এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১৯
সুনেত্র
বরাবর দেখেছে, সোমবার দিন চেম্বারে পেশেন্টের সংখ্যা একটু বেড়ে ওঠে। সকালের দিকে
কিছুটা বেশি, সন্ধের চেম্বারে বেশ কয়েকজন। অবশ্য একথাও ঠিক সকালের থেকে সন্ধ্যাতেই
তার চেম্বারে বেশি ভিড় জমে। সকালের দিকে সাধারণতঃ বয়স্ক মানুষ ও মহিলাদের সংখ্যা
বেশি থাকে। পুরুষরা সাধারণতঃ অবসরপ্রাপ্ত হন এবং মহিলারা হন বয়স্কা শ্বাশুড়ি,
যাঁরা পুত্রবধূর হাতে সংসারের ভার তুলে দিয়ে চেম্বারে আসেন নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে
কিছুটা আলোচনা করতে। এই বয়স্ক মানুষরা সাধারণতঃ স্বচ্ছল এবং অতিমাত্রায় স্বাস্থ্য-সচেতন
বা আরও একটু খুলে বললে, বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকেন। সামান্যতম শারীরিক অস্বস্তি হলেই
তাঁরা ব্যস্ত হয়ে চলে আসেন ডাক্তারের কাছে।
আর সন্ধ্যেয়
আসেন অফিস বা কাজ থেকে ফেরা মানুষরা। কখনো নিজের জন্যেই, কখনো বা ছেলে-মেয়েদের
জন্যে অথবা স্ত্রী-ভাই-বোনদের জন্যে। তাঁরা বৃদ্ধ বাবা-মাকেও নিয়ে আসেন, যাঁরা
নিজেদের যে কোন অসুস্থতাকেই, মনে করেন সেরকম কিছুই হয়নি, কটা দিন ধৈর্য ধরলেই সেরে
যাবে। অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন চেম্বারেই শিশু থেকে বৃদ্ধ – সব বয়সের পেশেন্টদের বিচিত্র
অসুস্থতা ও জটিলতা নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে হয়।
মা মারা
যাবার কয়েকমাস পর, সে কর্পোরেট চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে, নিজস্ব চেম্বারে বসার সিদ্ধান্ত
নিয়েছিল। প্রথম প্রথম সে বেশ বিবেকবান ডাক্তার হিসেবেই সকল নেট-ওয়ার্ক থেকে নিজেকে
মুক্ত রাখতে চেয়েছিল। প্রায় বছর তিনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে করতে সুনেত্র বুঝে
গেছে, আজকাল মেডিক্যাল জগতটা আশ্চর্য নিখুঁত এক নেটওয়ার্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অবশ্য
এ নেটওয়ার্ক যে কর্পোরেট জগতে ছিল না তা নয়। কিন্তু তার অধিকাংশটাই নিঃশব্দে ঘটে
যেত, এবং তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সে জড়িত ছিল না। বুঝতে পারত সবই, কিন্তু সব
কিছুই ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
কিন্তু আজ সে
প্রত্যক্ষভাবেই এই নেট-ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। শহরের উল্লেখযোগ্য ডায়াগ্নস্টিক
ল্যাবরেটরিগুলির সকলেই তার পক্ষপাতের প্রত্যাশা করে। এই ব্যাপারটা তার কাছে নতুন।
কারণ তার কর্পোরেট হসপিট্যালেই ছিল ইন-হাউস অত্যন্ত উন্নতমানের ল্যাবরেটরি। সেখানে
পক্ষপাতিত্বের কোন বিষয় কোনদিন স্থান পায়নি। কিন্তু আজ তার রেকমেণ্ড করা প্যাথলজিক্যাল
বা অন্যান্য নানান টেস্ট-রিপোর্ট, তার পেশেন্টরা যে ল্যাবরেটরি থেকেই করিয়ে আনুক
না কেন, মাসান্তে তার কাছে চলে আসে তার কমিশনের টাকা এবং কতজন পেশেন্ট সেখান থেকে কি
কি টেস্ট করিয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসেব। এই টাকাটা আগে চেকে আসত, আজকাল সে নগদে
নেয়। পরিস্থিতির চাপে কিছুটা চতুর তাকেও হতে হয়েছে।
এ ছাড়া আছে মেডিক্যাল
রিপ্রেসেন্টেটিভদের চিরন্তনী নেট-ওয়ার্ক। এই নেট-ওয়ার্ক তার কর্পোরেট হসপিট্যালেও
ছিল, এখানেও আছে। আরও আছে। কোন ক্রিটিক্যাল পেশেন্টকে কোন বিশেষ প্রাইভেট হসপিট্যালে
রেফার করলে, সেখান থেকে চিকিৎসান্তে ডাক্তারের কমিশন।
অর্থাৎ
আজকাল প্রেস্ক্রিপশনের প্রতিটি লাইন লিখতে লিখতে, তার সম্ভাব্য পাওনা কমিশন-মূল্যের
একটা ধারণাও তার মনে মনে তৈরি হয়ে যায়। জটিল অসুখের পেশেন্টকে একদিকে সারিয়ে
তোলাটা যেমন তার একটা চ্যালেঞ্জ মনে হয়, তেমনি তার কাছে সেই পেশেন্ট, দীর্ঘদিনের -
হয়তো লাগাতার দু’-তিনমাসের – স্বর্ণাণ্ড-প্রসবকারী হাঁসও হয়ে উঠতে পারে। এভাবে ভাবতে
সুনেত্রর ভালো লাগে না, কিন্তু আজকের দিনের মেডিকেল নেট-ওয়ার্ক তাকে
এই পথেই চালিত করে চলেছে। তার সাধ্য কি, এর বাইরে সে বের হয়ে আসবে?
সকালের
চেম্বার সেরে, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সুনেত্র ল্যাপটপ খুলে বসেছিল একবার, কনির
কোন নতুন মেল এল কিনা চেক করতে। আসেনি। কনি লিখেছিল “অধৈর্য হয়ে আবার ফোন কোর না, বা চলে এস না আমার কাছে”। না
সুনেত্র অধৈর্য হবে না, এতদিন অপেক্ষা করেছে যখন, আরও এক-দুদিন অপেক্ষা করতে কোন আপত্তি
নেই তার। যে কথা মা এবং পিসিমা তাকে কোনদিন বলেননি বা বলতে পারেননি, সে কথার
কিছুটা কাল রাত্রে জেনেছে। বুঝেছে, কনি নিজের জীবনে যে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে,
সেই যন্ত্রণার অংশীদার হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের চোখে সন্তানের এই কষ্ট
দিনের পর দিন প্রত্যক্ষ করার অসহ্য মনোকষ্ট তার মা-বাবা অর্থাৎ পিসিমা-পিসেমশাইয়ের
কাছেও কম ভয়ানক নয়। সম পরিমাণ না হলেও তার নিজের মায়ের পক্ষেও, যথেষ্ট বেদনার।
মানসিক এই কারণেই পিসিমা হয়তো এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন - তার
গৃহপ্রবেশের কয়েক-মাস পরেই। অথচ পিসেমশাই, যাঁর শরীর সেরিব্রাল অ্যাটাকে অনেকটাই
ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল। সকলে ভেবেছিল তিনি পিসিমার অনেক আগেই চলে যাবেন। তিনি মারা
গেলেন বছর খানেক আগে। সুনেত্রর দুর্ভাগ্য সে সময় দেশের বাইরে গিয়েছিল, বিখ্যাত এক
মেডিসিন কোম্পানি-প্রায়োজিত সেমিনারে। পিসেমশাইয়ের শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ
মিটে যাওয়ার পাঁচ-ছদিন পর সুনেত্র কলকাতা ফিরেছিল। পিসেমশাইয়ের বাড়িও গিয়েছিল, কনির
সঙ্গে যদি দেখা হয়। দেখা হয়নি। প্রতিবেশীদের কাছে সুকন্যার খবর নিতে গিয়ে বুঝতে
পেরেছিল, তারা কেউই সুকন্যার ব্যাপারে কোন কথা বলতে উৎসাহী নয়। তেমন খোঁজও রাখে না
কেউ। একটি মেয়ে বলেছিল, “সুকুআন্টি শুনেছি কার্সিয়াং গিয়েছেন। কোথায় তা তো জানি
না, আংকল”। বাড়ির তালাবন্ধ দরজা দেখেই তাকে হলদিয়ায় ফিরে আসতে হয়েছিল।
তার সামনে
খুলে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিন স্লিপ মোডে চলে গেছিল অনেকক্ষণ। একসময় সুনেত্রর খুব
ঘুম পেল। তার স্বভাবে ভাত-ঘুমের অভ্যাস এখনও বাসা বাঁধতে পারেনি, বেলা দুটো-আড়াইটে
থেকে বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, যথেষ্ট অবসর থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু বিগত
রাত্রের প্রায় নিদ্রাহীন মস্তিষ্ক এখন বিশ্রাম চায়। টেবিলে মাথা রেখে গভীর নিদ্রায়
ডুবে গেল।
বিকেল সোয়া
পাঁচটা নাগাদ, সুনেত্রর ঘরে এল শম্পাদিদি। সুনেত্রর টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে ডাকল,
“দাদাবাবু, উঠে পড়ো, পাঁচটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। মিলকিদিদিভাই এখনই চলে আসবে”।
ঘুম ভেঙে তাকাল
সুনেত্র, বলল, “এঃ এমন অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি না, প্রায় ঘন্টা
তিনেক?”
“আজ সকাল
থেকেই দেখছি, তুমি কী যেন এক ভাবনার মধ্যে ডুবে রয়েছ, সারাক্ষণ। কী হয়েছে বলো তো
তোমার?”
“কিচ্ছু
হয়নি শম্পাদিদি, এমনিই একটু চোখ লেগে গিয়েছিল”। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে সুনেত্র
বলল। মুখে চোখে জলের ছিটে দিয়ে বেশ আরাম পেল, সুনেত্র। ঘুমঘুম ভাবটা কেটে গেল, এবং
লক্ষ্য করল ঘন্টা তিনেকের ঘুমটা ক্লান্তি এবং অবসাদ থেকেও তাকে অনেকটা মুক্তি
দিয়েছে।
ঘরে ফিরে
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে নিজেকে খুব ফ্রেশ অনুভব করল সুনেত্র। রান্নাঘর থেকে
শম্পাদিদির গলা পেল, “মাসিমা তো তোমাকে বলে বলে, হয়রান হয়ে চলেই গেলেন। এবার একটা
বিয়ে করে স্থিতু হও দেখি দাদাবাবু”।
সুনেত্র
হেসে ফেলল হো হো করে, তারপর বলল, “এতদিন পরে তোমার মাথায় এ ভূত কে ঢোকালো,
শম্পাদিদি”?
শম্পাদিদি
ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এই রোববারে তোমাদের দুটিকে একসঙ্গে দেখেই ভূতটা
আমার মাথায় ঢুকেছে, দাদাবাবু”।
“তুমি কি
সুনুর কথা বলছো, শম্পাদিদি? তুমি কি জানো তুমি কী বলছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে
গেছে?” অবাক বিস্ময়ে শম্পাদিদির মুখের দিকে তাকিয়ে সুনেত্র বলল।
“আমি সব
জানি। তোমাদের দুজনের সব কথা। মাসিমা, পিসিমণি দুজনেই আমাকে সব বলেছেন”। একটু থেমে
আবার বলল, “তোমরা ছেলেরা চোখ থেকেও যেন কানা, সুনুদিদির মানসিক অবস্থাটা কি তুমি
কিছুতেই বুঝবে না, দাদাবাবু?” শম্পাদিদি আর কিছু বলল না, ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে
নিজের কাজে চলে গেল।
সুনেত্র পাথরের
মতো বসে রইল টেবিলের সামনে। কাপের অর্ধেক চায়ের ওপর জমতে লাগল সর।
মিনিট পনের পর, শম্পাদিদি ঘরে এল, বলল, “মিলকি দিদিভাই এসে চাবি নিয়ে গেল, দাদাবাবু। এঃ চাটা খেতে দেখছি ভুলেই গেছ, ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল। আরেক কাপ বানিয়ে নিয়ে আসছি, তুমি রেডি হয়ে নাও”।
শম্পাদিদিকে
কী বলে গিয়েছেন, তার মা ও পিসিমা? সেকথা সে জানে না, কেন? মা বা পিসিমা তাকে
সরাসরি সে কথা বলতে পারেননি, কেন? কনির জীবনে এত দুর্যোগ ঘটে গেছে, সে কথা তাঁরা
দুজনেই জানতেন, নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু সকল সঙ্কোচ ভেঙে কেন তাঁরা
সুনেত্রকে বলতে পারলেন না? যে কথার অর্ধেকটা সে জেনেছে গতকাল রাত্রে এবং বাকিটা
হয়তো জানবে আজ রাত্রে।
সুনেত্র
চটপট রেডি হতে না হতেই, শম্পাদিদি এক কাপ চা, আর এক পিস কেকের টুকরো দিয়ে গেল
প্লেটে। ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল শম্পাদিদি, সুনেত্র তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “শম্পাদিদি,
মা পিসিমা, তোমাকে সব কথা বলতে পারলেন, অথচ আমাকে বলতে পারলেন না, কেন?”
শম্পাদিদি
কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল সুনেত্রর দিকে, তারপর বলল, “ওঁনারা দুজনেই বড়ো
দ্বিধায় ছিলেন, দাদাবাবু। সুকুদিদির জীবনটা যে ভাবে তাঁরা দুজনে ছন্নছাড়া করে দিয়েছিলেন,
সে কথা মুখ ফুটে নিজের ছেলেকে কী করে বলবেন, বলো তো, দাদাবাবু? কী করে বলবেন, সুকুদিদির
জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোকে মন থেকে মুছে ফেলে, এতবছর পরে তুমি তাকেই গ্রহণ করো...।
আমি হলেও বলতে পারতাম না, দাদাবাবু। তুমি কী করে বুঝবে মায়েদের বুকের জ্বালা?”। একটু
থেমে শম্পাদিদি আবার বলল, “যাগ্গে এখন ওসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, তুমি চেম্বারে যাও,
দাদাবাবু। মিলকি দিদিভাই বলছিল অনেক পেশেন্ট নাকি চলে এসেছে”।
সাড়ে নটা
নাগাদ চেম্বার থেকে যখন মুক্তি পেল সুনেত্র, নিজেকে খুব ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মনে
হচ্ছিল। আজ পেশেন্টের সংখ্যা কিছু বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু তার ক্লান্তিটা ঠিক সে
জন্যে নয়। তার মনটাকে জাস্ট সুইচ অফ করে, মনের মধ্যে নিরন্তর ঘটে চলা দ্বন্দ্বটাকে
যদি বন্ধ করা যেত। এবং অন করে দেওয়া যেত তার প্রফেসন্যাল মনটাকে...তাহলে এই
ক্লান্তিটা অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া যেত।
মনটাকে এই
সুইচ-অফ/ সুইচ-অন মোডে রাখার উপদেশটা সে শুনছিল তাদের কর্পোরেট অফিসে। তাদের অফিসে
প্রায়ই বাইরে থেকে কিছু ম্যানেজমেন্ট টিমকে ডেকে আনা হতো, যাদের অ্যাজেণ্ডা হতো
রীতিমতো রোমহর্ষক। যেমন “প্রফেশনালিসম অ্যাণ্ড লাইফ – ইয়র পার্স্পেক্টিভ”, “ইয়োর
ওয়ার্ক অ্যাণ্ড ইয়র লাভ”, ইত্যাদি। এরকমই একটা প্রোগ্রামে নানান গ্রাফিক্স এবং বার-চার্ট
থেকে সে জেনেছিল, তার প্রফেশন এবং তার জীবনটাকে সুন্দর কয়েকটা ছকে বেঁধে ফেলা যায়।
না, ভুল বলল সে, নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলতে হবে। এবং তার সার কথাটি হল, যতক্ষণ
তুমি কাজের মধ্যে রয়েছ নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাকে মুছে ফেল। অর্থাৎ অসুস্থ মা-বাবা,
কিংবা স্ত্রীর শপিং করার আব্দার, অথবা ছেলে-মেয়ের স্কুল থেকে ডাকা পেরেন্ট’স মিটিং
অ্যাটেণ্ড করার টেনশন – বিলকুল মুছে ফেলতে হবে মন থেকে। ডাস্টার দিয়ে আঁকিবুকি
লেখা বোর্ডটাকে এক লহমায় মুছে ফেলার মতো – ব্ল্যাংক করে ফেল মনটাকে। এটাই হল মনের
সুইচ অফ মোড।
এর সঙ্গে
সঙ্গেই অফিসের কাজের জন্যে তোমার মনটাকে সুইচ অন করে ফেল। গতকাল কী কী কাজ পেণ্ডিং
ছিল, সেগুলো আজ কমপ্লিট করতে হবে। আজ কোন কোন মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে হবে, তার জন্যে
ডিসকাশন পয়েন্ট্স্ জট ডাউন করতে হবে। কাস্টমার ও সার্ভিস প্রোভাইডারদের ফলো আপ
করে ফিড-ব্যাক নেওয়া...। তার মধ্যে কোনভাবেই তোমার মনে সংসার যেন উঁকি না মারতে
পারে। দৈবাৎ, উঁকি মারলেই, ইউ উইল বি ইন মেস। বাংলা করে বললে, তুমি কেলোর কিত্তি বাধিয়ে তুলেছ, হে।
আবার সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ অফিসের লিফটের গেট বন্ধ হওয়ার
পর বেসমেন্ট ওয়ানে – যেখানে তোমার গাড়ি পার্ক করা আছে – নামার সুইচটা যখন টিপছ –
তখনই সুইচ অফ করে দাও তোমার মনের অফিস মোডটাকে...। আর অন করে নাও তোমার ব্যক্তিগত
জীবনের মানসিক মোড।
ব্যাপারটা এতই সহজ আর সরল, অন্ততঃ ওই প্রফেশনাল টিমগুলো যা
বোঝাতো, তাতে প্রত্যেক মানুষের জীবন পাখির হালকা পালকের মতো ভেসে চলবে চিরকাল।
এই উপদেশ এবং স্বপ্নময় জীবনের নিশ্চিত আশ্বাস সত্ত্বেও
সুনেত্র কোনদিনই ওই অন-অফ মোডে মনটাকে আনতে পারেনি। অফিসে গেলেও তার মনের মধ্যে কলকল
ধ্বনিতে ঢুকে পড়েছে বাড়ির কথা এবং বাড়ি এসেও মনে মনে আফশোস করেছে, অফিসের কিছু
কিছু কাজ সেরে আসতে ভুলে যাওয়ার জন্যে। এর কারণ কি তার মধ্যবিত্তসুলভ আবেগপ্রবণতা?
না, তাও নয়, কারণ সে তার দাদাকে দেখেছে, বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে তুচ্ছ ও গুরুতর কারণে
তুমুল ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়েই, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল
আড্ডা দিতে। এটাও সেই মনের অন-অফ মোড, তার দাদা অর্জন করেছিল বাই ডিফল্ট।
কিন্তু সে পারেনি – সেদিনও না, আজও না। এরকম ঘটনার পরে স্কুলে
গেলে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তার মুখ দেখেই বুঝে যেত, আজ সুনেত্রর মুড খারাপ। মুখটা
হাঁসের পেছন বানিয়ে তুলেছে। প্রতিটা ক্লাস, টিফিন - এমনকি ছুটির সময়েও তার মনের
মোডটাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারেনি কতদিন...। আজও চেম্বারে ঢোকার আগে সে পারেনি
মন থেকে শম্পাদিদির কথার অভিঘাত মুছে ফেলতে। আজও সে চিন্তাক্লিষ্ট আনমনা মুখেই কি সবার
চিকিৎসা করল না? অথচ সে বহু পেশেন্টদের থেকে বহুবার কমপ্লিমেন্ট শুনেছে, “আপনার
সামনে বসে আপনার মুখের হাসিটুকু দেখলেই আমাদের আর্ধেক রোগ পালায়, ডাক্তারবাবু। মনে
হয় নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায় আপনাকে”। আজকের পেশেন্টদের জন্যে সে কথাটা নিশ্চয়ই খাটল
না। তার মুখখানা দেখেই পেশেন্টদের অর্ধেক অসুখও আজ সারল না। সেক্ষেত্রে তার ফিজ্টাকেও
অর্ধেক করা কি তার উচিৎ ছিল না?
চলবে...