বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৭

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - সপ্তম পর্ব


ব্রহ্মর্ষি শুকদেব কথিত ঈশ্বরের তত্ত্ব ব্যাখ্যা  

বাদরায়ণপুত্র শ্রীশুক বললেন, “মহারাজ, এই মহাপুরাণে সর্গ, বিসর্গ, স্থান, পোষণ, ঊতি, মন্বন্তরসমূহ, ঈশকথা, নিরোধ, মুক্তি ও আশ্রয় এই দশ রকমের বিষয় বর্ণিত হয়েছে। এই দশটি বস্তুর মধ্যে দশম বস্তুটিই সর্ব প্রধান। এই বস্তুর তত্ত্বজ্ঞানের জন্য মহাজন অন্য নয়টির বর্ণনা করে থাকেন।

[মহাভারত ও চার বেদের সংকলক মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের আরেকটি নাম বাদরায়ণ, তাঁর পুত্র মহর্ষি শুকদেব।]  

পরব্রহ্ম থেকে প্রকৃতির তিনগুণের বৈষম্য হয়ে মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, শব্দ ইত্যাদি পঞ্চ তন্মাত্র, আকাশ প্রভৃতি মহাভূত ও ইন্দ্রিয়সকল সৃষ্টি হয় এবং তারপর বিরাট অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড দেহ নির্মাণ করে, এই দুই ধরনের সৃষ্টিকে সর্গ বলে। বৈরাজপুরুষ অর্থাৎ ব্রহ্ম থেকে যে চরাচর সৃষ্টি হয় তাকে বিসর্গ বলে। বৈকুণ্ঠ অর্থাৎ ভগবান জীবের দুঃখহরণ করে, তাদের পালন করেন, তাকে স্থান বলে। এই ভাবে পালিত জীবগণের মধ্যে, তিনি নিজের ভক্তদের প্রতি যে কৃপা দেখান, তাকে পোষণ বলে। কর্ম থেকে যে বাসনার সৃষ্টি হয়, সেই বাসনাকে ঊতি বলে। মন্বন্তরের অধপতিদের যে ধর্ম, তাকে মন্বন্তর বলে। নানা উপাখ্যানে শ্রীহরি ও তাঁর ভক্তদের যে চরিত্র বর্ণনা করা হয়, তাকে ঈশকথা বলে। প্রলয়কালে শ্রীহরি যোগনিদ্রায় অবস্থা করলে, জীবগণ নিজ নিজ শক্তি নিয়ে তাঁর মধ্যে লয় হয়ে যায়, সে লয়কে নিরোধ বলে। জীব অবিদ্যার বশে নিজের মধ্যে কর্তৃত্ব আরোপ করে থাকে; যখন সেই জীব নিজের ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ করে ব্রহ্মস্বরূপে অবস্থান করে, তখন সেই অবস্থাকে মুক্তি বলে। যাঁর থেকে এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় হয়, তিনিই দশম পদার্থ – আশ্রয়; শাস্ত্রে তিনিই ব্রহ্ম ও পরমাত্মা বলে বর্ণিত হন।

যে জীব চক্ষু ইত্যাদিকে আমার ইন্দ্রিয় মনে করেন, তাঁকে আধ্যাত্মিক পুরুষ বলে এবং সূর্য প্রমুখ যে সকল দেবতা ওই ইন্দ্রিয়সকলের অধিষ্ঠাতা অর্থাৎ যাঁদের শক্তিতে ইন্দ্রিয় কর্ম করতে পারে, তাঁদের আধিদৈবিক পুরুষ বলে। যিনি আধ্যাত্মিক তিনিই আধিদৈবিক পুরুষ; কারণ উভয়েই একই উপাদানে নির্মিত। যে দেহতে সকল ইন্দ্রিয় ও তাদের অধিষ্ঠাতা দেবতারা অবস্থান করে, দুই প্রকার বিভাগ সৃষ্টি হয়েছে, সেই দেহকে আধিভৌতিক পুরুষ বলে। এই তিন পুরুষ কেউই আত্মা নয়, কারণ তারা পরষ্পরনির্ভর; একটির অভাবে অন্যটির অস্তিত্ব বোধ করা যায় না। দৃশ্য পদার্থ দেখা গেলে অনুমান করা যায় চক্ষু নামক একটি ইন্দ্রিয় আছে এবং দর্শন কর্তা একজন জীব আছে। একইভাবে দর্শনের প্রবৃত্তিদাতা একজন দেবতাও আছেন অনুমান করা যায়। কিন্তু যিনি এই তিনের সাক্ষীরূপে অবস্থান করছেন, তিনিই পরমাত্মা, তিনিই দশম পদার্থ আশ্রয় বলে অভিহিত হয়েছেন। তিনি একইসঙ্গে তিনটি বিষয়ের উপলব্ধি করতে পারেন, কিন্তু ওই তিন বিষয়ের উপর তাঁর অস্তিত্ব নির্ভর করে না। এই কারণে তিনিই স্বতন্ত্র ভাবে নিখিল বিশ্বের আশ্রয়, সুতরাং তিনিই নিত্য সত্য; আর যা কিছু সমস্তই মায়াময় অনিত্য।

মহাপ্রলয়ে সমস্ত জীব প্রকৃতিতে এবং প্রকৃতি পরব্রহ্মে লীন থাকেন। যখন ব্রহ্মে সৃষ্টি করার ইচ্ছা হয়, তিনি প্রকৃতিতে ঈক্ষণ করেন অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছায় প্রকৃতিতে চাঞ্চল্য উপস্থিত হয় এবং তিন গুণের বৈষম্য ঘটে যায়। এইভাবে যিনি প্রকৃতিকে সংক্ষুব্ধ করেন, তাঁকে প্রথম পুরুষাবতার বলে। সংক্ষুব্ধ প্রকৃতিতে প্রথমতঃ মহত্তত্ত্বের আবির্ভাবে প্রকৃতি অণ্ডের আকার গ্রহণ করে, পুরুষ সেই অণ্ডের মধ্যে প্রবেশ করে অন্তর্যামীরূপে অবস্থান করেন। তারপর সেই অণ্ডকে দুইভাগে বিভক্ত করে, অর্ধেক অংশ শুদ্ধ জলে পূর্ণ করেন, অর্থাৎ আগেকার মহত্তত্ত্ব থেকে অহংকারতত্ত্ব এবং পৃথিবীতত্ত্ব পর্যন্ত সমস্ত তত্ত্ব প্রকাশ করেন। ঐ সকল তত্ত্বের মহাসমষ্টিকে কারণ অর্ণব বলে। তারপর সেই পুরুষ ওই সকল তত্ত্বের কিছু কিছু পরিমাণ নিয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে মিশ্রণ করে বিভিন্ন উপাদান নির্মাণ করেন। সেই উপাদান দিয়েই তিনি হিরণ্ময় ব্রহ্মাণ্ড তৈরি করেন। এই বার সেই হিরণ্ময় ব্রহ্মাণ্ড নিজের জঠরে রেখে তিনি কারণ অর্ণবে সহস্রবছর যোগনিদ্রায় অবস্থান করেন, অর্থাৎ এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির পর বহুদিন সৃষ্টির কাজ স্থগিত হয়ে থাকে। ঐ আদি পুরুষের আরেকটি নাম নর, তাঁর থেকেই ওই কারণবারির সৃষ্টি হওয়ায় ঐ কারণবারির আরেকটি নাম নারা। ভগবান ওই নারা আশ্রয় করে যোগনিদ্রায় শুয়ে থাকেন বলেই, তাঁর অন্য আর এক নাম নারায়ণ। এই নারায়ণ দ্বিতীয় পুরুষাবতার এবং এই পুরুষের প্রভাব অচিন্ত্য। এঁনার অনুগ্রহেই সকল উপাদান, কর্ম, কাল, স্বভাব ও জীব কার্য করার ক্ষমতা পায় এবং ইনি অপেক্ষা করলেই সকলে অক্ষম হয়ে পড়ে

তারপর যোগনিদ্রার অবসানে, নারায়ণ নিজের মায়াশক্তির প্রভাবে, হিরণ্ময় অণ্ডকে অধিদেব, অধ্যাত্ম ও অধিভূত এই তিন ভাগে বিভক্ত করে থাকেন। নারায়ণের ক্রিয়াশক্তিতে তাঁর হৃদয়রূপ আকাশ থেকে ইন্দ্রিয়শক্তি, মনঃশক্তি ও দেহশক্তির আবির্ভাব ঘটে এবং তাঁর ক্রিয়াশক্তি থেকে সূক্ষ্ম মহাপ্রাণের প্রকাশ হয়। এই প্রাণকেই সূত্র বলে। ভৃত্য যেমন সর্বদা রাজার অনুসরণ করে, তেমনই এই প্রাণ ক্রিয়াশীল হলে সকল ইন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল হয় এবং প্রাণ ক্রিয়া থেকে বিরত হলে, তারাও বিরতি লাভ করে। প্রাণ সঞ্চালন ক্রিয়া শুরু করলে, পুরুষের অন্তরে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সৃষ্টি হয়, তখন পুরুষের ভোজন ও পান করার ইচ্ছা হয় এবং মুখ প্রকাশিত হয়। তারপর মুখ থেকে অধিষ্ঠান তালু, ইন্দ্রিয় জিভ,   বিষয় নানা রস ও দেবতা বরুণ আবির্ভূত হন। এদের মধ্যে অধিষ্ঠান ও বিষয় অর্থাৎ তালু ও নানান স্বাদের রসকে অধিভূত, ইন্দ্রিয় অর্থাৎ জিভকে অধ্যাত্ম এবং দেবতা অর্থাৎ বরুণকে অধিদৈব বলা হয়। তিনি বাক্য উচ্চারণ করতে চাইলে, তাঁর মুখ থেকে অগ্নি ও বাক্যের ইন্দ্রিয় এবং এই উভয় থেকে বাক্য উচ্চারণ ক্রিয়া আবির্ভূত হয়। এই ভাবেই প্রাণবায়ুর চাঞ্চল্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠান, তাদের ক্রিয়া, বিষয় এবং দেবতাদের ধীরে ধীরে আবির্ভাব হতে থাকে”

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন আপনাকে অধিদৈবদের কথা বললাম, এখন আমি তাদের অংশ ধাতু প্রভৃতির স্বরূপ বলছি, শুনুন। স্থূল ও সূক্ষ্ম চর্ম, মাংস, রুধির, মেদ, মজ্জা ও অস্থি এই সাতটি ধাতু ভূমি, অপ ও তেজ থেকে উৎপন্ন এবং প্রাণ আকাশ, জল ও বায়ুময়। রূপ ইত্যাদি গুণ থেকে চোখ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি, এই কারণেই বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট হওয়ায় এদের স্বভাব। এই গুণসমূহ অহংকার তত্ত্ব থেকে উৎপন্ন হয়। এই কারণে বস্তুতঃ সুন্দর না হলেও, অহংকারের বশে বিষয়কে সুন্দর বলে ভ্রম হয়।  মন হর্ষ, দুঃখ ইত্যাদি সকল প্রকার বিকারের আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ এবং বিবেকশক্তিকেই বুদ্ধি বলা হয়।

মহারাজ, আপনার কাছে ভগবানের এই স্থূল রূপ বর্ণনা করলাম। এই স্থূল সমষ্টি পৃথিবী, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, অহংকারতত্ত্ব, মহত্তত্ত্ব ও প্রকৃতি এই আটটি আবরণে আবৃত। এছাড়া ভগবানের আর একটি অতি সূক্ষ্ম রূপ আছে, যা বাক্য ও মনের অতীত। এই রূপ যেহেতু বর্ণ এবং আকারহীন, সেহেতু স্থূল রূপের মতো এর উৎপত্তি, স্থিতি ও লয় নেই। এই রূপ অব্যক্ত হওয়ায় অতীন্দ্রিয় অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে এই রূপকে অনুভব করা যায় না। ভগবানের এই উভয় রূপই মায়া দিয়ে তৈরি, সেই কারণে জ্ঞানীরা এই দুই রূপকে সত্য বলে স্বীকার করেন না। আগে যে মহত্তত্ত্বের কথা বলেছি, সেই তত্ত্বের সৃষ্টিকর্তা ভগবান ব্রহ্মা হয়ে নাম, রূপ ও ক্রিয়া সৃষ্টি করেন। তিনি বাস্তবে কর্মহীন হলেও মায়ায় কর্মযুক্ত হন। ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে প্রজাপতি, মনু, দেবতা, ঋষি, পিতৃগণ, সিদ্ধ, চারণ, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, অসুর, গুহ্যক, কিন্নর, অপ্সরা, নাগ, সর্প, কিংপুরুষ, নর, মাতৃগণ, রক্ষঃ, পিশাচ, ভূত, প্রেত, বিনায়ক, কুষ্মাণ্ড, উন্মাদ, বেতাল, যাতুধান, গ্রহ, মৃগ, খগ, পশু, বৃক্ষ, গিরি ও সরীসৃপ সকলের সৃষ্টি করে থাকেন। তিনি প্রাণিসমূহকে স্থাবর ও জঙ্গম এই দুই ভাগে এবং জলচর, স্থলচর ও খেচর প্রাণিদের জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ ও উদ্ভিজ্জ এই চারভাগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করে থাকেন। এইভাবে বিবিধ সৃষ্টির হেতু এই যে, যে যেমন কর্ম আচরণ করে, সে সেইরকম গতি পেয়ে থাকে। পুণ্যফলে উত্তম, পাপফলে অধম ও মিশ্র কর্মের ফলে মিশ্র গতি লাভ হয়।

সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণই সুর, নর ও নারকীয় গতি প্রাপ্তির কারণ। এই তিনটি গুণ অপর দুই গুণের সঙ্গে মিশ্রিত থাকায়, তাদের তারতম্য অনুসারে তিনটি গুণ প্রত্যেক তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে নয় প্রকারের গতির সৃষ্টি করে থাকে। এইভাবে রজোগুণী মানুষ সত্ত্বগুণের আধিক্যে ব্রাহ্মণত্ব এবং তমোগুণের আধিক্যে শূদ্রত্ব পেয়ে থাকে। তির্যক, নর ও সুরগণের মধ্যে, ভগবান অবতাররূপে বারবার অবতীর্ণ হয়ে ধর্মরূপে বিশ্বের পালন করেন। তারপর প্রলয়ের সময় উপস্থিত হলে, বায়ু যেমন মেঘসমূহকে সংহার করে, কালাগ্নি রুদ্ররূপে ভগবান নিজের সৃষ্টিকেই বিনাশ করেন।

হে রাজন, আপনার কাছে এই মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের বিষয় সংক্ষেপে বর্ণনা করলামমহাকল্পে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সৃষ্টি ও খণ্ডকল্পে স্থাবর ইত্যাদি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমস্ত মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের এটাই সাধারণ নিয়ম। কালের স্থূল ও সূক্ষ্ম পরিমাণ এবং কল্পের লক্ষণ ও মন্বন্তর ইত্যাদি বিভাগ আপনাকে পরে সবিস্তারে বলব, এখন পাদ্মকল্পের বিবরণ শুনুন”

শ্রীশৌণক বললেন, “হে সূত, আপনি বলেছিলেন, ভক্তশ্রেষ্ঠ বিদুর বন্ধু, পরিজন ত্যাগ করে পৃথিবীতে নানান তীর্থে ভ্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে মৈত্রেয় মুনির আত্মজ্ঞান বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিদুরের সঙ্গে তাঁর কী কী কথা হয়েছিল, বন্ধুদের ছেড়ে বিদুর যেভাবে তীর্থ ভ্রমণ করলেন এবং পরে আবার ফিরে এলেন, সেই সকল কথা আমাদের বর্ণনা করুন”

শ্রীসূত বললেন, “আপনারা যেমন জিজ্ঞাসা করলেন, মহারাজ পরীক্ষিতও শ্রীশুকদেবকে একই কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। বিদুর ও মৈত্রেয়র আলোচনা নিয়ে শ্রীশুকদেব রাজাকে যা যা উত্তর দিয়েছিলেন, আমিও আপনাকে সেই ভাবেই বলছি শুনুন” 

                                                    দ্বিতীয় স্কন্ধ সমাপ্ত 

পরের পর্বে তৃতীয় স্কন্ধের শুরু ...

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৭ 


৩৪

 

ভল্লা আর রামালি ভোরে রওনা হল মহড়ার মাঠের দিকে। গতকাল গ্রামপ্রধানের দাহ সৎকার শেষ হতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে গিয়েছিল। ভল্লা ভেবেছিল নোনাপুরের কেউ আজ আর মহড়ায় আসবে না। কিন্তু দাহ শেষে কাল রাত্রেই ছেলেরা বলেছিল, তারা আজ আসবে। অন্যদিনের মতো একই নিয়মে মহড়া করবে। আজ সকালে মহড়ার মাঠে পৌঁছে ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা আশ্চর্য হল। প্রত্যেকটি ছেলের মুখ গম্ভীর। তাদের দু চোখে ছেলেমানুষী সরলতা নয়, জেগে উঠেছে দৃঢ় এবং নিষ্ঠুর প্রতিজ্ঞা। একজন শ্রদ্ধেয় মানুষের এমন অসম্মানের মৃত্যু, একরাত্রেই তাদের মনে অদ্ভূত এই রূপান্তর এনে দিয়েছে! ভল্লা কিছু বলল না। এক পাশে বসে, ছেলেদের অনুশীলন দেখতে লাগল, মন দিয়ে। একে একে সকলেরই অনুশীলন দেখে খুশি হল, ভল্লা। উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেদের কাছে গেল, সুরুল আর আহোকের কাঁধে হাত রেখে সকলের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “নাঃ এতদিনে তোরা সত্যিই এক-এক জন যোদ্ধা হয়ে উঠছিস। আমার মনে যেটুকু দ্বিধা ছিল সেটা কেটে যাচ্ছে। তোদের সকলকে নিয়ে প্রকৃত লড়াইয়ে নামার সময় এবার এগিয়ে আসছে। প্রতিশোধ। হ্যাঁ, এই প্রতিশোধের আগুনটা রাজধানী ছাড়ার পর থেকেই আমার বুকের মধ্যে জ্বলছে অহরহ। আজ তোদের মধ্যেও সেই আগুনটা আমি দেখতে পাচ্ছি। আর দশটা দিন এভাবেই তোরা অনুশীলন চালিয়ে যা। তারপরে গভীর রাত্রে আমরা আস্থানে যাব”। ভল্লা এবার গম্ভীর দৃঢ় স্বরে, প্রত্যেকটি কথা শান্ত নিষ্ঠুর উচ্চারণে বলল, “এবারে আর শুধু অস্ত্র-শস্ত্র চুরি নয় – সরাসরি আক্রমণ। আমাদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে একটাই। কবিরাজমশাইয়ের মুক্তি। এই লক্ষ্য পূরণের জন্যে কিছু রক্ষীকেও হত্যা করতে হবে। তখন তোদের কারো...একজনেরও হাত যেন না কাঁপে”।

ভল্লার শেষের কথাগুলো ছেলেদের কাঁপিয়ে দিল, একসঙ্গে সকলে গর্জে উঠল, “কাঁপবে না। রক্তের শোধ নেব রক্তেই”। ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল কিছুক্ষণ। বলল, “এই শপথের আগুন সর্বদা জ্বলতে থাকুক তোদের সবার মনে। নে আবার মহড়া শুরু কর। কাল যে রণপা চড়ে ভল্ল ছোঁড়া দেখিয়েছিলাম, সেটাও...। ওটা হয়ে গেলে শুরু হবে আমাদের রাত্রের মহড়া...”।

ছেলেরা আবার অনুশীলন শুরু করতে, রামালিকে ডাকল ভল্লা, বলল, “আমাদের রণপা, ভল্ল, বল্লম কতগুলো আছে বলতো? গুণে দেখেছিস? আমাদের ছেলেদের সবার হয়ে যাবে?”

রামালি বলল, “ছ’জোড়া রণপা বেশি আছে। ভল্ল বেশি আছে দুটো, আর বল্লম বেশি আছে প্রায় দশটা”।

ভল্লা বলল, “মিলাদের ওখানে আপাততঃ কতগুলো দেওয়া যাবে?”

রামালি বলল, “চারজোড়া রণপা, আর ছটা বল্লম দেওয়া যাবে... ভল্ল না দেওয়াই ভালো, ভেঙে-টেঙে গেলে, আমাদেরই অসুবিধে হবে। বালিয়াকে দিয়ে কিছু ভল্ল বানিয়ে নিলে হয় না?”

“তা হয়, কিন্তু সরু ছোটছোট বাঁশের টুকরো পাবি কোত্থেকে, যার মাথায় ভল্লর ফলা জোড়া যাবে?”

“হাত দেড়েক লম্বা টুকরো হলেই তো ভল্ল হয়ে যাবে, সে টুকরো বাঁশ কিন্তু আমাদের আছে”।

“কোথায়?” অবাক হয়ে ভল্লা জিজ্ঞাসা করল রামালিকে।

“আমাদের প্রত্যেকের যে রণপা রয়েছে, ভল্লাদাদা। তার মাথা থেকে হাত দেড়েক যদি কেটে নেওয়া হয়, তাতে কি অসুবিধে হবে?”

ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রণপা জোড়া খাড়া করে ধরল, দুটো বাঁশের দৈর্ঘ্যই তার মাথা ছাড়িয়ে গেল। ভল্লা বলল, “বাঃ এটা আমার মাথায় আসেনি তো! সবকটাই কি একইরকম লম্বা?”

“হ্যাঁ ভল্লাদাদা সবকটাই – তার মানে ছত্রিশ জোড়া”।    

“বাঃ, তার মানে ছত্রিশ জোড়া ভল্ল হয়ে যাবে? রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র আসা অবধি আমাদের চলে যাবে। এখন চল, মিলারা বোধহয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। মিলাদের কথা আমাদের ছেলেদের বলেছিস?”

“না ভল্লাদাদা, বলিনি। নিজেদের অঞ্চলে ওরা তো আসলে ডাকাতি করছে…তাই…” একটু ইতস্ততঃ করে রামালি থেমে গেল।

ভল্লা হাসল, বলল, “ধুর বোকা, ওরা ডাকাতি করছে টাকাকড়ির জন্যে, ওদের আসল উদ্দেশ্য তো রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ… আর এতদিনে তুই তো বুঝেই গেছিস, আমাদের পেছনে আছে, আমাদেরই প্রশাসন। অতএব শুরুতে আমাদের ডাকাতি করতে হল না। কিন্তু ওদের তো তা নেই…। আমাদের ছেলেদের সময়মতো বলে দিস। অন্য কারোর মুখে মিলাদের কথা শুনলে ছেলেরা ভুল বুঝতে পারে…”। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাচ্ছি, তোরা কিন্তু মহড়া চালিয়ে যা। রামালি একটু পরেই ফিরবে…আমি আসব বিকেলে”।

ছেলেরা বলল, “ঠিক আছে, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “হ্যারে শল্কু আসেনি? কী হয়েছে ওর?”

আহোক বলল, “জানিনা ভল্লাদাদা, আসার সময় ওর সঙ্গে ওর বাড়ির সামনে দেখা হল। জিজ্ঞাসা করলাম, কি রে যাবি না? বলল, তোরা চল, আমি যাচ্ছি একটু পরে… এখনও তো এল না”।

বিনেশ বলল, “শল্কুটা বিগড়ে গেছে, ভল্লাদাদা…ওর হাবভাব ভালো ঠেকছে না”।

ভল্লা আহোক আর বিনেশের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। তারপর রণপায় চড়ে বলল, “বেরোচ্ছি, রে”।  

*     *     * 

ভল্লা আর রামালি বাসায় পৌঁছে দেখল, মিলা, জনাদের সাতজন ছেলে তাদের ঘরের সামনে উঠোনে বসে হ্যা হ্যা করে হাঁফাচ্ছে। রামালির মনে পড়ল প্রথমদিন রামালিদেরও একই অবস্থা হয়েছিল।

ভল্লা ওদের দেখে হাসল, বলল, “ভালই তো হাঁফাচ্ছিস, কতক্ষণ দৌড়লি? রামালি ওদের জন্যে রণপাগুলো নিয়ে আয়। আর তোরা বসে বসে হাঁফাস না, চল হাঁটি। তোদের মহড়ার মাঠটা দেখিয়ে দিই”।

জনা বলল, “ওফ যা দৌড় করিয়েছ ভল্লাদাদা, একটু জিরোতে দাও”।

“রামালিরা জানে, আমি ওদের জিরোতে দিই না – তোরাও জেনে যাবি - কয়েকটাদিন আমার সঙ্গে থাক”। ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “চল ওঠ, ওই দ্যাখ, রামালি তোদের জন্যে রণপা আর বল্লম নিয়ে চলে এসেছে”।

রামালি ওদের হাতে চার জোড়া রণপার বাঁশ তুলে দিল। তারপর ভল্লা আর রামালি নিজেদের রণপায় চড়ে পড়ে, ভল্লা বলল, “তোরা কি রণপা আগে দেখেছিস? রণপা চড়ে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটাচলা করা যায় – আর দৌড়তে পারলে, ঘোড়াকেও টেক্কা দিতে পারবি। চল মাঠে চ, তোদের শেখাবো”।

মাঠ দেখে মিলাদের সকলেরই বেশ ভালো লাগল। চারদিকে ঘন গাছের জঙ্গল ঘেরা অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ভল্লা বলল, “আপাততঃ চারটে রণপা জোগাড় করতে পেরেছি, বল্লম আছে গোটা দশেক - বিকেলে পেয়ে যাবি। এই নিয়েই শুরু কর, তারপর দেখছি কত তাড়াতাড়ি তোদের অস্ত্র যোগাড় করতে পারি”।

রামালি চারজন ছেলেকে রণপায় চড়ে হাঁটতে শেখাতে লাগল। ভল্লা মিলা আর জনাকে বলল, “তোদের এখন তো কাজ নেই – চল কিছু কথা সেরে নেই। তিনজনেই মাটিতে বসল। ভল্লা বলল, “দ্যাখ মহড়ার মাঠ তো হল, কিন্তু তোদের একটা বা দুটো বড়ো ঘর তো চাই। যেখানে তোদের এই অস্ত্র-শস্ত্র সব রাখতে হবে। রোজ সন্ধেয় বাড়ি নিয়ে যাবি আর ভোরে সেসব সঙ্গে নিয়ে এখানে আসবি। লোকের বুঝতে কিছু বাকি থাকবে?”

মিলা জনার দিকে তাকাল, বলল, “ঠিক কথা, এদিকটা আমরা ভাবিনি”।

ভল্লা বলল, “এখান থেকে ক্রোশ খানেক দূরে একটা পুকুর আছে, তার পাশে কিছুটা জমি নিয়ে তোরা একটা বা দুটো ঘর বানিয়ে নিতে পারিস। কিন্তু কী দিয়ে বানাবি? ইঁট না কি বাতা?”

মিলা বলল, “ইঁট দিয়ে বানালে ভাল হয় না”?

“ভাল তো হয়ই, কিন্তু খরচ এবং সময় লাগবে বেশি। ইঁট যোগাড় করতে পারবি? তোদের ওদিক থেকে ইঁট আনতে গেলে – সকলেই জেনে যাবে”।

জনা বলল, “রামালিরা যেখান থেকে ইঁট কেনে, সেখান থেকেই নিতে পারি আমরা। ইঁট, চুন, সুরকি – পুকুরের জল তো পেয়েই যাব। তাহলে আমাদের দিকের লোকেরা চট করে বুঝতে পারবে না। কিন্তু টাকাকড়ি?”

ভল্লা বলল, “তোরা তো কাল দিয়েই গেলি – সেখান থেকে এখন নিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে দে। আর ওই দুটো ঘরের ভেতর একটাতে,  ছোট্ট একটা কুঠরি বানিয়ে তার মধ্যে একটা সিন্দুক বসিয়ে ফেল। তোরা টাকা-কড়ি যা যোগাড় করবি, ওখানেই রাখবি। অস্ত্র কেনার ব্যাপার হলে, আমাকে বা রামালিকে দিবি”।

মিলা বলল, “রামালিকে তুমি এতটা ভরসা করছো ভল্লাদাদা?”

ভল্লা হাসল, “তোরাও করবি, কয়েকটা দিন ওর সঙ্গে ওঠাবসা কর…। ওই দ্যাখ রামালি ওর নিজের রণপাজোড়াও দিয়ে দিল…ভাল করেছে… একসঙ্গে পাঁচজনই শিখতে পারবে। অ্যাই রামালি, এদিকে শোন…”।

রামালি ওদের তিনজনের কাছে এসে বসতে ভল্লা বলল, “রামালি, এদের জন্যে দুটো ঘর বানানোর ব্যবস্থা করতে হবে – ওরা চাইছে ইঁটের দেওয়াল তুলতে, ইঁট-চুন-সুরকি যোগাড় করে দিতে পারবি? এবং কাজের লোক?”

রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “বীজপুরের একজন আমাদের এদিকে ঘর বানানোর কাজ করে...তাকে খবর দিতে পারি...তবে দু-তিনদিন সময় লাগবে...ওর কাছে সব পাওয়া যাবে...এমনকি ঘর ছাওয়ার টালি থেকে কাঠের বরগা-কড়ি সব...”।

মিলা বলল, “বাঃ তাহলে তো খুব ভালো হয়...কিন্তু আমরা খবর দেব, সে আসবে...কথাবার্তা হবে...তারপর সে মালপত্র আনবে, লোক পাঠাবে...অনেক দেরি হয়ে যাবে তো!”

ভল্লা বলল, “লোকটাকে তুই চিনিস? কোথায় থাকে জানিস?”

রামালি বলল, “তা চিনি, কিন্তু বীজপুরে ঠিক কোথায় থাকে জানি না। তবে ওখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে...”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “রণপা চড়ে বীজপুর যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে...তিন, সাড়ে তিন প্রহর?”

রামালি হেসে ফেলল, বলল, “পায়ে হেঁটেও আমি কোনদিন বীজপুর যাইনি ভল্লাদাদা...। তবে যারা যাওয়া-আসা করে, তাদের মুখে শুনেছি পায়ে হেঁটে প্রায় ছ-সাত প্রহরের পথ”।

ভল্লা বলল, “হুঁ, তার মানে রণপা চড়ে গেলে – দুই-তিন প্রহরের মধ্যে পৌঁছনো সম্ভব। আমরা এখান থেকে যদি আজ মধ্য রাত্রিতে রওনা দিই, আগামীকাল সকাল-সকাল বীজপুর পৌঁছে যাবো...”।

মিলা আর জনা চমকে উঠে বলল, “তুমি যাবে ভল্লাদাদা...কী বলছো?”

ভল্লা মুচকি হেসে বলল, “একসঙ্গে যখন নেমেছি, তখন ক্ষতি কী? অবিশ্যি তোরা যদি না চাস তাহলে যাবো না”।  

মিলা লজ্জা পেয়ে বলল, “যাঃ কী যে বলো না, তা নয়...এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে?”

ভল্লা এবার গম্ভীর মুখে বলল, “আমরা যদি যাই, আগামী কাল হয়তো দুজনেই থাকবো না...তাই বলে তোদের মহড়া যেন বন্ধ না হয়। পরশু এসে দেখতে চাই তোরা সবাই রণপা চড়তে শিখে গিয়েছিস”।

মিলা বলল, “তুমি আমাদের জন্যে এত কিছু করছ...তার পরিবর্তে আমরা তোমায় ফাঁকি দেব? সে কথা মনেও স্থান দিও না ভল্লাদাদা”।

ভল্লা বলল, “উত্তম। আরেকটা কথা – তোরা দুজন ছাড়া এই কথা কেউ যেন জানতে না পারে – এমনকি আমাদের এদিকের ছেলেরাও কেউ না...”।

“জানবে না, ভল্লাদাদা”।

“আমরা এখন উঠছি রে মিলা। আমাদের ও দিকে কী হচ্ছে একবার দেখে আসি। রামালি চল”।

রামালি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “জনা, তোরা ফিরবি কখন?”

“সন্ধের দিকে”।

“তাহলে যাওয়ার সময় রণপাগুলো ভল্লাদাদার বাসার কাছে রেখে দিয়ে আসবি”?

ভল্লা বলল, “হুঁ, যতদিন না তোদের ঘর হচ্ছে, ততদিন ওগুলো আমাদের ওখানে রেখে দেওয়াই নিরাপদ”।

জনা বলল, “ঠিক আছে ভল্লাদাদা। তার মানে তোমাদের সঙ্গে পরশু দিন আবার দেখা হবে...”।

রামালি হেসে বলল, “কেন? আজ সন্ধেতেই আবার দেখা হবে। আমরা যদি নাও থাকি, একটু অপেক্ষা করিস, আমরা চলে আসবো”।    

চলবে...

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৪ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৫


 ৫.২.১ বেদান্তে ব্রহ্ম ধারণা (আগের পর্বের পরবর্তী অংশ) 

এবার কেনোপনিষদ থেকে কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক। প্রথম খণ্ডের প্রথম শ্লোকে, গুরুদেবের কাছে কোন এক শিষ্য যেন ব্রহ্ম সম্বন্ধে আমাদের মনে আসা প্রশ্নগুলিরই উত্তর জানতে চেয়েছেন,-

“কার ইচ্ছায় এবং নির্দেশে আমাদের মন চালিত হয়? কার আদেশে প্রধান প্রাণ নিজ কাজে নিযুক্ত হয়? কার ইচ্ছায় মানুষ এত কথা বলে, কোন জ্যোতির্ময় পুরুষই বা চোখ, কানকে নিয়ন্ত্রণ করেন?” ১/১

(শিষ্যের প্রশ্নের উত্তরে গুরুদেব বলছেন,) “যাঁর শক্তিতে কান শুনতে পায়, মন চিন্তা করে, বাগেন্দ্রিয় কথা বলে, তাঁর শক্তিতেই প্রাণ উজ্জীবিত হয়, চোখ দেখতে পায়। তিনিই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের চালক, পণ্ডিতেরা এই তত্ত্ব জেনে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, সংসারের ঊর্ধ্বে অমৃতলোক অনুভব করেন। ১/২

চোখ তাঁকে দেখতে পায় না, বাক্যে তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, মনেও তাঁর কল্পনা করা যায় না। আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না। ১/৩

আমাদের জানা, এমনকি অজানা সকল বিষয় থেকেই তিনি ভিন্ন, আমাদের পূর্ববর্তী গুরুদের কাছে এমন ব্যাখ্যাই আমরা শুনেছি। ১/৪

যাঁকে কথায় প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু আমাদের বাক্য যিনি প্রকাশিত করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৫

মন যাঁকে চিন্তা করতে পারে না, অথচ যিনি মনে চেতনার প্রকাশ ঘটান, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৬

চোখ যাঁকে দেখতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের দৃষ্টিতে আলো দিয়েছেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৭

কান যাঁকে শুনতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের শ্রবণে শব্দের বোধ সঞ্চার করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৮

এই প্রাণ যে প্রাণকে উপলব্ধি করতে পারে না, অথচ যিনি আমাদের প্রাণ সঞ্চার করেন, তুমি তাঁকেই ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন।” ১/৯”

(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ ")

যেখানে উপনিষদের ঋষিগুরু তাঁর শিষ্যদের বলছেন, “আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না”। বারবার বলছেন, “আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন”। সেখানে আমাদের উপলব্ধিতে তিনি ধরা দেবেন, এমন সাহস করি কী করে?

অতএব আমরা দেখতে পেলাম বেদান্ত দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলেন ব্রহ্ম, তিনি ভিন্ন অন্য কোন দেব ধারণা নেই। ব্রহ্মই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কারণ। বেদান্ত দর্শনের সূত্রপাত সম্ভবতঃ খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীর কোন সময়ে ঘটেছিল। কিন্তু আচার্য শংকর (৭৮৮-৮২০ সি.ই.) সেই বেদান্ত দর্শনকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজ ভারতীয় দর্শন বলতে বেদান্ত দর্শনকেই বোঝায়। আচার্য শংকর যে বেদান্তের মত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন – তার নাম অদ্বৈত-বেদান্ত। কিন্তু তাঁর পরেও বেদান্তের অনেকগুলি নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও মত ভারতের বহু অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছিল। তাদের নাম উল্লেখ করার আগে, একটা কথা বলে রাখা ভাল, বেদান্তের শাখা ও মত যতগুলিই হোক না কেন, সবগুলিরই মূল কিন্তু ব্রহ্ম-ধারণা।

 ভাষ্যকারের নাম                 সময়কাল                             বেদান্ত মতবাদ

শংকরাচার্য                       ৭৮৮-৮২০ সিই                  অদ্বৈত

ভাষ্কর                           ৯৯৬-১০৬১ সিই                  ভেদাভেদ

যাদবপ্রকাশ                      ১০০০ সিই                       ভেদাভেদ

রামানুজ                         ১০১৭-১১২৭ সিই                 বিশিষ্টাদ্বৈত   

মধ্বা                            ১২৩৮-১৩১৭ সিই                দ্বৈত

নিম্বার্ক                          ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধ          দ্বৈতাদ্বৈত

শ্রীকান্থ                          ১২৭০ সিই                       শৈব-বিশিষ্টাদ্বৈত

শ্রীপতি                          ১৪০০ সিই                       ভেদাভেদাত্মক – বিশিষ্টাদ্বৈত

বল্লভ                            ১৪৭৯-১৫৪৪ সিই                শুদ্ধাদ্বৈত

শুক                             ১৫৫০ সিই                      ভেদাভেদ

বিজ্ঞানভিক্ষু                      ১৫৫০ সিই                      আত্ম-ব্রহ্মকিয়-ভেদাভেদ

বলদেব                          ১৭২৫ সিই                      অচিন্ত্য-ভেদাভেদ

 দর্শন কথার মূল অর্থ দৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টি। আমরা এতক্ষণ যে ছয়টি দর্শনের আলোচনা করলাম, প্রত্যেকটি দর্শনই এই বিশ্বজগতের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ ও অস্তিত্বকে বুঝতে বা দেখতে শেখায়। তবে বেদান্ত এই জগতকে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিতে শুধুমাত্র দেখতেই শেখায় না, আমাদের আধ্যত্মিক জীবনের পথও দেখায়। এই দর্শনের লক্ষ্য মানুষের সাধারণ-চৈতন্য সীমা ছাড়িয়ে, জাগতিক দুঃখ-কষ্ট পার করে, পূর্ণতা ও শান্তি লাভ। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দর সর্বজন-সমন্বয়ের বেদান্ত ভাবনাই, বেদান্তকে ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বেদান্তের অনেকগুলি প্রচলিত শাখার কথা আমি ওপরের সারণিতে দেখিয়েছি, সেগুলির মধ্যে আধুনিক হিন্দু বিবুধ-সমাজের প্রধান দর্শন অবশ্যই অদ্বৈত বেদান্ত।

অদ্বৈত তত্ত্বের স্থূল অর্থ ব্রহ্মর দুটি সত্ত্বার অনস্তিত্ব, অথবা ব্রহ্মার দ্বৈতসত্ত্বার অনস্বীকার। সেক্ষেত্রে দ্বৈত ও অদ্বৈত তত্ত্বের পার্থক্যটা কোথায়? দুই তত্ত্বের প্রাথমিক পার্থক্য হল, দ্বৈত মতে মোক্ষ অবস্থাতেও মানুষের বাস্তব ব্যক্তিসত্ত্বার অস্তিত্ত্ব থাকে। কিন্তু অদ্বৈত মতে ব্যক্তিসত্ত্বাও অবাস্তব এবং মুক্তিতে ব্যক্তিসত্ত্বার কোন অস্তিত্ব থাকে না। [আমরা আবার সেই ৪.৩.২ অধ্যায়ের তথাগতর অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব – অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের “চতুষ্কটিকা” যুক্তিতেই যেন চলে এলাম! এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - "ধর্মাধর্ম - ৪/৫"] আচার্য শংকর বলছেন, “আমরা যাকে জীব বলি, সেটি ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন নয়। বরং জীব হল সেই ব্রহ্ম, যাঁর সঙ্গে বুদ্ধি, কর্তা এবং ভোক্তা অভিধা আরোপিত হয়। ব্যক্তি-সত্ত্বার সীমিত আধার অর্থাৎ তার শরীর বা দেহের জন্যেই তাকে পরম-সত্ত্বার থেকে পৃথক ধারণা হয়। বিচিত্র আকার ও নামের এই দেহ-রূপ ধারণার সৃষ্টি হয় অজ্ঞান বা অবিদ্যা থেকে। অদ্বৈত মতে এইটুকু ছাড়া দুই সত্ত্বার মধ্যে কোন প্রভেদ নেই।

দ্বৈত মতে ব্রহ্মকে নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তিসত্ত্বাকেই আত্মা বলা হয়। যখন এই আত্মা জীবের দেহ এবং মনে অধিষ্ঠিত হয় তখন তাকে “জীবাত্মা” বলে। মুক্তিতে জীবাত্মার অভিধা অদৃশ্য হয়, ব্রহ্মে বিলীন হয়, কিন্তু সেখানেও অতি নগণ্য হলেও কিছুটা পার্থক্য থেকে যায়। এই বিষয়টি পূর্ণের সঙ্গে তার ভগ্নাংশের সাযুজ্য হওয়ার মতোই তুলনীয় – এবং ব্যক্তিসত্ত্বা ও ব্রহ্মের এই প্রভেদকে দ্বৈত মতে “স্বগত-ভেদ” বলে।

অদ্বৈত এই স্বগত-ভেদকে স্বীকার করে না। অদ্বৈতের মতে, মুক্তির পর্যায়ে, ব্রহ্ম ও আত্মা অভিন্ন হয়ে যায় এবং আত্মা ব্রহ্মই হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে জীব যখনই তার মন এবং দেহ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তখনই আত্মা ও ব্রহ্মর পার্থক্য অবলুপ্ত হয়। এই কারণেই অদ্বৈত দর্শন ব্যক্তি সত্ত্বাকে জীবাত্মা এবং ব্রহ্মকে পরমাত্মা বলে থাকে।                

বেদান্ত তত্ত্বে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা দুই সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ সত্ত্বার – ব্রহ্ম এবং বাস্তব জগৎ - সঙ্গতি সাধন। আমরা আগেই জেনেছি ব্রহ্ম হলেন অসীম এক চেতনা, তিনি নির্গুণ, ব্রহ্ম কেমন সেকথা অবর্ণনীয়। উপনিষদ ব্রহ্মর সংজ্ঞায় বলেছেন, তিনি “সত্য, পরমজ্ঞান ও অসীম”, কিন্তু এ সবই তাঁর লক্ষণ, তাঁর বর্ণনা নয়, এবং এই লক্ষণগুলি থেকে তাঁর ধারণাও করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, সীমিত ছকে বাঁধা কোন বোধ দিয়েই অসীম, অবিভাজ্য এবং নির্গুণ বিষয়ের কোন ধারণা করা যায় না।

এই অধ্যায়ের শুরুতেই কেনোপনিষদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, এবার কেনোপনিষদের তৃতীয় খণ্ড এবং চতুর্থ খণ্ডের দুটি শ্লোক থেকে একটি আশ্চর্য গল্প শোনাবো, -

“একবার ব্রহ্মই (দেবাসুর যুদ্ধে) দেবতাদের বিজয়ী করলেন। সেই ব্রহ্মের জন্যেই দেবতারা মহিমান্বিত হলেন। কিন্তু দেবতারা মনে করলেন, “এই বিজয় আমাদের, এই মহিমা আমাদেরই”। (৩/১)

তাঁদের এই চিন্তার কথা ব্রহ্ম জানতে পারলেন, তিনি দেবতাদের মঙ্গলের জন্যে তাঁদের সামনে যক্ষ বেশে আবির্ভূত হলেন। কিন্তু দেবতারা জানতেও পারলেন না, কে এই যক্ষ। (৩/২)

তাঁরা (দেবতারা) অগ্নিকে বললেন, “হে জাতবেদ, এই যে যক্ষ, যিনি এসেছেন, তিনি কে, জেনে এসো।” অগ্নিদেব বললেন, “তাই হোক”। (৩/৩)

অগ্নি সেই যক্ষের সামনে গেলে, যক্ষ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?” অগ্নি বললেন, “আমিই অগ্নি, আমি জাতবেদা নামেও বিখ্যাত”। (৩/৪)

যক্ষবেশী ব্রহ্ম বললেন, “কোন ক্ষমতার জন্যে তুমি বিখ্যাত”? অগ্নি বললেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি দগ্ধ করতে পারি”। (৩/৫)

“এটিকে দগ্ধ করো দেখি”, বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম অগ্নির সামনে একটি শুষ্ক তৃণ রাখলেন। সর্ব শক্তি দিয়েও অগ্নি সেই তৃণটিকে দগ্ধ করতে না পেরে ক্ষান্ত হলেন। দেবতাদের কাছে ফিরে বললেন, “এই পূজনীয় যক্ষ কে, জানতে পারলাম না”। (৩/৬)

এরপর দেবতারা বায়ুকে বললেন, “হে বায়ু, তুমি জেনে এসো তো, এই যক্ষ কে”? বায়ু বললেন, “তাই হোক”। (৩/৭)

বায়ু তাঁর কাছে গেলে, যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে”? বায়ু বললেন, “আমাকে সবাই বায়ু বলে, মাতরিশ্বা নামেও আমি বিখ্যাত”। (৩/৮)

যক্ষবেশী ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কোন দক্ষতার জন্যে তুমি বিখ্যাত”? বায়ু উত্তর দিলেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি উড়িয়ে নিতে পারি”। (৩/৯)

“এই তৃণ গ্রহণ করো” বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম তাঁর সামনে একটি শুষ্ক তৃণ রাখলেন। সর্বশক্তি দিয়েও বায়ু সেই তৃণটিকে উড়িয়ে তুলতে সমর্থ হলেন না। তিনি ফিরে এসে বললেন, “এই যক্ষ যে কে, আমি জানতে পারলাম না”। (৩/১০)

এরপর দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, “হে মঘবন্, আপনিই গিয়ে জেনে আসুন, এই যক্ষ কে”? ইন্দ্র বললেন, “তাই হোক”। ইন্দ্র সামনে যেতেই যক্ষ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (৩/১১)

তখন সেই আকাশেই বহু সোনার অলংকারে সজ্জিতা এক নারী, উমা হৈমবতী[2] আবির্ভূতা হলেন। ইন্দ্র তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যক্ষ কে?” (৩/১২)

তিনি (উমা) বললেন, “ইনিই ব্রহ্ম, ব্রহ্মের বিজয়কে নিজেদের মনে করে তোমরা মহিমান্বিত মনে করছো”। এইভাবেই ইন্দ্র জানতে পারলেন ইনিই ব্রহ্ম”। (৪/১)

যেহেতু অগ্নি, বায়ু এবং ইন্দ্র ব্রহ্মার নিকটে গিয়ে আলাপ করেছেন এবং প্রথমে এঁরাই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেছেন, সেহেতু অন্য দেবতাদের থেকে এঁনারা অধিক উৎকর্ষ লাভ করেছেন। (৪/২)” 

(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ৩ ও ৪ ")     

এই কাহিনীতে আমরা দেখলাম, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তিন প্রধান দেবতা ইন্দ্র, অগ্নি ও বায়ুর মহিমা পরমব্রহ্ম-র কাছে একান্তই অকিঞ্চিৎকর। এখানে রুদ্র বা বিষ্ণুর কোন উল্লেখই এল না। কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রধান দুই দেবতা বিষ্ণু ও শিব, ব্রহ্মর সমকক্ষ হয়ে ত্রিদেব হয়ে উঠেছেন। এমনকি অনেক গ্রন্থে তাঁদের ব্রহ্মর থেকেও বেশী ঐশ্বর্যবান দেখানো হয়েছে। আর যে স্বর্ণভূষিতা নারী[1] (কোন দেবীও নন?) ইন্দ্রকে ব্রহ্ম সম্বন্ধে অবহিত করলেন তিনি উমা। তিনিই আমাদের আদরের মাতৃরূপা-কন্যা, আশ্বিনে যাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় আমরা প্রত্যেক বছর উদ্গ্রীব অপেক্ষায় থাকি। তিনিই আদ্যাশক্তি দুর্গা, হিন্দু ধর্মে তাঁর স্থান ত্রিদেবেরও ওপরে। ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতদের হিন্দু বা পৌরাণিক পণ্ডিত হয়ে উঠতে এতটাই বৈতসী বৃত্তি অবলম্বন করতে হয়েছিল! ভাবলে বিস্মিত হতে হয় বৈকি।              

ষড়দর্শন প্রসঙ্গের উপসংহার টানার আগে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় সাধককবি শ্রী রামপ্রসাদ সেনের একটি গান উল্লেখ করি -  

“কে জানে কালী কেমন, ষড় দর্শনে না পায় দরশন।

আত্মারামের আত্মা কালী প্রমাণ প্রণবের মতন,

সে যে ঘটে ঘটে বিরাজ করে ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।

কালীর উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা বুঝ কেমন,

যেমন শিব বুঝেছেন কালীর মর্ম, অন্য কেবা জানে তেমন।

মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন,

কালী পদ্মবনে হংস সনে হংসী রূপে করে রমণ।

প্রসাদ ভাষে, লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধু-তরণ,

আমার মন বুঝেছে, প্রাণ বুঝে না; ধরবে শশী হয়ে বামন”।

অতএব সাঁতরে সাগর পার হওয়া অথবা বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যাওয়া সম্ভব নয় বুঝেই, আমরা সাধারণ মানুষজন এই ষড়দর্শন এবং তার তত্ত্ব উপলব্ধি থেকে মুক্ত থাকার পথটাই বেছে নিয়েছি। আমাদের মধ্যে যারা নাস্তিক তারা এক কথায় এসব নস্যাৎ করে দিব্যি উন্নাসিক থাকতে পারলেন। কিন্তু আমাদের মতো যারা ধর্মভীরু আস্তিক তারাও ষড়দর্শন এবং পরমব্রহ্ম বিষয়ে খুব স্পষ্ট ধারণা করতে পারলাম না। কিন্তু এ বিষয়ে কতিপয় ধর্মগুরু এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতের দুর্বোধ্য সংস্কৃত শাস্ত্রবাক্যকে শিরোধার্য করে, নিজ-নিজ ভাষায় নিজ-নিজ গোষ্ঠীর দেবদেবীর চরণে নিজেদের ভক্তি ও বিশ্বাস নিবেদন করতে শুরু করলাম। অর্থাৎ আমরা সেই দিন থেকেই হিন্দু হয়ে উঠতে লাগলাম। এ কথা এই পর্বের প্রতিটি অধ্যায়েই ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হবে।

যাই হোক, ষড়দর্শন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার এখানেই ইতি টানলাম। প্রসঙ্গতঃ বলি, এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে প্রথম চারটি দর্শনের সৃষ্টি ব্রাহ্মণ্য যুগে এবং শেষ দুটি হিন্দু যুগে – অর্থাৎ সে সময়ে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের হিন্দুধর্মে রূপান্তর প্রায় হয়ে এসেছে। এবার যে গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে, আমি ধর্ম বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা করব, সেটি হল মহাভারত। কারণ মহাভারত সম্পর্কে বলাই হয় – “যা নেই (মহা)ভারতে তা নেই ভারতে”।



[1] হৈমবতী শব্দের দুটি অর্থই সম্ভব – প্রথমটির উৎস হেম অর্থা সোনা – অতএব স্বর্ণালংকার ভূষিতা। আবার হিম মানে তুষার – অর্থাৎ হিমালয় কন্যা হিসেবেও হৈমবতী শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে। 

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৭

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...