ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "
ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "
ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "
ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "
ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "
ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "
ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "
এর আগের গল্প - " বাসা বদল "
স্থানঃ
লালটুকটুকে ফলে ভরা বিশাল এক বটগাছ।
সময়ঃ সকাল
পাত্র-পাত্রীঃ কাক, কাকের
বউ কাকী আর কোকিল
(বড়ো
সাইজের একটা কুটো ঠোঁটে নিয়ে কাকটা উড়ে এসে বসল বটগাছের মস্ত ডালে। ওখানে ওরা বাসা
বানাচ্ছে। বাসার মধ্যে কুটোটা রেখে, একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে কাক তার বউকে বলল,)
কাকঃ আজকের
মধ্যে বাসাটা বানিয়ে ফেলতেই হবে, গিন্নি। আর কী কী আনতে হবে, চটপট ফর্দ করে দাও
দেখি।
কাকীঃ আগে
একটু জিরিয়ে নাও। সেই কোন সকাল থেকে তোমার কুটো বওয়া শুরু হয়েছে,
যাও, কা কা খা খা - একটু খেয়েদেয়ে ঘুরেঘেরে এসো। অল ওয়ার্ক
অ্যাণ্ড নো প্লে, মেক্স কাক এ ডাল বয়, শোনোনি নাকি?
কাকঃ খা
খা খাবার কথা বলে খিদেটা বাড়িয়ে দিলে গিন্নি। দাঁড়াও, দাঁড়াও একটু বসে নিই, তারপর
খা খা খেতে যাবো। আচ্ছা, ওই যে বললে, ডাল বয়, ওটার মানে কী বলো তো?
ডাল মানে কী মুশুর ডাল, মুগ ডাল? নাকি গাছের ডাল। আমরা তো গাছের ডালেই থাকি। হে হে
হে, আমি তো ডাল বয়ই, আর তুমিও তো ডাল গার্ল।
কাকীঃ ডাল
গার্ল! হে হে, এমন কথা কোনদিন শুনিনি! তবে মানেটানে অতশত জানি না, বাপু। ঘরে বসে
মানুষের ছেলেমেয়েগুলো পড়ে, জানালার পাল্লায় বসে শুনেছি, তাই বললাম।
(পাতার আড়ালে একটা কোকিল বসেছিল, আর টুকটুকে লাল
চোখ ঘুরিয়ে দেখছিল চারদিক। মনের আনন্দে সে মাঝে মাঝে পাকাপাকা টুকটুকে লাল বটফল
খাচ্ছিল, আর ডাকছিল কুউ কুউ। কাক আর কাকীর কথাবার্তা শুনে সে বলে উঠল,)
কোকিলঃ কুউঃ।
ভোর থেকে কু আরম্ভ করেছিস বলতো, কাক? সকাল থেকে এত হুটোপাটি করছিস, এত হাঁফাচ্ছিস
কেন?
কাকঃ তোর
আর কী? বেড়ে আছিস, বাসা বানাতেও জানিস না, জানিস কেবল গান গাইতে! তুই আর বুঝবি কী?
কোকিলঃ অত
বুঝে আর কাজ নেই, ভাই। সারাদিন তোদের কেবল খা খা – খাওয়ার চিন্তা। আর এই ছুটছিস,
সেই উড়ছিস। তোদের এই সর্বদা খা খা অব্যেসের জন্যেই মানুষগুলো তোদের হুস হুস করে।
কাছাকাছি বসতেই দেয় না।
কাকঃ হুস
হুস করলেই শুনছি আমি আর, আমার কাছে বুঝি এমনি পাবে পার? সেদিন একটা পুঁচকে ছেলে করছিল
হুসহুস; তাকে আচ্ছা করে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমরাও মানুষ!!
কোকিলঃ সে
কি রে? তুই ঝগড়া করেছিস? তাও একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে? তোকে হুস হুস করবে না, তো
কাকে করবে, রে কাকে? বড়ো মুখ করে, তুই আবার নিজেকে বলছিস মানুষ? ছি ছি তুই খুব
কুউঃ। আর দেখ, আমার গান শোনার জন্যে ওরা সারা বছর হা পিত্যেশ করে বসে থাকে। আমার
ডাক শুনতে পেলেই বলে, “ওই ওই, শীতবুড়িটা বিদেয় হয়ে, আসবে এবার বসন্ত ”।
কাকঃ ছোঃ,
তোর ওই একঘেয়ে সুর কু-কু-কু ডাকে, মানুষগুলো বোকা বলেই বেজায় মজে থাকে!
কোকিলঃ কুউঃ
কুউঃ কুউঃ কুউঃ, আমার গানে তুই কু পাস? তোর মনটাই যে কু সেটা কি তুই জানিস? এই
জন্যেই অনেকে কাকাকে কাকু বলে! সে যাক, তা কী বললি সেই পুঁচকে ছেলেকে, শুনি!
কাকঃ সেদিন
বসেছিলাম ওদের পুবদিকের জানলায়, দেখছিলাম পাশের বাড়ি খাবার কী পাওয়া যায়। ঝপ করে ছোঁ দিতে
করছিলাম উশখুশ, সেই সময়ই ছেলেটা আমায় বললে “যাঃ যাঃ হুস হুস”?
কাকীঃ তাতে
কী হয়েছে? ছেলেমানুষ, অত কী আর বোঝে? তুমিই তো অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারতে! আমাদের
কি আর বসার জায়গার অভাব, নাকি কা কা খা খা খাবার অভাব?
কাকঃ তা
ঠিক, কিন্তু ভাবো তো একবার, চেষ্টায় রয়েছি তখন কিছুমিছু খাবার! হুসহুস বললে কী না
আমায়, আমাদের who’s who নিয়ে ওরা, কেউ কি মাথা ঘামায়?
কোকিলঃ কী
বললি, সেটা বল না!
কাকঃ সে সব
কথা যদিও তেমন কিছু নয়, সত্যি কথা বলতে আমি থোড়াই করি ভয়? বললাম, আমার দুইটি ডাকে
কাকা, আর তার বৌকে বলো কাকী, তোমাদের সঙ্গে আমাদের কীই বা রইল বাকি?
কোকিলঃ বাঃ
বেশ বলেছিস। কুউঃ! কুউকথায় তোর সঙ্গে কেউ পারবে? তারপর?
কাকঃ বললাম
কাকের ইংরিজি you know নিশ্চয়ই crow, দেবতার হাতে থাকলে সেই আমরা হই চক্র! তোমাদের যত বিক্রম তার
মাঝেও থাকি আমরা, আর বক্র, মানে ব্যাঁকা চিন্তায়, তক্র খাও তোমরা!
কোকিলঃ তুই
বলতে চাস, আক্রম, বিক্রম, পরাক্রম সবেতেই তোরা আছিস? এমন বক্র চিন্তা করিস বলেই,
আমরা বলি কুউঃ – কুচিন্তা!
কাকীঃ কা
কা খা খা খারাপ কী বলেছে কথাটা। কোকিলদাদার কথা ছাড় তো, তারপর তুমি আর কী বললে,
বলো?
কাকঃ বললাম,
নক্র মানে কুমীর আর তক্র মানে ঘোল। কাকের নামেই ক্রমাগত পালটে যাচ্ছে ভোল।তোমাদের
ঠাকুরদাদা ছিলেন ক্রোম্যাগনন, ক্রমান্বয়ে মানুষ হলে, হোমো স্যাপিয়েন।
কোকিলঃ বাবা,
এত কথাও জানিস তুই? আরও কিছু জানিস নাকি, বল না!
কাকঃ কায়দা
করা জুলফির নাম জেনো কাকপক্ষ, কাকনিদ্রা যে লোকের হয়, সেই জেনো দক্ষ।
কাকীঃ ঠিক
আমাদের মতো, গভীর ঘুমের মধ্যেও তারা সতর্ক থাকে। তারপর?
কাকঃ কাক
ডাকলেই তাল পড়ে, আর না কভু বলিও। সমাপতন ঘটলেই, হয় কি গো কাকতালীয়?
কাকীঃ ওরা
তাই বলে বুঝি? কাক ডাকলেই তাল পড়ে! ওমা, মানুষ কী বোকা! তারপর আর কিছু বলোনি?
কাকঃ বলিনি
আবার? আরো বললাম, সাধু ভাষায় কাককে বায়স বলে, জানো তো? সত্যজিতের
বিশ্বখ্যাতি বায়সকোপ বানিয়ে, মানো তো?
কোকিলঃ সত্যিই
তো! এমন তো ভাবিনি রে? এত বয়স হল, তবু বায়স্কোপ ব্যাপারটাতে তোরা আছিস, এটা
বুঝিইনি!
কাকঃ তার
পরে আরও বললাম, BIOS ছাড়া কম্পিউটার শুধুই বাক্স যে একখান, কাক ছাড়া তোমাদের থাকবে
কি সম্মান?
কোকিলঃ কুউঃ
কুউঃ, যাই বলিস আর তাই বলিস, তুই খুব কুউ। ওইটুকুউ একটা ছেলেকে এমন করে কেউ বলে? নিশ্চয়ই খুব দুঃখুউ
পেয়েছিল, বেচারা? নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলেছিল?
কাকঃ না
না কাঁদবে কেন? চেঁচিয়ে ডাকল তার মাকে, বলল ‘অ মা দেখে যাও কী বলছে কাকে!’
কাকীঃ সর্বনাশ,
তখন তুমি কী করলে?
কাকঃ কী
আর করবো, হুস করে উড়ে গিয়ে বসলাম পাশের জামরুল গাছের ঘন পাতার ফাঁকে।
কোকিলঃ কী
ভিতু রে তুই কাক! পুঁচকে একটা ছেলের ওপর খুব জারিজুরি করলি, আর তার মা আসছে শুনেই
পালিয়ে গেলি?
কাকঃ কোকিল
সেই থেকে তুই অনেক আকথা কুকথা বলছিস। তুই কোন সাহসী রে? মানুষের কাছে তোর যাওয়ার
সাহস আছে? বসে থাকিস তো শুধু বট আর আমগাছের ঘন পাতার আড়ালে। টপাটপ বটফল খাস, আর
কুকু ডাকিস। নিজের বাসাটুকু বানানোরও তোর মুরোদ নেই। বুঝলে গিন্নি, এবার কোকিলের
বউ আমাদের বাসায় ডিম পাড়তে এলে ঠুকরে তাড়িয়ে দেবে।
কোকিলঃ অ্যাই
দেখো, রাগ করছিস কেন, মিছিমিছি। তোকে দু একবার কু বলা ছাড়া কু এমন বলেছি, বল তো?
তাতেই এত ক্রোধী হচ্ছিস? ওই দ্যাখ, ক্রোধের সামনেও crow আছে! বাসা বানানোর অনেক ঝক্কি, সে ভাই আমরা পারি না।
কাক ছাড়া কাকে আমরা ভরসা করতে পারি বল তো? ঠিক কথা তোর বাসায় আমার বউ ডিম পাড়তে
যায়। এত
বাসা থাকতে, তোর বাসাতেই কেন যায়, সেটা জানিস কি?
কাকঃ দ্যাখ
কোকলে, শুধু ডিম পাড়তে যায়, তাই নয়, আমাদের একটা দুটো ডিম, সে পায়ে করে বাসার
বাইরে ফেলেও দেয়!
কোকিলঃ না,
না, ছি ছি এমন হতেই পারে না। হতে পারে আমার বউয়ের পায়ে বা ডানায় লেগে একটা আধটা
ডিম পড়ে গেছে। কিন্তু ইচ্ছে করে ডিম ফেলে দেয়, এমনটা হতেই পারে না।
কাকঃ তোর
ওই কুউ কথায় আর কুউ ডাকে আমরা আর ভুলছি না। আমাদের বাসার ত্রিসীমানায় যদি তোকে
কোনদিন আর দেখেছি, ঠুকরে তোর পালক খসিয়ে দেব! এবারে তোর বউ আসুক, ঠুকরে ঠুকরে 2ক্রো
2ক্রো করে রাখবো, বলে দিলাম।
কোকিলঃ কাক,
অ্যাই কাক, শোন না। এত রেগে যাচ্ছিস কেন? তোদের বাসায় আমরা কেন ডিম পাড়ি জানিস?
সেটা তো জানিস না। জানলে আর এমন কথা বলতিস না।
কাকঃ কেন?
(খুব রাগত স্বরে)
কোকিলঃ আমাদের
মধ্যে, একমাত্র তোরই বেশ একটা ইয়ে, মানে তেজ আছে। হাঁকডাক করা, ঠোক্কর মারা। অনেক
কাক মিলে একসংগে কা কা খা খা করা, এসব আমরা কেউ পারি, বল? তোদের কে না ডরায় বলতো?
বেড়াল, কুকুর থেকে শুরু করে মানুষও তোদের ঠোক্করকে ভয় পায়।
কাকঃ গিন্নি
শুনছো, কোকিল এই মাত্র আমাকে বলল ভিতু, এখন আবার বলছে আমাদের মানুষ ভয় পায়।
কাকীঃ কথাটা
ভুল কিছু বলে নি। আমরা একা একা মানুষকে ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু একজোট হলে মানুষও
আমাদের ভয় পায়!
কোকিলঃ অ্যাই,
এই কথাটাই বলছিলাম, কাককে একটু বুঝিয়ে বলো দেখি, বৌদিভাই। আর ঠিক এই জন্যেই আমরা
তোদের বাসায় ডিম পাড়ি।
কাকঃ তার
মানে? মামার বাড়ির আবদার, নাকি কাকার
বাড়ির?
কোকিলঃ ওফ,
তুই বুঝছিস না কাক, তোরা যে ডালে বাসা বানাস, সেই ডালে তোরা উটকো কাউকে বসতেই দিস
না। তোদের ভয়ে, বেড়াল বা ভাম কিংবা চিল কেউই কাছ ঘেঁষে না। তাই তোদের বাসা সব থেকে
নিরাপদ। তোদের
বাসায় তোদের বাচ্চাদের সঙ্গে আমাদের ছানারাও নিশ্চিন্তে বড়ো হয়।
কাকঃ তাহলে?
আমরা তোর এত্তো উপকার করি, তাও আমাদের নিন্দে করছিলি কেন? খালি বলছিলি কু?
কোকিলঃ (লাজুক
মুখে মাথা চুলকোতে চুলকোতে) ওটা শিখেছি মানুষের থেকে।
কাকঃ তার
মানে?
কোকিলঃ একজন
মানুষ যার থেকে উপকার নেয়, তারই সব থেকে নিন্দে করে। হে হে আমরাও তাই শিখেছি।
কাকঃ এ
কথাটা মন্দ, মানে কু বলিসনি। পথেঘাটে সারাদিন মানুষ যতো নোংরা ফেলে, তার কত কিছু
আমরা খেয়ে সাফ করে ফেলি। এতটুকু কৃতজ্ঞ তো হয়ই না, উলটে জানালা, কিংবা বারান্দার
রেলিং একবার পা দিলেই হুস হুস করে তাড়িয়ে দেয়। খুব রাগ হয় জানিস?
কোকিলঃ হবারই
তো কথা। একশবার রাগ করবি। কিন্তু আমার ওপর রাগ করে থাকিস না, ভাই। তোদের বাসায় যদি
ডিম পাড়তে না দিস, আমাদের কোকিল বংশই ধ্বংস হয়ে যাবে, সে কথাটা একবারও ভেবে দেখবি
না, ভাই?
কাকীঃ (চোখের
জল মুছে) হ্যাঁগো, শুনছো? তুমি আর রাগ করে থেকো না গো। আমাদের ছানাদের সঙ্গে
দুতিনটে কোকিলের ছানাও আমরা দিব্যি বড়ো করে তুলতে পারবো গো, ওতে আমদের কোন কষ্ট
হবে না।
কাকঃ হুম।
মনটা একটু বড়ো করার সঙ্গে সঙ্গে বাসাটাও একটু বড়ো করে নিলেই হয়।
কাকীঃ তা
তো হয়ই। সে আমরা করেও ফেলব, গো। তোমাকে আরো বেশ কিছু কুটোকাটা বয়ে আনতে হবে, এই
যা। শোনো, তুমি আর দেরি করো না। যাও যাও, কা কা খা খা খেয়ে এসো, আর ফেরার সময় আর
একটু বড়ো বড়ো কুটো খুঁজে পেতে এনো।
কোকিলঃ কুক
কুক কুউউউরে, কাকবৌদি তোমার কাকচরণে প্রণাম, কাক তোকেও অনেক অনেক থাংকুউউ ভাই। তোর
মতো সুজন আর কুউউথায় গেলে পাই? তোদের সাহায্যে আমরা কোকিল কূজনে ভরে তুলব
দশদিক...কুউউ কুউউ।
কাকঃ কা
কা খা খা খেয়ে আসি দাঁড়া, তারপর তোর গান শুনতে শুনতে বাসাটা আজই চটপট বানিয়েই
ফেলব।
-০০-