প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২১ "
২২
প্রথম প্রথম খুব আড়ষ্ট হয়ে ছিলাম, অফিসের কাজের মধ্যে ঢুকতে
পারছিলাম না কিছুতেই। বইয়ে পড়েছি, পরীক্ষা দিয়ে ভালোভাবে পাসও করেছি। কিন্তু এখানে
এসে টের পেলাম, আমার বইয়ে পড়া সমস্যাগুলির তুলনায় এখানকার সমস্যা অনেক ব্যাপ্ত।
আমার মুখস্থ করা সমাধানের সূত্রগুলো দিয়ে তার তল খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। দিন
পনের পরে, আমার ডাক পড়ল শশাঙ্কবাবুর চেম্বারে। গিয়ে দেখি সেখানে উল্টোদিকের চেয়ারে
বিভাসবাবুও বসে রয়েছেন।
আমি ঢুকতেই শশাঙ্কবাবু বললেন, “আসুন সুকন্যা, বসুন। কেমন
লাগছে অফিসের কাজ-কর্ম?”
আমি একটু দ্বিধা নিয়েই বললাম, “রীতিমত হাবুডুবু খাচ্ছি...যা
পড়াশোনা করে এসেছিলাম, মনে হচ্ছে কিছুই শিখিনি, বাস্তবে এত জটিলতা...!”
শশাঙ্কবাবু হেসে বললেন, “গুড, তার মানে ঠিক পথেই চলেছেন।
দেখুন আপনাদের কমার্সের ব্যাপারটা আমি বলতে পারবো না। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে
সাইটে প্রথম কাজ করতে গিয়েও আমাদের সকলকেই এই অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়। ওটা কিছু নয়,
মাস দু-তিন লাগবে, ভেতরে ঢুকতে। তারপর বছর খানেকের মধ্যে সব সমস্যারই সমাধান নিজেই
খুঁজে নিতে পারবেন। আপনাকে যে জন্যে ডেকেছিলাম, সেটা বলি।
লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, চারদিকেই এখন কম্পিউটার ঢুকে পড়ছে।
আমরাও ধীরে ধীরে কম্পিউটার জগতে ঢোকার চেষ্টা করছি। টেকনিক্যাল এবং অ্যাকাউন্ট্সের
কাজের জন্যে অলরেডি শুরু করে দিয়েছি। আশা করছি, আগামী বছর খানেকের মধ্যে আমরা সব
কিছুই কম্পিউটারাইজ্ড্ করে তুলতে পারব। তার জন্যে আপনাকেও প্রস্তুত হতে হবে”।
“আমি তো কম্পিউটার চালাতে জানি না”। খুব অসহায় ভাবে আমি
বললাম।
মৃদু হেসে শশাঙ্কবাবু বললেন, “না জানারই কথা, কিন্তু শিখতে
হবে। আমাদের অফিস থেকেই সে ব্যবস্থা করছে। সামনের মাসের পয়লা থেকে আপনি ও এ অফিসের
আরও কয়েকজন - কম্পিউটর সেন্টারে ভর্তি হয়ে যাবেন। সপ্তাহে তিনদিন ক্লাস – রোজ দু
ঘন্টা করে। ছমাসের কোর্স – কোর্স ফি কোম্পানিই বেয়ার করবে। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে ছুটির
একঘন্টা আগে অফিস থেকে বেরিয়ে যাবেন, তবে বাড়ি ফিরতে একঘন্টা দেরি হবে। আশা করি
সেটুকু অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারবেন”।
কোন খবর বুঝতে আমার বাকি ছিল না, বললাম, “আমার জীবনের এই
অধ্যায়টা এতই অস্বস্তিকর যে ডিভোর্স পাওয়ার খবরটা চারিদিকে চাউর করার কোন ইচ্ছেই
হয়নি, মিঃ মিত্র”।
গম্ভীর মুখে শশাঙ্ক বললেন, “দ্যাট্স্ ট্রু। কিন্তু একথাও
সত্যি, আপনার জীবনের ওই ছোট্ট অধ্যায়টুকু এতই ইনসিগ্নিফিক্যান্ট যে, তাকে অনায়াসে
মুছে ফেলতে পারেন”।
শশাঙ্কর চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়েছিলাম, “তাই কি?”
“তাই নয়?”
“ওই ছোট্ট অধ্যায়ের সম্পর্ক থেকেই আমি মা হয়েছি, মিঃ মিত্র।
আমার সন্তান তো আমার কাছে ইন্সিগ্নিফিক্যান্ট নয় এবং কোন দিন হবেও না। জ্যোতিষ ও
আমি আইনত বিচ্ছিন্ন হয়েছি, কিন্তু তাই বলে আমার সন্তানের পিতৃত্ব থেকে আমি
জ্যোতিষকে বিচ্ছিন্ন করব কী করে? একটু বড়ো হয়ে আমার ছেলে যখন জিজ্ঞাসা করবে, “মা
আমার বাবা কোথায়? তার নাম কি?” তার উত্তরে জ্যোতিষের নামটা তো এসেই যাবে”।
নিজের আবেগটা সামলে কিছুটা থেমে আবার বললাম, “অ্যাজ আ থার্ড
পার্সন, ব্যাপারটা মনে হয় ভীষণ সরল, সহজ-সুন্দর। ছোটবেলায় ইরেজার দিয়ে ড্রয়িং খাতা
থেকে পেন্সিলের আঁকিবুকি মুছে ফেলার মতো। কিন্তু আমার জীবনটা তো ড্রয়িং খাতায়
পেন্সিলে আঁকা আঁকিবুকি নয়, মিঃ মিত্র”।
শশাঙ্ক কোন কথা বললেন না। টেবিলে রাখা কাঁচের পেপারওয়েটের
রঙিন বুদ্বুদের তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর খুব গভীর স্বরে বললেন, “রাগের মাথায়
ডিভোর্স নিয়ে ফেলার জন্যে, আপনি কি এখন অনুতপ্ত?”
“কেন? অনুতপ্ত হব কেন? একটুও না। আমি যে এখন কতখানি মুক্ত –
সে কথা আপনাকে বুঝিয়ে বলার সাধ্য আমার নেই”।
“তাহলে, জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু করবেন না কেন? পিছনে
ফেলে আসা একটা অধ্যায়ের গ্লানি বয়ে কেন বিষণ্ণ করে তুলবেন, আপনার এবং আপনার পুত্রের
ভবিষ্যৎ? আপনার কাছাকাছি থাকা থার্ড পার্সনদের মধ্যে জনৈক, যদি হাত বাড়িয়ে দেয়,
তার হাত ধরে আপনার জীবনের নতুন অধ্যায়ের পথে পাড়ি দিতে অসুবিধে কোথায়?”
শশাঙ্কর কথার ইঙ্গিতটুকু বুঝে আমি সেদিন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, সুনুদা। উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না, উত্তর দিইওনি। কিন্তু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম শশাঙ্কর মুখের দিকে অনেকক্ষণ। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, “বেশ কিছু কাজ জমা আছে, আজ শেষ করতেই হবে। আমি এখন আসছি মিঃ মিত্র”। শশাঙ্ক কিছু বলল না, গম্ভীরমুখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। চেম্বারের দরজা খুলে বাইরে আসার সময়ও টের পেলাম, শশাঙ্কর দৃষ্টি আমার দিকেই নিবদ্ধ।
নিজের কিউবিক্লে ফিরে চেয়ারে বসলাম, জল খেলাম অনেকটা।
মাথার মধ্যে অজস্র চিন্তা গম-গম করে চলেছে একটানা – দীর্ঘ ব্রিজ পার হওয়ার সময় ট্রেনের
চাকায় যেমন একটানা ভারি ধ্বনি ওঠে, সেরকম। আমি শম্ভুদাকে বললাম, “শম্ভুদা, এক কাপ
চা খাওয়াবে, গো?”
ডেস্কটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, অত্যন্ত
বিরক্তিকর সংক্ষিপ্ত দাম্পত্য জীবন থেকে আমি সদ্য মুক্তি পেয়েছি। তার কিছুটা আগেই,
অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনে এসেছে আত্মনির্ভর হওয়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ। সে সুযোগটা
হল শশাঙ্কর দেওয়া যথেষ্ট সম্মানজনক এই চাকরি। এই চাকরিটা প্রতিনিয়ত নিজেকে চিনতে
শেখাচ্ছে। বাইরের জগতে এসে আমি যে কোন কাজ করতে পারি, সেই কাজটার গভীরেও যে আমি
ঢুকতে পারি, সেটাই যোগাচ্ছে আমার আত্মবিশ্বাস। সেই কাজের বিনিময়ে মাসান্তে যে অর্থ
আমি উপার্জন করি – তার যোগ্য হয়ে উঠছি আমি প্রতিদিন। নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার
পাশাপাশি, এই মুক্তির স্বাদটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করাতেই নিবিষ্ট ছিল আমার
মনটা।
এই মানসিক পরিস্থিতিতে আমার মনটা সত্যিই খুব সংকীর্ণ হয়ে
উঠেছিল, একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, সুনুদা। আমার মনোজগতে ছিল, শুধু চারজন –
আমার পুত্র, বাবা, মা আর আমি নিজে। এর বাইরের অন্যান্য সম্পর্ক-বৃত্তগুলি নিয়ে আমার
কোন কৌতূহল তো ছিলই না, ছিল না সে দিকে লক্ষ্য করার বা মনোযোগ দেওয়ার কোন অবকাশ।
প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই শশাঙ্ককে আমার পছন্দ হয়েছিল, তার স্পষ্ট
এবং অকপট কথাবার্তার জন্যে। যথেষ্ট
শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতাও ছিল তার প্রতি। আমার প্রতি শুধু মৌখিক সহানুভূতি দেখিয়েই সে
নিরস্ত থাকেনি, উপযাচক হয়ে আমাকে তার
অফিসে চাকরি দিয়েছিল যথোচিত সম্মানের সঙ্গে। আমার কর্মস্থলেও তার আচরণে সে বজায়
রেখেছিল – এমপ্লয়ার ও এমপ্লয়িসুলভ দূরত্ব। উপকার করেছে বলেই, আমার প্রতি তার অকারণ
ব্যক্তিগত মনোযোগ, যাকে বলা চলে গায়ে-পড়া ধরনের আচরণ, শশাঙ্ক কোনদিন করেনি। তার এই
আচরণের জন্যেও তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ ছিলাম, শ্রদ্ধাও করেছিলাম তাকে। কিন্তু প্রেম?
না মনের কোন কোণেই শশাঙ্কর জন্যে প্রেম-মেঘের উদয় হতে দেখিনি কোনদিন।
কিন্তু সেদিন, আর পাঁচজন অতি সাধারণ ধান্দাবাজ মানুষের মতোই,
সে যখন আমায় তার “বাড়িয়ে দেওয়া হাতটিকে” ধরার প্রস্তাব দিল, বিশ্বাস করো,
সুনুদা... খুব ধাক্কা খেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, পুরুষ মানেই কি সব একরকম? একই ছাঁচে গড়া?
তাদের সমস্ত সহানুভূতি এবং সহযোগীতার অন্তরালেই কি থাকে ঠিক সময়মতো প্রেম নিবেদনের
প্রস্তুতি?
শুনেছি মেয়েরা নাকি পুরুষদের মুগ্ধ প্রেম নিবেদনে সর্বদাই
পুলকিত হয়, তার প্রতি মেয়েরা আকৃষ্ট না হলেও। বিবিধ পুরুষের চোখে ফুটে ওঠা মুগ্ধতার
লক্ষণ দেখে মেয়েরা নাকি নিজেদের মাধুরীর ব্যাপ্তি উপলব্ধি করে থাকে। আমি কিন্তু করিনি। বরং আমার মনটাই বড়ো ছোট হয়ে গিয়েছিল
সেদিন। আমার চোখে শশাঙ্ক নামের মানুষটাও অনেকটাই ছোট হয়ে গিয়েছিল।
সেদিনের ওই ঘটনার পর, সারাদিনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে বহুবার
বহুভাবে বিশ্লেষণ করে চললাম। নিজেকে, নিজের জীবনকে। শশাঙ্ককেও। মাঝে মাঝে ভয় হতো,
শশাঙ্কর প্রস্তাবে আমি যদি রাজি না হই। যদি নাকচ করে দিই। তাহলে এই অফিস থেকে আমার
এই কাজটি কি খোয়াতে হবে? মাত্র এই মাস তিনেকের অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্য কোথাও, আরেকটি
সম্মানজনক কাজ জুটিয়ে নেওয়া কি সম্ভব হবে? যদি না হয়, তাহলে আমাকে তো আবার সেই
অনিশ্চিত জীবনের অন্তহীন নিঃসঙ্গ পথচলা শুরু করতে হবে। অফিসের কাজ নিয়ে ভুলে থাকা
মেয়ের দিকে তাকিয়ে আমার মা ও বাবা যে নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন। তাঁদের আদরের কন্যা
ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে, অভিজ্ঞ, আত্মনির্ভর ও যথেষ্ট উপার্জনশীল। নিজের ও তার
সন্তানের জীবনধারণের জন্যে সে আর পরমুখাপেক্ষী থাকবে না। তারপর কোনোদিন, তাঁদের মেয়ের
জীবনে যদি উপস্থিত হয়, নতুন কোন পুরুষ। এবং সে সম্পর্কে যদি নিজে থেকেই বাঁধা পড়তে
চায় তাঁদের মেয়ে, সে ইচ্ছেতে তাঁরা আপত্তি করবেন না। অথবা সে যদি সন্তানকে নিয়ে সারা
জীবন একলাই থাকতে চায়, তাতেও আপত্তি করবেন না, কোনদিন।
কিন্তু আজ শশাঙ্ক কোন একটা অজুহাতে আমার এই চাকরিটা ছিনিয়ে নিলে,
আমাদের সকলের জীবনের আশা-স্নিগ্ধ কিশলয়দল অচিরেই শুকিয়ে যাবে রুক্ষ মরুর দহন-জ্বালায়!
চলবে...