বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব "  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ "

শ্রীকৃষ্ণের লীলাসংবরণ   

 অর্জুন প্রিয়সখা-শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায় গিয়েছিলেন, সে অনেকদিন হয়ে গেল। প্রিয়ভাই অর্জুন ও চিরসখা কৃষ্ণের অনেকদিন কোন সংবাদ না পেয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের চোখে ভয়াবহ অশুভ সব লক্ষণ ধরা পড়তে লাগল। তিনি দেখলেন, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ব্যবহার। মানুষ ক্রোধ, লোভ ও মিথ্যাকে আশ্রয় করে, অসৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করছে। বাবা, মা, বন্ধু, ভাই, স্বামী, স্ত্রী নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। মানুষের অন্তরে সরল আত্মীয়তার বদলে কুটিল শঠতা আশ্রয় নিয়েছে।

[পরিবেশ নিয়ে সুসভ্য আধুনিক মানুষ সচেতন হয়েছে বা হচ্ছে বিগত পাঁচ-ছয় দশকে। তার কারণ বলা হয়, আধুনিক সভ্যতার ব্যাপক শিল্পায়ন, বিপুল নগরায়ণ এবং বীভৎস অরণ্য আগ্রাসন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের যুগে (ঐতিহাসিকরা বলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৯০০ বিসিই) আধুনিক সভ্যতার ওই ত্র্যহস্পর্শের স্পর্শ ছিল নামমাত্র। অতএব যুধিষ্ঠির যে লক্ষণগুলি দেখেছিলেন বা অনুভব করেছিলেন, সেগুলির সবকটিই ঘোর কলির লক্ষণ। কিন্তু একটু আশ্চর্য লাগে তাঁর "গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে" এই মন্তব্যে। তাঁর সময়েও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণ কি? ভগবান তাঁর মর্ত্যলীলা সংবরণ করেছেন বলে আমাদের সামাজিক দুর্গতি শুরু হল, কিন্তু ঋতুর ধর্ম তিনি কেন বদলে দেবেন?]      

মহারাজ যুধিষ্ঠির একদিন অনুজ ভীমকে ডেকে বললেন, “বৃকোদর, অর্জুন প্রিয়সখা কৃষ্ণের সঙ্গে  দ্বারকায় গেছে বহুদিন হয়ে গেল। অর্জুন এখনও ফিরছে না কেন, বুঝতে পারছি না।  দেবর্ষি নারদ ভগবানের নরলীলা সংবরণের যে ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন, সেই সময় কি তবে আসন্ন? এই ভগবান কৃষ্ণের জন্যেই আমরা আজ এই রাজ্য, সম্পদ, প্রাণ, সম্মান, কুল ও প্রজা লাভ করেছি। তাঁর অনুগ্রহেই আমরা আমাদের শত্রুদের জয় করে স্বর্গসুখের অধিকারী হয়েছি। কিছুদিন ধরে, আমার শরীরে এবং চারপাশে আমি নানান অশুভ লক্ষণ লক্ষ্য করছি। আমার মনে হচ্ছে কোন এক ভয়ংকর বিপদ আমাদের দিকে যেন এগিয়ে আসছে।

এই দেখ, ভীম, আমার বাম চক্ষু, উরু আর বাহু বারবার কেঁপে উঠছে। কাঁপছে আমার হৃদয়। ওই দেখ, উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ করে শৃগালী বমি করছে, আর কাঁদছে। কুকুর আমার দিকে তাকিয়েও নির্ভয়ে চিৎকার করছে। গবাদি পশুরা কেন আমার ডানদিকে আর গাধারা আমার বাঁদিকে যাওয়া আসা করছে। ঘোড়াগুলিকে দেখ, আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। পেঁচা আর কাক কুৎসিত আওয়াজে কেমন ডাকছে শুনতে পাচ্ছো? ঐ দেখ ভীম, নদ, নদী, সরোবর  অশান্ত হয়ে উঠছে। কি আশ্চর্য, দেখ, আগুনে ঘি দিলেও আগুন জ্বলছে না। গোয়ালের বাছুরেরা স্তন্যপান করছে না। গাভীরা দুগ্ধক্ষরণ করছে না। দেবপ্রতিমাসকল দেখ, যেন ঘর্মাক্ত শরীরে কাঁদছে, তাঁরাও যেন অস্থির।  অশান্ত বাতাসে আর ধুলিকণায় সূর্য প্রভাহীন, নিস্তেজ। সমস্ত জনপদ, গ্রাম, নগর, উদ্যান, আশ্রম ধূসর, মলিন আর নিরানন্দ হয়ে উঠছে। এই সমস্ত ভয়াবহ লক্ষণ দেখে আমার মনে হচ্ছে, ভাই ভীম, এতদিনে বোধহয় পৃথিবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্নলাভের সৌভাগ্য হারাল”

[যুধিষ্ঠির বর্ণিত এই দুর্লক্ষণগুলিই আমাদের মনে কুসংস্কার হিসেবে গেঁথে রয়েছে বিগত প্রায় তিনহাজার বছর ধরে!]

এইরকম উদ্বিগ্ন চিন্তায় মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন কিছুদিন ব্যাকুল, একদিন অর্জুন দ্বারকাপুরী থেকে হস্তিনাপুরে ফিরলেন। ফিরে এসেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের পদতলে। অর্জুনের চোখে অশ্রুধারা, মুখ বিষণ্ণ, তিনি যেন ঘোরতর অসুস্থতাঁকে দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আরেকবার দেবর্ষি নারদের সেই ইঙ্গিতের কথা মনে পড়ল।

ব্যাকুল হয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই অর্জুন, তুমি এমন কাঁদছো কেন? তোমার সুন্দর মুখ, কেন এত বিষণ্ণ? দ্বারকায় মধু, ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, সাত্বত বন্ধুরা সকলে ভালো আছেন তো? পূজনীয় মাতামহ শূর ও মামা বসুদেব, দেবকীসহ আমাদের সপ্ত মামীরা, তাঁদের পুত্র ও পুত্রবধূগণ সকলে কুশলে আছেন তো? পুত্রহীন রাজা উগ্রসেন, তাঁর ভাই দেবক ও হৃদীক, তাঁদের পুত্রেরা কৃতবর্মা, অক্রুর, জয়ন্ত, গদ, সারণ, শত্রুজিৎ এবং যদুশ্রেষ্ঠ ভগবান বলরাম ভালো আছেন তো? মহাবীর প্রদ্যুম্ন, ভগবান অনিরুদ্ধ, সুষেণ, চারুদেষ্ণ, জাম্ববতীর পুত্র শাম্ব এবং কৃষ্ণের অন্য পুত্রেরাও সকলে ভালো আছেন তো? শ্রীকৃষ্ণের অনুচর শ্রুতদেব ও উদ্ধব, সুনন্দ, নন্দ ও অন্যান্য যদুবীরগণের কুশল তো? ব্রাহ্মণের মঙ্গলকারী ও ভক্তবৎসল ভগবান গোবিন্দ দ্বারকাপুরীতে বন্ধুগণের সঙ্গে সুখে ও পরমানন্দে বাস করছেন তো?

ভাই অর্জুন, তোমার একি দশা হয়েছে? তোমার অঙ্গকান্তি মলিন, তোমার আর সেই তেজ নেই, তোমার এই অবস্থার কারণ কী? অনেকদিন বন্ধুগণের সঙ্গে ছিলে বলেই কি তোমার প্রাপ্য সম্মান তুমি পাওনি? তোমাকে কি তাঁরা অবহেলা করেছেন? কর্কশ কটুকথায় কেউ কি তোমার মনে কষ্ট দিয়েছে? দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোন দরিদ্রকে তুমি কি দান করতে পারোনি?  তোমার সাহায্যপ্রার্থী ব্রাহ্মণ, বালক, বৃদ্ধ, স্ত্রী, রোগী বা অন্য কাউকে তুমি কি সাহায্য করতে পারোনি? কোন দুশ্চরিত্রা নারীতে তুমি উপগত হওনি তো?  আসার পথে তোমার চেয়ে নীচ কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে পরাজয় স্বীকার করোনি তো?  ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ অথবা বালককে ভোজন না করিয়ে, তুমি নিজে ভোজন করে নিয়েছ, এমন হয়নি তো? অথবা তোমার চিরদিনের সখা কৃষ্ণকে হারিয়ে তুমি কি নিজেকে নিঃস্ব মনে করছো? আমার মনে হয়, এটাই একমাত্র কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন কারণেই তোমার এই দশা হতে পারে না”

নিজেকে যথাসাধ্য সংবরণ করে, অর্জুন অগ্রজ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “দাদা, আমাদের সেই পরম বন্ধু শ্রীহরি আমাকে পরিত্যাগ করে দিব্যলোকে চলে গেছেন, যাবার সময় তিনি আমার সমস্ত শক্তিও হরণ করে নিয়েছেন। প্রাণহীন দেহ ক্ষণকালের মধ্যেই যেমন শবদেহ হয়ে যায়, তেমনই কৃষ্ণের ক্ষণকাল বিয়োগেই সমস্ত পৃথিবী শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

দাদা, তোমার মনে আছে, আমি দ্রুপদরাজার স্বয়ংবরে সমবেত সমস্ত রাজাদের পরাস্ত করে, মাছের চোখ বিদ্ধ করে, কৃষ্ণাকে লাভ করেছিলাম। ইন্দ্রের দেবসৈন্যকে পরাজিত করে খাণ্ডববন অগ্নিকে সমর্পণ করেছিলাম। ময়দানবকে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ করে, তার অপূর্ব শিল্পকর্ম স্বরূপ আমাদের রাজসূয় সভা নির্মাণ করিয়েছিলাম। দাদা ভীম রাজসূয় যজ্ঞের সময়, জরাসন্ধকে হত্যা করে, তার কারাগারে বন্দী সমস্ত রাজাদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন। রাজসূয় যজ্ঞে মহা অভিষেকের পর, দ্রৌপদী তার সুন্দর কেশকবরী বন্ধন করেছিল। কিন্তু কপট দুঃশাসনরা সভামধ্যে কৃষ্ণার কবরী খুলে দিয়েছিল। পরে দাদা ভীম সেই দুঃশাসনদের হত্যা করে, তাদের পত্নীদেরও কবরী খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিলেন। এই সমস্তই আমরা করতে পেরেছিলাম আমাদের চিরসখা কৃষ্ণের অনুগ্রহে।

তারপর, দাদা তোমার মনে পড়ে, দুর্যোধনরা দুর্বাসার শাপে আমাদের বিনাশ করার পরিকল্পনায় আমাদের আশ্রমে একবার সহস্র শিষ্যসহ দুর্বাসামুনিকে অসময়ে পাঠিয়েছিল? সহস্র লোকের সেই হঠাৎ আতিথ্যে, মহাসঙ্কটে পড়ে দ্রৌপদী কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চেয়েছিলকৃষ্ণ এল, এসে মৃদু হেসে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে, কৃষ্ণা, কী আছে খেতে দাও”দ্রৌপদীর তখন অসহায় অবস্থা, যাদের থেকে পরিত্রাণের জন্য সে কৃষ্ণকে ডাকল, তিনিও কিনা অভুক্ত? অবেলায়, কৃষ্ণার ভাঁড়ার তখন শূণ্য

ম্লান মুখে কৃষ্ণা বলেছিল, “আমি নিরুপায়, হে কৃষ্ণ, আমাদের সকলের খাওয়া শেষ, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই তোমাকে দেবার মতো”

“রান্নাঘরে যাও না, কৃষ্ণা, দেখ যা আছে, তাতেই আমার ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে” কৃষ্ণের মুখে অদ্ভূত প্রসন্ন হাসি আর দু চোখে অনন্ত রহস্য। কৃষ্ণা রান্নাঘরে গেল, শূণ্য পাত্রের গায়ে একটু শাক লেগে আছে, আর আছে তিন চারটে অন্নের দানা। পরম লজ্জায় আর দ্বিধায় তাই একটা পাত্রে এনে দিল দ্রৌপদী। তাই দেখে মহা আগ্রহে কৃষ্ণ হাতে নিল সেই পাত্র, কি আনন্দে সে মুখে তুলল সেই শাক আর অন্ন।

খাওয়ার পর উজ্জ্বল মুখে বলল,  “কৃষ্ণা, তবে যে তুমি বলেছিলে তোমার ভাঁড়ার শূণ্য, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই। তোমার দেওয়া এই অন্নে শুধু আমার নয়, জগতের সমস্ত জীবের ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে, এ আমি নিশ্চয় জানি”আশ্চর্য, কৃষ্ণের সেই অদ্ভূত লীলায় মুনি দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যরা স্নান সেরে সন্ধ্যা আহ্নিক করতে করতে অনুভব করলেন তাঁদের সকলের উদর পরিপূর্ণ, অন্নগ্রহণের এতটুকুও আর স্থান নেই। অপ্রস্তুত হয়ে নদীকূল থেকেই তাঁরা সকলে চলে গিয়েছিলেন, আমাদের আশ্রমে আর ফিরে আসেননি।

এই কৃষ্ণের প্রভাবেই আমি শূলপাণি মহাদেব ও উমাদেবীকে অবাক করে পাশুপত অস্ত্র লাভ করেছিলামএই কৃষ্ণের জন্যেই আমি এই নরদেহে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে বসতে পেরেছিলাম। যখন আমি ইন্দ্রলোকে ছিলাম নিবাত, কবচ দৈত্যদের বিনাশ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কৃষ্ণের প্রভাবেই। এই কৃষ্ণকে আমি হারিয়েছি, দাদা। এই কৃষ্ণ বন্ধুরূপে আমার সঙ্গে ছিলেন বলেই, আমি ভীষ্মের মতো প্রবল সেনানীদেরও পরাজিত করে, বিরাট রাজার গোধন ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। তারপর মোহনাস্ত্র প্রয়োগ করে, শত্রুদের ঘুম পাড়িয়ে তাঁদের সকলের মাথার মণি ও মুকুট আহরণ করে আনতে পেরেছিলাম।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আমার রথের সারথি হয়ে আমার সামনে বসে, এই কৃষ্ণই তাঁর কালদৃষ্টি দিয়ে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্য প্রমুখ বীরদের আয়ু, উৎসাহ, শক্তি ও বীর্য ক্ষয় করে দিয়েছিলেননৃসিংহ ভক্ত প্রহ্লাদকে যেমন অসুরদের কোন অস্ত্র স্পর্শ করতে পারত না, তেমনি আমাকেও ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্যদের মতো বীরদের অস্ত্র থেকে কৃষ্ণই বারবার রক্ষা করেছেনআমরা মূর্খ, তাই তাঁকে আমরা রথের সামান্য সারথি করে রেখেছিলাম।

আর এক দিনের কথা মনে পড়ছে দাদা, কুরুক্ষেত্রে জয়দ্রথ বধের দিন, আমার ঘোড়াগুলো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রথ থেকে নেমে আমি ওদের জল খাওয়াচ্ছিলাম। বিপদের কথা আমার মনেও হয়নি, আর কি আশ্চর্য দাদা, আমি যতক্ষণ ঘোড়াগুলিকে জল খাওয়াচ্ছিলাম, কৃষ্ণের মায়ায় কেউ আমার দিকে একটা অস্ত্রও প্রয়োগ করেনি। যদি করত, আজ আমি তোমার সামনে থাকতে পারতাম না, দাদা। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণকে হারিয়ে আমি সবদিক দিয়েই নিঃস্ব ও দুর্বল।

কত দিন আমি কৃষ্ণের সঙ্গে একসাথে বসে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি, শুয়েছি। মাধব সর্বদা হাসিমুখে আমায় অর্জুন, পার্থ, সখে কিংবা কুরুনন্দন বলে ডাকতেন। কতদিন পরিহাসছলে তাঁকে কত কথা বলেছি। আজ মনে হচ্ছে, সে সব কথা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি কিন্তু কিছু মনে করেননি। পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর এবং পতি যেমন পত্নীর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন, তিনিও আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। 

[গীতা - ১১শ পর্ব -এর ৪৪ সংখ্যক শ্লোকেও অর্জুন প্রায় একই কথা বলেছেন। পাশের সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন।]  

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের লীলা সংবরণের পর তাঁর মহিষীদের সুরক্ষার জন্যে আমার সঙ্গে নিয়ে আসছিলাম। আসার পথে একদল নীচ গোপসৈন্য আমাকে অসহায় অবলার মতো পরাস্ত করে, তাঁদের হরণ করে নিয়ে চলে গেল, আমি কিছু করতে পারলাম না। আমি সেই অর্জুন, আমার সঙ্গে সেই রথ, আমার কাছে সেই তির-ধনুক, অস্ত্র-শস্ত্র, যা দেখে একসময় মহাবীর রাজারাও ভয়ে মাথা নত করত, কিন্তু কৃষ্ণ বিরহে আজ আমি অক্ষম হয়ে গেছি। দ্বারকাপুরে যে বন্ধুগণের কুশল সংবাদ তুমি জিজ্ঞেস করলে, দাদা, তারা মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সকলে মারা গেছে, বেঁচে আছেন মাত্র চার পাঁচজন।

প্রাণীগণ যে পরস্পরের সঙ্গে শত্রুতা করে অথবা সৌহার্দ সূত্রে আবদ্ধ হয়, সে সবই ভগবানের কার্য, তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহাবীর যদুসৈন্যদের দিয়ে ভারতের অন্যান্য দুর্ধর্ষ বীর অত্যাচারী রাজাদের বিনাশ করেছিলেন। সবার শেষে যদুবীরদের দিয়েই যদুবীরদের বিনাশ করে, তিনি পৃথিবীর ভার হরণ করলেন। সকল মানুষের মধ্যে এনে দিলেন সমমনোভাব”

শ্রীকৃষ্ণমহিমার কথা বলতে বলতে, তাঁর কথা চিন্তা করতে করতে অর্জুনের মনে শান্তি ও বৈরাগ্যের উদয় হল। তাঁর মনে পড়ে গেল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে শোনা সেই পরমতত্ত্বকথা। সেই উপলব্ধি থেকে তাঁর মনের সমস্ত কামনা বাসনা দূর হয়ে গেল, দূর হয়ে গেল অজ্ঞানযুধিষ্ঠিরও ভগবানের লীলা সংবরণ ও যদুকুলের বিনাশের কথা শুনে স্থির করে ফেললেন, সবকিছু ছেড়ে তিনিও বেরিয়ে পড়বেন মহাপ্রস্থানের পথে। মাতা কুন্তীও সব ঘটনার বিবরণ শুনে ভগবানের পাদপদ্মে একান্ত ভক্তিসহকারে নিজের মন প্রাণ সমর্পণ করে পরম মুক্তির অপেক্ষা করতে লাগলেন।

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, যদুবংশীয় ও যে সকল অসুর রাজকুলে জন্ম নিয়ে পৃথিবীকে ভারযুক্ত করেছিল, তারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের তনু। প্রথমটিকে যাদব-তনু এবং দ্বিতীয়টিকে ভূভার-তনু বলা যেতে পারে। পায়ে ফোটা কাঁটা যেমন লোকে আরেকটি কাঁটা দিয়ে তুলে ফেলার পর, দুটি কাঁটাকেই পরিত্যাগ করে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ যাদব-তনুর সাহায্যে ভূভার-তনুর বিনাশ করে, অবশেষে যাদব-তনুরও সংহার করলেন। কারণ উভয়েই সংহারযোগ্য বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমান।

যেদিন ভগবান মুকুন্দ এই পৃথিবীর লীলা সাঙ্গ করে, নিজের মূর্তিতে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গেলেন, সেই দিন অবিবেকীদের অমঙ্গলকারী কলি পূর্ণরূপে আবির্ভূত হল। বিচক্ষণ রাজা যুধিষ্ঠির নগরে, জনপদে, নিজের গৃহে ও নিজেদের মনে লোভ, মিথ্যা, হিংসা, কুটিলতা ও অধর্মের প্রবৃত্তিকে কলির প্রসার বলে বুঝতে পারলেন, এবং মহাপ্রস্থানে যাত্রার বেশ ধারণ করলেন। তারপর বিনীত ও সর্বগুণে নিজের তুল্য পৌত্র পরীক্ষিৎকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসালেন। অন্যদিকে অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে মথুরার সিংহাসনে বসিয়ে শূরসেন দেশের অধিপতি করলেন। সকল কর্তব্যের পর মহারাজা যুধিষ্ঠির প্রাজাপত্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেন। তাঁর অগ্নিগৃহে তিনটি অগ্নিকুণ্ড বর্তমান ছিল, প্রতিদিন সেই তিন অগ্নিতে তিনি গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণ নামক হোম যথা নিয়মে করতেন। এখন তিনি প্রাত্যহিক হোম কার্য পরিত্যাগ করে মহাপ্রস্থানের জন্য প্রস্তুত। সুতরাং তিনি নিজের আত্মাকেই অগ্নিকুণ্ড কল্পনা করে, মনে মনে হোমক্রিয়া সমাপ্ত করলেন। তারপর সেই স্থানেই তিনি রাজোচিত পট্টবস্ত্র, অলংকার, সাজসজ্জা ত্যাগ করে নিষ্ঠুরভাবে সংসারের বন্ধন ছিন্ন করলেন। এরপর হৃদয়ে পরব্রহ্মের ধ্যান করতে করতে তিনি উত্তরে হিমালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করলেন, কারণ, উত্তরদিকের হিমালয় প্রদেশে গেলে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না। তাঁর অনুজ ভাইয়েরাও সকলে তাঁর অনুগমন করলেন। অন্যদিকে বিদুরও প্রভাসক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণে মন প্রাণ সমর্পণ করে দেহরক্ষা করলেন। দ্রৌপদীও তাঁর পতিদের এই নির্মম ও উদাসীন ভাব দেখে, ভগবানের প্রতি অবিচলিত ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম লাভ করলেন।

যিনি শ্রীকৃষ্ণের একান্ত ভক্ত পাণ্ডুপুত্রগণের এই অতি পবিত্র মহাপ্রস্থানের কথা শোনেন, তিনি শ্রীহরির চরণ অরবিন্দে ভক্তিলাভ করেন ও সিদ্ধ অবস্থা পেয়ে থাকেন” 

চলবে...             

বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

অবিচলিত থাকা

 

এর আগের রম্যকথা - " পাইলট " 


আজ সকাল সকাল ভোট দিয়ে এসে, জানি না কেন রবি ঠাকুরের “রক্তকরবী” নাটকের এই নাট্যাংশটুকু হঠাৎ মনে পড়ে গেল। মানসিক দিক থেকে আজকের দিনে আমরা সকলেই যথেষ্ট বিচলিত কিন্তু বাইরে "অবিচলিত" ভাবটা বজায় রেখে চলি সর্বদা - সেই কারণেই "আরো কটা মাস পাড়ায় ফৌজ রাখা ভালো"...!      


"সর্দার -  নাতনি, একটা সুখবর আছে। এদের ভালো কথা শোনাবার জন্যে কেনারাম গোঁসাইকে আনিয়ে রেখেছি। এদের কাছ থেকে প্রণামী আদায় করে খরচটা উঠে যাবে। গোঁসাইজির কাছ থেকে রোজ সন্ধেবেলায় এরা--

ফাগুলাল - না না, সে হবে না সর্দারজি। এখন সন্ধেবেলায় মদ খেয়ে বড়োজোর মাতলামি করি, উপদেশ শোনাতে এলে নরহত্যা ঘটবে।

বিশু - চুপ চুপ, ফাগুলাল।

[গোঁসাইয়ের প্রবেশ]

সর্দার – এই যে বলতে বলতেই উপস্থিত। প্রভু, প্রণাম। আমাদের এই কারিগরদের দুর্বল মন, মাঝে মাঝে অশান্ত হয়ে ওঠে। এদের কানে একটু শান্তিমন্ত্র দেবেন-- ভারি দরকার।

গোঁসাই - এই এদের কথা বলছ? আহা, এরা তো স্বয়ং কূর্ম-অবতার। বোঝার নীচে নিজেকে চাপা দিয়েছে বলেই সংসারটা টিঁকে আছে। ভাবলে শরীর পুলকিত হয়। বাবা ৪৭ফ, একবার ঠাউরে দেখো, যে মুখে নাম কীর্তন করি সেই মুখে অন্ন জোগাও তোমরা; শরীর পবিত্র হল যে নামাবলিখানা গায়ে দিয়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সেখানা বানিয়েছ তোমরাই। এ কি কম কথা! আশীর্বাদ করি, সর্বদাই অবিচলিত থাকো, তা হলেই ঠাকুরের দয়াও তোমাদের পরে অবিচলিত থাকবে। বাবা, একবার কণ্ঠ খুলে বলো "হরি হরি'। তোমাদের সব বোঝা হালকা হয়ে যাক। হরিনাম আদাবন্তে চ মধ্যে চ।

চন্দ্রা - আহা, কী মধুর। বাবা, অনেকদিন এমন কথা শুনি নি। দাও দাও, আমাকে একটু পায়ের ধুলো দাও।

ফাগুলাল - এতক্ষণ অবিচলিত ছিলুম, কিন্তু আর তো পারি নে। সর্দার, এত বড়ো অপব্যয় কিসের জন্যে। প্রণামী আদায় করতে চাও রাজি আছি, কিন্তু ভণ্ডামি সইব না।

বিশু - ফাগুলাল খেপলে আর রক্ষে নেই, চুপ চুপ।

চন্দ্রা - ইহকাল পরকাল তুমি দুই খোওয়াতে বসেছ? তোমার গতি হবে কী। এমন মতি তোমার আগে ছিল না, আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের উপরে ঐ নন্দিনীর হাওয়া লেগেছে।

গোঁসাই - যাই বল সর্দার, কী সরলতা! পেটে মুখে এক, এদের আমরা শেখাব কি, এরাই আমাদের শিক্ষা দেবে। বুঝেছ?

সর্দার - বুঝেছি বৈকি। এও বুঝেছি উৎপাত বেধেছে কোথা থেকে। এদের ভার আমাকেই নিতে হচ্ছে। প্রভুপাদ বরঞ্চ ওপাড়ায় নাম শুনিয়ে আসুন, সেখানে করাতীরা যেন একটু খিটখিট শুরু করছে।

গোঁসাই - কোন্‌ পাড়া বললে, সর্দারবাবা।

সর্দার - ঐ-যে ট ঠ পাড়ায়। সেখানে ৭১ট হচ্ছে মোড়ল। মূর্ধন্য-ণয়ের ৬৫ যেখানে থাকে তার বাঁয়ে ঐ পাড়ার শেষ।

গোঁসাই - বাবা,দন্ত্য-ন পাড়া যদিও এখনো নড়্‌নড়্‌ করছে, মূর্ধন্য ণরা ইদানীং অনেকটা মধুর রসে মজেছে। মন্ত্র নেবার মতো কান তৈরি হল বলে। তবু আরো কটা মাস পাড়ায় ফৌজ রাখা ভালো। কেননা, নাহংকারাৎ পরো রিপুঃ। ফৌজের চাপে অহংকারটার দমন হয়, তার পরে আমাদের পালা। তবে আসি।

চন্দ্রা - প্রভু, আশীর্বাদ করো, এই এদের যেন সুমতি হয়। অপরাধ নিয়ো না।

গোঁসাই - ভয় নেই মা-লক্ষ্মী, এরা সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

[ প্রস্থান]

সর্দার - ওহে ৬৯ঙ, তোমাদের ওপাড়ার মেজাজটা যেন কেমন দেখছি!

বিশু - তা হতে পারে। গোঁসাইজি এদের কূর্ম-অবতার বললেন, কিন্তু শাস্ত্রমতে অবতারের বদল হয়। কূর্ম হঠাৎ বরাহ হয়ে ওঠে, বর্মের বদলে বেরিয়ে পড়ে দন্ত, ধৈর্যের বদলে গোঁ।

-- ০০ --


মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৮   


২৫ 

খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে ভল্লা আর রামালি পুকুরে গেল মুখ-হাত ধুতে আর বাসন-থালা পরিষ্কার করতে। কিছু শুকনো পাতাতে মাটি নিয়ে ঘষে ঘষে মালসা আর সরার তলায় লেগে থাকা উনুনের যত কালি মেজে পরিষ্কার করে ফেলল রামালি। ভল্লা কিছু বলল না, কিন্তু রামালির প্রতি তার মুগ্ধতা আরও বাড়ল। ভল্লা নিজে বড়ো হয়েছে মাতৃস্নেহে। বাবার কাছে অনেক শিক্ষাই সে পেয়েছে, কিন্তু সে সবই বাইরের কাজ। লাঠি খেলা, কুস্তি লড়া, বল্লম চালানো, নৌকা বাওয়া, রণপায়ে চেপে দৌড়ে বেড়ানো। কিন্তু ঘরের কাজ সে কিছুই জানত না। কাজের জন্যে বাইরে থাকতে থাকতে নিজের জন্যে একটু ভাত কিংবা ভুট্টা ফুটিয়ে নেওয়া...ব্যস্‌ ওইটুকুই সে বাধ্য হয়ে শিখেছে।

কিন্তু শৈশবেই মা-বাপ হারানো রামালিকে হাতে ধরে কেউ কিচ্‌ছু শেখায়নি। অতএব বেঁচে থাকার তাগিদেই তাকে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে, যে শিক্ষা আর পাঁচটা শিশুকে না শিখলেও চলে। ভল্লা এখানে আসার পর থেকে এ গ্রামের এবং পড়শী গ্রামের অনেক ছেলেই তার কাছে নতুন নতুন বিদ্যা শিখছে। সে শিক্ষা গ্রহণেও রামালি যে বেশ আন্তরিক ও তৎপর, সেটা ভল্লা অনেকবারই লক্ষ্য করেছিল। কিন্ত হানো, শল্কু, আহোকদের তুলনায় রামালিকে ভল্লা অতটা মনোযোগ দেয়নি। তার কারণ রামালি বড়ো মুখচোরা। অনেকের মধ্যে নিজের বক্তব্য নিয়ে সোচ্চার হওয়া তার ধাতে নেই। কিন্তু আশ্চর্য হল, মুখচোরা সেই ছেলেটিই আজ শেষ রাত থেকে তার গভীর ভাবনা-চিন্তার কথা প্রকাশ করে, ভল্লাকে অবাক করে দিয়েছে। এমন স্বচ্ছ অথচ গভীর ভাবনা-চিন্তা করার সাধ্য হানোর ছিল না। শল্কু এবং আহোকের নেই। সত্যি বলতে খুব কম ছেলের মধ্যেই এই ক্ষমতা মিলবে। ভল্লা রামালির মধ্যে এখন একজন সম্পূর্ণ মানুষকে দেখতে পাচ্ছে। যার হাতে তার বানিয়ে তোলা বিদ্রোহের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া যেতে পারে।

পুকুর থেকে একসঙ্গে ফেরার পথে ভল্লা রামালিকে বলল, “শল্কুরা এখনই এসে যাবে হয়তো। কথাবার্তার সময় চুপ করে পুতুলের মতো বসে থাকবি না – তোর কী মতামত, তুই কী ভাবছিস বলবি। যুদ্ধের দক্ষতা নিয়ে ভাল সৈনিক হওয়া যায়। কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যার নিজস্ব বুদ্ধি আর ভাবনাচিন্তা থাকে সে সেনাপতি হয়ে উঠতে পারে”।

রামালি অবাক হয়ে ভল্লার দিকে তাকাল, কিছু বলল না। দুজন কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর ভল্লা আবার বলল, “দেখলি, এটাই তোর বড়ো দোষ। আমি যে তোকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বললাম, তার কোন উত্তরই দিলি না। আমি বুঝতেই পারলাম না, রে গর্দভ, আমার কথাটা তোর মগজে ঢুকল, কি ঢুকল না”।

রামালি হাসল, বলল, “শুধু ঢুকেছে নয় ভল্লাদাদা, একেবারে বিঁধে গিয়েছে। যে উত্তরটা মনে এসেছিল, তোমাকে বললে বলবে, আমি নাকে কাঁদছি। তবুও বলছি, কারণ তুমিই বলতে আদেশ করলে। ছোটবেলা থেকেই এমন পারিবারিক পরিবেশে আমি বড়ো হয়েছি, আমার যে কোন আচরণ বা কথার, অদ্ভূত-অদ্ভূত বিকৃত মানে করা হয়েছে। এবং তার ফলে আমাকে প্রায়ই গালাগাল শুনতে হয়েছে। কখনও কখনও শাস্তিও পেতে হয়েছে। জীবনের সেই পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু আমি পারব, কথা দিলাম, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা রামালির কাঁধে হাত রাখল, বলল, “জীবনের কোন অভিজ্ঞতাই ফেলনা নয়, রামালি। কাকা-কাকির সংসারে তোর এত বছরের অনাথ জীবন তোকে এমন কিছু বিরল শিক্ষা দিয়েছে, যে শিক্ষা বাবা-মার আদরে, ভালোবাসায় বড়ো হলে, কোনদিন টেরই পেতিস না। আমিও পাইনি – কারণ আমি বাবা-মাকে পেয়েছি, আমার মাথার ওপর আমার মা এখনও রয়েছেন। ওই শিক্ষাটাই তোকে অনেকদূর চালিত করবে...পিছনের সব কথা ভুলে, শুধু অভিজ্ঞতাটা মনে রাখ, রামালি। তুই পারবি”।  

ভল্লারা ঘরে ফিরে দেখল, শল্কুরা এসে গেছে। ওরা ছ’ জন। ঘরের সামনে মাটিতেই বসে আছে যে যার সুবিধে মত। শল্কু জিজ্ঞাসা করল, “তোমাদের এখনও খাওয়া হয়নি, ভল্লাদাদা?”

ভল্লা বলল, “হয়ে গেছে, এই তো পুকুর থেকে আঁচিয়ে ফিরছি”।

আহোক বলল, “তোমার ঘরে দেখলাম একটা সরায় বেশ কিছুটা খিচুড়ি আর কুঁদরি ভাজা ঢাকা দিয়ে রাখা রয়েছে, তাই ভাবলাম, এখনও খাওনি”। রামালি ঘরে ঢুকে ধোয়া বাসন-থালাগুলো সাজিয়ে রাখতে গেল, ভল্লা বাইরেই বসল, বলল, “আজ রামালিই রান্না করল। হতভাগা যে দারুণ রান্না করে, সে কথা তোরা জানতিস? ব্যাটা মেয়েদেরকেও হার মানাবে। শুধু একটাই ভুল করেছে, ও ভেবেছিল আমি বুঝি বকরাক্ষস। তাই অনেকটাই বেশি হয়ে গেল, খিচুড়িটা। ইচ্ছে হলে তোরা খেতে পারিস”।

“শল্কু বলল, আমরা এই মাত্র খেয়ে এলাম ভল্লাদাদা। ঠিক আছে, যাওয়ার সময় রামালির রান্না চেখে দেখব”।

ভল্লা বলল, “তোদের কী ব্যাপার কি? আজ সকালে ভেবেছিলাম তোরা আসবি। আগের মতো মহড়া শুরু করবি…। নাকি একবার ডাকাতি করেই শখ মিটে গেল?”

আহোক বলল, “চোখের সামনে হানোটা মরে গেল। ওর মা আর তিনবোন এখনো খুব কান্নাকাটি করছে, ভল্লাদাদা। তাদের চোখের সামনে দিয়ে মহড়ায় আসতে – একটু সংকোচ হচ্ছিল। আমাদের আসতে দেখলেই ওদের তো হানোর কথা মনে পড়ে যাবে…”।

ভল্লা কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বসে রইল, তারপর বলল, “প্রচণ্ড একটা ঝড় আসছে… সেটা কি টের পাচ্ছিস?”

শল্কু জিজ্ঞাসা করল, “কিসের ঝড়, ভল্লাদাদা? আস্থানের রক্ষীরা আমাদের গ্রামে আসবে, সে কথাই বলছো তো? রামালি আমাদের বলল। রামালির কথা মতো আমাদের ঘরে ঘরে যার যা একটা-দুটো জংধরা অস্ত্র-শস্ত্র ছিল সব পুকুরের জলে লুকিয়ে ফেলেছি। বাড়িতে খুঁজলে নরুন আর হাতা-খুন্তি ছাড়া কিচ্ছু পাবে না।”

ভল্লা এই সংবাদটা জানত না, রামালির বুদ্ধিতে সে আরও একবার অবাক হল। ভল্লা বলল, “সে না হয় হল, কিন্তু রক্ষীরা হয়তো জিজ্ঞাসা করবে লুঠ করা অস্ত্রগুলো কোথায় রেখেছিস … সেটা জানার জন্যেই গ্রামের সকলের ওপর অত্যাচার করবে। আমাদের ছেলেরা কি তখন চুপ করে বসে থাকতে পারবে? আমাদের ছেলেরা কি চোখের সামনে সব অত্যাচার দেখেও বলতে পারবে – আমরা ডাকাতি নয় রামকথা শুনতে গিয়েছিলাম?”

“রক্ষীরা এলে, তোমার নির্দেশ মতো আমাদের দলের কেউই তো সামনে যাবে না, বরং গ্রামের বাইরে গা ঢাকা দেবে। বাকি রইল বড়োরা আর বাচ্চারা – তাদের ওপর নিশ্চয়ই খুব একটা অত্যাচার করবে না”।

ভল্লা হাসল, “রক্ষীরা কি ধরনের অমানুষ আর নিষ্ঠুর হয়, তোদের কোন ধারণা নেই। কিন্তু সে কথা চিন্তা করে লাভ নেই। তোদের বাড়ির লোকজন বা পরিবারের কেউ কি জানে – তোরা সেদিন ডাকাতি করতে গিয়েছিলি? এবং আমাদের লুঠ করে আনা আস্ত্র-শস্ত্র কোথায় রাখা আছে?”

শল্কু বলল, “আমাদের কেউই এ ব্যাপারে কাউকে একটা কথাও বলিনি, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, ভল্লাদাদা – সেদিন আমরা হানোর চিতার সামনেই সবাই শপথ নিয়েছিলাম…”।

ভল্লা খুব চিন্তিত মুখে বলল, “ওরা কবে যে আসবে সেটা তো জানা যাচ্ছে না…হয়তো আজ, নয়তো কাল বা পরশু…কিন্তু তোরা মনে মনে কী ঠিক করেছিস? মহড়া চালিয়ে যাবি এবং লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হবি? নাকি সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে আগের মতোই শান্ত নিরুপদ্রব জীবনে ফিরে যাবি?”

আহোক জিজ্ঞাসা করল, “এ কথা কেন বলছো, ভল্লাদাদা? তোমার কী মনে হয়, আমরা ভয় পাচ্ছি? রক্ষীদের আক্রমণের ভয়? আমরা কিন্তু…”।

রামালি শল্কুর পাশেই বসেছিল, হঠাৎ উঠে দাঁড়াল – ইশারায় সকলকে চুপ করতে বলে, কান পাতল কোন শব্দ শোনার জন্যে। ফিসফিস করে বলল, “কেউ একজন ছুটতে ছুটতে আসছে, ভল্লাদাদা…তবে কি রক্ষীরা গ্রামে এসে গেছে?” রামালির কথায় সকলেই উঠে দাঁড়াল, রামালি কিছুটা এগিয়ে গেল শব্দ লক্ষ্য করে, বলল, “আরে এ তো সুকরা গাঁয়ের সুরুল…” রামালি ডাকল “সুরুল, অ্যাই সুরুল, এদিকে…এদিকে আয়…কী হয়েছে?”

রামালিকে দেখে সুরুল বলল, “ওঃ তোরা এখানে আছিস? ভল্লাদাদা?”

“আছে সবাই আছে, একটু বোস…বড্ডো হাঁফাচ্ছিস তুই, জিরিয়ে নে একটু”।

সুরুল ভল্লার সামনে এসে বসে পড়ল মাটিতে, বলল, “ভল্লাদাদা, ওরা ভীলককাকাকে বিচ্ছিরিভাবে মেরেছে…চাবুক মেরেছে আমাদের সবাইকে…এই দ্যাখো” গায়ের ফতুয়াটা খুলে নিজের পিঠ দেখাল সুরুল

রামালি বলল, “ওরা মানে? আস্থানের রক্ষীরা?” রামালি ঘরের ভেতর থেকে এক ঘটি জল এনে সুকুলের হাতে তুলে দিল। সুরুল রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে ঘটিটা হাতে নিল, ঘটির জল নিঃশেষ করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। খালি ঘটিটা হাতে নিয়ে রামালি বলল, “দুপুরে কিছু খেয়েছিস? মনে তো হচ্ছে না…”। রামালি ঘরে ঢুকে খালি ঘটি রেখে, খিচড়ি আর ভাজির সরাটা আনল। সুকুলের হাতে তুলে দিয়ে বলল, “এটা খেতে থাক…খেতে খেতে বল, কী হয়েছে? কিসের জন্যে তুই এভাবে দৌড়ে এলি?”

সুরুল কৃতজ্ঞ চোখে ভল্লার দিকে তাকিয়ে খাওয়া শুরু করল। খেতে খেতে সব কথা বলল। আজকেই একটু আগে ভল্লাদাদার বানানো বাঁধের ধারে যা যা ঘটেছিল। সুরুল আরো বলল, “আমাদেরকে রগড়ে, কুত্তার বাচ্চারা তোদের গ্রামের দিকে রওনা হল, শল্কু, রামালি। দেখলাম তোদের গ্রামের ওপরেই ওদের যত আক্রোশ…”।

ভল্লা শল্কুদের দিকে তাকিয়ে বলল, “যে ভয়টা পাচ্ছিলাম, সেটা আজ এখনই ঘটে চলেছে তোদের গ্রামে”।

আহোক হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে যারা অকারণে এমন নিষ্ঠুর আঘাত করতে পারে, তারা আমাদের গ্রামেও একই রকম অত্যাচার করবে, বুঝতে পারছি। এই প্রতিটি রক্তবিন্দুর শোধ আমরা নেবই ভল্লাদাদা, তুমি আমাদের শক্তি দাও…”।

সুরুল বলল, “আমরাও…ভীলককাকার সামনেই আমি শপথ করেছি। এরকম মার খেয়েও তিনি এতটুকু ভয় পাননি…আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছেন…”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, আমাদের এখন আবেগ নয়, বিবেচনার সঙ্গে কাজ করতে হবে। শল্কু, আহোক তোরা ফিরে যা। রক্ষীরা আশাকরি সন্ধের অনেক আগেই আস্থানে ফিরে যাবে। তবে তোরা কিন্তু হুট করে গ্রামে ঢুকবি না। রাজরক্ষীরা গ্রাম ছেড়ে গিয়েছে, নিশ্চিত হয়েই তারপর গ্রামে ঢুকবি। তোদের এখন প্রথম কাজ নিজের নিজের পরিবারের পাশে থাকা… ভরসা দেওয়া। তোদের বাবা-মা, গ্রামের বয়স্ক মানুষরা এমনকি ছোটরাও - আজকের ঘটনায় মানসিকভাবে হয়তো ভেঙে পড়বেন। তাঁদের মনের শক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে…সেটাই এখন প্রধান কাজ…”।

একটু চুপ করে থেকে ভল্লা আবার বলল, “রক্ষীরা আমার খোঁজে হয়তো এখানেও চলে আসবে…এখানে আমার সঙ্গে তোদের এতজনকে দেখলে…তোদের বিপদ আরও বাড়বে…। তোরা এখনই বেরিয়ে পড়…যে ভাবে বললাম, গ্রামের সীমানার বাইরে জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করবি। এখান থেকে আমিও গা ঢাকা দেব… গোঁয়ার্তুমি করে রক্ষীদের হাতে ধরা পড়ার কোন মানে হয় না। সুরুল তুইও গ্রামে ফিরে যা। আমি কাল থেকেই মহড়া শুরু করতে চাই। কিন্তু তার আগে গ্রামের পরিস্থিতি কীরকম সেটা জানতে হবে, বুঝতে হবে। রাত্রের দিকে আমি একবার দুটো গ্রামেই যাব…আমার সঙ্গে থাকবে রামালি… এখন তোরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়…”।

উদ্বিগ্ন মুখে শল্কুরা সবাই উঠে দাঁড়াল। ভল্লা শল্কু আর সুরুলের কাঁধে হাত রেখে বলল, “প্রকৃত লড়াই এবার শুরু হল বলে। আজ রাত্রেই ঠিক করে ফ্যাল, লড়াইতে নামবি, নাকি শত্রুপক্ষের হাতে নিজেদের সমর্পণ করে দিবি? আচ্ছা রামালি, তুই কোন পাখির ডাক-টাক নকল করতে পারিস?”

রামালি অবাক হয়ে বলল, “পাখির ডাক? হ্যাঁ পারি, মোরগের ডাক”।

“ধুর ব্যাটা, রাতের দুই প্রহরে কখনও মোরগ ডাকে? অন্য কিছু?”

রামালি এবার বুঝতে পারল, বলল, “কুকুরের ডাক, কুকুরের কান্না…”।

ভল্লা হাসল, বলল, “বাঃ চলবে। রাত্রি দুই প্রহরের মাঝামাঝি পরপর তিনবার কুকুরের কান্না শুনলে বুঝবি ওটা রামালির সংকেত। চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে রামালির সঙ্গে চলে আসবি, আমি গ্রামের বাইরেই থাকব। সুরুল, তোদের গ্রামে যেতে আমাদের আরও একটু দেরি হবে… হয়তো দুই প্রহরের শেষে অথবা তিন প্রহরের শুরুতে। শুধু তুই না, তোর সঙ্গে তোর বিশ্বস্ত আরো কিছু লড়াকু ছেলেকেও সঙ্গে আনতে পারিস”।

চলবে...

   


সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৫ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

ষোড়শ পর্বাংশ 


৪.৮.৩ কল্যাণের পশ্চিমা-চালুক্য              

শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা তৈলপ ছিলেন, চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মনের কোন কাকার বংশধর। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব মানেন না। এঁরা বলেন, নাম না জানা কোন গুরুত্বহীন গোষ্ঠীর রাজা ছিলেন তৈলপ। সে যাই হোক, তৈলপের জীবনের শুরু রাষ্ট্রকূটদের সামন্তরাজা হিসেবে। পরমার রাজা যখন রাজধানী মান্যখেটের পতন ঘটালেন, সেই ডামাডোলের মধ্যে তৈলপ রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কর্ককে হয় হত্যা করেছিলেন, অথবা দূর কোন নিরাপদ জায়াগায় পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন। এরপর পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে রাষ্ট্রকুটরা যখন নাজেহাল, তখন তৈলপ চতুর্থ ইন্দ্রকে পরাস্ত করে, রাষ্ট্রকূট রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তৈলপ দক্ষিণ গুজরাটের লাট জয় করেছিলেন, কিন্তু বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি, অনহিলওয়াড়ার মূলরাজ চালুক্য, তৈলপের প্রশাসক বারপ্পকে লাট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শোনা যায়, তৈলপ কুন্তল (কর্ণাটের অংশ), চেদি এবং চোলদের পরাজিত করেছিলেন। যদিও তাঁর রাজ্যের উত্তর সীমান্তে পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জ বারবার হানা দিচ্ছিলেন। শোনা যায় শেষ যুদ্ধে তৈলপ বাকপতি-মুঞ্জকে বন্দী করে, তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এখান থেকেই পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে পরমার রাজাদের চিরশত্রুতার সূত্রপাত হল। তৈলপের মৃত্যু হয় ৯৯৭ সি.ই.-তে, তারপর রাজা হলেন তাঁর পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.)।

তাঁর রাজত্বকালে চোল রাজা প্রথম-রাজারাজ চালুক্য রাজ্যে প্রভূত ক্ষতি এবং গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু সত্যাশ্রয় অচিরেই চোলদের এই ধাক্কা সামলে তাঁদের সমুচিত শিক্ষাও দিয়েছিলেন। সত্যাশ্রয়ের পরে রাজা হলেন তাঁর ভাইপো পঞ্চম-বিক্রমাদিত্য, খুব কমদিনই তিনি রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। পরমার রাজা ভোজ তাঁকে চূড়ান্ত পরাস্ত করে, পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এরপরে রাজা ভোজ দাক্ষিণাত্যের অধিকার সুরক্ষিত করতে শক্তিশালী অনহিলওয়াড়ার প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজাদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চম-বিক্রমাদিত্যর পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ জগদেকমল্ল (১০১৬-৪২ সি.ই.), মালবের পরমার রাজা ভোজের এই স্বপ্ন পূর্ণ হতে দেননি।

প্রথম সোমেশ্বর(১০৪২-৬৮ সি.ই.)

১০৪২ সি.ই.-তে রাজা হলেন, দ্বিতীয় জয়সিংহের পুত্র, প্রথম সোমেশ্বর। তিনি চোল এবং পরমারদের আক্রমণ করলেন, এবং পরমার রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে মালব রাজ্যের মাণ্ডু এবং ধারা অঞ্চল অধিকার করে নিলেন। রাজা ভোজের অনুপস্থিতিতে, পরমার দুর্বল রাজারা প্রথম সোমেশ্বরের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পেরে, উজ্জয়িনী পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানেও ধাওয়া করলেন প্রথম সোমেশ্বর এবং উজ্জয়িনী জয় করলেন। এর মধ্যে রাজা ভোজ রাজধানীতে ফিরে উজ্জয়িনী উদ্ধার করে, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু এরপর অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজা লক্ষ্মী-কর্ণের যৌথ আক্রমণে পরমারদের দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে এল। এই যুদ্ধে রাজা ভোজ মারা গেলেন, এবং পরমার রাজত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল। এই সময়ে ভোজের পরবর্তী পরমাররাজা জয়সিংহ, অনহিলওয়াড়া এবং কলচুরিদের থেকে রক্ষা পেতে, সোমেশ্বরের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সোমেশ্বর এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না, তিনি চিরশত্রু পরমারদের সঙ্গে সখ্যতা করে, প্রথম ভীম এবং লক্ষ্মীকর্ণকে পরাস্ত করে, জয়সিংহকে পরমার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি জানতেন মধ্য ভারতের যে কোন শক্তিই প্রবল হলে, তাঁর চালুক্যরাজ্যের পক্ষে তাঁরা বিপজ্জনক।

যুদ্ধে প্রথম সোমেশ্বরের প্রধান সহায় ছিলেন, তাঁর পুত্র ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। মধ্যভারত নিয়ন্ত্রণে আসার পর, প্রথম সোমেশ্বর উত্তরভারতের দিকে মন দিলেন। গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলের প্রতিহার রাজারা তখন দুর্বল, অতএব চালুক্য সৈন্যরা অতি সহজেই দোয়াব এবং কনৌজ জয় করে নিলেন। তারপর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী, মিথিলা, মগধ, অঙ্গ, বঙ্গ এবং গৌড় পর্যন্ত বিনা বাধায় চলে এসেছিলেন। তখন গৌড়ের পালরাজারাও প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। যদিও কামরূপের রাজা রত্নপাল চালুক্য সৈন্যদের পরাস্ত করেছিলেন এবং এরপর চালুক্য সৈন্যবাহিনী দক্ষিণ কোশলের পথে নিজেদের ঘরে ফিরেছিলেন। এ ভাবেই প্রথম সোমেশ্বরের আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষই চালুক্য রাজাদের শক্তি টের পেয়েছিল।

প্রথম সোমেশ্বর তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন কল্যাণে (কল্যাণী, হায়দ্রাবাদ)। ১০৬৮ সি.ই.তে তাঁর মৃত্যুও ঘটেছিল অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে। শোনা যায় তিনি মারাত্মক এক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং নিরাময় অসম্ভব জেনে, রীতিমতো উৎসব করে, মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে তুঙ্গভদ্রার জলে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় সোমেশ্বর আহবমল্ল, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। যদিও যাবতীয় যুদ্ধ বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল, তাঁর ভাই ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর, কিন্তু প্রথম দিকে সিংহাসন নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন বিবাদ ছিল না। দ্বিতীয় সোমেশ্বরের স্বল্পস্থায়ী রাজত্বে তেমন কিছু কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায় না, তাঁর সময়ে একটাই প্রধান ঘটনা হল, ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বন্ধু মালবের রাজা জয়সিংহকে আক্রমণ করে, তিনি পরাজিত করেছিলেন।

১০৭৬ সি.ই.তে দ্বিতীয় সোমেশ্বরের মৃত্যুর পর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য রাজা হয়েছিলেন, এবং সেই বছর থেকে চালুক্য-বিক্রমাঙ্ক অব্দ শুরু হয়। এই পশ্চিমা-চালুক্য বংশের সব থেকে সফল ও উজ্জ্বল রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। তিনি শিল্প, শিক্ষা এবং জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কাশ্মীরি লেখক বিলহনের গুণমুগ্ধ ছিলেন, বিলহনের লেখা “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত”, রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যকে অমর করে দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজসভার পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর, হিন্দু রীতিনীতির ওপর “মিতাক্ষরা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর পুত্র তৃতীয় সোমেশ্বর ভূলোকমল্ল ১১২৬ থেকে ১১৩৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় জগদেকমল্ল রাজত্ব করেছিলেন ১১৩৮-১১৫১ সি.ই.। তারপর সিংহাসনে বসেন, তাঁর ভাই নুরমডি তৈল। কিন্তু এরপর কলচুরি রাজ্যের রণমন্ত্রী, ভিজ্জলার মন্ত্রণা এবং প্ররোচনায় চালুক্য রাজ্যের সামন্তরাজাদের মধ্যে বিদ্রোহ এবং ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তাঁরা নুরমডি তৈলকে ১১৫৭ সি.ই.তে সিংহাসন চ্যুত করেন। নুরমডি তৈলর পুত্র ভীর সোম বা চতুর্থ সোমেশ্বর ১১৮২ সি.ই.তে পিতৃরাজ্য কিছুটা উদ্ধার করে ১১৮৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু দেবগিরির যাদব এবং দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজ্যের প্রবল আক্রমণে পশ্চিমা-চালুক্যবংশ ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল। 

[Image courtsey www.alamy.com]

৪.৮.৪ দেবগিরির যাদব

মহাভারতের ভগবান শ্রীকৃষ্ণর যদু বংশ থেকে যাদবদের উৎপত্তি, এমনই প্রবাদ শোনা যায়। যদিও, তাঁদের রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল, মান্যখেড়ের রাষ্ট্রকূট এবং পশ্চিমা-চালুক্যদের সামন্তরাজা হিসাবে। পশ্চিমা-চালুক্যদের দুর্বলতার সুযোগে যাদবদের উত্থানের শুরু এবং পরবর্তী কালে তাঁরা বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, পঞ্চম ভিল্লাম। তাঁর রাজধানী ছিল দেবগিরি (হায়দ্রাবাদ জেলার আধুনিক দৌলতাবাদ)। তিনি খুব বেশি রাজত্ব বিস্তার করতে পারেননি, কারণ ১১৯১ সি.ই.-তে হোয়সল রাজ প্রথম বীর-বল্লালের হাতে তিনি পরাস্ত হন এবং খুব সম্ভবতঃ প্রাণও হারান।

ভিল্লমের পুত্র জৈতুগি বা প্রথম জৈত্রপাল (১১৯১-১২১০ সি.ই.)। তিনি তৈলঙ্গ (ত্রিকলিঙ্গ) রাজ রুদ্রদেবকে পরাজিত করেন এবং হত্যাও করেন, তারপর রাজা রুদ্রদেবের ভাইপো গণপতিকে সিংহাসনে বসিয়ে কাকতীয় বংশের সূচনা করেছিলেন। এভাবেই যাদবরা সমসাময়িক রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে থাকেন।

যাদব বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন, জৈত্রপালের পুত্র সিংহন (১২১০ - ১২৪৭ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু অঞ্চল এবং রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনি ১২১৫ সি.ই.তে বীরভোজকে পরাস্ত করে, কোলাপুরের সিলাহারা অঞ্চল এবং পরনালা বা পনহালা দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তাঁর দাদুর হত্যাকারী হোয়সল রাজ দ্বিতীয় বীরবল্লালকে পরাস্ত করে, কৃষ্ণা নদীর অপর পাড়ে হটিয়ে দিয়েছিলেন। সিংহন এরপরে মালবের রাজা অর্জুনবর্মন, ছত্তিশগড়ের চেদি রাজা জাজ্জল, গুজরাটের বাঘেলা রাজাদের আক্রমণ করেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন।

সিংহন অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায় বিখ্যাত কিছু গুণী এবং বিদ্বানেরা বিশেষভাবে সম্মানীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সারঙ্গধর, সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম “সঙ্গীত-রত্নাকর”। এই গ্রন্থের টীকা এবং ভাষ্য রচনা করেছিলেন, স্বয়ং রাজা সিংহন। সিংহনের সভায় আরেকজন বিদ্বান ছিলেন, শার্ঙ্গদেব, বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তিনি খান্দেশ জেলার পাটনায় একটি মঠ (মহাবিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ভাস্করাচার্যের “সিদ্ধান্ত-শিরোমণি” এবং অন্যান্য জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হত।

সিংহনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি কৃষ্ণ বা কনহার (১২৪৭-৬০ সি.ই.)। তাঁকেও মালব, গুজরাট এবং কোঙ্কনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তিনি হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময়েই জলহনের কাব্য সংকলন “সূক্তিমুক্তাবলী” এবং আমলানন্দর বেদান্ত ভাষ্য - “বেদান্ত-কল্পতরু” রচিত হয়েছিল। কৃষ্ণের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মহাদেব (১২৬০-৭১ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু রাজ্য, যেমন সিলাহারদের উত্তরকোঙ্কন, কর্ণাটক, গুজরাটের লাট এবং কাকতীয় রাণী রুদ্রাম্বার রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। মহাদেব এবং তাঁর পরবর্তী রাজা রামচন্দ্র বা রামরাজার (১২৭১-১৩০৯ সি.ই.) মন্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত হেমাদ্রি বা হেমাদপন্ত। যিনি “চতুর্বর্গ–চিন্তামণি” নামে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। শোনা যায় তিনি দাক্ষিণাত্যের মন্দির স্থাপত্যের নতুন প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন এবং মোড়ি[1] লিপির সংস্কার করেছিলেন। আরও শোনা যায় রাজা রামচন্দ্র সন্ন্যাসী জ্ঞানেশ্বরের শিষ্য ছিলেন, পণ্ডিত জ্ঞানেশ্বর ১২৯০ সি.ই.-তে মারাঠী ভাষায় প্রথম ভাগবত-গীতার ভাষ্য রচনা করেছিলেন।

রামচন্দ্রের রাজত্বকালে ১২৯৪ সি.ই.-তে আলাউদ্দিন খিলজি হঠাৎ দেবগিরি অবরোধ করেন, রামচন্দ্র তখন দেবগিরি দুর্গেই ছিলেন। তাঁর পুত্র শংকর তাঁকে মুক্ত করতে, বহু প্রয়াস করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন রামচন্দ্র বাধ্য হলেন আলাউদ্দিনের সঙ্গে এক তরফা চুক্তি করতে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন “৬০০ মণ মুক্তা, ,০০০ রৌপ্যমুদ্রা, ,০০০ রেশম বস্ত্র এবং প্রচুর দামি জিনিষপত্র” আদায় করলেন এবং দিল্লিতে বাৎসরিক রাজস্ব পাঠানোর শপথ করালেন। এর পর আলাউদ্দিন নিজে যখন দিল্লির মসনদে বসলেন, তিনি সেনাপতি মালিক কাফুরকে পাঠিয়ে ১৩০৭ সি.ই.-তে দেবগিরি অধিকার করলেন এবং পরাজিত রামচন্দ্রকে বন্দী করে দিল্লি নিয়ে গেলেন। সম্রাট আলাউদ্দিন তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্যের বিনিময়ে মুক্তি দিলেন, কিন্তু ১৩০৯ সি.ই.-তে রামচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল। রামচন্দ্রের পুত্র শংকর দিল্লিকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে দিলে, ১৩১২ সি.ই.-তে মালিক কাফুর আবার দেবগিরি আক্রমণ করে শংকরকে হত্যা করেন। এরপরেও রামচন্দ্রের জামাই হরপাল যখন মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেন, সুলতান মুবারকের আদেশে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল[2]। এভাবেই অতি নিদারুণভাবে যাদববংশের সমাপ্তি ঘটেছিল। 

৪.৮.৫ ওয়ারাঙ্গালের কাকতীয়

কাকতীয় বংশের উৎপত্তি সঠিক জানা যায় না। কেউ বলেন “কাকত” শব্দের অর্থ কাক, সেখান থেকেই বংশের নাম কাকতীয়। কেউ বলেন স্থানীয় দেবী দুর্গার এক রূপ “কাকতী” সেখান থেকে এই বংশের নাম এসেছে। আবার পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন তাঁরা সূর্য বংশীয় ক্ষত্রিয়। কিন্তু নেল্লোর জেলার কয়েকটি শিলালিপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে কাকতীয়রা ছিলেন শূদ্র।

প্রথমদিকে কাকতীয়রাও চালুক্যরাজাদের সামন্তরাজা ছিলেন। চালুক্য সাম্রাজ্যের পতনের সময়, তাঁরা তেলেঙ্গানা অঞ্চলে প্রথম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বহু উত্থান ও পতনের পর, যাঁদের সমাপ্তি ঘটে বাহমনি সুলতান আহমদ শাহের হাতে ১৪২৪-২৫ সি.ই.-তে।

প্রথম দিকে কাকতীয় রাজাদের রাজধানী ছিল অনমাকোণ্ডা বা হনুমাকোণ্ডাতে, পরবর্তী কালে তাঁরা রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ারাঙ্গাল বা ওরুঙ্গল্লুতে। প্রথম যে রাজা এই বংশের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি প্রোলরাজ মোটামুটি ১১১৭-১৮ সি.ই.-তে। তিনি পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরে রুদ্র ১১৬০ সি.ই. অব্দি এবং তাঁর ভাই মহাদেব ১১৯৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এরপর রাজা হয়েছিলেন, রাজা মহাদেবের পুত্র, রাজা গণপতি, তিনি প্রায় বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই কাকতীয় রাজত্বের গৌরব সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল। তাঁর পরাক্রমে চোল, কলিঙ্গ, যাদব, কর্ণাটের লাট এবং বলনাড়ুরা পরাস্ত হয়েছিলেন।

রাজা গণপতির পুত্র না থাকায়, তাঁর সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর কন্যা রুদ্রাম্বা ১২৬১ সি.ই.-তে। শোনা যায় তিনি পিতার রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন এবং প্রায় তিরিশ বছর রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পৌত্র প্রতাপরুদ্রদেব। এই প্রতাপরুদ্রদেবকে অমর করে গিয়েছিলেন, তাঁর সমসাময়িক কবি বৈদ্যনাথ, তাঁর রচিত “প্রতাপরুদ্রীয়” কাব্যে। এই প্রতাপরুদ্রই ছিলেন কাকতীয় বংশের শেষ রাজা এরপর সেনাপতি মালিক কাফুরের দাক্ষিণাত্য অভিযানে কাকতীয় বংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শোনা যায় তাঁদের বংশের কোন শাখা বস্তার (মধ্যপ্রদেশ) অঞ্চলে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

৪.৮.৬ শিলাহার

শোনা যায় শিলাহার বংশের উৎপত্তি পৌরাণিক রাজা জীমূতবাহনের থেকে, যিনি বিদ্যাধরের রাজা ছিলেন এবং নাগদের রক্ষা করার জন্যে, নিজেকে গরুড়ের আহার হিসেবে উৎসর্গ করেছিলেন। এই কাহিনীর মূল্য যাই থাক, শিলাহাররা সম্ভবতঃ ক্ষত্রিয় ছিলেন।

যতদূর জানা যায়, শিলাহারদের তিনটি শাখা ছিল এবং তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল টগর বা টের নামক কোন অঞ্চলে। প্রাচীনতম শাখা অষ্টম শতাব্দীর শেষ থেকে একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত দক্ষিণ কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল গোয়া। শিলাহারদের দ্বিতীয় শাখা উত্তর কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন, নবম শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর। তাঁদের রাজত্বের মধ্যে ছিল থানা, রত্নগিরি এবং সুরাট জেলার কিছু অংশ। তাঁদের রাজধানী ছিল থানা। তৃতীয় শিলাহার শাখা একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, তাঁদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কোলাপুর, সাতারা এবং বেলগামে। শিলাহারদের প্রথম দুই শাখা মোটামুটি কোন না কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধীনে রাজত্ব করতেন, যেমন, রাষ্ট্রকূট, চালুক্য এবং যাদব প্রমুখ। সে দিক থেকে শিলাহারদের তৃতীয় শাখা মাঝে মধ্যে স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। শোনা যায় এই শাখার এক রাজা বিজয়াদিত্য বা বিজয়ার্ক, চালুক্যবংশের পতনের জন্য কলচুরি মন্ত্রী বিজ্জলকে সাহায্য করেছিলেন। এই শাখার সব থেকে উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন ভোজ (১১৭৫-১২১০ সি.ই.), শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পরে যাদব রাজ সিংহন, শিলাহারদের এই রাজ্যটি অধিকার করে নিয়েছিলেন।



[1] সংস্কৃতর দেবনাগরি লিপি ভেঙে মোড়ি লিপি বা মুদিয়া লিপি মারাঠিভাষার প্রথম লিপি, যে লিপির আধুনিক সংস্করণ আজও প্রচলিত। 

[2] হয়তো ভয়ংকর এই ঘটনার স্মৃতি থেকেই বলিউডি সিনেমায় বহু ভিলেনের মুখে “তেরা খাল খিঁচ লুঙ্গা” ডায়লগ শুনতে পাওয়া যায়। যেমন মহাভারতে মহাবীর ভীমের দুঃশাসনের রক্তপানের বর্ণনা থেকে “তেরা খুন পি যাউঙ্গা” ডায়লগটি অনেক নায়কের মুখেই শোনা যায়।      

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড ...