এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১ "
১৮
এই সন্ধিক্ষণেই গ্রামপ্রধান জুজাক নিজের ঘরের
দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। তাঁর পিছনে ঘরের দরজার পাশে মাটি-লেপা দরমার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন কমলিমা। দুজনেই দূরের পাহাড়,
ঝোপঝাড়-জঙ্গল, পূবের আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। নির্লক্ষ্য
বোবা, নির্বিকার দৃষ্টি মেলে। সবকিছুই তাঁদের দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে, কিন্তু তাঁদের
মনে কোন ছায়া পড়ছে না। এই জীবন, ওই প্রকৃতি, দিন-রাত্রি এসবই তাঁদের কাছে আজ যেন মূল্যহীন
মনে হচ্ছে। মাত্র হাত তিনেক দূরে বসে থাকা দুই জীবনসঙ্গী নিজেদের মধ্যে কথাও বলছেন
না। দীর্ঘ দাম্পত্যের প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষোভ-অভিমান-অভিযোগের কথা। কিংবা সাধারণ সাংসারিক
সুখদুঃখের কথা, প্রয়োজনের কথা। সব কথাই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাঁদের জীবন থেকে যেন
ফুরিয়ে গেছে সমস্ত অনুভব।
কেন এবং কতক্ষণ তাঁরা এভাবে বিমনা বসে আছেন, সে কথা একবারের
জন্যেও তাঁদের মনে আসেনি। তাঁদের সম্বিৎ ফিরল কবিরাজদাদার ডাকে, “জুজাকভায়া, বাড়িতে
একা একা বসে কী করছ?” জুজাক দাওয়া থেকে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন উঠোনে। “আসুন আসুন, কবিরাজদাদা।
কী আর করব, এই বসে ছিলাম একটু…”।
“সন্ধ্যে হয়ে গেল, আলো জ্বালাওনি, তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাওনি।
কী ব্যাপার? চুপ করে দাওয়ায় বসে দুটিতে কী ভাবছিলে বলো তো, মা?”
কবিরাজদাদার ডাকে কমলিমাও উঠে পড়েছিলেন। আড়া থেকে আসন পেড়ে,
দাওয়ায় বিছিয়ে দিয়ে, বললেন, “আসুন কবিরাজদাদা, বসুন। সত্যিই বড়ো ভুল হয়ে গেছে”। তিনি
তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালালেন। কাচা কাপড় পরে প্রদীপ হাতে, দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন
উঠোনের তুলসীতলায়। প্রথমে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন, তারপর গলায় আঁচল জড়িয়ে মাটিতে
গড় হয়ে প্রণাম সারলেন। তারপর ঘরে ঢুকে প্রদীপ
জ্বালিয়ে, সলতেটা ছোট করে বাইরে দাওয়ায় এসে বসলেন, নিজের জায়গাটিতেই। ঘরের স্তিমিত
আলোয় এবং বাইরের ক্ষুদ্র দীপালোকে – অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়ে উঠল। আর তখনই পুবের পাহাড়
চূড়ায় দেখা দিল চাঁদ। গতকাল পূর্ণিমা ছিল, আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। গতকালের পূর্ণতা
আজ তার আর নেই – আগামী প্রতিদিনই সে শীর্ণ হতে থাকবে।
কবিরাজদাদা জুজাকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “গ্রামের
পরিস্থিতি কী বুঝছো, জুজাক?”
মুখে বিষণ্ণ হাসি নিয়ে জুজাক বললেন, “আপনি কী বুঝছেন, কবিরাজদাদা?”
কবিরাজ দাদা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মোটেই ভালো বুঝছি
না, হে। দিনকাল আগের মতো থাকছে না। অবশ্য দিনকাল যে চিরদিন একই রকম থাকবে, তা না। বদল
হবেই। কিন্তু এ বদল যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি ঘটে চলেছে”।
জুজাক একই রকম বিষণ্ণ সুরে বললেন, “সব কিছুই হাতের বাইরে চলে
যাচ্ছে, কবিরাজদাদা। আমাদের বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে আর তাল রাখতে পারছি না”।
সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর জুজাক বললেন, “শুনলাম গত
রাত্রে আস্থানের শিবিরে নাকি ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে নাকি তিন-তিনজন রক্ষী প্রাণ
দিয়েছে। তুমি আমি এই গ্রামেই আশৈশব বড়ো হলাম, দাদা। এমন ডাকাতির কথা কোনদিন শুনেছ?
আমাদের গ্রামের কথা ছেড়েই দাও আশেপাশে যত গ্রাম আমি চিনি কোথাও কোনদিন এমন ঘটনা ঘটেনি।
আজ কারা এইসব করছে? কে তাদের সাহস যোগাচ্ছে?”
কবিরাজদাদা মন দিয়ে জুজাকের কথা শুনছিলেন। ঠোঁটের কোনায় মৃদু
হাসি নিয়ে তিনি বললেন, “তোমার নিজের প্রশ্নগুলির উত্তর তুমি তো
নিজেই দিয়ে ফেললে জুজাক”। জুজাক কবিরাজদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কোন কথা
বললেন না।
কবিরাজদাদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, “বুঝতে
পারলে না, না? আচ্ছা, গতকাল আমাদের গ্রামের পনের-ষোলোজন ছেলে
রাত্রে বাড়িতে ছিল না”।
“হ্যাঁ। ওরা তো রামকথা শুনতে গিয়েছিল”।
“আশেপাশের গ্রামগুলোতে এমনকি আমাদের এই গ্রামেও নানান উৎসবে,
পূর্ণিমায় এমন রামকথা তো প্রায়ই হয়। এ সব ধর্ম কথা শুনতে গ্রামের মহিলারা যায়...বয়স্ক মানুষরা যায়। অনেক ভক্ত আমাদের প্রতিবেশী গ্রামগুলিতেও
যায়। কিন্তু জুজাক, তুমি আমায় বলো তো – আমাদের ছোকরা ছেলে-পুলেদের এত বড়ো দল কবে কোথায়
গিয়েছে ধর্মকথা শুনতে? তাও কাছাকাছির মধ্যে প্রতিবেশী গ্রামে নয়, গভীর জঙ্গল-পথে এতটা
হেঁটে, পাশের রাজ্যে? আমার তো মনে পড়ে না”।
জুজাক চমকে উঠলেন, “তার মানে? ওরা কাল রাত্রে রামকথা শুনতে যায়নি?
তাহলে কোথায় গিয়েছিল?”
কবিরাজদাদা বললেন, “তা তো জানি না, ভাই। আরও একটা কথা - পাশের
সুকরা গ্রামের চারজন গতকাল রাত্রে সত্যিই বটতলি গ্রামে গিয়েছিল রামকথা শুনতে। আমাদের
ছোঁড়াগুলো যদি রামকথা শুনতে নাই গিয়ে থাকে, তাহলে ওই চারজন এসে ওদের সঙ্গে কোথায় জুটল?
কেন জুটল?”
জুজাক বললেন, “তুমি কি গতকাল আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে আমাদের ছেলেদের
সংযোগ খুঁজে পাচ্ছ”?
কমলিমা এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, শুধু শুনছিলেন। এখন উত্তেজিত
হয়ে বললেন, “কী বলছো, এ কোনদিন হতে পারে? আমাদের ছেলেরা যাবে আস্থানে ডাকাতি করতে?
কবিরাজদাদা, তুমি কি সত্যিই তাই সন্দেহ করছো? আমাদের ছেলেদের তুমি চেন না? তারা করবে ডাকাতি?”
কবিরাজদাদা ম্লান হেসে বললেন, “কেন চিনব না? খুব ভালো করেই চিনি,
মা। কিন্তু প্রথমেই যে বললাম, অনেক কিছু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে”।
কবিরাজদাদার কথাটা কমলিমার মনঃপূত হল না, বললেন, “তাই বলে ডাকাত?”
কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন,
“ডাকাত বলতে সাধারণ চোর-ডাকাতের কথা আমি বলিনি, মা। যাদের কথা আমরা সাধারণতঃ শুনে থাকি।
তারা হিংস্র, লোভী, স্বার্থপর। পরের ধন-সম্পদ লুঠ করা তাদের জীবিকা। আস্থানে যে ডাকাতির
কথা শুনলাম, মা, তাতে আর কিছু নয়, লুঠ হয়েছে প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র। কর সংগ্রহের সময়
আস্থানের ভাণ্ডারে যথেষ্ট শস্য এবং অর্থ সঞ্চিত থাকে বা রয়েছে – এ কথা আমরা সকলেই জানি।
কিন্তু এই ডাকাতরা আস্থানের শস্যভাণ্ডার কিংবা অর্থভাণ্ডার স্পর্শও করেনি। কেন? এই
ডাকাতির সঙ্গে সাধারণ ডাকাতির কোন মিলই খুঁজে পাচ্ছি না। এই ডাকাতির
উদ্দেশ্য অন্য কিছু…”।
কমলিমা মানতে রাজি নন, তিনি বললেন, “এ কেমন তর ডাকাতি আমি বুঝি
না, কবিরাজদাদা। কিন্তু তুমি যে বললে আস্থানে তিনজন রক্ষী নিহত হয়েছে। আমাদের ছেলেরা
হত্যা করতে পারবে? একথা তুমি বিশ্বাস করো?”
কবিরাজদাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিছু বললেন না। এই গ্রামে বধূ
হয়ে আসা থেকে তিনি কমলিকে চেনেন, স্নেহ করেন নিজের ভগ্নীর মতো। এই মেয়েটির মনে বিরাজ
করে, সারল্য, বিশ্বাস, মায়া, ভালোবাসা আর মাতৃত্ব। তার ছোট্ট মনোজগতের বাইরের বিশাল
জগৎ যে সর্বদা নিষ্ঠুর তঞ্চক ক্রূর ও কুটিল খেলায় মগ্ন রয়েছে,
সে কথা কমলির কাছে কোনমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা তুলসীতলার দীপ
শিখাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিন্তু আমি যে টের পাচ্ছি, মা, ধিকিধিকি
আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে”।
জুজাক অনেকক্ষণ পর কথা বললেন, “এই আগুনের উৎস কি ভল্লা, কবিরাজদাদা?”
কবিরাজদাদা উত্তরে “হ্যাঁ” কিংবা “না” কোন কথাই বললেন না, একই ভাবে তাকিয়ে রইলেন মঙ্গলময়
স্নিগ্ধ দীপ শিখাটির দিকে। কিন্তু জুজাকের প্রশ্নের উত্তরে কবিরাজদাদা
কিছু না বলাতে, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন কমলিমা, বললেন, “যারে দেখতে
নারি, তার চলন ব্যাঁকা? এ তোমাদের ভীষণ অন্যায় কবিরাজদাদা। ছেলেটাকে তোমরা কোনদিনই
সহজ চোখে দেখতে পারো না। ছেলেটা আমাদের গ্রামের ছোঁড়াদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। কাজ
নেই কর্ম নেই, তারা অলস দিন কাটাতো। সেই আলসেমি কাটিয়ে, সে তাদের মানুষ করে তুলছে...”। প্রাথমিক উত্তেজনায় কমলিমা
এতগুলো কথা বলে ফেলে একটু শান্ত সংযত হলেন, তারপর আবার বললেন, “সেই কোন কাল থেকে
তোমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে নালা বয়ে চলেছে। সেই জলকে কাজে লাগিয়ে যে চাষ করা সম্ভব,
সে কথা কেউ তো বলতে পারেনি। ছেলেটা সেটাও করে দেখিয়েছে। আজ আমাদের নোনাপুর এবং
সুকরার কিছু চাষি নতুন কিছু আবাদী জমি পেয়েছে। নতুন কিছু ফসল ফলানোর সুযোগ পেয়েছে।
এ কি কম কথা, কবিরাজদাদা?”
কমলিমায়ের কথা শেষ হতে কেউই কোন কথা বললেন না,
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে নিজেদের মনে চিন্তা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা
বললেন, “ভল্লা অসুস্থ অবস্থায় যখন এসেছিল, প্রথম দেখাতেই আমি বলেছিলাম – এ ছোকরা অসাধারণ
এবং বীর যোদ্ধা। মনে আছে? পরে আমরা
জানলাম, ছোকরা নির্বাসন দণ্ড পাওয়া অপরাধী। যদিও মানবিক দিক দিয়ে বিচার করলে এত
গুরু দণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ কী ও করেছে? আমাদের সহজাত বিবেচনায় মনে
হয়, না করেনি। দু-পাঁচ বছরের কারা দণ্ডই হয়তো ওর ন্যায্য শাস্তি হতে পারত”।
কবিরাজদাদা কিছুক্ষণ বিরতি দিলেন, কিছু চিন্তা
করলেন। তারপর আবার বললেন, “প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্বাসন হয়েছে - কিন্তু
নির্বাসনের জন্যে, তাকে এতদূরে রুক্ষ, উষর পশ্চিম প্রান্তে আসতে হল কেন? আমার মনে
হয়েছে ও পূর্বাঞ্চলের লোক। সেক্ষেত্রে রাজধানী থেকে পূর্ব সীমান্তের দিকেই যাওয়াই
ওর পক্ষে স্বাভাবিক হত। রাজধানী থেকে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব, পূর্ব
সীমান্তের থেকে অনেকটাই বেশি। ছোকরা তাহলে কেন আমাদের সীমান্তে এসে উপস্থিত হল।
প্রশাসনের নির্দেশে?”
যদিও দুজনের মনোভাবে বিস্তর ফারাক, কিন্তু জুজাক
এবং কমলিমা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কবিরাজদাদার কথা শুনছিলেন। কবিরাজদাদা একটু
থেমে আবার বললেন, “রাজধানীতে যা যা ঘটেছিল, ভল্লার মুখে আমরা সবাই শুনেছি। যাদের রাজধানীতে নিত্য যাওয়া আসা
আছে, তাদের মুখেও যা শুনেছি - ভল্লা এতটুকুও মিথ্যা বলেনি। এও
শুনেছি রাজধানীর সাধারণ মানুষ ভল্লার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং এই ঘটনার পর
ভল্লা সাধারণের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে”।
জুজাক নির্বিকার মনেই শুনছিল, কিন্তু কমলিমা ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে
কবিরাজদাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে? মানুষ চিনতে আমি মোটেই ভুল করিনি, কবিরাজদাদা”।
কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু
হেসে বললেন, “ঠিক। কিন্তু আমিও ওকে চিনতে এতটুকু ভুল করিনি, মা।
শুধু দেখার চোখটাই যা আলাদা। যে কথা বলছিলাম, রাজধানীর ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, শুনেছি
সেই রাত্রেই ভল্লা রাজধানী থেকে রওনা হয়েছিল। রাজধানী ছাড়ার পর চতুর্থ দিন ভোরে সে
আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছিল পায়ে হেঁটে। বিপর্যস্ত অবস্থায়। রাজধানী থেকে আমাদের গ্রামের
যা দুরত্ব, সেটা তিনদিন, তিন রাত পায়ে হেঁটে
আসা অসম্ভব। বিশেষ করে ওরকম অসুস্থ অবস্থায়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ও বেশিরভাগ পথটাই এসেছিল
হয় ঘোড়ায় চড়ে অথবা রণপায়”। একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের গ্রাম
থেকে সবথেকে কাছের চটি হল বীজপুরের জনাইয়ের চটি। সেখান থেকে ভোর ভোর রওনা হলে, পায়ে
হেঁটে পরের দিন ভোরে আমাদের গ্রামে হেসেখেলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ভল্লার মতো ছোকরাদের
পক্ষে ছয়-সাত প্রহরই যথেষ্ট। কিন্তু ভল্লার অনেকটাই বেশি সময় লেগেছে, কারণ ও তখন ভয়ানক
অসুস্থ”।
কথা শেষ করে কবিরাজদাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মুখ তুলে
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এঃ লক্ষ্যই করিনি রাত্রি অর্ধ প্রহর
পার হতে চলল, আমি এখন আসি”। জুজাকও যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, বললেন, “চলো, তোমাকে কিছুটা
পথ এগিয়ে দিই”।
“তুমি আবার বেরোবে কেন, জুজাক? চাঁদের আলোয় টুকটুক করে চলে যাবো”।
“তা হোক, তোমার সঙ্গে কিছুটা যাই”।
কবিরাজদাদা হাসলেন, উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলি রে, মা। রাগ করিস
না। অনেক কথাই বললাম, তোর হয়তো ভালো লাগল না”।
কমলিমা সংকোচের সুরে বললেন, “আমিও অনেক কথা বলে ফেললাম, রাগ
করবেন না কবিরাজদাদা”।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে চললেন বেশ কিছুক্ষণ,
তারপর জুজাক চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভল্লা কেন এখানে এসেছে, কিছু বুঝতে পারলেন,
কবিরাজদাদা? তার উদ্দেশ্যটা কি?”
“ভল্লার এখানে আসার ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্যই নেই জুজাক। ভল্লা
এসেছে প্রশাসনের নির্দেশে কোন বিশেষ একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ভল্লার পিছনে আছে প্রশাসনের
অদৃশ্য হাত”।
“কী বলছ, কবিরাজদাদা? তাহলে তার এই নির্বাসন দণ্ড। আস্থানে শষ্পকের
ওরকম অশ্রাব্য গালিগালাজ। মৃত্যুদণ্ডের হুমকি…এ সব কেন?”
কবিরাজদাদা বললেন, “সবটাই সাজানো – নাটক। সাধারণ মানুষের চোখে
ধুলো দেওয়া…। তবে এটাও ঠিক ভল্লা রাষ্ট্রের
ওপর এতটাই বিশ্বস্ত, এ কাজে সে নিজের প্রাণ পণ রাখতেও এতটুকু দ্বিধা করবে না। সে কাজে
যদি তার বিবেকের সায় না থাকে – তাও”।
বিস্মিত জুজাক জিজ্ঞাসা
করলেন, “এভাবে একটা অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করায় রাষ্ট্রের কী উদ্দেশ্য থাকতে
পারে?”
কবিরাজদাদা মাথা নাড়লেন,
জানেন না। তারপর বললেন, “তুমি এবার এসো জুজাক, আমি তো প্রায় এসেই গেছি। এবার বাড়ি
যাও – কমলি একলা রয়েছে বাড়িতে”।
চলবে...