এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
শৌনক বললেন, “স্বয়ং জন্মরহিত
অর্থাৎ ভগবান মানুষের কাছে নিজের তত্ত্ব জানাবার জন্যই সাংখ্য প্রবর্তক কপিলরূপে
জন্ম নিয়েছিলেন। ভগবান পুরুষোত্তম এবং সকল যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যিনি এই কীর্তির
কথা শোনেন, ভগবান তাঁর মধ্যে প্রকাশ হন”।
সূত বললেন, “আত্মবিদ্যা বিষয়ে
মহামতি বিদুর, ভগবান মৈত্রয়কে জিজ্ঞাসা করলেন।
মায়ের কাছে মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা
শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “পিতা কর্দম
অরণ্যে চলে যাওয়ার পর, শ্রীভগবান মায়ের কাছেই বিন্দুসর আশ্রমে বাস করতে লাগলেন।
একদিন মাতা দেবহূতি দেখলেন, তত্ত্বমার্গের পথ প্রদর্শক তাঁর পুত্র সকল কর্ম ত্যাগ
করে বসে আছেন। তাঁর মনে পড়ল, ব্রহ্মা বলেছিলেন, তাঁর এই পুত্র ভগবান শ্রীহরির অংশ।
অতএব তিনি পুত্রের কাছে গিয়ে বললেন, “হে প্রভু, পরমেশ্বর, আমার মন ও ইন্দ্রিয়
সর্বদাই বিষয়ের দিকে দৌড়ে চলেছে। বিষয়বাসনা পূর্ণ করতে করতে আমি সংসারের ঘোর
অন্ধকারে ঢুকে পড়েছি। তুমিই জীবগণের নিয়ন্ত্রণকারক আদি ভগবান, তুমি অন্ধকারে ডুবে
থাকা জীবলোকের চোখে সূর্যের আলোর মতো উদয় হয়েছ। অতএব, হে ভগবান, আমার এই মোহ থেকে
তুমি আমাকে মুক্তির পথ দেখাও। তোমার মায়ার প্রভাবেই আমার মধ্যে “আমি” ও “আমার” এই
আসক্তি এবং সেই আসক্তি থেকেই আমার মধ্যে রাগ, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, শোক, তাপ ইত্যাদির
সৃষ্টি হয়েছে। এই সংসারী পুরুষ কে, আর যার জন্যে পুরুষের এই সংসারভোগ, সেই
প্রকৃতিই বা কে? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্যে আমি তোমারই শরণাপন্ন হলাম। প্রভু, আমি
জানি, তুমি শরণাগতের আশ্রয়, তোমাকে আমি প্রণাম করি”।
জননীর এই প্রশ্নে ভগবান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন, মৃদু হেসে
বললেন, “মাতঃ, আমার মতে আত্মনিষ্ঠ যোগই মানুষের মুক্তির পথ। এই যোগে চিরকালের মত
সুখ দুঃখের নিবৃত্তি হয়। জীবের চিত্তই হল তার বন্ধন বা মুক্তির কারণ। চিত্ত বিষয়ে
আসক্ত হলে বন্ধনের কারণ হয়, আর পরমেশ্বরে আসক্ত হলে মুক্তি লাভ করা যায়। এই দেহ “আমি”
আর এই স্ত্রীপরিবার, ঘর বিষয়আশয় “আমার”, এই অভিমান থেকেই কামনা, লোভ ও মনের
মলিনতার সৃষ্টি হয়। যখন এই মলিনতা মুছে
গিয়ে মন শুদ্ধ হয়, তখন সুখে-দুঃখে সমান ভাবনা আসে। তখন জীবের অন্তরে শুদ্ধ আত্মার উপলব্ধি আসে। তিনি উপলব্ধি করেন এই আত্মা
শুদ্ধ, ভেদজ্ঞানহীন, সূক্ষ্ম, নিখিল বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম ও নিজের রূপে উজ্জ্বল। যোগীগণের
ব্রহ্মলাভ বিষয়ে, অখিল আত্মা ভগবানে নিরত ভক্তির মতো সুচারু পথ, অন্য আর কোন পথ
নেই। জ্ঞানীগণ বলেন, অসৎসঙ্গই জীবের
বন্ধন, সাধুসঙ্গে মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। হে মাতঃ, সাধুব্যক্তির লক্ষণ
কি, মন দিয়ে শোন। সাধুদের ধৈর্য রাখতে হয়, সকল জীবের প্রতি তাঁর করুণা ও বন্ধুভাব
থাকতে হবে। তাঁর কোন শত্রু থাকবে না। তিনি
শান্ত, শাস্ত্র বিশ্বাসী এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী হবেন। তাঁরা আমাকেই একান্ত ভক্তি
করবেন এবং আমার জন্যেই সকল কর্ম ও স্বজন বন্ধুপরিজন ত্যাগ করবেন। আমার প্রতি তাঁদের মন সর্বদা
নিযুক্ত থাকার জন্যে, তাঁরা সংসারের জ্বালাযন্ত্রণায় বিব্রত হন না। হে মাতা, তোমার
এই রকম সাধুসঙ্গই একান্ত প্রয়োজন, এই সঙ্গ থেকে সমস্ত দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
এই সৎসঙ্গ যে ভক্তির অঙ্গ তাও বলছি, শোন।
সাধুদের মুখে আমার কথা শুনলে অন্তরে পরমসুখ অনুভব করা যায়। আমার কীর্তির কথা শুনতে শুনতে আমার প্রতি প্রথমে শ্রদ্ধা, তারপরে অনুরাগ ও শেষে ভক্তির উদয় হয়। তারপর আমার সৃষ্টিলীলার কথা চিন্তা করতে করতে ইহলোকের ও পরলোকের ইন্দ্রিয়সুখের বাসনা দূর হয়ে যায়। এইভাবে জীব প্রকৃতির তিনগুণ ও বিষয়ের বাসনা থেকে নিবৃত্ত হয়ে জ্ঞান, বৈরাগ্য, অষ্টাঙ্গ যোগ ও আমাতেই অর্পিত ভক্তি দিয়ে আমাকে আত্মস্বরূপে লাভ করে থাকে”।
[পণ্ডিতেরা বলেন সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক ঋষি কপিলের আবির্ভাবকাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। সে সময় তিনি নিজেকে ভগবান শ্রীহরি বলে জানতেন না, এবং তাঁর এই দর্শনে ঈশ্বর বা ভগবানের কোন উল্লেখ নেই। প্রায় হাজার বছর পর খ্রিস্টাব্দ চতুর্থ/ পঞ্চম শতাব্দীতে ভাগবত রচনার সময় (পুরাণকারের মহিমায়) তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে, তিনি শ্রীহরির অবতার - অতএব তাঁর দর্শনে ঘটে গেল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন - ঈশ্বরের অস্তিত্ব!]
[কৌতূহল মেটাতে এই ব্লগের এই সূত্র "ধর্মাধর্ম - ৫/১" থেকে পড়ে নিতে পারেন মূল সাংখ্য দর্শনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য।]
মাতা দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন,
“যে ভক্তি তোমাতে অর্পণ করতে হয়, সে কেমন ভক্তি? যে ভক্তির পথে আমার মতো নারী
তোমার নির্বাণপদ খুব সহজেই লাভ করতে পারে, সেই ভক্তির পথ আমাকে দেখাও। হে ভগবান,
আমি স্বল্পবুদ্ধি নারী, যে যোগের লক্ষ্য শুধুমাত্র তুমি এবং যে পথে পরমতত্ত্বজ্ঞান
লাভ হয়, সেই যোগ কেমন এবং কতভাগে বিভক্ত? তোমার অনুগ্রহে আমি এই দুর্বোধ বিষয় যাতে
সহজে উপলব্ধি করতে পারি, সেইভাবে তুমি আমাকে বলো।”
শ্রীভগবান জননীর জ্ঞানের প্রতি
এই আগ্রহ দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং যে জ্ঞানে সকলতত্ত্ব নির্দিষ্ট জানা যায়,
যে শাস্ত্রকে জ্ঞানীগণ সাংখ্যশাস্ত্র বলেন, সেই বিস্তৃত ভক্তি ও যোগের নির্ণায়ক
শাস্ত্র বর্ণনা করার জন্য বললেন, “যাঁরা বেদ অনুযায়ী অহংকারহীন নিষ্কাম কর্মের
অনুষ্ঠান করেন, তাঁদের আর কিছু করতে হয় না। তাঁদের জ্ঞান ও সমস্ত কর্মের ইন্দ্রিয়
স্বাভাবিকভাবেই শ্রীহরির সত্ত্বমূর্তির প্রতি অনুরক্ত হয়। এই নিষ্কাম, একনিষ্ঠ
চিত্তবৃত্তিই উত্তমা ভক্তি। এই ভাগবতী ভক্তি, মুক্তির থেকেও অনেক বড়ো। ভোজনের পর
পেটের মধ্যে অন্ন নিজে নিজেই হজম হয়ে যায়, তার জন্যে জীবকে যেমন কোন চেষ্টা করতে
হয় না। সেই রকম এই ভক্তি নিজে নিজেই লিঙ্গশরীরকে আত্মস্থ করে ফেলে, সুতরাং ভক্তকে
আর মুক্তির জন্য কোন প্রয়াস করতে হয় না। যাঁরা আমার উদ্দেশে কর্মের অনুষ্ঠান করেন,
নিরন্তর আমার চরণসেবা করেন এবং পরষ্পর মিলিত হয়ে আমার কীর্তিগাথা আলোচনা করেন,
তাঁরা আর মোক্ষের জন্য অভিলাষ করেন না। সেই ভক্তেরা আমার প্রসন্নবদন ও বরপ্রদ আমার দিব্যরূপ দর্শন করে থাকেন এবং ওই
মূর্তির সঙ্গে মনোহর আলোচনা করতে থাকেন। অতএব জ্ঞান ও যোগের থেকে ভক্তিপথের
শ্রেষ্ঠতা এই যে, এই পথে নিত্য পরমশ্বরের অনুভবসুখ লাভ করা যায়। আমাকে যাঁরা ভজনা
করেন, আমার কমনীয় অবয়ব, মধুর লীলা, হাস্য, কটাক্ষ ও মধুরবচন তাঁদের সকল ইন্দ্রিয় ও
চিত্তকে অভিভূত করে রাখে; তাঁরা ইচ্ছা না করলেও তাঁদের ভক্তিই তাঁদের মুক্তি দান
করে।
[কপিল মুনির অন্তরে যেন শ্রীহরি নিজেই ভর করেছেন, তিনি তাঁর মুখ দিয়েই নিজের লীলা-মহিমা কীর্তন করছেন! ভাগবত পুরাণকারের ইচ্ছাতে কপিল মুনি যেন শ্রীহরির তোতাপাখি হয়ে উঠেছেন।]
অবিদ্যার নিবৃত্তি হলে, ভক্তরা
যদিও সত্য ইত্যাদি লোকের ভোগ সম্পত্তি, অণিমা ইত্যাদি অষ্ট ঐশ্বর্য অথবা বৈকুণ্ঠের
সম্পদ কিছুই বাসনা করেন না, তবুও আমার বৈকুণ্ঠলোকে তাঁরা সব কিছুই পেয়ে যান। যে
সকল ভক্ত আমাকে আত্মার মতো প্রিয়, পুত্রের মতো স্নেহপাত্র, সখার মতো বিশ্বাসী,
গুরুর মতো উপদেষ্টা, সুহৃদের মতো হিতকারী এবং ইষ্টদেবতার মতো পূজ্য মনে করে আমার
ভজনা করেন, আমার কালচক্র কখনও তাঁদের গ্রাস করে না। এই কারণে শুদ্ধসত্ত্বরূপ
বৈকুণ্ঠে, তাঁরা কোন ভোগ্য বিষয় থেকেই বঞ্চিত হন না। আমিই প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতি ও
পুরুষের নিয়ন্তা, সর্বভূতের আত্মা ভগবান। আমাকে ছাড়া অন্য বিষয়ে ভক্তি স্থাপন করলে
জীবের মৃত্যুভয় দূর হয় না। আমার ভয়ে বাতাস বইছে, সূর্য উত্তাপ দিচ্ছে, ইন্দ্র
বর্ষণ দিচ্ছে, অগ্নি দগ্ধ করছে ও মৃত্যু বিচরণ করছে। এই কারণে যোগীরা জ্ঞান ও
বৈরাগ্যের সঙ্গে ভক্তিযোগে আমার পাদমূলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন এবং তাঁদের কোন ভয় ও
সংশয় থাকে না। তীব্র ভক্তিতে জীবের চিত্ত যদি আমাতে অর্পিত হয় এবং আমাতেই অচঞ্চল
থাকে, সেই জীবের পরমপুরুষার্থ লাভ হয়, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই”।
শ্রীভগবান বললেন, “এখন আমি তোমাকে সকল তত্ত্বের আলাদা আলাদা লক্ষণের কথা বলছি, যা বুঝতে পারলে পুরুষ প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে। পুরুষের আত্মদর্শনের জ্ঞান থেকে অহংকারের নিবৃত্তি ঘটে, পণ্ডিতেরা বলেন, এই জ্ঞান নিঃশ্রেয়স অর্থাৎ মুক্তির জন্য একান্ত জরুরি। “আত্মাই পুরুষ, ইনি বিষয়ের বিপরীতে অবস্থান করেন। আত্মা অনাদি, এঁনার শুরু ও শেষ বলে কিছু নেই, ইনি ক্ষণস্থায়ী নন, ইনি সনাতন। আত্মা প্রকৃতির ঊর্ধে থাকেন, অতএব অসঙ্গ, সুতরাং স্বভাবতঃ সংসারী নন। ইনি নির্গুণ, সত্ত্ব, রজো ও তমঃ এই তিন গুণের অতীত। ইনি নিজেই প্রকাশিত হন, অতএব ইনি জ্ঞানের বিষয় বা জ্ঞানের আধার নন। এই বিশ্বে আত্মা বিরাজিত বলেই এই বিশ্বের প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতি বিষ্ণুর অব্যক্ত গুণময়ী শক্তি। প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের সঙ্গতেই এই সৃষ্টিলীলা ঘটে থাকে। এই প্রকৃতি নিজের গুণের অনুরূপ পদার্থ সকল সৃষ্টি করতে আরম্ভ করলে, পুরুষ এই জ্ঞানের আবরণকারিনী প্রকৃতিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ নিজের স্বরূপ ভুলে যায়। এই মোহ আবরণে আচ্ছন্ন হয়ে পুরুষ প্রকৃতিকেই “আমি” বলে মনে করতে থাকে। সকল কর্ম প্রকৃতির তিনগুণের কারণে অনুষ্ঠিত হলেও, পুরুষ নিজেকে সেই সব কর্মের কর্তা বলে মনে করে। পুরুষ অকর্তা অর্থাৎ সাক্ষীস্বরূপ হয়েও যে কর্তার অভিমানে আচ্ছন্ন হয়, তাকেই বন্ধন বলে। এই কর্মবন্ধন থেকেই স্বাধীন ও নির্বিকার পুরুষ, সুখ-দুঃখ, শোক-তাপ ইত্যাদি ভোগের অধীন হয়ে জন্ম মৃত্যুর শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে।
এই শরীরকে কার্য, ইন্দ্রিয়কে
কারণ ও দেবতাদেরকে কর্তা বলা হয়ে থাকে।
অর্থাৎ স্বভাবতঃ নির্বিকার পুরুষ যে এই বিকার স্বভাব পায়, তার কারণ
প্রকৃতি। অন্যদিকে সুখদুঃখ ইত্যাদির যে ভোগ হয়, তার কারণ প্রকৃতির পরস্থিত পুরুষ।
অতএব সিদ্ধান্ত এই যে, দেহ ইত্যাদি প্রকৃতির পরিণাম, সেই দেহতে কর্তৃত্বের অনুভব
আনে অহংবুদ্ধি। তবে যে পুরুষকে ভোগের কারণ বলে নির্দেশ করা হল, তার কারণ, চৈতন্য
ছাড়া ভোগ হয় না”।
দেবহূতি বললেন, “হে পুরুষোত্তম,
সংসারী পুরুষ ও তার কারণ স্বরূপ প্রকৃতির বিষয়ে জানলাম। এখন আপনি সেই ঈশ্বর ও
প্রকৃতির বিষয়ে বলুন, যাঁর থেকে জগতের সকল সূক্ষ্ম ও স্থূল বিষয়ের সৃষ্টি হয়েছে”।
ভগবান বললেন, “প্রকৃতি স্বভাবতঃ
বিশেষত্বহীন হলেও বিশ্বের সকল বিষয়ের আশ্রয়। এই প্রকৃতির তিনগুণ, অতএব নির্গুণ
ব্রহ্ম নয়। প্রকৃতি কোন পরিণাম নয়,
প্রকৃতি অব্যক্ত। প্রকৃতির কার্যকরণেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, সুতরাং প্রকৃতি কাল
নয়। প্রকৃতিও নিত্য, অতএব সনাতন।
প্রধান থেকে অর্থাৎ পুরুষ ও
প্রকৃতির সংযোগে চব্বিশটি তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই তত্ত্বসমূহকেই কার্য্যাত্মক
ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড বলা হয়ে থাকে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু ও আকাশ এই পাঁচটি
মহাভূত। এদের সূক্ষ্ম অবস্থার নাম পঞ্চতন্মাত্র, যেমন গন্ধতন্মাত্র, রসতন্মাত্র,
রূপতন্মাত্র, স্পর্শতন্মাত্র ও শব্দতন্মাত্র। দশটি ইন্দ্রিয় হল, চোখ, কান, নাক,
জিভ, ত্বক, বাক-ইন্দ্রিয়, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ অর্থাৎ জনন-ইন্দ্রিয়। অন্তরের
চাররকম বৃত্তির জন্যে চার ভাগ লক্ষ্য করা যায়, যেমন, মনঃ, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্ত।
এই যে সগুণ ব্রহ্মের চব্বিশটি প্রপঞ্চ তত্ত্বের কথা বললাম, এছাড়াও আরেকটি তত্ত্ব
আছে, তাকে কাল বলা হয়। কেউ কেউ বলেন, ঈশ্বরের প্রভাবই কাল, এই কাল পঁচিশতম তত্ত্ব। যারা প্রকৃতির বশীভূত হয়ে, দেহের
অহংকারে “আমিই কর্তা” এমন অভিমান করে, তাদের কাছে কাল ভয়ংকর সংহারক মূর্তিতে দেখা
দেয়। আবার অনেকে বলেন, যিনি প্রকৃতির তিনগুণের বিভেদকে সাম্য অবস্থায় প্রতিষ্ঠা
করেন, তিনিই ভগবান কাল। এই ভগবান কে? যিনি নিজের মায়ায় সমস্ত জীবের অন্তরে নিয়ন্তারূপে
এবং বাইরে কালরূপে বিরাজ করেন, তিনিই ভগবান।
চলবে...