সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৪ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ  - ৫


 ৫.২.১ বেদান্তে ব্রহ্ম ধারণা (আগের পর্বের পরবর্তী অংশ) 

এবার কেনোপনিষদ থেকে কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক। প্রথম খণ্ডের প্রথম শ্লোকে, গুরুদেবের কাছে কোন এক শিষ্য যেন ব্রহ্ম সম্বন্ধে আমাদের মনে আসা প্রশ্নগুলিরই উত্তর জানতে চেয়েছেন,-

“কার ইচ্ছায় এবং নির্দেশে আমাদের মন চালিত হয়? কার আদেশে প্রধান প্রাণ নিজ কাজে নিযুক্ত হয়? কার ইচ্ছায় মানুষ এত কথা বলে, কোন জ্যোতির্ময় পুরুষই বা চোখ, কানকে নিয়ন্ত্রণ করেন?” ১/১

(শিষ্যের প্রশ্নের উত্তরে গুরুদেব বলছেন,) “যাঁর শক্তিতে কান শুনতে পায়, মন চিন্তা করে, বাগেন্দ্রিয় কথা বলে, তাঁর শক্তিতেই প্রাণ উজ্জীবিত হয়, চোখ দেখতে পায়। তিনিই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের চালক, পণ্ডিতেরা এই তত্ত্ব জেনে আত্মবুদ্ধি ত্যাগ করে, সংসারের ঊর্ধ্বে অমৃতলোক অনুভব করেন। ১/২

চোখ তাঁকে দেখতে পায় না, বাক্যে তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, মনেও তাঁর কল্পনা করা যায় না। আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না। ১/৩

আমাদের জানা, এমনকি অজানা সকল বিষয় থেকেই তিনি ভিন্ন, আমাদের পূর্ববর্তী গুরুদের কাছে এমন ব্যাখ্যাই আমরা শুনেছি। ১/৪

যাঁকে কথায় প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু আমাদের বাক্য যিনি প্রকাশিত করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৫

মন যাঁকে চিন্তা করতে পারে না, অথচ যিনি মনে চেতনার প্রকাশ ঘটান, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৬

চোখ যাঁকে দেখতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের দৃষ্টিতে আলো দিয়েছেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৭

কান যাঁকে শুনতে পায় না, অথচ যিনি আমাদের শ্রবণে শব্দের বোধ সঞ্চার করেন, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন। ১/৮

এই প্রাণ যে প্রাণকে উপলব্ধি করতে পারে না, অথচ যিনি আমাদের প্রাণ সঞ্চার করেন, তুমি তাঁকেই ব্রহ্ম বলে জানবে – কিন্তু আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন।” ১/৯”

(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ ")

যেখানে উপনিষদের ঋষিগুরু তাঁর শিষ্যদের বলছেন, “আমরা তাঁর স্বরূপ জানি না, অতএব কী ভাবে তাঁর কথা তোমাকে বলবো, তাও জানি না”। বারবার বলছেন, “আমরা যাঁর উপাসনা করি, তিনি নন”। সেখানে আমাদের উপলব্ধিতে তিনি ধরা দেবেন, এমন সাহস করি কী করে?

অতএব আমরা দেখতে পেলাম বেদান্ত দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলেন ব্রহ্ম, তিনি ভিন্ন অন্য কোন দেব ধারণা নেই। ব্রহ্মই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কারণ। বেদান্ত দর্শনের সূত্রপাত সম্ভবতঃ খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীর কোন সময়ে ঘটেছিল। কিন্তু আচার্য শংকর (৭৮৮-৮২০ সি.ই.) সেই বেদান্ত দর্শনকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আজ ভারতীয় দর্শন বলতে বেদান্ত দর্শনকেই বোঝায়। আচার্য শংকর যে বেদান্তের মত প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন – তার নাম অদ্বৈত-বেদান্ত। কিন্তু তাঁর পরেও বেদান্তের অনেকগুলি নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও মত ভারতের বহু অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছিল। তাদের নাম উল্লেখ করার আগে, একটা কথা বলে রাখা ভাল, বেদান্তের শাখা ও মত যতগুলিই হোক না কেন, সবগুলিরই মূল কিন্তু ব্রহ্ম-ধারণা।

 ভাষ্যকারের নাম                 সময়কাল                             বেদান্ত মতবাদ

শংকরাচার্য                       ৭৮৮-৮২০ সিই                          অদ্বৈত

ভাষ্কর                           ৯৯৬-১০৬১ সিই                         ভেদাভেদ

যাদবপ্রকাশ                      ১০০০ সিই                              ভেদাভেদ

রামানুজ                         ১০১৭-১১২৭ সিই                        বিশিষ্টাদ্বৈত   

মধ্বা                            ১২৩৮-১৩১৭ সিই                        দ্বৈত

নিম্বার্ক                          ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধ                  দ্বৈতাদ্বৈত

শ্রীকান্থ                          ১২৭০ সিই                              শৈব-বিশিষ্টাদ্বৈত

শ্রীপতি                          ১৪০০ সিই                           ভেদাভেদাত্মক – বিশিষ্টাদ্বৈত

বল্লভ                            ১৪৭৯-১৫৪৪ সিই                        শুদ্ধাদ্বৈত

শুক                             ১৫৫০ সিই                              ভেদাভেদ

বিজ্ঞানভিক্ষু                      ১৫৫০ সিই                           আত্ম-ব্রহ্মকিয়-ভেদাভেদ

বলদেব                          ১৭২৫ সিই                              অচিন্ত্য-ভেদাভেদ

 দর্শন কথার মূল অর্থ দৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টি। আমরা এতক্ষণ যে ছয়টি দর্শনের আলোচনা করলাম, প্রত্যেকটি দর্শনই এই বিশ্বজগতের সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ ও অস্তিত্বকে বুঝতে বা দেখতে শেখায়। তবে বেদান্ত এই জগতকে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিতে শুধুমাত্র দেখতেই শেখায় না, আমাদের আধ্যত্মিক জীবনের পথও দেখায়। এই দর্শনের লক্ষ্য মানুষের সাধারণ-চৈতন্য সীমা ছাড়িয়ে, জাগতিক দুঃখ-কষ্ট পার করে, পূর্ণতা ও শান্তি লাভ। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দর সর্বজন-সমন্বয়ের বেদান্ত ভাবনাই, বেদান্তকে ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রধান মত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বেদান্তের অনেকগুলি প্রচলিত শাখার কথা আমি ওপরের সারণিতে দেখিয়েছি, সেগুলির মধ্যে আধুনিক হিন্দু বিবুধ-সমাজের প্রধান দর্শন অবশ্যই অদ্বৈত বেদান্ত।

অদ্বৈত তত্ত্বের স্থূল অর্থ ব্রহ্মর দুটি সত্ত্বার অনস্তিত্ব, অথবা ব্রহ্মার দ্বৈতসত্ত্বার অনস্বীকার। সেক্ষেত্রে দ্বৈত ও অদ্বৈত তত্ত্বের পার্থক্যটা কোথায়? দুই তত্ত্বের প্রাথমিক পার্থক্য হল, দ্বৈত মতে মোক্ষ অবস্থাতেও মানুষের বাস্তব ব্যক্তিসত্ত্বার অস্তিত্ত্ব থাকে। কিন্তু অদ্বৈত মতে ব্যক্তিসত্ত্বাও অবাস্তব এবং মুক্তিতে ব্যক্তিসত্ত্বার কোন অস্তিত্ব থাকে না। [আমরা আবার সেই ৪.৩.২ অধ্যায়ের তথাগতর অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব – অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের “চতুষ্কটিকা” যুক্তিতেই যেন চলে এলাম! এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - "ধর্মাধর্ম - ৪/৫"] আচার্য শংকর বলছেন, “আমরা যাকে জীব বলি, সেটি ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন নয়। বরং জীব হল সেই ব্রহ্ম, যাঁর সঙ্গে বুদ্ধি, কর্তা এবং ভোক্তা অভিধা আরোপিত হয়। ব্যক্তি-সত্ত্বার সীমিত আধার অর্থাৎ তার শরীর বা দেহের জন্যেই তাকে পরম-সত্ত্বার থেকে পৃথক ধারণা হয়। বিচিত্র আকার ও নামের এই দেহ-রূপ ধারণার সৃষ্টি হয় অজ্ঞান বা অবিদ্যা থেকে। অদ্বৈত মতে এইটুকু ছাড়া দুই সত্ত্বার মধ্যে কোন প্রভেদ নেই।

দ্বৈত মতে ব্রহ্মকে নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তিসত্ত্বাকেই আত্মা বলা হয়। যখন এই আত্মা জীবের দেহ এবং মনে অধিষ্ঠিত হয় তখন তাকে “জীবাত্মা” বলে। মুক্তিতে জীবাত্মার অভিধা অদৃশ্য হয়, ব্রহ্মে বিলীন হয়, কিন্তু সেখানেও অতি নগণ্য হলেও কিছুটা পার্থক্য থেকে যায়। এই বিষয়টি পূর্ণের সঙ্গে তার ভগ্নাংশের সাযুজ্য হওয়ার মতোই তুলনীয় – এবং ব্যক্তিসত্ত্বা ও ব্রহ্মের এই প্রভেদকে দ্বৈত মতে “স্বগত-ভেদ” বলে।

অদ্বৈত এই স্বগত-ভেদকে স্বীকার করে না। অদ্বৈতের মতে, মুক্তির পর্যায়ে, ব্রহ্ম ও আত্মা অভিন্ন হয়ে যায় এবং আত্মা ব্রহ্মই হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে জীব যখনই তার মন এবং দেহ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, তখনই আত্মা ও ব্রহ্মর পার্থক্য অবলুপ্ত হয়। এই কারণেই অদ্বৈত দর্শন ব্যক্তি সত্ত্বাকে জীবাত্মা এবং ব্রহ্মকে পরমাত্মা বলে থাকে।                

বেদান্ত তত্ত্বে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা দুই সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ সত্ত্বার – ব্রহ্ম এবং বাস্তব জগৎ - সঙ্গতি সাধন। আমরা আগেই জেনেছি ব্রহ্ম হলেন অসীম এক চেতনা, তিনি নির্গুণ, ব্রহ্ম কেমন সেকথা অবর্ণনীয়। উপনিষদ ব্রহ্মর সংজ্ঞায় বলেছেন, তিনি “সত্য, পরমজ্ঞান ও অসীম”, কিন্তু এ সবই তাঁর লক্ষণ, তাঁর বর্ণনা নয়, এবং এই লক্ষণগুলি থেকে তাঁর ধারণাও করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, সীমিত ছকে বাঁধা কোন বোধ দিয়েই অসীম, অবিভাজ্য এবং নির্গুণ বিষয়ের কোন ধারণা করা যায় না।

এই অধ্যায়ের শুরুতেই কেনোপনিষদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, এবার কেনোপনিষদের তৃতীয় খণ্ড এবং চতুর্থ খণ্ডের দুটি শ্লোক থেকে একটি আশ্চর্য গল্প শোনাবো, -

“একবার ব্রহ্মই (দেবাসুর যুদ্ধে) দেবতাদের বিজয়ী করলেন। সেই ব্রহ্মের জন্যেই দেবতারা মহিমান্বিত হলেন। কিন্তু দেবতারা মনে করলেন, “এই বিজয় আমাদের, এই মহিমা আমাদেরই”। (৩/১)

তাঁদের এই চিন্তার কথা ব্রহ্ম জানতে পারলেন, তিনি দেবতাদের মঙ্গলের জন্যে তাঁদের সামনে যক্ষ বেশে আবির্ভূত হলেন। কিন্তু দেবতারা জানতেও পারলেন না, কে এই যক্ষ। (৩/২)

তাঁরা (দেবতারা) অগ্নিকে বললেন, “হে জাতবেদ, এই যে যক্ষ, যিনি এসেছেন, তিনি কে, জেনে এসো।” অগ্নিদেব বললেন, “তাই হোক”। (৩/৩)

অগ্নি সেই যক্ষের সামনে গেলে, যক্ষ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?” অগ্নি বললেন, “আমিই অগ্নি, আমি জাতবেদা নামেও বিখ্যাত”। (৩/৪)

যক্ষবেশী ব্রহ্ম বললেন, “কোন ক্ষমতার জন্যে তুমি বিখ্যাত”? অগ্নি বললেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি দগ্ধ করতে পারি”। (৩/৫)

“এটিকে দগ্ধ করো দেখি”, বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম অগ্নির সামনে একটি শুষ্ক তৃণ রাখলেন। সর্ব শক্তি দিয়েও অগ্নি সেই তৃণটিকে দগ্ধ করতে না পেরে ক্ষান্ত হলেন। দেবতাদের কাছে ফিরে বললেন, “এই পূজনীয় যক্ষ কে, জানতে পারলাম না”। (৩/৬)

এরপর দেবতারা বায়ুকে বললেন, “হে বায়ু, তুমি জেনে এসো তো, এই যক্ষ কে”? বায়ু বললেন, “তাই হোক”। (৩/৭)

বায়ু তাঁর কাছে গেলে, যক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে”? বায়ু বললেন, “আমাকে সবাই বায়ু বলে, মাতরিশ্বা নামেও আমি বিখ্যাত”। (৩/৮)

যক্ষবেশী ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কোন দক্ষতার জন্যে তুমি বিখ্যাত”? বায়ু উত্তর দিলেন, “এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সে সব আমি উড়িয়ে নিতে পারি”। (৩/৯)

“এই তৃণ গ্রহণ করো” বলে যক্ষবেশী ব্রহ্ম তাঁর সামনে একটি শুষ্ক তৃণ রাখলেন। সর্বশক্তি দিয়েও বায়ু সেই তৃণটিকে উড়িয়ে তুলতে সমর্থ হলেন না। তিনি ফিরে এসে বললেন, “এই যক্ষ যে কে, আমি জানতে পারলাম না”। (৩/১০)

এরপর দেবতারা ইন্দ্রকে বললেন, “হে মঘবন্, আপনিই গিয়ে জেনে আসুন, এই যক্ষ কে”? ইন্দ্র বললেন, “তাই হোক”। ইন্দ্র সামনে যেতেই যক্ষ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। (৩/১১)

তখন সেই আকাশেই বহু সোনার অলংকারে সজ্জিতা এক নারী, উমা হৈমবতী[2] আবির্ভূতা হলেন। ইন্দ্র তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলেন, “এই যক্ষ কে?” (৩/১২)

তিনি (উমা) বললেন, “ইনিই ব্রহ্ম, ব্রহ্মের বিজয়কে নিজেদের মনে করে তোমরা মহিমান্বিত মনে করছো”। এইভাবেই ইন্দ্র জানতে পারলেন ইনিই ব্রহ্ম”। (৪/১)

যেহেতু অগ্নি, বায়ু এবং ইন্দ্র ব্রহ্মার নিকটে গিয়ে আলাপ করেছেন এবং প্রথমে এঁরাই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেছেন, সেহেতু অন্য দেবতাদের থেকে এঁনারা অধিক উৎকর্ষ লাভ করেছেন। (৪/২)” 

(সম্পূর্ণ কেনোপনিষদের অনুবাদ পড়ে নিতে পারেন এই ব্লগের এই সূত্র থেকে - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ৩ ও ৪ ")     

এই কাহিনীতে আমরা দেখলাম, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তিন প্রধান দেবতা ইন্দ্র, অগ্নি ও বায়ুর মহিমা পরমব্রহ্ম-র কাছে একান্তই অকিঞ্চিৎকর। এখানে রুদ্র বা বিষ্ণুর কোন উল্লেখই এল না। কিন্তু হিন্দু ধর্মের প্রধান দুই দেবতা বিষ্ণু ও শিব, ব্রহ্মর সমকক্ষ হয়ে ত্রিদেব হয়ে উঠেছেন। এমনকি অনেক গ্রন্থে তাঁদের ব্রহ্মর থেকেও বেশী ঐশ্বর্যবান দেখানো হয়েছে। আর যে স্বর্ণভূষিতা নারী[1] (কোন দেবীও নন?) ইন্দ্রকে ব্রহ্ম সম্বন্ধে অবহিত করলেন তিনি উমা। তিনিই আমাদের আদরের মাতৃরূপা-কন্যা, আশ্বিনে যাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় আমরা প্রত্যেক বছর উদ্গ্রীব অপেক্ষায় থাকি। তিনিই আদ্যাশক্তি দুর্গা, হিন্দু ধর্মে তাঁর স্থান ত্রিদেবেরও ওপরে। ব্রাহ্মণ্য পণ্ডিতদের হিন্দু বা পৌরাণিক পণ্ডিত হয়ে উঠতে এতটাই বৈতসী বৃত্তি অবলম্বন করতে হয়েছিল! ভাবলে বিস্মিত হতে হয় বৈকি।              

ষড়দর্শন প্রসঙ্গের উপসংহার টানার আগে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় সাধককবি শ্রী রামপ্রসাদ সেনের একটি গান উল্লেখ করি -  

“কে জানে কালী কেমন, ষড় দর্শনে না পায় দরশন।

আত্মারামের আত্মা কালী প্রমাণ প্রণবের মতন,

সে যে ঘটে ঘটে বিরাজ করে ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।

কালীর উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা বুঝ কেমন,

যেমন শিব বুঝেছেন কালীর মর্ম, অন্য কেবা জানে তেমন।

মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন,

কালী পদ্মবনে হংস সনে হংসী রূপে করে রমণ।

প্রসাদ ভাষে, লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধু-তরণ,

আমার মন বুঝেছে, প্রাণ বুঝে না; ধরবে শশী হয়ে বামন”।

অতএব সাঁতরে সাগর পার হওয়া অথবা বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যাওয়া সম্ভব নয় বুঝেই, আমরা সাধারণ মানুষজন এই ষড়দর্শন এবং তার তত্ত্ব উপলব্ধি থেকে মুক্ত থাকার পথটাই বেছে নিয়েছি। আমাদের মধ্যে যারা নাস্তিক তারা এক কথায় এসব নস্যাৎ করে দিব্যি উন্নাসিক থাকতে পারলেন। কিন্তু আমাদের মতো যারা ধর্মভীরু আস্তিক তারাও ষড়দর্শন এবং পরমব্রহ্ম বিষয়ে খুব স্পষ্ট ধারণা করতে পারলাম না। কিন্তু এ বিষয়ে কতিপয় ধর্মগুরু এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতের দুর্বোধ্য সংস্কৃত শাস্ত্রবাক্যকে শিরোধার্য করে, নিজ-নিজ ভাষায় নিজ-নিজ গোষ্ঠীর দেবদেবীর চরণে নিজেদের ভক্তি ও বিশ্বাস নিবেদন করতে শুরু করলাম। অর্থাৎ আমরা সেই দিন থেকেই হিন্দু হয়ে উঠতে লাগলাম। এ কথা এই পর্বের প্রতিটি অধ্যায়েই ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হবে।

যাই হোক, ষড়দর্শন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার এখানেই ইতি টানলাম। প্রসঙ্গতঃ বলি, এই ছয়টি দর্শনের মধ্যে প্রথম চারটি দর্শনের সৃষ্টি ব্রাহ্মণ্য যুগে এবং শেষ দুটি হিন্দু যুগে – অর্থাৎ সে সময়ে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের হিন্দুধর্মে রূপান্তর প্রায় হয়ে এসেছে। এবার যে গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে, আমি ধর্ম বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা করব, সেটি হল মহাভারত। কারণ মহাভারত সম্পর্কে বলাই হয় – “যা নেই (মহা)ভারতে তা নেই ভারতে”।



[1] হৈমবতী শব্দের দুটি অর্থই সম্ভব – প্রথমটির উৎস হেম অর্থা সোনা – অতএব স্বর্ণালংকার ভূষিতা। আবার হিম মানে তুষার – অর্থাৎ হিমালয় কন্যা হিসেবেও হৈমবতী শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে। 

চলবে...


রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

মহীরূহ

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " অপর্ণা "


 

সে এক বিশাল বটগাছ। বিশাল বেড়ের গুঁড়ি মাঝখানে। অনেকটা জায়গা জুড়ে চারপাশে অজস্র ঝুড়ি নামিয়ে বেশ সবল অধিষ্ঠান। মাথার ওপর সতেজ পাতার নিটোল আচ্ছাদন। জ্বলন্ত গ্রীষ্মেও স্নিগ্ধ ছায়ার অনাবিল আশ্বাস। আশ্রিত পক্ষিকূলের কলকাকলিতে প্রাণবন্ত সারাটাদিন।

পরশের মনে হয় এমন একটা গাছ আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই থাকা দরকার কাছে হোক বা দূরে। কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা শান্তির জন্যে। নিরাপদে, নিশ্চিন্তে দু’দণ্ড বসার জন্যে, বসে ভাবার জন্যে। আর সবচেয়ে বেশী দরকার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে। যেখানে বার বার এক দৌড়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে অল্প আয়াসে। চোর চোর খেলায় বার বার বুড়ি ছুঁয়ে ফেলার মতো।

এমন একটা গাছ সত্যিই ছিল। আজও হয়তো আছে স্বমহিমায়। সেখানে যেতেই হবে একদিন। পথ যদিও আগের চেয়ে সুগম হয়েছে। তবু মনে হয় অনেক দূরের সে পথ, এ জীবনে পার হওয়া সম্ভব হবে না আর। তবু চেষ্টা করে যেতে হবে বারবার। অন্ততঃ আরেকবার সেই গাছটার কাছে পৌঁছে যেতে চায় পরশ। সে উপলব্ধি করে যেদিন পৌঁছে যাবে সেদিন সেও গাছই হয়ে যাবে। সুদীর্ঘ কালের নীরব এবং নিরপেক্ষ সাক্ষী হয়ে সে তাকিয়ে থাকবে কখনো মাটির দিকে কখনো আকাশের দিকে। 

 

পরশের দেশের বাড়ি খুব দূর নয় কলকাতা থেকে। ভোরে হাওড়া থেকে ট্রেন। স্টেসনে নেমে বাস। সওয়া নটা নাগাদ বাস থেকে নেমে বাসস্টপের পাশেই নারাণ ময়রার দোকানে মন্ডা আর রসগোল্লা খেয়ে পথচলা শুরু। বাসস্টপ থেকে একটু এগোলেই বড় একটা গ্রাম একটা মসজিদ, দুটো মন্দিরের পাশ কাটিয়ে...।

বাবার যে একটা ডাকনাম আছে সেটা প্রায় ভুলেই গেছিল পরশ। বাড়িতে বাবার পরিচিত যাঁরা আসেন পাড়ার বা অফিসের কলিগ, সকলেই জীবনবাবু বা জীবনদা ডাকেন। বাবা সবার বড় বলে কাকা ও পিসিমারা ডাকেন বড়দা। দিদিমা, বড়মামা ডাকেন জীবন বলে, বাকিরা সবাই ছোট তাই জামাইবাবু। একমাত্র ঠাকুমা ডাকতেন মান্তু বলে। দাদুকে পরশ দেখেনি, আর ঠাকুমাও চলে গেলেন বেশ কবছর হল। কাজেই বাবার ডাকনামটা প্রায় ভুলতেই বসেছিল।

পথে বাবার পরিচিত নানা বয়সের মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল। চলছিল প্রণাম দেওয়া এবং নেওয়া। কখনো বা আলিঙ্গন। সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ। পাশে থেকে পরশ দেখছিল, শুনছিল। বাবাও যে কোনসময় ছোট ছিলেন, স্কুলে গেছেন, দৌরাত্ম্য করেছেন স্কুলে, পাড়ায়, গ্রামে। কানমলা, গাঁট্টা খাওয়ার মতো অপরাধ যে বাবাও কোনদিন করতে পারেন, এটা কোনদিন মনেই হয়নি পরশের। এইসব গ্রামগুলির মাঠে ঘাটে রাস্তার ধুলোয়, পুকুরের জলে তার ছোট্ট বাবার বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনী মিশে আছে। বাস্তবিক এখানে না এলে, পরশের কাছে এইসব অভিনব সংবাদ অধরা থেকে যেত চিরদিন।

গ্রামটা পার হয়ে বেশ কিছুটা আবাদি জমি। তারপর ডাঙা জমির ওপর সেই বটগাছটা। অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ে। পড়বেই না পড়ে উপায় নেই, এমনই অমোঘ তার উপস্থিতি।

এই গাছটার নীচে আয় একটু বসি

আর কদ্দুর বাবা, এখান থেকে?

অনেকখানি, ধর যতটা এলাম এতক্ষণ, ততটাই হবে প্রায়। সামনের এই মাঠটা পার হয়ে, ওই যে অনেক গাছপালা ওইটে আমাদের গ্রাম

পরশ দূরের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে দূরত্বটা।

এই গাছটা আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি। একইরকম বিশাল। যে গ্রামটা পার হয়ে এইমাত্র এলাম ওখানেই আমরা পড়তে আসতাম। পাঠশালা থেকে ফেরার পথে এইখানে হয়ে যেতাম

কি করতে এখানে?

তোরা কি করিস স্কুল ছুটির পর। বাবার চোখে দুষ্টু দুষ্টু মজার আলো।

খেলি

আমরাও খেলতাম। তোদের স্কুলে ছোটদের জন্যে দোলনা, সি-স, বানিয়ে রাখা আছে। আমাদের ছোটবেলায় এটাই আমাদের খেলার জায়গা ছিল। ঝুলে থাকা এই ঝুড়ি থেকে ঝুলতাম দুলতাম। হাত পা ছড়ে যেত। বাড়িতে ধরা পড়লে মা পেটাত খুব। বলত দস্যি ছেলে কোনদিন পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবি যে

ঠাকুমা মারত তোমাকে? দেখে তো মনে হয়নি কোনদিন। আমাদের তো কোনদিন বকেছেন বলেও মনে পড়ে না

তোরা তো নাতি। তোদেরকে তো ভালবাসবেই। আমাদের এদিকে, একটা কথা আছে, “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। আমাদের মায়ের কাছে আমরা হলাম যেন টাকা, আর তোরা হচ্ছিস সুদ। অনেক কষ্টে, অনেক যত্নে ছেলেমেয়েদের সুস্থভাবে বড়ো করে তোলার পরেই না আসে সুদ, অতএব তার মিষ্টত্ব স্বাভাবিক। তাছাড়া বয়েস হলে মানুষ অনেক শান্ত হয়ে যায় না? আমি, তোর মা তোকে কম পিটিয়েছি ছোটবেলায়। বাবা লাজুক হাসেন। দেখবি, তোর যখন ছেলেমেয়ে হবে, ভীষণ ভীষণ আদর করব। তোরা শাসন করতে গেলে, মারধোর করতে গেলে, দেখবি বাধা দেব। উপদেশ দেব বাচ্চারা অমন একটু-আধটু করতেই পারে

 বাবার চোখের দৃষ্টি ভীষণ নরম আর মায়াময়। এই বটগাছের মতোই যেন। ভীষণ স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা।

 এতটা পথ হেঁটে আসতে কষ্ট হয়নি তো তোর? এই গরমে

নাঃ, কষ্ট হয়নি, বাবা

তোদের তো অব্যেস নেই

তোমার যেন আছে। তুমিও তো কলকাতাতে ট্রাম বাস ট্যাক্সিতেই অভ্যস্ত বহুকাল

তা ঠিক। তবে কি জানিস, আমাদের বনেদটা তৈরি হয়েছিল এই কষ্ট দিয়েই। নাঃ, ভুল বললাম। তখনকার দিনে এগুলোকে কেউ কষ্ট বলে ভাবতাম না। ভাবনা তো দূরের কথা, মাথাতেই আসত না। এছাড়া যে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব, সেই চেতনাটাই ছিল না যে! পাঠশালা ছেড়ে আমরা যে হাইস্কুলে পড়তাম, সেটা এই তল্লাটের একমাত্র হাইস্কুল। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক দূরে। রোজ সাইকেলে যেতাম। সবাই, সে যত ধনীই হোক বা দরিদ্র, একই ভাবে রোজ মাইল দশেক প্রায় সাইকেল চালাতাম। কিন্তু সত্যিকার কষ্টটা হত বর্ষাকালে। যখন মাঠ ঘাট প্রায়ই ডুবে থাকত জলে, আর মাঝে মাঝে বান আসত নদীতে। তখন তো আর সাইকেল চলবে না, পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় কি?

কিছুক্ষণ থেমে বাবা আবার বললেন, “আমরা গেছি, আমাদের আগেও বাবা কাকারা গেছেন, আমাদের পরেও বহুদিন চলেছে এইভাবে। স্কুল থেকে ফিরে মাঠে দৌড়িদৌড়ি করেছি বল নিয়ে। এই ভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল আমাদের সেই জীবনযাত্রা। একসঙ্গে যাওয়া আসা করতাম এক গাঁয়ের ছেলেরা। ফাজলামি, পেছনে লাগা, মাঝে মাঝে বদমায়েসি সবই ঘটত চলার পথেই। সবার অলক্ষ্যে গড়ে উঠত এক একটা সম্পর্ক। অনেককে মেনে নেওয়ার, অনেকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠত এই নিত্য পথ চলায়

আমরা যারা শহরে থাকি, আরামে যাওয়া আসা করি, আমরা কি এই সম্পর্কটা মিস করি?

ডেফিনিটলি। ক্লাসে কতটুকু সময় পাস বন্ধুত্ব করার - টিফিনের সময়টুকু ছাড়া? স্কুল ছুটি হলেই সবাই বেরিয়ে পড়িস কেউ স্কুল বাসে, কেউ ভাড়ার গাড়ি, কেউ নিজের গাড়ি। কেউ কেউ ট্রামে, বাসে বা পায়ে হেঁটে। যাই বলিস আমরা যে স্মৃতি বয়ে চলেছি তোরা তার ভগ্নাংশও কল্পনা করতে পারবি না। সব স্মৃতিই আনন্দের বা সুখের নয়। স্মৃতিও গাছের মতোই। কেউ ফল দেয়, ফুল দেয়। কেউ কাঁটা দেয়। কেউ কিচ্ছু দেয় না দেয় শুধু শান্তি। এই বটগাছটার মতো

 বাবা চুপ করে গিয়েছিলেন। চোখ বন্ধ। মনে হয় গভীর কোন চিন্তায় মগ্ন। পরশ কলকাতায় বাবাকে এত কথা বলতে শোনেনি কোনদিন। বাবা বরাবরই গম্ভীর এবং বাংলা সিনেমার বাবাদের মতো ভয়ংকর না হলেও, সমীহ কাড়া দূরত্ব বজায় রাখতেন সবসময়েই। 

এই গ্রাম, এই মহীরুহ বট, দীর্ঘ অদর্শনের পর এত পরিচিত জন, বাবাকে বিচলিত করেছে। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে আসছে চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে, আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে।

অনেকক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা তাকালেন, মুখে লাজুক হাসি, বললেন, তোদের ভাষায় বললে, বোর হলি তো?

নাঃ, একদম না। পরশ হাসে। বরং ভীষণ ভাল লাগছে। আসার সময় বহুদূর থেকে এই জায়গাটা দেখে সত্যি দারুণ লাগছিল। চারিদিকে বহুদূর বিস্তৃত মাঠ, জমি, আশেপাশে কিছু এলেবেলে তালগাছ। তার মধ্যে এই গাছটির সুপ্রাচীন অস্তিত্ত্ব। নিমেষে মন ভাল হয়ে গেল। কিন্তু এতক্ষণ বসার পর মনে হচ্ছে এই গাছটার বোধহয় কোন জাদু আছে। অনেস্টলি বাবা, এখানে না এলে, তোমাকে এভাবে হয়তো চিনতামই না। তোমাকে এত কথা আমি অন্ততঃ কোনদিন বলতে শুনিনি। অনেক না বলা কথা তোমার ভেতরে জমা ছিল। আজ তুমি প্রকাশ করলে। তুমি আজ যখন বলছিলে বাবা, আমার চোখের সামনে থেকে পর্দাটা যেন সরে গেল। তোমাদের সেই শান্ত নিস্তরঙ্গ ফেলে আসা দিনগুলো যেন ফুটে উঠল চোখের সামনে। রিয়েলি, এই গাছটা জাস্ট গাছ নয়, যেন যেন - কি বলব যেন একটা ব্যক্তিত্ত্ব। বাবা মুচকি মুচকি হাসছিলেন।

লজ্জা পেয়ে পরশ বলে, হেসো না, বাবা। আমার মনে হল তাই বলে ফেললাম, ব্যস

হাসছিলাম তোর কথা শুনে নয়” – হাসি মুখেই বাবা বললেন ভাল লাগল তোর ফিলিংসটা। বুঝলাম আমার ছেলে হিসেবে তুই খুব একটা খারাপ নোস

দেখলে তো বাবা, তোমার রবি ঠাকুরের ভাষায়, এতদিন আমাদের চেনাশোনা ছিল, আজ থেকে জানাশোনা-র সূত্রপাত হল পরশের মুখে ফাজিল হাসি।

তোর মুখে রবীন্দ্রনাথ! কবে পড়লি শেষের কবিতা’”?

না না অতোটা আশাবাদী হয়ো না, ক্যাসেটটা শুনছিলাম একদিন

পড়িস, সুযোগ পেলেই পড়িস। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জীবনটাকে চিনতে বেশ অসুবিধে হয়

অ্যাই, তোমার আবার শুরু হল। রবি ঠাকুরে অবসেসন তোমার আর পাল্টাবার নয়

কি এমন ঘটল যে - যার জন্যে অন্তুতঃ এই বিষয়ে নিজেকে পাল্টে ফেলতে হবে!

তোমার ঘটেনি, কিন্তু আমার ঘটেছে। গম্ভীর মুখে পরশ ব্যক্ত করে।

কি? বাবার চোখে বিস্ময়।

এতদিন তোমার গাম্ভীর্যের ধাক্কায় তোমাকে ওরে বাব্বা ভাবতাম। আজ থেকে শুধু বাবা - খুব ভালোবাসার প্রিয়জন বাবা ভাবব

এতটা ম্যাচিওরড হয়ে গেছিস তুই, বুঝিনি তো!

একটু পরে বললেন, নে ওঠ, এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে 

 

অনেকটা পথ যেতে হবে। তাই আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হল পরশ। তার গন্তব্য অনেকটাই দূর - জোকা পার হয়েও বেশ কিছুটা। রাজারহাট থেকে তিনটে নাগাদ বেরিয়েও ফোর্থ ফেজ-এর গেট অব্দি পৌঁছতে প্রায় পাঁচটা বাজিয়ে ফেলল পরশ। পার্কিংয়ে গাড়ি লক করতে করতে লক্ষ্য করল বাবা বারান্দায় বসে আছেন। পরশ হাত নাড়ল। বাবা কোন রেসপন্স করলেন না। হয়তো খেয়াল করেননি। আজ তো তার আসার কথা ছিল না, কাজেই পথ চেয়ে প্রতীক্ষায় থাকবেন এমনটাও নয়।

একটু দূর পরে বটে, কিন্তু বেশ ভাল এই হোমটা। অনেকটা জায়গা জুড়ে ক্যাম্পাস। বাড়িটাও বেশ বড়। অনেক গাছপালা, বড় বাগান, সুন্দর সাজানো। ব্যবস্থাপত্রও ভালোই। পরশ এদিক ওদিক অন্যান্য বৃদ্ধাবাস সম্পর্কে যা শুনেছে, তার তুলনায় এটা ওয়েল ম্যানেজড আর ওয়েল মেন্টেন্ড।

নীচের কাউন্টারের রেজিস্টারে নাম ধাম লিখে পরশ জোড়া জোড়া সিঁড়ি পার হয়ে দোতলায় উঠল। লম্বা করিডর ও দীর্ঘ বারান্দা পার হয়ে বাবার পিছনে দাঁড়াল পরশ। বাবা একই ভাবে বসে আছেন সামনের বড় গাছটার দিকে তাকিয়ে। পরশ গাছ-টাছ তেমন চেনে না, তবে গাছটা ঋজু, সুঠাম আর শাখাপ্রশাখা সমেত বেশ ঝাঁকালো জম্পেশ গাছ। বাবা সেটার দিকেই নিবিষ্ট তাকিয়ে আছেন।

 বাবা, কেমন আছ? খুব নরম গলায় ডাকতে পারল পরশ। বাবা কোনমতেই যেন চমকে না ওঠেন। অথবা বাবার এই নিবিড় একাকিত্বটুকু ভাঙতে তার যেন দ্বিধা।

ঘরে চেয়ার আছে, টেনে নিয়ে বোস। বাবা নির্দেশ দিলেন। ঘাড় ঘোরালেন না। মাথা তুললেন না। একইভাবে বসে রইলেন সামনের দিকে চেয়ে। পরশ বাবার ঘর থেকে চেয়ার এনে বাবার পাশে বসল।

কেমন আছ, বললে না তো?

তোরা কেমন আছিস। বৌমা, ঊশ্রী। ভাল আছে সবাই?

হ্যাঁ, সবাই ভাল আছে

ঊশ্রীর স্কুল এখন ছুটি না? নিয়ে আসতে পারতিস। অনেকদিন দেখিনি মেয়েটাকে

টিউশন, নাচের ক্লাস। পড়ার প্রচন্ড চাপ...

অস্বস্তি হচ্ছিল পরশের কথাগুলো বলতে। আজ সকালে এই নিয়ে অশান্তি হয়ে গেল খানিকটা। পরশের কন্যা ঊশ্রী আসতে চেয়ে মায়াবী চোখে বার বার দেখছিল পরশের দিকে। ওর মা প্রীতি কিছুতেই আসতে দিল না। একই অজুহাতে যেগুলো একটু আগে পরশ বাবাকে বলল। পরশ জানে, ঊশ্রী এলে বাবা এমন উদাসীন বসে থাকতে পারতেন না। ছোট্ট চঞ্চল পাখির মতো সে উড়ে আসত, দাদুর গলা জড়িয়ে ধরত। বাবার এই নিবির্কার বসার ভঙ্গি টুটে এলোমেলো হয়ে যেত অন্ততঃ এই সময়টুকুর জন্যে। পরশকেও ভাবতে হতো না কিভাবে সামাল দেবে বাবার এই উদাসীনতা।

 আজন্মই ঊশ্রী ভীষণ দাদু ন্যাওটা। স্কুল থেকে ফিরে জুতো খুলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত দাদুর কোলে। গলা জড়িয়ে পিঠে চেপে পড়ত। স্কুলের কথা কোন বন্ধু কী বলল, কোন আন্টি কী বলল কল কল করে বলে যেত অনর্গল। ওর মা বকত। বলত দাদুকে বিরক্ত না করতে। বাবা আপত্তি করলে বলত, বাবা নাকি আদিখ্যেতা দেখিয়ে নাতনীর বারোটা বাজাচ্ছেন! আর রাগটা গিয়ে পড়ত ঊশ্রীর ওপর। চড়চাপড় মারধোর খেয়েছে কত, তবু ঊশ্রী সুযোগ পেলেই চলে যেত তার দাদুর কাছে।

আজও মেয়েটা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে দাদুর জন্যে। পরশের মনে হয়। আজ সকালে প্রীতি যখন ঊশ্রীর আসাটা নাকচ করে দিল, মেয়েটার মুখটা ব্যাথায় পাথর হয়ে গেল। পরশ ঠিক করল খুব শিগ্‌গির সে আবার আসবে এবং ঊশ্রীকে নিয়ে আসবে সঙ্গে। প্রয়োজন হলে জোর করেই।

মুখোমুখি দুজনেই বসে চুপচাপ। অস্বস্তির পাহাড় সরিয়ে পরশ আবার জিগ্‌গেস করে, তুমি কিন্তু বললে না, বাবা, কেমন আছ?

বাবা কোন উত্তর দিলেন না। মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন, রোববার ছেড়ে আজকে হঠাৎ চলে এলি, অফিসে ছুটি নিয়ে? অফিসে কাজকর্ম সব ঠিকঠাক চলছে? বাবা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন পরশের দিকে।

হুঁ, চলছে, ঠিকঠাক চলছে সব

পরশ বলল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হল না যেন। বাবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পরশের ফাঁকটুকু যেন ধরা পড়ে গেল। স্নেহ, ভালোবাসা এবং সমস্ত সম্পর্কের টান থেকে উপড়ে নিজের বাবাকে ঠেলে দিয়েছে এই একাকিত্বের নিশ্ছিদ্র জগতে। কতোটুকুই বা দূর তার বাসা থেকে এই হোম তবু যেন মনে হয় সীমাহীন দূরত্ব। অনন্ত সময় যেন পার হয়ে যায় এখানে পৌঁছতে। এ নিয়ে অফিসে, পাড়ায় আড়ালে আলোচনা হয় কানে আসে তারও। শীতল সম্পর্কের ঘেরাটোপে আবদ্ধ পরশ লজ্জায় মাথা নত করে। মনে মনে বলে কিছুই ঠিক নেই, বাবা, কিচ্ছু ঠিক নেই।

এই গাড়িটা কবে নিলি। গতবার তো এটা দেখিনি

তুমি দেখেছ? তখন নীচে থেকে হাত নাড়লাম, ভাবলাম তুমি খেয়াল করনি। রিসেন্টলি নিয়েছি। মাস তিনেক হল

কিছুটা উজ্জ্বল হয় পরশ, পুত্রের সাফল্যে কোন পিতা না গবির্ত হয়?

আগেরটা কি গোলমাল করছিল কিছু?

না তেমন কিছু নয়। নতুন মডেল। লেটেস্ট ফেসিলিটি। বেটার মাইলেজ। তাই পাল্টে ফেললাম   

ভেরি গুড”। তারপর খুব ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করলেন, "নতুন মডেল। বেটার মাইলেজ। লেটেস্ট ফেসিলিটি”।

পরশ নিশ্চিত কথাগুলো আর যাই হোক নিছক প্রশংসা নয়। প্রতিটি কথায় উনি শ্লেষ মিশিয়েছেন চায়ের সঙ্গে কড়া চিনি মেশানোর মতো। প্রসঙ্গটা এড়াতে, অবান্তর জেনেও পরশ আচমকা জিজ্ঞেস করে ফেলল, বাবা, একবার দেশের বাড়ি যাবে?

হঠাৎ?

অনেকদিন যাওয়া হয় না। বহুদিন, তাই না? তাছাড়া ঊশ্রীওতো দেখল না আমাদের গ্রাম। ঘরবাড়ি

বেশ তো যাও না, ঘুরে এসো। আজকাল তো হাঁটতেও হয় না, গাড়ি যাবার মতো রাস্তা হয়ে গেছে শুনেছি। তবে গেলে শীতের সময় যেও। গরমে ঊশ্রীর বড় কষ্ট হবে

তুমি যাবে না”? 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা উত্তর দিলেন, নাঃ, কী হবে আর ওসবে, যাবার কোন মানে হয় না”।

তোমার সেই বটগাছটার কথা মনে আছে, বাবা।?

কোনটা? তোর সেই ব্যক্তিত্ববান বটগাছটি?

বাবার মুখে মৃদু হাসি। হাসিটা পুরোন কথা মনে পড়ে যাওয়ার জন্যে। নাকি পরশের প্রতি সামান্য বিদ্রূপ। পরশ ঠিক বুঝল না।

চলো না, বাবা, একবার। শুধু তুমি আর আমি। আর কেউ না। দুজনে অনেকক্ষণ বসে থাকব সেই গাছের নীচে। কোন কথা বলার ইচ্ছে হলে বলব। না, তো না   

পরশের কণ্ঠে মিনতির সুর। বাবা পরশের দিকে তাকালেন। তারপর পরশের কাঁধে হাত রাখলেন। কাঁধে বাবার স্পর্শ নিরাপত্তার এক অদ্ভূত বোধ সঞ্চার করল পরশের মনে। বাবা কিছু বললেন না। তাকিয়ে রইলেন সামনের গাছটার দিকে। পরশের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। নিজের কোলের ওপর জড়ো করে রাখলেন হাতদুটি। খুব জোরে শ্বাস নিলেন - সে আর হয় না। আর কখনো হবার নয়। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

কেন বাবা? দেখ গেলে ভালোই লাগবে

না রে, এই বেশ আছি আমি। এই বারান্দায় এই ভাবেই বসে থাকি সারাটাদিন। মাঝে মাঝে গান চালিয়ে দিয়ে আসি। রবীন্দ্রনাথ শুনি। এই ছোট্ট গন্ডিটুকুর বাইরে কী আছে, কী ঘটছে সে সব জেনে, আমার আর কী যাবে আসবে, বলতে পারিস? পেছনে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি যে সব সম্পর্ক, তাদের থেকে না পারব মন খুলে কিছু নিতে, না পারব দিতে।

আজ আমরা যে যেখানে দাঁড়িয়ে, তার সব দায় তোর, এমন ভাবিস না। এটা ভালো নয়। এই ভাবনা তোকে কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে দেবে না, অথচ মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবি ধীরে ধীরে। কাছে থেকেও তুই যে এত কম আসিস। তুই কি আসতে পারিস না? পারিস, কিন্তু আসিস না সঙ্কোচে। কোন মুখে দাঁড়াব বাবার সামনে? কোন সান্ত্বনার কথা শোনাব এই ভাবনায়। সবই বুঝি।

নিজেকে বিপন্ন করি এই চিন্তায় যে, তুই নিজেকে কোথাও জুড়তে পারছিস না অন্তর থেকে। না আমার সঙ্গে। না বৌমার সঙ্গে। এমনকি তোর সন্তান ঊশ্রীও বঞ্চিতা হচ্ছে তার প্রকৃত পাওনা থেকে। বোঝা যাক বা না যাক, তোর কোলিগ, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী কেউ মেনে নিচ্ছে না তোর এই ছেঁড়াখোঁড়া সম্পর্কের টানাপোড়েন। মেনে নেওয়া সম্পর্ক আর মনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সে সম্পর্ক যত কাছের বা দূরেরই হোক না কেন

 সন্ধে হয়ে এল। হোমের গাছে গাছে বাসা বাঁধা পাখিরা ফিরে এসে ব্যাপক কিচিরমিচির করছে। শাঁখের আওয়াজ পাওয়া গেল না। প্রদীপ জ্বালালো না কেউ। ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠছে সব জায়গায়। ধূপের মৃদু গন্ধ এসে লাগল নাকে, কেউ জ্বালিয়েছে - হয়তো কোন ঘরে বা রিসেপশনে। বাবা অনেকগুলি কথা বলার পর চুপচাপ বসে রইলেন। পরশ একবার উঠে বাবার ঘরের লাইটটা অন করে দিয়ে এল। করিডোর আর বারান্দার লাইট এসে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল হোমের একজন, কাছাকাছি এল। ওদের দুজনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে কিছু বলল না। চলে গেল।

 ঊশ্রীর কোন ক্লাস হল যেন, আজকাল এইসব ব্যাপারগুলো আর মনে রাখতে পারি না

সেভেন

কেমন করছে পড়াশোনা?

ওই একরকম। পড়তে চায় না। পড়ায় মন নেই

মারধোর করিস নাকি খুব?

নাঃ ওর মা করে, একটু আধটু। খুব জেদি মেয়েটা -কিছুটা স্টাবোর্ন

 বাবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মাথা নাড়লেন বার বার। বললেন, এমনটা কি হবার কথা ছিল? বৌমাও চান নি। তুমিও না। কেউ না। কিন্তু ঘটে যাচ্ছে এইসব। অনিবার্য পরিণতির দিকেই চলছে সব কিছু। অমোঘ নিয়তির মতো

খুব চঞ্চল আর বিভ্রান্ত লাগছে বাবাকে। যেন অতিষ্ঠ। উঠে দাঁড়ালেন। হতাশায় বিবর্ণ মুখ। কিছুটা রূঢ় ভাবে বললেন, তুমি এসো। আর থেকো না এখানে। তোমার দেরী হয়ে যাবে ফিরতে। আবার অশান্তি হবে। ভীষণ কষ্ট পাবে মেয়েটা

পরশ উঠে দাঁড়াল। কিছু বলতে পারল না। কথাগুলো কতটা সত্যি তার চেয়ে বেশী আর কে জানে?

আসছি, বাবা

এসো। আবার এসো। খুব অসুবিধে না হলে ঊশ্রীকে আনবে পরেরবার

 পরশ এগিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে। প্রণাম করে বাবাকে। সমস্ত অন্তর নত হয়ে আসে তার এই সমর্পণে। বাবা কাঁধে হাত রাখেন একবার। অস্ফুটে বললেন, সাবধানে যেও

পরশ নীচে নেমে এল। খুব ধীরে ধীরে। তার শরীরে শক্তি আর নেই যেন। নীচে পার্কিং লটে গাড়ির দরজা খুলে তাকাল দোতলার বারান্দায়। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পরশ হাত তুলতে গিয়েও নিরস্ত হল। মাথা নীচু করে কিছু ভাবল এবং একটা কথা মনে পড়ল হঠাৎ - “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। বহুদিন আগে বাবা বলেছিলেন। তাঁর জীবনে ঊশ্রীর সান্নিধ্যের মাধুর্যটুকু উপভোগের সময়েই সে কি তার বাবাকে চরম বঞ্চিত করল না – তাঁকে নিঃসঙ্গ একাকীত্বের শেকলে বেঁধে?  ক্লান্ত বিষণ্ণ শরীরটা গাড়ির সিটে ছেড়ে দিয়ে, সে গাড়ি স্টার্ট করল।

নীরব উদাসীনতায় ঋজু এক মহীরূহের মতোই বারান্দায় বসে রইলেন তার বাবা। আশে পাশে স্নিগ্ধ ছায়া মেলে। 

-০০-

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৫

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃত...