ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৩ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
চতুর্দশ পর্বাংশ
৪.৭.৪ আসাম
আসামের পৌরাণিক নাম পাওয়া যায় কামরূপ এবং কোন
একসময় নরক ছিলেন কামরূপের রাজা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম মতে রাজা নরক ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ
অসুর, যাঁকে
সাধারণ ক্ষত্রিয় সৈন্যবাহিনী দিয়ে পরাজিত করা যায়নি, ভগবান বিষ্ণুকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল।
সে যাই হোক সেই রাজা নরকের পুত্র ছিলেন ভগদত্ত, যিনি মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে
নাকি কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন।
তবে কামরূপের প্রথম ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়
সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে, যেখানে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের
সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসেবে কামরূপের উল্লেখ করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্য পতনের পর, পরবর্তী
গুপ্তরাজা মহাসেনগুপ্তের অন্য একটি লিপি থেকে জানা যায় তাঁর রাজত্বের সীমা লোহিত্য
নদীর (ব্রহ্মপুত্র) তটভূমি পর্যন্ত এবং তিনি কামরূপ রাজা সুস্থিতবর্মনকে পরাস্ত
করেছিলেন। এই কামরূপের রাজা সুস্থিতবর্মনের পুত্র ভাস্করবর্মনের কথা ইতিহাসে
বারবার উঠে এসেছে। ৬৪৩ সি.ই.-তে হুয়ান সাং যখন কামরূপ গিয়েছিলেন তখন কামরূপের রাজা
ছিলেন ভাস্করবর্মন। ভাস্করবর্মন প্রতিবেশী কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের আতঙ্কে, শুরু থেকেই
রাজা হর্ষের সঙ্গে “অনন্ত মৈত্রী”-তে আবদ্ধ ছিলেন। রাজা হর্ষের আয়োজিত দুটি
মহামৈত্রী সম্মেলনে,
একটি কনৌজ এবং অন্যটি প্রয়াগে, তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। হর্ষের
মৃত্যুর পরে তাঁর সিংহাসনে বসা অযোগ্য রাজাকে সরানোর ব্যাপারেও তিনি চীনের
রাষ্ট্রদূতকে পূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ
জয় করেছিলেন।
ভাস্করবর্মণের পর কামরূপের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট।
অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি শ্রীহর্ষ নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়, যিনি গৌড়, ওড্র
(উড়িষ্যা), কলিঙ্গ, কোশল এবং
আরও অনেক অঞ্চল জয় করেছিলেন। আবার একাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রত্নপাল নামে এক
রাজার নাম পাওয়া যায়,
যিনি গুর্জরদের রাজধানী, গৌড়রাজ, দাক্ষিণাত্যের রাজা (হয়তো চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য, যিনি কামরূপ
অভিযান করেছিলেন), কেরালেশ
( হয়তো চোল বংশের প্রথম রাজেন্দ্র), বাহিকা এবং তৈকদের পরাজিত করেছিলেন।
যদিও এর মধ্যে বাংলার পালবংশের রাজা
দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.),
তাঁর ভাইপো জয়পালকে প্রাগজ্যোতিষ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন এবং পাল রাজত্বের
অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত প্রাগজ্যোতিষ রাজা
কুমারপালের অধীনেই ছিল এবং তাঁর প্রতিনিধি মন্ত্রী বৈদ্যদেবের যথেষ্ট কর্তৃত্ব ও
প্রভাব সেখানে ছিল।
কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে আসাম অধিকার করে
নিয়েছিলেন, অহোম
নামের শান উপজাতিদের একটি শাখা। যাঁদের থেকে গোটা রাজ্যের নাম অহোম বা আসাম বলা
হয়ে থাকে। আসামে মুসলিম অভিযান সাফল্য পেয়েছিল অনেকটাই পরে, মুঘল সম্রাট
ঔরংজেব তাঁর বিখ্যাত সেনাপতি মিরজুমলাকে (১৬৬২ সি.ই.) পাঠিয়ে প্রথম আসাম অধিকার
করেছিলেন।
৪.৭.৫ উড়িষ্যা
প্রাচীন কলিঙ্গ সীমানার ধারণা হল গোদাবরী থেকে
মহানদী পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল। যদিও এই সীমানা কখনোই ধরাবাঁধা ছিল
না। কোন কোন সময় কলিঙ্গ রাজ্য, উৎকল, ওড্র এবং কলিঙ্গ নামেও একই বা তিনটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল।
আবার অনেক সময়েই দক্ষিণবঙ্গের তাম্রলিপ্তি বন্দর সহ মেদিনীপুর কলিঙ্গের অন্তর্গত
ছিল, আবার
কোন কোন সময় উড়িষ্যার গঞ্জাম পর্যন্ত বঙ্গের সীমানার মধ্যে ছিল।
ঐতিহাসিক সময় থেকে কলিঙ্গ নন্দ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তারপর সম্রাট অশোক কলিঙ্গকে মৌর্যসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মৌর্যদের পর কলিঙ্গের রাজা হয়েছিলেন শক্তিশালী খারবেল, তিনি একসময়ে মগধ এবং অন্ধ্রের বেশ কিছুটা অংশ কলিঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এরপর কলিঙ্গের স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। গুপ্তরাজাদের সময় কলিঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের মধ্যেই ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকে কলিঙ্গের রাজা ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গবংশীয় রাজারা।
৪.৭.৫.১ প্রাচ্য গঙ্গ
গঙ্গবংশের উৎপত্তি মহীশূরের কোলার অঞ্চলে, তাঁদের একটি
শাখা পূর্বদিকে কলিঙ্গে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এই কারণে তাঁদের প্রাচ্য গঙ্গ বলা
হয়। রাজা ইন্দ্রবর্মন ছিলেন প্রাচ্য গঙ্গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রাজধানী ছিল
গঞ্জাম জেলার কলিঙ্গপতনম বা মুখলিঙ্গম। এই প্রাচ্য গঙ্গ বংশ প্রায় চারশ বছর রাজত্ব
করেছিলেন। খ্রীষ্টিয় দশম শতাব্দীতে চালুক্য ও চোলরাজাদের আক্রমণে কলিঙ্গ রাজ্য
বারবার বিধ্বস্ত হয় এবং প্রাচ্যগঙ্গ বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়েন।
১০৭৭ সি.ই.তে গঙ্গবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গর
রাজত্বকালে, কলিঙ্গ
আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর নাম চোড়গঙ্গ হয়েছিল, কারণ তাঁর পিতা রাজারাজগঙ্গ বিবাহ
করেছিলেন, রাজেন্দ্র
চোড়ের কন্যা রাজসুন্দরীকে। চোড়গঙ্গ দীর্ঘ সত্তর বছর রাজত্ব করেছিলেন (১০৭৭-১১৪৭
সি.ই.)। এই অনন্তবর্মনই পুরীর জগন্নাথ মন্দির এবং আরও অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা
করিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর গঙ্গবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাংলার সেনরাজা কলিঙ্গ
রাজ্যের কিছুটা অধিকার করে নিয়েছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিমরা বঙ্গের
সেনবংশকে উৎখাত করতে পারলেও, গঙ্গরাজারা মুসলিমদের আরও প্রায় একশ বছরের ওপর ঠেকিয়ে
রেখেছিলেন। মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মুসলিমরা কলিঙ্গ জয় করেছিলেন।
এর মধ্যে কেশরী রাজবংশও দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন, সম্ভবতঃ উৎকল রাজ্যে, তাঁদের রাজধানী ছিল ভুবনেশ্বর। মন্দির শহর ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত মন্দিরগুলির অধিকাংশই কেশরী রাজাদের প্রতিষ্ঠিত। খ্রীষ্টিয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র উড়িষ্যা জুড়ে অজস্র মন্দির নির্মিত হয়েছিল, যার আদর্শ ছিল ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ, পুরীর জগন্নাথধাম এবং কোনার্কের সূর্য মন্দির।
৪.৭.৬ ত্রিপুরির কলচুরি
শোনা যায় কলচুরি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ছিলেন, পৌরাণিক
রাজা কার্তবীর্যাজুন,
হৈহয় বংশের শাখা,
যাঁরা নর্মদা উপত্যকায় রাজত্ব করতেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল মাহিষ্মতী বা
মান্ধাতা। কলচুরি বংশের উত্থান যে রাজার হাত ধরে, তাঁর নাম প্রথম কোকল্ল, তিনিই
ত্রিপুরী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর অঞ্চলে। তাঁর
রাজত্বকাল নবম শতাব্দীর শেষ দশক থেকে দশম শতাব্দীর শুরুর দুই দশক। তাঁর এই
রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে বৈবাহিক সম্পর্কও থাকতে পারে। তিনি চান্দেল রাজ দ্বিতীয়
কৃষ্ণের (৮৭৫ - ৯১১ সি.ই.) কন্যা রাজকুমারী নট্টদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। এছাড়াও
জানা যায় তাঁর জামাই ছিলেন রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজকুমার। অতএব এই তিনটি রাজবংশীয়
মিলিত শক্তি নিয়ে, তিনি
চালুক্য, ভোজ
এবং প্রতিহার রাজবংশের রাজাদের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে গেছেন। একসময় তাঁর
সম্বন্ধে, “জগজ্জয়ী”
উপাধিও ব্যবহার করা হত।
প্রথম কোকল্লের পর কলচুরি বংশের আরেক রাজার নাম
পাওয়া যায়, তাঁর
নাম গাঙ্গেয়দেব (১০১৯-১০৪১ সি.ই.)। ইনি “বিক্রমাদিত্য” উপাধি নিয়েছিলেন, এবং তাঁকেও
“জগজ্জয়ী” বলা হত। রাজা গাঙ্গেয়দেব, প্রতিহার বংশের রাজাদের পতনের পর
উত্তর ভারত অভিযান করেছিলেন এবং কীর দেশ (কাংড়া উপত্যকা), প্রয়াগ এবং
বারাণসী জয় করেছিলেন। যদিও পরবর্তী কালে পরমার বংশের ভোজরাজার হাতে তিনি পরাস্ত
হয়েছিলেন। গাঙ্গেয়দেবের পুত্র লক্ষ্মী-কর্ণ (১০৪১-৭২ সি.ই.), কলচুরি
বংশের সব থেকে প্রতিপত্তিশালী রাজা ছিলেন। রাজা কর্ণ কয়েক বছরের জন্যে কাংড়া থেকে
বারাণসী এবং কনৌজ নিজের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। বারাণসীতে তিনি একটি শৈব মন্দির
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,
যাকে “কর্ণ-মেরু” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর কলচুরি বংশের রাজা হন রাজা লক্ষ্মীকর্ণর পুত্র যশকর্ণ (১০৭৩-১১২০ সি.ই.)। শোনা যায় যশকর্ণের মাতা ছিলেন হুণ জাতীয়া। যশকর্ণকেও প্রায় সারাজীবনই যুদ্ধবিগ্রহে লেগে থাকতে হয়েছিল। তাঁর সময়ে উত্তরের এলাহাবাদ, বারাণসী এবং কনৌজ জয় করে নিয়েছিলেন গাড়োয়ালরা, এমনকি তাঁরা ত্রিপুরী রাজধানীও আক্রমণ করেছিলেন। চান্দেল, চালুক্যদের সঙ্গে তাঁর নিত্য যুদ্ধ তো ছিলই। যশকর্ণের পুত্র গয়া-কর্ণের পর কলচুরি রাজবংশ ইতিহাসে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল।
৪.৭.৭ জিজাকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল
চান্দেল বংশের উৎপত্তি পূর্ণচন্দ্র এবং ব্রাহ্মণ
কন্যার বিবাহ থেকে! অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, তাঁরা প্রাচীন ভারতের ভর বা গোণ্ড
জাতির শাখা, যাঁদের
আদি নিবাস ছিল ছতরপুর রাজ্যের মানিয়াগড়ে, কেন নদীর ধারে। নবম শতাব্দীর শুরুর
দিকে চান্দেল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন, নান্নুক। তাঁর নাতির নাম জিজা বা
জয়শক্তি– তাঁর নাম অনুসারেই তাঁদের রাজ্যের নাম হয় জিজাকভুক্তি। অনুমান করা হয়, চান্দেল
বংশের প্রথম দিকের বেশ কিছু রাজা ছিলেন, কনৌজের প্রতিহার সাম্রাজ্যের সামন্ত
রাজা। তাঁদের মধ্যে হর্ষদেব চান্দেল তাঁর প্রভাব এবং ক্ষমতা বাড়িয়ে তুললেন, প্রতিহার
রাজ মহীপালের সৎভাই দ্বিতীয় ভোজকে সরিয়ে, তাঁকে কনৌজের সিংহাসনে বসতে সাহায্য
করে। এরপর কনৌজের রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, চান্দেলরা আরও বেশি স্বাধীন ও
শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। এইসময় রাজা হলেন, হর্ষদেবের পুত্র ধঙ্গ (৯৫০-১০০২
সি.ই.)। শোনা যায় তাঁর সময়ে কনৌজ কিছুদিনের জন্য চান্দেল রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত
হয়েছিল। খাজুরাহোর একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় “রাজা ধঙ্গ খেলার ছলে অধিকার
করেছেন, কালঞ্জর
(কালিঞ্জর দুর্গ –বুন্দেলখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ), সুদূর মালব নদীতটের ভাস্বত (?), যমুনার তীর, চেদি
রাজ্যের সীমানা, এমনকি
গোপগিরি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল”। ধঙ্গ কোন এক সময় বারাণসী জয় করেছিলেন, তার প্রমাণও
পাওয়া যায়। ৯৮৯ অথবা ৯৯০ সি.ই.তে সবুক্তিগিনকে প্রতিরোধ করার জন্যে শাহী রাজা
জয়পাল যখন রাজা ধঙ্গের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন, রাজা ধঙ্গ
তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন এবং আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন।
একইভাবে রাজা ধঙ্গের পুত্র গণ্ডের কাছে আনন্দপাল
শাহী ১০০৮ সি.ই.-তে গজনির সুলতান মামুদের আক্রমণ প্রতিরোধের সাহায্য চাইলে রাজা
গণ্ডও সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই হিন্দু যৌথশক্তির পরাজয় হয়েছিল।
এরপর সুলতান মামুদের ভয়ে (কাপুরুষের মতো?) পালিয়ে যাওয়া কনৌজের প্রতিহাররাজা
রাজ্যপালকে শাস্তি দিতে,
রাজা গণ্ড ও শাহী যুবরাজ বিদ্যাধর, ১০১৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজ্যপালকে হত্যা
করেন। এই সংবাদ যখন গজনিতে সুলতানের কানে পৌঁছল, রাজা গণ্ডকে শাস্তি দিতে সুলতান
মামুদ ১০১৯ সালে চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করলেন। এবার রাজা গণ্ড সুলতানের সামরিক
শক্তি দেখে কোন ঝুঁকি নিলেন না, রাতের অন্ধকারে (বীরের মতো?) পালিয়ে জীবন রক্ষা করলেন। এরপর
সুলতান মামুদ ১০২২ খ্রীষ্টাব্দে আবার চান্দেল রাজ্য আক্রমণ করেন এবং গোয়ালিয়র
দুর্গ ও কালিঞ্জর দুর্গ অধিকার করে নিলেন। এই সময় রাজা গণ্ড সুলতান মামুদের (বীরের
মতো?) বশ্যতা
মেনে নিয়েছিলেন। সুলতান মামুদ রাজা গণ্ডকে দুর্গদুটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, বদলে প্রচুর
ধনসম্পদ নিয়ে গজনি ফিরে গিয়েছিলেন।
এরপর চান্দেল বংশের উল্লেখযোগ্য রাজারা হলেন, কীর্তিবর্মন, মদনবর্মন, পরমার্দি
(১১৬৫-১২০৩ সি.ই.) প্রমুখ। তাঁরাও প্রতিবেশী রাজ্যগুলি কখনো জয় করেছেন, কখনো আবার
পরাজিতও হয়েছেন। এই সময়ে ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে কুতব-উদ্দিন আইবক কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ
করেন এবং চান্দেল রাজত্বের অবসান ঘটান। অবশ্য এরপরেও প্রায় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত
ছোট রাজ্যের শাসক হয়ে,
চান্দেল বংশের অস্তিত্ব ছিল।
চান্দেল রাজাদের অন্যতম কীর্তি খাজুরাহো মন্দির, কালিঞ্জর দুর্গ এবং মাহোবা নগর। সমসাময়িক কালে এমন সুসজ্জিত দুর্গ এবং সুন্দর শহর ভারতে কমই ছিল। চান্দেল রাজারা বেশ কিছু মন্দির এবং সুন্দর সরোবর বানিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুলেছিলেন বুন্দেলখণ্ড এবং মাহোবা শহর। মাহোবার এরকমই একটি সরোবরের নাম মদনসাগর, যেটি নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজা মদনবর্মন।
৪.৭.৮ মালবের পরমার বংশ
শোনা যায়, পরমার বংশের উৎপত্তি হয়েছিল পৌরাণিক
বশিষ্ঠ মুনির যজ্ঞবেদী থেকে। কিন্তু সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি শিলালিপি থেকে জানা
গেছে, পরমার
বংশ দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশের একটি শাখা।
সেকালের উজ্জয়িনী নগর বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক
গুরুত্বের বিচারে, মধ্যভারতের
সব থেকে উন্নত শহর ছিল। গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের পর বহু রাজবংশই এই শহরে আধিপত্য
স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তাঁদের মধ্যে
অন্যতম ছিলেন, রাষ্ট্রকূট, কিন্তু
তাঁরা উজ্জয়িনীর ওপর অধিকার ধরে রাখতে পারেননি। পরবর্তী কালে প্রতিহার বংশের
রাজারা বেশ কয়েক বছর উজ্জিয়িনী তাঁদের অধিকারে রেখেছিলেন। অনুমান করা হয়, প্রতিহার
রাজাদের সামন্তরাজা হিসাবেই উজ্জয়িনী বা মালবের পরমার বংশের সূত্রপাত। পরমার বংশের
প্রথম যে শাসকের নাম জানা যায়, তিনি শিয়াক-হর্ষ, তিনি ৯৪৯-৭২ সি.ই. পর্যন্ত
উজ্জিয়িনীর শাসক ছিলেন। কিন্তু এই পর্যায়ে প্রতিহার বংশের রাজারা দুর্বল হয়ে পড়াতে, শিয়াক-হর্ষ
সামন্ত রাজা থেকে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
শিয়াক-হর্ষ রাজা হয়ে ওঠায় রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয়
কৃষ্ণ (৯৫৫-৭০ সি.ই.),
উজ্জয়িনী আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু শিয়াক-হর্ষ তাঁকে পরাজিত করেন। শিয়াক-হর্ষ কিছু হুণ
গোষ্ঠী রাজাদেরও পরাজিত করে, অবন্তী রাজ্য এবং উজ্জিয়িনী নগরে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
তাঁর পুত্র বাকপতি অথবা মুঞ্জা রাজা হয়েছিলেন ৯৭৪ সি.ই.-তে। শোনা যায়, কলচুরি, কর্ণাট, চোল এবং
কেরালার রাজারা তাঁর তলোয়ারের সামনে মাথা নত করেছিলেন। তবে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব, চালুক্য
রাজা দ্বিতীয় তৈলপের আক্রমণ তিনি অন্ততঃ ছবার প্রতিহত করেছিলেন। জৈন গ্রন্থকার
মেরুতুঙ্গের “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, সপ্তমবার চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের
সময় বাকপতি-মুঞ্জ, তাঁর
মন্ত্রীদের পরামর্শ না শুনে, গোদাবরী পার হয়ে চালুক্য রাজ্যের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন।
সেখানেই তিনি বন্দী হন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর কাল অনুমান করা হয়
৯৯৩-৯৪ সি.ই., এর
কিছুদিন পরেই ৯৯৭-৯৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় তৈলপের মৃত্যু হয়। বাকপতি মুঞ্জ শুধু রণদক্ষ
রাজাই ছিলেন, তা
নয়, তিনি
প্রজাদের হিতের জন্যে অনেক সরোবর এবং মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। ধারা শহরের
মুঞ্জসাগর সরোবর, তাঁরই
স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে। তাঁর সভায় কবি ও বিদ্বানরা অত্যন্ত সম্মানীয় ছিলেন, যেমন
পদ্মগুপ্ত, ধনঞ্জয়
(“দশরূপ” গ্রন্থ প্রণেতা),
ধনিক (“দশরূপাবলোক” গ্রন্থ প্রণেতা) এবং ভট্ট হলায়ুধ, যাঁর রচনা
দুই বিখ্যাত গ্রন্থ,“মৃতসঞ্জীবনী”
এবং “অভিধান-রত্নমালা”।
বাকপতি-মুঞ্জের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ছোট
ভাই সিন্ধুলা বা সিন্ধুরাজা বা নবশশাঙ্ক। তিনিও কলচুরি, হুণ এবং
চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। সিন্ধুলার সংক্ষিপ্ত রাজত্বের পর রাজা
হয়েছিলেন, বাকপতি-মুঞ্জের
পুত্র ভোজ। তিনি রাজধানী সরিয়ে আনেন ধারাতে। উদেপুর প্রশস্তিতে তাঁকে “সার্বভৌম”
বলা হয়েছে, এবং
তিনি কৈলাশ থেকে মলয় পর্বত পর্যন্ত “সমগ্র পৃথিবীর রাজা” বলেও দাবি করা হয়েছে।
তিনি পিতার হত্যার প্রতিশোধে চালুক্যদের আক্রমণ করে পঞ্চম বিক্রমাদিত্যকে পরাস্ত
এবং হত্যা করেন, ১০০৮
সি.ই.-তে। যদিও দাক্ষিণাত্যের এই সাফল্য তাঁকে হারাতে হয়েছিল ১০১৯ এ.ডি-তে
চালুক্যরাজ দ্বিতীয় জয়সীমার (১০১৬-৪২ সি.ই.) কাছে। এরপরেও তিনি নিরন্তর যুদ্ধ
করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন প্রতিবেশী রাজ্যগুলির সঙ্গে, উত্তরের
কনৌজ অধিকারের জন্যে,
এমনকি “তুরুষ্কু” (মুসলিম)-দের সঙ্গেও। এই মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তিনটি
রাজ্য একত্র হয়েছিলেন,
কলচুরিরাজ লক্ষ্মীকর্ণ,
পরমার-রাজ ভোজ এবং অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম। এই যুদ্ধের সময়েই প্রায়
পঞ্চান্ন বছর রাজত্বের পর রাজা ভোজের মৃত্যু হয়। রাজা ভোজের মৃত্যুর পর এই মিত্র
রাজ্যগুলিই রাজধানী ধারা এবং মালব অধিকার করে নিয়েছিল।
রাজা ভোজ যেমন অসি চালনায় দক্ষ ছিলেন, তেমনই দক্ষ
ছিলেন বিদ্যাচর্চায়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অন্ততঃ চব্বিশটি গ্রন্থ লিখেছিলেন, যেমন
“আয়ুর্বেদ-সর্বস্ব”,
“রাজমৃগাঙ্ক”, “ব্যবহার-সমুচয়”, “শব্দানুশাসন”, “সমরাঙ্গণ-সূত্রধর”, “সরস্বতী-কণ্ঠাভরণ”, “নাম-মালিকা”, “যুক্তি-কল্পতরু”, ইত্যাদি।
তিনি ধারা শহরে “ভোজ-শালা” নামে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে
দূরদূরান্ত থেকে বিদ্যার্থীরা পড়তে আসতেন। পরবর্তী কালে মুসলিম রাজত্বের সময় এটিকে
মসজিদ বানিয়ে তোলা হয়েছিল। রাজা ভোজ শৈব ছিলেন, সমস্ত রাজ্য জুড়ে তিনি অজস্র সুন্দর
মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। আধুনিক ভূপালের দক্ষিণে নতুন ভোজপুর শহর নির্মাণ
করিয়েছিলেন।
রাজা ভোজের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন মালব নিয়ে
ছিনিমিনি খেলেছিলেন,
চালুক্য, কলচুরি
এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্যের রাজারা। অবশেষে মালব থেকে ১৩০৫ সি.ই.-তে পরমার
বংশের নাম মুছে দিলেন,
আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি আইন-উল-মুল্ক্।
৪.৭.৯ অনহিলওয়াড়ার চালুক্য (সোলাংকি) বংশ
অনহিলওয়াড়া বা অনহিল-পাটককে আধুনিক গুজরাটের পাটন
বলে চিহ্নিত করা হয়। চালুক্য বা সোলাঙ্কি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মূলরাজ। এই
চালুক্যদের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের চালুক্যদের (যাঁদের কথা পরের অধ্যায়ে আসবে) কোন
সম্পর্ক ছিল কিনা অথবা তাঁরাই সৌরাষ্ট্রর (কাথিয়াওয়াড়) চালুক্য গোষ্ঠী কিনা, সে কথা
নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে গুজরাটের লোককথা থেকে জানা যায়, মূলরাজের
পিতা ছিলেন, রাজি, কনৌজের এক
রাজকুমার কল্যাণকটকের পুত্র। এবং তাঁর মাতা ছিলেন চাবড় বা চাপোটক বংশের কন্যা, যাঁরা
চালুক্যদের আগে গুজরাটের ছোট কোন অঞ্চল শাসন করতেন। লোককথায় এমনও শোনা যায়, মূলরাজ তাঁর
মাতুলকে হত্যা করে, চাপোটকের
সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। এই ঘটনা মোটামুটি ৯৪১ সি.ই.-র। সিংহাসনে বসেই মূলরাজ
রাজ্য অধিকারে মন দিলেন। তিনি কচ্ছের লক্ষরাজাকে পরাজিত ও হত্যা করলেন।
সৌরাষ্ট্রের বামনস্থলীর (আধুনিক ওয়ানথালি) চূড়াসামা গোষ্ঠীর রাজা গ্রহরিপুকে বন্দী
করলেন। দক্ষিণ গুজরাটের লাট অঞ্চলের বারাপ্পা এবং শাকম্ভরীর চাহমান রাজা
বিগ্রহরাজকেও আক্রমণ করলেন। যতদূর জানা যায়, ৯৯৫-৯৬ সি.ই.-তে তাঁর মৃত্যু হয়।
চালুক্য বংশের পরবর্তী রাজা প্রথম ভীম, ইনি
মূলরাজার নাতি দুর্লভরাজের ভাইপো ছিলেন। তাঁর রাজত্বকাল মোটামুটি ১০২১ সি.ই. থেকে
১০৬৩ সি.ই. পর্যন্ত। প্রথম ভীমের রাজত্বকাল গজনির সুলতান মামুদের বীভৎস অভিযানের
জন্যে অবিস্মরণীয়। ১০২৫ সি.ই.-তে সুলতান মামুদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গুজরাটের
সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন। তিনি শুনেছিলেন, যুগ যুগ ধরে ওই মন্দিরে বিপুল সোনা, মণিরত্ন-সম্পদ
সঞ্চিত আছে। সুলতান মামুদ রাজস্থানের মরু অঞ্চল পেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছলেন
অনহিলওয়াড়ার সীমান্তে। রাজা প্রথম ভীম সুলতান মামুদের সেনাবাহিনী দেখে আতঙ্কিত হয়ে, কোন রকম
প্রতিরোধ না করে, পালিয়ে
গেলেন। সুলতান মামুদ বিনা বাধায়, সোমনাথ নগর, সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করলেন এবং নগরের
ব্রাহ্মণ ও সাধারণ মানুষ,
যাঁরা দুর্বল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের গণহত্যা করলেন। তারপর
মন্দিরের সমস্ত সম্পদ লুঠ করে, সোমনাথের মূর্তি ভেঙে গজনি ফিরে গেলেন। শোনা যায়, এই ভাঙা
মূর্তির টুকরো দিয়ে তিনি জামা-মসজিদের প্রবেশের সিঁড়ি বানিয়েছিলেন।
সুলতান মামুদ ফিরে যাওয়ার পর, প্রথম ভীম
আবার তাঁর রাজ্য এবং রাজধানীতে ফিরে এলেন। অনতিবিলম্বেই তিনি আবুর পরমার প্রশাসককে
পরাজিত করলেন, কিন্তু
পরমার ভোজের সেনাপতি কুলচন্দ্রের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কলচুরিরাজ
লক্ষ্মী-কর্ণের সঙ্গে জোট বেঁধে মালব রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি করেছিলেন। রাজা ভোজের
মৃত্যুর পর কলচুরিদের সঙ্গে প্রথম ভীমের সখ্যতা ভেঙে যায়, এবং প্রথম
ভীম লক্ষ্মী-কর্ণকে পরাজিত করেন। এই সুযোগেই মালবের পরমার রাজারা আবার স্বাধীন
রাজ্য হয়ে উঠেছিল।
প্রথম ভীমের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র কর্ণ
(১০৬৩-৯৩ সি.ই.)। তাঁর সময়ে পরমার রাজত্ব আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, কারণ পরমার
রাজা উদয়াদিত্য রাজা কর্ণকে পরাস্ত করেছিলেন। রাজা কর্ণ অজস্র মন্দির এবং সরোবর
নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং নিজের নামে নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে শহর এখন
আমেদাবাদ। রাজা কর্ণের পরবর্তী রাজা জয়সিংহ সিদ্ধরাজ, তাঁর
রাজত্বকাল ১০৯৩ সি.ই. থেকে ১১৪৩ সি.ই.। প্রথমদিকে তিনি নাবালক থাকায়, রাজ্য শাসন
করতেন তাঁর মাতা মিয়াংল্লা দেবী। জয়সিংহ ক্ষমতায় এসে নাদোলের (যোধপুর রাজ্য) চৌহান
এবং সৌরাষ্ট্রের চূড়াসামা রাজাকে পরাস্ত করে, দুটি রাজ্য অধিকার করেন। এরপর তিনি
পরমার রাজা নরবর্মন এবং যশোবর্মনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মালব জয় করে
“অবন্তীনাথ” উপাধি নিয়েছিলেন। জৈনগ্রন্থ “প্রবন্ধ চিন্তামণি” থেকে জানা যায়, রাজা জয়সিংহ
ত্রিপুরির কলচুরি রাজ এবং কাশীর রাজার সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করেছিলেন।
জয়সিংহ তাঁর পিতার মতোই অনেক মন্দির নির্মাণ
করিয়েছিলেন, তিনি
ধর্মসহিষ্ণু এবং শিক্ষা বিষয়েও উৎসাহী ছিলেন। তিনি হয়তো শৈব ছিলেন, কিন্তু জৈন
আচার্য হেমচন্দ্রকে রাজসভায় সম্মানের স্থান দিয়েছিলেন। জয়সিংহের কোন পুত্র না
থাকায়, তাঁর
দূর সম্পর্কের কোন আত্মীয়,
কুমারপাল সিংহাসন অধিকার করেন। শোনা যায়, তিনি সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ
করিয়েছিলেন। তিনি হয়তো প্রথমদিকে শৈব ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে আচার্য
হেমচন্দ্রের প্রভাবে জৈন হয়েছিলেন। সম্ভবতঃ এই কারণের তিনি তাঁর বিস্তীর্ণ রাজ্যে
পশুহত্যা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সময়ে আচার্য হেমচন্দ্র অজস্র জৈন গ্রন্থ এবং
ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। রাজা কুমারপালের মৃত্যু হয় ১১৭২ সি.ই.-র কিছু আগে।
তারপর রাজা হয়েছিলেন অজয়পাল।
এরপর গুজরাটের রাজাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা
যায় না, কিন্তু
১১৭৮ সি.ই.-তে দ্বিতীয় ভীম (বা ভোলা ভীম) রাজা হয়ে প্রায় ষাট বছর রাজত্ব করেছিলেন।
তাঁর সময়েই ঘুরের সুলতান গুজরাট আক্রমণ করেছিলেন, যদিও ভয়ংকর যুদ্ধের পর ঘুরের সুলতান
পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১১৯৭ সি.ই.তে কুতব-উদ-দিন অনহিলওয়াড়া জয় করে নিয়েছিলেন, কিন্তু
সম্ভবতঃ কুতব-উদ-দিন স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তবে এরপরে মালবের রাজা এবং
দেবগিরির যাদবদের আক্রমণে গুজরাটের চালুক্যরা বিশেষভাবে দুর্বল পড়েছিলেন। এই সময়ে
বাঘেলা পরিবার গুজরাটের ক্ষমতা অধিকার করল। এই বাঘেলা পরিবার, শোনা যায়, রাজা
কুমারপালের বোনের বংশধর। শোনা যায়, জনৈক লবণপ্রসাদ, রাজা ভোলা
ভীমের বাঘেলা সামন্তরাজা,
দক্ষিণ গুজরাটে স্বাধীন উঠেছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁরা সমগ্র গুজরাট অধিকার করে
নিয়েছিলেন।
১২৯৭ সি.ই.-তে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি যখন তাঁর
শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী দিয়ে দুই সেনাপতি উলুঘ খান এবং নসরত খানকে পাঠিয়েছিলেন, তখন বাঘেলা
রাজ করণ বা করণদেব রাজধানী ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিনের সেনাবাহিনী
এরপর গুজরাটের প্রধান শহরগুলি অধিকার করে নেওয়ার পর, গুজরাট থেকে হিন্দু শাসন মুছে গেল।
চলবে...