এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব "
২৮
বিলম্বিত মধ্যাহ্ন ভোজনের পর প্রাসাদের অতিথিশালায় কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করছিলেন মহর্ষি ভৃগু। আচার্য বিশ্ববন্ধু ছিলেন, সংলগ্ন কক্ষে। এখন সূর্য অস্তগামী, দ্বিপ্রহরের রৌদ্রতাপের পর, মধ্য আশ্বিনের বৈকালিক পরিবেশ আরামদায়ক ও মনোরম। মহর্ষি ভৃগু গবাক্ষ পথে সম্মুখের উদ্যানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, আচার্য বিশ্ববন্ধুকে ডাকলেন। তাঁর ডাক শুনে আচার্য বিশ্ববন্ধু মহর্ষির কক্ষে প্রবেশ করে বললেন, “আদেশ করুন, মহর্ষি”!
স্মিতমুখে আচার্য বিশ্ববন্ধুর দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন,
“যতই বিলাসবহুল হোক বৎস, কক্ষ আমাদের আবদ্ধই রাখে! সামনের ওই মুক্ত উদ্যানে চলো
স্বল্প পদচারণা করে আসি। শরতের স্নিগ্ধ বাতাস অঙ্গে নিয়ে, তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি
পরামর্শ সেরে নিই। সন্ধ্যার পর আমি মহারাণির সাক্ষাৎ প্রার্থী হবো, তুমিও যাবে
আমার সঙ্গে। অত্যন্ত গোপন সেই আলোচনার পক্ষে, এই কক্ষ আদৌ নিরাপদ নয়!”
কক্ষ থেকে বেরিয়ে সম্মুখের উদ্যানের পথে পাশাপাশি হাঁটতে
হাঁটতে, আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “রাজ অতিথিশালা অত্যন্ত সুরক্ষিত, সেই কক্ষের
মধ্যে গোপন আলোচনা নিরাপদ নয় কেন, মহর্ষি?”
স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “স্বদেশ এবং বিদেশের অনেক
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অস্থায়ী বাসের জন্য এই কক্ষগুলি নির্মিত হয়েছে, বৎস।
সেই অতিথিদের সকলেই সরল এবং নিরীহ হবেন, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁদের
গতিবিধি এবং আলাপের উপর গোপন পর্যবেক্ষণের জন্য এই কক্ষের দেওয়ালগুলি বিশেষভাবে নির্মাণ
করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে নিভৃত ও নিরাপদ মনে হলেও, হতে পারে, বিশ্বস্ত কোন গুপ্তচর
অসীম ধৈর্যে দেওয়ালের ওপাশে কান পেতে বসে আছে, অথবা সূক্ষ্মছিদ্র পথে লক্ষ্য রাখছে
আমাদের গতিবিধি ও আচরণ!”
“কী সাংঘাতিক, মহর্ষি! কিন্তু আমাদের উপর পর্যবেক্ষণ
করার প্রয়োজন কী?”
“বলো কী, বৎস, প্রয়োজন নেই? যতদিন পৃথু রাজা না হচ্ছেন,
এই রাজ্যের সিংহাসনের প্রত্যাশী অনেকেই!”
“অনেকেই? আমার ধারণা ছিল, একজনই - রাজাবেণের মিত্র
শক্তিধর”!
মহর্ষি হেসে ফেলে বললেন, “তোমরা বৈদ্যরা অত্যন্ত সরল,
শত্রু হোক বা মিত্র, তাদের ইষ্ট ছাড়া তোমরা কিছুই চিন্তা করো না। সিংহাসন লাভের
দৌড়ে শক্তিধর আছে, কিন্তু সে আপাততঃ অনেকটাই পিছিয়ে! এখন তার লোকবল সীমিত,
প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করাও তার পক্ষে কষ্টসাধ্য! তার থেকে
অনেক শক্তিশালী দাবিদার মহামন্ত্রী বিমোহন”।
“মহামন্ত্রী বিমোহন?” অবাক হয়ে বিশ্ববন্ধু মহর্ষির মুখের
দিকে তাকালেন, বললেন, “তিনি মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন, উপরন্তু তিনি
নিজেও এখন যথেষ্ট বৃদ্ধ, এই বয়সে তাঁর রাজ্যলাভের ইচ্ছা? আশ্চর্য?”
“তাঁর নিজের জন্য কেন হবে, বৎস বিশ্ববন্ধু? তুমি ভুলে
যাচ্ছো, তাঁর একটি পুত্র আছে। সে যুবক। সে আমাদের আশ্রমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন
কৃতী ছাত্র এবং বর্তমানে দক্ষিণের একটি রাজ্যের মন্ত্রীপদে আসীন”।
“হ্যাঁ মহর্ষি, মনে পড়েছে। আমাদের থেকে একাদশবর্ষের অনুজ
– নাম শ্রীগোত্রপাদ! মহামন্ত্রী তাঁকে সিংহাসনে বসাতে চাইছেন?”
মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, বললেন, “রাজনীতির অন্দরমহলে
নিঃস্বার্থ বলে কিছু হয় না, বৎস! কিন্তু এখন ওসব কথা থাক। আজ সন্ধ্যাকালে মহারাণির
সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তাঁকে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতির কথা জানাবো। ওই সঙ্গে
জানাবো, রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে, নব নির্মিত উদ্যানবাটিকায় তাঁদের বাস করার কথা!”
আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “বাঃ, তার অর্থ রাজমাতার
প্রস্তাবে মন্ত্রীমণ্ডলী সম্মত? রাজ্যশাসন থেকে অব্যাহতি পেলে, রাজমাতা স্বস্তি
পাবেন, কিন্তু প্রাসাদ ত্যাগে সম্মত হবেন কী? এই সুখ, এই বিলাস, ত্যাগ করা সামান্য
বিষয় নয়”!
মহর্ষি ভৃগু হাসলেন, বললেন, “তোমার তাই ধারণা, বৎস? আমার
ধারণা তিনি যদি প্রথম প্রস্তাবে স্বস্তি পান, তবে নির্দ্বিধায় উদ্যানবাটিকায় যেতেও
সম্মতা হবেন”।
অবাক হয়ে আচার্য বিশ্ববন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন, “শাসনভার
থেকে মুক্ত হয়ে তিনি স্বস্তি পাবেন না, গুরুদেব? সকালে স্বয়ং তিনিই তো আপনাকে এই
অনুরোধ করেছিলেন!”
“ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এবং না থাকার পার্থক্য মহারাণি
সুনীথা, খুব ভাল করেই জানেন, বৎস। তিনি রাজকন্যা, এবং বিবাহের পর রাজরাণী হওয়ায়,
সুদীর্ঘকাল ক্ষমতার মাহাত্ম্য খুব নিকট থকে উপভোগ করেছেন। কিন্তু মহারাজ অঙ্গের
অন্তর্ধানের পর, তিনি রাজমাতা হয়ে, কিছুকাল ক্ষমতাচ্যুতির অসহায় যন্ত্রণাও ভোগ
করেছেন। তিনি সকালে যখন আমাকে শাসনভার থেকে মুক্তি চাইলেন, আমার ধারণা, পুত্রের
অসুস্থতার হতাশা থেকে, আবেগে বলে ফেলেছেন, অন্তর থেকে বলেননি। অথবা এমনও হতে পারে,
তিনি আমাদের পরীক্ষা করতে চাইছিলেন!”
“পরীক্ষা? কিসের পরীক্ষা, গুরুদেব?”
“জড়বৎ এবং দুরারোগ্য অসুস্থ এক পুত্রের প্রৌঢ়া মাতার
হাতে রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত রাখতে, আমরা সকলেই সত্য সত্যই আগ্রহী কী
না? আগ্রহী হলেও সে আগ্রহ কতদিনের?”
“তাহলে উপায়? মহারাণি যদি রাজ্যভার ত্যাগ করতে সম্মতা না
হন”? উদ্যানের মধ্যে পায়ে চলা পথে, দুজনে শ্লথ গতিতে পাশাপাশি হাঁটছিলেন, গভীর
চিন্তায় মহর্ষি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, “সম্মতা না হওয়ার কোন সুযোগ আমি তাঁকে দেব
না, বৎস। আমি মন্ত্রীমণ্ডলীর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করবো। সে সিদ্ধান্ত সাধারণতঃ
অনড় এবং সেই সিদ্ধান্তের অন্যথা করতে হলে, পুনরানুমোদনের জন্য মন্ত্রীমণ্ডলকেই
আবার অনুরোধ করতে হবে! সেই অনুরোধ কি, মহারাণি এবং রাজমাতা সুনীথার মর্যাদার হানি
ঘটাবে না?”
“অবশ্যই ঘটাবে, গুরুদেব!”
“অতএব, ওই বিষয়ে আমি বিশেষ চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত তাঁর
স্থান পরিবর্তনের অভিমত নিয়ে। আর এই বিষয়ে তোমার সহায়তা আমার একান্ত প্রয়োজন”।
“আমার সহায়তা, গুরুদেব? কী সাহায্য আমি করতে পারি?”
“দেশব্যাপী সুখ্যাত আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধুকে
রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস এনে দিতে হবে, উদ্যানবাটিকার নতুন পরিবেশ রাজাবেণের
স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল। নিজের একান্ত অভিলাষ অনুযায়ী নির্মিত এই
উদ্যানবাটিকায় বাস করলে, রাজাবেণের মনে উদ্দীপন হতে পারে। ধীরে ধীরে তাঁর
স্নায়ুবৈকল্যের নিরাময় হতেও পারে”।
“বুঝেছি মহর্ষি। আপনি সহায় হলে, রাজমাতার মনে এই বিশ্বাস
অবশ্য সঞ্চার করতে পারবো”!
“অতি উত্তম, বৎস। শুরুটা তুমিই করবে, তারপর পরিস্থিতি
অনুযায়ী আমাদের ভাবনায় পরিবর্তন আনা যাবে! এখন চল, আমরা ফিরে যাই, প্রস্তুত হয়ে
মহারাণি সুনীথার সাক্ষাতে যেতে, আমাদের বিলম্ব না হয়ে যায়!” ফেরার পথে অনেকক্ষণ
কেউ কোন কথা বললেন না।
উদ্যান থেকে বের হবার একটু আগে আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন,
“একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, মহর্ষি?”
স্মিতমুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সপুত্র মহারাণি সুনীথাকে
আমি প্রাসাদ থেকে দূরে নিয়ে যেতে চাইছি, কেন, তাই তো?” আচার্য বিশ্ববন্ধু অবাক
হলেন না, গুরুদেবের এই ক্ষমতার জন্যেই তিনি সকলের গুরুদেব, সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি
হেসে সম্মতির ঘাড় নাড়লেন। মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অনেক কারণ, বৎস, অনেক। ক্ষমতাহীনা
মহারাণিকে প্ররোচিত করে, আমাদের বিপক্ষীয়রা আমাদের বিরোধীতা করতে পারে! প্রশাসনিক
কাজে হস্তক্ষেপ করা যাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস, তিনি সুযোগ পেলেই, তাঁর অভিমত
প্রকাশ্যে আনতে দ্বিধা করবেন না। তাঁর সঙ্গে সাধারণ প্রজাদের দীর্ঘদিনের মাতা-পুত্র
সম্পর্ক, তাঁর কাছে তাদের অবারিত দ্বার। প্রশাসনিক দায়িত্ব না থাকায়, তিনি এখন
তাদের প্রতি আরও বেশি উদার হস্ত হয়ে উঠবেন। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে, তিনি
অপমানিতা বোধ করবেন, প্রজারা বিক্ষুব্ধ হবে, তারা আমাদের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায়
সন্দিহান হয়ে উঠবে! কারণ তিনি যে রাজমাতা ও মহারাণি! তাঁর জ্ঞাতে এবং অজ্ঞাতেও - প্রশাসন
বারবার বিপন্ন হবে!
উপরন্তু তিনি এখন এই রাজভবনের অন্দরমহলে সর্বময়ী কর্ত্রী
এবং এর পরেও তিনি তাই থাকবেন! এ বিষয়ে মন্ত্রীমণ্ডলীর কোন নিয়ন্ত্রণ চলে না! অতএব অন্দরমহলের
প্রতিটি বিষয়ে তাঁর হস্তক্ষেপ থাকবেই। তাতেও পরিস্থিতি ক্রমাগতঃ জটিল হয়ে উঠতে
থাকবে! আমাদের নবীন রাজা ও নবীনা রাণির জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে খুব দেরি হবে না। খুব
সংক্ষেপে যদি শুনতে চাও, বৎস, তাহলে বলি, আমি মহারাণি সুনীথাকে এই রাজভবনের
অন্দরমহল ও বারমহলের সব কিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন রাখতে চাই!”
চলবে...