সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৪ 


২১ 

মারুলা আর ভল্লা রণপা নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে একটা নির্দিষ্ট বিশাল গাছে উঠে বসল। বিশাল এই মহানিম গাছের মস্ত মোটা একটা ডালে দুজনে মুখোমুখি বসল, পা ঝুলিয়ে, বেশ আরাম করে। তাদের পায়ের নীচে এবং মাথার ওপর ঘন পাতার ছাউনি। নীচ থেকে কেউ ওপরে তাকালেও সহজে তাদের কেউ খুঁজে পাবে না। তার ওপর মধ্যরাতের একটানা হাওয়ায় পাতায় পাতায় যে রকম ঝরঝর শব্দ হচ্ছে, তাতে গাছের তলা থেকে তাদের কোন কথাই, নীচের থেকে শুনতে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। গাছের ডালে রণপা জোড়া ঝুলিয়ে রেখে মারুলা বলল, “কী বলল, তোর কমলিমা?”

ভল্লা খুব চিন্তিত ও বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “খুবই খারাপ বার্তা রে মারু। যে কাজটা করতে আমার মন থেকে একটুও সায় নেই...সে কাজটাই এখন খুব শিগ্‌গির আমাকে করতে হবে অথবা কাউকে দিয়ে করাতে হবে”।

অবাক হয়ে মারুলা বলল, “কী কাজ? কী করতে হবে তোকে?”

ভল্লা উপরের দিকে তাকিয়ে ঝিলিমিলি পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশের দিকে চোখ রেখে  বলল, “যে কবিরাজের কথা তোকে তখন বলছিলাম না? সেই কবিরাজ। হতভাগা বুড়ো বড়ো বেশি বুঝে ফেলেছে। বুঝেছিস তো বুঝেছিস, সে বেশ কথা, নিজের মনে চুপ করে থাকলে কোন ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তা না, বুড়ো সেসব কথা লোককে বলেও বেড়াচ্ছে। গ্রামপ্রধান জুজাক জানে, জানে কমলিমা...হয়তো আরও অনেকে”।

মারুলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝে ফেলেছে?”

ভল্লা বলল, “আমি এ গাঁয়ে আসার পরেই, জানিস নিশ্চয়ই, ওই বুড়োই আমার চিকিৎসা করেছিল। শুনেছি, আমি যখন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম – সে সময়েই নাকি বুড়ো বলেছিল, এ ছোকরা, অর্থাৎ আমি, নাকি সাধারণ লোক নই। বলেছিল, বহুদূর থেকে আসা, ভয়ংকর অসুস্থ এই ছোকরা আমাদের গ্রামে যে আচমকা এসে পড়েছে – এমনটা হয়তো নয়। হয়তো এখানে আসার পিছনে বড়ো কোন পরিকল্পনা আছে”!

“বলিস কী? এ কথা শষ্পককে বলেছিলি?”

“না, বলিনি। আসলে সে সময় বুড়োর কথায় আমি কেন, গাঁয়ের কেউই তেমন কান দেয়নি। কিন্তু আজ জানতে পারলাম, বুড়ো অসাধারণ বুদ্ধি ধরে। জুজাককে সে বলেছে, গত রাত্রে নোনাপুর গাঁয়ের কেউই নাকি রামকথা শুনতে যায়নি। তার মানে, এই গাঁয়ের ছোকরারাই যে আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত – সে ইঙ্গিতও বুড়ো দিয়ে গেছে”।

“কী বলছিস? বুড়ো তো তার মানে সবটাই বুঝে গেছে”।

“হুঁ। সবটাই। আমার সঙ্গে রতিকান্তর রাজধানীতে ঘটা সেই ঘটনার দিন থেকে মাত্র তিনরাত-তিনদিনে, কীভাবে আমি নোনাপুর পৌঁছলাম, বুড়োর মনে সেটাও সন্দেহ জাগিয়েছে। কোন সুস্থ সবল মানুষের পক্ষেও ওই সময়ে এতটা পথ পায়ে হেঁটে আসা সম্ভব নয়। অতএব, আমি অধিকাংশ পথই যে ঘোড়ায় চড়ে বা রণপায়ে এসেছি...সেটা এই বুড়ো অনুমান করে নিয়েছে। নির্বাসনে যেতে সুবিধে হবে বলে, কোন প্রশাসন একজন অপরাধীকে ঘোড়া দিয়ে সাহায্য করে বল তো?”

“অর্থাৎ, তুই হয় অত্যন্ত ক্ষমতাশালী কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিস। অথবা তোকে রাষ্ট্রই পাঠিয়েছে অত্যন্ত গোপন কোন উদ্দেশে”।

“ঠিক তাই। বুড়োর মনে হচ্ছে দ্বিতীয়টা”।

“সর্বনাশ, এসব কথা পাঁচকান হলে, আমরা সকলেই  ফেঁসে যাবো রে...। তা, তুই এখন কী করতে চাইছিস?”

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “আগেই বললাম না, যে কাজটা করতে আমি চাইছি না - সেটাই খুব তাড়াতাড়ি করাতে হবে। কবিরাজবুড়োকে সরাতে হবে”। ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “নিজের গ্রাম, প্রতিবেশী গ্রামের মানুষজন এমনকি এই রাজ্যের সকলের ভালোর জন্যে সারাজীবন চিন্তা করে গেছে যে বুড়ো। অত্যন্ত বিদ্বান, বুদ্ধিমান কিন্তু বড্ডো সরল এবং একরোখা সেই বুড়োটা মরবার সময়েও বুঝতে পারবে না,  ঠিক কী অপরাধে ওর মৃত্যু হল…”। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ।  

মারুলা ভল্লার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ও ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দে ভল্লা। বুড়োর আয়ু ফুরিয়ে গিয়েছে, হয়তো আগামী দিনটাই তার শেষ...”।

নিজের কাঁধে রাখা মারুলার হাতটা ধরে ভল্লা বলল, “দেখিস আমার নাম যেন কোনমতেই সামনে না আসে”

“নিশ্চিন্ত থাক, ভল্লা। তোর নাম সামনে আসবে কেন?”

“প্রশাসনের হাতে বুড়োর মৃত্যু হলে - আমার কাজটা অবশ্য এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে যাবে”।

মারুলা ভল্লার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “তোর মতো তিলে খচ্চর আমি আর দুটি দেখিনি ভল্লা। একদিকে তুই বলছিস, বুড়োকে তুই বেজায় শ্রদ্ধা করিস। অন্যদিকে তুই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে দিলি। আবার আমাদের হাতে বুড়ো মরলে, গাঁয়ের ছেলেদের মনে যে ক্রোধ জমবে – সেটাকে ভাঙিয়ে তুই বিদ্রোহের আগুনটা আরও উস্কে নিবি। এই না হলে, তুই শালা ভল্লা?”।

ভল্লা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে বলল, “হ্যাঁ, রাজনীতি ব্যাপারটা আদতে খচ্চরদেরই সৃষ্টি। ভালো আর মন্দ, ঔদার্য আর তঞ্চকতা, সহমর্মীতা আর নিষ্ঠুরতাকে মনের মধ্যে পাশাপাশি বসিয়ে রাজনীতির চর্চা করতে হয়। তাঁর বিচক্ষণতার জন্যে রাষ্ট্রের অভিনব এই পরিকল্পনাটাই হয়তো ভেস্তে যাবে। অতএব মরতে তাঁকে হবেই। কবিরাজবুড়োর জন্যে আমি বাইরে শুধু লোক-দেখানে কাঁদব - তা নয়, মনে মনে সত্যিই কষ্ট পাবো। তবে মনে মনে একথা চিন্তা করেও সান্ত্বনা পাব যে, উনি নিজের জীবন দিয়ে আমার কাজটাকেই অনেক সহজ করে দিয়ে গেলেন। জীবনে বহুবার দেখেছি, প্রত্যেক অশুভ কাজের মধ্যেও মঙ্গল লুকিয়ে থাকে, বুঝেছিস মারুলা?” কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, ভল্লা নিজের আবেগটা সামলে নিল, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাগ্‌গে এবার ওদিকের সংবাদ বল? শষ্পকের নির্দেশ কী?

মারুলা বলল, “আস্থানে ডাকাতির সংবাদ শষ্পক রাজধানীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেক তেলমশলা মাখিয়ে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে। কিন্তু ডাকাতির কারণে উনি এখনই কোন গ্রামের ওপরে কোন পদক্ষেপ করতে চাইছেন না। বলছেন যে তাতে তোর নতুন চেলারা ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাবে”।

ভল্লা মাথা নাড়ল, “না, না আমার মনে হয় এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। আস্থানের রক্ষীদল গ্রামে এসে আমাকে পাগলের মতো খুঁজুক। সরাসরি ছেলেদের নয় – বয়স্কমানুষগুলোকে ভয় দেখাক, অপমান করুক। এক কথায় বেশ গভীর একটা সন্ত্রাসের আবহ পাকিয়ে তুলুক। বাবা-জ্যাঠার অপমান হলে গ্রামের ছেলেগুলো আরও তেতে উঠবে। শুধু এই গ্রামেই নয়, আশেপাশের গ্রামগুলোতেও। এর মধ্যেই তো কবিরাজের মৃত্যুটা হতে হবেকীভাবে সেটা তোরাই ঠিক করে নিস। আর গ্রামপ্রধান জুজাকেরও যেন ভালোরকম অপমান হয়। তবে না খেলা জমবে”।

মারুলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, ভল্লার কথা শেষ হলে বলল, “ঠিক আছে তাই বলবো। আর একটা কথা, শষ্পক বলেছেন চৈত্র মাসের পূর্ণিমাতে তিনি এদিকের আস্থান তুলে উত্তরের দিকে রওনা হবেন। তোর কথা মতো জায়গাতেই অস্থায়ী শিবির ফেলে পক্ষকাল বিশ্রাম নেবেন”।

“চৈত্রের পূর্ণিমা? গতকাল মাঘের পূর্ণিমা গেল। তার মানে মোটামুটি মাস দেড়েক। ঠিক আছে, কতদূর কী করা যায়, দেখি! আজ বিকেলেই পাশের রাজ্যের কিছু ছোকরা এসেছিল। তারাও তাদের রাজার বিরুদ্ধে লড়তে চায় এবং প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে চা। শষ্পককে জিজ্ঞাসা করিস, কোন অস্ত্রের কত মূল্য ধরা হবে, সেটা যেন তিনি নির্দেশ করে দেন। অথবা যে বণিক এই অস্ত্র-শস্ত্র বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছে সে যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়, তাহলে বাকিটা আমি বুঝে নেব

“আমার মনে হয় প্রতিবেশী রাজ্যের বিদ্রোহীদের অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রির নির্দেশ রাজধানী কখনোই দেবে না। প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক। তারা যদি জেনে যায়, তাদের রাজ্যের বিদ্রোহীদের আমরা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছি, তাতে দু রাজ্যের সম্পর্ক নষ্ট হবে। নষ্ট হবে বাণিজ্যিক সম্পর্কও”।

ভল্লা একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “না বুঝেই পোঁদপাকামি করিস না তো, মারুলা। আমাদের প্রশাসন ওদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিচ্ছে নাকি?  দিচ্ছি তো আমি! আমি কে? আমি এ রাজ্যের একজন বিদ্রোহী রাজরক্ষী। আমার অপরাধের জন্যে রাষ্ট্র আমাকে অনেক দিন আগেই নির্বাসন দণ্ড দিয়েছে। আমি রয়েছি আমার রাজ্য-সীমানার বাইরে।  আমি যদি কাউকে অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করি – রাষ্ট্রের দায় কোথায়?”

“তা হয়তো ঠিক। কিন্তু তুই অস্ত্র পাচ্ছিস কোথা থেকে? তোর তো আর নিজস্ব অস্ত্রের কারখানা নেই”!

মারুলার সরলতায় ভল্লা এবার হেসে ফেলল, বলল, “আমাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্রাগার থেকে পুরোন অস্ত্র-শস্ত্র বাতিল করে, বিশেষ কয়েকজন বণিককে বিক্রি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বণিক সেই অস্ত্র কিনে কী করবে - মাটির তলায় পুঁতে দেবে। নাকি নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। নাকি খেলনার মতো ভিন্ন রাজ্যের ছোকরাদের হাতে বেচে দেবে – সে তো বণিকদের মাথাব্যথা। তাতে রাষ্ট্রের কী করার আছে? আমি, জনৈক নির্বাসিত অপরাধী হলাম, একজন মাধ্যম – যার কাজ ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সম্পূর্ণ ব্যাপারটার মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়?”

মারুলা তাও ইতস্ততঃ করে বলল, “কী জানি আমার তাও মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা এতই সহজ? রাষ্ট্র এত সহজে দায় এড়াতে পারবে? আমাদের মন্ত্রী আর প্রশাসনিক কর্তারাই শুধু ধূর্ত – আর ও রাজ্যের প্রশাসন একেবারেই বোকাসোকা-ভোঁদাই এমন তো হতে পারে না।

“ছাড় না। আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে আমাদের কী প্রয়োজন? রাষ্ট্র কী করবে সেটা রাষ্ট্রকেই বুঝতে দে। আমাদের দায়িত্ব প্রশাসনের নির্দেশ মতো কাজ করা। ব্যস্‌। রাত্রি শেষ হতে আর হয়তো দণ্ড তিনেক বাকি আছে। তুই কেটে পড়। আমার সঙ্গে তোকে কেউ দেখে ফেললে, ভবিষ্যতে অসুবিধেয় পড়তে হবে।  শষ্পককে সব কথা জানাবি। বলবি, তাঁর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় আমি রইলাম”।

মারুলা গাছে থেকে নেমে আসার উদ্যোগ করতেই, ভল্লা বলল, “মারুলা, কবিরাজকে মেরে না ফেলে, আমাদের উচিৎ তাঁকে একটা সুযোগ দেওয়া, তাই না রে?”

মারুলা কিছু বলল না, ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল চুপ করে। ভল্লা বলল, “না মানে বলছিলাম, বুড়োকে কিছুটা মারধোর করে, আস্থানের বন্দীশালায় যদি ফেলে রাখা হয়। বিনা বিচারে। এখানে বিচার করবেই বা কে? বিচার তো হবে সেই রাজধানীতে। অতএব বিনা বিচারে দীর্ঘ দিন বন্দী। বুড়ো জব্দ হবে, কিন্তু প্রাণে তো বেঁচে থাকবে। কী বলিস?”  

মারুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভল্লাকে বলল, “ঠিক আছে, তাহলে শষ্পককে গিয়ে আমি তাই বলি?”

“কাজের সূত্রে আমি বহু মানুষের প্রাণ নিয়েছি, মারুলা। তারা কোনদিন আমার মনে দাগ কাটেনি। কিন্তু আমাদের হাতে ইনি মারা গেলে, আমার হাত থেকে ওঁর রক্তের দাগ কোনদিন মুছে উঠতে পারব না। হ্যাঁ শষ্পককে গিয়ে তাই বল, আপাততঃ বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাসই হোক ওঁনার ভবিষ্যৎ”।         

গাছ থেকে নেমে মারুলা রওনা হল আস্থানের দিকে। মারুলা নেমে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর ভল্লা রণপা জোড়া কাঁধে নিয়ে মাটিতে নামল। ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল তার বাসার দিকে। সে এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্বে তার মন এখন বিক্ষিপ্ত।

নির্দিষ্ট ঝোপের আড়ালে দুজোড়া রণপা আগে লুকিয়ে রেখে, নিজের বাসার সামনে এসে চমকে উঠল ভল্লা। রামালি! রামালি শুয়ে আছে, তার ঘরের সামনে মাটিতে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা।

চলবে...    


রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

মাফিয়া

 



এর আগের অণুগল্প - " বড়ো মাথা "


    ক্লাস নাইনের বাংলা ক্লাসে বরদাস্যার ছেলেদের শুধোলেন, “বড়ো হয়ে তোমরা কী হতে চাও?” ছেলেদের অধিকাংশ বলল, ডাক্তার হতে চাই, বিজ্ঞানী অথবা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা শিক্ষক হতে চাই। পিছনের বেঞ্চে বসা বিনোদকে তিনি পছন্দ করেন না, সে বলল “আমি মাফিয়া হতে চাই স্যার”। বিরক্ত হয়ে বরদাস্যার বললেন, “তুমি মাফিয়া মানে জানো?” বিনোদ খানিক মাথা-টাথা চুলকে বলল, “তা জানি না, স্যার। তবে এটুকু জানি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষকদের সরকার রীতিমতো হেনস্থা করে। কিন্তু মাফিয়াদের নিশ্চিত সুরক্ষা ও সম্মান দেয়”।    

--00--

শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৫ 


ষষ্ঠ পর্ব   


কাগজের নোট 

ভারত ইতিহাসে কাগজের নোট  

সাধারণ মানুষের হাতে সোনা, রূপোর মুদ্রা কটাই বা থাকত, দু-চারটে বড়ো জোর। কিন্তু অসুবিধে হত ধনী আর বড়ো বড়ো বণিকদের। যাদের সঞ্চয়ে প্রচুর সোনা-রূপোর মুদ্রা থাকত। সাধারণতঃ পঁচিশটা মুদ্রা নিয়ে সে সময় এক-একটা কাপড়ের বটুয়া হত। এরকম অনেকগুলি বটুয়া নিয়ে তীর্থ কিংবা বাণিজ্য করতে দেশ-দেশান্তরে যাওয়ায় একদিকে যেমন ঝামেলা ছিল তেমনি ছিল বিস্তর বিপদ। এগুলো ওজনে ভারি হত – আবার ভয় থাকত চুরি বা ডাকাতি হওয়ার। আজকের যুগে হ্যাকাররা যেমন আমাদের ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নিমেষে ফাঁকা করে দেয়, সে যুগেও দেশে দেশে ঠগী, ঠ্যাঙাড়ে বা কুখ্যাত ডাকাত দলের অভাব ছিল না। অতএব মুদ্রা ব্যবহারের এই বিপজ্জনক ঝক্কি এড়ানোর চিন্তাভাবনা ধনী-বণিকদের মাথায় সর্বদাই ছিল। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই মিলল মুদ্রার বিকল্প – কাগজের নোট। ব্যাপারটা কেমন একটু বুঝিয়ে বলি।

ধরা যাক সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্ত থেকে কোন বণিক পশ্চিমে গেল তার বাণিজ্যের পসরা নিয়ে। সেখানে নির্বিঘ্নে বিক্রিবাটা করে, সে প্রচুর অর্থ উপার্জন করল। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় তার দুশ্চিন্তা – এতগুলি সোনার মুদ্রা নিয়ে পথে যদি কোন বিপদ হয় – সে তো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে! সে তখন কী করল - পশ্চিম প্রদেশের কোন শেঠের কোষাগারে মোহরগুলি জমা করে – সেখান থেকে নিজের নামে একটি নির্দেশ বা প্রতিজ্ঞা পত্র লিখিয়ে নিল, অনেকটা এরকম “পূর্ব প্রদেশের অমুক শহরের অমুক বণিক আমাদের কাছে এত টাকা জমা করেছে, সে নিজের শহরে ফিরে, অমুক শেঠের কার্যালয়ে এই নির্দেশপত্র দেখালে, তাকে যেন সমপরিমাণ টাকা দিয়ে দেওয়া হয়”। ব্যস্‌, লিখিত সেই দলিল নিয়ে বণিক নিশ্চিন্তে নিজের শহরে ফিরে এল এবং পূর্ব প্রদেশের বিখ্যাত ওই নির্দিষ্ট শেঠের কাছে সেই নথি দেখিয়ে টাকাও পেয়ে গেল।

আমাদের দেশে কোন কোন সময় শক্তিশালী সাম্রাজ্যে, যেমন মৌর্য বা গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো সুশাসিত কঠোর প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে, বণিকদের বাণিজ্য করতে তেমন অসুবিধে হত না। কিন্তু ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত এই দেশের ক্ষুদ্র রাজারা নিজেদের মধ্যে লড়াই-যুদ্ধে এতই ব্যস্ত থাকত যে, তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা হত অত্যন্ত দুর্বল। অতএব নানান রাজ্যের বিচিত্র প্রশাসন সামলে বণিকদের বাণিজ্য করাটাই হয়ে উঠত যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ। এই বিঘ্ন এড়াতে দেশ জুড়ে এক নিবিড় বাণিজ্যিক অন্তর্জাল গড়ে তুলে এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী বা পুগা (পালি ভাষায় পুগার অর্থ সমিতি বা সমবায়) (guilds)এই বণিক-সংঘ বা সমবায়ের পক্ষ থেকেই প্রয়োজন বুঝে সংঘের নির্দিষ্ট প্রতীক বা মোহর (Stamp) সম্বলিত “প্রতিজ্ঞা পত্র” (promissory note) দেওয়া হত বিশেষ প্রার্থীকে। ভারতে এই ব্যবস্থা চালু ছিল আজ থেকে অন্ততঃ দেড়-দুহাজার বছর আগে থেকে।         

প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু ধনী শেঠের নাম পাওয়া যায়, যাদের পরিচিতি এবং খ্যাতি ছিল ভারতজোড়া। এর আগে দ্বিতীয় পর্বে বণিক অনাথপিণ্ডদের কথা বলেছি – এমন আরও অনেক বিখ্যত বণিকের নাম পাওয়া যায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মশাস্ত্রগুলিতে। আমাদের ঘরের কাছে মুর্শিদাবাদ শহরের এমনই একজন শেঠের নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনে থাকবে, মানিকচাঁদ - যাঁকে মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ার “জগৎ শেঠ” উপাধিতে সম্মানিত করেছিলেন। শেঠ (সংস্কৃত শ্রেষ্ঠী শব্দের চলিত রূপ) কথার অর্থ Banker এবং জগৎ শেঠ কথাটির অর্থ Banker of the World। সেই সময় এই জগৎ শেঠ পরিবারের সম্পদের পরিমাণ এতই বিপুল ছিল যে, তার প্রভাবে বাংলার সিংহাসন তো বটেই, এমনকি দিল্লির সিংহাসনও টলমল করত!    

সে যাই হোক, ভারতের বণিকমহলে এভাবে টাকার আদান-প্রদান করার ব্যবস্থা আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই প্রচলিত ছিল আগেই বলেছি। এই ব্যবস্থার চলতি নাম ছিল “হুণ্ডি” এবং “হাওয়ালা”। প্রাচীন ভারতের হুণ্ডির কোন নমুনা পাওয়া যায়নি, তবে ব্রিটিশ ভারতের একটি নমুনা থেকে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।  

British India

ব্রিটিশ ভারতে হুণ্ডির নমুনা 

এই ব্যবস্থায় উভয়পক্ষই – অর্থাৎ যে টাকা রেখে নথি লিখে দিচ্ছে এবং যে নথি নিয়ে টাকা ফেরত দিচ্ছে – জমা টাকার কিছু শতাংশ কেটে নিত – এই পরিষেবার ব্যয় হিসেবে। হাওয়ালা ব্যবস্থায় কাগজের নোট ছিল ঠিকই – কিন্তু আসলে এটি ছিল নির্দেশনামা এবং এটির প্রচলন ছিল খুব সীমিত ও পরিচিত বণিকমহলের মধ্যে – সাধারণের জন্য নয়। বলা বাহুল্য, এই নির্দেশনামার সঙ্গে রাজা, সম্রাট, কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না কোন দায়।

স্বাধীনতার পর, ভারতে হুণ্ডি এবং হাওয়ালার মাধ্যমে টাকার আদান-প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধরা পড়লে কঠিন শাস্তিরও বিধান আছে।

    চিনের ইতিহাসে কাগজের নোট   

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বিশ্বে প্রথম কাগজের নোট প্রচলন হয়েছিল চিনদেশে। সপ্তম শতাব্দীতে চিন তখন তাং সাম্রাজ্যের অধীন। যদিও আজকের টাকার নোট বলতে আমরা যা বুঝি, সেটির প্রচলন হয়েছিল আরও পরে, একাদশ শতাব্দীতে সোং সাম্রাজ্যের আমলে।

বিশ্বের প্রথম কাগজের নোট, জিয়াওজি, সোং সাম্রাজ্য, চিন

    ওপরের যে যে কারণের জন্যে ভারতীয় বণিকদের মধ্যে “হাওয়ালা” ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, বলাবাহুল্য চিনেও সেই একই কারণে কাগজের নোট চালু হয়েছিল। এই নোটগুলিও প্রকৃতপক্ষে ছিল জমা রাখা অর্থের বিনিময়ে, আমনাতকারীকে তার প্রয়োজনমতো অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাপত্র (Promissory Note)। চৈনিক ভাষায় এই নোটের নাম ছিল জিয়াওজি (jiaozi)। যদিও সোং রাজত্বে ধাতুমুদ্রা কখনোই বাতিল হয়ে যায়নি – জিয়াওজির পাশাপাশি মুদ্রারও বহুল প্রচলন ছিল। 

    কিছুদিনের মধ্যেই, ১১২০ সিই নাগাদ ধনী বণিকদের হাত থেকে রাষ্ট্র নিজেই এই ব্যবস্থা অধিগ্রহণ করে এবং সরকারিভাবে কাঠের ব্লকে ছাপা কাগজের টাকার প্রচলন শুরু করে দেয়। এক্ষেত্রেও এই নোটগুলি ছিল প্রকৃতপক্ষে জমা রাখা টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিজ্ঞাপত্রই – কিন্তু যেহেতু সম্রাট বা রাষ্ট্র ছিল এই নোটের দায়িত্বে – অতএব এর বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি - বলাই বাহুল্য।

চৈনিক ও মোঙ্গল ভাষায় লেখা একটি কাগজের নোট
 ও নোট ছাপানোর ব্লক 

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভেনিসের বিখ্যাত বণিক এবং অভিযাত্রী মার্কো পোলো ১২৭৮ থেকে ১২৯৫ – প্রায় সতের বছর চিনদেশে বাস করেছিলেন। সে সময় চিনের সম্রাট ছিলেন ইউয়ান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কুবলাই খাঁ – তাঁর রাজত্বকাল ১২৭১ থেকে ১২৯৪ সিই। কুবলাই খাঁ মার্কো ও তাঁর পরিবারকে এতটাই সম্মান করতেন, যে সাম্রাজ্যের অনেকগুলি প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।  

সেই সময়েই মার্কো ওদেশে প্রচলিত কাগজের নোটের সঙ্গে পরিচিত হন এবং এর সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।  সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগে এই কাগজের নোট প্রচলনের বিষয়টি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং ব্যবস্থাটি তাঁর খুব মনে ধরেছিল। পরবর্তীকালে দেশে ফিরে তিনি তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ভ্রমণ বৃত্তান্ত (The Travels of Marco Polo) লিখেছিলেন। বিখ্যাত সেই গ্রন্থে কাগজের নোট নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন এবং  সেখান থেকেই ইওরোপের মানুষ প্রথম কাগজের নোট সম্বন্ধে অবহিত হয়

প্রসঙ্গতঃ এই লেখার পঞ্চম পর্বে উল্লেখ করেছি মহম্মদ বিন তুঘলক চিনের এই অর্থ ব্যবস্থার অনুপ্রেরণায় ভারতেও মুদ্রার বিকল্প কিছু করার প্রচলন শুরু করেছিলেন – কিন্তু সে প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল।


ইওরোপের ব্যাংক নোট বা কাগজের টাকা

সতেরশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইওরোপের বাজারে প্রথম প্রাপ্তি-স্বীকার পত্র (receipts) চালু হয়েছিল। তার কারণ  সে সময় অন্যান্য পণ্যের তুলনায় সোনার অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল এবং যার ফলে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রাগুলির নতুন করে মূল্যমান নির্দিষ্ট করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে লণ্ডনের সুবর্ণবণিক সংঘগুলি (goldsmith-bankers), যে কোন ধনী ব্যক্তির জমা রাখা স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে প্রাপ্তি-স্বীকার পত্র দেওয়া শুরু করেছিল। এর ফলে, বণিক সংঘের সঙ্গে কোন সম্পর্কহীন ধনী ব্যক্তিও এই স্বীকার পত্রগুলি মুদ্রার বদলে ব্যবহার করতে পারত, কারণ এই পত্রগুলিতে লিখিত অর্থের পরিমাণ পাওনাদারকে দিতে সংঘগুলি দায়বদ্ধ ছিল।

এই নির্ধঞ্ঝাট প্রক্রিয়া যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ফলে, ধনবান ব্যক্তিরা ছোট-ছোট মূল্যের স্বীকার-পত্রের জন্যে দাবি তুলল। সহজ করে বললে, ধরা যাক মিঃ এ পাঁচ হাজার টাকার স্বর্ণ মুদ্রা জমা রেখে বলল, আমাকে সমমূল্যের একটিমাত্র স্বীকার-পত্র না দিয়ে, পঞ্চাশ টাকা মূল্যের একশটি স্বীকার-পত্র দেওয়া হোক। তাতে তার ছোট-বড়ো যে কোন ধরনের কেনাকাটা বা ব্যবসা বাণিজ্য করতে সুবিধে হবে। এবং এইখান থেকেই সূত্রপাত হল আধুনিক ব্যাংক-নোটের (Bank notes)।

এই ব্যবস্থাটা শুরু হয়েছিল সুবর্ণ-বণিক সংঘ এবং ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে – অর্থাৎ পুরোটাই ছিল বণিক-সভার সঙ্গে ধনীদের ব্যক্তিগত ব্যবস্থা – রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই ব্যাপারে কোন দায়িত্ব ছিল না। সরকারি ভাবে প্রথম ব্যাংক নোট চালু হয়েছিল ১৬৬১ সালে – সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – স্টকহোমস্‌ ব্যাংকো (Stockholms Banco) থেকে – পরবর্তী কালে যার নাম হয় ব্যাংক অফ সুইডেন (Bank of Sweden)।

 https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/7/7e/Sweden-Credityf-Zedels.jpg/220px-Sweden-Credityf-Zedels.jpg  

 যদিও ব্যাংকের অবিমৃষ্যকারীতায় এই ব্যবস্থা বেশিদিন চলতে পারেনি। কেন চলতে পারেনি সে কথাটা জানলে,  তখনকার দিনে ইওরোপের ব্যাংকগুলি (পরবর্তী কালে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের ব্যাংকগুলিও) কেন বার বার দেউলিয়া (Bankrupt) হয়ে যেত, তার প্রধান কয়েকটি কারণ বোঝা যাবে।

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই ইওরোপে তামার দাম দ্রুত হারে কমতে থাকে। তার জন্যে সোনা ও রূপোর মুদ্রার প্রেক্ষীতে তামার মুদ্রার মূল্যমান সমানুপাতিক রাখতে তামার মুদ্রার ওজন বার বার বাড়াতে হচ্ছিল। উদাহরণে ধরা যাক আজকে একটি তামার মুদ্রা দিয়ে দশ কেজি চাল কেনা যাচ্ছে – চালের দাম বৃদ্ধি না পেলেও – কয়েকমাস পরে দশ কেজি চাল কিনতে – পাঁচটি তামার মুদ্রা অথবা আগের তুলনায় পাঁচগুণ ভারি একটি তামার মুদ্রা দিতে হচ্ছে। কারণ ততদিনে তামার দাম অনেকটাই কমে গেছে । এই পরিস্থিতি সামল দিতেই ব্যাংক নোট ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।

এই ব্যাংক নোট ছাপানোর ক্ষেত্রেও একটা নিয়ম আছে, সে নিয়মটা খুব জটিল। খুব সহজ করে বলি, ধরা যাক কোন ব্যাংকের কাছে দশ লাখ টাকা মূল্যের সোনা বা রূপো জমা আছে। ব্যাংকটি জমা মূল্যের সমানসমান ব্যাংক নোট ছাপিয়ে, জনগণের প্রয়োজনমতো যদি বিলি করে, সেক্ষেত্রে ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু তা না করে, ব্যাংকগুলি – জমা-মূল্যের দু-গুণ বা তিনগুণ মূল্যের ব্যাংক-নোট ছেপে জনগণকে বিলি করে থাকে। তার কারণ ব্যাংকিং পণ্ডিতদের তত্ত্ব হল – তিরিশ লাখ টাকার ব্যাংক-নোট কয়েকমাস ধরে যদি দশ-পনের হাজার লোকের মধ্যে বিলি করা যায় – জনগণের কেনাকাটা করার ক্ষমতা বাড়বে, তাতে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। সেই তত্ত্বে এটাও ধরে নেওয়া হয় – সকল জনগণ একই দিনে বা একই সপ্তাহে তাদের জমারাখা সব টাকা ব্যাংক থেকে তুলতে আসবে না।  

এ গেল একটা দিক। আরেকটা দিক হল, ওই গচ্ছিত দশ লাখ টাকা থেকেই, ব্যাংক বেশ কিছু বণিক-ব্যবসাদারকে কিছু টাকা (ধরা যাক পাঁচ লাখ) নির্দিষ্ট সময়-সীমায় ঋণ দিল – বার্ষিক ১৫% বা ২০% সুদে। তত্ত্ব বলছে – ঠিকঠাক সময়ে ওই টাকার পুরোটাই ব্যাংকে ফিরে আসবে, উপরন্তু সুদ থেকে ব্যাংকের বেশ কিছুটা  উপার্জনও হবে।

কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাস্তবে তেমনটা হয় না। বহু ঋণ আদায় হয় না, ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে বহু বণিক দেউলিয়া হয়ে যায় এবং ঋণ ফেরত দেওয়ার অবস্থাতেই থাকে না। উপরন্তু দেশে কোন বড়ো বিপদ উপস্থিত হলে, যেমন যুদ্ধ, ভয়ংকর দুর্যোগ, এমনকি বড়োসড়ো কোন উৎসবের মরশুমে জনগণের মধ্যে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। ঠিক এরকম সময়েই গচ্ছিত মূলধনের তুলনায়, বহুগুণ বেশি ব্যাংক নোট বিলি করা ব্যাংকগুলি দেউলিয়া হয়ে পড়ে – ব্যর্থ হয় জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করতে।

এই ধরনের ঘটনা সারা বিশ্বের বহু দেশেই বারবার ঘটেছে – এবং গত আড়াইশ-তিনশ বছরে কয়েকশ ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে – কিন্তু তাই বলে ব্যাংকিং পরিষেবা বন্ধ হয়নি, বরং আধুনিক সমাজ জীবনে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বহুগুণ।

এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক।

সামাজিক এবং আইনসিদ্ধ ঐক্যমত্যর ওপর আধুনিক ব্যাংক নোট বা টাকার মূল্যমান সম্পূর্ণ নির্ভর করে। অর্থাৎ সামাজিক মুক্ত বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং চাহিদার সঙ্গে স্বর্ণ-মুদ্রার মূল্যমান সম্পূর্ণ নির্ভর করে, সোনার ধাতব গুণাগুণের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক থাকে না। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে এই ধারণা থেকেই বাজারে প্রয়োজনীয় ব্যাংকনোট প্রচলন শুরু হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলেন, “টাকা হল একটি কাল্পনিক মূল্যমান যুক্ত কাগজের টুকরো, বিনিময়-প্রথার সুবিধার্থে যার মূল্য নির্ধারিত হয় আইনি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী”।

১৬৯৪ সালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের টাকা যোগাড় করার জন্যে ইংরেজরা ব্যাংক অফ ইংল্যাণ্ড (Bank of England) গড়ে তোলে এবং ১৬৯৫ সালে এই ব্যাংক থেকে কাগজের নোট ছাড়া শুরু হয় – যার ওপর ব্যাংকের পক্ষ থেকে ছেপে দেওয়া হত “I promise to pay the bearer the value of the note on demand” -  “নোট-বাহকের দাবি অনুযায়ী এই নোটের মূল্য প্রদান করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ”। এইভাবেই অনেক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইওরোপের ব্যাংক নোটের প্রচলন শুরু হল। 

চলবে...

কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দ্বাদশ পর্বাংশ 


৪.৬ সম্রাট হর্ষ পরবর্তী উত্তর ভারত

এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী অধ্যায়গুলি পড়তে বিরক্তি আসতেই পারে। যাঁরা ইতিহাস নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন কিংবা ঐতিহাসিক হয়েছেন, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু এত রাজবংশ, রাজাদের নাম এবং তাঁদের অজস্র সালতামামি মনে রাখার ভয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলজীবনে ইতিহাস বই ছুঁলেই দু চোখ জড়িয়ে আসত গভীর ঘুমে। তা সত্ত্বেও, ইতিহাস-বিরক্ত সাধারণ পাঠকদের জন্যে খুব সংক্ষেপে এই পর্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করবলক্ষ্য রাখুন, ৬৪৭ সি.ই.-তে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত – দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছ-শো বছরের ভারতীয় রাজনীতির পরিস্থিতির দিকে। সে সময় আমাদের এই ভারতবর্ষ কতগুলি টুকরো ছিল। এবং সেই টুকরোগুলির অধিকার নিয়ে কতগুলি রাজবংশ সৃষ্টি হয়েছে, আর কতগুলি ধ্বংস হয়েছে। প্রত্যেকটি টুকরো রাজ্য কীভাবে প্রতি নিয়ত ব্যস্ত ছিল লাগাতার যুদ্ধে। শুধু সেইটুকুই লক্ষ্য রাখুন।

তা নাহলে কী করে বুঝবেন, আমাদের আধুনিক ভারতবর্ষের চেহারাটা কেন এমন হল? উত্তরভারতের সঙ্গে কেন বনে না দক্ষিণভারতের? বঙ্গ–বিহার-উড়িষ্যার মতো প্রতিবেশী রাজ্যবাসীদের মনে কেন সুপ্ত হয়ে রয়েছে বিদ্বেষ? একটু ফুলকির স্পর্শেই কেন ঘটে যায় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাসমূহ? আমরা যতই আশ্চর্য ও অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিময় যুগে জীবনযাপন করি না কেন, আমাদের মানসিকতার সিংহভাগ পড়ে আছে সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর আশেপাশেই!    

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে” - কবিগুরু যখন এই কথাগুলি লিখেছিলেন, তখন কি তিনি ভারতের এই ইতিহাস জানতেন না? আমি নিশ্চিত, অন্ততঃ আমার থেকে সহস্রগুণ ভালোভাবে জানতেন। তবুও তিনি লিখেছিলেন, হতে পারে, তার একটিই কারণ – ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সাধারণ ভারতীয়দের ঐক্য দেখে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন ভারত বুঝি বা এমনই থাকবে। কিন্তু কই, আমরা তেমন তো রইলাম না? কিন্তু কেন থাকতে পারলাম না? এই সাড়ে ছ-শ বছরের রাজতন্ত্র এবং প্রশাসনিক উচ্চমহলের আত্মক্ষয়ী নির্বোধ অহংকার ও বিবেকহীন দুর্নীতি আমাদের জীবন এবং ভাবনা- চিন্তায় যে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, সেই অভিশাপই যে আমরা আজও বহন করে চলেছি। 

 

৪.৬.১ উত্তরভারতের কনৌজ

আলোচ্য সময়ে উত্তর ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য ছিল কনৌজ – তার রাজধানী কান্যকুব্জ বা কনৌজ শহরের আধুনিক অবস্থান – আধুনিক উত্তরপ্রদেশের প্রায় মধ্যস্থলে। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার কোন কোন সময়ে, দক্ষিণে নর্মদা নদীর উত্তর তীর, পশ্চিমে গুজরাট-সৌরাষ্ট্রের অধিকাংশ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের বেশ কিছু অংশ, উত্তরে কাশ্মীরের কিছুটা এবং নেপালের অধিকাংশ, আর পূর্বে বঙ্গ সাম্রাজ্যের সীমানা

আমরা আগেই দেখেছি কনৌজ সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সম্রাট হর্ষবর্ধন। অতএব তাঁর মৃত্যুর পর দক্ষ ও পরাক্রমী সম্রাটের অভাবে কনৌজকে বারবার প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। এই দুই প্রতিবেশী সাম্রাজ্য হল দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট ও পূর্বের পাল রাজারা।

প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কনৌজ অধিকারের পিছনে রাজনৈতিক অনেকগুলি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধানতম ছিল, পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে সহজ বাণিজ্যপথগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। পাশের মানচিত্রটি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, পূর্ব এবং দক্ষিণের থেকে পশ্চিমের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থলপথটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কনৌজ সাম্রাজ্যের হাতেউপরন্তু, সমগ্র উত্তরভারতের বৈদেশিক নৌবাণিজ্যের প্রধান সমুদ্র বন্দর - গুজরাটের বন্দর শহরগুলিও ছিল কনৌজের আয়ত্ত্বেঅতএব প্রতিবেশী দুই শক্তির স্বপ্ন ছিল কনৌজ সাম্রাজ্য অধিকার করে উত্তরভারতে তাদের সম্পূর্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এই তিন সাম্রাজ্যের অধিপতিদের মধ্যে কেউই এমন কিছু (মৌর্য বা গুপ্ত রাজাদের মতো) প্রতিভাধর পরাক্রমী কিংবা সুদক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, যাতে করে তাঁদের স্বপ্নপূরণ ঘটতে পারত। বরং প্রায় ২৫০ বছর ধরে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করে, একটানা খুব জোর দু-তিন দশকের জন্য কনৌজকে নিজেদের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। তার ফলে তিনটি সাম্রাজ্যই দুর্বল হতে হতে, নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং পরবর্তীকালে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল।  

ওপরের মানচিত্রে দেখানো তিনটি সাম্রাজ্য যেমন নিজেদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে থাকতেন, পরবর্তী কালে টুকরো রাজ্যগুলির রাজবংশসমূহও সেই পরম্পরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছিলেন, মোটামুটি ১৩০০ সিই পর্যন্ত। সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করা যাক। 

সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করব, কিন্তু সব রাজ্য বা রাজার প্রসঙ্গ আনব না – কারণ সে ইতিহাস লিখতে গেলে এই গ্রন্থের আয়তন হয়ে উঠবে মহাভারত-তুল্য। তার থেকে সমসাময়িক ভারতের মুখ্য অঞ্চলগুলি ধরে সেখানকার রাজবংশের কীর্তির কথা সংক্ষেপে বলব – এবং দেখাতে চেষ্টা করব নিজেদের চরণযুগলে কীভাবে তাঁরা কুড়ুল মেরেছিলেন – আগ্রাসী ইসলামিক আক্রমণের সময়।     

 ৪.৭ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি (৬৪৭-১৩০০ সিই)

৪.৭.১ কনৌজ

৪.৭.১.১ রাজা যশোবর্মন

৬৪৭ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে রাজা হর্ষের মৃত্যুর পর প্রায় পঁচাত্তর বছর কনৌজের ইতিহাস তেমন কিছু জানা যায় না। তারপরে মোটামুটি ৭২৫ – ৭৫২ সি.ই. পর্যন্ত যশোবর্মন কনৌজের রাজা ছিলেন। যথারীতি তাঁর বংশ পরিচয় স্পষ্টভাবে জানা যায় না, অনেকে মনে করেন, তিনি মৌখরি বংশের রাজা। তাঁর সময়ে কাশ্মীরের রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় এবং চীনের এক লেখা থেকে জানা যায় রাজা যশোবর্মন মধ্যভারতের রাজা ছিলেন এবং চীনের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন।

যশোবর্মনের রাজ্য বিস্তারে, তিনি যে মগধের রাজা “মগহনাহ”কে পরাজিত করেছিলেন এবং বঙ্গের অনেকটা জয় করেছিলেন, সে বিষয়ে হয়তো সন্দেহ নেই। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য ৭৩৩ সি.ই.তে তাঁর কাশ্মীর জয়ের আশা পূর্ণ হতে দেননি। এই রাজা যশোবর্মনেরই সমসাময়িক ছিলেন, কবি ভবভূতি, যাঁর কথা আগেই বলেছি, তাঁর সভায় আরেক কবির নাম পাওয়া যায়, “বাকপতি”, তাঁর গ্রন্থের নাম “গৌড়ারোহ”। যশোবর্মনের পরে তাঁর উত্তরসূরি আরও তিনজন রাজা হয়েছিলেন, তবে তাঁরা সকলেই ছিলেন গুরুত্বহীন অস্পষ্ট - প্রায় কিছুই জানা যায় না।

৪.৭.১.২ আয়ুধ রাজবংশ

এই বংশের তিনজন রাজা কয়েক বছরের জন্য রাজত্ব করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম রাজার নাম ছিল বজ্রায়ুধ। তাঁর রাজত্বকালের শুরু হয়তো ৭৭০ সি.ই.-তে। তিনি হয়তো কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্যকে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন কিন্তু পরে কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড় বিনয়াদিত্যের (৭৭৯-৮১০সি.ই.) হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন ইন্দ্রায়ুধ এবং তাঁর সমসাময়িক কালেই বঙ্গের পাল রাজাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রকূট বংশের ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৪ সি.ই.) গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজা ধর্মপালের কাছে ইন্দ্রায়ুধ পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর পুত্র চক্রায়ুধকেই রাজা ধর্মপাল কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রথম অমোঘবর্ষ*-এর শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুবর পুত্র তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৪-৮১৪ সি.ই.), ধর্মপাল এবং চক্রায়ুধ দুজনকেই রাষ্ট্রকূট রাজাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলা গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল করে তুলেছিল এবং সেই সুযোগে প্রতিহার বংশের দ্বিতীয় নাগভট্ট চক্রায়ুধকে পরাস্ত করে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন।

[*অমোঘবর্ষ ছিলেন রাষ্ট্রকূট সম্রাট - যাঁর কথা পরে দক্ষিণ ভারত প্রসঙ্গে আসবে।]

৪.৭.১.৩ গুর্জর-প্রতিহার

রজোরার (আলোয়ার) শিলালিপিতে প্রতিহারদের “গুর্জর-প্রতিহারানবায়” অর্থাৎ গুর্জরদের এক শাখা গোষ্ঠী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গুর্জররা ছিলেন, মধ্য এশিয়ার এক উপজাতি, যাঁরা গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর, হুণদের কিছু পরেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।

প্রতিহারদের প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া যায় মধ্য রাজস্থানের মান্দোর (যোধপুরের কাছে) অঞ্চলে এবং রাজত্ব করতেন হরিচন্দ্র। তাঁদের একটি শাখা দক্ষিণে এগিয়ে উজ্জয়িনী অধিকার করেছিলেন। প্রতিহারদের এই শাখার রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, নাগাবালোক অথবা প্রথম নাগভট, শোনা যায় তিনি শক্তিশালী ম্লেচ্ছদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং ভারুকচ্ছ (ভারুচ) পর্যন্ত নিজের আয়ত্তে এনেছিলেন। এই ম্লেচ্ছ সম্ভবতঃ আরবের যোদ্ধা কোন উপজাতি। প্রথম নাগভটের পরবর্তী দুই রাজা গুরুত্বহীন কিন্তু তাঁদের পরবর্তী বৎসরাজা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মধ্য রাজস্থানের ভান্ডি বা ভাট্টি উপজাতিদের পরাস্ত করেছিলেন, প্রায় সম্পূর্ণ রাজপুতানা অধিকারে এনেছিলেন। তিনি গৌড়ের রাজা ধর্মপালকেও পরাজিত করেছিলেন। যদিও এর কিছুদিন পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব তাঁকে উৎখাত করে দেন এবং শোনা যায় তিনি মরু অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বৎসরাজার পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় নাগভট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। তিনি পিতৃরাজ্য আবার অধিকারের জন্যে খুবই চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের কাছে চূড়ান্ত পরাজিত হয়েছিলেন এবং দুর্বল কনৌজ অধিকার করেছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দর ৮১৪ সি.ই.-তে মৃত্যু হওয়াতে দ্বিতীয় নাগভট কিছুটা স্বস্তি পেলেও, গৌড়ের রাজা ধর্মপাল এইসময় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি ভয়ংকর লড়ে মুদ্‌গগিরি (মুঙ্গের) জয় করেন এবং পরবর্তী কালে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলে অন্ধ্র, সিন্ধু, বিদর্ভ এবং কলিঙ্গের রাজারা তাঁর সঙ্গে মৈত্রী করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গোয়ালিয়র শিলালিপি থেকে জানা যায়, এরপর দ্বিতীয় নাগভট একে একে আনর্ত্ত (উত্তর কাথিয়াবাড়), মালব (মধ্য ভারত), মৎস (পূর্ব রাজপুতানা), কিরাত (হিমালয় অঞ্চলে), তুরুস্ক ( পশ্চিম ভারতের আরবি সম্প্রদায়) এবং বৎস রাজাদের অধীন কোশাম্বি (উত্তরপ্রদেশের একটি জেলা) জয় করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় নাগভটের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র রামভদ্র, তিনি খুবই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যে নানান বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছিল। তাঁর পুত্র মিহির ভোজ(৮৩৬-৮৫ সি.ই.) সিংহাসনে বসেই কঠোর হাতে সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন এবং মধ্যদেশের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। প্রথমেই তিনি পূর্বদিকে বঙ্গ ও গৌড় জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গের তৎকালীন রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, পূর্বের আশা ছেড়ে দক্ষিণে মন দিলেন। তিনি নর্মদা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করতে পারলেও রাষ্ট্রকূটরাজ দ্বিতীয় ধ্রুব ধারাবর্ষের কাছে পরাস্ত হলেন, হয়তো ৮৬৭ সি.ই.-তে। যদিও তাঁর বিভিন্ন প্রত্ন-নিদর্শন থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর রাজ্য পশ্চিমে পেহোয়া (কারনাল) এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। একজন আরবি ভ্রমণকারী, সুলেইমানের ৮৫১ সি.ই.-র লেখা থেকে জানা যায়, ভোজ একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর সমৃদ্ধ রাজত্ব ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং রাজ্যে কোথাও চুরি-ডাকাতির ঘটনা ছিল না। তবে তিনি “আরবিদের পছন্দ করতেন না” এবং “মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন”।

মিহিরভোজের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র প্রথম মহেন্দ্রপাল (৮৮৫-৯১০ এ.ডি)। তিনি পূর্বদিকে মগধ এবং উত্তরবঙ্গ অধিকার করলেও, তাঁর সাম্রাজ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রথম মহেন্দ্রপাল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন রাজশেখর, তাঁর গ্রন্থগুলির নাম “কর্পূরমঞ্জরী”, “বাল-রামায়ণ”, “বালভারত”, “কাব্যমীমাংসা” ইত্যাদি। প্রথম মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে কিছুটা বিবাদ হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ সিংহাসনে বসেছিলেন মহীপাল (৯১২ – ৪৪ সি.ই.)। মহীপাল রাজা হওয়ার পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের ভয়ংকর আক্রমণে কনৌজ এবং পূর্বদিকের রাজ্যগুলিও প্রতিহারদের হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রকূটরা ফিরে যাওয়ার পর, প্রতিহারদের দুর্বলতার সুযোগে, বঙ্গের পাল রাজারা ৯১৬-১৭ সি.ই.-তে তাঁদের অধিকৃত রাজ্যগুলির অনেকটাই জয় করতে পেরেছিলেন।

মহীপালের পরে রাজা হয়েছিলেন দেবপাল, তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ৯৪৮ সি.ই.-র কিছুদিন আগেই, কিন্তু তাঁর দুর্বলতার সুযোগে, প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল চান্দেলরা এবং প্রতিহার সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল। প্রতিহার বংশের পরবর্তী রাজা বিজয়পালের সময়ে, প্রতিহার সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেল, যেমন, যোজকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল, অনহিলওয়াড়ার (পাতান, গুজরাট) চালুক্য, গোয়ালিয়রের কচপঘাত, দাহলের চেদি, মালবের পরমার, দক্ষিণ রাজপুতানার গুহিল এবং শাকম্ভরির (রাজস্থান) চাহমানরা। যাই হোক, দশম শতাব্দীর শেষ দশকে পরবর্তী রাজা রাজ্যপাল যখন সিংহাসনে বসলেন, প্রতিহার সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তাচলে। এই সময়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মুসলিম রাজ্য থেকে ভারতজয়ের অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাজ্যপাল উদ্‌ভাণ্ডপুরের (ভাটিণ্ডা) শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৯১ সি.ই.তে সুলতান সবুক্তিগিন এবং ১০০৮ সি.ই.-তে জয়পালের পুত্র আনন্দপালের সঙ্গে সুলতান মামুদকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই যৌথ প্রচেষ্টা দুবারই ব্যর্থ হয়েছিল, এবং ১০১৮ সি.ই.তে রাজ্যপাল গঙ্গা পার হয়ে বারিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরেও ১০৩৬ সি.ই. পর্যন্ত প্রতিহার রাজাদের কথা শোনা যায়, শেষ রাজার নাম ছিল যশপাল।

৪.৭.১.৪ গাড়োয়াল

গাড়োয়াল রাজাদের বংশপরিচয় জানা যায় না। তবে ১০৮০ বা ১০৮৫ সি.ই.-র মধ্যে কোন এক সময় গাড়োয়াল বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রদেব, কোন এক গোষ্ঠী প্রধান গোপালকে পরাস্ত করে, কনৌজ অধিকার করেছিলেন। চন্দ্রদেবের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি কাশী, উত্তর কোশল (ফৈজাবাদ জেলা), কুশিকা (কনৌজ) এবং ইন্দ্রপ্রস্থ (দিল্লি)-র রক্ষাকর্তা। চন্দ্রদেব সম্ভবতঃ ১১০০ সি.ই.তে মারা যান। চন্দ্রদেবের পর রাজা হন মদনপাল, তারপর ১১১৪ সি.ই.-তে রাজা হন মদনপালের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র। রাজা হওয়ার আগেই যখন তিনি যুবরাজ ছিলেন ১১০৯ সি.ই.-তে, মুসলিম রাজা তৃতীয় মাসুদের (১০৯৮-১১১৫ এ.ডি) সেনাপতি হাজিব তুঘাতিগিনের অভিযান প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। রাজা হবার পর তিনি বঙ্গের দুর্বল পালরাজাদের থেকে মগধ এবং মুঙ্গের অধিকার করে নিয়েছিলেন, আরও জয় করেছিলেন মালবের পূর্বাংশ। এছাড়া কাশ্মীরের জয়সিংহ (১১২৮-৪৯ সি.ই.), গুজরাটের সিদ্ধারাজ জয়সিংহ (১০৯৫ -১১৪৩ সি.ই.) এবং সম্ভবতঃ দক্ষিণের চোলদের সঙ্গেও তাঁর মৈত্রী সম্পর্ক ছিল।

গোবিন্দচন্দ্রের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিজয়চন্দ্র ১১৫৪ সি.ই.-তে। সেসময় গজনির আলাউদ্দিন ঘোরির কাছে পরাস্ত হয়ে লাহোর অধিকার করেছিলেন আমির খুসরু*। বিজয়চন্দ্রকে এই আমির খুসরু বা তাঁর পুত্র খুসরু মালিকের ভারত অভিযান প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। বিজয়চন্দ্রের সময় চাহমান (চৌহান) এবং চান্দেলরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলে এবং সম্ভবতঃ তাঁর রাজত্ব থেকে দিল্লি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

[*এই আমির খুসরু কিন্তু বিখ্যাত সুফি কবি ও গায়ক আমির খুসরু (১২৫৩-১৩২৫) নন।] 

বিজয়চন্দ্রের পুত্র জয়চন্দ্র রাজা হয়েছিলেন, ১১৭০ সি.ই.-তে। তাঁর রাজত্বকালের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরির ভারত আক্রমণ। ১১৯১ সি.ই.-তে চাহমান বা চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ সুলতান ঘোরিকে তারৌরির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ে সুলতান ঘোরি এতই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, পরের বছর ফিরে এসে তিনি রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করেন। এই ঘটনায় জয়চন্দ্র সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং কিছুটা স্বস্তিও পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, সুলতান ঘোরি যুদ্ধজয়ের পর স্বদেশে ফিরে যাবেন এবং পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর ফলে উত্তর ভারতে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি হবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি, কারণ ১১৯৪ সি.ই.-তে সুলতান সিহাবুদ্দিন কনৌজ আক্রমণ করেন এবং চন্দোয়ার ও এটাওয়ার যুদ্ধে জয়চন্দ্র পরাজিত এবং নিহত হন। যদিও সুলতান সিহাবুদ্দিন জয়চন্দ্রের পুত্র হরিশচন্দ্রকে কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর মোটামুটি ১২২৬ সি.ই.-তে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অধিকারে চলে গিয়েছিল।

৪.৭.১.৫ চাহমান বা চৌহান

চাহমান বা চৌহানরাও সম্ভবতঃ মধ্য এশিয়ার কোন উপজাতি এবং অগ্নির উপাসক বা অগ্নিবংশ বলে পরিচিত ছিলেন। অগ্নির পবিত্রতায় তাঁরা ভারতীয় সমাজে খুবই সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের বেশ কয়েকটি শাখা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সাকম্ভরি বা সাম্ভর গোষ্ঠী। তাঁদের কথা প্রথম জানা যায়, ৯৭৩ সি.ই.-র শিলালিপি থেকে এবং তাঁদের রাজা প্রথম গুবক, প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভটের সমসাময়িক ছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই বংশের রাজা অজয়রাজ, রাজস্থানে অজয়মেরু নামে এক নগরের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের আজমির। আরেকজন রাজার নাম জানা যায় চতুর্থ বিগ্রহরাজ বিশালদেব (১১৫৩-৬৪ সি.ই.), তিনি নাকি দিল্লি জয় করেছিলেন এবং গাড়োয়াল রাজ বিজয়চন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন। এই বংশের সব থেকে বিখ্যাত রাজা তৃতীয় পৃথ্বীরাজ (১১৭৯-৯২ সি.ই.), যাঁকে মুসলিম ঐতিহাসিকরা রাই পিথৌরা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক নায়কোচিত কাহিনি শোনা যায়। সমসাময়িক কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। রাজা জয়চন্দ্র নিজের কন্যা সংযুক্তা বা সংযোগিতার বিবাহের জন্যে যে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে রাজা পৃথ্বীরাজকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। কিন্তু পৃথ্বীরাজ সভার মাঝখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে বীরের মতো সংযুক্তাকে হরণ করেছিলেন, শোনা যায় কন্যা সংযুক্তারও এতে সম্মতি ছিল, তিনি রাজা পৃথ্বীরাজের গুণমুগ্ধা ছিলেন। এই পৃথ্বীরাজ চান্দেল রাজ পরমারদি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.)-কে পরাস্ত করে বুন্দেলখণ্ড জয় করেছিলেন এবং গুজরাটের চালুক্যরাজ দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গেও তাঁর যুদ্ধ বেধেছিল।  তাঁর শেষ পরিণতি এবং মৃত্যুর কথা আগেই বলেছি।

এভাবেই কনৌজ অঞ্চলে শুরু হল মুসলিম শাসকের আধিপত্য। 

চলবে... 

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...