প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫ "
৪১
কমলিমায়ের উঠোনে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল
ভল্লা আর রামালি। ঘরের দরজাটা বন্ধ নয়, ভেজানো। দরজার ফাঁক দিয়ে
দীপের ম্লান আলোর আভাস আসছে। ভল্লা দাওয়ায় উঠল – হাল্কা চাপ দিতে খুলে গেল দরজাটা।
কমলিমা মেঝেয় বসে আছেন, খাটিয়ার ওপর দুহাতের মধ্যে মাথা রেখে। খাটিয়ায়
পরিষ্কার বিছানা টানটান করে পাতা, যেন কেউ এখনই আসবে – এসে শোবে। আর তার অপেক্ষাতেই বসে থেকে থেকে কমলিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভল্লার বুকের
ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কী অসহায় শূণ্যতা নিয়েই না এখন বেঁচে রয়েছেন কমলিমা। ভল্লা নিঃশব্দে
কমলিমায়ের পাশে গিয়ে বসল। তার পিছনে সামান্য দূরে বসল রামালি।
ভল্লা অতি সন্তর্পণে কমলিমায়ের কাঁধে হাত রেখে
চাপা স্বরে বলল, “এমন করে বসে আছিস, কেন রে মা?”
কমলিমা মাথা তুলে তাকালেন, ভল্লাকে দেখে বললেন,
“ভল্লা? কতক্ষণ এসেছিস, তুই? জানতেই পারিনি”। কমলিমা হাসলেন – সে হাসির মধ্যে
এতটুকু আনন্দ প্রকাশ পেল না, বরং ফুটে উঠল বিষণ্ণ নির্লিপ্তি। কমলিমা আবার বললেন,
“এতদিনে তোর সময় হল? ওই দিন আমার কাছে একটি বারের জন্যেও আসতে পারলি না? কিন্তু
শুনলাম তুই শ্মশানে গিয়েছিলি?”
“হুঁ। গিয়েছিলাম। তোর কাছে আসতে সেদিন ভয়
পেয়েছিলাম মা। সেদিন গ্রামের মেয়ে-পুরুষ অনেকেই তোর কাছে ছিল...তারা কে কী বলবে...সেই
ভয়...”।
“হ্যাঁ এসেছিল, গ্রামের সবাই। কবিরাজদাদা আর তুই
- ছাড়া। সেদিন গ্রামের সবাই বলছিল আমাকে মুখে আগুন দিতে হবে। আমাকে শ্মশানে যেতে
হবে। পাগল নাকি? তাই কখনও হয়, বল? মেয়েরা শ্মশানে যায়? আর আমি কেন মুখে আগুন দিতে
যাব? আমি কী আঁটকুড়ি নাকি? গাঁয়ের লোক কী যে বলে না...”। ভল্লা কোন কথা বলল না,
তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের শীর্ণ অবসন্ন মুখের দিকে।
“তুই এলে, তোকেই বলতাম। যা ছেলের কাজটা করে আয়। এলি
না। হ্যারে মুখে আগুন না দিলে আত্মার সদ্গতি হয় না, না? তাহলে কী হবে? এখন মনে
হচ্ছে ভুলই করেছি...লোকের কথা শুনে...শ্মশানে গেলেই হত...হ্যারে আমার কী পাপ হল?” গলার
কাছে রুদ্ধ হয়ে থাকা কষ্টটাকে ভল্লা এতক্ষণ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মুখ তুলে
কমলিমায়ের শিরা-বিকীর্ণ কঙ্কালসার হাতটা দুহাতে ধরে বলল, “পাপ কেন হতে যাবে রে,
মা? আর প্রধানমশাইয়ের আত্মার সদ্গতিই বা হবে না কেন? এইসব কথা চিন্তা করে তুই বসে
বসে রাত জাগছিস, মা? গ্রামের মেয়েদের কেউ রাত্রে তোর কাছে থাকে না”?
“ধুর। সন্ধে হলেই আমি তাদের তাড়িয়ে দিই। খুব ভয়
করে জানিস? কচি কচি মেয়েগুলো সারারাত আমার
সঙ্গে থাকবে – যদি কিছু হয়ে যায়? খুব ভয় করে। বলি পালা আমার সামনে থেকে”।
“কিসের ভয় মা?”
“নিজের পেটের দু-দুটো ছেলেকে খেয়েছি। স্বামীকে
খেয়েছি। আমার বিয়ে হয়েছিল আট বছর বয়সে, এ বাড়িতে এসেছি আমার তের বছর বয়সে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি
বলতেন আমি নাকি খুব লক্ষ্মীমন্ত। কবিরাজদাদা বলত তুই খুব ডাকাবুকো ছেলে – ভয়ডর কম।
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তো – ভয় করছে না? আমার চোখে অকল্যাণের ছায়া দেখতে
পাচ্ছিস না? পুকুরে চান করতে গিয়ে জলে ছায়া পড়ে – স্পষ্ট দেখতে পাই একজোড়া ডাইনীর
চোখ”।
চণ্ড রাগে ভল্লা বলে উঠল, “কী আজেবাজে বকছিস, মা?
মা কোনদিন ডাইনী হয়? তুই আমার সঙ্গে চল, মা। এই ঘরে একা একা সারাদিন এইসব চিন্তা
করে তুই নিজেকে শেষ করে দিবি নাকি? কোন কথা নয় - এখনই ওঠ। সারাদিন তোর কাজ নেই
কম্মো নেই, নাওয়া নেই খাওয়া নেই, ঘুম নেই...। আর তাকিয়ে দ্যাখ, রামালি আর আমি
সারাদিন-রাত খেটে মরছি। তারপরেও ঘরে ফিরে রামালি দু বেলা হাত পুড়িয়ে রান্না করে –
নিজে খায়, আমাকে খাওয়ায়...। আজ তুই চ আমাদের সঙ্গে – এ ঘরে তোকে আমি রাখব না। কত
বড়ো ডাইনী তুই হয়েছিস, আমাদের দেখা তো, মা? তোর চোখের বিষে আমাদের কেমন শুকিয়ে মারতে
পারিস – চল আমাদের সঙ্গে – দেখি। ওঠ। না উঠলে, তোর ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে যাবো, এই বলে
রাখলাম, মা। এই গোঁয়ার-গোবিন্দ ছেলেকে তুই ভালই চিনিস। এখনই ওঠ...”।
“পাগল হয়েছিস, ভল্লা? এ আমার স্বামীর ভিটে – এ
আমার শ্বশুরের ভিটে...এ সব ছেড়ে...। তাছাড়া তোরা সব উড়নচণ্ডে ছেলে...দল বেঁধেছিস লড়াই
করবি বলে...”।
ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “হ্যাঁ,
তাই...কিন্তু উড়নচণ্ডেদেরও মা থাকে, ভাইবোন থাকে...রামালি ওঠ। এই বিছানা, আর
কমলিমায়ের শাড়ি-টাড়ি গামছা-টামছা – হাতের সামনে যা পাচ্ছিস নিয়ে একটা পুঁটলি
বানা...চল। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়...”। রামালি উঠে পড়ল - দ্রুত হাতে গুছিয়ে
তুলতে লাগল কমলিমায়ের কাপড়-চোপড়।
কমলিমা চেঁচিয়ে উঠলেন, “অ্যাই, রামালি – যেমন ছিল
সব রেখে দে - কিচ্ছুতে হাত দিবি না – মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেব...”।
ভল্লা হা হা করে হেসে উঠল, পাঁজাকোলা করে দুহাতে
তুলে নিল কমলিমাকে, বলল, “তুই যদি রামালির ঠ্যাং ভাঙতে পারিস, তাহলে আমরাও তোর ঘাড়
ভাঙতে পারি, মা। কী শরীর, রে তোর? আমাদের ওদিকের পায়রাগুলোও তোর থেকে ভারি হয় ...হা হা...”।
কমলিমা কঠোর চোখে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায়
নামিয়ে দে ভল্লা। সেবা-যত্ন করে তোকে সুস্থ করে তুলেছিলাম, আমার সঙ্গে এই ব্যবহার করবি
বলে?”
ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তোর ওই ডাইনী চোখের ভিরকুটিতে
আমি ডরাবার পাত্র নই... আর আমি যে ডাকাত - সে কথা কবিরাজদাদা তোকে বলেনি? সারা
জীবনে অনেক ডাকাতি করেছি - অস্ত্র-শস্ত্র, টাকাকড়ি...কিন্তু মা ডাকাতি কোনদিন
করিনি...”।
ভল্লা দাওয়া পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নামল,
রামালি প্রদীপ নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার শেকল তুলে দিল। তার কাঁধে বেশ বড়ো একটা
পুঁটলি। দুজনে অন্ধকারের মধ্যে কমলিমায়ের বাড়ির বেড়া টপকে এগিয়ে চলল জঙ্গলের দিকে।
ভল্লার বুকের মধ্যে শীর্ণ পাখির মতোই আবদ্ধ কমলিমা অনর্গল বকাবকি করতে লাগলেন
ভল্লাকে...হতভাগা ছেলে, গাঁয়ের লোক কি বলবে? আমার সন্তান গেছে – আমার স্বামীও গেল –
এ গ্রামে বাকি ছিল একটু মান-সম্মান – সেটাও গেল তোর জন্যে – কাল সকালে
গাঁয়েগাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যাবে প্রধানের বউ – ভল্লার সঙ্গে পালিয়েছে – এখনও বলছি আমায় নামিয়ে
দে ভল্লা – মুখপোড়া বাঁদর – তোর জ্বালায় আমাকে শেষ অব্দি গলায় দড়ি দিতে হবে…”!
উপানুদের মারে মারাত্মক আহত হয়ে গ্রামপ্রধান জুজাক যেদিন থেকে
নিশ্চেতন অবস্থায় শয্যাশায়ী হলেন – সেই দিন থেকেই কমলিমায়ের অনিয়ম শুরু হয়েছিল। তাঁর
জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল নিয়মিত নাওয়া-খাওয়া, ঘুম-বিশ্রাম, হাসি-আনন্দ, এমনকি প্রতিবেশী
মহিলাদের সঙ্গে স্বাভাবিক বাক্যালাপও। আজ ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘ বাক-যুদ্ধের উত্তেজনা
এবং ভল্লার উদ্ভট এই আচরণের অসহায় প্রতিবাদ করতে করতে তিনি একসময় ভেঙে পড়লেন। তিনি
যেন ভল্লার বুকেই নিজেকে সমর্পণ করে ফেললেন। জুজাকের মৃত্যুতেও যিনি এতটুকু অশ্রুপাত
করেননি, আজ ভল্লার ওপর রাগে, অভিমানে তাঁর দুচোখে নেমে এল রুদ্ধ অশ্রুস্রোত।
ভল্লা অন্ধকারেও টের পেল, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে
বলল, “কেঁদে নে মা, কেঁদে নে…বুকের মধ্যে অনড় পাথরের মতো জমে ওঠা যত অপমান, দুঃখ-শোক
বেরিয়ে আসুক চোখের জল হয়ে। একদিন সকলকেই মরতে হবে। কিন্তু এভাবে তুই নিজেকে শেষ করতে
পারিস না, মা – আমাদের জন্যেই তোকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে রামালির জন্যে – এই গ্রামের
জন্যে”।
জঙ্গলে ঢুকে ভল্লা কমলিমাকে সাবধানে ঘাসে বসাল, তারপর রামালিকে
বলল, “তোর পুঁটলি থেকে একটা শাড়ি বের কর তো, রামালি। তারপর ঝোলা বানিয়ে আমার পিঠে শক্ত
করে বেঁধে দে বুড়িটাকে। দেখিস একটুও যেন নড়তে না পারে”।
কান্না রুদ্ধ গলায় কমলিমা বলে উঠলেন, “কেন? আমি তো পাখির মতো
হাল্কা, আমাকে নিয়ে এটুকু আসতেই তোর হাঁফ ধরে গেল?”
ভল্লা কমলিমায়ের পায়ের ওপর হাত রেখে বলল, “আমরা এখন রণপা চড়ে
যাবো, তোকে দুহাতে ধরতে পারবো না, সেই জন্যেই রামালিকে বলছি আমার পিঠে তোকে ঝুলিয়ে
দিতে। রাগ করিস নে মা। একজন মা স্বেচ্ছায় তিলতিল করে মৃত্যুর
দিকে এগিয়ে চলেছে, সে কথা বুঝেও কোন ছেলের পক্ষে ঠাণ্ডা থাকা সম্ভব? আচ্ছা বেশ, আমি
তো তোর ছেলে নই – তাহলে তুই কেন নাওয়া-খাওয়া ভুলে আমার সেবা করে সুস্থ করেছিলি? আমি
তোর ছেলে নই, তাই কোন অধিকারে আমি তোর ওপর এমন জোর খাটাচ্ছি, এখন তোর তাই মনে হচ্ছে,
না রে মা…?”
কমলিমা হঠাৎই ফুঁসে উঠলেন, দুহাতে ভল্লার চুলের মুঠি ধরে বললেন,
“আমি তোকে তাই বললাম বুঝি?” তারপর দুহাতে ভল্লার মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আবার কান্নায়
ভেঙে পড়লেন। ভল্লা ভীষণ নরম গলায় বলল, “কাঁদ মা, কাঁদ – কেঁদে হাল্কা হ। কিন্তু এত
উত্তেজিত হস না, তোর দুর্বল শরীর…”। রামালি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল কমলিমাকে,
এরকমই কী হয় মায়েরা? ধীরে ধীরে সেও ওদের কাছে এসে বসল। ভল্লা রামালিকে দেখিয়ে বলল,
“দ্যাখ মা, রামালির মুখটা দ্যাখ। হতভাগা বাচ্চাবেলায় মাকে হারিয়েছে – বড়ো হয়েছে কাকির
গালমন্দ খেতে খেতে – কেমন অবাক হয়ে তোকে দেখছে দ্যাখ…”। রামালিকেও কাছে টেনে তার মাথায়
হাত রেখে কমলিমা কান্নাভেজা গলায় বললেন, “কোন চুলোয় নিয়ে যাবি চল, রাত শেষ হতে চলল
– ছেলেরা বলে তুই আর রামালি নাকি খুব খাটিস সারাদিন… ঘুমোবি কখন?”
চলবে...