মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৫ 


৩২  

বেশ কিছুটা দূর থেকেই ভল্লা অস্ত্রাগারের কাঠামোটা দেখতে পেল। ভল্লা রণপা থেকে নামল। ফতুয়াটা খুলে ফেলল, গলার গামছাটা জড়িয়ে নিল মাথায় আর ধুতিটা গুটিয়ে তুলে নিল কুঁচকির কাছাকাছি। তারপর উঁচু একটা গাছে উঠে তুলে দিল রণপা জোড়া আর ফতুয়াটা। গাছ থেকে নেমে এসে জঙ্গল এবং ঝোপঝাড়ে আড়ালে আড়ালে এগোতে শুরু করল অস্ত্রাগারের দিকে।

কাছাকাছি গিয়ে সন্তর্পণে উঠে পড়ল একটা বড়ো গাছে। মোটা ডালে বসে, পাতার আড়াল থেকে দেখতে লাগল, নির্মীয়মাণ অস্ত্রাগারটা। মোটা ইঁটের দেওয়াল গাঁথা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চারটে কুঠুরি পাশাপাশি, লাগোয়া। ওদিকের দুটো ঘর বেশ বড়োবড়ো আয়তাকার আর এদিকের দুটো কিছুটা ছোটো। ঘরগুলোর ছাউনির জন্যে কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, মোটা মোটা কাঠের কড়িবরগা দিয়ে। পাশাপাশি চলছে, মানুষ-সমান উঁচু ইঁটের পাঁচিলের কাজও। কিন্তু ভল্লা একটু আশ্চর্য হলকোথাও কোন কুলিক, তার যোগাড়ে – মুনিষ, কাউকেই দেখতে পেল না। আজ কি এখানে কাজ বন্ধ? কেন?

ওপর থেকে শস্ত্রাগারের প্রবেশ দ্বার বলে যেদিকটা তার মনে হল, সেদিকে দেখল মারুলা দাঁড়িয়ে আছে হাতে বল্লম আর ঢাল নিয়ে। তার পাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। পোশাক দেখে মনে হচ্ছে বণিক। ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে চারজন প্রহরী, রীতিমতো বল্লম, ঢাল, তীর ধনুক নিয়ে।

ভল্লা গাছ থেকে নেমে এল। নির্মীয়মাণ পাঁচিলের একটা ফাঁক দিয়ে ভল্লা ঢুকে পড়ল, অস্ত্রাগারের সীমানার ভেতরে। প্রবেশদ্বারের দিকেই সে এগোতে লাগল সন্তর্পণে। চলতে চলতে এক জায়গায় বেশ কিছু ঝুড়ি, কোদাল বেলচা এবং কুলিকের যন্ত্রপাতি পড়ে থাকতে দেখল ভল্লা। সেখান থেকে একটা ওলন-দড়ি আর মাটাম তুলে নিয়ে আবার ধীরে সুস্থে এগিয়ে চলল। শস্ত্রাগারের ডানদিকের দেওয়াল ধরে সে এতক্ষণ চলছিল, সে দেয়াল শেষ হতেই সে পৌঁছে গেল শস্ত্রাগারের কোনায়। তাকে দেখামাত্র চারজন প্রহরী হইহই করে উঠল, “অ্যাই তুই ওখানে কে রে? কী করছিস ওখানে? পিছনে যা, এদিকে আসবি না”। ভল্লা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।

প্রহরীদের চেঁচামেচিতে মারুলা আর সেই বণিক লক্ষ্য করল ভল্লাকে। কিছুক্ষণ দেখে মারুলা বণিকের কানে কানে বলল, “আরেঃ কী আশ্চর্য, ও তো ভল্লা। কী চেহারা বানিয়ে এসেছে দেখুন, মান্যবর।”

বণিক নীচু স্বরে বললেন, “তুমি ঠিক চিনেছ? আমি তো চিনতে পারছি না, ভল্লাকে”!

মারুলা বলল, “আমি নিশ্চিত, মান্যবর। কাছে আসতে দিন, চিনতে পারবেন”।

মারুলা প্রহরীদের বলল, “ওকে আসতে দাও”। প্রহরীরা ভল্লার দিকে হাত তুলে ডাকল, একজন বলল, “এই-ই, এদিকে আয়, সরকার ডাকছেন”।

ভল্লা ধীরে ধীরে ভয়ে ভয়ে সামনে এল। তার পা যেন কাঁপছে। সামনে এসে দুজনেই দুজনকে চিনতে পারল। ভল্লা জোড়হাতে নীচু হয়ে প্রণাম করল, বণিকবেশী শষ্পককে এবং মারুলাকেও।

মারুলা প্রহরীদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, “বড়ো দেরি করে এলে কুলিকভাই, বণিকমশাই সেই থেকে অপেক্ষা করছেন তোমার জন্যে। চলো আমরা একটু ভেতরে যাই, কিছু কথা আছে”। মারুলা প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বণিকমশাইকে নিয়ে আমরা একটু ভেতরে যাচ্ছি রক্ষীভাইরা, দেখো কেউ যেন এখন না ঢোকে। কেউ কাছাকাছিও যেন না আসতে পারে”।  রক্ষীদের সর্দার বলল, “একটা মাছিও ঢুকতে পারবে না, মারুলাভাই, নিশ্চিন্তে যান”।

প্রথমে শষ্পক এবং পিছনে ভল্লা আর মারুলা ঢুকল সামনের ঘরটিতে। এই ঘরটি বাঁদিক থেকে তৃতীয় ঘর। ঘরে ঢুকে শষ্পক ঘরের মাঝখানে দাঁড়ালেন, ভল্লার মুখোমুখি হয়ে চাপা স্বরে বললেন, “কি চেহারা বানিয়ে এসেছ, ভল্লা? মারুলা না বললে তো আমি চিনতেই পারতাম না”।

ভল্লা হেসে বলল, “আপনিও কম যান না, মান্যবর। ছদ্মবেশ ধরাটা আমাদের কাজের মধ্যেই পরে, কিন্তু আপনার তো তা নয়”।

শষ্পক হাসলেন, “দরকার পড়লে, সবই শিখে নেওয়া যায় ভল্লা। যাগ্‌গে চটপট কাজের কথাগুলো সেরে নিই। ভল্লা, এই অস্ত্রাগারে মোট চারটে কক্ষ আছে”।

ভল্লা বলল, “আমি আগেই দেখে নিয়েছি, মান্যবর। আমাদের এদিকে আছে দুটো বড়ো ঘর, আর ওপাশে আছে একটা ঘর। কিন্তু কোন কুলিক বা শ্রমিককে কাজ করতে দেখলাম তো! আজ কী ওদের অবসর?”। শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার দিকে তাকালেন। মারুলা বলল, “আমাদের এই সাক্ষাতের জন্যেই সবাইকে আসতে মানা করা আছে। কিন্তু তুই কখন দেখলি?”

ভল্লা মুচকি হাসল, “আসার সময়, গাছের ওপর থেকে”।

শষ্পক খুশি হয়ে বললেন, “বাঃ ভালই হয়েছে, কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল”।

ভল্লা বলল, “আমার মনে হয় বড়ো ঘর দুখানায় অস্ত্রাগার করার পরিকল্পনা করেছেন, তাই না মান্যবর?”

শষ্পক বললেন, “ঠিক আর এই ঘরটা হবে কায়স্থ ও পুস্তপালের কার্যালয়। মারুলা বলছিল, তোমার একটা কোষাগার প্রয়োজন…”।

“হ্যাঁ মান্যবর, ভীষণ প্রয়োজন, অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রির অর্থ আমি রাখব কোথায়? আরও একটা অনুরোধ, মান্যবর, পুস্তপালের এখানে কী করণীয়? একজন অভিজ্ঞ কায়স্থই সামলে নিতে পারবে। কিন্তু আমার প্রয়োজন একজন জহুরি-স্বর্ণকার”।

শষ্পক বিস্মিত হয়ে বললেন, “জহুরি-স্বর্ণকার? সে এখানে কী করবে?”

“মান্যবর, মারুলা নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছে, পাশের রাজ্যের বটতলি গ্রামের কিছু ছেলে অস্ত্র-শস্ত্র কিনবে”।

“হ্যাঁ, বলেছে”।

“তারা অস্ত্র কেনার অর্থ যোগাড় করবে হয়তো ডাকাতি করে। ডাকাতি মানে, মান্যবর, কড়ি কিংবা রূপো বা সোনার মুদ্রা হতে পারে। আবার গয়না-গাঁটি, মণি-রত্নও হতে পারে। সে সবের মূল্য নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে তো সম্ভব নয়। সোনা বা মণিরত্নের ওজন, সোনায় খাদের পরিমাণ, মণি-রত্নের গুণাগুণ যাচাই করতে পারবে একজন অভিজ্ঞ জহুরি-স্বর্ণকারই”।

“হুঁ। বুঝেছি। তুমি তাহলে কী করতে চাইছ?”

“মান্যবর, মাঝখানে একটি দেওয়াল তুলে দিয়ে, এই ঘরটিকেই দুটি ঘরে ভাগ করে দিলে কেমন হয়? একটু ছোট ঘরটা পিছন দিকে, ওটাই হবে কোষাগার। মাঝের দেওয়ালে একটি মাত্র লোহার দরজা থাকবে কোষাগারে ঢোকার জন্যে। ওই ঘরের পিছনে কোন জানালা থাকবে না। জানালা থাকবে উঁচুতে, পাশের অস্ত্রাগারের দেওয়ালে। আর সামনের দিকে হবে কার্যালয়। সেখানে একদিকে বসবে কায়স্থ তার পুঁথিপত্র, কলম দোয়াত নিয়ে। আর অন্যদিকে বসবে স্বর্ণকার তার যাবতীয় সরঞ্জাম ও তুলাযন্ত্র নিয়ে”।

এ ব্যবস্থা মন্দ নয়, কোষাগারের ঘরে আমি আপাতত দুটো সিন্দুক দিয়ে দেব। কিন্তু তোমার কি মনে হয়, ওই ছোকরারা কি এতই ডাকাতি করবে, যে এখানে একজন স্বর্ণকারের স্থায়ী নিয়োগ অর্থবহ হবে?”

“না, মান্যবর তা হয়তো হবে না,  মাসে - দুমাসে হয়তো একবার, কি দুবার। কিন্তু এছাড়া অন্য উপায় কী”?

একটু চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “বীজপুর চেন তো, যেখানে জনাইয়ের চটি। বীজপুরে আমাদের একটি অভিবাসন ও আন্তর্শুল্ক দপ্তর আছে। ওখানে আন্তর্দেশীয় বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের থেকে কর আদায় হয়। ওখানে, ওই তুমি যেমন বললে, বণিক এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে মাঝেমাঝেই সোনার ভূষণ, মণি-রত্নও মেলে। সেগুলির সঠিক মূল্যায়নের জন্যে আমরা ওই বীজপুরেরই নিবাসী রাজনা স্বর্ণকারের সাহায্য নিই। অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ব্যক্তি। আমি ভাবছি, আমাদের প্রয়োজন মতো, দু-একদিনের জন্যে, তাকে যদি এখানে ডেকে নিই, তাহলে কেমন হয়?”

ভল্লা নির্দ্বিধায় বলল, “সঠিক সিদ্ধান্ত মান্যবর। একজন স্থায়ী স্বর্ণকারকে মাসের পর মাস এখানে বসিয়ে বসিয়ে পোষার থেকে – এই ব্যবস্থাই সমীচীন”।      

“উত্তম, তাহলে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করছি। মারুলাকে আমাদের শুল্কদপ্তরে পাঠিয়ে দেব – ওদের মাধ্যমেই কথাবার্তা পাকা করে আসবে। এদিকটা মিটল, এবার এই অস্ত্রাগার নিয়ে তোমার আর কোন বক্তব্য আছে?”

“পাশের ঘরটি কিসের জন্যে মান্যবর?”

“ও ঘরে আমাদের রক্ষীদের এবং কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা হবে। আপাততঃ মোট আটজন সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা রাখছি, দিনে চারজন, রাত্রে চারজন”।

“ঠিক আছে। এবার চলুন অস্ত্রাগারদুটি দেখে নিই, মান্যবর”।

শষ্পক, ভল্লা ও মারুলা তৃতীয় ঘর থেকে বেরিয়ে, এবার দ্বিতীয় ঘরটিতে গেল। প্রশস্ত ঘরটি দেখে ভল্লা খুশিই হল, বলল, “বাঃ অস্ত্রাগারের পক্ষে উপযুক্ত ঘরই বটে। কিন্তু মান্যবর, অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম রাখা হবে কোথায়? মেঝেয়?”

শষ্পক একটু বিস্মিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, মেঝেয় – নয়তো আর কোথায়?”

“তিন দিকের দেওয়ালে মোটা কাঠের পাটা দিয়ে তাক বানিয়ে দিন না। সেখানে প্রত্যেকটি অস্ত্র আলাদা আলাদা ভাবে সাজিয়ে রাখা যাবে। মেঝেয় রাখলে, কিছুদিনের মধ্যেই সব এলোমেলো হয়ে যাবে। ভারি জিনিষের তলায় চাপা পড়ে হাল্কাগুলি বেঁকে যাবে, ভেঙে যাবে। এদিকের দেওয়ালের তিনটি তাকে শুধু বল্লম থাকবে। ওদিকের দেওয়ালের তিনটি তাকে ভল্ল, তীর ধনুক, ছোরা-ছুরি। পিছনের দেওয়ালের তাকে রইল রণপা। এইরকম সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলে জিনিষগুলি ভালো থাকবে, মান্যবর”।

“হুঁ। বুঝেছি। মারুলা তুমি প্রথম থেকেই এই নির্মাণ দেখছ, এ কথাটা তোমার মাথায় এল না? রাজধানী থেকেও যে নকশা করে পাঠিয়েছে, তার মধ্যে কি রয়েছে? আস্থানে গিয়ে আবার দেখব। সে যাক, ভল্লা এই তাকগুলো দেয়ালে লাগাবে কী করে?”

“দেওয়ালে লোহার মোটামোটা কীল গেঁথে দেবে। প্রতিটি তাকের জন্যে চারটে বা পাঁচটা – দেড় হাত অন্তর-অন্তর। তার ওপর মোটা তক্তা বিছিয়ে দেবে – ব্যস্‌ এটুকুই। কুলিকপ্রধানকে বলবেন, মান্যবর, ওরা সব জানে, ওরা করে দেবে। আপনি চিন্তা করবেন না”।

ভল্লা কথা শেষ করতে, শষ্পক জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু বক্তব্য আছে, ভল্লা? তুমি আসাতে খুব ভাল হল। তা না হলে নির্মাণ শেষে আবার ভাঙাভাঙি – জোড়াজুড়ি করতে হত”।

“নাঃ মান্যবর। আমার আর কিছু বক্তব্য নেই। তবে ওরাজ্যের ছোকরাগুলো হয়তো আজ বা কাল আসবে। ওরা যদি কিছু লুঠের টাকাকড়ি আনে আমি মারুলার হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেব। আপনি আস্থানের কোষাগারেই আপাততঃ রেখে দেবেন”।

শষ্পক বললেন, “সে রেখে দেব। কিন্তু যে গতিতে তুমি এগিয়ে চলেছ ভল্লা, রাজধানীর পরিকল্পনা তার থেকে পিছিয়ে পড়ছে। বণিক অহিদত্তর গোশকটগুলি, খবর পেয়েছি, সবে অনন্তপুর পৌঁছেছে। তার মানে এখানে আসতে আরও অন্ততঃ দশদিন। ছেলেগুলো তোমায় টাকা দিয়ে দিলে, তুমি ওদের অস্ত্র দেবে কী করে?”

“অস্ত্র পেতে দেরি হোক না, মান্যবর – চিন্তা নেই। আগে তো ওদের অস্ত্র চালাতে শিখতে হবে। এতগুলো অস্ত্র ওরা কোথায় রাখবে, ভাবতে হবে...সময় পেয়ে যাবো। তার আগে প্রতিটা অস্ত্র-শস্ত্রের ন্যূনতম মূল্য কী হবে, সেটা ঠিক করে দিন, মান্যবর। ওটাই এখন জরুরি। তাম্রমুদ্রায় হোক বা রূপোর মুদ্রায় হোক, ওরা প্রতিটি অস্ত্র এবং শস্ত্রের সঠিক মূল্য জানতে চাইবে”।   

“ঠিক। রাজধানী থেকে অহিদত্তের সঙ্গে বিক্রয়-শর্তের পূর্ণ বিবরণ আমার কাছে আজ সকালে এসে পৌঁছেছে। আমি এখান থেকে ফিরে গিয়েই ওগুলো নিয়ে বসব। সন্ধের পর মারুলা তো তোমার কাছে যাবেই, ওর হাত দিয়েই আমি পাঠিয়ে দেব। তবে ন্যূনতম মূল্য কত হতে পারে, সেটুকুই আমি তোমাকে জানাবো। কাকে কোন মূল্যে বিক্রয় করবে, সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। ঠিক আছে”?  

“ঠিক আছে, মান্যবর”।

“আচ্ছা, এবার বলো তো তোমার কবিরাজমশাইকে নিয়ে কী করব? মারুলার কাছে শুনেছো তো, আমার পক্ষে খুব সমস্যা হয়ে উঠছেন উনি। কী করা উচিৎ?”

“একটু – এই ধরুন দিন দশেক অপেক্ষা করুন, মান্যবর। আমাদের ছেলেরা আস্থানে আরেকবার হানা দিতে চাইছে...”।

“আবার? এত তাড়াতাড়ি?” শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যাঁ, আপনার রক্ষীরা গ্রামপ্রধান আর ভীলকমশাইকে পিটিয়ে আধমরা করে এল, কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আনল, ছেলেরা তার শোধ তুলবে না? কবিরাজমশাইকে মুক্ত করতে হবে না? না হলে আর বিপ্লব কিসের?”

“তা করুক, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কবিরাজকে মুক্ত করলে, আমরা সবাই বিপদে পড়ে যাবো যে”।

“ওই দিন কবিরাজমশাই দু’ভাবেমুক্ত হয়ে যাবেন, মান্যবর। আমার ছেলেরা তাকে বন্দীশালা থেকে মুক্ত করে আস্থানের বাইরে কিছু দূর আসার পরেই, তিনি ইহজগৎ থেকেও মুক্তি পাবেন - পিছনে ধাওয়া করে আসা আপনার রক্ষীদের ভল্লর আঘাতে! মনে রাখবেন মান্যবর, ভল্লর আঘাতে - তিরের আঘাতে নয়। কারণ, আমাদের ছেলেদের তির-ধনুক চালাতে এখনো শিখিয়ে উঠতে পারিনি। দেখা যাক এর মধ্যে শেখাতে পারি কি না।  

তারপর রাজধানী এবং সর্বত্র আপনি বার্তা পাঠাবেন, ডাকাতের সঙ্গে রক্ষীদের খণ্ডযুদ্ধের সময়, ডাকাতের হাতে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজমশাইয়ের নৃশংস মৃত্যুতে আমরা সকলেই মর্মাহত। দোষী ডাকাতদের আমরা খুঁজে বের করবই, এবং প্রশাসন প্রত্যেকটি অপরাধীর চরম দণ্ডের প্রতিজ্ঞা করছে। এদিকে আমাদের ছেলেরাও গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেবে, রাজার অত্যাচারী রক্ষীদের হাতে অকারণে প্রাণ গেল সর্বজনশ্রদ্ধেয় নিরপরাধ কবিরাজমশাইয়ের! প্রতিশোধ নিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গর্জে ওঠো, হে তরুণদল”।

শষ্পক অবাক হয়ে মারুলার দিকে তাকালেন, বললেন, “আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি, ভল্লামশাই, রাজধানীর প্রশাসনিক মহলে, কিন্তু কী বলব... সে যে এরকম...জানি না, ঠিক কী বলব...”!

মারুলা বলল, “যদি অভয় দেন তো আমি বলি, মান্যবর?”

শষ্পক কৌতুক চোখে ভল্লার দিকে একবার তাকিয়ে মারুলাকে বললেন, “বলো”।

মারুলা বলল, “তিলে খচ্চর, মান্যবর। একথা আমরা ওকে প্রায়ই বলি”।  

চলবে ...

সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/২ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৩


৫.১.৪ ন্যায় দর্শন

মহর্ষি গোতম এই দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর আরেকটি নাম অক্ষপাদ, এই কারণে এই দর্শনকে গোতম বা অক্ষপাদ-দর্শনও বলা হয়ে থাকে। ন্যায় দর্শনের জন্ম খুব সম্ভবতঃ খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে কিংবা খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে।

মহর্ষি গোতম বৈশেষিক তত্ত্বের পরমাণুবাদকেই অনুসরণ করেছেন, একমাত্র বিশেষ পদার্থ ছাড়া স্বীকার করেছেন অন্য সব দ্রব্য পদার্থ। ন্যায় শাস্ত্রে এই তত্ত্বগুলি ছাড়া আরও ষোলটি পদার্থের অবতারণা করা হয়েছে। এই পদার্থ কিন্তু কোন বস্তু নয়, বরং বিষয় বলাই ভালো। ন্যায় দর্শন প্রকৃতপক্ষে তর্ক বা বিচার শাস্ত্র। এই শাস্ত্রে তর্ক ও বিচারের পদ্ধতি এবং তার সঙ্গে প্রমাণ, প্রমেয়, সিদ্ধান্ত ইত্যাদি ষোলটি অঙ্গকে ষোলটি পদার্থ বলা হয়েছে।

যা দিয়ে কোন বিষয়কে নির্দিষ্ট করা যায় তাকেই প্রমাণ বলে। প্রমাণের আবার রকমফের আছে, যেমন প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। অতএব অনুমান, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় হাইপোথিসিস (Hypothesis) বলে, সেই অনুমান ভারতীয় তত্ত্বেও গ্রাহ্য।

পাঁচটি প্রমাণের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রমাণের ব্যাখার প্রয়োজন নেই। অনুমান প্রমাণের ব্যাখ্যা প্রয়োজন কারণ এটি ন্যায় দর্শনের প্রধান অংশ। খুব সহজ করে বললে, অনুমান হল কার্য দেখে তার কারণ স্থির করা। যেমন একটা ঘট দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, একজন মৃৎশিল্পী মাটি দিয়ে এটিকে গড়েছেন। অথবা ধোঁয়া দেখলে বোঝা যায় তার পিছনে আগুন আছে। এই অনুমানের পাঁচটি অঙ্গ বা অবয়ব আছে – প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন। এগুলির ব্যাখ্যা দেওয়ার থেকে উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধে হবে।

ধরা যাক প্রাচীন কালের একদল যাত্রী পাহাড়ি জঙ্গলের পথে দূরদেশে যাত্রা করছে। পথে সন্ধ্যে হয়ে আসছে, লোকালয়ের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, অথচ রাত্রিবাসের জন্যে একটা আশ্রয় তো চাই। হঠাৎ ওই যাত্রীদল দেখল, কিছুটা দূরের পাহাড়ের গায়ে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এই ধোঁয়া দেখে কী কী অনুমান এবং সিদ্ধান্ত করা যায় দেখা যাক, –

১. ধোঁয়া যখন দেখা গেছে, তার পিছনে আগুন অবশ্যই আছে – প্রতিজ্ঞা অর্থাৎ নিশ্চিত অনুমান।

২. আগুন থাকলে তার ধোঁয়া থাকবেই – এটি হেতু, কারণ তখনকার দিনে কাঠ জ্বেলে আগুন ধরানো হত (এখনকার গ্যাস বা ইন্‌ডাকশনে ধোঁয়া বেরোবেই না)।

৩. আগুন যখন জ্বালানো হয়েছে, তখন ওখানে নিশ্চয়ই মানুষ আছে, কারণ মানুষ ছাড়া কেউ আগুন জ্বালাতে পারে না। - এটি উদাহরণ অনুমান।

৪. মানুষ তার রান্নাঘরে কিংবা অন্য কোন কাজের জন্যেই আগুন ধরিয়েছে – এটি উপনয় অনুমান।

৫. অতএব ওই পর্বতে মানুষের বসতি অথবা লোকালয় বা গ্রাম আছে, ওইদিকে গেলে রাতের আশ্রয় মিলতে পারে – এটি নিগমন অনুমান – সিদ্ধান্ত।

উপমান হল জানা বস্তুর ধারণা থেকে অজানা বস্তুকে চিনতে পারা। যে ধাতু হিসেবে তামা, ব্রোঞ্জ চেনে, তার কাছে লোহা অজানা হলেও, সেটা যে একটি ধাতু চিনতে খুব অসুবিধে হয় না। যে গরুর পাল চেনে, সে ছাগলের পাল দেখেও বুঝতে পারে, এগুলি গৃহপালিত প্রাণী।

 শব্দ বলতে আপ্ত-কথা বোঝায়, যেমন বেদের উক্তি শব্দ, তার উদাহরণ বা উল্লেখ (reference)-ই শেষ কথা।

এই গেল প্রমাণের কথা। এখন প্রমাণ দিয়ে যে বিষয়ের নিশ্চিত জ্ঞান হয় তাকে প্রমেয় বলে। ন্যায় শাস্ত্রে প্রমেয় বারো প্রকারের – আত্মা, শরীর, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের বিষয়, বুদ্ধি, মন, প্রবৃত্তি, দোষ, প্রেত্যভাব (বারবার জন্ম ও মৃত্যুর চক্র), ফল, দুঃখ ও অপবর্গ।

অনিশ্চিত বিষয়কে নিশ্চয় করাকে সিদ্ধান্ত বলে। খুব বেশি ভেতরে না ঢুকে বলা যায়, প্রমাণ, প্রমেয় ও সিদ্ধান্তের মতো, অন্য পদার্থগুলির মধ্যে প্রধান হল, সংশয়, প্রয়োজন, দৃষ্টান্ত, বাদ, বিতণ্ডা, ছল প্রভৃতি মোট ষোলটি পদার্থ। এই ষোলটি পদার্থ বিচারের অঙ্গ এবং তর্ক-বিতর্কের উপায়।

এই ষোলটি পদার্থ দিয়ে কিসের বিচার করা হবে? শরীর যে আত্মা নয়, তার বিচার হবে এবং নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করে, জ্ঞাত হওয়া যাবে। শরীর যে আত্মা নয়, সেটা জানলে মানুষের মুক্তি হবে। এই ন্যায় দর্শনে প্রমেয় পদার্থের মধ্যে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ কোথাও উল্লেখ নেই। যা প্রমাণ করা যায় না, তার অস্তিত্ব থাকে কী করে? অর্থাৎ ঋষি গোতমও ছিলেন নিরীশ্বরবাদী - নাস্তিক!

কিন্তু তাঁর পরবর্তী নৈয়ায়িক পণ্ডিতেরা এই তত্ত্বের “আত্মা” কে দুটি ভাগে ভেঙে ফেললেন - জীবাত্মা ও পরমাত্মা। তাঁরা আরও বললেন ঈশ্বর কী প্রমাণ সাপেক্ষ কোন বিষয়? ঈশ্বর তো স্বতঃসিদ্ধ-প্রমাণ, তাঁর জন্যে আবার বিচার কিংবা তর্ক-বিতর্ক কিসের?

পরবর্তী কালে এই বৈশেষিক এবং ন্যায় দর্শনের অজস্র টীকা এবং ব্যাখ্যা রচনা করেছেন পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন শঙ্করমিশ্র, বল্লভাচার্য, উদয়ণাচার্য, বার্তিক, বাচষ্পতি মিশ্র, কেশব মিশ্র, গোবর্ধন মিশ্র, জয়দেব মিশ্র, জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন প্রমুখ। এক সময়ে এই বঙ্গের নবদ্বীপ এবং ভট্টপল্লী (ভাটপাড়া) ছিল এই ন্যায় শাস্ত্র চর্চার অন্যতম সেরা পীঠস্থান। শ দেড়েক বছর আগে পর্যন্ত সারা দেশের শিক্ষার্থীরা ন্যায়-শাস্ত্র পাঠ করতে আসতেন নবদ্বীপ এবং ভাটপাড়ায়।

 

৫.১.৫ মীমাংসা দর্শন

মহর্ষি জৈমিনি এই দর্শনের প্রবক্তা, এবং খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন সময় এই দর্শন-তত্ত্বের সূচনা হয়। এই দর্শনকে জৈমিনি দর্শনও বলা হয়। মীমাংসা দর্শনের প্রধান কাজ, বেদের কর্ম-যোগের তাৎপর্য বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা। মীমাংসা ও বেদান্তের দর্শন-তত্ত্ব খুব ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরকও বটে। দুই তত্ত্বের এই নিবিড় সম্পর্কের স্বীকৃতিস্বরূপ বেদান্তকে উত্তর-মীমাংসা অর্থাৎ পরবর্তী ব্যাখ্যা বলা হয়, আর মীমাংসা যেহেতু বেদান্তের থেকে অনেকটাই পূর্ববর্তী তত্ত্ব, সেই কারণে একে পূর্ব-মীমাংসা বলা হয়।

বেদের জটিল রীতি ও প্রথা প্রকরণগুলিকে, সঠিক উপলব্ধি ও অনুসরণের সুবিধার জন্যে মীমাংসা সেগুলির সরল ব্যাখ্যা ও পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। উপরন্তু, বেদের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে, মীমাংসা বিস্তারিত কিছু জ্ঞানতত্ত্বের সৃষ্টি করেছে, সেই তত্ত্বগুলি বেদান্তও প্রায় সম্পূর্ণতঃ স্বীকার করে নিয়েছে। মীমাংসা বলে, দুই ধরনের জ্ঞান আছে – প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। পরোক্ষের আবার পাঁচটি বিভাগ আছে, অনুমান, উপমান, শব্দ, অর্থপত্তি এবং অনুপলব্ধি। আমরা এর আগের দর্শন-তত্ত্বগুলির আলোচনায় প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন করব অর্থপত্তি ও অনুপলব্ধি নিয়ে।

নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়া গেলেও কোন বিষয়ের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যে আনুমানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে অর্থপত্তি বলা হয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে, - সারাদিন উপবাসে থেকেও কোন ব্যক্তি যদি দিন কে দিন মোটা হতে থাকেন, তাহলে অর্থপত্তি করা যায় যে, তিনি নিশ্চয়ই রাত্রে সকলের অগোচরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করেন (অথবা তিনি হাইপোথাইরয়েডিজ্‌মে ভুগছেন)।

কোন বিষয়ের অকস্মাৎ অনুপস্থিতির কারণে আমাদের যে উপলব্ধি হয়, তাকে অনুপলব্ধি বলে। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়ে বিশাল গাছের উপড়ে পড়ায় আমাদের অনুপলব্ধির চেতনা আসে – এই তো কিছুক্ষণ আগেও অত্তো বড়ো সজীব গাছটা দাঁড়িয়েছিল, এখন আর নেই? এই তো গতকালই সন্ধেয় ক-বাবুর সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে আড্ডা দিলাম, তিনি আজ ভোরে মারা গেলেন?

মীমাংসা আরও বলেছে, যদিও সঠিক জ্ঞান আমাদের জীবনের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কিন্তু ঘটনাচক্রে, তত্ত্বের নানান ব্যখ্যায় আমাদের ভ্রান্তি আসাও সম্ভব। যেমন, যদিও দড়ি ও সাপ সম্বন্ধে আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে, কিন্তু আবছা আলোয় আমাদের দড়িকে সাপ বলে ভ্রম হয়ে থাকে। এর কারণ সাপ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ সর্বদাই অত্যন্ত স্পর্শকাতর থাকে। এই বিষয়টিকে মীমাংসা-দর্শন নাম দিয়েছে অখ্যাতিবাদ অর্থাৎ অলীক ভাবনার ভ্রান্তি।

মীমাংসা যাবতীয় বিষয়ভুক্ত এই বাস্তব জগতকে স্বীকার করে। মীমাংসার মতে, পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও পঞ্চ তন্মাত্র-ময় জীবসমূহ নিয়েই এই জগতের সৃষ্টি। এই জীবদেহের মধ্যেই অস্থায়ীভাবে আত্মা অধিষ্ঠান করেন এবং সেই আত্মাই জীবকে সৎ ও অসৎ কর্মে প্ররোচিত করেন। এর ফলস্বরূপ জীব তার নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী এই জগতের বিষয় উপভোগ করে অথবা কষ্টভোগ করে।

জীবাত্মার সংখ্যা অসীম এবং নিত্য। কিন্তু ইহলোকের জীবদেহে আত্মা যখন আবদ্ধ থাকে, জীবের সৎ ও অসৎ কর্মের জন্যে তাদের পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয়। আত্মার নিজস্ব কোন চেতনা নেই, কিন্তু যখনই জীবের মন, ইন্দ্রিয় এবং তন্মাত্রর সঙ্গে তার সংযোগ হয়, তখনই তার জাগরণ ঘটে। এই অবস্থা উপলব্ধি করা যায় সুষুপ্তির সময়, সে সময় জীবের সম্যক চেতনার অভাবে আত্মাও নির্বিকার থাকে। 

যেহেতু সকল মানুষকেই জীবনধারণের জন্যে সর্বদাই কর্মে নিযুক্ত থাকতে হয়, সেহেতু বেদ সকল মানুষকেই কর্মযোগ সাধনার উপদেশ দেয়। এই কর্ম প্রধানতঃ দুই প্রকারের, নিত্য কর্ম – যেমন, জীবনধারণের জন্য উপার্জন, আহার, স্নান, নিদ্রা ইত্যাদি এবং নৈমিত্তিক কর্ম অথবা বৈদিক কর্ম, যেমন যজ্ঞ, ধ্যান, যোগ, উপাসনা ইত্যাদি।

একজন মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিৎ মোক্ষ, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর নিরন্তর চক্র থেকে মুক্তি। এই পর্যায়ে মানব-আত্মার সকল দুঃখ ও বেদনা থেকে মুক্তি মেলে, যদিও চেতনাহীন আত্মার দুঃখ ও আনন্দের কোন অনুভূতি নেই। এই মোক্ষলাভের উপায় প্রসঙ্গে মীমাংসারও সহজ উত্তর, নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মযোগ। তবে কোন কর্মের একটিও কাম্য-কর্ম হলে চলবে না। মনোগত বাসনা বা কামনা পূরণের জন্য যে কোন কর্মই হল কাম্য-কর্ম। অতএব কাম্য-কর্মের সঙ্গে মনে আসে লোভ, মায়া, হিংসা, ঈর্ষা, প্রভৃতি রিপু। তবে অজ্ঞাতে কৃত কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত কামনায় যদি যজ্ঞ করা হয়, সেটি কাম্য-কর্ম হলেও সেই কর্মে কোন বাধা নেই।

এই প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতায়, অর্জুনকে বলেছেন,

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।

মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোঽস্ত্বকর্মণি।।

তোমার অধিকার শুধুমাত্র কাজ করায়, কর্মফলে তোমার অধিকার নেই। কর্মফলের প্রত্যাশায় যেমন কোন কাজ করা উচিৎ নয়, তেমনই কর্মত্যাগের মতিও যেন তোমার না হয়”। (গীতা/২/৪৭)[1]

নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মে চিত্তশুদ্ধি হয়। বিপরীতে এই দুই কর্ম না করলে হয় প্রত্যবায়দোষ (অকর্ম বা নিষ্কর্মের ত্রুটি), তাতে মোক্ষলাভের পথ দুরূহ হয়ে ওঠে। নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠানে প্রারব্ধ কর্মফল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। প্রারব্ধ কর্মফল হল পূর্বজন্মে কৃত যাবতীয় কর্মের ফল। অতএব এই জন্মে পূর্বজন্মের প্রারব্ধ ফল নিষ্ক্রিয় করতে পারলে এবং ইহজন্মে একটিও কাম্য-কর্ম না করলে, পরের জন্মের জন্য কোন প্রারব্ধ কর্মফল আর বকেয়া হবে না। অর্থাৎ পুনর্জন্ম হবে না, মোক্ষলাভ ঘটবে।

মীমাংসা দর্শনে আরেকটি প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে, সেটি হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে বা নেই। যেহেতু এই বিশ্ব জগতের যাবতীয় উপাদানের (পঞ্চভূত) অস্তিত্ব রয়েছে অনাদি কাল থেকেই এবং আত্মার অদৃষ্ট বা প্রারব্ধ কর্মই সকল সৃষ্টি প্রকরণের নিয়ামক, সেক্ষেত্রে সৃষ্টি সম্পাদনে ঈশ্বরের তো কোন ভূমিকাই থাকছে না!

এখানেই মীমাংসা দর্শন অনন্য। কারণ এই দর্শন বেদকেই ঈশ্বরের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অস্বীকার করেছে বেদের সৃষ্টিকর্তাকে। শুধু পরমেশ্বরকেই নয়, বেদে উল্লিখিত সকল দেবতাদেরও – ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রমুখ – যাদের উদ্দেশ্যে বেদ নানা যজ্ঞের বিধান নির্দিষ্ট করেছিল, সেই দেবতারাও এই তত্ত্বে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন! কাজেই এমন সিদ্ধান্ত করাই যায় মীমাংসা দর্শনের এই নিরীশ্বর দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই, পরবর্তীকালে হিন্দু-দর্শনের মূল তত্ত্বগুলি থেকে ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই দর্শনের গুরুত্ব রয়ে গেছে, কারণ, বেদান্ত দর্শন বুঝতে পূর্ব-মীমাংসার বেদ ব্যাখ্যা ও বেদতত্ত্ব-জ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজন।  




[1] গীতার সরল বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ এই লেখকের “চিরসখা হে” থেকে উদ্ধৃত।

চলবে...



রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

অপর্ণা

   বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    

এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


এবারে মনোতোষ পালের জবরদস্ত ব্যস্ততা। চোদ্দখানা প্রতিমার অর্ডার আছে তার হাতেগতবারে ছিল মাত্র আটটা। এই কৃতিত্বের পুরোটাই তার ছেলে সিধুর।  ছেলে সিধুর জন্যে গর্বের শেষ নেই মনোতোষের। রীতিমত গ্র্যাজুয়েট পাস করা ছেলে তার। বছর তিনেক আগেও সিধুর খুব ঝোঁক ছিল লেখাপড়ার দিকে আর গ্র্যাজুয়েট পাস দিয়ে চাকরির দিকে। প্রতিমা গড়ার কাজ সিধু করত ঠিকই – কিন্তু মন দিত না তেমন। বাবার পরিশ্রম কিছুটা লাঘব করার জন্যে আর মায়ের তাগিদে একরকম বাধ্য হয়েই সে হেল্প করতো বাবাকে। প্রায় বছর দুয়েক লাগাতার চেষ্টার পরেও কোন চাকরি জোগাড় করতে না পেরে, গত বছর থেকে সিধু মন দিয়েছে প্রতিমা গড়ার কাজে।

মনোতোষের প্রতিমা গড়ার শিক্ষা তার বাবা পরাণ পালের কাছে, সে নিজে প্রতিমা গড়ে চলেছে নয় নয় করে বছর তিরিশেক তো হলই। কিন্তু মনোতোষ দেখেছে সিধুর আঙুলে জাদু আছেসিধুর হাতের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ পেয়ে যায় খড়-মাটির প্রতিমাগুলো, এ জিনিষ সে কোনদিন করে উঠতে পারেনি, পারেনি তার বাবা পরাণ পালও। মুগ্ধ চোখে দুদণ্ড চেয়ে থাকতে হয় প্রতিমার মুখের দিকে, তাদের হাত পা শরীরের গড়নের দিকে। প্রতিমার চোখ যেন টলটলে জীবন্ত, ভাষা ফুটে ওঠে তাদের হাতের পেলব আঙুলের ভঙ্গিতে। সিধুর হাতের আঙুল যেন কথা কয় নরম মাটি আর রং-তুলির সঙ্গে।

মনোতোষ নিজে এবং তার বাবাও প্রতিমার রেডিমেড মুখের ছাঁচ কিনে আনত কলকাতা থেকে। প্রতিমার গড়ন বা ভঙ্গি যাই হোক, মুখের আদল থাকত একই ছাঁচের। সে মা দুগ্‌গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী যাই হোক না কেন। গতবার সিধুর কি খেয়াল হল, নিজেই বসে গেল ছাঁচ বানাতে। কটাদিন একমনে বসে, প্যারিস প্লাস্টারে বানিয়ে তুলল মুখের ছাঁচ। তাও এক আধখানা নয় একদম তিন সেট – দুগ্‌গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কাত্তিক গণেশ সব আলাদা মুখএমনকি গতবার সিধু মা কালীর মুখও আলাদা বানিয়েছিল। মনোতোষ যদিও একবার আপত্তি করেছিল, কি হবে আবার নতুন ছাঁচ বানিয়ে, মা দুগ্‌গার মুখই তো চলে যাবে মা কালীতেও, সিধু শোনেনি। সিধুর এই শিল্পীসুলভ আন্তরিকতার ফল মিলেছে এইবার। দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার বেড়ে গিয়েছে ছটা, কালীপ্রতিমার অর্ডারও বিস্তর আসছে! 

অর্ডার আছে চোদ্দটা কিন্তু কঞ্চির কাঠামোতে খড় বেঁধে প্রতিমার আকার গড়ে উঠেছে পনেরটা। বিভিন্ন তাদের গড়ন, বিভিন্ন তাদের ভঙ্গি। এক চালা প্রতিমা, আলাদা আলাদা প্রতিমাদুটো আছে ডায়নামিক - মা দুর্গার সঙ্গে অসুরের ভীষণ লড়াইয়ের মূহুর্তটা যেন স্থির হয়ে আছে আকারে। কিন্তু একটার আকার বুঝতে পারছে না মনোতোষঅর্ডার নেই, কিন্তু সিধু ওটা নিজেই বানিয়েছে। একদম অন্যরকম। মা দুগ্‌গা আর অসুর ছাড়া অন্য আর কেউ নেই। প্রমাণ সাইজের মূর্তি, খুব সাধারণ। মনোতোষের একদম পছন্দ হয়নি। মনোতোষ সিধুকে জিগ্যেস করেছিল, “এটা কী বানাচ্ছিস তুই বল তো? কিছুই তো বুজছি না। অর্ডার ছাড়া প্রতিমা বানিয়ে কী হবে?”

সিধু সেই কাঠামোর দিকে তাকিয়ে বলেছিল “এটা কারোর নয়, এমনিই। আগে তো বানাতে দাও, তারপর দেখো” মনোতোষ অবাক হলেও, কিছু বলল না, ছেলের ওপর তার আস্থা আছে। সে বিশ্বাস করে তার ছেলে একজন প্রকৃত শিল্পী, বাঁধাধরা কাজের বাইরে নতুন কিছু করার তার সাহস আছে, যে সাহস তার ছিল না। ছিল না তার বাবারও তবু তার মনে ধন্দ থাকে, এ যুগের ছেলেছোকরা, কি বানাতে, কি বানিয়ে ফেলে, লোকে আবার দুটো কথা না শুনিয়ে যায়! ঠাকুর দেবতা নিয়ে ছেলেখেলাও একদম পছন্দ হয় না মনোতোষ পালের।

পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর দিন সব মূর্তিই রওনা হয়ে যাবে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। একটা প্রতিমার আবার স্পেশাল অর্ডার – মহালয়ার দুদিন আগেই তিনি রওনা হবেন। সেই ক্লাবের সেক্রেটারি বলেছে, কোন এক সাংঘাতিক ভিআইপি নাকি খুব ব্যস্ত। তাঁর হাতে এতটুকু সময়ও নেই। তিনি মহালয়ার দিনই প্রতিমা উদ্বোধন করে ফেলতে চান। কারণ ওই দিন তাঁর হাতে ঘন্টা কয়েক সময় বেঁচে আছে – এবং ওই সময়েই তিনি গোটা দশেক প্রতিমা উদ্বোধন করে ল্যাঠা চুকিয়ে অন্য জরুরি কাজে ঢুকে পড়তে চান।  

পিতৃপক্ষের অমাবস্যাতেই মায়ের মূর্তি উদ্বোধনের ব্যাপারটা তেমন হজম হয়নি মনোতোষের। তবে মনে মনে বিরক্ত হলেও সে কিছু বলতে পারেনি। এই সব ক্লাবের কর্তারা – ছোটা এই শহরেরও হর্তা-কর্তা-বিধাতা। তেঁনারাও বেশ জাঁদরেল ধরনের ভিআইপি, তাঁদের চটিয়ে ভিটে-মাটি চাঁটি করার দুর্বুদ্ধি মনোতোষের কোনদিনই হয়নি।  

অতএব মাঝে আর মাত্র বাইশ দিন। সব কাঠামোর মাটির কাজ শেষ। বাপ ছেলের ব্যস্ততার অন্ত নেই। মিহিন মাটির দুই পরতের পর মসৃণ হয়ে উঠছে প্রতিমার শরীর। পাতলা কাপড়ের ফালিতে নিটোল জুড়ে উঠছে কনুই, কব্জি আর গলার ভাঁজ। নিষ্প্রাণ নিখুঁত মুখ নিয়ে জেগে উঠছে প্রতিমার শরীরি ভাষা। প্রতিমার পীন বক্ষের সুডৌল আদল গড়তে গড়তে মনোতোষ লক্ষ্য করল সিধু একমনে গড়ে চলেছে একটি মেয়ের আর একটি পুরুষের মুখ। কিন্তু ও কার মুখ, কিসের মুখ?

মনোতোষ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ”ওটা কার মুখ বানাচ্ছিস রে? মায়ের মুখ বলে মনে হচ্ছে না তো”?

”মায়ের মুখ বানাচ্ছি না তো মায়ের মুখ না হোক, একটা মেয়ের মুখতো বটে? সব মেয়ের মুখই কি মাদুগ্‌গার পারা হয়”?

“ও মুর্তিটা আসলে কিসের বল দেখি? মাত্র দুখানা হাত - মা দুগ্‌গা তো নয়, আর এদিকে অসুরের চারখানা হাত? কোন শাস্ত্রে এমনটা আছে আমাকে বল দেখি”

“সব কি শাস্ত্রে থাকে? শাস্ত্র বানানো হয়েছিল সে কত্তো যুগ আগে! যারা বানিয়েছিল তাদের ঘরে টিভি ছিল, না কোলে ল্যাপটপ ছিল, না কি হাতে ছিল মোবাইল? শাস্ত্র বদলাতে হবে। তুমি এসব বেকার ভাবচো কেন বলো তো, মূর্তিটা বানাচ্ছি আমার নিজের জন্যে”

“কাজের সময় অকাজে বেকার টাইম বরবাদ করিস ক্যানো? এখনো কত কাজ বাকি আছে সে খেয়াল আছে, তোর”?

“আছে, আছে সব আছে। তুমি টেনসান করো না তো, সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে, সময়মতো” 

 

এই এলাকার প্রধান হিসেবে গণপতি ঘোড়ুইকে সমঝে না চলে উপায় নেই। মহলায়ার দুদিন আগে সকাল সাড়ে নটা নাগাদ গণপতি ঘোড়ুই স্করপিও নিয়ে এসেছেন মনোতোষের বাড়ি, সঙ্গে ক্লাবের আরো চারজন। 

“কি মনোতোষবাবু, প্রতিমা কদ্দূর? আজ ছেলেরা বিকেলের দিকে এসে তুলে নেবে কিন্তু। পরশু উদ্বোধন, মিনিস্টার আসবে ফিঁতে কাটতে”।

মনোতোষ বিগলিত হাসি মুখে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আপনার প্রতিমা, একদম রেডি স্যার। এখনই নিয়ে যেতে পারেন। এইধারে আসুন, দেখে নিন মনোমত হল কিনা”? লম্বা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু মনোতোষের পিছন পিছন ঢুকে পড়লেন তিরপল ঘেরা টালির চাল দেওয়া মনোতোষের বিশাল কারখানায়। পাঁচ-ছটা বালবের আলোয় বিশাল ঘরের অনেকটাই আলো আঁধারি। পাশাপাশি সাজানো মূর্তির সারি দেখাতে দেখাতে মনোতোষ এগিয়ে নিয়ে চলল গণপতিবাবুকে,  

“এইটে “সবুজ সংঘ”, এটা “নতুন দল”, ওটা “মুচকুন্দপুর আমরা সবাই”, এটা “চাঁপাডাঙা মুক্তি ক্লাব”, আর এই যে, এইটে আপনাদের – মাঝেরপাড়া “নবজীবন সংঘ”“গণপতিবাবু আর তাঁর চার সঙ্গী সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ প্রতিমাগুলিকে নিরীক্ষণ করলেন।

গণপতিবাবু আধখানা সিগারেট পায়ের তলায় নিভিয়ে দিয়ে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মনে হচ্ছে, রে তপু, পছন্দ? কিরে প্রদীপ, কিছু বল”?

সকলের চোখেই মুগ্ধ দৃষ্টি, প্রদীপ বলল-

“একদম ফাটিয়ে দিয়েছে গণাদা, একঘর হয়েছে কিন্তু। কি বল তপু?”

তপুও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কোন কথা হবে না, বস। ফাটাফাটি”।

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলেছিলাম কিনা, মনোতোষ পাল কলকাতার যে কোন শিল্পীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়”।

“কি যে বলেন, স্যার। সবই আপনাদের আশীব্বাদ আর মায়ের কৃপা। নিজের ছেলের কথা স্যার না বলাই ভালো, তবু বলব, সিদ্ধেশ্বরের হাতে স্যার মায়ের কৃপা আছে। আপনারা যদি একটু নজর রাখেন – ওর বাপ ঠাকুদ্দাকেও ও মনে হয় ছাড়িয়ে যাবে”

“বটে? এই মূর্তি কি তোমার ছেলেই বানিয়েছে নাকি, হে”?

“বাপ-ব্যাটা দুজনেই বানাই, তবে ওই মুখ আর তুলির টান আজকাল সিধুই দেয়”

“হুঁ। ভেরি গুড। চলুনতো আপনার অন্য প্রতিমাগুলোও দেখি”। গণপতিবাবু এগিয়ে চললেন আরো ভেতরে।  

টুকটাক কিছু কাজ বাকি থাকলেও, চোদ্দখানা সুসজ্জিতা এবং সালংকারা প্রতিমা নিজ নিজ পূজা মণ্ডপে রওনা হবার অপেক্ষায় রয়েছেনসবগুলি প্রতিমা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গণপতিবাবু স্পষ্টতঃ বেশ আনন্দ পেলেন।

প্রদীপ গণপতিবাবুকে বলল, “গণাদা, কালীঠাকুরটাও তাহলে এরাই বানাক না। অর্ডার দিয়ে দেবেন”?

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলছিস”?

“প্রদীপ একদম ঠিক বলেছে, গণাদা”। অর্ডার দিয়ে দিলেই ভালো”। তপুও সমর্থন করল প্রদীপকে।

 গণপতিবাবু বললেন, “মনোতোষবাবু, আপনাকে আমাদের ক্লাবের কালীঠাকুরও যে বানাতে হবে”।

“একটু মুশকিলে ফেললেন, স্যার। অলরেডি বাইশটা মা কালীর অর্ডার নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, স্যার কিন্তু আপনি বললে না-ই বা বলি কি করে? আচ্ছা দেখব, স্যার করে দেব যে করে হোক”।

“গুড। ভেরি গুড। ওদিকে আরেকটা কি প্রতিমা বানাচ্ছে, ওই কি আপনার ছেলে”? একটু আড়ালে আধো অন্ধকারে বসে সিধু একমনে তার নিজস্ব প্রতিমায় তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছিল ভাষা।

“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, ওই আমার ছেলে, সিধু – সিদ্ধেশ্বর পাল, কোন অর্ডারের প্রতিমা নয় স্যার, এমনিই বানাচ্ছে – অল্প বয়সের খামখেয়াল আর কিমাথামুণ্ডু নেই, একদম ফালতু, স্যার”।

“তাই নাকি? কই চলো তো দেখি” গণপতিবাবু এগিয়ে গেলেন, যেদিকে সিদ্ধেশ্বর একমনে প্রতিমা বানাচ্ছিল, সেই দিকে। 

ওরা পাঁচজন এসে তার পিছনে যে দাঁড়িয়েছে, সিধু জানতেই পারল না, এতটাই মনযোগে সে কাজ করছিল। তার প্রতিমা বানানো প্রায় হয়ে এসেছিল, টুকটাক কিছু কাজ বাকি। খুব সাধারণ একটি দ্বিভুজা মেয়ে। পরনে খুবই সাধারণ শাড়ি, নিরাভরণ কাঁধে কলেজের বই নেওয়ার ব্যাগ। তার দু চোখে না আছে রুদ্র অসুরবিনাশিনী দৃষ্টি, না আছে করুণাঘন মাতৃত্ববরং দুচোখে তার ভয়ার্ত ব্যাকুলতাতার দুই করে না আছে কোন প্রহরণ, না আছে বরাভয়ের আশ্বাস। বরং আছে চরম বিপদের থেকে পরিত্রাণের ব্যাকুলতা। তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে অতি সাধারণ চেহারার এক চতুর্ভুজ ব্যক্তি। মুখে তার লাম্পট্যের হাসি পরনে তার সাধারণ জামা আর লুঙ্গি। তার চেহারা অসুর সুলভ পেশীবহুল নয় ঠিকই – কিন্তু শরীরে তার চরম ঔদ্ধত্য। তার আসল শক্তি প্রশ্রয়, চোখে দেখা যায় না, আড়ালে থাকে। আশে পাশে আর কিছু নেই – না সিংহ, না নিহত মহিষ। 

“সিধু, বাবুমশাইরা এসেছেন তোর কাজ দেখতে” মনোতোষের ডাকে চমকে ঘাড় ফেরাল সিধু। উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল সকলকে, কিন্তু কোন কথা বলল না। গণপতিবাবু আরো কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন প্রতিমাটি। গণপতিবাবুর কানে কানে তপু কিছু বলল, শোনা গেল না।

“তোমার নাম সিদ্ধেশ্বর তো? তুমি মনোতোষের ছেলে, তাই তো”? গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার” সিধু উত্তর দিল।

প্রতিমার দিকে নির্দেশ করে গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন, “এটা কী হয়েছে”?

“এটা এমনিই বানিয়েছি, তেমন কিছু নয়, স্যার”।

“বল কি হে, তেমন কিছু নয়? আমি তো অনেক কিছু দেখছি হে, অনেক বক্তব্য! বল না হে, তোমার বক্তব্যই বা কি আর মতলবটাই বা কি?” গণপতিবাবু্ তীব্র শ্লেষ নিয়ে জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“সত্যি বলছি স্যার, তেমন কিছু ভেবে বানাই নি” সিধুর কণ্ঠে ভয় –”হঠাৎ মনে হল, তাই”।

“হঠাৎ মনে হল আর বানিয়ে ফেললে? তাও একেবারে “ব্রেকিং নিউজ”, য়্যাঁ? তোমাদের তো ভালোমানুষ বলেই জানতাম, হে। কি মনোতোষ? এইসব প্রতিবাদের ঠিকা আবার কবে থেকে নিজেদের মাথায় তুলে নিলে? এদিকে আবার বলছো কোন মতলব নেই, উঁহু, এসব তো ভালো কথা নয় হে, মনোতোষ” 

 

সাড়ে বারোটার একটু আগে, দুটো ট্রাক নিয়ে ওরা এল। জনা পঁচিশেক ছোকরা। খুব যত্ন করে তুলে নিলে “নবজীবন সংঘ”-এর সব কটি প্রতিমা। আলাদা করে রাখা প্রতিমার সমস্ত শস্ত্রও তুলে নিল ট্রাকে। তারপর সকলে আবার নেমে এল, তাদের হাতে তখন লোহার রড এবং হকি স্টিক। তারা একসঙ্গে ঢুকে পড়ল মনোতোষের কারখানায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোহার রড আর হকি স্টিক দিয়ে ভাঙতে লাগল সমস্ত প্রতিমার হাত আর মাথা। আঘাত করতে লাগল সমস্ত প্রতিমার শরীরে। নির্বাক সুন্দর প্রতিমার মাথাগুলো ভেঙে ভেঙে পড়তে লাগল মেঝেয়। বাধা দিতে এসেছিল মনোতোষ আর সিধু। চারজনে মিলে বাপ আর ছেলেকে বেধড়ক মেরে ফেলে রেখে চলে গেল ঝড়ো হাওয়ার মতো।

 

ওরা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সিধু উঠে দাঁড়াল এবং বাবাকে ধরে তুলল মেঝে থেকে। সিধুকে জড়িয়ে ধরে মনোতোষ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল, “আমাদের এখন কি হবে, সিধু? হাতে আর মাত্র পাঁচ-ছদিন। ক্লাবের লোকেরা আসবে প্রতিমা নিতে, কী জবাব দেবো তাদের? মণ্ডপে মণ্ডপে মায়ের সাজানো আসন শূণ্য থাকবে এ বছর”?

 সিধু কোন উত্তর দিল না, বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সব। সালংকারা সুসজ্জিতা প্রতিমাগুলি এখন ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপ। কারখানার শেষপ্রান্তে এসে সিধু অবাক হয়ে গেল, তার নিজের জন্যে বানানো অন্যরকম প্রতিমাটি দাঁড়িয়ে আছে অক্ষত। হয়তো ওরা কেউ লক্ষ্য করেনি অথবা সাধারণ মেয়ের মূর্তি দেখে ফেলে রেখে গেছে অবহেলায়।  

“বাবা, দ্যাখো দ্যাখো, এখনও বেঁচে আছে এই মূর্তিটা। ওরা সব ভেঙে ফেলেনি”! মনোতোষ মুখ তুলে তাকিয়ে রইল বেঁচে যাওয়া মূর্তির দিকে।

অস্ফুট স্বরে বলল, “মেয়েটা কে”?

“অপর্ণা”

“অপর্ণা? যাকে ধর্ষণের পর নিষ্ঠুর হত্যা করেছিল লোকগুলো”?

“হুঁ। গণপতি ওকে ঠিকই চিনেছে, এমনকি নিজের দলের লোকটাকেও। দুর্গার মূর্তিকে শিখণ্ডী রেখে ওরা টাকা তোলে, পুজোর নামে টাকা কামানোর জন্যে। তাই মা দুর্গাকে ওরা ভয় পায় না। কিন্তু ওরা ভয় পায় সাধারণ মেয়েকে, ভয় পেয়েছে এই মেয়েটাকেও! ওদের লোকেরা ভেঙে দিয়ে গেল সমস্ত প্রতিমা, অথচ বেঁচে রইল অপর্ণা নামের এই মেয়েটাই”!

“ঠিকই বলেছিস, সিধু। ভিআইপিরা আজ আছে, কাল নেই। বেশিদিন টেকে না। মানুষরাই বেঁচে থাকে, সাধারণ মানুষ। তারাই ভিআইপিদের মাটিতে টেনে নামিয়ে আনে, ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।  চটপট তৈরি হয়ে নে, সিধু, কিচ্‌ছু হয়নি। আমরা আবার গড়ে তুলব সমস্ত মূর্তি, চল আর দেরি নয়। এখনও অনেক সময় আছে”।

“কি বলছ, বাবা, আমরা পারব”?

“পারব না মানে? দিন-রাত এক করে দেব, সিধু। উঠে দাঁড়াতেই হবে আমাদের”।  

-**-

   


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৬

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...