সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৬ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৭


৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস (পূর্ববর্তী পর্বের শেষাংশ)

    যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা "শেষাংশ)

“প্রিয়বাক্য বললে কী লাভ হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে, বহুমিত্র হলে কিংবা ধর্মে অনুরাগী হলেই বা কী কী লাভ হয়?”

“প্রিয়বাদী সকলের প্রিয় হয়, বিবেচনা করে কাজ করলে ব্যক্তি অনেকবেশী লাভ করতে পারে, বহুমিত্র হলে, ব্যক্তি সতত আনন্দে থাকে এবং ধর্মানুরাগী হলে সদ্গতি লাভ হয়”।

“সুখী কে? আশ্চর্য কী? পথ এবং বার্তাই বা কী? এই চার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে, তোমার ভাইয়েরা আবার বেঁচে উঠতে পারেন”।

যুধিষ্ঠির বললেন, “যিনি অঋণী ও অপ্রবাসী হয়ে, দিনের পঞ্চম বা ষষ্ঠভাগে, নিজের গৃহে শাক-অন্ন আহার করেন তিনিই সুখী। প্রাণীগণকে প্রতিদিন মারা যেতে দেখেও, জীবিত ব্যক্তিরা নিজেদের চিরজীবন আশা করে, এর থেকে আশ্চর্য আর কী হতে পারে? তর্কের সীমা নেই, বেদ ও স্মৃতির মত বিভিন্ন। মুনি একজন নয়, যে তাঁর মতই একমাত্র, আর ধর্মের অজস্র তত্ত্ব জ্ঞানের গুহায় মিলিয়ে যায়। অতএব মহাজনেরা যে পথে গমন করেছেন, সেই পথই পথ। সূর্যরূপ কাল (সময়)-এর আগুনে, দিন-রাত্রিস্বরূপ ইন্ধন জ্বালিয়ে, মহামায়ার কড়াইতে ঋতু ও মাস-স্বরূপ হাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে, প্রাণিদের যে সর্বদা রন্ধন করা হয়, সেটাই হল বার্তা”।

যক্ষ বললেন, “হে রাজন, এখনও পর্যন্ত তুমি আমার সকল প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিয়েছ। এখন বল, পুরুষ কে এবং সকলের মধ্যে ধনী কে?”

“পুণ্যকর্ম দিয়ে যখন স্বর্গ স্পর্শ করা যায়, তখনি মানুষের যশ এই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে, সেই যশ যতদিন থাকে, ততদিন সেই পুণ্যকর্মা ব্যক্তিকে পুরুষ বলে বিবেচনা করা হয়। যে ব্যক্তি অতীত বা ভবিষ্যতের সুখ-দুঃখ ও প্রিয়-অপ্রিয়কে সমান মনে করেন, তিনিই সকলের মধ্যে ধনী”।

যক্ষ এবার বললেন, “হে রাজন, এখন আমি তোমার ইচ্ছামতো তোমার একজন ভাইকে জীবিত করব, বল সে কোন ভাই?”

যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, ওই শ্যামকলেবর, লোহিত-লোচন, বিশালবক্ষ, মহাবাহু নকুল জীবিত হয়ে উঠুক”।

যক্ষ আশ্চর্য হয়ে বললেন, “হে রাজন, তুমি দশ-হাজার হাতির তুল্য বলশালী প্রিয় ভীম কিংবা পাণ্ডবদের প্রধান আশ্রয় ধনঞ্জয়কে ছেড়ে, বিমাতার পুত্র নকুলের কথা কেন বললে?”

যুধিষ্ঠির বললেন, “ধর্মকে নষ্ট করলে, ধর্মও আমাদের নষ্ট করবেন এবং তাঁকে রক্ষা করলে, তিনিও আমাদের রক্ষা করবেন। অতএব আমি কখনও ধর্ম পরিত্যাগ করব না, ধর্মও আমাকে যেন কখনো পরিত্যাগ না করেন। হে যক্ষ, আনৃশংস্য[1]ই পরমধর্ম, আমি সর্বদাই আনৃশংস্য অবলম্বন করতে চাই। সকলে আমাকে ধর্মশীল বলে জানেন, অতএব আমি কোনক্রমেই স্বধর্ম ত্যাগ করতে পারব না। কুন্তী ও মাদ্রী দুজনেই আমার জননী। উভয়েই পুত্রবতী হয়ে থাকুন, এই আমার অভিলাষ। আমার পক্ষে দুজনেই সমান, অতএব আপনি নকুলকে জীবিত করে, দুজনকেই পুত্রবতী রাখুন”।

যক্ষ বললেন, “হে রাজন, আপনি অর্থতঃ এবং কামতঃ আনৃশংস্যপরায়ণ, এই কারণে আপনার সকল ভাইই আবার জীবিত হোক”। যক্ষের কথা অনুযায়ী, পাণ্ডবদের সকলেই গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো উঠে বসলেন। তখন রাজা যুধিষ্ঠির যক্ষকে বললেন, “আপনাকে যক্ষ বলেও মনে হয় না, আপনি কোন মহাপুরুষ হবেন। আপনি বসু, রুদ্র কিংবা মরুৎগণের মধ্যে প্রধান কেউ, অথবা দেবরাজ ইন্দ্র হবেন। নচেৎ এমন ঘটনা অসম্ভব। এই ভূমণ্ডলে এমন যোদ্ধা নেই, যে আমার এই রণকুশল ভাইদের পরাভূত করতে পারে। তাছাড়া ভাইয়েরা যেভাবে সুস্থ এবং স্বচ্ছন্দে জেগে উঠেছে, তাতে তাদের কোনরকম চোট বা আঘাতের লক্ষণ নেই। আমার মনে হয় আপনি আমাদের সুহৃৎ, আমাদের পিতৃসম”।

যক্ষ এবার স্মিতমুখে বললেন, “বৎস, আমিই তোমার পিতা, ভীমপরাক্রম ধর্ম, তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। হে যুধিষ্ঠির, তুমি আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র, তুমি পঞ্চযজ্ঞে[2] একান্ত অনুরক্ত হয়েছ এবং সকল পাপের কারণ, কাম, ক্রোধ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে পরাজিত করেছ। আমি তোমাকে পরীক্ষা করার জন্যেই এখানে এসেছিলাম, এখন তোমার ধর্মজ্ঞানে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার মঙ্গল হোক, এখন আমি তোমাকে বর দিতে চাই”।

এরপর রাজা যুধিষ্ঠির যেমন যেমন বর চেয়েছিলেন, তাঁর পিতা যক্ষরূপী ধর্মদেব সবগুলিই অনুমোদন করলেন, তারপর সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

ওপরে স্বয়ং ধর্মদেব এবং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের আলোচনায় ধর্ম বলতে প্রচুর ঘৃতাহুতি ও বেদোচ্চারণ করে বিশাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান এবং তারপর বিপুল দান-টান করে স্বর্গবাস সুনিশ্চিত করার প্রকরণ বলে মনে হল না। যজ্ঞ-টজ্ঞ নিয়ে দু চার কথা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা গৌণ, মুখ্যতঃ ধর্ম বলতে যা বুঝলাম, সংসার, সমাজ, প্রতিবেশী, গুরুজন, স্বজন-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব সকলের সঙ্গে সদাচরণ, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে সদ্ভাব বজায় রেখে চলা। একথা ভগবান বুদ্ধ, সম্রাট অশোকও বলেছিলেন, তাঁদের আমরা “বুদ্ধু” বলেছি, বলেছি “নির্বোধ”। কারণ এই ধর্ম আচরণে সমাজের পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ শ্রেণীর স্বার্থ সিদ্ধি হয় না। তাঁদের স্বার্থসিদ্ধির প্ররোচনায়, আমরাই “বুদ্ধু” এবং “নির্বোধ”-এর মত, ধর্ম নিয়ে প্রতিবেশী, সমাজ, বন্ধুজনের প্রতি আনৃশংস্যতার পরিবর্তে নৃশংস হয়ে উঠেছি বহুকাল। ধর্মের নামে আমরা কবেই খুইয়ে বসেছি আমাদের মানবধর্ম।         

৫.২.৩ বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য দেব-দেবী

বৈদিক দেব-দেবীদের কথা আগে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি। এখন আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

ঋগ্বেদে প্রাক-বৈদিক দেবতাদের আবির্ভাব বা অভ্যুদয়ের পর্যায়গুলি ভীষণ সুন্দর ও মানবিক। আর্য ঋষিরা উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে, এই দেশের অপরূপ মহিমা ও সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। উত্তরে সুউচ্চ তুষারাবৃত মৌন গম্ভীর হিমালয়ের পর্বত শ্রেণী। স্রোতস্বীনি অজস্র নদী ও আশ্চর্য তাদের বিস্তার। নদীগুলির অববাহিকায় চিরহরিৎ অরণ্য এবং কিছু কিছু অঞ্চলে অনার্যদের সবুজ বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র। রুক্ষ, দুর্গম, সুদীর্ঘ পার্বত্য পথ পার হয়ে, এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে পৌঁছে, তাঁরা শুধু অভিভূতই হলেন না, মনের মধ্যে অনুভব করলেন, আশ্চর্য প্রশান্তি, স্নিগ্ধ পূর্ণতা এবং অভূতপূর্ব মুগ্ধতা। তাঁরা একদিকে যেমন অসাধারণ কাব্যিক শ্লোক রচনা করেছিলেন, তেমনই প্রকৃতির এই অদ্ভূত ঐশ্বর্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিস্ময়ে তাঁরা মগ্ন হলেন দেবত্বের কল্পনায়।  ঊর্ধের আকাশ – দ্যু, পায়ের নীচের পৃথিবী –পৃথ্বী। দিনের আকাশের দেবতা উজ্জ্বল সূর্য, তিনি জগতের প্রাণ, তিনি মিত্র। আর নৈশ বা নীল আকাশের দেবতা বরুণ। প্রাচীন বৈদিক দেবতার ধারণায় মাত্র এই কয়েকজনই ছিলেন, তাঁদের পূজার রীতি সহজ সরল, সঙ্গীতময় কিছু মন্ত্রের উচ্চারণ।

এর পর বৈদিক ঋষিরা অনুভব করলেন, অনন্ত এবং অসীমের ধারণা, যার প্রকাশ দ্যু ও পৃথ্বী রূপে। এই অসীম হলেন অদিতি, যিনি সকল দেবতাদের মাতা, তাঁর পুত্রেরাই আদিত্য। অদিতি শব্দের মূল অর্থ অবিচ্ছিন্ন, অবিভাজ্য এবং অসীম। এই অসীম দৃশ্যতঃ অসীম, যতদূর চোখ যায় অসীম আকাশ, হিমালয়ের অসীম বিস্তার, অসীম অরণ্য ও তৃণক্ষেত্র। অসীমের এই সংজ্ঞা থেকে, মহাবিশ্বকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে, ঊর্ধতম স্তরের নাম দ্যুলোক, নিম্নতম স্তরের নাম ভূর্লোক এবং এই দুই লোকের মাঝখানে রয়েছে অন্তরীক্ষলোক। এই তিন লোকের প্রধান দেবতারা হলেন, সবিতৃ বা সূর্য দ্যুলোকের, ইন্দ্র বা বায়ু অন্তরীক্ষলোকের এবং অগ্নি হলেন ভূর্লোকের দেবতা। এই তিনদেবতাকে আবার তেত্রিশজন দেবতায় ভাগ করা হয়েছিল। অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, দ্যু এবং পৃথ্বী।

 ক) দ্বাদশ আদিত্য – দ্যুলোকের দেবতা

ঋগ্বেদে আদিত্য ছজন, মিত্র, অর্যমা, ভগ, বরুণ, দক্ষ, অংশ।

অথর্ব বেদে ও তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে এঁরা আটজন– মিত্র, বরুণ, অর্যমা, অংশ, ভগ, ধাতা, ইন্দ্র ও বিবস্বান।

শতপথ ব্রাহ্মণের মতে দ্বাদশ আদিত্য হলেন, ধাতৃ, মিত্র, অর্যমান, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বত, পূষণ, সবিতৃ, ত্বষ্টা এবং বিষ্ণু।  শতপথ ব্রাহ্মণে এই বারো জন আদিত্য, বারোমাসের দেবতা।

হরিবংশ পুরাণে আদিত্যের বর্ণনা একটু আলাদা রকম, - ঋষি ত্বষ্টার কন্যা সংজ্ঞা, সূর্যের প্রচণ্ড তেজ সহ্য করতে না পারায়, কন্যার প্রতি স্নেহবশতঃ, ত্বষ্টা সূর্যকে বারোটি খণ্ডে বিভক্ত করেন, বারো মাসে বারোটি আদিত্য-সূর্যের উদয় হয়, যেমন মাঘে অরুণ, ফাল্গুনে সূর্য, চৈত্রে বেদজ্ঞ, বৈশাখে তপন, জৈষ্ঠে ইন্দ্র, আষাঢ়ে রবি, শ্রাবণে গভস্তি, ভাদ্রে যম, আশ্বিনে হিরণ্যরেতাঃ, কার্তিকে দিবাকর, অঘ্রাণে চিত্র (বা মিত্র) ও পৌষে বিষ্ণু।

খ) অষ্টবসু – অন্তরীক্ষ দেবতা।

বৈদিক মতে আটজন বসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, আপ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।

মহাভারতের (আদি/৬৬ ) অষ্টবসু হলেন, ধব, ধ্রুব, সোম, অহঃ, অনিল, অনল, প্রত্যূষ ও প্রভাস।

অন্তরীক্ষ স্তরের প্রধান দেবতা হলেন ইন্দ্র বা বায়ু, তাঁর অন্যান্য রূপ হল মরুৎ এবং মাতরিশ্ব। নিরুক্ত মতে, এই স্তরের দেবতারা হলেন, ইন্দ্র, বায়ু, অষ্টবসু, যম ও যমী, অশ্বিনীকুমার যুগল। এ ছাড়াও এই স্তরের দেবতা হলেন বিশ্বদেব – যিনি বৃষ্টির দেবতা। দেবী ঊষস (ভোর) দ্যুলোক ও অন্তরীক্ষের মধ্যে সংযোগরক্ষা করতেন। ঋভুরা আগে মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাদের সুকীর্তির জন্যে তাঁরা দেবতা হয়ে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

গ) একাদশ রুদ্র – ভূর্লোকের দেবতা

বেদে একাদশ রুদ্রের নাম খুব স্পষ্ট করে পাওয়া যায় না। মহাভারতের (আদি/৬৬) একাদশ রুদ্র হলেন, মৃগব্যাধ, সর্প, নির্‌ঋতি, অজৈকপাদ, অহি, বুধ্ন, পিনাকী, দহন, কপালী, স্থাণু ও ভর্গ। ভূর্লোক বা পৃথ্বীলোকের প্রধান দেবতা ছিলেন, অগ্নি। বেদে ইন্দ্রের পরেই অগ্নির প্রধান স্থান। ঋগ্বেদের শুরুই হয়েছে, অগ্নির উপাসনার শ্লোক দিয়ে, যার উল্লেখ দ্বিতীয় পর্বে করেছি। অগ্নির আরেক নাম রুদ্র, এই রুদ্রেরই একাদশ রূপে প্রকাশ ঘটেছে।

এতগুলি দেবতার নাম থাকলেও ঋগ্বেদের ছেচল্লিশতম মন্ত্রে, ঋষি দীর্ঘতমস বলেছেন, “একম্‌ সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি” – অর্থাৎ সত্য একটাই – কিন্তু ঋষিরা নানা নামে বলেন”। নিরুক্তকার যাস্কও একই কথা বলেছেন, ঈশ্বর এক - তিনিই পৃথ্বীস্থানে অগ্নি, অন্তরীক্ষস্থানে ইন্দ্র এবং দ্যুস্থানে তিনিই সবিতৃ। এই একমাত্র দেবতা বা ঈশ্বরকে বলা হয়েছে – হিরণ্যগর্ভ।

এ ছাড়াও আরও কিছু দেবতার নাম পাওয়া যায়, যেমন সোম, মধু, অশ্বিন প্রমুখ।

সোম দেবতাকে চন্দ্র এবং সোম[3]রস দু ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। সোম যখন চন্দ্রদেব, তিনি দুই হাতেই অস্ত্র চালনা করতে পারতেন এবং যুদ্ধের সময় তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের সারথি হতেন। কিন্তু সোম দেবতা যখন সোমরস তখন ব্যাপারটা অত্যন্ত রসসিক্ত হয়ে উঠত।

খুব নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, এক ধরনের লতানে উদ্ভিদ থেকে সোমরস বানানো হত এবং বিশেষ ওই লতাকেই বলা হত সোমলতা। যজ্ঞের সময় এবং যজ্ঞ সমাপ্তিতে এই পবিত্র রস পান অবশ্য কর্তব্য ছিল। এবং এই রস পান করে যে আশ্চর্য অনুভূতি মিলত, তার আভাস ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১১৯ সূক্তে দেবরাজ ইন্দ্রর কথায় আমরা বুঝতে পারি। আমরা কলির মানুষরা পবিত্র সোমরসে বঞ্চিত, কিন্তু ভাঙ বা সিদ্ধির শরবতেও এমন অভিজ্ঞতার আমেজ অনুভব করা যায় বৈকি, যেমন,  

“দমকা বায়ু যেমন গাছকে দোলায়, সোমরস পান করে আমিও তেমন দুলছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/২)

“দামাল ঘোড়া যেমন রথকে ওড়ায়, আমিও তেমন উড়ছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”।  (১০/১১৯/৩)

“আমার এমনই ক্ষমতা, যদি বল, এই পৃথিবীকে এক স্থান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতে পারি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/৯)

“এই পৃথিবীকে আমি দগ্ধ করতে পারি, যে স্থান বল সে স্থান ধ্বংস করতে পারি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১০)

“আমার একপাশ আছে আকাশে, আরেক পাশ পৃথিবীতে, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১১)

“আমি মহতেরও মহৎ, আমি আকাশ ঠেলে উঠেছি, আমি বড্ডো সোম পান করেছি”। (১০/১১৯/১২)[4]

অশ্বিন নামের যুগল দেবতার নাম পাওয়া যায়, যাঁর সম্বন্ধে খুব স্পষ্ট জানা যায় না। তবে যজ্ঞ অনুষ্ঠানে রীতি ও প্রথা প্রকরণ থেকে জানা যায়, অগ্নি সকল দেবতার মুখ, তিনিই যজ্ঞের হবি গ্রহণ করে, সকল “হবির্ভাজ” অর্থাৎ যজ্ঞভাগ দেবতাদের পৌঁছে দেন। সোম এই যজ্ঞ প্রথার দেবতা, মধু জ্ঞানের দেবতা, অশ্বিন মধুর সঙ্গে যুক্ত এবং ইন্দ্র যুক্ত সোমের সঙ্গে।

চলবে...



[1] আনৃশংস্য–অনৃশংসভাব, অহিংস্রতা; পরের দুঃখে দুঃখিত, অনুকম্পা। (শব্দকোষ)

[2] জন্ম থেকেই প্রতিটি মানুষ পঞ্চঋণে ঋণী – পাঁচটি ঋণ হল দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ, নৃঋণ ও ভূতঋণ। এই পাঁচটি ঋণ থেকে মুক্তির উপায় জীবনে পঞ্চযজ্ঞের আচরণ ও অনুষ্ঠান।

[3] সোমরস – সোমলতার রস, উৎকৃষ্ট মাদক - উত্তর ভারতের হিমালয়ের বনভূমিতে এককালে পাওয়া যেত, এখন অবলুপ্ত।

[4] ঋগ্বেদের বাংলা অনুবাদ – শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র দত্ত (আধুনিক বাংলায় রূপান্তর - লেখক)।



শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩ 


১৪ 

চিঠিটা শেষ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। মধ্যরাত্রি এখন, ঘড়িতে সোয়াদুটো। ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। সামনে রাস্তার ধারে স্ট্রিট লাইট – রাত্রিতেও নিশীথের বোধ আনতে দেয় না নাগরিক সভ্যতায়। জনহীন আলোকিত পিচের রাস্তাটা যেন লম্বা হয়ে শুয়ে আছে আরামে। দু একটা কুকুর এদিক ওদিক থেমে থেমে কিছু শুঁকতে শুঁকতে হেঁটে বেড়াচ্ছে অকারণ। ওদিকের বড়ো বকুল গাছের ঝাঁকড়া মাথায় একটা বাচ্চা কাক – থেকে থেকে ডেকে উঠছে। বাচ্চাটার মা-কাকটা বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছে এদিক সেদিক খাবারের সন্ধানে। শহরের পথে ঘাটে কাকদের খাওয়ার মতো কিছু না কিছু আবর্জনা সর্বদাই পড়ে থাকে। বিশেষ করে মোড়ের মাথায় বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বসে, নানান মুখরোচক খাবারের অস্থায়ী পসরা। রাস্তায় পড়ে থাকা বা ফেলে যাওয়া খাদ্যের সেই অবশিষ্টাংশ থেকেই মা-কাক কিছু কিছু তুলে এনে ফিরে আসছে বাসায় – ক্ষুধার্ত বাচ্চাটা মায়ের মুখ থেকে খাবার নেওয়ার সময় গলা থেকে আনন্দের অদ্ভূত আওয়াজ তুলছে।

 অধিকাংশ জীবজগতে প্রকৃতি মাতৃত্বকে আশ্চর্য এক দায়িত্ববোধ উপহার দিয়েছে। সে দায়িত্ব কোন কারণে বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হলেই, মা-নামক জীবসত্ত্বাটি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে তার বাচ্চাকে সেই বিপদ থেকে বাঁচানোর। ওই বিনিদ্র কাক-মা এই মধ্যরাত্রেও তার ক্ষুধার্ত ছানাটির জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যদি এখনই কোন ব্যক্তি ওই গাছের নীচে এখন দাঁড়ায়, এবং গাছের ওপরের দিকে সন্দেহজনক ভাবে তাকায়, ওই কাক-মা সতর্ক হবে। সজাগ করে তুলবে ওর আশেপাশে থাকা কাক-সমাজকেও। তারপর বিপজ্জনক মনে হলে সকলে মিলে লড়তে শুরু করবে বিপদটিকে তাড়াতে।

কনির ক্ষেত্রেও যেন ব্যাপারটা সেরকমই ঘটেছিল। ওর শ্বশুরবাড়ির প্রতিকূলতার সঙ্গে অনেকটা অ্যাডজাস্ট করে কনি নিজের জীবনটাকে কিছুটা হলেও যেন বাজি রেখেছিল। কিন্তু নিজের সন্তান আসার পরেই সে বুঝেছিল, সেই প্রতিকূলতাকে আর প্রশ্রয় দেওয়াটা হয়ে উঠবে বিপজ্জনক। তার পক্ষে তো বটেই, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা তার সন্তানের পক্ষে। একটা শিশু বড়ো হয়ে ওঠে মায়ের এবং বাবার ছায়ায়, আশেপাশে আরও থাকেন ঠাকুমা-দাদু, আত্মীয়-পরিজন। এসবের মধ্যে সন্তানের পিতা এবং ঠাকুমাই যদি নির্ভরযোগ্য না হয়, সন্তান বড়ো হওয়ার আগেই হয়ে উঠবে অসুস্থ। শারীরিক না হোক, মানসিক অসুস্থ তো বটেই। অতএব, এ কথা পরিষ্কার, ওই সময়ে কনির হাতে খুব বেশি অপশন তেমন ছিল না। অপশন ছিল দুটো, নিজের জীবনের মতো সন্তানের বড়ো হয়ে ওঠার প্রত্যেকটি দিনকে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া অথবা সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কনি দ্বিতীয় অপশনটাই বেছেছে।

এই বিষয়টাতে সুনেত্র তেমন অবাক হয়নি। কিন্তু তার কাছে আশ্চর্যের বিষয় হল, তার মা সুকুর এই বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপড়েনের কথা তাকে প্রায় কিছুই বলেননি। কেন? তিনি যে এ ব্যাপারের কিছুই জানতেন না, এমন হতেই পারে না।

একথা সত্যি চণ্ডীগড়ের পড়া শেষ করে, কর্মসূত্রে সে প্রায় আট-দশ বছর দিল্লি-হরিয়ানার বিখ্যাত কয়েকটি হসপিটালের সঙ্গে সে নিজেকে যুক্ত রেখেছিল। তার মুখ্য কারণ কলকাতার তুলনায় ওদিকের বিখ্যাত প্রাইভেট হসপিট্যালগুলির কাজের পরিবেশ অনেকটাই উন্নতই ছিল। তাছাড়া, ওরা যথেষ্ট লোভনীয় ফেসিলিটি এবং রেমিউনারেশনও দিত। অন্য আরেকটি একটি কারণ হল, কলকাতায় ফিরে এসে জীবিকার সন্ধান করে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার কোন ইচ্ছাই তার মনের মধ্যে সেই সময় স্থান পায়নি। অবশ্যই, এই দ্বিতীয় কারণের পিছনে ছিল, তার জীবনে কনির না আসা, এবং কনির বিয়ে হয়ে যাওয়া। তার মনের গোপন এই কথাটা কি মা এবং পিসিমা বুঝতে পেরেছিলেন?

কিন্তু ঘটনা যাই হোক, সুনেত্রর সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ তো কোনদিনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। মোটামুটি নিয়মিতই - এক-দেড়মাস অন্তর সে কলকাতায় যাওয়া আসা করেছে। কলকাতায় এলে পিসিমা-পিসেমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যায়নি, তেমন একবারও হয়েছে বলে তো তার মনে পড়ছে না। সে সময় কনির সঙ্গেও তার দেখা হয়েছে অনেকবার। মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই একসঙ্গে তার হরিয়ানা এবং পরে দিল্লির বাসাতেও বেশ কয়েকবার গিয়েছেন। ওঁদের নিয়ে সে আনন্দ করেই দিল্লি, আগ্রা, ফতেপুরসিক্রি, মথুরা, বৃন্দাবন, কুরুক্ষেত্র, পানিপথ এবং চণ্ডীগড়, অমৃতসর পর্যন্ত ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক সকল দর্শনীয় স্থানেই গিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনদিন কনির এই বিপর্যয়ের কথা তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি কেন?

চণ্ডীগড় থেকে পাশ করে বেরোনোর পরেই তার বিয়ের জন্যেও উঠে পড়ে লেগেছিল, সুনেত্রর মা এবং পিসিমা। দুজনের থেকেই সে বারবার শুনেছিল, সুনেত্রর মতো “লাখে এক” বর পাওয়ার জন্যে চেনা-শোনা এবং পরিচিত মহলের বিবাহযোগ্যা কনারা নাকি চতুর্দশীতে শিবের মাথায় জল ঢালছেন বালতি বালতি। সেই জল অপচয় বন্ধ করার জন্যেই আমার বিয়ে হওয়াটা জরুরি। আমার জন্যে এই বিবাহ প্রস্তাবের প্রবল প্রকোপ চলেছিল প্রায় বছর ছয়েক। তারপর ধীরে ধীরে সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, বিষণ্ণ হলেন এবং একসময় সকলে ক্ষান্তও হলেন।

তাঁদের ক্ষুব্ধ মনের শেষ খেদোক্তি ছিল, “হ্যারে সত্যিসত্যিই তুই বিয়ে করবি না...এ কি ধনুকভাঙা পণ রে তোর? তোকে আজীবন আগলে রাখতে আমরা কেউই থাকব না, একথাটা মনে রাখিস। আমরা যখন চোখ বুজবো তখন টের পাবি কত ধানে কত চাল। বুড়ো বয়সে তখন বাধ্য হয়ে ছাদনাতলায় দাঁড়াবি টাকে টোপর পরে। আমরা তো আর তখন দেখতে আসবো না - যা পারিস করিস...”।

সে সব কথা মনে পড়ে যাওয়াতে সুনেত্র মুচকি হাসল। বহু বছর হল সে তার মা-বাবা, পিসিমা-পিসেমশাই সবাইকেই হারিয়েছে। কিন্তু আজও তাঁরা সকলেই উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছেন তার স্মৃতিতে। তাঁদের অকুন্ঠ স্নেহ-ভালোবাসা, প্রশ্রয় ও হিতাকাঙ্ক্ষার স্মৃতি আজও তাকে জীবনের সঠিক পথচলার দিশা নির্দেশ করে।

তার বাবা মারা যাবার সঙ্গেসঙ্গেই সে দিল্লি থেকে পাততাড়ি গুটোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বিখ্যাত কর্পোরেট হসপিটালের ঊর্ধতন কমিটিতে সে নির্দ্বিধায় জমা করেছিল তার ত্যাগপত্র। কিন্তু কমিটি তার ত্যাগপত্র নাকচ করে প্রস্তাব দিয়েছিল, “রিজাইন করছেন কেন? আপনি জানেন কলকাতা এবং হলদিয়ায় আমাদের এই কর্পোরেট হসপিট্যালের ব্র্যাঞ্চ রয়েছে। আপনার যেখানে সুবিধে, আপনি স্বচ্ছন্দে জয়েন করতে পারেন, একই শর্তে এবং একই রেমিউনারেশনে”। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কোন কারণই সুনেত্র খুঁজে পায়নি, অতএব সে সানন্দেই কমিটির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল এবং জয়েন করেছিল হলদিয়ায়। দীর্ঘদিন দিল্লিতে থাকার অভ্যাসে, সুনেত্র কলকাতার শহরের জটিল রাজনৈতিক আবর্তে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হওয়ার কথা চিন্তা করেই, হলদিয়াতে জয়েন করেছিল। সেদিন তো বটেই, আজও তার মনে হয়, কলকাতার থেকে হলদিয়ার রাজনৈতিক জটিলতা কিছুটা হলেও কম। রাজনীতি ব্যাপারটা তো আর লোকসভা বা বিধানসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার বিস্তার সর্বত্র। কর্পোরেট কোম্পানির উচ্চতম স্তর থেকে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত তার অবাধ যাতায়াত।

অতএব রাজধানীর পাট চুকিয়ে সে হলদিয়াতেই স্থায়ী ভাবে চলে এসেছিল। বাবার ক্রিয়া-কর্ম শেষে মাকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তার হলদিয়ার কোয়ার্টারে। মা অবশ্য একটু আপত্তি করেছিলেন, বলেছিলেন, “আমার স্বামী-শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে তোর সঙ্গে হলদিয়ায় গিয়ে থাকব, কোন দুঃখে, সুনু?”

সুনেত্র বলেছিল, “আমার দুঃখে, মা”।

“সে আবার কি? তোর আবার দুঃখ কিসের?”

“আমার ঘরে যে ভাত-জল করার কোন লোক নেই, মা। ঠিক সময় মতো আমার বিয়েটা তো দিলে না...! এখন তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো, যে তোমার সুনুর মর্জিমাফিক ঠিকঠাক তিনবেলা ভাত-জলের যোগাড় করে দেবে?”

সুনেত্রর পিঠে তার মা আদরের থাবড়া মেরে হেসে বলেছিলেন, “এখনও বেলা বয়ে যায়নি, সে লোক গোকুলে বাড়ছে। তুই একবার হ্যাঁ বললেই, তোর কাছে তাকে হাজির করে দেব, সুনু। তোর বাবার বাৎসরিক কাজ মিটলেই তোদের চার-হাত এক হয়ে যাবে”।

“হুঁঃ, তোমার এই দামড়া ছেলেকে বিয়ে করার জন্যে মেয়ের বাবারা এবং মেয়েরাও একেবারে জলছাড়া মাছের মতো হাঁকপাঁক করছে বৈকি! তুমি তোমার এই ছেলেটিকে আজও হীরের আংটি বিশেষ মনে করো, তাই না, মা? হীরে-টিরে কিচ্ছু নয়, আসলে পলকাটা কাচের, যাকে আমেরিকান ডায়মণ্ড বলে। সত্যি বলতে, আমি খুব ভয় পাই মা। পরের ঘরের কোন মেয়ে এসে ঘাড়ে চাপবে। সে অহর্নিশ আমাকেই বোঝাতে চাইবে, আমি আমার বাবা-মায়ের আসল রূপটাই চিনি না, জানি না। আমার ওই বাবা, মা, পরিজন সব্বাই কুচুটে, বদমাইশ নাম্বার ওয়ান...। সংসার নামক একটি আজব সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্যে, আমাকে চুপ মেরে ভ্যাবলাকান্ত সেজে থাকতে হবে। তোমাদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে, চিনেও যেন চিনি না এমন ভান করতে হবে...। না মা, অত ঝক্কি আমার পোষাবে না... এই বেশ আছি। তুমি যদি আমার সঙ্গে একান্তই না যেতে চাও, তোমাকে জোর করব না। নিজেদের দুবেলা দুমুঠো ভাত-ডাল যোগাড়ের আশায়, আমাকে দুবেলা রান্না করে দেওয়ার মানুষ, ভারতবর্ষে অজস্র অঢেল পাওয়া যায়, মা। তাতেই আমার চলে যাবে...”।

সুনেত্রর এই কথার পর নিজের গোঁ ধরে ছেলের সঙ্গে যাবেন না, কোন মায়ের পক্ষেই বলা সম্ভব না। সুনেত্রর মাও পারলেন না। উঠে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তোমার মন যে কোথায় বাঁধা আছে সে কি আর আমি বুঝি না, বাপু - সব বুঝি। কবে যাবি হলদিয়া, আমিও যাব তোর সঙ্গে, ব্যাগ-ট্যাগ গোছানোর সুযোগ দিবি তো?”

সুনেত্র অবাক হয়ে বলেছিল, “কী বোঝো তুমি, মা? আমার মন কোথায় বাঁধা আছে?”

“সে সব তো কবেই চুকেবুকে গেছে, ভেবে আর লাভ কি?  কবে যেতে হবে বলিস। কটা দিন সময় দিস, আমাকে এদিকটাও গুছিয়ে যেতে হবে তো...”।  

এই কথাটুকুর মধ্যে মা কোন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্পষ্ট হয়নি সুনেত্রর কাছে। কখনো মনে হয়েছে কনির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কখনো মনে হয়েছে কনি নয়, মায়ের হয়তো অন্য কোন মেয়েকে পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে সেই মেয়েটি নিশ্চয়ই কোন একদিন চলে গেছে অন্য কারোর ঘরে, তাদের সংসারের আলো হয়ে।

সুনেত্র বহুদিন ভেবেছে সময়মতো মাকে একদিন চেপে ধরে বলবে, “আমার মনের তরী ঠিক কোন ঘাটে বাঁধা আছে বলো তো, মা?”

কিন্তু  কোনদিন বলতে পারেনি কিছুটা সংকোচে কিছুটা ভয়ে। মনে হয়েছে, মা হয়তো তার কথা শুনেই নস্যাৎ করে দেবেন, “ধূর, তখন কী মনে হয়েছিল, কী বলতে কী বলেছিলাম, অতশত আর মনে রাখতে পারি না বাপু”।

অথবা সত্যিই যদি মন খুলতেন এবং বলতেন, “তখন তো আমার কথা শুনলি না সুনু, একেবারে ধনুকভাঙা পণ করে বসে রইলি। তোর জন্যে খুব ভালো একটি মেয়ে দেখেছিলাম। আমার স্কুলের ক্লাসমেট বিশাখার মেয়ে, ভারি মিষ্টি। দেখতে ডানা কাটা পরি নয়, তবে অনেকটা আমাদের সুকুর মতো, খুব হাসিখুশি প্রাণখোলা। তোর জন্যে বছর খানেক অপেক্ষার পর, ভালো ঘরে, ভালো বরে, বিশাখা ওর মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল”।

তাহলে? সে মাঝেমাঝেই কল্পনার জগতে বিভোর থেকেছে এই চিন্তায় যে, মা হয়তো এতদিনে সুকুর সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতাটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি বুঝেছেন কনির অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার জন্যেই তাঁর সুনু বিয়ে না করার পণ নিয়েছে। অসামাজিক জেনেও, সুনুর পিসিমা সুলেখার সঙ্গে আলোচনা করে, সুনু আর সুকুর সম্পর্কটাকে যদি মেনে নেওয়া যেত, তাহলে ছেলে-মেয়েদুটোর জীবন এমন এলোমেলো হয়ে যেত না। মনে মনে এই ভাবনাটাকে কতভাবে যে সুনেত্র লালন করেছে, এত বছর ধরে পোষণ করে আনন্দ পেয়েছে...! পাছে তার এই গোপন এবং অলীক আনন্দটুকুও হারিয়ে যায় – সেই ভয়েও সে মাকে কোনদিন আর জিজ্ঞেস করতে ভরসা পায়নি।

 নাঃ রাত শেষ হতে চলল প্রায় – মোবাইলের পর্দায় দেখল সাড়ে তিনটে। শোবার আগে শেষ সিগারেটটা ধরিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে এল সুনেত্র, বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে চলে এল শোবার ঘরে। আলো নিভিয়ে, অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে সিগারেট টানতে লাগল বুকের ওপর অ্যাশট্রেটা রেখে। আলো না থাকলেও ঘর আঁধার হয়নি। স্ট্রিট লাইটের তিরছি আলোয়, চোখ চলে পরিষ্কার। মাথার ওপরে পাখা ঘুরছে বনবনিয়ে। সিগারেটের শেষ পাফটুকু অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে, সরিয়ে রাখল মাথার কাছে রাখা টেবিলে। তারপর পায়ের বালিশ টেনে, কাত হয়ে আরামে চোখ বুজল। আগামী কাল সোমবার – ইংরিজি মতে অবশ্য মানডে শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সকাল সকাল দুটো নার্সিং হোমে দৌড়তে হবে দুজন পেশেন্টকে অ্যাটেণ্ড করতে। তারপর চেম্বারে বসতে হবে সকাল নটা থেকে। ঘুমটা এখন জরুরি।   

চলবে... 



শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

অপূর্ব কোপি

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " শ্রীমান "


 আমরা তখন তোমাদের মতোই ছোট্ট, থুড়ি বড়ো; আসলে ক্লাস-এইট পর্যন্ত আমরা নিজেদের বাচ্ছাই মনে করতাম, আর ক্লাস নাইন থেকেই বেশ বড়ো। তোমরাও নিশ্চয়ই তাই মনে করো। তবে আমাদের তুলনায় তোমরা এখন অনেকটাই বড়ো, কারণ আমাদের দৌড় ছিল রেডিওতে গান আর খবর শোনা। সে তুলনায় তোমরা ছোট্ট থেকেই টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল দেখতে দেখতে আমাদের থেকেও কত্তো বড়ো যে হয়ে ওঠো তার হদিস তোমরাও জানো না। তাও আমরা সেই রেডিও ছুঁতে পেরেছিলাম, আরো অনেক বড়ো বয়সে। আমরা যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম, আমাদের বাড়িতে রেডিও চালানোর দায়িত্ব ছিল মাত্র তিনজনের, জ্যেঠু, বাবা আর মা। আমার জ্যেঠিমা ছিলেন সরল আলাভোলা মানুষ, তিনি ওই নব ঘুরিয়ে রেডিও চালু করা, কিংবা অন্য নব ঘুরিয়ে স্টেশন খুঁজে বেড়ানোটাকেও খুব জটিল এক কর্মকাণ্ড ভাবতেন। অতএব, বাড়ির বড়োরা অফিসে চলে গেলে, জ্যেঠিমা আমার মাকে ডাকতেন, “অ মেজো, রেডিওটা একটু চালু করে দিয়ে যা তো”। আমার মা ছিলেন আমাদের বাড়ির মেজবৌমা।

স্কুলে গরমের ছুটি পড়তে তখনো বেশ কটা দিন বাকি, তবে গরম পড়েছিল বেজায়। গলায় ঘাড়ে, পিঠে ঘামাচি বেরোচ্ছে বিস্তর। খেলার মাঠ থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরে, আমরা ঠাকুমার শরণাপন্ন হতাম। তাঁর ছড়ানো দুই পায়ের ওপর মাথা রেখে আমরা অবলীলায় শুয়ে পড়তাম। ঠাকুমাকে কিছু বলতে হত না, তিনি তাঁর বুড়ো আঙুলের ভোঁতা নখ দিয়ে, পিট পিট শব্দে ঘামাচি গেলে দিতেন, আর হাত বুলিয়ে দিতেন বুকে পিঠে। সেই আরামে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসত। মনে হত ভাগ্যিস গরম পড়ে, তা নইলে কী আর ঠাকুমার হাতের এমন পরশ বুঝতে পারতাম। তবে “বাব্বাঃ কী গরম পড়েছে”, বললেই ঠাকুমা বেশ রেগে যেতেন, বলতেন, “মুখপোড়া, গরম না পড়লে খাবি কি? আম, জাম, কাঁঠালই বা পাকবে কী করে?” তা ঠিক, পাকা এবং আধপাকা আমের নাম শুনলেই তখন জিভে জল আসত। আর আমাদের দিদিরা সর্ষেবাঁটা, তেল, নুন, লংকার গুঁড়ো দিয়ে কুষ্টি আম মেখেই মুখপোড়া গরমের তাপকে আবাহন করত।

মুখপোড়ার কথায় হনুমানের কথা মনে পড়ল। আমাদের সেই মফস্বল শহরে মাঝে মাঝেই বিস্তর হনুমান আসত। তারা দল বেঁধে সকাল সকাল হাজির হত, ঘুরে বেড়াত পাড়ার সবার বাড়ির গাছে গাছে। কাঁচা হোক পাকা হোক সব ফলেই দাঁত বসিয়ে দেখাটা তাদের রেওয়াজ ছিল। পেয়ারা, কাঁচা আম, কাঁচা সবেদা, সবুজ জাম, জামরুলের কুশি কিছুই তারা ছেড়ে দিত না। আর ছোট ছোট ইঁচড়গুলোকে গাছ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিত মাটিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে উঠত মানুষজন। পাড়ার লোকেরা থালাবাটি আর খালি ক্যানেস্তারা বাজিয়ে তাদের তাড়িয়ে বেড়াত। সে আওয়াজে আমাদেরই কান ঝালাপালা হয়ে উঠত, হনুমানদের কথা না বলাই ভাল।

স্কুলে সেদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল সংস্কৃতর ক্লাস। প্রত্যেকদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পিরিয়ড। কারণ এরপরেই আমাদের টিফিনের ঘন্টা পড়ত, আধ ঘণ্টার বিরতিএই ফোর্থ পিরিয়ড চলার সময়েই দিবাকরদা প্রত্যেক ক্লাসরুমে টিনের ট্রেতে আমাদের মাথা গুণে টিফিনের প্যাকেট রেখে যেত। তেলে ভিজে ওঠা বাদামি সেই প্যাকেট থেকে খাবারের গন্ধ বেরিয়ে, আমাদের নাকগুলোকে সচল করে তুলত, যেভাবে কাঠবিড়ালি বা ইঁদুররা খাবারের গন্ধ পেলে নাক চুলবুল করে, অনেকটা সেরকম। তার মধ্যে সহদেব স্যারের সংস্কৃত শ্লোক, আমাদের মাথা-কান-মন সব ঘেঁটে একসা করে তুলল

সেদিন সহদেব স্যার যে শ্লোকটা পড়াচ্ছিলেন, সেটি ছিল একটি চাণক্য শ্লোক, “অপূর্ব কোঽপি ভাণ্ডারস্তব ভারতি দৃশ্যতে, ব্যয়তো বৃদ্ধিমায়াতি ক্ষয়মায়াতি সঞ্চয়াৎ”। খুব সহজ করে বললে, শ্লোকটির মর্মার্থ হল, “হে সরস্বতি, তোমার ভাণ্ডারটির মতো অপূর্ব আর কীই বা দেখা যায়? যা খরচ করলে বেড়ে ওঠে আর সঞ্চয় করলে কমে যায়”! এই ভাণ্ডারটি হল আমাদের বিদ্যা বা জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিদ্যাচর্চা বা আলোচনা করলে আমাদের জ্ঞান বেড়ে ওঠে। কিন্তু চর্চার অভাবে আমাদের সেই জ্ঞানই হারিয়ে যায়, তার মানে আমরা ভুলে যেতে থাকি। এই শ্লোকের “ভারতি” হচ্ছেন মা সরস্বতী। ভারতী মা সরস্বতীর আরেকটি নাম, সে কথা নিশ্চয়ই জানো। তাঁর ভারতী নামটিই এখানে সম্বোধনে “ভারতি” হয়েছে – সংস্কৃতে সেটাই নিয়ম।  সরস্বতী বানানটাও একই নিয়মে সরস্বতি লিখতে হয়েছে। সে যাই হোক, এই শ্লোকটির মানে আজ যত সহজে তোমাদের বলতে পারলাম, সেদিন আমাদের সেটা বুঝতে কিন্তু বেজায় বেগ পেতে হয়েছিল।

শ্লোকটি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করে, সহদেব স্যার আমাদের জিগ্যেস করলেন, “‘কোঽপি’ শব্দের অর্থ তোদের মধ্যে কে বলতে পারিস?” আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়, সব স্যারদের চোখের মণি, পুলক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হনুমান, স্যার”। এখানে ছোট্ট করে বলে রাখি, এই ঘটনার পর পুলকের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘পুলকপি’।

সহদেব স্যার, অদ্ভূত এক মুখভঙ্গি করে বললেন, “তোরা যে সবাই এক একজন কপি, সে বেপারটা বুঝতে আমার বাকি নেই। এই ‘কোঽপি’ সে কপি নয়, কঃ অপি সন্ধি হয়ে কোঽপি, অর্থ হল ‘আর কে’? কিংবা ‘আর কী?’” দীর্ঘ শব্দে নাকে নস্যি নিয়ে সহদেব স্যার, সামান্য নাকি স্বরে বললেন, “সংস্কৃত হল ভাষার রাজা, প্রত্যেকটি শব্দের মধ্যে রহস্য লুকোনো থাকে, সে সব খুঁজে বের করাতেই আসল মজা”।

আমি অবিশ্যি সে সব মজার কিছুই টের পেলাম না। চিন্তা করতে লাগলাম, কপি মানে আমি এতদিন জানতাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি। শীতকাল হলেই ভুদেবকাকা বাজার থেকে আনে। আরেকটা কপি জানি, সেটা ইংরিজি - কপিবুক, কপি করা। কিন্তু কপি মানে বাঁদরও হয়? যদিও সহদেবস্যারের কথায় আর আমার মন ছিল না, ভাবছিলাম কতক্ষণে টিফিনের ঘন্টা পড়বে, আর আমরা টিফিনের প্যাকেট হাতে নিয়ে দৌড়ে নেমে যাবো স্কুলের মাঠে।

এমন সময় ক্লাশের বাইরে হঠাৎ খুব দুপদাপ হুপহাপ আওয়াজ উঠল। আমাদের জানালার পাশেই একটা বড়ো তেঁতুলগাছ ছিল, দেখলাম তার ডালপালাগুলোয় ভীষণ ঝাঁকুনি উঠেছে। সহদেব স্যার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? এই অসময়ে ঝড় উঠল নাকি?” ওপাশে জানালার ধারেই বসে দীপক, সে বলল, “ঝড় নয় স্যার, হনুমান। একদল হনুমান হানা দিয়েছে”।

সহদেব স্যার বললেন, “অর্বাচীন কোথাকার, হনুমান কী ডাকাত না মারাঠিসেনা? যে হানা দেবে?” কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় একদল হনুমানকে দৌড়োদৌড়ি করতে দেখা গেল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বারান্দার দিকের খোলা জানালায় মুখ রেখে আমাদের দিকে লক্ষ্যও করতে লাগল। জানালায় গ্রিল ছিল, তাই আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম, ওরা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তারপরেই তারা যা ক্ষতি করল, সে কথা মনে পড়লে, আজও আমার মন দুঃখে হু হু করে ওঠে।  

হনুমানের দলের বেশ কয়েকজন প্রথমদিকে একটু ইতস্ততঃ করলেও, একটু পরেই তারা স্যারের অনুমতি না নিয়েই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। তারপর সহদেব স্যারের টেবিলের কোণায় রাখা টিফিনের ট্রে থেকে আমাদের খাবারের প্যাকেটগুলি নিমেষের মধ্যে হাতিয়ে নিল এবং আগের মতোই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকেআমরা সত্যি বলতে নিঃস্ব হয়ে গেলাম তৎক্ষণাৎ। ঘরের মধ্যে আমরা সকল ছেলেরা এবং সহদেব স্যারও স্তম্ভিত হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। আমাদের ক্লাসের শ্যামল গোটা স্কুলেই বিখ্যাত ছিল। হেডস্যার থেকে শুরু করে সব স্যারেরাই মনে করতেন শ্যামলের মত ফক্কোড় আর ইঁচড়ে-পাকা ছেলে ভূ-হুগলি জেলায় আর একটিও নেইক্লাসের সবাইকে বেশ কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থাকতে দেখে, শ্যামল অত্যন্ত নিরীহ মুখ করে, বলল, “স্যার এটাকে কী, ‘কোপি দৃশ্যতে মারাঠীসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা’ বলা যাবে?  যার অর্থ হতে পারে - মারাঠী সেনার মতো এমন কপিসেনা আর কে দেখেছে?” শ্যামলের ভুল-ভাল সংস্কৃত বাক্য শুনে সহদেবস্যার খুব রেগে উঠে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই একতলা থেকে বেজে উঠল স্কুলের ঘন্টা, একটানা। এই ঘন্টা টিফিনের ঘন্টা নয়, এমার্জেন্সি ঘণ্টা – কোন বিশেষ কারণে, সবাইকে একত্র হওয়ার সংকেত দিতেই এমন একটানা ঘণ্টা বাজানো হয়। বুঝতে পারলাম, বইখাতার ব্যাগ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি নীচেয় নামতে হবে।

তোমাদের হয় কিনা জানি না, আমাদের সময়, স্কুলের একতলায় ঘন্টা বাজলেই আমাদের মাথায় যেন পোকা নড়ে উঠত। সে ক্লাস শেষের ঘন্টা হোক, কিংবা টিফিনের অথবা ছুটির। আর এমন জরুরি ঘন্টা হলে তো কথাই নেই। মূহুর্তের মধ্যে ব্যাগের মধ্যে বই-টই ঢুকিয়ে আমরা দৌড়ে বেরোতে লাগলাম বারান্দা দিয়ে। এক একটা ক্লাসরুম থেকে নানান বয়েসের ছেলের দল বন্যার মতো বেরিয়ে আসছিল। তারপর বারান্দার নদীতে মিশে গিয়ে জলপ্রপাতের মতো সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে আমরা নেমে এলাম একতলায়।

নীচের বারন্দাতে এসেই আমাদের আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তে হল, কারণ হেডস্যারের ঘরের সামনে, হেডস্যার নিজে এবং মাষ্টারমশাইদের অনেকে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দাঁড়িয়ে আছেন থানার বড়োবাবু এবং শহরের বেশ কিছু গণ্যমান্য ভদ্রলোক। ওঁনারা সকলেই যেন আমাদেরই অপেক্ষা করছিলেন। ওপর থেকে নেমে আসা ছেলেদের-স্রোতের বেগ কিছুটা শান্ত হতে, থানার বড়োবাবু বললেন, “মনে হচ্ছে, সকলেই নেমে এসেছে”? হেডস্যার বললেন, “হুঁ, তাই তো মনে হচ্ছে”।

মস্ত ভুঁড়ির ওপর ট্রাউজারটা টেনে তুলতে তুলতে বড়োবাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারো হাতে পায়ে খিমচে-খামচে দেয়নি তো?” আমাদের মধ্যে কেউই কোন উত্তর দিলাম না।

আমরা তো বুঝতেই পারলাম না, কে আমাদের খিমচে দেবে, আর সেটা জানার জন্যে আমাদের নীচেয় ডাকাই বা হল কেন? শ্যামল একটু পিছনের দিকে ছিল, আমাদের ধাক্কা দিয়ে আর গুঁতিয়ে সে একটু সামনে এগিয়ে হাত তুলে বলল, “স্যার, অপূর্ব কোপি দৃশ্যতে মারাঠিসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা”। আমরা তো বটেই স্যারেরা এবং উপস্থিত মানী মানুষরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শ্যামলের দিকে। বড়োবাবু আতঙ্কিত স্বরে হেডস্যারকে বললেন, “ও ওসব কী বলছে? কী ভাষা? স্যার এই ছেলেটিকে মনে হয়, হনুমান খিমচে বা আঁচড়ে দিয়েছে। জলাতঙ্ক হওয়ার আগেই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার”।

“তোর কী হয়েছে, শ্যামল? হঠাৎ সংস্কৃত বলা শুরু করলি কেন?” হেডস্যার বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। তবে তিনি শ্যামলকে ভরসা না করে, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ফার্স্টবয় পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোদের ক্লাসে হনুমান ঢুকেছিল?”

“হ্যাঁ, স্যার দশ-বারোটা”।

শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দুজন বলে উঠলেন, “সর্বনাশ। হনুমানের বিশাল দলটাকে আমরা এই দিকে আসতে দেখে এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম, গোলোকবাবু। স্কুলের ছেলেদের ওপর এরা কী না কী দৌরাত্ম্য করে বসে”গোলোকবাবু থানার বড়োবাবু, এমন সার্থক নামের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। প্রকাণ্ড ভুঁড়ি সহ গোলগাল মানুষটির নাম গোলক ছাড়া আর কী হতে পারে? অবশ্য আরও বড়ো হয়ে জেনেছিলাম – গোলোক মানে বৈকুণ্ঠ বা বিষ্ণুলোক; তার সঙ্গে গোল বা গোলকের কোন সম্পর্ক নেই।

যাই হোক, গোলোকবাবু ট্রাউজারটা আরেকবার টেনে তুলে বললেন, “আপনাদের আশঙ্কার কথা শোনা মাত্র আমরাও তো থানা থেকে চলে এসেছি, স্যার”।

“আঃ, আপনারা একটু শান্ত হবেন?” হেডস্যার বিরক্ত স্বরে বললেন, “কী হয়েছে ঘটনাটা শোনাই যাক না। পুলক, হনুমান ঘরে ঢুকে কী করেছে?”

“আমাদের সবার টিফিনের প্যাকেট লুঠ করে নিয়ে গেছে, স্যার”। পুলকের স্বরে হাহাকার, আমাদের  মনের কথাই সে বলল। আমরা সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখে-শোকে মাথা নীচু করলাম।

“কী ছিল টিফিনে? হনুমানরা আজকাল কলা-মূলো-বেগুন ছেড়ে দিয়ে টিফিন খাচ্ছে?” অবাক গোলোকবাবু নেমে যাওয়া প্যান্ট আবার টেনে তুলে নিয়ে বললেন।

“টিফিনে কী ছিল জানি না, স্যার। আমরা দেখার আগেই তো ওরা...” পুলক কথা শেষ করতে পারল না, স্বাভাবিক, এমন দুঃখের কথা মুখ ফুটে বলাও শক্ত বৈকি!

“ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে আমি দেখছি। কিন্তু শ্যামল সংস্কৃত শ্লোক বলছে কেন?” হেডস্যার জিজ্ঞাসা করলেন। পুলক বলল, “আমাদের ওই পিরিয়ডে সংস্কৃত পড়াচ্ছিলেন সহদেব স্যার। চাণক্য শ্লোকঅপূর্ব কোপি ভাণ্ডারস্তব। আমি বলেছিলাম কোপি মানে হনুমান। কিন্তু স্যার বললেন, এই কোপি সেই কপি নয়”

“এই কপি ফুলকপি বা বাঁধাকপিও নয় স্যার। এ কোপি অন্য কোন কপি”। আমিও ফোড়ন দিলাম পুলকের সঙ্গে। স্যারেরা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। গোলোকবাবু, আরও একবার প্যান্ট টেনে তুলে বললেন, “স্কুলে এত রকমের কপি নিয়ে আলোচনার দরকারটা কী, স্যার? হনুমানরা কী জানে, কোন কপি মানে হনুমান আর কোন কপিতে হনুমান নয়?  বাঁধাকপি শুনে ওরা ভেবে নিয়েছে – ওদের বেঁধে রাখার ফন্দি করছে মানুষগুলো, আর তাই খামোখা ওরা খেপে গিয়ে ছেলেদের টিফিন নিয়ে চলে গেছে! তোমাদের সংস্কৃত কোন স্যার পড়ান, খোকা?” গোলোকবাবু পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন। পুলকপি উত্তর দিল, “সহদেবস্যার, স্যার”।

নিজের নাম শুনে সহদেবস্যার এগিয়ে এলেন, বললেন, “আমিই সহদেব, সহদেব চক্রবর্তী, ছেলেদের সংস্কৃতের টিচার। সংস্কৃতে ওরকম থাকলে পড়াবো না?” “আহা, পড়াবেন না কেন? একশবার পড়াবেন। কিন্তু এদিকটা বিবেচনা করবেন না? দেখছেন শহরে হনুমানের উপদ্রব। এইসময় ওই কপি-টপি উচ্চারণ করে মিছিমিছি ওদের কোপে পড়ার দরকারটা কী?” সহদেববাবু বেশ রেগেই গেলেন এবার, বেশ ওজস্বিনী স্বরে বললেন, “থানার বড়োবাবু হয়ে, এই কটা হনুমান সামলাতে আপনি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন গোলোকবাবু? আর আমরা যে বছরের পর বছর কত শত হনুমানকে মানুষ করে তুলছি? সে কথাটা ভেবে দেখেছেন?”

গোলোকবাবু একটু থতমত খেয়ে কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। ওদিকে স্যারেরা এবং শহরের মান্যিগণ্যি লোকেরা হেসে উঠলেন হো হো করে। আমরাও, যদিও সংস্কৃতস্যার আমাদেরই হনুমান বললেন, রাগ করব কিনা ভাবতে ভাবতেই, হি হি করে সবাই হেসেই ফেললাম।

গোলোকবাবুও কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝে, যখন সকলের হাসি থেমে গিয়েছে, তখন খুব হাসলেন খানিকক্ষণ, তারপর বললেন, “কথাটা মন্দ বলেননি, স্যার। আমরাও কী ছোটবেলায় কম বাঁদরামি করেছি? হে হে হে হে। যাকগে হনুমান হানা দিলেও তেমন কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, সেটাই রক্ষেআপনারা আপনাদের হনুমান সামলান, আর আমি চলি শহরের হনুমান সামলাতে”। গোলোকবাবু সহদেবস্যারের থেকে নস্যির ডিবে নিয়ে নাকে একটিপ নস্যি নিলেন জোরসে। ওদিকে আমাদের হেডস্যার ঘোষণা করলেন, “ছেলেদের টিফিন যখন হনুমান নিয়ে চলে গেছে, তখন আজকে আর স্কুল হবে না, আজকে হাফ-ছুটি। ছেলেরা, সব বাড়ি যাও”।

রতনমণিদা আমাদের স্কুলের ঘন্টা বাজাতেন, তিনি ঘন্টা বের করে, ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন ঢং ঢং করে। আমরাও সকলে একসঙ্গে হৈ হৈ করে দৌড় দিলাম স্কুলের মাঠ পেরিয়ে মেন গেটের দিকে।

নস্যি ভরা নাকের জন্যে খোনা স্বরে গোলোকবাবু বললেন, “আঁহা, আঁমাদেরও যদি এমন একজন হেডস্যার থাকতেন, কেমন মজার একটা হাঁফ ছুটি পেয়ে, আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।”

..০০..


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতীয়...