মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২

    ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১


দ্বিতীয় পর্ব 

 

আগেই বলেছি সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা দ্রব্য বিনিময় প্রথা (barter system) এবং অর্থ বিনিময়  প্রথা (money transaction system) দুটোতেই অভ্যস্ত ছিল, তা না হলে দেশের ভেতরে এবং বিদেশেও নিয়মিত বাণিজ্য করা সম্ভব হত না।  এই সভ্যতার মানুষেরা তামা, রুপো, সোনা প্রভৃতি ধাতুর ব্যবহারও যে জানত, সে প্রমাণ বহুল পাওয়া যায়। অতএব, অনুমান করা যায় যে অর্থ বিনিময়ে তারা ধাতুর ব্যবহারও শুরু করতে পেরেছিল। সেই সময় যে অঞ্চল থেকে রুপো আমদানি করা হত, তাদের মধ্যে প্রধান দেশ ছিল সুমের (এখন সে অঞ্চল ইরাকের মধ্যে), এ সুমেরের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্কের অনেক হদিশ পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে মহেঞ্জোদরোতে পাওয়া এগারোটি রুপোর টুকরোর কথা উল্লেখ করা যায়। একটি রুপোর বাক্সের মধ্যে কিছু গয়নার সঙ্গে এই এগারোটি রুপোর টুকরো পাওয়া গিয়েছিলএদের মধ্যে দুটি ছাড়া, অন্যগুলির আকার গোল কিংবা আয়তাকার। এই নটি ধাতুখণ্ডের ওজন, সিন্ধুসভ্যতার তৌল ও ওজন রীতি (weighing system)- সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু যে দুটি ধাতুখণ্ড  সিন্ধুসভ্যতার ওই প্রচলিত ওজনের সঙ্গে মেলে না, তাদের গায়ে কীলক (cuneiform) আকারের লিপি খোদাই করা আছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশেষ করে দেখেছেন, এই আলাদা ধাতুখণ্ডদুটি সুমের থেকে এখানে এসেছিল। এই উদাহরণ থেকে ধরে নেওয়া যায়, আমাদের দেশে ধাতুকে বিনিময় মাধ্যম (medium of exchange) হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবেই শুরু হয়েছিল, যদিও তার গুণ মান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়।

 

সিন্ধু সভ্যতার অবলুপ্তির অনেক কারণ অনুমান করা হয় এবং সে নিয়ে নানান বিতর্কেরও শেষ নেই। কিন্তু সিন্ধুসভ্যতার উন্নত নাগরিক সভ্যতার পর, আর্যভাষীদের সামাজিক কাঠামোর যে সন্ধান আমরা পাই, সে সভ্যতা পুরোপুরি গ্রাম নির্ভর। সেক্ষেত্রে তাদের দ্রব্য বিনিময় প্রথাই (barter system) হয়তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ঋগ্বেদের একটি সূত্রে ‘নিষ্ক’ ব্যবহারের যে কথা বলা হয়েছে, সেটি ধাতব খণ্ড বিশেষ করে সোনার খণ্ড ছাড়া কিছুই নয়। এই ‘নিষ্ক’ সাধারণতঃ সোনার ছোট ছোট টুকরো জুড়ে গয়নার কথা বোঝাতো। কিন্তু যেখানে ‘নিষ্ক’র বিশেষণে শত ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট ওজনের একশটি সোনার খণ্ডের কথাই বলা হয়েছে মনে করা যায়। সেক্ষেত্রে আর্যভাষী সমাজেও নির্দিষ্ট ওজনের ধাতব খণ্ডকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা হত, এ কথা বলাই যায়। ঐতিহাসিকেরা বলেন, বৈদিক যুগের শেষের দিকেই অর্থাৎ ৮০০/৭০০ বি.সি.ই-র কোন সময়েই নির্দিষ্ট ওজনের ধাতবখণ্ড বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত ছিল।

এই সময়েই উত্তরপশ্চিম থেকে, পূর্বে গঙ্গার উপনদী ও শাখানদীর অববাহিকা ধরে, আর্যভাষীদের সমাজ ও সভ্যতার প্রসার হচ্ছিল। এই অঞ্চলের ষোড়শ মহাজনপদের হাত ধরেই আর্যভাষীদের নগরায়ণ ও নাগরিক সভ্যতার সূত্রপাত। সুতরাং সেই সময়েই উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিভিন্ন নগরে বেড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। এই বাণিজ্যের প্রয়োজনেই নির্দিষ্ট ওজন এবং নির্দিষ্ট গুণমানের ধাতুখণ্ডের নির্ধারিত মূল্য এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। জরুরি হয়ে উঠল এই ধাতুখণ্ড তৈরির নির্দিষ্ট পদ্ধতি। কোন রাজ্যের শক্তিশালী রাজা বা তাঁর প্রতিনিধি কিংবা সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোন বণিকসভা ছাড়া এই ধাতবখণ্ডের নির্দিষ্ট মূল্যমান নিয়ন্ত্রণের কঠিন দায়িত্ব নেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধাতব মুদ্রা বা টাকা অপরিহার্য হয়ে উঠতে লাগল।

ভারতবর্ষে ঠিক কবে থেকে টাকার প্রচলন শুরু হয়েছিল, আজ তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে বৌদ্ধ কাহিনী ও বুদ্ধদেবের জীবনী, জাতকের নানান কাহিনীতে এই টাকা ও মুদ্রার ব্যবহারের ইঙ্গিত প্রচুর পাওয়া যায়। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের মোটামুটি ৬০০ থেকে ৫০০ বছর আগে, ঐতিহাসিকেরা এই সময়টাকে নির্দিষ্ট করেন। এই প্রসঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ বিনয়পিটকের একটি কাহিনী শুনলে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়।

শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ স্বর্ণমুদ্রা বিছিয়ে জেতবন বিহারের জমি কিনছেন 

সে সময়কার একজন ধনী ব্যবসায়ী বা শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ ছিলেন বুদ্ধের একান্ত ভক্ত। তিনি একবার মনস্থ করলেন, ভগবান বুদ্ধ ও তাঁর সকল শিষ্যদের থাকার জন্যে একটি সঙ্ঘবিহার নির্মাণ করাবেন। উপযুক্ত জমির খোঁজ করতে করতে তিনি শ্রাবস্তী (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের সাহেত-মাহেত) নগরের কাছে মনোমত বেশ অনেকটা জমির সন্ধান পেলেন। সেই জমির মালিকের নাম জেত। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ জেতের কাছে ওই জমি কিনে নেবার প্রস্তাব দিলে, শুরুতে জেত কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। অনেক অনুরোধের পর জেত রাজি হলেন, কিন্তু জমির যে দাম দাবি করলেন, তা শুনলে চমকে উঠতে হয়। তিনি দাবি করলেন, জমির দাম হিসেবে, পুরো জমিটা সোনার ধাতুখণ্ড দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডদ রাজি হয়ে গেলেন এবং গরুর গাড়িতে হাজার হাজার সোনার খণ্ড এনে, প্রচুর লোক দিয়ে সেই খণ্ড বিছিয়ে, ঢেকে দিতে লাগলেন সেই জমি। শ্রেষ্ঠীর এই অদ্ভূত ভক্তি দেখে জেত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ অব্দি তিনি কোন দাম না নিয়ে জমিটি শ্রেষ্ঠীকে দান করে দিয়েছিলেন। সেই উপকারের কথা মনে রেখে শ্রেষ্ঠী সেই বিহারের নাম জেতবনবিহার রেখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। এই আশ্চর্য ঘটনার কথা অজানা কোন শিল্পী ছবির ভাষায় লিখে রেখে গেছেন মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলার ভারহুত স্তূপের কাছে, একটি স্তম্ভের গায়ে।

বৌদ্ধ কাহিনীর বর্ণনা এবং উপরের চিত্র দেখে অনুমান করা যায়, চারকোণা এই সোনার পাতের টুকরোগুলিই মুদ্রা, আর এই মুদ্রার নাম ছিল কার্ষাপণ। প্রথমে ধাতুকে গলিয়ে ছাঁচের মধ্যে সমান উচ্চতায় (thickness) ঢালাই (casting) করে লম্বা পাত বানানো হতো। অন্যদিকে নানান চিহ্ন এবং নকশা উলটো খোদাই করে, ছোট ছোট ছাঁচ বানানো হত। মিষ্টির দোকানে আজও সন্দেশ বানানোর যেমন ছাঁচ থাকে, অনেকটা সেরকম। এবার ঢালাই করা ধাতুর পাত, সমান মাপে কেটে ফেলে, একটু গরম করে, ধাতুকে সামান্য নরম করে নেওয়া হত। তারপর ওই ছোট ছাঁচ নরম ধাতুর পাতের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে জোরে ঘা দিলেই, নরম পাতের টুকরোতে ছাপা হয়ে যেত সোজা চিহ্ন বা নকশা। তৈরি হয়ে যেত মুদ্রা (coin)এই ধরনের মুদ্রাকে ছাপদেওয়া মুদ্রা (punch marked coin) বলা হত। সোনার কার্ষাপণ আজ পর্যন্ত উদ্ধার না হলেও রুপোর অজস্র কার্ষাপণ উদ্ধার করা গেছে। প্রাচীনতম রুপোর যে কার্ষাপণ পাওয়া গেছে, সেগুলি মৌর্য আমলের, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময়কাল মোটামুটি ৩২০ থেকে ২৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ধরা হয়।

    

সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং তার বাইরের প্রতিবেশী কিছু দেশও সেই সময় মৌর্য রাজাদের অধীনে ছিল। বিশাল এই সাম্রাজ্যের সর্বত্র মুদ্রার ঠিকঠাক প্রচলন করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। জাল বা নকল মুদ্রার প্রচলন ঠেকাতে, মৌর্য রাজারা বিশেষ কয়েকটি রাজকীয় প্রতীক ব্যবহার করতেন। নিচের এই নকশাগুলির মধ্যে বাঁদিক থেকে প্রথম চারটি চিহ্ন বা সংকেত মৌর্য আমলের পাওয়া, প্রায় সব মুদ্রাতেই দেখা যায়, এই চারটি ছাড়াও নানান সময়ের নানান মুদ্রায় আরো কিছু চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রধান চারটি চিহ্ন ছিল রাজা কিংবা রাজ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নির্দিষ্ট চিহ্ন, আর অন্যগুলি হয়তো স্থানীয় প্রশাসন কিংবা নানান সময়ের মুদ্রা হিসেবে অথবা কোন বিশেষ উৎসবের সংকেত হিসেবে ছাপ দেওয়া হত।    

 


 


মৌর্য যুগের রৌপ্যমুদ্রায়  মুদ্রিত নানান সংকেত চিহ্ন  

 

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ও মহামন্ত্রী কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে, মুদ্রার গুণমান এবং তার নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কানুন নিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর মতে মুদ্রা তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব লক্ষণাধ্যক্ষের – ইনি রাজকোষ বা টাঁকশালের অধ্যক্ষ। লক্ষণাধ্যক্ষই রাজ্যের প্রয়োজন অনুসারে, পণ (কার্ষাপণ), অর্ধপণ, পাদপণ ও অষ্টভাগপণ মুদ্রা তৈরি করাবেন। এক পণ মানে ৩২ রতি বা ৫৭.৬ গ্রেন কিংবা ৩.৭৩২ গ্রাম। যদিও এখনকার হিসাবে ৩২ রতি মানে ৩.৮৮৮ গ্রাম ধরা হয়। অর্ধপণ মানে ১৬ রতি, পাদপণ মানে ৮ রতি, আর অষ্টভাগপণ মানে ৪ রতি। খাঁটি রুপো কিন্তু বেশ নরম ধাতু। [কাঠের হাতুড়ি পিটিয়ে বানানো অতি পাতলা রুপোর তবক দেওয়া ভালো সন্দেশ তোমরা নিশ্চয়ই খেয়েছ] খাঁটি রুপোর মধ্যে খাদ অর্থাৎ অন্য ধাতু মিশিয়ে, মুদ্রার জন্যে উপযোগী শক্ত সংকর ধাতু বানানো হত। কৌটিল্যের নির্দেশ ছিল, একটি ৩২ রতি মুদ্রার মধ্যে ২২ রতি খাঁটি রুপো থাকতেই হবে, আর বাকি ১০ রতি হবে তামা। প্রচলিত মুদ্রার গুণমান পরীক্ষা এবং নকল মুদ্রা ধরার জন্যে ‘রূপদর্শক’ নামে মুদ্রা পরীক্ষক নিযুক্ত হতেন। ‘রূপদর্শক’-এর দায়িত্বে গাফিলতি ধরা পড়লে ১০০০ পণ জরিমানার নির্দেশ ছিল এবং রাজকোষে নকল মুদ্রা চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লে, রূপদর্শকের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তিরও নির্দেশ ছিল।

মৌর্যযুগে মুদ্রা তৈরির অধিকার ছিল শুধুমাত্র রাজা ও রাজসরকারের। সে সময় আসমুদ্র হিমাচল বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্যের সকল জনসাধারণ এই সমস্ত মুদ্রাই ব্যবহার করত। সাম্রাজ্যের সকল রাজকর্মচারীদের বেতনও এই মুদ্রাতেই দেওয়া হত। সাধারণ জনগণের মনে রাজা ও রাজ প্রতিনিধিদের উপর যে যথেষ্ট আস্থা ও বিশ্বাস ছিল, এই মুদ্রা ব্যবস্থার বিপুল ব্যবহার দেখে বোঝা যায়। এর থেকে এও স্পষ্ট বোঝা যায় মৌর্য যুগের রাজাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি, প্রভাব ছিল ও সারা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন।

তবে সর্বকালে সর্বদেশেই দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের যেমন অভাব হয় না, তেমনি সে সময়েও হয়নি। এত সব কঠোর নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ থাকলেও, সে সময়কার এমন অনেক মুদ্রার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলি নিঃসন্দেহে জাল। এই মুদ্রাগুলি পাৎলা রুপোর পাত মোড়া তামার মুদ্রা!

মৌর্য যুগের পরে ছাঁচে ঢালা বিভিন্ন আকারের তামার মুদ্রার বহুল প্রচলন হয়েছিল। উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুদিকে ছবির ছাপযুক্ত তামার মুদ্রা অনেক আবিষ্কৃত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর গোড়ার দিকেই লেখসমেত ছাঁচের আঘাতে মুদ্রিত ভারতীয় মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইরাণে পাওয়া ‘ধমপালস’ এবং ‘উজেনিয়ি’ লিপির ছাপযুক্ত উজ্জয়িনীর মুদ্রার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। এই সময়ের মুদ্রাগুলির উপর শক্তিশালী কোন রাজসরকারের কিংবা প্রভাবশালী প্রশাসকের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, কিন্তু দুপাশেই ছবি ও লেখ সমেত ছাঁচে ঢালা মুদ্রার ব্যবহার প্রচুর হয়েছিল। 

 

‘টাকা’ কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘টঙ্ক’ বা ‘টঙ্কক’ শব্দ থেকে, এই দুটি শব্দের অর্থ ‘বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত প্রশাসনিক ছাপমারা ধাতবখণ্ড’ইংরিজি coin শব্দের উৎপত্তি ল্যাটিন ‘কুনেউস’ (cuneus) থেকে যার মানে কীলক। যে কোন পোস্ট অফিসে, কাঠের হাতলের সামনে গোল ছাপ মারার যে যন্ত্রটি দিয়ে পোস্ট অফিসের অফিসাররা সবকিছুতে ছাপ মারেন, সেই রকম কীলক দিয়ে ছাপ দিয়ে ধাতব মুদ্রায় ছবি ছাপা হত বলেই, ইংরিজিতে এই ধাতব মুদ্রাকে coin বলা হয়। আবার মুদ্রা তৈরির জন্যে, একটি কাঠের পাটার মধ্যে উলটো ছবির ছাঁচ বানিয়ে, রোমের লোকেরা মুদ্রা ছাপাত। সেই কাঠের পাটার নাম মনেতা (Moneta)রোমের  Juno Moneta মন্দিরে এই পদ্ধতিতে মুদ্রা তৈরি করা হত বলেই, ইংরিজিতে  বিনিময় যোগ্য ধাতব খণ্ডকে, ওই মন্দিরের দেবতার নাম অনুসারে money বলা হত।

এই সময়ে সারা বিশ্বেই মুদ্রার বহুল ব্যবহার শুরু এবং জনপ্রিয় হলেও বিনিময় প্রথা (barter system) কিংবা দ্রব্যধন বিনিময়ের (Commodity exchange system) প্রথা একদম বন্ধ হয়ে যায়নি। এই দ্রব্যধনের মধ্যে নানান শস্য, যেমন ধান, গম; নানান পশু, যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া; এমনকি মানুষও ব্যবহার হত। আয়ারল্যাণ্ডে প্রাচীনকালে অর্থের বিনিময়ে এক বিশেষ জাতির ক্রীতদাসী একক হিসাবে ব্যবহার হত! আফ্রিকার সুদানে আজ থেকে ১৫০/২০০ বছর আগেও ক্রীতদাসকে দ্রব্যধন হিসাবে ব্যবহার করা হত।

পৃথিবীর যাবতীয় দ্রব্যধনের মধ্যে সব থেকে বেশী দেশে যে দ্রব্যধনের বহুল প্রচলন ছিল, তার নাম কড়ি (cowry) এবং পুঁতি (bead)প্রাচীন ভারতের বহু বসতিতে উৎখননের সময় অজস্র পুঁতি পাওয়া গেছে। এই পুঁতির মধ্যে অনেকসময় মূল্যবান পাথরও থাকত।

একসময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপসমূহ এবং মালদিভ্‌স অঞ্চলের দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কড়ি পাওয়া যেত। বিনিময় মাধ্যম হিসাবে কড়ির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যার জন্যে সেই সময়ে কড়ি প্রায় গোটা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথমতঃ নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ছাড়া কড়ি বেশ বিরল, অতএব কড়ির সরবরাহ সীমিত ছিলতাছাড়া আকারে এবং ওজনে কড়ি যথেষ্ট হালকা হওয়ায় বহন করতে সুবিধে হত। তার চেয়েও বড় ব্যাপার হল, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভালো জাতের কড়ির গুণ বা মান পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু সোনা, রুপো কিংবা তামার মুদ্রার ক্ষেত্রে গুণ বা মানের কারচুপি হামেশাই হত এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই সব নকল মুদ্রা চট করে ধরাও সম্ভব হত না। এই সব কারণে যে সব জায়গায় কড়ি সহজলভ্য নয়, সে সব অঞ্চলে দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনা বেচার ক্ষেত্রে কড়ি ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। খ্রিষ্টিয় চতুর্থ শতকের শেষদিকে কিংবা পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে, ফা হিয়েন যখন ভারতে এসেছিলেন, তিনি মধ্যভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জিনিষপত্র কেনা বেচায় কড়ির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করেছিলেন। সংস্কৃত ‘কপর্দ্দক’ শব্দ থেকে কড়ি শব্দের সৃষ্টি। বেশ কিছু কাল কড়ির ব্যবহার লুপ্ত হলেও, আমাদের চলতি নানান কথায়, সেই স্মৃতি আমরা আজও বহন করে চলেছি, যেমনঃ ‘টাকাকড়ি’ কেমন দেবে? আমার কাছে এখন একটা ‘কানাকড়ি’ও নেই, ব্যক্তি নাম হিসেবে ‘তিনকড়ি’, ‘পাঁচকড়ি’ ইত্যাদি এবং কাউকে ‘নিঃস্ব’ বোঝাতে আজও ‘কপর্দ্দকহীন’ বলা হয়। লক্ষ্মীপুজোর সময়, লক্ষ্মীঠাকুরের ঝাঁপিতে বেশ কয়েকটা কড়ি আটকে ধনের দেবীকে অর্থপূর্ণ করে তোলার স্মৃতি, আজও সেই সব দিনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।


যে কড়িগুলি টাকার মতো ব্যবহার করা হত, সেগুলির বৈজ্ঞানিক নাম মনেটারিয়া মনেটা (Monetaria moneta)। এগুলি এক প্রজাতির সামুদ্রিক শামুক (sea shell), যাকে জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় সাইপ্রেডি (Cypraeidae) গোষ্ঠীর gastropod mollusc বলা হয়। 

চলবে...

সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯ 


 

ভল্লা নালার পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোল বাঁধের কাছে। প্রভাত সুর্যের আলো তখন সবে ছড়িয়ে পড়ছে গাছের পাতায় পাতায়। বাঁধের উঁচু পাড়ে উঠে ভল্লা চারদিকে তাকাল। এই বাঁধের বাঁদিকে নোনাপুর গ্রাম। আর ডানদিকে সুকরা। এই নালাই এতদিন ছিল দুই গ্রামের সীমানা। যখন থেকে ভল্লা এই নালায় বাঁধ বানানোর তোড়জোড় শুরু করেছে, দুই গ্রামের লোকজন কৌতূহলী হয়েছে। ভল্লার কথায় তারা বুঝেছে, এই বাঁধের জলে গ্রামের পুরো ক্ষেত না হোক কিছু কিছু জমিতে সারা বছর চাষবাস করা সম্ভব। সেই থেকে তারা ভল্লার সঙ্গে মেতে উঠেছে, তাকে সর্বতো সাহায্য করেছে, বাঁধ নির্মাণে। দুপক্ষই উৎসাহী হয়ে নালার দুপাশের অনাবাদী বেশ কিছু জমিকে আবাদযোগ্য করে তুলেছে। সরু সরু শিরার মতো নালা কেটে তারা দুপাশের জমিতে চারিয়ে নিয়েছে বাঁধের জল। বপন করেছে বাদাম ও তুলোর বীজ। বিগত পনের-বিশ দিনে সে বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়ে সবুজ হয়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ কয়েকটি মাঠ।

একধরনের নেশা আছে সবুজ রঙে। বিশেষ করে সে সবুজ যদি হয় সম্ভাব্য শস্যের স্বপ্ন। সে স্বপ্নে চাষীরা বিভোর হয়ে থাকেন। সারাদিন মাঠের কাজ সেরে, বাড়িতে গিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। রাত্রে ঘুম ভেঙে বারবার উঠে বসেন। জঙ্গলের ইঁদুর, খরগোশ, শজারুরা রাত্রেই খাবারের সন্ধানে বের হয়। চারাগাছ উপড়ে বীজ খেয়ে তারা যদি শস্যের সর্বনাশ করে? যতদিন না গাছগুলি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, ততদিন এই দুশ্চিন্তা।

ভল্লাকে দেখে সুকরা গাঁয়ের বয়স্ক চাষী ভীলককাকা একগাল হেসে বললেন, “গতকাল রাত্রে গাঁয়ের ছোকরারা সব রামকথা শুনতে গিয়েছিল। তুই যাসনি, বেটা?”

ভল্লা হাসল, বলল, “ইচ্ছে তো ছিল, কাকা। রামকথা শুনতে অনেক ধরনের লোক যায় – আমাকে চিনে ফেললে, বিপদে পড়ে যাব। সেই ভয়ে যাইনি। এই যে তোমাদের এখানে এসেছি, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে…কেউ দেখে ফেললেই বিপদ”।

ভীলককাকা বললেন, “হুঁ। তার মানে তুই জানিস না। নোনাপুরের এক ছোকরাকে কাল রাতে সাপ কামড়েছে!

“সাপে কেটেছে? কই শুনিনি তো! কাকে কেটেছে জানো, কাকা?”

“হানোকে। ডাকাবুকো তাজা ছেলেটা – এভাবে মারা যাবে - ভাবা যায় না”।

“হানো? কী বলছো, কাকা? সেই জন্যেই আজ ভোরে কেউ আসেনি আমার কাছে। ভাবলাম, পালাগান শুনে হয়তো শেষ রাত্রে বাড়ি ফিরে সব ঘুমোচ্ছে...। কিন্তু...কিন্তু আমার এখন কী করা উচিৎ, কাকা? আমার যে একবার হানোর বাড়িতে যাওয়া খুব দরকার। ছেলেটা আমাকে এত ভালোবাসত – যা বলতাম সব শুনত - দারুণ কাজের ছেলে”।

ভীলককাকা বললেন, “সবই বুঝছি, ভল্লা। কিন্তু এসময় তোকে গাঁয়ে দেখলে, সকলেরই বিপদ বাড়বে। শত্রুর তো আর শেষ নেই গ্রামে”।

ভল্লা চিন্তাগ্রস্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তা ঠিক”। কোন কথা না বলে নোনাপুর গ্রামের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর অবসন্ন গলায় বলল, “আমি নোনাপুর গ্রামে আসার পর থেকেই নানান অঘটন ঘটে চলেছে, কাকা। আমার মনে হয় এই অঞ্চল ছেড়ে আরও দূরে কোথাও আমার চলে যাওয়া উচিৎ”।

ভীলককাকা বললেন, “অঘটন? অঘটন আবার কী ঘটল?”

অন্যমনস্ক ভল্লা বলল, “ওই যে, রাজকর্মচারী শষ্পক গ্রামপ্রধানকে অপমান করল। গ্রামপ্রধান কর আদায়ে কিছুটা ছাড়ের জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। শুনলাম শষ্পক এককথায় তাঁর সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। আমাকে নিয়েও কি কম কথা শুনিয়েছে, বয়স্ক সম্মানীয় গ্রামপ্রধানকে। যাচ্ছেতাই, সে সময় আমি তো ছিলাম সামনে, সব শুনেছি। সে সব কথা কানে শোনাও পাপ। এখন আবার হানোটা এভাবে অপঘাতে চলে গেল...না কাকা, এ অঞ্চলে আর নয়”।        

 ভীলককাকা সান্ত্বনার সুরে বললেন, “বুঝতে পারছি, হানোর এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা তোর বুকে বড়ো বাজছে। কিন্তু এসবের জন্যে তুই নিজেকে দুষছিস কেন? তুই কী করবি? জ্ঞান হয়ে থেকে রাজকর্মচারীদের ঔদ্ধত্য আর অপমানের কথা আমরা শুনে আসছি, আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের থেকে। ও সব আমাদের কাছে নতুন নাকি? আর সাপে কামড়ানোর কথা বলছিস? আশেপাশের চার-পাঁচখানা গাঁয়ে খোঁজ নিয়ে দেখ। ছেলে-ছোকরা, ব্যাটাছেলে বা মেয়েছেলেদের মধ্যে দু-একজনের অপঘাত মৃত্যু হয়নি – এমন একটা বছর আমাকে দেখা তো। সাপেকাটা, জলে ডোবা, গলায় দড়ি... একটা না একটা অপঘাত মৃত্যু লেগেই আছে প্রতি বছর। এই তো গত বছর, একটু মেঘ করে – চটাপট এমন শিলাবৃষ্টি হল, আমাদের গাঁয়ের রাখাল কালডি মারা গেল ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। সঙ্গে মরল চারটে ছাগল। এসবই আমাদের জীবনের অঙ্গ রে ভল্লা, তোর থাকা না থাকায় কী আসে যায়? তোর কমলিমা আর গ্রামপ্রধান জুজাকের দুটি ছেলেই যে সাপের কামড়ে মারা গেছিল – সে কথা শুনিসনি?”

বাঁধের ওপর ভীলককাকা আর ভল্লা দুজনেই চুপ করে পাশাপাশি বসে রইল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর ভীলককাকা আবার বললেন, “তুই এসে এই যে নালার মধ্যে বাঁধ গড়ার বুদ্ধি দিলি। তোর সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে আমরা সেই বাঁধ বানালাম। আমাদের দুটি গ্রামের বেশ কিছু বাঁজা জমিকে আমরা সবাই মিলে আবাদী করে তুললাম। এর মূল্য কিছু কম নাকি? সে কথা ভুলে যাচ্ছিস কী করে?”                

ভল্লা বলল, “কাকা, এ বাঁধটা আমরা ভালই বানিয়েছি, কী বলো?”

সে কথা আর বলতে! বাপ পিতেমোদের সময় থেকেই তো এই নালা বয়ে চলেছে। কারও মাথায় আসেনি এখানে বাঁধ দিয়ে কিছু জমি চাষবাস করা সম্ভব। তুই এসে পথ দেখালি, রে ব্যাটা”।

“কিন্তু এ বাঁধের নীচের সরু সরু ছিদ্র দিয়ে জল কিন্তু ভাটায় বেরিয়ে চলেছে, কাকা। সেই জলের গতি কমাতে না পারলে, এ বাঁধ কিন্তু দুর্বল হয়ে যাবে। সামনের বর্ষায় হয়তো ভেঙেই পড়বে”।

“এ কথা তুই আগেও বলেছিস, বেটা। কিন্তু কী দিয়ে আটকাবো?”

“শক্ত এঁটেলমাটি যোগাড় করতে পারো না, কাকা? তোমাদের সুকরা কিংবা নোনাপুরে?”

“সে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সে মাটিতে কী হবে?”

“এঁটেলমাটির বড়ো বড়ো চাঙর বাঁধের জলে ফেলে দিও। সে মাটি গলে গিয়ে জলের সঙ্গে বইতে থাকবে ওই সরুসরু নালিপথে। ধীরে ধীরে কমে যাবে জলের ধারা ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “নোনাপুরের কেউ আজ মাঠে আসেনি – হানোর হঠাৎ মৃত্যুটা সবাইকে পাথর করে দিয়েছে, না কাকা?”

হ্যাঁ। ও গাঁয়ের পাঁচজন লোক সারারাত পাহারা দিয়েছে, আমাদের লোকদের সঙ্গেই।  যেমন রোজ দেয়। কিন্তু সকালে কেউ আসেনি”

“রাতে কিসের পাহারা, কাকা?”

“ইঁদুর, শজারু আছে, মাঝে মাঝে আসে হরিণের পাল – তাদের থেকে শস্য পাহারা দেওয়া আমাদের বরাবরের অভ্যাস বেটা। ডপলি, ঢাকের আওয়াজ করে, আগুনের মশাল জ্বেলে তাদের দূরে রাখতে হয়”।

“তাই? দুটো শস্যের জন্যে কী পরিশ্রমই করতে হয়, তাই না, কাকা? কিন্তু রাজারা রাজস্ব আদায়ের সময় এসব কথা চিন্তাও করে না”। ভল্লার স্বরে কিছুটা উষ্মা।

“এটা ঠিক নয়, বেটা। তোরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা বুঝিস না, রাজা এই সমস্ত জমির মালিক।  তিনিই আমাদের জীবন ধারণের জন্য বাস্তু আর আবাদের জমি দিয়েছেন। তার বদলে তাঁরা কর নেবেন না? কর না নিলে তাঁদের চলবে কী করে? কী করে বানাবেন রাস্তাঘাট? কী করে রাজ্যের সুরক্ষা সামলাবেন?”

“রাজা কী করে জমির মালিক হলেন? এই মাটি, জল, হাওয়া, রোদ্দুর, শস্যের বীজ সবই তো ভগবান সৃষ্টি করেছেন”।

ভীলককাকা প্রশ্রয়ের হাসি মাখা মুখে বললেন, “ভগবানই তো সৃষ্টি করেছেন, বেটা। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু বিলিব্যবস্থার জন্যে তিনি যে রাজাকেও নিয়োগ করেছেন”।

ভল্লা কিছুক্ষণ ভীলককাকার স্নেহসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বলল, “সেই রাজার শালা, বছরের পর বছর মেয়েদের যাচ্ছেতাই অসম্মান করবে। রাজা মুখ বুজে বসে বসে দেখবে। আমরা রক্ষীরা তাকে শায়েস্তা করলে আমাদের নির্বাসন দেবে। এই কাজের জন্যেও কি ভগবান রাজাকে নিযুক্ত করেছিলেন, কাকা?” হঠাৎ করেই ভল্লা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কাকা তুমি আমাকে যতই বোঝাও, আমি বুঝব না। আমি এখন চলি কাকা, তোমরা সাবধানে থেক।

বাঁধ থেকে নেমে নালার ধারের ঝোপঝাড়ের আড়ালে হনহন করে ভল্লা এগিয়ে গেল তার কুটিরের পথে। ভীলককাকা তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন, “ভগবান যে এই সব কিছুর মধ্যে নেই, সে কথা কী আর আমরা বুঝি না, বেটা? আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে, তোর মতো কেউ পাশে দাঁড়ালে, হয়তো আমরাও…। ভগবান তোকে দীর্ঘ পরমায়ু দিন, বেটা”। 

চলবে...



শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ পুরুষোত্তমযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৫শ পর্ব "


ষোড়শ অধ্যায়ঃ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ

১-৩

শ্রীভগবানুবাচ

অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।

দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্‌।। ১

অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগাঃ শান্তিরপৈশুনম্‌।

দয়া ভূতেষ্বলোলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীরচাপলম্‌।। ২

তেজঃ ক্ষমাঃ ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা।

ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত।। ৩

শ্রীভগবান উবাচ

অভয়ং সত্ত্ব-সংশুদ্ধিঃ জ্ঞান-যোগ-ব্যবস্থিতিঃ।

দানং দমঃ চ যজ্ঞঃ চ স্বাধ্যায়ঃ তপঃ আর্জবম্‌।। ১

অহিংসা সত্যম্‌ অক্রোধঃ ত্যাগাঃ শান্তিঃ অপৈশুনম্‌।

দয়া ভূতেষু অলোলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীঃ অচাপলম্‌।। ২

তেজঃ ক্ষমাঃ ধৃতিঃ শৌচম্‌ অদ্রোহঃ ন অতিমানিতা।

ভবন্তি সম্পদং দৈবীম্‌ অভিজাতস্য ভারত।। ৩

শ্রীভগবান বললেন- যাঁরা দৈবী বিভূতি লাভের জন্য জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের নির্ভয়, চিত্তের শুদ্ধি, জ্ঞান ও যোগে নিষ্ঠা, দান, ইন্দ্রিয়ের সংযম, যজ্ঞ, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র পাঠ, তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধকে জয় করা, ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দা না করা, সর্বজীবে দয়া, নির্লোভী, কুটিলতা ত্যাগ, কুকর্মে লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, মানসিক ও শারীরিক শুচিতা, বিনয় ও অহংকারহীনতা – এই সকল সদ্‌গুণরূপ সম্পদ লাভ হয়ে থাকে।

[দৈবী – দেবযোগ্য, সাত্ত্বিক]

 

দম্ভো দর্পোঽভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।

অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্‌।।

দম্ভঃ দর্পঃ অভিমানঃ চ ক্রোধঃ পারুষ্যম্‌ এব চ।

অজ্ঞানং চ আভিজাতস্য পার্থ সম্পদম্‌ আসুরীম্‌।।

হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অহংকার, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা ও অজ্ঞান বিবেকহীনতা থেকেই ব্যক্তি আসুরী অবস্থা লাভ করে থাকে।

   

দৈবী সম্পদ্বিমোক্ষায় নিবন্ধায়াসুরী মতা।

মা শুচঃ সম্পদং দৈবীমভিজাতোঽসি পাণ্ডব।।

দৈবী সম্পৎ বিমোক্ষায় নিবন্ধায়া আসুরী মতা।

মা শুচঃ সম্পদং দৈবীম্‌ অভিজাতঃ অসি পাণ্ডব।।

বলা হয়ে থাকে, দৈবী সদ্‌গুণ সংসারের বন্ধন থেকে পরমমুক্তির উপায় এবং আসুরীগুণ সংসারের বন্ধনের কারণ। হে পাণ্ডুপুত্র অর্জুন, দুঃখ করো না, তুমি দৈবী সম্পদ নিয়েই জন্ম গ্রহণ করেছ।

 

দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেঽস্মিন্‌ দৈব আসুর এব চ।

দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।

দ্বৌ ভূত-সর্গৌ লোকে অস্মিন্‌ দৈবঃ আসুরঃ এব চ।

দৈবঃ বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।

হে পার্থ, এই জগতে দৈব এবং আসুর, এই দুই প্রকার স্বভাবেরই জীব ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। দেবসুলভ মানুষের কথা তোমাকে আগেই সবিস্তারে আমি বলেছি, এখন অসুরসুলভ মানুষের কথা বলছি, শোন। 

 

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ।

ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।

প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ জনা ন বিদুঃ আসুরাঃ।

ন শৌচং ন অপি চ আচারঃ ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।

আসু্রী মানুষের না ধর্মে প্রবৃত্তি থাকে, না অধর্মের নিবৃত্তি জানে। তাদের শুচিতা থাকে না, সদাচার থাকে না, এমনকি সত্যও থাকে না। 

 

অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্‌।

অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্‌।।

অসত্যম্‌ অপ্রতিষ্ঠং তে জগৎ আহুঃ অনীশ্বরম্‌।

অপরঃ-পর-সম্ভূতং কিম্‌ অন্যৎ কামহৈতুকম্‌।।

তারা বলে, জগৎ মিথ্যা, এখানে ধর্ম বা অধর্মের কোন সংস্থান নেই এবং ঈশ্বরও নেই। এই জগৎ সৃষ্টিতে স্ত্রী ও পুরুষের পারষ্পরিক কাম সংযোগ ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পারে? 

 

এতাং দৃষ্টিমবষ্টভ্য নষ্টাত্মানোঽল্পবুদ্ধয়ঃ।

প্রভবন্ত্যুগ্রকর্মণঃ ক্ষয়ায় জগতোঽহিতাঃ।।

এতাম্‌ দৃষ্টিম্‌ অবষ্টভ্য নষ্ট-আত্মানঃ-অল্পবুদ্ধয়ঃ।

প্রভবন্তি-উগ্রকর্মণঃ ক্ষয়ায় জগতঃ-অহিতাঃ।।

বিকৃত আত্মা, স্বল্পবুদ্ধি ও নিষ্ঠুর কর্মা এই ব্যক্তিরা, এই দর্শন অনুসরণ ক’রে, জগতের অমঙ্গল ও বিনাশের জন্যেই জন্মগ্রহণ করে।

 

১০

কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ।

মোহাদ্‌ গৃহীত্বাঽসদ্‌গ্রাহান্‌ প্রবর্তন্তেঽশুচিব্রতাঃ।।

কামম্‌ আশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভ-মান-মদ-অন্বিতাঃ।

মোহাৎ গৃহীত্বা অসদ্‌গ্রাহান্‌ প্রবর্তন্তে অশুচিব্রতাঃ।।

মনে অপূরণীয় কামনা নিয়ে, তারা অহংকার, অভিমান এবং ঈর্ষায় সংযুক্ত থাকে আর বিবেকহীন অন্ধ মোহে তারা বীভৎস কর্মে লিপ্ত হয়।

 

১১

চিন্তামপরিমেয়োঞ্চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ।

কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।

চিন্তাম্‌ অপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তাম্‌ উপাশ্রিতাঃ।

কাম-উপভোগ-পরমা এতাবৎ ইতি নিশ্চিতাঃ।।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, কাম উপভোগই জীবনের পরমকর্ম, আর এই চিন্তাতেই মৃত্যু পর্যন্ত তারা সীমাহীন সময় পার করে দেয়।

 

১২

আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।

ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্‌।।

আশা-পাশ-শতৈঃ-বদ্ধাঃ কাম-ক্রোধপরায়ণাঃ।

ঈহন্তে কাম-ভোগ-অর্থম্‌ অন্যায়েন অর্থসঞ্চয়ান্‌।।

আশার অজস্র বন্ধনে আবদ্ধ এবং কাম ও ক্রোধের বশীভূত এই সব ব্যক্তি, বিষয় কামনা চরিতার্থ করার জন্যে অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।

 


১৩

ইদমদ্য ময়া লব্ধমিদং প্রাপ্স্যে মনোরথম্‌।

ইদমস্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্‌।

ইদম্‌ অদ্য ময়া লব্ধম্‌ ইদং প্রাপ্স্যে মনোরথম্‌।

ইদম্‌ অস্তি ইদম্‌ অপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্‌।

 ‘আজ আমার এই লাভ হয়েছে, আমার মনোমত এই বিষয় কাল পাবো। আজ আমার এই সম্পদ আছে, আরো সম্পদ আমি ভবিষ্যতে লাভ করবো’

 

১৪

অসৌ ময়া হতঃ শত্রুর্হনিষ্যে চাপরানপি।

ঈশ্বরোঽহমহং ভোগী সিদ্ধোঽহং বলবান্‌ সুখী।।

অসৌ ময়া হতঃ শত্রুঃ হনিষ্যে চ অপরান্‌ অপি।

ঈশ্বরঃ অহম্‌ অহং ভোগী সিদ্ধঃ অহং বলবান্‌ সুখী।।

 ‘আজ এই শত্রুকে আমি হত্যা করেছি, অন্য শত্রুদেরও আমি বিনাশ করবো। আমিই সর্ব নিয়ন্তা ঈশ্বর, আমিই ভোগী, আমিই সফল সিদ্ধ পুরুষ। আমি শক্তিশালী, আমি সুখী’।

 

১৫

আঢ্যোঽভিজানবানস্মি কোঽন্যোঽস্তি সদৃশ ময়া।

যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইত্যজ্ঞানবিমোহিতাঃ।।

আঢ্যঃ অভিজানবান্‌ অস্মি কঃ অন্যঃ অস্তি সদৃশ ময়া।

যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইতি অজ্ঞান-বিমোহিতাঃ।।

 ‘আমি ধনী ও উচ্চবংশ জাত, আমার সমান আর কে আছে? আমিই যজ্ঞ করবো, দান করবো আবার আনন্দও করবো’, এই সমস্ত অজ্ঞানের জন্যেই বিবেকহীন ব্যক্তিরা মুগ্ধ হয়। 

 

১৬

অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ।

প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেঽশুচৌ।

অনেক-চিত্ত-বিভ্রান্তাঃ মোহ-জাল-সমাবৃতাঃ।

প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকে অশুচৌ।

এই রকম বহু কামনায় বিক্ষিপ্ত, মোহ জালে ঢাকা, বিষয়-বাসনা ভোগে আসক্ত যার মন, সে অপবিত্র কুৎসিত নরকে পতিত হয়।

 

১৭

আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদান্বিতাঃ।

যজন্তে নামযজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্‌।।

আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধন-মান-মদ-অন্বিতাঃ।

যজন্তে নামযজ্ঞৈঃ তে দম্ভেন অবিধিপূর্বকম্‌।।

নিজেকেই যে ব্যক্তি মহৎ ভাবে, দুর্বিনীত এবং অর্থগৌরবে অহংকারী সেই দাম্ভিক ব্যক্তি, শাস্ত্র নিয়ম না মেনে যে যজ্ঞ করে, সে যজ্ঞ নামমাত্র।

 

১৮

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধঞ্চ সংশ্রিতাঃ

মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোঽভ্যসূয়কাঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ

মাম্‌ আত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তঃ অভ্যসূয়কাঃ।।

অহংকার, উৎপীড়নের ক্ষমতা, দর্প, কাম ও ক্রোধে আচ্ছন্ন ব্যক্তি সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের দোষবিচার করে এবং সমস্ত দেহের পরমাত্মা স্বরূপ আমাকেই অবজ্ঞা করে।

 

১৯

তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্‌ সংসারেষু নরাধমান্‌।

ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।।

তান্‌ অহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্‌ সংসারেষু নরাধমান্‌।

ক্ষিপামি অজস্রম্‌ অশুভান্‌ আসুরীষু এব যোনিষু।।

এই সমস্ত সাধু বিদ্বেষী, নিষ্ঠুর, সংসারের অমঙ্গলকারী নিকৃষ্ট নরাধমকে আমি বারবার আসুর যোনিতে নিক্ষেপ করি।

 

২০

আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।

মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্‌।।

আসুরীং যোনিম্‌ আপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।

মাম্‌ অপ্রাপ্য এব কৌন্তেয় ততঃ যান্তি অধমাং গতিম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র, এই রূপ মূর্খব্যক্তি জন্মে জন্মে আসুরী যোনিতেই জন্ম লাভ করে এবং আমাকে লাভ করা দূরে থাক, তারা আরও নীচ জন্ম লাভ করে।

 

২১

ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ।

কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্রয়ং ত্যজেৎ।।

ত্রিবিধং নরকস্য ইদং দ্বারং নাশনম্‌ আত্মনঃ।

কামঃ ক্রোধঃ তথা লোভঃ তস্মাৎ এতত্রয়ং ত্যজেৎ।।

কাম, ক্রোধ এবং লোভ – নরকের এই তিন প্রকার দ্বার জীবাত্মাকে নীচ পথে চালনা করে। কাজেই এই তিনটি দোষকে সর্বদা ত্যাগ করা উচিৎ।  

 

২২

এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।

আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্‌।।

এতৈঃ বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈঃ ত্রিভিঃ নরঃ।

আচরতি আত্মনঃ শ্রেয়ঃ ততঃ যাতি পরাং গতিম্‌।।

এই নরকের দ্বার স্বরূপ তিন তমোগুণ থেকে বিমুক্ত হলে, মানুষ নিজের মঙ্গল আচরণে সমর্থ হয় এবং তারপর পরমমোক্ষ লাভ করে। 

 

২৩

যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকরতঃ।

ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্‌।।

যঃ শাস্ত্রবিধিম্‌ উৎসৃজ্য বর্ততে কামকরতঃ।

ন স সিদ্ধিম্‌ অবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্‌।।

যে শাস্ত্র বিধি না মেনে নিজের ইচ্ছামতো কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে ব্যক্তি না সিদ্ধিলাভ করে, না সুখ পায় এবং পরম মুক্তিও লাভ করতে পারে না।

 

২৪

তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ।

জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহার্হসি।।

তস্মাৎ শাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্য-অকার্য-ব্যবস্থিতৌ।

জ্ঞাত্বা শাস্ত্র-বিধান-উক্তং কর্ম কর্তুম ইহ অর্হসি।।

অতএব শাস্ত্রই হল তোমার কর্তব্য এবং অকর্তব্য কর্মের একমাত্র প্রমাণ, কাজেই শাস্ত্রে বর্ণিত বিধি নিষেধ মেনেই কর্তব্য কর্ম করো।

 দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ সমাপ্ত


চলবে...।

নতুন পোস্টগুলি

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২

     ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - "  হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প)   " ছোটদের রহস্য উপন্যাস - "  পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক র...