মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২১"]


৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব (আগের পর্বের পরে) 

সুষুম্না নাড়ীতে ছটি পদ্ম আছে, একদম নিচে মূলাধার, তারপর ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা। তন্ত্রমতে এই ছটি পদ্মকে বলে চক্র – ষট্‌চক্র ভেদই তন্ত্র সাধনার মূল উদ্দেশ্য, বেদে এই ছটি পদ্মকে বলা হয় ভূমি। মূলাধারের অবস্থানের কথা আগেই বলেছি, স্বাধিষ্ঠান চক্রের অবস্থান উপস্থের, মণিপুর নাভিমণ্ডলের, অনাহত হৃদয়ের, বিশুদ্ধ কণ্ঠের এবং আজ্ঞা চক্র ভ্রূর সমান্তরালে অবস্থান করে। সাধনার বিভিন্ন পর্যায়ে সুষুম্নানাড়ী পথে কুণ্ডলিনী শক্তি এক একটি চক্র ভেদ করে উপরের দিকে উঠতে থাকে। কুণ্ডলিনী যখন হৃদয়ের অনাহত চক্র স্পর্শ করে তখন সাধকের মন থেকে সমস্ত কামনা বাসনার অবসান হয়, সাধক অদ্ভূত এক জ্যোতি দেখতে পান। এরপর কুণ্ডলিনী বিশুদ্ধ চক্র স্পর্শ করলে সাধকের মন ঈশ্বর চিন্তায় ব্যাকুল হয়, তখন ঈশ্বরের বিষয় ছাড়া অন্য কথা বলতে পারেন না, অন্য কথা শুনলেও অসহ্য বোধ হয়। এরপর কুণ্ডলিনী ষষ্ঠ চক্র আজ্ঞাভূমি স্পর্শ করলে, সাধক ঈশ্বরকে দেখতে পান, কিন্তু একটু আড়াল থাকে – যেমন লণ্ঠনের আলো, দেখা যায়, কিন্তু কাচের জন্যে স্পর্শ করা যায় না। ষষ্ঠ চক্র অতিক্রম করে কুণ্ডলিনীশক্তি যদি সপ্তমভূমিতে সহস্রার অর্থাৎ সহস্রদল পদ্মে মিলিত হয়, তখন সাধকের সমাধি হয়। সমাধিস্থ হলে সাধকের বাহ্যজ্ঞান লোপ পায়, সাধক দেহ রক্ষা করতে পারেন না, একুশ দিনের মধ্যে তাঁর দেহের অবসান হয়। সপ্তমভূমির এই সহস্রদল পদ্মের অবস্থান, মাথার ব্রহ্মতালুতে। এই সহস্রার পদ্মেই সচ্চিদানন্দ শিব অবস্থান করেন, সাধকের শক্তি শিবের সঙ্গে মিলিত হন। শিব-শক্তির এই মিলনই তন্ত্রের পরমার্থ লাভ, উপনিষদের ব্রহ্ম লাভ।

যাঁরা ঈশ্বরকোটি সাধক অর্থাৎ অবতার, তাঁরা লোকশিক্ষার জন্যে সমাধি অবস্থা থেকেও আবার নেমে আসতে পারেন। তাঁদের অবস্থান থাকে ষষ্ঠ ও সপ্তমভূমির মাঝখানে। তাঁদের মধ্যে ভক্তভাবের অথবা দাসভাবের সামান্য অহংটুকু – ভক্ত আমি, দাস আমি - থাকে। যেমন হনুমান ছিলেন, দাসভাবে; নারদ, সনক, সনন্দ, সনাতন, সনৎকুমার প্রমুখ ছিলেন ভক্তভাবে, যেমন শ্রীশ্রীচৈতন্য ছিলেন প্রেমভাবে এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন সন্তানভাবে।       

তন্ত্র সাধনার নিম্ন স্তরে - মূলাধার থেকে অনাহত চক্র স্পর্শ করার আগেই সাধকের আটটি দৈব ক্ষমতার সিদ্ধি ঘটতে থাকে। এই সিদ্ধিকে বিভূতিও বলে - আটটি সিদ্ধি এরকম – অণিমা (সূক্ষ্ম হয়ে ওঠা), লঘিমা (পালকের মতো হাল্কা হওয়া), গরিমা (অস্বাভাবিক ভারি হয়ে ওঠা), মহিমা (বিশাল চেহারা), প্রাপ্তি (ইচ্ছেমতো যে কোন বস্তু হাতে আনা), প্রাকাম্য (ইচ্ছেমতো যে কোন বিষয় অর্জন করা), বশিত্ব (যে কোন মানুষ বা জীবকে বশ করা), ঈশিত্ব (সৃষ্টি বিষয়ে নাক গলাতে পারা!)।

সেকাল থেকে আজ পর্যন্ত, তীর্থে-তীর্থে এবং কলকাতা বা যে কোন বড়ো শহরের রত্নব্যবসায়ীদের চেম্বারে প্রায়ই স্বঘোষিত সিদ্ধ সাধকদের দেখা যায়। তাঁদের অনেকে আবার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত – এই পদক কোন প্রতিষ্ঠান দিয়ে থাকে জানা যায় না। তবে এঁরা বশীকরণ করতে পারেন, আপনাকে যে কোন কাজে সার্থক করে তুলতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল বৈদেশিক আক্রমণের সময় এঁদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোদ্ধাদেরই সীমান্তে লড়তে হয়ে। তাঁরা বশিত্ব দিয়ে বিপক্ষ সৈন্য বা সেনাপতিদের বশ করে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারতেন, কিন্তু কোনদিন করেননি। অথবা সাধারণ আকৃতির সাধক মহিমা সিদ্ধি দিয়ে হঠাৎ বিশাল শরীর বানিয়ে, গরিমা সিদ্ধিতে তাঁদের পায়ের তলায় পিষে একজন শত্রুকেও বিনাশ করতে পেরেছেন - এমন শোনা যায় না।     

তন্ত্রসাধনায় এই আটটি সিদ্ধিলাভকে খুবই তুচ্ছ এবং অবহেলার চোখে দেখা হয়েছে। এই বিভূতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে অবাক করে, যাঁরা অর্থ, যশ বা প্রতিপত্তি উপার্জন করেন, তন্ত্রশাস্ত্র তাঁদের খুবই নীচু স্তরের সাধক বলেছেন।

৫.৬.৫ তন্ত্রশাস্ত্র

তন্ত্রে বেদ - বেদান্ত সর্বশাস্ত্রকে একত্রে বলা হয় নিগম এবং তন্ত্র-শাস্ত্রকে বলা হয় আগম। উভয়ের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মতো। পুত্র পিতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে, কিন্তু যুগোপযোগী হতে গিয়ে তার মতের সঙ্গে পিতার মতের অমিল হয়। আবার পিতা অর্থাৎ বৈদিক মতের সনাতন পণ্ডিতেরা, তন্ত্রকে তাচ্ছিল্য করেন, বলেন, হতভাগা এত লেখাপড়া শিখেও উচ্ছন্নে গেল?

মহানির্বাণ তন্ত্র চোদ্দটি পর্বে বিভক্ত, এই পর্বগুলিকে “উল্লাস” বলা হয়েছে। প্রথম উল্লাসে জগজ্জননী পার্বতী সাধারণ মানুষের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পতিদেব শিবকে বলছেন, “হে সর্বভূতেশ, তুমি সকলের অন্তর্যামী, চারবেদ তোমার দ্বারাই প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বেদ থেকেই বর্ণাশ্রমাদি  প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সত্যযুগে মানুষ সত্যবাদী, ধার্মিক ছিল, তারা অতিলোভী বা কামুক ছিল না, সকলেই সর্বদা আনন্দে থাকত। সত্যযুগের পরে, মানুষ বেদ অনুসরণ করে, সব কর্ম করতে পারত না, বৈদিক কর্ম তাদের কাছে কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তবুও তারা বেদ ত্যাগ করেনি। তখন তুমি পৃথিবীতে বেদার্থযুক্ত স্মৃতিশাস্ত্র প্রকাশ করেছিলে, সেই শাস্ত্র অনুসরণ করে, মানুষ দুঃখ-শোক-রোগ-তাপ থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। তারপর দ্বাপরে মানুষ স্মৃতির সুকর্মও ত্যাগ করে, মনোকষ্ট এবং ব্যাধিতে আকুল হয়ে উঠেছিল। তখন তুমি ব্যাসাদি ঋষি হয়ে সংহিতাশাস্ত্র (পুরাণাদি) উপদেশ দিয়ে মানুষকে উদ্ধার করেছ।

[লক্ষ্য করার বিষয়, এখানে দেবী পার্বতী বললেন, মহেশ্বর শিবই চারবেদের প্রকাশক, তিনিই মনু হয়ে স্মৃতিশাস্ত্র রচনা করেছেন, আবার তিনিই বেদব্যাসের মতো ঋষি হয়ে পুরাণাদি রচনা করেছেন! শ্রীশ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভূতি যোগের মহিমাকেই তিনি যেন খণ্ডন করলেন!]  

তারপর পাপরূপী, সর্বধর্ম-বিলোপকারী কলিযুগ এসে গেল। এখন দেবতারা শক্তিহীন, স্মৃতি এখন স্মৃতিহীন, নানা পথ প্রদর্শনকারী পুরাণাদির বিনাশ হতে চলেছে। মানুষ মন্দমতি, শঠ, নীচ, পরের সম্পদ চুরি করে। ব্রাহ্মণেরা সন্ধ্যা-বন্দনাদি ছেড়ে শূদ্রের মত আচরণ করে। মানুষের মনে কখনো সৎচিন্তা, সৎকথা শোনা যাবে না। এই নরাধমদের উদ্ধারের জন্যেই তুমি সকল তন্ত্র রচনা করেছ এবং ভোগ ও মুক্তিপ্রদ আগমশাস্ত্র সৃষ্টি করেছ। কিন্তু এখনকার লোক কলির পাপযুক্ত, সর্বদাই অস্থিরমতি, নিদ্রা ও আলস্যে আসক্ত, এদের ভাবশুদ্ধি কী ভাবে হতে পারে?

দেবী পার্বতীর মানবের প্রতি এই মাতৃসুলভ ব্যাকুলতার উত্তরে সদাশিব দ্বিতীয় উল্লাসে বলেছেন, “হে মহাভাগে, তুমিই জগতের কল্যাণকারিণী, তুমি খুবই ভাল প্রশ্ন করেছ, এমন প্রশ্ন আগে কেউ করেনি। হে প্রিয়ে, তুমি সর্বজ্ঞা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ বিষয়ে তুমি যা যা বললে, সবই যথার্থ। হে প্রিয়ে, আমি সত্য সত্য পুনঃ সত্য বলছি, কলিকালে আগমোক্ত পথ ছাড়া অন্য পথ নেই।  কলিকালে বেদের মন্ত্রসকল বিষহীন সাপের মতো নির্বীর্য হয়ে পড়েছে, যে মন্ত্র সত্যাদি যুগে ফলদায়ী ছিল, কলিতে তারা সকলেই মৃতের মত নিষ্ফলা হয়ে গেছে।  হে দেবেশি, বেদ, আগম, বিশেষতঃ বহু তন্ত্রের সার আমি তোমাকে সংক্ষেপে বলছি। যেমন, মানুষের মধ্যে তত্ত্বজ্ঞানী শ্রেষ্ঠ, নদীর মধ্যে গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, দেবতাদের মধ্যে আমি শ্রেষ্ঠ, তেমনি সমস্ত আগম শাস্ত্রের মধ্যে এই মহানির্বাণ তন্ত্রই শ্রেষ্ঠ। এই মহাতন্ত্র বিশেষ ভাবে জানলে, জীব সর্বসিদ্ধি লাভ করে।

হে পরমেশ্বরি, বিশ্বের হিত করলে বিশ্বের ঈশ্বর প্রীত হন, কারণ তিনিই বিশ্বের আত্মা, বিশ্ব তাঁকেই আশ্রয় করে রয়েছে। তিনি এক, অদ্বিতীয়, সত্য, পরাৎপর, স্বপ্রকাশ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ। তিনি নির্বিকার, নির্বিশেষ, গুণাতীত, সর্বাত্মা, সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, বিভু ও সনাতন। হে মহেশ্বরি, সেই পরমেশ্বরই সর্বপ্রাণীর একমাত্র কারণ; তাঁর নিযুক্তিতেই ব্রহ্মা জীব সৃষ্টি করে স্রষ্টা পদবী পেয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই বিষ্ণু এই জগৎকে পালন করে, পালয়িতা হয়েছেন। তাঁর ইচ্ছাতেই সংহারকারী হয়ে, আমি জগতে সংহর্তা আখ্যা পেয়েছি। তুমিই তাঁর পরমা প্রকৃতি, সেহেতু তুমি ত্রিভুবনে পূজ্যা”।

চতুর্থ উল্লাসে ভগবান সদাশিব বলেছেন, “হে মহাভাগে, হে দেবি, তোমার থেকেই এই নিখিল জগৎ উৎপন্ন হয়েছে। হে শিবে, তুমিই এই নিখিল জগতের জননী। তুমি সকলের আদ্যা অর্থাৎ আদিভূতা। সকল বিদ্যা এবং আমরা সকলেও তোমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছি। তুমি জগতের সকল বিষয় জান, কিন্তু তোমাকে কেউ জানতে পারে না। তুমি কালী, তুমি তারিণী, তুমি দুর্গা, তুমিই ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ধূমাবতী, তুমিই বগলা, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, তুমিই অন্নপূর্ণা, বাগ্‌দেবী, তুমিই কমলালয়া লক্ষ্মী, তুমি সর্বশক্তিস্বরূপা এবং তুমিই সর্বদেবময়ী। তুমি সাকারা হয়েও নিরাকারা। তুমি মায়া দিয়ে বহুরূপ ধারণ কর, তুমিই সকলের আদি, অনাদি, কর্ত্রী, হর্ত্রী (হননকারিণী) এবং পালিকা। হে দেবি, এই কারণেই তোমাকে বলছি, ব্রহ্মমন্ত্রে দীক্ষিত সাধক যে ফল লাভ করে, তোমার সাধনা করেও সে একই ফল লাভ করতে পারে”।

তৃতীয় উল্লাসে দেবীর প্রশ্নের উত্তরে মহাদেব শঙ্কর বলেছেন, “হে দেবি, কুলাচার বিনা শক্তিমন্ত্র সিদ্ধিপ্রদ হয় না, অতএব কুলাচারে নিরত হয়েই শক্তিসাধন করতে হবে। হে আদ্যে, শক্তিপূজা বিধানে মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন এই পঞ্চতত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। পঞ্চতত্ত্ব ছাড়া সাধকের ইষ্টসিদ্ধি হয় না, পদে পদে বিঘ্ন ঘটে”।

আবার ষষ্ঠ উল্লাসে, মহাদেব শঙ্কর পঞ্চতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছেন,

মদ্য - “উত্তম মদ্য বা সুরা তিনপ্রকার– গৌড়ী, পৈষ্টী এবং মাধ্বী, এই সুরা তাল, খেজুর, মধু থেকে সঞ্জাত। এই সুরা যেভাবেই তৈরি হোক এবং যেই নিয়ে আসুক, এ বিষয়ে কোন জাতিভেদ নেই, শোধন করলে সর্বসিদ্ধি দান করে। শুদ্ধি বিনা মদ্যপান, বিষপানের তুল্য – সাধক চিররুগ্ন এবং স্বল্পায়ু হয়।

মাংস – তিন প্রকারের – জলচর, ভূচর, খেচর। এই মাংস যেখান থেকেই আনা হোক বা যে ব্যক্তিই সে প্রাণীর ঘাতক হোক, শোধনের পর কিছু আসে যায় না।  বলিতে পুরুষ-পশু বিহিত, স্ত্রী-পশু হত্যা নিষিদ্ধ।

মৎস্য– শাল, বোয়াল, রুই মাছ – এই তিন মাছ উত্তম। অন্যান্য কাঁটাহীন মাছ মধ্যম, বেশি কাঁটাযুক্ত মাছ অধম।

মুদ্রা –চাঁদের মতো শুভ্র, যব অথবা গম থেকে তৈরি এবং ঘিয়ে ভাজা, মনোহর মুদ্রা (লুচি বা পুরি) উত্তম। ধান থেকে তৈরি মুদ্রা মধ্যম। অন্য শস্য (ছোলা, মটর) ভেজে তৈরি মুদ্রা অধম।

মৈথুন – নিজের দীক্ষিতা পত্নী অথবা শক্তিরূপা দীক্ষিতা পরকীয়া নারী সঙ্গম”।

সাধারণ জন এই পঞ্চতত্ত্বকেই “পঞ্চ-ম” বলে জানেন এবং বিশেষতঃ এই পঞ্চ-ময়ের কারণেই তাঁদের মনে তন্ত্র-সাধনা সম্পর্কে একটা বিভীষিকা কাজ করে, তাঁদের মনে হয়, তন্ত্রসাধনা মানেই যেন এই “পঞ্চ-ম”-এর অনাচার ও ব্যাভিচার। সাধারণের মন থেকে এই আতঙ্ক ও বিরূপভাব দূর করার জন্যে পরবর্তী অনেক তন্ত্রতত্ত্বে এই পঞ্চতত্ত্বের যে ব্যাখা করা হয়েছে, তার কথাও এখানে বলে রাখি। প্রসঙ্গতঃ বলি, ওপরের পঞ্চ-ম-এর তত্ত্ব বিবৃত করেছেন, স্বয়ং ভগবান মহাদেব, অন্ততঃ মহানির্বাণতন্ত্রে তাই দাবি করা হয়েছে। কিন্তু নিচের এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করেছেন পরবর্তী পণ্ডিতগণ -  

ইড়া ও পিঙ্গলার শ্বাসবায়ুকে একত্র করে, ধীরে ধীরে বায়ু গ্রহণ করতে হয়, তারপর মূলাধার সংকুচিত করে, “হংসঃ”[1]-মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে কুম্ভক করলে, মৎস্য সাধনা হয়। মৎস্য এখানে ইড়া ও পিঙ্গলা নাড়ীর মধ্যে ঊর্ধমুখী কুল-কুণ্ডলিনী শক্তি।

এরপর কুণ্ডলিনী শক্তিকে হৃদয়ের অনাহত-পদ্মে এনে পূজা, জপ ও হোম কার্য করতে হবে, তারপর সহস্রার মহাপদ্মের ভেতর পারদের মতো উজ্জ্বল বিন্দুরূপ শিবস্থানের কল্পনা করতে হয়, এরই নাম মুদ্রা সাধনা।

এর পর সাধক কল্পনায় হৃদয়পদ্ম থেকে ষোড়শী, স্থির যৌবনা, পীন পয়োধরা, সর্বালঙ্কারভূষিতা, রক্তবর্ণা, সুন্দরদর্শনা, মৃদুহাস্যবদনা ইষ্ট দেবীকে সহস্রারপদ্মে ভগবান শিবের কাছে উপস্থিত করবেন। সাধক মৌনী হয়ে আরও চিন্তা করবেন, ওই দেবী ভগবতী ভগবান শিবের কাছে বসে, তাঁর মুখপদ্ম চুম্বন করছেন। এই চিন্তনই মাংস সাধনা।

এরপর সাধক চিন্তা করবেন, দেবী ভগবতী ভগবান শিবকে আলিঙ্গন করে সঙ্গমে নিরত রয়েছেন, এই সময় সাধক নিজেকে শক্তির সঙ্গে অভিন্ন চিন্তা করে নিজেকে পরমসুখী ও আনন্দময় জ্ঞান করবেন, এই সাধনার নাম মৈথুন।

এরপর সাধক তাঁর জিহ্বাগ্র দিয়ে তালু কুহর রোধ করে ধ্যান করবেন যে, শিব ও শক্তির মিলন ও বিহারে সুধাক্ষরণ হচ্ছে, সে সুধার স্বাদ তিনি জিহ্বাগ্রে যেন অনুভব করছেন। এই সাধনাই মদ্য সাধনা। এই সময় সাধকের নেশাগ্রস্তের অবস্থা হয়, এই অবস্থাকেই সমাধি বলে। সমাধি অবস্থার যে আনন্দ – সে আনন্দ শরীর ও মনের অব্যক্ত – ভাষায় তার বর্ণনা করা যায় না ।


চলবে...



[1] “হংসঃ” - শাক্ত ও শৈব তত্ত্বে একে অজপা মন্ত্র বলে – অর্থাৎ জীবকে এই মন্ত্র জপ করতে হয় না, তার শ্বাস – প্রশ্বাসের সঙ্গে স্বতঃই অহোরহ এই মন্ত্র জপিত হয়। নিশ্বাসের সময় “হং” শব্দে বায়ু শরীর থেকে বের হয়ে আসে, এবং “সঃ” শব্দে বায়ু শরীরে প্রবেশ করে। প্রতি মিনিটে ১৫ বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া হয় ধরে নিলে সারাদিনের ২৪ ঘণ্টায় আমরা নাকি ২৪ x ৬০ x ১৫ = ২১,৬০০ হংসঃ মন্ত্র জপ করে থাকি।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৮"


২৯

 

সুনুদা,

 প্রথমেই তোমাকে একটা চিঠি পড়াই। আমার পুত্রের লেখা প্রথম চিঠি তার মাকে,

 “আমি ভালো আছি, মা। আমার জন্যে চিন্তা করবে না। আমার থাকা-খাওয়াতে একদম কষ্ট হচ্ছে না। লেখাপড়াও মন দিয়ে করছি। টিচাররা খুব ভাল, বেশ সুন্দর পড়ায়। সদাশিবস্যার আমার অঙ্ক খাতায় তিনদিন ভেরিগুড লিখে দিয়েছে। দিদিমার দেওয়া আচারটা আমার সাতজন বন্ধু মিলে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। ওদের খুব ভালো লেগেছে আচারটা। তুমি আসার সময় আরেকটা আচার নিয়ে এসো। দাদু কেমন আছে? দাদু-দিদিমাকে আমার প্রণাম দিও। তুমিও আমার প্রণাম নিও।

ইতি বাম্বাই”।

 কার্সিয়াং থেকে ফেরার দিন দশ পরে চিঠিটা বাড়ি পৌঁছেছিল। প্রথমে পড়েছিলেন মা। তারপর বাবাকে চিঠিটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমি সন্ধ্যের সময় বাড়ি ফিরতে আমার হাতে চিঠিটা পড়তে দিয়ে বললেন, “বাম্বাই সোনা কি সুন্দর চিঠি লিখেছে পড়ে দেখ। তোকে তখনই বলেছিলাম, দু বোতল আচার নিয়ে যা। কথা শুনলি না। এক বোতল আচার ওর বন্ধুরাই খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। বেচারা এখন কি খাবে?”

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর তাঁর কথা শুনে আমি বেশ খুশিই হলাম। অনেকদিন পর মাকে বেশ স্বাভাবিক লাগল। মায়ের সেই রুক্ষ-খিটখিটে মেজাজটা তখন অনেকটাই শান্ত। বাম্বাইয়ের চিঠিটা বুকের কাছে ধরে, আমি আমার ঘরের দিকে যেতে যেতে হেসে বলেছিলাম, “বেশ তো এবার তিন বোতল দিও, দিয়ে আসব”।

“কবে যাবি তুই?”

“তিন মাস পর”।

“তিন মাস? সে তো অনেক দেরি। কেন সামনের হপ্তায় শনি-রবি করে যেতে পারবি না? ছেলেটার ওপর তোর কি একটুও টান নেই? কেমন মা তুই, সুনু?” মায়ের স্বর আগের মতোই আবার কর্কশ হয়ে উঠল।

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, “এটা স্কুলের নিয়ম, মা। আমার কিছু করার নেই। বাড়ির লোকরা বারবার গেলে বাচ্চাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ভেবেই, ওরা এই নিয়ম বানিয়েছে”।

মা বুঝলেন না, উল্টে আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রয়োজন মত ছেলের সঙ্গে মা দেখা করতে যেতে পারবে না? আর মা বুঝি বাড়ির লোক? কী যে বলিস সুনু, তোর মাথা-ফাথা খারাপ হয়েছে মনে হয়”।

আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চিঠিটা দু হাতে মেলে ধরলাম। মনে হল, বাম্বাইয়ের দুটো হাত যেন আমার দু হাতের মুঠোয়। টেবিলে বসে ঘাড় নীচু করে চিঠিটা যে হাতে লিখেছে, সেই হাতেরই স্পর্শ আমি যেন পেলাম ওর চিঠির প্রতিটি অক্ষরে। কিন্তু প্রতিটি অক্ষর কেমন ঝাপসা ঠেকল আমার দু চোখে। এমন অসময়েই কি আমার দুচোখে ভরে উঠতে হয় অশ্রুবিন্দুতে? মাথার বালিশের তলায় চিঠিটা রেখে দিলাম। ফ্রেশ হয়ে বাইরের জামা-কাপড় বদলে চলে গেলাম বাবার পাশটিতে। বাবা চোখ তুলে তাকালেন, তাঁর মুখটা হাসির প্রচেষ্টায় কিছুটা বেঁকে গেল। খুব শান্ত স্বরে বললেন, “ছেলেটা ভালই আছে, বল?”

রাত্রে খাওয়ার দাওয়ার পর নিজের ঘরে যখন শুতে গেলাম, বালিশের তলা থেকে নিশ্চিন্তে বের করলাম বাম্বাইয়ের চিঠিটা। খুব মন দিয়ে পড়লাম চিঠিটা। আগেকার বাংলা সিনেমায় যেমন দেখাত, চিঠির মধ্যেই ফুটে উঠত লেখকের মুখ এবং তিনিই সুন্দর আবৃত্তি করে পড়ে দিতেন চিঠিটা। আমার মনে হল, আমিও সেরকম পোস্টকার্ডের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম বাম্বাইয়ের মুখখানি এবং সেই যেন পড়ে শোনাল চিঠিটা। অনেকবার পড়লাম চিঠিটা – এবং ওই ছোট্ট চিঠিতেও যেন খুঁজে পেলাম ওর জীবনের কিছু কিছু পরিবর্তনের শুভ সূচনা। ওর অঙ্কের স্যার সদাশিববাবুকে ও ভালবেসে ফেলেছে – তিনি শুধু যে ভালো পড়ান তাই নয়, অঙ্ক ঠিকঠাক পারলে, খাতায় “ভেরিগুড” লিখে ছাত্রদের উৎসাহও দেন। ওর নতুন বন্ধুদের সঙ্গেও বাম্বাই অনেকটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছে। তা নাহলে ওর আচারে তারা নির্দ্বিধায় ভাগ বসাত না। চিঠিটা বারবার পড়েও তৃপ্তি হচ্ছিল না কিছুতেই। মনে হচ্ছিল, চিঠিটার বিটুইন দ্য লাইন্‌স্‌ অনেক কিছু বোঝার আছে, উপলব্ধির আছে। সেই অর্থ বুঝতে বুঝতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানতেও পারিনি।

সকালে ঘুম যখন ভাঙল, নিজেকে খুব চাঙ্গা আর হাল্কা অনুভব করলাম। এমন গভীর ঘুম কত দিন যে ঘুমোইনি। আমার শরীরে ও মনে বাম্বাইয়ের ওই ছোট্ট চিঠিটাই যে নতুন এনার্জি সঞ্চার করেছে, বেশ বুঝতে পারলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে, বাম্বাইয়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর না দিলে, ও যদি অভিমান করে, ভাবে, “মা কি এতই ব্যস্ত যে আমার চিঠির উত্তর দিতে পারল না?” আমার যে এমন চিঠি অনেক অনেক চাই, প্রতি সপ্তাহে, অন্ততঃ একটা! অতএব নিজের স্বার্থেই আমার যে বিলম্বে উত্তর দেওয়া চলবে না।

অফিসে গিয়েই আমাদের অফিসের পিওন রতনদাকে চিঠিটা পোস্ট করতে পাঠালাম। পাড়ার ডাকবাক্সে নয়, সবথেকে কাছের পোস্ট-অফিসের মেলবক্সে।

তারপর আমাদের এইচআরের রজতকে ডাকলাম। তাকে বললাম, যে ক্যুরিয়ার সার্ভিসে আমাদের রেগুলার চিঠিপত্র যায়, তাদের কি কার্সিয়াংয়েও সার্ভিস আছে? জেনে নাও তো ভাই। আর যদি থাকে, তারা কি কাচের বোতলে আচার পাঠালে ডেলিভারি করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে অন্য উপায় কিছু আছে কি?

রজত খুব স্মার্ট ছেলে, এতটুকু চিন্তা না করে উত্তর দিল, “ক্যুরিয়রের সঙ্গে কথা আমি বলে নিচ্ছি। কিন্তু তার থেকেও তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবে ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস সার্ভিস। আজ বিকেলে ধর্মতলায় পার্সেল ডেলিভারি দিলে, আগামীকাল বিকেলের মধ্যে কার্সিয়াং পোঁছে যাবে নিশ্চিন্তে”।      

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এরকম হয় নাকি?”

রজত মুখে বোদ্ধার মতো হাসি নিয়ে বলেছিল, “এই তো করছি আমরা, ম্যাডাম। উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, নর্থ বেঙ্গল, আপটু গুয়াহাটি - বাস সার্ভিসের মতো প্রম্পট আর হেল্পফুল সার্ভিস আর কিছু হয় না”।

যাই হোক ওই ব্যবস্থাতেই বাম্বাই ও তার বন্ধুরা, দিদিমার আচারের স্বাদ পেতে লাগল নিয়মিত এবং মা তাঁর নাতির জন্যে কিছু একটা করতে পেরে বেশ খুশিই হয়ে উঠলেন।

 তিনমাস পূর্ণ হওয়ার প্রথমদিনেই আমি মাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম কার্সিয়াংয়ের উদ্দেশে। ওইসময় বাবাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে। এই পরামর্শটা আমাকে চুপিচুপি দিয়েছিলেন তোমার মা। মামিমা। বলেছিলেন, “যাওয়া-আসা নিয়ে খুব জোর তিন চারদিনের ব্যাপার, মা কে সঙ্গে নিয়ে যা সুনু। তোর মায়ের সঙ্গে তার নাতির দেখাও হবে, দেখা হবে বাম্বাইয়ের স্কুল, তার পরিবেশ। আর দু একদিন বেশি থেকে দারজিলিং, টাইগার হিল, এসবও ঘুরিয়ে আনতে পারিস। তোর মায়ের মনটা কিছুটা হাল্কা হবে। একভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকে, দিন রাত তোর বাবার সেবায় ব্যস্ত। একমাত্র রিলিফ ছিল বাম্বাই, সেও চলে গেল কার্সিয়াং। বেচারা খিটখিটে হবে না কেন, আমাকে বুঝিয়ে বল তো?”

হোটেলে লটবহর রেখে আমরা স্কুলে গিয়ে যখন দেখা করলাম, সাড়ে চারটে বাজে - তখনও সূর্য অস্ত যায়নি। বিকেলের রোদে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতায় মোড়া চারপাশের পাহাড়ের চূড়াগুলো আশ্চর্য সুন্দর। আর নীচের পাইন বন থেকে উঠে আসছে হালকা কুয়াশা। আমাদের গায়ে হাল্কা সোয়েটার ছিল, শিরশিরে বাতাসের স্পর্শে পাচ্ছিলাম শীতলতার আমেজ। মাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “জায়গাটা কেমন লাগছে, মা?”

মুগ্ধ চোখে চারদিক দেখতে দেখতে মা বললেন, “এ তো স্বর্গ রে। ভাল করেছিস, তুই বাম্বাইসোনাকে এখানে পাঠিয়ে। আমি ভেবেছিলাম, জেলখানায় কয়েদিদের মতো বন্দী বুঝি”।

অ্যাডমিন অফিসের সামনের লনের দুধ সাদা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে মিনিট পনের অপেক্ষার পরই বাম্বাইয়ের গলা পেলাম – “মা...দিদিমা...”। দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। কলকাতায় থাকতে কেমন যেন চুপচাপ, ভীতুভীতু হয়ে থাকত বাম্বাই। তিনমাসের অদর্শনে আমার তৃষিত মাতৃত্বের চোখ দুটো যেন সার্থক হয়ে উঠেছিল সেদিন। কি প্রাণোচ্ছল, আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ছেলেটা। সঙ্কোচহীন আনন্দ ওর দুই চোখে। কাছে এসে আমাদের দুজনকেই জড়িয়ে ধরল। মা তো ওকে নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। চুমো খাচ্ছিলেন, আদর করছিলেন, অনর্গল বলছিলেন “আমার সোনাবাবাটা, আমার সোনাবাবাটা। এই তিনমাসেই কত বড়ো হয়ে গেছে আমার বাবাটা”।

সে সময় মামিমার কথা মনে পড়ছিল খুব। মামিমা না বললে এবং তিনি আমার বাবার দেখভালের দায়িত্ব না নিলে, মাকে সঙ্গে আনার কথাটা আমার মাথাতেই আসত না। আর এখন আমি দুচোখ ভরে দেখছি – মা আর তাঁর নাতির প্রাণখোলা আনন্দের প্রকাশ। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। কার্সিয়াংয়ের এই সন্ধ্যেয় সুন্দর সবুজ লনের বেঞ্চে বসে আছি আমরা তিন প্রজন্ম। মাঝের প্রজন্মের এই আমি – অন্য দুই প্রজন্মের আলাপ শুনে খুশিতে আনন্দে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। বাম্বাইকে দেখে ভালো লাগছিল তো বটেই, ভালো লাগছিল মাকে দেখেও। বহুদিন ঘড়ি ধরে স্বামীর সেবা, পথ্য, ওষুধ-পত্র নিয়ে ডুবে থাকা মা, অতি শীর্ণ নদীর মতোই নিষ্প্রাণ প্রাণটাকে বয়ে চলেছিলেন নিঃশব্দে। আজ সেই নদীতেই দুকূল ভাসানো আবেগ মাখা প্রাণবন্ত জোয়ার।

কোথা দিয়ে যে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বোঝাই গেল না। অফিস থেকে একজন মহিলা আমাদের ডেকে বললেন, “টাইম ইজ আপ। ছটা বেজে গেছে। সুধন্বা তোমার রুমে চলে যাও। আপনারা কালকেও রয়েছেন তো?”

আমি বললাম, “কাল তো রোববার, কাল কি সুধন্বাকে নিয়ে আমরা দার্জিলিং শহরটা ঘুরে আসতে পারি?”

“নিশ্চয়ই পারেন – কিন্তু সকাল নটা থেকে সন্ধ্যে ছটা। ছটা পনের পর্যন্ত না ফিরলে কিন্তু প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে রিপোর্ট চলে যাবে। তাতে নেক্সট ভিজিটের সময় আপনাদেরই অসুবিধে হবে”।

আমি বিনীতভাবে প্রমিস করলাম, “ছটার আগেই আমরা সুধন্বকে নিয়ে ফিরে আসব ম্যাডাম”।

সত্যি বলতে, সুনুদা, এই কবছরে বাম্বাইয়ের জন্যে কার্সিয়াং গিয়েছি বহুবার। এরকম দেখা করতে। কিংবা ওর স্কুলের ভেকেশনের সময় ওকে বাড়ি আনতে। বহুবার। কিন্তু সেই প্রথমবারে যে আনন্দ আর আশ্চর্য এক স্বস্তির আস্বাদ পেয়েছিলাম, পরে আর কোনদিন অনুভব করিনি। মাত্র ওই কয়েকটা দিন আমার জীবন-স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। থেকেও যাবে আমৃত্যু।

সমপরিমাণ দুঃখ আর সুখ মিলিয়ে-মিশিয়ে গড়ে নিতে হয় আমাদের জীবনের সবটুকু, আজ এই কথাটা বুঝে গিয়েছে,

তোমার কনি। 

চলবে...  

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১০

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

৩০শে জুলাই, ২০২৬, রবিবার সকাল, নটা পনের

 প্রবীণবাবু আর নবীনবাবু ছাড়া, জলখাবারে সবার পাতেই লুচি পড়ল। প্রবীণবাবুদের ডাক্তারের নিষেধ আছে, ওঁনারা রুটি খান।  

অবিনবাবু লুচি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, “কতদিন পরে গরম গরম লুচি খাচ্ছি। তা তোরা লুচি খাস না কেন?”

প্রবীণবাবু বললেন, “এই বয়েসে ভাজাভুজি খেতে সব ডাক্তারই মানা করেন...”।

প্রবীণবাবুর কথা শেষ হবার আগেই অবিনবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “এ আবার কী? এ লুচি ঘিয়ে ভাজা নয়? কিসে ভাজা হয়েছে, ছ্যা, ছ্যা, কি বিটকেল গন্ধ...”। তিনি আলুচচ্চড়ি দিয়ে সবে লুচির প্রথম টুকরোটা মুখে তুলেছিলেন।

তিৎলি পাশেই দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছিল, অবাক হয়ে বলল, “কেন সাদা তেল দিয়ে ভাজা হয়েছে। আপনি খান না”?

অবিনবাবু বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “তেল দিয়ে লুচি ভাজা হয়? কি তেল নারকেল না সরষের তেল? সাদা তেলটা কী বস্তু?”

নবীনবাবু বললেন, “সাদা তেল মানে সূর্যমুখী তেল, সান ফ্লাওয়ার অয়েল। এখন এটাই তো চলে...”।

অবিনবাবু দুহাতে ঠেলে প্লেট সরিয়ে দিলেন, বললেন, “আমাকে বরং ওই রুটিই দাও দুখানা... এ লুচি নিয়ে যাও মা। আমাদের বাগানে প্রচুর সূর্যমুখী ফুল হত। সেই ফুল দিয়ে যে তেল হয়, আর সেই তেলে যে লুচি ভাজা হবে – একথা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। তোরা ঘি খাস না কেন?”

নবীনবাবু বললেন, “একে তো ঘিয়ের আকাশ ছোঁয়া দাম। তার ওপর ডাক্তারদের কড়া বিধান ঘি খেলে কোলেস্টোরল বাড়ে! হার্টের অসুখ করে।”

তিৎলি নতুন প্লেটে দুটো রুটি আর আলু চচ্চড়ি দিতে অবিনবাবু খেতে শুরু করলেন, তারপর বেশ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বাপ-মায়ের কোলে ওঠে, ঘি খেলে তোদের কোলে কী ওঠে বললি?”

নবীনবাবু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, “কোলেস্টোরল, মেডিক্যাল টার্ম”।

অবিনবাবু বললেন, “জানি না, বাপু – তোদের এ কোল কোন কোল। তবে ছোটবেলায় মা ঠাকুমাদের মুখে শুনেছি – মাংসে মাংস বৃদ্ধি ঘৃতে বৃদ্ধি বল আর দুধে লাবণ্য বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল। বেশ বুঝতে পারছি তোরা আমাদের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছিস। অনেক উন্নতি করেছিস। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে...বেশ...”। কথা শেষ না করে অবিনবাবু সবার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ব্যাঁকা হাসি হাসলেন, তারপর বললেন, “ছোট ছোট বাড়ি, ছোট ছোট গাড়ি...খাওয়াদাওয়াও তথৈবচ...” তারপর অহীন আর সর্বজিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই অখাদ্য লুচি তোরা তো বেশ তরিবত করে খাচ্ছিস দেখছি!”

সর্বজিৎ বোন তিৎলিকে বলল, “তিৎলি, আরও দুটো লুচি দে তো। বিনুদা, মা ঠাকুমাদের কাছে আরেকটি কথা শোননি? শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়”?

অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কি? এসব কথা তোরাও জানিস?”

সর্বজিৎ বলল, “জানি বৈকি, এই তিৎলির মা – আমার মাসিমা, এইসব প্রবচনের আকর বিশেষ। তোমার ওই মাংস, ঘি, নিয়ে প্রবচনের মধ্যে, খাদ্য হিসেবে মাংসটা আমরা এখন বাড়াবাড়ি রকমের বাড়িয়ে ফেলেছি। অন্যদিকে মুগ বা অড়হর ডালে, কিংবা পুজোর ভোগের খিচুড়িতে - একটু-আধটু ঘিয়ের ছিটে দিয়েই আমাদের কাজ মিটে যায়। ঘিয়ের বদলে এসেছে এই সাদা তেল। তোমার অভ্যেস নেই, তাই একটু আজব গন্ধ লাগছে। আমাদের কিন্তু ভালই লাগে”। তার পর মুচকি হেসে বলল, “শরীরে যা সওয়াবে, তাই সইবে গো, বিনুদা”।          

 এর পর আর কোন কথা বলল না কেউ। মাথা নীচু করে সবাই খেতে লাগল। অবিনবাবু সামান্য শ্লাঘা অনুভব করছিলেন। ভারত স্বাধীন হয়েছে। অনেক যন্ত্রপাতি হয়েছে। ঘরে ঘরে আলো এসেছে, পাখা আছে। দোতলার কলঘরেও জল পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তাঘাট ভাল হয়েছে। এক কথায় প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাপারেই এরা বেশ পিছিয়েও গেছে। মাথা নীচু করে সকলের খাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর চোখ পড়ল, দেওয়ালে ঝোলানো কালো রঙের একটা বেশ বড়ো চৌকো চ্যাপটা বাক্সের দিকে। সেটার দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “দেয়ালে ওই বস্তুটা কী, তিৎলি মা? কালো কুচকুচ করছে যখন ছবি বা ফটোর ফ্রেম তো নয় …”।

লুচি নিয়ে অবিনবাবুর কথায় তিৎলি বেশ ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, উত্তর দিল, “ওটা টিভি”।

“সেটা কী বস্তু?”

তিৎলি একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “ওটাতে নাচ, গান, সিনেমা, খেলা, খবর, নানারকমের অনুষ্ঠান দেখা যায়”।

“দেখা যায়? বটে?” অবিনবাবু আবারও অবাক হলেন, তারপর কিছু একটা ভেবে বললেন “অ বুঝেছি, আমাদের কালে বায়োস্কোপ ছিল, সে এখন ঘরের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে? তা কটা থেকে খোলে? কলকাতার হলগুলোতে শুনেছি তিনটে করে শো হত - তিনটে, ছটা, নটা – সেরকম?”

“নাঃ চব্বিশ ঘন্টাই চলে” তিৎলি বলল, “এখন সবাই কাজে ব্যস্ত বলে চালানো হয়নি”।

“এখন চলবে? কই চালাও দেখি”।

তিৎলি টিভির পাশের সুইচটা অন করে এসে, খাবার টেবিলের মাঝখানে রাখা রিমোটটা নিয়ে টিভি চালু করল। “কী দেখবেন বলুন?”

খাওয়া বন্ধ করে অবিনবাবু টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন, বললেন, “আমি তো জানিনা, তুমিই একটা কিছু চালাও না। খবর আছে বলছিলে না? এখন শোনা যাবে – ইয়ে মানে দেখা যাবে?”।

“হুঁ। দেখা যাবে”। তিৎলি একটি বাংলা নিউজ চ্যানেল চালু করল। পর্দায় একটি মেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে, “পথ দুর্ঘটনায় বালকের ভয়ংকর মৃত্যু। আজ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পোড়াবটতলার কাছে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে, বাসের চাকার তলায় পিষে গিয়েছে একটি আট বছরের বালক...গুরুতর আহত হলেও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন বালকের মা...এলাকার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তাঁরা রাস্তা অবরোধ করেছেন, জ্বালিয়ে দিয়েছেন দুটি বাস... পরস্থিতি অগ্নিগর্ভ... আমাদের প্রতিনিধি সজল হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করে সরাসরি চলে যাব ঘটনাস্থলে”... মেয়েটির ছবি একপাশে সরে গেল, আরেক পাশে ভেসে এল ঘটনাস্থলের ছবি... মেয়েটি বলল, “সজল, ওখানকার কি পরিস্থিতি আমাদের জানাও...”।

অবিনবাবু বললেন, “সকাল সকাল খুবই দুঃখের খবর সন্দেহ নেই...কিন্তু মেয়েটি অমন চেঁচাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেন কারো সঙ্গে ঝগড়া করছে...”

অহীন বলল, “ওটাই এখন খবর বলার ধরন, বিনুদা...ঘটনার অভিঘাতে মেয়েটি উত্তেজিত...”।

অবিনবাবু বললেন, “তাই বুঝি?”                              

 টিভিতে সজলের কণ্ঠ শোনা গেল, “একেবারেই মিতালি, এখানকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। আহত মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, নিহত ছেলেটির মৃতদেহ পুলিশের হাতে তুলে দিতে নারাজ স্থানীয় জনতা...তাদের দাবি অবিলম্বে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের আসতে হবে...এবং তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হবে...এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হবে...” মিতালি নামের মেয়েটির ছবি এখন পর্দা জুড়ে, একই রকম উত্তেজিত স্বরে বলল, “এখন নিচ্ছি একটা ছোট্ট বিরতি, সঙ্গে থাকুন...”। শুরু হল বিজ্ঞাপনমালা – এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছেলেটি কোন নোটবুক মুখস্থ করেছে...কোন স্টিলবার ব্যবহার না করলে ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়বে আপনার প্রিয় বাড়িটি, সকালে চায়ের সঙ্গে কোন বিস্কুট না খেলে দিনটাই মাটি...

অবিনদাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেই খাওয়া শেষ করলেন, বললেন, “তিৎলি মা, এই তোমাদের খবর?”

তিৎলি অবিনদাদুর প্লেটে দুটো সন্দেশ দিতে দিতে বলল, “এই জন্যেই খবরের চ্যানেল আমরা তেমন দেখি না, অকারণ চেঁচামেচি আর অজস্র বিজ্ঞাপন”।

“তাহলে কী দেখ?”

“আমরা তো সিরিয়াল দেখি – সিরিয়ালে এক-একটা ল-অ—ম্বা গল্প একটু একটু করে রোজ দেখায় আর সরুদা অহীনদের পছন্দ খেলা – ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস...”।

“অ, তাহলে দেশ-বিদেশের খবরাখবর?”

তিৎলি নাক কুঁচকে হাসল, বলল, “তেমন দেখা হয় না”।

“খ্যাঁদা, নবু তোরা কী দেখিস?”      

নবীনবাবু খুব সতর্ক হয়ে বললেন, “বাবা আর আমি সময় পাই কোথায়? তাছাড়া বসে বসে টিভি দেখার ধৈর্যও থাকে না। ওরা যখন দেখে, আমরা ওই দু পাঁচমিনিট বসলাম – ওই আর কি?”

“তিৎলি মা, এখনও পর্যন্ত তোমাদের এই একটা জিনিষই বড়ো ভালো লাগল, সন্দেশ – আমাদের কালে এমন সুন্দর - মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়া সন্দেশ খাইনি...”।

তিৎলি উৎসাহে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে আরও দুটো দিই?”

অবিনবাবু হাসলেন, “পাগল হয়েছ মা? এখন আর না। নবু, আমাদের খবরের কাগজ-টাগজ নেওয়া হয় না?  নাকি সেসব উঠে গেছে আজকাল”।

নবীনবাবু আগের মতোই সতর্ক হয়ে বললেন, “না উঠে যায়নি, আছে দু চারখানা – সে একেবারে অখাদ্য – আমরা রাখি না”।

“তার মানে দেশের খবর – বিদেশে কোথায় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে তোদের কোন কৌতূহলই নেই? আজব ব্যাপার তো! আমাদের সময় সকালের খবরের কাগজে চোখ না বোলালে সারা দিনটাই কেমন পানসে মনে হত”।

অহীনের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে গেল। তারপর বাবার ঘর থেকে সেদিনের খবরের কাগজটা এনে অবিনবাবুর সামনে রেখে বলল, “বিনুদা, এই যে আজকের কাগজ। আজ রবিবার তো...শুধু খবর নয় – অনেক গল্প-প্রবন্ধও আছে”। তারপর বাবাকে বলল, “বিনুদার থেকে আর কত আড়াল করবে, বাবা? আস্তে আস্তে সবকিছুই উনি বুঝতে পারবেন, জানতেও পারবেন...”।

অহীনের অকস্মাৎ এই আচরণে টেবিলে বসা সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এমনকি অবিনবাবু নিজেও। বিজ্ঞাপনের শেষে টিভিতে মিতালি নামের মেয়েটি তারস্বরে বলে যেতে লাগল একই সংবাদ, সজলের সেই একই বক্তব্য...নীরব ঘরের মধ্যে ছড়াতে লাগল আশ্চর্য শব্দ দূষণ।

অবিনবাবু গম্ভীর মুখে অহীনের আনা কাগজটা বাঁহাতে টেনে নিলেন, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে রঙিন বিজ্ঞাপন – কোন এক সয়া তেলের। এই তেলে হার্টের অসুখ সেরে যায়, অনেক ধরনের ভিটামিন জুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন এই তেল ছাড়া মানুষের কাছে আজ আর কোন বিকল্প নেই...। তিৎলি বিনুদার পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

 তিৎলি মমতামাখা শান্ত কণ্ঠে বলল, “অহীনের কথায় কিছু মনে করবেন না, বিনুদা”।

অবিনবাবু চোখ তুলে তাকালেন তিৎলির মুখের দিকে, খুব সুন্দরী না হলেও সরল কিন্তু বুদ্ধিমতী তিৎলির চোখদুটি। অবিনবাবু ম্লান হাসলেন, বললেন, “তোমরা আজকাল দেওরকে নাম ধরেই ডাক বুঝি?”

তিৎলি খুব সপ্রতিভ উত্তর দিল, “হ্যাঁ। আজকাল সবাই তো তাই বলে। তাছাড়া প্রপিতামহ-শ্বশুরমশাইকেই যদি “বিনুদা” ডাকতে পারি – তাহলে ভাইয়ের বয়সী দেওরকে নাম ধরে ডাকতে…  ”।

তিৎলির কথা শেষ না হতেই সকলেই হা হা করে হেসে উঠলেন। এমনকি অবিনবাবুও! যাঁকে এতক্ষণ সকলেই ব্যাঁকা বা মুচকি হাসি হাসতে দেখেছেন সকলে।

সবার হাসি থামলে অবিনবাবু হাসি মুখেই বললেন, “বেশ বলেছিস, মা। বৌদিমণি – মানে খ্যাঁদার মাও আমাকে নাম ধরে ডাকতেন... বিনু। তবে অহীনের কথায় আমি কিছু মনে করিনি, মা। বরং বলব সবার মধ্যে, ওই দুই ছোকরাই – অহীন আর সর্বজিৎ - আমার সঙ্গে বেশ স্পষ্ট দ্বিধাহীন ব্যবহার করছে। খ্যাঁদা আর নবুতো আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছে – আমি যেন এই সংসারে অনাহুত”।

প্রবীণবাবু বলে উঠলেন, “কী বলছো ছোটকা? আমরা তোমাকে…”

প্রবীণবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অবিনবাবু বললেন, “ধীরে ধীরে আমিও বুঝছি - তিরাশি বছর সময়টা বড্ডো বেশিই। আমার দেখা জগৎ থেকে হঠাৎ তোদের জগতে এসে পড়ে, আমারই নিজেকে অনাহুত মনে হচ্ছে। অচেনা অজানা আগন্তুক। এই দেখ না, এই খবরের কাগজটা। আমাদের সময়ে কাগজের প্রথম পাতায় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলিই ছাপা হত। আর প্রথমপাতার হেডলাইন মানে – সেটাই হত দিনের প্রধানতম খবর। আজও মনে পড়ে ১৯৩০ সালে – সঠিক তারিখটা মনে নেই - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করার খবর সেকালের সব কটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বেরিয়েছিল। আমার বয়েস তখন বছর সাতেক – আমার তখনও বোঝার বয়েস হয়নি। কিন্তু বাবা, বড়দা, মেজদা, সেজদা,  পাড়া- প্রতিবেশীর বয়স্ক মানুষদের দেখেছিলাম ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে। অনেকের কাছেই মাস্টারদা হয়ে উঠেছিলেন পূজনীয় নেতা, আবার বেশির ভাগ লোকই বলেছিল “আহম্মক, বোকা – এভাবে লড়ে বৃটিশরাজকে তাড়ানো যাবে?”

অবিনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর আজ দেখছি, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে তেলের বিজ্ঞাপন – এই তেল দিয়েই তোমরা লুচি ভেজেছিলে না?”

তিৎলি বলল, “ওই তেলে নয় – ওটা সয়া তেল, আমরা খাই সানফ্লাওয়ার মানে সূর্যমুখীর তেল”।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “সয়া ব্যাপারটা কি?”

তিৎলি বলল, “সয়া একধরনের বড়ো বড়ো দানা – ইংরিজিতে সয়া বিন্‌স্‌ বলে, কিছুটা বরবটির দানার সঙ্গে মিল আছে। তার সঙ্গে খুব সম্ভবতঃ পাম তেলও মেশানো হয়”।

অবিনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “যেন খুব কিছু বুঝে ফেললাম। না, মা, সময় লাগবে… সব কিছু বুঝতে অনেকটাই সময় লাগবে। তোমরা সবাই কাজের মানুষ – আমার মতো নিষ্কর্মা লোকের সঙ্গে তোমরা কতক্ষণ থাকবে? যাও, তোমরা নিজের নিজের কাজ করগে’। আমি বরং কাগজটা পড়ি – বুঝতে চেষ্টা করি আজকের সময়টাকে…”।

খাবার ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর, অবিনবাবু পায়ের চটি খুলে চেয়ারেই আসন পিঁড়ি হয়ে বসলেন। তারপর আরাম করে খবরের কাগজের প্রথম দুটি বিজ্ঞাপনের পাতা খুঁটিয়ে পড়লেন। প্রথমটি ছিল স্বাস্থ্যকর সয়া তেলের – যা নিয়ে তাঁর সঙ্গে তিৎলির আগেই কথা হয়েছে। দ্বিতীয় পাতায় বিশাল আবাসন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন। চব্বিশতলা বাড়িগুলির প্রত্যেকটি ঘরের জানালা খুললেই হুড়মুড় করে প্রকৃতি ঢুকে পড়ে। সবুজ অরণ্য, আকাশ, আলো, পাখি, বসন্তের হাওয়া...। আজ সকালেই নার্সিং হোম না প্রাইভেট হসপিটাল থেকে ফেরার পথে, বড় রাস্তার দুপাশে বেশ কয়েকটি উঁচু বাড়ি দেখেছেন। তখন তিনি খেয়াল করেননি ওগুলো কত তলা। এখন চব্বিশ তলা আন্দাজ করার সময় তিনি সেগুলির সঙ্গে তুলনা করছিলেন। এই বাড়িটি দোতলা, তাঁদের পৈতৃক বাড়িটাও দোতলা ছিল। কিন্তু সে বাড়ির ঘরের হাইটগুলো ছিল এই বাড়ির থেকে অনেক উঁচু, দুগুণ তো বটেই – তার বেশি হলেও আশ্চর্য হবেন না। তার তুলনায় চব্বিশ তলা বাড়ি কতটা উঁচু? বুঝতে হবে।

অবিনবাবু তিৎলিকে ডাকলেন, “তিৎলি মা, খুব ব্যস্ত নাকি?”

তিৎলি রান্নাঘরে শাশুড়ির সঙ্গে কাজ করছিল, দৌড়ে এল, বলল, “কী বলছ, বিনুদা?”

“একটা কাগজ আর পেন দিতে পারো, মা? কিছু কিছু জিনিষ লিখে রাখব”।

তিৎলি দৌড়ে দোতলায় গেল। একটা কাগজ আর পেন এনে রাখল অবিনবাবুর সামনে।

চলবে...       

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...