মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩১

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩০  


৩৭ 

সুকরা গ্রাম পার হয়ে, আধ-ক্রোশটাক যাওয়ার পর, রাজপথে ওঠার পথটা দেখিয়ে দিয়ে মারুলা চলে গেল দক্ষিণে আস্থানের দিকে। তারপর শুধু ভল্লা আর রামালি। ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় বিছানো বিস্তীর্ণ মাঠ চারদিকে। তার মাঝখান দিয়ে ধুসর অজগরের মতো পথ চলেছে এঁকেবেঁকে। ওদের সামনে – পুবের আকাশে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে। মাথার ওপরে ঘন কালো নির্ভাঁজ টানটান বিছানো চাদরের বুকে অজস্র অভ্রকুচির মতো চিকচিক করছে নক্ষত্রের বুটি – ওটাই আকাশ! রামালি রণপা চড়ে ভল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই হাঁটছিল – আর দু চোখ দিয়ে শুষে নিচ্ছিল আশ্চর্য এক অনুভূতি। ছোটবেলা থেকে নোনাপুর গ্রামের বাইরে সে যায়নি কোনদিন। মায়ের মুখটা তার মনেই পড়ে না বাবার মুখটা মনে পড়ে, কিন্তু ঝাপসা। এবং এতদিন তার জীবনটাও ছিল ঝাপসা। নিত্য অবহেলা, কুকথা আর মমতাহীন সম্পর্কের শিকলে তার মনটা বাঁধা পড়েছিল বড্ডো সংকীর্ণ গণ্ডীতে। আজ এই উন্মুক্ত প্রান্তরের মাঝখানে, উদার আকাশের নীচে – পায়ের তলায় পড়ে থাকা সীমানা ছাড়ানো পথে চলতে চলতে, এই প্রথম তার নিজেকে মুক্ত মনে হল।

শৈশব পার করে তার বালক বয়েসের সমস্ত স্মৃতিই বিভীষিকাময়। বালকের স্বভাবসুলভ চাপল্য, তার কাকির কাছে ছিল গুরুতর অপরাধ। একই ধরণের অপরাধ করে, তার বন্ধু আহোক, বিশুন, বাপালি, হানো, শল্কুরাও   তাদের মায়ের কাছে মার খেয়েছে, মায়ের অভিশাপও কুড়িয়েছে। কিন্তু একটু পরেই সেই মায়েরাই আবার পুত্রদের কোলে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছিয়েছে, আদর করেছে। কিন্তু তার কাকি? তার মারের মধ্যে থাকত মাতৃত্বহীন নিষ্ঠুরতা। “বাপ-মাখেকো ছেলে, তুই মরিস না কেন? মরলে যে আমার হাড় জুড়োয়” কাকির সেই অভিশাপ ছিল অন্তরের কথা। প্রচণ্ড মার খেয়ে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রামালি, কোনদিন দূর থেকে কাকির ডাক শোনেনি “রামালি কোথায় গেলি বাবা, ঘরে আয় খাবার বাড়ছি”…। দিনের পর দিন গড়িয়ে গেছে সকাল থেকে সন্ধ্যায় - কিন্তু না – কখনও কাকির ব্যবহারে অনুতাপের লেশ দেখেনি। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে, কাকা তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলে, কাকির চোখে দেখেছে তীব্র ঘৃণা, দাঁতে দাঁত চেপে বলতে শুনেছে, “মরিসনি এখনও আক্কুটে ছেলে? বাপের পিণ্ডি গিলে আমায় উদ্ধার করো”।

লজ্জায় অপমানে ঘৃণায় কতদিন সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে বনে, যে বনে এখন তার বাস। প্রথম প্রথম ছটফট করত দারুণ ভয়ে আর খিদেয়। ধীরে ধীরে সে ভয় কেটে গেল, সে বড়ো হতে লাগল। চিনে ফেলল বনের পশুপাখি, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ। তারাই যেন তার খেলার সাথী। বিষধর সাপও হয়ে উঠল তার বন্ধু – একটু বদরাগী, এই যা।

আহোক, বিনাই, শল্কু, হানো, মইলির মায়েরা তাকে প্রায়ই ডাকত…রান্নাঘরের কোনায় বসিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পেট ভরে খাওয়াত। বলত, কাকি তাড়িয়ে দিলে চুপিচুপি চলে আসবি, বাবা। আমাদের দুবেলা দুমুঠো জুটলে – তোরও জুটবে। পোড়া কপাল তোর বাবা, নইলে অমন লক্ষ্মী-জনার্দনের মতো মা-বাবা চলে যায়? রামালির চোখে জল চলে আসার উপক্রম হত  - কিন্তু না কোনদিন কাঁদেনি। বরং চোরের মতো রান্নাঘরের কোনায় বসে বসে সে অনুভব করত – মাতৃত্ব কেমন।

বিনাইয়ের মাকে খুব মনে পড়ে রামালির। পথে ঘাটে দেখা হলেই, রামালির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতেন বাড়িতে। রান্নাঘরের কোনে একটা পিঁড়িতে বসিয়ে বলতেন,  কোত্থাও যাবি না। চুপ করে বস - একপা নড়লে মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব। চুপ করে বসে, রামালি দেখত উনুনের গরমে ঘেমে-নেয়ে কী ভাবে বিনাইয়ের মা – ছেলেমেয়ে, স্বামী শ্বশুর, শাশুড়ির জন্যে খাবার বানাতেন। শ্বাশুড়ি ও মেয়েরা পাশে থেকে তাঁকে সাহায্য করত ঠিকই… কিন্তু তাঁর আচরণে সে দেখতে পেত মমতামাখা এক আশ্চর্য কর্তৃত্ব! চিনেছিল ওটাই মাতৃত্ব। মা।

প্রতিবেশী মায়েদের অনুকম্পাতে রামালির বাল্য জীবনটা এভাবেই কোনরকমে উৎরে গেল। কিন্তু সেই উৎরে যাওয়াটা আদৌ নিষ্কণ্টক হয়নি - সেটা কৈশোরে এসে রামালি টের পেয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল হানো আর শল্কু। কিন্তু তারাই একটু বড় হয়ে পাড়ার সকলের সামনে সুযোগ পেলেই তাকে টিটকিরি দিত। বিশেষ করে ডাণ্ডা-গুলি কিংবা চোরচোর অথবা কানামাছি খেলায় রামালির কাছে ওরা হেরে গেলে। বলত, মা-খেগো, আমাদের বাড়িতে গিলে এত বড়ো হলি, হতভাগা অন্নদাস, নির্লজ্জ ভিখিরি...। অন্যান্য সাথীরা বিশেষ করে বিনাইরা, প্রতিবাদ করলে, আরও ক্ষেপে উঠত ওরা – অশ্রাব্য গালিতে ছাড়িয়ে যেত বন্ধুত্বের সকল সীমানা...রামালি কিছু বলেনি কোনদিন। যোগ্য উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তার  ছিল না। কিন্তু তার মনের মধ্যে জমছিল প্রচণ্ড ক্রোধ – কাকি, হানো, শল্কুদের ওপর।

 

রাজপথে উঠে এসে ভল্লা বলল, “কীরে ব্যাটা, এতটা পথ এলি, কোন কথা নেই, কী ভাবছিস?”

রামালি ভল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাসল, বলল, “না, সেরকম কিছু না। জীবনে কোনদিন এরকম গভীর রাত্রে ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলিনি ভল্লাদাদা। বিশেষ করে এই রণপাজোড়া। তোমার থেকে শিখে বনের পথে দু-তিন ক্রোশ হেঁটেছি – কিন্তু এরকম দীর্ঘ পথচলা – যেন শেষ নেই – এ আশ্চর্য অভিজ্ঞতা”।

“ঠিক বলেছিস আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। আমাদের জীবন বন্দী ছিল - আমার যেমন ছোট্টগ্রাম পিপুলতলায়, তোর তেমনি নোনাপুরে। তার বাইরে বেরিয়ে দেখেছি - কী বিশাল এই রাজ্য - কতরকমের প্রকৃতি, কত মানুষজন। কত ধরনের চরিত্র আর পেশা... আশ্চর্য অভিজ্ঞতা তো বটেই...”।

“তোমার গ্রামের নাম পিপুলতলা?”

“হ্যাঁ। আমার আসল নাম ডামল”।

“ডামল? তাহলে ভল্লা নামটা?”

“ওটা ছদ্ম নাম, প্রশাসনের দেওয়া। এই কাজটার জন্যে বিশেষ নাম”। ভল্লা হেসে উত্তর দিল।

“আচ্ছা? এখানে তোমার কাজটা কী সেটা কিন্তু আজও স্পষ্ট বুঝলাম না, ভল্লাদাদা”।

“কেন? না বোঝার কী আছে? রাজার বিরুদ্ধে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে তোদের নিয়ে বিদ্রোহ করছি?”

রামালি হেসে বলল, “সে তো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের খেপাচ্ছ, আবার প্রশাসন তোমাকেই পূর্ণ সমর্থন করে যাচ্ছে – কেন? সেটাই তো আমার মোটা মাথায় ঢুকছে না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “মোটা মাথা শুধু তোর নয়, আমারও। আমাকে যখন প্রথম এই কাজের কথা বলা হয়েছিল – আমিও বুঝতে পারিনি। মান্যবর সহকারী রাজ্যাধিকারিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঠিক তোর মতোই। উত্তরে তিনি বললেন, আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রের কর্মশালায় – সর্বদাই নতুন নতুন অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হচ্ছে। নতুন বলতে - আরো হালকা কিন্তু পোক্ত বল্লমের দণ্ড, ভল্ল এবং বল্লমের আরও নিশিত ফলা। এরকম তির-ধনুক – তিরের ফলা, খড়্গ...সবকিছুই আরও উন্নত হচ্ছে। মানে অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধে হচ্ছে, এবং আরও ধারালো হচ্ছে”।

“ভালো তো। তাতে সমস্যা কিসের?”

“ওখানেই তো সমস্যা রে, রামালি। ধর গতদশ বছর ধরে যত অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হয়েছে, আজকের নতুন অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় সেগুলো গাব্দা ভারি আর ভোঁতা। তার ওপর পুরোনো অস্ত্রের লোহার ফলায় চট করে জং ধরে যায় – নষ্ট হয়ে যায় তাড়াতাড়ি”।

“হবেই তো”।

“এইবার তুই আমাকে বল, পুরোনো এই অস্ত্রগুলো তুই কি জমিয়ে রেখে দিবি? অত জায়গা কোথায়? ওগুলো কী তুই ফেলে দিবি? কোথায় ফেলবি? যারা কুড়িয়ে পাবে – তারা সকলেই তো অস্ত্র চালাতে শুরু করবে – রাজ্যে সন্ত্রাস শুরু হয়ে যাবে”।

“ঠিক, আমাদের যুদ্ধ-বিমুখ রাজা যুদ্ধ করে রাজ্যের সীমা বাড়ানোয় আগ্রহী নন। বহুকাল যুদ্ধ হচ্ছে না, অতএব বিস্তর অস্ত্র-শস্ত্র জমে উঠছে”।

“বাঃ ঠিক ধরেছিস। এবার প্রশাসনের উচ্চতম মহল থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে – নকল যুদ্ধ বানাও, সে যুদ্ধে পুরোন অস্ত্র সরবরাহ করো উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে। খালি হোক রাজধানীর অস্ত্র ভাণ্ডার – রাজধানীর কোষাগার ভরে উঠুক পুরোনো অস্ত্র বিক্রির অর্থে”।

রামালি কিছু বলল না। অনেকক্ষণ পর বলল, “এবার বুঝেছি, তোমার কাজ প্রশাসনের হয়ে কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওই অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করে – রাজকোষের সঞ্চয় বাড়ানো। আর সেই কারণেই তোমার এই বিপ্লব-বিপ্লব খেলা”।

হ্যাঁ, তবে এটা হল গৌণ দিক। এতে লাভের গুড় তেমন লোভনীয় হবে না। কিন্তু অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের হাতে এই অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারলে, প্রশাসনের লাভের গুড় কলসি উপচে পড়বে”।

“তার মানে বটতলির মিলা, জনারাই তোমার প্রধান লক্ষ্য?”

“অনেকটা তাই। আমরা পূবের লোকেরা খুব মাছ খাই, তোরা মাছ খাস?”

“খাই। তবে মাছের জন্যে আহামরি কোন আগ্রহ নেই।  কিন্তু হঠাৎ একথা কেন?”

“বলছি। আমরা যখন অনেক মাছ ধরি, তখন পুকুরে বা নদীতে জাল ফেলি – তাতে প্রচুর মাছ ওঠে। কিন্তু একটা-দুটো মাছ ধরতে হলে – ছিপ ফেলি। ছিপের আগায় বঁড়শিতে কিছু টোপ দিই, মাছকে লোভ দেখানোর জন্যে। মাছ সেই খাবার খেতে এলে, বঁড়শির কাঁটা তার মুখে আটকে যায় – এক ঝটকায় জল থেকে ছিপ তুললেই আমরা একটা মাছ পেয়ে যাই। এখানে আমাদের দল গড়া, তোদের মহড়া এবং তিনজন রক্ষীকে মেরে আস্থানে ডাকাতি …এ দৃষ্টান্তগুলো পাশের রাজ্যের গ্রামগুলোতে যত ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের অস্ত্রের ব্যবসাও তত ফুলে-ফেঁপে উঠবে”।

চলবে...


সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৭ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৮

৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তর

পশ্চিম ভারতের আঞ্চলিক দেবতা বাসুদেবের নাম প্রথম পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে। এই সময়েই পশ্চিম ভারতের শাসক রাজা এবং মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসা উপজাতি গোষ্ঠী প্রধান এবং রাজারাও দেবতা বাসুদেবের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন।

পশ্চিম ভারতের – রাজস্থান ও গুজরাট অঞ্চলে পশুপালক জনগোষ্ঠীর দেবতা ছিলেন কৃষ্ণ। আবার তামিল লোকগাথায় “কৃষ্ণবর্ণের” মায়ণ নামে এক দেবতার নাম পাওয়া যায়, যিনি পশুপালক, বাঁশি বাজাতেন এবং গোপরমণীদের সঙ্গে ক্রীড়া করতেন। তাঁর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়, তামিল ভাষার “সঙ্গম” নামক লোকগাথার সংকলনে। তাঁর অন্য আরও নাম ছিল যেমন, “পরিপাতল” এবং “মল”।  ভগবান বিষ্ণুর তামিল নাম পেরুমল, পেরুমাল বা থিরুমলকে এই পরিপাতল ও মল নামেরই পরিবর্তিত রূপ বলে অনুমান করা হয়।  বিশ্‌দেব, যাঁর কথা এই গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বে উল্লেখ করেছি, ছিলেন মধ্যভারতের অনার্য গোষ্ঠীর দেবতা। গঙ্গা-যমুনা-গোমতী-শোণ প্রভৃতি নদীর উর্বর অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের কাছে দেবতুল্য মহামানব ছিলেন শ্রীরাম। রামায়ণের বহু আগে থেকেই তাঁর বীরত্বের গাথা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। বাল্মীকির প্রতিভায় সেই কাহিনীই মহাকাব্যিক হয়ে উঠেছে।   

অন্যদিকে মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীদের আরও কিছু দেবতা সাধারণ জনসমাজে, জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। যেমন পশুপতি, শিব, মহাদেব, স্কন্দ ও গণপতি, সৃষ্টির প্রতীক লিঙ্গ, নৃসিংহ, বরাহ, সিংহ, নাগ, গরুড়, পেচক, রাজহংস, ময়ূর, মূষিক[1], মৎস্য ইত্যাদি, এবং নদ-নদী - গঙ্গা, নর্মদা, গোদাবরী, পাহাড় – হিমালয়, মন্দর, মৈনাক[2], গাছপালা – বট, অশ্বত্থ, তুলসী, কদম্ব, বিল্ব ইত্যাদি। এখানে একটা খটকা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে, এই অনার্য দেবতা বা দেব-আত্মাদের অনার্য মানুষরা কী নামে ডাকতেন[3]? সেটা আজ আর জানার কোন উপায় নেই, তার কারণ সংস্কৃতায়নের প্লাবনে সে ভাষা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে গেছে। সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার হলে, কিছু আভাস হয়তো মিলতে পারে।     

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পক্ষে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত – কমবেশি এই আটশ বছরের পর্যায়টি - মোটেই অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না। তার পরোক্ষ সমর্থন পাওয়া যায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যুগ-ধারণা থেকেও।

আমরা আগের পর্বে ব্রাহ্মণ্য যুগ-ধারণায় চারটি যুগের - সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি - আলোচনা করেছি। এই যুগধর্মের লক্ষণগুলি নিয়ে তখন আলোচনা করিনি। সেই লক্ষণগুলি হল, সত্য যুগে চারপাদ পুণ্য, ত্রেতায় ত্রিপাদ, দ্বাপরে দ্বিপাদ এবং কলিযুগে একপাদ পুণ্য ও ত্রিপাদ পাপ বা অনাচার। মহাভারত থেকে আমরা জানতে পারি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নর-দেহ ত্যাগের দিন থেকে দ্বাপর যুগের শেষ ও কলির শুরু। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যদি ৯০০ বি.সি.ই-তে ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে মোটামুটি ৮৫০/৮৪০ বি.সি.ই-তে হতে পারে কলি যুগের সূচনা।  অর্থাৎ সেই সময় থেকেই আর্যাবর্তের সমাজে বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের বিপরীতে অন্যান্য ভাবনার প্রভাব শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। সেই শক্তির প্রবল ধাক্কাটা এল ভগবান মহাবীর ও গৌতমবুদ্ধের আবির্ভাবে – অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। আর ব্রাহ্মণ্য মতে বেদ-বিরোধী বা ব্রাহ্মণ্য-বিদ্বেষী মতবাদ পাপাচার ছাড়া আর কিই বা হতে পারে? অতএব কলিযুগ হয়ে উঠল ত্রিপাদ পাপের ভারে ভারাক্রান্ত। এই কথাগুলিই আমরা তন্ত্রশাস্ত্রে স্বয়ং ভগবান মহাদেবের থেকেই শুনব, পরের পর্বে।       

যাই হোক, ব্রাহ্মণ্য-সমাজের এই প্রতিকূল পরিস্থিতির অনেকগুলি কারণের মধ্যে কয়েকটি হল,

১. ক্ষত্রিয় ছাড়া রাজা হওয়া যায় না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মন থেকে এমন ধারণা মুছে যেতে লাগল। কারণ নন্দবংশ থেকে ভারতজোড়া সাম্রাজ্য গড়ে তোলা মৌর্যরা কেউই ক্ষত্রিয় ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এবং পরবর্তী রাজাদের অধিকাংশই অক্ষত্রিয়, অনেকেই অনার্য – তাঁরা আর যাই করুন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতায় আগ্রহী ছিলেন না। 

২. দেশের রাজা ক্ষত্রিয় না হওয়ায়, ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ও সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ থাকছিল না। কারণ ক্ষত্রিয় রাজা না হলে, রাজসূয় কিংবা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন কে করবে? আর্য ধনী সম্প্রদায়ের যজ্ঞ থেকে জীবন ধারণ চলতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধি আসে না।         

৩. এই সময় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুললেন, গ্রীক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব, গুর্জর ইত্যাদি জাতি ও গোষ্ঠীর বিদেশী রাজারা। তাঁদের অনেকেই নিজস্ব ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যাঁদের ছিল না, তাঁরা এ দেশীয় ধর্মের মধ্যে বৌদ্ধ বা অনার্যদের ধর্ম গ্রহণ করলেন।

৪. ব্রাহ্মণ্যধর্মের অসহিষ্ণু দুর্ভেদ্যতার এতদিন পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছিল বৌদ্ধরা। কিন্তু বৌদ্ধদের ধর্মও পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত জটিল তত্ত্বনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ভগবান বুদ্ধের সহজ বাণীতে রাজা বিম্বিসার, অজাতশত্রু বা প্রসেনজিৎ মুগ্ধ হয়েছিলেন। ভগবান বুদ্ধের সরল বাণী ও আচার-আচরণ অনুসরণ করা স্থবিরবাদীনদের কথায় মুগ্ধ হয়েছিলেন সম্রাট অশোক। কিন্তু মহাযানী ধর্মমতের প্রবল উন্নাসিক পাণ্ডিত্যে বৌদ্ধরাও সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল।    

৫. এইরকম সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল দেশীয় অনার্য ধর্মশাখাগুলি, ভাগবত, শৈব, পাশুপত্য, গাণপত্য ইত্যাদি। তাঁদের ধর্মে, মূর্তিপুজো আছে। মন্ত্র উচ্চারণ আছে, কিন্তু সেই মন্ত্রের কোন বাঁধা-ধরা ধর্মতত্ত্ব নেই। এই ধর্ম আচরণের জন্যে মোহ, মায়া, অহংকার, ঈর্ষা, হিংসা, কামনা, বাসনা এবং সংসার ত্যাগ করে নির্জনে তপস্যা, ধ্যান কিছুই করতে হয় না।

এই পুজো প্রকৃত অর্থে যেন উৎসব– যার যেমন সামর্থ্য, যার যেমন ইচ্ছে - একত্রে পালন করা যায়। ধনীরা  মহামূল্য অলংকার ও পোষাকে সেজে দরিদ্রদের অকাতরে দান করতে পারেন, তাঁদের বৈভবে সমাজের সাধারণ মানুষকে আশ্চর্য করে দিতে পারেন। সমাজের মানুষ তাঁকে ধন্য ধন্য করবে। বাড়বে তাঁর যশ – প্রতিপত্তি। সাধারণ মানুষ সকলেই এই উৎসবে মেতে উঠবে। তারা আনন্দ করবে, নানান বাদ্য বাজিয়ে নাচ-গান, কোলাহল করবে। তাদের কেউ যাবে মন্দিরে পুজো দিতে, কেউ যাবে মদ খেতে, কেউ যাবে পতিতাদের কাছে – সারা বছরের পরিশ্রম থেকে মুক্তি নিয়ে কয়েকটি দিনের উপভোগ।

এই পুজো ও উৎসবের একটি দিনের অনবদ্য এবং নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যায় তামিল কাব্য “মাদুরাই মালিকা” থেকে। এই কাব্যের রচয়িতার নাম জানা যায় না, কিন্তু তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই, এমন সুন্দর সহজ একটি বর্ণনার জন্য। এই কাব্য খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজা নেড়ুঞ্জেলিয়াণের সম্মানে লেখা হয়েছিল, সম্ভবতঃ আরো এক বা দুশ বছর পরে। এমন বাস্তব উৎসবের চিত্র উত্তর ভারতের কাব্যে খুব কমই পাওয়া যায়।

“কবি বিশাল তোরণ পথে শহরে ঢুকলেন, তোরণের স্তম্ভে, খোদিত রয়েছে দেবী লক্ষ্মী[4]র মূর্তি। দেবীর সর্বাঙ্গ ঘিয়ে প্রলিপ্ত। শহরবাসী তাঁকে এই সশ্রদ্ধ নৈবেদ্য দিয়েছে, কারণ এই দেবীই তাদের দিয়েছেন শহরের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি। সে দিনটা ছিল উৎসব পালনের দিন। মহান রাজার বিজয় ও বীরত্বকে স্মরণ করার দিন। শহরের চারদিকে অজস্র বর্ণময় ধ্বজা উড়ছে, সেনাপতিদের গৃহের শিখরেও ধ্বজা উড়ছে, এমনকি তড্ডি[5] বিক্রেতাও মহানন্দে তার দোকানে ধ্বজা ওড়াচ্ছে। প্রশস্ত রাস্তাগুলি দিয়ে আজ যেন মানুষের স্রোত বয়ে চলেছে। সকল জাতির মানুষ, বাজারে বিকিকিনি করছে এবং আশ্চর্য সব বাদ্যযন্ত্রের তালে তারা গানও করছে।

বিশাল ঢাকের বাদ্য বাজিয়ে, একটি রাজকীয় শোভাযাত্রা এগিয়ে চলেছে পথে, সেই শোভাযাত্রায় আছে হাতি এবং রথ – রথের ঘোড়াগুলি তেজ এবং শক্তিতে টগবগ করছে। তাদের পেছনে চলেছে বিজয়ী পদাতিকের দল।  চারদিকে শঙ্খ ধ্বনিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বহুদিন বেঁধে রাখা কোন এক অতিকায় পশু হঠাৎ যেন ছাড়া পেয়ে উত্তাল সমুদ্রে নাচিয়ে তুলছে রণতরী – যতক্ষণ না তাকে আবার বন্দী করা যাবে, এই উদ্দীপনা থামবে না।

এর মধ্যেই পসারীরা মহোৎসাহে বিক্রি করে চলেছে তাদের পণ্য - মিষ্টান্ন, ফুলের মালা, সুগন্ধী রেণু এবং পানের খিলি। বয়স্কা মহিলারা ঘরে ঘরে মেয়েদের কাছে বিক্রি করছেন পুষ্পস্তবক এবং নানা রঙের পদক। অভিজাত মানুষেরা রথে চড়ে চলেছেন, তাঁদের পরনে উজ্জ্বল রঙিন বসন এবং অঙ্গে সুগন্ধী ফুলের মালা। তাঁদের কটিবন্ধে  সোনালী তরবারী-কোষগুলি ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। নানান অলঙ্কারে ভূষিতা সুন্দরী পুরনারীরা অলিন্দ ও গবাক্ষ থেকে রাজপথের শোভাযাত্রা লক্ষ্য করছেন।

বহু মানুষ মন্দিরে জড়ো হয়েছেন পুজো দিতে, তাঁরা সমবেত সুরে প্রার্থনা করছেন, পুষ্প ও মাল্যের নৈবেদ্য নিবেদন করছেন দেবদেবীর চরণে, সাধুদের প্রণাম করছেন শ্রদ্ধায়। শিল্পীরা তাদের বিপণিতে কাজ করছেন, তাঁরা শাঁখের বালা বানাচ্ছেন, স্বর্ণকার, তাম্রকার, পটশিল্পী, তন্তুবায় সকলেই এখন ব্যস্ত; ব্যস্ত বস্ত্র, ফুল, চন্দনের ব্যাপারীরাও। খাবারের বিপণিগুলিতেও ব্যস্ততার বিরাম নেই – টাটকা সবজি, কাঁঠাল, আম, চিনির মঠ, রান্না করা ভাত এবং মাংস, কী নেই সেখানে!

সন্ধ্যায় শহরের বারবনিতারা নৃত্য ও গীতে মনোরঞ্জন করছে, তাদের প্রিয় নাগরদের। তাদের গান ও বাঁশির সুরে রাজপথও যেন মত্ত হয়ে উঠেছে। মত্ত প্রাকৃতজন অতিরিক্ত পান করে পথেই গড়াগড়ি দিচ্ছে, অভিজাত মহিলারা এসেছেন মন্দিরের সন্ধ্যারতি দেখতে, তাঁদের হাতে জ্বলন্ত দীপ ও নৈবেদ্য, তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন তাঁদের সখীবৃন্দ ও সন্তানেরা। তাঁদের নৃত্য ও মন্ত্রোচ্চারণে গমগম করছে মন্দিরের নাটমণ্ডপ।

অবশেষে এল রাত্রি, নগর এখন নিদ্রামগ্ন – জেগে আছে শুধু প্রেত ও অশরীরি, আর সাহসী সিঁদকাটারা। তাদের হাতে দড়ির মই, ছুরি, মাটির দেয়ালে গর্ত করার ছেনি। কিন্তু নৈশ প্রহরীরাও সকলে সজাগ, নাগরিকরা নিশ্চিন্তেই নিশিযাপন করল নিজ নিজ গৃহে।

ভোর হল ব্রাহ্মণদের পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণে। চারণ কবিরা পল্লীতে পল্লীতে গান গেয়ে নতুন দিনের সূচনা করলেন। ব্যবসায়ীরা তাদের বিপণি খুলে পসরা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ভোরের পিপাসী রসিকদের জন্যে তড্ডি-বিক্রেতাও তার বিপণি খুলেছে। মত্তজনেরা আবার টলতে লাগল, চিৎকারে ভরে তুলল রাজপথ। নগরের ঘরে ঘরে দরজা খোলার শব্দ। মহিলারা বাড়ির অঙ্গন থেকে বিগত উৎসবের বাসি ফুল ঝাঁট দিয়ে সরাতে শুরু করলেন। এভাবেই নগর আবার ফিরে গেল তার প্রাত্যহিক ব্যস্ততায়”। [Wonder that was India – A L Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত – অনুবাদ - লেখক।]

চলবে...


[1] রাজস্থানের বিকানিরে কর্ণি মাতা মন্দিরে অজস্র পবিত্র মূষিক আজও পূজিত হয়।  

[2] মৈনাক হিমালয়ের পুত্র এবং শিব জায়া পার্বতীর ভ্রাতা। ছোট এই পর্বত নাকি উড়তেও পারতেন।   

[3] সারা ভারতে তামিল ভাষাই প্রথম আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাই একমাত্র এই ভাষাতেই প্রাক-আর্য কিছু নাম পাওয়া গিয়েছে।

[4] দেবী লক্ষ্মী আজও আমাদের সমৃদ্ধি দেন, কিন্তু সে সময় তিনি নিরাপত্তাও দিতেন। অতএব অনুমান করা যায়, খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে দেবী লক্ষ্মী পূর্ণ দেবী রূপেই পূজিতা হতেন। পরবর্তীকালের হিন্দুধর্মে, তিনি নিরাপত্তার ব্যাপারটা তাঁর মাতা দেবী দুর্গার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। 

[5] তড্ডি অর্থাৎ তাড়ি – তাল, খেজুর অথবা নারকেল গাছের রস থেকে বানানো মদ।


শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৪ 



১৫  

কিসের একটা আওয়াজে সুনেত্রর ঘুম ভেঙে গেল আচমকা। বিছানায় উঠে বসে আওয়াজটা কিসের বোঝার চেষ্টা করল। দেয়ালের ঘড়িতে দেখল পাঁচটা কুড়ি। তার মানে দু-ঘন্টাও ঘুমোয়নি সে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল স্ট্রিট লাইট নিভে গেছে। সূর্যোদয় হয়নি, কিন্তু মায়াবি আলোয় ভরে উঠেছে সামনের রাস্তা, গাছাপালা, টুকরো আকাশটাও। যদিও তার ঘরে আবছায়া। নির্জন রাস্তা দিয়ে হঠাৎই ঝমঝমিয়ে দৌড়ে গেল একটা মেটাডোর – পিঠে উপচে পড়া নানান শাক-সব্জির পসরা। তার ওপরে দুজন লোক বসে ঝিমোচ্ছে। শহুরে বাবুদের বাজারে টাটকা সবজি সরবরাহ করে ওরা – রোজই করে, আজ নতুন নয়। তার ঘুমটা ভেঙেছিল কি এরকমই কোন মেটাডোরের আওয়াজে?  

রাতের ঘন্টা দুয়েকের ঘুমটাও তেমন জমাট বাঁধেনি টের পেল সে, আধো তন্দ্রায়, আধো সুষুপ্তিতেই কেটেছে ওটুকু সময়। তন্দ্রা ভঙ্গ হয়ে চোখ মেলে তাকায়নি – কিন্তু ছেঁড়া ছেঁড়া অস্বস্তির ঘুমের অনুভবটা তার মাথায় তার দু চোখের কড়কড়ানিতে। বিছানা থেকে নেমে টেবিলে রাখা কাচের জগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে পান করল সুনেত্র। অন্যদিন তার ফোনের অ্যালার্ম বাজে সাড়ে ছটায়, শম্পাদিদি আসে সাতটা নাগাদ। অতএব আরও ঘন্টাখানেকের জন্যে টেনে আনা যায় চটকে যাওয়া ঘুমটাকে। সুনেত্র আবার শুয়ে পড়ল এবং চোখ বন্ধ করল ঘুমোনোর চেষ্টায়।

 চোখ বন্ধ করতেই তার মনে হল, মুখে কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু একজন নারীর জীবনে দীর্ঘদিন মিশে ছিল যে জীবনসঙ্গীর জীবন – তার চলে যাওয়ার সম্পূর্ণ শূণ্যতাটুকু বুকের মধ্যে শুষে নেওয়া - বড়ো সহজ কাজ নয়। উপরন্তু সে নারীর মুম্বাই-প্রবাসী বড় সন্তানের কেমন যেন দায়সারা ভাব। ছোট সন্তান খোঁজ-খবর রাখে, কিন্তু সেও তো ছিল দিল্লি-প্রবাসী। সে নারীর প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সে সন্তানেরও তো কোন লেনদেন নেই। সুনেত্রর মনে হয়েছিল, জীবনের এই সমস্ত একাকীত্বটুকু আত্মসাৎ করতে করতে মাও অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এবং মনে-প্রাণে চাইবেন, আর কতদিন, এবার আমাকেও তুলে নাও ঠাকুর।       

অতএব মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে খুব নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল সুনেত্র। এখানে এসে মাকে সে আক্ষরিক অর্থে “ভাত-জল” করার কাজে নিযুক্তও করেনি, তার জন্যে ছিল শম্পাদিদি। শম্পাদিদিকে সুনেত্র দিদি বলে ঠিকই কিন্তু মহিলা তার থেকে মাস ছয়েকের ছোট। একবার শম্পাদিদি বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, দিন তিনেকের জন্যে চেনাজানা এক হসপিট্যালে ভর্তি করতে হয়েছিল। সে সময়েই শম্পাদিদির সঠিক বয়েসটা সে জানতে পেরেছিল। এই তথ্যটি জেনেও “শম্পাদিদি” ডাকটা সে ছাড়েনি, কারণ শম্পাদিদির আচরণে, ব্যবহারে সে সত্যিই এক দিদির মমতা টের পায়। মা এসেও শম্পাদিদিকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শম্পামাকে মা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন, সুনেত্রর প্রিয় রান্নার পদগুলি। অতএব আজ প্রায় তিন বছর হল, মা চলে যাওয়ার পরেও, সুনেত্র তার মায়ের হাতের রান্নারই স্বাদ পায় শম্পাদিদির রান্নায়। এমন সৌভাগ্য কজনার হয়?

বাবা মারা যাওয়ার পর, মা এখানে এসে থাকতে শুরু করাতে, সুনেত্রর দাদা – সুমিত্রর অত্যন্ত গাত্রদাহ হয়েছিল। সুমিত্রর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, মাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, দাদাকে বঞ্চিত করে, সমস্ত সম্পত্তি এবং টাকাকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার মতলব করছে সুনেত্র। সুনেত্রকে নয়, মাকে বার বার ফোন করত সুমিত্র, “তুমি যখন কলকাতার বাড়ি ছেড়ে সুনেত্রর ওখানেই গিয়ে উঠলে, মা, তাহলে এই বেলা বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়াই ভালো। ফাঁকা-বাড়ি ফেলে রাখলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, জানো তো? এখন বেচলে যা দাম পাবে, দুবছর পরে তার অর্ধেকও পাবে না”।

মা উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি যদ্দিন রয়েছি, ও বাড়ি তো বিক্রি হবে না, সুমু। আমি চোখ বুজলে তোরা যা প্রাণ চায়, করিস, আমি দেখতে আসব না”।

মার এই উত্তরের পর সুনেত্রর দাদা বহুদিন তাদের সঙ্গে আর কোনরকম যোগাযোগ করেনি। অন্ততঃ সাত-আট মাস। অবশ্য সুনেত্র বা সুনেত্রর মাও কোন খোঁজ করেননি – আসলে মন থেকে যোগাযোগ রাখার কোন তাগিদ অনুভব করেননি। কিন্তু দাদা স্বয়ং এক বর্ষার দিনে অকস্মাৎ এসে হাজির হল সুনেত্রর কোয়ার্টারে। সুনেত্র কোয়ার্টারে তখন ছিল না, হসপিট্যালের ডিউটিতে ছিল। লাঞ্চের সময় ঘরে ফিরেই সে অবাক। জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ, কোন খবর না দিয়েই তুমি চলে এলে, দাদা? আমার এই কোয়ার্টারের ঠিকানা কী করে জানলে?”

রহস্যের হাসি হেসে দাদা নাটকীয় ভঙ্গীতে বলেছিল, “মন যখন টানে – তখন কোন বাধাকেই আর বিঘ্ন মনে হয় না, রে। চলে এলাম, বহুদিন মাকে দেখিনি। মনটা বড়ো চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। তোকেও দেখিনি কতদিন বল, সেই বাবার কাজের সময় শেষ দেখা। সত্যি বলতে, তোর ভাইপো-ভাইঝি আর বৌদিই আমাকে ঠেলে পাঠালো, বলল, দাদি বুঝি শুধু আংকলের মা? চিন্তা কর, টুকাই, টিংকু – টিংকু ছোটবেলায় তোর কেমন ন্যাওটা ছিল, মনে আছে? সেই টিংকু কী রকম পাকা-পাকা কথা শিখেছে, শুনলে তাজ্জব হয়ে যাবি”।

সুনেত্রর দাদার বরাবরই নাটক-থিয়েটার করার খুব শখ, সে পাড়ার ক্লাবেই হোক, ওর অফিসের রিক্রিয়েশন প্রোগ্রামেই হোক কিংবা মুম্বাইয়ের বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের কালচারাল প্রোগ্রামেই হোক - সুযোগ পেলেই নেমে পড়ে। সুনেত্র দু-তিনবার দেখেছে সে নাটক – যখন কলকাতায় থাকত। খুব ইম্প্রেসিভ মনে হয়নি তার – বড়ো বেশি নাটুকে মনে হয়েছিল – কিছুটা যাত্রা টাইপের। সে যাই হোক, কোন কোন বিষয়ে কারও প্যাশান থাকতেই পারে, সে নিয়ে সুনেত্রর কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু ওর দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি আচার-আচরণে এবং কথাবার্তাতেও সেই নাটুকেপনা প্রায়ই প্রকট হয়ে ওঠে - সেটাই যা বিরক্তিকর।

সুনেত্র হালকা হেসে উত্তর দিয়েছিল, “সে ভালই তো। ঠিকই তো বলেছে”।

সেদিন বহু বছর পর, দু’ভাই একত্রে খাবার টেবিলে খেতে বসেছিল। খাবার পরিবেশন করছিলেন মা। খাওয়ার সময় সুমিত্র আরো অনেক কথাই বলেছিল।  

“এতদিন ধরে এতবড়ো কোম্পানিতে জব করছিস আর থাকিস এই ছোটা কোয়ার্টারে? কোম্পানি না দেয়, তুই নিজেও তো এর থেকে একটু বড়া কোয়ার্টার বা বাড়ি দেখে নিতে পারিস”।

“কী দরকার, দাদা? আমি আর মা – দুজনের জন্যে তিনটে শোবার ঘর, ড্রয়িং-ডাইনিং, দুটো টয়লেট, দুটো বারান্দা – খারাপ কি – আমার তো দিব্যি চলে যাচ্ছে, দাদা”।

“তুই সেই চিরকালের মেদামারা রয়ে গেলি, সুনু। চলে যাওয়াটা কোন কাজের কথা নয়, কথাটা হল দিল বড়া হোনা চাহিয়ে। এবার আমি মাকে নিয়ে যাচ্ছি, এর মধ্যে তুইও চলে আয় একদিন – দেখবি দুনিয়াটা কিতনা বড়া হ্যায়, কিতনা কুছ বাকি হ্যায় হাসিল করনে কে লিয়ে.. মানে...ওই কী যেন বলে... অর্জন করার...”।

“তুমি মাকে নিয়ে যাচ্ছো? হঠাৎ? এমন আচমকা?” সুনেত্র মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে।

“তোকে তখন বললাম না, টুকাই, টিংকু, তাছাড়া তোর বৌদিও, আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিল, মাকে নিয়ে যেতেই হবে”।

“ঠিক আছে, কথাটা কদিন আগে ফোনেও তো বলে দিতে পারতে...মায়ের রেডি হওয়ারও তো একটা ব্যাপার আছে...”।

“আরে ধুর, আমি আজই মাকে নিয়ে যাচ্ছি নাকি? আমার অফিসিয়াল কিছু অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতায় এসেছিলাম, সেসব সেরে আমি মুম্বাই ফিরব পরশোরোজ । পরশুর ফ্লাইটে মায়ের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে – সামকো সাড়ে ছে বাজে ফ্লাইট। ও নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। কোম্পানির গেস্ট হাউসে উঠেছি। কাজেই দায়িত্ব শুধু আর আমার নয় আমার কোম্পানিরও। আমাদের পি.আর ম্যানেজার সব ইন্তেজাম করে দিয়েছে। পরশু সকালে সে নিজেই গাড়ি নিয়ে আসবে, এবং ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে মাকে নিয়ে আমাদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাবে  – সেখান থেকে আমরা একসাথ দমদম যাবো। তুই একদম টেনশন করিস না, সুনু, ওসব জমানা কি আর আছে – সেই কুলির মাথায় পোর্টমান্টো, হোল্ডঅল... ভারি ভারি টিনের সুটকেস, খাবার জলের কলসি...এই ছিল বাঙালির প্রবাস যাত্রা...” হা হা করে কিছুক্ষণ উচ্চস্বরে হেসে, সুমিত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “মনে আছে মা?”

বেশ বিরক্তি নিয়েই মা বললেন, “একদমই মনে নেই, বাবা। ছোটবেলায় ওসব পড়েছি গল্পের বইয়ে, আর দেখেছি পুরোন দিনের সাদা-কালো সিনেমায়। নিজের চোখে দেখিনি”।

মায়ের উত্তরে সুমিত্রর নাটকীয়তা বেশ দমে গেল, চাটনি খেতে খেতে হাতের ঘড়ি দেখে বলল, “অনেকটা দেরি হয়ে গেল, মা। খেয়ে উঠেই আমি বেরিয়ে পড়ব, অনেকটা পথ...। পরশু দিন তুমি তাহলে রেডি থেক মা। সকাল নটা-সাড়েনটা নাগাদ গাড়ি চলে আসবে - সঙ্গে থাকবে আমাদের ম্যানেজার গুরপ্রীত, পাঞ্জাবি ছোকরা, ভালো ছেলে। আমার থেকে ভালো বাংলা বলে – মুম্বাইতে বিশ বছরের ওপর হয়ে গেল, বাংলাটা প্রায় ভুলতেই বসেছি...”।

দাদা বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুনেত্রকেও বেরোতো হল হসপিট্যালে, তাই তখন আর মায়ের সঙ্গে কথাবার্তার কোন সময় পায়নি সুনেত্র। সন্ধের পর হসপিট্যাল থেকে ফিরে ফ্রেস হওয়ার পর, ডাইনিং রুমে বসে সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার বলো তো, মা? দাদা, একবারে হুট করে, তোমাকে নিতে চলে এল?”

মা চিন্তিত মুখে বলেছিলেন। “কী জানি, আমার জন্যে এতদিন পরে, ওদের সকলের হঠাৎ এত দরদ উথলে উঠল কেন, বুঝতে পারছি না”।  

সুনেত্র ব্রিফকেস খুলে চারটে পোস্ট-অফিসের হলুদ খাম, কিছু সাদা কাগজ আর একটা পেন দিল মায়ের হাতে, বলল, “আমার কিন্তু তেমন সুবিধে ঠেকছে না, মা। তোমার ব্যাগের মধ্যে এই খাম আর কাগজগুলো রেখে দাও। সাবধানে রেখ। খামগুলোতে আমার নাম-ঠিকানা লিখে দিয়েছি। কোনরকম অসুবিধে মনে হলেই দু কলম লিখে যে করে হোক পোস্ট করে দিও। যে অবস্থাতেই আমি থাকি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি তোমার কাছে চলে আসব। তোমাকে নিয়ে আসব, মা”।

মায়ের এমন অসহায় আর বিপন্ন মুখ আগে কোনদিন দেখেনি সুনেত্র, খুব মৃদু স্বরে বললেন, “দুপুরে তুই আসার আগে আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছিল – কলকাতার বাড়িটার জন্যে কি ভাবছো? কতদিন বাড়িটাকে ফেলে রাখবে, এরপর তো ওটা হানাবাড়ি হয়ে উঠবে...। বাবার কত টাকার সেভিংস আছে – ব্যাংকে কত, পোস্ট-অফিসে কত? বাবার তো আবার পোস্ট-অফিসে ওপর খুব ঝোঁক ছিল, বলে মুখ বেঁকিয়ে হাসল”। মাথা নীচু করে মা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তারপর আবার বললেন, “ছোটবেলায় সুমু তো এমন হিংসুটে ছিল না, সুকু। এই বয়েসে এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে তোর বাবার বা আমার যা কিছু আছে - আমি তোকেই সব দিয়ে যাব, ওকে বঞ্চিত করে? এত বছর ও মুম্বাইতে রয়েছে - বিয়ের আগে প্রায় পাঁচবছর, বিয়ের পরেও হয়ে গেল প্রায় আট-ন বছর। কোনদিন তো আমাকে এবং তোর বাবাকে বলেনি, আমার এখানে এসো – কটা দিন ঘুরে যাও”।

সুনেত্র বাড়ি ফিরলে, মা আর সুনেত্র একসঙ্গে বসে চা খায় শম্পাদিদি জানে। চা বানিয়ে এনে শম্পাদিদি দুজনের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, “তোমার বড় ছেলে কিন্তু তোমার কিংবা দাদাবাবুর মতো একদমই না, মাসিমা। কেমন যেন...”। কথা শেষ না করেই থেমে গেল।

“কেমন যেন কি, শম্পা?”

“না থাকগে ওসব কথা, দাদাবাবু আপনাকে তেল মাখিয়ে মুড়ি বাদাম দিই?”

“দাও, মা খাবে তো?”

“দু মুঠো খাব, আমার জন্যে তুই আলাদা বাটি করিস না, শম্পামা, সুনুর বাটিতেই বেশি করে দিস, আমি তুলে নেব”।

চায়ের কাপে কয়েকটা চুমুক দেওয়ার পর মা মুখ তুলে তাকালেন সুনেত্রর দিকে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, “তুই কি এখানে বা কলকাতায় মাথা গোঁজার মতো নিজের কোন আস্তানা বানাবি না?”

“সে ভাবে ভাবিনি মা, কিন্তু কেন বলো তো?”

“দেখ সুমু যে ভাবে উঠে পড়ে লেগেছে, কলকাতার বাড়িটা বেচে দিতেই হবে। নয়তো ও বাড়ির যা দাম হতে পারে তার অর্ধেক টাকা তোকে সুমুকে মিটিয়ে দিয়ে বাড়িটা তোকেই নিতে হবে...”।

মায়ের কথা শুনে সুনেত্র সেদিন টের পেয়েছিল, এতদিন পরে বড়ো ছেলের অকস্মাৎ উদয়ে, মা কতখানি উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত হয়েছিলেন। সুনেত্র কিছু বলল না, মায়ের কথার অপেক্ষায় রইল।

“...ও বাড়ির দাম কত হবে আমি জানি না, কিন্তু অর্ধেক হিসেবে তুই যাই দাম দিবি ... ও সারাজীবন তোকে কথা শুনিয়ে যাবে - তুই ওকে ডাঁহা ঠকিয়েছিস। ও বাড়ির জন্যে কোন সেন্টিমেন্ট না রেখে, তোর নিজের ক্ষমতায় তুই নিজের জন্যে একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ি যদি কিনে রাখিস, আমার মনে হয় তোর পক্ষে সেটাই স্বস্তির হবে”।

দুজনের কেউই বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বলল না। চা শেষ হয়ে গিয়েছিল, শম্পাদিদি বড়ো বাটিতে করে ওদের সামনে মুড়ি-মাখা রাখল রান্নাঘরে গেল। একমুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে, মায়ের দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে সুনেত্র বলেছিল, “কয়েকমাস ধরেই একটা কথা ভাবছিলাম। হলদিয়ার এই খোলামেলা পরিবেশে থেকে, চাকরি শেষে কলকাতার সেই ভিড়-ভাড়, হই-হট্টগোলের মধ্যে ফিরে যেতে মন চাইছে না। চাকরি শেষ হতেও এখনো ধরো বিশ -বাইশ বছর...। ততদিনে মন হলদিয়াতেই আরও জমে যাবে, চেনা-পরিচিতি বাড়বে। চাকরির পরেও প্র্যাকটিস করতে ইচ্ছে হলে – তাতেও অসুবিধে হবে না। তাই ভাবছিলাম, হলদিয়াতে ছোট্ট একটু জমি কিনে, নিজের মনোমত বাড়ি যদি একটা বানিয়ে নিই মন্দ হয় না। কলকাতায় তো সে শখ মেটার কোন সম্ভাবনা নেই – সে শখ মেটাতে হলে কলকাতার বাইরে দৌড়তে হবে। বারাসাত পার হয়ে সে হাবড়া বা গাইঘাটা, নয়তো বারুইপুর পার হয়ে সেই জয়নগর, বহেড়ু...।  তার চেয়ে আমার এই হলদিয়াই ভাল”।

মা মুড়ি খেতে খেতে খুব মন দিয়ে শুনছিলেন সুনেত্রর কথা, সুনেত্র বিরতি দিতেই বললেন, “ভালো-মন্দ বিচার করে যা করার হয় তাড়াতাড়ি করে নে, বাবা, আমি বেঁচে থাকতে থাকতে। মনে হয় না, তোকে সংসারী দেখে যাওয়ার কপাল আমার হবে, কিন্তু চোখ বোজার আগে অন্ততঃ তোর নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হয়েছে, এটুকু দেখে যেতে দে...”।

“সংসার করলে কখনো কখনো কী হয় সে তো দাদাকে দেখে কিছুটা বুঝছো মা, কিন্তু আমার বাড়ি দেখার সাধ আমি অপূর্ণ রাখব না, এ আমি তোমায় কথা দিলাম। এবং জীবনের শেষ কটা বছর আমার সেই বাড়িতেই তুমি বিরাজ করবে...”।

চলবে... 


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...