সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৪

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৩ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৪

৫.১.৬ বেদান্ত দর্শন

মধ্য যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সব থেকে প্রচলিত এবং আলোচিত দর্শন বেদান্ত। বেদান্তের একমাত্র ভাবনা ব্রহ্ম। ব্রহ্মের ধারণা এবং ব্রহ্ম-উপলব্ধির দর্শনই বেদান্ত। বেদান্ত দর্শন সম্পূর্ণ বেদ-নির্ভর এবং এর নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি বেদের অন্ত বা শেষ অর্থাৎ উপনিষদকে মূলতঃ অনুসরণ করেছে। যদিও বেদান্ত উপনিষদ ছাড়াও ব্রহ্মসূত্র এবং গীতার তত্ত্বের উপরও নির্ভরশীল।  

যাঁর থেকে জগতের উৎপত্তি এবং যাঁর জন্যে জগতের স্থিতি ও লয় হয়, তিনিই ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সত্য-স্বরূপ, জ্ঞান-স্বরূপ ও অনন্ত-স্বরূপ। তিনি অদ্বিতীয় অর্থাৎ তিনি ছাড়া অন্য কোন বিষয় থাকতে পারে না। তিনিই সত্য, বাকি আর সব অসত্য। কিন্তু তিনি সৎ[1]-স্বরূপ রয়েছেন বলেই জগতের অস্তিত্ব রয়েছে এমন ধারণাও একরকমের ভ্রম। সে কথায় পরে আসছি।

মাটি দিয়ে যে ঘট বানানো হয়, তাতে মাটি হল উপাদান-কারণ এবং যিনি ওই ঘট বানিয়েছেন, অর্থাৎ কুম্ভকার নিমিত্ত-কারণ। সৃষ্টির আদিতে অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমেশ্বরই ছিলেন, আর কিছুই ছিল না। সেক্ষেত্রে তাঁকেই জগতের নিমিত্ত এবং উপাদান-কারণ বলতে হয়। মাটি যেমন পরিণত এবং পরিমার্জিত হয়ে ঘট হয়ে ওঠে, তিনি কিন্তু নিজে পরিণত অথবা বিকৃত হয়ে এই জগতের সৃষ্টি করেননি। কারণ তিনি নির্বিকার এবং অব্যয়, কারণ তিনি নিত্য অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই তাঁর পরিবর্তন সম্ভব নয়।

অতএব মাটি যেমন ঘটের পরিণাম-উপাদান, সেরকম ব্রহ্ম এই জগতের পরিণাম-উপাদান হতে পারেন না। যদিচ আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়। এই বিষয়ে এই দর্শনে একটি অতি প্রচলিত উদাহরণ ব্যবহার করা হয়, অন্ধকারে দেখলে রজ্জু অর্থাৎ দড়িকে সাপ বলে মনে হয়। কিন্তু আলোতে দেখলে রজ্জু, রজ্জুই থাকে। অর্থাৎ “রজ্জুতে সর্পভ্রম”-এর মতোই, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে, ব্রহ্মে জগৎ-ভ্রম হয়ে থাকে। এই ধরনের ভ্রমাত্মক উপাদানের ধারণাকে বেদান্তের ভাষায় বিবর্ত-উপাদান বলে, অতএব ব্রহ্ম জগতের বিবর্ত-উপাদান কারণ।

এই ভ্রমকে দূর করার জন্যে মায়া তত্ত্ব আনা হয়েছে। মায়া পরব্রহ্মের শক্তি-স্বরূপ। তিনি মায়াবচ্ছিন্ন (মায়ার প্রভাবে বিভক্ত) হলেই জগতের উৎপত্তি হয়। কিন্তু তিনি যদি নিত্য এবং মুক্ত হন, তাহলে তিনি বিভক্ত হচ্ছেন কী করে? এই সংশয় দূর করার জন্যে বৈদান্তিকেরা একটি উদাহরণ দিয়েছেন। পাতায় ভরা গাছের নিচে বসে আকাশের দিকে তাকালে, মনে হয় আকাশ যেন ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে আকাশ একটাই থাকে। তেমনি ব্রহ্ম মায়াবচ্ছিন্ন হলেও বাস্তবে অবচ্ছিন্ন হন না। এই একই অনুভবের কথা আমরা ভগবান বুদ্ধের ক্ষেত্রেও শুনেছি, বোধিবৃক্ষের নীচে বসে একটি অশ্বত্থ পাতার আড়ালে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি জীবনের অনাত্মতা ও অনিত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন (অধ্যায় ৩.২.২)। 

বেদান্তের মতে ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার, নির্বিকার, অবাঙ্মনসোগোচর (তাঁকে কথা বা চিন্তা দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না) ও চিন্ময়-স্বরূপ এবং বাস্তবে জীব ও পরব্রহ্মে তেমন কোন পার্থক্য নেই। অজ্ঞান জীবের যখন প্রকৃত জ্ঞানলাভ হয়, তখনই জীবও পরব্রহ্ম হয়ে যায়। জীব ও ব্রহ্মের এই অভেদ-জ্ঞানের সাধনার পথই বেদান্তের দর্শন। বেদান্তের এই পরব্রহ্ম ভাবনা বেদের সংহিতা ও ব্রাহ্মণ অংশে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় উপনিষদে। অতএব বেদান্ত দর্শনের প্রধান প্রমাণ উপনিষদ। উপনিষদের কয়েকটি বাক্যকে বেদান্ত “মহাবাক্য” বলে উল্লেখ করে থাকে। যেমন “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” – এই আত্মাই ব্রহ্ম, “অহং ব্রহ্মাস্মি – আমিই ব্রহ্ম, “তত্ত্বমসি” – তুমি সেই ব্রহ্ম। এই জ্ঞান অর্জন করার জন্য শম, দম, উপরতি, তিতিক্ষা ও সমাধির অভ্যাস করতে হয়। সমাধির পর, “আমিই ব্রহ্ম” এই উপলব্ধি হয় এবং চৈতন্য-স্বরূপ জীব-আত্মা পরমাত্মায় লীন হয়ে যায়। একেই “নির্বাণ, মুক্তি বা মোক্ষ” বলে।

বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞানের জন্যে চারটি সাধনপথের কথা বলা হয়েছে, তাকে একত্রে সাধন চতুষ্টয় বলে, যেমন,

১. নিত্যানিত্য-বস্তু বিবেক – অর্থাৎ ব্রহ্মই নিত্য এবং অন্য সমুদয় বস্তু অনিত্য এই বিচার।

২. ইহামুত্র (ইহলোকে এবং পরলোকে) ফল-ভোগ-বিরাগ[2][4] অর্থাৎ ঐহিক ও পারলৌকিক সুখ-ভোগ-বিরাগ।

৩. শম-দমাদি সাধন-সম্পত্তি অর্থাৎ শম, দম, উপরতি (নিবৃত্তি), তিতিক্ষা (ধৈর্য), সমাধান অর্থাৎ ঈশ্বর-বিষয়ক শ্রবণাদিতে একাগ্রচিত্ততা এবং শ্রদ্ধা অর্থাৎ গুরুর উপদেশে ও বেদান্ত শাস্ত্রে অখণ্ড বিশ্বাস। শম অর্থাৎ মনকে শান্ত করা। সকল ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা, অর্থাৎ দম বা দমন করা। সকল সকাম অর্থাৎ ফলের আশায় করা কর্ম থেকে নিবৃত্ত হওয়াই উপরতি। শীত-গ্রীষ্ম এবং যাবতীয় দুঃখ-শোক সহ্য করে ধৈর্য রাখাই তিতিক্ষা।  আর আলস্য ও মনের ভ্রান্তি দূর করে একাগ্র ও নিবিষ্ট মনে পরব্রহ্মের চিন্তনই সমাধান – অর্থাৎ সমাধি। 

৪. মোক্ষাভিলাষ অর্থাৎ মোক্ষের জন্য তীব্র আকাঙ্খা।

এই রকম জ্ঞানের অভ্যাস যাঁরা করতে পারেন না, তাঁদের জন্যে অন্য ব্যবস্থাও আছে। তাঁরা প্রথমে প্রণব অর্থাৎ ওঁ-কার অবলম্বন করে পরমাত্মার উপাসনা করবেন। মাণ্ডুক্য-উপনিষদে এই উপাসনার সবিস্তার বর্ণনা দেওয়া আছে। এই উপাসনার তাৎপর্য হল, জাগ্রৎ, স্বপন, সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার অধিষ্ঠাতা ও সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ অদ্বিতীয়-স্বরূপ পরমাত্মাই প্রণবের প্রতিপাদ্য। অতএব যাঁরা ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু কিন্তু দুর্বল অধিকারী তাঁদের পক্ষে ওঁ-কার মন্ত্রের উপাসনা করাই অবশ্য কর্তব্য। ওই উপনিষদে বলা হয়েছে, প্রণব ধনুকের মতো, আর জীবাত্মা যেন তির, প্রণব উপাসনা-রূপ ধনুক থেকে জীবাত্মার তির ছুঁড়ে পরমব্রহ্ম-রূপ লক্ষ্য ভেদ করতে হবে। তির যেমন লক্ষ্যে বিদ্ধ হয়ে থাকে, জীবাত্মাও সেরকম পরমাত্মায় অধিষ্ঠিত হয়ে যায়।

বেদান্ত শাস্ত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী, যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠান না করলেও ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসু ব্যক্তির ব্রহ্ম-সাধনায় পূর্ণ অধিকার ছিল। নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রমের ধর্মাচরণ করলে ভাল, কিন্তু না করলেও তত্ত্বজ্ঞানের ইচ্ছা হলে, যে কোন ব্যক্তি এই সাধনা করতে পারেন।

সাংখ্য, বৈশেষিক এবং ন্যায় দার্শনিকদের মনে এমন সংশয় আসে, যে ঈশ্বরই যদি সকল জীব ও মানুষের সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে মানুষের এমন বিভিন্ন অবস্থা হয় কেন? কেউ দুঃখী, কেউ সুখী, কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র, কেউ চিররুগ্ন, কেউ বা স্বাস্থ্যবান। ঈশ্বর কি তবে সমদর্শী নন, তিনি কি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট? এই সংশয় দূর করে বেদান্ত বলেছেন, ঈশ্বর নির্বিকার এবং সমদর্শী। জীব বা মানুষের অবস্থার ভেদ হয় তার নিজেরই কর্ম দোষে। পূর্ব জন্মে যে যেমন কাজ করে, পরের জন্মে সে তেমনই ফল ভোগ করে থাকে। এই প্রসঙ্গে তাঁরা ঈশ্বরকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁরা বলেন, মেঘ বৃষ্টি হয়ে নেমে ক্ষেত্রকে সরস করে, তার থেকে বিভিন্ন শস্য - যব, ধান, গম ইত্যাদি পুষ্ট হয়। এক্ষেত্রে মেঘ একই হলেও, যব, গম বা ধানের চরিত্র এক নয়, সেই কারণে তাদের পুষ্টি ভিন্ন, তাদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তেমনই ঈশ্বর দেবতা, মানুষ ও অন্যান্য জীব সৃষ্টির সাধারণ কারণ, কিন্তু তাদের অবস্থা ভেদের জন্য তিনি দায়ী নন। দেবতা যে দেবতা হয়েছেন, কিংবা মানুষ যে মানুষ হয়েছে, সে সবই তাদের পূবর্জন্মের কর্মফলে। এই কারণ অসাধারণ কারণ, এর জন্যে সম্পূর্ণতঃ দায়ী দেবতা, মানুষ বা পশুরা।

এই মত অগ্রাহ্য না করে, সাংখ্য দার্শনিকেরা প্রশ্ন করতে পারেন, ঈশ্বর যখন প্রথম জীব সৃষ্টি করেছিলেন, তখন তো কোন জীবের পূর্বজন্ম-কৃত কর্মফলের গুণ বা দোষ থাকতে পারে না, তাহলে দেব, মানুষ এবং পশুদের বিভেদ হল কেন? এই সংশয়ের উত্তরে বৈদান্তিকেরা বলেন, ঈশ্বর যেমন অনাদি, তাঁর সৃষ্টিও অনাদি। ঈশ্বর অনাদি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি অনাদি হয় কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ঈশোপনিষদের শান্তি পাঠে – “ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।। / ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ”।

(সন্ধি ভাঙলে – ওঁ পূর্ণম্‌ অদঃ পূর্ণম্‌ ইদম্‌ পূর্ণাৎ পূর্ণম্‌ উচ্যতে। / পূর্ণস্য পূর্ণম্‌ আদায় পূর্ণম্‌ এব অবশিষ্যতে।। /ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।)

অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডে নিরাকার রূপে যিনি পূর্ণ, এই জগতে সাকার রূপেও তিনি পূর্ণ, পূর্ণ থেকেই পূর্ণের সৃষ্টি, পূর্ণ থেকে পূর্ণ গ্রহণ করলেও, পূর্ণই অবশিষ্ট থাকেন। হে পরমাত্মন, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক। অর্থাৎ ব্রহ্ম এই জগতের ঊর্ধে, আবার এই জগতের সর্বত্রই তিনি ব্যাপ্ত। এই জগতের সৃষ্টি কিংবা বিনাশে তিনি কোনভাবেই প্রভাবিত হন না। [বাংলা অনুবাদ-লেখক।]

এই পূর্ণতার সংজ্ঞা যদি অসীম (Infinity) ধরা যায়, সেক্ষেত্রে অসীম থেকে অসীম নিলেও, অবশিষ্ট অসীমই থাকেন বৈকি!

 ৫.২.১ বেদান্তে ব্রহ্ম ধারণা

উপনিষদ তথা বেদান্তে পরমপুরুষ ব্রহ্মের স্বরূপ কি, তার আভাস মেলে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ খণ্ডের দুটি শ্লোকে। ব্রহ্ম বিষয়ে এই আলোচনা করছেন ঋষি আরুণি ও তাঁর পুত্র শ্বেতকেতু[3]। 

(পিতা) – “এই লবণ জলে ফেলে প্রাতঃকালে আমার কাছে এস”। শ্বেতকেতু তাই করলেন।

পিতা তাঁকে বললেন, “বৎস, (গত) রাত্রে যে লবণ জলে ফেলেছিলে, সেটি নিয়ে এস”। তিনি (শ্বেতকেতু) লবণের অনুসন্ধান করেও পেলেন না, যদিও সেটি জলেই বিলীন হয়ে বিদ্যমান ছিল।

(পিতা) – “বৎস, এই জলের উপরিভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?”। “লবণাক্ত”।

“মধ্যভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?” “লবণাক্ত”।

“অধোভাগ থেকে আচমন কর; কেমন বোধ হচ্ছে?” “লবণাক্ত”।

“এই জল ফেলে দিয়ে আমার কাছে এসে বস”। শ্বেতকেতু তখন তাই করলেন, (এবং) “ওই লবণ সর্বদাই বিদ্যমান ছিল”, (এই কথা বলতে বলতে ফিরে এলেন)।

পিতা তাঁকে বললেন, “এই জলের মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও যেমন তুমি লবণকে দেখেতে পেলে না, তেমনি হে সৌম্য, এই দেহমধ্যেই সৎ (ব্রহ্ম) বিদ্যমান আছেন”। (ছান্দোগ্য/৬/১৩/১,২) [স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত উপনিষদ্‌ গ্রন্থাবলী – দ্বিতীয় খণ্ড (ছান্দোগ্যপনিষদ্‌) (উদ্বোধন কার্যালয়) থেকে সহজ বাংলায় অনুবাদ - লেখক।]



[1] ভারতীয় দর্শনে সত্য বা সৎ বলতে truth বা honest বোঝায় না, সৎ কথার অর্থ that who exists – অতএব সৎ এবং সত্য বলতে শাশ্বত, চিরন্তন বা চিরস্থায়ী। এবং অসৎ মানে নশ্বর, অস্থায়ী ইত্যাদি।  

[2] ইহামুত্রফলভোগবিরাগঃ” – বেদান্তসার।

[3] এই শ্বেতকেতু ও তাঁর পিতা  আরুণি বা উদ্দালকের কথা আমরা আগেই জেনেছি ২.৫.৩ অধ্যায়ে – এই শ্বেতকেতুই আর্য সমাজে নারীপুরুষের যথেচ্ছ মিলনের অবসান ঘটিয়ে, বিবাহ প্রথার প্রচলন করেছিলেন।  

চলবে...

রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

শ্রীমান

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " সম্মোহন "


তোয়া ছোটকার টেবিলে চা রেখে বলল, “ছোটকা, চা দিয়ে গেলাম, মনে করে খেয়ে নিও কিন্তু, ভুলে যেও না, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে” ছোটকা উত্তর দিল, “হুপ

ছোটকাটা এমনই একটু পাগলাটে ধরনের সর্বদাই পড়াশোনার রাজ্যে ডুবে থাকে যতক্ষণ ঘরে থাকে খালি বই আর বই বই বৈ আর কিছুই জানে না আগে কলেজে পড়াতে যেত, এখন লকডাউন হয়ে, ছোটকার দারুণ মজা, সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে দাদুন আক্ষেপ করে বলেন, কর্কটরাশিতে জন্মেও ছোঁড়াটা এমন মর্কট কী করে হয়ে গেল কে জানে? আর ঠাম্মি দুঃখ করে বলেন, “তোর দাদুর জন্যেই আমার মুকুলটা নষ্ট হয়ে গেল ছোট বেলা থেকে ও বাবার মুখে সারাদিন “পড়তে বস, পড়তে বস” শুনে এসেছে আর কে না জানে অল ওয়ার্ক এন্ড নো প্লে মেকস জ্যাক এ ডাল বয় সেই থেকেই ও ডাল হয়ে গেল, তারপর বিদ্যার ডালে ডালে ঘুরে আর বইয়ের গন্ধমাদন বইতে বইতে হনুমান হয়ে উঠলো তবে দাদুন আর ঠাম্মি যাই বলুন, তোয়া জানে তার ছোটকার মতো লেখাপড়া জানা মানুষ এই মনোহরপুর শহরে আর কেউ নেই পাড়াপড়শিতে, তার স্কুলের দিদিমণিরা সকলেই ছোটকার নাম শুনলে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন বলেন ওঁনার মতো শিক্ষিত সজ্জন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় কই? আর সেই দৌলতে তোয়াও সকলের থেকে একটু বেশিই স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। 

আজকাল লকডাউন বলে তোয়াদের স্কুল হয় ঘরে বসেই অনলাইনে এ যে কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, তোয়ার একটুও পছন্দ হয় না সকাল এগারোটা থেকে ক্লাস শুরু হয় ল্যাপটপে বইখাতা নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসলেই দিদিমণি চলে আসেন কম্পিউটারের পর্দায় রোলকল করেই পড়া চালু এভাবে পড়া করায় কোন মজা আছে বলো? আশেপাশে তার প্রিয় বন্ধুরা কেউ নেই, রাণি, মৌটুসি, পিয়ালি ক্লাস শুরুর আগে একটু গপ্পোসপ্পো, ক্লাস চলাকালীন একটু ফিসফাস কিংবা চোখেচোখে কথা না বললে আবার স্কুলের পড়া হবে কী করে?

তারপর সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল টিফিনের সময় চারবন্ধু মিলে বাড়ি থেকে আনা টিফিন ভাগ করে খাওয়া? ওফ, সে যে কী মজার আলুর দম দিয়ে নুডলস, দইবড়া দিয়ে পরোটা, কিংবা মোমোর সঙ্গে চিঁড়ের  পোলাও এই লকডাউনের সময় তোয়া মাকে একদিন বলেছিল নুডলস দিয়ে চিঁড়ের পোলাও বানাতে মা গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “অমন রান্না আমি কোনদিন শুনিনি কিন্তু এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই কোরোনা থেকে বাঁচতে গেলে এছাড়া অন্য উপায়ও নেই বাবান অফিস যান, সপ্তাহে এক-দুদিন, বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ করেন আর যেদিন যান, মুখে মাস্ক পরা বাবানকে দেখলে মনে হয়, জলদস্যুদের সর্দার কার্ভালো!

আজকে রবিবার তাই তোয়ার অনলাইন ক্লাস নেই ছোটকার ঘরে চা দিয়ে সে ছাদে গেল এই সময় তাদের ছাদে আর আশেপাশের গাছপালায় অনেক পাখপাখালি আসে তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে তোয়ার খুব মজা লাগে

ছাদে গিয়ে তোয়া অবাক, ওমা ছোটকা ছাদে কখন এল? “ছোটকা, তোমাকে এই মাত্র চা দিয়ে এলাম, আর তুমি এরই মধ্যে ছাদে এলে কী করে? এত তাড়াতাড়ি তোমার চা খাওয়া হয়ে গেল? আর আমার আগে কোন দিক দিয়ে ছাদে এসে গেলে”?

আমাকে চা দিয়ে এলি? ধুস তা কী করে হয়? আমি তো সেই কোন সকাল থেকেই ছাদে রয়েছি

কী বলছো? আমি এইমাত্র দেখে এলাম, তুমি চেয়ারে বসে টেবিলে বই পড়ছো তোমার গায়ে সেই মিষ্টি নীল রঙের জামাটা, ও হ্যাঁ, এর মধ্যে তুমি জামাটা পালটে, মেরুন টিশার্টও পরে নিয়েছ”?

তুই শিয়োর আমিই ঘরে ছিলাম, আর আমাকেই চা দিয়েছিস”? ছোটকা একটু যেন ধন্দে পড়েছে

বাঃ রে তোমাকেই তো দিলাম তোমাকে এও বললাম, ছোটকা ভুলে যেওনা, চাটা খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে উত্তরে তুমি বললে হুঁ সব ভুলে গেলে”?

খুবই চিন্তিত মুখে, তোয়ার ছোটকা বললেন, “তবে কী আমি এখানেও আছি, আবার আমার ঘরেও আছি? এটা আমার দ্বৈত সত্ত্বা?”

সেটা আবার কী জিনিষ? ঠাম্মির আমসত্ত্বের মতো কিছু?”

ছোটকা হেসে ফেললেন, “নারে, আমার পুঁচকি মা, আমরা যখন খুব গভীর কিছু চিন্তা করি, তখনও তো আমাদের স্নান-টান, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া সবই করতে হয়! তখন একটা সত্ত্বা চিন্তা করতে থাকে, আর অন্যটা নানান কাজ করে, এই আমি যেমন এখন আমার পুঁচকি মায়ির সঙ্গে গল্প করছিআর একই সঙ্গে হয়তো নীচেয় চেয়ারে বসে তোর চা খেতে খেতে মন দিয়ে বই পড়ছি

তোয়ার ব্যাপারটা ঠিক মনঃপূত হল না, সে একটা ছোটকাকেই বড্ডো ভাল বাসে, তার মধ্যে কোনটা এখন নীচের ঘরে বসে আছে, আর কোনটা রয়েছে ছাদে, এর সমাধান সে করে কী করে? ডবল ছোটকা নিয়ে তার কাজ কী?

এমন সময় নীচের তলা থেকে বেজায় এক গোলমালের শব্দ পাওয়া গেল প্রথমে চায়ের কাপ-প্লেট ভাঙার আওয়াজ, তারপর চেয়ার বা টেবিল উলটে যাওয়ার হুড়মুড় শব্দ, তারপর হুফ হুফ আওয়াজ তারপরেই প্রতিমাদিদির হৈচৈ চিৎকার, “ওরে বাবারে, এ কী অলক্ষুণে কারবার গো, ও বড়োমা, ও বৌদি, শিগগির এসে দেখে যাও ছোড়দা কী করচে”? প্রতিমাদিদি তোয়াদের বাড়িতে কাজ করেন, তিনি ঠাম্মিকে ডাকেন বড়োমা আর তোয়ার মাকে, ডাকেন বৌদি

নিচের গোলমাল শুনে ছোটকা এবং তোয়া দুজনেই দৌড়ে নীচে নামল ছোটকার ঘরের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে, দাদুন, ঠাম্মি, বাবা, মা আর প্রতিমাদিদি, ঘরের মেঝেয় বসে রীতিমতো কান্নাকাটি করছেন, “ও জ্যেঠু, ও বড়োদাদা, ছোড়দার এ কী হল গো?”

দাদু জোর এক ধমক দিলেন প্রতিমা দিদিকে, বললেন, “আঃ, চেঁচাস না, চুপ কর মুকুলের কী হয়েছে”? তোয়ার ছোটকার ডাক নাম মুকুল আর ঘরের ভিতরে বসে থাকার কারণে প্রতিমাদিদি ঘরের বাইরের সকলের পেছনে দাঁড়ানো ছোটকাকে দেখতে পাননি।

দাদুনের বকা খেয়ে প্রতিমা দিদি কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “ঝাঁট দেব বলে আমি ঘরে ঢুকেছিলাম, দেখি ছোড়দা চেয়ারে বসে বই পড়ছে আর টেবিলে রাখা কাপের চাটা ছুঁয়েও দেখেনি তাই আমি বললাম, ও ছোড়দা, চাটা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল গো”?

তারপর?”

তারপর, যেমনি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে গিয়েছে, ওরে বাপরে, ছোড়দার সেকি চেঁচামেচি আর লাফালাফি চেয়ার টেবিল উলটে, চায়ের কাপডিস ভেঙে, মেঝেয় চা ছড়িয়ে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড! আমি তো ভয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ছোড়দার কাণ্ডকারখানা ও বড়ো মা, ও বৌদি, দেখি কী, রাগে ছোড়দার মুখটা পুড়ে একেবারে কালো হয়ে গেছে, তাতে আবার চশমা হাতে পায়ে এত্তো এত্তো লোম, আবার পেছনে এই লম্বা একখান লেজও”!  

প্রতিমাদিদির বর্ণনায় সকলেই স্তম্ভিত কারো মুখে কোন কথা নেই প্রতিমাদিদি আবারও কান্নার সুরে টেনেটেনে বলল, “এবার কী হবে, বড়োমা? ছোড়দা কলেজে পড়াতে গেলে, বদমায়েশ ছেলেরা যে ছোড়দার লেজ নিয়ে টানাটানি করবে ছিছি এমন অবাক কাণ্ড কী করে হল গো, বৌদি”?

তোয়া খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোটকা তো আমার সঙ্গে ছাদে ছিল, কোন সকাল থেকে তুমি নীচেয় যে ছোটকাকে দেখেছ প্রতিমাদিদি, সেটা অন্য ছোটকা”।

তোয়ার মা জিজ্ঞাসা করলেন, “সকালে চা করে তোকে যে বললাম, ছোটকার ঘরে চাটা দিয়ে আয়, তুই দিসনি?”

দিয়েছিলাম তো কিন্তু সেটাতো আসল ছোটকা নয়, ছোটকার দৈত্য না কী একটা যেন

দৈত্য নয় দ্বৈত সত্ত্বা ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন

ঠাম্মি বললেন, “ও বাবা, সেটা আবার কী বস্তু?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি বলছি, মা, কী বস্তু মুকুল খুব সকালেই ছাদে গিয়ে পায়চারি করছিল আমার ঘরে শুয়ে ওর পায়ের শব্দ পেয়েছি এদিকে ঘর খালি দেখে, তোমার প্রিয় শ্রীমান, মুকুলের ঘরে ঢুকেছে মুকুলের নীলজামাটা গায়ে দিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে বসেছে তারপর চশমাটাও পরেছে আর তারপরেই আমাদের তোয়ারাণি তার ঘরে ঢুকে টেবিলে চা রেখে এসেছে পেছন থেকে নীলজামা, আর চোখে চশমা দেখে, বেচারা ভেবেছে ওর ছোটকাই চেয়ারে বসে আছে

তোয়ার বাবা একটু থামলেন তারপর আবার শুরু করলেন, “এর কিছুক্ষণ পরেই ঝাড়ু হাতে প্রতিমা ঘরে ঢুকে বকবক শুরু করাতে, শ্রীমান ঘাবড়ে গিয়ে গরম চায়ের কাপে কিংবা চায়ে হাত-টাত লাগিয়ে ফেলাতেই যত বিপত্তি ওরা তো রান্নাবান্না করে না, গরম চা বা গরম ঝোলও খায়না কাজেই হাতে ছেঁকা লাগাতে মনে হয় বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল তারপরেই চেয়ার টেবিল উলটে হুলুস্থুল বাধিয়েছে এরপর প্রতিমা মেঝেয় বসে কান্নাকাটি করাতে বেচারা সুযোগ পেয়ে পালিয়েছে”

তোয়ার দাদুন জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু তুমি এত কিছু জানলে কী করে?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “বারান্দার পূবের কোণা থেকে দেখে এস, আমাদের কাঁঠালগাছের ডালে, মায়ের শ্রীমান, কেমন মুকুল সেজে বসে আছে! গায়ে তার নীল জামা, চোখে ঝুলছে চশমা পিছনে অবিশ্যি মস্ত লেজটাও আছে”

সকলেই, বারান্দার কোণ থেকে, এমনকি ছোটকা নিজেও দেখে এলেন সত্যিই শ্রীমান গায়ে জামা পরে বসে আছে যদিও বুকের বোতাম লাগাতে পারেনি, আর সাইজে বড় হওয়াতে জামাটা খুব ঢলঢল করছে চশমাটাও ওর দু'কান থেকে ঝুলছে আর নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল বারবার চুষছে বারান্দায় তোয়াদের সকলকে দেখে, শ্রীমান মিটমিট করে তাকাল, তারপর বেশ কয়েকটা দাঁত দেখালবাঁ হাতে পেট চুলকোতে চুলকোতে। ওটাই কী ওর 'সরি' বলার নমুনা? প্রতিমাদিদি ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম ছোড়দা, তুমি কিনা শেষ অব্দি, হিহি হিহি, লেজ নিয়ে ঘোরাফেরা করবে?”

ছোটকা গম্ভীর মুখে বললেন, “বাজে বক বক করিসনা, প্রতিমা। কিন্তু আমার চশমার কী হবে? চশমা ছাড়া আমি পড়ব কী করে?”

তোয়ার ছোটকার প্রিয় নীল জামাটা না হয় গেল কিন্তু এই লকডাউনে নতুন চশমা পাবে কোথায়? চশমার দোকান-টোকানতো সব বন্ধ কবে খুলবে কে জানে; এদিকে ছোটকার চলবে কী করে? চশমা ছাড়া বই পড়বেন কী করে?

ঠাম্মি সব্বাইকে বললেন, “এখানে ভিড় করিস না, সব্বাই যে যার ঘরে যা আমি দেখছি কী করা যায়

শ্রীমান নামের হনুমানটি, অনেকদিন ধরেই দল ছুট হয়ে তোয়াদের এবং আশেপাশের বাগানের গাছে থাকে তেমন কোন উপদ্রব কিংবা বিরক্ত করে না আর তোয়ার ঠাম্মি শ্রীমানকে খুবই স্নেহ করেন ও যত্ন-আত্তি করেন বাড়িতে নিত্য সেবার পুজোয় একটু বেশিই ফলটল নৈবেদ্য দেন, কলা, শসা, পাকা পেঁপে, পেয়ারা, সবেদা ঠাম্মি ভগবান রামের খুব ভক্ত, তাঁর নিত্যসেবার দেবতাটি রঘুপতি রামচন্দ্র ঠাম্মির দৃঢ় বিশ্বাস, তিনিই তাঁর ভক্ত হনুমানটিকে পাঠিয়েছেন, তাঁর নিবেদন করা ফলগুলির সদ্ব্যবহারের জন্যে

ঠাম্মি আজও দেবতার পুজো দিলেন, অনেক ফল দিয়ে তারপর ছাদ থেকে হাঁক পাড়লেন, “অ শ্রীমান, খাবি আয় কাঁঠাল গাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে শ্রীমান ঠাম্মির হাতের ফলভরা রেকাবিটা দেখল একবার পেট চুলকে ডানহাতের দুটো আঙুল চুষল তোয়া ফিসফিস করে ঠাম্মিকে বলল, “শ্রীমানদাদার ওই আঙুল দুটোতেই মনে হয় ছেঁকা লেগেছে, তাই না, ঠাম্মি?”

দেখি, কাছে এলে বুঝতে পারবো

চোখে চশমা, গায়ে নীল জামা শ্রীমান একটু ইতস্তত করলেও এল। ছাদের আলসেতে বসে ঠাম্মির দিকে আর তাঁর হাতের রেকাবিটা দেখল মন দিয়ে তারপর ছাদের মেঝেয় নেমে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল ঠাম্মি ছাদের মেঝেয় বসে, যত্ন করে একটা একটা করে কাটা ফল দিতে লাগলেন, শ্রীমান বাঁহাত বাড়িয়ে মুখে পুরে কচমচ চিবোতে লাগল

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, দৌড়ে যা তো, তোর মাকে বলে, ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ নিয়ে আয় ছেঁকালাগা আঙুলে ঠাণ্ডা পেলে একটু আরাম পাবে বেচারা তোয়া এক ছুট্টে নিচেয় গেল বরফ আনতে

শ্রীমান যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, ঠাম্মি প্রথমেই খুলে নিলেন, চশমাটা শ্রীমান আপত্তি তো করলই না, বরং শান্ত ভাবে বসে রইল চুপটি করে এরপর তোয়া বরফের কিউব নিয়ে এল আর ঠাম্মি শ্রীমানের ডানহাতের আঙুলে বরফ থেকে ফোঁটা ফোঁটা টোপানো জল দিতে শুরু করলেন আঙুলে গরম ছেঁকার পর এখন বরফজলের শৈত্যে শ্রীমান একটু থমকে গেল সে ডান হাতটা তুলে মন দিয়ে দেখল তারপর আবার ছাদের মেঝেয় পেতে দিল ডান হাতটা

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, মনে হয়, আরাম পাচ্ছে, বুঝেছিস তোয়ারাণি প্রতিবছরই দুএকদিন শিলাবৃষ্টি তো হয়ই, কাজেই ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতা হয়তো ওর আছে তুই এক কাজ কর, তুই ওর আঙুলে বরফজলের ফোঁটা দিতে থাক। আমি ততক্ষণে ওর জামাটা খুলে নিই

বারে, জামাটা খুলে নিলে ও রেগে যাবে না 

কিচ্ছু না, ওদের জামা-টামা পরার অভ্যেস আছে নাকি? আমাদের দেখে বাঁদরামি করে জামাটা গায়ে চাপিয়েছিল গাছের ডালে লাফালাফি করতে গিয়ে, কোন খোঁচায় ওই ঝুলঝুলে জামা আটকে পড়ে গিয়ে হাতপা ভাঙবে মুখপোড়াসে হবে আরেক বিপদ।”

সত্যিই জামাটা খুলে দেওয়াতে শ্রীমান যেন স্বস্তি পেল, এদিকে ফলও শেষ হয়ে গিয়েছিল ঠাম্মি বললেন, “যা, গাছে ফিরে যা, শ্রীমান, আর কক্ষণো এমন বাঁদরামি করিস না, কেমন? তোয়ার মনে হল, শ্রীমান যেন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ঠাম্মির কথায়

তোয়া মজা পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও ঠাম্মি, ওরা বাঁদরামি না করলে, কারা করবে?”

কেন তুই আর তোর ছোটকা আছিস কী করতে? তোরা করবি!ঠাম্মিও হেসে ফেলে বললেন

ঠাম্মির কথায় দারুণ মজা পেয়ে তোয়া হাসতে লাগল খুব, আর মনে মনে ভাবল, তার ছোটকা দৈত্য না কী যেন হয়ে ভাগ্যিস দুজন হয়ে যায়নি! হলে তার কী বিপদই না হত কাঁঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তোয়াকে হাসতে দেখে, শ্রীমানও তার অনেকগুলি দাঁত বের করল মনে হয় সেও হাসছিল 

-oo-


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৪

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...