সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৯ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

শেষ পর্বাংশ  

৪.৮.৫ দীর্ঘ এই ভারত-পরিক্রমায় প্রাপ্তি

প্রায় সাড়ে ছশো বছরের ভারত-পরিক্রমা শেষ হল। এর মধ্যেও বাকি রয়ে গেল আরও অনেক বংশ এবং রাজরাজড়াদের নাম। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই নামমাত্র শোনা যায়, ইতিহাসে তেমন কোন দাগ রেখে যেতে পারেননি। যাঁদের কথা বললাম, তাঁরাই বা কী এমন দাগ রেখে গেছেন, বেশ কিছু সুন্দর আর অনবদ্য স্থাপত্য নির্মাণ ছাড়া? এঁরা সক্কলেই নিজেদের মধ্যে নিরন্তর লড়াই করে, যুদ্ধ করে, অপচয় করেছেন জীবনীশক্তি, নিজেরা দুর্বল হয়েছেন, প্রতিবেশীকে দুর্বল করেছেন। প্রত্যেকটি রাজ্য জয় অথবা বিজয় অভিযানে তাঁরা অন্য রাজ্য থেকে লুঠ করে এনেছেন সম্পদ, সেই সম্পদে জমকালো মন্দির বানিয়েছেন অজস্র। তার পিছনে যত না ভক্তি, তার থেকে অনেক বেশি ছিল, বৈভব প্রদর্শনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাদের ঈর্ষান্বিত করে তুলে, ক্ষমতার উষ্ণতা উপভোগ করা। তারপর কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা তাঁদের বানিয়ে তোলা বংশমর্যাদা নিয়ে মিলিয়ে গেছেন, কালের গহ্বরে। এমনই ঘটেছে বারবার, প্রত্যেকটি রাজবংশের ক্ষেত্রে।

দীর্ঘ সাড়ে ছশ বছরের এই ইতিহাস থেকে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে আমার কয়েকটি উপলব্ধি হয়েছে, সেগুলি সংক্ষেপে এখানে বর্ণনা করি।

১) বীর রাজারা তাঁদের প্রতিবেশী রাজাদের যত সহজে বারবার পরাস্ত করতে পেরেছেন, সেই বীরত্ব বিদেশী আক্রমণের সময় বারবার লোপ পেয়েছিল তাঁদের অদূরদর্শী কূপমাণ্ডুক্যের জন্যে।

উদাহরণে বলা যায়, গুপ্ত সম্রাটরা, বিশেষ করে কুমারগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্ত রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী ছোট রাজ্যগুলির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা বিদেশাগত দুর্ধর্ষ হুণ জাতিকে প্রতিরোধের জন্যে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিলেন, সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হচ্ছে জেনেও। কারণ তাঁদের কাছে খুব স্পষ্ট ছিল – আন্তর্দেশিক প্রতিবেশী রাজ্যের শত্রুদের তুলনায় বহিরাগত হুণরা - ভারতের সাংস্কৃতিক, ধার্মিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদিও দুর্ভাগ্যক্রমে সম্রাট স্কন্দগুপ্তের অকাল মৃত্যুর কারণে হুণদের বিরুদ্ধে সেই প্রতিরোধ সফল হতে পারেনি।      

কিন্তু আলোচ্য সাড়ে ছশ বছরে, প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে অহরহ যুদ্ধরত রাজন্যবর্গ মুসলিম আক্রমণের প্রকৃত বিপদটা কোথায় এবং কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে - সেটা উপলব্ধিই করতে পারেননি। তাঁরা বিশ্বাস রেখেছিলেন – “যাক শত্রু পরে পরে” এই প্রবাদে এবং নিজ নিজ প্রতিবেশী-শত্রু যখন আক্রান্ত হয়েছে, তাঁরা মুচকি হেসেছেন। আশ্চর্য হল, আরেকটি প্রবাদ তাঁদের মাথায় আসেনি – “ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে”। কয়েকটি উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে।   

ক) চৌহান বংশের রাজা পৃথ্বীরাজ যখন সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরীকে প্রতিরোধ করলেন, তখন প্রতিবেশী গাড়োয়াল বংশের রাজা জয়চন্দ্র ব্যক্তিগত আক্রোশে উদাসীন রইলেন। আক্রোশের কারণ তাঁর অমতে রাজা পৃথ্বীরাজ রাজা জয়চন্দ্রের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এই আক্রোশের হেতু কী তাঁর জ্যাত্যাভিমান, বংশমর্যাদা? তিনি ভুলে গেলেন, কয়েকবছর আগেই তাঁর পিতা রাজা বিজয়চন্দ্রকেও খুসরু মালিকের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। সে সময় তিনি হয়তো যুবরাজ ছিলেন। তাঁর এই নির্বুদ্ধিতা ও অহংকারের মূল্য চোকাতে হয়েছিল, সুলতান সিহাবুদ্দিনের হাতে নিজের প্রাণ ও রাজ্য খুইয়ে। (অধ্যায় ৪.৭.১.৪ ও ৪.৭.১.৫)

খ) চান্দেলরাজ ধঙ্গ নাকি “খেলার ছলে অধিকার করেছিলেন, কালঞ্জর (কালিঞ্জর দুর্গ –বুন্দেলখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ), সুদূর মালব নদীতটের ভাস্বত (?), যমুনার তীর, চেদি রাজ্যের সীমানা, এমনকি গোপগিরি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল”। কিন্তু তিনি শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টাতেও সবুক্তিগিনের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। এরপর গজনির সুলতান মামুদের আক্রমণের সময়, রাজা ধঙ্গের পুত্র রাজা গণ্ড ও শাহী রাজা আনন্দপালের সঙ্গে যৌথ প্রয়াসও ব্যর্থ হয়েছিল। (অধ্যায় ৪.৭.৭)

পরপর এই দুটি পরাজয়েও চান্দেলরাজ গণ্ড এবং ভাটিণ্ডার শাহী রাজারা কিন্তু সতর্ক হলেন না। কেনই বা তাঁরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বারবার পরাস্ত হচ্ছেন, সেই বিশ্লেষণও করলেন না। উল্টে, সুলতান মামুদের ভয়ে পলাতক কনৌজের প্রতিহাররাজ রাজ্যপালকে খুঁজে, তাঁর কাপুরুষতার “উচিৎ শিক্ষা” দিতে তাঁকে হত্যা করলেন। এই সংবাদ পেয়ে গজনির সুলতান মামুদ পরের বছর ফিরে এলেন রাজা গণ্ডকেই “উচিৎ শিক্ষা” দিতে। এবার রাজা গণ্ড নিজেই ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে কোন ক্রমে প্রাণরক্ষা করলেন। কিন্তু নিস্তার পেলেন না, বছর তিনেক পরে সুলতান মামুদ আবার ফিরে এসে তাঁকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করলেন এবং রাজা গণ্ডকে বশ্যতা স্বীকার করিয়ে প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। (অধ্যায় ৪.৭.৭)

গ) গজনির সুলতান যখন গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের সম্পদ লুঠ করতে এসেছিলেন, তখন চালুক্য বা সোলাংকিরাজ প্রথম ভীম ভয় পেয়ে রাজধানী অনহিলওয়াড়া (গুজরাটের আধুনিক পাটন) ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সুলতান মামুদ সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করে এবং সমস্ত সম্পদ নিয়ে যখন ভারত ছাড়লেন, রাজা প্রথম ভীম “সগৌরবে” রাজধানীতে ফিরে সিংহাসনে বসলেন। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবেশী রাজ্য আবুর (রাজস্থান) সামন্তরাজাকে আক্রমণ করে তাঁকে পরাস্ত করলেন! (অধ্যায় ৪.৭.৯)।

মোটামুটি সাড়ে ছশ’ বছরের ভারতীয় ইতিহাসে, এমনই অনেক বীর রাজাদের কাহিনী আমাদের গর্বের হিন্দু রাজত্বের ঐতিহ্য!        

২) এঁনাদের কূপমণ্ডুক বলেছি, তার কারণ বারবার মুসলিম আক্রমণ থেকে তাঁরা কোনদিন কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেননি। যুগের সঙ্গে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রণকৌশল, সামরিক দক্ষতা, সামরিক সম্ভার কিছুই বদল করেননি। এই পর্যায়ে হিন্দু রাজত্বগুলির মুসলিম প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার কয়েকটি কারণ, আমার মনে হয়,

ক) ভারতের শস্য-শ্যামল, সম্পদ-সমৃদ্ধ পরিবেশে হিন্দু রাজা এবং তাঁদের সেনাদল ছিল অনেকটাই নরম-সরম, শ্লথ, এবং বেশ আত্মতুষ্ট। প্রতিবেশী সমমনস্ক সৈন্যদলকে পরাস্ত করতে পারলেই, নিজেদেরকে বীরত্বের পরাকাষ্ঠা বলে মনে করতেন। অন্যদিকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার রুক্ষ ও ঊষর অঞ্চলের মুসলিম যোদ্ধারা ছিলেন বিপরীত প্রকৃতির। তাঁরা একদিকে ছিলেন কষ্টসহিষ্ণু, নির্মম, ক্ষিপ্র, আর অনমনীয় জেদের অধিকারী। তাঁরা অশ্বচালনায় যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি তলোয়ার চালনাতেও ছিলে অত্যন্ত নিপুণ। এমনকি তাঁদের তীক্ষ্ণ তলোয়ারগুলিও হত ভারতীয় অস্ত্রগুলির থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা, কিন্তু অনেক বেশি ঘাতসহ।

খ) রণকৌশলেও মুসলিম যোদ্ধারা ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত। তাঁরা প্রচলিত ভারতীয় রণনীতি এবং বিধি-বিধানের ধার ধারতেন না। সরাসরি যুদ্ধে তাঁরা যেমন ভারতীয় রাজাদের অধিকাংশ সময়েই পর্যুদস্ত করেছিলেন, তেমনি শোনা যায় অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা বিদেশী বণিকদলের বেশে রাজধানীতে ঢুকে কিছুদিন রাজধানীতে বাস করতেন। তারপর একদিন আচমকা আক্রমণ করে, রাজধানীর সুরক্ষা-ব্যবস্থা ধ্বংস করে দুর্গ ও তার সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতেন। তারপর অসীম ধৈর্যে অপেক্ষা করতেন সপ্তাহ এমন কি মাসাধিক কাল। দুর্গের সঞ্চিত রসদ ফুরিয়ে গেলেই, দুর্গের সকল অধিবাসীদের প্রাণ রক্ষার জন্যেই রাজারা বাধ্য হতেন দুর্গের প্রধান দরজা খুলে দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে। এই সংবাদে প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা কখনো কাউকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, এমন শোনা যায় না। বরং নিজেদের বিলাসী প্রাসাদে বসে তাঁরা অমাত্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা করতেন, মুসলিম যোদ্ধারা লুঠপাট করে ফিরে গেলেই, ভগ্নকটি ওই দুর্বল রাজ্যের থেকে কোন কোন উর্বর অঞ্চল অতি দ্রুত হস্তগত করে ফেলা যায়।

গ) এবারে অধ্যায় ৪.৪.২ অধ্যায় থেকে গুপ্ত রাজাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে একবার চোখ রাখা যাক। রাজধানীর বাইরের সাম্রাজ্যকে তাঁরা কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে, নাম দিয়েছিলেন ভুক্তি। প্রত্যেকটি ভুক্তি বিভক্ত করেছিলেন কয়েকটি বিষয় অর্থাৎ জেলায়। জেলার অধীনে থাকত গ্রাম পঞ্চায়েত বা গ্রামসভা। ধরে নেওয়া যায় গুপ্ত পরবর্তী হিন্দু যুগেও এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল।

রাজ্যের বা সাম্রাজ্যের রাজা যদি, প্রধান অমাত্য ও সেনাধ্যক্ষদের নিয়ে সর্বদাই যুদ্ধে – সে নিজের রাজ্য রক্ষার জন্যেই হোক অথবা অন্য রাজ্য জয়ের জন্যেই হোক – ব্যস্ত থাকেন, প্রদেশ থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দুর্বলতা আসতে বাধ্য। প্রশাসনিক দুর্বলতার পিছনে অবধারিতভাবে আসে দুর্নীতি। অর্থাৎ প্রাদেশিক থেকে গ্রামিক আধিকারিকরা মিলিতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মগ্ন হয়ে পড়তেন। অতএব একদিকে যেমন প্রশাসনিক আধিকারিকরা হয়ে উঠতেন অত্যাচারী আঞ্চলিক রাজা, অন্যদিকে সাধারণ প্রজাদের দুর্গতির সীমা থাকত না। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে রাজা কখনো-সখনো রাজধানীতে বসে প্রজাদের খবরাখবর জানতে চাইলে, প্রশাসনের লোকজন রাজাকে নিশ্চিন্ত রাখত, বলত “আপনার শাসনে দেশে রাম-রাজত্ব চলছে, মহারাজ, প্রজারা সুখে শান্তিতে, নিরাপদে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করছে”।

ঘ) আরও একটি বিষয় নিশ্চিত ভাবেই অনুমান করা যায়। রাজধানীর সিংহাসনে দশ বা বিশ বছর অন্তর নতুন-নতুন রাজা বসলেও, এই প্রশাসনিক কর্তাদের এতটুকুও ক্ষতি হত না, বরং লাভ হত। কারণ বিজয়ী রাজার পক্ষে, বিজিত রাজ্যের প্রশাসনের সর্ব স্তরে, রাতারাতি নিজস্ব আধিকারিক নিয়োগ করা কখনোই সম্ভব ছিল না। অতএব বিজয়ী রাজাকেও রাজধানীর বাইরের রাজ্য পরিচালনার জন্যে, পরাজিত রাজার কর্মচারীদের ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, প্রশাসনিক আধিকারিকরাও অত্যন্ত নিশ্চিন্তে দুর্নীতির সাগরে ডুবে থাকতেন।

ঙ) ওপরের (খ) ও (ঘ) কারণের জন্যেই সফল গুপ্তচর ব্যবস্থাও এই সময়কার রাজ-প্রশাসনে ভয়ংকর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আমরা মৌর্য যুগে চাণক্য রাজনীতিতে, প্রশাসনিক কাজের সহায়ক যে নিবিড় গুপ্তচর চক্রের হদিস পাই, সে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই গুপ্ত যুগেও ছিল। তা নাহলে গুপ্ত সম্রাটদের পক্ষে এতদিন ধরে, এত বড়ো সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হত না। এই গুপ্তচর চক্র সক্রিয় না থাকার ফলেই, দেশের রাজারা কেউই মুসলিম যোদ্ধাদের সম্যক শক্তি ও তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কোনদিনই বুঝতে পারেননি। যার ফলে তাঁরা মুসলিমদের সঙ্গে অধিকাংশ যুদ্ধেই পরাজিত হয়েছেন, কখনো বা অতিরঞ্জিত গুজবে বিশ্বাস করে আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়েছেন। এই কারণেই হয়তো আঠারো জন যোদ্ধা সঙ্গী নিয়ে বখতিয়ার খিলজি – অশ্ব ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ঢুকে নদীয়ার প্রাসাদ থেকে বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পালাতে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।                         

দেশ জোড়া টুকরো টুকরো অজস্র রাজ্য বা সাম্রাজ্যের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ (অর্থাৎ আমরা) এবং নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র কর্মী বা শ্রমিক সমাজের মানুষের অবস্থা কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। তা না থাক, এ বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা তৈরি করাই যায়। সে প্রসঙ্গ নিয়েই পর্যালোচনা করব পঞ্চম ও অন্তিম পর্বে।

চতুর্থ পর্ব সমাপ্ত।

  

চিত্র ঋণঃ https://commons.wikimedia.org/wiki

মানচিত্র ঋণঃ https://en.wikipedia.org/wiki

গ্রন্থ ঋণঃ

১. ধর্মপুস্তক – পুরাতন ও নূতন নিয়ম - The Holy Bible – Bengali – The Bible Society of India, Bangalore.

২. The Unknown Life of Jesus Christ – Nicolas Notovitch – translated in English by - J. H. Connelly and L. Landsberg.

৩. কাশ্মীর ও তিব্বতে – স্বামী অভেদানন্দ– শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ, কলকাতা।

৪. Jesus Lived in India (His unknown life before and after the Crucifixion) – Holger Kersten.

৫. Schools and Sects of Buddhism – by P. V. Bapat and Nalinaksha Dutta – from The Cultural Heritage of India (Volume I) – published by Swami Lokeswarananda, The Ramkrishna Mission Institute of Culture, Kolkata under the board of eminent scholars like, Dr. Sarvepalli Radhakrishnan (Chairman), R.C. Majumdar, Suniti Kumar Chatterji, Humayun Kabir, U.N. Ghoshal, A.D. Pusalker, Niharranjan Ray, et al.

৬. History of Ancient India – Rama Shankar Thripathi.

৭. Penguin History of Early India – Dr. Romila Thapar.

৮. The Wonder that was India – A. L. Basham.

. The Bŗhdāraņyak Upanișada – Translated by Swami Madhavananda, Advaita Ashram, Mayavati, Almora.

১০. অপরূপা অজন্তা – শ্রী নারায়ণ সান্যাল।

    ১১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ – বাংলায় গদ্য অনুবাদ – তারাকান্ত কাব্যতীর্থ ভট্টাচার্য।


এর পরে আসবে - "ধর্মাধর্ম" - পঞ্চম পর্ব - পর্বাংশ ১


রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

নামকরণ

    

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


    শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের একটু বেশি হল তিনি মা হয়েছেন – কন্যাসন্তান। তিনি ও মেয়ের বাবা বিজন আপাততঃ মেয়েকে ফুটকি বলে ডাকছেন। আর শ্বাশুড়িমা ডাকেন “জলি”। জলি নামটা খারাপ নয়, তাঁর মেয়ে খুবই হাসিখুশি – কান্নাকাটি নেই বললেই চলে – হাত-পা ছুঁড়ে যখন হাসে বিজলির মাতৃহৃদয় টইটুম্বুর ভরে ওঠে। শ্বশুরমশাই তাঁর ও বিজনের নামের আদ্যক্ষর দুটি নিয়ে “বিবি” ডাকেন।      

কিন্তু এগুলি সবই অস্থায়ী – মেয়ের জন্যে বেশ ভালো দেখে দুটো নাম ঠিক করতে হবে। তাড়াতাড়ি। তা নাহলে এই নামগুলিই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মুখে মুখে বসে যাবে। তখন ভাল নাম যাই রাখা হোক, এই নামগুলিই তাদের মনে গেঁথে রইবে। বিজনের অফিসের একজন লেখক কলিগ আছেন। ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু লেখেন। অবিশ্যি বইমেলায় ফিবছর বই ছাপা হলেই যে কেউ লেখক হয়ে যায় – এটা বিজলি বিশ্বাস করেন না। যদিও প্রতিবার বইমেলা গিয়ে ভদ্রলোকের বই তাঁদের কিনতে হয়, ঘরে এনে সাজিয়ে রাখতেও হয়। কিন্তু তিনি বা বিজন কেউই এতবছর ধরে ভদ্রলোকের একটা বইও পড়ে উঠতে পারেননি। সময় কোথায়? তাছাড়াও আছে ধৈর্যের অভাব। অবিশ্যি শ্বশুর-শাশুড়ি ভদ্রলোকের সব বই পড়েছেন, ওঁনাদের নাকি ভালোই লেগেছে পড়ে। বইমেলা কাছাকাছি এলেই শাশুড়িমা বিজনকে মনে করিয়ে দেন, হ্যারে তোদের নবীনবাবুর কোন নতুন বই এবার বেরোচ্ছে না?

সেই নবীনবাবুই বিজনের অনুরোধে, বারোটি নামের লিস্ট পাঠিয়েছেন। তার সঙ্গে জুড়েছে, তাঁর নিজের, বিজনের, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ পূজালি এবং দেওর সুজনের প্রস্তাবিত নামসমূহ। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত আটত্রিশটা নাম জড়ো হয়েছে। সুজন বিজলিকে বৌদি বলে না, বলে দিদিমণি। সে বলে, বৌদি ডেকে কানমলা খাওয়ার থেকে, দিদিমণি ডেকে কানমলা খাওয়া ঢের ভালো। তাতে নিজেকে এখনো স্কুল-বয় টাইপ মনে হয়।

বিজনরা তিন ভাইবোন। বোন পূজালি, তার বিয়ে হয়ে গেছে। সুজন সবার ছোট, কলেজে পড়ে। খুব পাকা আর ফক্কোর, বিজলির হাতে সত্যিসত্যিই কানমলা খায় প্রায়ই। এই তো গতকাল রাত্রে খেতে বসে ফুটকির নাম নিয়ে যখন কথা উঠল, সুজন ফক্কুরি করে বলল, আটত্রিশটা হয়ে গেছে, দাদা, আর মাত্র সত্তরটা হলেই...ব্যস্‌। বিজলি প্রথমে বুঝতে পারেনি, জিজ্ঞেস করেছিল, কী হবে, আরও সত্তরটা হলে? বিজন গম্ভীর মুখে বলেছিল অষ্টোত্তরশত নাম। এ কথায় বিজলির গা জ্বালা করবে না? তিনি কষে কান-মলে দিয়েছিলেন সুজনের।

 

স্কুলে ঢুকেই বিজলি হেডমিস্ট্রেস কনকদির ঘরে গেলেন। বিজলিকে দেখেই কনকদি উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে বিজলিকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, “সুকন্যা ভালো আছে তো রে? সাবধানে রাখবি, ঠাণ্ডা-ফাণ্ডা না লেগে যায়। অবিশ্যি তোর শাশুড়ি-মা আগেকার দিনের মানুষ, নাতনিকে উনি বুকে করে আগলে রাখবেন”। কনকদির আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বিজলি উল্টোদিকের চেয়ারে বসলেন। কনকদিও চেয়ারে বসে, বেল টিপে বললেন, “তুই চা খাবি তো? মা হয়ে তোর কেমন লাগছে, চা খেতে খেতে শুনব”। বেল শুনে মল্লিকা দরজায় এল, কনকদি বললেন, “আমাদের দুজনকে দুটো ফার্স্টক্লাস চা খাওয়াবি, মল্লিকা?”

মল্লিকা হাসিমুখে বলল, “এক্ষুণি আনছি, বড়দি। ওঃ বিজলিদি, আজ জয়েন করলে? আহা, কি মিষ্টি মেয়ে গো তোমার। শুধুই হাসে! আমি তো নাম দিয়েছি “হাসি”। আজ মিষ্টি খাওয়াবে না? না খাওয়ালে, ছাড়ব না কিন্তু।”

বিজলি লাজুক হেসে বললেন, “নিশ্চয়ই খাওয়াবো”।

মল্লিকা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে কনকদি বললেন, “এবার তুই কেমন আছিস বল। এসময় তোকেও খুব সাবধানে থাকতে হবে”। বিজলি বললেন, “ভালই আছি। তবে ওই একটু দুর্বল লাগে। তাছাড়া অনেকদিন শুয়ে-বসে কাটালাম তো, একটু...”। কনকদি গম্ভীর হয়ে বললেন, “হুঁ। মেয়ে পড়ানো নেই। উইকলি টেস্ট নেই, খাতা দেখার চাপ নেই...আমার বকাঝকা নেই, একটু খালিখালি তো লাগবেই”। বিজলি হেসে ফেলে বললেন, “সত্যিই তাই, বিশেষ করে আপনার ওই বকুনি...”।

“থাক থাক বুঝে গেছি। সিনিয়র হিসেবে কিছু উপদেশ দিই। বাইরের খাওয়া এড়িয়ে, ঘরেই ভালোমন্দ পুষ্টিকর খাবার খাবি। আর নিজেও হাসিখুশি থাকবি, মেয়ের সামনে রাগারাগি, ঝগড়াঝাঁটি করবি না। জেনে রাখিস, নাড়ির যোগ ছিন্ন করেই, সন্তানগর্বের আহ্লাদে অনেক আনাড়ি মা, যা খুশি শুরু করে দেয়। তারা বোঝে না, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও বহুকাল মায়ের ওপর নির্ভর করে থাকে। মাকেই অনুসরণ করে। সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের শাস্ত্রে মেয়েদের “প্রকৃতি” বলে, জানিস নিশ্চয়ই। শ্যামা কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি...শুনেছিস গানটা? মা আমাদের হৃদয়ে আলো দেন, সব মেয়েরাই, সব মায়েরাই অলোকসামান্যা আলোকিনী!”

মল্লিকা চা নিয়ে ঘরে আসাতে কনকদির আবেগঘন উপদেশে ছেদ পড়ল। কনকদির কথায় বিজলি বেশ বোর হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়ের জন্যে কয়েকটি সম্ভাব্য নাম পেয়ে যাওয়ায় বেশ উত্তেজিতও হচ্ছিল। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কনকদি নিজের আবেগ কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, “নে চা খা। তোর ক্লাস কখন থেকে?”

বিজলি বললেন, “সেকেণ্ড পিরিয়ড থেকে। আজ মোট তিনটে ক্লাস আছে – সিক্স, সেভেন আর এইটের”।

“প্রথম দিনেই বেশি চাপ নিস না। দুটো ক্লাস নে, এইটেরটা স্নিগ্ধা সামলে নেবে। কিন্তু কী ব্যাপার বল তো, তোকে কিছুটা আনমনা দেখছি যেন? কী হয়েছে? কোন প্রবলেম?”

“না, না, কোন প্রবলেম নেই”।

“তাহলে? কিছু একটা ভাবছিস মনে হচ্ছে?”

বিজলি একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, “না, তেমন কিছু নয়...মেয়ের কী নাম রাখা যায় সেটাই সারাক্ষণ ভাবছি...”।

কনকদি উচ্চস্বরে হেসে ফেললেন, তারপর বললেন, “এই সময়ে এর থেকে বড়ো সমস্যা আর কিছু হয় না রে। আমার দুই ছেলেমেয়ের নাম নিয়ে, ওদের বাবা আর আমি কত বিনিদ্র রজনী যে কাটিয়েছি, তার হিসেব নেই। আমার নামটাই ধর না। আমার ঠাকুমা জেদ ধরেছিলেন, আমার নাম চাঁপা রাখতে হবে। তার উত্তরে দাদু নাকি বলেছিলেন, ছ্যাঃ, চাঁপা? হাটে গিয়ে ‘চাঁপারাণি’ হাঁক পাড়লে, শতখানেক মেয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে। শেষমেষ আমার কনকচাঁপা নাম সাব্যস্ত করে, দাদু গৃহযুদ্ধ আটকেছিলেন”।

 

আরও কিছুক্ষণ কনকদির সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিজলি গেলেন টিচার্স রুমে। টিচার্স রুম ফাঁকা সকলেই ক্লাস নিতে বেরিয়ে গিয়েছে। বিজলি মল্লিকাকে ডেকে টাকা দিয়ে বললেন, সক্কলের জন্যে মিষ্টি আনবি, কেউ যেন বাদ না পড়ে। গেটের সুখরামজি, চারজন আয়া, সুষমা, মুকুল, তুই - কেউ যেন ছুটে না যায়। আর একরকমের মিষ্টি আনবি না, রসগোল্লা আর সন্দেশ। যা দিয়েছি হয়ে যাবে তো?” মল্লিকা বলল, “যথেষ্ট। হয়ে বেশি হবে - তোমার মিষ্টি মেয়ে আরও মিষ্টি হয়ে উঠুক দিদি”।

বিজলি বললেন, “ঠিক আছে তুই এখন যা। মিনিট দশ পরেই ঘন্টা পড়বে, আমার ক্লাস আছে। টিফিনের সময় মিষ্টিগুলো সবাইকে ভাগ করে দিবি, কেমন?” মল্লিকা চলে যেতে ব্যাগ থেকে পেন আর ফুটকির নামের লিস্টিওয়ালা কাগজটা বের করে, বিজলি কয়েকটা নতুন নাম লিখল। সুকন্যা, প্রকৃতি, আলোকিনী, হাসি, মিষ্টি। লেখার পর পুরো তেতাল্লিশটা নামের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল একবার। বিজলির চোখ অনেকক্ষণ আটকে রইল, শেষ পাঁচটা নামে। ফার্স্ট পিরিয়ড শেষের ঘন্টা পড়ল। আজই সন্ধেবেলা বিজন আর সুজন ঘরে ফিরলে সবার সঙ্গে বসে, ফাইন্যাল করে ফেলতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।      

 

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বিজলিরা সকলে মিলে বসলেন তাঁদের শোবার ঘরে। শাশুড়ি আর বিজলি বসলেন বিছানায়। বাকি তিনজন সামনের চেয়ারে। ও আরেকজন – যার জন্যে এই আয়োজন – সেও রয়েছে। ফুটকি।  খাটের ওপরেই গোলাপি বেবি-মশারির মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। মুগ্ধ চোখে মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, বিজলি মনে মনে আদর করলেন কন্যাকে – আমার হাসি ছোনাটা, মিষ্টি ছোনাটা...।

বিজন মেয়ের তেতাল্লিশটা নামের লিস্ট প্রথম থেকে শেষ অব্দি সবাইকে পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন, “এর মধ্যে আমার পছন্দের নাম দুটি হল, নবীনবাবুর দেওয়া ছন্দা আর কনকদির আলোকিনী”।

বিজলি বললেন, “ছন্দার জায়গায় হাসি হলে খারাপ হয়? কিংবা মিষ্টি?”

সুজন বলল, “আমার মনে হয় হাসি নামটাই বেটার। কারণ আমার ভ্রাতুষ্পুত্রীটি এমনিতেই দারুণ মিষ্টি।  তারওপর সারাদিন মিষ্টি-মিষ্টি ডাক শুনলে আমাদের সকলেরই সুগার ধরে যাবে...”।

বিজলি সুজনের দিকে একবার চোখ পাকিয়ে তাকালেন, তারপর সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাসি, ছন্দা না মিষ্টি?” সকলেই একসঙ্গে হাসিতেই সায় দিলেন। বিজন বললেন, “গুড। সকলের সম্মতিতে “হাসি” নামটা ডাক নাম হিসেবে ফাইন্যাল হল। তাহলে ভালো নামটা হোক আলোকিনী”?

বিজলি বললেন, “কেন? প্রকৃতি নামটা খারাপ? কিংবা সুকন্যা?”

সুজন বলল, “তুমি খেপেছ দিদিমণি। তুমি জানো, বাংলা ভাষা থেকে আজকাল র-ফলা, ঋ-ফলা সব উধাও হয়ে যাচ্ছে? প্রবলেম হয়ে যাচ্ছে পব্লেম। প্রশাসন হয়ে উঠেছে পোশাসন। তেমনি প্রকৃতি হয়ে যাবে পোকিতি। ও যদি বড়ো হয়ে প্রকৃতিপ্রেমিক হয়, লোকে বলবে পোকিতি পোকিত পোকিতিপেমিক। অসম্ভব। তার থেকে আলোকিনী অনেক সুন্দর, আন্‌কমন্‌”।

কেউ কিছু বললেন না। সকলেই সুজনের কথাগুলো মনে মনে ভাবছিলেন। সেই সময় সুজন আবার বলল, “তুমি হয়তো রেগে গিয়ে আমার কানমলে দেবে, কিন্তু তাও আমি বলব। বড়ো হয়ে হাসি যখন জানবে প্রকৃতির ডাকের ইংরিজি ‘নেচার’স কল’, তখন ও কাউকে ডাকবে? নাকি ওর বন্ধুরা কেউ ওর ডাকে সাড়া দেবে? মানছি প্রকৃতি শব্দটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রাচীন এবং মিনিংফুল। আমাদের সনাতন দর্শন মতে প্রকৃতি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের মুখ্য কারণ। কিন্তু লালমুখো ব্রিটিশদের জন্যে ওই শব্দটা তুমি নাম হিসেবে ব্যবহার করতেই পারবে না। আমাদের ময়ূর-সিংহাসন বা কোহিনুর ওরা যেরকম ঝেড়ে দিয়েছে, তেমনি শেষ করে দিয়েছে প্রকৃতি শব্দটার মাহাত্ম্য”।

সুজনের কথার উত্তরে কেউ কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পরে বিজলি বললেন, “ঠিক আছে প্রকৃতি চলবে না। কিন্তু সুকন্যা নামটা কেমন?”

বিজন বললেন, “বেশ ভালই তো”।

সুজন আবার বলল, “দাদা, তুই সব ভুলে গেছিস। বাবাকে জিজ্ঞেস কর, বাবা জানে। বাবাদের সময়ে শাম্মি কাপুরের বিখ্যাত গান ছিল সুকু-সুকু। তাই না, বাবা? মনে পড়ছে?”

সুজনের বাবা একটু অস্বস্তি অনুভব করলেও, ইতস্তত করে বললেন, “মনে নেই আবার – আই আই আ করুঁ ম্যায় কেয়া, সুকুসুকু। সুকু ছিল এক নর্তকীর নাম। সে গান যা হিট করেছিল! পাড়ায় পাড়ায় পুজো-প্যাণ্ডেলে চোঙা-মাইকে সারাদিন ওই গান বাজত – কান মাথা ঝাঁঝাঁ করত আমাদের”।

বিজন বললেন, “তার সঙ্গে সুকন্যার কী সম্পর্ক?”

সুজন বলল, “স্কুল-কলেজে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা সর্বদাই নাম ছোট করে ডাকে। তোমাকে ডাকত বিজু। দিদিকে ডাকত পূজা। আমাকে ডাকে সুজি। সেরকম হাসিকে ওর বন্ধুরা ডাকবে সুকু। তারপর, ওর ডেঁপো বয়ফ্রেণ্ডরা ওই গান গেয়ে নেচে নেচে পেছনে লাগবে...ইস্‌, মেয়েটা যে তখন আমাদেরই দুষবে, দাদা”।

সুজনের কথায় সকলেই গম্ভীর হয়ে যাওয়াতে, বিজলি অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আমার মেয়ের ভালো নাম কী হবে?”

সুজন বলল, “কেন? আমাদের ঘর আলো করে এসেছে যে মেয়েটি। আমাদের সক্কলের মনে যে এনে দিয়েছে খুশি এবং হাসির আলো, তার নাম আলোকিনী ছাড়া আর কী হতে পারে? বন্ধুরা ওর নাম ছোট করে দেবে? দিক না, সে নামও হবে আলো। আমাদের রবিঠাকুর আলো নিয়ে গান রচনা করতে কোনদিনই ক্লান্তি অনুভব করেননি। সেই স্নিগ্ধ আলো আমাদের চোখের সামনেই ফুটে উঠুক না, দিদিমণি”।

বিজলির চোখ ছলছল করে উঠল আবেগে। বিছানা থেকে নেমে সুজনের কাছে যেতেই, সুজন দুই হাতে কান ঢেকেছিল। কিন্তু না, সুজনকে জড়িয়ে ধরে, তার মাথায় চুমো দিল বিজলি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “সত্যিই তুই সুজন”।

 -০০-

     

                            

           

                                                  


শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬ " 


 

বেষ্পতিবার/ দুপুরঃ ২:

 সুনুদা,

 শুধু কথা আর কথা। এত কথাও তুমি বলতে পারো।

তোমার কথার জালে জড়িয়ে পড়ে অনেক সময়েই আমার মনে হত, সত্যি সত্যি তুমি কতটা সিরিয়াস? তোমার কথায় এমন একটা অদ্ভূত সুন্দর স্বপ্ন-রাজ্যের হদিশ দিতে, মনে হত আমি যেন এক পরি। ডানাকাটা নয় আস্ত দুটো ডানাওলা। মনে হত, আমি এই দুটো ডানা ছড়িয়ে তোমার মনের দাঁড়ে ঠিকঠাক বসতে পারবো তো? শেষে এমন তো হবে না, বাস্তবের ঝিঙে, পটল, তেল নুন মশলার অভিঘাতে তোমারই স্বপ্নের ডানা খসে পড়ল! আর আমি তোমার কাছে হয়ে উঠলাম রোঁয়া ওঠা পালক ঝরা অপয়া এক শালিক।

সেদিন তোমার ডাকে সাড়া দিইনি, সে ঐ বাস্তবের চিন্তায়। আমাদের ভালোবাসার জন্যে মূল্য বড়ো কম দিতে হত তুমি ভেবেছিলে? তোমার বাড়ি, আমার বাড়ি - আমাদের এই পথচলা - কেউ কি মেনে নিত, বলো? শুধু সপ্তপদ নয়গো, তুমি কি জানো আমি তোমার সঙ্গে লক্ষ যোজন পথ চলতেও উন্মুখ ছিলাম। জীবনতো শুধু পথচলা নয় সুনুদা, এটা তো মানবে? জীবন মানে নির্জনে তোমার বাহুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত শুয়ে থাকা। জীবন মানে আমার কোলে তোমার মাথা রাখা, আর তোমার চুলে আমার করাঙ্গুলির বিলি কাটা। জীবন মানে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে বসে থাকা।

তোমার ওই কুয়োর জলে ঝপ্‌পাস করে ফেলে দেওয়া ছোট্ট সিন্দুকের মধ্যে, আমাকে কাছে পাওয়ার কতোখানি স্বপ্ন আর কতোখানি বাসনা তুমি ভরতে পেরেছিলে আমি জানি না। আমি কিন্তু সবুজ ঘাসের জমিনে আমার আঁচলের মতো আজও বিছিয়ে রেখেছি, তোমাকে ঘিরে থাকা আমার সমস্ত সত্ত্বা। তোমরা ছেলেরা বড়ো অধৈর্য আর আউপাতালে, একটুতেই হাল ছেড়ে দাও। কেন বলো তো?

একদিন চলো না, সেই কুয়োটার পাড়ে। যে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছিলে তোমার স্মৃতিভরা সিন্দুক। কুয়োতে পড়ে যাওয়া জিনিষ তোলার জন্যে লোক পাওয়া যায়, জানো তো? তাদের একজনকে ধরে তুলে আনি তোমার সিন্দুকটা। কোন চাবিওলা ডেকে সিন্দুকটা না হয় আমিই খুলিয়ে নেব। দেখে নিও, তোমার ক্ষুব্ধ হৃদয়টিকে খুব আদরে আর খুব যত্নে বুকের মধ্যে আজীবন ধরে রাখবে,

 তোমারই কনি।

 বেষ্পতিবার/ রাত ১২:৩৫

আমার কনি, 

আমাকে কি তোর সেই রূপকথার রাক্ষস বলে মনে হয়? যার প্রাণভোমরা লুকিয়ে রাখা থাকত গোপন চাবির সিন্দুকের মধ্যে। তুই কি কোন রাজকন্যা, কুয়োর জল ছেঁচে তুলে আনবি আমার হৃদয়, তারপর তোর বুকে নিয়ে  তাকে পুষবি শুকপাখির মতো? শুকপাখি নাকি সুখ-পাখি? তোর বুকের বাসায় থাকার চির দিনের আশ্বাসেও, সে যদি কোনদিন বিশ্বাস হারায়? যদি সে আঁচড়ে দেয়, ঠুকরে দেয় তোর নরম নরম বুক? বললি না, আমরা ছেলেরা খুব আউপাতালে? আমি যদি ধৈর্য হারাই? এরপর যেদিন যাবো, তোর জন্যে এটিএস নিয়ে যাবো তিন ফাইল। প্রথমটার চব্বিশঘন্টা পরে দ্বিতীয় আর দ্বিতীয়ের বাহাত্তর ঘন্টা পরে তৃতীয়সুখ পাখির নখ এবং চঞ্চুর আঁচড়ে সেপটিক হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

অথবা এমনও তো হতে পারে, তুইই একদিন বিরক্ত হয়ে আমার প্রাণভোমরাটাকে নিজের উরুর ওপর রেখে টিপে মেরে ফেললি, এতটুকুও রক্ত ঘরের মেঝেতে পড়তে না দিয়ে। থোড়ের মতো তোর মসৃণ উরুতে একটা হালকা দাগ হয়ে রয়ে গেলাম কিছুদিন। তারপর সুগন্ধী সাবান, অলিভ অয়েল আর বডি লোশনের প্রাত্যহিক প্রয়োগে সেই দাগটুকুও আর থাকবে না কোথাও। তারপর কোন এক শীতের একান্ত সন্ধ্যায় হঠাৎ আমার কথা মনে হলে, বসন সরিয়ে খুঁজতে থাকবি আমায়। বাম উরু নাকি ডান উরু – কোথায় যেন ছিল সেই দাগটা। তোর মনে হবে, জীবনে কোথাও এতটুকু দাগও রেখে যেতে না পেরে শেষে হয়তো হারিয়েই গেল,

 তোর সুনুদা।

শুক্রবার/ দুপুর ১২:৫৫

সুনুদা,

 আমার ছোটবেলায় আমার এক ব্যাচেলার দাদুর বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। তিনি আমার বাবার দূর সম্পর্কের মামা আর থাকতেন উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এক বাড়ির উত্তর-পশ্চিম টেরে। দি মোস্ট শ্যাবি অ্যান্ড স্যাঁতসেঁতে কর্ণার দ্যাট আই হ্যাভ এভার সিন ইন মাই লাইফ। তাঁর মালিকানায় ছিল দুটো মাত্র ঘর – একটা বসার, আরেকটা শোবার আর একটা বাথরুম-টয়লেট। তাঁর খাবার আসত পাড়ার একটি দোকান থেকে। আমরা ওঁর বাড়িতে গেলেই খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন, কিছুক্ষণ কথা বার্তার পর তিনি বেরিয়ে যেতেন পাড়ার দোকানে, কিনে আনতেন অনেক খাবার দাবার, আমার জন্যে গাদাখানেক চকলেট, লজেন্স। একবার উনি যখন ছিলেন না, কি খেয়াল হতে আমি ওঁনার শোবার ঘরে ঢুকেছিলাম। বিছানায় ওঁনার তেলচিট ময়লা মাথার বালিশের নীচে দেখেছিলাম একটি বাংলা পর্নোগ্রাফির বই। বইটার দু এক পাতা উল্টে দেখেছিলাম, কি জঘন্য সব ছবি আর লেখা। তাঁর ঘরে অনেক দেয়াল আলমারি, কাঠের আলমারি ছিল, সবকটাই নানান জিনিষে ঠাসা। কিন্তু সেখানে কোথাও একটাও পাঠযোগ্য গল্প উপন্যাসের বই দেখিনি। কি মনে হতে বিছানার তোষক তুলে দেখেছিলাম, তাঁর বিছানার তলায় সাজানো অজস্র বই, সবই ওই রকম অশ্লীল আর অপাঠ্য।

ভদ্রলোক কি ভীষণ আমুদে আর অমায়িক ছিলেন, তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা সকলেই তাঁকে বেশ রেসপেক্ট করতাম, কিন্তু সেদিনের পর তাঁর চোখের দিকে আর কোনদিন তাকাতে পারিনি। তাঁর বাড়িতেও আর কোনদিন যাইনি তারপর থেকেকয়েকবছর পর তাঁর যখন মৃত্যুসংবাদ এসেছিল, প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, তাঁর ঘরের সেই বইগুলির কথা। আমরা কেউ যাইনি, বাবা গিয়েছিলেন। বাবাকে জিজ্ঞেসও করতে পারিনি, শয্যার নীচে তাঁর ওই অজস্র বইয়ের কী গতি হয়েছিল!

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার ওই দাদু প্রথম যৌবনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেনউচ্চবংশ ও ধনী বাড়ির সেই মেয়েটির সঙ্গে আমার দাদুর নাকি সঠিক অর্থে আলাপও ছিল না। বিয়ের প্রস্তাব করা তো অনেক দূরের ব্যাপার। মেয়েটির যথাসময়ে বিয়ে হয়ে যাবার পর, আমার দাদু ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন আর বিয়ে থা না করে সারা জীবন কুমার থাকবেন। তাই ছিলেন – তবে তাঁর সঙ্গী হয়েছিল ওই ইতর বইগুলো!

এত কথা বললাম, তোমার ওই চিঠিটা পড়ে। কি জঘন্য আর কদর্য। তোমাকে আমার সেই ব্যাচিলার দাদুর মতোই লাগছে, অস্পষ্ট এক ভালোবাসার কল্পনায় যিনি নিজেকে বিকৃত করে তুলেছিলেন দিন কে দিন।

কোন একটি মেয়ে তার নিখাদ কিন্তু অক্ষম ভালোবাসা দিয়ে যে তোমার জীবন, কোন একদিন ভরে তুলেছিল, সেকথাটা তোমার এখন ভুলে যাওয়াই উচিৎ। প্লিজ, তোমার ওই নোংরা মুখে আর কোনদিন যেন না শুনি, আমার ওই একান্ত আপনার নামটি-

“কনি”

শুক্রবার/রাত্রি ২:১৫

 ওরে আমার কনকনানি,

 দেখলি তোর হুমকিতে ত্রস্ত হয়ে তোকে আর “কনি” বলে ডাকতে ভরসা পেলাম না।

বাপরে, ইৎনা গুস্‌সা? এত রেগে গেলি আমার ওই চিঠিটা পড়ে? তোকে আর ডাকতেও দিবি না, “কনি” বলে? এতটুকু মায়াও কি তোর হল না তোর সুনুদার ওপর? তোর দাদু না হয়, হলেও হতে পারতেন ঠাকুমার সঙ্গে আলাপটুকুও করে উঠতে পারেননি। আমাদের তো তা নয়? আমি তো তোকে বিয়ের প্রস্তাবও করেছিলাম। করিনি বল? হে আমার কনি, সুকন্যা দত্ত, তোকে তো এও বলেছিলাম আমাদের বিয়ের পর তুই একদম আমার হয়ে যাবি, মিসেস সুকন্যা বসু। সে নাম শুনে তুই কি লিখেছিলি মনে আছে, কনি? লিখেছিলি “সুকন্যা বসু” নামটা শুনেই তোর সমস্ত শরীর যেন শিরশির করে উঠেছিল অদ্ভূত এক অজানা আবেগে বলিসনি বল?

তোর দাদুর একান্তই ব্যাডলাক, তিনি যে সময়ের লোক, তখন না ছিল, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, না ছিল ইন্টারনেট। থাকলে তাঁকে তোর কাছে ধরা পড়তে হত না। অথবা তাঁর মৃত্যুর পর বিছানার তলায় সাজানো বই নিয়েও তাঁর পরিজনদের আতান্তরে পড়তে হত না। মিচকে হেসে পাড়ার ফক্কোর ছেলেদের বলতেও হত না, “বুড়ো শালার খুব রস ছিল তো, কোনদিন বোঝাই যায়নি”। বরং নেট সার্ফিং করে যখন তখন কল্পনার নীল জগতে ঢুকে পড়তে পারতেনভদ্রলোক সারাটা জীবন তাঁর সেই একটিমাত্র মহিলার মধ্যেই ডুবে রইলেন, কল্পনার একটু সুবিধের জন্যে সাহায্য নিয়েছেন ওই বইগুলির। কিন্তু যাই করুন না কেন, আমি দৃঢ় নিশ্চিত, তাঁর একা একা চরম আনন্দের মুহূর্তগুলিতে ওই বই তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। তাঁর মনেও আসত না ওই বইয়ের ছবির শরীর আর মুখগুলো, তাঁর স্বপ্নে আসত তোর সেই হলেও হতে পারত ঠাকুমারই মুখটাই। এটাও কি কম একনিষ্ঠতা? সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এটা ভীষণ অদ্ভূত এক বিকৃতি। কিন্তু সত্যিই বিকৃতি কি?

তোর এই দাদু ভদ্রলোকটি কোনোদিন দুষ্টু পাড়ামুখো হয়েছেন বলেও আমার মনে হয় না। অন্ততঃ আমার তাই বিশ্বাস। যদি হতেন, বাস্তব নারীর সংসর্গে তিনি কবেই ভুলে যেতেন তাঁর সেই মনের মানুষটিকে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে চরম লজ্জাকর হবে জেনেও, তাঁকে এত বইও কিনতে হত না। তোরা মেয়েরা কেন যে এত একবগ্‌গা, বাঁধা পথে ভাবিস, বুঝি না। এরকম অদ্ভূত কিন্তু নিষ্ফল ভালোবাসা নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া, এমন একজন বেচারা মানুষ তোর থেকে শ্রদ্ধা না পান, একটু মায়া কিন্তু পেতেই পারতেন। এভাবে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে তোলা, এবং মনটাকে এমন নিবিড় স্বপ্নের গহীনে ডুবিয়ে রাখার মানসিকতা - আজকাল কেউ কল্পনাও করতে পারে কি? না, পারে না।

আজকাল কেউ মুখে অ্যাসিড ছোড়ে, কেউ হত্যা করে। কেউ কেউ হত্যা করে, দেহটাকে কুচি কুচি করে কেটে, স্যুটকেশে ভরে গঙ্গায় ফেলে দিতে যায়...।

আমি কিন্তু পেরেছিআমি জানি এই চিঠিটা পড়ে, তুইও স্বীকার করবি, তোকে “কনি” বলে ডাকার অধিকার, ন্যায্যতঃ যদি কারোর থাকে, আর কারও নয়, সে শুধু থাকবে

তোর সুনুদার

শনিবার/সকাল ১১:৩৫

সুনুদা,

আমি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলাম, ভাঙা আয়নার মতো। ঘরের মেঝেতে আমার অজস্র সত্ত্বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে।

আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

তোমার কনি।

পুনশ্চঃ ঘরে সাবধানে পা ফেল, আয়নার কাচে পা কেটে না যায়।


চলবে...




বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১



দ্বিতীয় স্কন্ধ - প্রথম পর্ব

ভাগবত পুরাণের মাহাত্ম্য 

শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনি যে প্রশ্ন করলেন, সেই প্রশ্ন নরলোকের হিতকর, মুক্ত আত্মা জ্ঞানীগণের সম্মত এবং মানুষের শোনার মতো যা কিছু আছে তার মধ্যে এই বিষয়ই সার ও শ্রেষ্ঠ। গৃহস্থাশ্রমে গৃহীর পিপীলিকা, কীট, পতঙ্গ ইত্যাদি প্রাণীহিংসা অনিবার্য এবং বিষয়ে আসক্তি থাকায় আত্মতত্ত্ব জানতে পারে না। সুতরাং এই ধরনের মানুষের শোনার মতো এবং অনুষ্ঠান করার মতো হাজার হাজার বিষয় আছে। যিনি মোক্ষলাভ করার ইচ্ছা করেন, তাঁর সকলের অন্তর্যামী ও নিয়ন্তা ভুবনসুন্দর শ্রীহরির চরিত্র কথা শ্রবণ, স্মরণ ও কীর্তন করা কর্তব্য। যে মানুষের অন্তিমকালে শ্রীনারায়ণ স্মরণে আসেন, তাঁর মানবজন্মলাভ সার্থক। যা আত্মা নয়, তার থেকে আত্মাকে পৃথক জানার যে জ্ঞান তাকে সাংখ্য বলে। ইন্দ্রিয়দমন প্রভৃতি আট প্রকার সাধনার নাম অষ্টাঙ্গযোগএই সাংখ্য ও যোগ অনুষ্ঠানে এবং নিজের বর্ণ ও আশ্রমের কর্তব্য অনুষ্ঠানে যদি নারায়ণ স্মৃতিপথে উদিত হন, তবেই মানবজন্মের সবথেকে উৎকৃষ্ট লাভ বিবেচনা করা হয়।

যে সকল মুনি শাস্ত্রের নিয়ম ও নিষেধের অতীত নির্গুণ ব্রহ্মলাভ করেছেন, তাঁরাও শ্রীহরির গুণকীর্তন শুনে অতুল আনন্দ উপভোগ করেন। আমি দ্বাপর যুগের শুরুতে আমার পিতা দ্বৈপায়ণের কাছে একটি গ্রন্থ পাঠ করেছিলাম, শ্রীমৎভাগবত। এই ভাগবতপুরাণ শ্রীহরির নামে ও বিষয়ে পরিপূর্ণ এবং সমস্ত বেদের সমতুল্য। আমি নির্গুণ ব্রহ্মে সম্যক অবস্থান করেও, শ্রীহরির লীলা মাধুর্যের জন্য আমি এই আখ্যান পাঠে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। আপনি বিষ্ণুভক্ত, অতএব আমি আপনার কাছে এই আখ্যান বর্ণনা করব। যিনি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পুরাণ শোনেন, তাঁর মনে অতি দ্রুত মুকুন্দের প্রতি অহৈতুকী মতির উদয় হয়। যাঁরা শ্রীহরির কাছে অভয়ফল কামনা করেন, কিংবা যাঁরা মোক্ষলাভ করতে চান তাঁরা হরিনামকীর্তন সাধনে ওই সকল ফল লাভ করতে পারেন। আর যাঁরা জ্ঞানী, নামকীর্তনই তাঁদের কাছে জ্ঞানের ফল। সুতরাং সিদ্ধ হোন কিংবা সাধক, এর থেকে ভালো কোন উপায় আর দ্বিতীয় নেই।

এই জগতে মানুষের অজান্তে বহুবছর ব্যর্থ যায়, মানুষের মনে এক মূহুর্তও বৃথা যাচ্ছে এই বোধ যখন আসে, সেটাই বহু বছরের থেকে বেশী ফলদায়ক। কারণ ওই জ্ঞান এলে, মানুষ নিজের মঙ্গলের চিন্তা শুরু করে। খট্টাঙ্গ নামে এক রাজর্ষি দেবগণের থেকে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর মূহুর্তকাল মাত্র আয়ু অবশিষ্ট আছে, তৎক্ষণাৎ সকল আসক্তি বিসর্জন দিয়ে, ওই রাজর্ষি শ্রীহরির অভয়পদ লাভ করেছিলেন। হে কুরুকুলতিলক, আজ থেকে আপনার এখনও সপ্তাহকাল পরমায়ু অবশিষ্ট আছে, আপনি ইতিমধ্যে পরলোকের পক্ষে যা হিতকর তার অনুষ্ঠান করুন”

শ্রীশুকদেব আরো বললেন, “হে রাজন, পুরুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হলে, নির্ভয়ে পুত্রকলত্র ইত্যাদি থেকে সমস্ত আসক্তি  মুছে ফেলতে হবে। ঘরে থাকলে এই আসক্তি বিনাশের পরেও আবার ফিরে আসতে পারে, সেই কারণে ঘর ছেড়ে তীর্থস্থানে গিয়ে, নির্জন পবিত্র স্থানে কুশ, মৃগচর্মের আসনে বসতে হবে। তারপর অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের প্রণবরূপ ব্রহ্মবীজ মনে মনে জপ করতে হয়। জপ করতে করতে প্রাণায়ামে শ্বাস জয় করে মনকে বশীভূত করতে হবে। তারপর স্থির বুদ্ধি দিয়ে মনের থেকে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয়ের যোগ ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম বিধিকে প্রত্যাহার বলে। কর্মবাসনায় মন আবার যদি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাহলে বুদ্ধি দিয়ে শ্রীভগবানের রূপ ধারণা করতে হয়। শ্রীভগবানের সমগ্র রূপ চিত্তে ধারণার পর, তাঁর চরণ ইত্যাদি এক একটি অঙ্গের ধ্যান করলে, মন বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তাশূণ্য হয়। মনের এই অবস্থায় পরমানন্দের স্ফূর্তি ও পরমা শান্তি লাভ করা যায়। মনের এই অবস্থাকে বলে সমাধি এবং এই ভাবেই শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ লাভ করা যায়। রজোগুণে আবার যদি মন আক্ষিপ্ত অর্থাৎ চঞ্চল হয়, অথবা তমোগুণে মন বিমূঢ় অর্থাৎ নিদ্রিত হয়, তাহলে আবার প্রত্যাহার ও সমাধির ধারণায় মনকে শোধণ করতে হয়। এই ধারণাই মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণের বিনাশ করে এবং এই ধারণা দৃঢ় হলে শ্রীভগবানের অমল মূর্তি দেখতে দেখতে মনে ভক্তিযোগ আসে”

মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রহ্মন, যে ভাবে ও যে ধারণায় মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণ আশু দূর হয়, আপনি সেই ধারণার কথা উপদেশ করুন”

ঈশ্বরের দেহতত্ত্ব 

শ্রীশুকদেব বললেন, “প্রথমে পদ্মাসন কিংবা অন্য আসন অভ্যাস করে, প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণবায়ু জয় ও আসক্তি ত্যাগ করে, সকল ইন্দ্রিয়কে সংযত করবেন। তারপর ভগবানের স্থূলরূপ মনের মধ্যে ধারণা করবেন। এই যে ব্রহ্মাণ্ড দেখছেন, এটিই ভগবানের বিরাট দেহ। এই দেহ স্থূল বস্তুর থেকেও স্থূল। ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু অতীত হয়েছে, বর্তমানে যা কিছু আছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু সৃষ্টি হবে, সব এই স্থূল দেহেই আশ্রয় পায়। এই বিরাট দেহের ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশ - এই পঞ্চভূত, অহঙ্কারতত্ত্ব ও মহত্তত্ত্ব অর্থাৎ সমষ্টিবুদ্ধি, এই সাতটি আবরণ আছে। এই দেহের মধ্যে অন্তর্যামী হয়ে যে ভগবান বিরাজ করছেন, তাঁকে বৈরাজ পুরুষ বলে। সাধক আসলে এই পুরুষেই মনের ধারণা করে থাকেন।

হে মহারাজ, এই বিশ্বের স্রষ্টা পুরুষের বিরাট দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিভাগ কীর্তন করছি মন দিয়ে শুনুন। পাতাল এঁর পায়ের তলা। রসাতল পায়ের পিছন ও সামনের অংশ। মহাতল দুই গোড়ালি ও তলাতল এঁনার দুই জঙ্ঘাসুতল এই বিশ্বমূর্তির জানু, বিতল ও অতল দুই উরু, মহীতল জঘনদেশ এবং নভস্তল অর্থাৎ ভুবর্লোক বা প্রেতলোক এঁনার নাভি সরোবর। স্বর্লোক অর্থাৎ স্বর্গলোক এঁনার বক্ষ, মহর্লোক গ্রীবা, জনলোক মুখ, তপোলোক কপাল এবং সত্যলোক এই পুরুষের মস্তক। ইন্দ্র প্রমুখ তেজস্বী দেবতারা এই আদিপুরুষের বাহু, অশ্বিনীকুমারদুইজন নাসিকা ও ঘ্রাণ শক্তি, প্রদীপ্ত অগ্নি এঁনার মুখ। অন্তরীক্ষ শ্রীবিষ্ণুর নেত্র গোলক ও সূর্য দর্শনের শক্তি, দিন ও রাত্রি চোখের রোম, ব্রহ্মপদ ভ্রূভঙ্গী, জল এঁনার রসনা ও রস গ্রহণের শক্তি। সমস্ত বেদ এই অনন্ত পুরুষের ব্রহ্মরন্ধ্র, যম এঁনার দন্ত ও স্নেহ দাঁতের শক্তি, মায়া এঁনার হাসি এবং অপার সংসার এঁর নয়নের কটাক্ষ। লজ্জা এই পুরুষের উত্তরোষ্ঠ, লোভ অধরোষ্ঠ, ধর্ম স্তন, অধর্ম পৃষ্ঠদেশ, প্রজাপতি জননেন্দ্রিয়, মিত্রাবরুণ দুইকোষ, সমুদ্রসকল এঁনার কুক্ষিদেশ এবং গিরিসমূহ অস্থিহে নৃপেন্দ্র, সমস্ত নদী এঁনার নাড়ী, বৃক্ষসমূহ শরীরের রোমরাজি, অনন্তশক্তি বায়ু এঁনার শ্বাস, কাল এঁনার গমন এবং প্রাণীগণের সংসার এই পুরুষের ক্রীড়া। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, মেঘসমুহ এঁনার কেশ, সন্ধ্যা এঁনার বস্ত্র, প্রকৃতি হৃদয় এবং সকল বিকারের আশ্রয় চন্দ্রমা এঁনার মন। মহত্তত্ত্ব  এই সর্বাত্মার চিত্ত অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির আধার, শ্রীরুদ্র এঁনার অহঙ্কার, অশ্ব, অশ্বেতরী উট, হাতি এঁনার নখ এবিং মৃগ ইত্যাদি সকল পশু এঁনার কটিদেশ বলা হয়। পক্ষসমূহ এঁনার শিল্পনৈপুণ্য, স্বায়ম্ভূব মনু এঁনার বুদ্ধি, মানুষ এঁনার নিবাস। গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ ও অপ্সরাগণ এঁনার স্বর এবং অসুরশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ এঁনার স্মৃতি। ব্রাহ্মণ এই পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয় হাত, বৈশ্য উরু ও তমঃপ্রধান শূদ্র এঁনার চরণ এবং যজ্ঞই এই পুরুষের কর্ম।

হে মহারাজ, আমি ঈশ্বরদেহের যে অবয়ব বিন্যাস বললাম, এ ছাড়া অন্য কোন বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, মুক্তিকামী ব্যক্তিরা নিজের বুদ্ধিতে ভগবানের এই স্থূলতম দেহে মনের ধারণা করে থাকেন। সত্যস্বরূপ আনন্দনিধি ভগবানে এই স্থূল বিশ্ব ও জীবসমূহকে লীন করে তাঁর ভজনা করাই বিধেয়, নয়তো অন্য বস্তুতে আসক্তি হলে, জীবাত্মার সংসাররূপ অধোগতি লাভ হয়।

চলবে...

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/শেষ পর্বাংশ

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...