শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮ 


১৫

 

যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র রাখার জন্যে ভল্লা তার নির্বাসন কুটির থেকে কিছুটা দূরে দুটি বিশাল গাছ নির্দিষ্ট করেছিল। সেই গাছের মাঝামাঝি উচ্চতায় দুটি শক্তপোক্ত মাচানও সেই বাঁধিয়ে রেখেছিল। ঘন পাতার আড়ালে সে মাচানের অবস্থান যথেষ্ট গোপন। ভূমি থেকে উপরের দিকে তাকালে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। গাছগুলিতে গুটি গুটি ফল হয়। সে ফল মানুষ কিংবা বাঁদরের ভক্ষ্য নয়। অতএব বাইরের উপদ্রব মুক্ত। হেমন্ত বা শীতেও সে গাছদুটির পাতা ঝরে না, চিরহরিৎ।

মধ্যরাত্রি শেষের দণ্ড দেড়েক আগেই সেই গন্তব্যে পৌঁছে, টানা-শকটদুটি খালি করে সমস্ত অস্ত্র সম্ভার উঠে গেছে, দুই গাছের দুই মাচায়। অতএব এতক্ষণে অস্ত্র অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করল ভল্লা। সকলকে ডেকে চাপা স্বরে বলল, “ছেলেরা, আমাদের আপাততঃ কাজ শেষ, এই স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আমরা দণ্ড দুয়েক বিশ্রাম নেব। তারপর ঊষাকালে যে যার বাড়ি ফিরে যাবি”। ছেলেরা ভল্লাকে ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে নানান কথাবার্তা বলতে লাগল। সকলেই প্রথম এই অভিযানের সাফল্যে গর্বিত, উচ্ছ্বসিত। একজন বলল, “ভল্লাদাদা, রাজার রক্ষীরা কোন ভুট্টার রুটি খায় গো? গুটিচারেক লোক ছাড়া কেউ আটকাতেই এল না! এই রক্ষীদের নিয়ে রাজ্য শাসন চলে?”

ভল্লা হাসল, কোন উত্তর দিল না। অন্য আরেকজন বলল, “সত্যিই, আস্থান থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুঠ করা যে এত সহজ হবে, কে জানত? যাবার সময় আমার তো রীতিমতো হাত-পা কাঁপছিল। ফুস্‌, গিয়ে দেখলাম কিছুই না, ছেলের হাতের মোয়া”!

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “এই অভিযানটাকে তেমন গুরুত্ব দিস না। এর পরের অভিযানগুলোতে টের পাবি, লড়াই কাকে বলে। কী ভাবে সত্যিকার লড়াই লড়তে হয়। এসব কথা এখন থাক। মন থেকে এই অভিযানের কথা সম্পূর্ণ সরিয়ে দে। বাড়ি গিয়ে বাবা-মা ভাইবোন যখন প্রশ্ন করবে কী জবাব দিবি, সেটা এখনি ঠিক করে নে”

“কেন? তুমি গত পরশুই বাড়িতে বলতে বলেছিলে, আমরা রাম-কথা শুনতে যাবো, পাশের রাজ্যে। আমরা সেকথা বলেই তো এসেছি”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “রামায়ণের কাহিনী বিশাল, তার মধ্যে কোন কাহিনী নিয়ে আমরা রামকথা শুনলাম, সেটা ভেবেছিস? নাকি নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে সকলে আলাদা আলাদা গল্প শোনাবি?  কেউ বলবি হরধনু ভঙ্গ, কিংবা বালি বধ, কিংবা সীতা হরণ – কোনটা? কিশনা ধর তুই তোর মাকে বললি, জটায়ূ বধের গল্প, আর মিকানি তার মাকে বলল মারীচবধের গল্প। এবার তোদের দুই মায়ের যখন দেখা হবে, তোদের মিথ্যে কথা ধরতে তাঁদের খুব সময় লাগবে কি?”

কেউ কোন উত্তর দিতে পারল না। ভল্লা হাসল, বলল, “আবারও বলছি, আজকের এই অভিযানের কথা ভুলে যা। নিজেদের মধ্যে এখন রামকথা নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা কর। আমি যতদূর জানি, গতকাল রাত্রে হরধনু ভঙ্গ নিয়ে রামকথা হয়েছে। অতএব তোদের সবাইকে হরধনু ভঙ্গ নিয়েই কথা বলতে হবে। এর আগে কোথাও যদি দেখে বা শুনে থাকিস, সেটাকে সকলে মিলে মনে করার চেষ্টা কর। নইলে সবাই – সব্বাই - ধরা পড়ে যাবি। শুধু এ গাঁয়ে নয় আশপাশের গাঁয়েও ঢি ঢি পড়ে যাবে। আমি সুকরার চারজনকে রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের চলে আসা উচিৎ”।

কিশনা বলল, “তারা এসে কী করবে?”

“আজকের রামকথা তারা কেমন দেখল, কী দেখল, সে কথা তোদের বলবে। বিষয়টা কেন গুরুতর তোরা বুঝতে পারছিস না। আস্থানের অস্ত্র লুঠের সংবাদ আগামী কাল দুপুর থেকেই গ্রামের সকলে জেনে যাবে। তখন তোদের মিথ্যে গল্পের সঙ্গে আস্থান লুঠের যোগসূত্র বুঝে যাবে তোদের গ্রামের কুকুর-ছাগলগুলোও”!

বিষাণ বলল, “আমি এর আগে দু বার হরধনু ভঙ্গ দেখেছি…তাহলে সে নিয়েই আলোচনা হোক”।

ভল্লা হেসে মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক। আরও একটা ঝুঁকির কথা বলি। ওই রামকথা শুনতে আশেপাশের গ্রাম থেকেও কিছু লোক গিয়ে থাকতে পারে। তারা তোদের কাউকে কাউকে হয়তো চেনে। তাদের কেউ বলতেই পারে – আমি তো কাল গেছিলাম, কই তোদের তো দেখলাম না! কোথায়, কোনদিকে বসেছিলি? সে বিপদের কথাও ভেবে রাখিস”।

ছেলেরা ভল্লার কথায় অবাক হয়ে নির্বাক হয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভল্লা আবার হেসে বলল, “এই অভিযানটা  তোদের ছেলের হাতের মোয়া মনে হচ্ছে তো? তার কারণ আমার কাছে খবর ছিল, গতকাল সন্ধ্যে থেকে  আস্থানে পূর্ণিমা-উৎসব পালন করছে। রক্ষীদের অধিকাংশই তাড্ডির নেশায় মাতাল ছিল। সেই সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি মাত্র”। একটু থেমে আবার বলল, “এই অভিযান তখনই সফল হবে, যদি তোদের একজনও কেউ ধরা না পড়িস। মনে রাখিস, একজনও কেউ ধরা পড়লে, তার পেট থেকে সকলের নাম-ধাম বের করে নেওয়াটা রাজরক্ষীদের কাছে – ছেলের হাতের মোয়া”।

ভল্লা ছেলেদের মুখ আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেল, বলল, “ভয় পাস না। চিন্তা কর, ভাবনা কর। আর যেমন যেমন বললাম, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নে – সকলের বক্তব্য যেন একই হয়”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে আসা জরুরি। কথা বলতে বলতেও সে হানো, শলকু আর আহোকের দিকেও লক্ষ্য রাখছিল। হানোর অবস্থা এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি। বরং তার পাগলামি বাড়ছে। ভল্লা হানোর কাছে গেল, তার কাঁধে হাত রেখে অনুভব করল ধূম জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। ভল্লার ভুরু কুঁচকে উঠল। একটু পাশে সরে এসে সে চিন্তা করতে লাগল, কী করে হানোকে নির্বিঘ্নে সরিয়ে ফেলা যায়তার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল রামালি। “ভল্লাদাদা, হানোর জন্যে আমরা সবাই মনে হচ্ছে ডুববো”।

ভল্লা তীক্ষ্ণ চোখে রামালির দিকে তাকাল, বলল, “হুঁ। কিন্তু কী করা যায়?”

“সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর তো কোন পথ দেখছি না”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল। রামালির মতো ছেলের মুখে এমন নির্বিকার সিদ্ধান্তের কথা, ভল্লা আশা করেনি। রামালি তার দলে ভিড়েছে প্রথম দিন থেকে। যে কোন বিষয় জানার এবং শেখার জন্যে তার যে তীব্র নিষ্ঠা, সেটা ভল্লার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু ছেলেটার চোখেমুখে কোনদিন কোন উচ্ছ্বাস, আনন্দ, কষ্টবোধ সে লক্ষ্য করেনি। সে শুনেছে শৈশবে বাপ-মা মরা ছেলেটি বড়ো হয়েছে কাকা-কাকিমার সংসারে। রামালির প্রতি তার কাকার স্নেহ ও সহানুভূতি থাকলেও, কাকিমা তার ওপর সর্বদাই খড়্গহস্তা। ভল্লার মনে হয়েছে আশৈশব নানান অত্যাচার, বঞ্চনা এবং নির্স্নেহ - তার মানসিক চরিত্রটাকেই এভাবে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে রামালির আশ্চর্য উদাসীন ব্যবহার চমকে দিল ভল্লাকে

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল “এখানে এতজনের সামনে, কী ভাবে?”

এতটুকু সময় না নিয়ে রামালি বলল, “সাপ। দুর্ঘটনা – অপঘাত মৃত্যু। এই জঙ্গলে বেশ কিছু সাপের বাসা আমার জানা আছে – কেউটে, গোখরো”।

অন্ধকারে, গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া চাঁদের ঝিলিমিলি আলোয় ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। রামালি বলল, “তুমি অনুমতি দিলেই…”। ভল্লা তাকিয়েই রইল রামালির দিকে। একটু পরে রামালি দৌড়ে মিশে গেল অন্ধকার জঙ্গলে। ভল্লা সরে গেল অন্য দিকে। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হরধনু ভঙ্গ প্রসঙ্গে গবেষণায় নিবিষ্ট। ভল্লা সবার মুখই দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। এখন হানোকে সে আর দেখছে না। তার চোখ বারবার ফিরে আসছে শলকু আর আহোকের মুখে। দুজনেই এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তাও সে স্বস্তি পাচ্ছে না। 

এই সময়েই সুকরার চারজন ছোকরা এসে যোগ দিল ওদের দলে, ভল্লা যাদের রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিল। ওদের কাছে গিয়ে ভল্লা বলল, “যা ওরা সবাই রামকথা নিয়েই আলোচনা করছে, ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দে, তোরা ঠিক ঠিক কী দেখলি, কেমন দেখলি”।

তার পরিকল্পনায় এখনও পর্যন্ত কোন ত্রুটি ঘটেনি – শুধু হানোর ব্যাপারটা ছাড়া। হানোর মতো উদ্যোগী এবং কর্মঠ এক যুবক যে মানসিকভাবে এত দুর্বল – সেকথা ভল্লা বুঝতে পারেনি। ভল্লা এখনও পর্যন্ত তার এই ভুলটুকুই খুঁজে পেয়েছে – তবে ভুলটা সামান্য নয়। এর ফল হতে পারে মারাত্মক।     

প্রত্যূষের দণ্ডখানেক পার হওয়ার পরেও ভল্লা কারও চোখেমুখে ক্লান্তি বা ঘুমের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রায় সারারাত পালাগান বা রামকথা শুনে, কবে কোন লোকের চোখেমুখে বিনিদ্র-ক্লান্তির লক্ষণ ফোটে না? কিন্তু এদের চোখে মুখে কোথাও ক্লান্তির লেশমাত্র নেই! প্রথম অভিযান এমন নির্বিঘ্নে সফল হওয়ার আনন্দে তাদের মন এতই আত্মতুষ্ট এবং গর্বিত যে তাদের ক্লান্তি নেই? ঘুম আসছে না? এদিকে ভোর হতেআর দেরি নেই – ভোরে সকলের ঘরে ফেরা উচিৎ। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেলেরা এবার তোদের ঘরের দিকে রওনা হওয়া প্রয়োজন। এখনই রওনা হলে ভোরের দিকে গ্রামে পৌঁছতে পারবি। আশা করি নিজেদের মধ্যে আলোচনায় রাত্রের হরধনু-ভঙ্গ পালার প্রতিটি ঘটনা সকলেই জেনে গিয়েছিস। বাড়িতে জিজ্ঞাসা করলে সকলেই একই রকম কথা বলতে পারবি নিশ্চয়ই”।

দলের ছেলেদের অধিকাংশই বলে উঠল, “পারবো, তুমি চিন্তা করো না, ভল্লাদাদা।“

“বাঃ বেশ। আরেকটা কথা বলে রাখি। আগামীকাল তোদের বাবা-জ্যাঠারা হয়তো জেনে যাবেন, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে। হয়তো তাঁদের মুখে শুনবি – দু তিনজন রক্ষীর মৃত্যু সংবাদও!”

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? হত্যা? আমাদের কেউ করেছে নাকি?” ছেলেরা আঁতকে উঠল ভয়ে।

ভল্লা বলল, “হতে পারে। নাও হতে পারে। অনেক সময় প্রশাসন থেকে মিথ্যে কথাও বলা হয়, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে”।

ছেলেরা ভল্লার মুখের দিকে আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভল্লা তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত ভয় পাচ্ছিস কেন? এরকম উড়ো খবর শুনে বাবা-জ্যাঠাদের সামনে অমন ভয়ে শিউরে উঠবি নাকি? ডাকাতির সংবাদ শুনে, সবাই অবাক হয়ে যেমন “তাই নাকি?”, "কখন হল?" "ডাকাতের দল এল কোথা থেকে?" বলে, সেরকমই বলবি। মৃত্যুর সংবাদ শুনেও একই ভাবে বলবি “বলছো কী? ইস্‌ কি ভয়ংকর”!  ব্যস। তার বেশি বা কম নয়”।

ভল্লা একটু সময় নিল, তারপর আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস, শুধু অভিযান করলেই বীর হওয়া যায় না। তার পরেও প্রতিটি পা ফেলতে হয় বুদ্ধি আর বিবেচনা করে। এতটুকু ভুল কথা, সামান্য বেঠিক আচরণে তোরা সবাই বিপদে পড়ে যেতে পারিস। আশা করি এই একটা মাত্র অভিযান করেই, তোদের কেউই চাইবি না, রাজার কারাগারে সারাজীবনটা কাটুক। প্রকৃত বীরকে অনেক পথ চলতে হয় অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে। যা, এবার রওনা হয়ে পর। আর দেরি করিস না”।

ছেলের দল উঠে দাঁড়াল। শলকু বলল, “আজকে আর সকালের মহড়ার কথা বলো না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, শলকুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোদের মহড়া আজ বন্ধ। তবে আমি আজ সকালের দিকে চাষিভাইদের সঙ্গে মাঠে থাকবো। ওদের কাজকর্ম দেখাশোনা করবো। বাঁধটার আরও কিছু মেরামতি দরকার”।

শলকু বলল, “তুমিও তো সারারাত ঘুমোওনি। আজ বিশ্রাম নিতে পারতে”।

ভল্লা হেসে বলল, “কে বলল আমি কাল সারারাত ঘুমোইনি? আমি তো রামকথা দেখতে যাইনি। তোরা কাল রাত্রি দেড়প্রহরে বেরিয়ে যেতেই, আমি রান্নাবান্না করেছি, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছি…। তোদের কারও সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি...।

ভল্লার কথা শেষ হল না, একজন দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, হানোর কোন সাড়াশব্দ নেই, চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, মারা গেছে”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কী যাতা বলছিস? কই চল তো দেখি”।

সকলে হানোর পড়ে থাকা শরীরটার দিকে দৌড়ে গেল। ভল্লা উবু হয়ে বসে নাকের নীচে আঙুল রাখল, কবজি ধরে নাড়ি পরখ করল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, না প্রাণ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল হানোর বাঁ কানের নীচেয় – কালচে নীল হয়ে রয়েছে জায়গাটা। তার মাঝখানে দুটো সূক্ষ্ম ছিদ্র – সাপের ছোবল। ভল্লা কিছু বলল না। কিছু বলার দরকারও ছিল না। বছরে এমন একটা-দুটো সর্পদংশনের ঘটনা গ্রামের ছেলেরা ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখেছে। তবে সেগুলো সাধারণতঃ হয় পায়ে, অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে, অথবা জমিতে নীচু হয়ে কাজ করতে গিয়ে, হাতে। সে সব ক্ষেত্রে কখনও সখনও মানুষ বেঁচেও যায়। কিন্তু হানোকে ছুবলেছে – মোক্ষম জায়গায়, বেঁচে ফেরার কথাই ওঠে না।  

কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “চটপট একটা হালকা মাচা বানিয়ে, হানোকে সাবধানে নিয়ে যা। ছেলেটা সবে তৈরি হয়ে উঠছিল রে…এভাবে বেঘোরে মারা পড়ল…” ভল্লার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

গাছের ডাল কেটে মাচা বানিয়ে চার জন ছেলে হানোকে কাঁধে চাপিয়ে নিল। ছেলেদের সকলের মুখই এখন বিষণ্ণ। ক্লান্ত। অবসন্ন। এতক্ষণ তাদের মনে যে উত্তেজনা ও আনন্দ ছিল, সে সব মুছে দিয়ে গেল হানোর এই ভয়ংকর মৃত্যু। ভল্লা তাকিয়ে রইল দলটার দিকে। দলের পিছনে ছিল রামালি। রামালির সঙ্গে ভল্লার ক্ষণিকের চোখাচোখি হল। রামালির মুখও এখন আশ্চর্য অবসন্ন।

ভল্লা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া লক্ষ্য করল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। এখনও অন্ধকার। পাখিরা ঘুম ভেঙে সবে ডাকতে শুরু করেছে। ভোরের বাতাস গাছের পাতায় পাতায় তুলছে মর্মর শব্দ।    



চলবে...

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৫শ পর্ব

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের চতুর্দশ অধ্যায়ঃ গুণত্রয়বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৪শ পর্ব "


পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ পুরুষোত্তমযোগ


শ্রীভগবানুবাচ

ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্‌।

ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ঊর্ধ্ব-মূলম্‌-অধঃশাখম্‌-অশ্বত্থং প্রাহুঃ অব্যয়ম্‌।

ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যঃ তং বেদ স বেদবিৎ।।

শ্রীভগবান বললেন- জ্ঞানীজনেরা বলেন এই সংসার যেন একটি অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার ঊর্ধে শিকড় আর নীচেয় শাখা প্রশাখা, চারবেদ যেন এই বৃক্ষের পাতা। এই বৃক্ষটির স্বরূপ যিনি বোঝেন, তিনিই বেদজ্ঞ।

[অশ্বত্থ কথার মূল অর্থ যা কাল পর্যন্ত থাকে না, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। ইহলোকে সংসারে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে আবদ্ধ ক্ষণস্থায়ী জীবনের নিরন্তর জীবন চক্রকেই অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।]

[এই শ্লোকটির অনুরূপ শ্লোক পাওয়া যায় কঠোপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর প্রথমেই। ধর্মরাজ যম সেখানে অশ্বত্থ বৃক্ষকে সনাতন বলেছেন, এখানে ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন অব্যয়। বাকি বক্তব্য প্রায় একই। কঠোপনিষদের ওই পর্বটি এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - কঠোপনিষদ - ২/৩ (শেষ পর্ব)। এই কারণেই পণ্ডিতেরা বলেন, গীতা হল সকল উপনিষদের সারাংশ - অতএব আমাদের সনাতন ধর্মের মূল-তত্ত্বকথাগুলি এক গীতার মধ্যেই যেন বিধৃত।]     

 

অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ।

অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি কর্মানুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে।।

অধঃ চ ঊর্ধ্বং প্রসৃতাঃ তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়-প্রবালাঃ।

অধঃ চ মূলানি অনুসন্ততানি কর্ম-অনুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে।।

এই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা ত্রিগুণের প্রভাবে বেড়ে উঠে বিষয়রূপ পল্লব হয়ে নীচের থেকে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আবার ঊর্ধের মূলসমূহ মানুষের সুকর্ম এবং কুকর্মের ফলস্বরূপ নীচের দিকেও প্রসারিত হয়ে থাকে।

 

৩,৪

ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে

নান্তো ন চার্দিন চ সম্প্রতিষ্ঠা।

অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলমসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।।

ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং

যস্মিন্‌ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ।

তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে

যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী।।

ন রূপম্‌ অস্য ইহ তথা উপলভ্যতে

ন অন্ত ন চ আদিঃ ন চ সম্প্রতিষ্ঠা।

অশ্বত্থম্‌ এনং সুবিরূঢ়মূলম্‌ অসঙ্গ-শস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।। ৩

ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং

যস্মিন্‌ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ।

তম্‌ এব চ আদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে

যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী।। ৪

ইহলোকে সংসাররূপ এই অশ্বত্থের রূপ সঠিক উপলব্ধি করা যায় না, কারণ এই বৃক্ষের শেষ নেই, শুরু নেই, এমনকি মধ্যবর্তী স্থিতাবস্থাও নেই। এই বদ্ধমূল অশ্বত্থবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রে কেটে ফেলার পর, যে ব্রহ্মপদ লাভ করলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না, সেই পরম ব্রহ্মপদের অন্বেষণ করা উচিৎ। আমি সেই আদি পরমব্রহ্মপুরুষেরই শরণাপন্ন হই, যাঁর থেকে এই চিরন্তনী সংসার-প্রবৃত্তি প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

  

     ৫

নির্মানমোহা জিতসঙ্গদোষা

অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তিকামাঃ।

দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈর্গচ্ছন্ত্যমূঢ়া

পদমব্যয়ং তৎ।।

নিঃ-মান-মোহা জিত-সঙ্গ-দোষা

অধ্যাত্ম-নিত্যাঃ বিনিবৃত্তি-কামাঃ।

দ্বন্দ্বৈঃ-বিমুক্তাঃ সুখ-দুঃখ-সংজ্ঞৈঃ গচ্ছন্তি অমূঢ়া

পদম্‌ অব্যয়ং তৎ।।

অহংকারহীন ও মোহবর্জিত হয়ে, আসক্তির সমস্ত দোষ জয় করে, পরমাত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা নিয়ে, বাসনা ত্যাগ করে, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে, জ্ঞানী ও বিবেকী ব্যক্তিরাই সেই অব্যয় পরমব্রহ্মপদ লাভ করেন।

  

ন তদ্ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।

যদ্‌ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।

ন তৎ ভাসয়তে সূর্যঃ ন শশাঙ্কঃ ন পাবকঃ।

যৎ গত্বা ন নিবর্তন্তে তৎ ধাম পরমং মম।।

যে পদ লাভ করলে আবার জন্ম নিতে হয় না, সূর্য, চন্দ্র কিংবা অগ্নি যাঁকে প্রকাশ করতে পারেন না, সেই পদই আমার কাছে পরম ব্রহ্মপদ।

  

মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।

মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।

মম এব অংশঃ জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।

মনঃ-ষষ্ঠানি-ইন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।

কারণ আমারই সনাতন একটি অংশ জীবলোকে জীবভূতরূপে, প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও ছয় ইন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে।

 

শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ।

গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ।।

শরীরং যৎ অবাপ্নোতি যৎ চ অপি উৎক্রামতি ঈশ্বরঃ।

গৃহীত্বা এতানি সংযাতি বায়ুঃ-গন্ধান-ইব-আশয়াৎ।।

যেমন বায়ু পুষ্প থেকে গন্ধ আহরণ করে, তেমনি দেহের অধিকারী, শরীর ত্যাগের সময়, পূর্ব দেহ থেকে সমস্ত ইন্দ্রিয় আহরণ করে প্রস্থান করেন ও নতুন শরীর ধারণ করেন।

 

শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনঞ্চ রসনং ঘ্রাণমেব চ।

অধিষ্ঠায় মনশ্চায়ং বিষয়ানুপসেবতে।।

শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনং চ রসনং ঘ্রাণম্‌ এব চ।

অধিষ্ঠায় মনঃ চ অয়ং বিষয়ান্‌ উপসেবতে।।

দেহের অধিকারী এই জীবাত্মা কান, চোখ, ত্বক, জিভ ও নাক এমনকি মনকেও আশ্রয় করে বিষয় সম্পদ উপভোগ করেন।

 

     ১০

উৎক্রামন্তং স্থিতং বাপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্‌।

বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ।।

উৎক্রামন্তং স্থিতং বা অপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্‌।

বিমূঢ়া ন অনুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ।।

যে জীবাত্মা অন্য শরীরে গমন করেন ও অবস্থান করেন, যিনি ইন্দ্রিয় ও তিনগুণের প্রভাবে বিষয় ভোগ করতে থাকেন, তাঁকে অজ্ঞান ব্যক্তি দেখতে পায় না, কিন্তু আত্মজ্ঞানীরা তাঁকে দেখতে পান।

 

১১

যতন্তো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্ত্যাত্মন্যবস্থিতম্‌।

যতন্তোঽপ্যকৃতাত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ।।

যতন্তঃ যোগিনঃ চ এনং পশ্যন্তি আত্মনি অবস্থিতম্‌।

যতন্তঃ অপি অকৃত আত্মানঃ ন এনং পশ্যন্তি অচেতসঃ।।

সমাহিত চিত্তের যোগীগণ এই আত্মাকে নিজের আত্মায় প্রতিষ্ঠিত দেখতে পান, কিন্তু অশুদ্ধচিত্তের বিবেকহীন মানুষ এই আত্মাকে দেখতে পায় না।

 

    ১২

যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ভাসয়তেঽখিলম্‌।

যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্‌।।

যৎ আদিত্য-গতং তেজঃ জগৎ ভাসয়তে অখিলম্‌।

যৎ চন্দ্রম্‌ অসি যৎ চ অগ্নৌ তৎ তেজঃ বিদ্ধি মামকম্‌।।

সূর্যের যে তেজে, চন্দ্রের যে জ্যোতিতে এবং অগ্নির যে দাহিকাশক্তিতে এই অখিল জগৎ উদ্ভাসিত হয়, জেনে রাখো, সেই তেজ আমারই।

 

১৩

গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়ম্যহমোজসা।

পুষ্ণামি চৌষধীঃ সর্বাঃ সোমো ভূত্বা রসাত্মকঃ।।

গাম্‌ আবিশ্য চ ভূতানি ধারয়মি অহম্‌ ওজসা।

পুষ্ণামি চ ঔষধীঃ সর্বাঃ সোমঃ ভূত্বা রস-আত্মকঃ।।

এই নিখিল ভুবনে প্রবেশ ক’রে, আমার ঐশ্বরিক শক্তি দিয়ে স্থাবর জঙ্গম সকল ভূতকে আমিই ধারণ করি। রসাত্মক চন্দ্র হয়ে আমিই সমস্ত শস্যকে পুষ্টি দান করি।

 

    ১৪

অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।

প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্‌।।

অহং বৈশ্বানরঃ ভূত্বা প্রাণিনাং দেহম্‌ আশ্রিতঃ।

প্রাণ-অপান-সমাযুক্তঃ পচামি অন্নং চতুঃ-বিধম্‌।।

আমিই অগ্নি রূপে জীবদেহে অবস্থান করি এবং প্রাণ ও অপানবায়ুর সংযোগে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, এই চার প্রকারের খাদ্য পরিপাক করি।

 

১৫

সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো

মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনঞ্চ।

বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো

বেদান্তকৃদ্‌ বেদবিদেব চাহম্‌।

সর্বস্য চ অহং হৃদি সন্নিবিষ্টো

মত্তঃ স্মৃতিঃ-জ্ঞানম্‌ অপোহনং চ।

বেদৈঃ চ সর্বৈঃ অহম্‌ এব বেদ্যঃ

বেদান্ত-কৃৎ বেদ-বিৎ এব চ অহম্‌।

আমিই সকল জীবের হৃদয়ে সম্যকরূপে নিবিষ্ট থাকি, আমার থেকেই স্মৃতি ও জ্ঞানের উপলব্ধি হয় আবার অবলুপ্তিও ঘটে। সকল বেদে আমিই জ্ঞানের বিষয়, বেদান্তের অধিকারী আমিই বেদজ্ঞ।

  

   ১৬

দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ।

ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোঽক্ষর উচ্যতে।।

দ্বৌ ইমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরঃ চ অক্ষরঃ এব চ।

ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থঃ অক্ষরঃ উচ্যতে।।

ক্ষর ও অক্ষর এই দুইধরনের পুরুষ জগতে প্রসিদ্ধ।  বিনাশী বিকার থেকে উৎপন্ন সমস্ত ভূতকে ক্ষর পুরুষ এবং কূটস্থ নির্বিকার পুরুষকে অক্ষর বলে।

[ক্ষর কথার অর্থ যার ক্ষরণ বা ক্ষয় হয় - অর্থাৎ বিনাশী, নশ্বর। আর অক্ষর হল তার বিপরীত, অর্থাৎ অবিনাশী, অব্যয়, অবিনশ্বর]  

 

১৭

উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ।

যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ।।

উত্তমঃ পুরুষঃ তু অন্যঃ পরমাত্মা ইতি উদাহৃতঃ।

যঃ লোকত্রয়ম্‌ আবিশ্য বিভর্তি অব্যয়ঃ ঈশ্বরঃ।।

এই দুই পুরুষ ছাড়া আরেক জন শ্রেষ্ঠ পুরুষ আছেন, তিনিই পুরুষোত্তম নামে অভিহিত হন। ভূঃ, ভুবঃ আর স্বঃ -এই তিন ভুবনের মধ্যে অবস্থান ক’রে, তিনিই অব্যয় ঈশ্বররূপে সকলকে পালন করেন।

 

    ১৮

যস্মাৎ ক্ষরমতীতোঽহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ।

অতোঽস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।

যস্মাৎ ক্ষরম্‌ অতীতঃ অহম্‌ অক্ষরাৎ অপি চ উত্তমঃ।

অতঃ অস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।

যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষরের অনেক ঊর্ধে, সেহেতু সর্বলোকে এবং সকল বেদে, আমিই পুরুষোত্তম নামে প্রখ্যাত।

 

১৯

যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্‌।

স সর্ববিদ্‌ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।

যঃ মাম্‌ এবম্‌ অসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষ-উত্তমম্‌।

স সর্ববিদ্‌ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।

হে অর্জুন, সমস্ত মোহমুক্ত হয়ে, অভিমানশূণ্য চিত্তে যিনি আমাকেই পুরুষোত্তম উপলব্ধি করেন, সেই সর্বজ্ঞ ব্যক্তি সর্বতোভাবে আমারই উপাসনা করেন।

 

২০

ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রমিদমুক্তং ময়াঽনঘ।

এতদ্‌ বুদ্ধা বুদ্ধিমান্‌ স্যাৎ কৃতকৃত্যশ্চ ভারত।।

ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রম্‌ ইদম্‌ উক্তং ময়া অনঘ।

এতদ্‌ বুদ্ধা বুদ্ধিমান্‌ স্যাৎ কৃতকৃত্যঃ চ ভারত।।

হে অপাপবিদ্ধ অর্জুন, এই যে পরমরহস্যময় শাস্ত্রতত্ত্ব আমি তোমাকে ব্যাখা করলাম, এই তত্ত্ব জানতে পারলে যে কোন ব্যক্তি পরম জ্ঞানী ও কৃতার্থ হয়ে থাকেন। 


পুরুষোত্তমযোগ সমাপ্ত

চলবে...





বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের পঞ্চম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৫ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)


৪.৩.২ গুপ্ত সাম্রাজ্য

ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর্বকে সব থেকে উজ্জ্বল পর্যায় বলা হয়, তার কারণ এই সময়ের সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রাচুর্য। যার থেকে সমসাময়িক ভারতবর্ষের পরিস্থিতি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্যক ধারণা করা যায়।

গুপ্তদের বংশ পরিচয় অস্পষ্ট, অনেক ঐতিহাসিক তাঁদের নামে “গুপ্ত” সংযোগ দেখে বৈশ্য বলে মনে করেন। কিন্তু গুপ্ত দেখেই বৈশ্য ধারণা করা হয়তো সঠিক নয়, কারণ সমসাময়িক কালে ব্রহ্মগুপ্ত নামে এক জ্যোতির্বিদের নাম পাওয়া যায়, যিনি একজন বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত।

গুপ্ত বংশের প্রথম যে রাজার নাম পাওয়া যায় তাঁর নাম শ্রীগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল “মহারাজা”। অনুমান করা হয় মগধ অঞ্চলের ছোট কোন রাজ্যে তাঁর রাজত্ব ছিল। চৈনিক পর্যটক ই-ৎসিং-এর বর্ণনা থেকে তাঁকে চিহ্নিত করা যায়। ওই বর্ণনা অনুযায়ী মহারাজা চি-লি-কি-তো (শ্রীগুপ্ত) চৈনিক তীর্থযাত্রীদের জন্য মৃগশিখাবনে একটি বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ই-ৎসিংয়ের ভারতভ্রমণ কাল ৬৭৩-৬৯৫ সি.ই., তিনি লিখেছেন, মন্দিরটি প্রায় পাঁচশ বছর আগে নির্মিত হলেও, তাঁর ভ্রমণকালে খুব সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে দেখেছেন। সেক্ষেত্রে শ্রীগুপ্তর সময়কাল হওয়া উচিৎ ১৭৩ সি.ই., কিন্তু ই-ৎসিংয়ের “পাঁচশ বছর”কে নির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে না ধরে, যথেষ্ট প্রাচীন হিসেবে কথার-কথা ধরা যেতে পারে। শ্রীগুপ্তর সময় যদি ২৭৩ সি.ই. ধরা যায়, সেক্ষেত্রেও ই-ৎসিং-য়ের সময় ওই মন্দিরের বয়স প্রায় চারশ বছরের কাছাকাছি!

শ্রীগুপ্ত-র পুত্রের নাম ঘটোৎকচ, তিনিও মহারাজা উপাধি ব্যবহার করতেন, তবে তাঁর সম্পর্কে তেমন আর কিছুই জানা যায় না।

 

৪.৩.২.১ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত

ঘটোৎকচের পর তাঁর পুত্র চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন এবং তিনি “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। যার থেকে ধারণা করা যায় গুপ্তবংশের তিনিই প্রথম রাজা, যিনি এই বংশের শক্তি এবং মর্যাদা বাড়িয়ে তুলতে পেরেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবির রাজকুমারী কুমারদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শিলানির্দেশে নিজেকে “লিচ্ছবিদৌহিত্র” বলে উল্লেখ করেছেন। চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে লিচ্ছবি রাজকুমারীর এই বিবাহের আরও সমর্থন পাওয়া যায়, তাঁর প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রায়। তাঁর মুদ্রার একদিকে মুদ্রিত আছে, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পত্নীকে সোনার বলয় উপহার দিচ্ছেন, এবং ডানদিকে লেখা আছে চন্দ্র এবং বাঁদিকে কুমারদেবী। মুদ্রার অপরদিকে মুদ্রিত সিংহবাহিনী দেবীর চিত্র এবং লেখা আছে “লিচ্ছবায়া”। এই মুদ্রার মুদ্রণ এবং সূক্ষ্ম গুণমান, সমসাময়িক রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রাগুলির সমতুল্য।

ভগবান মহাবীর ও ভগবান বুদ্ধের সময়ে এই লিচ্ছবি-গণরাজ্যের রাজধানী বৈশালী (আধুনিক বিহারের মজঃফরপুর অঞ্চল) গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পন্ন শহর ছিল। অজাতশত্রুর হাতে পরাজয়ের পর, লিচ্ছবিরা নেপালের কাঠমাণ্ডু অঞ্চলে নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অতএব কয়েক শতাব্দী পরে হলেও, বিখ্যাত লিচ্ছবিদের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা, নিঃসন্দেহে উভয় পক্ষেরই সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধির সূচনা করেছিল।

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের সময়সীমা ৩২০ থেকে ৩৩৫ সি.ই.। সমসাময়িক নানান উল্লেখ থেকে অনুমান করা হয় তাঁর রাজ্যের সীমা দক্ষিণ বিহার, মগধ, প্রয়াগ, সাকেত এবং অবশ্যই বৈশালী এবং তার সংলগ্ন অঞ্চল।

 

৪.৩.২.২ সমুদ্রগুপ্ত                                

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত। যদিও মনে করা হয় তিনি প্রথম চন্দ্রগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, কিন্তু পিতা তাঁকেই রাজপদে নির্বাচিত করেছিলেন। অতএব প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর রাজ পরিবারে কিছুটা অশান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। যাই হোক, সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসে, পিতার আস্থার মর্যাদা রাখতে পেরেছিলেন এবং গুপ্ত রাজ্যকে সাম্রাজ্য বানিয়ে তুলেছিলেন।

সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য বিস্তারের বিবরণ পাওয়া যায়, এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে। ঘটনাচক্রে এই শিলালিপিটি ছিল সম্রাট অশোকের, যার ওপর তিনি শান্তি ও মৈত্রীর নির্দেশ লিখিয়েছিলেন। সেই শিলারই অন্য অংশে সমুদ্রগুপ্ত লেখালেন তাঁর রক্তক্ষয়ী “দিগ্বিজয়”-এর বৃত্তান্ত! এই শিলা লেখের সময়কাল ৩৬০ সি.ই.। এই শিলালিপিতে তিনি বহু রাজ্যের রাজা, আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী নেতার নাম উল্লেখ করেছেন, যার থেকে গুপ্তযুগের আগে সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক পটভূমি এবং তার বিচিত্র অনৈক্য এবং বিভাজনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই শিলালিপির বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা - পূর্বের চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাজস্থান, পাঞ্জাব। পশ্চিমের মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। মধ্যভারত, আর্যাবার্ত এবং দাক্ষিণাত্যের চের (কেরালা) রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত। যদিও ঐতিহাসিকরা তাঁর এই শিলালিপির বর্ণনাকে অতিরঞ্জিত মনে করেন, কারণ সমুদ্রগুপ্তের উল্লেখ করা সবকটি প্রান্তে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্তির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়নি। সে যাই হোক, তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই জানা যায়, কিছু কিছু রাজ্যের রাজাদের তিনি হত্যা করে নির্বংশ করে দিয়েছিলেন। কিছু কিছু রাজাদের বন্দী করার পর, তাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অনেক রাজ্য নিজে থেকেই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। 

৪.৩.২.৩ বৈদেশিক সম্পর্ক

সমুদ্রগুপ্তের বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর প্রতিবেশী দেশ এবং রাজ্যগুলির রাজারা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল এবং মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছিল। সমসাময়িক সিংহলের রাজা মেঘবন্ন বা মেঘবর্ণ (৩৫২-৩৭৯ সি.ই.), দুজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে পাঠিয়েছিলেন ধর্মদূত হিসেবে। শোনা যায় ওই দুই ধর্মদূত সমুদ্রগুপ্তের রাজসভায় কোন স্বীকৃতি এবং আতিথ্য পাননি। এর পর মেঘবর্ণ সমুদ্রগুপ্তের সভায় প্রথাগতভাবে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল মেনে রাজদূত পাঠিয়েছিলেন এবং সিংহলী তীর্থযাত্রীদের জন্যে একটি বৌদ্ধ বিহার বানানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। এবার সমুদ্রগুপ্ত সসম্মান অনুমতি দিয়েছিলেন এবং বোধগয়ায় বিখ্যাত “মহাবোধি সংঘারাম” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপিতে দৈবপুত্র-শাহি–শাহানুসাহি-শক-মুরুণ্ড নামে কিছু রাজারও বশ্যতা স্বীকারের কথা উল্লেখ আছে। এই নামগুলি থেকে অনুমান করা হয় এঁরা আফগানিস্তান এবং বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্দ অঞ্চলের শক এবং কুষাণ রাজা। এঁরা বশ্যতা স্বীকার না করলেও, নিঃসন্দেহে সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনা করেছিলেন।

 এই দিগ্বিজয়ের পরই তিনি ৩৬০ সি.ই.-র কোন সময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, যদিও এই বিষয়ে তাঁর শিলালিপিতে কোন উল্লেখ নেই। এই যজ্ঞে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছিলেন এবং এই যজ্ঞ উপলক্ষে সোনার মুদ্রার প্রকাশ করেছিলেন। সেই মুদ্রার একদিকে “যূপকাষ্ঠ”[1] -এর সামনে একটি ঘোড়ার চিত্র এবং অন্য দিকে রাণির ছবি ও লেখা “অশ্বমেধপরাক্রম” মুদ্রিত ছিল। এই যজ্ঞের আয়োজনকে তিনি সগৌরবে “চিরোৎসন্নাশ্বমেধাবর্তূঃ” বলে উল্লেখ করেছেন, এই কথার অর্থ “বহু যুগ আগে উৎসন্নে যাওয়া অশ্বমেধ (যজ্ঞ) আবার পালিত হল।” 

 অশ্বমেধ যজ্ঞের স্মারক সমুদ্রগুপ্তর স্বর্ণমুদ্রা  

অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেও, তিনি ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এমন নয়। সে আলোচনা যথা সময়ে আসবে। তাঁর প্রশাসনিক সিলমোহরের প্রতীক ছিল “গরুড়”।


৪.৩.২.৪  সমুদ্রগুপ্তর গুণাবলী ও সুকৃতি

শুধুমাত্র যুদ্ধ জয় এবং দিগ্বিজয়ই নয়, সমুদ্রগুপ্ত নানা দিকেই প্রতিভাশালী ছিলেন। তিনি নিজেই বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন এবং গুণীজন ও পণ্ডিতদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। কাব্য রচনাতেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল, সেই কারণে তাঁকে “কবিরাজ” উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি খুব ভালো বীণা বাজাতে পারতেন। তাঁর প্রকাশিত কিছু কিছু মুদ্রায় সিংহাসনে বসে বীণাবাদন রত অবস্থায় তাঁর চিত্র মুদ্রিত পাওয়া যায়। 

সমুদ্রগুপ্তের বীণাবাদনরত চিত্র মুদ্রিত স্বর্ণমুদ্রা 


এলাহাবাদ শিলালিপিতে বর্ণনা আছে “তীক্ষ্ণ মেধা এবং রুচিশীলতায় তিনি দেবতাদের গুরুকে (বৃহষ্পতি) এবং সুমধুর সঙ্গীত চর্চায় তুম্বুরু[2] ও নারদকেও লজ্জা দিয়ে থাকেন”।

সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যু সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্প্রতি আবিষ্কৃত মথুরার এক লিপি থেকে  অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল শুরু হয়েছিল ৩৭৫ সি.ই. থেকে, সে ক্ষেত্রে ৩৭২ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন এক সময়ে সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর সম্ভাবনা।

 ৪.৩.২.৫ রামগুপ্ত

সমুদ্রগুপ্তের অনেক পুত্রের মধ্যে অনুমান করা হয় রামগুপ্ত তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। যাঁর কথা বিশাখদত্তের লেখা “দেবী-চন্দ্রগুপ্তম” নাটক থেকে পাওয়া যায়। যদিও মূল নাটকটি পাওয়া যায় না, এর কিছু উদ্ধৃতি পাওয়া যায় রামচন্দ্র এবং গুণচন্দ্রের লেখা নাট্যতত্ত্ব - “নাট্য-দর্পণ” থেকে। রামগুপ্ত অত্যন্ত ভীতু এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। শোনা যায় তিনি শকরাজার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং শক রাজার আদেশে নিজের স্ত্রী ধ্রুবদেবীকেও তাঁর হাতে সমর্পণ করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ধ্রুবদেবীর সম্মান রক্ষা করেছিলেন তাঁর দেবর, চন্দ্রগুপ্ত - তিনি নারীর ছদ্মবেশে গিয়ে শক রাজাকে হত্যা করেছিলেন। এরপর চন্দ্রগুপ্ত দাদা রামগুপ্তকে সরিয়ে নিজেই পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন এবং বিপুল জনপ্রিয়তা ও জনগণের প্রশংসা নিয়ে, তিনি ধ্রুবদেবীকেই বিবাহ করেন। এই কাহিনীর আভাস পাওয়া যায় পরবর্তীকালের কবি বাণের লেখা “হর্ষচরিত”-এ। এই কাহিনীর আরও সমর্থন পাওয়া যায় ভোজের লেখা “শৃঙ্গার-প্রকাশ” এবং রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষের সন্‌জন লিপিতে। এসব সত্ত্বেও ঐতিহাসিকেরা এই কাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না, তাঁরা বলেন, আজ পর্যন্ত রামগুপ্তর নামে কোন মুদ্রা পাওয়া যায়নি এবং গুপ্তরাজাদের নথির কোথাও রামগুপ্তের নাম পাওয়া যায় না। অতএব তাঁরা মনে করেন, রামগুপ্ত কোনদিনই রাজা হননি।

 ৪.৪.১ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত– বিক্রমাদিত্য (৩৭৫ – ৪১৫ সি.ই.)

তাঁর পিতামহের থেকে আলাদা পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে সাধারণতঃ বিক্রমাদিত্য বলা হত। তিনি সমুদ্রগুপ্ত ও দত্তাদেবীর পুত্র। সিংহাসনে আরোহণের পর বিক্রমাদিত্যকে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে তেমন কিছু করতে হয়নি, কারণ তাঁর পিতা সমুদ্রগুপ্ত শক্ত হাতেই সাম্রাজ্যের সীমানা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে শুধুমাত্র পশ্চিমের বাকাতক এবং কিছু শক ক্ষত্রপ, সাম্রাজ্যের বিরক্তি উৎপাদন করছিল। বিক্রমাদিত্য বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে, বাকাতকদের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তুললেন। তিনি তাঁর রাণি কুবেরনাগার (নাগ রাজকুমারী) গর্ভজাতা কন্যা প্রভাবতীর সঙ্গে বাকাতক রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। এই মৈত্রী বন্ধনের পর তাঁর সামনে শক ছাড়া আর কেউ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রইল না।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজেই তাঁর বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে শকরাজ্য জয়ের অভিযান করেছিলেন। এই অভিযানের সময় এবং ঠিক কবে তিনি শকরাজ্য জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে পশ্চিম-ক্ষত্রপ রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহর শেষ মুদ্রাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল ৩৮৮ সি.ই.তে এবং প্রায় একই সময়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ওই অঞ্চলে তাঁর রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অতএব ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন ওই সময়ের কাছাকাছি সময়েই পশ্চিমের শকরাজ্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত অধিকার করেছিলেন। শকরাজ্য জয়ের ব্যাপারে অন্যরকম এক ঘটনার আভাস দিয়েছেন বাণ, তাঁর “হর্ষচরিত” গ্রন্থে।  দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নাকি এবারেও মহিলা পরিচারিকার ছদ্মবেশে প্রমোদসভায় গিয়ে শকরাজাকে হত্যা করেছিলেন। অতএব কবি বাণের “হর্ষচরিত”, ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের হাতে শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহের পরাজয়ের ফলে, গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হল, মালব যার রাজধানী উজ্জয়িনী এবং গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। এই রাজ্যগুলি জয়ে, তাঁর সব থেকে লাভ হল, পশ্চিমের সম্পন্ন সমুদ্রবন্দরগুলি – ভৃগুকচ্ছ, সোপারা, কল্যাণ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অতএব পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবাধ বাণিজ্যের দরজাগুলি খুলে গেল। এমনকি এই অন্তর্ভুক্তিতে বণিক সম্প্রদায়েরও প্রভূত লাভ হল, তাদের একই দ্রব্যের জন্যে বিভিন্ন রাজ্যের সীমানায় বারবার আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার ঝামেলা দূর হয়ে গেল। এই রাজ্য জয়ের ফলে আরও একটি লাভ হল উজ্জয়িনী শহরের অধিকার। উজ্জয়িনী তখনকার সময়ে ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পশ্চিম থেকে পূর্বে অথবা উত্তর থেকে দক্ষিণের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র ছিল এই শহর। অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই শহর গুপ্তসাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠল এবং প্রকৃত অর্থে পরবর্তী সময়ে উজ্জয়িনী, পাটলিপুত্রর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি প্রত্ন-নিদর্শনের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দিল্লির কুতব মিনারের কাছে একটি লৌহস্তম্ভ আছে, তার গায়ের লিপিতে “চন্দ্র” নামে কোন এক রাজার রাজ্য জয়ের বিবরণ আছে। সেখানে লেখা আছে রাজা “চন্দ্র” যে যে শত্রুরাজ্য অধিকার করেছিলেন, সেগুলি হল “বঙ্গ”, “তাঁর পরাক্রমের সৌরভে সুরভিত হয়েছিল দক্ষিণের সমুদ্র”, সিন্ধু অববাহিকার “সপ্ত(ব)দ্বীপের বাহ্লিক (কুষাণ)”। এই রাজা যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত নন, যদি একই হন, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক, বঙ্গ এবং কুষাণদের জয় করে সমুদ্রগুপ্তের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিস্তার অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিলেন।

৪.৪.১.১ ফা-হিয়েনের বিবরণ (৪০৫-৪১১ সি.ই.)

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের মধ্যেই বিখ্যাত চৈনিক বৌদ্ধ-সন্ন্যাসী, ফা-হিয়েন এদেশে তীর্থযাত্রায় এসেছিলেন। ফা হিয়েন চীন থেকে ভারতে এসেছিলেন স্থলপথে – ভয়ংকর গোবি মরুভূমি পার হয়ে, খোটান, পামিরের দুর্গম পাহাড়ি পথে, সোয়াৎ উপত্যকা এবং গান্ধার হয়ে। ভারতবর্ষ ও নেপালের সবগুলি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থে - মথুরা, সংকাশ্য[3], কনৌজ, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, কুশিনগর, বৈশালি, পাটলিপুত্র, কাশি ইত্যাদি – তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। এরপর তিনি তাম্রলিপ্তি বন্দর থেকে সমুদ্রপথে সিংহল যান এবং সেখান থেকে জাভা হয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।

ফা-হিয়েন বৌদ্ধ পুঁথি পাঠ এবং সংগ্রহে এতই নিবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে, যাঁর সাম্রাজ্যে তিনি প্রায় ছ’বছর নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালেন, সেই সম্রাট বা রাজার নামও উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা তাঁর আগের গুপ্তরাজাদের কেউই বৌদ্ধ ছিলেন না বলেই কি তিনি সম্রাটের নামোচ্চারণেও আগ্রহী হননি? তবে তাঁর লেখা থেকে বিভিন্ন শহর, তার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ফা-হিয়েন রাজধানী পাটলিপুত্রে ছিলেন তিন বছর, এখানে তিনি সংস্কৃত শিখেছিলেন। পাটলিপুত্রে “মনোরম ও সৌম্য” দুটি বৌদ্ধ বিহার তিনি দেখেছিলেন, তাদের একটি হীনযানী এবং অন্যটি মহাযানী। দুটিতেই ছ’শ থেকে সাতশ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে আসত শিক্ষালাভের জন্যে। সম্রাট অশোকের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন (খুবই স্বাভাবিক, সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন), তাঁর মনে হয়েছিল এই স্থাপত্য অসাধারণ কোন শিল্পী মানবের নির্মাণ। মগধের সমসাময়িক সম্পদ এবং সমৃদ্ধি দেখেও তিনি অভিভূত হয়েছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের প্রশংসায় তিনি লিখেছেন, “এখানকার অধিবাসীরা পরোপকার এবং ধার্মিকতার জন্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে”! আরও লিখেছেন শহরের বণিকসম্প্রদায় চমৎকার একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে দরিদ্র এবং দুঃস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সেবা দান করা হত।

ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সামাজিক পরিস্থিতিরও কিছু কিছু চিত্র পাওয়া যায়। যেমন মধ্যদেশের শহরগুলির বাসিন্দারা অধিকাংশই নিরামিষাশী এবং অহিংস মতে বিশ্বাসী, শহরের বাজারে তিনি কোন কসাইখানা বা মদের দোকান দেখেননি, নগরবাসী শূকর বা মুরগী পুষত না, পেঁয়াজ-রসুন খেত না, মদ্যপান করত না। তবে চণ্ডালরা শিকার করত এবং মাংসের ব্যবসা করত। তারা শহরের বাইরে বাস করত এবং যখনই তারা শহরে ঢুকত, কাঠের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে সতর্ক করে দেওয়া হত – কেউ যেন তাদের ছুঁয়ে না ফেলে! এই বিবরণ হয়তো আংশিক সত্য, কারণ তিনি নিজে বিদেশী এবং বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী – অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বৌদ্ধবিহারেই থাকতেন এবং তাঁর এদেশীয় সঙ্গী-সাথিরাও সকলেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন, অতএব তাঁর কাছে বৌদ্ধ আচরণগুলিই স্পষ্ট ধরা দিয়েছে। তবে অস্পৃশ্য চণ্ডালের বিবরণের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

 ৪.৪.২ গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামো

রাজা চন্দ্রগুপ্ত (২য়) মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ এবং সহায়তায় সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। এই মন্ত্রীপরিষদ নাগরিক এবং সামরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এবং এই মন্ত্রীপরিষদের অনেককেই যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত থাকতে হত। সমগ্র সাম্রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধের জন্যে অনেকগুলি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল, যাদের “দেশ” বা “ভুক্তি” বলা হত। এই ভুক্তির প্রশাসকদের বলা হত উপরিক মহারাজা বা গোপ্তা। সাধারণতঃ, এই প্রশাসনের প্রধান হতেন রাজপুত্র বা রাজবংশের লোকরা। প্রত্যেকটি ভুক্তিকে অনেকগুলি জেলায় ভাগ করা হত, যাদের বলা হত “বিষয়”। বিষয়গুলির প্রশাসকদের মধ্যে থাকতেন, কুমারামাত্য (রাজকুমারদের মন্ত্রী), মহাদণ্ডনায়ক (প্রধান বিচারক), বিনয়স্থিতিস্থাপক (পৌরনিগম?), মহা-প্রতিহার (গৃহমন্ত্রক), ভতাশ্বপতি (সেনানায়ক?), দণ্ডপাশাধিকরণ (পুলিশ প্রধান) ইত্যাদি। প্রতিটি “বিষয়”-এর প্রধানকে “বিষয়পতি” বলা হত এবং তাঁর দায়িত্ব ছিল মহারাজা বা গোপ্তার কাছে জবাবদিহি করা। বিষয়পতি যেখানে থাকতেন তাকে “অধিস্থান” বলা হত, এবং তাঁর কার্যালয়ের নাম ছিল “অধিকরণ”। বিষয়পতিকে সহায়তা করতেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, তাঁদের মধ্যে বণিকসমবায় বা গিল্ড (Guild)-এর প্রধান বা ব্যাংকার (“নগর-শ্রেষ্ঠীন্‌”), প্রধান ব্যবসায়ীরা (“সার্থবাহ”), প্রধান শিল্পী (“প্রথম কুলিক”) এবং প্রধান হিসাবরক্ষক (“প্রথম কায়স্থ”)। আরও এক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের নাম পাওয়া যায় “পুস্তপাল”- যাঁর দায়িত্ব ছিল যাবতীয় জমি-জায়গার নথিপত্র তৈরি করা এবং সুরক্ষিত রাখা। প্রশাসনের নিম্নতম একক ছিল গ্রাম, গ্রামের প্রধানকে বলা হত “গ্রামিক”। তিনি গ্রামের বৃদ্ধ (“গ্রামবৃদ্ধ”) এবং অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে গড়া “পঞ্চমণ্ডলী” বা “পঞ্চায়েত”-এর মতামত নিয়ে গ্রামের প্রশাসন পরিচালনা করতেন।

প্রসঙ্গতঃ মনে করিয়ে দিই, মুসলিম রাজা ও বাদশাদের যুগ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষের সকল হিন্দু রাজ্যেই এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হত। 

চলবে... 



[1] যূপকাষ্ঠ – যজ্ঞে পশু বলিদানের জন্য হাড়িকাঠ।

[2] পৌরাণিক কাহিনীতে তুম্বুরু বা তুম্বরু গন্ধর্ব সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি কুবের ও দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় প্রধান বীণাবাদক ও সুগায়ক ছিলেন।

[3] সংকাশ্য বা সংকাশিয়া প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ শহর। আধুনিক উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ জেলায় কনৌজ থেকে ৪৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এখানে সম্রাট অশোক একটি স্তম্ভনির্দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্তম্ভের “হস্তীমূর্তি” ক্যাপিটালের অবশেষ, বৌদ্ধ মন্দির, বিহার এবং স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...