এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৫ "
৩২
বেশ কিছুটা দূর থেকেই
ভল্লা অস্ত্রাগারের কাঠামোটা দেখতে পেল। ভল্লা রণপা থেকে নামল। ফতুয়াটা খুলে ফেলল,
গলার গামছাটা জড়িয়ে নিল মাথায় আর ধুতিটা গুটিয়ে তুলে নিল কুঁচকির কাছাকাছি। তারপর
উঁচু একটা গাছে উঠে তুলে দিল রণপা জোড়া আর ফতুয়াটা। গাছ থেকে নেমে এসে জঙ্গল এবং
ঝোপঝাড়ের আড়ালে আড়ালে এগোতে শুরু করল অস্ত্রাগারের দিকে।
কাছাকাছি গিয়ে সন্তর্পণে
উঠে পড়ল একটা বড়ো গাছে। মোটা ডালে বসে, পাতার আড়াল থেকে দেখতে লাগল,
নির্মীয়মাণ অস্ত্রাগারটা। মোটা ইঁটের দেওয়াল গাঁথা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চারটে
কুঠুরি পাশাপাশি, লাগোয়া। ওদিকের দুটো
ঘর বেশ বড়োবড়ো আয়তাকার আর এদিকের দুটো কিছুটা ছোটো। ঘরগুলোর ছাউনির জন্যে কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, মোটা মোটা
কাঠের কড়িবরগা দিয়ে। পাশাপাশি চলছে, মানুষ-সমান উঁচু ইঁটের পাঁচিলের কাজও। কিন্তু
ভল্লা একটু আশ্চর্য হল। কোথাও কোন কুলিক, তার যোগাড়ে – মুনিষ, কাউকেই দেখতে পেল না।
আজ কি এখানে কাজ বন্ধ? কেন?
ওপর থেকে শস্ত্রাগারের
প্রবেশ দ্বার বলে যেদিকটা তার মনে হল, সেদিকে দেখল মারুলা দাঁড়িয়ে আছে হাতে বল্লম
আর ঢাল নিয়ে। তার পাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। পোশাক দেখে মনে হচ্ছে বণিক। ওদের থেকে
কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে চারজন প্রহরী, রীতিমতো বল্লম, ঢাল, তীর ধনুক নিয়ে।
ভল্লা গাছ থেকে নেমে এল।
নির্মীয়মাণ পাঁচিলের একটা ফাঁক দিয়ে ভল্লা ঢুকে পড়ল, অস্ত্রাগারের সীমানার ভেতরে।
প্রবেশদ্বারের দিকেই সে এগোতে লাগল সন্তর্পণে। চলতে চলতে এক জায়গায়
বেশ কিছু ঝুড়ি, কোদাল বেলচা এবং কুলিকের যন্ত্রপাতি
পড়ে থাকতে দেখল ভল্লা। সেখান থেকে একটা ওলন-দড়ি আর মাটাম তুলে নিয়ে আবার ধীরে সুস্থে
এগিয়ে চলল। শস্ত্রাগারের ডানদিকের দেওয়াল ধরে সে এতক্ষণ চলছিল, সে দেয়াল শেষ হতেই সে
পৌঁছে গেল শস্ত্রাগারের কোনায়। তাকে দেখামাত্র চারজন প্রহরী হইহই করে উঠল, “অ্যাই তুই
ওখানে কে রে? কী করছিস ওখানে? পিছনে যা, এদিকে আসবি না”। ভল্লা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
প্রহরীদের চেঁচামেচিতে মারুলা
আর সেই বণিক লক্ষ্য করল ভল্লাকে। কিছুক্ষণ দেখে মারুলা বণিকের কানে কানে বলল, “আরেঃ
কী আশ্চর্য, ও তো ভল্লা। কী চেহারা বানিয়ে এসেছে দেখুন, মান্যবর।”
বণিক নীচু স্বরে বললেন,
“তুমি ঠিক চিনেছ? আমি তো চিনতে পারছি না, ভল্লাকে”!
মারুলা বলল, “আমি নিশ্চিত,
মান্যবর। কাছে
আসতে দিন, চিনতে পারবেন”।
মারুলা প্রহরীদের বলল, “ওকে
আসতে দাও”। প্রহরীরা ভল্লার দিকে হাত তুলে ডাকল, একজন বলল, “এই-ই, এদিকে আয়, সরকার
ডাকছেন”।
ভল্লা ধীরে ধীরে ভয়ে ভয়ে
সামনে এল। তার পা যেন কাঁপছে। সামনে এসে দুজনেই দুজনকে চিনতে পারল। ভল্লা জোড়হাতে নীচু
হয়ে প্রণাম করল, বণিকবেশী শষ্পককে এবং মারুলাকেও।
মারুলা প্রহরীদের শুনিয়ে
শুনিয়ে বলল, “বড়ো দেরি করে এলে কুলিকভাই, বণিকমশাই সেই থেকে অপেক্ষা করছেন তোমার জন্যে।
চলো আমরা একটু ভেতরে যাই, কিছু কথা আছে”। মারুলা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বণিকমশাইকে
নিয়ে আমরা একটু ভেতরে যাচ্ছি রক্ষীভাইরা, দেখো কেউ যেন এখন না ঢোকে। কেউ কাছাকাছিও
যেন না আসতে পারে”।
রক্ষীদের সর্দার বলল, “একটা মাছিও ঢুকতে পারবে
না, মারুলাভাই, নিশ্চিন্তে যান”।
প্রথমে শষ্পক এবং পিছনে ভল্লা
আর মারুলা ঢুকল সামনের ঘরটিতে। এই ঘরটি বাঁদিক থেকে তৃতীয় ঘর। ঘরে ঢুকে শষ্পক ঘরের
মাঝখানে দাঁড়ালেন, ভল্লার মুখোমুখি হয়ে চাপা স্বরে বললেন, “কি চেহারা বানিয়ে এসেছ, ভল্লা? মারুলা
না বললে তো আমি চিনতেই পারতাম না”।
ভল্লা হেসে বলল, “আপনিও কম
যান না, মান্যবর। ছদ্মবেশ ধরাটা আমাদের কাজের মধ্যেই পরে, কিন্তু আপনার তো তা নয়”।
শষ্পক হাসলেন, “দরকার পড়লে,
সবই শিখে নেওয়া যায় ভল্লা। যাগ্গে চটপট কাজের কথাগুলো সেরে নিই। ভল্লা, এই অস্ত্রাগারে
মোট চারটে কক্ষ আছে”।
ভল্লা বলল, “আমি আগেই দেখে
নিয়েছি, মান্যবর। আমাদের এদিকে আছে দুটো বড়ো ঘর, আর ওপাশে আছে একটা ঘর। কিন্তু কোন কুলিক বা শ্রমিককে কাজ করতে দেখলাম তো! আজ কী
ওদের অবসর?”। শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার দিকে তাকালেন।
মারুলা বলল, “আমাদের এই সাক্ষাতের জন্যেই সবাইকে
আসতে মানা করা আছে। কিন্তু তুই কখন দেখলি?”
ভল্লা মুচকি হাসল, “আসার
সময়, গাছের ওপর থেকে”।
শষ্পক খুশি হয়ে বললেন, “বাঃ
ভালই হয়েছে, কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল”।
ভল্লা বলল, “আমার মনে হয়
বড়ো ঘর দুখানায় অস্ত্রাগার করার পরিকল্পনা করেছেন, তাই না মান্যবর?”
শষ্পক বললেন, “ঠিক আর এই
ঘরটা হবে কায়স্থ ও পুস্তপালের কার্যালয়। মারুলা বলছিল, তোমার একটা কোষাগার প্রয়োজন…”।
“হ্যাঁ মান্যবর, ভীষণ প্রয়োজন, অস্ত্র-শস্ত্র
বিক্রির অর্থ আমি রাখব কোথায়? আরও একটা অনুরোধ, মান্যবর, পুস্তপালের এখানে কী করণীয়?
একজন অভিজ্ঞ কায়স্থই সামলে নিতে পারবে। কিন্তু আমার প্রয়োজন একজন জহুরি-স্বর্ণকার”।
শষ্পক বিস্মিত হয়ে বললেন,
“জহুরি-স্বর্ণকার? সে এখানে কী করবে?”
“মান্যবর, মারুলা নিশ্চয়ই
আপনাকে বলেছে, পাশের রাজ্যের বটতলি গ্রামের কিছু ছেলে অস্ত্র-শস্ত্র কিনবে”।
“হ্যাঁ, বলেছে”।
“তারা অস্ত্র কেনার অর্থ
যোগাড় করবে হয়তো ডাকাতি করে। ডাকাতি মানে, মান্যবর, কড়ি কিংবা রূপো বা সোনার মুদ্রা
হতে পারে। আবার গয়না-গাঁটি, মণি-রত্নও হতে পারে। সে সবের মূল্য নির্ধারণ করা আমাদের
পক্ষে তো সম্ভব নয়। সোনা বা মণিরত্নের ওজন, সোনায় খাদের পরিমাণ, মণি-রত্নের গুণাগুণ
যাচাই করতে পারবে একজন অভিজ্ঞ জহুরি-স্বর্ণকারই”।
“হুঁ। বুঝেছি। তুমি তাহলে
কী করতে চাইছ?”
“মান্যবর, মাঝখানে একটি দেওয়াল
তুলে দিয়ে, এই ঘরটিকেই দুটি ঘরে ভাগ করে দিলে কেমন হয়? একটু ছোট ঘরটা পিছন
দিকে, ওটাই হবে কোষাগার। মাঝের দেওয়ালে একটি মাত্র লোহার দরজা থাকবে কোষাগারে
ঢোকার জন্যে। ওই ঘরের পিছনে কোন জানালা থাকবে না। জানালা থাকবে উঁচুতে, পাশের অস্ত্রাগারের
দেওয়ালে। আর সামনের দিকে হবে কার্যালয়। সেখানে একদিকে বসবে কায়স্থ তার পুঁথিপত্র, কলম
দোয়াত নিয়ে। আর অন্যদিকে বসবে স্বর্ণকার তার যাবতীয় সরঞ্জাম ও তুলাযন্ত্র নিয়ে”।
“এ ব্যবস্থা মন্দ নয়, কোষাগারের ঘরে আমি আপাতত দুটো সিন্দুক
দিয়ে দেব। কিন্তু তোমার কি মনে হয়, ওই ছোকরারা কি
এতই ডাকাতি করবে, যে এখানে একজন স্বর্ণকারের স্থায়ী নিয়োগ অর্থবহ হবে?”
“না, মান্যবর তা হয়তো হবে
না, মাসে - দুমাসে হয়তো একবার, কি দুবার। কিন্তু
এছাড়া অন্য উপায় কী”?
একটু চিন্তা করে শষ্পক বললেন,
“বীজপুর চেন তো, যেখানে জনাইয়ের চটি। বীজপুরে আমাদের একটি অভিবাসন ও আন্তর্শুল্ক দপ্তর আছে। ওখানে আন্তর্দেশীয়
বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের থেকে কর আদায় হয়। ওখানে, ওই তুমি যেমন বললে, বণিক এবং
তীর্থযাত্রীদের কাছে মাঝেমাঝেই সোনার ভূষণ, মণি-রত্নও মেলে। সেগুলির সঠিক
মূল্যায়নের জন্যে আমরা ওই বীজপুরেরই নিবাসী রাজনা স্বর্ণকারের সাহায্য নিই।
অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ব্যক্তি। আমি ভাবছি, আমাদের প্রয়োজন মতো, দু-একদিনের জন্যে, তাকে
যদি এখানে ডেকে নিই, তাহলে কেমন হয়?”
ভল্লা নির্দ্বিধায় বলল,
“সঠিক সিদ্ধান্ত মান্যবর। একজন স্থায়ী স্বর্ণকারকে মাসের পর মাস এখানে বসিয়ে বসিয়ে
পোষার থেকে – এই ব্যবস্থাই সমীচীন”।
“উত্তম, তাহলে আমি তার
সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করছি। মারুলাকে আমাদের শুল্কদপ্তরে পাঠিয়ে দেব – ওদের
মাধ্যমেই কথাবার্তা পাকা করে আসবে। এদিকটা মিটল, এবার এই
অস্ত্রাগার নিয়ে তোমার আর কোন বক্তব্য আছে?”
“পাশের ঘরটি কিসের জন্যে
মান্যবর?”
“ও ঘরে আমাদের রক্ষীদের
এবং কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা হবে। আপাততঃ মোট আটজন সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা
রাখছি, দিনে চারজন, রাত্রে চারজন”।
“ঠিক আছে। এবার চলুন
অস্ত্রাগারদুটি দেখে নিই, মান্যবর”।
শষ্পক, ভল্লা ও মারুলা
তৃতীয় ঘর থেকে বেরিয়ে, এবার দ্বিতীয় ঘরটিতে গেল। প্রশস্ত ঘরটি দেখে ভল্লা খুশিই
হল, বলল, “বাঃ অস্ত্রাগারের পক্ষে উপযুক্ত ঘরই বটে। কিন্তু মান্যবর, অস্ত্রশস্ত্র এবং
অন্যান্য সরঞ্জাম রাখা হবে কোথায়? মেঝেয়?”
শষ্পক একটু বিস্মিত হয়ে
বললেন, “হ্যাঁ, মেঝেয় – নয়তো আর কোথায়?”
“তিন দিকের দেওয়ালে মোটা
কাঠের পাটা দিয়ে তাক বানিয়ে দিন না। সেখানে প্রত্যেকটি অস্ত্র আলাদা
আলাদা ভাবে সাজিয়ে রাখা যাবে। মেঝেয় রাখলে, কিছুদিনের মধ্যেই সব এলোমেলো হয়ে যাবে।
ভারি জিনিষের তলায় চাপা পড়ে হাল্কাগুলি বেঁকে যাবে, ভেঙে যাবে। এদিকের দেওয়ালের
তিনটি তাকে শুধু বল্লম থাকবে। ওদিকের দেওয়ালের তিনটি তাকে ভল্ল, তীর ধনুক, ছোরা-ছুরি।
পিছনের দেওয়ালের তাকে রইল রণপা। এইরকম সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলে জিনিষগুলি ভালো থাকবে,
মান্যবর”।
“হুঁ। বুঝেছি। মারুলা
তুমি প্রথম থেকেই এই নির্মাণ দেখছ, এ কথাটা তোমার মাথায় এল না? রাজধানী থেকেও যে
নকশা করে পাঠিয়েছে, তার মধ্যে কি রয়েছে? আস্থানে গিয়ে আবার দেখব। সে যাক, ভল্লা এই
তাকগুলো দেয়ালে লাগাবে কী করে?”
“দেওয়ালে লোহার মোটামোটা
কীল গেঁথে দেবে। প্রতিটি তাকের জন্যে চারটে বা পাঁচটা – দেড় হাত অন্তর-অন্তর। তার ওপর
মোটা তক্তা বিছিয়ে দেবে – ব্যস্ এটুকুই। কুলিকপ্রধানকে বলবেন, মান্যবর, ওরা সব জানে,
ওরা করে দেবে। আপনি চিন্তা করবেন না”।
ভল্লা কথা শেষ করতে,
শষ্পক জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু বক্তব্য আছে, ভল্লা? তুমি আসাতে খুব ভাল হল। তা না
হলে নির্মাণ শেষে আবার ভাঙাভাঙি – জোড়াজুড়ি করতে হত”।
“নাঃ মান্যবর। আমার আর
কিছু বক্তব্য নেই। তবে ওরাজ্যের ছোকরাগুলো হয়তো আজ বা কাল আসবে। ওরা যদি কিছু
লুঠের টাকাকড়ি আনে আমি মারুলার হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেব। আপনি আস্থানের কোষাগারেই আপাততঃ
রেখে দেবেন”।
শষ্পক বললেন, “সে রেখে
দেব। কিন্তু যে গতিতে তুমি এগিয়ে চলেছ ভল্লা, রাজধানীর পরিকল্পনা তার থেকে পিছিয়ে
পড়ছে। বণিক অহিদত্তর গোশকটগুলি, খবর পেয়েছি, সবে অনন্তপুর পৌঁছেছে। তার মানে এখানে
আসতে আরও অন্ততঃ দশদিন। ছেলেগুলো তোমায় টাকা দিয়ে দিলে, তুমি ওদের
অস্ত্র দেবে কী করে?”
“অস্ত্র পেতে দেরি হোক
না, মান্যবর – চিন্তা নেই। আগে তো ওদের অস্ত্র চালাতে শিখতে হবে। এতগুলো অস্ত্র
ওরা কোথায় রাখবে, ভাবতে হবে...সময় পেয়ে যাবো। তার আগে প্রতিটা অস্ত্র-শস্ত্রের ন্যূনতম
মূল্য কী হবে, সেটা ঠিক করে দিন, মান্যবর। ওটাই এখন জরুরি। তাম্রমুদ্রায় হোক বা
রূপোর মুদ্রায় হোক, ওরা প্রতিটি অস্ত্র এবং শস্ত্রের সঠিক মূল্য জানতে চাইবে”।
“ঠিক। রাজধানী থেকে অহিদত্তের
সঙ্গে বিক্রয়-শর্তের পূর্ণ বিবরণ আমার কাছে আজ সকালে এসে পৌঁছেছে। আমি এখান থেকে
ফিরে গিয়েই ওগুলো নিয়ে বসব। সন্ধের পর মারুলা তো তোমার কাছে যাবেই, ওর হাত দিয়েই
আমি পাঠিয়ে দেব। তবে ন্যূনতম মূল্য কত হতে পারে, সেটুকুই আমি তোমাকে জানাবো। কাকে
কোন মূল্যে বিক্রয় করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। ঠিক আছে”?
“ঠিক আছে, মান্যবর”।
“আচ্ছা, এবার বলো তো
তোমার কবিরাজমশাইকে নিয়ে কী করব? মারুলার কাছে শুনেছো তো, আমার পক্ষে খুব সমস্যা
হয়ে উঠছেন উনি। কী করা উচিৎ?”
“একটু – এই ধরুন দিন
দশেক অপেক্ষা করুন, মান্যবর। আমাদের ছেলেরা আস্থানে আরেকবার হানা দিতে চাইছে...”।
“আবার? এত তাড়াতাড়ি?”
শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
“হ্যাঁ, আপনার রক্ষীরা
গ্রামপ্রধান আর ভীলকমশাইকে পিটিয়ে আধমরা করে এল, কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আনল, ছেলেরা
তার শোধ তুলবে না? কবিরাজমশাইকে মুক্ত করতে হবে না? না হলে আর বিপ্লব কিসের?”
“তা করুক, আমার আপত্তি
নেই। কিন্তু কবিরাজকে মুক্ত করলে, আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো যে”।
“ওই দিন কবিরাজমশাই দু’ভাবেই মুক্ত হয়ে যাবেন,
মান্যবর। আমার ছেলেরা তাকে বন্দীশালা থেকে মুক্ত করে আস্থানের বাইরে কিছু দূর আসার
পরেই, তিনি ইহজগৎ থেকেও মুক্তি পাবেন - পিছনে ধাওয়া করে আসা আপনার রক্ষীদের ভল্লর
আঘাতে! মনে রাখবেন মান্যবর, ভল্লর আঘাতে -
তিরের আঘাতে নয়। কারণ, আমাদের ছেলেদের তির-ধনুক চালাতে এখনো শিখিয়ে উঠতে পারিনি। দেখা
যাক এর মধ্যে শেখাতে পারি কি না।
তারপর রাজধানী এবং
সর্বত্র আপনি বার্তা পাঠাবেন, ডাকাতের সঙ্গে রক্ষীদের খণ্ডযুদ্ধের সময়, ডাকাতের হাতে সর্বজনশ্রদ্ধেয়
কবিরাজমশাইয়ের নৃশংস মৃত্যুতে আমরা সকলেই মর্মাহত। দোষী ডাকাতদের আমরা খুঁজে বের করবই, এবং প্রশাসন প্রত্যেকটি
অপরাধীর চরম দণ্ডের প্রতিজ্ঞা করছে। এদিকে আমাদের
ছেলেরাও গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেবে, রাজার অত্যাচারী রক্ষীদের হাতে অকারণে প্রাণ গেল সর্বজনশ্রদ্ধেয় নিরপরাধ কবিরাজমশাইয়ের!
প্রতিশোধ নিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গর্জে ওঠো, হে তরুণদল”।
শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার
দিকে তাকালেন, বললেন, “আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি, ভল্লামশাই, রাজধানীর
প্রশাসনিক মহলে, কিন্তু কী বলব... সে যে এরকম...জানি না, ঠিক কী বলব...”!
মারুলা বলল, “যদি অভয়
দেন তো আমি বলি, মান্যবর?”
শষ্পক কৌতুক চোখে ভল্লার
দিকে একবার তাকিয়ে মারুলাকে বললেন, “বলো”।
মারুলা বলল, “তিলে খচ্চর,
মান্যবর। একথা আমরা ওকে প্রায়ই বলি”।
চলবে ...