শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭ " 


 

সুনেত্রর মোবাইলটা যখন বেজে উঠল, তখন পৌনে বারোটা। স্ক্রিনে “কনি কলিং” দেখে সুনেত্র বেশ অবাক হল। এই কদিনে সুকন্যা একবারও ফোন করেনি। তাদের আলাপচারিতা যা কিছু হচ্ছে সবই মেলে। তার চেম্বারে সেসময় একজন পেশেন্ট ছিল। বয়স্ক লোক, রিটায়ার্ড, প্রায়ই আসেন। বিপত্নীক, একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, একমাত্র ছেলে আর ছেলের বউ চাকরি করে। সারাটা দিন বুড়োর সময় কাটে না। তাই পয়সা খরচ করে তার কাছে আসেন অলীক অসুখের গল্প করতে। আজও এসেছে, তার কমপ্লেন – “ডাক্তার বাবু, কদিন ধরেই সকালবেলায় বাওলটা ঠিক সাফ হচ্ছে না। তার ওপর মলের রংটাও...”। ফোনটা ধরে সুনেত্র ইশারায় বৃদ্ধকে একটু ওয়েট করতে বলে, চেম্বারের বাইরে এল, “হ্যাঁ বল”বাইরে বসার ঘরেও চারজন বসেছিল, তাকে বেরোতে দেখে সকলে সম্ভ্রমে নড়ে চড়ে বসল। কথা শুনতে শুনতে প্যাসেজ পার হয়ে নিজের বসার ঘরে ঢুকল সুনেত্র। 

“ব্যস্ত? এখন কথা বলা যাবে”? কনির স্বর একটু চাপা আর যেন কান্না ধরা।

“হুঁ, বলা যাবে। কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ”?

“কেন বলোতো”?

“গলাটা কেমন যেন ধরা ধরা শোনাচ্ছে। কাঁদছিলি নাকি”? সুকন্যা কোন উত্তর দিল না।

“কি হল, উত্তর দিচ্ছিস না? শশাংকবাবু কিছু বলেছে? ঝগড়া-টগড়া হয়েছে নাকি”? কোন উত্তর পেল না সুনেত্র। কিন্তু ফোনে শুনতে পাচ্ছিল সুকন্যার কান্নাময় নিঃশ্বাসের শব্দ।

“আরে, দাম্পত্যে একটু-আধটু কলহ হয়েই থাকে। আমার চেয়ে তোর তো অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সেই কি যেন পড়েছিলাম, বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। এর জন্যে এত কান্নাকাটি করছিস কেন”? সুনেত্র হা হা করে একটু হাসল।

“বাজে বকা রাখো। আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে...” সুকন্যা কথাটা শেষ করল না। অধীর অপেক্ষায় সুনেত্র কানের মধ্যে চেপে ধরল ফোনটা। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরেও সুকন্যা কিছু বলল না দেখে সুনেত্র আবেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে রে, কনি”?

“তোমাকে...তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, সুনুদা। আসবে, প্লিজ”

“এখন? এখনই? আমি তো এখন চেম্বারে। পেশেন্ট রয়েছে চার-পাঁচজন। ঘন্টাখানেক পরে গেলে চলবে না? এই ধর দেড়টা নাগাদ”?

“চলবে। এসো কিন্তু, প্লিজ”

সুকন্যা ফোনটা কেটে দিতে, সুনেত্র কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে। কনি কী চাইছে তার কাছে, মধ্য দুপুরের এই নির্জনে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে ফিরে গেল তার ছেড়ে আসা চেম্বারে, তার জন্যে অপেক্ষারত বৃদ্ধের কোষ্ঠ সাফাইয়ের নিদান দিতে। যাওয়ার পথে ফোনটা আবার বেজে উঠল, কনি কলিং।

“হ্যাঁ বল, আবার কি হল”?

“তোমার তো নিশ্চই খাওয়া হয়নি দুপুরে”?

“না”

“তাহলে তুমি এলে আমার সঙ্গেই তুমি খাবে”

“এসবের কি খুব দরকার ছিল”?

“ছিল নয় আছে। তুমি এসো, তখন কথা হবে”ফোন কেটে দিল কনি।

এখন কনির স্বর স্বচ্ছ, কান্নার বদলে তার কণ্ঠে খুশির আবেশ।

 

চেম্বারে এসে সুনেত্র দেখল, বৃদ্ধ আগের মতোই নিশ্চিন্তে বসে আছেন, কোন তাড়া নেই। সে চেম্বারে ঢুকতেই বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, “এমার্জেন্সি কল বুঝি”? সুনেত্র তখনো কনির চিন্তা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি, তাই আনমনে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলছিলেন”?

“ফোন রিসিভ করে উঠে গেলেন, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম, এমার্জেন্সি কল বোধহয়”?

“হুঁ”সংক্ষেপে উত্তর সারল সুনেত্র। এমার্জেন্সি মানে? এরকম এমার্জেন্সি সুনেত্র জীবনে কোনদিন ফেস করেনি। সুনেত্র ভাবল।

“আপনারা সত্যি এত অকুপায়েড, দু মিনিট যে বসে কথা বলবেন, তারও সোয়াস্তি নেই”

“সে যাক, আপনার প্রবলেমটা বলুন, অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি আপনাকে”হাল্কা হাসি মুখে সুনেত্র বলল।

“খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি, জানেন। সকালে বাওল সাফ না হলে কি যে অস্বস্তি হয়। সারাটা জীবন কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছি। দিনরাত এক করে দিয়েছি বলতে পারেন। এসব প্রবলেম কোনদিন ছিল না, জানেন? রিটায়ারমেন্টের পর এই কটা বছর কিচ্ছু করার নেই সারাদিন, জানেন। বসে থেকে শুয়ে থেকে সর্ব অঙ্গে যেন জং ধরে উঠছে। বাওলের আর দোষ কি! তারপরে জানেন, মলের রংটাও...”

“এই দুটো ট্যাবলেট দিলাম। প্রথমটা দিনে দুবার, ব্রেকফাস্টের আগে একটা আর রাত্রে খাবার আগে একটা। সেকেণ্ড ট্যাবলেটটা একবার - রাতে শোবার আগেপাঁচদিনের কোর্সকেমন থাকবেন জানাবেন”বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতেই প্রেসিক্রিপসন লিখছিল সুনেত্র। লেখা হয়ে যেতে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে দিল প্রেসক্রিপসনটা।

“কিন্তু আপনি তো আমার প্রব্লেমটা পুরো শুনলেনই না”স্পষ্টতঃই একটু হতাশ বৃদ্ধ ভদ্রলোক।

“আপনার সঙ্গে কি স্যার, আমার আজকের সম্পর্ক”? মুখে মাখোমাখো হাসি নিয়ে সুনেত্র বলল, “আপনার শরীরের খবর আপনার চেয়ে আমি ভালো জানি, আপনার মা কিংবা আপনার ওয়াইফের মতো”বিগলিত হেসে বৃদ্ধ শার্টের বুক পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বললেন, “সেই জন্যেই তো, আপনার ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি, ডাক্তারবাবু। মোক্ষম বলেছেন কিন্তু, সব ডাক্তার আর পেশেন্টের রিলেশান, স্বামী-স্ত্রীর মতো হলে আর ভাবনা থাকত না। আপনি আমার চেয়ে অনেকটাই ইয়ং, বাট আই রেস্পেক্ট ইয়োর ডায়াগন্সিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট”সুনেত্রর হাতে তুলে দিলেন পাঁচটা একশ টাকার নোট, সুনেত্র একটা নোট বৃদ্ধকে ফেরত দিয়ে বলল, “সবার থেকে পাঁচশ নিই, কিন্তু আপনার থেকে চারশই যথেষ্ট। ওনলি ফর ইউ, স্যার”

টেবিলের ডানদিকে পায়ার ওপরের দিকে ফিট করা বেলের সুইচ টিপতেই, রিসেপশনিস্ট মিলকি পাঠিয়ে দিল নেক্সট পেশেন্টকে। চেম্বারের দরজা ঠেলে ঢুকল এক মহিলা, সঙ্গে মলিন মুখের একটি ছেলে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক অগত্যা নিরুপায় হয়েই নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন চেম্বার থেকে।

চলবে... 


বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আমার বলা এই ধারণা সামান্য নয়, এই ধারণা থেকে বিশ্বসৃষ্টির সামর্থ হয়ে থাকে। সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা এই ধারণা দিয়েই নিশ্চিত বুদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং শ্রীহরিকে পরিতুষ্ট করে, প্রলয়কালে তাঁর যে সৃষ্টির স্মৃতি লোপ পেয়েছিল, তা আবার ফিরে পেয়েছিলেন। এই ভাবে অব্যর্থ সৃষ্টিশক্তির বলে তিনি পূর্বকল্পের মতোই এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

এই কারণে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বুদ্ধি স্থির রেখে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে সুখের লেশমাত্র না রেখে, শুধু দেহধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংগ্রহে চেষ্টা করবেন এবং যদি ওই দ্রব্য অন্য কোনভাবে পাওয়া যায়, তাহলে অতিরিক্ত সংগ্রহের চেষ্টাকে পণ্ডশ্রম মনে করে, সে বিষয়ে বিরত থাকবেন। ভূমিশয্যা থাকতে অন্য শয্যার প্রয়োজন কী? স্বাভাবিক বাহু থাকতে উপাধানের কী দরকার? যখন অঞ্জলি আছে, তখন নানা ধরনের তৈজসপত্রের কী দরকার? দিক-বল্কল থাকতে পট্টবস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা পণ্ডশ্রম নয় কী? যারা নিজেদের ফলে অন্যের পুষ্টি সাধন করে, সেই বৃক্ষরাজি কী ফল ভিক্ষা দানে বিমুখ হয়েছে? নদীসমূহ কী শুকিয়ে গিয়েছে? সমস্ত গিরিগুহার মুখ কী বন্ধ হয়ে গিয়েছে? ভগবান অজিত কী শরণাগতদের রক্ষা করেন না? বিনা কষ্টে পাওয়া এই সমস্ত বস্ত্র, ভোজন, পান ইত্যাদি সুলভ থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কিসের জন্য ধনগর্বে অন্ধ ধনীদের ভজন করেন? অতএব শ্রী ভগবান জীবের মনে নিজেই প্রকাশিত আছেন, তিনিই জীবের ভজনার ধন, তিনিই নিত্য সত্য আত্মা, এবং প্রিয়তম বিষয়; সংসারে আসক্তি ত্যাগ করে তাঁর ভজনা করলে পরমানন্দ অনুভব হয় এবং সংসাররূপ অনর্থের মূল অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞান দূর হয়ে থাকে।

হে রাজন, এর আগে আপনাকে আমি বৈরাজ পুরুষের ধারণার কথা বলেছি। 

[বৈরাজ শব্দটির অর্থ ব্রহ্মসম্বন্ধীয়। আমাদের শাস্ত্রে ব্রহ্মকে বলা হয় ধারণাতীত, অবাঙ্মনসোগোচর - অর্থাৎ তাঁকে আমাদের মননে উপলব্ধি করা যায় না, কিংবা তাঁকে কথা দিয়েও বর্ণনা করা যায় না। তবুও তিনি যে আছেন সে সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। তিনি এই বিশ্বের শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি বিশ্বের পালয়িতাও। তিনি একদিকে যেমন এই জগতের সমস্ত উদ্ভিদ, জীব ও জড় সৃষ্টি করেছেন, আবার তেমনই তাদের জীবন ধারণের জন্যে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল আশ্চর্য এক বাস্তুতন্ত্রও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে আমরা তাঁর স্থূল অস্তিত্ব বুঝতে পারি না। কিন্তু আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি সর্বত্র টের পাওয়া যায়। এই ধারণাকেই "বৈরাজ পুরুষের ধারণা" বলা হয়েছে।]               

 

ঈশ্বরের মূর্তিধারণা

এখন ভগবানের শ্রীমূর্তির ধারণা বর্ণনা করছি শুনুন। কোন কোন ভক্ত হৃদয়ের আকাশে প্রাদেশ-প্রমাণ অর্থাৎ তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগের ব্যবধান পরিমাপের চতুর্ভুজ পুরুষকে ধারণা করে থাকেন। তাঁর চারটি হাত শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মে সুশোভিত, প্রসন্ন মুখ, আয়ত কমললোচন ও কদম্বকেশরের মতো পীতবর্ণ বসন। তাঁর বাহু মহারত্নখচিত সোনার অঙ্গদে কমনীয়, মাথায় উজ্জ্বল মহারত্নময় সোনার কিরীট, কানে সোনার কুণ্ডল নিরুপম শোভায় মণ্ডিত। যোগেশ্বরগণ তাঁদের হৃদয় কমল আসনে তাঁর পায়ের পল্লব স্থাপন করেন। তাঁর বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন আঁকা, তাঁর গলায় সোনার সুতোর গ্রন্থিতে কৌস্তুভ মণি এবং অম্লানকান্তি বনমালা বিরাজিত। তিনি মেখলা, অঙ্গুরীয় ও নূপুর, কঙ্কণ ইত্যাদি ভূষণে বিভূষিত এবং তাঁর স্নিগ্ধ অমল কুঞ্চিত নীল কেশে কমনীয় মুখের হাসির আভায় ভুবন মুগ্ধ। তাঁর উদার লীলাময় হাস্য দৃষ্টিতে অনন্ত করুণার উদ্রেক।

হে মহারাজ, শ্রীহরির চরণযুগল থেকে শুরু করে হাস্য পর্যন্ত সকল অবয়ব ধ্যান করবেন, যে যে অঙ্গ অনায়াসে স্ফূরিত হবে, সেই অঙ্গ ত্যাগ করে অন্যান্য অঙ্গ ধ্যান করতে হবে। এইভাবেই মন থেকে চঞ্চলতা দূর হয়ে মন নির্মল হয়। শ্রীভগবান পরাবর; পর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা প্রমুখ এঁনার অবর অর্থাৎ কনিষ্ঠ। ইনি বিশ্বেশ্বর ও সর্বসাক্ষী; যতদিন পর্যন্ত এই ভগবানের প্রতি প্রেমভক্তির উদয় না হয়, ততদিন প্রত্যেকদিনের প্রয়োজনীয় কর্মের অনুষ্ঠান সেরে, নিষ্ঠা ভরে, এই পুরুষের স্থূলরূপ চিন্তা করবেন। আসন্নমৃত্যু ব্যক্তির যা কর্তব্য, আমি বর্ণনা করলাম। এখন ওই ব্যক্তি যদি নিজের দেহত্যাগের সঙ্কল্প করে থাকেন, তা হলে পুণ্যক্ষেত্র অথবা উত্তরায়ণ কালের দিকে মন না দিয়ে, স্থির ও সুখকর আসনে উপবেশন করে প্রাণায়ামে পঞ্চপ্রাণ জয় করবেন এবং মনে ইন্দ্রিয়দের সংযত করবেন। তারপর নিজের নির্মল বুদ্ধি দিয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বুদ্ধিকে ক্ষেত্রজ্ঞে লয় করবেন। যে আত্মা বুদ্ধি প্রভৃতিকে নিজের দৃশ্য বিষয় ও নিজেকে তাদের দ্রষ্টা বলে মনে করেন, সেই আত্মা কে ক্ষেত্রজ্ঞ বলে। ক্ষেত্রজ্ঞের শুদ্ধ স্বরূপ আছে, তাঁকে শুদ্ধ জীবাত্মা বলে। ক্ষেত্রজ্ঞ আত্মাকে শুদ্ধ জীবাত্মায় লয় করে, জীবকে ব্রহ্মে লয় করতে হয়। তারপর পরমা শান্তি লাভ করে, সকল কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত থাকবেন, কারণ মুক্ত ব্যক্তির সকল কর্তব্যের অবসান হয়ে থাকে।

মহারাজ, যে দেবতারা জগৎ ও প্রাণীদের উপর আধিপত্য করে থাকেন, তাঁরাও কালের বশীভূত কিন্তু ওই কাল, যে ব্রহ্মস্বরূপের কথা আপনাকে বললাম, তার উপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ নয়, সুতরাং দেবতারা কার উপর আধিপত্য করবে? শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, অহঙ্কার, বুদ্ধিতত্ত্ব বা প্রকৃতি কিছুই অবস্থান করতে পারে না। যিনি আত্মস্বরূপ লাভ করতে ইচ্ছা করেন, তিনি জগতের যাবতীয় বস্তুকে, “এতে আত্মা নেই, এতে আত্মা নেই” বলে পরিত্যাগ করেন এবং দেহকেই আত্মা বলে যে ভ্রান্ত জ্ঞান হয়েছিল, সেই জ্ঞানকেও ত্যাগ করেন, তারপর তিনি শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ নিত্য আলিঙ্গন করেন। যদি তিনি দেহ ত্যাগ করে সদ্য মুক্তি পেতে চান, তাহলে, প্রথমে পাদমূল দিয়ে মূলাধার অর্থাৎ গুহ্যদ্বার নিরুদ্ধ করে, অক্লান্তভাবে প্রাণবায়ুকে ছটি স্থানের মধ্যে দিয়ে ঊর্ধে উন্নীত করবেন। প্রথমে নাভি অর্থাৎ মণিপূরচক্রে অবস্থিত প্রাণবায়ুকে হৃদয় অর্থাৎ অনাহতচক্রে তুলে এনে, উদান বায়ুর গতি অনুসরণ করে কণ্ঠের নীচে অবস্থিত বিশুদ্ধচক্রে তুলে আনবেন। পরে মনকে সংযত করে ওই বায়ুকে ধীরে ধীরে তালুমূলে অর্থাৎ বিশুদ্ধচক্রের আগে নিয়ে আসবেন। তারপর চোখ, কান, নাক ও মুখ এই সাতটি দ্বার রুদ্ধ করে প্রাণকে ভ্রূমধ্যে অবস্থিত আজ্ঞাচক্রে তুলে আনবেন। ভোগবাসনা যদি একান্তই ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে অর্ধমূহুর্তকাল অপেক্ষা করে, ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে পরব্রহ্মে মিলিত হবেন এবং সেই মূহুর্তেই দেহ ও ইন্দ্রিয় সকল পরিত্যাগ করবেন।

হে রাজন, যোগেশ্বরগণের লিঙ্গশরীর বায়ুর থেকেও সূক্ষ্ম; তাঁরা লিঙ্গশরীরে ভূলোক, প্রেতলোক ও স্বর্গলোক এই ত্রিভুবনের মধ্যে অবস্থিত যে কোন লোকে অথবা এর বাইরে মহর্লোকে, এমনকি ব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও যেতে পারেন। তাঁদের শক্তি অতুলনীয়, তাঁরা উপাসনা, তপস্যা, অষ্টাঙ্গযোগ ও সমাধিজ্ঞান দিয়ে যে শক্তিলাভ করেন, মানুষ সাধারণ কর্ম দিয়ে সেই শক্তি লাভের কল্পনাও করতে পারে না।


মহামুক্তি ও ঈশ্বর-লীন   

মহারাজ, সুষুম্না নামে একটি নাড়ী দেহস্থ সকল চক্র ভেদ করে সহস্রার পর্যন্ত গিয়েছে, তারপর সেই নাড়ী আকাশপথ পার হয়ে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। যোগী ওই জ্যোতির্ময় ব্রহ্মপথ ধরে, প্রথমে অগ্নিলোকে উপস্থিত হন, সেখানে নির্মল হয়ে অর্থাৎ আসক্ত না হয়ে আরো উঁচুতে শিশুমারচক্র অর্থাৎ তারারূপ নারায়ণের অধিষ্ঠানভূমি লাভ করেন, অর্থাৎ সূর্য থেকে আরম্ভ করে ধ্রুবলোক পর্যন্ত যেতে পারেন। শ্রীবিষ্ণুর এই চক্র, বিশ্বের নাভি স্বরূপ, কারণ ওই জ্যোতিশ্চক্রই সূর্য ইত্যাদি নক্ষত্রের আশ্রয়স্থান। যোগী এই স্থান পার হয়ে নির্মল লিঙ্গশরীরে ব্রহ্মবিদদের বন্দনীয় মহর্লোকে যেতে পারবেন। এই স্থানে যাওয়ার সামর্থ স্বর্গবাসীদেরও নেই। এই স্থানে মহর্ষিরা কল্পান্তকাল পর্যন্ত মহানন্দে বাস করেন। ওই যোগী যদি ওই লোকে বাস করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে এক কল্প কাল পর্যন্ত বাস করতে পারেন, পরে কল্পের অবসানে যখন অনন্ত ভগবানের মুখের আগুনে বিশ্ব দগ্ধ হতে থাকে, তখন সেই লোক পর্যন্ত সেই উত্তাপ অনুভব করা যায়। তখন তিনি দ্বিপরার্ধকাল স্থায়ী ব্রহ্মলোকে অর্থাৎ সত্যলোকে যেতে পারেন। এই লোকে শোক, জরা, মৃত্যু বা অন্য কোন বিষয়ে উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকে না। সত্যলোকবাসিদের শুধুমাত্র মানসিক দুঃখের অনুভব থাকে। “সংসারী লোক শ্রীভগবানের ধ্যানপথ ভুলে এই মনোহর লোকে আসতে পারছে না এবং সংসারের দুঃখে পীড়িত হচ্ছে” এই চিন্তাই তাঁদের চিত্তে করুণার সৃষ্টি করে ও মানসিক ক্লেশ উৎপন্ন করে। তা না হলে অন্য কোন দুঃখ তাঁদের অনুভব হয় না।

হে মহারাজ, যাঁরা এই সত্যলোকে আসেন, তাঁদের তিন রকমের গতি আছে। যাঁরা উৎকৃষ্ট পুণ্যের বলে এই লোকে আসেন, তাঁরা অন্য কল্পে যাঁর যেমন পুণ্য, সেই পুণ্যের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। যাঁরা হিরণ্যগর্ভ নারায়ণের উপাসনাবলে এই লোক লাভ করেন, তাঁরা দ্বিপরার্ধকাল শেষ হলে ব্রহ্মার সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন। আর যাঁরা ভগবানের ভক্ত, তাঁরা স্বেচ্ছায় ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করে বৈষ্ণবপদ অর্থাৎ বিষ্ণুলোকে চলে যেতে পারেন। হে মহারাজ, তাঁদের ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করার প্রক্রিয়া কিরকম, বলছি শুনুন।

ভগবানের ভক্ত প্রথমে লিঙ্গদেহকে পার্থিব অর্থাৎ পৃথিবীতত্ত্বে নির্মাণ করে, নির্ভয়ে ব্রহ্মাণ্ডের পার্থিব আবরণ ভেদ করেন। তারপর জলময় মূর্তিতে জলের আবরণ, অনলমূর্তিতে অগ্নিলোক, বায়ুমূর্তিতে বায়ুলোক, ও আকাশমূর্তিতে পরমাত্মার আকাশরূপ আবরণ ভেদ করে থাকেন। এই সকল আবরণ ভেদ করার সময়, তাঁরা ওই সকল লোক ভোগ করতে করতেই যান। যোগী ঘ্রাণ দিয়ে গন্ধ, জিহ্বা দিয়ে রস, দৃষ্টি দিয়ে রূপ, চর্ম দিয়ে স্পর্শ ও কান দিয়ে আকাশগুণ শব্দ উপভোগ করতে থাকেন এবং কর্ম ইন্দ্রিয় দিয়ে কাজও করতে থাকেন। এইভাবে তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূত অতিক্রম করে তাদের আবরণস্বরূপ অহঙ্কারতত্ত্বে পৌঁছে যান। এই অহঙ্কারতত্ত্ব তিন প্রকারের, তামস, রাজস ও সাত্ত্বিক। তামস থেকে জড় সূক্ষ্ম ভূতসমূহ, রাজস থেকে বহির্মুখ দশ ইন্দ্রিয় এবং সাত্ত্বিক থেকে মন ও ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের সৃষ্টি হয়। এই তিন অহঙ্কারের সঙ্গে নিজের লিঙ্গদেহকে এক করে, তিনি বিজ্ঞানতত্ত্ব অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব লাভ করেন। এই মহত্তত্ত্বের সঙ্গে নিজের লিঙ্গশরীরকে এক করে, তিনি নিখিল গুণের লয়স্থান প্রকৃতিতে পৌঁছে যান। তারপর প্রকৃতিরূপে আনন্দময় হয়ে সকল উপাধি অর্থাৎ দেহ পরিত্যাগ করে শান্ত ও পরমানন্দস্বরূপ অবিকৃত পরমাত্মাকে লাভ করেন। যিনি এই ভাগবতী গতি লাভ করতে পারেন, তাঁকে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না”

তারপর শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনার কাছে সদ্যমুক্তি ও ক্রমমুক্তি, দুটি পথের কথাই বর্ণনা করলাম। এই বর্ণনা আমার নিজের কল্পনা থেকে বানিয়ে বলা নয়এই দুই সনাতন পন্থা বেদেও বলা হয়েছে। আগে ভগবান বাসুদেব, ব্রহ্মার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সংসারবদ্ধ জীবের মুক্তির জন্য তপস্যা, যোগ ইত্যাদি নানান পথ আছে, কিন্তু এর মতো সুখকর ও নির্বিঘ্ন পথ আর দ্বিতীয় নেই। এই পথ অনুসরণ করলে, ভগবান বাসুদেবে ভক্তিযোগ উৎপন্ন হয়।

হে রাজন, যে বিষয় আমাদের পরিচিত অর্থাৎ যাকে আমরা আগেই অনুভব করেছি, সেই বিষয়েই আমাদের রতি হতে পারে। কিন্তু যে বিষয় কোনদিন আমাদের অনুভব হয় নি, সে বিষয়ে রতি হওয়া অসম্ভব। সুতরাং শ্রীহরি আগে আমাদের অনুভবে না এলে, কিভাবে তাঁর প্রতি রতি আসা সম্ভব এমন চিন্তা করবেন না। এর কারণ আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, মন দিয়ে শুনুন।

আমাদের বুদ্ধি প্রভৃতি যা কিছু দেখা যায়, সবই জড়, তা হলে এই যে সব জড় পদার্থ রয়েছে, তার সাক্ষ্য কে দিচ্ছে? শ্রীহরিই একমাত্র দ্রষ্টা বা সাক্ষী; তিনিই সর্বভূতের অন্তর্যামীরূপে থেকে বুদ্ধি প্রভৃতিকে প্রকাশ করছেন। অতএব তিনি না থাকলে জড় বুদ্ধির প্রকাশ হত না, এই প্রমাণে আমরা আমরা শ্রীহরিকে অনুভব করতে পারছি। এছাড়া অন্য এক প্রমাণেও শ্রীভগবানের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। আমরা দেখতে পাই, কুঠার বা অন্য কোন যন্ত্র নিজে নিজে কোন কাজই করতে পারে না, তাদের ব্যবহারের জন্য অন্য একজন পৃথক কর্তার প্রয়োজন হয়। সেই রকম, আমাদের বুদ্ধি কিংবা অন্যান্য বৃত্তি যন্ত্র ভিন্ন আর কিছুই নয়, অথচ এরা সকলেই জড়। তাহলে কে এই বুদ্ধি নামক যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে, জ্ঞান নামক কর্মটিকে সম্পন্ন করছেন? এই ভাবে অনুমানের প্রমাণ দিয়েও একজন স্বতন্ত্র কর্তা ঈশ্বর আছেন, এই অনুভব করা যায়। সাধুব্যক্তিরা শ্রীভগবানকে আত্মরূপে প্রকাশমান বলে সর্বদাই অনুভব করে থাকেন। যাঁরা এই ভগবানের কথামৃত শ্রবণরূপ ওষ্ঠ দিয়ে পান করেন, তাঁদের বিষয়ের স্পর্শে মলিন চিত্ত পবিত্র হয় এবং তাঁরা শ্রীভগবানের চরণপদ্মে অবস্থান করে থাকেন।


মানুষের কর্তব্য 

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে মহারাজ, জীব বহু যোনিতে জন্ম নিতে নিতে দৈবযোগে মনুষ্যত্ব লাভ করেতাদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী এবং জ্ঞানীদের মধ্যেও যাঁরা মুমুক্ষু অর্থাৎ মুক্তির ইচ্ছা করেন, তাঁদের কর্তব্য সম্বন্ধে আপনি যা প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে শ্রীহরিকথা শোনা একটি অবশ্য কর্তব্য বলেই আমি উল্লেখ করলাম। যাঁদের মন্দবুদ্ধি তাঁরা নানা দেবতার ভজনা করেন। যিনি ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, তিনি বেদপতি ব্রহ্মার উপাসনা করেন। এইভাবে, যাঁরা ইন্দ্রিয়ের দক্ষতা কামনা করেন তাঁরা ইন্দ্রের, সন্তান কামনায় দক্ষ ও অন্য প্রজাপতির, ঐশ্বর্যকামী শ্রীদুর্গার, তেজ কামনাকারী অগ্নির, ধনের প্রত্যাশীরা বসুগণের ও বীরত্বের কামনায় রুদ্রগণের উপাসনা করে থাকেন। যাঁরা অন্নের প্রার্থী তাঁরা অদিতির, স্বর্গ কামনায় দ্বাদশ আদিত্যের, সুষ্ঠু রাজ্যপরিচালনায় বিশ্বদেবগণের, কৃষি ও বাণিজ্যের কামনায় সাধ্যগণ, আয়ুর বাসনায় অশ্বিনীকুমারদ্বয়, পুষ্টির জন্যে পৃথিবীদেবী, প্রতিষ্ঠার কামনায় লোকমাতা দ্যাবাপৃথিবীর, রূপের সাধনায় গন্ধর্বগণের, স্ত্রীর কামনায় অপ্সরা উর্বশীর ভজনা করেন। সকলের উপর আধিপত্যকামী পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার, যশ প্রার্থী যজ্ঞেশ্বের বিষ্ণুর, ধনসঞ্চয়ের জন্য প্রচেতার, বিদ্যার জন্য গিরীশের, দাম্পত্যসুখের কামনায় সতী উমাদেবীর, ধর্মের জন্য উত্তমশ্লোক বিষ্ণুর, বংশবিস্তারের জন্য পিতৃগণের, বিঘ্ন নিবৃত্তির জন্য যক্ষগণের উপাসনা করেন। রাজত্বের কামনায় মন্বন্তরের অধিপতি দেবগণের, শত্রুবিনাশের জন্য রাক্ষসগণের, ভোগের ইচ্ছায় সোমের এবং বৈরাগ্য কামনায় প্রকৃতির প্রকৃত অধিষ্ঠাতা ঈশ্বরের যজনা করেন।

কিন্তু যিনি উদারবুদ্ধি, একান্ত ভক্ত, তাঁর এই সকল কামনা থাকুক কিংবা না থাকুক, অথবা তাঁহার মোক্ষলাভের অভিলাষ থাকুক, তিনি তীব্র ভক্তিযোগে পরমেশ্বরের ভজনা করেন। হে রাজন, হরিকথা শুনতে শুনতে প্রথমে জ্ঞানের উদয় হয়, এই জ্ঞানে রাগ, দ্বেষ প্রভৃতি নিবৃত্ত হয়, এবং সকল বিষয়ে বৈরাগ্য জন্মায়। বৈরাগ্যের উদয়ে চিত্তে প্রসন্নতা আসে ও ভক্তিযোগের উদয় হয়, এই পন্থাকেই শাস্ত্রে কৈবল্য পথ বলা হয়ে থাকে” 

শ্রী শৌণক বললেন, “ভরতকুলতিলক রাজা পরীক্ষিৎ এইসব কথা শোনার পর বেদজ্ঞ ও পরমব্রহ্মদর্শী শুকদেবকে আর কী জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের শুনতে ইচ্ছা হয়। পাণ্ডুকুলতিলক পরীক্ষিৎ ও ব্যাসনন্দন শ্রী শুকদেব দুজনেই ভগবান বাসুদেব পরায়ণ। অতএব এই দুই সাধু ব্যক্তির উরুগায় অর্থাৎ মহাযশা ভগবানের গুণাবলীপূর্ণ মহৎ কথার প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। সূর্যদেব প্রত্যেকদিন উদিত ও অস্তমিত হয়ে মানুষের আয়ুক্ষয় করছেন, অতএব ভগবান বাসুদেবের পুণ্যকথা ছাড়া অন্য সকল প্রসঙ্গই বৃথা কালক্ষয় করে। তরুসমূহ কি জীবন ধারণ করে না? কর্মকারের ভস্ত্রা অর্থাৎ বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র কি শ্বাসক্রিয়া করে না? গ্রামের অন্যান্য পশু কি ভোজন ও রতিক্রিয়ায় কাল হরণ করে না? অতএব কেবল জীবনধারণ, শ্বাসক্রিয়া, ভোজন ও মিথুন মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয়। শ্রীকৃষ্ণের মধুরিমা যে মানুষের কানে পৌঁছায়নি, সে ব্যক্তি কুকুরের মতো অবজ্ঞার পাত্র, গ্রাম্য শূকরের মতো মলিন বিষয়ে আসক্ত, উটের মতো  বিষয়রূপ কষ্টকর কাঁটা চর্বণে ব্যস্ত এবং গাধার মতো অপরের ভার বৃথা বহন করে।

হে সূত, মানবের যে দুই কান শ্রীহরির গুণকথা না শোনে, সেই কান দুইটি ছিদ্র মাত্র। যে জিহ্বা ভগবানের মধুর চরিত্র কীর্তন না করে, সেই জিভ ব্যাঙের জিভের মতো। যে উত্তমাঙ্গ অর্থাৎ মাথা মুকুন্দের পায়ে অবনত না হয়, সেই মাথা মূল্যবান মুকুটে শোভিত হলেও বৃথা ভারের মতো। যে হাত ভগবানের সেবায় ব্যবহৃত হয় না, সেই হাত কঙ্কন-বলয় শোভিত হলেও, শবদেহের হাতের মতোই কুৎসিত। যে চোখ শ্রীহরির মূর্তি লক্ষ্য করেনা, সেই চোখ ময়ুরপুচ্ছের মতো, যে পা শ্রীহরি ক্ষেত্রে গিয়ে ধন্য হয় না, সেই পা গাছের শিকড়ের মতো। যে ব্যক্তি মুকুন্দের চরণধুলা মাথায় নেয়নি কিংবা তাঁর চরণের তুলসীপাতার গন্ধের ঘ্রাণ নেয়নি, সেই মানুষ জীবন্মৃত। যে হৃদয় শ্রীকৃষ্ণ নামে বিগলিত হয়ে আনন্দের অশ্রুধারা ও অঙ্গে পুলক সৃষ্টি না করে, সন্দেহ নেই, সেই হৃদয় পাথরের মতোই নিষ্প্রাণ।

হে সূত, অভক্তের সমস্তই ব্যর্থ হয়ে যায়। ভক্তচূড়ামণি ব্যাসনন্দন আর যা যা বলেছিলেন, আপনি আমাদের সবিস্তারে বর্ণনা করুন”

চলবে...


বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


এর আগের পর্ব - ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ২ "


টাইম পিস (time piece) এবং পকেট ঘড়ি (Pocket watch)

এবার অ্যালার্ম দেওয়া টাইম-পিস ঘড়ির ভেতরের জটিল কথা একটু সহজ করে বলার চেষ্টা করছি। এই ঘড়িতে ছোট্ট ছোট্ট অনেক পার্টস বা অংশ থাকে। তাদের মধ্যে প্রধানগুলি হল,

১. অ্যাংকার (anchor) - এটি একটি লিভার, ঘড়ির পেছনে লাগানো থাকে,  

এর কাজ হল এস্কেপমেন্ট গিয়ারকে একজায়গায় ধরে রাখা এবং গিয়ারের এক একটি দাঁতকে ঘুরতে দেওয়া। এই লিভারের সঙ্গে আরেকটি লিভারও জুড়ে দেওয়া হয়, যেটি অ্যালার্ম গিয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে।

২.  ব্যালান্স স্প্রিং (balance spring) – হেয়ার স্প্রিং ও ব্যলান্স হুইল মিলে ব্যলান্স স্প্রিং বানানো হয় । এরা দুজনে মিলে নির্দিষ্ট সময়ের মাপে অ্যাংকারকে কেন্দ্র করে দুলতে (oscillate) থাকে। খুব পাৎলা ধাতব তার দিয়ে হেয়ার স্প্রিং বানানো হয়। এই স্প্রিং বিশেষ এক ধরনের সংকর ধাতু, নিভারক্স (nivarox) দিয়ে বানানো হয়।

এই ধাতুর  বিশেষত্ব হল, খুব গরম অথবা ঠান্ডার সময়, এই ধাতুর বৈশিষ্ট্যে তেমন কোন পরিবর্তন হয় না। যার ফলে, সব ঋতুতেই ঠিকঠাক সময় হিসেব করতে পারে। ব্যালান্স স্প্রিংয়ের সাহায্যে ব্যালান্স হুইল এস্কেপমেন্টের তত্ত্ব মেনে নির্দিষ্ট সময়ে দুলতে থাকে এবং সময়কে নির্দিষ্ট ভাগে গুনতে থাকে।    

৩. মেন স্প্রিং (Main spring) – মেন স্প্রিংয়ের কাজ হল শক্তি সঞ্চয় করা, এই স্প্রিংয়ের জট একটু একটু খুলতে থাকলে ব্যালান্স স্প্রিংয়ের দোলা ও এস্কেপমেন্ট চলতে থাকে। এই ধরনের ঘড়িতে দিনে একবার দম (winding) দেওয়ার নিয়ম ছিল। দম দেওয়া মানে স্প্রিংটিকে পাকিয়ে তোলা। একবার পুরো দম দিলে একটি ঘড়ি ২৪ ঘন্টা থেকে ছত্রিশ ঘন্টা পর্যন্ত চলতে থাকত ঠিকঠিক টিকটিক। আবার দম বেশি হয়ে গেলে, এই স্প্রিং কেটে গিয়ে ঘড়ি বন্ধই হয়ে যেত। এই মেন স্প্রিংয়ে দম দেওয়ার জন্যে ঘড়ির পেছনদিকে চাবি লাগাতে হত, একটি ঘড়ির জন্যে অন্যটি অ্যালার্মে ঘন্টি বাজানোর জন্যে।  পাশের ছবিতে মেন স্প্রিং ও চাবির ছবি দেওয়া হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলে রাখি, আগেকার দিনে খুব বড়লোকদের বাড়িতে ঘরে ঘরে ছোট বড়ো অনেক ঘড়ি থাকত। দিনের কোন এক সময়, সাধারণতঃ একটু বেলার দিকে সেই সব ঘড়িতে শুধু দম দেওয়ার জন্যেই এক বা একাধিক লোক থাকতেন। তাঁদের পদ (designation) ছিল “ঘড়িবাবু” (winding man)।

ঘড়িতে এই দম দেওয়া ব্যাপারটা বেশ নিয়মিত দায়িত্বের কাজ ছিল, কারণ দম না দেওয়ার ফলে ঘড়ি যদি বন্ধ হয়ে যায়, কাছাকাছির মধ্যে ঘড়িওয়ালা লোক বা বাড়ি না পেলে সময় মিলিয়ে নেওয়ার কোন উপায় থাকত না। আর আগেই বলেছি, বেশি দম দিয়ে ফেললে ঘড়ি বিগড়েই যেত, তখন বড়ো শহর ছাড়া সে ঘড়ি সারানো সম্ভব হত না, সেক্ষেত্রে ঘড়ি সারানোটাও বেশ সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠত।          

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বালক পুত্র রবিকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছুদিনের জন্যে যখন হিমালয় বেড়াতে গিয়েছিলেন, তখন রবিকে তাঁর হাত ঘড়িতে দম দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রবি এই দায়িত্ব পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন, কারণ পিতা তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়াতে তিনি নিজেকে সাবালক ভাবতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অতি উৎসাহে দম দিতে গিয়ে তিনি যে ঘড়িটি খারাপ করে ফেলেছিলেন, সে কথাও তিনি তাঁর "জীবন স্মৃতি" গ্রন্থে বলতে ভোলেননি!  

 ৪. গিয়ার ট্রেন (Gear train) – এইবার দম দেওয়া মেন স্প্রিংয়ের একটি করে গাঁট বা ঘাট খুলতে থাকার সঙ্গে ব্যালান্স হুইল ও ব্যালান্স স্প্রিং এস্কেপমেন্ট পদ্ধতিতে দুলতে শুরু করে। সেই দোলার সময়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন মাপের গিয়ারগুলিও ঘুরতে থাকে। গিয়ারগুলির সাইজ ও তার ঘাটগুলি খুব হিসেব করে বানাতে হয়, সে কথা বলাই বাহুল্য।  এক একটি গিয়ার বিভিন্ন সময়ের কাঁটাকে ঘোরাতে থাকে। যেমন সব থেকে ছোটটি সেকেণ্ডের কাঁটাকে ঘোরায়, তার পরেরটি মিনিট, সব থেকে বড়োটি ঘন্টার।


এই গিয়ার বা পিনিয়নগুলি যেমন যেমন ঘুরতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে থাকে তার কেন্দ্রের শ্যাফট (shaft), যার মাথায় নির্দিষ্ট লেভেলে ঘড়ির কাঁটাগুলিও ঘুরতে থাকে আর ঘড়ির সামনের ডায়ালের ওপর লেখা সময়কে নির্দেশ করে আমাদের ঘন্টা মিনিট, সেকেণ্ড দেখাতে থাকে।  

 ওপরের ছবিতে মেন স্প্রিংয়ের ব্যারেল B থেকে এস্কেপ হুইল Eকে দোলানোর শক্তি যোগায়, সঙ্গে  Z1 কেন্দ্রিয় হুইল, Z3 তিন নম্বর হুইল, Z5 চারনম্বর হুইলকেও ঘোরাতে থাকে। এই হুইলগুলি আবার যথাক্রমে Z2, Z4 এবং Z6 পিনিয়নগুলিকে ঘুরিয়ে ঘড়ির কাঁটা ঘোরাতে থাকে। পিনিয়নের মাথায় কাঁটাগুলি এক লেভেলে বা একই তলে থাকতে পারবে না, তাই সব থেকে ওপরে সেকেণ্ডের, তার নিচে মিনিট এবং সব শেষে ঘন্টার কাঁটা বসানো হয়একটি পকেট ঘড়ির ভেতরের নানান পার্টস্‌ এবং তার পাশে সুদৃশ্য একটি পকেট ঘড়ির ছবি নীচেয় দেওয়া হল।   


    প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে, দম দেওয়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি অথবা ব্যালান্স স্প্রিং ব্যবহার করা টেবিল ঘড়ি ও হাতঘড়ির রাজত্ব চালু ছিল। বিশ্বের সেরা যান্ত্রিক (Mechanical) ঘড়ি তৈরিতে একসময় সুইজ্যারল্যাণ্ডের ভীষণ সুনাম ছিল এবং বিশ্বের লোকের কাছে সুইস (Swiss) ঘড়ির আলাদা কদর ছিল। মোটামুটি ১৯৮০ সাল নাগাদ যখন থেকে ইলেকট্রনিক কোয়ার্জ্‌ (Electronic Quartz) ঘড়ি আবিষ্কার হল, তখন থেকে আমাদের জীবন থেকে যান্ত্রিক ঘড়ি তার মহিমা হারিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করল।

রাত্রে দেরি করে বাড়ি ফেরা সন্তানের অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা অথবা স্বামীর প্রতীক্ষায় থাকা স্ত্রীদের উৎকণ্ঠিত হৃৎ-স্পন্দনের সঙ্গে যে ঘড়ির টিকটিক অথবা টিকটক আওয়াজ মিশে যেত, আমাদের এখনকার ব্যস্ত জীবন থেকে সেই সব যান্ত্রিক ঘড়ি আজ মোটামুটি অবলুপ্ত।

অত্যাধুনিক ঘড়ি বলতে আমরা বুঝি কোয়ার্জ্‌ (Quartz) ঘড়ি। এই ঘড়িতে একটি বৈদ্যুতিন দোলক (Electronic oscillator) ব্যবহার করা হয়, যেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যাল (Quartz crystal) সময়ের সূক্ষ্ম হিসেব করে। বিশ্বের প্রথম কোয়ার্জ্‌ ঘড়িটি ১৯২৭ সালে বানিয়েছিলেন বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিসের (Bell Telephone Laboratories) Warren Marrison এবং J. W. Hortonযদিও বিশ্বের প্রথম কোয়ার্জ হাতঘড়িটি বানিয়েছিল সিকো (Seiko) কোম্পানি ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে, তাদের সেই মডেলটির নাম ছিল অ্যাসট্রন (Astron)তারপর মোটামুটি ১৯৮০ সাল থেকে সবধরনের ঘড়ি – বড়, ছোট, হাত ঘড়ি, এমন কি কম্পিউটার – এক কথায় যে যে যন্ত্রে (appliance) ঘড়ি ব্যবহার করা হয় সব ঘড়িতেই এই কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যাল পদ্ধতি কাজে লাগানো শুরু হয়ে গেল। তার কারণ এই পদ্ধতি দিয়ে সময় পরিমাপের ভ্রান্তি (error) অত্যন্ত কম, প্রত্যেকদিন দম দেওয়ার ঝামেলা এবং অন্যান্য নিয়মিত মেরামতির ঝক্কি নেই এবং যান্ত্রিক ঘড়ির তুলনায় দামও বেশ কম।

কোয়ার্জ্‌ ঘড়ির অন্দর মহলে ঢোকার আগে কোয়ার্জ্‌ জিনিষটা কী, সেটা একটু জেনে নেওয়া যাক। কোয়ার্জ্‌ হল একটি খনিজ যৌগ যার রাসায়নিক নাম সিলিকন ডায়ক্সাইড (SiO2 – silicon dioxide)প্রকৃতিতে এই খনিজটির অফুরন্ত ভাণ্ডার বললেও কম বলা হয়। প্রায় সব ধরনের বালি এবং পাথরের মধ্যে এই কোয়ার্জ্‌ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। অনেক সময় অনেকগুলি কোয়ার্জের যৌগ একত্র হয়ে সিলিকন-অক্সিজেন টেট্রাহেড্রা (SiO4) কেলাস বা ক্রিস্ট্যাল হিসেবেও প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি কম্পিউটার এবং সকল ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে ব্যবহৃত চিপ এবং মাইক্রোচিপ (chip and micro-chips) বানানো হয় এই সিলিকন মৌল থেকেই।               

 

 বালুতে মিশে থাকা কোয়ার্জ্‌      কোয়ার্জের ক্রিস্ট্যাল            কোয়ার্জের ক্রিস্ট্যাল

কোয়ার্জের যে অনুপম গুণের জন্যে এটি আধুনিক বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেই গুণটি হল এটির পিজোইলেক্ট্রিক (piezoelectric) ধর্ম। কোয়ার্জ্‌ ক্রিষ্ট্যালের ওপর যদি প্রচণ্ড চাপ (stress) দেওয়া হয়, তাহলে কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যালের মধ্যে খুব মৃদু ভোল্টেজের বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আবার উল্টোদিকে কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যালের মধ্যে যদি খুব সামান্য ভোল্টেজের বিদ্যুতের প্রবাহ পাঠানো যায়, ক্রিস্ট্যালের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট হিসেবের দোলন (Oscillation) বা কম্পন (vibration) লক্ষ্য করা যায়। খুব সহজ কথায় বললে কোয়ার্জের এই আশ্চর্য গুণটিকেই পিজোইলেকট্রিক ধর্ম বলে।

কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যালের এই পিজোইলেকট্রিক ধর্মটিকেই পেণ্ডুলামের দোলন (Oscillation) পদ্ধতির বদলে ব্যবহার করা হয়। যে কোন কোয়ার্জ্‌ ঘড়ির ভেতরে একটি ব্যাটারি থাকে, এই ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ একটি বৈদ্যুতিন বর্তনির (Electronic circuit) মাধ্যমে কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যালের মধ্যে সঞ্চার করা হয়। এই বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যালটি সামনে – পিছনে দুলতে থাকে বা কাঁপতে থাকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই কম্পনের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা আছে, প্রতি সেকেণ্ডে ৩২৭৬৮ বার – একবার বেশিও নয়, কমও নয়! 

বৈদ্যুতিন বর্তনি, কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যালের এই কম্পনকে গুণতে থাকে, এবং প্রতি সেকেণ্ডে একটি তড়িতাঘাত (pulse) দিতে থাকে। এই তড়িতাঘাত সরাসরি এলসিডি ডিসপ্লের (LCD Display) পর্দায় সংখ্যা দিয়ে সময় দেখায় অথবা ছোট্ট একটি মোটরের সাহায্যে সেকেণ্ড, মিনিট ও ঘন্টার কাঁটার গিয়ার ঘোরাতে থাকে।

  ওপরের ছবিতে বিখ্যাত সিকো কোম্পানীর  কোয়ার্জ ঘড়ির ভেতরের নানান যন্ত্রাংশ দেখতে পাবে, তার মধ্যে প্রধান যন্ত্রাংশের নামগুলি নিচেয় দেওয়া হলঃ-

১. ব্যাটারি – ছমাস থেকে একবছর কাজ করে।

২. মাইক্রোমোটর – এই মোটরের শ্যাফ্‌ট্‌ থেকেই কাঁটার গিয়ারগুলি ঘোরে।

৩. মাইক্রোচিপ – মাইক্রোচিপ কোয়ার্জের কম্পন গোনে এবং তড়িতাঘাত পাঠায়।

৪.  বর্তনি – এই বর্তনি মাইক্রোচিপ এবং ঘড়ির অন্যান্য যন্ত্রাংশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

৫. কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যাল অসিলেটার – বিদ্যুতের প্রবাহে এটি দুলতে বা কাঁপতে থাকে।

৬. ক্রাউন স্ক্রু – এই স্ক্রু ঘুরিয়ে সময় বদল করা যায়।

৭. গিয়ারের সেট – নানান সাইজের গিয়ারের সেট, ঘন্টা, মিনিট, সেকেণ্ডের কাঁটা ঘোরায়, এমনকি দিন এবং মাসের হিসেবও দেখায়।

৮. গিয়ারের শ্যাফট – এই শ্যাফটটি গিয়ারগুলিকে ধরে রাখে। 


    ওপরের পাঁচ নম্বরে দেখানো কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যাল অসিলেটারের ধাতব ঢাকনার ভেতরে টিউনিং ফর্কের আকারে কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যাল রাখা থাকে, বিদ্যুতের প্রভাবে এটিতেই সেকেণ্ডে ৩২৭৬৮ বার কম্পন হয়। হাতের আঙুলের তুলনায় এটির আকার কত ছোট্ট, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো।

 পেণ্ডুলাম এবং যান্ত্রিক ঘড়ির সমস্যা ছিল, নিয়মিত দম দেওয়া। দম দিতে ভুল হয়ে গেলে ঘড়ি বন্ধ হয়ে যেত। কোয়ার্জ ঘড়ি ব্যাটারিতে চলে, ভালো ব্যাটারি হলে ছমাস থেকে একবছর ঘড়ি নিশ্চিন্তে চলতে থাকে। পেণ্ডুলাম ঘড়ির আরেকটা সমস্যা ছিল, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পেণ্ডুলামের গতিকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। সেক্ষেত্রে কলকাতা থেকে কেনা পেণ্ডুলাম ঘড়ি দার্জিলিংয়ে ব্যবহার করলে, সময়ের গণ্ডগোল হত। তার ওপর পেণ্ডুলাম ঘড়ির পেণ্ডুলামের দৈর্ঘ,  প্রচণ্ড গ্রীষ্ম অথবা শীতের আবহাওয়ার কারণে কিছুটা বড়-ছোট হয়ে যেত, সে কারণে ঘড়ির সময়েও পার্থক্য হত।

কোয়ার্জ্‌ ঘড়িতে এই সমস্যার সবগুলিই সমাধান হয়ে গেছে। কিতু তাই বলে এই ঘড়িতেও সারাবছর সর্বদা এবং সর্বত্র নির্ভুল সময় দেবে তাও কিন্তু নয়। কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যাল নিখুঁত কাজ করে ২৫০ থেকে ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। এর থেকে তাপমাত্রা কমবেশি হলে, কোয়ার্জের কম্পাঙ্ক কমে যায়। প্রতি দশ ডিগ্রি তাপমাত্রা কমবেশিতে, বছরে মোটামুটি ১১০ সেকেণ্ড সময়ের পার্থক্য হয়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় বছরে এই সময়টুকুর তারতম্যকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্যে আজকাল কৃত্রিম উপায়ে বিভিন্ন কাজের উপযোগী বিশেষ কোয়ার্জ ক্রিস্ট্যাল বানানো হচ্ছে! সেক্ষেত্রে এই কৃত্রিম কোয়ার্জ্‌ ক্রিস্ট্যালগুলির, এভারেস্টের চূড়া থেকে মরুভূমি সাহারায় শিহরণ বা কম্পাঙ্ক একই থাকবে!

কৃতজ্ঞতাঃ সিকো ঘড়ি নির্মাতা সংস্থা, আই আই টি, কানপুর ও উইকিপিডিয়া 

সমাপ্ত 


নতুন পোস্টগুলি

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...