বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


পর্ব - ১

এই লেখাটা পড়ার সময় কী তোমাদের হবে? সকাল থেকে উঠে হোমটাস্ক, স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে ক্রিকেট কোচিং, নয়তো সাঁতার, নয়তো নাচ শেখা! সেটা সেরে আবার টিউশন যাওয়া! ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে আটটা-নটা! সত্যি বলতে তোমাদের সকলের প্রতিটা দিন এবং রাত ঘন্টা-মিনিটের ঘড়ি ধরে হিসেব করা সেখান থেকে একচুলও এদিক সেদিক হবার জো নেই সময়কে এভাবে ঘন্টা মিনিটে যদি ভাগ করা না যেত, তাহলে কী হত, আমাদের প্রত্যেকদিনের কার্যপ্রণালী? যাকে ইংরিজিতে বলে ডেলি শিডিউল!

 আদিম মানুষের সময়ের হিসেব ছিল খুবই সহজ আর সাধারণ দিন আর রাত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত হল কাজের সময়কাজ বলতে ছিল খাদ্যের সন্ধান আর খাওয়া তারপর সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাত্রের কাজ ছিল অল্পস্বল্প গল্পগাছা, বিশ্রাম আর গভীর ঘুম সময়ের এইটুকু অভিজ্ঞতা দিয়েই তাদের দিব্যি চলে গেছে হাজার হাজার বছর, অন্য কোন শিডিউল দরকারই হয়নি। প্রথমে আগুন জ্বালাতে শেখা, তারপর কৃষি এবং পশুপালন শিখে ফেলার পর, তাদের কাছে সময়ের একটা হিসেব মনের মধ্যে গড়ে উঠতে লাগল। কীভাবে গড়ে উঠল তাদের এই বোধ?

আদিম মানুষদের দলে কিছু বৃদ্ধ মানুষ থাকতেন, যাঁদের শিকার করতে যাওয়ার মতো কঠিন পরিশ্রমের সাধ্য হত না। তাঁরা গুহা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়েই থাকতেন, দলের শিশু, বালকদের দেখাশোনা করতেন, অসুস্থ কিংবা আহত সঙ্গীদের দেখভাল করতেন।  তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ লক্ষ্য করলেন, সূর্য উঠলে দিন হয়, সূর্য অস্ত গেলে রাত আসে। কিন্তু সূর্যটা এক জায়গায় স্থির নেই। সূর্য যেদিক থেকে ওঠে, সেদিকের নাম যদি পূর্ব দেওয়া হয়, তাহলে সূর্য অস্ত যায় তার উল্টোদিকে, সে দিকটার নাম দেওয়া হল পশ্চিম। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, সূর্যের আলোর উল্টোদিকে গাছপালা, খুঁটি এমনকি নিজেদেরও ছায়া পড়ে। সেই ছায়ার রকমসকম সারা দিনে একই থাকে না। ছোট হয়, লম্বা হয়, মানুষের সামনে অথবা পিছনে পড়ে থাকে। আর সূর্য যখন মধ্য আকাশে থাকে, তখন ছায়া পড়ে থাকে পায়ের নিচে – ছোট্ট হয়ে তেমনই রাত্রের চাঁদটাও সব দিন সমান থাকে না। পুরো চাঁদ দেখা যায় যে রাতে, সেই রাতকে যদি পূর্ণিমা বলা যায়, তারপরের রাত থেকেই রোজই চাঁদের আকার কমতে থাকে। কমতে কমতে এমন হয়, এক রাত্রে চাঁদকে দেখাই যায় না, সে রাতের নাম দেওয়া হল অমাবস্যা।             

 এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করতে করতে আদিম মানুষের বিজ্ঞ জনেরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব পেতে শুরু করলেন। তাঁরা দেখলেন পনেরদিন অন্তর চাঁদটা একবার পূর্ণিমা হয়, পরের পনেরদিনে হয় অমাবস্যা! এক একটা পনেরদিনের তাঁরা নাম দিলেন পক্ষ। অমাবস্যার পরের পনেরদিন শুক্লপক্ষ, পূর্ণিমার পরের পনেরদিনের নাম দিলেন কৃষ্ণপক্ষ। শুক্ল মানে সাদা, অমাবস্যার পর চাঁদ রোজই বাড়ে, প্রতি রাত্রিতে বাড়ে চাঁদের উজ্জ্বলতাও, তাই নাম শুক্লপক্ষ। আর পূর্ণিমার পর চাঁদ যতো ছোট হতে থাকে, প্রতি রাত্রে চাঁদের উজ্জ্বলতা কমতে থাকে, অন্ধকার হতে থাকে রাত্রের আকাশ, তাই তার নাম কৃষ্ণপক্ষ!

তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, বছরের সব সময় সূর্য পূর্ব দিকের একই জায়গা থেকে উদয় হয় না, আবার পশ্চিমের একই জায়গায় অস্তও যায় না, কিছুট করে সরে যায়। যার ফলে, বছরের কিছুদিন সূর্যের তেজ প্রখর হয়, সেই সময়ের নাম দেওয়া হল গ্রীষ্ম (summer)। এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে দীর্ঘতম হয়ে ওঠে। আর যে সময়ে সূর্যের তেজ বেশ কম থাকে সেই সময়ের নাম দেওয়া হল শীত (winter) এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে হ্রস্বতম হয়ে ওঠে।

নির্মল রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, আকাশের অজস্র নক্ষত্র, কিছু কিছু গ্রহ। অজস্র সেই নক্ষত্রের মধ্যে তাঁরা কয়েকটি নক্ষত্র চিনে ফেললেন! কয়েকটি নক্ষত্রের সমষ্টিকে একত্রে এক একটা বিশেষ আকার কল্পনা করে তাদের নামও রাখতে শুরু করতে লাগলেন। যেমন কালপুরুষ (Orion) এবং তার পায়ের কাছে থাকে একটি কুকুর এবং একটি শশক। এইভাবেই তাঁরা খুঁজে নিতে পারলেন, আরো বেশ কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী, যেমন সপ্তর্ষিমণ্ডল (Great bear), তুলা (Libra), মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), ধনু (Sagittarius) ইত্যাদি। তাঁরা আরো লক্ষ্য করলেন, এই নক্ষত্রমণ্ডলীগুলির কোনোটিই আকাশের এক জায়গায় স্থির থাকেনা। এক এক সময় আকাশে কিছু কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী দেখা যায়। তারা প্রতিদিন অল্প অল্প সরে সরে যায়, কিছুদিন পর তাদের আর দেখাই যায় না। তখন আকাশে উদয় হয় নতুন কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী। আরো আশ্চর্য ব্যাপার বেশ কিছুদিন, মোটামুটি প্রতি ৩৬৫ দিনের পর পর, নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীগুলিই আকাশের নির্দিষ্ট অবস্থানে বার বার ফিরে আসে।


বিভিন্ন মাসের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থান 

দীর্ঘ দিন লক্ষ্য করতে করতে তাঁরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব গড়ে তুলতে পারলেন। তাঁরা সেই নির্দিষ্ট সময়ের নাম রাখলেন বর্ষ বা বছর। আকাশে নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রের নির্দিষ্ট উপস্থিতি অনুযায়ী, তাঁরা আরও একটা হিসাব করে ফেললেন, সেটির নাম দিলেন মাস। যেমন বিশাখা নক্ষত্র, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, আষাঢ়, শ্রবণা, ভদ্রা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা ইত্যাদি। নক্ষত্র অনুযায়ী মাসের নাম রাখলেন বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক। এরকমই পুষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

তাঁরা বুঝতে পারলেন, আমাদের এই ধরিত্রী এবং আকাশের ওই সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সকলেই নির্দিষ্ট নিয়মের এক শৃঙ্খলে বাঁধা। সূর্য, গ্রহ-তারাদের নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্যই পৃথিবীতে গ্রীষ্ম আসে। মাস দুয়েক সময় সূর্যের প্রখর তাপে জলাশয়ের জল শুকিয়ে যায়, জলের অভাবে কাতর হয়ে ওঠে সকল জীব, প্রাণী, গাছপালা প্রকৃতি। তারপরেই আকাশ জুড়ে ভেসে আসে ঘন মেঘ, প্রখরতাপে তপ্ত মাটি ভিজিয়ে নেমে আসে বৃষ্টি ধারা। দুই মাস ধরে চলা নিয়মিত বর্ষণে মাঠ ভরে ওঠে সবুজ শস্যে। গাছপালা প্রকৃতি পুষ্টি পায়, নদী নালা, খাল, বিল জলে ভরে ওঠে। এইভাবেই গড়ে উঠল ঋতুর ভাবনা। এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে প্রকৃতির পরিবর্তনগুলোও তাঁদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। তাঁরা বুঝতে শিখলেন বর্ষচক্র (Wheel of the year)। এই বর্ষচক্রর ধারণা থেকেই তাঁরা কৃষিকাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত, বীজ বপন থেকে ফসল তোলা - সমস্ত কাজের সঠিক সময় নির্দিষ্ট করে ফেললেন। তাঁরা নির্দিষ্ট করে ফেললেন মৃগয়া ও শিকার উৎসবের সময় শরৎ, ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উৎসবের সময়!

সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রদের পর্যবেক্ষণ করে, পক্ষ, মাস, ঋতু এবং বছরের হিসেব বুঝতে মানুষের কয়েক হাজার বছর লেগে গিয়েছিল। প্রাচীন যুগে খালি চোখে পর্যবেক্ষণের যে হিসেব, তার সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হিসেবে কিছু কিছু ভুল ভ্রান্তি ধরা পড়েছে, কিন্তু সেগুলো খুব একটা মারাত্মক নয়। সে কথায় পরে আসবো।

 

প্রাচীন যুগের মানুষেরা দিন ও রাতের হিসেব, সূর্যোদয় – সূর্যাস্ত – সূর্যোদয়, এই নিয়মেই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কৃষি, ও বাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানান বৃত্তি ও পেশার সৃষ্টি হল, তার সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামাজিক জটিলতা যতো বাড়তে লাগল, ততই সময়ের সূক্ষ্মতর পরিমাপ জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। প্রথম দিকে দিনও রাতকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হত, এভাবে - ভোর, সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যে, মধ্যরাত্রি, শেষরাত্রি। প্রাচীন ভারতে দিন ও রাতকে ৬০ ভাগে ভাগ করা হত, প্রত্যেকটি ভাগকে বলা হত ঘড়ি। দিন ও রাত প্রত্যেককে আবার চারটি প্রহরেও ভাগ করা হত। আমাদের আধুনিক যে নিয়মে দিন ও রাতকে পরিমাপ করা হয়, সেই ২৪ ঘন্টার নিয়মের সূত্রপাত করেছিলেন ব্যবিলনের বাসিন্দারা - ১৯০০-১৬৫০ বিসিইতে। ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা এবং ৬০ সেকেণ্ডে এক মিনিট – এই নিয়মও তাঁরাই শুরু করেছিলেন। 

 

সূর্যঘড়ি (Sun clock or Sun dial)

সব থেকে প্রাচীন ও সহজ যে সময় মাপার যন্ত্রের কথা জানা যায়, তার নাম সূর্য ঘড়ি। এই ঘড়ি সারা বিশ্বেই বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ছিল। সমতল মাটিতে একটি লম্বা খুঁটি পুঁতে, দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোয়, তার ছায়ার অবস্থান ও দৈর্ঘ থেকে সময়ের আন্দাজ পাওয়া যেত। তবে ঘড়ি হিসেবে সূর্যঘড়ির ব্যবহার সর্বপ্রথম মিশরে শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

মিশরের ভ্যালি অব কিংস থেকে পাওয়া প্রথম সূর্যঘড়ির নিদর্শন (১৫০০ বিসিই) - 


চিনের হান সাম্রাজ্যের সমসাময়িক সূর্যঘড়ি (৩০০ - ২০০ বিসিই)


 

ওপরের ছবিতে ইংল্যাণ্ডের সেন্ট মাইকেল’স মাউন্ট পাহাড়ে অবস্থিত দুর্গের প্রাচীরে রাখা মধ্যযুগের উন্নত সূর্যঘড়ি। মাঝের কোনাকুনি খাড়া করা খুঁটির ছায়া দেখে সময় বুঝতে কোন অসুবিধে হত না। 

সূর্য ঘড়ি পরিষ্কার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের পরিমাপ করতে খুবই উপযোগী ছিল, কিন্তু সমস্যা হত মেঘলা দিনগুলিতে। কারণ সূর্যের আলোয় ছায়া না হলে, এই ঘড়ি অচল! 

 

জলঘড়ি (Water Clock)

প্রাচীন মিশর সভ্যতায় প্রথম জলঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। এই ঘড়ি পরবর্তীকালে প্রাচীন গ্রীসেও বহুল ব্যবহৃত হত। নির্দিষ্ট আকারের একটি পাত্রের নিচের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে, পাত্রে ভরা জল যতক্ষণে খালি হয়ে যেত, সেই সময়কে একঘন্টা ধরা হতো। চিনের ঝাউ রাজাদের আমলে (মোটামুটি ২০০০ বিসিই) এই ধরনের ঘড়ি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।      

আমাদের দেশে প্রাচীনতম যে জলঘড়ির নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার নাম “ঘটিকা যন্ত্র”। ঘটিকা, ঘড়ি শব্দগুলির উৎপত্তি একই শব্দমূল থেকে। লক্ষ্য করে থাকবে আমরা আজও আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ পত্রে এবং পূজার নির্ঘন্টে “ঘটিকা” কথা ব্যবহার করে থাকি। প্রাচীন রাজাদের প্রাসাদে এই ঘটিকা যন্ত্রের প্রচলন ছিল। যে রাজকর্মচারীরা এই ঘড়ি ব্যবহার করে সময় ঘোষণা করত, তাদের বলা হত “ঘড়িয়ালি”। নিচের দিকে ছোট্ট ছিদ্রওয়ালা একটি খালি পাত্র, জলভরা একটি বড়ো পাত্রের মধ্যে রেখে দেওয়া হত। বড় পাত্রের জল, ছোট্ট ছিদ্রপথে ছোট পাত্রের ভেতরে ঢুকে, ছোট পাত্রটি জলে ভরে উঠে ডুবে গেলেই – নির্দিষ্ট সময়ের হিসেব পাওয়া যেত। পাত্রের আকার অনুযায়ী, সে সময়ের মাপ হত, কোথাও অর্ধ প্রহর, কোথাও পূর্ণ প্রহর। ঘড়িয়ালিরা ঘটিকা যন্ত্রের হিসেব অনুসারে, কাঠের হাতুড়ি দিয়ে উঁচুতে ঝোলানো কাঁসা বা পেতলের বড়ো ঘন্টা বাজিয়ে প্রাসাদের সকলকে প্রহর বা অর্ধপ্রহর সম্পর্কে অবহিত করত।

 

বালু ঘড়ি (Sand clock or Hour Clock)

বালু ঘড়িতে কিছু মিনিট অথবা ঘণ্টা খানেক সময়ের পরিমাপ করা চলত। এই ঘড়ির প্রথম কোথায় প্রচলন হয়েছিল বলা শক্ত, তবে মধ্য যুগের শুরুতে সারা বিশ্বেই এই ঘড়ির বহুল প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ছবিতে দেখানো দুটি কাচের ফানুস (Glass Bulbs), কাঠ বা সুদৃশ্য ধাতব ফ্রেমে বসানো থাকত। কাচের ফানুসদুটি মুখোমুখি জোড়া থাকত এবং তার মধ্যে থাকত খুব ছোট্ট একটি ছিদ্র। কাচের ফানুস বানানোর সময়েই তার মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে শুকনো দানাদার বালু ভরে দেওয়া হত। এবার ওপরের ফানুস থেকে সমস্ত বালু নিচের ফানুসে ঝরে পড়তে যে সময় লাগত, সেই সময়কেই ঘন্টা বা কয়েক মিনিটে পরিমাপ করা যেত। ওপরের ফানুসের বালি নিঃশেষ হয়ে গেলে, যন্ত্রটিকে উলটে বসিয়ে দিলেই, আবার চালু হয়ে যেত পরবর্তী সময়ের পরিমাপের জন্যে! 

    

বাতি ঘড়ি (Candle Clock)

চিনা কবি ইউ জিয়ানফুর (৫২০ সিই) কবিতায় প্রথম বাতি ঘড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। এই ঘড়ি বিশেষতঃ রাত্রের সময় পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হত। জাপানে এই ধরনের বাতি-ঘড়ির প্রচলন মোটামুটি দশম শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এই ঘড়িতে সারাদিনের জন্য সাধারণতঃ ছটি উৎকৃষ্ট মোমের বাতি ব্যবহার করা হত এবং প্রত্যেকটি বাতি চার ঘন্টা করে জ্বলত। প্রত্যেকটি বাতির আকার নির্দিষ্ট হত এবং তাতে বারোটি করে সমান ভাগ করা থাকত। এক একটি ভাগ পুড়তে সময় লাগত মোটামুটি কুড়ি মিনিট। বাতি জ্বালানোর পর পুরো যন্ত্রটিকে কাঠের ফ্রেম দিয়ে বানানো কাচের বাক্সে রেখে দেওয়া হত, যাতে বাইরের হাওয়া লেগে, মোমবাতি তাড়াতাড়ি না জ্বলে যায়।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নানা রকমের ঘড়ির প্রচলন ছিল। তার মধ্যে  দীপ-ঘড়ি (Oil-lamp clock), গন্ধ-ঘড়ি (Incense clock) উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশেও প্রাচীন কালে এই দুই ঘড়ির বহুল প্রচলন ছিল। বাতি ঘড়ির মোমের পরিবর্তে, দীপ ঘড়িতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হত এবং নির্দিষ্ট সলতে দিয়ে দীপ জ্বালানোর ফলে, তেলের পরিমাণ কমে যাওয়া অনুযায়ী সময়ের পরিমাপ করা হত!

             দীপ ঘড়ি                                              গন্ধ বা ধূপ ঘড়ি

গন্ধ ঘড়িকে সহজ ভাষায় ধূপ-ঘড়িও বলা যায়। চন্দন কাঠের গুঁড়ো, ধুনো, গুগ্‌গুল, রজন (Resin)-এর সঙ্গে মিশিয়ে লম্বা এবং মোটা কাঠি বানানো হত। সময়ের হিসেবের জন্যে সেই কাঠির গায়ে নির্দিষ্ট দাগ কেটে দেওয়া হত।       

পরবর্তী সময়ে সেই দাগের ওপর সুতোয় বাঁধা ছোট্ট ছোট্ট ধাতুর বল ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ধুপ পুড়তে পুড়তে এক একটি দাগে পৌঁছোলেই দাগের ওপর রাখা সুতো আগুনে পুড়ে যেত এবং ধাতব বলটি পড়ে যেত গন্ধ-ঘড়ির তলায় রাখা ধাতব থালায়। তাতে যে ঠং বা টুং শব্দ হতো তাতে ঘরের লোক সময় সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠত। 

পণ্ডিতেরা বলেন, এই ধূপ-ঘড়ির প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ভারতে এবং বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে এই ধুপ-ঘড়ির প্রযুক্তি তিব্বত ও চিনেও বহুল প্রচলিত হয়েছিল। বৌদ্ধ গুম্ফাতে আজও এই ধূপ-ঘড়ি ব্যবহার হয়ে থাকে, সময়ের পরিমাপ করার জন্যে ততটা নয়, বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপকরণ হিসেবে!

বাতি ঘড়ি কিংবা দীপ ঘড়ির থেকে ধূপ ঘড়ি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল, তার কারণ ঘরের মধ্যে বাতি বা দীপের আগুনের তুলনায় ধূপের আগুন অনেক নিরাপদ। উপরন্তু ধূপের পবিত্র গন্ধ দীর্ঘ সময়ের জন্যে, ঘরের পরিবেশকে বদলেও দিতে পারে।

এতক্ষণ যে ঘড়িগুলির কথা বললাম, তার মধ্যে ধূপ-ঘড়িটিই আমার খুব পছন্দের! কিন্তু এই ঘড়ির ভরসায় শেয়ালদা থেকে সন্ধে ৭-৪২ এর বনগাঁ লোকাল, অথবা দমদম থেকে সকাল ৬-১৫-র দিল্লির ফ্লাইট ধরা যাবে কি? মনে হয় না, সেক্ষেত্রে অন্য রকম ঘড়ি দরকার, সে সব ঘড়ির কথা বলবো পরের পর্বে।

চলবে...          

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০ 


২৭

 

সেদিন সন্ধের একটু পরে, ভল্লা ঘরের বাইরে বসেছিল, রামালি পুকুরে গিয়েছিল জল আনতে। হঠাৎই চার-পাঁচজন মানুষের পায়ের শব্দে ভল্লা সতর্ক হয়ে উঠল। যে পাথরে সে সাধারণতঃ বসে, তার ঠিক পিছনের দিকে মাটির কাছাকাছি একটা বড়ো খোঁদলের মধ্যে রাখা আছে ছোট্ট একটা ভল্ল। খোঁদলের মুখে ঘন ঝোপ-ঝাড়ের জন্যে সহজে তার সন্ধান পাওয়া যায় না। ভল্লা হাত বাড়িয়ে ভল্লটা ধরে থাকল। কে হতে পারে লোকগুলো? এই সন্ধেয় তাদের কী দরকার? একটু পরেই বেড়ার বাইরে থেকে কেউ ডাকল, “ভল্লামশাই, রয়েছেন নাকি? আমি বণিক অহিদত্ত”।

কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, "বণিকমশাই ওদিকে নয়, আপনি বাঁদিক দিয়ে ঘুরে আসুন। অনেকদিন পর, কী ব্যাপার?”

অহিদত্ত উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বললেন, “এই তাহলে আপনার নির্বাসনের বাসা?”

ভল্লা কিছু বলল না, হাসল।

“আপনার সঙ্গে কিছু গভীর কথা ছিল। এখানে কি নিরাপদ? তাছাড়া আমার সঙ্গে চারজন রক্ষীও রয়েছে...”।

এই সময়েই রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরে এল। উঠোনে অপরিচিত লোকটিকে দেখে একটু অবাক হল। ঘরে ঢুকে চর্বির প্রদীপ জ্বালিয়ে বাইরে আনতে, ভল্লা বলল, “রামালি, ইনি অহিদত্ত। বিখ্যাত বণিক। তুই এখন রান্নাবান্না করবি তো? আমি ওঁনার সঙ্গে দণ্ড দুয়ের জন্যে ঘুরে আসছি। বণিকমশাই এই ছেলেটিকে চিনে রাখুন, রামালি। আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। আমার সঙ্গেই থাকে। আপনার রক্ষীদের বলুন, তারা এখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক  চলুন, আমরা ঘুরে আসি”।

 

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা গিয়ে ভল্লা অহিদত্তকে নিয়ে ফাঁকা একটা জায়গায় বসল। আশপাশে ছোটছোট ঝোপ ঝাড়, কাছাকাছি কোন বড় গাছ নেই। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের কথা কেউ শুনবে, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

“বাঃ জায়গাটা বেশ বেছেছেন তো! চারদিকের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝির যা আওয়াজ আসছে...এমনিতেই কিছু শোনা যাবে না...”।

ভল্লা হাসল, বলল, “কী সংবাদ বলুন। তার আগে আমার একটা অনুরোধ আছে, রাখতে হবে”।

“কী অনুরোধ?”

“আপনাদের ওদিক থেকে ভালো কোন কবিরাজকে পাঠাতে পারবেন?”

“প্রধানমশাইয়ের চিকিৎসার জন্যে?”

“শুনেছেন?”

“বাঃ শুনব না? কালকে দুপুরে আস্থানের রক্ষীরা নোনাপুর আর সুকরা গ্রামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সে খবর তো দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভল্লামশাই। প্রধানমশাইকে যাচ্ছেতাই মেরেছে। কবিরাজমশাইকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। সুকরার ভীলকদাদাকেও বিচ্ছিরি মেরেছে কোন কারণ ছাড়াই। আস্থানের রক্ষীদের ভয়ে সহজে কেউ আসতে চাইবে না হয়তো। তবু আমি পাঠিয়ে দেব, কাল সকালেই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন”।

“প্রধানমশাই ছাড়াও, রামালির কাকাকে একবার দেখতে হবে। আর সুকরার ভীলককাকাকেও...”।

“রামালি? যার সঙ্গে আপনি এই মাত্র পরিচয় করিয়ে দিলেন?”

“হ্যাঁ ওর কাকা। ওঁনার অবস্থা ততটা সঙ্গীন নয়, তবুও আপনাদের কবিরাজমশাই যাচ্ছেন যখন একবার দেখে এলে ভাল হয়”।

“ঠিক আছে, হয়ে যাবে। আর কিছু?”

ভল্লা হাসল, বলল, “নাঃ আর কিছু না। এবার কাজের কথা বলুন”।

অহিদত্ত মুচকি হেসে বললেন, “আপনি এদিকের পরিস্থিতি যে ভাবে পাকিয়ে তুলেছেন, তাতে আপনার অনেক অস্ত্রশস্ত্র লাগবে তো?”

ভল্লাও হাসল, বলল, “শুধু এদিকের না, আপনাদের দিকের ছেলেরাও অস্ত্র কিনতে চাইছে...আমার কাছে ওরা তিন-চারদিনের মধ্যেই আসবে পাকা কথা শোনার জন্যে”।

“আমাদের দিকের ছেলেরা? কী বলছেন, ভল্লামশাই?”

“আপনাদের রাজা নাকি, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে রাস্তা-ঘাট না বানিয়ে, সেচব্যবস্থা না করে, গ্রামে গ্রামে মন্দির বানিয়ে চলেছেন?”

“হুঁ, তা চলেছেন। আর সে মন্দির বানানোর কাজ পাচ্ছে রাজধানীর জনা তিনেক বড়োবড়ো শ্রেষ্ঠী। বজ্জাতরা এক-একজন টাকার কুমীর। রাজ্যের ছোট-বড়ো সমস্ত আধিকারিকদের সঙ্গে জোটপাট করে, রাজ্যের সবদিকে তারা অজস্র মন্দির বানিয়ে চলেছে। কিন্তু তার সঙ্গে গ্রামের সাধারণ ছেলেদের কী সম্পর্ক?”

“তারা নিজেদের আর আশেপাশের গ্রামের ওই দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের জব্দ করতে চাইছে। তার জন্যে ওদের অস্ত্র চাই”।

অহিদত্ত বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “আপনি কি জানেন, আপনাদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে পুরোনো অস্ত্র কেনার একটা দায়িত্ব আমি পেয়েছি? সে অস্ত্র আপনি আমার থেকেই পাবেন, এদিককার আন্দোলনের জন্যে। কিন্তু আমাদের রাজ্যের ছেলেদের...না ভল্লামশাই, আমাদের রাজ্যের ছেলেদের অস্ত্র দিলে আমি ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবো। আমাদের রাজধানীতে এই খবর একবার পৌঁছলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বণিকরা আমার পিছনে লাগার দারুণ সুযোগ পেয়ে যাবে। আধিকারিকদের সঙ্গে মিলে আমার ভিটেমাটি চাঁটি করে দেবে...”।

“তাহলে? ওরা অস্ত্র পাবে না?”

“পাবে না কেন? আপনি ওদের দেবেনআমি দেব আপনাকে। তাতে সবারই শুভ লাভ হবে”।

শুভ লাভ?”

“বুঝলেন না? ধরুন আমি আপনাকে কিছু অস্ত্র দিলাম এক টাকার বিনিময়ে। আপনি ওদের দেবেন, সোয়া দুটাকা কিংবা আড়াই টাকা দরে। এক টাকায় আপনি আমার দেনা শোধ করে দেওয়ার পরেও, আপনার হাতে থাকবে দেড়টাকা। আপনাদের খরচ-খরচা, আর ভবিষ্যতের সঞ্চয়। আপনার দল বাড়লে তার খরচও তো বাড়বে ভল্লামশাই”।

“কিন্তু আপনাদের ছেলেরা কতদিন আর অস্ত্র কিনবে, কতটুকুই বা কিনবে?”

বণিক অহিদত্ত অদ্ভূতভাবে হাসলেন, বললেন, “আমি আপনাদের রাজধানীতেই অতি বিচক্ষণ একজন মানুষের কাছে, কিছুদিন আগেই, একটা কথা শুনলাম। সেটাই আপনাকে বলি। আপনি আমার থেকেও অনেক বেশী প্রত্যক্ষদর্শী, বিচক্ষণওঁনার কথাগুলোর মর্ম আপনি আমার থেকেও ভালো ধরতে পারবেন।

উনি বলছিলেন, ক্ষমতার মতো দুর্ধর্ষ নেশা আর হয় না। তার তুলনায় অর্থ, মদ, গাঁজা, চরস, ভাঙ, নারীর যৌবন কিস্‌সু না। একবার যদি কেউ এই ক্ষমতার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তার ফিরে আসার সব পথ বন্ধ। এই ক্ষমতা সে কিভাবে অর্জন করতে পারে? প্রথমে ছোট করেই শুরু হবে...কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ জোটাবে, ছোটখাটো অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে খুচখাচ কিছু চুরি, ডাকাতি করবে...কিছু অর্থ উপার্জন করবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা আরো অস্ত্রশস্ত্র কিনবে, আরও বড়ো বড়ো ডাকাতি করবে। তার ক্রিয়াকলাপে আকৃষ্ট হয়ে আরো অনেক সাঙ্গোপাঙ্গ এসে জুটবে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে তার ক্ষমতার চারাগাছটি – মহীরূহে পরিণত হবে...। ব্যস্‌, এই পরিস্থিতিতে তার কাছে সব আছে... ক্ষমতা, অর্থ, লোকবল। এখন সে একটা ছোট্ট অঞ্চলের রাজাই বলা চলে।

কোন রাজার পক্ষেই রাজ্যের আপামর জনসাধারণকে সমভাবে তুষ্ট রাখা অসম্ভব। তার কারণ প্রশাসনের গাফিলতি থাকতে পারে। তার কারণ আঞ্চলিক পরিবেশ – মানে কোথাও সুজলা, সুফলা উর্বর, আবার কোথাও রুক্ষ, ঊষর – হতে পারে। কোথাও প্রচুর খনিজ সম্পদ, আমাদের এদিকে যেমন সবই ঢুঢু। সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদীবহুল অঞ্চলে বাণিজ্যের যেমন সহজ প্রসার হয়, আমাদের এই অঞ্চলে দেখুন, সে সম্ভাবনাও অপ্রতুল। অতএব নানান কারণে কোন কোন অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের বঞ্চনার শিকার মনে করে ক্ষুব্ধ হতে থাকে।

সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ওই আঞ্চলিক রাজা এবার মূল প্রশাসনের সমান্তরালে, জনদরদী এক আঞ্চলিক   প্রশাসন গড়ে তুলতে শুরু করবে। এদের ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গোরা হয়ে উঠবে ওই প্রশাসনের আধিকারিক। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী জনগণ হবে এদের অনুগামী সমর্থক। তখন কিন্তু ওরা আর ডাকাত নয়, নিজেদের পরিচয় দেবে বিদ্রোহী, বিপ্লবী কিংবা সমাজ-সংস্কারক। উল্টোদিকে মূল রাষ্ট্র এবং প্রশাসন, তাদের নাম দেয় বিচ্ছিন্নতাকামী, সন্ত্রাসবাদী – রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নাশক পরজীবী গোষ্ঠী

এবার সে রাজ্যের রাজার সঙ্গেই বিপ্লবে নামতে পারে। সরাসরি বিচ্ছিন্ন কিছু যুদ্ধেও নামতে পারে। আর সে রাজ্যের রাজা যদি সাধারণ প্রজাদের অপছন্দের রাজা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। দেখা যাবে, ধীরে ধীরে সে রাজাকেই পরাস্ত এবং হত্যা করে – রাজ্যের অধীশ্বরও হয়ে উঠতে পারে। অবিশ্যি সবাই যে অতদূর যেতে পারবে, তা নয়, ক্বচিৎ দু একজনই পারে। আপনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নাম শুনেছেন?”

ভল্লা মাথা নাড়ল, না।

“আমিও শুনিনি। উনি কোন এক সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের নাম বললেন। তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, নাম চাণক্য। বহু যুগ আগে দুজনে মিলে পরাক্রমশালী নন্দবংশের সম্রাটকে পরাস্ত করে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন”।

“তিনি তো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেছিলেন। তিনি বিদ্রোহী হতে পারেন, কিন্তু ডাকাত হতে যাবেন কেন?”

“আমিও একই প্রশ্ন করেছিলাম, ভল্লামশাই। তিনি উত্তরে বললেন, ইতিহাসে তিনি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত নামেই প্রসিদ্ধ। শুরুর দিকে, যখন তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক চন্দ্রগুপ্ত মাত্র, যখন নন্দ-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী কিছু কিছু অঞ্চল তিনি নিজের আয়ত্তে আনছিলেন, রাজধানীতে নন্দরাজার সেনাপ্রধানরা, তাঁকে ডাকাতই মনে করেছিল। তারা ভাবত, হতভাগা ডাকাতটাকে, একবার ধরতে পারলে শূলেই চড়াবো। সেনাপ্রধানদের সে স্বপ্ন অবশ্য পূর্ণ হয়নি।

ওসব বড়ো বড়ো কথা ছেড়েই দিন ভল্লামশাই। এখানেই দেখুন না, প্রশাসন আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে, রাজার বিরুদ্ধে কিছু বিদ্রোহ বানিয়ে তোলার জন্যে। আপনার ছেলেরা সবাই ভাবছে তারা বিদ্রোহ করছে। কিন্তু আপনার প্রশাসন গতকাল গ্রামে গিয়ে, বিদ্রোহের নয় - ডাকাতির তদন্ত করেছেগ্রামের বয়স্ক মানুষদের পীড়ন করেছে, ভয় দেখিয়েছে, যাতে তারা এই ধরনের ডাকাতি ভবিষ্যতে আর না করে”।

অতএব, কে কি নামে ওদের ডাকল, তাতে কিছু এসে যায় না, ভল্লামশাই। আসল কথাটা হল, ক্ষমতার নেশায় মজে থাকা এই গোষ্ঠীগুলির নিয়মিত অস্ত্রের সরবরাহ না পেলে চলবে কী করে ভল্লামশাই? ও নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন”।

ভল্লা চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “ঠিক কবে থেকে আপনি অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন?”

“রাজধানী থেকে গত পরশু রওনা হয়েছে। আপাততঃ চারটি গোশকটে। আশা করি দিন দশেকের মধ্যে আস্থানে পৌঁছে যাবে”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “অস্ত্র-শস্ত্রের মূল্য কী রকম ধরছেন?”

অহিদত্ত হেসে বললেন, “আমি কে মশাই? মূল্য তো আপনি ঠিক করে দেবেন। শষ্পকমশাই নির্দিষ্ট দিনে তাঁর লোক পাঠাবেন...আমিও থাকব...সকলে মিলে বসে মূল্য ঠিক করা যাবে। কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গেল ভল্লামশাই – আমি আজ উঠি – অনেকটা পথ যেতে হবে...। রাজধানীর অস্ত্র কাছাকাছি পৌঁছলেই আমি আবার আসব...”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, গম্ভীর মুখে বলল, “হ্যাঁ চলুন এগোনো যাক – ভয়ংকর এক বিদ্রোহের দিকে...”।

অহিদত্ত ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বললেন, “নাঃ, সে এখনও দেরি আছে। আপাততঃ আপনার বাসার দিকেই যাওয়া যাক...”।

চলবে...

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

অষ্টাদশ পর্বাংশ  


৪.৮.১১ চোল বা চোড়

তামিল চোল শব্দের অর্থ “ভবঘুরে”, অনেকে বলেন, সংস্কৃত “চোর” থেকে চোড় শব্দের সৃষ্টি, অথবা দক্ষিণ ভারতের “কোল” নামে প্রাক-আর্য জনগোষ্ঠীরাই চোল। যাই হোক না কেন, চোলরা ছিলেন দক্ষিণ ভারতেরই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেদের পৌরাণিক সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।

প্রাচীন চোল-মণ্ডলম বলতে পেন্নার এবং ভেল্লারু (ভেল্লার) এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, অর্থাৎ আজকের তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লি এবং পাণ্ডুকোট্ট রাজ্যের কিছুটা। এই সীমানা অবশ্য চোল রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তি অনুযায়ী কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।

চোল বা চোড়দের নাম প্রথম শোনা যায় চতুর্থ শতাব্দী বি.সি.ই-র বৈয়াকরণ কাত্যায়নের পাণিনি-ভাষ্যে। এঁদের নাম মহাভারতে এবং সম্রাট অশোকের শিলা নির্দেশেও পাওয়া যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে বন্ধু রাজ্য হিসেবে চোল বা চোড়দের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপর সিংহলের বৌদ্ধ গ্রন্থ “মহাবংশ” থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি কোন সময়ে জনৈক চোল রাজা ইলার সিংহল দ্বীপ জয় করেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এরপর তামিল সাহিত্য গ্রন্থ “সঙ্গম”- থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টিয় কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন মহিমান্বিত চোল রাজার কথা, যাঁরা সুবিচার এবং দানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইলাঞ্জেটচেন্নির পুত্র করিকাল। তাঁর সময়েই নাকি চোল রাজ্যের বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি পাণ্ড্য ও চেরা রাজাদের এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী-প্রধানদের পরাস্ত করে চোলরাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন পেরুনারকিল্লি, তিনি রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন এবং রাজা করিকালের মতোই অনেক কীর্তি স্থাপনা করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দী সি.ই.-তে চোলরাজ্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে, পল্লব, পাণ্ড্য এবং চেরদের ক্রমাগত আক্রমণে।

চোল বংশের নতুন রাজত্বের শুরু করেছিলেন রাজা বিজয়ালয়। যদিও তাঁর সঙ্গে প্রাচীন চোলদের সম্পর্কের সঠিক সন্ধানসূত্র পাওয়া যায় না। ৮৫০ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে তিনি পল্লবদের সামন্তরাজা হয়ে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। শোনা যায় তিনি তাঞ্জাভুর বা তাঞ্জোর অবরোধ করে, পাণ্ড্য রাজার সামন্তরাজা মুত্থারাইয়ার প্রধানকে পরাজিত করেন।

প্রথম আদিত্যঃ রাজা বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য ৮৭৫ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, এবং পল্লবরাজ অপরাজিত বর্মনকে পরাজিত করে, তোণ্ডামণ্ডলম অধিকার করে নিয়েছিলেন ৮৯০ সি.ই.-তে। তারপর পশ্চিমা-গঙ্গদের রাজধানী তালকড়ও নাকি অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, বেশ কিছু শিব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।

প্রথম পরান্তকঃ প্রথম আদিত্যের পুত্র প্রথম পরান্তক যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের সীমানা বিশাল – পূর্বের কলহস্তী এবং উত্তরের মাদ্রাজ (চেন্নাই), দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত। তাঁর ৯০৭-৫৩ সি.ই.-র রাজত্বকালে এই সীমা তিনি আরও বাড়িয়েছিলেন। প্রথমে তিনি অধিকার করলেন পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহের রাজ্য, যার জন্যে জয়সিংহকে সিংহলে পালাতে হয়েছিল। এই জয়ের পর তিনি “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পল্লবরাজাদের সরিয়ে নেল্লোর পর্যন্ত পল্লব রাজ্য অধিকার করে নিলেন। অবশ্য তাঁর সিংহল বিজয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ তাঞ্জোর এবং কাঞ্চী অবরোধ করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম পরান্তকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মারা গিয়েছিলেন, এবং শোনা যায় তৃতীয় কৃষ্ণ বিনা বাধায় রামেশ্বরম পর্যন্ত বিজয় অভিযান করেছিলেন। এই সময় চোলরাজ্য ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল এবং এখান থেকে উদ্ধার পেতে তাঁদের বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম পরান্তকও শৈব ছিলেন, তিনিও তাঁর পিতার মতো অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সোনায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

৯৫৩ সি.ই.-তে পরান্তকের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন চোলদের খুব স্পষ্ট কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। শোনা যায় তাঁর দুই পুত্র গণ্ডারাদিত্য এবং অরিঞ্জয় রাজা হয়েছিলেন। তারপরে অরিঞ্জয়ের পুত্র সুন্দরচোল এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আদিত্য করিকাল এবং উত্তমচোল রাজা হয়েছিলেন। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং চোল রাজত্বে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারেননি।

প্রথম-রাজরাজ(৯৮৫-১০১৪ সি.ই.) - সুন্দরচোলের পুত্র প্রথম-রাজরাজ রাজা হওয়ার পর চোলরাজ্যের আবার গৌরবময় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা। কিন্তু তাঁর পরাক্রম, বুদ্ধি এবং রণদক্ষতা চোলরাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাজবংশ করে তুলেছিল। প্রথমেই তিনি চেরদের রাজ্য জয় করলেন, চের রাজ্যের কান্ডালুর ধ্বংস করলেন। এরপর জয় করলেন মাদুরা, সেখানকার পাণ্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গকে বন্দী করলেন। এরপর জয় করলেন কোল্লাম এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের দুর্গ শহর উদাগাই (উটি) এবং মালাইনাড়ু (কুর্গ)। এরপর তিনি উত্তর সিংহল জয় করে, ওই অঞ্চলের নাম রাখলেন, মুম্মদি চোলামণ্ডলম। এরপর তিনি গঙ্গবাড়ি এবং নোলাম্বাপাড়ি জয় করে মহীশূরের অধিকাংশ নিজের আয়ত্ত্বে আনলেন। রাজরাজের এই পরাক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালুক্যরা ভাল চোখে দেখেননি, অতএব চালুক্যদের সঙ্গেও যুদ্ধ শুরু হল। তবে চালুক্য রাজ তৈলপের ৯৯২ সি.ই.-র লিপি থেকে জানা যায়, তিনি চোলদের গর্ব খর্ব করে দিয়েছিলেন। যদিচ তৈলপের পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.) যখন রাজা ছিলেন, তখন চোলরা রাজরাত্তপাড়ি অধিকার করে চালুক্য রাজ্যের ভয়ংকর ক্ষতি করেছিলেন।

এরপর তিনি প্রাচ্য চালুক্যদের রাজ্য ভেঙ্গি অধিকার করেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্য চালুক্যদের রাজা বিমলাদিত্য রাজরাজের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই বশ্যতার পরিবর্তে রাজা বিমলাদিত্যকে, রাজরাজ তাঁর কন্যা, কুণ্ডাবাইকে দান করেছিলেন। এরপরেও তিনি কলিঙ্গ এবং লাক্ষাদ্বীপ ও মালদিভস জয় করেছিলেন। এভাবেই রাজরাজ সমগ্র তামিলনাড়ু, মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল, কলিঙ্গ, সিংহল এবং অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ জয় করে, একক প্রচেষ্টায় চোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন।

প্রথম রাজরাজের কৃতিত্ব শুধু মাত্র রাজ্য জয়েই নয়, তিনি বেশ কিছু বিস্ময়কর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের কাছে পরম গৌরবের বিষয়। যেমন তাঞ্জোরের শিবমন্দির, নিজের নামেই তিনি এই মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন, “রাজরাজেশ্বর”।  শিব মন্দির ছাড়াও তিনি বিষ্ণু মন্দিরও নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের জন্যে নেগাপতনমে একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই বিহারের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা ছিলেন সাগরপাড়ের মালয়-উপদ্বীপের রাজা শৈলেন্দ্র এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শ্রীমার-বিজয়তুঙ্গবর্মন।

প্রথম-রাজেন্দ্র গঙ্গাইকোন্ডা (১০১৪-৪৪ সি.ই.) - পিতার আসনে বসে প্রথম-রাজেন্দ্র, পিতার মতোই যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠা করা সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ তো রেখেছিলেনই, উপরন্তু জয় করেছিলেন, ইডিতুড়াইনারু (রায়চূর জেলা), বনবাসী (উত্তর কানারা), কোলিপ্পাক্কাই (কুলপক), মন্নাইক্কড়ক্কম (সম্ভবতঃ মান্যখেট)। এরপর তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র সিংহল, যার উত্তর অংশ জয় করেছিলেন, তাঁর পিতা প্রথম রাজরাজ। এরপর তিনি পাণ্ড্য এবং কেরালাও অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পুত্র জাতবর্মনসুন্দরকে প্রশাসনিক প্রধান পদে বসিয়ে, ওই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন, “চোল-পাণ্ড্য”। এরপর প্রথম-রাজেন্দ্র উত্তরের দিকে বিজয় অভিযানে মন দিলেন। একে একে তিনি জয় করলেন, ওড্ড-বিষয় (ওড্র-উড়িষ্যা), কোশলাইনাড়ু (দক্ষিণ কোশল), দন্তভুক্তির (দাঁতন- মেদিনীপুর) ধর্মপাল, তক্কন-লাঢ়মের (দক্ষিণ রাঢ়) রণশূর, বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) গোবিন্দচন্দ্র, মহীপাল, উত্তির-লাঢ়ম (উত্তর রাঢ়)। এই বিজয় অভিযানের সময়কাল মোটামুটি ১০২১ থেকে ১০২৫ সি.ই.।

                                    মানচিত্র ঋণঃ উইকিপিডিয়া। 

    প্রথম-রাজেন্দ্রর এই বিজয় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রদর্শন, রাজ্য অধিকার করা নয়। অতএব তাঁর এই বিজয় অভিযানে কোন স্থায়ী ফল হল না, শুধু বঙ্গে কয়েকজন কর্ণাটকী সেনা প্রধান রয়ে গেলেন, পরবর্তীকালে যাঁরা সম্ভবতঃ সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ফেরার পথে তিনি নিজের দেশে কয়েকজন শৈব পণ্ডিত বা সন্ন্যাসীকে নিয়ে গেলেন গঙ্গা পাড়ের কোন রাজ্য থেকে।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাজেন্দ্রই প্রথম সম্রাট যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের বেশ কিছু দেশে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালীকে তাঁর নৌবহর এবং বাণিজ্যতরী দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষ্মের (Khmer) বা কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর শুধু যে নিবিড় বাণিজ্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা নয়, দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গভীর হার্দিক সম্পর্কও। দুটি সাম্রাজ্যের মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প এবং ধর্মচিন্তার গভীর আদানপ্রদানও শুরু হয়েছিল। কম্বোজে অবস্থিত (আজকের কম্বোডিয়া) সুবিখ্যাত আঙ্কোর-ভাট মন্দির এবং ওই অঞ্চলের আরও অনেক বিক্ষিপ্ত মন্দির আজও সেই সুসম্পর্কের স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে দক্ষিণ চিনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক।  এবং শুধু এই পূর্বদিকেই নয়, সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রর এই বাণিজ্যিক নৌবহরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল পশ্চিম দিকের আরব উপমহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা, আন্তোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এবং তুর্কিয়ে সাম্রাজ্য পর্যন্ত।

        আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোজ (কম্বোডিয়া) - চিত্র ঋণ - https://www.britannica.com/         

প্রথম-রাজেন্দ্র নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম “গঙ্গাইকোণ্ডাচোলাপুরম” (আধুনিক গঙ্গাকুণ্ডপুরম)। এই রাজধানীতে তিনি দুর্ধর্ষ রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির, সরোবর, স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন, কিন্তু কালের নির্মম নিয়মে সে সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

প্রথম রাজাধিরাজঃ (১০৪৪-৫২ সি.ই.) -প্রথম-রাজেন্দ্রর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ ১০৪৪ সি.ই.তে সিংহাসনে বসলেও, তিনি যুবরাজ হয়ে পিতার প্রশাসনে সহায়তা করেছে ১০১৮ সি.ই. থেকে। পিতার বহু অভিযানেই তিনি সফল সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু চালুক্যরাজ প্রথম-সোমেশ্বর আহবমল্লের সঙ্গে যুদ্ধে ১০৫২ সি.ই.তে কোপ্পমের রণক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান।

দ্বিতীয় রাজেন্দ্র দেব (১০৫২-৬৩ সি.ই.) –চালুক্যদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বীর রাজেন্দ্র (১০৬৩-৭০ সি.ই.) - দ্বিতীয় রাজেন্দ্রর পর রাজা হলেন, তাঁর ভাই বীর রাজেন্দ্র। তাঁর সময়ে চালুক্য ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের আক্রমণ ও বিদ্রোহ দমনেই তাঁর রাজত্বকাল শেষ হয়েছিল। যদিও তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে চালুক্য রাজকুমারের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে, চালুক্যদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০-১১২২ সি.ই.) – বীর রাজেন্দ্রর পর তাঁর পুত্র অধিরাজেন্দ্র কিছুদিনের জন্য রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সিংহাসন অধিকারে রাখতে পারেননি বা অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন প্রথম কুলোত্তুঙ্গ। চোলরাজ প্রথম-রাজরাজের কন্যা কুণ্ডাবাইয়ের সঙ্গে ভেঙ্গির চালুক্য রাজ বিমলাদিত্যের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের পুত্র রাজরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল চোলরাজা প্রথম-রাজেন্দ্রর কন্যা অম্মাঙ্গ দেবীর। তাঁদের পুত্রের নাম দ্বিতীয়-রাজেন্দ্র চালুক্য ওরফে প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ। প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ আবার বিবাহ করেছিলেন, চোলরাজ দ্বিতীয়-রাজেন্দ্রদেবের কন্যা মধুরান্তকীকে। অতএব অনুমান করা যায়, যেহেতু এই সময়ে চোল রাজপরিবারে সিংহাসনে বসার মতো যোগ্য কোন উত্তরাধিকারী পাওয়া যায়নি এবং যেহেতু তাঁর ধমনীতে চালুক্যদের থেকে চোল রক্তের পরিমাণ বেশি ছিল, সেহেতু প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। সে যাই হোক, প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। যদিও হোয়সল, পরমার, প্রাচ্য-গঙ্গ, পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ বিবাদ লেগেই ছিল।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ ধর্মীয় এবং সাহিত্য বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জন্যেও অনেক দান করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি বৈষ্ণব আচার্য রামানুজমের ওপর বিরক্ত হয়ে, তাঁকে শ্রীরঙ্গম (ত্রিচিনোপল্লি) ছাড়তে বাধ্য করেন।  আচার্য রামানুজমকে হোয়সল রাজ বিত্তিগবিষ্ণুবর্ধনের মহীশূর রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তিনি জয়গোণ্ডন, যিনি “কলিঙ্গত্তুপ্পারনি”-র রচয়িতা এবং আদিয়ারক্কুনাল্লারের, যিনি “শিলপ্পধিকারম”-গ্রন্থের রচয়িতা, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

 পরবর্তী চোলরাজা

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিক্রম চোল (১১২২-৩৩ সি.ই.)। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সময়ে আচার্য রামানুজম আবার চোলরাজ্যের শ্রীরঙ্গমে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩-৪৭ সি.ই.), দ্বিতীয়-রাজরাজ (১১৪৭-৬২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয়-রাজাধিরাজ (১১৬২-৭৮ সি.ই.)। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন এবং এঁদের সময়ে চোল সাম্রাজ্য তার গৌরব দ্রুত হারাতে থাকে। হোয়সল, সিংহল, কেরালা সকলেই চোল সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। তারপরে তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৭৮-১২১৬ সি.ই.) দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও, অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেননি। এই সময় থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের আধিপত্যে চোলরাজ্যের মূল সীমানাও খণ্ডিত হতে থাকে। মোটামুটি ১২৬৭ সি.ই.তে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চোলরাজ্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

চলবে...



নতুন পোস্টগুলি

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল...