এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১৫
কিসের একটা আওয়াজে সুনেত্রর ঘুম ভেঙে গেল আচমকা। বিছানায়
উঠে বসে আওয়াজটা কিসের বোঝার চেষ্টা করল। দেয়ালের ঘড়িতে দেখল পাঁচটা কুড়ি। তার
মানে দু-ঘন্টাও ঘুমোয়নি সে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল স্ট্রিট লাইট নিভে গেছে। সূর্যোদয়
হয়নি, কিন্তু মায়াবি আলোয় ভরে উঠেছে সামনের রাস্তা, গাছাপালা, টুকরো আকাশটাও। যদিও
তার ঘরে আবছায়া। নির্জন রাস্তা দিয়ে হঠাৎই ঝমঝমিয়ে দৌড়ে গেল একটা মেটাডোর – পিঠে
উপচে পড়া নানান শাক-সব্জির পসরা। তার ওপরে দুজন লোক বসে ঝিমোচ্ছে। শহুরে বাবুদের
বাজারে টাটকা সবজি সরবরাহ করে ওরা – রোজই করে, আজ নতুন নয়। তার ঘুমটা ভেঙেছিল কি এরকমই
কোন মেটাডোরের আওয়াজে?
রাতের ঘন্টা দুয়েকের ঘুমটাও তেমন জমাট বাঁধেনি টের পেল সে,
আধো তন্দ্রায়, আধো সুষুপ্তিতেই কেটেছে ওটুকু সময়। তন্দ্রা ভঙ্গ হয়ে চোখ মেলে তাকায়নি
– কিন্তু ছেঁড়া ছেঁড়া অস্বস্তির ঘুমের অনুভবটা তার মাথায় তার দু চোখের কড়কড়ানিতে। বিছানা
থেকে নেমে টেবিলে রাখা কাচের জগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে পান করল সুনেত্র। অন্যদিন তার
ফোনের অ্যালার্ম বাজে সাড়ে ছটায়, শম্পাদিদি আসে সাতটা নাগাদ। অতএব আরও ঘন্টাখানেকের
জন্যে টেনে আনা যায় চটকে যাওয়া ঘুমটাকে। সুনেত্র আবার শুয়ে পড়ল এবং চোখ বন্ধ করল
ঘুমোনোর চেষ্টায়।
চোখ বন্ধ করতেই তার
মনে হল, মুখে কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু একজন নারীর জীবনে দীর্ঘদিন মিশে ছিল যে
জীবনসঙ্গীর জীবন – তার চলে যাওয়ার সম্পূর্ণ শূণ্যতাটুকু বুকের মধ্যে শুষে নেওয়া - বড়ো
সহজ কাজ নয়। উপরন্তু সে নারীর মুম্বাই-প্রবাসী বড় সন্তানের কেমন যেন দায়সারা ভাব। ছোট
সন্তান খোঁজ-খবর রাখে, কিন্তু সেও তো ছিল দিল্লি-প্রবাসী। সে নারীর প্রাত্যহিক
জীবনের সঙ্গে সে সন্তানেরও তো কোন লেনদেন নেই। সুনেত্রর মনে হয়েছিল, জীবনের এই সমস্ত
একাকীত্বটুকু আত্মসাৎ করতে করতে মাও অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এবং মনে-প্রাণে
চাইবেন, আর কতদিন, এবার আমাকেও তুলে নাও ঠাকুর।
অতএব মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে খুব নিশ্চিন্ত বোধ
করেছিল সুনেত্র। এখানে এসে মাকে সে আক্ষরিক অর্থে “ভাত-জল” করার কাজে নিযুক্তও করেনি,
তার জন্যে ছিল শম্পাদিদি। শম্পাদিদিকে সুনেত্র দিদি বলে ঠিকই কিন্তু মহিলা তার থেকে
মাস ছয়েকের ছোট। একবার শম্পাদিদি বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, দিন তিনেকের জন্যে
চেনাজানা এক হসপিট্যালে ভর্তি করতে হয়েছিল। সে সময়েই শম্পাদিদির সঠিক বয়েসটা সে জানতে
পেরেছিল। এই তথ্যটি জেনেও “শম্পাদিদি” ডাকটা সে ছাড়েনি, কারণ শম্পাদিদির আচরণে,
ব্যবহারে সে সত্যিই এক দিদির মমতা টের পায়। মা এসেও শম্পাদিদিকে অত্যন্ত
আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শম্পামাকে মা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন, সুনেত্রর
প্রিয় রান্নার পদগুলি। অতএব আজ প্রায় তিন বছর হল, মা চলে যাওয়ার পরেও, সুনেত্র তার
মায়ের হাতের রান্নারই স্বাদ পায় শম্পাদিদির রান্নায়। এমন সৌভাগ্য কজনার হয়?
বাবা মারা যাওয়ার পর, মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে, সুনেত্রর
দাদা – সুমিত্রর অত্যন্ত গাত্রদাহ হয়েছিল। সুমিত্রর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, মাকে
ভুলিয়ে-ভালিয়ে, দাদাকে বঞ্চিত করে, সমস্ত সম্পত্তি এবং টাকাকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব
করছে সুনেত্র। সুনেত্রকে নয়, মাকে বার বার ফোন করত সুমিত্র, “তুমি যখন কলকাতার
বাড়ি ছেড়ে সুনেত্রর ওখানেই গিয়ে উঠলে, মা, তাহলে এই বেলা বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়াই
ভালো। ফাঁকা-বাড়ি ফেলে রাখলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, জানো তো? এখন বেচলে যা দাম
পাবে, দুবছর পরে তার অর্ধেকও পাবে না”।
মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি যদ্দিন রয়েছি, ও বাড়ি তো বিক্রি
হবে না, সুমু। আমি চোখ বুজলে তোরা যা প্রাণ চায়, করিস, আমি দেখতে আসব না”।
মার এই উত্তরের পর সুনেত্রর দাদা বহুদিন তাদের সঙ্গে আর
কোনরকম যোগাযোগ করেনি। অন্ততঃ সাত-আট মাস। অবশ্য সুনেত্র বা সুনেত্রর মাও কোন খোঁজ
করেননি – আসলে মন থেকে যোগাযোগ রাখার কোন তাগিদ অনুভব করেননি। কিন্তু দাদা স্বয়ং এক
বর্ষার দিনে অকস্মাৎ এসে হাজির হল সুনেত্রর কোয়ার্টারে। সুনেত্র কোয়ার্টারে তখন
ছিল না, হসপিট্যালের ডিউটিতে ছিল। লাঞ্চের সময় ঘরে ফিরেই সে অবাক। জিজ্ঞেস করল,
“হঠাৎ, কোন খবর না দিয়েই তুমি চলে এলে, দাদা? আমার এই কোয়ার্টারের ঠিকানা কী করে
জানলে?”
রহস্যের হাসি হেসে দাদা নাটকীয় ভঙ্গীতে বলেছিল, “মন যখন
টানে – তখন কোন বাধাকেই আর বিঘ্ন মনে হয় না, রে। চলে এলাম, বহুদিন মাকে দেখিনি।
মনটা বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তোকেও দেখিনি কতদিন বল, সেই বাবার কাজের সময় শেষ দেখা।
সত্যি বলতে, তোর ভাইপো-ভাইঝি আর বৌদিই আমাকে ঠেলে পাঠালো, বলল, দাদি বুঝি শুধু আংকলের
মা? চিন্তা কর, টুকাই, টিংকু – টিংকু ছোটবেলায় তোর কেমন ন্যাওটা ছিল, মনে আছে? সেই
টিংকু কী রকম পাকা-পাকা কথা শিখেছে, শুনলে তাজ্জব হয়ে যাবি”।
সুনেত্রর দাদার বরাবরই নাটক-থিয়েটার করার খুব শখ, সে পাড়ার ক্লাবেই
হোক, ওর অফিসের রিক্রিয়েশন প্রোগ্রামেই হোক কিংবা মুম্বাইয়ের বেঙ্গলি
অ্যাসোসিয়েশনের কালচারাল প্রোগ্রামেই হোক - সুযোগ পেলেই নেমে পড়ে। সুনেত্র
দু-তিনবার দেখেছে সে নাটক – যখন কলকাতায় থাকত। খুব ইম্প্রেসিভ মনে হয়নি তার – বড়ো
বেশি নাটুকে মনে হয়েছিল – কিছুটা যাত্রা টাইপের। সে যাই হোক, কোন কোন বিষয়ে কারও
প্যাশান থাকতেই পারে, সে নিয়ে সুনেত্রর কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু ওর দৈনন্দিন
জীবনের প্রায় প্রতিটি আচার-আচরণে এবং কথাবার্তাতেও সেই নাটুকেপনা প্রায়ই প্রকট হয়ে
ওঠে - সেটাই যা বিরক্তিকর।
সুনেত্র হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, “সে ভালই তো। ঠিকই তো
বলেছে”।
সেদিন বহু বছর পর, দু’ভাই একত্রে খাবার টেবিলে খেতে বসেছিল।
খাবার পরিবেশন করছিলেন মা। খাওয়ার সময় সুমিত্র আরো অনেক কথাই বলেছিল।
“এতদিন ধরে এতবড়ো কোম্পানিতে জব করছিস আর থাকিস এই ছোটা
কোয়ার্টারে? কোম্পানি না দেয়, তুই নিজেও তো এর থেকে একটু বড়া কোয়ার্টার বা বাড়ি
দেখে নিতে পারিস”।
“কী দরকার, দাদা? আমি আর মা – দুজনের জন্যে তিনটে শোবার ঘর,
ড্রয়িং-ডাইনিং, দুটো টয়লেট, দুটো বারান্দা – খারাপ কি – আমার তো দিব্যি চলে
যাচ্ছে, দাদা”।
“তুই সেই চিরকালের মেদামারা রয়ে গেলি, সুনু। চলে যাওয়াটা
কোন কাজের কথা নয়, কথাটা হল দিল বড়া হোনা চাহিয়ে। এবার আমি মাকে নিয়ে যাচ্ছি, এর
মধ্যে তুইও চলে আয় একদিন – দেখবি দুনিয়াটা কিতনা বড়া হ্যায়, কিতনা কুছ বাকি হ্যায়
হাসিল করনে কে লিয়ে.. মানে...ওই কী যেন বলে... অর্জন করার...”।
“তুমি মাকে নিয়ে যাচ্ছো? হঠাৎ? এমন আচমকা?” সুনেত্র মায়ের
মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে।
“তোকে তখন বললাম না, টুকাই, টিংকু, তাছাড়া তোর বৌদিও, আমাকে
ঠেলে পাঠিয়ে দিল, মাকে নিয়ে যেতেই হবে”।
“ঠিক আছে, কথাটা কদিন আগে ফোনেও তো বলে দিতে পারতে...মায়ের
রেডি হওয়ারও তো একটা ব্যাপার আছে...”।
“আরে ধুর, আমি আজই মাকে নিয়ে যাচ্ছি নাকি? আমার অফিসিয়াল
কিছু অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতায় এসেছিলাম, সেসব সেরে আমি মুম্বাই ফিরব পরশোরোজ । পরশুর
ফ্লাইটে মায়ের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে – সামকো সাড়ে ছে বাজে ফ্লাইট। ও নিয়ে তোকে
চিন্তা করতে হবে না। কোম্পানির গেস্ট হাউসে উঠেছি। কাজেই দায়িত্ব শুধু আর আমার নয়
আমার কোম্পানিরও। আমাদের পি.আর ম্যানেজার সব ইন্তেজাম করে দিয়েছে। পরশু সকালে সে
নিজেই গাড়ি নিয়ে আসবে, এবং ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে মাকে নিয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাবে
– সেখান থেকে আমরা একসাথ দমদম যাবো। তুই
একদম টেনশন করিস না, সুনু, ওসব জমানা কি আর আছে – সেই কুলির মাথায় পোর্টমান্টো,
হোল্ডঅল... ভারি ভারি টিনের সুটকেস, খাবার জলের কলসি...এই ছিল বাঙালির প্রবাস
যাত্রা...” হা হা করে কিছুক্ষণ উচ্চস্বরে হেসে, সুমিত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “মনে
আছে মা?”
বেশ বিরক্তি নিয়েই মা বললেন, “একদমই মনে নেই, বাবা।
ছোটবেলায় ওসব পড়েছি গল্পের বইয়ে, আর দেখেছি পুরোন দিনের সাদা-কালো সিনেমায়। নিজের
চোখে দেখিনি”।
মায়ের উত্তরে সুমিত্রর নাটকীয়তা বেশ দমে গেল, চাটনি খেতে
খেতে হাতের ঘড়ি দেখে বলল, “অনেকটা দেরি হয়ে গেল, মা। খেয়ে উঠেই আমি বেরিয়ে পড়ব,
অনেকটা পথ...। পরশু দিন তুমি তাহলে রেডি থেক মা। সকাল নটা-সাড়েনটা নাগাদ গাড়ি চলে
আসবে - সঙ্গে থাকবে আমাদের ম্যানেজার গুরপ্রীত, পাঞ্জাবি ছোকরা, ভালো ছেলে। আমার
থেকে ভালো বাংলা বলে – মুম্বাইতে বিশ বছরের ওপর হয়ে গেল, বাংলাটা প্রায় ভুলতেই
বসেছি...”।
দাদা বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুনেত্রকেও বেরোতো হল হসপিট্যালে,
তাই তখন আর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার কোন সময় পায়নি সুনেত্র। সন্ধের পর হসপিট্যাল
থেকে ফিরে ফ্রেস হওয়ার পর, ডাইনিং রুমে বসে সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার
বলো তো, মা? দাদা, একবারে হুট করে, তোমাকে নিতে চলে এল?”
মা চিন্তিত মুখে বলেছিলেন। “কী জানি, আমার জন্যে এতদিন পরে,
ওদের সকলের হঠাৎ এত দরদ উথলে উঠল কেন, বুঝতে পারছি না”।
সুনেত্র ব্রিফকেস খুলে চারটে পোস্ট-অফিসের হলুদ খাম, কিছু
সাদা কাগজ আর একটা পেন দিল মায়ের হাতে, বলল, “আমার কিন্তু তেমন সুবিধে ঠেকছে না,
মা। তোমার ব্যাগের মধ্যে এই খাম আর কাগজগুলো রেখে দাও। সাবধানে রেখ। খামগুলোতে
আমার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছি। কোনরকম অসুবিধে মনে হলেই দু কলম লিখে যে করে হোক
পোস্ট করে দিও। যে অবস্থাতেই আমি থাকি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি তোমার কাছে চলে
আসব। তোমাকে নিয়ে আসব, মা”।
মায়ের এমন অসহায় আর বিপন্ন মুখ আগে কোনদিন দেখেনি সুনেত্র,
খুব মৃদু স্বরে বললেন, “দুপুরে তুই আসার আগে আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছিল –
কলকাতার বাড়িটার জন্যে কি ভাবছো? কতদিন বাড়িটাকে ফেলে রাখবে, এরপর তো ওটা হানাবাড়ি
হয়ে উঠবে...। বাবার কত টাকার সেভিংস আছে – ব্যাংকে কত, পোস্ট-অফিসে কত? বাবার তো
আবার পোস্ট-অফিসে ওপর খুব ঝোঁক ছিল, বলে মুখ বেঁকিয়ে হাসল”। মাথা নীচু করে মা
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তারপর আবার বললেন, “ছোটবেলায় সুমু তো এমন হিংসুটে ছিল
না, সুকু। এই বয়েসে এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে তোর বাবার বা আমার যা কিছু আছে - আমি
তোকেই সব দিয়ে যাব, ওকে বঞ্চিত করে? এত বছর ও মুম্বাইতে রয়েছে - বিয়ের আগে প্রায়
পাঁচবছর, বিয়ের পরেও হয়ে গেল প্রায় আট-ন বছর। কোনদিন তো আমাকে এবং তোর বাবাকে
বলেনি, আমার এখানে এসো – কটা দিন ঘুরে যাও”।
সুনেত্র বাড়ি ফিরলে, মা আর সুনেত্র একসঙ্গে বসে চা খায় শম্পাদিদি
জানে। চা বানিয়ে এনে শম্পাদিদি দুজনের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে খুব সংকোচের
সঙ্গে বলল, “তোমার বড় ছেলে কিন্তু তোমার কিংবা দাদাবাবুর মতো একদমই না, মাসিমা। কেমন
যেন...”। কথা শেষ না করেই থেমে গেল।
“কেমন যেন কি, শম্পা?”
“না থাকগে ওসব কথা, দাদাবাবু আপনাকে তেল মাখিয়ে মুড়ি বাদাম
দিই?”
“দাও, মা খাবে তো?”
“দু মুঠো খাব, আমার জন্যে তুই আলাদা বাটি করিস না, শম্পামা,
সুনুর বাটিতেই বেশি করে দিস, আমি তুলে নেব”।
চায়ের কাপে কয়েকটা চুমুক দেওয়ার পর মা মুখ তুলে তাকালেন সুনেত্রর
দিকে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, “তুই কি এখানে বা কলকাতায় মাথা গোঁজার মতো নিজের
কোন আস্তানা বানাবি না?”
“সে ভাবে ভাবিনি মা, কিন্তু কেন বলো তো?”
“দেখ সুমু যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, কলকাতার বাড়িটা বেচে
দিতেই হবে। নয়তো ও বাড়ির যা দাম হতে পারে তার অর্ধেক টাকা তোকে সুমুকে মিটিয়ে দিয়ে
বাড়িটা তোকেই নিতে হবে...”।
মায়ের কথা শুনে সুনেত্র সেদিন টের পেয়েছিল, এতদিন পরে বড়ো
ছেলের অকস্মাৎ উদয়ে, মা কতখানি উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত হয়েছিলেন। সুনেত্র কিছু বলল
না, মায়ের কথার অপেক্ষায় রইল।
“...ও বাড়ির দাম কত হবে আমি জানি না, কিন্তু অর্ধেক হিসেবে তুই
যাই দাম দিবি ... ও সারাজীবন তোকে কথা শুনিয়ে যাবে - তুই ওকে ডাঁহা ঠকিয়েছিস। ও
বাড়ির জন্যে কোন সেন্টিমেন্ট না রেখে, তোর নিজের ক্ষমতায় তুই নিজের জন্যে একটা
ফ্ল্যাট বা বাড়ি যদি কিনে রাখিস, আমার মনে হয় তোর পক্ষে সেটাই স্বস্তির হবে”।
দুজনের কেউই বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলল না। চা শেষ হয়ে
গিয়েছিল, শম্পাদিদি বড়ো বাটিতে করে ওদের সামনে মুড়ি-মাখা রাখল রান্নাঘরে গেল।
একমুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে, মায়ের দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে সুনেত্র বলেছিল, “কয়েকমাস
ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। হলদিয়ার এই খোলামেলা পরিবেশে থেকে, চাকরি শেষে কলকাতার
সেই ভিড়-ভাড়, হই-হট্টগোলের মধ্যে ফিরে যেতে মন চাইছে না। চাকরি শেষ হতেও এখনো ধরো বিশ
-বাইশ বছর...। ততদিনে মন হলদিয়াতেই আরও জমে যাবে, চেনা-পরিচিতি বাড়বে। চাকরির পরেও
প্র্যাকটিস করতে ইচ্ছে হলে – তাতেও অসুবিধে হবে না। তাই ভাবছিলাম, হলদিয়াতে ছোট্ট
একটু জমি কিনে, নিজের মনোমত বাড়ি যদি একটা বানিয়ে নিই মন্দ হয় না। কলকাতায় তো সে
শখ মেটার কোন সম্ভাবনা নেই – সে শখ মেটাতে হলে কলকাতার বাইরে দৌড়তে হবে। বারাসাত
পার হয়ে সে হাবড়া বা গাইঘাটা, নয়তো বারুইপুর পার হয়ে সেই জয়নগর, বহেড়ু...। তার চেয়ে আমার এই হলদিয়াই ভাল”।
মা মুড়ি খেতে খেতে খুব মন দিয়ে শুনছিলেন সুনেত্রর কথা, সুনেত্র
বিরতি দিতেই বললেন, “ভালো-মন্দ বিচার করে যা করার হয় তাড়াতাড়ি করে নে, বাবা, আমি
বেঁচে থাকতে থাকতে। মনে হয় না, তোকে সংসারী দেখে যাওয়ার কপাল আমার হবে, কিন্তু চোখ
বোজার আগে অন্ততঃ তোর নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়েছে, এটুকু দেখে যেতে দে...”।
“সংসার করলে কখনো কখনো কী হয় সে তো দাদাকে দেখে কিছুটা বুঝছো মা, কিন্তু আমার বাড়ি দেখার সাধ আমি অপূর্ণ রাখব না, এ আমি তোমায় কথা দিলাম। এবং জীবনের শেষ কটা বছর আমার সেই বাড়িতেই তুমি বিরাজ করবে...”।
চলবে...