মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৭  


 

সেইদিন মধ্যাহ্নের দ্বিতীয় দণ্ডে মাঠের ধুলো উড়িয়ে সাত জনের একটি রক্ষীদল দল এসে দাঁড়াল সুকরা গ্রামের প্রান্তে নালার ধারে। সুকরা গ্রামের জনা সাতেক মানুষ ক্ষেতে কাজ করছিল, ভয়ে এবং কৌতূহলে তারাও এসে একত্র হল। নোনাপুরের মানুষরা যারা নালার ওধারে ক্ষেতের কাজ করছিল, তারা এসে দাঁড়াল নালার সামনে। সকলের মনেই আশঙ্কা। পরশু রাত্রে আস্থানে যে ডাকাতি হয়েছিল, নিশ্চয় সে বিষয়ে সন্ধান নিতেই রক্ষীরা গ্রামে উপস্থিত হয়েছে।

রক্ষীদলের সর্দার উপানু ঘোড়ার পিঠে বসেই বলল, “এখানে এসব কী হচ্ছে?”

সুকরার বয়স্ক মানুষ ভীলক বললেন, “চাষ-বাসের কাজ করছি, আজ্ঞে”।

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু এই ঢিপি কবে হল, নালার মধ্যে?”

“আজ্ঞে আমরা এখানে ছোট একটা বাঁধ গড়ে, কিছুটা সেচের ব্যবস্থা করেছি”।

“কে দিয়েছে অনুমতি?”

“অনুমতি, মানে অনুমতি তো...সেভাবে কারও নেওয়া হয়নি...”।

“আপনি অভিজ্ঞ বয়স্ক মানুষ - অনুমতি ছাড়া এমন কাজ করলেন কী করে? জানেন না রাজার অনুমতি ছাড়া এসব কাজ করা যায় না”? সর্দার এতক্ষণ বেশ শান্ত ভদ্রভাবেই কথা বলছিল, এখন হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠল, “এটা কি বাপের সম্পত্তি পেয়েছেন? জানেন না যে কোন নতুন জমিতে আবাদ করতে, নালা-নদী থেকে সেচের জল যোগাড় বানাতে, গ্রামে পুকুর কাটতেও রাজার অনুমতি নিতে হয়? ন্যাকামি করছেন, নাকি রাজার নিয়মকে অমান্য করছেন? আপনার বাড়ি কোন গ্রামে?”

অপমানে ও ভয়ে আড়ষ্ট ভীলক বললেন, “ওই যে সুকরা গ্রামে...”।

“আচ্ছা? এতদিন নোনাপুরের নানান বজ্জাতির কথা কানে এসেছে, এখন সুকরাও তাদের দলে ভিড়েছে? তা এই নালার মধ্যে বাঁধ দেওয়ার ভাবনাটা কার?”

ভীলক বললেন, “আজ্ঞে আমাদেরই...আমরাই সকলে মিলে...”।

উপানু লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে নামল, বাঁহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে বলল, “এই নালা তো আপনাদের চোদ্দপুরুষের আগে থেকেই বইছিল। এতকাল আপনাদের মনে এই ভাবনার উদয় হয়নি কেন? হঠাৎ এই মাস দেড়েক যাবৎ এদিকের গ্রামগুলোতে অনেক কিছু অনিয়ম ঘটে চলেছে, দেখছি? কার বুদ্ধিতে?”

ভীলক খুবই ভীত স্বরে বললেন, “আজ্ঞে কারো বুদ্ধিতে নয়, আমরাই সকলে মিলে..., কই হে, তোমরাও বলো না”। ভীলক তাঁর পিছনের এবং সামনের নোনাপুরের উপস্থিত গ্রামবাসীদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। গ্রামবাসীরা কেউই কোন উত্তর দিল না, ভয়ার্ত অসহায় দৃষ্টিতে উপানুর মুখের দিকে তাকিয়ে রই

উপানু ভদ্রতার মুখোশটা ফেলে দিয়ে এবার ক্রূর হাসল, বলল, “ওঃরে, চাঁদ, এই মাত্র সুকরা গাঁয়ের প্রধানের সঙ্গে আমরা দেখা করে এলাম। তুই তো প্রধান নোস, তাহলে কি গাঁয়ের সর্দার? গাঁয়ের নেতা? এদের সবাইকে দলে টানছিস? এখন ধর তোকে সবার সামনে যদি ল্যাংটো করে চাবকাই, এরা সকলে তোকে বাঁচাবে? কার বুদ্ধিতে তোরা এসব করছিস, বলে ফ্যাল চাঁদ?”

অনেকক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই, উপানু সকলের মুখের দিকে এক এক করে তাকাল। অভিজ্ঞ উপানুর বুঝতে অসুবিধে হল না, ওদের সকলের চোখেই এখন ভয়ের নিবিড় ছায়া। হাতের বল্লমের বাঁট দিয়ে সজোরে গুঁতো মারল ভীলকের পেটে। আকস্মিক এই আঘাতে ভীলক মাটিতে পড়ে গেলেন, যন্ত্রণায় পেটে হাত রাখলেন। তাঁর চোখে এখন যেন মৃত্যুভয়। ভীলকের মাটিতে পড়ে থাকা দেহের পাশে দাঁড়াল উপানু, বলল, “কার বুদ্ধিতে এসব হচ্ছে, বলে ফ্যাল। এ তো সবে শুরু, না বললে আরও যে কী করব তোদের নিয়ে, ভাবতেও পারছিস না”।

ভীলক উঠে বসলেন মাটিতে, কিছু বললেন না। আঘাতে, অপমানে, অসহায় ক্রোধে তাঁর মুখ বিবর্ণ। ঘোলাটে চোখে তাকালেন উপানুর দিকে। উপানু বেশ উপভোগ করল ভীলকের অভিব্যক্তি – ঘাড় ফিরিয়ে সে তার সঙ্গীদের ইশারা করল। অন্য রক্ষীরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে ঘিরে ফেলল উপস্থিত মানুষগুলিকে। তারপর সপাসপ চাবুক চালাতে লাগল, তাদের নগ্ন পিঠে। উপানু সেদিকে একবার তাকিয়ে, চোখ রাখল ভীলকের চোখে, “কে তোদের পোঁদে সলতে ধরাচ্ছে, আমরা জানি না ভাবছিস? জানি...কিন্তু তোদের থেকে নামটা নিশ্চিত করতে চাই। বলে ফেল, নয়তো এমন দশা করব...শেয়ালকুকুর কাঁদবে”।

রক্ষীদের চাবুকের আঘাতে উত্যক্ত একজন হাত তুলে বলল, “বলছি, বলছি, আর মারবেন না”। উপানু হাত তুলে সকলকে চাবুক থামাতে বলল, তারপর সেই লোকটিকে বেশ স্নেহমাখা সুরে ডাকল, “এদিকে আয়, বিনা কারণে এতক্ষণ মার খেয়ে মরলি, প্রথমেই বলে ফেললে পারতিস। বল কার বুদ্ধিতে এসব হচ্ছে?”

“ভল্লা”।

“সে তো জানি, ভল্লা, নেড়িকুত্তীর বাচ্চা শালা, সে ছাড়া আর কে হবে? এখন সে কোথায়?”

“সে তো পশ্চিমদিকে রাজ্য-সীমার বাইরে জঙ্গলে থাকে”।

“আরে, সে তো আমরাও জানি। কিন্তু নোনাপুরে যে তার নিত্যি যাওয়া-আসা আছে সে খবরও আমাদের আছে। সে এখন কোথায়?”

“আজ্ঞে সে এখন কোথায় সত্যিই আমি জানি না। আমি তো সকাল থেকে এই মাঠেই আছি”।

“তোর বাড়ি কোন গাঁয়ে?”

“আজ্ঞে নোনাপুর”।

“নোনাপুর – নোওনাআ। রক্তের স্বাদ নোনতা হয়, চোখের জলের স্বাদও নোনতা...জানিস কি? গত পরশু রাত্রে আস্থানে ডাকাতি হয়েছিল শুনেছিস তো? সে লুঠের মাল কোথায় আছে, কার বাড়িতে। কাদের বাড়িতে?”

নোনাপুরের মানুষগুলোর শরীর এবার ভয়ে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। চাবুকের আঘাত সহ্য করতে না পেরে, এতক্ষণ নোনাপুরের যে মানুষটি কথা বলছিল, এখন তার কথা বলার শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই যেন। আসন্ন বিপদের ভয়ানক আভাসে তার কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা নত হয়ে এল। দু হাত জড়ো করে বুকের কাছে ধরে, সে তাকিয়ে রইল উপানুর চোখের দিকে। তার দুচোখে অসহায় মিনতি। উপানু জিজ্ঞাসা করল, “তোর নাম কি?”

“আজ্ঞে, আমি সত্যিই কিছু জানি না, সরকার”।

উপানু অকারণ উচ্ছ্বাসে হাহা করে হাসল কিছুক্ষণ, বলল, “বলিস কি? নিজের নামটাও জানিস না? বাপের নাম জানিস তো?” উপানুর হাসি যেন উপস্থিত সকলের মনে মৃত্যুভয় ধরিয়ে তুলল।  

“আজ্ঞে, সামারু”। কোন মতে নিজের নামটা উচ্চারণ করল।

“বাঃ, সামারু বেশ নাম। কার কার বাড়িতে লুঠের মাল রাখা আছে, বলে দাও তো ভাই”।

“আজ্ঞে জানি না, বিশ্বাস করুন”। আর্তনাদের মতো শোনাল সামারুর কথাগুলো।

উপানু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তুই নাও জানতে পারিস, কিন্তু তোদের মধ্যে অন্য কেউ তো জানবেই”। কিছুক্ষণ সময় দিয়ে উপানু খুব সহানুভূতি মাখানো গলায় বলল, “দ্যাখ, নামগুলো বলে দিলে, আমরা শুধু তাদের বাড়িতেই যাব। তা না হলে গ্রামের সব বাড়িতেই ঢুকে, আমাদের অনর্থক ভাঙচুর মারধোর করতে হবে। তোদের সবার বাড়িতে বুড়ো মা-বাপ আছে, বউ আছে। ছেলেমেয়ে আছে – অকারণ তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলা...। আর আমাদেরও কাজ সারতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সন্ধের পর আস্থানে ফিরে দুপাত্র রস নিয়ে বসব, আনন্দে উল্লাসে মাথা ঝিমঝিম করবে ...  কী বল?” উপানু ঘাড় ফিরিয়ে তার সঙ্গী রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল। তারা কেউ কিছু বলল না। চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল মানুষগুলোর দিকে।

উপানু সামারুদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বুঝতে পারছিস, ওরা কী রকম রেগে আছে? শালা বেজন্মা, তোরা ডাকাতি করলি, তার ওপর আবার দের তিন-তিনজন বন্ধুকে মেরে দিলি? কী ভেবেছিস, ঘাড় শক্ত করে জোড় হাতে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেই আমরা ছেড়ে দেব?” উপস্থিত মানুষগুলোর মুখে কোন উত্তর নেই। আসন্ন দুর্দশার অপেক্ষা করা ছাড়া।

উপানু এবার দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ স্বরে বলল, “এখনও সময় আছে, বলে ফ্যাল। নয়তো তোদের তো বটেই - তোদের গ্রামের সব বাড়িতে আগুন ধরিয়ে – সব কটাকে পুড়িয়ে মারব”।

সামারু এবং আরও তিনজন একসঙ্গেই বলল, “বিশ্বাস করুন আমরা সত্যিই জানি না। গ্রামের কেউ ডাকাতি করতে যায়নি, সরকার। আমাদের বিশ্বাস করুন, দয়া করুন”।         

 কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে উপানু নিজের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই পাঁঠাগুলোর সঙ্গে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। চ ওদের গ্রামে যাই, হতভাগাদের ঘর থেকে বের করে সবার সামনে ল্যাংটো করে গ্রাম ঘোরালেই সব কথা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে”।        

উপানু নিজের ঘোড়ায় চড়ল। ভীলক একই ভাবে মাটিতে বসেছিলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে উপানু বলল, “তোকে আমি মনে রাখব, তুই ভল্লার চেলা হয়েছিস না?” তারপর বল্লমের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল ভীলকের মুখে। বলল, “ভল্লা ধরা পড়লে ভাল। নাহলে পরের বার তুই বাঁচবি না, কথাটা মনে রাখিস”। ঘোড়া ছুটিয়ে উপানু সঙ্গীদের নিয়ে রওনা হল নোনাপুরের দিকে।

উপানুর বল্লমের আঘাতে ভীলক যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর চোয়াল ফেটে রক্ত ঝরছিল  দরদর করে। দুই গ্রামের উপস্থিত মানুষরা সকলে তাঁকে ঘিরে ধরল। নালা থেকে জল এনে তাঁর মাথায় মুখে ছেটাতে লাগল। নিজেদের ধুতি থেকে কাপড়ের ফালি ছিঁড়ে চেপে ধরল ভীলকমশাইয়ের ক্ষতে। এখনই রক্ত বন্ধ না হলে প্রাণ সংশয়ও হতে পারে। একটু পরেই ভীলকের জ্ঞান ফিরতে, সুকরার কুশান বলল, “তোরা এখনই গ্রামে ফিরে যা - তাড়াতাড়ি। হায়নার দল ওদিকেই গেল। তোদের যে কী হবে, ভাবতেই শিউরে উঠছি...। পরিস্থিতি বুঝে কবিরাজদাদাকে ভীলকদাদার কথা বলবি। ওদিকটা সামলে তিনি যেন আমাদের গ্রামে এসে ভীলকদাদাকে একবার দেখে যান”।   

সামারু বলল, “ভীলকদাদাকে এভাবে ফেলে রেখে আমরা পালাব?”

ঝেঁজে উঠে কুশান বলল, “আগে বাড়ি যা, নিজের পরিবার সামলা – আমরা তো রয়েছি, ভীলকদাদাকে দেখছি”।  

নোনাপুরের লোকেরা নিজেদের গ্রামের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।

ওরা চলে যেতে কুশান বলল, “এক কাজ কর। সবাই ধরাধরি ভীলকদাদাকে সামনের ওই গাছতলায় নিয়ে যা। ছায়াতে একটু আরাম পাবে। ততক্ষণ আমি দেখছি, জঙ্গল থেকে কিছু গাছগাছড়া এনে, রক্তপাতটা যদি বন্ধ করা যায়”।  

খুব সাবধানে ভীলককে তুলে নিয়ে সুকরার চারজন এগিয়ে গেল বড়গাছটার দিকে। কুশান গেল বাঁধের উজানে কিছুটা দূরের ঝোপঝাড়ের দিকে। সেখান থেকে খুঁজে খুঁজে তুলে নিল কিছু গাছগাছড়ার পাতা। তারপর দৌড়ে ভীলকের পাশে বসে এক গোছা পাতা নিয়ে দুহাতের তালুতে ঘষতে ঘষতে বলল, “রক্ত পড়া কমেছে?”

“মনে হচ্ছে না, কাপড়গুলো রক্তে ভিজে উঠছে বারবার”। সবুজ পাতার প্রলেপ বানিয়ে কুশান আলতো হাতে পুরু করে লাগিয়ে দিল ভীলকের ক্ষতে। বলল, “চেপে ধরে থাক কিছুক্ষণ, আশা করি এবার বন্ধ হয়ে যাবে”।

উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে এখন ওদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এখান থেকে তাদের গ্রামের দূরত্ব অনেকটাই। এই অবস্থায় ভীলকের পক্ষে পায়ে হেঁটে গ্রামে ফেরা অসম্ভব। ওরা সবাই মিলে ভীলককে বয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভয় হচ্ছে যে হারে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে, ভীলককে বেশি নাড়াচাড়া করলে, বিপদ আরও বাড়বে। কুশান বলল, “গাছের ডাল দিয়ে ছোট একটা খাটুলা বানিয়ে ফেললে হয় না? সেটায় তুলে ভীলকদাদাকে আমরা গ্রামে নিয়ে যেতে পারি?”

কুশানের থেকে অনেকটাই কমবয়সী সুরুল বলল, “বাঃ ভালো বলেছ, কুশানকাকা, চ তো আমরা বানিয়ে ফেলি”। ওরা তিনজন উঠে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কিছু গাছের ডাল যোগাড় করে আর এক গোছা লতা এনে, বসে গেল খাটুলা বানাতে।

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “রক্তপড়া কমেছে, কুশানকাকা?”

“কমবে। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। গভীর ক্ষত – সময় লাগবে বৈকি! ভল্লাটা এসে সত্যিই আমাদের সবার কপালেই বেশ দুর্ভোগ এনে দিলছেলেটা কাজের, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিপজ্জনকও। ওরা কি সত্যিই কাল আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিল?”

সুরুল আর তার দুই বন্ধু গাছের ডালগুলোকে লতা দিয়ে বেঁধে কাঠামো বানাতে বানাতে বলল, “নতুন পথে চলতে গেলে, একটু হোঁচট তো লাগবেই কুশানকাকা”?

“তার মানে?”

“আমাদের কেউ কোনদিনই রাজাকে দেখিনি। জানিও না, চিনিও না। রাজা বস্তুটা খায় না মাথায় মাখে তাও জানি না। আমরা জানি রাজার কর্মচারীদের। সেই রাজকর্মচারীরা চিরকাল যে আমাদের পোষা ছাগল-ভেড়ার মতোই দেখে একথা আমরা ছোটবেলা থেকে শুনছি। এবং বড়ো হতে হতে টেরও পেয়েছি। একটা পোষা কুকুরকেও তার প্রভু কিছুটা সমীহ করে। কারণ সে জানে বাড়াবাড়ি করলে পোষা কুকুরটাও ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা পারি না। যত ভাবে, যে ভাবেই আমাদের অত্যাচার করুক না কেন, আমরা কামড়ে দেওয়া তো দূরস্থান, দাঁত খিঁচিয়ে সামান্য ঘ্যাঁকটুকুও কোনদিন করতে পারিনি। ভল্লাদাদা আমাদের সেটাই শেখাচ্ছে”।

“ঠিক কি বলতে চাইছিস বল তো”? সুকুলের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে কুশান জিজ্ঞাসা করল, “এসব করেই কি আমরা ওদের থেকে সব সম্মান-টম্মান, ন্যায় বিচার-টিচার পেয়ে যাবো?”

সুরুল হেসে ফেলে বলল, “ভীলককাকার রক্তপড়াটা থেমেছে, কুশানকাকা”?

“হ্যাঁ অনেকটাই কমেছে। এখন কেমন লাগছে, ভীলকদাদা?” ভীলকের কথা বলার মতো অবস্থা নয়, হাত তুলে ইশারা করলেন, ঠিক আছি।

সুরুল বলল, “আর একটু সময় দাও, ভীলককাকা, তোমাকে আমরা বীরের সম্মানে কাঁধে তুলে নিয়ে যাবো”।

“আমার কথার জবাব দিলি না তো?” ভ্রূকুটি চোখে তাকিয়ে কুশান জিজ্ঞাসা করল।

“কিছুই না, কিছুই হবে না”, সুরুল খাটুলা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “তবু একবার লড়েই দেখা যাক না, কিছু তো হতে পারে! হাত-পা গুটিয়ে, হা-হুতাশ করে। কপালকে দোষারোপ করে। আর ঈশ্বরকে অভিযোগ করেই বা এতদিন কী হয়েছে, বলতে পারো, কুশানকাকা?” সুরুলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কুশান ভীলকের দিকে তাকাল, ভীলক কী শুনতে পেলেন সুরুলের কথা? ভীলক অনায়াসে উপানুকে ভল্লার নামটা শুরুতেই বলে দিতে পারতেন। বললে তাঁকে এত দুর্ভোগ আর অপমান সহ্য করতে হত না।

কুশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিন্তু তার জন্যে এই রক্তপাত, অপমান...”।

“এই নাও, আমার খাটুলা প্রস্তুত”। সুরুল নিজেই একবার শুয়ে পড়ল খাটিয়ায়, তারপর উঠে বসে বলল, “নাঃ পিঠে বড়ো লাগছে, কিছু ঘাস-পাতা বিছিয়ে দে তো পুরু করে। সুকুলের সঙ্গীরা ছুটে গেল, ঝোপ-ঝাড়ের দিকে, সুরুল লতার বাঁধনগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে করতে বলল, “অপমানের কথা বলছ, কুশানকাকা? ওদের কাছে আমাদের সম্মান কোনদিন ছিল কি? তাহলে কিসের অপমান বলো তো? ভীলককাকাকে ওরা নয়, আমরা এতদিন সবাই সম্মান করেছি, ভালবেসেছি। আজ থেকে আমরা কি আর কাকাকে ভালবাসব না? সম্মান করবো না?” সুরুল একটা জোড়ে আরো শক্ত করে লতা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “অপমান কোথায়, কুশানকাকা? বরং ওঁর সম্মান বাড়ল! আর রক্তপাত? ভীলককাকার রক্তের দাম আমরা চুকিয়ে দেব, কাকা, তুমি ভেব না...। এই তো, বাঃ একদম কাঁচা ঘাস আর সবুজ পাতা – নরম আর ভারি ঠাণ্ডাও হবে। কুশানকাকা, ভীলককাকাকে তোলা যাবে? তাহলে তুলেই দাও। কাকাকে এই গাছতলার উদলা মাটিতে ফেলে রাখতে ভাল লাগছে না... “।

সকলে ধরাধরি করে ভীলককে খাটুলিতে তুলে শোয়াল। ভীলককে শোয়ানোর সময় নীচু হয়ে থাকা সুরুলের মাথায় ভীলক একটা হাত রাখলেন, কিছু বলতে পারলেন না। এত কষ্টের মধ্যেও তাঁর চোখে যেন আশীর্বাদের বার্তা দেখতে পেল সুরুল

চলবে...

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৪ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

পঞ্চদশ পর্বাংশ 



৪.৮ দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্যের রাজবংশ

সংস্কৃতে দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্যের ভৌগোলিক অবস্থান সাধারণতঃ ভারতীয় উপদ্বীপ অঞ্চল, যার বিস্তৃতি নর্মদার দক্ষিণ তীর পর্যন্ত বোঝায়। যেমন উত্তরাপথ বলতে বিন্ধ্য এবং হিমালয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়।

বৈদিক আর্যদের কাছে দক্ষিণ ভারত সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না, তাঁরা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণের অঞ্চলটিকে দুর্গম “মহাকান্তার” বলে মনে করতেন। ব্রাহ্মণ্য পর্যায়ে বিন্ধ্যের বাধা পেরিয়ে তাঁরা দক্ষিণে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন জাতি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছিলেন। যার উদাহরণ পাওয়া যায়, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “অন্ধ্র, পুণ্ড্র, শবর, পুলিন্দ এবং মুটিবরা বৈদিক ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্র”। আবার পৌরাণিক উপাখ্যান আছে, মহামুনি অগস্ত্যের শিষ্য ছিলেন বিন্ধ্যপর্বত। একবার সূর্যের ওপর রাগ করে বিন্ধ্যপর্বত সূর্যের গতিরোধ করার জন্যে খুব বেড়ে উঠছিলেন। সে সময় বিন্ধ্যের বৃদ্ধি কমাতে অগস্ত্যমুনি বিন্ধ্য পার হয়ে দক্ষিণ ভারত যাওয়ার মনস্থ করলেন। মহামুনি অগস্ত্য বিন্ধ্যপর্বতের সামনে দাঁড়াতেই, মহামুনিকে প্রণাম করতে বিন্ধ্য যখন মাথা নত করলেন, মহামুনি বললেন, আমি যতদিন না ফিরে আসি, এভাবেই মাথা নত করে থাকো। অগস্ত্য তারপরে দক্ষিণভারত থেকে আর ফেরেননি, বিন্ধ্যপর্বত আজও মাথা নত করে আছে এবং আমাদের সৌভাগ্যক্রমে, সূর্যেরও প্রদক্ষিণ পথ আজও রুদ্ধ হয়নি। কাহিনী যাই হোক, এর সার কথা হল মহামুনি অগস্ত্য দুর্গম বিন্ধ্যপর্বত পার হয়ে দক্ষিণ ভারতে যেতে পেরেছিলেন এবং তাঁর দেখানো পথে, পরবর্তী উত্তরভারতের রাজা, ঋষি এবং উপনিবেশ-স্থাপনকারী মানুষেরা, উত্তরের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি নিয়ে দক্ষিণে যাওয়া আসা শুরু করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটামুটি ৫০০ বি.সি.ই-র রচনা পাণিনির “অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে” কলিঙ্গ পর্যন্ত নাম পাওয়া যায়, এবং প্রাচীনতম বৌদ্ধ শাস্ত্র “সূত্ত-নিপাত” গ্রন্থে গোদাবরী তীরে একমাত্র বাভারিন সঙ্ঘের উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ বি.সি.ই-র কাত্যায়ন তাঁর পাণিনি-ভাষ্যে মাহিষ্মত, নাসিক্য নগর ছাড়াও চোড় এবং পাণ্ড্যদের কথা উল্লেখ করেছেন। তৃতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে সমগ্র দক্ষিণ ভারত এবং তাম্রপর্ণীর (সিংহল) প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। অতএব মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়েই উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের নিবিড় যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল।

এর কিছুদিন পরে এসেছে সাতবাহন রাজবংশ, যাঁরা দাক্ষিণাত্যের অধিকাংশ অঞ্চল এবং আশেপাশের মালব প্রভৃতি অঞ্চলগুলিও শাসন করতেন। তাঁদের রাজত্বের শেষদিকে শকরা কিছুদিনের জন্যে, মহারাষ্ট্র এবং মালব অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন। খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি আভির গোষ্ঠীর রাজা ঈশ্বরসেন উত্তর মহারাষ্ট্র জয় করেছিলেন। এরপর বাকাতক বংশের রাজারা মধ্যভারত এবং দাক্ষিণাত্যের বেশ কিছুটা অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর দাক্ষিণাত্যের পূর্বদিকে ইক্ষ্বাকু এবং পল্লবরা এবং ছোট ছোট অনেকগুলি রাজা রাজত্ব করেছিলেন, যেমন কুদুরার বৃহতফলায়ন, ভেঙ্গিপুরের সালংকায়ন, দেনড়ুলুরুর (ভেঙ্গির কাছে) বিষ্ণুকুণ্ডিন ইত্যাদি। এরপরে দাক্ষিণাত্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ হল চালুক্য।  

৪.৮.১ চালুক্য

চালুক্যদের উৎপত্তি নিয়ে বিস্তর জল্পনা ও কল্পনা শোনা যায়। অনেকে বলেন দেবী হারীতি যখন তর্পণের জল অর্পণ করছিলেন, তাঁর ঘট থেকে চালুক্য বংশের সৃষ্টি। দেবী হারীতি বৌদ্ধদের দেবী, বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৌদ্ধদের এই দেবীর কল্পনা এসেছে - গ্রীস থেকে, জিউস এবং অ্যাফ্রোডাইটের কন্যা - গ্রীক দেবী টাইচের অনুসরণে। অনেকে বলেন, চালুক্য বা সোলাংকি বংশ গুর্জরদের মতো মধ্য এশিয়ার কোন যোদ্ধা উপজাতি। প্রথমদিকে এঁরা রাজস্থানে উপনিবেশ গড়েছিলেন, পরবর্তীকালে এঁদের একটি শাখা দক্ষিণ দিকে চলে এসেছিলেন।

দক্ষিণের চালুক্য বংশের উপস্থিতি ছোট করে শুরু করেছিলেন জয়সিংহ এবং তাঁর পুত্র রণরাগ। ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে রণরাগের পুত্র প্রথম-পুলকেশি চালুক্য বংশকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠা করলেন বাতাপিতে (এখন বাদামি, বিজাপুর জেলা) এবং অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা কীর্তিবর্মন উত্তর কোঙ্কন, কদম্ব রাজ্যের (উত্তর কানাড়া) বনবাসি এবং নালদের রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, উত্তর কোঙ্কনের তৎকালীন রাজা ছিলেন মৌর্যদের বংশধর! নালদের সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। পুত্ররা নাবালক থাকার জন্যে, কীর্তিবর্মনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মঙ্গলরাজ বা মঙ্গলেশ। তাঁর সাম্রাজ্য শোনা যায় পশ্চিমের সমুদ্র থেকে পূর্বের সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একথা সত্যি হোক বা না হোক, তিনি যে রেবতী দ্বীপ (আজকের রেড়ি, রত্নগিরি জেলা) অধিকার করেছিলেন, তার নিশ্চিত নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনিই বাদামি পাহাড়ে বিষ্ণুর গুহামন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মঙ্গলরাজের মৃত্যু হয়েছিল তাঁর সাবালক ভাইপোদের সঙ্গে যুদ্ধের সময়।  

দ্বিতীয়-পুলকেশি

দ্বিতীয়-পুলকেশি যখন রাজা হলেন, চালুক্য সিংহাসন নিয়ে পারিবারিক বিবাদ তখন তুঙ্গে। কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সেই বিবাদ মিটিয়ে তিনি সাম্রাজ্যের শক্তি বাড়াতে পেরেছিলেন। তিনি নিজেকে “পরমেশ্বর-শ্রীপৃথ্বীবল্লভ-সত্যাশ্রয়” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি গঙ্গবাড়ির (মহীশূরের অংশ) গঙ্গ এবং মালাবারের অলূপা (?) রাজ্য জয় করেছিলেন। শোনা যায়, দক্ষিণ গুজরাটের লাট রাজ্য, মালব এবং গুর্জররা (সম্ভবতঃ ভৃগুকচ্ছ) তাঁর অধীনতা মেনে নিয়েছিল। তবে তাঁর সবথেকে বড় কীর্তি কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধনকে পরাজিত করা। এই যুদ্ধজয়ের পর কলিঙ্গ এবং কোশল রাজ্যও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। এর পরে তিনি পল্লব রাজকুমার প্রথম-মহেন্দ্রবর্মনকে আক্রমণ করে, কাঞ্চীপুর (কাঞ্জিভরম) অবরোধ করেছিলেন, যার ফলে পল্লবরা এবং কাবেরী নদীর অপর পাড়ের রাজ্যগুলি, যেমন চোল, পাণ্ড্য এবং কেরালাও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয়-পুলকেশি যে শুধু রণদক্ষ রাজা ছিলেন তা নয়, তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর সঙ্গে পারস্যের রাজা দ্বিতীয়-খুসরুর ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল, তিনি ৬২৫ সি.ই.-তে পারস্যে রাজদূত পাঠিয়েছিলেন, এবং পারস্যের রাজাও তাঁর রাজধানীতে দূত পাঠিয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময় চীনা পর্যটক হুয়ান সাং সম্ভবতঃ ৬৪১ সি.ই.-তে তাঁর সাম্রাজ্যে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে দ্বিতীয়-পুলকেশীর সাম্রাজ্য সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।  

দ্বিতীয়-পুলকেশীর পরবর্তী রাজারা

তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে পল্লবরাজ নরসিংহবর্মন (৬২৫-৪৫ সি.ই.) চালুক্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন এবং ৬৪২ সি.ই.-তে রাজধানী বাতাপি বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন এবং সম্ভবতঃ সেই যুদ্ধেই দ্বিতীয়-পুলকেশীর মৃত্যু হয়। দ্বিতীয়-পুলকেশীর পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর দ্বিতীয় পুত্র প্রথম-বিক্রমাদিত্য। তিনি ৬৫৪ সি.ই.-তে পল্লবদের পরাজিত করে, পিতার হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র ও নাতি, যথাক্রমে বিনয়াদিত্য (৬৮০-৬৯৬ সি.ই.) এবং বিজয়াদিত্য (৬৯৬-৭৩৩ সি.ই.)। বিজয়াদিত্যের পুত্র দ্বিতীয়-বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকাল ৭৩৩ থেকে ৭৪৭ সি.ই. এবং তাঁর পরে রাজা হন দ্বিতীয়-কীর্তিবর্মন। এই সবগুলি রাজার রাজত্বকালেই পল্লব, চোল, পাণ্ড্য এবং কেরালা রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের নিরন্তর যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই ছিল। তবে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে তাঁদের সাম্রাজ্য থেকে মহারাষ্ট্র অধিকার করে নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রকূটদের দন্তিদুর্গা। দ্বিতীয়-কীর্তিবর্মনের পর চালুক্যবংশ এবং সাম্রাজ্য বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তবে ছোট ছোট রাজ্যে তাঁদের অস্তিত্ব ছিল দীর্ঘদিন। 

চালুক্য বংশের ধর্ম ও শিল্প

চালুক্য রাজাদের সকলেই একনিষ্ঠ হিন্দু ছিলেন, কিন্তু ধর্ম সহিষ্ণু ছিলেন। তাঁদের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যে জৈনদের প্রভাব বেড়েছিল। শোনা যায় রবিকীর্তি নামে একজন জৈন আচার্যকে দ্বিতীয়-পুলকেশী “জিনেন্দ্র” মন্দির নির্মাণে পূর্ণ সহযোগীতা করেছিলেন। বিজয়াদিত্য এবং দ্বিতীয়-বিক্রমাদিত্য জৈন পণ্ডিতদের অনেকগুলি গ্রাম দান করেছিলেন। বরং সেই তুলনায় বৌদ্ধদের তেমন কোন প্রভাব দেখা যায় না। যদিও হুয়ান সাং-এর বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি শতাধিক বৌদ্ধসংঘ দেখেছিলেন, যেখানে উভয় মতের – হীনযান এবং মহাযান– প্রায় পাঁচহাজার সন্ন্যাসী বসবাস করতেন। রাজধানীর বাইরে অশোকের নির্মিত পাঁচটি স্তূপ ছিল, এবং দেশ জুড়ে অসংখ্য স্তূপ তিনি দেখেছিলেন। এই যুগে পৌরাণিক দেবতাদের মূর্তি এবং মন্দির অজস্র নির্মাণ হয়েছিল, তার মধ্যে প্রধানতঃ ছিলেন ত্রিমূর্তি - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। অনুমান করা হয় অজন্তা গুহার দেওয়াল-চিত্রগুলির (frescoes) বেশ কিছু এই সময়ের আঁকা। চালুক্য রাজাদের মধ্যে যজ্ঞ আয়োজনের প্রবণতা ছিল, যেমন প্রথম-পুলকেশি একাই অশ্বমেধ, বাজপেয়, পৌণ্ডরিক ইত্যাদি যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন। 

৪.৮.২ মান্যক্ষেট বা মালখেড়-এর রাষ্ট্রকূট

যথারীতি রাষ্ট্রকূটদের উৎপত্তি নিয়েও কল্পনা ও বিতর্কের শেষ নেই। তার মধ্যে বিশেষজ্ঞরা যে মতটিকে সব থেকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন, সেটি হল অশোকের শিলালিপিতে উল্লেখ করা কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর নাম, যেমন রাষ্টিক বা রাঠিক, যার থেকে রাষ্ট্রকূট বা রাঠোর। অতএব রাষ্ট্রকূটরা দক্ষিণভারতেরই প্রাচীন অধিবাসী এবং মৌর্যদের সময়ে মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকের কিছু অংশের সামন্তরাজা ছিলেন। এই বংশের কয়েকজন রাজা, যেমন দন্তিবর্মন, প্রথম-ইন্দ্র পৃছকরাজ, প্রথম গোবিন্দ, প্রথম কর্ক এবং দ্বিতীয়-ইন্দ্ররাজ-এর নামটুকু ছাড়া আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাষ্ট্রকূট রাজাদের মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা দন্তিদুর্গা। দন্তিদুর্গার মা ছিলেন চালুক্য রাজকুমারী ভবনাগা, যাঁকে তাঁর বিবাহ-বাসর থেকে তুলে এনে বিবাহ করেছিলেন দ্বিতীয়-ইন্দ্ররাজ।

অষ্টম শতাব্দীর পঞ্চম দশকে দন্তিদুর্গা, চালুক্য সাম্রাজ্য থেকে মহারাষ্ট্র অধিকার করে নিয়েছিলেন। দন্তিদুর্গা সমসাময়িক অনেক রাজাকেই পরাজিত করতে পেরেছিলেন, যাঁদের মধ্যে আছেন, কাঞ্চীর পল্লবরাজ, কলিঙ্গ, দক্ষিণ কোশল, মালব (উজ্জিয়িনীর গুর্জর-প্রতিহার রাজা), লাট (দক্ষিণ গুজরাট), শ্রীশৈল (কারনুল জেলা), ইত্যাদি। দন্তিদুর্গার কোন পুত্র না থাকায়, তাঁর এক কাকা, কন্নর বা প্রথম কৃষ্ণ, ৭৫৮ সি.ই.-র কাছাকাছি, সিংহাসনে বসেন। প্রথম-কৃষ্ণ চালুক্যরাজ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মনকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে, কর্ণাটক ও তার সন্নিহিত বেশ কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি “রাজাধিরাজ-পরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি কোঙ্কন ও গঙ্গবাড়ি (গঙ্গদের রাজ্য) জয় করেছিলেন এবং ভেঙ্গি অঞ্চলের চালুক্য সামন্তরাজা চতুর্থ বিষ্ণুবর্মনকেও পরাস্ত করেছিলেন। এই প্রথম-কৃষ্ণই ইলোরার পাহাড় কেটে বিখ্যাত এবং অনবদ্য কৈলাসমন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। 

রাষ্ট্রকূটবংশের অন্যান্য রাজারা

দ্বিতীয়-গোবিন্দঃ  প্রথম-কৃষ্ণের মৃত্যুর পর, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, ৭৭২ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত অসংযমী এবং কামার্ত মানুষ ছিলেন।

ধ্রুব নিরুপমঃ  দ্বিতীয়-গোবিন্দের ভাই, ৭৭৯ সি.ই.-তে দাদাকে সরিয়ে সিংহাসনে বসেন। তাঁর পরাক্রমে গঙ্গরাজ পরাস্ত এবং বন্দী হন এবং তিনি গঙ্গরাজ্য অধিকার করেন। তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন, কাঞ্চীর পল্লবরাজ। এরপর তিনি প্রতিহার রাজ বৎসরাজকে পরাস্ত করে, মরু অঞ্চলে (রাজস্থান) বিতাড়িত করেছিলেন এবং উজ্জিয়নী সহ মালব অধিকার করেছিলেন। এরপর তিনি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে অভিযান করেছিলেন, রাজা ইন্দ্রায়ুধকে পরাস্ত করেছিলেন। সম্ভবতঃ এই সময়েই গৌড়রাজ ধর্মপালের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয় এবং গৌড়রাজকে পরাস্ত করে, তাঁর শ্বেত ছত্র এবং লক্ষ্মী-কমল অধিকার করেছিলেন। উত্তর ও মধ্য ভারতের এই রাজ্যগুলি তিনি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেননি, নিজের পরাক্রম দেখানোর জন্যে অভিযান করেছিলেন এবং অবশ্যই পরাজিত রাজ্যগুলি থেকে প্রভূত ধনসম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন।

তৃতীয়-গোবিন্দ জগত্তুঙ্গঃ ধ্রুবর পর রাজা হয়েছিলেন, তৃতীয়-গোবিন্দ, সম্ভবতঃ ৭৯৪ সি.ই.-তে। তৃতীয়-গোবিন্দকেও প্রতিবেশী সকল রাজাদের সঙ্গে, যেমন গঙ্গ, পল্লব, চালুক্য, প্রভৃতি নিরন্তর যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য রক্ষা করতে হয়েছিল। তিনিও কনৌজের চক্রায়ুধ এবং গৌড়ের রাজা ধর্মপালের বশ্যতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন উত্তর ভারতে ব্যস্ত, তখন তাঁর রাজ্যে যৌথ আঘাত হানল, দক্ষিণের চোল, গঙ্গ এবং পাণ্ড্য রাজারা, যদিও এই যুদ্ধেও তিনিই জয়ী হয়েছিলেন।

প্রথম-অমোঘবর্ষঃ তৃতীয়-গোবিন্দের মৃত্যুর পর ৮১৪ এ.ডি-তে রাজা হলেন নাবালক প্রথম-অমোঘবর্ষ, তাঁর অভিভাবক হয়ে প্রশাসনিক কাজ সামলাতেন, কর্করাজ-সুবর্ণবর্ষ, রাষ্ট্রকূট-সাম্রাজ্যের গুজরাট অঞ্চলের সামন্তরাজা ও মন্ত্রী। প্রথম দিকে ঠিকঠাক চললেও পরবর্তী কালে বিদ্রোহ এবং বিবাদ উপস্থিত হল। রাজ পরিবারের সাবালাক রাজকুমারদের সঙ্গে কর্করাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হল। এই দুর্বলতার সুযোগে ভেঙ্গির রাজা দ্বিতীয় বিজয়াদিত্য রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং অমোঘবর্ষ রাজ্যচ্যুত হলেন। কিন্তু এর পরে গুজরাটের একটি লিপি থেকে জানা যায় ৮২১ সি.ই.-তে অমোঘবর্ষ আবার সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, সম্ভবতঃ কর্করাজের সহায়তায়। অমোঘবর্ষ যুদ্ধ-বিগ্রহে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর হয়ে রাষ্ট্রকূট বংশের অন্যান্য রাজকুমার ও সামন্তরাজারা দক্ষতার সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। অমোঘবর্ষ তাঁর পরমগুরু জিনসেনার প্রভাবে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যদিও অন্য একটি লিপি থেকে জানা যায়, তিনি দেবী মহালক্ষ্মীর ভক্ত ছিলেন। তিনি সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যের গুণগ্রাহী ছিলেন। সাহিত্য তত্ত্ব নিয়ে, কানাড়ি ভাষায় রচিত তাঁর “কবিরাজমার্গ” এবং নৈতিক গুণাবলীর ওপর লেখা “প্রশ্নোত্তরমালিকা” উল্লেখযোগ্য। যদিও শেষ গ্রন্থটি অনেকের মতে শঙ্করাচার্য অথবা বিমলের রচনা। শেষ জীবনে তিনি ধর্ম এবং সাধনাতেই নিমগ্ন থাকতেন, এবং রাজকুমার ও মন্ত্রীদের হাতেই রাজ্যভার সমর্পণ করে দিয়েছিলেন।

মোটামুটি ৮৭৮ সি.ই.-তে অমোঘবর্ষের মৃত্যুর পর, রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র দ্বিতীয়-কৃষ্ণ, যাঁর উপাধি ছিল অকালবর্ষ এবং শ্রী-বল্লভ। দ্বিতীয়-কৃষ্ণ বিবাহ করেছিলেন কলচুরি রাজকুমারী – প্রথম কোকল্লের কন্যাকে। দ্বিতীয়-কৃষ্ণর ৯১৪ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্বকালে, তাঁর পূর্বপুরুষদের মতোই প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করতে হয়েছিল। দ্বিতীয়-কৃষ্ণর পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি তৃতীয় ইন্দ্র। তৃতীয় ইন্দ্রের পিতা ছিলেন, জগত্তুঙ্গ, যিনি কম বয়সেই মারা গিয়েছিলেন, এই জগত্তুঙ্গ ছিলেন, দ্বিতীয়-কৃষ্ণ ও কলচুরি রাজকুমারী লক্ষ্মীর পুত্র। তৃতীয় ইন্দ্র সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর সব থেকে বড় কীর্তি হল কনৌজ জয়, সম্ভবতঃ ৯১৬ বা ৯১৭ সি.ই.-তে। তাঁর স্বল্পস্থায়ী রাজত্বের পর ৯১৮ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন, দ্বিতীয়-অমোঘবর্ষ, এবং তারপরে চতুর্থ-গোবিন্দ। চতুর্থ-গোবিন্দ রাজ্যের প্রশাসনের থেকে বেশি মন দিয়েছিলেন, আমোদ-ফূর্তি এবং নারীসঙ্গে। চতুর্থ-গোবিন্দের পর ৯৩৬ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন তৃতীয় অমোঘবর্ষ, তিনি বুদ্ধিমান রাজা ছিলেন, তিনি কলচুরি এবং গঙ্গ বংশের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, কিছুদিনের জন্যে স্বস্তি পেয়েছিলেন।

তৃতীয় অমোঘবর্ষের পুত্র তৃতীয় কৃষ্ণ রাজা হয়েছিলেন ৯৪০ সি.ই.-তে। তৃতীয় কৃষ্ণ রণকুশল শক্তিশালী রাজা ছিলেন। তিনি কঠিন হাতে সাম্রাজ্য রক্ষা করেছিলেন, উপরন্তু বুন্দেলখণ্ড জয় করে মধ্য ভারতে কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিলেন। এরপরেই তিনি “পরমভট্টারক”, “মহারাজাধিরাজ” এবং “পরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। এরপর দক্ষিণেও তিনি কাঞ্চি ও তাঞ্জোর জয় করেছিলেন। ৯৬৮ সি.ই.-তে তৃতীয় কৃষ্ণের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রকূট বংশ পারিবারিক কলহের জন্যে অতি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ৯৭৩ সি.ই.-র পর এই বংশের কথা তেমন আর শোনা যায়না।

চলবে...


রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " স্তন্য-ডাইনী "


আমাদের এই শহর – পথিকপুরের শহীদ জগবন্ধু স্টেডিয়ামে আসছেন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় জিকাল্ডো। কোন দেশে থাকেন ঠিক জানি না। পর্তুগাল, ইটালি কিংবা ব্রাজিল এমনকি চিলি হলেও হতে পারে। সত্যি বলতে এই দেশগুলোও ঠিক কোনদিকে, মানে আমাদের দেশের পূর্বে না উত্তরে, নাকি কিছুটা দক্ষিণ দিক ঘেঁষে – সেটাও সঠিক বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি আমি তাঁর অন্ধ ভক্ত। জিকাল্ডোকে আমি আদর করে বলি জিকুদা। জিকুদার খেলা টিভিতে দেখাই যায়, কিন্তু সে খেলাও যে আমি খুব দেখেছি তা নয়। তবে খবরের কাগজে ছাপানো তাঁর সব ছবির কাটিং আমি সাঁটিয়ে রেখেছি আমার ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে।

আমি নিজে ফুটবল সেভাবে খেলি না, ছোটবেলায় গলিতে খেলতাম, রবারের বলে। সেই পর্যন্তই। অতএব খোলা মাঠে ফুটবল খেলাটা কী ভাবে খেলতে হয় সে বিষয়েও আমার তেমন ধারণা নেই। তার কারণ মাঠে গিয়ে আমাদের এদিকের ভাল ভাল টিমের খেলা দেখতে আমি তেমন উৎসাহ পাই না। লাইন দিয়ে টিকিট কাট, দুঘন্টা আগে থেকে মাঠের গ্যালারিতে সিট আগলে বসে থাক। আর বসে বসে খেলা দেখা? ইস্‌ সে খেলার যা ছিরি - অখাদ্য যত প্লেয়ার নিজেদের মধ্যে বল নিয়ে ঝুটোপুটি করছে। একবার বাঁদিকে ছুটছে তো পরক্ষণেই আবার উল্টোমুখে ছুটছে। এ আবার কি, মাঠের মধ্যে আনতাবড়ি ছুটোছুটি করলেই ফুটবল খেলা হয়ে গেল? তবে আমার বন্ধুদেরও বলিহারি। তাদের সবাই এবং গ্যালারির সব দর্শকও ওই খেলা দেখেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, গোল-টোল হলে তিড়িং বিড়িং লাফায়। আর নিজের দল গোল খেয়ে গেলে মাথা চাপড়ে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি গালাগাল দেয়।

সেখানে জিকুদাকে দেখ – কি শান্ত, সৌম্য চেহারা, যেন দেবদূত। দেখিনি কোনদিন, তবে শুনেছি জিকুদার পায়ে আঠা আছে, একবার বল এলে জিকুদার শ্রীচরণে সেটা চিপকে যায় – সে আঠা ছাড়ে বিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে – গোওওওল হলে। সেই জিকুদা আমাদের শহরের স্টেডিয়ামে আসছে আর আমি মাঠে যাবো না তাকে একবার চোখের দেখা দেখতে?

আমাদের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার দশেক মতো সিট। প্রথমে ভেবেছিলাম, আরামসে টিকিট পেয়ে যাব, এই পোড়া শহরে কপিস লোক আর আছে – যারা জিকুদার কদর বোঝে? তাই প্রথম দিকে একটু গড়িমসি করে, দিন তিনেক পরে টিকিট কাটতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! শুনলাম প্রথম দিনেই টিকিট সব শেষ, টিকিটের খুদ-কুঁড়োও এখন আর মিলবে না।

পরদিন সকালেই রওনা হলাম শানুদার বাড়ি। আমাদের এলাকার নেতা, তাঁর নাম শুনলে আগে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত। ইচ্ছা থাকলেও আজকাল অবশ্য খেতে পারে না  – কারণ বাঘগুলো থাকে সুদূর অভয়ারণ্যের ভেতর আর গরুরা গোমাতা হয়ে আমাদের সঙ্গে। শানুদার পুরো নাম শান্তিরঞ্জন, তবে তাঁর চারপাশে এবং তাঁর কীর্তিকলাপে সর্বত্রই অশান্তি বিরাজ করে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে আড়ালে বলে শানু মানে সেয়ানা – নিজের স্বার্থটি তিনি ষোলআনা বোঝেন কিনা।

কী সব জরুরি মিটিং-টিটিং চলছিল বলে, তাঁর বৈঠকখানা ঘরে আমি ডাক পেলাম ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর। আমাকে দেখেই আধবোজা চোখে বললেন, “কিরে তোর আবার কী হল, গতি? টিকিট পেলি না? তাহলে কী হবে? জিকাল্ডোকে দেখবি কী করে?”

আমার নাম গৌতম পল্লে, সংক্ষেপে গতি। কিন্তু গতি নাম হলে কী হবে – শানুদার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও আমার আজ পর্যন্ত কোন গতি হয়নি। তবে আশা আছে আজ আর শানুদা আমাকে হতাশ করবেন না, কিছু একটা গতি করে দেবেনই।

কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, “বুঝতেই তো পারছেন, দাদা। কোন গতিকেই সুবিধে করতে পারলাম না। তাই আপনার কাছে আসা। কিছু একটা করে দিতেই হবে দাদা, আমাদের শহরে জিকুদা আসছেন আর আমি দেখতে পাবো না, এ হতেই পারে না। বিশেষ আপনি থাকতে”।

“বুঝি রে সব বুঝি, তোরা আমায় এত ভক্তি-শোদ্দা করিস, ভরসা করিস, বিশ্বাস করিস। তোরা ছাড়া আমার কী আছে বল তো? সমাজের পাঁচ জনের জন্যে কিছু করতে পারলে, আমি মনে করি, তোদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারলাম। টিকিট আমার কাছে আছে, কিন্তু যা দাম, তুই কি দিতে পারবি, গতি?”

আমি খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কত দাম, শানুদা?”

“দুরকম টিকিট আছে - পঁচিশ আর চল্লিশ হাজার। চল্লিশের টিকিটে বসলে মনে হবে, তুই মাঠের মধ্যেই বসে আছিস – গ্যালারিতে নয়”।

“কিন্তু শুনেছি, গ্যালারির টিকিট দু রকমের? পিছনের দিকের সিটের দাম পনেরশ আর সামনের দুহাজার...”।

“ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু এখন তার ওই রকমই দাম...কিছু পড়ে আছে... খুব চাপ চলছে রে, হয়তো আজ কালের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে”।

আমি রীতিমত চমকে গিয়ে বললাম, “এত দাম দিয়ে কারা কিনছে, শানুদা?”

“নেবার লোকের অভাব নেই রে, গতি – ওই দামেও লোকে হা হা করে কিনছে। এ রাজ্যের লোক তো বটেই – ভিন রাজ্যের লোকরাও...। বর্ষার সন্ধ্যেয় চপ-ফুলুরির দোকানে কেমন ভিড় হয় দেখিসনি? তার থেকেও বেশি – সাত হাজার টিকিট আমার হাতে এসেছিল – শ তিনেক বাকি আছে...”

খুব কাকুতির সুরে বললাম, “আমার জন্যে দামে-দামে একটা দিন না, দাদা”।

“ফাগল হয়েছিস? এ টাকার হিসেব দিতে হবে না আমায়? এই টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতার এদিকে ওদিকে। তুই কী ভাবছিস, আমি ঝাড়ছি টাকাটা? এমনটা ভাবতে পারলি, গতি? তোদের সঙ্গে এতদিন উঠছি বসছি, এই বুঝি তার পোতিদান?”

আমি লজ্জায় কুঁজো হয়ে বললাম, “তোমাকে আমরা দেবতার মতো ভক্তি করি, দাদা। এমন কথাটা তুমি ভাবলে কী করে? আমার বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে সারদায় পাঁচলাখ লাগালো, সবটাই গেল জলে। তোমায় আমরা কিছু বলেছি? এ পাড়া - সে পাড়ার কত গরু যে পাচার হয়ে চলে গেল সীমান্ত পেরিয়ে – তুমি তার কী করবে বলো? মায়ের গয়না বেচা আট লাখ টাকা গেল আমার ক্লাস ফোর পাস ভাইয়ের হাইস্কুলের টিচার হতে গিয়ে। তাতেই বা তোমার কী করার ছিল, বলো। আমাদের ভক্তিতে কোনদিন কোন খাদ দেখেছ? রেশনে চাল পাইনি, চিনি পাইনি – তাতে কি? বাজার থেকে সেই চাল- চিনি কিনেই তো ভাত খেয়েছি, চা খেয়েছি। বলো খাইনি – চুপ করে, মুখ বুজে। আমরা তো জানি – সব দিক দিয়েই তোমার হাত-পা বাঁধা। আমি একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে সিকিউরিটির কাজ করি, মাস গেলে হাজার ছয়েক পাই। তাতেই কোন মতে আমাদের দিন চলে যাচ্ছে...। তোমার কাছে কোনদিন কিছু চেয়েছি? কোন অভিযোগ করেছি? আমরা জানি, তুমি যখন আছ মাথার ওপরে, আমরা টিকে থাকব ঠিক...”। বলতে বলতে আমার চোখে জল ভরে এল। গলা বুঝে এলেও বললাম, “তোমাকে আমরা অবিশ্বাস করতে পারি, একথা তোমার মনে হল কী করে, দাদা?”

শানুদাও চশমা খুলে চোখটা মুছল রুমালে, বলল, “আমিই বা কী পেয়েছি বল? সারাটা জীবন দলের জন্যেই তো প্রাণপাত করে দিলাম। একফালি এই জমিতে ধারদেনা করে ছোট্ট এই বাড়িটা করেছি – কোন মতে। তিনতলা বাড়ি, মোটে বারোখানা ঘর। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথ, ব্যালকনি। এসি। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে সবজি বাগান। মাথাগুঁজে এ বাড়িতে থাকার এত কষ্ট যে, ছেলে-মেয়ে দুটোকে চোখের সামনে রাখতে পারলাম না। কলকাতায় রেখে আসতে হল তাদের লেখাপড়ার জন্যে। তাও ইংরিজি মিডিয়াম, প্রাইভেট স্কুলে। গাড়ি রাখতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে – কিন্তু তাও দলের কাজের জন্যেই তিনটে গাড়ি রাখতে হয়েছে। আরও দুটো হলে ভালো হত – কী করব উপায় নেই... টাকার বড়ো টানাটানি, রে গতি...”।

আমি নিজেকে সামলে শানুদার সামনে মেঝেয় বসে পড়ে বললাম, “সে কি আর আমরা জানি না, বুঝি না, শানুদা? বুকের রক্ত দিয়ে, কী ভাবে তুমি দলটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ? ছাতা হয়ে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছ আমাদের মাথার ওপর – ঝড়-ঝাপটা-রোদ-বৃষ্টি সামলে। আমাদের এতটা অকিতজ্ঞ ভেব না, শানুদা। তোমাকে দাদার মতো মনে করি বলেই না, তোমার কাছে একটা টিকিটের আবদার নিয়ে এসেছিলাম। এ ব্যাপারেও যে তোমার হাত-পা বাঁধা, সেকথা বুঝতে পারিনি গো দাদা। বুঝলে কি আর আসতাম, তোমাকে দুঃখ দিতে?”

শানুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, বলল, “সত্যিই রে, আমার হাত-পা বাঁধা, কিচ্‌ছু করার নেই। এভাবে ফেরাতে আমারও কি মন চাইছে? একদম না। কিন্তু... একটা উপায় বলতে পারি, যদি পাঁচকান না করিস”।

অসহায় হাত-পা বাঁধা শানুদার হাত হয়তো কোনভাবে খোলার আশায় আমি খুব উদ্গ্রীব হয়ে বললাম, “কী উপায়, দাদা?”

চারদিকে তাকিয়ে, ঘরে উটকো কেউ নেই দেখে, শানু দুহাতের আট আঙুলের আটটা আংটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “ঠোঁটকাটা নেপালকে নিয়ে থানায় যা, ওখানে স্টেডিয়ামে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু সাবধান, ঘুণাক্ষরেও কেউ যেন জানতে না পারে”।

“কেউ জানবে না, দাদা। ওফ্‌, তোমাকে কী বলে যে শোদ্দা জানাবো, শানুদা। কী যে আনন্দ হচ্ছে, চোখের সামনে জিকুদাকে দেখব, হেঁটে চলে বেড়াতে – ভাবা যায় না। আমি তাহলে এখন আসি, দাদা?”

“আয়”।

 

 

শানুদার বাড়ি থেকে বেরোতেই সামনের চায়ের দোকানে ঠোঁটকাটা নেপালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নেপাল বলল, “কি রে, দাদার সঙ্গে দেখা করলি? কী বলল, দাদা?”

“খুব গোপন কথা, বাইরে আয়, বলছি”। নেপাল দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াতে বললাম, “দাদার কাছে গিয়েছিলাম, একটা টিকিটের জন্যে। বলল, তোর সঙ্গে থানায় যেতে...”।

“জিকুদার টিকিট? আবে আমাকে বলবি তো”!

“আমি আমতা-আমতা করে বললাম, “ভেবেছিলাম, দাদাকে বলে, স্টেডিয়ামের একটা টিকিট যদি যোগাড় হয়ে যায়...”।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে নেপাল বলল, “তা কি বলল, শানুদা?”

“যা দাম বলল, তাতে আমাকে বাপের ভিটেমাটি বেচতে হবে... পঁচিশ আর চাল্লিশ হাজার”।

“তুই কি বললি?”

“বলার আর আছেটা কী? দাদা তো আমার অবস্থা জানেই। তোর সঙ্গে থানায় যেতে বলল, ওখানে নাকি মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে?”

“তা হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানেও কিছু টাকা খসাতে হবে – দুহাজার পার হেড। তোর কটা লাগবে?”

“একটাই...কিন্তু দু হাজার? কমসম হবে না?”

শানুদার মতোই দুখু-দুখু উদাসমুখে নেপাল বলল, “কমের কথা মুখেও আনিস না, গতি। আমাদের হাত-পা বাঁধা। জানিস তো সবই – এ টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতায়। তোর কী মনে হয় – থানার সঙ্গে সাঁট করে আমরা ঝাড়ছি টাকাটা?”

“আরে না না, তা কেন ভাবব? তোর সঙ্গে কি আমার সেই সম্পক্কো?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেপাল বলল, “সেই...শানুদাকে তো চিনিস, সবার জন্যেই কত চিন্তাভাবনা করে। তোদের মতো কাছের ছেলেদের জন্যেই, নানান রকম ফন্দি-ফিকির বানিয়ে রেখেছে। সাধ্যের মধ্যেই যাতে তোদেরও সাধ মেটে। মাঝে মাঝে খুব ধিক্কার দিই নিজেকে, জানিস তো? এতদিন ধরে পাটি করে কী পেয়েছি বল? তুই তো জানিস চার কাঠা জমিটা কীভাবে যোগাড় করলাম। তারপর কীভাবে চারতলা বাড়িটা পোমোট করলাম। বদলে কী পেলাম? মোটে দুখানা ফ্ল্যাট আর একতলার দোকানটা”।

সবটা না জানলেও কিছু কিছু জানি। নেপালরা বছর পাঁচেক আগেও থাকত রেললাইনের ধারে জবরদখল জমিতে। এর মধ্যেই বিধবা এক বুড়িকে ধমকে-চমকে চার কাঠার ওই জমিটা হাতাল, আর রাতারাতি তুলে ফেলল চারতলা বাড়িটা। নিজের জন্যে, রাস্তার ধারে একটা দোকানঘর, আর দোতলায় দুটো ফ্ল্যাট রাখল, বুড়িকেও দিল একটা। বাকি তেরটা ফ্ল্যাট বেচে দিল। রাস্তার ওপরেই নেপালের মনিহারি দোকানটা এখন চালায়, ওর বৌ আর মা। রমরমিয়ে চলছে দোকানটা। সত্যিই তো, কী এমন পেল এত বছর পাটি করে?

নেপাল একটু চুপ করে থাকার পর আবার বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোদের মতোই একটা চাকরি নিয়ে সারাজীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু পারি না ওই শানুদার জন্যে। মানুষটা এত ভাল, আর উদার সমাজসেবী – মনে হয় – ওকে দেখে আমাদের সকলের শেখা উচিৎ। শুধু নিজেরটুকু নিয়ে থাকলেই হয় না – সবার জন্যেই কিছু না কিছু করা দরকার। তা নইলে সমাজে থেকে আর লাভ কি, বল? সে দুঃখের কথা যাগ্‌গে, থানায় কখন যাবি...আজই বিকেলে, নাকি কাল সকালে?”

“বিকেলে ... আজ ডিউটি থেকে ছুটি নিয়েছি। পরপর দুদিন ছুটি নিলে চাকরিটাই...”

“ঠিক আছে, সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ এখানেই আয় – দু হাজার টাকা নিয়ে... একসঙ্গে থানায় যাব, ঠিক আছে?”

 

 

সেদিন দুহাজার টাকা নিয়ে, থানা থেকে আমাকে একটা চুটকা কাগজ দিয়েছিল। সে কাগজের মাঝখানে গোল স্ট্যাম্প মারা। সেই কাগজটা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের গেটে যেতেই, গেটে থাকা পুলিশরা কাগজটা পকেটে পুরে, আমাকে মাঠে ঢুকিয়ে দিল। সেদিন থানাতেই বলেছিল, এই কাগজ কিন্তু গ্যালারিতে বসার জন্যে নয় – শুধু মাঠে ঢোকার জন্যে। মাঠে ঢুকে কোথায় দাঁড়াব, কী করব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তবে হ্যাঁ – থানা থেকে দেওয়া চুটকার কথা বাইরের লোকের কানে যেন কোন মতেই না যায়।

পোগ্‌গামের ঘন্টা দুয়েক আগে আমি মাঠে ঢুকে দেখলাম, স্টেডিয়ামের গ্যালারির অনেক সিটই ফাঁকা। আর গ্যালারির নীচে আমরা বেশ কজন ঘোরাঘুরি করছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার চেনাজানা, যেমন পদা, রতন, সমু, বাপি। কাজেই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। রতনই প্রথম কথা বলল, “কি বে, থানার চোথা?”

আমি ভয়ে ভয়ে নীচু গলায় বললাম, “চুপ বেটা, কেউ যেন জানতে না পারে”। আমার কথায় ওরা সবাই হো হো করে হেসে উঠল, পদা বলল, “শহরের সব কচি বাচ্চারাও জানে, আর তুই আমাদের চুপ করতে বলছিস?”

সমু বলল, “শুনেছি, মোটামুটি হাজার তিনেক চোথা ছেড়েছে থানা থেকে”।

রতন বলল, “শানুদা বলছিল গ্যালারির টিকিট সব বিক্রি হয়ে গেছে, তার ওপর আমাদের মত থানার চোথাধারীরা, মাঠে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যাবে না, মাইরি”।

দেখলাম ওরা ভেতরের খবর সব জানে, সে খবরের কিছু কিছু যে আমিও জানি, সেটা দেখাবার জন্যে বললাম, “তা তো হবেই, পনেরশর টিকিট পঁচিশে আর দুহাজারের টিকিট চল্লিশ হাজার ব্ল্যাকে বিক্রি হয়েছে, এমন ডিম্যাণ্ড”।

পদা ফিচেল হেসে বলল, “এমন এঁটো-কাঁটা বাসি খবর কেন ছড়াচ্চিস, গতি? লাস্টের দিকে পনেরশ বিক্রি হয়েছে পঁচাত্তরে আর দু হাজার এক লাখে”।

আমি চমকে উঠলাম, “বলিস কি?” তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “অবিশ্যি শানুদা আর কী করবে? হাত-পা বাঁধা, কলকাতা যেমন বলবে...”।

সমু বলল, “তুই চিরকাল সেই একই রকম ক্যালানে কাত্তিকই রয়ে গেলি, গতি। কোনকালে আর মানুষ হবি না! তোকে ওই সব ভুজুং দিয়েছে বুঝি?”

রতন আমার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে বলল, “চ গ্যালারির নীচে কোথাও বসি, বাপি, বাবার পেসাদ এনেছিস, নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?”

আমরা গ্যালারির তলায় মাথা নীচু করে ঢুকলাম, নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বসলাম গোল হয়ে। রতন পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে সবাইকে দিল, বাপি নিল না। বাপি জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল, তারপর সিগারেটের পেট টিপে তামাক বের করে, থানার চুটকাতে জমা করতে লাগল। আমি বললাম, “সে কি রে? চুটকাটা গেটে দাঁড়ানো পুলিশগুলো নেয়নি?” বাপি কোন উত্তর না দিয়ে, বিচ্ছিরি একটা মুখভঙ্গি করল, যার অর্থ হতে পারে, আমার বাপ-মা তো বটেই –  আমার চোদ্দ পুরুষকেও উদ্ধার হয়ে গেল। আমি গুম হয়ে বিড়ি টানতে লাগলাম।

 

 কোথা দিয়ে যে সময়টা কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এটুকু বুঝলাম গ্যালারি তো বটেই - বেড়ার এদিকের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরে গেছে। এমনকি আমাদের আশেপাশেও প্রচুর লোক গিজগিজ করছে। রতন বলল, “আর না, এবার চল, সামনের দিকে যাই। সওয়া চারটে বাজে, চারটের মধ্যে পৌঁছনোর কথা না?” কিন্তু তখন আর সামনের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই – ঠাসাটাসি ভিড়। তার মধ্যেও আমরা কোনমতে কিছুটা এগোতে পারলাম, কিন্তু বেড়ার ধার অব্দি পৌছনো গেল না। ওদিকে মানুষের দুর্ভেদ্য পাঁচিল। এর মধ্যেই গ্যালারির মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তারস্বরে চিৎকার করছে “জি কাল্ডো, জি কাল্ডো”। আমরা ডিং মেরে মাঠের দিকে তাকালাম। এক জায়গায় অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে ভনভন করছে – মৌচাকে জমে ওঠা মৌমাছি। তারা সব দামি দামি চকচকে নানান রংদার পোষাক পরা। তাদের মধ্যে মহিলারাও রয়েছে। মৌচাকটাকে চেপে বেঁধে রেখেছে গাদা-গাদা বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীরা। যেমন তাদের দশাসই চেহারা তেমনি তাদের হেক্কড়। আর রয়েছে, ফটো তোলার লোকেরা। ওরা ওই মৌচাকের চারপাশে উড়ছে – কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে, শরীর দুমড়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে চলেছে অবিরাম। কিন্তু জিকুদা কোথায় – দেখতে পাচ্ছি না তো?

আমার থেকে বেশ কিছুটা ঢ্যাঙা রতন, পাশেই দাঁড়িয়েছিল, তাকে বললাম, “জিকুদা কোথায় রে? দেখতে পাচ্ছিস?”

“আছে, মনে হচ্ছে ওই ভিড়ের মাঝখানে। ভিআইপিরা ওকে ঘিরে ধরে প্রচুর সেলফি তুলছে। তাদের মধ্যে আমাদের শানুদাও রয়েছে – দেখতে পাচ্ছিস? আর আছে কলকাতা থেকে আসা বেশ কিছু নেতা। বেশ কিছু ফিলিম-এস্টারও এসেছে...”।

অধীর ব্যাকুলতায় আমি ওই দিকেই তাকিয়ে রইলাম, চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেলাম। একবার – একঝলক দেখা দাও জিকুদা...তোমার কাছে ওই ভিআইপিরাই বুঝি সব? আমরা এই যে এত মানুষ এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ট্যাঁকের পয়সা খসিয়ে – মাস শেষের দিনগুলো কী করে কাটাবো জানি না...কিন্তু তোমাকে একবার দেখতে পেলে – সে দুঃখের কথা মনেও পড়বে না, জিকুদা একবারটি সামনে এসো। কিন্তু মৌচাক ভাঙল না, বরং আরও যেন জমাট বাঁধতে লাগল।

হঠাৎ আমাদের মাথার ওপরে গ্যালারি থেকে অজস্র জলের বোতল উড়ে গিয়ে পড়তে লাগল মাঠের মধ্যে। যেগুলো খালি, সেগুলো বেশি দূর গেল না। তবে যেগুলো খালি নয়, সেগুলোর বেশ কিছু গিয়ে পড়ল ভিআইপিদের গায়ে, মাথায়। ভিআইপিদের ফুলের গায়ে মুচ্ছো যাওয়ার অবস্থা। রীতিমতো চিড়বিড়িয়ে উঠে তিড়িংবিড়িং লাফাতে শুরু করল। তাই না দেখে টনক নড়ে উঠল তাদের ঘিরে থাকা যত নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশদের। এরই মধ্যে আমাদের ওপর চড়াও হল একদল পুলিশ, হাতের ডাণ্ডা উঁচিয়ে। “শালা, হারামীর বাচ্চারা, বোতল ছুঁড়ছিস?” বলেই সপাসপ ডাণ্ডা হাঁকাতে লাগল। আমরা চেঁচালাম অনেক, “আমরা বোতল কোথায় পাবো, যে ছুঁড়বো? আমরা কি কেউ জল কিনে খাই?” কেউ বলল, “বোতল ছুঁড়েছে গ্যালারির একলাখি সিটের লোকেরা, তাদের গিয়ে ক্যালান না...”। তাতে ফল হল আরও মারাত্মক। “শালা, অন্যের নামে ঢপ দিচ্ছিস ? আমরা দেখলাম তোদের ছুঁড়তে...” বলামাত্র পুলিশদলের লাঠির দাপট বারবার টের পেতে লাগলাম আমাদের পিঠে কাঁধে, ঘাড়ে...।

বাস্তবিক বোতলের জল কোনদিন আমরা কিনে খেয়েছি? মনে তো পড়ে না। আজকাল বিয়েবাড়িতে প্রায়ই পুঁচকে পুঁচকে জলের বোতল দেয়, সেগুলোর কিছু বাড়িতে চলে আসে। সেই বোতলেই জল ভরে, আমার বাবা এবং আমি, কাজে বেরোই। আমাদের কাঁধের ছোট্ট ব্যাগ, টিফিন কৌটো আর ওই তেলচিটে ময়লা জলের বোতলটা আমাদের নিত্যসঙ্গী। সেই সঙ্গীকে আমরা ছুঁড়বো ভিআইপিদের দিকে?

বুঝলাম, পুলিশরা একলাখি টিকিটওয়ালাদের কিছুই করতে পারবে না, কারণ ওদেরও হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আমরা? মার খেতে খেতে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে আমরা গেট দিয়ে ছুটে পালাচ্ছিলাম, তার মধ্যে বেনোজলে কই মাছ ধরার মতো আমাদের কজনকে কপাকপ ধরে ভ্যানে তুলে দিল পুলিশরা। তারপর আমাদের নিয়ে গেল থানায়, ভরে দিল লকআপে। আমার চেনা বলতে বাপিও ছিল আমার সঙ্গে।

সন্ধে গেল, রাত্রি হল। আমার বাবা থানায় এলেন আমাকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কিছুই হল না, শুনলাম, শানুদা থানায় আসছেন, তিনি যা বলবেন তাই হবে। ভরসা পেলাম, শানুদা নিশ্চয়ই...।

শানুদা এল রাত বারোটার একটু আগে। লকআপের সামনে শানুদা এসে দাঁড়াতেই, বন্ধ লোহার দরজায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম, “শানুদা, আমরা কিচ্ছু করিনি, বিশ্বাস করো...শুধুমুধু আমাদের ধরে এনেছে...”।

শানুদা গম্ভীরমুখে আমাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী যে করিস না, তোরা। তোদের জন্যে আমার মাথাটা কাটা গেল। যাতে দেখতে পাস বলে অনেক কষ্টে মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলাম, তোরা এই করলি?”

“কিচ্ছু করিনি, শানুদা, মাইরি বলছি”।

“সে কথা তোরা বা আমরা বললেই তো কেউ মেনে নেবে না রে। এটা এখন কেন্দ্রের হাতে, তারাই তদন্ত করে দেখবে, কারা আসল দোষী। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি যাতে তোরা শিগ্‌গিরি ছাড়া পেয়ে যাস। তবে বুঝতেই তো পারছিস...”।

“আপনার হাত-পা বাঁধা...” দু হাতে লোহার দরজার শিক ধরে বাপি উত্তর দিল।   

--০০-- 


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...