সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৮"


২৯

 

সুনুদা,

 প্রথমেই তোমাকে একটা চিঠি পড়াই। আমার পুত্রের লেখা প্রথম চিঠি তার মাকে,

 “আমি ভালো আছি, মা। আমার জন্যে চিন্তা করবে না। আমার থাকা-খাওয়াতে একদম কষ্ট হচ্ছে না। লেখাপড়াও মন দিয়ে করছি। টিচাররা খুব ভাল, বেশ সুন্দর পড়ায়। সদাশিবস্যার আমার অঙ্ক খাতায় তিনদিন ভেরিগুড লিখে দিয়েছে। দিদিমার দেওয়া আচারটা আমার সাতজন বন্ধু মিলে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। ওদের খুব ভালো লেগেছে আচারটা। তুমি আসার সময় আরেকটা আচার নিয়ে এসো। দাদু কেমন আছে? দাদু-দিদিমাকে আমার প্রণাম দিও। তুমিও আমার প্রণাম নিও।

ইতি বাম্বাই”।

 কার্সিয়াং থেকে ফেরার দিন দশ পরে চিঠিটা বাড়ি পৌঁছেছিল। প্রথমে পড়েছিলেন মা। তারপর বাবাকে চিঠিটা পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমি সন্ধ্যের সময় বাড়ি ফিরতে আমার হাতে চিঠিটা পড়তে দিয়ে বললেন, “বাম্বাই সোনা কি সুন্দর চিঠি লিখেছে পড়ে দেখ। তোকে তখনই বলেছিলাম, দু বোতল আচার নিয়ে যা। কথা শুনলি না। এক বোতল আচার ওর বন্ধুরাই খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। বেচারা এখন কি খাবে?”

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর তাঁর কথা শুনে আমি বেশ খুশিই হলাম। অনেকদিন পর মাকে বেশ স্বাভাবিক লাগল। মায়ের সেই রুক্ষ-খিটখিটে মেজাজটা তখন অনেকটাই শান্ত। বাম্বাইয়ের চিঠিটা বুকের কাছে ধরে, আমি আমার ঘরের দিকে যেতে যেতে হেসে বলেছিলাম, “বেশ তো এবার তিন বোতল দিও, দিয়ে আসব”।

“কবে যাবি তুই?”

“তিন মাস পর”।

“তিন মাস? সে তো অনেক দেরি। কেন সামনের হপ্তায় শনি-রবি করে যেতে পারবি না? ছেলেটার ওপর তোর কি একটুও টান নেই? কেমন মা তুই, সুনু?” মায়ের স্বর আগের মতোই আবার কর্কশ হয়ে উঠল।

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, “এটা স্কুলের নিয়ম, মা। আমার কিছু করার নেই। বাড়ির লোকরা বারবার গেলে বাচ্চাদের মন চঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ভেবেই, ওরা এই নিয়ম বানিয়েছে”।

মা বুঝলেন না, উল্টে আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রয়োজন মত ছেলের সঙ্গে মা দেখা করতে যেতে পারবে না? আর মা বুঝি বাড়ির লোক? কী যে বলিস সুনু, তোর মাথা-ফাথা খারাপ হয়েছে মনে হয়”।

আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চিঠিটা দু হাতে মেলে ধরলাম। মনে হল, বাম্বাইয়ের দুটো হাত যেন আমার দু হাতের মুঠোয়। টেবিলে বসে ঘাড় নীচু করে চিঠিটা যে হাতে লিখেছে, সেই হাতেরই স্পর্শ আমি যেন পেলাম ওর চিঠির প্রতিটি অক্ষরে। কিন্তু প্রতিটি অক্ষর কেমন ঝাপসা ঠেকল আমার দু চোখে। এমন অসময়েই কি আমার দুচোখে ভরে উঠতে হয় অশ্রুবিন্দুতে? মাথার বালিশের তলায় চিঠিটা রেখে দিলাম। ফ্রেশ হয়ে বাইরের জামা-কাপড় বদলে চলে গেলাম বাবার পাশটিতে। বাবা চোখ তুলে তাকালেন, তাঁর মুখটা হাসির প্রচেষ্টায় কিছুটা বেঁকে গেল। খুব শান্ত স্বরে বললেন, “ছেলেটা ভালই আছে, বল?”

রাত্রে খাওয়ার দাওয়ার পর নিজের ঘরে যখন শুতে গেলাম, বালিশের তলা থেকে নিশ্চিন্তে বের করলাম বাম্বাইয়ের চিঠিটা। খুব মন দিয়ে পড়লাম চিঠিটা। আগেকার বাংলা সিনেমায় যেমন দেখাত, চিঠির মধ্যেই ফুটে উঠত লেখকের মুখ এবং তিনিই সুন্দর আবৃত্তি করে পড়ে দিতেন চিঠিটা। আমার মনে হল, আমিও সেরকম পোস্টকার্ডের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিলাম বাম্বাইয়ের মুখখানি এবং সেই যেন পড়ে শোনাল চিঠিটা। অনেকবার পড়লাম চিঠিটা – এবং ওই ছোট্ট চিঠিতেও যেন খুঁজে পেলাম ওর জীবনের কিছু কিছু পরিবর্তনের শুভ সূচনা। ওর অঙ্কের স্যার সদাশিববাবুকে ও ভালবেসে ফেলেছে – তিনি শুধু যে ভালো পড়ান তাই নয়, অঙ্ক ঠিকঠাক পারলে, খাতায় “ভেরিগুড” লিখে ছাত্রদের উৎসাহও দেন। ওর নতুন বন্ধুদের সঙ্গেও বাম্বাই অনেকটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছে। তা নাহলে ওর আচারে তারা নির্দ্বিধায় ভাগ বসাত না। চিঠিটা বারবার পড়েও তৃপ্তি হচ্ছিল না কিছুতেই। মনে হচ্ছিল, চিঠিটার বিটুইন দ্য লাইন্‌স্‌ অনেক কিছু বোঝার আছে, উপলব্ধির আছে। সেই অর্থ বুঝতে বুঝতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানতেও পারিনি।

সকালে ঘুম যখন ভাঙল, নিজেকে খুব চাঙ্গা আর হাল্কা অনুভব করলাম। এমন গভীর ঘুম কত দিন যে ঘুমোইনি। আমার শরীরে ও মনে বাম্বাইয়ের ওই ছোট্ট চিঠিটাই যে নতুন এনার্জি সঞ্চার করেছে, বেশ বুঝতে পারলাম। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে, বাম্বাইয়ের চিঠির উত্তর লিখতে বসলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর না দিলে, ও যদি অভিমান করে, ভাবে, “মা কি এতই ব্যস্ত যে আমার চিঠির উত্তর দিতে পারল না?” আমার যে এমন চিঠি অনেক অনেক চাই, প্রতি সপ্তাহে, অন্ততঃ একটা! অতএব নিজের স্বার্থেই আমার যে বিলম্বে উত্তর দেওয়া চলবে না।

অফিসে গিয়েই আমাদের অফিসের পিওন রতনদাকে চিঠিটা পোস্ট করতে পাঠালাম। পাড়ার ডাকবাক্সে নয়, সবথেকে কাছের পোস্ট-অফিসের মেলবক্সে।

তারপর আমাদের এইচআরের রজতকে ডাকলাম। তাকে বললাম, যে ক্যুরিয়ার সার্ভিসে আমাদের রেগুলার চিঠিপত্র যায়, তাদের কি কার্সিয়াংয়েও সার্ভিস আছে? জেনে নাও তো ভাই। আর যদি থাকে, তারা কি কাচের বোতলে আচার পাঠালে ডেলিভারি করতে পারে? যদি না পারে, তাহলে অন্য উপায় কিছু আছে কি?

রজত খুব স্মার্ট ছেলে, এতটুকু চিন্তা না করে উত্তর দিল, “ক্যুরিয়রের সঙ্গে কথা আমি বলে নিচ্ছি। কিন্তু তার থেকেও তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেবে ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ির বাস সার্ভিস। আজ বিকেলে ধর্মতলায় পার্সেল ডেলিভারি দিলে, আগামীকাল বিকেলের মধ্যে কার্সিয়াং পোঁছে যাবে নিশ্চিন্তে”।      

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এরকম হয় নাকি?”

রজত মুখে বোদ্ধার মতো হাসি নিয়ে বলেছিল, “এই তো করছি আমরা, ম্যাডাম। উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, নর্থ বেঙ্গল, আপটু গুয়াহাটি - বাস সার্ভিসের মতো প্রম্পট আর হেল্পফুল সার্ভিস আর কিছু হয় না”।

যাই হোক ওই ব্যবস্থাতেই বাম্বাই ও তার বন্ধুরা, দিদিমার আচারের স্বাদ পেতে লাগল নিয়মিত এবং মা তাঁর নাতির জন্যে কিছু একটা করতে পেরে বেশ খুশিই হয়ে উঠলেন।

 তিনমাস পূর্ণ হওয়ার প্রথমদিনেই আমি মাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম কার্সিয়াংয়ের উদ্দেশে। ওইসময় বাবাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে। এই পরামর্শটা আমাকে চুপিচুপি দিয়েছিলেন তোমার মা। মামিমা। বলেছিলেন, “যাওয়া-আসা নিয়ে খুব জোর তিন চারদিনের ব্যাপার, মা কে সঙ্গে নিয়ে যা সুনু। তোর মায়ের সঙ্গে তার নাতির দেখাও হবে, দেখা হবে বাম্বাইয়ের স্কুল, তার পরিবেশ। আর দু একদিন বেশি থেকে দারজিলিং, টাইগার হিল, এসবও ঘুরিয়ে আনতে পারিস। তোর মায়ের মনটা কিছুটা হাল্কা হবে। একভাবে ঘরে বন্দী হয়ে থাকে, দিন রাত তোর বাবার সেবায় ব্যস্ত। একমাত্র রিলিফ ছিল বাম্বাই, সেও চলে গেল কার্সিয়াং। বেচারা খিটখিটে হবে না কেন, আমাকে বুঝিয়ে বল তো?”

হোটেলে লটবহর রেখে আমরা স্কুলে গিয়ে যখন দেখা করলাম, সাড়ে চারটে বাজে - তখনও সূর্য অস্ত যায়নি। বিকেলের রোদে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতায় মোড়া চারপাশের পাহাড়ের চূড়াগুলো আশ্চর্য সুন্দর। আর নীচের পাইন বন থেকে উঠে আসছে হালকা কুয়াশা। আমাদের গায়ে হাল্কা সোয়েটার ছিল, শিরশিরে বাতাসের স্পর্শে পাচ্ছিলাম শীতলতার আমেজ। মাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “জায়গাটা কেমন লাগছে, মা?”

মুগ্ধ চোখে চারদিক দেখতে দেখতে মা বললেন, “এ তো স্বর্গ রে। ভাল করেছিস, তুই বাম্বাইসোনাকে এখানে পাঠিয়ে। আমি ভেবেছিলাম, জেলখানায় কয়েদিদের মতো বন্দী বুঝি”।

অ্যাডমিন অফিসের সামনের লনের দুধ সাদা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে মিনিট পনের অপেক্ষার পরই বাম্বাইয়ের গলা পেলাম – “মা...দিদিমা...”। দৌড়ে আসছে আমাদের দিকে। কলকাতায় থাকতে কেমন যেন চুপচাপ, ভীতুভীতু হয়ে থাকত বাম্বাই। তিনমাসের অদর্শনে আমার তৃষিত মাতৃত্বের চোখ দুটো যেন সার্থক হয়ে উঠেছিল সেদিন। কি প্রাণোচ্ছল, আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ছেলেটা। সঙ্কোচহীন আনন্দ ওর দুই চোখে। কাছে এসে আমাদের দুজনকেই জড়িয়ে ধরল। মা তো ওকে নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। চুমো খাচ্ছিলেন, আদর করছিলেন, অনর্গল বলছিলেন “আমার সোনাবাবাটা, আমার সোনাবাবাটা। এই তিনমাসেই কত বড়ো হয়ে গেছে আমার বাবাটা”।

সে সময় মামিমার কথা মনে পড়ছিল খুব। মামিমা না বললে এবং তিনি আমার বাবার দেখভালের দায়িত্ব না নিলে, মাকে সঙ্গে আনার কথাটা আমার মাথাতেই আসত না। আর এখন আমি দুচোখ ভরে দেখছি – মা আর তাঁর নাতির প্রাণখোলা আনন্দের প্রকাশ। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। কার্সিয়াংয়ের এই সন্ধ্যেয় সুন্দর সবুজ লনের বেঞ্চে বসে আছি আমরা তিন প্রজন্ম। মাঝের প্রজন্মের এই আমি – অন্য দুই প্রজন্মের আলাপ শুনে খুশিতে আনন্দে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। বাম্বাইকে দেখে ভালো লাগছিল তো বটেই, ভালো লাগছিল মাকে দেখেও। বহুদিন ঘড়ি ধরে স্বামীর সেবা, পথ্য, ওষুধ-পত্র নিয়ে ডুবে থাকা মা, অতি শীর্ণ নদীর মতোই নিষ্প্রাণ প্রাণটাকে বয়ে চলেছিলেন নিঃশব্দে। আজ সেই নদীতেই দুকূল ভাসানো আবেগ মাখা প্রাণবন্ত জোয়ার।

কোথা দিয়ে যে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বোঝাই গেল না। অফিস থেকে একজন মহিলা আমাদের ডেকে বললেন, “টাইম ইজ আপ। ছটা বেজে গেছে। সুধন্বা তোমার রুমে চলে যাও। আপনারা কালকেও রয়েছেন তো?”

আমি বললাম, “কাল তো রোববার, কাল কি সুধন্বাকে নিয়ে আমরা দার্জিলিং শহরটা ঘুরে আসতে পারি?”

“নিশ্চয়ই পারেন – কিন্তু সকাল নটা থেকে সন্ধ্যে ছটা। ছটা পনের পর্যন্ত না ফিরলে কিন্তু প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে রিপোর্ট চলে যাবে। তাতে নেক্সট ভিজিটের সময় আপনাদেরই অসুবিধে হবে”।

আমি বিনীতভাবে প্রমিস করলাম, “ছটার আগেই আমরা সুধন্বকে নিয়ে ফিরে আসব ম্যাডাম”।

সত্যি বলতে, সুনুদা, এই কবছরে বাম্বাইয়ের জন্যে কার্সিয়াং গিয়েছি বহুবার। এরকম দেখা করতে। কিংবা ওর স্কুলের ভেকেশনের সময় ওকে বাড়ি আনতে। বহুবার। কিন্তু সেই প্রথমবারে যে আনন্দ আর আশ্চর্য এক স্বস্তির আস্বাদ পেয়েছিলাম, পরে আর কোনদিন অনুভব করিনি। মাত্র ওই কয়েকটা দিন আমার জীবন-স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। থেকেও যাবে আমৃত্যু।

সমপরিমাণ দুঃখ আর সুখ মিলিয়ে-মিশিয়ে গড়ে নিতে হয় আমাদের জীবনের সবটুকু, আজ এই কথাটা বুঝে গিয়েছে,

তোমার কনি। 

চলবে...  

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১০

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

৩০শে জুলাই, ২০২৬, রবিবার সকাল, নটা পনের

 প্রবীণবাবু আর নবীনবাবু ছাড়া, জলখাবারে সবার পাতেই লুচি পড়ল। প্রবীণবাবুদের ডাক্তারের নিষেধ আছে, ওঁনারা রুটি খান।  

অবিনবাবু লুচি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, “কতদিন পরে গরম গরম লুচি খাচ্ছি। তা তোরা লুচি খাস না কেন?”

প্রবীণবাবু বললেন, “এই বয়েসে ভাজাভুজি খেতে সব ডাক্তারই মানা করেন...”।

প্রবীণবাবুর কথা শেষ হবার আগেই অবিনবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “এ আবার কী? এ লুচি ঘিয়ে ভাজা নয়? কিসে ভাজা হয়েছে, ছ্যা, ছ্যা, কি বিটকেল গন্ধ...”। তিনি আলুচচ্চড়ি দিয়ে সবে লুচির প্রথম টুকরোটা মুখে তুলেছিলেন।

তিৎলি পাশেই দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছিল, অবাক হয়ে বলল, “কেন সাদা তেল দিয়ে ভাজা হয়েছে। আপনি খান না”?

অবিনবাবু বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, “তেল দিয়ে লুচি ভাজা হয়? কি তেল নারকেল না সরষের তেল? সাদা তেলটা কী বস্তু?”

নবীনবাবু বললেন, “সাদা তেল মানে সূর্যমুখী তেল, সান ফ্লাওয়ার অয়েল। এখন এটাই তো চলে...”।

অবিনবাবু দুহাতে ঠেলে প্লেট সরিয়ে দিলেন, বললেন, “আমাকে বরং ওই রুটিই দাও দুখানা... এ লুচি নিয়ে যাও মা। আমাদের বাগানে প্রচুর সূর্যমুখী ফুল হত। সেই ফুল দিয়ে যে তেল হয়, আর সেই তেলে যে লুচি ভাজা হবে – একথা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি। তোরা ঘি খাস না কেন?”

নবীনবাবু বললেন, “একে তো ঘিয়ের আকাশ ছোঁয়া দাম। তার ওপর ডাক্তারদের কড়া বিধান ঘি খেলে কোলেস্টোরল বাড়ে! হার্টের অসুখ করে।”

তিৎলি নতুন প্লেটে দুটো রুটি আর আলু চচ্চড়ি দিতে অবিনবাবু খেতে শুরু করলেন, তারপর বেশ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বাপ-মায়ের কোলে ওঠে, ঘি খেলে তোদের কোলে কী ওঠে বললি?”

নবীনবাবু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন, “কোলেস্টোরল, মেডিক্যাল টার্ম”।

অবিনবাবু বললেন, “জানি না, বাপু – তোদের এ কোল কোন কোল। তবে ছোটবেলায় মা ঠাকুমাদের মুখে শুনেছি – মাংসে মাংস বৃদ্ধি ঘৃতে বৃদ্ধি বল আর দুধে লাবণ্য বৃদ্ধি, শাকে বৃদ্ধি মল। বেশ বুঝতে পারছি তোরা আমাদের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছিস। অনেক উন্নতি করেছিস। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে...বেশ...”। কথা শেষ না করে অবিনবাবু সবার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ব্যাঁকা হাসি হাসলেন, তারপর বললেন, “ছোট ছোট বাড়ি, ছোট ছোট গাড়ি...খাওয়াদাওয়াও তথৈবচ...” তারপর অহীন আর সর্বজিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই অখাদ্য লুচি তোরা তো বেশ তরিবত করে খাচ্ছিস দেখছি!”

সর্বজিৎ বোন তিৎলিকে বলল, “তিৎলি, আরও দুটো লুচি দে তো। বিনুদা, মা ঠাকুমাদের কাছে আরেকটি কথা শোননি? শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়”?

অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কি? এসব কথা তোরাও জানিস?”

সর্বজিৎ বলল, “জানি বৈকি, এই তিৎলির মা – আমার মাসিমা, এইসব প্রবচনের আকর বিশেষ। তোমার ওই মাংস, ঘি, নিয়ে প্রবচনের মধ্যে, খাদ্য হিসেবে মাংসটা আমরা এখন বাড়াবাড়ি রকমের বাড়িয়ে ফেলেছি। অন্যদিকে মুগ বা অড়হর ডালে, কিংবা পুজোর ভোগের খিচুড়িতে - একটু-আধটু ঘিয়ের ছিটে দিয়েই আমাদের কাজ মিটে যায়। ঘিয়ের বদলে এসেছে এই সাদা তেল। তোমার অভ্যেস নেই, তাই একটু আজব গন্ধ লাগছে। আমাদের কিন্তু ভালই লাগে”। তার পর মুচকি হেসে বলল, “শরীরে যা সওয়াবে, তাই সইবে গো, বিনুদা”।          

 এর পর আর কোন কথা বলল না কেউ। মাথা নীচু করে সবাই খেতে লাগল। অবিনবাবু সামান্য শ্লাঘা অনুভব করছিলেন। ভারত স্বাধীন হয়েছে। অনেক যন্ত্রপাতি হয়েছে। ঘরে ঘরে আলো এসেছে, পাখা আছে। দোতলার কলঘরেও জল পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তাঘাট ভাল হয়েছে। এক কথায় প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাপারেই এরা বেশ পিছিয়েও গেছে। মাথা নীচু করে সকলের খাওয়া দেখতে দেখতে তাঁর চোখ পড়ল, দেওয়ালে ঝোলানো কালো রঙের একটা বেশ বড়ো চৌকো চ্যাপটা বাক্সের দিকে। সেটার দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “দেয়ালে ওই বস্তুটা কী, তিৎলি মা? কালো কুচকুচ করছে যখন ছবি বা ফটোর ফ্রেম তো নয় …”।

লুচি নিয়ে অবিনবাবুর কথায় তিৎলি বেশ ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, উত্তর দিল, “ওটা টিভি”।

“সেটা কী বস্তু?”

তিৎলি একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “ওটাতে নাচ, গান, সিনেমা, খেলা, খবর, নানারকমের অনুষ্ঠান দেখা যায়”।

“দেখা যায়? বটে?” অবিনবাবু আবারও অবাক হলেন, তারপর কিছু একটা ভেবে বললেন “অ বুঝেছি, আমাদের কালে বায়োস্কোপ ছিল, সে এখন ঘরের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে? তা কটা থেকে খোলে? কলকাতার হলগুলোতে শুনেছি তিনটে করে শো হত - তিনটে, ছটা, নটা – সেরকম?”

“নাঃ চব্বিশ ঘন্টাই চলে” তিৎলি বলল, “এখন সবাই কাজে ব্যস্ত বলে চালানো হয়নি”।

“এখন চলবে? কই চালাও দেখি”।

তিৎলি টিভির পাশের সুইচটা অন করে এসে, খাবার টেবিলের মাঝখানে রাখা রিমোটটা নিয়ে টিভি চালু করল। “কী দেখবেন বলুন?”

খাওয়া বন্ধ করে অবিনবাবু টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন, বললেন, “আমি তো জানিনা, তুমিই একটা কিছু চালাও না। খবর আছে বলছিলে না? এখন শোনা যাবে – ইয়ে মানে দেখা যাবে?”।

“হুঁ। দেখা যাবে”। তিৎলি একটি বাংলা নিউজ চ্যানেল চালু করল। পর্দায় একটি মেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে, “পথ দুর্ঘটনায় বালকের ভয়ংকর মৃত্যু। আজ সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ পোড়াবটতলার কাছে মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে, বাসের চাকার তলায় পিষে গিয়েছে একটি আট বছরের বালক...গুরুতর আহত হলেও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন বালকের মা...এলাকার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, তাঁরা রাস্তা অবরোধ করেছেন, জ্বালিয়ে দিয়েছেন দুটি বাস... পরস্থিতি অগ্নিগর্ভ... আমাদের প্রতিনিধি সজল হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করে সরাসরি চলে যাব ঘটনাস্থলে”... মেয়েটির ছবি একপাশে সরে গেল, আরেক পাশে ভেসে এল ঘটনাস্থলের ছবি... মেয়েটি বলল, “সজল, ওখানকার কি পরিস্থিতি আমাদের জানাও...”।

অবিনবাবু বললেন, “সকাল সকাল খুবই দুঃখের খবর সন্দেহ নেই...কিন্তু মেয়েটি অমন চেঁচাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেন কারো সঙ্গে ঝগড়া করছে...”

অহীন বলল, “ওটাই এখন খবর বলার ধরন, বিনুদা...ঘটনার অভিঘাতে মেয়েটি উত্তেজিত...”।

অবিনবাবু বললেন, “তাই বুঝি?”                              

 টিভিতে সজলের কণ্ঠ শোনা গেল, “একেবারেই মিতালি, এখানকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। আহত মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, নিহত ছেলেটির মৃতদেহ পুলিশের হাতে তুলে দিতে নারাজ স্থানীয় জনতা...তাদের দাবি অবিলম্বে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের আসতে হবে...এবং তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত হবে...এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি হবে...” মিতালি নামের মেয়েটির ছবি এখন পর্দা জুড়ে, একই রকম উত্তেজিত স্বরে বলল, “এখন নিচ্ছি একটা ছোট্ট বিরতি, সঙ্গে থাকুন...”। শুরু হল বিজ্ঞাপনমালা – এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ছেলেটি কোন নোটবুক মুখস্থ করেছে...কোন স্টিলবার ব্যবহার না করলে ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়বে আপনার প্রিয় বাড়িটি, সকালে চায়ের সঙ্গে কোন বিস্কুট না খেলে দিনটাই মাটি...

অবিনদাদু অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেই খাওয়া শেষ করলেন, বললেন, “তিৎলি মা, এই তোমাদের খবর?”

তিৎলি অবিনদাদুর প্লেটে দুটো সন্দেশ দিতে দিতে বলল, “এই জন্যেই খবরের চ্যানেল আমরা তেমন দেখি না, অকারণ চেঁচামেচি আর অজস্র বিজ্ঞাপন”।

“তাহলে কী দেখ?”

“আমরা তো সিরিয়াল দেখি – সিরিয়ালে এক-একটা ল-অ—ম্বা গল্প একটু একটু করে রোজ দেখায় আর সরুদা অহীনদের পছন্দ খেলা – ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস...”।

“অ, তাহলে দেশ-বিদেশের খবরাখবর?”

তিৎলি নাক কুঁচকে হাসল, বলল, “তেমন দেখা হয় না”।

“খ্যাঁদা, নবু তোরা কী দেখিস?”      

নবীনবাবু খুব সতর্ক হয়ে বললেন, “বাবা আর আমি সময় পাই কোথায়? তাছাড়া বসে বসে টিভি দেখার ধৈর্যও থাকে না। ওরা যখন দেখে, আমরা ওই দু পাঁচমিনিট বসলাম – ওই আর কি?”

“তিৎলি মা, এখনও পর্যন্ত তোমাদের এই একটা জিনিষই বড়ো ভালো লাগল, সন্দেশ – আমাদের কালে এমন সুন্দর - মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়া সন্দেশ খাইনি...”।

তিৎলি উৎসাহে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে আরও দুটো দিই?”

অবিনবাবু হাসলেন, “পাগল হয়েছ মা? এখন আর না। নবু, আমাদের খবরের কাগজ-টাগজ নেওয়া হয় না?  নাকি সেসব উঠে গেছে আজকাল”।

নবীনবাবু আগের মতোই সতর্ক হয়ে বললেন, “না উঠে যায়নি, আছে দু চারখানা – সে একেবারে অখাদ্য – আমরা রাখি না”।

“তার মানে দেশের খবর – বিদেশে কোথায় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে তোদের কোন কৌতূহলই নেই? আজব ব্যাপার তো! আমাদের সময় সকালের খবরের কাগজে চোখ না বোলালে সারা দিনটাই কেমন পানসে মনে হত”।

অহীনের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে গেল। তারপর বাবার ঘর থেকে সেদিনের খবরের কাগজটা এনে অবিনবাবুর সামনে রেখে বলল, “বিনুদা, এই যে আজকের কাগজ। আজ রবিবার তো...শুধু খবর নয় – অনেক গল্প-প্রবন্ধও আছে”। তারপর বাবাকে বলল, “বিনুদার থেকে আর কত আড়াল করবে, বাবা? আস্তে আস্তে সবকিছুই উনি বুঝতে পারবেন, জানতেও পারবেন...”।

অহীনের অকস্মাৎ এই আচরণে টেবিলে বসা সকলেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এমনকি অবিনবাবু নিজেও। বিজ্ঞাপনের শেষে টিভিতে মিতালি নামের মেয়েটি তারস্বরে বলে যেতে লাগল একই সংবাদ, সজলের সেই একই বক্তব্য...নীরব ঘরের মধ্যে ছড়াতে লাগল আশ্চর্য শব্দ দূষণ।

অবিনবাবু গম্ভীর মুখে অহীনের আনা কাগজটা বাঁহাতে টেনে নিলেন, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে রঙিন বিজ্ঞাপন – কোন এক সয়া তেলের। এই তেলে হার্টের অসুখ সেরে যায়, অনেক ধরনের ভিটামিন জুড়ে স্বাস্থ্য সচেতন এই তেল ছাড়া মানুষের কাছে আজ আর কোন বিকল্প নেই...। তিৎলি বিনুদার পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

 তিৎলি মমতামাখা শান্ত কণ্ঠে বলল, “অহীনের কথায় কিছু মনে করবেন না, বিনুদা”।

অবিনবাবু চোখ তুলে তাকালেন তিৎলির মুখের দিকে, খুব সুন্দরী না হলেও সরল কিন্তু বুদ্ধিমতী তিৎলির চোখদুটি। অবিনবাবু ম্লান হাসলেন, বললেন, “তোমরা আজকাল দেওরকে নাম ধরেই ডাক বুঝি?”

তিৎলি খুব সপ্রতিভ উত্তর দিল, “হ্যাঁ। আজকাল সবাই তো তাই বলে। তাছাড়া প্রপিতামহ-শ্বশুরমশাইকেই যদি “বিনুদা” ডাকতে পারি – তাহলে ভাইয়ের বয়সী দেওরকে নাম ধরে ডাকতে…  ”।

তিৎলির কথা শেষ না হতেই সকলেই হা হা করে হেসে উঠলেন। এমনকি অবিনবাবুও! যাঁকে এতক্ষণ সকলেই ব্যাঁকা বা মুচকি হাসি হাসতে দেখেছেন সকলে।

সবার হাসি থামলে অবিনবাবু হাসি মুখেই বললেন, “বেশ বলেছিস, মা। বৌদিমণি – মানে খ্যাঁদার মাও আমাকে নাম ধরে ডাকতেন... বিনু। তবে অহীনের কথায় আমি কিছু মনে করিনি, মা। বরং বলব সবার মধ্যে, ওই দুই ছোকরাই – অহীন আর সর্বজিৎ - আমার সঙ্গে বেশ স্পষ্ট দ্বিধাহীন ব্যবহার করছে। খ্যাঁদা আর নবুতো আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছে – আমি যেন এই সংসারে অনাহুত”।

প্রবীণবাবু বলে উঠলেন, “কী বলছো ছোটকা? আমরা তোমাকে…”

প্রবীণবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অবিনবাবু বললেন, “ধীরে ধীরে আমিও বুঝছি - তিরাশি বছর সময়টা বড্ডো বেশিই। আমার দেখা জগৎ থেকে হঠাৎ তোদের জগতে এসে পড়ে, আমারই নিজেকে অনাহুত মনে হচ্ছে। অচেনা অজানা আগন্তুক। এই দেখ না, এই খবরের কাগজটা। আমাদের সময়ে কাগজের প্রথম পাতায় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলিই ছাপা হত। আর প্রথমপাতার হেডলাইন মানে – সেটাই হত দিনের প্রধানতম খবর। আজও মনে পড়ে ১৯৩০ সালে – সঠিক তারিখটা মনে নেই - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ করার খবর সেকালের সব কটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বেরিয়েছিল। আমার বয়েস তখন বছর সাতেক – আমার তখনও বোঝার বয়েস হয়নি। কিন্তু বাবা, বড়দা, মেজদা, সেজদা,  পাড়া- প্রতিবেশীর বয়স্ক মানুষদের দেখেছিলাম ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে। অনেকের কাছেই মাস্টারদা হয়ে উঠেছিলেন পূজনীয় নেতা, আবার বেশির ভাগ লোকই বলেছিল “আহম্মক, বোকা – এভাবে লড়ে বৃটিশরাজকে তাড়ানো যাবে?”

অবিনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর আজ দেখছি, কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে তেলের বিজ্ঞাপন – এই তেল দিয়েই তোমরা লুচি ভেজেছিলে না?”

তিৎলি বলল, “ওই তেলে নয় – ওটা সয়া তেল, আমরা খাই সানফ্লাওয়ার মানে সূর্যমুখীর তেল”।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “সয়া ব্যাপারটা কি?”

তিৎলি বলল, “সয়া একধরনের বড়ো বড়ো দানা – ইংরিজিতে সয়া বিন্‌স্‌ বলে, কিছুটা বরবটির দানার সঙ্গে মিল আছে। তার সঙ্গে খুব সম্ভবতঃ পাম তেলও মেশানো হয়”।

অবিনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “যেন খুব কিছু বুঝে ফেললাম। না, মা, সময় লাগবে… সব কিছু বুঝতে অনেকটাই সময় লাগবে। তোমরা সবাই কাজের মানুষ – আমার মতো নিষ্কর্মা লোকের সঙ্গে তোমরা কতক্ষণ থাকবে? যাও, তোমরা নিজের নিজের কাজ করগে’। আমি বরং কাগজটা পড়ি – বুঝতে চেষ্টা করি আজকের সময়টাকে…”।

খাবার ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর, অবিনবাবু পায়ের চটি খুলে চেয়ারেই আসন পিঁড়ি হয়ে বসলেন। তারপর আরাম করে খবরের কাগজের প্রথম দুটি বিজ্ঞাপনের পাতা খুঁটিয়ে পড়লেন। প্রথমটি ছিল স্বাস্থ্যকর সয়া তেলের – যা নিয়ে তাঁর সঙ্গে তিৎলির আগেই কথা হয়েছে। দ্বিতীয় পাতায় বিশাল আবাসন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন। চব্বিশতলা বাড়িগুলির প্রত্যেকটি ঘরের জানালা খুললেই হুড়মুড় করে প্রকৃতি ঢুকে পড়ে। সবুজ অরণ্য, আকাশ, আলো, পাখি, বসন্তের হাওয়া...। আজ সকালেই নার্সিং হোম না প্রাইভেট হসপিটাল থেকে ফেরার পথে, বড় রাস্তার দুপাশে বেশ কয়েকটি উঁচু বাড়ি দেখেছেন। তখন তিনি খেয়াল করেননি ওগুলো কত তলা। এখন চব্বিশ তলা আন্দাজ করার সময় তিনি সেগুলির সঙ্গে তুলনা করছিলেন। এই বাড়িটি দোতলা, তাঁদের পৈতৃক বাড়িটাও দোতলা ছিল। কিন্তু সে বাড়ির ঘরের হাইটগুলো ছিল এই বাড়ির থেকে অনেক উঁচু, দুগুণ তো বটেই – তার বেশি হলেও আশ্চর্য হবেন না। তার তুলনায় চব্বিশ তলা বাড়ি কতটা উঁচু? বুঝতে হবে।

অবিনবাবু তিৎলিকে ডাকলেন, “তিৎলি মা, খুব ব্যস্ত নাকি?”

তিৎলি রান্নাঘরে শাশুড়ির সঙ্গে কাজ করছিল, দৌড়ে এল, বলল, “কী বলছ, বিনুদা?”

“একটা কাগজ আর পেন দিতে পারো, মা? কিছু কিছু জিনিষ লিখে রাখব”।

তিৎলি দৌড়ে দোতলায় গেল। একটা কাগজ আর পেন এনে রাখল অবিনবাবুর সামনে।

চলবে...       

শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৫

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ  স্কন্ধ - পর্ব ৫


ধ্রুবর তপস্যা

এদিকে মধুবনে স্নান করে ধ্রুব সমাহিত হয়ে সমস্ত রাত্রি উপবাসে রইলেন এবং দেবর্ষির উপদেশ মতো শ্রীহরির পরিচর্যা করতে লাগলেন। প্রত্যেক তিন রাত্রি অন্তর শুধুমাত্র দেহধারণের জন্যে ধ্রুব বেল ও কুল জাতীয় ফল খেয়ে শ্রীহরির অর্চনায় একমাস কাটিয়ে দিলেন। দ্বিতীয় মাসে প্রতি ছদিন অন্তর শাকপাতা খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তৃতীয় মাসে প্রতি নদিন অন্তর শুধুমাত্র জলপান করে কাটিয়ে দিলেন। চতুর্থ মাসে প্রতি বারোদিন অন্তর বায়ুভক্ষণ করে সমাধিযোগে ভগবানের ধ্যানে নিরত রইলেন। পঞ্চমমাসে শ্বাসজয় করে রাজপুত্র ধ্রুব একপায়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভগবানের অবিচল ধ্যান করতে লাগলেন। ধ্রুব যখন একপায়ে দাঁড়িয়ে ধ্যানে ডুবে রইলেন, ত্রিভুবন দুলে উঠল। হাতি নৌকায় উঠলে, তার ভারে নৌকা যেমন বামে ও দক্ষিণে দুলতে থাকে, তেমনই ধ্রুবর একটি পায়ের ভারে, পৃথিবীর অর্ধাংশ ডাইনে বাঁয়ে দুলতে লাগল। পৃথিবীর এই অবস্থায় দেবতা ও লোকপালেরা আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন, তাঁরা এই ঘটনার কোন কারণ বুঝতে না পেরে ভগবান শ্রীহরির শরণাপন্ন হলেন।

দেবতাদের আশ্বস্ত করে ভগবান বললেন, “তোমরা আতঙ্কিত হয়ো না, মহারাজ উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব আমার বিশ্বরূপের সঙ্গে একত্র হয়ে অবস্থান করছে। কিছুদিনের মধ্যেই আমি তাকে এই তীব্র তপস্যা থেকে নিরস্ত করবো। তোমরা ভীত না হয়ে, নিজ নিজ স্থানে ফিরে যাও”। দেবতারা নিশ্চিন্তমনে স্বর্গে ও লোকপালেরা নিজেদের স্থানে ফিরে গেলে, ভগবান শ্রীহরিও তাঁর গরুড়ের পিঠে উঠে মধুবনের দিকে রওনা হলেন।

 

৯

 

ধ্রুবর শ্রীহরি দর্শন

মধুবনে পৌঁছে শ্রীহরি দেখলেন, বাইরে থেকে ধ্রুব স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে তার হৃদয়ের মধ্যে শ্রীহরির পরমরূপ দর্শন করছে। সামনে ভগবান স্বয়ং প্রত্যক্ষ উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ধ্রুব তাঁকে দেখতে পেল না। তখন ধ্রুবর হৃদয় থেকে ভগবান নিজের রূপ তুলে নিতেই, ধ্রুব চোখ মেলে তাকাল এবং সামনেই দেখতে পেল স্বয়ং ভগবানকে। ভগবানকে দেখে ধ্রুব তাঁকে দণ্ডবৎ প্রণাম করল, তারপর জোড়হাতে ভগবানের স্তব করার ইচ্ছায় ব্যাকুল হয়েও কিছুই বলতে পারল না। কারণ সে সময় ধ্রুব আনন্দে বাক্যহারা এবং কিভাবে ভগবানের গুণবর্ণনা করতে হয়, তাও তার জানা ছিল না। করুণাময় ভগবান সবই বুঝতে পারলেন, তিনি স্মিতমুখে তাঁর বেদশঙ্খ দিয়ে স্পর্শ করলেন ধ্রুবর দুই গাল।  ভগবানের স্পর্শে বালক ধ্রুব এখন ঈশ্বর ও জীবের তত্ত্ব উপলব্ধি করলেন এবং ধ্রুব নামক অক্ষয় লোকের অধিকারী হলেন।

এরপর তাঁর মধ্যে ভগবানের স্তুতিশক্তি সঞ্চারিত হল, তিনি বললেন, “অখিল শক্তিধর যিনি আমার মধ্যে চিৎশক্তিরূপে আমার প্রাণ ও সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সঞ্জীবিত করছেন, সেই অন্তর্যামী ভগবান, আপনাকে প্রণাম। হে ভগবান, ত্রিগুণবিশিষ্ট মায়া আপনার শক্তি। আপনি এই মায়ার প্রভাবে চরাচর সৃষ্টি করে, নিজেও তার মধ্যে সংযুক্ত রয়েছেন। অগ্নি যেমন নানান ধরনের কাঠে নানান রূপে দেখা যায়, আপনিও অন্তর্যামীরূপে এক হয়েও, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ব্যাপ্ত থেকে নানা রূপে দেখা দিয়ে থাকেন। হে নাথ, ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি, জেগে উঠে যেমন পূর্ব দিনের মতোই জগতকে দেখতে পায়, আপনার দেওয়া জ্ঞানেই আপনার শরণাপন্ন ব্রহ্মা এই বিশ্বকে দর্শন করতে পেরেছিলেন। আপনি মুক্তদেরও আশ্রয়, আপনি জীবকে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি দেন, আপনি কল্পতরু। হে অনন্ত, যাঁরা সর্বদা আপনাকে ভক্তি চিত্তে মনে রাখেন, সেই সব মহাজন ব্যক্তিদের সঙ্গেই যেন আমার সঙ্গ হয়। কারণ তাঁদের মুখে সর্বদা আপনার কথামৃত পান করে, আমিও এই বিপদসংকুল ভবসাগর খুব সহজেই পার হয়ে যেতে পারব।

হে অজ, এই বিশ্বের নিখিল বস্তুর মধ্যে আপনার যে স্থূলরূপ ব্যাপ্ত, আমি আপনার সেইটুকুই শুধু জানি। কিন্তু এই সব কিছুর অতীত আপনার যে ঈশ্বররূপ, যা শব্দের অগোচর, সেই ব্রহ্মস্বরূপ সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। যে অদ্ভূত পুরুষ কল্পের অবসানে নিজের জঠরের মধ্যে ত্রিলোককে ধারণ করে, অন্তর্দৃষ্টিতে অনন্তের কোলে শয়ন করেন । যাঁর নাভিমূল থেকে সঞ্জাত মৃণালের মধ্যে  হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা আবির্ভূত হন, আমি সেই পরমপুরুষকে প্রণাম করি। আপনার সঙ্গে জীবের অনেক বৈলক্ষণ আছে। যেমন আপনি নিত্যমুক্ত, কিন্তু আপনার করুণায় জীব মুক্ত হয়। আপনি পবিত্র, জীব মলিন। আপনি সর্বজ্ঞ, জীব অজ্ঞ। আপনি আত্মা, জীব জড়। আপনি নির্বিকার কূটস্থ, জীবের বিকার আছে। আপনি অজ, জন্মরহিত আদিপুরুষ, জীবের জন্ম আছে। আপনি ভগ অর্থাৎ ঐশ্বর্যবান, জীব ঐশ্বর্যহীন। আপনি ত্রিগুণের অধীশ্বর, কিন্তু ত্রিগুণের অতীত, জীব গুণের বশীভূত। আপনি সমস্ত জীবের পালনকর্তা, আপনার কৃপা ছাড়া জীব নিজেকেও পালন করতে অক্ষম। আপনি সকল যজ্ঞের অধিকর্তা, জীব যজ্ঞ কর্মের অধীন। আপনার অখণ্ড আত্মদৃষ্টি দিয়ে জীবের সকল অবস্থার আপনিই সাক্ষী, জীবের দৃষ্টি তার অবস্থা ভেদে খণ্ডিত। যাঁর থেকে এই বিশ্বের সৃষ্টি, সেই অখণ্ড অনন্ত, নির্বিকার আনন্দমাত্র ব্রহ্মের আমি শরণাপন্ন হলাম। হে ভগবান, পরমানন্দই আপনার মূর্তি, আপনি আমাদের মতো দীন শরণাপন্ন মানুষকে সংসারভয় থেকে রক্ষা করুন”।

ভক্তবৎসল ভগবান ধীমান ধ্রুবের এই স্তুতিতে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “হে রাজপুত্র, তোমার কল্যাণ হোক। আমি জানি, তোমার মনের কি সংকল্প। হে সুব্রত, দুর্লভ হলেও আমি তোমার মনের সেই সংকল্প পূর্ণ করব। হে বৎস, আমি তোমাকে এমন উৎকৃষ্ট লোক দান করব, যা নিত্যধাম, যা এর আগে অন্য আর কেউ লাভ করতে পারেন নি। যাকে কেন্দ্র করে গ্রহ, নক্ষত্র সমন্বিত জ্যোতিশ্চক্র স্থাপিত হয়েছে। ত্রৈলোক্য বিনষ্ট হলেও, যার বিনাশ হয় না। নক্ষত্ররূপী ধর্ম, অগ্নি, কশ্যপ, ইন্দ্র ও সপ্তর্ষিমণ্ডল যাকে তারকাদের সঙ্গে প্রদক্ষিণ করেন, তোমাকে সেই উৎকৃষ্ট লোক দান করলাম।

তোমার পিতা তোমার হাতে পৃথিবীর ভার অর্পণ করে বনবাস করলে, তুমি তেষট্টিহাজার বছর পৃথিবীকে পালন করবে, কিন্তু তোমার ইন্দ্রিয়শক্তি খর্ব হবে না। তোমার ভাই উত্তম, মৃগয়া করতে গিয়ে প্রাণত্যাগ করবে এবং সেই শোকে পাগলিনী হয়ে তোমার বিমাতা সুরুচি দাবাগ্নিতে প্রবেশ করবেন। আমিই যজ্ঞ, অতএব যজ্ঞ করেই তুমি আমার ভজনা করবে এবং প্রচুর দক্ষিণা দান করবে। তারপর তুমি আমার ধামে যাত্রা করবে, সেই লোক সর্বলোকের বন্দনীয়, ঐ স্থানে গেলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না”।

[শ্রীহরি ধ্রুবকে তেষট্টিহাজার বছর রাজত্ব করার বর দিলেন - তাঁর সেই রাজত্ব আবার শুধু এই ভারতবর্ষ নয় সমগ্র পৃথিবী! পুরাণকাররা   পুরাণ লিখতে বসে অল্পে সন্তুষ্ট হতেন না, তাঁরা বিশ্বাস করতেন, "মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার" অথবা কল্পনার রন্ধনে ঘি যদি ঢালতেই হয় দু এক চামচ নয়, ঢালতে হবে কলসি কলসি। সব কিছুই মাত্রাছাড়া।]  

ভগবান শ্রীহরি এই কথা বলে, বালক ধ্রুবের সামনেই নিজের ধামে ফিরে গেলেন, কিন্তু ধ্রুব তাঁর কঠোর তপস্যার ফলস্বরূপ শ্রীভগবানের বর পেয়েও খুব খুশী হতে পারলেন না। তিনি রাজপুরীতে ফিরে গেলেন এবং চিন্তা করতে লাগলেন, “আমি মুক্তিপতি ভগবানের কৃপা পেয়েও মুক্তি চাইলাম না। সনন্দ প্রমুখ কুমারেরা বহুজন্ম সমাধি অভ্যাস করে, যে পদ লাভ করতে পেরেছেন, আমি মাত্র ছমাসের তপস্যায় সেই পদ লাভ করেছিলাম। শ্রীহরির চরণ লাভ করলে ভববন্ধন ছিন্ন হয়, কিন্তু আমার ভেদদৃষ্টি ও মূর্খতার জন্যে আমি সংসারের মায়াই সংকল্প করে রইলাম। বিমাতার বাক্যবাণ আমার হৃদয়ে এমনই ক্ষত সৃষ্টি করেছিল,  যে কঠোর তপস্যাতেও সেই ক্ষত আরোগ্য হয় নি। দৈবী মায়ার বশে আমি বিমাতা ও বৈমাত্রেয় ভাইকে শত্রু কল্পনা করেছিলাম। আয়ু শেষে মরণাপন্ন ব্যক্তির যেমন ওষুধ নিষ্ফল হয়, আমারও এই তপস্যা লব্ধ ফল ব্যর্থ হয়েছে। ভগবান এসেছিলেন আমাকে তাঁর পরমানন্দ দান করতে, আর আমি আমার অহংকারের আরোগ্যের জন্যে তাঁর কাছে রাজত্ব ও রাজ্য সংকল্প করলাম! হায়, আমার মূঢ়তার কোন সীমা নেই”।

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “রাজা উত্তানপাদ, তাঁর পুত্র ধ্রুব ফিরে আসছে, প্রথমে এই সংবাদ শুনে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তারপর দেবর্ষি নারদের কথা মনে পড়ায়, তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে সেই সংবাদদাতাকে সোনার হার পুরষ্কার দিলেন।  অমাত্য, ব্রাহ্মণসহ, সুনীতি ও সুরুচি দুই পত্নী এবং পুত্র উত্তমকে নিয়ে রথে চড়ে পুত্র ধ্রুবর সন্ধানে বের হলেন। কিছুদূর গিয়ে উপবনের সামনেই ধ্রুবকে দেখতে পেয়ে, রথ থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে বুকের মধ্যে পুত্র ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরলেন। ধ্রুব পিতার চরণে প্রণাম করলেন, আনন্দ অশ্রুতে ভরে উঠল রাজা উত্তানপাদের দুই চোখ। ধ্রুব তাঁর দুই মাতাকেই প্রণাম করলেন। ভাই উত্তমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাজর্ষি উত্তানপাদ পুত্র ধ্রুবের ভগবত তপস্যার অদ্ভূত প্রভাব শুনে ও দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং পিতার ভবনে ধ্রুব স্বর্গের দেবতার মতোই বসবাস করতে লাগলেন।

ধ্রুবর রাজ্যভোগ ও যক্ষ হত্যা 

অনেক দিন পর, নিজের বার্দ্ধক্য অনুভব করে এবং ধ্রুবর যৌবন উপস্থিত দেখে, তিনি প্রজাদের সম্মতি নিয়ে ধ্রুবকে নিজের রাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। তারপর বিষয়ভোগ ত্যাগ করে, ঈশ্বরচিন্তার জন্যে তিনি রাজভবন ছেড়ে বনে চলে গেলেন।

পিতার সিংহাসনে আরোহণ করে, ধ্রুব শিশুমারের কন্যা ভ্রমি ও বায়ুর কন্যা ইলাকে বিবাহ করেছিলেন। ভ্রমির গর্ভে কল্প ও বৎসর নামে দুই পুত্র আর ইলার গর্ভে উৎকল নামে এক পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হল। উত্তম বিয়ে করলেন না। একবার মৃগয়া করতে গিয়ে তিনি হিমালয় প্রদেশের কাছে মহাশক্তিধর যক্ষসেনার হাতে মারা গেলেন। সেই শোকে ব্যাকুল সুরুচি পুত্রের খোঁজে অরণ্যে প্রবেশ করার পর দাবানলের মধ্যে প্রাণত্যাগ করলেন। এদিকে ভাই উত্তমের মৃত্যু সংবাদে মহারাজ ধ্রুব প্রচণ্ড শোকে এবং  ক্রোধে অভিভূত হয়ে, প্রতিশোধের ইচ্ছায় যক্ষপুরী অলকার উদ্দেশে রওনা হলেন।

দীর্ঘদিন ধরে যক্ষদের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধের পর, মহারাজ ধ্রুবর প্রবল পরাক্রমে অজস্র যক্ষ ও রাক্ষস সেনা হতাহত হল। মহারাজের রণকৌশলে পর্যুদস্ত হয়ে একদিন রণক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কাউকেই দেখতে পেলেন না। তিনি একবার ভাবলেন শত্রু পরাস্ত হয়েছে, তাঁর ইচ্ছা হল পরাজিত যক্ষদের রাজপুরীতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তিনি নিজেকে সংযত করে তাঁর রথের সারথিকে বললেন, “যক্ষরা অনেক মায়া জানে, অতএব আমরা আরো কিছুক্ষণ সতর্ক হয়ে অপেক্ষা করি”। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, চারদিকে সমুদ্রের গর্জন শোনা গেল। প্রচণ্ড ধুলোর ঝড়ে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল, আকাশে ভীষণ বিদ্যুৎ দেখা গেল, শোনা গেল মেঘের ভয়ঙ্কর গর্জন।  সেই মেঘ থেকে অজস্র গদা, পাথর, খড়্গ বর্ষণ হতে লাগল। অজস্র সাপ, উন্মত্ত হাতি, সিংহ ও বাঘ মহারাজ ধ্রুবের দিকে দৌড়ে আসতে লাগল। ধ্রুবের প্রতি মায়াবী অসুরদের এই ভয়ংকর আক্রমণ দেখে মুনিগণ রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে মহারাজ ধ্রুবকে বললেন, “হে উত্তানপাদতনয়, যাঁর নাম উচ্চারণ করলে বা শুনলে লোকে সাক্ষাৎ মৃত্যুকেও অতিক্রম করতে পারে, আপনি সেই বিপদতারণ শ্রীহরির শরণাপন্ন হোন”।

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৪

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?] 


 


৪৯

 

রাত্রে খাওয়া-দাওয়া করে মারুলা গতকাল আস্থানে ফিরে যায়নি, ভল্লাদের সঙ্গেই ছিল। আজ খুব ভোরে দুজনে রণপা চড়ে বেরিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছে বলল না, যাবার সময় রামালিকে বলল, কালকের কথা মতো নোনাপুরের মাঠে চলে যাবি – ওখানেই আমরা চলে আসব ঠিক সময় মতো”।

অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে, ভল্লা আর মারুলা গেল আস্থানে। আস্থানের দরজায় এখন পাহারা দেয় শষ্পকের ব্যক্তিগত রক্ষীরা। তারা ভল্লাকে না চিনলেও, মারুলাকে চেনে। শিবিরের ভেতরে ঢুকে মারুলা গলা তুলে বলল, “মান্যবর আপনি ডেকেছিলেন, আমরা এসেছি”।

শষ্পক তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ভল্লাকে দেখে হাসলেন, “তোমরা আস্থানের বাইরে থাকো – আমি আসছি – এখানে সব আলোচনা করা যাবে না”।

ভল্লা আর মারুলা আস্থানের বাইরে গিয়ে রাজপথের ধারে দাঁড়াল। একটু অপেক্ষার পরেই শষ্পক আস্থান থেকে বেরিয়ে ওদের কাছে এগিয়ে এলেন। মারুলা এবং ভল্লা দুজনেই অভিবাদন করল, উত্তরে শষ্পক ভল্লার হাত ধরে বললেন, “তুমি খেলা একটা করে দেখালে বটে, ভল্লা – গোটা রাজ্যবাসী চমকে গেছে…চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি”।

ভল্লা বলল, “কিন্তু মান্যবর, রক্ষীদের কাউকে নিলেন না, আপনার নিরাপত্তা?”

শষ্পক হাসলেন, বললেন, “তোমাদের মতো দুজন বন্ধু থাকলে নিরাপত্তার চিন্তা কি?”  কিছুটা এগিয়ে শষ্পক দাঁড়ালেন, বললেন, “এ জায়গাটা বেশ নির্জন – কথাবার্তাগুলো এখানেই সেরে নেওয়া যাক”। ভল্লা আর মারুলা চুপ করে তাকিয়ে রইল শষ্পকের দিকে।

শষ্পক ভল্লাকে বললেন, “মারুলা নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছে, তোমার ছেলেদের নিয়ে এরপর কী করবে ভল্লা?”

ভল্লা বলল, “মারুলার কাছে আপনার প্রস্তাব শোনার পরেই, আমি ছেলেদের বলেছি – আজ সকালে ওরা জানাবে। আপত্তি হওয়ার কোন কারণ তো নেই, মান্যবর – তবে ওরা একটু ভয় পাচ্ছে…”।

“যে আস্থানের রক্ষীদের ওরা মারল – সেই আস্থানেই ওদের রক্ষী হয়ে নিয়োগ – অবিশ্বাস এবং ভয় করার কথাই তো। বুঝিয়ে বল…দেখ কী হয় – অন্ততঃ জনা দশেক ছেলে আমার এখনই চাই – আগামী কাল থেকে হলেও আপত্তি নেই…”

“কিন্তু মান্যবর, রাজধানীর মতামত নিয়েছেন? রাজ্য সুরক্ষা মন্ত্রক এই বার্তা পেলে উন্মাদ হয়ে যাবে যে!”

“যাক না। আমি কী করবো? এই আস্থানের কোষাগারে এখন কত টাকা আছে – সঠিক না জানলেও অনুমান করতে পার তো? আমার ওই কটা দেহরক্ষীদের পক্ষে তার সুরক্ষা করা সম্ভব? তোমার বটতলি গ্রামের চেলারা অস্ত্র কেনার অর্থ যোগাড় করছে – ওদিকের ধনীদের বাড়ি ডাকাতি করে। তাদের পক্ষে এই আস্থান তো এখন ফাঁকা মাঠ। আমার তো রাত্রের ঘুম চলে গেছে ভল্লা”। একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “উপানুর দলকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে তুমি আমাকে যেমন নিশ্চিন্ত করেছ – কিন্তু অন্য দিকে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েও দিয়েছ বহুগুণ। রাজধানীতে দিনে দুবার পত্র লিখে পাঠাচ্ছি – তাতে আমার সমস্যা তো মিটছে না। আমার ধারণা ওখান থেকে নতুন রক্ষীদল এখানে আসতে মাসখানেক লাগবেই”।

মারুলা বলল, “মাস খানেক? না না মান্যবর, সাত-দশদিনের মধ্যে ঠিক এসে যাবে…”।

ভল্লা বলল, “নারে মান্যবর সঠিক বলেছেন। রক্ষীসর্দার সহ এতগুলো রক্ষী মারা গেল – সে নিয়ে মন্ত্রকগুলির মধ্যে – কার দোষ - কার দায় – সেই নিয়েই রীতিমতো চাপান-উতোর চলবে কিছুদিন… তারপর মহামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সুরক্ষা মন্ত্রক নড়াচড়া শুরু করবে। তারপর মন্ত্রক ঠিক করবে - কোন সর্দারকে কোথা থেকে তুলে এখানে পাঠাবে। সে সর্দার খবর পেয়েই এখানে লাফিয়ে চলে আসবে তেমনও নয়। উপানুদের মৃত্যুর কথা শুনলে হয়তো আসতেই চাইবে না। আসতে চাইলেও – তারা বলবে – এতদূরে যাবো…কবে আবার ফেরা হবে কে জনে - কিছুদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসি…এসব তো তুই জানিস, মারুলা? মান্যবর মাসখানেক বললেন, তার বেশি লাগলেও আমি আশ্চর্য হবো না”।

শষ্পক বললেন, “একদম বাস্তব চিত্র ভল্লা – এমনটাই ঘটবে”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি, মান্যবর। আমি দেখছি – আগামীকাল সকালে পনের জন ছেলেকে যদি পাঠাতে পারি – তাদের সাতজন থাক দিনে আর রাত্রে থাক আটজন – আর মারুলা, আপাততঃ তুইই কদিনের জন্যে ওদের সর্দার হয়ে যা – নতুন ছেলে – কাজের ধরনটা ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে তো”।

“বাঃ, এতো খুব ভালো ব্যবস্থা, আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারব। আর আস্থান থেকেই আমি ওদের নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা করে দেব – মাসে চার তাম্র-মুদ্রা – রাজধানীর রক্ষীদেরও তাই দেওয়া হয়”।

“সে ঠিক আছে, কিন্তু দুটো সমস্যা আছে, মান্যবর,” ভল্লা বলল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সমস্যা, ভল্লা?”

“প্রথম, রাজধানী থেকে রক্ষীদল এলে ওরা কী করবে?”

“সে ব্যবস্থা আমার ওপর ছেড়ে দাও। রাজধানীতে আমি বলে দেব – রক্ষীদল না পাঠাতে। ছেলেরা আমার সঙ্গেই থাকবে – এখান থেকে অন্য আস্থানে। কিন্তু তোমার ছেলেরা যদি কদিন পরে আচমকা পালিয়ে যায় – তাহলে কিন্তু আমার দুকূলই যাবে”।

“তার দায়িত্ব আমার, মান্যবর, ও নিয়ে ভাববেন না। তবে আমার দ্বিতীয় সমস্যা, দিনে-রাতে, ছেলেরা এখানে খাবে কোথায়?” ভল্লা বলল।

শষ্পক বললেন, “এ উপায় তো আমার হাতেও নেই। গ্রামে কোন লোকজন নেই – অন্ততঃ দুজন – যারা পনের-কুড়িজনকে রোজ রেঁধে খাওয়াতে পারবে?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “গ্রামে মেয়েরাই রান্নার কাজ করে, পুরুষরা খায়। শহরের কিছু পুরুষ চটিতে বা পান্থশালায় রান্নার কাজ করে। বীজপুরের জনাইকে একবার বলে দেখা যায়, মান্যবর – ও কোন ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। আপনি চিন্তা করবেন না, মান্যবর, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।

শষ্পক হেসে বললেন, “সে আমি জানি – আপনি একবার দায়িত্ব নিলেই ব্যস্‌ - নিশ্চিন্ত। কিন্তু আমার আরও একটি সমস্যা আছে – ঘোড়াগুলোর কী হবে? আটটি ঘোড়া। আমার একটি -  তাকে নিয়ে আমি রোজই দুবেলা এদিক সেদিক একটু ঘুরে আসি – কিন্তু বাকি সাতটা? হাঁটা-চলা না করলে ওদের তো বাত ধরে যাবে। মারুলাকে মাঝে দুদিন বীজপুরে পাঠিয়েছিলাম ঘোড়া দিয়ে…”।

ভল্লা মারুলার দিকে তাকাল, মুচকি হেসে বলল, “আমরা যদি সাতটা ঘোড়া থেকে - ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুটো – তিনটে রোজ নিয়ে যাই, মান্যবর – ছেলেদের ঘোড়ায় চড়াটাও শিখিয়ে ফেলতাম”।

শষ্পকও হাসল, “আমার আপত্তি নেই। এখনই নিয়ে যাও। চলো, অনেকক্ষণ হল, এবার ফেরা যাক, নাহলে রক্ষীরা আমাকে খুঁজতে এখানে চলে আসবে…”।

“হ্যাঁ চলুন। আগামী কাল সকালে ছেলেরা আসবে – আপনার রক্ষীদের বলে রাখবেন, মান্যবর – তা নাহলে ভয়ংকর ভুল বোঝাবুঝি হয়ে উঠতে পারে – আর মারুলা তুই দরজার বাইরে অবশ্যই অপেক্ষায় থাকবি…”

“ভাল কথা মনে করিয়েছ, ভল্লা। রক্ষীরা এমনিতেই বেশ আতঙ্কে আছে – সকাল সকাল হঠাৎ জনা পনের ছেলেকে দরজার সামনে দেখলে, কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে উঠতে পারত”।    

 

তিনটে ঘোড়া নিয়ে নোনাপুর মহড়া-মাঠে পৌঁছে ভল্লা আর মারুলা দেখল – ছেলেরা বসে আছে তাদের অপেক্ষায়। রামালি, সুরুলরাই শুধু নয় – তাদের দলের প্রায় সবাই।

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বলল, “ভল্লাদাদা এটা তো উপানুর ঘোড়া – তুমি পেলে কোথায়?”

ভল্লা নিজের ঘোড়াটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলল, “তাই নাকি? তা তো জানতাম না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল সবকটা…নিয়ে এলাম। ঘোড়ায় চড়া শিখবি?”

একথায় সকলেই লাফিয়ে উঠল – ঘোড়ায় চড়া শিখবো!

ভল্লা হাসতে হাসতে হাত তুলে বলল, “আরেঃ – আজই সবাই শিখে ফেলবি নাকি – তিনটে তো মোটে ঘোড়া – হবে পালা করে হবে”। ভল্লা আর মারুলা ঘোড়া তিনটেকে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে মাঠের ধারে বসল। ঘোড়া তিনটে ঘাড় নামিয়ে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যখন খেতে লাগল – সেই দৃশ্যও ছেলের দল মোহিত হয়ে দেখতে লাগল। তাদের স্বপ্ন এভাবে মাটিতে নেমে আসতে পারে? বিশ্বাসই হয় না।

ভল্লা ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে, বেশ মজা পেল, বলল, “তোরা এলি কেন? তোরা কী জানতিস – আমরা আজ ঘোড়া নিয়ে আসব?”

বিনেশ হাসতে হাসতে বলল, “তা নয় ভল্লাদাদা, ওরা সবাই রক্ষীর কাজ করতে উৎসাহী। কিন্তু ওদের বাড়ির লোক কেউ বিশ্বাসই করছে না – বলছে, আস্থানের রক্ষীদের তোরা মারলি – আর সেখানেই তোদের কাজে নেবে? এ কখনও হতে পারে? ওদের বক্তব্য তুমি নিজে গিয়ে বললে, বাড়ির লোক মনে হয় মেনে নেবে”।      

  ভল্লা হাসল, বলল, “সে না হয় যাবো, বিকেলের দিকে। কিন্তু তার আগে কয়েকটা কথা স্পষ্ট করে বলে নিই। তোদের মাসোহারা হবে চার তাম্র মুদ্রা”।

ছেলেদের মধ্যে অনেকেই আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রতিমাসে – চার তাম্র মুদ্রা?”

ভল্লা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু তার কয়েকটা নিয়ম আছে – সেগুলো না মানলে কিন্তু কাজ তো যাবেই – কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিও হতে পারে”। এর পর ভল্লা শষ্পকের বলা কাজের নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিল ছেলেদের।  

 ছেলেরা আশ্চর্য স্বপ্নে তখন বিভোর, সবাই ঘাড় নাড়ল সম্মতিতে।

ভল্লা বলল, “তোদের দলের সর্দার কে হবে? তোরাই ঠিক করে নে। তার কথা কিন্তু তোদের সকলকে মানতে হবে”।

ছেলেরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বলল, “দেবান”।

দেবান উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরেঃ আমি সর্দারির কী জানি? পাগল হয়েছিস নাকি তোরা?”

মারুলা বলল, “ভয় পাস না। সর্দারি করার কাজটা আমি তোকে বুঝিয়ে দেব, দেবান, চিন্তা করিস না”।

ভল্লা বলল, “সবাই রাজি?”

“রাজি”।

“তাহলে কাল সকালেই দেবানের সঙ্গে তোরা চোদ্দজন রণপা চড়ে আস্থানে চলে যাবি। দরজার বাইরে থাকবে মারুলাদাদা। ও তোদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে – থাকার জায়গা এবং কাজের কথা সব বুঝিয়ে দেবে। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে”।

“বেশ এখন তোরা বাড়ি যা। বাড়ি গিয়ে বড়োদের সঙ্গে কথা বল। আমি বিকেলে যাবো – নোনাপুরে এবং সুকরাতেও…”।     

         

ছেলের দল চলে যেতে আহোকরা অধীর আগ্রহে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দলের অনেকেরই তো বেশ একটা গতি হয়ে গেল, কিন্তু তাদের কী হবে?

তাদের মনের কথাটা রামালিই শুরু করল, “আমাদের দলে মোট বত্রিশজন রয়েছি ভল্লাদাদা। তার মধ্যে ওরা পনের জন – আর আমরা পাঁচজন। তাছাড়াও থাকছে – আরো বারো জন। আমাদের আর ওই বারো জনের কী হবে”?

“বারো জন নয় বাকি রইল নজন আর তোরা আটজন। মইলি, দীপান আর বিশুনের কথা ভুলে গেলি নাকি? ওরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। ওই ন’জনও দু-পাঁচদিনের মধ্যে রক্ষী হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য সেটা অনেকটাই নির্ভর করবে, এই পনেরজনের ওপর। ওরা যদি কোন গণ্ডগোল না পাকায় কিংবা পালিয়ে না আসে – তাহলে বাকি নজনও ওদের সঙ্গে যোগ দেবে”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা হাসল, বলল, “তোদের আটজনের কী হবে? খুব চিন্তায় রয়েছিস না? তোদের আটজনের মধ্যে সর্দার হবে রামালি – এটা আমিই ঠিক করে দিলাম। তোদের কিছু বলার আছে? মনে কোন সন্দেহ হচ্ছে? থাকলে এখনই বলে ফেল”।

আহোক বলল, “না ভল্লাদাদা, আমাদের মধ্যে রামালিই যে সবার থেকে ভালো যোদ্ধা – সে কথা আমাদের দলের সবাই মানি”।

“বাঃ এই বিশ্বাস আর ভরসা যেন সর্বদা থাকে। আমিও মানি রামালি সবার থেকে ভালো, কিন্তু তোরা বাকি সাতজন – বিশেষ করে আহোক, সুরুল, বিনেশ আর কিশনা – তোরাও যথেষ্ট দক্ষ এবং বুদ্ধিমান, ঠাণ্ডা মাথার কাজের ছেলে। তোরা আটজন এই অঞ্চলের পুরো কাজটা দেখবি। কী কাজ? এক এক করে বলি,

নতুন নতুন ছেলেদের নিয়ে ভালো রক্ষী হওয়ার মতো দল তৈরি করতে হবে।

এর সঙ্গে বটতলির এখনকার ছেলেদের এবং আরও নতুন ছেলেদেরও তৈরি করতে হবে।

বটতলির ছেলেরা ওদের রাজ্যে ওদের মতো কাজ করবে – তার মধ্যে নাক গলাবি না – তবে প্রয়োজন হলে ওদের কাজের পরিকল্পনা বানাতে আমরা পরামর্শ দেব। যেমন গতকাল বলছিলাম।

বটতলির ছেলেরা আমাদের যেমন যেমন টাকা-পয়সা দেবে, আমরা সেই অনুযায়ী ওদের অস্ত্র-শস্ত্র দেব।

তবে এই রাজ্যে বটতলির ছেলেরা যেন কোন গণ্ডগোল পাকাতে না আসে - সেদিকেও তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখবি।

 

এবার খুব মন দিয়ে শোন, কয়েকটা বিষয় কখনও করবি না। তোরা যতটা শিখেছিস – সবটা বটতলির ছেলেদের কিংবা নতুন রক্ষী ছেলেদের শেখাবি না। কিছুটা কম শেখাবি।

বিশ্বাস করে – আমাদের ভেতরের কোন কথাই কাউকে বলবি না – সে বটতলির ছেলেরা হোক, রক্ষী ছেলেরা হোক কিংবা তোদের বাড়ির লোকই হোক।

আর আশা করব – নিজেদের মধ্যে কোন রকম বিশ্বাসঘাতকতা করবি না। কারও মনে কোন সন্দেহ হলে বা বুঝতে না পারলে – সবাই মিলে বসে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিবি। তা নাহলে দল ভেঙে যাবে – শেষ হয়ে যাবি। আবার সেই অসহায় সাধারণ মানুষ হয়ে যাবি। 

আর সবার ওপরে মাথায় রাখবি নিজ নিজ গ্রামের – নোনাপুর, সুকরার - মানুষরা যাতে ভালো থাকে – ধীরে ধীরে গ্রামের যেন উন্নতি হয়।

আপাতত যেটুকু মাথায় এলো বললাম। তোরা নিজেরাও কথাগুলো চিন্তা কর। আমরা সর্বদাই একসাথে থাকবো – আরো অনেক কথাই হয়তো হবে”।  


চলবে...




নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...