রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নিত্যযাত্রী

  

এর আগের রম্যকথা - " অবিচলিত থাকা "


হেউ।

মুখে ভাজা মৌরির দানা ফেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই ঢেঁকুরটা উঠল। লোহার গেটের হাঁসকল বন্ধ করতে করতে বললাম ‘শুনছো, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিও, বেরোলাম’।  ‘দিচ্ছিইইই, দুগ্‌গা, দুগ্‌গা’, ভেতর থেকে বউয়ের কণ্ঠ শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। 

বউয়ের হাতের রান্না; কুচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি। আর ফালি ফালি লম্বা দুটো আলু ডোবানো চারাপোনার পাতলা ঝোল দিয়ে চারটি ভাত খেয়ে বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল। গেট থেকে বের হলাম নটা ছেচল্লিশে। তরিবতের রান্না জুত করে খেতে একটু সময় লাগেই। আর খাওয়াটাও বেশী হয়ে যায়। তার ওপর কাঁধে আছে রেক্সিনের ছোট ব্যাগে লাঞ্চ বক্স। তাতে তিনটে রুটি আর আলু-কুমড়োর ছেঁচকি। ছাড়ানো শসা দু’ ফালি।

চিন্তা হচ্ছে, নটা বাহান্নর মিনিটা পাবো কিনা। ওটা না পেলে কপালে আজ দুঃখ আছে। এমনিতে আমাদের অফিস শুরু দশটা থেকে তবে এগারোটা পর্যন্ত ঢুকলেও চলে। এই মিনিটা পেলে আরামসে পৌঁছে যাওয়া এগারোটার আগেই। কিন্তু এটা না পেলে যদি পরেরটায় যাই, সেটা দশটা আঠেরোয়। সেটাতে অফিস পৌঁছতে সাড়ে এগারোটা হয়েই যায়। কেউ কিছু বলে না, তবে কান্তিদুলালবাবু ভুরু তুলে, একবার আমাকে দেখেন, তারপর দেখেন হলের দেয়ালঘড়িটা। কান্তিদুলালবাবু আমার বড়োবাবু।

আমাদের বাড়ি থেকে বড়োরাস্তা পর্যন্ত গলিতে দুটো ভাঁজ আছে। অন্যদিনের চেয়ে আজকে একটু বেশ জোরেই পা চালাচ্ছি, তবে চালাবো বললেই কি আর চালানো যায়? শরীরের ওজনটি তো আর কম নয়। তারওপর সবে খেয়ে উঠে ভরা পেটের ভরটা শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে চাইছে। আমার পেটটি, কি আর বলব, মোশায়, আমার মধ্যে তো আর নেই, ঠেলে বেড়ে উঠছে দিন কে দিন। শীতকালে ছাদে উঠে রোদ্দুরে বসে, সারা গায়ে সরষের তেল মেখে বড়ো আনন্দ পাই। বাবা বলতেন, ‘শীতকালে নাভিতে অবশ্যই তেল দিবি রে, পটোল, পেটটা শীতল থাকবে’। বাবার কথা মতো নাভিতে তেল মাখাতে হাতড়াতে হয়, নাভিটা কোনখানে। চোখে তো আর খুঁজে পাই না।

গলির লাস্ট ভাঁজটা ঘুরলে, বড়ো রাস্তাটা চোখে পড়ে। অটো যাচ্ছে, গাড়ি যাচ্ছে, বাইক যাচ্ছে হুস হুস করে। ঘড়িতে দেখলাম তিপ্পান্ন হয়ে গেছে। মিনিটা কি চলে গেলো। দু’ পাঁচ মিনিট দেরি তো হামেশা করে, আজ কি আর করবে না? ব্যাটারা আমার যেদিন দেরি হয় সেদিনই রাইট টাইমে বেরিয়ে যায়। আর আমি রাইট টাইমে এলে, লেট করে। বাস পাবো কি পাবো না, এই দ্বিধায় যখন দুলছি, কানে এল, সেই চেনা ডাকটি- ‘আই, টালিগঞ্জ, মেট্রো, মেট্রো, রাসবিয়ারি, হাজরা, ভওয়ানিপুর, এক্সাইড, পাকিস্টিট, ডালহাউসি’

বাঁশির সুরে শ্রীমতীর কি হতো ঠিক জানি না, কিন্তু ওই ডাক শুনে আমি ব্যাকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘অ্যাই মিনি, রোককে। রোককে’।  মিনির হেল্পারটা শুনতে পেয়েছে। ‘আস্তেপ্পাসেঞ্জার’ বলে নেমে পড়ল রাস্তায়। আগের মতোই ডাক পাড়তে পাড়তে বলল, ‘একটু পা চালিয়ে, কাকু’।

ঠিক চুয়ান্নতে বাসের পাদানি বেয়ে উঠতেই বিপত্তি। ওপরে ওঠার জায়গা নেই। হেল্পার আমার পশ্চাতে গুঁতো দিচ্ছে ভেতরে ঢোকার জন্যে। ঢুকবো কোথায়? ভর্তি বাস! সকলেই দুর্যোধন। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গাও কেউ ছাড়বে না। কন্ডাকটার অনবরত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে, ‘পিছনের দিকে এগিয়ে যান। গেটের মুখটা ছেড়ে দিন’। সারা জীবন শুনে এলাম, পিছনে তাকিও না, সামনে এগিয়ে যাও। মিনিবাসে নিয়ম উলটো পিছনের দিকে এগোতে হয়। গুঁতোগুঁতি করে ঠেলে ধাক্কা মেরে ঢুকেই গেলাম। আমার চোখ দু দিকের সিটে বসা লোক ও মেয়েদের মুখগুলোর দিকে। চেনামুখ যদি পাওয়া যায়, যারা মেট্রো কিংবা রাসবিহারী মোড়ে নামবে, তাহলে সেই সিটটার সামনে দাঁড়াবো।

পেয়েও গেলাম, এক ছোকরাকে কানে হেড ফোন নিয়ে রোজ গান শোনে, আর মাথা নীচু করে মোবাইলে মহাভারত লিখে চলে। এই ছোকরা রোজ টালিগঞ্জ মেট্রোতে নামে। সিটটার কাছে আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তার ঘাড়ে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে, মুচকি হেসে বললাম, ‘সরি ভাই, যা ভিড়। ভদ্রভাবে দাঁড়ানো যাচ্ছে না’। তার ওপর আমার উদ্ধত ও উদ্গত পেটটি দিয়ে চেপে ধরলাম, উটকো লোকটিকে। উটকো লোকটি আহাম্মক ও ভদ্রলোক, সরে গিয়ে আমায় জায়গা ছেড়ে দিয়ে পিছনের দিকে চলে গেল। আমি সযত্নে নিজেকে ছোকরার সিটের পাশে প্রতিষ্ঠা করলাম। যাক বাবা, আজ সব কিছু ভালোয় ভালোয় চলছে। আর পাঁচটা স্টপেজ পরেই মেট্রো, ছোকরা নেমে গেলে, সিটটাতে বসে একটু চোখ বুজবো।

এতক্ষণ অন্যদিকে খেয়াল করিনি, এখন শুনলাম অনেক যাত্রী বাসের ড্রাইভার আর কণ্ডাকটারের খুব পেছনে লেগেছে

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’? ‘কণ্ডাক্টার, বাসটা এবার চালাতে বলো, সেই থেকে লোক তোলা হল তো’। ‘আধাঘন্টা হয়ে গেল, এইটুকু আসতে। এবার একটু টান, বাপ’। ‘এ শালা, গরুর গাড়ির ড্রাইভার নাকি রে?’ আমারও খুব মজা লাগে পেছনে লাগতে। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে। মেঘের আড়াল থেকে তির ছোঁড়ার মজাই আলাদা। আর হবি তো হ, সুযোগ চলে এল হাতের মুঠোয়। কোন স্টপেজ নেই, বাসটা খামোখা থেমে পড়ে দুটো প্যাসেঞ্জার তুলল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার লোক আমি অন্ততঃ নই। গলাটা একটু ভারি করে বললাম, ‘কিরে, এবার কি লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক তুলবি নাকি? যেখান সেখান থেকে লোক তুলছিস’? আমিই একটু আগে তাই করেছি, অস্টপেজে না দাঁড়ালে, এ বাসে আমার আজ চড়াই হত না। কিন্তু তাতে কি? আমারটা তো গুছোনো হয়ে গেছে! আশেপাশের দু’ চারজন আমার দিকে তাকালো, একজন শুঁটকে টাকমাথা বুড়ো বলল, ‘যা বলেছেন, ভাই’।

 আমি একটু জোর পেয়ে গেলাম, আবার বললাম, ‘এরা মানুষকে মানুষ বলেই গণ্যি করে না, ছোটলোকের দল। ছাগল ভেড়ার মতো লোক গাদাই করেই চলেছে’।  আমার কথায় কাজ হল বেশ, আরো কিছু লোক খুব তেতে উঠে তেড়ে গালাগাল দিতে লাগল ড্রাইভার আর কণ্ডাক্টারকে। দু’তিনজন বাসের গায়ে ধপ ধপা ধপ চাপড় মারতে শুরু করল। বাসের ভিড়টা বেশ খেপে উঠেছে। বাসটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল, এইসময় আমি আর একটা দিলাম ছোট্ট করে, ‘দেখলেন, শালারা সেই থেকে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে এসে কিরম সিগন্যালটা খেলো? এখন দাঁড়িয়ে থাকুন পাঁচমিনিট’। একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘আমাদের কি কাজকম্মো নেই নাকি রে, শালা’? ‘এই ড্রাইভারটা কী করে লাইসেন্স পেল রে’? ‘লাইসেন্স আছে কিনা, তাই বা কে জানে’? 

জনগণের এই সব কথা বার্তায় আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠতে লাগল বারবার। নিজেকে মনে হচ্ছে জব্বর ন্যাতা, যার উস্কানিতে খেপে উঠছে জনতা। কি আনন্দ, কি আনন্দ! এদিকে আমার সামনের সিটে বসা ছোকরা কানের হেডফোন গুটিয়ে ব্যাগে রাখলপরের স্টপেজ হচ্ছে, টালিগঞ্জ মেট্রো। ছোকরা নামার জন্যে রেডি হচ্ছে। তার মানে এবার আমার সিটে বসার পালা। আমাদের ছোটবেলায় স্লেট পেন্সিলে অ আ ক খ লিখতাম, ছোকরা স্লেটের মতো ঢাউস মোবাইলটা চাপা জিন্সের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সিট ছাড়ল। আমি তেরছা হয়ে দাঁড়িয়ে ছোকরাকে বেরোনোর রাস্তা করে দিলাম, আর উল্টোদিকটা ব্লক করে দিলাম, যাতে অন্য কেউ ঢুকে পড়ে, আমার সিটটা দখল না করে নেয়। বাসে চলা ফেরা করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার রে ভাই? অনেক স্ট্রাটেজি, বিবিধ কৌশল, বিস্তর কায়দা।

সিটে বসে পড়ে নিজেকে মনে হল, এ সিট যেন বাসের আসন নয়, যেন রাজ্যসভা, লোকসভা কিংবা নিদেনপক্ষে বিধানসভার সিট। কাঁধ থেকে নামিয়ে বউয়ের রান্না ভরা ব্যাগটা কোলে নিয়ে জুত করে বসলাম। মেট্রো স্টেশান চলে এসেছে, হুড় হুড় করে লোক নেমে, প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল বাসটা। সিটগুলো সব দখল, চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার সামনে দাঁড়ানো সেই আহাম্মক ভদ্রলোক। মনে হল, ওর কাটা ঘায়ে একটু নুনের ছিটে দিই। চোখাচোখি হতে বললাম, ‘এতো সিট খালি হল, আপনি একটা সিট পেলেন না’? ভদ্রলোক হাসলেন একটু, বোকার হাসি। ভাবখানা, ঠিক আছে, কী আর করা যাবে। আহাম্মক ভদ্রলোক আর কাকে বলে?

মেট্রোতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করেও তেমন প্যাসেঞ্জার হল না, বাস আবার ছেড়ে দিল। ফাঁকা বাসে আমার এবার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ভিড়ের মধ্যে আমি যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর অনেক কথাই যে আমি বলেছিলাম, কণ্ডাক্টারটা বুঝতে পারেনি তো? বাস ছাড়ার পরই কন্ডাকটার আমার কাছেই দৌড়ে এল দেখে আমি চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, এখন ও যদি কিছু বলে? দেখলাম সেরম কিছু নয়, ব্যাটা টিকিট চাইতে এসেছে। কন্ডাক্টারের হাতে দশটাকা দিয়ে বললাম, আটটাকা। আসলে আমার গলির মুখ থেকে ভাড়া হয় দশ টাকা। ও কি আর অতো মনে রেখেছে? জিগ্যেস করলে বলব, মেট্রোর একটা স্টপেজ আগে উঠেছি। 

আট টাকার টিকিট আর দুটাকা ফেরত নিতে নিতে খুব দরদ ভরা গলায় বললাম, ‘কি হল হে? বাস তো একদম খালি, লোসকান হয়ে যাবে যে, ভাই’। 

আমার সহানুভূতিতে কণ্ডাকটার গলে গেল, বলল, ‘কি বলব বলেন, কাকু। স্ট্যান্ড থেকে মেট্রো অব্দি যা প্যাসেঞ্জার পাই, ওতেই আমাদের দুটো পয়সা থাকে। তা পাব্লিক এমন গালাগাল দেয়...’  

আমি মাখো মাখো গলায় বললাম, ‘সব লোক কি আর সমান হয় রে, ভাই? হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? তবে? ও সব কথা কানে দিও না’।

নিশ্চিন্ত হয়ে গুছিয়ে বসে আমি চোখ বুজলাম, মনে মনে বললাম, আর বকিস না বাপ, এবার একটু ঝিমোতে দে                                                                  

                                                            -০০- 

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

আগুনের পরশমণি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


শেষ পর্ব 


 


    পাথরে ঠোকাঠুকি করলে ছোটখাটো যে আগুনের ফুলকি দেখা যায়, তা দিয়ে কিন্তু আগুন জ্বালানো যায় না। আগুন জ্বালানোর জন্য অনেক বড়ো ফুলকির দরকার হয়, আর যে দুটো পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর মতো ফুলকি তৈরি করা যেত তারা প্রধানতঃ হল ফ্লিন্ট (Flint) আর পাইরাইট (Pyrite) পাথর। এই পাইরাইট যদি লোহা মিশ্রিত হয়, তবে তার ফুলকি হয় সবচেয়ে জোরদার। চক বা চুণাপাথরের (Lime stone) মধ্যে কেলাসিত (crystallized)  একটি বিশেষ কোয়ার্জ (Quartz) পাথরকে ফ্লিন্ট বলে। উপরের ছবিটি প্রস্তর যুগের একটি ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র।  এই ফ্লিন্ট পাথরের বিশেষত্ব হল, একটা বিশেষ দিক থেকে আঘাত করলে, বেশ পাতলা, মসৃণ অথচ শক্ত স্তরে ভেঙে যায়। তারপর একটু ঘষাঘষি করলে, পাথরের ধারালো অস্ত্র বানিয়ে তোলা যেত সহজেই। প্রস্তর যুগের মানুষেরা যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্রই বহুল ব্যবহার করত, তাদের কাছে ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র ছিল সব থেকে কাজের জিনিষ। পাইরাইট একধরনের খনিজ পাথর, প্রধানত লোহা বা তামার সালফাইড; পাললিক (sedimentary) পাথরের স্তরে মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। বহুদিন পরে মানুষ যখন লোহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল, তখনও লোহা আর এই ফ্লিন্ট পাথরের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ব্যবহার করেই আগুন জ্বালাত। সত্যি বলতে আজও আমরা যে গ্যাসলাইটারে লোহার চাকায় চাপ দিয়ে আগুন জ্বালি, তার নিচেয় থাকে ফ্লিন্ট পাথরের ছোট্ট একটা কুচি, যাকে চলতি বাংলায় আমরা চকমকি পাথর বলি।

তখনকার দিনে এই ফ্লিন্ট পাথর আর আয়রন পাইরাইট দিয়ে আগুন জ্বালানোতেও কিন্তু অনেক ঝামেলা ছিল। প্রথমতঃ জরুরি ছিল দক্ষতা এবং ধৈর্য, দ্বিতীয়তঃ শুকনো ঘাসপাতা, ডালপালার যোগাড়। সারা বছরের সামান্য কয়েকটি মাস ছাড়া, বৃষ্টি বা শিশিরের প্রকোপে শুকনো ঘাসপাতা যোগাড় করা এবং সঞ্চয় রাখা কম মুস্কিল ছিল না। তার থেকে আগুনকে না নিভিয়ে, স্তিমিত অবস্থায় জ্বালিয়ে রাখা অনেক সহজ ছিল এবং আগুনের নিয়ন্ত্রণ শিখে যাওয়ার পর, তখনকার মানুষ তাই করত। যদিও এতে বিপদ এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল বিস্তর।

আগুনকে না নিভিয়ে, তাকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে জ্বালিয়ে রাখার চিন্তা ভাবনা থেকেই এসে গেল, জ্বালানি তেলের আবিষ্কার। পৃথিবীতে প্রথম জ্বালানি তেল পশুচর্বি। বড় পাথরের পাত্রে, অনেকটা চর্বিতে ভিজিয়ে রাখা শুকনো ঘাস বা শুকনো শ্যাওলায় আগুন ধরালে, দাউদাউ করে জ্বলে না উঠে, ছোট্ট শিখায় আগুন অনেকক্ষণ জ্বালিয়ে রাখা যেত। এরপর আরো অনেক ভাবনা চিন্তার হাত ধরে, এই আবিষ্কার প্রদীপ হয়ে উঠল। কারণ ততদিনে মানুষ চাষবাস শিখে গিয়ে তৈলবীজের সন্ধান পেয়ে গেছে, তারা জেনে গেছে, তিল, নারকেল, রেড়ি, সরষে এমন নানান বীজ থেকে তেল বের করা যায়, এই তেল রান্নার জন্যেও যেমন ভীষণ উপযোগী, তেমনি স্নিগ্ধ শিখার প্রদীপ জ্বালাতেও দারুণ কার্যকর। আগুনের ভয়ংকর লকলকে শিখাকে সুন্দর স্নিগ্ধ নরম আলোর শিখায় রূপান্তর করাও একটা দারুণ আবিষ্কার। এই প্রদীপ উৎসব, ধর্ম অনুষ্ঠান এবং প্রত্যেকদিনের মঙ্গল আচরণের সঙ্গেও জুড়ে গেল। সেই তেলের প্রদীপের আলোর এমনই মাহাত্ম্য, প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে, আমাদের জীবনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে, আজ এই এত উন্নত বিদ্যুতের আলোর যুগেও!

 

আগুন নিয়ন্ত্রণের পর মানুষের উন্নতির প্রথম ধাপ যদি হয় শীতে হাত-পা সেঁকা, অন্ধকার দূর করা আর রান্না করা, তাহলে তার পরের ধাপ অবশ্যই ধাতু আবিষ্কার। আগুনের ব্যবহার শিখে, প্রথম যে ধাতু তারা নিষ্কাশন করে ব্যবহার করতে শিখল, তার নাম তামা। তামা প্রধান ধাতু হলেও, তার সঙ্গে টিনের মিশ্রণে সংকর ধাতু ব্রোঞ্জেরও বহুল ব্যবহার শুরু হয়, আজ থেকে মোটামুটি হাজার ছয়েক বছর আগে। এই দুটি ধাতুই অস্ত্রশস্ত্র, চাষবাস এবং গেরস্থালির নানান উপকরণে অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এই কারণে মানবসভ্যতার এই পর্যায়টাকে তাম্রযুগ বলা হয়। আগুনের ব্যবহার না জানলে, এই ধাতুর ব্যবহার, খনিজ পাথর থেকে তামা ও টিন নিষ্কাশন, ব্রোঞ্জের মতো সংকর ধাতু তৈরি, কোনাটাই সম্ভব হত না। এই যুগেই মানুষের সামাজিক কাঠামোটাও দ্রুত বদলে জটিল হতে শুরু করল। দক্ষতা ও কাজ অনুযায়ী মানুষের নতুন নতুন পেশা তৈরি হয়ে উঠতে লাগল। যেমন তামা, ব্রোঞ্জের মতো ধাতু দিয়ে, যারা অস্ত্রশস্ত্র, উপকরণ কিংবা অলংকার তৈরি করত, তারা হয়ে উঠল কারিগর বা শিল্পী, তাদের চাষবাস কিংবা শিকার করতে হতো না। স্থানীয় অঞ্চলে তামার খনিজ না পাওয়া গেল, দূর দেশ থেকে যারা সেই খনিজ কিনে নিয়ে আসত, তারা হয়ে উঠল বণিক। কারিগরদের দক্ষতায় বানানো উপকরণের চাহিদা অনুযায়ী, এই বণিকরাই অঞ্চলের বাইরে, এমনকি দেশের বাইরেও এই সব উপকরণ বিক্রি করত। অর্থাৎ, মানব সভ্যতার দ্রুত উন্নতিতে আগুনের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক এবং সত্যি বলতে আমরা যত ভালোভাবে আগুনকে ব্যবহার করতে শিখেছি, ততই আমাদের সভ্যতা দ্রুত উন্নত হয়েছে।

কিছু মানুষ চিরকালই থাকেন, যাঁরা যে কোন আবিষ্কারের পরেও আরো চিন্তা ভাবনা দিয়ে, মানবজাতির উন্নতির চিন্তা করে যান, আর কিছু মানুষ সেই সব আবিষ্কারকেই অন্য মানুষের ক্ষতি করার কাজে ব্যবহার করে। আগুনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, আগুনের ব্যবহার শিখে মানুষ, অন্য দলের বা শত্রুদের সর্বনাশ করার এক অতি সহজ উপায় হাতে পেয়ে গেল। শত্রুদের বাড়িতে, গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তিরের ডগায় চর্বি মাখানো কাপড়ে আগুন লাগিয়ে, দূর থেকেই গ্রামে আগুন লাগানো। এমন সব যুদ্ধের ভয়ংকর উপকরণও আবিষ্কার করে ফেলল, তখনকার মানুষ। এমন সব তিরের কথা মহাভারতে অনেক আছে। তারপর যখন বারুদ আবিষ্কার করে ফেলল, তখন বারুদ আর আগুন দিয়ে ভয়ংকর সব যুদ্ধের অস্ত্রও বানিয়ে ফেলতে শুরু করল। এরকম অস্ত্র ব্যবহারে যে যত দক্ষ, সেই দেশ বা রাজ্য তত শক্তিশালী হয়ে উঠল।

 

 আগুন ব্যাপারটাকে বেশ ভালোভাবে রপ্ত করে, তাকে নানান কাজে সফল ব্যবহার শুরু হতে কিন্তু আরো অনেকদিন পার হয়ে গেল। আসলে আগুন জ্বলা, তার তাপ আর আলো দেওয়ার ক্ষমতাকে ঠিকঠাক বুঝতেই মানুষের এতদিন সময় লেগে গিয়েছিল। কাজেই আগুন ব্যাপারটা কী, সেটা অল্প কথায় একটু বুঝে নেওয়া যাক।

বিশেষ এক ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া থেকে আমরা যে তাপ আর আলো পাই, সেই তাপ আর আলোকেই আগুন বলি, আর ওই রাসায়নিক প্রক্রিয়াটিকে বলি দহন (combustion)দহনের জন্য তিনটি বিষয় থাকতেই হবে, জ্বালানি (fuel), বাতাসের অক্সিজেন (O2), আর দহন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ।

জ্বালানি বলতে এতক্ষণ আমরা কাঠ-কুটো, শুকনো পাতা, পশুচর্বি, নানান ভেষজ তেলের কথা উল্লেখ করেছি। এই সমস্ত জ্বালানির মধ্যেই অনেক পদার্থের সঙ্গে একটি মৌল পদার্থ প্রচুর পরিমাণে থাকে, তার নাম কার্বন। মোটামুটি ১৫০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, কাঠের মধ্যে কার্বনের যে যৌগ থাকে, সেটি অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করে এবং তার ফলে আমরা পাই তাপ, প্রচুর জলীয় বাষ্প (H2O), কার্বন ডায়ক্সাইড (CO2), কার্বন মনক্সাইড (CO) এবং আরো নানা ধরনের গ্যাস তৈরি হয়। অক্সিজেনের সঙ্গে এই বিক্রিয়াকে অক্সিডেশান (oxidation) বলে, এই বিক্রিয়া তাপদায়ী (exo-thermic), তার কারণ এই বিক্রিয়া থেকে আমরা তাপ আর আলো পাই।  দহন শুরু করার জন্যে যে জরুরি তাপমাত্রার দরকার হয় তাকে জ্বলন উত্তাপ (ignition temperature) বলা হয়, কাঠের ক্ষেত্রে এই তাপ ১৫০ সেলসিয়াস আগেই বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির জন্য এই তাপ ভিন্ন হয়ে থাকে।

একবার এই দহন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে, আগুন নিভবে না, কারণ দহনের জন্য যে তিনটি বিষয়ের কথা আগে বলেছি, তার মধ্যে জ্বালানি আর অক্সিজেন যদি থাকে, আগুন তার নিজের উত্তাপেই দহন চালিয়ে যেতে থাকে, অর্থাৎ আগুনের জ্বলতে থাকা একটি শৃঙ্খল-বিক্রিয়া (chain reaction)এই বিক্রিয়াকে বন্ধ করার অর্থ, আগুন নেভানো; সেক্ষেত্রে ওই তিনটি বিষয়ের কোন একটি বিষয়কে সরিয়ে ফেলতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। যেমন, যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, অথবা পাথর, বালি কিংবা বড়ো পাত্র চাপা দিয়ে যদি বাতাসের অক্সিজেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। অথবা জল বা অন্য কোন অদাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ঢেলে, আগুনের উত্তাপকে যদি শীতল করে দেওয়া যায়।

এই লেখার প্রথম পর্বের সেই আদিম যুবক, যে প্রথম আগুন নেভাতে এবং জ্বালাতে শিখেছিল, সে এত সব জানতই না এবং সত্যি বলতে আগুন জ্বলা ও নেভার এই রহস্য বুঝতে বুঝতে আমাদের প্রায় একলাখ পঁচিশ হাজার বছর পার হয়ে গেল!

আগুনের এই রহস্য বুঝে ফেলার পর মানুষ উন্নত মানের জ্বালনির সন্ধান শুরু করল। বহুদিন পর্যন্ত আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাঠ, নানান ভেষজ তেল, পশুচর্বির ব্যবহার হত, একথা আগেই বলেছি। তার থেকে অনেক ভাল জ্বালানি হল কয়লা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাটির ওপরেই পাওয়া কিছু কিছু কয়লার ব্যবহার মোটামুটি তিন হাজার বছর আগে থেকে চালু হলেও, খনির মধ্যে কয়লার সন্ধান এবং সেখান থেকে কয়লা তুলে, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার শুরু হল মোটামুটি দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। সেই সময় অবশ্য কয়লা প্রধানতঃ ব্যবহার হত ঘরের কাজে, চূণভাটি আর ধাতু নিষ্কাশনের ছোটখাটো কারখানায়কিন্তু কয়লার ধোঁয়ার দূষণ থেকে বহুলোকের শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়াতে, ১৩০৬ সালে কয়লার ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সময়, মোটামুটি ১৭৬০ থেকে ১৮২০ বা ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ধরা হয়।  জলকে বাষ্প করে তার শক্তিতে নানান ইঞ্জিন চালানো, সেই ইঞ্জিন দিয়ে বড়ো বড়ো কারখানা তৈরি হতে লাগল। কারখানা ও উন্নত যন্ত্রপাতি বানাতে বেড়ে গেল লোহার ব্যবহার। লোহা ও অন্যন্য ধাতু নিষ্কাশনের জন্যেও বিশাল বিশাল কারখানার প্রতিষ্ঠা হতে লাগল। সেই সময় ইউরোপে শিল্পের এই অদ্ভূত উন্নতির জন্য সবথেকে বেশি জরুরি ছিল উচ্চ তাপমাত্রার আগুন, আর সেই আগুনের জন্যেই সারা বিশ্ব জুড়ে খনি থেকে কয়লা তোলার কাজও শুরু হয়ে গেল।

ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের মাঝামাঝি সময়েই কয়লা-পোড়ানো আগুনে জল ফুটিয়ে বাষ্পশক্তির প্রয়োগ করে সূচনা হল রেল ব্যবস্থার ইঞ্জিন। বেশ কম খরচে বহু যাত্রী ও পণ্য বহন করা শুরু হল লোহার রেলপথ বিছিয়ে, তার ওপর দিয়ে ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি ছুটিয়ে। সারা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই রেলপথ ও রেলগাড়ি। বিশ্বজুড়ে হিড়িক পড়ে গেল রেলগাড়ি চালানোর। এমনকি এই বাষ্প-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের জাহাজ এবং নদীতে স্টিমারও চালু হয়ে গিয়েছিল। শেষ হয়ে গিয়েছিল দাঁড়-টানা বৈঠা-বাওয়া পালতোলা জাহাজের যুগ।     

         

আজ যে বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের সভ্য জীবন অচল হয়ে উঠেছে, এর পেছনেও আগুনের অবদান সব থেকে বেশি। আজ সারা বিশ্বে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তার অধিকাংশই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Thermal Power Station)সেই তাপ বিদ্যুৎ কারখানাতেও কয়লা পুড়িয়ে আগুন জ্বালতে হয়, জলকে বাষ্প করার কাজে। আর সেই বাষ্পের তীব্র ধাক্কায় টার্বো জেনারেটর ঘুরিয়ে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে যায় আমাদের ঘরে ঘরে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই শুরু হয়ে গেল রেল চলাচল ব্যবস্থাও। সারা বিশ্বে এখন বাষ্প-চালিত ইঞ্জিনের রেলগাড়ি প্রায় উঠে গেছে, অধিকাংশই এখন ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। ইলেক্ট্রিক ট্রেনে যাত্রা করার সময়েও মনে রেখো, তার বিদ্যুৎটি সরবরাহ হচ্ছে তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের  কয়লা পুড়িয়ে জল ফোটানো বাষ্প দিয়ে চালিত টার্বো জেনারেটর থেকে।

 বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কয়লার বিকল্প হিসেবে আগুন জ্বালানোর নতুন ইন্ধন এসে গেল - খনিজ তেল। ভূগর্ভের অনেক নীচে জমে থাকা প্রাকৃতিক এই খনিজ তেলকে তুলে এনে, পরিশ্রুত করে আমরা উৎপন্ন শুরু করলাম, নানা ধরনের ইন্ধন-তেল, যেমন অ্যাভিয়েশন ফুয়েল, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ইত্যাদি। অ্যাভিয়েশন ফুয়েল দিয়ে – উড়োজাহাজ চালানো হয়। পেট্রল, ডিজেলে চলে ছোট গাড়ি বড়োগাড়ি, এমনকি দুরন্ত গতি রেলের ইঞ্জিনও। আর গৃহস্থালির আগুন জ্বালাবার কাজে লাগে কেরোসিন। খনিজ ইন্ধনের আরেকটি প্রকার হল, প্রাকৃতিক গ্যাস। ভূগর্ভের ভাণ্ডার থেকে এই গ্যাস তুলে এনে, লোহার সিলিণ্ডারে ভরে আমাদের ঘরে ঘরে সরবরাহ করা হয় রান্নার জন্যে।         

  অতএব, আজ আমাদের সভ্যতা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা মানুষ হিসেবে যে বিজ্ঞানের জন্যে এত গর্ব অনুভব করি, তার পিছনে সেই আদিম লোকগুলির অবদান আমরা যেন ভুলে না যাই। তাদের সেই কৌতূহল বা আগ্রহ যদি না থাকত, আমরা হয়তো কোন গুহার অন্ধকারে আজও ভয়ে মায়ের কোল ঘেঁষটে শুয়ে থাকতাম। এই লেখা পড়ে মজা পাওয়াটা তোলা থাকত আরো কয়েক হাজার বছর পরে!  

-০-


 

শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৪

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


"@শুধু _তুই .কম" উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 


৪র্থ পর্ব 

 

শশাঙ্ক আর সুনেত্র হুইস্কির পেগ হাতে নিয়ে যখন বসল, তখন সাড়ে দশটা বাজে। সামনের গ্লাস টপ সেন্টার টেবিলে ফ্রুট স্যালাডের প্লেট, সল্টেড পিনাটস, কাজু আর সেঁকা পাঁপড়। সুকন্যা ফ্রেস হয়ে বসার ঘরে এলো – পরনে হাউসকোট।

“ব্যস, শুরু হয়ে গেছে? সুনুদা, রাত্রে তুমি রুটি খাও তো? কটা রুটি? একটু ডাল আর সঙ্গে চিকেন কারি – এত রাত্রে এর বেশি কিছু আর জোগাড় করতে পারছি না – অসুবিধে হবে না তো”?

“অসুবিধে হলেও কি আর বলব, ভেবেছিস? তবে এই ড্রিংক্‌সের পর দুটো রুটিই যথেষ্ট। এখন কি দোকান খোলা থাকবে – এক প্যাকেট সিগারেট আনতে পারলে ভালো হত”

“কেন হবে না? আপনি মুখ ফুটে একবার বলুন না, সব চলে আসবে – আকাশের চাঁদখানা ছাড়া। সুকু, হারুকে একবার পাঠিয়ে দাও না, মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসুক – কোন ব্র্যাণ্ড চলে আপনার”?

সুনেত্র তার সিগারেটের ব্র্যাণ্ড বলতে বলতে পার্স খুলে টাকা বের করছিল, তাই দেখে সুকন্যা বলল, “দেখছ, তোমার সামনে বসে সুনুদা পার্স থেকে টাকা বের করছে সিগারেটের দাম দেবে বলে, আর তুমি সেটা সহ্য করছ? হি ইজ ইয়োর অনারেব্‌ল্‌ গেষ্ট, অ্যান্ড ইউ বিয়িং আ রেস্পন্সিব্‌ল্‌ হোস্ট – এটা কি উচিৎ হচ্ছে, বস্‌”?

সুকন্যার ঠোঁটে মুচকি হাসি। একথায় চোখ ছোট করে শশাঙ্ক সুনেত্রর দিকে দেখল, বলল, “হারু, সিগারেটটা ঝট করে নিয়ে আয়, আমি টাকা দিয়ে দেব”

“হারু, এক কাজ করিসতো, বাবা, তিনটে পান আনিস, খয়ের ছাড়া, মিঠে পাতার সাদা পান – এলাচ, মৌরি, চমনবাহার...চট করে যা – দোকান না বন্ধ হয়ে যায়”। সুকন্যা বলল।

হারু বেরিয়ে যাবার পর, শশাঙ্ক তৃতীয় গ্লাসে অল্প হুইস্কি ঢালল, তারপর অল্প সোডা আর তিন পিস আইস কিউব। গ্লাসটা সুকন্যার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, “লেট আস সেলিব্রেট দি গ্রেট আবির্ভাব অফ মিস্টার সুনেত্র...। আজকের দিনটাকে বেশ মেমোরেব্‌ল্‌ করে তোলা যেত – কিন্তু এত রাত্রে সে আর হবার নয়। তাছাড়া সুনেত্রসায়েব মনে হচ্ছে সুরার আসরে জনৈক বেসুরো মানুষ বিশেষ, অতএব সেই ফিউটাইল প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না।”

সুকন্যা গ্লাসটা হাতে নিতে শশাঙ্ক নিজের গ্লাস সুকন্যার হাতে ধরা গ্লাসে ঠেকিয়ে বলল, “চিয়ার্স”।

“তোমরা তো অলরেডি শুরু করে দিয়েছ, এঁটো গেলাসে ঠেকিয়ে আবার চিয়ার্স হয় না কি”?

“তুমি সেই বিধবা পিসিমাদের মতো এঁটোকাঁটা নিয়ে ভাবতে বসলে? মদ আবার এঁটো হয় নাকি? নাও চালু করো”

“উল্লাস” – সুকন্যা বলল, তারপর হাল্কা করে ঠোঁটে ছোঁয়ালো গ্লাসটা

“উল্লাস... আজকাল বঙ্গসমাজে “চিয়ার্স” চলছে না, না?” সুনেত্র সুকন্যাকে জিজ্ঞেস করলকথাটা শুনে শশাঙ্ক বলল, “আপনার “কনি” আগে একদমই খেত না, জানেন। আজকাল মাঝে মধ্যে খায়। সৎসঙ্গে স্বর্গবাস আর কুসঙ্গে সর্বনাশ – আমার পাল্লায় পড়ে অধঃপাতে চলে গেছে – তা যদি বলেন – আই উইল ফিল প্রাউড।”

সুনেত্র কোন জবাব দিল না, একটু অপ্রস্তুতভাবে হাসল, কিন্তু সুকন্যা বড় বড় চোখে শশাঙ্কর দিকে তাকিয়ে বলল, “হাউ ডেয়ার ইউ কল মি “কনি” – ইট্‌স্‌ নট ফর ইউ...”।

“আই নো, আই নো। এটা অনেকটা বীজমন্ত্রের মতো – মিতা আর বন্যা – সকলের জন্যে নয় – হাটে বাজারে ব্যবহৃত হয়ে সাতকান হবার নয়। বাট আই লাইক ইট অ্যাণ্ড ফিল জেলাসি – এমন নামটা আমার মাথায় কেন আগে আসেনি”?

“মাথায় এলেও লাভ হতো না...”

“কেন? সুনেত্রবাবু কপিরাইট করে নিয়েছেন বলছ”?

“সুনুদাকেই জিজ্ঞেস কর, বাট দ্যাট নেম ইজ নট ফর ইউ, ব্যস্‌”সুকন্যা বলল।

 

শশাঙ্কর গ্লাস খালি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সুনেত্রর গ্লাস অর্ধেকও খালি হয়নি দেখে শশাঙ্ক বলল, “আপনি কি মশাই, ওই এক গ্লাসেই রাত পোয়াবেন নাকি? খালি করুন”

“আপনি নিন না, আমি একটু স্লো - টেস্ট প্লেয়ার – টি২০র মতো চৌকা-ছক্কা মারা আমার ধাতে নেই। আপনি আমার গ্লাসের দিকে নজর দিলে খুব বোর হবেন, তার চেয়ে নিজের মতো এনজয় করুন”সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল।

“বলছেন”? বলে শশাঙ্ক নিজের গ্লাস আবার ভরে তুলল হুইস্কি-সোডা-বরফে। “আসলে কি জানেন ছোটবেলায় এক জ্যোতিষী আমার কোষ্ঠীবিচার করে বলেছিল আমার নাকি জলে ভয় আছে” বড় চুমুকে গেলাস হাফ খালি করে শশাঙ্ক আবার বলল – “তারপর যা হয়, ছোটবেলায় মা-বাবা আমায় জলের ধারে কাছে যেতে দেয়নি কোনোদিন। তাই বড় হয়ে নিরন্তর চেষ্টায় আছি ডুবে মরার – চুল্লুভর পানি মে বলুন অথবা হুইস্কির গেলাসে বলুন - একই ব্যাপার”

“এটা কি তুমি রসিকতা করলে? বলে দিও, বাপু, যদি হাসতে হয় সেটাও স্পষ্ট উল্লেখ করে দিও”। সুকন্যার এই কথায় শশাঙ্ক উচ্চৈস্বরে হাসল।

হাসির দমক থামলে বলল, “সুকু, তুমি কিন্তু রীতিমত আমার লেগপুল করছো”।

সুকন্যা নিজের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “কখন খেতে বসবে? এগারোটা বাজতে চলল প্রায়। হারু এলে খাবার গরম করতে বলব”?

“কি বলছো, সুনেত্রবাবুর গ্লাস এখনো খালিই হল না, এখন খাবেন কী করে? আরেক পেগ নিতে হবে তো”? বড়ো চুমুকে নিজের গ্লাস খালি করে শশাঙ্ক বলল, “এবার অন্ততঃ আপনারটা খালি করুন”।

“নাঃ। ইট্‌স্‌ ফাইন। আমি কিন্তু দারুণ এনজয় করছি। প্লিজ জোর করবেন না। আপনি আপনার মতো চালিয়ে যান। নো প্রবলেম”।

শশাঙ্ক নিজের গ্লাস আবার ভরে নিল – এবারে আর সোডা নিল না – হুইস্কি, জল আর বরফ, তারপর বলল, “আপনার মতো সঙ্গী পেলে নির্ঘাৎ অমর হয়ে যাবো, মশাই। সামনের সোফায় যম এসে বসেই থাকবেন, আপনার গ্লাসটা খালি হলে আমাকে তুলে নিয়ে যাবেন ভেবে। আপনার গ্লাসও খালি হবে না আর সে বেচারা হাই তুলতে তুলতে একসময় ঘুমিয়েই পড়বেন হয়তো বা...। আমার আয়ুতে একটা রাত বেড়ে যাবে”। কথা শেষ করে বেশ বড় চুমুক দিল শশাঙ্ক।

“তুমি কি এরপরেও আর নেবে? তোমার অবস্থা খুব সুবিধের নয়। আজেবাজে বকা শুরু হয়ে গেছে তোমারসুকন্যা বলল।

“কিছু কি ভুল বললাম, সুকু? “গৃহীতৈব কেশেষু মৃত্যুনা, ধর্মমাচরেৎ”। যম আমাদের চুলের মুঠি ধরেই আছেন...যে কোন সময়ে তিনি বলতেই পারেন, প্যাক আপ ...ব্যস্‌। অতএব এনজয় – এনজয় দিস লাইফ...”। শেষ দিকে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিল, জিভ জড়িয়ে আসছিল শশাঙ্কর।

“ও। “ধর্মমাচরেৎ” মানে এনজয় দিস লাইফ”?

“হোয়াই নট, সুকু, হোয়াই নট – এ ধর্ম জীবধর্ম হতেই বা বাধা কোতায়? ধর্ম মানেই কি ভুলভাল কিছু মন্ত্র ঝাড়া আর ট্যাং ট্যাং ট্যাং ঘন্টা নাড়া? জীবনকে যা ধরে রাখে সেটাই কি ধর্ম নয়? বহুদিন আগে বেশ ইন্টারেস্টিং একটা গল্প পড়েছিলাম – ট্রাইবাল ফোক লোর। কোথায়, কোন বইতে পড়েছিলাম, মনে নেই।

গল্পটা হল - বহুযুগ আগে জীবন যখন খুব সাধারণ ছিল, মানে আমাদের মতো মানুষ তখনো অসভ্য ধরনের সুসভ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এবং তাকে সামলানোর জন্যে গোদা গোদা শাস্ত্র-গ্রন্থ রচনা এবং তার পাশাপাশি বীভৎস অস্ত্র-শস্ত্র, অ্যাটম বা নিউক্লিয়ার ফিউশন এবং ফিশন করে উঠতে পারেনি। সেই নির্মল-সরল জীবনে, আমাদের মাথার ওপরে থাকা আকাশটাকে আঁকশি দিয়ে হাতের কাছে টেনে নামানো যেত রোজ। চাঁদ এবং প্রতিটি নক্ষত্রকে হাতে ধরে কাপড় দিয়ে ঘষে ঘষে চকচকে করে তোলা যেত। ন্যাতা-জল দিয়ে পরিষ্কার ঝকঝকে করে নিকিয়ে নেওয়া চলত বিশাল আকাশটাকেও। তারপর আবার আঁকশি দিয়ে তুলে ঠেলে ঠিকঠাক জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যেত আকাশটাকে।

তারপর মানুষ সভ্য হতে লাগল। চাষবাস শিখে ফেলল, পশুপালন শিখে ফেলল। সে যুগের সভ্য মানুষদের লোভ বাড়তে লাগল। প্রকৃতিকে ভেঙে-চুরে নিজেদের কাজ গোছাতে লাগল। সে সময় এক সভ্য মহিলার ছিল অনেক গরু-মোষের এক বিশাল বাথান। সেখান থেকে সে যেমন প্রচুর দুধ পেত, তেমনি পেত প্রচুর গোময়। কিন্তু সেই গোময় শুকিয়ে ঘুঁটে দেওয়ার মতো নিরিবিলি জায়গার খুবই অভাব হল। সেই মহিলা একদিন করল কি, আঁকশি দিয়ে আকাশটাকে টেনে এনে – আকাশের গায়ে থাবড়ে দিল অজস্র ঘুঁটে। ঢাকা পড়ে গেল চাঁদ এবং কত শত নক্ষত্র। কদর্য নোংরা দুর্গন্ধময় হয়ে উঠল গোটা আকাশটা। এমনই ঘটতে লাগল প্রায় রোজ।

একদিন ঈশ্বরের চোখে পড়ল, তিনি ভয়ানক ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁর সৃষ্টির ওপর একি অত্যাচার? এত সাহসই বা পায় কোত্থেকে লোভী মানুষগুলো? প্রথমে তিনি অভিশাপ দিলেন মানুষকে – “তোরা লোভী হয়ে নিজেরাই নিজেদের  ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠ”।  তারপর তিনি প্রবল ঝড়-বৃষ্টি এনে তাঁর আকাশ ও নক্ষত্রসমুহকে ধুয়ে-মুছে আবার আগের মতো ঝকঝকে করে তুললেন। কিন্তু এবার আকাশটাকে তুলে দিলেন বহু উঁচুতে, মানুষের কোন আঁকশি দিয়েই তাকে আর নামিয়ে আনা সম্ভব নয়...,”।

শশাঙ্ক গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে আবার বলল, “ফ্রম দ্যাট ভেরি ডে আমরা সুসভ্য হয়ে উঠতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে একদল হেন অন্যায় কাজ নেই যা করে না, অন্য দল মোটা মোটা গ্রন্থ লিখে আর ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে পাপ-পুণ্যের বাণী ছড়াতে লাগল। মাঝের থেকে আমরা, যারা না ঘরকা – না ঘাটকা - ডুবে রইলাম দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পারাবারে...”।           

হারু ফিরে আসাতে এই আলোচনায় ছেদ পড়ল। সিগারেটের প্যাকেটটা আর পানগুলো সুকন্যাকে হস্তান্তর করল হারু সুকন্যা সিগারেটের প্যাকেটটা সুনেত্রর হাতে দিতে দিতে বলল, “তোমার তো যা দৌড়, আর নেবে না নিশ্চয়ই। আর ওর সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে তোমার রাত ভোর হয়ে যাওয়াও আশ্চর্য নয় আমি বরং খাবার দিতে বলিহারু, খাবার গরম করো, আমি আসছি...”।

শশাঙ্ক কিছুটা আনমনা হয়ে বলল, “শশাঙ্কবাবু, আপনার ফোক-লোরটি অসাধারণ... এত সিমপ্ল আর সরল বলেই মনে দাগ রেখে যায়...”।    

নিজের গ্লাসটা খালি করে শশাঙ্ক একটু হেসে হাত বাড়াল সুনেত্রর দিকে, “একটা সিগারেট দিন তো, ব্রাদার”। তারপর টিশার্টের কলারে সামান্য নাড়া দিয়ে র‍্যালা করে বলল, “আমি শুধু মালই খাই না, ব্রাদার, শুধু বেওসাই করিনা। আরও অনেক – অনেক কিছু পাবেন এই খোলসটার অন্দরে ...খালি কষ্ট করে আপনাকে একটু কাল্টিভেট করতে হবে”।


 মৃদু হেসে সুনেত্র তার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে শশাঙ্ককে দিল, শশাঙ্ক সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে লাগাল, হাতের ইশারায় দেশলাই চাইল। সুনেত্র দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে শশাঙ্কর সিগারেট ধরিয়ে দিল। শশাঙ্কর হাত কাঁপছিল, ঠোঁটে ধরা সিগারেটটাও কাঁপছিল সিগারেটে বড় একটা টান দিয়ে, এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে শশাঙ্ক নেশাগ্রস্তভাবে হাসল, তারপর বলল, “জ্বালিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো, ব্রাদার, যাবার আগে। রাত ভোর হওয়া নিয়ে কী বলছিলে, সুকু, রাত ভরে বৃষ্টি”?

চলবে...

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব "  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ "

শ্রীকৃষ্ণের লীলাসংবরণ   

 অর্জুন প্রিয়সখা-শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায় গিয়েছিলেন, সে অনেকদিন হয়ে গেল। প্রিয়ভাই অর্জুন ও চিরসখা কৃষ্ণের অনেকদিন কোন সংবাদ না পেয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের চোখে ভয়াবহ অশুভ সব লক্ষণ ধরা পড়তে লাগল। তিনি দেখলেন, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ব্যবহার। মানুষ ক্রোধ, লোভ ও মিথ্যাকে আশ্রয় করে, অসৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করছে। বাবা, মা, বন্ধু, ভাই, স্বামী, স্ত্রী নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। মানুষের অন্তরে সরল আত্মীয়তার বদলে কুটিল শঠতা আশ্রয় নিয়েছে।

[পরিবেশ নিয়ে সুসভ্য আধুনিক মানুষ সচেতন হয়েছে বা হচ্ছে বিগত পাঁচ-ছয় দশকে। তার কারণ বলা হয়, আধুনিক সভ্যতার ব্যাপক শিল্পায়ন, বিপুল নগরায়ণ এবং বীভৎস অরণ্য আগ্রাসন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের যুগে (ঐতিহাসিকরা বলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৯০০ বিসিই) আধুনিক সভ্যতার ওই ত্র্যহস্পর্শের স্পর্শ ছিল নামমাত্র। অতএব যুধিষ্ঠির যে লক্ষণগুলি দেখেছিলেন বা অনুভব করেছিলেন, সেগুলির সবকটিই ঘোর কলির লক্ষণ। কিন্তু একটু আশ্চর্য লাগে তাঁর "গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে" এই মন্তব্যে। তাঁর সময়েও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণ কি? ভগবান তাঁর মর্ত্যলীলা সংবরণ করেছেন বলে আমাদের সামাজিক দুর্গতি শুরু হল, কিন্তু ঋতুর ধর্ম তিনি কেন বদলে দেবেন?]      

মহারাজ যুধিষ্ঠির একদিন অনুজ ভীমকে ডেকে বললেন, “বৃকোদর, অর্জুন প্রিয়সখা কৃষ্ণের সঙ্গে  দ্বারকায় গেছে বহুদিন হয়ে গেল। অর্জুন এখনও ফিরছে না কেন, বুঝতে পারছি না।  দেবর্ষি নারদ ভগবানের নরলীলা সংবরণের যে ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন, সেই সময় কি তবে আসন্ন? এই ভগবান কৃষ্ণের জন্যেই আমরা আজ এই রাজ্য, সম্পদ, প্রাণ, সম্মান, কুল ও প্রজা লাভ করেছি। তাঁর অনুগ্রহেই আমরা আমাদের শত্রুদের জয় করে স্বর্গসুখের অধিকারী হয়েছি। কিছুদিন ধরে, আমার শরীরে এবং চারপাশে আমি নানান অশুভ লক্ষণ লক্ষ্য করছি। আমার মনে হচ্ছে কোন এক ভয়ংকর বিপদ আমাদের দিকে যেন এগিয়ে আসছে।

এই দেখ, ভীম, আমার বাম চক্ষু, উরু আর বাহু বারবার কেঁপে উঠছে। কাঁপছে আমার হৃদয়। ওই দেখ, উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ করে শৃগালী বমি করছে, আর কাঁদছে। কুকুর আমার দিকে তাকিয়েও নির্ভয়ে চিৎকার করছে। গবাদি পশুরা কেন আমার ডানদিকে আর গাধারা আমার বাঁদিকে যাওয়া আসা করছে। ঘোড়াগুলিকে দেখ, আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। পেঁচা আর কাক কুৎসিত আওয়াজে কেমন ডাকছে শুনতে পাচ্ছো? ঐ দেখ ভীম, নদ, নদী, সরোবর  অশান্ত হয়ে উঠছে। কি আশ্চর্য, দেখ, আগুনে ঘি দিলেও আগুন জ্বলছে না। গোয়ালের বাছুরেরা স্তন্যপান করছে না। গাভীরা দুগ্ধক্ষরণ করছে না। দেবপ্রতিমাসকল দেখ, যেন ঘর্মাক্ত শরীরে কাঁদছে, তাঁরাও যেন অস্থির।  অশান্ত বাতাসে আর ধুলিকণায় সূর্য প্রভাহীন, নিস্তেজ। সমস্ত জনপদ, গ্রাম, নগর, উদ্যান, আশ্রম ধূসর, মলিন আর নিরানন্দ হয়ে উঠছে। এই সমস্ত ভয়াবহ লক্ষণ দেখে আমার মনে হচ্ছে, ভাই ভীম, এতদিনে বোধহয় পৃথিবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্নলাভের সৌভাগ্য হারাল”

[যুধিষ্ঠির বর্ণিত এই দুর্লক্ষণগুলিই আমাদের মনে কুসংস্কার হিসেবে গেঁথে রয়েছে বিগত প্রায় তিনহাজার বছর ধরে!]

এইরকম উদ্বিগ্ন চিন্তায় মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন কিছুদিন ব্যাকুল, একদিন অর্জুন দ্বারকাপুরী থেকে হস্তিনাপুরে ফিরলেন। ফিরে এসেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের পদতলে। অর্জুনের চোখে অশ্রুধারা, মুখ বিষণ্ণ, তিনি যেন ঘোরতর অসুস্থতাঁকে দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আরেকবার দেবর্ষি নারদের সেই ইঙ্গিতের কথা মনে পড়ল।

ব্যাকুল হয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই অর্জুন, তুমি এমন কাঁদছো কেন? তোমার সুন্দর মুখ, কেন এত বিষণ্ণ? দ্বারকায় মধু, ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, সাত্বত বন্ধুরা সকলে ভালো আছেন তো? পূজনীয় মাতামহ শূর ও মামা বসুদেব, দেবকীসহ আমাদের সপ্ত মামীরা, তাঁদের পুত্র ও পুত্রবধূগণ সকলে কুশলে আছেন তো? পুত্রহীন রাজা উগ্রসেন, তাঁর ভাই দেবক ও হৃদীক, তাঁদের পুত্রেরা কৃতবর্মা, অক্রুর, জয়ন্ত, গদ, সারণ, শত্রুজিৎ এবং যদুশ্রেষ্ঠ ভগবান বলরাম ভালো আছেন তো? মহাবীর প্রদ্যুম্ন, ভগবান অনিরুদ্ধ, সুষেণ, চারুদেষ্ণ, জাম্ববতীর পুত্র শাম্ব এবং কৃষ্ণের অন্য পুত্রেরাও সকলে ভালো আছেন তো? শ্রীকৃষ্ণের অনুচর শ্রুতদেব ও উদ্ধব, সুনন্দ, নন্দ ও অন্যান্য যদুবীরগণের কুশল তো? ব্রাহ্মণের মঙ্গলকারী ও ভক্তবৎসল ভগবান গোবিন্দ দ্বারকাপুরীতে বন্ধুগণের সঙ্গে সুখে ও পরমানন্দে বাস করছেন তো?

ভাই অর্জুন, তোমার একি দশা হয়েছে? তোমার অঙ্গকান্তি মলিন, তোমার আর সেই তেজ নেই, তোমার এই অবস্থার কারণ কী? অনেকদিন বন্ধুগণের সঙ্গে ছিলে বলেই কি তোমার প্রাপ্য সম্মান তুমি পাওনি? তোমাকে কি তাঁরা অবহেলা করেছেন? কর্কশ কটুকথায় কেউ কি তোমার মনে কষ্ট দিয়েছে? দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোন দরিদ্রকে তুমি কি দান করতে পারোনি?  তোমার সাহায্যপ্রার্থী ব্রাহ্মণ, বালক, বৃদ্ধ, স্ত্রী, রোগী বা অন্য কাউকে তুমি কি সাহায্য করতে পারোনি? কোন দুশ্চরিত্রা নারীতে তুমি উপগত হওনি তো?  আসার পথে তোমার চেয়ে নীচ কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে পরাজয় স্বীকার করোনি তো?  ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ অথবা বালককে ভোজন না করিয়ে, তুমি নিজে ভোজন করে নিয়েছ, এমন হয়নি তো? অথবা তোমার চিরদিনের সখা কৃষ্ণকে হারিয়ে তুমি কি নিজেকে নিঃস্ব মনে করছো? আমার মনে হয়, এটাই একমাত্র কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন কারণেই তোমার এই দশা হতে পারে না”

নিজেকে যথাসাধ্য সংবরণ করে, অর্জুন অগ্রজ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “দাদা, আমাদের সেই পরম বন্ধু শ্রীহরি আমাকে পরিত্যাগ করে দিব্যলোকে চলে গেছেন, যাবার সময় তিনি আমার সমস্ত শক্তিও হরণ করে নিয়েছেন। প্রাণহীন দেহ ক্ষণকালের মধ্যেই যেমন শবদেহ হয়ে যায়, তেমনই কৃষ্ণের ক্ষণকাল বিয়োগেই সমস্ত পৃথিবী শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

দাদা, তোমার মনে আছে, আমি দ্রুপদরাজার স্বয়ংবরে সমবেত সমস্ত রাজাদের পরাস্ত করে, মাছের চোখ বিদ্ধ করে, কৃষ্ণাকে লাভ করেছিলাম। ইন্দ্রের দেবসৈন্যকে পরাজিত করে খাণ্ডববন অগ্নিকে সমর্পণ করেছিলাম। ময়দানবকে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ করে, তার অপূর্ব শিল্পকর্ম স্বরূপ আমাদের রাজসূয় সভা নির্মাণ করিয়েছিলাম। দাদা ভীম রাজসূয় যজ্ঞের সময়, জরাসন্ধকে হত্যা করে, তার কারাগারে বন্দী সমস্ত রাজাদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন। রাজসূয় যজ্ঞে মহা অভিষেকের পর, দ্রৌপদী তার সুন্দর কেশকবরী বন্ধন করেছিল। কিন্তু কপট দুঃশাসনরা সভামধ্যে কৃষ্ণার কবরী খুলে দিয়েছিল। পরে দাদা ভীম সেই দুঃশাসনদের হত্যা করে, তাদের পত্নীদেরও কবরী খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিলেন। এই সমস্তই আমরা করতে পেরেছিলাম আমাদের চিরসখা কৃষ্ণের অনুগ্রহে।

তারপর, দাদা তোমার মনে পড়ে, দুর্যোধনরা দুর্বাসার শাপে আমাদের বিনাশ করার পরিকল্পনায় আমাদের আশ্রমে একবার সহস্র শিষ্যসহ দুর্বাসামুনিকে অসময়ে পাঠিয়েছিল? সহস্র লোকের সেই হঠাৎ আতিথ্যে, মহাসঙ্কটে পড়ে দ্রৌপদী কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চেয়েছিলকৃষ্ণ এল, এসে মৃদু হেসে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে, কৃষ্ণা, কী আছে খেতে দাও”দ্রৌপদীর তখন অসহায় অবস্থা, যাদের থেকে পরিত্রাণের জন্য সে কৃষ্ণকে ডাকল, তিনিও কিনা অভুক্ত? অবেলায়, কৃষ্ণার ভাঁড়ার তখন শূণ্য

ম্লান মুখে কৃষ্ণা বলেছিল, “আমি নিরুপায়, হে কৃষ্ণ, আমাদের সকলের খাওয়া শেষ, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই তোমাকে দেবার মতো”

“রান্নাঘরে যাও না, কৃষ্ণা, দেখ যা আছে, তাতেই আমার ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে” কৃষ্ণের মুখে অদ্ভূত প্রসন্ন হাসি আর দু চোখে অনন্ত রহস্য। কৃষ্ণা রান্নাঘরে গেল, শূণ্য পাত্রের গায়ে একটু শাক লেগে আছে, আর আছে তিন চারটে অন্নের দানা। পরম লজ্জায় আর দ্বিধায় তাই একটা পাত্রে এনে দিল দ্রৌপদী। তাই দেখে মহা আগ্রহে কৃষ্ণ হাতে নিল সেই পাত্র, কি আনন্দে সে মুখে তুলল সেই শাক আর অন্ন।

খাওয়ার পর উজ্জ্বল মুখে বলল,  “কৃষ্ণা, তবে যে তুমি বলেছিলে তোমার ভাঁড়ার শূণ্য, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই। তোমার দেওয়া এই অন্নে শুধু আমার নয়, জগতের সমস্ত জীবের ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে, এ আমি নিশ্চয় জানি”আশ্চর্য, কৃষ্ণের সেই অদ্ভূত লীলায় মুনি দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যরা স্নান সেরে সন্ধ্যা আহ্নিক করতে করতে অনুভব করলেন তাঁদের সকলের উদর পরিপূর্ণ, অন্নগ্রহণের এতটুকুও আর স্থান নেই। অপ্রস্তুত হয়ে নদীকূল থেকেই তাঁরা সকলে চলে গিয়েছিলেন, আমাদের আশ্রমে আর ফিরে আসেননি।

এই কৃষ্ণের প্রভাবেই আমি শূলপাণি মহাদেব ও উমাদেবীকে অবাক করে পাশুপত অস্ত্র লাভ করেছিলামএই কৃষ্ণের জন্যেই আমি এই নরদেহে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে বসতে পেরেছিলাম। যখন আমি ইন্দ্রলোকে ছিলাম নিবাত, কবচ দৈত্যদের বিনাশ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কৃষ্ণের প্রভাবেই। এই কৃষ্ণকে আমি হারিয়েছি, দাদা। এই কৃষ্ণ বন্ধুরূপে আমার সঙ্গে ছিলেন বলেই, আমি ভীষ্মের মতো প্রবল সেনানীদেরও পরাজিত করে, বিরাট রাজার গোধন ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। তারপর মোহনাস্ত্র প্রয়োগ করে, শত্রুদের ঘুম পাড়িয়ে তাঁদের সকলের মাথার মণি ও মুকুট আহরণ করে আনতে পেরেছিলাম।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আমার রথের সারথি হয়ে আমার সামনে বসে, এই কৃষ্ণই তাঁর কালদৃষ্টি দিয়ে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্য প্রমুখ বীরদের আয়ু, উৎসাহ, শক্তি ও বীর্য ক্ষয় করে দিয়েছিলেননৃসিংহ ভক্ত প্রহ্লাদকে যেমন অসুরদের কোন অস্ত্র স্পর্শ করতে পারত না, তেমনি আমাকেও ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্যদের মতো বীরদের অস্ত্র থেকে কৃষ্ণই বারবার রক্ষা করেছেনআমরা মূর্খ, তাই তাঁকে আমরা রথের সামান্য সারথি করে রেখেছিলাম।

আর এক দিনের কথা মনে পড়ছে দাদা, কুরুক্ষেত্রে জয়দ্রথ বধের দিন, আমার ঘোড়াগুলো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রথ থেকে নেমে আমি ওদের জল খাওয়াচ্ছিলাম। বিপদের কথা আমার মনেও হয়নি, আর কি আশ্চর্য দাদা, আমি যতক্ষণ ঘোড়াগুলিকে জল খাওয়াচ্ছিলাম, কৃষ্ণের মায়ায় কেউ আমার দিকে একটা অস্ত্রও প্রয়োগ করেনি। যদি করত, আজ আমি তোমার সামনে থাকতে পারতাম না, দাদা। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণকে হারিয়ে আমি সবদিক দিয়েই নিঃস্ব ও দুর্বল।

কত দিন আমি কৃষ্ণের সঙ্গে একসাথে বসে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি, শুয়েছি। মাধব সর্বদা হাসিমুখে আমায় অর্জুন, পার্থ, সখে কিংবা কুরুনন্দন বলে ডাকতেন। কতদিন পরিহাসছলে তাঁকে কত কথা বলেছি। আজ মনে হচ্ছে, সে সব কথা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি কিন্তু কিছু মনে করেননি। পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর এবং পতি যেমন পত্নীর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন, তিনিও আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। 

[গীতা - ১১শ পর্ব -এর ৪৪ সংখ্যক শ্লোকেও অর্জুন প্রায় একই কথা বলেছেন। পাশের সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন।]  

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের লীলা সংবরণের পর তাঁর মহিষীদের সুরক্ষার জন্যে আমার সঙ্গে নিয়ে আসছিলাম। আসার পথে একদল নীচ গোপসৈন্য আমাকে অসহায় অবলার মতো পরাস্ত করে, তাঁদের হরণ করে নিয়ে চলে গেল, আমি কিছু করতে পারলাম না। আমি সেই অর্জুন, আমার সঙ্গে সেই রথ, আমার কাছে সেই তির-ধনুক, অস্ত্র-শস্ত্র, যা দেখে একসময় মহাবীর রাজারাও ভয়ে মাথা নত করত, কিন্তু কৃষ্ণ বিরহে আজ আমি অক্ষম হয়ে গেছি। দ্বারকাপুরে যে বন্ধুগণের কুশল সংবাদ তুমি জিজ্ঞেস করলে, দাদা, তারা মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সকলে মারা গেছে, বেঁচে আছেন মাত্র চার পাঁচজন।

প্রাণীগণ যে পরস্পরের সঙ্গে শত্রুতা করে অথবা সৌহার্দ সূত্রে আবদ্ধ হয়, সে সবই ভগবানের কার্য, তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহাবীর যদুসৈন্যদের দিয়ে ভারতের অন্যান্য দুর্ধর্ষ বীর অত্যাচারী রাজাদের বিনাশ করেছিলেন। সবার শেষে যদুবীরদের দিয়েই যদুবীরদের বিনাশ করে, তিনি পৃথিবীর ভার হরণ করলেন। সকল মানুষের মধ্যে এনে দিলেন সমমনোভাব”

শ্রীকৃষ্ণমহিমার কথা বলতে বলতে, তাঁর কথা চিন্তা করতে করতে অর্জুনের মনে শান্তি ও বৈরাগ্যের উদয় হল। তাঁর মনে পড়ে গেল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে শোনা সেই পরমতত্ত্বকথা। সেই উপলব্ধি থেকে তাঁর মনের সমস্ত কামনা বাসনা দূর হয়ে গেল, দূর হয়ে গেল অজ্ঞানযুধিষ্ঠিরও ভগবানের লীলা সংবরণ ও যদুকুলের বিনাশের কথা শুনে স্থির করে ফেললেন, সবকিছু ছেড়ে তিনিও বেরিয়ে পড়বেন মহাপ্রস্থানের পথে। মাতা কুন্তীও সব ঘটনার বিবরণ শুনে ভগবানের পাদপদ্মে একান্ত ভক্তিসহকারে নিজের মন প্রাণ সমর্পণ করে পরম মুক্তির অপেক্ষা করতে লাগলেন।

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, যদুবংশীয় ও যে সকল অসুর রাজকুলে জন্ম নিয়ে পৃথিবীকে ভারযুক্ত করেছিল, তারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের তনু। প্রথমটিকে যাদব-তনু এবং দ্বিতীয়টিকে ভূভার-তনু বলা যেতে পারে। পায়ে ফোটা কাঁটা যেমন লোকে আরেকটি কাঁটা দিয়ে তুলে ফেলার পর, দুটি কাঁটাকেই পরিত্যাগ করে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ যাদব-তনুর সাহায্যে ভূভার-তনুর বিনাশ করে, অবশেষে যাদব-তনুরও সংহার করলেন। কারণ উভয়েই সংহারযোগ্য বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমান।

যেদিন ভগবান মুকুন্দ এই পৃথিবীর লীলা সাঙ্গ করে, নিজের মূর্তিতে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গেলেন, সেই দিন অবিবেকীদের অমঙ্গলকারী কলি পূর্ণরূপে আবির্ভূত হল। বিচক্ষণ রাজা যুধিষ্ঠির নগরে, জনপদে, নিজের গৃহে ও নিজেদের মনে লোভ, মিথ্যা, হিংসা, কুটিলতা ও অধর্মের প্রবৃত্তিকে কলির প্রসার বলে বুঝতে পারলেন, এবং মহাপ্রস্থানে যাত্রার বেশ ধারণ করলেন। তারপর বিনীত ও সর্বগুণে নিজের তুল্য পৌত্র পরীক্ষিৎকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসালেন। অন্যদিকে অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে মথুরার সিংহাসনে বসিয়ে শূরসেন দেশের অধিপতি করলেন। সকল কর্তব্যের পর মহারাজা যুধিষ্ঠির প্রাজাপত্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেন। তাঁর অগ্নিগৃহে তিনটি অগ্নিকুণ্ড বর্তমান ছিল, প্রতিদিন সেই তিন অগ্নিতে তিনি গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণ নামক হোম যথা নিয়মে করতেন। এখন তিনি প্রাত্যহিক হোম কার্য পরিত্যাগ করে মহাপ্রস্থানের জন্য প্রস্তুত। সুতরাং তিনি নিজের আত্মাকেই অগ্নিকুণ্ড কল্পনা করে, মনে মনে হোমক্রিয়া সমাপ্ত করলেন। তারপর সেই স্থানেই তিনি রাজোচিত পট্টবস্ত্র, অলংকার, সাজসজ্জা ত্যাগ করে নিষ্ঠুরভাবে সংসারের বন্ধন ছিন্ন করলেন। এরপর হৃদয়ে পরব্রহ্মের ধ্যান করতে করতে তিনি উত্তরে হিমালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করলেন, কারণ, উত্তরদিকের হিমালয় প্রদেশে গেলে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না। তাঁর অনুজ ভাইয়েরাও সকলে তাঁর অনুগমন করলেন। অন্যদিকে বিদুরও প্রভাসক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণে মন প্রাণ সমর্পণ করে দেহরক্ষা করলেন। দ্রৌপদীও তাঁর পতিদের এই নির্মম ও উদাসীন ভাব দেখে, ভগবানের প্রতি অবিচলিত ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম লাভ করলেন।

যিনি শ্রীকৃষ্ণের একান্ত ভক্ত পাণ্ডুপুত্রগণের এই অতি পবিত্র মহাপ্রস্থানের কথা শোনেন, তিনি শ্রীহরির চরণ অরবিন্দে ভক্তিলাভ করেন ও সিদ্ধ অবস্থা পেয়ে থাকেন” 

চলবে...             

নতুন পোস্টগুলি

নিত্যযাত্রী

   এর আগের রম্যকথা - "  অবিচলিত থাকা   " হেউ। মুখে ভাজা মৌরির দানা ফেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই ঢেঁকুরটা উঠল। লোহার গেটের হাঁসকল...