ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৬ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
সপ্তদশ পর্বাংশ
৪.৮.৭ কদম্ব
কদম্বদের সম্পর্কে শোনা যায়, তাঁরা
মানব্য গোত্রের ব্রাহ্মণ ছিলেন। শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা এক ব্রাহ্মণ, নাম
ময়ূরশর্মা, একবার
পল্লব রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চীতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কর্ণাটকে
একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং রাজধানী ছিল বনবাসীতে। এই ঘটনা
ঘটেছিল খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এরপরে সমুদ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য
অভিযানে পল্লবরাই বিধ্বস্ত এবং গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। অতএব প্রায় অস্তিত্বহীন
কদম্ববংশের ইতিহাসে প্রথম সাড়া পাওয়া গেল, রাজা ককুস্থবর্মনের সময়। এই সময়
কদম্ব রাজ্যের পরিসীমা এবং প্রভাব চোখে পড়ার মতো পর্যায়ে এসেছিল। তারপর ষষ্ঠ
শতাব্দীর প্রথম দশকে যখন রবিবর্মন রাজা হলেন, গঙ্গ এবং পল্লবদের সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধ
করতে হয়েছিল এবং তিনি তাঁর নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, হালসীতে
(বেলগাম জেলা)। কিন্তু এরপর বাতাপির চালুক্য বংশের উত্থানে কদম্বরা আবার
অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই কদম্বদের আবার দেখা পাওয়া যায় দশম শতাব্দীর
শেষদিকে, রাষ্ট্রকূট
রাজ্যের পতনের সময়। এই কদম্বদের ছোট ছোট শাখা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট
ছোট রাজ্য গড়ে তাঁদের অস্তিত্ব স্থানীয় ভাবে বজায় রেখেছিলেন, ত্রয়োদশ
শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত!
৪.৮.৮ তলকড়ের গঙ্গ
গঙ্গদের উৎপত্তি শোনা যায় পৌরাণিক ইক্ষ্বাকু বংশ
থেকে, এমনও
শোনা যায় তাঁদের আদি নিবাস ছিল গঙ্গার তীরে অথবা তাঁরা মুনি কণ্বর উত্তরসূরি।
মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে গঙ্গদের রাজ্য ছিল এবং সেই সময়ে তাঁদের রাজ্যকে
গঙ্গবাড়ি বলা হত। মোটামুটি চতুর্থ শতাব্দীর কোন সময়ে, এই রাজ্যের
প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দিদিগ বা কোঙ্গনিবর্মন এবং মাধব। প্রথম দিকে এই রাজ্যের রাজধানী
ছিল কুলুবলে (কোলার?)।
পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি গঙ্গরাজা হরিবর্মা রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন কাবেরী নদীর
তীরে, তলবনপুর
বা তলকড়ে। গঙ্গদের এক রাজা দুর্বিনীত পল্লবদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দাক্ষিণাত্যের
রাজনীতিতে গঙ্গদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষায় “পৈশাচী
বৃহৎ-কথা” রচনা করেছিলেন। গঙ্গদের আরেক বিখ্যাত রাজা ছিলেন শ্রীপুরুষ (৭২৬-৭৬
সি.ই.)। তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রকূটদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিলেন এবং পল্লবদের
পর্যুদস্ত করেছিলেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে গঙ্গরাজাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন
ভেঙ্গির চালুক্যরা এবং মালখেড়ের রাষ্ট্রকূটরা। এই সময় গঙ্গরাজ শিবমার বন্দী
হয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব নিরুপম। এরপর
থেকে গঙ্গ রাজারা নানান শক্তিশালী রাজ্যের সামন্তরাজা হিসেবেই রাজ্য পরিচালনা করতেন, যেমন
রাষ্ট্রকূট, হোয়সল
এবং চোল।
গঙ্গ রাজারা সাধারণতঃ জৈন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন।
এই বংশের রাজা দুর্বিনীত জৈন আচার্য পূজ্যপাদের শিষ্য ছিলেন। এই বংশের আরেক রাজা
চতুর্থ-রাজমল্ল এবং তাঁর সেনাপতি ও মন্ত্রী চামুণ্ডরায় ৯৮৩ সি.ই.-তে শ্রবণবেলগোলার
সুবিখ্যাত গোমতেশ্বর মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৪.৮.৯ দ্বারসমুদ্রের হোয়সল
হোয়সল বা পোয়সলরা দাবি করেন, তাঁরা
“যাদবকূলতিলক” বা “চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়”। তবে এঁদের সম্বন্ধে আরেকটি প্রবাদ শোনা
যায়, এই
বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীর সাল কোন এক মুনির নির্দেশে, লৌহশূল দিয়ে একা একটি বাঘকে হত্যা
করেছিলেন। তার থেকেই এই বংশের নাম হোয়সল বা পোয়সল (হোয় বা পোয় কথার অর্থ হত্যা এবং
সাল থেকেই সল)।
হোয়সল রাজত্বের উন্নতির সূচনা একাদশ শতাব্দীর শুরুতে। তার আগে এঁরা মহীশূরের ক্ষুদ্র অঞ্চলের রাজা ছিলেন। এই সময় তাঁরা চোল বা কল্যাণের চালুক্য রাজাদের অনুগত রাজ্য হয়ে নিজেদের শক্তি এবং প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছিলেন। মোটামুটি ১০৪৫ সি.ই.-তে এই বংশের রাজা বিনয়াদিত্য এবং তাঁর পুত্র এরিয়ঙ্গ, চালুক্য রাজাদের সহযোগী হয়ে অনেক যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। এরপর রাজা বিত্তিগ বিষ্ণুবর্ধনের (১১১০-৪০ সি.ই.) সময় হোয়সল রাজ্য দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই রাজা তাঁর রাজধানী ভেলাপুর (বেলুর, হাসান জেলা) থেকে সরিয়ে দ্বারসমুদ্রে (হালেবিদ, হাসান জেলা) নিয়ে আসেন। এই সময় তিনি চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, প্রায় স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু কখনই কোন “রাজা” উপাধি গ্রহণ করেননি। চালুক্য রাজাদের প্রতিনিধি হয়ে, তিনি সমসাময়িক, চোল, মাদুরার পাণ্ড্য, মালাবার, দক্ষিণ কানারার তুলুব, গোয়ার কদম্ব সকলের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই সময় রাজা বিষ্ণুবর্ধন সম্পূর্ণ মহীশূর এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলের অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ জৈন ছিলেন, কিন্তু পরে আচার্য রামানুজের সংস্পর্শে এসে তিনি বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
রাজা বিষ্ণুবর্ধনের পর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন, তাঁর নাতি
প্রথম-বীরবল্লাল (১১৭২-১২১৫ সি.ই.)। তিনিই প্রথম নিজেকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে
ভূষিত করেছিলেন। তিনি চালুক্য এবং যাদবদের পরাজিত করে, স্বাধীন
রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর থেকেই হোয়সল রাজত্বের পতনের শুরু এবং
শেষ হোয়সল রাজা তৃতীয়-বীরবল্লাল ১৩১০ সি.ই.তে সেনাপতি মালিক কাফুরের হাতে পরাজিত
হন এবং তাঁকে বন্দী করে দিল্লি আনা হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হোয়সল বংশ
লুপ্ত হয়ে যায়।
হোয়সল রাজাদের স্থাপত্য কীর্তি বিশেষ উল্লেখের
দাবি রাখে। তাঁদের রাজত্ব কালে অজস্র মন্দির ও স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে
বেলুর ও হালেবিদের স্থাপত্যগুলি শিল্প সুষমায় অনবদ্য।
৪.৮.১০ কাঞ্চীর পল্লব
পল্লবদের উৎস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর
মতভেদ আছে। অনেকে বলেন,
তাঁরা আদিতে পহ্লব অর্থাৎ পার্থিয়ান, দক্ষিণ ভারতে এসে পল্লব হয়ে
গিয়েছিলেন। পৌরাণিক কথায় শোনা যায়, তাঁরা দ্রোণাচার্য এবং অশ্বত্থামার
বংশধর –অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-যোদ্ধা। অনেকে বলেন তাঁরা দক্ষিণ ভারতের দেশীয় গোষ্ঠী। তবে
তাঁরা যে উত্তরভারত থেকেই দক্ষিণে গিয়েছিলেন, তার কিছু যুক্তি আছে, যেমন, পল্লবদের
প্রাচীন রাজভাষা ছিল প্রাকৃত এবং পল্লবরা শুরু থেকেই সংস্কৃতের পৃষ্ঠপোষক। এর আগে
কদম্ববংশের প্রতিষ্ঠাতা ময়ূরশর্মার লিপি থেকে আমরা জেনেছি, “পল্লবক্ষত্রিয়”, অতএব
পল্লবরা উত্তরভারতের ক্ষত্রিয় এমন অনুমান হয়তো করা যায়।
খ্রীষ্টিয় তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীতে কিছু
প্রাকৃত লিপি থেকে পল্লবদের প্রথম ইতিহাস জানা যায়। এই লিপিতে বেশ কয়েকজন রাজার
নাম পাওয়া যায়, যেমন
বপ্পদেব, শিবস্কন্দবর্মন, বুদ্ধি (বা
অঙ্কুর) এবং বীরবর্মন। রাজা বপ্পদেব পল্লব বংশের প্রতিষ্ঠাতা কিনা সঠিক জানা না
গেলেও, তিনিই
এই রাজবংশকে দক্ষিণে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাঁর সময়ে তেলুগুর “অন্ধ্রপথ” এবং
তামিলদের “তোণ্ডামণ্ডলম”- তাঁর রাজ্যের দুই প্রধান অঞ্চল ছিল এবং এই দুই অঞ্চলে
তাঁর প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল ধ্যানকটা (ধরণীকোট্টা, অমরাবতীর কাছে) এবং কাঞ্চী
(কাঞ্জিভরম)। তাঁর পুত্র শিবস্কন্দবর্মন এই রাজত্ব হয়তো আরো দক্ষিণে বিস্তৃত করতে
পেরেছিলেন, নচেৎ
তিনি অশ্বমেধ, বাজপেয়
এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের আয়োজন করতে পারতেন না। আরেকজন পল্লব রাজার নাম পাওয়া যায়
সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ লিপিতে, কাঞ্চীর রাজা বিষ্ণুগোপ। দাক্ষিণাত্য অভিযানে সমুদ্রগুপ্তের
সঙ্গে এই রাজার যুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজা বিষ্ণুগোপের সময় কাল চতুর্থ
শতাব্দীর মাঝামঝি কোন সময়ে। অতএব পল্লবদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর্ব সাতবাহন
সাম্রাজ্যের পতনের সময় থেকে একথা সহজেই অনুমান করা যায়।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে পল্লবদের দ্রুত উত্থান শুরু হয়েছিল, মোটামুটি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে। এই সময় থেকেই পল্লবরা দক্ষিণভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলেন।
রাজা সিংহবিষ্ণুঃ পল্লবদের
এই পর্যায়ে রাজা সিংহবিষ্ণু চোলদের পরাস্ত করে, কাবেরি নদী পর্যন্ত এবং তারপরেও আরও
দক্ষিণে পাণ্ড্য, কালাভ্র
এবং আরও কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন।
রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মনঃ
সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে পিতা সিংহবিষ্ণুর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন। তাঁর সময় থেকেই
পল্লব এবং চালুক্যদের মধ্যে নিরন্তর বিবাদ শুরু হয়েছিল, দুজনেরই
উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভারতে অবিসম্বাদিত প্রতিপত্তি স্থাপনা। এই সময়ের উভয় পক্ষীয়
শিলালিপিতেই অন্যপক্ষকে পরাজিত করার বিবরণ বারবার লেখা হয়েছে। রাজা মহেন্দ্রবর্মন
প্রথম দিকে জৈন ছিলেন,
কিন্তু পরবর্তী কালে স্বামী আপ্পার প্রভাবে শৈব হয়েছিলেন। তাঁর সময়েই পাহাড়
কেটে প্রচুর মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। তিনি নিজে “মত্তবিলাস-প্রহসন” নামে একটি
গ্রন্থ রচনা করেছিলেন,
যার কথা আগেই বলেছি।
প্রথম নরসিংহবর্মনঃ প্রথম
মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র,
পিতার মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকের কোন
সময়ে। ভীষণ শক্তিশালী এবং সাহসী এই রাজা চালুক্যদের ভয়ংকর আক্রমণ করেছিলেন, এবং ৬৪২
সি.ই.-র যুদ্ধে তিনি চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন।
তাঁর সময়ে তিনি দুবার নৌ-অভিযান করে সিংহলও আক্রমণ করেছিলেন। নরসিংহবর্মন শুধু
যুদ্ধ নয়, মন্দির
স্থাপত্যেও অনবদ্য নিদর্শন রেখে গেছেন, তাঁর পিতার মতো তিনিও পাহাড় কেটে
অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যার মধ্যে মহাবলিপুরম বা মামল্লপুরম
সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নরসিংহবর্মনের রাজত্বকালেই চীনের বৌদ্ধ পর্যটক হুয়ান সাং
কাঞ্চী গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছুদিন ছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় কাঞ্চী শহরে
প্রায় শতাধিক সংঘারাম ছিল এবং সেখানে প্রায় দশ হাজার মহাযানী সন্ন্যাসী
বিদ্যাচর্চা করতেন। শহরে প্রায় আশিটি দেবমন্দির দেখেছিলেন এবং শহরে অনেক
নির্গ্রন্থ (জৈন) সন্ন্যাসীও বাস করতেন।
প্রথম পরমেশ্বরবর্মনঃ মোটামুটি
৬৫৫ সি.ই.-তে পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করা
ছাড়া তাঁর তেমন কোন কীর্তির কথা জানা যায় না।
দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনঃ সপ্তম
শতাব্দীর শেষ দশকে তিনি পিতার সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকাল শান্তি এবং সমৃদ্ধির
জন্যে বিখ্যাত। তিনি অনেকগুলি বিখ্যাত মন্দির, যেমন রাজ সিংহেশ্বর এবং কাঞ্চীর
“ঐরাবতেশ্বর” মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মামল্লপুরমের সমুদ্রতট মন্দিরে তাঁরও
অবদানের কথা শোনা যায়। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভার
অলংকার ছিলেন দণ্ডিন,
যাঁর কথা আগেই বলেছি। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য
কোন তথ্য পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি
অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ পরিবারের মধ্যেই তীব্র বিবাদ
এবং কলহ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় বেশ কিছুদিন বিশৃঙ্খলার পর, জনগণের
বিপুল সমর্থনে রাজা হয়েছিলেন, নন্দিবর্মন। তাঁর পিতা হিরণ্যবর্মন ছিলেন, সিংহবিষ্ণুর
ভাইয়ের বংশধর। নন্দিবর্মনের রাজত্বকালের শুরুতেই চালুক্যরা আবার পল্লব রাজ্য
আক্রমণ করেছিলেন, যদিও
নন্দিবর্মন তাঁদের প্রতিহত করে, পল্লব রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। নন্দিবর্মন প্রায়
পঁয়ষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ
করিয়েছিলেন। নন্দিবর্মণের পর রাজা হয়েছিলেন দন্তিবর্মন। শোনা যায় তিনি রাষ্ট্রকূট
রাজকন্যা রেবার পুত্র। এই রাজকুমারী রেবা ছিলেন দন্তিদুর্গার কন্যা। কিন্তু এই
বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চালুক্যরাজ তৃতীয় গোবিন্দ ৮০৪ সি.ই.-তে কাঞ্চী আক্রমণ
করেছিলেন এবং দন্তিবর্মনকে পরাজিত করেছিলেন। দন্তিবর্মনের (৭৭৬-৮২৮সি.ই.)
রাজত্বকালে পাণ্ড্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী রাজারা হলেন নন্দি
(৮২৮-৫১ সি.ই.), নৃপতুঙ্গবর্মন
(৮৫১-৭৬ সি.ই.) এবং অপরাজিতবর্মন (৮৭৬-৯৫ সি.ই.)। তাঁর সময়েই চোলরাজা প্রথম আদিত্য
পল্লবরাজ্যে চরম আঘাত হানেন এবং পল্লবদের রাজ্যচ্যুত করেছিলেন। এরপর দাক্ষিণাত্যের
ইতিহাস থেকে পল্লবদের যুগ সমাপ্ত হল।
চলবে...