শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৫

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ  স্কন্ধ - পর্ব ৫


ধ্রুবর তপস্যা

এদিকে মধুবনে স্নান করে ধ্রুব সমাহিত হয়ে সমস্ত রাত্রি উপবাসে রইলেন এবং দেবর্ষির উপদেশ মতো শ্রীহরির পরিচর্যা করতে লাগলেন। প্রত্যেক তিন রাত্রি অন্তর শুধুমাত্র দেহধারণের জন্যে ধ্রুব বেল ও কুল জাতীয় ফল খেয়ে শ্রীহরির অর্চনায় একমাস কাটিয়ে দিলেন। দ্বিতীয় মাসে প্রতি ছদিন অন্তর শাকপাতা খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তৃতীয় মাসে প্রতি নদিন অন্তর শুধুমাত্র জলপান করে কাটিয়ে দিলেন। চতুর্থ মাসে প্রতি বারোদিন অন্তর বায়ুভক্ষণ করে সমাধিযোগে ভগবানের ধ্যানে নিরত রইলেন। পঞ্চমমাসে শ্বাসজয় করে রাজপুত্র ধ্রুব একপায়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভগবানের অবিচল ধ্যান করতে লাগলেন। ধ্রুব যখন একপায়ে দাঁড়িয়ে ধ্যানে ডুবে রইলেন, ত্রিভুবন দুলে উঠল। হাতি নৌকায় উঠলে, তার ভারে নৌকা যেমন বামে ও দক্ষিণে দুলতে থাকে, তেমনই ধ্রুবর একটি পায়ের ভারে, পৃথিবীর অর্ধাংশ ডাইনে বাঁয়ে দুলতে লাগল। পৃথিবীর এই অবস্থায় দেবতা ও লোকপালেরা আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন, তাঁরা এই ঘটনার কোন কারণ বুঝতে না পেরে ভগবান শ্রীহরির শরণাপন্ন হলেন।

দেবতাদের আশ্বস্ত করে ভগবান বললেন, “তোমরা আতঙ্কিত হয়ো না, মহারাজ উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব আমার বিশ্বরূপের সঙ্গে একত্র হয়ে অবস্থান করছে। কিছুদিনের মধ্যেই আমি তাকে এই তীব্র তপস্যা থেকে নিরস্ত করবো। তোমরা ভীত না হয়ে, নিজ নিজ স্থানে ফিরে যাও”। দেবতারা নিশ্চিন্তমনে স্বর্গে ও লোকপালেরা নিজেদের স্থানে ফিরে গেলে, ভগবান শ্রীহরিও তাঁর গরুড়ের পিঠে উঠে মধুবনের দিকে রওনা হলেন।

 

৯

 

ধ্রুবর শ্রীহরি দর্শন

মধুবনে পৌঁছে শ্রীহরি দেখলেন, বাইরে থেকে ধ্রুব স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে তার হৃদয়ের মধ্যে শ্রীহরির পরমরূপ দর্শন করছে। সামনে ভগবান স্বয়ং প্রত্যক্ষ উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ধ্রুব তাঁকে দেখতে পেল না। তখন ধ্রুবর হৃদয় থেকে ভগবান নিজের রূপ তুলে নিতেই, ধ্রুব চোখ মেলে তাকাল এবং সামনেই দেখতে পেল স্বয়ং ভগবানকে। ভগবানকে দেখে ধ্রুব তাঁকে দণ্ডবৎ প্রণাম করল, তারপর জোড়হাতে ভগবানের স্তব করার ইচ্ছায় ব্যাকুল হয়েও কিছুই বলতে পারল না। কারণ সে সময় ধ্রুব আনন্দে বাক্যহারা এবং কিভাবে ভগবানের গুণবর্ণনা করতে হয়, তাও তার জানা ছিল না। করুণাময় ভগবান সবই বুঝতে পারলেন, তিনি স্মিতমুখে তাঁর বেদশঙ্খ দিয়ে স্পর্শ করলেন ধ্রুবর দুই গাল।  ভগবানের স্পর্শে বালক ধ্রুব এখন ঈশ্বর ও জীবের তত্ত্ব উপলব্ধি করলেন এবং ধ্রুব নামক অক্ষয় লোকের অধিকারী হলেন।

এরপর তাঁর মধ্যে ভগবানের স্তুতিশক্তি সঞ্চারিত হল, তিনি বললেন, “অখিল শক্তিধর যিনি আমার মধ্যে চিৎশক্তিরূপে আমার প্রাণ ও সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সঞ্জীবিত করছেন, সেই অন্তর্যামী ভগবান, আপনাকে প্রণাম। হে ভগবান, ত্রিগুণবিশিষ্ট মায়া আপনার শক্তি। আপনি এই মায়ার প্রভাবে চরাচর সৃষ্টি করে, নিজেও তার মধ্যে সংযুক্ত রয়েছেন। অগ্নি যেমন নানান ধরনের কাঠে নানান রূপে দেখা যায়, আপনিও অন্তর্যামীরূপে এক হয়েও, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের মধ্যে ব্যাপ্ত থেকে নানা রূপে দেখা দিয়ে থাকেন। হে নাথ, ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি, জেগে উঠে যেমন পূর্ব দিনের মতোই জগতকে দেখতে পায়, আপনার দেওয়া জ্ঞানেই আপনার শরণাপন্ন ব্রহ্মা এই বিশ্বকে দর্শন করতে পেরেছিলেন। আপনি মুক্তদেরও আশ্রয়, আপনি জীবকে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি দেন, আপনি কল্পতরু। হে অনন্ত, যাঁরা সর্বদা আপনাকে ভক্তি চিত্তে মনে রাখেন, সেই সব মহাজন ব্যক্তিদের সঙ্গেই যেন আমার সঙ্গ হয়। কারণ তাঁদের মুখে সর্বদা আপনার কথামৃত পান করে, আমিও এই বিপদসংকুল ভবসাগর খুব সহজেই পার হয়ে যেতে পারব।

হে অজ, এই বিশ্বের নিখিল বস্তুর মধ্যে আপনার যে স্থূলরূপ ব্যাপ্ত, আমি আপনার সেইটুকুই শুধু জানি। কিন্তু এই সব কিছুর অতীত আপনার যে ঈশ্বররূপ, যা শব্দের অগোচর, সেই ব্রহ্মস্বরূপ সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। যে অদ্ভূত পুরুষ কল্পের অবসানে নিজের জঠরের মধ্যে ত্রিলোককে ধারণ করে, অন্তর্দৃষ্টিতে অনন্তের কোলে শয়ন করেন । যাঁর নাভিমূল থেকে সঞ্জাত মৃণালের মধ্যে  হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা আবির্ভূত হন, আমি সেই পরমপুরুষকে প্রণাম করি। আপনার সঙ্গে জীবের অনেক বৈলক্ষণ আছে। যেমন আপনি নিত্যমুক্ত, কিন্তু আপনার করুণায় জীব মুক্ত হয়। আপনি পবিত্র, জীব মলিন। আপনি সর্বজ্ঞ, জীব অজ্ঞ। আপনি আত্মা, জীব জড়। আপনি নির্বিকার কূটস্থ, জীবের বিকার আছে। আপনি অজ, জন্মরহিত আদিপুরুষ, জীবের জন্ম আছে। আপনি ভগ অর্থাৎ ঐশ্বর্যবান, জীব ঐশ্বর্যহীন। আপনি ত্রিগুণের অধীশ্বর, কিন্তু ত্রিগুণের অতীত, জীব গুণের বশীভূত। আপনি সমস্ত জীবের পালনকর্তা, আপনার কৃপা ছাড়া জীব নিজেকেও পালন করতে অক্ষম। আপনি সকল যজ্ঞের অধিকর্তা, জীব যজ্ঞ কর্মের অধীন। আপনার অখণ্ড আত্মদৃষ্টি দিয়ে জীবের সকল অবস্থার আপনিই সাক্ষী, জীবের দৃষ্টি তার অবস্থা ভেদে খণ্ডিত। যাঁর থেকে এই বিশ্বের সৃষ্টি, সেই অখণ্ড অনন্ত, নির্বিকার আনন্দমাত্র ব্রহ্মের আমি শরণাপন্ন হলাম। হে ভগবান, পরমানন্দই আপনার মূর্তি, আপনি আমাদের মতো দীন শরণাপন্ন মানুষকে সংসারভয় থেকে রক্ষা করুন”।

ভক্তবৎসল ভগবান ধীমান ধ্রুবের এই স্তুতিতে সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “হে রাজপুত্র, তোমার কল্যাণ হোক। আমি জানি, তোমার মনের কি সংকল্প। হে সুব্রত, দুর্লভ হলেও আমি তোমার মনের সেই সংকল্প পূর্ণ করব। হে বৎস, আমি তোমাকে এমন উৎকৃষ্ট লোক দান করব, যা নিত্যধাম, যা এর আগে অন্য আর কেউ লাভ করতে পারেন নি। যাকে কেন্দ্র করে গ্রহ, নক্ষত্র সমন্বিত জ্যোতিশ্চক্র স্থাপিত হয়েছে। ত্রৈলোক্য বিনষ্ট হলেও, যার বিনাশ হয় না। নক্ষত্ররূপী ধর্ম, অগ্নি, কশ্যপ, ইন্দ্র ও সপ্তর্ষিমণ্ডল যাকে তারকাদের সঙ্গে প্রদক্ষিণ করেন, তোমাকে সেই উৎকৃষ্ট লোক দান করলাম।

তোমার পিতা তোমার হাতে পৃথিবীর ভার অর্পণ করে বনবাস করলে, তুমি তেষট্টিহাজার বছর পৃথিবীকে পালন করবে, কিন্তু তোমার ইন্দ্রিয়শক্তি খর্ব হবে না। তোমার ভাই উত্তম, মৃগয়া করতে গিয়ে প্রাণত্যাগ করবে এবং সেই শোকে পাগলিনী হয়ে তোমার বিমাতা সুরুচি দাবাগ্নিতে প্রবেশ করবেন। আমিই যজ্ঞ, অতএব যজ্ঞ করেই তুমি আমার ভজনা করবে এবং প্রচুর দক্ষিণা দান করবে। তারপর তুমি আমার ধামে যাত্রা করবে, সেই লোক সর্বলোকের বন্দনীয়, ঐ স্থানে গেলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না”।

[শ্রীহরি ধ্রুবকে তেষট্টিহাজার বছর রাজত্ব করার বর দিলেন - তাঁর সেই রাজত্ব আবার শুধু এই ভারতবর্ষ নয় সমগ্র পৃথিবী! পুরাণকাররা   পুরাণ লিখতে বসে অল্পে সন্তুষ্ট হতেন না, তাঁরা বিশ্বাস করতেন, "মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার" অথবা কল্পনার রন্ধনে ঘি যদি ঢালতেই হয় দু এক চামচ নয়, ঢালতে হবে কলসি কলসি। সব কিছুই মাত্রাছাড়া।]  

ভগবান শ্রীহরি এই কথা বলে, বালক ধ্রুবের সামনেই নিজের ধামে ফিরে গেলেন, কিন্তু ধ্রুব তাঁর কঠোর তপস্যার ফলস্বরূপ শ্রীভগবানের বর পেয়েও খুব খুশী হতে পারলেন না। তিনি রাজপুরীতে ফিরে গেলেন এবং চিন্তা করতে লাগলেন, “আমি মুক্তিপতি ভগবানের কৃপা পেয়েও মুক্তি চাইলাম না। সনন্দ প্রমুখ কুমারেরা বহুজন্ম সমাধি অভ্যাস করে, যে পদ লাভ করতে পেরেছেন, আমি মাত্র ছমাসের তপস্যায় সেই পদ লাভ করেছিলাম। শ্রীহরির চরণ লাভ করলে ভববন্ধন ছিন্ন হয়, কিন্তু আমার ভেদদৃষ্টি ও মূর্খতার জন্যে আমি সংসারের মায়াই সংকল্প করে রইলাম। বিমাতার বাক্যবাণ আমার হৃদয়ে এমনই ক্ষত সৃষ্টি করেছিল,  যে কঠোর তপস্যাতেও সেই ক্ষত আরোগ্য হয় নি। দৈবী মায়ার বশে আমি বিমাতা ও বৈমাত্রেয় ভাইকে শত্রু কল্পনা করেছিলাম। আয়ু শেষে মরণাপন্ন ব্যক্তির যেমন ওষুধ নিষ্ফল হয়, আমারও এই তপস্যা লব্ধ ফল ব্যর্থ হয়েছে। ভগবান এসেছিলেন আমাকে তাঁর পরমানন্দ দান করতে, আর আমি আমার অহংকারের আরোগ্যের জন্যে তাঁর কাছে রাজত্ব ও রাজ্য সংকল্প করলাম! হায়, আমার মূঢ়তার কোন সীমা নেই”।

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “রাজা উত্তানপাদ, তাঁর পুত্র ধ্রুব ফিরে আসছে, প্রথমে এই সংবাদ শুনে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। তারপর দেবর্ষি নারদের কথা মনে পড়ায়, তিনি আনন্দে অভিভূত হয়ে সেই সংবাদদাতাকে সোনার হার পুরষ্কার দিলেন।  অমাত্য, ব্রাহ্মণসহ, সুনীতি ও সুরুচি দুই পত্নী এবং পুত্র উত্তমকে নিয়ে রথে চড়ে পুত্র ধ্রুবর সন্ধানে বের হলেন। কিছুদূর গিয়ে উপবনের সামনেই ধ্রুবকে দেখতে পেয়ে, রথ থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে বুকের মধ্যে পুত্র ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরলেন। ধ্রুব পিতার চরণে প্রণাম করলেন, আনন্দ অশ্রুতে ভরে উঠল রাজা উত্তানপাদের দুই চোখ। ধ্রুব তাঁর দুই মাতাকেই প্রণাম করলেন। ভাই উত্তমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাজর্ষি উত্তানপাদ পুত্র ধ্রুবের ভগবত তপস্যার অদ্ভূত প্রভাব শুনে ও দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং পিতার ভবনে ধ্রুব স্বর্গের দেবতার মতোই বসবাস করতে লাগলেন।

ধ্রুবর রাজ্যভোগ ও যক্ষ হত্যা 

অনেক দিন পর, নিজের বার্দ্ধক্য অনুভব করে এবং ধ্রুবর যৌবন উপস্থিত দেখে, তিনি প্রজাদের সম্মতি নিয়ে ধ্রুবকে নিজের রাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। তারপর বিষয়ভোগ ত্যাগ করে, ঈশ্বরচিন্তার জন্যে তিনি রাজভবন ছেড়ে বনে চলে গেলেন।

পিতার সিংহাসনে আরোহণ করে, ধ্রুব শিশুমারের কন্যা ভ্রমি ও বায়ুর কন্যা ইলাকে বিবাহ করেছিলেন। ভ্রমির গর্ভে কল্প ও বৎসর নামে দুই পুত্র আর ইলার গর্ভে উৎকল নামে এক পুত্র ও এক কন্যার জন্ম হল। উত্তম বিয়ে করলেন না। একবার মৃগয়া করতে গিয়ে তিনি হিমালয় প্রদেশের কাছে মহাশক্তিধর যক্ষসেনার হাতে মারা গেলেন। সেই শোকে ব্যাকুল সুরুচি পুত্রের খোঁজে অরণ্যে প্রবেশ করার পর দাবানলের মধ্যে প্রাণত্যাগ করলেন। এদিকে ভাই উত্তমের মৃত্যু সংবাদে মহারাজ ধ্রুব প্রচণ্ড শোকে এবং  ক্রোধে অভিভূত হয়ে, প্রতিশোধের ইচ্ছায় যক্ষপুরী অলকার উদ্দেশে রওনা হলেন।

দীর্ঘদিন ধরে যক্ষদের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধের পর, মহারাজ ধ্রুবর প্রবল পরাক্রমে অজস্র যক্ষ ও রাক্ষস সেনা হতাহত হল। মহারাজের রণকৌশলে পর্যুদস্ত হয়ে একদিন রণক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কাউকেই দেখতে পেলেন না। তিনি একবার ভাবলেন শত্রু পরাস্ত হয়েছে, তাঁর ইচ্ছা হল পরাজিত যক্ষদের রাজপুরীতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তিনি নিজেকে সংযত করে তাঁর রথের সারথিকে বললেন, “যক্ষরা অনেক মায়া জানে, অতএব আমরা আরো কিছুক্ষণ সতর্ক হয়ে অপেক্ষা করি”। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, চারদিকে সমুদ্রের গর্জন শোনা গেল। প্রচণ্ড ধুলোর ঝড়ে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল, আকাশে ভীষণ বিদ্যুৎ দেখা গেল, শোনা গেল মেঘের ভয়ঙ্কর গর্জন।  সেই মেঘ থেকে অজস্র গদা, পাথর, খড়্গ বর্ষণ হতে লাগল। অজস্র সাপ, উন্মত্ত হাতি, সিংহ ও বাঘ মহারাজ ধ্রুবের দিকে দৌড়ে আসতে লাগল। ধ্রুবের প্রতি মায়াবী অসুরদের এই ভয়ংকর আক্রমণ দেখে মুনিগণ রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে মহারাজ ধ্রুবকে বললেন, “হে উত্তানপাদতনয়, যাঁর নাম উচ্চারণ করলে বা শুনলে লোকে সাক্ষাৎ মৃত্যুকেও অতিক্রম করতে পারে, আপনি সেই বিপদতারণ শ্রীহরির শরণাপন্ন হোন”।

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৪

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?] 


 


৪৯

 

রাত্রে খাওয়া-দাওয়া করে মারুলা গতকাল আস্থানে ফিরে যায়নি, ভল্লাদের সঙ্গেই ছিল। আজ খুব ভোরে দুজনে রণপা চড়ে বেরিয়ে গেল। কোথায় যাচ্ছে বলল না, যাবার সময় রামালিকে বলল, কালকের কথা মতো নোনাপুরের মাঠে চলে যাবি – ওখানেই আমরা চলে আসব ঠিক সময় মতো”।

অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে বেরিয়ে, ভল্লা আর মারুলা গেল আস্থানে। আস্থানের দরজায় এখন পাহারা দেয় শষ্পকের ব্যক্তিগত রক্ষীরা। তারা ভল্লাকে না চিনলেও, মারুলাকে চেনে। শিবিরের ভেতরে ঢুকে মারুলা গলা তুলে বলল, “মান্যবর আপনি ডেকেছিলেন, আমরা এসেছি”।

শষ্পক তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ভল্লাকে দেখে হাসলেন, “তোমরা আস্থানের বাইরে থাকো – আমি আসছি – এখানে সব আলোচনা করা যাবে না”।

ভল্লা আর মারুলা আস্থানের বাইরে গিয়ে রাজপথের ধারে দাঁড়াল। একটু অপেক্ষার পরেই শষ্পক আস্থান থেকে বেরিয়ে ওদের কাছে এগিয়ে এলেন। মারুলা এবং ভল্লা দুজনেই অভিবাদন করল, উত্তরে শষ্পক ভল্লার হাত ধরে বললেন, “তুমি খেলা একটা করে দেখালে বটে, ভল্লা – গোটা রাজ্যবাসী চমকে গেছে…চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি”।

ভল্লা বলল, “কিন্তু মান্যবর, রক্ষীদের কাউকে নিলেন না, আপনার নিরাপত্তা?”

শষ্পক হাসলেন, বললেন, “তোমাদের মতো দুজন বন্ধু থাকলে নিরাপত্তার চিন্তা কি?”  কিছুটা এগিয়ে শষ্পক দাঁড়ালেন, বললেন, “এ জায়গাটা বেশ নির্জন – কথাবার্তাগুলো এখানেই সেরে নেওয়া যাক”। ভল্লা আর মারুলা চুপ করে তাকিয়ে রইল শষ্পকের দিকে।

শষ্পক ভল্লাকে বললেন, “মারুলা নিশ্চয়ই তোমাকে বলেছে, তোমার ছেলেদের নিয়ে এরপর কী করবে ভল্লা?”

ভল্লা বলল, “মারুলার কাছে আপনার প্রস্তাব শোনার পরেই, আমি ছেলেদের বলেছি – আজ সকালে ওরা জানাবে। আপত্তি হওয়ার কোন কারণ তো নেই, মান্যবর – তবে ওরা একটু ভয় পাচ্ছে…”।

“যে আস্থানের রক্ষীদের ওরা মারল – সেই আস্থানেই ওদের রক্ষী হয়ে নিয়োগ – অবিশ্বাস এবং ভয় করার কথাই তো। বুঝিয়ে বল…দেখ কী হয় – অন্ততঃ জনা দশেক ছেলে আমার এখনই চাই – আগামী কাল থেকে হলেও আপত্তি নেই…”

“কিন্তু মান্যবর, রাজধানীর মতামত নিয়েছেন? রাজ্য সুরক্ষা মন্ত্রক এই বার্তা পেলে উন্মাদ হয়ে যাবে যে!”

“যাক না। আমি কী করবো? এই আস্থানের কোষাগারে এখন কত টাকা আছে – সঠিক না জানলেও অনুমান করতে পার তো? আমার ওই কটা দেহরক্ষীদের পক্ষে তার সুরক্ষা করা সম্ভব? তোমার বটতলি গ্রামের চেলারা অস্ত্র কেনার অর্থ যোগাড় করছে – ওদিকের ধনীদের বাড়ি ডাকাতি করে। তাদের পক্ষে এই আস্থান তো এখন ফাঁকা মাঠ। আমার তো রাত্রের ঘুম চলে গেছে ভল্লা”। একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “উপানুর দলকে যমের দুয়ারে পাঠিয়ে তুমি আমাকে যেমন নিশ্চিন্ত করেছ – কিন্তু অন্য দিকে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েও দিয়েছ বহুগুণ। রাজধানীতে দিনে দুবার পত্র লিখে পাঠাচ্ছি – তাতে আমার সমস্যা তো মিটছে না। আমার ধারণা ওখান থেকে নতুন রক্ষীদল এখানে আসতে মাসখানেক লাগবেই”।

মারুলা বলল, “মাস খানেক? না না মান্যবর, সাত-দশদিনের মধ্যে ঠিক এসে যাবে…”।

ভল্লা বলল, “নারে মান্যবর সঠিক বলেছেন। রক্ষীসর্দার সহ এতগুলো রক্ষী মারা গেল – সে নিয়ে মন্ত্রকগুলির মধ্যে – কার দোষ - কার দায় – সেই নিয়েই রীতিমতো চাপান-উতোর চলবে কিছুদিন… তারপর মহামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সুরক্ষা মন্ত্রক নড়াচড়া শুরু করবে। তারপর মন্ত্রক ঠিক করবে - কোন সর্দারকে কোথা থেকে তুলে এখানে পাঠাবে। সে সর্দার খবর পেয়েই এখানে লাফিয়ে চলে আসবে তেমনও নয়। উপানুদের মৃত্যুর কথা শুনলে হয়তো আসতেই চাইবে না। আসতে চাইলেও – তারা বলবে – এতদূরে যাবো…কবে আবার ফেরা হবে কে জনে - কিছুদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসি…এসব তো তুই জানিস, মারুলা? মান্যবর মাসখানেক বললেন, তার বেশি লাগলেও আমি আশ্চর্য হবো না”।

শষ্পক বললেন, “একদম বাস্তব চিত্র ভল্লা – এমনটাই ঘটবে”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি, মান্যবর। আমি দেখছি – আগামীকাল সকালে পনের জন ছেলেকে যদি পাঠাতে পারি – তাদের সাতজন থাক দিনে আর রাত্রে থাক আটজন – আর মারুলা, আপাততঃ তুইই কদিনের জন্যে ওদের সর্দার হয়ে যা – নতুন ছেলে – কাজের ধরনটা ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে তো”।

“বাঃ, এতো খুব ভালো ব্যবস্থা, আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারব। আর আস্থান থেকেই আমি ওদের নিয়মিত মাসোহারার ব্যবস্থা করে দেব – মাসে চার তাম্র-মুদ্রা – রাজধানীর রক্ষীদেরও তাই দেওয়া হয়”।

“সে ঠিক আছে, কিন্তু দুটো সমস্যা আছে, মান্যবর,” ভল্লা বলল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সমস্যা, ভল্লা?”

“প্রথম, রাজধানী থেকে রক্ষীদল এলে ওরা কী করবে?”

“সে ব্যবস্থা আমার ওপর ছেড়ে দাও। রাজধানীতে আমি বলে দেব – রক্ষীদল না পাঠাতে। ছেলেরা আমার সঙ্গেই থাকবে – এখান থেকে অন্য আস্থানে। কিন্তু তোমার ছেলেরা যদি কদিন পরে আচমকা পালিয়ে যায় – তাহলে কিন্তু আমার দুকূলই যাবে”।

“তার দায়িত্ব আমার, মান্যবর, ও নিয়ে ভাববেন না। তবে আমার দ্বিতীয় সমস্যা, দিনে-রাতে, ছেলেরা এখানে খাবে কোথায়?” ভল্লা বলল।

শষ্পক বললেন, “এ উপায় তো আমার হাতেও নেই। গ্রামে কোন লোকজন নেই – অন্ততঃ দুজন – যারা পনের-কুড়িজনকে রোজ রেঁধে খাওয়াতে পারবে?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “গ্রামে মেয়েরাই রান্নার কাজ করে, পুরুষরা খায়। শহরের কিছু পুরুষ চটিতে বা পান্থশালায় রান্নার কাজ করে। বীজপুরের জনাইকে একবার বলে দেখা যায়, মান্যবর – ও কোন ব্যবস্থা করতে পারে কিনা। আপনি চিন্তা করবেন না, মান্যবর, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।

শষ্পক হেসে বললেন, “সে আমি জানি – আপনি একবার দায়িত্ব নিলেই ব্যস্‌ - নিশ্চিন্ত। কিন্তু আমার আরও একটি সমস্যা আছে – ঘোড়াগুলোর কী হবে? আটটি ঘোড়া। আমার একটি -  তাকে নিয়ে আমি রোজই দুবেলা এদিক সেদিক একটু ঘুরে আসি – কিন্তু বাকি সাতটা? হাঁটা-চলা না করলে ওদের তো বাত ধরে যাবে। মারুলাকে মাঝে দুদিন বীজপুরে পাঠিয়েছিলাম ঘোড়া দিয়ে…”।

ভল্লা মারুলার দিকে তাকাল, মুচকি হেসে বলল, “আমরা যদি সাতটা ঘোড়া থেকে - ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দুটো – তিনটে রোজ নিয়ে যাই, মান্যবর – ছেলেদের ঘোড়ায় চড়াটাও শিখিয়ে ফেলতাম”।

শষ্পকও হাসল, “আমার আপত্তি নেই। এখনই নিয়ে যাও। চলো, অনেকক্ষণ হল, এবার ফেরা যাক, নাহলে রক্ষীরা আমাকে খুঁজতে এখানে চলে আসবে…”।

“হ্যাঁ চলুন। আগামী কাল সকালে ছেলেরা আসবে – আপনার রক্ষীদের বলে রাখবেন, মান্যবর – তা নাহলে ভয়ংকর ভুল বোঝাবুঝি হয়ে উঠতে পারে – আর মারুলা তুই দরজার বাইরে অবশ্যই অপেক্ষায় থাকবি…”

“ভাল কথা মনে করিয়েছ, ভল্লা। রক্ষীরা এমনিতেই বেশ আতঙ্কে আছে – সকাল সকাল হঠাৎ জনা পনের ছেলেকে দরজার সামনে দেখলে, কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে উঠতে পারত”।    

 

তিনটে ঘোড়া নিয়ে নোনাপুর মহড়া-মাঠে পৌঁছে ভল্লা আর মারুলা দেখল – ছেলেরা বসে আছে তাদের অপেক্ষায়। রামালি, সুরুলরাই শুধু নয় – তাদের দলের প্রায় সবাই।

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত স্বরে বলল, “ভল্লাদাদা এটা তো উপানুর ঘোড়া – তুমি পেলে কোথায়?”

ভল্লা নিজের ঘোড়াটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলল, “তাই নাকি? তা তো জানতাম না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল সবকটা…নিয়ে এলাম। ঘোড়ায় চড়া শিখবি?”

একথায় সকলেই লাফিয়ে উঠল – ঘোড়ায় চড়া শিখবো!

ভল্লা হাসতে হাসতে হাত তুলে বলল, “আরেঃ – আজই সবাই শিখে ফেলবি নাকি – তিনটে তো মোটে ঘোড়া – হবে পালা করে হবে”। ভল্লা আর মারুলা ঘোড়া তিনটেকে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে মাঠের ধারে বসল। ঘোড়া তিনটে ঘাড় নামিয়ে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যখন খেতে লাগল – সেই দৃশ্যও ছেলের দল মোহিত হয়ে দেখতে লাগল। তাদের স্বপ্ন এভাবে মাটিতে নেমে আসতে পারে? বিশ্বাসই হয় না।

ভল্লা ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে, বেশ মজা পেল, বলল, “তোরা এলি কেন? তোরা কী জানতিস – আমরা আজ ঘোড়া নিয়ে আসব?”

বিনেশ হাসতে হাসতে বলল, “তা নয় ভল্লাদাদা, ওরা সবাই রক্ষীর কাজ করতে উৎসাহী। কিন্তু ওদের বাড়ির লোক কেউ বিশ্বাসই করছে না – বলছে, আস্থানের রক্ষীদের তোরা মারলি – আর সেখানেই তোদের কাজে নেবে? এ কখনও হতে পারে? ওদের বক্তব্য তুমি নিজে গিয়ে বললে, বাড়ির লোক মনে হয় মেনে নেবে”।      

  ভল্লা হাসল, বলল, “সে না হয় যাবো, বিকেলের দিকে। কিন্তু তার আগে কয়েকটা কথা স্পষ্ট করে বলে নিই। তোদের মাসোহারা হবে চার তাম্র মুদ্রা”।

ছেলেদের মধ্যে অনেকেই আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রতিমাসে – চার তাম্র মুদ্রা?”

ভল্লা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কিন্তু তার কয়েকটা নিয়ম আছে – সেগুলো না মানলে কিন্তু কাজ তো যাবেই – কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিও হতে পারে”। এর পর ভল্লা শষ্পকের বলা কাজের নিয়মগুলো বুঝিয়ে দিল ছেলেদের।  

 ছেলেরা আশ্চর্য স্বপ্নে তখন বিভোর, সবাই ঘাড় নাড়ল সম্মতিতে।

ভল্লা বলল, “তোদের দলের সর্দার কে হবে? তোরাই ঠিক করে নে। তার কথা কিন্তু তোদের সকলকে মানতে হবে”।

ছেলেরা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বলল, “দেবান”।

দেবান উত্তেজিত হয়ে বলল, “আরেঃ আমি সর্দারির কী জানি? পাগল হয়েছিস নাকি তোরা?”

মারুলা বলল, “ভয় পাস না। সর্দারি করার কাজটা আমি তোকে বুঝিয়ে দেব, দেবান, চিন্তা করিস না”।

ভল্লা বলল, “সবাই রাজি?”

“রাজি”।

“তাহলে কাল সকালেই দেবানের সঙ্গে তোরা চোদ্দজন রণপা চড়ে আস্থানে চলে যাবি। দরজার বাইরে থাকবে মারুলাদাদা। ও তোদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে – থাকার জায়গা এবং কাজের কথা সব বুঝিয়ে দেবে। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে”।

“বেশ এখন তোরা বাড়ি যা। বাড়ি গিয়ে বড়োদের সঙ্গে কথা বল। আমি বিকেলে যাবো – নোনাপুরে এবং সুকরাতেও…”।     

         

ছেলের দল চলে যেতে আহোকরা অধীর আগ্রহে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের দলের অনেকেরই তো বেশ একটা গতি হয়ে গেল, কিন্তু তাদের কী হবে?

তাদের মনের কথাটা রামালিই শুরু করল, “আমাদের দলে মোট বত্রিশজন রয়েছি ভল্লাদাদা। তার মধ্যে ওরা পনের জন – আর আমরা পাঁচজন। তাছাড়াও থাকছে – আরো বারো জন। আমাদের আর ওই বারো জনের কী হবে”?

“বারো জন নয় বাকি রইল নজন আর তোরা আটজন। মইলি, দীপান আর বিশুনের কথা ভুলে গেলি নাকি? ওরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। ওই ন’জনও দু-পাঁচদিনের মধ্যে রক্ষী হিসেবে কাজ করবে। অবশ্য সেটা অনেকটাই নির্ভর করবে, এই পনেরজনের ওপর। ওরা যদি কোন গণ্ডগোল না পাকায় কিংবা পালিয়ে না আসে – তাহলে বাকি নজনও ওদের সঙ্গে যোগ দেবে”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা হাসল, বলল, “তোদের আটজনের কী হবে? খুব চিন্তায় রয়েছিস না? তোদের আটজনের মধ্যে সর্দার হবে রামালি – এটা আমিই ঠিক করে দিলাম। তোদের কিছু বলার আছে? মনে কোন সন্দেহ হচ্ছে? থাকলে এখনই বলে ফেল”।

আহোক বলল, “না ভল্লাদাদা, আমাদের মধ্যে রামালিই যে সবার থেকে ভালো যোদ্ধা – সে কথা আমাদের দলের সবাই মানি”।

“বাঃ এই বিশ্বাস আর ভরসা যেন সর্বদা থাকে। আমিও মানি রামালি সবার থেকে ভালো, কিন্তু তোরা বাকি সাতজন – বিশেষ করে আহোক, সুরুল, বিনেশ আর কিশনা – তোরাও যথেষ্ট দক্ষ এবং বুদ্ধিমান, ঠাণ্ডা মাথার কাজের ছেলে। তোরা আটজন এই অঞ্চলের পুরো কাজটা দেখবি। কী কাজ? এক এক করে বলি,

নতুন নতুন ছেলেদের নিয়ে ভালো রক্ষী হওয়ার মতো দল তৈরি করতে হবে।

এর সঙ্গে বটতলির এখনকার ছেলেদের এবং আরও নতুন ছেলেদেরও তৈরি করতে হবে।

বটতলির ছেলেরা ওদের রাজ্যে ওদের মতো কাজ করবে – তার মধ্যে নাক গলাবি না – তবে প্রয়োজন হলে ওদের কাজের পরিকল্পনা বানাতে আমরা পরামর্শ দেব। যেমন গতকাল বলছিলাম।

বটতলির ছেলেরা আমাদের যেমন যেমন টাকা-পয়সা দেবে, আমরা সেই অনুযায়ী ওদের অস্ত্র-শস্ত্র দেব।

তবে এই রাজ্যে বটতলির ছেলেরা যেন কোন গণ্ডগোল পাকাতে না আসে - সেদিকেও তীক্ষ্ণ লক্ষ্য রাখবি।

 

এবার খুব মন দিয়ে শোন, কয়েকটা বিষয় কখনও করবি না। তোরা যতটা শিখেছিস – সবটা বটতলির ছেলেদের কিংবা নতুন রক্ষী ছেলেদের শেখাবি না। কিছুটা কম শেখাবি।

বিশ্বাস করে – আমাদের ভেতরের কোন কথাই কাউকে বলবি না – সে বটতলির ছেলেরা হোক, রক্ষী ছেলেরা হোক কিংবা তোদের বাড়ির লোকই হোক।

আর আশা করব – নিজেদের মধ্যে কোন রকম বিশ্বাসঘাতকতা করবি না। কারও মনে কোন সন্দেহ হলে বা বুঝতে না পারলে – সবাই মিলে বসে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিবি। তা নাহলে দল ভেঙে যাবে – শেষ হয়ে যাবি। আবার সেই অসহায় সাধারণ মানুষ হয়ে যাবি। 

আর সবার ওপরে মাথায় রাখবি নিজ নিজ গ্রামের – নোনাপুর, সুকরার - মানুষরা যাতে ভালো থাকে – ধীরে ধীরে গ্রামের যেন উন্নতি হয়।

আপাতত যেটুকু মাথায় এলো বললাম। তোরা নিজেরাও কথাগুলো চিন্তা কর। আমরা সর্বদাই একসাথে থাকবো – আরো অনেক কথাই হয়তো হবে”।  


চলবে...




মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২১

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২০"]


৫.৬.৩ তন্ত্র ধর্মের উৎপত্তি

শিব এবং শক্তির পূজা ভারতের প্রাচীনতম পূজা পদ্ধতি, ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে এঁনাদের সকলেই অনার্যদের মাতৃকা দেবী এবং বেশ কিছু অনার্য গোষ্ঠীর মধ্যে এঁদের পূজার যে বহুল প্রচলন ছিল, তার প্রত্ননিদর্শণ পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতার অবশেষ থেকে। অনুমান করা যায় এই দেবীদের সকলেই নারী যোদ্ধা, হয়তো মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রধানা ছিলেন। অথবা বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াইতে কোন গোষ্ঠীর অধিকাংশ পুরুষের মৃত্যু হওয়াতে, সেই গোষ্ঠীর নারীরাই ভয়ংকর যোদ্ধা হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। যার ফলে তাঁরা একটু বেশি মাত্রায় নৃশংস হয়ে, নরমুণ্ডমালিনী এবং হাতে রক্ত-ঝরা কাটা মুণ্ড ধারণ করেছিলেন।

ভারতের অনার্য মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মাতৃতান্ত্রিক বা মাতৃকুলীয় সমাজের অস্তিত্ব যে ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আজও মেঘালয়ের খাসি, জয়ন্তিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর মানুষদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। শোনা যায়, কেরালার নায়ার গোষ্ঠীর মানুষদের সমাজও মাতৃতান্ত্রিক ছিল। এই সমাজের মানুষদের, টিপু সুলতানের এতই উদ্ভট লেগেছিল, তিনি উঠে পড়ে লেগেছিলেন, এই গোষ্ঠীর মানুষদের নিকেশ করার জন্যে। এই নায়ার গোষ্ঠীর পুরুষরা কিন্তু যোদ্ধা হিসেবে দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনজাতি। এঁদের উপাস্য দেবতা ছিলেন নাগ বা সর্প। যে সাপ মহাদেব এবং দেবী তারার অঙ্গভূষণ। পৌরাণিক মতে, দেবী সতীর শবদেহের টুকরো থেকে যে একান্নটি শক্তিপীঠের সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলি ভারতের একান্নটি অনার্য অঞ্চলের মাতৃকাদেবী, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। তাঁরা সকলেই দেবী সতীর বিভিন্ন রূপ হয়ে হিন্দুধর্মে অন্তর্ভুক্তা হয়েছেন।

তন্ত্রপুজোর প্রচলন অতি প্রাচীন। আগেই বলেছি, প্রাথমিক ভাবে তাঁদের পুজোর উপচার এবং পদ্ধতি খুবই সরল ছিল। উপচারের মধ্যে ছিল ফুল-পাতা। নৈবেদ্যর মধ্যে ছিল, মানুষের যা যা খাদ্য তার সবকিছুই। ফলমূল, মিষ্টান্ন, ভাত-ডাল-সব্জি-মাছ-মাংস, সাধারণ মানুষের যা যা প্রিয় খাদ্য, সবই দেবতার নৈবেদ্য। আর মন্ত্র ছিল দেবতার কাছে মনের যাবতীয় ইচ্ছে বা স্বপ্ন নিবেদন। এই পূজায় তাঁরা কিছু প্রতীকও ব্যবহার করতেন, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আকার, স্বস্তিক এবং নানান চিত্রলিপি – যা দিয়ে প্রকৃতিকে চিনে নেওয়া যায়, যেমন পর্বত, গাছ, গাছের পাতা – অশ্বত্থের পাতা, নদী, নানান পশু-পাখির আকার, এমনকি মানুষের আকারও। এই প্রতিটি প্রতীকেরই নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নাবশেষ থেকে।

অনার্য দেবদেবী এবং তাঁদের পূজাপদ্ধতি হিন্দু ধর্মে অন্তর্ভুক্তির সময়েই তাত্ত্বিক তন্ত্র শব্দের উৎপত্তি হল। সংস্কৃত এই শব্দটির উৎপত্তি, পণ্ডিতেরা বলেন, যে শব্দ থেকে তন্তু এবং তাঁত শব্দের উৎপত্তি, সেই শব্দ থেকে। অর্থাৎ এই অর্থ ধরলে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনে ওতপ্রোত জড়িত বিভিন্ন পূজাপদ্ধতির তত্ত্ব নিয়ে বুনে তোলা একটি তত্ত্বই তন্ত্র। আবার অনেকে বলেন, তত্ত্ব আর মন্ত্র নিয়ে তন্ত্র। অর্থাৎ অনার্যদের সাধারণ যে মনোবাসনার মন্ত্র ছিল তার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব জুড়ে তন্ত্র শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল।

আগেই বলেছি, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাথমিক স্তরে, জীবনের তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য ছিল, ধর্ম, অর্থ ও কাম। অর্থাৎ ধর্ম পথে থেকে সুস্থ জীবিকা উপার্জন করা আর সংসার জীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য কামনা, বাসনা উপভোগ করা। ব্রহ্মলাভ, ব্রহ্মজ্ঞ হওয়া বা মোক্ষলাভ বিষয়টা সাধারণের জন্যে নয়, সেটা ছিল তপস্বী বা সাধকদের জন্যে, যাঁরা জন সমাজের বাইরে - অরণ্যে তপস্যা বা সাধনা করে থাকেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ এবং জৈনধর্ম এই মোক্ষলাভ বা মুক্তি বিষয়টাকে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুললেন। সেই অনুসরণে ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতরাও মুক্তি বিষয়টিকে জীবনের লক্ষ্যে স্থির করে দিলেন, চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। বেদ ও উপনিষদে এই মোক্ষলাভের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করাই ছিল। পরবর্তী কালের হিন্দু পুরাণকাররা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চতুর্বর্গ এবং উপনিষদের মোক্ষলাভের সাধনার পথই অনুসরণ করলেন, একটু অন্যভাবে। ভাগবত ধর্মে বিষ্ণু এবং শৈবধর্মে শিব হলেন পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম। ব্রহ্মত্ব-লাভের মতো বিষ্ণুত্ব-লাভের জন্যে ভক্তি সাধনার কথা আগেই বলেছি, এবার তন্ত্রমতে শিবত্বলাভের সাধনার কথা বলব।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তন্ত্র বা শক্তি সাধনায় তো দেবীদের প্রাধান্য, সেখানে দেবীত্ব লাভ না হয়ে শিবত্ব লাভ হবে কেন? এর উত্তর, এই সাধনায় দুটোই হবে। কারণ দেবীরা হলেন আদ্যাশক্তি প্রকৃতি - মহামায়া, আর শিব হলেন পরমপুরুষ বা ব্রহ্ম। সাধনার উচ্চতম স্তরে অনুভব করা যাবে শিব ও শক্তি –অর্থাৎ পরমপুরুষ ও পরমাপ্রকৃতি একাকার হয়ে আছেন।

তন্ত্রশাস্ত্রের বহু গ্রন্থের কথাই শোনা যায়, তার মধ্যে অধিকাংশই অবলুপ্ত হয়ে গেছে, আমাদের কাল পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে সবথেকে নির্ভরযোগ্য যে গ্রন্থটি তার নাম “মহানির্বাণ তন্ত্র”। এই গ্রন্থের লেখকের নাম পাওয়া যায় না, তবে এই গ্রন্থের সৃষ্টি কর্তা স্বয়ং শিব ও পার্বতী। তাঁদের ধর্মতত্ত্বের আলোচনা থেকেই তন্ত্রধর্ম সম্বন্ধে বিশদে জানা যায়।

 

৫.৬.৪ তন্ত্র সাধনতত্ত্ব

তন্ত্রের শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে আলোচনার আগে, তন্ত্র সাধনতত্ত্ব বিষয়ে একটু বিশদে আলোচনা করা যাক, নচেৎ আধুনিক হিন্দুধর্মের ভিত যে তন্ত্রধর্ম সেটার উপলব্ধি অধরা থেকে যাবে।

আগেই বলেছি নানান তত্ত্ব ও মন্ত্র নিয়ে তন্ত্রের সৃষ্টি। তন্ত্র তত্ত্বের মূল সাংখ্য দর্শন, যার কথা আগেই বলেছি। পঁচিশটি তত্ত্ব নিয়ে যে সাংখ্য তত্ত্ব, সেখানে আমরা দেখেছি তার চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান সম্যক আয়ত্ত্ব করতে পারলে, পঁচিশতম তত্ত্বটি আপনিই উপলব্ধি করা যায়, সেই জ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, পরমজ্ঞান।

তন্ত্র মতে এই চব্বিশটি তত্ত্বের জ্ঞান অর্জনের জন্যে নিবিড় আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজন, আর সেই সাধনার অন্যতম সহায় হল আধ্যাত্মিক কিছু শব্দের বারবার ব্যবহার – এই শব্দগুলিকেই বীজমন্ত্র বলে, যেমন, ওঁ, হ্রীং, ক্লীং, বষট্‌ ইত্যাদি। অতএব মন্ত্র দিয়ে যে তত্ত্বজ্ঞানের সাধনা, তাকেই তন্ত্র বলে। তন্ত্রদর্শন ছাড়া অন্য দর্শনে মন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে, কিন্তু এই মন্ত্র ছাড়া তন্ত্র অচল।

তন্ত্র-তত্ত্বের মূল কিন্তু বেদ, উপনিষদ এবং সাংখ্য ও বেদান্ত দর্শন। বেদের কর্মকাণ্ডে যত যাগ-যজ্ঞের বিধিনিয়ম আছে, তন্ত্র-তাত্ত্বিকেরা নিজেদের মত করে সে সবই আত্মসাৎ করেছিলেন। উপনিষদের মূল বক্তব্য হল ত্যাগ এবং বিবেক বিচারে “নেতি” “নেতি[1]”  করতে করতে পরমার্থ লাভ। অর্থাৎ পার্থিব সব বিষয়কে ত্যাগ করতে করতে পরমার্থ সাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া। তন্ত্র এই বিষয়টিকেও তাঁদের তত্ত্বে যুক্ত করে নেওয়ায়, বৈরাগ্যও তন্ত্রের একটি তত্ত্ব হয়ে গেল। রাজযোগের যে দর্শন শরীর ও মনকে পবিত্র করা, তন্ত্র সেটাও গ্রহণ করেছে। পুরাণের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হল বৈধী ভক্তি এবং পরাভক্তি। বৈধী ভক্তি আনুষ্ঠানিক, যেমন গঙ্গা স্নান, তুলসী পাতা খাওয়া, চন্দনের তিলক আঁকা, ষোড়শোপচারে পূজা করা, ইত্যাদি। আর পরাভক্তি হল, ঈশ্বরে পরম আস্থা, অহৈতুকী নিঃশর্ত ভক্তি। তন্ত্র এই দুই ভক্তির মধ্যে পরাভক্তিকে গ্রহণ করেছে, তন্ত্রের ভক্তি ঈশ্বরকে নিবিড় ভালোবাসা। খুব সংক্ষেপে বললে, তন্ত্রতত্ত্ব অনুযায়ী, তন্ত্রসাধককে পার্থিব বিষয়সমূহ ত্যাগ করে সাধনা করতে হবে, ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে এবং আকুল ভক্তিতে ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থনা করতে হবে।

তন্ত্রমতে জীবনের উদ্দেশ্য ভোগ আর অপবর্গ। ভোগ মানে এই জগতের ভোগ আর অপবর্গ মানে মুক্তি বা মোক্ষ। এই ব্যাপারেও তন্ত্রের সঙ্গে বেদ বা মহাভারতের কোন পার্থক্য নেই। বেদ বা মহাভারত বলেছেন, জীবনের উদ্দেশ্য চারটে– ধর্ম, অর্থ, কাম আর মোক্ষ। তন্ত্র বলছে, মোক্ষ ছাড়া সবকিছুই ভোগ।

তন্ত্রমতে যাঁরা সাধনা করেন, একই সাধনায় তাঁরা ভোগ এবং অপবর্গ দুটোই পেতে পারেন, শুধু সংকল্প স্থির করতে হবে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে। শ্রীশ্রী চণ্ডীতে আমরা দেখি রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি একই দৈবীসূক্তম্‌ মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। দীর্ঘ সাধনার পর দেবী শ্রীচণ্ডী দুজনকেই বর দিতে আবির্ভূতা হলেন। রাজা সুরথ বললেন, আমি সমগ্র ভূমণ্ডলের রাজা হতে চাই, দেবীর বরে তিনি তাই হলেন, অর্থাৎ রাজা সুরথের ভোগ লাভ হল। অন্যদিকে বৈশ্য সমাধি বললেন, আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু মুক্তি চাই, দেবী তাঁকে মুক্তিই দিলেন, অর্থাৎ তাঁর অপবর্গ লাভ হল। অতএব তন্ত্রমতে মন্ত্র এবং সাধনা একই থাকবে, শুধু সংকল্প স্থির করতে হবে। পুরাণের থেকে তন্ত্রের আরেকটি পার্থক্য হল, পুরাণে অনেক ক্ষেত্রেই বলা আছে, ঈশ্বরের অহেতুক করুণা বা কৃপা হলেও মুক্তি হয়ে যায়। যেমন অজামিলের কাহিনী আছে, অজামিল জীবনে কোনদিনই সাধনা-টাধনার ধার ঘেঁষেননি, তিনি শুধু নিজের পুত্রের নাম রেখেছিলেন “হরি”। মৃত্যুকালে তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে পুত্র হরিকে ডেকেছিলেন, “হরি, ও হরি, আমার পাশটিতে একবার আয়” - তাতেই অজামিলের মুক্তি হয়ে বৈকুণ্ঠলোক লাভ হয়েছিল, কারণ তিনি মৃত্যুকালে “হরি” নাম করেছিলেন! তন্ত্র এই ফাঁকি স্বীকার করে না।

তন্ত্র সাধন তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রাণবায়ু বা প্রাণ এবং নাড়ী।  উপনিষদ বলছে, প্রাণ পাঁচটি – অপান, প্রাণ, সমান, ব্যান, উদান। পায়ু ও উপস্থে যে প্রাণবায়ু অবস্থান করে, তার নাম অপান। চোখ, কান, নাক ও মুখে প্রাণ অবস্থান করে এবং দুইয়ের মাঝখানে অর্থাৎ নাভি মণ্ডলে অবস্থান করে সমান। আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তাকে পরিপাক করে, শরীরে শক্তি ও পুষ্টি বিধান করে সমান বায়ু।  আমাদের আত্মা অবস্থান করেন আমাদের হৃদয়ে। সেই হৃদয়ে একশ একটি নাড়ী আছে, সেই নাড়ীর প্রত্যেকটিতে আবার একশটি করে শাখা নাড়ী আছে। প্রত্যেক শাখা নাড়ীতে আছে বাহাত্তর হাজার করে প্রতিশাখা নাড়ী। তার মানে আমাদের সারা শরীরে মূল নাড়ী ১০১টি; শাখা নাড়ী = ১০১ x ১০০ = ১০,১০০;  প্রতিশাখা নাড়ী = ১০,১০০ x ৭২০০০ = ৭২,৭২,০০,০০০। অতএব মোট নাড়ী সংখ্যা = ৭২,৭২,১০,২০১![2] এই সমস্ত নাড়ীর মধ্যে অবস্থান করে ব্যানবায়ু অর্থাৎ আমাদের সারা শরীরেই ব্যানবায়ু ব্যাপ্ত রয়েছে। এর মধ্যে মূলনাড়ীর ঊর্ধমুখী একটি নাড়ীতে উদান বায়ু অবস্থান করে, এই উদানবায়ুই আমাদের পুণ্যকর্ম থেকে পুণ্যলোক, পাপকর্ম থেকে পাপলোক এবং উভয়কর্ম থেকে মনুষ্যলোক প্রাপ্ত করায়। ঊর্ধমুখী ওই নাড়ীকেই তন্ত্রে সুষুম্না বলে।

তন্ত্র সাধন পদ্ধতিতে প্রাণায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের ভিতরে প্রাণবায়ু গ্রহণ অর্থাৎ পুরক, শরীরে তাকে রুদ্ধ করা অর্থাৎ কুম্ভক এবং শরীর থেকে সেই বায়ু ত্যাগ করা অর্থাৎ রেচকের পদ্ধতিকেই প্রাণায়াম বলে। তন্ত্রে তিনটি নাড়ীও খুব গুরুত্বপূর্ণ – ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। মেরুদণ্ডের কেন্দ্রে যে সূক্ষ্মনাড়ী তার নাম সুষুম্না, তার বাঁয়ে থাকে ইড়া আর ডানদিকে পিঙ্গলা। সুষুম্নার শুরু মূলাধার থেকে – মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে গুহ্যের কাছাকাছি জায়গায়। আবার এই মূলাধারেই থাকে কুণ্ডলিনীশক্তি। তন্ত্র মতে আমাদের সাধারণ অবস্থায় এই কুণ্ডলিনীশক্তি সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, সেই সময় মানুষের মন সুখ-দুঃখ-শোক-আনন্দ-কামনা-বাসনায় জর্জরিত থাকে। সাধনা শুরুর সঙ্গে এই কুণ্ডলিনী জেগে ওঠে এবং সুষুম্না পথে ওপরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

চলবে...



[1] সন্ধি বিচ্ছেদে নেতি শব্দ হয় ন + ইতি। অর্থাৎ সাধক নিজের চারপাশে এবং তাঁর অন্তরেও ব্রহ্মের স্বরূপ সন্ধান করতে একেকটি বিষয় চিন্তন করবেন, আর একসময় উপলব্ধি করবেন, না এটি নয় – ন ইতি। এইভাবেই ধীরে ধীরে তিনি পৌঁছে যাবেন তাঁর লক্ষ্যে এবং যখন উপলব্ধি করবেন,  “এই আত্মাই ব্রহ্ম” অথবা “আমিই ব্রহ্ম” তখনই তাঁর মোক্ষ ঘটে যাবে।       

[2] প্রশ্নোপনিষদ – তৃতীয় প্রশ্নের ৫ থেকে ৭ সংখ্যক শ্লোক – অনুবাদঃ লেখক।


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৫

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...