প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
১
বারোই জুলাই, ২০২৬ শনিবার
শনিবার সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ উঠে অহীন দাঁত ব্রাশ
করছিল, বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সামনের বাগানে প্রচুর ফুল এসেছে। নয়নতারা, টগর, রঙ্গন,
সূর্যমুখী, দোপাটি – কেউই তেমন নামকরা ফুল নয়। কিন্তু সজীব সবুজ পাতার সঙ্গে সদ্যফোটা
ফুলের ঔজ্জ্বল্যে চোখ এবং মন ভরে ওঠে। খুব মন দিয়ে দেখছিল অহীন, পিছনে এসে দাঁড়ালেন
অহীনের বাবা নবীনবাবু, তাঁর হাতে চায়ের কাপ। ছেলেকে ব্রাশ করতে দেখে বললেন, “এতক্ষণে
উঠলি? রাত করে শুবি, তারপর বেলা করে উঠবি”।
মুখে ফেনা নিয়েও অহীন হেসে ফেলল, মুখটা ওপর দিকে
তুলে বলল, “সকাল সাড়ে ছটাও তোমার কাছে বেলা হয়ে গেল, বাবা?”
নবীনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “মুখে ফেনা নিয়ে
বক বক করিস না, যা চট করে মুখটা ধুয়ে আয়। বাবা আজ সকালে মিটিং ডেকেছেন, ভুলে গেলি?
গতকাল রাত্রে আমাকে বললেন, আমরা সবাই মিলে, ওঁনার ঘরে যেন যাই, আজ ঠিক সকাল ছটায়।
তোর জন্যে দেরি হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে এখন আমাকে বকা খেতে হবে”।
অহীন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাল, বলল, “পি,
প্যাপা পও পো?” কথাটা, কি ব্যাপার বলো তো? কিন্তু মুখভরা পেস্টের ফেনা নিয়ে প-বর্গের
আদ্যাক্ষর ছাড়া কিছুই বোঝা গেল না। নবীনবাবু এবার বিরক্ত হলেন, বললেন, “প-প না করে
মুখটা ধুয়ে আয় না, তাড়াতাড়ি”। অহীন কথা না বাড়িয়ে বেসিনের দিকে গেল, নবীনবাবু
ছেলেকে বললেন, “আমি বাবার ঘরে যাচ্ছি, মুখ ধুয়ে বৌমার থেকে চা নিয়ে তুই তোর মা, আর
বৌমাকে নিয়ে সোজা চলে আসবি”। অহীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।
মুখটুক ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মা আর বৌদির সঙ্গে
দাদুর ঘরে ঢুকল অহীন। ঠাকুমা ঘরেই ছিলেন, বিছানায় বসেছিলেন। তাঁর পাশে অহীনের মা আর বৌদি গিয়ে বসলেন, অহীন বসল বাবার পাশে সোফায়, দাদুর
উল্টোদিকে।
প্রবীণবাবু পুত্র নবীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ ১২ই
জুলাই। আর ঠিক সাতদিন পর, আমার ছোটকা, তোর ছোড়দাদু অবিনের সমাধি ভঙ্গ এবং
জাগরণ দিবস, মনে আছে?”
অহীন আকাশ থেকে পড়ল, ছোটবেলা থেকে সে মা-দাদু-ঠাকুমার
কাছে শুনেছে বটে। ঠাকুরদাদার ছোটকাকা তাদের প্রাচীন বাড়ির কোন এক পাতালঘরে নাকি বন্দী হয়ে বহুদিন ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন আছেন। সেই ছোড়- প্রপিতামহর একশ
বছর পূর্ণ হলেই তিনি আবার নাকি ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন। কথাটা সে মোটেই বিশ্বাস
করেনি। এমন আবার হয় নাকি? আজগুবি গল্প বলেই, সে মন থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা।
কিন্তু আজ সাতসকালে তার দাদুর মুখে সেই কথাটাই শুনে সে বেশ তাজ্জব হয়ে গেল। দাদু তার মানে এ কথাটা বিশ্বাস করেন শুধু
নয়, সেই দিনটি তিনি সিরিয়াসলি মনেও রেখেছেন! অহীন কিছু বলল না, দাদুর মুখের দিকে
তাকিয়ে রইল।
নবীনবাবু মুচকি হেসে বললেন, “ওসব কথা এখনও তুমি
মনে করে রেখে দিয়েছ, বাবা? ওসব কথা কি আর সত্যি? স্বদেশী করা ছোটদাদু হঠাৎ
নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন বলে, ও রকম একটা গুজব রটেছিল। অনেককে তো বলতে শুনেছি, ব্রিটিশ
সরকারের পুলিশ তাঁকে মেরে ফেলেছিল। আবার কেউ কেউ বলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সুদূর
হিমালয়ে চলে গেছিলেন – পরে সেখানেই দেহরক্ষা করেছেন”।
প্রবীণবাবু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পুত্রের কথা
শুনছিলেন, কথা শেষ হতে বেশ রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি চিরকালই পরের মুখে ঝাল খেতে
ভালোবাস। বাবা-মা, গুরুজনদের কথা কোনদিনই তোমার কানে ঢোকেনি আর কোনদিন ঢুকবেও না। নিজের
চোখে আমি যা দেখেছি, তুমি তাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চাও?”
ব্যাপারটা বেশ রাগারাগির দিকে চলে যাচ্ছে দেখে,
আর দাদুর কাছে নিজের বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে অহীনের খুব খারাপ লাগছিল। সে
বলল, “দাদু তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”
প্রবীণবাবু নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “একরকম ভাবে
নিজের চোখেই দেখা বলতে পার। তবে আমাকে কি আর সেই পাতালঘরে কেউ ঢুকতে দিয়েছিল? আমি যে
তখন বছর সাতেকের বালক মাত্র!”
অহীন খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “পুরো ঘটনাটা
বলো না, দাদু। ঠাকুমার কাছে ছোটবেলায় শুনেছিলাম, মনে নেই তেমন”।
নাতির আগ্রহে প্রবীণবাবু খুশিই হলেন। পাশের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। হয়তো পুরোনো সেই সব দিনের স্মৃতিগুলি তিনি মনের মধ্যে গুছিয়ে তুলছিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন।
“১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। আর যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি, সে ঘটনা ঘটেছিল তেতাল্লিশ সালে। আমার ছোটকা তখন বছর সতেরর টগবগে তরুণ, আর আমার বয়স সাত। আমার বাবা এবং আমার দাদু দুজনেই ছিলেন জাঁদরেল সরকারি অফিসার। অবিশ্যি দাদুকে আমার মনে পড়ে না। কারণ তিনি যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন দেড় কি দু বছর। গোরা সায়েবদের সঙ্গে তাঁদের বেশ ভালই দহরম-মহরম ছিল। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, ওই রকম সাহেবঘেঁষা পরিবারের ছেলেদের অনেকেই কেমন করে যে স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন, কে জানে? আমার মেজকা, সেজকা দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মেজকা পুলিশের গুলিতে মারা যান তাঁর ছাব্বিশ বছর বয়সে। কাকিমা চার বছরে মেয়ে আর দুবছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন। আর সেজকা নিরুদ্দেশ হয়ে যান ঊণিশ বছর বয়সে। তার পর থেকে তাঁর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। দুই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, এক সময় ছোটকাও স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিল।
তবে বড়ো হয়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বিশাল
পরিবারের সব ঠাট-বাট বজায় রাখতে গিয়ে আমার বাবাকে বাধ্য হয়েই
ব্রিটিশদের গোলামি করতে হয়েছিল। সায়েবদের
সঙ্গে কিছুটা আমড়াগাছিও যে করতেন না, তা নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও,
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁর মনে কোথাও একটা প্রশ্রয় এবং সহানুভূতি ছিল। আর
সেই কারণেই, স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে মেতে ওঠা ছোটভাইদের তিনি কোনদিনই তেমন কঠোরভাবে
নিষেধ করেননি।
বিয়াল্লিশ সালে মহাত্মাজির ডাকে ভারত ছাড়ো
আন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছিল। শিক্ষিত যুবক এবং ছোকরারা দলে দলে স্বদেশী বিপ্লবে
নাম লেখাল। ছোটকাও সে দলে ভিড়ে গেল আর কিছুদিনের মধ্যেই তার নাম জড়িয়ে গেল একটি
ডাকাতির কেসে। ছোটকা হয়ে গেল স্বদেশী ডাকাত”।
অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “স্বদেশী ডাকাত
মানে?”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রবীণবাবু বললেন, “দেখ বাপু, বিপ্লব, আন্দোলন কিংবা সংগ্রাম যাই বলো না কেন – একটা সংগঠন
গড়ে, ছেলেপুলেদের শিখিয়ে পড়িয়ে দেশের কাজে নামাতে গেলে, অনেক খরচা আছে। এসবের
জন্যে ভাল রকম টাকাকড়ির যোগাড় রাখতে হয়। বিশেষ করে সে আন্দোলন যদি আবার সশস্ত্র
সংগ্রাম হয়। টাকা ছাড়া বন্দুক, গোলাগুলি, বোমা বানানোর সরঞ্জাম কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও
সাধারণ খরচ-খরচাও তো কম নয়। এদিক-সেদিক যেতে আসতে ট্রেনের ভাড়া, লঞ্চের ভাড়া, খেয়ার পারানি, খাইখরচ।
কিছু কিছু ধনী মানুষ – শুনেছি আমার বাবাও
- সে সময় গোপনে দান-টান করতেন ঠিকই, কিন্তু সে
টাকায় সংকুলান হত না। অতএব ডাকাতি করতে হত। কোন কৃপণ দেশীয়
বড়োলোক মহাজনের বাড়িতে হোক, কিংবা পোস্ট অফিস বা সরকারি ট্রেজারিই হোক।
সরকারি ট্রেজারি লুঠ করার ভয়ংকর ঝুঁকি ছিল ঠিকই। কিন্তু করতে পারলে, অনেক দিক থেকেই লাভ হত। এক, টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। দুই, গোরা প্রশাসনের মুখে
ঝামা ঘষে তাদের ওপরে বেশ একটা চাপ সৃষ্টি করা যেত। এবং তিন, এই ধরনের কাজ দু চারটে
ঠিকঠাক করতে পারলে, স্বদেশী করা ছেলেদের মনোবল বাড়িয়ে তোলা যেত। নতুন নতুন তরুণ এবং যুবকদের স্বদেশী দলে টানা সহজ হত। অতএব যারা এই ধরনের লুঠপাটের কাজ করত তাদেরকে “স্বদেশী ডাকাত” বলা হত”।
অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কারা বলত? নিশ্চয়ই ব্রিটিশরা
এবং তাদের ধামাধরা ভারতীয় অফিসাররা?”
প্রবীণবাবু হাসলেন, বললেন, “ইংরেজরা তাদের
এক্সট্রিমিস্ট বলেছে, টেররিস্ট বলেছে। তারা ওসব বলতেই পারে, কারণ তাদের ট্রেজারি
লুঠ হলে, তাদের গায়েই তো সব থেকে বেশী জ্বালা ধরত। কিন্তু “স্বদেশী ডাকাত” নামটা
দিয়েছিল দেশীয় সাধারণ মানুষরাই! যারা বিশ্বাস করত সায়েবরা হল রাজার জাত, আর আমরা
সবাই মহারাণির প্রজা। তাদের কাছে আমরা কৃপা বা করুণা ভিক্ষা করতে পারি। ইংল্যাণ্ডে
রাণির কাছে দরবার করতে পারি। তা না করে, গোরাদের কোষাগার লুঠ করা, সায়েবদের পেটানো
বা খুন করে ফেলা। এ সবই সাধারণ মানুষদের চোখে ঘোরতর অন্যায় মনে হত। তারা বলত, যারা
এসব করে, তারা স্বদেশী আন্দোলনের নামে আসলে ডাকাতি করছে”।
প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, আবার
বললেন, “সাতচল্লিশে ভারত যখন স্বাধীন হল, আমার বয়স তখন এগারো বা সাড়ে এগারো। তখন
দেখেছিলাম, স্বাধীনতার উৎসবে ওই সাধারণ মানুষগুলোই সব থেকে বেশি নাচানাচি শুরু করেছিল।
পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে তখন প্রত্যেকটি লোকই নিজেদের “স্বাধীনতা-সংগ্রামী”
ঘোষণা করে দিয়েছিল। পাড়ার কুকুর-বেড়ালগুলো নেহাত অবলা নাহলে তারাও বলে উঠত “জয়
হিন্দ”। আর এই ডামাডোলের সুযোগেই, রাতারাতি গজিয়ে উঠল অনেক ডান ও বাম নেতা, যারা
কোনদিন স্বদেশী তো করেইনি, বরং বহুক্ষেত্রে তারা স্বদেশীদের ঢিট করতে ব্রিটিশ
পুলিশকে সাহায্য করেছিল। এবং তারাই স্বাধীনতা অর্জনের সমস্ত গৌরবটা চেঁটেপুটে খেল”।
অহীন বলল, “প্রকৃত স্বদেশী নেতারা এসব মেনে নিলেন
কেন?”
প্রবীণবাবু বিষণ্ণ হাসলেন, বললেন, “কী জানো দাদুভাই। স্বদেশীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করা। স্বাধীনতার
জন্যে তাদের সকলের মনে ছিল আশ্চর্য এক আবেগ আর আদর্শ। তাঁরা তো কেউ নেতা হয়ে নিজের
আখের গোছানোর কথা চিন্তা করেননি। তাছাড়া আগেই যে বললাম, সাধারণ জনগণ এই স্বদেশী
কর্মীদের আবেগটা কোনদিন বুঝতেই পারেনি। স্বদেশীরা ডাকাতি করে, সায়েবদের বোমা মারে।
দলে দলে মিছিল করে। জেলে যায়, জেল থেকে অসুস্থ হয়ে ফেরে। জেল
থেকে ছাড়া পেয়েও তারা পুলিশের নজরে থাকে। এই সব লোকের সংস্রব সাধারণ মানুষ কোন
ভরসায় রাখবে? তার থেকে, যাদের সঙ্গে থানার কিংবা প্রশাসনের অফিসারদের নিত্য
ওঠাবসা, সেই সব মুরুব্বি-মাতব্বর নেতাদের তারা দিব্যি বুঝতে
পারত। তাদের মান্যিগণ্যি করে কৃতার্থ হত।
স্বাধীনতার পর প্রশাসনের ব্রিটিশকর্তারা তো
চলে গেল, কিন্তু দেশীয় অফিসাররা? যারা এতদিন ব্রিটিশ সরকারের হয়ে কাজ করছিল,
স্বাধীন ভারতে তারাই তো হয়ে উঠল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা! তারাই বা স্বদেশী করা নেতাদের ভরসা করবে কোন মুখে? স্বাধীনতার কয়েকদিন আগেও তো তারা
ওই স্বদেশী নেতাদের থানায় ধরে এনে উত্তম-মধ্যম ঠেঙিয়েছে! রাতবিরেতে তাদের গ্রেফতার
করতে গিয়ে বাড়ির মা-বোনদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে! দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে, সেই
অফিসারদের পক্ষে, রাতারাতি সেই সব স্বদেশী
নেতাদের “স্যার, স্যার” বলা সম্ভব? আমলারা যতই আমড়াগাছির চেষ্টা করুক না, তেলে-জলে
কোনদিন মিশ খায়?
বরং এতদিন যাদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা ছিল। যাদের হাত
থেকে তারা নিয়মিত ডুডুও খেত, তামুকও খেত। সেই সব মাতব্বরদের সাহায্য করাই তাদের পক্ষে তখন
অনেক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠল! অতএব বলা যায় স্বাধীনতার পরদিন থেকেই প্রশাসন আর ধান্দাবাজ
নেতা ও বণিকদের মধ্যে গড়ে উঠল নিখুঁত আদান-প্রদানের সখ্যতা। দু
পাঁচজন ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সামিল। আর
স্বদেশী করা, পুলিশের মার খাওয়া, জেলখাটা বিপ্লবের নেতারা হয়ে উঠলেন অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের
তাম্রফলক আর সাম্মানিক শংসাপত্র দিয়ে। অনেক দুস্থ সংগ্রামীকে মাসিক
ভাতা-টাতা দিয়ে, আসলে দূরে ঠেলে দেওয়া হল।
অহীন গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝলাম”।
গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদু বললেন, “যাগ্গে, সে
সব কথা এখন থাক, ছোটকার কথায় ফিরে আসি। যে স্বদেশীরা আমাদের জেলার ট্রেজারি লুঠ
করেছিল, শুনেছি সেই দলে ছোটকাও ছিল। ওই ঘটনায় নাকি দুজন দেশীয় সেপাই মারা গিয়েছিল
এবং এক গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। যার ফলে, পুলিশের দল ঘেয়ো কুকুরের মতো খুঁজতে বের
হল স্বদেশী ডাকাতদের ধরতে। ছোটকার নামে অনেক কিছু শুনেছিলাম। ছোটকার কাছে নাকি
দেশি পিস্তল ছিল আর সেই পিস্তলের গুলিতেই নাকি ওই গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। অতএব,
ছোটকা ধরা পড়লে ফাঁসি না হলেও, দ্বীপান্তর-বাস ছিল বাঁধা”।
“দ্বীপান্তর মানে – আন্দামান? সেলুলার জেল?”
“সেলুলার জেল। এই খবরে আমার ঠাকুমা তো ভেঙে পড়লেন।
এর আগেই তিনি দুটি ছেলেকে হারিয়েছেন। এবার ছোট ছেলের শোকে তিনি নাওয়া-খাওয়া
বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন সব কিছু যে বুঝতে পেরেছিলাম, তা নয়। তবে বাড়িতে বড়োদের সবার
আচরণেই ভয়ানক দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের লক্ষণগুলো বুঝতে পারছিলাম। এই সময়েই এক
দুপুরে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন, দাদু ও ঠাকুমার গুরুদেব, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ। তাঁর
কাছে আমার বাবা-মাও দীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং সকলেই তাঁকে সাক্ষাৎ শিবজ্ঞানে ভক্তি
করতেন।
ঠাকুর সিদ্ধানন্দ আমার ঠাকুমা আর মায়ের কাছে সব
শুনে বললেন, “কিচ্ছু চিন্তা করিস না, মা। সন্ধে বেলা বড়োখোকা সুধীন সেরেস্তা থেকে
ফিরলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস”। তখনকার দিনের মানুষরা যে কোন সরকারি দপ্তরকেই সেরেস্তা
বলতেন। আর আমার বাবা হলেন বড়োখোকা - বাড়ির বড়ো ছেলে।
বাবা অফিস থেকে ফিরে অফিসের ধরাচূড়ো না ছেড়েই সোজা
গেলেন গুরুদেবের ঘরে। বাবা আর ঠাকুমা ছাড়া সে সময় তিনি কাউকেই ঘরে থাকতে দিলেন না।
কাজেই তাঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হল, বাড়ির আর কেউ জানতে পারলেন না।
তবে বড়ো হয়ে শুনেছি। ছোটকা সে সময় কোন গোপন
জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিল। সে জায়গার হদিশ বাবা নাকি খুব ভাল করেই জানতেন। অতএব
গুরুদেবের সঙ্গে কথাবার্তার পরেই, তিনি সেই সন্ধেতেই অফিসের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে
পড়লেন, ম্যজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করতে। গোপনীয়তার জন্যে, তাঁর গাড়ির ড্রাইভার
বলাইকাকুকেও সঙ্গে নিলেন না। বাবা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে গেলেন।
ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করে বাবা নাকি কথা দিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাঁর ছোট
ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং এরপরে অবিন কোনভাবেই কোন
স্বদেশী দলের সঙ্গে সংস্রব রাখবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে
যেন অন্ততঃ চব্বিশ ঘন্টা সময় দেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে বিশ্বাস করে রাজি
হয়েছিলেন এবং কথাও দিয়েছিলেন। তারপর বাবা ছোটভাইকে তার গোপন ডেরা থেকে তুলে আনতে বেরিয়ে
গিয়েছিলেন।
ওদিকে ঠাকুমা আর আমার মা ঠাকুরঘরে জপ করতে বসলেন।
অন্যদিকে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ তাঁর দুই সেবক শিষ্যকে নিয়ে যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরের
দরজায় খিল দিয়ে যোগাড়-যন্ত্র শুরু করলেন। সারা বাড়ি তখন উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তায়
থমথম করছে। আমরা ছোটরা অর্থাৎ আমরা চার ভাইবোন এবং খুড়তুতো ভাই-বোনরাও সবাই সেদিন
অবস্থা বুঝে পড়ার ঘরে চুপটি করে বই খুলে বসে পড়লাম। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম
ফিসফিস করে। এটুকু বুঝেছিলাম, সেদিন বড়োদের বিরক্ত করলে আমাদের পিঠ বাঁচাতে ঠাকুমা
আসতে পারবেন না।
সেদিন রাত প্রায় সাড়ে নটা নাগাদ, বাবা বাড়ি
ফিরলেন। তাঁর পিছনে পিছনে এল একজন লোক। মাথা থেকে পা পর্যন্ত
তার কালো চাদরে ঢাকা। চেনবার কোন জো ছিল না। আমরা সবাই গাড়ির শব্দ পেয়ে কৌতূহলে দরজা-জানালা
দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারলাম না। লোকটিকে নিয়ে বাবা সোজা
গুরুদেবের ঘরের বন্ধ দরজায় দুবার টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “গুরুদেব, আমরা
এসেছি”। গুরুদেবের ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক হল এবং কালো কাপড় পরা লোকটিকে ঘরে ঢুকিয়ে
নিয়ে, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ বললেন, “তোমাকে এখন আর দরকার নেই, সুধীন। দুশ্চিন্তা করো
না। খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম কর। রাত সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ আমিই তোমাদের ডাকব। তার
আগে কেউ যেন আমাদের বিরক্ত না করে”।
বাবা দোতলায় গিয়ে মা আর ঠাকুমার সঙ্গে চাপাস্বরে কিছুক্ষণ
কথা বললেন, তারপর বললেন “সকলকে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে বল। গুরুদেবকে এখন বিরক্ত করা
যাবে না, তাঁর কাজ শেষ হলে তিনিই আমাদের ডাকবেন”। এতক্ষণ গোটা বাড়িতে কিছুটা হলেও
যেন প্রাণ ফিরল। মা-মেজকাকিমা, পিসিমারা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কাজের মাসি, রান্নার
ঠাকু্ররাও চঞ্চল হয়ে উঠল। সদর দরজায় তালা পড়ে গেল। পালোয়ান সুভগরাম – আমাদের
দারোয়ান - অন্যদিন শোয়ার আগে রামসীতার ভজন গাইত, সেদিন একদম নিস্তব্ধ। আমরা ছোটরাও
কাকিমার তত্ত্বাবধানে চুপচাপ খেয়ে উঠে ঠাকুমার ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে
নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, ঠাকুমা কখন তাঁর কাজ
সেরে ঘরে ফিরবেন। তখন কিছু খবর অন্ততঃ পাওয়া যাবে।
তা কিন্তু হল না। অপেক্ষা করতে করতে কখন আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। ঠাকুমার ডাকে আমাদের যখন ঘুম ভাঙল তখন ভোর। দেখলাম প্রত্যেকদিনের মতোই তিনি স্নান সেরে ফেলেছেন। তাঁর হাতে ফুলের সাজি - পুজোয় বসার আগে আমাদের ডাকতে এসেছেন।
ঘুম থেকে উঠে আমরা গোটা বাড়িটাই এক চক্কর ঘুরে
এলাম। চার জন মানুষের কোন সন্ধান পেলাম না। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ও তাঁর দুই শিষ্য এবং কালো চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা সেই লোকটি। বলা বাহুল্য সেই লোকটিই আমার ছোটকা”।