মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২২"]


৫.৬.৫ তন্ত্রশাস্ত্র (আগের পর্বের পরে)

অষ্টম উল্লাসে দেবী পার্বতী প্রশ্ন করলেন, “হে বিভো, বর্তমানে (কলিকালে) বর্ণ ও আশ্রম কী কী? সেই বর্ণে ও আশ্রমে যে আচার-আচরণ বিহিত আছে, সে কথাও আমায় বল”। দেবাদিদেব সদাশিব বললেন, “হে সুব্রতে, সত্য প্রভৃতি তিন যুগে চার বর্ণ ও চার আশ্রমের কথা বলা আছে। কিন্তু কলিকালে বর্ণ পাঁচ - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং সামান্য, আর আশ্রম দুই – গার্হস্থ্য ও ভৈক্ষুক– ব্রহ্মচর্য ও বাণপ্রস্থ নেই। কলিকালে গৃহস্থদের সকল কাজই আগমোক্ত ও তন্ত্রমতে কর্তব্য। কলিযুগে ভৈক্ষুকাশ্রমেও বেদোক্ত দণ্ডধারণ নেই, কারণ ওটা বৈদিক সংস্কার। কলিতে শৈব সংস্কার বিধি অনুসারে, অবধূতাশ্রম ধারণকেই “সন্ন্যাস গ্রহণ” বলা হয়। কলিযুগে ব্রাহ্মণ এবং অন্য সকল বর্ণেরই এই দুই আশ্রমে অধিকার থাকবে।

বৃদ্ধ মাতা-পিতা, শিশু পুত্রকন্যা, পতিব্রতা ভার্যা, অসমর্থ বন্ধুজনকে ত্যাগ করে প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস গ্রহণ নিষিদ্ধ। সাধক গৃহস্থোচিত কর্তব্য শেষ করে, আত্মীয়-স্বজন সকলকে পরিতুষ্ট করে, মমতাশূণ্য, কামনাশূণ্য ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে গৃহত্যাগ করতে পারে। গৃহস্থাশ্রম ছেড়ে যদি কেউ সন্ন্যাস গ্রহণে ইচ্ছা করে, সেক্ষেত্রে তাকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী এবং গ্রামের সকলের শুভেচ্ছা ও অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। এর আগের পর্বে (৪.৩.১) আমি লিখেছিলাম বৌদ্ধ ধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তার কালে, সমাজের বহু তরুণ এবং যুবক সংসারের দায়িত্ব এড়াতে, সংসার ত্যাগ করে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে বৌদ্ধ-বিহারে যোগ দিত। অতএব তন্ত্র-শাস্ত্র রচনার কালে, সমাজের যুবসম্প্রদায়ের সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের জন্যেই সন্ন্যাস গ্রহণে এত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল।    

সন্ন্যাসীর দেহ কখনও দাহ করা যাবে না, মরদেহ গন্ধপুষ্পে অর্চনা করে, ভূমিতে সমাধি অথবা জলে নিমগ্ন করতে হবে।

এখানে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই, দশম উল্লাসের ৭৯ ও ৮০ সংখ্যক শ্লোকে দেবাদিদেব শঙ্কর বলেছেন, “কুলকামিনীকে মৃতা স্বামীর সঙ্গে দগ্ধ করবে না, যেহেতু ওই রমণী জগতে অপ্রকাশিত শরীরা তোমারই (দেবী পার্বতীর) স্বরূপ। মোহবশতঃ কোন রমণী স্বামীর চিতায় উঠলে, সে অবশ্যই নরকগামিনী হবে”। এমন স্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও এই সেদিন পর্যন্ত সহমরণ ও সতীদাহের হিড়িক উঠেছিল কেন? এই সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগের জন্যেই ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়কে সমাজচ্যুত করেছিলেন তৎকালীন হিন্দুসমাজের মাতব্বরেরা। এই ধর্ম প্রথার উৎপত্তি কি, বিধবার সম্পত্তি গ্রাস এবং সংসারে বিধবাকে পালনের ঝামেলা এড়াতে, ব্রাহ্মণ ও সমাজপতিদের বানানো স্বার্থ-ধর্ম? তা ছাড়া আর কীই বা হতে পারে?

সকল উপাসক বা সাধকের গুরুর কাছে অভিষিক্ত এবং দীক্ষিত হওয়া আবশ্যিক। গুরু ছাড়া তন্ত্র সাধনা হতে পারে না। কৌলগুরু যে কোন সম্প্রদায়ের গুরুপদের জন্য প্রশস্ত, কৌলগুরুর অভাবে নিজ সম্প্রদায়ের গুরু গ্রহণই প্রশস্ত, যেমন শাক্তদের শাক্তগুরু, বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবগুরু ইত্যাদি। যিনি সকল বিষয় ব্রহ্মে এবং সকল বিষয়েই ব্রহ্মকে দেখতে পান, তিনিই জীবন্মুক্ত সৎকৌল, তিনিই প্রকৃত কৌলগুরু।    

মহানির্বাণ তন্ত্রের অন্তিম ও চতুর্দশ উল্লাসে মহেশ্বর শিব সাধকের মুক্তি বিষয়ে বলেছেন, “ব্রহ্মা থেকে সামান্য তৃণ পর্যন্ত সমস্ত জগৎই মায়া এবং মিথ্যা –এক পরমব্রহ্মই সত্য, এই জ্ঞানই পরমজ্ঞান। এই জ্ঞান অর্জন করতে পারলে সমস্ত কর্মবন্ধন এবং “অহং” জ্ঞান থেকে মুক্ত হওয়া যায়। যতক্ষণ দেহাদিতে “অহং” জ্ঞান থাকে, ততক্ষণ জপ, হোম, শতশত উপবাস করলেও মুক্তি হয় না। কিন্তু, “ব্রহ্মই আমি” এই উপলব্ধি হলে, দেহী মুক্ত হয়। “ব্রহ্মই সত্য, আর সমুদায় মিথ্যা” – এই ভাবই উত্তম। ধ্যানভাব মধ্যম। স্তব ও জপতপ অধম। বাহ্যপূজা অধমের থেকেও অধম। যাঁর মনে পরম জ্ঞান উপলব্ধি হয়েছে, তাঁর জপ, যজ্ঞ, তপস্যা, নিয়ম ব্রত প্রভৃতি কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। মায়ার বশে জ্ঞান, জ্ঞেয়, ও জ্ঞাতা এবং ধ্যান, ধেয় ও ধাতা – এই তিনকে ভিন্ন স্বরূপ মনে হয়, কিন্তু বিচার করলে দেখা যায়, আত্মাই অবশিষ্ট থাকেন। চিন্ময় আত্মাই জ্ঞান ও ধ্যান, চিন্ময় আত্মাই জ্ঞেয় ও ধেয় এবং সেই আত্মাই জ্ঞাতা ও ধাতা। যাঁর এই জ্ঞান হয়েছে, তিনিই আত্মবিৎ - এই জ্ঞান চতুর্বিধ অবধূতের পরমধন”।

শ্রীভগবতী বললেন, “একটু আগেই তুমি গৃহস্থ ও ভৈক্ষুক – এই দুই আশ্রমের কথা বললে, এখন আবার চার অবধূতাশ্রমের কথা বলছ? চার অবধূত কারা, তাঁদের লক্ষণ কী?”

শ্রীসদাশিব বললেন, “হে প্রিয়ে, ব্রহ্মমন্ত্রের উপাসক গৃহস্থাশ্রমে বাস করলেও, তাঁদের “যতি” বা ব্রাহ্মাবধূত বলে জানবে। যে সকল মানুষ পূর্ণ অভিষিক্ত হয়ে সংস্কৃত হয়েছেন, তাঁরা শৈবাবধূত। এঁরা সকলের পূজনীয়।  এই অবধূতও দুই প্রকার – পূর্ণ ও অপূর্ণ। পূর্ণ শৈবাবধূত ও ব্রাহ্মাবধূতের নাম পরমহংস। আর যে অবধূতের অদ্বৈতভাবের জ্ঞান পূর্ণ হয়নি, তিনি অপূর্ণ অবধূত। তিনি সর্বদা ব্রহ্মনিষ্ঠ থেকে “ওঁ তৎসৎ” এই মন্ত্র উচ্চারণ করে, “সোঽহমস্মি” এই ধ্যান করতে থাকবেন। “ওঁ তৎসৎ” এই মন্ত্র সর্ব সুখসাধ্য, এই মন্ত্রে কোন বাহুল্য নেই, কিন্ত এই মন্ত্র অনন্ত ফলদায়ক। এই মন্ত্র নিগম, আগম ও তন্ত্র সমুদায়ের সারাৎসার”।

মহানির্বাণ তন্ত্রে, বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও, তন্ত্রতত্ত্বে শব-সাধনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। এই সাধনা বীরভাব-সাধনার অন্তর্গত। বীরভাবের সাধক নির্জন ঘরে, নদী তীরে, পাহাড়, নির্জন স্থানে, বেলগাছের তলায় অথবা শ্মশানের কাছকাছি নির্জন বনে শব সাধনা করতে পারেন। শবসাধনার সময়ের নির্দেশে বলা হয়েছে, কৃষ্ণ কিংবা শুক্ল পক্ষের অষ্টমী ও চতুর্দশী তিথিতে মঙ্গলবারের রাত্রে, এই সাধনা করলে সাধক উত্তমা সিদ্ধি লাভ করতে পারে।

সাধারণ জনসমাজে তন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে যতই বিরূপতা এবং আতঙ্ক থাক, হিন্দু দেব-দেবীর পূজার সঙ্গে তন্ত্র তার মন্ত্র ও যন্ত্র নিয়ে ওতপ্রোত মিশে আছে। যে কোন দেবদেবীর পূজার অধিকাংশই পদ্ধতিই, আমরা না জেনে, তন্ত্রমতের অনুসরণ করে থাকি। যেমন, সমস্ত পূজার সাধারণ কর্মানুষ্ঠান, যেমন আচমন, স্বস্তিবাচন, গন্ধাদির অর্চনা, সঙ্কল্প, ঘটস্থাপন, সামানার্ঘ্য, জলশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, করশুদ্ধি, পুষ্পশুদ্ধি, দ্বারদেবতাপূজা, ভূতাপসারণ ও দিগ্বন্ধন, পঞ্চামৃত শোধন, প্রতিমার চক্ষুর্দান, প্রাণপ্রতিষ্ঠা, আবাহন ইত্যাদির সবই আমরা তন্ত্রমতে করে থাকি। দেব-দেবীর স্তব, পূজা, প্রণাম মন্ত্রগুলি এসেছে, বেদ থেকে, কিছু আচার্য শঙ্করের রচনা, কিছু মন্ত্রের সৃষ্টি করেছেন পুরাণ এবং তন্ত্র।

তন্ত্রে যন্ত্র বলতে নানান জ্যামিতিক আকারকে বোঝায়। পূজার যজ্ঞবেদী নির্মাণের অনেক বিধি-নিয়ম বেদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু তন্ত্র যজ্ঞ ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকটি পূজা পদ্ধতির মধ্যে সরল ও বক্র রেখা ব্যবহার করে, তার মধ্যে প্রধানতঃ পাঁচ রঙের চূর্ণ(গুঁড়ি)-র প্রয়োগ আছে। সে আকার ত্রিভুজ, আয়ত, বর্গ, বৃত্ত, স্বস্তিকা, পদ্ম, মীন, কূর্ম ইত্যাদি নানান আকারের হতে পারে। যে কোন পূজায় মেঝে কিংবা দেওয়ালে আল্পনা আঁকার প্রচলনও তন্ত্র-তত্ত্বের শৈল্পিক বিবর্তন বলেই মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বলি, স্বস্তিকা, পদ্ম, মীন, কূর্ম ইত্যাদি অনেক প্রতীক বা চিহ্ন সিন্ধুসভ্যতার সিলগুলিতে এবং মৃৎপাত্রের গায়ে চিত্রিত পাওয়া গেছে। অতএব তন্ত্র-ধর্মর অনার্য-সংযোগ এবং তার প্রাচীনতা নিয়ে কোন সংশয় থাকে না।    

৫.৭.১ যুগপুরুষ শঙ্করাচার্য

হিন্দুধর্মের আলোচনায় আচার্য শঙ্করের অবদানের কথা স্বীকার না করলে, হিন্দু ধর্মের  ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শত শত ঋষি, মুনি ও পণ্ডিতদের কথা আমরা পৌরাণিক কাহিনীতে জেনেছি। কিন্তু আজকের হিন্দুধর্মে, তাঁদের সকলের তুলনায়, আচার্য শঙ্করের অবদান অনন্য। আচার্য শঙ্করের জীবন কাহিনী সংক্ষেপে আলোচনা করেই আমরা হিন্দু ধর্মের তত্ত্বালোচনা শেষ করব।    

যুগপুরুষ শঙ্করাচার্যের আবির্ভাব কাল সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর জীবনকাল মোটামুটি ৭৮৮ থেকে ৮২০ সি.ই.। তাঁর পিতা শিবগুরু, পিতামহ বিদ্যাধর। মাতা বিশিষ্টা, মাতামহ মঘ। তাঁর জন্মস্থান ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে কেরলের আলোয়াই নদীর উত্তরতীরের কালাড়ি নামের ছোট্ট একটি গ্রামে। আমরা সকলেই জানি আচার্য শঙ্কর স্বল্পায়ু (মাত্র বত্রিশ বছর) ছিলেন, তবে কিছু বিক্ষিপ্ত তত্ত্বে তাঁর দীর্ঘায়ুর কথাও শোনা যায়।

শিশু শঙ্কর মাত্র তিন বছর বয়সে, পিতৃহারা হন। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর উপনয়ন সংস্কার করে, তাঁর মাতা তাঁকে গুরুগৃহে পাঠিয়েছিলেন। তীক্ষ্ণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির জন্যে, মাত্র দু’বছরের মধ্যেই গুরুগৃহের যাবতীয় শিক্ষা তিনি সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন এবং মাত্র আট বছর বয়সেই অধ্যাপনা শুরু করেছিলেন। তখনকার দিনে শিক্ষান্তে পুত্রের বিবাহ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, মায়ের শত অনুরোধেও শঙ্কর বিয়ে করতে রাজি হলেন না। বরং তিনি মায়ের কাছে সন্ন্যাসী হওয়ার অনুমতি চাইলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই শঙ্করমাতা পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেননি। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যে এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে তিনি পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন।

মাতা ও পুত্র একদিন আলোয়াই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন, হঠাৎ একটি কুমীর শঙ্করের পা কামড়ে, তাঁকে গভীর জলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। আতঙ্কিত বালক শঙ্কর বললেন, “মা আমি চললাম। তুমি তো আমাকে সন্ন্যাসী হতে দিলে না, এখন দেখ কুমীরের গ্রাসে আমার প্রাণ যায়। এখনও যদি তুমি অনুমতি দাও, তাতেও সন্ন্যাসী হয়ে, আমি পরলোকে মুক্তি পেতে পারি”। নদীর ঘাটে উপস্থিত নরনারী সকলেই অবাক হয়ে গেল শঙ্করের কথায়, মাতা বিশিষ্টাও অন্য কোন উপায় না দেখে, কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তাই হোক, শংকর,  এ যদি দৈব বিধান হয় তবে তুই সন্ন্যাসীই হ, বাবা”। এরপর নদীতে মাছ ধরতে থাকা জেলেরা জাল ফেলে সেই কুমীরকে ধরে ফেলল এবং শঙ্করের পাও কুমীরের গ্রাস থেকে মুক্ত হল। কিছুদিন পরে যখন তাঁর পায়ের ক্ষতস্থানগুলি সেরে উঠল, তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন।

সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই কেরল থেকে তিনি রওনা হলেন, সুদূর নর্মদা তীরে মহাযোগী গোবিন্দপাদের দর্শন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্যে। শোনা যায়, এই মহাযোগী গোবিন্দপাদই নাকি ঋষি পতঞ্জলি (যাঁর আবির্ভাব কাল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে অনুমান করা হয়!), গুরুগৃহে যাঁর ভাষ্য পাঠ করে বালক শঙ্কর মুগ্ধ হয়েছিলেন। শঙ্করের উপস্থিতিতে সুদীর্ঘ সমাধি ভঙ্গ করে, মহাযোগী বহুদিন পর চোখ মেলে তাকালেন এবং তাঁকে শিষ্যত্বে বরণ করলেন। শঙ্কর মহাযোগী গোবিন্দপাদের কাছে যোগসাধনা শিখতে শুরু করলেন এবং তিনবছর পরে তাঁর সাধনা সম্পন্ন হল।

মহাযোগী গোবিন্দপাদ বললেন, “বৎস শঙ্কর, তোমার জ্ঞান সম্পূর্ণ। আমার গুরু গৌড়পাদে[1]-র (এই মহাগুরু গৌড়পাদের সঙ্গে আচার্য শঙ্করের দেখা হয়েছিল, তাঁর গৌড়দেশ ভ্রমণের সময়) নির্দেশে আমি সহস্রাধিক বছর তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। আমার কার্য সম্পূর্ণ হয়েছে, এবার আমি দেহ রক্ষা করব। এখান থেকে তুমি কাশীধামে যাও এবং অদ্বৈত ব্রহ্ম-জ্ঞানের প্রচার করো। দেশে এসময় নানান অবৈদিক ধর্মমত প্রচলিত রয়েছে, নানান ভ্রান্ত তত্ত্বে পণ্ডিতেরা দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করে, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে। এই সমস্ত ধর্মমত খণ্ডন করে, তুমি আচার্য শঙ্কর হও, ভারতভূমিতে বৈদিক ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করো”।

গুরু গোবিন্দপাদের দেহরক্ষার পর শঙ্করাচার্য কাশীর উদ্দেশে রওনা হলেন, তাঁর লক্ষ্য এখন সর্বধর্ম সমন্বয়।

চলবে...

[1] মহাগুরু ও যোগী গোবিন্দপাদই যদি ঋষি পতঞ্জলি হন, তাঁরও গুরু কিনা গৌড় নিবাসী মহাগুরু গৌড়পাদ! তাঁর সঙ্গে দেখাও হয়েছিল আচার্য শংকরের! কি অসাধারণ ইতিহাস! অবিশ্যি অনেকেই অনুমান করে নেবেন, এই পতঞ্জলি সেই পতঞ্জলি নন, এই গৌড়পাদও সেই গৌড়পাদ নন - একই নামের ঐতিহ্যবাহী সহস্রাধিক বছরের গুরু-শিষ্য পরম্পরা!    


সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ৩০

  প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯"


৩০

স্নেহের সুকন্যা,  

 পর পর চারটে চিঠিই পড়লাম। প্রথম তিনটি চিঠিতে তোর জীবনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মাখা দিনগুলির কথা পড়তে পড়তে মনটা বড়ো বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিল। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম বারবার। প্রাত্যহিক নৈকট্য না থাকলেও, কলকাতায় যখনই এসেছি আমি তো তোর এবং তোদের সকলের আশেপাশেই ছিলাম। তোর একক লড়াইয়ের চিত্রগুলি আমার যে চোখে পড়েনি, এমন কথা বললে চরম মিথ্যাই বলা হবে। কিন্তু কী এক অদ্ভূত অহংকারী মায়ায় নিজেকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলাম, ভাবলে আজ আমার মাথা হেঁট হয়ে আসছে লজ্জায়। দেখেও না দেখার ভান করেছি। কিছু কিছু বুঝেও – আরও গভীরে বোঝার প্রয়াস করিনি নির্মম উদাসীনতায়। পাঁচ-সাতদিনের জন্যে কলকাতায় গিয়ে কিছু কিছু উপদেশ এবং অনেক হাসি-ঠাট্টা-ফাজলামি দিয়ে ভুলিয়ে রাখা বসন্তের মধুকণ্ঠ কোকিলের মতোই ছিল আমার আচরণ। তোর লড়াইয়ের নিত্য সঙ্গী হয়ে বাস্তবের কর্কশ বায়স হয়ে উঠতে চাইনি।

বিগত কয়েকমাসের ঘনিষ্ঠতায়, তোর কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে কখনো কখনো উপস্থিত হয়েছি আমি। কিন্তু ওই তিনটি চিঠি পড়ার পর নিজেকে চূড়ান্ত মতলববাজ আর ধান্দাবাজ মনে হচ্ছে, বিশ্বাস কর। বহুদিন আগে জীবনসঙ্গিনী রূপে তোকে আমি পেতে চেয়েছিলাম যখন, আমাকে তুই প্রত্যাখ্যান করেছিলি। তার জন্যে মনে মনে ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, অভিমান করেছিলাম। পৃথিবীর সমস্ত মেয়েদের প্রতিই আমার মনে একধরণের তুচ্ছতা এসে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল প্রকৃত ভালোবাসার মর্ম বোঝার মত গভীর মনোভাব মেয়েদের থাকতে নেই। তারা সর্বদাই সস্তা- চটকদার জিনিষের প্রতি নিবিষ্ট থাকতে ভালোবাসে। এক কথায় মহিলা জাতির প্রতিই আমার কেমন যেন অনীহা উপস্থিত হয়েছিল।

তোর ওই দুঃসহ সময়ে নিত্য পাশে ছিলেন যিনি, সেই শশাঙ্কবাবুকেও মনে হত – হাল্কা মনের মানুষ। মেয়েদের প্রতি উদার সহায়তা বিলিয়ে তোর মন জয় করাতেই তার যেন যাবতীয় বাহাদুরি। তাচ্ছিল্য করতাম তাঁকেও। মাঝে মধ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ যে আমার হয়নি তা নয়, কিন্তু কোনদিনই তাঁকে মনে রাখার মতো আলাপ-পরিচয় করার বিষয়ে এতটুকু উৎসাহ খুঁজে পাইনি আমার মনের গভীরে।

আজ তোর চিঠি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে, কী আশ্চর্য গভীর মানসিকতা নিয়েই না তিনি সেসময় তোর পাশে থেকেছেন সর্বদা – সুখে-সম্পদে, দুঃখে-বিপদে। আমার মনের সেই সব সঙ্কীর্ণতা দূরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আজ আমি তোদের দুটিকে – তোর ও শশাঙ্কর দাম্পত্যকে সশ্রদ্ধ চিত্তে বরণ করে নিলাম। তাঁর সমস্ত পিতৃত্ব দিয়ে তোর বাম্বাইকে তিনি যেভাবে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন, অত দরাজ বক্ষ আমার কোনদিনই হবার নয়।

তোর জীবনের সঙ্কটময় নানান ঘটনার কথা জেনে ও বুঝে, আজ তোদের ছোট্ট সুখী পরিবারটিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আর আমার ঈর্ষা-জর্জরিত দৃষ্টি ও মনের বিষ-বাষ্প যেন কোন ভাবেই তোদের সংসারকে স্পর্শ করতে না পারে – সেই কামনা করি সর্বান্তঃকরণে। আমার দায়-বোধহীন বন্ধ্যা ভালোবাসার মোহ তোকে যেন কোনভাবেই গ্রাস না করে।

তোরা সক্কলে আনন্দে থাকিস। খুব ভালো থাকিস। বাম্বাইকে আমার আশীর্বাদ জানাস।

তোর

সুনেত্র দাদা।

 গত পরশু অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সুকন্যার চিঠিগুলো পড়ছিল সুনেত্র। চিঠি পড়ার পর মাথার মধ্যে ভিড় করে এসেছিল নানান ভাবনা চিন্তা। বিছানায় শুয়েও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার উঠে সিগারেট ধরিয়ে সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়েই প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছিল সুনেত্রকে।

গতকাল রাত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারত, কিন্তু হয়নি। কারণ গত দু’রাতের সুদীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর, ওপরের চিঠিটি সুকন্যাকে পাঠিয়ে প্রায় আড়াইটে নাগাদ, শুতে গিয়েছিল সুনেত্র। এবং গতকাল রাতের ঘুমে আর কোন বিঘ্ন ঘটেনি।

আজ রবিবার তার চেম্বার বন্ধ। আলস্য মাখা সকাল সাড়ে নটার দ্বিতীয় কাপের চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েই তার মনে হল, গত রাত্রে তার অমন গভীর ঘুমের কারণ কি? সে কারণ কি, প্রত্যুত্তরে লেখা তার ওই চিঠিটা? নিজেকে অলীক এক সম্পর্কের মোহ-মায়া থেকে মুক্ত করতে পেরেছে বলে? এবং তার বুনে চলা নিপুণ ও নিবিড় স্বপ্নজালে বদ্ধ হতে কনিকেও নিরন্তর প্ররোচনা দেওয়া থেকে বিরত হওয়ার জন্যে?

চায়ের কাপটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরাল সুনেত্র এবং নিজেকে খুব তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট মনে হল। কি সহজেই না সে শেষমেষ পারল – বহু বছর ধরে মনের মধ্যে লালন করে আসা এক স্বপ্নকে নিষ্প্রাণ করে তুলতে। কিছুটা আত্মশ্লাঘাও অনুভব করল মনে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় তার বাগানে উজ্জ্বল ফুটে থাকা নানা বর্ণের ফুলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, পৃথিবীটা বেশ সুন্দর।

এই মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়ল, হলদিয়া আসার পথে তার বিগড়ে যাওয়া গাড়ির কারণে, বহুদিন পর তার সঙ্গে কনির ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার পরের দিন সকাল সকাল বাড়ি ফিরে এমনই চা খেতে খেতে তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা বড়ো সুন্দর।

সুনেত্রর মনে হল, ঠিক কোন পৃথিবীটা তার কাছে সুন্দর? সেদিন কনিকে বহুদিন পরে ফিরে পাওয়া। বহুদিন অবদমিত থাকা মনের বাসনা-কামনা পূরণের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে যাওয়া। সেদিনের সেই মানসিক পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছিল, এতদিনে বুঝি জীবনের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হল। তাই সেদিন পৃথিবীটাকে ভারী সুন্দর লেগেছিল।

আর আজ, সে যখন কনির জীবনের সব সত্য জেনেছে। মেল লিখে কনির সামনে নিজের মুখোসটা খুলে ফেলে নিজের নির্লজ্জ মুখটা সে মেলে দিয়েছে। নিজের মনটাকে সংযত করে উদাসীন হয়ে উঠতে পেরেছে। আজও তার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা বেশ ভালোরকমের সুন্দর! আশ্চর্য না?

আসলে পৃথিবীটা তার নিজের নিয়ম মতো বারো মাস ছয় ঋতুতে সর্বদাই সুন্দর থাকে। কিন্তু মানুষের মনোদৃষ্টির কারণেই বদলে যায় তার সৌন্দর্য। অর্থাৎ সেদিন সুনেত্রর যে মনটা রোমান্টিসিজ্‌মের আগুনে পুড়ছিল, আর আজ সেই মনের আগুনে জল ঢেলে দেওয়ার পরে, সে যখন নিঃস্ব - তাও সে দেখছে পৃথিবীটা একই রকম সুন্দর! সুনেত্র কি সত্যিই সুন্দর দেখছে পৃথিবীটাকে? নাকি নিজের মনকেই সে চোখ ঠারছে? এই যে সে ঢাকঢোল বাজিয়ে কনিকে নিয়ে তার সকল রোমান্টিক স্বপ্নের গলায় ফাঁস জড়ালো, তাতে সত্যিই কি তার মন হার মেনে নিল? নাকি, মনের গোপন কুঠিতে তার রোমান্টিসিজ্‌মকে অবদমিত রেখে, কনি এবং তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের চোখে সে মহান হতে চাইল?

সুনেত্রর অলস মস্তিষ্ক যখন তার এই মানসিক দ্বন্দ্বের মীমাংসায় নিমগ্ন, শম্পাদিদি এল চায়ের খালি কাপটা তুলে নিতে। যাওয়ার সময় বলল, “মাসকাবারি কিছু জিনিষ ফুরিয়ে গিয়েছে, দাদা, আজ একবার মার্কেটে যাবেন?”

সুনেত্র বাস্তবে নেমে এল আচমকা, বলল, “ওঃ তাই? ফর্দ বানিয়েছ? তাহলে এখনই বেরিয়ে গিয়ে বাজারটা সেরে আসি – ফর্দটা দাও দেখি”।  

“সে দিচ্ছি। কিন্তু এখনই যাবেন? না জলখাবার খেয়ে বেরোবেন? ফিরতে যদি দেরি হয়?”

“কত দেরি হবে – ঘন্টাখানেক ম্যাক্সিমাম – এগারোটার মধ্যে চলে আসব”।

“রোববারগুলোতে মার্কেটে বড্ডো ভিড় হয় কিন্তু”।

সুনেত্র হাসল, বলল, “তা হোক, আজ ব্রেকফাস্টে কী খাওয়াবে গো, শম্পাদিদি?”

“তোমার প্রিয় লুচি আর সুজির হালুয়া”। ভেতর থেকে ফর্দটা এনে সুনেত্রর হাতে দিতে দিতে শম্পাদিদি বলল।

“ওঃ গ্রেট, তাহলে ফিরে এসেই খাব - আরাম করে হাতে সময় নিয়ে”। বলতে বলতে সুনেত্র নিজের ঘরে গেল জামা কাপড় বদলাতে।

অন্য রোববারের তুলনায় আজ ভিড়টা অনেকটাই বেশি ছিল। রবিনকে সঙ্গে নিয়ে সে যখন রাস্তার পার্কিংয়ে রাখা গাড়ির সামনে এল, ঘড়িতে তখন পৌনে বারোটা বাজছে। রবিন নামের ছেলেটি বসাকবাবুর দোকানে কাজ করে, বছর চোদ্দ-পনের বয়েস হবে বড়ো জোর। কেনাকাটার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে, বসাকবাবু ওকে পাঠান, গাড়িতে থলেগুলো তুলে দিয়ে আসতে।

ডিকি খুলে দিতেই রবিন থলেদুটো ভেতরে রাখল, এবং সুনেত্র তার হাতে একশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলল, “টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নাও, রবিন, বাড়ির জন্যে কিছু...”। কোন কথা না বলে মুখে অত্যন্ত মলিন একটু হাসি নিয়ে রবিন দৌড়ে ফিরে গেল ওদের দোকানের দিকে।

সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডিকি বন্ধ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। রবিনদের মতো ছেলেদের জন্যে আগে তার বেশ কষ্ট হত, এখন আর হয় না। স্বাধীনতার পর প্রায় আশি বছর পার হতে চলল, কত রকমের সরকার এল এবং গেল – বুর্জোয়া সরকার, সেকুলার-সমাজতান্ত্রিক সরকার, মা-মাটি-মানুষের সরকার। রবিনদের মতো ছেলেদের অবস্থা দিন-কে-দিন আরো সঙ্গীন হয়ে চলেছে। এই ছেলেগুলো সারাদিন কি কঠিন পরিশ্রম করে সেকথা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে সুনেত্র। বসাকবাবু ক’টাকাই বা মাইনে দেয়? কিন্তু সেই টাকাকটার জন্যেই কত যে অপমান ওদের সহ্য করতে হয়। আর চাকরি-হারানোর ভয়ে সর্বদা সিঁটিয়ে থাকতে তো হয়ই। লেখাপড়া নেই, স্কুল নেই, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা নেই, বাবা-মায়ের কাছে দামি স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার বায়না নেই। সারাক্ষণ মোবাইলে চোখ রেখে ফেসবুক, হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ, ইনস্টাগ্রামের রিলস স্ক্রোল করে যাওয়া নেই। রবিনদের মতো ছেলেদের আছে শুধু অন্নচিন্তা ও ভবিষ্যৎহীন অস্তিত্বরক্ষার দুশ্চিন্তা।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গাড়িতে উঠতে যাওয়ার মুহূর্তে, একদম তার পাশেই আচমকা ব্রেক মেরে দাঁড়াল একটা অটো। অটো ড্রাইভার চেঁচিয়ে উঠল, “ওই তো ডাক্তারবাবু। স্যার, স্যার, এই ছেলেটি আপনারই বাড়ি যাচ্ছে...”।

অটো ড্রাইভারকে চিনতে পারল সুনেত্র, ভদ্রলোকের মা তার নিয়মিত পেশেন্ট। যদিও নামটা মনে করতে পারল না। আর পিছনের যাত্রীটি পনের ষোল বছরের একটি ছেলে – একলা। মুখটা কোথায় যেন দেখেছে সুনেত্র, চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক চিনতে পারছে না।

পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক নিয়ে ছেলেটি অটো থেকে নেমেই সুনেত্রর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। সুনেত্র বেশ হতভম্ব হয়ে বলল, “আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না, ভাই”।

ছেলেটি খুব সপ্রতিভভাবেই বলল, “আপনিই ডাক্তার সুনেত্র বসু তো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু...”

   “আমি সুধন্বা বসু। ডাক নাম বাম্বাই”। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুনেত্র। সুকন্যা দত্ত অথবা শশাঙ্ক মিত্রর পুত্র মিত্র নয়, দত্ত নয়, বসু হয়ে গেল কী করে? তার অন্তরে এখন আবেগের প্রবল স্রোত। সেই স্রোতের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যেতে লাগল সযত্নে বেঁধে রাখা তার মনের ঘাটখানা। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কিছু বলার আগেই, বাম্বাই আবার বলল, “দাঁড়াও, ভাড়াটা মিটিয়ে আসছি”।

চলবে...


রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 

[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।] 

 

৩০শে জুলাই, ২০২৬ রবিবার, সকাল সাড়ে এগারোটা

ওপরে অহীনের ঘরে সর্বজিৎ আর অহীন আড্ডা দিচ্ছিল। অবশ্য সে আড্ডার অধিকাংশ আলোচনাই চলছিল অবিনবাবুকে নিয়ে। আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে অবিনবাবুর প্রতিক্রিয়া শেষ অব্দি কোথায় পৌঁছবে, সেটাই এখন এ বাড়ির সকলের মাথাব্যথা। সেই গম্ভীর ও গভীর আলোচনার মাঝখানে তিৎলি যখন দুজনের জন্যে দুটো অমলেট আর দুকাপ কফি নিয়ে ওদের ঘরে গেল, দুজনেই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, বলল, “ওঃ এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে?”

সর্বজিৎ চামচ দিয়ে গরম অমলেটের টুকরো মুখে পুরে বলল, “বিনুদা নীচেয় কী করছে, রে তিৎলি?”

তিৎলি টুলের ওপর বসে বলল, “এমন মনোযোগী পাঠক আমি আগে কোনদিন দেখিনি, সরুদা। তাও আবার খবরের কাগজ। শুধু খবর নয়, প্রত্যেক বিজ্ঞাপনের শর্তাবলী প্রযোজ্য পর্যন্ত সবই পড়ছেন। তার ওপর একটা কাগজে কী সব লিখে চলেছেন”।  

অহীন বলল, “কাগজ-পেন কোথায় পেলেন?”

তিৎলি বলল, “আমার কাছে চাইলেন তো, আমিই দিলাম। পেনটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন, এ তো ফাউন্টেন পেন নয় বৌমা! এই পেনেই এখন তোমরা লেখ বুঝি? এ পেনের নাম কি? আমি বললাম, আমরা বলপেন বলি, অনেকে ডটপেনও বলে। তারপর কাগজে দু একটা দাগ টেনে, নিজের নাম লিখলেন। বললেন, বাঃ বেশ পেন তো! কালি ভরে কোনদিক দিয়ে? আমি বললাম, ওর মধ্যে কালি ভরা যায় না। আমি পেনের মুণ্ডুটা খুলে পেনের রিফিলটা দেখালাম। বললাম, এই রিফিলটা শেষ হয়ে গেলে, নতুন কিনতে পাওয়া যায়, সেটা  ঢুকিয়ে নিলেই আবার লেখা চালু হয়ে যাবে”।   

সর্বজিৎ বলল, “দাম-টাম জিজ্ঞাসা করেননি?”

“করেননি আবার? বললাম পাঁচটাকা, আর রিফিলের দাম দুটাকা। আমাদের স্টুডেন্ট লাইফে যখন প্রচুর লিখতে হত – তখন একটা রিফিলে দিন পনের-কুড়ি আরামসে হয়ে যেত। উনি অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছিলেন আমার কথা। বললেন, পাঁআচ টাআকাআ? তিরিশটাকা মাইনেতে একটা সংসারের সারা মাস চলে যায়, বৌমা। দু-তিনটে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করলে, তাদের রিফিল কিনতেই তো মাসে দশ-বারোটাকা বেরিয়ে যাবে! কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললেন, যত দেখছি, ততই তো চমকে যাচ্ছি, বৌমা”। আরও কিছুক্ষণ হালছাড়া অবস্থায় বসে থেকে বললেন, ঠিক আছে বৌমা, তুমি যাও”। তিৎলি হাসল বলল, “আমি তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, বাবা”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কী লিখছেন কিছু দেখেছ?”

“হুঁ। এই তো কফি দিতে গিয়ে দেখে এলাম, এ-ফোর পাতার এক পৃষ্ঠা শেষ করে, পরের পাতায় লিখে চলেছেন। তবে হ্যাঁ, হাতের লেখাটি কিন্তু মুক্তোর মতো…”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “উনি এত কী লিখছেন, বলো তো, সরুদা তোমার কী মনে হয়?”

সর্বজিৎ অমলেট শেষ করে, কফির কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, “আমাদের জন্যে প্রশ্নবাণ তৈরি হচ্ছে, অহীন। ভীষ্মের শরশয্যার কথা শুনেছ? প্রস্তুত হও, আমাদের সকলেরই সেই অবস্থা হবে”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তুমি বলছ, খবরের কাগজ পড়ে ওঁর যা কিছু মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, সে সব উনি প্রশ্ন করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন?”

“ঠিক তাই। তার মধ্যে ইতিহাস থাকবে, ভূগোল থাকবে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বেশ কিছুটা বিজ্ঞানও থাকবে… এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি”।

অহীন আর তিৎলি হেসে উঠল হো হো করে। সর্বজিৎও হাসল, বলল, “হাসছ অহীন? এ পরীক্ষা ইউপিএসসি ধরনের – যে কোন বিষয় থেকে যে কোন প্রশ্ন আসতে পারে… রেডি হও…”।

সর্বজিতের কথা শেষ হল না, অবিনবাবু স্মিতমুখে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “কি, এত হাসাহাসি কিসের?”

অহীনরা সকলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আরেব্বাস, বিনুদা তুমি একেবারে ওপরে চলে এলে? এস এস আরাম করে বিছানায় বস। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক”।

অবিনবাবু অহীনের বিছানাতেই বসলেন। আরাম করেই বসলেন। তারপর তাঁর হাতের কাগজটা দুহাতে মেলে ধরে বললেন, “বুড়োদুটোর ওপর আমার তেমন ভরসা নেই, তাই তোদের কাছেই এলাম। আমার অনেক প্রশ্ন আছে”।

অহীন বলল, “ঠিক এই কথা নিয়েই আমরা হাসাহাসি করছিলাম, বিনুদা। বৌদি এসে খবর দিল, তুমি খবরের কাগজ পড়ছ আর কাগজে কি সব যেন লিখছ। সেই শুনে সরুদা বলল, তুমি কঠিন কঠিন প্রশ্নমালা সাজাচ্ছ… এবং সেগুলোর উত্তর আমাদেরকেই দিতে হবে”।

অবিনবাবু খুশি হয়ে সর্বজিতের দিকে তাকালেন, বললেন, “এই জন্যেই তো তোদের কাছে এলাম। সত্যিই অনেক কিছু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে…”।

সর্বজিৎ বলল, “তোমার প্রশ্ন শোনার আগে, আমি একটা লেকচার দিয়ে দিই, বিনুদা। তাতে হয়তো তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। এবং অনেক ব্যাপার-স্যাপার তোমার বুঝতেও সুবিধে হবে”।

অবিনবাবু হাসলেন, হাতের কাগজটা ভাঁজ করে পাশের টেবিলে রেখে বললেন, “সেই ভালো, শুরু করো তোমার বক্তৃতা”।

তিৎলি বলল, “আমি তাহলে নীচেয় যাই…অনেক কাজ আছে”।

অবিনবাবু বললেন, “না, মা তুমিও থাকবে। তুমি নীচেয় গিয়ে তোমার শাশুড়িমাকে বলে এস, আমি ডেকেছি…”। তিৎলি অহীন আর সর্বজিতের প্লেট আর কফির খালি প্লেট নিয়ে নীচেয় যেতে যেতে বলল, “আচ্ছা”।

অবিনবাবু স্মিতমুখে বললেন, “শুরু করো, সর্বজিৎ”।

সর্বজিৎ একটু সময় নিয়ে মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিল, তারপর বলল, “তুমি যখন সমাধিতে গেলে, দাদুর মুখে শুনেছি সালটা ছিল ঊণিশশ তেতাল্লিশ? তাই তো?”

“হুঁ”।

“গোটা ইওরোপ তখন যুদ্ধে জ্বলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম দিকে হিটলারের জার্মানি খুব বাজিমাত করলেও, মিত্রশক্তি অর্থাৎ আমেরিকা এবং ইটালি ছাড়া, ইওরোপের দেশগুলো পরের দিকে ভালোই পালটা মার শুরু করল। অবশ্য হিটলার তাতেও দমবার পাত্র নয়, আক্রমণ করে বসল রাশিয়াকে। রাশিয়ার স্টালিনকে আরেকজন হিটলারও বলা যায়। তফাৎ শুধু গোঁফে – একজনের টুথব্রাশ আরেকজনের মুশটাশ। স্টালিনের লাল ফৌজ হিটলারের নাজি বাহিনীকে নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছাড়ল। শেষমেষ মিত্রশক্তি আর রাশিয়ার যৌথ চাপে হিটলার বিধ্বস্ত হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯৪৫ সালে। তবে এই যুদ্ধে সবথেকে বেশি মূল্য চোকাতে হয়েছিল জাপানকে। জাপান ছিল অক্ষ শক্তিতে, অর্থাৎ জার্মানি ও ইটালির সমর্থক। আমেরিকা জাপানে দুটি অ্যাটম বম্ব ফেলে ধ্বংস করে দিল জাপানের দুটি শহর। হিরোসিমা আর নাগাসাকি। আমেরিকার রসিক ও সভ্য বিজ্ঞানীরা ওই দুটি বম্বের নাম দিয়েছিল, লিট্‌ল্‌ বয় আর ফ্যাট ম্যান। পুঁচকে ছেলে, আর ভুঁড়ো মানুষ। দুই বোমায় নিহত হল প্রায় লাখ তিনেক নিরীহ মানুষ এবং আণবিক তেজস্ক্রিয়ায় কত মানুষ যে অসুস্থ আর পঙ্গু হল তার সম্পূর্ণ হিসেব পাওয়া যায় না।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এই অ্যাটম বম্ব বস্তুটা কি?”

সর্বজিৎ বলল, “তোমরা নানান কেমিক্যাল দিয়ে যে হাতবোমা বানিয়ে সায়েবদের মারতে, সে বোমার ক্ষমতাকে যদি পিঁপড়ে বলি, তাহলে তার তুলনায় অ্যাটম বম্ব হল লাখখানেক বা তারও বেশি হাতির ক্ষমতা। ওই ব্যাপারটা এখন ভুলে যাও, বিনুদা। ভীষণ জটিল বিজ্ঞান – আমার যা বিদ্যে-বুদ্ধি তাতে তোমাকে কিছুটা আভাস হয়তো দিতে পারব। এখন বরং আমাদের আগের কথায় ফিরে আসি।       

এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র এবং অক্ষ শক্তির সভ্য, উচ্চশিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান রাষ্ট্রনেতাদের হাতে মারা পড়ল প্রায় সাত-সাড়ে সাত কোটি মানুষ। তাদের অধিকাংশই নিরীহ নাগরিক।  

ওই হিসেবের বাইরে, এই যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোন যোগ না থাকলেও, আমাদের এই বাংলার প্রায় তিরিশ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিলেন স্রেফ অনাহারে”।

“সে কি? কেন?”

“বিনুদা, আমরা তখনও পরাধীন। সিন্ধবাদের ঘাড়ে চেপে থাকা সেই বুড়োর মতো বৃটিশরা তখন আমাদের ঘাড়ে বসে গোগ্রাসে গিলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের সৈন্যদলের খাদ্যের সংস্থান ঠিকঠাক রাখতে বাংলা থেকে জাহাজ ভরে তারা নিয়ে গিয়েছিল আমাদের মুখের গ্রাস – চাল, গম, ডাল…। মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে গ্রামে গ্রামে যাঁরা ফসল ফলান, তাঁদের না খাইয়ে মেরে ফেলল বৃটিশ সরকার – তাদের সৈন্যদের পেট ভরাতে”।

অবিনবাবু বিস্ফারিত চোখে সর্বজিতের কথা শুনছিলেন, অস্ফুট স্বরে বললেন, “কী বলছ, সর্বজিৎ!”

“সত্যি ঘৃণায় রক্ত গরম হয়ে ওঠে। সে সময় এই সব নানান কারণে আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন চরমে উঠল। তখন ইওরোপের পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা হেরে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হলেও, বিজয়ী দেশগুলির মধ্যে বৃটিশদেরও বেজায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তার ওপর তারা ভয়ও পেল ভীষণ। এদেশ থেকে তারা বহু ভারতীয়কে নিয়ে গিয়ে, আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে পাঠিয়েছিল জার্মানির সীমান্তে। সেসময় একে তো গোটা দেশবাসী তখন উত্তাল “ভারত ছাড়ো” আন্দোলন নিয়ে, তার ওপর ওইসব সুশিক্ষিত ভারতীয় সৈন্যরা দেশে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে যদি যোগ দেয়?

ঘটেও ছিল তাই – ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ। ব্রিটিশ ভারতে এই বিদ্রোহ বিখ্যাত “রয়্যাল ঈন্ডিয়ান নেভি মিউটিনি” নামে। ১৮-ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে এই বিদ্রোহ শুরু হয় মুম্বাই বন্দরে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতের মুখ্য বন্দরগুলিতে – যেমন করাচি, কলকাতা, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তনম। তাদের অনেকগুলি দাবির মধ্যে ছিল – বর্ণ বৈষম্য, জাতি বিদ্বেষ – অর্থাৎ ভারতীয় নৌসেনারা যতই দক্ষ এবং সাহসী হোক না কেন, ব্রিটিশ অফিসাররা তাদের প্রতিপদে চরম অপমান এবং দুর্ব্যবহার করত। বৃটিশ সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সেনাদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা সবকিছুই ছিল অত্যন্ত কম। আরও দেখা যেত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সর্বদাই ভারতীয় সেনাদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হত – আর ব্রিটিশ সেনারা থাকত পিছনে নিরাপদে।

এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি, মুসলিম লিগের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। এবং এই বিদ্রোহে সরাসরি সামিল হয়েছিল, বায়ু সেনা এবং কিছু কিছু অঞ্চলের স্থলবাহিনীর সেনারাও। কিছু কিছু শহরের পুলিশ বাহিনীও এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়েছিল।  যাইহোক সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মধ্যস্থতায় এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬।

মাত্র এই সাতদিনের বিদ্রোহই লণ্ডনে বসে থাকা ব্রিটিশ প্রধানদের হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝেছিল প্রশিক্ষিত ভারতীয় সেনা এবং সাধারণ পুলিশও যদি এভাবে বিদ্রোহ করে, তাহলে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেতে ওঠা বিপ্লবীদের সামলাবে কে? ইওরোপের নানান দেশ থেকে সদ্য ফিরে আসা রাণির ভক্ত বৃটিশ সৈন্যরা ওই সময় কেউ এদেশে আসতে চাইবে না। অতএব চালিয়াৎ বৃটিশরা হঠাৎই উদার হয়ে গেল, ঘোষণা করল যে, তারা ধীরে ধীরে ভারতীয়দের হাতে পূর্ণ শাসন ক্ষমতা ছেড়ে যাবে। যেটা বলল না, সেটা হল, মানে মানে কেটে পড়তে পারলে বাঁচি”।

অহীন বলল, “ইতিহাসে এসব ঘটনার কথা সবই পড়েছি, মুখস্থ করেছি। পরীক্ষা দিয়ে পাশও করেছি। কিন্তু তোমার মতো ঘটনাগুলোর এমন গুরুত্ব কেউ শেখায়নি, সরুদা। ঘটনাগুলো আজ নতুন চোখে দেখছি”।

তিৎলি হেসে বলল, “কার দাদা দেখতে হবে না?”

সর্বজিৎ লাজুক হেসে বলল, “তাই তো! যাগ্‌গে, আবার আগের কথায় ফিরি। সুসভ্য বৃটিশরা অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম বিভেদটাকে উস্কে তুলছিল, সে কথা তোমরাও নিশ্চয় জানো, বিনুদা”।

অবিনবাবু বললেন, “সে আর জানব না? বজ্জাত বৃটিশদের ওটাই তো ছিল ধূর্তামি”।

সর্বজিৎ বলল, “একদম। এইবার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তারা বিভেদটাকে একদম সামনে তুলে আনল। মুসলিমদের সামনে কংগ্রেসকে হিন্দুদল আর হিন্দুদের সামনে মুসলিম লিগকে মুসলমানদের দল হিসেবে প্রচার করে দিল। তারপর দুপক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে দুপক্ষকেই উস্কে দিতে থাকল। ফল যা হবার তাই হল, মুসলিমরা চাইল – ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করতে হবে। অর্থাৎ যে যে অঞ্চলে মুসলিম অধিবাসীদের সংখ্যাধিক্য – সেই অঞ্চলগুলি নিয়ে দুটো আলাদা দেশ হোক। অনেক বৈঠক, আলোচনা, দেশ জুড়ে বিতর্কের ঝড় – কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বৃটিশরা মুচকি হেসে বলল, সে বেশ হবে। তোমরা ঠিক করে ফেল, কীভাবে দেশটাকে ভাগ করা যায়”।

“দেশ ভাগ?” অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন।

“হ্যাঁ বিনুদা। দেশ ভাগ। বৃটিশ সরকার র‍্যাডক্লিফ নামের এক ব্যারিস্টারকে দেশভাগ কমিটির চেয়ারম্যান বানিয়ে, ভারতকে ভেঙে তিন টুকরো করার দায়িত্ব দেওয়া হল। মধ্যিখানে ভারত আর দুই পাশে দুই দেশ - পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিমের পাঞ্জাব প্রদেশ আর আমাদের বাংলা দুটুকরো হল, বাকি দেশ একই রইল”।

“সে সময় গান্ধিজি, সুভাষ বসু, নেহরু কী করছিলেন?”

“১৯৪৫ সালের আঠারই আগষ্ট, নেতাজিকে শেষ দেখা গিয়েছিল, তাইওয়ানের তাইপেই শহরে। কেউ বলে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কেউ বলে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ বলে তিনি সব ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তাঁর ঠিক কী হয়েছিল, সে কথা হয়তো কিছু লোক জানে বা জানত, কিন্তু সাধারণ মানুষ আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি”।

“বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১৯৪৩ সালে সুভাষ বসু জাপান গিয়েছিলেন এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু শেষ অব্দি তাঁর মতো নেতার এই পরিণতি হয়েছিল?”

“হ্যাঁ বিনুদা। আমাদের নেহরু আর মুসলিম লিগের জিন্না সায়েব দেশভাগকে সমর্থন করেছিলেন। গান্ধিজি দেশভাগ সমর্থন না করলেও – এই ব্যাপারে তাঁর আর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এই পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলার অজস্র জায়গায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বীভৎস দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল গণহত্যা – দুপক্ষেরই বহুলোক মারা গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছিল – দেশ ভাগ ছাড়া, আর অন্য উপায় রইল না। বৃটিশরা যা চেয়েছিল, তাই ঘটল। এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান আর ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হল। সেই স্বাধীনতার উল্লাসে ফিকে হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তপাতের লজ্জা এবং বাধ্য হয়ে নিজের দেশ, গ্রাম, শহর ছেড়ে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের দুঃসহ অসহায়তার গুরুত্ব”।

সর্বজিৎ মাথা নীচু করে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “তোমরা যে আদর্শে, যে স্বাধীনতার স্বপ্নে সংগ্রাম করেছিলে, বিনুদা। তার সমাপ্তি হল, স্বাধীনতা এল। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা ক্ষমতার লোভে তাদের পছন্দ মতো ভারতটাকে ছিঁড়ে ফেলল। তাতে কত লোকের প্রাণ গেল, কতলোক উদ্বাস্তু হল তাতে ওই নেতাদের কী আসে যায়? যদিও ভারতের রাজনীতিতে গান্ধিজি তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন, তবুও নিজের মতো করে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার যাতে শান্তি ও সদ্ভাব ফিরে আসে সেই চেষ্টা করছিলেন। অনেকেরই সেটা সহ্য হল না – স্বাধীনতার ছমাসের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হত্যা করা হল”।

“গান্ধিজিকে হত্যা? কী বলছ সর্বজিৎ। এও সম্ভব? মানছি, গান্ধিজির পথ ও মতামত সে সময়েও আমাদের  বহুবার, বহুক্ষেত্রে মনোমত হয়নি। কিন্তু তাই বলে খুন? কারা করেছিল? কেন করেছিল?”

সর্বজিৎ গম্ভীরভাবেই বলল, “এখন এই অব্দিই থাক, বিনুদা। তোমার সমাধিতে যাওয়া আর গান্ধিজিকে হত্যার মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধান। সেই পাঁচবছরের যে অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তোমাকে বললাম, তাতেই তোমার শিউরে ওঠার মতো অনেক উপকরণ আমি দিয়ে ফেলেছি। এই যে প্রবীণদাদু – তোমার খ্যাঁদা - যাঁর জন্ম  ১৯৩৪ সালে। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় তাঁর বয়েস ছিল তের। একটি বালকের জ্ঞান হওয়ার বয়স যদি পাঁচ কিংবা ছয় ধরি – সেই বয়স থেকেই এই ধরনের প্রত্যেকটি মর্মান্তিক ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রতিটি ঘটনার অভিঘাতে, দেশের প্রতি তাঁর আবেগ যেমন জর্জরিত হয়েছে, তেমনই তাঁর মন থেকে বদলে যেতে থেকেছে সনাতন মূল্যবোধের ধারণা। তিনি দেখেছেন, সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে দায়সারা কয়েকদিনের প্রতিবাদ এবং ধিক্কার জানিয়ে – নির্লিপ্ত দক্ষতায় নিজ নিজ স্বার্থে, নিজ নিজ কাজে নিযুক্ত থেকেছে।

অনেক বেলা হল, স্নান করতে যাও, বিনুদা। আমরাও যাবো। আমাদের জন্যে বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছেন”।

চলবে... 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২৩

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...