বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১



দ্বিতীয় স্কন্ধ - প্রথম পর্ব

ভাগবত পুরাণের মাহাত্ম্য 

শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনি যে প্রশ্ন করলেন, সেই প্রশ্ন নরলোকের হিতকর, মুক্ত আত্মা জ্ঞানীগণের সম্মত এবং মানুষের শোনার মতো যা কিছু আছে তার মধ্যে এই বিষয়ই সার ও শ্রেষ্ঠ। গৃহস্থাশ্রমে গৃহীর পিপীলিকা, কীট, পতঙ্গ ইত্যাদি প্রাণীহিংসা অনিবার্য এবং বিষয়ে আসক্তি থাকায় আত্মতত্ত্ব জানতে পারে না। সুতরাং এই ধরনের মানুষের শোনার মতো এবং অনুষ্ঠান করার মতো হাজার হাজার বিষয় আছে। যিনি মোক্ষলাভ করার ইচ্ছা করেন, তাঁর সকলের অন্তর্যামী ও নিয়ন্তা ভুবনসুন্দর শ্রীহরির চরিত্র কথা শ্রবণ, স্মরণ ও কীর্তন করা কর্তব্য। যে মানুষের অন্তিমকালে শ্রীনারায়ণ স্মরণে আসেন, তাঁর মানবজন্মলাভ সার্থক। যা আত্মা নয়, তার থেকে আত্মাকে পৃথক জানার যে জ্ঞান তাকে সাংখ্য বলে। ইন্দ্রিয়দমন প্রভৃতি আট প্রকার সাধনার নাম অষ্টাঙ্গযোগএই সাংখ্য ও যোগ অনুষ্ঠানে এবং নিজের বর্ণ ও আশ্রমের কর্তব্য অনুষ্ঠানে যদি নারায়ণ স্মৃতিপথে উদিত হন, তবেই মানবজন্মের সবথেকে উৎকৃষ্ট লাভ বিবেচনা করা হয়।

যে সকল মুনি শাস্ত্রের নিয়ম ও নিষেধের অতীত নির্গুণ ব্রহ্মলাভ করেছেন, তাঁরাও শ্রীহরির গুণকীর্তন শুনে অতুল আনন্দ উপভোগ করেন। আমি দ্বাপর যুগের শুরুতে আমার পিতা দ্বৈপায়ণের কাছে একটি গ্রন্থ পাঠ করেছিলাম, শ্রীমৎভাগবত। এই ভাগবতপুরাণ শ্রীহরির নামে ও বিষয়ে পরিপূর্ণ এবং সমস্ত বেদের সমতুল্য। আমি নির্গুণ ব্রহ্মে সম্যক অবস্থান করেও, শ্রীহরির লীলা মাধুর্যের জন্য আমি এই আখ্যান পাঠে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। আপনি বিষ্ণুভক্ত, অতএব আমি আপনার কাছে এই আখ্যান বর্ণনা করব। যিনি শ্রদ্ধা নিয়ে এই পুরাণ শোনেন, তাঁর মনে অতি দ্রুত মুকুন্দের প্রতি অহৈতুকী মতির উদয় হয়। যাঁরা শ্রীহরির কাছে অভয়ফল কামনা করেন, কিংবা যাঁরা মোক্ষলাভ করতে চান তাঁরা হরিনামকীর্তন সাধনে ওই সকল ফল লাভ করতে পারেন। আর যাঁরা জ্ঞানী, নামকীর্তনই তাঁদের কাছে জ্ঞানের ফল। সুতরাং সিদ্ধ হোন কিংবা সাধক, এর থেকে ভালো কোন উপায় আর দ্বিতীয় নেই।

এই জগতে মানুষের অজান্তে বহুবছর ব্যর্থ যায়, মানুষের মনে এক মূহুর্তও বৃথা যাচ্ছে এই বোধ যখন আসে, সেটাই বহু বছরের থেকে বেশী ফলদায়ক। কারণ ওই জ্ঞান এলে, মানুষ নিজের মঙ্গলের চিন্তা শুরু করে। খট্টাঙ্গ নামে এক রাজর্ষি দেবগণের থেকে জানতে পেরেছিলেন, তাঁর মূহুর্তকাল মাত্র আয়ু অবশিষ্ট আছে, তৎক্ষণাৎ সকল আসক্তি বিসর্জন দিয়ে, ওই রাজর্ষি শ্রীহরির অভয়পদ লাভ করেছিলেন। হে কুরুকুলতিলক, আজ থেকে আপনার এখনও সপ্তাহকাল পরমায়ু অবশিষ্ট আছে, আপনি ইতিমধ্যে পরলোকের পক্ষে যা হিতকর তার অনুষ্ঠান করুন”

শ্রীশুকদেব আরো বললেন, “হে রাজন, পুরুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হলে, নির্ভয়ে পুত্রকলত্র ইত্যাদি থেকে সমস্ত আসক্তি  মুছে ফেলতে হবে। ঘরে থাকলে এই আসক্তি বিনাশের পরেও আবার ফিরে আসতে পারে, সেই কারণে ঘর ছেড়ে তীর্থস্থানে গিয়ে, নির্জন পবিত্র স্থানে কুশ, মৃগচর্মের আসনে বসতে হবে। তারপর অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের প্রণবরূপ ব্রহ্মবীজ মনে মনে জপ করতে হয়। জপ করতে করতে প্রাণায়ামে শ্বাস জয় করে মনকে বশীভূত করতে হবে। তারপর স্থির বুদ্ধি দিয়ে মনের থেকে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয়ের যোগ ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম বিধিকে প্রত্যাহার বলে। কর্মবাসনায় মন আবার যদি চঞ্চল হয়ে ওঠে, তাহলে বুদ্ধি দিয়ে শ্রীভগবানের রূপ ধারণা করতে হয়। শ্রীভগবানের সমগ্র রূপ চিত্তে ধারণার পর, তাঁর চরণ ইত্যাদি এক একটি অঙ্গের ধ্যান করলে, মন বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তাশূণ্য হয়। মনের এই অবস্থায় পরমানন্দের স্ফূর্তি ও পরমা শান্তি লাভ করা যায়। মনের এই অবস্থাকে বলে সমাধি এবং এই ভাবেই শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ লাভ করা যায়। রজোগুণে আবার যদি মন আক্ষিপ্ত অর্থাৎ চঞ্চল হয়, অথবা তমোগুণে মন বিমূঢ় অর্থাৎ নিদ্রিত হয়, তাহলে আবার প্রত্যাহার ও সমাধির ধারণায় মনকে শোধণ করতে হয়। এই ধারণাই মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণের বিনাশ করে এবং এই ধারণা দৃঢ় হলে শ্রীভগবানের অমল মূর্তি দেখতে দেখতে মনে ভক্তিযোগ আসে”

মহারাজ পরীক্ষিৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রহ্মন, যে ভাবে ও যে ধারণায় মন থেকে রজোগুণ ও তমোগুণ আশু দূর হয়, আপনি সেই ধারণার কথা উপদেশ করুন”

ঈশ্বরের দেহতত্ত্ব 

শ্রীশুকদেব বললেন, “প্রথমে পদ্মাসন কিংবা অন্য আসন অভ্যাস করে, প্রাণায়ামের সাহায্যে প্রাণবায়ু জয় ও আসক্তি ত্যাগ করে, সকল ইন্দ্রিয়কে সংযত করবেন। তারপর ভগবানের স্থূলরূপ মনের মধ্যে ধারণা করবেন। এই যে ব্রহ্মাণ্ড দেখছেন, এটিই ভগবানের বিরাট দেহ। এই দেহ স্থূল বস্তুর থেকেও স্থূল। ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু অতীত হয়েছে, বর্তমানে যা কিছু আছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু সৃষ্টি হবে, সব এই স্থূল দেহেই আশ্রয় পায়। এই বিরাট দেহের ক্ষিতি, জল, তেজ, বায়ু ও আকাশ - এই পঞ্চভূত, অহঙ্কারতত্ত্ব ও মহত্তত্ত্ব অর্থাৎ সমষ্টিবুদ্ধি, এই সাতটি আবরণ আছে। এই দেহের মধ্যে অন্তর্যামী হয়ে যে ভগবান বিরাজ করছেন, তাঁকে বৈরাজ পুরুষ বলে। সাধক আসলে এই পুরুষেই মনের ধারণা করে থাকেন।

হে মহারাজ, এই বিশ্বের স্রষ্টা পুরুষের বিরাট দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিভাগ কীর্তন করছি মন দিয়ে শুনুন। পাতাল এঁর পায়ের তলা। রসাতল পায়ের পিছন ও সামনের অংশ। মহাতল দুই গোড়ালি ও তলাতল এঁনার দুই জঙ্ঘাসুতল এই বিশ্বমূর্তির জানু, বিতল ও অতল দুই উরু, মহীতল জঘনদেশ এবং নভস্তল অর্থাৎ ভুবর্লোক বা প্রেতলোক এঁনার নাভি সরোবর। স্বর্লোক অর্থাৎ স্বর্গলোক এঁনার বক্ষ, মহর্লোক গ্রীবা, জনলোক মুখ, তপোলোক কপাল এবং সত্যলোক এই পুরুষের মস্তক। ইন্দ্র প্রমুখ তেজস্বী দেবতারা এই আদিপুরুষের বাহু, অশ্বিনীকুমারদুইজন নাসিকা ও ঘ্রাণ শক্তি, প্রদীপ্ত অগ্নি এঁনার মুখ। অন্তরীক্ষ শ্রীবিষ্ণুর নেত্র গোলক ও সূর্য দর্শনের শক্তি, দিন ও রাত্রি চোখের রোম, ব্রহ্মপদ ভ্রূভঙ্গী, জল এঁনার রসনা ও রস গ্রহণের শক্তি। সমস্ত বেদ এই অনন্ত পুরুষের ব্রহ্মরন্ধ্র, যম এঁনার দন্ত ও স্নেহ দাঁতের শক্তি, মায়া এঁনার হাসি এবং অপার সংসার এঁর নয়নের কটাক্ষ। লজ্জা এই পুরুষের উত্তরোষ্ঠ, লোভ অধরোষ্ঠ, ধর্ম স্তন, অধর্ম পৃষ্ঠদেশ, প্রজাপতি জননেন্দ্রিয়, মিত্রাবরুণ দুইকোষ, সমুদ্রসকল এঁনার কুক্ষিদেশ এবং গিরিসমূহ অস্থিহে নৃপেন্দ্র, সমস্ত নদী এঁনার নাড়ী, বৃক্ষসমূহ শরীরের রোমরাজি, অনন্তশক্তি বায়ু এঁনার শ্বাস, কাল এঁনার গমন এবং প্রাণীগণের সংসার এই পুরুষের ক্রীড়া। হে কুরুশ্রেষ্ঠ, মেঘসমুহ এঁনার কেশ, সন্ধ্যা এঁনার বস্ত্র, প্রকৃতি হৃদয় এবং সকল বিকারের আশ্রয় চন্দ্রমা এঁনার মন। মহত্তত্ত্ব  এই সর্বাত্মার চিত্ত অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির আধার, শ্রীরুদ্র এঁনার অহঙ্কার, অশ্ব, অশ্বেতরী উট, হাতি এঁনার নখ এবিং মৃগ ইত্যাদি সকল পশু এঁনার কটিদেশ বলা হয়। পক্ষসমূহ এঁনার শিল্পনৈপুণ্য, স্বায়ম্ভূব মনু এঁনার বুদ্ধি, মানুষ এঁনার নিবাস। গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ ও অপ্সরাগণ এঁনার স্বর এবং অসুরশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ এঁনার স্মৃতি। ব্রাহ্মণ এই পুরুষের মুখ, ক্ষত্রিয় হাত, বৈশ্য উরু ও তমঃপ্রধান শূদ্র এঁনার চরণ এবং যজ্ঞই এই পুরুষের কর্ম।

হে মহারাজ, আমি ঈশ্বরদেহের যে অবয়ব বিন্যাস বললাম, এ ছাড়া অন্য কোন বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়, মুক্তিকামী ব্যক্তিরা নিজের বুদ্ধিতে ভগবানের এই স্থূলতম দেহে মনের ধারণা করে থাকেন। সত্যস্বরূপ আনন্দনিধি ভগবানে এই স্থূল বিশ্ব ও জীবসমূহকে লীন করে তাঁর ভজনা করাই বিধেয়, নয়তো অন্য বস্তুতে আসক্তি হলে, জীবাত্মার সংসাররূপ অধোগতি লাভ হয়।

চলবে...

 


বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ২

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


এর আগের পর্ব - "  ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "


পর্ব - ২


সূর্য ঘড়ি, জল ঘড়ি দিয়ে যে সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ করা যায় না, তাছাড়া তাদের নানান সমস্যার কথা গত পর্বেই লিখেছি। সে সব সমস্যা মিটিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে সময়ের পরিমাপ করার চেষ্টা কম হয়নি সে যুগে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এমন ঘড়ি তৈরি সম্ভব হল এই সেদিন, মোটামুটি ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে। এই ঘড়িগুলিই প্রথম দিককার যান্ত্রিক ঘড়ি। এই ঘড়ি বানানোর বিষয়ে সে যুগে কাদের অবদান সবথেকে বেশি, সেটা জানলে ভীষণ আশ্চর্য হবে! সে যুগে যান্ত্রিক ঘড়ি বানানোর ব্যাপারে সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল চার্চের monk বা সন্ন্যাসীদের। ৯৯৬ সালে আবিষ্কার করা প্রথম যে যান্ত্রিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করলাম, সেই ঘড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী কালে জার্মানের ম্যাগড়েবুর্গ (Magdeburg) শহরের পোপ হয়েছিলেন, নাম পোপ সিলভেস্টা টু (Pope Sylvester II) চার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রীতিনিয়মের জন্যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ এতটাই জরুরি ছিলে যে, ধর্ম আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি বানানোতেও তাঁরা গভীর মনোনিবেশ করতেন। তবে সে ঘড়ির আর অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে প্রাচীন যে যান্ত্রিক ঘড়ি লণ্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে রাখা আছে, সেটি চতুর্দশ শতাব্দীর এক সন্ন্যাসীর বানানো। তাঁর নাম পিটার লাইটফুট (Peter Lightfoot), তিনি গ্ল্যাসটনবেরির (Glastonbury) সন্ন্যাসী ছিলেন।

যান্ত্রিক ঘড়ির রহস্যটা বুঝতে গেলে প্রথমেই এস্কেপমেন্ট (Escapement) ব্যাপারটা বোঝা দরকার। ইংরিজিতে to escape মানে পালানো, সে তো জানোই। যান্ত্রিক ঘড়ির মধ্যে পালানো আর ধরে ফেলা এই  চলতে থাকে নিরন্তর। পাশের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।

ছবিতে দেখ অনেক খাঁজকাটা একটা লোহার চাকা রয়েছে, যার কেন্দ্রে একটা পিন দিয়ে তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। ধরে আছে মানে চাকাটা নড়াচড়া করতে পারবে না, কিন্তু পিনটাকে অক্ষ করে ঘুরতে পারবে।  এই চাকার পিছনে ঝোলানো থাকে তিরের ফলার মতো দেখতে লম্বা লোহার একটা কাঠি, ওই তিরের ফলার দুই ধারে হুকের মতো খাঁজ কাটা আছে। ওই তিরের মতো কাঠিটাও নড়বে চড়বে না, কিন্তু তার ভরকেন্দ্রে, মাথার কাছে ছোট্ট ছিদ্রটাকে অক্ষ করে দু পাশে দুলতে পারবে।

এইবার ওই লোহার কাঠিটাকে নির্দিষ্ট মাপে যদি দোলানো যায়, তাহলে তার হুকের ধাক্কায় লোহার চাকাটা ঘুরবে, কিন্তু দুলতে থাকা তিরের অন্য হুকের জন্যে চাকাটা মাত্র এক ঘাটের বেশি ঘুরতে পারবে না। অর্থাৎ তিরের ধাক্কায় চাকাটা যেন পালাতে চাইছে, কিন্তু অন্য ঘাটটা চাকাটাকে পালাতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই এস্কেপমেন্টের মূল তত্ত্ব।

এবার তীরের মতো কাঠিটাকে দোলানোর জন্যে প্রথমদিকে ভারি ওজন ঝোলানো হত, পরের দিকে স্প্রিংয়ের সঙ্গে পেণ্ডুলাম এবং তারও পরে ব্যলান্স-হুইল (balance wheel) ব্যবহার করা হত। খাঁজকাটা ওই চাকার নাম হুইল গিয়ার (wheel gear) দুলতে থাকা ওই কাঠি আর হুইল গিয়ারের ধাক্কার থেকেই আওয়াজ হত “টিক-টক” বা “টিক-টিক” আর সেই থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্ত, ঘড়ি আর ওই আওয়াজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

ভারি ওজন ঝোলানো ঘড়িগুলো আকারে বিশাল বড়ো আর ভারি হত। এই ঘড়িগুলি সাধারণতঃ বড় বড়ো চার্চের মাথায় কিংবা শহরের প্রধান জায়গায় বেশ উঁচু ঘড়িঘর বানিয়ে তার মাথায় বসিয়ে রাখা হত। ওই সব ঘড়িতে প্রহর ঘোষণার জন্যে ঘড়ির সঙ্গে বড় বড় ঘন্টাও রাখা হত। প্রতি ঘন্টায় সে সব ঘন্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বাজত, ঢং ঢং। শহরের লোক নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘন্টা শুনে বুঝতে পারতো কটা বাজে। আমাদের দেশে সময়ের পরিমাপ ঘটিকা বা ঘন্টা (hour) এইভাবেই পেতল বা অন্য ধাতু দিয়ে বানানো ঘন্টা (bell)-র সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।

 

পেণ্ডুলাম ঘড়ি

এতদিন ধরে যে যান্ত্রিক ঘড়ি চলছিল, সেগুলো বেশ জবড়জং জটিল আর খুব ভারি লোহা, ইস্পাত দিয়ে বানানো ভজকট ব্যাপার। ওপরের ছবিটা দেখ না, দেখে কী মনে হচ্ছে, যে ওটা একটা ঘড়ির অন্দরমহল!  কাজেই এই ঘড়িকে আরো উন্নত করে, কীভাবে আরো সহজ সরল যন্ত্র তৈরি করা যায়, যা দিয়ে আরো সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব করা সম্ভব, সে প্রচেষ্টা চলছিলই!  তাছাড়া দেশের ধনী ব্যক্তিরাও চাইছিল, তাদের প্রাসাদে এবং সম্ভব হলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সুন্দর সাজিয়ে রাখার মতো একটা করে ঘড়ি হোক, যাতে সাধারণ মানুষের মতো ঘড়িঘরের ঘন্টার আওয়াজ শুনে সময়ের হিসেব করতে না হয়।


    ১৫৮০ সালে ইটালির গ্যালিলিও গ্যালিলি পেণ্ডুলাম আবিষ্কার করলেন এবং তিনি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য এক তত্ত্ব। একটি সাধারণ পেণ্ডুলাম বলতে সুতোয় ঝোলানো একটি বল বা ওজনকে বোঝায়, ওই সুতো যতো সূক্ষ্ম ও হাল্কা হবে পেণ্ডুলাম তত ভালো কাজ করবে, অবিশ্যি সুতোটা যথেষ্ট শক্তও হতে হবে, যাতে বলটি ছিঁড়ে না পড়ে যায়। এবার ওই সুতোর অন্য প্রান্তটি কোন একটি কীলক বিন্দুতে (pivot point) ঝুলিয়ে, যদি দুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুতোয় বাঁধা বলটি নির্দিষ্ট গতিতে ডান থেকে বাঁদিকে সমান দূরত্বে  দুলতে (oscillate) থাকে।  আদর্শ শর্ত (ideal conditions) অনুযায়ী এই বলটির অনন্তকাল একই দূরত্বে, একই গতিতে দুলতে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, কারণ, সূক্ষ্ম ভরহীন সূতো (mass-less rod or thread) দিয়ে ভরগোলক (mass bob) ঝোলানো অসম্ভব, যাকে কেন্দ্র করে পেন্ডুলাম দুলবে, সেই কীলকটি ঘর্ষণহীন (frictionless pivot) হওয়াও অসম্ভব।  তাছাড়া আছে বাতাসের ঘর্ষণ।

পেণ্ডুলামের এই নির্দিষ্ট সময়ের দোলাকে (oscillation) কাজে লাগিয়ে যে ঘড়ি বানানো সম্ভব, সে কথা গ্যালিলিও আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এবং ঘড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানাতে পারেননি। তার পরিবর্তে ১৬৫৬ সালে ক্রিস্টিয়ান হিউজেন্স (Christiaan Huygens) নামে একজন ডাচ অংকবিদ ও বিজ্ঞানী প্রথম এই পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানিয়েছিলেন। 

      

ওপরের ছবিদুটি হিউজেন্স সায়েবের বানানো প্রথম পেণ্ডুলাম ঘড়ির ছবি। বাঁদিকের ছবিটি বাইরে থেকে ঘড়ির চেহারা, আর ডানদিকের ছবিটি ঘড়ির অন্দরের কলকব্জার ছবি। দুটি ছবিতেই পেণ্ডুলামের গোলকদুটি চিনতে পারছো নিশ্চয়ই। ওই পেণ্ডুলামের সাহায্যে এস্কেপমেন্ট সিস্টেম কাজে লাগিয়ে এই ঘড়ি বানানো হয়েছিল। প্রথম দিকের এই ঘড়িতে দিনে মাত্র এক মিনিটের ভুল (error) হতো!

গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক 


একবার পেণ্ডুলাম ঘড়ি চালু হয়ে যাওয়াতে, ইংল্যাণ্ডে এই ঘড়ি বানানোর যেন হিড়িক পড়ে গেল। ১৬৭০-৭১ সালে উইলিয়াম ক্লিমেন্ট নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক, বিশাল বাক্সের মধ্যে  পেণ্ডুলাম ঘড়ি বানিয়ে ফেললেন, সে ঘড়ির নাম ঠাকুরদাদা ঘড়ি (Grandfather clock)।

১৭০০ সালের এরকমই একটি গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক দোরাব টাটাজি মুম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েল্‌স্‌ মিউজিয়ামে দান করেছিলেন। এই ঘড়ির ডায়ালে তামিল ভাষায় ১ থেকে ১২ সংখ্যা লেখা আছে। মনে করা হয়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মাদ্রাজের শিল্পকলা স্কুল থেকে এটির বাইরের বাক্সটি বানানো হয়েছিল, সেই সময়েই তামিল ভাষায় সংখ্যাগুলি লেখা হয়েছিল।



ক্লিমেন্ট সায়েবের পরে কয়েক বছরের মধ্যে পেণ্ডুলাম ও এস্কেপমেন্ট পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়ে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানোর মতো সুদৃশ্য ছোট ঘড়ি, প্রচুর পরিমাণে বানানো শুরু হয়ে গেল। সে সব ঘড়ি আমাদের ছোটবেলাতেও অনেক উচ্চবিত্ত বাড়িতেই দেখা যেত। এইগুলিকেই আমরা দেওয়াল-ঘড়ি (wall clock) বলতাম   





আকারে বড়ো হোক কিংবা ছোট, পেণ্ডুলাম ঘড়ি, বড় হল ঘরের মেঝেয় বসিয়ে কিংবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সময় দেখার জিনিষ। পথে ঘাটে, দূর বিদেশের অপরিচিত জায়গায় সময় জানতে গেলে সে ঘড়ি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাছাড়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভালো কাজ করে, একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অথবা ঝুলে থাকলে, একটু নড়াচড়া হলেই ঘড়ি বিগড়ে যেত। অতএব, আকারে ছোট্ট, পকেটে রাখা যায় এবং ঠিকঠাক সময়ও দেখা যায় এমন ঘড়ির ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে গেল।

ক্রিশ্চিয়ান হিউজেন্স, যাঁর উন্নত পেণ্ডুলাম ঘড়ি আবিষ্কারের কথা আগেই বলেছি, তিনি পেণ্ডুলামের পরিবর্তে ব্যালান্স স্প্রিং (Balance Spring) এবং ব্যালান্স হুইল (Balance Wheel) দিয়ে ছোট্ট ঘড়ি যে বানানো সম্ভব সেই আবিষ্কারের কথা তখনকার দিনের বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। এবং  ১৬৭৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, স্পাইর‍্যাল ব্যালান্স স্প্রিং (Spiral balance spring) বা স্পাইর‍্যাল হেয়ার স্প্রিং (spiral hair-spring) ব্যবহার করে, সর্বদা কাছে রাখার মতো ছোট্ট ঘড়ি বানিয়ে ফেলে নতুন যুগের সূচনা করে ফেললেন!  এই ঘড়িরও মূল তত্ত্ব সেই এস্কেপমেন্ট তত্ত্ব, যার কথা তোমাদের আগেই বলেছি। এর পরের পর্বে আসবে টাইম পিস (time piece) এবং পকেট ঘড়ি (Pocket watch) নিয়ে আলোচনা। 

তথ্য ও চিত্র ঋণঃ - আই আই টি, কানপুর ও উইকিপিডিয়া। 

চলবে...



মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ 


২৮

 

পরের দিন সকালে বসে অনেকক্ষণ ছেলেদের মহড়া দেখছিল ভল্লা। একসময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিছুই হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না...এভাবে তোরা কোনদিনই কোথাও পৌঁছতে পারবি না...”। ভল্লার কথায় ছেলের দল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরে শল্কু বলল, “তুমি তো এভাবেই আমাদের অভ্যাস করতে বললে, ভল্লাদাদা”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “বলেছি। কিন্তু এমন তো বলিনি এটুকু শিখলেই আমাদের শিক্ষা সব শেষ? রণপায় চড়ে স্বাভাবিক হাঁটাহাঁটি করতেই কাল সারাটা দিন চলে গেল – এখনও ঠিকঠাক চলতে পারছিস না। টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিস বারবার। ভল্ল ছোঁড়ার অভ্যেস করতে বললাম, কুড়িবার ছুঁড়লে খুব জোর তিনবার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছিস। বাকিগুলো বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে নয়তো গাছের গুঁড়িতে বিঁধছে...। একই জিনিষ নিয়ে কতদিন কতবার রগড়াবি?”

কেউ কোন কথা বলল না, মাথা নীচু করে রইল। শল্কু বলে উঠল, “আহা একদিনেই সবাই পারে নাকি...সবাই কী আর তোমার মতো হতে পারে? তুমিই কী একদিনে সব শিখে ফেলেছিলে?”

ভল্লা বিরক্ত মুখে বলল, “একদিনে শিখে ফেলা যায় না, সে কথা তোর থেকে আমি অনেক ভালো জানি, শল্কু। কিন্তু কালকের শিক্ষার থেকে আজকের শিক্ষায় যদি কোন উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় – সে রকম দায়সারা শিক্ষায় লাভ কী? মনে এই সামান্য জেদটুকুই যদি না আসে – আজ যেটুকু শিখব সেটা নিখুঁত শিখব। আগামীকাল সেটাকে নিয়ে আবার না রগড়ে – নতুন কিছু শিখবো। তা নাহলে এতো অনন্তকাল চলতেই থাকবে...”।

ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “দ্যাখ সব জিনিষ সবাইকে দিয়ে হয় না। একলক্ষ লোকের মধ্যে খুব জোর হলে হাজার পাঁচেক রক্ষী হয় আর হাজার দুয়েক সৈন্য হয়। আমি আর দু’-তিনদিন দেখব...উন্নতির কোন লক্ষণ না দেখলে বলব”...ভল্লা হঠাৎ হাতজোড় করে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “ক্ষ্যামা দাও বাপাসকল, অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যাও – বাপের সঙ্গে চাষবাসের কাজে লাগো গে...নয়তো দীঘীর পাড়ের অশথ তলায়, গুটি সাজিয়ে বাঘবন্দী খেলো গে...”।  ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে রণপা নিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেদের অনুশীলনের মাঠ থেকে।

 

দুপুরে খেতে এসে রামালি বাসায় ফিরে দেখল, ভল্লা ঘরের সামনে নির্দিষ্ট পাথরে বসে গম্ভীর মুখে কিছু চিন্তা করছে। রামালি কিছু বলল না। ঘরে ঢুকে জলের কলসি নিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর স্নান সেরে ভরা কলসিটা ঘরে রেখে রান্নার যোগাড় করতে করতে লক্ষ্য করল, ভল্লা একই ভাবে বসে আছে। রামালি উনুন ধরিয়ে বলল, “কী ভাবছো, ভল্লাদাদা? তুমি রাগ করে চলে আসার পর ছেলেরা সত্যিই ভয়ানক পরিশ্রম করছে। ওরা আজ খেতেও যায়নি। বলেছে সন্ধ্যে পর্যন্ত অভ্যাস করে, কাল তোমাকে ওরা চমকে দেবে...”।

ভল্লা মুখ তুলে রামালির মুখের দিকে তাকাল। বলল, “তাই? আর ওই শল্কু?”

রামালি হাসল, বলল, “ওর তেমন হেলদোল নেই, ওর ধারণা ও সব শিখে ফেলেছে”।

“তাই, না? হতভাগার ডানা গজিয়েছে – পিমড়ে – ডানা গজালেই ভাবে উড়তে শিখেছে...মরবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া আর আসে না কেন রে?” বালিয়া নোনাপুর গ্রামেই থাকে, বাপ-ঠাকুদ্দাদের সময় থেকেই তারা লোহার কাজ করে। রামালি বলল, “লড়াই-টড়াই করা ওর পছন্দ নয়। শান্তিপ্রিয় নিরীহ ছেলে। ও বলে আমাদের খেটে খেতে হবে রামালিদা – লড়াই শিখে করবো কী আর খাবোই বা কী? ভল্লাদাদাকে বলো অন্য কাজ থাকলে, আমাকে যেন বলে”।

ভল্লা খুশি হল, বলল, “বাঃ, বালিয়া বেশ বুঝদার ছেলে তো! ঠিকই বুঝেছে - লড়াই সবার জন্যে নয়। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে, ওকে খবর পাঠাস তো। ওকে দিয়ে কিছু কাজ করাব। রণপাগুলোর তলায় লোহার খুড়ো আর ডগায় লোহার ফলা বসাতে হবে। এখন আমরা মাটিতে চলাফেরা করছি বলে তেমন ক্ষইছে না। কিন্তু পাথরে বাঁধানো পাকা রাস্তায় চললে বাঁশের ডগাগুলো দাঁতনের মতো ছরকুটে যাবে। লোহার খুড়ো দিয়ে বাঁধিয়ে নিলে বেশি দিন টিকবে”।

“আজ বিকেলেই এক ফাঁকে গিয়ে বলে আসবো”।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু কথা বলল না। রামালি রান্না নিয়ে ব্যস্ত, ভল্লা আগের মতোই চুপ করে বসে কিছু চিন্তা করতে লাগল। রান্নাটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি বটতলির সনাতন কবিরাজকে আমাদের গ্রামে পাঠিয়েছিলে?” রামালির আচমকা এই প্রশ্নে ভল্লা আকাশ থেকে পড়ল, “বটতলির সনাতন কবিরাজ? আমি তাকে চিনিই না, ডাকব কী করে?”।

অবাক হয়ে রামালি বলল, “তাহলে? কে ডাকল তাঁকে? আজ সকালে আমাদের গ্রামে এলেন। প্রধানমশাইকে, আমার কাকাকে দেখে গেলেন। বিনা দক্ষিণায় ওষুধ-পথ্যি করে গেলেন। কেন?” ভল্লার মনে পড়ল এবার, বলল, “ও হ্যাঁ হ্যাঁ। গতকাল বণিক অহিদত্তকে বলেছিলাম বটে। আমাদের কবিরাজকাকা তো গ্রামে নেই, যদি ওদিক থেকে কাউকে... বাঃ, তার মানে বণিক অহিদত্ত কথা রেখেছে? দেখে কী বলল?”।

রামালি মাথা নাড়ল, বলল, “কাকার অবস্থা তেমন কিছু নয়, দু-পাঁচদিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। কিন্তু প্রধানমশাইয়ের অবস্থা ভয়ংকর। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি অচৈতন্য থাকেন। সনাতন কবিরাজ তেমন ভরসা পাচ্ছেন না”।

“বলিস কী?”

রামালি কোন উত্তর দিল না, রান্না সারতে লাগল চুপ করে। ভল্লা আবার জিজ্ঞাসা করল, “আর ভীলককাকা?”

“ভীলককাকার তিনটে দাঁত ভেঙে গেছে – মাড়ি ফেটে গেছে। জিভও কেটে গেছে অনেকটা। চোয়ালে গভীর ক্ষত। কিছু বটিকা দিয়েছেন, জলে গুলে খাওয়াতে হবে আর প্রলেপ দিয়েছেন। বলেছেন সামনের তিন-চারদিন খুবই সংকট – সাবধানে থাকতে হবে। এরমধ্যে ক্ষতগুলো যদি বিষিয়ে না যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সেরে উঠবেন, নচেৎ...”।

ভল্লা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। রামালির রান্না হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করল, “চান করেছ ভল্লাদাদা? আমার রান্না হয়ে গেছে”।

ভল্লা বিষণ্ণ মুখে বলল, “এদিকে প্রধানমশাইকে প্রায় শেষ করে দিল আর ভীলককাকারও যা অবস্থা কতদিনে সুস্থ হবেন তার ঠিকানা নেই। ওদিকে কবিরাজমশাইকেও আস্থানে নিয়ে গিয়ে, কী অত্যাচার করছে, কে জানে? ওই কটা রক্ষী এসে, নোনাপুর আর সুকরা গ্রামদুটোকে একেবারে কানা করে দিয়ে গেল”।

রামালি কিছুক্ষণ ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুমি চলে আসার পর মহড়ার মাঠে শল্কু বলছিল, তুমি রাজি হলে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা আস্থান আক্রমণ করব। গ্রামে এসে রক্ষীদের অত্যাচারের চরম শোধ তুলব আমরা”।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয়, তোরা পারবি?”

“আমাদের মধ্যে অন্ততঃ জনা ছয়েক বল্লম চালানো আর রণপা ব্যবহারে মোটামুটি দক্ষ তো হয়েছি”, ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “অবশ্য, সে বিচার তুমিই ভাল করতে পারবে। কিন্তু সুরুল আর আমার মত অন্য। এত তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বিপদ বাড়ানোর মানে হয় না। আমরা যতটুকু শিখেছি, তাতে রক্ষীদলের কোমর ভাঙা সম্ভব হবে না। উলটে আমাদেরই কোমর ভেঙে যেতে পারে। রক্ষীদলের দু-তিনজন হয়তো আমাদের হাতে মরবে, কিন্তু আমাদের মরবে কিংবা আহত হবে তার থেকে অনেক বেশি। আমাদের এই ছোট্ট দলের পক্ষে সে আঘাত হবে মারাত্মক। এবং সেই আঘাত সেরে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ই পাবো না। তার আগেই রক্ষীরা আমাদের গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে আমাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চিন্ত আশ্রয়গুলোকে উচ্ছন্ন দেবে”।

ভল্লা রামালির বিচক্ষণতায় আশ্চর্য হল। রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আস্থান থেকে যেদিন আমরা অস্ত্র লুঠ করলাম, সেদিন আমাদের গায়ে কোন আঁচও তো লাগেনি। তখন তো তোরা লড়াই করার কিছুই জানতিস না, তাই না? উলটে ওদেরই তো তিনজন পটল তুলল”।

রামালি অনেকক্ষণ ভল্লার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ভল্লাদাদা, একথার উত্তর দিলে ছোট মুখে বড়ো কথা হয়ে যাবে কিন্তু”।

ভল্লা রামালির মুখের ওই হাসি এবং তার কথা বলার ভঙ্গিতে রীতিমতো সতর্ক হয়ে উঠল। আচমকা বলে উঠল, “না রে, তোর কথা পরে শুনব। এখানে নয়, নিরিবিলিতে। খুব খিদে পেয়েছে। চট করে পুকুরে কটা ডুব দিয়ে আসি দাঁড়া – তুই খাবার বাড়…”।

রামালি গম্ভীর হয়েই ভল্লাদাদার কথাগুলো শুনলো, তার মুখে হাসি নেই। তবে তার মনে তৃপ্তির হাসি, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রাজাধিকারিকও তার কথায় এমন চমকে উঠল?

চলবে...

সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৮ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

ঊণবিংশ পর্বাংশ  


৪.৮.১২ মাদুরার পাণ্ড্য

পাণ্ড্যদের উৎপত্তি নিয়েও কাহিনী ও বিতর্কের শেষ নেই। পৌরাণিক মতে তাঁরা কোরকাইয়ের তিনভাইয়ের বংশধর, যাঁদের থেকে পাণ্ড্য, চোল এবং চেরা বংশের উৎপত্তি। আবার আরেকটি মতে তাঁরা মহাভারতের পাণ্ডবদের বংশধর। পাণ্ড্য রাজারা যদিও নিজেদের চন্দ্র বংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করেছেন। কাহিনী যাই হোক, পাণ্ড্যরা দক্ষিণ ভারতের প্রাক-আর্য জাতি, পরবর্তী কালে দক্ষিণ ভারতে আর্যদের উপনিবেশ গড়ে তোলার সময়, তাঁরা আর্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, নিজেদের গৌরব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

পাণ্ড্যরা দক্ষিণভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে এবং তার পূর্ব উপকূলে রাজত্ব করতেন। যদিও পাণ্ড্য বংশের রাজাদের পরাক্রম অনুযায়ী তাঁদের এই রাজ্যের সীমানা কখনো বেড়েছে, কখনো ছোট হয়েছে। সাধারণতঃ তাঁরা আধুনিক তিনটি জেলা, মাদুরা, রামনাদ, তিন্নেভেল্লি এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে রাজত্ব করেছেন। তাঁদের রাজধানী ছিল মধুরা (মাদুরা), যাকে দক্ষিণের মথুরা বলা হয়ে থাকে। তাঁদের প্রাচীন বাণিজ্যিক বন্দর ছিল তাম্রপর্ণী নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলের কোরকাই, পরবর্তীকালে নদীর ভৌগোলিক পরিবর্তন হওয়াতে, কয়ল হয়ে ওঠে তাঁদের প্রধান বন্দর।

পাণ্ড্যদের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন, কাত্যায়নের (বি.সি.ই চতুর্থ শতাব্দী) পাণিনি-ভাষ্যে পাণ্ড্যদের নাম প্রথম পাওয়া যায়। এরপর রামায়ণ ও মহাভারতেও তাঁদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। সিংহলের “মহাবংশ” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সিংহলের রাজকুমার বিজয়ের সঙ্গে পাণ্ড্য রাজকুমারীর বিবাহ হয়েছিল, ভগবান বুদ্ধের পরিনির্বাণের কিছুদিন পরেই। এরপর কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র”-এ বিশেষ এক ধরনের মুক্তার উল্লেখ করা হয়েছে, যার উৎস ছিল পাণ্ড্যকাবটক। আবার মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে পাওয়া যায়, পাণ্ড্যরাজ্য নাকি পরিচালনা করতেন মহিলারা। তবে সব থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে। যেখানে বলা হয়েছে, মৌর্য সাম্রাজ্যের দক্ষিণতম সীমার বাইরে পাণ্ড্যদের স্বাধীন রাজ্য ছিল। এরপর কলিঙ্গরাজ খারবেলের শিলালিপি থেকে জানা যায়, পাণ্ড্য রাজারা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং তিনি পাণ্ড্যদের থেকে ঘোড়া, হাতি, রত্ন, রুবি এবং অজস্র মুক্তা উপহার পেয়েছিলেন। এরপর রোমান ঐতিহাসিক স্ট্রাবোর লেখায় “রাজা পাণ্ডিয়ন”-এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি ২০ বি.সি.ই-তে রোম-সম্রাট অগাস্টাস সীজারের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন। এরপর গ্রীক পর্যটক টলেমির গ্রন্থেও দক্ষিণভারতে “পাণ্ডিনোই” নামে এক রাজ্যের নাম পাওয়া যায়, যাদের রাজধানী ছিল “মোদৌরা” (মধুরা) ।

অতএব প্রাচীন কাল থেকেই পাণ্ড্যরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব থাকলেও, তাঁদের সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন কিছু উল্লেখ ছাড়া, নির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। ইতিহাসের পরিধিতে তাঁদের প্রথম প্রবেশ ষষ্ঠ শতাব্দীতে, পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণুর উত্থান এবং কালাভ্র গোষ্ঠীর হাতে তাঁদের পরাজয়ের ইতিহাস দিয়ে। শোনা যায় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে রাজা কাড়ুঙ্গন পাণ্ড্যরাজ্য পুনরুদ্ধার করে, পাণ্ড্যরাজকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।  এই পাণ্ড্যরাজ কাড়ুঙ্গন এবং তাঁর পুত্র মারবর্মন অবনিশূলামণির সঙ্গে পল্লবরাজ সিংহবিষ্ণুর বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়েছিল, কারণ দুই পক্ষই তাঁদের রাজ্যের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে অরিকেশরী মারবর্মন, তাঁর উত্তরসূরি কোচ্চড়য়নরণধীর (সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে), মারবর্মন প্রথম-রাজসিংহ এবং নেড়ুঞ্জড়য়ন প্রথম-বরগুণ, প্রধানতঃ চোল এবং কেরালা রাজ্যের অংশ জয় করে পাণ্ড্য রাজ্যের সীমানা বিস্তার করেছিলেন। রাজা নেড়ুঞ্জলয়ন কোঙ্গুদেশ (কোয়মবাটোর এবং সেলম জেলা) এবং বেনাড়া (দক্ষিণ ত্রিবাঙ্কুর); তাঁর পুত্র শ্রীমারশ্রীবল্লভ (৮১৫-৬২ সি.ই.) সিংহল জয় করেছিলেন এবং পল্লব, গঙ্গ এবং চোলদের সঙ্গে যুদ্ধ করে কুড়মুক্কু (কুম্বকোনম) অধিকার করেছিলেন। যদিও পাণ্ড্যরাজা দ্বিতীয়-বরগুণ ৮৮০ সি.ই.তে চোলরাজ প্রথম-আদিত্যের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

এরপর থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন চোল রাজারা। শোনা যায় পাণ্ড্যরাজা মারবর্মন দ্বিতীয়-রাজসিংহ, সিংহলের রাজার সঙ্গে মিলিত শক্তিতে চোলরাজা প্রথম-পরান্তককে আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু সুবিধে করতে পারেননি। বরং পরবর্তী চোলরাজ পাণ্ড্যরাজ্যের রাজধানী অধিকার করে, “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এভাবেই পাণ্ড্যরাজ্য মোটামুটি ৯২০ সি.ই.-তে চোলদের অধীন রাজ্য হয়ে গেল এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত দক্ষিণভারতে পাণ্ড্যরাজ্য তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। যদিও পাণ্ড্যদের কয়েকজন রাজা বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে, চোলদের আধিপত্য খর্ব করার বারবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু খুব একটা সফল হতে পারেননি। চোলরাজ তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গের মৃত্যুর (১২১৬ সি.ই.) পর চোলরাজ্য যখন শক্তিহীন হয়ে পড়ল, সেই সময় পাণ্ড্যরাজাদের প্রতিপত্তি আবার বেড়ে উঠল।

        মানচিত্র ঋণ ঃ https://www.mapsofindia.com

পাণ্ড্যরাজ জাতবর্মন কুলশেখর ১১৯০ সি.ই.-তে রাজা হওয়ার পর পাণ্ড্যরাজ্যের ভাগ্যের চাকা আবার অনুকূল ঘুরতে শুরু করেছিল। এরপর প্রায় শতাধিক বছর পাণ্ড্যরাজ্যের গৌরব অম্লান ছিল। জাতবর্মন কুলশেখরের পুত্র মারবর্মন সুন্দর প্রথম-পাণ্ড্য (১২১৬-১২৩৮ সি.ই.) চোলদের আক্রমণ করে, তাঁদের প্রধান দুই শহর তাঞ্জোর এবং উরায়ুর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, এবং চোলরাজ তৃতীয় রাজরাজ বশ্যতা স্বীকার করায়, তাঁকেই সিংহাসন ফেরত দিয়েছিলেন। তার পরের পাণ্ড্যরাজা ছিলেন মারবর্মন সুন্দর দ্বিতীয়-পাণ্ড্য (১২৩৮-১২৫১ সি.ই.), তাঁর সময়েও চোল–পাণ্ড্য–হোয়সল সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়নি। তার পরের পাণ্ড্যরাজা জাতবর্মন সুন্দর পাণ্ড্য (১২৫১-১২৭২ সি.ই.) পরাক্রমী রাজা ছিলেন, তাঁর সময়েই পাণ্ড্যরাজ্য তার সমৃদ্ধির শীর্ষে উঠেছিল। তিনি চোলদের বিপর্যস্ত করে কাঞ্চী অধিকার করে নিয়েছিলেন, এবং চের রাজ্য এবং সিংহলেও আধিপত্য বিস্তার করেন। উপরন্তু তিনি হোয়সলরাজ বীর-সোমেশ্বরকে এবং কাকতীয়রাজ গণপতিকেও চূড়ান্ত পরাস্ত করে, তাঁদের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এভাবেই জাতবর্মন সুন্দর পাণ্ড্য দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে কুডাপ্পা এবং উত্তরের নেল্লোর পর্যন্ত অবিসম্বাদিত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে “মহারাজাধিরাজ-শ্রীপরমেশ্বর” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন মারবর্মন কুলশেখর তিনিও বেশ কিছু নতুন অঞ্চল অধিকার করে সাম্রাজ্যের সীমানা অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে ১২৯৩ সি.ই.-তে ভেনেসিয় পর্যটক মার্কো পোলো দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পাণ্ড্য রাজাদের কথা, শাসন ব্যবস্থা, শহর ও গ্রামের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি পাণ্ড্যরাজাদের সমৃদ্ধি, সম্পদ ও বাণিজ্য সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।

মারবর্মন কুলশেখরের শেষ জীবন খুব একটা শান্তির ছিল না। তাঁর দুই পুত্র, তাঁদের মধ্যে একজন অবৈধ, বীর পাণ্ড্য এবং অন্যজন সুন্দর, বৈধ পুত্র ছিলেন। দুজনেই দীর্ঘদিন– যথাক্রমে ১২৯৬ সি.ই. এবং ১৩০৩ সি.ই. থেকে পিতার প্রশাসনের অন্যতম সহায় ছিলেন। পিতা মারবর্মন কুলশেখরের জীবনের শেষদিকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে তীব্র বিরোধ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় মারবর্মন কুলশেখর কোন এক পুত্রের হাতে নিহত হন এবং তাঁর বৈধ পুত্র সুন্দর সিংহাসন অধিকার করার জন্যে আলাউদ্দিন খিলজির কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। সত্য ঘটনা যাই হোক, পারিবারিক এই বিবাদের মধ্যে, আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুরের পক্ষে মাদুরা জয় করে পাণ্ড্যদের উচ্ছেদ করতে কোন বেগ পেতে হয়নি।  অতএব ১৩১০ সি.ই. এবং তার কয়েক বছরের মধ্যে পাণ্ড্য সাম্রাজ্যের গৌরব ধূলিসাৎ হয়ে, মুসলিম আধিপত্য স্থাপিত হয়েছিল।

 

৪.৮.১৩ চের

চের বা কেরালাদের উৎপত্তি নিয়ে তেমন কোন বিতর্ক শোনা যায় না। তাঁরা দক্ষিণ ভারতেরই প্রাক-আর্য অধিবাসী এবং তাঁদের রাজ্যের সীমানা ছিল আধুনিক মালাবার, ত্রিবাঙ্কুর এবং কোচিন জেলা। কখনো কখনো কোয়মবাটোর এবং সেলম জেলার দক্ষিণাংশও তাঁদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। চের রাজ্যের পশ্চিম উপকূলে প্রাচীন কাল থেকেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর ছিল। একটি পেরিয়ার নদীর মোহনায় মুজিরি এবং বৈক্করাই। এ দুটির মধ্যে মুজিরি থেকেই অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হত। সুদূর গ্রীস, রোম ও মেসোপটেমিয়ায় প্রাচীন কাল থেকেই নানারকমের মশলা, মুক্তা এবং রত্ন রপ্তানি হত, যার ফলে অনেক গ্রীক ও রোমান বণিক এই অঞ্চলে বসবাস করতেও শুরু করেন এবং তাঁরা তাঁদের দেবতা অগাস্টাসের মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই অঞ্চলে ইহুদীদেরও একটি উপনিবেশ ছিল, যাঁদের চেররাজা ভাস্কর রবিবর্মন দশম শতাব্দীর শুরুতে সনদ দান করেছিলেন।

চের রাজ্যের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়, সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে, যেখানে চোড় (চোল) এবং পাণ্ড্যদের সঙ্গে, তাঁদের কেরলপুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। গ্রীক পর্যটক টলেমির গ্রন্থেও চেরদের উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও এই সময়ের চেরদের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট। তবে সেনগুট্টুবন নামে এক চের রাজার নাম পাওয়া যায় বিখ্যাত তামিল “শিলপ্পাদিকরম” গ্রন্থে। শোনা যায় এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তাঁর সন্ন্যাসী ভাই, ইলঙ্গবদিগল। তাঁর গ্রন্থ থেকে অনুমান করা হয়, চেররাজা সেনগুট্টুবন হয়তো পাণ্ড্যরাজা নেড়ুঞ্জলয়ন এবং চোল রাজা করিকালের নাতির সমসাময়িক।

অতএব রাজা সেনগুট্টুবনকেই প্রথম ঐতিহাসিক চের রাজা বলা যায়। তাঁর পরবর্তী রাজাদেরও চোল ও পাণ্ড্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিরন্তর লড়তে হচ্ছিল। কিন্তু তাঁদের কেউই সম্ভবতঃ পরাক্রমী বা উদ্যোগী রাজা ছিলেন না, অতএব বেশ কয়েক শতাব্দী চের রাজারা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের আবার প্রকাশ ঘটল অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে। এই সময় জনৈক চেররাজার সঙ্গে পল্লবরাজ পরমেশ্বরবর্মনের যুদ্ধ করতে দেখা গিয়েছিল। এই শতাব্দীর শেষ দিকে পাণ্ড্যরাজাদের সঙ্গেও তাঁদের যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তাঁদের দক্ষিণ ত্রিবাঙ্কুর হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ে চেররাজাদের সঙ্গে চোলরাজাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা গড়ে ওঠে, চোলরাজ প্রথম-পরান্তক চের রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দশম শতাব্দীর শেষদিকে চেররাজাদের সঙ্গে চোল রাজাদের সখ্যতা ভেঙে যায়, এবং চোলরাজ প্রথম-রাজরাজ চেরদের রাজত্বের অনেকটাই অধিকার করে নিয়েছিলেন। এই সময় থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরু অব্দি চের রাজ্য চোল রাজাদের অধীনে ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে চোল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে চের রাজারা, বিশেষ করে ১২৯৯ সি.ই.তে রাজা রবিবর্মনকুলশেখর, চের রাজ্যকে স্বাধীন করলেন এবং তারপর পাণ্ড্য এবং চোলরাজাদের পরাজিত করে বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই পরাক্রমও প্রতিরোধ করেছিলেন কাকতীয় রাজা প্রথম-রুদ্র। সে যাই হোক, রাজা রবিবর্মনকুলশেখরের পর চেররাজ্য আবার গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...