বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১১

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১



 তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ১১

মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা (আগের পর্বের পরে) 

    মাটির সঙ্গে স্পর্শের আগে জল যেমন স্বচ্ছ, মধুর ও শান্ত অবস্থায় থাকে, সেই রকম সাংসারিক বিষয়ে আসক্ত হবার আগে জীবের চিত্ত শান্ত, অচঞ্চল ও সহজেই ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এইভাবেই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় চিত্তের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। ভগবৎ শক্তি বা চিৎশক্তি থেকে মহত্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, মহত্তত্ত্ব থেকে ক্রিয়া কারণে অহঙ্কারতত্ত্বের সৃষ্টি হয়এই অহঙ্কার তত্ত্ব তিনি প্রকারের, সাত্ত্বিক, রাজস ও তামস। হে মাতঃ, এই অহংকারের তিন লক্ষণের কথাও শুনে রাখ। অহঙ্কার দেবতারূপে কর্তা, ইন্দ্রিয়রূপে কারণ ও মহাভূতরূপে কার্যঅথবা অন্যভাবে বলা যায় সত্ত্বগুণে অহংকার শান্ত, রজোগুণে চঞ্চল আর তমোগুণে বুদ্ধিভ্রষ্টসাত্ত্বিক অহংকার বা বৈকারিক অহংকার থেকে থেকে মনস্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই মনের সংকল্প ও বিকল্প আছে। সাধারণতঃ বিষয় গ্রহণের ইচ্ছাকে সংকল্প ও বিশেষ চিন্তায় বিশেষ বিষয় নেবার ইচ্ছাকে বিকল্প বলে। সংকল্প ও বিকল্প থেকেই কামনার সৃষ্টি হয়। মন ইন্দ্রিয়দের অধীশ্বর। যোগীরা এই মনকে বশীভূত করে ঈশ্বরে নিবিষ্ট হন

    রাজস অহংকার থেকে বুদ্ধিতত্ত্বের সৃষ্টি হয়। বুদ্ধিতত্ত্বের দুই লক্ষণ হল পদার্থের প্রকাশরূপ জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়কে প্রবৃত্তিদান। এই লক্ষণ বৃত্তিভেদে নানা রকম, যেমন সংশয়, নিশ্চয়, স্মৃতি ও নিদ্রা। রাজস অহংকার থেকেই কর্মের ও জ্ঞানের ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি। প্রাণ রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় তার কর্ম ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস এবং বুদ্ধিও রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় জ্ঞানের ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস হয়ে থাকে। এইভাবে ভগবানের কালশক্তিতে তামস অহংকার থেকে শব্দতন্ময় অর্থাৎ সূক্ষ্ম শব্দ উৎপন্ন হয়, এই শব্দ থেকেই আকাশ সৃষ্টি হয়, তখন শব্দের সঙ্গে শব্দের ইন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ণের সংযোগ স্থাপন ঘটে। শব্দ পদার্থের বাচক। শব্দ জীবের জ্ঞাপক অর্থাৎ জীব তার কর্ণে শব্দ শুনতে পায়। অতএব, পদার্থবাচক, ব্যক্তিজ্ঞাপক ও সূক্ষ্ম আকাশ, শব্দের এই তিন লক্ষণ। আকাশেরও লক্ষণ আছে, আকাশ সকল ভূতকে আশ্রয় দান করে থাকে। আমরা যে বাহির ও অভ্যন্তর, এই দুই ভাব ব্যবহার করি, আকাশ তার কারণ, এবং প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও মন আকাশকে আশ্রয় করে থাকে। অতএব এই তিন কার্য আকাশের লক্ষণ।

তারপর শব্দতন্মাত্র আকাশ থেকে কালশান্তির প্রভাবে স্পর্শতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। তার থেকে বায়ু উৎপন্ন হয়ে ত্বক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে স্পর্শের সম্পর্ক ঘটে। মৃদু, কঠিন, শীত, উষ্ণ এবং বায়ুর সূক্ষ্ম অবস্থা হল স্পর্শের লক্ষণ। বায়ু বৃক্ষশাখাদের চঞ্চল করে, তৃণদের মিলিত করে, সকল বস্তুর সঙ্গে সংলিপ্ত থাকে এবং গন্ধদ্রব্যের গন্ধকে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের কাছে, শীত ও উষ্ণতা প্রভৃতিকে ত্বক ইন্দ্রিয়ের কাছে এবং শব্দকে শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কাছে বহন করে। এই সমস্ত কর্মে বায়ুর লক্ষণ উপলব্ধি হয় এবং বায়ু সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজীব রাখে। এইভাবে স্পর্শতন্মাত্র ও বায়ুর দৈবযোগে রূপতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়রূপ তন্মাত্র থেকে চক্ষুর সম্বন্ধ ঘটে। রূপ বস্তুর সঙ্গে অনুভব করা যায়, স্বতন্ত্র অনুভব করা যায় না। বস্তুর যেমন আকার স্থূল, সূক্ষ্ম, ঋজু বা বক্র, রূপেরও তেমন অনুভূতি; সুতরাং এই সকল রূপের লক্ষণ।

তেজ আহার পাক করে, ক্ষুধাতৃষ্ণার উদ্রেক করে ভোজন ও পান করায়, শৈত্য নিবারণ করায়, উষ্ণতা শোষণ করায়। এই স্কল কার্য তেজের লক্ষণ। রূপ তন্মাত্র তেজ কাল প্রভাবে রসতন্মাত্র সৃষ্টি করে। রসতন্মাত্র থেকে জলের সৃষ্টি হলে জিভের সঙ্গে রসের সম্পর্ক ঘটে। রস সাধারণতঃ মধুর, কিন্তু যে সব ভৌতিক পদার্থের সঙ্গে সংসর্গ ঘটে, সেই অনুসারে কষায়, মধুর, তিক্ত, কটু, অম্ল ও লবণ, এই ছয় প্রকারের রসের অনুভব হয়। জল পদার্থকে সিক্ত করে, জীবকে তৃপ্তি দিয়ে তাদের জীবিত রাখে, পিপাসা ও তাপের নিবৃত্তি করে; সুতরাং এই সমস্তই জলের বৃত্তি অর্থাৎ কার্য। তারপর রসতন্মাত্র জল কালের প্রভাবে গন্ধতন্মাত্রের সৃষ্টি করে এবং তার থেকে পৃথ্বী উৎপন্ন হলে ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে গন্ধের সংযোগ স্থাপন করে। ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন গন্ধের অনুভব হয়, মিশ্রগন্ধ, দুর্গন্ধ, কর্পূর ইত্যাদির সৌরভ, পথ্য ইত্যাদির শান্তগন্ধ, লশুন ইত্যাদির উগ্রগন্ধ ও অম্লগন্ধ। পৃথ্বীতত্ত্বের লক্ষণ এই যে, এর থেকে প্রতিমারূপে ব্রহ্মের সাকারতা সাধিত হয়। পৃথ্বী স্বতন্ত্র ভাবে অবস্থান করতে পারে, জল ইত্যাদির মতো অপরের নির্ভর করে না। এই পৃথ্বীতত্ত্ব জল ইত্যাদির আধার ও আকাশ ইত্যাদির বিভাজক; পৃথ্বী থেকে সমস্ত জীবের আকার প্রকাশ পেয়ে থাকে।

হে মাতঃ এখন তোমাকে জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের লক্ষণসমূহ বলছি, শোন। কান দিয়ে আকাশের অসাধারণ গুণ শব্দ শোনা যায়। ত্বক দিয়ে বায়ুর অসাধারণ গুণ স্পর্শ অনুভব হয়, চোখ দিয়ে তেজের অসাধারণ গুণ রূপ দেখা যায়, জলের অসাধারণ গুণ রস গ্রহণ করা যায় জিভে, ভূমির অসাধারণ গুণ গন্ধ যে ইন্দ্রিয় গ্রহণ করে, তার নাম নাক। এইভাবে আগেকার সকল মহাভূতের গুণ পরের মহাভূতে সংযুক্ত হওয়ার কারণে, পৃথ্বীতত্ত্বে আকাশ ইত্যাদি সকল ভূতের অসাধারণ গুণ অনুভূত হয়। সৃষ্টির শুরুতে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সকল তত্ত্ব যখন অমিশ্রিত অবস্থায় অবস্থান করছিল, তখন জগতের আদি কারণ ঈশ্বর কাল অর্থাৎ গুণ সমূহে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী শক্তি, কর্ম অর্থাৎ জীবের অদৃষ্ট ও গুণ অর্থাৎ প্রকৃতি; এই তিন কারণে অধিষ্ঠিত হয়ে, ওই সকল তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। 

এই ব্রহ্মাণ্ড শ্রীহরির রূপ। কারণ সলিলে অবস্থিত এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ভগবান উত্থিত হলেন অর্থাৎ উদাসীন অবস্থা পরিত্যাগ করে অধিষ্ঠিত হলেন ও অনেক ইন্দ্রিয় ছিদ্র প্রকাশ করলেন। প্রথমতঃ এই বিরাট পুরুষের মুখ প্রকাশিত হল এবং বাক্য ইন্দ্রিয়ের দেবতা অগ্নির তার মধ্যে প্রবেশ করল। তারপর প্রাণের অন্বয়ে নাক প্রকাশ হলে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের দেবতা বায়ু তার মধ্যে আশ্রয় নিল। এইভাবে অক্ষিগোলকে চোখের দেবতা সূর্য, কানের প্রকাশ হলে শ্রবণের দেবতা দিগ্‌দেবতা প্রবেশ করলেন। তারপর বিরাট পুরুষের ত্বক, রোম ও শ্মশ্রু প্রকাশে ত্বকের ঔষধি দেবতাগণ, শিশ্নর প্রকাশ হলে বীর্যের দেবতা অব্‌দেবতা, পায়ু প্রকাশিত হলে, অপান ইন্দ্রিয়ের দেবতা মৃত্যুর অধিষ্ঠান হলহাত ও পায়ের প্রকাশে, বল ও গতির দেবতা ইন্দ্র ও বিষ্ণু, নাড়িসকল প্রকাশিত হলে শোণিতর দেবতা নদীর অধিষ্ঠান হল তারপর উদর প্রকাশিত হলে, ক্ষুধা ও পিপাসা ইন্দ্রিয়ের দেবতা সমুদ্রদেবের সঙ্গে অধিষ্ঠিত হল। পরে বিরাট পুরুষের হৃদয়ে মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত, যথাক্রমে চন্দ্র, ব্রহ্মা, রুদ্র ও চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞর সঙ্গে অধিষ্ঠান করতে লাগল। দেবতা চৈত্ত ছাড়া অন্য সকল দেবতাই বিরাট পুরুষকে জাগরিত করার জন্যে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় স্থানে অধিষ্ঠান করলেও, বিরাট পুরুষ জাগ্রত হলেন না। তারপর চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞ চিত্ত তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করামাত্র তিনি কারণ বারিধি থেকে উত্থিত হলেন। যে ক্ষেত্রজ্ঞ ছাড়া প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সুপ্ত পুরুষকে জাগ্রত করতে পারে না, সেই ক্ষেত্রজ্ঞকে চিন্তা করতে হবে। প্রথমতঃ পরমেশ্বরে ভক্তি, দ্বিতীয়তঃ অন্যত্র সকল বিষয়ে বৈরাগ্য, তারপর যোগ অনুষ্ঠানে একাগ্র চিত্ত হলে যে জ্ঞান সৃষ্টি হবে, সেই জ্ঞানের সাহায্যে এই দেহে ক্ষেত্রজ্ঞকে আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হবে। 

শ্রীভগবান বললেন, “যাঁকে পুরুষ বলে উল্লেখ করলাম, ইনি স্বভাবতঃ নির্গুণ; এই নিমিত্ত তিনি অকর্তা, সুতরাং নির্বিকার। জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া পড়লে যেমন সেই ছায়া কাঁপে, কিন্তু আকাশের সূর্য কাঁপে না, তেমনই প্রকৃতিতে অর্থাৎ দেহে অবস্থান করে, এই পুরুষ এই দেহের সুখদুঃখের অংশীদার বলে মনে হলেও, বস্তুতঃ তিনি নির্লিপ্ত থাকেন। যখন এই পুরুষ প্রকৃতির গুণসমূহে একান্ত আসক্ত হন, তখন প্রকৃতির কার্যকে “আমি করছি” এই অভিমানে বিমূঢ় হয়ে থাকেন। এই অভিমানে পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের জন্য পাপ ও পুণ্য অর্জন করে এবং সেই কর্মদোষে সৎ অর্থাৎ দেবযোনি, মিশ্র অর্থাৎ মনুষ্যযোনি অথবা অসৎ অর্থাৎ তির্যকযোনিতে বারবার জন্মমৃত্যুর দশা লাভ করে, কখনো পরমানন্দ স্বরূপ লাভ করতে পারে না। পুরুষের কর্ম না থাকলেও কর্তার ভ্রান্ত অভিমানে, সংসারের বিষয়ে আসক্ত হয়ে অনর্থ দশা পায়। অতএব বিষয়ের প্রতি একান্ত আসক্ত মনকে, কঠোর ভক্তি ও বৈরাগ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বশীভূত করাই কর্তব্য।

হে মাতঃ, যে ভাবে আত্মলাভ হয়, সে কথা বলছি শোন। শ্রদ্ধার সঙ্গে যোগ অবলম্বন করে মনকে বার বার একাগ্র করবে, অকপট আচরণ করবে, আমার প্রতি একান্ত ভক্তি নিয়ে, আমার কথা শুনবে। সর্বভূতে সমদর্শীতা, শত্রুতা ত্যাগ, সঙ্গ ত্যাগ, ব্রহ্মচর্য, মৌনতা, নিজের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী কর্ম ঈশ্বরে অর্পণ, যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তোষ, পরিমিত আহার, একাগ্র চিন্তা, নির্জনে বাস, রাগদ্বেষ পরিত্যাগ, সর্বভূতের মঙ্গল চিন্তা, করুণা, ইন্দ্রিয়জয়, স্ত্রীপুত্রকন্যা ও নিজের দেহের প্রতি “আমি” ও “আমার” এই অভিমান ত্যাগ, এই সমস্ত সৎগুণ থাকতে হবে। এইভাবে প্রকৃতি ও পুরুষ বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞান হলে, জাগ্রত অবস্থার নিবৃত্তি হয়ে অন্তরের দিকে দৃষ্টি যায়, তখন আর অন্য বস্তুর দিকে লক্ষ্য যায় না। যোগীব্যক্তি নিজের অবিচ্ছিন্ন আত্মা দিয়ে শুদ্ধ আত্মাকে লাভ করেন এবং শেষে প্রকৃতির আবরণহীন, মিথ্যা অহঙ্কারে সত্যরূপে ভাসমান ব্রহ্মকে লাভ করতে পারেন। শুদ্ধ জীবস্বরূপের থেকে ব্রহ্মের পার্থক্য এই যে, ইনি প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতির অধিষ্ঠান; চোখের মতো নিখিল সৃষ্টির প্রকাশক এবং নিখিল কার্য-কারণের সম্পর্কযুক্ত অদ্বয় অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপে বিরাজিত।

হে জননি, জীবাত্মা কিভাবে শুদ্ধব্রহ্মকে লাভ করতে পারে একটি উদাহরণ দিয়ে বলি শোন। কখনো কখনো জলে সূর্যের ছায়া পড়লে, সেই ছায়া আবার ঘরের দেওয়ালেও দেখা যায়। তখন সেই গৃহে থাকা ব্যক্তি, ঘরের মধ্যে সূর্যের ছায়া কোথা থেকে এল, সন্ধান করতে করতে প্রথমে জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া এবং অবশেষে আকাশের সূর্যের সন্ধান পায়। একই ভাবে সাধক প্রথমতঃ ভূত, ইন্দ্রিয় ও মনে আত্মা অর্থাৎ চৈতন্যের ছায়া অর্থাৎ প্রকাশ দেখতে পান। জড়বস্তুতে ঐ ছায়া কোথা থেকে এল, অনুসন্ধান করতে গিয়ে ত্রিগুণ অহঙ্কারে চৈতন্যের প্রকাশ দেখতে পানতারও পরে কারণ অনুসন্ধান করতে করতে স্বপ্রকাশ ব্রহ্মচৈতন্য উপলব্ধি করতে পারেন।

হে মাতঃ, এই আত্মাকে কিভাবে সুষুপ্তির সাক্ষিরূপে অনুভব করা যায়, তাও তোমাকে দেখাচ্ছি। সুষুপ্তিকালে স্থূলভূত, সূক্ষ্মভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অব্যক্ত প্রকৃতিতে লয় অবস্থায় থাকে। তখন আত্মা বিনিদ্র ও অহঙ্কারহীন অবস্থায় অবস্থান করে। যদি বলো, আত্মা যদি বিনিদ্রই থাকে, তবে জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্নদর্শনের মতো আত্মার স্ফূরণ দেখা যায় না কেন? তার কারণ হল, জাগ্রত ও স্বপ্নকালে আত্মা দ্রষ্টা থাকেন, দৃশ্য বিষয়ের সঙ্গে পার্থক্যের জন্য, নিজেকে দ্রষ্টা হিসেবে বুঝতে পারেন। কিন্তু সুষুপ্তিকালে অহঙ্কারের সকল বিষয় ভূত ইত্যদি বিলীন হয়ে যায় এবং অহঙ্কারও বিনষ্ট হয়; তখন আত্মা নিজে নষ্ট হন না, কিন্তু নিজেকে নষ্ট ভেবে বিভ্রান্ত হন। ধনী ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হলে, সেই ব্যক্তি যেমন নিজে নষ্ট না হয়েও, নিজেকে ধ্বংস মনে করে ব্যাকুল হয়, আত্মারও সেই একই অবস্থা ঘটে। জীবের দেহ, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি অহঙ্কারের সমন্বয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে, অতএব অহঙ্কারকেও দৃশ্য পদার্থের মধ্যে গণ্য করা হয়; কিন্তু আত্মা দ্রষ্টা, অহঙ্কার ও সকল দেহের আশ্রয় ও প্রকাশকএই কারণে সুষুপ্তিকালে নিখিল দৃশ্যপদার্থ থেকে ভিন্ন আত্মা নিজেই প্রকাশ পায় এবং শুদ্ধ সাক্ষিচৈতন্যরূপে অবস্থান করেন”

মাতা দেবহূতি বললেন, “হে প্রভু, তুমি বললে প্রকৃতি ও পুরুষ পরষ্পরের মধ্যে নিত্য আশ্রয় ও আশ্রিতভাব। মনে ভক্তি ও বৈরাগ্য আনলেও, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়, তাহলে কিভাবে মুক্তি হওয়া সম্ভব? পুরুষ অকর্তা হলেও, প্রকৃতির যে সমস্ত গুণের কারণে পুরুষের কর্মের বন্ধন হয়, সেই সমস্ত গুণ বর্তমান থাকলে পুরুষের কৈবল্য প্রাপ্তি কিভাবে সম্ভব? আমার মনে হয়, এই কারণেই কোন কোন পুরুষ তত্ত্ববুদ্ধি দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করলেও, তাঁর মধ্যে প্রচ্ছন্ন ভয় থেকেই যায় এবং সেই কারণে আবার মৃত্যুভয় উপস্থিত হয়”

শ্রীভগবান বললেন, “হে মাতঃ, কামনাহীন ধর্ম আচরণ, নির্মল অন্তর, আমার কথা শোনার ফলে মনে সুদৃঢ় ভক্তি, তত্ত্ব উপলব্ধির প্রগাঢ় জ্ঞান, তীব্র বৈরাগ্য, তপস্যা ও আত্মসমাধি যোগে প্রকৃতি দিন রাত্রি জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যন্ত বিনষ্ট হয়। এই ভাবে বিনষ্ট প্রকৃতি, স্বতন্ত্র ও পরমানন্দে অধিষ্ঠিত পুরুষের কোন অশুভ করতে পারে না। বহুবার জন্মগ্রহণ করে জীব যখন আত্মনিষ্ঠ হন এবং নিখিল ভুবনে বৈরাগ্যযুক্ত হন, তখন আমার প্রসাদে কৈবল্যনামক স্বরূপ প্রাপ্ত হন এবং আত্মজ্ঞান লাভ করে মনের সকল সংশয় ছিন্ন করতে সমর্থ হন। তারপর লিঙ্গশরীর বিনষ্ট হলে, সেই যোগী সংসারে আর ফিরে আসেন না। হে মাতঃ, এই অবস্থায় যোগের আনুষঙ্গিক ফল, অণিমা ইত্যাদি সিদ্ধিসকল, বাধা হয়ে উপস্থিত হয়। সিদ্ধযোগী যদি ওই প্রলোভনে আকৃষ্ট না হন, তবে তিনি পরামুক্তি লাভ করেন এবং তাঁর মৃত্যুভয় চিরতরে দূর হয়ে যায়”

মাতা দেবহূতি সাংখ্যজ্ঞানের প্রবর্তক সেই ভগবানকে প্রণাম করে স্তব করতে করতে বললেন, “ব্রহ্মাণ্ড স্বয়ং যাঁর নাভি মণ্ডল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যিনি নিখিল কার্য ও কারণ। যাঁর মধ্যে সত্ত্ব প্রভৃতি তিনগুণের প্রবাহ বর্তমান। সেই তুমিই এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমি নিষ্ক্রিয় ও সত্য সঙ্কল্প, এই কারণে তুমি প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি না করেও, নিজের শক্তিকে তিন গুণের প্রবাহে বিভক্ত করে জীবগণকে ভোগের জন্য সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমিই এক হয়ে এই অসংখ্য বিচিত্র ভোগের বিধান দাও। তোমার অনন্ত অচিন্ত্য শক্তির কে ইয়ত্তা করতে পারবে? হে নাথ, প্রলয় কালে এই বিশ্ব যাঁর জঠরে ছিল, তাঁকে আমি কী ভাবে গর্ভে ধারণ করেছিলাম? অথবা যেমন কল্পের অন্তে, তোমার মায়ার প্রভাবে তুমি শিশুরূপ ধারণ করেছিলে এবং একটিমাত্র বটপাতায় শুয়ে নিজের পায়ের আঙুল পান করেছিলে, এও তোমার সেই রকমই কোন মায়া? অথবা তুমি দুষ্টগণের শাসন, ভক্তদের সমৃদ্ধি ও জ্ঞানমার্গের পথ দেখানোর জন্য, তোমার নানান অবতার মূর্তির মতো আরেক মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছ? হে ভগবান, যাঁরা তোমার নাম গ্রহণ করেন, তাঁরা তপস্যা, হোম, তীর্থদর্শন ও বেদপাঠের সমান ফল লাভ করেন। যদি চণ্ডালের জিহ্বাতেও তোমার নাম উচ্চারণ থাকে, শুধুমাত্র সেই কারণেই সে সদাচার পবিত্র হয়ে ওঠে, সন্দেহ নেই। তুমি ব্রহ্ম, তুমি পরমপুরুষ। মন বিষয় থেকে নিবৃত্ত হলে, তোমাকে চিন্তা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। নিখিল বেদ তোমার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। হে প্রভু, তুমিই কপিলরূপী বিষ্ণু, আমি তোমাকে প্রণাম করি”। 

তৃতীয় স্কন্ধ সমাপ্ত

এর পর শুরু হবে চতুর্থ স্কন্ধের প্রথম পর্ব। 


মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮ "


৪৪

 

কাজের কথা সেরে বালিয়া আর বড়্‌বলা চলে যেতেই, ভল্লা বলল, “এক ঘটি জল খাওয়াবি, মা? তেষ্টায় ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে”। কমলিমা উঠে গেলেন জল আনতে, ভল্লা বলল, “তোর রাতের রান্না কী হয়ে গেছে, মা?”

কমলিমা জলের ঘটি ভল্লার হাতে দিয়ে বললেন, “খাবি তো সেই দুপুররাত্তিরে – বসাব এখন...”

“বলছিলাম, তোর আরেকটি ছেলে এই এল বলে, প্রতি রাত্রেই সে আমাদের সঙ্গে খায়। দুটো-তিনটে রুটি বেশি করিস মা”।

“সে ছেলে দিনে না এসে, রাতে কেন আসে?”

মারুলা বেড়ার কাছে চলে এসেছিল, ভল্লার বাসা থেকে মহিলার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল।

ভল্লা টের পেয়ে বলল, “সে ছেলে নিশাচর, রে মা। পেঁচা কিংবা বাদুড়ের মতো। দিনের আলোয় চোখে অন্ধকার দেখে...ওই তো এসে গেছে...অনেকদিন বাঁচবি হতভাগা, এই যে মা, এর নাম মারুলা”।

মারুলা উঠোনে এসে দাঁড়াল, কমলিমায়ের পাঁ ছুঁয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করল, “কমলিমা? আমার নামে কী বলছিল মা, মুখপোড়াটা? আমি পেঁচা, বাদুড়?”

কমলিমা হেসে ফেলে বললেন, “তার আমি কী জানি – সে তোমাদের বন্ধুদের ব্যাপার। কিন্তু তুমি আমাকে কী করে চিনতে পারলে, বাবা?”

“তোমাকে না চিনলে কী হবে, তোমার কথা এত শুনেছি এই ভল্লা আর রামালির কাছে – না চিনে যে উপায় নেই মা”।

কমলিমা হেসে বললেন, “তা বেশ বাবা, তোমরা বসে কথা বল, আমি রান্নার জোগাড় দেখি”।

ভল্লা বলল, “তোর সঙ্গেও দুটো কথা আছে মা, একটু বসে যা। আমাদের ছেলেদের একটা দল আছে নিশ্চয়ই শুনেছিস, মা। সেই দলের সবাই যদি নাম পালটে নিজেদের ‘জুজাক’ বলে ডাকে, তুই রেগে যাবি মা?”

কমলিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে, বললেন, “তার মানে? মরা মানুষটাকে নিয়ে হঠাৎ এ আবার কী পাগলামি?”

“দেখ মা। তোকে খোলাখুলিই বলি। এই অমাবস্যায় আমাদের ছেলেরা আস্থান আক্রমণ করবে – সেখানে ছেলেরা নিজেদের নাম নিয়ে ডাকাডাকি করলে, আস্থানের রক্ষীরা তাদের চিনে নেবে। সেই কারণে সবারই নাম হবে জুজাক। রক্ষীরা বুঝবে এ আক্রমণ কিসের জন্যে – তারা হাড়ে হাড়ে টের পাবে একজন জুজাককে মারলে – তিরিশজন জুজাক তার শোধ নেবে...”

কমলিমার দুই চোখ জলে ভরে উঠল, কান্নার বেগ কিছুটা সামলে ধরা গলায় বললেন, “সত্যিই তোরা শোধ নিবি? রামালি সে রাত্রে বলেছিল বটে – ভেবেছিলাম ছেলেমানুষী আবেগ...”।

“না মা, এ আবেগ নয় – প্রতিজ্ঞা। তুই জানিস না মা – রামালি, সুরুল, আহোক, কিশনা এই ক’মাসে কী দারুণ লড়াই করতে শিখেছে। এই অমাবস্যায় সেই পরীক্ষা। রামালি আর সুরুল ঠিক করেছে – নিজের হাতে উপানুকে হত্যা করবে... উপানুর নাম শুনেছিস মা?”

কমলিমায়ের অশ্রুসিক্ত দুই চোখ যেন ঝলসে উঠল, বললেন, “অনামুখো, বাঁশবুকো মিনসের নাম শুনবো না? রামালিদের হাতে ও যেদিন ঘেয়ো কুকুরের মতো মরবে, সেইদিন শান্তি পাবো আমি এবং আমার প্রধান”।

রামালি উঠে এসে কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রেখে বসে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি নিশ্চিন্ত থাক জেঠিমা – আমি আর সুরুল ওর এমন অবস্থা করব – ওকে চেনা যাবে না...”।

কমলিমা রামালির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি তোদের সবাইকে আশীর্বাদ করছি বাবা, তোদের প্রতিজ্ঞা নিশ্চিত পালন হবে – তোদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগবে না...”।

একটু সময় নিয়ে ভল্লা খুব নরম করে বলল, “আমাদের দলের আমরা সবাই জুজাক, তাই তো মা?”

কমলিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন, অস্ফুট অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ জুজাক”।

“আরেকটা কথা আছে মা। আমাকে যেমন সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছিলি, আমার বা আমাদের ছেলেদের যদি তেমন সেবা দরকার হয়, করবি মা?”

কমলিমা উৎকণ্ঠায় বলে উঠলেন, “কেন কার কী হয়েছে?”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত ধরে বলল, “বালাই ষাট, কারও কিছু হয়নি। কিন্তু ওদিন যদি কেউ চোট-আঘাত পায় – বড়্‌বলা তাদের চিকিৎসা করবে আর তুই করবি সেবা...পারবি না, মা?”

কমলিমা বললেন, “তা করব না কেন? আমার আর কাজ কি? কিন্তু এই ঘরে তাদের রাখবি কী করে?”

ভল্লা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল, “এ ঘরে নয় মা। এখান থেকে একটু দূরে আমাদের নতুন পাকা বড়ো বড়ো ঘর হয়েছে। অমাবস্যার দিন তোকে নিয়ে যাবো মা, সেখানেই আমরা সবাই মিলে কয়েকদিন থাকব”।

“আমার ছেলেদের সঙ্গে আমি সর্বদাই জুড়ে থাকব, ভল্লা, ভাবিস না। এখন উঠি – রাত হল অনেক...রান্না বসাই...”।

“আচ্ছা, আরেকটা কথা বলে রাখি মা, কাল থেকে আমাদের এখানেও পাকা ঘর বানানোর কাজ শুরু হবে। কাল সকালে কুলিকপ্রধান আসবে তার লোকজন নিয়ে। কোন অসুবিধে হবে না তো?”

“এখান থেকে একটু সরে করতে বলিস – হই-হট্টগোল আমার ভাল লাগে না। আর তারাও সবাই পুকুরে যাবে তো?” কমলিমা একটু উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো যাবেই। কিন্তু ভাবিস না মা, ওদের বলে দেব। তোকে ওরা বিরক্ত করবে না”।

 

ভল্লা মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওদিকের কী খবর?”

“বীজপুর থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আজ রাতে রওনা হচ্ছে। আশা করি কাল রাত্রে আমাদের ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। কিন্তু উপানু শালা কাঠি করতে শুরু করেছে। আজ সকালে শষ্পকের কাছে গিয়ে নাকি বলেছে, ওর কাছে খবর এসেছে, চারখানা গোশকট বোঝাই অস্ত্র-শস্ত্র, বীজপুরের পাশে জঙ্গলের মধ্যে রাখা আছে। কোন এক বণিক – তার নাম জানে না – আমাদের রাজধানী থেকে ওগুলো কিনে এপথে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝে দ্যাখ, ভল্লা, হতভাগার আড়কাঠি সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে”।

“তা তো থাকবেই। আমাদেরও তো আছে – কিন্তু শুনে শষ্পক কী বলল?”

“শষ্পক আমাকে যা বলল, ওকে জিজ্ঞাসা করেছে,

“তোমার লোক বণিকের মোহর-পত্র দেখেছে?”

“দেখেছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু বণিক নিজে তো সঙ্গে নেই, আছে তার করণিক আর রক্ষীদল”।

“মোহর-পত্র যদি ঠিক থাকে, তোমার - আমার মাথাব্যথা কিসের? রাজধানী বুঝবে আর বুঝবে সেই বণিক”।

“তা ঠিক কিন্তু...”।

“কিচ্ছু কিন্তু নেই, উপানু। আমি এই আস্থান আর ওই দুই গ্রাম নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছি। আর বিপদ ডেকে এনো না””।

ভল্লা বলল, “শষ্পক তো ঠিকই করেছে। কিন্তু উপানু হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ওর সেই চরটাকে খুঁজে বের করতে পারবি?”

“পারবো। বীজপুরের জনাই – আর ওই বণিকের রক্ষীসর্দার – ওদের থেকেই ব্যাটার সব তত্ত্ব জেনে নেব – তারপর ধরতে আর কতক্ষণ”?

“তবে আর কি? যা করার করে ফ্যাল। আর উপানুর আয়ু তো অমাবস্যা অব্দি, তাই তো রামালি?”

“ওই রাতের পর উপানুর আর বাঁচার কোন আশাই নেই – আমরা কমলিমায়ের আশীর্বাদ পেয়েছি, ভয় কি?”

কমলিমা রান্না করতে করতে বললেন, “ভল্লা, আমার রান্নার ভাঁড়ার কিন্তু বাড়ন্ত – বড়ো জোর দু একদিন চলবে...”।

ভল্লা হেসে বলল, “ভাবিস না মা, কাল ভোরে উঠেই দেখবি, তোর ঘরের দরজার সামনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাখা আছে”।

ভল্লা মারুলাকে বলল, “বটতলির ছেলেদের তাহলে, পরশু সকাল সকাল পাঠাব – অস্ত্র-শস্ত্র আনার জন্যে?”

“পরশু সকালে? ঠিক আছে – বলে রাখব। ও হ্যাঁ, বটতলির ছেলেদের গয়না-পত্র বিক্রি হয়ে বীজপুর থেকে টাকা চলে এসেছে। কত টাকা, শুনলে চমকে যাবি”।

“কত?”

“তিনশ চল্লিশ রূপোর মুদ্রা!”

“বলিস কী? বটতলির ছেলেগুলোকে খুব হাল্কাভাবে নিয়েছিলাম – কিন্তু এখন দেখছি বেশ কাজের তো?”

“সে আর বলতে? আচ্ছা, কাল দুপুরে রামালি যাচ্ছিস তো? আর ভল্লা যাচ্ছিস বিকেলের দিকে, তাই তো?”

“হ্যাঁ রামালি দুপুরে খেয়ে সোজা চলে যাবে – আমি মাকে আর ছেলেদের নিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে যাবো”।

কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাকে নিয়ে কোথায় যাবি? কালকেই নতুন ঘরে চলে যাবি নাকি?”

“না রে মা, কালকে গিয়ে তুইও একবার দেখে নে। তোর প্রয়োজন মত, কোথায় কী করতে হবে বলে দিবি। তারপর সন্ধেতেই আমরা ফিরে আসব। তারপর অমাবস্যার বিকেলে আমরা সবকিছু নিয়ে চলে যাবো – কিছুদিনের জন্যে আমরা ওখানেই থাকব”।       

মারুলা বলল, “কিন্তু কমলিমাকে নিয়ে তোরা হেঁটে যাবি নাকি?”

ভল্লা বলল, “সে চিন্তা তোকে করতে হবে না, সে মা জানে… তোকে একটা কথা বলে রাখি – সবই তো শুনলি মায়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে – আক্রমণের দিন আমরা সবাই সবাইকে ‘জুজাক’ বলে ডাকব – কারো কোন নাম থাকবে না। তুই, আমি, রামালি সবাই জুজাক – জুজাকদাদাও নয় – ঠিক আছে?”

মারুলা বলল, “ঠিক আছে

মারুলার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে বণিক অহিদত্তের ডাক শোনা গেল, “ভল্লামশাই রয়েছেন নাকি?”

“রয়েছি - চলে আসুন বণিকমশাই, আপনার রক্ষীদের বলুন আমাদের বাসাটা ঘিরে থাকুক – কেউ যেন কাছে না আসতে পারে…” ভল্লা গলা তুলে সাড়া দিল।

অহিদত্ত উঠোনে এসে একটু চমকে গেলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “কমলিমা না? বাঃ খুব ভালো করেছেন। ছেলেগুলোর মাথার ওপরে একজন মা থাকলে – ওদের শক্তি বেড়ে যাবে”।

ভল্লা বলল, “এখানে বসুন বণিকমশাই। তারপর পরিস্থিতি কী বলুন”।

ভল্লার পাশে বসে বণিকমশাই বললেন, “এমনিতে সবই ঠিক আছে, বার্তা পেলাম বীজপুর থেকে আমাদের শকট রওনা হয়ে গেছে –  ওখান থেকে নতুন বলদ জুড়েছে, বেশ তাড়াতাড়িই টানবে মনে হয়। বলছে আগামীকাল দুপুরের আগেই... কিন্তু একটা আপদ এসে জুটেছে...এঁটুলির মতো”।

মারুলা বলল, “কোন ফেউ পিছু নিয়েছে?”

অহিদত্ত ভল্লার দিকে তাকালেন, ভল্লা বলল, “আমারই ভুল – আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি – ও হচ্ছে মারুলা – আমরা একসঙ্গেই...”

ভল্লার কথা শেষ করতে না দিয়ে অহিদত্ত বললেন, “মারুলামশাই – বিলক্ষণ রাজধানীতে আপনার কথাও বলেছে – আপনিই নাকি সবদিক দেখা শোনা করবেন। নমস্কার।”

মারুলাও নমস্কার করে বলল, “আপদটা কি?”

“আর বলবেন না, বীজপুরে ঢোকা থেকে কে একটা লোক আমাদের লোকগুলোর পিছনে পড়ে গেছে, মোহর-পত্র দেখেছে। জিগ্যেস করছে কোথায় যাবে, বণিকের নাম কী, এত অস্ত্র-শস্ত্র কী হবে...হাজারটা প্রশ্ন”।

“ও কি সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে?” মারুলা জিজ্ঞাসা করল।

“না – একটু পিছনে – নাগাড়ে অনুসরণ করে চলেছে...আমাদের রক্ষীরা কিছু করতেও পারছে না, অচেনা-অজানা – কার লোক কে জানে?”

মারুলা ভল্লার দিকে তাকাতে, ভল্লা ঘাড় নাড়ল – তারপর বলল, “ঠিক আছে ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, বণিকমশাই। আপনার সঙ্গে লোকজন আছে তো? শকট খালি করে ভাণ্ডারে ঢোকাতে বেশ কিছু লোক লাগবে কিন্তু...”।

“লোক সঙ্গেই আছে, ওরা খালি করে শকট নিয়ে ফিরে যাবে। আর আছে আটজন সশস্ত্র রক্ষী, একজন করণিক, তার একজন সহকারী, আর চারজন ভৃত্য। ভাণ্ডারে সব কিছু ঢুকে গেলেই দরজায় তালা পড়ে যাবে - সকলে নিজের নিজের কাজ সামলাবে...”।

ভল্লা বলল, “বাঃ ব্যবস্থা তো ভালোই... আগামীকাল ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে নিশ্চিন্ত। ও আরেকটা কথা বণিকমশাই – আমাদের মায়ের রান্নার ভাণ্ডার প্রায় শেষ হতে চলল, আজ রাত্রে অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার এসে যাবে তো?”

অহিদত্ত বললেন, “হ্যাঁ আজ ওর আসার কথা তো, নিশ্চয়ই দিয়ে যাবে...”

“আরেকটা অনুরোধ – অমাবস্যার রাতে আমাদের একটা বড়ো কাজ আছে – ওই দিন থেকে আমরা বেশ কিছুদিন অস্ত্র ভাণ্ডারেরই একটা ঘরে সবাই থাকব – প্রায় চল্লিশজন – তাদের পেটের সমাধানটাও আপনাকেই করতে হবে... অমাবস্যার আগেই। কোন ঘরে রাখতে হবে মারুলা, করণিকবাবুকে বুঝিয়ে দিস”।

“অনুরোধ বলবেন না ভল্লামশাই – আপনি আমার থেকে কোনদিন কোন সাহায্যই নেননি – দু মণ তুলো আর দু’মণ বাদামের বীজ দিয়েছিলাম – তার মূল্যও আপনি পাই-পয়সায় মিটিয়ে দিয়েছেন...আমার কাছে আপনার যা মুদ্রা এখনও জমা আছে...তাতে চল্লিশজনের মাসখানেকের খাদ্যের সংস্থান হয়ে যাবে...ও নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমি বণিক - এটাই আমার কাজ”।

“ঠিক আছে, বণিকমশাই। এরপর আমাদের সময় করে একদিন বসতে হবে – কিন্তু সেটা ওই অমাবস্যার পরেই কোন একদিন – আপনাকে সংবাদ দেব। আমরা চারজন – আপনি, মারুলা, রামালি এবং আমি বসে দর-মূল্য সব ঠিক করে নেব – ওই দিন আদান-প্রদানও সেরে নেব...”।

অহিদত্ত অবাক হয়ে বললেন, “বলছেন কী ভল্লামশাই, আদান-প্রদানও...”।

ভল্লা মৃদু হেসে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল, “এখন আর কোন কথা নয়”।

        অহিদত্ত হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আমি এখন আসি। কমলিমা, প্রণাম নেবেন। চললাম, দেখা হবে     আবার"। 


চলবে... 


সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৫ "]


৫.৫.১ সমুদ্র মন্থন

ভগবান শিবের এই দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করার রুদ্র রূপই একমাত্র রূপ নয়। তাঁর অন্য আরেকটি রূপ ভীষণ সহজ, সরল, অনাড়ম্বর এবং উদাসীন তপস্বীর মঙ্গলময় রূপ। অমৃত লাভের জন্যে দেবতা ও অসুররা সম্মিলিত হয়ে, সমুদ্রমন্থন শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের থেকে অতি উৎকট হলাহল উঠে এল। সেই হলাহলের তীব্র তেজে দেবতা, অসুর এবং লোকপালেরা সকলেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁদের রক্ষার জন্যে সকলেই দেবাদিদেব মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন। মহেশ্বর তখন কৈলাসে দেবীর সঙ্গে তপস্যা করছিলেন। দেবতাদের প্রার্থনা শুনে তিনি পত্নী ভবানীকে বললেন, “কী দুশ্চিন্তার বিষয়, সমুদ্র মন্থনে উদ্ভূত কালকূট প্রজাদের ঘোর দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রজাগণ নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এদের অভয় দেওয়াই আমার বিধেয়, যেহেতু যিনি সমর্থ, দীনজনকে রক্ষা করাই তাঁর একান্ত কর্তব্য। অতএব এই বিষ আমিই পান করব”। দেবী ভবানী পতি মহেশ্বরের সাধ্যের কথা জানতেন, তাই আপত্তি করলেন না। তখন দেবাদিদেব সমস্ত হলাহল পান করলেন এবং বিষের তীব্র তেজে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে গেল। যদিও সেই বিষ তাঁর আর কোনও ক্ষতি করতে পারল না। সেই থেকেই তাঁর আরেক নাম হল নীলকণ্ঠ। পান করার সময়, তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে কিছু বিষ মাটিতে পড়েছিল, সেই ছিটেফোঁটা বিষ পান করেই, সাপ, বৃশ্চিক, শৃগাল, কুকুর এবং কিছু লতা-গুল্ম বিষধর হয়ে উঠেছিল।

এরপর সমুদ্রমন্থন থেকে একে একে নানান ঐশ্বর্যের উদ্ভব হতে লাগল। যেমন, সুরভি নামের কামধেনু, ব্রহ্মবাদী ঋষিরা তাঁকে গ্রহণ করে তাঁদের গোয়ালে বেঁধে ফেললেন। শ্বেতবর্ণ এক ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবা, দেবরাজ ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের ঘোড়াশালে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। ঐরাবত নামের হাতি, সঙ্গে আটটি হস্তিনী- কেউ গ্রহণ করলেন কিনা, মহাভারত থেকে জানা যায় না। কিন্তু অন্য পুরাণ মতে ঐরাবত দেবরাজ ইন্দ্রই কুক্ষিগত করে নিজের পিলখানায় বেঁধে ফেলেছিলেন। কৌস্তুভ নামের পদ্মরাগ রত্ন, ভগবান বিষ্ণু গ্রহণ করলেন। পারিজাত বৃক্ষ, ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের বাগানে রোপণ করলেন। সোনার অলংকারে ভূষিতা অপ্সরাগণ, তাঁদেরও ইন্দ্র স্বর্গে নিয়ে গেলেন। এরপর আবির্ভূতা হলেন লক্ষ্মীদেবী, তিনি নিজেই ভগবান বিষ্ণুকে আশ্রয় করলেন। এরপর সুরার দেবী বারুণী আবির্ভূতা হলেন, ভগবান বিষ্ণুর অনুমতি নিয়ে অসুররা তাঁকে গ্রহণ করলেন। এরপরেই অমৃতপূর্ণ কলস হাতে আবির্ভূত হলেন, আয়ুর্বেদ পারদর্শী ধন্বন্তরি। অতএব সমুদ্রমন্থনে লব্ধ এত ঐশ্বর্যের মধ্যে ভগবান শিবের ভাগে জুটেছিল তীব্র বিষ, কারণ অমৃতের ভাগ তো, পৌরাণিক মতে, দেবতাদের সকলেই পেয়েছিলেন। এমন উদাসীনতা আর কোন হিন্দু দেবতার মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না।  

৫.৫.২ শিবের পূজা

মহাভারতে শিবের রূপ নিয়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখ আছে। ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে, দেবাদিদেব শিবের বর্ণনায় বলেছেন, “ত্রিপুরারি মহাদেব - বৃষ তাঁর বাহন, তিনি নীলকণ্ঠ, শূল ও পিনাকধারী এবং কৃত্তিবাস” (সভা/৪৫)। মহারাজ সগর পুত্রকামনায় কৈলাস পর্বতে গিয়ে তপসা করেছিলেন এবং সেখানে ভবানীপতি শূলপাণীর থেকে পুত্রলাভের বর লাভ করেছিলেন (বন/১০৬)। মহাদেবের থেকে পাশুপত অস্ত্র লাভের জন্যে অর্জুন হিমাচলের দুর্গম এক পাহাড়ে দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন। অর্জুনের তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব কিরাতের বেশে অর্জুনের সঙ্গে প্রথমে অস্ত্রযুদ্ধ পরে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হন। সে যুদ্ধে যদিও অর্জুনের পরাজয় হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরাক্রমে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে, নিজের পরিচয় জানালেন এবং পাশুপত অস্ত্র দান করলেন। তারপর এই অস্ত্রের প্রয়োগ ও নিরোধের বিধি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞ অর্জুন মহাদেবের স্তবে বলেছিলেন, “হে মহাদেব, হে নীলকণ্ঠ, হে জটাধর, হে ত্র্যম্বক (ত্রিলোচন), হে বিষ্ণুরূপ শিব, হে শিবরূপ বিষ্ণো, হে শূলপাণে, হে পিনাকধারিণ, হে মার্জ্জালীয়[1], আপনাকে প্রণাম” (বন/১৩৯)। মহাভারতে ব্যাসদেব অর্জুনের কাছে মহাদেবের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “তিনি রুদ্র, নীলকণ্ঠ, করাল, পিঙ্গলাক্ষ, কপর্দ্দী (জটাধারী), উগ্র। তিনি দিক্‌পতি, পর্জন্যপতি, ভূতপতি, বৃক্ষপতি, গোপতি, বিশ্বপতি। তিনি ধর্মাত্মা, মহেশ্বর, মহোদর, দ্বীপীচর্মবাস (বাঘছাল বসন), ত্রিশূলপাণি, পিনাকী, খড়্গ-চর্মধারী। তিনি ত্রিপুরঘ্ন, ভগনেত্রঘ্ন, বনষ্পতির পতি, নরগণের পতি, মাতৃগণের পতি, গণপতি, গোপতি, যজ্ঞপতি, দেবপতি। তাঁকে বিনীত নমস্কার কর। তাঁর অনেক পার্ষদ আছেন, তাঁরা বামন, জটিল (জটাধারী), মুণ্ডী (নরমুণ্ডধারী), হ্রস্বগ্রীব, মহোদর, মহাকায় প্রভৃতি বিকৃত বেশধারী, বিকৃত মুখ, বিকৃত পা প্রাণী” (দ্রোণ/ ২০৩)।

মহাভারতের প্রধান চরিত্রদের অনেকেই শিবভক্ত এবং মহাদেব শঙ্করের আরাধনা করতেন, যেমন দ্রৌপদী, অর্জুন, জরাসন্ধ প্রমুখ। জরাসন্ধ যখন নরবলি দিয়ে রুদ্রযজ্ঞের আয়োজন করছিলেন, সেই সময়েই কৃষ্ণের নির্দেশে ভীম তাঁকে হত্যা করেন। কৌরব প্রাসাদের দেবমন্দিরে মহাদেবের উপাসনা কে করবেন, সে নিয়ে রাণি গান্ধারী ও রাণি কুন্তীর মধ্যে নাকি বিবাদ হয়েছিল। রাজা সগর, জয়দ্রথ, অম্বা, দ্রুপদরাজা, সোমদত্ত, অশ্বত্থামা এবং স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণও শাল্ব রাজার রাজধানী সৌভনগর ধ্বংস করতে যাওয়ার আগে শিবের উপাসনা করেছিলেন।  

৫.৫.৩ শিবমূর্তি

শিবের বহু মূর্তিপূজার প্রচলন থাকলেও, সব থেকে প্রাচীন এবং আজও সব থেকে পূজিত হয়, তাঁর প্রতীক “লিঙ্গ”। যতদূর প্রমাণ পাওয়া যায় এই লিঙ্গপূজা, সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। এই লিঙ্গের বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার শহরগুলির প্রত্নখননে। লিঙ্গ প্রজননের প্রতীক। প্রচুর শস্য, সন্তান, পশু এবং সমৃদ্ধির আশায় ভারতীয় সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই লিঙ্গ পূজার বহুল প্রচলন। এবং প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনকাল থেকে লিঙ্গপূজার মতো সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা হিন্দুধর্মের আর কোন দেবতার ভাগ্যে জোটেনি।

বিবিধ লিঙ্গ এবং তার মহিমার কথা সবিস্তারে জানা যায়, “তপোভূমি নর্মদা” গ্রন্থে,

যেমন – “সাধারণতঃ আমরা শিবলিঙ্গ দেখলেই তাঁকে বাণলিঙ্গ আখ্যা দিই। কিন্তু বাণলিঙ্গের অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন, রৌদ্রলিঙ্গ, শিবনাভিলিঙ্গ, দেবলিঙ্গ, আর্ষলিঙ্গ, আগ্নেয়লিঙ্গ, নৈঋতলিঙ্গ, বারুণলিঙ্গ, বায়ুলিঙ্গ, কুবেরলিঙ্গ, বৈষ্ণব লিঙ্গ, ইত্যাদি। এছাড়া যে কোন শিবলিঙ্গের মধ্যে জ্যোতির প্রকাশ থাকলে তাকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলা হয়”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৮২)।

এই বাণলিঙ্গের সৃষ্টি সম্পর্কে যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতায়, স্বয়ং মহেশ্বর দেবী পার্বতীকে বলছেন, “বাণাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বর দিয়েছিলাম যে (ধাবড়ি কুণ্ডে) পর্বত ও নর্মদার জলস্রোতে বিঘূর্ণন ও বিঘর্ষণে আমি লিঙ্গরূপে সতত নর্মদার জলে বিরাজমান থাকব। শত সহস্র লিঙ্গের মধ্যে যেগুলির আকৃতি পাকা জাম বা হংস ডিম্বের মতো হবে, বর্ণ হবে পাকা জামের মতো কিংবা মধুবর্ণ, শ্বেত, নীল ও মরকতের মত দ্যুতিসম্পন্ন সেইগুলিকেই বাণলিঙ্গ বলে জানবে”। পুরাণের কাহিনী থেকে জানা যায়, নর্মদার তীরেই ছিল বলিরাজার পুত্র বাণাসুরের সাম্রাজ্য। সাতপুরা পর্বতের শিখরদেশে ছিল তাঁর রাজধানী”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৯১)।  

পরবর্তী কালে এই লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যোনি, যাকে গৌরীপাট বা গৌরীপট্ট বলে। উদ্দেশ্য একই ভগবান শিব ও ভগবতী গৌরীর ঐশী মিলনে ভক্তদের গোলা ভরে উঠুক শস্যে, ঘরের উঠোনে খেলে বেড়াক সুস্থ সন্তানেরা। গোয়ালে বেড়ে উঠুক সবৎসা গাভী। প্রজনন মানেই সুখ, সম্পদ ও সমৃদ্ধি। ভগবান শিবের মন্দিরের মধ্যে সব থেকে পবিত্র মনে করা হয় দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। আজও হিন্দুদের মধ্যে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের তীর্থদর্শন খুবই পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। এই বারোটি মন্দিরের অবস্থান, সোমনাথ (গুজরাট), মল্লিকার্জুন (অন্ধ্র), মহাকালেশ্বর (উজ্জয়নী), ওঙ্কারেশ্বর (মধ্যপ্রদেশ), কেদারনাথ (উত্তরাখণ্ড), ত্র্যম্বকেশ্বর (মহারাষ্ট্র), রামনাথস্বামী (তামিলনাড়ু), কাশী বিশ্বনাথ (উত্তরপ্রদেশ), ইলোরার ঘুস্মেশ্বর (মহারাষ্ট্র), বৈদ্যনাথ (ঝাড়খণ্ড), দ্বারকার নাগেশ্বর (গুজরাট), ভীমশংকর (মহারাষ্ট্র)।

দক্ষিণ ভারতে শিবের নটরাজ মূর্তি পূজার বহুল প্রচলন আছে। দক্ষিণ ভারতীয় শিবভক্তদের বিশ্বাস, মহাদেবের হিমালয়ে কৈলাস পর্বতের আবাস ছাড়াও দক্ষিণ ভারতেও তাঁর আবাস আছে। সেটি হল চিদম্বরম মন্দির বা তিল্লই মন্দির – পুদিচ্চেরি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দক্ষিণে, সমুদ্র উপকূলের কাছে। চিদম্বরম (চিৎ+অম্বরম) শব্দের অর্থ মনের আকাশ বা চেতনার আকাশ, দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির মধ্যে স্থাপত্য সৌন্দর্যে এই মন্দির অন্যতম প্রধান। এখানে মহাদেবের নটরাজ মূর্তি পূজিত হয়। এই মন্দিরের দেওয়ালে নটরাজের যে ১০৮টি নৃত্যভঙ্গি খোদিত আছে, সেগুলির বর্ণনা ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়। এই ভঙ্গীগুলি থেকেই বিখ্যাত ভারতনাট্যম নৃত্যের সৃষ্টি। 

প্রাচীন অনার্য ভারতীয়দের পূজিত আরেকটি দেবমূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে, সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নখননে। শিং-ওয়ালা মুকুট মাথায় এক দেবমূর্তি, যাঁর আশেপাশে বেশ কয়েকটি সজীব প্রাণীর মোটিফ। অনুমান করা হয় ইনি ভগবান শিবের আদিম সংস্করণ, পশুপতিদেব। একটু অন্যরকম পশুপতির মূর্তি পাওয়া গেছে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতেও। সে মূর্তি চতুর্ভুজ, একহাতে বরাভয় বা আশীর্বাদ, অন্য হাত মুক্ত যেন বরদানে উদ্যত, তৃতীয় হাতে একটি কুঠার আর চতুর্থ হাত থেকে লাফিয়ে উঠছে ছোট্ট একটি হরিণশাবক।



[1] শব্দকোষে মার্জ্জালীয় শব্দের অর্থ বলছে, ১. মার্জ্জার, ২. কিরাত বা শুদ্ধদেহ, ৩. শূদ্র। (মহাদেব কী তাহলে শূদ্র কিরাতের ছদ্মবেশে নয়, নিজের স্বাভাবিক বেশেই অর্জুনের সঙ্গে লড়াই করলেন? তা না হলে, অর্জুন তাঁকে সাক্ষাৎ মহাদেব জেনেও, তাঁর কিরাত বা শূদ্র রূপেরও সম্বর্ধনা করলেন কেন

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১১

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...