শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১১

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১০ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

একাদশ পর্বাংশ 


৪.৫.৮ বিজ্ঞান

৪.৫.৮.১ মহাকাশ ও পৃথিবী

বৈদিক বিশ্ব ছিল খুবই সহজ সরল, উপরে স্বর্গ, নিচেয় এই পৃথ্বী, আর এই দুইয়ের মাঝে আছে অন্তরীক্ষ বা বায়ু। স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররা ঘুরে বেড়ায় এবং অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায় যত পাখি, মেঘ এবং উপদেবতারা। বৈদিক সাহিত্যের ঋষিরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁরা সরল কিন্তু গভীর মননশীল প্রজ্ঞার দর্শন নিয়েই বড়ো প্রশান্তির জীবন যাপন করতেন।

কিন্তু পরবর্তী কালে, বৈদিক দর্শন থেকে অনেকটাই সরে আসা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা যখন বৌদ্ধ, জৈন এবং সুপ্রাচীন অনার্য ধর্মীয় শাখাগুলির কাছে যথেষ্ট শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন, তখন বৈদিক প্রজ্ঞার সীমায় বন্দি না থেকে, তাঁরা সুপ্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে জটিল সব তত্ত্ব ও কাহিনি রচনা শুরু করলেন। এই কাহিনি রচনার শুরু খ্রিস্টপূর্ব মোটামুটি দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন এক সময় থেকে।

প্রথমতঃ তাঁরা এই মহাবিশ্বকে কল্পনা করলেন ব্রহ্মাণ্ড – যার স্থূল অর্থ ব্রহ্মের অণ্ড। এই ব্রহ্মাণ্ড একুশটি অঞ্চল বা বিভাগে বিভক্ত। উপর থেকে ধরলে পৃথিবী বা মর্ত্যের স্থান সপ্তম। পৃথিবীর উপরের ছয়টি স্তরে আছে ঊর্ধলোক। পৃথিবীকে বলা হয় ভূলোক এবং এর ঊর্ধের ছ’টি লোক হল, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ এবং সত্য বা ব্রহ্মলোক। এগুলিকে স্বর্গও বলা হয়। বিভিন্ন স্বর্গের সুখের মাত্রা আলাদা এবং মর্ত্যলোকের পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন স্বর্গলাভ হয়ে থাকে। ভূলোক এবং ছটি স্বর্গলোকের কথা অবিশ্যি বেদেও উল্লেখ আছে। পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরে আছে সপ্ত পাতাল, যেমন, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। পাতালের পরেও আছে সাতটি স্তর, সেগুলি নরক, যেমন তমিস্রা, অন্ধতমিস্রা, রৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, শূকরমুখ, অন্ধকূপ। পুণ্য সঞ্চয়ের মতো পাপ সঞ্চয়েরও মাত্রা আছে, সেই মাত্রা অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃদু থেকে ভয়ংকর কষ্টদায়ক নরকে যেতে হত।

সে যাই হোক, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ও নরকের ধারণা যে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সমসাময়িক প্রচলিত ধর্মগুলির থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। তাঁরা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন, পুণ্য ও পাপ এবং তার ফলে প্রাপ্য পুরষ্কার ও তিরষ্কারের ধারণা। তাঁদের উচ্চারিত প্রত্যয়ী মন্ত্রের ব্যাখ্যায়, কথকতায়, ধর্মকথায় কল্পনার জগতের দুয়ার খুলে গেছিল সাধারণ মানুষের মনে। তাঁরা আশ্চর্য হয়েছিলেন, অভিভূত হয়েছিলেন, এবং বিশ্বস্ত হয়েছিলেন। আমাদের ছোটবেলাতেও গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, বাঁধানো ফ্রেমে আঁকা নরকভোগের রঙিন চিত্রপট। সেখানে যমদূতেরা চোরদের হাত কাটে, পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের লোহার কাঁটাওয়ালা স্তম্ভ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়, ফুটন্ত তেলে পাপীদের ভাজতে ভাজতে (deep fry) যমদূতরা মাথায় ড্যাঙস মারে, ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণ মানুষ যখনই বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে লাগল, বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রশান্ত অধরে ফুটে উঠল সাফল্যের মৃদু হাসি এবং তাঁরা আরও নিবিড় কল্পকাহিনি রচনায় মগ্ন হতে লাগলেন – সেই সব কাহিনিই পুরাণ।

এই তত্ত্বও কিছু বছরের মধ্যে অনেকটাই বদলে গেল, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে খ্রিস্টাব্দ প্রথম দুই শতাব্দীতে। তখন এই বিশ্ব-পৃথিবী হয়ে উঠল মোটামুটি সমতল বিশাল থালা বা রেকাবির মতো। যার কেন্দ্রে আছে মেরুপর্বত, যাকে ঘিরে ঘুরে চলেছে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ এবং সকল নক্ষত্র। দশদিকে আছে দশ দিকপাল। এই মেরুপর্বতকে ঘিরে আছে জম্বুদ্বীপ। তার চারদিকে ঘিরে রয়েছে লবণ-সমুদ্র। দক্ষিণের এই দ্বীপ-মহাদেশের নাম জম্বুদ্বীপ। জম্বু মানে জাম গাছ, এই অঞ্চলে জামগাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। লবণ সমুদ্রকে ঘিরে রয়েছে যে স্থলভূমি তার নাম প্লক্ষদ্বীপ। সেই দ্বীপের নাম প্লক্ষ নামের এক স্বর্ণময় বৃক্ষের নামে। প্লক্ষদ্বীপকে ঘিরে আছে ইক্ষুরস(ঝোলা-গুড়)-সমুদ্র। এই সমুদ্রকে ঘিরে আছে শাল্মলদ্বীপ – এই নাম ওই দ্বীপে একটি শাল্মলী গাছ থাকার কারণে। শাল্মলীদ্বীপকে ঘিরে আছে সুরা-সমুদ্রের বলয়। এভাবেই একের পর এক দ্বীপ ও সমুদ্র আছে যথাক্রমে কুশদ্বীপ-ঘৃতসমুদ্র, ক্রৌঞ্চদ্বীপ-ক্ষীরসমুদ্র, শাকদ্বীপ-দধিমণ্ডসমুদ্র, পুষ্করদ্বীপ-শুদ্ধোদকসমুদ্র। শুদ্ধোদক সমুদ্রের পরে আছে লোকালোক (লোক+অলোক) পর্বত। যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় তার নাম লোক, তার বাইরের দেশগুলি যারা সূর্যালোক বঞ্চিত – তাদের নাম অলোক। (শ্রীমদ্ভাগবত/৫ম স্কন্ধ/ অধ্যায় ২০)            

বিশ্ব-তত্ত্বের শেষ দুটি ধারণা পুরাণ থেকে নেওয়া হয়েছে, যে পুরাণগুলি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এবং সর্বশেষ পুরাণ লেখা হয়েছে, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে। অতএব সহজেই অনুমান করা যায় পুরাণের এই তত্ত্বগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এর কয়েকশ বছর আগে থেকেই। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা দেখেছি, মৌর্য যুগের আগে থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্য সূত্রে পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিসের মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের নিবিড় পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিচয় না থাকলে বীর আলেকজাণ্ডার ভারতজয়ের স্বপ্ন কেন দেখেছিলেন?  মৌর্যযুগ থেকে এই বৈদেশিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং খ্রিস্টপূর্ব শেষ দুটি শতাব্দী থেকে এদেশে রাজত্ব বিস্তার করেছেন, গ্রিক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব প্রভৃতি জাতি। তা সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণ্য এবং হিন্দু পণ্ডিতেরা বিশ্বতত্ত্বের এমন হাস্যকর ধারণা করলেন কেন, সেকথা তাঁরা এবং তাঁদের ভগবান ছাড়া আর কে বলতে পারবেন?

পৌরাণিক গ্রন্থে বিশ্বতত্ত্বের ধারণা যাই হোক, এর পাশাপাশি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্ব ও মহাকাশের ধারণা ছিল বিস্ময়কর – এবং সে ধারণার শুরু হয়েছিল বৈদিক এমনকি প্রাক-বৈদিক যুগেও। 

 

৪.৫.৮.২ গণিত

ভারতীয় অংক, বিশেষ করে জ্যামিতি, পরিমিতি, কৌণিক মাপ, সূক্ষ্ম থেকে স্থূল ওজন পরিমাপের নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে আমরা দেখেছি। অতএব যজ্ঞবেদী নির্মাণের থেকে ভারতীয় জ্যামিতি ও পরিমিতির সূচনা এমন ধারণা যে আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে আমি অন্ততঃ কোন ভাবেই সহমত হতে পারি না। বরং আর্যরা বৈদিক যজ্ঞবেদী নির্মাণের নানান মাপ-জোক শিখেছে অনার্য মানুষদের থেকেই।

কিন্তু এরপর এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও, যখন থেকে লিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে, সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা ও সাফল্য চমকপ্রদ। লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যামিতি ও পরিমিতিতে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিরপেক্ষ সংখ্যা (Abstract Number) এবং বীজগণিত।

নিরপেক্ষ সংখ্যা হল বিশেষ একধরনের লিপি, যা দিয়ে শুধু মাত্র সংখ্যাই বোঝানো যায়। যেমন, , , ৯ – এগুলি নিরপেক্ষ সংখ্যা, কিন্তু যখনই ৩ দিন, ৪ কি.মি. বা ৯ জন বলা হবে তখন সেগুলি নানান বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিমাপ বোঝাবে। এই নিরপেক্ষ সংখ্যা আবিষ্কার, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনন্য সৃষ্টি, যার ওপরে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাই দাঁড়িয়ে আছে। উপরন্তু, এই নিরপেক্ষ সংখ্যার বৈশিষ্ট্য হল দশটি মাত্র লিপি - ১ থেকে ৯ এবং ০ দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম সংখ্যা অতি সহজে এবং সংক্ষেপে লিখে ফেলা যায়। এই সংখ্যার জাদু ধরা পড়বে একটি উদাহরণ দিলে, ১২৩৪ সংখ্যাটি সমসাময়িক রোমান ভাষায় লিখতে গেলে, MCCXXXIV দাঁড়াবে। ১২৩৪ সংখ্যাটিকে যদি আমরা ভাঙি – তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় – ১০০০+২০০+৩০+৪, এই অনুযায়ী  M(১০০০), CC(২০০), XXX(৩০), IV(৪)। এভাবেই আমরা তিরিশ কোটি সংখ্যাটি, অংকের নিয়মে লিখে ফেলতে পারি, x ১০কিন্তু রোমান ভাষায় তিরিশ কোটি লেখার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম।   

এই লিপির মধ্যে ০ (শূন্য) সংখ্যাটির গুরুত্ব সীমাহীন, সীমাহীন সংখ্যা লিখতে। এই লিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় গুজরাটের ৫৯৫ সি.ই.-র একটি শিলালিপি থেকে, অতএব অনুমান করা যায় এর শিলালিপি লেখার অনেক আগে থেকেই শূন্য সংখ্যার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই শিলালিপির প্রায় সমসময়ে, এই সংখ্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সিরিয়া এবং সুদূর ভিয়েতনামে! এইসংখ্যা-লিপির আবিষ্কার কে করেছিলেন সঠিক জানা যায় না, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর একটি পাণ্ডুলিপিতেও – “বকশালী পাণ্ডুলিপি” -এই সংখ্যা-লিপির ব্যবহার দেখা গেছে। ৪৯৯ সি.ই.তে লেখা বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট, তাঁর গ্রন্থে এই সংখ্যালিপি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট সংখ্যা বা শূণ্যের আবিষ্কর্তা নন, তাঁর আগেই এগুলির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।

গণিতবিদ আর্যভট্টের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে অবদান অবিশ্বাস্য। জ্যামিতিতে, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল – ভূমির অর্ধেক এবং লম্ব উচ্চতার গুণফল, বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে – পাই (π)-এর দশমিকের পর চার সংখ্যা পর্যন্ত অভ্রান্ত মান নির্ণয় – ৩.১৪১৬। প্রসঙ্গতঃ  তিনি প্রথম সংখ্যার দশমিক হিসেব আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচলিত চান্দ্র-বছরের জটিল হিসাবের পরিবর্তে তিনি সৌর-বছরের প্রচলনের প্রস্তাব দেন এবং তাঁর সৌর বছরের হিসেব আধুনিক হিসেবের তুলনায় প্রায় নিখুঁত – ৩৬৫.৩৫৮৬৮০৫ দিন! তিনিই বিশ্বে প্রথম পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করেছিলেন এবং মত দিয়েছিলেন পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। তিনিই প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদে গ্রহণ হয় এবং চাঁদ সামনে চলে আসে বলে সূর্যগ্রহণ হয়। তার আগে পর্যন্ত পৌরাণিক ধারণা ছিল রাহু নামের এক রাক্ষসের অমর মুণ্ড চাঁদকে এবং সূর্যকে গ্রাস করে। ইংরেজদের হাত ধরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত ভারতীয় পণ্ডিত বা অশিক্ষিত সমাজের এই বিশ্বাসকে আর্যভট্ট এতটুকুও প্রভাবিত করতে পারেননি। বরং তাঁর অনেকগুলি সিদ্ধান্ত প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনঃপূত না হওয়াতে, সম্ভবতঃ তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সেগুলিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

আর্যভট্টের সামান্য পরে বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা (Astrology) এবং রাশিফল বা কোষ্ঠী বিচারকেও যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতেন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না, এমনকি বিপরীত কথা বলে। বরাহমিহিরের “পঞ্চসিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থে সমসময়ের জ্যোতির্বিদ্যার পাঁচটি ঘরানার সংকলন এবং আলোচনা করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি সিদ্ধান্তের কথা আগেই বলেছি, “রোমক” এবং “পৌলিশ” সিদ্ধান্ত।

এই সময়ে আরবের প্রজ্ঞাবান মানুষদের সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরবের পণ্ডিত মহলে ভারতের আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের খুবই সমাদর ছিল। একসময় বাগদাদ সম্রাটের (খলিফা) রাজসভায় অনেক ভারতীয় পণ্ডিত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁরা বসবাস করতেন। এই বাগদাদ আরবি পণ্ডিতদের মাধ্যমেই পরবর্তী কালে, ভারতীয় গণিত ইউরোপের বিদ্বান সমাজে পৌঁছেছিল।


৪.৫.৯ ধর্ম

এই সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নতুন ধর্মের ধর্মশাস্ত্রগুলি নতুন করে রচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনা, নতুন আদর্শ এবং দর্শনে। এই হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই বৌদ্ধধর্মও অনেকটা হীনবল হয়ে উঠল। ভারত থেকে হীনযানী মত প্রায় দুষ্প্রাপ্য হতে বসল, মহাযানী মতও দুর্বল হয়ে গেল, কারণ মহাযানী শাখা ভেঙে উদ্ভব হল নতুন শাখা বজ্রযানী মত। বিপুল এই পরিবর্তনের কথা সবিস্তারে আসবে পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে। তার আগে দেখা নেওয়া যাক হর্ষ পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

চলবে...

বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "


   ৩

সৃষ্টি তত্ত্ব

শ্রীসূত বললেন, “সৃষ্টির আদিতে ভগবান লোক সৃষ্টি করার জন্যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক), পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (মস্তিষ্ক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ), মন ও পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম), এই ষোলটি অংশে রচিত পুরুষ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। যিনি কারণসমুদ্রে যোগনিদ্রায় শয়ান ছিলেন এবং যাঁর নাভিরূপ হ্রদে উৎপন্ন পদ্ম থেকে প্রজাপতিগণের পিতা ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল, ইনিই সেই নারায়ণ। বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ উদ্গত হয়, তেমনি অক্ষয় বীজস্বরূপ আদি নারায়ণ মূর্তি থেকেই নিখিল অবতার মূর্তি আবির্ভূত হয়ে থাকে। অবতারগণের লীলা অবসান হলে, তাঁরা আবার ওই মূর্তির মধ্যেই লীন হয়ে যান। শ্রীনারায়ণের নাভি পদ্ম থেকে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে মরীচি প্রমুখ প্রজাপতিগণের সৃষ্টি করেন এবং সেই প্রজাপতিগণ দেবতা, নর ও পশু প্রভৃতি ইতর জীবের সৃষ্টি করেছিলেন।

এই পদ্মনাভ নারায়ণ প্রথম অবতারে সনৎকুমার প্রমুখ ব্রাহ্মণরূপে দুষ্কর ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেছিলেন। দ্বিতীয় অবতারে যজ্ঞপতি শ্রীহরি বরাহরূপে, রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, সৃষ্টির অবস্থানের জন্য। দেবর্ষি নারদ তাঁর তৃতীয় অবতার। এই অবতারে ভগবান পঞ্চরাত্র নামে বৈষ্ণবতন্ত্র প্রকাশ করেছিলেন। মানুষ কর্ম করেও কিভাবে কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে এই তন্ত্রে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। চতুর্থ অবতারে ইনি ধর্মের পুত্র নর ও নারায়ণ দুই ঋষি* রূপে আত্মার শান্তির জন্য দুশ্চর তপস্যা করেছিলেন। সিদ্ধ মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কপিল তাঁর পঞ্চম অবতার। এই মূর্তিতে আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে কাল প্রভাবে লুপ্ত হতে যাওয়া সাংখ্যশাস্ত্র উপদেশ দিয়েছিলেন। সাংখ্য সমস্ত তত্ত্বের নির্ণায়ক তত্ত্ব। ষষ্ঠ অবতারে অত্রিপত্নী অনসূয়ার পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং অলর্ক ও প্রহ্লাদকে আত্মবিদ্যা উপদেশ দিয়েছিলেন। তারপর সপ্তম অবতারে রুচি ও আকূতির পুত্র যজ্ঞ নামে জন্মগ্রহণ করে, স্বায়ম্ভূব মন্বন্তর পালন করেছিলেন। অষ্টম অবতারে নাভি ও মেরুদেবীর পুত্র ঋষভ নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শান্ত গুণের অনুসরণে চার আশ্রমের কর্তব্য পরমহংসগণের পথ প্রকাশ করেছিলেন।

[*এই নর ও নারায়ণ দুই ঋষিকে শাস্ত্রমতে  আমরা আরও দু বার পেয়েছি, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন রূপে আর এই কলি যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ রূপে]  

হে বিপ্রগণ, নবম অবতারে শ্রীহরি ঋষিদের প্রার্থনায় পৃথু* নরপতি রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পৃথিবীতে ওষধির সৃষ্টি করেছিলেন। এই অবতার অত্যন্ত রমণীয় বলে কথিত আছে। চাক্ষুষ মন্বন্তরের অবসানে, যখন মহাপ্লাবন ঘটেছিল, তখন বৈবস্বত মনুকে একটি নৌকায় বসিয়ে তিনি মৎস্য অবতার রূপে জগতের জীবকে রক্ষা করেছিলেন। এই অবতার তাঁর দশম অবতার রূপ। একবার দেবতা ও অসুরেরা মন্দর পর্বত দিয়ে সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, একাদশ অবতারে তিনি কূর্মরূপ ধারণ করে ওই মন্দর পর্বতের আধার স্বরূপ হয়েছিলেন। দ্বাদশ অবতারে ধন্বন্তরি ও ত্রয়োদশ অবতারে মোহিনী রূপ ধারণ করেছিলেন এবং অসুরদের মুগ্ধ করে দেবতাদের সুধা পান করিয়েছিলেন। চতুর্দশ অবতারে শ্রীনারায়ণ ভয়ংকর নৃসিংহমূর্তি ধারণ করে, মহা শক্তিধর হিরণ্যকশিপুকে নিজের উরুদেশে রেখে, নখের সাহায্য তার বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন। পঞ্চদশ অবতারে শ্রী হরি বামনরূপে বলিরাজের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে স্বর্গ থেকে বিচ্যুত করার জন্যে তিন পদ পরিমাপ ভূমি যাঞ্চা করেছিলেন।

[* পৃথু নরপতি রূপে শ্রীহরির  অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটিকেই আমি উপন্যাস রূপে এই ব্লগে উপস্থাপিত করেছি - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "] 

ষোড়শ অবতারে ক্ষত্রিয় নৃপতিগণকে ব্রাহ্মণ বিদ্বেষী দেখে অতি উগ্র পরশুরাম রূপে, পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। সপ্তদশ অবতারে পরাশর ও সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব রূপে অবতীর্ণ হয়ে, অল্পবুদ্ধি মানবদের কল্যাণের জন্য সমস্ত বেদকে ভিন্ন ভিন্ন শাখায় বিভক্ত করেছিলেন। অষ্টাদশ অবতারে দেবকার্যে রঘুকুলে শ্রীরামচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়ে সমুদ্রবন্ধন ও লঙ্কাবিজয় ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রদর্শন করেছিলেন। একোনবিংশ ও বিংশ অবতারে ভগবান নারায়ণ, যদুবংশে বলরাম ও কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হয়ে ধরণী থেকে পাপের ভার হরণ করেছিলেন। এরপর একবিংশ অবতারে, কলিযুগের শুরুতে দেব বিদ্বেষীদের মোহ সৃষ্টির জন্যে কীকট প্রদেশে অজনের পুত্র বুদ্ধ নামে খ্যাত হবেন। কলিযুগের অবসানে রাজগণ দস্যুর মতো আচরণ করলে, ব্রাহ্মণের পুত্র হয়ে কল্কি নাম ধারণ করবেন, এবং সেটিই হবে তাঁর দ্বাবিংশ অবতার।

[এখানে শ্রীহরির বাইশটি অবতারের কথা বলা হল - যার মধ্যে শেষ অবতার - কল্কি ভূভার হরণ করতে কবে আসবেন কে জানে? প্রসঙ্গতঃ বিষ্ণুর দশাবতার হল পূর্ণ-অবতার এবং বাকি বারোটি অংশ-অবতার।]

হে দ্বিজগণ, ক্ষয়শূণ্য সরোবর থেকে যেমন সহস্র সহস্র জলধারা নির্গত হয়, তেমনই নিখিল আবির্ভাবের মূলাধার শ্রীহরির থেকে অসংখ্য অবতার আবির্ভূত হন। মহাতেজ ঋষিগণ, মনুসমূহ, সকল দেবতা ও প্রজাপতি, সকলেই শ্রীভগবানের কলা অর্থাৎ বিভূতি। যে অবতারের কথা আগে বললাম, তাঁদের কেউ কেউ শ্রী নারায়ণের অংশ, কেউ কেউ তাঁর কলা। মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ এবং সনৎকুমার, কপিল, নারদ প্রমুখ তাঁর কলা। কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। অসুরেরা যখন জগতে নানান উৎপীড়ন করে, অবতারগণ যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে জগতের শান্তি ও মঙ্গল বিধান করেন। যে ব্যক্তি শুদ্ধচিত্তে সকালে ও সন্ধ্যায় ভগবানের এই জন্ম রহস্য কীর্তন করেন কিংবা শোনেন, তিনি সংসারের অশেষ দুঃখ থেকে নিস্তার পান।

[এখানে আবার বলা হচ্ছে "মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ" অর্থাৎ অংশ-অবতার, পূর্ণ-অবতার নয়। শ্রীকৃষ্ণ আবার অবতার নন, তিনি সাক্ষাৎ ভগবান।] 

এইবার বলি, দেহ সম্বন্ধ থাকলেও কিভাবে জীবের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জীবের আত্মা চৈতন্যস্বরূপ, কিন্তু স্থূলদেহ ভগবানের মায়ায় বিরচিত। এই দেহকেই যখন আত্মা বলে বোধ হয়, তখনই জীব মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে। অজ্ঞব্যক্তি হাওয়ার বেগে ভেসে চলা মেঘকে দেখে আকাশ ভেসে চলেছে মনে করে কিংবা ধুলিঝড়ের ধূসর বর্ণ বায়ুতে আরোপ করে, বায়ুকেই ধূসর বর্ণ মনে করে। তেমনই অবিবেকী জীব সর্বসাক্ষী চেতনে, জড় ও দৃশ্য দেহকে আরোপ করে, দেহই আত্মা এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন হয়। এই স্থূল দেহ ছাড়াও আরেকটি সূক্ষ্ম দেহ আছে, সেই দেহকে লিঙ্গ দেহ বলে। ওই দেহকে দেখা যায় না কিংবা শোনাও যায় না, ওই দেহে হাত, পা ইত্যাদি কোন অবয়বও নেই। এই কারণে লিঙ্গ দেহকে অব্যক্তও বলা যায়। স্থূলদেহের বিনাশে, এই লিঙ্গদেহই জন্ম ও মরণের বশে বার বার সংসার দশা ভোগ করে। যতদিন অবিদ্যা বা অজ্ঞান, আত্মার স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে, মনে নানান বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কিন্তু যখন বিদ্যা অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়, তখন তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ পরমানন্দে বিরাজ করেন।

পরমেশ্বর ও জীবে প্রভেদ এই যে, পরমেশ্বর স্বতন্ত্র পুরুষ, কিন্তু জীব মায়ার অধীন। তিনি নির্লিপ্তভাবে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করছেন। মানুষ যেমন দূর থেকে ফুলের গন্ধ উপভোগ করে, সর্বভূতের অন্তর্যামী ছয় ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা পরমেশ্বর, সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয় ঠিক তেমন ভাবেই গ্রহণ করে থাকেন। ভক্তিহীন জ্ঞানীরা তর্ক বিতর্ক ও কৌশলে তাঁর নাম, রূপ ও লীলার তত্ত্ব কখনোই বুঝতে পারে না। যিনি এই চক্রপাণি পরমপুরুষের চরণপদ্মের সৌরভে সর্বদা অকপট আনন্দ অনুভব করেন, তিনিই এই বিশ্ববিধাতার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন। এই জগতে আপনারা ধন্য, কারণ অখিল লোকপতি বাসুদেবে আপনাদের ঐকান্তিকী রতি উৎপন্ন হয়েছে।

এই শ্রীমৎভাগবত পুরাণ সকল বেদের সমান। ভগবান বেদব্যাস লোকহিতের জন্য সকল বেদ ও ইতিহাসের সার সংগ্রহ করে হরিলীলাপূর্ণ এই মহাপুরাণ রচনা করেছিলেন। জিতেন্দ্রিয় যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিজের পুত্র শুকদেবকে, ভুবনমঙ্গল এই গ্রন্থ রচনা করে পাঠ করতে দিয়েছিলেন। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মহারাজ পরীক্ষিৎ আমৃত্যু অনশনে যখন গঙ্গাতীরে বসেছিলেন, সেই সময় অন্যান্য মহর্ষিদের সঙ্গে মহারাজ পরীক্ষিৎকেও শ্রী শুকদেব এই গ্রন্থের বর্ণনা শুনিয়েছিলেন। হে বিপ্রগণ, যখন মহাতেজা ব্রহ্মর্ষি শুকদেব এই পুরাণ সকলকে শোনাচ্ছিলেন, সেই মহৎ সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমার বুদ্ধি অনুসারে, এই পুরাণের অর্থ আমি যতদূর অবধারণ করতে পেরেছি, আপনাদের কাছে তাই আমি বর্ণনা করবো”। 

 

সুদীর্ঘ যজ্ঞে দীক্ষিত ঋক বেদজ্ঞ বৃদ্ধ শৌনক বললেন, “হে সূত, ভগবান শুকদেব যে ভাগবত পুরাণের কথা কীর্তন করেছিলেন, সেই পুরাণ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। শুনেছি, ব্যাসদেব মহাভারত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন, তিনি আবার কোন সময়ে, কোথায় এবং কী উদ্দেশে এই পুরাণ রচনা করলেন? আপনি বললেন, তাঁর পুত্র শুকদেব এই পুরাণ কীর্তন করেছেন, কিন্তু তা কী করে সম্ভব? কারণ তিনি মহাযোগী, সর্বভূতে সমদর্শী, শত্রুমিত্র ভেদজ্ঞান রহিত। মোহবন্ধনের অতীত এবং ব্রহ্মে একনিষ্ঠ থেকে তিনি গোপনে বিচরণ করেন। তাঁকে দেখলে হিতাহিত বোধশূণ্য এক বালকের মতো মনে হয়। একবার প্রব্রজ্যা নিয়ে, তিনি নগ্ন দেহেই বেরিয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাসদেব ছুটেছিলেন পুত্রের পিছনে। পথের পাশে থাকা একটি সরোবরের জলে একদল সুন্দরী অপ্সরা স্নান করছিল, তারা মহাযোগী কিন্তু যুবক শুকদেবকে দেখে লজ্জা পেল না, কিন্তু বৃদ্ধ ব্যাসদেবকে দেখে তারা লজ্জায় বস্ত্র পরে ফেললএই ঘটনায় অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে, ব্যাসদেব ওই অপ্সরাদের এর কারণ জিগ্যেস করলে, অপ্সরা রমণীরা বলেছিল, আপনার পুত্রের দৃষ্টি পবিত্র, তিনি যুবক হলেও তাঁর দৃষ্টিতে নারীপুরুষ ভেদ নেই, কিন্তু আপনার সেই ভেদজ্ঞান রয়েছে।

তিনি উন্মত্ত ও মূকের মতো ঘুরতে ঘুরতে, কুরুজাঙ্গাল অতিক্রম করে হস্তিনাপুরে যখন পৌঁছলেন, তাঁকে নগরবাসীরা চিনতে পারল কী করে? তাঁর সঙ্গে রাজর্ষি পরীক্ষিতের আলোচনাই বা কিভাবে সম্ভব হল? তিনি গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য গৃহস্থবাড়িতে গোদোহন কালের বেশী থাকেন না, সেই যোগী শুকদেব সুদীর্ঘ সময় ধরে এই পুরাণ কীর্তন ও ব্যাখ্যা কী করে করলেন? হে সূত, অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ ভক্তদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁর অতি আশ্চর্য জন্ম ও কর্ম বৃত্তান্ত আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। পাণ্ডুবংশতিলক মহাবীর সম্রাট পরীক্ষিৎ তাঁর যৌবনেই রাজ্যলক্ষ্মী ত্যাগ করে, কিসের কারণে অনশনে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প করেছিলেন? যাঁরা ভগবানের চরণে আত্ম সমর্পণ করেন, তাঁরা নিজের জন্য কিছুই করেন না, লোকহিতের জন্যেই তাঁরা প্রাণধারণ করেন। অতএব, মহারাজ কিসের জন্য পরমবৈরাগ্য অবলম্বন করে নিজের দেহও পরিত্যাগ করলেন? আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী, অতএব আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাদের তৃপ্তি দান করুন”

[গোদোহন কাল - অর্থাৎ একটি গাই দুইতে যতটা সময় লাগে - এখনকার হিসেবে মিনিট পাঁচ-দশ বড় জোর।]

[বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী", অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই।]  

সূত বললেন, “দ্বাপর যুগের অবসানকাল আসন্ন হলে, ঋষি পরাশর ও বসুকন্যা সত্যবতীর পুত্র হয়ে, যোগী ব্যাসদেব শ্রীহরির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন সূর্যোদয়কালে সরস্বতীর পবিত্র জলে স্নান আহ্নিক সেরে, ব্যাসদেব তাঁর বদরিকা আশ্রমে ধ্যানে বসলেন। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি দিব্যনেত্রে অনুভব করলেন, কালের অমোঘ প্রভাবে যুগধর্মের বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। তিনি দেখলেন, জীবের স্থূলদেহ শক্তিহীন এবং মানুষ শ্রদ্ধাহীন, সত্ত্বগুণরহিত, মন্দমতি, অল্পায়ু ও ভাগ্যহীন হতে চলেছে। সর্বজ্ঞ মুনি বেদব্যাস মানুষের এই অবস্থা দেখে চতুর্বর্ণ ও চার আশ্রমের কিসে মঙ্গল হয়, এই চিন্তা করলেন। তিনি চিন্তা করলেন, বৈদিক যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মানুষের চিত্তশুদ্ধি হয়, অতএব যজ্ঞ ক্রিয়া অনুষ্ঠান যাতে লুপ্ত না হয়ে যায়, সেই ইচ্ছাতে বেদকে ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব এই চার ভাগে বিভক্ত করলেন এবং ইতিহাস ও পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসাবে গ্রন্থিত করলেন।

মহর্ষি হৈল ঋকবেদজ্ঞ, মহর্ষি জৈমিনি সামবেদজ্ঞ এবং বৈশম্পায়ন যজুঃ বেদে পারদর্শী ছিলেন। মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। আমার পিতা রোমহর্ষণ ইতিহাস ও পুরাণে বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। ঋষিরা নিজ নিজ শিষ্যদের মধ্যে নিজ নিজ বেদের বহুল প্রচার করতে শুরু করলেন। অত্যন্ত অজ্ঞান ব্যক্তিও যাতে বেদের তত্ত্ব বুঝতে পারে, ব্যাসদেব সেই ভাবেই বেদের বিভাগ করেছিলেন। স্ত্রীলোক, শূদ্র ও পতিত জাতির বেদ চর্চায় অধিকার না থাকায়, তাদের সকলের চিত্তশুদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য ঋষি বেদব্যাস মহাভারত নামে বিশাল আখ্যায়িকা রচনা করলেন।

[মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। মুনি সুমন্ত অথর্ব বেদে সুনিপুণ - অর্থাৎ শাস্ত্রমতে তিনি চতুর্বেদী - (আধুনিক মতে) চৌবে - অর্থাৎ বৈদ্য। এই বৈদ্যরাও আদিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু তাঁরা আভিচারিক কর্মে সুদক্ষ হওয়ায়, পরবর্তী কালে এবং আজও উত্তরভারতের বহু স্থানে সমাজ তাঁদের পতিত বা ভ্রষ্ট - ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য করে। ব্রিটিশ যুগে ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের আগে, সারা ভারতে বৈদ্যরাই ছিলেন মানুষ ও গৃহপালিত পশুর চিকিৎসক - কিন্তু হলে কি হবে, তাঁরা সমাজের শীর্ষস্থানীয় হিসাবে পরগণিত হতেন না। ]     

একদিন ধর্মবিৎ ঋষি বেদব্যাস অপ্রসন্ন চিত্তে নির্জন সরস্বতীর তীরে বসে, চিন্তা করলেন, “আমি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রতধারণ করে দেব, অগ্নি ও গুরুজনের সমুচিত পূজা ও তাঁদের আজ্ঞা প্রতিপালন করেছি। শূদ্ররাও যাতে ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারে, সেই উদ্দেশে মহাভারতের ছলে সকল বেদের সারাংশ প্রকাশ করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য, আত্মায় ব্রহ্মতেজ ও পূর্ণতা উপলব্ধি করেও, মনে হচ্ছে আমার স্বরূপ লাভ হয়নি। যে ভক্তিধর্ম অচ্যুত ও ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়, আমি সেই ভক্তিধর্মের বিস্তারিত রূপ কীর্তন করিনি বলেই কী আমার আত্মাকে বিচ্ছিন্ন এবং অপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে?”

ঋষি যখন নির্জনে বসে, এই রকম চিন্তা করছেন, সেই সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলে দেবর্ষি নারদ। 

চলবে...


বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব "


৩১ 

যজ্ঞস্থলে বেণপুত্র পৃথুর রাজ্যাভিষেক ও বিবাহের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হল। অনুষ্ঠানের শেষে তাঁরা যুগলে রাজপুরোহিত এবং আশ্রমের আচার্যদের প্রণাম করলেন; মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলের সঙ্গে পরিচিত হলেন, আন্তরিক সম্ভাষণ করলেন।

 তারপর প্রকাশ্য রাজসভায় মহারাজ পৃথুর বন্দনাগীত শুরু করলেন রাজভট্ট। বন্দনা শেষ হতেই তিনি ঘোষণা করলেন, মহারাজা পৃথুর আগমন বার্তা, “ত্রিলোকের পিতা ভগবান ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভূব মনু হইতে প্রাচীন কালে যে পূত রাজবংশের উদ্গম হইয়াছিল - সেই মহান্‌ স্বায়ম্ভূব এবং তৎপত্নী রত্নগর্ভা শতরূপার দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ ভগবান বাসুদেবের অংশে ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন - মহারাজা উত্তানপাদ ও তাঁর পুণ্যব্রতা পত্নী সুনীতির মহাপুণ্যবান বালক পুত্র ধ্রুব, কঠোর তপস্যায় ভগবান বিষ্ণুর সাক্ষাৎলাভ করিয়া, স্বয়ং ভগবান শ্রীহরির আশীর্বাদ ও অনুগ্রহ লাভ করতঃ সসাগরা ধরিত্রীকে স্বীয় সন্তানের ন্যায় সুদীর্ঘকাল প্রতিপালন করিয়া অক্ষয় বৈকুণ্ঠলাভ করিয়াছিলেন – এই অনুপমবংশললাম ছিলেন মহারাজ অঙ্গ - তাঁহার তুল্য ধর্মপরায়ণ, প্রজারঞ্জক নৃপতি ভূভারতে কদাপি দৃষ্টিগোচর হয় নাই –  প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। আজ কার্তিক মাসের পুণ্য পূর্ণিমা তিথিতে প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিদেব, শ্রীশ্রীব্রহ্মা, শ্রীশ্রীবিষ্ণু, ভগবান ভব, দেবরাজ শ্রীইন্দ্রাদি সকল দেবতাদের সম্যক উপস্থিতিতে কীর্তিমান শ্রীপৃথুর রাজ্যাভিষেক যজ্ঞ সুসম্পন্ন হইল। ঐ যজ্ঞানুষ্ঠানেই মহারাজ শ্রীপৃথু ও শ্রীমতী অর্চ্চি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই রাজ্যেই বৈকুণ্ঠলোকের প্রতিষ্ঠা করিলেন। স্বায়ম্ভূবকূলতিলক দেবোপম দম্পতি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃমাতৃতুল্য মহারাজা ও মহারাণীকে রাজসভায় পদার্পণ করতঃ আমাদিগকে কৃতার্থ করিবার নিবেদন করিতেছি...”।

সভার বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা একসঙ্গে বারবার জয়ধ্বনি করে উঠল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”!

 

 রাজভট্টের ঘোষণা ও আবাহন সমাপ্ত হতেই, প্রশস্ত সুসজ্জিত দ্বারপথে প্রথমেই প্রবেশ করল সুশৃঙ্খল নিরাপত্তাবাহিনী। নিরাপত্তারক্ষীরা পূর্ব নির্দিষ্ট স্ব স্ব স্থানে স্থিত হওয়ার পর দ্বারপথে দেখা দিলেন রাজপুরোহিত। বামহস্তে সরস্বতীর পূতবারি পূর্ণ তাম্রঘট, দক্ষিণহস্তে পঞ্চপত্রমঞ্জরী দিয়ে ঘটের মন্ত্রঃপূত বারি সিঞ্চন করতে করতে তিনি সভাস্থলে প্রবেশ করলেন।  তাঁর অনুবর্তী হলেন রাজদম্পতি, তাঁদের অনুবর্তী হলেন মহামন্ত্রী বিমোহন, সকল মন্ত্রীমণ্ডলী এবং সর্বশেষে আশ্রমের পঞ্চ আচার্য এবং দুই আশ্রমকন্যা।                       

রাজ সিংহাসনে উপবেশন করলেন, মহারাজা পৃথু, তাঁর বাম দিকে বসলেন, মহারাণি অর্চ্চি। সিংহাসনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন মহামন্ত্রী বিমোহন এবং রাজপুরোহিত। সিংহাসনের পিছনে দাঁড়ালেন, মন্ত্রীমণ্ডলী ও আশ্রমের আচার্যগণ ও দুই আশ্রমকন্যা। সকলের অবস্থান স্থিত হলে, রাজভট্ট সভামধ্যে উপস্থিত বৈদেশিক রাজন্যবর্গ, রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রীদের গুরুত্ব ও প্রভাব অনুযায়ী একে একে পরিচয় ঘোষণা করতে লাগলেন। এই পদ্ধতি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর কিন্তু বিদেশনীতির বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজদম্পতি করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা অনুধাবণ করছিলেন। প্রত্যেক পরিচয়ের সমাপ্তিতে, সভাসদবৃন্দ “সাধু, সাধু” ধ্বনিতে স্বাগত জানাচ্ছিলেন রাজদম্পতিকে এবং ক্রমে ক্রমে অধৈর্য হতে থাকা জনতা অধিকতর উৎসাহে গর্জন করে উঠছিল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারারাণি অর্চ্চির জয়”!

জনতার সম্মিলিত জয়ধ্বনি, ভয়ংকর মেঘগর্জনের মতো কাঁপিয়ে তুলছিল সেই সভাগৃহ। বারবার জলদগম্ভীর জয়ধ্বনিতে কল্যাণী, যিনি বর্তমানে মহারাণি অর্চ্চি, অসহায় হরিণীর মতো কেঁপে উঠছিলেন। মহারাণি অর্চ্চি কনুইয়ের চাপে মহারাজ পৃথুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অস্ফুটস্বরে বললেন, “আর্যপুত্র, আমার ভয় করছে”।

মহারাজা পৃথু প্রশ্রয়ের হাসি চোখে নিয়ে, প্রিয়তমা রাণিকে অস্ফুটে বললেন, “ভয় কী, আমি তো আছি!” মহারাজ পৃথুর চোখে চোখ রেখে মহারাণি অর্চ্চি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন, তিনি স্বামীর দুই চোখে দেখতে পেলেন অদ্ভূত এক শক্তি – এ দৃষ্টি কদাপি অর্চনের নয়, এ দৃষ্টি মহারাজা পৃথুর!  

 

কারণ বিগত সন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে নির্জন সাক্ষাতেও অর্চন কল্যাণীর দুটি হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল, “এ আমি কিছুতেই পারবো না, কল্যাণী, পারবো না। আমার চোখে এখনো ভাসছে আমাদের গ্রাম, মাঠ-ঘাট, দীঘির নিবিড় পার, নদীর নিরালা স্রোত। আমাদের হৃদয়ে রয়েছে পিতামাতার স্নেহময়শাসন, ভ্রাতা ও ভগিনীদের কপটকলহমাখা শ্রদ্ধা -  সেই সব কিছু ছেড়ে রাজা সাজতে আমি পারবো না। আমি আজ রাত্রেই মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্য সুনীতিকুমারকে বলব, আমার অক্ষমতার কথা, বলব, গুরুদেব, আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে মুক্তি দিন! আমাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন, আমাদের সেই গ্রামে, আমাদের পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায়”!

সে সময় কুমারী কল্যাণীই সান্ত্বনা দিয়েছিল অর্চনকে, বলেছিল, “তা আর হয় না, অর্চন। মহর্ষি এবং আচার্যদের এই পরিস্থিতিতে ফেলে তুমি পালিয়ে যাবে? আবেগের বশে এখন হয়তো তুমি একথা বলছো, কিন্তু তুমি চলে গেলে, আচার্যগণ যে অসহ্য অপমানিত হবেন, সে কথা তোমার যখনই মনে পড়বে তুমি অনুশোচনায় দগ্ধ হবে - সারাজীবন, অহরহ। আমার মুখের দিকে তাকাও অর্চন, আমি বিশ্বাস করি, তুমি পারবে। মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্যগণও বিশ্বাস করেন তুমিই পারবে! হে প্রিয়, তুমি নিজেকে বিশ্বাস করো, শান্ত হও, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করো নিজেকে”!               

 

মহারাজ পৃথু করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা শুনতে শুনতেও অনুভব করলেন, কল্যাণী অবাক নয়নে তাকিয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে। কল্যাণীর এই বিস্ময়ের কারণ তিনি জানেন। গতকাল সন্ধ্যাতেও অর্চন নামের সেই তরুণ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তার পিছনে ফেলে আসা জীবনের সারল্যে ফিরে যাবে, নাকি আলিঙ্গন করে নেবে রাজকীয় জীবনের এই জটিল আবর্তকে? কিন্তু আজ প্রভাতে অভিষেকের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে, তাঁকে ঘিরে ঘটতে থাকা সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান, তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিয়োজিত অজস্র মানুষের শ্রদ্ধা, তাঁকে ধীরে ধীরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তুলছে। এই সভাস্থলে উপস্থিত ভিন্নদেশের রাজন্যবর্গ, মহামান্য অতিথিবৃন্দ, এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এই রাজ্যের বিপক্ষীয়, তাঁরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন নবীন রাজার ব্যক্তিত্ব বিচার করতে। আচার্য সুনীতিকুমার এই বোধ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, দীর্ঘ কয়েকমাসে। আজ সিংহাসনে উপবেশনের পর তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী -  বিপক্ষীয়দের সামনে তাঁকে শিষ্ট অথচ বলিষ্ঠ এক নৃপতির ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতেই হবে।

উপরন্তু সভাগৃহের বাইরে, উপস্থিত ওই যে জনতা, যাঁদের নির্দিষ্ট কাউকেই তিনি চেনেন না। একদিন তিনি নিজেও ওদের মধ্যেই জনৈক ছিলেন, অথচ ভাগ্যক্রমে আজ তিনি রাজা! এখনও পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কোন কীর্তিই নেই, তবুও ওই জনতা সম্পূর্ণ আস্থায় তাঁর জয়ধ্বনি দিয়ে চলেছে বারংবার। প্রতিবার জয়ধ্বনির গর্জনে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি আর সাধারণ অর্চন নন, তিনিই মহারাজ পৃথু, এই বিশ্বাস – তাঁর প্রতি ন্যস্ত এই দায়িত্বের প্রতিদান তাঁকে করতেই হবে! চারণকবিদের গানে যে মহারাজ পৃথুর কীর্তির কথা পল্লবিত হয়ে চলেছে এতদিন, তিনিই সেই মহারাজ পৃথু, তাঁকে অতিক্রম করতেই হবে ওইসকল কীর্তির চূড়া!

কিছুক্ষণ আগেও এই মহারাজ পৃথুকে অর্চন নিজেই চিনতেন না, চিনছেন প্রতি পলে, অতএব আজকে তাঁকে দেখে কল্যাণী, প্রিয়তমা মহারাণি অর্চ্চি যে বিস্মিত হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?    

 পরিচয় ও সৌজন্য পর্ব শেষ হল, রাজভট্ট সমাপ্তি ঘোষণায় বললেন,  “উপস্থিত সম্মানীয় রাজন্যবর্গ এবং সম্মানীয় অতিথিবর্গ এই অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের নব রাজদম্পতির পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ এই অনুষ্ঠান এখানেই সমাপ্ত হোক। আপনারা নিজ নিজ স্কন্ধাবারে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সন্ধ্যার পর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে থাকবে নৃত্য ও গীতের অনুষ্ঠান। সেখানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের রাজদম্পতি আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আপনারা আশীর্বাদ করুন আমাদের রাজদম্পতিকে – তাঁদের জয় হোক, শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক তাঁদের নতুন জীবন – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের সকল রাজ্যবাসীর”।

করজোড়ে রাজা পৃথু ও রাণি অর্চ্চি সকলকে বিদায় অভিবাদন করলেন, তারপর উপস্থিত সকলের সঙ্গে ধীরপায়ে সভাস্থলের বাইরে এলেন। দ্বারের সম্মুখে অপেক্ষারত সুসজ্জিত অশ্বশকটে তাঁরা উঠে বসলেন। অশ্বশকট মৃদু গতিতে রাজপ্রাসাদের দিকে চলতে শুরু করল। নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে অপেক্ষারত সহস্র জনগণ আবার গর্জন করে উঠল, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাজা পৃথু বামহাতে রাণি অর্চ্চির ডানহাতটি চেপে ধরলেন, হাস্যমুখে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন জনগণের উদ্দেশে। দুপাশের হর্ম্যরাজির অলিন্দ থেকে বর্ষিত হতে লাগল পুষ্পরাশি।

চলবে... 


মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

কোশিশ কিজিয়ে...

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " ছোট্ট হওয়া "


 

শনিবারের বাজারটা একদম ময়দানে মারা গেলদিল্লিতেও ময়দান আছে, আছে কলকাতাতেওকলকাতায় মেট্রো রেলে বলে নেক্সট স্টেসন ইজ ম্যায়ডান। কিন্তু বাংলায় বলে পরবর্তী স্টেসন ময়দান। দিল্লির ময়দানে আছে প্রগতি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ময়দানে প্রগতি নেই। প্রগতি আর উন্নতিকে কি সমার্থক বলা যায়? তাহলে বলব পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ধারে। ত্রিফলা আলোর মতো। ত্রিফলা আলোর ডাণ্ডায় জড়ানো নীল-সাদা এলইডি টুনি বাল্বের মতো। উন্নতির আলোয় কিছুই দেখা যায় না – কিন্তু মিটমিট করে।     

থাকি গুরগাঁওতে, চাকরি করি একটা বহুজাতিক সংস্থায়। ফাইভ ডে উইক হলেও, কোম্পানির বাতিক হল এমপ্লয়িদের চাঙ্গা রাখা। আর সেই কাজের তদারকির জন্যে আছে এইচ আর ডিপার্টমেণ্ট। অবাঙালিরা বলে হ্যাচ আর। ঠিকই বলে, আমরা যেন পোলট্রির ডিম, হ্যাচ করে বানিয়ে তুলবে ঝিম মারা সব মুরগি ছানা। কিছুদিন পরেই গোটা ১৭০/-, কাটা ২৩০/-।

আমাদের এই হ্যাচ আর ডিপার্টমেণ্ট, যার কর্পোরেট মাথায় আছে আম্রুৎ নেগি, ন্যাগ করার জন্য বিখ্যাত। ব্যাটা সব জানে। এমন কোন বিষয় নেই, এমন কোন ভাষা নেই জানে না। আমার সঙ্গে একবারই ছোটি সি মুলাকাত হয়েছিল। বলেছিল বাঙ্গালীদের হামি খুব রেসপেক্ট কোরে, বাঙ্গালি খুব মিশটি আছে। টাগোরের গান হামার ওয়াইফ পসন্দ করল। বিপোঁদে মোরে রকছা কড়ো এ নাহি মোর পরারথনা, বিপোঁদে হামি না জেনো কোড়ি ভোয়। আরে ওয়াঃ, কা বাত। হোয়েনএভার ইউ ফেস এনি ট্রাবুল, ডোন্ট গেট অ্যাফ্রেড। মায়ের চিকিৎসার জন্যে, আমি ছুটির দরখাস্ত করেছিলাম। তার জন্যে এত কথা! আরো বলেছিল, আপনার মামি হামাদেরও মামি। আপনাকে যেতে হোবে কেনো? হামি কঅলকাতার ব্রাঞ্চে কহিয়ে দিচ্ছে, সব ঠিক কোরে দেবে। কঅলকাতার বেস্ট নার্সিংহোম, বেস্ট ডক্টর। আমাদের কলকাতা উচ্চারণে কোল আছে, অবাঙালী উচ্চারণে কল আছে যাকে গ্যাঁড়াকল বলা চলে। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে বসে শোনা যায় কঅলকাতা যানেওয়ালি ফ্লাইট গেট নাম্বার তেইশসে রওয়ানা হোগি...। কলকাতার কোলে বেড়ে ওঠা বাঙালী, বাইরে গেলেই জাঁতাকলে পড়ে যায়। তা সে যাইহোক, আমার এবং মায়ের দুজনেরই ভাগ্য ভালো, শেষমেষ সেবারে আর যেতে হয়নি। মা দু একদিনের মধ্যেই রিকভার করে গিয়েছিলেন।

সেই নেগির ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক শনিবার অফিস ছুটি থাকলেও, আমাদের হাজরি দিতে হয়। সকাল দশটা থেকে বারোটা-সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। “জিনে কি তরিকা” আমাদের বাঁচার ক্লাস নেয় বেঁচে তো সবাই আছে এই পৃথিবীতে - পিমড়ে থেকে হাতি, অ্যামিবা থেকে তিমি। কিন্তু সে জিনা কি আর জিনা, রে লাল্লু। “জিনে কি তরিকা”-র বাবা তেজকিরণ প্রতি শনিবার আমাদের ক্লাস নেন। কিভাবে আমাদের জীবনটা আরো সুন্দর হয়ে উঠবে। তিনি আমাদের ধ্যান শেখান, ইয়োগা শেখান, প্রাণায়াম শেখান। আমাদের মনের মধ্যে জমে ওঠা সারা হপ্তার যাবতীয় কাজের স্ট্রেস, তিনি টিপে টিপে বের করে দেন, টুথপেস্টের টিউব থেকে পেস্ট বের করার মতো। একবারে সবটা বের করে দিলেই হয়, কিন্তু তা নয় একটু একটু করে, প্রতি শনিবার।

বাবা তেজকিরণ আসেন, তাঁর সঙ্গে আসেন দুই সঙ্গিনী। পাক্কা দশটায় আমাদের অফিসের থার্ডফ্লোরের সেমিনার হলটাকে ফ্যাঁস ফ্যাঁস রুম ফ্রেশনারে ফ্রেশ করে নেওয়া হয়। সাজিয়ে তোলা হয় ফুল দিয়ে আর সারা হলের কোনায় কোনায় সুগন্ধী আগরবাত্তি জ্বেলে দেয় ওরা। দুই কন্যার পরনে সাদা খোলে নীল চিরুনি পাড় শাড়ি। গায়ে থ্রি কোয়ার্টার সাদা ব্লাউজ, কনুইয়ের একটু নিচে ফ্রিল দেওয়া হাতাভাবলেশহীন মুখে তারা যন্ত্রের মতো সব কাজ সেরে ফ্যালে। দশটা দশে আবির্ভাব হওয়ার পর, বাবা সিংহাসনে আসীন হলে, তারা বাবার পিছনে বসে – একজন ফার্স্টস্লিপ, অন্যজন লেগস্লিপ ফিল্ডারের মতোঅতটা না হলেও, একটু পিছনে, কোনাকুনি। তাদের দুজনার মতো রাম গরুড়ের ছানা আমি আর তৃতীয় দেখিনি। মুখ দেখলে মনে হয়, আমাদের নেগি সায়েবের মতো, বাবা তেজও তাদের বহুদিন ইনক্রিমেন্ট আটকে রেখেছেন; নয়তো বহুদিন তাদের লিভ অ্যাপ্লিকেশন পেন্ডিং রেখে দিয়েছেন।

সকাল দশটার মধ্যে আমরা যখন হলে পৌঁছাই, বাইরে জুতো খুলে, হাল্কা পায়ে উঠে বসি সাদা চাদর বিছানো, মেঝেয় পাতা ঢালাও গদিতেআর নেগি সায়েবের চ্যালা রাজেশ পুনিয়া, বাবা তেজকিরণকে সঙ্গে নিয়ে হলে প্রবেশ করলেই আমরা হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াইজোড়হাত করে, আমরা সমস্বরে নমস্কার করে বলি, “পরণাম, মহারাজজী”।

এতগুলি সন্তানের গর্বিত পূজ্য বাবা দুই হাত তুলে আশীর্বাদ করেন, “জয়মস্তু, শুভমস্তু”। বাবার গোলগাল নির্দাড়িগোঁফ মুখে হাল্কা হাসি, চোখ সামান্য আবিষ্ট। মাথার কাঁচাপাকা চুল ঘাড় অব্দি, থাক-কাটা-কাটা। পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি। ম্যাজেন্টা রঙের চওড়া পাড় দেওয়া বাসন্তি খোলের ধুতি, ভাঁজ করে পরা। ফুলে সাজানো সোনালি নকশা করা ডিপব্রাউন সিংহাসনটা হলের পশ্চিম দিকে, মাঝখানে রাখাই ছিল। গদি আঁটা সেই সিংহাসনে বসে, তিনি দুই হাতের ইশারা করলে, আমরা সকলে বসি। সমঝদারকে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়। বাবু হয়ে বসতে আমাদের অনেকের হাঁটুতেই কটমট, খটমট আওয়াজ হয়। তা হোক, গদিতে বসার পর, আমরা তাঁর বাণী শোনার জন্য উদ্গ্রীব হইউদ্গ্রীব হই?! আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, সত্যিকারের উদ্গ্রীব না হলেও, আমরা সেরকমই অভিনয় করি। আসলে প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিনিয়ত আমরা যে কত ভালো অভিনয় করি, সে কথা জানলে উত্তমকুমার-সৌমিত্রও শিউরে উঠতেন! 

সকলের একজোড়া হ’লে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ জোড়া চোখে, আমরা বাবা তেজকিরণের মুখের দিকে চেয়ে থাকি। না ঠিক বললাম না, নিখিল চোমালের একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। ছোকরা বছর কয়েক আগে বাইক অ্যাক্সিডেণ্ট করে, প্রায় মরতে বসেছিল। হাতে-পায়ে স্টিল প্লেট বসিয়ে, একটা চোখ খুইয়ে বেচারা এখন আমাদের সঙ্গেই চার্টার্ড বাসে যাওয়া আসা করে। আমরা সবাই বাবা তেজকিরণের দিকে তাকিয়ে আছি বললাম বটে, কিন্তু কিছু লোকের চোখ, বাবার সঙ্গী স্লিপের দুই ফিল্ডারের দিকেও থাকে। আমাদের সেকসনে কওশল সুমন নতুন ঢুকেছে, বছর খানেক হল। ছোঁড়া খুব ডেঁপো, মেয়েদের পেছনে খুব ঘুরঘুর করে। সে নাকি লেগস্লিপের মেয়েটির সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিয়েছে। মেয়েটির বাপের দেওয়া নাম নেহা পটেল, আর এখন বাবার আশ্রম থেকে দেওয়া নাম শান্তিমতী। খুব গরিব ঘরের মেয়ে। কোনরকমে ক্লাস টেন পাস করার পর আর লেখাপড়া করতে পারেনি। বাবা তেজকিরণের রাজকোটের আশ্রমে ওদের পরিবারের আসাযাওয়া ছিল। সেখানেই ও কিভাবে যেন বাবার চোখে পড়ে যায় এবং সেই থেকে আশ্রমে রয়ে গেছে। বছর খানেক ট্রেনিংয়ের পর, এখন বাবার সঙ্গেই থাকে, বাবার সেবা করে। অহর্নিশ সেবা মে হে।

“বহনোঁ অওর ভাইয়োঁ...আজ আমরা যে বিষয় শিখবো – সে বিষয় প্রত্যেক লেডিস ও জেন্টসের পক্ষে অত্যন্ত জরুরী শিক্ষণীয় বিষয়। পরন্তু আমাদের দেশে যে শিক্‌ষাবেওস্থা আছে, তাতে এই শিক্‌ষা আমাদের দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের বাচ্চারা পচ্চিমদেশের অনুকরণ করে যে শিক্‌ষা লাভ করে, তাতে তারা যে শুধু ভোগময় জীবনের প্রতি লালচি হয় তাই নয়, বরং পাপের দিকে নিরন্তর দৌড়তে থাকে। তারা কদাপি মনমে শান্তি পায় না, দিনরাত পয়সা, প্রমোশন, আলিসান ফ্ল্যাট, লেটেস্ট মডেলের দামি গাড়ি, বছরে একবার ফোরেন টুরের স্বপ্ন দেখতে দেখতে, অন্দরসে খোকলা হয়ে যায়, পরেসান হতে থাকে। বাড়তে থাকে স্ট্রেস – মান্‌সিক চাপ। মেরেকো আকসর পুছা যাতা হ্যায়, বাবা, ইস সে ক্যায়সে মিলেগি ছুটকারা? কেয়া মুক্তি কি কোই ভি উপায় নেহি হ্যায়? আমি বলি, কিঁউ নেহি, বেটা, অবশ্য উপায় হ্যায়। তোমার কাছে ইয়দি দোপলকা ওয়ক্ত থাকে, শান্ত হয়ে বসো দেখি আমার সামনে, মন দিয়ে শোন দেখি আমার কথা। আমাদের এই দেশেরই মুনি ঋষিরা সাদিয়োঁ পহেলে, এর মোক্ষম উপায় বাতলে দিয়ে গেছেন। আমরা সে কথা শুনি না। কিন্তু সেই উপায় ইস্তেমাল করে, পচ্চিমের সায়েবরা যখন সেই উপায়ের কথা ইংরিজিতে সাতকাহন করে বলে, তখন আমাদের গর্বে বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু তাও আমরা সেই উপায়ের কথা চিন্তা করি না। সেই উপায় কী”? 

ওপরের কথাগুলো বাবা তেজকিরণ স্যান্সক্রিট ঘেঁষা শুদ্ধ হিন্দীতে বললেও, আমি অধিকাংশই পাতি বাংলাতেই বললাম। হিন্দি বলা এবং লেখাতে আমার কচি নয়, বেশ ব্যথা আছে। তবু বাচালতা করা যার স্বভাব সে করবেই, আমি বলে ফেললাম, “যোগ”।

প্রসন্ন হাসিতে বাবা তেজকিরণের মুখ ভরে উঠল, বললেন, “অতি উত্তম। সহি জওয়াব। লেকিন যোগ নেহি বেটা, ই-য়ো-গা। আপনি বাঙ্গালি আছে, জরুর”। আমি হেসে ঘাড় নাড়লাম। তিনিও আধবোজা চোখের হাসিতে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইয়োগা। আজ ইয়োগার মধ্যে আমি অন্য এক বিষয়ের কথা বলব, ধ্যান। আপলোগ সবাই মক্ষিকে তো দেখেছেন। মক্ষি কভি ফুলের ওপর বসে, কভি গন্ধা বিষ্ঠায় বসে, আমাদের এই চঞ্চল মনটাও ওই মক্ষির মতো ...

 

 মাছির কথায় আমার মাছের কথা মনে পড়ল, আজ অনেকদিন পর বাজারে বেশ টাটকা মৌরলা পেলাম। এদিকে এসব মাছ বেশ কম আসে। আর এলেও এমন দাম হাঁকে, নেব কি নেব না, ভাবতে ভাবতে অন্য লোকেরা তুলে নেয়। তাছাড়া হরিয়ানভি যে বাই আমাদের ফ্ল্যাটে কাজ করতে আসে কিংবা ঝিনিও, এই ছোটোমাছ সাফ করার তরিকাটা ঠিক জানে না। ঝিনি, আমার বউ, ছোটমাছ খেতে পছন্দ করে, কিন্তু নিজে রান্না করতে বিরক্ত হয়। দিন দশেক হল, দুর্গাপুর থেকে ঝিনির মা এসেছেন, সেই ভরসাতেই আজ সাহস করে মৌরলা মাছ কিনেই ফেললাম। শ্বাশুড়ি দুর্গাপুর থেকে আসার সময় একগাদা আমের, কুলের আর তেঁতুলের আচার, কাসুন্দি নিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে এনেছেন কল্যাণেশ্বরী মায়ের আর ঘাগরবুড়িমার প্রসাদীফুল ও প্রসাদ। কল্যাণেশ্বরী মা এবং ঘাগরবুড়িমা, দুজনেরই থানে ঝিনির মা মান্নত করে এসেছেন, এবার যেন আমাদের একটি ছেলে হয়। আমাদের বড়োটি মেয়ে, বুল্টি, বছর চারেক বয়েস। এখন ঝিনি আবার মা হতে চলেছে। দেরী আছে - সবে তিনমাস, ডেট আছে সেই নভেম্বরে। অফিসে এখনো কাউকে বলা হয়নি। বললেই বলবে, পার্টি দো - হুইস্কি, চিলি চিকেন, সেঁকাপাঁপড়, ডালমুট...এখনই দুম করে খরচ করতে চাইছি না। ঝিনির চেকআপ, শ্বাশুড়ির আপ্যায়ন, বুল্টির নিয়মমাফিক ভ্যাক্সিন। তার ওপর সামনে ঝিনির ডেলিভারি, বুল্টির প্রেপ স্কুলে অ্যাডমিশান, অনেক খরচ...

 

“চঞ্চল-চুলবুলি এই মনটাকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপনা করতে হবে। তার কি উপায়? সমতল আসনে সরলদেহে আরামে বসতে হবে। সরলদেহ কা মতলব কেয়া হ্যায়? সমগ্রীবকায়। অর্থাৎ কিনা মাথা থেকে ঘাড়, মেরুদণ্ড বিলকুল সিধা টানটান করে বসতে হবে। তারপর দুই হাত নিজের কোলের ওপর উত্তানভাবে, একহাতের উপর অন্যহাত রাখতে হবে। উত্তানভাব কেয়া হ্যায়? হাতের তালুর উপরের দিকে খোলা অবস্থানকে উত্তানভাব বলে। আভি আপনা দো আঁখোকা নজর আপনা নাককে উপর ডালনে কি কোশিশ কিজিয়ে। ট্রাই টু কিপ ইয়োর ভিসন, অন ইয়োর ওন নোজ টিপ। কিজিয়ে কিজিয়ে, কোশিশ কিজিয়ে। আপ, সেকেণ্ড রো মে, থার্ড, হাঁ হাঁ আপ, অ্যায়সা ঝুকনে সে নেহি চলেগা, একদম সিধা ব্যায়ঠনা হোগা, মেরেকো দেখিয়ে, গওরসে দেখিয়ে...হাঁ আব সহি হুয়া...। আভি ধীরে ধীরে পুউউউরা শ্বাস লিজিয়ে, থোরা রুককে, পুউউরা ছোড়িয়ে। একদম ধীরে ধীরে। কিজিয়ে কিজিয়ে, কোশিশ কিজিয়ে”...

চোখ টেরিয়ে নাকের ডগায় দৃষ্টি রেখে, আস্তে আস্তে শ্বাস নিলাম বুক ভরে। ভুরুর একটু ওপরে, কপালের মাঝখানটায় কেমন যেন চিনচিন করে উঠল এই চিনচিনে ব্যথাটা কি উপকারী ব্যথা? ছোটবেলায় এরকম কোন ব্যাথা লাগলে, মা বলতেন, ভালোই তো পোকাগুলো মরছে। খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেলে, মা তুলোয় ডেটল লাগিয়ে, হাল্কা ছোঁয়ায় মুছে দিতেন ক্ষতটা। ডেটল লাগলে আমি চিনচিনে জ্বালায় যখন আঁউ করে উঠতাম, মা বলতেন, অ্যাই চুপ, তুই কেন চেঁচাচ্ছিস? চেঁচাবে তো পোকাগুলো, যারা তোর কাটা ঘায়ে বসে বসে মরছে। আচ্ছা, আজ এই যে ভুরুর কাছটা চিনচিন করছে, আমি যদিও আঁউ করে উঠলাম না। যদি করতাম, মা কি বলতেন, অ্যাই চুপ, তুই কেন চেঁচাচ্ছিস? ভালই তো, তোর মনের পোকাগুলো মরছে!

এ ভাবে নাসাগ্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের ভেতরে গোল চৌকো নানারকম রঙের আকার, ভেসে বেড়াতে দেখলাম। আরেব্বাস। আমি মহাপুরুষ বা সিদ্ধপুরুষ হয়ে যাচ্ছি নাকি? এরকম কিছুক্ষণ করলে কি আমার মাথার পেছনে সোনালি বিশাল থালার মতো জ্যোতি দেখা যাবে? আমি কি এই সাদা চাদর বিছানো গদি থেকে ইঞ্চি ছয়েক উপরে উঠে শূণ্যে ভেসে উঠব? কিন্তু আগেকার দিনের মুনিঋষিরা তো হাজার বছর ধরে তপস্যা করে, তারপর সিদ্ধ-টিদ্ধ হতেন। এই হাজার বছরে নিশ্চয়ই কোন একটা ক্যাচ আছে। মুনি ঋষিরা হাজার বছর ধরে তপস্যা করতেন। কবিরা হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতেন। হাজার ছাড়া কিছু হবার নয়। আমি তাহলে এই কর্পোরেট অফিসের হলে ঘন্টা দেড়েক, কি দুয়েক ধ্যান-ট্যান করে কোন সিদ্ধি লাভ করতে পারবো কে জানে?

 

“এসিকা পরিশ্রুৎ শীতল পওন, ফুলোঁকা মহকইস পবিত্র বাতাবরণকা পুরা মজা লিজিয়ে। ধীরে ধীরে, কোই জলদিবাজি নেহি, ধীরে ধীরে পুউউউরা শ্বাস লিজিয়ে। থোড়াসা - দশ সেকেণ্ড তক শ্বাসকো রোক লিজিয়ে, উসকে বাদ ফির ধীরে ধীরে শ্বাস ছোড়িয়ে...”

 

পবিত্র বাতাবরণের কথায় মনে পড়ল। আমার দিদিমা ছিলেন বাংলা প্রবাদ আর নানান গল্পের আকরতাঁর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। এখন মনে পড়ে গেল হঠাৎ। অনেক দিন আগে, হাটে মাছের সওদা শেষ করতে করতে, এক মেছুনির বেলা পড়ে এল। আর হবি তো হ সেদিনই হল প্রবল ঝড়বৃষ্টি। বৃষ্টি যখন ছাড়ল, সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সেই মেছুনির বাড়ি বেশ দূরের এক গাঁয়ে, অনেকটা পথ, ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কী করে ফিরবে? সেই হাটেই ঝড়বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল এক মালিনীবুড়ি। তার ফুলের ঝুড়িতে তখনো পড়ে ছিল বিক্রি না হওয়া বেশ কয়েকটা বেলি আর জুঁই ফুলের মালা। বৃষ্টির ছাটে আর সন্ধ্যের ঝোঁকে সেই মালার ফুলের মন জুড়োনো সৌরভে ভরে উঠল চারদিক। মেছুনির আতান্তর দশা দেখে মালিনীবুড়ি বলল, আমার বাড়ি এই সামনেই পাশের গাঁয়ে, আজ রাত্তিরটা আমার বাড়িতে কাটিয়ে, কাল ভোরে না হয় চলে যাস তোর নিজের বাড়ি। মেছুনি হাতে যেন স্বর্গ পেল, রাজি হয়ে গেল এক কথায়। মালিনীবুড়ির মনটাও যেমন ভাল, বাড়িটাও ভাল। চারিদিকে নানান ফুলের বাগান, মাঝখানে ছোট্ট চাঁচের ঘর, খড়ের চাল। দুপশলা বৃষ্টির জলে, সতেজ ফুলের গন্ধে সেই বাড়ির পরিবেশ পবিত্র হয়ে উঠেছে। ওই মানে, পবিত্র বাতাবরণ। বুড়ি রাত্রে খাওয়ার সময় একটু দুধভাতের ব্যবস্থাও করে দিল। তারপর নানান সুখদুঃখের কথা বলতে বলতে তারা দুজনে শুয়ে পড়ল ঘরের দাওয়ায়। শোয়া মাত্র মালিনীবুড়ি ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু মেছুনির আর ঘুম আসে না। এপাশ ফেরে, ওপাশ ফেরে। উঠে ব’সে, কলসী থেকে জল গড়িয়ে খায়। দু-দুবার দাঁতে গুড়াখু ঘষল। সে নেশাও কেটে গেল। কিন্তু কিছুতেই আর তার ঘুম আসে না। নানান ফুলের গন্ধে তার মাথা কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল। শেষে সে আর পারল না, উঠে গিয়ে উঠোনে ঢোকার মুখে বাগানের বাইরে, তার মাছের যে চুপড়িটা রেখে এসেছিল, সেটা নিয়ে এল। সেটা মাথায় দিয়ে শোয়া মাত্র, তার দুই চোখে নেমে এল ঘুমের জোয়ার। তার নাকে এখন মাছের আঁশটে গন্ধ, কাজ কী তার ফুলের সৌরভে? তখন এই গল্পটা শুনে এটাকে নিছক একটা গল্প বলেই মনে হয়েছিল। আজ এই পবিত্র বাতাবরণে লম্বা শ্বাস নিতে নিতে মনে হল, যার যেথা মজে মন। পবিত্র বাতাবরণ সকলের সয় কি! এই এখন যেমন আমার নাকে এসে ঝাপটা লাগছে মৌরলা ভাজার গন্ধ। এখান থেকে আমার ফ্ল্যাট অন্ততঃ বিশ কিলোমিটার তো হবেই। তাও আমি গন্ধটা পাচ্ছি। এই সময় ঘরে থাকলে চায়ের সঙ্গে এক প্লেট মুচমুচে মৌরলা ভাজা – আঃ। আজ শনিবারের ছুটির সকালটা মাটি করে দিল মাইরি। ঝিনি অবশ্য জানে মৌরলা ভাজা খেতে আমি ভালোবাসি। কিন্তু মনে করে তুলে রাখবে কি? ঝিনি কি মনে রাখবে আমি তাকেও ভালবাসি। তার গর্ভে বেড়ে উঠছে আমার ভালবাসার সৃষ্টি। সেটাও কি ভুলে যাবে? আমি কিছু বলে আসিনি, আজ মৌরলা দিয়ে কী করবে? কাঁচা লংকা চিরে দেওয়া মৌরলার ঝাঁঝালো সর্ষে ঝাল? নাকি সামান্য হলুদ আর কালো জিরে ফোড়ন দেওয়া অর্ধস্বচ্ছ পাৎলা ঝোল। দুটোই সমান উপাদেয়ভাবতেই আমার মুখের ভিতরটা রসস্থ হয়ে উঠল।

 

“ইধর ইধর, হেলো, আপকা নজর মেরে পর কিঁউ? দাদা, বাঙ্গালীদাদা, আপকো বোল রহা হুঁ”।

বাঙ্গালীদাদা শুনে আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল, আমি বাবা তেজকিরণের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন এবং আমাকেই বলছেন।

“কেয়া, বাঙ্গালীদাদা কিস চিন্তনমে খো গয়ে থে আপ? মেরে পর নেহি, আপকা নজর নাককে উপর রাখনা চাহিয়ে। অওর শ্বাস লিজিয়ে লম্বা...”।

 

আমি আবার নাকের ডগায় দৃষ্টি দিলাম, আবার চিনচিন করে উঠল আমার ভুরুর কাছে কপাল। তারপর লম্বা শ্বাস নিতে নিতে মনে হল, সৌরভের পর থেকে অবাঙালীরা বাঙালী দেখলেই দাদা বলে আজকাল। এই দাদা ডাকের মধ্যে একটা ভালোবাসাও যেমন থাকে, তার সঙ্গে কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে একটু সিমপ্যাথিও। ন্যায় বিচার না পাওয়া বা যোগ্য সম্মান না পাওয়া হিরো। এই হিরোর কথায় মনে পড়ল বাঙালীদের মনের মানুষ আর এক হিরো উত্তমকুমারকে। বাংলার বাইরে যাঁকে কেউই সম্মান দেয়নি। বড় হয়ে যখন শঙ্খবেলা দেখেছি, মাধবী আর উত্তমের সেই ডুয়েট - কে প্রথম কাছে এসেছি। সাদাকালো ঝাপসা ঝাপসা ছবি, ঝির ঝির করছে, কিন্তু নেশা হয়ে গিয়েছিল মনে আছে। তার কিছুদিন আগেই, আমি আবার প্রেমে পড়েছিলাম। সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার। সেই মেয়েটিকে ইউনিভার্সিটি থেকে তুলে নিয়ে চলে গেলাম ব্যাণ্ডেল চার্চের গঙ্গার ঘাটে। সেখানে নৌকো ভাড়া করে ভেসে পড়লাম দুজনে। হাতে হাত, চোখে চোখ। মেয়েটির চোখে লাজুক প্রশ্রয়ের হাসি। নৌকার মাঝি করিমচাচা (নামটা জানিনা, তবে মাঝিদের অন্য আর কোন নাম হয় নাকি?) দাঁড় বেয়ে নৌকাটাকে নিয়ে গেল মাঝদরিয়ায়, তারপর মাটিতে লগি গেঁথে বলল, যান, যান, গলুইয়ের মধ্যে যাইয়া বসেন। দ্যাহেন পর্দা ঝুলতাসে, পর্দা ফেলাইয়া দুটিতে আরাম করেন গিয়া। আমি বিড়ি খাইয়া একটুন জিরান লই। কুন ভয় নাই বাবু, যান যাইয়া বসেন, আমি আসি। করিম মিঁয়ার নাও হক্কলে সিনে। কুন ভয় নাই। গলুইয়ের মধ্যে সেই মেয়ে আর আমি যেন মাধবী আর উত্তম কুমার। কে প্রথম কাছে গিয়েছি। পর্দা ঢাকা গলুইয়ের মধ্যে বসে ওই কাছে যাওয়াই সার হল, একটা চুমো অবদি খেতে পারিনি, লজ্জা কিংবা ভয়ে, কে জানে? মেয়েটির উৎসুক মুখের কাছে যতবার মুখ নিয়ে যাবো ভেবেছি, মনে হয়েছে, জ্যালজেলে পর্দার ভিতর দিয়া করিম চাচা নির্ঘাৎ দ্যাকতাসে। করিমচাচা বড়ো বড়ো বিড়ির টান দিতে আসে, আর দ্যাকতাসে গলুইয়ের অন্দরে ছ্যামড়া আর ছ্যামড়ি কিডা করে? সেবারের সেই চুমো মিস করলেও, কিছুদিন পরে এক নির্জন ঘরের নিরিবিলিতে বড়ো সুখের চুমো দিয়েছিলাম সেই মেয়েটিকে। একদম বুকের মধ্যে চেপে ধরে, অধরে অধর চেপে বহুক্ষণ প্রথমবারের পর কিছুটা বিরতি, চোখে চোখ রেখে একে অপরকে আরো আরো ভালো লাগা, তারপর আবার। অস্ফুটস্বরে কানে কানে বলেছিলাম, তোর আর আমার মধ্যে এই দূরত্ব কোনদিন কী দূর হবে না? অবাক দুটি সরল নয়ন মেলে সে বলেছিল, আর কতো কাছে আসব বলো তো, কিসের দূরত্ব? আমি বলেছিলাম, তোর ওই উদ্ধত দুই বুক, কিছুতেই আমাদের কাছে আসতে দিচ্ছে না। আমার বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ছটফট করতে করতে বলেছিল, তুমি যাতা একটা অসভ্য হয়ে উঠছো দিনদিন। তার মুখে ফুটে উঠেছিল স্বর্গীয় লাজুক হাসি, অতএব আবার।

সেই মেয়ে আমার ঘরণী হয়নি, অনেক দূরে সে এখন অন্য পুরুষের স্ত্রী। হেমন্তর সেই গানের মতো, আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে। আজও দূর প্রবাসে অবসর সময়ে নির্জন রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে যখন বসে থাকি। যখন উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। তখন কেন যে মনে হয়, এই ট্রেনটা চলে গেলেই দেখব সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ষাটের দশকের গল্পে উপন্যাসে প্রায়ই এমন হতো! ডানহাতে মাঝারি আকারের একটা চামড়ার স্যুটকেশ, পরনে মেরুনপাড়ের বাসন্তী শাড়ি, গায়ে ম্যাচিং করা মেরুন ব্লাউজ। সেই মেয়েটি পায়ের কাছে সুটকেশ রেখে আমার বেঞ্চেই এসে বসবে। মাঝখানে আরও দুজন বসার মতো দূরত্ব রেখে। অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞাসা করবে, তোমার মাথা ধরা রোগটা এখনও আছে? টাইগার বাম দিয়ে এখন কে তোমার কপালে হাত বুলিয়ে দেয়?

আজও শীতের নির্জন অরণ্যে একা একা পায়চারি করতে করতে কানে আসে পায়ের তলায় শুকনো পাতা ভাঙার আওয়াজ, ঠিক সেই মেয়েটির অস্ফুট কথার মতো। আজও প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দগ্ধ দিনশেষের এক পশলা বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে এলে, সেই মেয়েটির নিশ্বাসের গন্ধ পাই।

 

“বহনোঁ অওর ভাইয়োঁ...আভি সাধনা কে ওর, অওর এক কদম আগে বড়েঙ্গে। দৃষ্টি রহেগা নাক কে উপর, লম্বা লম্বা শ্বাস লেঙ্গে, মনসে সমুচা ভাওনা হটাকে, মনকো সির্ফ এক বিন্দুমে লানেকা কোশিশ করেঙ্গে। হামারা মন এক আশ্চর্য বিষয় হ্যায়, কভি ইধার, কভি উধার ভাগতা হ্যায়। কভি ভি এক জাগাপে রুক নেহি শকতা। কভি বিবিকা চিন্তা, কভি বাচ্চোঁকা চিন্তা, কভি দোস্তকে সাথ মস্তি বানানেকা চিন্তা, কভি কলিগকো ক্যায়সে লেগপুল করেঁ, ক্যায়সে বসকো খুশ করেঁ, ও চিন্তা। আভি ইয়ে সব চিন্তাকো দূর ভাগাকে, মনকো এক জাগা পে নিরুধ করনা হ্যায়কঠিন হ্যায় জরুর, লেকিন নামুমকিন নেহি। লম্বা শ্বাসোঁকে সাথ হাম এক মন্ত্র উচ্চারণ করেঙ্গে, ও হ্যায় ‘ওঁম’”। বাবা তেজকিরণ নিজেই বার চারেক করে দেখালেন, তারপর বললেন, “কিজিয়ে কিজিয়ে, মেরা সাথ কোশিশ কিজিয়ে, বলিয়ে ওঁম...”।

 

দুই চোখের দৃষ্টি নাকের ডগায়, লম্বা শ্বাস তার মধ্যে আবার ওঁম। এতগুলো একসঙ্গে হয় নাকি? লম্বা শ্বাস নিতে গেলে দৃষ্টি সরে যায় আশেপাশে। দৃষ্টি ঠিক রাখতে গেলে লম্বা শ্বাস নিয়ে, শ্বাস ছাড়তে ভুল হয়ে যায়। আর ‘ওঁম’ বলতে গেলে হাতের উত্তান ভঙ্গি ভ্রষ্ট হয়ে, হাত চলে আসে হাঁটুর ওপর। অনেকদিন আগে দুহাতে নৌকোর বৈঠে বাইতে গিয়ে এমন হয়েছিল। বাঁহাতের দিকে নজর দিলে, ডানহাত থেমে যায়, আবার ডানহাতে নজর দিলে, বাঁহাত বৈঠে নিয়ে বসে থাকে। কিছুতেই দুটো হাত একসঙ্গে চালাতে পারিনি। নৌকো এক ইঞ্চিও এগোচ্ছিল না, উল্টোপাল্টা বৈঠের ঠানে মুখটা এদিক সেদিক ঘুরে যাচ্ছিল। শেষ অব্দি মাঝির হাতে বৈঠে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত, মাঝি গল্প করতে করতে দিব্যি দুহাতে সাবলীল বৈঠে টানতে লাগল। নৌকো এগোতে লাগল তরতরিয়ে, নৌকোর পাটায় বসে, মুগ্ধ চোখে মাঝির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, এও তো এক সব্যসাচী। মাঝি তখন অনবরত বলে চলেছিল তার বহতা জীবনের কথা, উজানে বেয়ে চলা সেই নদীর কথা, যে নদীর সঙ্গে তার জীবন জুড়ে গেছে ওতপ্রোত। সে নদীর নাম বরাক – বয়ে চলেছে বদরপুর শহরের পাশ দিয়ে। অতএব দক্ষতা ব্যাপারটা কোনদিনই জন্মসূত্রে পাওয়া যায় না, অর্জন করতে হয়। সে এই ইয়োগার ধ্যানই হোক আর সেই নৌকো বাওয়াই হোক। সারা হপ্তা ইঁদুরের মতো দৌড়োদৌড়ি করে। এক শনিবারেই কি আর মন্ত্রের সাধন হওয়া সম্ভব? একে তো লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে, ফুসফুসের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। বেশ ছিল নিকোটিনের মোহ আবরণে আছন্ন হয়ে, প্যাকেটে দেখানো ঘরমোছা ন্যাতার মতো চেহারা নিয়ে।এ মোহ আবরণ খুলে দাও, দাও হে” – বললেই কি আর হয়? খামোখা সুবাসিত অক্সিজেন পেয়ে বেচারা চমকে গেছে। কাশি আসছে খুক খুক করে, তার ওপর প্রায় ঘন্টাদুয়েক হতে চলল রক্ত হয়ে উঠছে নির্নিকোটিন।

 

“দাদা, আপনি কিন্তু ওঁম বলছেন না, অন্য কুছু চিন্তা কোরছেন”।

 

বাবা তেজকিরণ দেখি আমাকেই টার্গেট করে নিয়েছেনআমি হাল্কা কেশে গলাটা সাফ করে নিয়ে, লম্বা শ্বাস নিতে নিতে বললাম ওঁওওওম। মন্ত্র বলব কি, ভেতর থেকে বড়ো বড়ো হাই উঠে আসছে। ডাক্তাররা বলেন রক্তে অক্সিজেন কমে এলে নাকি হাই ওঠে, এতো লম্বা শ্বাস টেনেও অক্সিজেন কমল কী করে? এমন হাই উঠছে মনে হচ্ছে সাত রাত্তির ঘুমোইনি। এক আধটা রাত্তির না ঘুমিয়ে অনেক বার কাটিয়েছি, ছোটমামা, ছোটকাকা, দিদিদের বিয়ে, দাদাদের বিয়ে, বন্ধু বান্ধবের, কিংবা নিজেদের ঠাকুমা, দাদু মারা গেলে শ্মশানযাত্রায়। কিন্তু সাত রাত্তির ঘুমোইনি দুবার হয়েছিল। একবার কলেজে হস্টেলে গিয়ে র‍্যাগিং পিরিয়ডের সময় - সেটা ছিল বড়ো কষ্টের। আর একবার নিজের বিয়ের পর ফুলশয্যার রাত থেকে অষ্টমঙ্গলা পর্যন্ত – সেটা কী বলব, বলতে লজ্জা করে, বড় আনন্দের। সে কদিন অফিসে গিয়ে দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম আসত, ফেরার সময় বাসের রড ধরেও ঢুলতাম, কিন্তু বাড়ি ফিরে, জুতো খুলতে খুলতে ঝিনি যখন হাতে এক গ্লাস জল নিয়ে সামনে দাঁড়াত, ঘুম দৌড় লাগাত পিছনের দরজা দিয়ে। সারা রাত কতশত গল্প, নানান রঙের দুষ্টুমি, কত তরিকার ভালোবাসা। আহা সেই ঝিনি এখন কেমন যেন হয়ে গেছে। আজকাল ভালোবাসা ব্যাপারটাকে বেশ ধোঁয়াটে আর ঝাপসা একটা অনুভূতি মনে হয়। ভাদুরে বর্ষার মতো। সারাদিন প্যাচপেচে ঘেমো চাঁদি জ্বালানো গরম, তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দু এক পশলা অপ্রস্তুত করে দেওয়া বৃষ্টি। আর সেই বৃষ্টি থেকেই আজ ঝিনির তিনমাস। এই যে আমাদের দ্বিতীয় সন্তান আসছে, সে কি আমাদের ভালোবাসার ফসল? নাকি আকস্মিক উত্তেজনায় হঠাৎ ঘটে যাওয়া! আজ আমার জন্যে, ঝিনি যদি মৌরলাভাজা আলাদা তুলে রেখে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা নামক নিরাকার ব্যাপারটা রয়ে গেছে। আমি কি জুয়ো খেলছি? মৌরলামাছ ভাজার সঙ্গে আমাদের দাম্পত্য ভালোবাসার ফাটকা?

 

“কুছ নেহি হো রহা হ্যায়। না, না, কুছ ঠিক নেহি হো রহা হ্যায়। এক কাম কিজিয়ে আপলোগ। আজ তো টাইম বিত চুকে হ্যাঁয়। আজ কা সেশন এহি খতম করতে হ্যাঁয়। আপলোগ হর দিন সুবে প্র্যাকটিস কিজিয়েগা জরুর। আগলে শনিবার হমলোগ ফির মিলেঙ্গে, ফির নয়া কুছ শিখনেকে লিয়ে। লেকিন ইয়াদ রাখিয়ে, যব তক মনকো নিয়ন্ত্রিত নেহি কর পায়েঙ্গে, তব তক মনমে শান্তি নেহি আয়েগা, মনকো এক হি কেন্দ্রমে স্থাপিত করনাহি হামারা মকসদ রহেগা। শুভমস্তু। সবকা মঙ্গল হো”।

 

বাবা তেজকিরণ বিদায় নেওয়ার পর, আমরাও সবাই উঠে পড়লাম। অশান্ত মনকে স্থির করার কর্পোরেট ধ্যানধারণার এই ধ্যান-ইয়োগায় যোগের থেকে বিয়োগটাই যে বেশি হল তাতে কোন ভুল নেই। রক্তে ফিকে হয়ে আসা নিকোটিনের মাত্রা যোগ করার জন্যে অফিস থেকে বেরিয়ে লম্বা একটা সিগারেট ধরালাম। আর এই ঠা ঠা করা রোদ্দুরে গুরগাঁওয়ের গরমে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা চিন্তা করতেই মন আগের থেকে অনেক বেশি অশান্ত হয়ে উঠল। মনে মনে আমাদের হ্যাচ আর হেড অম্রুত নেগির নামে অনেকগুলি বিশেষণ যোগ করলাম – কিন্তু সেগুলোর সবকটাই লেখার অযোগ্য!       

--০০--

 

                                        

  


 

                                        

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১১

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম...