শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৭

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

 পঁচিশে জুলাই, ২০২৬, মঙ্গলবার – বিকেল চারটে

বিকেল চারটে থেকে ভিজিটিং আওয়ার, অহীনের সঙ্গে নবীনবাবু পৌঁছে গেলেন কেবিনের দরজায়। সন্তর্পণে দরজা ফাঁক করে নবীনবাবু কেবিনে ঢুকলেন, পিছনে অহীন। অবিনবাবুর বিছানার মাথার দিকটা তুলে দেওয়া, পিছনে বালিশের ঠেস দিয়ে তিনি বসে আছেন। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ঘরে ঢোকা দুই মূর্তির দিকে।

নবীনবাবু হাসি হাসি মুখে, একটু ঘাড় নামিয়ে বললেন, “প্রণাম নিও দাদু, আমি তোমার বড়দার একমাত্র ছেলে প্রবীণের পুত্র। মানে তুমি আমার বাবার ছোটকা”। অবিনদাদু তাকিয়ে রইলেন নবীনবাবুর দিকে, কোন উত্তর দিলেন না। বাবার দেখাদেখি অহীনও মাথা নামিয়ে বলল, “প্রণাম নিও, দাদু”। নবীনবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, “দাদু, এটি আমার ছোট পুত্র – অহীন, তোমার প্রপৌত্র, মানে পুতি। আমার বড় পুত্র মহীন এখানে নেই – কর্মসূত্রে গুজরাটে আছে”।  

অবিনবাবু এবার বিরক্ত হয়ে মুখ বেঁকালেন, হাত নেড়ে ওদের বসতে ইশারা করলেন, তারপর একটু চাপা স্বরে বললেন, “সবাই মিলে অ্যাতো দাদু দাদু করচিস কেন? আমাকে দেখে কি দাদু মনে হচ্চে?”

নবীনবাবু এবং অহীন দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে বিছানার পাশে রাখা টুলে বসল। নবীনবাবু হাত কচলে, অমায়িক হাসিমাখা মুখে বললেন, “তা তুমি আমার বাবার ছোটকা। তুমি আমার দুই পুত্রের ঠাকুরদাদার ছোটকা। দাদু বলবে তাতে আর আশ্চর্য কি?”

কড়া চোখে নবীনবাবুর দিকে তাকিয়ে অবিনবাবু একটু ধমকের সুরে বললেন, “না, বলবি না। অবিনদা বলবি, বা ওরকম কিছু – দাদু কক্ষণো না। এই বলে রাখলাম”।  

“আচ্ছা তাই হবে। কেমন আছ বলো। দুপুরে মাছের ঝোল ভাত দিয়েছিল, কেমন লাগল?”

মুখ বিকৃত করে অবিনবাবু বললেন, “ছ্যাঃ মুখে তোলা যায় না। যেমন পিণ্ডি চটকানো ভাত, তেমনি ঝোল। যেন পুকুরের জলে ভেসে বেড়ানো মাছ ধরে, সেই জলেই একটু নুন আর হলুদ ছেটানো”।

নবীনবাবু আর অহীন এই কথায় হেসে ফেলল। তাদের হাসি দেখে অবিনবাবু বললেন, “হাসছিস? বড়ো বৌদিদির রান্না তো খাসনি। বড় বৌদিদি মানে খ্যাঁদার মা। আহা সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে”।

কেবিনের দেয়ালে বেশ বড়ো একটা ফটো টাঙানো ছিল – গভীর অরণ্যের মধ্যে পায়ে চলা পথ বহু দূরে চলে গেছে, বনের আরও গভীরে। সেই ফটোটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবিনবাবু আবার বললেন, “ওঁনারা আর বেঁচে নেই না? বড়দা, বড়বৌদিদি? বড়বৌদিদি যখন বিয়ে করে আমাদের বাড়ি এল, ওঃ যেন সাক্ষাৎ মা জগদ্ধাত্রী। বাড়ির মেয়েরা ওঁনাকে বরণ করল, তারপর নানান মেয়েলি আচার অনুষ্ঠান হল। সে সব সম্পন্ন হতেই, আমার মা বললেন, বৌমা, যাও নিজের ঘরে গিয়ে কাপড় চোপড় ছেড়ে বিশ্রাম নাও। পিসিরা, দিদিরা বৌদিদিকে নিয়ে দোতলায় যাচ্ছিল, বৌদিদি বললেন, বিনু কোথায়, বিনু? সবাই জিজ্ঞাসা করল বিনু কে? বিনু বলে তো কেউ নেই এ বাড়িতে? অনুষ্ঠান বাড়ির ভিড়ের ভেতর থেকে আমাকে ঠিক লক্ষ্য করেছিলেন। আমার দিকে হাত তুলে ডাকলেন, বললেন, ওই তো বিনু। আমার কাছে আয়। আমি কাছে যেতে জিজ্ঞাসা করলেন, তোর নাম কী রে? আমি বললাম, অবিন, সবাই অবু বলে ডাকে। বৌদিদি বললেন, আজ থেকে আমি তোকে বিনু বলে ডাকব। বলে আমার একটা হাত ধরে ওপরে নিয়ে গেলেন। পরে জেনেছিলাম, বাপের বাড়িতে ওঁনার ছোটভাই ছিল, বিনয়, ডাকনাম বিনু - আমারই বয়সী। আমার মধ্যে উনি নিজের ছোট ভাইকে খুঁজে...”। অবিনবাবুর কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এল, তাঁর দুচোখের কোলে জমে উঠল অশ্রু।

নিজেকে সামলে নিয়ে একটু পরে অবিনবাবু বললেন, “জিজ্ঞেস করতেও ভয় হয়, খ্যাঁদা বেঁচে-বর্তে আছে তো”?

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “বিনুদা, খ্যাঁদা কে?”

এই প্রথম অবিনবাবুর মুখে হাসি ফুটল, বললেন, “বিনুদা? বাঃ বেশ নাম দিয়েছিস। খ্যাঁদা কে হয় তোর বাপকে জিজ্ঞেস কর না, ছোঁড়া”। অহীন তার বাবার দিকে তাকাল, নবীনবাবু বললেন, “ঠাম্মা চলে গেছেন প্রায় বছর কুড়ি হবে। আজ এতদিন পর তোমার মুখে বাবার ডাকনাম শুনে কত কথাই যে মনে পড়ছে – বাবা ভালই আছেন, মাও আছেন। ওঁনাদের আজকে আসতে আমিই মানা করেছি। কাল নিয়ে আসব”।

এবার অবিনবাবু গম্ভীরভাবে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কয়েকটা প্রশ্ন করব, তার সোজাসাপটা উত্তর দিবি”? ওরা দুজনেই একটু উৎকণ্ঠিত হল, কী প্রশ্ন করবেন, রে বাবা। কেউই কিছু বলল না, অবিনবাবুর প্রশ্নের অপেক্ষায় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ডাক্তারবাবুকে সকালে আর দুপুরে দুবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তর না দিয়ে বললেন, সে অনেক কথা, এখন আমার সময় নেই, পরে একসময় বলব। পারুল, যে মেয়েটি আমার সেবা করে, সর্বদা দেখাশোনা করে, তাকেও জিজ্ঞেস করলাম, সে গম্ভীর মুখে বলল, সবাই তো তাই বলে, কিন্তু আমি তো তেমন কিছু বুঝি না”। একটু থেমে অবিনবাবু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভারত কি স্বাধীন হয়েছে?”

সর্বজিৎ, মহীন, অহীন আর ডাক্তারকাকু এই বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আগেই আলোচনা করেছিল। অবিনদাদুর কিছু কিছু প্রশ্নের ধাক্কা আসবে, যেগুলো খুব সাবধানে সামলাতে হবে। যেমন এই স্বাধীনতা। নেতাজী সুভাষের বিতর্কিত মৃত্যু। দেশভাগ। সিদ্ধানন্দ ঠাকুরের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলেই আসবে সেই সময়কার দুই বাংলা জুড়ে বীভৎস দাঙ্গার ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল নিঃস্ব হিন্দু উদ্বাস্তুদের এদেশে চলে আসার প্রসঙ্গ আসবে। এত লক্ষ মানুষের এদেশে কিভাবে পুনর্বাসন হয়েছে, সে কথাও উনি জানতে চাইবেন হয়তো। এসব কথা কোন না কোন সময় অবিনদাদুকে বলতেই হবে। কিন্তু উনি কী ভাবে নেবেন সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়।

নবীনবাবু এই প্রশ্নের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি অহীনের মুখের দিকে তাকালেন। অহীন বলল, “হ্যাঁ বিনুদা, ভারত ১৯৪৭ সালের পনেরই আগষ্ট মাঝ রাত্তিরে স্বাধীন হয়েছে। ব্রিটিশরা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে গেছে”।

“সাতচল্লিশ সালে? আজ থেকে ঊণতিরাশি বছর আগে? বলিস কি? ডমিনিয়ন স্টেটাস না পূর্ণ স্বরাজ?”

অহীন বলল, “না বিনুদা, ডমিনিয়ন স্টেটাস নয়, পূর্ণ স্বরাজ। আমাদের দেশ এখন গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হয়, আমরা সবাই ভোট দিয়ে, আমাদের সরকারকে নির্বাচিত করি”।

অবিনবাবু খুশি হলেন, অহীনের কথায়। কিন্তু তারপরই জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওই মেয়েটি, মানে পারুল, কথাবার্তা বলে বেশ শিক্ষিত মনে হল… সে ওরকম বলল কেন?”

অহীন একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আমাদের দেশটা কত বড়ো, সে তো তুমি জানোই বিনুদা। এত রকমের মানুষ। এত রকমের ভাষা, জাত, পাত, ধর্ম। তার ওপর ধনী আছে, মধ্যবিত্ত আছে, দরিদ্র আছে, হত-দরিদ্রও আছে। এদের সকলেরই আশা ছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে, এবার নিশ্চয়ই সকলের সুদিন আসবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সর্বস্তরের সর্বসাধারণের মধ্যে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছনো যায়নি। মেয়েটির ব্যাকগ্রাউণ্ড জানি না, কাজেই সঠিক বলতে পারব না, কেন সে একথা বলল। আমাদের দেশবাসীদের মধ্যে অনেকের মনেই এমন ক্ষোভ রয়েছে”।

অবিনবাবু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে অহীনের কথা শুনছিলেন, এখন জিজ্ঞাসা করলেন, “তোর মনে কোন ক্ষোভ নেই?”

অহীন এবার হেসে ফেলল, বলল, “ক্ষোভ বলা যাবে কি না জানি না, তবে কিছু কিছু বিষয়ে আমরাও যে হতাশ হচ্ছি না, তা নয়”।

“যেমন”?

অহীন আবারও হাসল, বলল, “তুমি কী স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সব পরিস্থিতি আজকেই জেনে ফেলতে চাইছ, বিনুদা? আরও একটু সুস্থ হও, বাড়ি চলো। তারপর এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে”।

অবিনবাবু অহীনের সপ্রতিভতায় খুশি হলেন। তাঁর মনে পড়ল নিজের পিতা-মাতার কথা। বড়দাদা এবং বড়োবৌদিদির কথা। ভাইপো খ্যাঁদার কথা। সাত বছরের বালক অবস্থায় যাকে তিনি শেষ দেখেছিলেন। সেই রক্তধারাই বহন করে চলেছে – এই ছেলেটি, যার নাম অহীন। এতক্ষণে আন্তরিক এক আবেগ অনুভব করলেন ছেলেটির প্রতি। তাঁর বুকের মধ্যে এখন আশ্চর্য এক আত্মীয়তার অনুভূতি – এই ছেলেটি তাঁর প্রপৌত্র – যাকে চলিত কথায় বলে পুতি। মানুষ কেন, কোন জীবই চিরকাল বাঁচে না, এ কথাটা পূর্ণ সত্য নয়। তারা বেঁচে ছিল তাদের পূর্বপুরুষে। তারা বেঁচে থাকে তাদের উত্তরপুরুষে। সৃষ্টির আদি থেকে এ এক অবিচ্ছিন্ন ধারা। সেই ধারার মধ্যে প্রতিটি সম্পর্কের একটা প্রাকৃতিক পারম্পর্য থাকে।

সাধারণতঃ একটি মানব শিশুর জন্ম হয় তার পিতা-মাতার যৌবন অবস্থায়। সে সময় তার পিতামহ এবং পিতামহী থাকে যৌবনের উপান্তে। সে শিশুর প্রপিতামহ ও প্রপিতামহী, যদি জীবিত থাকে, তারা বৃদ্ধ নির্যৌবন জীবনযাপন করে। কিন্তু তিনি এই যে মানুষগুলির সামনে বসে কথা বলছেন, তাদের স্বাভাবিক “দাদু” ডাক শুনে তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। কেন? কারণ কোন এক অলৌকিক কারণবশতঃ তিনি ও তাঁর প্রপৌত্র অহীন সমবয়সী হয়ে উঠেছেন। তিনি নিজেই জীবনের পারম্পর্যহীন প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এবং বয়সোচিত স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছেন না! এ কথাটা বুঝতে পেরে তিনি নিজেকে বড়ো অসহায় বোধ করলেন।          

অবিনবাবু অহীনের মুখের দিকে তাকিয়ে যতক্ষণ এসব কথা ভাবছিলেন, অহীনের একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। তার শেষ কথায় অবিনবাবু কি আঘাত পেলেন? এই মানুষটিকে গতকাল পর্যন্ত তার মনে হয়েছিল আশ্চর্য এক জীব বিশেষ। প্রাগৈতিহাসিক না হোক – এক জীবন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তিরাশি বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা একটি প্রাণ। যার বয়েস থমকে রয়েছে, থমকে রয়েছে শরীর।

অহীন জানে মৃত্যুতে মানুষের বয়স এবং শরীর থমকে যায়। অহীনের এক পিসিমা বিয়ের কয়েকবছর পরে এক দুর্ঘটনায় মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে মারা যান। তাদের বাড়ির দেয়ালে, ফটো অ্যালবামে ওই পিসিমার সঙ্গে তাদের অনেকগুলি উজ্জ্বল হাসিখুশি মুহূর্তের ছবি সযত্নে রাখা আছে। আজ প্রায় দশ বছর বাদে, বেঁচে থাকলে পিসিমার বয়েস হত চুয়াল্লিশ। অথবা আজ থেকে আরও কুড়ি বছর পরে পিসিমার বয়েস হতে পারত চৌষট্টি। এই সময়ে অহীনের বয়েস বাড়বে, শরীরে আসবে নানান পরিবর্তন। ছবিতে যে বালকের সঙ্গে পিসিমার ছবি দেখে সে এখন স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়, সে এখন আর বালক নয়, যুবক। আরও কুড়ি বছর পরে সে পিসিমার বয়েস পেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওই ছবিগুলির মধ্যে পিসিমা থমকে রয়েছেন, তাঁর কোন পরিবর্তন হয়নি, হবেও না। কিন্তু সামনে বসে থাকা ওই ভদ্রলোক তো থমকে নেই, থমকে থাকবেন না। তিনি অনেকটা পথ পিছিয়ে পড়েছেন, তাঁর সঙ্গী পথিকদের সবাই এগিয়ে গিয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। তিনি কি নিজেকে নির্বান্ধব পথভ্রষ্ট ভাবছেন?

অবিনবাবু হাত বাড়িয়ে অহীনকে ডাকলেন, “এদিকে আয়, আমার পাশে একটু বস তো”...। অহীন টুল ছেড়ে অবিনবাবুর পাশে বিছানায় বসল। অবিনবাবু তাঁর হাতটা বাড়িয়ে অহীনের ডানহাতটা ধরলেন। একটাও কথা না বলে, তাকিয়ে রইলেন ফ্রেমে বাঁধানো অরণ্যের ফটোটির দিকে। তিনি যেন গভীর অরণ্যের রহস্য ভেদ করতে চাইছেন। অহীনের হাত ধরে হাঁটতে চাইছেন, অজানা – অচেনা অরণ্যপথে...।  কেউই আর কোন কথা বলল না। অবিনবাবু অহীনের হাতটা ধরে বসেই রইলেন, দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকিয়ে।

চলবে...      


বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ স্কন্ধ - পর্ব ২


সতীর দেহত্যাগ

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “এই ঘটনার পর শ্বশুর দক্ষ ও জামাতা শিবের মধ্যে দীর্ঘকাল বিদ্বেষভাব চলতেই লাগল। ব্রহ্মা যখন দক্ষকে প্রজাপতিগণের অধিপতি পদে অভিষিক্ত করেছিলেন, সেই সময় থেকে দক্ষের মনে অত্যন্ত অহংকার ও গর্বের সঞ্চার হয়েছিল। আরেকবার তিনি শিব ও ব্রহ্মিষ্ঠ ঋষিদের উপেক্ষা করে বাজপেয় যজ্ঞ ও তার পরে সর্বশ্রেষ্ঠ বৃহষ্পতিসব যজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। এই যজ্ঞে তিনি সকল ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি, পিতৃ ও দেবতাদের সস্ত্রীক আমন্ত্রণ করলেন, কিন্তু শিব ও তাঁর কন্যাকে নিমন্ত্রণ করলেন না।

এদিকে দক্ষকন্যা সতী, আকাশচারী গন্ধর্বদের থেকে পিতার যজ্ঞ মহোৎসবের কথা শুনলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে সুন্দরী গন্ধর্ব স্ত্রীরা সুন্দর সাজে সেজে তাঁর পিতার যজ্ঞস্থলে যাচ্ছে। তাদের পরনে সুন্দর সাজসজ্জা, অঙ্গে দামী দামী অলংকার। এইসব দেখে, তিনি স্বামী শিবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে স্বামী, আমার পিতা সম্প্রতি মহোৎসবের আয়োজন করেছেন, ওই দেখুন দেবতারা সকলে সেই অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। আপনার অনুমতি পেলে আমিও সেখানে যেতে পারি। সেই অনুষ্ঠানে আমার অন্যান্য বোনেরাও তাদের স্বামীদের নিয়ে আসবে, আমার মায়ের সঙ্গেও দেখা হবে। কতদিন মায়ের সঙ্গে এবং আমার প্রিয় বোনেদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না বলে, আমার মন অত্যন্ত ব্যাকুল, আপনি দয়া করে আমাকে সেখানে যাবার অনুমতি দিন। পিতৃগৃহে কোন অনুষ্ঠানের কথা শুনলে, কোন কন্যা স্থির থাকতে পারে, হে নাথ? তাছাড়া পিতৃগৃহে এবং শ্বশুরগৃহে যাবার জন্যে কখনো নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। হে প্রভু, আপনি পরম করুণাময়, আমার অভিলাষ পূর্ণ করে, আমাকে যাবার অনুমতি দিন”।

গিরীশ প্রিয়তমা পত্নীর ব্যাকুলতা দেখে সহাস্যে বললেন, “প্রিয়ে, তুমি যে বললে নিমন্ত্রিত না হয়েও লোকে বন্ধু বান্ধবের বাড়ি যায়, সে কথা ঠিক। কিন্তু সেই বন্ধু যদি দেহের অহংকারে অন্ধ হয়ে গর্ব ও ক্রোধের বশীভূত হয়, সে বাড়িতে না যাওয়াই ভালো। বিদ্যা, তপস্যা, চিত্ত, দেহ, যৌবন ও কুল, এই ছয়টি সাধুগণের গুণ। আবার এই ছয়টি গুণ অহংকারী লোকের অধিগত হলে, এই গুণগুলিই দোষে পরিণত হয়। আমি জানি, তুমি পিতার কাছে অন্য কন্যাদের তুলনায় অত্যন্ত স্নেহভাজন, কিন্তু আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের কারণে তোমার পিতা তোমাকে সমাদর করবেন না। লোকে বলে, শত্রুর তিরে শরীরে যে ক্ষত হয়, তার বেদনার থেকেও বুদ্ধিভ্রংশ বান্ধবের কটু বাক্য অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।  প্রিয়ে, জ্ঞানীব্যক্তিরা সর্বদাই পরষ্পরকে যে অভিবাদন করেন, সে অভিবাদন অন্তর্যামী পরমপুরুষের জন্য, অহংকারীর দেহাভিমানের জন্যে নয়। যে বাসুদেব শব্দে বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণ বোঝায়, ইন্দ্রিয়ের অগোচর সেই বাসুদেবকে আমি নিত্য অর্চনা করি। এই রকম আধারে মায়ার আবরণ মুক্ত পরমেশ্বরের অনুভব আসে, আমি এই শুদ্ধসত্ত্বে অধোক্ষজ। অতএব, প্রজাপতিগণের যজ্ঞসভায়, আমি নিরিপরাধ হওয়া সত্ত্বেও যিনি আমাকে কুবাক্য বলেছেন, তিনি আমার শত্রু। হে প্রিয়ে, তিনি তোমার পিতা হলেও তোমার সেখানে যাওয়া উচিৎ নয়। আমার কথা না শুনে, পিতার ভবনে গেলে, তোমার মঙ্গল হবে না। কারণ, যে স্বজনের কাছে এখন তোমার প্রতিষ্ঠা আছে, সেই স্বজনের অপমান তোমার সহ্য হবে না, তোমার কাছে মরণের তুল্য হবে”।   

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ভগবান শংকরের অনুমতি না পেয়ে দেবী সতী ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। একদিকে মা ও বোনদের সঙ্গে মিলনের ইচ্ছা, অন্যদিকে ভগবান ভবের নিষেধ, তিনি চরম দ্বিধায় ঘর বার করতে লাগলেন। তারপর একসময়, রাগে অভিমানে অস্থির হয়ে, তিনি পিতৃগৃহে যাবার জন্যে, একলাই পথে বেরিয়ে পড়লেন, । দেবী সতীকে একলা যেতে দেখে মহাদেব রুদ্রের হাজার অনুচর তাঁকে অনুসরণ করে চলল। তাঁকে বৃষেন্দ্রর উপর আরোহণ করিয়ে, তাঁর হাতে তুলে দিল গোলক, আয়না, লীলাকমল ও অনেক পুতুল। অনুচরেরা তাঁর মাথায় ধরল শ্বেত ছত্র, তাঁকে ব্যজন করতে লাগল, তাঁর যাত্রা পথে বাজাতে লাগল দুন্দুভি, শঙ্খ আর বাঁশি।

[পতির উপর রাগ করে বালিকা সতী বাপের বাড়ি চললেন... কিন্তু কেন বালিকা বললাম, কারণ তাঁর অনুচরেরা তাঁর হাতে তুলে দিলে গোলক ( অর্থাৎ খেলার বল), অনেক পুতুল, আয়না আর লীলাকমল... আমার ছোটবেলায় দিদিমার মুখে শুনেছি তিনিও নাকি এমনই নানান উপকরণ নিয়ে যাওয়া আসা করতেন। বালিকা বধূর পতিগৃহে যাত্রার সময় নানান খেলনা-পুতুল সামগ্রী বহন করা, এমনকি বিবাহের তত্ত্বেও শ্বশুরবাড়ি থেকে বালিকার আনন্দের জন্যে নানান পুতুল দেওয়ার প্রচলন ছিল। অর্থাৎ পুরাণে উল্লিখিত প্রায় ১৪০০ বছরের ট্র্যাডিশন আজ থেকে একশ/দেড়শ বছর আগে পর্যন্ত প্রবহমান ছিল।]

    পিতা দক্ষের যজ্ঞস্থলে তিনি পৌঁছে দেখলেন, বেদমন্ত্রের উচ্চারণে যজ্ঞভূমি মুখর। সেখানে উপস্থিত রয়েছেন অনেক বিখ্যাত মুনি, ঋষি ও ব্রাহ্মণেরা। চারিদিকে শোভা পাচ্ছে মাটি, কাঠ, সোনা, রূপো এবং চামড়ার তৈরি নানান যজ্ঞপাত্র। দেবীসতীকে দেখে পিতা দক্ষ কোন রকম সমাদর দেখালেন না। এমন কি দক্ষের ভয়ে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত অন্য কেউই তাঁকে সম্ভাষণও করল না। তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর মা ও অন্য বোনেরা। কিন্তু পিতা দক্ষের অনাদরে অভিমানিনী দেবীসতী ক্রুদ্ধ হলেন, তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর পতি রুদ্রের জন্য কোন যজ্ঞভাগ সংকল্প করা হয় নি। পিতা দক্ষ তাঁদের নিমন্ত্রণ করেন নি, এখন বিনা নিমন্ত্রণে তিনি এসেছেন কিন্তু তাও তাঁকে অবহেলা করলেন। প্রচণ্ড অপমানে তিনি সক্রোধে বললেন,

“এই লোকে যাঁর থেকে মহান আর কেউ হতে পারেন না। যাঁর কাছে এই জগতের কেউই প্রিয় কিংবা অপ্রিয় নয়। দেহীদের কাছে যিনি আত্মাস্বরূপ। যিনি এই সমস্ত জগতের কারণস্বরূপ, যিনি কোন জীবের প্রতি শত্রুভাব পোষণ করেন না। এমন মহেশ্বরের সঙ্গে আপনি বিরুদ্ধ আচরণ করছেন? এই জগতে কেউ কেউ আছেন, যাঁরা অপরের দোষগুণ যথাযথ বিচার করেন, তাঁদের মধ্যস্থ বলা হয়। কেউ কেউ আছেন যাঁরা অপরের শুধু গুণ বিচার করেন, দোষ দেখেন না, তাঁরা মহত্তর সাধু। আবার কেউ কেউ আছেন যাঁরা অপরের দোষ অগ্রাহ্য করে, তার সামান্য গুণকে মহৎগুণ হিসেবে বিচার করেন, তাঁরা মহত্তম সাধু। আর সম্পূর্ণ দোষহীন মহেশ্বর, জগতের অতুলনীয় গুণবান হওয়া সত্ত্বেও, আপনি তাঁর দোষ কল্পনা করে নিন্দা করছেন! আপনার মন অসূয়াযুক্ত, আপনার মন বিদ্বেষে পূর্ণ। আপনি এই জড়দেহকেই আত্মা বিবেচনা করে মোহে অন্ধ হয়ে রয়েছেন। যে “শিব” নামের উচ্চারণে সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যায়, আপনি সেই শিবের বিরুদ্ধে প্রচার করছেন! আপনি যাঁকে নামে শিব, বস্তুতঃ অশিব  বলেছেন। যিনি জটাধারী, যিনি শ্মশানে ভস্ম, নরকপালের ভূষণে সজ্জা করেন, যিনি প্রেত ও পিশাচদের সঙ্গে বাস করেন, তাঁকে আপনি ছাড়া সকলে, এমনকি ব্রহ্মাও অশিব মনে করেন না। মহেশ্বরের চরণের নির্মাল্য সকলেই মাথায় করে রাখেন।

আপনি শিবনিন্দুক এবং আমি আপনার সন্তান, এই চিন্তায় আমার ঘৃণা উৎপন্ন হচ্ছে। ভুল করে অপবিত্র অন্নভোজনের পর বমন করাই দেহশুদ্ধির সবথেকে ভাল উপায় বলে মনে করা হয়। হে পিতা, শিব ব্রহ্মস্বরূপ, অতএব তিনি কোন কর্মে আবদ্ধ না থাকলেও কোন দোষ হয় না এবং কোন কর্মফলই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। আপনার ঐশ্বর্য যজ্ঞশালাতেই আবদ্ধ, যজ্ঞের অন্নেই আপনার উদর পোষণ। আপনি কর্মকাণ্ডে আসক্ত, তাই আপনি এই ঐশ্বর্যের মধ্যে আবদ্ধ। আমাদের ঐশ্বর্য যজ্ঞের ফলের প্রত্যাশা করে না, আমাদের ইচ্ছা অনুসারে পরমব্রহ্মস্বরূপ আনন্দ আমরা অনুভব করতে পারি। অতএব আপনি সমৃদ্ধ এবং আমি ও আমার পতি রুদ্র দরিদ্র, এমন চিন্তাই আপনাকে অহংকারি করে তুলেছে। আপনি হরের নিন্দা করে চরম অপরাধ করেছেন, আর আপনার দেহ থেকেই আমার জন্ম। আপনার মতো দুর্জনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে, এই চিন্তাতেই আমি অত্যন্ত লজ্জিত এবং ধিক আমার এই জন্মকে। মহেশ্বর আমাকে ঠাট্টার ছলেও “দাক্ষায়ণী” নামে ডাকলে, আমার অন্তর দুঃখে ভরে ওঠে। অতএব আপনার দেহ থেকে সৃষ্টি হওয়া আমার এই দেহ আমি এই যজ্ঞস্থলেই ত্যাগ করব”।

হে বিদুর, দেবীসতী পিতা দক্ষকে এইভাবে তিরস্কারের পর উত্তরদিকে মুখ করে মাটিতে বসলেন। তারপর আচমন করে পীতবস্ত্রে নিজের দেহকে আবৃত করে, আচমন করলেন এবং চোখ বন্ধ করে যোগসাধনায় নিরত হলেন। তিনি নাভিচক্রে ঊর্ধগামী প্রাণবায়ু আর অধোগামী অপানবায়ুর সমতা বিধান করে, উদানবায়ুকে হৃদয়ের মধ্যে স্থাপনা করলেন। তারপর কণ্ঠপথ পার করে  নিজের ভ্রুযুগলের মধ্যে সেই উদানবায়ুকে সঞ্চারিত করলেন। সর্বজনের পূজ্য মহাদেব যে দেহকে সমাদর করে নিজের কোলে স্থাপন করতেন, সেই দেহের প্রত্যেক অঙ্গে তিনি অগ্নির সঞ্চার চিন্তা করতে লাগলেন। তারপর তিনি নিজের স্বামী জগৎগুরু মহেশ্বরের চরণপদ্মের চিন্তায় অন্য সমস্ত চিন্তা ত্যাগ করলেন। তখন তিনি যে দক্ষকন্যা, তাঁর এই অভিমান দূর হয়ে গেল, তিনি বিশুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তারপর সমাধিযোগে তাঁর দেহে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল।

এই অদ্ভূত ঘটনা দেখে জগতের ও আকাশের সকলে হাহাকার করে উঠলেন, তীব্র ধিক্কারের সকলে বলে উঠলেন, “দক্ষের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে দেবাদিদেব শংকরের পত্নী সতীদেবী দেহত্যাগ করলেন। আর এই দক্ষকে দেখ, যিনি প্রজাপতি এবং সর্ব চরাচর যাঁর প্রজা, যাঁর নিজের কন্যা মনস্বিনী সতীদেবী সর্বদা সমাদরের যোগ্য, সেই অভিমানিনী কন্যা নিজের পিতার কাছেই অপমানিতা হয়ে দেহত্যাগ করলেন। এই দক্ষ দাম্ভিক ও অহংকারী, এই দক্ষের অন্তরে মহাদেবের শ্রেষ্ঠত্ব সহ্য হয়নি, এই দক্ষ ব্রহ্মদ্রোহী শিববিদ্বেষী। নিজের কন্যার দেহত্যাগের সংকল্প চাক্ষুষ করলেন, কিন্তু একবারের জন্যেও নিবারণের চেষ্টা করলেন না। এই দক্ষের গতি একমাত্র নরক এবং এই জগতে তাঁর অখ্যাতির কোন সীমা থাকবে না”।

দেবীসতীর সঙ্গে রুদ্রের যে সকল অনুচর এসেছিল, তারা দক্ষকে বধ করার জন্যে অস্ত্র ধারণ করল। মহামুনি ভৃগু দক্ষের এই যজ্ঞের হোমকর্তা ছিলেন, তাঁর আহুতিতে চন্দ্রলোক থেকে উপস্থিত হল ঋভু নামক শতশত দেবগণ। এই ঋভুগণ প্রচণ্ড বেগে রুদ্রের অনুচরদের প্রতিহত করলেন, তাঁদের হাতে পরাস্ত হয়ে রুদ্রের অনুচরেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হল।।

চলবে...


মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪০"


৪৬

 

সকলেই বাইরে এল। ভোরের আলো ফুটছে – পাখিদের ডাকে টের পাওয়া যাচ্ছে সকালের আগমনী।  কমলিমা দাওয়ায় বসলেন। তাঁর কোলের কাছে বসল ভুটিক আর পাশে বসল, সুরমা আর পালি। ছেলেদের সঙ্গেই বসল কবিরাজ বড়্‌বলা। কমলিমা বললেন, “সবাই মিলে চেঁচামেচি না করে একজন কেউ বল, কী রাজ্য জয় তোরা করে এলি”।

“শুরুটা তাহলে আমিই করি”, আহোক বলল, “দক্ষিণ-পূর্ব কোনের স্তম্ভে আমি ছিলাম – অতএব শুরুটা আমি সবটাই দেখেছি”। ছেলেরা কেউ কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল আহোকের মুখের দিকে।

“ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, ওরা চারজন – ভল্লাদাদা, সুরুল, মইলি আর রামালি – পূবদিকের দরজার উল্টোদিকে ঝোপের ভেতর ঘাপটি দিয়ে বসল। ওদের সঙ্গে আমি ছিলাম, কিশনা ছিল আর গোলোকদাদা ছিল…”

“গোলোকদাদাটি আবার কে? কোথা থেকে জুটল”? কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো জানিনা জেঠিমা। ভল্লাদাদার বন্ধু এইটুকুই জানি”।

“ঠিক আছে বল”।

“কথা ছিল, গোলোকদাদা স্তম্ভের ওপরে থাকা প্রহরীদের মারলেই, আমি আর কিশনা চটপট সেই স্তম্ভে উঠে চারদিকের পরিস্থিতি দেখে সংকেত দেব। তারপর ভল্লাদারা ভেতরে ঢুকবে। আমি উঠে গেলাম দক্ষিণপূর্ব স্তম্ভে, কিশনাও নির্বিঘ্নে উত্তর-পূর্ব স্তম্ভে চড়ে পড়ল। আমি উঠে দেখলাম, ওখানে মাত্র চারজন প্রহরী রয়েছে – অথচ আমাদের কাছে নিশ্চিত সংবাদ ছিল, ওই দরজার কাছে ছজন থাকে। একটু  সন্দেহ হলেও আমি সংকেত দিলাম – এবং ওপর থেকে ভল্লা ছুঁড়ে এক জনকে, শেষ করলাম। ভল্লাদাদারা শেষ করল দরজার সামনের দুজনকে। বাকি একজন বিপদ বুঝে রক্ষীদের ঘরের দেওয়ালের দিকে সরে গিয়েছিল, তাকে মারল কিশনা। এরপর ভল্লাদাদারা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখল, দরজায় তালা নেই – আলগা ভেজানো। ওরা ভেতরে ঢুকে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল। আমাদের সন্দেহ হল – রক্ষীদের দুজন হয়তো বাইরে গিয়েছে…এখনই ফিরে আসবে। হলও তাই – একটু পরেই দেখলাম একজন রক্ষী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকছে। ভল্লাদাদাদের হাতেই তার মরণ হল। প্রায় একই সময়ে অন্য আরেকজন বেরিয়ে এল রক্ষীদের ঘরের প্রথম দরজাটা দিয়ে এবং সে ব্যাটাও মারা পড়ল সঙ্গে সঙ্গে”।

এরপরের ঘটনাগুলো আমি দেখতে পাইনি, দেখেছে কিশনা। ও ভাল বলতে পারবে”।

 

এবার সকলে কিশনার মুখের দিকে উদ্গ্রীব হয়ে তাকাল। কিশনা বলল, “আমাদের প্রথম লক্ষ্যটা নির্বিঘ্নেই শেষ হল, এবং আমরা ওপর থেকে দেখলাম ভল্লাদাদারা নিঃশব্দে – কী বলব – একদম বেড়ালের মতো দ্রুত গতিতে পূব আর উত্তরের গলির মধ্যে দৌড়ে সবকটা ঘরের শেকল তুলে দিল। তারপরের লক্ষ্য উপানুর ঘর। মইলি উপানুর অভিসার ঘরের দরজায় টোকা দিল দুবার”।

“অভিসার ঘর মানে?” কমলিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আস্থানে অভিসারের ব্যবস্থাও আছে নাকি”!

কথাটা বলে ফেলে কিশনা একটু অস্বস্তিতে পড়ল। সকলের সামনে জ্যেঠিমাকে কী করে সে বলবে উপানুর জঘন্য কীর্তির কথা। তাই বলা যায় নাকি?

কিশনা বলল, “সে বড়ো নোংরা কথা। আমি তোমায় বলতে পারব না, জেঠিমা। ভল্লাদাদার থেকে জেনে নিও। এখন যা হয়েছে সে কথা বলি শোনো - ভেতর থেকে উপানুর সাড়া পেতেই – মইলি পিছিয়ে এল – রামালি আর সুরুল অস্ত্র হাতে দাঁড়াল দরজার দুপাশে আর ভল্লাদা রইল – উল্টোদিকের বাগানের ঝোপের আড়ালে।

দরজা খুলে ব্যাটা বেরোল, ওর কথা কানে এল, “কী হয়েছে - এত রা…” কথা শেষ করতে পারল না, সুরুল বল্লমের ফলাটা সজোরে বিঁধিয়ে দিল হতভাগার মুখের ভেতর – তারপর সুরুল বল্লমটা টেনে নিতে উপানুর মুখ ছেৎরে গেল। পরিকল্পনার সময় ভল্লাদাদা বলেছিল, উপানু অভিজ্ঞ রক্ষী আর ব্যাটার শক্তিও ভয়ংকর। বললে বিশ্বাস করবে না জেঠিমা…ওই অবস্থাতেও উপানু ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল – আহত পশুর মতো চিৎকার করে দৌড়ে চলল দক্ষিণ দিকে। তার চিৎকার শুনে পশ্চিমের দরজার দুই রক্ষী ধেয়ে এল – তাদের একজন ভল্লাদাদার ভল্লর আঘাতে ছিটকে পড়ল – আর অন্যজনকে ভল্ল ছুঁড়ে শেষ করল সুরুল। কিন্তু তার আগেই দ্বিতীয় রক্ষীটা হাতের ভল্ল ছুঁড়ে মেরেছিল মইলির দিকে। সেই দেখে রামালি একধাক্কায় সরিয়ে দিল মইলিকে আর লাফিয়ে উঠে ওর বল্লমের ফলায় গেঁথে নিল উপানুর মাথা – উপানু মরল। কিন্তু দ্বিতীয় রক্ষীর ছোঁড়া ভল্লটা মইলির দাবনার একটা পাশ ছিঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। রামালি যদি ওই মোক্ষম সময়ে মইলিকে ধাক্কাটা না দিত – হয়তো মইলির বুকেই বিঁধত ভল্লটা। খুব জোর বেঁচে গেছে মইলি”।

সকলেই রুদ্ধশ্বাসে কিশনার কথা শুনছিল, কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর?”

লোহার দরজা ঠেলে এই সময়েই ভেতরে এল দুজন। সম্পৎ আর দেবান। সম্পৎ আর দেবানের কাঁধে খাটুলা। দুজনেই অবসন্ন, ক্লান্ত এবং ক্লিষ্ট।

কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন উদ্বেগে, বললেন, “আমাদের কেউ কি মারা গেছে, সম্পৎ? কে… কে মারা গেল?”

সম্পৎ আর দেবান উত্তর দিল না, সাবধানে খাটুলা নামাল বাঁধানো দাওয়ায়। মৃতদেহ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল সবাই। আহোক আর কিশনার বর্ণনায় শ্রোতারা যে আনন্দ ও উত্তেজনায় এতক্ষণ মগ্ন ছিল – তারাও এখন ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে রইল শবদেহ ঘিরে।  

 

 

একটু পরে শবদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের ভিড়ের মধ্যে পথ কেটে ভেতরে এল ভল্লা, সুরুল আর রামালি। ভল্লা কাছে এসে কবিরাজমশাইয়ের দেহটার পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল, বলল, “পারলাম না, রে মা। কবিরাজমশাইকে গ্রামে ফিরিয়ে আনার জন্যেই আমাদের এত দিনের আয়োজন, সে সব বৃথা হয়ে গেল”।

কমলিমায়ের দু চোখেও এখন অশ্রুর প্লাবন, বললেন, “কী করে এমন হল? ওদের রক্ষীরাই কি…”।

সুরুল বলল, “ভল্লাদাদার পরিকল্পনা মতো, আস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভের রক্ষীকে গোলোকদাদা ভল্লা ছুঁড়ে মারল – অন্য স্তম্ভের রক্ষীরা কেউ পড়েনি – কিন্তু ওই ব্যাটা ওপর থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল বন্দীশালার চালে। বিকট শব্দে টালি ভেঙে নীচেয় পড়ল রক্ষীর হুমদো দেহটা। তখন কি আর জানতাম – ওই ঘরেই বন্দী আছেন কবিরাজমশাই? বাইরের অন্য রক্ষীদের শেষ করে, আমরা বন্দীশালায় ঢুকলাম। খুঁজতে খুঁজতে ওঁনাকে পেলাম ভাঙাচোরা টালি আর ওই রক্ষীর মৃতদেহের নীচে। সে সব সরিয়ে ওঁনাকে যখন বের করলাম…উনি আর নেই…”।

কমলিমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “ভল্লা কাঁদিস না। ওঠ - ওঁনার সৎকারের ব্যবস্থা তোকেই করতে হবে তো”।

কান্নাভাঙা হতাশ চোখে ভল্লা তাকাল কমলিমায়ের দিকে, বলল, “তা তো করতেই হবে। ওঁনাকে প্রথমে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাই, মা। তারপর গ্রামের লোকেরাই ওঁর উচিৎ মতো সৎকারের ব্যবস্থা করবেন”।

সুরুল বলল, “আমিও তোমার সঙ্গে যাবো ভল্লাদাদা। যাবার সময় আমাদের গ্রাম হয়ে যাবো – আমাদের সকলের কাছেও উনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন”।

ভল্লা বলল, “চল, কিন্তু সবার যাওয়ার দরকার নেই – আমরা পাঁচ-ছজন গেলেই হবে। তার আগে সবাই কালো ধুতি ছেড়ে নিজেদের ধুতি পরে নে। মুখের কালিঝুলি ধুয়ে নে। সকাল হয়ে গেছে, এই চেহারা নিয়ে বাইরে বেরোন যাবে না। যারা যারা যাবি – চটপট প্রস্তুত হয়ে নে। ওরা কেমন আছে মা, মইলি, দীপান, বিশুন”।

বড়্‌বলা বলল, “চিন্তা করার কিছু নেই, ভল্লাদাদা, ওরা ভালোই আছে – ঘুমের ওষুধ দিয়েছি – ঘুমোচ্ছে।   তোমাদের সঙ্গে আমিও এখন চলে যাই ভল্লাদাদা। আজকে আমার আর কোন কাজ নেই, কাল একটু বেলা করে আসব। ক্ষত পরিষ্কার করে, নতুন প্রলেপ লাগিয়ে দিয়ে যাবো”।

ভল্লা বলল, “ঠিক আছে চলো। আমিও ততক্ষণ কালিঝুলি ধুয়ে ধড়া-চূড়ো বদলে নিই”।


চলবে...



সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৭"]


৫.৫.৫ হরি-হর

খ্রীষ্টপূর্ব শেষ শতাব্দী এবং পরবর্তী দুই শতাব্দীতে আমরা হিন্দু ধর্মের ভাগবত এবং শৈব দুই শাখারই সুস্পষ্ট অস্তিত্ব দেখেছি।  ভাগবত শাখার প্রধান দেবতা বিষ্ণু, যাঁর আরেক নাম হরি। এবং শৈব শাখার প্রধান দেবতা শিব, যাঁর আরেক নাম হর। প্রাথমিক পর্যায়ে এই দুই শাখার মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও কিছুটা রেষারেষি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতার আভাস পাওয়া যায় পুরাণগুলিতে। যেমন বিষ্ণু-মহিমার পুরাণগুলিতে, বিষ্ণুকেই পরমব্রহ্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং অন্যান্যরা তাঁর তুলনায় কিছুটা হলেও গৌণ।

যেমন শ্রীমদ্ভাগবতের সৃষ্টিতত্ত্বে বলা হয়েছে, যখন এই বিশ্ব একার্ণব[1] জলে নিমগ্ন ছিল, সেই সময় শ্রীনারায়ণ[2] অনন্তশয্যায় যোগনিদ্রায় শুয়ে ছিলেন। তাঁর এই যোগনিদ্রার অর্থ, তাঁর চিৎ-শক্তি মায়া বিরহিত হয়ে, স্বরূপানন্দে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বিরাজ করছিল। যোগনিদ্রায় সহস্র চতুর্যুগ পরিমিত কাল পার হওয়ার পর কালশক্তির প্রভাবে তিনি সৃষ্টিক্রিয়ায় নিযুক্ত হলেন। প্রলয়ের সময় সমস্ত লোকসকল সূক্ষ্মভাবে তাঁর শরীরেই লীন হয়ে থাকে, এখন সেই সূক্ষ্মতত্ত্ব তাঁর নাভি থেকে পদ্মকোষের আকারে উঠে এল। সেই পদ্মকোষেই আবির্ভাব হল বেদময় ব্রহ্মার। তিনি সেই পদ্মাসনে বসে, চতুর্মুখে চারদিক নিরীক্ষণ করেও কোন ভুবন বা জগৎ দেখতে পেলেন না। তিনি বিস্মিত হয়ে চিন্তা করলেন, এই পদ্মের কোথা থেকে সৃষ্টি হল? তিনি বহু কাল অন্বেষণ করেও, এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি সেই পদ্মাসনে যোগসমাধিতে প্রবৃত্ত হলেন।

দীর্ঘ শত বৎসর পর তাঁর যোগ সম্পন্ন হলে, তিনি নিজের হৃদয়ে উপলব্ধি করলেন, এক পুরুষ শেষনাগের শয্যায় এবং অনন্তনাগের সহস্রফণার আচ্ছাদনে, প্রলয়-জলের উপরে শুয়ে আছেন। তাঁরই নাভি থেকে সৃষ্ট পদ্মের উপর তিনি বসে আছেন। এবার ব্রহ্মা তাঁকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন এবং বুঝতে পারলেন ভগবান হরির লোকসৃষ্টির ইচ্ছাতেই, এই নাভিপদ্ম এবং তিনি সৃষ্ট হয়েছেন। ব্রহ্মা এবার একনিষ্ঠ মনে ভগবানের স্তব শুরু করলেন। দীর্ঘ তপস্যার পর, প্রকৃতি ও পুরুষের অধিপতি পদ্মনাভ শ্রীহরি, ব্রহ্মাকে সৃষ্টির তত্ত্ব সকল বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন, “তুমি আমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছ, অতএব তুমিও জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়াশক্তির আধার। তুমি সর্ববেদময়। অতএব পূর্বকল্পের মতো সমগ্র ত্রিলোক, যা এখন আমার মধ্যেই নিহিত আছে, সেই সব আবার সৃজন কর এবং প্রকাশ কর”। এরপর পদ্মনাভ ভগবান শ্রী নারায়ণ রূপে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (শ্রীমদ্ভাগবত/৮, ৯)।

শিব-মহিমা বর্ণিত লিঙ্গপুরাণের কাহিনী মূলতঃ একই, কিন্তু সেখানে অদ্ভূত এক মোচড় আছে, সেটাই লক্ষ্য করার বিষয়। সেখানে বলা হয়েছে, পাদ্ম-কল্পের শুরুতে এই জগৎ অতি ভয়ংকর ও অন্ধকারময় বিভাগশূণ্য একার্ণব ছিল। সেই একার্ণব জগতে একমাত্র প্রভু হরি সহস্রফণাবিশিষ্ট অনন্তনাগের দেহ-শয্যায় অনির্বচনীয় যোগ আশ্রয় করে শুয়ে ছিলেন। অনন্তশয্যায় শয়ান জগৎকারণ বিষ্ণু খেলাচ্ছলে নিজের নাভিদেশে একটি পুষ্কর সৃষ্টি করলেন, সেই পদ্ম শতযোজন বিস্তীর্ণ। এই সময় সেখানে উপস্থিত হলেন চতুর্মুখ ব্রহ্মা, তিনি সুগন্ধি দিব্যপদ্ম নিয়ে খেলায় নিরত দিব্য পুরুষকে দেখে বিস্মিত হলেন, এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সৌম্য, আপনি কে? জলের মধ্যে অনন্ত শয্যায় শুয়ে আছেন কেন?” তখন বিস্মিত ভগবান অচ্যুত হরি শয্যা থেকে উঠে বসলেন এবং বললেন, “আমি জগন্নিবাস, প্রতি কল্পেই আমার এই আশ্রয়। আমিই স্বর্গ ও পৃথিবী; আমিই পৃথিবীর পরমস্থান। কিন্তু তুমি কে? তুমি কোথা থেকে আমার কাছে এলে, যাবেই বা কোথায়? তোমার আশ্রয় কোথায়?” ভগবান হরি এই কথা বলায়, পিতামহ তাঁকে বললেন, “শম্ভুর মায়ায় মুগ্ধ হয়ে আমি আপনাকে চিনতে পারিনি, আপনিও আমায় চিনতে পারেননি। আপনি যেমন সৃষ্টিকর্তা ও প্রজাপতি, আমিও তেমনই সৃষ্টিকর্তা ও প্রজাপতি”।

দুজনের এই রকম নানান কথোপকথনের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হলেন শূলপাণি মহাদেব, তিনি অনন্তশয্যার কাছে উপস্থিত হলেন। তাঁর পায়ের আঘাতে সমুদ্রের বিক্ষিপ্ত জলকণা হয়ে উঠল মেঘ, স্থির বাতাসও হয়ে উঠল চঞ্চল বহমান। ভগবান ভবকে সামনে দেখে বিষ্ণু বললেন, “আপনার পদভারে সমুদ্রের জল থেকে আকাশমণ্ডলে জলধর সৃষ্টি হয়েছে। ঘ্রাণজ-বায়ু স্পন্দিত হয়ে উঠেছে। আপনি অনাদি অন্তকৃৎ[3] ও প্রভু, আপনিই ঈশ্বর। আমি আপনার স্তব ও উপাসনা করি। আপনিই মহাযোগের ইন্ধন, আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম ও বরদাতা, এই জগতের হেতু। আপনি পুরাণপুরুষ ও অব্যয়। আপনিই বীজবান, ব্রহ্মাই বীজ, আমি যোনি ও সনাতন”। বিষ্ণুর এই স্তববাক্য শুনে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যোনি, আমি বীজ, মহেশ্বর বীজবান– এই বিষয়ে আমার সংশয় হচ্ছে, হে বিষ্ণু, তুমি আমার সংশয় দূর কর”। বিষ্ণু বললেন, “আত্মা দুই প্রকার – নির্গুণ ও সগুণ, এর মধ্যে নির্গুণ আত্মা অব্যক্ত এবং সগুণ আত্মাই মহেশ্বর। হে ব্রহ্মা, মহেশ্বরের লিঙ্গ থেকে উৎপন্ন প্রথম বীজ তুমি। বীজস্বরূপ তুমিই আমার যোনিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, কালপর্যায়ে হিরণ্ময় অণ্ড জন্ম নিয়েছিল। জলের মধ্যেই অধিষ্ঠিত সেই অণ্ড সহস্র বছর পর দুইভাগে বিভক্ত হল, উপরের খণ্ড হল স্বর্গ, এবং অন্য খণ্ড হল পৃথিবী। এইভাবেই জগতের সৃষ্টি সম্পাদন হয়”। (লিঙ্গপুরাণ/২০)

দুই পুরাণের সৃষ্টি কাহিনী থেকে স্পষ্টতঃই অনুমান করা যায়,

১. শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের রচনাকাল লিঙ্গপুরাণের অনেকটাই আগে। ভাগবত পুরাণের সৃষ্টিতত্ত্বে বিষ্ণুই পরমেশ্বর, ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ সৃষ্টিকর্তা। মহেশ্বরের কোন উল্লেখই নেই। লিঙ্গপুরাণ যখন রচনা করা হয়েছিল, সেসময় আগের পুরাণটি যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচারিত হয়ে গেছে। সে কারণেই লিঙ্গপুরাণের পুরাণকারকে, ভাগবত পুরাণের বিষ্ণু ও ব্রহ্মার কাহিনী-কাঠামোর মধ্যে মহেশ্বরকে অনুপ্রবেশ করাতে হয়েছে।

২.  লিঙ্গপুরাণ রচনার আগেই বিষ্ণু পুরুষোত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন, অতএব লিঙ্গপুরাণে সেই বিষ্ণুকে দিয়েই বলাতে হয়েছে, মহেশ্বর পুরুষোত্তম এবং বিষ্ণু ও ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ।

অতএব এমত পরিস্থিতিতে সমাজে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভাগবতদের সঙ্গে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া শৈবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘটতে থাকা খুবই স্বাভাবিক। এই কারণেই এই পর্যায়ের শৈবরা বেশ কয়েকবার ভয়ংকর আগ্রাসী হয়ে উঠেছিলেন এবং সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে তাঁদের “রুদ্র-ভৈরব”-আতঙ্কের একটা আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে অজস্র অসুর, দৈত্য, রাক্ষস, নর নিধনের কাহিনী থাকা সত্ত্বেও, মানুষের মনে কোনদিনই তাঁর যোদ্ধা ইমেজ গড়ে ওঠেনি, অথচ গুটিকয়েক অসুর নিধন করে, মহেশ্বর রূদ্র যোদ্ধারূপে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। অতএব বুঝতে অসুবিধে হয় না, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেতে ভাগবতদের তুলনায় শৈবদের অনেকবেশি আগ্রাসী হতে হয়েছিল, সেই স্মৃতিই সাধারণের মনে শিবের রুদ্ররূপটি গেঁথে দিয়েছে। 

যদিচ হরি ও  হর ভক্ত গোষ্ঠীদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সম্ভবতঃ কোনদিনই ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ছোটখাটো বিবাদ ও সংঘর্ষের ঘটনা লেগেই থাকত। যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বের অবসান করেছিলেন যুগপুরুষ শঙ্করাচার্য। মূলতঃ তাঁর প্রচেষ্টাতেই হরি ও হর প্রায় অভিন্ন দেবতা হরি-হর আত্মারূপে হিন্দু ভক্তদের মনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনিই হিন্দুধর্মের গঠন সম্পূর্ণ এবং সম্পন্ন করলেন, যার মূল তত্ত্ব আজও হিন্দু সমাজে একইভাবে প্রবহমান। সেকথা সংক্ষেপে আসবে একটু পরেই।



[1] একার্ণব–এক+অর্ণব - গোটা পৃথিবী একটিমাত্র সমুদ্রের জলে ডুবে ছিল।

[2] নারায়ণ – নার মানে জল, আর অয়ণ মানে আশ্রয় – একার্ণব জলের মধ্যে তিনিই একমাত্র আশ্রয় বলে, তাঁর নাম নারায়ণ।

[3] অন্তকৃৎ - অন্তকারক, নাশক । “অনাদি অন্তকৃৎ” - যাঁর শুরু নেই অথচ যিনি প্রলয়কারী বিনাশক – অর্থাৎ ভগবান মহাদেব।

চলবে...

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

খুঁজে ফিরি - পর্ব ১

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



অন্যান্য রম্য রচনা - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


১

১৯৮৪ সালের একটা ডেট মনে করার চেষ্টা করে চলেছি বেশ কয়েকদিন। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না দেখে কড়া নাড়লাম, উইকির দরজায়। উইকি বাড়ি আছো? সাড়া পেলাম, এবং উইকি বলল, 

“১৯৮৪ সালে এই দেশে আমাদের মনে রাখার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল।

১২ই মার্চ – আজকের সুগায়িকা অত্যন্ত জনপ্রিয়া শ্রেয়া ঘোষালের জন্মদিন, আজ প্রায় বছর কুড়ি ধরে যিনি আপামর ভারতীয় সঙ্গীতরসিকের হৃদয়ে বিরাজ করছেন।

২রা এপ্রিল - স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মার মহাকাশ যাত্রা।

২৩শে মে – শ্রীমতি বাচেন্দ্রি পাল প্রথম ভারতীয় মহিলা অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেছিলেন।

৪ঠা জুন – ভারতীয় সেনা অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অপারেশন ব্লু স্টার শুরু করেছিল।

৭ই জুলাই – দূরদর্শনে অশোককুমার অভিনীত “হামলোগ” সিরিয়াল শুরু হয়েছিল। বেশ কয়েকবছর ধরে একটানা চলা এই সিরিয়ালটি সে সময় ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

৮ই আগস্ট – মাত্র ১/১০০ সেকেণ্ড পিছিয়ে থাকার জন্যে পি টি ঊষাকে অলিম্পিকের মেডেল হারাতে হয়েছিল।

২৪শে আগস্ট – ভারতে প্রথম ৩ডি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল, মালায়লী ভাষায় ছোটদের জন্যে বানানো এই সিনেমার নাম - My Dear Kuttichathan।

২৪শে অক্টোবর – ভারত তো বটেই, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মেট্রো রেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতায়, ভবানীপুর থেকে এসপ্ল্যানেড।

২৭শে অক্টোবর – ভারতের অন্যতম সেরা পেস বোলার ইরফান পাঠানের জন্মদিন। বড় হয়ে ওই তরুণ ইরফান বল করতে এলে বহু বিরোধীপক্ষীয় ব্যাটারের মুখ শুকিয়ে যেতে।   

৩১শে অক্টোবর – নিজেরই দুই নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে নিহত হলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছিল শিখ নিধন যজ্ঞের বীভৎস তাণ্ডব।  

৩রা ডিসেম্বর – ভূপাল গ্যাস-লিক ট্র্যাজেডি – ইউনিয়ন কার্বাইডে মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস লিক হওয়ার কারণে বহু মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের অসুস্থ হয়ে পড়া ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া।

 কিন্তু যে তারিখটি আমি খুঁজছিলাম সেটা পেলাম না। সঠিক তারিখের সন্ধান না পেলেও, এটা স্বীকার করতে কোন বাধা নেই – এই বছরটি আমাদের দেশের পক্ষে – সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে আমাদের ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়া জগতের পক্ষেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার মতো ম্যাংগো-মানুষের কথা উইকির স্মরণ করার দায় থাকতে পারে না। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পরিসরে এই বছরটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমার পরবর্তী জীবনে এর প্রভাব অপরিসীম।

প্রথমটি হল আমার কর্মজীবনে প্রথম রাখা। সম্ভবতঃ তারিখটি ছিল ১৯৮৪-র ২৩ বা ২৪শে ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ইন্টারভিউ দেওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যেই হাতে পেয়েছিলাম আমার নিয়োগপত্রটি। সেই অনুভূতি আজও আমার মনে অম্লান। এরপর আমার জয়েনিং ডেট ছিল পয়লা মার্চ, ১৯৮৪ – সেদিনটাও আমার কাছে ছিল এক আশ্চর্য স্বপ্নপূরণের দিন।

আর দ্বিতীয়টি হল আমার মাতৃবিয়োগ – ৪ঠা ডিসেম্বর সকালে নিত্যপূজা সেরে নিজের জন্যে এক কাপ চা বানাতে গিয়ে তিনি কেরোসিন স্টোভ বার্স্ট করে দগ্ধ হয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তাঁকে পিজি হসপিট্যালে ভর্তি করানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাক্তারদের মতামত ছিল – মোর দ্যান ৮৫% বার্ন ইনজুরি, এক ঈশ্বর ছাড়া এ মানুষকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। দুদিন পর ৬ই ডিসেম্বর, তিনি বিকেলের দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যুর অভিঘাত আজও আমি বহন করে চলেছি প্রতি নিয়ত। জীবনের অজস্র সাফল্য, আনন্দ কিংবা আনুকূল্যের দিনে তাঁর অনুপস্থিতি যেমন অনুভব করেছি। তেমনই জীবনের প্রতিটি ব্যর্থ, বেদনা এবং প্রবঞ্চনার দিনে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে করেছি, তুমি যদি থাকতে....”।

প্রতিটি দিন গুনতে গুনতে আজ এগিয়ে চলেছি মহামুক্তির দিকে। কিন্তু যাওয়ার আগে আজ এটুকু বুঝেছি - মন্দিরের দেববিগ্রহে ঈশ্বর থাকেন না, কোনদিনই ছিলেন না। তিনি আমাদেরই পাশে থাকেন - মাতৃ ও পিতৃরূপে - কখনো প্রকাশ্যে কখনো অন্তরে।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৭

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রা...