মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪০

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯ "


 

রাত্রি তিন প্রহরের একটু আগেই ওরা বেরিয়ে গেল কমলিমাকে প্রণাম করে, তাঁর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে। আজ সারাটা দিন যেন তাঁর নিমেষে কেটে গেল নানান কাজে এবং বিচিত্র ব্যস্ততায়। আশ্চর্য এক উন্মাদনায় তিনি যেন মগ্ন ছিলেন। ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই তিনি বসলেন বিরাট দরজার কাঠের পাল্লায় হেলান দিয়ে। খুব ক্লান্তি অনুভব করলেন এবং উদ্বিগ্ন। এখন তাঁর আর কোন কাজ নেই – ছেলেগুলোর প্রতীক্ষায় বসে থাকা ছাড়া।

কমলিমায়ের ডাকে নোনাপুর থেকে আরও দুই মহিলা এসেছেন, অমরার মা সুরমি, আর সুদাসের মা পালি। আরও এসেছে আহোকের বোন কুসি আর দীপানের ভাই ভুটিক। কবিরাজ বড়্‌বলা তো রয়েছেই। ওরা সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর পালি বললেন, “ওখানে ওভাবে বসলে কেন, ঘরে এসে চোখ বুঝে গতরটা একটু এলিয়ে দাও না, দিদি। ঘুম হবে না জানি, একটু জিরেন তো হবে। এসো দিদি, ঘরে এস”।

কমলিমা বললেন, “আসছি রে বোন, বাইরে বেশ হাওয়া বইছে – একটু বসি – তোরা একটু ঘুমিয়ে নে – কী অবস্থায় ওরা ফিরবে কে জানে? তখন আর হাঁফ ফেলার সময়ই পাবি না হয়তো”।

সুরমি বললেন, “চিন্তা করো না তো কমলিদিদি, কিচ্ছু হবে না। ওরা সবাই যেমন বুক চিতিয়ে গেল, তেমনিই আবার ফিরে আসবে”।

“আহা তোর মুখে ঘি-মধু পড়ুক রে সুরমি। তাই যেন হয়। তোরা শুয়ে পড়, আমি এখনই আসছি। বড়্‌বলার তো নাক ডাকছে...কুসি আর ভুটিও মনে হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল”।

কুসি চাপা স্বরে উত্তর দিল, “আমি মোটেও ঘুমোইনি জেঠিমা। সব শুনছি...”।

“আচ্ছা, আচ্ছা, পাকু মা আমার...ঘুমোও দেখি এবার...” কমলিমা স্নেহঢালা সুরে কুসিকে বললেন।

সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তিতে সকলের চোখেই এখন নেমে আসছে গাঢ় ঘুমের কালো পর্দাখানা। কমলিমায়ের জন্যে সকলেই একটু অস্বস্তি বোধ করলেও – দু-চারবার উশখুস করতে করতে, কিছুক্ষণের মধ্যে সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল। কমলিমা নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি উঠে গিয়ে প্রদীপের সলতেটা কমাতে গিয়ে দেখলেন, তেল ফুরিয়ে আসছে। প্রদীপে তেল ভরলেন, কানায় কানায়। অমাবস্যার অন্ধকারে কাজ সেরে ওরা যখন ফিরবে – তখন ঘরে যেন থাকে দীপের আলো! তারপর আবার গিয়ে বসলেন দরজার সামনে, কাঠের পাল্লায় হেলান দিয়ে।

ঘরের সামনে এক টানা বাঁধানো দাওয়া – মাটি থেকে তিনধাপ উঁচু। ডানদিকে দাওয়া থেকে হাত পাঁচেক দূরেই রয়েছে বেশ বড়ো ইঁদারা – কোমরভর উঁচু পাড়-বাঁধানো । সামনে অনেকটা চওড়া ঘেসো জমি – তার মধ্যে কিছু কিছু বুনো ঝোপঝাড়। তার আশেপাশে এলোমেলো পড়ে আছে প্রচুর ইঁট, কাঠ আর বাঁশের ছোট-বড়ো টুকরো - নির্মাণ কাজের অবশেষ। তারপরেই প্রায় দেড় মানুষ-ভর উঁচু মোটা গাঁথনির পাঁচিল। পাঁচিলের বাইরেই জঙ্গল আছে, সে কথা জানেন কমলিমা – কিন্তু কিছুই দেখা যায় না এখান থেকে। এখান থেকে এখন মাথার ওপরে চোখে পড়ে শুধুই কালো আকাশ – অজস্র তারায় ঝলমল। কমলিমা শুনেছেন – বড়ো বড়ো পণ্ডিতরা নাকি অনেক গণনা করে দেখেছেন – জন্মমুহূর্ত থেকেই প্রতিটি মানুষের ভাগ্য নাকি কোন না কোন তারকাগুচ্ছের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় – যুক্ত হয়ে যায় কোন না কোন গ্রহের সঙ্গেও। একমাত্র মৃত্যুর পরেই নাকি সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।

প্রধান এবং তাঁর দুই পুত্রের ভাগ্য কোন তারকারাজির বন্ধনে আবদ্ধ ছিল – তিনি জানেন না। তাঁর নিজের ভাগ্যের নির্দিষ্ট তারকাগুচ্ছ কোনটি – তাও তিনি জানেন না। পুত্রশোক ভুলেছিলেন পাশের মানুষটিকে আঁকড়ে ধরে। সেই পাশের মানুষটিও অত্যন্ত অসম্মানে যেদিন চলে গেল – সেদিন নিজেকে বড়ো অসহায় নিরালম্ব মনে হয়েছিল। হাহাকার করে অন্ততঃ একবারও কেঁদে উঠতেও পারেননি – এতই শূণ্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কার বুকে মাথা রেখে কাঁদবেন তিনি, কে তাঁকে দেবে সান্ত্বনা? মন তো মারা গেছে কবেই - প্রধানের সঙ্গেই।  তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকেই নিজের দেহটাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলছিলেন...।

হতভাগা ভল্লা – কমলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখের জল মুছলেন আঁচলে – সেদিন ঝড়ের মতো ধেয়ে এল, ভেঙে তছনছ করে দিল তাঁর যত শূণ্যতা – নিরেট শোকের যত পাষাণ দেওয়াল। অন্ধকারে তিনি যে অবলম্বন খুঁজছিলেন, তখন পাননি। আজ পেয়েছেন - এতগুলি ছেলের সম্মিলিত ক্রোধ আর মনের আগুনই এখন তাঁর একমাত্র অবলম্বন। শুধু তাই নয় – তিনি নিজেও আজ এতগুলি ছেলের অবলম্বন!

সুদূর আকাশের কোন নক্ষত্রপুঞ্জ অথবা কোন গ্রহ তাঁর ভাগ্যকে আজ এইখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে – তাদের চিনে নিতে, আজ বড়ো সাধ হয়। কমলিমা আকাশের দিকেই নির্নিমেষ চেয়ে রইলেন...

 

কখন যে তাঁর দুচোখ লেগে এসেছিল, কমলিমা টের পাননি। লোহার গেটটা ঠেলে খোলার শব্দে তিনি চমকে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “এসেছিস? কারা এলি, বাবা...?”

কাঁধে খাটুলা নিয়ে দাওয়ায় উঠে এল চিকনা আর মেদুল। বিষণ্ণ স্বরে চিকনা বলল, “বার্তা শুভ নয় কমলিমা, মইলি...”

কমলিমা শিউরে চিৎকার করে উঠলেন, “মইলি...”?

খাটুলায় শুয়ে মইলি বলল, “আমি আছি জেঠিমা - আমি আছি, বল্লমের সামান্য খোঁচা খেয়েছি – চিকনাটা একেবারে গাধা – ওই ভাবে কেউ বলে জেঠিমার সামনে?”

কমলিমার চিৎকারে আর ওদের কথাবার্তায় ঘরের সকলেই উঠে পড়ল। কমলিমা শশব্যস্ত হয়ে বললেন, “কুসিমা প্রদীপের সলতেটা উস্কে দিয়ে, আরও দুটো প্রদীপ ঝট করে জ্বেলে এদিকে নিয়ে আয় না, মা। এখানে বাবা চিকনা, এখানে নামা – মইলিকে – দেখিস খুব সাবধানে। ধীরে ধীরে... বাবা বলা, এদিকে এসে দেখ দেখি ভাল করে, ছেলেটা বাঁচবে তো?”

তিনটে প্রদীপের আলোয়, ঘর এখন অনেকটাই উজ্জ্বল। মইলি কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, হাসল, বলল, “তুমি অত ব্যস্ত হয়ো না জ্যেঠিমা, আমি ঠিক আছি – এক রক্ষীব্যাটার ছোঁড়া বল্লমটা আমার দাবনা ঘেঁষে লাগল... ভল্লাদাদা আর সুরুল কাপড় দিয়ে চেপে বেঁধে দিয়েছিল তখনই... ওঃহো, ভালো খবরটাতো বলিই নি – উপানু মরেছে, জেঠিমা। হতভাগার মুখটা ফেঁড়ে দিয়েছিল সুরুল – আর রামালি ব্যাটার খুলি ফাটিয়ে দিয়েছে...”।

কমলিমা বললেন, “এখন চুপ করে শুয়ে থাক, পরে সব শুনবো...আগে বলাকে দেখতে দে”।

বলা খাটুলির পাশে বসে, মইলির ক্ষতের কাপড়ের পরত খুলছিল...বলল, “ভল্লাদাদা বেঁধেছে, একদম কবিরাজের মতোই ..বেশি রক্ত ঝরেনি – হুঁ কেটেছে অনেকটাই – গোটা ছয়েক টাঁকা দিতে হবে...একটু লাগবে মইলি...সহ্য করতে হবে...”।

মইলি বলল, “করে নেব...শালা উপানুটা মরেছে, মরেছে অন্ততঃ গোটা দশেক রক্ষী, আমার আবার ব্যথা কিসের?”

মইলির ক্ষতে সাতটা টাঁকা পড়ল – ঘন প্রলেপ লাগিয়ে – গুল্মপাতা দিয়ে ক্ষতস্থান ঢেকে দিল বলা – তারপর কাপড়ের পরতে মুড়ে দিল ক্ষতস্থান।

“কমলিমা, একটু জল দাও না, মইলিকে দুটো বটিকা খেতে হবে...”। বলার কথা শেষ না হতেই, কুসি দৌড়ে গেল – ছোট্ট ঘটিতে জল আনল। বলা তার হাতে দুটো বটিকা দিয়ে বলল, “এ দুটো খাইয়ে দে...”।

কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “বাকিদের কী হল রে, মইলি? এত দেরি হচ্ছে কেন?”

“বাকিরা রয়ে গেল - কবিরাজকাকাকে ছাড়িয়ে আনতে হবে বলে...আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল ভল্লাদাদা আর গোলোকদাদা মিলে... এসে যাবে এখনই, জ্যেঠিমা, তুমি ভেব না...” মইলির চোখ বুজে এল।

কমলিমা ভয় পেয়ে বললেন, “কথা বলতে বলতে...ও কী হল মইলির, বাবা বলা...?”।

বলা হেসে বলল, “চিন্তা করো না, কমলিমা, ঘুমের বটিকা দিয়েছি, মইলি এখন ঘুমোক কিছুক্ষণ”।

 

একটু পরেই কাঁধে আরও দুটো খাটুলা নিয়ে ঢুকল চারজন। দীপান আর বিশুনেরও আঘাত লেগেছে। ভল্লর আঘাতে দুজনেরই কাঁধে গভীর ক্ষত। তবে গুরুতর নয়। মারুলা দুজনের ক্ষতই কাপড়ের পরতে বেঁধে দিয়েছিল, তাই মারাত্মক রক্ত ক্ষরণ হয়নি। বলা পরপর দুজনেরই ক্ষত চিকিৎসা করে – ঘুমের বটিকা দিল।

এই সময়েই দলের প্রায় সকলেই ফিরে এল, পাঁচজন ছাড়া – ভল্লা, সুরুল, রামালি, সম্পৎ আর দেবান। উত্তেজনা আর আনন্দে সকলেই হই হই আরম্ভ করেছিল – বড়্‌বলা আর কমলিমা সকলকেই বকলেন, ঘরের মধ্যে হইচই করিস না, ওরা তিনজন ঘুমোচ্ছে। ঘরের বাইরে চল, আমরাও যাচ্ছি। কুসি মা তুই একটু থাক না, ওদের পাশে। ঘুমের ঘোরে ওরা যদি কিছু বলে বা জল চায় – আমাকে ডাকিস”।


চলবে...

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৭

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৬"]


৫.৫.৪ শিবের অসুর বা দৈত্য নিধন

বিষ্ণুর মতো তাঁরও বেশ কিছু অবতারের কথা শোনা যায়, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, সেগুলির জনপ্রিয়তা নেই। বিষ্ণু এবং কৃষ্ণ যেমন দলে দলে অসুর দলন করেছেন, মহাদেব সে তুলনায় বেশ কম। যে কয়েকজন বিখ্যাত অসুরকে তিনি বধ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন ত্রিপুরাসুর।

ত্রিপুরাসুর - মহাভারতে ঋষি বেদব্যাস অর্জুনকে ত্রিপুরাসুর-সংহার-সংবাদ বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনকালে[1] অসুরদের তিনটি পুর বা দুর্গ ছিল, এই তিনটি পুর যথাক্রমে সোনা, রূপো ও লোহা দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। স্বর্ণময় পুরের অধিকারী ছিল কমলাক্ষ, রৌপ্যময়ের তারকাক্ষ এবং লৌহময়ের বিদ্যুন্মালী। দেবরাজ ইন্দ্র এই তিনটি পুরের বিনাশ না করতে পেরে মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন এবং বললেন “ব্রহ্মার বরে ওই তিন অসুর সবার উপরে অত্যাচার করছে, আপনি ছাড়া কেউ ওদের বিনাশ করতে পারবে না। অতএব আপনিই ওদের বিনাশ করুন”। ভগবান ভূতভাবন, তিনটি পুরকে ঘিরে দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ নিমার্ণ করে সহস্র বছর ধরে অবরোধ করে রইলেন। তারপর তিনটি পর্বযুক্ত শল্যের আঘাতে তিনটি পুর দগ্ধ করলেন।

দৈত্য অন্ধক - এই অন্ধকের জন্ম কাহিনী খুবই অদ্ভূত। একবার কৈলাসে মহেশ্বর যখন তপস্যায় মগ্ন, পত্নী দেবী পার্বতী খেলাচ্ছলে পিছন থেকে দুই হাতে তাঁর চোখ বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিশ্বচরাচর অন্ধকার হয়ে যায় এবং মহেশ্বর ও পার্বতীর স্বেদ থেকে এক অন্ধ শিশুর জন্ম হয়। দেবীপার্বতী এই অদ্ভূত ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠায়, মহেশ্বর তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, যেহেতু এই পুত্র তাঁদের অঙ্গস্পর্শ থেকেই জাত, অতএব এই পুত্র তাঁদেরই। এরপর নিঃসন্তান হিরণ্যাক্ষ পুত্র কামনায় মহেশ্বরের তপস্যা করলে, মহাদেব তাঁর হাতে অন্ধককে তুলে দেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে হিরণ্যাক্ষের মৃত্যুর পর, অন্ধক রাজা হলেন, কিন্তু তাঁর গোষ্ঠীর দৈত্যরা তাঁকে মেনে নিল না, কারণ তিনি দৈত্যপুত্র নন, দেবপুত্র এবং অন্ধ। তখন অন্ধক ঘোর তপস্যা করে ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করলেন এবং ভগবান ব্রহ্মার বরে তাঁর অন্ধত্ব দূর হল এবং একমাত্র মহাদেব ছাড়া তিনি সকলের অবধ্য হয়ে গেলেন। বিপুল পরাক্রম অর্জন করে, এরপর তিনি স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে দেবরাজ ইন্দ্র ও দেবতাদের উপর খুবই অত্যাচার শুরু করেছিলেন। যথারীতি অন্ধকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হওয়াতে, তিনি মহাদেবকে এর প্রতিকারের অনুরোধ করলেন। মহাদেব অনায়াসেই অন্ধকের “কোটি-কোটি (!)” অসুর-সৈন্যদের বিনাশ করে, অন্ধককে তাঁর ত্রিশূলে গেঁথে ফেললেন। অন্ধকের পতনে ত্রিলোকের দেবতা, মুনি-ঋষি, নর আনন্দে মহাদেবের জয়ধ্বনি করতে লাগল। এদিকে মহাদেবের শূলে বিদ্ধ অন্ধকের মনে তখন সাত্ত্বিক ভাবের উদয় হল, তিনি বহু স্তব ও স্তুতিতে মহাদেবকে সন্তুষ্ট করলেন। মহাদেব তাঁকে শূল থেকে নামিয়ে মুক্তি দিলেন এবং “প্রমথাধিপত্য[2]দান করলেন। সেই থেকে অন্ধক গাণপত্যে প্রতিষ্ঠিত হলেন, এবং ইন্দ্রাদি দেবতারা তাঁকে প্রণাম করলেন। (লিঙ্গপুরাণ/৯৩)

জলন্ধর – পুরাকালে জলন্ধর এক প্রবল পরাক্রমী অসুর ছিলেন। সেই অসুর দেব, দানব, যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগ এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মাকেও পরাজিত করেছিলেন। এরপর তিনি বিশ্বহর বিষ্ণুকে আক্রমণ করে, অবিরত যুদ্ধের পর বিষ্ণুকেও পরাজিত করলেন। বিষ্ণুকে পরাজিত করে তিনি ভগবান পিনাকীকে জয় করার ইচ্ছা নিয়ে মহাদেবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে দেবদেব, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করার ইচ্ছাতেই এখানে এসেছি”। অসুরের কথা শুনে ভগবান মহেশ্বর সমুদ্রের মধ্যে পায়ের আঙুল ডুবিয়ে ভীষণ সুদর্শন চক্র উৎপন্ন করলেন। কিন্তু পাছে এই চক্রে ত্রিজগৎ ও দেবতারা নিহত হয় ভেবে, তিনি সমুদ্রের জলেই চক্রটি রেখে দিলেন। এখন অসুরের কথায় হাসতে হাসতে বললেন, “ওহে অসুরেন্দ্র জলন্ধর, তুমি যদি সমুদ্র থেকে ওই চক্র তুলে আনতে পারো, তবেই আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হব, নচেৎ হব না”। ভগবান মহাদেবের কথায় জলন্ধর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, “হে শঙ্কর, গরুড় যেমন নির্বিষ ডুণ্ডুভ (ঢোঁড়া) সাপকে অবলীলায় বিনাশ করে, সেভাবে আজ আমিও তোমাকে, নন্দীকে এবং তোমার সব পারিষদদের সংহার করব।  আমি ভগবান বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি, যম, কুবের, বায়ু, বরুণ সকল দেবতাকেই পরাজিত করেছি। স্বর্গে-মর্তে যুদ্ধ করার মতো কোন প্রতিপক্ষ না থাকায় একবার আমার হাত সুড়সুড় করছিল বলে, পাহাড়ের গায়ে হাত ঘষেছিলাম। তাতে মন্দর, শ্রীমান, নীল, সুশোভন সুমেরু পাহাড় পড়ে গিয়েছিল। মজা দেখার জন্যে আমি হিমালয়ে একবার গঙ্গার গতিরোধ করে দিয়েছিলাম। আমার পত্নীর ভৃত্যেরা পর্যন্ত দেবতাদের বজ্র আটকে দিয়েছে। আমি গরুড় ও বিষ্ণুকে একসঙ্গে নাগপাশে বদ্ধ রেখেছিলাম। ইন্দ্রের পত্নী শচী এবং উর্বশী সহ সকল অপ্সরাকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলাম। ইন্দ্র আমার কাছে এসে অনেক অনুনয়-বিনয় করাতে, শচীকে ছেড়ে দিয়েছি। এ হেন মহাবীর জলন্ধরকে তুমি চেন না?”

জলন্ধরের এই রকম আস্ফালন শুনে মহাদেব বেশ বিরক্ত হলেন। তাঁর তৃতীয় নয়নের প্রান্ত থেকে অগ্নিকণা বের হয়ে অসুরের রথ, অশ্ব, হাতি এবং অজস্র দৈত্য দগ্ধ হয়ে মারা গেল। জলন্ধর তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে উন্মত্ত ক্রোধে সমুদ্র থেকে সেই চক্র তুলতে প্রবৃত্ত হল। অতি কষ্টে সেই চক্র সে যেমনি কাঁধে তুলল, তখনি তার দেহ দু’টুকরো হয়ে, কাটা গাছের মতো, আছড়ে পড়ল মাটিতে। জলন্ধর নিহত হওয়াতে ত্রিজগতের দেব, গন্ধর্ব, দানব এবং নর - সকলেই আনন্দে “সাধু সাধু” বলতে লাগল। এই জলন্ধর-বিমর্দন উপাখ্যান যিনি পাঠ করবেন বা শুনবেন বা শোনাবেন, তিনি গাণপত্য লাভ করে অপার আনন্দ ভোগ করতে পারবেন। (লিঙ্গপুরাণ/ ৯৭)

 ৫.৫.৪.১ তারকাসুর বধ ও শিব-পার্বতী সংবাদ

দক্ষের যজ্ঞে সতীদেবীর দেহত্যাগের পর, মহাদেব সুদীর্ঘ তপস্যায় মগ্ন রয়েছেন, পুনর্বিবাহের কথা তাঁর মনেও আসেনি। অন্য দিকে সতীদেবী মহাদেবকেই আবার পতিরূপে লাভ করতে নিজের ইচ্ছেয় জন্ম নিলেন, হিমালয়-পত্নী মেনকা দেবীর গর্ভে। এই জন্মে তাঁর নাম হল হিমালয়-দুহিতা পার্বতী। দেবী পার্বতীর যখন বারো বছর বয়স হল, তিনি তপস্যায় প্রবৃত্তা হলেন।

এদিকে দুর্দান্ত অসুরদের প্রথা অনুযায়ী প্রাচীনকালে তারকাসুরও দেবতাদের পরাজিত করে তাঁদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করছেন। কিন্তু কোন দেবতাই তাঁর পরাক্রম সহ্য করতে পারছিলেন না, এমনকি ভগবান বিষ্ণুও নাকি তাঁর সঙ্গে “কুড়ি হাজার বছর” ধরে, যুদ্ধ করে পরাজিত হয়েছেন। দেবাদিদেব কঠোর তপস্যায় মগ্ন, তাঁর কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। উদ্বিগ্ন দেবতারা তারকাসুরের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে ভগবান ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ভগবান ব্রহ্মা সব শুনে বললেন, “দেবতাদের এই দুর্গতির কথা আমি সবই জানি। কিন্তু তাও কেন নিশ্চিন্তে আছি তোমাদের বলি। সতীদেবী এই জন্মে গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা হয়ে জন্ম নিয়েছেন। তোমরা সকলে হিমালয় কন্যা পার্বতীদেবীর সঙ্গে রুদ্র মহাদেবের বিবাহে সচেষ্ট হও। তাঁদের মিলনে বীর্যবান এক পুত্রের জন্ম হবে, তাঁর নাম কার্তিকেয়। তিনি ষড়ানন (ছটি মুখ) এবং দ্বাদশ বাহু নিয়ে মহা শক্তিধর বীর হবেন। একমাত্র তাঁর হাতেই তারকাসুরের সংহার সম্ভব। তিনিই দেবতাদের সেনাপতি হয়ে দেবসেনাপতি নাম গ্রহণ করবেন। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য নাম হবে স্কন্দ, শাল্য, বিশাল্য, নৈগমেয় ইত্যদি”।

দেবতারা খুশি হয়ে প্রথমেই সুমেরু পর্বতের শিখরে কামদেবতার উদ্যানে গেলেন। সেখানে কামনার দেবতা কন্দর্প ও তাঁর পত্নী রতিকে দেবরাজ ইন্দ্র সব কথা বলতে, কন্দর্প ও রতি তখনই মহাদেবের তপস্যা স্থলে উপস্থিত হলেন। মদনদেব ও রতি সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, কঠোর তপস্যার রুক্ষ পরিবেশ সরে গিয়ে, প্রকৃতিতে বসন্তের স্পর্শ লাগল। হঠাৎ এই ঋতু পরিবর্তনে ভগবান ত্র্যম্বক বিস্মিত হলেন, তিনি তৃতীয় নয়ন মেলে তপস্যারতা সুন্দরী কন্যা পার্বতীকে দেখলেন এবং এ সবের আড়ালে দেখতে পেলেন মদনদেবকে।

তাঁর মনে চঞ্চলতা আনার জন্যে এসব মদনদেবেরই কারসাজি বুঝে, তিনি তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে মদনদেবকে দগ্ধ করে ফেললেন। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাতুরা রতি মহাদেবের চরণে বিলাপ করাতে, মহাদেব বললেন, “হে ভদ্রে, তোমার পতি অনঙ্গ (কায়াহীন) হলেও তোমাদের দাম্পত্যে কোন বিঘ্ন ঘটবে না। ভগবান বিষ্ণু যখন সর্বজনের হিতের জন্যে বসুদেব-তনয় বাসুদেব হয়ে মর্ত্যে জন্ম নেবেন, তাঁর পুত্র হয়ে মদন আবার জন্ম নেবে”। মহাদেবের বরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে রতিদেবী তাঁর বসন্ত পারিষদদের নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।

কন্দর্পের এই দুর্দশা দেখে দেবী পার্বর্তী আরও কঠোর তপস্যায় মগ্না হলেন। এই তপস্যায় সারাদিনে তিনি একট পাতাও মুখে দিতেন না, এই কারণে তাঁর নাম হল অপর্ণা। তাঁর এই কঠোর তপস্যায় মহাদেব বিচলিত হলেন এবং সন্তুষ্টও হলেন। তিনি ব্রাহ্মণের বেশে দেবী অপর্ণার আশ্রমে গেলেন। অলৌকিক দিব্য লক্ষণাদি দেখে দেবী তাঁকে মহেশ্বর বলে চিনতে পেরে পূজা ও স্তব করলেন। মহাদেব তখন স্বরূপ ধারণ করে স্মিতমুখে বললেন, “হে দেবি, সকলকে আমাদের লীলা দেখানোর জন্যেই তোমার বিবাহের স্বয়ংবরে, আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হব”।  এই কথা বলে তিনি নিজের আশ্রমে চলে গেলেন, দেবী পার্বতীও তপস্যা ভঙ্গ করে ফিরে এলেন পিতৃগৃহে।

দেবী পার্বতী ঘরে ফিরে আসাতে মাতা মেনকা ও পিতা গিরিরাজ আনন্দে বিহ্বল হলেন এবং কন্যার মুখে দেবাদিদেবের মন্ত্রণার কথা শুনে সর্বলোকে কন্যার স্বয়ংবর ঘোষণা করলেন। সেই সভায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু থেকে সকল দেবতাই উপস্থিত হলেন। সর্ব অলংকারে ভূষিতা গিরিকন্যা যখন সভায় উপস্থিত হলেন, তাঁর সঙ্গী ছিলেন কল্পদ্রুম-পুষ্পের মালা হাতে জয়া এবং ব্যজন (চামর) হাতে বীজন করছিলেন বিজয়া। সভাস্থলে দেবী পার্বতী যখন বরমাল্য হাতে নিলেন, তখন অকস্মাৎ ভগবান মহাদেব লীলা করার ইচ্ছায় শিশুরূপ ধারণ করে তাঁর কোলে শুয়ে পড়লেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত দেবতারা সকলেই ক্ষুব্ধ হলেন, এই শিশু কে? দেবরাজ ইন্দ্র শিশুকে হত্যা করার জন্যে বজ্র নিক্ষেপ করতে উদ্যত হতেই, শিশুর হাতের ইঙ্গিতে ইন্দ্র পুতুলের মতো নিঃসাড় হয়ে গেলেন। এভাবেই যে যে দেবতা তাঁদের অস্ত্র হাতে শিশুকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন, সকলেই স্থির, নিশ্চেষ্ট, স্পন্দনহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দেবতাদের এই অদ্ভূত দুর্দশা দেখে ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলেন এবং জানতে পারলেন, ওই শিশুই ভূতভাবন ভূতপতি মহেশ্বর। তিনি তখন উঠে দাঁড়িয়ে শিশু দেবাদিদেবকে নমস্কার করে, তাঁর স্তব ও স্তুতি করতে লাগলেন। তারপর ব্রহ্মা সকল স্তম্ভিত দেবতাদের উদ্দেশে বললেন, “ওহে দেবতাগণ, দেবাদিদেব মহেশ্বর যে শিশুরূপে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তা তোমাদের কেউই বুঝতে পারোনি? অতএব তোমরা সকলেই মূঢ় প্রতিপন্ন হয়েছ। এখন সকলে মহেশ্বর ও মহেশ্বরীর শরণাপন্ন হও। দেবতারা সকলেই মোহমুক্ত হয়ে দেবাদিদেব শঙ্কর ও দেবী পার্বতীকে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন এবং নানান স্তবস্তুতিতে তাঁদের অর্চনা করলেন।

এরপর বহুবিধ আড়ম্বরে সকল দেবতাদের উপস্থিতিতে উভয়ের বিবাহ সম্পন্ন হল এবং যথাকালে তাঁদের পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হওয়ার পরে, বালক কার্তিকের হাতেই তারকাসুর নিহত হল (লিঙ্গপুরাণ/১০১, ১০২, ১০৩)।

এই কাহিনী নিয়ে কোন মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু একটা বিষয় বেশ উপভোগ্য। দেবরাজ ইন্দ্র অসুর ও দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রায়শঃ পরাজিত ও স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিত্রাণের জন্য ত্রিদেবের শরণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে দেবী পার্বতীর কোলে থাকা একটি শিশুকে বধ করার জন্য তাঁকে প্রথমেই হাতে বজ্র তুলে নিতে হল! আবার শিশুরূপী দেবাদিদেবের হাতের ইশারায় তিনি একেবারে জড়বৎ পুতুল হয়ে গেলেন! দেখা যাচ্ছে ভাগবত এবং শৈব - উভয় পুরাণকারই সুযোগ পেলেই বৈদিক দেবরাজ ইন্দ্রকে অপদস্থ করতে দ্বিধা করেননি।

চলবে...



[1] সম্ভবতঃ সত্যযুগে– এই সময়েই বিখ্যাত অসুর এবং দৈত্যদের সংহার করে আর্যরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করছিলেন, এই অসুর, দৈত্য, দানব সকলেই যে অবৈদিক অনার্য সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

[2] প্রমথাধিপত্য>প্রমথদের আধিপত্য – প্রমথ মানে ভূত বা প্রেত – মহাদেবের পারিষদদের “গণ” বলা হত, গণপতি তাদের প্রধান।


শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৪

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৩ "  


২৪ 

সুনুদা, 

গতকাল বাগডোগরা থেকে কার্সিয়াং গিয়ে সব কাজ কর্ম সারতে সারতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। কাজ শেষ করে নেমে এলাম শিলিগুড়িতে। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, প্রায় সাড়ে দশটা। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে সামান্য ডিনার সারার পর, খুব টায়ার্ড ফিল করছিলাম। তাছাড়া আভোরে কলকাতা ফেরার ফ্লাইট ধরার টেনশন ছিল বলে, তোমাকে লিখতে পারিনি। আজ এখন এয়ারপোর্টেওয়েটিং লাউঞ্জে বসে আছি। হাতে বেশ খানিকটা সময় আছে। তাই লিখতে বসলাম।

কলকাতার তুলনায় হলদিয়ার ভোরগুলি মাচ বেটার। আবার হলদিয়ার থেকেও এদিককার ভোর আরও বেশি সুন্দর। তার কারণ কি প্রকৃতি? অজস্র গাছপালা, দিগন্ত জোড়া চা-বাগান, ছোট্ট একটা নদী, পাহাড়। হোটেল থেকে বেরিয়েছিলাম ভোরে, আসার সময় কুয়াশা ছিল, খুব হালকা। তার সঙ্গে ছিল সামান্য শীতলতার আবেশ। এখন ওয়েদার অনেকটাই ক্লিয়ার। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে শীতলতার আমেজ একটু বেশীই। তবে এই শীতলতা প্রাকৃতিক নয়, সেন্ট্রাল এসির। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে এখন। মেঘলা না হলে কলকাতা বা হলদিয়াতে এখন ঝলমলে রোদ্দুর উঠে গেছে, কিন্তু এখানে ওই হাল্কা কুয়াশার কারণে রোদ্দুরের উজ্জ্বলতা কম, কিছুটা মলিন যেন বিষণ্ণ। আমার ফ্লাইটের ডিপার্চার টাইম পৌনে নটা।

গতকাল যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই আজ শুরু করি। আমার পুত্রের জীবনটা শুরুই হল একটা আপাত-মিথ্যা দিয়ে। যদিও আমি জানতাম, জগতের কাছে কথাটা মিথ্যে হলেও, আমার কাছে নয়। বরং আমার মনের দিক থেকে ওই কথাটা আজও আমার কাছে পরম সত্য। এবং সেই বিশ্বাসেই আমি ম্যাডামকে দৃঢ়ভাবে বলতে পেরেছিলাম, “হান্ড্রেড পারসেন্ট”।

ওই প্রেপ স্কুলের কাজকর্ম শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরলাম, বাবা, সুধন্বা ও আমি। আসার পথে বাবা খুব চাপা কণ্ঠে আমাকে বললেন, “এটা কি ঠিক করলি, সুকু?”

“এছাড়া আর অন্য কী উপায় আছে বলো? ম্যাডাম তো ঠিকই বলেছেন, বাম্বাই এখন না হয় শিশু, চিরকাল তো আর থাকবে না। ওর সহপাঠী বন্ধুরা এই ব্যাপারটা নিয়ে ওকে হ্যারাস করবে, ইন্সাল্ট করবে, কখনো সামনা-সামনি, কখনো বা আড়ালে। ওর সেই মানসিক যন্ত্রণাটা হয়তো এক, দুবার আমাদের সঙ্গে ও শেয়ার করবে, বাবা, একটু বড়ো হয়ে গেলে, নিজের মনেই গুমরে মরবে। আজকের ভাষায় যাকে বলে ডিপ্রেশন, অবসাদ। যদি ভবিষ্যতে কোনদিন ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়েও, তখন দেখা যাবে। আমার ধারণা আমি হতাশ হব না”।

কথা আর এগোয়নি সেদিন, কারণ ট্যাক্সিটা আমাদের বাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। নামবার সময় ট্যাক্সির ভাড়া মেটানোর সময় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাবা বলেছিলেন, “যা ভালো বুঝিস কর, আমি আর কী বলব, মা?”

তখনকার মতো কোন কথাবার্তা না হলেও, রাত্রে আমার শোবার ঘরে এসে মা বললেন, “বাম্বাইয়ের জীবনটা শুরু করলি এমন একটা ডাঁহা মিথ্যে দিয়ে? আজকাল শুনেছি স্কুল থেকে মা-বাবাকে প্রায়ই ডাকে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া কেমন এগোচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনার জন্যে। সে মিটিংয়ে বারবার তুই যখন একলা যাবি, কী উত্তর দিবি টিচারদের? কত মিথ্যে সাজাবি? সেই সাজানো মিথ্যে তো বাম্বাইও শুনবে, জানবে। তখন তো তোর একূল-ওকূল দুকূলই যাবে, সুকু”!

“তাহলে, তুমি বলছো জ্যোতিষের নামটা ওখানে দেওয়াটাই উচিৎ ছিল?”

“বুঝে দ্যাখ, আমাদের বাম্বাই জ্যোতিষেরই ছেলে, সে কথা অস্বীকার করার কোন উপায় আছে? কিন্তু তার সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক নেই, তোদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গেছে, এ কথাটা স্পষ্ট করে বলে দিলে ক্ষতি কী হত? আজকের যুগে কথাটা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হত। স্কুলের টিচারদের কাছে। এমনকি বাম্বাইয়ের কাছেও? ও একটু বড়ো হলে নিজেই বুঝত, বাবার সঙ্গে থাকতে তার মায়ের খুব কষ্ট হত, তাই মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে”।

“কিন্তু আমার জীবনের ওই পর্বটাকে আমি যে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চাই, মা”।

“সে কি আর আমি বুঝছি না, মা? কিন্তু মুছে ফেলব বললেই কি আর মুছে ফেলা যায়? একি বাম্বাইয়ের খেলার সময় পড়ে গিয়ে হাঁটুর নুন-ছাল উঠে যাওয়া? যে কদিন পরেই সে দাগ মিলিয়ে যাবে! জীবনের কিছু কিছু দাগ সারা জীবন বয়ে বেড়াতেই হয়, তাকে নিঃশেষে মুছে ফেলতে যাওয়া কিচ্ছু নয়”।

সেদিন মায়ের কথার কোন উত্তর দিতে পারলাম না এবং এই নিয়ে কোন কথা বলতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ বসে থেকে মা উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “রাত হল, ঘুমিয়ে পড়। কালকে তোর আবার অফিস আছে”।     

যাই হোক এভাবেই আমার পুত্র শিশু সুধন্বার শিক্ষা জীবনের পথচলা শুরু হল আমার বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। সত্যি বলতে আমার ওই সিদ্ধান্তটা ঠিক না ভুল, বুঝে উঠতে পারিনি আজও। বিভিন্ন স্কুলে টিচার্স মিটিং অ্যাটেণ্ড করেছি বহুবার – ওর বাবার প্রসঙ্গ এসেছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ওর বাবাকে এনে হাজির করার জন্যে কেউ জোরজারি করেনি। এবং শিশু সুধন্বাও এখন আর শিশু নেই, কৈশোর পেরিয়ে সে এখন তারুণ্যের দোরগোড়ায়। সেও কোনদিন তার মাকে তার বাবার সন্ধান এনে দিতেই হবে, একথা মুখ ফুটে বলেনি। হতে পারে এই ব্যাপারটা সে তার দিদার থেকেই বুঝে নিয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই আমাদের কথাবার্তায় পিতৃ প্রসঙ্গ টেনে এনে তার মাকে সে কোনদিন বিব্রত করেনি।

বেশ কয়েক বছর আমাদের জীবনটা বেশ সাবলীল চলার পর, প্রথম ঝড়টা এল বাম্বাই যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। বাবার হঠাৎ সেরিব্রাল অ্যাটাক হল। হপ্তা দুয়েকের টানা লড়াইয়ের পর বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম, কিন্তু তাঁর বাঁদিকটা তখন প্রায় অসাড়। তুমি ডাক্তার, তোমাকে আর নতুন কী বোঝাবো, সুনুদা? তাছাড়া তুমি তো সেসময় প্রায়ই আসতে হসপিট্যালে এবং বাড়িতে। সে সময় তোমার সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছিল বেশ কয়েকবার। বাবার অসুস্থতা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম তখন। তখনও তোমাকে অনেক কথাই বলার ছিল, হয়তো সুযোগও ছিল। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে সে সব কথা তোমাকে বললে তুমি হয়তো ভুল বুঝতে। অথবা বলে ফেলার পর আমিই হয়তো মরমে মরে থাকতাম এই ভেবে যে, আমি কি সাংঘাতিক স্বার্থপর!  বাবা হসপিট্যালে জীবনের জন্যে লড়াই করছেন। আর আমি, তাঁর বুকের মধ্যে অত্যন্ত যত্নে বড়ো হয়ে ওঠা কন্যা, নিজের আখের গুছোচ্ছি!

 সে সময় মামীমা আমাদের বাড়িতেই ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি বুক দিয়ে সামলেছিলেন বাম্বাই ও মাকে। বুঝতেই পারছো বাবার এই আকস্মিক অসুস্থতায় মা দুশ্চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং মামীমা এসে আমাদের সংসারের হাল না ধরলে আরও বিপদে পড়তাম আমরা – সেকথা আজও স্বীকার করতে আমার কোন দ্বিধা নেই, সুনুদা। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মামীমার সেই ঋণ আমি এতটুকুও শোধ করতে চাই না – বরং সেই ঋণ আমার অন্তরে আজীবন সজীব থাকুক।

মায়ের কথাই শুধু বলি কেন, আমিও কি কম আতান্তরে পড়েছিলাম? বড়ো হতে হতে বাবা ও মায়ের সামান্য জ্বর-জ্বারি, সর্দি-কাশি, কিংবা দাঁতের ব্যথা অথবা চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন আমি সামলেছি নির্বিঘ্নে। মনে করেছিলাম এই তো বেশ বড়ো হয়ে গেছি, স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছি। কিন্তু সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর, পাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে বাবার নিত্য পাঞ্জা কষার দৃশ্যগুলো আমার ভেতরটাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল, সুনুদা।

কোথায় কোন হসপিট্যালে নিয়ে যাব। কোন ডাক্তার ভালো এবং যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য কিছুই তো জানতাম না। কলকাতা শহরে কত ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট হসপিট্যাল, পাড়ায় পাড়ায় কত নার্সিং হোম। কিন্তু কোথায় গেলে হতে পারে বাবার সঠিক চিকিৎসা? কিছুই ঠিক করতে পারছিলাম না। তাছাড়া শুধু চিকিৎসাও তো নয়, তার ব্যয়সীমাও যে জানা দরকার। নামজাদা হসপিট্যালে ভর্তি করার পর, সেখানে প্রাত্যহিক খরচ যদি আমাদের আয়ত্তসীমার বাইরে হয়, তাহলে কতদিন টানতে পারবে আমার পরিবার। এক কথায় দিশাহারা হয়ে উঠেছিলাম।

সে সময় শশাঙ্কর সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না। ওকে ফোন করে বিপদের কথা জানাতেই মিনিট পনেরর মধ্যে বিভাস এএলএস অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চলে এল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শশাঙ্ক উপস্থিত হল নিজের গাড়ি নিয়ে। পাঁচমিনিটের মধ্যে বাড়িতে তালা দিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম, কোথায় যাচ্ছি তখনো জানতাম না। নিজের গাড়িতে সামনের সিটে বসা শশাঙ্ক, সারাটা পথ মোবাইলে কথা বলে চলেছিল অনর্গল। মিনিট দশের মধ্যে আমরা ঢুকে পড়লাম, একটা হসপিট্যালের পার্কিংয়ে। ওখানে অতুল আমাদের জন্যে ওয়েট করেছিল।

পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল অ্যাটেণ্ডেটরা। শশাঙ্ক আমাকে নিয়ে গেল ওদের ইনডোর রিসেপশনে। মাকে বলল, “মাসিমা, চিন্তা করবেন না, চিকিৎসা শুরু হয়ে গেছে, আপনি এই চেয়ারে বসুন। আর সুকন্যা, ফর্ম-টর্ম সব ফিলআপ করা হয়ে গেছে, তোমাকে কয়েকটা সিগনেচার শুধু করতে হবে”।                       

এই সময় বিভাসও সেখানে উপস্থিত হল, বলল, “মেসোমশাইকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিয়েছে। বেশ কয়েকটা টেস্ট আর চেক-আপ হবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ওরা মেসোমশাইয়ের কণ্ডিশন জানিয়ে দেবে”।

আমি বেশ কয়েক পাতার ফিল-আপ করা ফর্মটা খুব দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে প্রত্যেক পাতাতেই সই করে দিলাম। আমার ও বাবার নাম, ঠিকানা, বয়েস, আমাদের মেডিক্যাল ইন্সিওরেন্সের নাম্বার, এমনকি ক্যাশলেস কার্ড, আমার আধার কার্ড, প্যানকার্ডের ফোটোকপি পর্যন্ত অ্যাটাচ্‌ড্‌ রয়েছে ফর্মের সঙ্গে। বিভাসকে জিজ্ঞেস করলাম, “এত ডিটেল্‌স্‌ আর ডকুমেন্ট্‌স্‌ পেলেন কোথায়, ফর্মটা ফিলআপই বা করল কে, অতুল?”

বিভাস মুচকি হেসে বলল, “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না, ম্যাডাম। এটাই আমাদের কাজ। কাল সকালে কিন্তু অতুলকে পাঠাবো, মনে করে মেসোমশাইয়ের আধার আর প্যানকার্ডটা দিয়ে দেবেন, ম্যাডাম, ওগুলো না পেলে ফর্মটা কিন্তু প্রসেসে যাবে না”।

সই করা হয়ে যেতে বিভাস ফর্মটা জমা করে দিল রিসেপশনের ম্যাডামকে। তিনিও বাবার আধার আর প্যান নিয়ে একই রিমাইণ্ডার দিলেন। উত্তরে বিভাস বলল, “কাল সকাল নটার মধ্যে সব পেয়ে যাবেন, ম্যাডাম...”।

 আমি মায়ের পাশে একটা চেয়ারে বসলাম, ভয়ানক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত শুকনো মুখে মা বসেছিলেন। মায়ের হাতে হাত রেখে আমি বললাম, “চিন্তা করো না, মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাবা কেমন আছেন, সে কথাও আমরা জেনে যাবো”।

মা কোন উত্তর দিলেন না, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মায়ের দু চোখের দৃষ্টিতে কোন বোধ নেই যেন। তারপর সামনের দেয়ালে টাঙানো বড় ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। খুব অসহায় মনে হয়েছিল নিজেকে, এখন থেকে সারাক্ষণ মা কি সেকেণ্ড, মিনিট কাউন্ট করে যাবেন?

 ওই, বোর্ডিং কল শুরু হল। এখানেই শেষ করছি। সময় পেলেই আবার লিখব, সুনুদা।

 তোমার কনি।

চলবে...

 


শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৫

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৪ "


মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

১৩ই জুলাই, ২০২৬, রবিবারের সন্ধে

সন্ধেবেলা প্রবীণবাবুর ঘরে সকলেই জড়ো হল। নবীনবাবু, অহীন, সর্বজিৎ এবং নবীনবাবুদের গৃহ চিকিৎসক ডাক্তার বিপিন সরকার। প্রবীণবাবু ডাক্তারবাবুকে তাঁর ছোটকা অবিনবাবুর পাতালঘরে বন্দী থাকার কথা সবিস্তারে বললেন। সর্বর্জিৎ আজ সকালে যা যা ঘটেছে সব কথাই বলল এবং অবিনবাবুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে তার উদ্বেগের কথাও বলল।

সবকথা শুনে ডাক্তার সরকার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, তারপর বললেন, “প্রবীণকাকু, তোমার ছোটকার কথা আমার দাদু, ঠাকুমা এবং বাবা-মার মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছি। তবে সত্যি বলতে আমরা সেকথা বিশ্বাস করিনি। তবে আজ সর্বজিতের কথায় আশ্চর্য হচ্ছি – আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে এমন ঘটনার কথা কোনদিন পড়িনি, আর আমার দীর্ঘ ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনা কখনও দেখিনি বা শুনিনি। সর্বজিৎ তার দুশ্চিন্তার কথা যা বলল, সেগুলোও খুবই যুক্তিযুক্ত। ১৯৪৩ থেকে ২০২৬ মানে এই তিরাশি বছরে আমাদের পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু আগেও ছিল এখনও আছে। নিমোনিয়া, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, সর্দিজ্বর তখনও ছিল, আজও আছে। কিন্তু এখনকার ভাইরাসগুলোর চরিত্র অনেক বদলে গেছে, যেমন আমরাও বদলে গেছি। তার পাশাপাশি আমরা ভয়ংকর কিছু নতুন ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে সদ্য জিতেছি। যেমন কোরোনা ভাইরাস। অবিনদাদুর পক্ষে এর যে কোন একটা সংক্রমণই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে”।

প্রবীণবাবু বললে, “ঠিক কথা, ডাক্তার। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ কোন মন্ত্র আর কৌশলে এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, সে কথা তিনিই জানেন। কিন্তু আজ তিরাশি বছর পরে - মানুষটি জেগে উঠলে আমাদের কী করতে হবে সে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কিনা – সেও তো আমরা জানি না, ছাই। আচ্ছা, ত্রিকালদর্শী মানুষ যা হোক, হুঁঃ। নিজের মৃত্যুটাই কবে হবে এবং কিভাবে হবে সেটাই তিনি জানতে পারেননি!”

ডাক্তার সরকার বললেন, “সে কথা জানার কোন উপায় যখন নেই, তখন আমার মতে অবিনদাদুকে পাতালঘর থেকে বের করে, সরাসরি কোন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে দেওয়াই সমীচীন। সারাক্ষণ অবজার্ভেশনে রেখে ওঁনার শরীর-স্বাস্থ্য মনিটর করতে সুবিধে হবে”।

সর্বজিৎ আনন্দে বলে উঠল, “বাঃ এর থেকে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতেই পারে না। কিন্তু সেখানেও কিছু সমস্যা দেখা দেবে...”।

ডাক্তার সরকার জিজ্ঞাসা করলেন, “কিসের সমস্যা সর্বজিৎ?”

সর্বজিৎ বলল, “নার্সিং হোমে অ্যাডমিট করতে গেলেই দাদুর আইডেন্টিটি লাগবে, ওঁনার আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড কিছুই নেই”।

ডাক্তার সরকার বললেন, “একদম ঠিক বলেছ। নবীনদা, ওঁনার আধার আর ভোটার কার্ড, যত শিগ্‌গিরি সম্ভব বানিয়ে ফেলতেই হবে। তবে আপাততঃ আমার নার্সিং হোমে আমি ভর্তি করে, অবজার্ভেশন চালু করে দেব...তবে সেক্ষেত্রেও বড় একটা সমস্যার কথা মাথায় রাখতে হবে”।

প্রবীণবাবু বললেন, “আবার কি সমস্যা, ডাক্তার?”

একটু ইতস্ততঃ করে ডাক্তার সরকার বললেন, “যদি অবিনদাদু ঠিকঠাক থাকেন – কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় – আমি ও আমার নার্সিং হোম ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। থানা-পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেবে না...আমার নার্সিং হোম তো বন্ধ হয়ে যাবেই – আমার ডাক্তারি লাইসেন্সও হয়তো...”।

প্রবীণবাবু বললেন, “তুমি কি ছোটকার মারা যাওয়া নিয়ে ভাবছ, ডাক্তার? দুর্ভাগ্যক্রমে যদি তা হয়ও, তোমার বিপদ হবে কেন? চিকিৎসাধীন মানুষের কি হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে মৃত্যু হয় না?”

ডাক্তার সরকার বললেন, “সে তো হতেই পারে, কাকু। কিন্তু অবিনদাদুর কোন পরিচয় নেই যে। উনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কোন কাজের জন্যে উনি পাতালঘরে গা ঢাকা দিয়েছিলেন? সে কথা এতদিন স্থানীয় পৌরসভা বা থানায় জানানো হয়নি কেন? এসব প্রশ্ন উঠে আসবেই। আজ যদি হঠাৎ আমরা বলি, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ অবিনদাদুকে তিরাশি বছরের জন্যে সমাধি করে রেখেছিলেন। এবং এতদিনে তাঁর সমাধি ভঙ্গ হয়েছে। কেউ বিশ্বাস করবে? আমাদের সকলকেই চরম হেনস্থার মধ্যে পড়তে হবে!”

প্রবীণবাবু বললেন, “হুম্‌, বুঝলাম। কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ, ডাক্তার। বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে বিশ্বাস ব্যাপারটাই লোপ পেয়ে গেছে। কেউ ভাল কাজ করলে বলি, ব্যাটার কোন ধান্দা আছে। আর কেউ খারাপ কাজ করে ধরা পড়লে বলি, তাকে ফাঁসানোর জন্যে ঘটনাটা সাজানো হয়েছে। আমার ছোটকার ব্যাপারটাও জানাজানি হলে, লোকে বলবে – বড়সড় কোন কেলেংকারি করে গা ঢাকা দিয়েছিল। এখন আমরা সবাই মিলে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছি, তাকে বাঁচানোর জন্যে। তাহলে তোমার মতে এখন কী করণীয়?”

ডাক্তার সরকার বললেন, “করণীয় বলতে একটাই, আমরা আগামীকালই অবিনদাদুকে বের করে নিয়ে সোজা আমার নার্সিং হোমে নিয়ে যাবো। তার সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন সকলকেই জানিয়ে দেব। প্রেস এবং মিডিয়ার ব্যাপারটা পুলিশকেই সামলাতে বলব”।

নবীনবাবু এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলেন, এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ঠিক বলেছেন, ডাক্তারবাবু, প্রেসকে আমরা কিছু বলতে গেলে, গুড়ের নাগরিতে মাছি পড়ার মতো, আমাদের ছেঁকে ধরবে – তখন এদিককার আসল কাজই হয়তো পণ্ড হয়ে যাবে”।

প্রবীণবাবু বললেন, “কিন্তু ছোটকার সমাধির তিরাশি বছর পূর্ণ হবে, এমাসের ১৯ তারিখে। তার মানে এখনও ছদিন বাকি। আমার মতে, ডাক্তার, এ কটাদিন অপেক্ষা করি না। ওই ঊণিশ তারিখেই ছোটকাকে বের করে আনার ব্যবস্থা করলে ভালো হত না?”

সকলেই চুপ করে তাকিয়ে রইলেন প্রবীণবাবুর মুখের দিকে। বৃদ্ধের দুচোখে আশা আর আনন্দের দ্যুতি।  মুখে ধৈর্যের দৃঢ়তা। প্রিয় ছোটকাকে সুস্থ দেখতে তিনি উদ্গ্রীব – কিন্তু সামান্য এই কটা দিনের জন্যে – তিনি কোন ঝুঁকি নিতে চান না।

কিছুক্ষণ পরে সর্বজিৎ বলল, “তাই হবে দাদু। এই কটা দিন সময় পেলে আমরাও কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারবো। অহীন, মহীনদা কাল দুপুরের দিকে পৌঁছাচ্ছে বললে, না?”

অহীন বলল, “হ্যাঁ। আমদাবাদ থেকে ভোরের ফ্লাইট – কলকাতা থেকে বাড়ি আসতে একটা-দেড়টা হয়ে যাবে”।

“গুড। ডাক্তারকাকু, আগামীকাল সন্ধেবেলা আমরা আরেকবার বসতে পারি কি? মহীনদা থাকবে। আপনাদের পরিচিত এ শহরের কয়েকজন গণ্যমান্য মানুষকেও যদি ডাকেন, তাঁদের সকলকে সব কথা জানিয়ে আমরা তাঁদের পরামর্শও নিতে পারবো। তাতে আমাদের সব ব্যবস্থা সামলে নিতেও সুবিধে হবে”।

ডাক্তারবাবু একটু চিন্তা করে বললেন, “হুঁ আমি চলে আসতেই পারি। আসলে অবিনদাদুর এই কেসটা নিয়ে আমি খুবই এক্সাইটেড ফিল করছি। মেডিকেল সায়েন্সে এই ঘটনা হয়তো অসাধারণ এক রেকর্ড গড়ে তুলবে। ঠিক আছে, আজ তাহলে আমি উঠি। কাল সন্ধে সাড়ে ছটা-সাতটা নাগাদ আসব। প্রশাসনের দু একজন মাথাকেও সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করব”।

নবীনবাবু বললেন, “বাঃ তাহলে তো খুবই উপকার হয়”।

চলবে... 



নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪০

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...