ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "
ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "
ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "
ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "
আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "
ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "
ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "
প্রবন্ধ গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "
প্রবন্ধ গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "
প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "
এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "
১
বাজারের গেটের ধারে মানিকদার চায়ের দোকান। প্রতি রবিবার বাজার সেরে
ওখানে এক কাপ চা খাওয়া আমার বহুদিনের অভ্যাস। পাড়ার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, নানান কথাবার্তা
আর খবরের আদান-প্রদান হয়। মানিকদাই হচ্ছে এই তল্লাটের সব খবরের খনি – আর রবিবারটাই
হল সে সব খবর তুলে আনার দিন। আজও “মানিকদা, কড়া করে একটা চা দিও”, বলে আমি দোকানের বাইরের বেঞ্চে
বসলাম, পায়ের কাছে বাজারের থলিটা রেখে। আর তখনই লক্ষ্য করলাম, দোকানের ভেতরের
বেঞ্চে একজন সাধুমহারাজ বসে রয়েছেন আর চায়ের গ্লাসে পাঁউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছেন। তার
সামনে ডান হাত মেলে বসে আছেন অমলদা। বেশ কৌতূহল হচ্ছিল, এপাড়ায় এমন সাধুমহারাজ কেউ
আছেন, কোনদিন শুনিনি তো।
মানিকদা আমার হাতে চায়ের গেলাস দিতে কাছে এলে নীচু গলায় জিজ্ঞাসা
করলাম, “কী ব্যাপার, মানিকদা? তোমার দোকানে সাধুবাবার আবির্ভাব?” মানিকদাও ফিসফিস
করে উত্তর দিল, “হিমালয়ের থেকে সোজা এসে এখানেই পা রেখেছেন। খিদে পেয়েছে বললেন,
তাই ওই চা আর পাঁউরুটি দিলাম। এরমধ্যেই অনেকে হাত-টাত দেখিয়ে ওঁকে দিয়ে তাদের
ভাগ্যবিচার করে নিয়েছে। মাইতিবাবু, চাটুজ্জেমশায়, সেনবাবু, এখন ওই অমলবাবু। যা যা
বলছেন – সব নাকি মোক্ষম মিলে যাচ্ছে। তোমার হাতটাও একবার দেখিয়ে নাও না, মুকুল।
বিয়ে থা করলে না, একা একা থাক, শরীরগতিক কেমন যাবে...”। মানিকদা দোকানের ভেতরে চলে
যেতে, আমি গেলাসে চুমুক দিয়ে সাধুবাবাকে দেখতে লাগলাম।
বেশ হাট্টাকাট্টা জব্বর চেহারাখানি বাবাজির। তার ওপর মাথাভর্তি
ঝাঁকড়াচুল নেমে এসেছে ঘাড় অব্দি। কপালে লম্বা সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষের
মালা, দুহাতে রুদ্রাক্ষের বালা। পরনে রক্তাম্বর – খালি গায়ে লাল রঙের একটা চাদর,
কাঁধের পৈতেটা বেশ মোটা এবং ধবধবে সাদা। সাধুবাবাজিদের ওপর আমার একেবারেই বিশ্বাস
নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে এই বাবাজির চেহারায় বেশ একটা ব্যক্তিত্ব আছে সেটা মানতে
হবে। বাবাজি চা খেতে খেতে অমলদার সঙ্গে নীচু স্বরে কথা বলছিলেন, আমি শুনতে
পাচ্ছিলাম না। এটাও আমার একটু অবাক লাগল। সাধারণতঃ এ ধরনের সাধুবাবাজিরা – সকলকেই
তুই-তোকারি করে, আশেপাশের সব লোককে শুনিয়ে ডেকে-হেঁকে কথা বলেন। যাতে সবাই তাঁদের
প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু ইনি দেখলাম সেরকম না, নীচু স্বরে - প্রায় ফিসফিস করে অমলদার
সঙ্গে কথা বলছেন।
চা শেষ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম বেঞ্চে। আজকে যারাই দোকানে আসছে, দেখছি
বাবাজিকে নমস্কার করে ভেতরে গিয়ে তাঁর কাছকাছি বসছে। বুঝলাম আজ আর অন্যদিনের মতো
আড্ডা জমার আশা নেই। কাজেই উঠে পড়লাম। টেবিলে খালি গেলাসটা রেখে মানিকদাকে চায়ের
দাম দিতে দিতে নীচু স্বরে বললাম, “আসি গো মানিকদা, আজ আর আড্ডা জমবে না। সবাই দেখছি
নিজেদের ভাগ্য গুছোতেই ব্যস্ত। আমার তো ভাগ্যই নেই, তো গুছোবো কী?”
কথাটা বলে সবে পেছন ফিরেছি, গম্ভীর গলার একটা মন্তব্য কানে এল, “ওহে
বাচাল, ভাগ্য নিয়েই মানুষের জন্ম হয়, গোছাতে হয় না। মানুষের আলসেমি আর বোকামিতে
সেই ভাগ্যের ওপর যখন পলি জমে ওঠে – আমরা সেই পলি সরিয়ে তার ভাগ্যটাকে একটু মেজেঘষে
দিই”।
কথাটা শুনে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম, কাপালিক ভদ্রলোক আমার দিকেই তাকিয়ে
রয়েছেন, অর্থাৎ আমাকেই তিনি “বাচাল” বলে ডাকলেন! বাচাল মানে, যে না জেনে, না বুঝে
অনেক কথা বলে। আমিও কাপালিক ভদ্রলোকের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
কতক্ষণ মনে নেই, হয়তো আধ মিনিট, তারপর চিন্তা করলাম, এইসব বুজরুক কাপালিকদের কথার
উত্তর দেওয়ার মানে হয় না। এদের চালাকির মুখোশ খুলে দিয়েছেন, অনেক অনেক বিজ্ঞানী
এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষরা – কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে এতটুকুও চিড়
ধরেনি। কাজেই আমি মৃদু হেসে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।
২
বাড়ি এসে কলমিকে বললাম, “এই নে বাজারের থলিটা ধর। আর ঝট করে এককাপ চা
করে খাওয়া তো”।
কলমি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “খালি পেটে অত চা খেতে হবে না, মামা। সকালে হয়েছে একবার, আরেকবার খেয়ে এলে মানিককাকুর দোকান থেকে। আমার জলখাবার রেডি, জামাটা খুলে টেবিলে বস, আমি পাঁচমিনিটের মধ্যে পরোটা-আলুভাজা নিয়ে আসছি”।
কলমি আমার
ভাগ্নী হলে কী হবে, আমি ওকে রীতিমতো ভয় পাই। কলমির “হ্যাঁ” মানে হ্যাঁ আর “না” তো
না – কথার নড়চড় করে না। কড়া শাসন – অবিশ্যি সে আমার ভালোর জন্যেই। কলমি খুব ভালো
মেয়ে, আর আমাকে ভালোওবাসে খুব। তাই বেশি বকাঝকা করতে পারি না। আসলে ওর মা
অন্নদাদিদি আমাদের বাড়িতে কাজ করেন আমার ছোট্টবেলা থেকে। আমার মাও খুব ভালোবাসতেন
অন্নদাদিদিকে। আমার ছ’বছর বয়েসে বাবা মারা যান, আর মাও চলে গেলেন আমি যখন বিএসসি
থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমার অসুস্থ মা মারা যাবার বেশ কদিন আগে থেকে, অন্নদাদিদির হাত
ধরে অনেকবারই বলেছিলেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না রে, অন্ন, আমি চলে গেলে মুকুলকে
একটু দেখিস’। এই সব নানা কারণে অন্নদাদিদি ও তার মেয়ে কলমি এবাড়ির আলাদা কেউ নয়।
অন্নদাদিদির স্নেহ-আদরে সে সময়ে মায়ের চলে যাওয়ার কষ্টটা সামলে উঠতে, বেশ সুবিধেই
হয়েছিল!
সকালে কলমি আসে, ঘরদোর ঝাড়া-পোঁছা করে, আমার জলখাবার বানিয়ে দিয়ে যায়।
একটু বেলায় আসে অন্নদাদিদি। দুপুরের রান্নাবান্না সেরে, আমার খাওয়াদাওয়ার পাট
চুকিয়ে বাড়ি ফেরে। কলমির মেয়ে ফুটকি রবিবারদিন মায়ের সঙ্গে এ বাড়িতে আসে। ফুটকি আমার
কাছে সকালে লেখাপড়া করে আর আমার সঙ্গে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে, দিদিমার সঙ্গে
বাড়ি ফেরে। ফুটকি ক্লাস থ্রিতে পড়ে।
কলমি রান্না ঘরে ঢুকে যেতে ফুটকি আমার পাশে এসে বসল, বলল, “দাদু, টোম্যাটো এনেছ? বলেছিলে আজ চাটনি হবে”?
“আমি জামা খুলতে খুলতে বললাম, “একশ বার এনেছি, শীতকালে টম্যাটোর চাটনি
- খেজুর, কিসমিস দিয়ে যেমন জমে, তেমন আর কোন সময় হয় না”। ছটফটে ফুটকি সোফা থেকে
নেমে দৌড়ে গেল, রান্নাঘরের দরজার পাশে বসিয়ে
রাখা বাজারের থলিটা কাত করে মেঝেয় ঢেলে দিল। মেঝেময় যা ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে আমি
আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম, “ফুটকি শিগ্গির পালিয়ে আয় এদিকে, কলমি তুই রান্নাঘর থেকে একদম
বেরোস না... ওখনাএই দাঁড়া, আমি দেখছি কী করা যায় ...!!”
আমার চিৎকারে ফুটকি আমার পাশে এসে আমার হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে
আমার মুখের দিকে তাকাল। ওদিকে রান্নাঘরের দরজায় কলমি মেঝেয় ছড়ানো আনাজগুলোর দিকে
তাকিয়ে, অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে, মামা?”
রাগে আমার মাথা গরম হয়ে গেল, বললাম, “দেখতে পাচ্ছিস না, নাকি? কিন্তু
বাজারের থলির মধ্যে এসব কোত্থেকে এল?
আশ্চর্য তো! ওই সবুজ রঙের সরুসরু সাপগুলো? কিলবিল করছে - ওগুলোর নাম জানিস, চিনিস?
আর ওই গোব্দা সবুজ ব্যাংদুটো? আর ওদিকে দেখ, পাঁচটা জোঁক লিটপিট করছে কেমন। জোঁক
কী এত মোটা হয়? ব্যাটারা একবার ধরলে শরীরে সব রক্ত এক চুমুকে শেষ করে দেবে, খুব
সাবধান। আর ওই প্যাকেটে এত আরশোলাই বা এল কী করে? প্যাকেটটা ভাগ্যে বন্ধ, না হলে
এতক্ষণ ফরফরিয়ে ঘরময় উড়ে বেড়াত! অনেক শাঁখ দেখেছি – তবে এমন জ্যান্ত শাঁখকে ঘরের
মেঝেয় হেঁটে চলে বেড়াতে কোনদিন দেখিনি! আর ওই টুকটুকে লাল শামুকগুলোও মনে হচ্ছে
জ্যান্ত! শামুক এমন লাল টুকটুকে হয় কোনদিন জানতামই না।”
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কলমি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই
আছে, একটা কথাও বলছে না। বুঝতে পারছি, ব্যাপার দেখে কলমিটাও হতভম্ব হয়ে গেছে! খুবই স্বাভাবিক।
কিন্তু ফুটকি আমার হাঁটু ছেড়ে মেঝেয় পড়ে থাকা আনাজগুলোর সামনে উবু হয়ে
বসে হাত বাড়াল, খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, “ও দাদু, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে
নাকি”? তারপর তার ছোট্ট হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে আমায় বোঝাতে লাগল, “সাপ
কোথায় দেখছ, ওগুলো তো বিন্স্, গাজর, ক্যাপসিকাম, খেজুর, শাঁকালু আর টোমাটো...হি
হি হি হি...”।
আমি ছুট্টে গেলাম আর এক ঝটকায় ফুটকিকে কোলে তুলে নিলাম। ফুটকির কথায়
পাত্তা না দিয়ে, কলমিকে বললাম, “এগুলোকে নিয়ে এখন কী করা যায় বলতো? আমার তো মাথায়
কিছুই আসছে না”।
এবার খুব ঠাণ্ডা গলায় কলমি বলল, “তুমি ফুটকিকে নিয়ে তোমার ঘরে যাও তো। ওসব আমি এখনই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করছি, চিন্তা করো না। আমি তোমার ঘরে জলখাবার দিয়ে আসছি”।
এমনিতেই ভয়ে আমার বুক ধুকপুক করছিল, তারওপর কলমির কঠিন আদেশ শুনে আমি
আর তর্ক করতে ভরসা পেলাম না। ফুটকিকে কোলে নিয়ে ঘরেই গেলাম।
ফুটকিকে কোল থেকে নামিয়ে আমি বিছানায় বসলাম। ফুটকিও আমার পাশে বসল,
আমার বুকে হাত রেখে বলল, “তোমার শরীর খারাপ লাগছে, দাদু?”
কলমি এই সময়েই দু হাতে দুটো প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল, তিনটে পরোটাওয়ালা
প্লেটটা আমার হাতে দিল আর অন্য প্লেটটা দিল ফুটকিকে – তাতে একটা পরোটা আর আলুভাজা।
তারপর একই রকম কঠিন স্বরে বলল, “এই ঘরে বসেই খেয়ে নাও, মামা। ফুটকি, দাদুর কাছেই
থাকবি, এই ঘর ছেড়ে বের হলে, তোর পিঠ কিন্তু আস্তো রাখবো না। মনে থাকে যেন”।
ঘরের মেঝেয় বসে আমি আর ফুটকি চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। কলমির ভয়ে আমরা দুজনেই একটাও কথা বলছিলাম না। খাওয়া শেষ হতেই কলমি আমার চায়ের কাপ দিয়ে গেল, আর এঁটো প্লেট দুটো তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “মামা তুমি চা খেয়ে বিছানায় একটু গড়িয়ে নাও। ফুটকি দাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি, কেমন? দাদু একটু আরাম পাবে”। ফুটকি এত্তোবড়ো ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল। তারপর কলমি আমার ঘরের দরজাটা চেপে ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল।
৩
অন্যদিন কলমি আমায় জলখাবার খাইয়ে ওর বাড়ি চলে যায়। আজ যায়নি। আমাকে আর ফুটকিকে ঘরবন্দী করে রেখে, কলমি ফোন করেছিল সন্ময়কে। সন্ময় আমার সবচে' প্রিয়বন্ধু – ও প্রায়ই আমার বাড়ি আসে আমিও ওর বাড়ি যাই। মাসিমা, মানে সন্ময়ের মা আমাকে সন্ময়ের মতোই খুবই স্নেহ করেন। আমার সেই বাল্যবন্ধু সন্ময় আমাদের এক ডাক্তার বন্ধু সমরকে নিয়ে কখন এসেছে আমি জানতেও পারিনি। আমি তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরের ঘরে দুজনকে বসিয়ে, চা দিয়ে, কলমি বাজার থেকে ফেরার পর আমার অদ্ভূত আচরণের কথা সবিস্তারে বলেছে।
সব কথা শুনে সমর জিজ্ঞাসা করল, “তোমার মামা এখন কী করছে?”
কলমি হাসল, বলল, “ঘুমোচ্ছে। আমি চুপিচুপি দরজা খুলে দুবার দেখে এসেছি। আমার
মেয়েও আছে, সেও তার দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমে এক্কেবারে কাদা”।
“এই অবেলায় ঘুমোচ্ছে? কতক্ষণ হল?”
“সন্ময়মামাকে ফোন করেছি সোয়া দশটা নাগাদ, ধরুন সেই সময় থেকেই”।
সন্ময় বলল, “হুঁ - তার মানে প্রায় ঘন্টা দেড়েক। দেখবি নাকি একবার?”
“দেখব তো বটেই – চ ওর ঘরে যাই”।
সন্ময় এগিয়ে গেল, ভেজানো দরজা আস্তে আস্তে খুলে ভেতরে ঢুকল। সমর এসে
আমার হাতটা তুলে নিতে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে দুই
বন্ধু সমর আর সন্ময়কে দেখলাম, তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে কলমি। আর আমার পাশেই গুটিসুটি
মেরে ঘুমোচ্ছে ফুটকি। অবাক হয়ে আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলাম, যাতে ফুটকির ঘুম না ভাঙে।
আমি নীচু স্বরে বললাম, “আমার কী হয়েছে কি? এরকম
অসময়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম কেন? তোরা কখন এলি, আর আমার দিকে অমন তাকিয়েই বা রয়েছিস
কেন?”
সন্ময় বলল, “তোর কিচ্ছু হয়নি, আমি আর সমর এদিক
দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোর সঙ্গে দেখা করতে এলাম। কলমি বলল, তুই ঘুমোচ্ছিস। এই অসময়ে তুই
ফুটকিকে না পড়িয়ে, ঘুমোচ্ছিস কেন? সেটাই দেখতে এলাম”। আমাদের কথাবার্তার মধ্যে সমর
তার স্টেথোস্কোপ কানে নিয়ে বুক দেখল, তারপর প্রেসার মাপার যন্ত্র বের করে ফসফসিয়ে প্রেসার
মাপতে বসল। সব কিছু হয়ে যেতে আমার চোখের কোল টেনে দেখল, জিভ বের করতে বলল, সব দেখে
ঘাড় নেড়ে বলল, “কোন গড়বড় তো নেই! রাত্রে ঘুম-টুম ঠিক হয়েছিল? বাজার থেকে ফিরে কী
হয়েছিল? মাথা-টাথা ঘুরে গিয়েছিল নাকি?”
ঘুম থেকে উঠে আমার মাথাটা কেমন যেন ভোম মেরে
ছিল। বাজার থেকে ফিরে কী করেছি, কী বলেছি সব ভুলেই গেছিলাম। সমরের কথায় হঠাৎ মনে
পড়ে গেল, বললাম, “আর বলিস না, বাজার থেকে ফিরতে ফুটকি বাজারের থলিটা মেঝেয় ঢেলে
দিতেই দেখলাম সবুজ রঙের গুচ্ছের সাপ কিলবিল করছে, আরও কী কী সব যেন দেখলাম। অদ্ভূত
অদ্ভূত সব প্রাণী বাজারের থলি থেকে ছাড়া পেয়ে মেঝেয় নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে...”!
সমর বলল, “অদ্ভূত, বাজারে উল্টোপাল্টা কিছু
খেয়েছিলি?”
আমি একটু রেগেই গেলাম, “মানিকদার দোকানে একটা
চা খেয়েছি, উল্টোপাল্টা আবার কী খাব?”
সন্ময় বলল, “আহা, রেগে যাচ্ছিস কেন? কিছু একটা
তো হয়েছিল – তা নাহলে... কলমি, মামার বাজারের আনাজগুলো রয়েছে, না কি সব রান্না করে
ফেলেছিস?”
কলমি বলল, “সব আছে, ঝুড়িতে তুলে রেখেছি। নিয়ে
আসব?” কলমি দৌড়ে গেল এবং ঝুড়িটা এনে সামনে রাখল।
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “এই - এই যে বিন্স্গুলোকে
মনে হয়েছিল জ্যান্ত সাপ, খেজুরগুলোকে জ্যান্ত আরশোলা...কেন এমন হল বল তো?”
প্রশ্নটা করলাম সমরকে।
সমর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, বলল, “বিশেষ
কারুর সঙ্গে বাজারে তোর দেখা হয়েছিল?”
এই কথায় আমার মনে পড়ল সেই কাপালিকের কথা। আমি
সেই কাপালিক সম্পর্কে যা যা জেনেছিলাম, এবং যা যা ঘটেছিল সব বললাম। আমার কথা শেষ
হতে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। প্রথম কথা বলল কলমি, “মামা, তোমার ওই সব লোকদের
সঙ্গে লাগতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? ওরা অনেক কিছু পারে। তোমরা বিশ্বাস করো না,
কিন্তু আমরা জানি”।
সন্ময় একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ক বছর পরে মানুষ
হয়তো চাঁদে, মঙ্গলে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করবে! সেখানে কে এক কাপালিক তার অলৌকিক
ক্ষমতা দিয়ে ফিজিক্সের প্রফেসার মুকুল সেনকে এভাবে জব্দ করে দিল?”
সমর মুচকি হাসল, বলল “ধূর, এটাকে অলৌকিক ভাবছিস
কেন? এটা তো পিয়র কেস অব হিপ্নোটিজ্ম্, যাকে বাংলায় বলে সম্মোহন। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক
আর কিছু না জানুন, সম্মোহনটা জানেন। সম্মোহন না জানলে, ওঁদের চলবে কী করে? আমাদের
মুকুল কিছুটা সম্মোহিত হয়েছে ঠিকই – কিন্তু এ কথাও বলব সেই কাপালিক ভদ্রলোক
মুকুলকে কাবু করতে পারেননি। পারলে পাজামার পিছনে ডান হাতটা ঘষে সাফ করে, মুকুলও
হাত মেলে ধরত ওই ভদ্রলোকের সামনে”।
সন্ময় বলল, “বুঝলাম। কিন্তু মুকুলের মধ্যে এখনও
সেই সম্মোহনের রেশ রয়ে যায়নি তো?”
সমর বলল, “আরে না, না, কিচ্ছু না। মুকুল যে
ভাবে ঘুমিয়েছে, সে সম্মোহনের রেশ কেটে গেছে। আর কোন চিন্তা নেই”।
আমি ভয়ে ভয়ে কলমিকে বললাম, “আমাদের সকলকে চা
খাওয়াবি নাকি, কলমি?”
আমার কথার ভঙ্গিতে কলমি হেসে ফেলল, বলল, “ওরকম
ভয়ে ভয়ে বলছ কেন, মামা? সবার জন্যেই চা আনছি – আর তার সঙ্গে অমলেট। একটু বসো”।
কলমির কথায় সমর আর সন্ময় হেসে ফেলল। ওদের হাসির শব্দে এতক্ষণে ঘুম ভাঙলো ফুটকির - অবাক দুই ডাগর চোখ মেলে সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর দেখতে লাগল তার দাদুর বন্ধুদের।
--০০--