সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৫ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

ষোড়শ পর্বাংশ 


৪.৮.৩ কল্যাণের পশ্চিমা-চালুক্য              

শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা তৈলপ ছিলেন, চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মনের কোন কাকার বংশধর। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব মানেন না। এঁরা বলেন, নাম না জানা কোন গুরুত্বহীন গোষ্ঠীর রাজা ছিলেন তৈলপ। সে যাই হোক, তৈলপের জীবনের শুরু রাষ্ট্রকূটদের সামন্তরাজা হিসেবে। পরমার রাজা যখন রাজধানী মান্যখেটের পতন ঘটালেন, সেই ডামাডোলের মধ্যে তৈলপ রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কর্ককে হয় হত্যা করেছিলেন, অথবা দূর কোন নিরাপদ জায়াগায় পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন। এরপর পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে রাষ্ট্রকুটরা যখন নাজেহাল, তখন তৈলপ চতুর্থ ইন্দ্রকে পরাস্ত করে, রাষ্ট্রকূট রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তৈলপ দক্ষিণ গুজরাটের লাট জয় করেছিলেন, কিন্তু বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি, অনহিলওয়াড়ার মূলরাজ চালুক্য, তৈলপের প্রশাসক বারপ্পকে লাট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শোনা যায়, তৈলপ কুন্তল (কর্ণাটের অংশ), চেদি এবং চোলদের পরাজিত করেছিলেন। যদিও তাঁর রাজ্যের উত্তর সীমান্তে পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জ বারবার হানা দিচ্ছিলেন। শোনা যায় শেষ যুদ্ধে তৈলপ বাকপতি-মুঞ্জকে বন্দী করে, তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এখান থেকেই পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে পরমার রাজাদের চিরশত্রুতার সূত্রপাত হল। তৈলপের মৃত্যু হয় ৯৯৭ সি.ই.-তে, তারপর রাজা হলেন তাঁর পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.)।

তাঁর রাজত্বকালে চোল রাজা প্রথম-রাজারাজ চালুক্য রাজ্যে প্রভূত ক্ষতি এবং গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু সত্যাশ্রয় অচিরেই চোলদের এই ধাক্কা সামলে তাঁদের সমুচিত শিক্ষাও দিয়েছিলেন। সত্যাশ্রয়ের পরে রাজা হলেন তাঁর ভাইপো পঞ্চম-বিক্রমাদিত্য, খুব কমদিনই তিনি রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। পরমার রাজা ভোজ তাঁকে চূড়ান্ত পরাস্ত করে, পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এরপরে রাজা ভোজ দাক্ষিণাত্যের অধিকার সুরক্ষিত করতে শক্তিশালী অনহিলওয়াড়ার প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজাদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চম-বিক্রমাদিত্যর পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ জগদেকমল্ল (১০১৬-৪২ সি.ই.), মালবের পরমার রাজা ভোজের এই স্বপ্ন পূর্ণ হতে দেননি।

প্রথম সোমেশ্বর(১০৪২-৬৮ সি.ই.)

১০৪২ সি.ই.-তে রাজা হলেন, দ্বিতীয় জয়সিংহের পুত্র, প্রথম সোমেশ্বর। তিনি চোল এবং পরমারদের আক্রমণ করলেন, এবং পরমার রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে মালব রাজ্যের মাণ্ডু এবং ধারা অঞ্চল অধিকার করে নিলেন। রাজা ভোজের অনুপস্থিতিতে, পরমার দুর্বল রাজারা প্রথম সোমেশ্বরের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পেরে, উজ্জয়িনী পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানেও ধাওয়া করলেন প্রথম সোমেশ্বর এবং উজ্জয়িনী জয় করলেন। এর মধ্যে রাজা ভোজ রাজধানীতে ফিরে উজ্জয়িনী উদ্ধার করে, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু এরপর অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজা লক্ষ্মী-কর্ণের যৌথ আক্রমণে পরমারদের দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে এল। এই যুদ্ধে রাজা ভোজ মারা গেলেন, এবং পরমার রাজত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল। এই সময়ে ভোজের পরবর্তী পরমাররাজা জয়সিংহ, অনহিলওয়াড়া এবং কলচুরিদের থেকে রক্ষা পেতে, সোমেশ্বরের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সোমেশ্বর এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না, তিনি চিরশত্রু পরমারদের সঙ্গে সখ্যতা করে, প্রথম ভীম এবং লক্ষ্মীকর্ণকে পরাস্ত করে, জয়সিংহকে পরমার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি জানতেন মধ্য ভারতের যে কোন শক্তিই প্রবল হলে, তাঁর চালুক্যরাজ্যের পক্ষে তাঁরা বিপজ্জনক।

যুদ্ধে প্রথম সোমেশ্বরের প্রধান সহায় ছিলেন, তাঁর পুত্র ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। মধ্যভারত নিয়ন্ত্রণে আসার পর, প্রথম সোমেশ্বর উত্তরভারতের দিকে মন দিলেন। গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলের প্রতিহার রাজারা তখন দুর্বল, অতএব চালুক্য সৈন্যরা অতি সহজেই দোয়াব এবং কনৌজ জয় করে নিলেন। তারপর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী, মিথিলা, মগধ, অঙ্গ, বঙ্গ এবং গৌড় পর্যন্ত বিনা বাধায় চলে এসেছিলেন। তখন গৌড়ের পালরাজারাও প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। যদিও কামরূপের রাজা রত্নপাল চালুক্য সৈন্যদের পরাস্ত করেছিলেন এবং এরপর চালুক্য সৈন্যবাহিনী দক্ষিণ কোশলের পথে নিজেদের ঘরে ফিরেছিলেন। এ ভাবেই প্রথম সোমেশ্বরের আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষই চালুক্য রাজাদের শক্তি টের পেয়েছিল।

প্রথম সোমেশ্বর তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন কল্যাণে (কল্যাণী, হায়দ্রাবাদ)। ১০৬৮ সি.ই.তে তাঁর মৃত্যুও ঘটেছিল অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে। শোনা যায় তিনি মারাত্মক এক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং নিরাময় অসম্ভব জেনে, রীতিমতো উৎসব করে, মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে তুঙ্গভদ্রার জলে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় সোমেশ্বর আহবমল্ল, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। যদিও যাবতীয় যুদ্ধ বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল, তাঁর ভাই ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর, কিন্তু প্রথম দিকে সিংহাসন নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন বিবাদ ছিল না। দ্বিতীয় সোমেশ্বরের স্বল্পস্থায়ী রাজত্বে তেমন কিছু কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায় না, তাঁর সময়ে একটাই প্রধান ঘটনা হল, ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বন্ধু মালবের রাজা জয়সিংহকে আক্রমণ করে, তিনি পরাজিত করেছিলেন।

১০৭৬ সি.ই.তে দ্বিতীয় সোমেশ্বরের মৃত্যুর পর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য রাজা হয়েছিলেন, এবং সেই বছর থেকে চালুক্য-বিক্রমাঙ্ক অব্দ শুরু হয়। এই পশ্চিমা-চালুক্য বংশের সব থেকে সফল ও উজ্জ্বল রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। তিনি শিল্প, শিক্ষা এবং জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কাশ্মীরি লেখক বিলহনের গুণমুগ্ধ ছিলেন, বিলহনের লেখা “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত”, রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যকে অমর করে দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজসভার পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর, হিন্দু রীতিনীতির ওপর “মিতাক্ষরা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর পুত্র তৃতীয় সোমেশ্বর ভূলোকমল্ল ১১২৬ থেকে ১১৩৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় জগদেকমল্ল রাজত্ব করেছিলেন ১১৩৮-১১৫১ সি.ই.। তারপর সিংহাসনে বসেন, তাঁর ভাই নুরমডি তৈল। কিন্তু এরপর কলচুরি রাজ্যের রণমন্ত্রী, ভিজ্জলার মন্ত্রণা এবং প্ররোচনায় চালুক্য রাজ্যের সামন্তরাজাদের মধ্যে বিদ্রোহ এবং ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তাঁরা নুরমডি তৈলকে ১১৫৭ সি.ই.তে সিংহাসন চ্যুত করেন। নুরমডি তৈলর পুত্র ভীর সোম বা চতুর্থ সোমেশ্বর ১১৮২ সি.ই.তে পিতৃরাজ্য কিছুটা উদ্ধার করে ১১৮৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু দেবগিরির যাদব এবং দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজ্যের প্রবল আক্রমণে পশ্চিমা-চালুক্যবংশ ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল। 

[Image courtsey www.alamy.com]

৪.৮.৪ দেবগিরির যাদব

মহাভারতের ভগবান শ্রীকৃষ্ণর যদু বংশ থেকে যাদবদের উৎপত্তি, এমনই প্রবাদ শোনা যায়। যদিও, তাঁদের রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল, মান্যখেড়ের রাষ্ট্রকূট এবং পশ্চিমা-চালুক্যদের সামন্তরাজা হিসাবে। পশ্চিমা-চালুক্যদের দুর্বলতার সুযোগে যাদবদের উত্থানের শুরু এবং পরবর্তী কালে তাঁরা বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, পঞ্চম ভিল্লাম। তাঁর রাজধানী ছিল দেবগিরি (হায়দ্রাবাদ জেলার আধুনিক দৌলতাবাদ)। তিনি খুব বেশি রাজত্ব বিস্তার করতে পারেননি, কারণ ১১৯১ সি.ই.-তে হোয়সল রাজ প্রথম বীর-বল্লালের হাতে তিনি পরাস্ত হন এবং খুব সম্ভবতঃ প্রাণও হারান।

ভিল্লমের পুত্র জৈতুগি বা প্রথম জৈত্রপাল (১১৯১-১২১০ সি.ই.)। তিনি তৈলঙ্গ (ত্রিকলিঙ্গ) রাজ রুদ্রদেবকে পরাজিত করেন এবং হত্যাও করেন, তারপর রাজা রুদ্রদেবের ভাইপো গণপতিকে সিংহাসনে বসিয়ে কাকতীয় বংশের সূচনা করেছিলেন। এভাবেই যাদবরা সমসাময়িক রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে থাকেন।

যাদব বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন, জৈত্রপালের পুত্র সিংহন (১২১০ - ১২৪৭ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু অঞ্চল এবং রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনি ১২১৫ সি.ই.তে বীরভোজকে পরাস্ত করে, কোলাপুরের সিলাহারা অঞ্চল এবং পরনালা বা পনহালা দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তাঁর দাদুর হত্যাকারী হোয়সল রাজ দ্বিতীয় বীরবল্লালকে পরাস্ত করে, কৃষ্ণা নদীর অপর পাড়ে হটিয়ে দিয়েছিলেন। সিংহন এরপরে মালবের রাজা অর্জুনবর্মন, ছত্তিশগড়ের চেদি রাজা জাজ্জল, গুজরাটের বাঘেলা রাজাদের আক্রমণ করেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন।

সিংহন অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায় বিখ্যাত কিছু গুণী এবং বিদ্বানেরা বিশেষভাবে সম্মানীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সারঙ্গধর, সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম “সঙ্গীত-রত্নাকর”। এই গ্রন্থের টীকা এবং ভাষ্য রচনা করেছিলেন, স্বয়ং রাজা সিংহন। সিংহনের সভায় আরেকজন বিদ্বান ছিলেন, শার্ঙ্গদেব, বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তিনি খান্দেশ জেলার পাটনায় একটি মঠ (মহাবিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ভাস্করাচার্যের “সিদ্ধান্ত-শিরোমণি” এবং অন্যান্য জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হত।

সিংহনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি কৃষ্ণ বা কনহার (১২৪৭-৬০ সি.ই.)। তাঁকেও মালব, গুজরাট এবং কোঙ্কনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তিনি হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময়েই জলহনের কাব্য সংকলন “সূক্তিমুক্তাবলী” এবং আমলানন্দর বেদান্ত ভাষ্য - “বেদান্ত-কল্পতরু” রচিত হয়েছিল। কৃষ্ণের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মহাদেব (১২৬০-৭১ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু রাজ্য, যেমন সিলাহারদের উত্তরকোঙ্কন, কর্ণাটক, গুজরাটের লাট এবং কাকতীয় রাণী রুদ্রাম্বার রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। মহাদেব এবং তাঁর পরবর্তী রাজা রামচন্দ্র বা রামরাজার (১২৭১-১৩০৯ সি.ই.) মন্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত হেমাদ্রি বা হেমাদপন্ত। যিনি “চতুর্বর্গ–চিন্তামণি” নামে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। শোনা যায় তিনি দাক্ষিণাত্যের মন্দির স্থাপত্যের নতুন প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন এবং মোড়ি[1] লিপির সংস্কার করেছিলেন। আরও শোনা যায় রাজা রামচন্দ্র সন্ন্যাসী জ্ঞানেশ্বরের শিষ্য ছিলেন, পণ্ডিত জ্ঞানেশ্বর ১২৯০ সি.ই.-তে মারাঠী ভাষায় প্রথম ভাগবত-গীতার ভাষ্য রচনা করেছিলেন।

রামচন্দ্রের রাজত্বকালে ১২৯৪ সি.ই.-তে আলাউদ্দিন খিলজি হঠাৎ দেবগিরি অবরোধ করেন, রামচন্দ্র তখন দেবগিরি দুর্গেই ছিলেন। তাঁর পুত্র শংকর তাঁকে মুক্ত করতে, বহু প্রয়াস করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন রামচন্দ্র বাধ্য হলেন আলাউদ্দিনের সঙ্গে এক তরফা চুক্তি করতে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন “৬০০ মণ মুক্তা, ,০০০ রৌপ্যমুদ্রা, ,০০০ রেশম বস্ত্র এবং প্রচুর দামি জিনিষপত্র” আদায় করলেন এবং দিল্লিতে বাৎসরিক রাজস্ব পাঠানোর শপথ করালেন। এর পর আলাউদ্দিন নিজে যখন দিল্লির মসনদে বসলেন, তিনি সেনাপতি মালিক কাফুরকে পাঠিয়ে ১৩০৭ সি.ই.-তে দেবগিরি অধিকার করলেন এবং পরাজিত রামচন্দ্রকে বন্দী করে দিল্লি নিয়ে গেলেন। সম্রাট আলাউদ্দিন তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্যের বিনিময়ে মুক্তি দিলেন, কিন্তু ১৩০৯ সি.ই.-তে রামচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল। রামচন্দ্রের পুত্র শংকর দিল্লিকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে দিলে, ১৩১২ সি.ই.-তে মালিক কাফুর আবার দেবগিরি আক্রমণ করে শংকরকে হত্যা করেন। এরপরেও রামচন্দ্রের জামাই হরপাল যখন মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেন, সুলতান মুবারকের আদেশে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল[2]। এভাবেই অতি নিদারুণভাবে যাদববংশের সমাপ্তি ঘটেছিল। 

৪.৮.৫ ওয়ারাঙ্গালের কাকতীয়

কাকতীয় বংশের উৎপত্তি সঠিক জানা যায় না। কেউ বলেন “কাকত” শব্দের অর্থ কাক, সেখান থেকেই বংশের নাম কাকতীয়। কেউ বলেন স্থানীয় দেবী দুর্গার এক রূপ “কাকতী” সেখান থেকে এই বংশের নাম এসেছে। আবার পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন তাঁরা সূর্য বংশীয় ক্ষত্রিয়। কিন্তু নেল্লোর জেলার কয়েকটি শিলালিপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে কাকতীয়রা ছিলেন শূদ্র।

প্রথমদিকে কাকতীয়রাও চালুক্যরাজাদের সামন্তরাজা ছিলেন। চালুক্য সাম্রাজ্যের পতনের সময়, তাঁরা তেলেঙ্গানা অঞ্চলে প্রথম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বহু উত্থান ও পতনের পর, যাঁদের সমাপ্তি ঘটে বাহমনি সুলতান আহমদ শাহের হাতে ১৪২৪-২৫ সি.ই.-তে।

প্রথম দিকে কাকতীয় রাজাদের রাজধানী ছিল অনমাকোণ্ডা বা হনুমাকোণ্ডাতে, পরবর্তী কালে তাঁরা রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ারাঙ্গাল বা ওরুঙ্গল্লুতে। প্রথম যে রাজা এই বংশের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি প্রোলরাজ মোটামুটি ১১১৭-১৮ সি.ই.-তে। তিনি পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরে রুদ্র ১১৬০ সি.ই. অব্দি এবং তাঁর ভাই মহাদেব ১১৯৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এরপর রাজা হয়েছিলেন, রাজা মহাদেবের পুত্র, রাজা গণপতি, তিনি প্রায় বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই কাকতীয় রাজত্বের গৌরব সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল। তাঁর পরাক্রমে চোল, কলিঙ্গ, যাদব, কর্ণাটের লাট এবং বলনাড়ুরা পরাস্ত হয়েছিলেন।

রাজা গণপতির পুত্র না থাকায়, তাঁর সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর কন্যা রুদ্রাম্বা ১২৬১ সি.ই.-তে। শোনা যায় তিনি পিতার রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন এবং প্রায় তিরিশ বছর রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পৌত্র প্রতাপরুদ্রদেব। এই প্রতাপরুদ্রদেবকে অমর করে গিয়েছিলেন, তাঁর সমসাময়িক কবি বৈদ্যনাথ, তাঁর রচিত “প্রতাপরুদ্রীয়” কাব্যে। এই প্রতাপরুদ্রই ছিলেন কাকতীয় বংশের শেষ রাজা এরপর সেনাপতি মালিক কাফুরের দাক্ষিণাত্য অভিযানে কাকতীয় বংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শোনা যায় তাঁদের বংশের কোন শাখা বস্তার (মধ্যপ্রদেশ) অঞ্চলে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

৪.৮.৬ শিলাহার

শোনা যায় শিলাহার বংশের উৎপত্তি পৌরাণিক রাজা জীমূতবাহনের থেকে, যিনি বিদ্যাধরের রাজা ছিলেন এবং নাগদের রক্ষা করার জন্যে, নিজেকে গরুড়ের আহার হিসেবে উৎসর্গ করেছিলেন। এই কাহিনীর মূল্য যাই থাক, শিলাহাররা সম্ভবতঃ ক্ষত্রিয় ছিলেন।

যতদূর জানা যায়, শিলাহারদের তিনটি শাখা ছিল এবং তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল টগর বা টের নামক কোন অঞ্চলে। প্রাচীনতম শাখা অষ্টম শতাব্দীর শেষ থেকে একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত দক্ষিণ কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল গোয়া। শিলাহারদের দ্বিতীয় শাখা উত্তর কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন, নবম শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর। তাঁদের রাজত্বের মধ্যে ছিল থানা, রত্নগিরি এবং সুরাট জেলার কিছু অংশ। তাঁদের রাজধানী ছিল থানা। তৃতীয় শিলাহার শাখা একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, তাঁদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কোলাপুর, সাতারা এবং বেলগামে। শিলাহারদের প্রথম দুই শাখা মোটামুটি কোন না কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধীনে রাজত্ব করতেন, যেমন, রাষ্ট্রকূট, চালুক্য এবং যাদব প্রমুখ। সে দিক থেকে শিলাহারদের তৃতীয় শাখা মাঝে মধ্যে স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। শোনা যায় এই শাখার এক রাজা বিজয়াদিত্য বা বিজয়ার্ক, চালুক্যবংশের পতনের জন্য কলচুরি মন্ত্রী বিজ্জলকে সাহায্য করেছিলেন। এই শাখার সব থেকে উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন ভোজ (১১৭৫-১২১০ সি.ই.), শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পরে যাদব রাজ সিংহন, শিলাহারদের এই রাজ্যটি অধিকার করে নিয়েছিলেন।



[1] সংস্কৃতর দেবনাগরি লিপি ভেঙে মোড়ি লিপি বা মুদিয়া লিপি মারাঠিভাষার প্রথম লিপি, যে লিপির আধুনিক সংস্করণ আজও প্রচলিত। 

[2] হয়তো ভয়ংকর এই ঘটনার স্মৃতি থেকেই বলিউডি সিনেমায় বহু ভিলেনের মুখে “তেরা খাল খিঁচ লুঙ্গা” ডায়লগ শুনতে পাওয়া যায়। যেমন মহাভারতে মহাবীর ভীমের দুঃশাসনের রক্তপানের বর্ণনা থেকে “তেরা খুন পি যাউঙ্গা” ডায়লগটি অনেক নায়কের মুখেই শোনা যায়।      

চলবে...

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

পাইলট

 

এর আগের রম্যকথা - " পয়লা বৈশাখ " 


 

স্টার্ট দেওয়ার পর নিউট্রালে পা রেখে তিনবার অ্যাক্সিলেটারে চাপ দিলাম, গাঁগাঁ করে উঠল ইঞ্জিন। ব্যাটা খ্যাপামোষের মতো হাঁকড়াচ্ছে, তার মানে ছোটার জন্যে রেডি।  রেয়ার আয়নায় দেখলাম, ‘প্রতিবন্ধু’ আর সিনিয়ার সিটিজেনের চারটে সিট যা খালি, বাকি সিটগুলো সব ভরে আছে। স্ট্যাণ্ড থেকে এই সিটগুলো রোজই ভরে যায় মাছেরঝোল ভাত খেয়ে সাজুগুজু অফিসবাবুরা, এই বাসের টায়েম জানে। বাসে উঠে সিট পেয়েই ঝিমোতে থাকে। মেয়েরা আবার কানে হেডফোন গুঁজে মোবাইলে গান শোনে। ইসটাটারের থেকে চার্ট নিয়ে হারুদা দোকানে গিয়েছে বিড়ি আর দেশলাই কিনতে। ও এলেই গাড়ি ছেড়ে দেব। আটটা বাজল।

ড্যাশবোর্ডে মা কালীর পেতলের মতো রঙ করা মূর্তিতে তাজা জবাফুলের মালা। পাশের ধুপদানিতে তিনটে ধুপ জ্বলছে। জয় মা, গাড়িভরা প্যাসেঞ্জার দিও মা। লোক তোলার সময় মোড়ের সার্জেন্টগুলো যেন কাটি না করে, মা। সব শালাদের বাস যেন পিছনে পড়ে থাকে, মা। এই রুটের পরের বাস চালাচ্ছে মনাদা, সে আমায় ধরতে এলেই, তার যেন টায়ার পাঞ্চার হয়, মা।  হারুদা আমার সিটের নিচেয় রাখলো ছ্যাতলা ধরা পেপসির বড়ো বোতলে টিপকলের জল। ওটা আমার জন্যে। গুটখা খাওয়া মুখ ধুয়ে, নতুন গুটখা ঢালার জন্যে। হারুদা বিড়ির প্যাকেট আর দেশলাই ড্যাশবোর্ডে রাখতে আমি পয়লা গিয়ার মারলাম। এতক্ষণ বাসটা ঘিজি ঘিজি ঘিজি ঘিজি কাঁপছিল, এবার প্রাণ পেয়ে চাকা চালু হল।

ডানদিকে স্টিয়ারিং মেরে রাস্তার মাঝখানে যাবার মুখেই বাধাএকটা সাইকেল রিকশা প্যাঁক, প্যাঁক করে উঠল, আর দুটো বাইক উড়ে যাবার জন্যে হর্ন মারতে লাগল। ব্রেক মারলাম, রিকসাওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ে প্যাডেল মারছে যাবার সময় বলে গেল – ‘শুয়োরের বাচ্চারা রাস্তাটাকে কিনে লেছে, এতক্ষণ দেঁইড়ে থেকে থেকে...’রিকশাটা পার হয়ে যাবার পর গাড়িটাকে রাস্তার মাঝে এনে গিয়ার ঠেললাম দু নম্বরে। রিকশটাকে ওভারটেক করার সময় ঠেসে হর্নটা বাজিয়ে দিলাম, ব্যাটার কানের ষষ্ঠীপুজো গালাগাল দিল, ‘যা না শালা, ফাঁকা রাস্তা পড়ে রইচে, চোকে দেকতে পাস না নাকি, গুয়োর ব্যাটা?’ গিয়ার তিন নম্বরে ঠেলে নিশ্চিন্ত হলাম, আজ দিনটা ভালোই যাবে।

প্রতি মিনিটেই দাঁড়াতে হচ্ছে লোক তোলার জন্যে। হারুদা গেটে চেঁচাচ্ছে। খালিগাড়ি। খালিগাড়ি। মেট্রো মেট্রো, রাসবিয়ারি, হাজরা, একসাইড লোক উঠছে। লোক উঠছেশুরুতে এই সুবিধে, নামার পাব্লিক নেই, শুধু ওঠে। রাস্তার ধারে, গলির মোড়ে যে হাত দেখাচ্ছে, দাঁড়িয়ে তুলে নিলেই হল। বাস ভরে উঠছে। হারুদাকে আর দেখা যাচ্ছে না, শুধু গলা শোনা যাচ্ছে ‘বাঁয়ে চাপ, বাঁয়ে চাপ। আস্তেল্লেডিস। একদম আস্তে করে দে। ওকাকু, গেটটা ছেড়ে ভেতরে যান না। পেছনে এগিয়ে যান, পেছনে এগিয়ে যান। এই যে ভাইটি, ব্যাগটা সামনে নিন, সামনে নিন, লোককে ঢুকতে দিন। বাঁ দিকে সাইকেল, বাঁ দিকে সাইকেল। বাসের বডিতে থাবড়া মেরে হারুদা বলল – হোইইইই। মাসীমা, ড্রাইভারের পিছনে দাঁড়িয়ে যান’

দরজায় লোক ঝুলছে। বাঁদিকের মিররে লাগাতার চোখ রাখতে হচ্ছে। শালা, উনিশবিশ হলেই এক আধটা খসে যাবে। আর কপালে জুটবে পাব্লিকের ক্যালানি। আমি তো শালা গেট খুলে ঠিক টপকে যাবো। মরবে বেচারা হারুদা। পালাবার রাস্তা পাবে? একটা মারও শালা বাইরে পড়বে না।

পাইলটদের শুনেছি হেব্বি কামাই। ড্রেসটেস মেরে একঘর মাঞ্জা। মালগুলো পারবে এরকম চালাতে? মধ্যমগ্রামে দেখেছি পেলেনগুলো সাঁ করে ওঠে কিংবা ঝুপ করে নামে। রাস্তাগুলো? শালা ওরম রাস্তা আমাকে দিক না। গাড়ি চালানো শিকিয়ে দেব সব ব্যাটাকে। আর মালগুলো আকাশে যখন ওড়ে? শালা একটা পাব্লিক নেই। লোক তোলা নেই, লোকের নামা নেই। সাইকেল নেই, অটো নেই, রিকশা নেই। পেছনে সেম রুটবাসের বাঁশ নেই। সামনে পাছা বেঁকিয়ে দাঁড়ানো পাব্লিক বাস নেই। এই যে এখন আমি এই বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। ডানদিকে বুড়োটা পাছা উঁচু করে মাছের কানকো মাপছে, পেট টিপছে, হর্ন মারছি, শালার হেলদোল নেই! ওদিকে বাঁয়ে স্কুলভ্যানে ছাগল গাদানোর মতো বাচ্চা তুলছে। এদিকে বাসের ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছি,

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’

‘কি কণ্ডাকটার, সেই থেকে লোক তুলচো, বাসটা এবার চালাতে বলো’

‘এবারে একটু টান বাপ, আধাঘন্টা হয়ে গেল এইটুকু আসতে’

‘এ শালা গরুরগাড়ির ড্রাইভার নাকি রে’?

পাব্লিক বাসের বডি পেটাচ্ছে, ধপ ধপা ধপ।

আকাশে এসব আছে? কিচ্ছু নেই। তবু শালাদের এত মাঞ্জা কিসের? মেজাজ খিঁচড়ে লাভ নেই, যার যা নসিব। মাইনে যা পাই সে না বলাই ভালো। দিশি ছাড়া আর কিছু জোটে না। লাভের মধ্যে কমিশন। পার টিকিটে দশপয়সা। জয় মাকালী, এতক্ষণ প্যাসেঞ্জার ভালোই দিয়েচ, মা। মেট্রোতে গাড়ি খালি হয়ে যাবে। ওখানে যেন গুচ্ছের পাব্লিক ওয়েটে থাকে, মা, বাসে ঝাঁপিয়ে ওঠার মতো। আমার দরজার বাইরে লিখে রেখেছি পাইলট, ড্রাইভার নয়, পাইলট। লটে পাব্লিক যেন পাই, ওইটুকুনি দেখো, মা, আর কিছু চাই না। 

-*-

 


শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

আগুনের পরশমণি - পর্ব ১

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব 

এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


প্রথম পর্ব

 

আগুন, আগুন, দাউ দাউ আগুন জ্বলছে পাহাড়তলিতে। আগুনের হল্কা, ধোঁয়া, আর ছাই উড়ছে হাওয়ায়। গাছের মোটা মোটা ডাল আর গুঁড়ি ফাটছে ফট ফট শব্দে। বড়ো বড়ো গাছের ডাল দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে ভেঙে পড়ছে মাটিতে, তীব্র আগুনের শিখা লক লক করে উঠছে থেকে থেকে। জঙ্গলের মধ্যে বাস করা পশুর দল দৌড়ে চলেছে দিগ্বিদিকেএখন হিংস্র বাঘের পাশে পাশে দৌড়চ্ছে হরিণের পাল। বুনো শুয়োরের সঙ্গে দৌড়চ্ছে বুনো মহিষের দল। কেউ কেউ দিশাহারা হয়ে ঢুকে পড়ছে আগুনের মধ্যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্বলতে জ্বলতে পড়ে যাচ্ছে আগুনের মধ্যে আর উঠে দাঁড়াচ্ছে না।

গুহার মুখে বসে এক বৃদ্ধ মানুষ দেখছিলেন, দলের যুবক যুবতী, বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা চঞ্চল হয়ে উঠছিল বারবার, পাহাড়তলিতে ওই আগুনের দৃশ্য দেখে, তাদের চোখে, তাদের আচরণে প্রচণ্ড আতঙ্ক। এই গুহাতে থাকা কী উচিৎ হবে? ওই আগুন যদি উঠে আসে এই পাহাড়ের চূড়াতেও, যদি গ্রাস করে নেয় আদিম মানুষের এই নিশ্চিন্ত আবাসটুকু? দিনের বেলায় আগুনের প্রকোপটা খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেই আগুনের তীব্র উজ্জ্বল রঙের প্রবাহে মুগ্ধ হয়ে গেল্ সেই মানুষগুলো। কী অপূর্ব সুন্দর রং, কি অপূর্ব তার আভা, আগুনের উজ্জ্বল গোলাপী আভায় উদ্ভাসিত হয়ে রইল সারা আকাশ। সেই ভয়ংকর অথচ সুন্দর অগ্নিকাণ্ডের দিকে নেশাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে থেকে তারা সকলেই সারারাত কাটিয়ে দিল। ভোরের দিকে সে আগুন স্তিমিত হয়ে এল অনেকটাই, অজস্র ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে, ধোঁয়ার আবরণে আচ্ছন্ন জঙ্গল। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ। বিনিদ্র দুই চোখ জ্বালা করছে ধোঁয়ার স্পর্শে।

এক প্রৌঢ়া মহিলা বৃদ্ধের পাশেই বসেছিলেন, বললেন, “বাবা, মনে হচ্ছে, আগুন নিভে গেছে”। 

অশক্ত জরাগ্রস্ত শরীরের ভারে দুই হাঁটুর উপর নত হয়ে আসা মাথা তুলে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, “ও ভাবে বোলো না, ও ভাবে বোলো না, বলো অগ্নিদেব। করজোড়ে, নতজানু হয়ে বলো, হে অগ্নিদেব, তুমি শান্ত হও। হে প্রভু, শান্ত করো তোমার রোষ। হে দেবতা, তোমার ক্রোধের প্রচণ্ড তেজ জগতে কেউই সহ্য করতে পারে না। তুমি নিরস্ত হও। প্রসন্ন হও, হে অগ্নিদেব, তুমি প্রশমিত হয়ে আমাদের কল্যাণ দাও” প্রৌঢ়া  মহিলা নতজানু হয়ে, করজোড়ে কণ্ঠ মেলালো বৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে। তাদের ওই মন্ত্র উচ্চারণ করতে দেখে দলের অন্য সকলেও এসে বসল তাদের ঘিরে। গুহার সামনের চাতালে বসে তারা দেখল, গত পরশুও যে জঙ্গল থেকে তারা পশু শিকার করে আনত, সংগ্রহ করে আনত গাছের ফল, মূল, কন্দ, ক্ষত সারানোর ওষধি, সেই জঙ্গল আজ নিঃস্ব, পড়ে আছে শুধু ছাই আর জ্বলন্ত অঙ্গারের স্তূপ।

প্রৌঢ়া মহিলাই এই দলের নেত্রী। তার কাছাকাছি এসে বসেছিল তার থেকে একটু কমবয়সের আরো চারপাঁচজন  মহিলা। তাদের একজন বললেন, “গুহায় সঞ্চিত সব খাবার দাবার প্রায় শেষ, এতগুলো লোক এখন কী খাবে? গত পরশুদিন শিকার করে আনা পশুমাংসে কাল সারাটাদিন চলে গেছে। টেনেটুনে আজকের দিনটাও হয়তো চলে যাবে। কিন্তু আজ রাত্রে, কিংবা কাল সকাল থেকে কী খাবে এতগুলো মানুষ? এখনই শিকারে যাওয়া দরকার, তা না হলে এতগুলো লোকের অনাহার অনিবার্য”। 

সে কথা প্রৌঢ় মহিলার বুঝতে অসুবিধে হল না, বড়দের কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল, কিন্তু বাহাত্তর জনের এই দলে আছে অন্ততঃ চোদ্দ জন বালক বালিকা, তাদের ক্ষুধা কিভাবে শান্ত হবে? অসহায় চোখে তিনি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকালেন, কিন্তু কোন উত্তর খুঁজে পেলেন না। বৃদ্ধ মানুষটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু আশার কথা যেন শুনতে চাইলেন প্রৌঢ়া মহিলা। 

বৃদ্ধ মানুষটি শ্লেষ্মা জড়িত ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন, “দেবতার রোষ, এর থেকে মুক্তি দেখাতে পারেন একমাত্র দেবতাই। তাঁকে প্রসন্ন করো, তাঁকে সন্তুষ্ট করোকিছু একটা উপায় তিনি ঠিক করে রেখেছেন। এতগুলো অসহায় মানুষকে তিনি অনাহারে মরতে দেবেন না নিশ্চয়ই”। 

বৃদ্ধ মানুষটির এই কথার থেকে, এই দুরবস্থা থেকে উদ্ধারের কোন উপায় পাওয়া গেল না, সকলেই অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল ধোঁয়া ওঠা জঙ্গলের দিকে। অনেকক্ষণ পর একটি যুবক হঠাৎ কথা বলে উঠল, “আজ খুব ভোরে আমি নীচেয় গিয়েছিলাম”, অজানা আশঙ্কায় সবাই শিউরে উঠল, সবাই ফিরে তাকাল সেই যুবকের দিকে। সকলের চোখেই একই জিজ্ঞাসা, কেন গিয়েছিলি? কি দেখলি সেখানে? 

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “দেখলাম, চারিদিকে ছাইয়ের স্তূপ, তারমধ্যে পড়ে আছে অনেক অনেক পশুর দগ্ধ দেহ। আশে পাশে জীবনের কোন অস্তিত্বই নেই আর। একটা পাখির ডাকও শুনতে পেলাম না। এমন নিঃশব্দ প্রাণহীন জায়গা আগে কোনদিন দেখিনি আমি। আমার খুব খিদে পেয়েছিল, গতকাল প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি আমার”

যুবক এই পর্যন্ত বলে একটু থামল। প্রৌঢ়া মহিলারা নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন, প্রায় সকলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেনএই যুবক প্রৌঢ়া নেত্রীর এক বোনের ছেলে। সবার থেকে আলাদা। একটু দুর্বল, অন্য ভাইয়েরা যেমন বলিষ্ঠ শক্তিমান, এ ততটা নয়, কেমন যেন ভাবুক ধরনের। অন্য সব যুবকেরা খাবার সময় যেমন হামলে পড়ে, ও তেমন নয়, ও অপেক্ষা করে। সকলে খাওয়ার ভাগ তুলে নেওয়ার পর, যেটুকু বাঁচে, তাতেই ও খুশি থাকে। তার মা সেটা লক্ষ্য করে, প্রয়োজনে নিজের ভাগের থেকে তুলে দেন ছেলেকে। কাল নিচের দাবানলের আতঙ্কে খেয়াল করেননি, তাই গতকাল যুবক ছেলেটি অভুক্ত থেকেছে! 

যুবক আবার বলতে শুরু করল, “কিচ্ছু পেলাম না, না ফল, না মূল, না কন্দ। এক জায়গায় বেশ বড়োসড়ো কয়েকটা হরিণ মরে পড়ে আছে দেখলাম, চামড়াহীন অর্ধদগ্ধ, মাথার শিং ছাড়া তাদের চেনবার উপায় নেই। পাথরের ছুরি দিয়ে কেটে সামনের পা থেকে অনেকটা মাংস কেটে নিলাম। আধপোড়া মাংস এতই নরম কাটতে কোন অসুবিধে হল না, অসুবিধে হল না, দাঁতে ছিঁড়ে চিবোতে। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কিন্তু কাঁচা রক্ত মাংসের গন্ধ নেই, আর কি নরম, তুলতুলে, চিবোতেই যেন মিলিয়ে যেতে লাগল মুখের ভিতর। অনেকটা মাংস খেয়ে ফেললাম। ফিরে এসে দেখি, দাদু অগ্নিদেবের মন্ত্র পড়ছেন”। প্রৌঢ়া মাসিমার দিকে তাকিয়ে যুবক বলল, “মাসিমা, আমরা কয়েকজন মিলে যদি ওই আধপোড়া পশুদের ওপরে বয়ে আনতে পারি, আমাদের বেশ কয়েকদিনের খাবারের সমস্যা মিটে যাবে। আর তার মধ্যে আমরা নিশ্চয়ই কোন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিতে পারবো”। 

যুবকের কথা শেষ হবার আগেই, বৃদ্ধ শিউরে উঠলেন, ভীষণ উত্তেজিত হয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরে বললেন, “মূর্খ, উদ্ধত যুবক, তুই জানিস না কী ভয়ানক পাপ তুই করেছিস। ওই পশু প্রভু অগ্নিদেবের শিকার, তাঁর অগ্নিপ্রভায় ওইসকল পশু দগ্ধ হয়ে মারা গেছেঅগ্নিদেবের খাবার তুই চুরি করেছিস, এর পরিণাম মোটেই ভালো হবে না”। তারপর নিজের পুত্র-কন্যা-পৌত্র-পৌত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাবধান হ, সাবধান হ। লোভের বশে এমন পাপ করিস না। ওই অজ্ঞান ছোকরার কথায় ভুলেও অগ্নিদেবের আহারে ভাগ বসাতে যাস না। মরবি, সকলে একসঙ্গে মরবি, দেবতার রোষে কেউ পরিত্রাণ পাবি না”।  

বৃদ্ধের কথা যুবকের মনঃপূত হল না, সে অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিন্তু দাদু, অগ্নিদেব তাঁর একার আহারের জন্য এতগুলি পশুকে কেন পুড়িয়ে মেরে ফেললেন? তিনি কেমন দেবতা? আর মেরেই যখন ফেলেছেন, আমাদের আহারের জন্য, তার থেকে দশ-বিশ খানা যদি আমরা সরিয়েই আনি, তাতেই বা তিনি ক্রুদ্ধ হবেন কেন? তিনি না আমাদের দেবতা, আমরা যদি সুস্থ শরীরে বেঁচেই না থাকি - যদি অনাহারে মারাই যাই, তাঁকে দেবতা বলে কে মনে রাখবে”?

বৃদ্ধ প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপতে লাগলেন, তাঁর আর সেই শক্তি নেই, না হলে এক ঘুঁষিতে ভেঙে দিতে পারতেন এই উদ্ধত যুবকের নাক। তিনি নিজের মেয়েদের বললেন, “তোদের আস্কারা পেয়েই, ওর এই দশা। ওকে সংযত কর, নয়তো অগ্নিদেবের রোষে আমরা সবাই ধ্বংস হবো”। 

প্রৌঢ়া নেত্রী গম্ভীর আদেশের সুরে বললেন, “আপনি শান্ত হোন বাবা, আমি দেখছি কী করা যায়। আপনি বরং গুহার ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম নিনকাল সারারাত আপনার এতটুকুও বিশ্রাম হয়নি।” ঈশারা পেয়ে দুই পুত্রের কাঁধে ভর দিয়ে, তিনি গুহার দিকে চলে গেলেন। বৃদ্ধের গুহায় ঢোকা অব্দি অপেক্ষা করে, যুবক বোনপোর দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ়া নেত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই ওই পোড়া মাংস খেলি? তোর ভালো লাগল?  কাঁচা টাটকা মাংস ছাড়া অন্য কোন মাংস খাবার কথা আমি তো ভাবতেই পারি না”। 

প্রৌঢ়া নেত্রীর কথা প্রায় সবাই সমর্থন করল, অনেকে সেই যুবককে উপহাস করে বলল, “ছিঃ, পোড়া মাংস আবার কেউ খায় নাকি? থুঃ থুঃ। তোর কি কোন রুচি অরুচি নেই, রে? কোন পশুকেও কোনদিন পোড়া মাংস খেতে দেখিনি। তুই তো পশুরও অধম”। 

প্রৌঢ়া নেত্রী হাত তুলে সবাইকে চুপ করার আদেশ দিলেন, সবাই থামলে তিনি বললেন, “আমি অবশ্য অতটা বিরুদ্ধে যেতে চাইছি না। কারণ, আমরা এখন ভীষণ সংকটে, জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, জ্যান্ত পশুরা পালিয়ে গেছে দূরের অন্য কোন জঙ্গলে। নতুন জঙ্গল খুঁজে আমাদের সকলের বেঁচে থাকার মতো যথেষ্ট শিকার যোগাড় করতে বেশ কদিন সময় লাগবে। ততদিন, যদি একদম অখাদ্য না হয়, আমরা সবাই নীচেয় গিয়ে ব্যাপারটা বুঝে আসতেই পারি”

বৃদ্ধবাবার এবং তাঁর অগ্নিদেবের রোষের কথা দু একজন বলল, কিন্তু প্রৌঢ়া নেত্রী সে কথায় কান দিলেন না। তিনি জানেন এই পরিস্থিতিতে এত বড়ো দলটাকে সুস্থ ভাবে বাঁচিয়ে রাখাটা অনেক বেশি জরুরি, অনাহারে যদি সবাই মারাই যায়, তখন প্রভু অগ্নিদেবের রোষে কী আর এমন এসে যাবে? যুবক বোনপোর কথাগুলো পুরোটা মেনে নিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু অস্বীকার করে উড়িয়ে দেওয়ার জোরও পাচ্ছেন না।  শিশু আর দু একজন অসুস্থদের দেখা শোনার জন্যে কয়েকজন মহিলা থেকে গেল, দলের বাকিরা চলল পাহাড়তলির দিকে, সকলের সামনে সেই যুবক আর নেত্রী মহিলা। তাদের সকলের হাতে পাথরের তৈরি নানান আকারের ফলা।

 ফেলে যাওয়া সেই হরিণের পা থেকে পাথরের ফলা দিয়ে কেটে কেটে বেশ কয়েকটা টুকরো মাংস কেটে তুলল সেই যুবক, বাড়িয়ে দিল প্রৌঢ়া নেত্রী, তার মা ও অন্যান্য মাসিদের দিকে। অধীর আগ্রহে অন্য সকলে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। সকলেই জিভে ঠেকিয়ে স্বাদ নিলেন, গন্ধ নিলেন, তারপর দাঁতে কেটে চিবোতে লাগলেন মাংসের টুকরো। একদম অন্য রকম স্বাদ। একটু পোড়া পোড়া গন্ধ, কিন্তু তাতে পশুর নিজস্ব গন্ধ নেই বললেই চলে। অনেক সময় কিছু কিছু পশুর গায়ে খুব উৎকট গন্ধ হয়, সে গন্ধ অনেকটাই কম লাগছে। আর সব থেকে আশ্চর্য এত নরম মাংস, পূর্ণ বয়স্ক হরিণের মাংস বলে মনেই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে খুব বাচ্চা কোন হরিণের। তাঁদের আচরণে দলের অন্য সকলেই কিছুটা ভরসা পেল, তারাও সবাই নিজেদের পাথরের ফলা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মাংস কেটে কেটে তুলতে।

পোড়া মাংসের অভিনব স্বাদ নিতে নিতে প্রৌঢ়া নেত্রী এবং তাঁর বোনেরা, দলের অন্য সকলের দিকেই লক্ষ্য রাখছিলেন। তাঁরা দেখলেন, শিকার করে আনা বড়ো একটা হরিণকে শেষ করতে যে সময় লাগে, তার অর্ধেক সময়েই দু দুটো প্রমাণ সাইজের আধপোড়া হরিণ শেষ করে দিয়েছে তাঁর দলটা। তার মানে ঝলসে যাওয়া এই পশুর মাংস ছাড়িয়ে খেতে অনেক কম সময় লাগছে। এই মাংস শিশু এবং নড়বড়ে দাঁত বৃদ্ধদের পক্ষেও অসুবিধের হবে না। প্রৌঢ়া নেত্রী সবাইকে নির্দেশ দিলেন, যতগুলো সম্ভব এমন ঝলসানো পশু নিয়ে উপরে গুহার মধ্যে সংগ্রহ করতে। 

তারপর যুবক বোনপোর কাঁধে হাত রাখলেন, বললেন, “তোর থেকে আমরা এক নতুন বিষয় শিখলাম। আগুনে ঝলসানো পশু খাবার পক্ষে খুব সুবিধের। বাবা বলেছিলেন, এ অগ্নিদেবের রোষ, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এ তাঁর আশীর্বাদ। কিন্তু এমন তো রোজ রোজ হতে পারে না! জঙ্গলে তো আর নিয়মিত আগুন লাগবে না, আর একবার আগুন লাগলে জঙ্গলই তো সাফ হয়ে যাবে! কাজেই এমন সুবিধে রোজ রোজ আমাদের ভাগ্যে জোটার কোন আশা নেই”।

“কিন্তু, আম্মা, আগুন যদি জ্বালানো যেত, আমরা তো শিকার করে এনে, ঝলসে নিতে পারতাম, আমাদের দরকার মতো!” 

যুবকের এই কথায় প্রৌঢ়া নেত্রী খুব বিরক্ত হলেন, রূঢ়ভাবে বললেন, “মূর্খ বাচালের মতো কথা বলিস না। প্রকৃতিতে ঝড়, বৃষ্টি, সূর্য, চন্দ্রের মতো, আগুনও দেবতার দান। এই আগুন নিজেই অগ্নিদেবতা। সেই আগুন তুই দরকার মতো জ্বালাবি, নেভাবি? তোর স্পর্ধার তো সীমা নেই, দেখছিআমরা সবাই দেবতার অধীন, সেই দেবতাকে তুই বশে আনতে চাস? বাবা, ঠিকই বলেছেন, আমরাই আদর দিয়ে দিয়ে তোকে মাথায় তুলে দিয়েছি। এমন কথা আর কক্ষণো যেন না শুনি, এমন অমঙ্গলের কথা চিন্তা করলে, এই দলে আর তোর জায়গা হবে না, বলে দিলাম”।

যুবক মাথা নীচু করে রইল, আর কিছু বলল না, তবে তার মাথার মধ্যে চিন্তাটা ঘুরতেই লাগল। তার মনে হল অগ্নিদেবতার কী এমন গরজ পড়ল, যে তিনি আমাদের জন্য অজস্র পশু ঝলসে রেখে দিলেন? আর তার জন্যে তিনি, গোটা জঙ্গলটাকেই পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন! কাল কী খাব সেটা একবারও ভাবলেন না? এটা কি সত্যিই অগ্নিদেবতার আশীর্বাদ, নাকি নিছক একটা দুর্ঘটনা? 

                                                         

ঝলসানো পশু শুধু যে খাওয়ার সুবিধে তাই নয়, কাঁচা মাংসের থেকে অনেক বেশিদিন রাখাও যায়। অতএব গুহাবাসী এই দলটি বেশ কটাদিন সময় পেয়ে গেল, বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত জঙ্গলের সন্ধান করার এবং পেয়েও গেল মনোমত পশু এবং পর্যাপ্ত ফলমূল ভরা গভীর এক জঙ্গল। সেদিন ভোর ভোর তাদের একটা বড়দল পাথরের সমস্ত অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, সেই জঙ্গলে শিকার করতে। জঙ্গলের সবই ভালো, কিন্তু খুব পাথুরে, যেখানে সেখানে গভীর গাছপালার ভিতরে হাতির পিঠের মতো বড়ো বড়ো পাথর মাথা তুলে পড়ে আছে। এই পাথরের সুবিধে, অসুবিধে দুইই আছে। শিকারীর সুবিধে লুকিয়ে থাকতে, অসুবিধে শিকার খুঁজতে, কারণ পাথরের আড়ালে পশুরা লুকিয়ে থাকলে, চট করে দেখতে পাওয়া যায় না। 

এমনই এক বড়ো পাথরের আড়ালে শুকনো ঘাসপাতা আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ল দলছুট একটা বয়স্ক বুনো শুয়োর লুকিয়ে আছে। দলের লোক এবং মহিলারা অর্ধচন্দ্রের মতো গোল হয়ে, অস্ত্র বাগিয়ে নিচু হয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল ঘন ঘাসের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে তাকে ঘিরে শিকারী মানুষগুলোর অস্তিত্ব পশুটা বুঝে ফেলেছে, সে এখন সতর্ক, তার শরীর টানটান উত্তেজনায়, স্থির চোখে সে লক্ষ্য রাখছে, মানুষগুলোর গতিবিধি। শিকারী মানুষগুলোর বৃত্তটা যতো ছোট হয়ে আসতে লাগল, দুপক্ষের উত্তেজনার পারদ ততই চড়ছে। হঠাৎ শিকারীদের সঙ্গে শিকারের চোখাচোখি হতেই, মূহুর্তের জন্য সমস্ত কিছু থেমে গেল। 

মানুষগুলো একসঙ্গে বিকট চিৎকার করে, একইসঙ্গে ছুঁড়ে দিল পাথরের তীক্ষ্ণ ফলকগুলি। পশুটা আহত হয়েছে ঠিকই কিন্তু গুরুতর নয়, বরং তীব্র গতি ও শক্তিতে একজন মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ দাঁতে চিরে দিল পেট, তারপর দৌড়ে পালাতে লাগল, বনের অন্য দিকে। পশুটার সারা গায়ে তো বটেই, নাকে আর চোখেও পাথরের ফলায় গভীর ক্ষত, তীব্র রক্তপাত হচ্ছে। আহত এই শিকার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়বে, কমে আসবে তার পালাবার গতি, লড়াইয়ের শক্তি। শিকারী মানুষগুলো পেয়ে গেছে সাফল্যের স্বাদ, এত বড়ো শূকরের মাংস, তাদের গোটা দলের পক্ষে যথেষ্ট। তারা পিছনের দিকে তাকাল না, আহত সঙ্গীকে ফেলে রেখেই দৌড়ে গেল আহত শিকারের দিকে।

না সকলে গেল না, রয়ে গেল সেই যুবক, সে অতি দ্রূত সেই সঙ্গীকে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিয়ে, যোগাড় করে আনল নানান গাছের পাতা, শেকড়। পাথরে ঘষে সবুজ পাতার রস আর প্রলেপ করে দিল সঙ্গীর ক্ষতে। সঙ্গী এখন অনেকটাই শান্ত, সুস্থ; তার দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। যুবক সেই সঙ্গীর পাশে এসে বসল। এতক্ষণের ব্যস্ততায় সে খেয়াল করেনি, হঠাৎ তার নাকে এল গাছের শুকনো পাতা ডালাপালা পোড়ার গন্ধ। চমকে উঠল যুবক, আবার কী অরণ্যে আগুন ধরল? সর্বনাশ, তা যদি হয়, তাহলে তারা সকলেই তো পুড়ে মরবে এই জঙ্গলের মধ্যে। তার দলের অন্য লোকেরা কোথায়, অরণ্যের কত ভিতরে? চারপাশে তাকিয়ে দেখল, যে বড় পাথরটাকে পিছনে রেখে শূকরটা দাঁড়িয়েছিল, সেই পাথরের কোলে শুকনো পাতা, শুকনো ঝোপঝাড়ের ডালপালায় আগুন জ্বলছে, খুব বড়ো সড়ো নয়, ধিকি ধিকি। এই কী তবে অগ্নিদেবের অভিশাপ? 

সেদিন সে এবং তার দলের লোকেরা তাঁর মাংস চুরি করেছিল বলেই, দেবতা প্রতিশোধের আয়োজন করছেন। যুবক ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বড়ো পাথরটার দিকে। যে পাতাগুলো জ্বলছিল, যে ডালপালাগুলো জ্বলছিল, তার ওপর পাথর ছুড়তে লাগল, বেশ কিছুটা ভয়ে, অনেকটা আক্রোশে। এভাবে কোন দেবতাই পারেন না, মানুষের বেঁচে থাকার উপর খবরদারি করতে। কিছুক্ষণ পর পাথরে চাপা পড়ে নিভে গেল আগুন, সামান্য ধোঁয়া উঠতে লাগল পাথরের স্তূপের ভিতর থেকে। যুবক আশ্চর্য হল, তাহলে আগুনকে নিভিয়ে ফেলাও যায়? সেক্ষেত্রে আগুন জ্বালানো যাবে না কেন?

আগুন নিভে যাবার পর, সেই যুবক বড়ো পাথরের খুব কাছে গিয়ে দেখল তাদের ছোঁড়া পাঁচ ছটা পাথরের ফলক এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। তার মধ্যে একটা ফলক তার। এর অর্থ তার ছোঁড়া পাথরের ফলক লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, এত কাছে থেকে এত বড়ো শিকারকে সে আহত করতে পারেনি বুঝে, যুবক লজ্জা পেল যেন। ওই বড়ো পাথরটাই যেন তার শিকার, হাতের শক্তি আর লক্ষ্যবেধের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে সে পাথরের টুকরো ছুড়তে লাগল বারবার। হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে পাথর ছুঁড়তেই লাগল, ছুঁড়তেই লাগল। কিছুক্ষণ পরে, হঠাৎ লক্ষ্য করল, তার ছোঁড়া পাথরের আঘাতে, বড়ো পাথরটার গায়ে বার বার আগুনের ফুলকি দেখা যাচ্ছে। সে আবার ভয় পেল, ওই পাথরের বুকে কী আগুন আছে? তার দাদু, মা, মাসিরা যে অগ্নি দেবতার কথা বলেন, ওই পাথরের মধ্যেই কি তাঁর নিবাস? নাকি ওই পাথর তাঁর আশীর্বাদে পবিত্র?

আর সে পাথর ছুঁড়ল না, ধীরে ধীরে বড়ো পাথরটার কাছে গিয়ে নীচু হয়ে বসল। তার মনে হল, তাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া পাথরের আঘাতে যে আগুনের ফুলকি তৈরি হয়েছিল, তার থেকেই শুকনো ঘাস পাতায় আগুন ধরে যায়নি তো? তারা তখন শূকর শিকারের উত্তেজনায় কেউ লক্ষ্যই করেনি। আগুন আশে পাশে ছড়িয়ে যাওয়ার পরই তার নাকে গন্ধ এসেছিল, সে লক্ষ্য করেছিল। সেই যুবক হাতে একটা ছোট্ট পাথর তুলে, বড়ো পাথরের গায়ে ঠুকল এবং প্রত্যেকবার ঠিকরে উঠতে লাগল ফুলকি । এবার সে নিশ্চিত হল, ওই বড় পাথরটা অন্য পাথরের থেকে আলাদা, ওই পাথরের বুকে আগুন আছে। এবার সে বড়ো সেই পাথরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে, এক জায়গায় একটা ফাটল দেখতে পেল। সেই ফাটলের মধ্যে পাথরের ফলক ঢুকিয়ে বেশ কয়েকবার ঠুকতেই ভেঙে বেরিয়ে এল মাঝারি সাইজের কয়েকটা পাথর।

সেই আগুনে পাথরের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে ঘষতেই বেরিয়ে এল আগুনের ফুলকি। এবার সে শুকনো পাতা কাঠকুটো যোগাড় করে, একটা স্তূপ বানালো, তার খুব কাছে দুটো আগুনে পাথর ঘষে ঘষে বার কয়েক ফুলকি দিতেই দপ করে শুকনো পাতায় আগুন জ্বলে উঠল। একবার আগুন ধরে যেতেই তার ওপর কাঠকুটো ধরে বেশ ছোট্ট একটা আগুনের কুণ্ড বানিয়ে ফেলতেও অসুবিধে হল না। আনন্দে সেই যুবক অদ্ভূত চিৎকার করে উঠল, তার সঙ্গী ওষধির গুণে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ছিল, যুবকের চিৎকারে সে ভয় পেয়ে গেল। আরো ভয় পেয়ে গেল যুবকের সামনে জ্বলতে থাকা আগুন দেখে। বন্যশূকরের দাঁতের আঘাতের যন্ত্রণায় সে যে চিৎকার করেছিল, তার থেকে অনেক বেশি চিৎকার করে উঠল আগুনের ভয়ে। যুবক প্রথমে তাকে শান্ত করল, তারপর পাথর দিয়ে চেপে চেপে নিভিয়ে ফেলল তার জ্বালিয়ে তোলা আগুনের কুণ্ডআহত সঙ্গী আশ্বস্ত হল, যুবকের অদ্ভূত ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হল অনেক বেশি।

সেই প্রকাণ্ড শূকর, তারসঙ্গে ছোট খাটো আরো কিছু পশু শিকার করে এবং আহত সঙ্গীকে মাচায় শুইয়ে নিয়ে, পুরো দলটি যখন তাদের গুহার আবাসে ফিরল, সূর্য ডুবতে তখন আর দেরি নেই। দলের অধিকাংশই তখন ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত। ঠিক হল, সঞ্চিত খাবার গুহায় যা আছে, আর ছোটখাটো পশুগুলো খেয়েই রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাক। কাল সকালে উঠে বুনো শুয়োরের ছাল চামড়া ছাড়িয়ে যা ব্যবস্থা করার করা যাবে। সারাদিনের পরিশ্রম আর উত্তেজনায় হাক্লান্ত সেই দলের মানুষগুলো, সন্ধে নামার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল গুহার ভিতর।

 প্রৌঢ়া মহিলার ঘুম খুব পাতলা, তার ওপর তাঁর খুব ভোরে ওঠার অভ্যেস। পরদিন ভোরে উঠে, গুহার বাইরে এসে দেখলেন, তাঁর বোনপো, সেই যুবক, গুহার বাইরে শুকনো পাতার একটা বড়সড় স্তূপ বানিয়েছে, আর যোগাড় করেছে, এক বোঝা শুকনো গাছের ডালপালা। অবাক হয়ে তিনি কিছুক্ষণ তার ব্যস্ততা লক্ষ্য করলেন, কিছুই বুঝতে না পেরে তিনি জিগ্যেস করলেন, “কী ব্যাপার বলতো, এই কাক ভোরে উঠে কী করছিস কি, ডালপালা দিয়ে”?

“কালকে যে বুনো শুয়োরটা শিকার করে নিয়ে এসেছ, ওটাকে ঝলসাবো”। 

সন্দিগ্ধ চোখে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে প্রৌঢ়া মহিলা বললেন, “তার মানে? আগুন পাবি কোথায়?” 

যুবক দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলল, “আগুন পেয়েছি, দেখ না কী করি! তুমি শুধু ওদের কয়েকজনকে বলো না শুয়োরটাকে এখানে এনে, এই যে এইখানে ঝুলিয়ে দেবে”। হাত বাড়িয়ে শুকনো পাতার স্তূপের দুপাশে খাড়া করা মোটা মোটা গাছের ডাল দুটো দেখিয়ে দিল যুবক। অবিশ্বাস আর বিরক্তিতে প্রৌঢ়া মহিলার ভুরু কুঁচকে উঠল। কিন্তু কিছু বললেন না, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন যুবকের চোখের দিকে। তাঁদের কথার আওয়াজে আরো কয়েকজন গুহা থেকে বেরিয়ে এসেছিল, প্রৌঢ়া তাদের বললেন, গত দিনের শিকার করা মরা শুয়োরটাকে যুবকের কথা মতো ঝুলিয়ে দিতে। আগুন নিয়ে এই ছেলে খেলা তাঁর পছন্দ না হলেও, তাঁর মনে একটা কৌতূহলও হচ্ছিল, কী করে দেখাই যাক না।

জনা ছয়েক সবল পুরুষ ধরাধরি করে পশুটাকে ঝুলিয়ে দিল, দু পাশের খাড়া করা মোটা মোটা দুই ডালের মাথায়। তারপর সেই যুবক উবু হয়ে বসে, গত কাল দূরের জঙ্গল থেকে যোগাড় করে আনা পাথরের টুকরোর গায়ে, তার পাথরের অস্ত্র-ফলক ঠুকতে শুরু করল। ঝিলিক দিয়ে উঠল স্ফুলিঙ্গ। যারা যুবকের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল, তারা ভয়ে লাফ দিয়ে সরে গেল অনেকটা দূরে। যুবক নিবিষ্ট মনে বার কয়েক পাথরে পাথর ঠুকতে ঠুকতে হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল শুকনো পাতার স্তূপ। জ্বলে উঠল আগুন। শুকনো পাতার মধ্যে কয়েকটা শুকনো গাছের ডাল গুঁজে দিতে, সেগুলোও ধরে উঠল, আগুনের শিখা বড়ো হয়ে, ছুঁয়ে ফেলল মরা পশুর শরীর, পুড়তে লাগল তার রোম, চামড়া

পশুটার সামনের দুই পা আর পেছনের দুই পা বাঁধা অবস্থায়, গাছের একটা মোটা ডালে ঝুলছিল। তার ফলে, আগুনের শিখার স্পর্শে দগ্ধ হচ্ছিল তার পিঠ, কাঁধবেশ কিছুক্ষণ দগ্ধ হবার পর, সেই যুবক লম্বা পাথরের ফলা নিয়ে কেটে নিল কাঁধের কিছুটা অংশ। তারপর তপ্ত, নরম সেই মাংস গাছের বড়ো একটা পাতার ওপর নিয়ে, প্রৌঢ়া মহিলার কাছে নিয়ে গেল যুবক। বলল, “মাসি, খেয়ে দেখ তো সেদ্ধ হল কিনা?”

গরম গরম এবং নরম মাংসের স্বাদ ও গন্ধে নেত্রী আশ্চর্য হলেন, তিনি যুবকের দিকে তাকিয়ে গর্বের সঙ্গে বললেন, “সত্যিই অপূর্ব, তুই অগ্নিদেবের আশীর্বাদ পেয়েছিস”।  সেদিন শিশু থেকে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ, দলের সকলেই, সেই দগ্ধ মাংসের স্বাদ নিয়ে তৃপ্ত হল।

এই ঘটনার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব যে মানব সভ্যতাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে, সে কথা সেদিনের সেই মানুষগুলির বোঝার সাধ্য ছিল না। কিন্তু এই ঘটনা যে মানব সভ্যতার আদিতে অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল, আজ সে কথা স্বীকার করতে কোন দ্বিধা নেই । 

 

বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রচুর মত বিরোধ থাকলেও, সকলে একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে প্রায় ১,২৫,০০০ বছর আগে মানুষ আগুনের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। কেউ কেউ বলেন ৪,০০,০০০ বছর আগে। যাঁরা এই আগুনের ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন আমাদের এই বর্তমান মানব প্রজাতির পূর্বপুরুষ। আমাদের এই মানব প্রজাতিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হোমো-স্যাপিয়েনস (Homo-Sapiens), আর যাঁরা এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন হোমো-ইরেক্টাস  (Homo-erectus)ইরেক্ট কথার মানে খাড়া বা ঋজু, মানবজাতির যে গোষ্ঠী প্রথম দুইপায়ে সোজা দাঁড়িয়ে চলাফেরা থেকে শুরু করে সব কাজ করতে পারত তাদের হোমো ইরেক্টাস বলা হত। এই প্রজাতির মানবগোষ্ঠী বহু বছর আগেই এই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জার্মানির ল্যান্ডিস মিউজিয়মের বিজ্ঞানীরা হোমো-ইরেক্টাসদের চেহারা কেমন হতে পারে, তার একটি ছবি বানিয়েছেন। নিচের ছবিতে দেখে নিতে পারো, আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের চেহারা।

আজ আমাদের রোজকার জীবনে আগুনের ব্যবহার এমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে, আগুন যে আমাদের কতো বড়ো বন্ধু, সে কথা আমরা ভাবিই না। আগুন থেকে কোন বিপদ বা দুর্ঘটনা হলেই, আমরা যেন টের পাই তার ভয়ংকর ক্ষমতার কথা। এই আগুনের ব্যবহার কেন মানবসভ্যতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ, সেইকথাই এখন তোমাদের বলব। 

বদলে দিল মানুষের স্বভাবঃ

দেড়-দু লাখ বছর আগে মানুষেরা বেঁচে থাকত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কিন্তু প্রকৃতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। শীত-গ্রীষ্মের প্রকোপ, ঝড়ঝঞ্ঝা, আলো-অন্ধকার, নানান কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে প্রবল বন্যপ্রাণীদের আক্রমণ সমস্ত দিক দিয়েই প্রবল প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই চলত, সেই মানবজাতির জীবনযাত্রা। আগুন এনে দিল উত্তাপ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আলো। আগুন এবং তার ধোঁয়াকে অধিকাংশ প্রাণী এবং কীটপতঙ্গই ভয় করে, গুহার মুখে কিংবা চারদিকে আগুনের বলয় জ্বেলে রাখলে সারা রাত তাদের উৎপাত থেকে নিশ্চিন্তে ঘুমোন যায়। প্রচণ্ড শীতের রাতে আগুনের উত্তাপ মানুষকে নিরাপদ স্বস্তি দিল। দিন-রাত এবং শীত-গ্রীষ্মের পরিবেশে, আবহাওয়ায় যে তাপের (Ambient temperature) তারতম্য ঘটে, তার সঙ্গে শরীরের উত্তাপের (Body temperature) সামঞ্জস্য রাখার জন্যেই স্তন্যপায়ী প্রাণিদের শরীরে লোমের বাহুল্য। আগুনের ব্যবহার মানুষের শরীরের সেই তাপমাত্রার ওঠাপড়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করল, তার ফলে মানুষের শরীরে লোমের পরিমাণও কমতে লাগলকোন কোন বিজ্ঞানীরা বলেন, যে সব মানবগোষ্ঠী গোরিলা বা শিম্পাঞ্জীদের মতো গাছের ওপর বাস করত, আগুনের ব্যবহার শিখে তারা মাটিতে ডালপালা দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকা শুরু করেছিল। এই সব পরিবর্তন দু এক বছরে হয়েছিল, তা নয়, কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে হোমো ইরেক্টাসরা আজকের হোমোস্যাপিয়েন হবার দিকে এগোতে লাগল।  

বদলে দিল খাদ্যঃ

সেই যুগে মানুষের খাদ্য ছিল জঙ্গলের কাঁচা ফল, মূল, শিকড় আর শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস। কয়েকটা মাত্র ফল ছাড়া কাঁচা শাকসব্জি মূল, কন্দের সেলুলোজ ও স্টার্চ আমাদের হজম হয় না। আগুনে সেদ্ধ হয়ে, সেই সব সব্জি খেতেও যেমন সুবিধে হল, হজম হয়ে শরীরে সহজ পুষ্টিও সরবরাহ করতে লাগল। আগে যে সব কন্দ, বা শস্য দানা খাওয়ার কথা মানুষ ভাবতেই পারত না, সেই রকম অজস্র খাদ্য ঢুকে পড়ল তার খাদ্য তালিকায়। তার মধ্যে রয়েছে চাল, গম, যব, ভুট্টা, নানান ডাল – যা আজও সারা বিশ্বের মানব জাতির প্রধান খাদ্য। শস্যের খাদ্য রহস্য বুঝে ফেলার পর মানুষ ধীরে ধীরে শিখে ফেলতে লাগল চাষবাস রান্না করা শস্যদানা, সব্জি, মাংস সহজে হজম হওয়ার জন্য, অনেক কম পরিমাণ খাদ্য থেকেও শরীরে অনেক বেশি পুষ্টির যোগান হতে লাগল। বিজ্ঞানীরা বলেন, শুধুমাত্র কাঁচা শাকসব্জি খেয়ে, শরীরকে তাজা আর কর্মক্ষম রাখতে হলে, মানুষকে দিনে অন্ততঃ সাড়ে ন ঘন্টা খেতে হত। শীতকালে চিড়িয়াখানায় গেলে দেখবে, জলহস্তী, গণ্ডার, হাতি, জিরাফ এই সব প্রাণীরা সারাদিনই মুখ নাড়িয়ে খেয়ে চলেছে।

 তীক্ষ্ণ হতে থাকল মগজাস্ত্রঃ

আগুনের ব্যবহার শিখে রান্না করা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্র অনেক হাল্কা হতে লাগল; সেদ্ধ খাবার চিবোনো অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায়, চোয়ালের পেশী এবং দাঁতের গঠন বদলে গিয়ে, মানুষের মুখ ও মাথার গঠনও বদলাতে লাগল। খাবার সময় কমে গিয়ে এবং খাবারের বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে, শুধু খাওয়া, ঘুম আর বেঁচে থাকার চিন্তা ছাড়াও মানুষের হাতে অনেকটা সময় বেঁচে রইল। সেই সময়টা ব্যবহার হতে লাগল নানান চিন্তা ভাবনায়, অতএব বেড়ে গেল মস্তিষ্কের ব্যবহার। সেই চিন্তাভাবনা যত সুসংহত হল, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ হতে লাগল দ্রুত। আগে শুধু কাঁচা খাদ্য খেতে এবং হজম করতে যে পরিমাণ পুষ্টি-শক্তি ক্ষয় হত, এখন সেই উদ্বৃত্ত পুষ্টি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে চলল। অভিনব চিন্তা ভাবনা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আরো উন্নতির দিকে; আরো সুস্থ, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে।      

নীচের প্রথম ছবিটি হোমো হ্যাবিলিস যারা পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করতে শিখেছিল, দ্বিতীয় হোমো ইরেক্টাস যারা আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, আর তৃতীয়টি আমাদের অত্যন্ত নিকট আত্মীয় হোমো স্যাপিয়েন্স। এদের নাক, মুখ, চোয়াল, ভুরু এবং মাথার গঠনের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো নয় কী?     

   

    হোমো হ্যাবিলিস              হোমো ইরেক্টাস        প্রথম যুগের হোমো স্যাপিয়েন্স।

(পরের সংখ্যায় দ্বিতীয় পর্ব)


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ত...