সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ২


৫.১.৩ বৈশেষিক সিদ্ধান্ত বা দর্শন

ঋষি কণাদ এই দর্শনের প্রবর্তক। ঋষি কণাদের আবির্ভাবকাল ২০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে। কপিল মুনি যেমন তাঁর সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি ও পুরুষকে নিত্য স্বীকার করেছেন, কণাদ নটি পদার্থকে নিত্য বলে সাব্যস্ত করেছেন, যেমন পৃথিবী বা মাটি, জল, বায়ু, তেজ, আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন। ঋষি কণাদ এগুলিকে নিত্য দ্রব্য-পদার্থ বলেছেন। এদের মধ্যে জল, বায়ু, মৃত্তিকা, তেজ - এই চার জড় পদার্থের শুধুমাত্র পরমাণুগুলিই নিত্য, কিন্তু পরমাণু-সমষ্টি নিত্য নাও হতে পারে। যেমন মাটি এবং মাটির পরমাণু নিত্যদ্রব্য হলেও, মাটি থেকে বানানো কলসি নিত্যদ্রব্য নয়।

কণাদ বলছেন, পরমাণুই সৎ-স্বরূপ নিত্য পদার্থ, তার আর কোন কারণ নেই। আমরা চোখের সামনে যা কিছু দেখতে পাই, সবই এই জড় পদার্থ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, গাছ-পালা, লতা, গুল্ম, ঘটিবাটি, হাতা-খুন্তি, এমনকি যাবতীয় জীবজগৎ। কিন্তু তাদের আকার বিভিন্ন বলেই আমাদের মনে হয় তারাও বিভিন্ন। কিন্তু অবিভাজ্য পরমাণু এতই ক্ষুদ্র, তাকে তো চোখে দেখা যায় না। তাহলে কী করে মাটি, জল, বায়ু ও তেজের পরমাণুকে আলাদা করে বোঝা যাবে? কী করেই বা বোঝা যাবে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য? ঋষি কণাদ এখানে বললেন, এই দ্রব্যপদার্থগুলির পরমাণুতে “বিশেষ” নামের আরেকটি পদার্থ আছে, যার থেকে পরমাণুগুলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি বললেন, অদৃষ্ট (অদৃশ্য) এই বিশেষ গুণময় পরমাণুদের সংযোগেই বিশ্বসংসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে। “বিশেষ” এই পদার্থের কারণেই এই দর্শনের নাম বৈশেষিক দর্শন।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ঋষি কণাদের পরমাণু তত্ত্ব কোনভাবেই আধুনিক পদার্থ বা রসায়ন বিজ্ঞানের অণু-পরমাণুর যে ধারণা, তার সমগোত্রীয় নয়। ঋষি কণাদের পরমাণু চারটি দ্রব্য-পদার্থের অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম কণা, তার বেশী কিছু নয়। উদাহরণে বলা যায় – জলকে তিনি নিত্য দ্রব্য বলেছেন, কিন্তু আমরা জানি জল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের একটি যৌগ, অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের পরমাণুর সঙ্গে, ঋষি কণাদের পরমাণুর কোন সম্পর্কই থাকতে পারে না।  ঋষি কণাদের পরমাণু ধারণার স্বপক্ষে ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের দ্বাদশ খণ্ডের দুটি শ্লোকের উল্লেখ করব। পিতা আরুণি ও পুত্র শ্বেতকেতুর কথোপকথন নিয়ে এই দুটি খণ্ড রচিত।

(পিতা) – “এই (সুবিশাল বট) বৃক্ষ থেকে একটি বট ফল আহরণ কর”।

(পুত্র) – “এই যে, ভগবন্‌”।  (পিতা) – “ভাঙো”।

(পুত্র) – “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?

(পুত্র) – “অণুর মতো বীজসমূহ”।  (পিতা) – “এদের একটিকে ভাঙো”।

(পুত্র) -  “ভগবন্‌, ভাঙা হয়েছে”। (পিতা) – “এতে কি দেখছ”?

(পুত্র) – “কিছুই না, ভগবন্‌”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/১)

(পিতা) তাঁকে বললেন, “হে সৌম্য, বীজের এই যে সূক্ষ্মাংশটি দেখতে পাচ্ছ না, সেই সূক্ষ্মাংশ থেকেই উৎপন্ন হয়ে এই মহাবট বৃক্ষটি তোমার সামনে বিদ্যমান রয়েছে। হে সৌম্য, শ্রদ্ধা অবলম্বন কর”। (ছান্দোগ্য/৬/১২/২) [অনুবাদ – লেখক]

ঋষি কণাদ এই তত্ত্বে সিদ্ধান্ত দিলেন, অপসর্পণ ও উপসর্পণ, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা – জীবের যাবতীয় কর্মের কারণ কোন না কোন দ্রব্যপদার্থের পরমাণু এবং তার বিশেষ দ্রব্য – যাকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। “অপসর্পণ” মানে মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে মন বা আত্মা-র বাইরে চলে যাওয়া এবং “উপসর্পণ” মানে অন্য দেহে মনের প্রবেশ। এভাবেই অগ্নির ঊর্ধমুখী শিখা, বায়ুর তির্যকগতি, মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, উদ্ভিদের দেহে রসের সঞ্চার, জীবের জীবন ও মৃত্যু – অর্থাৎ জগতের সবকিছুই, চোখে দেখা যায় না এমন কিছু পরমাণু এবং বিশেষ দ্রব্যের নির্দিষ্ট সংযোগ।

আশ্চর্যের বিষয় হল, মহর্ষি কণাদও কিন্তু তাঁর এই বৈশেষিক তত্ত্বে সরাসরি কোন ঈশ্বরের প্রস্তাব দিলেন না। এই তত্ত্বের কোথাও তিনি ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করলেন না। অতএব তাঁর তত্ত্বকেও “নাস্তিক” তত্ত্ব বলাই যায়। কিন্তু তাঁর তত্ত্বের পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা এই অদৃষ্ট-বিশেষ দ্রব্যের ব্যাখ্যাতে জীবাত্মা এবং পরমাত্মা এনে ফেলে, এই তত্ত্বকে আস্তিক তত্ত্ব বানিয়ে তুলেছিলেন।

ভারতীয় দর্শন মানেই ধর্মতত্ত্ব এবং জীব, বিশেষ করে মানবের মঙ্গল সাধন। অতএব ঋষি কণাদ ধর্মের বিষয়ে বললেন, দু প্রকারের ধর্ম হয়, অভ্যুদয় এবং নিঃশ্রেয়স। অভ্যুদয় মানে সমৃদ্ধির ইষ্টসাধন এবং নিঃশ্রেয়স মানে স্বর্গলাভ এবং সংসারের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি – এক কথায় মুক্তি। মুক্তি হলে শরীরের সঙ্গে মন বা আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ঋষি কণাদ মুক্তির উপায় সম্পর্কে বললেন, আত্ম-কর্ম সম্পন্ন হলেই মুক্তি লাভ হয়। এই আত্ম-কর্ম কী?

বৈশেষিক তত্ত্বে সাতটি পদার্থের উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব। প্রথম পদার্থ দ্রব্যের কথা আগেই বলেছি। এখন অন্য পদার্থগুলি কী, সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

গুণ পদার্থ চব্বিশটি – রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমাণ, পৃথকত্ব, সংযোগ, বিয়োগ, পরত্ব, অপরত্ব, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ ও প্রযত্ন। ঋষি কণাদ এই সতেরটি পদার্থর উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তী টীকাকারগণ তার সঙ্গে আরও সাতটি যোগ করেছেন, শব্দ, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, পাপ ও পুণ্য।

কর্ম পদার্থ পাঁচটি – উৎক্ষেপণ, অবক্ষেপণ, আকুঞ্চন, প্রসারণ ও গমন।

সামান্যপদার্থ –বস্তু বা জীবের জাতিগত ধর্ম অর্থাৎ তাদের সাধারণ ধর্মকে সামান্য ধর্ম বলে । যেমন ধাতুর ধর্ম তার ধাতব বৈশিষ্ট্য, গরুর বা বাঘের ধর্ম তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

বিশেষ পদার্থ – বিশেষ পদার্থের কথাও আগেই বলেছি।

সমবায় পদার্থ – সম্বন্ধ-বিশেষের নাম সমবায়। যেমন ঘটের সঙ্গে মাটির সম্বন্ধ, বস্ত্রের সঙ্গে সুতোর সম্বন্ধ কিংবা কর্তার সঙ্গে কর্মের সম্বন্ধ।

অভাব পদার্থ – অভাবের অর্থ কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকা।  এই অভাবও চার প্রকারের। যেমন প্রথমতঃ প্রাগভাব (প্রাক্‌+অভাব) –কোন বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে যে অবস্থা থাকে, যেমন মাটি আছে কিন্তু ঘট বানানো হয়নি। অতএব ঘট এখানে প্রাগভাব পদার্থ। দ্বিতীয়তঃ ধ্বংসাভাব – কোন বস্তু নষ্ট হলে বা মৃত্যু হলে যে অভাব হয়, যেমন ঘট বানানোর পর ভেঙে গেল, ঘট এখানে ধ্বংসাভাব পদার্থ। তৃতীয়তঃ ভেদাভাব – দুই বস্তুর মধ্যে প্রভেদ বোঝা যায় – যেমন মাটি দিয়ে তৈরি ঘট এবং মাটির বাড়ির মধ্যে ভেদ-অভাব পদার্থ লক্ষ্য করা যায়, যদিও দুটিই মাটি থেকেই নির্মিত। চতুর্থতঃ অত্যন্তাভাব পদার্থ –ঘট ও বস্ত্রের মধ্যে যে অভাব সেই অভাবকে অত্যন্তাভাব পদার্থ বলা হয়েছে। দুটি বস্তুর উপাদান সম্পূর্ণ আলাদা। এই অভাব পদার্থের বিষয়টি ঋষি কণাদের তত্ত্বে ছিল না, এটিও পরবর্তী ব্যাখ্যাকাররা আরোপ করেছিলেন।

এখন ঋষি কণাদ বলছেন, এই যে ছ’ প্রকার পদার্থের - দ্রব্য থেকে সমবায় – তত্ত্বজ্ঞানই হল আত্মকর্ম। এই তত্ত্বজ্ঞানের জন্যে শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনের অনুশীলন করতে হয়। এই তত্ত্বজ্ঞান হলেই দেহ যে আত্মা নয় সেই উপলব্ধি আসে। তখন মন থেকে রাগ–দ্বেষ বিলুপ্ত হয়। রাগ-দ্বেষ দূর হয়ে গেলে ধর্মাধর্মে প্রবৃত্তি থাকে না। ধর্মাধর্মের প্রবৃত্তি না থাকলে পুনর্জন্ম হয় না। আর পুনর্জন্ম না হলেই দুঃখ থাকে না। অতএব সকল দুঃখের অবসানই মোক্ষ।

ঋষি কণাদ যে সময়ে পরমাণু এবং তার সঙ্গে বিশেষ পদার্থের তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন, সেটিকে পরবর্তী কালের ব্যাখ্যাকাররা যদি ঈশ্বরের ছাঁচে না ফেলে, ঋষি কণাদের পথেই আরও গভীরে হাঁটতেন, হয়তো তাঁরাই বিশ্বের পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নে পথিকৃৎ হতে পারতেন। কিন্তু তা হবার নয়, কারণ সর্ব বিষয়েই ঈশ্বরের উপপত্তি ভারতীয় মস্তিষ্কের “বিশেষ পদার্থ” যে!

চলবে...


রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

সম্মোহন

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "



এর আগের গল্প - " মানিকজোড় 


 

 

বাজারের গেটের ধারে মানিকদার চায়ের দোকান। প্রতি রবিবার বাজার সেরে ওখানে এক কাপ চা খাওয়া আমার বহুদিনের অভ্যাস। পাড়ার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, নানান কথাবার্তা আর খবরের আদান-প্রদান হয়। মানিকদাই হচ্ছে এই তল্লাটের সব খবরের খনি – আর রবিবারটাই হল সে সব খবর তুলে আনার দিন। আজও “মানিকদা, কড়া করে একটা চা দিও”, বলে আমি দোকানের বাইরের বেঞ্চে বসলাম, পায়ের কাছে বাজারের থলিটা রেখে। আর তখনই লক্ষ্য করলাম, দোকানের ভেতরের বেঞ্চে একজন সাধুমহারাজ বসে রয়েছেন আর চায়ের গ্লাসে পাঁউরুটি ডুবিয়ে খাচ্ছেন। তার সামনে ডান হাত মেলে বসে আছেন অমলদা। বেশ কৌতূহল হচ্ছিল, এপাড়ায় এমন সাধুমহারাজ কেউ আছেন, কোনদিন শুনিনি তো।

মানিকদা আমার হাতে চায়ের গেলাস দিতে কাছে এলে নীচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার, মানিকদা? তোমার দোকানে সাধুবাবার আবির্ভাব?” মানিকদাও ফিসফিস করে উত্তর দিল, “হিমালয়ের থেকে সোজা এসে এখানেই পা রেখেছেন। খিদে পেয়েছে বললেন, তাই ওই চা আর পাঁউরুটি দিলাম। এরমধ্যেই অনেকে হাত-টাত দেখিয়ে ওঁকে দিয়ে তাদের ভাগ্যবিচার করে নিয়েছে। মাইতিবাবু, চাটুজ্জেমশায়, সেনবাবু, এখন ওই অমলবাবু। যা যা বলছেন – সব নাকি মোক্ষম মিলে যাচ্ছে। তোমার হাতটাও একবার দেখিয়ে নাও না, মুকুল। বিয়ে থা করলে না, একা একা থাক, শরীরগতিক কেমন যাবে...”। মানিকদা দোকানের ভেতরে চলে যেতে, আমি গেলাসে চুমুক দিয়ে সাধুবাবাকে দেখতে লাগলাম।

বেশ হাট্টাকাট্টা জব্বর চেহারাখানি বাবাজির। তার ওপর মাথাভর্তি ঝাঁকড়াচুল নেমে এসেছে ঘাড় অব্দি। কপালে লম্বা সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, দুহাতে রুদ্রাক্ষের বালা। পরনে রক্তাম্বর – খালি গায়ে লাল রঙের একটা চাদর, কাঁধের পৈতেটা বেশ মোটা এবং ধবধবে সাদা। সাধুবাবাজিদের ওপর আমার একেবারেই বিশ্বাস নেই। কিন্তু সব মিলিয়ে এই বাবাজির চেহারায় বেশ একটা ব্যক্তিত্ব আছে সেটা মানতে হবে। বাবাজি চা খেতে খেতে অমলদার সঙ্গে নীচু স্বরে কথা বলছিলেন, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। এটাও আমার একটু অবাক লাগল। সাধারণতঃ এ ধরনের সাধুবাবাজিরা – সকলকেই তুই-তোকারি করে, আশেপাশের সব লোককে শুনিয়ে ডেকে-হেঁকে কথা বলেন। যাতে সবাই তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু ইনি দেখলাম সেরকম না, নীচু স্বরে - প্রায় ফিসফিস করে অমলদার সঙ্গে কথা বলছেন।

চা শেষ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম বেঞ্চে। আজকে যারাই দোকানে আসছে, দেখছি বাবাজিকে নমস্কার করে ভেতরে গিয়ে তাঁর কাছকাছি বসছে। বুঝলাম আজ আর অন্যদিনের মতো আড্ডা জমার আশা নেই। কাজেই উঠে পড়লাম। টেবিলে খালি গেলাসটা রেখে মানিকদাকে চায়ের দাম দিতে দিতে নীচু স্বরে বললাম, “আসি গো মানিকদা, আজ আর আড্ডা জমবে না। সবাই দেখছি নিজেদের ভাগ্য গুছোতেই ব্যস্ত। আমার তো ভাগ্যই নেই, তো গুছোবো কী?”

কথাটা বলে সবে পেছন ফিরেছি, গম্ভীর গলার একটা মন্তব্য কানে এল, “ওহে বাচাল, ভাগ্য নিয়েই মানুষের জন্ম হয়, গোছাতে হয় না। মানুষের আলসেমি আর বোকামিতে সেই ভাগ্যের ওপর যখন পলি জমে ওঠে – আমরা সেই পলি সরিয়ে তার ভাগ্যটাকে একটু মেজেঘষে দিই”।  

কথাটা শুনে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম, কাপালিক ভদ্রলোক আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন, অর্থাৎ আমাকেই তিনি “বাচাল” বলে ডাকলেন! বাচাল মানে, যে না জেনে, না বুঝে অনেক কথা বলে। আমিও কাপালিক ভদ্রলোকের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কতক্ষণ মনে নেই, হয়তো আধ মিনিট, তারপর চিন্তা করলাম, এইসব বুজরুক কাপালিকদের কথার উত্তর দেওয়ার মানে হয় না। এদের চালাকির মুখোশ খুলে দিয়েছেন, অনেক অনেক বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষরা – কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে এতটুকুও চিড় ধরেনি। কাজেই আমি মৃদু হেসে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।

 

 

বাড়ি এসে কলমিকে বললাম, “এই নে বাজারের থলিটা ধর। আর ঝট করে এককাপ চা করে খাওয়া তো”।

কলমি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “খালি পেটে অত চা খেতে হবে না, মামা। সকালে হয়েছে একবার, আরেকবার খেয়ে এলে মানিককাকুর দোকান থেকে। আমার জলখাবার রেডি, জামাটা খুলে টেবিলে বস, আমি পাঁচমিনিটের মধ্যে পরোটা-আলুভাজা নিয়ে আসছি”। 

কলমি আমার ভাগ্নী হলে কী হবে, আমি ওকে রীতিমতো ভয় পাই। কলমির “হ্যাঁ” মানে হ্যাঁ আর “না” তো না – কথার নড়চড় করে না। কড়া শাসন – অবিশ্যি সে আমার ভালোর জন্যেই। কলমি খুব ভালো মেয়ে, আর আমাকে ভালোওবাসে খুব। তাই বেশি বকাঝকা করতে পারি না। আসলে ওর মা অন্নদাদিদি আমাদের বাড়িতে কাজ করেন আমার ছোট্টবেলা থেকে। আমার মাও খুব ভালোবাসতেন অন্নদাদিদিকে। আমার ছ’বছর বয়েসে বাবা মারা যান, আর মাও চলে গেলেন আমি যখন বিএসসি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমার অসুস্থ মা মারা যাবার বেশ কদিন আগে থেকে, অন্নদাদিদির হাত ধরে অনেকবারই বলেছিলেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না রে, অন্ন, আমি চলে গেলে মুকুলকে একটু দেখিস’। এই সব নানা কারণে অন্নদাদিদি ও তার মেয়ে কলমি এবাড়ির আলাদা কেউ নয়। অন্নদাদিদির স্নেহ-আদরে সে সময়ে মায়ের চলে যাওয়ার কষ্টটা সামলে উঠতে, বেশ সুবিধেই হয়েছিল! 

সকালে কলমি আসে, ঘরদোর ঝাড়া-পোঁছা করে, আমার জলখাবার বানিয়ে দিয়ে যায়। একটু বেলায় আসে অন্নদাদিদি। দুপুরের রান্নাবান্না সেরে, আমার খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফেরে। কলমির মেয়ে ফুটকি রবিবারদিন মায়ের সঙ্গে এ বাড়িতে আসে। ফুটকি আমার কাছে সকালে লেখাপড়া করে আর আমার সঙ্গে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে, দিদিমার সঙ্গে বাড়ি ফেরে। ফুটকি ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

 কলমি রান্না ঘরে ঢুকে যেতে ফুটকি আমার পাশে এসে বসল, বলল, “দাদু, টোম্যাটো এনেছ? বলেছিলে আজ চাটনি হবে”?

“আমি জামা খুলতে খুলতে বললাম, “একশ বার এনেছি, শীতকালে টম্যাটোর চাটনি - খেজুর, কিসমিস দিয়ে যেমন জমে, তেমন আর কোন সময় হয় না”। ছটফটে ফুটকি সোফা থেকে নেমে দৌড়ে গেল, রান্নাঘরের  দরজার পাশে বসিয়ে রাখা বাজারের থলিটা কাত করে মেঝেয় ঢেলে দিল। মেঝেময় যা ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে আমি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম, “ফুটকি শিগ্‌গির পালিয়ে আয় এদিকে, কলমি তুই রান্নাঘর থেকে একদম বেরোস না... ওখনাএই দাঁড়া, আমি দেখছি কী করা যায় ...!!”

আমার চিৎকারে ফুটকি আমার পাশে এসে আমার হাঁটু ধরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে আমার মুখের দিকে তাকাল। ওদিকে রান্নাঘরের দরজায় কলমি মেঝেয় ছড়ানো আনাজগুলোর দিকে তাকিয়ে, অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে, মামা?”

রাগে আমার মাথা গরম হয়ে গেল, বললাম, “দেখতে পাচ্ছিস না, নাকি? কিন্তু বাজারের থলির মধ্যে এসব  কোত্থেকে এল? আশ্চর্য তো! ওই সবুজ রঙের সরুসরু সাপগুলো? কিলবিল করছে - ওগুলোর নাম জানিস, চিনিস? আর ওই গোব্দা সবুজ ব্যাংদুটো? আর ওদিকে দেখ, পাঁচটা জোঁক লিটপিট করছে কেমন। জোঁক কী এত মোটা হয়? ব্যাটারা একবার ধরলে শরীরে সব রক্ত এক চুমুকে শেষ করে দেবে, খুব সাবধান। আর ওই প্যাকেটে এত আরশোলাই বা এল কী করে? প্যাকেটটা ভাগ্যে বন্ধ, না হলে এতক্ষণ ফরফরিয়ে ঘরময় উড়ে বেড়াত! অনেক শাঁখ দেখেছি – তবে এমন জ্যান্ত শাঁখকে ঘরের মেঝেয় হেঁটে চলে বেড়াতে কোনদিন দেখিনি! আর ওই টুকটুকে লাল শামুকগুলোও মনে হচ্ছে জ্যান্ত! শামুক এমন লাল টুকটুকে হয় কোনদিন জানতামই না।”

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কলমি আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই আছে, একটা কথাও বলছে না। বুঝতে পারছি, ব্যাপার দেখে কলমিটাও হতভম্ব হয়ে গেছে! খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু ফুটকি আমার হাঁটু ছেড়ে মেঝেয় পড়ে থাকা আনাজগুলোর সামনে উবু হয়ে বসে হাত বাড়াল, খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, “ও দাদু, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি”? তারপর তার ছোট্ট হাতের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে আমায় বোঝাতে লাগল, “সাপ কোথায় দেখছ, ওগুলো তো বিন্‌স্‌, গাজর, ক্যাপসিকাম, খেজুর, শাঁকালু আর টোমাটো...হি হি হি হি...”।

আমি ছুট্টে গেলাম আর এক ঝটকায় ফুটকিকে কোলে তুলে নিলাম। ফুটকির কথায় পাত্তা না দিয়ে, কলমিকে বললাম, “এগুলোকে নিয়ে এখন কী করা যায় বলতো? আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না”।

 এবার খুব ঠাণ্ডা গলায় কলমি বলল, “তুমি ফুটকিকে নিয়ে তোমার ঘরে যাও তো। ওসব আমি এখনই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করছি, চিন্তা করো না। আমি তোমার ঘরে জলখাবার দিয়ে আসছি”।

এমনিতেই ভয়ে আমার বুক ধুকপুক করছিল, তারওপর কলমির কঠিন আদেশ শুনে আমি আর তর্ক করতে ভরসা পেলাম না। ফুটকিকে কোলে নিয়ে ঘরেই গেলাম।

ফুটকিকে কোল থেকে নামিয়ে আমি বিছানায় বসলাম। ফুটকিও আমার পাশে বসল, আমার বুকে হাত রেখে বলল, “তোমার শরীর খারাপ লাগছে, দাদু?”

কলমি এই সময়েই দু হাতে দুটো প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল, তিনটে পরোটাওয়ালা প্লেটটা আমার হাতে দিল আর অন্য প্লেটটা দিল ফুটকিকে – তাতে একটা পরোটা আর আলুভাজা। তারপর একই রকম কঠিন স্বরে বলল, “এই ঘরে বসেই খেয়ে নাও, মামা। ফুটকি, দাদুর কাছেই থাকবি, এই ঘর ছেড়ে বের হলে, তোর পিঠ কিন্তু আস্তো রাখবো না। মনে থাকে যেন”।

ঘরের মেঝেয় বসে আমি আর ফুটকি চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। কলমির ভয়ে আমরা দুজনেই একটাও কথা বলছিলাম না। খাওয়া শেষ হতেই কলমি আমার চায়ের কাপ দিয়ে গেল, আর এঁটো প্লেট দুটো তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “মামা তুমি চা খেয়ে বিছানায় একটু গড়িয়ে নাও। ফুটকি দাদুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি, কেমন? দাদু একটু আরাম পাবে”। ফুটকি এত্তোবড়ো ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল। তারপর কলমি আমার ঘরের দরজাটা চেপে ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেল। 

 

অন্যদিন কলমি আমায় জলখাবার খাইয়ে ওর বাড়ি চলে যায়। আজ যায়নি। আমাকে আর ফুটকিকে ঘরবন্দী করে রেখে, কলমি ফোন করেছিল সন্ময়কে। সন্ময় আমার সবচে' প্রিয়বন্ধু – ও প্রায়ই আমার বাড়ি আসে আমিও ওর বাড়ি যাই। মাসিমা, মানে সন্ময়ের মা আমাকে সন্ময়ের মতোই খুবই স্নেহ করেন। আমার সেই বাল্যবন্ধু সন্ময় আমাদের এক ডাক্তার বন্ধু সমরকে নিয়ে কখন এসেছে আমি জানতেও পারিনি। আমি তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম। বাইরের ঘরে দুজনকে বসিয়ে, চা দিয়ে, কলমি বাজার থেকে ফেরার পর আমার অদ্ভূত আচরণের কথা সবিস্তারে বলেছে।

সব কথা শুনে সমর জিজ্ঞাসা করল, “তোমার মামা এখন কী করছে?”

কলমি হাসল, বলল, “ঘুমোচ্ছে। আমি চুপিচুপি দরজা খুলে দুবার দেখে এসেছি। আমার মেয়েও আছে, সেও তার দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমে এক্কেবারে কাদা”।

“এই অবেলায় ঘুমোচ্ছে? কতক্ষণ হল?”

“সন্ময়মামাকে ফোন করেছি সোয়া দশটা নাগাদ, ধরুন সেই সময় থেকেই”।

সন্ময় বলল, “হুঁ - তার মানে প্রায় ঘন্টা দেড়েক। দেখবি নাকি একবার?”

“দেখব তো বটেই – চ ওর ঘরে যাই”।

সন্ময় এগিয়ে গেল, ভেজানো দরজা আস্তে আস্তে খুলে ভেতরে ঢুকল। সমর এসে আমার হাতটা তুলে নিতে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে দুই বন্ধু সমর আর সন্ময়কে দেখলাম, তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে কলমি। আর আমার পাশেই গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে ফুটকি। অবাক হয়ে আমি আস্তে আস্তে উঠে বসলাম, যাতে ফুটকির ঘুম না ভাঙে।

আমি নীচু স্বরে বললাম, “আমার কী হয়েছে কি? এরকম অসময়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম কেন? তোরা কখন এলি, আর আমার দিকে অমন তাকিয়েই বা রয়েছিস কেন?”

সন্ময় বলল, “তোর কিচ্ছু হয়নি, আমি আর সমর এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোর সঙ্গে দেখা করতে এলাম। কলমি বলল, তুই ঘুমোচ্ছিস। এই অসময়ে তুই ফুটকিকে না পড়িয়ে, ঘুমোচ্ছিস কেন? সেটাই দেখতে এলাম”। আমাদের কথাবার্তার মধ্যে সমর তার স্টেথোস্কোপ কানে নিয়ে বুক দেখল, তারপর প্রেসার মাপার যন্ত্র বের করে ফসফসিয়ে প্রেসার মাপতে বসল। সব কিছু হয়ে যেতে আমার চোখের কোল টেনে দেখল, জিভ বের করতে বলল, সব দেখে ঘাড় নেড়ে বলল, “কোন গড়বড় তো নেই! রাত্রে ঘুম-টুম ঠিক হয়েছিল? বাজার থেকে ফিরে কী হয়েছিল? মাথা-টাথা ঘুরে গিয়েছিল নাকি?”

ঘুম থেকে উঠে আমার মাথাটা কেমন যেন ভোম মেরে ছিল। বাজার থেকে ফিরে কী করেছি, কী বলেছি সব ভুলেই গেছিলাম। সমরের কথায় হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বললাম, “আর বলিস না, বাজার থেকে ফিরতে ফুটকি বাজারের থলিটা মেঝেয় ঢেলে দিতেই দেখলাম সবুজ রঙের গুচ্ছের সাপ কিলবিল করছে, আরও কী কী সব যেন দেখলাম। অদ্ভূত অদ্ভূত সব প্রাণী বাজারের থলি থেকে ছাড়া পেয়ে মেঝেয় নড়ে চড়ে বেড়াচ্ছে...”!

সমর বলল, “অদ্ভূত, বাজারে উল্টোপাল্টা কিছু খেয়েছিলি?”

আমি একটু রেগেই গেলাম, “মানিকদার দোকানে একটা চা খেয়েছি, উল্টোপাল্টা আবার কী খাব?”

সন্ময় বলল, “আহা, রেগে যাচ্ছিস কেন? কিছু একটা তো হয়েছিল – তা নাহলে... কলমি, মামার বাজারের আনাজগুলো রয়েছে, না কি সব রান্না করে ফেলেছিস?”

কলমি বলল, “সব আছে, ঝুড়িতে তুলে রেখেছি। নিয়ে আসব?” কলমি দৌড়ে গেল এবং ঝুড়িটা এনে সামনে রাখল।

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “এই - এই যে বিন্‌স্‌গুলোকে মনে হয়েছিল জ্যান্ত সাপ, খেজুরগুলোকে জ্যান্ত আরশোলা...কেন এমন হল বল তো?” প্রশ্নটা করলাম সমরকে।

সমর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, বলল, “বিশেষ কারুর সঙ্গে বাজারে তোর দেখা হয়েছিল?”

এই কথায় আমার মনে পড়ল সেই কাপালিকের কথা। আমি সেই কাপালিক সম্পর্কে যা যা জেনেছিলাম, এবং যা যা ঘটেছিল সব বললাম। আমার কথা শেষ হতে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। প্রথম কথা বলল কলমি, “মামা, তোমার ওই সব লোকদের সঙ্গে লাগতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? ওরা অনেক কিছু পারে। তোমরা বিশ্বাস করো না, কিন্তু আমরা জানি”।

সন্ময় একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ক বছর পরে মানুষ হয়তো চাঁদে, মঙ্গলে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করবে! সেখানে কে এক কাপালিক তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে ফিজিক্সের প্রফেসার মুকুল সেনকে এভাবে জব্দ করে দিল?”

সমর মুচকি হাসল, বলল “ধূর, এটাকে অলৌকিক ভাবছিস কেন? এটা তো পিয়র কেস অব হিপ্নোটিজ্‌ম্‌, যাকে বাংলায় বলে সম্মোহন। বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক আর কিছু না জানুন, সম্মোহনটা জানেন। সম্মোহন না জানলে, ওঁদের চলবে কী করে? আমাদের মুকুল কিছুটা সম্মোহিত হয়েছে ঠিকই – কিন্তু এ কথাও বলব সেই কাপালিক ভদ্রলোক মুকুলকে কাবু করতে পারেননি। পারলে পাজামার পিছনে ডান হাতটা ঘষে সাফ করে, মুকুলও হাত মেলে ধরত ওই ভদ্রলোকের সামনে”।

সন্ময় বলল, “বুঝলাম। কিন্তু মুকুলের মধ্যে এখনও সেই সম্মোহনের রেশ রয়ে যায়নি তো?”

সমর বলল, “আরে না, না, কিচ্ছু না। মুকুল যে ভাবে ঘুমিয়েছে, সে সম্মোহনের রেশ কেটে গেছে। আর কোন চিন্তা নেই”।

আমি ভয়ে ভয়ে কলমিকে বললাম, “আমাদের সকলকে চা খাওয়াবি নাকি, কলমি?”

আমার কথার ভঙ্গিতে কলমি হেসে ফেলল, বলল, “ওরকম ভয়ে ভয়ে বলছ কেন, মামা? সবার জন্যেই চা আনছি – আর তার সঙ্গে অমলেট। একটু বসো”।

কলমির কথায় সমর আর সন্ময় হেসে ফেলল। ওদের হাসির শব্দে এতক্ষণে ঘুম ভাঙলো ফুটকির - অবাক দুই ডাগর চোখ মেলে সে আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর দেখতে লাগল তার দাদুর বন্ধুদের।    

--০০--    

    


শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৮ " 


 

মেনগেটের সামনে দিবাকর গাড়ি দাঁড় করাতেই রামশরণ লোহার গেট খুলে দিল। দিবাকর গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দাঁড় করাল সদর দরজার সামনে। হর্নের আর গাড়ির আওয়াজে দরজা খুলে দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল কনি। পরনে হলুদ রংয়ের তাঁতের শাড়ি, ঘন খয়েরি চওড়া পাড়, শাড়ির জমিনে একই রঙের বুটি। পিঠের ওপর ছড়ানো এলো চুল। কপালে একই রঙের ছোট্ট বিন্দি। সুকন্যার দিকে তাকিয়ে, গাড়ি থেকে নামতে কয়েক মুহূর্ত দেরি হয়ে গেল সুনেত্রর।

সিঁড়ির সামনে এগিয়ে এসে উজ্জ্বল চোখে, প্রসন্ন মুখে সুকন্যা বলল, “এসো”এখন তার সদ্য স্নাত নির্মল মুখে কোন কান্নার ছায়া নেই। তখন কেন কাঁদছিল কনি? ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকল সুনেত্র।

“আমার কিন্তু বীভৎস খিদে পেয়েছে, সুনুদা, চট করে হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়ো আগে, একসঙ্গে খাবো। হারু খাবার দিয়ে দাও। সুনুদার সারথি দিবাকরকেও খাইয়ে দিও কিন্তু”

ভেতর থেকে হারুর গলা পাওয়া গেল, “টেবিলে প্লেট দিয়ে দিয়েছি বৌদিমণি, বসলেই সার্ভ করে দেব”

“দিবাকর বোধহয় খেয়ে নিয়েছে, ও তো বাড়ি থেকে খাবার আনে” সুনেত্র বলল।

“ঠিক আছে, তুমি চাপ নিও না তো, সুনুদা। দুপুরবেলা বাড়িতে এসে কেউ অভুক্ত থাকবে, এটা আমার একেবারেই সহ্য হয় না”সুনেত্র আর কিছু বলল না, বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিল, পাশে কনি দাঁড়িয়েছিল হাতে তোয়ালে নিয়ে। তোয়ালেতে হাত মুছে, সুনেত্র বলল, “হঠাৎ একেবারে নেমন্তন্ন, তার ওপর আবার লাঞ্চ, কী ব্যাপার বলতো”?

“বসো তো আগে, তারপর সব কথা হবে”

সুনেত্র এবং সুকন্যা দুজনেই ডাইনিং টেবিলে সামনাসামনি বসল। হারু অপেক্ষা করছিল। দুজনকে প্লেট এগিয়ে দিল। একধারে রাখল ঝিরিঝিরি করলা ভাজা। তারপর ভাত। খাওয়া শুরু করতে সুকন্যা বলল, “জানি না, এতদিনে তোমার খাওয়ার অভ্যেসগুলো পাল্টে গিয়েছে কিনা”

“ভাবিস না, একই আছে, প্রথম পাতে ঈষৎ তিক্ততা আজও ভালোবাসি। আমার ফেভারিট, তখনও ছিল, আজও আছে। বাট, এরপর কী?

“আরে এটা তো শেষ করো আগে। এটাই শেষ করলে না, তার আগে পরেরটার চিন্তা। রহু ধৈর্যং। ক্রমশঃ প্রকাশ্য”

“বাবা, খেতে বসে সাসপেন্স? ওসব তো আগে হতো, আজকাল তো সারি সারি আহার্য পাত্রে-পাত্রে সাজিয়ে রেখে দেওয়ার নিয়ম, মনোমত খাবার তুলে নিতে হয় প্লেটে”

“একি তোমার বুফে নাকি? এ হচ্ছে সামনে বসিয়ে, থালায় ব্যঞ্জন সাজিয়ে, তালপাতার পাখা নাড়তে নাড়তে খাওয়ানো। আজকাল এসি হয়ে গিয়ে তালপাতার পাখাই হাওয়া হয়ে গেছে। না হলে...”

“রাজলক্ষ্মী না অভয়া?” করলা ভাজা শেষ করে ভাত ভাঙল সুনেত্র। হারু ভাতের ওপর বিউলির ডাল দিল এক হাতা। তারপরে আলু পোস্ত।

“তুমি আর যাই হও, সুনুদা, শ্রীকান্ত হওয়ার মতো গুণ বলো গুণ, দোষ বলো দোষ - কোনটাই নেই। তোমার সুগারের বালাই নেই তো? নিজেই ডাক্তার যখন থাকলেও, কন্ট্রোল করে চলো নিশ্চয়ই”

“আলু রয়েছে বলে বলছিস? নাঃ, সারা জীবনটাই যেহেতু তিক্ততামাখা, তাই আমার রক্তে মিষ্টত্বের বাহুল্য এখনও খুঁজে পাইনি। হারু আর একটু ডাল দাও তো, ভাতগুলো জুত করে মাখি”

“আরে রে করছো কি? সবভাতগুলো মেখে ফেললে, মাছ দিয়ে কি খাবে?”

“মাছ, এর পরে না খেলেই কি নয়? অনেকদিন পর এমন স্বাদের বিউলিডাল-আলুপোস্ত খাচ্ছি, নাই বা হলো মাছ। আমার না আছে আলুর দোষ এবং না আমি “পঞ্চ-ম”-এর রসিক। শ্রীকান্ত হবার এলেম নেই ঠিকই, কিন্তু বরং অনেকটা তোর সেই দাদুর মতো কিম্ভূতকিমাকার। আমিষহীন জীবনে বিধবার একমাত্র মুখরোচক বিলাসিতা পোস্ত। সে আলুর হোক, ঝিঙের হোক কিংবা পোস্তর বড়া। এটা তো মানবি?”

“তুমি কি বিধবা”?

“মোটেই না, ঠিকঠাক বললে অকৃতদার, কিন্তু বৈধব্যের থেকে তার খুব কি পার্থক্য থাকে”

“থাকে না? কি বলছ তুমি, সুনুদা। তোমার জীবন নিয়ন্ত্রণহীন আজগুবি বাতাসের মতো। তার যত্র তত্র যা খুশী করে ফেলার অদ্ভূত প্রবণতা। আর বিধবাদের পুরোটাই তো নিয়ন্ত্রণ, বদ্ধ ঘরের বুকচাপা বাতাস। একঘেয়েমির গন্ধমাখা”সুনেত্র কিছু বলল না। একটু হাসল। হারু চট করে সুনেত্রর পাতে বেশ বড়সড় একটা পাবদা মাছ নামিয়ে দিল। সেই পাবদা সরষের রসে আপ্লুত।        

“হারু, তুমিও এভাবে আমার সর্বনাশ করতে মেতে উঠলে কেন বলো তো”? হারু হাসল, বলল, “পোস্ত মাখা ভাতটা শেষ করে ফেলুন, স্যার। তারপর আরেকটু ভাত দিই, সরষের ঝোল দিয়ে মেখে নিন”

 

খাওয়া দাওয়া সেরে, হাতমুখ ধুয়ে ড্রয়িং রুমে বসতেই সুনেত্রর হাতে একটি সাজা পান বাড়িয়ে দিল সুকন্যা। নিজেও একটি পান মুখে নিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, আজ আর মুখোমুখি পান খাওয়া হল না, সুনুদা, সোফায় মুখোমুখি বসেই পান চিবোতে হবে

হেসে ফেলল সুনেত্র, তারপর বলল, এই কথাটা এমন গম্ভীর মুখে জজ সায়েবের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মতো বলবার কী আছে?

“না মানে, তুমি হয়তো আঁচ করে রেখেছিলে - আজও সেই রাত্রের মতো, জড়িয়ে ধরে মুখোমুখি পান খাওয়া হবে – সে কথাই বলছিলাম। কিন্তু সে তো আর হল না”। আড়চোখে সুনেত্রর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকন্যা বলল।

সুকন্যার তিরছি নজর এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলাটুকু খুবই উপভোগ করল সুনেত্র, তারপর হাসিমুখে বলল, “তাতে তো মনে হচ্ছে তোরই মনে হুতাশ বেশি”!

“ওরকম চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছ, কেন? বিকাশ রায়ের মতো?” সুকন্যা একটু ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, “সব দোষ আমারই না? তুমি একবারে গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসী পাতা...”।

সুকন্যার চোখে চোখ রেখে সুনেত্র সোফা ছেড়ে উঠে গেল সুকন্যার সামনে, নাটকীয় ভাবে হাঁটু গেড়ে বসল মেঝেয়। তারপর দুহাতে চুল ধরে টেনে নামাল সুকন্যার মাথাটা, এবং মুখ তুলে সুকন্যার উন্মুখ অধরে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। দীর্ঘ চুম্বনে আবিষ্ট রইল দুজনেই। উভয়ের হৃৎ-স্পন্দনের গতি এতটাই বেড়ে উঠল, এসি চলা নিঃশব্দ ঘরে দুজনেই শুনতে পেল দুটি হৃদয়ের কলধ্বনি।

“ছাড়ো, কেউ এসে পড়বে...”, অস্ফুটে বলল সুকন্যা। সুনেত্র ছেড়ে দিল। মেঝে থেকে উঠে আবার সোফায় বসল। সুকন্যার দিকে তাকাল। খুব মনোযোগ দিয়ে সুকন্যা এখন এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল এবং শাড়ির আঁচল ঠিক করছিল – দীর্ঘ সময় ধরে। এতটাই কি বিস্রস্ত হয়েছে সুনেত্রর কুন্তল এবং অঞ্চল, মনে হল না সুনেত্রর। বরং, তার মনে হল, ওই সময়টুকুতে সে গুছিয়ে নিতে চাইছে উথাল-পাথাল হয়ে যাওয়া তার অন্তরটাকে।

দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে সুনেত্র নিজের দিকেও তাকাল এবার। তার আধা-আধুরী জীবনে এই মাধুরীটুকু যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। বড়ো ইচ্ছে হয় – আজ, এতদিন পরেও তার শুকিয়ে ওঠা ইচ্ছে-লতায় আসুক কিশলয়, ধরুক মুকুল। শীতের শীর্ণ রুক্ষতার পর যেমন আসে বাসন্তী উজ্জীবন। 

চলবে...                      


শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

ভারতের নির্বাচনে সুকুমার সেন

  


এর আগের প্রবন্ধ " চোদ্দ শাক " 

[প্রত্যেকটি লেখা সরাসরি আপনার মেলে পেতে চাইলে, ডান দিকের কলমে "ফলো করুন" 👉 

 বক্সটি ক্লিক করে নিজের নাম ও মেল আইডি রেজিস্টার করে নিন]


 

এই ২০২৬ সালে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়ে গেছে। এই নির্বাচন নিয়ে অন্যান্যবারের মতোই রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক উত্তেজনা ছিল চরম সীমায়। ছিল নির্বাচনী প্রচারের নামে রাজনৈতিক দলগুলির কদর্য কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি এবং তীব্র আকথা-কুকথার নিবিড় চাষ। জনগণ নির্ভয়ে ভোট দেবে নাকি সভয়ে ঘরে বসেই শুনবে, তার হয়ে কারা যেন ভোট দিয়ে দিয়েছে। মুগ্ধ বা বিভ্রান্ত কিংবা ক্ষুব্ধ সাধারণ নাগরিক কার পক্ষে দাঁড়ালেন – সেকথা আমরা জেনে গেছি ৪ঠা মে, ২০২৬ তারিখ। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘটে গেছে নিঃশব্দ বিপ্লব – জনগণের রায়ে উল্টে গেছে বিগত পনের বছর ধরে মৌরসী-পাট্টা বিছানো সরকার। নব নির্বাচিত সরকার হাতে তুলে নিয়েছে নতুন শাসন ও প্রশাসন ব্যবস্থা।     

বিগত ৪৯ (৩৪ + ১৫) বছরে পশ্চিমবঙ্গ-নির্বাচন মানেই ছিল – ভোটের আগে এবং ভোটের পরে বিরোধী সমর্থকদের হত্যা, ধর্ষণ, ব্যাপক মারধোর, ঘরে ঘরে আগুন জ্বালানো এবং সমর্থক পুরুষদের ঘর ছাড়া করার সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, বঙ্কিম, সত্যজিৎ, নেতাজী সুভাষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ-বিলাসী বাঙালীর সংস্কৃতি-গর্বের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল, বাংলার প্রাক নির্বাচনী ও নির্বাচনোত্তর বীভৎস মারণ ও ধ্বংস লীলার সংস্কৃতিও। সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়টাই আমাকে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে  - নানান রাজ্যে কাটাতে হয়েছে। সুদূর কেরালা থেকে হিমাচল, কিংবা গুজরাট থেকে কাছাড় (আসাম) – প্রতিটি নির্বাচনের সময়েই সর্বত্র শুনতে হয়েছে – আমরা এত হিংস্র কেন? নিজের পড়শি-প্রতিবেশীদের প্রতি বাঙালীরা কেন এত নির্মম-নৃশংস হয়ে ওঠে “নির্বাচন” নামক মৌসুমী-বায়ুর প্রভাবে?     

লজ্জায় মাথা নত করে চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উত্তর দিতে পারিনি কোনবার। কিন্তু দীর্ঘ ৪৯ বছর পর এই ২০২৬-এর নির্বাচনে আমাদের সেই রাহু-কেতু ও শনির দশা কাটিয়ে তোলা গেছে – কেন্দ্রীয় বাহিনীর চুলচেরা পর্যবেক্ষণে। যৎসামান্য কিছু ঘটনা ছাড়া, এবারের নির্বাচন ঘটে গেছে শান্তিতে। যদিও বাঙালীর অগৌরবের চরিত্রটি আবার ফুটে ওঠে কিনা – সেকথা বোঝা যাবে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে। সে পৌরসভা, পঞ্চায়েত, লোকসভা, বিধানসভা, যাই হোক না কেন।     

 এই প্রসঙ্গে বাংলার আরও এক কৃতী সন্তান - যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) হয়ে শুধু সূচনা করেননি, গণতান্ত্রিক ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দাঁড় করিয়েছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় এক ভিত্তিতে। তাঁর সেই গৌরবজনক কৃতিত্বের কথাই এখন বলব।

 ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে ভারতবাসীর হাত ও পায়ের শেকল ভেঙে আমাদের দেশ স্বাধীন হল। স্বাধীনতা লাভের মুহূর্তে দেশের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা জওয়াহরলাল নেহরু আপামর জনতার উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially.

At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom. A moment comes, which comes but rarely in history, when we step out from the old to the new, when an age ends, and when the soul of a nation, long suppressed, finds utterance....”।

   তাঁর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম হল, ভারত নামক সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণপ্রজাতন্ত্রী একটি শিশু-দেশের। পণ্ডিত নেহেরুর তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা গড়ে, শুরু হল শিশু রাষ্ট্রের পথ চলা। সেই মন্ত্রীসভার প্রধান হলেন পণ্ডিত নেহরু।

সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক একটি দেশ শাসনের জন্যে প্রথমেই দরকার পাকাপোক্ত একটি সংবিধান। আর দরকার সাধারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে, কেন্দ্রীয় স্তরে সংসদ এবং রাজ্য স্তরে বিধানসভার পরিকাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সংবিধান নির্দিষ্ট না হলে তো নির্বাচন করা যায় না, অতএব প্রথমেই শুরু হল সংবিধান রচনার  প্রক্রিয়া।  

২৯শে আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে ভারতীয় সংবিধানের খসড়া রচনার জন্যে সাতজন সভ্য নিয়ে একটি কমিটি গড়া হয়েছিল। সে কমিটির চেয়ারম্যান হলে বাবা ভিমরাও আম্বেদকার। সংবিধানের প্রথম খসড়াটি, অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভার কাছে জমা পড়েছিল ৪ঠা নভেম্বর ১৯৪৮। অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা, নানান আলোচনা এবং তর্কবিতর্কের পর ২৬শে নভেম্বর ১৯৪৯ সালে - সংবিধানটি সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করল। এরপর ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি, স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হলেন বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, এবং সেই দিনটি থেকেই শুরু হল গণতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক পথ চলা।  সেই দিনটি আজও আমরা মহাড়ম্বরে স্মরণ করি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে।

এরপর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা এবং অনুমতি নিয়ে শুরু করলেন সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের পরামর্শে, অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নেহরুজি শ্রী সুকুমার সেনকে ডেপুটেশনে দিল্লি নিয়ে গেলেন এবং শ্রী সেনের হাতে তুলে দিলেন প্রথম সুষ্ঠু নির্বাচন করানোর দায়িত্ব – অর্থাৎ তিনিই হলেন ভারতের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ঐতিহাসিক সেই দিনটি ছিল ১৯৫০ সালের ২১শে মার্চ – অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ছিয়াত্তর বছর আগে।    

 কিন্তু কে এই সুকুমার সেন? তাঁর বিপুল কর্মকাণ্ডের আলোচনায় যাওয়ার আগে, শ্রীসেনের পরিচয়টা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

এক বাঙালী বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে, সুকুমার সেনের জন্ম। তাঁর জন্ম তারিখ দোসরা জনুয়ারি ১৮৯৯। তিনি তাঁর পিতা, সরকারী আধিকারিক, শ্রী অক্ষয় কুমার সেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁর লেখাপড়া কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে, এবং তারপর তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্যে যান ইউনিভার্সিটি অব লণ্ডনে। সেখানে অঙ্কে বিশেষ কৃতিত্বের জন্যে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (ICS) যোগ দেন এবং বিভিন্ন জেলায় আইসিএস আধিকারিক এবং বিচারক পদে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয়, সে সময় তিনি ছিলেন বেঙ্গল প্রভিন্সের প্রধান সচিব। ব্রিটিশ জমানায় এই পদটিই ছিল যে কোন ভারতীয় আইসিএস আধিকারিকের পক্ষে সর্বোচ্চ পদ। স্বাধীনতার পরেও তিনি এই পদেই কর্মরত ছিলেন।

শ্রী সেনের অনুজ শ্রী অশোক কুমার সেন (১৯১৩-১৯৯৬) ছিলেন বিখ্যাত ব্যারিষ্টার এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৭ ও ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত – সুদীর্ঘ দিন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী পদেও আসীন ছিলেন দীর্ঘদিন। তাঁর আরেক ভাই শ্রী অমিয় কুমার সেন, ছিলেন প্রথিতযশা ডাক্তার এবং রবীন্দ্রনাথের অন্তিম-যাত্রা পথে তিনিই তাঁর সঙ্গী ছিলেন।

 

 

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণের পর, শ্রী সেন মাত্র ৫৮৩ দিন – মোটামুটি দেড় বছরের মাথায় - ভারতের প্রথম নির্বাচনের প্রথম পর্যায় শুরু করতে পেরেছিলেন ১৯৫১-র ২৫শে অক্টোবর। এবং এই নির্বাচনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে শেষ করতে পেরেছিলেন ১১৯ দিনের মাথায়  ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি।

আজকের প্রযুক্তি-সম্পৃক্ত জীবনপ্রবাহের প্রবল স্রোতে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, একটা সাধারণ নির্বাচন শুরু করতে কেন লাগল দীর্ঘ ৫৮৩ দিন?  এবং সেটাও শেষ হল আরো চারমাস পর!  কেন এতটা সময় লাগল সে কথাই এবার আলোচনা করা যাক।

  ১৯৫১ সালের জন গণনা অনুযায়ী ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬.১০ কোটি, তার মধ্যে ১৭.৩২ কোটি মানুষের বয়স ছিল একুশ বছর বা তার বেশী। সে সময় একুশ বছর বয়সকেই ভোটাধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত করা হয়েছিল। এই ১৭.৩২ কোটি ভারতবাসীর মধ্যে প্রায় ৮৫% ছিলেন নিরক্ষর। এই মানুষগুলিকে ভোটাধিকার কি? স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ভোট দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? এবং ভোট দিলে তাদের জীবনে কোন মোক্ষলাভ ঘটবে? এই সব তত্ত্বকথা বুঝিয়ে প্রতিটি ভোটারকে বুথ-মুখী করে তোলাই ছিল নিঃসন্দেহে শ্রীসেনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।   

টিভি, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়াহীন সেই যুগে এই চ্যালেঞ্জটির সমাধান করা হয়েছিল, রেডিওয় অনবরত প্রচারের মাধ্যমে এবং সিনেমা শোয়ের আগে ডকুমেন্টরি দেখিয়ে। সারা দেশে তখন প্রায় ৩০০০ সিনেমা হল ছিল, সেখানে “ইণ্ডিয়ান নিউজ রিল” নামের নানান আঞ্চলিক ভাষার ডকুমেন্টরিতে ভোটারদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বারংবার বোঝানো হত। মূল সিনেমা শুরুর আগে এই ডকুমেন্টরিগুলি দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এছাড়া ভোটার লিস্ট বানানোর সময় সরকারি প্রতিনিধিরা গ্রামে-গ্রামে, শহরের পাড়ায়-পাড়ায় ব্যক্তিগতভাবেও এই প্রচার যথাসম্ভব চালিয়ে গিয়েছিলেন।

তখনকার সামাজিক সংস্কার ও রীতিনীতি এমনই ছিল, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে, ভোটার লিস্ট বানানোও হয়ে উঠেছিল মস্তো বড়ো এক চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে বিষয়টা। সর্বধর্ম নির্বিশেষে গ্রামের মহিলারা নিজেদের পরিচয় দিতেন, “শ্যামলের মা”, কিংবা, “সামসুদ্দিনের বউ” হিসেবে। মহিলাদের এই রকম নাম সম্বলিত খসড়া ভোটার লিস্ট যখন সুকুমার সেনের কাছে জমা পড়েছিল, তিনি এই লিস্ট বাতিল করেছিলেন এবং তাঁর প্রতিনিধিদের আবার গ্রামে গ্রামে পাঠিয়েছিলেন মহিলাদের নির্দিষ্ট নামগুলি নতুন করে রেকর্ড করার জন্যে। এর পরেও প্রায় পঁচিশ লক্ষ মহিলা তাঁদের নিজস্ব নাম নথিভুক্ত করেননি – অর্থাৎ যুগ-প্রাচীন সংস্কারের বাইরে তাঁরা বেরিয়ে আসতে পারেননি। কিন্তু শ্রী সেন এবার আর কোন রকম আপোস না করে, এই পঁচিশ লক্ষ মহিলার নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন এবং ১৯৫১-৫২ সালের নির্বাচনে তাঁরা কেউ ভোটের অধিকার পাননি।  

আজকের সোশাল মিডিয়ার যুগে এরকম ঘটনা ঘটলে – শ্রীসেনকে সারা দেশ জুড়ে অজস্র “মিম” এবং “ট্রোল”-এর সামনে পড়তে হত এবং তাঁকে স্বৈরাচারী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হিসেবেও চিহ্নিত করে ফেলত আজকের সমাজ-সচেতন নেটিজেন জনগণ।

কিন্তু শ্রী সেনের এই কড়া পদক্ষেপের কারণে, মহিলারা দ্রুত সচেতন হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তী নির্বাচনের অর্ত্থাৎ ১৯৫৭ সালের ভোটার লিস্টে তাঁরা নিজ-নিজ নামই নথিভুক্ত করেন এবং ভোট দিতেও তাঁদের কোন অসুবিধে হয়নি। প্রসঙ্গতঃ ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও শ্রী সেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন।  অতএব, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রী সেন যে অজস্র ভারতীয় নিরক্ষর মহিলাকে নিঃশব্দে যথেষ্ট আত্মসচেতন করে তুলতে পেরেছিলেন, একথা আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়।

যেহেতু প্রায় ৮৫% ভোটার সেই সময় নিরক্ষর ছিলেন, নির্বাচনে লড়তে নামা রাজনৈতিক দলগুলির নাম অথবা দলের প্রার্থীদের নাম তাঁদের পক্ষে পড়া সম্ভব ছিল না। তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নাম বা দলের নাম লিখে, ব্যালট বক্সে সেই কাগজ জমা দেওয়ারও। শ্রী সেন এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন প্রতিটি দলের জন্য আলাদা প্রতীক (Symbol)-এর ব্যবস্থা করে। সে সময় সারা দেশে মোট যে চোদ্দটি দল নির্বাচনে লড়েছিল, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ দলের জন্যে আলাদা আলাদা প্রতীক বেছে নিয়ে জমা দিয়েছিল নির্বাচনী কমিশনের কাছে। যেমন জোড়া-বলদ, কাস্তে-ধানের শিষ, উদিত-সূর্য, গাছ, ইত্যাদি। নীচের চার্ট থেকে সেদিনের চোদ্দটি দলের নাম ও প্রতীকগুলি দেখে নিতে পারেন। জানা যাবে তখনকার চোদ্দটি জাতীয় দলের নামও।

১৯৫১-৫২ সালে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন দলের প্রতীক 
 

এই প্রথম নির্বাচনেই শ্রী সেন প্রত্যেকটি বুথে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিহ্নিত আলাদা আলাদা ব্যালট বক্স রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এতে নিরক্ষর হলেও, কোন মানুষেরই তাঁর সমর্থিত দলের নির্দিষ্ট বক্সে, তাঁর সমর্থনের কাগজটি ফেলতে কোন অসুবিধে হয়নি।

আজকের দিনের নির্বাচনে “ছাপ্পা ভোট” শব্দটি আমাদের কাছে বহুল প্রচলিত গা সওয়া ব্যাপার। কিন্তু প্রথম নির্বাচনের আগেই শ্রী সেনের মাথায় এই আশঙ্কা এসেছিল যে, একই চতুর ভোটার নিজের দলের বক্সে অনেকগুলি ভোট দিয়ে ফেলতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সাহায্য নিয়ে ভোটারদের আঙুলে ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক (indelible ink) লাগানোর ব্যবস্থা করেন। আজও সেই কালিই ব্যবহার হয় এবং আমরা সকলেই জানি, এই কালি একবার লাগিয়ে দিলে, অন্ততঃ দিন সাতেকের আগে আঙুল থেকে এই কালি মোছা যায় না।

প্রথমবারের সেই নির্বাচনী লড়াই হয়েছিল ৪৫০০ আসনের জন্যে, তার মধ্যে সংসদের আসন ছিল ৪৮৯ এবং বাকিগুলি ছিল রাজ্য বিধানসভার আসন। প্রায় ৫৬০০০ নির্বাচনী অফিসার নিযুক্ত ছিলেন, সারা ভারতের ২,২৪,০০০ বুথ পরিদর্শনের জন্য। ১৬,৫০০ করণিককে ছমাসের জন্যে নিযুক্ত করা হয়েছিল সারা ভারতের ভোটার লিস্ট বানানো, নির্বাচনী বিধি-বিধান রচনা, আরও বিবিধ নথিপত্র বানানোর জন্যে। ৮২০০ টন ইস্পাত থেকে, প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ ব্যালট বক্স বানানো হয়েছিল। প্রায় ৩,৮৯,৮১৬ ফাইল ইণ্ডেলিব্‌ল্‌ ইংক ব্যবহার হয়েছিল ১৯৫১-৫২-র সেই নির্বাচনে। বক্সগুলি বুথে বুথে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ২,৮০,০০০ শ্রমিক এবং বক্সের সুরক্ষার জন্যে ২,২৪,০০০ পুলিশ কর্মী নিযুক্ত হয়েছিল।

মনে রাখতে হবে সেসময়, এক্সপ্রেসওয়ে, হাইওয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনার মতো প্রকল্প বহুদূরের স্বপ্ন – ভারতের প্রত্যন্ত প্রান্তের বুথগুলিতে ব্যালটবক্স সহ নির্বাচনী কর্মীদের পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ছিল গরুরগাড়ি কিংবা ঘোড়ার গাড়ি।

১৯৫১-৫২ নির্বাচনের পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনেও শ্রীসেনই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন। প্রথমবারের তুলনায় দ্বিতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ব্যয় কমেছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এর কারণ হল প্রথমবারে বানানো সমস্ত ব্যালট বক্সই, দূরদর্শী শ্রী সেন সযত্নে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।

 ভারতের প্রথম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাফল্য সে সময় গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বিশ্বের তৎকালীন গণতান্ত্রিক দেশগুলি, যেমন আমেরিকা কিংবা ইওরোপের কোন দেশের সাহায্য ছাড়াই, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটা দেশ যে এত নির্বিঘ্নে এমন সার্বিক নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবে, একথা তথাকথিত সুসভ্য শ্বেতবর্ণ মানুষদের পক্ষে হজম করা নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল বৈকি!  অনুমান করে নেওয়া যায় সদ্য ভারত ছেড়ে যাওয়া ইংরেজ শাসকরাই ঈর্ষান্বিত হয়েছিল সব থেকে বেশি। কারণ যে দেশের অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কই ছিল নিরক্ষর। যে দেশে মাত্র বছর চারেক আগেই ১৯৪৬-৪৭ সালে ধর্ম নিয়ে এবং দেশভাগ নিয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে ঘটে গেছে অজস্র গণহত্যার বীভৎস ঘটনাসমূহ। স্বাধীনতা লাভের পরেই যে দেশকে ১৯৪৭-৪৮ সালে, সদ্যজাত প্রতিবেশী দেশের উদ্ধত আক্রমণকে শক্ত হাতে দমন করতে হয়েছে। যে দেশের ৭০% - ৮০% মানুষ জীবনযাপন করতেন  দারিদ্রসীমার নীচে। এই সকল প্রতিকূলতাকে নিপুণ হাতে সামলে, নবজাত একটি দেশের এমন সার্বিক সাফল্যের মূল্যায়ন - আজকের অত্যাধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে তার আন্দাজ করাও অসম্ভব।

১৯৫২ সালের স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, 


Nehru's haste [in wanting India's first general election] was understandable, but it was viewed with some alarm by the man who had to make the election possible, a man who is an unsung hero of Indian democracy. It is a pity we know so little about Sukumar Sen. He left no memoirs and, it appears, no papers either. ...

It was perhaps the mathematician in Sen, which made him ask the prime minister to wait. No officer of State, certainly no Indian official, has ever had such a stupendous task placed in front of him. Consider, first of all, the size of the electorate: 176 million Indians aged 21 or more, of whom about 85 per cent could not read or write. Each voter had to be identified, named and registered. This registration of voters was merely the first step. For how did one design party symbols, ballot papers and ballot boxes for a mostly unlettered electorate? Then, polling stations had to be built and properly spaced out, and honest and efficient polling officers recruited. Voting has to be as transparent as possible, to allow for the fair play of the multiplicity of parties that would contest. Moreover, with the general election would take place elections to the State Assemblies. Working with Sukumar Sen in this regard were the election commissioners of the different provinces, also I.C.S. men.

 নবীন ভারতের প্রথম নিরপেক্ষ এবং সাবলীল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল, বিশ্বের বহু উন্নতিশীল  গণতন্ত্রকামী দেশ। তাদের মধ্যে একটি দেশ হল সুদান। সে দেশের ১৯৫৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করার জন্যে, ১৯৫১-৫২-র সাধারণ নির্বাচনের পরেই সুদান থেকে শ্রী সেনের কাছে আমন্ত্রণ আসে। ১৯৫৭ সালে সুদানের প্রথম যে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়, তার অধিকাংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনগুলি ভারতীয় নিয়মের অনুসারী ছিল।

১৯৫২ সালের পাঁচ বছর পর ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েও তিনিই ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান ছিলেন এবং ১৯৫৮ পর্যন্ত তিনি ওই পদেই নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে “পদ্মভূষণ” সম্মানে ভূষিত করেন। নির্বাচন কমিশনের পদ ছাড়ার পর  ১৯৬০ সালে বর্ধমানের রাজবাড়ি, গোলাপবাগে নব প্রতিষ্ঠিত বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হয়েছিলেন সুকুমার সেন।

জিটি রোড থেকে গোলাপবাগ পর্যন্ত প্রধান রাস্তাটি তাঁর নামেই চিহ্নিত করা হয়। আবার তাঁর অবদানের কথা মনে রেখে সুদূর সুদানের রাজধানী খার্তুম শহরেও তাঁর নামাঙ্কিত একটি প্রধান রাস্তা আছে। কিন্তু যৎসামান্য এই স্মৃতিরক্ষার প্র্য়াসটুকু ছাড়া এমন একটি কৃতী বাঙালীকে আমরা আজ ভুলেই গেছি। এই কলকাতা শহরে কোন আয়োজন নেই তাঁর স্মৃতি রক্ষার।

১৯৬৩ সালের ১৩ই মে তাঁর পরলোক যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সূচনা পর্বটি।

গুগ্ল সার্চ করে উইকিপিডিয়া এবং কয়েকটি সর্বভারতীয় পত্রিকার ওয়েবসাইট থেকে যেটুকু তথ্য তাঁর সম্বন্ধে জানা যায় – সেটুকুই এই প্রবন্ধে তুলে ধরতে পারলাম। এই লেখাটি পড়ে আশা করি কোন উৎসাহী গবেষক, তাঁর সম্বন্ধে আরও বেশী তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের সামনে তুলে ধরবেন। এবং সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের এতদিনের অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত।      

 --০০--

 চিত্রঋণঃ উইকিপিডিয়া।

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...