ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের অষ্টম পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/৮ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
নবম পর্বাংশ
৪.৫.১ গুহামন্দির
গুহামন্দির নির্মাণ শুরু করেছিলেন সম্রাট অশোক, সে কথা আগেই বলেছি। এই গুহামন্দিরগুলি গয়ার কাছে বরাবর পাহাড়ে তিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন আজীবিক সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্য। এই গুহাগুলির নির্মাণে কাঠের কাঠামোর অনুকরণ করা হয়েছিল, অর্থাৎ কাঠের স্তম্ভ-কড়ি-বরগার আদলেই পাথরের দেওয়াল ও ছাদ খোদাই করা হয়েছিল। যদিও গুহাগুলির মসৃণ দেয়ালের পালিশ ছিল দেখবার মতো। বোঝা যায় একই দক্ষ শিল্পীরা সম্রাট অশোকের স্তম্ভগুলিরও পালিশ করেছিলেন।
| গয়ার কাছে বরাবর গুহামন্দিরের প্রবেশ পথ সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে মোটামুটি ২৫০ বিসিই-তে নির্মিত |
এর পরে সাতবাহন রাজাদের সময় দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অনেকগুলি গুহামন্দির নির্মিত হয়েছিল। তার মধ্যে সবথেকে প্রাচীন পুণার কাছে ভাজা গুহা। এই গুহাগুলির একটির শেষ প্রান্তে পাথর কেটে স্তূপের আকার দেওয়া হয়েছিল এবং এই স্তূপটি ঘিরে পিছনে ছিল, প্রদক্ষিণ পথ। এই গুহাগুলির দেওয়াল খোদাই করে অষ্টভুজ স্তম্ভ বানানো হয়েছিল এবং মন্দিরের ছাদ ছিল কিছুটা উত্তলাকারের (vaulted), তাতেও কাঠের বড়োবড়ো বরগার মতো করে পাথর খোদাই করা হয়েছিল। এরপরে সম্ভবতঃ খ্রীষ্টাব্দর শুরুতে কারলি গুহা বানানো হয়েছিল। এই গুহার চৈত্যটি অনেক বেশি অলংকৃত এবং গুহাগুলিও সুসজ্জিত। গুহার সামনে পাথর কেটে সুন্দর বারান্দা, সামনের দেওয়ালে জানালা এবং তিনটি প্রবেশ দ্বারে যুগলমূর্তির চমৎকার রিলিফ তৈরি করা হয়েছিল।
| মহারাষ্ট্রে অজন্তার গুহামন্দির শ্রেণী |
তবে সব থেকে বিখ্যাত হল মহারাষ্ট্রের অজন্তার গুহামন্দিরগুলি। মোট সাতাশটি গুহা অশ্বক্ষুরাকৃতি পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে বানানো হয়েছিল। এই গুহাগুলির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল বি.সি.ই দ্বিতীয় শতাব্দীতে এবং শেষদিকের গুলি মোটামুটি সপ্তম শতাব্দী সি.ই.-তে। অদ্ভুত সুন্দর ভাস্কর্য এবং গুহার দেওয়ালে আঁকা চিত্রগুলি সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। যদিও দেওয়াল-চিত্রগুলি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে আসছে। এই গুহামন্দিরগুলি সবই বৌদ্ধ ধর্মীয়।
অজন্তা থেকে প্রায় আটচল্লিশ কি.মি. দূরের ইলোরার
গুহামন্দিরগুলি আরও বেশি সুন্দর। এখানে প্রায় চৌঁত্রিশটি গুহামন্দির রয়েছে, যাদের
নির্মাণকাল পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দী সি.ই.-তে। এই গুহাগুলি সবই হিন্দুধর্মীয় এবং
হিন্দু দেবদেবীদের প্রচুর মূর্তি খোদিত আছে। এই মূর্তিগুলির ভাস্কর্যও অনবদ্য। তবে
এগুলির মধ্যে সবথেকে আশ্চর্য এবং সুন্দর গুহামন্দির হল কৈলাসনাথ মন্দির। এই মন্দির
নির্মাণ করিয়েছিলেন,
দক্ষিণের রাষ্ট্রকূট সম্রাট প্রথম কৃষ্ণ, যাঁর রাজত্বকাল ৭৫৬ থেকে ৭৭৩ সি.ই.।
এতদিনের গুহামন্দিরগুলি ছিল পাহাড়ের গা
থেকে পাথর কাটা শুরু করে,
পাথর কেটে পাহাড়ের ভেতরের দিকে বড়োবড়ো গুহা নির্মাণ। কিন্তু ছোট সম্পূর্ণ একটি
পাহাড়কেই ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত কেটে মন্দিরের আদলে বানিয়ে তোলা হয়েছে কৈলাস
মন্দির। এই মন্দিরের গায়ের অজস্র প্যানেলে পুরাণ, রামায়ণ এবং মহাভারতের নানান কাহিনীর
অজস্র রিলিফ নিখুঁত সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ ভাবে আমরা যে কোন মন্দির
নির্মাণ শুরু করি ভিত থেকে,
শেষ করি মন্দিরের চূড়ায়। এক্ষেত্রে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, সম্পূর্ণ
বিপরীত পদ্ধতিতে, অর্থাৎ
চূড়া থেকে শুরু করে শেষে হয়েছে মন্দিরের ভিত। এই বিপরীত নির্মাণের পরিমিতি এবং
প্রাক-পরিকল্পনা ভাস্কর কিংবা ভাস্করদের চূড়ান্ত দক্ষতার পরিচয়। উপরন্তু মন্দিরের
গায়ে খোদাই করেছেন, অজস্র
নিখুঁত রিলিফ প্যানেল। অনন্য এই নির্মাণ এর আগে এবং পরে ভারতবর্ষে তো বটেই, বিশ্বের আর
কোথাও হয়েছে বলে শোনা যায় না। তবে পাথর কেটে মন্দির বানানোর কাজ আরও হয়েছে, যেমন সপ্তম
শতাব্দী সি.ই.-তে চেন্নাই থেকে আশি কিলোমিটার দূরের মামল্লপুরমে।
ভারতে গুহামন্দিরের শেষ নিদর্শন মুম্বাই থেকে
সামান্য দূরের এলিফ্যান্টা দ্বীপের গুহাগুলি। এই গুহাগুলির হিন্দু দেবদেবীদের
মূর্তি, বিশেষ
করে ত্রিমূর্তি – ব্রহ্মা,
বিষ্ণু ও শিবের মূর্তিগুলি বিখ্যাত। এই গুহামন্দিরগুলি অনেকে বলেন পঞ্চম থেকে
নবম শতাব্দীর মধ্যে বানানো আবার অনেকে বলেন, পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি এগুলির
নির্মাণ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
৪.৫.২ মন্দির
গুপ্তযুগের আগেকার কোন মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন
এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এর থেকে এমন প্রমাণ হয় না, যে তার আগে
ভারতীয়দের মনে মন্দির নির্মাণের কোন ধারণা ছিল না। বরং এমন অনুমান করা যায়, ইঁট-কাঠ-মাটি
দিয়ে বানানো মন্দিরগুলি আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি।
সবথেকে প্রাচীন মন্দিরের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া
গেছে, তক্ষশিলা
শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে,
জায়গাটির আধুনিক নাম জনদিয়াল। মন্দিরটির নির্মাণে স্পষ্ট গ্রীক প্রভাব দেখা
যায়। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এটি জরথ্রুস্টিয়ান মন্দির। গ্রীক প্রভাবে নির্মিত মন্দিরের
আরও একটি নিদর্শন পাওয়া গেছে, কাশ্মীরের মার্তণ্ড বা সূর্য মন্দিরে। খ্রিষ্টিয় অষ্টম
শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরের বাস্তু-পরিকল্পনা পরবর্তী কালের ভারতীয় মন্দিরের
সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে না। সেই কারণেই
অনুমান করা হয় এগুলির নির্মাণ হয়েছিল গ্রীস বা পারস্য এবং ভারতীয় রীতির মিশ্র অনুসরণে।
গুপ্তযুগের বেশ কয়েকটি মন্দিরের প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়, তার মধ্যে
অন্যতম হল ঝাঁসি থেকে সামান্য দূরের দেওগড় মন্দির, সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নির্মাণ। এই
মন্দির পাথর দিয়ে বানানো,
এবং দেওয়ালে পাথরের জোড়গুলি মজবুত করার জন্যে লোহার রড ব্যবহৃত হয়েছিল। এর
শীর্ষে পাথরের ছোট্ট একটি টাওয়ার আছে।
| জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগে অবস্থিত মার্তণ্ড (সূর্য মন্দির) - মোটামুটি খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে নির্মিত। |
গুপ্তযুগে হিন্দু মন্দিরের যে স্থাপত্য নিয়ম প্রচলিত হয়েছিল, সেই নিয়ম আজও বর্তমান। জমি থেকে বেশ কিছুটা উঁচু যে ভিতের ওপর সমগ্র মন্দিরটি নির্মিত হত, তাকে বলা হত “বিমান”। এই বিমানের মধ্যে সব থেকে ছোট অন্ধকার প্রকোষ্ঠটিকে বলা হয় “গর্ভগৃহ”। এই গর্ভগৃহেই প্রধান দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। গর্ভগৃহকে ঘিরে বৃত্তাকার যে অলিন্দ বানানো হত, তার নাম “প্রদক্ষিণ”। এই পথে ভক্তরা প্রধান দেবতাকে প্রদক্ষিণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিমানের ওপরে গর্ভগৃহের সামনে বানানো হত প্রশস্ত হলঘর, যার নাম “মণ্ডপ”। এই মণ্ডপ থেকে সমবেত ভক্তরা বিগ্রহ দর্শন করতেন, পূজা এবং প্রার্থনা নিবেদন করতেন। মণ্ডপে যাওয়ার আগে আরও একটি হলঘর বানানো হত, যার নাম “অর্ধমণ্ডপ”। জমি থেকে প্রশস্ত সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠে – ভক্তরা যাতে তাঁদের বিক্ষিপ্ত চঞ্চল মনকে দেবতার প্রতি স্থির-নিবিষ্ট করতে পারেন, সেই উদ্দেশেই এই অর্ধমণ্ডপ বানানো হত। গর্ভগৃহ ও প্রদক্ষিণ, মণ্ডপ এবং অর্ধমণ্ডপের ছাদ গুলিকে “শিখর” বলা হত। প্রত্যেকটি শিখরের উচ্চতা আলাদা হত। স্বাভাবিক ভাবেই গর্ভগৃহের শিখর সব থেকে উঁচু এবং সবথেকে অলংকৃত হত। এই শিখরের গঠন বৃত্তাকার থেকে চতুর্ভুজ কিংবা বহুভুজ হত এবং আকার হত পিরিমিডিয় বা নিচে থেকে শীর্ষের দিকে ক্রমশঃ সরু (tapering)। পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরের গঠন ও আকার অনেক বিশদ এবং বিস্তৃত হলেও মূল কাঠামোতে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। ভারতবর্ষের মন্দির স্থাপত্যের দুটি ঘরানা পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছে, তার একটি দাক্ষিণাত্য এবং অন্যটি উড়িষ্যা বা কলিঙ্গ ঘরানা। স্থাপত্য এবং নির্মাণ প্রকৌশল নিয়ে অনেকগুলি “শিল্পশাস্ত্র” এবং “বাস্তুশাস্ত্র”-এর গ্রন্থও এসময়ে রচিত হয়েছিল।
খ্রীষ্টিয় সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত
দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য শিল্পের সুবর্ণ যুগ বলা যায়। দক্ষিণ
ভারতের স্থাপত্যে পহ্লব,
চোল, রাষ্ট্রকূট
ও চালুক্য রাজবংশের অবদান অবিস্মরণীয়। এই পর্যায়ের নির্মিত মন্দিরগুলি অনেক বেশি
ব্যাপ্ত এবং বিস্তৃত। প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ ভারতে মন্দির স্থাপত্যের আলাদা ঘরানার
সূত্রপাত করেছিলেন পহ্লব রাজ নরসিংহবর্মণ (৬৪২-৬৮৮ খ্রীষ্টাব্দ), তাঁর সমুদ্র
সৈকতে বানানো মামল্লপুরমের মন্দির থেকে। পরবর্তী কালে গোপুরম (প্রবেশদ্বার), বিমান, গর্ভগৃহ, অলিন্দ, নাটমন্দির, মণ্ডপ, মহামণ্ডপ
নিয়ে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলি বিশাল এবং বিস্তৃত আকার নিয়েছিল। এর সঙ্গে মন্দিরের
প্রাঙ্গণে আরও যুক্ত হয়েছিল বাঁধানো সরোবর, ফুলের বাগান, কোষাগার, যাত্রীনিবাস, ভাণ্ডারগৃহ
ইত্যাদি। এই সব কিছু সুরক্ষিত রাখতে নির্মাণ করা হত বিশাল পাথরের প্রাচীর। মূল
মন্দিরের শিখরের উচ্চতা এবং অলংকরণও হয়ে উঠেছিল বিশদ। সমগ্র দক্ষিণ ভারত জুড়েই এমন
আশ্চর্য এবং অপরূপ বহু মন্দির আজও সগৌরবে বিরাজমান।
সেই তুলনায় উত্তরভারতের অধিকাংশ প্রধান শহরের
মন্দিরগুলির আজ আর কোন অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। যেগুলি আছে সেগুলি পরবর্তীকালে
পুনর্নির্মিত। এমনকি বিখ্যাত বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরও মাত্র কয়েকশ বছর আগে
পুনর্নির্মিত। উত্তর ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে বেশ কিছু মন্দির আজও স্বমহিমায় টিকে আছে
যেমন উড়িষ্যা, বুন্দেলখণ্ড
এবং গুজরাটের মন্দিরগুলি। উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর, কোণার্ক এবং পুরীর অনবদ্য শৈলীর
মন্দিরগুলির নির্মাণ কাল অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে। বুন্দেলখণ্ডের প্রধান
দর্শনীয় স্থাপত্যগুলির নির্মাণকাল দশম এবং একাদশ শতাব্দীতে। এর মধ্যেই আছে
বিশ্ববিখ্যাত খাজুরাহোর মন্দিরগুলি। এই মন্দিরগুলির গঠন কলিঙ্গ ঘরানার থেকে
অনেকটাই আলাদা এবং উত্তরভারতের মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অনুসারী। গুজরাটের
সোলাংকি রাজবংশ একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অনেকগুলি জৈন এবং হিন্দু মন্দির
স্থাপনা করেছিলেন। তার মধ্যে অনেকগুলির স্থাপত্য এবং অলংকরণে অনবদ্য শৈলীর প্রকাশ
ঘটেছে, যেমন
মাউন্ট আবুর জৈন মন্দির। এর অপরূপ সৌন্দর্য আজও মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে।
৪.৫.৩ ভাস্কর্য
মৌর্য আমলে পাথর খোদাই করে ভাস্কর্য নির্মাণের
শুরু এবং সাঁচি, ভারহুত, সারনাথ এবং
আরও কিছু অঞ্চলে তার নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং তার কিছু কিছু বর্ণনা আগেই দিয়েছি।
ভারতীয় ভাস্কর্যের নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছিল কুষাণ যুগে, গান্ধার
শিল্পের হাত ধরে এবং ভারতে এই গান্ধার শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরায়। যদিও মথুরার
ভাস্কর্য শিল্পের শুরু হয়তো খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতেই। এই সময়ে তাঁরা
জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায়,
পাথরের ফলকে দিগম্বর তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি খোদাই করেছিলেন। তাছাড়া মথুরা
স্তূপের রেলিংয়ের গায়ে প্রচুর যক্ষীমূর্তিও খোদাই করেছিলেন। এই যক্ষীদের অতিরঞ্জিত
পয়োধর ও নিতম্ব এবং ক্ষীণতম কটি, এই শিল্পের অন্যতম বিশেষত্ব। এই যক্ষীমূর্তিগুলির নৃত্যের
ভঙ্গিমা এবং তাদের অঙ্গের বিভিন্ন অলংকারের সূক্ষ্মতা নিঃসন্দেহে শিল্পীদের
দক্ষতাকেই প্রকাশ করে।
কুষাণ যুগে, বিশেষ করে সম্রাট কণিষ্ক, মথুরা
ঘরাণার এই ভাস্করদের প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। মথুরার কাছেই মাট নামক একটি
গ্রামে, যেখানে
হয়তো সম্রাট কণিষ্কের শৈত্যাবাস ছিল, সেখানে একটি ছোট ধর্মস্থানে (chapel) বেশ কয়েকজন
কুষাণ রাজা এবং রাজকুমারদের মূর্তিখোদাই করা হয়েছিল। এখানেই সম্রাট কণিষ্কের
মুণ্ডহীন একটি পূর্ণ মূর্তিও পাওয়া গেছে। যেখানে সম্রাট কণিষ্ক মধ্য-এশিয়ার
প্রচলিত ভারি পোষাক,
বুটজুতো পরে দাঁড়িয়ে আছেন, এক হাতে তাঁর তলোয়ার আর অন্য হাতে ঢাল।
বৌদ্ধধর্মের হীনযানী মতে এতদিন কোথাও বুদ্ধদেবের
মূর্তি চিত্রিত হয়নি,
তাঁর পরিবর্তে নানান প্রতীক ব্যবহার করা হত, যেমন ধর্মচক্র, অশ্বত্থ গাছ, সিংহ
ইত্যাদি। কণিষ্কের আমলে বৌদ্ধধর্মের মহাযানী শাখার উদ্ভব হওয়াতে, মহাযানী
বৌদ্ধরা গান্ধার এবং মথুরার মূর্তিগুলি এবং তীর্থংকরের ধ্যানস্থ মূর্তি দেখেই যে
ভগবান বুদ্ধের মূর্তি বানানোয় উৎসাহী হয়েছিলেন সেকথা অনুমান করাই যায়। অতএব কুষাণ
সাম্রাজ্যের পতন হয়ে গেলেও মহাযানী মতের বিপুল পৃষ্ঠপোষকতায়, বুদ্ধদেব, বোধিসত্ত্বের
মূর্তি এবং তাঁর জাতকের নানান কাহিনী নিয়ে অজস্র চিত্র ফুটে উঠতে লাগল পাথরের
ফলকে। শুধু উত্তরভারতেই নয়,
দক্ষিণভারতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। যার ফলে সাতবাহন আমলের নির্মাণ
(খ্রীষ্টিয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দী) অমরাবতী স্তূপের প্রস্তর ফলকে বুদ্ধদেব এবং
জাতকের নানান কাহিনী এবং বেশকিছু পূর্ণ অবয়ব বুদ্ধমূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। যার
নিদর্শন সাঁচি বা ভারহুত স্তূপে নেই। অমরাবতী স্তূপের প্রভাবে পরবর্তী কালে সিংহল
এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী
অনুরূপ মূর্তির প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল।
তবে ভারতীয় শিল্পের উৎকর্ষ দেখা গেল চতুর্থ থেকে
পঞ্চম শতাব্দীতে, যে
সময়ে সারনাথ স্তূপের শেষ পুনর্নিমার্ণের কাজ হয়েছিল। সারনাথে বুদ্ধদেবের মূর্তিটিই
হয়তো প্রথম, যার
মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সত্ত্বা ভাষা পেয়েছে কঠিন পাথরের মূর্তিতে। ধ্যানস্থ
ভঙ্গীতে ভগবান বুদ্ধ বসে আছেন। তাঁর পেলব অবয়বে কোথাও পেশিশক্তির প্রকাশ ঘটেনি।
প্রশান্ত মুখে মৃদু হাসির আভাস, দুই চোখ অর্ধ নিমীলিত, তাঁর হাতের চাঁপার কলির মতো নিখুঁত
সুন্দর আঙুলে ধর্মচক্র মুদ্রা। তাঁর মাথার পিছনে অলংকৃত জ্যোতির্বলয়। দুপাশে দুই
আকাশচারী উপদেবতা যেন তাঁর কথা শুনছেন। সার্থক এই মূর্তিটিই যেন নির্দিষ্ট করে দিল, পরবর্তী
ভারতীয় সমস্ত শিল্পের,
সে চিত্র হোক বা ভাস্কর্যের, মানদণ্ড।
ভারতীয় শিল্পের রূপরেখা ও তার বিধিবিধানকে ষড়ঙ্গ বলা হয়, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
৪.৫.৪ ভারতীয় শিল্পের ষড়ঙ্গ
শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “ভারতশিল্পে ষড়ঙ্গ” নিবন্ধে মূলতঃ চিত্র নিয়ে বললেও, ভাস্কর্য সম্পর্কেও এই তত্ত্ব সমান কার্যকরী, সেকথা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝবেন।
আচার্য বলেছেন, আলেখ্যর ছয়টি অঙ্গ – যেমন রূপভেদ, প্রমাণ, ভাব, লাবণ্য-যোজনা, সাদৃশ্য আর বর্ণিকাভঙ্গ।
রূপভেদ–এই জগতে আমরা যা কিছু দেখি, তার থেকে একটি বা কয়েকটি বিষয় বেছে নিয়ে শিল্পী ছবি আঁকেন। সেই বিষয়ের বিশেষ ব্যক্তি, প্রাণী, গাছপালা অথবা বস্তুর বাহ্যিক রূপ সম্পর্কে শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ। অর্থাৎ চিত্রটি পুরুষ কিংবা নারীর, অল্প অথবা বেশি বয়সী, কোন দেশের, কোন শ্রেণির ইত্যাদি সকল বিষয়েই শিল্পীর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। উপরন্তু হরিণের চিত্র দেখে কোন সাধারণ দর্শক যদি সেটিকে শিং-না-গজানো ভেড়া বলে মনে করেন, তাহলে বুঝতে হবে, শিল্পীর রূপভেদ সম্পর্কে ধারণা অপ্রতুল।
প্রমাণ –রূপভেদের পরেই অথবা একই সঙ্গে এসে পড়ে প্রমাণ অর্থাৎ সামঞ্জস্যপূর্ণ আকার। যেমন নর ও বানরের অবয়বের কিছু সাদৃশ্য আছে আবার বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য আছে। বানরের শরীরে লেজ না দিলেই বানর নর হয়ে যায় না, কিংবা নরের শরীরে প্রচুর লোম, বানরোচিত মুখাবয়ব, একটি লেজ অথবা চারটি হাত এঁকে দিলেই নর বানর হয়ে যায় না। এই দুইয়ের মধ্যে আছে সূক্ষ্ম মাপ-জোক, অঙ্গ-সংস্থান এবং বিশেষ ভঙ্গিমা – সেটাই প্রমাণ। প্রাচীন শিল্পসাধকরা শিল্পমূর্তিকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন, যেমন নর, ক্রূর, আসুর, বালা এবং কুমার। এই পাঁচশ্রেণীর মূর্তির জন্যে তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীর তাল ও মান নির্দেশ করেছেন। এই তাল ও মান হল – সামঞ্জস্য এবং মাপ-জোক অথবা এক কথায় বলা চলে প্রোপোরশনস (proportions)। যেমন নরমূর্তি হবে দশতাল; ক্রূরমূর্তি দ্বাদশতাল; আসুরমূর্তি ষোড়শতাল; বালামূর্তি পঞ্চতাল এবং কুমারমূর্তি ষট্তাল। শিল্পীর নিজ মুষ্টির এক-চতুর্থাংশকে বলে এক আঙুল। এরকম দ্বাদশ আঙুল বা তিন মুষ্টিতে হয় এক তাল।
শিল্পাচার্য আরও বলেছেন, রাম, কৃষ্ণ, নৃসিংহ, ইন্দ্র, অর্জুন
প্রভৃতির মূর্তি নরমূর্তি অর্থাৎ দশ তাল। চণ্ডী, ভৈরব, বরাহ প্রভৃতি দ্বাদশ তালের
ক্রূরমূর্তি। হিরণ্যকশিপু,
রাবণ, কুম্ভকর্ণ, মহিষাসুর
প্রভৃতি ষোড়শ তালের আসুরমূর্তি। বটকৃষ্ণ বা গোপাল প্রভৃতি পঞ্চতালের বালামূর্তি
এবং বামন, কৃষ্ণসখা
প্রভৃতির ষট্ তালের কুমারমূর্তি। শুধু তাই নয়, দেহের বিভিন্ন অংশ, হাত-পায়ের
মাপ কোন মূর্তিতে কত হবে,
সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে, নর ও নারী মূর্তির প্রভেদ সহ। এ
বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এত নিয়ম-কানুন, নির্দিষ্ট মাপ-জোক দিয়ে, বৈচিত্রময়
মূর্তি কী করে আসবে - সবই তো একঘেয়ে এক ছাঁচের বানানো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা
হয় না। মোটামুটি একই প্রোপোরশনে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানব শরীর জন্ম নিচ্ছে, অথচ তাদের
প্রত্যেকেরই চেহারায় নিজস্ব ব্যক্তিত্ব রয়েছে।
ভাব - চিত্রের বহিরঙ্গ বিষয়ে রূপভেদ এবং প্রমাণের কথা হল, এবার আসবে অন্তরঙ্গ রূপ অর্থাৎ ভাব। ভাবের কিছুটা আমরা বুঝতে পারি ভঙ্গী দেখে, কিছুটা আমরা অনুভব করি হৃদয়ে। একটি মেয়ে ছবিতে গালে হাত দিয়ে বসে কিছু ভাবছে, অথবা এক যুবক কোমরের তলোয়ারের মুঠ শক্ত হাতে চেপে ধরেছে, এই ছবির ভাব খুবই সরল বুঝতে খুব অসুবিধে হয় না। কিন্তু ভাবের রাজ্য সর্বদা এতটা সহজ নাও হতে পারে, যেমন ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি বা ছবি। আসলে এই ভাবরাজ্যেই শিল্পী এবং দর্শকের অন্তরের আত্মীয়তা। শিল্পী কখনই তাঁর শিল্পে ভাবের পূর্ণপ্রকাশ করেন না, তাতে ভাবের মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। শিল্পী কিছুটা ইঙ্গিত এবং আভাস দিয়ে থেমে যান, সে আভাস ধরা পড়তে হবে দর্শকদের মনে। দর্শক যখন কল্পনায় ভাবের নাও ভাসিয়ে মুগ্ধ হতে থাকবেন, তখনই শিল্পীর ভাবনা সার্থক, সার্থক দর্শকের শিল্পী সত্ত্বা।
লাবণ্য-যোজন –লাবণ্য
শব্দের উৎপত্তি লবণ থেকে,
অতএব লাবণ্য-যোজনা অর্থ লবণ যোগ করা। শ্রীযুক্ত নারায়ণ সান্যাল মহাশয় আমাদের
মতো সাধারণ লোকের পক্ষে বোঝার সুবিধের জন্যে লিখেছেন, মাছের
তরকারি রান্নার সময়,
মাছ, আলু, পটল এই সব
উপাদান বিচারকে যদি আমরা “রূপভেদ” বলি, আর উপাদানের পরিমাণের অনুপাতে নানান
মশলা প্রয়োগ যদি হয় “প্রমাণ”, তাহলে সেই তরকারিতে সঠিক লবণ প্রয়োগই হচ্ছে, লাবণ্য-যোজনা।
সঠিক পরিমাণে, সঠিক
সময়ে লবণ না দিলে যত উৎকৃষ্ট মশলাই দেওয়া হোক, তরকারির স্বাদ আসে না। সঠিক সময়েও, কারণ, তরকারি
নামানোর মুহূর্তে লবণ দিলে তরকারির উপাদানগুলি সুচারু লাবণ্যময় হয়ে ওঠে না, আলুর ভেতরে
কিংবা মাছের অন্তরে লবণ ঢুকবে না।
এই স্থূল উপমার পরে, শ্রী রূপ
গোস্বামীপাদের শ্লোক থেকে আরেকটি উপমা দিলে লাবণ্য-যোজনার সঠিক তাৎপর্য বোঝা যাবে।
একটি মুক্তোকে তার আকার,
আয়তন, রঙ
সবই ছবি এঁকে বোঝানো যায়। কিন্তু মুক্তার সর্বাঙ্গে যে তরলিত ঢলঢল আভা সেটির তো
কোন রূপভেদ বা প্রমাণ দেওয়া যায় না। কিন্তু যে শিল্পী তাঁর চিত্রে মুক্তোর এই
আভাটিকে প্রকাশ করতে পারেন,
তিনি তাঁর চিত্রে লাবণ্য-যোজনা করেন।
এরপর সারনাথ, অজন্তা, ইলোরা, কোনার্ক, খাজুরাহোর
মতো বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানে যখনই বেড়াতে যাবেন, ভারতীয় শিল্প-ভাস্কর্যের এই ষড়ঙ্গ
তত্ত্বগুলি আশা করি মনে পড়বে।
চলবে...
চিত্রঋণঃ উইকিপিডিয়া