এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ,
আপনি যে প্রশ্ন করলেন, সেই প্রশ্ন নরলোকের হিতকর, মুক্ত আত্মা জ্ঞানীগণের সম্মত
এবং মানুষের শোনার মতো যা কিছু আছে তার মধ্যে এই বিষয়ই সার ও শ্রেষ্ঠ।
গৃহস্থাশ্রমে গৃহীর পিপীলিকা, কীট, পতঙ্গ ইত্যাদি প্রাণীহিংসা অনিবার্য এবং বিষয়ে
আসক্তি থাকায় আত্মতত্ত্ব জানতে পারে না। সুতরাং এই ধরনের মানুষের শোনার মতো এবং
অনুষ্ঠান করার মতো হাজার হাজার বিষয় আছে। যিনি মোক্ষলাভ করার ইচ্ছা করেন, তাঁর
সকলের অন্তর্যামী ও নিয়ন্তা ভুবনসুন্দর শ্রীহরির চরিত্র কথা শ্রবণ, স্মরণ ও কীর্তন
করা কর্তব্য। যে মানুষের অন্তিমকালে শ্রীনারায়ণ স্মরণে আসেন, তাঁর মানবজন্মলাভ
সার্থক। যা আত্মা নয়, তার থেকে আত্মাকে পৃথক জানার যে জ্ঞান তাকে সাংখ্য বলে।
ইন্দ্রিয়দমন প্রভৃতি আট প্রকার সাধনার নাম অষ্টাঙ্গযোগ। এই সাংখ্য ও যোগ অনুষ্ঠানে এবং
নিজের বর্ণ ও আশ্রমের কর্তব্য অনুষ্ঠানে যদি নারায়ণ স্মৃতিপথে উদিত হন, তবেই
মানবজন্মের সবথেকে উৎকৃষ্ট লাভ বিবেচনা করা হয়।
যে সকল মুনি শাস্ত্রের নিয়ম ও
নিষেধের অতীত নির্গুণ ব্রহ্মলাভ করেছেন, তাঁরাও শ্রীহরির গুণকীর্তন শুনে অতুল
আনন্দ উপভোগ করেন। আমি দ্বাপর যুগের শুরুতে আমার পিতা দ্বৈপায়ণের কাছে একটি গ্রন্থ
পাঠ করেছিলাম, শ্রীমৎভাগবত। এই ভাগবতপুরাণ শ্রীহরির নামে ও বিষয়ে পরিপূর্ণ এবং
সমস্ত বেদের সমতুল্য। আমি নির্গুণ ব্রহ্মে সম্যক অবস্থান করেও, শ্রীহরির লীলা
মাধুর্যের জন্য আমি এই আখ্যান পাঠে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। আপনি বিষ্ণুভক্ত, অতএব আমি
আপনার কাছে এই আখ্যান বর্ণনা করব। যিনি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পুরাণ শোনেন, তাঁর মনে অতি
দ্রুত মুকুন্দের প্রতি অহৈতুকী মতির উদয় হয়। যাঁরা শ্রীহরির কাছে অভয়ফল কামনা
করেন, কিংবা যাঁরা মোক্ষলাভ করতে চান তাঁরা হরিনামকীর্তন সাধনে ওই সকল ফল লাভ করতে
পারেন। আর যাঁরা জ্ঞানী, নামকীর্তনই তাঁদের কাছে জ্ঞানের ফল। সুতরাং সিদ্ধ হোন
কিংবা সাধক, এর থেকে ভালো কোন উপায় আর দ্বিতীয় নেই।
এই জগতে মানুষের অজান্তে বহুবছর
ব্যর্থ যায়, মানুষের মনে এক মূহুর্তও বৃথা যাচ্ছে এই বোধ যখন আসে, সেটাই বহু বছরের
থেকে বেশী ফলদায়ক। কারণ ওই জ্ঞান এলে, মানুষ নিজের মঙ্গলের চিন্তা শুরু করে।
খট্টাঙ্গ নামে এক রাজর্ষি দেবগণের থেকে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর মূহুর্তকাল মাত্র
আয়ু অবশিষ্ট আছে, তৎক্ষণাৎ সকল আসক্তি বিসর্জন দিয়ে, ওই রাজর্ষি শ্রীহরির অভয়পদ
লাভ করেছিলেন। হে কুরুকুলতিলক, আজ থেকে আপনার এখনও সপ্তাহকাল পরমায়ু অবশিষ্ট আছে,
আপনি ইতিমধ্যে পরলোকের পক্ষে যা হিতকর তার অনুষ্ঠান করুন”।
শ্রীশুকদেব আরো বললেন, “হে রাজন,
পুরুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হলে, নির্ভয়ে পুত্রকলত্র ইত্যাদি থেকে সমস্ত
আসক্তি মুছে ফেলতে হবে। ঘরে থাকলে এই
আসক্তি বিনাশের পরেও আবার ফিরে আসতে পারে, সেই কারণে ঘর ছেড়ে তীর্থস্থানে গিয়ে,
নির্জন পবিত্র স্থানে কুশ, মৃগচর্মের আসনে বসতে হবে। তারপর অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের
প্রণবরূপ ব্রহ্মবীজ মনে মনে জপ করতে হয়। জপ করতে করতে প্রাণায়ামে শ্বাস জয় করে
মনকে বশীভূত করতে হবে। তারপর স্থির বুদ্ধি দিয়ে মনের থেকে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয়ের
যোগ ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম বিধিকে প্রত্যাহার বলে। কর্মবাসনায় মন আবার যদি চঞ্চল
হয়ে ওঠে, তাহলে বুদ্ধি দিয়ে শ্রীভগবানের রূপ ধারণা করতে হয়। শ্রীভগবানের সমগ্র রূপ
চিত্তে ধারণার পর, তাঁর চরণ ইত্যাদি এক একটি অঙ্গের ধ্যান করলে, মন বিষয় থেকে
মুক্ত হয়ে চিন্তাশূণ্য হয়। মনের এই অবস্থায় পরমানন্দের স্ফূর্তি ও পরমা শান্তি লাভ
করা যায়। মনের এই অবস্থাকে বলে সমাধি এবং এই ভাবেই শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ লাভ করা যায়।
রজোগুণে আবার যদি মন আক্ষিপ্ত অর্থাৎ চঞ্চল হয়, অথবা তমোগুণে মন বিমূঢ় অর্থাৎ
নিদ্রিত হয়, তাহলে আবার প্রত্যাহার ও সমাধির ধারণায় মনকে শোধণ করতে হয়। এই ধারণাই
মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণের বিনাশ করে এবং এই ধারণা দৃঢ় হলে শ্রীভগবানের অমল মূর্তি
দেখতে দেখতে মনে ভক্তিযোগ আসে”।
মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন,
“হে ব্রহ্মন, যে ভাবে ও যে ধারণায় মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণ আশু দূর হয়, আপনি সেই
ধারণার কথা উপদেশ করুন”।
ঈশ্বরের দেহতত্ত্ব
শ্রীশুকদেব বললেন, “প্রথমে
পদ্মাসন কিংবা অন্য আসন অভ্যাস করে, প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণবায়ু জয় ও আসক্তি
ত্যাগ করে, সকল ইন্দ্রিয়কে সংযত করবেন। তারপর ভগবানের স্থূলরূপ মনের মধ্যে ধারণা
করবেন। এই যে ব্রহ্মাণ্ড দেখছেন, এটিই ভগবানের বিরাট দেহ। এই দেহ স্থূল বস্তুর
থেকেও স্থূল। ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু অতীত হয়েছে, বর্তমানে যা কিছু আছে এবং ভবিষ্যতে
যা কিছু সৃষ্টি হবে, সব এই স্থূল দেহেই আশ্রয় পায়। এই বিরাট দেহের ক্ষিতি, জল,
তেজ, বায়ু ও আকাশ - এই পঞ্চভূত, অহঙ্কারতত্ত্ব ও মহত্তত্ত্ব অর্থাৎ সমষ্টিবুদ্ধি,
এই সাতটি আবরণ আছে। এই দেহের মধ্যে অন্তর্যামী হয়ে যে ভগবান বিরাজ করছেন, তাঁকে
বৈরাজ পুরুষ বলে। সাধক আসলে এই পুরুষেই মনের ধারণা করে থাকেন।
হে মহারাজ, এই বিশ্বের স্রষ্টা
পুরুষের বিরাট দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিভাগ কীর্তন করছি মন দিয়ে শুনুন। পাতাল এঁর
পায়ের তলা। রসাতল পায়ের পিছন ও সামনের অংশ। মহাতল দুই গোড়ালি ও তলাতল এঁনার দুই
জঙ্ঘা। সুতল এই বিশ্বমূর্তির জানু, বিতল
ও অতল দুই উরু, মহীতল জঘনদেশ এবং নভস্তল অর্থাৎ ভুবর্লোক বা প্রেতলোক এঁনার নাভি
সরোবর। স্বর্লোক অর্থাৎ স্বর্গলোক এঁনার বক্ষ, মহর্লোক গ্রীবা, জনলোক মুখ, তপোলোক
কপাল এবং সত্যলোক এই পুরুষের মস্তক। ইন্দ্র প্রমুখ তেজস্বী দেবতারা এই আদিপুরুষের
বাহু, অশ্বিনীকুমারদুইজন নাসিকা ও ঘ্রাণ শক্তি, প্রদীপ্ত অগ্নি এঁনার মুখ।
অন্তরীক্ষ শ্রীবিষ্ণুর নেত্র গোলক ও সূর্য দর্শনের শক্তি, দিন ও রাত্রি চোখের রোম,
ব্রহ্মপদ ভ্রূভঙ্গী, জল এঁনার রসনা ও রস গ্রহণের শক্তি। সমস্ত বেদ এই অনন্ত
পুরুষের ব্রহ্মরন্ধ্র, যম এঁনার দন্ত ও স্নেহ দাঁতের শক্তি, মায়া এঁনার হাসি এবং
অপার সংসার এঁর নয়নের কটাক্ষ। লজ্জা এই পুরুষের উত্তরোষ্ঠ, লোভ অধরোষ্ঠ, ধর্ম
স্তন, অধর্ম পৃষ্ঠদেশ, প্রজাপতি জননেন্দ্রিয়, মিত্রাবরুণ দুইকোষ, সমুদ্রসকল এঁনার
কুক্ষিদেশ এবং গিরিসমূহ অস্থি। হে
নৃপেন্দ্র, সমস্ত নদী এঁনার নাড়ী, বৃক্ষসমূহ শরীরের রোমরাজি, অনন্তশক্তি বায়ু
এঁনার শ্বাস, কাল এঁনার গমন এবং প্রাণীগণের সংসার এই পুরুষের ক্রীড়া। হে
কুরুশ্রেষ্ঠ, মেঘসমুহ এঁনার কেশ, সন্ধ্যা এঁনার বস্ত্র, প্রকৃতি হৃদয় এবং সকল
বিকারের আশ্রয় চন্দ্রমা এঁনার মন। মহত্তত্ত্ব
এই সর্বাত্মার চিত্ত অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির আধার, শ্রীরুদ্র এঁনার অহঙ্কার,
অশ্ব, অশ্বেতরী উট, হাতি এঁনার নখ এবিং মৃগ ইত্যাদি সকল পশু এঁনার কটিদেশ বলা হয়।
পক্ষসমূহ এঁনার শিল্পনৈপুণ্য, স্বায়ম্ভূব মনু এঁনার বুদ্ধি, মানুষ এঁনার নিবাস।
গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ ও অপ্সরাগণ এঁনার স্বর এবং অসুরশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ এঁনার
স্মৃতি। ব্রাহ্মণ এই পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয় হাত, বৈশ্য উরু ও তমঃপ্রধান শূদ্র
এঁনার চরণ এবং যজ্ঞই এই পুরুষের কর্ম।
হে মহারাজ, আমি ঈশ্বরদেহের যে অবয়ব বিন্যাস বললাম, এ ছাড়া অন্য কোন বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, মুক্তিকামী ব্যক্তিরা নিজের বুদ্ধিতে ভগবানের এই স্থূলতম দেহে মনের ধারণা করে থাকেন। সত্যস্বরূপ আনন্দনিধি ভগবানে এই স্থূল বিশ্ব ও জীবসমূহকে লীন করে তাঁর ভজনা করাই বিধেয়, নয়তো অন্য বস্তুতে আসক্তি হলে, জীবাত্মার সংসাররূপ অধোগতি লাভ হয়।
চলবে...