ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৬ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৭
৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস (পূর্ববর্তী পর্বের শেষাংশ)
যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা "শেষাংশ)
“প্রিয়বাক্য বললে কী লাভ হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে, বহুমিত্র হলে কিংবা ধর্মে অনুরাগী
হলেই বা কী কী লাভ হয়?”
“প্রিয়বাদী সকলের প্রিয় হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে ব্যক্তি অনেকবেশী লাভ করতে পারে, বহুমিত্র হলে, ব্যক্তি সতত আনন্দে থাকে
এবং ধর্মানুরাগী হলে সদ্গতি লাভ হয়”।
“সুখী কে? আশ্চর্য
কী? পথ এবং বার্তাই বা কী? এই চার প্রশ্নের সঠিক
উত্তর দিলে,
তোমার
ভাইয়েরা আবার বেঁচে উঠতে পারেন”।
যুধিষ্ঠির বললেন, “যিনি অঋণী ও অপ্রবাসী হয়ে, দিনের পঞ্চম বা ষষ্ঠভাগে, নিজের গৃহে শাক-অন্ন আহার
করেন তিনিই সুখী। প্রাণীগণকে প্রতিদিন মারা যেতে দেখেও, জীবিত ব্যক্তিরা নিজেদের চিরজীবন
আশা করে,
এর থেকে
আশ্চর্য আর কী হতে পারে? তর্কের সীমা নেই, বেদ ও স্মৃতির মত বিভিন্ন। মুনি একজন নয়, যে তাঁর মতই একমাত্র, আর ধর্মের অজস্র তত্ত্ব
জ্ঞানের গুহায় মিলিয়ে যায়। অতএব মহাজনেরা যে পথে গমন করেছেন, সেই পথই পথ। সূর্যরূপ কাল
(সময়)-এর আগুনে,
দিন-রাত্রিস্বরূপ
ইন্ধন জ্বালিয়ে,
মহামায়ার
কড়াইতে ঋতু ও মাস-স্বরূপ হাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে, প্রাণিদের যে সর্বদা রন্ধন করা হয়, সেটাই হল বার্তা”।
যক্ষ বললেন, “হে রাজন, এখনও পর্যন্ত তুমি আমার সকল প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিয়েছ।
এখন বল, পুরুষ কে এবং সকলের মধ্যে
ধনী কে?”
“পুণ্যকর্ম দিয়ে যখন স্বর্গ স্পর্শ করা যায়, তখনি মানুষের যশ এই পৃথিবীতে
ছড়িয়ে পড়ে,
সেই যশ
যতদিন থাকে,
ততদিন সেই
পুণ্যকর্মা ব্যক্তিকে পুরুষ বলে বিবেচনা করা হয়। যে ব্যক্তি অতীত বা ভবিষ্যতের
সুখ-দুঃখ ও প্রিয়-অপ্রিয়কে সমান মনে করেন, তিনিই সকলের মধ্যে ধনী”।
যক্ষ এবার বললেন, “হে রাজন, এখন আমি তোমার ইচ্ছামতো তোমার একজন ভাইকে জীবিত করব, বল সে কোন ভাই?”
যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, ওই শ্যামকলেবর, লোহিত-লোচন, বিশালবক্ষ, মহাবাহু নকুল জীবিত হয়ে উঠুক”।
যক্ষ আশ্চর্য হয়ে বললেন, “হে রাজন, তুমি দশ-হাজার হাতির তুল্য বলশালী প্রিয় ভীম কিংবা
পাণ্ডবদের প্রধান আশ্রয় ধনঞ্জয়কে ছেড়ে, বিমাতার পুত্র নকুলের কথা কেন বললে?”
যুধিষ্ঠির বললেন, “ধর্মকে নষ্ট করলে, ধর্মও আমাদের নষ্ট করবেন এবং
তাঁকে রক্ষা করলে, তিনিও
আমাদের রক্ষা করবেন। অতএব আমি কখনও ধর্ম পরিত্যাগ করব না, ধর্মও আমাকে যেন কখনো পরিত্যাগ না
করেন। হে যক্ষ,
আনৃশংস্য[1]ই পরমধর্ম, আমি সর্বদাই আনৃশংস্য
অবলম্বন করতে চাই। সকলে আমাকে ধর্মশীল বলে জানেন, অতএব আমি কোনক্রমেই স্বধর্ম ত্যাগ
করতে পারব না। কুন্তী ও মাদ্রী দুজনেই আমার জননী। উভয়েই পুত্রবতী হয়ে থাকুন, এই আমার অভিলাষ। আমার
পক্ষে দুজনেই সমান, অতএব
আপনি নকুলকে জীবিত করে, দুজনকেই পুত্রবতী রাখুন”।
যক্ষ বললেন, “হে রাজন, আপনি অর্থতঃ এবং কামতঃ আনৃশংস্যপরায়ণ, এই কারণে আপনার সকল ভাইই
আবার জীবিত হোক”। যক্ষের কথা অনুযায়ী, পাণ্ডবদের সকলেই গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো উঠে বসলেন।
তখন রাজা যুধিষ্ঠির যক্ষকে বললেন, “আপনাকে যক্ষ বলেও মনে হয় না, আপনি কোন মহাপুরুষ হবেন। আপনি বসু, রুদ্র কিংবা মরুৎগণের
মধ্যে প্রধান কেউ, অথবা
দেবরাজ ইন্দ্র হবেন। নচেৎ এমন ঘটনা অসম্ভব। এই ভূমণ্ডলে এমন যোদ্ধা নেই, যে আমার এই রণকুশল ভাইদের
পরাভূত করতে পারে। তাছাড়া ভাইয়েরা যেভাবে সুস্থ এবং স্বচ্ছন্দে জেগে উঠেছে, তাতে তাদের কোনরকম চোট বা
আঘাতের লক্ষণ নেই। আমার মনে হয় আপনি আমাদের সুহৃৎ, আমাদের পিতৃসম”।
যক্ষ এবার স্মিতমুখে বললেন, “বৎস, আমিই তোমার পিতা, ভীমপরাক্রম ধর্ম, তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। হে যুধিষ্ঠির, তুমি আমার অত্যন্ত
স্নেহের পাত্র,
তুমি
পঞ্চযজ্ঞে[2] একান্ত অনুরক্ত হয়েছ এবং সকল
পাপের কারণ,
কাম, ক্রোধ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে পরাজিত
করেছ। আমি তোমাকে পরীক্ষা করার জন্যেই এখানে এসেছিলাম, এখন তোমার ধর্মজ্ঞানে আমি
সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার মঙ্গল হোক, এখন আমি তোমাকে বর দিতে চাই”।
এরপর রাজা যুধিষ্ঠির যেমন যেমন বর চেয়েছিলেন, তাঁর পিতা যক্ষরূপী ধর্মদেব
সবগুলিই অনুমোদন করলেন, তারপর সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
ওপরে স্বয়ং ধর্মদেব এবং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আলোচনায় ধর্ম বলতে
প্রচুর ঘৃতাহুতি ও বেদোচ্চারণ করে বিশাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান এবং তারপর বিপুল দান-টান
করে স্বর্গবাস সুনিশ্চিত করার প্রকরণ বলে মনে হল না। যজ্ঞ-টজ্ঞ নিয়ে দু চার কথা
রয়েছে ঠিকই,
কিন্তু সেটা
গৌণ, মুখ্যতঃ ধর্ম বলতে যা
বুঝলাম, সংসার, সমাজ, প্রতিবেশী, গুরুজন, স্বজন-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সকলের সঙ্গে
সদাচরণ, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে
সদ্ভাব বজায় রেখে চলা। একথা ভগবান বুদ্ধ, সম্রাট অশোকও বলেছিলেন, তাঁদের আমরা “বুদ্ধু” বলেছি, বলেছি “নির্বোধ”। কারণ এই
ধর্ম আচরণে সমাজের পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ শ্রেণীর স্বার্থ সিদ্ধি হয় না। তাঁদের
স্বার্থসিদ্ধির প্ররোচনায়, আমরাই “বুদ্ধু” এবং “নির্বোধ”-এর মত, ধর্ম নিয়ে প্রতিবেশী, সমাজ, বন্ধুজনের প্রতি
আনৃশংস্যতার পরিবর্তে নৃশংস হয়ে উঠেছি বহুকাল। ধর্মের নামে আমরা কবেই খুইয়ে বসেছি
আমাদের মানবধর্ম।
৫.২.৩ বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য দেব-দেবী
বৈদিক দেব-দেবীদের কথা আগে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। এখন আরেকবার চোখ
বুলিয়ে নেওয়া যাক।
ঋগ্বেদে প্রাক-বৈদিক দেবতাদের আবির্ভাব বা অভ্যুদয়ের পর্যায়গুলি ভীষণ
সুন্দর ও মানবিক। আর্য ঋষিরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে, এই দেশের অপরূপ মহিমা ও
সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। উত্তরে সুউচ্চ তুষারাবৃত মৌন গম্ভীর হিমালয়ের
পর্বত শ্রেণী। স্রোতস্বীনি অজস্র নদী ও আশ্চর্য তাদের বিস্তার। নদীগুলির অববাহিকায়
চিরহরিৎ অরণ্য এবং কিছু কিছু অঞ্চলে অনার্যদের সবুজ বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র। রুক্ষ, দুর্গম, সুদীর্ঘ পার্বত্য পথ পার
হয়ে, এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে
পৌঁছে, তাঁরা শুধু অভিভূতই হলেন
না, মনের মধ্যে অনুভব করলেন, আশ্চর্য প্রশান্তি, স্নিগ্ধ পূর্ণতা এবং
অভূতপূর্ব মুগ্ধতা। তাঁরা একদিকে যেমন অসাধারণ কাব্যিক শ্লোক রচনা করেছিলেন, তেমনই প্রকৃতির এই অদ্ভূত
ঐশ্বর্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিস্ময়ে তাঁরা মগ্ন হলেন দেবত্বের কল্পনায়। ঊর্ধের আকাশ – দ্যু, পায়ের নীচের পৃথিবী –পৃথ্বী।
দিনের আকাশের দেবতা উজ্জ্বল সূর্য, তিনি জগতের প্রাণ, তিনি মিত্র। আর নৈশ বা নীল আকাশের
দেবতা বরুণ। প্রাচীন বৈদিক দেবতার ধারণায় মাত্র এই কয়েকজনই ছিলেন, তাঁদের পূজার রীতি সহজ
সরল, সঙ্গীতময় কিছু মন্ত্রের
উচ্চারণ।
এর পর বৈদিক ঋষিরা অনুভব করলেন, অনন্ত এবং অসীমের ধারণা, যার প্রকাশ দ্যু ও পৃথ্বী
রূপে। এই অসীম হলেন অদিতি, যিনি সকল দেবতাদের মাতা, তাঁর পুত্রেরাই আদিত্য। অদিতি
শব্দের মূল অর্থ অবিচ্ছিন্ন, অবিভাজ্য এবং অসীম। এই অসীম দৃশ্যতঃ অসীম, যতদূর চোখ যায় অসীম আকাশ, হিমালয়ের অসীম বিস্তার, অসীম অরণ্য ও তৃণক্ষেত্র।
অসীমের এই সংজ্ঞা থেকে, মহাবিশ্বকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, ঊর্ধতম স্তরের নাম
দ্যুলোক,
নিম্নতম
স্তরের নাম ভূর্লোক এবং এই দুই লোকের মাঝখানে রয়েছে অন্তরীক্ষলোক। এই তিন লোকের
প্রধান দেবতারা হলেন, সবিতৃ
বা সূর্য দ্যুলোকের, ইন্দ্র
বা বায়ু অন্তরীক্ষলোকের এবং অগ্নি হলেন ভূর্লোকের দেবতা। এই তিনদেবতাকে আবার
তেত্রিশজন দেবতায় ভাগ করা হয়েছিল। অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, দ্যু এবং পৃথ্বী।
ক) দ্বাদশ আদিত্য – দ্যুলোকের
দেবতা
ঋগ্বেদে আদিত্য ছজন, মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ, অংশ।
অথর্ব বেদে ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এঁরা আটজন– মিত্র, বরুণ, অর্যমা, অংশ, ভগ, ধাতা, ইন্দ্র ও বিবস্বান।
শতপথ ব্রাহ্মণের মতে দ্বাদশ আদিত্য হলেন, ধাতৃ, মিত্র, অর্যমান, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বত, পূষণ, সবিতৃ, ত্বষ্টা এবং বিষ্ণু। শতপথ ব্রাহ্মণে এই বারো জন আদিত্য, বারোমাসের দেবতা।
হরিবংশ পুরাণে আদিত্যের বর্ণনা একটু আলাদা রকম, - ঋষি ত্বষ্টার কন্যা সংজ্ঞা, সূর্যের প্রচণ্ড তেজ সহ্য
করতে না পারায়,
কন্যার
প্রতি স্নেহবশতঃ, ত্বষ্টা
সূর্যকে বারোটি খণ্ডে বিভক্ত করেন, বারো মাসে বারোটি আদিত্য-সূর্যের উদয় হয়, যেমন মাঘে অরুণ, ফাল্গুনে সূর্য, চৈত্রে বেদজ্ঞ, বৈশাখে তপন, জৈষ্ঠে ইন্দ্র, আষাঢ়ে রবি, শ্রাবণে গভস্তি, ভাদ্রে যম, আশ্বিনে হিরণ্যরেতাঃ, কার্তিকে দিবাকর, অঘ্রাণে চিত্র (বা মিত্র)
ও পৌষে বিষ্ণু।
খ) অষ্টবসু – অন্তরীক্ষ দেবতা।
বৈদিক মতে আটজন বসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, আপ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।
মহাভারতের (আদি/৬৬ ) অষ্টবসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, অহঃ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।
অন্তরীক্ষ স্তরের প্রধান দেবতা হলেন ইন্দ্র বা বায়ু, তাঁর অন্যান্য রূপ হল
মরুৎ এবং মাতরিশ্ব। নিরুক্ত মতে, এই স্তরের দেবতারা হলেন, ইন্দ্র, বায়ু, অষ্টবসু, যম ও যমী, অশ্বিনীকুমার যুগল। এ ছাড়াও এই
স্তরের দেবতা হলেন বিশ্বদেব – যিনি বৃষ্টির দেবতা। দেবী ঊষস (ভোর) দ্যুলোক ও
অন্তরীক্ষের মধ্যে সংযোগরক্ষা করতেন। ঋভুরা আগে মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাদের সুকীর্তির
জন্যে তাঁরা দেবতা হয়ে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
গ) একাদশ রুদ্র – ভূর্লোকের দেবতা
বেদে একাদশ
রুদ্রের নাম খুব স্পষ্ট করে পাওয়া যায় না। মহাভারতের (আদি/৬৬) একাদশ রুদ্র হলেন, মৃগব্যাধ, সর্প, নির্ঋতি, অজৈকপাদ, অহি, বুধ্ন, পিনাকী, দহন, কপালী, স্থাণু ও ভর্গ। ভূর্লোক
বা পৃথ্বীলোকের প্রধান দেবতা ছিলেন, অগ্নি। বেদে ইন্দ্রের পরেই অগ্নির প্রধান স্থান। ঋগ্বেদের
শুরুই হয়েছে,
অগ্নির
উপাসনার শ্লোক দিয়ে, যার
উল্লেখ দ্বিতীয় পর্বে করেছি। অগ্নির আরেক নাম রুদ্র, এই রুদ্রেরই একাদশ রূপে প্রকাশ
ঘটেছে।
এতগুলি দেবতার নাম থাকলেও ঋগ্বেদের ছেচল্লিশতম মন্ত্রে, ঋষি দীর্ঘতমস বলেছেন, “একম্ সদ্বিপ্রা বহুধা
বদন্তি” – অর্থাৎ সত্য একটাই – কিন্তু ঋষিরা নানা নামে বলেন”। নিরুক্তকার যাস্কও
একই কথা বলেছেন,
ঈশ্বর এক -
তিনিই পৃথ্বীস্থানে অগ্নি, অন্তরীক্ষস্থানে ইন্দ্র এবং দ্যুস্থানে তিনিই সবিতৃ। এই
একমাত্র দেবতা বা ঈশ্বরকে বলা হয়েছে – হিরণ্যগর্ভ।
এ ছাড়াও আরও কিছু দেবতার নাম পাওয়া যায়, যেমন সোম, মধু, অশ্বিন প্রমুখ।
সোম দেবতাকে চন্দ্র এবং সোম[3]রস দু ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সোম যখন চন্দ্রদেব, তিনি
দুই হাতেই অস্ত্র চালনা করতে পারতেন এবং যুদ্ধের সময় তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের সারথি
হতেন। কিন্তু সোম দেবতা যখন সোমরস তখন ব্যাপারটা অত্যন্ত রসসিক্ত হয়ে উঠত।
খুব নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, এক ধরনের লতানে উদ্ভিদ থেকে সোমরস বানানো হত এবং বিশেষ ওই লতাকেই বলা হত সোমলতা। যজ্ঞের সময় এবং যজ্ঞ সমাপ্তিতে এই পবিত্র রস পান অবশ্য কর্তব্য ছিল। এবং এই রস পান করে যে আশ্চর্য অনুভূতি মিলত, তার আভাস ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১১৯ সূক্তে দেবরাজ ইন্দ্রর কথায় আমরা বুঝতে পারি। আমরা কলির মানুষরা পবিত্র সোমরসে বঞ্চিত, কিন্তু ভাঙ বা সিদ্ধির শরবতেও এমন অভিজ্ঞতার আমেজ অনুভব করা যায় বৈকি, যেমন,
“দমকা বায়ু যেমন গাছকে দোলায়, সোমরস পান করে আমিও তেমন দুলছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/২)
“দামাল ঘোড়া যেমন রথকে ওড়ায়, আমিও তেমন উড়ছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/৩)
“আমার এমনই ক্ষমতা, যদি বল, এই পৃথিবীকে এক স্থান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে পারি, আমি বড্ডো সোম পান
করেছি”। (১০/১১৯/৯)
“এই পৃথিবীকে আমি দগ্ধ করতে পারি, যে স্থান বল সে স্থান ধ্বংস করতে
পারি, আমি বড্ডো সোম পান
করেছি”। (১০/১১৯/১০)
“আমার একপাশ আছে আকাশে, আরেক পাশ পৃথিবীতে, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”।
(১০/১১৯/১১)
“আমি মহতেরও মহৎ, আমি আকাশ ঠেলে উঠেছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”।
(১০/১১৯/১২)[4]
অশ্বিন নামের যুগল দেবতার নাম পাওয়া যায়, যাঁর সম্বন্ধে খুব স্পষ্ট জানা যায় না। তবে যজ্ঞ অনুষ্ঠানে রীতি ও প্রথা প্রকরণ থেকে জানা যায়, অগ্নি সকল দেবতার মুখ, তিনিই যজ্ঞের হবি গ্রহণ করে, সকল “হবির্ভাজ” অর্থাৎ যজ্ঞভাগ দেবতাদের পৌঁছে দেন। সোম এই যজ্ঞ প্রথার দেবতা, মধু জ্ঞানের দেবতা, অশ্বিন মধুর সঙ্গে যুক্ত এবং ইন্দ্র যুক্ত সোমের সঙ্গে।
চলবে...
[1] আনৃশংস্য–অনৃশংসভাব, অহিংস্রতা; পরের দুঃখে দুঃখিত, অনুকম্পা। (শব্দকোষ)
[2] জন্ম
থেকেই প্রতিটি মানুষ পঞ্চঋণে ঋণী – পাঁচটি ঋণ হল দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ, নৃঋণ ও ভূতঋণ। এই পাঁচটি ঋণ থেকে
মুক্তির উপায় জীবনে পঞ্চযজ্ঞের আচরণ ও অনুষ্ঠান।
[3] সোমরস
– সোমলতার রস,
উৎকৃষ্ট
মাদক - উত্তর ভারতের হিমালয়ের বনভূমিতে এককালে পাওয়া যেত, এখন অবলুপ্ত।
[4] ঋগ্বেদের
বাংলা অনুবাদ – শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত (আধুনিক বাংলায় রূপান্তর - লেখক)।