বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "
এর আগের ছোট গল্প - " হাত-পা বাঁধা "
১
তিনি কোথা
থেকে এলেন কে জানে। সরোবরে অবগাহন স্নান সেরে যখন তিনি উঠে এলেন, তখনই তাঁকে চোখে
পড়ল। তাঁর ভেজা শরীর থেকে ঝরে পড়ছে জল।
ভোরের সোনালী আলোয় চিকমিক করছে ঝরে পড়া জলের বিন্দু। দুইহাতে মুখের ওপর থেকে তিনি
সরিয়ে দিলেন ভিজে চুলের গুচ্ছ। কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়া চুল থেকেও জল ঝরতে লাগল তাঁর
পিঠ বেয়ে। মেদহীন সুপ্রশস্ত পিঠ আর বুক। অশ্বত্থপাতার সুসমঞ্জস বলিরেখার মতো তাঁর
উদর। পাড়ে উঠে তিনি উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকালেন। বুকের কাছে জোড় হাত রেখে তিনি
উচ্চারণ করলেন –
“জবাকুসুম
সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্
ধ্ব্যান্তারিং
সর্বপাপঘ্নং প্রণোতোস্মি দিবাকরম”।
তাঁর
সুস্পষ্ট অথচ অনুচ্চ কণ্ঠস্বর আর উচ্চারণে জেগে উঠতে লাগল আশেপাশের সমস্ত প্রকৃতি।
গাছপালা, লতাগুল্ম, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, পাখি, সরীসৃপ। আকাশ, বাতাস, এমনকি এই
ভোরের আলোও। যে দিবাকরকে তিনি এইমাত্র প্রণাম করলেন, সেও ধন্য হয়ে, আরও উজ্জ্বল
হয়ে উঠল আনন্দে। প্রথম সূর্যের রশ্মি স্পর্শ করল তাঁর মুখমণ্ডল। তাঁর উজ্জ্বল দুই
চোখে এখন করুণার আলো, স্নিগ্ধ আনন্দের আবেশ। তাঁর ওষ্ঠ ও অধরে ইষৎ হাসির রেশ, সে
হাসিতে অকুণ্ঠ মায়া।
উড়ে এল একটি
পাখি, তার ডানায় সবুজ পাতার সজীব রং, ঠোঁটদুটি অরুণ রাঙ্গা। তাঁর মাথার উপর
কিছুক্ষণ উড়ে, সে এসে বসল তাঁর কাঁধে। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি সেই পাখির চোখে চোখ রাখলেন।
কিছু বলবি? নাঃ। কিছু চাইবি? নাঃ। যা চাই সবই তো দিয়েছো। কিচ্ছু চাই না আর, শুধু
তোমাকে চাই, চাই তোমাকে স্পর্শ করতে। তোমার ওই দুই চোখে চোখে রাখতে চাই। ব্যস।
তুমি যে আছো আমাদের সঙ্গে, সেটুকুতেই আমাদের আনন্দ। হে পরমপুরুষ, তুমি চিরদিন বাস
করো আমাদের অন্তরে। স্মিত আস্যে তিনি পাখির পিঠে হাত রাখলেন, স্পর্শ করলেন তার দুই
পক্ষপুট, যেখানে স্পর্শ করলেন সেখানে ফুটে উঠল সোনালী আলো। সোনালী তিলকে উজ্জ্বল
সেই পাখি উড়ে গেল জঙ্গলের দিকে। তার কণ্ঠে এখন সব পেয়েছির সুর।
দৌড়ে এল
কাঠবিড়ালি, দৌড়ে এল হরিণ, দৌড়ে এল খরগোশ। সামনে এসে আগ্রহে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের
দিকে। তিনি হাঁটু মুড়ে বসলেন তাদের সামনে। হরিণ এগিয়ে এসে তাঁর বুকে মাথা ঠেকিয়ে
দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। দুরন্ত কাঠবিড়ালি এক ছুট্টে উঠে পড়ল তাঁর কাঁধে, দৌড়ে বেড়াতে
লাগল তাঁর পিঠে, মাথায়। খরগোশটি তাঁর বাড়িয়ে ধরা হাতের তালুতে জিভের আলতো ছোঁয়া
দিল, বুক ভরে নিল তাঁর ঘ্রাণ। প্রত্যেককেই তাঁর করস্পর্শে ধন্য করে, তিনি মৃদু
কণ্ঠে বললেন তোরা কি কিছু চাস আমার থেকে? কেউ কোন কথা বলল না, শুধু ঘাড় নেড়ে বলল,
না, না, কিচ্ছু না। খরগোশ রুবিরাঙা চোখে, কাঠবিড়ালি আর হরিণ কাজল চোখে তাকিয়ে রইল
তাঁর দুই চোখের দিকে। গভীর মায়ায় করুণাঘন চোখে তিনিও তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে।
এমনি করেই
এক এক করে সেখানে এসে জুটতে লাগল সেই অরণ্যের যত অরণ্যবাসী। সোনালী তিলক পাওয়া সেই
পাখি অরণ্যের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দিয়েছে তাঁর সংবাদ। শাখা প্রশাখার ধ্বজা
নিয়ে বারশিঙা, দীঘল পায়ের নীলগাই, শক্তিধর গাউর, ডোরাকাটা বাঘ, অজস্র টিপ পড়া
চিতা, লেজ ফোলানো শেয়াল, কাঁটায় মোড়া সজারু, আরো আরো অনেকে। আরো এসে জুটল সব পাখি।
সরু পায়ের বক, সারস, তীক্ষ্ণ ঠোঁটের চিল আর বাজ, সেজেগুজে এল ময়ুর, বনমোরগ। আরো কত
পাখি এল রংবাহারি সাজে আর রকমারি ঠোঁট নিয়ে। সক্কলে চায় তাঁর স্পর্শ তাঁর আদর।
তিনি সক্কলকে স্পর্শ করলেন, অনুভব করলেন সকলের প্রাণের উত্তাপ আর আবেগ। তিনি আবারও
জিজ্ঞাসা করলেন, কিছুই কি চাই না তোদের? সব্বাই বলল না, না, যা পেয়েছি তাই ঢের,
কিচ্ছু চাই না আর। তুমিই তো রয়েছ, তুমিই থেকো চিরদিন। আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু চাই না
আর।
সরোবরের যতো কুমুদ সকল পাপড়ি মেলে মৃদু দুলতে লাগল আনন্দে। গাছে গাছে বিকচ কুসুমরাশি ঝরে ঝরে পড়তে লাগল তাঁর মাথায়, তাঁর পদতলে। যে সব গাছে ফুল নেই তারা পাতাভরা শাখা দুলিয়ে ঝিরিঝিরি শীতল হাওয়ায় অস্ফুট উচ্চারণে বলল, তুমি আছো। তুমি আছো। তুমি আছো আমাদের অন্তরে, তুমি আছো আমাদের বাহিরে। সমস্ত সুগন্ধ নিয়ে সুরভিত বাতাস বইতে লাগল তাঁরই আশেপাশে।
২
“ইট্স্ টু
মাচ”। রথীন বলল।
“এক্স্যাক্টলি,
এত কস্টলি, কোন মানে হয় না”। প্রমথ বিরক্ত হয়েই সায় দিল রথীনের কথায়।
“কিসের রে?”
অগ্নি জিগ্যেস করল, সে কাউন্টারে যায়নি, সে জানে না। এই ফরেস্টে ঢোকা, সাফারির জিপ
রিজার্ভ করা আর সঙ্গে মুভি ক্যামেরা থাকার চার্জ কতো। রথীন আর প্রমথই ওদিকটা
সামলাচ্ছিল। সত্যি বলতে ওরা অগ্নিকে এসব ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেয় না, ওর মতামত
নেওয়ার কোন মানেও হয় না। কারণ অগ্নির অবস্থাটা তারা দুজনে ভালোভাবেই জানে।
ওরা তিনজন
একই স্কুলে, একই ক্লাসের সহপাঠী ছিল। স্কুলে পড়ার দশবারোটা বছর তাদের যে গভীর
বন্ধুত্ব ছিল, সেটা আজও আছে, শুধুমাত্র রথীন আর প্রমথর জন্যেই। সমাজের যে উঁচু
স্তরে ওরা এখন উঠে গেছে, তার তুলনায় অগ্নি এখন নেহাতই নগণ্য। তারা অগ্নিকে অনায়াসে
ইগনোর করতে পারত, সব সম্পর্কের ইতি টেনে দিতেই পারত, কিন্তু তা করেনি। সেটা ওদের
মহানুভবতা ছাড়া আর কী হতে পারে?
লেখাপড়ায়
ওরা তিনজনে প্রায় একই রকম ছিল, উনিশবিশ। হায়ার সেকেণ্ডারির পর ওরা তিনজনে ছিটকে
গিয়েছিল তিনদিকে। রথীন গেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, প্রমথ ডাক্তারি আর অগ্নি চান্স পেয়েও
সব ছেড়েছুড়ে চরম বোকামি করল, পড়তে গেল বাংলা অনার্স নিয়ে। বছর পাঁচেকের মধ্যেই
অনিবার্য তফাতটা নজরে আসতে লাগল। কলেজের পড়া সাঙ্গ করে ওরা যখন সাফল্যের সিঁড়িতে
প্রথম পা রাখল, অগ্নি তখন মফস্বলের এক স্কুলে বাংলার টিচার হয়ে চলে গেল। আর খাতা
ভরে তুলতে লাগল কবিতা আর গল্পে। সে সব লেখা কেউ কেউ ছাপে। ক্বচিৎ কখনো কেউ ফেরত
পাঠায়, আর অধিকাংশই নিরুত্তর থাকে, তার লেখাগুলি ছিঁড়ে ফেলে দেয় ওয়েস্ট বাস্কেটে।
কলকাতায়
থাকার কারণে প্রমথর সঙ্গেই অগ্নির যোগাযোগটা বেশি। কলকাতায় এলে অগ্নি তার বাড়িতেই
ওঠে, কারণ অগ্নি কলকাতার পাট বহুদিন চুকিয়ে দিয়ে বুড়ি মাকে নিয়ে চাকরি স্থলেই বাসা
বেঁধে থাকত। বছর তিনেক আগে ওর মা মারা যাবার পর এখন আর কোন পিছুটানও নেই অকৃতদার
অগ্নির।
সাফারি
জিপদুটো ওদের সামনে এসে দাঁড়াতে, রথীন তাড়া লাগালো সকলকে, “কুইক, কুইক। সবাই উঠে
পড়ো। সামনেরটায় আমরা আর পিছনেরটায় ছোটরা সবাই”।
তাই হল,
সামনের জিপে উঠল ওরা তিন বন্ধু, রথীনের স্ত্রী সোনিয়া আর প্রমথর স্ত্রী পলা।
পিছনের জিপে উঠল প্রমথর দুই মেয়ে, আর রথীনের এক ছেলে এক মেয়ে, আর কাজের মেয়ে
রুক্কি। রথীন বিয়ের পর থেকে প্রায় বছর পনের হল জব্বলপুরেই সেটেল্ড্, সে এর আগেও
এই ফরেস্টে এসেছে কয়েকবার। এখানকার অনেক নিয়মকানুনই তার জানা।
“একটু পরেই
আমরা ফরেস্টের ভিতরে ঢুকবো। কেউ চেঁচামেচি করবে না। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা
বলবে। গাড়ি থেকে নামবার চেষ্টা করবে না। ড্রাইভার আঙ্কেল কিন্তু শুধু ড্রাইভারই নয়,
উনি জঙ্গলের গাইডও। উনি যেমন বলবেন, সেভাবে চলবে। নো দুষ্টুমি। ওকে?”
ছোটদের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সকলকে নির্দেশ দিল রথীন। তারপর এগিয়ে গিয়ে সামনের গাড়িতে উঠে বসল, সামনের সিটে। তার পাশে অগ্নি, ওপাশে ড্রাইভার। ওদের গাড়িটা ছেড়ে দিতেই, অনুসরণ করল দ্বিতীয় গাড়িটাও।
৩
পাস দেখিয়ে
দু নম্বর গেট পার হয়ে ঢুকতে ঢুকতে ড্রাইভার বলল, “এইবার আমরা কোর জংগলে ঢুকে
পড়লাম, স্যার। সকলে চারপাশে সতর্ক নজর রেখে চলুন, যে কোন সময়ে যে কোন অ্যানিমাল
চোখে পড়তে পারে”। গাড়ি খুব ধীর গতিতে চলতে লাগল, জঙ্গলের ভিতর সরু রাস্তা দিয়ে।
দুপাশে শাল, পলাশ, তেন্ডু, মহুয়ার গভীর জঙ্গল। কিছু কিছু টিকও চোখে পড়ছে।
পুব আকাশে
ভোরের আলোর আভাস দেখা গেলেও এখনো ভোর হয় নি। ঘন জঙ্গলের নীচে এখনো চাপচাপ অন্ধকার,
রহস্যময় করে রেখেছে চারিপাশ। অগ্নি খুব জোরে শ্বাস নিল, বলল, “শ্বাস নিয়ে দেখ।
সুন্দর না গন্ধটা?”
“কিসের
গন্ধ? ফুলের?” রথীন জিগ্যেস করল।
“জঙ্গলের
গন্ধ”।
রথীন আর
প্রমথ হো হো করে হেসে ফেলেই, সামলে নিল নিজেদের, “সরি, সরি। হাসিটা জোর হয়ে গেছিল।
তুই এমন ছড়াস না, অগ্নি, সত্যি”, প্রমথ বলল।
“এই জন্যেই
তো অগ্নিকে ভালো লাগে। আস্ত একপিস খোরাক”। নিঃশব্দে হাসতে হাসতে রথীন আরো বলল, “ও
সংগে থাকলে ইউ নেভার ফিল বোর। শালা, জঙ্গলের গন্ধ”।
“সে কিরে,
তোরা পাচ্ছিস না? তোমরাও পাচ্ছো না?” পিছন ফিরে পলা আর সোনিয়াকে জিগ্যেস করল
অগ্নি।
“না, অগ্নিদা।
আমরা তো কবি নই”। পলা উত্তর দিল। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি। সোনিয়ার গায়ে কনুই দিয়ে
মৃদু ঠেলা দিয়ে আবার বলল, “প্রকৃতির গন্ধ-টন্ধ কবিদের নাকেই ধরা দেয়। “আকাশের গায়ে
যেন টকটক গন্ধ। টকটক থাকে নাকো হলে পরে বৃষ্টি, তখন দেখেছি চেটে একদম মিষ্টি”।
সুকুমার রায়ের ছড়া ছিল না? তা অগ্নিদা, আপনার এই গন্ধটা কেমন?”
ড্রাইভার আর
অগ্নি ছাড়া সকলেই হাসছিল। অগ্নির কোন বিকার নেই, সে আনমনে বলল, “ওভাবে তো বলতে
পারব না, কিন্তু আছে, গন্ধটা পাচ্ছি। ড্রাইভারসাব, থোড়া রুকিয়ে তো, গাড়িকা স্টার্টভি
বন্ধ করিয়ে না”।
ড্রাইভার
গাড়ি থামিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দিল। ইঞ্জিনের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যেতে, শোনা গেল একটানা
ঝিঁঝির ডাক, ভোরের পাখিদের কাকলি। গাছের পাতায় পাতায় ঝিরঝির শব্দ। দমকা
বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাওয়ার শব্দ। সব মিলিয়ে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ। কান পেতে
শুনতে লাগল অগ্নি। তার সমস্ত শরীরে অদ্ভূত শিহরণ লাগল।
“গাড়ি
থামালি কেন?” রথীন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।
“মন দিয়ে
শোন না, জঙ্গলের নিজস্ব একটা শব্দ আছে শুনতে পাচ্ছিস না?”
“এ মাকালটা
মাইরি, এত বোর করবে জানলে নিয়েই আসতাম না”। প্রমথ বলল। “ড্রাইভারজি আপ চলিয়ে। উনকা
বাতোঁ মে মত আইয়ে, আপকা দিমাক ঘুম জায়েগা”।
গাড়ি আবার
স্টার্ট করে চলা শুরু করতে অন্য সব
শব্দই আড়াল হয়ে গেল।
রথীন বলল, “ওটা
ঝিঁঝিঁর ডাক। শালা, থাকিস তো তুই মফস্বলে, গেঁয়ো ভুত একখানা। কোনদিন ঝিঁঝিঁর আওয়াজ
শুনিসনি? ঝিঁঝিঁ উচ্চিঙ্গের মতো এক রকমের পোকা। ডানা কাঁপিয়ে আওয়াজ বের করে। কখন
করে জানিস? শালা, মেটিংয়ের সময়”।
“তুইও
পারিস, রথীন, সারাটা জীবন ওর কেটে গেল হ্যাণ্ডেল মেরে, ওকে তুই মেটিং বোঝাচ্ছিস”!
চাপা হাসির রোল উঠল আবার, খুক খুক করে।
পলা বলল, “তোমার
মুখের কোন লাগাম নেই, ওভাবে কেউ বলে? ছিঃ। তাও আমাদের সামনে?”
পলার উরুতে
আদুরে চিমটি কেটে সোনিয়া বলল, “এমনিতেই তো অগ্নিদা দুখী আত্মা, তার ওপর নমক মত
ছিড়ক না, প্লিজ”।
সোনিয়ার বাবা
বহুদিনের প্রবাসী বাঙালী এবং এ অঞ্চলের প্রতিপত্তিশালী কন্ট্রাক্টর। তাঁর লওতি
বেটি হিসেবে সে জব্বলপুরেই বর্ন এণ্ড ব্রটআপ। কাজেই তার বংলায় রাষ্ট্রভাষার মিশেল।
দেহান্ত হওয়া শ্বশুরের দামাদ হিসেবে রথীন এখন রাজ্য ও রাজকন্যের অধীশ্বর।
“দুখী আতমা?
বাঃ বেড়ে বলেছো তো সোনিয়া”। প্রমথ বলল। “এদিকে তো জঙ্গলে একটা বেড়ালও দেখা যাচ্ছে না, মাইরি। এতগুলো টাকা গচ্চা দিয়ে,
আমরাও কি দুখী আতমা হয়ে বাড়ি ফিরব নাকি রে, রথীন”?
“তাই তো
দেখছি। আগেরবার বাঘ না দেখলেও বাইসন, নীলগাই, অনেক হরিণটরিণ দেখেছিলাম।
সত্যি, এবারে তাও চোখে পড়ছে না। আধঘন্টা তো হয়ে গেল আমরা ফরেস্টে ঢুকেছি। কেয়া,
ড্রাইভারজি, আভি তক কুছভি দিখাই নেহি দিয়া কিঁউ”?
“কুছ সমঝ মে
নেহি আ রহা হ্যায়, স্যার। অ্যায়সা তো কভি হোতা নেহি হ্যায়”।
“তোদের
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, সবাইকে গান্ডু বানাচ্ছে, বুঝেছিস রথীন”? প্রমথ মন্তব্য করল।
ড্রাইভার কিষুণলাল খুব ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিল। এ জঙ্গলে বাঙালি টুরিস্ট এতো আসে, তাদের কথা শুনে শুনে সে চলনসই বাংলা বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না। তার তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞ চোখ দুপাশে খুঁজে চলেছে কোন না কোন জ্যান্ত প্রাণী। যাতে তার সায়েবদের পয়সা উশুল হয়ে যায়। সে জানে কোন ওয়াইল্ড প্রাণী না দেখে এরা ফিরে গেলে ফরেস্টের বদনাম। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যদিও তার কোন ভূমিকা নেই, তবুও এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তার নিজেরও খুব শরমিন্দা লাগে। টুরিস্টরা এখানে আসে, পয়সা খরচ করে, জঙ্গলের প্রাণী দেখার জন্যে। সেটা না হলে বাস্তবিক তার মনে হয়, সেই যেন বুরবক বানিয়ে দিল এই টুরিস্টগুলোকে। আজ কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না, কী হল? একটাও প্রাণী চোখে পড়ছে না কেন?
ওয়াকি-টকি চালু করে সে যোগাযোগ করল অন্যান্য সাফারি জিপের
ড্রাইভারের সঙ্গে।
“তাজ্জব কি
বাত হ্যায়, ইয়ার। অ্যায়সা কভি নেহি দেখা”।
“কেয়া
হ্যায়, কাঁহা”?
“চার নম্বর
বিট মে যো বড়ি তালাও হ্যায় উধার আ যা। ফটাফট”। ওয়াকি-টকি অফ করে কিষুণলাল গাড়ি
ডানদিকে মোড় নিয়ে ঢুকে পড়ল গহনতর জঙ্গলের মধ্যে।
“কুছ পতা
চলা?” রথীন জিগ্যেস করল।
“অ্যায়সাই কুছ বোল রহা হ্যায়। চলিয়ে, দেখতে হ্যাঁয়। লেকিন একদম শান্ত রহিয়ে, কোই আওয়াজ হোনা নেহি চাহিয়ে”।
৪
তাদের সামনে
আরো পাঁচটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বলে, জায়গাটা ওদের চিনতে অসুবিধে হল না। বনপথ থেকে
বাঁদিকে কিছুটা ঘাস জমি পেরিয়ে সেই সরোবর। আর সরোবরের তীরে একসঙ্গে এতগুলি প্রাণীর
সহাবস্থান দেখে ওদের বিস্ময়ের অবধি রইল না। বাঘ ও হরিণ। সাপ ও নেউল। খরগোশ আর বাজ।
একইসঙ্গে পাশাপাশি বসে আছে, ঘুরছে, ফিরছে, উড়ছে। কোন
ভয় নেই। তারা কেউ যেন খাদক নয়। খাদ্যও নয় কেউ। তাদের
এই নিশ্চিন্ত অবসর যাপনের দৃশ্য, মানুষগুলোর আজীবন গড়ে তোলা সমস্ত ধারণাকে ঝাঁকিয়ে
দিল। কী করে সম্ভব, অদ্ভূত, এমন এক অদ্ভূত ঘটনা! মানুষগুলো উত্তেজিত। যতই শান্ত আর
নিঃশব্দ থাকার চেষ্টা করুক মানুষগুলো, কিছুতেই পারল না। তাদের অস্ফুট বিস্ময় আর
চাপা কথাবার্তাও পাল্টে দিল জঙ্গলের নিজস্বতা। তাদের উজ্জ্বল প্রসাধন। তাদের আধুনিক
রঙিন পরিধান, তাদের বহুমূল্য ক্যামেরার অজস্র ক্লিক। পুরো পরিবেশটাকেই খুব বেমানান
করে তুলল।
তিনি
বসেছিলেন এবং ছোট বড়ো সকল প্রাণীই তাঁকে এতক্ষণ ঘিরে ছিল বলে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল
না। প্রথমে তিনিও লক্ষ্য করেননি। কিন্তু একে একে সাতটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে তিনি টের
পেলেন এই টুরিস্টদের উপস্থিতি। তিনি অধৈর্যে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর উজ্জ্বল ও সুঠাম
নগ্নতায় শিউরে উঠল সকল নারী ও পুরুষ। ব্যাকুল হল উপস্থিত নারীরা, পুরুষরা অনুভব
করল হীনমন্য ঈর্ষা। প্রভাত সূর্যের মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর শরীর ও মুখ। তিনি
চোখ তুলে তাকালেন একবার। এতদূর থেকেও তাঁর নিবিড় দৃষ্টির অভিঘাতে সমস্ত মানুষ
আচ্ছন্ন হয়ে রইল বহুক্ষণ।
অতঃপর তিনি
পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন সরোবরের দিকে। তাঁর নিরুদ্বেগ চলার সঙ্গী হল সমস্ত
প্রাণী, পশু, পাখি। সরোবরের তীরে তিনি দু হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে রইলেন
কিছুক্ষণ। সমস্ত প্রাণীই যেন একান্ত অনিচ্ছাতে তাঁকে ছেড়ে ঢুকে যেতে লাগল অরণ্যের
ভিতর। সমস্ত প্রাণী যখন চলে গেল দৃষ্টির অন্তরালে, তিনি নেমে গেলেন সরোবরের মধ্যে।
তিনি সম্পূর্ণ অবগাহন করার পর, সোনালী তিলক আঁকা সবুজ ডানার সেই পাখিটিও শিস দিয়ে
উড়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। তিনি আর উঠলেন না, তাঁকে আর দেখা গেল না।
“মালটা কে বলতো?” এতক্ষণে রথীন মুখ খুলল।
“কে জানে - পাগল-টাগল
হবে হয়তো”। প্রমথ উত্তর দিল।
“যাঃ জলে
নেমে গেল যে, তুই কি এটাকে সুইসাইড কেস বলতে চাইছিস?”
“তা নাহলে,
কোন সাধু, জংলী বাবা – টাবা হবে”।
“আর এই
জানোয়ারগুলো, সবাই যে ওর চারদিকে ঘুরছিল পোষা কুকুরের মতো, কেন?”
“বিভূতি!”
“যাই বলো
হেভি দেখতে কিন্তু। কেমন জানি একটা ফিলিংস হচ্ছিল”। পলার স্বরে মুগ্ধতা।
“তাতো হবেই।
শালা, ল্যাংটো, জঙ্গলের মধ্যে ভয়ারিজ্ম্। এতগুলো মহিলা দেখেও লজ্জাশরমের কোন বালাই
নেই”। রথীন উত্তর দিল।
“আমি বলছি তোকে,
এ হচ্ছে একজন নাগা সন্ন্যাসী। যাদের কুম্ভমেলায় দেখা যায়, হি ইজ ওয়ান অব দেম।
প্লাস হঠযোগী। এখন জলে নেমেছে। পাব্লিক সরে
গেলে, চুপচাপ উঠে জঙ্গলের ভিতরেই কোথাও সান্টিং হয়ে যাবে”। নিশ্চিত সিদ্ধান্ত
নেবার সুরে প্রমথ বলল।
“কিন্তু
চোখমুখের ওই উজ্জ্বলতা। সম্পূর্ণ নগ্ন অথচ কি সহজ। এই পরিবেশে একবারের জন্যেও
বেমানান মনে হল না”! সোনিয়া আনমনে বলল।
আর কিছু দেখার ছিল না। সাতখানা গাড়িই লাইন ধরে একসঙ্গে ফিরছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ফিরতে পারবে অভ্যস্ত জীবনে। রথীন তার ক্যামেরা রিওয়াইণ্ড করে একটু আগেই তোলা ছবিগুলো চেক করছিল। আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রমো, তোর ক্যামেরাটা চেক করতো, এতগুলো শট নিলাম, একটাও ওঠেনি। খালি গাছপালা আর লেকের ছবি। ফ্রেমে কেউ নেই, না ওই লোকটা, না কোন জানোয়ার। দুটো ভিডিও তুলেছিলাম, সেম কণ্ডিসান”।
“কি বলছিস?
দাঁড়া, দাঁড়া, আমারটা চেক করছি”।
এতক্ষণ কোন কথাই বলেনি অগ্নি। চুপচাপ বসে কিছু ভাবছিল, বলল, “পাবি না। এ ছবি কোন ক্যামেরাতেই আসবে না। আমরা যাঁকে দেখেছি তিনি আমাদের মতো কোন মানুষ নন। নাগা সন্ন্যাসী, হঠযোগী, জংলী বাবা, কেউ নন। ইনি আমাদের সমস্ত ধারণার অনেক ঊর্ধে। পুরোটাই একটা অনুভব”।
“নাঃ রে,
আমার ক্যামেরাতেও সেম অবস্থা। শুধুই জঙ্গল”। হতাশ স্বরে প্রমথ বলল।
“লে, এবার
অগ্নির বাতেলা শোন। ওর এই ডায়ালগগুলোও রেকর্ড হবে না, দেখিস, রিপ্লে করলে জঙ্গলের
নিজস্ব শব্দ শোনা যাবে, ঝিঁঝিঁর ডাক”। রথীন পিছন ফিরে বলল।
“ছিঃ
বাতেলা, বলিস না, রথী, বল বাণী, বাব অগ্নিদেবের বাণী”। প্রমথ আওয়াজ দিল।
ওদের এই
কথায় হাসল অগ্নি, আবার বলল, “খুব সহজ কথাটা আমাদের মাথায় কিছুতেই বসতে চায় না। তার
কারণ, তাতে মাটি হয়ে যাবে আমাদের অহং, ভেঙে পড়বে আমাদের এতদিনের বানিয়ে তোলা সভ্যতার
ধারণাগুলো। অত ভাবনায় কাজ কি গুরু, তার চেয়ে নিট রেজাল্টটা ভাব না, যে আশায় অনেক টাকা
খরচ করে তোরা চাপে ছিলি, সেটা উশুল হয়ে গিয়েছে সুদ সমেত।
সোনিয়া ম্যাডাম, হিন্দীতে কি যেন বলে বেশ, ব্যাপারটাকে?
“পয়সা বোসুল”।
“এক্স্যাক্টলি। প্লাস সারা জীবন লোককে শোনানোর মতো একটা গপ্পোও পেয়ে গেলি। কিন্তু দুঃখ, কোন প্রমাণ রইল না। যারা এই গপ্পো শুনবে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাস করবে, বলবে তিনি আছেন। অধিকাংশই বলবে, গত রাতে ক’ পেগ চড়িয়েছিলে, গুরু? খোঁয়াড়িটা সকাল পর্যন্ত রয়ে গেল! নিজেদের চোখে দেখেও আমরা বিশ্বাস করি বা নাই করি, তিনি আছেন আমাদের সকলের অন্তরে, তিনি থাকবেনও চিরদিন”!
-*-