ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৫ "]
পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৬
৫.২.২ মহাভারতের ধর্ম এবং ধর্মবিশ্বাস
বাস্তবিক আমাদের হিন্দুদের এমন কোন বিষয় – সমাজনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি ও দর্শন, সংস্কৃতি, ধর্ম বিশ্বাস এবং মানব
চরিত্রের যাবতীয় প্রবৃত্তি - প্রেম, ঘৃণা, সারল্য, ক্রূরতা, নৃশংসতা, অহিংসতা, বিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা – নেই, যা মহাভারতে নেই। এছাড়া আরও বেশি
গুরুত্বপূর্ণ হল, একমাত্র
মহাভারতেই ভারতীয় সমাজের প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে গুপ্ত রাজত্বের সমসাময়িক
কালের হিন্দু যুগ হয়ে ওঠার পর্যায়গুলির সুস্পষ্ট রূপরেখাটি খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব
মহাভারত যে হিন্দুধর্মের এনসাইক্লোপিডিয়া, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
যদিও মহাভারতের আলোচনায় তিনটি কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে, প্রথমতঃ মহাভারতের
সর্বশেষ পরিমার্জিত ও সংযোজিত সংস্করণ রচিত হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে, গুপ্তযুগ বা তার কাছাকাছি
সময়ে। যে মহাভারত আজ আমরা পড়ি। দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় আর্য জাতিগোষ্ঠীগুলিকে নিয়ে, আর্য জাতিগোষ্ঠীর জন্যে, আর্য এবং পরবর্তী কালে
ব্রাহ্মণ্য ঋষি এবং হিন্দু পণ্ডিতরা মহাভারত রচনা করেছিলেন। অতএব ভারতীয় প্রাচীন
অনার্য গোষ্ঠীর মানুষেরা এই গ্রন্থে কদাচিৎ[1] তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা
পেয়েছেন। তৃতীয়তঃ মহাভারতের যাবতীয় কাহিনী রাজা, রাজপরিবার এবং তাঁদের ঘিরে থাকা
মুনি-ঋষি বা রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষের কাহিনী, সেখানে সাধারণ মানুষজনের কথা নেই
বললেই চলে। এই তিনটি কথা মাথায় রেখে আমরা মহাভারত চর্চায় প্রবেশ করব।
ব্রাহ্মণ্য ধর্মে মানব জীবনের সার্থকতার জন্যে তিনটি বর্গ বা লক্ষ্য, যাকে ত্রিবর্গ বলে, অনুসরণ করা আবশ্যিক ছিল।
এই তিনটি বর্গ হল ধর্ম, অর্থ ও কাম। পরবর্তী কালে, অর্থাৎ মহাভারত সংকলনের সময় অথবা
আরও স্পষ্ট করে বললে, হিন্দুধর্মে
সেটিকে চতুর্বগ করে তোলা হল, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। অতএব হিন্দুধর্মের সার্থকতার লক্ষ্য হয়ে উঠল
চতুর্বর্গ।
এই চতুর্বর্গ ধর্ম কি এবং কেমন হওয়া উচিৎ সেই ধর্মাচরণ, তার সারাংশ আমরা পাই
বনপর্বের ৩১২ অধ্যায়ে - বকরূপী এক যক্ষের সঙ্গে রাজা যুধিষ্ঠিরের সুদীর্ঘ
প্রশ্নোত্তর পর্ব থেকে, সেই আলোচনাতেই এখন চোখ রাখা যাক।
দ্বাদশ বর্ষ বনবাসের শেষ পর্যায়ে পাণ্ডবেরা একবার বনের মধ্যে ঘুরতে
ঘুরতে পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিলেন। রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে প্রথমে নকুল
গেলেন কাছাকাছি এক সরোবর থেকে জল আনতে। বহু সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু তিনি জল নিয়ে
ফিরলেন না। এরপর উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশে একে একে সকলেই জল আনতে গেলেন, কিন্তু কেউই ফিরে এলেন
না। তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজা যুধিষ্ঠির নিজেই গেলেন, ভাইদের সন্ধানে। সরোবরের সামনে
গিয়ে দেখলেন,
তাঁর
অপরাজেয় ভাইয়েরা সকলেই, সরোবরের তীরের মাটিতে সংজ্ঞাহীন নিশ্চল শুয়ে আছে। বিস্মিত
ও আতঙ্কিত রাজা যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, সরোবরের পাড়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বক। সেই বক বললেন, “হে কুন্তীপুত্র, আমি এই সরোবরের অধিকারী।
আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর না দিলে, এই সরোবরের জল আমি কাউকে স্পর্শ করতে দিই না। তোমার
ভাইয়েরা আমার কথা অবহেলা করে, জলস্পর্শ করতে গিয়েছিল বলেই, তাদের সকলকে আমি শমনসদনে
পাঠিয়েছি। তোমাকেও বলছি, আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলে, তোমারও একই দশা হবে”।
বিস্মিত রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই সাধারণ কোন বক নন।
একটি পাখির পক্ষে আমার মহাবীর ভাইদের এভাবে পরাস্ত করা, কোন মতেই সম্ভব নয়। আপনি কে?” রাজা যুধিষ্ঠিরের কথায়, বক খুশি হলেন, বললেন, “তোমার মঙ্গল হোক, আমি সত্যিই কোন জলচর
পক্ষি নই,
আমি যক্ষ, আমিই তোমার পরাক্রমশালী
ভাইদের নিহত করেছি”। যক্ষ এবার নিজমূর্তি ধারণ করাতে, রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “হে যক্ষ, আপনার কী প্রশ্ন আছে, জিজ্ঞাসা করুন, আমি যথাসাধ্য সেই
প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করব”।
যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নোত্তরমালা
যক্ষ একের পর এক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করতে লাগলেন, “কে আদিত্যকে উচ্চে
প্রতিষ্ঠা করেন?
কারা তাঁর
চারদিকে থাকেন,
কে বা তাঁকে
বশীভূত করেন এবং তিনি কোথায় প্রতিষ্ঠিত আছেন?”
রাজা যুধিষ্ঠির বললেন, “ব্রহ্ম আদিত্যকে উচ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবতারা তাঁর
চারদিকে ঘুরে বেড়ান, ধর্ম
তাঁকে বশীভূত করতে পারেন এবং তিনি সত্যে প্রতিষ্ঠিত আছেন”।
“কী থেকে শ্রোত্রিয়[2] হওয়া যায়, কিসের থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, কিসের থেকে পুত্রবান এবং
কিসের থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়?”
“শ্রুতি থেকে শ্রোত্রিয় হওয়া যায়, তপস্যা থেকে মহত্ত্বলাভ হয়, যজ্ঞ থেকে পুত্রবান এবং
বৃদ্ধসেবা থেকে বুদ্ধিমান হওয়া যায়”।
“ব্রাহ্মণদের দেবত্ব কি? তাঁদের কোন ধর্ম সাধু ধর্ম? তাঁদের মনুষ্যভাব কি? তাঁদের অসাধু ভাবই বা কি?”
“বেদপাঠ ব্রাহ্মণদের দেবত্ব, তপস্যা সাধুধর্ম, মৃত্যু মনুষ্যভাব। পরীবাদ[3] তাঁদের অসাধুভাব”।
“ক্ষত্রিয়দের দেবভাব, সাধুভাব, মনুষ্যভাব এবং অসাধুভাব কি?”
“ক্ষত্রিয়দের অস্ত্র-শস্ত্র দেবভাব, যজ্ঞ সাধুভাব, ভয় মনুষ্যভাব এবং যুদ্ধ
পরিত্যাগ অসাধুভাব”।
“যজ্ঞীয় সাম কি? যজ্ঞীয় যজুঃ কি? কে যজ্ঞ বরণ করে এবং কাকে সে অতিক্রম করে না?”
“প্রাণ যজ্ঞীয় সাম; মন যজ্ঞীয় যজুঃ, ঋক যজ্ঞকে বরণ করে এবং যজ্ঞ ঋককে অতিক্রম করে না”।
“আবপনকারী, নিবপনকারী, প্রতিষ্ঠমান এবং
প্রসূতিকারী,
এদের মধ্যে
কি কি শ্রেষ্ঠ?”
“আবপনকারীদের বৃষ্টি, নিবপনকারীদের বীজ, প্রতিষ্ঠমানদের[4] ধেনু এবং প্রসূতিকারীদের
পুত্রই শ্রেষ্ঠ”।
“কোন ব্যক্তি ইন্দ্রিয়সুখ অনুভবে সমর্থ, বুদ্ধিমান, সম্মানিত, তবু প্রাণীর মতো জীবন
থাকতেও জীবিত নয়?”
“যে ব্যক্তি দেবতা, অতিথি, ভৃত্য, পিতৃলোক ও আত্মাকে শ্রদ্ধা ও অর্চনা করে না, সে জীবন থাকতেও জীবিত
নয়”।
“পৃথিবীর থেকেও কে মহৎগুরু, আকাশের থেকেও কে উচ্চতর, বায়ুর থেকেও কে দ্রুতগামী, আর কার সংখ্যা তৃণের
থেকেও বেশী?”
“মাতা পৃথিবীর থেকেও মহৎগুরু, পিতা আকাশের থেকেও উচ্চতর, মন বায়ুর থেকেও দ্রুতগামী আর
চিন্তা তৃণের থেকেও বহুতর”।
“কে ঘুমিয়ে থাকলেও চোখ খোলা রাখে? জন্মানোর পরেও কার স্পন্দন হয় না, কার হৃদয় নেই এবং কে
দ্রুত বেড়ে ওঠে?[5]”
“মাছ ঘুমোলেও চোখ খোলা রাখে, অণ্ড (ডিম) জন্মালেও তার স্পন্দন হয় না, পাষাণের হৃদয় নেই এবং নদী
দ্রুত বেড়ে ওঠে”।
“প্রবাসীর মিত্র কে, গৃহবাসীর মিত্র কে? আতুর ও মুমূর্ষু ব্যক্তির মিত্র
কে?”
“প্রবাসীর সঙ্গী সহযাত্রী, গৃহবাসীর ভার্যা, আতুরের চিকিৎসক ও মুমূর্ষু ব্যক্তির দানই মিত্র”।
“কে সর্বভূতের অতিথি, সনাতন ধর্ম কি, অমৃত কি এবং সমুদয় জগৎ কি পদার্থ?”
“অগ্নি সর্বভূতের অতিথি, জ্ঞানযোগ সনাতন ধর্ম, সলিল ও যজ্ঞশেষ অমৃত, বায়ু সমুদয় জগৎ”।
“কে একা বিচরণ করেন, কে বার বার জন্ম নেয়, হিমের ঔষধ কি এবং কে প্রধান
বপনক্ষেত্র?”
“সূর্য একা বিচরণ করেন, চন্দ্রমা বার বার জন্ম নেয়, অগ্নি হিমের ঔষধ এবং পৃথ্বী
প্রধান বপনক্ষেত্র”।
“ধর্মের একমাত্র আশ্রয় কি, যশের একমাত্র আশ্রয় কি, স্বর্গ এবং সুখের একমাত্র আশ্রয়
কি কি?”
“দাক্ষ্য[6]
ধর্মের, দান যশের, সত্য স্বর্গের এবং শীল
(সদাচরণ) সুখের একমাত্র আশ্রয়”।
“মানুষের আত্মা কে, দৈবকৃত সখা কে, উপজীবিকা কি এবং প্রধান আশ্রয়ই বা কি”?
“পুত্র মানুষের আত্মা, ভার্যা দৈবকৃত সখা, মেঘ উপজীবিকা এবং দান প্রধান
আশ্রয়”।
“ধন্যে[7]র
মধ্যে উত্তম কি,
ধনের মধ্যে
উত্তম কি,
লাভের মধ্যে
এবং সুখের মধ্যেই বা উত্তম কি কি?”
“দাক্ষ্য ধন্যের মধ্যে, শাস্ত্র ধনের মধ্যে, আরোগ্য লাভের মধ্যে এবং সন্তোষই
সুখের মধ্যে উত্তম”।
“প্রধান ধর্ম কি, কোন ধর্ম সর্বদা ফলবান, কাকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর কার সঙ্গে সন্ধি করলে
সন্ধি ভেঙে যায় না”?
“অনৃশংসতা প্রধান ধর্ম, বৈদিক ধর্ম সর্বদা ফলবান, মনকে সংযত করলে শোক থাকে না, আর সাধুর সঙ্গে সন্ধি
করলে, সন্ধি ভঙ্গ হয় না”।
“কী ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, কী ত্যাগ করলে শোক হয় না, কী ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং কী
ত্যাগ করলে সুখী হয়?”
“অভিমান ত্যাগ করলে প্রিয় হয়, ক্রোধ ত্যাগ করলে শোক হয় না, কামনা ত্যাগ করলে অর্থবান হয় এবং
লোভ ত্যাগ করলে সুখী হয়”।
“ব্রাহ্মণ, নট
ও নর্তক,
ভৃত্য এবং
রাজাকে দান করার প্রয়োজনীয়তা কি?”
“ধর্মের জন্য ব্রাহ্মণকে, যশের জন্যে নট ও নর্তককে, ভরণের জন্য ভৃত্যকে এবং ভয়ের
কারণে রাজাকে দান করা প্রয়োজন”।
“লোকেরা কিসে আবৃত থাকে, কিসে আচ্ছন্ন থাকে, মিত্রদের কেন পরিত্যাগ করে, আর কেনই বা স্বর্গে যেতে
অসমর্থ হয়?”
“লোকেরা অজ্ঞানে আবৃত, তমোগুণে আচ্ছন্ন থাকে। লোভের জন্যে মিত্রদের পরিত্যাগ করে
এবং সঙ্গদোষে স্বর্গে যেতে পারে না”।
“মৃত পুরুষ কে, মৃত রাষ্ট্র কি, মৃত শ্রাদ্ধ এবং মৃত যজ্ঞই বা কি?”
“দরিদ্র পুরুষই মৃত, অরাজক রাষ্ট্র মৃত, শ্রোত্রিয়হীন শ্রাদ্ধ মৃত আর
দক্ষিণাহীন যজ্ঞ মৃত”।
“দিক কি, জল
কি, অন্ন কি, বিষ কি এবং শ্রাদ্ধের
কালই বা কি?”
“সাধুরা (যে পথ দেখান, সেটাই) দিক, আকাশই জল, ধেনু অন্ন, অনুগ্রহ বিষ এবং ব্রাহ্মণই শ্রাদ্ধের কাল”।
“তপ,
দম, ক্ষমা ও লজ্জার লক্ষণ কী?”
“নিজের ধর্মে আস্থাই তপ, মনের সংযম দম, দ্বন্দ্ব সহ্য করাই ক্ষমা, অনাচার থেকে নিবৃত্ত থাকাই
লজ্জা”।
“জ্ঞান, শম, দয়া ও আর্জব কাকে বলে?”
“তত্ত্বের অর্থবোধকে জ্ঞান, মনের প্রশান্তি শম, সকলের সুখ ইচ্ছে করা দয়া, এবং সমদর্শীতাই আর্জব[8]”।
“পুরুষের কোন শত্রু দুর্জয়, কোন ব্যাধি অনন্ত, কি রকম লোককে সাধু কিংবা অসাধু
বলা যায়?”
“ক্রোধ পুরুষের দুর্জয় শত্রু, লোভ অনন্ত ব্যাধি, সকল প্রাণীর মঙ্গলকারী ব্যক্তিই
সাধু এবং নির্দয় ব্যক্তি অসাধু”।
“মোহ, মান, আলস্য ও শোকের লক্ষণ কি?”
“ধর্ম বিষয়ে অনভিজ্ঞতা মোহ, আত্ম-অহংকারই মান, ধর্ম আচরণ না করাই আলস্য এবং
অজ্ঞানই শোক”।
“ঋষিরা স্থৈর্য, ধৈর্য, স্নান ও দানের কী কী লক্ষণ বলেছেন?”
“নিজ ধর্মে স্থিরতা স্থৈর্য, ইন্দ্রিয়ের সংযম ধৈর্য, মনের মালিন্য দূর করাই স্নান এবং
প্রাণীদের রক্ষা করাই দান”।
“পণ্ডিত কে, নাস্তিক কে? মূর্খ কে, কাম কি, ঈর্ষা কি?”
“ধর্মজ্ঞই পণ্ডিত, নাস্তিকেরা মূর্খ এবং মূর্খরাই নাস্তিক। সংসারে আসক্তি কাম
এবং প্রবল বাসনাই ঈর্ষা”।
“অহংকার, দম্ভ, দৈব এবং পৈশুন্য (খলতা, ক্রূরতা) কি?”
“অজ্ঞানতা অহংকার, নিজেকে ধার্মিক বলে প্রচার করাই দম্ভ, দানের ফল দৈব, এবং অন্যকে দোষারোপ
পৈশুন্য”।
“ধর্ম, অর্থ
ও কাম – এরা তো পরষ্পরবিরোধী; তাহলে ত্রিবর্গে এদের সমাবেশ কিভাবে হয়?”
“যখন ধর্ম ও ভার্যা, পরষ্পরের বশীভূত হয়, তখনই ধর্ম, অর্থ ও কামের সমাবেশ
ঘটে”।
“হে রাজন, কোন
কর্ম করলে অক্ষয় নরকে যেতে হয়?”
“যে ব্যক্তি প্রার্থী দরিদ্র ব্রাহ্মণকে দান করার জন্যে নিজেই ডেকে এনে, পরে “নেই” বলে বিদায় করে, যে ব্যক্তি বেদ, ধর্মশাস্ত্র, দ্বিজ, দেবতা ও পৈতৃক ধর্মকে
মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন করে, যে ধনবান ব্যক্তি “নেই” বলে অর্থাৎ কার্পণ্যবশতঃ, দান ও ভোগ না করে, তাদেরই অক্ষয় নরকে যেতে
হয়”।
“হে রাজন, কুল, বৃত্ত (আচরণ, চরিত্র), স্বাধ্যায় এবং শ্রুত এর
মধ্যে কোনটি ব্রাহ্মণত্বের কারণ, নিশ্চিত করে বল”।
“হে যক্ষ, কুল, স্বাধ্যায় বা শ্রুত
কিছুতেই ব্রাহ্মণত্ব জন্মায় না। একমাত্র বৃত্তই ব্রাহ্মণত্বের কারণ। যাঁরা
শুধুমাত্র অধ্যয়ন, অধ্যাপন
বা শাস্ত্রচিন্তা করেন, তাঁরা সকলেই মূর্খ এবং শাস্ত্রজীবী। কিন্তু যিনি বিধিমতো
নিত্য ধর্ম আচরণ করেন, তিনিই
বৃত্ত, তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ”।
[1] উদাহরণে
বলা যায়,
নিষাদ
রাজপুত্র একলব্যের ঘটনাটির বিবরণ মহাভারতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
[2] শ্রোত্রিয়
- বেদজ্ঞ।
[3] পরীবাদ
বা পরিবাদ – পরনিন্দা, অপবাদ
(শব্দকোষ)।
[4] আবপনকারী–দেবতর্পণকারী, নিবপনকারী -
পিতৃতর্পণকারী,
প্রতিষ্ঠমান–যশ
বা প্রতিপত্তি লোভী। (শব্দকোষ)।
[5] এই
প্রশ্নগুলি ধর্ম সম্পর্কে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক – কিছুটা কুইজ কনটেস্ট ধরনের –
অতএব অনুমান করা যায় অবান্তর এই প্রশ্নগুলি প্রক্ষিপ্ত।
[6] দাক্ষ্য
– ১. দক্ষভাব,
কৌশল, পটুতা; ২. কর্মোৎসাহ, উৎসাহ। (শব্দকোষ)
এক্ষেত্রে কর্মোৎসাহ, উৎসাহ
অর্থই যুক্তিযুক্ত।
[7] ধন্য
– ধনবান বা ধনলাভকারী; সুকৃতী, পুণ্যবান। (শব্দকোষ)
[8] আর্জব
– ১. ঋজুভাব,
অবক্রতা; ২. সরলতা, অকপটতা, প্রতারণারাহিত্য; ৩. বিনয়গ্রাহিতা, বিনীতভাব। (শব্দকোষ)।
এক্ষেত্রে অকপটতা ও প্রতারণারাহিত্য অর্থটিই মনে হয় উপযুক্ত।
চলবে...