শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪ 



১৫  

কিসের একটা আওয়াজে সুনেত্রর ঘুম ভেঙে গেল আচমকা। বিছানায় উঠে বসে আওয়াজটা কিসের বোঝার চেষ্টা করল। দেয়ালের ঘড়িতে দেখল পাঁচটা কুড়ি। তার মানে দু-ঘন্টাও ঘুমোয়নি সে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল স্ট্রিট লাইট নিভে গেছে। সূর্যোদয় হয়নি, কিন্তু মায়াবি আলোয় ভরে উঠেছে সামনের রাস্তা, গাছাপালা, টুকরো আকাশটাও। যদিও তার ঘরে আবছায়া। নির্জন রাস্তা দিয়ে হঠাৎই ঝমঝমিয়ে দৌড়ে গেল একটা মেটাডোর – পিঠে উপচে পড়া নানান শাক-সব্জির পসরা। তার ওপরে দুজন লোক বসে ঝিমোচ্ছে। শহুরে বাবুদের বাজারে টাটকা সবজি সরবরাহ করে ওরা – রোজই করে, আজ নতুন নয়। তার ঘুমটা ভেঙেছিল কি এরকমই কোন মেটাডোরের আওয়াজে?  

রাতের ঘন্টা দুয়েকের ঘুমটাও তেমন জমাট বাঁধেনি টের পেল সে, আধো তন্দ্রায়, আধো সুষুপ্তিতেই কেটেছে ওটুকু সময়। তন্দ্রা ভঙ্গ হয়ে চোখ মেলে তাকায়নি – কিন্তু ছেঁড়া ছেঁড়া অস্বস্তির ঘুমের অনুভবটা তার মাথায় তার দু চোখের কড়কড়ানিতে। বিছানা থেকে নেমে টেবিলে রাখা কাচের জগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে পান করল সুনেত্র। অন্যদিন তার ফোনের অ্যালার্ম বাজে সাড়ে ছটায়, শম্পাদিদি আসে সাতটা নাগাদ। অতএব আরও ঘন্টাখানেকের জন্যে টেনে আনা যায় চটকে যাওয়া ঘুমটাকে। সুনেত্র আবার শুয়ে পড়ল এবং চোখ বন্ধ করল ঘুমোনোর চেষ্টায়।

 চোখ বন্ধ করতেই তার মনে হল, মুখে কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু একজন নারীর জীবনে দীর্ঘদিন মিশে ছিল যে জীবনসঙ্গীর জীবন – তার চলে যাওয়ার সম্পূর্ণ শূণ্যতাটুকু বুকের মধ্যে শুষে নেওয়া - বড়ো সহজ কাজ নয়। উপরন্তু সে নারীর মুম্বাই-প্রবাসী বড় সন্তানের কেমন যেন দায়সারা ভাব। ছোট সন্তান খোঁজ-খবর রাখে, কিন্তু সেও তো ছিল দিল্লি-প্রবাসী। সে নারীর প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সে সন্তানেরও তো কোন লেনদেন নেই। সুনেত্রর মনে হয়েছিল, জীবনের এই সমস্ত একাকীত্বটুকু আত্মসাৎ করতে করতে মাও অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এবং মনে-প্রাণে চাইবেন, আর কতদিন, এবার আমাকেও তুলে নাও ঠাকুর।       

অতএব মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল সুনেত্র। এখানে এসে মাকে সে আক্ষরিক অর্থে “ভাত-জল” করার কাজে নিযুক্তও করেনি, তার জন্যে ছিল শম্পাদিদি। শম্পাদিদিকে সুনেত্র দিদি বলে ঠিকই কিন্তু মহিলা তার থেকে মাস ছয়েকের ছোট। একবার শম্পাদিদি বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, দিন তিনেকের জন্যে চেনাজানা এক হসপিট্যালে ভর্তি করতে হয়েছিল। সে সময়েই শম্পাদিদির সঠিক বয়েসটা সে জানতে পেরেছিল। এই তথ্যটি জেনেও “শম্পাদিদি” ডাকটা সে ছাড়েনি, কারণ শম্পাদিদির আচরণে, ব্যবহারে সে সত্যিই এক দিদির মমতা টের পায়। মা এসেও শম্পাদিদিকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শম্পামাকে মা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন, সুনেত্রর প্রিয় রান্নার পদগুলি। অতএব আজ প্রায় তিন বছর হল, মা চলে যাওয়ার পরেও, সুনেত্র তার মায়ের হাতের রান্নারই স্বাদ পায় শম্পাদিদির রান্নায়। এমন সৌভাগ্য কজনার হয়?

বাবা মারা যাওয়ার পর, মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে, সুনেত্রর দাদা – সুমিত্রর অত্যন্ত গাত্রদাহ হয়েছিল। সুমিত্রর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, মাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, দাদাকে বঞ্চিত করে, সমস্ত সম্পত্তি এবং টাকাকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করছে সুনেত্র। সুনেত্রকে নয়, মাকে বার বার ফোন করত সুমিত্র, “তুমি যখন কলকাতার বাড়ি ছেড়ে সুনেত্রর ওখানেই গিয়ে উঠলে, মা, তাহলে এই বেলা বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়াই ভালো। ফাঁকা-বাড়ি ফেলে রাখলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, জানো তো? এখন বেচলে যা দাম পাবে, দুবছর পরে তার অর্ধেকও পাবে না”।

মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি যদ্দিন রয়েছি, ও বাড়ি তো বিক্রি হবে না, সুমু। আমি চোখ বুজলে তোরা যা প্রাণ চায়, করিস, আমি দেখতে আসব না”।

মার এই উত্তরের পর সুনেত্রর দাদা বহুদিন তাদের সঙ্গে আর কোনরকম যোগাযোগ করেনি। অন্ততঃ সাত-আট মাস। অবশ্য সুনেত্র বা সুনেত্রর মাও কোন খোঁজ করেননি – আসলে মন থেকে যোগাযোগ রাখার কোন তাগিদ অনুভব করেননি। কিন্তু দাদা স্বয়ং এক বর্ষার দিনে অকস্মাৎ এসে হাজির হল সুনেত্রর কোয়ার্টারে। সুনেত্র কোয়ার্টারে তখন ছিল না, হসপিট্যালের ডিউটিতে ছিল। লাঞ্চের সময় ঘরে ফিরেই সে অবাক। জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ, কোন খবর না দিয়েই তুমি চলে এলে, দাদা? আমার এই কোয়ার্টারের ঠিকানা কী করে জানলে?”

রহস্যের হাসি হেসে দাদা নাটকীয় ভঙ্গীতে বলেছিল, “মন যখন টানে – তখন কোন বাধাকেই আর বিঘ্ন মনে হয় না, রে। চলে এলাম, বহুদিন মাকে দেখিনি। মনটা বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তোকেও দেখিনি কতদিন বল, সেই বাবার কাজের সময় শেষ দেখা। সত্যি বলতে, তোর ভাইপো-ভাইঝি আর বৌদিই আমাকে ঠেলে পাঠালো, বলল, দাদি বুঝি শুধু আংকলের মা? চিন্তা কর, টুকাই, টিংকু – টিংকু ছোটবেলায় তোর কেমন ন্যাওটা ছিল, মনে আছে? সেই টিংকু কী রকম পাকা-পাকা কথা শিখেছে, শুনলে তাজ্জব হয়ে যাবি”।

সুনেত্রর দাদার বরাবরই নাটক-থিয়েটার করার খুব শখ, সে পাড়ার ক্লাবেই হোক, ওর অফিসের রিক্রিয়েশন প্রোগ্রামেই হোক কিংবা মুম্বাইয়ের বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের কালচারাল প্রোগ্রামেই হোক - সুযোগ পেলেই নেমে পড়ে। সুনেত্র দু-তিনবার দেখেছে সে নাটক – যখন কলকাতায় থাকত। খুব ইম্প্রেসিভ মনে হয়নি তার – বড়ো বেশি নাটুকে মনে হয়েছিল – কিছুটা যাত্রা টাইপের। সে যাই হোক, কোন কোন বিষয়ে কারও প্যাশান থাকতেই পারে, সে নিয়ে সুনেত্রর কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু ওর দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি আচার-আচরণে এবং কথাবার্তাতেও সেই নাটুকেপনা প্রায়ই প্রকট হয়ে ওঠে - সেটাই যা বিরক্তিকর।

সুনেত্র হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, “সে ভালই তো। ঠিকই তো বলেছে”।

সেদিন বহু বছর পর, দু’ভাই একত্রে খাবার টেবিলে খেতে বসেছিল। খাবার পরিবেশন করছিলেন মা। খাওয়ার সময় সুমিত্র আরো অনেক কথাই বলেছিল।  

“এতদিন ধরে এতবড়ো কোম্পানিতে জব করছিস আর থাকিস এই ছোটা কোয়ার্টারে? কোম্পানি না দেয়, তুই নিজেও তো এর থেকে একটু বড়া কোয়ার্টার বা বাড়ি দেখে নিতে পারিস”।

“কী দরকার, দাদা? আমি আর মা – দুজনের জন্যে তিনটে শোবার ঘর, ড্রয়িং-ডাইনিং, দুটো টয়লেট, দুটো বারান্দা – খারাপ কি – আমার তো দিব্যি চলে যাচ্ছে, দাদা”।

“তুই সেই চিরকালের মেদামারা রয়ে গেলি, সুনু। চলে যাওয়াটা কোন কাজের কথা নয়, কথাটা হল দিল বড়া হোনা চাহিয়ে। এবার আমি মাকে নিয়ে যাচ্ছি, এর মধ্যে তুইও চলে আয় একদিন – দেখবি দুনিয়াটা কিতনা বড়া হ্যায়, কিতনা কুছ বাকি হ্যায় হাসিল করনে কে লিয়ে.. মানে...ওই কী যেন বলে... অর্জন করার...”।

“তুমি মাকে নিয়ে যাচ্ছো? হঠাৎ? এমন আচমকা?” সুনেত্র মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে।

“তোকে তখন বললাম না, টুকাই, টিংকু, তাছাড়া তোর বৌদিও, আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল, মাকে নিয়ে যেতেই হবে”।

“ঠিক আছে, কথাটা কদিন আগে ফোনেও তো বলে দিতে পারতে...মায়ের রেডি হওয়ারও তো একটা ব্যাপার আছে...”।

“আরে ধুর, আমি আজই মাকে নিয়ে যাচ্ছি নাকি? আমার অফিসিয়াল কিছু অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতায় এসেছিলাম, সেসব সেরে আমি মুম্বাই ফিরব পরশোরোজ । পরশুর ফ্লাইটে মায়ের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে – সামকো সাড়ে ছে বাজে ফ্লাইট। ও নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। কোম্পানির গেস্ট হাউসে উঠেছি। কাজেই দায়িত্ব শুধু আর আমার নয় আমার কোম্পানিরও। আমাদের পি.আর ম্যানেজার সব ইন্তেজাম করে দিয়েছে। পরশু সকালে সে নিজেই গাড়ি নিয়ে আসবে, এবং ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে মাকে নিয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাবে  – সেখান থেকে আমরা একসাথ দমদম যাবো। তুই একদম টেনশন করিস না, সুনু, ওসব জমানা কি আর আছে – সেই কুলির মাথায় পোর্টমান্টো, হোল্ডঅল... ভারি ভারি টিনের সুটকেস, খাবার জলের কলসি...এই ছিল বাঙালির প্রবাস যাত্রা...” হা হা করে কিছুক্ষণ উচ্চস্বরে হেসে, সুমিত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “মনে আছে মা?”

বেশ বিরক্তি নিয়েই মা বললেন, “একদমই মনে নেই, বাবা। ছোটবেলায় ওসব পড়েছি গল্পের বইয়ে, আর দেখেছি পুরোন দিনের সাদা-কালো সিনেমায়। নিজের চোখে দেখিনি”।

মায়ের উত্তরে সুমিত্রর নাটকীয়তা বেশ দমে গেল, চাটনি খেতে খেতে হাতের ঘড়ি দেখে বলল, “অনেকটা দেরি হয়ে গেল, মা। খেয়ে উঠেই আমি বেরিয়ে পড়ব, অনেকটা পথ...। পরশু দিন তুমি তাহলে রেডি থেক মা। সকাল নটা-সাড়েনটা নাগাদ গাড়ি চলে আসবে - সঙ্গে থাকবে আমাদের ম্যানেজার গুরপ্রীত, পাঞ্জাবি ছোকরা, ভালো ছেলে। আমার থেকে ভালো বাংলা বলে – মুম্বাইতে বিশ বছরের ওপর হয়ে গেল, বাংলাটা প্রায় ভুলতেই বসেছি...”।

দাদা বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুনেত্রকেও বেরোতো হল হসপিট্যালে, তাই তখন আর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার কোন সময় পায়নি সুনেত্র। সন্ধের পর হসপিট্যাল থেকে ফিরে ফ্রেস হওয়ার পর, ডাইনিং রুমে বসে সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার বলো তো, মা? দাদা, একবারে হুট করে, তোমাকে নিতে চলে এল?”

মা চিন্তিত মুখে বলেছিলেন। “কী জানি, আমার জন্যে এতদিন পরে, ওদের সকলের হঠাৎ এত দরদ উথলে উঠল কেন, বুঝতে পারছি না”।  

সুনেত্র ব্রিফকেস খুলে চারটে পোস্ট-অফিসের হলুদ খাম, কিছু সাদা কাগজ আর একটা পেন দিল মায়ের হাতে, বলল, “আমার কিন্তু তেমন সুবিধে ঠেকছে না, মা। তোমার ব্যাগের মধ্যে এই খাম আর কাগজগুলো রেখে দাও। সাবধানে রেখ। খামগুলোতে আমার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছি। কোনরকম অসুবিধে মনে হলেই দু কলম লিখে যে করে হোক পোস্ট করে দিও। যে অবস্থাতেই আমি থাকি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি তোমার কাছে চলে আসব। তোমাকে নিয়ে আসব, মা”।

মায়ের এমন অসহায় আর বিপন্ন মুখ আগে কোনদিন দেখেনি সুনেত্র, খুব মৃদু স্বরে বললেন, “দুপুরে তুই আসার আগে আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছিল – কলকাতার বাড়িটার জন্যে কি ভাবছো? কতদিন বাড়িটাকে ফেলে রাখবে, এরপর তো ওটা হানাবাড়ি হয়ে উঠবে...। বাবার কত টাকার সেভিংস আছে – ব্যাংকে কত, পোস্ট-অফিসে কত? বাবার তো আবার পোস্ট-অফিসে ওপর খুব ঝোঁক ছিল, বলে মুখ বেঁকিয়ে হাসল”। মাথা নীচু করে মা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তারপর আবার বললেন, “ছোটবেলায় সুমু তো এমন হিংসুটে ছিল না, সুকু। এই বয়েসে এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে তোর বাবার বা আমার যা কিছু আছে - আমি তোকেই সব দিয়ে যাব, ওকে বঞ্চিত করে? এত বছর ও মুম্বাইতে রয়েছে - বিয়ের আগে প্রায় পাঁচবছর, বিয়ের পরেও হয়ে গেল প্রায় আট-ন বছর। কোনদিন তো আমাকে এবং তোর বাবাকে বলেনি, আমার এখানে এসো – কটা দিন ঘুরে যাও”।

সুনেত্র বাড়ি ফিরলে, মা আর সুনেত্র একসঙ্গে বসে চা খায় শম্পাদিদি জানে। চা বানিয়ে এনে শম্পাদিদি দুজনের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, “তোমার বড় ছেলে কিন্তু তোমার কিংবা দাদাবাবুর মতো একদমই না, মাসিমা। কেমন যেন...”। কথা শেষ না করেই থেমে গেল।

“কেমন যেন কি, শম্পা?”

“না থাকগে ওসব কথা, দাদাবাবু আপনাকে তেল মাখিয়ে মুড়ি বাদাম দিই?”

“দাও, মা খাবে তো?”

“দু মুঠো খাব, আমার জন্যে তুই আলাদা বাটি করিস না, শম্পামা, সুনুর বাটিতেই বেশি করে দিস, আমি তুলে নেব”।

চায়ের কাপে কয়েকটা চুমুক দেওয়ার পর মা মুখ তুলে তাকালেন সুনেত্রর দিকে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, “তুই কি এখানে বা কলকাতায় মাথা গোঁজার মতো নিজের কোন আস্তানা বানাবি না?”

“সে ভাবে ভাবিনি মা, কিন্তু কেন বলো তো?”

“দেখ সুমু যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, কলকাতার বাড়িটা বেচে দিতেই হবে। নয়তো ও বাড়ির যা দাম হতে পারে তার অর্ধেক টাকা তোকে সুমুকে মিটিয়ে দিয়ে বাড়িটা তোকেই নিতে হবে...”।

মায়ের কথা শুনে সুনেত্র সেদিন টের পেয়েছিল, এতদিন পরে বড়ো ছেলের অকস্মাৎ উদয়ে, মা কতখানি উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত হয়েছিলেন। সুনেত্র কিছু বলল না, মায়ের কথার অপেক্ষায় রইল।

“...ও বাড়ির দাম কত হবে আমি জানি না, কিন্তু অর্ধেক হিসেবে তুই যাই দাম দিবি ... ও সারাজীবন তোকে কথা শুনিয়ে যাবে - তুই ওকে ডাঁহা ঠকিয়েছিস। ও বাড়ির জন্যে কোন সেন্টিমেন্ট না রেখে, তোর নিজের ক্ষমতায় তুই নিজের জন্যে একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ি যদি কিনে রাখিস, আমার মনে হয় তোর পক্ষে সেটাই স্বস্তির হবে”।

দুজনের কেউই বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলল না। চা শেষ হয়ে গিয়েছিল, শম্পাদিদি বড়ো বাটিতে করে ওদের সামনে মুড়ি-মাখা রাখল রান্নাঘরে গেল। একমুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে, মায়ের দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে সুনেত্র বলেছিল, “কয়েকমাস ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। হলদিয়ার এই খোলামেলা পরিবেশে থেকে, চাকরি শেষে কলকাতার সেই ভিড়-ভাড়, হই-হট্টগোলের মধ্যে ফিরে যেতে মন চাইছে না। চাকরি শেষ হতেও এখনো ধরো বিশ -বাইশ বছর...। ততদিনে মন হলদিয়াতেই আরও জমে যাবে, চেনা-পরিচিতি বাড়বে। চাকরির পরেও প্র্যাকটিস করতে ইচ্ছে হলে – তাতেও অসুবিধে হবে না। তাই ভাবছিলাম, হলদিয়াতে ছোট্ট একটু জমি কিনে, নিজের মনোমত বাড়ি যদি একটা বানিয়ে নিই মন্দ হয় না। কলকাতায় তো সে শখ মেটার কোন সম্ভাবনা নেই – সে শখ মেটাতে হলে কলকাতার বাইরে দৌড়তে হবে। বারাসাত পার হয়ে সে হাবড়া বা গাইঘাটা, নয়তো বারুইপুর পার হয়ে সেই জয়নগর, বহেড়ু...।  তার চেয়ে আমার এই হলদিয়াই ভাল”।

মা মুড়ি খেতে খেতে খুব মন দিয়ে শুনছিলেন সুনেত্রর কথা, সুনেত্র বিরতি দিতেই বললেন, “ভালো-মন্দ বিচার করে যা করার হয় তাড়াতাড়ি করে নে, বাবা, আমি বেঁচে থাকতে থাকতে। মনে হয় না, তোকে সংসারী দেখে যাওয়ার কপাল আমার হবে, কিন্তু চোখ বোজার আগে অন্ততঃ তোর নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়েছে, এটুকু দেখে যেতে দে...”।

“সংসার করলে কখনো কখনো কী হয় সে তো দাদাকে দেখে কিছুটা বুঝছো মা, কিন্তু আমার বাড়ি দেখার সাধ আমি অপূর্ণ রাখব না, এ আমি তোমায় কথা দিলাম। এবং জীবনের শেষ কটা বছর আমার সেই বাড়িতেই তুমি বিরাজ করবে...”।

চলবে... 


বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা (পূর্ব পর্বের পর...) 

শ্রীউদ্ধব বললেন, “তারপর একদিন বলদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ মথুরায় গেলেন, সেখানে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে কংসের বিনাশ করলেন। সেখানে বন্দী মাতাপিতাকে উদ্ধার করে তাঁদের সন্তুষ্ট করলেনএরপর সন্দীপনিমুনির পাঠশালায় একবার মাত্র শুনে তিনি সর্ববেদ ও শাস্ত্র পাঠ শেষ করলেন। তারপর পঞ্চজন অসুরকে হত্যা করে, তিনি গুরুপুত্রকে উদ্ধার করে, গুরুদক্ষিণা দিলেন।

[এই পঞ্চজন অসুরের অস্থি থেকেই শ্রীকৃষ্ণের পূত পাঞ্চজন্য শঙ্খের উৎপত্তি।]                 

ভীষ্মকরাজকুমার রুক্মী, ভগিনী রুক্মীণীর সঙ্গে শিশুপালের বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন। কৃষ্ণগতপ্রাণ রুক্মীণী কৃষ্ণকে সংবাদ পাঠালেন উদ্ধারের জন্যে। বিয়ের সভায় শিশুপালের সঙ্গে বরযাত্রী এসেছিল জরাসন্ধের মতো বীর সহস্র রাজা। তাদের সকলকে অপমান করে গান্ধর্বমতে বিয়ে করে রুক্মীণীকে তুলে এনেছিলেন কৃষ্ণ।

নাগ্নজিতীর স্বয়ংবরের শর্ত ছিল, সাতটা বিশাল ষাঁড়কে যে দমন করতে পারবে, সেই হবে নাগ্নজিতীর বর। কৃষ্ণ সাতটি ষাঁড়কে বশ করে, তাদের নাক বিদ্ধ করে দড়ি পড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাতে উপস্থিত রাজারা খুব অপমান বোধ করেছিল এবং কৃষ্ণকে মারতে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষ্ণ তাদের সকলকে পরাস্ত করেছিলেন, অথচ তাঁর কোন আঘাত লাগেনি।

ভগবান কৃষ্ণ কারও অধীন নয়, তবুও স্ত্রৈণের মত প্রিয় পত্নী সত্যভামাকে খুশি করার জন্যে স্বর্গ থেকে পারিজাত তুলে এনে সত্যভামাকে উপহার দিয়েছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র রাগে অন্ধ হয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।

নরকাসুর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল দেহ বিস্তার করে সমস্ত আকাশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, এই কৃষ্ণই তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে তার মুণ্ডছেদ করেছিলেন। তারপর নরকাসুরের মা ধরিত্রীদেবীর অনুরোধে অন্য পুত্র ভগদত্তকে রাজ্যভার দিয়ে নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে বন্দিনী বহু রাজকুমারীকে উদ্ধার করেছিলেন। পরিত্রাতা কৃষ্ণকে দেখেই সদ্য মুক্তি পাওয়া রাজকুমারীরা মুক্তির মোহিত হয়ে, তাঁকে স্বামী হিসেবে পেতে উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। তখন কৃষ্ণ তাঁর অদ্ভূত যোগমায়ায় নিজেকে বহুভাগে বিভক্ত করে সকল রাজকুমারীকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন ও প্রত্যেককে দশটি করে পুত্র দান করেন।

কংসের বিনাশের পর জরাসন্ধ, কালযবন, শাল্বপ্রভৃতি বীররাজাগণ মথুরা আক্রমণ করলে, মুচুকুন্দ ও ভীমকে দিয়ে তিনিই তাদের বিনাশ করেন। একইভাবে তিনি প্রদ্যুম্ন, বলরামকে দিয়ে শম্বর, দ্বিবিদ, বল্কল প্রমুখ রাক্ষসদেরও বিনাশ করেছিলেন। তিনি নিজে দন্তবক্র ও মুরের বিনাশ করেছিলেন, বাণ্বরাজার অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধনের সমর্থনে যত রাজা সমবেত হয়েছিলেন। যাঁদের শক্তিতে আর অহংকারে সমস্ত পৃথিবী বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তাঁদের সকলকেই তিনি বিনাশ করলেন, অর্জুন আর ভীমকে সামনে রেখেআবার তিনিই উত্তরার গর্ভে অভিমন্যুর পুত্র, পুরুবংশের শেষ উত্তরাধিকার পরীক্ষিৎকে রক্ষা করলেন। কারণ যুধিষ্ঠিরের পর পরীক্ষিৎই হবে প্রজাপালক ধার্মিক রাজা।

এইসব কিছুর পর তিনি প্রদ্যুম্নের নেতৃত্বাধীন দুর্ধর্ষ যদু সৈন্যের ধ্বংসের উপায়ও তিনি স্থির করে ফেললেন। যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধকদের নিয়েই ছিল দুর্ভেদ্য যদু সৈন্য, তাদের সকলের মধ্যে খুব সদ্ভাব থাকলেও, ভগবান কৃষ্ণ স্থির করলেন, মত্ত অবস্থায় এরা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে ধ্বংস হোক।  রাজপুরীর মধ্যে যদু ও ভোজ রাজকুমাররা একদিন খেলায় উন্মত্ত হয়ে, উপস্থিত মুনিদের উপেক্ষা ও অপমান করে বসল। অপমানিত মুনিরা কৃষ্ণের প্রশ্রয়েই তাদের অভিশাপ দিলেন।

এর মাস কয়েকপরে যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধককুমাররা সকলে মহাসমারোহে প্রভাসতীর্থে যাত্রা করলেন। সেখানে স্নান করলেন, তীর্থজল দিয়ে পিতৃ ও দেব তর্পণ করলেন। ব্রাহ্মণদের প্রচুর সম্পদ, গরু, সোনা, রূপো, জীবিকার জমি ও বাসের জমি দান করলেন। ওই যদুবীরেরা গো ও ব্রাহ্মণের মঙ্গলের জন্য চিরদিন নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এখন তাঁরা সেই দান কর্মের ফল শ্রীভগবানে অর্পণ করে, মাটিতে শুয়ে ব্রাহ্মণদের প্রণাম করলেন”

যাদবদের উচ্ছৃখলতা  

ব্রাহ্মণদের অন্ন ভোজনের পর, ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে নিজেরা ভোজন করলেন। তারপর সকলে মিলে শুরু করলেন মদ্যপান। অতিরিক্ত মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে তারা একে অপরকে গালি দিতে লাগল, তাদের ক্রোধ বেড়ে উঠতে লাগল, তারা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল এবং একসময় উন্মত্ত অবস্থাতেই সকলের বিনাশ হল।

এই ঘটনার কিছুদিন আগেই কৃষ্ণ দ্বারকা ত্যাগ করেছিলেন, আর আমাকে বলেছিলেন বদরিকাশ্রমে চলে যেতে। আমাকে বললেও আমি তাঁর সঙ্গ ছাড়তে পারিনি। যদুকুল ধ্বংস হবার পর, তিনি সরস্বতীর জলে আচমন করে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। সেই গোধুলিবেলায়, সরস্বতী নদীর তীরে, গাছে পিঠ রেখে, তিনি মাটিতে একলা বসে ছিলেন, তাঁর মুখ তখনও প্রসন্ন।

আমি তাঁর চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলাম। আমাকে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “উদ্ধব, তোমার মনের কি ইচ্ছে আমি জানি।, তুমি এইজন্মে আমার কৃপা লাভ করেছ, অতএব এই জন্মই তোমার শেষ জন্ম। এই লোকে আমার সব কাজ সব শেষ হয়ে গেছে, এখন বৈকুণ্ঠে ফেরার সময় হয়ে এল। আমি চলে যাবার পর, উদ্ধব, যতদিন তুমি এই ভূলোকে থাকবে, আমার বিষয়ে লোককে উপদেশ দেওয়ার ভার আমি তোমাকেই দিয়ে গেলাম। কারণ, তুমি আমার থেকে এতটুকুও কম নও। তুমি বদরিকাশ্রমে যাও, সেখানেই তোমার কাজ শুরু করো”

ডান উরুর উপর, বাঁ পা রেখে, তিনি নিজের লীলা সংবরণের প্রতীক্ষায় বসেই রইলেন সেই অশ্বত্থ গাছের তলায়। সেইদিন সরস্বতী নদীর তীরে গোধুলির আলোয় তাঁর উজ্জ্বল প্রসন্ন মুখ দর্শন করে, আমি তাঁর নির্দেশে রওনা হলাম বদরিকা আশ্রমের দিকে। 

সৃষ্টিতত্ত্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীকৃষ্ণের লীলা মাহাত্ম্য বর্ণনার পর উদ্ধব বদরিকা আশ্রমে যাবার জন্যে উদ্যত হচ্ছেন দেখে, বিদুর ভক্তিভরে বললেন, হে উদ্ধব, শ্রীভগবান আপনাকে নিজের তত্ত্বস্বরূপ পরমজ্ঞানের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমাকে সেই উপদেশ দান করুন। কী উপায়ে আমি তাঁর একান্ত অনুগত থাকতে পারি, তাও আমার কাছে বর্ণনা করুনউদ্ধব বললেন, কুশারুনন্দন ঋষি মৈত্রেয় তোমার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর দেবেন। তিনিই তোমার আরাধ্য গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণও মর্ত্যলোক ত্যাগ করার আগে আমার সামনে এইরকমই নির্দেশ করে গিয়েছেন। অতএব, তুমি ঋষি মৈত্রেয়র সঙ্গে তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ করো। 

উদ্ধবের নির্দেশমতো হরিদ্বারে পৌঁছে, বিদুর পরমজ্ঞানী মহাঋষি মৈত্রেয়র সামনে উপস্থিত হলেন। পরম ভক্তিভরে বিদুর ঋষি মৈত্রেয়কে বললেন, “আমি ব্যাসদেবের কাছে ধর্মতত্ত্ব বহুবার শুনেছি, কিন্তু আমি বুঝেছি ওই সকল ধর্ম আচরণ, তুচ্ছ সুখের সন্ধান দেয় মাত্র। কিন্তু কৃষ্ণকথামৃতপানের সুযোগ যে কবার আমি পেয়েছি, তাতে আমার তৃপ্তি হয়নি। আপনি আমাকে সেই কৃষ্ণকথার অমৃত তত্ত্ব শোনানযে তত্ত্ব অন্তরে ঢুকে সংসারের প্রতি সমস্ত আসক্তি দূর করে, শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় লাভ করে পরমমুক্তির সন্ধান দেয়”

বিদুরের মুখে ব্যাকুল এই প্রশ্ন শুনে, কুশারুনন্দন মৈত্রেয় তাঁকে সমাদর করে বললেন, “হে বিদুর আপনি খুবই উত্তম প্রশ্ন করেছেন। এর উত্তর সঠিক বুঝতে গেলে, জানতে হবে, এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্বটি। এই সমগ্র বিশ্ব যখন সাগরের জলে ডুবে ছিল, তখন শ্রী নারায়ণ যোগনিদ্রায় চোখ বন্ধ করে  অনন্তশয্যায় শুয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে তাঁকে মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু অন্তরে তাঁর চিৎশক্তি পূর্ণমাত্রায় সজাগ ছিল। কাঠের দাহিকা শক্তি যেমন কাঠের মধ্যেই রুদ্ধ থাকে, ঠিক সেরকমই তাঁর মধ্যে নিরুদ্ধ ছিল জগতের সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মস্বরূপ।  তিনি মায়ালীলা ত্যাগ করে আত্মস্বরূপে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয়ভাবে বিরাজ করছিলেন।

এইভাবে তাঁর চার হাজার যুগ তিনি রইলেন যোগনিদ্রায়, তারপর একদিন সৃষ্টির ইচ্ছায় তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং নিজের অন্তরে সূক্ষ্মরূপে লীন হয়ে থাকা সমস্ত লোকসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাঁর এই দৃষ্টির আঘাতে সঞ্চারিত হল রজোগুণ আর এই রজোগুণের প্রভাবেই, কাল সমস্ত জীবের কর্মের ভাগ্য নির্দিষ্ট করে দিলসেই কালের নিয়মেই জেগে ওঠা জীবের সূক্ষ্মতত্ত্ব, উজ্জ্বল এক পদ্মকোষের আকারে তাঁর নাভিমূল থেকে উদ্গত হল। সেই পদ্মকোষের উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চারিদিকের অনন্ত জলরাশি। এই পদ্মই জীবের ভোগবস্তুর প্রকাশ করে থাকে।

তারপর সেই পদ্মকোষ থেকে আবির্ভূত হলেন বেদময় স্বয়ং ব্রহ্মা যেহেতু পদ্মকোষেই তাঁর স্বয়ং আবির্ভাব,  তাই তাঁকে স্বয়ম্ভূ বলা হয়। পদ্মের উপর বসে তিনি চারিদিকে কোন জগৎ দেখতে পেলেন না, চারিদিকে অখণ্ড  জলরাশি ও সীমাহীন তরঙ্গ দেখতে পেলেন। উদ্গ্রীব হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চারদিকে দেখার জন্যেই তাঁর চারটি মাথার সৃষ্টি হয়েছিল, তাই তাঁকে চতুর্মুখও বলা হয়ে থাকে। তিনি চারিদিকে জলরাশি দেখে খুবই হতাশ হলেন। তিনি নিজে সেই পদ্মে অবস্থান করেও তিনি সেই পদ্মের স্বরূপ ও তার সম্পূর্ণ আকার উপলব্ধি করতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, আমি এই যে পদ্মের উপর বাস করছি, আমি কে? আর এই বিপুল জলরাশির মধ্যে পদ্মই বা কোথা থেকে সৃষ্টি হল? যে আধার থেকে এই পদ্মের সৃষ্টি হয়েছে, সে আধার নিশ্চয়ই জলের মধ্যেই কোথাও ডুবে আছে!

এই চিন্তা করে ব্রহ্মা পদ্মের মৃনালের ছিদ্রপথে জলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে শত বছর  খুঁজেও তিনি তাঁর ও এই পদ্মের আবির্ভাবের কোন কারণ বুঝতে পারলেন না। দীর্ঘ অন্বেষণে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন তাঁর পদ্মের আসনেই। তারপর মনকে সংযত করে সমাধিযোগে বসে রইলেন আরো শত বৎসর।  একশ বছর পর তাঁর যোগ সফল হলআগে দীর্ঘদিন বহু সন্ধানে করেও যাঁকে তিনি লাভ করতে পারেন নি, তাঁকে আজ নিজের মনের মধ্যেই বিরাজ করতে দেখলেন। তিনি দেখলেন, শ্যামলাবণ্য, পীতবসন এক দিব্য পুরুষকে; তাঁর মাথায় বহুরত্নখচিত মুকুট; তাঁর সর্ব অঙ্গে রত্নের অলংকার; শেষনাগের দেহের শয্যায় শুয়ে রয়েছেন; সেই দিব্য পুরুষের মাথার উপর ছাতার মতো ব্যাপ্ত রয়েছে শেষনাগের সহস্র ফণা।          

অবশেষে ব্রহ্মা সেই দিব্যপুরুষকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন। ব্রহ্মা সকলের আরাধ্য শ্রীবিষ্ণুর স্তব করলেন

চলবে...



মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩০

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯  


৩৬ 

রামালি রান্না বসানোর কিছুক্ষণ পরেই নিঃশব্দে ঢুকল মারুলা। ভল্লার পাশে বসেই বলল, “তোদের নোনাপুরে শল্কু বলে কেউ আছে? চিনিস, রামালি?” ভল্লা এবং রামালি দুজনেই চমকে ঘাড় ঘোরালো মারুলার দিকে। ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “আছে বৈকি। কিন্তু তুই তাকে চিনলি কী করে?”

“আজ দুপুরে আস্থানে গিয়েছিল যে, তোদের নামে অভিযোগ জানাতে…”।

রামালি ঘুরে বসল, “অভিযোগ জানাতে আস্থানে গিয়েছিল? কী বলছো? এত সাহস?”

ভল্লা শল্কুর পরিচয় দিল এবং শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত তার সব আচরণের কথা মারুলাকে বলল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “কার কাছে অভিযোগ করেছে?”

“উপানুর কাছে”।  

“উপানু কী বলল?”

“সে ব্যাটা আমাকে সব কথা বলে নাকি? আমি শষ্পককে গিয়ে বলতে, শষ্পক উপানুকে ডেকে পাঠিয়েছিল। সেখানে আমিও ছিলাম। শল্কু নাকি তোদের দলের কথা। তোরাই যে আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিলি এবং সে দলে ও নিজেও যে ছিল সে কথাও নাকি স্বীকার করেছে। বলেছে চুরি করা অস্ত্র-শস্ত্র তোরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ও দেখিয়ে দিতে পারবে”।

“তারপর?”

“শষ্পক উপানুকে বেশ কড়া করেই ধমক দিয়ে বলল, “ওই ছোকরার কথায়, এবার আর তোমার ওপর কোন দায়িত্ব আমি দেব না, উপানু। গতবার বলেছিলাম গাঁয়ের লোকদের একটু রগড়ে ভয় দেখাতে। তোমরা গ্রামপ্রধানকে এমন মারলে, বেচারা বৃদ্ধ মারাই গেল! আর ভীলক নামের একজনকে এমন মেরেছো, শুনতে পাই তারও অবস্থা ভাল নয়। কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আনতে বলেছিলাম, তার পা দুটোর কী অবস্থা করেছো, উপানু? এতদিন পরেও সোজা পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না! এমন কাণ্ড বাধালে যে আমার কাছে রাজধানী থেকে প্রায় রোজই দূত আসছে গ্রামের পরিস্থিতি কী জানার জন্যে। তার উত্তর দিতে দিতে আমার দোয়াতের কালি ফুরিয়ে যাচ্ছে। নাচার বুড়োগুলোর ওপরেই তোমার যত বীরত্ব, না? তোমার ভরসায় আর কোন ঝুঁকি আমি নিতে পারব না”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “কবিরাজমশাইয়ের পায়ে কী হয়েছে?”

“জানিস না? উপানু শুয়োরের বাচ্চা তাকে ঘোড়ার পাশে ঝুলিয়ে এমন করে নিয়ে গেছে, দুটো পায়েরই চেটো দুটোয় হাড় কখানা ছাড়া কিছুই প্রায় অবশিষ্ট ছিল না। বেচারা নিজেই নিজের চিকিৎসা করছেন, এখন কিছুটা ভালোর দিকে। কিন্তু জীবনে কোনদিন আর হাঁটতে পারবেন বলে, আমার মনে হয় না”।

ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, রামালিও - কেউই কোন কথা বলল না।     

মারুলা বলল, “তারপর শোন না, শালা উপানু কুকুরের মতো কুঁইকুঁই করে বলল, “এমন সুযোগটা ছেড়ে দেব, সরকার”? কথাটা শুনে শষ্পক উপানুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের এমন একটা হাসি দিল না, উপানুর পোঁদ জ্বলে গেল মনে হয়, নাকে যেন চামড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম। তারপর বলল, “বুঝতে পারছ না, উপানু, ওরা ফাঁদ পেতেছে? তোমরা ওর সঙ্গে গেলে তোমাদের ঘিরে ধরে, পিটিয়ে মারবে। দু-তিনটে গ্রামের লোক জড়ো হলে সামলাতে পারবে, উপানু? তার ওপর ওদের ছোকরাদের হাতে আমাদের অতগুলো অস্ত্র আছে...আর পেছনে আছে হতভাগা ভল্লা...না উপানু, আমি কোন ঝুঁকি নেব না। রাজধানীতে সংবাদ পাঠাচ্ছি, সেখান থেকে সেনাদল পাঠাক। তারা যা করার করবে”।

উপানু ভিজে বেড়ালের মতো উঠতে যাচ্ছিল, শষ্পক জিজ্ঞাসা করল, “ছোকরা এসেছে কখন?” উপানু বলল, “আজ্ঞে, মধ্যাহ্নের একটু আগে, সরকার”। “এখন তো মধ্য অপরাহ্ন - খেতে-টেতে দিয়েছিলে?” উপানু ঘাড় নেড়ে না বলল। ব্যস্‌ আর যায় কোথায়, শষ্পক আবার ধমক দিল, “একটা ছোকরা সেই কোন সকালে গ্রাম থেকে বেরিয়ে তোমার কাছে এসেছে গোপন সংবাদ নিয়ে। তার কথায় নেচে তুমি দৌড়চ্ছিলে গ্রামের লোকদের ঢিট করতে, বেচারাকে দুমুঠো খাওয়াতে পারলে না? রক্ষীসর্দার হয়েছ বলে, স্বাভাবিক মানবিকতাও ভুলে যেতে হয়, উপানু? এখনই যাও, আগে ওকে খাওয়াও। তারপর ওকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠাও। কিন্তু সন্ধের পর ছাড়বে...আর বলবে, প্রশাসন সময় মতো সঠিক ব্যবস্থা নেবে। বুঝেছ? কথাটা বললেই দেখবে ছোকরার মুখ শুকিয়ে যাবে, ওদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল বলে...”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “তারপর”?

“তারপর আর কী? উপানু চলে যেতে শষ্পক আমার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, তারপর বলল, “পিপীলিকার পাখা ওঠে”। আমি বললাম, “হয়ে যাবে, মান্যবর। কেউ জানতেও পারবে না””।

তিনজনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মারুলা বলল, “রামালি, কিছু মনে করিস না, ভাই। শল্কু এখন ঘুমিয়ে আছে মাটির তলায়, শীতল শান্তিতে”। রামালি কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্না শেষ করায় মন দিল। ভল্লা আর মারুলা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “আজ মাঝ রাত্তিরে আমরা দুজন বীজপুর যাচ্ছি মারুলা, ফিরতে ফিরতে কাল শেষ রাত হয়ে যাবে”।

মারুলা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হঠাৎ বীজপুর কেন?” বীজপুরে যাওয়ার কারণগুলো ভল্লা বলল মারুলাকে। তারপর বলল, “এছাড়া আরও কিছু কাজ আছে। কিছু কেনাকাটা আছে। রামালিরও চেনা-জানা হবে জায়গাটা। জনাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হবে”।

রামালি চুপ করে বসে ওদের কথা শুনছিল, হঠাৎ বলল, “মারুলাদাদা কারা যেন আসছে - দৌড়ে”। মারুলা দ্রুত সরে গেল বাসার পিছনে ঝোপের আড়ালে। একটু পরে উঠোনে এসে ঢুকল, বিশুন, আহোক আর মইলি। হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বলল, “শল্কুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ভল্লাদাদা, এদিকে আসেনি তো?”

“না, তোরাই তো এখান থেকে গেলি সন্ধের পর। বস না। কী হয়েছে বল তো”?

বিশুন বলল, “আমরা গ্রামে ফিরে যে যার বাড়ি ফেরার দণ্ড দেড়েক পরে আমার বাড়ি এসেছিল শল্কুর দিদি। বলল, তোরা সবাই ফিরে এলি, শল্কু কোথায়? ও ফেরেনি কেন! আমি বললাম, শল্কু তো আজ যায়নি। আমাদের সঙ্গে সারাদিন ওর দেখাই হয়নি। গেছে কোথায়? কিছু বলে যায়নি? দিদি বলল, না কিছুই বলে যায়নি। তোরা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই ও বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, আমরা ভেবেছি তোদের ওখানেই... তাহলে গেল কোথায়? আমি বললাম, তুমি বাড়ি যাও দিদি, আমরা দেখছি। দিদিকে বাড়ি পাঠিয়ে আমি বেরোলাম, আমাদের সবাইকে ডাকলাম। তারপর খুঁজতে বেরিয়েছি। গ্রামের সব বাড়িতেই খোঁজা হচ্ছে। সুকরাতে গিয়েছে চারজন। আমরা এলাম তোমার কাছে। কোথায় যেতে পারে বলো তো?”

“কী করে বলি বল তো! কয়েকদিন ধরেই দেখছিলাম মহড়ায় ওর মন ছিল না – হয়তো এসব লড়াই-টড়াই ওর ভালো লাগছিল না...কিন্তু সে কথা তো বলতে পারত আমাদের, যেমন বালিয়া বলেছে। কিন্তু চলে গেল কেন? আর গেলই বা কোথায়? ওর মামার বাড়ি কোথায়? সেদিকে চলে যায়নি তো”?

রামালি বলল, “ওর মামার বাড়ি কমলিজেঠিমার বাপের বাড়ি থেকে আরও তিনক্রোশ উত্তরে। গ্রামের নাম যদ্দূর মনে পড়ছে ধুলোট। শল্কুর দিদিকে জিজ্ঞাসা করলেই বলে দেবে”।

ভল্লা বলল, “আজ অনেক রাত হল, কাল ভোরে, গ্রামের দু-তিনজন চলে যাক না। চিন্তা করিস না। গিয়ে দেখবি, শল্কু হয়তো মামার বাড়ির আদর খাচ্ছে”।

আহোক বলল, “ঠিক আছে, দেখা যাক। আমরা এখন চলি ভল্লাদাদা। এখানে যদি ও আসে…”।

ভল্লা বলল, “সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেব, সে কথা আর বলতে?”

 

মারুলা খেতে খেতে বলল, “বড়ো রাস্তা ছাড়াও বীজপুর যাওয়ার অন্য একটা পথ আছে, সেটা জানিস তো ভল্লা?”

“তাই নাকি? জানি না তো। রামালি জানিস?”।

“সুকরা গ্রাম পার হয়ে, বাঁদিকে চড়াইয়ের পথটা তো? কোনদিন যাইনি, শুনেছি, ওটা কোনাকুনি গিয়ে রাজপথে মিশেছে”।

“হুঁ। ওই দিক দিয়ে গেল ক্রোশ তিনেক পথ কম হয়। আমার সঙ্গে চল, আমি তো ওইদিকেই যাবো, দেখিয়ে দেব। অন্ধকারে ঠাহর করতে না পারলে, বিপদে পড়ে যাবি। ও হ্যাঁ, শষ্পক বলছিল, তোর টাকাকড়ি কিছু লাগবে কিনা…পরশু রাত্রে তাহলে নিয়ে আসব”।

“এখন লাগবে না, আমার কাছে যা আছে তাতে চলে যাবে কিছুদিন…লাগলে বলব”।

কিন্তু তুই এতদিন চালাচ্ছিস কী করে? যতদূর জানি তোকে তো রাজধানী থেকে পিটিয়ে আধমরা করে পাঠিয়েছিল। এখানে এসে প্রধানমশাই আর কমলিমায়ের ছায়ায় যদ্দিন ছিলি, চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু তারপর? এই যে জঙ্গলে এতদিন রয়েছিস, এই ব্যয় যোগাচ্ছে কে? আজ আবার বীজপুর যাচ্ছিস...”

“প্রথম কয়েকদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। তারপর বণিক অহিদত্তের সঙ্গে পরিচয় হওয়াতে, আমায় কিছু বলতেও হয়নি, ও বেশ কিছুদিন সাহায্য করেছিল। মনে হয় রাজধানী থেকে ও নির্দেশ নিয়েই এসেছিল। তারপর আস্থানে ডাকাতি করার দিন শষ্পকের কোষাগার থেকে চারটে বটুয়া ঝেড়ে দিয়েছিলাম। একসঙ্গে এত রূপোর মুদ্রা কোনদিন হাতে পেয়েছি, শালা? ওইদিন থেকেই তো আমি বড়লোক। ওখান থেকেই অহিদত্তের ধার শোধ করেছি। নোনাপুর আর সুকরার চাষের জন্যে চার মণ বীজ কিনেছি। অহিদত্তের কাছে কিছু রূপো জমা আছে। পনেরদিন অন্তর গভীর রাত্রে একটা গাধার পিঠে চাপিয়ে, আমার আর রামালির জন্যে ভুট্টা, জোয়ার, চাল, ডাল, নুন-তেল-মশলার ঝোলা পৌঁছে যায়। যে লোকটা নিয়ে আসে, তাকে আমি দেখিনি, সেও আমাদের চেনে না”।

রামালি বলল, “আজ সন্ধেতে বালিয়াকে চারটে রূপো দিলে, ভল্লর ফলা বানাতে...”।

ভল্লা বলল, “ঠিক”।

“তাই বল। তোদের ওই ডাকাতির পরে, শষ্পক একদিন বলছিল রাজধানীতে সে সংবাদ পাঠিয়েছে, কোষাগার থেকে দশটা বটুয়া খোয়া গেছে। আরও বলেছিল, ভল্লার জন্যে ছটা বটুয়া রাখা আছে, টাকার দরকার হলেই যেন জানায়। সেদিন আমি শষ্পককে মনে মনে বেশ কিছু কাঁচা গালাগাল দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দশটার মধ্যে চারটে বটুয়া নিজে ঝেড়ে, ছটা তোকে দেবে...। ছ্যাঃ কী ভুলই করেছিলাম - আজ তোর আর শষ্পকের খেলাটা বুঝতে পারলাম”।

“ছাই বুঝেছিস, তুই চিরকেলে মাথামোটা। চল অকারণ সময় নষ্ট না করে, বেরিয়ে পড়ি। এখনই বেরোলে, কাল সকাল সকাল জনাইয়ের চটিতে পোঁছে যাবো”।

এঁটো থালা নিয়ে উঠতে উঠতে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে আরও কবছর থাকলে, আমার মাথাও সরু হয়ে, ভোমরার হুল হয়ে উঠবে। যার পোঁদে ফোটাবো, সাতদিন যাবে তার টাটানি সারতে...”।

রামালি হেসে ফেলল মারুলার কথায়, তারপর বলল, “আমি এক্ষুণি আসছি, ভল্লাদাদা, এঁটো থালাবাটিগুলো ধুয়ে আনি। দুদিন পড়ে থাকলে বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ হবে...”

রামালি চলে যেতে, মারুলা নীচু স্বরে বলল, “তোর চোখ শালা জহুরির চোখ, এতগুলো ছোকরার মধ্যে সেরাটাকেই বেছেছিস। শল্কুকে মেরে ফেলার কথাটা শুনে ভেবেছিলাম, কী না কী করে বসবে। ব্যাটার চোখের পাতা অব্দি পড়ল না?”

ভল্লা হাসল, “হানো বলে আমাদের একটা ছেলে এর আগে মারা গেছে শুনেছিস তো”?

“শুনেছি। সাপের কামড়ে”।

“সেই সাপটাকে তার গর্ত থেকে তুলে এনেছিল রামালি। কাজ হয়ে যেতে নিঃশব্দে সরিয়েও ফেলেছিল সাপটাকে”।

মারুলা কিছু বলল না, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার হাসিমাখা মুখের দিকে।

চলবে...


সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৬ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৭


৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস (পূর্ববর্তী পর্বের শেষাংশ)

    যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা "শেষাংশ)

“প্রিয়বাক্য বললে কী লাভ হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে, বহুমিত্র হলে কিংবা ধর্মে অনুরাগী হলেই বা কী কী লাভ হয়?”

“প্রিয়বাদী সকলের প্রিয় হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে ব্যক্তি অনেকবেশী লাভ করতে পারে, বহুমিত্র হলে, ব্যক্তি সতত আনন্দে থাকে এবং ধর্মানুরাগী হলে সদ্গতি লাভ হয়”।

“সুখী কে? আশ্চর্য কী? পথ এবং বার্তাই বা কী? এই চার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে, তোমার ভাইয়েরা আবার বেঁচে উঠতে পারেন”।

যুধিষ্ঠির বললেন, “যিনি অঋণী ও অপ্রবাসী হয়ে, দিনের পঞ্চম বা ষষ্ঠভাগে, নিজের গৃহে শাক-অন্ন আহার করেন তিনিই সুখী। প্রাণীগণকে প্রতিদিন মারা যেতে দেখেও, জীবিত ব্যক্তিরা নিজেদের চিরজীবন আশা করে, এর থেকে আশ্চর্য আর কী হতে পারে? তর্কের সীমা নেই, বেদ ও স্মৃতির মত বিভিন্ন। মুনি একজন নয়, যে তাঁর মতই একমাত্র, আর ধর্মের অজস্র তত্ত্ব জ্ঞানের গুহায় মিলিয়ে যায়। অতএব মহাজনেরা যে পথে গমন করেছেন, সেই পথই পথ। সূর্যরূপ কাল (সময়)-এর আগুনে, দিন-রাত্রিস্বরূপ ইন্ধন জ্বালিয়ে, মহামায়ার কড়াইতে ঋতু ও মাস-স্বরূপ হাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে, প্রাণিদের যে সর্বদা রন্ধন করা হয়, সেটাই হল বার্তা”।

যক্ষ বললেন, “হে রাজন, এখনও পর্যন্ত তুমি আমার সকল প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিয়েছ। এখন বল, পুরুষ কে এবং সকলের মধ্যে ধনী কে?”

“পুণ্যকর্ম দিয়ে যখন স্বর্গ স্পর্শ করা যায়, তখনি মানুষের যশ এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে, সেই যশ যতদিন থাকে, ততদিন সেই পুণ্যকর্মা ব্যক্তিকে পুরুষ বলে বিবেচনা করা হয়। যে ব্যক্তি অতীত বা ভবিষ্যতের সুখ-দুঃখ ও প্রিয়-অপ্রিয়কে সমান মনে করেন, তিনিই সকলের মধ্যে ধনী”।

যক্ষ এবার বললেন, “হে রাজন, এখন আমি তোমার ইচ্ছামতো তোমার একজন ভাইকে জীবিত করব, বল সে কোন ভাই?”

যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, ওই শ্যামকলেবর, লোহিত-লোচন, বিশালবক্ষ, মহাবাহু নকুল জীবিত হয়ে উঠুক”।

যক্ষ আশ্চর্য হয়ে বললেন, “হে রাজন, তুমি দশ-হাজার হাতির তুল্য বলশালী প্রিয় ভীম কিংবা পাণ্ডবদের প্রধান আশ্রয় ধনঞ্জয়কে ছেড়ে, বিমাতার পুত্র নকুলের কথা কেন বললে?”

যুধিষ্ঠির বললেন, “ধর্মকে নষ্ট করলে, ধর্মও আমাদের নষ্ট করবেন এবং তাঁকে রক্ষা করলে, তিনিও আমাদের রক্ষা করবেন। অতএব আমি কখনও ধর্ম পরিত্যাগ করব না, ধর্মও আমাকে যেন কখনো পরিত্যাগ না করেন। হে যক্ষ, আনৃশংস্য[1]ই পরমধর্ম, আমি সর্বদাই আনৃশংস্য অবলম্বন করতে চাই। সকলে আমাকে ধর্মশীল বলে জানেন, অতএব আমি কোনক্রমেই স্বধর্ম ত্যাগ করতে পারব না। কুন্তী ও মাদ্রী দুজনেই আমার জননী। উভয়েই পুত্রবতী হয়ে থাকুন, এই আমার অভিলাষ। আমার পক্ষে দুজনেই সমান, অতএব আপনি নকুলকে জীবিত করে, দুজনকেই পুত্রবতী রাখুন”।

যক্ষ বললেন, “হে রাজন, আপনি অর্থতঃ এবং কামতঃ আনৃশংস্যপরায়ণ, এই কারণে আপনার সকল ভাইই আবার জীবিত হোক”। যক্ষের কথা অনুযায়ী, পাণ্ডবদের সকলেই গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো উঠে বসলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির যক্ষকে বললেন, “আপনাকে যক্ষ বলেও মনে হয় না, আপনি কোন মহাপুরুষ হবেন। আপনি বসু, রুদ্র কিংবা মরুৎগণের মধ্যে প্রধান কেউ, অথবা দেবরাজ ইন্দ্র হবেন। নচেৎ এমন ঘটনা অসম্ভব। এই ভূমণ্ডলে এমন যোদ্ধা নেই, যে আমার এই রণকুশল ভাইদের পরাভূত করতে পারে। তাছাড়া ভাইয়েরা যেভাবে সুস্থ এবং স্বচ্ছন্দে জেগে উঠেছে, তাতে তাদের কোনরকম চোট বা আঘাতের লক্ষণ নেই। আমার মনে হয় আপনি আমাদের সুহৃৎ, আমাদের পিতৃসম”।

যক্ষ এবার স্মিতমুখে বললেন, “বৎস, আমিই তোমার পিতা, ভীমপরাক্রম ধর্ম, তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। হে যুধিষ্ঠির, তুমি আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র, তুমি পঞ্চযজ্ঞে[2] একান্ত অনুরক্ত হয়েছ এবং সকল পাপের কারণ, কাম, ক্রোধ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে পরাজিত করেছ। আমি তোমাকে পরীক্ষা করার জন্যেই এখানে এসেছিলাম, এখন তোমার ধর্মজ্ঞানে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার মঙ্গল হোক, এখন আমি তোমাকে বর দিতে চাই”।

এরপর রাজা যুধিষ্ঠির যেমন যেমন বর চেয়েছিলেন, তাঁর পিতা যক্ষরূপী ধর্মদেব সবগুলিই অনুমোদন করলেন, তারপর সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

ওপরে স্বয়ং ধর্মদেব এবং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আলোচনায় ধর্ম বলতে প্রচুর ঘৃতাহুতি ও বেদোচ্চারণ করে বিশাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান এবং তারপর বিপুল দান-টান করে স্বর্গবাস সুনিশ্চিত করার প্রকরণ বলে মনে হল না। যজ্ঞ-টজ্ঞ নিয়ে দু চার কথা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা গৌণ, মুখ্যতঃ ধর্ম বলতে যা বুঝলাম, সংসার, সমাজ, প্রতিবেশী, গুরুজন, স্বজন-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সকলের সঙ্গে সদাচরণ, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে সদ্ভাব বজায় রেখে চলা। একথা ভগবান বুদ্ধ, সম্রাট অশোকও বলেছিলেন, তাঁদের আমরা “বুদ্ধু” বলেছি, বলেছি “নির্বোধ”। কারণ এই ধর্ম আচরণে সমাজের পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ শ্রেণীর স্বার্থ সিদ্ধি হয় না। তাঁদের স্বার্থসিদ্ধির প্ররোচনায়, আমরাই “বুদ্ধু” এবং “নির্বোধ”-এর মত, ধর্ম নিয়ে প্রতিবেশী, সমাজ, বন্ধুজনের প্রতি আনৃশংস্যতার পরিবর্তে নৃশংস হয়ে উঠেছি বহুকাল। ধর্মের নামে আমরা কবেই খুইয়ে বসেছি আমাদের মানবধর্ম।         

৫.২.৩ বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য দেব-দেবী

বৈদিক দেব-দেবীদের কথা আগে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। এখন আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

ঋগ্বেদে প্রাক-বৈদিক দেবতাদের আবির্ভাব বা অভ্যুদয়ের পর্যায়গুলি ভীষণ সুন্দর ও মানবিক। আর্য ঋষিরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে, এই দেশের অপরূপ মহিমা ও সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। উত্তরে সুউচ্চ তুষারাবৃত মৌন গম্ভীর হিমালয়ের পর্বত শ্রেণী। স্রোতস্বীনি অজস্র নদী ও আশ্চর্য তাদের বিস্তার। নদীগুলির অববাহিকায় চিরহরিৎ অরণ্য এবং কিছু কিছু অঞ্চলে অনার্যদের সবুজ বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র। রুক্ষ, দুর্গম, সুদীর্ঘ পার্বত্য পথ পার হয়ে, এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে পৌঁছে, তাঁরা শুধু অভিভূতই হলেন না, মনের মধ্যে অনুভব করলেন, আশ্চর্য প্রশান্তি, স্নিগ্ধ পূর্ণতা এবং অভূতপূর্ব মুগ্ধতা। তাঁরা একদিকে যেমন অসাধারণ কাব্যিক শ্লোক রচনা করেছিলেন, তেমনই প্রকৃতির এই অদ্ভূত ঐশ্বর্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিস্ময়ে তাঁরা মগ্ন হলেন দেবত্বের কল্পনায়।  ঊর্ধের আকাশ – দ্যু, পায়ের নীচের পৃথিবী –পৃথ্বী। দিনের আকাশের দেবতা উজ্জ্বল সূর্য, তিনি জগতের প্রাণ, তিনি মিত্র। আর নৈশ বা নীল আকাশের দেবতা বরুণ। প্রাচীন বৈদিক দেবতার ধারণায় মাত্র এই কয়েকজনই ছিলেন, তাঁদের পূজার রীতি সহজ সরল, সঙ্গীতময় কিছু মন্ত্রের উচ্চারণ।

এর পর বৈদিক ঋষিরা অনুভব করলেন, অনন্ত এবং অসীমের ধারণা, যার প্রকাশ দ্যু ও পৃথ্বী রূপে। এই অসীম হলেন অদিতি, যিনি সকল দেবতাদের মাতা, তাঁর পুত্রেরাই আদিত্য। অদিতি শব্দের মূল অর্থ অবিচ্ছিন্ন, অবিভাজ্য এবং অসীম। এই অসীম দৃশ্যতঃ অসীম, যতদূর চোখ যায় অসীম আকাশ, হিমালয়ের অসীম বিস্তার, অসীম অরণ্য ও তৃণক্ষেত্র। অসীমের এই সংজ্ঞা থেকে, মহাবিশ্বকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, ঊর্ধতম স্তরের নাম দ্যুলোক, নিম্নতম স্তরের নাম ভূর্লোক এবং এই দুই লোকের মাঝখানে রয়েছে অন্তরীক্ষলোক। এই তিন লোকের প্রধান দেবতারা হলেন, সবিতৃ বা সূর্য দ্যুলোকের, ইন্দ্র বা বায়ু অন্তরীক্ষলোকের এবং অগ্নি হলেন ভূর্লোকের দেবতা। এই তিনদেবতাকে আবার তেত্রিশজন দেবতায় ভাগ করা হয়েছিল। অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, দ্যু এবং পৃথ্বী।

 ক) দ্বাদশ আদিত্য – দ্যুলোকের দেবতা

ঋগ্বেদে আদিত্য ছজন, মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ, অংশ।

অথর্ব বেদে ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এঁরা আটজন– মিত্র, বরুণ, অর্যমা, অংশ, ভগ, ধাতা, ইন্দ্র ও বিবস্বান।

শতপথ ব্রাহ্মণের মতে দ্বাদশ আদিত্য হলেন, ধাতৃ, মিত্র, অর্যমান, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বত, পূষণ, সবিতৃ, ত্বষ্টা এবং বিষ্ণু।  শতপথ ব্রাহ্মণে এই বারো জন আদিত্য, বারোমাসের দেবতা।

হরিবংশ পুরাণে আদিত্যের বর্ণনা একটু আলাদা রকম, - ঋষি ত্বষ্টার কন্যা সংজ্ঞা, সূর্যের প্রচণ্ড তেজ সহ্য করতে না পারায়, কন্যার প্রতি স্নেহবশতঃ, ত্বষ্টা সূর্যকে বারোটি খণ্ডে বিভক্ত করেন, বারো মাসে বারোটি আদিত্য-সূর্যের উদয় হয়, যেমন মাঘে অরুণ, ফাল্গুনে সূর্য, চৈত্রে বেদজ্ঞ, বৈশাখে তপন, জৈষ্ঠে ইন্দ্র, আষাঢ়ে রবি, শ্রাবণে গভস্তি, ভাদ্রে যম, আশ্বিনে হিরণ্যরেতাঃ, কার্তিকে দিবাকর, অঘ্রাণে চিত্র (বা মিত্র) ও পৌষে বিষ্ণু।

খ) অষ্টবসু – অন্তরীক্ষ দেবতা।

বৈদিক মতে আটজন বসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, আপ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।

মহাভারতের (আদি/৬৬ ) অষ্টবসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, অহঃ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।

অন্তরীক্ষ স্তরের প্রধান দেবতা হলেন ইন্দ্র বা বায়ু, তাঁর অন্যান্য রূপ হল মরুৎ এবং মাতরিশ্ব। নিরুক্ত মতে, এই স্তরের দেবতারা হলেন, ইন্দ্র, বায়ু, অষ্টবসু, যম ও যমী, অশ্বিনীকুমার যুগল। এ ছাড়াও এই স্তরের দেবতা হলেন বিশ্বদেব – যিনি বৃষ্টির দেবতা। দেবী ঊষস (ভোর) দ্যুলোক ও অন্তরীক্ষের মধ্যে সংযোগরক্ষা করতেন। ঋভুরা আগে মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাদের সুকীর্তির জন্যে তাঁরা দেবতা হয়ে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

গ) একাদশ রুদ্র – ভূর্লোকের দেবতা

বেদে একাদশ রুদ্রের নাম খুব স্পষ্ট করে পাওয়া যায় না। মহাভারতের (আদি/৬৬) একাদশ রুদ্র হলেন, মৃগব্যাধ, সর্প, নির্‌ঋতি, অজৈকপাদ, অহি, বুধ্ন, পিনাকী, দহন, কপালী, স্থাণু ও ভর্গ। ভূর্লোক বা পৃথ্বীলোকের প্রধান দেবতা ছিলেন, অগ্নি। বেদে ইন্দ্রের পরেই অগ্নির প্রধান স্থান। ঋগ্বেদের শুরুই হয়েছে, অগ্নির উপাসনার শ্লোক দিয়ে, যার উল্লেখ দ্বিতীয় পর্বে করেছি। অগ্নির আরেক নাম রুদ্র, এই রুদ্রেরই একাদশ রূপে প্রকাশ ঘটেছে।

এতগুলি দেবতার নাম থাকলেও ঋগ্বেদের ছেচল্লিশতম মন্ত্রে, ঋষি দীর্ঘতমস বলেছেন, “একম্‌ সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি” – অর্থাৎ সত্য একটাই – কিন্তু ঋষিরা নানা নামে বলেন”। নিরুক্তকার যাস্কও একই কথা বলেছেন, ঈশ্বর এক - তিনিই পৃথ্বীস্থানে অগ্নি, অন্তরীক্ষস্থানে ইন্দ্র এবং দ্যুস্থানে তিনিই সবিতৃ। এই একমাত্র দেবতা বা ঈশ্বরকে বলা হয়েছে – হিরণ্যগর্ভ।

এ ছাড়াও আরও কিছু দেবতার নাম পাওয়া যায়, যেমন সোম, মধু, অশ্বিন প্রমুখ।

সোম দেবতাকে চন্দ্র এবং সোম[3]রস দু ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। সোম যখন চন্দ্রদেব, তিনি দুই হাতেই অস্ত্র চালনা করতে পারতেন এবং যুদ্ধের সময় তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের সারথি হতেন। কিন্তু সোম দেবতা যখন সোমরস তখন ব্যাপারটা অত্যন্ত রসসিক্ত হয়ে উঠত।

খুব নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, এক ধরনের লতানে উদ্ভিদ থেকে সোমরস বানানো হত এবং বিশেষ ওই লতাকেই বলা হত সোমলতা। যজ্ঞের সময় এবং যজ্ঞ সমাপ্তিতে এই পবিত্র রস পান অবশ্য কর্তব্য ছিল। এবং এই রস পান করে যে আশ্চর্য অনুভূতি মিলত, তার আভাস ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১১৯ সূক্তে দেবরাজ ইন্দ্রর কথায় আমরা বুঝতে পারি। আমরা কলির মানুষরা পবিত্র সোমরসে বঞ্চিত, কিন্তু ভাঙ বা সিদ্ধির শরবতেও এমন অভিজ্ঞতার আমেজ অনুভব করা যায় বৈকি, যেমন,  

“দমকা বায়ু যেমন গাছকে দোলায়, সোমরস পান করে আমিও তেমন দুলছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/২)

“দামাল ঘোড়া যেমন রথকে ওড়ায়, আমিও তেমন উড়ছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”।  (১০/১১৯/৩)

“আমার এমনই ক্ষমতা, যদি বল, এই পৃথিবীকে এক স্থান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে পারি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/৯)

“এই পৃথিবীকে আমি দগ্ধ করতে পারি, যে স্থান বল সে স্থান ধ্বংস করতে পারি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১০)

“আমার একপাশ আছে আকাশে, আরেক পাশ পৃথিবীতে, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১১)

“আমি মহতেরও মহৎ, আমি আকাশ ঠেলে উঠেছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১২)[4]

অশ্বিন নামের যুগল দেবতার নাম পাওয়া যায়, যাঁর সম্বন্ধে খুব স্পষ্ট জানা যায় না। তবে যজ্ঞ অনুষ্ঠানে রীতি ও প্রথা প্রকরণ থেকে জানা যায়, অগ্নি সকল দেবতার মুখ, তিনিই যজ্ঞের হবি গ্রহণ করে, সকল “হবির্ভাজ” অর্থাৎ যজ্ঞভাগ দেবতাদের পৌঁছে দেন। সোম এই যজ্ঞ প্রথার দেবতা, মধু জ্ঞানের দেবতা, অশ্বিন মধুর সঙ্গে যুক্ত এবং ইন্দ্র যুক্ত সোমের সঙ্গে।

চলবে...



[1] আনৃশংস্য–অনৃশংসভাব, অহিংস্রতা; পরের দুঃখে দুঃখিত, অনুকম্পা। (শব্দকোষ)

[2] জন্ম থেকেই প্রতিটি মানুষ পঞ্চঋণে ঋণী – পাঁচটি ঋণ হল দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ, নৃঋণ ও ভূতঋণ। এই পাঁচটি ঋণ থেকে মুক্তির উপায় জীবনে পঞ্চযজ্ঞের আচরণ ও অনুষ্ঠান।

[3] সোমরস – সোমলতার রস, উৎকৃষ্ট মাদক - উত্তর ভারতের হিমালয়ের বনভূমিতে এককালে পাওয়া যেত, এখন অবলুপ্ত।

[4] ঋগ্বেদের বাংলা অনুবাদ – শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত (আধুনিক বাংলায় রূপান্তর - লেখক)।



নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...