বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৭শ পর্ব "


৩১ 

যজ্ঞস্থলে বেণপুত্র পৃথুর রাজ্যাভিষেক ও বিবাহের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হল। অনুষ্ঠানের শেষে তাঁরা যুগলে রাজপুরোহিত এবং আশ্রমের আচার্যদের প্রণাম করলেন; মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলের সঙ্গে পরিচিত হলেন, আন্তরিক সম্ভাষণ করলেন।

 তারপর প্রকাশ্য রাজসভায় মহারাজ পৃথুর বন্দনাগীত শুরু করলেন রাজভট্ট। বন্দনা শেষ হতেই তিনি ঘোষণা করলেন, মহারাজা পৃথুর আগমন বার্তা, “ত্রিলোকের পিতা ভগবান ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভূব মনু হইতে প্রাচীন কালে যে পূত রাজবংশের উদ্গম হইয়াছিল - সেই মহান্‌ স্বায়ম্ভূব এবং তৎপত্নী রত্নগর্ভা শতরূপার দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ ভগবান বাসুদেবের অংশে ধরাতলে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন - মহারাজা উত্তানপাদ ও তাঁর পুণ্যব্রতা পত্নী সুনীতির মহাপুণ্যবান বালক পুত্র ধ্রুব, কঠোর তপস্যায় ভগবান বিষ্ণুর সাক্ষাৎলাভ করিয়া, স্বয়ং ভগবান শ্রীহরির আশীর্বাদ ও অনুগ্রহ লাভ করতঃ সসাগরা ধরিত্রীকে স্বীয় সন্তানের ন্যায় সুদীর্ঘকাল প্রতিপালন করিয়া অক্ষয় বৈকুণ্ঠলাভ করিয়াছিলেন – এই অনুপমবংশললাম ছিলেন মহারাজ অঙ্গ - তাঁহার তুল্য ধর্মপরায়ণ, প্রজারঞ্জক নৃপতি ভূভারতে কদাপি দৃষ্টিগোচর হয় নাই –  প্রজাপিতা মহারাজ অঙ্গের পুত্র অরাতিমর্দন মহারাজ বেণের মানসপুত্র শ্রী পৃথু ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার এবং মানসকন্যা শ্রীমতী অর্চ্চি সনাতনী কমলার অংশ রূপে প্রবোধিণী একাদশীর পুণ্য তিথিতে ধরণীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। আজ কার্তিক মাসের পুণ্য পূর্ণিমা তিথিতে প্রজ্জ্বলন্ত অগ্নিদেব, শ্রীশ্রীব্রহ্মা, শ্রীশ্রীবিষ্ণু, ভগবান ভব, দেবরাজ শ্রীইন্দ্রাদি সকল দেবতাদের সম্যক উপস্থিতিতে কীর্তিমান শ্রীপৃথুর রাজ্যাভিষেক যজ্ঞ সুসম্পন্ন হইল। ঐ যজ্ঞানুষ্ঠানেই মহারাজ শ্রীপৃথু ও শ্রীমতী অর্চ্চি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হইয়া এই রাজ্যেই বৈকুণ্ঠলোকের প্রতিষ্ঠা করিলেন। স্বায়ম্ভূবকূলতিলক দেবোপম দম্পতি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃমাতৃতুল্য মহারাজা ও মহারাণীকে রাজসভায় পদার্পণ করতঃ আমাদিগকে কৃতার্থ করিবার নিবেদন করিতেছি...”।

সভার বাইরে অপেক্ষমাণ জনতা একসঙ্গে বারবার জয়ধ্বনি করে উঠল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”!

 

 রাজভট্টের ঘোষণা ও আবাহন সমাপ্ত হতেই, প্রশস্ত সুসজ্জিত দ্বারপথে প্রথমেই প্রবেশ করল সুশৃঙ্খল নিরাপত্তাবাহিনী। নিরাপত্তারক্ষীরা পূর্ব নির্দিষ্ট স্ব স্ব স্থানে স্থিত হওয়ার পর দ্বারপথে দেখা দিলেন রাজপুরোহিত। বামহস্তে সরস্বতীর পূতবারি পূর্ণ তাম্রঘট, দক্ষিণহস্তে পঞ্চপত্রমঞ্জরী দিয়ে ঘটের মন্ত্রঃপূত বারি সিঞ্চন করতে করতে তিনি সভাস্থলে প্রবেশ করলেন।  তাঁর অনুবর্তী হলেন রাজদম্পতি, তাঁদের অনুবর্তী হলেন মহামন্ত্রী বিমোহন, সকল মন্ত্রীমণ্ডলী এবং সর্বশেষে আশ্রমের পঞ্চ আচার্য এবং দুই আশ্রমকন্যা।                       

রাজ সিংহাসনে উপবেশন করলেন, মহারাজা পৃথু, তাঁর বাম দিকে বসলেন, মহারাণি অর্চ্চি। সিংহাসনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন মহামন্ত্রী বিমোহন এবং রাজপুরোহিত। সিংহাসনের পিছনে দাঁড়ালেন, মন্ত্রীমণ্ডলী ও আশ্রমের আচার্যগণ ও দুই আশ্রমকন্যা। সকলের অবস্থান স্থিত হলে, রাজভট্ট সভামধ্যে উপস্থিত বৈদেশিক রাজন্যবর্গ, রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রীদের গুরুত্ব ও প্রভাব অনুযায়ী একে একে পরিচয় ঘোষণা করতে লাগলেন। এই পদ্ধতি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর কিন্তু বিদেশনীতির বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজদম্পতি করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা অনুধাবণ করছিলেন। প্রত্যেক পরিচয়ের সমাপ্তিতে, সভাসদবৃন্দ “সাধু, সাধু” ধ্বনিতে স্বাগত জানাচ্ছিলেন রাজদম্পতিকে এবং ক্রমে ক্রমে অধৈর্য হতে থাকা জনতা অধিকতর উৎসাহে গর্জন করে উঠছিল, “জয় মহারাজ পৃথুর জয়, জয় মহারারাণি অর্চ্চির জয়”!

জনতার সম্মিলিত জয়ধ্বনি, ভয়ংকর মেঘগর্জনের মতো কাঁপিয়ে তুলছিল সেই সভাগৃহ। বারবার জলদগম্ভীর জয়ধ্বনিতে কল্যাণী, যিনি বর্তমানে মহারাণি অর্চ্চি, অসহায় হরিণীর মতো কেঁপে উঠছিলেন। মহারাণি অর্চ্চি কনুইয়ের চাপে মহারাজ পৃথুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অস্ফুটস্বরে বললেন, “আর্যপুত্র, আমার ভয় করছে”।

মহারাজা পৃথু প্রশ্রয়ের হাসি চোখে নিয়ে, প্রিয়তমা রাণিকে অস্ফুটে বললেন, “ভয় কী, আমি তো আছি!” মহারাজ পৃথুর চোখে চোখ রেখে মহারাণি অর্চ্চি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন, তিনি স্বামীর দুই চোখে দেখতে পেলেন অদ্ভূত এক শক্তি – এ দৃষ্টি কদাপি অর্চনের নয়, এ দৃষ্টি মহারাজা পৃথুর!  

 

কারণ বিগত সন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে নির্জন সাক্ষাতেও অর্চন কল্যাণীর দুটি হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল, “এ আমি কিছুতেই পারবো না, কল্যাণী, পারবো না। আমার চোখে এখনো ভাসছে আমাদের গ্রাম, মাঠ-ঘাট, দীঘির নিবিড় পার, নদীর নিরালা স্রোত। আমাদের হৃদয়ে রয়েছে পিতামাতার স্নেহময়শাসন, ভ্রাতা ও ভগিনীদের কপটকলহমাখা শ্রদ্ধা -  সেই সব কিছু ছেড়ে রাজা সাজতে আমি পারবো না। আমি আজ রাত্রেই মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্য সুনীতিকুমারকে বলব, আমার অক্ষমতার কথা, বলব, গুরুদেব, আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে মুক্তি দিন! আমাকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন, আমাদের সেই গ্রামে, আমাদের পিতামাতার স্নেহচ্ছায়ায়”!

সে সময় কুমারী কল্যাণীই সান্ত্বনা দিয়েছিল অর্চনকে, বলেছিল, “তা আর হয় না, অর্চন। মহর্ষি এবং আচার্যদের এই পরিস্থিতিতে ফেলে তুমি পালিয়ে যাবে? আবেগের বশে এখন হয়তো তুমি একথা বলছো, কিন্তু তুমি চলে গেলে, আচার্যগণ যে অসহ্য অপমানিত হবেন, সে কথা তোমার যখনই মনে পড়বে তুমি অনুশোচনায় দগ্ধ হবে - সারাজীবন, অহরহ। আমার মুখের দিকে তাকাও অর্চন, আমি বিশ্বাস করি, তুমি পারবে। মহর্ষি ভৃগু এবং আচার্যগণও বিশ্বাস করেন তুমিই পারবে! হে প্রিয়, তুমি নিজেকে বিশ্বাস করো, শান্ত হও, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করো নিজেকে”!               

 

মহারাজ পৃথু করজোড়ে স্মিতমুখে রাজভট্টের ঘোষণা শুনতে শুনতেও অনুভব করলেন, কল্যাণী অবাক নয়নে তাকিয়ে আছেন তাঁর মুখের দিকে। কল্যাণীর এই বিস্ময়ের কারণ তিনি জানেন। গতকাল সন্ধ্যাতেও অর্চন নামের সেই তরুণ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তার পিছনে ফেলে আসা জীবনের সারল্যে ফিরে যাবে, নাকি আলিঙ্গন করে নেবে রাজকীয় জীবনের এই জটিল আবর্তকে? কিন্তু আজ প্রভাতে অভিষেকের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে, তাঁকে ঘিরে ঘটতে থাকা সকল রাজকীয় অনুষ্ঠান, তাঁর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিয়োজিত অজস্র মানুষের শ্রদ্ধা, তাঁকে ধীরে ধীরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে তুলছে। এই সভাস্থলে উপস্থিত ভিন্নদেশের রাজন্যবর্গ, মহামান্য অতিথিবৃন্দ, এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এই রাজ্যের বিপক্ষীয়, তাঁরা এখানে উপস্থিত হয়েছেন নবীন রাজার ব্যক্তিত্ব বিচার করতে। আচার্য সুনীতিকুমার এই বোধ তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন, দীর্ঘ কয়েকমাসে। আজ সিংহাসনে উপবেশনের পর তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ী -  বিপক্ষীয়দের সামনে তাঁকে শিষ্ট অথচ বলিষ্ঠ এক নৃপতির ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতেই হবে।

উপরন্তু সভাগৃহের বাইরে, উপস্থিত ওই যে জনতা, যাঁদের নির্দিষ্ট কাউকেই তিনি চেনেন না। একদিন তিনি নিজেও ওদের মধ্যেই জনৈক ছিলেন, অথচ ভাগ্যক্রমে আজ তিনি রাজা! এখনও পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত কোন কীর্তিই নেই, তবুও ওই জনতা সম্পূর্ণ আস্থায় তাঁর জয়ধ্বনি দিয়ে চলেছে বারংবার। প্রতিবার জয়ধ্বনির গর্জনে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি আর সাধারণ অর্চন নন, তিনিই মহারাজ পৃথু, এই বিশ্বাস – তাঁর প্রতি ন্যস্ত এই দায়িত্বের প্রতিদান তাঁকে করতেই হবে! চারণকবিদের গানে যে মহারাজ পৃথুর কীর্তির কথা পল্লবিত হয়ে চলেছে এতদিন, তিনিই সেই মহারাজ পৃথু, তাঁকে অতিক্রম করতেই হবে ওইসকল কীর্তির চূড়া!

কিছুক্ষণ আগেও এই মহারাজ পৃথুকে অর্চন নিজেই চিনতেন না, চিনছেন প্রতি পলে, অতএব আজকে তাঁকে দেখে কল্যাণী, প্রিয়তমা মহারাণি অর্চ্চি যে বিস্মিত হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?    

 পরিচয় ও সৌজন্য পর্ব শেষ হল, রাজভট্ট সমাপ্তি ঘোষণায় বললেন,  “উপস্থিত সম্মানীয় রাজন্যবর্গ এবং সম্মানীয় অতিথিবর্গ এই অনুষ্ঠানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের নব রাজদম্পতির পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আজ এই অনুষ্ঠান এখানেই সমাপ্ত হোক। আপনারা নিজ নিজ স্কন্ধাবারে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সন্ধ্যার পর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে থাকবে নৃত্য ও গীতের অনুষ্ঠান। সেখানে আপনাদের উপস্থিতির জন্য আমাদের রাজদম্পতি আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। আপনারা আশীর্বাদ করুন আমাদের রাজদম্পতিকে – তাঁদের জয় হোক, শুভ হোক, মঙ্গলময় হোক তাঁদের নতুন জীবন – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের – মঙ্গল হোক এই রাজ্যের সকল রাজ্যবাসীর”।

করজোড়ে রাজা পৃথু ও রাণি অর্চ্চি সকলকে বিদায় অভিবাদন করলেন, তারপর উপস্থিত সকলের সঙ্গে ধীরপায়ে সভাস্থলের বাইরে এলেন। দ্বারের সম্মুখে অপেক্ষারত সুসজ্জিত অশ্বশকটে তাঁরা উঠে বসলেন। অশ্বশকট মৃদু গতিতে রাজপ্রাসাদের দিকে চলতে শুরু করল। নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে অপেক্ষারত সহস্র জনগণ আবার গর্জন করে উঠল, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাজা পৃথু বামহাতে রাণি অর্চ্চির ডানহাতটি চেপে ধরলেন, হাস্যমুখে আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন জনগণের উদ্দেশে। দুপাশের হর্ম্যরাজির অলিন্দ থেকে বর্ষিত হতে লাগল পুষ্পরাশি।

চলবে... 


মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

কোশিশ কিজিয়ে...

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " ছোট্ট হওয়া "


 

শনিবারের বাজারটা একদম ময়দানে মারা গেলদিল্লিতেও ময়দান আছে, আছে কলকাতাতেওকলকাতায় মেট্রো রেলে বলে নেক্সট স্টেসন ইজ ম্যায়ডান। কিন্তু বাংলায় বলে পরবর্তী স্টেসন ময়দান। দিল্লির ময়দানে আছে প্রগতি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ময়দানে প্রগতি নেই। প্রগতি আর উন্নতিকে কি সমার্থক বলা যায়? তাহলে বলব পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ধারে। ত্রিফলা আলোর মতো। ত্রিফলা আলোর ডাণ্ডায় জড়ানো নীল-সাদা এলইডি টুনি বাল্বের মতো। উন্নতির আলোয় কিছুই দেখা যায় না – কিন্তু মিটমিট করে।     

থাকি গুরগাঁওতে, চাকরি করি একটা বহুজাতিক সংস্থায়। ফাইভ ডে উইক হলেও, কোম্পানির বাতিক হল এমপ্লয়িদের চাঙ্গা রাখা। আর সেই কাজের তদারকির জন্যে আছে এইচ আর ডিপার্টমেণ্ট। অবাঙালিরা বলে হ্যাচ আর। ঠিকই বলে, আমরা যেন পোলট্রির ডিম, হ্যাচ করে বানিয়ে তুলবে ঝিম মারা সব মুরগি ছানা। কিছুদিন পরেই গোটা ১৭০/-, কাটা ২৩০/-।

আমাদের এই হ্যাচ আর ডিপার্টমেণ্ট, যার কর্পোরেট মাথায় আছে আম্রুৎ নেগি, ন্যাগ করার জন্য বিখ্যাত। ব্যাটা সব জানে। এমন কোন বিষয় নেই, এমন কোন ভাষা নেই জানে না। আমার সঙ্গে একবারই ছোটি সি মুলাকাত হয়েছিল। বলেছিল বাঙ্গালীদের হামি খুব রেসপেক্ট কোরে, বাঙ্গালি খুব মিশটি আছে। টাগোরের গান হামার ওয়াইফ পসন্দ করল। বিপোঁদে মোরে রকছা কড়ো এ নাহি মোর পরারথনা, বিপোঁদে হামি না জেনো কোড়ি ভোয়। আরে ওয়াঃ, কা বাত। হোয়েনএভার ইউ ফেস এনি ট্রাবুল, ডোন্ট গেট অ্যাফ্রেড। মায়ের চিকিৎসার জন্যে, আমি ছুটির দরখাস্ত করেছিলাম। তার জন্যে এত কথা! আরো বলেছিল, আপনার মামি হামাদেরও মামি। আপনাকে যেতে হোবে কেনো? হামি কঅলকাতার ব্রাঞ্চে কহিয়ে দিচ্ছে, সব ঠিক কোরে দেবে। কঅলকাতার বেস্ট নার্সিংহোম, বেস্ট ডক্টর। আমাদের কলকাতা উচ্চারণে কোল আছে, অবাঙালী উচ্চারণে কল আছে যাকে গ্যাঁড়াকল বলা চলে। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে বসে শোনা যায় কঅলকাতা যানেওয়ালি ফ্লাইট গেট নাম্বার তেইশসে রওয়ানা হোগি...। কলকাতার কোলে বেড়ে ওঠা বাঙালী, বাইরে গেলেই জাঁতাকলে পড়ে যায়। তা সে যাইহোক, আমার এবং মায়ের দুজনেরই ভাগ্য ভালো, শেষমেষ সেবারে আর যেতে হয়নি। মা দু একদিনের মধ্যেই রিকভার করে গিয়েছিলেন।

সেই নেগির ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক শনিবার অফিস ছুটি থাকলেও, আমাদের হাজরি দিতে হয়। সকাল দশটা থেকে বারোটা-সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। “জিনে কি তরিকা” আমাদের বাঁচার ক্লাস নেয় বেঁচে তো সবাই আছে এই পৃথিবীতে - পিমড়ে থেকে হাতি, অ্যামিবা থেকে তিমি। কিন্তু সে জিনা কি আর জিনা, রে লাল্লু। “জিনে কি তরিকা”-র বাবা তেজকিরণ প্রতি শনিবার আমাদের ক্লাস নেন। কিভাবে আমাদের জীবনটা আরো সুন্দর হয়ে উঠবে। তিনি আমাদের ধ্যান শেখান, ইয়োগা শেখান, প্রাণায়াম শেখান। আমাদের মনের মধ্যে জমে ওঠা সারা হপ্তার যাবতীয় কাজের স্ট্রেস, তিনি টিপে টিপে বের করে দেন, টুথপেস্টের টিউব থেকে পেস্ট বের করার মতো। একবারে সবটা বের করে দিলেই হয়, কিন্তু তা নয় একটু একটু করে, প্রতি শনিবার।

বাবা তেজকিরণ আসেন, তাঁর সঙ্গে আসেন দুই সঙ্গিনী। পাক্কা দশটায় আমাদের অফিসের থার্ডফ্লোরের সেমিনার হলটাকে ফ্যাঁস ফ্যাঁস রুম ফ্রেশনারে ফ্রেশ করে নেওয়া হয়। সাজিয়ে তোলা হয় ফুল দিয়ে আর সারা হলের কোনায় কোনায় সুগন্ধী আগরবাত্তি জ্বেলে দেয় ওরা। দুই কন্যার পরনে সাদা খোলে নীল চিরুনি পাড় শাড়ি। গায়ে থ্রি কোয়ার্টার সাদা ব্লাউজ, কনুইয়ের একটু নিচে ফ্রিল দেওয়া হাতাভাবলেশহীন মুখে তারা যন্ত্রের মতো সব কাজ সেরে ফ্যালে। দশটা দশে আবির্ভাব হওয়ার পর, বাবা সিংহাসনে আসীন হলে, তারা বাবার পিছনে বসে – একজন ফার্স্টস্লিপ, অন্যজন লেগস্লিপ ফিল্ডারের মতোঅতটা না হলেও, একটু পিছনে, কোনাকুনি। তাদের দুজনার মতো রাম গরুড়ের ছানা আমি আর তৃতীয় দেখিনি। মুখ দেখলে মনে হয়, আমাদের নেগি সায়েবের মতো, বাবা তেজও তাদের বহুদিন ইনক্রিমেন্ট আটকে রেখেছেন; নয়তো বহুদিন তাদের লিভ অ্যাপ্লিকেশন পেন্ডিং রেখে দিয়েছেন।

সকাল দশটার মধ্যে আমরা যখন হলে পৌঁছাই, বাইরে জুতো খুলে, হাল্কা পায়ে উঠে বসি সাদা চাদর বিছানো, মেঝেয় পাতা ঢালাও গদিতেআর নেগি সায়েবের চ্যালা রাজেশ পুনিয়া, বাবা তেজকিরণকে সঙ্গে নিয়ে হলে প্রবেশ করলেই আমরা হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াইজোড়হাত করে, আমরা সমস্বরে নমস্কার করে বলি, “পরণাম, মহারাজজী”।

এতগুলি সন্তানের গর্বিত পূজ্য বাবা দুই হাত তুলে আশীর্বাদ করেন, “জয়মস্তু, শুভমস্তু”। বাবার গোলগাল নির্দাড়িগোঁফ মুখে হাল্কা হাসি, চোখ সামান্য আবিষ্ট। মাথার কাঁচাপাকা চুল ঘাড় অব্দি, থাক-কাটা-কাটা। পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি। ম্যাজেন্টা রঙের চওড়া পাড় দেওয়া বাসন্তি খোলের ধুতি, ভাঁজ করে পরা। ফুলে সাজানো সোনালি নকশা করা ডিপব্রাউন সিংহাসনটা হলের পশ্চিম দিকে, মাঝখানে রাখাই ছিল। গদি আঁটা সেই সিংহাসনে বসে, তিনি দুই হাতের ইশারা করলে, আমরা সকলে বসি। সমঝদারকে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়। বাবু হয়ে বসতে আমাদের অনেকের হাঁটুতেই কটমট, খটমট আওয়াজ হয়। তা হোক, গদিতে বসার পর, আমরা তাঁর বাণী শোনার জন্য উদ্গ্রীব হইউদ্গ্রীব হই?! আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, সত্যিকারের উদ্গ্রীব না হলেও, আমরা সেরকমই অভিনয় করি। আসলে প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিনিয়ত আমরা যে কত ভালো অভিনয় করি, সে কথা জানলে উত্তমকুমার-সৌমিত্রও শিউরে উঠতেন! 

সকলের একজোড়া হ’লে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ জোড়া চোখে, আমরা বাবা তেজকিরণের মুখের দিকে চেয়ে থাকি। না ঠিক বললাম না, নিখিল চোমালের একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। ছোকরা বছর কয়েক আগে বাইক অ্যাক্সিডেণ্ট করে, প্রায় মরতে বসেছিল। হাতে-পায়ে স্টিল প্লেট বসিয়ে, একটা চোখ খুইয়ে বেচারা এখন আমাদের সঙ্গেই চার্টার্ড বাসে যাওয়া আসা করে। আমরা সবাই বাবা তেজকিরণের দিকে তাকিয়ে আছি বললাম বটে, কিন্তু কিছু লোকের চোখ, বাবার সঙ্গী স্লিপের দুই ফিল্ডারের দিকেও থাকে। আমাদের সেকসনে কওশল সুমন নতুন ঢুকেছে, বছর খানেক হল। ছোঁড়া খুব ডেঁপো, মেয়েদের পেছনে খুব ঘুরঘুর করে। সে নাকি লেগস্লিপের মেয়েটির সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিয়েছে। মেয়েটির বাপের দেওয়া নাম নেহা পটেল, আর এখন বাবার আশ্রম থেকে দেওয়া নাম শান্তিমতী। খুব গরিব ঘরের মেয়ে। কোনরকমে ক্লাস টেন পাস করার পর আর লেখাপড়া করতে পারেনি। বাবা তেজকিরণের রাজকোটের আশ্রমে ওদের পরিবারের আসাযাওয়া ছিল। সেখানেই ও কিভাবে যেন বাবার চোখে পড়ে যায় এবং সেই থেকে আশ্রমে রয়ে গেছে। বছর খানেক ট্রেনিংয়ের পর, এখন বাবার সঙ্গেই থাকে, বাবার সেবা করে। অহর্নিশ সেবা মে হে।

“বহনোঁ অওর ভাইয়োঁ...আজ আমরা যে বিষয় শিখবো – সে বিষয় প্রত্যেক লেডিস ও জেন্টসের পক্ষে অত্যন্ত জরুরী শিক্ষণীয় বিষয়। পরন্তু আমাদের দেশে যে শিক্‌ষাবেওস্থা আছে, তাতে এই শিক্‌ষা আমাদের দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের বাচ্চারা পচ্চিমদেশের অনুকরণ করে যে শিক্‌ষা লাভ করে, তাতে তারা যে শুধু ভোগময় জীবনের প্রতি লালচি হয় তাই নয়, বরং পাপের দিকে নিরন্তর দৌড়তে থাকে। তারা কদাপি মনমে শান্তি পায় না, দিনরাত পয়সা, প্রমোশন, আলিসান ফ্ল্যাট, লেটেস্ট মডেলের দামি গাড়ি, বছরে একবার ফোরেন টুরের স্বপ্ন দেখতে দেখতে, অন্দরসে খোকলা হয়ে যায়, পরেসান হতে থাকে। বাড়তে থাকে স্ট্রেস – মান্‌সিক চাপ। মেরেকো আকসর পুছা যাতা হ্যায়, বাবা, ইস সে ক্যায়সে মিলেগি ছুটকারা? কেয়া মুক্তি কি কোই ভি উপায় নেহি হ্যায়? আমি বলি, কিঁউ নেহি, বেটা, অবশ্য উপায় হ্যায়। তোমার কাছে ইয়দি দোপলকা ওয়ক্ত থাকে, শান্ত হয়ে বসো দেখি আমার সামনে, মন দিয়ে শোন দেখি আমার কথা। আমাদের এই দেশেরই মুনি ঋষিরা সাদিয়োঁ পহেলে, এর মোক্ষম উপায় বাতলে দিয়ে গেছেন। আমরা সে কথা শুনি না। কিন্তু সেই উপায় ইস্তেমাল করে, পচ্চিমের সায়েবরা যখন সেই উপায়ের কথা ইংরিজিতে সাতকাহন করে বলে, তখন আমাদের গর্বে বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু তাও আমরা সেই উপায়ের কথা চিন্তা করি না। সেই উপায় কী”? 

ওপরের কথাগুলো বাবা তেজকিরণ স্যান্সক্রিট ঘেঁষা শুদ্ধ হিন্দীতে বললেও, আমি অধিকাংশই পাতি বাংলাতেই বললাম। হিন্দি বলা এবং লেখাতে আমার কচি নয়, বেশ ব্যথা আছে। তবু বাচালতা করা যার স্বভাব সে করবেই, আমি বলে ফেললাম, “যোগ”।

প্রসন্ন হাসিতে বাবা তেজকিরণের মুখ ভরে উঠল, বললেন, “অতি উত্তম। সহি জওয়াব। লেকিন যোগ নেহি বেটা, ই-য়ো-গা। আপনি বাঙ্গালি আছে, জরুর”। আমি হেসে ঘাড় নাড়লাম। তিনিও আধবোজা চোখের হাসিতে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইয়োগা। আজ ইয়োগার মধ্যে আমি অন্য এক বিষয়ের কথা বলব, ধ্যান। আপলোগ সবাই মক্ষিকে তো দেখেছেন। মক্ষি কভি ফুলের ওপর বসে, কভি গন্ধা বিষ্ঠায় বসে, আমাদের এই চঞ্চল মনটাও ওই মক্ষির মতো ...

 

 মাছির কথায় আমার মাছের কথা মনে পড়ল, আজ অনেকদিন পর বাজারে বেশ টাটকা মৌরলা পেলাম। এদিকে এসব মাছ বেশ কম আসে। আর এলেও এমন দাম হাঁকে, নেব কি নেব না, ভাবতে ভাবতে অন্য লোকেরা তুলে নেয়। তাছাড়া হরিয়ানভি যে বাই আমাদের ফ্ল্যাটে কাজ করতে আসে কিংবা ঝিনিও, এই ছোটোমাছ সাফ করার তরিকাটা ঠিক জানে না। ঝিনি, আমার বউ, ছোটমাছ খেতে পছন্দ করে, কিন্তু নিজে রান্না করতে বিরক্ত হয়। দিন দশেক হল, দুর্গাপুর থেকে ঝিনির মা এসেছেন, সেই ভরসাতেই আজ সাহস করে মৌরলা মাছ কিনেই ফেললাম। শ্বাশুড়ি দুর্গাপুর থেকে আসার সময় একগাদা আমের, কুলের আর তেঁতুলের আচার, কাসুন্দি নিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে এনেছেন কল্যাণেশ্বরী মায়ের আর ঘাগরবুড়িমার প্রসাদীফুল ও প্রসাদ। কল্যাণেশ্বরী মা এবং ঘাগরবুড়িমা, দুজনেরই থানে ঝিনির মা মান্নত করে এসেছেন, এবার যেন আমাদের একটি ছেলে হয়। আমাদের বড়োটি মেয়ে, বুল্টি, বছর চারেক বয়েস। এখন ঝিনি আবার মা হতে চলেছে। দেরী আছে - সবে তিনমাস, ডেট আছে সেই নভেম্বরে। অফিসে এখনো কাউকে বলা হয়নি। বললেই বলবে, পার্টি দো - হুইস্কি, চিলি চিকেন, সেঁকাপাঁপড়, ডালমুট...এখনই দুম করে খরচ করতে চাইছি না। ঝিনির চেকআপ, শ্বাশুড়ির আপ্যায়ন, বুল্টির নিয়মমাফিক ভ্যাক্সিন। তার ওপর সামনে ঝিনির ডেলিভারি, বুল্টির প্রেপ স্কুলে অ্যাডমিশান, অনেক খরচ...

 

“চঞ্চল-চুলবুলি এই মনটাকে একটি কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপনা করতে হবে। তার কি উপায়? সমতল আসনে সরলদেহে আরামে বসতে হবে। সরলদেহ কা মতলব কেয়া হ্যায়? সমগ্রীবকায়। অর্থাৎ কিনা মাথা থেকে ঘাড়, মেরুদণ্ড বিলকুল সিধা টানটান করে বসতে হবে। তারপর দুই হাত নিজের কোলের ওপর উত্তানভাবে, একহাতের উপর অন্যহাত রাখতে হবে। উত্তানভাব কেয়া হ্যায়? হাতের তালুর উপরের দিকে খোলা অবস্থানকে উত্তানভাব বলে। আভি আপনা দো আঁখোকা নজর আপনা নাককে উপর ডালনে কি কোশিশ কিজিয়ে। ট্রাই টু কিপ ইয়োর ভিসন, অন ইয়োর ওন নোজ টিপ। কিজিয়ে কিজিয়ে, কোশিশ কিজিয়ে। আপ, সেকেণ্ড রো মে, থার্ড, হাঁ হাঁ আপ, অ্যায়সা ঝুকনে সে নেহি চলেগা, একদম সিধা ব্যায়ঠনা হোগা, মেরেকো দেখিয়ে, গওরসে দেখিয়ে...হাঁ আব সহি হুয়া...। আভি ধীরে ধীরে পুউউউরা শ্বাস লিজিয়ে, থোরা রুককে, পুউউরা ছোড়িয়ে। একদম ধীরে ধীরে। কিজিয়ে কিজিয়ে, কোশিশ কিজিয়ে”...

চোখ টেরিয়ে নাকের ডগায় দৃষ্টি রেখে, আস্তে আস্তে শ্বাস নিলাম বুক ভরে। ভুরুর একটু ওপরে, কপালের মাঝখানটায় কেমন যেন চিনচিন করে উঠল এই চিনচিনে ব্যথাটা কি উপকারী ব্যথা? ছোটবেলায় এরকম কোন ব্যাথা লাগলে, মা বলতেন, ভালোই তো পোকাগুলো মরছে। খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেলে, মা তুলোয় ডেটল লাগিয়ে, হাল্কা ছোঁয়ায় মুছে দিতেন ক্ষতটা। ডেটল লাগলে আমি চিনচিনে জ্বালায় যখন আঁউ করে উঠতাম, মা বলতেন, অ্যাই চুপ, তুই কেন চেঁচাচ্ছিস? চেঁচাবে তো পোকাগুলো, যারা তোর কাটা ঘায়ে বসে বসে মরছে। আচ্ছা, আজ এই যে ভুরুর কাছটা চিনচিন করছে, আমি যদিও আঁউ করে উঠলাম না। যদি করতাম, মা কি বলতেন, অ্যাই চুপ, তুই কেন চেঁচাচ্ছিস? ভালই তো, তোর মনের পোকাগুলো মরছে!

এ ভাবে নাসাগ্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের ভেতরে গোল চৌকো নানারকম রঙের আকার, ভেসে বেড়াতে দেখলাম। আরেব্বাস। আমি মহাপুরুষ বা সিদ্ধপুরুষ হয়ে যাচ্ছি নাকি? এরকম কিছুক্ষণ করলে কি আমার মাথার পেছনে সোনালি বিশাল থালার মতো জ্যোতি দেখা যাবে? আমি কি এই সাদা চাদর বিছানো গদি থেকে ইঞ্চি ছয়েক উপরে উঠে শূণ্যে ভেসে উঠব? কিন্তু আগেকার দিনের মুনিঋষিরা তো হাজার বছর ধরে তপস্যা করে, তারপর সিদ্ধ-টিদ্ধ হতেন। এই হাজার বছরে নিশ্চয়ই কোন একটা ক্যাচ আছে। মুনি ঋষিরা হাজার বছর ধরে তপস্যা করতেন। কবিরা হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতেন। হাজার ছাড়া কিছু হবার নয়। আমি তাহলে এই কর্পোরেট অফিসের হলে ঘন্টা দেড়েক, কি দুয়েক ধ্যান-ট্যান করে কোন সিদ্ধি লাভ করতে পারবো কে জানে?

 

“এসিকা পরিশ্রুৎ শীতল পওন, ফুলোঁকা মহকইস পবিত্র বাতাবরণকা পুরা মজা লিজিয়ে। ধীরে ধীরে, কোই জলদিবাজি নেহি, ধীরে ধীরে পুউউউরা শ্বাস লিজিয়ে। থোড়াসা - দশ সেকেণ্ড তক শ্বাসকো রোক লিজিয়ে, উসকে বাদ ফির ধীরে ধীরে শ্বাস ছোড়িয়ে...”

 

পবিত্র বাতাবরণের কথায় মনে পড়ল। আমার দিদিমা ছিলেন বাংলা প্রবাদ আর নানান গল্পের আকরতাঁর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। এখন মনে পড়ে গেল হঠাৎ। অনেক দিন আগে, হাটে মাছের সওদা শেষ করতে করতে, এক মেছুনির বেলা পড়ে এল। আর হবি তো হ সেদিনই হল প্রবল ঝড়বৃষ্টি। বৃষ্টি যখন ছাড়ল, সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সেই মেছুনির বাড়ি বেশ দূরের এক গাঁয়ে, অনেকটা পথ, ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কী করে ফিরবে? সেই হাটেই ঝড়বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল এক মালিনীবুড়ি। তার ফুলের ঝুড়িতে তখনো পড়ে ছিল বিক্রি না হওয়া বেশ কয়েকটা বেলি আর জুঁই ফুলের মালা। বৃষ্টির ছাটে আর সন্ধ্যের ঝোঁকে সেই মালার ফুলের মন জুড়োনো সৌরভে ভরে উঠল চারদিক। মেছুনির আতান্তর দশা দেখে মালিনীবুড়ি বলল, আমার বাড়ি এই সামনেই পাশের গাঁয়ে, আজ রাত্তিরটা আমার বাড়িতে কাটিয়ে, কাল ভোরে না হয় চলে যাস তোর নিজের বাড়ি। মেছুনি হাতে যেন স্বর্গ পেল, রাজি হয়ে গেল এক কথায়। মালিনীবুড়ির মনটাও যেমন ভাল, বাড়িটাও ভাল। চারিদিকে নানান ফুলের বাগান, মাঝখানে ছোট্ট চাঁচের ঘর, খড়ের চাল। দুপশলা বৃষ্টির জলে, সতেজ ফুলের গন্ধে সেই বাড়ির পরিবেশ পবিত্র হয়ে উঠেছে। ওই মানে, পবিত্র বাতাবরণ। বুড়ি রাত্রে খাওয়ার সময় একটু দুধভাতের ব্যবস্থাও করে দিল। তারপর নানান সুখদুঃখের কথা বলতে বলতে তারা দুজনে শুয়ে পড়ল ঘরের দাওয়ায়। শোয়া মাত্র মালিনীবুড়ি ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু মেছুনির আর ঘুম আসে না। এপাশ ফেরে, ওপাশ ফেরে। উঠে ব’সে, কলসী থেকে জল গড়িয়ে খায়। দু-দুবার দাঁতে গুড়াখু ঘষল। সে নেশাও কেটে গেল। কিন্তু কিছুতেই আর তার ঘুম আসে না। নানান ফুলের গন্ধে তার মাথা কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল। শেষে সে আর পারল না, উঠে গিয়ে উঠোনে ঢোকার মুখে বাগানের বাইরে, তার মাছের যে চুপড়িটা রেখে এসেছিল, সেটা নিয়ে এল। সেটা মাথায় দিয়ে শোয়া মাত্র, তার দুই চোখে নেমে এল ঘুমের জোয়ার। তার নাকে এখন মাছের আঁশটে গন্ধ, কাজ কী তার ফুলের সৌরভে? তখন এই গল্পটা শুনে এটাকে নিছক একটা গল্প বলেই মনে হয়েছিল। আজ এই পবিত্র বাতাবরণে লম্বা শ্বাস নিতে নিতে মনে হল, যার যেথা মজে মন। পবিত্র বাতাবরণ সকলের সয় কি! এই এখন যেমন আমার নাকে এসে ঝাপটা লাগছে মৌরলা ভাজার গন্ধ। এখান থেকে আমার ফ্ল্যাট অন্ততঃ বিশ কিলোমিটার তো হবেই। তাও আমি গন্ধটা পাচ্ছি। এই সময় ঘরে থাকলে চায়ের সঙ্গে এক প্লেট মুচমুচে মৌরলা ভাজা – আঃ। আজ শনিবারের ছুটির সকালটা মাটি করে দিল মাইরি। ঝিনি অবশ্য জানে মৌরলা ভাজা খেতে আমি ভালোবাসি। কিন্তু মনে করে তুলে রাখবে কি? ঝিনি কি মনে রাখবে আমি তাকেও ভালবাসি। তার গর্ভে বেড়ে উঠছে আমার ভালবাসার সৃষ্টি। সেটাও কি ভুলে যাবে? আমি কিছু বলে আসিনি, আজ মৌরলা দিয়ে কী করবে? কাঁচা লংকা চিরে দেওয়া মৌরলার ঝাঁঝালো সর্ষে ঝাল? নাকি সামান্য হলুদ আর কালো জিরে ফোড়ন দেওয়া অর্ধস্বচ্ছ পাৎলা ঝোল। দুটোই সমান উপাদেয়ভাবতেই আমার মুখের ভিতরটা রসস্থ হয়ে উঠল।

 

“ইধর ইধর, হেলো, আপকা নজর মেরে পর কিঁউ? দাদা, বাঙ্গালীদাদা, আপকো বোল রহা হুঁ”।

বাঙ্গালীদাদা শুনে আমার চিন্তায় ছেদ পড়ল, আমি বাবা তেজকিরণের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন এবং আমাকেই বলছেন।

“কেয়া, বাঙ্গালীদাদা কিস চিন্তনমে খো গয়ে থে আপ? মেরে পর নেহি, আপকা নজর নাককে উপর রাখনা চাহিয়ে। অওর শ্বাস লিজিয়ে লম্বা...”।

 

আমি আবার নাকের ডগায় দৃষ্টি দিলাম, আবার চিনচিন করে উঠল আমার ভুরুর কাছে কপাল। তারপর লম্বা শ্বাস নিতে নিতে মনে হল, সৌরভের পর থেকে অবাঙালীরা বাঙালী দেখলেই দাদা বলে আজকাল। এই দাদা ডাকের মধ্যে একটা ভালোবাসাও যেমন থাকে, তার সঙ্গে কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে একটু সিমপ্যাথিও। ন্যায় বিচার না পাওয়া বা যোগ্য সম্মান না পাওয়া হিরো। এই হিরোর কথায় মনে পড়ল বাঙালীদের মনের মানুষ আর এক হিরো উত্তমকুমারকে। বাংলার বাইরে যাঁকে কেউই সম্মান দেয়নি। বড় হয়ে যখন শঙ্খবেলা দেখেছি, মাধবী আর উত্তমের সেই ডুয়েট - কে প্রথম কাছে এসেছি। সাদাকালো ঝাপসা ঝাপসা ছবি, ঝির ঝির করছে, কিন্তু নেশা হয়ে গিয়েছিল মনে আছে। তার কিছুদিন আগেই, আমি আবার প্রেমে পড়েছিলাম। সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার। সেই মেয়েটিকে ইউনিভার্সিটি থেকে তুলে নিয়ে চলে গেলাম ব্যাণ্ডেল চার্চের গঙ্গার ঘাটে। সেখানে নৌকো ভাড়া করে ভেসে পড়লাম দুজনে। হাতে হাত, চোখে চোখ। মেয়েটির চোখে লাজুক প্রশ্রয়ের হাসি। নৌকার মাঝি করিমচাচা (নামটা জানিনা, তবে মাঝিদের অন্য আর কোন নাম হয় নাকি?) দাঁড় বেয়ে নৌকাটাকে নিয়ে গেল মাঝদরিয়ায়, তারপর মাটিতে লগি গেঁথে বলল, যান, যান, গলুইয়ের মধ্যে যাইয়া বসেন। দ্যাহেন পর্দা ঝুলতাসে, পর্দা ফেলাইয়া দুটিতে আরাম করেন গিয়া। আমি বিড়ি খাইয়া একটুন জিরান লই। কুন ভয় নাই বাবু, যান যাইয়া বসেন, আমি আসি। করিম মিঁয়ার নাও হক্কলে সিনে। কুন ভয় নাই। গলুইয়ের মধ্যে সেই মেয়ে আর আমি যেন মাধবী আর উত্তম কুমার। কে প্রথম কাছে গিয়েছি। পর্দা ঢাকা গলুইয়ের মধ্যে বসে ওই কাছে যাওয়াই সার হল, একটা চুমো অবদি খেতে পারিনি, লজ্জা কিংবা ভয়ে, কে জানে? মেয়েটির উৎসুক মুখের কাছে যতবার মুখ নিয়ে যাবো ভেবেছি, মনে হয়েছে, জ্যালজেলে পর্দার ভিতর দিয়া করিম চাচা নির্ঘাৎ দ্যাকতাসে। করিমচাচা বড়ো বড়ো বিড়ির টান দিতে আসে, আর দ্যাকতাসে গলুইয়ের অন্দরে ছ্যামড়া আর ছ্যামড়ি কিডা করে? সেবারের সেই চুমো মিস করলেও, কিছুদিন পরে এক নির্জন ঘরের নিরিবিলিতে বড়ো সুখের চুমো দিয়েছিলাম সেই মেয়েটিকে। একদম বুকের মধ্যে চেপে ধরে, অধরে অধর চেপে বহুক্ষণ প্রথমবারের পর কিছুটা বিরতি, চোখে চোখ রেখে একে অপরকে আরো আরো ভালো লাগা, তারপর আবার। অস্ফুটস্বরে কানে কানে বলেছিলাম, তোর আর আমার মধ্যে এই দূরত্ব কোনদিন কী দূর হবে না? অবাক দুটি সরল নয়ন মেলে সে বলেছিল, আর কতো কাছে আসব বলো তো, কিসের দূরত্ব? আমি বলেছিলাম, তোর ওই উদ্ধত দুই বুক, কিছুতেই আমাদের কাছে আসতে দিচ্ছে না। আমার বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি পেতে ছটফট করতে করতে বলেছিল, তুমি যাতা একটা অসভ্য হয়ে উঠছো দিনদিন। তার মুখে ফুটে উঠেছিল স্বর্গীয় লাজুক হাসি, অতএব আবার।

সেই মেয়ে আমার ঘরণী হয়নি, অনেক দূরে সে এখন অন্য পুরুষের স্ত্রী। হেমন্তর সেই গানের মতো, আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে। আজও দূর প্রবাসে অবসর সময়ে নির্জন রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে যখন বসে থাকি। যখন উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। তখন কেন যে মনে হয়, এই ট্রেনটা চলে গেলেই দেখব সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। ষাটের দশকের গল্পে উপন্যাসে প্রায়ই এমন হতো! ডানহাতে মাঝারি আকারের একটা চামড়ার স্যুটকেশ, পরনে মেরুনপাড়ের বাসন্তী শাড়ি, গায়ে ম্যাচিং করা মেরুন ব্লাউজ। সেই মেয়েটি পায়ের কাছে সুটকেশ রেখে আমার বেঞ্চেই এসে বসবে। মাঝখানে আরও দুজন বসার মতো দূরত্ব রেখে। অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞাসা করবে, তোমার মাথা ধরা রোগটা এখনও আছে? টাইগার বাম দিয়ে এখন কে তোমার কপালে হাত বুলিয়ে দেয়?

আজও শীতের নির্জন অরণ্যে একা একা পায়চারি করতে করতে কানে আসে পায়ের তলায় শুকনো পাতা ভাঙার আওয়াজ, ঠিক সেই মেয়েটির অস্ফুট কথার মতো। আজও প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দগ্ধ দিনশেষের এক পশলা বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে এলে, সেই মেয়েটির নিশ্বাসের গন্ধ পাই।

 

“বহনোঁ অওর ভাইয়োঁ...আভি সাধনা কে ওর, অওর এক কদম আগে বড়েঙ্গে। দৃষ্টি রহেগা নাক কে উপর, লম্বা লম্বা শ্বাস লেঙ্গে, মনসে সমুচা ভাওনা হটাকে, মনকো সির্ফ এক বিন্দুমে লানেকা কোশিশ করেঙ্গে। হামারা মন এক আশ্চর্য বিষয় হ্যায়, কভি ইধার, কভি উধার ভাগতা হ্যায়। কভি ভি এক জাগাপে রুক নেহি শকতা। কভি বিবিকা চিন্তা, কভি বাচ্চোঁকা চিন্তা, কভি দোস্তকে সাথ মস্তি বানানেকা চিন্তা, কভি কলিগকো ক্যায়সে লেগপুল করেঁ, ক্যায়সে বসকো খুশ করেঁ, ও চিন্তা। আভি ইয়ে সব চিন্তাকো দূর ভাগাকে, মনকো এক জাগা পে নিরুধ করনা হ্যায়কঠিন হ্যায় জরুর, লেকিন নামুমকিন নেহি। লম্বা শ্বাসোঁকে সাথ হাম এক মন্ত্র উচ্চারণ করেঙ্গে, ও হ্যায় ‘ওঁম’”। বাবা তেজকিরণ নিজেই বার চারেক করে দেখালেন, তারপর বললেন, “কিজিয়ে কিজিয়ে, মেরা সাথ কোশিশ কিজিয়ে, বলিয়ে ওঁম...”।

 

দুই চোখের দৃষ্টি নাকের ডগায়, লম্বা শ্বাস তার মধ্যে আবার ওঁম। এতগুলো একসঙ্গে হয় নাকি? লম্বা শ্বাস নিতে গেলে দৃষ্টি সরে যায় আশেপাশে। দৃষ্টি ঠিক রাখতে গেলে লম্বা শ্বাস নিয়ে, শ্বাস ছাড়তে ভুল হয়ে যায়। আর ‘ওঁম’ বলতে গেলে হাতের উত্তান ভঙ্গি ভ্রষ্ট হয়ে, হাত চলে আসে হাঁটুর ওপর। অনেকদিন আগে দুহাতে নৌকোর বৈঠে বাইতে গিয়ে এমন হয়েছিল। বাঁহাতের দিকে নজর দিলে, ডানহাত থেমে যায়, আবার ডানহাতে নজর দিলে, বাঁহাত বৈঠে নিয়ে বসে থাকে। কিছুতেই দুটো হাত একসঙ্গে চালাতে পারিনি। নৌকো এক ইঞ্চিও এগোচ্ছিল না, উল্টোপাল্টা বৈঠের ঠানে মুখটা এদিক সেদিক ঘুরে যাচ্ছিল। শেষ অব্দি মাঝির হাতে বৈঠে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত, মাঝি গল্প করতে করতে দিব্যি দুহাতে সাবলীল বৈঠে টানতে লাগল। নৌকো এগোতে লাগল তরতরিয়ে, নৌকোর পাটায় বসে, মুগ্ধ চোখে মাঝির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, এও তো এক সব্যসাচী। মাঝি তখন অনবরত বলে চলেছিল তার বহতা জীবনের কথা, উজানে বেয়ে চলা সেই নদীর কথা, যে নদীর সঙ্গে তার জীবন জুড়ে গেছে ওতপ্রোত। সে নদীর নাম বরাক – বয়ে চলেছে বদরপুর শহরের পাশ দিয়ে। অতএব দক্ষতা ব্যাপারটা কোনদিনই জন্মসূত্রে পাওয়া যায় না, অর্জন করতে হয়। সে এই ইয়োগার ধ্যানই হোক আর সেই নৌকো বাওয়াই হোক। সারা হপ্তা ইঁদুরের মতো দৌড়োদৌড়ি করে। এক শনিবারেই কি আর মন্ত্রের সাধন হওয়া সম্ভব? একে তো লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে, ফুসফুসের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। বেশ ছিল নিকোটিনের মোহ আবরণে আছন্ন হয়ে, প্যাকেটে দেখানো ঘরমোছা ন্যাতার মতো চেহারা নিয়ে।এ মোহ আবরণ খুলে দাও, দাও হে” – বললেই কি আর হয়? খামোখা সুবাসিত অক্সিজেন পেয়ে বেচারা চমকে গেছে। কাশি আসছে খুক খুক করে, তার ওপর প্রায় ঘন্টাদুয়েক হতে চলল রক্ত হয়ে উঠছে নির্নিকোটিন।

 

“দাদা, আপনি কিন্তু ওঁম বলছেন না, অন্য কুছু চিন্তা কোরছেন”।

 

বাবা তেজকিরণ দেখি আমাকেই টার্গেট করে নিয়েছেনআমি হাল্কা কেশে গলাটা সাফ করে নিয়ে, লম্বা শ্বাস নিতে নিতে বললাম ওঁওওওম। মন্ত্র বলব কি, ভেতর থেকে বড়ো বড়ো হাই উঠে আসছে। ডাক্তাররা বলেন রক্তে অক্সিজেন কমে এলে নাকি হাই ওঠে, এতো লম্বা শ্বাস টেনেও অক্সিজেন কমল কী করে? এমন হাই উঠছে মনে হচ্ছে সাত রাত্তির ঘুমোইনি। এক আধটা রাত্তির না ঘুমিয়ে অনেক বার কাটিয়েছি, ছোটমামা, ছোটকাকা, দিদিদের বিয়ে, দাদাদের বিয়ে, বন্ধু বান্ধবের, কিংবা নিজেদের ঠাকুমা, দাদু মারা গেলে শ্মশানযাত্রায়। কিন্তু সাত রাত্তির ঘুমোইনি দুবার হয়েছিল। একবার কলেজে হস্টেলে গিয়ে র‍্যাগিং পিরিয়ডের সময় - সেটা ছিল বড়ো কষ্টের। আর একবার নিজের বিয়ের পর ফুলশয্যার রাত থেকে অষ্টমঙ্গলা পর্যন্ত – সেটা কী বলব, বলতে লজ্জা করে, বড় আনন্দের। সে কদিন অফিসে গিয়ে দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম আসত, ফেরার সময় বাসের রড ধরেও ঢুলতাম, কিন্তু বাড়ি ফিরে, জুতো খুলতে খুলতে ঝিনি যখন হাতে এক গ্লাস জল নিয়ে সামনে দাঁড়াত, ঘুম দৌড় লাগাত পিছনের দরজা দিয়ে। সারা রাত কতশত গল্প, নানান রঙের দুষ্টুমি, কত তরিকার ভালোবাসা। আহা সেই ঝিনি এখন কেমন যেন হয়ে গেছে। আজকাল ভালোবাসা ব্যাপারটাকে বেশ ধোঁয়াটে আর ঝাপসা একটা অনুভূতি মনে হয়। ভাদুরে বর্ষার মতো। সারাদিন প্যাচপেচে ঘেমো চাঁদি জ্বালানো গরম, তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দু এক পশলা অপ্রস্তুত করে দেওয়া বৃষ্টি। আর সেই বৃষ্টি থেকেই আজ ঝিনির তিনমাস। এই যে আমাদের দ্বিতীয় সন্তান আসছে, সে কি আমাদের ভালোবাসার ফসল? নাকি আকস্মিক উত্তেজনায় হঠাৎ ঘটে যাওয়া! আজ আমার জন্যে, ঝিনি যদি মৌরলাভাজা আলাদা তুলে রেখে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের মধ্যে ভালোবাসা নামক নিরাকার ব্যাপারটা রয়ে গেছে। আমি কি জুয়ো খেলছি? মৌরলামাছ ভাজার সঙ্গে আমাদের দাম্পত্য ভালোবাসার ফাটকা?

 

“কুছ নেহি হো রহা হ্যায়। না, না, কুছ ঠিক নেহি হো রহা হ্যায়। এক কাম কিজিয়ে আপলোগ। আজ তো টাইম বিত চুকে হ্যাঁয়। আজ কা সেশন এহি খতম করতে হ্যাঁয়। আপলোগ হর দিন সুবে প্র্যাকটিস কিজিয়েগা জরুর। আগলে শনিবার হমলোগ ফির মিলেঙ্গে, ফির নয়া কুছ শিখনেকে লিয়ে। লেকিন ইয়াদ রাখিয়ে, যব তক মনকো নিয়ন্ত্রিত নেহি কর পায়েঙ্গে, তব তক মনমে শান্তি নেহি আয়েগা, মনকো এক হি কেন্দ্রমে স্থাপিত করনাহি হামারা মকসদ রহেগা। শুভমস্তু। সবকা মঙ্গল হো”।

 

বাবা তেজকিরণ বিদায় নেওয়ার পর, আমরাও সবাই উঠে পড়লাম। অশান্ত মনকে স্থির করার কর্পোরেট ধ্যানধারণার এই ধ্যান-ইয়োগায় যোগের থেকে বিয়োগটাই যে বেশি হল তাতে কোন ভুল নেই। রক্তে ফিকে হয়ে আসা নিকোটিনের মাত্রা যোগ করার জন্যে অফিস থেকে বেরিয়ে লম্বা একটা সিগারেট ধরালাম। আর এই ঠা ঠা করা রোদ্দুরে গুরগাঁওয়ের গরমে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা চিন্তা করতেই মন আগের থেকে অনেক বেশি অশান্ত হয়ে উঠল। মনে মনে আমাদের হ্যাচ আর হেড অম্রুত নেগির নামে অনেকগুলি বিশেষণ যোগ করলাম – কিন্তু সেগুলোর সবকটাই লেখার অযোগ্য!       

--০০--

 

                                        

  


 

                                        

 


সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২  



 বটতলির ছোকরা পাঁচজন চলে যাওয়ার পর, ভল্লা চুপ করে বসেই রইল দণ্ড তিনেক। জঙ্গলের অন্ধকারে চুপচাপ বসে নানান চিন্তাভাবনা করতে তার ভালই লাগে। আঁধারে চোখের কাজ সীমিত হয়ে যায়। অবশ্য আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। জঙ্গলের বাইরে পূর্ণিমার মতোই জ্যোৎস্না ফুটেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জঙ্গলে ঘন গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে তার ঝিলিমিলিটুকুই চোখে পড়ে। সেই আলো-আঁধারী ছায়া-প্রচ্ছায়াতে চোখে বেজায় বিভ্রম সৃষ্টি করে। এ সময় ভল্লা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার কানের ওপর। ভল্লার মনে হয়েছিল এসময় রামালি আসতে পারে। কিন্তু সন্ধের পর প্রায় তিন দণ্ড পার হয়ে গেল, রামালি এল না দেখে, সে রান্নার যোগাড়ে লাগল।

কিছু কাঠকুটো জ্বেলে গুঁজে দিল উনুনের গর্তে। তারপর পোড়া মালসায় জল নিয়ে তিন মুঠো ভুট্টার দানা ঢেলে দিল তাতে। চাপিয়ে দিল আগুনের ওপর। শুকনো পাতা আর গাছের ডালের টুকরো ঠেলে দিল জ্বলন্ত উনুনের গর্তে। আগুন উলসে উঠল ভালোই। তারপর ঘর থেকে আনল একটু নুন আর গোটা পাঁচেক গোলমরিচের দানা। আর কাঁচা লঙ্কা ভেঙে ফেলে দিল উষ্ণ হতে থাকা মালসার জলে। এখন তার আর কিছু করার নেই, আগুনটাকে উস্কে তোলা ছাড়া। জল ফুটবে। ভুট্টার দানা সেদ্ধ হবে, সময় নেবে – দণ্ড খানেক তো বটেই।

হঠাৎ তার পিঠে কেউ হাত রাখল, কর্কশ শক্তিশালী হাত। ভল্লা বিদ্যুৎ বেগে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলল আঘাত করার জন্যে, আগন্তুক ভয় পেয়ে মাথা নামিয়ে বলল, “আরেঃ শালা, মারবি নাকি রে?” ভল্লা চিনতে পারল, মারুলা। হেসে ফেলে হাত নামিয়ে বলল, “ওঃ তুই”?

“তা নয়তো কাকে ভেবেছিলি? এই জঙ্গলে তোকে সেই কখন থেকে খুঁজছি জানিস? কিছুতেই আর ঠাহর করতে পারছিলাম না। শেষে ওই আগুনের আলোয় বুঝতে পারলাম তুই এখানে। কী রাঁধছিস? ভুট্টার ঝোল? আমার জন্যেও দু মুঠো ফেলে দে, ভল্লা। খিদে পেয়েছে বেশ”।

“তুই এখানে হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলি, হতভাগা”? বলতে বলতে ভল্লা উঠে ঘরে গেল, মুঠো তিনেক ভুট্টা এনে মালসায় ঢেলে দিয়ে, আরও একটু নুনের ছিরিক মেরে দিল। “আমি এখানে আছি সে বার্তা তোকে কে দিল?”

মারুলা বলল, “তোকে এখানে যারা পাঠিয়েছে, তারাই আমাকে বলেছে তোর পোঁদে লেগে থাকতে। এঁটুলির মতো। কিন্তু একটা কথা ভল্লা, তুই কিন্তু বেশ ভোঁদা মেরে গেছিস। আমি তোর এত কাছে চলে এলাম, তোর পিঠে হাত রাখলাম, তার আগে পর্যন্ত তুই টেরই পেলি না? যে ভল্লাকে আমরা সবাই চিনি, সে ভল্লা তো তুই নোস। কী হয়েছে, ভল্লা?”

ভল্লা একটু লজ্জাই পেল। মারুলা অত্যন্ত দক্ষ গুপ্তচর। ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছে। নিঃশব্দ চলাফেরায় মারুলা তার মতোই দক্ষ। কিন্তু তার এত কাছে এসে পড়া সত্ত্বেও ভল্লা টেরই পেল না, এটা আদৌ স্বস্তির বিষয় নয়। ভল্লা নিজেও চিন্তিত হল। বলল, “ঠিকই বলেছিস, মারু। আমার আরো সতর্ক থাকা উচিৎ ছিল”।

মারুলা একটু হাল্কা সুরেই বলল, “ঠিক আছে...হয়তো আগুন জ্বলার শব্দ, জল ফোটার শব্দ, তার ওপর মাথায় চিন্তার জট পাকানোর শব্দ – কিছুটা আনমন হয়ে গিয়েছিলি। আচ্ছা, একটা কথা মনে পড়ে গেল, তুই কোনদিন জঙ্গলে হাতির কাছাকাছি গিয়েছিস?”

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “বেশ কয়েকবারপ্রাণ হাতে করে, চুপটি করে লুকিয়ে থেকেছি ঝোপের আড়ালে। তখনই শুনেছি হাতির পেটের শব্দ। সাত-আট হাত দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায় – বড়ো জালার মধ্যে জল ফোটার মতো, কিংবা তার থেকেও ভয়ংকর। সেই শব্দের কথাই বলছিস তো?

“আমাদের কিংবা আমাদের কর্তাদের মগজে যখন নানান কুবুদ্ধি খেলা করে বেড়ায় তখনও নিশ্চয়ই ওরকম আওয়াজ হয় – ভুটভাট, শোঁ শোঁ...”।

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তুই কি আমাকে হাতির বাতকম্মো শোনাতে এসেছিস? কী ব্যাপার বল তো?”

মারুলা একটু চাপা স্বরে বলল, “অনেক কথা আছে, পরে বলব, এখানে নয়, অন্য কোথাও। তোর এই ঘরে আমি জানি অনেক লোকের যাতায়াত...। ততক্ষণ একটু ফকড়েমি করি না। তুই আর শালা কোনদিন শুধরোবি না। চব্বিশ ঘন্টা পোঁদে আটা লাগিয়ে কাজ আর কাজ। তাও যদি মুতিকান্ত না হয়ে একটু রতিকান্ত হতে পারতিস...” বলে খিঁক খিঁক করে ফিচেল হাসতে লাগল। ভল্লাও হেসে ফেলল, বলল, “তুই শালা পারিসও বটে”।

রতিকান্ত আর মুতিকান্ত রাজধানীর রক্ষী শিবিরে প্রচলিত অত্যন্ত চালু রসকথা – অবশ্যই আদিরসাত্মক। দীর্ঘদিন নারীসঙ্গবর্জিত রক্ষী শিবিরের একঘেয়ে জীবনে শব্দদুটি অত্যন্ত অর্থবহ। পুরুষের একটি বিশেষ প্রত্যঙ্গ দুটি কর্মে ব্যবহৃত হয়, প্রস্রাব কর্মে এবং রতিকর্মে। অধিকাংশ পুরুষ প্রাকৃতিক কারণেই দ্বিতীয় কর্মে সেই প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার কামনা করে। কিন্তু রক্ষীরা সে ভাগ্য করে আসেনি। রাজ্য-রাজধানীর সুরক্ষার জন্যে তাদের প্রায়ই মাঠে-ঘাটে, জঙ্গলে-পাহাড়ে, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। অতএব তাদের পুরুষাঙ্গটি শুধুমাত্র যত্রতত্র প্রস্রাব করাতেই ব্যবহার হয়। অতএব তারা সকলেই মুতিকান্ত। কিন্তু রাজার শ্যালক রতিকান্ত সারারাত প্রস্রাবের থেকে রতিকর্মেই বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাই তিনি সার্থকনামা।

কাঠের হাতা দিয়ে দু-তিনটে ভুট্টার দানা তুলে, ভল্লা টিপে টিপে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। হয়নি, আরেকটু হবে। দানাগুলো মালসার জলে ছেড়ে দিয়ে তাকাল মারুলার দিকে। আগুনের কমলা রঙে, মারুলার মুখটাও লালচে দেখাচ্ছে। ভল্লার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মারুলা এক চোখ টিপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভুট্টার দানা টিপেই টিপেই রাত কাটাবি, ভল্লা?”

মারুলার ইশারাটা বুঝে ভল্লা মিচকে হাসল, বলল, “সে হিসেব তোকে দেব নাকি রে, মদনা? এমন ভাব করছিস, তুই যেন রোজ রাতে টিপতে পাস?”

মারুলা নিরীহ মুখে বলল, “সে টেপাটেপি তো করতেই হয়, বন্ধু। সারাদিন হেঁটেহেঁটে পায়ে যা ব্যথা হয়, রেড়ির তেল নিয়ে পাদুটো টিপলে বেশ ভালই লাগে। তুই কোন টেপার কথা বলছিস, ভল্লা?”

ভল্লা মুখ বেঁকিয়ে হাসল, বলল, “ন্যাকা, তুই শালা পা টেপার কথা বলছিলি, বুঝি?”

মারুলা আকাশ থেকে পড়ল, বলল, “তুই কী ভেবেছিলি? এ রাম, ছি ছি, তোর মনটা শালা মাছির মতো, গুড়ের কলসি দেখলেই ভনভন করে জুটে যাস...”। ভল্লা এবার উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো বের করে হাসতে হাসতে মারুলার দিকে এগিয়ে নিয়ে বলল, “আজ তোকে ষাঁড়-দাগা করেই ছাড়বো, হতভাগা ধর্মের ষাঁড়”।

দুহাত বাড়িয়ে আত্মরক্ষার ভঙ্গি করে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে দুটো রসের কথা বললাম বলে তুই ষাঁড় বললি? তোর সঙ্গে কাজের কথা ছাড়া আর কোন কথাই বলব না”। কপট অভিমানে মুখ গোমড়া করে বসে রইল মারুলা। ভল্লা জ্বলন্ত কাঠটা উনুনে গুঁজে দিতে মারুলা বলল, “তুই ছোটবেলায় পাঠশালে গেছিলি ভল্লা”?

মারুলা কথাটা কোনদিকে নিয়ে যেতে চায় বুঝতে না পেরে, ভল্লা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল মারুলার দিকে, বলল, “গিয়েছি বৈকি, বছর দুয়েক মতো”।

মারুলা বলল, “দু-বছর? তাহলে তুই তো পণ্ডিত রে? আমি তো শালা ছমাসের মাথায় পণ্ডিতমশাইয়ের হাতে এমন গোবেড়েন খেয়েছিলাম, তারপর আর ওই মুখো হইনি”।

“কেন?”

“সে আর বলিস না। আচ্ছা, তুই বল, ভল্লা, ষণ্ড মানে ষাঁড়, ভণ্ড থেকে ভাঁড়, তাহলে গণ্ড থেকে যে গাল হবে আমি কী করে বুঝবো বল তো? পণ্ডিতমশাই শুধোলো – গণ্ড মানে কি? বললাম। আমার উত্তর শুনে পাঠশালের অন্য ছেলেরা হ্যা হ্যা করে এমন হাসলে – পণ্ডিতমশাই একেবারে জ্বলে উঠল। তারপর গাল দিয়ে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে ছড়ি দিয়ে এমন পেটাল, বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছিল শালা...”।

ভুট্টার মালসা নামিয়ে, ঘরের ভেতর থেকে থেকে দুটো মাটির সরা আনল ভল্লা। গরম ভুট্টাসেদ্ধ সমান দুভাগ করে ঢালল সরায়, তারপর মারুলার হাতে একটা সরা তুলে দিয়ে বলল, “কোথায় পেটাল, তোর গণ্ডে?”

মারুলা খুবই বিষণ্ণ মুখে বলল, “তুই আর সেই ভল্লা নেই রে। আগে বন্ধুদের জন্যে তোর কত দরদ ছিল, আজ তুই আমার দুর্দশার কথায় ঠাট্টা করছিস?”।

ভল্লা কিছু বলল না, ভুট্টা খেতে লাগল মন দিয়ে। মারুলা ঝোলে চুমুক দিয়ে বলল, “বেড়ে বানিয়েছিস তো শালা? দুদিন আগে জনাইয়ের চটিতে গমের রুটি আর এরকমই ভুট্টার ঝোল খেয়েছিলাম। অ্যাঃ সে শালা মুখে তোলা যায় না। আর তুই এখানে এই জঙ্গলে, হাতের কাছে মশলাপাতি কিছুই নেই, এমন ঝোল বানালি কী করে?”

দুজনেরই খাওয়া সাঙ্গ হতে উনুনের আগুন নিভিয়ে দিয়ে ভল্লা ঝোপের মধ্যে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করল। একজোড়া মারুলাকে দিয়ে বলল, “এবার চল, কোথাও গিয়ে বসে কাজের কথাগুলো সেরে ফেলে যাক।  কিন্তু তার আগে নোনাপুর গ্রামের সর্বশেষ পরিস্থিতি কেমন সেটা জানা দরকার। আজ সারাদিন নোনাপুর গ্রামের ছেলেরা কেউই আসেনি। তাদের আসা সম্ভবও নয়। তাই ভাবছি একবার নোনাপুর গ্রামে যাবো”।  

“পাগল হয়েছিস নাকি? এত রাত্রে কে তোর জন্যে বসে থাকবে?”

ভল্লা হাসল, বলল, “আছেন, একজন আছেন, আমার কমলিমা। যে সংবাদ আমি জানতে চাইছি, তাঁর থেকে ভাল আর কেউ বলতে পারবে না”।

“কমলিমা? মানে গ্রামপ্রধানের বউ? বোঝ, গ্রামপ্রধানের বুড়ি বউ তোকে কী খবর দেবে? তোকে দেখলে হয়তো খানিক কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তুলবে”।

“না রে, বুড়ি মোটেই আউপাতালে নয়, বেশ শক্ত মনের মানুষ। কমলিমার থেকে গ্রামের আজকের পরিস্থিতিতে জুজাক কী ভাবছে, কী বলছে, সেটা সহজেই জেনে যাব। সেই সঙ্গে, ভাগ্য ভাল হলে, আরেকজনার কথাও”।

“আরেকজন কে?”

“কবিরাজ”।

“কবিরাজ! হ্যাঁ কবিরাজের কথা আস্থানেও শুনেছি। শুনেছি বুড়োটা খুব ধূর্ত”!

ভল্লা বলল, “ধূর্ত বলিস না, বল বিচক্ষণ, দূরদর্শী। আমি যদি রাজরক্ষী না হয়ে, এই গ্রামের লোক হতাম, বুড়োকে বুকে করে রাখতাম। বুড়োর গায়ে এতটুকু আঁচও লাগতে দিতাম না। কিন্তু কে জানে… হয়তো আমাদের কাজের স্বার্থে... হয়তো আমরাই কোনদিন ..."। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আবার বলল, "যাগ্‌গে পরে কী হবে পরে দেখা যাবে, এখন শোন, বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। তুই গাঁয়ের বাইরেই কোথাও আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাক। কমলিমায়ের সঙ্গে দেখাটা সেরেই – আমি তোর কাছে আসছি...”।

“তাই হোক”

দুজনেই রণপায়ে চড়ে জঙ্গলের পথে রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে। 

চলবে...



রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ২

  


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "





 

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্কুল শুরু। এরমধ্যে অচ্যুত একদিন গিয়ে স্কুলের নিয়ম কানুন, ফর্ম ফিল-আপ, টাকা-পয়সা জমা দেওয়া সব করে এসেছেন। তার সঙ্গে ক্লাসের রুটিন, বুকলিস্ট, কেমন জামাপ্যান্ট পরতে হবে সব জেনে এসেছেন, পাছে কোন কথা ভুলে যান তাই লিখেও এনেছেন। সেদিন পান্নাও স্কুলে গিয়েছিল বাবার সঙ্গেতার বয়সি আরো কিছু ছেলে ছিল সেখানে। তাদেরও সঙ্গে ছিল বাবা, কিংবা বাবা-মা দুজনেই। নিজের নিজের ছেলেদের সঙ্গে বাবা-মায়েরা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁরা খুশি খুশি মুখে বললেন, “তোরা সব একই ক্লাশে পড়বি। বন্ধু হবি, এখন থেকেই পরিচয় করে নে”! কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তো বন্ধুত্ব হয় না। অচেনা সমবয়সীদের সামনেও কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগে, বাধো বাধো ঠেকে!

বাবা যতক্ষণ স্কুলের কাজকর্ম সারছিলেন, পান্না স্কুলের সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। এই আমার স্কুল! বিরাট চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে, সে অবাক হয়ে গেল। এই স্কুল আমার! উঠোনের দু ধারে বেশ কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পাতায় ভরা মাথাগুলো স্কুলের চারতলা বাড়ির প্রায় সমান। উঠোনের ওপারে, বিশাল মোটা মোটা থামওয়ালা উঁচু ছাদের বাড়ি। অবাক হয়ে পান্না সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাদের স্কুলের একতলায় এখন খুব ব্যস্ততা। কিন্তু বিশাল এই বাড়িটা একদম নির্জন। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে সিমেন্টের বিরাট চাতাল, চাতালের পরে বিরাট দরজা। সে দরজা কত্তো উঁচু – হাতিও যেন ঢুকে যাবে সেই দরজা দিয়ে। পান্না সিঁড়ি দিয়ে উঠে চাতালে পা দিল, তারপর ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল! ভীষণ কৌতূহল - কী আছে ভেতরে?

“উঁহুহুঁহুঁ...ওপটে যিবে না, ওপটে যিবে না”। পান্না পেছন ফিরে দেখল, একজন লোক তাকেই বলছে কথাটা। তার গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি আর পরনে ফুলপ্যান্ট। কিন্তু পেটের কাছে গেঞ্জিটা খুব ফুলে আছে, বেশ বড়োসড়ো ভুঁড়ির জন্যেপান্না লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে কোন রাগ বা বিরক্তি দেখতে পেল না, কিন্তু ভেতরের দিকেও আর গেল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল স্কুলের উঠোনে। নিচেয় নেমে আসতে লোকটা তার কাঁধে হাত রাখল, বলল, “কী নাম তোমার? আজ ভর্তি হচ্ছ স্কুলে?” পান্না ঘাড় নাড়ল। কিন্তু নিজের নাম বলতে বেশ বেগ পেল। অপরিচিত লোক তার নাম জিগ্যেস করলেই, তার এমন হয়। কথা আটকে যায়। লোকটা ধৈর্য ধরে শুনল, তারপর হেসে বলল, “মোরঅ নাম দুর্যোধন অছি। দুর্যোধনদা কহিবা, কেমন? মু তম সবকু দেখিবি, আউ।  আউ দুষ্টুমি করিলে কঁড় হব দেখিবা ...।” কথা শেষ করল না, কিন্তু চোখ বড় বড় করে হাসল, বলল, “সঙ্গরে কউ অছন্তি, বাপঅ, না মা?”

“ব্‌-বাবা” দুর্যোধনদা তার হাত ধরে বলল, “চলো তোমাকে স্কুলটা দেখাই”।

 

পান্নার স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত মর্নিং সেশন।  অতএব তাকে এখন রোজ সকালবেলা বাবার হাত ধরে, স্কুলে যেতে হয়। তার পরনে স্কুলের ড্রেস, সাদা হাফ-প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পায়ে নটিবয় শু।  জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন স্কুল শুরু হল, তখন গায়ে ছিল শীতের সোয়েটার, তার রং বট্‌ল্‌ গ্রিন। আর হাতে স্টিলের চারচৌকো স্যুটকেশ। তার মধ্যে স্কুলের রুটিন অনুযায়ী ভরে নেয় বই খাতা, পেন্সিল বক্স, রবার, পেন্সিল ছোলার কল, একফুট লম্বা কাঠের স্কেল

শ্রী গোপাল মল্লিকের গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তা মির্জাপুর স্ট্রিটের ওপারে আছে বিহারি দেবলালকাকুর মনিহারি দোকান। বাবা স্কুল যাবার পথে, সে দোকান থেকে রোজ কিনে দেন, চারটে বিস্কুট আর রাংতায় মোড়া দুটো লজেঞ্চুস বা চকোলেট, কোনদিন বাপুজি কেকদেবলালকাকু কাগজের ঠোঙায় টিফিন ভরতে ভরতে মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন, “এতেই হয়ে যায়, খোখাবাবা? ভুখ লাগে না?” স্টিলের বাক্সের মধ্যে ঠোঙাটা নিতে নিতে পান্নার রোজই মনে হয়, স্কুলের টিফিন হতে এখনও অনেক দেরি, তিনটে পিরিয়ড শেষ হলে তারপর। তার তো এখনই খিদে পাচ্ছে, বিস্কুট আর লজেঞ্চুসের খিদে!

কিন্তু সে উপায় তো নেই, বাড়ি থেকে সেদ্ধ চিঁড়ে, চিনি আর লেবু মেখে খেয়ে এসেছে। কারণ সে বড্ডো পেটরোগা, কালমেঘ দেওয়া “কুমারেশ” সিরাপ কিংবা থানকুনি পাতার রস এখন তার নিত্য সেব্য। তার সঙ্গে ওই চিঁড়ে! অতএব এখনই বিস্কুটে কামড় দিলে, বাবার হাতে তার কানটা আর আস্ত থাকবে না।

বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রিট ধরে এগিয়ে, মহাবোধি সোসাইটির উল্টোদিকের গেট দিয়ে ঢুকে, কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে, স্কুলের রাস্তাটা বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। সোজা গিয়ে ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউটের কাছে মোড় নিয়ে, বাঁদিকে সোজা গেলেও কফি হাউসের উল্টোদিকের গেট দিয়ে স্কুলে যাওয়া যায়, কিন্তু সে পথটা কিছুটা ঘুরপথ। তাছাড়া সকাল-সকাল কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে বিস্তর মজা পাওয়া যায়। কত মোটা-সোটা মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন হাঁস-ফাঁস করতে করতে। বেঞ্চে বসে বৃদ্ধরা গল্প করছেন। সাঁতারের ক্লাবের বাগানের ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে সাজি ভরে তুলছেন দু একজন বয়স্কা মহিলা। বড়রা ঝুপুস ঝুপুস ঝাঁপ মারছেন গোলদীঘির জলে, জলছিটিয়ে সাঁতার কাটছে অনেকে। সে সব সাঁতারের নানান স্টাইল – চিৎসাঁতার, বাটারফ্লাই, ফ্রিহ্যান্ড - পান্না এসব নাম অবিশ্যি শিখেছে অনেক পরে। কিন্তু তার স্কুল যাওয়ার পথে – এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায় পান্না। কোন কোন দিন স্কুল পৌঁছতে দেরি হবার আশঙ্কায়, বাবা ধমকান, “কী দেখছিস কি হাঁ করে, স্কুলের ঘন্টা পড়ে গেলে আর ঢুকতে দেবে না যে! তাড়াতাড়ি পা চালা”!

প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়েছিলএকতলাতেই বাবার হাত ছেড়ে দিতে হল, প্রভাকরদা হাত ধরল। বলল, চল তোমাকে ক্লাশে পৌঁছে দিই। বাবা নিচেয় দাঁড়িয়ে রইলেন, পান্না চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে বার বার দেখছিল বাবার দিকে, তার বুকের মধ্যে এখন জমে উঠছে ভয় আর কেমন এক কান্না-কান্না অনুভূতি। বাবা স্মিতমুখে হাত নাড়লেন বার দুয়েক। শক্ত হাতে পান্নার হাত ধরে প্রভাকরদা বলতে বলতে চলল, “ভয় পাচ্ছো কেন? কেলাসে গিয়ে দেখবে তোমার বয়সি কত্তো বন্ধু ... লেখাপড়া করে বাবার মতো হতে হবে না...”? সিঁড়ির ল্যাণ্ডিংয়ে উঠে দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠতে বাবাকে আর দেখতে পেল না পান্না, দোতলার দীর্ঘ করিডরে উঠে, ডানদিকের প্রথম ঘরটাতেই ক্লাস ওয়ানের ঘর, পান্নাকে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল প্রভাকরদা। ক্লাসের ছেলেরা নিজের নিজের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বেঁটেখাটো সুদর্শন মাস্টারমশাইও দাঁড়িয়ে দুই চোখ বন্ধ করে, জোড়হাতে গান করছেন, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্যসুন্দর”প্রভাকরদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় পান্নাকে চুপ করে দাঁড়াতে বলল এ গানটা পান্নার বেশ পছন্দের গান, বহুবার তার মাকে এই গান গাইতে শুনেছে। কিন্তু আজ স্কুলের প্রথম দিনে,  শীতের সুন্দর এই সকালে, তারই সমবয়সি একঘর ছেলেদের সঙ্গে তন্ময় মাষ্টারমশাইয়ের গাওয়া সমবেত গান, পান্না মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। তার খুবই পরিচিত গানটিই আজ যেন নতুন মহিমা নিয়ে পান্নার জীবনকে উদ্ভাসিত করে তুলল।

একটু পরেই গান শেষ হলে, প্রভাকরদা পান্নাকে মাস্টারমশাইয়ের হাতে সমর্পণ করে চলে গেল, আর পান্না নিজের অজান্তেই তার সমস্ত শৈশব সমর্পণ করে দিল, এই স্কুলের মাতৃক্রোড়ে। পান্নাকে তার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আর ডেস্ক দেখিয়ে দিলেন, মাস্টারমশাই। প্রথম দিন স্কুলে এসেই, নিজের অধিকারে একটি ডেস্কের অর্ধেক আর বসার বেঞ্চের অর্ধেক পেয়ে, পান্না আনন্দ ও উত্তেজনায়, খুব কষ্ট করে বলল, “গুডমর্নিং, স্যার”মাস্টারমশাই সস্নেহে তার মাথায় হাত রাখলেন, মৃদু হেসে বললেন, “বসো”।

প্রথম কটাদিন কেটে গেল স্কুল এবং তার নিয়ম কানুন বুঝতে। মাস্টারমশাই এবং দিদিমণিদের চিনতে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারি ভালো, পড়া না পারলে বা হোমটাস্ক করে না আনলে বকা দেন, কিন্তু সে বকার মধ্যে কোন ভয় লাগে না। বরং তাঁরা যখন মাথায় হাত রেখে জিগ্যেস করেন, “কেন পড়িসনি রে?”, অথবা “হোমটাস্ক করতে ভালো লাগে না?” তখন পান্নার বেশ লজ্জাই লাগে। আর যাঁরা খুব বকাবকি করেন, চেঁচামেচি করে বলেন, “তোদের বাবা-মায়েরা কেমন রে? ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত, তার লেখাপড়ার কোন খোঁজখবর রাখে না?” তাঁদের অনেকেই কষ কষ করে কান মলে দেন, ক্লাসের বাইরে কানধরে নিল-ডাউন করিয়ে রাখেন, দুই আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল রেখে চিপে ধরেন পান্নাদের ছোট্ট ছোট্ট আঙুল। একজন বয়স্ক মাস্টারমশাই আবার জুলপির চুল ধরে, এমন টেনে দেন, ব্যথায় ঝনঝন করে ওঠে মাথা!

প্রথমদিন এবং প্রত্যেকদিন যে মাস্টারমশাই “আনন্দলোকে...” প্রার্থনা গেয়ে ক্লাস শুরু করেন, তাঁর নাম পান্না জেনেছে, পূর্ণেন্দুবাবু। পূর্ণেন্দুবাবু পান্নার খুব প্রিয় মাস্টারমশাই, শান্ত-ধীর-স্থির মানুষটি যেমন সুন্দর পড়ান, তেমন ভালোবাসেন প্রত্যেক ছেলেকে। হোমওয়ার্ক হোক বা ক্লাসের খাতা, সুন্দর নির্ভুল উত্তর লিখলে তিনি “ভেরি গুড” লিখে দেন খাতার পাতায়। তাছাড়াও খাতা বিচার করে, তিনি “গুড”, “ফেয়ার”, “ব্যাড”ও লিখে দিতেন। পান্না আপ্রাণ চেষ্টা করত রোজ, “ভেরি গুড” বা “গুড” অর্জন করতে, যেদিন বড়সড় ভুলচুক করে “ব্যাড” জুটত, সেদিন তার মনটাই খারাপ হয়ে থাকত সারাটা দিন। ছেলেদের খাতায় “ব্যাড” লিখতে পূর্ণেন্দুবাবুও যে খুব কষ্ট পেতেন, সেটা বোঝা যেতে তাঁর মুখের দিকে তাকালে আর তাঁর চোখের চাউনিতে।

যে দুজন দিদিমণি পান্নার খুব প্রিয়, তাঁরা হলেন, কনকদিদি আর ইন্দিরাদিদি। ইন্দিরাদিদি তাও মাঝে মধ্যে একটু রেগে যেতেন, কিন্তু সে ছেলেরা যখন দুষ্টুমি করত তখন। পড়ানোর সময় কাটাকুটি খেললে, কিংবা তাঁর পড়ানোর সময় পাশের বন্ধুর সঙ্গে নিচু গলায় গল্প করলে, কিংবা পাশের বন্ধুকে ঢিসুম করে ঘুঁষি মারলে, ইন্দিরাদিদি খুব রেগে যেতেন। বলতেন, “সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক, হনুমান”।  আর কনকদিদি ছিলেন পরম মমতাময়ী, পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সুন্দর গল্প করতেন, কাউকে কক্‌খনো উঁচু গলায় ধমকাতেন না, কিন্তু তাঁর ক্লাশে সব্বাই চুপ করে পড়া শুনত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত তাঁর মুখের দিকে। তিনি কখনো নিজের চেয়ার-টেবিলে বসতেন না, পড়ানোর সময় সারাক্ষণ পায়চারি করতেন, ঘরের এধার থেকে ওধার।

            

 

স্কুল কী শুধু লেখাপড়া শেখায়? নানারকম খেলাধুলো, ড্রিল-পিটি শেখায়। ছবি আঁকতে শেখায়। গান গাইতেও শেখায়। ক্লাস-টু থেকে নাচ-গানের ক্লাশ ছিল সপ্তাহে দুদিন। সে দুটো দিন বড়ো মজার। মীনাদিদি গান শেখাতেন, শেখাতে চেষ্টা করতেন নাচের নানান অঙ্গভঙ্গি। ক্লাশের সব ছেলে মিলে ধুপধাপ শব্দে “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে...”, “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে...” অথবা “আজি ধানের ক্ষেতে...” গান গাইতে গাইতে যখন নাচের প্রচেষ্টায় হাত-পা নাড়ত, সে এক আশ্চর্য অনুভব। বসে বসে গান না গেয়ে নাচের চেষ্টা করতে করতে গানগাওয়ার মধ্যে সে বিস্তর ফারাক টের পেত। মজা লাগত বেশ। ওই নাচ-গানের ক্লাশ থেকে, মীনাদিদি গান গাওয়ার জন্যে দুজনকে বেছে নিলেন, একজন পিনাকী আর অন্যজন পান্না। পিনাকী বড়ো ভালো গাইত, আর পান্নার কাজ ছিল পিনাকীর গলায় গলা মেলানো। ওইভাবেই ক্লাস টু থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, প্রাইমারি সেশনের, যে কোন অনুষ্ঠানে – বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী বা পুজোর ছুটির আগে শারদোৎসবে - পিনাকী আর পান্নার দু-চারটে যৌথগান অবধারিত ছিল।           

পনেরই আগষ্টের দিন স্কুলে ফ্ল্যাগ তোলা হত, পতাকার নিচেয় দাঁড়িয়ে হেডস্যার ওজস্বিনী ভাষায় দেশভক্তি, স্বাধীনতা আর ছাত্রদের কর্তব্য নিয়ে সেদিন বক্তৃতা দিতেন। সেদিন সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হত, বন্দে মাতরম আর জোড়হাতে একসঙ্গে গাইতে হত “জনগণমন অধিনায়ক...” জাতীয় সঙ্গীত। তারপরেই হুটোপুটি করে লাইনে দাঁড়াতে হত পুঁটিরামের সিঙাড়া আর দরবেশের বাদামী প্যাকেট সংগ্রহের জন্যে।

এর কিছুদিন আগেই কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার কাছে পাহাড়ের মতো জমে উঠত ইয়া মোটা মোটা শালের খুঁটি আর অজস্র বাঁশ। স্কুলে যাওয়ার পথে বাবা, আর ফেরার পথে মাকে জিগ্যেস করে জেনেছিল ওগুলো দিয়ে মা দুগ্‌গার প্যাণ্ডেল হবে। শালের খুঁটি আর বাঁশের ধাঁচা বানিয়ে তার ওপর ত্রিপল আর রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি হবে ওই প্যান্ডেল। তার মানে পুজো আসতে আর দেরি নেই? মা বলতেন, “এই তো আর মাস দেড়েক পরেই পুজো, এসেই তো গেল, দেখতে দেখতে কেটে যাবে দিনগুলো”।

তারপর থেকে রোজ স্কুলে যাওয়া আসার পথে চোখের সামনে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল মা দুগ্‌গার বিশাল প্যাণ্ডেল। বেশ কিছুদিন ধরে গড়ে উঠল অজস্র বাঁশের হাড়গোড় বের করা কঙ্কালের মতো খাঁচার কাঠামো। তারপর একদিন সে কাঠামো ঢাকা পড়ে যেত ত্রিপলের আস্তরেএরপর শুরু হত কাপড়ের কাজ। স্কুলে যাওয়ার তাড়ায়, সকালে না হলেও, ফেরার সময় মাকে বায়না করে প্যাণ্ডেলের ভেতর ঢুকত এক একদিন। অজস্র রঙিন আর সাদা কাপড় আর কাপড়ের ফালি ঝুলছে চারদিকে, তার সঙ্গে সুতো আর দড়ি। অনেক অনেক লোক একসঙ্গে বসে কাপড় কুঁচিয়ে তুলছেন, অন্য অনেকে সেই কুঁচি দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন প্যাণ্ডেল। সেই কাপড়ের সাজে অপরূপ হয়ে উঠতে লাগল দিনের পর দিন, ঠিক পান্নার স্বপ্নের মতো। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত পান্না, ওখান থেকে পা সরত না, কিন্তু মায়ের তাড়া থাকত, ঘরে ফিরে তাঁর কাজের শেষ নেই যে!

পান্না বড় হয়ে উঠতে উঠতে স্কুলের সঙ্গে ওই কলেজ স্কোয়ারটাও তার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল। বাল্য থেকে কৈশোর, কৈশোর পার হয়ে তারুণ্য পর্যন্ত তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে রইল তার স্কুল আর কলেজ স্কোয়ার।

-০০-



নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...