ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের নবম পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/৯ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
দশম পর্বাংশ
৪.৫.৫ সাহিত্য - কাব্য
সাহিত্যে এবং মনীষায় এ যুগের অন্যতম নক্ষত্র
অবশ্যই মহাকবি কালিদাস। তাঁর সময় অনুমান করা হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এবং প্রথম
কুমারগুপ্তের রাজত্ব কালে। তাঁর কাব্যগুলি সমসাময়িক সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য
প্রতিফলন। যদিও তাঁর সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না, কিন্তু তাঁর
লেখা থেকে অনুমান করা যায়,
তিনি দুঃখীর সমব্যথী,
শিশু ও নারী মনস্তত্বে অভিজ্ঞ, ফুল, গাছপালা, পশুপাখিপ্রেমী
এবং রাজসভার আড়ম্বরে অভ্যস্ত হলেও, সুখী এবং প্রশান্ত মানুষ ছিলেন। তিনি
তিনটি নাটক লিখেছিলেন,
“মালবিকাগ্নিমিত্র”,
“বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্”; দুটি দীর্ঘ কাব্য, “কুমারসম্ভব”
ও “রঘুবংশম্” এবং দুটি ছোট কাব্য “মেঘদূত” ও “ঋতুসংহার”। এছাড়াও তাঁর অনেকগুলি
রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়,
যেগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
কালিদাস ছাড়াও মোটামুটি সমকালে অথবা সামান্য
পরবর্তী কালে অনেকেই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, কিন্তু কেউই মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ
হয়ে উঠতে পারেননি। যেমন কুমারদাসের, “সীতাহরণ” কিংবা ভারবির
“কিরাতার্জুনীয়”। সপ্তম শতাব্দীতে শ্রীরামের জীবন নিয়ে লেখা ভট্টির “ভট্টিকাব্য”।
এই সময়েই আরেক কবি মাঘ রচনা করেছিলেন, “শিশুপালবধ”। মাঘ তাঁর কাব্যে অক্ষর, শব্দ এবং
ছন্দ নিয়ে বেশ কিছু অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, যেমন একটি মাত্র ব্যঞ্জন-ধ্বনি “দ”
ব্যবহার করে এই শ্লোকটি,
“দাদদোদুদ্দ-দুদ্-দাদী /
দাদাদোদুদো-দী-দ-দোঃ।
দুদ্-দাদম্ দাদাদেদুদ্দে / দদ-আদদ-দদো দ-দঃ”।।
বেশ কিছু অপ্রচলিত এবং অস্পষ্ট-অর্থ-শব্দ নিয়ে এই
শ্লোকটির অর্থ হতে পারে,
“(যিনি)
দান-দাতা, অরিদের
(যিনি) দুঃখদাতা,
(যিনি)
পুণ্যদাতা, যাঁর
বাহু দুঃখদাতার বিনাশ করেন,
(যিনি)
দানবদলনকারী, ধনাঢ্য
এবং দরিদ্রকে সমদান দেন,
অরিদলনে (তিনিই) উদ্যত করলেন তাঁর অস্ত্র”[1] । (ইংরিজি
থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)
এমন অদ্ভুত অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য সেকালে এবং পরবর্তী কালেও অনেকেই রচনা করেছিলেন। হয়তো তাঁদের অনেকেরই মনে হয়েছিল, মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়, অতএব তাঁরা চমকদার কিছু লিখে, মানুষের মনে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সমকালে তাঁরা নিশ্চয়ই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে এই ধরনের কাব্যগুলি দুর্বোধ্য এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।
এরকম আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য পাওয়া যায়, যাকে
“দ্বৈয়াশ্রয়-কাব্য” বলা হত। বিভিন্ন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ এবং পংক্তি নিয়ে এই
কাব্যগুলিতে একই সঙ্গে দুটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল
দ্বাদশ শতাব্দীর সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”। এই কাব্যটি একই সঙ্গে অযোধ্যার
শ্রীরামচন্দ্র এবং বঙ্গের পাল রাজা রামপালের জীবনীর ওপর লেখা, কবি
সন্ধ্যাকর রামপালের সভাকবি ছিলেন।
সপ্তম শতাব্দীর কোন সময়ে আরেক জন কবি ছিলেন
ভর্তৃহরি। তিনি কোন কাব্য রচনা করেননি, কিন্তু চার পংক্তির ছোট ছোট প্রায়
তিনশ কবিতা রচনা করেছিলেন। এই কবিতাগুলি, পার্থিব জ্ঞান, ত্যাগ, প্রেম, আদিরস
ইত্যাদি নানান বিচিত্র বিষয়ের ওপর এবং অধিকাংশ কবিতাই বেশ রসোত্তীর্ণ। যেমন,
“(হয়তো) কুমীরের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নিতে পারো মণি,
সাগর পার হতে পারো
সাঁতরে ঢেউয়ের সার,
মালা করে চুলে জড়াতেও পারো
কাল-ফণী,
(কিন্তু) ঘোচাতে কী পারো মূর্খের
অন্ধ-সংস্কার!
অথবা,
(হয়তো) বালু
পিষে তেল পেতে পারো বহু ক্লেশে,
মরীচিকা হতে জল
পেতে পারো তৃষ্ণার
শশকের শিং যদিও বা দেখ
কোনো দূরদেশে
(কিন্তু) ঘোচাতে কি পারো মূর্খের
অন্ধ-সংস্কার![2]
(ইংরিজি
থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)
হয়তো ভর্তৃহরির সমসাময়িক আরেকজন কবির একই রকমের
চার পংক্তির কবিতাগুচ্ছ পাওয়া যায় তাঁর নাম অমরু। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বিষয় প্রেম, আবেগ এবং
তীব্র কামনা। একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি কবি বিলহনের লেখা
“চৌরপঞ্চাশিকা”ও উল্লেখযোগ্য কাব্য। এক চোর এবং রাজকুমারীর গোপন প্রেম নিয়ে পঞ্চাশ
স্তবকে লেখা এই কবিতাগুলির আবেগ ও অনুভূতি যথেষ্ট কাব্যময়। তবে দ্বাদশ শতাব্দীতে
জয়দেবের লেখা সংস্কৃত কাব্য “গীতগোবিন্দ” বাংলায় এবং বিশেষ করে বাংলার বৈষ্ণব মহলে
ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। মূলতঃ রাধা ও কৃষ্ণের ভালোবাসার আবেগ-ঘন অনুভূতি এই কাব্যের
বিষয়।
কাব্য এবং কবিতা ছাড়াও বর্ণনাভিত্তিক জনপ্রিয়
গল্প-সংগ্রহ লিখেছিলেন সোমদত্ত, তাঁর বইয়ের নাম “কথাসরিৎসাগর”- সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীর কোন
সময়ের রচনা। দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের কলহন রচনা করেছিলেন “রাজতরঙ্গিণী”- এই
গ্রন্থটি কোন কাব্য গ্রন্থ নয়, বরং বলা চলে ঐতিহাসিক উপাখ্যান। কাশ্মীরের প্রাচীন রাজবংশের
প্রচলিত কাহিনি এবং সমসাময়িক রাজাদের স্তুতি নিয়ে এই গ্রন্থটি রচিত। কাশ্মীরের
সমসাময়িক রাজাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য
রাজ্য এবং রাজাদেরও অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। অতএব কাব্য হিসেবে এই গ্রন্থের
গুরুত্ব না থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনচরিত নিয়ে লেখা, তাঁর বন্ধু
ও কবি বাণভট্টের কথা আগেই বলেছি, তাঁর গ্রন্থের নাম “হর্ষচরিত”। এর পরে চালুক্যরাজ ষষ্ঠ
বিক্রমাদিত্যের (১০৭৫-১১২৫ সি.ই.) জীবন নিয়ে লেখা বিলহনের “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত”
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বাংলার কবি সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”-এর কথা আগেই বলেছি।
সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত সাহিত্যের গ্রন্থটির নাম “হাম্মীর-মহাকাব্য”। এটির
রচনাকার এক জৈন সন্ন্যাসী,
নাম ন্যায়চন্দ্র সূরি। এই গ্রন্থটি খুব পরিচিত না হলেও, এর কাব্যগুণ
এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। চাহমান রাজা হাম্মীরের জীবনী নিয়ে
লেখা এই গ্রন্থটি, ১৩০১
সালে আলাউদ্দিন খিলজির হাতে রণস্তম্ভপুরার (আধুনিক রণথম্ভোর) যুদ্ধে হাম্মীরের
পরাজয় এবং নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাকে কবি অত্যন্ত মহিমময় করে তুলেছিলেন।
সংস্কৃত সাহিত্যে নাটকের শুরু কবে থেকে, সে সম্পর্কে
স্পষ্ট ধারণা করা যায় না। তবে কথোপকথনের বহুল প্রচলন উপনিষদগুলিতে পাওয়া যায়। যেমন
কঠোপনিষদ, কেনোপনিষদ, বৃহদারণ্যকোপনিষদ
ইত্যাদি। এই কথোপকথন অবশ্য কোন নাটক গড়ে তোলেনি, ধর্ম এবং বিশেষ করে ব্রহ্মজ্ঞানের
চর্চায় গুরু-শিষ্যের আলাপ অথবা উন্মুক্ত সভার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের সংলাপ। যেমন
কঠোপনিষদে যমদেবের সঙ্গে নচিকেতার সংলাপ, কিংবা বৃহদারণ্যকে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের
সঙ্গে অন্যান্য পণ্ডিতদের তর্ক-বিতর্ক।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংস্কৃতে নাটকের ধারণা এসেছে গ্রিক
সংস্কৃতি থেকে। তাঁদের যুক্তি হল সংস্কৃত নাটকে মঞ্চের সামনে এবং পিছনে যে পর্দার
ব্যবহার হয়, সংস্কৃতে
তাকে “যবনিকা” বলে, এই
যবনিকা শব্দটি এসেছে “যবন” থেকে। সংস্কৃতে “যবন” শব্দ গ্রিক অর্থে ব্যবহৃত হত। এই
যুক্তি অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ। কারণ সংস্কৃতে নাটকের ধারণা যদি সম্পূর্ণতঃ গ্রিক
প্রভাবেই এসে থাকে, সেক্ষেত্রে
যবনিকা ছাড়াও আরও অনেক শব্দ পাওয়া যেত, যার উৎস হত গ্রিক। সেরকম কোন উদাহরণ
প্রাচীনতম নাটকেও পাওয়া যায় না। বরং আমার ধারণা, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নাটকীয় ভাবে
গল্প বলার – যাকে পালাগান বা যাত্রা বলা যায় - প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতের এই
ধরনের লোকশিল্প বা যাত্রার অভিনয় সর্বদাই মুক্তমঞ্চে অভিনীত হত, অর্থাৎ
দর্শকরা মঞ্চের চারদিকে বসে যাত্রা দেখতে পারতেন, একদিকে কুশীলবদের যাওয়া আসার জন্যে
ছোট একটি পথ ছেড়ে দিয়ে। গ্রিক প্রভাবে সেই মুক্তমঞ্চ পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলা হল এবং
দর্শক শুধুমাত্র সামনে থেকেই অভিনয় দেখতে পারতেন। মঞ্চ ব্যবহারের এই দুই ধরণ
অনুযায়ী অভিনেতাদের অভিনয়ের ধরণও বদলে যেতে বাধ্য - সেকথা অভিনেতারা অবশ্যই
স্বীকার করে নেবেন। কারণ মুক্তমঞ্চের অভিনেতাদের চারদিকের দর্শকের কথা মাথায় রেখে
ঘুরেফিরে-হেঁটেচলে অভিনয় করতে হত, সেখানে পর্দাঘেরা মঞ্চে তাঁদের অভিনয় করতে হয় একমুখী
দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। অতএব মুক্তমঞ্চে পর্দার ব্যবহারের এই গ্রিক প্রভাবকেই
সংস্কৃত নাটক “যবনিকা” নাম দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছিল।
যাই হোক বিতর্ক এড়িয়ে আমরা এবার সংস্কৃত নাটকের
দিকে চোখ ফেরাই। সংস্কৃত নাটকের প্রথম যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার রচয়িতা
অশ্বঘোষ, যাঁর
কথা আগেই বলেছি। যদিও তাঁর লেখা পূর্ণ নাটক একটিও পাওয়া যায়নি, কিছু কিছু
অংশ পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ার মরু অঞ্চলে। যাঁর লেখা প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ নাটক
আমাদের কাল অব্দি এসে পৌঁচেছে, তাঁর নাম, ভাস। ভাসের সময় কাল সঠিক জানা যায় না, তবে
বিশেষজ্ঞরা তাঁকে কালিদাসের নিশ্চিত পূর্বসূরি বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। তাঁর লেখা
তেরটি নাটকের মধ্যে দুটি মহানাটকের নাম, “স্বপ্নবাসবদত্ত” এবং
“প্রতিজ্ঞাযৌগণধরায়ন”। এ ছাড়া তিনি অনেকগুলি ছোট নাটকও লিখেছিলেন।
কিন্তু গুপ্তযুগের কালিদাস একদিকে যেমন মহাকবি
ছিলেন, তেমনই
ছিলেন মহানাট্যকার। কালিদাসের মাত্র তিনটি নাটক আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যেমন
“মালবিকাগ্নিমিত্র”,
“বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্”। প্রথমটি শুঙ্গ রাজত্ব-কালে
রাজপ্রাসাদে হারেমের অন্তঃপুর-চক্রান্ত নিয়ে লেখা। দ্বিতীয়টি পৌরাণিক রাজা পুরুরবা
ও ঊর্বশীর প্রেমের কাহিনি নিয়ে। তৃতীয়টি পৌরাণিক রাজা দুষ্মন্ত এবং মুনি কণ্বর
পালিতা কন্যা শকুন্তলার কাহিনি। এই তিনটি নাটকের মধ্যে “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্” ভারত
তো বটেই বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম। কাহিনিবিন্যাস, নাটকীয়
ঘটনার মোড়, নানান
চরিত্র গড়ে তাদের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের মানসিক দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয় তুলে
ধরায়, মহাকবি
কালিদাস নাটকটিকে উৎকর্ষের চরম সীমায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
কালিদাসের প্রায় সমসাময়িক নাট্যকার শূদ্রক, তাঁর লেখা
মাত্র একখানি নাটকই পাওয়া যায়, যার নাম “মৃচ্ছকটিক” (মৃৎ+শকটিক- মাটির খেলনাগাড়ি)। এই
নাটকের বাস্তবমুখী গল্প,
জটিল মনস্তত্ব এবং নাটকীয়তার জন্যে এই নাটক আজও বহুল জনপ্রিয়। সম্ভবতঃ ষষ্ঠ
শতাব্দীর নাট্যকার বিশাখদত্তর দুটি রাজনৈতিক নাটক পাওয়া যায়, তার মধ্যে
একটি “মুদ্রারাক্ষস”। এই নাটকের গল্পের বিষয়, শেষ নন্দরাজা ধননন্দকে উৎখাত করে, চাণক্যের
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসানোর কূট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। প্রসঙ্গতঃ
ধননন্দের প্রধান অমাত্যের নাম ছিল “রাক্ষস”। আরেকটি নাটক হল “দেবীচন্দ্রগুপ্ত”। এই
নাটকের বিষয় বড়ো ভাই রামগুপ্তকে সরিয়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনে বসার ঘটনা, যে ঘটনার
কথা আগেই বলেছি।
রাজা হর্ষবর্ধনের (অথবা তাঁর নামে উৎসর্গ করা)
লেখা তিনটি নাটক পাওয়া যায়,
“রত্নাবলী”, “প্রিয়দর্শিকা”
এবং “নাগানন্দ”। প্রথম দুটির নায়িকা অন্তঃপুর-নারী, তাঁদের নামেই নাটকের নাম এবং বিষয়
অন্তঃপুরিকাদের নানান মজাদার ঘটনা। তৃতীয় নাটকটির নায়ক রাজকুমার জীমূতবাহন, গল্পের বিষয়
নিজের জীবন দিয়ে আর্তের উদ্ধার। রাজা হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক আরেক রাজা, পল্লবরাজ
মহেন্দ্র বিক্রমবর্মণ একখানি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন, যার নাম “মত্তবিলাস”। নাটকটি
প্রহসনধর্মী এবং তীব্র বিদ্রূপাত্মক। এক শৈব সন্ন্যাসী মদ্যপানে মত্ত হয়ে, তাঁর
ভিক্ষাপাত্রটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই ভিক্ষাপাত্রটি ছিল একটি “কপাল” (অর্থাৎ
নরখুলির উপরাংশ)। নেশাভঙ্গের পর, তাঁর এই কপালটি চুরি করার জন্যে তিনি দোষী সাব্যস্ত করলেন
এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে। এই নিয়ে বহু বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ল গ্রামের উভয় পক্ষীয়
মহিলা এবং পুরুষরাও। অবশেষে দেখা গেল কপালটি মুখে নিয়ে একটি কুকুর পালিয়েছিল। এই
নাটকটির সাহিত্যগুণ যাই হোক সমসাময়িক সমাজের একটি স্পষ্ট খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে।
কালিদাসের পরেই বিখ্যাত সংস্কৃত নাট্যকারের নাম, ভবভূতি।
বিদর্ভের ভবভূতির সময়কাল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে, তিনি কনৌজের
রাজা যশোবর্মনের সভাকবি ছিলেন। তাঁর তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “মালতী-মাধব”, “মহাবীরচরিত”
এবং “উত্তর-রামচরিত”। প্রথম নাটকটির বিষয় নায়ক ও নায়িকার প্রেম। পরের দুটি নাটকেরই
নায়ক শ্রীরামচন্দ্র।
৪.৫.৭ সাহিত্য - গদ্য
ভারতীয় ভাষায় এবং সংস্কৃতে কাব্য কিংবা নাটকের
তুলনায় গদ্য রচনা খুবই কম। প্রথম সংস্কৃত গদ্য রচনা কিছু পাওয়া যায় উপনিষদে, ব্রাহ্মণে।
তাছাড়া পালি ভাষায় গদ্য গ্রন্থ “জাতক” – ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনিগুলি।
ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে তিনজন লেখক কিছু গদ্য রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন, দণ্ডিন, সুবন্ধু এবং
বাণ। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক লেখক দণ্ডিন, তাঁর
গ্রন্থের নাম “দশকুমারচরিত”। এই গ্রন্থের দশটি গল্প দশজন রাজকুমারের ভ্রমণ কাহিনি
নিয়ে। দশজন রাজকুমারের দেশভ্রমণের বর্ণনা থেকে উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের
মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা– তার মধ্যে আছে বণিক, চোর, বারবনিতা, রাজকুমারী, কৃষক এবং
বন্য উপজাতি। এই অভিজ্ঞতা কখনো মজার, কখনো ভয়ংকর, কখনো অনৈতিক
কিন্তু মোটামুটি বাস্তব। সমাজের নিম্ন স্তরের এমন সাবলীল এবং প্রায় বাস্তব চিত্র, সংস্কৃত
সাহিত্যে আর পাওয়া যায় না।
চলবে...