সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১  


১৮

 সূর্যাস্ত হয়ে গেলেও পশ্চিম আকাশ এখনও কিছুটা রঙ আর আলো ধরে রেখেছে। পূবের আকাশে সে রঙের কোন আভাস নেইগোটা আকাশটাকে অজস্র তারার চুমকি বসানো কালো পর্দার আড়ালে ঢেকে দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে সন্ধ্যাকাল। যেমন অপেক্ষা করছে নিশাচর জীবেরা – রাত্রি নামলে তারা বের হবে জীবিকার সন্ধানে। অন্যদিকে সারাদিন জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত পাখিরা এখন বাসায় ফিরছে। আশেপাশের গাছগুলি থেকে তাদের কলধ্বনি কানে আসছে। সন্ধ্যা আসছে, তার পিছনে আসছে রাত্রি।

এই সন্ধিক্ষণেই গ্রামপ্রধান জুজাক নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। তাঁর পিছনে ঘরের দরজার পাশে মাটি-লেপা দরমার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন কমলিমা। দুজনেই দূরের পাহাড়, ঝোপঝাড়-জঙ্গল, পূবের আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। নির্লক্ষ্য বোবা, নির্বিকার দৃষ্টি মেলে। সবকিছুই তাঁদের দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে, কিন্তু তাঁদের মনে কোন ছায়া পড়ছে না। এই জীবন, ওই প্রকৃতি, দিন-রাত্রি এসবই তাঁদের কাছে আজ যেন মূল্যহীন মনে হচ্ছে। মাত্র হাত তিনেক দূরে বসে থাকা দুই জীবনসঙ্গী নিজেদের মধ্যে কথাও বলছেন না। দীর্ঘ দাম্পত্যের প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষোভ-অভিমান-অভিযোগের কথা। কিংবা সাধারণ সাংসারিক সুখদুঃখের কথা, প্রয়োজনের কথা। সব কথাই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাঁদের জীবন থেকে যেন ফুরিয়ে গেছে সমস্ত অনুভব।

কেন এবং কতক্ষণ তাঁরা এভাবে বিমনা বসে আছেন, সে কথা একবারের জন্যেও তাঁদের মনে আসেনি। তাঁদের সম্বিৎ ফিরল কবিরাজদাদার ডাকে, “জুজাকভায়া, বাড়িতে একা একা বসে কী করছ?” জুজাক দাওয়া থেকে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন উঠোনে। “আসুন আসুন, কবিরাজদাদা। কী আর করব, এই বসে ছিলাম একটু…”।

“সন্ধ্যে হয়ে গেল, আলো জ্বালাওনি, তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাওনি। কী ব্যাপার? চুপ করে দাওয়ায় বসে দুটিতে কী ভাবছিলে বলো তো, মা?”

কবিরাজদাদার ডাকে কমলিমাও উঠে পড়েছিলেন। আড়া থেকে আসন পেড়ে, দাওয়ায় বিছিয়ে দিয়ে, বললেন, “আসুন কবিরাজদাদা, বসুন। সত্যিই বড়ো ভুল হয়ে গেছে”। তিনি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালালেন। কাচা কাপড় পরে প্রদীপ হাতে, দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন উঠোনের তুলসীতলায়। প্রথমে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন, তারপর গলায় আঁচল জড়িয়ে মাটিতে গড় হয়ে প্রণাম সারলেন। তারপর  ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালিয়ে, সলতেটা ছোট করে বাইরে দাওয়ায় এসে বসলেন, নিজের জায়গাটিতেই। ঘরের স্তিমিত আলোয় এবং বাইরের ক্ষুদ্র দীপালোকে – অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়ে উঠল। আর তখনই পুবের পাহাড় চূড়ায় দেখা দিল চাঁদ। গতকাল পূর্ণিমা ছিল, আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। গতকালের পূর্ণতা আজ তার আর নেই – আগামী প্রতিদিনই সে শীর্ণ হতে থাকবে।    

কবিরাজদাদা জুজাকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “গ্রামের পরিস্থিতি কী বুঝছো, জুজাক?”

মুখে বিষণ্ণ হাসি নিয়ে জুজাক বললেন, “আপনি কী বুঝছেন, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজ দাদা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মোটেই ভালো বুঝছি না, হে। দিনকাল আগের মতো থাকছে না। অবশ্য দিনকাল যে চিরদিন একই রকম থাকবে, তা না। বদল হবেই। কিন্তু এ বদল যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি ঘটে চলেছে”।

জুজাক একই রকম বিষণ্ণ সুরে বললেন, “সব কিছুই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, কবিরাজদাদা। আমাদের বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে আর তাল রাখতে পারছি না”।

সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর জুজাক বললেন, “শুনলাম গত রাত্রে আস্থানের শিবিরে নাকি ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে নাকি তিন-তিনজন রক্ষী প্রাণ দিয়েছে। তুমি আমি এই গ্রামেই আশৈশব বড়ো হলাম, দাদা। এমন ডাকাতির কথা কোনদিন শুনেছ? আমাদের গ্রামের কথা ছেড়েই দাও আশেপাশে যত গ্রাম আমি চিনি কোথাও কোনদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। আজ কারা এইসব করছে? কে তাদের সাহস যোগাচ্ছে?”

কবিরাজদাদা মন দিয়ে জুজাকের কথা শুনছিলেন। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি নিয়ে তিনি বললেন, “তোমার নিজের প্রশ্নগুলির উত্তর তুমি তো নিজেই দিয়ে ফেললে জুজাক”। জুজাক কবিরাজদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কোন কথা বললেন না।

কবিরাজদাদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, “বুঝতে পারলে না, না? আচ্ছা, তকাল আমাদের গ্রামের পনের-ষোলোজন ছেলে রাত্রে বাড়িতে ছিল না”।

“হ্যাঁ। ওরা তো রামকথা শুনতে গিয়েছিল”।

“আশেপাশের গ্রামগুলোতে এমনকি আমাদের এই গ্রামেও নানান উৎসবে, পূর্ণিমায় এমন রামকথা তো প্রায়ই হয়। এ সব ধর্ম কথা শুনতে গ্রামের মহিলারা যায়...বয়স্ক মানুষরা যায়। অনেক ভক্ত আমাদের প্রতিবেশী গ্রামগুলিতেও যায়। কিন্তু জুজাক, তুমি আমায় বলো তো – আমাদের ছোকরা ছেলে-পুলেদের এত বড়ো দল কবে কোথায় গিয়েছে ধর্মকথা শুনতে? তাও কাছাকাছির মধ্যে প্রতিবেশী গ্রামে নয়, গভীর জঙ্গল-পথে এতটা হেঁটে, পাশের রাজ্যে? আমার তো মনে পড়ে না”।

জুজাক চমকে উঠলেন, “তার মানে? ওরা কাল রাত্রে রামকথা শুনতে যায়নি? তাহলে কোথায় গিয়েছিল?”

কবিরাজদাদা বললেন, “তা তো জানি না, ভাই। আরও একটা কথা - পাশের সুকরা গ্রামের চারজন গতকাল রাত্রে সত্যিই বটতলি গ্রামে গিয়েছিল রামকথা শুনতে। আমাদের ছোঁড়াগুলো যদি রামকথা শুনতে নাই গিয়ে থাকে, তাহলে ওই চারজন এসে ওদের সঙ্গে কোথায় জুটল? কেন জুটল?”

জুজাক বললেন, “তুমি কি গতকাল আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে আমাদের ছেলেদের সংযোগ খুঁজে পাচ্ছ”?

কমলিমা এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, শুধু শুনছিলেন। এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কী বলছো, এ কোনদিন হতে পারে? আমাদের ছেলেরা যাবে আস্থানে ডাকাতি করতে? কবিরাজদাদা, তুমি কি সত্যিই তাই সন্দেহ করছো?  আমাদের ছেলেদের তুমি চেন না? তারা করবে ডাকাতি?”

কবিরাজদাদা ম্লান হেসে বললেন, “কেন চিনব না? খুব ভালো করেই চিনি, মা। কিন্তু প্রথমেই যে বললাম, অনেক কিছু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে”।

কবিরাজদাদার কথাটা কমলিমার মনঃপূত হল না, বললেন, “তাই বলে ডাকাত?”

কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “ডাকাত বলতে সাধারণ চোর-ডাকাতের কথা আমি বলিনি, মা। যাদের কথা আমরা সাধারণতঃ শুনে থাকি। তারা হিংস্র, লোভী, স্বার্থপর। পরের ধন-সম্পদ লুঠ করা তাদের জীবিকা। আস্থানে যে ডাকাতির কথা শুনলাম, মা, তাতে আর কিছু নয়, লুঠ হয়েছে প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র। কর সংগ্রহের সময় আস্থানের ভাণ্ডারে যথেষ্ট শস্য এবং অর্থ সঞ্চিত থাকে বা রয়েছে – এ কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই ডাকাতরা আস্থানের শস্যভাণ্ডার কিংবা অর্থভাণ্ডার স্পর্শও করেনি। কেন? এই ডাকাতির সঙ্গে সাধারণ ডাকাতির কোন মিলই খুঁজে পাচ্ছি না। এই ডাকাতির উদ্দেশ্য অন্য কিছু…”।

কমলিমা মানতে রাজি নন, তিনি বললেন, “এ কেমন তর ডাকাতি আমি বুঝি না, কবিরাজদাদা। কিন্তু তুমি যে বললে আস্থানে তিনজন রক্ষী নিহত হয়েছে। আমাদের ছেলেরা হত্যা করতে পারবে? একথা তুমি বিশ্বাস করো?”

কবিরাজদাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিছু বললেন না। এই গ্রামে বধূ হয়ে আসা থেকে তিনি কমলিকে চেনেন, স্নেহ করেন নিজের ভগ্নীর মতো। এই মেয়েটির মনে বিরাজ করে, সারল্য, বিশ্বাস, মায়া, ভালোবাসা আর মাতৃত্ব। তার ছোট্ট মনোজগতের বাইরের বিশাল জগযে সর্বদা নিষ্ঠুর তঞ্চক ক্রূর ও কুটিল খেলায় মগ্ন রয়েছে, সে কথা কমলির কাছে কোনমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা তুলসীতলার দীপ শিখাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিন্তু আমি যে টের পাচ্ছি, মা, ধিকিধিকি আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে”।

জুজাক অনেকক্ষণ পর কথা বললেন, “এই আগুনের উৎস কি ভল্লা, কবিরাজদাদা?” কবিরাজদাদা উত্তরে “হ্যাঁ” কিংবা “না” কোন কথাই বললেন না, একই ভাবে তাকিয়ে রইলেন মঙ্গলময় স্নিগ্ধ দীপ শিখাটির দিকে। কিন্তু জুজাকের প্রশ্নের উত্তরে কবিরাজদাদা কিছু না বলাতে, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন কমলিমা, বললেন, “যারে দেখতে নারি, তার চলন ব্যাঁকা? এ তোমাদের ভীষণ অন্যায় কবিরাজদাদা। ছেলেটাকে তোমরা কোনদিনই সহজ চোখে দেখতে পারো না। ছেলেটা আমাদের গ্রামের ছোঁড়াদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। কাজ নেই কর্ম নেই, তারা অলস দিন কাটাতো। সেই আলসেমি কাটিয়ে, সে তাদের মানুষ করে তুলছে...”। প্রাথমিক উত্তেজনায় কমলিমা এতগুলো কথা বলে ফেলে একটু শান্ত সংযত হলেন, তারপর আবার বললেন, “সেই কোন কাল থেকে তোমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে নালা বয়ে চলেছে। সেই জলকে কাজে লাগিয়ে যে চাষ করা সম্ভব, সে কথা কেউ তো বলতে পারেনি। ছেলেটা সেটাও করে দেখিয়েছে। আজ আমাদের নোনাপুর এবং সুকরার কিছু চাষি নতুন কিছু আবাদী জমি পেয়েছে। নতুন কিছু ফসল ফলানোর সুযোগ পেয়েছে। এ কি কম কথা, কবিরাজদাদা?”

কমলিমায়ের কথা শেষ হতে কেউই কোন কথা বললেন না, অনেকক্ষণ চুপ করে বসে নিজেদের মনে চিন্তা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা বললেন, “ভল্লা অসুস্থ অবস্থায় যখন এসেছিল, প্রথম দেখাতেই আমি বলেছিলাম – এ ছোকরা অসাধারণ এবং বীর যোদ্ধা। মনে আছে?  পরে আমরা জানলাম, ছোকরা নির্বাসন দণ্ড পাওয়া অপরাধী। যদিও মানবিক দিক দিয়ে বিচার করলে এত গুরু দণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ কী ও করেছে? আমাদের সহজাত বিবেচনায় মনে হয়, না করেনি। দু-পাঁচ বছরের কারা দণ্ডই হয়তো ওর ন্যায্য শাস্তি হতে পারত”।

কবিরাজদাদা কিছুক্ষণ বিরতি দিলেন, কিছু চিন্তা করলেন। তারপর আবার বললেন, “প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্বাসন হয়েছে - কিন্তু নির্বাসনের জন্যে, তাকে এতদূরে রুক্ষ, উষর পশ্চিম প্রান্তে আসতে হল কেন? আমার মনে হয়েছে ও পূর্বাঞ্চলের লোক। সেক্ষেত্রে রাজধানী থেকে পূর্ব সীমান্তের দিকেই যাওয়াই ওর পক্ষে স্বাভাবিক হত। রাজধানী থেকে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব, পূর্ব সীমান্তের থেকে অনেকটাই বেশি। ছোকরা তাহলে কেন আমাদের সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। প্রশাসনের নির্দেশে?”

যদিও দুজনের মনোভাবে বিস্তর ফারাক, কিন্তু জুজাক এবং কমলিমা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কবিরাজদাদার কথা শুনছিলেন। কবিরাজদাদা একটু থেমে আবার বললেন, “রাজধানীতে যা যা ঘটেছিল, ভল্লার মুখে আমরা  সবাই শুনেছি। যাদের রাজধানীতে নিত্য যাওয়া আসা আছে, তাদের মুখেও যা শুনেছি - ভল্লা এতটুকুও মিথ্যা বলেনি। এও শুনেছি রাজধানীর সাধারণ মানুষ ভল্লার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং এই ঘটনার পর ভল্লা সাধারণের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে”।

জুজাক নির্বিকার মনেই শুনছিল, কিন্তু কমলিমা ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে কবিরাজদাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে? মানুষ চিনতে আমি মোটেই ভুল করিনি, কবিরাজদাদা”।

কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক। কিন্তু আমিও ওকে চিনতে এতটুকু ভুল করিনি, মা। শুধু দেখার চোখটাই যা আলাদা। যে কথা বলছিলাম, রাজধানীর ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, শুনেছি সেই রাত্রেই ভল্লা রাজধানী থেকে রওনা হয়েছিল। রাজধানী ছাড়ার পর চতুর্থ দিন ভোরে সে আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছিল পায়ে হেঁটে। বিপর্যস্ত অবস্থায়। রাজধানী থেকে আমাদের গ্রামের যা দুরত্ব, সেটা  তিনদিন, তিন রাত পায়ে হেঁটে আসা অসম্ভব। বিশেষ করে ওরকম অসুস্থ অবস্থায়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ও বেশিরভাগ পথটাই এসেছিল হয় ঘোড়ায় চড়ে অথবা রণপায়”। একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের গ্রাম থেকে সবথেকে কাছের চটি হল বীজপুরের জনাইয়ের চটি। সেখান থেকে ভোর ভোর রওনা হলে, পায়ে হেঁটে পরের দিন ভোরে আমাদের গ্রামে হেসেখেলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ভল্লার মতো ছোকরাদের পক্ষে ছয়-সাত প্রহরই যথেষ্ট। কিন্তু ভল্লার অনেকটাই বেশি সময় লেগেছে, কারণ ও তখন ভয়ানক অসুস্থ”।

কথা শেষ করে কবিরাজদাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এঃ লক্ষ্যকরিনি রাত্রি অর্ধ প্রহর পার হতে চলল, আমি এখন আসি”। জুজাকও যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, বললেন, “চলো, তোমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিই”।

“তুমি আবার বেরোবে কেন, জুজাক? চাঁদের আলোয় টুকটুক করে চলে যাবো”।

“তা হোক, তোমার সঙ্গে কিছুটা যাই”।

কবিরাজদাদা হাসলেন, উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলি রে, মা। রাগ করিস না। অনেক কথাই বললাম, তোর হয়তো ভালো লাগল না”।

কমলিমা সংকোচের সুরে বললেন, “আমিও অনেক কথা বলে ফেললাম, রাগ করবেন না কবিরাজদাদা”।   

 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে চললেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর জুজাক চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভল্লা কেন এখানে এসেছে, কিছু বুঝতে পারলেন, কবিরাজদাদা? তার উদ্দেশ্যটা কি?”

“ভল্লার এখানে আসার ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্যই নেই জুজাক। ভল্লা এসেছে প্রশাসনের নির্দেশে কোন বিশেষ একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ভল্লার পিছনে আছে প্রশাসনের অদৃশ্য হাত”।

“কী বলছ, কবিরাজদাদা? তাহলে তার এই নির্বাসন দণ্ড। আস্থানে শষ্পকের ওরকম অশ্রাব্য গালিগালাজ। মৃত্যুদণ্ডের হুমকি…এ সব কেন?”

কবিরাজদাদা বললেন, “সবটাই সাজানো – নাটক। সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া…। তবে এটাও ঠিক ভল্লা রাষ্ট্রের ওপর এতটাই বিশ্বস্ত, এ কাজে সে নিজের প্রাণ পণ রাখতেও এতটুকু দ্বিধা করবে না। সে কাজে যদি তার বিবেকের সায় না থাকে – তাও”।

বিস্মিত জুজাক জিজ্ঞাসা করলেন, “এভাবে একটা অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করায় রাষ্ট্রের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?”

কবিরাজদাদা মাথা নাড়লেন, জানেন না। তারপর বললেন, “তুমি এবার এসো জুজাক, আমি তো প্রায় এসেই গেছি। এবার বাড়ি যাও – কমলি একলা রয়েছে বাড়িতে”।

চলবে...

রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ১

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " মাথার পোকা "

 



 কাজের ফাঁকে ফাঁকেই সোনা পান্নাকে পড়ানো শুরু করে দিলেন। প্রথম দিকে মুখে মুখে পাখি পড়ানোর মত। ঘরের কাজ সারতে সারতে, তিনি নানান প্রশ্ন করতেন আর উত্তরও বলে দিতেন। সূর্য কোনদিকে ওঠে। সপ্তাহে কটা দিন। পক্ষ কতদিনে হয়। ক মাসে হয় বছর। গ্রহ কি, নক্ষত্র কি? মুখে মুখে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। এভাবে কিছুদিন চলার পর দুপুরে খাওয়ার পর হীরুর পুরোন বইগুলো নিয়ে পড়াতে বসলেন। স্লেট আর চকপেন্সিল দিয়ে লেখাতেও শুরু করলেন। ভোর থেকে উঠে রান্না-বান্না ছাড়াও নানান কাজ সেরে দুপুরে খাওয়ার পর যদিও ক্লান্তিতে তাঁর দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম আসে, তবু নিয়ম করে তিনি রোজ বসেন পুত্র পান্নাকে নিয়ে। বাংলা বর্ণমালা, ইংরিজি বর্ণমালা লেখা অভ্যাস করান। বাংলা এবং ইংরিজি সংখ্যা লেখাও অভ্যাস করান। মায়ের হাত ধরেই পান্না একে একে পার হয়ে চলল বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ, নিজে পড়, নিজে শেখ, ফার্স্ট বুক অব রিডিং ইত্যাদির পর্ব।

        

দীর্ঘ এই প্রস্তুতি চলতে চলতেই স্কুলে ভর্তির জন্যে পান্না পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার দিন পনের পরে অচ্যুত খুব দুশ্চিন্তা নিয়েই স্কুলে গিয়েছিলেন - অ্যাডমিশান লিস্টে পান্নার নাম আছে কিনা দেখতে! পান্নার নাম সে লিস্টে ছিল! বাড়ি ফেরার সময় বড়ো এক মাটির হাঁড়িতে অনেক রসগোল্লা কিনে অচ্যুত বাড়ি ফিরলেন। সোনার হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “পান্নাটারও একটা হিল্লে হয়ে গেল, বুঝলে?” 

দু চোখে খুশির চিকিমিকি আলো নিয়ে সোনা বললেন, “তবে? তুমি যে বলতে, আমার ভুট্‌কু, হীরুর মতো নয়, বোকাসোকা হাঁ-করা...হাত-মুখ ধুয়ে এসো, মিষ্টি দিচ্ছি, খাও...”

সোনা দুটো প্লেটে দুই ছেলেকে দুটো করে দিলেন, আর অচ্যুতের জন্যে চারটে আনলেন অন্য প্লেটে। কলতলা থেকে ঘরে ঢুকেই অচ্যুত প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো কেন? দুটো দাও। তোমার কই?”

“আমি খাচ্ছি, তোমরা খাও না?”

চৌকিতে আরাম করে বসে, একটা রসগোল্লা মুখে পুরে বললেন, “বুঝেছ, যে স্বপ্ন নিয়ে গাঁ ছেড়ে আসা, তার প্রথম ধাপটা হল। কলকাতার সেরা স্কুলে দুজনেই ভর্তি হয়ে গেল। এবার বাকিটা...”।

কাঁসার গেলাসে খাবার জল এনে অচ্যুতের প্লেটের পাশে রেখে সোনা বললেন, “সব হবে, দেখে নিও, আমাদের এত কষ্ট কী ভগবান দেখতে পাচ্ছেন না?” দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে অচ্যুত বড়ো তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সোনা আরো চারটে রসগোল্লা এনে হিরুকে দুটো দিলেন, পান্নার প্লেটেও দুটো।

পান্না খুব জোরে মাথা নেড়ে, ইঁড়ো পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি আর খাবো না, মা। আমার পেট ভরে গেছে। ওদুটো তুমি খাও”। তার ঘাড় নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাসের পাকামি, সোনার চোখ এড়াল না, তিনি বেশ উপভোগ করলেন পান্নার এই বড়ো হয়ে ওঠার অনুভব। স্নেহের হাসিমাখা মুখে বললেন, “আচ্ছা বেশ, আমি একটা খাচ্ছি, আরেকটা তুই খেয়ে নে”।

পান্না রাজি হল না, বলল, “নাঃ তুমি দুটো খাও”। পান্নার প্লেট থেকে তুলে, সোনা একটা রসগোল্লায় কামড় দিয়ে বললেন, “এত্তো আনলে কেন? খাবে কে?”

রসগোল্লা শেষ করে অচ্যুত গেলাসের জল খেলেন ঢকঢক করে, তৃপ্তির ছোট্ট ঢেঁকুর তুলে বললেন, “সন্ধ্যেবেলায় লাইব্রেরিতে পাড়ার অনেক লোকজন আসে, ওদের ডাকবো। খুশি হবে সবাই। দশ বারোজন হবে, সবার কুলোবে না?”

“আমি তো গুনিনি। কত এনেছো, আমার তো দেখে মনে হল, তাতেও বেশি হবে”।

অচ্যুত হাসতে হাসতে বললেন, “পঞ্চাশটা, তার ওপর আবার দুটো ফাউ দিয়েছে”।

“তবে? আরামসে হবে। শোনো না, ওবাড়ির দিদি আমায় খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, হিন্দু-হেয়ার-সংস্কৃত ওসব বড়ো বড়ো স্কুল... ওসব স্কুলে এক পুঁটুলি করে না দিলে, নাকি ছেলে ভর্তি হয় না। সন্ধেবেলায় হিরুর হাত দিয়ে কটা মিষ্টি পাঠিয়ে দেব?”

“কেন দেবে না, একশ বার দেবে!”

“কিন্তু, কিছু ভাববে না তো?”

“কী আবার ভাববে?”

“ওদের দু ছেলের কেউই নাকি ভর্তি হতে পারেনি, ওরা অন্য স্কুলে পড়ে। আজ আমি মিষ্টি দিলে হয়তো ভাববে, আমরা পুঁটলি ভরা টাকা দিয়ে ভর্তি করেছি? হয়তো ভাববে, মিষ্টি দিয়ে আমরা দেমাক দেখাচ্ছি”?

“যারা ভাবার, তুমি মিষ্টি  দাও বা না দাও তারা ভাববেই। কিন্তু এমন আনন্দটা পাড়াপড়শিদের সঙ্গে ভাগ না করে নিলে চলবে কেন? ও সব নিয়ে অত ভেবো না তো, তুমি!”

এর আগে মা আর বাবাকে এত খুশি হতে পান্না কোনদিন দেখেনি। আর এই খুশির কারণ যে সে নিজে, সেটাও টের পাচ্ছে বেশ!  তার মনে এখন যে অনুভূতি সেটা নিছক আনন্দের নয়, অন্য কিছুর। সেটা ঠিক কী, তা সে জানে না, বড় হতে হতে সে একদিন বুঝবে, এরই নাম সাফল্য! সন্ধেবেলা পাড়ার অনেক জ্যেঠু – কাকুরা এলেন। সকলেই খুব প্রশংসা করলেন দুই ভাইয়ের। এক কাকু, বললেন, “তুইও পান্না, আমিও পান্না। আমারও নাম পান্না, জানিস তো? তুই আর আমি আজ থেকে ভাই-ভাই, বুঝলি?” হেসে পান্নার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তাঁদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক এ পাড়ার গণ্য-মান্য বিজয় জ্যেঠু বললেন, “আপনি দেখালেন বটে অচ্যুতবাবু, এ পাড়ায় আমার সাতপুরুষের বাস, এ পাড়ার কোন ছেলে হিন্দু স্কুলে পড়েছে...কই তেমন তো মনে আসছে না! আর আপনি এই কবছর আগে এপাড়ায় ভাড়া এসে, দুই ছেলেকেই ঢুকিয়ে ফেললেন? নাঃ আপনাকে আর বৌমাকেও...বলিহারি যাই...এ একেবারে যেন অসাধ্য সাধন! আপনার ছেলেদুটিও যে রত্ন, এ কথা স্বীকার করতেই হবে”। পান্নাকাকু সেকথার জের টেনে হাসতে হাসতে বললেন, “হীরক আর পান্না, যেমন নাম তেমনই কাম...”!

সোনা বাইরে বের হননি, মাথায় ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। পান্না দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে। তার দায়িত্ব ছিল, কাকু-জ্যেঠুদের মিষ্টি দেওয়া, খাবার জল দেওয়া – অন্তরালে থাকা মায়ের সাহায্য করা। হঠাৎ পান্না দেখল, ঘোমটার মধ্যে মুখ ঢেকে মা যেন কাঁদছেন! কী আশ্চর্য, সব্বাই আনন্দ করছে, কত কত ভালো ভালো কথা বলছে, কিন্তু মা কাঁদছেন কেন? পান্না মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ের হাতে নাড়া দিয়ে মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, “ও মা, কাঁদছো কেন?”

ঘোমটা সামান্য ফাঁক করে, মুখে আঙুল দিয়ে সোনা পান্নাকে ইশারা করলেন, চুপ। পান্না আরো অবাক হয়ে দেখল, মায়ের মুখে অদ্ভূত এক মায়ার হাসি, কিন্তু তাঁর দুচোখ ভেসে যাছে অশ্রুতে! সোনা একটা হাত ধরে পান্নাকে কাছে টেনে নিলেন, পান্নার মাথায় হাত রেখে, ঘোমটার খুঁট দিয়ে চোখদুটো মুছে নিলেন; তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে পান্নাকে অস্ফুট স্বরে বললেন, “কই কাঁদছি?”

চলবে...


শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৩

   ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২ 


তৃতীয় পর্ব  


মৌর্য পরবর্তী ভারতীয় মুদ্রা

আগের পর্বে মৌর্য যুগের মুদ্রা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলাম এবং এও বলেছিলাম সম্রাট এবং রাজাদের প্রচলন করা সোনা, রূপো বা তামার মুদ্রার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিকল্প মুদ্রা হিসাবে কড়িরও বহুল প্রচলন ছিল।  এবারে মৌর্যদের পরবর্তী যুগের মুদ্রা নিয়েও কিছু আলোচনা করা যাক।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যটিকে দুর্বল আঞ্চলিক রাজারা ছোট ছোট রাজ্যে ভেঙে নিয়ে রাজ্য শাসন করতে শুরু করল। এই ডামাডোলের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে শুরু করল নানান জাতি, যেমন গ্রীক, ব্যক্ট্রিয়ান ইত্যাদি এবং তাদের পিছনে পিছনে প্রবেশ করতে লাগল মধ্য এশিয়ার নানান উপজাতিও যেমন পার্থিয়ান বা পহ্লব, কুষাণ, শক ইত্যাদি – এদের সকলেই ছিল যাযাবর ও পশুপালক গোষ্ঠী।

গ্রীক এবং ব্যাক্ট্রিয়ানরা বালুচিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আধুনিক ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশ পর্যন্ত বেশ বড়-সড় সাম্রাজ্য বিস্তার করে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজত্ব করেছিল। ইতিহাসে তাদের পরিচয় ইন্দো-গ্রীক (Indo-Greek)। তাদের প্রবর্তিত রূপোর মুদ্রার একটি নমুনা নীচেয় দেখা যাবে। এটির সোজা পিঠে গ্রীসের কোন না কোন দেব-দেবীর ছবি আর উল্টোদিক থাকত যে রাজার নামে মুদ্রা প্রচলিত হয়েছিল, তাঁর ছবি।                  



 পহ্লবদের উৎখাত করে কুষাণরা ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমপ্রান্ত থেকে মগধ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করে মোটামুটি ১০০ বিসিই-র কাছাকাছি সময়ে। কুষাণ বংশের প্রথম বিখ্যাত রাজা ছিলেন ভিমা কদফিসিস এবং কণিষ্ক ছিলেন এই বংশের সুবিখ্যাত সম্রাট। কুষাণ যুগের বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে – যার মধ্যে প্রথমদিকের মুদ্রাগুলিতে গ্রীস ও মেসোপটেমিয়ার প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু পরবর্তীকালে ভারতীয় সংস্কৃতির স্পর্শে সেই মুদ্রায় শিব, বুদ্ধ এবং কার্তিকের ছবিও মুদ্রিত হত। নীচের ছবিতে একটি স্বর্ণমুদ্রার উভয় পিঠের ছবি দেখতে পাওয়া যাবে।            

 Kushan _Coins

৭৮ সি.ই.তে ইন্দো-গ্রীক রাজাদের হারিয়ে শক রাজারা ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই ৭৮ সি.ই. থেকেই শকাব্দ গণনার শুরু এবং স্বাধীন ভারতের জাতীয় ক্যালেণ্ডারে এই বর্ষ গণনাকেই মান্যতা দেওয়া হয়। ইতিহাসে এই শকদের পশ্চিম-ক্ষত্রপও বলা হয়ে থাকে। শকদের মুদ্রার সঙ্গে ইন্দো-গ্রীক মুদ্রার অনেকটাই মিল ছিল। রূপোর মুদ্রার একদিকে রাজার ছবি থাকত আর উল্টোদিকে, প্রথম দিকে গ্রীসের দেবদেবীর ছবি থাকলেও, পরবর্তী কালে বৌদ্ধ স্তূপ বা চৈত্যের ছবি থাকত। মুদ্রার বিবরণ সাধারণতঃ গ্রীক, ব্রাহ্মী এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে খরোষ্ঠীলিপিতে লেখা হত। গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ইতিহাস থেকে এই শক বা পশ্চিমক্ষত্রপদের প্রভাব খর্ব হয়ে যায়।


গুপ্তযুগের ভারতীয় মুদ্রা  

ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগকে ঐতিহাসিকরা সুবর্ণযুগ বলে বর্ণনা করেন। তার কারণ এই সময়কালে সর্ব বিষয়েই ভারতের চরম উৎকর্ষ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। রাজনীতি ও রাজ্যশাসন, বাণিজ্য ও অর্থনীতি, সাহিত্য- সংস্কৃতি ও নৃত্য-গীত-নাট্যকলা, বিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদ চর্চা, শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্য – এক কথায় ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরা বলতে আমরা আজ যা কিছু বুঝি, তার সব কটি ক্ষেত্রই পূর্ণ বিকশিত হয়ে উঠেছিল। এমত পরিস্থিতিতে আমাদের মুদ্রা বিজ্ঞান পিছিয়ে থাকবে এমন হতে পারে?

মগধ অঞ্চলে গুপ্তবংশের রাজ্যপাটের সূচনা হয়েছিল শ্রীগুপ্তর হাত ধরে, মোটামুটি ২৭৩ সি.ই.-তে। কিন্তু সে রাজ্যকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৩৫ সি.ই.), সমুদ্রগুপ্ত (৩৩৫-৩৭২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য (৩৭৫-৪১৫ সি.ই.)। তারপরে উল্লেখযোগ্য সম্রাটরা হলেন কুমারগুপ্ত (৪১৫-৪৫৫ সি.ই.) এবং স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫ – ৪৬৭ সি.ই.)। স্কন্দগুপ্তের অকালমৃত্যু এবং হুণদের প্রবল আক্রমণের কারণে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন দ্রুত ঘনিয়ে আসে।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত থেকে স্কন্দগুপ্ত পর্যন্ত গুপ্তবংশের সকল সম্রাট, নিজ নিজ রাজত্বকালে নতুন নতুন মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। প্রধানতঃ স্বর্ণমুদ্রা হলেও, তাঁরা রূপো ও তামার মুদ্রারও প্রবর্তিত করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রাগুলি মূলতঃ কুষাণ ও পশ্চিম-ক্ষত্রপদের মুদ্রাসমূহের অনুসারী হলেও, গুণমানে এবং লিপি ও শিল্প সুষমায় প্রত্যেকটি অনন্য। বিবিধ ঘটনা উপলক্ষে এবং বিচিত্র চিত্রসজ্জার মুদ্রা প্রচলনে গুপ্ত সম্রাটরা বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। নীচের চিত্রে অপূর্ব সুন্দর সেই মুদ্রাগুলির কথাই এখন বলব। মুদ্রার ছবিগুলিতে বাঁদিকের চিত্রটি মুদ্রার সামনের দিক (Obverse বা Head) এবং ডানদিকেরটি মুদ্রার পিছন দিক (Reverse বা Tail) দেখানো হয়েছে।  

   মুদ্রার ওজন ৭.৪৬ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।        

বাঁদিকে যজ্ঞবেদীতে উৎসর্গরত সমুদ্রগুপ্ত, তাঁর হাতে রাজদণ্ড, তাঁর বাঁহাতের নীচে ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “সমুদ্র”। ডানদিকে সিংহাসনে বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা “পরাক্রমঃ”।           

  

   মুদ্রার ওজন ৭.৪৪ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।

বাঁদিকে লিচ্ছবি রাজকুমারী রাণি কুমারদেবী এবং প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।  ব্রাহ্মীলিপিতে রাণির বাঁদিকে লেখা “কুমারদেবী” এবং রাজার ডানদিকে “চন্দ্রগুপ্ত”। ডানদিকে সিংহের পিঠে উপবিষ্টা দেবী (সম্ভবতঃ দুর্গা), তাঁর মাথায় মুকুট। দেবীর ডানদিকে ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “লিচ্ছবায়া”।

প্রসঙ্গতঃ চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবির রাজকুমারী কুমারদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, এই স্বর্ণমুদ্রা থেকে এবং চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শিলানির্দেশে নিজেকে “লিচ্ছবিদৌহিত্র” বলে উল্লেখ করেছেন।

 

     মুদ্রার ওজন ৭.২৭ গ্রাম, ব্যাস – ১৯ মিমি।

বাঁদিকে জনৈক অনুচর সহ রাজার ছবি – দুজনের হাতেই পরশু দণ্ড। ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “কৃ”। ডানদিকে সিংহাসনে বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা “কৃতান্তপরশু”। কৃতান্ত মানে যম বা মৃত্যু, পরশু মানে কুঠার, যুদ্ধাস্ত্র। এটি সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা, তিনিই দীর্ঘ যুদ্ধবিজয়ের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তার বাড়িয়েছিলেন।

     মুদ্রার ওজন ৭.৪৬ গ্রাম, ব্যাস – ২১ মিমি।

এটিও সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা, তিনি দীর্ঘ যুদ্ধবিজয় করে সাম্রাজ্যবিস্তারের পর অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। বাঁদিকে যূপ-কাষ্ঠের সামনে বলিপ্রদত্ত ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, তার পেটের নীচে লেখা “সি” – যার অর্থ হতে পারে সিদ্ধম্‌।  ডানদিকে রাণি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর ডানহাতে চামরদণ্ড এবং বাঁহাতে বস্ত্রখণ্ড। রাণির ডানদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা “অশ্বমেধপরাক্রম”।

 মুদ্রার ওজন ৭.৮৫ গ্রাম, ব্যাস -২০ মিমি।

এই মুদ্রায় রয়েছে বীণাবাদনরত সমুদ্রগুপ্তের ছবি (বাঁদিকে), তিনি উচ্চপিঠ যুক্ত আসনে বসে আছেন, তাঁর কোলে শোয়ানো রয়েছে বীণাটি। ডানদিকে একটি টুল বা (বাঁশ বা বেত দিয়ে বোনা) মোড়ায় বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। দেবীর ডানদিকে লেখা রয়েছে “সমুদ্রগুপ্ত”।

  মুদ্রার ওজন ৭.৫৮ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।

রাজার বাঁদিকে থাকা একটি বাঘের দিকে, ডানহাতে ধরে থাকা ধনুক থেকে রাজা তির ছুঁড়ছেন। তাঁর ডানদিকে লেখা আছে “ব্যাঘ্রপরাক্রম”। আর ডানদিকে মকর-বাহনা গঙ্গাদেবীর ডান হাতে যেন রাজদণ্ড এবং বাঁহাতে দীর্ঘ মৃণালসহ একটি পদ্মফুল। দেবীর ডানদিকে লেখা আছে “সমুদ্রগুপ্ত”।

 

 মুদ্রার ওজন ৭.২৯ গ্রাম, ব্যাস – ১৯ মিমি।

অনবদ্য এই মুদ্রাটি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তর। হাঁ করে তেড়ে আসা সিংহের বুকে তির ছুঁড়ছেন রাজা (বাঁ দিকে)। এই মুদ্রায় সিংহ ও রাজা উভয়ের চিত্রই আশ্চর্য রকমের গতিশীল, আগের মুদ্রাগুলির চিত্রর মতো আড়ষ্ট নয়। ডানদিকের সিংহের পিঠে অধিষ্ঠিতা দেবী মূর্তিটিও (হয়তো দুর্গা) অত্যন্ত প্রাণবন্ত। দেবীর ডানদিকে লেখা আছে “সিংহবিক্রম”।   

        

 মুদ্রার ওজন ৭.৬১ গ্রাম, ব্যাস - ২১ মিমি।      

এই মুদ্রায় বাঁদিকে ঘোড়ার পিঠে বসা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের যুদ্ধযাত্রার ছবিটিও অদ্ভূত গতিময় ও প্রাণবন্ত। ডানদিকে দেবী লক্ষ্মীর মাথায় মুকুট এবং বাঁহাতে দীর্ঘ মৃণাল সহ পদ্মফুল। দেবীর ডানদিকে লেখা “অজিতবিক্রম”।

 

গুপ্ত পরবর্তী ভারতীয় মুদ্রা

মৌর্য সাম্রাজ্যের পর যেমন ঘটেছিল, গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরও একই ঘটনা ঘটল – ছোট ছোট দুর্বল রাজ্যে ভাগ হয়ে গেল সমগ্র সাম্রাজ্য। সেই রাজ্যগুলির শক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকার দরুন, অবনতি ঘটতে লাগল শাসন ব্যবস্থার, অর্থনীতির এবং মুদ্রা শিল্পেরও। যে উৎকর্ষতায় পৌঁছেছিল গুপ্তযুগের মুদ্রা ব্যবস্থার – অচিরেই তার পতন ঘটল। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তফাৎটা সহজেই টের পাওয়া যাবে।


  মুদ্রার ওজন ২.০৭ গ্রাম, ব্যাস - ১২ মিমি।

কলচুরি রাজ কৃষ্ণরাজা (৫৫০-৫৭৫ সি.ই.)-র প্রচলিত রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল রূপক বা দ্রাখমা। বাঁদিকে রাজার মাথার চিত্র, ডান দিকে উপবিষ্ট নন্দীর (শিবের বাহন) চিত্র। তাকে ঘিরে ব্রাহ্মীতে লেখা “পরম মহেশ্বর মাতা পিতৃ পদানুধ্যাতা শ্রীকৃষ্ণ”।

Coin of Harshavardhana, c. 606–647 CE. Obverse: portrait of Harshavardhana with a crescent over the head. Reverse: Fan-tailed Garuda standing facing.[1] of Pushyabhuti dynasty

হর্ষবর্ধনের (৬০৬ – ৬৪৭ সি.ই.) রৌপ্যমুদ্রা। একদিকে মাথায় চন্দ্রচিহ্ন নিয়ে হর্ষবর্ধনের মুখ। আর উলটো দিকে মুক্ত পেখম গরুড় (ময়ূর?)।  

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর ভারতের খণ্ড-বিখণ্ড ছোট-বড়ো প্রতিবেশী রাজ্যগুলি নিজেদের মধ্যে নিত্য নতুন যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত থাকত এবং সেই যুদ্ধে এতই শক্তিক্ষয় এবং অর্থক্ষয় হত, শক্তিশালী প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হত না। তার প্রতিফলন পাওয়া যায় সমসাময়িক রাজ্যগুলিতে বৈচিত্রহীন এবং কিছুটা যেন দায়সারা-কাজচলা গোছের মুদ্রার প্রচলন দেখে। প্রসঙ্গতঃ আরো একটি কথা বলে রাখা ভাল, এই পর্যায়ে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন অতি সামান্য – অধিকাংশ মুদ্রাই ছিল হয় রূপোর বা তামার। অতএব জনসাধারণকে মুদ্রার বিকল্প হিসেবে কড়িকেই ব্যবহার করতে দেখা গেছে আরও বেশি করে – যে কথা আগের পর্বেই বলেছি।

উত্তর ভারতের এই পর্যায় শেষ করার আগে আমাদের বাংলার পালরাজাদের মুদ্রা নিয়েও দুচার কথা বলিঃ-

 

-   ওজন ৭.৫৯ গ্রাম, ব্যাস – ২১ মিমি।

পাল যুগের একমাত্র স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন ধর্মপাল (৭৭৫-৮৩০ সি.ই.)। বাঁদিকে ঘোড়ার পিঠে রাজা ধর্মপাল কোন এক পশুকে বর্শাবিদ্ধ করছেন – হয়তো কোন মৃগয়ার দৃশ্য। তাঁর বাঁদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা “শ্রীমান ধর্মপাল”। ডানদিকে পদ্মাসনে উপবিষ্টা লক্ষ্মীদেবী দুই হাতে দুটি পদ্ম ধরে আছেন। তাঁর মাথার বাঁদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা আছে “শ্রী”।

Pala Dynasty Coin - coinsstuff    

পাল রাজত্বে বহুল প্রচলিত নানা ধরনের রৌপ্যমুদ্রার নমুনা – অধিকাংশই কালের প্রভাবে মসৃণ হয়ে গেছে।

 

দক্ষিণ ভারতের মুদ্রা

 দক্ষিণ ভারতীয় মুদ্রায় প্রধানতঃ রাজবংশের প্রতীক ও নকশা ব্যবহৃত হত। যেমন চালুক্যদের প্রতীক ছিল বরাহ, পল্লবদের ষাঁড়, চোলদের বাঘ, পাণ্ড্য বা আলুপা-দের মাছ, চেরাদের তির-ধনুক এবং হোয়সলদের সিংহ। দেবগিরির যাদবরা “পদ্মটংক” নামে একটি স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেছিল – যার সামনের দিকে ছিল অষ্টদল পদ্ম, কিন্তু উল্টোদিকে কোন মুদ্রিত চিত্রই ছিল না। মুদ্রা-প্রচলনকারী রাজাদের নাম ও উপাধি মুদ্রাগুলির গায়ে আঞ্চলিক লিপি ও ভাষায় লেখা হত।

 

১১শ-১৩শ শতাব্দীর চেরাদের রৌপ্য মুদ্রা।

 

১১শ-১৩শ শতাব্দীর চেরাদের রৌপ্য মুদ্রা।

৯ম-১৩শ শতাব্দীর চোলদের স্বর্ণ মুদ্রা।

১১শ-১৩শ শতাব্দীর উদিপির আলুপাদের স্বর্ণমুদ্রা।

১২শ-১৪শ শতাব্দীতে দেবগিরির যাদবদের পদ্মটংক স্বর্ণ মুদ্রা।


দক্ষিণ ভারতের এই সময়কালের মুদ্রাগুলিতে কোন রকম অলংকরণ কিংবা দেব-দেবীদের চিত্র প্রায় থাকতই না। মুদ্রাগুলির এই বৈশিষ্ট্য প্রথম পাওয়া যায় মধ্যযুগের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের (চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী সি.ই.) মুদ্রাগুলিতে। সে আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে।

 

চলবে...         


কৃতজ্ঞতাঃ 

https://coinindia.com, 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.       


শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬

গীতা - ১৮শ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের সপ্তদশ অধ্যায়ঃ শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৭শ পর্ব "



অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ মোক্ষযোগ

অর্জুন উবাচ

সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্‌।

ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্‌ কেশিনিষূদন।।

অর্জুন উবাচ

সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বম্‌ ইচ্ছামি বেদিতুম্‌।

ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্‌ কেশিনিষূদন।।

অর্জুন বললেন- হে হৃষীকেশ, হে মহাবীর কেশিনিষূদন, আমি সন্ন্যাস এবং ত্যাগ - এই দুই তত্ত্ব আলাদাভাবে জানতে চাই।

[হৃষীক শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয় বা ঈন্দ্রিয়সমূহ, ঈশ মানে ঈশ্বর। অর্থাৎ সকল ঈন্দ্রিয়কে যিনি জয় করেছেন, বা সকল ইন্দ্রিয়ের যিনি নিয়ামক - তিনি শ্রেষ্ঠ তাপস, তিনিই হৃষীকেশ।

অন্যদিকে তিনি মহাবীরও বটেন, কারণ মথুরায় গিয়ে কংসের সামনাসামনি হওয়ার আগে, কংসের অনুচর প্রবল পরাক্রম মল্লবীর কেশীকে তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন।

প্রকৃত সন্ন্যাসীরা অলৌকিক তেজস্বী হতেও পারেন কিন্তু তাঁরা সাধারণতঃ শীর্ণদেহ দুর্বলকায় হয়ে থাকেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সর্বেন্দ্রিয়জয়ী সন্ন্যাসী হয়েও মহাবীর – সে কথাটিই স্মরণ করে অর্জুন প্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণকে দুটি নামে সম্বোধন করে – সন্ন্যাস ও ত্যাগ - এই দুই তত্ত্ব জানতে চাইলেন। অর্থাৎ অপার্থিব এবং পার্থিব সর্ব শক্তিতেই অমিতশৌর্যবান শ্রীকৃষ্ণের মতো মহাচার্য কে আর হতে পারেন?]      

 

শ্রীভগবানুবাচ

কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ঃ বিদুঃ।

সর্ব-কর্ম-ফল-ত্যাগং প্রাহুঃ ত্যাগং বিচক্ষণাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন- পণ্ডিতগণ ফলের প্রত্যাশী সকল কর্মের ত্যাগকে সন্ন্যাস বলেন এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সমস্ত কর্মের ফল ত্যাগ করাকেই ত্যাগ বলেন।

 

ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ।

যজ্ঞদানতপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে।।

ত্যাজ্যং দোষবৎ ইতি একে কর্ম প্রাহুঃ মনীষিণঃ।

যজ্ঞ-দান-তপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যম্‌ ইতি চ অপরে।।

কোন কোন মনীষি বলেন কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ, কারণ কর্ম দোষের হেতু। আবার কোন মনীষি বলেন যজ্ঞ, দান এবং তপস্যার মতো কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়।

 

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।

ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সম্প্রকীর্তিতঃ।।

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।

ত্যাগঃ হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সম্প্রকীর্তিতঃ।।

হে ভরতকুল শ্রেষ্ঠ, এই ত্যাগ বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত আমি তোমাকে বলছি, শোন। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রে বলা আছে যে ত্যাগও তিন প্রকারের হয়।

 

যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যমেব তৎ।

যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্‌।।

যজ্ঞ-দান-তপঃ-কর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যম্‌ এব তৎ।

যজ্ঞঃ দানং তপঃ চ এব পাবনানি মনীষিণাম্‌।।

যজ্ঞ, দান ও তপস্যা কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়, এই সকল কর্ম কর্তব্য। কারণ যজ্ঞ, দান এবং তপস্যার অভ্যাসেই মনীষিগণের চিত্তশুদ্ধি হয়।

 

এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।

কর্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্‌।।

এতানি অপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।

কর্তব্যানি ইতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতম্‌ উত্তমম্‌।।

হে পার্থ, এই সমস্ত কর্ম কিন্তু ফলের আশা ত্যাগ ক’রে নিরাসক্ত মনে করা উচিৎ। এই আমার নিশ্চিত ও উত্তম সিদ্ধান্ত।

 

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে।

মোহাৎ তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণঃ ন উপপদ্যতে।

মোহাৎ তস্য পরিত্যাগঃ তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

নিত্যকর্ম ত্যাগ করাও কিন্তু উচিৎ নয়। অজ্ঞানতার কারণে নিত্যকর্ম ত্যাগকে তামসিক ত্যাগ বলা হয়ে থাকে।

 

দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ।

স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ।।

দুঃখম্‌ ইতি এব যৎ কর্ম কায়-ক্লেশ-ভয়াৎ ত্যজেৎ।

স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং ন এব ত্যাগফলং লভেৎ।।

যে ব্যক্তি কর্মে দেহের কষ্ট, এই ভয়ে কর্মত্যাগ করেন, তিনি রাজসিক ত্যাগ করে ত্যাগের ফলস্বরূপ পরমমুক্তি লাভ করতে পারেন না।

 

  ৯

কার্যমিত্যেব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তেঽর্জুন।

  সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ।।

কার্যম্‌ ইতি এব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তে অর্জুন।

সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলং চ এব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকঃ মতঃ।।

হে অর্জুন, নিরাসক্ত চিত্তে, ফলের কামনা না করে যে সকল নিত্য কর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, সেই আসক্তি ও ফলের কামনা ত্যাগই সাত্ত্বিক ত্যাগ – এই আমার অভিমত।

 

১০

ন দ্বেষ্ট্যকুশলং কর্ম কুশলে নানুষজ্জতে।

ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।

ন দ্বেষ্টি অকুশলং কর্ম কুশলে ন অনুষজ্জতে।

ত্যাগী সত্ত্ব-সমাবিষ্টঃ মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।

সত্ত্বগুণ সম্পন্ন, মেধাবী ও নিঃসংশয় ত্যাগীগণ না কষ্টকর কর্মে বিরক্ত হন, না সহজ কর্মে আসক্ত হন।

 

১১

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।

যস্তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।।

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণি অশেষতঃ।

যঃ তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগী ইতি অভিধীয়তে।।

যেহেতু দেহ বিশিষ্ট জীবের নিঃশেষে সমস্ত কর্ম ত্যাগ সম্ভব নয়, সেহেতু যিনি কর্ম থেকে কোন ফলের প্রত্যাশা করেন না, তিনিই ত্যাগীরূপে অভিহিত হন।

  

১২

অনিষ্টমিষ্টং মিশ্রঞ্চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্‌।

ভবত্যত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।।

অনিষ্টম্‌ ইষ্টং মিশ্রং চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্‌।

ভবতি অত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।।

যাঁরা অত্যাগী তাঁরা মৃত্যুর পর ইষ্ট, অনিষ্ট এবং মিশ্র এই তিন ধরনের কর্মফল লাভ করে থাকেন, সন্ন্যাসীদের কোনভাবেই কোন ফললাভ করতে হয় না।

[ইষ্ট মানে পুণ্যফল – দেবলোক প্রাপ্তি, অনিষ্ট মানে পাপফল- নীচলোক প্রাপ্তি, মিশ্র মানে মধ্যফল – মনুষ্যলোক প্রাপ্তি]

 

১৩

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে।

সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্বকর্মণাম্‌।।

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে।

সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্বকর্মণাম্‌।।

হে মহাবীর অর্জুন, সর্বকর্মের অন্তস্বরূপ সাংখ্যে সকল কর্মের সিদ্ধিলাভের পাঁচটি কারণ বর্ণনা করা আছে, সেই কারণগুলি তুমি আমার থেকে জান।

 

১৪

অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণঞ্চ পৃথগ্বিধম্‌।

বিবিধাশ্চ পৃথক্‌ চেষ্টা দৈবঞ্চৈবাত্র পঞ্চমম্‌।।

অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণং চ পৃথক্‌ বিধম্‌।

বিবিধাঃ চ পৃথক্‌ চেষ্টা দৈবং চ এব অত্র পঞ্চমম্‌।।

জীবের দেহ, তার কর্তারূপ অহংকার, ইন্দ্রিয়রূপ বিভিন্ন করণ, জীবের নানাবিধ কর্ম প্রচেষ্টা আর এদের মধ্যে পঞ্চম দৈব

 

 

১৫

শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।

ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।।

শরীর-বাক্‌- মনোভিঃ যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।

ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চ এতে তস্য হেতবঃ।।

শরীর, বাক্য ও মন দিয়ে মানুষ যে ন্যায় এবং অন্যায় কর্ম করে, সেই সমস্ত কর্মেরই কারণ এই পাঁচটি।

 

১৬

তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মানং কেবলন্তু যঃ।

পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।

তত্র এবং সতি কর্তারম্‌ আত্মানং কেবলম্‌ তু যঃ।

পশ্যতি অকৃত-বুদ্ধিত্বাৎ ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।

এই পঞ্চ কারণ থাকলেও যে মোহান্ধ বুদ্ধিহীন ব্যক্তি শুদ্ধ আত্মাকে সকল কর্মের কর্তারূপে দেখে, দুর্বুদ্ধির কারণে সে সম্যক দেখতে পায় না।

 

১৭

যস্য নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে।

হত্বাপি স ইমাঁল্লোকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।

যস্য ন অহঙ্কৃতো ভাবঃ বুদ্ধিঃ যস্য ন লিপ্যতে।

হত্বা অপি স ইমান্‌ লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।

যাঁর অহংকার ও আমিই কর্তা এমন ভাব নেই, যাঁর কর্মফলে বুদ্ধি সংলিপ্ত নয়, তিনি এই জগতের সমস্ত জীবকে হত্যা করেও হত্যা করেন না, এবং এই হত্যাক্রিয়ার ফলে তিনি অধর্মে আবদ্ধ হন না।

 

১৮

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।

করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।

করণং কর্ম কর্তা ইতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা - কর্মে প্রবৃত্তির হেতু এই তিন প্রকার। করণ, ক্রিয়া এবং কর্তা – এই তিনটি কর্মের আশ্রয়।

[অর্থাৎ আত্মা কর্ম প্রবৃত্তির হেতুও নন, কর্মের আশ্রয়ও নন]

 

১৯

জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ।

প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্যপি।।

জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধা এব গুণভেদতঃ।

প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবৎ শৃণু তানি অপি।।

সাংখ্যশাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণভেদে তিনি প্রকারের বলা হয়েছে। সেই তিন ভেদের তত্ত্বটি যথাযথ শোন।

 

২০

সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।

অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ্‌জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্‌।।

সর্বভূতেষু যেন একং ভাবম্‌ অব্যয়ম্‌ ঈক্ষতে।

অবিভক্তং বিভক্তেষু তৎ জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্‌।।

যে জ্ঞানে বহু বিভক্ত সমস্ত ভূতকে একটি অবিভক্ত অব্যয় ভাবে উপলব্ধি করা যায়, সেই জ্ঞানকে সাত্ত্বিক জ্ঞান বলেই জানবে।

[এই জ্ঞান অদ্বৈত আত্মদর্শনের জ্ঞান]

 

২১

পৃথক্‌ত্বেন তু যজ্‌জ্ঞানং নানাভাবান্‌ পৃথগ্বিধান্‌।

বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তজ্‌জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

পৃথক্‌ত্বেন তু যৎ জ্ঞানং নানাভাবান্‌ পৃথক্‌ বিধান্‌।

বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তৎ জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

কিন্তু যে জ্ঞান সর্ব ভূতের প্রত্যেক দেহ স্থিত আত্মাকে, পৃথক পৃথক ভাবলক্ষণের আত্মা বলে জানে, সেই জ্ঞানকে রাজসিক জ্ঞান বলেই জেনে রাখো।

 

২২

যৎ তু কৃৎস্নবদেকস্মিন্‌ কার্যে সক্তমহৈতুকম্‌।

অতত্ত্বার্থবদল্পঞ্চ তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ তু কৃৎস্নবৎ একস্মিন্‌ কার্যে সক্তম্‌ অহৈতুকম্‌।

অতত্ত্বার্থবৎ অল্পঞ্চ তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

আর যে জ্ঞান কোন একটি বিশেষ কার্য অনুষ্ঠানে, সমগ্রভাবে আসক্ত হয়; যুক্তিহীন, ভ্রান্ততত্ত্ব এবং তুচ্ছ সেই জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলেই জানবে।

 

২৩

নিয়তং সঙ্গরহিতমরাগদ্বেষতঃ কৃতম্‌।

অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকমুচ্যতে।।

নিয়তং সঙ্গরহিতম্‌ অরাগ-দ্বেষতঃ কৃতম্‌।

অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকম্‌ উচ্যতে।।

রাগ-দ্বেষহীন, ফলের প্রত্যাশাহীন, আসক্তিশূণ্য কর্তব্যের যে নিত্যকর্ম অনুষ্ঠান - তাকেই সাত্ত্বিক কর্ম বলে।

 

২৪

যৎ তু কামেপ্সুনা কর্ম সাহঙ্কারেণ বা পুনঃ।

ক্রিয়তে বহুলায়াসং তদ্‌ রাজসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ তু কাম-ইপ্সুনা কর্ম স-অহঙ্কারেণ বা পুনঃ।

ক্রিয়তে বহুল-আয়াসং তৎ রাজসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

আবার ফলের প্রত্যাশায়, মনে অহংকার নিয়ে, বহু কষ্টসাধ্য কোন কর্ম অনুষ্ঠান করলেও তাকে রাজসিক কর্ম বলা হয়।

 

২৫

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসামনপেক্ষ্য চ পৌরুষম্‌।

মোহাদারভ্যতে কর্ম যৎ তৎ তামসমুচ্যতে।।

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসাম্‌ অনপেক্ষ্য চ পৌরুষম্‌।

মোহাৎ আরভ্যতে কর্ম যৎ তৎ তামসম্‌ উচ্যতে।।

আর শুভ বা অশুভ পরিণাম বিচার না করে, ক্ষতি, হিংসা এবং সামর্থ্য বিবেচনা না করে, মোহে আচ্ছন্ন হয়ে যে কর্ম অনুষ্ঠান, তাকে তামসিক কর্ম বলা হয়।

 

২৬

মুক্তসঙ্গোঽনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ।

সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।

মুক্ত-সঙ্গঃ অনহংবাদী ধৃতি-উৎসাহ-সমন্বিতঃ।

সিদ্ধি-অসিদ্ধ্যোঃ-র্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।

আসক্তিহীন, অহংকারশূণ্য, ধৈর্য ও উদ্যমী, সাফল্যে এবং ব্যর্থতায় নির্বিকার হয়ে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে সাত্ত্বিক কর্তা বলা হয়।

 

২৭

রাগী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোঽশুচিঃ।

হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

রাগী কর্ম-ফল-প্রেপ্সুঃ লুব্ধঃ হিংসাত্মকঃ অশুচিঃ।

হর্ষ-শোক-অন্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

বিষয় অনুরাগী, কর্মফলের প্রত্যাশী, লোভী, হিংসাযুক্ত, অশুচি মন নিয়ে এবং আনন্দে বিহ্বল ও দুঃখে কাতর হয়ে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে রাজসিক কর্তা বলে।

 

২৮

অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোঽলসঃ।

বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।

অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠঃ নৈষ্কৃতিকঃ অলসঃ।

বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।

নিষ্ঠাহীন, অস্থিরমতি, দুর্বিনীত, প্রতারক, স্বার্থসন্ধানী, উদ্যমহীন, বিষণ্ণ মানসিকতায়, আলস্যের সঙ্গে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে তামসিক কর্তা বলে।

 

২৯

বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুণতস্ত্রিবিধং শৃণু।

প্রোচ্যমানমশেষেণ পৃথক্‌ত্বেন ধনঞ্জয়।।

বুদ্ধেঃ ভেদং ধৃতেঃ চ এব গুণতঃ ত্রিবিধং শৃণু।

প্রোচ্যমানম্‌ অশেষেণ পৃথক্‌ত্বেন ধনঞ্জয়।।

হে ধনঞ্জয়, এইবার তিনগুণ অনুসারে বুদ্ধি ও ধৃতির তিন প্রকারভেদের কথাও পৃথক পৃথক ভাবে তোমাকে সম্পূর্ণ বর্ণনা করছি, শোনো।

 

৩০

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ কার্যাকার্যে ভয়াভয়ে।

বন্ধং মোক্ষঞ্চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ কার্য-অকার্যে ভয়-অভয়ে।

বন্ধং মোক্ষং চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

হে পার্থ, যে বুদ্ধিতে, প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, কর্তব্য ও অকর্তব্য, ভয় ও অভয়, বন্ধন ও মুক্তি, সম্যক উপলব্ধি করা যায়, সেই বুদ্ধি সাত্ত্বিকী।

 

৩১

যয়া ধর্মমধর্মঞ্চ কার্যঞ্চাকার্যমেব চ।

অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।

যয়া ধর্মম্‌ অধর্মং চ কার্যং চ অকার্যম্‌ এব চ।

অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।

হে পার্থ, যে বুদ্ধিতে ধর্ম ও অধর্ম, কর্তব্য ও অকর্তব্য, নিঃসংশয়ে জানা যায় না, সেই বুদ্ধিকে রাজসিক বুদ্ধি বলে।

 

৩২

অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা।

সর্বার্থান্‌ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।

অধর্মং ধর্মম্‌ ইতি যা মন্যতে তমসা-আবৃতা।

সর্ব-অর্থান্‌ বিপরীতাং চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।

হে পার্থ, তমোভাবে আচ্ছন্ন যে বুদ্ধিতে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে হয়, যে বুদ্ধি সকল বিষয়কে বিপরীত ভাবে গ্রহণ করে, সেই বুদ্ধিকে তামসিক বুদ্ধি বলে।

 

৩৩

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।

যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃ-প্রাণ-ইন্দ্রিয়-ক্রিয়াঃ।

যোগেন-অব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

হে পার্থ, যে ধৃতি মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয়ের সকল ক্রিয়াকে সংহত করে, চিত্তকে একনিষ্ঠ যোগে, ব্রহ্মে নিত্যসমাহিত রাখে, সেই ধৃতিই সাত্ত্বিকী ধৃতি।

 

৩৪

যয়া তু ধর্মকামার্থান্‌ ধৃত্যা ধারয়তেঽর্জুন।

প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।

যয়া তু ধর্ম-কামার্থান্‌ ধৃত্যা ধারয়তে অর্জুন।

প্রসঙ্গেন ফল-আকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।

হে অর্জুন, কিন্তু যে ধৃতি কামনার জন্যেই ধর্ম, এই ধারণা সৃষ্টি করে এবং সেই প্রসঙ্গে মনকে ফলের প্রত্যাশী করে তোলে, সেই ধৃতি রাজসিক ধৃতি।

 

৩৫

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ।

ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদম্‌ এব চ।

ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।

হে পার্থ, দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি যে ধৃতির প্রভাবে অবাস্তব কল্পনা, ভয়, শোক, বিষাদ এবং বিষয়ভোগ লালসা থেকে বিমুক্ত হতে পারে না, সেই ধৃতিকে তামসিক ধৃতি বলে।

  

৩৬

সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ।

অভ্যাসাদ্‌ রমতে যত্র দুঃখান্তঞ্চ নিগচ্ছতি।।

সুখং তু ইদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরত-ঋষভ।

অভ্যাসাদ্‌ রমতে যত্র দুঃখ-অন্তং চ নিগচ্ছতি।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, এখন তুমি আমার থেকে তিন রকম সুখের তত্ত্ব শোনো, যে সুখের একনিষ্ঠ অভ্যাসে পরম আনন্দ লাভ করা যায় এবং সকল দুঃখের অবসান হয়।

 

৩৭

যৎ তদগ্রে বিষমিব পরিণামেঽমৃতোপমম্‌।

তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্‌।

যৎ তৎ অগ্রে বিষম্‌ ইব পরিণামে অমৃত-উপমম্‌।

তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তম আত্ম-বুদ্ধি-প্রসাদ-জম্‌।

যে সুখ প্রথমে বিষের মতো কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমৃতের সমান, যে সুখ আত্মজ্ঞানের প্রসাদে নিঃসৃত হয়, সেই সুখকেই সাত্ত্বিক সুখ বলে।

 

৩৮

বিষয়েন্দ্রিয়সংযোগাদ্‌ যৎ তদগ্রেঽমৃতোপমম্‌।

পরিণামে বিষমিব তৎ সুখং রাজসং স্মৃতম্‌।।

বিষয়-ইন্দ্রিয়-সংযোগাৎ যৎ তৎ অগ্রে অমৃত-উপমম্‌।

পরিণামে বিষম্‌ ইব তৎ সুখং রাজসং স্মৃতম্‌।।

বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সংযোগে যে সুখ প্রথমে অমৃতের মতো মনে হয়, কিন্তু পরিণামে বিষতুল্য হয়ে ওঠে, সেই সুখকে রাজসিক সুখ বলে।

 

৩৯

যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ।

নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ অগ্রে চ অনুবন্ধে চ সুখং মোহনম্‌ আত্মনঃ।

নিদ্রা-আলস্য-প্রমাদো-উত্থং তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

এবং যে সুখ শুরুতে এবং পরিণামেও আত্মাকে মোহে আচ্ছন্ন রাখে, যে সুখ নিদ্রা, আলস্য ও ভ্রান্তি থেকে উৎপন্ন হয়, সেই সুখকে তামসিক সুখ বলে।

 

৪০

ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।

সত্ত্বং প্রকৃতিজৈউমুক্তং যদেভিঃ স্যাৎত্রিভির্গুণৈঃ।।

ন তৎ অস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।

সত্ত্বং প্রকৃতিজৈঃ মুক্তং যৎ এভিঃ স্যাৎ ত্রিভিঃ-গুণৈঃ।।

পৃথিবীতে বা স্বর্গে, মানুষ হোক কিংবা দেবতা - এমন কোন জীব নেই, যে প্রকৃতির মায়াতে সকল বন্ধনের কারণ এই ত্রিগুণ থেকে বিমুক্ত হয়।

  

৪১

ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।।

কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ।।

ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ।।

কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাব-প্রভবৈঃ গুণৈঃ।।

হে অরিন্দম, প্রকৃতির এই ত্রিগুণের প্রভাবেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের কর্মসকল, পৃথক পৃথক বিভাগে বিভক্ত হয়েছে।

 

৪২

শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।

জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্‌।।

শমঃ দমঃ তপঃ শৌচং ক্ষান্তিঃ আর্জবম্‌ এব চ।

জ্ঞানং বিজ্ঞানম্‌ আস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্‌।।

অন্তরে ইন্দ্রিয়ের সংযম, বাহিরে ইন্দ্রিয়ের দমন, তপস্যা, শুচিতা, ক্ষমা, সারল্য, শাস্ত্রজ্ঞান, তত্ত্বের উপলব্ধি এবং আস্তিক্য বুদ্ধি – এই সমস্ত ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম।

[যার ঈশ্বরে এবং শাস্ত্র বিধানে বিশ্বাস আছে সে আস্তিক, যার বিশ্বাস নেই সে নাস্তিক]

  

৪৩

শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্‌।

দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্‌।।

শৌর্যং তেজঃ ধৃতিঃ দাক্ষ্যং যুদ্ধে চ অপি অপলায়নম্‌।

দানম্‌ ঈশ্বরভাবঃ চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্‌।।

পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা এবং যুদ্ধ থেকে পালিয়ে না যাওয়ার প্রবৃত্তি, দান, ঈশ্বরের মতো শাসন ক্ষমতা – এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের স্বাভাবিক কর্ম।

  

৪৪

কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্‌।

পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্‌।।

কৃষি-গৌরক্ষ্য-বাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্‌।

পরিচর্যা-আত্মকং কর্ম শূদ্রস্য অপি স্বভাবজম্‌।।

বৈশ্যের স্বাভাবিক কর্ম - কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য আর সেবামূলক কাজই শূদ্রের পক্ষে স্বাভাবিক।

 

৪৫

স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধি লভতে নরঃ।

স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু।।

স্বে স্বে কর্মণি অভিরতঃ সংসিদ্ধি লভতে নরঃ।

স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তৎ শৃণু।।

বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত থেকেই মানুষ সিদ্ধি লাভ করতে পারে, স্বকর্মে নিরত ব্যক্তি কিভাবে সিদ্ধিলাভ করে, সেই কথাই এখন শোনো।

 

৪৬

যতঃ প্রবৃত্তির্ভূতানাং যেন সর্বমিদং ততম্‌।

স্বকর্মণা তমভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবম্‌।।

যতঃ প্রবৃত্তিঃ ভূতানাং যেন সর্বম্‌ ইদং ততম্‌।

স্বকর্মণা তম্‌ অভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবম্‌।।

যিনি এই জগতের সমস্ত জীবের স্রষ্টা, যিনি এই বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র ব্যাপ্ত রয়েছেন। মানুষ নিজ নিজ স্বভাব কর্ম অনুষ্ঠান ক’রে তাঁকেই অর্চনা করে ও সিদ্ধি লাভ করে।

 

৪৭

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।

স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্মঃ বিগুণঃ পরধর্মাৎ সু-অনুষ্ঠিতাৎ।

স্বভাব-নিয়তং কর্ম কুর্বন্‌ ন আপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

স্বধর্ম পালনে কোন ত্রুটিও হলেও, তা পরধর্মের সুষ্ঠু অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভাল। কারণ স্বভাবজাত কর্ম অনুষ্ঠানে কোন পাপ অর্শায় না।

  

৪৮

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ।

সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষম্‌ অপি ন ত্যজেৎ।

সর্ব-আরম্ভাঃ হি দোষেণ ধূমেন অগ্নিঃ ইব আবৃতাঃ।।

হে কুন্তীপুত্র, দোষযুক্ত হলেও স্বভাব কর্ম কখনো পরিত্যাগ করবে না কারণ সমস্ত কর্মই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন অগ্নির মতো, ত্রিগুণের দোষে দুষ্ট।

 

৪৯

অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ।

নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেনাধিগচ্ছতি।।

অসক্ত-বুদ্ধিঃ সর্বত্র জিত-আত্মা বিগত-স্পৃহঃ।

নৈষ্কর্ম্য-সিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেন অধিগচ্ছতি।।

সকল বিষয়েই নিরাসক্তি ভাব, সংযত চিত্ত, ভোগের আকাঙ্খামুক্ত সন্ন্যাস অভ্যাস করলে, নিষ্ক্রিয় আত্মস্বরূপে সিদ্ধি লাভ করা যায়।

 

৫০

সিদ্ধিং প্রাপ্তো যথা ব্রহ্ম তথাপ্নোতি নিবোধ মে।

সমাসেনৈব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।।

সিদ্ধিং প্রাপ্তঃ যথা ব্রহ্ম তথা আপ্নোতি নিবোধ মে।

সমাসেন এব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।।

হে কুন্তীপুত্র, এই সিদ্ধ পুরুষ যে জ্ঞান ও নিষ্ঠায় পরমাত্মা ব্রহ্মকে লাভ করেন, যে জ্ঞান সকল জ্ঞানের শেষ কথা, সেই জ্ঞানের কথাই এখন সংক্ষেপে তোমাকে বলব।

 

৫১-৫৩

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ।

শব্দাদীন্‌ বিষয়াংস্ত্যক্ত্বা রাগদ্বেষৌ ব্যুদস্য চ।।

বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যতবাক্‌কায়মানসঃ।

ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্‌।

বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তঃ ধৃত্যা আত্মানং নিয়ম্য চ।

শব্দ-আদীন্‌ বিষয়ান্‌ ত্যক্ত্বা রাগ-দ্বেষৌ ব্যুদস্য চ।।

বিবিক্ত-সেবী লঘু-আশী যত-বাক্‌-কায়-মানসঃ।

ধ্যান-যোগ-পরঃ নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্‌।

বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তঃ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

বিশুদ্ধ বুদ্ধি ও ধৈর্য, আত্মার সংযম, ধ্বনি ইত্যাদি সমস্ত বিষয় ত্যাগ, অনুরাগ, বিরাগ ও বিদ্বেষ ত্যাগ, নির্জন স্থানে বাস, পরিমিত আহার, বাক্য, মন ও শরীরের নিয়ন্ত্রণ, সর্বদা ধ্যানযোগে একনিষ্ঠতা, অনাসক্ত বৈরাগ্য ভাব, অহংকার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ ও পরিগ্রহ থেকে নিজেকে বিমুক্ত রেখে, সকল বিষয়ে মমত্বহীন প্রশান্ত চিত্ত পুরুষ পরম ব্রহ্মজ্ঞান লাভে সমর্থ হন।    

 

৫৪

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্‌।।

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্ন-আত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মৎ ভক্তিং লভতে পরাম্‌।।

ব্রহ্মভাব লাভ করার পর, প্রসন্ন চিত্ত সদানন্দ পুরুষ কোন বিষয়ে শোক করেন না, কোন বিষয় কামনাও করেন না, সর্বভূতে সমদর্শী এই পুরুষ আমাতে পরম ভক্তি উপলব্ধি করেন।  

 

৫৫

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্‌ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।

ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্‌।।

ভক্ত্যা মাম্‌ অভিজানাতি যাবান্‌ যঃ চ অস্মি তত্ত্বতঃ।

ততঃ মাং তত্ত্বতঃ জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্‌।।

স্বরূপতঃ আমিই যে জগতের বিভিন্ন রূপভেদে অবস্থান করি, এই তত্ত্বটি একনিষ্ঠ ভক্তগণ জানতে পারেন, আমার স্বরূপ তত্ত্বটি এই ভাবে সঠিক উপলব্ধি করতে পারলে, ভক্তগণ আমাতেই প্রবেশ করেন।

      

৫৬

সর্বকর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ।

মৎপ্রসাদাদবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্‌।।

সর্বকর্মাণি অপি সদা কুর্বাণঃ মৎ ব্যাপাশ্রয়ঃ।

মৎপ্রসাদাৎ অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদম্‌ অব্যয়ম্‌।।

যে ভক্ত সর্বদা আমার শরণাগত হয়ে তার সকল কর্মব্যস্ততা আমাকে সমর্পণ করে, আমার অনুগ্রহে সেই ভক্ত, শাশ্বত ও অব্যয় পরমপদ লাভ করেন।  

 

৫৭

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ।

বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।।

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ।

বুদ্ধিযোগম্‌ উপাশ্রিত্য মৎ চিত্তঃ সততং ভব।।

সর্বদা আমার শরণাপন্ন হও, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সমস্ত কর্মের অনুষ্ঠান আমাকে সমর্পণ করো। বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে সর্বদা আমাতেই চিত্তসংযুক্ত থাকো।

 

৫৮

মচ্চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি।

অথ চেৎ ত্বমহঙ্কারান্ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।।

মৎ চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি।

অথ চেৎ ত্বম্‌ অহঙ্কারাৎ ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।।

সর্বদা আমাতে চিত্ত সংযুক্ত হলে আমার অনুগ্রহে সংসারের সকল দুঃখ তুমি অতিক্রম করতে পারবে। আর যদি আত্ম অহংকারে তুমি আমার কথা অমান্য করো, তাহলে বিনষ্ট হবে।

 

৫৯

যদহঙ্কারমাশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে।

মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্ত্বাং নিযোক্ষ্যতি।।

যৎ অহঙ্কারম্‌ আশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে।

মিথ্যা এষ ব্যবসায়ঃ তে প্রকৃতিঃ ত্বাং নিযোক্ষ্যতি।।

অহংকারের প্রভাবে তুমি মনে করছ, যুদ্ধ করবে না, কিন্তু তোমার এই সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত। কারণ তোমার স্বভাব ধর্মই তোমাকে যুদ্ধে নিয়োগ করবে।

  

৬০

স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।

কর্তুং নেচ্ছসি যন্মোহাৎ করিষ্যস্যবশোঽপি তৎ।।

স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।

কর্তুং ন ইচ্ছসি যৎ মোহাৎ করিষ্যসি অবশঃ অপি তৎ।।

হে কুন্তীপুত্র, যদিও মোহে আচ্ছন্ন থাকার জন্যে এই কর্ম অনুষ্ঠানে তোমার ইচ্ছা হচ্ছে না, কিন্তু স্বভাবতঃ তুমি নিজের ক্ষত্রিয় ধর্মে আবদ্ধ, কাজেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই কর্ম তুমি করবে।

  

৬১

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্‌ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃৎ-দেশে অর্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্‌ সর্বভূতানি যন্ত্র আরূঢ়ানি মায়য়া।।

হে অর্জুন, ঈশ্বর পরমাত্মারূপে জগতের সমস্ত জীবের হৃদয়ে বাস করেন আর মায়ার প্রভাবে, তিনিই সর্ব জীবকে যন্ত্রের মতো নিয়ন্ত্রণ করেন। 

 

৬২

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত।

তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্‌।।

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত।

তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্‌।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জীবনের সর্ব বিষয়ে তাঁর শরণাগত হও, তাঁর অনুগ্রহে পরম শান্তি ও শাশ্বত পরম ব্রহ্মপদ লাভ করবে।

 

৬৩

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্‌ গুহ্যতরং ময়া।

বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথেচ্ছসি তথা কুরু।।

ইতি তে জ্ঞানম্‌ আখ্যাতং গুহ্যাৎ গুহ্যতরং ময়া।

বিমৃশ্য এতৎ অশেষেণ যথা ইচ্ছসি তথা কুরু।।

গোপনের থেকেও মহাগোপন এই জ্ঞান আমি তোমার কাছে ব্যাখ্যা করলাম, এই তত্ত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করে তোমার যা ইচ্ছা হয় তুমি করো।

 

৬৪

সর্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ।

ইষ্টোঽসি মে দৃঢ়মিতি ততো বক্ষ্যামি তে হিতম্‌।।

সর্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ।

ইষ্টঃ অসি মে দৃঢ়ম্‌ ইতি ততঃ বক্ষ্যামি তে হিতম্‌।।

যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই সমস্ত রহস্যের সেরা রহস্যতত্ত্বের পরম ব্যাখ্যা আমি আরো একবার বলছি, শোন। এই তত্ত্ব তোমার পক্ষে একান্ত মঙ্গলকর।

 

৬৫

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্‌যাজী মাং নমস্কুরু।

মামেবৈষ্যসিসত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োঽসি মে।।

মৎ-মনা ভব মৎ-ভক্তঃ মৎ-যাজী মাং নমস্কুরু।

মাম্‌ এব এষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ঃ অসি মে।।

আমাতে তোমার মন সংযুক্ত করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো। যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই আমি তোমার কাছে সত্য প্রতিজ্ঞা করছি, আমাকে তুমি এই স্বরূপেই লাভ করবে।

 

৬৬

সর্বধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

সর্বধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মাম্‌ একং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

সমস্ত ধর্ম ও অধর্ম ত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার শরণাগত হও। অনুতাপ ক’রো না, কারণ আমিই তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে বিমুক্ত করব।

 

৬৭

ইদং তে নাঽতপস্কায় নাঽভক্তায় কদাচন।

ন চাঽশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যোঽভ্যসূয়তি।।

ইদং তে না অতপস্কায় না অভক্তায় কদাচন।

ন চ অশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যঃ অভ্যসূয়তি।।

এই শাস্ত্রতত্ত্ব তপস্যাহীন কোন ব্যক্তিকে কখনোই তোমার বলা উচিৎ নয়। যার অন্তরে ভক্তি নেই, যে শাস্ত্র কিংবা গুরুর উপদেশ শুনতে চায় না, যে আমাকে ঈশ্বর না জেনে, সাধারণ মানুষ মনে করে ঈর্ষা করে, তাদেরকেও বলবে না।

 

৬৮

য ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্তেষ্বভিধাস্যতি।

ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।।

য ইদং পরমং গুহ্যং মৎ-ভক্তেষু অভিধাস্যতি।

ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মাম্‌ এব এষ্যতি অসংশয়ঃ।।

যিনি এই পরম গোপন তত্ত্ব আমার একান্ত ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করবেন, কোন সন্দেহ নেই, তিনি আমার প্রতি পরম ভক্তিতে আমাকেই লাভ করবেন।

 

৬৯

ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ।

ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভূবি।।

ন চ তস্মাৎ মনুষ্যেষু কঃ চিৎ মে প্রিয়কৃত্তমঃ।

ভবিতা ন চ মে তস্মাৎ অন্যঃ প্রিয়তরঃ ভূবি।।

এই জগতে সমস্ত মানুষের মধ্যে, তাঁর থেকে বেশী প্রিয় আমার আর কেউ নেই এবং ভবিষ্যতেও অন্য আর কেউ হবে না।

 

৭০

অধ্যেষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্যং সংবাদমাবয়োঃ।

জ্ঞানযজ্ঞেন তেনাহমিষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ।।

অধি-এষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্যং সংবাদম্‌ আবয়োঃ।

জ্ঞানযজ্ঞেন তেন অহম্‌ ইষ্টঃ স্যাম্‌ ইতি মে মতিঃ।।

এবং যিনি আমাদের দুজনের এই ধর্মতত্ত্ব আলোচনা নিষ্ঠা নিয়ে পাঠ করবেন, আমি নিশ্চিত বলছি, তাঁর সেই জ্ঞানযজ্ঞে আমিই পূজিত হবো।

 

৭১

শ্রদ্ধাবাননসূয়শ্চ শৃণুয়াদপি যো নরঃ।

সোঽপি মুক্তঃ শুভাল্লোঁকান্‌ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্‌।।

শ্রদ্ধাবান্‌ অনসূয়ঃ চ শৃণুয়াৎ অপি যঃ নরঃ।

সঃ অপি মুক্তঃ শুভান্‌ লোকান্‌ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্‌।।

যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে ও পূর্ণ বিশ্বাসে এই ধর্মতত্ত্ব শুনবেন, সম্যক উপলব্ধি না হলেও তিনি পাপমুক্ত হয়ে, পুণ্যবান ব্যক্তি্র মত পুণ্যলোক লাভ করবেন।

  

৭২

কচ্চিদেতচ্ছ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা।

কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।

কচ্চিৎ এতৎ শ্রুতং পার্থ ত্বয়া একাগ্রেণ চেতসা।

কচ্চিৎ অজ্ঞান-সম্মোহঃ প্রনষ্টঃ তে ধনঞ্জয়।।

হে পার্থ, তুমি কি একনিষ্ঠ চিত্তে এই ধর্মশাস্ত্র শুনেছ? অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন মোহ বন্ধন থেকে, হে ধনঞ্জয়, তুমি মুক্ত হতে পারলে কি?

 

৭৩

অর্জুন উবাচ

নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।

স্থিতোঽস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।

অর্জুন উবাচ

নষ্টঃ মোহঃ স্মৃতিঃ লব্ধা ত্বৎ-প্রসাদাৎ ময়া অচ্যুত।

স্থিতঃ অস্মি গত-সন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।

অর্জুন বললেন – হে অচ্যুত কৃষ্ণ, তোমার প্রসাদে আমার মোহ দূর হয়েছে, আত্মতত্ত্বের স্মৃতি লাভ করেছি, আর আমি নিঃসংশয় হয়েছি; এখন আমি তোমার উপদেশই পালন করব।

 

৭৪

সঞ্জয় উবাচ

ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।

সংবাদমিমশ্রৌষমদ্ভুতং রোমহর্ষণম্‌।।

সঞ্জয় উবাচ

ইতি অহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।

সংবাদম্‌ ইমম অশ্রৌষম্‌ অদ্ভুতং রোমহর্ষণম্‌।।

সঞ্জয় বললেন – আমি মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত রোমাঞ্চকর তত্ত্বের আলাপ শুনলাম।

 

৭৫

ব্যাসপ্রসাদাচ্চ শ্রুতবানেতদ্‌ গুহ্যমহং পরম্‌।

যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্‌।।

ব্যাস-প্রসাদাৎ চ শ্রুতবান্‌ এতৎ গুহ্যম্‌ অহং পরম্‌।

যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্‌।।

আমি মহর্ষি ব্যাসের অনুগ্রহে দিব্য দৃষ্টিতে ও দিব্য শ্রবণে এই অত্যন্ত গোপন পরমজ্ঞানের পরমতত্ত্ব প্রত্যক্ষ শুনলাম, যার বক্তা স্বয়ং যোগেশ্বর কৃষ্ণ!

 

৭৬

রাজন্‌ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভুতম্‌।

কেশবার্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।

রাজন্‌ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদম্‌ ইমম্‌ অদ্ভুতম্‌।

কেশব-অর্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।

হে মহারাজ, ভগবান কেশব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত পবিত্র তত্ত্ব আলোচনার কথা, আমার বার বার মনে পড়ছে এবং প্রতিক্ষণে আমি পরম আনন্দ অনুভব করছি।

 

৭৭

তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ।

বিস্ময়ো মে মহান্‌ রাজন্‌ হৃষ্যামি চ পুনঃপুনঃ।।

তৎ চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপম্‌ অতি-অদ্ভুতং হরেঃ।

বিস্ময়ঃ মে মহান্‌ রাজন্‌ হৃষ্যামি চ পুনঃপুনঃ।।

হে মহারাজ, ভগবান শ্রীহরির সেই অত্যন্ত অদ্ভূত বিশ্বরূপের কথা আমার বার বার মনে পড়ছে, চরম বিস্ময়ের আনন্দে আমি বার বার শিহরিত হচ্ছি।

 

৭৮

যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।

তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।

যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণঃ যত্র পার্থঃ ধনুর্ধরঃ।

তত্র শ্রীঃ বিজয়ঃ ভূতিঃ ধ্রুবা নীতিঃ মতিঃ মম।।

যে পক্ষে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ও পরমভক্ত পার্থ রয়েছেন, সেই পক্ষেই রাজ্যলক্ষ্মী, বিজয়, উন্নতি ও ধর্মনীতিও অবিচল থাকবেন – এ আমার নিশ্চিত অভিমত।   

 

মোক্ষযোগ সমাপ্ত

ওঁ তৎ সৎ

গীতা সমাপ্ত 

পরবর্তী পর্ব থেকে ধারাবাহিকভাবে আসবে - শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণ 

 

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...