প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০ "
২১
একটু পরে মিঃ মিত্র আবার বললেন, “এনিওয়ে, অতীতের কথা ছেড়ে
বর্তমানে ফিরি। দিন দশেক আগে জ্যোতিষ আমাদের ঝাড়খণ্ডের সাইটে ভিজিট করতে গিয়েছিল।
এখন সে মোটামুটি আট-ন বছরের এক্সপিরিয়েন্সড্ গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। তার থেকে আমরা
রিজনেব্ল্ রেস্পনসিব্লিটি এক্সপেক্ট করি, অধিকাংশই ক্ষেত্রে তাই হয়েও থাকে। যেমন
ওই সাইটেরই আমাদের যে প্রজেক্ট ম্যানেজার, তার নাম সুদীপ্ত – সে জ্যোতিষেরই ব্যাচমেট।
এই প্রজেক্টটা শুরুর থেকেই সুদীপ্ত খুব ভালো ম্যানেজ করছে। আমাদের কাস্টমার –
ওখানকার হেলথ ডিপার্টমেন্টও ওর পারফর্ম্যান্সে বেশ খুশি।
এই সোমবারের আগের সোমবার, আমাদের খুব ক্রিটিক্যাল একটা
স্ল্যাব কংক্রিটিংয়ের শিডিউল ছিল। আর আগের সপ্তাহে, বুধবার আমি নিজেই ওই সাইটে
গিয়েছিলাম, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম জ্যোতিষকে। ভেবেছিলাম জ্যোতিষ থাকলে সুদীপ্তর খানিকটা
হেল্প হবে। দুজনে মিলে কাজটা সাকসেসফুলি কমপ্লিট করতে কোন অসুবিধে হবে না। আমি নিজে
দুদিন সাইটে থাকার পর বেষ্পতিবার রাত্রে রওনা হয়ে আমি কলকাতায় পৌঁছই শুক্রবার ভোরে।
বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হতে না হতেই, আমার কাছে সুদীপ্তর ফোন এল, “শশাঙ্কদা, জ্যোতিষ কাল
রাত্রেই কলকাতা চলে গেছে”। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?” তার উত্তরে ও
বলল, “আপনি বেরিয়ে যাওয়ার পরেই, জানি না কোথা থেকে এক পেট ড্রিংক করে এসে, তপন,
জগন্নাথ, ত্রিদিবদের সঙ্গে বিশ্রী দুর্ব্যবহার করেছে। আপনার আর আমার নামেও নাকি
অশ্রাব্য গালাগাল দিয়েছে”। তপন, জগন্নাথ এরা আমাদের নন টেকনিক্যাল এমপ্লয়ি, যেমন
তপন স্টোর সামলায়, জগন্নাথ লেবারদের রেকর্ড মেনটেন করে, আর ত্রিদিব হচ্ছে আমাদের সাইট-অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
আমি সেই শুক্রবার অফিসে গিয়েই জ্যোতিষের খোঁজ করলাম, অফিসে
আসেনি। ওর বাড়িতে লোক পাঠালাম। সে ফিরে এসে বলল, “জ্যোতিষের মা নাকি বলেছে
জ্যোতিষের খুব শরীর খারাপ, সাইটে গিয়ে রোদে-গরমে খেটে ওর শরীর নাকি ঝলসে গিয়েছে”।
আমাদের লোকটিকে ওর সঙ্গে দেখা করতেও দেয়নি। যাই হোক আমার লোকটি বলে এসেছিল,
জ্যোতিষকে আমি ডেকেছি, অতি অবশ্যই যেন সেদিন বিকেলের মধ্যে দেখা করে।
জ্যোতিষ এসেছিল। নেশাক্রান্ত মানুষ সারারাত অপরিমিত নেশা
করার পর, পরেরদিন বেলা বারোটা-একটা পর্যন্ত বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকার পর যখন উঠে দাঁড়ায়
– ঠিক সেরকম চেহারা ওর। ঘৃণায় আর বিরক্তিতে আমার মনটা ভরে উঠল। কিছুক্ষণ কথা-বার্তা
বলেও বুঝলাম, ওর থেকে অবান্তর এবং উদ্ভট মিথ্যা কথা ছাড়া আর কিছু শোনার নেই। ওকে
বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, আমি আমার এইচ-আর অফিসার বিভাসকে ডাকলাম। ওর টার্মিনেশন
লেটারের ড্রাফ্ট্ আগেই করে রাখতে বলেছিলাম, অতএব বিভাস সেই ফাইলটা নিয়েই আমার
চেম্বারে এল।
বললাম, “লেটারটা এখনই ইস্যু করে দাও, জ্যোতিষকে। আর ওর ফুল
এণ্ড ফাইন্যাল পেমেন্টও আজই হয়ে যাওয়া চাই”।
“হয়ে যাবে, স্যার। ওর পেমেন্ট স্টেটমেন্টটা আমি রেডি করেই
নিয়ে এসেছি, একবার দেখে নেবেন স্যার”।
দেখলাম, খুবই সামান্য - পঁচিশ-হাজার সামথিং ডিউ হচ্ছে। দেখে
আমি একটু অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম, “অ্যামাউন্টটা এত কম কেন, বিভাস? ওকে তো আমরা
নোটিস না দিয়েই টার্মিনেট করছি, অতএব তিনমাসের স্যালারি তো ওর এমনিই পাওনা হয়। তার
ওপর আছে এ মাসের প্রায় ষোল দিনের স্যালারি, লিভ এনক্যাশমেন্ট, পার্ট অফ
এক্সগ্রাসিয়া...”।
বিভাস বলল, “জ্যোতিষবাবু মোটামুটি আটবছর সাড়ে চারমাস আমাদের
এখানে রয়েছেন। এতগুলি বছরে উনি যে ভাবে ছুটি নিয়েছেন, তাতে এখনও পর্যন্ত ওঁনার
ছুটির হিসেব নেগেটিভে রান করছে - মাইনাস একশ সাত দিন। সেই হিসেবে ওঁনার লিভ
এনক্যাশমেন্ট তো হচ্ছেই না, বরং নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর আছে ওঁনার অনেক আন-অ্যাডজাস্টেড
অ্যাকাউন্ট্স্। সাইট থেকে উনি বেশ কয়েকবার টাকা তুলেছেন, কিন্তু ফেরত দেননি। ওঁর
অ্যাকাউন্টে ট্র্যাভেলিং অ্যাডভান্সে জমা হয়ে আছে বহু টাকা, কিন্তু তার এগেনস্টে যে
বিল জমা দিয়েছেন, প্রত্যেক বিলেই রয়েছে অজস্র ডিসপিউট। প্রতি ফিনান্সিয়াল ইয়ারেই
এই ব্যাপারটা নিয়ে ওঁনার সঙ্গে আমাদের লড়তে হয় স্যার...”।
“ডিসপিউট মানে?”
“সব সাইটেই আমরা একটা-দুটো হোটেলের সঙ্গে টাই-আপ রাখি
স্যার, সে তো আপনি জানেন। এয়ারপোর্ট বা স্টেশন থেকে পিক-আপের জন্যে অথবা সাইটে
যাওয়ার জন্যে গাড়িও ওই হোটেল থেকেই ঠিক করে দেয়। তার জন্যে ওরা আমাদের অনেকটাই
ডিসকাউন্ট দেয়, এবং বেশ কিছু প্রিভিলেজও দেয়। সাইটে গেলে আপনিও স্যার ওই সব
হোটেলেই ওঠেন...”।
“তাই তো। তাতে ডিসপিউটের কী আছে”?
“জ্যোতিষবাবু ওই হোটেলগুলিতে প্রায় কোন সময়েই যান না। খবর
নিয়ে জেনেছি, তিনি অত্যন্ত সস্তা - লো বাজেটের হোটেলে ওঠেন। তাদের থেকে
ব্ল্যাংক-বিল তুলে, নিজের খুশি মতো বিল বানিয়ে জমা দেন, উইথ হিজ ওন হ্যাণ্ডরাইটিং...”।
“কী বলছো, বিভাস? এতদিন এসব আমায় জানাওনি কেন?”
“আপনাকে এসব নিয়ে বিরক্ত করিনি স্যার, কারণ আমরা ওঁকে প্রথম
ছমাসের মধ্যেই চিনে গেছিলাম, এবং ওঁনাকে কিভাবে হ্যাণ্ড্ল্ করতে হবে সেটাও বুঝে
গেছি। এই ক’বছরে আপনি যত বার আমাদের জন্যে এক্স-গ্রাসিয়া বা ইন্সেন্টিভ ডিক্লেয়ার
করেছেন, তার থেকেই আমরা ওঁনার যাবতীয় ডিসপিউট নিউট্রালাইজ করে নিয়েছি। ওঁর এই ফুল
অ্যাণ্ড ফাইন্যাল সেট্ল্মেন্টেও, ওঁনার যাবতীয় গোঁজামিল ক্লিয়ার হয়ে যাবে”।
শশাঙ্কবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “সেই দিনই ওকে বিদেয়
করলাম, বা বলা ভালো করতে বাধ্য হলাম। কিন্তু গত পরশুদিন বিভাস আপনার সংবাদটা আমাকে
দিল – আপনি নাকি জ্যোতিষের বিরুদ্ধে ডিভোর্স ফাইল পুট-আপ করেছেন। শুনেই মনে হল,
মস্তো বড়ো একটা ভুল হয়ে গেছে আমার। জ্যোতিষের জীবনের সঙ্গে আপনি যে জুড়ে আছেন, এবং
সম্প্রতি জুড়ে গিয়েছে আপনার শিশু পুত্রটির জীবনও, সে কথাটিই আমি রাগের মাথায় ভুলে
গিয়েছিলাম”।
বাবা এবং আমি দুজনেই এতক্ষণ শুধু শ্রোতা হয়েই ছিলাম, একটা
কথাও বলিনি। কিন্তু বাবা এবার বেশ বিরক্ত স্বরে বললেন, “কথাটা আপনার মনে থাকলে
আপনি কী করতেন, চাকরি থেকে ওকে তাড়াতেন না? এবং ওর চাকরি থাকলে আমরা ওর এগেনস্টে ফাইল
পুট-আপ করতাম না, এরকমই আপনার ধারণা?
আচ্ছা শশাঙ্কবাবু, সুকন্যার সঙ্গে বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে,
আপনাদের অফিসে আমি নিজে গিয়েছিলাম জ্যোতিষের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নিতে। সেদিন
আপনাদের এইচ-আর হেড, খুব সম্ভবতঃ ওই বিভাসবাবুই, আমাকে কিন্তু বলেছিলেন, জ্যোতিষ
অত্যন্ত সচ্চরিত্র, ব্রাইট ইয়ংমেন। তার ফিউচারও খুব ব্রাইট...। অথচ আজ আপনি এসে
বলছেন, আপনারা প্রায় শুরুর থেকেই সকলে জানতেন, জ্যোতিষ নানান গুণের গুণী। তাহলে
সেদিন আপনাদের অফিস থেকে আমাকে কেন মিথ্যা কথা বলা হয়েছিল? আমার একমাত্র কন্যার
জীবনটাকে এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার পিছনে আপনাদের ওই নির্জলা মিথ্যাচারও
কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ - তাই নয় কি, শশাঙ্কবাবু?”
অনেকক্ষণ শশাঙ্কবাবু কোন কথা বললেন না, মাথা নীচু করে মেঝের
দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ব্যাপারটা
আমি যদিও জানতাম না, কিন্তু তাতেও আমি বা আমার কোম্পানি কোনভাবেই এই দায় এড়াতে পারি
না। আমি আপনাদের দুজনের কাছেই আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। তার সঙ্গে আরও বলি, যে
উদ্দেশে আজ আপনাদের কাছে আমার আসা, এই ঘটনাটি জানার পর আমার সেই উদ্দেশ্যটি আরও
দৃঢ় হল।
কাকাবাবু, আপনার মেয়ে ও নাতির কথা মনে পড়লে জ্যোতিষকে আমি
বিদায় করতাম না। আমি তাকে বিদায় না করলে আপনারা ডিভোর্স স্যুট করতেন না, একথা বলার
জন্যে আমি আসিনি। আমি এসেছি, সুকন্যা এবং ওর শিশু পুত্রের কথা ভেবে...কোন ভাবে যদি
কিছু সাহায্য করতে পারি”।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কিভাবে?”
“সুকন্যার যদি একটা কাজ বা একটা স্থায়ী চাকরি হয়ে যায়, সুকন্যার
পক্ষে জীবনটা যথেষ্ট সম্মানজনক হবে। আপনার ওপর ওকে পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হবে
না”।
শশাঙ্কবাবুর এতক্ষণ ধরে, এত কথা শুনতে খুব বিরক্ত বোধ
করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এসব কথা এখন আর শুনে লাভ কি? যে ঘূণধরা জীবনটা আমি পেরিয়ে
এলাম, এসব কথায়, সে জীবনটা কি মুছে যাবে? কিন্তু এই কথাটা, সত্যি বলতে আমার খুব
মিনিংফুল মনে হল। আমি বললাম, “আপনাদের কোম্পানিতে? কী ধরনের চাকরি? আমি তো আর ইঞ্জিনিয়ার
নই। আমি কমার্স নিয়ে পড়েছিলাম – এম.কম”।
শশাঙ্কবাবু আমাদের বাড়ি আসার পর থেকে, এই প্রথম হাসলেন,
বললেন, “এম.কম? তাহলে তো হয়েই গেল। ভাগ্যিস ইংলিশ বা হিস্ট্রি নিয়ে এমএ করেননি,
সেক্ষেত্রে আমাকে একটু বেগ পেতে হত। ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের মতো কোম্পানির মূল স্তম্ভ
সুকন্যা, কিন্তু আমাদের অ্যাকাউন্টস বা কমার্স ডিপার্টমেন্টটা হল সেই স্তম্ভের
মাথায় ছাদ। রেগুলার অ্যাকাউন্টস্ ছাড়াও আজকাল এত রকমের ট্যাক্স এবং তার সঙ্গে
যুক্ত এত নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান মেনে চলতে হয়...যার সব কিছু আমি বুঝিও না। তবে
এটুকু বুঝি ও জানি, এই নিয়ম-কানুনের একটি দুটি ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেই, কোম্পানির
ঘাড়ে নেমে আসবে প্রশাসনিক খাঁড়া। সে বিপদ থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে ইঞ্জিনিয়াররা
নয়, আপনাদের মতো কমার্সের লোকরাই। মাথার ওপর ছাদ না থাকলে, প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি
সহ্য করে কতদিন টিকে থাকতে পারবে এই কোম্পানি ও তার স্তম্ভগুলো?”
এই প্রথম শশাঙ্কবাবুকে আমার বেশ লাগল, আমি বাবার মুখের দিকে
তাকিয়ে দেখলাম, তিনিও কিছুটা প্রসন্ন। একটু বিরতি দিয়েই শশাঙ্কবাবু বললেন, “আপনি
কবে থেকে জয়েন করতে পারবেন, সুকন্যা?”
আমি আঁতকে উঠে বললাম, “এখনই জয়েন? এখনও একমাসও হয়নি আমি
নার্সিং হোম থেকে ফিরেছি...”।
শশাঙ্কবাবু আবারও হাসলেন, বললেন, “আমি কি বলেছি কালই আপনাকে
জয়েন করতে হবে? টেক ইয়োর টাইম...ধরুন মাস তিনেক পর... সরকারি নিয়মে ডেলিভারির পর আঠারো
উইকের মেটার্নিটি লিভ পাওনা হয়, তার মধ্যে অলরেডি চারটে উইক ধরুন চলে গেছে...আশা
করি অসুবিধে হবে না”।
এবার বাবা উত্তর দিলেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে – মানে ওর
মায়ের সঙ্গেও একটু আলোচনা করে আপনাকে কয়েকদিনের মধ্যেই জানাবো”।
“অবশ্যই”। শশাঙ্কবাবু ওঁনার পকেট থেকে কার্ড-হোল্ডার বের
করে, বাবার হাতে একটা কার্ড দিয়ে বললেন, “এখানে আমার নাম্বার আছে... ফোনে জানিয়ে
দেবেন। আশা করি পজিটিভ রিপ্লাইই পাবো...পেলে বাকি ব্যবস্থা আমি করে নেব...”।
শশাঙ্কবাবু চলে গেলেন। তারপরে ক’দিন ধরে, আমাদের তিনজনের
মধ্যে চলল নানান বিশ্লেষণ। আমি তো রাজি ছিলামই – বাবাও ছিলেন মোটামুটি অনুকূল। মা ছিলেন বড্ডো প্রতিকূল,
বলেছিলেন, “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেই ডরায়। আমার বাপু ভালো লাগছে না। চেনা
নেই, শোনা নেই, হঠাৎ গায়ে পড়ে, বাড়ি বয়ে এসে চাকরি দিতে চাইছে তোকে... লোকটা ভদ্র
নাকি ওই জ্যোতিষের মতোই মুখোশ-পরা অভদ্র – কী করে বুঝবো বল তো? আজকাল কে যে কোন
মতলব পুষে রেখেছে মনে মনে...কে জানে?” অনেক পর্যালোচনা করার পর, পাঁচদিন পর আমরা
সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, আমি জয়েন করবো...।
এর পিছনেও ছিল, সুনুদা, তোমার প্রিয় রবি ঠাকুর। কথাটা বাবা উল্লেখ
করেছিলেন - “সভ্যতার সংকট” নামে একটি প্রবন্ধে রবি ঠাকুর নাকি বলেছিলেন, “মানুষের
প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ”। অতএব আমরা সেই পাপ কর্মটি করতে পারলাম না। আমি ফোন করে
শশাঙ্কবাবুকে বললাম, “আমি মাস তিনেক পর জয়েন করতে রাজি আছি”।
আমার কথা শুনে শশাঙ্কবাবু উত্তর দিলেন, “আমাদের কোম্পানিতে
মোস্ট ওয়েলকাম ম্যাডাম। আশা করি দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব। আমি
দু’-তিনদিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একটি ছেলেকে পাঠাবো, ইদার বিকাশ অর অতুল। তার
হাত দিয়ে আপনি একটা অ্যাপ্লিকেশন পাঠাবেন, আর তার সঙ্গে দেবেন, মাধ্যমিক থেকে
এম.কম পর্যন্ত আপনার কোয়ালিফিকেশন সার্টিফিকেটের ফটোস্ট্যাট কপি। ঠিক আছে?”
হ্যাঁ অতুল নামে একটি ছেলে এসেছিল, তার হাতে আমি তুলেও দিয়েছিলাম
আমার বিদ্যের পুরো জাহাজটা। তার দিন পনের পরে, আমার নামে বাড়িতে একটা চিঠি এল,
শশাঙ্কবাবুর কোম্পানির নাম-ছাপানো খামে। খুব খুশি হয়েছিলাম, নিজেকে বেশ একটা কেউকেটাও
মনে হয়েছিল। কারণ এর আগে তুমি ছাড়া খামে বা ইনল্যাণ্ডে, সরাসরি আমাকে কেউ কোনদিন
চিঠি দেয়নি। কিন্তু মামিমার কাছে, আমার বিয়ে ফাইন্যাল হয়ে গেছে শুনে, তোমার সেই
দুরন্ত কলমের মিষ্টি কালি শুকিয়ে গিয়েছিল। তুমি আমাকে চিঠি দেওয়া বন্ধ করে
দিয়েছিলে। একদিক থেকে অবশ্য ভালই করেছিলে। আমার উপকারই করেছিলে। শ্বশুরবাড়ি গিয়েও
নিয়মিত তোমার চিঠি পাওয়াটা, ওদের হাতে একটা অস্ত্র হয়ে উঠত। তোমার সঙ্গে আমার নিবিড়
সম্পর্কের একটা কল্প-গল্প গড়ে তুলে, আমার এবং আমার বাবা-মায়ের মুখগুলো পুড়িয়ে দিতে
পারলে ওরা খুব আনন্দ পেত। অনায়াসে ঢেকে ফেলতে পারত ওদের সুপুত্রের কীর্তিকলাপ।
যাগ্গে, তোমার সঙ্গে বোঝাপড়াটা এখন নয়, সামনাসামনি বসেই
সারব। এখন আবার আমার অতীতেই ফিরে যাই।
খামটা খুলে পড়লাম, সুন্দর টাইপ করা বেশ কয়েক পাতার চিঠি...অনেক
ক্লজ, অনেক টার্ম্স্ এণ্ড কণ্ডিশন্স্। সবটা পড়ার ধৈর্য ছিল না, পড়তে পারিওনি, কারণ
আমার চোখটা আটকে গিয়েছিল, রেমিউনারেশনের পৃষ্ঠাটায়। অনেকগুলি সংখ্যা জুড়ে, আবার
অনেক সংখ্যা কেটে আমার হাতে এসে যে টাকাটা জমবে...সেটা হল চব্বিশ হাজার সামথিং। বেশ
কিছুক্ষণ, আদর করার মতো আঙুল বুলিয়েছিলাম সংখ্যাটার ওপর। সে সময় মনে হয়েছিল এ যেন
সেই চিচিং ফাঁক - আলিবাবার গুহার সন্ধান।
বাবার হাতে তুলে দিলাম চিঠিটা। বাবা গোটা চিঠিটা মন দিয়ে
পড়লেন। তারপর মাকে বললেন, “মনে হচ্ছে সুনুর কোম্পানিটা বেশ ভালই, বুঝেছ? ওদের নিয়ম-কানুনগুলো
বেশ বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো এমনকি সরকারি চাকরির নিয়মের মতোই অনেকটা। পিএফ আছে,
গ্র্যাচুইটি আছে, গ্রুপ ইন্সিওরেন্স আছে, তারপর ধরো, বছরে ৩০ দিন পিএল, ১০টা সিএল,
১৫টা এমএল...। তিনমাসের নোটিস পিরিয়ড। মাইনেপত্রও নেহাৎ মন্দ নয়, আমাদের সুকুর
পড়াশোনা আছে ঠিকই, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা নেই একটুও। সে তুলনায় ভালই
বলতে হবে...”।
মায়ের জিম্মায় পুত্রকে রেখে, প্রথম দিন বাবার সঙ্গে আমি অফিসে রওনা হলাম। বাবা অফিসের সামনে আমায় ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আমি এবার চলি। তুই ভেতরে যা, দেখ কেমন লাগে, কোন অসুবিধে হলেই ফোন করবি...”। শুরু হল যেন আমার একটা আনকোরা জীবন।
চলবে...