এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "
৭
উত্তরার গর্ভরক্ষা
সূত বললেন, “অশ্বত্থামার
শাস্তি বিধানের পর, পুত্রদের শোকে ব্যাকুল দ্রৌপদী ও পঞ্চপাণ্ডব মৃত পুত্রদের
পারলৌকিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করলেন। তারপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডব ও কৌরবপক্ষের
নিহত সমস্ত যোদ্ধাদের মা, স্ত্রী, কন্যা ও ভগিনীদের নিয়ে পাণ্ডবগণ গঙ্গাতীরে
গেলেন। গঙ্গার পবিত্র জলে স্নান করলেন এবং তর্পণে জল অঞ্জলি দিলেন। সমবেত নারীদের
মধ্যে মাতা গান্ধারী ও মাতা কুন্তীও ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অন্ধ রাজা
ধৃতরাষ্ট্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এবং যুধিষ্ঠির ও তাঁর চার ভাই। সমবেত নারী ও
পুরুষেরা সকলেই এই মহাযুদ্ধে তাঁদের আত্মীয় পরিজনদের মৃত্যুতে শোকে ব্যাকুল হয়ে
ছিলেন। তাঁদের সান্ত্বনা দিলেন উপস্থিত মুনি, ঋষি এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি
বললেন, কাল বা মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। এই মৃত্যুকে কোন ভাবেই নিবারণ করা যায় না। অতএব,
এখন শোক ও দুঃখকে সংযত করাই সকলের কর্তব্য।
[এখানে কিঞ্চিৎ কথার মারপ্যাঁচ রয়ে গেল যেন - ভগবান বললেন, কাল বা মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। এই মৃত্যুকে কোন ভাবেই নিবারণ করা যায় না। একথা সত্যি। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিবারণ করতে পারলে, যুদ্ধক্ষেত্রে এতগুলি মানুষের অকালমৃত্যু অনিবার্য নাও হতে পারত। অবশ্য একথাও সত্যি, পাণ্ডব এবং ভগবান কৃষ্ণের যথোচিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষকে যুদ্ধ থেকে নিরস্ত করা যায়নি। হয়তো দুর্যোধনের অন্যায্য অহংকারই ছিল কাল-নির্দিষ্ট - তাঁদের সকলের এবং অন্যান্যদেরও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।]
মৃত
যোদ্ধাদের শ্রাদ্ধ ও তর্পণ সমাপ্তির পর, শ্রী কৃষ্ণ যুধিষ্ঠির কে দিয়ে তিনবার অশ্বমেধ যজ্ঞের
অনুষ্ঠান করালেন। এই যজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, ভারতভূমিতে যুধিষ্ঠির সহ
তাঁর চার ভাইয়ের আধিপত্য এবং খ্যাতির আর কোন সীমা রইল না।
এইভাবে সমস্ত কাজ সুন্দর সমাধা ক’রে, শ্রীকৃষ্ণ ভগবান সকলের কাছে
দ্বারকায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বহুদিন তিনি নিজ রাজ্য ছেড়ে হস্তিনাপুরে
রয়েছেন। এবার তাঁর ফিরে যাবার সময় হয়েছে। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় ক’রে, তিনি
সকলের থেকে বিদায় নিলেন। সবশেষে পাণ্ডবদের থেকেও বিদায় নিয়ে তিনি সাত্যকি আর
উদ্ধবের সঙ্গে তাঁর রথে উঠতে যাবেন, এমন সময় উন্মাদিনীর মতো সেখানে দৌড়ে এলেন,
অভিমন্যুর বিধবা পত্নী উত্তরা।
ভীতা ও সন্ত্রস্তা উত্তরা শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “হে প্রভু,
তপ্ত লোহার মতো ওই শেল আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ভয় পাচ্ছি, আমাকে রক্ষা
করুন, রক্ষা করুন। একলা আমি যদি এই আগুনময় তিরে পুড়ে মারা যেতাম, তাতে আমি ভয়
পেতাম না, দুঃখও পেতাম না। কিন্তু আমার গর্ভে রয়েছে অভিমন্যুর সন্তান। হে করুণাময়,
আপনি শরণাগতের পরিত্রাতা, আপনি আমার গর্ভের এই শিশুকে রক্ষা করুন”।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং পাণ্ডবদের সকলেই বুঝতে পারলেন, এ অশ্বত্থামার কুকীর্তি। পাণ্ডবদের বংশ ধ্বংস করার জন্যেই অশ্বত্থামা আরো একবার ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন। অপ্রস্তুত পাণ্ডব ভাইয়েরা সকলেই নিজের নিজের তির, ধনুক ও গাণ্ডীবের জন্যে ঘরের দিকে দৌড়লেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, হাতে একদমই সময় নেই আর এই ভয়ংকর অস্ত্র এখনই নিবারণ না করতে পারলে, সকলেরই সমূহ বিপদ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র প্রয়োগ করলেন এবং নির্বিষ করলেন অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রকে। তারপর তিনি তাঁর অদ্ভূত মায়ায়, উত্তরার গর্ভে প্রবেশ করলেন। গর্ভে প্রবেশ করে, উত্তরার শিশুকে তিনি আবৃত করে রাখলেন, আর নিজের শরীরে সেই ব্রহ্মাস্ত্রের প্রচণ্ড শক্তি গ্রহণ করলেন। তিনি স্বয়ং বিষ্ণু, তিনিই ভগবান, তাঁর কাছে কোন তেজই অনিবার্য নয়। রক্ষা পেল উত্তরার গর্ভের শিশু”।
৮
কুন্তীর কৃষ্ণবন্দনা
এরপর যখন আবার তিনি দ্বারকায় ফেরার জন্যে রথে চড়তে যাবেন,
মাতা কুন্তী ও দ্রৌপদী সপরিবারে এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। ভয়ংকর এক পরিণামের থেকে
এইমাত্র মুক্তি পেয়ে তাঁরা আশ্চর্য, অবাক ও বিহ্বল।
কুন্তী ভক্তি ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, “হে কৃষ্ণ,
তোমাকে নমস্কার করি। তুমি এই জগতের একমাত্র নিয়ন্তা। ত্রিগুণের অতীত, তুমিই
আদিপুরুষ, তুমিই পূর্ণরূপে কিন্তু সকলের অগোচরে এই নিখিল বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত
রয়েছ। যে ব্যক্তি গানের কিছুই বোঝে না, তার কাছে সঙ্গীতজ্ঞের সুরসমৃদ্ধ গান যেমন
সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য; তেমনি সর্বদা তোমার সঙ্গে থেকেও, আমরা তোমার অসীম লীলার
তত্ত্বটি কিছুই বুঝতে পারি না। তুমি আমাদের ভক্তি নাও। তুমি আমাদের প্রণাম নাও।
হে কৃষ্ণ, তুমি পুত্ররূপে জন্ম নিয়ে পিতা বসুদেব ও মাতা
দেবকীকে একবার করুণা করেছিলে। তারপর তোমার মাতা দেবকীকে তুমি আর একবারই মাত্র করুণা করেছ;
মহা নিষ্ঠুর কংসের কারাগার থেকে তোমার দুঃখিনী মাকে মুক্ত করে। হে কৃষ্ণ, তোমার মায়ের অন্য পুত্রদের তুমি কংসের
হাত থেকে রক্ষা করোনি। অথচ আমাদের প্রতি তোমার করুণার অন্ত নেই। হে কৃষ্ণ, তোমাকে
আমাদের সকলের প্রণাম। তুমি আমার পুত্রদের কতবার যে মৃত্যুর হাত থেকে, চরম বিপদের
থেকে মুক্ত করেছ, তার কোন হিসেব হয় না।
বালক দুর্যোধনের বিষপ্রয়োগের থেকে আমার পুত্রদের তুমি রক্ষা
করেছিলে। জতুগৃহদাহ থেকে তুমি আমার পুত্রদের এবং আমার প্রাণ রক্ষা করেছিলে। হিড়িম্বা
রাক্ষসের হাত থেকে তুমিই আমাদের রক্ষা করেছিলে। দ্যূতসভার
চাতুরি থেকে, বনবাসের সমস্ত কষ্ট থেকে তুমিই আমাদের রক্ষা করেছ। কুরুক্ষেত্রের
মহাযুদ্ধে, সঠিক সময়ে নির্ভুল পরামর্শ দিয়ে, তুমি আমার পুত্রদের বারবার রক্ষা
করেছ। এখন, এইমাত্র তুমি আমাদের বংশের একমাত্র উত্তরাধিকার উত্তরার শিশুপুত্রকে
রক্ষা করলে। হে কৃষ্ণ, তুমিই এই জগতের গুরু, এই জগতের পিতা। তুমি আমাদের প্রণাম
নাও। যে বিপদে তোমার দর্শন, তোমার সঙ্গ পাওয়া যায়, সেই বিপদ আমাদের যেন বার বার
আসে। কারণ দুঃখের দিনে তোমার স্পর্শ দিয়ে, তুমিই সকল দুঃখের অবসান করে থাকো।
[এমন অদ্ভূত ভগবৎ-ভক্তির কথা পৃথিবীর আর কোন ধর্মের কোন ধর্মগ্রন্থে রয়েছে বলে আমার জানা নেই। ভক্ত বিপদে পড়তে চাইছে, তার কারণ তার বিশ্বাস - বিপদে পড়লেই ঈশ্বরের দর্শন ও স্পর্শ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের (২৩০) গান –
“দুখের বেশে এসেছ ব’লে তোমারে নাহি ডরিব হে। যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় ক’রে
ধরিব হে।। আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, তোমারে তবু চিনিব আমি – মরণরূপে আসিলে,
প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে”। অথবা (২২৮) “আরো আরো, প্রভু, আরো আরো এমনি ক’রে আমায়
মারো... হাটে ঘাটে বাটে করি মেলা, কেবল হেসে খেলে গেছে বেলা – দেখি কেমনে কাঁদাতে
পারো”।।]
হে কৃষ্ণ, তোমার জন্ম নেই, তোমার মৃত্যুও নেই। শুধুমাত্র
ভক্তদের মঙ্গলের জন্যেই তুমি বারবার জন্ম নাও, মৃত্যুও বরণ করো। তোমার কর্ম নেই,
তাও তুমি অনলস কর্ম করে যাও। হে কৃষ্ণ, তুমি পশুরূপে বরাহ, নররূপে শ্রীরাম,
ঋষিরূপে নরনারায়ণ এবং জলচররূপে মৎস্যজন্ম নিয়েছ। তোমার মায়ায়, সেই সমস্ত অদ্ভূত
রূপ মানুষের মনে ভ্রম সৃষ্টি করে। তারা বোঝে না, তুমি অনাদি। তুমি অনন্ত। তুমি
জন্মরহিত। তুমি ত্রিগুণাতীত। তুমি অব্যয়।
এই জন্মেও কি অপূর্ব তোমার নরলীলা, হে কৃষ্ণ। একদিন তুমি
ননীর কলসী ভেঙে ফেলেছিলে। তাই দেখে মা যশোদা তোমাকে শাস্তি দিয়ে হাত বেঁধে দেবেন
বলে, দড়ি নিয়ে এসেছিলেন। সেই দড়ি দেখে তুমি কি ভয়ই না পেয়েছিলে! তোমার চোখের কাজল
সেদিন তোমার অশ্রুতে ধুয়ে গিয়েছিল। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে তুমি এমন মুখ ঘুরিয়ে রইলে,
আমাদেরই বুকে মোচড় দিচ্ছিল, মা যশোদা কী করে সইবেন? জানি, হে কৃষ্ণ, তুমি ভগবান। হে কৃষ্ণ, বুঝি এ
সবই তোমার লীলা। তবু তোমাতেই মন মুগ্ধ হয়ে থাকে সর্বক্ষণ।
হে কৃষ্ণ, আজ আমাদের ছেড়ে তুমি নিজের রাজ্য দ্বারকায় ফিরে
যাচ্ছো। আমরা তোমার বন্ধু, তোমার অনুগত। তোমার মতো কর্ণধার সর্বদা আমাদের সঙ্গে
ছিলে বলেই, আমরা অশান্তি ও ভয়ংকর যুদ্ধের সাগর পার করে, এই শান্তি ও সমৃদ্ধির পাড়ে
সবে মাত্র উঠেছি। এই যুদ্ধে বিরোধী পক্ষের যত রাজা নিহত হয়েছেন, তাঁদের আত্মীয়
পরিজনরা মনে মনে আমাদের শত্রু হয়ে উঠেছেন। এখন তাঁরা দুর্বল, কিন্তু অচিরেই তারা
বলবান হয়ে উঠতে পারেন। হে দ্বারকাধীশ কৃষ্ণ, যাদব এবং পাণ্ডব দুপক্ষের প্রতিই আমার
দৃঢ় স্নেহবন্ধন ও পক্ষপাত। তুমি চলে গেলে পাণ্ডবদের অমঙ্গল হবে এবং তাতে যাদবদেরও
অমঙ্গল হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে। তুমি আর অর্জুন চিরদিনের সখা। মুক্তবেণী গঙ্গা
যেমন একাগ্রভাবে সাগরে গিয়ে মেশে, তেমনি সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে, আমার মন
সর্বদা তোমার চরণতলেই আশ্রিত থাক”।
“আমার প্রতি তোমার এই ভালোবাসা আর ভক্তি চিরদিনই অবিচলিত থাকুক”, এই বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মধুর হাসি দিয়ে কুন্তীকে আপ্যায়ন করলেন। তারপর হস্তিনাপুরে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে তিনি দ্বারকা রওনা হবার উদ্যোগ নিলেন”
চলবে...