সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৪

    ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৩ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

চতুর্দশ পর্বাংশ 


৪.৭.৪ আসাম

আসামের পৌরাণিক নাম পাওয়া যায় কামরূপ এবং কোন একসময় নরক ছিলেন কামরূপের রাজা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম মতে রাজা নরক ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ অসুর, যাঁকে সাধারণ ক্ষত্রিয় সৈন্যবাহিনী দিয়ে পরাজিত করা যায়নি, ভগবান বিষ্ণুকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। সে যাই হোক সেই রাজা নরকের পুত্র ছিলেন ভগদত্ত, যিনি মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নাকি কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন।

তবে কামরূপের প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে, যেখানে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে কামরূপের উল্লেখ করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের পর, পরবর্তী গুপ্তরাজা মহাসেনগুপ্তের অন্য একটি লিপি থেকে জানা যায় তাঁর রাজত্বের সীমা লোহিত্য নদীর (ব্রহ্মপুত্র) তটভূমি পর্যন্ত এবং তিনি কামরূপ রাজা সুস্থিতবর্মনকে পরাস্ত করেছিলেন। এই কামরূপের রাজা সুস্থিতবর্মনের পুত্র ভাস্করবর্মনের কথা ইতিহাসে বারবার উঠে এসেছে। ৬৪৩ সি.ই.-তে হুয়ান সাং যখন কামরূপ গিয়েছিলেন তখন কামরূপের রাজা ছিলেন ভাস্করবর্মন। ভাস্করবর্মন প্রতিবেশী কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের আতঙ্কে, শুরু থেকেই রাজা হর্ষের সঙ্গে “অনন্ত মৈত্রী”-তে আবদ্ধ ছিলেন। রাজা হর্ষের আয়োজিত দুটি মহামৈত্রী সম্মেলনে, একটি কনৌজ এবং অন্যটি প্রয়াগে, তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। হর্ষের মৃত্যুর পরে তাঁর সিংহাসনে বসা অযোগ্য রাজাকে সরানোর ব্যাপারেও তিনি চীনের রাষ্ট্রদূতকে পূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ জয় করেছিলেন।

ভাস্করবর্মণের পর কামরূপের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি শ্রীহর্ষ নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়, যিনি গৌড়, ওড্র (উড়িষ্যা), কলিঙ্গ, কোশল এবং আরও অনেক অঞ্চল জয় করেছিলেন। আবার একাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রত্নপাল নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়, যিনি গুর্জরদের রাজধানী, গৌড়রাজ, দাক্ষিণাত্যের রাজা (হয়তো চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য, যিনি কামরূপ অভিযান করেছিলেন), কেরালেশ ( হয়তো চোল বংশের প্রথম রাজেন্দ্র), বাহিকা এবং তৈকদের পরাজিত করেছিলেন।

 যদিও এর মধ্যে বাংলার পালবংশের রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.), তাঁর ভাইপো জয়পালকে প্রাগজ্যোতিষ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন এবং পাল রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত প্রাগজ্যোতিষ রাজা কুমারপালের অধীনেই ছিল এবং তাঁর প্রতিনিধি মন্ত্রী বৈদ্যদেবের যথেষ্ট কর্তৃত্ব ও প্রভাব সেখানে ছিল।

কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে আসাম অধিকার করে নিয়েছিলেন, অহোম নামের শান উপজাতিদের একটি শাখা। যাঁদের থেকে গোটা রাজ্যের নাম অহোম বা আসাম বলা হয়ে থাকে। আসামে মুসলিম অভিযান সাফল্য পেয়েছিল অনেকটাই পরে, মুঘল সম্রাট ঔরংজেব তাঁর বিখ্যাত সেনাপতি মিরজুমলাকে (১৬৬২ সি.ই.) পাঠিয়ে প্রথম আসাম অধিকার করেছিলেন।

৪.৭.৫ উড়িষ্যা

প্রাচীন কলিঙ্গ সীমানার ধারণা হল গোদাবরী থেকে মহানদী পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল। যদিও এই সীমানা কখনোই ধরাবাঁধা ছিল না। কোন কোন সময় কলিঙ্গ রাজ্য, উৎকল, ওড্র এবং কলিঙ্গ নামেও একই বা তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। আবার অনেক সময়েই দক্ষিণবঙ্গের তাম্রলিপ্তি বন্দর সহ মেদিনীপুর কলিঙ্গের অন্তর্গত ছিল, আবার কোন কোন সময় উড়িষ্যার গঞ্জাম পর্যন্ত বঙ্গের সীমানার মধ্যে ছিল।

ঐতিহাসিক সময় থেকে কলিঙ্গ নন্দ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তারপর সম্রাট অশোক কলিঙ্গকে মৌর্যসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মৌর্যদের পর কলিঙ্গের রাজা হয়েছিলেন শক্তিশালী খারবেল, তিনি একসময়ে মগধ এবং  অন্ধ্রের বেশ কিছুটা অংশ কলিঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এরপর কলিঙ্গের স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। গুপ্তরাজাদের সময় কলিঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের মধ্যেই ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকে কলিঙ্গের রাজা ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গবংশীয় রাজারা। 

৪.৭.৫.১ প্রাচ্য গঙ্গ

গঙ্গবংশের উৎপত্তি মহীশূরের কোলার অঞ্চলে, তাঁদের একটি শাখা পূর্বদিকে কলিঙ্গে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এই কারণে তাঁদের প্রাচ্য গঙ্গ বলা হয়। রাজা ইন্দ্রবর্মন ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রাজধানী ছিল গঞ্জাম জেলার কলিঙ্গপতনম বা মুখলিঙ্গম। এই প্রাচ্য গঙ্গ বংশ প্রায় চারশ বছর রাজত্ব করেছিলেন। খ্রীষ্টিয় দশম শতাব্দীতে চালুক্য ও চোলরাজাদের আক্রমণে কলিঙ্গ রাজ্য বারবার বিধ্বস্ত হয় এবং প্রাচ্যগঙ্গ বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়েন।

১০৭৭ সি.ই.তে গঙ্গবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গর রাজত্বকালে, কলিঙ্গ আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর নাম চোড়গঙ্গ হয়েছিল, কারণ তাঁর পিতা রাজারাজগঙ্গ বিবাহ করেছিলেন, রাজেন্দ্র চোড়ের কন্যা রাজসুন্দরীকে। চোড়গঙ্গ দীর্ঘ সত্তর বছর রাজত্ব করেছিলেন (১০৭৭-১১৪৭ সি.ই.)। এই অনন্তবর্মনই পুরীর জগন্নাথ মন্দির এবং আরও অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর গঙ্গবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাংলার সেনরাজা কলিঙ্গ রাজ্যের কিছুটা অধিকার করে নিয়েছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিমরা বঙ্গের সেনবংশকে উৎখাত করতে পারলেও, গঙ্গরাজারা মুসলিমদের আরও প্রায় একশ বছরের ওপর ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুসলিমরা কলিঙ্গ জয় করেছিলেন।

এর মধ্যে কেশরী রাজবংশও দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন, সম্ভবতঃ উৎকল রাজ্যে, তাঁদের রাজধানী ছিল ভুবনেশ্বর। মন্দির শহর ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত মন্দিরগুলির অধিকাংশই কেশরী রাজাদের প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্টিয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র উড়িষ্যা জুড়ে অজস্র মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যার আদর্শ ছিল ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ, পুরীর জগন্নাথধাম এবং কোনার্কের সূর্য মন্দির।  

৪.৭.৬ ত্রিপুরির কলচুরি

শোনা যায় কলচুরি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ছিলেন, পৌরাণিক রাজা কার্তবীর্যাজুন, হৈহয় বংশের শাখা, যাঁরা নর্মদা উপত্যকায় রাজত্ব করতেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল মাহিষ্মতী বা মান্ধাতা। কলচুরি বংশের উত্থান যে রাজার হাত ধরে, তাঁর নাম প্রথম কোকল্ল, তিনিই ত্রিপুরী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর অঞ্চলে। তাঁর রাজত্বকাল নবম শতাব্দীর শেষ দশক থেকে দশম শতাব্দীর শুরুর দুই দশক। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে বৈবাহিক সম্পর্কও থাকতে পারে। তিনি চান্দেল রাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণের (৮৭৫ - ৯১১ সি.ই.) কন্যা রাজকুমারী নট্টদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় তাঁর জামাই ছিলেন রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজকুমার। অতএব এই তিনটি রাজবংশীয় মিলিত শক্তি নিয়ে, তিনি চালুক্য, ভোজ এবং প্রতিহার রাজবংশের রাজাদের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে গেছেন। একসময় তাঁর সম্বন্ধে, “জগজ্জয়ী” উপাধিও ব্যবহার করা হত।

প্রথম কোকল্লের পর কলচুরি বংশের আরেক রাজার নাম পাওয়া যায়, তাঁর নাম গাঙ্গেয়দেব (১০১৯-১০৪১ সি.ই.)। ইনি “বিক্রমাদিত্য” উপাধি নিয়েছিলেন, এবং তাঁকেও “জগজ্জয়ী” বলা হত। রাজা গাঙ্গেয়দেব, প্রতিহার বংশের রাজাদের পতনের পর উত্তর ভারত অভিযান করেছিলেন এবং কীর দেশ (কাংড়া উপত্যকা), প্রয়াগ এবং বারাণসী জয় করেছিলেন। যদিও পরবর্তী কালে পরমার বংশের ভোজরাজার হাতে তিনি পরাস্ত হয়েছিলেন। গাঙ্গেয়দেবের পুত্র লক্ষ্মী-কর্ণ (১০৪১-৭২ সি.ই.), কলচুরি বংশের সব থেকে প্রতিপত্তিশালী রাজা ছিলেন। রাজা কর্ণ কয়েক বছরের জন্যে কাংড়া থেকে বারাণসী এবং কনৌজ নিজের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। বারাণসীতে তিনি একটি শৈব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাকে “কর্ণ-মেরু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর কলচুরি বংশের রাজা হন রাজা লক্ষ্মীকর্ণর পুত্র যশকর্ণ (১০৭৩-১১২০ সি.ই.)। শোনা যায় যশকর্ণের মাতা ছিলেন হুণ জাতীয়া। যশকর্ণকেও প্রায় সারাজীবনই যুদ্ধবিগ্রহে লেগে থাকতে হয়েছিল। তাঁর সময়ে উত্তরের এলাহাবাদ, বারাণসী এবং কনৌজ জয় করে নিয়েছিলেন গাড়োয়ালরা, এমনকি তাঁরা ত্রিপুরী রাজধানীও আক্রমণ করেছিলেন। চান্দেল, চালুক্যদের সঙ্গে তাঁর নিত্য যুদ্ধ তো ছিলই। যশকর্ণের পুত্র গয়া-কর্ণের পর কলচুরি রাজবংশ ইতিহাসে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। 

৪.৭.৭ জিজাকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল

চান্দেল বংশের উৎপত্তি পূর্ণচন্দ্র এবং ব্রাহ্মণ কন্যার বিবাহ থেকে! অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, তাঁরা প্রাচীন ভারতের ভর বা গোণ্ড জাতির শাখা, যাঁদের আদি নিবাস ছিল ছতরপুর রাজ্যের মানিয়াগড়ে, কেন নদীর ধারে। নবম শতাব্দীর শুরুর দিকে চান্দেল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন, নান্নুক। তাঁর নাতির নাম জিজা বা জয়শক্তি– তাঁর নাম অনুসারেই তাঁদের রাজ্যের নাম হয় জিজাকভুক্তি। অনুমান করা হয়, চান্দেল বংশের প্রথম দিকের বেশ কিছু রাজা ছিলেন, কনৌজের প্রতিহার সাম্রাজ্যের সামন্ত রাজা। তাঁদের মধ্যে হর্ষদেব চান্দেল তাঁর প্রভাব এবং ক্ষমতা বাড়িয়ে তুললেন, প্রতিহার রাজ মহীপালের সৎভাই দ্বিতীয় ভোজকে সরিয়ে, তাঁকে কনৌজের সিংহাসনে বসতে সাহায্য করে। এরপর কনৌজের রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, চান্দেলরা আরও বেশি স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। এইসময় রাজা হলেন, হর্ষদেবের পুত্র ধঙ্গ (৯৫০-১০০২ সি.ই.)। শোনা যায় তাঁর সময়ে কনৌজ কিছুদিনের জন্য চান্দেল রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। খাজুরাহোর একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় “রাজা ধঙ্গ খেলার ছলে অধিকার করেছেন, কালঞ্জর (কালিঞ্জর দুর্গ –বুন্দেলখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ), সুদূর মালব নদীতটের ভাস্বত (?), যমুনার তীর, চেদি রাজ্যের সীমানা, এমনকি গোপগিরি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল”। ধঙ্গ কোন এক সময় বারাণসী জয় করেছিলেন, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। ৯৮৯ অথবা ৯৯০ সি.ই.তে সবুক্তিগিনকে প্রতিরোধ করার জন্যে শাহী রাজা জয়পাল যখন রাজা ধঙ্গের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন, রাজা ধঙ্গ তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন এবং আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন।

একইভাবে রাজা ধঙ্গের পুত্র গণ্ডের কাছে আনন্দপাল শাহী ১০০৮ সি.ই.-তে গজনির সুলতান মামুদের আক্রমণ প্রতিরোধের সাহায্য চাইলে রাজা গণ্ডও সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই হিন্দু যৌথশক্তির পরাজয় হয়েছিল। এরপর সুলতান মামুদের ভয়ে (কাপুরুষের মতো?) পালিয়ে যাওয়া কনৌজের প্রতিহাররাজা রাজ্যপালকে শাস্তি দিতে, রাজা গণ্ড ও শাহী যুবরাজ বিদ্যাধর, ১০১৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজ্যপালকে হত্যা করেন। এই সংবাদ যখন গজনিতে সুলতানের কানে পৌঁছল, রাজা গণ্ডকে শাস্তি দিতে সুলতান মামুদ ১০১৯ সালে চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করলেন। এবার রাজা গণ্ড সুলতানের সামরিক শক্তি দেখে কোন ঝুঁকি নিলেন না, রাতের অন্ধকারে (বীরের মতো?) পালিয়ে জীবন রক্ষা করলেন। এরপর সুলতান মামুদ ১০২২ খ্রীষ্টাব্দে আবার চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করেন এবং গোয়ালিয়র দুর্গ ও কালিঞ্জর দুর্গ অধিকার করে নিলেন। এই সময় রাজা গণ্ড সুলতান মামুদের (বীরের মতো?) বশ্যতা মেনে নিয়েছিলেন। সুলতান মামুদ রাজা গণ্ডকে দুর্গদুটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, বদলে প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে গজনি ফিরে গিয়েছিলেন।

এরপর চান্দেল বংশের উল্লেখযোগ্য রাজারা হলেন, কীর্তিবর্মন, মদনবর্মন, পরমার্দি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.) প্রমুখ। তাঁরাও প্রতিবেশী রাজ্যগুলি কখনো জয় করেছেন, কখনো আবার পরাজিতও হয়েছেন। এই সময়ে ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে কুতব-উদ্দিন আইবক কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করেন এবং চান্দেল রাজত্বের অবসান ঘটান। অবশ্য এরপরেও প্রায় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ছোট রাজ্যের শাসক হয়ে, চান্দেল বংশের অস্তিত্ব ছিল।

চান্দেল রাজাদের অন্যতম কীর্তি খাজুরাহো মন্দির, কালিঞ্জর দুর্গ এবং মাহোবা নগর। সমসাময়িক কালে এমন সুসজ্জিত দুর্গ এবং সুন্দর শহর ভারতে কমই ছিল। চান্দেল রাজারা বেশ কিছু মন্দির এবং সুন্দর সরোবর বানিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুলেছিলেন বুন্দেলখণ্ড এবং মাহোবা শহর। মাহোবার এরকমই একটি সরোবরের নাম মদনসাগর, যেটি নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজা মদনবর্মন।  

৪.৭.৮ মালবের পরমার বংশ

শোনা যায়, পরমার বংশের উৎপত্তি হয়েছিল পৌরাণিক বশিষ্ঠ মুনির যজ্ঞবেদী থেকে। কিন্তু সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি শিলালিপি থেকে জানা গেছে, পরমার বংশ দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশের একটি শাখা।

সেকালের উজ্জয়িনী নগর বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিচারে, মধ্যভারতের সব থেকে উন্নত শহর ছিল। গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের পর বহু রাজবংশই এই শহরে আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তাঁদের  মধ্যে অন্যতম ছিলেন, রাষ্ট্রকূট, কিন্তু তাঁরা উজ্জয়িনীর ওপর অধিকার ধরে রাখতে পারেননি। পরবর্তী কালে প্রতিহার বংশের রাজারা বেশ কয়েক বছর উজ্জিয়িনী তাঁদের অধিকারে রেখেছিলেন। অনুমান করা হয়, প্রতিহার রাজাদের সামন্তরাজা হিসাবেই উজ্জয়িনী বা মালবের পরমার বংশের সূত্রপাত। পরমার বংশের প্রথম যে শাসকের নাম জানা যায়, তিনি শিয়াক-হর্ষ, তিনি ৯৪৯-৭২ সি.ই. পর্যন্ত উজ্জিয়িনীর শাসক ছিলেন। কিন্তু এই পর্যায়ে প্রতিহার বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়াতে, শিয়াক-হর্ষ সামন্ত রাজা থেকে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শিয়াক-হর্ষ রাজা হয়ে ওঠায় রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ (৯৫৫-৭০ সি.ই.), উজ্জয়িনী আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু শিয়াক-হর্ষ তাঁকে পরাজিত করেন। শিয়াক-হর্ষ কিছু হুণ গোষ্ঠী রাজাদেরও পরাজিত করে, অবন্তী রাজ্য এবং উজ্জিয়িনী নগরে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র বাকপতি অথবা মুঞ্জা রাজা হয়েছিলেন ৯৭৪ সি.ই.-তে। শোনা যায়, কলচুরি, কর্ণাট, চোল এবং কেরালার রাজারা তাঁর তলোয়ারের সামনে মাথা নত করেছিলেন। তবে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব, চালুক্য রাজা দ্বিতীয় তৈলপের আক্রমণ তিনি অন্ততঃ ছবার প্রতিহত করেছিলেন। জৈন গ্রন্থকার মেরুতুঙ্গের “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, সপ্তমবার চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বাকপতি-মুঞ্জ, তাঁর মন্ত্রীদের পরামর্শ না শুনে, গোদাবরী পার হয়ে চালুক্য রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। সেখানেই তিনি বন্দী হন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কাল অনুমান করা হয় ৯৯৩-৯৪ সি.ই., এর কিছুদিন পরেই ৯৯৭-৯৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় তৈলপের মৃত্যু হয়। বাকপতি মুঞ্জ শুধু রণদক্ষ রাজাই ছিলেন, তা নয়, তিনি প্রজাদের হিতের জন্যে অনেক সরোবর এবং মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। ধারা শহরের মুঞ্জসাগর সরোবর, তাঁরই স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে। তাঁর সভায় কবি ও বিদ্বানরা অত্যন্ত সম্মানীয় ছিলেন, যেমন পদ্মগুপ্ত, ধনঞ্জয় (“দশরূপ” গ্রন্থ প্রণেতা), ধনিক (“দশরূপাবলোক” গ্রন্থ প্রণেতা) এবং ভট্ট হলায়ুধ, যাঁর রচনা দুই বিখ্যাত গ্রন্থ,“মৃতসঞ্জীবনী” এবং “অভিধান-রত্নমালা”।

বাকপতি-মুঞ্জের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ছোট ভাই সিন্ধুলা বা সিন্ধুরাজা বা নবশশাঙ্ক। তিনিও কলচুরি, হুণ এবং চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। সিন্ধুলার সংক্ষিপ্ত রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, বাকপতি-মুঞ্জের পুত্র ভোজ। তিনি রাজধানী সরিয়ে আনেন ধারাতে। উদেপুর প্রশস্তিতে তাঁকে “সার্বভৌম” বলা হয়েছে, এবং তিনি কৈলাশ থেকে মলয় পর্বত পর্যন্ত “সমগ্র পৃথিবীর রাজা” বলেও দাবি করা হয়েছে। তিনি পিতার হত্যার প্রতিশোধে চালুক্যদের আক্রমণ করে পঞ্চম বিক্রমাদিত্যকে পরাস্ত এবং হত্যা করেন, ১০০৮ সি.ই.-তে। যদিও দাক্ষিণাত্যের এই সাফল্য তাঁকে হারাতে হয়েছিল ১০১৯ এ.ডি-তে চালুক্যরাজ দ্বিতীয় জয়সীমার (১০১৬-৪২ সি.ই.) কাছে। এরপরেও তিনি নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে, উত্তরের কনৌজ অধিকারের জন্যে, এমনকি “তুরুষ্কু” (মুসলিম)-দের সঙ্গেও। এই মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনটি রাজ্য একত্র হয়েছিলেন, কলচুরিরাজ লক্ষ্মীকর্ণ, পরমার-রাজ ভোজ এবং অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম। এই যুদ্ধের সময়েই প্রায় পঞ্চান্ন বছর রাজত্বের পর রাজা ভোজের মৃত্যু হয়। রাজা ভোজের মৃত্যুর পর এই মিত্র রাজ্যগুলিই রাজধানী ধারা এবং মালব অধিকার করে নিয়েছিল।

রাজা ভোজ যেমন অসি চালনায় দক্ষ ছিলেন, তেমনই দক্ষ ছিলেন বিদ্যাচর্চায়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অন্ততঃ চব্বিশটি গ্রন্থ লিখেছিলেন, যেমন “আয়ুর্বেদ-সর্বস্ব”, “রাজমৃগাঙ্ক”, “ব্যবহার-সমুচয়”, “শব্দানুশাসন”, “সমরাঙ্গণ-সূত্রধর”, “সরস্বতী-কণ্ঠাভরণ”, “নাম-মালিকা”, “যুক্তি-কল্পতরু”, ইত্যাদি। তিনি ধারা শহরে “ভোজ-শালা” নামে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে বিদ্যার্থীরা পড়তে আসতেন। পরবর্তী কালে মুসলিম রাজত্বের সময় এটিকে মসজিদ বানিয়ে তোলা হয়েছিল। রাজা ভোজ শৈব ছিলেন, সমস্ত রাজ্য জুড়ে তিনি অজস্র সুন্দর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। আধুনিক ভূপালের দক্ষিণে নতুন ভোজপুর শহর নির্মাণ করিয়েছিলেন।

রাজা ভোজের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন মালব নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিলেন, চালুক্য, কলচুরি এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা। অবশেষে মালব থেকে ১৩০৫ সি.ই.-তে পরমার বংশের নাম মুছে দিলেন, আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি আইন-উল-মুল্‌ক্‌।

৪.৭.৯ অনহিলওয়াড়ার চালুক্য (সোলাংকি) বংশ

অনহিলওয়াড়া বা অনহিল-পাটককে আধুনিক গুজরাটের পাটন বলে চিহ্নিত করা হয়। চালুক্য বা সোলাঙ্কি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মূলরাজ। এই চালুক্যদের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের (যাঁদের কথা পরের অধ্যায়ে আসবে) কোন সম্পর্ক ছিল কিনা অথবা তাঁরাই সৌরাষ্ট্রর (কাথিয়াওয়াড়) চালুক্য গোষ্ঠী কিনা, সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে গুজরাটের লোককথা থেকে জানা যায়, মূলরাজের পিতা ছিলেন, রাজি, কনৌজের এক রাজকুমার কল্যাণকটকের পুত্র। এবং তাঁর মাতা ছিলেন চাবড় বা চাপোটক বংশের কন্যা, যাঁরা চালুক্যদের আগে গুজরাটের ছোট কোন অঞ্চল শাসন করতেন। লোককথায় এমনও শোনা যায়, মূলরাজ তাঁর মাতুলকে হত্যা করে, চাপোটকের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। এই ঘটনা মোটামুটি ৯৪১ সি.ই.-র। সিংহাসনে বসেই মূলরাজ রাজ্য অধিকারে মন দিলেন। তিনি কচ্ছের লক্ষরাজাকে পরাজিত ও হত্যা করলেন। সৌরাষ্ট্রের বামনস্থলীর (আধুনিক ওয়ানথালি) চূড়াসামা গোষ্ঠীর রাজা গ্রহরিপুকে বন্দী করলেন। দক্ষিণ গুজরাটের লাট অঞ্চলের বারাপ্পা এবং শাকম্ভরীর চাহমান রাজা বিগ্রহরাজকেও আক্রমণ করলেন। যতদূর জানা যায়, ৯৯৫-৯৬ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়।

চালুক্য বংশের পরবর্তী রাজা প্রথম ভীম, ইনি মূলরাজার নাতি দুর্লভরাজের ভাইপো ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল মোটামুটি ১০২১ সি.ই. থেকে ১০৬৩ সি.ই. পর্যন্ত। প্রথম ভীমের রাজত্বকাল গজনির সুলতান মামুদের বীভৎস অভিযানের জন্যে অবিস্মরণীয়। ১০২৫ সি.ই.-তে সুলতান মামুদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গুজরাটের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন। তিনি শুনেছিলেন, যুগ যুগ ধরে ওই মন্দিরে বিপুল সোনা, মণিরত্ন-সম্পদ সঞ্চিত আছে। সুলতান মামুদ রাজস্থানের মরু অঞ্চল পেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছলেন অনহিলওয়াড়ার সীমান্তে। রাজা প্রথম ভীম সুলতান মামুদের সেনাবাহিনী দেখে আতঙ্কিত হয়ে, কোন রকম প্রতিরোধ না করে, পালিয়ে গেলেন। সুলতান মামুদ বিনা বাধায়, সোমনাথ নগর, সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করলেন এবং নগরের ব্রাহ্মণ ও সাধারণ মানুষ, যাঁরা দুর্বল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের গণহত্যা করলেন। তারপর মন্দিরের সমস্ত সম্পদ লুঠ করে, সোমনাথের মূর্তি ভেঙে গজনি ফিরে গেলেন। শোনা যায়, এই ভাঙা মূর্তির টুকরো দিয়ে তিনি জামা-মসজিদের প্রবেশের সিঁড়ি বানিয়েছিলেন।

সুলতান মামুদ ফিরে যাওয়ার পর, প্রথম ভীম আবার তাঁর রাজ্য এবং রাজধানীতে ফিরে এলেন। অনতিবিলম্বেই তিনি আবুর পরমার প্রশাসককে পরাজিত করলেন, কিন্তু পরমার ভোজের সেনাপতি কুলচন্দ্রের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কলচুরিরাজ লক্ষ্মী-কর্ণের সঙ্গে জোট বেঁধে মালব রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি করেছিলেন। রাজা ভোজের মৃত্যুর পর কলচুরিদের সঙ্গে প্রথম ভীমের সখ্যতা ভেঙে যায়, এবং প্রথম ভীম লক্ষ্মী-কর্ণকে পরাজিত করেন। এই সুযোগেই মালবের পরমার রাজারা আবার স্বাধীন রাজ্য হয়ে উঠেছিল।

প্রথম ভীমের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র কর্ণ (১০৬৩-৯৩ সি.ই.)। তাঁর সময়ে পরমার রাজত্ব আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, কারণ পরমার রাজা উদয়াদিত্য রাজা কর্ণকে পরাস্ত করেছিলেন। রাজা কর্ণ অজস্র মন্দির এবং সরোবর নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং নিজের নামে নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে শহর এখন আমেদাবাদ। রাজা কর্ণের পরবর্তী রাজা জয়সিংহ সিদ্ধরাজ, তাঁর রাজত্বকাল ১০৯৩ সি.ই. থেকে ১১৪৩ সি.ই.। প্রথমদিকে তিনি নাবালক থাকায়, রাজ্য শাসন করতেন তাঁর মাতা মিয়াংল্লা দেবী। জয়সিংহ ক্ষমতায় এসে নাদোলের (যোধপুর রাজ্য) চৌহান এবং সৌরাষ্ট্রের চূড়াসামা রাজাকে পরাস্ত করে, দুটি রাজ্য অধিকার করেন। এরপর তিনি পরমার রাজা নরবর্মন এবং যশোবর্মনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মালব জয় করে “অবন্তীনাথ” উপাধি নিয়েছিলেন। জৈনগ্রন্থ “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, রাজা জয়সিংহ ত্রিপুরির কলচুরি রাজ এবং কাশীর রাজার সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করেছিলেন।

জয়সিংহ তাঁর পিতার মতোই অনেক মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, তিনি ধর্মসহিষ্ণু এবং শিক্ষা বিষয়েও উৎসাহী ছিলেন। তিনি হয়তো শৈব ছিলেন, কিন্তু জৈন আচার্য হেমচন্দ্রকে রাজসভায় সম্মানের স্থান দিয়েছিলেন। জয়সিংহের কোন পুত্র না থাকায়, তাঁর দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়, কুমারপাল সিংহাসন অধিকার করেন। শোনা যায়, তিনি সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ করিয়েছিলেন। তিনি হয়তো প্রথমদিকে শৈব ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে আচার্য হেমচন্দ্রের প্রভাবে জৈন হয়েছিলেন। সম্ভবতঃ এই কারণের তিনি তাঁর বিস্তীর্ণ রাজ্যে পশুহত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সময়ে আচার্য হেমচন্দ্র অজস্র জৈন গ্রন্থ এবং ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। রাজা কুমারপালের মৃত্যু হয় ১১৭২ সি.ই.-র কিছু আগে। তারপর রাজা হয়েছিলেন অজয়পাল।

এরপর গুজরাটের রাজাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না, কিন্তু ১১৭৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় ভীম (বা ভোলা ভীম) রাজা হয়ে প্রায় ষাট বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই ঘুরের সুলতান গুজরাট আক্রমণ করেছিলেন, যদিও ভয়ংকর যুদ্ধের পর ঘুরের সুলতান পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১১৯৭ সি.ই.তে কুতব-উদ-দিন অনহিলওয়াড়া জয় করে নিয়েছিলেন, কিন্তু সম্ভবতঃ কুতব-উদ-দিন স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে এরপরে মালবের রাজা এবং দেবগিরির যাদবদের আক্রমণে গুজরাটের চালুক্যরা বিশেষভাবে দুর্বল পড়েছিলেন। এই সময়ে বাঘেলা পরিবার গুজরাটের ক্ষমতা অধিকার করল। এই বাঘেলা পরিবার, শোনা যায়, রাজা কুমারপালের বোনের বংশধর। শোনা যায়, জনৈক লবণপ্রসাদ, রাজা ভোলা ভীমের বাঘেলা সামন্তরাজা, দক্ষিণ গুজরাটে স্বাধীন উঠেছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁরা সমগ্র গুজরাট অধিকার করে নিয়েছিলেন।

১২৯৭ সি.ই.-তে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি যখন তাঁর শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী দিয়ে দুই সেনাপতি উলুঘ খান এবং নসরত খানকে পাঠিয়েছিলেন, তখন বাঘেলা রাজ করণ বা করণদেব রাজধানী ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিনের সেনাবাহিনী এরপর গুজরাটের প্রধান শহরগুলি অধিকার করে নেওয়ার পর, গুজরাট থেকে হিন্দু শাসন মুছে গেল।

চলবে...

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

বিচিত্র ঐক্য

 

এর আগের রম্যকথা - " একটি শিশিরবিন্দু.... " 



দুবেলা কিছু করে পেট চালানোর মতো একটা ডিগ্রি আর ধুয়ে জল খাবার মতো একটা মার্কশীট যোগাড় হয়ে গেল চার বছরের শেষে। এইবার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী ছাপিয়ে ফেললাম, যেখানে হদিস ছিল আমার ভিতরকার ছাইচাপা আগুনের – ফুঁ দিয়ে কোন কোম্পানী সেই আগুনটাকে উসকে নেবে ...চলল তারই সন্ধান। ষাট-সত্তর দশকের বাংলা সিনেমায় চাকরির সন্ধানে ঘোরা নায়কদের মতোই বহু জায়গা থেকেই শোনা গেল “নো ভেকেন্সি”হেথা নয় হেথা নয় অন্য কোন খানে করতে করতে, অবশেষে দিন কুড়ির উদ্যমে মিলে গেল একখানতখনকার হিসেবে মাইনে পত্র চলে যায়, খাওয়া থাকা ফ্রি, বছরে দু’বার বাড়ি আসার জন্যে উড়োজাহাজের ভাড়া।

উড়োজাহাজ! জীবনের চাকরির শুরু ফ্লাইটে ট্রাভেল দিয়ে! বন্ধু-বান্ধব মহলে সাড়া পড়ে গেল। আসলে আমার কর্মস্থলটি এমনই জায়গায় – যেখানে ট্রেনে যাওয়াই যায়, কিন্তু পৌঁছতে সময় লাগত প্রায় আড়াই দিনজায়গাটি আসামের কাছাড় জেলায় পাঁচগ্রাম পেপার মিল। আর আমাদের বাসস্থান করিমগঞ্জ জেলার বদরপুর। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় সতেরশ কিমি। কাজেই ট্রেনে যাওয়ার রুট ছিল হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে গৌহাটি, সেখানে ট্রেন বদলে বরাক-ভ্যালি এক্সপ্রেস। ট্রেনের জার্নি, ট্রেনের অদল বদলে প্রায় আড়াই দিন পার হয়ে যেত অবহেলে।

দমদম বিমানবন্দরে সকাল বেলা পৌঁছে গেলাম মধ্যবিত্তের বিলাসী ট্যাক্সিতে, এবার মধ্যবিত্তের স্বপ্ন - উড়ানযাত্রাবাবার বেশ কয়েকবার উড়ানযাত্রার অভিজ্ঞতা ছিল, কাজেই বেশ কদিন ধরেই তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যাবতীয় করণীয় আর অকরণীয় ব্যাপার স্যাপার।

আমার সঙ্গে কোম্পানির বড়ো সায়েব ছিলেন আর ছিল কোম্পানীর ঠিকাদার - মাইতিবাবু, কাজেই আমার প্রথম প্লেনে চড়ার চাপটা অনেকটাই হাল্কা হয়ে গিয়েছিল। তারওপর সেসময় সন্ত্রাসের আশায় সদাসন্ত্রস্তভাব দেখাতেও হত না, আর নানান ভাড়ার নানান উড়ানের হাটও ছিল না, ছিল এক এবং অদ্বিতীয় আইএ আর তার রাজামশাই। কাজেই প্লেনে চড়ে পড়াটা বেশ সহজ সরল ব্যাপারই মনে হয়েছিল।

আমার সিট মাঝখানে, বাঁদিকে জানালার পাশে মাইতিবাবু, আর ডানদিকে প্যাসেজের পাশে – যার উড়ানী নাম “আইল” সেখানে বসলেন বড়োসায়েব। খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করছিলাম ভেতরটা। মাথার ওপরে হাওয়ার ঘূর্ণি-নব, সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার দিকে করার অনেক চেষ্টা করলাম, হাওয়াটা আমার নাক বরাবর এসে ঝরতে লাগল, তার চেয়ে কাছে আর এল না কিছুতেইতারপর দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সিটবেল্ট বাঁধা আর  সে সম্পর্কিত নির্দেশাবলীভারতবর্ষে মহাভারত পড়ার সেই ট্র্যাডিশন আজ আর নেই বললেই চলে, কিন্তু সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশাবলী, গত চল্লিশ বছরে একবর্ণও পালটায়নি

১৯২৯ সালে ভারতবর্ষে প্রথম এয়ারলাইন কোম্পানি চালু করেছিলেন জে আর ডি টাটা – নাম দিয়েছিলেন টাটা এয়ারলাইন্‌স্‌। টাটাসাহেব নিজে করাচি টু আমেদাবাদ ভায়া বোম্বাই ফ্লাই করেছিলেন – ১৯৩২ সালে। ১৯৪৬ সালে টাটা এয়ারলাইন্‌স্‌ পাব্লিক কোম্পানি হয়ে গেল – নাম হল, এয়ার ইণ্ডিয়াস্বাধীন হওয়ার ছ বছর পর, ১৯৫৩ সালে এয়ার ইণ্ডিয়া রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে দুটি স্বয়ংশাসিত কোম্পানি হিসেবে গড়ে উঠল - এয়ার ইণ্ডিয়া আর ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্‌স্‌। ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্‌স্‌ মূলতঃ দেশের ভিতরের বিমান পরিষেবার জন্যে আর এয়ার ইণ্ডিয়া আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবার জন্যে। ১৯৭০ সালে ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্‌স্‌ প্রথম বোয়িং ৭৩৭ বিমান আমদানি করে। আমাদের এই বিমানটিও ৭৩৭ – একটু বাড়িয়ে নম্বরটা ৭৮৬ করলেও মন্দ হতো না, নিরাপত্তা হয়তো একটু বাড়তকারণ “দীওয়ার” সিনেমার দৌলতে বুঝে গিয়েছি ৭৮৬-র মাহাত্ম্য। “বিল্লা নাম্বার সাতশ ছিয়াশি”।

ঝাঁপ পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নড়ে চড়ে উঠল উড়ানটা। সুন্দরী বিমানসেবিকারা ট্রেতে করে বয়ে আনলেন লজেঞ্চুস, প্লাস্টিক পাউচে কানে গোঁজার তুলো আর মুখ মোছার জন্যে হিমায়িত ওডিকোলনসিক্ত সফেদ টাওয়েল। বাবার পাঠ অনুযায়ী দুটো একটা একটা করে পাউচ তুললাম আর হাত নিসপিস করলেও মাত্র দুটো লজেঞ্চুস তুললাম ট্রে থেকে। অথচ আমার পাশে মাইতিবাবু যখন একমুঠি লজেঞ্চুস আর সঙ্গে চার পাঁচটা করে পাউচ তুলে নিল ট্রে থেকে, আমি লজ্জায় রাঙা হয়ে তাকালাম বিমানসেবিকার দিকে, কিন্তু তাঁর মুখ ভাবলেশহীন।

উড়ান এসে দাঁড়াল রানওয়ের প্রান্তে, ইঞ্জিনে শব্দ উঠতে লাগল গোঁ গোঁ করেএইবার শুরু হবে উড়াল দেওয়ার পালা। প্রচণ্ড বেগে দৌড় শুরু করে একটা সময় যখন হালকা হয়ে গেল আমার শরীরটা – বুঝলাম উড়ানটা মাটির মায়া ত্যাগ করলইঞ্জিনের চাপা গোঁ গোঁ আওয়াজের সঙ্গে মাঝে মাঝেই ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছিল উড়ানের গোটা শরীরটা। অথচ আমাদের বাড়ির বারান্দায় শালিক পাখিটা যখন সুরেলা শিস তুলে উড়াল দেয়, কি হাল্কা আর সাবলীল! ওদিকে ভিজিটার্স লাউঞ্জের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মা দুর্গা নাম জপলেন দুবার, তাঁর জোড়া হাত ঠেকালেন কপালে। দেখতে পেলাম না, কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করলাম।

নিশ্চিন্ত উচ্চতায় উঠে উড়ান যখন ভাসতে লাগল, নিভে গেল সিট বেল্টের আলো। ক্লিক ক্লিক শব্দে সকলে খুলে ফেলল সিট বেল্টের বাক্‌ল্‌স। আর সমবেত আনন্দে ধূমপায়ীরা ধারিয়ে ফেলল সিগারেট। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল – কিন্তু যেহেতু পাশে বসে রয়েছেন জীবনের প্রথম বস, কাজেই সংযত রইলাম। আমার পকেটে ছিল স্বল্প দৈর্ঘের সস্তা সিগারেটের প্যাকেট, আর উড়ানে সকলের হাতেই রাজকীয় আকারের দামি সিগারেট জ্বলতে দেখলাম। ঠিক করে ফেললাম, এরপর যখন একা একা যাওয়া আসা করব, আমিও ওই প্যাকেটই কিনব আর ফস ফস করে ধরাতে থাকব দামি সিগারেট!

প্রথমেই এসে গেল অরেঞ্জ জুস। উৎকট স্বাদের এক অদ্ভূত পানীয়। খুব হাল্কা চুমুকে, যাকে সিপ নেওয়া বলে, নিঃশব্দে পান করতে লাগলাম। কিন্তু আমার পাশে মাইতিবাবু ওসবের ধার মাড়াল না, চোঁক চোঁক শব্দে নিমেষে গ্লাস খালি করে তৃপ্তির আওয়াজ তুলল “আআআঃ”। আমাকে জিগ্যেস করল -”আরেকটু নেবেন নাকি, পান্নাবাবু”?

“নাঃ”। শিউরে উঠে আমি উত্তর দিলাম।

“আমি আরেকটু নেব। দাঁড়ান, ডাকি- দিদিভাই, ও দিদিভাই, এদিকে আরেকবার জুসটা আনুন না”।

আশে পাশের সকলে মাইতিবাবুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ভাবলেশহীন মুখে দিদিভাই এসে জগ থেকে ভরে দিয়ে গেল মাইতিবাবুর গ্লাস। কিন্তু আমি যে কেন লজ্জায় সিঁটিয়ে রইলাম কে জানে? সেদিন উড়ান এটিকেটকে চুলোর দুয়োরে পাঠিয়ে, মাইতিবাবুর চূড়ান্ত স্মার্টনেসের পরাকাষ্ঠা দেখে মনে মনে ঈর্ষান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু নিজে আজও পারিনি অমন স্মার্ট হতে – আজও উড়ানের নিশ্ছিদ্র এটিকেটের বাঁধা পথেই চলছে আমার উড়ান যাত্রা - “এক্সকিউজ মি” আর “থ্যাংকু”-র বাইরে বের হতে পারলাম না একবারও।

 

শিলচর তখন ছোট্ট ছোট্ট সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বিমান বন্দর। ছিমছাম সাজগোজ করা পাহাড়ি কিশোরীর মতো। ভাল লেগে গেল বেশ। মালপত্র হস্তগত করে বাইরে বের হতেই ছেঁকে ধরল ট্যাক্সিওয়ালারা, “খোই যাইতা”? –“ভদরফুর, হায়লাকান্দি, খরিমগন্‌জো...।”

মাইতিবাবু একজনকে জিগ্যেস করল – “ভদরপুর যাইতে নি রে বা...”

“অয়, অয়...”

দরদস্তুর শেষে আমরা ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। ট্যাক্সি বিমানবন্দরের চৌহদ্দি পার হয়ে রাস্তায় পড়তে মাইতিবাবুকে জিগ্যেস করলাম, “এটা কি ভাষা, আপনি মেদিনীপুরের লোক – এত ভালো শিখলেন কি করে”?     

“সে কি বাংলা ভাষাই তো – সিলেটি টান আছে একটু এই যা। বছরখানেক হতে চলল এখানে আমার যাওয়া আসা – শিখে ফেললাম – কিতা মাতরে বা ড্রাইভারবাই, বালা কইতাম নি”?

“অয় অয় বালা, বালা”। একগাল হেসে ড্রাইভারভাই উত্তর দিল। মাইতিবাবু আমাকে বলল, “কদিন থাকুন, আপনিও শিখে নেবেন, কোন ব্যাপার নয় – এখানকার মাটির এমনই গুণ। এখানে একটা মজার কথা চালু আছে – শুনবেন? “কি বা দ্যাশে আইলাম বা, কি বা মাটির গুণ, একোই গাসে পানহুপারি, একোই গাসে সুন”।

“তার মানে”?

“এখানে দেখবেন লোকজন খুব পান খায় – বলে তাম্বুল। গ্রামেরদিকে প্রায় সকলের বাড়িতেই সুপুরি গাছ আছে আর আছে তাম্বুলের লতা। এ পান কিন্তু আমাদের বাংলা পানের মতো চিকন নয় – অনেক মোটা আর খুব ঝাল। এরকমই কোন এক বাড়িতে সুপুরি গাছ বেয়েই উঠেছিল তাম্বুলের লতা। আর সেই তাম্বুলের পাতায় এক কাক - যা করে আর কি - সাদা চুনের মতো হেগে রেখেছিল। তাই দেখে কোন বোকাসোকা লোক ওই কথাটা বলেছিল – কি দেশেই বা এলাম, কি বা মাটির গুণ, একই গাছে পানসুপারি, একই গাছে চুন”!

 

জানালার বাইরে চোখ রাখলাম – গাড়ি ছুটে চলেছে এক নতুন দেশের পথ ধরে। এ দেশও আমারই দেশ এবং সেই থেকে শুরু হল সুবিশাল ভারতবর্ষের হাজার বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্যের সন্ধান।

 -00-


শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "






কোলাঘাট পার হয়ে কিছুটা এগিয়েই গাড়িটা বিগড়ে গেলহঠাৎ হেঁচকি তুলে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাবার পর আর স্টার্ট নিচ্ছে না কিছুতেই। কি যে হল বোধগম্য হল না সুনেত্রর। গাড়ি বলতে সে বোঝে চাবি, স্টিয়ারিং, গিয়ার, ক্লাচ আর অ্যাক্সিলেটার। বনেট খুলে গাড়ির কলকব্জার দিকে তাকালে তার পুরো ব্যাপারটাই অসম্ভব এক ধাঁধা মনে হয়। কোথাকার পাইপ, কোথাকার তার কোথায় গিয়ে কি কাণ্ড কারখানা ঘটালে গাড়িটা চলে আর কোনটা বিগড়োলে গাড়ি থমকে যায়, সেটা তার মাথায় ঢোকে না, কোনোদিন চেষ্টাও করেনি বোঝার। রাস্তায় ঘাটে এমন পরিস্থিতি অনেকবারই হয়েছে, সে সব সময়ে বনেট খুলে মুণ্ডু ঢুকিয়ে সামলে দিয়েছে দিবাকর – তার ড্রাইভার। সে পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনেছে পর পর দু তিনটে। ব্যস ওই টুকুই।

দিবাকরের বাড়ি মেচেদায়গতকাল কলকাতা যাবার সময় দিবাকরকে মেচেদায় নামিয়ে নিজেই ড্রাইভ করে কলকাতা গিয়েছিল। কথা ছিল আজ সন্ধ্যে আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ মেচেদার একই জায়গা থেকে তুলে নেবে দিবাকরকে – একসঙ্গে চলে যাবে হলদিয়াএকশটা টাকা খসিয়ে চারজন ছোঁড়াকে দিয়ে গাড়িটা ঠেলে স্টার্ট করা যায় কিনা, সে চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু কিছু লাভ হয় নি। অবশেষে নাচার হয়ে, সুনেত্র দিবাকরকেই ফোন করলদিবাকরকে মোটামুটি তার লোকেশনটা বুঝিয়ে দিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে উদ্ধার করার জন্যে। আপাততঃ তার আর কিছু করার নেই, গাড়িতে হেলান দিয়ে সিগারেট ধ্বংস করা ছাড়া – দিবাকরের এখানে এসে পৌঁছতে অন্ততঃ আধঘন্টা, পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো লাগবেই। একটু বেশিও হতে পারে – কারণ আজ একে রোববার তার ওপর রাত প্রায় সাড়ে আটটা, এসময় গাড়ি যোগাড় করে অকুস্থলে পৌঁছনো কম ঝকমারি নয়।

গাড়িতে হেলান দিয়ে চার নম্বর সিগারেটটা যখন টানছিল সুনেত্র, একটা গাড়ি তাকে ক্রস করে সামনেই বাঁদিকে সাইড করে দাঁড়াল। এখানে গাড়ি দাঁড়ানোর কথা নয়, কেন দাঁড়াল – সুনেত্রর চেনা কেউ? লিফট দিতে চায়? সুনেত্র নিজের জায়গা থেকেই দেখছিল গাড়িটাকে। ড্রাইভারের দরজা খুলে একজন মহিলা নেমে এগিয়ে এল তার দিকে!

“সুনুদা, না? এখানে দাঁড়িয়ে, কী করছো”? মহিলার কণ্ঠস্বরে বহুদিনের পূর্বস্মৃতি ফিরে এল সুনেত্রর। এই ডাক, এই গলা শোনার জন্যে একসময়ে তার সমস্ত মন উদগ্রীব হয়ে থাকত। আজ আচমকা এই রকম জায়গায় সেই মেয়েটির আবির্ভাব ঝাঁকিয়ে দিলে সুনেত্রর ভিতরটা।

নিজেকে যথাসম্ভব সামলে রেখে সে উত্তর দিল, “কনি, তুই? এখানে কোত্থেকে”?

“যাক, চিনতে পেরেছো তাহলে? আমি বাড়ি ফিরছি – হলদিয়া! কত্তা আছেন সঙ্গে, তবে আমিই ড্রাইভ করছিলাম। গাড়িতে হেলান দিয়ে তোমার ওই দাঁড়ানোর ভঙ্গীটা খুব চেনা লাগল, তাই দাঁড়ালাম, চিনতে ভুল করিনি, দেখছো তো”? হাসল সুকন্যা, পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অজস্র গাড়ির আলোর চকিত চমকানিতে তার মুখের একটা পাশই শুধু দেখা যাচ্ছিল। এ যেন নিছক মুখ দর্শন নয় – সুদূর অতীত থেকে বর্তমানের খণ্ড খণ্ড চলচিত্র!

“তোর সঙ্গে শেষ দেখা অন্ততঃ বছর আষ্টেক আগে। তখন আমার গাড়িও ছিল না, কাজেই গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর কোন ভঙ্গীই তুই আমার দেখিসনি কোনদিন, কাজেই এটা কিন্তু তুই ডাঁহা ঢপ দিলি”।

সুকন্যা এ কথায় এতটুকুও অপ্রতিভ না হয়ে বলল, “হতে পারে গাড়িতে হেলান দেবার ভঙ্গী দেখিনি, তবে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে, বাসস্টপের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে তোমাকে বহুবার দেখেছি। আর সত্যি বলতে মেয়েরা এগুলো ভুলতে পারে না, তোমরা ছেলেরা এসব বুঝবে না”।

সুকন্যা আবার হাসল, শাড়ির আঁচলে হাসিটা মুছে বলল, “প্রায় আট বছর বাদেও, আধো অন্ধকারে - গাড়ির হেডলাইটের আলোয়, তোমাকে দেখেই চিনতে পারলাম, এইটুকু কৃতিত্বও তুমি দেবে না”? কথাটা সত্যি। কাজেই সঠিক কোন উত্তর মনে এল না সুনেত্রর।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সুকন্যা বলল, “সে যাক গে, তুমি এসময় এখানে দাঁড়িয়ে কেন? গাড়ি বিগড়েছে”?

“আর কি? যাচ্ছিলাম হলদিয়া, হঠাৎ স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল, ঠেলেঠুলেও চেষ্টা করলাম, কী হল কে জানে। আমার ড্রাইভার দিবাকরকে ডেকেছি – মহিষাদলে থাকে - আসছে, এসে যাবে যে কোন সময়”।

“এক কাজ করো না, তোমারটা লক করে, আমার গাড়িতে উঠে পড়ো। তোমার দিবাকর এসে দেখবে, বুঝে শুনে সারাতেও তো সময় লাগতে পারে, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে রাস্তায়? ও সারিয়ে টারিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাবে”

“এভাবে মাঝরাস্তায় গাড়িটা ফেলে রেখে চলে যাবো? কিছু হয়ে গেলে”?

“ফোন করে দেখ না, তোমার দিবাকর এখন কোথায়, কতক্ষণ আর ফেলে রাখতে হবে, সেই একই রকম রয়ে গেলে তুমি, সুনুদা”। সুকন্যা মুখ টিপে হাসল, অস্ফুটে বলল, “এক নম্বরের ভিতু”।

সুনেত্রর ঠোঁটে জুৎসই একটা উত্তর চলে এসেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল নয় বুঝে কিছু বলল না। বরং কথাটা না শোনার ভান করে, সুনেত্র ফোন করল দিবাকরকে। দিবাকর যা বলল তাতে মনে হল সে পনের বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসতে পারবে আর ডুপ্লিকেট একটা চাবিও দিবাকরের কাছেই আছে। কাজেই দিবাকরকে পুরো ব্যাপারটা বলাতে দিবাকর বলল, “আপনি নিশ্চিন্তে বেরিয়ে যান, স্যার, কোন টেনসান নেবেন না, আমি দেখে নিচ্ছি সব”

 

ল্যাপটপের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গাড়ি লক করে সুনেত্র সুকন্যার গাড়ির কাছে গেল।

“তুমি সামনে বসো সুনুদা, পিছনের সিটে আমার কত্তাটি লাট খাচ্ছে”। সুকন্যা ড্রাইভারের সিটে বসতে বসতে বলল। ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সুনেত্র সামনের সিটে বসে দরজা বন্ধ করল।

“কি ল্যাংগোয়েজ তোর, কনি? তোর কত্তা শুয়ে কেন – শরীর খারাপ নাকি”? ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে সুনেত্র জিজ্ঞেস করল। সুকন্যা গাড়ি স্টার্ট করেছিল, গাড়ি গিয়ারে দিতে গিয়েও থমকে গেল, সুনেত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কতদিন পরে তোমার মুখে সেই “কনি” ডাক শুনলাম, সুনুদা”।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুকন্যা গাড়িটাকে মাঝরাস্তায় এনে চালাতে শুরু করল, তারপর বলল, “তুমি ড্রিংক করো”?

“করি, সে তেমন কিছু নয়, অবরে সবরেসিগারেট ছাড়া আর কোন নেশা নেই”

“তুমি তো তা হলে লক্ষ্মী ছেলে, সোনা ছেলে” সুকন্যার অধরে মিচকে হাসি। “আমার কত্তাটি এদিক দিয়ে খুব রসিক। আনন্দই হোক কিংবা দুঃখ – রোদ্দুর হোক বা বৃষ্টি, বোতল না খুললে ঠিক সেলিব্রেসান হয় না। আর সেও আকণ্ঠ সেলিব্রেসান! যার ফল ওই – পিছনের সিটে লাট খাচ্ছেন – থুড়ি, শুয়ে আছেনআমার ভাষা আমি সামলে নিয়েছি, সুনুদা, আমাকে আর ল্যাংগোয়েজ নিয়ে ল্যাং মেরো না, প্লিজ”।

“তুই খাস না”?

“খাই না, তা নয়, তবে আজ খাইনি। ভাগ্যিস খাইনি, যদি খেতাম আজকে পথ হারানো এই পথিককে খুঁজে পেতাম? তোমাকে নিয়ে এমন রথযাত্রা সম্ভব হতো, বলো? দ্বারকা থেকে রথ চালিয়ে সুভদ্রাই পালিয়ে এসেছিলেন না, অর্জুনকে নিয়ে”? অবাক হয়ে সুনেত্র সুকন্যার দিকে তাকাল, সুকন্যার মুখ গম্ভীর, সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির আলো আঁধারিতে তার মুখভাব স্পষ্ট বোঝা গেল না, সুনেত্র বলল, “কি উল্টোপাল্টা বকছিস? নেশা করিসনি বলছিস, কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে...।”?

“কী মনে হচ্ছে গো, নেশা করেছি”? এবার সুকন্যা বেশ জোরেই হাসল। এক ঝলক সুনেত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “এক্স্যাক্টলি, নেশাই তো, তবে এ নেশা মোটেই দারুর নেশা নয় – পেয়ার কা নাশা- ইয়ে নাশা পেয়ার কা নাশা হ্যায় – একটা হিন্দী গান আছে না? শুনেছ?”

“ফক্কুড়ি করছিস”? সুনেত্র হাসল, কিন্তু সে হাসিতে অস্বস্তি, তার বুকের মধ্যে কোথাও যেন একটা ব্যথার অনুভব, এতদিন পরে সব মনে পড়ে যাচ্ছে তার

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৪ "


উত্তরার গর্ভরক্ষা

সূত বললেন, “অশ্বত্থামার শাস্তি বিধানের পর, পুত্রদের শোকে ব্যাকুল দ্রৌপদী ও পঞ্চপাণ্ডব মৃত পুত্রদের পারলৌকিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করলেন। তারপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষের নিহত সমস্ত যোদ্ধাদের মা, স্ত্রী, কন্যা ও ভগিনীদের নিয়ে পাণ্ডবগণ গঙ্গাতীরে গেলেন। গঙ্গার পবিত্র জলে স্নান করলেন এবং তর্পণে জল অঞ্জলি দিলেন। সমবেত নারীদের মধ্যে মাতা গান্ধারী ও মাতা কুন্তীও ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এবং যুধিষ্ঠির ও তাঁর চার ভাই। সমবেত নারী ও পুরুষেরা সকলেই এই মহাযুদ্ধে তাঁদের আত্মীয় পরিজনদের মৃত্যুতে শোকে ব্যাকুল হয়ে ছিলেন। তাঁদের সান্ত্বনা দিলেন উপস্থিত মুনি, ঋষি এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বললেন, কাল বা মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। এই মৃত্যুকে কোন ভাবেই নিবারণ করা যায় না। অতএব, এখন শোক ও দুঃখকে সংযত করাই সকলের কর্তব্য।

[এখানে কিঞ্চিৎ কথার মারপ্যাঁচ রয়ে গেল যেন - ভগবান বললেন, কাল বা মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। এই মৃত্যুকে কোন ভাবেই নিবারণ করা যায় না। একথা সত্যি। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিবারণ করতে পারলে, যুদ্ধক্ষেত্রে এতগুলি মানুষের অকালমৃত্যু অনিবার্য নাও হতে পারত। অবশ্য একথাও সত্যি, পাণ্ডব এবং ভগবান কৃষ্ণের যথোচিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষকে যুদ্ধ থেকে নিরস্ত করা যায়নি। হয়তো দুর্যোধনের অন্যায্য অহংকারই ছিল কাল-নির্দিষ্ট - তাঁদের সকলের এবং অন্যান্যদেরও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।]  

মৃত যোদ্ধাদের শ্রাদ্ধ ও তর্পণ সমাপ্তির পর, শ্রী কৃষ্ণ  যুধিষ্ঠির কে দিয়ে তিনবার অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করালেন। এই যজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, ভারতভূমিতে যুধিষ্ঠির সহ তাঁর চার ভাইয়ের আধিপত্য এবং খ্যাতির আর কোন সীমা রইল না।

এইভাবে সমস্ত কাজ সুন্দর সমাধা ক’রে, শ্রীকৃষ্ণ ভগবান সকলের কাছে দ্বারকায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বহুদিন তিনি নিজ রাজ্য ছেড়ে হস্তিনাপুরে রয়েছেন। এবার তাঁর ফিরে যাবার সময় হয়েছে। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় ক’রে, তিনি সকলের থেকে বিদায় নিলেন। সবশেষে পাণ্ডবদের থেকেও বিদায় নিয়ে তিনি সাত্যকি আর উদ্ধবের সঙ্গে তাঁর রথে উঠতে যাবেন, এমন সময় উন্মাদিনীর মতো সেখানে দৌড়ে এলেন, অভিমন্যুর বিধবা পত্নী উত্তরা।

ভীতা ও সন্ত্রস্তা উত্তরা শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, হে প্রভু, তপ্ত লোহার মতো ই শেল আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ভয় পাচ্ছি, আমাকে রক্ষা করুন, রক্ষা করুন। একলা আমি যদি এই আগুনময় তিরে পুড়ে মারা যেতাম, তাতে আমি ভয় পেতাম না, দুঃখও পেতাম না। কিন্তু আমার গর্ভে রয়েছে অভিমন্যুর সন্তান। হে করুণাময়, আপনি শরণাগতের পরিত্রাতা, আপনি আমার গর্ভের এই শিশুকে রক্ষা করুন। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং পাণ্ডবদের সকলেই বুঝতে পারলেন, এ অশ্বত্থামার কুকীর্তি। পাণ্ডবদের বংশ ধ্বংস করার জন্যেই অশ্বত্থামা আরো একবার ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন। অপ্রস্তুত পাণ্ডব ভাইয়েরা সকলেই নিজের নিজের তির, ধনুক ও গাণ্ডীবের জন্যে ঘরের দিকে দৌড়লেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, হাতে একদমই সময় নেই আর এই ভয়ংকর অস্ত্র  এখনই নিবারণ না করতে পারলে, সকলেরই সমূহ বিপদ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র প্রয়োগ করলেন এবং  নির্বিষ করলেন অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রকে। তারপর তিনি তাঁর অদ্ভূত মায়ায়, উত্তরার গর্ভে প্রবেশ করলেন। গর্ভে প্রবেশ করে, উত্তরার শিশুকে তিনি আবৃত করে রাখলেন, আর নিজের শরীরে সেই ব্রহ্মাস্ত্রের প্রচণ্ড শক্তি গ্রহণ করলেন। তিনি স্বয়ং বিষ্ণু, তিনিই ভগবান, তাঁর কাছে কোন তেজই অনিবার্য নয়। রক্ষা পেল উত্তরার গর্ভের শিশু” 

কুন্তীর কৃষ্ণবন্দনা

এরপর যখন আবার তিনি দ্বারকায় ফেরার জন্যে রথে চড়তে যাবেন, মাতা কুন্তী ও দ্রৌপদী সপরিবারে এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। ভয়ংকর এক পরিণামের থেকে এইমাত্র মুক্তি পেয়ে তাঁরা আশ্চর্য, অবাক ও বিহ্বল।

কুন্তী ভক্তি ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তোমাকে নমস্কার করি। তুমি এই জগতের একমাত্র নিয়ন্তা। ত্রিগুণের অতীত, তুমিই আদিপুরুষ, তুমিই পূর্ণরূপে কিন্তু সকলের অগোচরে এই নিখিল বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত রয়েছ। যে ব্যক্তি গানের কিছুই বোঝে না, তার কাছে সঙ্গীতজ্ঞের সুরসমৃদ্ধ গান যেমন সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য; তেমনি সর্বদা তোমার সঙ্গে থেকেও, আমরা তোমার অসীম লীলার তত্ত্বটি কিছুই বুঝতে পারি না। তুমি আমাদের ভক্তি নাও। তুমি আমাদের প্রণাম নাও।

হে কৃষ্ণ, তুমি পুত্ররূপে জন্ম নিয়ে পিতা বসুদেব ও মাতা দেবকীকে একবার করুণা করেছিলেতারপর তোমার মাতা দেবকীকে তুমি আর একবারই মাত্র করুণা করেছ; মহা নিষ্ঠুর কংসের কারাগার থেকে তোমার দুঃখিনী মাকে মুক্ত করে হে কৃষ্ণ, তোমার মায়ের অন্য পুত্রদের তুমি কংসের হাত থেকে রক্ষা করোনি। অথচ আমাদের প্রতি তোমার করুণার অন্ত নেই। হে কৃষ্ণ, তোমাকে আমাদের সকলের প্রণাম। তুমি আমার পুত্রদের কতবার যে মৃত্যুর হাত থেকে, চরম বিপদের থেকে মুক্ত করেছ, তার কোন হিসেব হয় না।

বালক দুর্যোধনের বিষপ্রয়োগের থেকে আমার পুত্রদের তুমি রক্ষা করেছিলে। জতুগৃহদাহ থেকে তুমি আমার পুত্রদের এবং আমার প্রাণ রক্ষা করেছিলে। হিড়িম্বা রাক্ষসের হাত থেকে তুমিই আমাদের রক্ষা করেছিলেদ্যূতসভার চাতুরি থেকে, বনবাসের সমস্ত কষ্ট থেকে তুমিই আমাদের রক্ষা করেছ। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে, সঠিক সময়ে নির্ভুল পরামর্শ দিয়ে, তুমি আমার পুত্রদের বারবার রক্ষা করেছ। এখন, এইমাত্র তুমি আমাদের বংশের একমাত্র উত্তরাধিকার উত্তরার শিশুপুত্রকে রক্ষা করলে। হে কৃষ্ণ, তুমিই এই জগতের গুরু, এই জগতের পিতা। তুমি আমাদের প্রণাম নাও। যে বিপদে তোমার দর্শন, তোমার সঙ্গ পাওয়া যায়, সেই বিপদ আমাদের যেন বার বার আসে। কারণ দুঃখের দিনে তোমার স্পর্শ দিয়ে, তুমিই সকল দুঃখের অবসান করে থাকো।

[এমন অদ্ভূত ভগবৎ-ভক্তির কথা পৃথিবীর আর কোন ধর্মের কোন ধর্মগ্রন্থে রয়েছে বলে আমার জানা নেই। ভক্ত বিপদে পড়তে চাইছে, তার কারণ তার বিশ্বাস - বিপদে পড়লেই ঈশ্বরের দর্শন ও স্পর্শ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের (২৩০) গান – “দুখের বেশে এসেছ ব’লে তোমারে নাহি ডরিব হে। যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় ক’রে ধরিব হে।। আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, তোমারে তবু চিনিব আমি – মরণরূপে আসিলে, প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে”। অথবা (২২৮) “আরো আরো, প্রভু, আরো আরো এমনি ক’রে আমায় মারো... হাটে ঘাটে বাটে করি মেলা, কেবল হেসে খেলে গেছে বেলা – দেখি কেমনে কাঁদাতে পারো”।।]

হে কৃষ্ণ, তোমার জন্ম নেই, তোমার মৃত্যুও নেইশুধুমাত্র ভক্তদের মঙ্গলের জন্যেই তুমি বারবার জন্ম নাও, মৃত্যুও বরণ করো। তোমার কর্ম নেই, তাও তুমি অনলস কর্ম করে যাও। হে কৃষ্ণ, তুমি পশুরূপে বরাহ, নররূপে শ্রীরাম, ঋষিরূপে নরনারায়ণ এবং জলচররূপে মৎস্যজন্ম নিয়েছ। তোমার মায়ায়, সেই সমস্ত অদ্ভূত রূপ মানুষের মনে ভ্রম সৃষ্টি করে। তারা বোঝে না, তুমি অনাদি। তুমি অনন্ত। তুমি জন্মরহিত। তুমি ত্রিগুণাতীত। তুমি অব্যয়।

এই জন্মেও কি অপূর্ব তোমার নরলীলা, হে কৃষ্ণ। একদিন তুমি ননীর কলসী ভেঙে ফেলেছিলে। তাই দেখে মা যশোদা তোমাকে শাস্তি দিয়ে হাত বেঁধে দেবেন বলে, দড়ি নিয়ে এসেছিলেন। সেই দড়ি দেখে তুমি কি ভয়ই না পেয়েছিলে! তোমার চোখের কাজল সেদিন তোমার অশ্রুতে ধুয়ে গিয়েছিল। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে তুমি এমন মুখ ঘুরিয়ে রইলে, আমাদেরই বুকে মোচড় দিচ্ছিল, মা যশোদা কী করে সইবেন?  জানি, হে কৃষ্ণ, তুমি ভগবান। হে কৃষ্ণ, বুঝি এ সবই তোমার লীলা। তবু তোমাতেই মন মুগ্ধ হয়ে থাকে সর্বক্ষণ।

হে কৃষ্ণ, আজ আমাদের ছেড়ে তুমি নিজের রাজ্য দ্বারকায় ফিরে যাচ্ছো। আমরা তোমার বন্ধু, তোমার অনুগত। তোমার মতো কর্ণধার সর্বদা আমাদের সঙ্গে ছিলে বলেই, আমরা অশান্তি ও ভয়ংকর যুদ্ধের সাগর পার করে, এই শান্তি ও সমৃদ্ধির পাড়ে সবে মাত্র উঠেছি। এই যুদ্ধে বিরোধী পক্ষের যত রাজা নিহত হয়েছেন, তাঁদের আত্মীয় পরিজনরা মনে মনে আমাদের শত্রু হয়ে উঠেছেন। এখন তাঁরা দুর্বল, কিন্তু অচিরেই তারা বলবান হয়ে উঠতে পারেন। হে দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ, যাদব এবং পাণ্ডব দুপক্ষের প্রতিই আমার দৃঢ় স্নেহবন্ধন ও পক্ষপাততুমি চলে গেলে পাণ্ডবদের অমঙ্গল হবে এবং তাতে যাদবদেরও অমঙ্গল হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে। তুমি আর অর্জুন চিরদিনের সখা। মুক্তবেণী গঙ্গা যেমন একাগ্রভাবে সাগরে গিয়ে মেশে, তেমনি সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে, আমার মন সর্বদা তোমার চরণতলেই আশ্রিত থাক

আমার প্রতি তোমার এই ভালোবাসা আর ভক্তি চিরদিনই অবিচলিত থাকুক, এই বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মধুর হাসি দিয়ে কুন্তীকে আপ্যায়ন করলেন। তারপর হস্তিনাপুরে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে তিনি দ্বারকা রওনা হবার উদ্যোগ নিলেন” 

চলবে...   




নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১৪

    ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্...