মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 





এর আগের ছোট গল্প - "  কোশিশ কিজিয়ে... "


একই কথা ঘ্যানঘ্যান করিস ক্যান্‌? আর কিছু কথা নাই কি?  একশ বার তো বললাম। বহুদিন ধরে তুইই বলেছিলি গঙ্গা নাইতে যাবিযাচ্ছি যাবো করে যাওয়া হয়নি। মনিববাড়িতে ছুটি পাওয়া কতটা ঝকমারি তুই জানিস না? তুইও তো কাজ করিস তিনবাড়িতে। তুই তো বলিস একবেলা কামাই করলে কেমন মুখঝামটা দেয় তোর গতরপোষা মালকিন ভাবিরাহবিবগঞ্জের ঘাটে নাইতে যাওয়া মানে কম করে দুদিনের ধাক্কা। গঙ্গা নাওয়ার জন্যে দুদিনের ছুটি চাইলে তোকে কী মাথায় নিয়ে নাচত তোর মালকিনরা? নাকি আমাকেই কোলে বসিয়ে আদর করত গগন দুবে? আরে বাবুরা তো তাদের বিবিদের নিয়ে গঙ্গা নাহানে যায় পুণ্য সঞ্চয়ের জন্যে। আমাদের আবার পুণ্য কী রে, ছোট জাতের কোন কিছুতেই পুণ্য হয় না। মুখ বুজে গাধার মতো খেটে যাও, তাতেই আমাদের পুণ্য – জানিস না? আমাদের গঙ্গা স্নানের জন্যে কে ভাবে?

দুদিন নয়? রাস্তা কম নাকি? সকালের প্রথম বাস ধরে গেলেও হবিবগঞ্জ পৌঁছোতে মাঝ দুপুর হয়ে যায়। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে গঙ্গার ঘাটও অনেকখানি পথ। ঘাটে গিয়ে চানটান সেরে পুজো দেওয়া। তারপর খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে বেলা যখন গড়িয়ে যায়, তখন এদিকের লাস্ট বাসটাও ছেড়ে আসে ওখান থেকে। একটা রাত তো আমাদের থাকতেই হহবিবগঞ্জে। বিয়ের পর আমরা বার দুয়েক তো গিয়েছিলাম, তোর মনে নেই? বড্ডো ভুলে যাস তুই – ভুলিকে মাইয়া।

তখনকার কথা আর এখনকার কথা এক নয় জানি। সে সময়ের থেকে রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে। বাস-টাসগুলোও আগের মতো ঝড়ঝড়ে গুড়ের ক্যানেস্তারা নয়কিন্তু তখন আমাদের এখান থেকে হবিবগঞ্জ পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই ছিল জঙ্গুলে, তেমন কোথাও বাস দাঁড়াত না। সে জায়গায় এখন কতগুলো স্টপেজ হয়েছে জানিস? মিরপুর আর শিবানী নগরে তো বাস আধঘন্টা করে দাঁড়ায়। সেখানে গাড়ির ড্রাইভার খালাসিরা ফ্রিতে সামোসা দিয়ে চা নাস্তা করে, বিড়ি ফোঁকে। লোকজনও নেমে হাটবাজার করে। ও দুটো গঞ্জ ছাড়াও কত যে গ্রাম আর বস্তিতে বাস দাঁড়ায়, মাল তোলে, প্যাসেঞ্জার তোলে...

প্যাসেঞ্জার মানে যারা বাসে চড়ে যাওয়া আসা করে। ওটা ইংরিজি কথা, এ দিগড়ে তুই ছাড়া আর সব্বাই জানে। তুই সেই যেমন মুখ্যু ছিলি তেমনই রয়ে গেলি। গ্রাম ছেড়ে কোথাও বের হলি না, ভাবিদের সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের সংসারটাই বরবাদ করে ফেললি। বাইরের কারো সঙ্গে ভয়ে বাতচিৎ করলি না, ডরপোক, কিন্তু তোর যত তকরার সব আমার সঙ্গে। অবিশ্যি আমাকে ছাড়া তোর আর আছেই বা কে? মরদ বলিস মরদ, দুশমন বলিস দুশমন, সে তো কেবল আমিই।

হা হা হা হা, মুখ্যু বললাম বলে গাল ফোলালি, ভুলিকে মাই? একথা তোকে আজ প্রথম বললাম বুঝি? সচমুচ রে, গোটা দেশে আজকাল কত উন্নতি হচ্ছে, সে কথা তুই জানিসই না, আমিই কী আর সব জানিদুবের গদিতে হরেক লোকজন আসে, তাদের মুখে নানান কথা শুনি। দুবের কাজে বছরে এক আধবার হবিবগঞ্জ দৌড়তে হয়, তাই কিছু কিছু চোখে পড়ে।  

হবিবগঞ্জে লোকজনের হাতে হাতে এখন ফোন। সারাক্ষণ খুটখাট করছে, আর যখন তখন, পথে ঘাটে, বাসে গাড়িতে বকর বকর করে যাচ্ছে। প্রথমবার পেছন থেকে এক অওরতকে দেখেছিলাম, ঘোমটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে নাগাড়ে কথা বলে চলেছেআশেপাশে কেউ নেই কার সঙ্গে কথা বলছে? আমি তো তাজ্জব, ভাবলাম পাগলি-টাগলি হবে বুঝি। বেশ কিছুক্ষণ পর বলল, ছোড়তি হ, তারপর তার কথাও বন্ধ হল, আর হাতটাও নামাল দেখলাম শাদি সুদা আওরত হাতে একটা তাসের প্যাকেটের মতো চকচকে চিজ। তখনও বুঝিনি যে ওটা ফোন।

হে হে হে তোর অমনি গায়ে জ্বালা ধরল? পরের অওরতের দিকে আমার নজর কেন? গাঁয়েঘরে তুই ছাড়া কারও দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছি, কোনদিন? তুই জানিস না? হবিবগঞ্জে গিয়ে একটু নজর করেছি বলে তুই একেবারে খেপে উঠলি যে? আরে বুজদিল, কিচ্ছু চোখ নাচাইনি। বউটা বেশ জোরে জোরে কথা বলছিল তাই চোখ পড়ল। তা নইলে আমি কী আর জানি না, ভুলির মা ছাড়া আমার মতো মরদকে কে আর চোখে হারাবে? হবিবগঞ্জ থেকে ফিরব বলে আমি বাসে চেপেছিলাম। বাস ছাড়তে একটু দেরি ছিল বলে খালি খালি বাসে সিটও পেয়ে গেছিলাম জুতসই। আমার উল্টোদিকের জেনানা সিটে বসেছিল বউটা আর কথা বলছিল চেঁচিয়ে। তাই নজর পড়েছিল। সে যাক পরে আস্তে আস্তে বাস ভরে উঠতে লাগল, সব সিট ভরে উঠলআমার পাশে এক ছোঁড়া এসে বসল, সেও দেখলাম, কানে হাত রেখে বকেই চলেছে, বকেই চলেছে। আড় চোখে তাকে আমি নজর করতে লাগলাম। তার কথা শেষ হতে দেখলাম, ছোঁড়া চিজটা নিয়ে খুটখুট করতে লাগল। চারচৌকা পাতলা বাক্সের মতো চিজটা বেশ চকচকে, আর টিভির মতো তার ছোট্ট পর্দায় নানান ছবি দেখা যায়। আমি ছোঁড়াটাকে পুছলাম, বাপু ওটা কী? আমার মতো ডোকরা বুড়োকে দেখে ছোঁড়া চিজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলল, এটা ফোন। কী একটা ফোন যেন বলল, দাঁড়া বলছি, মো, মোব...না না মনে পড়েছে মোবিল ফোন। তারপর আমাকে বেশ আহম্মক ঠাউরে কত কিছু বলল, এটা দিয়ে লোকের সঙ্গে কথা কওয়া যায়। গান শোনা যায়। সিনেমা-টিনেমাও দেখা যায়। আবার হরেক কিসিমের খেলভি খেলা যায়।

নারে তাসের প্যাকেট দিয়ে তো শুধু তাসই খেলা যায়, তা দিয়ে কী আর কথা বলা যায় নাকি? নাকি গান শোনা যায়? তুই আড় বুঝোই রয়ে গেলি চিরটাকাল, নিজের চোখে দেখলেও বোধহয় তুই পেত্তয় যেতিস না। আরে বলছি না, তারপর নজর করে দেখলাম, বাসে বসে থাকা ছোকরা, বুড়ো, ছুঁড়ি, ধুমসি সবার হাতেই ওই ফোন, আর মাঝে মাঝেই তারা কানে লাগিয়ে কথা কইছে।

পাগল হয়েছিস, আমার চাষাড়ে হাতে ওই ফোন নিয়ে করবটা কী? কত দাম তাও তো জানি না। আমাদের গাঁয়ে কাউকে তো দেখিনিগগন দুবের তো টাকায় ছ্যাতলা পড়ে, তাকেও তো দেখিনি ওই ফোন নিয়ে ঘুরতে। আর কথা বলবই বা কার সঙ্গে? তোর সঙ্গে? বাসে বসে তোর সঙ্গে কী কথা বলতাম বল দিকি? সারাদিন তুইও খেটে মরছিস, এদিকে আমিও। ফোনে-টোনে নয়, আমাদের পাঁদাড়ে বসে গপ্পো করাতেই মজা। রাত্রে খাওয়ার পর আমি একটা বিড়ি ধরাই আর তুই মুখে মোতিহারি দোক্তা ঠুসে বসিস গা ঘেঁষেমার দুনম্বর বিড়িটা শেষ হবার আগেই রাক্ষুসে হাঁই তুলতে তুলতে তুই বলিস, চোক টানচে শুই গিয়ে

হ্যা হ্যা হ্যা রাগ করচিস কেনে? ওই রাক্ষুসে মুখেই চুমকুড়ি খেয়েই তো তিন-তিনটে বাচ্চা বিয়োলি? সারা জেবনটা তো গেল তোর ওই রাক্কুসে মুখের দিকেই চেয়ে। এই বুড়ো বয়েসে আবার দুষ্কুই বা করিস কেনে, রাগই বা করিস কিসের লেগে? হা হা হা হা...

 

****

হবিবগঞ্জ চৌমাথার মোড়ে সুখনরাম হাবিলদারের ডিউটি। ট্রাফিক সামলায়। এখন অবিশ্যি লকডাউনের চক্করে চারটে সড়কই ফাঁকা, ট্র্যাফিকের বালাই নেই। তাই সুখনরামের মন মেজাজ খারাপ। ট্র্যাফিক থাকলে ট্রাকওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের নিংড়ে তার আমদানি হত ভালই। এখন এই লকডাউনে সে সব গিয়েছে চুলোর দুয়োরে। ডিউটি দিতে দিতে নাস্তাপানিরও কোনদিন অভাব হয়নি সুখনরামের, তিওয়ারির চা, আর গঙ্গেশ দুধাওয়ার কচোরি, সামোসায় তার ছিল নিত্য অধিকার। আজকাল লকডাউনে সবই বন্ধ। খোলা আছে শুধু চুখনলালের পান-বিড়ির দোকান। চুখনের গুটখা আর জর্দার বরাদ্দটা এখনও চালু আছে, তাই সামোসার খিদে এখন গুটখার রসেই মেটাতে হচ্ছে।

রাস্তার ধারের নালার ওপর চুখনলালের গুমটি, তার সামনে নালার রেলিং। সেই রেলিংয়ে ভর দিয়ে সুখনরাম, একমুখ গুটকার লালা নিয়ে তাকিয়েছিল নির্জন ফাঁকা রাস্তাগুলোর দিকে, ভাবছিল তার পকেট ফাঁকা নসিবের কথাও। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে পড়ল লোকটাকে পরনে ময়লা ধুতি আর কুর্তা গায়ে লোকটা সাইকেল চালিয়ে জগৎপুর যাওয়ার রাস্তার দিক থেকে আসছে। কোন তাড়া হুড়ো নেই, ধীরে সুস্থে। তার পেছনের কেরিয়ারে আজিব সাইজের একটা প্যাকিং, কাঁথা আর কাপড়ে মুড়ে রশি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধাসেটার থেকেও আজিব ব্যাপার হল, লোকটা হাসছে হ্যা হ্যা করে। আজকাল মোবাইলের দৌলতে আপনমনে হাসার বা বাতচিৎ করার লোক হামেশা চোখে পড়ে। কিন্তু এ লোকটার চেহারায় মোবাইলে কথা বলার মতো মনে হচ্ছে না।

শুঁয়োপোকার মতো ভুরু কুঁচকে সুখনরাম তার দুই চ্যালাকে ইশারা করলনেশাখোর, বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো এই দুই ছোকরা সুখনরামের চ্যালাসুখনরামের ইশারাতে তারা লরিওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের থেকে তোলা আদায় করে সুখনরামের হাতে গুঁজে দেয়। আজকাল পথে ঘাটে সবার হাতেই মোবাইল, ফচাৎ করে কে কখন তসবির তুলে আখবারওয়ালা কিংবা হোয়াটসপে ছড়িয়ে দিলেই হয়েছে আর কি, তার নোকরি খতম,  পেট মে লাথসারাদিনের তোলা থেকে চ্যালাদের হাতে দশ-বিশ তুলে দিলে সে ভয়টা থাকে না।

সুখনরামের ইশারা পেয়ে চ্যালা দুটো হায়নার মতো লাফিয়ে পড়ল লোকটার ওপর।

“কোথায় যাচ্ছিস? কেয়া কাম হ্যায়? জানিস না, এখন লকডাউন। বেকার ঘুমনা-ফিরনা মানা হ্যায়?”

লোকটা সাইকেল থামিয়ে রাস্তায় পা ঠেকিয়ে কাত হয়ে দাঁড়াল, মিনমিন করে কিছু একটা বলল, সুখনরামের কানে এল না। সুখনরাম এক মুখ গোলাপি লালা নালার কালো জলে উগরে দিয়ে, কর্কশ গলায় হাঁকাড় দিল “আবে পুছ না, পিছে কা হ্যায়?”

লোকটা ভীরু চোখে আগের মতোই মিনমিনে গলায় বলল, “বিবি”।

সুখনরাম এবং তার দুই চ্যালা এমনকি হাবিলদার সায়েবকে বিনি পয়সায় গুটখা-জর্দা বিলোনো চুখনলালও আঁতকে উঠল, “বিবি? কিসকা?” “মেরি। কাল রাতকো গুজর গয়ি। গঙ্গা কিনার শমসানে যাচ্ছি”।

“মুর্দা সার্টিপিট দিখা”। চ্যালাদুটো চেপে ধরল লোকটাকেবুরবক লোকটা অবাক তাকিয়ে রইল ওদের মুখের দিকে। সুখনরামের এক চ্যালা অশ্রাব্য কয়েকটা গালাগাল দিল, বলল “কথাটা কানে গেল না? ডক্‌দরের সই করা মুর্দা সার্টিপিট আছে না নেই? শ্বশুরা, তুই নিজেই বিবিকে মেরে এখন গঙ্গায় যাচ্চিস? আর আমাদের উল্লু বানাচ্ছিস, ব্যাহ্‌ন**?”

এমন একটা সমস্যার কথা লোকটার মাথাতেই আসেনি। গত তিন চার রাত ভুলির মায়ের সেবা শুশ্রূষাতেই সে ব্যস্ত ছিল। তিনদিন তিনরাত যমে মানুষে টানাটানির পর, গত কাল মধ্য রাতে তার দেহান্ত হওয়াতে লোকটা দুঃখে শোকে ভেঙে পড়েছিল। সারারাত মুর্দা কোলে বসে থাকার পর হঠাৎ মনে হল, ভুলির মা বহুবারই বায়না করত গঙ্গা নাইতে যাবে। নানান ঝামেলায় সে আর হয়ে ওঠেনি। সে কথা মনে হতেই কী এক আবেগে সে ভুলির মায়ের শরীরটা চাদরে জড়িয়ে বেঁধে নিয়েছিল সাইকেলের কেরিয়ারে। তারপর শেষ রাতে সাইকেল নিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে পড়েছিল হবিবগঞ্জের দিকে। পড়শিদের সবাই মানা করেছিল। শমশান তো এখানেও ছিল, গঙ্গা নেই তো কী? আশেপাশের গ্রামগঞ্জের মানুষের দেহান্ত হলে কী সবাই হবিবগঞ্জ যায়? কী দরকার হবিবগঞ্জ যাবার? কেউ কেউ সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, তবে অনেকেই বলেছিল, “বিবিকে লিয়ে বাওরা বন গয়া শ্বশুরা, জানে দো শালে কো, কুছ দূর যানে কা বাদ আপনে আপ ওয়াপস আয়েগা...”।

জীবন আসে জন্মের নিয়মে আর মৃত্যু আসে জীবনের নিয়মে। কিন্তু শাসক মানুষের ক্ষমতা চায় সেই নিয়মকে সরকারি আইনে বেঁধে রাখতে। সেই সময়ে এসব কথা তার মাথায় আসেনি।  গ্রামে থাকলে পড়শিরাই ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করে, ভুলির মায়ের দাহকার্য সম্পন্ন করে দিতে পারত। কিন্তু এই শহরে সে একজন সন্দেহজনক বহিরাগত ব্যক্তি। তার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। তার কথা শোনার মতো ধৈর্য বা সদিচ্ছাও কারও থাকতে নেই।

খুব দুর্বল কণ্ঠে সে উত্তর দিল, “ইয়াদ নেহি থা, জি”। “শ্বশুরা, ইয়াদ নেহি থা?” অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে সজোরে থাপ্পড় চালালো সুখনরামের এক চ্যালা। লোকটা সাইকেল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ল। কিন্তু ক্যারিয়ারে বাঁধা লাশের প্যাকিংয়ের ঠেকায় সাইকেলটা পড়ে গেল না, কাত হয়ে দাঁড়িয়েই রইল রাস্তায়। লোকটার মরা বিবিই যেন সাইকেলটা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটার অপেক্ষায়।

চুলের মুঠি ধরে লোকটাকে রাস্তা থেকে তুলে ধরল সুখনরামের এক চ্যালা। অন্য চ্যালাটা বলা নেই কওয়া নেই আচমকা ঘুঁষি মারল পিছন থেকে লোকটার রগ বরাবর। সরু ধারায় রক্ত নামতে লাগল নাক দিয়ে,  লোকটা কোনমতে বলার চেষ্টা করল, “গরিব আদমি... কা কসুর মেরা, কাহে মার...”। কথা শেষ হবার আগেই তার বুকে সজোরে লাথি মারল প্রথম চ্যালা। তিন-চার দিনের বিশ্রাম হীন বিনিদ্র শরীরের দুর্বলতা ছিলই, তার সঙ্গে ছিল শোকের উন্মত্ততা এবং সুদীর্ঘ পথ সাইকেল চালিয়ে আসার ক্লান্তি। লাথির আঘাতে লোকটা উপুড় হয়ে ছিটকে পড়ল কঠিন পথের বুকে। ঝাপসা হয়ে এল তার চোখের আলো।   

সুখনরাম মুখের বয়লারে নতুন গুটকা এবং জর্দা ঢালতে ঢালতে দৃশ্যটা উপভোগ করতে লাগল। দীর্ঘ লকডাউনের নিরিমিষ নির্ঝঞ্ঝাট দৈনন্দিনে এ এক আশ্চর্য রিলিফ। তার চ্যালারা লোকটাকে মারতে মারতে যখন কিছুটা ক্লান্ত, সুখনরাম, গালভর্তি লালা নিয়ে মুখ উঁচু করে বলল, “আবে, আব তো রহম কর, শ্বশুরা”। কার প্রতি করুণা - লোকটির প্রতি নাকি তার চ্যালাদের এত পরিশ্রম থেকে বিরতির জন্যে? রাস্তায় পড়ে থাকা নির্জীব লোকটাকে ছেড়ে দুজনেই উঠে দাঁড়াল। একজন নীচু হয়ে লোকটির জামার পকেটগুলো হাতড়াল, কিছুই পেল না। গালাগাল দিয়ে একটা লাথি কষাল লোকটার শরীরে, তারপর লোকটার কোমরের ধুতির কষি ধরে টান মারতেই ময়লা কাপড়ের গেঁজ বেরিয়ে পড়ল, ছোঁ মেরে তুলে নিলে সেটা।

এখন আর মোটেই উদাসীন থাকার সময় নয়, মুখের লালা উগরে সুখনরাম ধমকে উঠল, “ইধর লে আ শ্বশুরা”। বিচ্ছিরি ময়লা কাপড়ের থলেটা নিয়ে সুখনরামের দুই চ্যালাই উপস্থিত হল, সুখনরাম ইশারা করল খুলে দেখার জন্যে। ওই ময়লা গেঁজেতে হাত লাগাবার ইচ্ছে তার নেই, কে জানে কোথা থেকে কোভিড ধরে নেয়। পাঁচটা পাঁচশ আর কয়েকটা দুশো - একশোর, কিছু দশ বিশের খুচরো নোটও রয়েছে। সুখনরাম এবার হাত বাড়াল, সব কটা নোট হস্তগত করে, দুটো দুশর নোট দুই চ্যালাকে দিয়ে বাকি সবগুলি পকেটস্থ করল। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কোন কারেন্সি নোট থেকে কদাচ হয় না, এটুকু টনটনে জ্ঞান সুখনরামের আছে।

টাকার মায়াতেই হয়তো বা স্নেহমাখা স্বরে রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “হারামি, মর তো নেহি গয়া?” এতক্ষণ চ্যালাদুটোরও কেমন সন্দেহ হল, হতভাগা সেই থেকে একভাবেই পড়ে আছে। নড়া-চড়া করছে না কেন?

এ সময় হঠাৎই শোনা গেল বাইকের আওয়াজ। ডানদিকে তাকিয়ে সুখনরাম আর তার চ্যালাদের মুখ শুকিয়ে গেল। রাউণ্ডে বেরিয়ে থানাদার সায়েব এদিকেই আসছেন। তিনজনেই রাস্তায় নেমে সায়েবের অপেক্ষা করতে লাগল। মোড়ের মাথায় এসে অদ্ভূত প্যাকিংসহ সাইকেল আর রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটাকে দেখে থানাদার সায়েব বাইক থামিয়ে দাঁড়ালেন। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুখনরাম স্যালুট ঠুকে বলল, “সুবে সুবে কেয়া আফৎ আ টপকা, দেখিয়ে না স্যার। এ লোকটা বিবিকে মেরে ফেলে সাইকেলে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে চুপচাপ পুড়িয়ে ফেলার তালে ছিল। আমরা পুছতাছ করতেই হারামিটা মারামারি শুরু করে দিল!”

“কোথাকার লোক। কোথা থেকে এসেছে?”

“সেটাই তো, স্যার, আমরা পুছতাছ করছিলাম। মুর্দা সার্টিপিট দেখতে চেয়েছিলাম, বাস, একদম ভড়কে মারতে এল”। থানাদার সায়েব, দূর থেকে লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “উসকো মার তো নেহি ডালা?”

“এক আধ চড়-থাপ্পড় বাস্‌, ...অ্যায়সে ক্যায়সে মর শক্‌তা?”

রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল লোকটার দেহটা। থানাদারের সন্দেহ হওয়ায় দেহটাকে চিৎ করার নির্দেশ দিল। সুখনরামের দুই চেলা দুদিক থেকে উল্টে দিল দেহটা। লোকটার গোটা মুখটাই রক্তাক্ত, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল জিন্দা, কিন্তু এখন সেও মুর্দা, তার বিবির মত। কে লিখবে, তার মুর্দা সার্টিপিট?

থানাদার সায়েব ক্রুদ্ধ মুখে ঘুরে তাকাল সুখনরামের দিকে, সপাটে এক থাপ্পড় লাগাল তার গালে, “কিতনা লুটা, মাদার**”? গালে হাত বোলাতে বোলাতে সুখনরাম মিনমিন স্বরে বলল, “কুছ ভি নেহি থা, সাব, ঢাইশ করিব, ভিখারি থা শালা”। থানাদার সায়েব সুখনরামের জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল সমস্ত টাকা। সেখান থেকে একটা দুশো টাকার নোট সুখনরামের দুই চ্যালার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এক্‌খুনি একটা ভ্যানে তুলে দুটো লাশকেই গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আয়, কিসি কো পতা চলনা নেহি চাহিয়ে। কিছু গড়বড় নেহি হোনা চাহিয়ে...”। কথাটা শেষ করল অশ্রাব্য অজাচারের আরও একটা গাল দিয়ে, তারপর বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন থানাদার।

 

ভ্যানে পাশাপাশি শুয়ে গঙ্গার দিকে চলতে চলতে আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুর্দা লোকটা তার পুঁটলি জড়ানো মুর্দা বিবিকে বলল, “বলেছিলি গঙ্গা নাইবি, দেখ, আখির হম দোনোকোই এক সাথ গঙ্গাহি তো মিলা!”

পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গায় অবগাহন স্নানে পাপ স্খালন হয়। হিন্দু উচ্চ বর্ণের সমাজপতিরা গঙ্গা স্নান সেরে স্বর্গপথের পথিক হন। সেই পূতসলিলা প্রবাহেই বেওয়ারিশ লাশ হয়ে ভেসে চলল হিন্দু ছোট জাতের এক দম্পতি। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সামান্যতম পরিচয়টুকুও হারিয়ে যাবে তাদের গলিত শবদেহের সঙ্গে।   

..০০..

 


সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৪

    এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩  



২০

 নোনাপুর গ্রামের সীমানার বাইরেই ঘন একটা ঝোপের আড়ালে মারুলা রয়ে গেল। ভল্লা তার কাছেই রণপাজোড়া রেখে পায়ে হেঁটে গ্রামের ভেতরে ঢুকল। ঘন গাছপালার আড়ালে, বিড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে দৌড়ে চলল গ্রামপ্রধানের বাড়ির পিছনদিকে। জ্যোৎস্না রাত, ঝিঁঝিঁর একটানা শব্দ আর গাছের পাতায় পাতায় হাওয়ার মর্মর-রব ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই। পাড়ার কুকুরগুলোও আজ রাত্রে চুপচাপ। তারাও হয়তো বোঝে এ গ্রামে আজ শোকের পরিবেশ। সারাদিন ঘরে ঘরে আজ একটাই আলোচনা – হানোর মৃত্যু। সারাদিনের পর এই চাঁদনি রাতও আজ যেন সকলের কাছে অশুভ। কোথাও একটা পেঁচা দুবার ডেকে উঠল গম্ভীর সুরে। তারপরেই হঠাৎ ডেকে উঠল একটা দাঁড় কাক। সে শব্দে অবাক হল গাছের ডালে বসে ঘুমিয়ে থাকা কাকগুলো। পেঁচাটাও যেন ভয় পেয়ে নিঃশব্দে উড়ে গেল দূরের পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের দিকে।

কমলিমা ঘরের দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন। ঘরের পিছনে এসে দেখতে পেলেন বড়ো একটা গাছের ছায়ায় ভল্লা দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত পায়ে ভল্লার কাছে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কমলিমা, ভল্লা ইশারা করল চুপ। তারপর কমলিমায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল, একটু দূরে। ছায়াময় বিশাল এক বটগাছের তলায় নিয়ে গিয়ে মোটা একটা শিকড় দেখিয়ে বলল, “এই খানে বস মা, কেমন আছিস বল”? তারপর নিজে বসল কমলিমায়ের পায়ের কাছে।

“আমার কথা ছাড়, তুই কেমন আছিস বল? এতদিন পর তোর কমলিমাকে মনে পড়ল?

মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ভল্লা, তারপর মুখ তুলে বলল, “ভাল আছি তো বলতে পারবো না, মা। সে কথা বললে মিথ্যে বলা হবে। তোর কাছে যে কদিন ছিলাম, বড়ো নিশ্চিন্তে আর স্বস্তিতে ছিলাম। এখন চলে যাচ্ছে, কোন মতে। নির্বাসনে থাকা একজন অপরাধীকে তো এভাবেই থাকতে হবে, মা”। কমলিমা ভল্লার মাথায় হাত রাখলেন। তার চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাঁর বড় পুত্রকেই যেন অনুভব করলেন। অন্ধকারে দেখতে না পেলেও ভল্লা বুঝতে পারল, কমলিমায়ের দুচোখ এখন জলে ভরে উঠেছে।

“প্রধানমশাই ভাল আছেতো?”

“হুঁ। ভালোই আছে”।

“প্রধানমশাই যে আস্থানের আধিকারিককে কিছু কর ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, সেটার কী হল, কিছু জানিস, মা?”

“দেয়নি। গ্রামের লোক তোকে আশ্রয় দিয়েছে। চিকিৎসা করে তোকে সারিয়ে তুলেছে। এসব শুনে রাজা নাকি বলেছে এই গ্রামের জন্যে কোনরকম দয়া বা অনুগ্রহ দেখানো যাবে না”।

ভল্লা কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল।

কমলিমা হঠাৎ ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন, “সেই জন্যেই তো তোর ওপরে ওদের খুব রাগ”।

“কাদের, মা?”

“প্রধান আর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা”!

ভল্লা হেসে ফেলে বলল, “তুই বড্ডো বাড়িয়ে বলিস মা। রাগ কেন করতে যাবেন? হ্যাঁ বিরক্ত হতেই পারেন। একটা মরণাপন্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাষ্ট্রের রোষদৃষ্টিতে পড়া...। একদিকে বিবেক বলছে যা করেছি ঠিক করেছি, আর অন্যদিকে বাস্তববুদ্ধি বলছে, বিবেক দেখিয়ে পোঁদপাকামি করার কী দরকার ছিল? এখন তার ফল ভোগ করো...”।

কমলিমা অবাক হয়ে গেলেন ভল্লার কথায়, তিনি আলো-আঁধারিতে ভল্লার মুখের দিকে তাকালেন। ভাবলেন ছোঁড়ার আশ্চর্য চিন্তাশক্তি তো! তিনি এভাবে কখনো ভাবতে পারেননি। তিনি ঘরে থাকেন, কাজকর্ম করেন, গ্রামের মধ্যেই তাঁর সীমানা। তাঁর চিন্তা একমুখী। কিন্তু প্রধান বা কবিরাজদাদার তো তা নয় – তাঁদের চাষবাস করতে হয়, বাইরের লোকজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় রাখতে হয়। এই গ্রামের সকল মানুষের স্বার্থ চিন্তা করে, গ্রামবাসীদের হয়ে রাজাধিকারিকদের সামনে গিয়েও তাঁদের দাঁড়াতে হয়। তাঁদের বিবেক এবং বাস্তব বিবেচনা – দুই কূল সামলে চলতে হয় বৈকি

“চুপ করে কেন, মা? কি ভাবছিস, বল তো? যাগ্‌গে ওসব কথা ছাড়, হানোর বাড়ির কী পরিস্থিতি? শুনলাম হানো নাকি সাপের কামড়ে মারা গেছে?”

ভল্লার আগের কথায় কমলিমায়ের মনটা একটু নরম হয়েছিল, এখন এই প্রশ্নে তিনি আবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বললেন, “সে কথাই তো বলছি, আজ সন্ধের সময় কবিরাজদাদা এসেছিল, প্রধানের সঙ্গে অনেক কথা বলল। কিন্তু দুজনের কেউই হানোকে নিয়ে একটা কথাও বলল না। অমন একটা জলজ্যান্ত তরতাজা ছেলে চোখের সামনে মরে গেল – দুজনের কারো মনেই যেন হেলদোল নেই”!

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “আজ দেখছি খুব রেগে আছিস মা? কী ব্যাপার বল তো? কী বলল কবিরাজবুড়ো?”

ভল্লার কথাটা কমলিমায়ের বেশ মনঃপূত হল, বললেন, “যা বলেছিস। বুড়ো তো বুড়োই – মনে হয় ভীমরতি ধরেছে। যতসব মনগড়া কথা বলে প্রধানের আর আমার মনে বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। আমাকে বোঝাতে পারেনি, তবে প্রধানের মাথাটি মনে হয় চিবিয়ে ফেলেছে”।

ভল্লা একটু জোরে হেসে উঠেই সতর্ক হয়ে গলা নামিয়ে বলল, “বলিস কী মা? কবিরাজবুড়ো ওষুধ না দিয়ে এখন সাপের মতো বিষঢালছে নাকি? তা সে বিষ কেমন একটু শুনি”।

“তুই হাসছিস? কী বলেছে শুনলে তুই চমকে যাবি। বলে কিনা আমাদের গ্রামের কোন ছেলেই নাকি কাল পাশের রাজ্যে রামকথা শুনতে যায়নি? তারা আস্থানে গিয়েছিল ডাকাতি করতে। গতকাল রাত্রে আস্থানে ডাকাতি হয়েছে শুনেছিস তো? কবিরাজদাদা বলল, ডাকাতের দল সেখানকার তিনরক্ষীকে নাকি মেরে ফেলেছে! হরে দরে যা বোঝাতে চাইল, সে সব নাকি আমাদের এই গ্রামের ছেলেদেরই কাজ”।

ভল্লা খুব সতর্ক দৃষ্টিতে কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এবং অবাক হল কবিরাজবুড়োর আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতায়। তবু খুব হাল্কা চালে বলল, “আচ্ছা? ছেলেরা রামকথা শুনতে না গিয়ে, আস্থানে গেছিল ডাকাতি করতে – এ সংবাদটা তোর কবিরাজদাদা কী করে টের পেল বল তো? কবিরাজবুড়ো কী আজকাল জ্যোতিষচর্চাও শুরু করছে নাকি?”

“কে জানে? বুড়োর মাথায় যত রাজ্যের কুচুটে চিন্তা দিনরাত কিলবিল করছেপুঁইয়ে সাপের মতো। প্রধানকে বললে, ছোকরাদের অত বড়ো দলকে একসঙ্গে কোনদিন রামকথার আসরে যেতে দেখেছ? সে আমাদের গ্রামেই হোক বা পড়শি গ্রামে? তারা কিনা ঠিক কালকেই দল বেঁধে জঙ্গল পার হয়ে এতটা পথ হেঁটে পাশের রাজ্যে গেল রামকথা শুনতে? আচ্ছা, ছেলে ছোকরাদের মতিগতি কি আমাদের মতো বুড়ো-বুড়ীদের ভাবনা-চিন্তার মতো হবে? তাদের মাথায় কখন কোন বাই চাপে কে বলতে পারে?” ভল্লা নিঃশব্দে শুনতে লাগল কমলিমায়ের কথা। তার দৃষ্টি এখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। কবিরাজবুড়ো অত্যন্ত বুদ্ধিমান – সন্দেহ নেই। কিন্তু এত সব বুঝে ফেলে তিনি যে নিজের সমূহ বিপদই ডেকে আনছেন – সেই কথাটা বুড়ো বুঝছেনা কেন?  

কমলিমা কিছুটা উত্তেজিত সুরে আরও বললেন, “কত কি আবোল-তাবোল যে বকে গেল – শুনলে তোর মাথা গরম হয়ে যেত ভল্লা! বলে কিনা রাজধানীতে মারধোর খেয়ে, তুই যে রাত্রে রওনা হয়েছিলি – আর এখানে এসে তুই যেদিন ভোরে পৌঁছলি –  হেঁটে এলে ওই সময়ের মধ্যে পৌঁছনো নাকি কক্‌খনো সম্ভব নয়”।

ভল্লা মনে মনে চমকে উঠল। কবিরাজবুড়ো যে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে দৌড়ে চলেছেন, এখন তার মনে আর কোন সন্দেহ নেই। তবু চোখেমুখে মুচকি হাসির রেশ ধরে রেখে বলল, “তোর কবিরাজদাদা, শুধু চিকিৎসার কবিরাজ নয় মা, কবিরাজ – মানে কল্পনা দিয়ে কাব্য রচনার কবিরাজও বটে”!

কমলিমা সে কথায় কান না দিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ আরও বলল, ডাকাতি মানে আমরা জানি ডাকতরা টাকা-পয়সা, শস্য-টস্য, অস্ত্র-শস্ত্র যা পায় সবই লুঠ করে। কিন্তু আস্থান থেকে নাকি শুধু অস্ত্র-শস্ত্রই ডাকাতি হয়েছে? সত্যি? তুই জানিস?”

নিরীহ গলায় ভল্লা বলল, “আমি কী করে জানব বল তো, মা?”  

কমলিমা কেমন এক ঘোরের মধ্যে বলে চললেন, “এ কেমন ডাকাতি কবিরাজদাদা বুঝতে পারছেন না। আমি একবার ঝেঁজে উঠেছিলাম। বললাম, ছেলেটা গাঁয়ের আলসে আর ঝিমোনো ছেলেদের নিয়ে দল বানিয়ে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করে তুলছে। মাথা খাটিয়ে নালায় বাঁধ দিয়ে চাষের নতুন জমি বানিয়ে তুলল। সেই ছেলেকে নিয়ে তোমরা এভাবে বদনাম করছ?”

ভল্লা কিছু বলল না, অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের মুখের দিকে। কমলিমায়ের থেকে যতটুকু জানার সে জেনে গেছে, বুঝে গেছে। এবার তাকে ফিরতে হবে।

ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তুই এবার ঘরে যা, মা। অনেকক্ষণ বাড়ির বাইরে আছিস। আমিও পালাই। কেউ দেখে ফেললে আরও অনেক কথা উঠবে। তুই এবং প্রধান দুজনেই বিপদে পড়বি”।

কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন, ধরা গলায় বললেন, “তোর জন্যে কত রাত যে জেগে কাটিয়েছি...এতদিনে তোর মায়ের কথা মনে পড়ল? কোথায় আছিস, কী খাচ্ছিস কিছুই তো জানা হল না। কী সব আজেবাজে কথায় সময়টা পার হয়ে গেল। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, তোর নিজের বাড়ি কোনদিকে রে?”

ভল্লা খুবই সতর্ক হয়ে উঠল কমলিমায়ের এই প্রশ্নে, বলল, “কেন বল তো? রাজধানী থেকে পূবে”।

“বুড়োটা তার মানে ঠিকই বলেছে”।

ভল্লা উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, “কী ঠিক বলেছে, রে মা?”

একটু আনমনা হয়ে কমলিমা বললেন, “বলল, তোর নির্বাসন দণ্ড যদি হয়ে থাকে, তাহলে রাজধানী থেকে রাজ্যের পূর্বসীমান্ত তো কাছে – সেদিকে না গিয়ে এত দূরে পশ্চিমসীমান্তে তুই এলি কেন? আমার সামনে আর কিছু বলতে সাহস পায়নি। বুড়োর বাড়ি ফেরার সময় প্রধান তার সঙ্গে গিয়েছিল একটু এগিয়ে দিতে। তাকে নাকি বলেছে – তোর এই নির্বাসন-টির্বাসন একদম মিথ্যা কথা, তুই এসেছিস প্রশাসনেরই কোন কাজে…”।

ভল্লা এবার রীতিমত বিভ্রান্ত বোধ করতে লাগল। কমলিমা এসব নিয়ে তাকে সরাসরি কোন প্রশ্ন করলে, তার পক্ষে সব কিছু ঢেকেঢুকে, সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যে বলা এখনই তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। অতএব সে হাসতে হাসতে কমলিমাকে থামিয়ে দিল, বলল, “তোর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা হয় গাঁজা খায় নয়তো আফিং। কবিরাজ তো, ওরা ভালই জানে কোন গাছ-গাছড়ায় নেশা জমে ওঠে – সন্ধের মুখে এসেছিল বললি না, মা? তার আগেই চড়িয়ে এসেছে…” আবার খানিক হাসল ভল্লা, তারপর বলল, “তোর থেকে এমন মজার গল্প আরও শুনব মা, তবে আজ নয়, পরে আরেকদিন। আজ চলি রে, মা, তুইও ঘরে যা, প্রধান টের পেলে খুব রেগে যাবে”।            

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আবার কবে আসবি?”

ভল্লা হাসল, বলল, “যত শিগ্‌গির পারি আসব, মা। তুই ভাবিস না। এখন যা। আরেকটা কথা আমার সঙ্গে তোর যে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে – একথা কাউকে বলবি না, মা। প্রধানকেও না। আমার দিব্ব্যি দিলাম”।

“এই মাঝরাতে ওভাবে কেউ দিব্ব্যি দেয়, তাও মায়ের কাছে…হতভাগা, মুখপোড়া…? বলতে বলতে বিরক্ত মুখে কমলিমা ত্রস্ত পায়ে ঘরের আড়ালে চলে গেলেন। ভল্লা নিঃশব্দ দ্রুততায় দৌড়ে চলল, গ্রামের সীমানায় – যেখানে মারুলা তার জন্যে অপেক্ষা করছে।

চলবে... 


রবিবার, ২২ মার্চ, ২০২৬

বাসা বদল

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " বুলেট রিকশ "


 

শনিবার রাত্রে হাওড়ায় ট্রেনে চেপে পরের দিন সকাল সাড়ে নটা নাগাদ শিল্টনগঞ্জ স্টেশনে নামল বোঁচা আর পল্টু। স্টেশনে তাদের রিসিভ করতে এসেছিল পিন্টু, পল্টুর মাসতুতো ভাই। পিন্টু বেশ কিছুদিন হল বন দপ্তরে চাকরি পেয়েছে। নানান জায়গায় ট্রেনিং নিয়ে সে এখন এই শিল্টনগঞ্জ থেকে পঁয়ষট্টি-সত্তর কিমি দূরের চেতলা ফরেস্টে পোস্টেড। দিন পনের আগে এই পিন্টু পল্টুকে ফোন করে বলেছিল, “জঙ্গল যদি দেখতে চাস, আমার কাছে চলে আয়। যাওয়া আসার ভাড়াটুকু যোগাড় করে হাওড়ায় ট্রেনে চেপে শিল্টনগঞ্জ পৌঁছে যাতারপর থেকে থাকা, খাওয়া এবং জঙ্গলে ঘোরাঘুরির সব দায়িত্ব আমার। এই সুযোগ মিস করিস না”।

বোঁচা আর পল্টু এই সুযোগ মিস করেনি, ট্রেনে রিজার্ভেশন পেয়েই পিন্টুকে ফোন করে জানিয়েছিল, “আমি ও আমার হাফপ্যাণ্টের বন্ধু বোঁচা, এই রোববার পৌঁছচ্ছি। তোর অনুমতি ছাড়াই বোঁচাকে সঙ্গে আনছি বলে, রাগ করবি না, নিশ্চয়ই”। পিন্টু উত্তরে হাসতে হাসতে বলেছিল, “তোরা আগে আয় তো, তারপর তোদের কী করি দেখিস, হুঁকোমুখো মর্কট!”

স্টেশনে নেবেই বোঁচা আর পিন্টুর পরিচয় পর্বটা বেশ ভালভাবেই মিটল এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওরা “তুমি” থেকে যখন “তুই”তে নেমে এল, বোঝা গেল, জঙ্গলের এই ট্রিপটা তিন বন্ধু মিলে খুব সহজেই জমিয়ে দেওয়া যাবে।

স্টেশন থেকে রিজার্ভ ফরেস্টের গেট অব্দি বাসে আসতে প্রায় ঘন্টা তিনেক লাগল। সে বাসে কেউ দাঁড়ায় না, সিটে তো বটেই, এমনকি বাসের মেঝেতেও সবাই বসে পড়ে। তাদের অনেকের সঙ্গেই একটা কি দুটো ছাগল, কিংবা ঝুড়ি ভর্তি মুরগি অথবা একসঙ্গে পা বাঁধা তিন-চারটে হাঁসদুটো ছাগল তো বেশ কিছু লোককে ঢুঁ মারল বেশ কয়েকবার। তিনটে আবার নাদি ছাড়ল বাসের মধ্যেই। বিচিত্র সহযাত্রীদের এমন আচরণে বোঁচা আর পিন্টু বেশ মজা পাচ্ছিল। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল নীচু স্বরে। তবে পল্টুর ঠিক বরদাস্ত হচ্ছিল না। ওদের হাসি ঠাট্টার মধ্যে বেশ কয়েকবার বলল, “এভাবে মানুষ যায়?” আরো কয়েকবার বলল, “কোন ভদ্রলোকেরই এভাবে ট্রাভেল করা উচিৎ নয়, মোস্ট আনহাইজিনিক। শরীর খারাপ হয়ে যাবে!” পল্টু যত বিরক্ত হচ্ছিল, ততই ওরা মজা পেয়ে হাসছিল, হো হো করে।

বাস থেকে নেমে, ফরেস্টের গেট দিয়ে ঢুকেই বেশ অনেকটা ছিমছাম প্রশস্ত জায়গা। বাঁপাশে অফিস। সেখান থেকে ফরেস্ট বাংলোয় থাকার কিংবা ফরেস্টের ভেতরে ঘোরার জন্যে গাড়ি বুক করা যায়। ফরেস্টে ঢোকার সময় প্রায় ভোরের দিকে, কিংবা বিকেল চারটের পর। এখন যেহেতু একটা বাজছে, বেশ ফাঁকা। বনের ভেতরে যাওয়ার রাস্তার বাঁ পাশে গোটা বিশেক সাফারি জিপ দাঁড়িয়ে আছে, ওগুলোই বুকিং হলে টুরিষ্টদের নিয়ে বিকেলে ঢুকবে। ডানদিকে একটা ছোট্ট সুন্দর সাজানো বাড়ি। সেখানে জঙ্গলের বিবরণ সহ অনেক ছবি-টবি আছে। ওই বাড়িতেই ছোট্ট একটা অডিটোরিয়ামও আছে, সেখানে ভিডিওতে ওয়াইল্ড লাইফের ছবি দেখানো হয়। মাঝে মাঝে সেমিনারও হয়। হাঁটতে হাঁটতে পিন্টু ওদের এসব দেখাচ্ছিল।

এসব পার হয়ে কোর-ফরেস্ট ফেনসিং-এর ধারে বন দপ্তরের কর্মীদের থাকার জন্যে নানান ধরনের কোয়ার্টারপিন্টু ওদের নিয়ে সেদিকেই চলল। পিন্টু নিজের কোয়ার্টারে ঢুকে বলল, “আমার এখানে একটা বসার ঘর, একটা শোবার ঘর, সঙ্গে টয়লেট বাথরুম। একটু কষ্ট করলে শোবার ঘরে তিনজনেরই হয়ে যাবে, না হলে বসার ঘরের চৌকিতে একজন। যেমন তোদের ইচ্ছে!”

বোঁচা বলল, “পাগল নাকি? আমি বসার ঘরে যাচ্ছি না, রাত্রে কোন জন্তু জানোয়ার এসে তুলে নিয়ে যাবে। তার চেয়ে ফরেস্ট অফিসারের সঙ্গেই থাকা ভাল, জানোয়াররা নিশ্চয়ই তাদের অফিসারকে জানে, কাজেই জেনেশুনে জানে মেরে ফেলবে না! কী বলিস, পল্টু?” পল্টুও বোঁচার কথায় সায় দিল, বলল, “দু ঘরে শুলে আড্ডা দেব কী করে? না না পিন্টু, তার চেয়ে তুই আমাদের ‘একঘরে’ করে দে!”

পিন্টু বোঁচার পিঠে একটা জোর থাপ্পড় মেরে হাসতে হাসতে বলল, “তোরা চানটান করে ফ্রেশ হয়ে নে, আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যে অফিস থেকে আসছি। ফিরে একসঙ্গে খেতে যাবো”।

সেদিন বিকেলে পায়ে হেঁটে এবং পরের দুটো দিন পিন্টুর গাড়িতে চেপে বেশ ভালই জঙ্গল দেখা হল। নানা রকমের হরিণ, সম্বর, নেউল, গাউর, নীলগাই প্রচুর দেখতে পাওয়া গেল। আর পাখ-পাখালির তো শেষ নেই। পিন্টুকে পাখিদের বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি ভজকট নাম বলতে দেখে, বোঁচা বলল, “দ্যাখ পিন্টু, তোর ওই সায়েবি কেতার নাম ছাড়, যদি দেশী কোন নাম জানা থাকে তো বল। যেমন বুলবুলি, টিয়া, চন্দনা, হাঁড়িচাচা, দোয়েল...তোর ওই সব রেড থ্রোটেড্‌, গ্রে ব্রেস্টেড্‌, গ্রিন নেক্‌ড্‌...ওসব শুনে আমাদের লাভ নেই...”। পিন্টু হো হো করে হাসল, তার হাসির শব্দে বেশ কিছু ঘুঘু আর হরিয়াল সামনের থেকে উড়ে বনের গভীরে চলে গেল। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “ওই দ্যাখ, ওগুলো ছিল ঘুঘু আর হরিয়াল। তোদের অতগুলো ঘুঘু দেখালাম বলে আমাকে যেন ফাঁদ দেখাসনি, হতভাগা”

 

 

তৃতীয় দিন সক্কালবেলা, পিন্টু দুজনকেই ঠেলে তুলে বলল, আমাকে এখনি একবার ওদিকের ফরেস্টে যেতে হবে, চটপট রেডি হয়ে নে”।  মিনিট পনেরর মধ্যে তিনজনে বেরিয়ে পড়ার পর, পল্টু জিজ্ঞেস করল, “ওদিকের ফরেস্টটা রিজার্ভ ফরেস্ট নয়?”

পিন্টু বলল, “না ওদিকে জঙ্গলের ভেতরে বেশ কয়েকটা গ্রাম আছে। গ্রামের লোকরা সবাই আদিবাসী তো, এই অরণ্যে ওদের অধিকার আছেকাজেই ওদিকটা রিজার্ভ নয়” জঙ্গলের পায়ে চলা সরু পথ ধরে হাঁটতে ভালই লাগছিল। নানা ধরনের পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁর আওয়াজকতরকমের পোকা আর প্রজাপতি যে উড়ে বেড়াচ্ছে তার আর ইয়ত্তা নেই। তিনজনের কেউই কথা বলছিল না। পিন্টু আগে আর পিছনে ওরা দুজন, চারদিক দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল বনের গভীরের দিকে।

 

প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর তারা কয়েকটা খড়ে ছাওয়া মাটির এলোমেলো ঘর দেখতে পেল। পিন্টু বলল, ওটাই আদিবাসীদের একটা গ্রাম। গ্রামের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আর বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ওদের দেখে এগিয়ে এল। বৃদ্ধরা নমস্কার করল পিন্টুকে। পিন্টুও সকলকে হাতজোড় করে নমস্কার করল। কথাবার্তাও হল পিন্টুর সঙ্গে। পিন্টু বাংলাতেই কথা বলছিল, ওরা বলছে স্থানীয় ভাষায়। বোঁচা আর পল্টু ওদের ভাষার কিছু কিছু বুঝতে পারছিল, কিন্তু অধিকাংশই বুঝতে পারছিল না।

 

গ্রামের পাশ দিয়ে আবার জঙ্গলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পল্টু পিন্টুকে জিজ্ঞেস করল, “এই গ্রামে কী শুধু বুড়োবুড়ি আর এই বাচ্চারা থাকে? বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা কোথায়?”

পিন্টু হাসল, বলল, “ওদের বাবা-মায়েরা খুব ভোরে বেড়িয়ে যায় রোজগারের সন্ধানে। পুরুষেরা যায় শহরের দিকে কোন কাজের খোঁজেমেয়েরাও যায়। তবে মেয়েরা দল বেঁধে বেশির ভাগ যায় জঙ্গলে। জঙ্গল থেকে জ্বালানির জন্যে শুকনো কাঠ-কুটো যোগাড় করে। বুনো ফল, কন্দ, মূল, শাক-টাক যোগাড় করে আনে। পুরুষদেরও কেউ কেউ জঙ্গলে যায়, শিকার করতে কিংবা নালা থেকে মাছ ধরতে। শেষ দুপুরে ওরা ঘরে ফেরে, তারপর রান্নাবান্না, খাওয়া দাওয়া...”।

বোঁচা বলল, “শিকার করতে যায়, মানে? জঙ্গলে শিকার করা মানা না?”

পিন্টু হাসল, বলল, “আমাদের জন্যে শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকিন্তু ওদের জন্যে কিছু কিছু শিকারের অনুমতি দেওয়া হয়। কারণ শিকার করাটা ওদের জীবন ধারণের জন্যে জরুরি। আর আমাদের শহুরে লোকেদের শিকার করাটা ছিল নিছক শখ মেটানো আর বাহাদুরি দেখানো! তাছাড়া যে সব প্রাণীদের সরকার ভার্মিন (vermin animal) ঘোষণা করেছেন, তাদের তো শিকার করাই যায়”।

“ভার্মিন? ভার্মিন আবার কী প্রাণী রে?” পল্টু জিজ্ঞেস করল।

“ভার্মিন কোন বিশেষ প্রাণী নয়। ভার্মিন সেই সব প্রাণীদের বোঝায়, যারা মানুষের এবং তার শস্য-সম্পদের ক্ষতি করে”, পিন্টু বলল, “পাখি, কীট-পতঙ্গ, জন্তুজানোয়ার সব কিছুই হতে পারে! আবার ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভার্মিনের সংজ্ঞাও আলাদা হতে পারে। আমাদের এই জঙ্গলে যেমন নীলগাই ভার্মিন নয়, কিন্তু বিহারের কিছু কিছু অরণ্যে নীলগাই ভার্মিন, তাকে শিকার করা যায়”।

বোঁচা জিজ্ঞেস করল, “এ জঙ্গলে কী কী প্রাণী ভার্মিন?”

পিন্টু বলল, “মেঠো ইঁদুর আছে, বাদুড় আছে

পল্টু বলল, “ইঁদুর না হয় বোঝা গেল, কিন্তু বাদুড় কেন?”

“সব বাদুড় নয়। ফলখেকো বাদুড়, যাদের ফ্রুট ব্যাট বলে। এরা আমাদের বাগানের ফল খেয়ে ক্ষতি করে যে, তাই ওরা ভার্মিন”।

বোঁচা বলল, “আদিবাসিরা ইঁদুর খায় শুনেছি, কিন্তু বাদুড় তো আর খায় না! বাদুড় শিকার করবে কেন?”

পিন্টু হাসল, বলল, “মানুষ যে কী খায় আর কী খায় না, তার হিসেব রাখা দায়। আদিবাসিদের সবাই না হলেও কেউ কেউ বাদুড় খানশুনেছি বাদুড়ের মাংস নাকি খুব সুস্বাদু। অনেকের ধারণা, বাদুড়ের মাংস অ্যাস্থমা মানে হাঁপানির মহা ওষুধ! যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই!”

পল্টু নাক মুখ কুঁচকে বলল, “তাই বলে বাদুড়ের মাংস? ছ্যাঃ”।

পিন্টু হাসতে হাসতে বলল, “অমন ছ্যাছ্যা করিস না, পল্টু, বিশ্বের বহু দেশেই বাদুড় খাওয়ার চল আছে।  তাঁরা শুনলে তোর ওপর রেগে যাবেন। কিছু দেশের শহুরে সুসভ্য মানুষেরা শুনেছি, হেঁটে চলে বেড়ানো যে কোন প্রাণীকেই সোনামুখ করে চিবিয়ে খান – তেঁতুলে বিছে, টিকটিকি...”।

কথা বলতে বলতেই, সামনে একজন আদিবাসি লোককে দেখতে পেল তারা। খালি গা, পরনে ঢোলা হাফপ্যান্ট। একটু বেঁটে খাটো কিন্তু ভীষণ বলিষ্ঠ শরীর। তাঁর কাঁধের ঝোলাতে কিছু তির আর একটা ধনুক, হাতে ঝুলছে একটা মাঝারি সাইজের জাল, তার মধ্যে ছটফট করছে বেশ কিছু কালো কালো জীব।

পিন্টু লোকটাকে দেখেই বলল, “বোঝো বাদুড় নিয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল, এখন সেই বাদুড় শিকার করেই ফিরছেন ওই আদিবাসি ভদ্রলোক”।

লোকটি কাছাকাছি আসতেই কড়া গলায় পিন্টু জিজ্ঞাসা করল, “কী শিকার করেছেন, দেখি?” লোকটা জালটা সামনে এনে দেখিয়ে কিছু বলল, পিন্টু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, যান”

লোকটা চলে যেতে, পিন্টু হাসতে হাসতে বলল, “কী রে বোঁচা, বাদুড় টেস্ট করে দেখবি নাকি?”

“কাঁচা?”

“ধুর হতভাগা কাঁচা হবে কেন? রান্না করাতে হবে। রাজি থাকিস তো বল, আমিও আছি তোর সঙ্গে”।

“পল্টু, তুই?”

“ইসস্‌স্‌, এর পর তো তোরা মানুষও খাবি রে, হতভাগা! আমি ওসবের মধ্যে নেই। চিকেন খা, মাটন খা, তাই বলে বাদুড়? ঘেন্নাপিত্তি বলে কিচ্ছু নেই তোদের?”

পিন্টু বলল, “আরেঃ আমরা কী রোজ রোজ খাচ্ছি নাকি? সারা জীবনে হয়তো এই একবারই! তাই তো রে, বোঁচা?”

“এক্স্যাক্টলি। জঙ্গলে এসেছি যখন, একেবারে জংলীই হয়ে যাবো আজ”। পিন্টু ঘুরে দাঁড়িয়ে আদিবাসি ভদ্রলোককে ডাকল, “ভাইয়া, একটু শুনবেন?”  

 

আদিবাসি ভদ্রলোকের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে ওরা আর একটা গ্রামে এসে পৌঁছলো। সকালে যে গ্রামের ভেতর দিয়ে ওরা এসেছিল, এটা সেই গ্রামটা নয়। পিন্টুর সঙ্গে ভদ্রলোকের কথাবার্তা শুনে ওরা বুঝল, উনি প্রথমে বাদুড়গুলো ছাড়াবেন, তারপর নিজের পরিবারের জন্যে কিছুটা রেখে বাকিটা বেচে দেবেনকত করে দাম জিজ্ঞেস করতে চোখ ছোট করে একগাল হাসলেন, কিছু বললেন না। জিজ্ঞাসা করলেন, “তুরা ইসব খাবি নাকি? শহরের লুকরা এসব খায় না!” আরও বললেন, লোকে খুব ঘেন্না করে। তাঁদের গ্রামেও সবাই খায় না। তবে খেতে মুরগির থেকে খারাপ কিছু নয়। পিন্টুরা খেয়ে দেখতে চায় শুনে, ভদ্রলোক আবার হাসলেন, ভাঙা বাংলায় বললেন, “পয়সা লাগবেক নাই, এট্টু দুব তুদের”।

এই কথাবার্তা আর বাদুড় খাবার হুজুগটা পল্টুর মোটেই ভালো লাগছিল নাগ্রামের মধ্যে ঢুকে সে একটা বড়ো শিরিষ গাছের ছায়ায় বসল। পিন্টু আর বোঁচা ভদ্রলোকের বাড়ির সামনের একটা বাঁশের বেঞ্চে বসল। ভদ্রলোক জালের ঝোলা বাইরে রেখে ভেতর থেকে বঁটি, ছুরি আর বড় একটা অ্যালুমিনিয়মের থালা নিয়ে এলেনতারপর দরজার বাইরে একপাশে বসে, ঝোলার থেকে একটা একটা করে বাদুড় বের করে, ছাড়াতে লাগলেনআর ছাড়ানো মাংস ভাগা দিয়ে রাখতে লাগলেন থালাতে। পল্টু এসব দৃশ্য দেখবে না ভেবেও বার বার চোখ চলে যাচ্ছিল ওদিকে। কলকাতার দোকানে মুরগি এবং ছাগল কাটা সে দেখেছে, সেই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এর এমন কিছু তফাৎ নেই। কিন্তু মানুষের লোভ আর হিংস্রতা দেখলেই তার কেমন অস্বস্তি হয়। খাদ্য হিসেবে মানুষের জন্যে এত কিছু রয়েছে, কিন্তু তাও শুধুমাত্র জিভের স্বাদ পরিবর্তনের জন্যে মানুষের প্রাণীহত্যার কোন সীমা নেই!

আদিবাসি ভদ্রলোক মোট এগারোটা বাদুড় কাটলেন, মাংস হল অনেকটাই। ঝোলার মধ্যে আরো দুটো বাদুড় রয়ে গেল, সেগুলো না কেটে উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন

পিন্টু বলল, “ও দুটো কাটবেন না?”

আদিবাসি ভদ্রলোক বললেন, নাঃ ও দুটা খেতে নেই। অমঙ্গল হয়, অশুভ

“অশুভ? কী হয় খেলে?”

“সেটি বুইলতে লারবেক, বুড়াদের মুখে শুনেছি, খাঁইতে লাই!”

“ওঃ তাই বুঝি? কী দেখে বুঝলেন, যে ওদুটো অশুভ?” আদিবাসি ভদ্রলোক জালের ঝোলা থেকে একটা বাদুড়ের মুণ্ডু টেনে বের করে বললেন, “ই দ্যাখেন, দু কানের পাশে ইটার সাদা সাদা রোঁয়া রইয়েছে বটে...ইগুলান ভাল লয়, খুব খারাপ!”

বোঁচা চাপা গলায় পিন্টুকে বলল, “যত্তো সব অন্ধ কুসংস্কার। শোন না, ওকে জিজ্ঞেস কর তো, ওদুটো নিয়ে উনি কী করবেন?”

পিন্টু ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করাতে, ভদ্রলোক বললেন,“ও দুটাকে আমি জঙ্গলে ছেড়ে দিব, কিন্তু উয়াদের ডানা ভেঙে গ্যাছে, উড়তে লারবে। এমনিতেই মরে যাবে...পরে শ্যালে খেঁয়ে ফেলাবে...”!

বোঁচা পিন্টুকে বলল, “ওই দুটোকেই আমাদের জন্যে ছাড়িয়ে দিতে বল। মাংসের জন্যে আমাদের থেকে পয়সা না নিলেও, ওঁর কোন লস হবে না”।

পিন্টু বলল, “কিন্তু ও যে বলল, ওগুলো অশুভ, খেলে শরীর খারাপ হয় যদি?”

বোঁচা বলল, “তুইও তেমনি...কানের পাশে যদি ঘা-টা কিছু দেখাত, তাও বুঝতাম। কানের চারপাশে কিছু সাদা লোম রয়েছে বলে, সেগুলো অশুভ হয়ে যাবে? তুইও ওঁর কথায় বিশ্বাস করে গেলি?”

“তা নয়। তবে...! তুই কী বলছিস? ও দুটোই আমাদের জন্যে ছাড়িয়ে দিতে, বলব?”

“আলবাৎ। একে বাদুড় তার ওপরে আবার অশুভ...এমন জিনিষ ছেড়ে দেওয়ার কোন মানে হয় না”!

পিন্টু বলাতে আদিবাসি ভদ্রলোক কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। বারবার একই অমঙ্গল আর ভীষণ খারাপ কিছু ঘটে যাওয়ার কথা বলছিলেন। অবিশ্যি ঠিক কতটা অমঙ্গল বা খারাপ হতে পারে, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারলেন না। বারবারই বললেন, বাবা-দাদুদের মুখে শুনেছেন, “ইগুলান খাঁইতে লাই”। কিন্তু পিন্টু এবং বোঁচার জোরাজুরিতে শেষ অব্দি তিনি ও দুটো বাদুড়ও ছাড়ালেন, কিন্তু ছাড়ানো মাংস অ্যালুমিনিয়মের থালায় রাখলেন না। কাঁচা বড়ো একটা শালপাতায় মুড়ে পিন্টুর হাতে দিয়ে যা বললেন, তা বাংলা করলে দাঁড়ায়, “কাজটা ঠিক করলেন না, বাবু। এখনও বলছি এ মাংস খাবেন না”।

পিন্টু আর বোঁচা হাসল, বলল, “ভাববেন না, আমাদের কিচ্ছু হবে না”।

 

পল্টু বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে যাচ্ছিল। ওরা ফিরতে উঠে দাঁড়াল। ওদের কথাবার্তা সে কিছুই শুনতে পায়নি, জিজ্ঞেস করল, “ভদ্রলোক বার বার মাথা নেড়ে কী বলছিলেন, রে?”

বোঁচা খুব তাচ্ছিল্য করে উত্তর দিল, “ও শুনে তুই কী করবি? চ, ঘরে যাই। দুপুরের খাওয়াটা ভালই জমবে। কিন্তু রান্না কে করবে, পিন্টু? তোদের মেসের কুক তো এই মাংস দেখলেই ভিরমি খাবে, রান্না করবে?”

পল্টু একটু খোঁচা দিয়ে বলল, “রান্না করার দরকার আছে? কাঁচাই খেয়ে ফেল না, ভাতে মেখে!”

পিন্টু হাসল হো হো করে, বলল, “তুই খুব রেগে গেছিস মনে হচ্ছে! চল চল অনেক দেরি হয়ে গেল, কোয়ার্টারে ফিরি। রান্না আমাকেই করতে হবে, বোঁচা। কুকের থেকে আদা, পেঁয়াজ, রসুন, নুন-মশলাটা যোগাড় করে নেব, বাকিটা আমাকেই সারতে হবে!”  

 

নটরাজদার চেম্বারে গিয়ে ছুটির কথা বলতেই, নটরাজদা শেয়ালের মতো খ্যাঁক করে উঠলেন, “এই তো এখনো তিনদিন হয়নি সাতদিনের ছুটি নিয়ে কোন জঙ্গলের থেকে ঘুরে এলি! আবার ছুটি? আবার বুঝি বাদুড়ের মাংস খেতে যাবি? অফিস-টফিস ছেড়ে দিয়ে ওই জঙ্গলে গিয়েই বসে থাক না! যখন যা খুশি করে বেড়াবি, কেউ কিচ্‌ছু বলতে যাবে না!”

ধমক খেয়ে নীলাব্জ একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “তুমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছো না, রাজুদা। গত পরশু থেকে পিঠে আর মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। কী হয়েছে কে জানে! গতকাল ডাক্তার দেখালাম, তিনি পরীক্ষা-টরীক্ষা করে বললেন, তেমন কিছু তো বুঝছি না, মনে হয় ঠাণ্ডা লেগেছে। বিচ্ছিরি রকমের ঠাণ্ডা লাগলে অনেক সময় এমন হয়। ওষুধ তেমন কিছু দেননি, বলেছেন, কটা দিন একটু রেস্ট নিতে”।

নটরাজদা কটমটে চোখে নীলাব্জর চোখে চোখ রেখে বললেন, “রেস্ট নিবি তো? একটা বেস্ট অপসন দিচ্ছি, শোন। চাকরি থেকে ইস্তফা দে, তারপর লম্বা রেস্ট, রেস্ট অফ ইয়োর লাইফ...”।

নীলাব্জ তাও ছুটির দরখাস্তটা নটরাজদার দিকে আরেকটু ঠেলে দিয়ে বলল, “রাজুদা, প্লিজ! দুটো দিন সময় দাও। তার মধ্যে যদি ঠিক হয়ে যাই, জয়েন করে যাবো আর নাহলে ফিরে এসে তোমাকে আর এ মুখ দেখাব না”

এই কথায় নটরাজদা একটু নরম হলেন, একটু চিন্তা করে বললেন, “দেখছিস তো কোম্পানি খরচ কমাতে দিন দিন লোক কমিয়ে দিচ্ছেআমার টিমে তোকে নিয়ে মোটে চারজন তো রয়েছিস। তার মধ্যে তুই যদি বার বার ছুটি নিস, আমি অন্যদের কী জবাব দেব? আর ওপরওয়ালাকেই বা কী যুক্তি দেব, বল?”

“এর পরে অন্ততঃ ছমাস কোন ছুটি নেব না, রাজুদা। প্রমিস। পিঠের আর মাথার ব্যথাটা খুব কষ্ট দিচ্ছে, শান্তিতে না পারছি শুতে, না পারছি বসতে। হাঁটাচলা করলেই মাথার মধ্যে ঝমঝম করছে। রোদ্দুরের মধ্যে চোখে কেমন যেন ঝাপসা দেখছি। ঠিক কী যে হয়েছে বুঝতে পারছি না... কটা দিন রেস্ট নিলে যদি...”।     

নীলাব্জর ছুটির দরখাস্তে সই করতে করতে নটরাজদা বললেন, “যা প্রমিস করলি, সেটা যেন মনে থাকে। তা নইলে সত্যি সত্যি কড়া স্টেপ নিতে বাধ্য হবো! আজকাল চাকরির হাল তো জানিস, এটা গেলে আর পাবি না। সারা জীবন ঝুলে থাকতে হবে!”

অনেক ধন্যবাদ দিয়ে নীলাব্জ ছুটির দরখাস্তটা জমা দিল এইচ আর ডিপার্টমেন্টে। তারপর লিফ্‌ট ধরে সোজা নীচে। সত্যি সত্যি তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। সারা শরীরে একটা চিনচিনে যন্ত্রণা যদি সারাক্ষণ চলতে থাকে, ভালো লাগে? কোন কাজে মন বসে? তার ওপর আর একটা উপসর্গ হয়েছে, রোদ্দুরে কিংবা বেশি আলোতে বেরোলেই চোখে ঝাপসা দেখছে। চোখ কুঁচকে ছোট করে তাকাতে হচ্ছে! সানগ্লাস পরে স্টাইল করার কথা কোনদিনই ভাবেনি, কিন্তু এমন চললে বাধ্য হয়েই তাকে, সানগ্লাস কিনে চোখে লাগাতে হবে

বাড়ির দিকে যাওয়ার রুটের একটা বাস পেয়ে নীলাব্জ উঠে পড়ল এ সময় উল্টোদিকের বাসে, মানে পার্কস্ট্রিট থেকে বাড়ি ফেরার বাসে, ভিড়টা বেশ কমই থাকে যদিও সিট খালি নেই, কিন্তু বেশ আরামে দাঁড়ানো গেল ধাক্কাধাক্কি বা গুঁতোগুঁতির মধ্যে পড়তে হবে না পার্কস্ট্রিট থেকে তার বাড়ির স্টপ অনেকটাই দূর নীলাব্জ একধারে জুত করে দাঁড়াল, দুহাতে মাথার ওপরের রড ধরে রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম আছে বাসটা মাঝেমাঝেই ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করে ব্রেক মারছে, আর সেই ধাক্কাটা নীলাব্জকে সামলাতে হচ্ছে দুইহাতে ব্যালান্স করে নীলাব্জ ভয় পাচ্ছিল, এতে তার পিঠে আর কাঁধের ব্যাথাটা আবার বেড়ে না যায়! কিন্তু তা হয়নি, বরং দুহাতে টাল সামলাতে গিয়ে কাঁধে যে টানটা পড়ছিল, তাতে তার বেশ আরামই হচ্ছিল হঠাৎ কী খেয়াল হতে সে আশেপাশে দাঁড়ানো এবং সিটে বসা লোকগুলোর দিকে তাকাল, কেউ তাকে দেখছে কিনা নাঃ দেখছে না, সামনের সিটে বসা দুজন তো গভীর ঘুমোচ্ছে মাথা ঝুঁকে পড়েছে কোলের কাছে! নীলাব্জ নিশ্চিন্ত হয়ে দুহাতে বাসের রড ধরে ঝুলে পড়ল, পা দুটো একটু তুলে নিল বাসের মেঝে থেকে আঃ গোটা শরীরটা যেন আরামে জুড়িয়ে গেল কাঁধের কিংবা পিঠের ব্যাথার অনুভব তো দূরের কথা, কোনদিন যে তার অমন ব্যাথা ছিল, সেটাও মনে হচ্ছে না এখন সেই সঙ্গে মাথার ভার ভার ব্যাপারটাও ছেড়ে যাচ্ছে আরামে নীলাব্জ চোখ বন্ধ করল

কতক্ষণ ওভাবে ঝুলছিল নীলাব্জ খেয়াল করেনি, তার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা ভেঙে গেল কন্ডাকটার ভাইয়ের ডাকে কন্ডাকটার ভাই তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, বলল, “টিকিটটা লিন তো! কোতায় লাব্বেন কোতায়?” বাসের মেঝেয় পা দিয়ে নীলাব্জ পকেট থেকে টাকা বের করে বলল, “একটা শাঁখারিপাড়া, পার্ক স্ট্রিট থেকে

এর মধ্যে তো কত সিট খালি হয়ে গেল, বসলেন না কেন?” খুচরো পয়সা আর টিকিট দিয়ে কণ্ডাকটারভাই বাসের অন্য দিকে যেতে যেতে বলল, “কত আজব কাণ্ড যে দেখবো রে, ভাই লোক সিটে বসেই ঝিমোয়, ইনি আবার বাসের রডে ঝুলে ঝুলে ঘুমোচ্ছেন!”

নীলাব্জ মনে মনে হাসল, তারপর নীচু হয়ে জানালা দিয়ে দেখল, বাস এখন হাজরা মোড়ের কাছাকাছি, তার স্টপেজ আসতে এখনো অন্ততঃ আধঘণ্টা! নীলাব্জ আগের মতোই দুহাতে আবার ঝুলে পড়ল, বাসের মেঝে থেকে পা দুটো সামান্য তুলে দুএকজন তার দিকে অবাক হয়ে দেখছিল, কণ্ডাকটারভাইও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকেই দেখছিল নীলাব্জ সে সব দেখেও, চোখ বুজে আরামের সমুদ্রে যেন ডুব দিল 

 বাস থেকে স্টপেজে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে নীলাব্জর গায়ের এবং মাথার ব্যথাটা আবার ফিরে এল। অসহ্য লাগছে। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে তাকাতেও পারছে না। চোখে ঝাপসা দেখছে এবং চোখ কড়কড় করছে।  অসময়ে বাড়ি ফিরতে দেখে নীলাব্জর মা খুব অবাক হলেন, বললেন, “কীরে বোঁচা, হঠাৎ বাড়ি চলে এলি? ব্যথা কী আরও বেড়েছে? কোথায় কোন জঙ্গলে গিয়ে এ কী বিপদ বাধালি, বাবা? এভাবে অফিসে নিত্যি ছুটি নিলে, চাকরিটা থাকবে তো?”

মায়ের কোন কথারই উত্তর দেওয়ার মতো কোন জবাব নেই নীলাব্জর কাছে। দোতলায় নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, “তুমি অত চিন্তা করো না তো মা। আমি একটু ঘুমোবো, এখন আমাকে বিরক্ত করো না”।

সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে নীলাব্জর মা জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু খাবি?”

“নাঃ। এখন শুধু ঘুমোবো”। শরীরের যন্ত্রণায় এখন কথা বলতেও ভালো লাগছে না, নীলাব্জর। নিজের ঘরে ঢুকেই দরজায় ছিটকিনি দিল। তারপর চটপট জামা প্যান্ট ছেড়ে নীল বারমুডা আর আকাশী টি শার্ট গায়ে পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়ল নিজের বিছানায়। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা লোহার হুক। পাখার ব্লেডের সীমানা থেকে অনেকটাই দূরে।

ওটার দিকে তাকিয়ে তার মাথায় অদ্ভূত একটা মতলব এল। বিছানায় উঠে বসে আন্দাজ করে দেখল, টেবিলটা টেনে তার ওপর চেয়ার চড়ালে, তার যা হাইট ওই হুকটায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। বিছানা ছেড়ে উঠে, পাখার সুইচটা অফ করল, তারপর দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে, মায়ের কাপড় শুকোতে দেওয়ার লম্বা নাইলনের দড়িটা খুলে নিল। মায়ের শাড়ি-টাড়ি কিছু দড়িতে শুকোতে দেওয়া ছিল, সেগুলো বারান্দার রেলিংয়ে ঝুলিয়ে দিল। তারপর ঘরে এসে টেবিলটা টানল হুকের ঠিক নীচে। টেবিলের জিনিষপত্র মেঝেয় নামিয়ে, তার ওপর চেয়ারটা চড়িয়ে দিল। এবার কাঁধে নাইলনের দড়ি নিয়ে সাবধানে উঠল চেয়ারে। হাতের সামনেই সেই হুক। হুকের মধ্যে দড়ির এক প্রান্ত ঢুকিয়ে ফেলে দিতেই, দু ফেরতা হয়ে দড়ি সরসরিয়ে নেমে এল নীচেয়। নীলাব্জ চেয়ার ছেড়ে টেবিলে নামল, তারপর আন্দাজ মতো হাইটে দড়ির দুটো মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলল। তার কাজ শেষ। টেবিল চেয়ার যথাস্থানে সরিয়ে দিল। ফ্যানের সুইচ অন করে এল আবার। তারপর ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে, দড়ির গাঁটটা দুহাতে ধরে ঝুলতে লাগল দড়ি ধরে। পা দুটো দুলতে লাগল মেঝে থেকে সামান্য ওপরে।

আঃ কী আরাম, শরীরের সব যন্ত্রণা কোথায় উধাও হয়ে গেল। তার দু চোখ ঝামড়ে নেমে এল ঘুম!

 

দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আওয়াজে নীলাব্জর ঘুম ভাঙল, মায়ের গলা শুনতে পেল, “ও বোঁচা, দরজায় খিল দিয়ে এ কেমন ঘুমোচ্ছিস, বাবা? উঠে দরজাটা খোল, একবার। কতক্ষণ ধরে ডাকছি...সাড়া দিচ্ছিস না কেন?” নীলাব্জ দড়ির গাঁট ছেড়ে নেমে এল মেঝেয়। টেবিলের জিনিষপত্র মেঝেয় রেখেছিল, সেগুলো সে সময় তোলা হয়নি। সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে, দরজার ছিটকিনি খুলল।

দরজা খোলা পেয়ে এবং ছেলেকে দেখে নীলাব্জর মা স্বস্তির শ্বাস নিলেন, বললেন, “ওফ কী চিন্তাতেই ফেলেছিলি, বাবা! ডেকে ডেকে গলা চিরে গেল, দরজা বন্ধ করে এভাবে কেউ ঘুমোয়”? নীলাব্জর মা ঘরে এসে ঢুকলেন, “লাইটটাও জ্বালিসনি...” বলেই ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন এলইডি বাল্ব, বেশ জোরালো আলো। ঘরে আলো যতক্ষণ ছিল না, নীলাব্জ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল, এখন বেশ কষ্ট হচ্ছিল তাকাতে।

নীলাব্জ জিজ্ঞেস করল, “কটা বাজছে গো?”

“সাড়ে আটটা। চা খাবি তো? চা করে আনছি। মুখেচোখে জল দে

মা বেরিয়ে যেতে লাইটটা নিভিয়ে, মোবাইলটা হাতে করে, বিছানায় বসল নীলাব্জ। স্ক্রিন আনলক করে দেখল, তিনটে নাম্বার থেকে মিস কল এসেছে। পল্টুর দুটো, নটরাজদার একটা, আর পিন্টুর আটত্রিশটা! পিন্টুর কী হল, এতবার ফোন করেছিল কেন? মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। পাশে রেখে দিল ফোনটা। তারপর চুপ করে বসে ঘরের চারদিক দেখতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরেই মা এলেন দরজায়, হাতে চায়ের কাপ।

“ঘরের আলো নিভিয়ে ভূতের মতো বসে কী ভাবছিস বল তো? কী হয়েছে কি তোর বোঁচা?” হাত বাড়িয়ে মা আবার সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। নীলাব্জর দিকে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে করতে বললেন, “হ্যারে কী হয়েছে, বল তো? তোর মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন? গাল ভর্তি দাড়ি...আজ দাড়ি কামাসনি? অফিসে যাওয়ার সময় তো দেখলাম কামিয়েছিস। তোর কী হয়েছে রে বোঁচা, আমাকে খুলে বল, বাবা?”

একটু বিরক্তি নিয়েই নীলাব্জ বলল, “কী আবার হবে? কিচ্ছু হয়নি মা। বাবা ফিরেছেন?”

“তোর বাবার আজ ফিরতে দেরি হবে। তোর মেজকাকার শরীর খুব খারাপ, দেখতে গেছে। কাল পারলে সময় করে একবার যাস না, বোঁচা, মেজকাকা তোকে খুব ভালোবাসে। তোকে দেখলে খুব খুশি হবে...ওটা কী রে?” হঠাৎ চমকে উঠে নীলাব্জর মা বললেন। কথা বলতে একদমই ভালো লাগছে না, তবু নীলাব্জ জিজ্ঞাসা করল “কোনটা”?

“দড়িটা...ওখানে কী করতে এনেছিস? তাই বলি, আমার কাপড়চোপড় বারান্দার রেলিংয়ে কে রাখল?” তারপরই হঠাৎ নীলাব্জর কাঁধে হাত রেখে আতঙ্কগ্রস্ত গলায় বললেন, “তোর মতলবটা কী বলতো? নাইলনের দড়ি এনে ঘরের সিলিং থেকে ঝুলিয়েছিস। সেই দুপুর দেড়টা থেকে এই রাত আটটা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছিস! তোর রকম সকম আমার ভালো লাগছে না, বোঁচা। কী হয়েছে আমায় খুলে বল, সোনা। আমার কাছে লুকোস না। হ্যারে নেশা-টেশা কিছু শুরু করিসনি তো?”

এবার একটু জোর করেই নীলাব্জ বলল, “মা, তোমার এত প্রশ্নের উত্তর দিতে ভাল লাগছে না। জানই তো শরীরটা ভাল নেইঅন্ধকারে চুপ করে শুয়ে থাকতে ভাল লাগছে। তার জন্যে তুমি এত সব ভেবে নাও কেন”?

নীলাব্জর মা একটু রাগ এবং কিছুটা অভিমান করে বললেন, “বেশ নিজের মনেই থাকো। চাটা দিয়ে গেলাম, খেয়ে আমায় ধন্যি করো”, দরজার কাছে গিয়ে আবার বললেন, “বাবার সামনে অমন মুখ নিয়ে কথা বলো না যেন। জানই তো তোমার বাবা কেমন ব্যতিব্যস্ত মানুষ...”। বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

নীলাব্জ উঠে গিয়ে ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে, চায়ের কাপটা হাতে নিল। কাপটা মুখের কাছে আনতেই, উৎকট এক গন্ধে তার যেন বমি পেল! কাপটা নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর ফোন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, ছাদে ওঠার সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গেল। অন্ধকার খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে অনেকটা ভালো লাগছে, কিন্তু শরীর আর মাথার ব্যাথাটা আবার ফিরে আসছে টের পেল। ফোন আনলক করে, পিন্টুর নাম্বারে ডায়াল করল। বার পাঁচেক রিং হওয়ার পর, ওপার থেকে পিন্টু বলল, “কী রে, কী করছিস?”

“শরীরটা ঠিক নেই, ছাদে পায়চারি করছি”।

“শরীরে কী? ব্যথা? মাথায়, দুই কাঁধে আর পিঠে?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তুই কী করে জানলি?”

“আয়নায় মুখটা দেখেছিস?”

“কেন বলতো? সকালে শেভ করার সময় দেখেছিলাম।”

“এখন একবার দেখে নিস। আর পারলে এখনই বেরিয়ে পড়!”

“কোথায়?”

“আমার এখানে। যত শিগ্‌গির আসতে পারবি, ভালো হয়ে যাবি”।

“কলকাতায় বড়ো বড়ো ডাক্তার থাকতে, তোর ওই জঙ্গলে গিয়ে ভালো হবো?”

“এ অসুখ সারানো কলকাতার ডাক্তারদের কম্মো নয়। ভালো চাস তো, চটপট চলে আয়”।

“কিন্তু ট্রেনের রিজার্ভেশন? চাকরি? আমার বস নটরাজদা বলে দিয়েছে, এবারের ছুটি দুদিনের বেশি হলেই, চাকরি নট...”

“গুলি মার তোর চাকরিতে আর রিজার্ভেশনে। জীবনটা আগে, নাকি চাকরিটা? কথা বলতে ভালো লাগছে না, চলে আয়। খুব দেরি হবার আগেই, বেরিয়ে পড়...রাখছি”।

পিন্টু কেটে দিল ফোনটা। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে নীলাব্জ কিছু ভাবল। তারপর নীচেয় এসে, বাথরুমে গেল। লাইট না জ্বেলেই আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব অবাক হল, ভয়ও পেল খুব দ্রুত ঘরে এসে বারমুডার পকেটে পার্সটা ঢোকাল। কাঠের আলমারি থেকে একটা চাদর বের করে, গায়ে মাথায় জড়িয়ে নিল তারপর আবার ছাদে গেল।

পিন্টু ঠিকই বলছে, ওকে আবার সেই জঙ্গলেই ফিরতে হবে। যত শিগ্‌গির সম্ভব। সদর দরজা দিয়ে বেরোতে গেলে, মা দেখে ফেলবেন, হৈ চৈ করে পাড়ার লোক জড়ো করে ফেললে কেলেঙ্কারি...। সামনে যখন রয়েছে ওই আমগাছের ডাল, তখন ছাদ থেকেই... 

 

শিল্টনগঞ্জ শহরের সীমানা অনেকটা ছাড়িয়ে বাস যখন দুপাশে জঙ্গল নিয়ে ছুটতে শুরু করল, নীলাব্জ ভীষণ আরাম অনুভব করলওফ্‌ কী শান্তি! তার যন্ত্রণাহীন শরীরটা এখন খুব হাল্কাইচ্ছে করলেই সে যেন উড়তে পারে। চাদরের আড়াল একটু সরিয়ে নীলাব্জ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। দেখছিল উল্টোদিকে দৌড়ে চলা গাছপালা, ঝোপঝাড় বাতাসের ঝাপটায় জঙ্গলের ঘ্রাণ তার নাকে এসে লাগল, কানে আসছিল ঝিঁঝিঁর একটানা আওয়াজ। এই ছুটে চলা বাস, আশেপাশে, সামনের মেঝেয় বসে থাকা সহযাত্রীদের সবাইকেই তার অবান্তর মনে হল। সে এখানে কেন? এ তো তার জায়গা নয়!

বাসের জানালার গরাদের ফাঁকগুলো যথেষ্ট নয়। নীলাব্জ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, তার পাশে বসা আদিবাসি মহিলা এখন ঢুলছেন। আশেপাশে সামনে মেঝেয় বসা সকলেই কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন। পিছনের দরজাটা এমন কিছু দূরে নয়। নীলাব্জ মনস্থির করে নিল, তারপর লাফ দিয়ে এক ঝটকায় বেরিয়ে পড়ল বাসের পিছনের দরজাটা দিয়ে! মুক্তির এমন আনন্দ সে কখনো কোনদিন পায়নি!

 

অনন্তপুর স্টপেজ আসতে বাস দাঁড়িয়ে গেল রাস্তার ধারে। কন্ডাক্টার বাস থেকে নেমে চেঁচাতে লাগল “অঁন্তপুর...অঁন্তপুর...”। তন্দ্রা ভেঙে আদিবাসি মহিলা দেখলেন, তাঁর পাশের সিটে কেউ নেই। সিট থেকে মেঝেয় লুটোচ্ছে চাদরটা। মহিলা চাদরটা গুছিয়ে সিটে তুলতে গিয়ে দেখলেন, মেঝেয় পড়ে আছে একটা নীল বারমুডা। তার পকেটে একটা পার্স। অবাক হয়ে তুলে নিলেন। চাদর তুলে দেখলেন, আকাশী একটা টি শার্ট পড়ে রয়েছে! মহিলা ভীষণ ভয়ে আর বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “ই দ্যাখ গ কণ্ডাক্টর...এ বাবুটো প্যাণ্ট জামা, মানিব্যাগটো ফেইল্যে কুথায় চলে গেল, বটে”?

 

জঙ্গলের মধ্যে গাছের ছায়ায় ছায়ায় এলোমেলো কিছুক্ষণ ঘুরতে ঘুরতে নীলাব্জ একটা গন্ধ পেল। ওই গন্ধটা তার চেনা নয়, কিন্তু ওই গন্ধে ভীষণ আনন্দের একটা অনুভূতি হচ্ছিল! গন্ধটা কোনদিক থেকে আসছে, অনুমান করে সে সেইদিকে দৌড়তে লাগল। গন্ধের তীব্রতা বাড়ছে... বাড়ছে তার আনন্দের অনুভূতি। ছোট্টবেলায় স্কুল ছুটির পর গেটের ধারে সে দাঁড়িয়ে থাকত মায়ের অপেক্ষায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অনেকটা দূরে সে যখন মাকে দেখতে পেত, তাকে নিতে মা আসছেন, ভীষণ আনন্দ হত। এখন ঠিক সেই অনুভূতি!

জঙ্গলের ভেতরে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে, সে ঢুকে পড়ল, বিশাল এক মহুয়া গাছের কোটরে... শান্তিতে পা মুড়িয়ে কোটরের দেওয়াল আঁকড়ে সে ঝুলতে লাগল

পাশ থেকে কেউ একজন বলল, “যাক, এসে পড়েছিস? ভালোই হল!” চেনা গলা শুনে, নীলাব্জ ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখল, কানের কাছে সাদা রোঁয়া নিয়ে সেও ঝুলছে! তারই মতো, ওপরে পা...নীচেয় মাথা! তারপর মহানন্দে দুলে দুলে ঝুলতে লাগল দুজনে! শেষমেষ নটরাজদার কথাই সত্যি হল – নীলাব্জকে সারা জীবন ঝুলেই থাকতে হবে!

 ..০০..

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...