ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৯"]
৫.৬.২ শক্তি, শাক্ত ও তন্ত্রধর্ম
৫.৬.২.১ শক্তির দেবী
শৈব ধর্মের আরেকটি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী শাখা হল শাক্ত। শাক্ত ধর্মের
মূলকথা শক্তি – যে আদ্যাশক্তির কথা শৈবধর্মে বলা হয়েছে, সেই শক্তিই এখানে প্রধানা দেবী
এবং তাঁর ভক্তরা শক্তির উপাসক। শাক্তদের উপাস্য দেবী প্রধানতঃ দশজন, তাঁদের একত্রে
দশমহাবিদ্যা বলা হয়ে থাকে। এই দশমহাবিদ্যা হলেন, কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এই
দেবীরা সকলেই শিবজায়া সতী ও পার্বতীর বিভিন্ন রূপ। প্রসঙ্গতঃ পৌরাণিক মতে সতী ও
পার্বতীও একই দেবী, দক্ষের
যজ্ঞে দেহত্যাগ করার পর সতীদেবীই পরজন্মে পার্বতী হয়েছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। এই
দশমহাবিদ্যার উৎপত্তি নিয়ে বহু পুরাণে বহু কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে, তার মধ্যে যে কাহিনী সব
থেকে প্রচলিত,
সেটি এরকম,-
নিমন্ত্রণ ছাড়াই সতীদেবী পিতা দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায়, মহাদেব তাঁকে যখন বারবার
নিষেধ করেছিলেন,
তখন ভীষণ
রেগে গিয়ে সতীদেবী স্বামীকে তাঁর এই দশরূপ দেখিয়েছিলেন।
কালী - এলোকেশী, ঘন মেঘের মতো কালো গায়ের রং, ত্রিনয়না, বড়বড় দাঁত ও লোলজিহ্বা। গলায়
মুণ্ডমালা,
তার থেকে
রক্ত ঝরছে,
তিনি
দাঁড়িয়ে আছেন শবের বুকে। তিনি চতুর্ভুজা, তাঁর বাঁহাতের একটিতে তীক্ষ্ণ খড়গ, অন্যটিতে কাটা মুণ্ড। দুই ডানহাতে
বরাভয় মুদ্রা। ইনি কৈবল্যদায়িনী– সংসারে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি দেন।
তারা - তাঁর গায়ের রং নীল, লোলজিহ্বা, ত্রিনয়না, করালবদনা, মাথার জটাতে খেলে বেড়াচ্ছে সাপ। কপালে পাঁচটি অর্ধচন্দ্রের
ভূষণ, পরনে বাঘছাল। তিনি শিবের
বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চারহাতে নীলপদ্ম, খড়গ, কাতি[1] ও নরখুলি। ইনি বিপদ-আপদ, ভূত-প্রেত থেকে সকলকে
ত্রাণ বা তারণ করেন, তাই
তারা।
ষোড়শী (রাজরাজেশ্বরী) - তাঁর গায়ের রং লাল, ত্রিনয়না, কপালে চন্দ্রভূষণ, তাঁর চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ, তীর ও ধনুক, তিনি বসে আছেন যে মঞ্চে
সেই মঞ্চ ধারণ করে আছেন, পাঁচ দেবতা - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ঈশ্বর, মহেশ ও রুদ্র। ইনি
ত্রিগুণাতীতা–অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের ঊর্ধে অবস্থিতা।
ভুবনেশ্বরী - এই রূপে তিনি পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ ও বরাভয় মুদ্রা।
ইনি এই বিশ্ব ভুবনকে পালন করেন।
ভৈরবী - ইনিও পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, ত্রিনয়না, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, গলায় মুণ্ডমালা, চার হাতে অক্ষমালা[2], পুঁথি ও বরাভয় মুদ্রা। ইনি ভৈরবের
ভার্যা - সকল দুঃখ নাশ করেন।
ছিন্নমস্তা - প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর বিপরীত রতিক্রিয়ায় মগ্ন মিথুনের
উপর তিনি দণ্ডায়মানা, তিনি
দ্বিভুজা,
দিগম্বরী, উপবীতের মতো তাঁর কাঁধে
মুণ্ডমালা এবং সাপ। একহাতের খড়্গ দিয়ে তিনি নিজের মুণ্ড কেটে ফেললেন, অন্য হাতে ধরলেন, নিজেরই কাটা মুণ্ড। কণ্ঠ
থেকে উৎসারিত হল তিনটি রক্তধারা। দুই পাশের রক্তধারা পান করতে লাগল তাঁর দুপাশে
দাঁড়িয়ে থাকা দুই ডাকিনী সহচরী এবং মধ্যের রক্তধারাটি পান করলেন হাতে ধরে থাকা
নিজের কাটা মুণ্ডটির মুখ দিয়ে। ইনি ত্রিশক্তিরূপিণী, মোহনাশিনী ও মোক্ষদায়িনী।
ধূমাবতী - ধূমাবতী অতি বৃদ্ধা বিধবা, তাঁর গায়ের রং ধূসর ধোঁয়ার মতো, তাঁর দুই স্তন বাতাসে
দুলছে, তিনি শীর্ণা, ক্ষুধায় আকুল, তাঁর একহাতে একটি কুলা, অন্য হাত কাঁপছে থরথর
করে। ইনি ধূম্রাসুরকে বধ করেছিলেন। ইনি চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ দান করেন।
বগলা – রত্নময় গৃহে, রত্নময় সিংহাসনে তিনি বসে আছেন, তিনি পীতবর্ণা, পীতবসনা, সালংকারা, তাঁর ত্রিনয়নে চন্দ্র, সূর্য এবং অগ্নি, কপালে চন্দ্রকলা, একহাতে তিনি এক অসুরের
জিভ টেনে ধরে আছেন, অন্য
হাতে মুগুর। ইনি স্বয়ং চৈতন্যরূপিণী
মাতঙ্গী – রক্তপদ্মাসনা, শ্যামবর্ণা, রক্তবসনা, চতুর্ভুজা – খড়্গ, চর্ম, পাশ, অঙ্কুশধারী, ত্রিনয়না, কপালে অর্ধচন্দ্র। ইনি
মতঙ্গ অসুরকে বধ করেছিলেন, সকল বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।
কমলা (মহালক্ষ্মী)– সুবর্ণ বর্ণা, কমলাসনা, চার হাতের দুই হাতে পদ্ম, দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা, দুই পাশে দুই-দুই হাতি
তাদের চারটি করে দাঁত। দুই হাতি সোনার ঘট থেকে রত্ন এবং অন্য দুই হাতি সোনার কলস
থেকে অমৃত ঢেলে দেবীকে অভিষিক্তা করছে।
দেবাদিদেব মহাদেব মনে করলেন, এঁরা কেউই তাঁর নরম-সরম পত্নী সতীদেবী নয়, অন্য কেউ। তিনি আতঙ্ক ও
ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা
কে? আমার সতী কোথায় গেল?” উত্তরে কালীরূপী সতীদেবী
বললেন, “তুমি তো সবই জান, এখন কেন ভুলে গেলে? চিন্তা করে দেখ আমিই পরমা
প্রকৃতি। সৃষ্টির আদিতে তুমি, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা যখন কারণ জলে ছিলে, আমিই তোমাদের তিনজনকে
প্রসব করেছিলাম। তোমরা তিনজনেই তখন সৃষ্টির জন্যে তপস্যা করছিলে, এমন সময় আমি শব হয়ে জলে
ভেসে সেখানে উপস্থিত হলাম। শবের পূতি গন্ধে বিষ্ণু উঠে গেলেন, ব্রহ্মা মুখ ফিরিয়ে
চতুর্মুখ হলেন। একমাত্র তুমিই ঘৃণা না করে, আমাকে আসন করলে এবং আমি প্রকৃতি
রূপে তোমার পুরুষ রূপের ভজনা করলাম। সেই তুমি, সেই আমি – এবার মনে পড়েছে?” এই কথা শুনে মহাদেবের সব
মনে পড়ে গেল,
সেই শবসাধনা, সেই তন্ত্রমন্ত্র।
সতীদেবীই যে সেই মহামায়া সে কথা মনে করে, তিনি সতীদেবীকে দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য
হলেন।
প্রসঙ্গতঃ এখানে সৃষ্টি তত্ত্বের শাক্তমতের কাহিনীটিও জানা গেল।
৫.৬.২.২ মহাভারতে শক্তিপূজা
মহাভারতে শক্তি দেবীদের পূজার বহু উল্লেখ আছে। সবগুলির আলোচনায় না গিয়ে, খুব তাৎপর্যপূর্ণ
একটিমাত্র ঘটনার উল্লেখ এখানে করতে চাই। পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী বারো বছর বনবাসের পর, এক বছর অজ্ঞাতবাসের জন্যে
বিরাটরাজ্যে আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু মানসিক উদ্বেগের শেষ নেই, অজ্ঞাতবাসের সময়
দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষ যদি তাঁদের অবস্থান জেনে ফেলে, তাহলে আবার তের বছরের জন্যে
দুর্ভোগ চলবে।
উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠির ভগবতী দুর্গার কৃপা প্রার্থনার জন্যে, তাঁর স্তব শুরু করলেন, “হে যশোদাকন্যা, নারায়ণপ্রিয়া, কংসের ধ্বংসকারিণি, অসুরবিনাশিনি, ভগবতি, বরদায়িণি, আপনাকে নমস্কার। আপনি ব্রহ্মচর্য্যস্বরূপা, বাসুদেবের ভগিনী।
দুর্ধর্ষ কংস আপনাকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, শিলাতলে আছাড় মারতে গেলে, আপনি তার হাত থেকে
অনায়াসে নিজেকে মুক্ত ক’রে, আকাশে অদৃশ্য হয়েছিলেন। হে ভুবনেশ্বরি, আপনি দিব্য বস্ত্র ও
মালায় সুসজ্জিতা। আপনার হাতে তীক্ষ্ণ খড়্গ ও ঢাল শোভা পাচ্ছে। হে ত্রৈলোক্যতারিণি, যাঁরা পাপের ভার ক্ষালনের
জন্যে আপনাকে একান্ত ভাবে স্মরণ করেন, আপনি তাঁদের দুস্তর পাপের পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে থাকেন”।
তারপর রাজা যুধিষ্ঠির, সকল ভাই ও স্ত্রী দ্রৌপদী মিলে দেবীকে দর্শনের ইচ্ছায় আরো
অনেকরকম স্তব করতে লাগলেন, “হে নবোদিত সূর্যের মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল দেবি, আপনার চার হাত, চার মুখ, আপনি ময়ুরপুচ্ছ বলয়ধারিণী, পীনস্তনী, গুরুনিতম্বিনী, কেয়ুরধারিণী দেবী। আপনি
লক্ষ্মীর মতো শোভা লাভ করে থাকেন। আপনার মুখমণ্ডলের আভায় চাঁদের জ্যোৎস্নাও লজ্জিত
হয়। আপনার দুই কান, সোনার
কুণ্ডলে অলংকৃত। বিচিত্র আপনার মাথার মুকুট এবং অত্যন্ত রমণীয় আপনার কেশবন্ধন। হে
বিবিধ অস্ত্রধারিণি, আপনার
বিপুল বাহুসমূহ শক্রধ্বজার মতো। আপনার কটিতটে
ভুজঙ্গের অলঙ্কারে, আপনি মহানাগ বেষ্টিত মন্দর গিরির মতো রূপ ধারণ করেছেন।
ময়ুরের পাখায় সাজানো আপনার ধ্বজদণ্ডের কী অপূর্ব শোভা হয়েছে। হে ত্রিদশেশ্বরি, আপনি কৌমার ব্রতে সুরলোক পবিত্র
করেছিলেন,
সেই কারণে
ত্রিদশগণ সর্বদা আপনার স্তব ও পূজা করেন। আপনি ত্রিলোককে রক্ষা করার জন্য মহাসুর
মহিষাসুরকেও সংহার করেছিলেন। আপনি জয়া, বিজয়া, বরদা এবং আপনি সংগ্রামে
বিজয় দান করেন,
অতএব আমাদের
প্রতি এখন প্রসন্ন হোন, কৃপা করে আমাদের বিজয় দান করুন। হে মদ্য ও পশুমাংসপ্রিয়ে[3], কামচারিণি, নগেন্দ্র বিন্ধ্যাচল
আপনার শাশ্বত বাসস্থান, প্রলয়কালে নিখিল জীব ও জড় আপনাতেই লীন হয়। হে কালি, হে মহাকালি, যাঁরা প্রভাতে আপনাকে
স্মরণ ও প্রণাম করেন, তাঁদের
সকল দুঃখের ভারমুক্তি ঘটে এবং প্রভূত ধন-পুত্র লাভ সুলভ হয়। হে দুর্গে, আপনি বিপদের দুর্গ থেকে
লোককে উদ্ধার করেন বলেই আপনার নাম দুর্গা। গহন অরণ্যে অবসন্ন, সাগরজলে নিমগ্ন ও দস্যু
কবলে আক্রান্ত জনের আপনিই একমাত্র গতি। হে দেবি, জলপোতে, নির্জন প্রান্তরে কিংবা গভীর
অরণ্যে বিপন্ন হয়ে, আপনাকে
ভক্তিভরে স্মরণ করলেই, আর
বিপদের ভয় থাকে না, বিপদ
থেকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার পাওয়া যায়। হে সুরেশ্বরি, আপনি কীর্তি, লক্ষ্মী, ধৃতি, সিদ্ধি, লজ্জা, বিদ্যা, সন্ততি, বুদ্ধি, সন্ধ্যা, রাত্রি, প্রভা, নিদ্রা, জ্যোৎস্না, কান্তি, ক্ষমা ও দয়া। আপনার পূজা
করলে মানুষের বন্ধন, মোহ, পুত্রনাশ, ধনক্ষয়, ব্যাধি, মৃত্যুভয় কিছুই থাকে না।
হে ভক্তবৎসলে,
শরণাগতপালিকে, দুর্গে, আমি রাজ্যভ্রষ্ট হয়েছি।
এখন আপনার শরণাপন্ন হয়েছি, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি আমাদের সকলকে রক্ষা করুন”
রাজা যুধিষ্ঠিরের এই স্তবে দেবী প্রসন্না হলেন, তাঁদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে বললেন, “হে রাজা, আমার প্রসাদে তোমাদের
অচিরকালের মধ্যেই বিজয় লাভ হবে। তুমি ও তোমার ভ্রাতৃগণ নিখিল কৌরবদের পরাজিত করে, নিষ্কণ্টকে রাজ্য ভোগ
করবে, সুখে এবং শান্তিতে জীবন
অতিবাহিত করবে। হে ধর্মরাজ, যে সকল নিষ্পাপ লোকেরা আমার নামসঙ্কীর্তন করে, আমি তাদের প্রতি প্রসন্ন
হই এবং আমি তাদের রাজ্য, আয়ু, সম্পদ, সুন্দর স্বাস্থ্য ও সন্তান প্রদান করি। প্রবাসে, নগরে, যুদ্ধে, সংগ্রামে, অরণ্যে, দুর্গম পাহাড়ে ও সাগরের
যে কোন দুর্গম স্থানে বিপন্ন হলেই, যারা আমাকে স্মরণ করে, তাদের আর কিছুই দুর্লভ থাকে
না। তোমার এই স্তব ও স্তোত্র শুনলে অথবা
পাঠ করলে তাদের সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন হয়, সকল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। হে পাণ্ডবগণ, আমি প্রসন্ন হয়েই বলছি, তোমরা এই বিরাটনগরে বাস
করলে, এখানকার লোকেরা এবং
কৌরবরাও,
কেউ তোমাদের
সঠিক পরিচয় জানতে পারবে না”। (বিরাট/ ৬)। যুধিষ্ঠিরকে এই কথা বলে, দেবী পাণ্ডবদের আশীর্বাদ
করলেন এবং সেখানেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
রাজা যুধিষ্ঠিরের এই দুর্গা স্তবের কাহিনী, মহাভারতে যুক্ত হয়েছে হয়তো
খ্রিস্টিয় তৃতীয় চতুর্থ শতাব্দীতে। মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি সময় মহর্ষি
ব্যাসদেব রচিত মূল মহাভারতে এই কাহিনী নিশ্চয়ই ছিল না। কারণ আগেই বলেছি মহাভারতে
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে কংস বধ (অর্থাৎ বৃন্দাবন থেকে মথুরা) কাহিনীর কোন
উল্লেখ আমরা পাই না। তাহলে রাজা যুধিষ্ঠির কী করে জানলেন, তিনি যশোদা কন্যা, এবং কংস তাঁকে পাথরে আছাড়
মারতে গিয়েছিলেন? উপরন্তু
আমরা আগেই দেখেছি, কুরুক্ষেত্র
যুদ্ধের বা মহাভারত রচনার কাল থেকে প্রায় পনেরশ (!) বছর বাদে দেবর্ষি নারদের
বকাবকিতে,
মহর্ষি
ব্যাসদেব ভাগবত ও অন্যান্য বহু পুরাণ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন (অধ্যায় ৫.৩.৩)।
অতএব মহাভারতে ভগবতী দুর্গা যখন রাজা যুধিষ্ঠিরের স্তবে আবির্ভূতা হয়েছেন, ততদিনে ভারতবর্ষে হিন্দু
ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অতএব এই কাহিনীটি প্রক্ষিপ্ত, কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে হংস-বিহারী
মহাভারতে রূপান্তরিত করার বহু প্রয়াসের মধ্যে এটি একটি।
[1] কাতি
– শাঁখ কাটার দুমুখো করাত, এখানে নিশ্চয়ই দুমুখী ধারাল কোন অস্ত্র।
[2] অক্ষমালা
–জপমালা,
জপসংখ্যা
গোনার জন্যে সাধারণতঃ রুদ্রাক্ষ, কমলাক্ষ ফল অথবা তুলসীকাঠ থেকে বানানো হত। কাচ, স্ফটিক বা সোনার গুটিকা
বা পুঁতি দিয়েও জপমালা বানানোর প্রচলন আছে।
[3] কী কাণ্ড, মহাভারত বলছে মদ্য ও পশুমাংস দেবী দুর্গার প্রিয় খাদ্য – কিন্তু আধুনিক ভারত তা মানবে কেন?
চলবে...