রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

শ্রীমান

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " সম্মোহন "


তোয়া ছোটকার টেবিলে চা রেখে বলল, “ছোটকা, চা দিয়ে গেলাম, মনে করে খেয়ে নিও কিন্তু, ভুলে যেও না, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে” ছোটকা উত্তর দিল, “হুপ

ছোটকাটা এমনই একটু পাগলাটে ধরনের সর্বদাই পড়াশোনার রাজ্যে ডুবে থাকে যতক্ষণ ঘরে থাকে খালি বই আর বই বই বৈ আর কিছুই জানে না আগে কলেজে পড়াতে যেত, এখন লকডাউন হয়ে, ছোটকার দারুণ মজা, সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে দাদুন আক্ষেপ করে বলেন, কর্কটরাশিতে জন্মেও ছোঁড়াটা এমন মর্কট কী করে হয়ে গেল কে জানে? আর ঠাম্মি দুঃখ করে বলেন, “তোর দাদুর জন্যেই আমার মুকুলটা নষ্ট হয়ে গেল ছোট বেলা থেকে ও বাবার মুখে সারাদিন “পড়তে বস, পড়তে বস” শুনে এসেছে আর কে না জানে অল ওয়ার্ক এন্ড নো প্লে মেকস জ্যাক এ ডাল বয় সেই থেকেই ও ডাল হয়ে গেল, তারপর বিদ্যার ডালে ডালে ঘুরে আর বইয়ের গন্ধমাদন বইতে বইতে হনুমান হয়ে উঠলো তবে দাদুন আর ঠাম্মি যাই বলুন, তোয়া জানে তার ছোটকার মতো লেখাপড়া জানা মানুষ এই মনোহরপুর শহরে আর কেউ নেই পাড়াপড়শিতে, তার স্কুলের দিদিমণিরা সকলেই ছোটকার নাম শুনলে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন বলেন ওঁনার মতো শিক্ষিত সজ্জন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় কই? আর সেই দৌলতে তোয়াও সকলের থেকে একটু বেশিই স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। 

আজকাল লকডাউন বলে তোয়াদের স্কুল হয় ঘরে বসেই অনলাইনে এ যে কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, তোয়ার একটুও পছন্দ হয় না সকাল এগারোটা থেকে ক্লাস শুরু হয় ল্যাপটপে বইখাতা নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসলেই দিদিমণি চলে আসেন কম্পিউটারের পর্দায় রোলকল করেই পড়া চালু এভাবে পড়া করায় কোন মজা আছে বলো? আশেপাশে তার প্রিয় বন্ধুরা কেউ নেই, রাণি, মৌটুসি, পিয়ালি ক্লাস শুরুর আগে একটু গপ্পোসপ্পো, ক্লাস চলাকালীন একটু ফিসফাস কিংবা চোখেচোখে কথা না বললে আবার স্কুলের পড়া হবে কী করে?

তারপর সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল টিফিনের সময় চারবন্ধু মিলে বাড়ি থেকে আনা টিফিন ভাগ করে খাওয়া? ওফ, সে যে কী মজার আলুর দম দিয়ে নুডলস, দইবড়া দিয়ে পরোটা, কিংবা মোমোর সঙ্গে চিঁড়ের  পোলাও এই লকডাউনের সময় তোয়া মাকে একদিন বলেছিল নুডলস দিয়ে চিঁড়ের পোলাও বানাতে মা গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “অমন রান্না আমি কোনদিন শুনিনি কিন্তু এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই কোরোনা থেকে বাঁচতে গেলে এছাড়া অন্য উপায়ও নেই বাবান অফিস যান, সপ্তাহে এক-দুদিন, বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ করেন আর যেদিন যান, মুখে মাস্ক পরা বাবানকে দেখলে মনে হয়, জলদস্যুদের সর্দার কার্ভালো!

আজকে রবিবার তাই তোয়ার অনলাইন ক্লাস নেই ছোটকার ঘরে চা দিয়ে সে ছাদে গেল এই সময় তাদের ছাদে আর আশেপাশের গাছপালায় অনেক পাখপাখালি আসে তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে তোয়ার খুব মজা লাগে

ছাদে গিয়ে তোয়া অবাক, ওমা ছোটকা ছাদে কখন এল? “ছোটকা, তোমাকে এই মাত্র চা দিয়ে এলাম, আর তুমি এরই মধ্যে ছাদে এলে কী করে? এত তাড়াতাড়ি তোমার চা খাওয়া হয়ে গেল? আর আমার আগে কোন দিক দিয়ে ছাদে এসে গেলে”?

আমাকে চা দিয়ে এলি? ধুস তা কী করে হয়? আমি তো সেই কোন সকাল থেকেই ছাদে রয়েছি

কী বলছো? আমি এইমাত্র দেখে এলাম, তুমি চেয়ারে বসে টেবিলে বই পড়ছো তোমার গায়ে সেই মিষ্টি নীল রঙের জামাটা, ও হ্যাঁ, এর মধ্যে তুমি জামাটা পালটে, মেরুন টিশার্টও পরে নিয়েছ”?

তুই শিয়োর আমিই ঘরে ছিলাম, আর আমাকেই চা দিয়েছিস”? ছোটকা একটু যেন ধন্দে পড়েছে

বাঃ রে তোমাকেই তো দিলাম তোমাকে এও বললাম, ছোটকা ভুলে যেওনা, চাটা খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে উত্তরে তুমি বললে হুঁ সব ভুলে গেলে”?

খুবই চিন্তিত মুখে, তোয়ার ছোটকা বললেন, “তবে কী আমি এখানেও আছি, আবার আমার ঘরেও আছি? এটা আমার দ্বৈত সত্ত্বা?”

সেটা আবার কী জিনিষ? ঠাম্মির আমসত্ত্বের মতো কিছু?”

ছোটকা হেসে ফেললেন, “নারে, আমার পুঁচকি মা, আমরা যখন খুব গভীর কিছু চিন্তা করি, তখনও তো আমাদের স্নান-টান, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া সবই করতে হয়! তখন একটা সত্ত্বা চিন্তা করতে থাকে, আর অন্যটা নানান কাজ করে, এই আমি যেমন এখন আমার পুঁচকি মায়ির সঙ্গে গল্প করছিআর একই সঙ্গে হয়তো নীচেয় চেয়ারে বসে তোর চা খেতে খেতে মন দিয়ে বই পড়ছি

তোয়ার ব্যাপারটা ঠিক মনঃপূত হল না, সে একটা ছোটকাকেই বড্ডো ভাল বাসে, তার মধ্যে কোনটা এখন নীচের ঘরে বসে আছে, আর কোনটা রয়েছে ছাদে, এর সমাধান সে করে কী করে? ডবল ছোটকা নিয়ে তার কাজ কী?

এমন সময় নীচের তলা থেকে বেজায় এক গোলমালের শব্দ পাওয়া গেল প্রথমে চায়ের কাপ-প্লেট ভাঙার আওয়াজ, তারপর চেয়ার বা টেবিল উলটে যাওয়ার হুড়মুড় শব্দ, তারপর হুফ হুফ আওয়াজ তারপরেই প্রতিমাদিদির হৈচৈ চিৎকার, “ওরে বাবারে, এ কী অলক্ষুণে কারবার গো, ও বড়োমা, ও বৌদি, শিগগির এসে দেখে যাও ছোড়দা কী করচে”? প্রতিমাদিদি তোয়াদের বাড়িতে কাজ করেন, তিনি ঠাম্মিকে ডাকেন বড়োমা আর তোয়ার মাকে, ডাকেন বৌদি

নিচের গোলমাল শুনে ছোটকা এবং তোয়া দুজনেই দৌড়ে নীচে নামল ছোটকার ঘরের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে, দাদুন, ঠাম্মি, বাবা, মা আর প্রতিমাদিদি, ঘরের মেঝেয় বসে রীতিমতো কান্নাকাটি করছেন, “ও জ্যেঠু, ও বড়োদাদা, ছোড়দার এ কী হল গো?”

দাদু জোর এক ধমক দিলেন প্রতিমা দিদিকে, বললেন, “আঃ, চেঁচাস না, চুপ কর মুকুলের কী হয়েছে”? তোয়ার ছোটকার ডাক নাম মুকুল আর ঘরের ভিতরে বসে থাকার কারণে প্রতিমাদিদি ঘরের বাইরের সকলের পেছনে দাঁড়ানো ছোটকাকে দেখতে পাননি।

দাদুনের বকা খেয়ে প্রতিমা দিদি কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “ঝাঁট দেব বলে আমি ঘরে ঢুকেছিলাম, দেখি ছোড়দা চেয়ারে বসে বই পড়ছে আর টেবিলে রাখা কাপের চাটা ছুঁয়েও দেখেনি তাই আমি বললাম, ও ছোড়দা, চাটা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল গো”?

তারপর?”

তারপর, যেমনি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে গিয়েছে, ওরে বাপরে, ছোড়দার সেকি চেঁচামেচি আর লাফালাফি চেয়ার টেবিল উলটে, চায়ের কাপডিস ভেঙে, মেঝেয় চা ছড়িয়ে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড! আমি তো ভয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ছোড়দার কাণ্ডকারখানা ও বড়ো মা, ও বৌদি, দেখি কী, রাগে ছোড়দার মুখটা পুড়ে একেবারে কালো হয়ে গেছে, তাতে আবার চশমা হাতে পায়ে এত্তো এত্তো লোম, আবার পেছনে এই লম্বা একখান লেজও”!  

প্রতিমাদিদির বর্ণনায় সকলেই স্তম্ভিত কারো মুখে কোন কথা নেই প্রতিমাদিদি আবারও কান্নার সুরে টেনেটেনে বলল, “এবার কী হবে, বড়োমা? ছোড়দা কলেজে পড়াতে গেলে, বদমায়েশ ছেলেরা যে ছোড়দার লেজ নিয়ে টানাটানি করবে ছিছি এমন অবাক কাণ্ড কী করে হল গো, বৌদি”?

তোয়া খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোটকা তো আমার সঙ্গে ছাদে ছিল, কোন সকাল থেকে তুমি নীচেয় যে ছোটকাকে দেখেছ প্রতিমাদিদি, সেটা অন্য ছোটকা”।

তোয়ার মা জিজ্ঞাসা করলেন, “সকালে চা করে তোকে যে বললাম, ছোটকার ঘরে চাটা দিয়ে আয়, তুই দিসনি?”

দিয়েছিলাম তো কিন্তু সেটাতো আসল ছোটকা নয়, ছোটকার দৈত্য না কী একটা যেন

দৈত্য নয় দ্বৈত সত্ত্বা ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন

ঠাম্মি বললেন, “ও বাবা, সেটা আবার কী বস্তু?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি বলছি, মা, কী বস্তু মুকুল খুব সকালেই ছাদে গিয়ে পায়চারি করছিল আমার ঘরে শুয়ে ওর পায়ের শব্দ পেয়েছি এদিকে ঘর খালি দেখে, তোমার প্রিয় শ্রীমান, মুকুলের ঘরে ঢুকেছে মুকুলের নীলজামাটা গায়ে দিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে বসেছে তারপর চশমাটাও পরেছে আর তারপরেই আমাদের তোয়ারাণি তার ঘরে ঢুকে টেবিলে চা রেখে এসেছে পেছন থেকে নীলজামা, আর চোখে চশমা দেখে, বেচারা ভেবেছে ওর ছোটকাই চেয়ারে বসে আছে

তোয়ার বাবা একটু থামলেন তারপর আবার শুরু করলেন, “এর কিছুক্ষণ পরেই ঝাড়ু হাতে প্রতিমা ঘরে ঢুকে বকবক শুরু করাতে, শ্রীমান ঘাবড়ে গিয়ে গরম চায়ের কাপে কিংবা চায়ে হাত-টাত লাগিয়ে ফেলাতেই যত বিপত্তি ওরা তো রান্নাবান্না করে না, গরম চা বা গরম ঝোলও খায়না কাজেই হাতে ছেঁকা লাগাতে মনে হয় বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল তারপরেই চেয়ার টেবিল উলটে হুলুস্থুল বাধিয়েছে এরপর প্রতিমা মেঝেয় বসে কান্নাকাটি করাতে বেচারা সুযোগ পেয়ে পালিয়েছে”

তোয়ার দাদুন জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু তুমি এত কিছু জানলে কী করে?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “বারান্দার পূবের কোণা থেকে দেখে এস, আমাদের কাঁঠালগাছের ডালে, মায়ের শ্রীমান, কেমন মুকুল সেজে বসে আছে! গায়ে তার নীল জামা, চোখে ঝুলছে চশমা পিছনে অবিশ্যি মস্ত লেজটাও আছে”

সকলেই, বারান্দার কোণ থেকে, এমনকি ছোটকা নিজেও দেখে এলেন সত্যিই শ্রীমান গায়ে জামা পরে বসে আছে যদিও বুকের বোতাম লাগাতে পারেনি, আর সাইজে বড় হওয়াতে জামাটা খুব ঢলঢল করছে চশমাটাও ওর দু'কান থেকে ঝুলছে আর নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল বারবার চুষছে বারান্দায় তোয়াদের সকলকে দেখে, শ্রীমান মিটমিট করে তাকাল, তারপর বেশ কয়েকটা দাঁত দেখালবাঁ হাতে পেট চুলকোতে চুলকোতে। ওটাই কী ওর 'সরি' বলার নমুনা? প্রতিমাদিদি ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম ছোড়দা, তুমি কিনা শেষ অব্দি, হিহি হিহি, লেজ নিয়ে ঘোরাফেরা করবে?”

ছোটকা গম্ভীর মুখে বললেন, “বাজে বক বক করিসনা, প্রতিমা। কিন্তু আমার চশমার কী হবে? চশমা ছাড়া আমি পড়ব কী করে?”

তোয়ার ছোটকার প্রিয় নীল জামাটা না হয় গেল কিন্তু এই লকডাউনে নতুন চশমা পাবে কোথায়? চশমার দোকান-টোকানতো সব বন্ধ কবে খুলবে কে জানে; এদিকে ছোটকার চলবে কী করে? চশমা ছাড়া বই পড়বেন কী করে?

ঠাম্মি সব্বাইকে বললেন, “এখানে ভিড় করিস না, সব্বাই যে যার ঘরে যা আমি দেখছি কী করা যায়

শ্রীমান নামের হনুমানটি, অনেকদিন ধরেই দল ছুট হয়ে তোয়াদের এবং আশেপাশের বাগানের গাছে থাকে তেমন কোন উপদ্রব কিংবা বিরক্ত করে না আর তোয়ার ঠাম্মি শ্রীমানকে খুবই স্নেহ করেন ও যত্ন-আত্তি করেন বাড়িতে নিত্য সেবার পুজোয় একটু বেশিই ফলটল নৈবেদ্য দেন, কলা, শসা, পাকা পেঁপে, পেয়ারা, সবেদা ঠাম্মি ভগবান রামের খুব ভক্ত, তাঁর নিত্যসেবার দেবতাটি রঘুপতি রামচন্দ্র ঠাম্মির দৃঢ় বিশ্বাস, তিনিই তাঁর ভক্ত হনুমানটিকে পাঠিয়েছেন, তাঁর নিবেদন করা ফলগুলির সদ্ব্যবহারের জন্যে

ঠাম্মি আজও দেবতার পুজো দিলেন, অনেক ফল দিয়ে তারপর ছাদ থেকে হাঁক পাড়লেন, “অ শ্রীমান, খাবি আয় কাঁঠাল গাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে শ্রীমান ঠাম্মির হাতের ফলভরা রেকাবিটা দেখল একবার পেট চুলকে ডানহাতের দুটো আঙুল চুষল তোয়া ফিসফিস করে ঠাম্মিকে বলল, “শ্রীমানদাদার ওই আঙুল দুটোতেই মনে হয় ছেঁকা লেগেছে, তাই না, ঠাম্মি?”

দেখি, কাছে এলে বুঝতে পারবো

চোখে চশমা, গায়ে নীল জামা শ্রীমান একটু ইতস্তত করলেও এল। ছাদের আলসেতে বসে ঠাম্মির দিকে আর তাঁর হাতের রেকাবিটা দেখল মন দিয়ে তারপর ছাদের মেঝেয় নেমে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল ঠাম্মি ছাদের মেঝেয় বসে, যত্ন করে একটা একটা করে কাটা ফল দিতে লাগলেন, শ্রীমান বাঁহাত বাড়িয়ে মুখে পুরে কচমচ চিবোতে লাগল

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, দৌড়ে যা তো, তোর মাকে বলে, ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ নিয়ে আয় ছেঁকালাগা আঙুলে ঠাণ্ডা পেলে একটু আরাম পাবে বেচারা তোয়া এক ছুট্টে নিচেয় গেল বরফ আনতে

শ্রীমান যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, ঠাম্মি প্রথমেই খুলে নিলেন, চশমাটা শ্রীমান আপত্তি তো করলই না, বরং শান্ত ভাবে বসে রইল চুপটি করে এরপর তোয়া বরফের কিউব নিয়ে এল আর ঠাম্মি শ্রীমানের ডানহাতের আঙুলে বরফ থেকে ফোঁটা ফোঁটা টোপানো জল দিতে শুরু করলেন আঙুলে গরম ছেঁকার পর এখন বরফজলের শৈত্যে শ্রীমান একটু থমকে গেল সে ডান হাতটা তুলে মন দিয়ে দেখল তারপর আবার ছাদের মেঝেয় পেতে দিল ডান হাতটা

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, মনে হয়, আরাম পাচ্ছে, বুঝেছিস তোয়ারাণি প্রতিবছরই দুএকদিন শিলাবৃষ্টি তো হয়ই, কাজেই ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতা হয়তো ওর আছে তুই এক কাজ কর, তুই ওর আঙুলে বরফজলের ফোঁটা দিতে থাক। আমি ততক্ষণে ওর জামাটা খুলে নিই

বারে, জামাটা খুলে নিলে ও রেগে যাবে না 

কিচ্ছু না, ওদের জামা-টামা পরার অভ্যেস আছে নাকি? আমাদের দেখে বাঁদরামি করে জামাটা গায়ে চাপিয়েছিল গাছের ডালে লাফালাফি করতে গিয়ে, কোন খোঁচায় ওই ঝুলঝুলে জামা আটকে পড়ে গিয়ে হাতপা ভাঙবে মুখপোড়াসে হবে আরেক বিপদ।”

সত্যিই জামাটা খুলে দেওয়াতে শ্রীমান যেন স্বস্তি পেল, এদিকে ফলও শেষ হয়ে গিয়েছিল ঠাম্মি বললেন, “যা, গাছে ফিরে যা, শ্রীমান, আর কক্ষণো এমন বাঁদরামি করিস না, কেমন? তোয়ার মনে হল, শ্রীমান যেন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ঠাম্মির কথায়

তোয়া মজা পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও ঠাম্মি, ওরা বাঁদরামি না করলে, কারা করবে?”

কেন তুই আর তোর ছোটকা আছিস কী করতে? তোরা করবি!ঠাম্মিও হেসে ফেলে বললেন

ঠাম্মির কথায় দারুণ মজা পেয়ে তোয়া হাসতে লাগল খুব, আর মনে মনে ভাবল, তার ছোটকা দৈত্য না কী যেন হয়ে ভাগ্যিস দুজন হয়ে যায়নি! হলে তার কী বিপদই না হত কাঁঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তোয়াকে হাসতে দেখে, শ্রীমানও তার অনেকগুলি দাঁত বের করল মনে হয় সেও হাসছিল 

-oo-


শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১০ " 


১১ 

আজ ছিল রবিবার। রবিবারে তার চেম্বার বন্ধ থাকে। তবুও তার রাতের খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে সাড়ে দশটা বেজেই গেল। রান্নাঘরে শম্পাদিদির কাজ শেষ করে বেরোতে আরও মিনিট পনের সময় লাগল। সদর দরজা বন্ধ করে, শোবার ঘরের টেবিলে একটু শান্তিতে বসে সুনেত্র যখন ল্যাপটপ চালু করল, তখন রাত প্রায় সোয়া এগারোটা। বেশ কিছুদিন সুনেত্র সুকন্যাকে কোন মেল করেনি। আজ ইচ্ছা হচ্ছিল, বেশ লম্বা একটা মেল করবে। আজ সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সুকন্যা তার কাছেই ছিল, এই ঘরে, শোবার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে, এমনকি রান্নাঘরেও। দুজনের জন্যে দুপুরের খাবার বানাতে ব্যস্ত শম্পাদিদির সঙ্গে ছিল অনেকক্ষণ।

মূল্যবান ধূপ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তার সুগন্ধ যেমন টের পাওয়া যায় ঘরের প্রতিটি কোণে, সুনেত্র আজ সেভাবেই যেন টের পাচ্ছিল সুকন্যার অস্তিত্ব – তার মনের অন্দরে তো বটেই – এমনকি এই বাড়ির সমগ্র আবহে। খুব সম্ভবতঃ শারদীয় উল্টোরথে ছোটবেলায় সুচিত্রা সেনের পরপর কয়েকটি বিশেষ মুডের পৃষ্ঠা-জোড়া সাদাকালো ফটো দেখেছিল সুনেত্র। সেগুলির নীচে লেখা ছিল নানান ক্যাপশন - বিস্মিতা, শঙ্কিতা, আনন্দিতা, লজ্জিতা, বিরহিনী, উৎকণ্ঠিতা... ঠিকঠাক মনে নেই, তবে এরকম ধরনের। আজ সারাটা দিন সুকন্যার মুখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিল সুনেত্র। এত দীর্ঘ সময় ধরে, সুকন্যাকে এতটা কাছে কোনদিন পায়নি সুনেত্র। হয়তো অনেকের মধ্যে ওকে খুঁজে নিয়ে চকিত চোখের কথা শুনেছে এবং বলেছে। কিংবা আধো-আলো-আঁধারি গঙ্গার ধার ধরে হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা, সদা-শঙ্কিত মনে। এই বুঝি চেনা কেউ দেখে ফেলবে, আচমকা বলে উঠবে – আরে সুনু, তুই এখানে? ওটা কে? তোর পিসতুতো বোন না? এসময় এখানে কী করছিস?

কিন্তু আজ? ধরা পড়ে যাওয়ার শঙ্কাহীন মনে অনেকক্ষণ - অনেক কথা দুজনের। যদিও সব কথা মুখ ফুটে বলা হল না, বলার দরকারও ছিল না তেমন। শব্দময় কথোপকথনের থেকে নিঃশব্দ আলাপন যে কতটা গভীর হয়, সে কথা সুনেত্র জানে। মুখ ফুটে অজস্র কথা বলার চেয়েও প্রতিটি কথা কান পেতে শোনা ও অনুভব করার মধ্যেই যে লুকিয়ে থাকে অনন্ত মাধুর্য - সে কথাটাও আজই প্রথম জানল সুনেত্র – তার এই মধ্য বয়সের উপান্তে।

ল্যাপটপে মেলবক্স খুলে খুব অবাক হল সুনেত্র, কনির দুটো মেল এসেছে – একটা প্রায় দেড়ঘন্টা আগে, আরেকটা মিনিট কুড়ি আগে। আগের মেলটাই প্রথম খুলল সুনেত্র। ছোট্ট চিঠি, 

“সুনুদা,

আজকের দিনের স্মৃতিটা মনের গভীরে কী ভাবে সাজিয়ে রাখা যায় বলো তো? দোহাই তোমার, “সোনার ফ্রেমে” বলো না। অথবা মনের মণিকোঠায় বলো না – অন্য কিছু ভাবো। যতদিন না আমার মনোমত ফ্রেমটা তুমি খুঁজে এনে আমার হাতে তুলে দেবে, ততদিন আমার নিরিবিলি মনের বাঁধা ঘাটেই রয়ে যাবে আজকের সকল স্মৃতি।

তোমার কনি”। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র পরের মেলটা খুলল, সুদীর্ঘ চিঠি। এত বড়ো চিঠি কনি কোনদিন লেখেনি – সেই কাগজ-কলমের যুগেও। অভিযোগ করলে বলত, তোমার বাগানে তুমি যেমন কথার চাষ করো, আমি তো তেমন করি না। তাই তোমার আছে কথার ঝুড়ি, আমার আছে একটি বা দুটি শিশিরে ভেজা সদ্যফোটা ফুল। সেটাকে তোমার যদি যৎকিঞ্চিৎ মনে হয়, তাহলে আমি নাচার। সেই কনি কী এত লিখল? ইন্টারেস্টিং! সুনেত্র চিঠিটা শুরু করার আগে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর... 

“সুনুদা,

শুনেছি সিদ্ধির নেশায় মানুষের মুখে নাকি তুবড়ি ছোটে। আবোলতাবোল কথা আর অকারণ হাসিতে নিজের মধ্যে নিজেই মজে থাকে আনন্দে। তুমি কি সিদ্ধি পুড়িয়ে ঘরে ধোঁয়া ভরে রেখেছিলে? নয়তো আজ আমার এমন ভূতে পাওয়া দশা হল কেন? আমার বাচাল বকবকানিতে কিংবা তুচ্ছমুচ্ছ কারণে হেসে গড়িয়ে পড়ার বাড়াবাড়ি দেখে তোমার মাথা ধরেনি? অবশ্য মাথা ধরলেও তুমি কী আর বলবে? নিজেই ডাক্তার – সকলের চোখের আড়ালে একটা ট্যাবলেট, ঘুট করে কখন জলের সঙ্গে মেরে দেবে – কেউ টেরও পাবে না।

আজ গোটা দিনটা – সেই তুমি যখন অনিমেষকে বাড়ি পাঠিয়ে, আমার হাত ধরে তোমার নির্জন নীড়ে আমায় টেনে নিয়ে গেলে। আর সন্ধেবেলায় তোমার গাড়িতে করে আমার বাড়িতে তুমি যখন পৌঁছে দিয়ে গেলে। বিশ্বাস কর সুনুদা, এই দুটো মাত্র ঘটনা ছাড়া, সারাটা দিন আমি কী করেছি, কী বলেছি, কতবার হেসেছি – কিচ্ছু মনে নেই। তুমি কি জান, সুনুদা - এই দুবারই আমি আকাশে-বাতাসে শুনেছি শঙ্খ ধ্বনি? তুমি শুনতে পাওনি, না? কিন্তু আমার দুই কান অত্যন্ত লোভীর মতো শুনেছে সেই শঙ্খ রব। তখন মনে হয়েছিল এই ধ্বনি মাঙ্গলিক, কিন্তু এখন তোমাকে এই মেল লিখতে বসে মনে হচ্ছে সে ধ্বনি অমঙ্গলের সংকেত। মনে হচ্ছে আমার জীবনে আবার আসছে নতুন এক ভাঙনের পর্ব...।

তুমি ভাবছ, আমার জীবনে আগে এক বা একাধিক ভাঙনের পর্ব ঘটেছিল নাকি, যে আবার আসছে নতুন একটা? এসেছিল, সুনুদা, এসেছিল। অন্ততঃ দু’বার তো বটেই – কখনো কখনো মনে হয় আরও বেশি। সেই ভাঙনে শেকড়-ছেঁড়া গাছের মতো যে ভেঙে পড়েছি তা নয়, তাহলে তো একদিক থেকে ভালই হত, সব ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু সেটাও হয়নি – আমার জীবন-তরুর প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণ বাসা বেঁধেছে। নিশুতি রাতে ঘুণ পোকার আওয়াজ শুনেছ, সুনুদা? আমি শুনেছি। আমাদের বাড়িতে, তোমার মনে আছে কিনা জানি না, বাইরের ঘরে আম বা জামকাঠের একটা চৌকি ছিল। সেই চৌকির কাঠে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছিল। নিশুত রাত্রে কখনো কোন কারণে ওই ঘরে ঢুকলেই আমি শুনতে পেতাম ঘুণদের কাঠ কাটার শব্দ। দিনের বেলায় কাঠের গায়ে থাকা ক্ষুদ্র ছিদ্রে কাঠি ঢুকিয়ে দেখেছি – আশ্চর্য গভীর রন্ধ্র। কাঠির খোঁচায় বেরিয়ে আসত পাউডারের মতো কাঠের গুঁড়ো – হয়তো তার মধ্যেই থাকত দু একটা ঘুণপোকা! সে পোকাকে চিনতে পারিনি, তার চেহারা কেমন জানি না। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হল, অহোরাত্র আমার ভিতরে সেই আওয়াজ শুনতে পাই।

তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার বিয়ের সময় তুমি বড়ো উদাসীন হয়ে গিয়েছিলে, সুনুদা। তুমি তখন পি.জি. করতে গিয়েছিলে চণ্ডীগড়ে। আমাকে তুমি কিছু জানাওনি, কিন্তু মামীমার থেকে শুনেছিলাম – তোমার নাকি একদম ছুটি নেই – ইন্টার্নশিপ না হাউস্টাফশিপের ডিউটি নাকি এমনই ভয়ংকর। আমার বিয়ের আটমাস আগেই তোমার প্রস্তাব আমি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম বলে, তীব্র অভিমানে তুমি আমার সঙ্গে আর কোন যোগাযোগই রাখোনি। অতএব আমার দিক থেকে তোমার প্রতি অভিমান করাটা হয়ে উঠেছিল অকারণ অপচয়।

আবার এটাও ঠিক, তুমি না আসাতে বেশ স্বস্তি পেয়েছিলাম। তুমি কাছাকাছি থাকলেই, তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হত। এক-আধবার তোমাকে স্পর্শ করার ইচ্ছে যে জাগত না, সে কথাই বা বলি কী করে? তুমি যে আমাকে তোমার জীবনের পথে একসাথে চলার আবাহন করেছিলে! তোমার সেই আহ্বানকে আমি যে বুকে পাথর বেঁধে (এ কথাটা যথেষ্ট নাটকীয় হয়ে উঠল জেনেও লিখলাম) প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, সে কথাও মনে পড়ত বারবার। এবং কে জানে ছাদনাতলায় তোমার হয়তো ডাক পড়তো আমার পিঁড়ি তুলে ধরে আমাকে সাতপাক ঘোরানোর জন্যে। পিঁড়িতে বসে তোমার কাঁধে ভর রেখে শুভদৃষ্টির সময় – আমি কি পারতাম তোমার দিকে একবারও না তাকিয়ে বরের মুখের দিকে তাকাতে?

আমার যে দেহ ও জীবনের ভার তুমি নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেয়েছিলে সুনুদা, সেই কাঁধে ভর রেখে আমি কোন আনন্দে শুভদৃষ্টি করতে পারতাম বলো তো? সে সময় তোমার কাঁধে আমার দেহের আংশিক ভারটুকুও কি তোমার কাছে তখন অসহনীয় মনে হত না? আমি তোমাতে আমার জীবন সমর্পণ করতে পারিনি, কিন্তু তাই বলে তোমার কাঁধে আমার দেহের ভার কোন লজ্জায় চাপাতাম বলো তো?

 

আমার বিয়েটা নির্বিঘ্নেই ঘটে গেল। আমাদের পক্ষের বয়স্কা মহিলারা প্রায় সকলেই বললেন, “অনেক ভাগ্যি করে এমন বর পেয়েছিস, সুকু। দেখিস খুব সুখী হবি তুই।” তখন ভেবেছিলাম, তাঁরা আমায় আশীর্বাদ করলেন, কিন্তু আজ মনে হয় তাঁরা অজান্তে আমার ভাগ্যকে বিদ্রূপই করেছিলেন।

অষ্টমঙ্গলা পার হল, নিয়ম মেনে আমি বাপের বাড়ি এলাম সাত দিনের জন্যে। আমার বর আমাকে আমাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল – শুধু সেইদিন নয়, আমার বর একটিও রাত্রিবাস করেনি তার শ্বশুরবাড়িতে। নির্দিষ্ট সপ্তাহ পার হয়ে গেল, আমাকে নিতে বর এল না। ওদের বাড়ি থেকে খবর এল, আমাদের বাড়ি থেকেই কেউ যেন আমাকে ওবাড়িতে পৌঁছে দেয়। অপ্রত্যাশিত এই সংবাদে বাবা-মা দুজনেই হতবাক এবং উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন – নানান দুশ্চিন্তায় তাঁদের ঘুম টুটল। মা আমাকে নির্জনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, অনেক কথা, শাশুড়ি কেমন, শ্বশুর কেমন, জামাই কেমন। আমার এক বিবাহিতা ননদ ছিল, সেই বা কেমন? তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যারে সত্যি করে বল তো, তোর সঙ্গে জামাইয়ের বা ও বাড়িতে কারো সঙ্গে কোন বচসা বা মনোমালিন্য হয়নি তো?”

কি বলি বলো তো, সুনুদা? যে কোন বাড়িতে বিয়ের পরেও তার উৎসবীয় রেশ চলে বেশ কিছুদিন। ও বাড়িতে সাতদিন যে ছিলাম, প্রকৃত অর্থে কার সঙ্গে আমার ঘরোয়া বেশে এবং পরিবেশে পরিচয় হওয়া সম্ভব ছিল বলো তো? সারাদিন সকলে মিলে, অন্ততঃ একশ বার জিজ্ঞেস করেছে – “কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো, বৌমা/ অথবা বৌদি?” এই প্রশ্নসমুহে সত্যিই কি কোন আন্তরিকতা থাকে? সকলেই তো জানে, অপরিচিত পরিবেশে নতুন বধূ হয়ে এসেছে পরের ঘরের যে কন্যাটি – তার নানান অসুবিধে, অস্বস্তি হবেই। তা বলে, সে কি সবাইকে সাতকাহন করে বলতে বসবে, হ্যাঁ আমার এইএই-ওইওই অসুবিধে হচ্ছে?  আর তুমি তো জানো, সুনুদা, যথেষ্ট কারণ থাকলেও, কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই। আমার মা এবং বাবাও কি সেকথা জানতেন না?

আমাকে সঙ্গে নিয়ে ও বাড়িতে বাবা নিজেই গেলেন। সকাল দশটা-সাড়ে দশটা হবে। বাবা আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে বাইরের ঘরে বসে আলাপ শুরু করলেন – সে আলাপ কিছুটা শুনেই আমার মনে হল যেন অতিরিক্ত সহৃদয়-হৃদ্যতায় মাখামাখি। উপস্থিত গুরুজনদের প্রণামপর্ব সেরে আমি শোবার ঘরে (সেই ঘরটার কথা মনে পড়লে, আজও আমার শরীর ঘৃণায় শিউরে ওঠে, সুনুদা) ঢুকলাম, দেখলাম আমার বর শ্রীমান জ্যোতিষ – বিছানায় আশ্চর্যরকমের বিশ্রীভাবে শুয়ে আছে। ঘরের সবকটি জানালা বন্ধ, যার ফলে বেশ ছায়াচ্ছন্ন  – ঘরের মধ্যে কদর্য গন্ধময় বদ্ধ বাতাস। আমার সঙ্গে ছিলেন শাশুড়ি, তিনি আমার বরের কাঁধে ঠেলা দিয়ে ডাকলেন, “অ্যাই, পিন্টু, ওঠ কত বেলা হল, উঠে দেখ বৌমা এসেছে...ওঠ, উঠে পড়”। পিন্টু হল তোমার ভগ্নীপতির ডাকনাম বুঝতেই পারছ।  

বার তিনেক ধাক্কা খেয়ে পিন্টু কোন রকমে চোখ মেলে তাকাল – কিছুটা ঘোলাটে লাল চোখ, নির্বিকার চোখের দৃষ্টি - কোন কিছুই যেন তার দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে না। ধরা দিলেও তার মস্তিষ্কে পাঠানো চোখের চিত্রগুলি স্পষ্ট হচ্ছে না। আমি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এবং কিছুটা ক্রুদ্ধ হয়েই ঘরের তিনটে বন্ধ জানালাই হাট করে খুলে দিলাম।

শাশুড়ি বললেন, “কাল থেকেই ওর শরীরটা খারাপ, কিনা...”।

আমি পিন্টুর দিকে তাকালাম, সকালের উজ্জ্বল আলোয় তার চোখ কুঁচকে গেছে। ভুরুর কাছে বাঁ হাতে তুলে আড়াল করছে আলো। আর সেই হাতে দেখলাম, কব্জির ওপর থেকে কনুই পর্যন্ত শুকনো রক্তমাখা একটা কাটাদাগ।  

“জানালাগুলো খুললে কেন?” পিন্টু বিরক্ত হয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠল। কিন্তু উঠে বসতে চেষ্টা করল না, হয়তো উঠে বসার অবস্থা তখনও ওর হয়নি।  

সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, “এমন শরীর খারাপ কি ওর প্রায়ই হয়? ডাক্তার দেখানো হয়েছে?”।

উনি আমতা আমতা করে বললেন, “না...ইয়ে মানে প্রায়ই হবে কেন... তাই আবার হয় নাকি? এবারই হল...সেরে উঠবে সন্ধে পর্যন্ত...ডাক্তার ডেকে... ডাকব? ডাক্তার ডেকে লাভ হবে কি?”

বিছানায় বসতে প্রবৃত্তি হল না। ছোট একটা টুলে বসে আমি শাশুড়ির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞ্রেস করলাম, “শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন, মা, তাতে কারো কোন উপকার হয় না – কাল কত রাত্রে ফিরেছে?”

আমার সরাসরি প্রশ্নে উনি ভেতরে ভেতরে টলে গেলেন, নিজের এবং নিজের পুত্রটির আত্মরক্ষার্থে একটু রূঢ় স্বরে বললেন, “কী বলতে চাইছ, বৌমা? পিন্টু নেশা করেছে? বললাম না, একটু শরীর খারাপ হয়েছে...”?

“নেশার কথা তো আমি বলিনি, মা?”

“তাই তো বলতে চাইছ? বলতে আর বাকি কী রাখলে?”

“বেশ। আপনি কি এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে তর্কাতর্কি করতে চাইছেন? আমাদের তর্কাতর্কিতে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, মনে করছেন? খুব ভালো, তাহলে আমিও প্রস্তুত হয়ে নিই...” বলে আমি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে বেঁধে নিলাম শক্ত করে, যাকে গাছ-কোমর বলে আর কি। তারপর আবার বললাম, “এক মিনিট আমি আসছি, আমার বাবাকে আমি বিদায় জানিয়ে আসি...আজ এখনই আপনাদের স্বরূপটা বাবা জেনে যাবেন...এটা আমার মনঃপূত হচ্ছে না”। ওঁনার উত্তরের অপেক্ষা না করে আমি বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। বসার ঘরে বাবার সামনে গিয়ে বললাম, “তুমি বাড়ি যাও বাবা, বেলা বাড়ছে...এরপর রোদ চড়া হয়ে উঠবে...একটা ট্যাক্সি ধরে নিও...”।

বাবা রীতিমতো থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। ঝড়ের বেগে আমার ঘরে ঢোকা, ওভাবে বাবাকে সেদিন চলে যেতে বলা আমার উচিৎ হয়নি মোটেই।

আমার কথাটা আমি উইথড্র করে নিলাম, সুনুদা, ওই যে বলেছিলাম, “কোনদিনই আমি বচসা-প্রবণ কিংবা মনোমালিন্য-প্রবণ মেয়ে নই”। কথাটা ভুল বলেছিলাম – এর আগে এমন দেয়ালে-পিঠ-ঠেকে-যাওয়া পরিস্থিতিতে কোনদিন পড়িনি, কাজেই আমার এই গুণের (নাকি দোষের?) বার্তাটি আমার কাছে কোনদিন ধরা দেয়নি যে!

আমার আচরণে বাবা চূড়ান্ত আশ্চর্য হলেন। মুখ তুলে তিনি আমার চোখে চোখ রাখলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর মুখটা, স্পষ্ট দেখলাম, পাণ্ডূর-বর্ণ হয়ে উঠল। এই “পাণ্ডূর” কথাটা শরৎচন্দ্রের বইতে অনেকবার পেয়েছি। অভিধানে দেখেছি এর অর্থ মলিন, বিষণ্ণ। আজন্ম তাঁর পরমস্নেহে লালিত কন্যার চোখের দিকে চেয়ে, আমার অন্তরে ঘটে চলা গভীর যন্ত্রণার অভিব্যক্তি অনুভব করে, তাঁর মন সেদিন নিছক বিষণ্ণ বা মলিন হয়নি – সত্যিই পাণ্ডূর হয়ে উঠেছিল। আমি জানি একথা তিনি বাড়ি ফিরে তাঁর কন্যার মাতা – অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও সহজে ভাগ করে নিতে পারবেন না। নিজের অন্তরেই তিনি দগ্ধ হতে থাকবেন অহরহ, সারাজীবন ধরে।

বাবা আমার চোখে চোখ রেখেই অস্ফুটে বললেন, “তুই কি আমার সঙ্গে ফিরে যাবি, মা?”

“না, বাবা, এখন আর তা হয় না”।

“ঠিক আছে, আমি তাহলে চলি, বেয়াইমশাই” আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সাবধানে থাকিস্‌, মা...কোন অসুবিধে হলে, কোন দ্বিধা করিস না, আমায় বলতে...”। এই কথা বলে, বাবা বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। আমি তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, দুই চোখ ভরে উঠতে চাইছিল অশ্রুতে, রুদ্ধ করলাম। এখন তো কান্নার সময় নয়”।

 

সুনেত্র সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা নিয়ে উঠে গেল, ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির লাইট জ্বালিয়ে ছাদে গেল। অন্ধকার ছাদে দাঁড়িয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঝলমল করছে আকাশ এবং কিছুটা অস্পষ্ট ছায়াপথ। তার বাবা-মা, কনির বাবা-মা কেউই আর ইহলোকে নেই। লোককথা বলে তাঁরা নাকি তারা হয়ে বিরাজ করছেন ওই আকাশে। তাকিয়ে আছেন তাঁদের সন্তানদের দিকে...। সুনেত্র একটা সিগারেট ধরালো।

কনির সঙ্গে আর কোনদিনই সে ভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি সুনেত্র। সে ভেবেছিল কনি এখন পরস্ত্রী, তার সংসারে কোনভাবেই উঁকি মারা তার উচিৎ নয়। উচিৎ নয় তার সাংসারিক কোন ব্যাপারে নাক গলানো। কিন্ত মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে তো তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তাঁরা কেউ কনির এই দুঃসহ জীবনের কথা কেন কোনদিন তাকে বলেননি? কনির কথা জিজ্ঞেস করলে, তাঁরা এড়িয়ে যেতেন, বলতেন, ভালোয়-মন্দয় মিশিয়ে সংসারে যেমন থাকা যায়...। অবশ্য এ কথার পরে সুনেত্রও কোনদিন কনির সংবাদ আরও গভীরে জানতেও চায়নি।

সে জানলেই বা কী করত? কনিকে তার সংসার থেকে উপড়ে তুলে আনত। কনি নিজেই কি তাতে রাজি হত? যে মেয়ে বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ পুড়বে ভেবে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। সেই মেয়ে তার ভরা সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামীকে ছেড়ে তার সঙ্গে বেরিয়ে এলে, তার বাবা-মা, মামা-মামীমার মুখ কি একটু কম পুড়ত? নাকি অনেক বেশি পুড়ত?

সুনেত্র দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়ল অনেকটা। এবং হঠাৎ তার মনে পড়ল প্রথম দিন কনির গাড়িতে যার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়েছিল তার নাম তো শশাঙ্ক মিত্র। এদিকে কনি তার বরের নাম লিখেছে জ্যোতিষ, ডাকনাম পিন্টু। জ্যোতিষের সঙ্গে কনির কি ডিভোর্স হয়েছিল? শশাংক কি কনির দ্বিতীয় বর? সিগারেটটা মাটিতে ফেলে চপ্পলের নীচে পিষে দিয়ে নীচেয় নামল সুনেত্র।   

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

শ্রীমান

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল...