বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

এক দুগুণে শূণ্য (নাটক)

 এর আগের গল্প - " জঙ্গী ব্যবসা "

এর আগের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



কুশীলবঃ (মঞ্চে প্রবেশের ক্রম অনুসারে)

পতিত (পরে প্রদীপের ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে)        সনৎবাবু    কমলবাবু    নেপাল   হরি

পৃথাদেবী (কমলবাবুর স্ত্রী)   মিতা (কাজের মেয়ে) (পরে বিশাখার ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে)

বিকাশ ( সিনিয়ার পুলিশ অফিসার)   প্রদীপ (জুনিয়ার পুলিশ অফিসার)

বাচ্চু (কমলবাবুর ছেলে)  বিশাখা (বাচ্চুর স্ত্রী)

দু/তিনজন পুলিশ (যাদের কোন সংলাপ নেই) 

প্রথম অঙ্ক

[পতিতের চায়ের দোকানসামনে চেরা বাঁশের দুটো বেঞ্চি, একটাতে বয়স্ক সনৎবাবু বসে আছে। উনুনে চায়ের জল গরম হচ্ছেমঞ্চের বাঁদিক ঘেঁষে একটা বট বা অশ্বত্থগাছ, তার আড়ালে নেপাল আর হরি দাঁড়িয়ে আছে। তারা খুব মন দিয়ে কিছু যেন শুনছে।]

সনৎঃ    কই রে পতিত, তোর চায়ের আর কদ্দূর?

পতিতঃ   আজ্ঞে জল চাপিয়েছি, এই ফুটল বলে। 

সনৎঃ    সেই থেকে একই কথা বলে যাচ্ছিস, বলি এই সময়ে কত ফুল ফুটে যায় রে, পতিত, তোর জল আর ফুটল না? তোর চায়ের জল ফুটতে ফুটতে আমিই না ফুটে যাই।

পতিতঃ   কী যে বলেন, বাবু। কাকভোরে অমন কথা বলতে আছে? কীই বা আপনার বয়েস?

সনৎঃ    বলিস কী রে? আট বছর হল রিটায়ার করেছি, বয়েস কম হল বলছিস, তুই?

[আরেক জন বয়স্ক ভদ্রলোকের প্রবেশ, নাম কমলবাবু। সনৎবাবুর পাশে বসতে বসতে বলল]

কমলঃ    তুই বড্ডো বাজে বকিস সনৎ। বয়সের কথা দুনিয়ার লোককে ঢাক পিটিয়ে বলার কী দরকার?  এর মধ্যে তোর কোন কৃতিত্ব আছে?

সনৎঃ    তার মানে? এর মধ্যে কৃতিত্বের কথাটা আসছে কোথা থেকে?

কমলঃ    তুই যে ম্যাট্রিকে জলপানি পেয়েছিলি, তারপর ধর আমাদের মধ্যে তুইই প্রথম চাকরি এবং বউ জুটিয়েছিলি, সে সব কথা গর্ব করে, বুক ফুলিয়ে বললি...সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু এই যে তুই বয়স বাড়ল, বয়স বাড়ল করে ঢাক পেটাচ্ছিস, এর দরকারটা কী?

সনৎঃ    বাঃ রে বয়েস বাড়লে, বয়েস বাড়ল বলবো না?

কমলঃ    কী হবে বাড়িয়ে? কিছু লোক আহা উহু করবে... কিছু লোক গায়ে পড়ে উপদেশ দেবে, শরতের হিম মাথায় নিও না, মিষ্টি খেও না, তেলেভাজা খেও না, আড়চোখে তাকিও না, ধর্মে কর্মে মন দাও...ওফ হরিব্‌ল্‌।

সনৎঃ    তোর ইচ্ছে না হয় তুই বলগে যা, আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস কেন?

কমলঃ    বোঝো, সামতাবেড়ে শহরে সব্বাই জানে তুই আর আমি মানিকজোড় বন্ধু। এক ক্লাসের দোস্ত। তুই না কমালে, আমি বয়েস কমাই কী করে? লোকে হাসবে যে! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ, ও সব এখন ছাড়, বেশ কদিন পর তোর দেখা পাওয়া গেল। কদিন ধরেই তোর বাড়ি যাবো যাবো করেও যাওয়া হয়নি। তা কী খবর কী? এখানে ছিলি না নাকি, মেয়ের কাছে গেছিলি?

সনৎঃ    নাআআআআ। এখানেই ছিলাম। শরীরটা ঠিক জুতে ছিল না। প্রেসারটা গড়বড় করছিল। তার ওপর একটু ঠান্ডা লেগে শরীরটা বেশ কাবু হয়ে গেছিল।

কমলঃ    অ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাই, এটাই বলছিলাম, যত ভাববি বয়েস বাড়ল, ততই বলতে শুরু করবি, “শরীরের আর দোষ কি? এ হচ্চে বয়েসের বিড়ম্বনা”বুইলি হতভাগা? আমারও কদিন বুকটা ধড়ফড় করছিল। গিন্নি বিধেন দিল কটা দিন বাড়ি থেকে বেরোতে পাবে না। আমি বললাম, আর যা বলো সব শুনবো, কিন্তু এইটি শুনবো না। ভোরের এই হাওয়াটা না খেলে আমার আবার হজমের গণ্ডগোল হয়। বুইলি না? পাঁচটা বাজলেই মনটা কেমন পালাই পালাই করে।

সনৎঃ    হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। আমারও একই দশা। তবে প্রেসারের জন্যে কদিন উঠে দাঁড়ালেই মাতাটা কেমন ঘুরে উঠছিল। তাছাড়া সিজ্‌ন্‌ চেঞ্জের সময় তো। বুকে ঠাণ্ডাটা চেপে বসলে আর রক্ষে পেতাম না। তাই কদিন বাড়ির বের হই নি।

কমলঃ    বেশ করেছিস। কিন্তু এদিকে খবর শুনেছিস?

সনৎঃ    কিসের খবর?

কমলঃ    শুনিস নি? আমাদের মংলার কন্যাটি ভেগে পড়েছে!

সনৎঃ    বলিস কি? কার সঙ্গে? কবে?

কমলঃ    তাই তো বলছিগত বুধবার দিন, ভর সন্ধ্যেবেলায়। ওই যে ছোঁড়াটা ওদের বাড়িতে থাকত, আর বাজার হাট করে দিত, তার সঙ্গে।

সনৎঃ    মংলার খুব পয়সা হয়েছিল, ব্যাটা ধরাকে সরা দেখছিল।

কমলঃ    উড়ছিল রে, উড়ছিল। মেয়েই মুকে ঝামা ঘষে দিল। 

সনৎঃ    অতি বাড় বেড়ো নাকো ঝড়ে পড়ে যাবে।

কমলঃ    হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ (হাসি), অতি ছোট হয়ো না হে, ছাগলে মুড়োবে। য্যাগ্‌গে, আমাদের কি দরকার ওসব কথায়?

সনৎঃ    তা যা বলেচিস, আমরা বাপু ওসব সাতেও নেই পাঁচেও নেই।

কমলঃ    হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। পরনিন্দা পরচর্চা একদম সহ্য হয় না। 

সনৎঃ    তবে কথাটা যখন উঠল, তখন না বলেও পারা যায় না। মংলার উত্থান একদম হাউইয়ের মতো। সাঁ সাঁ সাঁ সাঁ (হাতের ভঙ্গি সোজা উপরের দিকে)।

কমলঃ    পতনটাও তাই হবে, হাউইয়ের মতো, ধাঁআআআআ করে। (হাতের ভঙ্গি ধপাস নিচের দিকে)।

সনৎঃ    চার বচরে টাকা ডবল! ধাপ্পা দিয়ে কম টাকা কামিয়েচে? খুব লচর মচর বারফট্টাই।  

কমলঃ    হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। বাড়িতে নিত্যি মোচ্ছোব। হোমড়া চোমড়া সব লোক আসচে যাচ্ছেখানা পিনা হুল্লোড়।

সনৎঃ    মংলা থেকে মঙ্গলবাবু। মঙ্গল সায়েব। মঙ্গল স্যার।

কমলঃ    য্যাগগে, আমাদের কি দরকার ওসব কথায়? আমরা বাপু কারোর সাতেও নেই, পাঁচেও নেই।

সনৎঃ    তা যা বলেছিসপরনিন্দা পরচর্চা আমার ধাতে একদম সয় না। কই রে পতিত, তোর চায়ের জল ফুটল?

পতিতঃ   অনেকক্ষণ, চা সেদ্ধ হচ্ছে, এই হয়ে এল বলে।

কমলঃ    তবু একটা কথা না বললেই নয়। লোকের পাঁজর নিঙড়োনো পয়সা চুরি করে এত বাড় ভালো নয়।

সনৎঃ    সে আর বলতে? ও জিনিষ সামলে চলা যায়? সারা গায়ে ফুটে উঠবেই, পারদের ঘায়ের মতো হাজার লোকের দীর্ঘশ্বাস। অভিশাপ। হি হি হি হি (হাসি)। কাঁচা পয়সায় সংসারটাই বিগড়ে যায়, কারো ওপর কোন কন্ট্রোল থাকে না।

কমলঃ    তাই তো হল। মংলার একটা রক্ষিতে হল। আর বউটা মংলারই এক স্যাঙাতের সঙ্গে আজ মিরিক, কাল মন্দারমণি করে বেড়াচ্চে। এদিকে মেয়েটাও কাজের উটকো ছোঁড়াটার সঙ্গে সটকে পড়ল। 

সনৎঃ    মংলার এই বয়েসে আবার রক্ষিতে? বলিস কী রে?

কমলঃ    আমার কাছে শোন না, আমার কাছে সব খবর পাবিধোপাপুকুরের পশ্চিমপাড় বুজিয়ে যে নতুন  তিনটে ফ্ল্যাট বাড়ি উঠল? ঊর্বশী, মেনকা আর রম্ভা। রম্ভায় দু কামরার ফ্ল্যাটে মংলা তার রক্ষিতে রম্ভাকে পোষে।

সনৎঃ    রম্ভায় রম্ভা? বেশ বলেছিসহি হি হি হি (হাসি)। এ যে একেবারে অষ্ট রম্ভা, অ্যাঁ, ষোল কলার আদ্দেক? তা কলাটি দেকতে কেমন? 

কমলঃ    ছ্যা ছ্যা ছ্যা। সে এক পাপের মূর্তি, চোক তুলে তাকানো যায় না। হাঁটা-চলা, কথা বলায় পাপ ঝরে ঝরে পড়ছে

সনৎঃ    তা তো হবেই, যত্তো সব নষ্টা।

কমলঃ    তবে হ্যাঁ। গতরখানি খাসা। যাকে বলে ডবকা। ভাদরের ভরা গাঙ্‌, রসে জলে একেবারে মাখামাখি

সনৎঃ    মংলার থালে খুব সুখ বল, অ্যাঁ? ভাদরের ভরা নদীতে ঝাঁপাচ্চে, সাঁতার কাটচে, ডুব দিয়ে দিয়ে খুব নাইচে?

কমলঃ    সে আর বলতে? য্যাগ্‌গে যাক, আমাদের কি দরকার ওসব কথায়? পরনিন্দা পরচর্চা আমার দু চক্ষের বিষ।  

সনৎঃ    হ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা। আমরা বাপু খাই দাই গান গাই, কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই।      

 

[নেপাল ও হরি নিজেদের মধ্যে কিছু ইশারা করে, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। নেপালের বয়েস বত্রিশ তেত্রিশ, হরি একেবারেই ছোকরা। দুজনেরই কাঁধে ব্যাগ, একটা বড়ো, আরেকটা ছোটপতিতের দোকানের সামনে দাঁড়াল।]

 

নেপালঃ   দাদাভাই, দুটো চা হবে নাকি?

পতিতঃ   দু মিনিট, বসেন দিচ্ছি।

নেপালঃ   চায়ের সঙ্গে আর কিছু হবে?

পতিতঃ   ওই যে, বিস্যুট রয়েছে, কোনটা নেবেন নিন।

হরিঃ      ওই লেড়ো? ওছাড়া আর কিছু নেই?

পতিতঃ   ডিম-টুচ হবে, একটু বসেন করে দিচ্চি। টুচ-ঘুগনিও হবে, কিন্তু সে একটু দেরি হবে। মটর সেদ্দ আচে, একটু ছুঁকে দিলেই রেডি...।

[নেপাল আর হরি অন্য বেঞ্চে পাশাপাশি বসল। কমলবাবু আর সনৎবাবু দুজনকে লক্ষ্য করছিলেন]

কমলঃ    আপনাদের এদিকে নতুন মনে হচ্ছে? যাওয়া হবে কোথায়?

নেপালঃ   আমাদের বলছেন? [জোড় হাতে নমস্কার করে] নমস্কার, তা হ্যাঁ, নতুন বৈকি, তবে পুরোনো হয়ে যেতে কতক্ষণ?

কমলঃ    কোন কাজে? নাকি বেড়াতে?

নেপালঃ   বেড়াতে? এ জায়গাটা বেড়ানোর মতো টুরিষ্ট স্পট, এমন তো জানতাম না?

কমলঃ    না, বেড়াতে বলতে কাকার বাড়ি, মামার বাড়ি, মাসির বাড়ি, বন্ধুবান্ধবের বাড়ি লোকে বেড়াতে যায় না?

হরিঃ      এখানেও মামার বাড়ি!

নেপালঃ   [হরিকে ধমকে] চুকঃ। হ্যাঁ সে রকম বেড়ানো হয় বৈকি! মন্দ বলেননি, আমরা এসেছি কিছুটা কাজ, কিছুটা বেড়ানো, এই আর কী

[পতিত চারটে গেলাসে চা নিয়ে এল, গেলাসের মধ্যে আঙুল ডোবানো। সকলকে চা দিল।]

পতিতঃ   আপনারা ডিম-টুচ খাবেন তো? দু প্লেট বানাই?

নেপালঃ   খুব দেরি হবে কী? আমাদের আবার একটু জরুরী কাজ আছে।

পতিতঃ   না, না দেরি কেন হবে? চা খেতে খেতে বানিয়ে দিচ্চি, দেখেন না।

কমলঃ    [চায়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে] জরুরী কাজের সঙ্গে শরীরের দিকে নজর দেওয়াটাও জরুরি। ওই দেখুন, আমি আবার একটু ইয়ে চর্চা করে ফেললাম বোধ হয়। কিছু মনে করবেন না, বয়েস হয়েছে তো, হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ...।

নেপালঃ   ইয়ে মানে, আপনি অনধিকার চর্চা বলছেন কী? একটুও না। আপনারা আমাদের গুরুজন, গুরুজনের কথা আমরা মাথায় করে রাখি, কিন্তু মাথা খারাপ করি না। আমাদের আপনারা “তুমি”ও বলতে পারেন, কাকু।

সনৎঃ    (চায়ে চুমুক দিতে দিতে, খুশী মুখে) বাবা, একেবারে কাকু?

নেপালঃ   এ হে, একটু ইয়ে করে ফেললাম কী? দাদা বললে ভাল হতো?

সনৎঃ    আরে না, না, আমাদের অনেকেই এখন দাদু বলে, তাই বলছিলাম...।

নেপালঃ   য্যাঃ, কী বলছেন? দাদু? আপনাদের বলে? কে? কারা বলে? কিছু মনে করবেন না, যারা বলে, তারা মোটেই সুবিধের লোক নয়। কী এমন বয়েস হয়েছে আপনাদের? পঁয়তাল্লিশ কি বড়জোর আটচল্লিশ, তার বেশি তো নয়!

কমলঃ    (চায়ের গেলাস শেষ করে, মুচকি হেসে) আটান্ন।

নেপালঃ   সত্যি? অবিশ্বাস্য। বিশ্বাসই হয় না। আটান্নতে এই চেহারা? এমন টান টান? ভাবা যায় না। জাস্ট ভাবা যায় না।

সনৎঃ    সনতের একটু বাড়িয়ে বলা স্বভাব। আসলে ছাপ্পান্ন, আমরা একই বয়সি, একই স্কুলের একই ক্লাসের বন্ধু।

হরিঃ      আমরাও, একই গ্লাসের বন্ধু।

নেপালঃ   (হরিকে ধমকে) চুকঃ। দেখে মনে হচ্ছে আপনারা এখানে অনেকদিনের বাসিন্দা।

কমলঃ    হে হে হে হে, অনেকদিন কত দিনে হয় জানি না, তবে এই সামতাপুরে আমাদের সাত পুরুষের বাস।

নেপালঃ   বাবা, সা-আ-ত পুরুষ? তাহলে তো আপনারা এখানকার সকলকেই চিনবেন।

কমলঃ    (মৃদু হেসে) সামতাপুর এমন কিছু বড়ো জায়গা তো নয়, না চেনার কী আছে?

নেপালঃ   তাহলে মঙ্গল স্যারকেও চিনবেন নিশ্চয়ই?

সনৎঃ    মঙ্গল স্যার? মানে আমাদের মংলা? তাকে চিনবো না? সামতাপুরে অমন ধনী কজন আছে?

কমলঃ    তা মঙ্গলের সঙ্গেই কি আপনাদের জরুরি কাজ?

নেপালঃ   হুঁ। উনিই আমাদের ডেকেছেন। (চা শেষ করে মাটিতে গেলাস রেখে) তা উনি লোক কেমন?

কমলঃ    লোক ভালোই। মানে ওই যেমন হয় আর কি? সজ্জন, তারপরে ধরুন দিলদরিয়া। তার ওপর, ইয়ে মানে, বেশ বিবেকবান।

সনৎঃ    লগনচাঁদা লোক মশাই, ধুলিমুঠি থেকে সোনামুঠি – মা লক্ষ্মী ঘরে বাঁধা পড়েছেন।

নেপালঃ   তাই? কিন্তু...তাহলে আমাদের ডেকে পাঠালেন...

[পতিত দু প্লেট ডিম-টোস্ট নিয়ে দুজনের হাতে দিল।]

          আপনারা কিছু খাবেন না - আর আমরা বসে বসে খাবো?

কমলঃ    তাতে কী? তোমরা হচ্ছো এই শহরের অতিথি। অনেকদূর থেকে এসেছো। আমরা তো বাড়ি গিয়ে খাবো। তোমরা খাও। পতিত দেখিস, অতিথিদের যেন কোন অযত্ন না হয়। সামতাপুরের সম্মান এখন তোর হাতে। তা মঙ্গলের বাড়িতে কিসের কাজ?

নেপালঃ   (ডিম-টোস্ট চিবোতে চিবোতে) শুনেছি, কিছুদিন আগেও ওঁনার খুব ভালো অবস্থা ছিল। কিন্তু ইদানীং একটু কষ্টের মধ্যে আছেন। তাই বোধহয় আমাদের ডাক পড়েছে।

সনৎঃ    তা ঠিকই শুনেছেন। দিন কী আর সমান যায়? আজ যে রাজা কাল সে ফকির। এ তো হামেশা হয়।

কমলঃ    সত্যি কী ছিল, আর এখন কী হয়েছে! (দীর্ঘশ্বাস)।  মঙ্গলের মতো মানুষের কিন্তু এমন হওয়ার কথা ছিল না। জগতে ভালোমানুষদের কপালেই কী যত দুঃখ লেখা থাকে?

সনৎঃ    যা বলেছিস। কিন্তু মঙ্গলকে এই কষ্ট থেকে, তোমরা কীভাবে উদ্ধার করবে?

নেপালঃ   (মুখে পাঁউরুটি নিয়ে) ওটাই তো আমাদের পেশা। নেশাও বলতে পারেন।

হরিঃ      আমার দাদার দয়ার শরীর, মানুষের দুঃখে কষ্টে প্রাণ কাঁদে।

নেপালঃ   (হরিকে ধমকে) চুকঃ। দয়া-টয়া কিছু নয় কাকু, কর্তব্য। যার যা কর্তব্য সেটা না করলে অধর্ম হয় কী না বলুন?

কমলঃ    আলবাৎ হয়...তা সেই কর্তব্যটা কী?

নেপালঃ   (আশেপাশে তাকিয়ে, কিছুটা নিচু স্বরে) হাটের মধ্যে সব কথা কী বলা যায়, কাকু? নাকি যাকে তাকে মনের কথা বলা যায়? কার মনে কী আছে ঠিক কী? উপকার করতে না পারুক, লোকের ক্ষতি দেখলে মানুষ খুব আনন্দ পায়।

কমলঃ    (তেমন মনঃপূত হল না, গোমড়া মুখে) অঃ তাই বুঝি?

নেপালঃ   কাকু, রাগ করলেন নাকি? আপনাদের মতো লোককে বলা যাবে না, সে কথা বলিনি কিন্তু। সত্যি বলতে আপনাদের মতো মানুষ রোজ রোজ পাবো কোথায়? আপনাদের মতো লোকের এক আধ দিন দর্শন মেলে। আপনাদের সান্নিধ্য পেলে আমরা বর্তে যাই। আপনাদের বলবো না? ছ্যা ছ্যা এমনটা ভাবলেন কী করে, কাকু?

সনৎঃ    (খুশি মুখে) তাই বলো। আমরা তোমাকে ভুল বুঝছিলাম।

হরিঃ      ঠিক কি ভুল, সে কথা পরে টের পাবেন, কাকু।

নেপালঃ   (হরিকে ধমক) চুকঃ। কী জানেন কাকু, বিশ্বাস জিনিষটা সোনার পাথরবাটির মতো। যদি বিশ্বাস করেন, তাহলে বাটিটা সোনার। আর যদি অবিশ্বাস করেন তাহলে বাটিটা পাথরের!

কমলঃ    ওফ্‌, সাংঘাতিক বলেছো, ভাই। যত দেখছি শুনছি, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। কী বলিস সনৎ, দেখতে শুনতে সাধারণ, কিন্তু কী অসাধারণ কথাবার্তা, কী উঁচু বিশ্লেষণ, কী উঁচু ভাবনা।

সনৎঃ    (গদ্গদ স্বরে) যা বলেছিস। তা এত কথা হল, ভাইপোর নামটাই এখনো জানা হয়নি।

হরিঃ      বিপদতারণ বিশ্বাস। দাদার মা টানা পাঁচ বছর খুব নিষ্ঠা ভরে বিপত্তারিণী ব্রত করার পর, দাদা ওঁনার মায়ের কোলে অব... মানে ইয়ে...ওই কী যেন একটা হয়েছিলেন।

কমলঃ    অব মানে, অবতীর্ণ হয়েছিলেন কী?

হরিঃ      ঠিক বলেছেন। শক্ত শক্ত বাংলা কথাগুলো জিভে আসতেই চায় না!

নেপালঃ   আঃ, গোপাল, তোকে কতবার বলেছি, আমার এই সব অলৌকিক ঘটনার কথা যাকে তাকে বলে বেড়াবি না! লোকে বিশ্বাস করবে না। ভাববে বুজরুকি, কী দরকার কাকু, নিজের কথা ঢাক পিটিয়ে সকলকে বলে বেড়ানো। আপনারা তেমন মানুষ নয় জানি, আপনারা বিশ্বাস করবেন। কিন্তু অনেকে উপহাস করে, বিদ্রূপ করে। সে এক বেজায় লজ্জার ব্যাপার হয়ে ওঠে।

সনৎঃ    কী বিপদ। মূর্খ লোকে ঠাট্টা করবে বলে, তোমার জন্ম রহস্য আমাদের জানতে দেবে না, বিপদ? এ তোমার ভারি অন্যায়বিপদ থেকে তুমি মানুষকে উদ্ধার করার ব্রত নিয়েছো বিপদ, তুচ্ছ লোকের ঠাট্টায়, তোমার মহিমা গোপন থাকবে?

কমলঃ    গোপন থাকবেই বা কেন, আর আমরা এসব কথা গোপন রাখবোই বা কেন? আমরা একবার যখন তোমাকে পেয়েছি বিপদ, আর তো তোমায় ছাড়ছি না। আমাদের বাড়ির সমস্ত বিপদ তুমি কাটিয়ে দাও বিপদ।

হরিঃ      সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, বিপদের হাত বাড়িয়ে দাও বিপদ্‌দা, তোমার নিপুণ হাতের টানে বাড়ন্ত হয়ে উঠুক সকলের বাড়ি। এটুকু বাড়াবাড়ি তোমাকে করতেই হবে, বিপদ্‌দা

নেপালঃ   কিন্তু এই চায়ের দোকানে, (দর্শকদের দিকে লক্ষ্য করে), এত মানুষের হাটে এসব কথা বলা যাবে না। আপনাদের এখানে কোন নিরিবিলি জায়গা নেই কাকু, যেখানে নিশ্চিন্তে বসে দুটো কথা বলা যায়?

কমলঃ    বিলক্ষণ, নেই আবার? আমাদের কুমুদিনী উদ্যান। এই তো সামনেই, হেঁটে গেলে মিনিট পাঁচেক। এই সাত সকালে ওখানে কেউ থাকেও না...নির্জন, নিরিবিলি।

নেপালঃ   আপনারা এগিয়ে যান, আমরা চায়ের দাম-টাম দিয়ে আসছি।

সনৎঃ    ও কমল, আমরা থাকতে ওরা আবার দাম দেবে কী? পতিত আমার খাতায়, ওদের দুজনের হিসেবটাও লিখে রেখো। [পতিত যেন খ্যাঁক করে উঠল।]

পতিতঃ   আপনার তো হিসেব সাড়ে তিনশোর ওপর হয়ে গেল, বাবু, এমাসে এখনো পর্যন্ত একটা টাকাও ঠেকাননি...

সনৎঃ    আঃ তোর ওই হিসেবের জল পরে শুকোতে বসব, পতিত। এখন যা বলছি তাই কর।

[পতিত গজগজ করতে লাগল]

নেপালঃ   আপনারা তাহলে এগিয়ে পড়ুন।

কমলঃ    সে কী তোমরা যাবে না?

নেপালঃ   আসছি, আপনারা চলুন না। সকলে একসঙ্গে পার্কে ঢুকলে লোকের কৌতূহল হবে। আলাদা আলাদা ঢোকাই ভালো।

সনৎঃ    তা মন্দ বলেনি বিপদ। চল, আমরা এগিয়ে যাই কমল। ওরা পিছনেই আসুক। বেশি লোক জানাজানি হলে, বিপদ বাড়বে।

কমলঃ    আচ্ছা, তাহলে আমরা আসি। [সনৎবাবু ও কমলবাবুর প্রস্থান] 

নেপালঃ   পতিতবাবু, আমাদের সামনে সনৎবাবুর মতো মানী মানুষের ধারদেনার কথা বলাটা আপনার উচিৎ হয়নি।

পতিতঃ   নিকুচি করেছে মানী লোকের। বউনি হবার আগেই দু মক্কেল নিত্যি এসে ধারে চা খেয়ে যায়... তিনমাস ধরে চিৎহাত উপুড় করচে না, আমি কী দানছত্র খুলিচি নাকি? দুটোই সমান, চারটে শকুনি মরলে অমন দুই লোক হয়, যেমন কঞ্জুস, তেমনি বজ্জাত

হরিঃ      দাদা,  আমরা কী ভাগাড়ে যাচ্ছি?   

নেপালঃ   সে না হয় একটু ধার দেনা করে ফেলেছেন, কিন্তু মানুষদুটোর মন খুব সাদা, তাই না, পতিতবাবু?

পতিতঃ   সাদা না, ছাই। সারাদিন শুধু কূটকচালি, এর কথা তাকে, তার কথা একে। একটু আগেই মঙ্গলের নিন্দেয় ধুলো ওড়াচ্চিল, আপনার কথা শুনেই সেই মঙ্গল একেবারে বড়মানুষ হয়ে উঠল...

নেপালঃ   তাই? আপনার দোকানে ভালো সিগারেট কী আছে? দুটো দিন তো।         

পতিতঃ   সেটাও কি ধারে?

নেপালঃ   আহা, রাগছেন কেন পতিতবাবু, চা আর ডিমটোস্টের দাম সনৎবাবুর খাতায়, আর দুটো সিগারেট কমলবাবুর খাতায়। ধার আবার কোথায় হল?

[পতিত দুটো সিগারেট নিয়ে এসে দিল। নেপাল আর হরি সিগারেট ধরিয়ে আরামে দুটান দিল]

          আমরা এখন আসি পতিতবাবু। দেখা হবে আবার। আশা করি আপনার ধারের ওই ধারালো বিপদ কেটে যাবে খুব শিগ্‌গির।

হরিঃ    ধার দেনা, টাকা পয়সা নিয়ে মাথা গরম করবেন না, পতিতবাবুটাকা কী চিরকাল থাকবে? নাকি সঙ্গে যাবে?            আসি তাহলে? [দুজনের প্রস্থান।]

পতিতঃ   যতসব ফেরেব্বাজের দল কী আমার কপালেই জুটে যায়? এক পয়সার বউনি হলনা, গুচ্ছের ধার...

 

[পর্দা নেমে এল]

        

         

দ্বিতীয় অঙ্ক

 

[পার্কের মধ্যে গাছের নিচে একটা লম্বা বেঞ্চ। গাছটা কার্ডবোর্ডের ওপর আঁকা ঝাঁকড়া মাথা।  সনৎবাবু আর কমলবাবু বেঞ্চের এক ধারে বসে আছেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলছেনসে কথা শোনা যাবে না। পশ্চাৎপটে খুব সাধারণ কিছু পাখির ডাক, যেমন কাক, শালিক, চড়াই, একটা ঘুঘুও চলতে পারে, যাতে পার্কের পরিবেশ বোঝা যায়। দুজন ভদ্রলোক মঞ্চের ধারে হাত পা ছুঁড়ে ব্যায়াম করছেনেপাল ও হরির প্রবেশ।]

 

হরিঃ    নেপালদা, ওই যে বুড়োদুটো  ওই দিকে বেঞ্চে বসে রয়েছে।

নেপালঃ   চুকঃ, বুড়ো বলতে নেই, খদ্দের লক্ষ্মী। আর নেপালদা নেপালদা করছিস কেন? আমি বিপদ্‌তারণ, তুই গোপাল। ভুলে যাচ্ছিস?

হরিঃ      আহা, সে তো ওদের সামনে। এখন তো ওরা আমাদের সামনে নেই।

নেপালঃ   তা না থাক, তবু আসল নামে ডাকবি না, ভুল হয়ে যাবে। আর তুই কথার মাঝখানে অমন ফুট কাটিস কেন বল তো? সবে চার ধরেছে, ফাৎনা নড়ছে, তার মধ্যে তোর বুজকুরি, মাছ পালালে?

হরিঃ      কী করবো বেরিয়ে যায় যে, আচ্ছা এই কুলুপ দিলাম, আর কথা বলবো না। এখন থেকে চেষ্টা করবো মিউট মোডে থাকতে।

[সনৎবাবু আর কমলবাবু ওদের দেখে হাত নাড়ল]

নেপালঃ   মনে থাকে যেন, ওই যে হাত নাড়ছে, চল ওদিকে যাই। [বেঞ্চের সামনে গিয়ে] আপনাদের পার্কটা বেশ সুন্দর। কেমন সাজানো সবুজ, প্রচুর অক্সিজেন ভরা সকালের বাতাস। মন-টন একদম ঝরঝরে হয়ে যায়।

হরিঃ      ইহকাল তো বটেই, তবে পরকাল ঝরঝরে হয়ে যায় কিনা জানা যায় না।

[নেপাল কটমট করে হরির দিকে তাকাল। কমলবাবু কী বুঝল কে জানে, হেসে উঠল]

কমলঃ    বেশ বলেছো, গোপাল। ইহকাল ঝরঝরে হয়ে যায়... হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ...বসো হে, এসে বেঞ্চে বসো।

নেপালঃ   ছি ছি, তা হয় নাআপনাদের সঙ্গে একই আসনে, পাশাপাশি? আমার আবার লঘুগুরু জ্ঞান খুব টনটনে। আপনারা বসুন ওই উঁচুতে,  আমরা এই আপনাদের পায়ের কাছে ঘাসে বসছি।

সনৎঃ    আরে না না। সে আবার একটা কথা হল নাকি? তার থেকে, আমরা সবাই মিলে ঘাসেই বসি। কি বল, কমল, তাতে মুখোমুখি বসে কথাবার্তা বলতেও সুবিধে হবে।

কমলঃ    কিন্তু হাঁটু? ঘাসে হাঁটু মুড়ে বসতে পারবি তো?

নেপালঃ   এ হে আপনাদের হাঁটুতে ব্যাথা বুঝি। মোটে ছাপান্নতেই এই! অবিশ্যি আজকাল হাঁটু ব্যথার আর কোন বয়েস নেইএই আমারই দেখুন না, পুন্নিমে অমবস্যেতে হাঁটুদুটো কেমন কনকন করে। গোপাল তেল মালিশ করে দিলে বেশ আরাম হয়! গোপাল সেই তেলের শিসিটা তোর ব্যাগে নেই?

হরিঃ      না গো, বিপদ্‌দা, তাড়াহুড়োতে ভুলে গেছি।

কমলঃ    তোমারও হাঁটুতে ব্যথা? বল কী হে?

নেপালঃ   দোষ তো হাঁটুর নয় কাকা, দোষ ভেজালেরকোন খাঁটি জিনিষটা আমরা খাচ্ছি বলুন? সবেই ভেজাল, আর সেই বিষ পেটে গিয়ে আমাদের হাঁটু, চোখ, কান, নাক সব বিগড়োচ্ছে। কবছর পরে দেখবেন, কচি ছেলে মেয়েরাও বাতের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। মাঠে মাঠে খেলাধুলো করবে কী, সবাই তো বেতো রুগী। 

সনৎঃ    খুব সার কথা বলেছ, বিপদ, মানুষের বিপদ চার দিক থেকেই আসছে।

নেপালঃ   আর হাইব্রিড? এই যে মুরগির ডিম, ওগুলো কী ডিম?

হরিঃ      এতদিন ঘোড়ার ডিমের কথা শুনে এসেছিলাম, এখন নিজের চোখে দেখছি!

নেপালঃ   সারা বছর ইয়া বড়ো বড়ো ফুলকপি, সারা বছর ইয়া লম্বা লম্বা ঢ্যাঁড়স। খেতে অখাদ্য। আর তার ওপর ওই বিষ। আপনার আমার শরীরে ঢুকছে। বাতের আর দোষ কী? বাতের আর বয়েস কী?

[একটু কষ্ট করেই সকলে মাটিতে ঘাসের ওপর মুখোমুখি বসল]

হরিঃ      দাদার তেল মালিশে বাত কমে, বাতেলা শুনলেও নালিশ করতে ইচ্ছে হয় না।

নেপালঃ   ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছিস, গোপাল। তেলটা আপনারাও বানিয়ে নিতে পারেন কাকু। কাকিমাকে বলবেন বানিয়ে দিতে। ঘৃতকুমারী, কেশুত, আকন্দ, তুলসী আর ত্রিফলা – কুচিকুচি করে কেটে, খাঁটি তেলে ভিজিয়ে রোদ্দুরে রাখবেন। কড়া রোদে চার-পাঁচদিন রাখলেই, ব্যস্‌, আপনার তেল তৈরি।

কমলঃ    বাবা, তোমার আয়ুর্বেদও জানা আছে বুঝি?

হরিঃ      দাদা, ওই সব নিয়েই তো আছেন। দাদার অনেক বিদ্যা। আয়ুর্বেদ বিদ্যার কোন সাইড এফেক্ট নেই। কিন্তু অন্যগুলোর সাংঘাতিক সাইড এফেক্ট আছে।

নেপালঃ   গোপাল, বড়দের কথার মধ্যে কথা বলতে নেই, কতবার বলবো তোকে?

সনৎঃ    আহা, গোপালকে বকছ কেন? ও তো খারাপ কিছু বলে নি। তোমার গুণের কথা বললেই তুমি দেখছি রেগে যাও। কী বিনয়, আহা। তোমার মা খুবই পুণ্যবতী মহিলা, তাঁর বিপত্তারিণী ব্রত করা সার্থক। তাঁর সঙ্গে অন্ততঃ একবার দেখা করতে খুব ইচ্ছে হয়...।

নেপালঃ   আমি চাই না আমার মায়ের সঙ্গে এখনই আপনাদের দেখা হোক।

সনৎ ও কমলঃ কেন? কেন? চাও না কেন?

নেপালঃ   আপনাদের এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। আপনাদের স্নেহের ছায়ায় আমরা আরও বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্তে থাকি, এই আমাদের লোভ।

সনৎঃ    সে আবার কী? তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, বিপদ, বড়ো বিপদে ফেলছো।

নেপালঃ   আমার মা দেহ রেখেছেন, বহুদিন। ইহকালে তাঁর সঙ্গে আর দেখা করা সম্ভব নয়।

কমলঃ    ইস্‌ চলে গেছেন? দেখা হল না?

সনৎঃ    আহারে, মা-মরা ছেলে, বড়ো দুঃখ কষ্টে মানুষ।

কমলঃ    কত বিপদ আপদ সামলে, তবেই তো আজকের বিপদ্‌তারণ। ও নিয়ে আর দুঃখ করো না, বিপদ, বাপ-মা চিরদিন কারো থাকে? থাকে না।

[নেপালের মুখ নিচু, চোখ ছলছলে]

সনৎঃ    মায়ের কথায় বড়ো দাগা পেয়েছে ছেলেটা। আহা রে, বেচারা। দুঃখ কোরো না বিপদ, তাঁর ব্রতের কথা মনে করে, আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করো।

নেপালঃ   (চোখ মুছে) সে কথা একশবার কাকাবাবু, বলুন আপনাদের বিপদে আমি কী ভাবে সাহায্য করতে পারি? আমি কিন্তু শুধু টাকার সুরাহা করে দিতে পারি, অন্য কিছু পারি না।

সনৎঃ    যাচ্চলে! টাকার সুরাহা মানে? কম সুদে লোন? লোন নিয়ে শুধবো কী করে?

কমলঃ    না, না, তবে আর আমাদের বিপদের থেকে উদ্ধার করে লাভ নেই, বিপদ, লোন-টোন চাই না। ব্যাংকের থেকে রোজ পাঁচ-ছটা ফোন আসে, আমার জন্যেই নাকি অনেক টাকার লোন অ্যাপ্রুভ্‌ড্‌ হয়ে আছে, “হ্যাঁ” বললেই হয়। ওই রকম লোন নিয়ে ডুবব? পাগল হয়েছো?

নেপালঃ   ওফ্‌ কাকাবাবু, আপনারা আমার কথা তো শুনলেনই না। উলটে লোন ভেবে বসলেন। আপনার যা টাকা আছে আমি তাকে ডবল করে দিতে পারি!

সনৎঃ    ওই ফেরেব্বাজ মংলার মতো? চার বছরে ডবল? তারপর কোম্পানি উলটে যাবে?

কমলঃ    ওই চক্করে আমরা পড়ব না, বিপদ।

নেপালঃ   চার বছরে নয়, চব্বিশ ঘন্টায়। আপনার চোখের সামনে। আজকে যা নেবো, আগামীকাল আপনার হাতে ডবল তুলে দেব।

হরিঃ      আজ দশ দিলে কাল বিশ, আজ বিশ দিলে কাল চল্লিশ!

সনৎঃ    সত্যি বলছো?

নেপালঃ   (ক্ষুণ্ণ হয়ে) দেখলি গোপাল, তখনই বললাম, আমার নামে সাতকাহন করে বলিস না, কেউই বিশ্বাস করবে না।

কমলঃ    আহা, তুমি অত উতলা হয়ো না, বিপদ। আমরা সাধারণ ছা পোষা মানুষ তো, এই সব অলৌকিক ব্যাপার স্যাপার শুনলে চমকে উঠি।

সনৎঃ    মানে, আজকে এখন আমি যদি তোমাকে দুলাখ দিই, কাল তুমি আমাকে চার লাখ দেবে?

নেপালঃ   প্রথমে ছোট করে শুরু করুন না। আমি লোকটা কেমন আগে সেটা যাচাই করে নিনআজকে ধরুন পাঁচহাজার দিলেন, আর আপনাদের চোখে ধুলো দিয়ে রাত্রে আমরা বেপাত্তা হয়ে গেলাম! তখন? আপনার পাঁচহাজারই লস হবে।  সেটুকু আপনারা সামলে নিতে পারবেন! কিন্তু দুলাখের ধাক্কা কী সামলাতে পারবেন?

হরিঃ      আমরা যদি চিটিংবাজ, ফেরেব্বাজ হই, আপনাদের আমও যাবে ছালাও যাবে।

নেপালঃ   শুধু ওটা নয় গোপাল, আরেকটা আছে। খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে কিনে।

সনৎঃ    এই চব্বিশঘন্টা কী তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকবে?

নেপালঃ   তবে? আপনাদের বাড়িতেই তো থাকবো! আজ সিঙ্গল টাকা নিয়ে যাবো, কাল আবার ডবল নিয়ে ফিরে আসবো? আমাদের যাওয়া আসার খরচ, ট্রেনভাড়া, বাস ভাড়া...

হরিঃ      খাই খরচাও আছে একটা...

নেপালঃ   ঠিক। আপনাদের বাড়িতেই রইলাম। দুটো শাকভাত যা খাওয়ালেন খেলাম, রাতটা আপনারই বাড়িতে কাটিয়ে, সকালে আপনার হিসেব পত্র বুঝিয়ে তবে আমাদের ছুটি।

সনৎঃ    কি বলছিস, কমল?

কমলঃ    আমি তো খারাপ কিছু দেখছি না।

সনৎঃ    আমিও না। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করা উচিৎ?

কমলঃ    কক্ষণো না। যে ছাড়ে সে আহাম্মক।

হরিঃ      (সুর করে) আহাম্মকের এক, যে পরকে ধার দিয়ে, নিজের খালি রাখে ট্যাঁক।

          আহাম্মকের দুই, যে নিজের চালে তুলতে দেয় পড়শীজনের পুঁই।

নেপালঃ   আঃ গোপাল, তুই চুপ করবি? এখানে অত্যন্ত সিরিয়াস একটা ব্যাপার নিয়ে কথা চলছে, আর তুই চ্যাংড়ামি করছিস?

কমলঃ    আহা, বিপদ, ছেলেমানুষ একটু বাচালতা করবে বৈকি! আর তোমার মতো ধীর স্থির গুণী কী আর সবাই হতে পারে? তাহলে কী ঠিক করলি সনৎ?

সনৎঃ    একটা কথা আমার খটকা লাগছে, সেটা বলি?

নেপালঃ   কি খটকা, কাকাবাবু বলুন না। ইফ ইন ডাউট, আক্স, ইয়ে মানে...আস্ক।

কমলঃ    তোর আবার কিসের খটকা রে, সনৎ। আমি তো কিছু দেখছি না।

সনৎঃ    তুমি অন্যের টাকা ডবল করে বেড়াচ্ছো? অথচ নিজের টাকা ডবল করে করে, তুমি বড়োলোক হওনি কেন?

নেপালঃ   মোক্ষম প্রশ্ন করেছেন কাকাবাবু। আপনার পায়ের ধুলো দিন। যাবার সময় আরো নিয়ে যাবো। মাদুলিতে ভরে ঊর্ধবাহুতে বেঁধে রাখবো। আপনি এ প্রশ্নটা না করলে আপনার সরলতায় আমি মুগ্ধ হতাম, কিন্তু শ্রদ্ধা করতে পারতাম না। এখন পারবো, আপনার মতো বিচক্ষণ মানুষকে শ্রদ্ধা না করে, অন্য উপায় আছে?

কমলঃ    ঠিকই তো, এই প্রশ্নটা আমার মাথায় তো আসেনি। সনৎটা চিরকালই আমার থেকে ভালো ছাত্র ছিল, অঙ্কে বরাবর আমার থেকে দশবারো নম্বর বেশি পেত।

নেপালঃ   আমার যে মন্ত্রের শক্তিতে টাকা ডবল হয়, সেটা আমি নিজের জন্যে ব্যবহার করতে পারি না। সে নিয়ম নেই। মায়ের কঠোর নির্দেশ আছে। নিজের জন্যে কিংবা নিজের কোন আত্মীয় পরিজনের জন্যে আমি এই মন্ত্র ব্যবহার করতে পারবো না। করলেই মন্ত্রের শক্তি হাপিস হয়ে যাবে।

সনৎঃ    তাই? তাহলে তোমার স্বার্থ কী?

নেপালঃ   স্বার্থের জন্যে তো করি না, কাকাবাবু। আর্তপীড়িতের সেবার জন্যেই এই ব্রত।

কমলঃ    ওসব মন্ত্রের অনেক নিয়ম কানুন আছে রে, সনৎ। আমরা পাপীতাপী মানুষ ওসবের কী বুঝবো?

সনৎঃ    তাই তো মনে হচ্ছে রে!

নেপালঃ   তবে একেবারে কোন স্বার্থই নেই তাও বলব না।

[সনৎবাবু ও কমলবাবু দুজনেই নেপালের মুখের দিকে তাকালেন]

কমলঃ    কী স্বার্থ বিপদ?

নেপালঃ   আমি সামান্য কিছু কমিশন নিয়ে থাকি, মাত্র দশ পার্সেন্ট। মানে যে টাকাটা আপনার বাড়ছে, তার দশ পার্সেন্ট। ধরুন আপনি পাঁচ হাজার দিলেন, আমি দেব দশ। বাড়তি এই পাঁচের দশ পার্সেন্ট – মানে পাঁচশটাকা আমি নেব। মানে ইয়ে, এটাও না নিতে পারলে ভালো হত, কিন্তু আমাদের জীবন ধারণের জন্য, গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যেও তো কিছু অর্থের প্রয়োজন হয়ই! তা ছাড়া বিপত্তারিণী মায়ের নিয়মিত পুজো দিতে হয়, তারও একটা ব্যয় আছে।

কমলঃ    আরে এর জন্যে এত সংকোচ করছো কেন? ওটা তো তোমার পাওনা!

হরিঃ      জিএসটির কথাটা ভুলে গেলে দাদা? আঠেরো পার্সেন্ট জিএসটি। ওই পাঁচশোটাকার ওপর।

নেপালঃ   ও হ্যাঁ। এর ওপর আছে জিএসটি। ওটা তো আমারও নয়, আপনারও নয়, সরকারের টাকা। উন্নয়নের টাকা।

          জিএসটি জমা করে, চালানের জেরক্স আপনাদের পাঠিয়ে দেব।  

কমলঃ    ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। বুঝে গেছি। তোমাকে আর অত কিন্তু কিন্তু করতে হবে না।

সনৎঃ    (নেপালের দুই হাত ধরে) একটা অনুরোধ ছিল বাবা, না করতে পারবে না।

নেপালঃ   ছি ছি এ কী বলছেন, কাকাবাবু, অনুরোধ বলবেন না, আদেশ করুন।

সনৎঃ    ভাবছি তোমাকে পাঁচলাখ দিয়ে দশলাখ ঘরে তুলবো, সেক্ষেত্রে তোমার কমিশন হবে পঞ্চাশ হাজার টাকা, তার ওপরে আবার আঠের পার্সেন্ট জিএসটি, আমি যে ধনে প্রাণে মারা যাবো, বাবা। বুড়ো কাকাবাবুর মুখ চেয়ে একটু কী কনসিডারেশন হতে পারে না বাবা? এই ধরো পঞ্চাশের জায়গায়, পঁচিশ?

নেপালঃ   আপনার মতো শ্রদ্ধেয় গুরুজনের সঙ্গে দরদাম করতে লজ্জা করছে কাকাবাবু। আপনি যখন এভাবে বলছেন, তখন না করি কী করে? কিন্তু পঁচিশ নয় কাকাবাবু, ওটা চল্লিশ করুন আমার একটু লস হয়ে যাবে, তা হোক

সনৎঃ    আচ্ছা বাবা, আচ্ছা, আমার কথাটা রাখো। তোমার কথাও থাক, আমার কথাও থাক, তিরিশের বেশি দিতে পারবো না, বাবা।

হরিঃ      আর না করো না, দাদা। গুরুজন এত করে বলছেন।

নেপালঃ   বলছিস?

হরিঃ      বলছি দাদা। তোমার ব্রত সকলকে আনন্দে রাখা, খুশিতে রাখা, ওটুকু স্যাক্রিফাইস তোমায় করতেই হবে দাদাআমরা না হয় কটা দিন আলুচোখা আর ভাত খেয়েই দিন কাটাবো!

নেপালঃ   ঠিক আছে, তুইও বলছিস যখন তাই হোক।

হরিঃ      তোমার দয়ার শরীর দাদা। তুমি না দিলে কে দেবে? তবে কাকাবাবু, জিএসটি কিন্তু পুরোই দিতে হবে। ওই পঞ্চাশের ওপর আঠেরো পার্সেন্ট।

সনৎঃ    কেন? তিরিশের ওপরে হবে!

হরিঃ      আমাদের কোয়ার্টারলি জিএসটি রিটার্ন সাবমিট করতে হয়, প্রত্যেকবারই আমরা দশ পার্সেন্ট কমিশনের ওপর জিএসটি জমা দিই। এবারে তিরিশ নিয়েছি বললে, ডিপার্টমেন্ট থোড়ি শুনবে, তারা পঞ্চাশের উপরেই জিএসটি হিসেব করবে, তখন আমাদের ওই তিরিশের থেকে আবার বকেয়া জিএসটি গুনতে হবে।

সনৎঃ    আহা, পুরোটা দেখাবে কেন? তিন লাখ দেখাবে, তাহলেই ল্যাঠা চুকে যাবে।

নেপালঃ   (একটু রুষ্ট স্বরে) মিথ্যার আশ্রয় আমি নিতে পারবো না, কাকাবাবু। তাহলে আমাদের ছেড়ে দিন। আর ভারতীয় কারেন্সি নোট, রিজার্ভ ব্যাংকের কোষাগার থেকেই তো আসবে। এ তো আর জাল নোট নয়, যে তার কোন হিসেব নেই! রিজার্ভ ব্যাংক হিসেব ভুল করবে? তারা পাঁচ লাখ দিয়ে বলবে তিনলাখ দিয়েছে?

সনৎঃ    ও বাবা, এতো কাণ্ড? ব্যাপার রিজার্ভ ব্যাংক পর্যন্ত গড়াবে?

কমলঃ    যা বুঝিস না, তা নিয়ে কথা বলিস কেন? পাঁচলাখ ডবল করে, কী তোকে বিদেশী নোট দেবে? সে নোট তোর কী কাজে আসবে? দেশী নোট রিজার্ভ ব্যাংক ছাড়া আর কে দেবে? তুমি রাগ করো না, বাবা বিপদ। তুমি যেমন বলছো তেমনই হবে।

নেপালঃ   কী করবেন, দেখুন চিন্তা ভাবনা করে। আপনাদের ভাল লেগেছিল বলে, এত কথা বললাম, তা নইলে আমরা তো মঙ্গলবাবুর বাড়িই যাচ্ছিলাম।

সনৎঃ    বুড়ো মানুষ কী বলতে কী বলে ফেলেছি, ওসব মনে রাখতে নেই, বাবা। ভাবনা চিন্তার কিচ্ছু নেই, আমরা মনস্থির করেই ফেলেছি। আমি পাঁচ লাখ, কমল তুই কত করবি?

কমলঃ    আমিও তাই পাঁচ কিংবা ছলাখ। দেখি কতটা তুলতে পারি। ব্যাংকের থেকে ক্যাশ তুলতে হবে তো। অত কী আর ঘরে থাকে? এখন তো সবে সোয়া সাতটা বাজে, ব্যাংক খুলবে সেই বেলা দশটায়। ততক্ষণ তুমি কী করবে বাবা?

নেপালঃ   আমরা ততক্ষণ এই পার্কেই বসি।

কমলঃ    মঙ্গলের বাড়ি যাবে না?

নেপালঃ   যে বাড়ির কাজ আমাকে সেই বাড়িতেই থাকতে হবে যে, আপনাদের কাজ করলে আর মঙ্গলবাবুর বাড়িতে থাকবো কী করে?

সনৎঃ    তাই তো! সেই ভালো হবে, বাবা বিপদ, তুমি আমার বাড়িতে চলো। কমল তুইও আমার বাড়িতেই চলে আয়। আমার বাড়িতে রাত কাটিয়ে কাল সকালে হিসেবপত্র চুকিয়ে তারপর না হয়, মঙ্গলের বাড়ি যেও!

নেপালঃ   আমিও সেটাই ভাবছি।

কমলঃ    বাস, তাহলে ওটাই ফাইন্যাল, বিপদ আর গোপাল তোর বাড়িতেই থাকবে, আমিও টাকা তুলে তোর ওখানে চলে আসছি।

নেপালঃ   এখন আমরা তাহলে এই পার্কেই থাকি?

সনৎঃ    সে কী কথা, কেন? আমার সঙ্গে চলো।

নেপালঃ   না, না, বলা নেই কওয়া নেই, আমরা দুজন উটকো বিপদ হুম হুম করে ঘরে ঢুকে পড়বো, কাকিমা কী ভাববেন? আপনি বাড়ি গিয়ে কাকিমাকে সব কথা খুলে বলুন, আমরা আসছি ঘন্টা খানেকের মধ্যে।

সনৎঃ    বাড়ির কর্তা কে, আমি না তোমার কাকিমা? ওসব তোমায় চিন্তা করতে হবে না। বাড়িতে আমার কথাই শেষ কথা। তোমার কাকিমা আমাকে কী বলে জানো? হে হে হে হে, পুরুষসিংহ।

কমলঃ    যাঃ যাঃ, নিজের কথা অত ফলাও করে বলতে হয় না। বিপদকে দেখে শিখলি না, কেমন বিনয়ী, নিজের কথা বলা তো দূরের কথা, শুনতে অব্দি চায় না! ওরা কিছুক্ষণ যদি পার্কে থাকতে চায় থাক না। সনতের বাড়ি এখান থেকে মিনিট পনেরর হাঁটা পথ। ইলেক্ট্রিক অফিসের উল্টোদিকে, যে কেউ বললেই দেখিয়ে দেবে, বিপদ সনতের বাড়ি খুঁজতে কোন অসুবিধে হয় না।

নেপালঃ   ওঃ তাহলে তো কোন ব্যাপারই নেই, আমরা ঠিক পৌঁছে যাবো। আপনারা আসুন। ওদিকের যোগাড়-টোগাড় করে, শুভকাজ যত শিগ্‌গির শুরু করা যায় ততই ভালো। তবে ব্যাপারটা পাঁচকান করবেন না। সবাই তো আপনাদের মতো লোক নয়, কার মনে কী আছে, কে জানে!

কমলঃ    পাগল হয়েছে? এ সব কথা কেউ পাঁচকান করে? পড়শীদের চোখ টাটাবে না? তাহলে আসি?

হরিঃ      কাকু, কিছু টাকা অ্যাডভান্স পাওয়া যাবে, হাজার খানেক? একটু দরকার ছিল।

সনৎঃ    হাজার খানেক? না তো বাবা, মর্নিং ওয়াকে বেড়িয়ে অত টাকা সঙ্গে থাকে কি? আমার কছে শ দেড়েক হবে, কমল তোর কাছে?

কমলঃ    আমারও তাই, ওই শ দুয়েক।

হরিঃ      তাই দিন না। সাড়ে তিনশতেই চালিয়ে নেবো। (পকেট ঝেড়ে দুজনেই হরিকে টাকা দিলেন।) থ্যাংকিউ কাকু।

কমলঃ    আমরা তাহলে আসি? তোমরা তাহলে সনতের বাড়ি আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে চলে আসছো?

নেপালঃ   পাক্কা, কথার খেলাপ হবে না কাকাবাবু।

সনৎঃ    সে আমি তোমায় দেখেই বুঝেছি, বাবা।

[নেপালের মুচকি হাসি। দুজনের প্রস্থান]

নেপালঃ   হঠাৎ ভিখিরির মতো টাকা চেয়ে বসলি কেন? ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে ভালো লাগে?

হরিঃ      একটা পয়সা নেই, পকেটে, নিজের ইচ্ছেমতো একটু চা সিগারেট খাবো, তারও উপায় ছিল না। পতিত তোমাকে ধারের খাতায় আবার চা সিগারেট খাওয়াতো বুঝি?

নেপালঃ   (হেসে) তা অবশ্য ঠিক। মামারবাড়িতে আদরটাই জোটে, যখন ছেড়ে দেয় তখন যেন ট্যাঁকখালির জমিদার। চ একটু চা খাই, পতিতের দোকানে নয়, অন্য কোথাও। শালার চা তো নয় যেন ঘোড়ার হিসি!

[দুজনের প্রস্থান, পর্দা নেমে এল]

 

তৃতীয় অঙ্ক

 

[প্রথম দৃশ্য]

[সনৎবাবুর বসার ঘর। বাঁদিকে বাইরে যাওয়ার দরজা, ডানদিকে বাড়ির ভেতরে। লম্বা সোফায় বসে সনৎবাবুর স্ত্রী পৃথুলা পৃথা দেবী। পাশে আরো দুটো তিনটে চেয়ার। চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিচ্ছেন সুউউড়ুউউৎ। সোফার পিছনের দেয়ালে ঘড়ি, সময় পৌনে আটটা। সদর দরজায় বেলের আওয়াজ হল, টিং টং।]

 

পৃথাঃ     (চেঁচিয়ে) দরজা খোলা আছে, বেল বাজিয়ে আর পাড়া মাথায় করতে হবে না। 

[বাইরে দরজা খোলা এবং বন্ধের আওয়াজ, তারপর সনৎবাবুর প্রবেশ]

          কী হল আজ এত দেরি যে? পতিতের চায়ে কী আফিং মেশায় নাকি বলো তো, বাড়ির কথা আর মনেই পড়ে না।

সনৎঃ    ওই একটু দেরি হয়ে গেল, মিনিট পনেরো মতো।

পৃথাঃ     আমি কী ঘড়ি দেখতে জানি না, আমাকে টাইম বোঝাচ্ছো? রোজ সাতটায় চা করে, তুমি ডাকো। আজ সাড়ে সাতটা বাজল, তাও তোমার পাত্তা নেই দেখে আমিই উঠে চা করলাম।

সনৎঃ    একটা দিন যদি সকালে চা করেই থাকো, তাতে হয়েছেটা কী?

পৃথাঃ     তোমার ওই মিচকে পোড়া বুদ্ধি আমি বুঝি না মনে করেছ? চা বানাতে গেলেই তোমার গায়ে জ্বর চলে আসে। ফাঁকি মারার কিছু না কিছু একটা ছুতো ঠিক বের করে ফেলবে।

সনৎঃ    ওঃ ভাষার কী ছিরি – “মিচকে পোড়া বুদ্ধি”! সারারাত কী যত্তো আজেবাজে কথা চিন্তা করে রাখো, নাকি?  যাতে সকাল ঘুম থেকে উঠেই তোমার বুলি ঝাড়তে পারো!

পৃথাঃ     এ সব বুলি তোমাদের বাড়ি এসেই শেখা। আমাদের বাড়িতে এরকম ছোটলোকের ভাষা কোনদিন শুনেছ? বিয়ের পর থেকে যেমন শুনেছি তেমনি শিখেছি।

সনৎঃ    বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথা শোনো দেখি। আমার চা কোথায়, বানাওনি?

পৃথাঃ     তোমার বাড়ির কথা বললেই বাজে কথা হয়ে যায়, না? আর তোমার মতো কুচুটে মন আমার নয়, নিজের চা করলে তোমার চাও করি। রান্নাঘরে চাপা আছে, নিয়ে এসে গিলে নাও।

(সনৎবাবুর প্রস্থান, সামান্য পরেই চায়ের কাপ হাতে প্রবেশ)।

সনৎঃ    (চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে) তোমার হাতে জাদু আছে পিথু, এমন চা সাতজন্মেও আমি করতে পারবো না।

পৃথাঃ     ওসব মন ভুলোনো তেলমাখা কথায় আমি ভুলছি না। কী কাজের কথা আছে বলছিলে, সেটা ঝেড়ে কাশো।

সনৎঃ    ঠাণ্ডা মাথায় শুনতে হবে কিন্তু, খুব গোপন কথা। তোমার যা চেঁচামেচি করা স্বভাব, ভয় হয় পাড়ার লোক জেনে যাবে।

পৃথাঃ     আমার মাথা গরম? আমি চেঁচামেচি করি? আমার গলা পড়শিদের সবাই শুনতে পায়?

সনৎঃ    আঃ, তাই বললাম বুঝি?

পৃথাঃ     বলতে বাকি কী রাখলে? এসবও তোমার বাড়ির শিক্ষা। তোমার মা থাকতে তো বাড়িতে কাগচিল বসতে ভয় পেত। এখন দেখ গে, ছাদের আলসেতে কত কত কাগ বসে বসে হাগছে, হুস্‌ হুস্‌ করলেও ওড়ে না।

সনৎঃ    আচ্ছা বাবা, আচ্ছা, তোমার কণ্ঠস্বর কোকিলপোড়া-মধুমাখা, আর এবাড়ির সবার গলা চিরতা মাখা। কথাটা বলতে দেবে?

পৃথাঃ     ছিলই তো? পাড়ার পাঁচজনকে জিগ্যেস করে এসো না, তোমার মায়ের গলার আওয়াজে পাশের বাড়ির বাচ্চা ডুকরে কেঁদে উঠত কী না? পুকুরের ওপাড় থেকে চৌকিদার পবন সিং দৌড়ে আসেনি, এবাড়িতে ডাকাত পড়েছে ভেবে?

সনৎঃ    এখন আবার ইতিহাস বানাতে বসলে? বলি, কথাটা শুনবে কী?

পৃথাঃ     বললেই শুনব। তুমি পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করবে, আর আমি কাটা কাটা উত্তর দিলেই অমনি লেজগুটিয়ে কেঁউ কেঁউ...আচ্ছা বলো।

সনৎঃ    মোক্ষম একটা সুযোগ এসেছে, চব্বিশঘন্টার মধ্যে ঘরে বসে টাকা ডবল।

পৃথাঃ    আজকাল পতিত চায়ে গ্যাঁজার রসও মেশাচ্ছে নাকি? হতভাগাকে আমি জেলে পাঠাবো।

সনৎঃ   আরে ধ্যাত্তেরি পুরোটা না শুনেই আবোলতাবোল বকে চলেছএই জন্যেই বলে মেয়েলি বুদ্ধি।

পৃথাঃ     মেয়েছেলের মেয়েলি বুদ্ধি হবে না তো, ষাঁড়ের বুদ্ধি হবে? তোমার ধানাইপানাই রেখে আসল কথাটা কখন বলা হবে শুনি?

সনৎঃ    সেটাই তো বলার চেষ্টা করছি, তুমিই তো বারবার ব্যাগড়া দিয়ে কথার খেই হারিয়ে দিচ্ছো। পতিতের দোকানে আজ দুজনের সঙ্গে আলাপ হলো, বিপদ্‌তারণ আর গোপাল। দুজনে যাচ্ছিল মংলার বাড়ি টাকা ডবল করতে।

পৃথাঃ     মংলার বাড়ি? তার টাকার অভাব? তার টাকাও ডবল করতে হয়?

সনৎঃ    সেই কথাই তো বললাম, আমরা গরীবদুঃখী থাকতে তোমরা মঙ্গলবাবুর বাড়ি যাবে কেন, ভাই? আমাদের বিপদের হাত থেকে তোমাকেই রক্ষা করতেই হবে।

পৃথাঃ     এই আমরাটা আবার কে? তুমি ছাড়া আর কে ছিল?

সনৎঃ    কেন? কমল ছিল, রোজই তো আমরা একসঙ্গে মর্নিং ওয়াকে যাই।

পৃথাঃ     আবার সেই কমল? তাকেও তুমি এর মধ্যে জোটালে?

সনৎঃ    আরে বুঝছো না, পুরোনো বন্ধু সঙ্গে থাকলে যুক্তি শলা পরামর্শ করতে সুবিধে হয়।

পৃথাঃ     ছাই হয়। সব ব্যাপারে ওর তোমাকে টেক্কা দেবার স্বভাব – এ আমি বরাবর দেখে আসছি। কুচুটে আর হাড়ে বজ্জাত।

সনৎঃ    যাঃ এ তোমার রাগের কথা। তারপর কী হল শোনোই না।

পৃথাঃ     আর কী শুনবো? আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। আমাদের টাকা ডবল হলে, ওদের ওপর আমরা একটু ইয়ে করতে পারতাম। কমলের বউয়ের যা গুমর! আমার থেকে অন্ততঃ দশ বছরের বড়, তাও বলবে, (ভ্যাংচানো স্বরে) “দিদিভ্যাই তুমি না থ্যাকলে একা একা বাড়িতে আমি তো ভয়েই ম্যারা যেতাম”। ন্যাকা! আমি যেন সাতকেলে বুড়ি, আর উনি কচি খুকি, নাক টিপলে দুধ বেরোয়! আদিখ্যেতা একদম সহ্য হয় না।

সনৎঃ    তুমি কী এখনই কমলের বউয়ের গুষ্টি উদ্ধার করতে বসলে? এদিকে কত কাজ পড়ে আছে, সে জানো?

পৃথাঃ     আচ্ছা বলো।

সনৎঃ    ওরা সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের এখানেই আসবে।

পৃথাঃ     কারা আসবে?

সনৎঃ    বললাম যে, বিপদ্‌তারণ আর গোপাল – ওরাই তো টাকা ডবল করবে।

পৃথাঃ     তা আসে আসুক না, আমি কী তাদের বাড়া ভাতে ছাই ঢালতে যাবো নাকি?

সনৎঃ    ওরা দুপুরে খাবে। রাত্রে থাকবে, রাত্রেও খাবে। কাল সকালে আমাদের ডবল টাকার হিসেব বুঝিয়ে তারপর যাবে।

পৃথাঃ     এটা কী সরকারি লঙ্গরখানা নাকি ভাতের হোটেল? চারবেলা করে শুধু থাকবে আর খাবে! আমি ওসব পারবো না। 

সনৎঃ    ওফ্‌ কথাটা বুঝছো না। ওদের হাতে টাকা তুলে দেবো, তারপর যদি গা ঢাকা দেয়! আমাদের বাড়িতেই রাখবো, যতক্ষণ না টাকা ডবলের হিসেব দিচ্ছে, ততক্ষণ ছাড়া হবে না।

পৃথাঃ     অ, তাই বুঝি? কদিন আগে টিভিতে দেখাচ্ছিল, চিটিংবাজ কিছু লোক এইভাবে টাকা নিয়ে গায়েব হয়ে যায়, তারপর আর ফেরে না।

সনৎঃ    তবে? আমাকে কী অত বোকা পেয়েছো। আমি কড়ার করে নিয়েছি, কোত্থাও বেরোনো হবে না, টাকা ডবল হলে, পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে তবে মুক্তি।

পৃথাঃ     পাওনাগণ্ডা? থাকবে খাবে তারপরেও আবার পাওনা কিসের?

সনৎঃ    বাঃ রে, ওরা একটা কমিসন নেবে না? তা নাহলে ওদের চলবে কী করে?

পৃথাঃ     সেটা কত?

সনৎঃ    পাঁচলাখে পঞ্চাশ চেয়েছিল...

পৃথাঃ     তার মানে?

সনৎঃ    আমি ওদের পাঁচলাখ দেব, ওরা আমাকে সাড়ে ন লাখ দেবে।

পৃথাঃ     প - ন - চা – শ? টাকা কী খোলামকুচি নাকি?

সনৎঃ    আরে, না রে, বাবা, আমাকে অত বোকা পেয়েছো নাকি? পঞ্চাশ বললে অমনি পঞ্চাশেই রাজি হয়ে যাবো? পঁচিশ দিয়ে শুরু করেছিলাম, অনেক দরদাম, আকচাআকচি করে তিরিশে নামিয়েছি।

পৃথাঃ     মাথামোটা, তুমি আর বুদ্ধির বড়াই করো না। আমি হলে, দশ দিয়ে শুরু করে পনেরোয় রফা করে ফেলতাম। তোমরা ব্যাটাছেলেদের এমন উড়নচণ্ডে স্বভাব কেন বলো তো? হাতে কিছু টাকা আসতে না আসতেই ওড়াতে শুরু করো? টাকা রোজগার করতে কত মেহনত করতে হয় জানো?

সনৎঃ    বা রে সারাজীবন চাকরি করলাম, সংসার পালন করলাম, আমি জানবো না?

পৃথাঃ     যাও যাও আমার কাছে আর ঝাঁপ তুলো না। বাপ কিছু ইঁটকাঠ জড়ো করে বাড়িটা করে গেছিলেন, তাই তোমার এত ফোপরদালালি! তারপর আমি এসে সংসারের হাল ধরাতে, এ যাত্রায় কোনরকমে উৎরে গেলে। অন্য কেউ হলে তোমাকে খুঁজে পাওয়া যেত?

সনৎঃ    আচ্ছা আচ্ছা, সে সব কথা পরে শুনবো। আমি পাক্কা দশটায় ব্যাংকে যাবো। তার আগে সব ঠিকঠাক করে ফেলতে হবে।

পৃথাঃ     ব্যাংকে কেন?

সনৎঃ    টাকা তুলতে হবে না? ঘরে আর কতো আছে। ভাবছি পাঁচ তুলবো[দরজায় বেলের শব্দ] ওই ওরা চলে এল বোধহয়।

পৃথাঃ     কারা আবার এল, এই অসময়ে?

সনৎঃ    বললাম যে, বিপদ্‌তারণ আর গোপাল আসবে, যারা টাকা ডবল করবে। আমাদের এখানে থাকবে

[সনৎবাবু দরজা খুলে দিতে নেপাল ও হরির প্রবেশ]

নেপালঃ   আপনি নিশ্চয়ই কাকিমা। [পৃথাদেবী কিছুটা থতমত খেয়ে ইতস্তত করলেন]

পৃথাঃ     হ্যাঁ মানে না, ইয়ে আমিই... [নেপাল গড় হয়ে প্রণাম করল]

নেপালঃ   ওঃ সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা দর্শন হল, গোপাল, প্রণাম কর। এমন সুযোগ বড় আসে না রে। [বিগলিতা পৃথাদেবীকে হরির প্রণাম]

পৃথাঃ     আরে বোসো বোসো, চা খাবে তো? চা করে আনি?

নেপালঃ   ব্যস্ত হবেন না, কাকিমাবরং আপনারা দুজনে পাশাপাশি বসুন দেখি, দু চোখ ভরে একটু দেখি। আহা, যেন হর-গৌরী। শিব-পার্বতী। [সনৎবাবু সোফায় বসলেন পৃথাদেবীর পাশে] বাঃ, বেশ মানিয়েছে। এবার চট করে কিছু কাজের কথায় আসি। প্রথমেই জিগ্যেস করি, ওই কাকুটা – কমলকাকু আপনার স্কুলের বন্ধু বললেন। কেমন লোক?

সনৎঃ    কেন বলো তো?

নেপালঃ   ছোটমুখে বড়ো কথা শুনে রাগ করবেন না যেন, উনি তেমন সুবিধের লোক নন।

পৃথাঃ     ওই কথাই তো আমি সারাটা জীবন বলে আসছি। কিন্তু আমার কথা কানে তুলবে কেন?

নেপালঃ   না না কাকাবাবু, কথাটা হাল্কা ভাবে নেবেন না। উনি কিন্তু চান না, আপনার ভালো হোক।

পৃথাঃ     যে একবার দেখবে সেই ওকথা বলবে। কী জাদুতে যে তোমাদের কাকুকে ও বশ করেছে কে জানে। কিছু বলতে গেলেই একেবারে ফোঁস করে ওঠে। বলে আমার স্কুলের বন্ধু।

নেপালঃ   কাকাবাবু শিবতুল্য মাটির মানুষ। উনি কী করে আন্দাজ পাবেন ধূর্ত লোকের পেটে কী খেলা চলছে?

পৃথাঃ     শিবতুল্য না ছাই। মাথামোটা আর একলষেঁড়েযে পারে এসে মাথায় কাঁঠাল ভাঙে।

নেপালঃ   সে যাই হোক। কমলকাকু আসবেন, ওঁনার সঙ্গে আর কেউ যেন না আসে, এ কথাটা একটু কড়া করে বলে দেবেন।

পৃথাঃ     কমলও আসবে নাকি? কই আমাকে তো বলোনি? সেও এখানে থাকবে, খাবে?

সনৎঃ    বলার আর সুযোগ দিলে কোথায়?

পৃথাঃ     আমি সুযোগ দিলাম না? এতক্ষণ এত আবোলতাবোল বকতে পারলে, আর ওই কথাটাই বলা হল না? ভাগ্যিস বিপদ্‌ বলল, তা নইলে তো বিপদ আরও বাড়তো। তোমারই নাম বিপদ তো?

নেপালঃ   আজ্ঞে আমি বিপদতারণ, কিন্তু পুরো নামটা না বলে, সবাই বিপদ ডেকে আনে।

পৃথাঃ     “বিপদ ডেকে আনে”? হি হি হি হি বেশ বলেছো কথাটা।

হরিঃ      এ সেই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো, বিপদ ডেকে, বিপদ তাড়ানো...[সনৎবাবু আর পৃথাদেবী খুব হাসলেন।] আমি গোপাল।   

নেপালঃ   বাজে বক বক করিস না, গোপাল আজকের এই যজ্ঞের জন্যে, অনেক আয়োজন করতে হবে। আমাদের কিন্তু বেশী সময় নেই, কাকাবাবু। প্রথমেই আমাদের একটা নির্জন ঘর দরকার, যেখানে টাকা ডবল হবে।

পৃথাঃ     নির্জন মানে?

নেপালঃ   একটু আলাদা, যেখানে আপনারা কয়েকজন মানে আপনি, কাকাবাবু আর বিমলকাকু ছাড়া, আর কেউ না ঢুকতে পারে।

পৃথাঃ     কতক্ষণের জন্যে?

নেপালঃ   মোটামুটি চব্বিশ ঘন্টা ধরে রাখুন। কাকাবাবু ব্যাংক থেকে কখন আসবেন?

সনৎঃ    ব্যাংকের ব্যাপার তো, কতক্ষণ লাগবে কে জানে? দশটায় ব্যাংক খুলতেই যাবো, একটা দেড়টা তো হয়েই যাবে।

নেপালঃ   হুঁম, আজ দেড়টা দুটোতে যদি শুরু করতে পারি, আশা করি কাল দশটা এগারোটার মধ্যে আপনাদের খুশি করতে পারবো।

পৃথাঃ     তাই? কাল সকালেই ডবল? বিশ্বাসই হচ্ছে না।

সনৎঃ    প্রথম শুনে আমারও বিশ্বাস হয়নি।

নেপালঃ   আজ্ঞে, সে কথা একশ বার, বিশ্বাস না হবারই কথা। সবই মা বিপত্তারিণীর কৃপা। কিছুটা গঙ্গাজল লাগবে। একছড়া কলা লাগবে। কিছু কুচো ফুল, তুলসী, দুব্বো আর বেলপাতা। আর যদি পাঁচটা ফল দেন, ব্যস্‌মা এতেই সন্তুষ্ট।

পৃথাঃ     পুজো হবে না কি?

হরিঃ      পুজোই তো! মা বিপত্তারিণীর পুজো, আমার দাদা যে তাঁর মানস পুত্র। 

নেপালঃ   গোপাল, বলেছি না। আমার কথা নয়, কাজের কথা বল। এ বাড়িতে আপনারা দুজন ছাড়া আর কে আছেন?

পৃথাঃ     কেউ না। ছেলে বউ নিয়ে থাকে ব্যাঙ্গালুরু, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, দিল্লীতে থাকে। কেন?

নেপালঃ   কাজের লোক-টোক, মাসি-টাসি?

পৃথাঃ     তা আছে, তারা কাজ করে চলে যায়।

নেপালঃ   ভালই হয়েছে, আজ বিকেলে তাদের ছুটি দিয়ে দিন। বলবেন কাল একটু বেলা করে আসতে।

পৃথাঃ     তাহলে ঘরের কাজকম্মো?

নেপালঃ   একটাই বেলা, একটু সামলাতে পারবেন না, কাকিমা? আসলে সংসারে সকলেরই টাকাপয়সার খুব দরকার। কিন্তু অর্থ অনর্থের মূল সেটা তো মানবেন? কার মনে কী আছে, কী থেকে কী হয়ে যায়, সে কি আর বলা যায়?  একটু সাবধান হওয়াই ভালো!

সনৎঃ    খুবই সত্যি কথা।

হরিঃ      টাকার গন্ধ – কাঁঠালের মতো। ছাড়ালেই মাছির উপদ্রব শুরু হয়ে যায়।

নেপালঃ   আর খুব কম টাকাও তো নয়! কাকুর দশ লাখ, ওদিকে কমলবাবুর বারো – মোট বাইশ।

পৃথাঃ     তার মানে? কমলের বারো কেন? আমাদের কম আর ওর বেলায় বেশি হবে নাকি?

সনৎঃ    না, না, কমল বলছিল ও ছয় মতো তুলবে, ডবল করার জন্যে।

পৃথাঃ     দেখেছো, তুমি কেমন ম্যাদামারা? আমরা সব ঝক্কি পোয়াবো, আর তোমার বন্ধু কমল, গায়ে হাওয়া দিয়ে বারো লাখ কামিয়ে বগল বাজাবে!

সনৎঃ    ব্যাপারটা আমাদের হাতের মধ্যে থাকবে, সেটা বুঝছো না, কেন? ওর বাড়িতে হলে আমাকে ছাড়া ওরা ঢুকতে দিত?

পৃথাঃ     তা বটে। ওর ওই গুন্ডা ছেলে আর পটেরবিবি ছেলের বৌটাও সারাক্ষণ মাতব্বরি করতো।

সনৎঃ    তবে? আমাকে কি এতই বোকা ঠাউরেছো?

পৃথাঃ     থাক থাক খুব বাহাদুরি করেছো। তবে এই আমি কিন্তু বলে রাখলাম, কমল যদি বারো লাখ কামায়, আমার চোদ্দ চাই। আমার অনেকদিনের শখ ইওরোপ যাবো, লণ্ডন, প্যারিস, বার্লিন...

সনৎঃ    আচ্ছা, আচ্ছা, সে হবে খন। কিন্তু সাত লাখ তুলতে হলে, এত তাড়াতাড়ি হবে না, মনে হয়।

পৃথাঃ     পরে আবার করা যাবে না? মানে দশ লাখ থেকে বিশ লাখ। তখন তোমার কমলকে না বললেই হল।

সনৎঃ    বারবার “তোমার কমল”, “তোমার কমল” বলছো কেন বলো তো? কমল কী আমার ভাই না ভাতিজা?

পৃথাঃ     সে তুমিই জানো, আমি তার কী জানি? কমল ছাড়া এক পাও তো চলতে পারো না। তোমার প্রাণের বন্ধু। যার জন্যে তোমার বউও চিরটাকাল শত্রু হয়েই রইল।

নেপালঃ  কাকিমা, একই পরিবারে, বছরে একবারের বেশি টাকা ডবল করা যায় না। মায়ের সেরকমই নির্দেশ।

পৃথাঃ     কার মায়ের নির্দেশ?

হরিঃ      আমাদের সকলের মা বিপত্তারিণীর, দাদা যে তাঁর বর পুত্র।

পৃথাঃ     ও বাবা, খুব জাগ্রত বুঝি? তাহলে শুনছো, এক কাজ করো না, ফুটিকে বলে দাও তোমার অ্যাকাউন্টে তিনলাখ পাঠিয়ে দেবে,...বলবে ধার, কাল বা পরশু আবার ফিরিয়ে দেবে।

সনৎঃ    কথাটা মন্দ বলোনি, কিন্তু মেয়ে-জামাইয়ের থেকে ধার করবো?

পৃথাঃ     তাতে কী? আজকাল মেয়ে আর ছেলেতে কোন তফাৎ আছে নাকি? আর ফুটির বরের মতো ছেলে হয়? ও খুশি হয়েই দেবে।

সনৎঃ    তা ঠিক, তবু জামাই তো!

পৃথাঃ     জামাই তো কী হয়েছে? অমন জামাই লাখে একটা মেলে, আমার ফুটির কথায় কেমন ওঠে বসে! তোমার  ছেলের মতো নয়, বউ ছাড়া কোন কাজ করতে পারে? পোড়ারমুখী বউয়ের আঁচলে বাঁধা, হতভাগা জরু কা গোলাম!

সনৎঃ    আচ্ছা, তাই বলছি। (আনন্দে) তাহলে আমাদের আটদুগুনে ষোলো হয়ে যাবে গো!!

হরিঃ      আলবাৎ, ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে যাবে।

পৃথাঃ     তোমার ওই কমলের নাকে ঝামা না ঘষলে আমার শান্তি নেই, ও করবে বারো, আমাদের ষোলো।

সনৎঃ    (আনন্দে উত্তেজিত হয়ে) ওফ্‌, কমলটা দেখবে আর জ্বলবে - লুচির মতো ফুলবে!

হরিঃ      কতদিন কালো জিরে ফোড়নের আলু চচ্চড়ি দিয়ে ফুলকো লুচি খাই নি, দাদা।

নেপালঃ   (মহা রাগে) বেরিয়ে যা, আমার চোখের সামনে থেকে তুই, দূর হয়ে যা। এত্তো লোভ তোর?

হরিঃ      ও দাদা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, দাদা, আর কক্‌খনো লোভ করবো না, এবারকার মতো ক্ষমা করে দাও।

পৃথাঃ     দুখানা লুচি খেতে ইচ্ছে হয়েছে বলে, ওকে এমন ধমকাচ্ছো কেন? তোমার ইচ্ছে হয় না?

হরিঃ      (ভীষণ আতঙ্কে, নাক-কান মুলে, জিভ বের করে) ইস্‌স্‌স্‌, দাদা যে সব কিছুর ঊর্ধ্বে – নির্বিকার, উদাসীন।

পৃথাঃ     তা হোক, কলমির মা আসুক, আমি ময়দা মাখিয়ে খান কতক লুচি ভেজে দিচ্ছি ছেলেটা বড়ো মুখ করে খানকতক লুচি খেতে চাইল। কিন্তু তুমি কী বসে বসে শুধু লেজ নাড়বে, না বাজারেও যাবে?

সনৎঃ    লেজ আবার কখন...কী আনতে হবে বলো না, ছাই...

পৃথাঃ     ওম্মা, বিপদ যে বলল, পুজোর বাজার! তার ওপর তিন-তিনজন বাইরের লোক খাবে, প্লাস আমরা দুজন, কিছু আনবে না? এই মাছ-টাছ...

হরিঃ      (একই রকম আতঙ্কে, নাক-কান মুলে, জিভ বের করে) ইস্‌স্‌স্‌, দাদা যে শুদ্ধ শাকাহারী। গরম ভাত, একটু ঘি, নুন, কাঁচা সরষের তেল, দুটো কাঁচা লংকা। সঙ্গে দুটো আলু পটল চালের মধ্যে টবাং...ব্যস্‌।

সনৎঃ    টবাং মানে?

হরিঃ      হাঁড়িতে জল আর চাল চাপিয়ে, তার মধ্যে একটু ওপর থেকে আলু ছেড়ে দেখবেন, ওই রকমই আওয়াজ হয়।

[সনৎবাবু আর পৃথাদেবীর হাসি। নেপাল কটমট করে, তাকাল হরির দিকে। পৃথাদেবীও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।]

পৃথাঃ     এই তোমার দোষ, একবার আড্ডা মারতে বসলে তোমার আর কাজের কথা মনে থাকে না। ফুটিকে ফোন করো। বাজারে যাও। ততক্ষণে আমি ওদের ওপরে নিয়ে গিয়ে টাকা ডবলের ঘর দেখাই...ওদিকে কলমির মার আসার সময় হল, বসে থাকার আর সময় আছে? যে দিকটা না দেখবো, সেদিকে অনর্থ বাধিয়ে বসবে। তোমরা আমার সঙ্গে ওপরে চলো, বাবা...

[মঞ্চের ডান দিকে পৃথাদেবী, সঙ্গে নেপাল আর হরির প্রস্থান, বাঁদিকে সনৎবাবুর প্রস্থান। শূণ্য মঞ্চ।]

সনৎঃ    (বাঁদিক থেকে গলা পাওয়া গেল) বেরোলাম, দরজাটা দিয়ে গেলে না?

পৃথাঃ     (ডানদিক থেকে গলা পাওয়া গেল) চেপে দিয়ে যাও না, আমি কোন চুলোয় যাচ্ছি, শুনি? আর তোমার ঘরে কোন সাতরাজার ধন মানিক রাখা আছে, যে চুরি করার জন্যে চোর মুখিয়ে থাকবে?  

(মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল।)

 

(একটু পরেই মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল)

 

[দ্বিতীয় দৃশ্য]

 

[একই ঘর। কলমির মা, মিতা ঘর ঝাঁট দিচ্ছে, হাতে ঝাড়ু। যুবতী, চেহারায় বেশ লচক আছে, কথাবার্তায় আছে ঝংকার। বাচালতা শুধু মুখে নয়, সর্ব অঙ্গেই! পিছনের দেয়াল ঘড়িতে সময় আটটা চল্লিশ।]

 

মিতাঃ    অ বুইদি, ওপরের নোক দুটো কে গো? আগে কোনদিন দেকিনি?

পৃথাঃ     কেন রে? কিছু বলছিল? (ভেতর থেকে পৃথাদেবীর সাড়া পাওয়া গেল)

মিতাঃ    না তা কেন বলবে? তাই জিগ্‌গেস করতেছিলাম।

পৃথাঃ     এসেছে... ফুটির শ্বশুরবাড়ির লোক।

মিতাঃ    অ, আমি ভাবতেছিলাম, কে না কে? তবে যাই বলো বুইদি, নোকগুলোর দিষ্টি ভাল না।

পৃথাঃ     কার দৃষ্টি কেমন, সেদিকেও তোর নজর?

মিতাঃ    আমাদের গতর ভাঙিয়ে খেতে হয় বুইদি, সব দিকে নজর না দিলে চলে?

পৃথাঃ     বাব্‌বা, তা কী দেখলি?

মিতাঃ    যেন গিলে খাবে, এমন নজর।

পৃথাঃ     যাঃ বাজে বকিস না! খুব ধর্মটর্ম, পুজোআচ্চা নিয়ে থাকে, মোটেও খারাপ লোক নয়।

মিতাঃ    খারাপ নোক কী আমি বলিচি, বলচি দিষ্টিটা ভাল নয়কো।

পৃথাঃ     আমাদের সে খবরে কী দরকার বাপু, কাজে এসেছে, আজকে থেকে কাল চলে যাবে।

মিতাঃ    অ তা ভালো, তা কী কাজ?

পৃথাঃ     কাজ? ইয়ে কাজ মানে... তোর অত খবরে কী দরকার রে?

মিতাঃ    আমার আবার কী দরকার, এমনি জিগ্‌গেস করতেছিলাম।

পৃথাঃ     চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে।

মিতাঃ    হাসালে গো বুইদি, সামতাপুরে এয়েছে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে? হি হি হি হি...

পৃথাঃ     কেন? সামতাপুর এমন কী খারাপ জায়গা?

মিতাঃ    হি হি হি, এখানে চাকরি মানে রিকশা চালানো, আর চুল্লুর ঠেক চালানো। ওদের কোন চাকরি, বুইদি?

পৃথাঃ     আমি অত জানিনা। তুই তাড়াতাড়ি হাত চালা। ঘর ঝাড়ু দিয়ে ময়দা মাখতে হবে।

মিতাঃ    আমি কী মেশিন নাকি, আর কত হাত চালাবো? হুড়োতাড়া করলে তো বলবে, এখানে কুটো পড়ে আছে, ওখানে ময়লা পড়ে আছে, কী ঝাড়ু দিলি, কলমির মা? তুমি আবার যা ছুঁচিবাই।

[পৃথাদেবীর রেগেমেগে প্রবেশ]

পৃথাঃ     আমি ছুঁচিবাই? তোর এতবড়ো আস্পদ্দার কথা?

মিতাঃ    আচ্ছা লাও, আর রাগ করতে হবেনি, ছুঁচিবাই লও, পিটপিটে...।

পৃথাঃ     কবে আমি তোর সঙ্গে পিটপিট করি রে কলমির মা, যে তুই এমন কথা বলছিস?

মিতাঃ    সে বলা শক্ত, তবে কবে করো না, সে বল খুব সহজ, হি হি হি হি।

পৃথাঃ     তোর খুব চোপা হয়েছে কলমির মা, চুপ করে কাজ কর...

মিতাঃ    দুটো কতা কইলেই চোপা? আমার গুড়ুলে ব্যাতা, ময়দা মাকতে পারবোনি।

পৃথাঃ     গুড়ুল মানে?

মিতাঃ    গুড়ুলই তো, তোমরা কী বলো? এই তো একেনে[গোড়ালি দেখাল]

পৃথাঃ     অ গোড়ালি? তা গোড়ালিতে কী করে ব্যাথা হল?  

মিতাঃ    কাল কলমির বাবা একপেট তেল খেয়ে নদ্দমায় পড়ে গেছিল। মুখপোড়া মিনসের তাও হুঁশ ফেরেনি। আমি খপর পেয়ে দৌড়ে গেলাম। চেহেরা যত চিমড়ে কাটিপানা হোক, ব্যটাছেলের শরীর, একা তুলতে পারব ক্যানে? টানা-হেঁচড়াতে গুড়ুলে টান নাগলো! চলতে ফিরতে কী কষ্ট গো বুইদি, বলে বুজোতে পারবনি।

পৃথাঃ     কলমির বাবা হঠাৎ তেলই বা খেতে গেল কেন? কী তেল? সরষের নাকি নারকেল?

মিতাঃ    অম্মা, বুইদি বেশ ন্যাকাবোকা আছো কিন্তু! তেল মানে সে তেল লয় গো, এ তেল নেশার তেল।   

পৃথাঃ     অ বুঝলাম, কিন্তু গুড়ুলে ব্যাথা তো ময়দা মাখতে কী হয়েছে? তুই কী পায়ে ময়দা মাখবি নাকি?

মিতাঃ    ও বুইদি গো, শুদু কী গুড়ুলে? সারা গতরে ব্যাতা। কাঁদে, কাঁকালে, গুড়ুলে, বগলে...। কলমির বাপ বলছিল আজ আর কাজে যাসনি কলমির মা, একটা দিন এস্ট নে...তা আমি বললাম, বুইদিরা যা গতরখাকী, না গেলে সারাদিন আমায় গাল পাড়বে, আর হুঁচুট খেতে খেতে আমার ঠ্যাঙ ভাঙবেনে?

পৃথাঃ     আমি গতরখাকী?

মিতাঃ    লাও তোমায় বললাম নাকি? সব কতা লিজের গায়ে টেনে লাও ক্যানে? বলতেছিলাম ও বাড়ির বুইদির কতা।

          তুমি একটু আলসে, কিন্তুক গতরাখাকী লও।

পৃথাঃ     তোর বয়েস আর আমার বয়েস কলমির মা? তোর বয়েসে আমি এই সংসার একা সামলেছি। তখন তোর দাদাবাবুর মাইনে ছিল কম, কাজের লোক রাখার সাধ্য ছিল না। একা হাতে এই বাড়ি, ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, বরের অফিসের ভাত, শাশুড়ির সেবা...সব সামলেছি। তখন তুই ছিলি কোথায়? এখন আর পারি না, তাই তোরা আলসে দেখিস। [আবেগে পৃথাদেবীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।]

মিতাঃ    অ বুইদি কেঁদে দিওনি গো। দাদাবাবু বাজার থেকে এসে, দেকলে কী ভাববে? ভাববে আমি তোমায় ঠেইলে দিছি। হি হি হি হি।

পৃথাঃ     [আঁচলে চোখ ঘষে] তোর ঘর ঝাড়ু দেওয়া হল? বলছি না ময়দাটা মেখে দে, যাবার সময় তোর জন্যে খানচারেক লুচি আর আলুচচ্চড়ি দেবো, নিয়ে যাস।

মিতাঃ    অ বুইদি, আর গণ্ডাখানেক বেশি দিও, কলমির বাপটা আজ রিকশা নিয়ে বেরোয়নি, ঘরেই আচে।

পৃথাঃ     আচ্ছা, সে হবে খন, তুই কাজ সেরে রান্নাঘরে আয়আমি ময়দা বের করছি।

[পৃথাদেবীর ভেতরে প্রস্থান]

[মিতা ঘরের মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। ঝাড়ু রেখে আঁচল নাড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল নিজেকেতারপর গুনগুনিয়ে গান ধরল]

মিতাঃ    “বাবলা পাতার কষ লেগেচে, ও সে যায়না তো তোলা,

ছুঁচোর গায়ের গন্ধ কি যায় আতর মাকালে,

ও ভোলা মন আতর মাকালেএএএ।

মনকলসে চিড় ধরেচে, ও জল যায় না তো ভরা

কেলে সোনা হয় কি ধলা সাবাং মাকালে,

ও ভোলা মন সাবাং মাকালেএএএ”।

পৃথাঃ    [ভেতর থেকে] কই রে কলমির মা, তোর কাজ হল?

মিতাঃ    (স্বগত) আ মোলো যা, গতরখাকীর আর তর সইচে না। (প্রকাশ্যে) যাই গো বুইদি, যাই, এই দোরের কাচটা ঝাঁট দিয়েই আসতিছি। [দরজায় বেল বাজার শব্দ – টিং টং]

পৃথাঃ     ওই তোর দাদাবাবু এসে গেল মনে হচ্ছে, দরজাটা খুলে দেখ তো কে?

[মিতা চটপট উঠে হাতে ঝাড়ু নিয়ে দরজা খুলতে গেল। বাঁদিক থেকে দরজা খোলা ও বন্ধের আওয়াজ, সামনে মিতা আর পিছনে সনৎবাবুর প্রবেশ]

মিতাঃ    অ বুইদি, দাদাবাবু বাজার নে এয়েচে।

সনৎঃ    [পুরুষালী উপস্থিতি বোঝাতে গম্ভীরভাবে হাল্কা কাশি] কই গো? কোথায় গেলে? একবার এসে পুজোর বাজারটা নাও না। মাছে, পেঁয়াজে ঠেকাঠেকি হয়ে গেলে, তারপর তো বাড়ি মাথায় করবে...।

পৃথাঃ     ওঃ কী আমার সাতকেলে গুরু ঠাকুর এলেন। আমার এখন মরবার সময় নেই।  বাজারের থলি আর মাছটা কলমির মায়ের হাতে দাও, আর তুমি পুজোর বাজার নিয়ে একেবারে ওপরের ঘরে রেখে এসো।

[বাজারের থলি হস্তান্তর করে সনৎবাবু ভেতরে ঢুকে গেলেন, ক্ষিপ্র হাতে থলি থেকে কিছু কাঁচা আনাজ আর দুপিস মাছ হাত সাফাই করে নিল মিতা, পেট কাপড়ের প্লাস্টিকে সেগুলো রাখল, তারপর মদালসা ভঙ্গীতে হাঁটতে হাঁটতে]

মিতাঃ    ও বুইদি, এ থলিগুলো কোতায় রাকবো গো, যা ভারি...দাদাবাবু গোটা বাজারটা তুলে এনেচে মনে হয়। দাদাবাবুর ক্ষমতা কম লয় গো বুইদি, বাজার থেকে বলদের মতো এত ভারি ব্যাগদুটো বয়ে আনলো তো!  একটা রিকশা করতে পারলো নি? খুব কেপ্পন, বাবা! 

পৃথাঃ    কোথায় আবার রাখবি? রান্নাঘরে নিয়ে আয়। তারপর ময়দাটা মাখ। [মিতা ভেতরে ঢুকে গেল]     

 

[পর্দা নেমে এল]

 

[বিরতি]

 

চতুর্থ অঙ্ক

(প্রথম দৃশ্য)

 

[টাকা ডবলের নির্জন ঘর, অর্থাৎ এখানেই টাকা ডবল হবে। ঘরের ডান দিকে বিছানাপাতা একটা চৌকি, দুটো চেয়ার। পিছনের দিকে বাইরে যাওয়ার দরজা। নেপাল আর হরি ঘরের মেঝেয় আরামে গা এলিয়ে বসে আছে। একটু আগেই লুচি আলুচচ্চড়ি খাওয়া হয়ে গেছে, সামনে এঁটো থালা, জলের গেলাস।]

 

হরিঃ      (লম্বা ঢেঁকুর তুলে) হেএএউ...ওফ্‌ কতদিন পর এমন আরাম করে খেলাম বলো তো দাদা! লুচি কেমন খেতে প্রায় ভুলেই গেছিলাম। এমন জুটবে জানলে, কোন শালা পতিতের ডিমটুচ চিবোতো? ওটা না খেলে আরো চারটে লুচি নির্ঘাৎ পেটে ঢোকাতে পারতাম, দাদা!

নেপালঃ   তা ঠিক, বেশ তৃপ্তি হল খেয়ে।

হরিঃ      অথচ আমি লুচির কথা বলতেই তুমি এমন ধমকে দিলে, ভাবলাম ব্যাপারটা কেঁচেই গেল।

নেপালঃ   বোকা।

হরিঃ      কে তুমি তো? তা ঠিক, কিন্তু এভাবে নিজেকে ছোট করতে আছে, দাদা? এখন বোকা আছো তো কী হয়েছে, কালে কালে তুমিই একদিন দিকপাল বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে, দেখে নিও।   

নেপালঃ মারবো এক লাথি, ক্যাঁৎ করে। বোকা আমি না তুই?

হরিঃ    তা মারো, কিন্তু আজে বাজে জায়গায় না মেরে, ওই পাছাতেই মেরো, লাগবে কম।

নেপালঃ   আমি যদি তখন ওই নাটকটা না করতাম, ওই গতরখাকী মুটকি তোর জন্যে লুচি ভাজতো? বয়েই গিয়েছিল। একে বলে, রিভার্স সেন্টিমেন্ট প্রক্রিয়াতোকে চাপ দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করলাম, মুটকির সেন্টিমেন্টের জল, বন্যার মতো তোর দিকে ধেয়ে এলো। তা না হলে এতক্ষণ, শুকনো রুটি আর কুমড়োর ঘ্যাঁট...কিংবা শুকনো পাঁউরুটি আর চা জুটত!

হরিঃ      আরেঃ এভাবে ভাবিনি তো? মিথ্যেই তোমার ওপর রাগ করেছিলাম, দাদা।

নেপালঃ   ভাবতে শেখ, ভাবনাটাকে চেপে ধরতে চেষ্টা কর।

হরিঃ      মুটকিটার হালচাল দেখলে দাদা? ছিঃ। ইস্ত্রী হয়ে, স্বামীটাকে গালাগাল দিয়ে একেবারে ভাঁজে ভাঁজে ইস্ত্রি করে রেখে দিয়েছে, অথচ কাজের মাসি যা নয় তাই বলে যাচ্ছে, কিন্তু কোন হেলদোল নেই?

নেপালঃ   গভীর স্বার্থ! কাজের মেয়ে আজ যদি কেটে পড়ে, ওই গতরখাকীর কী অবস্থা হবে বুঝতে পারছিস? আতান্তরে পড়বে! আতাক্যালানে স্বামী তো আর ছেড়ে যাওয়ার জিনিষ নয়, তার ওপরেই যত ধোবিপাট।

হরিঃ      [নেপালের পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকাল] ওফ্‌, ভাবা যায় না।

নেপালঃ   এটা কী হল?

হরিঃ      সারাজীবনের জন্যে তোমার পায়ের কাছে আমার একটা জায়গা রেখো, দাদা। তা নইলে ভেসে যাবো আঘাটায়। কী জীবন ধর্ষণ! জীবনটাকে ধরে একেবারে শনশনে হাওয়া বইয়ে দিলে, মাইরি!

নেপালঃ   একটি থাপ্পড়ে... আচ্ছা, আমাকে শুদ্ধ শাকাহারী বলে তোর তখন নাটক করার কী দরকার ছিল? দুপুরের মাছের ঝোল ভাতটা মিস হয়ে গেল!

হরিঃ      ওই যে বললাম, তোমার ধমকানিতে তখন বেশ রাগ হয়ে গিয়েছিল, তাই দিলাম তোমার লেজটা একটু টেনে। আমার লুচি খাওয়াতে ব্যাগড়া, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। আমি কী আর জানি না, তোমার মতো মাংসাশী প্রাণীর কাছে বাঘও ছেলেমানুষ!

নেপালঃ   হারামজাদা, তুই আমাকে ল্যাং মারলি?

হরিঃ      আমার জাবনা ভরা মাথায়, তোমার সূক্ষ্ম ভাবনা ঢুকবে কী করে? অপরাধ নিও না, দাদা। তখন কী আর বুঝেছিলাম?

নেপালঃ   দুপুরের খাওয়াটা মাটি করলি, শালা।

হরিঃ      আমাদের জন্যে সেদ্ধভাত হচ্ছে, ওরাও কী তাই খাবে দাদা? ওদের জন্যে তো মাছেরঝোল-ভাতই হচ্ছে। তোমার প্রসাদ পাওয়ার পর, ওদের ওই ভোগ, ওদের ভোগে লাগবে ভাবছো?

নেপালঃ   হুঁ...তা ঠিক। কথাটা ভালই বলেছিস। তার মানে মাছের ঝোলভাত মিস হবে না বলছিস?

হরিঃ      আমার তো মনে হয় আমাদের কপালেই মাছের ঝোল-ভাত নাচছে, কিন্তু সিঁড়িতে পায়ের শব্দ দাদা, কেউ আসছে। [দুজনেই গুছিয়ে টানটান হয়ে বসল]

নেপালঃ   ধুতি দুটো আনিসনি? তখনই পই পই করে বললাম, এখন কী হবে? [মিতার প্রবেশ]

হরিঃ      [অবাক] ধুতি? কীসের ধুতি?

নেপালঃ   মায়ের পুজো কী প্যান্ট-শার্ট পরে করবো, হতভাগা?

মিতাঃ    দাদাবাবু, চা। [দুজনের হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে] বুইদি জিগ্যেস করল তোমাদের আর কিচু নাগবে কী না?

নেপালঃ   দুটো ধুতি...আমাদের দুটো ধুতি দরকার...

মিতাঃ    [নিচু হয়ে এঁটো বাসন তুলছিল] অ মা, বুইদি বলছিল, তোমরা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এয়েছেন, সেকেনে ধুতি কোন কাজে লাগবে? [নেপাল ও হরি থতমত খেয়ে গেল]

নেপালঃ   চাকরির ইন্টারভিউ?  কে বলল?

মিতাঃ    ক্যানে, বুইদি বলল। তোমরা ফুটিদিদির শ্বশুর বাড়ির নোক, চাকরি খুঁজতে এয়েছো!

নেপালঃ   ও হ্যাঁ চাকরি...শিল্পীর চাকরি তো, কি রে গোপাল, বল না...চাকরি নয়তো কী?

হরিঃ      চাকরি কী বলা যাবে, দাদা? আসলে আমাদের কাজটা একটু অন্যরকম...সামতাপুরের উত্তরে ধানজমিতে... শুটিং হবে, জমিদারবাড়ির পুজো, আমরা দুজন পুজো করবে, গ্রামের ব্যাপার স্যাপার আর কি...।

মিতাঃ    শুটিং? সিরিয়াল? টিভিতে দেখাবে? ও হ্যাঁ, ওরম একটা সিরিয়াল তো চলতিছে, “বাঁকিপুরের বাঁকেবাঁকে”গাঁয়ের জমিদার মিনসে হেব্বি হারামি, লেঠেল নিয়ে, ঘোড়ার পিঠে ঘোরে, আর মা-বুইনদের সব্বোনাশ করে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুব ডেকে হেঁকে কথা কয়...

হরিঃ      ইসসসস...

মিতাঃ    তবে ওই মুখপোড়া মিনসেটা, পীতি বলে একটা মেয়ের কাছে খুব জব্দ। পীতির খুব সাহস, হেব্বি লড়তিছে। তার সঙ্গে ভাব আছে পীতমের...

হরিঃ      হেব্বি ভাব?

মিতাঃ    হ্যাঁগো, পীতমটা একটু ম্যাদামারা টাইপের, কিন্তু হেব্বি ভাব পীতির সঙ্গে।

হরিঃ      বিয়ে হবে না?

মিতাঃ    ভাব করলে বিয়ে হবেনি? ও আবার কেমন কতা? ওরা যকোন নদীর ধারে ভাব করতে যায়, পেছনে কারা সব ফুলোট বাজায়, শাঁক বাজায়, উলু দেয়...ওদের সম্পোক্ক এ জন্মের নাকি...এর আগের জন্মেও ওরা সোয়ামি-ইস্তিরি ছিল যে!

হরিঃ      তাই? নদীর ধারে গিয়ে ওরা কী করে?

মিতাঃ    অ মা, কী আবার করবে? হেসে হেসে মিস্টি মিস্টি কতা কয়, মোবাইলে একসঙ্গে গান শোনে, কত্তো সেলফি তোলে...! কিন্তু জমিদার মিনসে নিজের ছেলের সঙ্গে পীতির বিয়ে দিতে চায়।

হরিঃ      সে কি? কেন? 

মিতাঃ    ওম্মা, তাতে পীতি ঢিট্‌ হয়ে যাবে নে? বে হয়ে গেলে, শ্বশুরের বজ্জাতি লিয়ে কিচু বলতে পারবে আর? হারামজাদা বারবার চেষ্টা করছে পীতমকে মেরে ফেলার জন্যে...খুব টেনসান দিচ্ছে হতভাগা...ওই সিরিয়ালের সবাই ধুতি পরে!

হরিঃ      অ্যাঁ? সবাই? পীতি বলে ওই মেয়েটাও?

মিতাঃ    অঅম্মা, পীতি ধুতি পরবে ক্যানে, ও গাছ কোমরে শাড়ি পরে... ব্যাটাছেলেরা ধুতি।

হরিঃ      যাক বাবা।

মিতাঃ    তা তোমরা কী সিরিয়াল করবে গো, দাদাভাই?

নেপালঃ   আমাদের সিরিয়াল কী হবে, আজ সন্ধেবেলা জানতে পারবো। আর তোমরা জানতে পারবে কাল সকালে... তার আগে কিছু হবে বলে মনে হয় না।

মিতাঃ    ওম্মাআগো, তা কী নাম গো, সিরিয়ালের?

নেপালঃ   নাম? সেও এখনো ঠিক হয়নি, ধরো “সামতাপুরের নামতা”।

হরিঃ      কিংবা “এক দুগুণে শূণ্য”

মিতাঃ    অম্মা, এক দুগুণি তো দুই হয়, শূণ্য হতে যাবে কী দুঃখে?

হরিঃ      শূণ্য বলেই তো দুঃখ,   

[নিচে থেকে পৃথাদেবীর গলা পাওয়া গেল]

পৃথাঃ     কলমির মা, ওপরে এতোক্ষণ কী করছিস রে? নিচেয় রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে...

মিতাঃ    অই, ডাক পড়েছে, খুব হিংসেকুটিল বাবা, আমি নোকের সঙ্গে দুটো কতা বললেই বুইদির গতরে আগুন ধরে যায়!

হরিঃ      সিরিয়ালের কতা আজই কাউকে বলবেন না যেন, কাল শুনে সবাই অবাক হয়ে যাবে।

মিতাঃ    আপনেরা সে চিন্তে করো না, দাদাভাই, কলমির মার পেট থেকে কতা বার করা ...হুঁ হুঁ অত সস্তা না...

নেপালঃ   বাঃ খুব ভালো। কাকিমাকে বলবেন তো, আমাদের দুটো কাচা ধুতি লাগবে।

মিতাঃ    আসতিচি...বুইদি নইলে নিচেয় কুরুখেত্তর বাধাবে... (এঁটো থালা, চায়ের কাপ নিয়ে মিতার প্রস্থান।)

হরিঃ      ব্যাপারটা কী হল, দাদা? বিপদতারণের বিপদ বাড়ল? নাকি কমল? এই মহিলা তো শহরময় কথা ছড়িয়ে দেবে!

নেপালঃ   তা হয়তো দেবে, কিন্তু এতদূর এসে, পালাবার কোন মানে হয় না। দেখা যাক না কী হয়। চ ছাদে যাই, সিগারেট টেনে আসি।

হরিঃ      এখানেই ধরাই না, এখন কেউ আসবে বলে তো মনে হয় না।

নেপালঃ   একদম না, এটা এক দুগুণে শূণ্যর ঘর – এখানে সিগারেটের ধোঁয়া? নৈব নৈব চ। চ চ ছাদে যাই...বিপদে পড়লে পালাবার অন্য পথগুলোও ভেঁজে রাখা ভালো। [দুজনের প্রস্থান]

 

(দ্বিতীয় দৃশ্য)

 

[একই ঘর। পুজোর জোগাড় সম্পুর্ণ। প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া টাকার বাণ্ডিল। তাতে তেলসিঁদুরের স্বস্তিকা আঁকা। দর্শকদের দিকে মুখ করে নেপাল পুজো করছে, পরনে ধুতি। একটু পেছনে বসে হরি তাকে সাহায্য করছে, তারও পরনে ধুতিসনৎবাবু, পৃথাদেবী আর কমলবাবু পাশাপাশি বসে আছে। তিনজনেরই জোড়হাত, তদ্গত ভাব।]

নেপালঃ   ওঁ বিপত্তারিণৈ নমস্কৃত্যং কারেন্সিনোট বৃদ্ধিম্‌ করিষ্যে। ওঁ বিপত্তারিণৈ নমঃ। (দুর্বাঘাসের গুছিতে জল নিয়ে সকলের মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে)

সারা দিনে তব নাম যে জপে শতবার।

তাহার ঘরেতে সম্পদ ঝরে অনিবার।।

শতেক বিপদ আপদ যায় বহুদূর।

ছাই লয়ে মুখ ঢাকে যতেক শত্তুর।।

প্রমোশন ঢেলে দেয় দুষ্ট উপরওয়ালা।

দুধে জল দিতে ভোলে যতেক গোয়ালা।।

ডেঙ্গু নিপা, অজানা জ্বর, চি... (সনৎবাবুর ফোন বেজে উঠল)

সনৎঃ   হ্যালো, ফুটি...পুজো চলছে রে, শেষ হলেই তোকে রিং ব্যাক করছি, হ্যাঁ হ্যাঁ ...রাখছি, পরে ফোন করবো...

হরিঃ    ফোনটা এই সময়েই ধরলেন...মা আবার বিরক্ত না হন।

সনৎঃ   কার মা, বিরক্ত হবেন?

হরিঃ    মা বিপত্তারিণী, যিনি টাকা ডবল করবেন।

সনৎঃ   ওঃ, তাই?               

কমলঃ  আঃ সনৎ, ফোনটা এখন সুইচ অফ করে রাখ না, পুজো শেষ হলে ফোন করিস।

হরিঃ      সেই ভালো, পুজোর সময় ডিস্টার্ব করলে, মা খুব রুষ্ট হন। দেবতাদের রুষ্ট হতেও বেশি সময় লাগে না, তুষ্ট হতেও তাই...

নেপালঃ   তুই থামবি? পুজোর মধ্যে বিঘ্ন এলে, মহা অনর্থ উপস্থিত হয়... ওঁ বিষ্ণু, ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ...       

ডেঙ্গু নিপা অজানা জ্বর, চিকুনগুনিয়া।    

তব সহায়ে মাতঃ দিব আচ্ছাসে ধুনিয়া।।

মারীতে মরিনি মোরা, কখনও হারিনি।

জয় জয় মহা দেবী, মাগো বিপত্তারিণী।।

 

শ্রাবণধারার মতো ঢেলে দিও টাকা।

বন বন ঘুরে যেন মোর ভাগ্যচাকা।।

শত্তুরের মুখেতে ঝামা ঘষিও ঘস্‌ঘস্‌

পতি-পুত্র-পরিবার সব হয় যেন বশ।।

এক টাকা দিলে যেন পাই টাকা দুই।

ডবল করিও মাগো যাহা পদতলে থুই।।

ট্যাক্সো-ওয়ালা বাক্স নিয়ে যায় যেন ভেগে।

তাহাদের ‘পরে মাগো তুমি যেও খুব রেগে।

মিটাইও যতেক সাধ যাহা সাধিতে পারিনি।

জয় জয় মহা দেবী, মাগো বিপত্তারিণী।।

[এবার কমলবাবুরও ফোন বেজে উঠল, কিন্তু কমলবাবু ফোন অফ করে দিলেন]

[মন্ত্র পাঠের পর নেপাল দীর্ঘক্ষণ প্রণাম করল। তারপর সোজা হয়ে বসল।]

         কাকিমা, কাকাবাবু, হাতে বেলপাতা, তুলসি আর কুচো ফুল নিয়ে জোড় হাতে বলুন,

         [সকলের হাতে হরি উপচার তুলে দিল]

         হয়েছে? সবাই বলুন, মাগো, আমাদের পুজোয় তুষ্ট হও মা

সকলেঃ সবাই বলুন, মাগো, আমাদের পুজোয় তুষ্ট হও মা...

নেপালঃ যাচ্চলে, সবাই বলুন বলছেন কেন? ওটা বলবেন না। বলুন, মাগো, আমাদের পুজোয় তুষ্ট হও মা।

সকলেঃ মাগো, আমাদের পুজোয় তুষ্ট হও মা।

নেপালঃ আমাদের শত্রুদের উপর রুষ্ট হও মা।

সকলেঃ আমাদের শত্রুদের উপর রুষ্ট হও মা

নেপালঃ আমাদের দারিদ্য, দৈন্য ঘুঁচিয়ে দাও মা।

সকলেঃ আমাদের দারিদ্য, দৈন্য ঘুঁচিয়ে দাও মা।

নেপালঃ আমাদের সামান্য অর্থ ডবল করে দাও মা।

সকলেঃ আমাদের সামান্য অর্থ ডবল করে দাও মা।

নেপালঃ   ব্যস, আমাদের কাজ শেষ, এবার যা কিছু করবেন, মা বিপত্তারিণী। সকলে মাকে প্রণাম করুন, যার যা মনের ইচ্ছে, মনের কথা মনে মনে বলুন। মা সবার সব ইচ্ছে পূর্ণ করে দেবেন।

[সকলে মেঝেয় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে লাগল, নেপাল হরির দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করল। প্রণাম শেষ করে উঠতেই...হরি নৈবেদ্যর থালা থেকে, কলার ছোট্ট টুকরো তুলে পৃথাদেবীর হাতে দিয়ে বলল।]

হরিঃ      কাকিমা, মায়ের এই প্রসাদ, একবারে কোঁৎ করে গিলে ফেলতে হবে। দাঁতে লাগলে, কিংবা চিবিয়ে ফেললেই সর্বনাশ! মনের ইচ্ছে পূরণও থেঁৎলে যাবে, পাখিতে ঠোকরানো ফলের মতো, কানা বেগুনের মতো নিষ্ফল হয়ে যাবে... খুব সাবধান।

পৃথাঃ     গলায় আটকে যাবে না?

হরিঃ      অশোকষষ্ঠীতে অশোকের ফুলসমেত কলার টুকরো, গিলে নেন না?

পৃথাঃ     তা তো নিই।

হরিঃ      তাহলে? মায়ের চরণে মন স্থির করে, মায়ের প্রসাদ গিলে ফেলুন... [পৃথাদেবী নির্বিঘ্নে গিলে ফেললেন।]

পৃথাঃ     [আনন্দে মুখ উদ্ভাসিত] হয়েছে, পেরেছি, মায়ের প্রসাদ...জয় মা, জয় মা...

হরিঃ      বাঃ এবার কাকাবাবু, আপনারা দুজনেই...

পৃথাঃ     দেখো, তোমার আবার কাকের মতো সবকিছুই ঠুকরে খাওয়ার অভ্যাস। দাঁত না লাগে...তাহলেই ইওরোপের দফা রফা। [কোন অঘটন হল না, দুজনেই নির্বিঘ্নে গিলে ফেলল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল নেপাল ও হরি।]

নেপালঃ   এতক্ষণে পুরো অনুষ্ঠানটা সুসম্পন্ন হল। বাকি প্রসাদ আপনারা সকলেই ভাগ করে নিন। আর কতক্ষণই বা সময় লাগবে? মা ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার করে দেবেন। আপনারাও সকলে গভীর স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকবেন।

হরিঃ      না ঘুমিয়ে কী স্বপ্ন দেখা উচিৎ হবে, দাদা?

নেপালঃ   ঘুম তো আসবেই, ঘুম না এসে যাবে কোথায়?

হরিঃ      তার আগে খেয়ে নিলে হত না?

সনৎঃ    ঠিক কথা, বেলা অনেক হল, পৌনে চারটে! শুনছো, চল সবাই একসঙ্গে খেয়ে নিই, আর বেলা বাড়িয়ে কাজ নেই। কমল, তুই আবার এলিয়ে পড়ছিস কেন? চল নিচেয় চল, খেয়ে আসি।

পৃথাঃ     কমলঠাকুরপো, খাবে এসো, নিচেয় গিয়ে আমি ভাত বাড়ছি...তোমরাও এসো, বিপদ, গোপাল...তুমি আবার সঙ সেজে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? নিচেয় চলো, আমি একা পারবো নাকি? তুমিও হাতে হাতে ধরে দেবে...

          [সনৎবাবু ও পৃথাদেবীর প্রস্থান, কমলবাবু, মেঝেয় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল...নাকের আওয়াজ আসছে।]

হরিঃ      ও দাদা, কমলকাকু এখানেই লটকে পড়ল যে।

নেপালঃ   ভালই তো, কমলবাবু কমল। চটপট ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে ফেল। ধুতি ছেড়ে, জামা-প্যান্ট... চটপট।

[টাকার প্যাকেট ভাগ হয়ে ঢুকে পড়ল, নেপাল ও হরির ব্যাগে। দরজার বাইরে গিয়ে, নেপাল ও হরি জামাপ্যান্ট পরে এল। কমলবাবুর ঘুম এখন গভীর, নাকের গর্জন শোনা যাচ্ছে।]

হরিঃ      এবার?

নেপালঃ   সদরের চাবিটা খুঁজতে হবে। তারপর সন্ধের জন্যে অপেক্ষা। সন্ধের আলো আঁধারিতে চটপট চম্পট।

হরিঃ      কোথায় যাবে, ঠিক করেছ? কলকাতায় যাওয়া কী ঠিক হবে?

নেপালঃ   একদম না, ভয়ংকর ভুল হবে। পুলিশের হাতে চোদ্দ লাখ তুলে দিয়ে, এত তাড়াতাড়ি আবার সরকারি অতিথি হওয়ার কোন ইচ্ছে আমার নেই।

হরিঃ      তাহলে?

নেপালঃ   এখান থেকে বাস ধরে বিহার...সেখান থেকে নেপাল...

হরিঃ      নেপাল যাবে নেপালে?

নেপালঃ   আরো ভাবতে হবে, আপাততঃ বঙ্গ থেকে রণে ভঙ্গ দিয়ে বিহার...তারপর চিন্তা করা যাবে...কিন্তু নিচে থেকে ডাক আসছে না, কেন? খিদেয় নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাওয়ার যোগাড়, খেতে টেতে দেবে না, নাকি রে?

হরিঃ      আমার মনে হয় দাদা, ওরাও ঘুমোচ্ছে...

নেপালঃ   সে কি রে? এত তাড়াতাড়ি সবার ওষুধ ধরে যাচ্ছে? চল তো নিচেয় যাই।

হরিঃ      বয়স তো কম হয়নি, দাদা? ঢকঢকে বুড়ো সব, ফুল ডোজ কী আর সহ্য হয়? টেঁশে যাবে না তো, দাদা?

নেপালঃ   অলক্ষুণে কথা বলছিস? বালাই ষাট, টেঁশে গেলে ডবল টাকায় ইওরোপ যাবার কী হবে? 

হরিঃ      টেঁশে গেলে তো বিনাপয়সায় ইওরোপ ভ্রমণ হয়ে যাবে দাদা! ভূতেদের ভিসা-পাসপোর্ট লাগে কী?

নেপালঃ   তার আমি কী জানি? আমি কী ভূত না প্রেত?

হরিঃ      ব্যাগগুলো নিচেয় নিয়ে যাই দাদা?

নেপালঃ   না, এখন এখানেই থাক, যদি না ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে বুঝে ফেলবে, আমরা ফেরেব্বাজ...আগে চল, দেখে আসি।

[উভয়ের প্রস্থান]

[পর্দা নেমে এল]

 

পঞ্চম অঙ্ক

 

[সনৎবাবুর বসার ঘর, সব আগের মতোই। সোফার পেছনের দেয়ালঘড়িতে চারটে বেজে দশসোফায় পৃথাদেবী অঘোরে ঘুমোচ্ছে, সনৎবাবু মেঝেয়। দুজনের নাকের গর্জনে কান পাতা দায়।]

 

নেপালঃ   বোঝো কাণ্ড। সবাই যে ঘুমিয়ে কাদা। হরি, চটপট সদরের চাবিটা খোঁজ। ওটা আগে দরকার।

হরিঃ      কোথায় খুঁজবো বলো তো?

নেপালঃ   আমি সনৎবাবুর পকেটে দেখছি, তুই কাকিমার কাপড়ের আঁচলে দেখ।

হরিঃ      শেষ অব্দি আমার হাতেই নারী শরীর তুলে দিলে, দাদা? আমার যে আবার কাঁচা বয়েস?

নেপালঃ   বাজে বকিস না, তাড়াতাড়ি খোঁজ।

হরিঃ      আঁচলে নেই, দাদা।

নেপালঃ   কোমরের খুঁটে?

হরিঃ      ইস্‌। তুমি খুব অশ্লীল দাদা...

নেপালঃ   ছেড়ে দে, মনে হচ্ছে পেয়েছি, বুড়োর কোমরে ঘুন্সি আছে, জানতিস? সেখানে ঝুলিয়েছিল।

হরিঃ      ওই চাবিটাই শিওর?

নেপালঃ   হুঁম, একবার চেক করে আসি, দাঁড়া, [নেপাল সদরের দিকে বের হল, কিছুক্ষণ খুটখাট আওয়াজ]

          নাঃ রে, এটা নয়, বুড়োর ভুতের ভয়, তাই কোমরে লোহার চাবি নিয়ে ঘোরে। রাত্রে বাথরুম পেলে বউকে ডাকে, বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বৌ শব্দ করি হিস্‌স্‌স্‌...হিস্‌স্‌স্‌...

হরিঃ      হা হা হা, ঘাড়ে এমন একখানা জাঁদরেল ভূত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারপরেও ভূতের ভয়? কিন্তু চাবি?

নেপালঃ   বুড়ির সব দেখেছিস?

হরিঃ      কী যাতা বলছো দাদা, ছোট ভাইয়ের চরিত্রের প্রতি তোমার এত সন্দেহ? তাই দেখা যায়?

নেপালঃ   মেয়েরা এমন এমন জায়গায় টুক করে রাখে...

হরিঃ      ও দাদা, আর বলো না, আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি, আমি ওসবে নেই... খুব খিদে পেয়েছে...

নেপালঃ   সেই ভালো... দেখ তো কী রান্না হয়েছে...আমি একটু চিন্তা করি...কোথায় থাকতে পারে? [হরির প্রস্থান]

হরিঃ      (রান্নাঘর থেকে) ভাত আলুসেদ্ধ, মাছের ঝোল।

নেপালঃ   বাঃ কপালে মাছের ঝোল নাচছে, ঠেকাবে কে? আমিও যাবো? না বাড়তে পারবি?

হরিঃ      তা পারবো... দুটো থালা...পেয়েছি। ভাতের হাতা...পেয়েছি...দুটো আলু সেদ্ধ... সরষের তেল...নুনের ডাব্বা...দাদা, দাদা, একটা চাবি! মনে হচ্ছে এটাই...[হরির দৌড়ে প্রবেশ]

নেপালঃ   দেখি...হতে পারে...[নেপাল আবার সদরের দিকে গেল, আবার খুটখাট আওয়াজ।] হয়েছে...খুলেছে, চিচিং ফাঁক। ওফ্‌ হরি, তুই সত্যি জিনিয়াস... তোর খিদে না পেলে...এতক্ষণে কত কী শ্লীলতাহানি, যৌন হেনস্থার  কেলেংকারি হয়ে যেতে পারতো। চল চটপট খেয়ে নিইএখনও অব্দি সব ঠিকঠাক চলছে।

হরিঃ      সবই মা বিপত্তারিণীর কৃপা। [দুজনেরই রান্নাঘরের দিকে প্রস্থান, একটু পরেই থালা নিয়ে প্রবেশ। দর্শকদের দিকে পিছন ফিরে চেয়ারে বসে]

নেপালঃ   আলুভাতেটা দারুণ মেখেছিস তো, কাঁচা তেলের ঝাঁজ টের পাওয়া যাচ্ছেএকটা কাঁচা লংকা পেলে জমে যেত।

হরিঃ      আনব? কোথায় আছে, খুঁজতে হবে।

নেপালঃ   ছেড়ে দে, অত তরিবতে কাজ নেই। [কিছুক্ষণ শুধু খাওয়ার আওয়াজ, কোন কথা নেই, হঠাৎ নেপাল খাওয়া থামাল] আচ্ছা, আমরা গতকাল যখন জেল থেকে ছাড়া পেলাম, তখন কী এত টাকার ফেরেব্বাজি করব, ভেবেছিলাম?

হরিঃ      পাগল? খুব জোর দশ-পনের হাজার...

নেপালঃ   কিন্তু এখন কত করলাম? 

হরিঃ      হুঁউউউ...চোদ্দ লাখ...

নেপালঃ   এটা কী ঠিক হচ্ছে?

হরিঃ      নাঃ একদমই হচ্ছে না। এত টাকা নিয়ে করবো কী?

নেপালঃ   টাকা কী সঙ্গে যাবে?

হরিঃ      না, না কোত্থাও যাবে না - না জেলে না হেলে!

নেপালঃ   হেলে মানে?

হরিঃ      মরার পর তো হেলেই যাবো, নাকি তুমি আবার স্বর্গে যাবে বলে স্বপ্ন দেখছো? আর খাবে না? ভাত আর মাছ পড়ে রইল যে?

নেপালঃ   নাঃ রে, ভাল লাগছে না।

হরিঃ      আমি খেয়ে নিই?

নেপালঃ   নে।

হরিঃ      যা নেব অঙ্গে, তাই যাবে সঙ্গে। টাকা যাবে না দাদা, কিন্তু এই ভাত মাছের ঝোল সঙ্গেই থাকবে।

নেপালঃ   আমি একটা কথা ভাবছি, বুঝেছিস?

হরিঃ      তুমি কী ভাবছো আমি জানি দাদা।

নেপালঃ   জানিস? কী জানিস? ওস্তাদি করে বললেই হলো?

হরিঃ      তুমি অত টাকা নিতে চাইছো না। যা রয়, সয় - এই ধরো বিশ- ত্রিশ হাজার, তার বেশি নয়।

নেপালঃ   সাবাশ, কী করে, বুঝলি হারামজাদা?

হরিঃ      জেলে আমরা আড়াই বছর দিনরাত একসঙ্গেই থাকতাম দাদা, তোমাকে চিনতে ভুল হয় নি, বলো?

নেপালঃ   তা হয় নি, কিন্তু তুই কী বলিস?

হরিঃ      কী ব্যাপারে, দাদা?

নেপালঃ   ওই যে টাকার ব্যাপারে?

হরিঃ      আমারও একই মত, বিশ- ত্রিশ, তার বেশী নয়। বলি বিবেক বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?

নেপালঃ   ঠিক বলেছিস।

হরিঃ      চলো দাদা, আঁচিয়ে আসি। তার পর টাকার প্যাকেট থেকে তিরিশ – আচ্ছা না হয় পঁয়ত্রিশ নিয়ে, চটপট কেটে পড়ি...।  বাকিটা পড়ে থাক যেমন আছে!

নেপালঃ   পঁয়ত্রিশ নয়, ভদ্রলোকের এক কথা – চল্লিশ। তুই আর ও নিয়ে দরদাম করিস না।

হরিঃ      তোমার কথার অবাধ্য কোনদিন হয়েছি দাদা? [এঁটো থালা নিয়ে দুজনের ভেতরে প্রস্থান। দরজার বেল বেজে উঠল, বার বার তিনবারতড়িঘড়ি দুজনের প্রবেশ।]

হরিঃ      কে হতে পারে দাদা? আমার মন কু গাইছে।

নেপালঃ   আমারও। আমাদের নেমন্তন্ন করে, সরকারি অতিথিশালায় নিয়ে যেতে এসেছে। [আবার বেল, সঙ্গে দরজায় ধাক্কা]

হরিঃ      দরজাটা খুলি? নাকি ছাদ দিয়ে পিছনের আমগাছ ধরে পালাবে?

নেপালঃ   পালানো যাবে? আটঘাট বেঁধেই এসেছে। খুলে দে। চল আরো কটা দিন সরকারি অন্ন ধ্বংস করে আসি।

[হরি দরজা খুলতেই, দুজন ভদ্রলোকের প্রবেশ। বিকাশ ও প্রদীপ - পুলিশের উর্দি নেই, কিন্তু চিনতে ভুল হয় না। প্রদীপ হরির হাত ধরল খপ করে। ]

বিকাশঃ   আপনারা? সনৎবাবু কমলবাবু কোথায়? সনৎবাবুর স্ত্রী? আপনারা কে?

নেপালঃ   আমি নেপাল, ও হরি।

বিকাশঃ   ও নাম তো নয়, আমার কাছে খবর আছে একজন বিপদতারণ, অন্য জন গোপাল। তাহলে আপনারা আবার কোথা থেকে উদয় হলেন?

নেপালঃ   আমরাই, আমি বিপদতারণ, ও গোপাল। অ্যালিয়াস।

বিকাশঃ   আচ্ছা। তোমরাই সেই ঘুঘু, ভেবেছিলে কোনদিন ধরা পড়বে না।

নেপালঃ   আজ্ঞে না স্যার, আমরা আদত খাঁচার পাখি, খাঁচার দরজা খুলে দিলেও, বাইরে একটু ফুড়ুৎ-ফাড়াৎ করে, আবার খাঁচাতেই ফিরে আসি। গতকাল দমদমের খাঁচা থেকে বেরিয়ে, আজ আবার ধরা পড়ার উপায় করলাম

বিকাশঃ   আচ্ছা? এঁরা দুজন কারা? এত লোকের কথাতেও নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন!

নেপালঃ   আজ্ঞে ইনিই সনৎকাকু, উনি কাকিমা। আর কমলকাকুরও একই অবস্থা, দোতলায় ঘুমোচ্ছেন।

বিকাশঃ   তাই নাকি? এমন ঘুমের কারণ কী? ঘুমের ওষুধের কড়া ডোজ? তোমাদের কীর্তি?

নেপালঃ   আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার ঠিকই ধরেছেন।

প্রদীপঃ   পাখি জাস্ট ওড়বার তাল করছিল, স্যার। আমাদের আসতে আর একটু দেরি হলেই ফুড়ুৎ।

বিকাশঃ   হুঁম্‌, এঁনাদের ঘুম কতক্ষণে ভাঙবে জানা আছে? নাকি ডাক্তার ডাকতে হবে? কিছু হয়ে গেলে কিন্তু মার্ডার কেস!

নেপালঃ   ডাক্তার ডাকতে পারেন স্যার, তবে ভয়ের কিছু নেই...সাড়ে তিনটে নাগাদ ওষুধ পড়েছে, আরো কিছুক্ষণ এমন চলবে।

বিকাশঃ   কী করবে প্রদীপ, হসপিটালে নিয়ে যাবে, নাকি অপেক্ষা করবে?

প্রদীপঃ   কী দরকার স্যার রিস্ক নিয়ে, ভ্যানটাকে ডেকে নিই, তুলে হসপিটালে নিয়ে যাক। এদের দুটোকেও তো লকআপে ভরতে হবে। আর এদিকে আমি কমলবাবুর মিসেসকে ফোন করি।

বিকাশঃ   সেই ভালো। এই গোপাল না হরি...এটাকে ছেড়ো না। আমি ধেড়েটাকে দেখছি।

নেপালঃ   [ম্লান হেসে] পালাবো না, স্যার। ইচ্ছে ছিল হাজার চল্লিশ নিয়ে কেটে পড়বো, সে যখন আর হল না, পালিয়ে কী করবো?

বিকাশঃ   হাজার চল্লিশ? কমলবাবুর ছয় আর সনৎবাবুর আট লাখ, মোট চোদ্দ লাখ হাতিয়েছো? আমাদের কাছে খবর আছে।

নেপালঃ   আজ্ঞে দোতলায় চলুন, বমাল পেয়ে যাবেন, দেখবেন কমলবাবু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কেমন আগলাচ্ছেন!

প্রদীপঃ   এ মক্কেল কঠিন জিনিষ স্যার, এই অবস্থাতেও আপনার সঙ্গে রসিকতা করছে!

বিকাশঃ   মিথ্যে বললে, আমার দাওয়াই কী জানে না তো... একনম্বর চোদ্দলাখ টাকার ফ্রডারি,

প্রদীপঃ   আই পি সি ৪১৬, ৪২০, ৪৪৭ আর ৩৭৯...

বিকাশঃ   দুনম্বর তিনজন সিনিয়ার সিটিজেনকে জোর করে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যার চেষ্টা...

প্রদীপঃ   আই পি সি ৩০৭...

বিকাশঃ   এমন এমন সব কেস দেব না? বাছাধন যাবজ্জীবন খাঁচায় বসে থাকবে!

নেপালঃ   (খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে) থ্যাংকিউ স্যার। অনেক ধন্যবাদ স্যার। কী বলে যে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাবো!

বিকাশঃ   (অবাক হয়ে) যাবজ্জীবনে এত উচ্ছ্বাস কিসের হে? সবাই তো হাতে পায়ে ধরে, পালাবার জন্যে ছটফট করে।

প্রদীপঃ   পলিটিক্যাল সাপোর্ট নেই তো স্যার? লকআপে ভরলেই ফোন আসবে...ছেড়ে দিন...কেস উইথড্র করুন।

নেপালঃ   না স্যার, কোন ফোন আসবে না, স্যার। নিশ্চিন্তে লকআপে রাখতে পারবেন স্যার। তবে একটু তদ্বির করে,  যদি তাড়াতাড়ি আদালত থেকে পানিশমেন্টটা করিয়ে দেন। একবার যদি কোন জেলে সেটল্‌ হতে পারি, স্যার, চিরজীবন আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো, স্যার।

বিকাশঃ   কি বুঝছো, প্রদীপ?

প্রদীপঃ   ফিস অফ ডিপ ওয়াটার, স্যার।

বিকাশঃ   যাও তো প্রদীপ, গোপাল না হরিকে সঙ্গে নিয়ে। দোতলার কী অবস্থা দেখে এসো। টাকার বান্ডিলগুলোও পেলে নিয়ে এসো। আমি এখানেই থাকছি। [প্রদীপ ও হরির প্রস্থান] বসো হে, পালাবার বেকার চেষ্টা করো না, দেখছো আমার কাছে রিভলভার আছে... [দুজনে মুখোমুখি চেয়ারে বসল]

নেপালঃ   দেখেছি স্যার। ওটা না থাকলেও পালাবার চেষ্টা করতাম না।

বিকাশঃ   দেখে তো শিক্ষিত ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। এই সব করে বেড়াও কেন? বার বার জেলে যেতে লজ্জা করে না?

নেপালঃ   আজ্ঞে স্যার, এক কালে শিক্ষিত ভদ্রলোক ছিলাম, অস্বীকার করবো না। তবে সে সব এখন আর নই।

বিকাশঃ   কেন? এ সব জাল জোচ্চুরি অভাবে করা হয়? নাকি স্বভাবে?

নেপালঃ   ঠিকই ধরেছেন স্যার, শুরু করেছিলাম অভাবে, এখন স্বভাব হয়ে গেছে।

বিকাশঃ   লেখাপড়া কদ্দূর?

নেপালঃ   বললে বিশ্বাস করবেন না, স্যার। ইঞ্জিনিয়ার। বিশ্বাস না করলে, দমদম থেকে আমার ফাইলটা আনিয়ে দেখতে পারেন, স্যার। সার্টিফিকেটের জেরক্স জমা করা আছে।

বিকাশঃ   বলেন...ইয়ে বলো কী? তার পরেও এই চোরচোট্টা লাইনে?

নেপালঃ   হে হে হে শিক্ষিত ভদ্রলোক থাকার জন্যে একটা মিনিমাম মেন্টিন্যন্স কস্ট আছে স্যার, সেট মানবেন তো? সেই কস্টটা রোজগার করতে হয়। অনেকে চাকরি করে, কেউ ব্যবসা করে। যার সে সব না জোটে, সে ভিক্ষে কর, নয় ফেরেব্বাজি করে।

বিকাশঃ   আর ওই হরি, না গোপাল?

নেপালঃ   ও আমাদের কলেজেরই ছেলে, স্যার। বছর দুয়েক আগে পাশ করেছে। আমার থেকে আট বছরের জুনিয়র। একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আলাপ, তারপর থেকে সুখে দুঃখে এক সঙ্গে রয়েছি। নাঃ ভুল বললাম, সুখেই আছি। দুঃখ আর কোথায়?  

বিকাশঃ   বাজারে চাকরি-বাকরির অবস্থা খারাপ মানছি, তাই বলে চেষ্টা করলে দুজন ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি হয় না, এটা মানতে পারলাম না, ভাই। এ একধরনের আলসেমি কিংবা বজ্জাতি করে বড়োলোক হওয়ার সখ।

[নেপাল নিরুত্তর]

বিকাশঃ   কী হল, উত্তর দিচ্ছ না যে?

নেপালঃ   আপনি সরকারি অফিসার স্যার, ঠিক বলবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী? যদি অভয় দেন তবে একটা কথা বলি স্যার?

বিকাশঃ   বলো। খুব যে ভয়ে আছো এমন তো মনে হচ্ছে না, বলো।

নেপালঃ   শহরের বড়ো বড়ো মলগুলোতে, শপিং প্লাজায় কী রকম ভিড় হয় দেখেছেন? খেলার মাঠে কী রকম ভিড় হয় সেও দেখেছেন। সবাই কী সুন্দর রোজগার করছে, তাই না? আবার অন্যদিকে দেখুন, স্যার, ক্লাস ফোর স্টাফ আর পিওনের চারটে পোস্টের জন্যে দেড় লাখের বেশি অ্যাপ্লিকেশন পড়েছিল, জানেন? তাতে আমিও ছিলাম। ওভার কোয়ালিফিকেশনের জন্যে ডাক পাইনি। আচ্ছা ওই দেড়লাখ কী ওইসব মলে যায়, নাকি খেলা দেখতে মাঠে যায়? কে জানে? আমি তো যাই না।

বিকাশঃ   ওসব অজুহাত। আমাদের তিনটে হাত, জানো কী? দুটো কাজ করার জন্যে আর একটা না করার জন্যে।

নেপালঃ   হে হে হে, এগুলো চমকদার কথার কারুকাজ, স্যার। শুনতে ভালো লাগেফেসবুক আর হোয়াট্‌স্‌ অ্যাপে খুব শেয়ার হয় স্যার খুব লাইক পায় (ব্যাগ সমেত হরি ও প্রদীপের প্রবেশ।)

বিকাশঃ   কী? টাকার বাণ্ডিল ঠিক আছে?

প্রদীপঃ   ব্যাংকের প্যাকেট হিসেবে চোদ্দই আছে। তবে প্যাকেটগুলো তো গুনতে পারিনি, সময় লাগবেপ্রত্যেকটা প্যাকেট না গুনলে বোঝা যাবে না। আর কমলবাবুও এঁদের মতোই নাক ডাকছেন খুব। এমন আরামের ঘুম বহুদিন ঘুমোননি মনে হচ্ছে!

বিকাশঃ   ভ্যানের জন্যে থানায় ফোন করেছেন?

প্রদীপঃ   এই করছি, স্যার।

বিকাশঃ   তাড়াতাড়ি করুন, আমরা কী সারারাত বসে থাকবো নাকি? তা নেপালবাবু, টাকা আগেই হস্তগত হয়ে গেছিল, সাড়ে তিনটের সময় সবাইকে অঘোরে ঘুম পাড়িয়ে, এতক্ষণ কী করছিলে বলো তো? আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলে নাকি?

প্রদীপঃ   অতি চালাকের গলায় দড়ি, বলে না, স্যার? হে হে হে হে।

বিকাশঃ   আপনি আগে ফোনটা করুন তো!

নেপালঃ   খুব খিদে পেয়েছিল স্যার। তাই একটু খাচ্ছিলাম – মাছের ঝোল দিয়ে ভাত। তাছাড়া এতগুলো টাকা নিয়ে কী করবো সেটা নিয়েও একটু চিন্তা করছিলাম। বেশ বুঝতে পারছিলাম চোদ্দ লাখ হজম করা আমাদের কম্মো নয়। ।

বিকাশঃ   আবার মিথ্যে কথা? যত্তো সব ঢপের কেত্তন? হজম করা কম্মো নয় তো করলে কেন? ধরা পড়ে ভালো সাজছো?

নেপালঃ   জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না, স্যার। আমরা যখন প্রথম টাকা ডবল করার টোপ দিয়েছিলাম, তখন কিন্তু আমরা পাঁচ-দশ হাজারের টোপই দিয়েছিলাম। কিন্তু এঁনারা দুই বন্ধুতে পাল্লা দিয়ে উঠে গেলেন লাখে। তাও সনৎকাকু বলেছিলেন পাঁচ আর কমলকাকু ছয়, কাকিমা সেই শুনে মেয়ের থেকে তিনলাখ ধার নিয়ে, করলেন আট। আমরা কিন্তু লাখের কথা ভাবিওনি, বলিওনি।

বিকাশঃ   সনৎবাবুর মেয়ে দিল্লি থেকে সাড়ে তিনটে থেকে মোবাইলে ট্রাই করে যাচ্ছেন, আর এদিকে কমলবাবুর স্ত্রী আর ছেলে...ওঁদের ফোনে না পেয়ে, আমাদের খবর দিয়েছেন।

নেপালঃ   সে বুঝতে পেরেছি। শিক্ষিত ভদ্রলোকের কথা বলছিলেন না, স্যার? এই দুজনকেই দেখুন না, নিজের বাড়ি, ব্যাংকে সঞ্চয়, ছেলে মেয়ে সকলেই প্রতিষ্ঠিত, তাও আরো আরো টাকার জন্যে কীরকম পাগল হয়ে উঠেছিলেন। অচেনা অজানা একটা লোকের স্রেফ কথার ফাঁদে পা দিয়ে দিলেন তিনজনে!

বিকাশঃ   এখন তো তুমি আর অচেনা অজানা নও, তুমি বমালসমেত ধরাপড়া একজন চোর। নিজের মুখেই সেটা তুমি স্বীকারও করে নিয়েছো। এত কিছু জেনেও তোমার সঙ্গে পুলিশের মতো আচরণ করতে পারছি না! কেন?

নেপালঃ   কেন?

বিকাশঃ   তোমার ওই চেহারা আর কথাবার্তার জন্যে। এমন একখানা শিক্ষিত-ভদ্রলোকের মুখোশ সেঁটে রেখেছো, বোঝে কার বাপের সাধ্যি!

নেপালঃ   ওইটাই একমাত্র পৈতৃক সম্পত্তি, আর কিছুই যে নেই!

বিকাশঃ   প্রদীপ, এদের দুটোর হাতেই হাতকড়া পরানআমাদের ভ্যানের সঙ্গে পাড়ার জনগণও জড়ো হবে। তারা আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। বলতে পারে তাদের হাতে অপরাধীদের তুলে দেওয়া হোক।

প্রদীপঃ   হ্যাঁ স্যার, পাবলিক একবার এদের হাতে পেলে কেলিয়ে হাতের সুখ করতে ছাড়বে না। [দুজনকে হাতকড়া পরালো অফিসার]

বিকাশঃ   শালা সরলমতি জনগণ, হঠাৎ বড়লোক হবার লোভে বারবার আহাম্মকি করবে, আর ভুগতে হবে আমাদের। চোর ধরো, জনগণ সামলাও, সুস্থ চোরকে জামাই আদরে রাখো,  আদালতে তোলো, উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করো, একটু উনিশ-বিশ হলেই বিচারকের এবং মানবাধিকারের হুড়কো খাও...সব শালা ওই সরলমতি অবুঝ জনগণের জন্যে।

          [বাইরে গাড়ির আওয়াজ, বেশ কিছু লোকের জটলার আওয়াজ, সদর দরজায় বেল বেজে উঠল। প্রদীপ দরজা খুলতেই বেশ কয়েকজন পুলিশ এবং তাদের পিছনে এক মহিলা বিশাখা ও এক ভদ্রলোক বাচ্চু ঢুকে পড়ল]

বিকাশঃ   প্রদীপ, চটপট এ দুজনকে ভ্যানে তোলো...অন্ততঃ দুজন যেন এদের প্রোটেকশনে থাকে। আর...

বিশাখাঃ (মেঝেয় শুয়ে থাকা সনৎবাবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে) ও বাবা, বাবাগো, এ তোমার কী হল বাবা...ও মা, এতো বাবা নয়, এযে সনৎজ্যেঠু...বাবা, কোথায়? 

বাচ্চুঃ     অফিসার, আমার বাবা কোথায়?

বিকাশঃ   আপনি কে? কে আপনার বাবা?

বাচ্চুঃ     আমি বাচ্চু, আমার বাবা কমলকান্তি মাইতি। আমিই আপনাদের থানায় ফোন করেছিলাম।

বিকাশঃ   বাঃ, আমাদের উদ্ধার করেছিলেন। আমরা কৃতার্থ হয়ে গেছি...।

বাচ্চুঃ     বাবা কোথায়? প্রশাসন থাকতেও প্রকাশ্য দিনের বেলা এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল?

বিকাশঃ   প্রশাসন কী বাড়ি বাড়ি বসে পাহারা দেবে? আপনার পিতৃদেব গোপনে টাকা ডবল করাচ্ছিলেন, টাকা ডবল হলে কী প্রশাসন জানতে পারতো? আপনার বাবা, কমলবাবু দোতলায় ঘুমোচ্ছেন। আপনারা তদন্তের কাজে বাধা দেবেন না...আমাদের ডিউটি করতে দিন।

[সনৎবাবু এবং পৃথাদেবীর ঘুম ভেঙেছে, দুজনেই উঠে বসে ঘুমজড়ানো চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, ঘরের ভেতর এত লোকজন ও পুলিশ দেখে। নেপাল ও হরিকে হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় পুলিশেরা বাইরে নিয়ে গেল। ওদের দেখে বাইরের হট্টগোল আরো বেড়ে উঠল।]

বাচ্চুঃ   এতক্ষণে আপনাদের ডিউটির কথা মনে পড়ল, চোরদুটো ধরা পড়েছে?

বিকাশঃ ধরা পড়েছে, আমরা ওদের অ্যারেষ্ট করেছি। আপনি যান বাবাকে দেখে আসুন।

বাচ্চুঃ     ব্যাটাদের সাজিয়ে থানায় নিয়ে যাচ্ছেন? শালা, ঠগবাজ, জোচ্চোর, শুয়োরের বাচ্চাদের কেলিয়ে হাড় ভেঙে দেবো।

বিকাশঃ আইন নিজের হাতে নেবেন না, আমরা তদন্ত করছি, অপরাধী শাস্তি পাবেই...

বাচ্চুঃ     আইনের নিকুচি করেছে, থানায় নিয়ে গিয়ে সব শালা গট-আপ খেলে ছেড়ে দেবেন...সে আর জানি না, আমাদের হাতে ওদের তুলে  দিন...

বিকাশঃ   (কড়া স্বরে) আপনি যদি এভাবে পুলিশের কাজে বাধা দেন, তাহলে কিন্তু আপনাকেও অ্যারেষ্ট করতে বাধ্য হবো, থানায় চলুন, আপনাদের যার যা কমপ্লেন থানায় গিয়ে রিপোর্ট করুন... [ভেতর থেকে কমলবাবুর প্রবেশ, কিছুটা আলুথালু অবস্থা, বিশাখা দৌড়ে গিয়ে কমলবাবুকে ধরল]।

বিশাখাঃ   বাবা...কেমন আছো বাবা? তোমার এ অবস্থা কেন?

কমলঃ    কী হয়েছে রে, সনৎ? এত চেঁচামেচি কিসের? ওরা কোথায়?

সনৎঃ    আয় এখানে এসে বস, মনে হচ্ছে সব গেল, ওদের পুলিশ ধরেছে...

কমলঃ    সে কী রে? আমাদের টাকা? আমার ছয়...

বাচ্চুঃ     ছয় কোথায় বাবা? তোমার কী ভীমরতি হয়েছে? আমাদের দশ লাখ...

বিশাখাঃ   ভীমরতি কী বলছো, গো? বাবাকে ওরা ছাইপাঁশ কীসব খাইয়ে দিয়েছে, মনে হয় বাবার মাথাটাই গেছে?

বাচ্চুঃ     অফিসার, টাকাগুলোর কোন হদিশ পাওয়া গেছে?

বিকাশঃ   পাওয়া গেছে, আমাদের কাস্টডিতেই এখন থাকবে। কেস মিটলে, মহামান্য আদালত যেমন বলবে, আপনারা টাকা ফেরত পাবেন।

বাচ্চুঃ     কত টাকা পাওয়া গেছে?

বিকাশঃ   থরো চেক আপ এখনো করা হয়ে ওঠেনি, চোদ্দটা নোটের বাণ্ডিল মিলেছে!

বাচ্চুঃ     ওর মধ্যে দশটা আমাদের...।

সনৎঃ    ওরে কমল তোর তো ছয় ছিল, আমার ছিল আট...

কমলঃ    তাই তো, কিন্তু এখন বাচ্চু যে বলছে দশ, আমার কী তবে গুনতে ভুল হয়েছিল?

বিকাশঃ   হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ বাচ্চুবাবু, কাল থানায় ব্যাংকের স্টেটমেন্ট জমা দেবেন, আদালত কিন্তু জানতে চাইবে, ক্যাশ দশ লাখ কোথা থেকে পেলেন, কীভাবে পেলেন...

বাচ্চুঃ     কেন? ব্যাংকের স্টেটমেণ্ট দিতে হবে কেন? টাকা আমাদের ঘরেই ছিল...

বিকাশঃ   সে কথা আমাদের বলে লাভ নেই, বাচ্চুবাবু। আদালতে বলবেন, আদালত প্রমাণ চাইবে। চল হে প্রদীপ, এঁনাদের সকলেরই যখন ঘুম ভেঙেছে, আমাদের কাজ শেষ। পারলে আজ রাত্রে চলে আসুন, নয়তো কাল সকালে সবাই থানায় আসবেন, রিপোর্ট লিখিয়ে যাবেন... প্রদীপ, সনৎবাবু আর ম্যাডামকে দিয়ে সিজার লিস্ট সই করাও, বাচ্চুবাবু আর এঁনারা উইটনেস থাকবেন, ওঁনাদেরও সবাইকে দিয়ে সই করাবে...। যে ভাবে টাকার হিসেব বাড়ছে...বেশিক্ষণ থাকলে আরো বাড়বে...থানা থেকে না ভরতুকি দিতে হয়...আমি বাইরে ওয়েট করছি, চটপট ফর্ম্যালিটিস শেষ করো।

সনৎঃ    আপনি কী চলে যাচ্ছেন নাকি? [বিকাশ বেরিয়ে যেতে গিয়েও দাঁড়াল]

বিকাশঃ   হ্যাঁ, কিছু বলবেন?

সনৎঃ    আপনার নামটা জানতে পারি?

বিকাশঃ   বিকাশ ঘোষ।

সনৎঃ    ঠিক ঠিক মনে পড়েছে, আপনার সঙ্গে বেশ কিছুদিন আগে একবার আলাপ হয়েছিল...আমাদের সমিতির পুজোর ব্যাপারে থানায় গিয়েছিলাম... [বিকাশ কিছুটা অধৈর্য]

বিকাশঃ   বাঃ খুব আনন্দ পেলাম, কিন্তু এখন কী কিছু বলবেন?

সনৎঃ    বলব...কিন্তু ওরা দুজন কোথায়?

বিকাশঃ   কারা দুজন?

সনৎঃ    ওই যে বিপদ আর গোপাল।

বিকাশঃ ওটা ওদের আসল নাম নয়, ওদের নাম নেপাল আর হরি।

সনৎঃ   ওরে বাবা, ওদের অষ্টোত্তর শত নাম থাক, তারা এখন কোথায়?

বিকাশঃ   বললাম না, ওরা পালাতে পারেনি, অ্যারেষ্টেড হয়েছেবাইরে ভ্যানে আছে। আর টাকার প্যাকেটও উদ্ধার হয়েছে।

সনৎঃ    ধুর বাবা, পালাবার কথা আসছে কোথা থেকে? ওরা পালাবার লোকই নয়!

বিকাশঃ   তার মানে?

সনৎঃ    মানে-টানে পরে হবে, আগে ওদের এখানে আনুন, ছি ছি, ভদ্রলোকের এমন হেনস্থা!

বাচ্চুঃ     কাকে কী বলছো, কাকু? দুটো চোর, ক্রিমিন্যালকে ভদ্রলোক বলছো?

সনৎঃ    আঃ বাচ্চু, বড়দের কথায় কথা বলতে নেই, কমল তোর ছেলেটা আর মানুষ হল না...কই হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? ওদের ছেড়ে দিন, এখানে নিয়ে আসুন।

বিকাশঃ   প্রদীপ, যাও তো ওদের নিয়ে এসো। [প্রদীপের প্রস্থান]

পৃথাঃ     তোমার কী ভীমরতি হল? নাকি ঘুমের ওষুধে মাথাটা বিগড়োলো? [সকলকে চমকে দিয়ে, চিৎকার করে]

সনৎঃ    স্তব্ধ হও নারী, তব অসার বাক্যবাণে আর না রহিব অসাড়...বাঃ বেশ একটা ইয়ে অনুভব করছি... মানে তেজ...! [মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে সবার দিকে তাকালেন, ভাবখানা কেমন দিলাম!]

বিশাখাঃ   হ্যাঁগো শুনছো, বাবাকে নিয়ে বাড়ি চলো...শেষে পাগলের পাল্লায়... [নেপাল ও হরিকে নিয়ে প্রদীপের প্রবেশ। দুজনের হাতে হাতকড়ি, মাথা নিচু।]

সনৎঃ    এসেছো বিপদ? ওদের হাতে হাতকড়ি কেন? ছি ছি ছি, খুলে দিন।

বিকাশঃ   ওরা পালালে কিন্তু আপনাকেও অ্যারেষ্ট করতে বাধ্য হবো সনৎবাবু।  ক্রিমিন্যালদের পালাতে সাহায্য করার জন্যে। প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার জন্যে...

সনৎঃ    আরে ভালো বিপদ তো, ওরা চোর না ডাকাত...সেই থেকে পালাবে পালাবে করছেন? খুলুন বলছি...

বিকাশঃ   খুলে দাও, প্রদীপ। দেখি এখন আবার কী নাটক হয়! [প্রদীপ দুজনের হাত মুক্ত করে দিল]

সনৎঃ    এখানে এসো বিপদ, সোফায় বসো...ওরা তোমায় মারধোর করেনি তো?

নেপালঃ   নাঃ কাকু। আর আমি বিপদ নই, নেপাল। ওর নাম হরি, গোপাল নয়।

সনৎঃ    না না, বিপদ নামটাই তোমাকে বেশি মানায়, বিপদ নামটাই আমি বলবো।

কমলঃ    যা বলেছিস, যা বিপদে আমাদের ফেলেছিল...

সনৎঃ    একদম ফালতু কথা বলবি না, কমল। ওরা বিপদে ফেলেছিল, না আমরা?

বাচ্চুঃ     বাবা, তুমি এসবে থেকো না, চলো বাড়ি যাই।

সনৎঃ    চোপ, একটা কথা বললে... [যেভাবে ধমকে উঠলেন, সকলেই চুপ]

কমলঃ    কী হল বল তো? তোকে তো এত হম্বিতম্বি করতে কোনদিন দেখিনি!

পৃথাঃ     চিরকেলে মেনিমুখো, হঠাৎ আজকে...

সনৎঃ    একদম চোপ। এতদিন তোমাদের মাথায় তুলেছি বলে, ভেবো না চিরকাল রাখবো। বিকাশবাবু টাকার বাণ্ডিল কোথায়?

বিকাশঃ   [প্রদীপের দিকে তাকিয়ে] কোথায়?

প্রদীপঃ   আমার কাছে, এই ব্যাগে।

সনৎঃ    বের করুন। [প্রদীপ ইতস্ততঃ করছিল, ধমকে উঠে] কথাটা কানে যাচ্ছে না?

বিকাশঃ   বার করো হে, দেখি না কোথাকার তেল কদ্দূর গড়ায়। [টাকার প্যাকেট ব্যাগ থেকে বের করে সনৎবাবুর হাতে হস্তান্তর]

সনৎঃ    [একটা প্যাকেট পৃথাদেবীকে দিয়ে] এটাই আমাদের প্যাকেট না? দেখোতো কটা বাণ্ডিল আছে। [অন্যটা কমলবাবুকে দিয়ে] তুইও চেক করে নে।

পৃথাঃ     [প্যাকেট খুলে] আটটাই আছে। ঠাকুরপো তোমার?

কমলঃ    আমারও ছটাই আছে।

সনৎঃ    আমি এর থেকে ষোলো দেবো, তুই কত দিবি কমল?

কমলঃ    কী দেব?

সনৎঃ    টাকা!

কমলঃ    কাকে দেব?

সনৎঃ    বিপদকে।

কমলঃ    কী আশ্চর্য, কেন দেবো? চোর...জোচ্চোর চিটিংবাজ...

সনৎঃ    [কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে, যেভাবে বিচারক ফাঁসির ঘোষণার আগে অপরাধীর দিকে তাকান] তুই চিরকালই চার অক্ষরের বোকা ছিলি মনে আছে? ওরা কী আমাদের বাড়ি এসে বলেছিল, হ্যাগো আমায় জোচ্চুরি করতে দেবে?

কমলঃ    তাতে কী?

সনৎঃ    তাতে কী? আমরা ওদের খোশামুদি করে বাড়ি নিয়ে আসিনি?

কমলঃ    বা রে, সে তো টাকা ডবলের লোভে...হতভাগা যা টোপ ফেলেছিল...

সনৎঃ    অ্যাই...পথে এসো বাছাধন। টোপ দিয়ে মাছ কারা ধরে?

কমলঃ    আমরা, মানুষরা।

সনৎঃ    বাঃ বুদ্ধি খুলছে...টোপ খেয়ে মাছের কী হয়?

কমলঃ    তোর নির্ঘাৎ ভীমরতি হয়েছে সনৎ, হে হে হে হে, টোপ খাওয়া মাছের আবার কী হবে? ভাজা হবে, ঝাল হবে...

সনৎঃ    আমি আর তুই টোপ গিলেছি, তাহলে আমাদের কী হবে?

কমলঃ    অ্যাঁ?

সনৎঃ    অ্যাঁ নয় রে হতভাগা, হ্যাঁ।

পৃথাঃ     হ্যাঁগো, তোমার কী নিজেকে মাছ মনে হচ্ছে? বাবা বাচ্চু, ডাক্তার সামন্তকে খবর দেবে বাবা? বলো এখনই একবার আসতে।

সনৎঃ    [স্ত্রীর দিকে বিদ্রূপের হাসি নিয়ে] তোমার প্যাকেট থেকে ষোলো বের করো, মৎস্যকন্যা। [পৃথাদেবীর মুখের সামনে হাত নেড়ে] “মাছ লয় গো মচ্ছকন্যা...রূপেগুণে অথৈ বন্যা”। টাকা ডবল করে ইওরোপ যাবে না?

পৃথাঃ     [সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে টাকা বের করে] এই নাও ষোলো।

সনৎঃ    কাৎলার মুড়ো দেখতেই ঢাউস, ঘিলু থাকে এক ছিটে। ষোলোশ নয়, ষোলো হাজার।

পৃথাঃ     হা জা র?

কমলঃ    হা জা র?

সনৎঃ    [মুখ ভেংচে]  না, হাজার কেন হবে? ষোলটাকা। আর এই যে তুই বৌদির সুরে সুর মেলাচ্ছিস...তুই দিবি বারো হাজার!  

কমলঃ    তোর মতিচ্ছন্ন হয়েছে, তুই দিতে হয় দিগে যা, আমি দেবো না, টাকা কী গাছে ফলে?

সনৎঃ    গাছে টাকা ফলে না, আগে জানতিস না? লেজ নেড়ে কেন ওদের ডাকলি?

কমলঃ    তুইও তো ডেকেছিলি। আমি একলা নাকি?

সনৎঃ    সেই জন্যেই তো প্রায়শ্চিত্ত করছি। আহাম্মকির প্রায়শ্চিত্ত। লোভের প্রায়শ্চিত্ত। হতভাগা কাল সকালে পাড়ার লোক, সামতাপুরের লোক যখন আওয়াজ দেবে...কী কমলবাবু...টাকা ডবল হলো না? খুব দাঁও মারতে গেছিলেন...একটুর জন্যে ফস্কে গেল...মুখ দেখাতে পারবি তো?

কমলঃ    সত্যি...খুব গুখুরি হয়ে গেছে...ছেলে বুড়ো সবাই টিটকিরি দেবে রে...

সনৎঃ    হতভাগা এখনো সময় আছে...

কমলঃ    কিসের সময়?

সনৎঃ    ওদের দুটোকে কিছু টাকা দিয়ে ছেড়ে দিই। ওরা আজ রাত্রেই সামতাপুর থেকে কেটে পড়ুক।

কমলঃ    তাতে লোকে আর টিটকিরি দেবে না?

সনৎঃ    বিকাশবাবুকে রিকোয়েস্ট করবো কোন কেস না দিয়ে, এই ঘটনার কথা চেপে যেতে...

বিকাশঃ   তা কী করে হবে? আমরা এলাম, পুলিশের ভ্যান এল!

সনৎঃ    তাতে কী? মিস আণ্ডারস্ট্যান্ডিং...একটা ভুল খবর পেয়ে এসেছিলেন...

বিকাশঃ   হুঁ...

প্রদীপঃ   স্যার, আমরাই না কেস খেয়ে যাই...

বিকাশঃ   চোপ! এটা এখন বিবেকের কেস... প্রতিবেশীর ছিছিক্কার থেকে বাঁচার কেস...

প্রদীপঃ   কিন্তু আপনিও চোপ বলছেন, স্যার?

বিকাশঃ   হুঁ, মনে হচ্ছে ওটা ছোঁয়াচে। একটা ব্যাপার ভেবে দেখেছো প্রদীপ, আদালতে উঠলে এ কেস কতদিনে নিষ্পত্তি হবে কে জানে! কিন্তু শুনানি শুনতে ভিড় ঠেকানো দায় হবে। আমাদের থানায় কজন কনস্টেবল আছে প্রদীপ? সে ভিড় সামলাতে পারবে?

প্রদীপঃ   আদালতে ভিড় হবে কেন, স্যার?

বিকাশঃ   শহরের মান্যিগণ্যি দুই মাতব্বর চব্বিশ ঘন্টায় টাকা ডবল করতে গেছিল, এমন দুই খোরাক পিস্‌ পেলে পাব্লিক ছেড়ে দেবে? গাঁটের কড়ি খরচ করে লোকে আলিপুর চিড়িয়াখানায় যাবে কেন? আদালতে ভিড় জমাবে!

প্রদীপঃ   তাহলে উপায়?

বিকাশঃ   এঁনারা যা করছেন করুন। আমরা নীরব সাক্ষী থাকি।  একদম চোপ!

সনৎঃ    আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেবো, বিকাশবাবু? কী রে কমল? এখনো কী ভাবছিস?

কমলঃ    [ইতস্ততঃ করেও টাকা বের করল] এই নে, বারো হাঃ...জার।

সনৎঃ    [টাকা হাতে নিয়ে] হাজার বলতে একেবারে হাহাকার করে উঠলি যে, কমল। বিপদ, এই টাকা কটা রাখো, বাবা। আজ রাতটুকু কাটিয়েই যেতে বলতাম, কিন্তু সে উপায় নেই। একেবারে ঘাড়ে সংক্রান্তি! অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে সরে পড়ো, বাবা।

বিপদঃ    ও টাকা আমি নিতে পারবো না, কাকু।

সনৎঃ    ন্যাকামি করে সময় নষ্ট করো না, বাবা। তুমিও মরবে, আমরাও। তুমি তো আমাদের বলেছিলে, পাঁচ দশ হাজার টাকার স্যাম্পল নিয়ে ট্রায়াল করতে। আমরাই তো লাফিয়ে উঠে বলেছিলাম, পাঁচলাখ আর ছয় লাখ। মারি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার। তোমার কাকিমা আবার তিন লাখ বাড়িয়ে তুলল, বলল আটলাখনাও ধরো।

বিপদঃ    [টাকাটা নিল] আপনাদের কথা কোনদিন ভুলবো না, কাকু।

সনৎঃ    আমরাও না। অন্ততঃ আমি তো ভুলবোই না। এই বুড়ো বয়সে কী বোকামি আর কী লোভ – আজ বাদে কাল খাটিয়ায় চড়বো...তাও ফোকটে টাকা ডবলের কথা শুনে এমন খেপে উঠলাম! ছি ছি। তুমি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছো বাবা। এসো দুগ্‌গা, দুগ্‌গা। আর দেরি কোর না। আটটা বাহান্নয় একটা ডাউন ট্রেন আছে না, কমল? ধরতে পারবে তো?

কমলঃ    দরকার কী? বাচ্চু, যা তো একটা রিকশ ডেকে ওদের তুলে দে, ভাড়াটা আমিই দিয়ে দেব...স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসুক...

সনৎঃ    ওফ্‌ কমল, একদম মনের কথা বলেছিস, সেই ভালো। যা যা, বাচ্চু ওদের রিকশয় তুলে দিয়ে আয়। 

          [নেপাল ও হরি নিচু হয়ে সকলকে নমস্কার করল, তারপর বাচ্চুর সঙ্গে প্রস্থান]

কমলঃ    হ্যারে সনৎ, একটা কথা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।

সনৎঃ    কী?

কমলঃ    এতদিন পরে তুই হঠাৎ এমন চেগে উঠলি কী করে? একেবারে বিবেক-টিবেক ঘাড়ে নিয়ে হুড়মুড় করে?

সনৎঃ    (পা দুলিয়ে দুলিয়ে মুচকি মুচকি হেসে) সে একটা ব্যাপার আছে!

কমলঃ    ব্যাপার তো কিছু আছেই, তা নইলে এমন হরণ কালে মরির নাম হয় কী করে?

সনৎঃ    হতভাগা, কথাটা মরণকালে হরির নাম...তুই সেই চার অক্ষরেরই রয়ে গেলি...। সলিড একটা ঘুম।

কমলঃ    যাচ্চলে, কী আবোল তাবোল বকছিস? সলিড ঘুম মানে?

সনৎঃ    বিয়ের পর থেকে আজ অব্দি তুই ক রাত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিস?

কমলঃ    কেন প্রায় সব রাতই, ট্রেন জার্নি, বাস জার্নি কিংবা বিয়ে-টিয়ে, শ্মশানযাত্রা – এরকম দু একদিনের ব্যাপার ছাড়া...

সনৎঃ    হতে পারে তুই তার মানে ভাগ্যবান। আমি কিন্তু বিয়ের পর থেকে এমন নিটোল ঘুম আজ ঘুমোলাম।

কমলঃ    কী ছাতার মাথা বকছিস বুঝছি না। (পৃথাদেবীর দিকে তাকিয়ে) সনৎ, কী বলছে গো, বৌঠান...  

পৃথাঃ     (মুখ ঝামটা দিয়ে) হুঃ, ছাড়ো তো ঠাকুরপো, বুড়োর মতিচ্ছন্ন ধরেছে।

সনৎঃ     (স্ত্রীর দিকে কটমট করে তাকিয়ে) বিয়ের পর নতুন বউ নিয়ে মাস দুই-তিন রাত্রে কেন ঘুম হয় না, সে কথা ছেলেপুলেদের সামনে আর বলবো না। সে তুইও জানিস।

পৃথাঃ     (লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে) আ মলো যা, মিনসের এতদিন পর আবার সে সব কথা কেন?

সনৎঃ    কিন্তু তারপর থেকে নতুন বউ যতো পুরোনো হয়েছে, রাতের ঘুম চটকে দিয়েছে রোজ...

কমলঃ    সে আবার কী?

সনৎঃ    গরমকালে মাঝরাত্রে ঠেলে তুলেছে, পাখার স্পিডটা দেখোতো কমানো আছে কী না! নয়তো জানালাগুলো খুলে দাও তো দমবন্ধ হয়ে আসছে। শীতকালে, জানলার ফাঁকে গামছা গুঁজে দাও তো, আদ্যিকালের লজঝড়ে জানালার ফাঁক দিয়ে হিলহিলে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে...

কমলঃ    তা মন্দ বলিস নি...

সনৎঃ    দাঁড়া আরো আছে। কিচ্ছু না পেলে, মশারিতে মশা ঢুকেছে...লাইটটা জ্বালিয়ে দেখো তো...। নয়তো নিচের ঘরে একটা আওয়াজ পেলাম না, হ্যাগো, চোর-টোর ঢোকেনি তো? যাও না দেখে এসো না একবার।

কমলঃ    হে হে হে হে...

সনৎঃ    শুনছো, বিকেলে ছাদের দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছি মনে হচ্ছে, যাও না, একবার দেখে এসো নাতা নইলে ভাম ঢুকে হেগে দিয়ে যাবে বাড়িময়...

কমলঃ    ধুর সে যাই হোক সে আর কদিন?

সনৎঃ    রোজ রে ভাই, রোজ। বিয়ের পর আজ এই প্রথম টানা তিন ঘন্টা সলিড ঘুমোলাম।

কমলঃ    আর তাতেই তুই চেগে উঠলি?

সনৎঃ    আলবাৎ। ভালো ঘুম মানুষকে চাঙ্গা করে তোলে, আর আধঘুম-আধজাগা মানুষেরা সর্বদা অবসন্ন হয়ে থাকে।

কমলঃ    তুই পারিসও বটে...

সনৎঃ    তুই মানিস কিংবা না মানিস...আমার মধ্যে কিন্তু একটা জোর এসেছে... বুদ্ধি-শুদ্ধি, বিবেক-টিবেকগুলোও ঠিকঠাক সাথ দিচ্ছে। মাইরি বলছি, অ্যাদ্দিন কেমন যেন ম্যাদামারা হয়ে ছিলাম, কোন উৎসাহ নেই, সবই মনে হতো য্যাগ্‌গে যা হচ্ছে হোক... আজ...

[অধৈর্য হয়ে বিকাশ উঠে দাঁড়াল]

বিকাশঃ   সত্যি চমৎকার হয়ে গেছে, সনৎবাবু, চমৎকারআরেকদিন এসে আপনার আরো গল্প শুনবো। এখন আমরাও তাহলে উঠি, সনৎবাবু, কমলবাবু?  ভ্যান নিয়ে এসে অনেক ভ্যানতাড়া দেখলাম, এবার চলি?

সনৎঃ    অনেক কষ্ট দিলাম, ভাই। আজকে চা খাওয়ানোর মতো অবস্থাতেও নেই, নইলে...একদিন চলে আসবেন, ছুটিছাটার দিনে...হাতে সময় নিয়ে...

প্রদীপঃ   এমন একখানা কেসের শেষে একটা গান হবে না, স্যার?

বিকাশঃ   গান? কিসের গান?

প্রদীপঃ   বিবেকের গান স্যার, আমাদের গ্রামের দিকে শীতকালে খুব যাত্রা হয়, সেখানে বিবেকের গান হয়...

বিকাশঃ   তুমি কী এখন বিবেকের গান গাইবে নাকি, প্রদীপ?

কমলঃ    বাঃ বাঃ, ওটাই বা বাকি থাকে কেন? যাবার আগে একটা গান শুনিয়ে যান প্রদীপবাবু। পুলিশের হাতে, কাঁধে গান দেখেছি বিস্তর, কিন্তু গলায়...কক্‌খনো না... কী বলিস, সনৎ?

সনৎঃ    বিলক্ষণ, এমন অনুষ্ঠান শেষে গান না হলে চলে? প্রদীপবাবু চালু করুন...

প্রদীপঃ   [গলা ঝেড়ে একটু ভঙ্গী নিয়ে] অবশেষে ভালোবেসে খুঁজে পেলি মন... সেই অমূল্য রতন...গুরুগুরু ঝং...

বিকাশঃ   ওটা কী হল?

প্রদীপঃ   ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক স্যার, না থাকলে ঠিক বেগ আসে না...

বিকাশঃ   বেগ না আবেগ...আচ্ছা ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি শেষ করো...তারপর?

প্রদীপঃ   অবশেষে ভালোবেসে খুঁজে পেলি মন

সেই অমূল্য রতন...গুরুগুরু ঝং...

          ও মন, ছয় জন করে ছল চাতুরি...

ও মন, ছয় জন করে ছল চাতুরি...

করে আঁদাড়পাঁদাড় ঘোরাঘুরি...

ও মন ঘোরাঘুরি করে...গুয়ে মাছির মতন ...

অবশেষে ভালোবেসে খুঁজে পেলি মন

সেই অমূল্য রতন...গুরুগুরু ঝং...

 

ভাবের ঘরে বিবেক বসে করে কারিকুরি  

          ও ভোলা মন, বিবেক বসে করে কারিকুরি

          তার কাছে চলবেনিকো কোন জারিজুরি

          ও মন চলবেনিকো জারিজুরি ... সে যে বড্ডো জ্বালাতন।

অবশেষে ভালোবেসে খুঁজে পেলি মন

সেই অমূল্য রতন...গুরুগুরু ঝং...। আর মনে নেই স্যার...খুব লম্বা গান ...

বিকাশঃ অনেক হয়েছে প্রদীপ, এবার চলো আমরা সবাই লম্বা হই...

[মঞ্চের সামনে সকল কুশীলব এসে উপস্থিত, মঞ্চে উজ্জ্বল আলো, দর্শকদের প্রতি সকলের নমস্কার, পর্দা নেমে এল।]

 

সমাপ্ত 


নতুন পোস্টগুলি

এক দুগুণে শূণ্য (নাটক)

 এর আগের গল্প - "  জঙ্গী ব্যবসা   " এর আগের নাটক - "  চ্যালেঞ্জ - নাটক "  কুশীলবঃ (মঞ্চে প্রবেশের ক্রম অনুসারে) পতিত ...