচারীদের বেতনও এই মুদ্রাতেই দেওয়া হত। সাধারণ জনগণের মনে রাজা ও রাজ প্রতিনিধিদের উপর যে যথেষ্ট আস্থা ও বিশ্বাস ছিল, এই মুদ্রা ব্যবস্থার বিপুল ব্যবহার দেখে বোঝা যায়। এর থেকে এও স্পষ্ট বোঝা যায় মৌর্য যুগের রাজাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি, প্রভাব ছিল ও সারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন।

তবে সর্বকালে সর্বদেশেই দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের যেমন অভাব হয় না, তেমনি সে সময়েও হয়নি। এত সব কঠোর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ থাকলেও, সে সময়কার এমন অনেক মুদ্রার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলি নিঃসন্দেহে জাল। এই মুদ্রাগুলি পাৎলা রুপোর পাত মোড়া তামার মুদ্রা!

মৌর্য যুগের পরে ছাঁচে ঢালা বিভিন্ন আকারের তামার মুদ্রার বহুল প্রচলন হয়েছিল। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুদিকে ছবির ছাপযুক্ত তামার মুদ্রা অনেক আবিষ্কৃত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর গোড়ার দিকেই লেখসমেত ছাঁচের আঘাতে মুদ্রিত ভারতীয় মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইরাণে পাওয়া ‘ধমপালস’ এবং ‘উজেনিয়ি’ লিপির ছাপযুক্ত উজ্জয়িনীর মুদ্রার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। এই সময়ের মুদ্রাগুলির উপর শক্তিশালী কোন রাজসরকারের কিংবা প্রভাবশালী প্রশাসকের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, কিন্তু দুপাশেই ছবি ও লেখ সমেত ছাঁচে ঢালা মুদ্রার ব্যবহার প্রচুর হয়েছিল। 

 

‘টাকা’ কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘টঙ্ক’ বা ‘টঙ্কক’ শব্দ থেকে, এই দুটি শব্দের অর্থ ‘বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত প্রশাসনিক ছাপমারা ধাতবখণ্ড’ইংরিজি coin শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন ‘কুনেউস’ (cuneus) থেকে যার মানে কীলক। যে কোন পোস্ট অফিসে, কাঠের হাতলের সামনে গোল ছাপ মারার যে যন্ত্রটি দিয়ে পোস্ট অফিসের অফিসাররা সবকিছুতে ছাপ মারেন, সেই রকম কীলক দিয়ে ছাপ দিয়ে ধাতব মুদ্রায় ছবি ছাপা হত বলেই, ইংরিজিতে এই ধাতব মুদ্রাকে coin বলা হয়। আবার মুদ্রা তৈরির জন্যে, একটি কাঠের পাটার মধ্যে উলটো ছবির ছাঁচ বানিয়ে, রোমের লোকেরা মুদ্রা ছাপাত। সেই কাঠের পাটার নাম মনেতা (Moneta)রোমের  Juno Moneta মন্দিরে এই পদ্ধতিতে মুদ্রা তৈরি করা হত বলেই, ইংরিজিতে  বিনিময় যোগ্য ধাতব খণ্ডকে, ওই মন্দিরের দেবতার নাম অনুসারে money বলা হত।

এই সময়ে সারা বিশ্বেই মুদ্রার বহুল ব্যবহার শুরু এবং জনপ্রিয় হলেও বিনিময় প্রথা (barter system) কিংবা দ্রব্যধন বিনিময়ের (Commodity exchange system) প্রথা একদম বন্ধ হয়ে যায়নি। এই দ্রব্যধনের মধ্যে নানান শস্য, যেমন ধান, গম; নানান পশু, যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া; এমনকি মানুষও ব্যবহার হত। আয়ারল্যাণ্ডে প্রাচীনকালে অর্থের বিনিময়ে এক বিশেষ জাতির ক্রীতদাসী একক হিসাবে ব্যবহার হত! আফ্রিকার সুদানে আজ থেকে ১৫০/২০০ বছর আগেও ক্রীতদাসকে দ্রব্যধন হিসাবে ব্যবহার করা হত।

পৃথিবীর যাবতীয় দ্রব্যধনের মধ্যে সব থেকে বেশী দেশে যে দ্রব্যধনের বহুল প্রচলন ছিল, তার নাম কড়ি (cowry) এবং পুঁতি (bead)প্রাচীন ভারতের বহু বসতিতে উৎখননের সময় অজস্র পুঁতি পাওয়া গেছে। এই পুঁতির মধ্যে অনেকসময় মূল্যবান পাথরও থাকত।

একসময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহ এবং মালদিভ্‌স অঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কড়ি পাওয়া যেত। বিনিময় মাধ্যম হিসাবে কড়ির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যার জন্যে সেই সময়ে কড়ি প্রায় গোটা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথমতঃ নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছাড়া কড়ি বেশ বিরল, অতএব কড়ির সরবরাহ সীমিত ছিলতাছাড়া আকারে এবং ওজনে কড়ি যথেষ্ট হালকা হওয়ায় বহন করতে সুবিধে হত। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হল, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভালো জাতের কড়ির গুণ বা মান পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সোনা, রুপো কিংবা তামার মুদ্রার ক্ষেত্রে গুণ বা মানের কারচুপি হামেশাই হত এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই সব নকল মুদ্রা চট করে ধরাও সম্ভব হত না। এই সব কারণে যে সব জায়গায় কড়ি সহজলভ্য নয়, সে সব অঞ্চলে দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনা বেচার ক্ষেত্রে কড়ি ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। খ্রিষ্টিয় চতুর্থ শতকের শেষদিকে কিংবা পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে, ফা হিয়েন যখন ভারতে এসেছিলেন, তিনি মধ্যভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জিনিষপত্র কেনা বেচায় কড়ির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করেছিলেন। সংস্কৃত ‘কপর্দ্দক’ শব্দ থেকে কড়ি শব্দের সৃষ্টি। বেশ কিছু কাল কড়ির ব্যবহার লুপ্ত হলেও, আমাদের চলতি নানান কথায়, সেই স্মৃতি আমরা আজও বহন করে চলেছি, যেমনঃ ‘টাকাকড়ি’ কেমন দেবে? আমার কাছে এখন একটা ‘কানাকড়ি’ও নেই, ব্যক্তি নাম হিসেবে ‘তিনকড়ি’, ‘পাঁচকড়ি’ ইত্যাদি এবং কাউকে ‘নিঃস্ব’ বোঝাতে আজও ‘কপর্দ্দকহীন’ বলা হয়। লক্ষ্মীপুজোর সময়, লক্ষ্মীঠাকুরের ঝাঁপিতে বেশ কয়েকটা কড়ি আটকে ধনের দেবীকে অর্থপূর্ণ করে তোলার স্মৃতি, আজও সেই সব দিনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।


যে কড়িগুলি টাকার মতো ব্যবহার করা হত, সেগুলির বৈজ্ঞানিক নাম মনেটারিয়া মনেটা (Monetaria moneta)। এগুলি এক প্রজাতির সামুদ্রিক শামুক (sea shell), যাকে জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় সাইপ্রেডি (Cypraeidae) গোষ্ঠীর gastropod mollusc বলা হয়। 

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৮

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...