বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৬

বরাহ অবতারের পৃথিবীর উদ্ধার (আগের পর্বে শুরু হয়েছিল, তারপর...)

পশু যেমন গন্ধ শুঁকে সবকিছুর সন্ধান করে, তিনিও গন্ধ শুঁকে পৃথিবীর সন্ধান করতে সমুদ্রের জলের মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। তাঁর বিশাল আকার এবং তাঁর ভীষণ ধারালো ক্ষুরের আঘাতে সমুদ্র যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। যে অর্ণবের জলে শ্রীনারায়ণ অনন্তশয়ান অবস্থানে ছিলেন, সেই শান্ত সমুদ্র এখন তোলপাড় হয়ে উঠল। সেই বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ঢেউয়ের নীচে খুঁজতে খুঁজতে তিনি পৃথিবীকে দেখতে পেয়েই, তাঁর বিশাল দুই দাঁতের উপর পৃথিবীকে তুলে নিলেন। সেই সময় সমুদ্রের মধ্যেই হিরণ্যাক্ষ নামে এক ভীষণ দৈত্য বাধা দিতে এলে, শ্রীবিষ্ণু ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে খুব সহজেই হত্যা করলেন। তারপর দুই দাঁতের মধ্যে পৃথিবীকে নিয়ে ভেসে উঠলেন সমুদ্রের উপর।

ব্রহ্মা ও অন্যান্য ঋষিগণ তমালনীল দৈব বরাহের দুই দাঁতের উপর ধরে রাখা শ্যামল সুন্দর পৃথিবীকে দেখে অভিভূত হলেনতাঁরা সকলে জোড় হাতে সেই বরাহদেবের স্তুতি করে বলতে লাগলেন,

“জয় জয় হে অজিত, তোমারই জয়। তুমিই যজ্ঞমূর্তি, বেদময় তোমার তনু। হে ভূধর, জলের মধ্যে গজশিশু তার দাঁতের ওপর পদ্ম ধারণ করলে যেমন শোভা হয়, তোমার দাঁতের উপর এই পৃথিবীর সেই রকম সুন্দর। পর্বত শিখরে বিশাল মেঘখণ্ডের মতো, দাঁতের উপর এই ভূমণ্ডল ধারণ করাতে, তোমার বেদময় বরাহরূপ অপরূপ দেখাচ্ছে। হে প্রভু, তুমি জগতের পিতা আর এই ধরিত্রীদেবী জগতের মাতা। যজ্ঞের সময়, যাজ্ঞিক যেমন কাঠে অগ্নি সংযোগ করে, তেমনি তুমিও এই পৃথিবীতে তোমার শক্তি নিহিত করেছ। এখন স্থাবর ও জঙ্গম সকল ভূতের আশ্রয় স্থানের জন্যে, এই পৃথিবীকে সংস্থাপন করো। আমরা সকলে এই পৃথিবীতে বসবাস করে তোমাদের দুজনকে জনক ও জননী রূপে প্রণাম করি।

হে জগন্নাথ, তুমি ছাড়া এমন শক্তিমান আর কে আছে, যে রসাতল থেকে এত আয়াসে পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারে? কিন্তু তোমার কাছে এ কাজ আদৌ আশ্চর্যের নয়। কারণ, তুমিই নিখিল বিশ্বের আধার, তুমি তোমার মায়ায় এই নিখিল বিশ্ব সৃষ্টি করেছ। হে ভগবান, এই নিখিল বিশ্ব তোমার যোগমায়ার গুণে তোমার সম্পর্কযুক্ত হয়ে মুগ্ধ। হে ঈশ্বর, তুমি বিশ্বের মঙ্গল সাধন করো। জীবগণ তোমার অনন্ত ও ধারণাতীত এই শক্তির তত্ত্ব উপলব্ধি করে, সব সময় যেন তোমার ভজনা করতে পারে, এই কৃপা তুমি দান করো”

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “এইভাবে ব্রহ্মবাদী ঋষিরা, লোকপালক বরাহদেবের স্তুতি করলে, তিনি নিজের ক্ষুরের আঘাতে অর্ণব সলিলে আধান শক্তি সঞ্চার করে, পৃথিবীকে জলের উপর প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। তারপর তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বৎস বিদুর, মেধা ও বুদ্ধি ভগবানে সমর্পণ করে দিলে, ভগবান সেই ভক্তের সকল ভার হরণ করে নেন। তাই তাঁর আর এক নাম হরিমেধা। তাঁর কথা সর্বদাই মঙ্গলময়, তাঁর মায়াময় চরিত্র সর্বজনের আদর্শ। ভগবান প্রসন্ন হলে, এই জগতে আর কোন বস্তু দুর্লভ থাকে? জগতের সমস্ত বস্তুকেই তখন তুচ্ছ মনে হয়কাজেই নিস্বার্থ ভক্তিতে যিনি ভগবানে মন প্রাণ সমর্পণ করতে পারেন, তিনি ভগবানের চরণে নিশ্চিত আশ্রয় পেয়ে থাকেন”

বরাহ অবতারের পৃথিবী উদ্ধারের কাহিনী শোনার পর, বিনীত বিদুর আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হে ঋষিশ্রেষ্ঠ  মৈত্রেয়,  শ্রীভগবান, তাঁর বরাহলীলায় পৃথিবীকে উদ্ধার করার সময়, তাঁর সঙ্গে আদিদৈত্য হিরণ্যাক্ষের কিসের জন্যে যুদ্ধ হল”?

শ্রী মৈত্রেয় স্মিত মুখে বললেন, “ভগবানের মাহাত্ম্য ভক্তিভরে শুনতে শুরু করলে কিছুতেই আর তৃপ্তি হয় না, আরো শুনতে ইচ্ছে হয়। মহামুনি নারদের মুখে, ভগবানের এই লীলা মাহাত্ম্য শুনে মহারাজ উত্তানপাদের বালক পুত্র ধ্রুব শ্রীবিষ্ণুপদ লাভ করেছিলেন। আর আমি এই বৃত্তান্ত শুনেছিলাম, স্বয়ং ব্রহ্মার কাছে, তিনি দেবতাদের কাছে এই ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন। তোমার এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলি, মন দিয়ে শোনো”


হিরণ্যাক্ষের জন্মরহস্য

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “একবার প্রজাপতি দক্ষের কন্যা দিতি, কামনার আগুনে অস্থির হয়ে তাঁর স্বামী মরীচিপুত্র কশ্যপের কাছে উপস্থিত হলেন। তখন সন্ধ্যাকাল, সবেমাত্র সূর্য অস্তে গিয়েছেন। মহামুনি কশ্যপ সারাদিন যজ্ঞের পর, যজ্ঞশালায় সমাহিত চিত্তে শ্রীবিষ্ণুর ধ্যান করছিলেন। 

দিতি বললেন, “হে স্বামী, আমার সমস্ত অঙ্গ কামনার অনলে জ্বলছে। আমি এখনই আমার গর্ভে তোমার সন্তানের উদ্রেক চাই। আমার সতীনেরা সকলেই আমার বোন। আমাদের পিতা মহারাজ দক্ষ আমাদের বিয়ের আগে আমাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা কাকে পতি হিসেবে পেতে চাই। আমাদের তেরজন বোনের সকলেই তোমার প্রতি অনুরক্ত ছিলাম, অতএব স্নেহবৎসল পিতা দক্ষ আমাদের তেরজনকেই তোমার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। এখন পুত্রবতী সতীনদের ভাগ্য দেখে আমি ঈর্ষায় জ্বলছি, হে নাথ, তুমি আমাকেও পুত্র দাওতোমার মতো স্বামীর সমাদর লাভ করে, আমার গর্ভে তোমার পুত্র ধারণ করার গৌরব আমাকে দান করো, হে স্বামী। তুমি কল্যাণপ্রদ ও ব্রহ্মজ্ঞ, আমি তোমার পত্নী, তোমার কাছে আমার কাতর অনুরোধ, তুমি আমার প্রার্থনা ফিরিয়ে দিও না। এসো, আমরা এখনই মিলিত হই”

পত্নীর কামনা জর্জর ব্যাকুলতা দেখে মহামুনি কশ্যপ মধুরস্বরে বললেন, “হে প্রিয়ে, তোমার এই আশঙ্কার কোন কারণ নেই। তোমার মনের ইচ্ছে আমি অবশ্যই পূরণ করব। তোমার মতো পত্নীকে সুখী করলে ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ হয়, অতএব তোমার বাসনা কেন অপূর্ণ রাখব? জাহাজের নাবিক যেমন নিজেকে এবং অন্যান্য যাত্রীদের নিয়ে সমুদ্র পার হয়। তেমনই গৃহস্থাশ্রমে, গৃহস্থ পত্নীর সাহায্যেই নিজেকে ও অন্যান্য আশ্রমিকদের অন্ন ইত্যাদি দান করে সংসারের দুঃখসাগর পার হয়ে থাকে। হে অভিমানিনী, পত্নী সামান্য নয়, সৎ কর্ম অনুষ্ঠানে পত্নী সর্বদাই পুরুষের অর্ধাঙ্গরূপিণী স্বরূপ। হে গৃহেশ্বরী, আমি সর্বদাই তোমার গুণগ্রাহী, তোমার থেকে যে উপকার আমি নিয়ে থাকি, আমার পক্ষে তার প্রত্যুপকার করা এই জন্মে কিংবা পরের জন্মেও সম্ভব হবে না। হে সাধ্বী, তোমার পুত্রকামনা আমি অবশ্যই পূর্ণ করবো, কিন্তু এখন সন্ধ্যাকাল। এই সময় আমাদের মিলনের পক্ষে মোটেই মঙ্গলজনক নয়। এই সময় তোমার পিতা দক্ষের আরেক কন্যা সতীর পতি মহাদেব রুদ্র তাঁর বৃষ বাহনে চারদিকে ঘুরে বেড়ান। সঙ্গে থাকে তাঁর ভূত প্রেত অনুচরগণ। মহাদেবের ধূসর জটা, ভস্মে ঢাকা তাঁর সোনার শরীর,  চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি তাঁর এই তিন চোখএই তিন চোখে তিনি এখন সব কিছুই দেখতে পান এই অসময়ে আমাদের মিলন তিনি দেখতে পাবেন, তাতেও কি তোমার লজ্জা হবে না?

হে প্রিয়তমে, ভগবান শ্রীরুদ্রের ঐশ্বর্যের কথা বলে শেষ করা যায় না। তিনি জগতে কাউকেই আত্মীয় বা পর মনে করেন না। জগতে কোন জীবের প্রতিই তাঁর না অনুরাগ আছে, না তিনি কাউকে বিদ্বেষ করেন। তিনি পরমেশ্বরের প্রতি একাত্ম। তিনি আমাদের ত্যাগধর্ম শেখাবার জন্যেই স্বয়ং সমস্ত ভোগ ত্যাগ করে নগ্ন হয়ে, গায়ে ভস্ম মেখে ঘুরে বেড়ান। যারা দেহকেই আত্মা বলে মনে করে, কুকুর ও শেয়ালের ভক্ষ্য দেহকে যারা বস্ত্র, মালা, অলংকার ও চন্দন-কুঙ্কুম চর্চায় সাজিয়ে তোলে, সেই সব মূর্খ ব্যক্তি, মহাদেব রুদ্রের এই নগ্ন আচরণ দেখে উপহাস করে। তাঁর এই আচরণ লোকশিক্ষার জন্যেই। অতএব এই সময় মহাদেব রুদ্রের দৃষ্টির সামনে আমাদের এই অসংযম কখনো করা উচিৎ নয়”

স্বামী কশ্যপের এই উপদেশ বাক্য শুনেও কিন্তু দিতি সংযত হতে পারলেন না। তিনি কামনায় নির্লজ্জ হয়ে কশ্যপের বস্ত্র আকর্ষণ করলেন এবং মহর্ষি কশ্যপকে প্ররোচিত করলেন মিলিত হবার জন্যে। মহর্ষি কশ্যপ, এই নিষিদ্ধ কর্ম থেকে পত্নীকে নিরস্ত করতে না পেরে, ঈশ্বরকে স্মরণ করে অবশেষে দিতির সঙ্গে মিলিত হলেন। মিলনের পর মহর্ষি কশ্যপ স্নান করলেন, প্রাণায়াম করলেন এবং নির্গুণ জ্যোতি ধ্যান করতে করতে প্রণব জপ করতে লাগলেন।

এতক্ষণে নিজের অসংযমের জন্যে লজ্জিতা দিতি ব্রহ্মর্ষি কশ্যপের কাছে গিয়ে, মুখ নীচু করে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আমি ভূতপতি রুদ্রের অবজ্ঞা করে ভীষণ অপরাধ করেছি, আমার গর্ভস্থ শিশুর যেন কোন ক্ষতি না হয়, তুমি এমন উপায় করো। তিনি ভগবান রুদ্র, তাঁর ক্রোধে বিশ্বের বিনাশ হয়, আমি তাঁকে প্রণাম করি। ভগবান মহাদেব আমার ভগ্নীপতি, তিনি অশেষ করুণাময়। তিনি সতীপতি, তিনি জানেন নারীরা অতি নিষ্ঠুর ব্যক্তিরও কৃপার পাত্র। তিনি আমার প্রতি যেন প্রসন্ন থাকেন”

সায়ন্তন ধ্যান শেষ করে প্রজাপতি কশ্যপ পত্নীর এই ভীত অবস্থা দেখে বিরক্ত মুখে বললেন, “হে অভদ্রে, তোমার স্বভাব অত্যন্ত ধৈর্যহীন এবং বড়ই ঈর্ষাগ্রস্ত। তোমার গর্ভের দুই নরাধম পুত্র, লোকপাল ও লোকসমূহের ভয়ানক কষ্টের কারণ হয়ে উঠবে। কারণ তোমার মন অপবিত্র ছিল, তুমি সন্ধ্যার কালদোষ চিন্তা করলে না, আমার আজ্ঞাও তুমি মানলে না। এমনকি মহাদেব রুদ্রকেও তুমি অবহেলা করলে। তোমার এই দুই পুত্র বড় হয়ে প্রাণিবধ করবে, নারীদের অত্যাচার করবে, সাধুব্যক্তিদের ক্রোধ সৃষ্টি করবে। সেই সময় বিশ্বেশ্বর ভগবান তাঁর লোক রক্ষার জন্যে জগতে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর হাতেই এই দুই নরাধমের বিনাশ হবে”। 

দিতি বললেন, “হে প্রভু, শ্রীভগবান চক্রধারী যদি আমার দুই পুত্রকে হত্যা করেন, আমার কোন দুঃখ নেই। কিন্তু কোন ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণের অভিশাপে যেন ওদের মৃত্যু না হয়। কারণ যারা ব্রহ্মশাপে বিনষ্ট হয়, তাদের সর্বলোক ভয় করে। তাদের নরকবাসীরাও ঘৃণা করে। পরে যে যে যোনিতে তাদের জন্ম হয়, সেই প্রাণিরাও তাদের প্রতি প্রসন্ন হয় না”। 

এই কথায় কশ্যপ কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “যেহেতু তুমি তোমার কাজের জন্যে অনুতপ্ত এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে যুক্তিপূর্ণ বিচার দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছ। যেহেতু আমার প্রতি তোমার প্রীতি ও ভগবানের প্রতি তোমার একান্ত ভক্তি দেখালে, সেহেতু তোমার পৌত্রদের মধ্যে একজন ভগবান শ্রীহরির মহান ভক্ত হবে। সাধু ব্যক্তিরা তার পবিত্র চরিত্র ও আচরণের অনুসরণ করবেন। ভগবান যার প্রতি প্রসন্ন হন, সমস্ত জগত তার প্রতি প্রসন্ন হয়ে থাকে, কারণ ভগবান জগতের আত্মা। সেই ভগবান তোমার পৌত্রের অনন্যভক্তিতে পরম প্রীত হবেনভগবান শ্রীহরি তোমার সেই পৌত্রকে ধ্যানযোগে এবং চোখের সামনে প্রত্যক্ষ স্বরূপে দর্শন দেবেন”

[দিতির পুত্ররা হলেন দৈত্য। কশ্যপ মুনি যে দুই নরাধম পুত্রের কথা বললেন, তাঁরা হলেন হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু। এই দুই পুত্রই ভগবান বিষ্ণুর হাতে প্রাণ দিয়ে মুক্তি লাভ করবেন। আর এই দৈত্যকুলেই জন্ম হবে হিরণ্যকশিপুর পুত্র বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের। দৈত্য বলতে যদি অনার্য ধরা হয়, তাহলে এই দুই দৈত্যরাজকে হত্যা করেছিলেন বিষ্ণু। আর্য-অনার্য মিলেমিশে সনাতন বা হিন্দু ধর্ম সৃষ্টির সময়, অনার্যদের মনে যাতে কোন রকম ক্ষোভের উদ্রেক না ঘটে, সেই কারণে পুরাণকার এই কাহিনীটি রচনা করলেন। অসংযমী মায়ের দোষে নরাধম দৈত্যরাজের জন্ম ও মৃত্যু এবং তাদের পুত্রের ভক্ত হয়ে ওঠা -  সব কিছুই যেন পূর্ব পরিকল্পিত!]   

মৈত্রেয় বললেন, “তাঁর পৌত্র ভগবানের মহান ভক্ত হবে এবং ভগবান বিষ্ণুর হাতে তাঁর দুইপুত্রের বিনাশ হবে, অর্থাৎ তাঁর দুই পুত্রের কীর্তি ও সদ্গতি হবে জেনে দক্ষকন্যা দিতি ভীষণ আনন্দিত হলেন”

চলবে...


মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৩ 


৩৮

জনাই বেরিয়ে যেতে রামালি ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, প্রতি প্রহর শেষ হলেই কি এখানে ঘন্টা বাজানোর নিয়ম? সকালে শুনলাম একবার, এখন দুবার। সারা দিনরাতে এরকম মোট আটবার ঘন্টা বাজানো হয় - প্রতিদিন?”

ভল্লা বলল, “হ্যাঁ। চটির অতিথি এবং কাজের লোকদের সুবিধের জন্যেই ঘন্টা বাজাতে হয়। কাকে কখন খেতে দিতে হবে। কার কখন কী কাজ - সেসব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে…”।

“বাবা। কী করে বোঝে ঠিক কখন কখন প্রহর শুরু হচ্ছে আর শেষ হচ্ছে? সূর্য দেখে?”

“সূর্য দেখে মোটামুটি বোঝা যায় ঠিকই – কিন্তু মেঘলা দিনে কিংবা রাত্রে কি সূর্য দেখা যায়?”

“না। তাহলে?”

“ঘড়ি আছে – জলঘড়ি”।

“জলঘড়ি? সে এবার কী?”

“ঘড়ির দুটো মানে হয় – ঘটিকা বা ঘন্টা – মানে প্রতি প্রহরের তিনভাগের এক ভাগ। আবার যে যন্ত্র দিয়ে এই ঘটিকা মাপা যায় – তাকেও ঘড়ি বলে। বিকেলে জনাইকে বলব, জলঘড়ি কেমন হয় তোকে দেখিয়ে দেবে। ব্যাপারটা বেশ মজার। বড়োসড়ো একটা গামলায় জল ভরে রাখা থাকে। সেই জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ছোট্ট একটা ঘটি। সেই ঘটিটা সাধারণ নয় – তার তলায় খুব ছোট্ট একটা ছিদ্র করা থাকে। সেই ছিদ্র দিয়ে গামলার জল ধীরে ধীরে ঘটিতে চুঁয়ে চুঁয়ে ঢোকে। এভাবে জল ঢুকতে ঢুকতে ওই ফুটো-ঘটিটা ভরে গেলেই, টুপ করে গামলার জলে ডুবে যায়। ওই ঘটিটা ভরতে যত সময় লাগে সেটাই হল এক ঘটিকা বা ঘন্টা। এরকম তিনবার হলে – এক প্রহর হয়। এই ব্যবস্থার জন্যে নির্দিষ্ট লোক আছে – যাদের কাজ হল – ঘড়িটা সঠিক চালানো - এবং ঘটিকা গুণে প্রহর শেষের ঘন্টা বাজানো। বড়ো বড়ো শহরে – প্রতি ঘটিকাতেই ঘন্টা বাজানো হয়, আবার প্রহর শেষেও ঘন্টা বাজানো হয়”।             

   রামালি অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ভল্লা আবার বলল, “নে এবার বাঁধানো মেঝেয় গা এলিয়ে একটু আরাম করে নে, এমন সুযোগ আবার কবে পাবি কে জানে। কেমন দেখলি বীজপুর?”

রামালি মেঝেয় শুয়ে শুয়েই বলল, “কী বলি বলো তো ভল্লাদাদা? শহর তো কোনদিন দেখিনি, অন্যের মুখে শুনেছি। এখানে এসে ভাবলাম, এটাই বুঝি শহর। শাম্‌লাকে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলল, ধুস্‌ - এটা নাকি শহর! শহর হল অনন্তপুর – বছর চারেক আগে একবার গিয়েছিলাম। শহর বটে একখানা। জিজ্ঞাসা করলাম, সেটা আবার কোনদিকে? বলল, এখান থেকে তিনদিনের হাঁটা পথ – রাজপথ ধরে পুবমুখো গেলেই হল”।

ভল্লা হাসল, বলল, “এই তো সবে শুরু রে, রামালি। অনেকদূর যাবি, অনন্তপুর তো তুচ্ছ, রাজধানী কদম্বপুরে তুই দাবড়ে ঘুরে বেড়াবি”। রামালি স্বপ্ন দেখা চোখে বলল, “সে আর কবে হবে, ভল্লাদাদা। আমার কপালে এই অব্দি যে এসেছি সেই ঢের”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হল, “আজ থেকে ছমাস আগে বীজপুর আসবি ভেবেছিলি? কপাল-টপাল কোন কাজের কথা নয়, রামালি। ওসব অকর্মাদের ধূর্তামি – আধাখ্যাঁচড়া কাজ করে মনোমত ফল না পেলে, বলে কপালে নেই তো করবো কী? তুই তো তেমন নস, তুই কেন কপালের দোষ দিবি?”

রামালি ঠোঁটে বিটলেমির হাসি নিয়ে বলল, “তুমি যদি নোনাপুরে না এসে, অন্য কোন দূরের  গ্রামে যেতে – তাহলে আমার কপাল খুলত কি?”

মুখে বিরক্তির আওয়াজ তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল ভল্লা, রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল, তারপর হেসে বলল, “চ্যাংড়ামো করছিস না? কিন্তু সেটাও কপাল নয় – সুযোগ। তুই একটা সুযোগ পেয়েছিস – তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে চলেছিস। অনেকে সুযোগ পেয়েও যোগ্য হতে পারে না – তারা হিংসুটে শল্কু হয়। নে অনেক বকবক হয়েছে, জনাই আসা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নিই চল...। রাত্রে আবার দৌড়তে হবে।” 

৩৯ 

মহড়ার মাঠ থেকে সন্ধের পর ভল্লা আর রামালি বাসায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই, বালিয়া এল। পিঠের বোঝা থেকে বের করল অনেকগুলো ভল্ল, বলল, “ভল্লাদাদা, পনের জোড়া মানে তিরিশখানা ভল্ল হয়ে গেছে। একবার দেখে নাও তো, ঠিকঠাক হয়েছে কিনা?” বালিয়া পাঁচটা ভল্ল এগিয়ে দিল ভল্লার দিকে।

“বাবা, একদিনের মধ্যে তিরিশখানা?” বালিয়ার হাত থেকে নিয়ে ভল্লগুলো পরখ করতে করতে, ভল্লা বলল।

“আমার ছোটভাইকেও লাগিয়ে দিয়েছি ভল্লাদাদা। ও লোহার পাত বানায়। আমি ফলার তির-মুখগুলো বানাই আর বাবা, ঘষে মেজে ফলাগুলোকে ধারালো বানায়। বাস, তারপর ভাই আর আমি দুজনে মিলে বাঁশের আগায় ওগুলো বসিয়ে দিই”।

ভল্লা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল, “ভালই তো হয়েছে রে। এর আগে রণপার খুড়ো আর ফলাগুলোও ঠিকঠাক হয়েছিল। তুই এক কাজ কর, আজ জোড়া ছয় সাতেক রণপাও নিয়ে যা, কাল বাকি ভল্লগুলো আর যতগুলো সম্ভব রণপা বানিয়ে নিয়ে আসবি। কি রে রামালি, রণপা দিলে অসুবিধে হবে?”

রামালি বলল, “তা একটু হবে, কিন্তু রণপাগুলো তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক করে না নিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তুই ছজোড়া রণপা এখন নিয়ে যা, পারলে কালই নিয়ে আসিস”।            

বালিয়া চলে যেতে রামালি রান্নার যোগাড়ে বসল। ভল্লা একটু চাপা স্বরে রামালিকে জিজ্ঞাসা করল, “অমাবস্যার আর কয়েকটা দিনই বাকি। আমাদের ছেলেরা পারবে? তোর কী মনে হয়, রামালি?”

রামালি রান্না করতে করতে বলল, “আমাদের মধ্যে বারো-তের জন তো ভালই তৈরি হয়েছে…এ কদিনে বাকিরাও হয়ে যাবে। আমার মনে হয় একটা ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি”।

ভল্লা বলল, “নিজের সম্পর্কে তোর কী ধারণা, পারবি রক্ষীদের কোমর ভাঙতে?”

রামালির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, ঘাড় ঘুরিয়ে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “পারতেই হবে - আর আমার হাতেই উপানুর মরণও হবে – এ আমি তোমায় বলে রাখলাম ভল্লাদাদা”।

ভল্লা দেখল রামালির মুখের ওপর আগুনের আভা খেলা করছে এবং তার দু চোখে জ্বলছে আগুন…। ভল্লা কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল রামালির দিকে।

মারুলা নিঃশব্দে ঢুকল ভল্লার উঠোনে, ভল্লার পাশে বসে বলল, “কখন ফিরলি তোরা, বীজপুর থেকে?”

ভল্লা বলল, “শেষ রাতে”।

“রামালি, বীজপুর কেমন দেখলি? কিছু আনিসনি ওখান থেকে?”

“এনেছি বৈকি। ভালো চাল-ডাল, আনাজ-পত্র… চাল-ডালের খিচুড়ি আর ভাজি বানাচ্ছি…” রামালি হেসে উত্তর দিল।

“যাক বাবা, রোজ তোর ওই জোয়ারের রুটি আর ভুট্টার ঝোল খেতে খেতে জিভটা চামচিকের পাখনা হয়ে  উঠছিল - আজ স্বাদ বদলাবে। একটা সুখবর দিই ভল্লা, রাজধানীর গোশকটগুলো আজ রাত্রে বীজপুরে ঢোকার কথা। তার মানে আর তিন-চারদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্রভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে”।

“অস্ত্র ভাণ্ডারের কী অবস্থা?”

“চারপাশের দেওয়াল হয়ে গেছে। সামনের দিকে আর উত্তরের দিকে লোহার গেট লেগে গেছে। তুই যে চারটে ঘর দেখে এসেছিলি, তার মধ্যে বড়ো ঘরদুটোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভাণ্ডারের দেওয়ালে তাক ঝোলানোও হয়ে গেছে। তুই বলেছিলি দেওয়ালে বড়ো বড়ো লোহার কীল বসিয়ে কাঠের মোটা পাটা বসিয়ে দিতে। কুলিকপ্রধান কীলগুলোকে দেওয়ালে গেঁথেছে, তার ওপর, দেওয়ালের একটু ওপর থেকে লোহার শিকলের টানা লাগিয়ে দিয়েছে। বলেছে তাকগুলো এমন পোক্ত হবে, যত ভারই দিন – ভেঙে পড়বে না। তুই দেখলে তোর তাক লেগে যাবে, রে শালা”।

“বাঃ, রাজধানীর অস্ত্রভাণ্ডারের দেওয়ালেও একই রকম ব্যবস্থা দেখেছি। তার মানে কুলিকপ্রধান যথেষ্ট অভিজ্ঞ। কিন্তু বাকি ঘরদুটো কবে শেষ হবে”?

“ঘর হয়ে গেছে, ছাদের কাঠামোও হয়ে গেছে। টালি দিয়ে ছাইতে আর কদিন – খুব জোর তিন-চারদিন”?

“হুঁ, তার মানে, রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র এসে গেলে, ওখানেই রাখা যাবে। কিন্তু শষ্পক কী করছে? বলেছিল সমস্ত ব্যয়-ট্যয় ধরে, অঙ্ক কষে অস্ত্র-শস্ত্রের কী মূল্য হতে পারে, জানাবে? জানালো না তো?”

“এখনও হয়নি। বলছে, গোশকট থেকে নামিয়ে, অস্ত্রভাণ্ডার পর্যন্ত সমস্ত অস্ত্র ঘরের ভিতর সাজিয়ে তুলতেও অনেক শ্রমিক লাগবে – সে সব ব্যয় ধরে, তারপর তোকে পাঠাবে”।

“ঠিক আছে, বুঝলাম”। একটু চিন্তা করে ভল্লা মারুলাকে জিজ্ঞাসা করল, “আস্থান থেকে অস্ত্রভান্ডারের দূরত্ব কতটা হবে বল তো?”

“আস্থান থেকে উত্তর-পশ্চিমে, তা ধর ক্রোশ দুয়ের বেশিই হবে”।

“অমাবস্যার রাতে আস্থান থেকে কাজ সেরে, আমাদের ছেলেরা যদি এদিকে না এসে অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে যায় – ওখানে কয়েকটাদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা সম্ভব?”

মারুলা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “বুদ্ধিটা মন্দ নয় ভল্লা, রণপা চড়ে তোরা একবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলে – রক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে ওদিকে চলে যাওয়া সহজ হবে…”।

“দাঁড়া, তার আগে আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা তোকে বলি, তাহলে তোর বুঝতে সুবিধা হবে। রামালি তোর রান্না কদ্দূর?”

    “এই হয়ে এসেছে, তুমি শুরু কর আমি আসছি”। রামালি সাড়া দিল।

চলবে...

সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১১

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১০ "]


৫.৩.২.২ বিষ্ণু - ভাগবত (আগের পর্বের পরে)

বামন অবতার – শ্রীবিষ্ণু বামন অর্থাৎ খর্বকায় ব্রাহ্মণরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর পিতা ঋষি কশ্যপ এবং মাতা দেবমাতা অদিতি। তিনি দানগর্বী দৈত্যরাজ বলির গর্ব খর্ব করেছিলেন। রাজা বলির গুরু ছিলেন শুক্রাচার্য এবং যজ্ঞের যাজক ঋষিরা ছিলেন ভৃগুবংশীয়। রাজা বলির প্রপিতামহ ছিলেন বিষ্ণু-বিদ্বেষী হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু, পিতামহ ছিলেন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ ও পিতা দানবীর বিরোচন। যিনি দেবতা জেনেও ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশী প্রার্থীদের নিজের আয়ু দান করেছিলেন। পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধে, প্রবল পরাক্রান্ত দৈত্যরাজ বলি স্বর্গ জয় করে দেবরাজ ইন্দ্রকে স্বর্গচ্যুত করেন, তারপর নর্মদার উত্তরতটের ভৃগুকচ্ছে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন। সেই অশ্বমেধ যজ্ঞে বামনরূপী বিষ্ণু যখন রাজা বলির থেকে মাত্র তিনপাদ ভূমি প্রার্থনা করলেন, রাজা বলি সানন্দে সেই দানের সম্মতি দিলেন। রাজা বলির সম্মতি পাওয়া মাত্র, শ্রীবিষ্ণু বিশ্বরূপে প্রকট হলেন। প্রথম পদে তিনি সসাগরা ধরিত্রী, দ্বিতীয় পদে স্বর্গলোক থেকে সত্যলোক পর্যন্ত আবৃত করলেন। এরপর, আর কোন স্থান অবশিষ্ট না থাকায়, নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে দৈত্যরাজ বলি নিজের মস্তকে শ্রীবিষ্ণুর তৃতীয় পদ ধারণ করলেন। অর্থাৎ সর্বস্ব হারিয়ে শ্রীবিষ্ণুর বশ্যতা স্বীকার করলেন।      

নৃসিংহ অবতার - নৃসিংহের জন্যে পুরাণকারেরা দুর্দান্ত একটি কাহিনী রচনা করলেন। কারণ ভগবান ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু শর্ত সাপেক্ষে অবধ্য ছিলেন। শর্তগুলি হল, তাঁকে ঘরের ভেতরে বা বাইরে, দিনে বা রাত্রিতে, মাটিতে বা আকাশে কেউ মারতে পারবে না। কোন অস্ত্র বা শস্ত্রে তাঁকে বধ করা যাবে না। কোন নর কিংবা পশু তাঁকে হত্যা করতে পারবে না। উপরন্তু, কোন প্রাণী বা প্রাণহীন এবং সুর, অসুর ও মহাসর্প ইত্যাদিও তাঁকে মারতে পারবে না। এই শর্তগুলি যেন জটিল এক ধাঁধা (puzzle), এই ধাঁধার সমাধান করতে পারলেই, হিরণ্যকশিপুকে বধ করা সম্ভব। যাই হোক অবতার নৃসিংহ, নর নন, পশুও নন, সুর বা অসুরও নন, তিনি নরপশু। তিনি দিন ও রাতের সন্ধি গোধূলি সময়ে, ঘরের ভিতরে বা বাইরে নয়, ঘরের চৌকাঠে, অস্ত্র বা শস্ত্র দিয়ে নয়, সিংহের নখে, মাটিতে বা আকাশে নয়, নিজের উরুতে রেখে হিরণ্যকশিপুর বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন। অনার্য ভারতীয়দের এক দেবতাকে, হিন্দুধর্মে ইনকরপোরেট করার জন্য, পুরাণকারের যে মাথা খাটিয়ে এই ধাঁধার সৃষ্টি এবং সমাধান করেছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই।   

পরশুরাম অবতার – ঋষি জমদগ্নির পুত্র ব্রাহ্মণ পরশুরাম ভয়ংকর বীর যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল পরশু অর্থাৎ কুঠার এবং তির ও ধনুক চালনাতেও ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। হৈহয় বংশীয় ক্ষত্রিয় রাজা ও বিষ্ণু ভগবানের অংশাবতার দত্তাত্রেয়র পরমভক্ত কার্তবীর্যাজুন ঋষি জমদগ্নির কামধেনুটি জোর করে হরণ করেছিলেন। সেই ক্রোধে পুত্র পরশুরাম একাই কার্তবীর্যকে বধ করে হৈহয় বংশের বিনাশ সাধন করেন। প্রসঙ্গতঃ কার্তবীর্য ছিলেন নর্মদাতটের মাহিষ্মতীর রাজা – তিনি রাক্ষসরাজ রাবণকে অবহেলায় বন্দী করে আবার মুক্ত করে দিয়েছিলেন, এতটাই বীরত্ব ছিল তাঁর। রাজা কার্তবীর্যার্জুনের পুত্রেরা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পরশুরামের পিতাকে হত্যা করায় পরশুরাম মাহিষ্মতী নগরীতে গিয়ে সেখানকার সকল ক্ষত্রিয়কে হত্যা করেছিলেন। এর পরেও ক্ষত্রিয়রা অন্যায়বর্তী হলেই তিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধে পৃথিবীকে মোট একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন।  

পরশুরাম সত্যযুগের মানুষ হলেও, ত্রেতা যুগে তাঁর সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের সাক্ষাতের কথা শোনা যায়, এবং দ্বাপর যুগের কাহিনী মহাভারতেও পরশুরামের কথা বেশ কয়েকবার এসেছে। আচার্য দ্রোণ তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে গিয়েছিলেন। মহাবীর কর্ণ ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়ে পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন, কিছু ঘটনাচক্রে তিনি ধরা পড়ে যান এবং পরশুরাম তাঁর প্রবঞ্চনায় ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তাঁর শেখানো সমস্ত বিদ্যাই চরম বিপদের সময় তিনি ভুলে যাবেন। সত্য যুগের মানুষ ত্রেতা যুগ পার করে, দ্বাপরে এসে পড়লেন!

শ্রীরাম অবতার – শ্রীরাম ঐতিহাসিক চরিত্র, তিনি অযোধ্যার রাজা ছিলেন, তাঁর মাতা কৌশল্যা, কোশলের এবং বিমাতা কৈকেয়ী কেকয় রাজকন্যা ছিলেন। তাঁর পত্নী সীতা ছিলেন বিদেহরাজ রাজর্ষি জনকের পালিতা কন্যা। তবে রাবণ রাক্ষসরাজ হলেন কী করে, সেটা বোঝা যায় না। তিনি স্বয়ং ব্রহ্মার প্রপৌত্র, সপ্তর্ষির অন্যতম পুলস্ত্যর পৌত্র এবং মুনি বিশ্রবার পুত্র এবং কুবেরের বৈমাত্রেয় ভাই। যদিচ তাঁর মাতা ছিলেন মুনি বিশ্রবার রাক্ষসী পরিচারিকা কৈকেশী বা পুষ্পোৎকটা। এমন বনেদি পিতৃকূল থাকা সত্ত্বেও, রাক্ষসী মাতার পরিচয়ে তিনি রাক্ষস হয়েছিলেন! কঠোর তপস্যা করে রাবণও ব্রহ্মার থেকে বর পেয়েছিলেন, মানুষ ছাড়া আর কেউ তাঁকে কোনদিন পরাস্ত করতে পারবে না। তিনি মানুষকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি, অতএব ভগবান বিষ্ণু নররূপেই শ্রীরাম হয়ে রাবণকে বধ করেছিলেন।

দুর্ধর্ষ এবং দেবতাদের অপরাজেয় রাবণকে বধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ব্রহ্মলোকে। দেবতাদের মুখপাত্র হয়ে হুতাশন অর্থাৎ অগ্নিদেব ব্রহ্মার কাছে গিয়ে বললেন, “ভগবন্‌, বিশ্রবা পুত্র মহাবীর রাবণের জন্যে স্বর্গে তো আর বাস করা যাচ্ছে না, কিছু একটা উপায় স্থির করুন, আমাদের রক্ষা করুন”। পিতামহ ব্রহ্ম বললেন, “ওহে অগ্নি, সে আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি। চতুর্ভুজ বিষ্ণু নর রূপে মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন, তাঁর নাম হবে শ্রীরাম। তবে তার আগে তোমরা দেবতারা সবাই মর্ত্যে যাও, সেখানে ঋক্ষী ও বানরীদের গর্ভে মহাবীর পুত্রদের সৃষ্টি করো, যারা রাবণ বধের সময় বিষ্ণুর সহায় হবেন।” দেবতারা নিজেদের মধ্যে যখন মর্তে আসার পরিকল্পনা করছেন, তখন ভগবান ব্রহ্মা গন্ধর্বী দুন্দুভিকে ডেকে বললেন, “দুন্দুভি, দেবকার্য সুষ্ঠু সম্পাদনের জন্যে তুমিও মর্তে যাও”। (বন/২৭৫)

এই দুন্দুভিই কুব্জা ও কুদর্শনা পরিচারিকা মন্থরা হয়ে, অযোধ্যার রাজা দশরথের অন্তঃপুরে রাণি কৈকেয়ীর  পরিচারিকা হয়েছিলেন। তিনিই রাণি কৈকেয়ীকে কুমন্ত্রণা দিয়ে শ্রীরামকে বনবাসে যেতে বাধ্য করেছিলেন। তা না হলে, শ্রীরামের বনবাস এবং রাবণবধ কোনোটাই হয়তো ঘটতো না। তবে সুদর্শনা গন্ধর্বী দুন্দুভি, পিঠে কুঁজ নিয়ে কেন কুদর্শনা হয়েছিলেন, সেটা জানা যায় না। হয়তো তিনি মর্ত্যের রাজ-অন্তঃপুরের পরিচারিকাদের দুর্গতির কথা জানতেন (অধ্যায় ২.৫.৩), তাই কোনরকম ঝুঁকি নেননি।

দেবতারা মর্ত্যে এসে ঋক্ষী ও বানরীদের গর্ভে প্রচুর পরাক্রমী সন্তান উৎপাদন করলেন। যাঁরা রামচন্দ্রের সহযোগী বানরসেনা ও ভল্লুকসেনা (ঋক্ষ মানে ভালুক) হয়ে, রাবণবধ ও সীতা-উদ্ধারে সহায়তা করেছিলেন। বিজ্ঞানের জেনেটিক কোডের বিধান অনুযায়ী, মানুষ বানরী ও ভল্লুকীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে পারে না। অতএব স্পষ্টতঃ এই বানর ও ভল্লুক দুটিই অনার্য জনগোষ্ঠী, যাঁদের টোটেম বা আত্মা-দেবতা যথাক্রমে বানর ও ভল্লুক। প্রসঙ্গতঃ বানর গোষ্ঠীর হনুমান, শ্রীরামচন্দ্রের পরমভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডে রামচন্দ্র বহুবার বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন। এই হনুমান সংকটমোচন দেবতা হিসাবে ভারতবর্ষের সর্বত্র হিন্দুদের পূজা পেয়ে থাকেন। এই প্রসঙ্গে আরও একটি আশ্চর্য ঘটনা হল, আমরা সকলেই জানি রাক্ষসরাজ রাবণের দশটি মুখ বা মাথা ছিল, কিন্তু মূল রামায়ণে সেকথার সমর্থন মেলে না। উপরন্তু তিনি ভগবান শিবের একান্ত ভক্ত ছিলেন; আরও শোনা যায় তিনি সর্ব শাস্ত্রে এবং চার বেদেও পণ্ডিত ছিলেন!   

৫.৩.২.৩ মহাভারতের কৃষ্ণ

দশ অবতারের মধ্যে সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ অবতার কৃষ্ণ। এমন সর্বগুণসম্পন্ন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ভারতীয় শাস্ত্রে আর কেউ নেই। বিষ্ণুর অবতার হয়েও, তাঁর অদ্ভূত ও আশ্চর্য লীলায় তিনি হিন্দুধর্মের স্বয়ংসম্পূর্ণ দেবতা হয়ে ভক্তদের মনে সর্বদাই বিরাজিত।

মহাভারতে কৃষ্ণের উপস্থিতি বেশ কিছুটা পরে, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায়। দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ ও তাঁর দাদা বলরাম স্বয়ংবর সভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে উত্তর ভারতের রাজাদের প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন, এবং পাণ্ডবরাও উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে। ছদ্মবেশে থাকলেও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বিচক্ষণ কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের চিনতে ভুল করলেন না। দুর্যোধনের ষড়যন্ত্রে মাতাকুন্তী সহ পাণ্ডবদের জতুগৃহে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর জনশ্রুতি তাঁর কানে এসেছিল, কিন্তু এভাবে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে সেকথা তিনি বিশ্বাস করেননি। সেদিন স্বয়ংবর সভায় সুস্থ সবল পঞ্চপাণ্ডবদের দেখে তিনি যেমন নিশ্চিন্ত হলেন, তেমনি কিছুটা হতাশও হলেন। কারণ তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল কন্যারত্ন দ্রৌপদীকে তিনি হয়তো লাভ করতে পারবেন। কিন্তু এখন সে আশা তিনি ছেড়ে দিলেন, কারণ অর্জুন যেখানে উপস্থিত, সেখানে তাঁর কোন আশাই নেই।

দ্রৌপদীর আশা ত্যাগ করে তিনি যে দুঃখী হলেন, তাও নয়, কারণ শত কষ্টেও তিনি কখনো দুঃখী হন না, উদ্বিগ্ন হন না, তিনি সর্বদাই আস্যমুখ। বরং তিনি দ্রুত ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে শুরু করলেন। পাণ্ডবমাতা কুন্তী তাঁর পিসি, পঞ্চপাণ্ডবেরা তাঁর পিসতুতো ভাই এবং অর্জুন তাঁর সমবয়সী। অতএব তিনি ও বলরাম পাণ্ডবদের স্বাভাবিক আত্মীয় ও মিত্র। অন্যদিকে পাণ্ডবদের জন্ম-শত্রু দুর্যোধন এবং তাঁর নিরানব্বই জন ভাই; উপরন্তু কৃষ্ণের চরম-শত্রু জরাসন্ধ দুর্যোধনের প্রিয়সখা। অর্জুন যদি দ্রৌপদীকে লাভ করতে পারে, প্রতিপত্তিশালী দ্রুপদ ও তাঁর পুত্র বীর ধৃষ্টদ্যুম্ন হবে পাণ্ডবদের আত্মীয়। সেক্ষেত্রে আর্যাবর্তের রাজনীতিতে দুটি শক্তিশালী মেরু গড়ে উঠবে। স্বাভাবিক সম্পর্ক সূত্রে তিনি পাণ্ডবপক্ষেই যাবেন, তখন তাঁর চিরশত্রু, যাঁর জন্যে তাঁদের সবাইকে মথুরা এবং বৃন্দাবন ছেড়ে দ্বারকায় সরে আসতে হয়েছে, সেই জরাসন্ধের বিনাশও তাঁর পক্ষে সহজ হয়ে যাবে। তিনি দূরদর্শী, তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন না, তিনি সুচিন্তিত পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ রচনা করেন। অতএব সেই স্বয়ংবর সভায় দুর্যোধন, জরাসন্ধ, শল্য, শাল্ব প্রমুখ বীর রাজাদের ব্যর্থ প্রয়াস দেখার জন্যে তিনি স্মিতমুখে বসে রইলেন নিশ্চিন্তে!

হিন্দুদের কাছে মহাভারতের ঘটনাবলী অতি পরিচিত, অতএব সে প্রসঙ্গে আর বাক্য বিস্তার করছি না। বরং কৃষ্ণ প্রসঙ্গে অন্য গ্রন্থাদির আলোচনায় যাওয়ার আগে, মহাভারতের ভয়ানক অশুদ্ধির দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

চলবে...


শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৮

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৭ 


১৮ 

সাড়ে ছটায় ফোনের অ্যালার্মটা বেজে উঠতেই সুনেত্র ফিরে এল বর্তমানে। অ্যালার্মটা বন্ধ করে, মেঝেয় পা রাখল। শুয়ে থেকে লাভ নেই, ঘুম হবে না – মাথার মধ্যে অনবরত ভিড় করে আসবে অজস্র তিক্ত স্মৃতি। সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল, দাঁত ব্রাশ করতে করতে। নিদ্রাহীন রাতের গ্লানি এখন তার মাথায় এবং সারা শরীরে। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে, এবং সামনের সবুজ বাগানে ফুটে থাকা নানান ফুলের বিচিত্র বর্ণে তার দুই চোখ এবং মস্তিষ্ক অনেকটাই শান্তি পেল।

মাকে নিয়ে মুম্বাই থেকে ফিরে এসে খুব দ্রুত তিনটে কাজ সেরে ফেলেছিল সুনেত্র। কাজগুলো করে তৃপ্তিও পেয়েছিল খুব। যতদিন সে বাইরে বাইরে ছিল, মাসের শুরুতে বাবাকে কয়েক হাজার টাকা পাঠানোর পরে, তার আয়ের অধিকাংশটাই জমা হত ব্যাংকের সেভিংস এবং ফিক্সড্‌ ডিপোসিটে। কারণ চিরকুমার সুনেত্রর নিজের জন্যে কত আর খরচ করবে? মাসের শুরুতে পেস্ট, শেভিং ক্রিম, সেফটি রেজার, আফটার শেভ লোশন, গায়ে মাখা সাবান, শীতকালে বোরোলিন কিনতেই বা কটা পয়সা যায়? দিল্লির যে গেস্ট-হাউসে সে এবং তার কিছু কলিগ থাকত, সেখানে তাদের ফুডিং এবং হাউসকিপিং ছিল ফ্রি।  এর পর কত জামা-প্যান্ট-জুতো কিনবে? তার সিগারেট ছাড়া অন্য কোন নেশাও নেই। দামি দামি বোতল কেনা অথবা বারে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রঙিন পানীয়ে অবগাহনের ব্যয় তার কোনদিনই ছিল না। কিন্তু মাকে নিয়ে হলদিয়া আসার পর, বিশেষ করে দাদার ওখানে তার সেই আধঘন্টার ভিজিটের পর, তার মনে হয়েছিল, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমে ওঠা টাকায় শ্যাওলা জমিয়ে লাভ কি? পৈতৃক সম্পদের অধিকার নিয়ে জন্মানো তার ছেলে-মেয়ে থাকলে, কিছুটা সান্ত্বনা মিলত। কিন্তু সে গুড়েও তো বালি ঢেলেছে সে নিজেই!

অতএব মুম্বাই থেকে ফেরার দিন দশেক পরে, এক অপরাহ্ন বেলায় মাকে নিয়ে গিয়েছিল গাড়ির শোরুমে। ঘটনাচক্রে সেই শোরুমের ম্যানেজার মিলনের মা ছিলেন তার পেশেন্ট। তার চিকিৎসায় তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। অতএব সুনেত্রর খাতিরের কোন ত্রুটি রইল না।

ছেলেটি তার মাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানান রঙের নানান আকারের গাড়ি দেখাতে লাগল। একটা গাড়ি পছন্দ করে, মা সুনেত্রকে বললেন, “হ্যারে, সুনু, এই গাড়িটা বেশ, না? হাত-পা ছড়িয়ে দিব্যি আরামে বসা যাবে, রঙটাও ভারি সুন্দর – যেন নীলকণ্ঠী ময়ুর। এটাই আমার পছন্দ। কিন্তু আমি তো গাড়ির আর কিছুই বুঝি না, বাকিটা তুই বুঝে নে”।

ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে, ওই মডেলটির টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি জেনে নিল সুনেত্র। ম্যানেজার ছোকরা বলল, “এটা লোয়ার ভার্সানের মডেল, আপনার জন্যে আমি এর থেকে হায়ার ভার্সানের একটা মডেল সাজেস্ট করব, স্যার, আপনার জন্যে একদম পার্ফেক্ট হবে। কিন্তু তার রঙটা মাসিমার মনোমত হচ্ছে না। আমাদের স্টকে যেটা আছে সেটার রঙ ডিপ ব্রাউন। অবশ্য আপনি দিন সাতেক ওয়েট করলে কলকাতা থেকে মাসিমার পছন্দের রঙের সেম মডেল, আমি আনিয়ে দিতে পারি”।

“ওয়েট করব, মিলন, কিন্তু মায়ের পছন্দের রঙটাই চাই। তবে দাম কী রকম পড়বে?”

“আপনার জন্যে ম্যাক্সিমাম ডিসকাউন্ট করে দেব, স্যার, ও নিয়ে ভাববেন না। লোনে কিনবেন না, ফুল পেমেন্ট?”

“ফুল পেমেন্ট”।

“বাঃ তাহলে তো আরো ডিসকাউন্ট দিতে পারবো স্যার”।

শোরুমের এসি রুমে বসে দুজনে কফি খেতে খেতেই, মিলন ইনভয়েস জেনারেট করে ফেলল, হিসেবপত্র সব বুঝিয়ে দিল সুনেত্রকে। সুনেত্র শোরুমের নামে চেক লিখতে লিখতে বলল, “আমি কিন্তু আপনার এখান থেকে গাড়ি নিয়ে যাবো – আমাকে যেন কোন কিছুর জন্যে দপ্তরে দপ্তরে দৌড়োদৌড়ি না করতে হয়...”।

“হবে না, স্যার। সব কিছু রেডি করেই আপনাকে গাড়ি হ্যাণ্ড-ওভার করব। আমরা কি জানি না, হসপিট্যালে সারাদিন আপনাদের কী প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়, আমাদের সুস্থ করে তোলার জন্যে?”

মিলন সব কথাই রেখেছিল। গাড়িটা সুনেত্রর হাতে এসেছিল সাতদিন পরে, দিনটা ছিল শনিবার। তার সঙ্গে ছিলেন মা ও শম্পাদিদি। মাকে সামনে বসাল সুনেত্র, শম্পাদিদি বসল পিছনে তারপর নিজে বসল ড্রাইভারের সিটে।

“তুই গাড়ি চালাতে পারিস, সুনু?”

“পারি একটু একটু...তেমন বলার মতো কিছু নয়”। হেসে বলেছিল সুনেত্র, তারপর মায়ের এবং নিজের সিট-বেল্ট বেঁধে গাড়ি স্টার্ট করেছিল। দুহাত জোড় করে মা বলেছিলেন, “দুর্গা-দুর্গা”। পিছনের সিটে বসে শম্পাদিদিও দু হাত জোড়া করে কপালে ঠেকিয়েছিল।

শোরুমের প্রাঙ্গণ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার পর, সুনেত্রকে মা বলেছিলেন, “আগে একটা কোন মন্দিরে চল, সুনু। একটু পুজো দিয়ে আসি, কাছাকাছি কালীমন্দির নেই কোন?”

“মুক্তিধামেই যাচ্ছি, মা। একসাথ সবাইকে পেয়ে যাবে, মা কালী, রাধাকৃষ্ণ, বজরংবলি এবং শিবঠাকুর”।

“মুক্তিধাম? এখানে আসার পর সেই যেখানে দু’বার নিয়ে গেছিলি? বড়ো সুন্দর জায়গা, রে। কিন্তু সে তো অনেক দূর”।

“বোঝো, ইচ্ছেমতো দূরে দূরে বেড়াবার জন্যেই তোমায় গাড়িটা দিলাম, মা। নইলে কি বাড়ির সামনের রাস্তায় ঘুরঘুর করার জন্যে...?”

মা এবং শম্পাদিদি দুজনেই প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন। খুশিতে উচ্ছ্বল মা বললেন, “তোর দাদাবাবুর কথা শুনছিস, শম্পা? এবার থেকে ছুটির দিন হলেই সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়ব সবাই মিলে... আমার গাড়ি নিয়ে...”।

“ড্রাইভারটিও তো তোমারই মাসিমা, তুমি যেমন চালাবে, তেমনি চলবে”।

এবার সুনেত্রও হেসে উঠল হো হো করে। কটা টাকাই বা দাম এই গাড়িটার – কিন্তু যে খুশি আর আনন্দ এনে দিল এই গাড়িটা – তার হিসেব কে করবে...”?

 

সুনেত্র আবার বর্তমানে ফিরতে বাধ্য হল, কারণ লোহার গেট খুলে শম্পাদিদি ঢুকল। শম্পাদিদিকে দেখেই তার মনে পড়ল সে প্রায় আধঘন্টা ধরে ব্রাশ করে চলেছে, এবং বেচারা দাঁতগুলির “ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি” অবস্থা হয়েছে। দ্রুত ওয়াশ রুমে গিয়ে নিজে তো বটেই, তার দাঁতগুলিও পরিত্রাণ পেল ব্রাশ করার অত্যাচার থেকে।

অন্যদিন শম্পাদিদির হাতের এক কাপ চা খেয়ে সে মিনিট কুড়ির জন্যে হাঁটাহাঁটি করতে বেরোয় – আজ আর ইচ্ছে হল না। বড্ডো ক্লান্ত লাগছে, এ হল গতকাল রাত্রে ভাল ঘুম না হওয়ার এফেক্ট। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে সে বসল বাইরের বারান্দায় – বাগানটা রইল তার চোখের সামনে। হঠাৎ তার মনে হল, যতক্ষণ সে বদ্ধ ঘরের মধ্যে শুয়েছিল, তার যত তিক্ত স্মৃতির কথাই মনে পড়ছিল। অথচ এখন বাইরে এই খোলা হাওয়ায়, বাগানের সামনে এলেই তার কেন আনন্দের স্মৃতি মনে আসছে?

এই যেমন এখন মনে আসছে...

তার চিন্তায় ছেদ ঘটাল শম্পাদিদি, “দাদাবাবু, চা”। সুনেত্রর হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ব্রেকফাস্টে পরোটা করি দাদাবাবু? সঙ্গে আলুভাজা?”

“করো”।

শম্পাদিদি চলে যেতে চায়ে চুমুক দিতেই সুনেত্রর মনে পড়ল, গাড়িটা কেনার দিন দশ-বারো পরেই মাকে নিয়ে গিয়েছিল একটা জমি দেখতে। সেটা এই জমিটাই। কর্নার প্লটে পাঁচ-কাঠা জায়গার সুন্দর আয়তক্ষেত্র। জমির মালিক প্রমোদ নায়ক ও তাঁর পরিবারের সকলেই তার দীর্ঘদিনের পেশেন্ট। কথাবার্তার শুরুতেই সুনেত্র জেনে নিয়েছিল, “জমিটায় কোন শরিকানা গণ্ডগোল নেই তো? জমির কেনার পর কোন আইনি জটিলতায় পড়তে হবে না তো?”

এক হাত জিভ কেটে প্রমোদবাবু বলেছিলেন, “ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, ডাক্তারবাবু। এ জমির মালিক আমার স্ত্রী। স্ত্রীর নামেই এই জমিটা কিনেছিলাম, হলদিয়া টাউন যখন সবে শহর হয়ে উঠছে – সেই কালে। আমরা ব্যবসাদার মানুষ, ডাক্তারবাবু। আমরা ঠিক টের পাই কোথায় কোন জমি রাংতা দিয়ে কিনলে, দশ বছরে তার দাম রূপো হয়ে উঠবে আর বিশ বছরে বিকোবে সোনার দরে। নিজের নামে যত খুশি জমি তো আর কেনা যায় না আজকাল, তাই স্ত্রীর নামে কেনা। কিছু জমি ছেলেমেয়ের নামেও আছে। আপনার বাজেট শুনে মনে হচ্ছে, এই জমিটাই আপনি খুঁজছেন। মাসিমাকে নিয়ে এই রোববারেই চলে আসুন, খুব একটা দূর নয়। সিটি সেন্টার থেকে গাড়িতে মিনিট দশ-বারোর বেশি সময় লাগবে না”।

“দাম?”

“ওই যে বললাম, রাংতার দামে কিনেছিলাম, এখন সে প্রায় সোনার দাম ছুঁইছুঁই। কিন্তু আপনাকে আমি রূপোর দরেই ছেড়ে দেব। আপনাকে যাবতীয় দলিলের কপি দিয়ে দেব, এই জমির প্রেজেন্ট ভ্যালু কত, যাচাই করে দেখে নেবেন। আপনাকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার জো কোথায়, ডাক্তারবাবু?”

ব্রেকফাস্ট সেরে পরের রোববারেই মাকে নিয়ে বেরিয়েছিল সুনেত্র, হ্যাঁ নিজের গাড়িতেই। সিটি সেন্টারে অপেক্ষা করছিলেন প্রমোদবাবু, সেখান থেকে তিনিই গাইড করে নিয়ে এলেন। প্রায় পাঁচফুট উঁচু ইঁটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা জমি। লোহার গেটের তালা খুলে তিনজনে ঢুকল।

প্রমোদবাবু বললেন, “এই হচ্ছে জমি। পূব আর দক্ষিণদিকে বিশফুটের রাস্তা। এখন আগাছায় ভরে উঠেছে, আপনি ফাইন্যাল করলেই, সব ছেঁটে ফেলে জমির মাপ আপনাকে বুঝিয়ে দেব। তবে মাপলে জমির মাপ সামান্য কম পাবেন, কারণ চার ধারেই ধরুন প্রায় দশইঞ্চি করে জমি খেয়ে বসে আছে পাঁচিলটা। এই পাঁচিলটার কথা আমার সেদিন মাথায় ছিল না – ওটা আপনাকে ফ্রি-গিফ্‌ট্‌ করছি, ডাক্তারবাবু। আজকের দিনে নতুন পাঁচিল গড়তে কত খরচ হবে, যে কোন ভালো রাজমিস্ত্রির থেকে যাচাই করে নিতে পারেন”।

সুনেত্রর পছন্দ হল, প্রমোদবাবু যে দাম বলেছেন, সেও তার বাজেটের মধ্যেই। সে এবার মায়ের দিকে তাকাল।  মা ঝোপ-ঝাড় ডিঙিয়ে যতটা পারা যায় ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। প্রমোদবাবু বললেন, “ভেতরের দিকে বেশি যাবেন না, মাসিমা, বলা যায় না, সাপ-টাপ থাকতে পারে...তাছাড়া পোকামাকড়, বিছে-টিছে তো থাকবেই...। আপনারা রাজি হলে কালই আমি লোক লাগিয়ে সাফ করে দেব"।

প্রমোদবাবুর সতর্কতায় মা আর ভেতরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেন না, কিন্তু তাঁর মুখ দেখে সুনেত্রর মনে হল মায়ের পছন্দ হয়েছে। কিন্তু খুব মন দিয়ে তিনি কিছু চিন্তা করছেন, জমিটার চারদিকে তাকিয়ে।

সকলে বেরিয়ে আসতে প্রমোদবাবু লোহার গেটে তালা লাগালেন। সুনেত্র বলল, “আপনাকে এক-দুদিনের মধ্যেই আমি ফাইন্যাল জানাচ্ছি, প্রমোদবাবু, মোটামুটি পজিটিভই ধরে রাখুন”।

“ব্যস, আমিও ওদিকে জমির কাগজপত্র সব রেডি করে ফেলি। আপনি তো নিশ্চয়ই হোম-লোন নেবেন, কোন ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছেন? আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না, ওরাই কাগজ-পত্র, জমির মাপজোক সব চেক করে নেবে – সব ঠিকঠাক না হলে ওরা লোন অ্যাপ্রুভই করবে না”।

প্রমোদবাবু চলে যেতে, সুনেত্র মাকে জিজ্ঞেস করল, “জমিটা কেমন লাগল, মা?”

মা বললেন, “শোন, সুনু, সামনে কিছুটা আর পেছনে অনেকটা জায়গা ছেড়ে বাড়ি করবি। আমি বাগান করব – পেছনে সবজি, আর সামনে ফুলের”।

মায়ের কথায় হেসে ফেলল সুনেত্র, বলল, “আগে জমিটা পছন্দ কিনা বলো, তার পর তো বাড়ির প্ল্যানিং করবে...”।

“পছন্দ মানে, একশবার পছন্দ – এই জমিটাই আমার চাই। পূব-দক্ষিণ খোলা এমন জমি - তবে বড্ডো ধূলো আর আওয়াজ হবে, সুনু - দুপাশেই রাস্তা তো। আমাদের কলকাতার বাসার সামনেই একটা টিউবওয়েল ছিল, মনে আছে তোর সুনু?”

হাসি মুখে মায়ের খুশিটা উপভোগ করছিল সুনেত্র, বলল, “হুঁ, মনে থাকবে না?”

“আমি যখন প্রথম ওই বাসায় এলাম গ্রাম থেকে, তুই তখন একবছরের, আর সুমুর ছয়। রাত্রি বারোটা-একটা পর্যন্ত কারা সব ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং করে ওই কল টিপে চান করত, বালতি ভরে জল নিয়ে যেত। আবার রাত সাড়ে-তিনটে, চারটে থেকে কিছু লোকের চান শুরু হত, তাদের মধ্যে অনেকে আবার চানের শেষে গায়ত্রী জপ করত, কেউ হরিনাম করত। প্রথম প্রথম ওই গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে যেত, খুব বিরক্ত লাগত। কিন্তু সপ্তাহ তিনেক কি একমাস পরে, এমনই অভ্যাস হয়ে গেল, ওই সব শব্দ আর টেরই পেতাম না, ঘুমের কোন ব্যাঘাতও ঘটত না”

চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তাঘাট-গাছপালা দেখতে দেখতে মা আবার বললেন, “শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়। মনে আছে, তুই বাবাকে আর আমাকে নিয়ে সেবার মানালিতে এক বন্ধুর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলি? পাহাড়ের কোলে, বিপাশার পাশে সেই জায়গাটিতে প্রথম পা দিয়েই মনে হয়েছিল, আহা কি সুন্দর, নিরিবিলি, নির্জন জায়গা। পাখির ডাক আর নদীর কুলু-কুলু জলের শব্দ বড়ো ভালো লেগেছিল। সন্ধে হতে না হতেই জায়গাটা কেমন নিঝ্‌ঝুম হয়ে যেত। আমরা তিনটি প্রাণী ছাড়া এ জগতে যেন আর কেউ নেই। ও মা তেরাত্তির না পোয়াতেই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। না বাপু এ জায়গা আমাদের জন্যে নয়। রাস্তার উল্টোদিকে টিউবওয়েল বসানো আমাদের সেই কলকাতার বাসাটিই খাসা – অমন আর হয় না”।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মা বললেন, “কাগজপত্র, দাম-দস্তুর সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিস। ঠিকঠাক থাকলে জমিটা নিয়ে নে, সুনু। বাড়িটাও শুরু করে দে তাড়াতাড়ি। তোর দাদার ওই ঝাঁজালো, জমকালো বিত্তের দম্ভ-মাখা ফ্ল্যাট নয়, সুন্দর পরিপাটি একটা স্বাধীন বাড়ি। ঠিক আমার মনোমত”।

ডাক্তার হবার সুবাদে সবকিছুই দ্রুত মিটে গেল, লোন অ্যাপ্রুভ্যাল, জমি হস্তান্তর, জমি রেজেস্ট্রি, বাড়ির প্ল্যান স্যাংশান - সব। এতদিন ধরে সুনেত্র ডাক্তারি করছে, কিন্তু সমাজে ডাক্তার হবার প্রিভিলেজগুলো সে কোনদিন উপলব্ধিই করেনি। ডাক্তার শুনলেই সজ্জন ভদ্রলোক থেকে ইতর, গুণ্ডা, বদমাশ সকলেই কেমন যেন বদলে যায়, সমীহ করে।

প্রমোদবাবুর চেনা বিশ্বাসী ঠিকাদার সনৎ নস্কর ভিত-পুজোর পর যখন তার বাড়ির কাজে হাত দিল, পাড়ার কিছু ছোঁড়া এসে হানা দিয়েছিল। বলেছিল, “তাদের থেকেই ইঁট-বালি-স্টোনচিপ্‌স্‌ লিতে হবে”। কিন্তু তারা যখনই জানতে পারল, সে নাকি বেশ নামজাদা ডাক্তার, তখন তারাই বলল, “কোন অসুবিধে হলে, কেউ ব্যাগড়া দিতে এলে, আমাদের বলবেন, কাকু। আমরাই সব সামলে নেব”।

এ কথাটা প্রমোদবাবুকে বলেছিল সুনেত্র। প্রমোদবাবু বলেছিলেন, “আমি ওদের নেতাকে বলে দেব, ওরা আপনাকে আর জ্বালাবে না। তবে হাজার কুড়ি-তিরিশ খরচ করতে হবে আপনাকে। একবারে দেবেন না। এই ধরুন স্ল্যাব ঢালার পর দশ। গৃহপ্রবেশের সময় পনের। আর ধরুন পুজোর চাঁদা-টাঁদা...। ওরা একটু মদ-টদ খাবে, পার্টি-ফার্টি করবে। কিন্তু দেখবেন, ওরা আপনার কেনা গোলাম হয়ে থাকবে। ওদের নেতাও শুনে খুশি হবে, তার চ্যালারা একেবারে বঞ্চিত হয়নি”।

বাড়িটা হয়েই গেল নির্বিঘ্নে। পরের বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় গৃহপ্রবেশ হল। কলকাতা থেকে পিসিমা আর পিসেমশাইকে সে নিজেই গিয়ে নিয়ে এসেছিল, অনুষ্ঠানের তিনদিন আগে। সেরিব্র্যাল অ্যাটাকের পর পিসেমশাই অনেকটাই অথর্ব হয়ে পড়েছেন। এছাড়া অফিসের কলিগ, তার স্কুলের এবং কলেজের দশ-বারোজন বন্ধু, বেশ কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী, সপরিবার প্রমোদবাবু, সনৎ ও তার সব সাঙ্গ-পাঙ্গ, এমনকি গাড়ির শোরুমের ম্যানেজার মিলনকেও ডেকেছিল। সব মিলিয়ে প্রায় একশ-কুড়ি জন নিমন্ত্রিত ছিল সেই অনুষ্ঠানে। নিজের ছোট পুত্রের বিবাহ-আয়োজনের আনন্দ থেকে বঞ্চিতা তার মা, সেদিন যেন অপার্থিব শক্তির অধিকারিণী হয়ে উঠেছিলাম। এই অনুষ্ঠান তাঁকে উজ্জীবীত করেছিল। সকাল থেকে হোম ও পূজার যোগাড় থেকে শুরু করে সমস্ত কাজে, এবং সন্ধ্যায় সকল অতিথি-বিদায় পর্যন্ত – তাঁর অনলস উদ্যমের কোন অভাব দেখেনি সুনেত্র। এই অনুষ্ঠানে দাদাকেও চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল সে, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আসার অনুরোধ করে। দাদা আসেনি, চিঠির উত্তরও দেয়নি।

 

শম্পাদিদি বারান্দায় এসে বলল, “তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো, দাদাবাবু? হাঁটতে গেলে না। একভাবে চেয়ারে বসে কী ভাবছো? আটটা-দশ হয়ে গেছে, চানে যাবে না?”

লজ্জিত মুখে সুনেত্র উঠে পড়ল, চানে যেতে যেতে বলল, “ইস্‌ আটটা-দশ হয়ে গেছে? আজ সব কিছুই যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, শম্পাদিদি। তুমি রেডি করো, আমি আসছি”। 

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৬

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ...