শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩ 


১৪ 

চিঠিটা শেষ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। মধ্যরাত্রি এখন, ঘড়িতে সোয়াদুটো। ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সামনে রাস্তার ধারে স্ট্রিট লাইট – রাত্রিতেও নিশীথের বোধ আনতে দেয় না নাগরিক সভ্যতায়। জনহীন আলোকিত পিচের রাস্তাটা যেন লম্বা হয়ে শুয়ে আছে আরামে। দু একটা কুকুর এদিক ওদিক থেমে থেমে কিছু শুঁকতে শুঁকতে হেঁটে বেড়াচ্ছে অকারণ। ওদিকের বড়ো বকুল গাছের ঝাঁকড়া মাথায় একটা বাচ্চা কাক – থেকে থেকে ডেকে উঠছে। বাচ্চাটার মা-কাকটা বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছে এদিক সেদিক খাবারের সন্ধানে। শহরের পথে ঘাটে কাকদের খাওয়ার মতো কিছু না কিছু আবর্জনা সর্বদাই পড়ে থাকে। বিশেষ করে মোড়ের মাথায় বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বসে, নানান মুখরোচক খাবারের অস্থায়ী পসরা। রাস্তায় পড়ে থাকা বা ফেলে যাওয়া খাদ্যের সেই অবশিষ্টাংশ থেকেই মা-কাক কিছু কিছু তুলে এনে ফিরে আসছে বাসায় – ক্ষুধার্ত বাচ্চাটা মায়ের মুখ থেকে খাবার নেওয়ার সময় গলা থেকে আনন্দের অদ্ভূত আওয়াজ তুলছে।

 অধিকাংশ জীবজগতে প্রকৃতি মাতৃত্বকে আশ্চর্য এক দায়িত্ববোধ উপহার দিয়েছে। সে দায়িত্ব কোন কারণে বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হলেই, মা-নামক জীবসত্ত্বাটি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে তার বাচ্চাকে সেই বিপদ থেকে বাঁচানোর। ওই বিনিদ্র কাক-মা এই মধ্যরাত্রেও তার ক্ষুধার্ত ছানাটির জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদি এখনই কোন ব্যক্তি ওই গাছের নীচে এখন দাঁড়ায়, এবং গাছের ওপরের দিকে সন্দেহজনক ভাবে তাকায়, ওই কাক-মা সতর্ক হবে। সজাগ করে তুলবে ওর আশেপাশে থাকা কাক-সমাজকেও। তারপর বিপজ্জনক মনে হলে সকলে মিলে লড়তে শুরু করবে বিপদটিকে তাড়াতে।

কনির ক্ষেত্রেও যেন ব্যাপারটা সেরকমই ঘটেছিল। ওর শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূলতার সঙ্গে অনেকটা অ্যাডজাস্ট করে কনি নিজের জীবনটাকে কিছুটা হলেও যেন বাজি রেখেছিল। কিন্তু নিজের সন্তান আসার পরেই সে বুঝেছিল, সেই প্রতিকূলতাকে আর প্রশ্রয় দেওয়াটা হয়ে উঠবে বিপজ্জনক। তার পক্ষে তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা তার সন্তানের পক্ষে। একটা শিশু বড়ো হয়ে ওঠে মায়ের এবং বাবার ছায়ায়, আশেপাশে আরও থাকেন ঠাকুমা-দাদু, আত্মীয়-পরিজন। এসবের মধ্যে সন্তানের পিতা এবং ঠাকুমাই যদি নির্ভরযোগ্য না হয়, সন্তান বড়ো হওয়ার আগেই হয়ে উঠবে অসুস্থ। শারীরিক না হোক, মানসিক অসুস্থ তো বটেই। অতএব, এ কথা পরিষ্কার, ওই সময়ে কনির হাতে খুব বেশি অপশন তেমন ছিল না। অপশন ছিল দুটো, নিজের জীবনের মতো সন্তানের বড়ো হয়ে ওঠার প্রত্যেকটি দিনকে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া অথবা সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কনি দ্বিতীয় অপশনটাই বেছেছে।

এই বিষয়টাতে সুনেত্র তেমন অবাক হয়নি। কিন্তু তার কাছে আশ্চর্যের বিষয় হল, তার মা সুকুর এই বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা তাকে প্রায় কিছুই বলেননি। কেন? তিনি যে এ ব্যাপারের কিছুই জানতেন না, এমন হতেই পারে না।

একথা সত্যি চণ্ডীগড়ের পড়া শেষ করে, কর্মসূত্রে সে প্রায় আট-দশ বছর দিল্লি-হরিয়ানার বিখ্যাত কয়েকটি হসপিটালের সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত রেখেছিল। তার মুখ্য কারণ কলকাতার তুলনায় ওদিকের বিখ্যাত প্রাইভেট হসপিট্যালগুলির কাজের পরিবেশ অনেকটাই উন্নতই ছিল। তাছাড়া, ওরা যথেষ্ট লোভনীয় ফেসিলিটি এবং রেমিউনারেশনও দিত। অন্য আরেকটি একটি কারণ হল, কলকাতায় ফিরে এসে জীবিকার সন্ধান করে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার কোন ইচ্ছাই তার মনের মধ্যে সেই সময় স্থান পায়নি। অবশ্যই, এই দ্বিতীয় কারণের পিছনে ছিল, তার জীবনে কনির না আসা, এবং কনির বিয়ে হয়ে যাওয়া। তার মনের গোপন এই কথাটা কি মা এবং পিসিমা বুঝতে পেরেছিলেন?

কিন্তু ঘটনা যাই হোক, সুনেত্রর সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ তো কোনদিনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। মোটামুটি নিয়মিতই - এক-দেড়মাস অন্তর সে কলকাতায় যাওয়া আসা করেছে। কলকাতায় এলে পিসিমা-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়নি, তেমন একবারও হয়েছে বলে তো তার মনে পড়ছে না। সে সময় কনির সঙ্গেও তার দেখা হয়েছে অনেকবার। মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই একসঙ্গে তার হরিয়ানা এবং পরে দিল্লির বাসাতেও বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ওঁদের নিয়ে সে আনন্দ করেই দিল্লি, আগ্রা, ফতেপুরসিক্রি, মথুরা, বৃন্দাবন, কুরুক্ষেত্র, পানিপথ এবং চণ্ডীগড়, অমৃতসর পর্যন্ত ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক সকল দর্শনীয় স্থানেই গিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনদিন কনির এই বিপর্যয়ের কথা তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি কেন?

চণ্ডীগড় থেকে পাশ করে বেরোনোর পরেই তার বিয়ের জন্যেও উঠে পড়ে লেগেছিল, সুনেত্রর মা এবং পিসিমা। দুজনের থেকেই সে বারবার শুনেছিল, সুনেত্রর মতো “লাখে এক” বর পাওয়ার জন্যে চেনা-শোনা এবং পরিচিত মহলের বিবাহযোগ্যা কনারা নাকি চতুর্দশীতে শিবের মাথায় জল ঢালছেন বালতি বালতি। সেই জল অপচয় বন্ধ করার জন্যেই আমার বিয়ে হওয়াটা জরুরি। আমার জন্যে এই বিবাহ প্রস্তাবের প্রবল প্রকোপ চলেছিল প্রায় বছর ছয়েক। তারপর ধীরে ধীরে সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, বিষণ্ণ হলেন এবং একসময় সকলে ক্ষান্তও হলেন।

তাঁদের ক্ষুব্ধ মনের শেষ খেদোক্তি ছিল, “হ্যারে সত্যিসত্যিই তুই বিয়ে করবি না...এ কি ধনুকভাঙা পণ রে তোর? তোকে আজীবন আগলে রাখতে আমরা কেউই থাকব না, একথাটা মনে রাখিস। আমরা যখন চোখ বুজবো তখন টের পাবি কত ধানে কত চাল। বুড়ো বয়সে তখন বাধ্য হয়ে ছাদনাতলায় দাঁড়াবি টাকে টোপর পরে। আমরা তো আর তখন দেখতে আসবো না - যা পারিস করিস...”।

সে সব কথা মনে পড়ে যাওয়াতে সুনেত্র মুচকি হাসল। বহু বছর হল সে তার মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই সবাইকেই হারিয়েছে। কিন্তু আজও তাঁরা সকলেই উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছেন তার স্মৃতিতে। তাঁদের অকুন্ঠ স্নেহ-ভালোবাসা, প্রশ্রয় ও হিতাকাঙ্ক্ষার স্মৃতি আজও তাকে জীবনের সঠিক পথচলার দিশা নির্দেশ করে।

তার বাবা মারা যাবার সঙ্গেসঙ্গেই সে দিল্লি থেকে পাততাড়ি গুটোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বিখ্যাত কর্পোরেট হসপিটালের ঊর্ধতন কমিটিতে সে নির্দ্বিধায় জমা করেছিল তার ত্যাগপত্র। কিন্তু কমিটি তার ত্যাগপত্র নাকচ করে প্রস্তাব দিয়েছিল, “রিজাইন করছেন কেন? আপনি জানেন কলকাতা এবং হলদিয়ায় আমাদের এই কর্পোরেট হসপিট্যালের ব্র্যাঞ্চ রয়েছে। আপনার যেখানে সুবিধে, আপনি স্বচ্ছন্দে জয়েন করতে পারেন, একই শর্তে এবং একই রেমিউনারেশনে”। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কোন কারণই সুনেত্র খুঁজে পায়নি, অতএব সে সানন্দেই কমিটির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল এবং জয়েন করেছিল হলদিয়ায়। দীর্ঘদিন দিল্লিতে থাকার অভ্যাসে, সুনেত্র কলকাতার শহরের জটিল রাজনৈতিক আবর্তে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা চিন্তা করেই, হলদিয়াতে জয়েন করেছিল। সেদিন তো বটেই, আজও তার মনে হয়, কলকাতার থেকে হলদিয়ার রাজনৈতিক জটিলতা কিছুটা হলেও কম। রাজনীতি ব্যাপারটা তো আর লোকসভা বা বিধানসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার বিস্তার সর্বত্র। কর্পোরেট কোম্পানির উচ্চতম স্তর থেকে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়াত।

অতএব রাজধানীর পাট চুকিয়ে সে হলদিয়াতেই স্থায়ী ভাবে চলে এসেছিল। বাবার ক্রিয়া-কর্ম শেষে মাকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তার হলদিয়ার কোয়ার্টারে। মা অবশ্য একটু আপত্তি করেছিলেন, বলেছিলেন, “আমার স্বামী-শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে তোর সঙ্গে হলদিয়ায় গিয়ে থাকব, কোন দুঃখে, সুনু?”

সুনেত্র বলেছিল, “আমার দুঃখে, মা”।

“সে আবার কি? তোর আবার দুঃখ কিসের?”

“আমার ঘরে যে ভাত-জল করার কোন লোক নেই, মা। ঠিক সময় মতো আমার বিয়েটা তো দিলে না...! এখন তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো, যে তোমার সুনুর মর্জিমাফিক ঠিকঠাক তিনবেলা ভাত-জলের যোগাড় করে দেবে?”

সুনেত্রর পিঠে তার মা আদরের থাবড়া মেরে হেসে বলেছিলেন, “এখনও বেলা বয়ে যায়নি, সে লোক গোকুলে বাড়ছে। তুই একবার হ্যাঁ বললেই, তোর কাছে তাকে হাজির করে দেব, সুনু। তোর বাবার বাৎসরিক কাজ মিটলেই তোদের চার-হাত এক হয়ে যাবে”।

“হুঁঃ, তোমার এই দামড়া ছেলেকে বিয়ে করার জন্যে মেয়ের বাবারা এবং মেয়েরাও একেবারে জলছাড়া মাছের মতো হাঁকপাঁক করছে বৈকি! তুমি তোমার এই ছেলেটিকে আজও হীরের আংটি বিশেষ মনে করো, তাই না, মা? হীরে-টিরে কিচ্ছু নয়, আসলে পলকাটা কাচের, যাকে আমেরিকান ডায়মণ্ড বলে। সত্যি বলতে, আমি খুব ভয় পাই মা। পরের ঘরের কোন মেয়ে এসে ঘাড়ে চাপবে। সে অহর্নিশ আমাকেই বোঝাতে চাইবে, আমি আমার বাবা-মায়ের আসল রূপটাই চিনি না, জানি না। আমার ওই বাবা, মা, পরিজন সব্বাই কুচুটে, বদমাইশ নাম্বার ওয়ান...। সংসার নামক একটি আজব সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্যে, আমাকে চুপ মেরে ভ্যাবলাকান্ত সেজে থাকতে হবে। তোমাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে, চিনেও যেন চিনি না এমন ভান করতে হবে...। না মা, অত ঝক্কি আমার পোষাবে না... এই বেশ আছি। তুমি যদি আমার সঙ্গে একান্তই না যেতে চাও, তোমাকে জোর করব না। নিজেদের দুবেলা দুমুঠো ভাত-ডাল যোগাড়ের আশায়, আমাকে দুবেলা রান্না করে দেওয়ার মানুষ, ভারতবর্ষে অজস্র অঢেল পাওয়া যায়, মা। তাতেই আমার চলে যাবে...”।

সুনেত্রর এই কথার পর নিজের গোঁ ধরে ছেলের সঙ্গে যাবেন না, কোন মায়ের পক্ষেই বলা সম্ভব না। সুনেত্রর মাও পারলেন না। উঠে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তোমার মন যে কোথায় বাঁধা আছে সে কি আর আমি বুঝি না, বাপু - সব বুঝি। কবে যাবি হলদিয়া, আমিও যাব তোর সঙ্গে, ব্যাগ-ট্যাগ গোছানোর সুযোগ দিবি তো?”

সুনেত্র অবাক হয়ে বলেছিল, “কী বোঝো তুমি, মা? আমার মন কোথায় বাঁধা আছে?”

“সে সব তো কবেই চুকেবুকে গেছে, ভেবে আর লাভ কি?  কবে যেতে হবে বলিস। কটা দিন সময় দিস, আমাকে এদিকটাও গুছিয়ে যেতে হবে তো...”।  

এই কথাটুকুর মধ্যে মা কোন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্পষ্ট হয়নি সুনেত্রর কাছে। কখনো মনে হয়েছে কনির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কখনো মনে হয়েছে কনি নয়, মায়ের হয়তো অন্য কোন মেয়েকে পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে সেই মেয়েটি নিশ্চয়ই কোন একদিন চলে গেছে অন্য কারোর ঘরে, তাদের সংসারের আলো হয়ে।

সুনেত্র বহুদিন ভেবেছে সময়মতো মাকে একদিন চেপে ধরে বলবে, “আমার মনের তরী ঠিক কোন ঘাটে বাঁধা আছে বলো তো, মা?”

কিন্তু  কোনদিন বলতে পারেনি কিছুটা সংকোচে কিছুটা ভয়ে। মনে হয়েছে, মা হয়তো তার কথা শুনেই নস্যাৎ করে দেবেন, “ধূর, তখন কী মনে হয়েছিল, কী বলতে কী বলেছিলাম, অতশত আর মনে রাখতে পারি না বাপু”।

অথবা সত্যিই যদি মন খুলতেন এবং বলতেন, “তখন তো আমার কথা শুনলি না সুনু, একেবারে ধনুকভাঙা পণ করে বসে রইলি। তোর জন্যে খুব ভালো একটি মেয়ে দেখেছিলাম। আমার স্কুলের ক্লাসমেট বিশাখার মেয়ে, ভারি মিষ্টি। দেখতে ডানা কাটা পরি নয়, তবে অনেকটা আমাদের সুকুর মতো, খুব হাসিখুশি প্রাণখোলা। তোর জন্যে বছর খানেক অপেক্ষার পর, ভালো ঘরে, ভালো বরে, বিশাখা ওর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল”।

তাহলে? সে মাঝেমাঝেই কল্পনার জগতে বিভোর থেকেছে এই চিন্তায় যে, মা হয়তো এতদিনে সুকুর সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতাটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি বুঝেছেন কনির অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার জন্যেই তাঁর সুনু বিয়ে না করার পণ নিয়েছে। অসামাজিক জেনেও, সুনুর পিসিমা সুলেখার সঙ্গে আলোচনা করে, সুনু আর সুকুর সম্পর্কটাকে যদি মেনে নেওয়া যেত, তাহলে ছেলে-মেয়েদুটোর জীবন এমন এলোমেলো হয়ে যেত না। মনে মনে এই ভাবনাটাকে কতভাবে যে সুনেত্র লালন করেছে, এত বছর ধরে পোষণ করে আনন্দ পেয়েছে...! পাছে তার এই গোপন এবং অলীক আনন্দটুকুও হারিয়ে যায় – সেই ভয়েও সে মাকে কোনদিন আর জিজ্ঞেস করতে ভরসা পায়নি।

 নাঃ রাত শেষ হতে চলল প্রায় – মোবাইলের পর্দায় দেখল সাড়ে তিনটে। শোবার আগে শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে এল সুনেত্র, বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে চলে এল শোবার ঘরে। আলো নিভিয়ে, অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল বুকের ওপর অ্যাশট্রেটা রেখে। আলো না থাকলেও ঘর আঁধার হয়নি। স্ট্রিট লাইটের তিরছি আলোয়, চোখ চলে পরিষ্কার। মাথার ওপরে পাখা ঘুরছে বনবনিয়ে। সিগারেটের শেষ পাফটুকু অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে, সরিয়ে রাখল মাথার কাছে রাখা টেবিলে। তারপর পায়ের বালিশ টেনে, কাত হয়ে আরামে চোখ বুজল। আগামী কাল সোমবার – ইংরিজি মতে অবশ্য মানডে শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সকাল সকাল দুটো নার্সিং হোমে দৌড়তে হবে দুজন পেশেন্টকে অ্যাটেণ্ড করতে। তারপর চেম্বারে বসতে হবে সকাল নটা থেকে। ঘুমটা এখন জরুরি।   

চলবে... 



শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

অপূর্ব কোপি

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " শ্রীমান "


 আমরা তখন তোমাদের মতোই ছোট্ট, থুড়ি বড়ো; আসলে ক্লাস-এইট পর্যন্ত আমরা নিজেদের বাচ্ছাই মনে করতাম, আর ক্লাস নাইন থেকেই বেশ বড়ো। তোমরাও নিশ্চয়ই তাই মনে করো। তবে আমাদের তুলনায় তোমরা এখন অনেকটাই বড়ো, কারণ আমাদের দৌড় ছিল রেডিওতে গান আর খবর শোনা। সে তুলনায় তোমরা ছোট্ট থেকেই টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল দেখতে দেখতে আমাদের থেকেও কত্তো বড়ো যে হয়ে ওঠো তার হদিস তোমরাও জানো না। তাও আমরা সেই রেডিও ছুঁতে পেরেছিলাম, আরো অনেক বড়ো বয়সে। আমরা যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম, আমাদের বাড়িতে রেডিও চালানোর দায়িত্ব ছিল মাত্র তিনজনের, জ্যেঠু, বাবা আর মা। আমার জ্যেঠিমা ছিলেন সরল আলাভোলা মানুষ, তিনি ওই নব ঘুরিয়ে রেডিও চালু করা, কিংবা অন্য নব ঘুরিয়ে স্টেশন খুঁজে বেড়ানোটাকেও খুব জটিল এক কর্মকাণ্ড ভাবতেন। অতএব, বাড়ির বড়োরা অফিসে চলে গেলে, জ্যেঠিমা আমার মাকে ডাকতেন, “অ মেজো, রেডিওটা একটু চালু করে দিয়ে যা তো”। আমার মা ছিলেন আমাদের বাড়ির মেজবৌমা।

স্কুলে গরমের ছুটি পড়তে তখনো বেশ কটা দিন বাকি, তবে গরম পড়েছিল বেজায়। গলায় ঘাড়ে, পিঠে ঘামাচি বেরোচ্ছে বিস্তর। খেলার মাঠ থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরে, আমরা ঠাকুমার শরণাপন্ন হতাম। তাঁর ছড়ানো দুই পায়ের ওপর মাথা রেখে আমরা অবলীলায় শুয়ে পড়তাম। ঠাকুমাকে কিছু বলতে হত না, তিনি তাঁর বুড়ো আঙুলের ভোঁতা নখ দিয়ে, পিট পিট শব্দে ঘামাচি গেলে দিতেন, আর হাত বুলিয়ে দিতেন বুকে পিঠে। সেই আরামে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসত। মনে হত ভাগ্যিস গরম পড়ে, তা নইলে কী আর ঠাকুমার হাতের এমন পরশ বুঝতে পারতাম। তবে “বাব্বাঃ কী গরম পড়েছে”, বললেই ঠাকুমা বেশ রেগে যেতেন, বলতেন, “মুখপোড়া, গরম না পড়লে খাবি কি? আম, জাম, কাঁঠালই বা পাকবে কী করে?” তা ঠিক, পাকা এবং আধপাকা আমের নাম শুনলেই তখন জিভে জল আসত। আর আমাদের দিদিরা সর্ষেবাঁটা, তেল, নুন, লংকার গুঁড়ো দিয়ে কুষ্টি আম মেখেই মুখপোড়া গরমের তাপকে আবাহন করত।

মুখপোড়ার কথায় হনুমানের কথা মনে পড়ল। আমাদের সেই মফস্বল শহরে মাঝে মাঝেই বিস্তর হনুমান আসত। তারা দল বেঁধে সকাল সকাল হাজির হত, ঘুরে বেড়াত পাড়ার সবার বাড়ির গাছে গাছে। কাঁচা হোক পাকা হোক সব ফলেই দাঁত বসিয়ে দেখাটা তাদের রেওয়াজ ছিল। পেয়ারা, কাঁচা আম, কাঁচা সবেদা, সবুজ জাম, জামরুলের কুশি কিছুই তারা ছেড়ে দিত না। আর ছোট ছোট ইঁচড়গুলোকে গাছ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিত মাটিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে উঠত মানুষজন। পাড়ার লোকেরা থালাবাটি আর খালি ক্যানেস্তারা বাজিয়ে তাদের তাড়িয়ে বেড়াত। সে আওয়াজে আমাদেরই কান ঝালাপালা হয়ে উঠত, হনুমানদের কথা না বলাই ভাল।

স্কুলে সেদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল সংস্কৃতর ক্লাস। প্রত্যেকদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পিরিয়ড। কারণ এরপরেই আমাদের টিফিনের ঘন্টা পড়ত, আধ ঘণ্টার বিরতিএই ফোর্থ পিরিয়ড চলার সময়েই দিবাকরদা প্রত্যেক ক্লাসরুমে টিনের ট্রেতে আমাদের মাথা গুণে টিফিনের প্যাকেট রেখে যেত। তেলে ভিজে ওঠা বাদামি সেই প্যাকেট থেকে খাবারের গন্ধ বেরিয়ে, আমাদের নাকগুলোকে সচল করে তুলত, যেভাবে কাঠবিড়ালি বা ইঁদুররা খাবারের গন্ধ পেলে নাক চুলবুল করে, অনেকটা সেরকম। তার মধ্যে সহদেব স্যারের সংস্কৃত শ্লোক, আমাদের মাথা-কান-মন সব ঘেঁটে একসা করে তুলল

সেদিন সহদেব স্যার যে শ্লোকটা পড়াচ্ছিলেন, সেটি ছিল একটি চাণক্য শ্লোক, “অপূর্ব কোঽপি ভাণ্ডারস্তব ভারতি দৃশ্যতে, ব্যয়তো বৃদ্ধিমায়াতি ক্ষয়মায়াতি সঞ্চয়াৎ”। খুব সহজ করে বললে, শ্লোকটির মর্মার্থ হল, “হে সরস্বতি, তোমার ভাণ্ডারটির মতো অপূর্ব আর কীই বা দেখা যায়? যা খরচ করলে বেড়ে ওঠে আর সঞ্চয় করলে কমে যায়”! এই ভাণ্ডারটি হল আমাদের বিদ্যা বা জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিদ্যাচর্চা বা আলোচনা করলে আমাদের জ্ঞান বেড়ে ওঠে। কিন্তু চর্চার অভাবে আমাদের সেই জ্ঞানই হারিয়ে যায়, তার মানে আমরা ভুলে যেতে থাকি। এই শ্লোকের “ভারতি” হচ্ছেন মা সরস্বতী। ভারতী মা সরস্বতীর আরেকটি নাম, সে কথা নিশ্চয়ই জানো। তাঁর ভারতী নামটিই এখানে সম্বোধনে “ভারতি” হয়েছে – সংস্কৃতে সেটাই নিয়ম।  সরস্বতী বানানটাও একই নিয়মে সরস্বতি লিখতে হয়েছে। সে যাই হোক, এই শ্লোকটির মানে আজ যত সহজে তোমাদের বলতে পারলাম, সেদিন আমাদের সেটা বুঝতে কিন্তু বেজায় বেগ পেতে হয়েছিল।

শ্লোকটি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করে, সহদেব স্যার আমাদের জিগ্যেস করলেন, “‘কোঽপি’ শব্দের অর্থ তোদের মধ্যে কে বলতে পারিস?” আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়, সব স্যারদের চোখের মণি, পুলক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হনুমান, স্যার”। এখানে ছোট্ট করে বলে রাখি, এই ঘটনার পর পুলকের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘পুলকপি’।

সহদেব স্যার, অদ্ভূত এক মুখভঙ্গি করে বললেন, “তোরা যে সবাই এক একজন কপি, সে বেপারটা বুঝতে আমার বাকি নেই। এই ‘কোঽপি’ সে কপি নয়, কঃ অপি সন্ধি হয়ে কোঽপি, অর্থ হল ‘আর কে’? কিংবা ‘আর কী?’” দীর্ঘ শব্দে নাকে নস্যি নিয়ে সহদেব স্যার, সামান্য নাকি স্বরে বললেন, “সংস্কৃত হল ভাষার রাজা, প্রত্যেকটি শব্দের মধ্যে রহস্য লুকোনো থাকে, সে সব খুঁজে বের করাতেই আসল মজা”।

আমি অবিশ্যি সে সব মজার কিছুই টের পেলাম না। চিন্তা করতে লাগলাম, কপি মানে আমি এতদিন জানতাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি। শীতকাল হলেই ভুদেবকাকা বাজার থেকে আনে। আরেকটা কপি জানি, সেটা ইংরিজি - কপিবুক, কপি করা। কিন্তু কপি মানে বাঁদরও হয়? যদিও সহদেবস্যারের কথায় আর আমার মন ছিল না, ভাবছিলাম কতক্ষণে টিফিনের ঘন্টা পড়বে, আর আমরা টিফিনের প্যাকেট হাতে নিয়ে দৌড়ে নেমে যাবো স্কুলের মাঠে।

এমন সময় ক্লাশের বাইরে হঠাৎ খুব দুপদাপ হুপহাপ আওয়াজ উঠল। আমাদের জানালার পাশেই একটা বড়ো তেঁতুলগাছ ছিল, দেখলাম তার ডালপালাগুলোয় ভীষণ ঝাঁকুনি উঠেছে। সহদেব স্যার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? এই অসময়ে ঝড় উঠল নাকি?” ওপাশে জানালার ধারেই বসে দীপক, সে বলল, “ঝড় নয় স্যার, হনুমান। একদল হনুমান হানা দিয়েছে”।

সহদেব স্যার বললেন, “অর্বাচীন কোথাকার, হনুমান কী ডাকাত না মারাঠিসেনা? যে হানা দেবে?” কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় একদল হনুমানকে দৌড়োদৌড়ি করতে দেখা গেল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বারান্দার দিকের খোলা জানালায় মুখ রেখে আমাদের দিকে লক্ষ্যও করতে লাগল। জানালায় গ্রিল ছিল, তাই আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম, ওরা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তারপরেই তারা যা ক্ষতি করল, সে কথা মনে পড়লে, আজও আমার মন দুঃখে হু হু করে ওঠে।  

হনুমানের দলের বেশ কয়েকজন প্রথমদিকে একটু ইতস্ততঃ করলেও, একটু পরেই তারা স্যারের অনুমতি না নিয়েই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। তারপর সহদেব স্যারের টেবিলের কোণায় রাখা টিফিনের ট্রে থেকে আমাদের খাবারের প্যাকেটগুলি নিমেষের মধ্যে হাতিয়ে নিল এবং আগের মতোই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকেআমরা সত্যি বলতে নিঃস্ব হয়ে গেলাম তৎক্ষণাৎ। ঘরের মধ্যে আমরা সকল ছেলেরা এবং সহদেব স্যারও স্তম্ভিত হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। আমাদের ক্লাসের শ্যামল গোটা স্কুলেই বিখ্যাত ছিল। হেডস্যার থেকে শুরু করে সব স্যারেরাই মনে করতেন শ্যামলের মত ফক্কোড় আর ইঁচড়ে-পাকা ছেলে ভূ-হুগলি জেলায় আর একটিও নেইক্লাসের সবাইকে বেশ কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থাকতে দেখে, শ্যামল অত্যন্ত নিরীহ মুখ করে, বলল, “স্যার এটাকে কী, ‘কোপি দৃশ্যতে মারাঠীসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা’ বলা যাবে?  যার অর্থ হতে পারে - মারাঠী সেনার মতো এমন কপিসেনা আর কে দেখেছে?” শ্যামলের ভুল-ভাল সংস্কৃত বাক্য শুনে সহদেবস্যার খুব রেগে উঠে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই একতলা থেকে বেজে উঠল স্কুলের ঘন্টা, একটানা। এই ঘন্টা টিফিনের ঘন্টা নয়, এমার্জেন্সি ঘণ্টা – কোন বিশেষ কারণে, সবাইকে একত্র হওয়ার সংকেত দিতেই এমন একটানা ঘণ্টা বাজানো হয়। বুঝতে পারলাম, বইখাতার ব্যাগ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি নীচেয় নামতে হবে।

তোমাদের হয় কিনা জানি না, আমাদের সময়, স্কুলের একতলায় ঘন্টা বাজলেই আমাদের মাথায় যেন পোকা নড়ে উঠত। সে ক্লাস শেষের ঘন্টা হোক, কিংবা টিফিনের অথবা ছুটির। আর এমন জরুরি ঘন্টা হলে তো কথাই নেই। মূহুর্তের মধ্যে ব্যাগের মধ্যে বই-টই ঢুকিয়ে আমরা দৌড়ে বেরোতে লাগলাম বারান্দা দিয়ে। এক একটা ক্লাসরুম থেকে নানান বয়েসের ছেলের দল বন্যার মতো বেরিয়ে আসছিল। তারপর বারান্দার নদীতে মিশে গিয়ে জলপ্রপাতের মতো সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে আমরা নেমে এলাম একতলায়।

নীচের বারন্দাতে এসেই আমাদের আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তে হল, কারণ হেডস্যারের ঘরের সামনে, হেডস্যার নিজে এবং মাষ্টারমশাইদের অনেকে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দাঁড়িয়ে আছেন থানার বড়োবাবু এবং শহরের বেশ কিছু গণ্যমান্য ভদ্রলোক। ওঁনারা সকলেই যেন আমাদেরই অপেক্ষা করছিলেন। ওপর থেকে নেমে আসা ছেলেদের-স্রোতের বেগ কিছুটা শান্ত হতে, থানার বড়োবাবু বললেন, “মনে হচ্ছে, সকলেই নেমে এসেছে”? হেডস্যার বললেন, “হুঁ, তাই তো মনে হচ্ছে”।

মস্ত ভুঁড়ির ওপর ট্রাউজারটা টেনে তুলতে তুলতে বড়োবাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারো হাতে পায়ে খিমচে-খামচে দেয়নি তো?” আমাদের মধ্যে কেউই কোন উত্তর দিলাম না।

আমরা তো বুঝতেই পারলাম না, কে আমাদের খিমচে দেবে, আর সেটা জানার জন্যে আমাদের নীচেয় ডাকাই বা হল কেন? শ্যামল একটু পিছনের দিকে ছিল, আমাদের ধাক্কা দিয়ে আর গুঁতিয়ে সে একটু সামনে এগিয়ে হাত তুলে বলল, “স্যার, অপূর্ব কোপি দৃশ্যতে মারাঠিসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা”। আমরা তো বটেই স্যারেরা এবং উপস্থিত মানী মানুষরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শ্যামলের দিকে। বড়োবাবু আতঙ্কিত স্বরে হেডস্যারকে বললেন, “ও ওসব কী বলছে? কী ভাষা? স্যার এই ছেলেটিকে মনে হয়, হনুমান খিমচে বা আঁচড়ে দিয়েছে। জলাতঙ্ক হওয়ার আগেই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার”।

“তোর কী হয়েছে, শ্যামল? হঠাৎ সংস্কৃত বলা শুরু করলি কেন?” হেডস্যার বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। তবে তিনি শ্যামলকে ভরসা না করে, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ফার্স্টবয় পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোদের ক্লাসে হনুমান ঢুকেছিল?”

“হ্যাঁ, স্যার দশ-বারোটা”।

শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দুজন বলে উঠলেন, “সর্বনাশ। হনুমানের বিশাল দলটাকে আমরা এই দিকে আসতে দেখে এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম, গোলোকবাবু। স্কুলের ছেলেদের ওপর এরা কী না কী দৌরাত্ম্য করে বসে”গোলোকবাবু থানার বড়োবাবু, এমন সার্থক নামের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। প্রকাণ্ড ভুঁড়ি সহ গোলগাল মানুষটির নাম গোলক ছাড়া আর কী হতে পারে? অবশ্য আরও বড়ো হয়ে জেনেছিলাম – গোলোক মানে বৈকুণ্ঠ বা বিষ্ণুলোক; তার সঙ্গে গোল বা গোলকের কোন সম্পর্ক নেই।

যাই হোক, গোলোকবাবু ট্রাউজারটা আরেকবার টেনে তুলে বললেন, “আপনাদের আশঙ্কার কথা শোনা মাত্র আমরাও তো থানা থেকে চলে এসেছি, স্যার”।

“আঃ, আপনারা একটু শান্ত হবেন?” হেডস্যার বিরক্ত স্বরে বললেন, “কী হয়েছে ঘটনাটা শোনাই যাক না। পুলক, হনুমান ঘরে ঢুকে কী করেছে?”

“আমাদের সবার টিফিনের প্যাকেট লুঠ করে নিয়ে গেছে, স্যার”। পুলকের স্বরে হাহাকার, আমাদের  মনের কথাই সে বলল। আমরা সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখে-শোকে মাথা নীচু করলাম।

“কী ছিল টিফিনে? হনুমানরা আজকাল কলা-মূলো-বেগুন ছেড়ে দিয়ে টিফিন খাচ্ছে?” অবাক গোলোকবাবু নেমে যাওয়া প্যান্ট আবার টেনে তুলে নিয়ে বললেন।

“টিফিনে কী ছিল জানি না, স্যার। আমরা দেখার আগেই তো ওরা...” পুলক কথা শেষ করতে পারল না, স্বাভাবিক, এমন দুঃখের কথা মুখ ফুটে বলাও শক্ত বৈকি!

“ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে আমি দেখছি। কিন্তু শ্যামল সংস্কৃত শ্লোক বলছে কেন?” হেডস্যার জিজ্ঞাসা করলেন। পুলক বলল, “আমাদের ওই পিরিয়ডে সংস্কৃত পড়াচ্ছিলেন সহদেব স্যার। চাণক্য শ্লোকঅপূর্ব কোপি ভাণ্ডারস্তব। আমি বলেছিলাম কোপি মানে হনুমান। কিন্তু স্যার বললেন, এই কোপি সেই কপি নয়”

“এই কপি ফুলকপি বা বাঁধাকপিও নয় স্যার। এ কোপি অন্য কোন কপি”। আমিও ফোড়ন দিলাম পুলকের সঙ্গে। স্যারেরা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। গোলোকবাবু, আরও একবার প্যান্ট টেনে তুলে বললেন, “স্কুলে এত রকমের কপি নিয়ে আলোচনার দরকারটা কী, স্যার? হনুমানরা কী জানে, কোন কপি মানে হনুমান আর কোন কপিতে হনুমান নয়?  বাঁধাকপি শুনে ওরা ভেবে নিয়েছে – ওদের বেঁধে রাখার ফন্দি করছে মানুষগুলো, আর তাই খামোখা ওরা খেপে গিয়ে ছেলেদের টিফিন নিয়ে চলে গেছে! তোমাদের সংস্কৃত কোন স্যার পড়ান, খোকা?” গোলোকবাবু পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন। পুলকপি উত্তর দিল, “সহদেবস্যার, স্যার”।

নিজের নাম শুনে সহদেবস্যার এগিয়ে এলেন, বললেন, “আমিই সহদেব, সহদেব চক্রবর্তী, ছেলেদের সংস্কৃতের টিচার। সংস্কৃতে ওরকম থাকলে পড়াবো না?” “আহা, পড়াবেন না কেন? একশবার পড়াবেন। কিন্তু এদিকটা বিবেচনা করবেন না? দেখছেন শহরে হনুমানের উপদ্রব। এইসময় ওই কপি-টপি উচ্চারণ করে মিছিমিছি ওদের কোপে পড়ার দরকারটা কী?” সহদেববাবু বেশ রেগেই গেলেন এবার, বেশ ওজস্বিনী স্বরে বললেন, “থানার বড়োবাবু হয়ে, এই কটা হনুমান সামলাতে আপনি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন গোলোকবাবু? আর আমরা যে বছরের পর বছর কত শত হনুমানকে মানুষ করে তুলছি? সে কথাটা ভেবে দেখেছেন?”

গোলোকবাবু একটু থতমত খেয়ে কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। ওদিকে স্যারেরা এবং শহরের মান্যিগণ্যি লোকেরা হেসে উঠলেন হো হো করে। আমরাও, যদিও সংস্কৃতস্যার আমাদেরই হনুমান বললেন, রাগ করব কিনা ভাবতে ভাবতেই, হি হি করে সবাই হেসেই ফেললাম।

গোলোকবাবুও কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝে, যখন সকলের হাসি থেমে গিয়েছে, তখন খুব হাসলেন খানিকক্ষণ, তারপর বললেন, “কথাটা মন্দ বলেননি, স্যার। আমরাও কী ছোটবেলায় কম বাঁদরামি করেছি? হে হে হে হে। যাকগে হনুমান হানা দিলেও তেমন কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, সেটাই রক্ষেআপনারা আপনাদের হনুমান সামলান, আর আমি চলি শহরের হনুমান সামলাতে”। গোলোকবাবু সহদেবস্যারের থেকে নস্যির ডিবে নিয়ে নাকে একটিপ নস্যি নিলেন জোরসে। ওদিকে আমাদের হেডস্যার ঘোষণা করলেন, “ছেলেদের টিফিন যখন হনুমান নিয়ে চলে গেছে, তখন আজকে আর স্কুল হবে না, আজকে হাফ-ছুটি। ছেলেরা, সব বাড়ি যাও”।

রতনমণিদা আমাদের স্কুলের ঘন্টা বাজাতেন, তিনি ঘন্টা বের করে, ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন ঢং ঢং করে। আমরাও সকলে একসঙ্গে হৈ হৈ করে দৌড় দিলাম স্কুলের মাঠ পেরিয়ে মেন গেটের দিকে।

নস্যি ভরা নাকের জন্যে খোনা স্বরে গোলোকবাবু বললেন, “আঁহা, আঁমাদেরও যদি এমন একজন হেডস্যার থাকতেন, কেমন মজার একটা হাঁফ ছুটি পেয়ে, আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।”

..০০..


বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




  তৃতীয় স্কন্ধ - প্রথম পর্ব


শ্রীশুকদেব বললেন, “অনেকদিন আগে, অখিলেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ, আপনার (পরীক্ষিতের) পূর্বপুরুষ পাণ্ডবদের দূত হয়ে এসেছিলেন, তখন তিনি দুর্যোধনের প্রাসাদে বাস না করে, নিজের ঘর মনে করে, বিদুরের ঘরেই বাস করেছিলেনসেই সমৃদ্ধ ঘর ছেড়ে বিদুর বনে গিয়ে ভগবান মৈত্রেয়র সঙ্গে অনেক তত্ত্ব আলোচনা করেছিলেন”

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “মহাত্মা বিদুরের সঙ্গে ভগবান মৈত্রেয়র কোথায় দেখা হয়েছিল? তাঁদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সে নিশ্চয় অত্যন্ত গভীর তত্ত্বকথা, সে বিষয়ে আমাকে সবিস্তারে জানান”

শ্রীসূত বললেন, “মহারাজ পরীক্ষিতের সাগ্রহ কৌতূহলে মহামুনি শুকদেব অত্যন্ত আনন্দ পেলেন, তিনি বললেন,

বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ

শ্রীশুকদেব বললেন, “অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র চিরকালই পুত্রস্নেহেও অন্ধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ও তাঁর পুত্রেরা পাণ্ডুপুত্রদের ক্ষতি করার বারবার চেষ্টা করেছেনতাঁর ছোটভাই পাণ্ডুর মৃত্যুর পর পাণ্ডবদের পাঁচভাই ও পাণ্ডবজননী কুন্তীকে জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। সে পরিকল্পনা অবশ্য ব্যর্থ হয়েছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও মহাত্মা বিদুরের সাহায্যে। এরপরে, যুধিষ্ঠিরের মতো সাধু ও সৎ ব্যক্তিকে পাশা খেলতে ডেকে, শঠতা করে হারিয়েছেন কয়েকবার। পাশার মিথ্যে চালে কেড়ে নিয়েছেন তাঁদের রাজ্য অধিকার রাজ্য থেকে বের করে, পাঠিয়েছেন বনবাসে। রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা, পাণ্ডবদের পাঁচভাইয়ের স্ত্রী দ্রৌপদীকে রাজসভায় সকলের সামনে চরম অপমান করেছেন। পুত্রদের একের পর এক এই রকম কুকীর্তি দেখেও, রাজা ধৃতরাষ্ট্র নীরব থেকেছেন সর্বদা।

পাণ্ডবরা বনবাসের পর ফিরে এলে, দুর্যোধন কথা দিয়েছিলেন, তাদের রাজ্য আবার ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে, পাণ্ডবরা যখন ফিরে এলেন, তাঁদের দাবি মানলেন না রাজা দুর্যোধন। এই রকম পরিস্থিতিতে পাণ্ডবদের কাছে সরাসরি যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা রইল না। কিন্তু তাও ধর্মপ্রাণ যুধিষ্ঠির, যুদ্ধ ঘোষণার আগে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আর রাজা দুর্যোধনের কাছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দূত হিসেবে পাঠালেন, শান্তির শেষ চেষ্টায়। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হল। রাজা দুর্যোধন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সামনেই শ্রীকৃষ্ণকে অপমান করলেন এবং তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে দিলেন এককথায়।

এই ঘটনায় ভয় পেয়ে, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র একদিন ছোটভাই বিদুরকে পরামর্শের জন্যে ডাকলেনমহাত্মা বিদুর সেদিন যে কথা বলেছিলেন – সেই সব কথা পরে বিদুর-বাক্য হিসেবে সবাই জেনেছে।

বিদুর বললেন, “হে মহারাজ, যুধিষ্ঠির ও তার পরিবার আজ যে দুঃসহ অপমান ও দুঃখ ভোগ করছে, তার জন্যে তো তুমিই দায়ী।  আজ অর্জুন ও ভীমের মতো মহাবীর আমাদের বিরুদ্ধে রাগে গর্জন করছে। শ্রীকৃষ্ণ কোন সাধারণ মানুষ নন, একথা আপনারা এখনো কেউ বোঝেননি, তিনি স্বয়ং ভগবান। কুন্তীর ছেলেদের সঙ্গে তিনি নিজে আছেন পরমবন্ধু ও আত্মীয় হয়ে। তিনি সঙ্গে থাকা মানে ভারতের অধিকাংশ রাজা, দেবতা, ব্রাহ্মণ ও যদুবীররাও পাণ্ডবপক্ষেই থাকবেন। 

অতএব, হে মহারাজ, এখনো সময় আছে। শ্রীকৃষ্ণকে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনুন। ফিরিয়ে দিন যুধিষ্ঠিরদের প্রাপ্য রাজ্যভাগ। আপনার এই পুত্রেরা নীতি মানে না, ধর্ম মানে না, ভগবানকে মানে না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো পরমপুরুষকে অপমান করে। আপনার এই পুত্রেরা হতশ্রী, মূর্তিমান অমঙ্গল। আপনি যত তাড়াতাড়ি আপনার এই পুত্রদের, বিশেষ করে দুর্যোধনকে ত্যাগ করবেন, তত তাড়াতাড়ি এই কুরুবংশে, এই হস্তিনাপুরনগরে এবং এই রাজ্যে মঙ্গল ফিরে আসবে”

বিদুর যখন মহারাজকে এই কথা বলছিলেন, দুর্যোধন, দুঃশাসন, কর্ণ, শকুনি সকলেই সামনে ছিলেন। বিদুরের কথায় রাগে আগুন হয়ে উঠলেন দুর্যোধন, তিনি চিৎকার করে বিদুরকে বললেন, “এই দাসীর ছেলেকে, কে এখানে ডেকে আনল? এই দুশ্চরিত্র লোকটা আমাদের অন্নে বেঁচে আছে, কিন্তু সর্বদা শত্রুপক্ষের হয়ে কাজ করে চলেছে। একে প্রাণে মের না। এর থেকে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে, একে রাজপুরি থেকে তো বটেই, এই রাজ্য থেকেও তাড়িয়ে দাও”

মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সামনেই দুর্যোধনের এই কথায় বিদুর একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি দুঃখও পেলেন না। তিনি মনে মনে ভাবলেন – এ সবই মায়ার লীলা। কুরুবংশ এখন দৌড়ে চলেছে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে, সেখান থেকে পরিত্রাণের আর উপায় নেই। যিনি এর সমাধান করতে পারতেন, সেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এখনও নীরব। বিদুর আর দেরি করলেন না, আরো কেউ কিছু বলার আগেই তিনি হস্তিনাপুর ছেড়ে এবং রাজ্য ছেড়ে সেই দিনই বেরিয়ে গেলেন। 

দেশভ্রমণ শেষে বিদুরের সঙ্গে উদ্ধবের সাক্ষাৎ

নগর হস্তিনাপুর ছেড়ে, বিদুর বেরিয়ে পড়লেন তীর্থভ্রমণে। যে সমস্ত স্থানে ভগবান বিষ্ণু, ব্রহ্ম এবং রুদ্রের মন্দির আছে, মূর্তি আছে। সেই সব স্থানই পবিত্র তীর্থ। মহাত্মা বিদুর সেই সব তীর্থ দেখে বেড়াতে লাগলেন। সেই সব তীর্থ ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখতে লাগলেন অজস্র পাহাড়, পর্বত, অরণ্য, বন-উপবন, নগর, গ্রাম, জনপদ, নদী, সরোবর। তিনি শ্রীকৃষ্ণ ভগবানে নিজের সমস্ত চিন্তা ও মনন সমর্পণ করে, আহারের সংযম করে শুধু ফল খেয়ে থাকতেন। মাটিতে, গাছের তলায় শুয়ে রাত কাটাতেন। তীর্থের জলে স্নান করতেন, পান করতেন। রাজপ্রাসাদের বেশ ছেড়ে তিনি গাছের ছাল পড়ে থাকতেন।

সারা ভারতভূমি ঘুরে তিনি এসে পৌঁছলেন প্রভাসতীর্থে। সেখানে এসে তিনি সংবাদ পেলেন, হস্তিনাপুরের সিংহাসনে এখন যুধিষ্ঠির, শ্রীকৃষ্ণের সাহায্যে তিনিই এখন একচ্ছত্র রাজা। শুনলেন কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিনের যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের সমস্ত পুত্রেরাই মারা গিয়েছেনএই সংবাদ পেয়ে তাঁর মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। তিনি হাঁটতে লাগলেন সরস্বতীর উৎসের দিকে। পথে অনেকগুলি তীর্থে স্নান করলেন, বহু বিষ্ণুক্ষেত্র দেখে তাঁর মন কিছুটা শান্ত হল। এই সব মন্দির দেখলেই তাঁর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে পড়ে যায়। তাঁর খুব জানার ইচ্ছা হল শ্রীকৃষ্ণ কেমন আছেনআর এই সময়েই তাঁর দেখা হয়ে গেল শ্রীকৃষ্ণ সহচর উদ্ধবের সঙ্গে।

উদ্ধবের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর মনের ইচ্ছাই যেন উদ্ধবের মধ্যে উপস্থিত হল। তিনি অধীর আগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, “হে উদ্ধব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভালো আছেন তো? কৃষ্ণপিতা বসুদেব কেমন আছেন? কেমন আছেন, কৃষ্ণ পুত্র প্রদ্যুম্ন, শাম্ব? কেমন আছেন মহারাজ উগ্রসেন? সাত্যকি ভালো আছেন? শ্রীকৃষ্ণের পত্নী রুক্মিণী, জাম্ববতী নিশ্চয়ই কুশলে আছেন? পথের ধুলোয় কৃষ্ণের পায়ের চিহ্ন দেখে যিনি ব্যকুল হয়ে যান, সেই অক্রুর, কেমন আছেন? যিনি স্বয়ং বিষ্ণুকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, সেই মহা পুণ্যবতী কৃষ্ণজননী দেবকী কেমন আছেন? অনিরুদ্ধ, কেমন আছেন? হৃদীক ও  সত্যভামার পুত্র চারুদেষ্ণ ও গদ কেমন আছেন?

আর ওদিকে যুধিষ্ঠির রাজা হয়ে রাজধর্ম যথাযথ পালন করছে তো? কৌরব বিনাশের পর অত্যন্ত রাগী বীর ভীমের রাগ কমেছে? কিরাতরূপী মহাদেবও যাঁর তির চালনায় খুশি হয়েছিলেন, সেই মহাবীর অর্জুন ভালো আছে? মাদ্রী সতীন হলেও তাঁর পুত্রদের, মাতা কুন্তী নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করেন, সেই নকুল ও সহদেব কেমন আছে?  কুন্তীর কথা আর কি জিজ্ঞেস করবো? মহাবীর পাণ্ডুর মতো স্বামীর মৃত্যুর পরেও তিনি যে জীবন ধারণ করে আছেন, সে শুধু এই পুত্রদের জন্যে;  জীবনের সুখভোগের জন্যে নয়।  মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের জন্যে আমার দুঃখ হয়, হে উদ্ধব। নিজের দুরাত্মা ছেলেদের কথায় মৃত ছোট ভাই পাণ্ডুর ছেলেদের কি কষ্টই না দিয়েছেন। আমাকেও তাঁর রাজ্য থেকে তিনি নির্বাসিত করেছিলেন।

এসব সত্ত্বেও আমি কিন্তু একটুও অবাক হই না, উদ্ধব। এ সবই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মায়া। ছোটবেলা থেকে দুর্যোধনরা যখন পাণ্ডুর ছেলেদের উপর অত্যাচার করতে শুরু করল, শ্রীকৃষ্ণ তখনই তাদের শেষ করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। তিনি তখন অন্যান্য দুর্দান্ত ও নিষ্ঠুর রাজাদের বিনাশে ব্যস্ত ছিলেন, যাঁদের অত্যাচারে দেশের সাধারণ ভক্ত ও ধার্মিক মানুষ নিদারুণ কষ্ট পাচ্ছিল। তিনি দুর্যোধনদের ধর্ম পথে আসার সুযোগ দিয়েছিলেনতিনিই যে পরমপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তিনি পৃথিবীতে এসেছেন দুষ্টের দমন করতে, একথাটা দুর্যোধনরা বুঝলই না। ঈর্ষা, মোহ আর অহংকারে অন্ধ হয়েই রইল দুর্যোধন আর তার সকল সঙ্গীরা। ফল যা হবার তাই হল”

উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা

শ্রীশুকদেব বললেন, “বিদুরের এই কথায় উদ্ধব যেন অসাড় হয়ে গেলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়েস থেকেই উদ্ধব কৃষ্ণভক্তিতে ব্যাকুল। খেলার পুতুলকে কৃষ্ণ ভেবে তিনি ওই বয়সেই স্নান খাওয়া ভুলে থাকতেন। আজ এই বৃদ্ধ বয়সে মহাত্মা বিদুরের মুখে কৃষ্ণ কথা শুনে তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তাঁর সারা শরীর শিউরে উঠল, তাঁর দুচোখে বইতে লাগল অশ্রুধারা।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে উদ্ধব বললেন, “হে বিদুর, কৃষ্ণসূর্য অস্ত গেছে। তোমাকে আর তাঁর কি মঙ্গল সংবাদ দেব? আমাদের দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য যাদবদের। জলের মধ্যে চাঁদের ছায়া পড়লে মাছরা তাঁকে জলচর জীব বলেই মনে করে, চাঁদ বলে বুঝতে পারে না।  সেরকম যাদবরা কৃষ্ণের সঙ্গে এতদিন থেকেও তাঁকে পরমপুরুষ বলে চিনতেই পারল না। এও কৃষ্ণের মায়া। তিনিই কাউকে বুঝতে দিলেন না, আসলে তিনি কে? তাঁর মায়ায় আচ্ছন্ন হয়েই রইল সমস্ত যদুকুল।

ভগবানের আদি নেই, শেষ নেই। জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। জীবের মঙ্গলের জন্যে যোগমায়ার প্রভাবে তিনি নররূপে এলেন। কিন্তু দেখ, সে রূপ এমনই যে চোখ ফেরানো যায় না। সৌন্দর্যের শেষকথা। অলংকার তাঁর অঙ্গের কি শোভা বাড়াত, বরং তাঁর সুকুমার অঙ্গই অলংকারের শোভা বাড়াত। যাঁর শক্তির শেষ নেই, সেই ভগবান অসহায় শিশুর মতো কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি কংসের ভয়ে মথুরা ছেড়ে, নিজের মাকে ছেড়ে, ব্রজে বড়ো হলেন। কংস বধের পর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কারাগারে বন্দী মা ও বাবাকে প্রণাম করে বলেছিলেন, কংসের ভয়ে আমি তোমাদের সেবা করতে পারিনি, আমাকে তোমরা ক্ষমা করো। এসব কথা মনে পড়লে আমার মন ব্যথায় ভরে ওঠে, বিদুর। আবার মনে হয় এ সবই তো তাঁর লীলা।

তুমিও তো যুধিষ্ঠিরের সেই রাজসূয় যজ্ঞে ছিলে, বিদুর। যেখানে শিশুপাল, চরম অপমান এবং বিদ্বেষ করেও ভগবানের চরণ লাভ করেছিলেন। তুমি ছিলে না, তাই তুমি দেখনি বিদুর, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অর্জুনের তিরে প্রাণ দেবার সময়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুধুমাত্র করুণা দৃষ্টিতেই মুক্তি পেয়ে গেল কত ক্ষত্রিয়বীর! প্রতিটি মৃত্যুই হয়ে উঠল ভগবানের চরণে জীবন উৎসর্গের সমান, তাঁরা সকলে পৌঁছে গিয়েছেন কৃষ্ণের পরমধামে।

যিনি ত্রিগুণের অতীত, যিনি পরম ঐশ্বর্যশালী। যাঁর সমতুল্য ব্যক্তি জগতে আর কেউ নেই, কাজেই তাঁর চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে? সেই ব্যক্তিকেও নত হয়ে রাজা উগ্রসেনকে, “হে দেব, দয়া করে আমার নিবেদন শুনুন” বলতে শুনেছি তাঁর এই দাসভাব দেখে, আমরা যারা শুধু তাঁরই দাস, অবাক হয়েছি, দুঃখ পেয়েছি। তাঁর দয়ার কথা কি বলব, বিদুর? শিশুকৃষ্ণকে হত্যা করবে বলে পূতনা রাক্ষসী নিজের স্তনে কালকূট বিষ মাখিয়ে এসেছিল, সেই রাক্ষসীর স্তন্য পানের সময়েই তাকে হত্যা করে, জননীরূপেই তাকে কৃষ্ণ উদ্ধার করেছিলেন।

হে বিদুর, ব্রহ্মার প্রার্থনায় রাজি হয়ে, স্বয়ং ভগবান পৃথিবীর মঙ্গলের জন্যে বসুদেবের পুত্র হয়ে মাতা দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন। পিতা বসুদেব দুর্ধর্ষ কংসের ভয়ে তাঁকে ব্রজপুরে নন্দের পত্নী মা যশোদার কাছে রেখে আসেন। সেখানে নিজের মহিমা গোপন রেখে, তিনি দাদা বলরামের সঙ্গে এগারো বছর ছিলেন। যমুনাতীরের সুন্দর উপবনে গোপবালকদের সঙ্গে তিনিও রোজ গোরু চড়াতেন, আর তাঁর বাঁশির মোহনসুর তুলে, সকল গোপবালকের মধ্যমণি হয়ে খেলে বেড়াতেন। তাঁকে হত্যা করার জন্যে কংস বহুবার মায়াবি অসুরদের পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বালকরা খড়ের তৈরি সিংহের পুতুলকে যেমন অনায়াসে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে, তিনিও সেই ভয়ংকর অসুরদের বিনাশ করেছিলেন।

একবার কালিয়হ্রদের বিষজল পান করে অনেক গোপবালক ও গরু অচেতন হয়ে গিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ কালিয় নাগকে দমন করে, সেই জলকে নির্বিষ করেছিলেন এবং সমস্ত গোপবালক ও গরুকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। একবার ইন্দ্রপুজো বন্ধ করে, কৃষ্ণের উপদেশে মহারাজ নন্দ গোযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছিলেন। এই ঘটনায় দেবরাজ ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত করে ব্রজবাসীদের ভয়ার্ত করে তুলেছিলেনতাদের পরিত্রাণের জন্যে, কৃষ্ণ গোবর্ধনগিরিকে ছাতার মতো তুলে ধরে সেই বৃষ্টিধারা রোধ করেছিলেন। আবার এই কৃষ্ণই এক কার্তিকী পূর্ণিমায় মধুর গান গেয়ে, গোপযুবতীদের সঙ্গে খেলা করে, সকলকে মুগ্ধ করেছিলেন”

চলবে... 


মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮ 


৩৫ 

দুপুরের খাওয়ার পর ভল্লা আর রামালি গেল এদিকের মহড়ার মাঠে। ছেলেরা ঘাম আর মাটি মাখা শরীরে পূর্ণ উদ্যমে মহড়া করে চলেছে। ভল্লা কিছু বলল না, ওদের পাশে গিয়ে বসল। বিনেশ আর দীপান রণপা চেপে দৌড়তে দৌড়তে ভল্ল ছোঁড়ার মহড়া দিচ্ছিল। ভল্লা মন দিয়ে দেখল। খুশিই হল। চেঁচিয়ে বলল, “তোরা আগের মহড়াটা একবার করে দেখা তো। দেখি কেমন শিখেছিস, ভুলে গেলি কিনা?”

দুজনেই রণপা থেকে নেমে আগের মহড়াটা তিনবার করে দেখাল। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ না হলেও, প্রায় নিখুঁত বলা যায়। ভল্লা ওদের ডাকল, বিনেশ আর দীপান হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসল ভল্লার সামনে। এবার রামালি, মইলি আর সুরুল নামল মহড়ায়। ভল্লা ভুরু কুঁচকে বলল, “রামালি বলছিল, তোরা নাকি ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করতে পারছিস, কিন্তু কই একটু ফস্কে যাচ্ছে যে?” দীপান বিনেশের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল, “সে তো তোমার জন্যে -তুমি সামনে এসে দাঁড়ালেই বুকের ভেতরটা কেমন দুরদুর করে – তোমার মতো ঠিকঠাক পারবো তো?”

ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে, বলল, “বোঝো, আমার ভয়ে তোদের হাত কাঁপছে! কিন্তু যুদ্ধে যখন নামবি, ওই সূক্ষ্ম ভুলের ওপরই তোদের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে রে হতভাগা! লক্ষ্যভেদের সময় যুধিষ্ঠির এবং অন্য সকলে – ওখানে উপস্থিত সব্বাইকে দেখতে পাচ্ছিল – গুরুদেব দ্রোণকে, নিজেদের ভাইদের। আকাশ, গাছপালা, পাতা, ফুল – সবকিছু। আর অর্জুন দেখেছিল শুধু পাখির চোখ – আর কিচ্ছু না। অর্জুনের লক্ষ্যভেদের গল্প শুনিসনি?”

ভল্লার পাশে বসা ছেলেরা সকলেই ভল্লার কথা শুনল। কেউ কিছু বলল না। কথাবার্তার ফাঁকে সে রামালি, মইলি আর সুরুলের মহড়া দেখছিল মন দিয়ে। তিনজনেই নিখুঁত – প্রতিবার। ভল্লা খুব খুশি হল, বলল, “মনে হচ্ছে তোরা আজ দুপুরে খেতে যাসনি?”

“নাঃ যাইনি। আজ থেকে আর যেতে হবে না। বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যাবে”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল, “তার মানে?”

আহোক বলল, “প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা গ্রামের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভল্লাদাদা। বাবা-কাকাদের তো বটেই, বিশেষ করে মা-কাকিমাদেরও। বলেছেন এতটা পথ হেঁটে তোরা খেতে আসবি, ফিরে যাবি...অকারণ সময় নষ্ট। তোদের আসতে হবে না, ঠিক সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে। চাষের সময় ঠিক যেভাবে মাঠে খাবার পাঠায় বাড়ির মেয়েরা...সেভাবে”

ভল্লা অস্ফুট স্বরে বলল, “কী বলছিস”?  অনেকক্ষণ কেউই কোন কথা বলল না। মহড়া শেষে রামালি, মইলি আর সুরুলও এসে বসল ওদের সঙ্গে। “সকলের এই আশীর্বাদের মর্যাদা যে আমাদের রাখতেই হবে...” ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “...সে কথা ভুলিস না। আয়, এবার ভাবনা চিন্তার মহড়া করা যাক”। ভল্লা মাঝখানে কিছুটা জায়াগা রেখে সকলকে গোল হয়ে ঘিরে বসতে বলল।

তারপর উঠে গিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল, গাছের ছোট একটা ডাল দিয়ে। চৌকো ঘর কেটে বলল, “এই হচ্ছে ধর আস্থানের সীমানা। চারপাশেই কাঠের বেড়া আছে – আর দুপাশে আছে আস্থানে ঢোকার দরজা। পশ্চিমে রাজপথের সামনের দরজাটাই প্রধান, সারা দিন-রাত ওখানে কড়া প্রহরা থাকে। রাত্রে ছজন প্রহরী থাকবেই থাকবে। কিন্তু পূবের দরজাটা প্রায় সবসময়েই বন্ধ থাকে। একমাত্র পণ্যবাহী গোযান ঢোকা বা বেরোনোর সময়, ওই দরজা খোলা হয়। রাত্রে ওদিকেও প্রহরী থাকে, কিন্তু কম – খুব বেশি হলে দু-তিনজন। তারাও গভীর রাত্রে অন্ধকার কোনায় বসে ঝিমোয়।

এবারে লক্ষ্য কর। পূবদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডানদিকে রক্ষীদের থাকার জন্যে এই রকম বড়ো বড়ো দুটো ঘর আছে। তার পাশে পশুশালা। সেখানে থাকে বেশ কিছু ঘোড়া, কয়েকটা গাধা আর বলদ, কিছু দুধেল গাইও। তার পরেই কিছুটা জায়গা জুড়ে থাকে করাধ্যক্ষের পালকি, কিছু কাঠের শকট, গোশকট আরও অনেক ধরনের হাবিজবি কাজের দ্রব্য-যন্ত্রপাতি।

এবার আসছি এই উত্তরদিকে – এখানে পরপর বেশ কিছু ঘর আছে, যেখানে থাকে করণিক আর কাছারির কর্মচারীরা। তারপরেই এইখানে আছে বিশাল রান্নাঘর, আর তার পাশেই পাচক এবং নানান ভৃত্যদের থাকার জায়গা।

এবারে চলে আসছি এই পশ্চিমের দিকে। এদিকে আছে কোষাধ্যক্ষ, তার সহকারী কর্মচারী এবং একটু উচ্চপদের কর্মীদের থাকার জায়গা। ওখানে রক্ষীসর্দার উপানুও থাকে। কোষাধ্যক্ষ আর উপানুর ঘরের ঠিক মাঝখানে আছে কোষাগার। এই যে এইখানে একটু জায়গা ছেড়ে আরেকটা পাকশালা আছে এবং তার পাশেই ছোটছোট ঘরে থাকে পাচক ও বিশেষ ভৃত্যরা। এগুলো সবই করাধ্যক্ষ ও অন্য উচ্চপদের আধিকারিকদের জন্যে।

এবারে আসছি দক্ষিণ দিকে। এদিকে তিনখানা বড়োবড়ো ঘর আছে যেখানে শস্য জমা রাখা হয় – প্রয়োজন মতো ঘরের সামনেই বিশাল দাঁড়ি-পাল্লা খাড়া করা হয়। তাই দেওয়ালের ধারে ধারে রাখা থাকে ভারি ভারি লোহার ওজন। এক থেকে চল্লিশ সেরের। অন্ধকারে চট করে চোখে পড়বে না, কিন্তু পায়ে লেগে হোঁচট খেলেই সর্বনাশ। এই তিনটে শস্যভাণ্ডারের পাশেই – এই দক্ষিণপশ্চিম কোনায় - আছে বন্দীশালা। অবশ্য এই বন্দীশালাতে কবিরাজমশাইকেও রেখেছে কিনা আমি জানি না – সেটা দেখতে হবে। কারণ বন্দীশালায় সাধারণতঃ কর না দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো লোকদেরই শাস্তির জন্যে রাখা হয়।

এবার আসি মাঝখানের খোলা জায়গাতে। এই যে এইখানে বসানো হয় করাধ্যক্ষের বিশাল শিবির। তার মধ্যেও তিনটে কক্ষ থাকে। একটায় ওঁনার কার্যালয়। এটা সভাকক্ষ – গোপন কথাবার্তার জন্যে। আর অন্যটা ওঁনার শয়ন এবং প্রসাধন কক্ষ। এই শিবিরের চারধারে বুক সমান উঁচু শক্ত বেড়া, তার বাইরে সাজানো ফুল গাছের সারি।

এই শিবির ছাড়া আস্থানের অন্যান্য সব ঘরই ইঁটের ঘর। অর্থাৎ স্থায়ী। কিন্তু শিবিরটা করাধ্যক্ষের সঙ্গে আসে এবং চলে যায়। করাধ্যক্ষের সঙ্গে অনেক লোকজন যেমন আসে, তাঁর সঙ্গে তারা চলেও যায়। কিন্তু কিছু কিছু লোক সারা বছরই থাকে। আস্থানের দেখাশোনা, টুকটাক কাজকম্ম করে...”।

  ভল্লা কথা শেষ করে বসল, বলল, “নকশাটা মাথার মধ্যে গেঁথে নে। একজায়গায় বসে দেখিস না। ঘুরে ঘুরে দেখ। তাতে দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে কোনটা ডানদিকে কোনটা – মাথার মধ্যে বসে যাবে। দুটো কথা বলে রাখি – আমরা আস্থানে ঢুকব পূবের দরজা দিয়ে কারণ ওদিকের প্রহরা বেশ দুর্বল…। আর করাধ্যক্ষের শিবিরে আমরা ঢোকার চেষ্টাও করব না”।

ভল্লা চুপ করে বসে ছেলেদের লক্ষ্য করছিল আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ছেলেদের প্রশ্নের। ওরা যদি নকশা দেখে নিয়ে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভল্লার এতদিনের পরিশ্রম এবং প্ররোচনার অনেকটাই বৃথা গিয়েছে।

প্রথম প্রশ্নটা করল, মইলি, “পূবের দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের ঘরগুলো রক্ষীদের বললে না?”

সুরুল বলল, ”হুঁ রক্ষীদের। ভল্লাদাদা ওদের ঘরের চালগুলো কি টালির?”

ভল্লা হাসল, বলল, “হ্যাঁ। কেন পাতার ছাউনি হলে আগুন ধরাতিস? ওকথা ভুলেও ভাবিস না, আগুন লাগলে আস্থানের ওইটুকু জায়গায় এমন হুটোপাটি শুরু হবে – আমাদের আসল কাজই পণ্ড হয়ে যাবে”।

সুরুল বলল, “রক্ষীগুলোকে শুরুতেই কিছুটা জব্দ করতে পারলে…”

রামালি বলল, “ঘোড়াগুলোকে দড়ি কেটে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভল্লাদাদা?”

আহোক বলল, “উঁহু, সেটা শুরুতে করা যাবে না। মাঝ রাত্রে আচমকা ঘোড়ার দল ছুটতে শুরু করলে, তাদের ক্ষুরের শব্দে আস্থানের সকলেই সজাগ হয়ে যাবে। ঘোড়াদের তাড়াতে গেলে আমাদের কাজ সেরে বেরিয়ে আসার ঠিক আগে করতে হবে…”।

রামালি বলল, “হুঁ ঠিকই বলেছিস। কিন্তু ঘোড়ার সামনে গিয়ে দড়ি কাটবে কে? শুনেছি ওরা ভয় পেলে পেছনের জোড়াপায়ে এমন লাথি ছোঁড়ে - বুকে লাগলে – পাঁজর ভেঙে মৃত্যু অনিবার্য”।

সুরুল বলল, “আচ্ছা, আস্থানে ঢোকার পর আমরা দু তিনজন গিয়ে সব ঘরের শিকল তুলে দিই যদি… ব্যাটারা থাক না ভেতরে। রাত্রে কজন রক্ষী প্রহরায় থাকবে ভল্লাদা – জনা দশ-বারো?  সে আমরা সামলে নেব”।

বিশুন বলল, “বাঃ এটা ভালো বুদ্ধি”।

ভল্লা মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “তোদের ভাবনা-চিন্তাগুলো বেশ ভালই ঠেকছে। এক কাজ কর – তোদের সবাইকে কালকের পুরো দিনটা সময় দিলাম। পরিকল্পনাটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে চিন্তা কর। কে কোন কাজের দায়িত্ব নিবি সেটাও ঠিক করে ফেল। আজ রাত্রে আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাবো…ফিরবো কাল রাত্রে। আমাদের পরশু সকালে আবার দেখা হবে। তা বলে মহড়ায় যেন এতটুকু ফাঁক না পড়ে। পরশু সন্ধের পর নতুন মহড়া শুরু হবে”।

“সে কি? অন্ধকারে দেখব কী করে?” দলের চার-পাঁচজন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

ভল্লা হাসল, বলল, “আলোর জন্যে মশালের ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা তো অন্ধকারেই আস্থান আক্রমণ করব, তাই না? আধো অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করাটাও শিখতে হবে না?”

কেউ কিছু বলল না। ভল্লা একটু পরে বলল, “বিকেল শেষ হতে চলল, এবার তোরা বাড়ি যা। আর মনে রাখিস আজকের এই আলোচনার কথা ভুলেও কারও সঙ্গে আলোচনা করবি না। শল্কুর সঙ্গেও না। মনে থাকবে? যাবার আগে নকশাটা ভালো করে মুছে ফেল”।

মইলি বলল, “থাক না ভল্লাদাদা। ওটা থাকলে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধে হবে তো”।

ভল্লা বলল, “উঁহু, মুছে ফেলতে হবে। যখন দরকার এঁকে নিবি, কিন্তু আলোচনার শেষে প্রত্যেকবার মুছতেই হবে। আমরা চলে যাবার পর কারো চোখে পড়ে গেলে – এবং সে যদি চতুর হয় – বুঝে ফেলবে সব”।

মইলি মাথা চুলকে বলল, “মুছে ফেললে, আঁকব কী করে – সবটা কী আর মনে আছে?”

বিশুন পাতা সমেত গাছের একটা ডাল নিয়ে এসেছিল, সেটা দিয়ে দাগগুলো মুছতে মুছতে বলল, “চিন্তা করিস না, আমার মনে আছে”। “আমারও” একে একে বলল, সুরুল, আহোক এবং আরও দু-একজন।

ভল্লা খুশি হয়ে হাসল, মইলির কাঁধে হাত রেখে বলল, “এবার বাড়ি যা। পরশু দেখা হবে”।

রামালি বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের সঙ্গে মইলি, বিশুন আর আহোক যাবে। ভল্লর জন্যে বাঁশের টুকরোগুলো কাটা আছে - নিয়ে যাবো সবাই মিলে”।

“কাটা হয়ে গেছে? বাঃ, এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে”।

 ভল্লারা বাসায় ফিরে দেখল বালিয়া বসে আছে, বসে আছে বটতলির মিলা, জনারাও। জনাদের নিয়ে রণপাগুলো লুকিয়ে রাখার জায়গাটা দেখাতে নিয়ে গেল রামালি। আর ভল্লা তার পাথরের আসনে বসে বলল, “বালিয়া, এসে গেছিস? ভালই হয়েছে। রণপার কাজটা এখন কদিন বন্ধ থাক…তার আগে এই টুকরো বাঁশগুলোর আগায় ফলা বসিয়ে ভল্ল বানিয়ে দে তো চটপট…। কতগুলো আছে রে মইলি?”

“এখন ছাব্বিশ জোড়া আছে, আর দশ জোড়া হবে… ওগুলো পরে দেব”।

“ছাব্বিশ জোড়া – মানে বাহান্নটা ফলা, কতদিনে করতে পারবি, বালিয়া?”

“দিন চারেক”।

“বাঃ, তারপর রণপার কাজ শুরু করে দিবি, কেমন? তুই আহোক-মইলিদের সঙ্গে যা – বাঁশগুলো নিয়ে যেতে সুবিধে হবে। তোরা একটু বস, আমি আসছি – যাবো আর আসবো”।

ভল্লা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। একটু পরেই রামালি ফিরে এল, ওদের দেখে বলল, “কী রে তোদের বসিয়ে রেখে ভল্লাদাদা কোথায় গেল?”

“জানি না। ভল্লাদাদা বলল, যাবো আর আসবো, তোরা বস”। রামালি প্রদীপ জ্বালাল, উনুনের সামনে কাঠকুটো যোগাড় করে রাখল। তারপর মাটিতে বসল ওদের সঙ্গে।

“কমলিমা কেমন আছে রে, আহোক?”

“ভালো না। আমি তো যেতে পারিনি। মা আর দিদির মুখে শুনেছি। কেমন যেন হয়ে গেছেন। প্রধানমশাই মারা যাওয়ার পর একবারের জন্যেও কাঁদেননি। ভাবতে পারিস?”

ভল্লা এসে ঢুকলো, ওদের কথার শেষটুকু শুনে জিজ্ঞাসা করল, “কে কাঁদেনি রে, আহোক?”

“কমলিমায়ের কথা বলছিলাম, ভল্লাদাদা”। ভল্লা হাতের বটুয়া থেকে চারটে রূপোর মুদ্রা বের করে, বালিয়ার হাতে দিয়ে বলল, “কমলিমা কাঁদবেন, ভাবিস না। তিনি আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছেন। এই চারটে রূপো আপাততঃ রাখ, বালিয়া। লোহার জন্যে কাজ যেন না আটকায়। আর দেখছিস তো, এরা কী রকম লড়ছে… তোরা তাড়াতাড়ি অস্ত্র দিতে না পারলে…আমাদের সব কাজই আটকে যাবে”।

“জানি ভল্লাদাদা”, বালিয়া বলল।

চারজনে চার বোঝা বাঁশের টুকরো পিঠে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে মিশে গেল রণপা চড়ে।

ওরা চলে যেতে রামালি বলল, “পুকুর থেকে ঘুরে আসছি, ভল্লাদা”।

“আজ পাঁচজনের রান্না করিস। কাল সকালে আমাদের লাগবে”। রামালি বেরিয়ে গেল - তাকে রান্নার যোগাড় করতে হবে। 


চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...