মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬

বড়ো মাথা



এর আগের অণুগল্প - " ছেলেমানুষ "


মস্ত এক ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে এ দেশের বিখ্যাত সব ধীবরমশাই*রা দেখলাম জাল ফেলছেন। কৌতূহল হল, পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, জিজ্ঞাসা করলাম, “আজকাল খুব মাছ ধরছেন শুনতে পাই”। 

মনে হল তাঁদের কেউই আমার প্রশ্নে খুশি হলেন না, একজন ব্যাজার মুখে বললেন, “হুঁঃ আমাদের আবার মাছ ধরা...”।

বললাম, “একথা বলছেন কেন? বিগত  বেশ কবছর ধরে একের পর এক জাল ফেলছেন আর টপাটপ মাছ তুলছেন... আমরা দেখছি না নাকি?”

এবার ভদ্রলোক আরও বিরক্ত হয়ে বললেন, “ধ্যার মশাই, বড়ো মাথাগুলোকে তো একবারও ধরতে পারলাম না। এমনকি মেজ-সেজ-ন মাছগুলোও ডাঙায় তোলার আগেই জাল ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে। পড়ে থাকছে কটা পুঁটি, মৌরলা, চুনো...। ও দিয়ে কি আর খাটনি পোষায়? প্রতিবার জাল পরীক্ষা করে দেখেছি – জালে কোথাও কোন ফুটো নেই – ফাটাও নেই...!”

“বড়ো মাথা বলতে?” জিজ্ঞাসা করলাম।

“বড়ো মাথা মানে কাতলা, রুই, বোয়াল এই সব আর কি। ব্যাটারা মস্ত ধড়িবাজ, জালে পড়তে পড়তেও ঠিক কেটে পড়ে। আহাম্মকের মতো আমরা এখন জাল বিছানোর নাটক করেই খুশি...”।

 

[*দোহাই আপনাদের, ধীবরের মধ্যে কোন রূপক খুঁজতে যাবেন না। ধীবর মানে জেলে, সে তাঁরা ধেড়ে ধেড়ে মাছ ধরে জেলে পাঠাতে পারুন বা নাই পারুন।]   

--০০--


 

সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১১  


১৮

 সূর্যাস্ত হয়ে গেলেও পশ্চিম আকাশ এখনও কিছুটা রঙ আর আলো ধরে রেখেছে। পূবের আকাশে সে রঙের কোন আভাস নেইগোটা আকাশটাকে অজস্র তারার চুমকি বসানো কালো পর্দার আড়ালে ঢেকে দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে সন্ধ্যাকাল। যেমন অপেক্ষা করছে নিশাচর জীবেরা – রাত্রি নামলে তারা বের হবে জীবিকার সন্ধানে। অন্যদিকে সারাদিন জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত পাখিরা এখন বাসায় ফিরছে। আশেপাশের গাছগুলি থেকে তাদের কলধ্বনি কানে আসছে। সন্ধ্যা আসছে, তার পিছনে আসছে রাত্রি।

এই সন্ধিক্ষণেই গ্রামপ্রধান জুজাক নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। তাঁর পিছনে ঘরের দরজার পাশে মাটি-লেপা দরমার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন কমলিমা। দুজনেই দূরের পাহাড়, ঝোপঝাড়-জঙ্গল, পূবের আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। নির্লক্ষ্য বোবা, নির্বিকার দৃষ্টি মেলে। সবকিছুই তাঁদের দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে, কিন্তু তাঁদের মনে কোন ছায়া পড়ছে না। এই জীবন, ওই প্রকৃতি, দিন-রাত্রি এসবই তাঁদের কাছে আজ যেন মূল্যহীন মনে হচ্ছে। মাত্র হাত তিনেক দূরে বসে থাকা দুই জীবনসঙ্গী নিজেদের মধ্যে কথাও বলছেন না। দীর্ঘ দাম্পত্যের প্রেম-ভালোবাসা-ক্ষোভ-অভিমান-অভিযোগের কথা। কিংবা সাধারণ সাংসারিক সুখদুঃখের কথা, প্রয়োজনের কথা। সব কথাই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাঁদের জীবন থেকে যেন ফুরিয়ে গেছে সমস্ত অনুভব।

কেন এবং কতক্ষণ তাঁরা এভাবে বিমনা বসে আছেন, সে কথা একবারের জন্যেও তাঁদের মনে আসেনি। তাঁদের সম্বিৎ ফিরল কবিরাজদাদার ডাকে, “জুজাকভায়া, বাড়িতে একা একা বসে কী করছ?” জুজাক দাওয়া থেকে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন উঠোনে। “আসুন আসুন, কবিরাজদাদা। কী আর করব, এই বসে ছিলাম একটু…”।

“সন্ধ্যে হয়ে গেল, আলো জ্বালাওনি, তুলসীতলায় প্রদীপ দেখাওনি। কী ব্যাপার? চুপ করে দাওয়ায় বসে দুটিতে কী ভাবছিলে বলো তো, মা?”

কবিরাজদাদার ডাকে কমলিমাও উঠে পড়েছিলেন। আড়া থেকে আসন পেড়ে, দাওয়ায় বিছিয়ে দিয়ে, বললেন, “আসুন কবিরাজদাদা, বসুন। সত্যিই বড়ো ভুল হয়ে গেছে”। তিনি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালালেন। কাচা কাপড় পরে প্রদীপ হাতে, দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন উঠোনের তুলসীতলায়। প্রথমে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন, তারপর গলায় আঁচল জড়িয়ে মাটিতে গড় হয়ে প্রণাম সারলেন। তারপর  ঘরে ঢুকে প্রদীপ জ্বালিয়ে, সলতেটা ছোট করে বাইরে দাওয়ায় এসে বসলেন, নিজের জায়গাটিতেই। ঘরের স্তিমিত আলোয় এবং বাইরের ক্ষুদ্র দীপালোকে – অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়ে উঠল। আর তখনই পুবের পাহাড় চূড়ায় দেখা দিল চাঁদ। গতকাল পূর্ণিমা ছিল, আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। গতকালের পূর্ণতা আজ তার আর নেই – আগামী প্রতিদিনই সে শীর্ণ হতে থাকবে।    

কবিরাজদাদা জুজাকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “গ্রামের পরিস্থিতি কী বুঝছো, জুজাক?”

মুখে বিষণ্ণ হাসি নিয়ে জুজাক বললেন, “আপনি কী বুঝছেন, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজ দাদা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মোটেই ভালো বুঝছি না, হে। দিনকাল আগের মতো থাকছে না। অবশ্য দিনকাল যে চিরদিন একই রকম থাকবে, তা না। বদল হবেই। কিন্তু এ বদল যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি ঘটে চলেছে”।

জুজাক একই রকম বিষণ্ণ সুরে বললেন, “সব কিছুই হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, কবিরাজদাদা। আমাদের বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে আর তাল রাখতে পারছি না”।

সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর জুজাক বললেন, “শুনলাম গত রাত্রে আস্থানের শিবিরে নাকি ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতদের হাতে নাকি তিন-তিনজন রক্ষী প্রাণ দিয়েছে। তুমি আমি এই গ্রামেই আশৈশব বড়ো হলাম, দাদা। এমন ডাকাতির কথা কোনদিন শুনেছ? আমাদের গ্রামের কথা ছেড়েই দাও আশেপাশে যত গ্রাম আমি চিনি কোথাও কোনদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। আজ কারা এইসব করছে? কে তাদের সাহস যোগাচ্ছে?”

কবিরাজদাদা মন দিয়ে জুজাকের কথা শুনছিলেন। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি নিয়ে তিনি বললেন, “তোমার নিজের প্রশ্নগুলির উত্তর তুমি তো নিজেই দিয়ে ফেললে জুজাক”। জুজাক কবিরাজদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কোন কথা বললেন না।

কবিরাজদাদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, “বুঝতে পারলে না, না? আচ্ছা, তকাল আমাদের গ্রামের পনের-ষোলোজন ছেলে রাত্রে বাড়িতে ছিল না”।

“হ্যাঁ। ওরা তো রামকথা শুনতে গিয়েছিল”।

“আশেপাশের গ্রামগুলোতে এমনকি আমাদের এই গ্রামেও নানান উৎসবে, পূর্ণিমায় এমন রামকথা তো প্রায়ই হয়। এ সব ধর্ম কথা শুনতে গ্রামের মহিলারা যায়...বয়স্ক মানুষরা যায়। অনেক ভক্ত আমাদের প্রতিবেশী গ্রামগুলিতেও যায়। কিন্তু জুজাক, তুমি আমায় বলো তো – আমাদের ছোকরা ছেলে-পুলেদের এত বড়ো দল কবে কোথায় গিয়েছে ধর্মকথা শুনতে? তাও কাছাকাছির মধ্যে প্রতিবেশী গ্রামে নয়, গভীর জঙ্গল-পথে এতটা হেঁটে, পাশের রাজ্যে? আমার তো মনে পড়ে না”।

জুজাক চমকে উঠলেন, “তার মানে? ওরা কাল রাত্রে রামকথা শুনতে যায়নি? তাহলে কোথায় গিয়েছিল?”

কবিরাজদাদা বললেন, “তা তো জানি না, ভাই। আরও একটা কথা - পাশের সুকরা গ্রামের চারজন গতকাল রাত্রে সত্যিই বটতলি গ্রামে গিয়েছিল রামকথা শুনতে। আমাদের ছোঁড়াগুলো যদি রামকথা শুনতে নাই গিয়ে থাকে, তাহলে ওই চারজন এসে ওদের সঙ্গে কোথায় জুটল? কেন জুটল?”

জুজাক বললেন, “তুমি কি গতকাল আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে আমাদের ছেলেদের সংযোগ খুঁজে পাচ্ছ”?

কমলিমা এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, শুধু শুনছিলেন। এখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কী বলছো, এ কোনদিন হতে পারে? আমাদের ছেলেরা যাবে আস্থানে ডাকাতি করতে? কবিরাজদাদা, তুমি কি সত্যিই তাই সন্দেহ করছো?  আমাদের ছেলেদের তুমি চেন না? তারা করবে ডাকাতি?”

কবিরাজদাদা ম্লান হেসে বললেন, “কেন চিনব না? খুব ভালো করেই চিনি, মা। কিন্তু প্রথমেই যে বললাম, অনেক কিছু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে”।

কবিরাজদাদার কথাটা কমলিমার মনঃপূত হল না, বললেন, “তাই বলে ডাকাত?”

কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “ডাকাত বলতে সাধারণ চোর-ডাকাতের কথা আমি বলিনি, মা। যাদের কথা আমরা সাধারণতঃ শুনে থাকি। তারা হিংস্র, লোভী, স্বার্থপর। পরের ধন-সম্পদ লুঠ করা তাদের জীবিকা। আস্থানে যে ডাকাতির কথা শুনলাম, মা, তাতে আর কিছু নয়, লুঠ হয়েছে প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র। কর সংগ্রহের সময় আস্থানের ভাণ্ডারে যথেষ্ট শস্য এবং অর্থ সঞ্চিত থাকে বা রয়েছে – এ কথা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু এই ডাকাতরা আস্থানের শস্যভাণ্ডার কিংবা অর্থভাণ্ডার স্পর্শও করেনি। কেন? এই ডাকাতির সঙ্গে সাধারণ ডাকাতির কোন মিলই খুঁজে পাচ্ছি না। এই ডাকাতির উদ্দেশ্য অন্য কিছু…”।

কমলিমা মানতে রাজি নন, তিনি বললেন, “এ কেমন তর ডাকাতি আমি বুঝি না, কবিরাজদাদা। কিন্তু তুমি যে বললে আস্থানে তিনজন রক্ষী নিহত হয়েছে। আমাদের ছেলেরা হত্যা করতে পারবে? একথা তুমি বিশ্বাস করো?”

কবিরাজদাদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কিছু বললেন না। এই গ্রামে বধূ হয়ে আসা থেকে তিনি কমলিকে চেনেন, স্নেহ করেন নিজের ভগ্নীর মতো। এই মেয়েটির মনে বিরাজ করে, সারল্য, বিশ্বাস, মায়া, ভালোবাসা আর মাতৃত্ব। তার ছোট্ট মনোজগতের বাইরের বিশাল জগযে সর্বদা নিষ্ঠুর তঞ্চক ক্রূর ও কুটিল খেলায় মগ্ন রয়েছে, সে কথা কমলির কাছে কোনমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা তুলসীতলার দীপ শিখাটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিন্তু আমি যে টের পাচ্ছি, মা, ধিকিধিকি আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে”।

জুজাক অনেকক্ষণ পর কথা বললেন, “এই আগুনের উৎস কি ভল্লা, কবিরাজদাদা?” কবিরাজদাদা উত্তরে “হ্যাঁ” কিংবা “না” কোন কথাই বললেন না, একই ভাবে তাকিয়ে রইলেন মঙ্গলময় স্নিগ্ধ দীপ শিখাটির দিকে। কিন্তু জুজাকের প্রশ্নের উত্তরে কবিরাজদাদা কিছু না বলাতে, ক্ষোভে ফেটে পড়লেন কমলিমা, বললেন, “যারে দেখতে নারি, তার চলন ব্যাঁকা? এ তোমাদের ভীষণ অন্যায় কবিরাজদাদা। ছেলেটাকে তোমরা কোনদিনই সহজ চোখে দেখতে পারো না। ছেলেটা আমাদের গ্রামের ছোঁড়াদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। কাজ নেই কর্ম নেই, তারা অলস দিন কাটাতো। সেই আলসেমি কাটিয়ে, সে তাদের মানুষ করে তুলছে...”। প্রাথমিক উত্তেজনায় কমলিমা এতগুলো কথা বলে ফেলে একটু শান্ত সংযত হলেন, তারপর আবার বললেন, “সেই কোন কাল থেকে তোমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে নালা বয়ে চলেছে। সেই জলকে কাজে লাগিয়ে যে চাষ করা সম্ভব, সে কথা কেউ তো বলতে পারেনি। ছেলেটা সেটাও করে দেখিয়েছে। আজ আমাদের নোনাপুর এবং সুকরার কিছু চাষি নতুন কিছু আবাদী জমি পেয়েছে। নতুন কিছু ফসল ফলানোর সুযোগ পেয়েছে। এ কি কম কথা, কবিরাজদাদা?”

কমলিমায়ের কথা শেষ হতে কেউই কোন কথা বললেন না, অনেকক্ষণ চুপ করে বসে নিজেদের মনে চিন্তা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর কবিরাজদাদা বললেন, “ভল্লা অসুস্থ অবস্থায় যখন এসেছিল, প্রথম দেখাতেই আমি বলেছিলাম – এ ছোকরা অসাধারণ এবং বীর যোদ্ধা। মনে আছে?  পরে আমরা জানলাম, ছোকরা নির্বাসন দণ্ড পাওয়া অপরাধী। যদিও মানবিক দিক দিয়ে বিচার করলে এত গুরু দণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ কী ও করেছে? আমাদের সহজাত বিবেচনায় মনে হয়, না করেনি। দু-পাঁচ বছরের কারা দণ্ডই হয়তো ওর ন্যায্য শাস্তি হতে পারত”।

কবিরাজদাদা কিছুক্ষণ বিরতি দিলেন, কিছু চিন্তা করলেন। তারপর আবার বললেন, “প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্বাসন হয়েছে - কিন্তু নির্বাসনের জন্যে, তাকে এতদূরে রুক্ষ, উষর পশ্চিম প্রান্তে আসতে হল কেন? আমার মনে হয়েছে ও পূর্বাঞ্চলের লোক। সেক্ষেত্রে রাজধানী থেকে পূর্ব সীমান্তের দিকেই যাওয়াই ওর পক্ষে স্বাভাবিক হত। রাজধানী থেকে আমাদের পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব, পূর্ব সীমান্তের থেকে অনেকটাই বেশি। ছোকরা তাহলে কেন আমাদের সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। প্রশাসনের নির্দেশে?”

যদিও দুজনের মনোভাবে বিস্তর ফারাক, কিন্তু জুজাক এবং কমলিমা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কবিরাজদাদার কথা শুনছিলেন। কবিরাজদাদা একটু থেমে আবার বললেন, “রাজধানীতে যা যা ঘটেছিল, ভল্লার মুখে আমরা  সবাই শুনেছি। যাদের রাজধানীতে নিত্য যাওয়া আসা আছে, তাদের মুখেও যা শুনেছি - ভল্লা এতটুকুও মিথ্যা বলেনি। এও শুনেছি রাজধানীর সাধারণ মানুষ ভল্লার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল এবং এই ঘটনার পর ভল্লা সাধারণের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে”।

জুজাক নির্বিকার মনেই শুনছিল, কিন্তু কমলিমা ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে কবিরাজদাদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে? মানুষ চিনতে আমি মোটেই ভুল করিনি, কবিরাজদাদা”।

কবিরাজদাদা কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক। কিন্তু আমিও ওকে চিনতে এতটুকু ভুল করিনি, মা। শুধু দেখার চোখটাই যা আলাদা। যে কথা বলছিলাম, রাজধানীর ঘটনাটা যেদিন ঘটেছিল, শুনেছি সেই রাত্রেই ভল্লা রাজধানী থেকে রওনা হয়েছিল। রাজধানী ছাড়ার পর চতুর্থ দিন ভোরে সে আমাদের গ্রামে এসে পৌঁছেছিল পায়ে হেঁটে। বিপর্যস্ত অবস্থায়। রাজধানী থেকে আমাদের গ্রামের যা দুরত্ব, সেটা  তিনদিন, তিন রাত পায়ে হেঁটে আসা অসম্ভব। বিশেষ করে ওরকম অসুস্থ অবস্থায়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ও বেশিরভাগ পথটাই এসেছিল হয় ঘোড়ায় চড়ে অথবা রণপায়”। একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের গ্রাম থেকে সবথেকে কাছের চটি হল বীজপুরের জনাইয়ের চটি। সেখান থেকে ভোর ভোর রওনা হলে, পায়ে হেঁটে পরের দিন ভোরে আমাদের গ্রামে হেসেখেলে পৌঁছে যাওয়া যায়। ভল্লার মতো ছোকরাদের পক্ষে ছয়-সাত প্রহরই যথেষ্ট। কিন্তু ভল্লার অনেকটাই বেশি সময় লেগেছে, কারণ ও তখন ভয়ানক অসুস্থ”।

কথা শেষ করে কবিরাজদাদা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এঃ লক্ষ্যকরিনি রাত্রি অর্ধ প্রহর পার হতে চলল, আমি এখন আসি”। জুজাকও যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, বললেন, “চলো, তোমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিই”।

“তুমি আবার বেরোবে কেন, জুজাক? চাঁদের আলোয় টুকটুক করে চলে যাবো”।

“তা হোক, তোমার সঙ্গে কিছুটা যাই”।

কবিরাজদাদা হাসলেন, উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলি রে, মা। রাগ করিস না। অনেক কথাই বললাম, তোর হয়তো ভালো লাগল না”।

কমলিমা সংকোচের সুরে বললেন, “আমিও অনেক কথা বলে ফেললাম, রাগ করবেন না কবিরাজদাদা”।   

 

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দুজনে নিঃশব্দে হেঁটে চললেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর জুজাক চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভল্লা কেন এখানে এসেছে, কিছু বুঝতে পারলেন, কবিরাজদাদা? তার উদ্দেশ্যটা কি?”

“ভল্লার এখানে আসার ব্যক্তিগত কোন উদ্দেশ্যই নেই জুজাক। ভল্লা এসেছে প্রশাসনের নির্দেশে কোন বিশেষ একটা কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ভল্লার পিছনে আছে প্রশাসনের অদৃশ্য হাত”।

“কী বলছ, কবিরাজদাদা? তাহলে তার এই নির্বাসন দণ্ড। আস্থানে শষ্পকের ওরকম অশ্রাব্য গালিগালাজ। মৃত্যুদণ্ডের হুমকি…এ সব কেন?”

কবিরাজদাদা বললেন, “সবটাই সাজানো – নাটক। সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া…। তবে এটাও ঠিক ভল্লা রাষ্ট্রের ওপর এতটাই বিশ্বস্ত, এ কাজে সে নিজের প্রাণ পণ রাখতেও এতটুকু দ্বিধা করবে না। সে কাজে যদি তার বিবেকের সায় না থাকে – তাও”।

বিস্মিত জুজাক জিজ্ঞাসা করলেন, “এভাবে একটা অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করায় রাষ্ট্রের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?”

কবিরাজদাদা মাথা নাড়লেন, জানেন না। তারপর বললেন, “তুমি এবার এসো জুজাক, আমি তো প্রায় এসেই গেছি। এবার বাড়ি যাও – কমলি একলা রয়েছে বাড়িতে”।

চলবে...

রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ১

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " মাথার পোকা "

 



 কাজের ফাঁকে ফাঁকেই সোনা পান্নাকে পড়ানো শুরু করে দিলেন। প্রথম দিকে মুখে মুখে পাখি পড়ানোর মত। ঘরের কাজ সারতে সারতে, তিনি নানান প্রশ্ন করতেন আর উত্তরও বলে দিতেন। সূর্য কোনদিকে ওঠে। সপ্তাহে কটা দিন। পক্ষ কতদিনে হয়। ক মাসে হয় বছর। গ্রহ কি, নক্ষত্র কি? মুখে মুখে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। এভাবে কিছুদিন চলার পর দুপুরে খাওয়ার পর হীরুর পুরোন বইগুলো নিয়ে পড়াতে বসলেন। স্লেট আর চকপেন্সিল দিয়ে লেখাতেও শুরু করলেন। ভোর থেকে উঠে রান্না-বান্না ছাড়াও নানান কাজ সেরে দুপুরে খাওয়ার পর যদিও ক্লান্তিতে তাঁর দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম আসে, তবু নিয়ম করে তিনি রোজ বসেন পুত্র পান্নাকে নিয়ে। বাংলা বর্ণমালা, ইংরিজি বর্ণমালা লেখা অভ্যাস করান। বাংলা এবং ইংরিজি সংখ্যা লেখাও অভ্যাস করান। মায়ের হাত ধরেই পান্না একে একে পার হয়ে চলল বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ, নিজে পড়, নিজে শেখ, ফার্স্ট বুক অব রিডিং ইত্যাদির পর্ব।

        

দীর্ঘ এই প্রস্তুতি চলতে চলতেই স্কুলে ভর্তির জন্যে পান্না পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার দিন পনের পরে অচ্যুত খুব দুশ্চিন্তা নিয়েই স্কুলে গিয়েছিলেন - অ্যাডমিশান লিস্টে পান্নার নাম আছে কিনা দেখতে! পান্নার নাম সে লিস্টে ছিল! বাড়ি ফেরার সময় বড়ো এক মাটির হাঁড়িতে অনেক রসগোল্লা কিনে অচ্যুত বাড়ি ফিরলেন। সোনার হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “পান্নাটারও একটা হিল্লে হয়ে গেল, বুঝলে?” 

দু চোখে খুশির চিকিমিকি আলো নিয়ে সোনা বললেন, “তবে? তুমি যে বলতে, আমার ভুট্‌কু, হীরুর মতো নয়, বোকাসোকা হাঁ-করা...হাত-মুখ ধুয়ে এসো, মিষ্টি দিচ্ছি, খাও...”

সোনা দুটো প্লেটে দুই ছেলেকে দুটো করে দিলেন, আর অচ্যুতের জন্যে চারটে আনলেন অন্য প্লেটে। কলতলা থেকে ঘরে ঢুকেই অচ্যুত প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো কেন? দুটো দাও। তোমার কই?”

“আমি খাচ্ছি, তোমরা খাও না?”

চৌকিতে আরাম করে বসে, একটা রসগোল্লা মুখে পুরে বললেন, “বুঝেছ, যে স্বপ্ন নিয়ে গাঁ ছেড়ে আসা, তার প্রথম ধাপটা হল। কলকাতার সেরা স্কুলে দুজনেই ভর্তি হয়ে গেল। এবার বাকিটা...”।

কাঁসার গেলাসে খাবার জল এনে অচ্যুতের প্লেটের পাশে রেখে সোনা বললেন, “সব হবে, দেখে নিও, আমাদের এত কষ্ট কী ভগবান দেখতে পাচ্ছেন না?” দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে অচ্যুত বড়ো তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সোনা আরো চারটে রসগোল্লা এনে হিরুকে দুটো দিলেন, পান্নার প্লেটেও দুটো।

পান্না খুব জোরে মাথা নেড়ে, ইঁড়ো পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি আর খাবো না, মা। আমার পেট ভরে গেছে। ওদুটো তুমি খাও”। তার ঘাড় নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাসের পাকামি, সোনার চোখ এড়াল না, তিনি বেশ উপভোগ করলেন পান্নার এই বড়ো হয়ে ওঠার অনুভব। স্নেহের হাসিমাখা মুখে বললেন, “আচ্ছা বেশ, আমি একটা খাচ্ছি, আরেকটা তুই খেয়ে নে”।

পান্না রাজি হল না, বলল, “নাঃ তুমি দুটো খাও”। পান্নার প্লেট থেকে তুলে, সোনা একটা রসগোল্লায় কামড় দিয়ে বললেন, “এত্তো আনলে কেন? খাবে কে?”

রসগোল্লা শেষ করে অচ্যুত গেলাসের জল খেলেন ঢকঢক করে, তৃপ্তির ছোট্ট ঢেঁকুর তুলে বললেন, “সন্ধ্যেবেলায় লাইব্রেরিতে পাড়ার অনেক লোকজন আসে, ওদের ডাকবো। খুশি হবে সবাই। দশ বারোজন হবে, সবার কুলোবে না?”

“আমি তো গুনিনি। কত এনেছো, আমার তো দেখে মনে হল, তাতেও বেশি হবে”।

অচ্যুত হাসতে হাসতে বললেন, “পঞ্চাশটা, তার ওপর আবার দুটো ফাউ দিয়েছে”।

“তবে? আরামসে হবে। শোনো না, ওবাড়ির দিদি আমায় খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, হিন্দু-হেয়ার-সংস্কৃত ওসব বড়ো বড়ো স্কুল... ওসব স্কুলে এক পুঁটুলি করে না দিলে, নাকি ছেলে ভর্তি হয় না। সন্ধেবেলায় হিরুর হাত দিয়ে কটা মিষ্টি পাঠিয়ে দেব?”

“কেন দেবে না, একশ বার দেবে!”

“কিন্তু, কিছু ভাববে না তো?”

“কী আবার ভাববে?”

“ওদের দু ছেলের কেউই নাকি ভর্তি হতে পারেনি, ওরা অন্য স্কুলে পড়ে। আজ আমি মিষ্টি দিলে হয়তো ভাববে, আমরা পুঁটলি ভরা টাকা দিয়ে ভর্তি করেছি? হয়তো ভাববে, মিষ্টি দিয়ে আমরা দেমাক দেখাচ্ছি”?

“যারা ভাবার, তুমি মিষ্টি  দাও বা না দাও তারা ভাববেই। কিন্তু এমন আনন্দটা পাড়াপড়শিদের সঙ্গে ভাগ না করে নিলে চলবে কেন? ও সব নিয়ে অত ভেবো না তো, তুমি!”

এর আগে মা আর বাবাকে এত খুশি হতে পান্না কোনদিন দেখেনি। আর এই খুশির কারণ যে সে নিজে, সেটাও টের পাচ্ছে বেশ!  তার মনে এখন যে অনুভূতি সেটা নিছক আনন্দের নয়, অন্য কিছুর। সেটা ঠিক কী, তা সে জানে না, বড় হতে হতে সে একদিন বুঝবে, এরই নাম সাফল্য! সন্ধেবেলা পাড়ার অনেক জ্যেঠু – কাকুরা এলেন। সকলেই খুব প্রশংসা করলেন দুই ভাইয়ের। এক কাকু, বললেন, “তুইও পান্না, আমিও পান্না। আমারও নাম পান্না, জানিস তো? তুই আর আমি আজ থেকে ভাই-ভাই, বুঝলি?” হেসে পান্নার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তাঁদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক এ পাড়ার গণ্য-মান্য বিজয় জ্যেঠু বললেন, “আপনি দেখালেন বটে অচ্যুতবাবু, এ পাড়ায় আমার সাতপুরুষের বাস, এ পাড়ার কোন ছেলে হিন্দু স্কুলে পড়েছে...কই তেমন তো মনে আসছে না! আর আপনি এই কবছর আগে এপাড়ায় ভাড়া এসে, দুই ছেলেকেই ঢুকিয়ে ফেললেন? নাঃ আপনাকে আর বৌমাকেও...বলিহারি যাই...এ একেবারে যেন অসাধ্য সাধন! আপনার ছেলেদুটিও যে রত্ন, এ কথা স্বীকার করতেই হবে”। পান্নাকাকু সেকথার জের টেনে হাসতে হাসতে বললেন, “হীরক আর পান্না, যেমন নাম তেমনই কাম...”!

সোনা বাইরে বের হননি, মাথায় ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। পান্না দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে। তার দায়িত্ব ছিল, কাকু-জ্যেঠুদের মিষ্টি দেওয়া, খাবার জল দেওয়া – অন্তরালে থাকা মায়ের সাহায্য করা। হঠাৎ পান্না দেখল, ঘোমটার মধ্যে মুখ ঢেকে মা যেন কাঁদছেন! কী আশ্চর্য, সব্বাই আনন্দ করছে, কত কত ভালো ভালো কথা বলছে, কিন্তু মা কাঁদছেন কেন? পান্না মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ের হাতে নাড়া দিয়ে মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, “ও মা, কাঁদছো কেন?”

ঘোমটা সামান্য ফাঁক করে, মুখে আঙুল দিয়ে সোনা পান্নাকে ইশারা করলেন, চুপ। পান্না আরো অবাক হয়ে দেখল, মায়ের মুখে অদ্ভূত এক মায়ার হাসি, কিন্তু তাঁর দুচোখ ভেসে যাছে অশ্রুতে! সোনা একটা হাত ধরে পান্নাকে কাছে টেনে নিলেন, পান্নার মাথায় হাত রেখে, ঘোমটার খুঁট দিয়ে চোখদুটো মুছে নিলেন; তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে পান্নাকে অস্ফুট স্বরে বললেন, “কই কাঁদছি?”

চলবে...


শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৩

   ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ২ 


তৃতীয় পর্ব  


মৌর্য পরবর্তী ভারতীয় মুদ্রা

আগের পর্বে মৌর্য যুগের মুদ্রা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলাম এবং এও বলেছিলাম সম্রাট এবং রাজাদের প্রচলন করা সোনা, রূপো বা তামার মুদ্রার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিকল্প মুদ্রা হিসাবে কড়িরও বহুল প্রচলন ছিল।  এবারে মৌর্যদের পরবর্তী যুগের মুদ্রা নিয়েও কিছু আলোচনা করা যাক।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্যটিকে দুর্বল আঞ্চলিক রাজারা ছোট ছোট রাজ্যে ভেঙে নিয়ে রাজ্য শাসন করতে শুরু করল। এই ডামাডোলের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে শুরু করল নানান জাতি, যেমন গ্রীক, ব্যক্ট্রিয়ান ইত্যাদি এবং তাদের পিছনে পিছনে প্রবেশ করতে লাগল মধ্য এশিয়ার নানান উপজাতিও যেমন পার্থিয়ান বা পহ্লব, কুষাণ, শক ইত্যাদি – এদের সকলেই ছিল যাযাবর ও পশুপালক গোষ্ঠী।

গ্রীক এবং ব্যাক্ট্রিয়ানরা বালুচিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আধুনিক ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশ পর্যন্ত বেশ বড়-সড় সাম্রাজ্য বিস্তার করে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজত্ব করেছিল। ইতিহাসে তাদের পরিচয় ইন্দো-গ্রীক (Indo-Greek)। তাদের প্রবর্তিত রূপোর মুদ্রার একটি নমুনা নীচেয় দেখা যাবে। এটির সোজা পিঠে গ্রীসের কোন না কোন দেব-দেবীর ছবি আর উল্টোদিক থাকত যে রাজার নামে মুদ্রা প্রচলিত হয়েছিল, তাঁর ছবি।                  



 পহ্লবদের উৎখাত করে কুষাণরা ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমপ্রান্ত থেকে মগধ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করে মোটামুটি ১০০ বিসিই-র কাছাকাছি সময়ে। কুষাণ বংশের প্রথম বিখ্যাত রাজা ছিলেন ভিমা কদফিসিস এবং কণিষ্ক ছিলেন এই বংশের সুবিখ্যাত সম্রাট। কুষাণ যুগের বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে – যার মধ্যে প্রথমদিকের মুদ্রাগুলিতে গ্রীস ও মেসোপটেমিয়ার প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। কিন্তু পরবর্তীকালে ভারতীয় সংস্কৃতির স্পর্শে সেই মুদ্রায় শিব, বুদ্ধ এবং কার্তিকের ছবিও মুদ্রিত হত। নীচের ছবিতে একটি স্বর্ণমুদ্রার উভয় পিঠের ছবি দেখতে পাওয়া যাবে।            

 Kushan _Coins

৭৮ সি.ই.তে ইন্দো-গ্রীক রাজাদের হারিয়ে শক রাজারা ভারতে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই ৭৮ সি.ই. থেকেই শকাব্দ গণনার শুরু এবং স্বাধীন ভারতের জাতীয় ক্যালেণ্ডারে এই বর্ষ গণনাকেই মান্যতা দেওয়া হয়। ইতিহাসে এই শকদের পশ্চিম-ক্ষত্রপও বলা হয়ে থাকে। শকদের মুদ্রার সঙ্গে ইন্দো-গ্রীক মুদ্রার অনেকটাই মিল ছিল। রূপোর মুদ্রার একদিকে রাজার ছবি থাকত আর উল্টোদিকে, প্রথম দিকে গ্রীসের দেবদেবীর ছবি থাকলেও, পরবর্তী কালে বৌদ্ধ স্তূপ বা চৈত্যের ছবি থাকত। মুদ্রার বিবরণ সাধারণতঃ গ্রীক, ব্রাহ্মী এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে খরোষ্ঠীলিপিতে লেখা হত। গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের ইতিহাস থেকে এই শক বা পশ্চিমক্ষত্রপদের প্রভাব খর্ব হয়ে যায়।


গুপ্তযুগের ভারতীয় মুদ্রা  

ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগকে ঐতিহাসিকরা সুবর্ণযুগ বলে বর্ণনা করেন। তার কারণ এই সময়কালে সর্ব বিষয়েই ভারতের চরম উৎকর্ষ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। রাজনীতি ও রাজ্যশাসন, বাণিজ্য ও অর্থনীতি, সাহিত্য- সংস্কৃতি ও নৃত্য-গীত-নাট্যকলা, বিজ্ঞান ও আয়ুর্বেদ চর্চা, শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্য – এক কথায় ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরা বলতে আমরা আজ যা কিছু বুঝি, তার সব কটি ক্ষেত্রই পূর্ণ বিকশিত হয়ে উঠেছিল। এমত পরিস্থিতিতে আমাদের মুদ্রা বিজ্ঞান পিছিয়ে থাকবে এমন হতে পারে?

মগধ অঞ্চলে গুপ্তবংশের রাজ্যপাটের সূচনা হয়েছিল শ্রীগুপ্তর হাত ধরে, মোটামুটি ২৭৩ সি.ই.-তে। কিন্তু সে রাজ্যকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৩৫ সি.ই.), সমুদ্রগুপ্ত (৩৩৫-৩৭২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য (৩৭৫-৪১৫ সি.ই.)। তারপরে উল্লেখযোগ্য সম্রাটরা হলেন কুমারগুপ্ত (৪১৫-৪৫৫ সি.ই.) এবং স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫ – ৪৬৭ সি.ই.)। স্কন্দগুপ্তের অকালমৃত্যু এবং হুণদের প্রবল আক্রমণের কারণে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন দ্রুত ঘনিয়ে আসে।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত থেকে স্কন্দগুপ্ত পর্যন্ত গুপ্তবংশের সকল সম্রাট, নিজ নিজ রাজত্বকালে নতুন নতুন মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। প্রধানতঃ স্বর্ণমুদ্রা হলেও, তাঁরা রূপো ও তামার মুদ্রারও প্রবর্তিত করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রাগুলি মূলতঃ কুষাণ ও পশ্চিম-ক্ষত্রপদের মুদ্রাসমূহের অনুসারী হলেও, গুণমানে এবং লিপি ও শিল্প সুষমায় প্রত্যেকটি অনন্য। বিবিধ ঘটনা উপলক্ষে এবং বিচিত্র চিত্রসজ্জার মুদ্রা প্রচলনে গুপ্ত সম্রাটরা বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। নীচের চিত্রে অপূর্ব সুন্দর সেই মুদ্রাগুলির কথাই এখন বলব। মুদ্রার ছবিগুলিতে বাঁদিকের চিত্রটি মুদ্রার সামনের দিক (Obverse বা Head) এবং ডানদিকেরটি মুদ্রার পিছন দিক (Reverse বা Tail) দেখানো হয়েছে।  

   মুদ্রার ওজন ৭.৪৬ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।        

বাঁদিকে যজ্ঞবেদীতে উৎসর্গরত সমুদ্রগুপ্ত, তাঁর হাতে রাজদণ্ড, তাঁর বাঁহাতের নীচে ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “সমুদ্র”। ডানদিকে সিংহাসনে বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা “পরাক্রমঃ”।           

  

   মুদ্রার ওজন ৭.৪৪ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।

বাঁদিকে লিচ্ছবি রাজকুমারী রাণি কুমারদেবী এবং প্রথম চন্দ্রগুপ্ত।  ব্রাহ্মীলিপিতে রাণির বাঁদিকে লেখা “কুমারদেবী” এবং রাজার ডানদিকে “চন্দ্রগুপ্ত”। ডানদিকে সিংহের পিঠে উপবিষ্টা দেবী (সম্ভবতঃ দুর্গা), তাঁর মাথায় মুকুট। দেবীর ডানদিকে ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “লিচ্ছবায়া”।

প্রসঙ্গতঃ চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবির রাজকুমারী কুমারদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, এই স্বর্ণমুদ্রা থেকে এবং চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শিলানির্দেশে নিজেকে “লিচ্ছবিদৌহিত্র” বলে উল্লেখ করেছেন।

 

     মুদ্রার ওজন ৭.২৭ গ্রাম, ব্যাস – ১৯ মিমি।

বাঁদিকে জনৈক অনুচর সহ রাজার ছবি – দুজনের হাতেই পরশু দণ্ড। ব্রাহ্মীলিপিতে লেখা “কৃ”। ডানদিকে সিংহাসনে বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা “কৃতান্তপরশু”। কৃতান্ত মানে যম বা মৃত্যু, পরশু মানে কুঠার, যুদ্ধাস্ত্র। এটি সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা, তিনিই দীর্ঘ যুদ্ধবিজয়ের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিস্তার বাড়িয়েছিলেন।

     মুদ্রার ওজন ৭.৪৬ গ্রাম, ব্যাস – ২১ মিমি।

এটিও সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা, তিনি দীর্ঘ যুদ্ধবিজয় করে সাম্রাজ্যবিস্তারের পর অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। বাঁদিকে যূপ-কাষ্ঠের সামনে বলিপ্রদত্ত ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, তার পেটের নীচে লেখা “সি” – যার অর্থ হতে পারে সিদ্ধম্‌।  ডানদিকে রাণি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর ডানহাতে চামরদণ্ড এবং বাঁহাতে বস্ত্রখণ্ড। রাণির ডানদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা “অশ্বমেধপরাক্রম”।

 মুদ্রার ওজন ৭.৮৫ গ্রাম, ব্যাস -২০ মিমি।

এই মুদ্রায় রয়েছে বীণাবাদনরত সমুদ্রগুপ্তের ছবি (বাঁদিকে), তিনি উচ্চপিঠ যুক্ত আসনে বসে আছেন, তাঁর কোলে শোয়ানো রয়েছে বীণাটি। ডানদিকে একটি টুল বা (বাঁশ বা বেত দিয়ে বোনা) মোড়ায় বসে আছেন লক্ষ্মীদেবী – তাঁর মাথায় মুকুট এবং হাতে ধনভাণ্ডার। দেবীর ডানদিকে লেখা রয়েছে “সমুদ্রগুপ্ত”।

  মুদ্রার ওজন ৭.৫৮ গ্রাম, ব্যাস – ২০ মিমি।

রাজার বাঁদিকে থাকা একটি বাঘের দিকে, ডানহাতে ধরে থাকা ধনুক থেকে রাজা তির ছুঁড়ছেন। তাঁর ডানদিকে লেখা আছে “ব্যাঘ্রপরাক্রম”। আর ডানদিকে মকর-বাহনা গঙ্গাদেবীর ডান হাতে যেন রাজদণ্ড এবং বাঁহাতে দীর্ঘ মৃণালসহ একটি পদ্মফুল। দেবীর ডানদিকে লেখা আছে “সমুদ্রগুপ্ত”।

 

 মুদ্রার ওজন ৭.২৯ গ্রাম, ব্যাস – ১৯ মিমি।

অনবদ্য এই মুদ্রাটি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তর। হাঁ করে তেড়ে আসা সিংহের বুকে তির ছুঁড়ছেন রাজা (বাঁ দিকে)। এই মুদ্রায় সিংহ ও রাজা উভয়ের চিত্রই আশ্চর্য রকমের গতিশীল, আগের মুদ্রাগুলির চিত্রর মতো আড়ষ্ট নয়। ডানদিকের সিংহের পিঠে অধিষ্ঠিতা দেবী মূর্তিটিও (হয়তো দুর্গা) অত্যন্ত প্রাণবন্ত। দেবীর ডানদিকে লেখা আছে “সিংহবিক্রম”।   

        

 মুদ্রার ওজন ৭.৬১ গ্রাম, ব্যাস - ২১ মিমি।      

এই মুদ্রায় বাঁদিকে ঘোড়ার পিঠে বসা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের যুদ্ধযাত্রার ছবিটিও অদ্ভূত গতিময় ও প্রাণবন্ত। ডানদিকে দেবী লক্ষ্মীর মাথায় মুকুট এবং বাঁহাতে দীর্ঘ মৃণাল সহ পদ্মফুল। দেবীর ডানদিকে লেখা “অজিতবিক্রম”।

 

গুপ্ত পরবর্তী ভারতীয় মুদ্রা

মৌর্য সাম্রাজ্যের পর যেমন ঘটেছিল, গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরও একই ঘটনা ঘটল – ছোট ছোট দুর্বল রাজ্যে ভাগ হয়ে গেল সমগ্র সাম্রাজ্য। সেই রাজ্যগুলির শক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকার দরুন, অবনতি ঘটতে লাগল শাসন ব্যবস্থার, অর্থনীতির এবং মুদ্রা শিল্পেরও। যে উৎকর্ষতায় পৌঁছেছিল গুপ্তযুগের মুদ্রা ব্যবস্থার – অচিরেই তার পতন ঘটল। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই তফাৎটা সহজেই টের পাওয়া যাবে।


  মুদ্রার ওজন ২.০৭ গ্রাম, ব্যাস - ১২ মিমি।

কলচুরি রাজ কৃষ্ণরাজা (৫৫০-৫৭৫ সি.ই.)-র প্রচলিত রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল রূপক বা দ্রাখমা। বাঁদিকে রাজার মাথার চিত্র, ডান দিকে উপবিষ্ট নন্দীর (শিবের বাহন) চিত্র। তাকে ঘিরে ব্রাহ্মীতে লেখা “পরম মহেশ্বর মাতা পিতৃ পদানুধ্যাতা শ্রীকৃষ্ণ”।

Coin of Harshavardhana, c. 606–647 CE. Obverse: portrait of Harshavardhana with a crescent over the head. Reverse: Fan-tailed Garuda standing facing.[1] of Pushyabhuti dynasty

হর্ষবর্ধনের (৬০৬ – ৬৪৭ সি.ই.) রৌপ্যমুদ্রা। একদিকে মাথায় চন্দ্রচিহ্ন নিয়ে হর্ষবর্ধনের মুখ। আর উলটো দিকে মুক্ত পেখম গরুড় (ময়ূর?)।  

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর ভারতের খণ্ড-বিখণ্ড ছোট-বড়ো প্রতিবেশী রাজ্যগুলি নিজেদের মধ্যে নিত্য নতুন যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত থাকত এবং সেই যুদ্ধে এতই শক্তিক্ষয় এবং অর্থক্ষয় হত, শক্তিশালী প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হত না। তার প্রতিফলন পাওয়া যায় সমসাময়িক রাজ্যগুলিতে বৈচিত্রহীন এবং কিছুটা যেন দায়সারা-কাজচলা গোছের মুদ্রার প্রচলন দেখে। প্রসঙ্গতঃ আরো একটি কথা বলে রাখা ভাল, এই পর্যায়ে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন অতি সামান্য – অধিকাংশ মুদ্রাই ছিল হয় রূপোর বা তামার। অতএব জনসাধারণকে মুদ্রার বিকল্প হিসেবে কড়িকেই ব্যবহার করতে দেখা গেছে আরও বেশি করে – যে কথা আগের পর্বেই বলেছি।

উত্তর ভারতের এই পর্যায় শেষ করার আগে আমাদের বাংলার পালরাজাদের মুদ্রা নিয়েও দুচার কথা বলিঃ-

 

-   ওজন ৭.৫৯ গ্রাম, ব্যাস – ২১ মিমি।

পাল যুগের একমাত্র স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন ধর্মপাল (৭৭৫-৮৩০ সি.ই.)। বাঁদিকে ঘোড়ার পিঠে রাজা ধর্মপাল কোন এক পশুকে বর্শাবিদ্ধ করছেন – হয়তো কোন মৃগয়ার দৃশ্য। তাঁর বাঁদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা “শ্রীমান ধর্মপাল”। ডানদিকে পদ্মাসনে উপবিষ্টা লক্ষ্মীদেবী দুই হাতে দুটি পদ্ম ধরে আছেন। তাঁর মাথার বাঁদিকে ব্রাহ্মীতে লেখা আছে “শ্রী”।

Pala Dynasty Coin - coinsstuff    

পাল রাজত্বে বহুল প্রচলিত নানা ধরনের রৌপ্যমুদ্রার নমুনা – অধিকাংশই কালের প্রভাবে মসৃণ হয়ে গেছে।

 

দক্ষিণ ভারতের মুদ্রা

 দক্ষিণ ভারতীয় মুদ্রায় প্রধানতঃ রাজবংশের প্রতীক ও নকশা ব্যবহৃত হত। যেমন চালুক্যদের প্রতীক ছিল বরাহ, পল্লবদের ষাঁড়, চোলদের বাঘ, পাণ্ড্য বা আলুপা-দের মাছ, চেরাদের তির-ধনুক এবং হোয়সলদের সিংহ। দেবগিরির যাদবরা “পদ্মটংক” নামে একটি স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেছিল – যার সামনের দিকে ছিল অষ্টদল পদ্ম, কিন্তু উল্টোদিকে কোন মুদ্রিত চিত্রই ছিল না। মুদ্রা-প্রচলনকারী রাজাদের নাম ও উপাধি মুদ্রাগুলির গায়ে আঞ্চলিক লিপি ও ভাষায় লেখা হত।

 

১১শ-১৩শ শতাব্দীর চেরাদের রৌপ্য মুদ্রা।

 

১১শ-১৩শ শতাব্দীর চেরাদের রৌপ্য মুদ্রা।

৯ম-১৩শ শতাব্দীর চোলদের স্বর্ণ মুদ্রা।

১১শ-১৩শ শতাব্দীর উদিপির আলুপাদের স্বর্ণমুদ্রা।

১২শ-১৪শ শতাব্দীতে দেবগিরির যাদবদের পদ্মটংক স্বর্ণ মুদ্রা।


দক্ষিণ ভারতের এই সময়কালের মুদ্রাগুলিতে কোন রকম অলংকরণ কিংবা দেব-দেবীদের চিত্র প্রায় থাকতই না। মুদ্রাগুলির এই বৈশিষ্ট্য প্রথম পাওয়া যায় মধ্যযুগের বিজয়নগর সাম্রাজ্যের (চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী সি.ই.) মুদ্রাগুলিতে। সে আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে।

 

চলবে...         


কৃতজ্ঞতাঃ 

https://coinindia.com, 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.       


নতুন পোস্টগুলি

বড়ো মাথা

এর আগের অণুগল্প - "  ছেলেমানুষ " মস্ত এক ঝিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে এ দেশের বিখ্যাত সব ধীবরমশাই*রা দেখলাম জাল ফেলছেন। কৌতূহল হল, পাশে গিয়...