শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ পুরুষোত্তমযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৫শ পর্ব "


ষোড়শ অধ্যায়ঃ দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ

১-৩

শ্রীভগবানুবাচ

অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।

দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্‌।। ১

অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগাঃ শান্তিরপৈশুনম্‌।

দয়া ভূতেষ্বলোলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীরচাপলম্‌।। ২

তেজঃ ক্ষমাঃ ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা।

ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত।। ৩

শ্রীভগবান উবাচ

অভয়ং সত্ত্ব-সংশুদ্ধিঃ জ্ঞান-যোগ-ব্যবস্থিতিঃ।

দানং দমঃ চ যজ্ঞঃ চ স্বাধ্যায়ঃ তপঃ আর্জবম্‌।। ১

অহিংসা সত্যম্‌ অক্রোধঃ ত্যাগাঃ শান্তিঃ অপৈশুনম্‌।

দয়া ভূতেষু অলোলুপ্ত্বং মার্দবং হ্রীঃ অচাপলম্‌।। ২

তেজঃ ক্ষমাঃ ধৃতিঃ শৌচম্‌ অদ্রোহঃ ন অতিমানিতা।

ভবন্তি সম্পদং দৈবীম্‌ অভিজাতস্য ভারত।। ৩

শ্রীভগবান বললেন- যাঁরা দৈবী বিভূতি লাভের জন্য জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের নির্ভয়, চিত্তের শুদ্ধি, জ্ঞান ও যোগে নিষ্ঠা, দান, ইন্দ্রিয়ের সংযম, যজ্ঞ, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র পাঠ, তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধকে জয় করা, ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দা না করা, সর্বজীবে দয়া, নির্লোভী, কুটিলতা ত্যাগ, কুকর্মে লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, মানসিক ও শারীরিক শুচিতা, বিনয় ও অহংকারহীনতা – এই সকল সদ্‌গুণরূপ সম্পদ লাভ হয়ে থাকে।

[দৈবী – দেবযোগ্য, সাত্ত্বিক]

 

দম্ভো দর্পোঽভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।

অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্‌।।

দম্ভঃ দর্পঃ অভিমানঃ চ ক্রোধঃ পারুষ্যম্‌ এব চ।

অজ্ঞানং চ আভিজাতস্য পার্থ সম্পদম্‌ আসুরীম্‌।।

হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অহংকার, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা ও অজ্ঞান বিবেকহীনতা থেকেই ব্যক্তি আসুরী অবস্থা লাভ করে থাকে।

   

দৈবী সম্পদ্বিমোক্ষায় নিবন্ধায়াসুরী মতা।

মা শুচঃ সম্পদং দৈবীমভিজাতোঽসি পাণ্ডব।।

দৈবী সম্পৎ বিমোক্ষায় নিবন্ধায়া আসুরী মতা।

মা শুচঃ সম্পদং দৈবীম্‌ অভিজাতঃ অসি পাণ্ডব।।

বলা হয়ে থাকে, দৈবী সদ্‌গুণ সংসারের বন্ধন থেকে পরমমুক্তির উপায় এবং আসুরীগুণ সংসারের বন্ধনের কারণ। হে পাণ্ডুপুত্র অর্জুন, দুঃখ করো না, তুমি দৈবী সম্পদ নিয়েই জন্ম গ্রহণ করেছ।

 

দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেঽস্মিন্‌ দৈব আসুর এব চ।

দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।

দ্বৌ ভূত-সর্গৌ লোকে অস্মিন্‌ দৈবঃ আসুরঃ এব চ।

দৈবঃ বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।

হে পার্থ, এই জগতে দৈব এবং আসুর, এই দুই প্রকার স্বভাবেরই জীব ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। দেবসুলভ মানুষের কথা তোমাকে আগেই সবিস্তারে আমি বলেছি, এখন অসুরসুলভ মানুষের কথা বলছি, শোন। 

 

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ।

ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।

প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ জনা ন বিদুঃ আসুরাঃ।

ন শৌচং ন অপি চ আচারঃ ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।

আসু্রী মানুষের না ধর্মে প্রবৃত্তি থাকে, না অধর্মের নিবৃত্তি জানে। তাদের শুচিতা থাকে না, সদাচার থাকে না, এমনকি সত্যও থাকে না। 

 

অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্‌।

অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্‌।।

অসত্যম্‌ অপ্রতিষ্ঠং তে জগৎ আহুঃ অনীশ্বরম্‌।

অপরঃ-পর-সম্ভূতং কিম্‌ অন্যৎ কামহৈতুকম্‌।।

তারা বলে, জগৎ মিথ্যা, এখানে ধর্ম বা অধর্মের কোন সংস্থান নেই এবং ঈশ্বরও নেই। এই জগৎ সৃষ্টিতে স্ত্রী ও পুরুষের পারষ্পরিক কাম সংযোগ ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পারে? 

 

এতাং দৃষ্টিমবষ্টভ্য নষ্টাত্মানোঽল্পবুদ্ধয়ঃ।

প্রভবন্ত্যুগ্রকর্মণঃ ক্ষয়ায় জগতোঽহিতাঃ।।

এতাম্‌ দৃষ্টিম্‌ অবষ্টভ্য নষ্ট-আত্মানঃ-অল্পবুদ্ধয়ঃ।

প্রভবন্তি-উগ্রকর্মণঃ ক্ষয়ায় জগতঃ-অহিতাঃ।।

বিকৃত আত্মা, স্বল্পবুদ্ধি ও নিষ্ঠুর কর্মা এই ব্যক্তিরা, এই দর্শন অনুসরণ ক’রে, জগতের অমঙ্গল ও বিনাশের জন্যেই জন্মগ্রহণ করে।

 

১০

কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ।

মোহাদ্‌ গৃহীত্বাঽসদ্‌গ্রাহান্‌ প্রবর্তন্তেঽশুচিব্রতাঃ।।

কামম্‌ আশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভ-মান-মদ-অন্বিতাঃ।

মোহাৎ গৃহীত্বা অসদ্‌গ্রাহান্‌ প্রবর্তন্তে অশুচিব্রতাঃ।।

মনে অপূরণীয় কামনা নিয়ে, তারা অহংকার, অভিমান এবং ঈর্ষায় সংযুক্ত থাকে আর বিবেকহীন অন্ধ মোহে তারা বীভৎস কর্মে লিপ্ত হয়।

 

১১

চিন্তামপরিমেয়োঞ্চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ।

কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।

চিন্তাম্‌ অপরিমেয়াং চ প্রলয়ান্তাম্‌ উপাশ্রিতাঃ।

কাম-উপভোগ-পরমা এতাবৎ ইতি নিশ্চিতাঃ।।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, কাম উপভোগই জীবনের পরমকর্ম, আর এই চিন্তাতেই মৃত্যু পর্যন্ত তারা সীমাহীন সময় পার করে দেয়।

 

১২

আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।

ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্‌।।

আশা-পাশ-শতৈঃ-বদ্ধাঃ কাম-ক্রোধপরায়ণাঃ।

ঈহন্তে কাম-ভোগ-অর্থম্‌ অন্যায়েন অর্থসঞ্চয়ান্‌।।

আশার অজস্র বন্ধনে আবদ্ধ এবং কাম ও ক্রোধের বশীভূত এই সব ব্যক্তি, বিষয় কামনা চরিতার্থ করার জন্যে অসৎ উপায়ে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।

 


১৩

ইদমদ্য ময়া লব্ধমিদং প্রাপ্স্যে মনোরথম্‌।

ইদমস্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্‌।

ইদম্‌ অদ্য ময়া লব্ধম্‌ ইদং প্রাপ্স্যে মনোরথম্‌।

ইদম্‌ অস্তি ইদম্‌ অপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্‌।

 ‘আজ আমার এই লাভ হয়েছে, আমার মনোমত এই বিষয় কাল পাবো। আজ আমার এই সম্পদ আছে, আরো সম্পদ আমি ভবিষ্যতে লাভ করবো’

 

১৪

অসৌ ময়া হতঃ শত্রুর্হনিষ্যে চাপরানপি।

ঈশ্বরোঽহমহং ভোগী সিদ্ধোঽহং বলবান্‌ সুখী।।

অসৌ ময়া হতঃ শত্রুঃ হনিষ্যে চ অপরান্‌ অপি।

ঈশ্বরঃ অহম্‌ অহং ভোগী সিদ্ধঃ অহং বলবান্‌ সুখী।।

 ‘আজ এই শত্রুকে আমি হত্যা করেছি, অন্য শত্রুদেরও আমি বিনাশ করবো। আমিই সর্ব নিয়ন্তা ঈশ্বর, আমিই ভোগী, আমিই সফল সিদ্ধ পুরুষ। আমি শক্তিশালী, আমি সুখী’।

 

১৫

আঢ্যোঽভিজানবানস্মি কোঽন্যোঽস্তি সদৃশ ময়া।

যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইত্যজ্ঞানবিমোহিতাঃ।।

আঢ্যঃ অভিজানবান্‌ অস্মি কঃ অন্যঃ অস্তি সদৃশ ময়া।

যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইতি অজ্ঞান-বিমোহিতাঃ।।

 ‘আমি ধনী ও উচ্চবংশ জাত, আমার সমান আর কে আছে? আমিই যজ্ঞ করবো, দান করবো আবার আনন্দও করবো’, এই সমস্ত অজ্ঞানের জন্যেই বিবেকহীন ব্যক্তিরা মুগ্ধ হয়। 

 

১৬

অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ।

প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেঽশুচৌ।

অনেক-চিত্ত-বিভ্রান্তাঃ মোহ-জাল-সমাবৃতাঃ।

প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকে অশুচৌ।

এই রকম বহু কামনায় বিক্ষিপ্ত, মোহ জালে ঢাকা, বিষয়-বাসনা ভোগে আসক্ত যার মন, সে অপবিত্র কুৎসিত নরকে পতিত হয়।

 

১৭

আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদান্বিতাঃ।

যজন্তে নামযজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্‌।।

আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধন-মান-মদ-অন্বিতাঃ।

যজন্তে নামযজ্ঞৈঃ তে দম্ভেন অবিধিপূর্বকম্‌।।

নিজেকেই যে ব্যক্তি মহৎ ভাবে, দুর্বিনীত এবং অর্থগৌরবে অহংকারী সেই দাম্ভিক ব্যক্তি, শাস্ত্র নিয়ম না মেনে যে যজ্ঞ করে, সে যজ্ঞ নামমাত্র।

 

১৮

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধঞ্চ সংশ্রিতাঃ

মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোঽভ্যসূয়কাঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ

মাম্‌ আত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তঃ অভ্যসূয়কাঃ।।

অহংকার, উৎপীড়নের ক্ষমতা, দর্প, কাম ও ক্রোধে আচ্ছন্ন ব্যক্তি সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের দোষবিচার করে এবং সমস্ত দেহের পরমাত্মা স্বরূপ আমাকেই অবজ্ঞা করে।

 

১৯

তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্‌ সংসারেষু নরাধমান্‌।

ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।।

তান্‌ অহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্‌ সংসারেষু নরাধমান্‌।

ক্ষিপামি অজস্রম্‌ অশুভান্‌ আসুরীষু এব যোনিষু।।

এই সমস্ত সাধু বিদ্বেষী, নিষ্ঠুর, সংসারের অমঙ্গলকারী নিকৃষ্ট নরাধমকে আমি বারবার আসুর যোনিতে নিক্ষেপ করি।

 

২০

আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।

মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্‌।।

আসুরীং যোনিম্‌ আপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।

মাম্‌ অপ্রাপ্য এব কৌন্তেয় ততঃ যান্তি অধমাং গতিম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র, এই রূপ মূর্খব্যক্তি জন্মে জন্মে আসুরী যোনিতেই জন্ম লাভ করে এবং আমাকে লাভ করা দূরে থাক, তারা আরও নীচ জন্ম লাভ করে।

 

২১

ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ।

কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্রয়ং ত্যজেৎ।।

ত্রিবিধং নরকস্য ইদং দ্বারং নাশনম্‌ আত্মনঃ।

কামঃ ক্রোধঃ তথা লোভঃ তস্মাৎ এতত্রয়ং ত্যজেৎ।।

কাম, ক্রোধ এবং লোভ – নরকের এই তিন প্রকার দ্বার জীবাত্মাকে নীচ পথে চালনা করে। কাজেই এই তিনটি দোষকে সর্বদা ত্যাগ করা উচিৎ।  

 

২২

এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।

আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্‌।।

এতৈঃ বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈঃ ত্রিভিঃ নরঃ।

আচরতি আত্মনঃ শ্রেয়ঃ ততঃ যাতি পরাং গতিম্‌।।

এই নরকের দ্বার স্বরূপ তিন তমোগুণ থেকে বিমুক্ত হলে, মানুষ নিজের মঙ্গল আচরণে সমর্থ হয় এবং তারপর পরমমোক্ষ লাভ করে। 

 

২৩

যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকরতঃ।

ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্‌।।

যঃ শাস্ত্রবিধিম্‌ উৎসৃজ্য বর্ততে কামকরতঃ।

ন স সিদ্ধিম্‌ অবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্‌।।

যে শাস্ত্র বিধি না মেনে নিজের ইচ্ছামতো কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে ব্যক্তি না সিদ্ধিলাভ করে, না সুখ পায় এবং পরম মুক্তিও লাভ করতে পারে না।

 

২৪

তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ।

জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহার্হসি।।

তস্মাৎ শাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্য-অকার্য-ব্যবস্থিতৌ।

জ্ঞাত্বা শাস্ত্র-বিধান-উক্তং কর্ম কর্তুম ইহ অর্হসি।।

অতএব শাস্ত্রই হল তোমার কর্তব্য এবং অকর্তব্য কর্মের একমাত্র প্রমাণ, কাজেই শাস্ত্রে বর্ণিত বিধি নিষেধ মেনেই কর্তব্য কর্ম করো।

 দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ সমাপ্ত


চলবে...।

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৭

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের ষষ্ঠ পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৬ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)


৪.৪.৩ গুপ্তবংশের অন্যান্য রাজা

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত (৪১৫–৪৫৫ সি.ই.)। তাঁর উপাধি ছিল মহেন্দ্রাদিত্য। কুমারগুপ্ত ছিলেন চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় রানি ধ্রুবদেবীর পুত্র। তিনি দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। অতএব ধরে নেওয়া যায় তাঁর সময় বড়োসড়ো যুদ্ধ-বিগ্রহ তেমন কিছু ঘটেনি, যদিও তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই, মধ্য এশিয়ায় ঘনিয়ে উঠল গুপ্তসাম্রাজ্যের বিপদের মেঘ।

হুন নামে এক যাযাবর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়ার ব্যাকট্রিয়া অধিকার করে ফেলল। এই হুনদের দুটি গোষ্ঠীর কথা ইতিহাসে শোনা যায়, শ্বেতহুন এবং পীতহুন। শ্বেতহুনদের আক্রমণে রোম শহর এবং সাম্রাজ্যের পতন এবং ধ্বংস হয়েছিল। এই শ্বেতহুনদের নেতা বা রাজা ছিল অ্যাটিলা। অন্যদিকে পীতহুনরা ভয়ংকর বন্যার মতো এগিয়ে আসতে লাগল উত্তরপশ্চিম ভারতের গিরিপথে। এই হুনজাতি ছিল দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার এবং যোদ্ধা, তাদের নৃশংসতার কথা বিশ্বের ইতিহাস মনে রেখেছে।

কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত রাজা হলেন ৪৫৫ সি.ই.-তে এবং রাজা হয়েই তাঁকে হুনদের সম্মুখীন হতে হল। প্রথমদিকে স্কন্দগুপ্ত হুনদের আক্রমণ শক্ত হাতেই প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু হুনদের ঘনঘন এবং বারবার আক্রমণে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন, তাঁর রাজত্বের অধিকাংশ সময়ই কাটতে লাগল সীমান্ত অঞ্চলে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হুণদের সামলাতে। রাজধানীতে তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে, দুর্বল হতে লাগল গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসন, বেড়ে উঠতে লাগল রাজধানী এবং রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ল, যার প্রমাণ পাওয়া যায় এই সময়ের তাঁদের মুদ্রার অবনতি দেখে। ৪৬৭ সি.ই. পর্যন্ত তিনি হুনদের ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু ওই সময় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন শুরু হল দ্রুতগতিতে। স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী গুপ্তরাজাদের কথা তেমন স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে হুনদের ভয়ংকর আক্রমণে গুপ্তরাজাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল এবং হুনরা ঢুকে পড়ল উত্তরভারতে। এর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই গুপ্তসাম্রাজ্য মুছে গিয়ে, দেশজুড়ে গড়ে উঠল ছোট ছোট রাজ্য।

প্রথম যে হুন রাজার নাম ভারতের ইতিহাসে পাওয়া যায় তাঁর নাম তোরমান, তাঁর রাজ্য ছিল পশ্চিমে পারস্য থেকে খোটান এবং তাঁর রাজধানী ছিল আফগানিস্তানের বামিয়ানে। এই তোরমান উত্তরভারতে এবং মধ্য ভারতের এরান (মধ্যপ্রদেশের সাগর জেলার প্রাচীন শহর) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তোরমানের পুত্র মিহিরকুলও (৫২০ সি.ই.) হুনদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। সমসাময়িক এক চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, মিহিরকুল ছিলেন অভদ্র এবং বদমেজাজী। তিনি মূর্তিপূজা বিরোধী এবং তীব্র বৌদ্ধ বিরোধী ছিলেন। তিনি অনেক বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যা করেছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কলহন তাঁর “রাজতরঙ্গিণী” গ্রন্থে লিখেছেন, লোভী ব্রাহ্মণরা নাকি হুনদের থেকে প্রচুর জমি দান হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।

যাই হোক, মধ্য ভারতের সমসাময়িক শিলালেখ থেকে জানা যায় পরবর্তী গুপ্ত রাজারা কিন্তু তখনও হুনদের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে, আবার আক্রমণের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আক্রমণে মিহিরকুল পরাস্ত হন এবং ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলের অধিকার ছেড়ে, কাশ্মীরের ছোট এক রাজ্যে স্থিতু হয়েছিলেন, এবং সেখানেই ৫৪২ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেই হুনদের দাপট অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হুনদের নতুন নতুন গোষ্ঠী ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে একটানা অশান্তির সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। এই সময়েই হুণদের ব্যাকট্রিয়া থেকে উৎখাত করল তুর্কি এবং পারস্যের সাসানিয়ানরা। পরবর্তী কালে তুর্কিরা পারস্যও জয় করে নিল। এর ফলে উত্তরভারত হুনদের থেকে পরিত্রাণ পেল ঠিকই, কিন্তু আক্রমণের নতুন মেঘ আবার ঘনিয়ে উঠতে লাগল উত্তর-পশ্চিম আকাশে। এর কয়েকশ বছর পর থেকে ভারত টের পাবে, তুর্কিদের প্রবল আক্রমণের ক্রমাগত ধাক্কা। 

 

৪.৪.৪ গুপ্ত রাজাদের ধর্ম

গুপ্তবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম চন্দ্রগুপ্তর মুদ্রায় সিংহবাহিনী দেবী মূর্তির চিত্র মুদ্রিত ছিল। হতে পারে তিনি হয়তো লিচ্ছবি-রাণি কুমারদেবীর প্রভাবে সিংবাহিনীদেবীর ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। অতএব মাতৃকা দেবী হিসেবে “সিংহবাহিনী দেবী” ততদিনে পূজিত হচ্ছেন। সমুদ্রগুপ্ত নিজেকে “পরমভাগবত” বলে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন “পরমভাগবত”। তবে গুপ্তরাজাদের কেউই পরধর্মে বিদ্বেষী ছিলেন না। শিলালিপিগুলি থেকে জানা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের দুই উচ্চপর্যায়ের আধিকারিক সাব-বীরসেনা শৈব ছিলেন এবং আম্রকারদাব ছিলেন বৌদ্ধ। রাজা কুমারগুপ্ত ছিলেন কার্তিকেয়র উপাসক। অনুমান করা যায় এই কারণেই তাঁর প্রিয় পুত্রেরও নাম রেখেছিলেন স্কন্দ, কার্তিকেয়র আরেকটি নাম। তাঁর রাজত্বকালে তিনি বেশ কিছু বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, সূর্য, শিব, বিষ্ণু এবং কার্তিকেয়র মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। অতএব তিনিও গুপ্ত পরম্পরা অনুযায়ী ধর্ম-সহিষ্ণু ছিলেন। অর্থাৎ সমসাময়িক সব কটি ধর্মীয় বিশ্বাসকেই তিনি যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী সম্রাট স্কন্দগুপ্ত বৈষ্ণব ছিলেন।

 

৪.৪.৫ গুপ্ত পরবর্তী পর্যায় ও হর্ষবর্ধন

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সপ্তম শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত উত্তর ভারতে চারটি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্ব ছিল। তাঁরা হলেন, মগধের গুপ্ত (অনেক ঐতিহাসিক এই গুপ্তদের গুপ্তবংশেরই উত্তরসূরি বলেন, অনেকে বলেন এঁরা আলাদা বংশ), কনৌজের মৌখরি, থানেশ্বরের পূষ্যভূতি এবং বল্লভির মৈত্রক। পূষ্যভূতি বংশের থানেশ্বর ছিল দিল্লির উত্তরে, এখনকার হরিয়ানা অঞ্চলে। মৌখরি বংশের সঙ্গে পূষ্যভূতিদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল এবং দুই বংশের বৈবাহিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। যার ফলে মৌখরি বংশের শেষ রাজার মৃত্যুর পর মৌখরিদের রাজ্য কনৌজ পূষ্যভূতিদের অধিকারে চলে এসেছিল। অন্যদিকে মৈত্রকরা ছিলেন সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের গুপ্তরাজাদের প্রশাসনিক প্রধান। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর তাঁরা স্বাধীন হয়ে ওই অঞ্চলেই নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল বল্লভিতে (আধুনিক ভাবনগর শহরের কাছাকাছি)। একসময় এই বল্লভি নগর বাণিজ্য এবং শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি রাজ্য ছাড়াও উড়িষ্যা, আসাম এবং আরো অনেক অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্যও গড়ে উঠেছিল। এই সব রাজ্যগুলির মধ্যে একমাত্র মৈত্রক বংশই দীর্ঘদিন রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি আরব উপজাতিদের আক্রমণের ফলে, বল্লভি রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করেছিল।

পূষ্যভূতি বংশের প্রথম শক্তিশালী রাজার নাম পাওয়া যায় প্রভাকরবর্ধন। বাণভট্টের হর্ষচরিতে, তাঁর বীরত্বের অতিরঞ্জিত বর্ণনা পাওয়া গেলেও, তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন, তাঁর ছেলে হর্ষবর্ধন। সাধারণতঃ তিনি হর্ষ নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত।

 

৪.৪.৬ সম্রাট হর্ষবর্ধন

হর্ষের রাজত্বকালের শুরু ৬০৬ সি.ই.-তে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কবি বাণভট্ট “হর্ষ-চরিত” নামে তাঁর জীবনী রচনা করেছিলেন। ভারতের ইতিহাসে কোন রাজার জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থই প্রথম। এর পরের রাজাদের মধ্যে এরকম জীবন-চরিত রচনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বললেও কম বলা হয়। কিন্তু তাদের তুলনায়, ঐতিহাসিক অতিরঞ্জন থাকলেও, কাব্য গুণে “হর্ষচরিত” সবার উপরে।

হর্ষ একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন এবং এই পর্যায়ে তিনি অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্য জয় করে নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে পেরেছিলেন। যেমন, জলন্ধর (পাঞ্জাব), কাশ্মীর, নেপাল এবং বল্লভি রাজ্যেরও কিছুটা। পূর্বদিকে বঙ্গের রাজা শশাঙ্ক তাঁর চিরশত্রু ছিল এবং দক্ষিণেও তিনি তেমন সুবিধে করতে পারেননি। দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমে চালুক্যবংশীয় দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন এবং এর পর দক্ষিণ জয়ের চেষ্টা তিনি ছেড়েই দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজধানী থানেশ্বর থেকে সরিয়ে কনৌজে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর কারণ হয়তো অনেকগুলি, প্রথমতঃ উত্তর-পশ্চিমের উপজাতিগোষ্ঠীগুলির বারবার আক্রমণ এড়ানো। দ্বিতীয়তঃ কনৌজ থানেশ্বরের তুলনায় কৃষি উৎপাদনে অনেক বেশি উর্বর। এবং হয়তো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল - কনৌজ থেকে তাঁর সাম্রাজ্যের চারদিকেই স্থলপথে এবং জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনেক প্রাচীন এবং উন্নত।

যুদ্ধ-বিগ্রহ না থাকলে হর্ষ তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় এবং কর আদায়ের ব্যাপারেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তিনি অনেকসময় সরাসরি সাধারণ প্রজাদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের অভিযোগ মন দিয়ে শুনতেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিতেন, কখনো কখনো তিনি দুঃস্থ প্রজাদের দানও করতেন। শোনা যায় পাঁচ বছর অন্তর তিনি একটি ধর্ম-উৎসবের আয়োজন করতেন, এবং সেখানে অজস্র দান করতেন। তাঁর রাজত্বকালে (৬৪৩ সি.ই.-তে) কনৌজ শহরে একটি বৌদ্ধ সম্মেলনের তিনিই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।  

এত ব্যস্ততার মধ্যেও শোনা যায় তিনি নাকি তিনটি নাটকের রচয়িতা। তার মধ্যে দুটি নাটক প্রথাগত মিলনান্ত নাটক এবং একটি বুদ্ধের তত্ত্ব নিয়ে চিন্তামূলক নাটক। যদিও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে, তাঁরা বলেন এই নাটকগুলি হয়তো তাঁর লেখা নয়, তাঁর নামে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর কোন ভক্ত নাট্যকার। যাই হোক, এর থেকে এটুকু স্পষ্ট ধারণা করা যায়, তিনি সাহিত্য এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং উৎসাহীও ছিলেন।

হর্ষের রাজত্বের অনেক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়, বাণভট্ট রচিত “হর্ষচরিত” থেকে। হর্ষচরিতে বেশ কিছুটা কাব্যিক অতিরঞ্জন থাকলেও, সমসাময়িক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার হদিশ পাওয়া যায়। হর্ষচরিতের থেকেও সমসাময়িক ঘটনার নিখুঁত বিবরণ পাওয়া যায় বিখ্যাত এক চৈনিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত থেকে। তিনি হলেন হুয়েনসাং বা জুয়ানজুয়াং। হুয়েনসাং অত্যন্ত পণ্ডিত এবং প্রজ্ঞাবান ছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে জানা যায়, তিনি চীনের এক মান্দারিন পরিবারের ছেলে এবং প্রথম জীবনে কনফুসিয়াসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি অত্যন্ত উৎসাহী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে এসেছিলেন শুধুমাত্র তীর্থ ভ্রমণের জন্য নয়, বরং বৌদ্ধ শাস্ত্র পড়তে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের অনুলিপি সংগ্রহ করতে। তাঁর লিখিত বিবরণ, তাঁর পূর্ববর্তী চৈনিক সন্ন্যাসী ফাহিয়েনের মতো, একপেশে বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা নয়।

হর্ষের রাজত্বের শেষ দিকের ঘটনাগুলিও চৈনিক বিবরণ থেকেই জানা যায়। হর্ষের সমসাময়িক চীনের তাং সাম্রাজ্যের সম্রাট তাই সুং, হর্ষের রাজসভায় দুবার রাজদূত পাঠিয়েছিলেন - একবার ৬৪৩ সি.ই.তে আরেকবার ৬৪৭ সি.ই.তে। কিন্তু দ্বিতীয় রাজদূত কনৌজে এসে পৌঁছোনোর কিছুদিন আগেই হর্ষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় তাঁর সিংহাসন অধিকার করেছিলেন কোন এক অযোগ্য এবং অপদার্থ রাজা। হর্ষের গুণমুগ্ধ সেই চৈনিক রাজদূত এই অনাচার সহ্য করতে না পেরে, নেপাল এবং আসামে গিয়েছিলেন, সামরিক সাহায্য এবং সৈন্যসংগ্রহ করতে। নেপাল ও আসাম ছিল হর্ষের মিত্র রাজ্য। এই মিলিত শক্তি দিয়ে তিনি সেই অপদার্থ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে পেরেছিলেন এবং রাজাকে বন্দী করে নিয়ে গিয়েছিলেন চীনে।

যাই হোক হর্ষের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য অনেকগুলি ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এবং অষ্টম শতাব্দীতে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন রাজা ললিতাদিত্য।

 

৪.৪.৬.১ হর্ষের ধর্ম

শোনা যায় হর্ষের পিতা ও পূর্বপুরুষেরা সূর্যের উপাসক ছিলেন, কিন্তু হর্ষ ছিলেন পরম শৈব। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর ভগ্নী রাজ্যশ্রীর প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেন। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষার পর তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর সাম্রাজ্য জুড়ে অনেক বৌদ্ধ বিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন।

৪.৪.৭ সামাজিক পরিবর্তন - সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা

এর আগে মৌর্য যুগের পর থেকে খ্রিষ্টিয় প্রথম দুই-তিন শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা করেছিলাম। ভারত ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ে যাবার আগে, ভারতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও একবার আলোচনা করে নেওয়া যাক। কারণ গুপ্ত যুগের শুরু থেকে হর্ষ-যুগের শেষ পর্যন্ত – প্রায় চারশ বছর মূল ভারত ভূখণ্ডের অধিকাংশ অঞ্চলই সুশাসনে বেশ স্থিতাবস্থার মধ্যেই ছিল। তাছাড়া এই পর্যায়ে ইতিহাস রচনার উপাদানের এতই প্রাচুর্য যে তার থেকে সমসাময়িক ভারতের সামগ্রিক রূপটি বেশ সহজেই ধারণা করা যায়।  

 ৪.৪.৮.১ পোষাক আশাক ও ফ্যাসান

সেকালের পুরুষেরা নিম্নাঙ্গে পরতেন ধুতি এবং গায়ে উত্তরীয়। ধুতি পরার নানান ধরণ ছিল, উত্তর ভারতে ধুতির কাছা ছিল আবশ্যিক এবং দক্ষিণে কোমরে জড়িয়ে রাখার নিয়ম। দরিদ্র বা সাধারণ গ্রাম্য মানুষের সাদা ধুতি হাঁটু অব্দি লম্বা হত, ধনী, সম্পন্ন এবং রাজা-রাজড়াদের হত গোড়ালি পর্যন্ত। ধনী ব্যক্তিরা নানান রঙের ধুতি পরতেন, যেমন নন্দ রাজপুত্র শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই পীতাম্বর পরতেন। স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ মানুষের ধুতি সুতির হলেও, ধনীদের রেশম, মসলিন বা উত্তম সূতির বস্ত্রই পরিধেয় ছিল। পুরুষদের মধ্যে অন্তর্বাস পরার প্রচলন ছিল না। শীতকালে পুরুষেরা গায়ে জড়াত পশমের বা মোটা সুতোর চাদর। তবে হিমালয়ের কাছাকাছি এবং শীতপ্রধান অঞ্চলে, পশমের জ্যাকেট যার নাম ছিল “প্রাবার”-এর প্রচলন ছিল। পুরুষদের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও সন্ন্যাসীরা মাথা মুড়িয়ে ফেলতেন, অবিশ্যি ব্রাহ্মণদের মাথার পিছনে একগুচ্ছ টিকি বা শিখা থাকত। তবে সাধারণ সম্পন্ন গৃহস্থ যুবকেরা তৈলাক্ত ও পরিপাটি লম্বা চুল রাখতেই পছন্দ করত। সম্পন্ন পুরুষদের মধ্যে সোনার অলংকার পরারও যথেষ্ট প্রচলন ছিল। কানে কুণ্ডল, আঙুলে আংটি বা উর্ধবাহুতে অঙ্গদ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অলংকার সাধারণতঃ সোনা বা রূপোর এবং সঙ্গে থাকত নানান ধরণের দামি পাথর বা রত্ন।


যক্ষিণী মূর্তি, ১৪৫০ সি.ই. রাজস্থান 

    মেয়েদের প্রধান পোশাক ছিল শাড়ি। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী মোটা সুতি, দুকূল, রেশম বা মসলিনের শাড়ির প্রচলন ছিল সর্বাধিক। তবে পশ্চিম এবং উত্তরপশ্চিম ভারতের সীমিত অঞ্চলে, মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের প্রভাবে মেয়েরা ঘাঘরা এবং চোলি ব্যবহার করত। শহরের উচ্চবিত্ত মহিলাদের মধ্যে অন্তর্বাসের প্রচলন ছিল।   নর্তকী এবং বারাঙ্গনারা দামি রেশম বা মসলিনের অর্ধস্বচ্ছ শাড়ি পরত এবং বক্ষে বাঁধত কঞ্চুক বা কাঁচুলি। সাধারণ জনসমাজে মহিলাদের অন্তর্বাস পরার কোন প্রচলন ছিল না। সাধ্য অনুযায়ী সুতি বা পশমের চাদরই ছিল মহিলাদের শীত নিবারণের উপায়।

মেয়েদের অলংকারের কোন সীমা ছিল না। আর্থিক অবস্থা অনুযায়ী অলংকারের বহুল প্রচলন ছিল।  মাথার খোঁপায়, সিঁথিতে, অথবা চুলের বেণীতে সোনা এবং রূপার বিচিত্র অলংকারের ব্যবহার ছিল। তেমনি ছিল, নাকে, কানে, আঙুলের আংটি, হাতের বালা, বাজুবন্ধ, বাহুবন্ধ, অজস্র ধরনের কণ্ঠহার, কোমরের অলংকার এবং নিতম্বসজ্জার অলংকার, তাছাড়া পায়েরও নানান অলংকার। তবে সাধারণতঃ পায়ের পাতা বা গোছে সোনার অলংকার ব্যবহার হত না, রূপো বা পেতলের নূপুর, মল, চুটকি ব্যবহার হত। অত্যন্ত মহার্ঘ এবং মর্যাদার ধাতু হিসেবে সোনার সম্মান ছিল রূপোর অনেক উপরে। সোনার অলংকারের সঙ্গে বহুল ব্যবহৃত হত নানা ধরনের দামি পাথর, মণি এবং মুক্তা। সোনার অলংকার ছাড়াও ফুলের মালা দিয়ে অঙ্গসজ্জার প্রচলন ছিল, ফুলের মালা জড়িয়ে রাখা হত, মাথার খোঁপায় বা মুক্ত বেণীতে।

মেয়েদের অঙ্গরাগ বা প্রসাধনের মধ্যে ছিল চন্দন, সিঁদুর, কাজল বা অঞ্জন, কুমকুম, গোরোচনা, পুষ্পরেণু। চন্দনের প্রলেপ সারা গায়েই মাখা হত, তার সুগন্ধের জন্যে এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শরীরকে শীতল রাখতে। সিঁদুর ও কুমকুমের টিপ কপালে পরা হত। পূর্বভারতীয় মেয়েদের মধ্যে কাঁচপোকা[1]-র টিপ পরারও বহুল প্রচলন ছিল।  চোখের পল্লবে এবং কোলে গভীর কাজলরেখায় অঙ্কিত কটাক্ষ-বাণ পুরুষ-হৃদয় ভেদ করার মোক্ষম উপায় ছিল। হলুদ গোরোচনা[2] কণিকার বিন্দু দিয়ে সাজিয়ে তোলা হত চিবুক এবং দুই গাল। ফুলের সৌরভময় পরাগ-রেণুতেও মহিলারা রাঙিয়ে তুলতেন চিবুক, গাল, ও গ্রীবা। হাত ও পায়ের আঙুলগুলি অলক্তক বা আলতার রঙে রাঙিয়ে তুলত মেয়েরা। এই আলতা ছিল এক ধরনের গাছের লালরস। ঠোঁট রাঙিয়ে তুলত তাম্বুল অর্থাৎ পান-খয়েরের রসে। নর্তকী এবং বারাঙ্গনা সুন্দরীরা দুধের সঙ্গে আলতা মিশিয়ে, গোলাপি আভায় সাজিয়ে তুলতেন তাঁদের পীন পয়োধর এবং গুরু নিতম্ব।

৪.৪.৮.২ খাদ্য ও পানীয়

প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বৈদিক যুগ পর্যন্ত মাংস খাওয়ার বহুল প্রচলন ছিল। এই মাংসের মধ্যে গৃহপালিত সকল পশু, এমনকি জঙ্গলের পশু, নানা ধরনের পাখি এবং মাছেরও প্রচলন ছিল। নিরামিষ আহারের প্রবণতা বেড়েছে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে এবং অবশ্যই সম্রাট অশোকের সময়ে। তিনি প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। যদিও “অর্থশাস্ত্র”-এ প্রাণীহত্যা এবং নগরের কসাইখানাগুলির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্যে নিয়মিত নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। মহাযানীয় বৌদ্ধ ধর্ম এবং পৌরাণিক হিন্দু ধর্ম প্রচলনের সময় থেকে নিরামিষ আহারের প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

প্রধান খাদ্যে আজকের ভারতীয় খাবারের থেকে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। ভাত এবং গম, যব কিংবা জোয়ারের রুটি, নানান ধরনের ডাল, সব্জিই প্রধান খাদ্য ছিল। তার সঙ্গে ছিল নানা ধরনের তেল এবং অবশ্যই ঘি, দুধ, দই, মাখন। ফল এবং মিষ্টান্নও ছিল বহুবিধ। যে যে মশলা প্রধানতঃ বিদেশে রপ্তানি হত, যেমন গোলমরিচ, তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জয়িত্রি, জায়ফল ছাড়াও হলুদ, ধনে, জিরে, সরষে, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। যদিও বৌদ্ধ মহাযানী এবং হিন্দু ধর্মের সময় পেঁয়াজ, রসুন ব্যবহারে কিছুটা লাগাম পড়েছিল।   

প্রাচীন এবং বৈদিক যুগে মদ্যপানের বহুল প্রচলন ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যজ্ঞের আয়োজনে সোমরস পানের রীতি আবশ্যিক ছিল এবং দেবরাজ ইন্দ্র যে মাত্রাতিরিক্ত সোম পান করতেন, সে কথাও জানা যাবে এই গ্রন্থের পঞ্চম ও শেষ পর্বে। বৌদ্ধধর্মে মদ্যপানকে পাপ বলা হয়েছে। তবে অর্থশাস্ত্র বিভিন্ন ধরনের মদ্যের বিবরণ দিয়ে বলেছেন, সরকারি পরিশ্রুতাগারেই মদ্য প্রস্তুত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার কারণ তিনটি – মদ্যের শুদ্ধতা রক্ষা, মদ্যপানের নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি রাজস্ব আদায়। এই মদ্যের মধ্যে ছিল চাল থেকে বানানো মদ্য “মেদক”, ময়দা থেকে বানানো, “প্রসন্না”, বেল থেকে বানানো “আসব”, গুড় থেকে বানানো “মৈরেয়” এবং আম থেকে বানানো “সহকারসুরা”। পূর্ব ভারতে মধু থেকে বানানো হত “মাধ্বী”, ঝোলাগুড় থেকে “গৌড়ী” এবং চাল থেকে বানানো হত “পৈষ্টি”। দক্ষিণ ভারতে তাল ও নারকেলের রস থেকে “তড্ডি” বা “তাড্ডি” (তাড়ি) মদ্য বানানো হত।

যাঁরা মনে করেন ব্র্যাণ্ডি, হুইস্কির মতো বিলিতি মদ্য ভারতে এনে ব্রিটিশরা আমাদের দেশকে উচ্ছন্ন পাঠানোর সুব্যবস্থা করেছিল - তাঁরা আংশিক সত্য। বহু ধরনের মদ্য-রসে ভারতবাসী বহু যুগ ধরেই সিক্ত ছিল - তফাৎটা হল প্যাকেজিং আর কোয়ালিটি কন্ট্রোলে। মাটির পোড়া হাঁড়ি থেকে শৌণ্ডিকের হাতে পরিবেশিত দেশী মদ্য (কান্ট্রি লিকার) - দাঁড়াতে পারল না কাঁচের দৃষ্টি-নন্দন বোতলে সাজানো বিলিতি মদ্যের (ফরেন লিকার) সামনে। অবশ্য স্বাদে-গন্ধেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। যদিচ আজকের নাগরিক সমাজের বাইরে বৃহত্তর দরিদ্র কিন্তু রসিক ভারতীয় সমাজ আজও প্রাচীন রসেই মজে থাকে।          

চলবে... 



[1] কাচপোকা  (Jewel bug)– Beetle  জাতীয় এক ধরনের পতঙ্গ, তার ডানার রঙ হত উজ্জ্বল সবুজ বা নীল। পতঙ্গের এই ডানাই টিপ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।  

[2] গোরোচনা - গরুর শুকনো পিত্ত – হলুদ রঙের কণিকা।

চিত্রঋণ - উইকিপিডিয়া  

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...