শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৪

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৩ "  


২৪ 

সুনুদা, 

গতকাল বাগডোগরা থেকে কার্সিয়াং গিয়ে সব কাজ কর্ম সারতে সারতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল। কাজ শেষ করে নেমে এলাম শিলিগুড়িতে। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল, প্রায় সাড়ে দশটা। হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে সামান্য ডিনার সারার পর, খুব টায়ার্ড ফিল করছিলাম। তাছাড়া আভোরে কলকাতা ফেরার ফ্লাইট ধরার টেনশন ছিল বলে, তোমাকে লিখতে পারিনি। আজ এখন এয়ারপোর্টেওয়েটিং লাউঞ্জে বসে আছি। হাতে বেশ খানিকটা সময় আছে। তাই লিখতে বসলাম।

কলকাতার তুলনায় হলদিয়ার ভোরগুলি মাচ বেটার। আবার হলদিয়ার থেকেও এদিককার ভোর আরও বেশি সুন্দর। তার কারণ কি প্রকৃতি? অজস্র গাছপালা, দিগন্ত জোড়া চা-বাগান, ছোট্ট একটা নদী, পাহাড়। হোটেল থেকে বেরিয়েছিলাম ভোরে, আসার সময় কুয়াশা ছিল, খুব হালকা। তার সঙ্গে ছিল সামান্য শীতলতার আবেশ। এখন ওয়েদার অনেকটাই ক্লিয়ার। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে শীতলতার আমেজ একটু বেশীই। তবে এই শীতলতা প্রাকৃতিক নয়, সেন্ট্রাল এসির। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে এখন। মেঘলা না হলে কলকাতা বা হলদিয়াতে এখন ঝলমলে রোদ্দুর উঠে গেছে, কিন্তু এখানে ওই হাল্কা কুয়াশার কারণে রোদ্দুরের উজ্জ্বলতা কম, কিছুটা মলিন যেন বিষণ্ণ। আমার ফ্লাইটের ডিপার্চার টাইম পৌনে নটা।

গতকাল যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই আজ শুরু করি। আমার পুত্রের জীবনটা শুরুই হল একটা আপাত-মিথ্যা দিয়ে। যদিও আমি জানতাম, জগতের কাছে কথাটা মিথ্যে হলেও, আমার কাছে নয়। বরং আমার মনের দিক থেকে ওই কথাটা আজও আমার কাছে পরম সত্য। এবং সেই বিশ্বাসেই আমি ম্যাডামকে দৃঢ়ভাবে বলতে পেরেছিলাম, “হান্ড্রেড পারসেন্ট”।

ওই প্রেপ স্কুলের কাজকর্ম শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরলাম, বাবা, সুধন্বা ও আমি। আসার পথে বাবা খুব চাপা কণ্ঠে আমাকে বললেন, “এটা কি ঠিক করলি, সুকু?”

“এছাড়া আর অন্য কী উপায় আছে বলো? ম্যাডাম তো ঠিকই বলেছেন, বাম্বাই এখন না হয় শিশু, চিরকাল তো আর থাকবে না। ওর সহপাঠী বন্ধুরা এই ব্যাপারটা নিয়ে ওকে হ্যারাস করবে, ইন্সাল্ট করবে, কখনো সামনা-সামনি, কখনো বা আড়ালে। ওর সেই মানসিক যন্ত্রণাটা হয়তো এক, দুবার আমাদের সঙ্গে ও শেয়ার করবে, বাবা, একটু বড়ো হয়ে গেলে, নিজের মনেই গুমরে মরবে। আজকের ভাষায় যাকে বলে ডিপ্রেশন, অবসাদ। যদি ভবিষ্যতে কোনদিন ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়েও, তখন দেখা যাবে। আমার ধারণা আমি হতাশ হব না”।

কথা আর এগোয়নি সেদিন, কারণ ট্যাক্সিটা আমাদের বাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। নামবার সময় ট্যাক্সির ভাড়া মেটানোর সময় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাবা বলেছিলেন, “যা ভালো বুঝিস কর, আমি আর কী বলব, মা?”

তখনকার মতো কোন কথাবার্তা না হলেও, রাত্রে আমার শোবার ঘরে এসে মা বললেন, “বাম্বাইয়ের জীবনটা শুরু করলি এমন একটা ডাঁহা মিথ্যে দিয়ে? আজকাল শুনেছি স্কুল থেকে মা-বাবাকে প্রায়ই ডাকে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া কেমন এগোচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনার জন্যে। সে মিটিংয়ে বারবার তুই যখন একলা যাবি, কী উত্তর দিবি টিচারদের? কত মিথ্যে সাজাবি? সেই সাজানো মিথ্যে তো বাম্বাইও শুনবে, জানবে। তখন তো তোর একূল-ওকূল দুকূলই যাবে, সুকু”!

“তাহলে, তুমি বলছো জ্যোতিষের নামটা ওখানে দেওয়াটাই উচিৎ ছিল?”

“বুঝে দ্যাখ, আমাদের বাম্বাই জ্যোতিষেরই ছেলে, সে কথা অস্বীকার করার কোন উপায় আছে? কিন্তু তার সঙ্গে আর কোন সম্পর্ক নেই, তোদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গেছে, এ কথাটা স্পষ্ট করে বলে দিলে ক্ষতি কী হত? আজকের যুগে কথাটা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হত। স্কুলের টিচারদের কাছে। এমনকি বাম্বাইয়ের কাছেও? ও একটু বড়ো হলে নিজেই বুঝত, বাবার সঙ্গে থাকতে তার মায়ের খুব কষ্ট হত, তাই মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে”।

“কিন্তু আমার জীবনের ওই পর্বটাকে আমি যে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চাই, মা”।

“সে কি আর আমি বুঝছি না, মা? কিন্তু মুছে ফেলব বললেই কি আর মুছে ফেলা যায়? একি বাম্বাইয়ের খেলার সময় পড়ে গিয়ে হাঁটুর নুন-ছাল উঠে যাওয়া? যে কদিন পরেই সে দাগ মিলিয়ে যাবে! জীবনের কিছু কিছু দাগ সারা জীবন বয়ে বেড়াতেই হয়, তাকে নিঃশেষে মুছে ফেলতে যাওয়া কিচ্ছু নয়”।

সেদিন মায়ের কথার কোন উত্তর দিতে পারলাম না এবং এই নিয়ে কোন কথা বলতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ বসে থেকে মা উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “রাত হল, ঘুমিয়ে পড়। কালকে তোর আবার অফিস আছে”।     

যাই হোক এভাবেই আমার পুত্র শিশু সুধন্বার শিক্ষা জীবনের পথচলা শুরু হল আমার বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। সত্যি বলতে আমার ওই সিদ্ধান্তটা ঠিক না ভুল, বুঝে উঠতে পারিনি আজও। বিভিন্ন স্কুলে টিচার্স মিটিং অ্যাটেণ্ড করেছি বহুবার – ওর বাবার প্রসঙ্গ এসেছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ওর বাবাকে এনে হাজির করার জন্যে কেউ জোরজারি করেনি। এবং শিশু সুধন্বাও এখন আর শিশু নেই, কৈশোর পেরিয়ে সে এখন তারুণ্যের দোরগোড়ায়। সেও কোনদিন তার মাকে তার বাবার সন্ধান এনে দিতেই হবে, একথা মুখ ফুটে বলেনি। হতে পারে এই ব্যাপারটা সে তার দিদার থেকেই বুঝে নিয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই আমাদের কথাবার্তায় পিতৃ প্রসঙ্গ টেনে এনে তার মাকে সে কোনদিন বিব্রত করেনি।

বেশ কয়েক বছর আমাদের জীবনটা বেশ সাবলীল চলার পর, প্রথম ঝড়টা এল বাম্বাই যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। বাবার হঠাৎ সেরিব্রাল অ্যাটাক হল। হপ্তা দুয়েকের টানা লড়াইয়ের পর বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম, কিন্তু তাঁর বাঁদিকটা তখন প্রায় অসাড়। তুমি ডাক্তার, তোমাকে আর নতুন কী বোঝাবো, সুনুদা? তাছাড়া তুমি তো সেসময় প্রায়ই আসতে হসপিট্যালে এবং বাড়িতে। সে সময় তোমার সঙ্গে আমার দেখাও হয়েছিল বেশ কয়েকবার। বাবার অসুস্থতা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম তখন। তখনও তোমাকে অনেক কথাই বলার ছিল, হয়তো সুযোগও ছিল। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে সে সব কথা তোমাকে বললে তুমি হয়তো ভুল বুঝতে। অথবা বলে ফেলার পর আমিই হয়তো মরমে মরে থাকতাম এই ভেবে যে, আমি কি সাংঘাতিক স্বার্থপর!  বাবা হসপিট্যালে জীবনের জন্যে লড়াই করছেন। আর আমি, তাঁর বুকের মধ্যে অত্যন্ত যত্নে বড়ো হয়ে ওঠা কন্যা, নিজের আখের গুছোচ্ছি!

 সে সময় মামীমা আমাদের বাড়িতেই ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি বুক দিয়ে সামলেছিলেন বাম্বাই ও মাকে। বুঝতেই পারছো বাবার এই আকস্মিক অসুস্থতায় মা দুশ্চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং মামীমা এসে আমাদের সংসারের হাল না ধরলে আরও বিপদে পড়তাম আমরা – সেকথা আজও স্বীকার করতে আমার কোন দ্বিধা নেই, সুনুদা। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মামীমার সেই ঋণ আমি এতটুকুও শোধ করতে চাই না – বরং সেই ঋণ আমার অন্তরে আজীবন সজীব থাকুক।

মায়ের কথাই শুধু বলি কেন, আমিও কি কম আতান্তরে পড়েছিলাম? বড়ো হতে হতে বাবা ও মায়ের সামান্য জ্বর-জ্বারি, সর্দি-কাশি, কিংবা দাঁতের ব্যথা অথবা চোখের ক্যাটারাক্ট অপারেশন আমি সামলেছি নির্বিঘ্নে। মনে করেছিলাম এই তো বেশ বড়ো হয়ে গেছি, স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছি। কিন্তু সেরিব্রাল অ্যাটাকের পর, পাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে বাবার নিত্য পাঞ্জা কষার দৃশ্যগুলো আমার ভেতরটাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল, সুনুদা।

কোথায় কোন হসপিট্যালে নিয়ে যাব। কোন ডাক্তার ভালো এবং যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য কিছুই তো জানতাম না। কলকাতা শহরে কত ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট হসপিট্যাল, পাড়ায় পাড়ায় কত নার্সিং হোম। কিন্তু কোথায় গেলে হতে পারে বাবার সঠিক চিকিৎসা? কিছুই ঠিক করতে পারছিলাম না। তাছাড়া শুধু চিকিৎসাও তো নয়, তার ব্যয়সীমাও যে জানা দরকার। নামজাদা হসপিট্যালে ভর্তি করার পর, সেখানে প্রাত্যহিক খরচ যদি আমাদের আয়ত্তসীমার বাইরে হয়, তাহলে কতদিন টানতে পারবে আমার পরিবার। এক কথায় দিশাহারা হয়ে উঠেছিলাম।

সে সময় শশাঙ্কর সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর ছিল না। ওকে ফোন করে বিপদের কথা জানাতেই মিনিট পনেরর মধ্যে বিভাস এএলএস অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চলে এল। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শশাঙ্ক উপস্থিত হল নিজের গাড়ি নিয়ে। পাঁচমিনিটের মধ্যে বাড়িতে তালা দিয়ে আমরা সবাই বেরিয়ে পড়লাম, কোথায় যাচ্ছি তখনো জানতাম না। নিজের গাড়িতে সামনের সিটে বসা শশাঙ্ক, সারাটা পথ মোবাইলে কথা বলে চলেছিল অনর্গল। মিনিট দশের মধ্যে আমরা ঢুকে পড়লাম, একটা হসপিট্যালের পার্কিংয়ে। ওখানে অতুল আমাদের জন্যে ওয়েট করেছিল।

পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে ভেতরে নিয়ে চলে গেল অ্যাটেণ্ডেটরা। শশাঙ্ক আমাকে নিয়ে গেল ওদের ইনডোর রিসেপশনে। মাকে বলল, “মাসিমা, চিন্তা করবেন না, চিকিৎসা শুরু হয়ে গেছে, আপনি এই চেয়ারে বসুন। আর সুকন্যা, ফর্ম-টর্ম সব ফিলআপ করা হয়ে গেছে, তোমাকে কয়েকটা সিগনেচার শুধু করতে হবে”।                       

এই সময় বিভাসও সেখানে উপস্থিত হল, বলল, “মেসোমশাইকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিয়েছে। বেশ কয়েকটা টেস্ট আর চেক-আপ হবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে ওরা মেসোমশাইয়ের কণ্ডিশন জানিয়ে দেবে”।

আমি বেশ কয়েক পাতার ফিল-আপ করা ফর্মটা খুব দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে প্রত্যেক পাতাতেই সই করে দিলাম। আমার ও বাবার নাম, ঠিকানা, বয়েস, আমাদের মেডিক্যাল ইন্সিওরেন্সের নাম্বার, এমনকি ক্যাশলেস কার্ড, আমার আধার কার্ড, প্যানকার্ডের ফোটোকপি পর্যন্ত অ্যাটাচ্‌ড্‌ রয়েছে ফর্মের সঙ্গে। বিভাসকে জিজ্ঞেস করলাম, “এত ডিটেল্‌স্‌ আর ডকুমেন্ট্‌স্‌ পেলেন কোথায়, ফর্মটা ফিলআপই বা করল কে, অতুল?”

বিভাস মুচকি হেসে বলল, “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না, ম্যাডাম। এটাই আমাদের কাজ। কাল সকালে কিন্তু অতুলকে পাঠাবো, মনে করে মেসোমশাইয়ের আধার আর প্যানকার্ডটা দিয়ে দেবেন, ম্যাডাম, ওগুলো না পেলে ফর্মটা কিন্তু প্রসেসে যাবে না”।

সই করা হয়ে যেতে বিভাস ফর্মটা জমা করে দিল রিসেপশনের ম্যাডামকে। তিনিও বাবার আধার আর প্যান নিয়ে একই রিমাইণ্ডার দিলেন। উত্তরে বিভাস বলল, “কাল সকাল নটার মধ্যে সব পেয়ে যাবেন, ম্যাডাম...”।

 আমি মায়ের পাশে একটা চেয়ারে বসলাম, ভয়ানক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত শুকনো মুখে মা বসেছিলেন। মায়ের হাতে হাত রেখে আমি বললাম, “চিন্তা করো না, মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বাবা কেমন আছেন, সে কথাও আমরা জেনে যাবো”।

মা কোন উত্তর দিলেন না, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মায়ের দু চোখের দৃষ্টিতে কোন বোধ নেই যেন। তারপর সামনের দেয়ালে টাঙানো বড় ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। খুব অসহায় মনে হয়েছিল নিজেকে, এখন থেকে সারাক্ষণ মা কি সেকেণ্ড, মিনিট কাউন্ট করে যাবেন?

 ওই, বোর্ডিং কল শুরু হল। এখানেই শেষ করছি। সময় পেলেই আবার লিখব, সুনুদা।

 তোমার কনি।

চলবে...

 


শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৫

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৪ "


মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

১৩ই জুলাই, ২০২৬, রবিবারের সন্ধে

সন্ধেবেলা প্রবীণবাবুর ঘরে সকলেই জড়ো হল। নবীনবাবু, অহীন, সর্বজিৎ এবং নবীনবাবুদের গৃহ চিকিৎসক ডাক্তার বিপিন সরকার। প্রবীণবাবু ডাক্তারবাবুকে তাঁর ছোটকা অবিনবাবুর পাতালঘরে বন্দী থাকার কথা সবিস্তারে বললেন। সর্বর্জিৎ আজ সকালে যা যা ঘটেছে সব কথাই বলল এবং অবিনবাবুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে তার উদ্বেগের কথাও বলল।

সবকথা শুনে ডাক্তার সরকার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, তারপর বললেন, “প্রবীণকাকু, তোমার ছোটকার কথা আমার দাদু, ঠাকুমা এবং বাবা-মার মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছি। তবে সত্যি বলতে আমরা সেকথা বিশ্বাস করিনি। তবে আজ সর্বজিতের কথায় আশ্চর্য হচ্ছি – আমাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে এমন ঘটনার কথা কোনদিন পড়িনি, আর আমার দীর্ঘ ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনা কখনও দেখিনি বা শুনিনি। সর্বজিৎ তার দুশ্চিন্তার কথা যা বলল, সেগুলোও খুবই যুক্তিযুক্ত। ১৯৪৩ থেকে ২০২৬ মানে এই তিরাশি বছরে আমাদের পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু আগেও ছিল এখনও আছে। নিমোনিয়া, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, সর্দিজ্বর তখনও ছিল, আজও আছে। কিন্তু এখনকার ভাইরাসগুলোর চরিত্র অনেক বদলে গেছে, যেমন আমরাও বদলে গেছি। তার পাশাপাশি আমরা ভয়ংকর কিছু নতুন ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে সদ্য জিতেছি। যেমন কোরোনা ভাইরাস। অবিনদাদুর পক্ষে এর যে কোন একটা সংক্রমণই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে”।

প্রবীণবাবু বললে, “ঠিক কথা, ডাক্তার। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ কোন মন্ত্র আর কৌশলে এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, সে কথা তিনিই জানেন। কিন্তু আজ তিরাশি বছর পরে - মানুষটি জেগে উঠলে আমাদের কী করতে হবে সে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কিনা – সেও তো আমরা জানি না, ছাই। আচ্ছা, ত্রিকালদর্শী মানুষ যা হোক, হুঁঃ। নিজের মৃত্যুটাই কবে হবে এবং কিভাবে হবে সেটাই তিনি জানতে পারেননি!”

ডাক্তার সরকার বললেন, “সে কথা জানার কোন উপায় যখন নেই, তখন আমার মতে অবিনদাদুকে পাতালঘর থেকে বের করে, সরাসরি কোন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করে দেওয়াই সমীচীন। সারাক্ষণ অবজার্ভেশনে রেখে ওঁনার শরীর-স্বাস্থ্য মনিটর করতে সুবিধে হবে”।

সর্বজিৎ আনন্দে বলে উঠল, “বাঃ এর থেকে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতেই পারে না। কিন্তু সেখানেও কিছু সমস্যা দেখা দেবে...”।

ডাক্তার সরকার জিজ্ঞাসা করলেন, “কিসের সমস্যা সর্বজিৎ?”

সর্বজিৎ বলল, “নার্সিং হোমে অ্যাডমিট করতে গেলেই দাদুর আইডেন্টিটি লাগবে, ওঁনার আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড কিছুই নেই”।

ডাক্তার সরকার বললেন, “একদম ঠিক বলেছ। নবীনদা, ওঁনার আধার আর ভোটার কার্ড, যত শিগ্‌গিরি সম্ভব বানিয়ে ফেলতেই হবে। তবে আপাততঃ আমার নার্সিং হোমে আমি ভর্তি করে, অবজার্ভেশন চালু করে দেব...তবে সেক্ষেত্রেও বড় একটা সমস্যার কথা মাথায় রাখতে হবে”।

প্রবীণবাবু বললেন, “আবার কি সমস্যা, ডাক্তার?”

একটু ইতস্ততঃ করে ডাক্তার সরকার বললেন, “যদি অবিনদাদু ঠিকঠাক থাকেন – কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় – আমি ও আমার নার্সিং হোম ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। থানা-পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেবে না...আমার নার্সিং হোম তো বন্ধ হয়ে যাবেই – আমার ডাক্তারি লাইসেন্সও হয়তো...”।

প্রবীণবাবু বললেন, “তুমি কি ছোটকার মারা যাওয়া নিয়ে ভাবছ, ডাক্তার? দুর্ভাগ্যক্রমে যদি তা হয়ও, তোমার বিপদ হবে কেন? চিকিৎসাধীন মানুষের কি হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে মৃত্যু হয় না?”

ডাক্তার সরকার বললেন, “সে তো হতেই পারে, কাকু। কিন্তু অবিনদাদুর কোন পরিচয় নেই যে। উনি এতদিন কোথায় ছিলেন? কোন কাজের জন্যে উনি পাতালঘরে গা ঢাকা দিয়েছিলেন? সে কথা এতদিন স্থানীয় পৌরসভা বা থানায় জানানো হয়নি কেন? এসব প্রশ্ন উঠে আসবেই। আজ যদি হঠাৎ আমরা বলি, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ অবিনদাদুকে তিরাশি বছরের জন্যে সমাধি করে রেখেছিলেন। এবং এতদিনে তাঁর সমাধি ভঙ্গ হয়েছে। কেউ বিশ্বাস করবে? আমাদের সকলকেই চরম হেনস্থার মধ্যে পড়তে হবে!”

প্রবীণবাবু বললেন, “হুম্‌, বুঝলাম। কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ, ডাক্তার। বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে বিশ্বাস ব্যাপারটাই লোপ পেয়ে গেছে। কেউ ভাল কাজ করলে বলি, ব্যাটার কোন ধান্দা আছে। আর কেউ খারাপ কাজ করে ধরা পড়লে বলি, তাকে ফাঁসানোর জন্যে ঘটনাটা সাজানো হয়েছে। আমার ছোটকার ব্যাপারটাও জানাজানি হলে, লোকে বলবে – বড়সড় কোন কেলেংকারি করে গা ঢাকা দিয়েছিল। এখন আমরা সবাই মিলে আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছি, তাকে বাঁচানোর জন্যে। তাহলে তোমার মতে এখন কী করণীয়?”

ডাক্তার সরকার বললেন, “করণীয় বলতে একটাই, আমরা আগামীকালই অবিনদাদুকে বের করে নিয়ে সোজা আমার নার্সিং হোমে নিয়ে যাবো। তার সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন সকলকেই জানিয়ে দেব। প্রেস এবং মিডিয়ার ব্যাপারটা পুলিশকেই সামলাতে বলব”।

নবীনবাবু এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলেন, এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ঠিক বলেছেন, ডাক্তারবাবু, প্রেসকে আমরা কিছু বলতে গেলে, গুড়ের নাগরিতে মাছি পড়ার মতো, আমাদের ছেঁকে ধরবে – তখন এদিককার আসল কাজই হয়তো পণ্ড হয়ে যাবে”।

প্রবীণবাবু বললেন, “কিন্তু ছোটকার সমাধির তিরাশি বছর পূর্ণ হবে, এমাসের ১৯ তারিখে। তার মানে এখনও ছদিন বাকি। আমার মতে, ডাক্তার, এ কটাদিন অপেক্ষা করি না। ওই ঊণিশ তারিখেই ছোটকাকে বের করে আনার ব্যবস্থা করলে ভালো হত না?”

সকলেই চুপ করে তাকিয়ে রইলেন প্রবীণবাবুর মুখের দিকে। বৃদ্ধের দুচোখে আশা আর আনন্দের দ্যুতি।  মুখে ধৈর্যের দৃঢ়তা। প্রিয় ছোটকাকে সুস্থ দেখতে তিনি উদ্গ্রীব – কিন্তু সামান্য এই কটা দিনের জন্যে – তিনি কোন ঝুঁকি নিতে চান না।

কিছুক্ষণ পরে সর্বজিৎ বলল, “তাই হবে দাদু। এই কটা দিন সময় পেলে আমরাও কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারবো। অহীন, মহীনদা কাল দুপুরের দিকে পৌঁছাচ্ছে বললে, না?”

অহীন বলল, “হ্যাঁ। আমদাবাদ থেকে ভোরের ফ্লাইট – কলকাতা থেকে বাড়ি আসতে একটা-দেড়টা হয়ে যাবে”।

“গুড। ডাক্তারকাকু, আগামীকাল সন্ধেবেলা আমরা আরেকবার বসতে পারি কি? মহীনদা থাকবে। আপনাদের পরিচিত এ শহরের কয়েকজন গণ্যমান্য মানুষকেও যদি ডাকেন, তাঁদের সকলকে সব কথা জানিয়ে আমরা তাঁদের পরামর্শও নিতে পারবো। তাতে আমাদের সব ব্যবস্থা সামলে নিতেও সুবিধে হবে”।

ডাক্তারবাবু একটু চিন্তা করে বললেন, “হুঁ আমি চলে আসতেই পারি। আসলে অবিনদাদুর এই কেসটা নিয়ে আমি খুবই এক্সাইটেড ফিল করছি। মেডিকেল সায়েন্সে এই ঘটনা হয়তো অসাধারণ এক রেকর্ড গড়ে তুলবে। ঠিক আছে, আজ তাহলে আমি উঠি। কাল সন্ধে সাড়ে ছটা-সাতটা নাগাদ আসব। প্রশাসনের দু একজন মাথাকেও সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করব”।

নবীনবাবু বললেন, “বাঃ তাহলে তো খুবই উপকার হয়”।

চলবে... 



বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১১

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১



 তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ১১

মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা (আগের পর্বের পরে) 

    মাটির সঙ্গে স্পর্শের আগে জল যেমন স্বচ্ছ, মধুর ও শান্ত অবস্থায় থাকে, সেই রকম সাংসারিক বিষয়ে আসক্ত হবার আগে জীবের চিত্ত শান্ত, অচঞ্চল ও সহজেই ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এইভাবেই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় চিত্তের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। ভগবৎ শক্তি বা চিৎশক্তি থেকে মহত্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, মহত্তত্ত্ব থেকে ক্রিয়া কারণে অহঙ্কারতত্ত্বের সৃষ্টি হয়এই অহঙ্কার তত্ত্ব তিনি প্রকারের, সাত্ত্বিক, রাজস ও তামস। হে মাতঃ, এই অহংকারের তিন লক্ষণের কথাও শুনে রাখ। অহঙ্কার দেবতারূপে কর্তা, ইন্দ্রিয়রূপে কারণ ও মহাভূতরূপে কার্যঅথবা অন্যভাবে বলা যায় সত্ত্বগুণে অহংকার শান্ত, রজোগুণে চঞ্চল আর তমোগুণে বুদ্ধিভ্রষ্টসাত্ত্বিক অহংকার বা বৈকারিক অহংকার থেকে থেকে মনস্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই মনের সংকল্প ও বিকল্প আছে। সাধারণতঃ বিষয় গ্রহণের ইচ্ছাকে সংকল্প ও বিশেষ চিন্তায় বিশেষ বিষয় নেবার ইচ্ছাকে বিকল্প বলে। সংকল্প ও বিকল্প থেকেই কামনার সৃষ্টি হয়। মন ইন্দ্রিয়দের অধীশ্বর। যোগীরা এই মনকে বশীভূত করে ঈশ্বরে নিবিষ্ট হন

    রাজস অহংকার থেকে বুদ্ধিতত্ত্বের সৃষ্টি হয়। বুদ্ধিতত্ত্বের দুই লক্ষণ হল পদার্থের প্রকাশরূপ জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়কে প্রবৃত্তিদান। এই লক্ষণ বৃত্তিভেদে নানা রকম, যেমন সংশয়, নিশ্চয়, স্মৃতি ও নিদ্রা। রাজস অহংকার থেকেই কর্মের ও জ্ঞানের ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি। প্রাণ রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় তার কর্ম ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস এবং বুদ্ধিও রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় জ্ঞানের ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস হয়ে থাকে। এইভাবে ভগবানের কালশক্তিতে তামস অহংকার থেকে শব্দতন্ময় অর্থাৎ সূক্ষ্ম শব্দ উৎপন্ন হয়, এই শব্দ থেকেই আকাশ সৃষ্টি হয়, তখন শব্দের সঙ্গে শব্দের ইন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ণের সংযোগ স্থাপন ঘটে। শব্দ পদার্থের বাচক। শব্দ জীবের জ্ঞাপক অর্থাৎ জীব তার কর্ণে শব্দ শুনতে পায়। অতএব, পদার্থবাচক, ব্যক্তিজ্ঞাপক ও সূক্ষ্ম আকাশ, শব্দের এই তিন লক্ষণ। আকাশেরও লক্ষণ আছে, আকাশ সকল ভূতকে আশ্রয় দান করে থাকে। আমরা যে বাহির ও অভ্যন্তর, এই দুই ভাব ব্যবহার করি, আকাশ তার কারণ, এবং প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও মন আকাশকে আশ্রয় করে থাকে। অতএব এই তিন কার্য আকাশের লক্ষণ।

তারপর শব্দতন্মাত্র আকাশ থেকে কালশান্তির প্রভাবে স্পর্শতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। তার থেকে বায়ু উৎপন্ন হয়ে ত্বক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে স্পর্শের সম্পর্ক ঘটে। মৃদু, কঠিন, শীত, উষ্ণ এবং বায়ুর সূক্ষ্ম অবস্থা হল স্পর্শের লক্ষণ। বায়ু বৃক্ষশাখাদের চঞ্চল করে, তৃণদের মিলিত করে, সকল বস্তুর সঙ্গে সংলিপ্ত থাকে এবং গন্ধদ্রব্যের গন্ধকে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের কাছে, শীত ও উষ্ণতা প্রভৃতিকে ত্বক ইন্দ্রিয়ের কাছে এবং শব্দকে শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কাছে বহন করে। এই সমস্ত কর্মে বায়ুর লক্ষণ উপলব্ধি হয় এবং বায়ু সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজীব রাখে। এইভাবে স্পর্শতন্মাত্র ও বায়ুর দৈবযোগে রূপতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়রূপ তন্মাত্র থেকে চক্ষুর সম্বন্ধ ঘটে। রূপ বস্তুর সঙ্গে অনুভব করা যায়, স্বতন্ত্র অনুভব করা যায় না। বস্তুর যেমন আকার স্থূল, সূক্ষ্ম, ঋজু বা বক্র, রূপেরও তেমন অনুভূতি; সুতরাং এই সকল রূপের লক্ষণ।

তেজ আহার পাক করে, ক্ষুধাতৃষ্ণার উদ্রেক করে ভোজন ও পান করায়, শৈত্য নিবারণ করায়, উষ্ণতা শোষণ করায়। এই স্কল কার্য তেজের লক্ষণ। রূপ তন্মাত্র তেজ কাল প্রভাবে রসতন্মাত্র সৃষ্টি করে। রসতন্মাত্র থেকে জলের সৃষ্টি হলে জিভের সঙ্গে রসের সম্পর্ক ঘটে। রস সাধারণতঃ মধুর, কিন্তু যে সব ভৌতিক পদার্থের সঙ্গে সংসর্গ ঘটে, সেই অনুসারে কষায়, মধুর, তিক্ত, কটু, অম্ল ও লবণ, এই ছয় প্রকারের রসের অনুভব হয়। জল পদার্থকে সিক্ত করে, জীবকে তৃপ্তি দিয়ে তাদের জীবিত রাখে, পিপাসা ও তাপের নিবৃত্তি করে; সুতরাং এই সমস্তই জলের বৃত্তি অর্থাৎ কার্য। তারপর রসতন্মাত্র জল কালের প্রভাবে গন্ধতন্মাত্রের সৃষ্টি করে এবং তার থেকে পৃথ্বী উৎপন্ন হলে ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে গন্ধের সংযোগ স্থাপন করে। ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন গন্ধের অনুভব হয়, মিশ্রগন্ধ, দুর্গন্ধ, কর্পূর ইত্যাদির সৌরভ, পথ্য ইত্যাদির শান্তগন্ধ, লশুন ইত্যাদির উগ্রগন্ধ ও অম্লগন্ধ। পৃথ্বীতত্ত্বের লক্ষণ এই যে, এর থেকে প্রতিমারূপে ব্রহ্মের সাকারতা সাধিত হয়। পৃথ্বী স্বতন্ত্র ভাবে অবস্থান করতে পারে, জল ইত্যাদির মতো অপরের নির্ভর করে না। এই পৃথ্বীতত্ত্ব জল ইত্যাদির আধার ও আকাশ ইত্যাদির বিভাজক; পৃথ্বী থেকে সমস্ত জীবের আকার প্রকাশ পেয়ে থাকে।

হে মাতঃ এখন তোমাকে জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের লক্ষণসমূহ বলছি, শোন। কান দিয়ে আকাশের অসাধারণ গুণ শব্দ শোনা যায়। ত্বক দিয়ে বায়ুর অসাধারণ গুণ স্পর্শ অনুভব হয়, চোখ দিয়ে তেজের অসাধারণ গুণ রূপ দেখা যায়, জলের অসাধারণ গুণ রস গ্রহণ করা যায় জিভে, ভূমির অসাধারণ গুণ গন্ধ যে ইন্দ্রিয় গ্রহণ করে, তার নাম নাক। এইভাবে আগেকার সকল মহাভূতের গুণ পরের মহাভূতে সংযুক্ত হওয়ার কারণে, পৃথ্বীতত্ত্বে আকাশ ইত্যাদি সকল ভূতের অসাধারণ গুণ অনুভূত হয়। সৃষ্টির শুরুতে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সকল তত্ত্ব যখন অমিশ্রিত অবস্থায় অবস্থান করছিল, তখন জগতের আদি কারণ ঈশ্বর কাল অর্থাৎ গুণ সমূহে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী শক্তি, কর্ম অর্থাৎ জীবের অদৃষ্ট ও গুণ অর্থাৎ প্রকৃতি; এই তিন কারণে অধিষ্ঠিত হয়ে, ওই সকল তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। 

এই ব্রহ্মাণ্ড শ্রীহরির রূপ। কারণ সলিলে অবস্থিত এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ভগবান উত্থিত হলেন অর্থাৎ উদাসীন অবস্থা পরিত্যাগ করে অধিষ্ঠিত হলেন ও অনেক ইন্দ্রিয় ছিদ্র প্রকাশ করলেন। প্রথমতঃ এই বিরাট পুরুষের মুখ প্রকাশিত হল এবং বাক্য ইন্দ্রিয়ের দেবতা অগ্নির তার মধ্যে প্রবেশ করল। তারপর প্রাণের অন্বয়ে নাক প্রকাশ হলে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের দেবতা বায়ু তার মধ্যে আশ্রয় নিল। এইভাবে অক্ষিগোলকে চোখের দেবতা সূর্য, কানের প্রকাশ হলে শ্রবণের দেবতা দিগ্‌দেবতা প্রবেশ করলেন। তারপর বিরাট পুরুষের ত্বক, রোম ও শ্মশ্রু প্রকাশে ত্বকের ঔষধি দেবতাগণ, শিশ্নর প্রকাশ হলে বীর্যের দেবতা অব্‌দেবতা, পায়ু প্রকাশিত হলে, অপান ইন্দ্রিয়ের দেবতা মৃত্যুর অধিষ্ঠান হলহাত ও পায়ের প্রকাশে, বল ও গতির দেবতা ইন্দ্র ও বিষ্ণু, নাড়িসকল প্রকাশিত হলে শোণিতর দেবতা নদীর অধিষ্ঠান হল তারপর উদর প্রকাশিত হলে, ক্ষুধা ও পিপাসা ইন্দ্রিয়ের দেবতা সমুদ্রদেবের সঙ্গে অধিষ্ঠিত হল। পরে বিরাট পুরুষের হৃদয়ে মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত, যথাক্রমে চন্দ্র, ব্রহ্মা, রুদ্র ও চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞর সঙ্গে অধিষ্ঠান করতে লাগল। দেবতা চৈত্ত ছাড়া অন্য সকল দেবতাই বিরাট পুরুষকে জাগরিত করার জন্যে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় স্থানে অধিষ্ঠান করলেও, বিরাট পুরুষ জাগ্রত হলেন না। তারপর চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞ চিত্ত তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করামাত্র তিনি কারণ বারিধি থেকে উত্থিত হলেন। যে ক্ষেত্রজ্ঞ ছাড়া প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সুপ্ত পুরুষকে জাগ্রত করতে পারে না, সেই ক্ষেত্রজ্ঞকে চিন্তা করতে হবে। প্রথমতঃ পরমেশ্বরে ভক্তি, দ্বিতীয়তঃ অন্যত্র সকল বিষয়ে বৈরাগ্য, তারপর যোগ অনুষ্ঠানে একাগ্র চিত্ত হলে যে জ্ঞান সৃষ্টি হবে, সেই জ্ঞানের সাহায্যে এই দেহে ক্ষেত্রজ্ঞকে আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হবে। 

শ্রীভগবান বললেন, “যাঁকে পুরুষ বলে উল্লেখ করলাম, ইনি স্বভাবতঃ নির্গুণ; এই নিমিত্ত তিনি অকর্তা, সুতরাং নির্বিকার। জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া পড়লে যেমন সেই ছায়া কাঁপে, কিন্তু আকাশের সূর্য কাঁপে না, তেমনই প্রকৃতিতে অর্থাৎ দেহে অবস্থান করে, এই পুরুষ এই দেহের সুখদুঃখের অংশীদার বলে মনে হলেও, বস্তুতঃ তিনি নির্লিপ্ত থাকেন। যখন এই পুরুষ প্রকৃতির গুণসমূহে একান্ত আসক্ত হন, তখন প্রকৃতির কার্যকে “আমি করছি” এই অভিমানে বিমূঢ় হয়ে থাকেন। এই অভিমানে পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের জন্য পাপ ও পুণ্য অর্জন করে এবং সেই কর্মদোষে সৎ অর্থাৎ দেবযোনি, মিশ্র অর্থাৎ মনুষ্যযোনি অথবা অসৎ অর্থাৎ তির্যকযোনিতে বারবার জন্মমৃত্যুর দশা লাভ করে, কখনো পরমানন্দ স্বরূপ লাভ করতে পারে না। পুরুষের কর্ম না থাকলেও কর্তার ভ্রান্ত অভিমানে, সংসারের বিষয়ে আসক্ত হয়ে অনর্থ দশা পায়। অতএব বিষয়ের প্রতি একান্ত আসক্ত মনকে, কঠোর ভক্তি ও বৈরাগ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বশীভূত করাই কর্তব্য।

হে মাতঃ, যে ভাবে আত্মলাভ হয়, সে কথা বলছি শোন। শ্রদ্ধার সঙ্গে যোগ অবলম্বন করে মনকে বার বার একাগ্র করবে, অকপট আচরণ করবে, আমার প্রতি একান্ত ভক্তি নিয়ে, আমার কথা শুনবে। সর্বভূতে সমদর্শীতা, শত্রুতা ত্যাগ, সঙ্গ ত্যাগ, ব্রহ্মচর্য, মৌনতা, নিজের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী কর্ম ঈশ্বরে অর্পণ, যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তোষ, পরিমিত আহার, একাগ্র চিন্তা, নির্জনে বাস, রাগদ্বেষ পরিত্যাগ, সর্বভূতের মঙ্গল চিন্তা, করুণা, ইন্দ্রিয়জয়, স্ত্রীপুত্রকন্যা ও নিজের দেহের প্রতি “আমি” ও “আমার” এই অভিমান ত্যাগ, এই সমস্ত সৎগুণ থাকতে হবে। এইভাবে প্রকৃতি ও পুরুষ বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞান হলে, জাগ্রত অবস্থার নিবৃত্তি হয়ে অন্তরের দিকে দৃষ্টি যায়, তখন আর অন্য বস্তুর দিকে লক্ষ্য যায় না। যোগীব্যক্তি নিজের অবিচ্ছিন্ন আত্মা দিয়ে শুদ্ধ আত্মাকে লাভ করেন এবং শেষে প্রকৃতির আবরণহীন, মিথ্যা অহঙ্কারে সত্যরূপে ভাসমান ব্রহ্মকে লাভ করতে পারেন। শুদ্ধ জীবস্বরূপের থেকে ব্রহ্মের পার্থক্য এই যে, ইনি প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতির অধিষ্ঠান; চোখের মতো নিখিল সৃষ্টির প্রকাশক এবং নিখিল কার্য-কারণের সম্পর্কযুক্ত অদ্বয় অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপে বিরাজিত।

হে জননি, জীবাত্মা কিভাবে শুদ্ধব্রহ্মকে লাভ করতে পারে একটি উদাহরণ দিয়ে বলি শোন। কখনো কখনো জলে সূর্যের ছায়া পড়লে, সেই ছায়া আবার ঘরের দেওয়ালেও দেখা যায়। তখন সেই গৃহে থাকা ব্যক্তি, ঘরের মধ্যে সূর্যের ছায়া কোথা থেকে এল, সন্ধান করতে করতে প্রথমে জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া এবং অবশেষে আকাশের সূর্যের সন্ধান পায়। একই ভাবে সাধক প্রথমতঃ ভূত, ইন্দ্রিয় ও মনে আত্মা অর্থাৎ চৈতন্যের ছায়া অর্থাৎ প্রকাশ দেখতে পান। জড়বস্তুতে ঐ ছায়া কোথা থেকে এল, অনুসন্ধান করতে গিয়ে ত্রিগুণ অহঙ্কারে চৈতন্যের প্রকাশ দেখতে পানতারও পরে কারণ অনুসন্ধান করতে করতে স্বপ্রকাশ ব্রহ্মচৈতন্য উপলব্ধি করতে পারেন।

হে মাতঃ, এই আত্মাকে কিভাবে সুষুপ্তির সাক্ষিরূপে অনুভব করা যায়, তাও তোমাকে দেখাচ্ছি। সুষুপ্তিকালে স্থূলভূত, সূক্ষ্মভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অব্যক্ত প্রকৃতিতে লয় অবস্থায় থাকে। তখন আত্মা বিনিদ্র ও অহঙ্কারহীন অবস্থায় অবস্থান করে। যদি বলো, আত্মা যদি বিনিদ্রই থাকে, তবে জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্নদর্শনের মতো আত্মার স্ফূরণ দেখা যায় না কেন? তার কারণ হল, জাগ্রত ও স্বপ্নকালে আত্মা দ্রষ্টা থাকেন, দৃশ্য বিষয়ের সঙ্গে পার্থক্যের জন্য, নিজেকে দ্রষ্টা হিসেবে বুঝতে পারেন। কিন্তু সুষুপ্তিকালে অহঙ্কারের সকল বিষয় ভূত ইত্যদি বিলীন হয়ে যায় এবং অহঙ্কারও বিনষ্ট হয়; তখন আত্মা নিজে নষ্ট হন না, কিন্তু নিজেকে নষ্ট ভেবে বিভ্রান্ত হন। ধনী ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হলে, সেই ব্যক্তি যেমন নিজে নষ্ট না হয়েও, নিজেকে ধ্বংস মনে করে ব্যাকুল হয়, আত্মারও সেই একই অবস্থা ঘটে। জীবের দেহ, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি অহঙ্কারের সমন্বয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে, অতএব অহঙ্কারকেও দৃশ্য পদার্থের মধ্যে গণ্য করা হয়; কিন্তু আত্মা দ্রষ্টা, অহঙ্কার ও সকল দেহের আশ্রয় ও প্রকাশকএই কারণে সুষুপ্তিকালে নিখিল দৃশ্যপদার্থ থেকে ভিন্ন আত্মা নিজেই প্রকাশ পায় এবং শুদ্ধ সাক্ষিচৈতন্যরূপে অবস্থান করেন”

মাতা দেবহূতি বললেন, “হে প্রভু, তুমি বললে প্রকৃতি ও পুরুষ পরষ্পরের মধ্যে নিত্য আশ্রয় ও আশ্রিতভাব। মনে ভক্তি ও বৈরাগ্য আনলেও, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়, তাহলে কিভাবে মুক্তি হওয়া সম্ভব? পুরুষ অকর্তা হলেও, প্রকৃতির যে সমস্ত গুণের কারণে পুরুষের কর্মের বন্ধন হয়, সেই সমস্ত গুণ বর্তমান থাকলে পুরুষের কৈবল্য প্রাপ্তি কিভাবে সম্ভব? আমার মনে হয়, এই কারণেই কোন কোন পুরুষ তত্ত্ববুদ্ধি দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করলেও, তাঁর মধ্যে প্রচ্ছন্ন ভয় থেকেই যায় এবং সেই কারণে আবার মৃত্যুভয় উপস্থিত হয়”

শ্রীভগবান বললেন, “হে মাতঃ, কামনাহীন ধর্ম আচরণ, নির্মল অন্তর, আমার কথা শোনার ফলে মনে সুদৃঢ় ভক্তি, তত্ত্ব উপলব্ধির প্রগাঢ় জ্ঞান, তীব্র বৈরাগ্য, তপস্যা ও আত্মসমাধি যোগে প্রকৃতি দিন রাত্রি জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যন্ত বিনষ্ট হয়। এই ভাবে বিনষ্ট প্রকৃতি, স্বতন্ত্র ও পরমানন্দে অধিষ্ঠিত পুরুষের কোন অশুভ করতে পারে না। বহুবার জন্মগ্রহণ করে জীব যখন আত্মনিষ্ঠ হন এবং নিখিল ভুবনে বৈরাগ্যযুক্ত হন, তখন আমার প্রসাদে কৈবল্যনামক স্বরূপ প্রাপ্ত হন এবং আত্মজ্ঞান লাভ করে মনের সকল সংশয় ছিন্ন করতে সমর্থ হন। তারপর লিঙ্গশরীর বিনষ্ট হলে, সেই যোগী সংসারে আর ফিরে আসেন না। হে মাতঃ, এই অবস্থায় যোগের আনুষঙ্গিক ফল, অণিমা ইত্যাদি সিদ্ধিসকল, বাধা হয়ে উপস্থিত হয়। সিদ্ধযোগী যদি ওই প্রলোভনে আকৃষ্ট না হন, তবে তিনি পরামুক্তি লাভ করেন এবং তাঁর মৃত্যুভয় চিরতরে দূর হয়ে যায়”

মাতা দেবহূতি সাংখ্যজ্ঞানের প্রবর্তক সেই ভগবানকে প্রণাম করে স্তব করতে করতে বললেন, “ব্রহ্মাণ্ড স্বয়ং যাঁর নাভি মণ্ডল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যিনি নিখিল কার্য ও কারণ। যাঁর মধ্যে সত্ত্ব প্রভৃতি তিনগুণের প্রবাহ বর্তমান। সেই তুমিই এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমি নিষ্ক্রিয় ও সত্য সঙ্কল্প, এই কারণে তুমি প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি না করেও, নিজের শক্তিকে তিন গুণের প্রবাহে বিভক্ত করে জীবগণকে ভোগের জন্য সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমিই এক হয়ে এই অসংখ্য বিচিত্র ভোগের বিধান দাও। তোমার অনন্ত অচিন্ত্য শক্তির কে ইয়ত্তা করতে পারবে? হে নাথ, প্রলয় কালে এই বিশ্ব যাঁর জঠরে ছিল, তাঁকে আমি কী ভাবে গর্ভে ধারণ করেছিলাম? অথবা যেমন কল্পের অন্তে, তোমার মায়ার প্রভাবে তুমি শিশুরূপ ধারণ করেছিলে এবং একটিমাত্র বটপাতায় শুয়ে নিজের পায়ের আঙুল পান করেছিলে, এও তোমার সেই রকমই কোন মায়া? অথবা তুমি দুষ্টগণের শাসন, ভক্তদের সমৃদ্ধি ও জ্ঞানমার্গের পথ দেখানোর জন্য, তোমার নানান অবতার মূর্তির মতো আরেক মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছ? হে ভগবান, যাঁরা তোমার নাম গ্রহণ করেন, তাঁরা তপস্যা, হোম, তীর্থদর্শন ও বেদপাঠের সমান ফল লাভ করেন। যদি চণ্ডালের জিহ্বাতেও তোমার নাম উচ্চারণ থাকে, শুধুমাত্র সেই কারণেই সে সদাচার পবিত্র হয়ে ওঠে, সন্দেহ নেই। তুমি ব্রহ্ম, তুমি পরমপুরুষ। মন বিষয় থেকে নিবৃত্ত হলে, তোমাকে চিন্তা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। নিখিল বেদ তোমার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। হে প্রভু, তুমিই কপিলরূপী বিষ্ণু, আমি তোমাকে প্রণাম করি”। 

তৃতীয় স্কন্ধ সমাপ্ত

এর পর শুরু হবে চতুর্থ স্কন্ধের প্রথম পর্ব। 


মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮ "


৪৪

 

কাজের কথা সেরে বালিয়া আর বড়্‌বলা চলে যেতেই, ভল্লা বলল, “এক ঘটি জল খাওয়াবি, মা? তেষ্টায় ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে”। কমলিমা উঠে গেলেন জল আনতে, ভল্লা বলল, “তোর রাতের রান্না কী হয়ে গেছে, মা?”

কমলিমা জলের ঘটি ভল্লার হাতে দিয়ে বললেন, “খাবি তো সেই দুপুররাত্তিরে – বসাব এখন...”

“বলছিলাম, তোর আরেকটি ছেলে এই এল বলে, প্রতি রাত্রেই সে আমাদের সঙ্গে খায়। দুটো-তিনটে রুটি বেশি করিস মা”।

“সে ছেলে দিনে না এসে, রাতে কেন আসে?”

মারুলা বেড়ার কাছে চলে এসেছিল, ভল্লার বাসা থেকে মহিলার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল।

ভল্লা টের পেয়ে বলল, “সে ছেলে নিশাচর, রে মা। পেঁচা কিংবা বাদুড়ের মতো। দিনের আলোয় চোখে অন্ধকার দেখে...ওই তো এসে গেছে...অনেকদিন বাঁচবি হতভাগা, এই যে মা, এর নাম মারুলা”।

মারুলা উঠোনে এসে দাঁড়াল, কমলিমায়ের পাঁ ছুঁয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করল, “কমলিমা? আমার নামে কী বলছিল মা, মুখপোড়াটা? আমি পেঁচা, বাদুড়?”

কমলিমা হেসে ফেলে বললেন, “তার আমি কী জানি – সে তোমাদের বন্ধুদের ব্যাপার। কিন্তু তুমি আমাকে কী করে চিনতে পারলে, বাবা?”

“তোমাকে না চিনলে কী হবে, তোমার কথা এত শুনেছি এই ভল্লা আর রামালির কাছে – না চিনে যে উপায় নেই মা”।

কমলিমা হেসে বললেন, “তা বেশ বাবা, তোমরা বসে কথা বল, আমি রান্নার জোগাড় দেখি”।

ভল্লা বলল, “তোর সঙ্গেও দুটো কথা আছে মা, একটু বসে যা। আমাদের ছেলেদের একটা দল আছে নিশ্চয়ই শুনেছিস, মা। সেই দলের সবাই যদি নাম পালটে নিজেদের ‘জুজাক’ বলে ডাকে, তুই রেগে যাবি মা?”

কমলিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে, বললেন, “তার মানে? মরা মানুষটাকে নিয়ে হঠাৎ এ আবার কী পাগলামি?”

“দেখ মা। তোকে খোলাখুলিই বলি। এই অমাবস্যায় আমাদের ছেলেরা আস্থান আক্রমণ করবে – সেখানে ছেলেরা নিজেদের নাম নিয়ে ডাকাডাকি করলে, আস্থানের রক্ষীরা তাদের চিনে নেবে। সেই কারণে সবারই নাম হবে জুজাক। রক্ষীরা বুঝবে এ আক্রমণ কিসের জন্যে – তারা হাড়ে হাড়ে টের পাবে একজন জুজাককে মারলে – তিরিশজন জুজাক তার শোধ নেবে...”

কমলিমার দুই চোখ জলে ভরে উঠল, কান্নার বেগ কিছুটা সামলে ধরা গলায় বললেন, “সত্যিই তোরা শোধ নিবি? রামালি সে রাত্রে বলেছিল বটে – ভেবেছিলাম ছেলেমানুষী আবেগ...”।

“না মা, এ আবেগ নয় – প্রতিজ্ঞা। তুই জানিস না মা – রামালি, সুরুল, আহোক, কিশনা এই ক’মাসে কী দারুণ লড়াই করতে শিখেছে। এই অমাবস্যায় সেই পরীক্ষা। রামালি আর সুরুল ঠিক করেছে – নিজের হাতে উপানুকে হত্যা করবে... উপানুর নাম শুনেছিস মা?”

কমলিমায়ের অশ্রুসিক্ত দুই চোখ যেন ঝলসে উঠল, বললেন, “অনামুখো, বাঁশবুকো মিনসের নাম শুনবো না? রামালিদের হাতে ও যেদিন ঘেয়ো কুকুরের মতো মরবে, সেইদিন শান্তি পাবো আমি এবং আমার প্রধান”।

রামালি উঠে এসে কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রেখে বসে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি নিশ্চিন্ত থাক জেঠিমা – আমি আর সুরুল ওর এমন অবস্থা করব – ওকে চেনা যাবে না...”।

কমলিমা রামালির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি তোদের সবাইকে আশীর্বাদ করছি বাবা, তোদের প্রতিজ্ঞা নিশ্চিত পালন হবে – তোদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগবে না...”।

একটু সময় নিয়ে ভল্লা খুব নরম করে বলল, “আমাদের দলের আমরা সবাই জুজাক, তাই তো মা?”

কমলিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন, অস্ফুট অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ জুজাক”।

“আরেকটা কথা আছে মা। আমাকে যেমন সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছিলি, আমার বা আমাদের ছেলেদের যদি তেমন সেবা দরকার হয়, করবি মা?”

কমলিমা উৎকণ্ঠায় বলে উঠলেন, “কেন কার কী হয়েছে?”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত ধরে বলল, “বালাই ষাট, কারও কিছু হয়নি। কিন্তু ওদিন যদি কেউ চোট-আঘাত পায় – বড়্‌বলা তাদের চিকিৎসা করবে আর তুই করবি সেবা...পারবি না, মা?”

কমলিমা বললেন, “তা করব না কেন? আমার আর কাজ কি? কিন্তু এই ঘরে তাদের রাখবি কী করে?”

ভল্লা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল, “এ ঘরে নয় মা। এখান থেকে একটু দূরে আমাদের নতুন পাকা বড়ো বড়ো ঘর হয়েছে। অমাবস্যার দিন তোকে নিয়ে যাবো মা, সেখানেই আমরা সবাই মিলে কয়েকদিন থাকব”।

“আমার ছেলেদের সঙ্গে আমি সর্বদাই জুড়ে থাকব, ভল্লা, ভাবিস না। এখন উঠি – রাত হল অনেক...রান্না বসাই...”।

“আচ্ছা, আরেকটা কথা বলে রাখি মা, কাল থেকে আমাদের এখানেও পাকা ঘর বানানোর কাজ শুরু হবে। কাল সকালে কুলিকপ্রধান আসবে তার লোকজন নিয়ে। কোন অসুবিধে হবে না তো?”

“এখান থেকে একটু সরে করতে বলিস – হই-হট্টগোল আমার ভাল লাগে না। আর তারাও সবাই পুকুরে যাবে তো?” কমলিমা একটু উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো যাবেই। কিন্তু ভাবিস না মা, ওদের বলে দেব। তোকে ওরা বিরক্ত করবে না”।

 

ভল্লা মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওদিকের কী খবর?”

“বীজপুর থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আজ রাতে রওনা হচ্ছে। আশা করি কাল রাত্রে আমাদের ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। কিন্তু উপানু শালা কাঠি করতে শুরু করেছে। আজ সকালে শষ্পকের কাছে গিয়ে নাকি বলেছে, ওর কাছে খবর এসেছে, চারখানা গোশকট বোঝাই অস্ত্র-শস্ত্র, বীজপুরের পাশে জঙ্গলের মধ্যে রাখা আছে। কোন এক বণিক – তার নাম জানে না – আমাদের রাজধানী থেকে ওগুলো কিনে এপথে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝে দ্যাখ, ভল্লা, হতভাগার আড়কাঠি সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে”।

“তা তো থাকবেই। আমাদেরও তো আছে – কিন্তু শুনে শষ্পক কী বলল?”

“শষ্পক আমাকে যা বলল, ওকে জিজ্ঞাসা করেছে,

“তোমার লোক বণিকের মোহর-পত্র দেখেছে?”

“দেখেছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু বণিক নিজে তো সঙ্গে নেই, আছে তার করণিক আর রক্ষীদল”।

“মোহর-পত্র যদি ঠিক থাকে, তোমার - আমার মাথাব্যথা কিসের? রাজধানী বুঝবে আর বুঝবে সেই বণিক”।

“তা ঠিক কিন্তু...”।

“কিচ্ছু কিন্তু নেই, উপানু। আমি এই আস্থান আর ওই দুই গ্রাম নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছি। আর বিপদ ডেকে এনো না””।

ভল্লা বলল, “শষ্পক তো ঠিকই করেছে। কিন্তু উপানু হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ওর সেই চরটাকে খুঁজে বের করতে পারবি?”

“পারবো। বীজপুরের জনাই – আর ওই বণিকের রক্ষীসর্দার – ওদের থেকেই ব্যাটার সব তত্ত্ব জেনে নেব – তারপর ধরতে আর কতক্ষণ”?

“তবে আর কি? যা করার করে ফ্যাল। আর উপানুর আয়ু তো অমাবস্যা অব্দি, তাই তো রামালি?”

“ওই রাতের পর উপানুর আর বাঁচার কোন আশাই নেই – আমরা কমলিমায়ের আশীর্বাদ পেয়েছি, ভয় কি?”

কমলিমা রান্না করতে করতে বললেন, “ভল্লা, আমার রান্নার ভাঁড়ার কিন্তু বাড়ন্ত – বড়ো জোর দু একদিন চলবে...”।

ভল্লা হেসে বলল, “ভাবিস না মা, কাল ভোরে উঠেই দেখবি, তোর ঘরের দরজার সামনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাখা আছে”।

ভল্লা মারুলাকে বলল, “বটতলির ছেলেদের তাহলে, পরশু সকাল সকাল পাঠাব – অস্ত্র-শস্ত্র আনার জন্যে?”

“পরশু সকালে? ঠিক আছে – বলে রাখব। ও হ্যাঁ, বটতলির ছেলেদের গয়না-পত্র বিক্রি হয়ে বীজপুর থেকে টাকা চলে এসেছে। কত টাকা, শুনলে চমকে যাবি”।

“কত?”

“তিনশ চল্লিশ রূপোর মুদ্রা!”

“বলিস কী? বটতলির ছেলেগুলোকে খুব হাল্কাভাবে নিয়েছিলাম – কিন্তু এখন দেখছি বেশ কাজের তো?”

“সে আর বলতে? আচ্ছা, কাল দুপুরে রামালি যাচ্ছিস তো? আর ভল্লা যাচ্ছিস বিকেলের দিকে, তাই তো?”

“হ্যাঁ রামালি দুপুরে খেয়ে সোজা চলে যাবে – আমি মাকে আর ছেলেদের নিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে যাবো”।

কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাকে নিয়ে কোথায় যাবি? কালকেই নতুন ঘরে চলে যাবি নাকি?”

“না রে মা, কালকে গিয়ে তুইও একবার দেখে নে। তোর প্রয়োজন মত, কোথায় কী করতে হবে বলে দিবি। তারপর সন্ধেতেই আমরা ফিরে আসব। তারপর অমাবস্যার বিকেলে আমরা সবকিছু নিয়ে চলে যাবো – কিছুদিনের জন্যে আমরা ওখানেই থাকব”।       

মারুলা বলল, “কিন্তু কমলিমাকে নিয়ে তোরা হেঁটে যাবি নাকি?”

ভল্লা বলল, “সে চিন্তা তোকে করতে হবে না, সে মা জানে… তোকে একটা কথা বলে রাখি – সবই তো শুনলি মায়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে – আক্রমণের দিন আমরা সবাই সবাইকে ‘জুজাক’ বলে ডাকব – কারো কোন নাম থাকবে না। তুই, আমি, রামালি সবাই জুজাক – জুজাকদাদাও নয় – ঠিক আছে?”

মারুলা বলল, “ঠিক আছে

মারুলার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে বণিক অহিদত্তের ডাক শোনা গেল, “ভল্লামশাই রয়েছেন নাকি?”

“রয়েছি - চলে আসুন বণিকমশাই, আপনার রক্ষীদের বলুন আমাদের বাসাটা ঘিরে থাকুক – কেউ যেন কাছে না আসতে পারে…” ভল্লা গলা তুলে সাড়া দিল।

অহিদত্ত উঠোনে এসে একটু চমকে গেলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “কমলিমা না? বাঃ খুব ভালো করেছেন। ছেলেগুলোর মাথার ওপরে একজন মা থাকলে – ওদের শক্তি বেড়ে যাবে”।

ভল্লা বলল, “এখানে বসুন বণিকমশাই। তারপর পরিস্থিতি কী বলুন”।

ভল্লার পাশে বসে বণিকমশাই বললেন, “এমনিতে সবই ঠিক আছে, বার্তা পেলাম বীজপুর থেকে আমাদের শকট রওনা হয়ে গেছে –  ওখান থেকে নতুন বলদ জুড়েছে, বেশ তাড়াতাড়িই টানবে মনে হয়। বলছে আগামীকাল দুপুরের আগেই... কিন্তু একটা আপদ এসে জুটেছে...এঁটুলির মতো”।

মারুলা বলল, “কোন ফেউ পিছু নিয়েছে?”

অহিদত্ত ভল্লার দিকে তাকালেন, ভল্লা বলল, “আমারই ভুল – আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি – ও হচ্ছে মারুলা – আমরা একসঙ্গেই...”

ভল্লার কথা শেষ করতে না দিয়ে অহিদত্ত বললেন, “মারুলামশাই – বিলক্ষণ রাজধানীতে আপনার কথাও বলেছে – আপনিই নাকি সবদিক দেখা শোনা করবেন। নমস্কার।”

মারুলাও নমস্কার করে বলল, “আপদটা কি?”

“আর বলবেন না, বীজপুরে ঢোকা থেকে কে একটা লোক আমাদের লোকগুলোর পিছনে পড়ে গেছে, মোহর-পত্র দেখেছে। জিগ্যেস করছে কোথায় যাবে, বণিকের নাম কী, এত অস্ত্র-শস্ত্র কী হবে...হাজারটা প্রশ্ন”।

“ও কি সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে?” মারুলা জিজ্ঞাসা করল।

“না – একটু পিছনে – নাগাড়ে অনুসরণ করে চলেছে...আমাদের রক্ষীরা কিছু করতেও পারছে না, অচেনা-অজানা – কার লোক কে জানে?”

মারুলা ভল্লার দিকে তাকাতে, ভল্লা ঘাড় নাড়ল – তারপর বলল, “ঠিক আছে ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, বণিকমশাই। আপনার সঙ্গে লোকজন আছে তো? শকট খালি করে ভাণ্ডারে ঢোকাতে বেশ কিছু লোক লাগবে কিন্তু...”।

“লোক সঙ্গেই আছে, ওরা খালি করে শকট নিয়ে ফিরে যাবে। আর আছে আটজন সশস্ত্র রক্ষী, একজন করণিক, তার একজন সহকারী, আর চারজন ভৃত্য। ভাণ্ডারে সব কিছু ঢুকে গেলেই দরজায় তালা পড়ে যাবে - সকলে নিজের নিজের কাজ সামলাবে...”।

ভল্লা বলল, “বাঃ ব্যবস্থা তো ভালোই... আগামীকাল ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে নিশ্চিন্ত। ও আরেকটা কথা বণিকমশাই – আমাদের মায়ের রান্নার ভাণ্ডার প্রায় শেষ হতে চলল, আজ রাত্রে অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার এসে যাবে তো?”

অহিদত্ত বললেন, “হ্যাঁ আজ ওর আসার কথা তো, নিশ্চয়ই দিয়ে যাবে...”

“আরেকটা অনুরোধ – অমাবস্যার রাতে আমাদের একটা বড়ো কাজ আছে – ওই দিন থেকে আমরা বেশ কিছুদিন অস্ত্র ভাণ্ডারেরই একটা ঘরে সবাই থাকব – প্রায় চল্লিশজন – তাদের পেটের সমাধানটাও আপনাকেই করতে হবে... অমাবস্যার আগেই। কোন ঘরে রাখতে হবে মারুলা, করণিকবাবুকে বুঝিয়ে দিস”।

“অনুরোধ বলবেন না ভল্লামশাই – আপনি আমার থেকে কোনদিন কোন সাহায্যই নেননি – দু মণ তুলো আর দু’মণ বাদামের বীজ দিয়েছিলাম – তার মূল্যও আপনি পাই-পয়সায় মিটিয়ে দিয়েছেন...আমার কাছে আপনার যা মুদ্রা এখনও জমা আছে...তাতে চল্লিশজনের মাসখানেকের খাদ্যের সংস্থান হয়ে যাবে...ও নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমি বণিক - এটাই আমার কাজ”।

“ঠিক আছে, বণিকমশাই। এরপর আমাদের সময় করে একদিন বসতে হবে – কিন্তু সেটা ওই অমাবস্যার পরেই কোন একদিন – আপনাকে সংবাদ দেব। আমরা চারজন – আপনি, মারুলা, রামালি এবং আমি বসে দর-মূল্য সব ঠিক করে নেব – ওই দিন আদান-প্রদানও সেরে নেব...”।

অহিদত্ত অবাক হয়ে বললেন, “বলছেন কী ভল্লামশাই, আদান-প্রদানও...”।

ভল্লা মৃদু হেসে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল, “এখন আর কোন কথা নয়”।

        অহিদত্ত হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আমি এখন আসি। কমলিমা, প্রণাম নেবেন। চললাম, দেখা হবে     আবার"। 


চলবে... 


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৪

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...