প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬ "
৪২
দিনের প্রথম প্রহরটা এখন মিলাদের মহড়ার মাঠেই নিয়মিত থাকে ভল্লা।
প্রথম-প্রথম তার মনে হয়েছিল ছেলেগুলোর আসল উদ্দেশ্য দ্রুত অর্থ উপার্জন করা – সে ডাকাতি
করেই হোক বা সার্থবাহদের গো-শকটবাহিনীর ওপর আচমকা আক্রমণ করেই হোক। কিন্তু জনা এবং মিলাদের সঙ্গে এই কদিনের ঘনিষ্ঠতায়
ভল্লার সে ভুল ভেঙেছে। দুনীতিগ্রস্ত রাজকর্মচারী এবং আঞ্চলিক প্রশাসকদের দমন করা এবং
প্রয়োজনে নিকেশ করাই যে জনাদের মুখ্য উদ্দেশ্য সেটা এখন বুঝেছে ভল্লা।
ওদের জন্যে মাত্র ছটা রণপাই দিতে পেরেছে ভল্লা। ভল্ল দিয়েছে
কুড়িটা আর বল্লম চারটে। উপকরণের স্বল্পতা সত্ত্বেও ছেলেদের শেখার উৎসাহে ঘাটতি নেই
এবং বটতলির দল দ্রুত উন্নতি করছে। ভল্লার ধারণা সকলের জন্যে পর্যাপ্ত অস্ত্র এসে গেলে
– বটতলির দলও, মাসান্তে, নোনাপুরের ছেলেদের মতোই দক্ষ হয়ে উঠবে।
ছেলেদের কিছু কিছু মহড়া দেখিয়ে দিয়ে ভল্লা মাঠের একধারে বসল।
ডেকে নিল মিলা আর জনাকে। বলল, “আমাদের অস্ত্রসম্ভার গত রাত্রেই বীজপুর পৌঁছে গেছে।
দু-তিনদিনের মধ্যে আমাদের অস্ত্র ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। আমাদের কাছে দুটো হাতে-টানা
শকট আছে, তোরা ওগুলো নিতে পারিস – অস্ত্র-শস্ত্র বয়ে আনতে সুবিধে হবে। কাজ হয়ে গেলে
ফেরত দিয়ে দিবি”।
“বাঃ, সে তো ভালোই হবে। কিন্তু তোমাদের অস্ত্রভাণ্ডার মানে?
কোথায় বানিয়েছ? এত তাড়াতাড়ি বানালে কী করে?”
ভল্লা বলল, “নোনাপুরের মহড়ার মাঠটা তোরা চিনিস তো? ওখান থেকে
ক্রোশ দুয়েক দূরে – সোজা দক্ষিণে। জঙ্গলের ভেতর। চিনতে অসুবিধে হবে না। আমাদের লোকজন
থাকবে – ভাণ্ডারে অস্ত্র ঢুকুক। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে”।
জনা বলল, “অস্ত্রগুলো হাতে পেলে, রামালিদের মতো আমরাও দিন-রাত
এক করে মহড়া দেব ভল্লাদাদা। তারপর প্রথম আঘাতটা হানব গ্রামপ্রধানের বাড়িতে”।
“গ্রামপ্রধানের বাড়ি? তোদের বটতলি গ্রামের?”
“তাকে তুমি নোনাপুরের গ্রামপ্রধানমশাইয়ের মতো ভাবছো, ভল্লাদাদা?
হুঁঃ - সে হচ্ছে শকুন – গ্রামের লোকেদের রক্ত চুষে খায়। তার বাড়ি-ঘর, বিলাসিতা, আর
উৎসবের জমক দেখলে মনে হবে – ছোটখাটো রাজাই বোধ হয়। এরকম বহু আছে আশেপাশের সব গ্রামেই”।
“কী করবি?”
মিলার চোখ যেন ঝলসে উঠল, বলল, “ভিখিরি করে দেব – ওর গোলার শস্য
বিলিয়ে দেব গ্রামের গরীব মানুষগুলোকে। পেতল-কাঁসার বাসন-পত্র, কাপড়-চোপড় – যা পাবো
সব বিলিয়ে দেব। আর টাকাকড়ি গয়না-গাঁটি যা পাবো – কিছুটা রাখব – কিছুটা গ্রামের কাজে
লাগাবো। ওই প্রধানের বাড়িতেই একটা পুকুর আছে, ভল্লাদাদা, সেখানে গ্রামের কাউকে নামতে দেয় না। সেটাকে আরও বড়ো করে কাটাবো, কাছাকাছি লোকেরা ওই পুকুরের
জল ব্যবহার করুক না – টুকটাক সেচের কাজে কিংবা নিত্য প্রয়োজনে…”।
ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “সামনের অমাবস্যায় আমাদের একটা পরিকল্পনা
আছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই – এ কটাদিন আমি আর রামালি একটু ব্যস্ত থাকব। ওটা হয়ে গেলে,
আমি তোদের সঙ্গেই বেশি থাকব। শুধু দক্ষতা দিয়ে লড়াই জেতা যায় না, মিলা – তার জন্যে
আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়। সেটাও তোদের শিখতে হবে”।
“পরিকল্পনা মানে”।
ভল্লা একটু হেসে বলল, “এখনই পুরোটা বলব না – শুরুটা বলছি। তোদের
ওই প্রধানের বাড়িতে দিনে-রাতে দুটো চালাক-চতুর ছেলে লাগিয়ে রাখ – পারলে, কোন কাজের
ছুতোয় বাড়িতে ঢুকিয়ে দে। তারা সব কিছু জেনে নিক। কোন ঘরে কে থাকে? কোন ঘরে টাকা-কড়ি
গয়না-গাঁটি রাখা থাকে? সিন্দুকের চাবি কার কাছে থাকে? রাত্রে কজন পাহারা দেয় – তাদের ভাবগতিক কেমন? এরকম
আর কি – এই সন্ধানগুলো আগে থেকে জানলে – খুব কমসময়ে কাজটা মনোমত ভাবে সেরে ফেলা যায়।
নিজেদের বিপদও কমানো যায়”।
জনা আর মিলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, বলল, “বাস্ রে, ঠিক
তো…, বুঝতে পারছি একটু একটু…”।
ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “এখন এটুকুই কর - বাকি পরে বলব। এখন
চলি রে। ওঃ মনে আছে তো, কাল সকালে কুলিকপ্রধান তার লোকজন নিয়ে আসবে তোদের ঘর বানানোর
কাজ শুরু করতে। এলেই আমি বা রামালি নিয়ে আসব এখানে…”।
ভল্লা রণপায়ে চড়ে দৌড়ে চলল নোনাপুরের মহড়া-মাঠের দিকে।
মহড়া-মাঠে পোঁছে ভল্লা একধারে বসল। দেখল ছেলেরা তির ছোঁড়া অভ্যেস
করছে। ভল্লাকে দেখেই আহোক আর বিশুন দৌড়ে এল, বলল, “ভল্লাদাদা,
শুনেছো? সেদিন থেকে শল্কুর তো কোন সন্ধান পাওয়াই গেল না, তার ওপর আজ ভোর থেকে কমলিমাকেও
খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”।
“শল্কুর মামাবাড়িতে যারা গিয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে?”
“হ্যাঁ ভল্লাদাদা, শল্কুর দুই দাদা গিয়েছিল। ওখানে শল্কু যায়নি”।
“যাচ্চলে – গেল কোথায় ছেলেটা? আশ্চর্য ব্যাপার! সন্ন্যাসী হয়ে
কোথাও চলে যায়নি তো, নেড়ামুণ্ডিদের সংঘে? আমাদের ওদিকের ছেলেপুলেরা
খুব যায়”।
“কিন্তু কমলিমায়ের কী হল?”
ভল্লা হাসল, বলল, “কমলিমায়ের আবার কী হবে? কিছুই হয়নি। গতকাল
মাঝরাত্রে কমলিমাকে আমি আর রামালি গিয়ে তুলে এনেছি। আমার বাসাতেই আছে…আমাদের জন্যে
দুপুরের রান্না করছে”।
“তোমরা? কমলিমাকে তুলে এনেছ?”
“হ্যাঁ – কেন? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি? কালকে দেখতে গিয়েছিলাম
– দেখেই বুঝলাম কমলিমায়ের বাঁচার কোন ইচ্ছে নেই। চান নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই…কী দশা
হয়েছে আমার কমলিমায়ের! বললাম, আমার সঙ্গে চল - কিছুতেই আসবে না। তারপর জোর করে ধরে
এনেছি। বাসায় ফিরে রামালি রান্না করল। ওই রাত্রেই কমলিমা পুকুরে গেল চান করতে – কতদিন
পরে নাইল কে জানে? ফিরে এসে রামালির রান্না খেয়ে কেঁদেকেটে একসা। আজ ভোরে বেরোনোর সময়
দেখি – বেড়ার দরজায় – জলছড়া দিচ্ছে। বুঝলাম কমলিমা আবার “কমলিমা” হয়ে উঠছে”।
“ইস্, এত কাণ্ড করেছো – কিন্তু রামালি কিছু বলল না কেন?”
“রামালিকে চিনিস না? সাত চড়ে রা কাড়ে? হতভাগার কথা বলতে, গায়ে
যেন জ্বর আসে। কিন্তু শল্কুটা গেল কোন চুলোয়? ছেলেটা ভাবিয়ে তুলল তো…”। কথা বলতে বলতেও
ভল্লা ছেলেদের দিকে লক্ষ্য রাখছিল – তির ছোঁড়াটা ওরা বেশ ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে। “বাঃ
তির ছোঁড়াটাও ভালোই শিখছিস”।
বিশুন বলল, “তোমার ওই বল্লম বা ভল্ল ছোঁড়ার
থেকে তির ছোঁড়া অনেক সহজ। তুমি যে আগেই কেন তির ছোঁড়াটা শেখাওনি…!”
ভল্লা বিশুনের মাথায় হাল্কা চাঁটি মেরে
বলল, “তোর মুণ্ডু। তির ছোঁড়াটাই সব থেকে কঠিন – ওটা প্রথমে শুরু করলে – আজও তির ছোঁড়াতেই
আটকে থাকতিস। ভল্ল আর বল্লমের অভ্যাস করার জন্যে তোদের হাত আর চোখের তাল-মিলটা তৈরি
হয়ে গেছে। সেই জন্যেই সহজ লাগছে তির ছোঁড়াটা। মহড়া তো ভালই হচ্ছে - এখন সবাইকে ডাক, একটু উপদেশ দিই”।
আহোক আর বিশুন ডাকতে সকলে ওদের কাছে এল,
ভল্লা বলল, “সবাই বস, কাল রাত্রে কতক্ষণ মহড়া দিলি?”
আহোক বলল, “প্রায় এক প্রহর”।
“বাঃ। কিন্তু অতক্ষণ এখানে থাকলে বিশ্রাম নিবি কখন? মহড়ার শেষে
তোদের বাড়ি ফিরতেও তো দণ্ড দুয়েক লাগে…। রাত্রের মহড়ার উদ্দেশ্য
হল আলো-ছায়াতে চোখের দৃষ্টিটাকে তীক্ষ্ণ করা। দিনেরবেলায় সূর্যের আলোতে দৃষ্টিবিভ্রম
হয় না বললেই চলে। কিন্তু আলো-আঁধারে খুব হয় – বিশেষ করে জ্যোৎস্না রাতে। মাঠের দিকে
তাকালে একটু দূরের ঝোপঝাড়গুলোকে মনে হয় কোন জন্তু। এমনও মনে হয় সেগুলো বুঝি চলে ফিরে
বেড়াচ্ছে – একটু আগে ওটা কি এত কাছে ছিল? একটু দূরে ছিল না? ঝোপঝাড়কে জন্তু ভাবলে কোন
ক্ষতি নেই – কিন্তু একটা লোক একটু অন্ধকারে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে – তোর চোখে পড়ল –
কিন্তু তুই ভাবলি - ধুর গাছের ছায়াটাকে মানুষ মনে হচ্ছে। সেটা কিন্তু মারাত্মক হতে
পারে। অন্ধকারে তীক্ষ্ণ নজরের অভ্যাস সেই বিভ্রমটা কাটিয়ে দেয়। রাত্রের দিকে যখনই ঘরের
বাইরে বেরোবি – একটু দূরের অন্ধকারের যে কোন বস্তুকে সঠিক চিনতে চেষ্টা করবি। তাহলেই
দেখবি অন্ধকারেও চোখ চলবে…। বোঝা গেল?”
একটু থেমে ভল্লা সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “এতদিন আমিই
লক্ষ্যভেদ বলতে মানুষের হৃৎপিণ্ডের কথা বলেছি তোদের – তোরাও সেভাবেই অভ্যাস করেছিস।
আজ বলছি – লক্ষ্যটা প্রয়োজনে বদলাতেও পারে। অনেক সময় রাজরক্ষীরা গায়ে লোহার কবচ পড়ে
– তার বুকে ভল্ল ছুঁড়লে ঠিকরে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য বদলাতে হবে। একটা
লোককে মারতে আর কোথায় কোথায় চরম আঘাত হানা যায়? মাথায়, চোখে, কানে, গলায় এবং পিছন থেকে
হলে ঘাড়ে। মাথাতেও অনেকসময় রক্ষীরা কবচ পরে – তার নাম শিরস্ত্রাণ। সেক্ষেত্রে বাকি
রইল চোখ, কান, গলা অথবা ঘাড়। বল্লমের অথবা তিরের বা ভল্লর ফলা এই মোক্ষম জায়গাগুলিতে
গেঁথে দিতে পারলেই – শত্রুর শেষ। বল্লমটা লাগে সামনাসামনি লড়াইয়ের সময়। একটা বল্লম
আমাকে দে – দেখাই। এই দ্যাখ বল্লমের ফলাটা যখন ঢোকে – খুব সহজেই ঢুকে যায় – কিন্তু
বের করার সময় –ফলার এই কানদুটো – আশেপাশের মাংসপেশী এবং ধমনী বা শিরাকে ছিঁড়ে নিয়ে
বের হয় – সেটা আরও বেশি মারাত্মক। কাজেই বল্লমে কাউকে গাঁথলে অবশ্যই গায়ের জোরে টানবি।
ভল্ল বা তির অনেকটাই দূর থেকে ছোঁড়া হয় বলে, সহজে টেনে নেওয়ার উপায় নেই – শত্রু মরেছে
নিশ্চিত হলেই কাছে গিয়ে টেনে তোলার প্রশ্ন আসবে”।
সুরুল বলল, “শত্রু নিশ্চিত মরেছে কিনা জানার কোন উপায় আছে, ভল্লাদাদা?”
“ভালো প্রশ্ন করেছিস, সুরুল। সহজ কোন উপায় নেই। তোর আঘাতে শত্রু
ধর মাটিতে পড়ে ছটফট করছে – অথবা টলতে টলতে দৌড়ে পালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সন্তর্পণে এগিয়ে
যাবি এবং শেষ আঘাতে শত্রুকে শেষ করবি। কিন্তু খুব সাবধান – তুই হয়তো একজনের দিকে লক্ষ্য
রেখে এগোচ্ছিস – কিন্তু তোর আশেপাশে বা পিছনে অন্য শত্রু হয়তো এগিয়ে আসছে – সেক্ষেত্রে
আহত শত্রুকে তখনকার মতো ছেড়ে দে – অন্য শত্রুর দিকে মন দে। এখানে আরও বলি – আস্থানের ছবিটা তোদের নিশ্চয়ই
মনে আছে – সে ঘরগুলোর কিছু ঘরে ছাদ আছে, কিছু ঘরে টালির চাল। সেক্ষেত্রে তোর শত্রু
ওপরেও থাকতে পারে। অতএব একজনকে লক্ষ্য রাখছিস বলে – অন্যদিকে চোখ রাখবি না – এমন যেন
কখনোই না হয়। যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ”।
সকলকে কিছুটা সময় দিয়ে ভল্লা আবার বলল, “কিছু কিছু অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের
আবার আশ্চর্য মানসিক নিয়ন্ত্রণ থাকে – তারা মরণ আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করেও মাটিতে মরার
মতো নিশ্চল শুয়ে থাকতে পারে। কাজেই তোর আঘাতের পরেই কেউ মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেল দেখে
– চট করে তার কাছে যাবি না – সে হয়তো অপেক্ষাতে আছে – মরার আগে তোকে একটা শেষ আঘাত
হানার জন্যে। আবারও বলি - যে যতবেশী সতর্ক – সে ততবেশি নিরাপদ। মনে রাখিস - নিজের জীবনের
থেকে মূল্যবান, জগতে আর কিচ্ছু হতে পারে না”।
সকলেই চুপ করে রইল ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে। ভল্লা হাসল, বলল,
“কী হল? সবাই ভয়ে ভেবলে গেলি নাকি? প্রথম দিন থেকেই তোদের বলেছিলাম, ভালো যোদ্ধা হতে
হলে দরকার শক্তি, দক্ষতা এবং মস্তিষ্ক। মনে আছে? তোরা দক্ষ হচ্ছিস, তোদের শক্তি বাড়ছে
– সেই সঙ্গে বাড়িয়ে তোল মস্তিষ্কের দক্ষতাও! তবে না লড়াইয়ের মজা”।
একটু সময় দিয়ে প্রসঙ্গ বদলাতে ভল্লা বলে উঠল, “হ্যারে রামালি,
তোদের সেই কবিরাজ ছেলেটি, বড়্বলাকে বার্তা পাঠিয়েছিস?”
“না গো ওদের খাবার আনতে গ্রাম থেকে যারা আসবে, তাদের বলে দেব
- সন্ধ্যে বেলায় তোমার বাসায় যেন দেখা করে”।
“ঠিক আছে”। তারপর সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা মজা পাওয়া মুখে
বলল, “কিন্তু ছেলেটি আমাদের বাসায় গিয়ে চমকে উঠবে, বল? কমলিমা বেরিয়ে এসে যখন বলবেন
– কেমন আছিস, বাবা?”
তিনজন ছাড়া সকলেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তোমার বাসায় কমলিমা?”
“কেমন দিলাম বল? রামালি তো সবটাই জানে – আহোক আর বিশুনকে একটু আগেই সব বলেছি – ওদের থেকে শুনে নিস। কিন্তু শল্কুটার
কী হল বল তো? বিশুন বলছিল ও নাকি মামাবাড়িতেও যায়নি”।
সুরুল বলল, “সত্যি কিনা জানি না। আমাদের গ্রামের এক রাখাল বলছিল,
ওই দিন একজন লোককে নাকি সে – আমাদের গ্রামের পিছনদিকের মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণদিকে যেতে
দেখেছিল। মোটামুটি প্রথম প্রহরের শেষ কিংবা দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে। রাখালটা নাকি জিজ্ঞাসাও
করেছিল – কোথা থেকে আসা হচ্ছে কত্তা – যাবেই বা কোথায়? তাতে লোকটা নাকি কোন সাড়া না
দিয়ে – মুখটা গামছায় ঢেকে দৌড়তে শুরু করেছিল। রাখাল ছেলেটি লোকটার চেহারার যা বর্ণনা
দিল, সে শল্কু হলেও হতে পারে। আমাদের গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণে আস্থান ছাড়া ও আর কোথায় যাবে,
ভল্লাদাদা? ওদিকে কাছাকাছি বলতে, পাঁচ-ছ ক্রোশের
আগে আর তো কোন গ্রাম নেই!”
“একা একা আস্থানে গিয়েছিল? কী বলছিস? এতটা সাহস ওর হবে? আমার
মনে হয় না, সুরুল। ও অন্য কেউ হবে…। কিন্তু… যদি শল্কুই হয়, আর যদি সত্যিই ও আস্থানে
গিয়ে থাকে…তাহলে এতদিনেও ফিরল না কেন? ওকে কি বন্দী করে রেখে দিয়েছে? শল্কু যদি গিয়ে
থাকে – কী করতে গিয়েছিল? আমরা কী করছি না করছি - সব কথা জানাতে গিয়েছিল? তাহলে তো সে এখন রাজসাক্ষী। তার মানে, ও কি এখন আস্থানেই আছে? কিন্তু আস্থানের রক্ষীরা এই কদিনে
এদিকে এল না কেন? যে কোনদিন এলেই তো রক্ষীরা আমাদের সকলকে এই মহড়া মাঠে পেয়ে
যেত – আস্থান থেকে লুঠ করে আনা সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র সহ…। উঁহু। আমার মনে হচ্ছে শল্কু
আস্থানে যায়নি। অন্য কোথাও গিয়েছে”।
ছেলেরা ভল্লার যুক্তিতে কোন ফাঁক খুঁজে পেল না। চুপ করে সবাই ভাবতে লাগল। ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এখন চলি রে। খেয়ে এসে আমাদের পরিকল্পনাটা আরেকবার ঝালিয়ে নেব। শল্কুর কথা চিন্তা করে লাভ নেই – ও নিজে না ফিরলে আমাদের আর কী করার আছে? রামালি চল। কমলিমা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন…”।
চলবে...