শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দ্বাদশ পর্বাংশ 


৪.৬ সম্রাট হর্ষ পরবর্তী উত্তর ভারত

এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী অধ্যায়গুলি পড়তে বিরক্তি আসতেই পারে। যাঁরা ইতিহাস নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন কিংবা ঐতিহাসিক হয়েছেন, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু এত রাজবংশ, রাজাদের নাম এবং তাঁদের অজস্র সালতামামি মনে রাখার ভয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলজীবনে ইতিহাস বই ছুঁলেই দু চোখ জড়িয়ে আসত গভীর ঘুমে। তা সত্ত্বেও, ইতিহাস-বিরক্ত সাধারণ পাঠকদের জন্যে খুব সংক্ষেপে এই পর্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করবলক্ষ্য রাখুন, ৬৪৭ সি.ই.-তে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত – দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছ-শো বছরের ভারতীয় রাজনীতির পরিস্থিতির দিকে। সে সময় আমাদের এই ভারতবর্ষ কতগুলি টুকরো ছিল। এবং সেই টুকরোগুলির অধিকার নিয়ে কতগুলি রাজবংশ সৃষ্টি হয়েছে, আর কতগুলি ধ্বংস হয়েছে। প্রত্যেকটি টুকরো রাজ্য কীভাবে প্রতি নিয়ত ব্যস্ত ছিল লাগাতার যুদ্ধে। শুধু সেইটুকুই লক্ষ্য রাখুন।

তা নাহলে কী করে বুঝবেন, আমাদের আধুনিক ভারতবর্ষের চেহারাটা কেন এমন হল? উত্তরভারতের সঙ্গে কেন বনে না দক্ষিণভারতের? বঙ্গ–বিহার-উড়িষ্যার মতো প্রতিবেশী রাজ্যবাসীদের মনে কেন সুপ্ত হয়ে রয়েছে বিদ্বেষ? একটু ফুলকির স্পর্শেই কেন ঘটে যায় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাসমূহ? আমরা যতই আশ্চর্য ও অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিময় যুগে জীবনযাপন করি না কেন, আমাদের মানসিকতার সিংহভাগ পড়ে আছে সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর আশেপাশেই!    

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে” - কবিগুরু যখন এই কথাগুলি লিখেছিলেন, তখন কি তিনি ভারতের এই ইতিহাস জানতেন না? আমি নিশ্চিত, অন্ততঃ আমার থেকে সহস্রগুণ ভালোভাবে জানতেন। তবুও তিনি লিখেছিলেন, হতে পারে, তার একটিই কারণ – ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সাধারণ ভারতীয়দের ঐক্য দেখে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন ভারত বুঝি বা এমনই থাকবে। কিন্তু কই, আমরা তেমন তো রইলাম না? কিন্তু কেন থাকতে পারলাম না? এই সাড়ে ছ-শ বছরের রাজতন্ত্র এবং প্রশাসনিক উচ্চমহলের আত্মক্ষয়ী নির্বোধ অহংকার ও বিবেকহীন দুর্নীতি আমাদের জীবন এবং ভাবনা- চিন্তায় যে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, সেই অভিশাপই যে আমরা আজও বহন করে চলেছি। 

 

৪.৬.১ উত্তরভারতের কনৌজ

আলোচ্য সময়ে উত্তর ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য ছিল কনৌজ – তার রাজধানী কান্যকুব্জ বা কনৌজ শহরের আধুনিক অবস্থান – আধুনিক উত্তরপ্রদেশের প্রায় মধ্যস্থলে। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার কোন কোন সময়ে, দক্ষিণে নর্মদা নদীর উত্তর তীর, পশ্চিমে গুজরাট-সৌরাষ্ট্রের অধিকাংশ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের বেশ কিছু অংশ, উত্তরে কাশ্মীরের কিছুটা এবং নেপালের অধিকাংশ, আর পূর্বে বঙ্গ সাম্রাজ্যের সীমানা

আমরা আগেই দেখেছি কনৌজ সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সম্রাট হর্ষবর্ধন। অতএব তাঁর মৃত্যুর পর দক্ষ ও পরাক্রমী সম্রাটের অভাবে কনৌজকে বারবার প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। এই দুই প্রতিবেশী সাম্রাজ্য হল দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট ও পূর্বের পাল রাজারা।

প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কনৌজ অধিকারের পিছনে রাজনৈতিক অনেকগুলি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধানতম ছিল, পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে সহজ বাণিজ্যপথগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। পাশের মানচিত্রটি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, পূর্ব এবং দক্ষিণের থেকে পশ্চিমের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থলপথটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কনৌজ সাম্রাজ্যের হাতেউপরন্তু, সমগ্র উত্তরভারতের বৈদেশিক নৌবাণিজ্যের প্রধান সমুদ্র বন্দর - গুজরাটের বন্দর শহরগুলিও ছিল কনৌজের আয়ত্ত্বেঅতএব প্রতিবেশী দুই শক্তির স্বপ্ন ছিল কনৌজ সাম্রাজ্য অধিকার করে উত্তরভারতে তাদের সম্পূর্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এই তিন সাম্রাজ্যের অধিপতিদের মধ্যে কেউই এমন কিছু (মৌর্য বা গুপ্ত রাজাদের মতো) প্রতিভাধর পরাক্রমী কিংবা সুদক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, যাতে করে তাঁদের স্বপ্নপূরণ ঘটতে পারত। বরং প্রায় ২৫০ বছর ধরে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করে, একটানা খুব জোর দু-তিন দশকের জন্য কনৌজকে নিজেদের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। তার ফলে তিনটি সাম্রাজ্যই দুর্বল হতে হতে, নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং পরবর্তীকালে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল।  

ওপরের মানচিত্রে দেখানো তিনটি সাম্রাজ্য যেমন নিজেদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে থাকতেন, পরবর্তী কালে টুকরো রাজ্যগুলির রাজবংশসমূহও সেই পরম্পরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছিলেন, মোটামুটি ১৩০০ সিই পর্যন্ত। সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করা যাক। 

সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করব, কিন্তু সব রাজ্য বা রাজার প্রসঙ্গ আনব না – কারণ সে ইতিহাস লিখতে গেলে এই গ্রন্থের আয়তন হয়ে উঠবে মহাভারত-তুল্য। তার থেকে সমসাময়িক ভারতের মুখ্য অঞ্চলগুলি ধরে সেখানকার রাজবংশের কীর্তির কথা সংক্ষেপে বলব – এবং দেখাতে চেষ্টা করব নিজেদের চরণযুগলে কীভাবে তাঁরা কুড়ুল মেরেছিলেন – আগ্রাসী ইসলামিক আক্রমণের সময়।     

 ৪.৭ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি (৬৪৭-১৩০০ সিই)

৪.৭.১ কনৌজ

৪.৭.১.১ রাজা যশোবর্মন

৬৪৭ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে রাজা হর্ষের মৃত্যুর পর প্রায় পঁচাত্তর বছর কনৌজের ইতিহাস তেমন কিছু জানা যায় না। তারপরে মোটামুটি ৭২৫ – ৭৫২ সি.ই. পর্যন্ত যশোবর্মন কনৌজের রাজা ছিলেন। যথারীতি তাঁর বংশ পরিচয় স্পষ্টভাবে জানা যায় না, অনেকে মনে করেন, তিনি মৌখরি বংশের রাজা। তাঁর সময়ে কাশ্মীরের রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় এবং চীনের এক লেখা থেকে জানা যায় রাজা যশোবর্মন মধ্যভারতের রাজা ছিলেন এবং চীনের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন।

যশোবর্মনের রাজ্য বিস্তারে, তিনি যে মগধের রাজা “মগহনাহ”কে পরাজিত করেছিলেন এবং বঙ্গের অনেকটা জয় করেছিলেন, সে বিষয়ে হয়তো সন্দেহ নেই। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য ৭৩৩ সি.ই.তে তাঁর কাশ্মীর জয়ের আশা পূর্ণ হতে দেননি। এই রাজা যশোবর্মনেরই সমসাময়িক ছিলেন, কবি ভবভূতি, যাঁর কথা আগেই বলেছি, তাঁর সভায় আরেক কবির নাম পাওয়া যায়, “বাকপতি”, তাঁর গ্রন্থের নাম “গৌড়ারোহ”। যশোবর্মনের পরে তাঁর উত্তরসূরি আরও তিনজন রাজা হয়েছিলেন, তবে তাঁরা সকলেই ছিলেন গুরুত্বহীন অস্পষ্ট - প্রায় কিছুই জানা যায় না।

৪.৭.১.২ আয়ুধ রাজবংশ

এই বংশের তিনজন রাজা কয়েক বছরের জন্য রাজত্ব করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম রাজার নাম ছিল বজ্রায়ুধ। তাঁর রাজত্বকালের শুরু হয়তো ৭৭০ সি.ই.-তে। তিনি হয়তো কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্যকে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন কিন্তু পরে কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড় বিনয়াদিত্যের (৭৭৯-৮১০সি.ই.) হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন ইন্দ্রায়ুধ এবং তাঁর সমসাময়িক কালেই বঙ্গের পাল রাজাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রকূট বংশের ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৪ সি.ই.) গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজা ধর্মপালের কাছে ইন্দ্রায়ুধ পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর পুত্র চক্রায়ুধকেই রাজা ধর্মপাল কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রথম অমোঘবর্ষ*-এর শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুবর পুত্র তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৪-৮১৪ সি.ই.), ধর্মপাল এবং চক্রায়ুধ দুজনকেই রাষ্ট্রকূট রাজাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলা গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল করে তুলেছিল এবং সেই সুযোগে প্রতিহার বংশের দ্বিতীয় নাগভট্ট চক্রায়ুধকে পরাস্ত করে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন।

[*অমোঘবর্ষ ছিলেন রাষ্ট্রকূট সম্রাট - যাঁর কথা পরে দক্ষিণ ভারত প্রসঙ্গে আসবে।]

৪.৭.১.৩ গুর্জর-প্রতিহার

রজোরার (আলোয়ার) শিলালিপিতে প্রতিহারদের “গুর্জর-প্রতিহারানবায়” অর্থাৎ গুর্জরদের এক শাখা গোষ্ঠী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গুর্জররা ছিলেন, মধ্য এশিয়ার এক উপজাতি, যাঁরা গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর, হুণদের কিছু পরেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।

প্রতিহারদের প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া যায় মধ্য রাজস্থানের মান্দোর (যোধপুরের কাছে) অঞ্চলে এবং রাজত্ব করতেন হরিচন্দ্র। তাঁদের একটি শাখা দক্ষিণে এগিয়ে উজ্জয়িনী অধিকার করেছিলেন। প্রতিহারদের এই শাখার রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, নাগাবালোক অথবা প্রথম নাগভট, শোনা যায় তিনি শক্তিশালী ম্লেচ্ছদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং ভারুকচ্ছ (ভারুচ) পর্যন্ত নিজের আয়ত্তে এনেছিলেন। এই ম্লেচ্ছ সম্ভবতঃ আরবের যোদ্ধা কোন উপজাতি। প্রথম নাগভটের পরবর্তী দুই রাজা গুরুত্বহীন কিন্তু তাঁদের পরবর্তী বৎসরাজা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মধ্য রাজস্থানের ভান্ডি বা ভাট্টি উপজাতিদের পরাস্ত করেছিলেন, প্রায় সম্পূর্ণ রাজপুতানা অধিকারে এনেছিলেন। তিনি গৌড়ের রাজা ধর্মপালকেও পরাজিত করেছিলেন। যদিও এর কিছুদিন পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব তাঁকে উৎখাত করে দেন এবং শোনা যায় তিনি মরু অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বৎসরাজার পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় নাগভট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। তিনি পিতৃরাজ্য আবার অধিকারের জন্যে খুবই চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের কাছে চূড়ান্ত পরাজিত হয়েছিলেন এবং দুর্বল কনৌজ অধিকার করেছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দর ৮১৪ সি.ই.-তে মৃত্যু হওয়াতে দ্বিতীয় নাগভট কিছুটা স্বস্তি পেলেও, গৌড়ের রাজা ধর্মপাল এইসময় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি ভয়ংকর লড়ে মুদ্‌গগিরি (মুঙ্গের) জয় করেন এবং পরবর্তী কালে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলে অন্ধ্র, সিন্ধু, বিদর্ভ এবং কলিঙ্গের রাজারা তাঁর সঙ্গে মৈত্রী করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গোয়ালিয়র শিলালিপি থেকে জানা যায়, এরপর দ্বিতীয় নাগভট একে একে আনর্ত্ত (উত্তর কাথিয়াবাড়), মালব (মধ্য ভারত), মৎস (পূর্ব রাজপুতানা), কিরাত (হিমালয় অঞ্চলে), তুরুস্ক ( পশ্চিম ভারতের আরবি সম্প্রদায়) এবং বৎস রাজাদের অধীন কোশাম্বি (উত্তরপ্রদেশের একটি জেলা) জয় করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় নাগভটের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র রামভদ্র, তিনি খুবই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যে নানান বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছিল। তাঁর পুত্র মিহির ভোজ(৮৩৬-৮৫ সি.ই.) সিংহাসনে বসেই কঠোর হাতে সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন এবং মধ্যদেশের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। প্রথমেই তিনি পূর্বদিকে বঙ্গ ও গৌড় জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গের তৎকালীন রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, পূর্বের আশা ছেড়ে দক্ষিণে মন দিলেন। তিনি নর্মদা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করতে পারলেও রাষ্ট্রকূটরাজ দ্বিতীয় ধ্রুব ধারাবর্ষের কাছে পরাস্ত হলেন, হয়তো ৮৬৭ সি.ই.-তে। যদিও তাঁর বিভিন্ন প্রত্ন-নিদর্শন থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর রাজ্য পশ্চিমে পেহোয়া (কারনাল) এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। একজন আরবি ভ্রমণকারী, সুলেইমানের ৮৫১ সি.ই.-র লেখা থেকে জানা যায়, ভোজ একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর সমৃদ্ধ রাজত্ব ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং রাজ্যে কোথাও চুরি-ডাকাতির ঘটনা ছিল না। তবে তিনি “আরবিদের পছন্দ করতেন না” এবং “মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন”।

মিহিরভোজের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র প্রথম মহেন্দ্রপাল (৮৮৫-৯১০ এ.ডি)। তিনি পূর্বদিকে মগধ এবং উত্তরবঙ্গ অধিকার করলেও, তাঁর সাম্রাজ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রথম মহেন্দ্রপাল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন রাজশেখর, তাঁর গ্রন্থগুলির নাম “কর্পূরমঞ্জরী”, “বাল-রামায়ণ”, “বালভারত”, “কাব্যমীমাংসা” ইত্যাদি। প্রথম মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে কিছুটা বিবাদ হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ সিংহাসনে বসেছিলেন মহীপাল (৯১২ – ৪৪ সি.ই.)। মহীপাল রাজা হওয়ার পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের ভয়ংকর আক্রমণে কনৌজ এবং পূর্বদিকের রাজ্যগুলিও প্রতিহারদের হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রকূটরা ফিরে যাওয়ার পর, প্রতিহারদের দুর্বলতার সুযোগে, বঙ্গের পাল রাজারা ৯১৬-১৭ সি.ই.-তে তাঁদের অধিকৃত রাজ্যগুলির অনেকটাই জয় করতে পেরেছিলেন।

মহীপালের পরে রাজা হয়েছিলেন দেবপাল, তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ৯৪৮ সি.ই.-র কিছুদিন আগেই, কিন্তু তাঁর দুর্বলতার সুযোগে, প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল চান্দেলরা এবং প্রতিহার সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল। প্রতিহার বংশের পরবর্তী রাজা বিজয়পালের সময়ে, প্রতিহার সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেল, যেমন, যোজকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল, অনহিলওয়াড়ার (পাতান, গুজরাট) চালুক্য, গোয়ালিয়রের কচপঘাত, দাহলের চেদি, মালবের পরমার, দক্ষিণ রাজপুতানার গুহিল এবং শাকম্ভরির (রাজস্থান) চাহমানরা। যাই হোক, দশম শতাব্দীর শেষ দশকে পরবর্তী রাজা রাজ্যপাল যখন সিংহাসনে বসলেন, প্রতিহার সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তাচলে। এই সময়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মুসলিম রাজ্য থেকে ভারতজয়ের অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাজ্যপাল উদ্‌ভাণ্ডপুরের (ভাটিণ্ডা) শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৯১ সি.ই.তে সুলতান সবুক্তিগিন এবং ১০০৮ সি.ই.-তে জয়পালের পুত্র আনন্দপালের সঙ্গে সুলতান মামুদকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই যৌথ প্রচেষ্টা দুবারই ব্যর্থ হয়েছিল, এবং ১০১৮ সি.ই.তে রাজ্যপাল গঙ্গা পার হয়ে বারিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরেও ১০৩৬ সি.ই. পর্যন্ত প্রতিহার রাজাদের কথা শোনা যায়, শেষ রাজার নাম ছিল যশপাল।

৪.৭.১.৪ গাড়োয়াল

গাড়োয়াল রাজাদের বংশপরিচয় জানা যায় না। তবে ১০৮০ বা ১০৮৫ সি.ই.-র মধ্যে কোন এক সময় গাড়োয়াল বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রদেব, কোন এক গোষ্ঠী প্রধান গোপালকে পরাস্ত করে, কনৌজ অধিকার করেছিলেন। চন্দ্রদেবের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি কাশী, উত্তর কোশল (ফৈজাবাদ জেলা), কুশিকা (কনৌজ) এবং ইন্দ্রপ্রস্থ (দিল্লি)-র রক্ষাকর্তা। চন্দ্রদেব সম্ভবতঃ ১১০০ সি.ই.তে মারা যান। চন্দ্রদেবের পর রাজা হন মদনপাল, তারপর ১১১৪ সি.ই.-তে রাজা হন মদনপালের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র। রাজা হওয়ার আগেই যখন তিনি যুবরাজ ছিলেন ১১০৯ সি.ই.-তে, মুসলিম রাজা তৃতীয় মাসুদের (১০৯৮-১১১৫ এ.ডি) সেনাপতি হাজিব তুঘাতিগিনের অভিযান প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। রাজা হবার পর তিনি বঙ্গের দুর্বল পালরাজাদের থেকে মগধ এবং মুঙ্গের অধিকার করে নিয়েছিলেন, আরও জয় করেছিলেন মালবের পূর্বাংশ। এছাড়া কাশ্মীরের জয়সিংহ (১১২৮-৪৯ সি.ই.), গুজরাটের সিদ্ধারাজ জয়সিংহ (১০৯৫ -১১৪৩ সি.ই.) এবং সম্ভবতঃ দক্ষিণের চোলদের সঙ্গেও তাঁর মৈত্রী সম্পর্ক ছিল।

গোবিন্দচন্দ্রের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিজয়চন্দ্র ১১৫৪ সি.ই.-তে। সেসময় গজনির আলাউদ্দিন ঘোরির কাছে পরাস্ত হয়ে লাহোর অধিকার করেছিলেন আমির খুসরু*। বিজয়চন্দ্রকে এই আমির খুসরু বা তাঁর পুত্র খুসরু মালিকের ভারত অভিযান প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। বিজয়চন্দ্রের সময় চাহমান (চৌহান) এবং চান্দেলরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলে এবং সম্ভবতঃ তাঁর রাজত্ব থেকে দিল্লি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

[*এই আমির খুসরু কিন্তু বিখ্যাত সুফি কবি ও গায়ক আমির খুসরু (১২৫৩-১৩২৫) নন।] 

বিজয়চন্দ্রের পুত্র জয়চন্দ্র রাজা হয়েছিলেন, ১১৭০ সি.ই.-তে। তাঁর রাজত্বকালের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরির ভারত আক্রমণ। ১১৯১ সি.ই.-তে চাহমান বা চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ সুলতান ঘোরিকে তারৌরির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ে সুলতান ঘোরি এতই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, পরের বছর ফিরে এসে তিনি রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করেন। এই ঘটনায় জয়চন্দ্র সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং কিছুটা স্বস্তিও পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, সুলতান ঘোরি যুদ্ধজয়ের পর স্বদেশে ফিরে যাবেন এবং পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর ফলে উত্তর ভারতে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি হবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি, কারণ ১১৯৪ সি.ই.-তে সুলতান সিহাবুদ্দিন কনৌজ আক্রমণ করেন এবং চন্দোয়ার ও এটাওয়ার যুদ্ধে জয়চন্দ্র পরাজিত এবং নিহত হন। যদিও সুলতান সিহাবুদ্দিন জয়চন্দ্রের পুত্র হরিশচন্দ্রকে কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর মোটামুটি ১২২৬ সি.ই.-তে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অধিকারে চলে গিয়েছিল।

৪.৭.১.৫ চাহমান বা চৌহান

চাহমান বা চৌহানরাও সম্ভবতঃ মধ্য এশিয়ার কোন উপজাতি এবং অগ্নির উপাসক বা অগ্নিবংশ বলে পরিচিত ছিলেন। অগ্নির পবিত্রতায় তাঁরা ভারতীয় সমাজে খুবই সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের বেশ কয়েকটি শাখা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সাকম্ভরি বা সাম্ভর গোষ্ঠী। তাঁদের কথা প্রথম জানা যায়, ৯৭৩ সি.ই.-র শিলালিপি থেকে এবং তাঁদের রাজা প্রথম গুবক, প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভটের সমসাময়িক ছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই বংশের রাজা অজয়রাজ, রাজস্থানে অজয়মেরু নামে এক নগরের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের আজমির। আরেকজন রাজার নাম জানা যায় চতুর্থ বিগ্রহরাজ বিশালদেব (১১৫৩-৬৪ সি.ই.), তিনি নাকি দিল্লি জয় করেছিলেন এবং গাড়োয়াল রাজ বিজয়চন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন। এই বংশের সব থেকে বিখ্যাত রাজা তৃতীয় পৃথ্বীরাজ (১১৭৯-৯২ সি.ই.), যাঁকে মুসলিম ঐতিহাসিকরা রাই পিথৌরা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক নায়কোচিত কাহিনি শোনা যায়। সমসাময়িক কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। রাজা জয়চন্দ্র নিজের কন্যা সংযুক্তা বা সংযোগিতার বিবাহের জন্যে যে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে রাজা পৃথ্বীরাজকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। কিন্তু পৃথ্বীরাজ সভার মাঝখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে বীরের মতো সংযুক্তাকে হরণ করেছিলেন, শোনা যায় কন্যা সংযুক্তারও এতে সম্মতি ছিল, তিনি রাজা পৃথ্বীরাজের গুণমুগ্ধা ছিলেন। এই পৃথ্বীরাজ চান্দেল রাজ পরমারদি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.)-কে পরাস্ত করে বুন্দেলখণ্ড জয় করেছিলেন এবং গুজরাটের চালুক্যরাজ দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গেও তাঁর যুদ্ধ বেধেছিল।  তাঁর শেষ পরিণতি এবং মৃত্যুর কথা আগেই বলেছি।

এভাবেই কনৌজ অঞ্চলে শুরু হল মুসলিম শাসকের আধিপত্য। 

চলবে... 

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "





  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২ "


 

মহাভারতের অপূর্ণতা

সূত বললেন, “ব্রহ্মলোক থেকে দেবর্ষি নারদকে আসতে দেখে, ঋষি ব্যাসদেব উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন এবং প্রণাম করলেন। দুজনেই সেই সরস্বতী নদীতীরে আসন গ্রহণ করার পর, দেবর্ষি নারদ স্মিতমুখে ব্যাসদেবকে বললেন, “হে মহাভাগ পরাশরনন্দন, আপনি নিজের চিত্তে, দেহে ও আত্মায় প্রসন্নতা লাভ করেছেন তো? আপনি সর্ব ধর্মের তত্ত্ব সার নিয়ে অদ্ভূত মহাভারত রচনা করেছেন, অতএব মনে হচ্ছে আপনি ধর্মের সকল বিষয়েই সম্যক জ্ঞান লাভ করেছেন। আপনি সনাতন ব্রহ্মের বিচার করেছেন, তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। এত সাফল্য সত্ত্বেও, আপনি অসফল ব্যক্তির মতো নিজের বিষয়ে, তাহলে শোক করছেন কেন?”

ব্যাসদেব বললেন, “আপনি যা বলেছেন, সবই সত্য। কিন্তু তাও আমি আত্ম-পরিতৃপ্তি অনুভব করতে পারছি না। আমার এই অসন্তুষ্টির কারণ কী, তাও বুঝতে পারছি না। আপনার জ্ঞানের কোন সীমা নেই, অতএব আপনিই আমার এই অস্থিরতার কারণ নির্দেশ করুন। যিনি স্বয়ং অসঙ্গ থেকে তিনগুণের সঙ্কল্পে এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং যিনি এই সমস্ত কার্য ও কারণের নিয়ন্তা, আপনি সেই পুরাণ পুরুষ ভগবানের উপাসনা করে সমস্ত গোপন বিষয় অবগত হয়েছেন। আপনি ত্রিভুবনে ঘুরে বেড়ান বলে, আপনি সূর্যের মতো সর্বদর্শী। আপনি প্রাণবায়ুর মতো যোগবলে সকল প্রাণীর অন্তরে থেকে প্রাণীদের বুদ্ধি প্রবৃত্তি লক্ষ্য করেন। আমি সদাচার, অহিংসা ও ধর্মযোগে পরব্রহ্মে স্থিতি লাভ করেছি। নিয়মমতো অধ্যয়ন করে বেদের তত্ত্বসমূহ উপলব্ধি করেছি, তাও আমার মধ্যে কেন এই অপূর্ণতার বোধ রয়েছে, আপনি কৃপা করে নির্দেশ করুন”

দেবর্ষি নারদ বললেন, “আপনি শ্রী ভগবানের নির্মল যশ প্রায় কিছুই বর্ণনা করেননি, সেই কারণেই আপনার মধ্যে এই অপূর্ণতার বোধ এসেছে। হে মুনিবর, আপনি ধর্ম ও তার সাধন যেমন সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, ভগবান বাসুদেবের মহিমা সেভাবে বর্ণনা করেননি। বাক্য নানান অলঙ্কারে সাজানো, বিচিত্র পদ বিন্যাসে অত্যন্ত সুশোভন হলেও, সেই বাক্য যদি শ্রীহরির জগৎপবিত্র যশ বর্ণনায় প্রযুক্ত না হয়, তাহলে সে বাক্য কাক-তুল্য কামনার বশীভূত মানুষের পক্ষে শ্রুতিমধুর হতেও পারে। কিন্তু সে বাক্য ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসদের কাছে একান্তভাবেই পরিত্যাজ্য একথা নিশ্চয় জানবেন। মনে রাখবেন, কোন গ্রন্থের প্রতিটি শ্লোক যদি ভগবানের যশোময় নামের কীর্তন করে, সেই শ্লোক অশুদ্ধ পদে রচিত হলেও জনগণের পাপ নাশ করে থাকে। যে জ্ঞানে অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়, সে জ্ঞান যদি ভগবান অচ্যুতে ভক্তিহীন হয়, তাও সেই জ্ঞান মূল্যহীন, কারণ ওই জ্ঞানে প্রত্যক্ষ ভাবে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। 

[দেবর্ষি নারদ অপ্রিয়বাদীতার জন্য বিখ্যাত। অতএব তিনি সরাসরি বেদব্যাসকে দোষারোপ করে যা বললেন, তার সার কথা হল, "ওহে দ্বৈপায়ন, তুমি শাস্ত্র ও তত্ত্ব কথা শুনিয়েছ, ধর্মাচরণ ও ধর্মসাধনার যাবতীয় পথ বাতলিয়েছ, কিন্তু আসল কথাটিই তো বলোনি। ভগবান শ্রীহরির প্রতি বন্দনা, স্তুতি ও ভজনা নিবেদন করে, তোমার এই পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছ? জনসাধারণের হিতের জন্যে মহাভারত রচনা করেছ, খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু তার মধ্যে শ্রীবাসুদেবের অপার মহিমা ও ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা কোথায় বলেছ...কিস্‌সু তো বলনি...। কাজেই মহাভারত রচনা করে আত্ম-তৃপ্তি পাওয়ার আশা করছ কী করে? আমি মানছি] আপনি সত্যদর্শী, পুণ্যকীর্তি ও দৃঢ়ব্রত, আপনি অখিল লোকের বন্ধনমুক্তির জন্য শ্রীহরির লীলা সবিস্তারে বর্ণনা করুন।

সাধারণ লোকের চিত্ত স্বভাবতঃ কামনার বশীভূত, আপনি নিন্দনীয় কামনার কর্মকে কর্তব্য নির্দেশ করে অত্যন্ত অন্যায় কার্য করেছেন। আপনার বাক্যের উপর আস্থা রেখে সাধারণ লোক কাম্য ধর্মকে মুখ্য ধর্ম বলে মনে করছে এবং তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তিরা এই ধর্ম মুখ্য ধর্ম নয় বললেও, তারা সে কথা অমান্য করছে। চেতন ও অচেতন সমস্ত পদার্থের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় ভগবানই নিয়ন্ত্রণ করেন, অতএব নিখিল বস্তু ভগবানের থেকে বিচ্ছিন্ন না হলেও, ভগবান এই সমস্ত পদার্থ থেকেই আলাদা। আপনি স্বয়ং এই ভগবৎ লীলা অবগত আছেন। আপনি নিজেকে পরমপুরুষ পরমাত্মার অংশ রূপেই জানবেন, আপনি জগতের মঙ্গলের জন্য জন্মগ্রহণ করেছেন। আপনার দৃষ্টি স্বচ্ছ ও অব্যর্থ, সুতরাং আপনি মহানুভব শ্রীহরির গুণসমূহের বর্ণনা করুন। জ্ঞানীগণ বলেন, উত্তমশ্লোক ভগবানের গুণ বর্ণনাই পুরুষের তপস্যা, বেদ পাঠ, উত্তম যজ্ঞের অনুষ্ঠান, স্তব পাঠ, জ্ঞান ও দানের অক্ষয় ফলস্বরূপ।

হে তপোধন, পূর্বকল্পে, আমার পূর্বজন্মের কথা আপনাকে বর্ণনা করছি, শুনুন।

[সে যুগে দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের পক্ষে ভাগবত পুরাণ সহ অন্য বহু পুরাণ রচনা কোনভাবেই সম্ভবপর নয়, কিন্তু পুরাণগুলি তাঁর নামেই রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল - কারণ তিনি ছিলেন সে যুগের জনপ্রিয়তম ও অলোকসামান্য প্রতিভাধর বেদ ও শাস্ত্রবেত্তা। অতএব ধারণা করা যায়, পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরা তাঁর নামে বিবিধ পুরাণ রচনার পাশাপাশি, মহাভারতের মূল রচনাতেও হস্তক্ষেপ করে বহু নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করেছিলেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ "ভাগবত গীতা"। যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত, টান-টান উত্তেজনায় অপেক্ষারত কুরু ও পাণ্ডবদের বিপুল সৈন্যসমাবেশের মাঝখানে, (ভীষ্ম পর্বে) শুরু হচ্ছে অষ্টাদশ অধ্যায় গীতার আলোচনা। এই আলোচনাটি করেছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন। ধরে নিলাম, শ্রীকৃষ্ণের ভগবৎ মহিমার প্রভাবে, তীক্ষ্ণ প্রতিভাধর অর্জুনের পক্ষে এই আলোচনার মর্ম উপলব্ধি করতে অন্ততঃ তিন-চার ঘন্টা সময় লেগেছিল (যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সারা জীবনও যথেষ্ট নয়)। এই দীর্ঘ সময় ধরে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধপক্ষের রণোৎসাহী বীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধন, কৃপ, অশ্বত্থামা প্রমুখ যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন? বিশ্বাস করা কঠিন। তবে ভক্তরা বলবেন, শ্রীকৃষ্ণের দৈবী মায়ায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন উপস্থিত ওই সকল বীর যোদ্ধারা - অতএব এমন ঘটনা না ঘটা অসম্ভব কেন?]              


 নারদের জীবন কথা

আমার মা ছিলেন কয়েকজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী। একটু বড়ো হয়ে আমিও সেই ব্রাহ্মণদের সেবা করতাম। আমি কিন্তু আর পাঁচজন ছেলেমানুষ বালকের মতো চঞ্চল ছিলাম না কিংবা খেলাধুলোতেও আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি কথা বলতাম কম, আর সর্বদাই সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতাম। এই পণ্ডিতরা সর্বদাই কৃষ্ণকথা বলতেন, আর তাঁর প্রসঙ্গই আলোচনা করতেন। এইভাবে সর্বক্ষণ কৃষ্ণকথা শুনতে শুনতে আমার মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি পরমভাব তৈরি হয়ে গেল। তাঁর প্রতি অবিচলিত ভক্তির জন্যে পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতেও খুব অসুবিধে হল না। আমি অনুভব করলাম, সমস্ত মায়ার অতীত পরমব্রহ্মই আমার স্বরূপ।

বর্ষা আর শরৎকালের কয়েকমাস টানা বৃষ্টির জন্যে সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা কোথাও বেরোতে পারতেন না**, তাই ঘরে বসে, দিন রাত তাঁরা হরি সংকীর্তন করতেন।  তাঁদের সেই সংকীর্তন শুনতে শুনতে আমার মন থেকে রজঃ ও তমোগুণ দূর হয়ে গেল, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সকল আসক্তি থেকে আমি মুক্ত হয়ে গেলাম। কৃষ্ণভাবে আমার এই একনিষ্ঠ অনুরাগ, আমার বিনীত ব্যবহার, সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধাভাব এবং আমার নিরাসক্ত সেবায় তাঁরা মুগ্ধ হলেন। আমি তখন সামান্য বালক হলেও, সাক্ষাৎ ভগবানের থেকে পাওয়া অতি গোপন তত্ত্বজ্ঞানের কথা তাঁরা দয়া করে আমাকে বর্ণনা করলেন। সেই জ্ঞানের তত্ত্ব উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গেই, বিশ্ববিধাতা ভগবান বাসুদেবের মায়ার স্বরূপ ও সমস্ত কার্য-কারণ আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা অন্য কোন জায়গায় চলে গেলেন।

**[সন্ন্যাসীরা বর্ষাকালের চারমাস পরিব্রাজন স্থগিত করে কোন জনপদে বা গ্রামে বাস করতেন। এবং সেখানেই তপস্যা, তত্ত্ব আলোচনা, ব্রত পালন করতে করতে বিশ্রাম করতেন। এই ব্রতের নাম ছিল “চাতুর্মাস্য ব্রত” – এই ব্রতের শুরু হত আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশীতে এবং সমাপ্তি হত কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে। সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম পরবর্তী কালেও অবশ্য পালনীয় ছিল। এই চারমাস ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বর্ষার কাল - বৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুর্যোগের সময়। অতএব পথঘাট পদব্রজের উপযুক্ত নয় এবং বর্ষায় ভরা নদীগুলিও পার হওয়ার পক্ষে প্রতিকূল হয়ে উঠত।]

আমিই ছিলাম আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার যত্নের জন্যে তাঁর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু যেহেতু তিনি অন্যের ঘরে দাসীর কাজ করতেন, তাই তাঁর একমাত্র পুত্রের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেও, আমার জন্যে যথেষ্ট খাবারদাবার, জিনিষপত্র যোগাড় করে উঠতে পারতেন না। আর তাতেই তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহের বশে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। এই জগতে আমরা সবাই যে ভগবানের হাতের পুতুল, কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেকথা সেই অবলা, অসহায় নারী কি করে বুঝবেন? একদিন রাত্রে, মা বেরিয়েছিলেন গোয়ালের গরু দুইয়ে আমার জন্যেই দুধ আনতে, আর ফিরলেন না। যাবার সময় সাপের গায়ে হয়তো পা দিয়ে ফেলেছিলেন, সেই সাপের কামড়েই তাঁর মৃত্যু হল।

সেই বালক বয়েসেই আমার সেই একমাত্র মায়া এবং ভালোবাসার বন্ধন ছিঁড়ে গেল। আমার মনে হল, এও ভগবান বাসুদেবের করুণা, মায়ার বাঁধন থেকে মুক্ত করে, তিনি আমাকে বিশ্বজগতের সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম উত্তরদিকে। অনেক শহর, গ্রাম, পাহাড়, পর্বত, ফুলের বাগান, বন, উপবন, নদী, সরোবর দেখলাম। কত ধরনের মানুষ, পাখি, প্রাণী, গাছপালা, অরণ্যের জন্তু, জানোয়ার দেখলাম। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক অরণ্যের মধ্যে ভীষণ ক্লান্তি আর খিদেয় অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এক জায়গায় একটি নদীসরোবর দেখে সেখানে স্নান করলাম, পেট ভরে জল পান করলামতারপর সেই জনহীন বনের মধ্যে এক বিশাল অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে, পরমাত্মার ধ্যান করতে শুরু করলাম।

অনেকক্ষণ ভগবানের শ্রীচরণকমলের ধ্যান করতে করতে আমার মন ভক্তিতে বিবশ হয়ে এল। আমার দু চোখে নেমে এল ভক্তি বিহ্বল অশ্রুর ধারা। অবশেষে তিনি আমার মনের মধ্যে প্রকাশ হলেনআমি তাঁকে অনুভব করলাম আমার অন্তরে। আমার সমস্ত শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম, ব্যাকুল হয়ে ডুবে গেলাম পরম আনন্দ সাগরে। আমি ভুলেই গেলাম আত্মা আর পরম আত্মার সকল তত্ত্ব।  সেই অনুভবের পর আমি যখন স্বজ্ঞানে ফিরলাম, তাঁর দর্শন পাওয়ার জন্যে, আমি ব্যাকুল হয়ে গেলাম। আমার অন্তরে তাঁর সেই অল্প সময়ের উপস্থিতিতে আমার মন ভরল না। তাঁকে কাছে পেয়েও তাঁকে দেখতে না পাওয়ার চরম দুঃখ আমাকে গ্রাস করল। আমার সমস্ত অন্তরে তখন শুধু হাহাকার, আমার নিজেকে তখন দীনের থেকেও অত্যন্ত দীন বলে মনে হচ্ছিল।

এইরকম অবস্থার মধ্যেই একদিন তাঁর কথা শুনতে পেলাম, তিনি গভীর করুণাময় মধুর কণ্ঠে আমাকে বললেন – বৎস নারদ, এই জন্মে তুমি আর আমাকে দেখতে পাবে না, কাজেই বৃথা চেষ্টা করো না। আমি তোমাকে একবার মাত্র দেখা দিলাম, যাতে তোমার অন্তর আমাতেই আসক্ত থাকে। কারণ, সকল ভক্তই সমস্ত কামনা বিসর্জন দেয়, শুধুমাত্র আমার দর্শন পাওয়ার ইচ্ছায়। যোগীর মন থেকে সমস্ত কামনা দূর না হলে, সে যোগী অসম্পন্ন যোগী, তাদের আমি দর্শন দিই না। তুমি বালক বয়সে খুব অল্প কিছুদিনের জন্য সাধুসেবা করলেও আমার প্রতি তোমার গভীর অনুরাগে আমি প্রসন্ন হয়েছি। এই জীবনের শেষে তুমি আমারই পার্ষদ হবে। আমার প্রতি যার চিত্ত সর্বদা অনুরক্ত থাকে, তার কোন কালেই আর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে না। এমন কি বিশ্বের সৃষ্টি ও প্রলয়ের সময়েও, সেই ভক্তের স্মৃতি আমি অক্ষুণ্ণ রাখি। 

এই আদেশ দিয়ে নিরাকার ভগবান চলে গেলেন। তাঁর এই অদ্ভূত করুণা পেয়ে আমি কৃতার্থ হয়ে তাঁকে বার বার প্রণাম করলাম আর তারপর আমিও বেরিয়ে পড়লামজগতের প্রতিটি জীবের মঙ্গলের জন্যে তাঁর প্রাত্যহিক লীলা দেখতে দেখতে, আমি গোটা পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম, আর দিন গুণতে শুরু করলাম, কবে হবে আমার এই দেহের বাঁধন থেকে মুক্তি আর তাঁর সঙ্গে হবে পরম মিলন। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, এল সেই শুভ দিন, আমার এই দেহ মৃত্যু বরণ করলআর আমি লাভ করলাম তাঁর নিত্য পার্ষদদেহ।

এই কাহিনী কিন্তু এই কল্পের নয়এ সব ঘটনা ঘটে গেছে বহু কল্প আগে। তারপর বহুবার এক কল্পের অন্তে ঘটে গেছে জগতের প্রলয়, সৃষ্টি হয়েছে নতুন কল্পের নতুন জগৎ। এক কল্পের অন্তে শ্রীনারায়ণ যখন কারণ-সাগরে শয়ন করেন, তাঁর সঙ্গে লীন হয়ে যান স্বয়ং ব্রহ্মও। তাঁর নিশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে, আমিও তাঁর ভিতরেই বাস করি। তারপর হাজার হাজার দিব্য যুগ পার করে, যখন নতুন কল্পে নতুন সৃষ্টির সময় হয়, শ্রীনারায়ণের নাভি কমল থেকে জেগে ওঠেন ব্রহ্মা। আর ভগবানের ইন্দ্রিয় থেকে মরীচিগণ ও আমার জন্ম হয়।  মহাবিষ্ণুর পরম করুণায়, আমরা আগেকার কোন জন্মের স্মৃ্তিই ভুলি না আমি চিরকাল ব্রহ্মচর্য্য পালন করি।  তাঁর করুণায়, এই তিন ভুবনে এমন কোন স্থান নেই যেখানে আমি না যেতে পারি। এই কল্পে তিনি আমাকে একটি বীণা দিয়েছেন। এই বীণার স্বরগ্রাম স্বতঃসিদ্ধ। এই বীণায় সুর তুলে, আমি দেশে দেশে, ঘরে ঘরে, তাঁর মহিমা গেয়ে বেড়াই। এই বীণার সুরে তিনি সর্বদাই আমার মনের মন্দিরে বাস করেন, আর আমিও সর্বদা তাঁর করুণার আশ্রয়ে থাকতে পারি।

অতএব, আপনি মনে আর কোন দ্বিধা রাখবেন নামনে রাখবেন, কামনা ও আসক্তিতে ভরা এই জগৎ সমুদ্র, তাঁর মহিমার ভেলাতেই পার হওয়া সম্ভব। যাগ, যজ্ঞ, যোগ সাধনার চেয়েও, শুধুমাত্র শ্রীমধুসূদনের একান্ত সেবাই, মনকে পরম শান্তি এনে দিতে পারে। অতএব, আপনি আর দেরি না করে, শ্রীহরির মাহাত্ম্য বর্ণনা করুনআপনার সুমধুর ভাষায় প্রচার করুন, তাঁর পরম লীলার পরম তত্ত্বকথা।  এছাড়া, আপনার মুক্তির আর অন্য কোন পথ নেই, হে মুনিবর”


সূত বললেন, প্রয়োজন ও সংকল্পশূণ্য দেবর্ষি নারদ ব্যাসদেবের সঙ্গে এইরূপ আলাপ আলোচনার পর বিদায় নিলেন এবং বীণাযন্ত্র আলাপ করতে করতে প্রস্থান করলেন। দেবর্ষি নারদই ধন্য! তিনি পরমানন্দে শ্রীহরির যশ গান করতে করতে দুঃখদগ্ধ জগৎকে শীতল করে থাকেন। 

[সেকালে ভর্তৃহীনা নারীর প্রতিভাবান পুত্রদের সমাজবরেণ্য হতে কোন বাধা ছিল না, এখানে দেবর্ষি নারদের কথা শুনলাম, উপনিষদের ঋষি সত্যকামের কথা শুনেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় - "জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে"। নারদ অবশ্য এখানে তাঁর মায়ের নামটি প্রকাশ করলেন না - "বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী" বলেই মায়ের পরিচয় পর্বটি সেরে ফেললেন।]    

চলবে...


বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - শেষ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব "



৩২

রাজপ্রাসাদে দ্বিতলের প্রশস্ত অলিন্দে মহারাণি সুনীথার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষি ভৃগু এবং তাঁদের কিছুটা পিছনে দাসী পদ্মবালা। সেখান থেকে প্রাসাদে আসার প্রশস্ত রাজপথটি সম্পূর্ণ দেখা যায়। মহারাণি সুনীথা দেখছিলেন, সুসজ্জিত অশ্বশকটে রাজদম্পতির আগমন। পথের দুপাশে সশস্ত্র নিরাপত্তাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র মানবপ্রাচীর। তার দুপাশে পরিখার সীমানা পর্যন্ত জনতার কালো মাথার সারি। তাঁরা শুনছিলেন, তাদের সমবেত ও স্বতঃস্ফূর্ত জয়ধ্বনির গর্জন, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাণি নিজের আবেগকে সংযত করার চেষ্টা করছিলেন, তবু তাঁর দুই চোখে ভরে উঠল অশ্রু! মহর্ষি ভৃগু, লক্ষ্য করলেন, কিছু বললেন না।

দাসী পদ্মবালা পিছন থেকে বলে উঠল, “যাই বলো রাজকুমারী, রাজকোষের অর্থ এভাবে জলের মতো ব্যয়, মহারাজ অঙ্গ কোনদিন করেননি, বেণের অভিষেকে তুমিও করোনি। আমাদের বেণ কিন্তু সেদিক থেকে খুব মিতব্যয়ী ছিল। সেও কী পারতো না, এরকম জাঁকজমক করতে? তার অভিষেকের সময় এত জনসমাগমও হয়নি, তাই না রাজকুমারী?”

রুদ্ধকণ্ঠে মহারাণি সুনীথা বললেন, “চুপ কর পদ্ম, চুপ কর। সে অভিষেকের সঙ্গে এ অভিষেকের বিস্তর পার্থক্য, তুই কী বুঝিস রাজনীতির?”

“তা বুঝিনা, আমার আর এ বয়সে বুঝে কাজও নেই। যা মনে হল, বললাম, সে তুমি যাই মনে করো রাজকুমারী”।

সেকথার কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথা, তিনি নিজের মনেই যেন বললেন, “রাজা অঙ্গের অন্তর্ধানের পর থেকে এই রাজ্য যেন রাহুগ্রস্ত ছিল। বেণের জোরাজুরিতে আমিই তাকে তার পিতার সিংহাসনে বসার অনুমতি দিয়ে অভিষেকের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের কেউই সেটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, না মন্ত্রীমণ্ডলী, না জনগণ। এমনকি আমিও!”

“কী বলছো, রাজকুমারী, তুমি বেণের মা, তুমিও মন থেকে চাওনি?”

“মহারাজ অঙ্গের মতো অজাতশত্রু প্রজাপিতা এক রাজা কেন অন্তর্ধান করলেন? তাঁর এমন পরিণতি আদৌ প্রাপ্য ছিল না। তাঁর এই আকস্মিক অন্তর্ধানের রহস্য আমার কাছে আজও স্পষ্ট হল না। হয়তো হবেও না কোনদিন। তিনি যদি আমার এবং পুত্রের প্রতি ক্ষোভে, অভিমানে সত্যিই বাণপ্রস্থে গিয়ে থাকেন, আমার কাছে সে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। মহর্ষি ঠাকুর, শুনেছি, পত্নীকে সঙ্গী করেই বাণপ্রস্থে যাওয়ার বিধান আছে আপনাদের শাস্ত্রে! মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থে গিয়েই থাকেন, তিনি আমাকে একবার বলারও প্রয়োজন মনে করলেন না? আমি অধর্মের কন্যা, কিন্তু আমাদের দীর্ঘ দাম্পত্যে তাঁর সেবায় কোনদিন কোন ত্রুটি করেছি, কিংবা তাঁকে অসম্মান করেছি এমন তো স্মরণে আসছে না! আমার প্রতি তাঁর আচরণেও কোনদিন কোন দ্বেষ বা বিরক্তি তো অনুভব করিনি। তাহলে? তিনি কী বাণপ্রস্থে আদৌ যাননি? কী হল তাঁর? কোথায় গেলেন? ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পুত্র বেণ একবার যে কথার ইঙ্গিত দিয়েছিল, সেই কী তবে তাঁর শেষ পরিণতি...কিন্তু সে কথা...?”

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন একটু অধৈর্যের সঙ্গেই বললেন, “মহারাণি, আপনি শান্ত হোন, অনর্থক অস্পষ্ট অতীতের কথা চিন্তা করে, নিজেকে পরিতপ্ত করবেন না। আজকের মতো এক মঙ্গললময় দিনে আপনার এই শোকবিলাপ মানায় না। আপনার একমাত্র পুত্র বেণের মানসপুত্র, পৃথুর আজ রাজ্যাভিষেক এবং বিবাহ। মহারাজা অঙ্গের কৃতজ্ঞ প্রজারা আজ আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তারা দুহাত ভরে অভিষিক্ত রাজদম্পতিকে উপহার দিয়েছে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজকরে, কোষভাণ্ডার পূর্ণ, উদ্বৃত্ত। তাদের আন্তরিক আশীর্বাদের ধ্বনি আপনি শুনতে পাচ্ছেন, মহারাণি”। মহারাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুর এই কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন।

কিছুক্ষণ পর মহর্ষি ভৃগুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “এই আয়োজন ও অনুষ্ঠানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, মহর্ষিঠাকুর। এমন রাজসিক আয়োজন মহারাজ অঙ্গের প্রাসাদের উপযুক্ত। কিন্তু মহর্ষিঠাকুর, আমি জানি পৃথু ও অর্চ্চি কোন অবতার নয়, ওরা আমার পুত্র বেণের মানসপুত্রও নয়। এ সমস্তই আপনার বানিয়ে তোলা, সাজানো ঘটনা”। মহর্ষি ভৃগু কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একটু থেমে মহারাণি আবার বললেন, “আপনিও জানেন না, মহর্ষি ঠাকুর, আমিও জানি না – রাজা পৃথু মহারাজ অঙ্গের যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে পারবে কি না! যদি না হয় আপনার এই প্রয়াস ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে”।

মহর্ষি ভৃগু মহারাণি সুনীথার চোখে চোখ রেখে বললেন, “আপনি তো জানেন, মহারাণি, আপনার পুত্র বেণ, মহারাজা অঙ্গের অত্যন্ত অযোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন, তাঁর মাত্র ঊণিশ মাসের শাসনকালেই রাজ্যের সর্বত্র হাহাকার শুরু হয়ে গিয়েছিল”।

ক্রোধে মহারাণি সুনীথার দুই চোখ ঝলসে উঠল, তিনি রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন, “আপনি, একজন মাতার সামনে পুত্রের নিন্দা করছেন, মহর্ষিঠাকুর, আপনার এত ঔদ্ধত্য?”

মহর্ষি ভৃগু অত্যন্ত শান্তস্বরে বললেন, “না, মহারাণি, আমি এই রাজ্যবাসীর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মাতার কাছে, এক দুর্ধর্ষ অত্যাচারী রাজার সমালোচনা করছি। যে রাজার কারণে মহারাণি নিজেও অত্যন্ত মনঃকষ্টে ছিলেন”।

মহারাণি অনেকক্ষণ কোন কথা না বলে মহর্ষি ভৃগুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর শান্তস্বরে বললেন, “হে মহর্ষিঠাকুর, আপনি আমার স্বামী মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রিয়সখা ও মন্ত্রণাদাতা। অনেক দুঃখে-কষ্টে বিপদে-আপদে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। সেকথা ভুলিনি মহর্ষিঠাকুর! এবারেও অনুপস্থিত প্রিয়সখা মহারাজ অঙ্গের বংশমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে আপনি অজস্র ষড়যন্ত্র এবং ছলনার আশ্রয় নিলেন। একমাত্র পুত্র বেণের মাতা হয়ে, আপনাকে অভিশাপ দেওয়াই আমার উচিৎ ছিল, কিন্তু আমার এই পুত্রের মাতা হওয়ার পিছনেও ছিল, আপনার ছলনা। আপনি ধর্ম পথের পথিক হয়েও বারবার এত ছলনার আশ্রয় নেন, কোন ধর্মমতে?” মহারাণি সুনীথার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল আবেগে!

মহর্ষি ভৃগু অস্ফুট স্বরে বললেন, “মহারাণি, রাজদম্পতি নীচেয় এসে গেছে, আপনার আশীর্বাদের জন্য অপেক্ষা করছে, আপনি বরণ করবেন না?”

“বরণ? আমি বরণ করবো? কোন সম্পর্কে মহর্ষি ঠাকুর?”

“পিতামহী”।

“পিতামহী?” মহারাণি সুনীথা মাথা নত করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর চেঁচিয়ে বললেন, “পদ্ম, বরণডালা কোথায়, এখনই নীচেয় যা, বরণডালা সাজা, দীপ জ্বালা...আমি আসছি। ছেলেমেয়ে দুটোকে বরণ করতে হবে না?” দাসী পদ্মবালা আকস্মিক এই আদেশে দৌড়ে নীচেয় চলে গেল। পদ্মবালা চলে যাওয়ার পর মহারাণি সুনীথা মেঝেয় বসে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন মহর্ষি ভৃগুকে।

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “আপনাদের ভগবান বিষ্ণুকে আমি জানি না, শুনেছি তাঁকে প্রত্যক্ষ করা দুঃসাধ্য! মহর্ষিঠাকুর, আপনার মহাপুণ্যময় প্রবোধিনী একাদশী তিথির কপট যজ্ঞ অনুষ্ঠানকালেও, আমি মনকে এই বলে প্রবোধ দিয়েছি, আপনি যা কিছু করছেন, সব কিছুই মহারাজ অঙ্গ এবং তাঁর আপামর রাজ্যবাসীর কল্যাণের জন্যই করছেন। অতএব আমার উপলব্ধিতে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু না থাকুন, আমার কাছে আপনিই তাঁর অবতার – কপট, লীলাময়, অপ্রতিরোধ্য - কিন্তু আশ্চর্য মঙ্গলময়। আপনি যা কিছু করেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন”।

একটু বিরতি দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহারাণি সুনীথা আবার বললেন, “আমায় অনুমতি দিন, মহর্ষি ঠাকুর, আমি নীচেয় গিয়ে ছেলেমেয়েদুটিকে বরণ করি। আপনার অনুগ্রহে আমিই তো এখন এ রাজ্যের রাজপিতামহী...!” এই কথা বলে মহারাণি ধীর পদক্ষেপে চলে গেলেন নিম্নগামী সোপানের দিকে।  

 

তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মহর্ষি ভৃগু বরাভয় মুদ্রায় ডান হাত তুলে, অস্ফুট স্বরে আশীর্বাদ করলেন মহারাণি সুনীথাকে। দ্বিতলের এই প্রশস্ত অঙ্গন এখন দ্বাদশীর জোৎস্নায় প্লাবিত। মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন – নিঃসঙ্গ দ্বাদশীর চাঁদ এখন আকাশে বিরাজমান এবং এখন এই রাজ্যে, এই প্রাসাদে তিনিও একা এবং নিঃসঙ্গ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কলঙ্কযুক্ত কিন্তু প্রায়-পূর্ণ চন্দ্রের দিকে।   

 

সমাপ্ত

 

[গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগের পঞ্চবিংশতি শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

“মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ”।।

অর্থাৎ, মহর্ষিদের মধ্যে আমিই ভৃগু, সমস্ত বাক্যের মধ্যে আমিই একাক্ষর প্রণব, সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে আমিই জপযজ্ঞ, সমস্ত স্থাবরের মধ্যে আমিই হিমালয়।

গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতি যোগ – পড়ে নিতে পারেন - গীতা - ১০ম পর্ব ]


মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 





এর আগের ছোট গল্প - "  কোশিশ কিজিয়ে... "


একই কথা ঘ্যানঘ্যান করিস ক্যান্‌? আর কিছু কথা নাই কি?  একশ বার তো বললাম। বহুদিন ধরে তুইই বলেছিলি গঙ্গা নাইতে যাবিযাচ্ছি যাবো করে যাওয়া হয়নি। মনিববাড়িতে ছুটি পাওয়া কতটা ঝকমারি তুই জানিস না? তুইও তো কাজ করিস তিনবাড়িতে। তুই তো বলিস একবেলা কামাই করলে কেমন মুখঝামটা দেয় তোর গতরপোষা মালকিন ভাবিরাহবিবগঞ্জের ঘাটে নাইতে যাওয়া মানে কম করে দুদিনের ধাক্কা। গঙ্গা নাওয়ার জন্যে দুদিনের ছুটি চাইলে তোকে কী মাথায় নিয়ে নাচত তোর মালকিনরা? নাকি আমাকেই কোলে বসিয়ে আদর করত গগন দুবে? আরে বাবুরা তো তাদের বিবিদের নিয়ে গঙ্গা নাহানে যায় পুণ্য সঞ্চয়ের জন্যে। আমাদের আবার পুণ্য কী রে, ছোট জাতের কোন কিছুতেই পুণ্য হয় না। মুখ বুজে গাধার মতো খেটে যাও, তাতেই আমাদের পুণ্য – জানিস না? আমাদের গঙ্গা স্নানের জন্যে কে ভাবে?

দুদিন নয়? রাস্তা কম নাকি? সকালের প্রথম বাস ধরে গেলেও হবিবগঞ্জ পৌঁছোতে মাঝ দুপুর হয়ে যায়। বাসস্ট্যাণ্ড থেকে গঙ্গার ঘাটও অনেকখানি পথ। ঘাটে গিয়ে চানটান সেরে পুজো দেওয়া। তারপর খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে বেলা যখন গড়িয়ে যায়, তখন এদিকের লাস্ট বাসটাও ছেড়ে আসে ওখান থেকে। একটা রাত তো আমাদের থাকতেই হহবিবগঞ্জে। বিয়ের পর আমরা বার দুয়েক তো গিয়েছিলাম, তোর মনে নেই? বড্ডো ভুলে যাস তুই – ভুলিকে মাইয়া।

তখনকার কথা আর এখনকার কথা এক নয় জানি। সে সময়ের থেকে রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে। বাস-টাসগুলোও আগের মতো ঝড়ঝড়ে গুড়ের ক্যানেস্তারা নয়কিন্তু তখন আমাদের এখান থেকে হবিবগঞ্জ পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই ছিল জঙ্গুলে, তেমন কোথাও বাস দাঁড়াত না। সে জায়গায় এখন কতগুলো স্টপেজ হয়েছে জানিস? মিরপুর আর শিবানী নগরে তো বাস আধঘন্টা করে দাঁড়ায়। সেখানে গাড়ির ড্রাইভার খালাসিরা ফ্রিতে সামোসা দিয়ে চা নাস্তা করে, বিড়ি ফোঁকে। লোকজনও নেমে হাটবাজার করে। ও দুটো গঞ্জ ছাড়াও কত যে গ্রাম আর বস্তিতে বাস দাঁড়ায়, মাল তোলে, প্যাসেঞ্জার তোলে...

প্যাসেঞ্জার মানে যারা বাসে চড়ে যাওয়া আসা করে। ওটা ইংরিজি কথা, এ দিগড়ে তুই ছাড়া আর সব্বাই জানে। তুই সেই যেমন মুখ্যু ছিলি তেমনই রয়ে গেলি। গ্রাম ছেড়ে কোথাও বের হলি না, ভাবিদের সংসার সামলাতে গিয়ে নিজের সংসারটাই বরবাদ করে ফেললি। বাইরের কারো সঙ্গে ভয়ে বাতচিৎ করলি না, ডরপোক, কিন্তু তোর যত তকরার সব আমার সঙ্গে। অবিশ্যি আমাকে ছাড়া তোর আর আছেই বা কে? মরদ বলিস মরদ, দুশমন বলিস দুশমন, সে তো কেবল আমিই।

হা হা হা হা, মুখ্যু বললাম বলে গাল ফোলালি, ভুলিকে মাই? একথা তোকে আজ প্রথম বললাম বুঝি? সচমুচ রে, গোটা দেশে আজকাল কত উন্নতি হচ্ছে, সে কথা তুই জানিসই না, আমিই কী আর সব জানিদুবের গদিতে হরেক লোকজন আসে, তাদের মুখে নানান কথা শুনি। দুবের কাজে বছরে এক আধবার হবিবগঞ্জ দৌড়তে হয়, তাই কিছু কিছু চোখে পড়ে।  

হবিবগঞ্জে লোকজনের হাতে হাতে এখন ফোন। সারাক্ষণ খুটখাট করছে, আর যখন তখন, পথে ঘাটে, বাসে গাড়িতে বকর বকর করে যাচ্ছে। প্রথমবার পেছন থেকে এক অওরতকে দেখেছিলাম, ঘোমটার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে নাগাড়ে কথা বলে চলেছেআশেপাশে কেউ নেই কার সঙ্গে কথা বলছে? আমি তো তাজ্জব, ভাবলাম পাগলি-টাগলি হবে বুঝি। বেশ কিছুক্ষণ পর বলল, ছোড়তি হ, তারপর তার কথাও বন্ধ হল, আর হাতটাও নামাল দেখলাম শাদি সুদা আওরত হাতে একটা তাসের প্যাকেটের মতো চকচকে চিজ। তখনও বুঝিনি যে ওটা ফোন।

হে হে হে তোর অমনি গায়ে জ্বালা ধরল? পরের অওরতের দিকে আমার নজর কেন? গাঁয়েঘরে তুই ছাড়া কারও দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছি, কোনদিন? তুই জানিস না? হবিবগঞ্জে গিয়ে একটু নজর করেছি বলে তুই একেবারে খেপে উঠলি যে? আরে বুজদিল, কিচ্ছু চোখ নাচাইনি। বউটা বেশ জোরে জোরে কথা বলছিল তাই চোখ পড়ল। তা নইলে আমি কী আর জানি না, ভুলির মা ছাড়া আমার মতো মরদকে কে আর চোখে হারাবে? হবিবগঞ্জ থেকে ফিরব বলে আমি বাসে চেপেছিলাম। বাস ছাড়তে একটু দেরি ছিল বলে খালি খালি বাসে সিটও পেয়ে গেছিলাম জুতসই। আমার উল্টোদিকের জেনানা সিটে বসেছিল বউটা আর কথা বলছিল চেঁচিয়ে। তাই নজর পড়েছিল। সে যাক পরে আস্তে আস্তে বাস ভরে উঠতে লাগল, সব সিট ভরে উঠলআমার পাশে এক ছোঁড়া এসে বসল, সেও দেখলাম, কানে হাত রেখে বকেই চলেছে, বকেই চলেছে। আড় চোখে তাকে আমি নজর করতে লাগলাম। তার কথা শেষ হতে দেখলাম, ছোঁড়া চিজটা নিয়ে খুটখুট করতে লাগল। চারচৌকা পাতলা বাক্সের মতো চিজটা বেশ চকচকে, আর টিভির মতো তার ছোট্ট পর্দায় নানান ছবি দেখা যায়। আমি ছোঁড়াটাকে পুছলাম, বাপু ওটা কী? আমার মতো ডোকরা বুড়োকে দেখে ছোঁড়া চিজটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলল, এটা ফোন। কী একটা ফোন যেন বলল, দাঁড়া বলছি, মো, মোব...না না মনে পড়েছে মোবিল ফোন। তারপর আমাকে বেশ আহম্মক ঠাউরে কত কিছু বলল, এটা দিয়ে লোকের সঙ্গে কথা কওয়া যায়। গান শোনা যায়। সিনেমা-টিনেমাও দেখা যায়। আবার হরেক কিসিমের খেলভি খেলা যায়।

নারে তাসের প্যাকেট দিয়ে তো শুধু তাসই খেলা যায়, তা দিয়ে কী আর কথা বলা যায় নাকি? নাকি গান শোনা যায়? তুই আড় বুঝোই রয়ে গেলি চিরটাকাল, নিজের চোখে দেখলেও বোধহয় তুই পেত্তয় যেতিস না। আরে বলছি না, তারপর নজর করে দেখলাম, বাসে বসে থাকা ছোকরা, বুড়ো, ছুঁড়ি, ধুমসি সবার হাতেই ওই ফোন, আর মাঝে মাঝেই তারা কানে লাগিয়ে কথা কইছে।

পাগল হয়েছিস, আমার চাষাড়ে হাতে ওই ফোন নিয়ে করবটা কী? কত দাম তাও তো জানি না। আমাদের গাঁয়ে কাউকে তো দেখিনিগগন দুবের তো টাকায় ছ্যাতলা পড়ে, তাকেও তো দেখিনি ওই ফোন নিয়ে ঘুরতে। আর কথা বলবই বা কার সঙ্গে? তোর সঙ্গে? বাসে বসে তোর সঙ্গে কী কথা বলতাম বল দিকি? সারাদিন তুইও খেটে মরছিস, এদিকে আমিও। ফোনে-টোনে নয়, আমাদের পাঁদাড়ে বসে গপ্পো করাতেই মজা। রাত্রে খাওয়ার পর আমি একটা বিড়ি ধরাই আর তুই মুখে মোতিহারি দোক্তা ঠুসে বসিস গা ঘেঁষেমার দুনম্বর বিড়িটা শেষ হবার আগেই রাক্ষুসে হাঁই তুলতে তুলতে তুই বলিস, চোক টানচে শুই গিয়ে

হ্যা হ্যা হ্যা রাগ করচিস কেনে? ওই রাক্ষুসে মুখেই চুমকুড়ি খেয়েই তো তিন-তিনটে বাচ্চা বিয়োলি? সারা জেবনটা তো গেল তোর ওই রাক্কুসে মুখের দিকেই চেয়ে। এই বুড়ো বয়েসে আবার দুষ্কুই বা করিস কেনে, রাগই বা করিস কিসের লেগে? হা হা হা হা...

 

****

হবিবগঞ্জ চৌমাথার মোড়ে সুখনরাম হাবিলদারের ডিউটি। ট্রাফিক সামলায়। এখন অবিশ্যি লকডাউনের চক্করে চারটে সড়কই ফাঁকা, ট্র্যাফিকের বালাই নেই। তাই সুখনরামের মন মেজাজ খারাপ। ট্র্যাফিক থাকলে ট্রাকওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের নিংড়ে তার আমদানি হত ভালই। এখন এই লকডাউনে সে সব গিয়েছে চুলোর দুয়োরে। ডিউটি দিতে দিতে নাস্তাপানিরও কোনদিন অভাব হয়নি সুখনরামের, তিওয়ারির চা, আর গঙ্গেশ দুধাওয়ার কচোরি, সামোসায় তার ছিল নিত্য অধিকার। আজকাল লকডাউনে সবই বন্ধ। খোলা আছে শুধু চুখনলালের পান-বিড়ির দোকান। চুখনের গুটখা আর জর্দার বরাদ্দটা এখনও চালু আছে, তাই সামোসার খিদে এখন গুটখার রসেই মেটাতে হচ্ছে।

রাস্তার ধারের নালার ওপর চুখনলালের গুমটি, তার সামনে নালার রেলিং। সেই রেলিংয়ে ভর দিয়ে সুখনরাম, একমুখ গুটকার লালা নিয়ে তাকিয়েছিল নির্জন ফাঁকা রাস্তাগুলোর দিকে, ভাবছিল তার পকেট ফাঁকা নসিবের কথাও। তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখে পড়ল লোকটাকে পরনে ময়লা ধুতি আর কুর্তা গায়ে লোকটা সাইকেল চালিয়ে জগৎপুর যাওয়ার রাস্তার দিক থেকে আসছে। কোন তাড়া হুড়ো নেই, ধীরে সুস্থে। তার পেছনের কেরিয়ারে আজিব সাইজের একটা প্যাকিং, কাঁথা আর কাপড়ে মুড়ে রশি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধাসেটার থেকেও আজিব ব্যাপার হল, লোকটা হাসছে হ্যা হ্যা করে। আজকাল মোবাইলের দৌলতে আপনমনে হাসার বা বাতচিৎ করার লোক হামেশা চোখে পড়ে। কিন্তু এ লোকটার চেহারায় মোবাইলে কথা বলার মতো মনে হচ্ছে না।

শুঁয়োপোকার মতো ভুরু কুঁচকে সুখনরাম তার দুই চ্যালাকে ইশারা করলনেশাখোর, বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো এই দুই ছোকরা সুখনরামের চ্যালাসুখনরামের ইশারাতে তারা লরিওয়ালা, ভ্যানওয়ালাদের থেকে তোলা আদায় করে সুখনরামের হাতে গুঁজে দেয়। আজকাল পথে ঘাটে সবার হাতেই মোবাইল, ফচাৎ করে কে কখন তসবির তুলে আখবারওয়ালা কিংবা হোয়াটসপে ছড়িয়ে দিলেই হয়েছে আর কি, তার নোকরি খতম,  পেট মে লাথসারাদিনের তোলা থেকে চ্যালাদের হাতে দশ-বিশ তুলে দিলে সে ভয়টা থাকে না।

সুখনরামের ইশারা পেয়ে চ্যালা দুটো হায়নার মতো লাফিয়ে পড়ল লোকটার ওপর।

“কোথায় যাচ্ছিস? কেয়া কাম হ্যায়? জানিস না, এখন লকডাউন। বেকার ঘুমনা-ফিরনা মানা হ্যায়?”

লোকটা সাইকেল থামিয়ে রাস্তায় পা ঠেকিয়ে কাত হয়ে দাঁড়াল, মিনমিন করে কিছু একটা বলল, সুখনরামের কানে এল না। সুখনরাম এক মুখ গোলাপি লালা নালার কালো জলে উগরে দিয়ে, কর্কশ গলায় হাঁকাড় দিল “আবে পুছ না, পিছে কা হ্যায়?”

লোকটা ভীরু চোখে আগের মতোই মিনমিনে গলায় বলল, “বিবি”।

সুখনরাম এবং তার দুই চ্যালা এমনকি হাবিলদার সায়েবকে বিনি পয়সায় গুটখা-জর্দা বিলোনো চুখনলালও আঁতকে উঠল, “বিবি? কিসকা?” “মেরি। কাল রাতকো গুজর গয়ি। গঙ্গা কিনার শমসানে যাচ্ছি”।

“মুর্দা সার্টিপিট দিখা”। চ্যালাদুটো চেপে ধরল লোকটাকেবুরবক লোকটা অবাক তাকিয়ে রইল ওদের মুখের দিকে। সুখনরামের এক চ্যালা অশ্রাব্য কয়েকটা গালাগাল দিল, বলল “কথাটা কানে গেল না? ডক্‌দরের সই করা মুর্দা সার্টিপিট আছে না নেই? শ্বশুরা, তুই নিজেই বিবিকে মেরে এখন গঙ্গায় যাচ্চিস? আর আমাদের উল্লু বানাচ্ছিস, ব্যাহ্‌ন**?”

এমন একটা সমস্যার কথা লোকটার মাথাতেই আসেনি। গত তিন চার রাত ভুলির মায়ের সেবা শুশ্রূষাতেই সে ব্যস্ত ছিল। তিনদিন তিনরাত যমে মানুষে টানাটানির পর, গত কাল মধ্য রাতে তার দেহান্ত হওয়াতে লোকটা দুঃখে শোকে ভেঙে পড়েছিল। সারারাত মুর্দা কোলে বসে থাকার পর হঠাৎ মনে হল, ভুলির মা বহুবারই বায়না করত গঙ্গা নাইতে যাবে। নানান ঝামেলায় সে আর হয়ে ওঠেনি। সে কথা মনে হতেই কী এক আবেগে সে ভুলির মায়ের শরীরটা চাদরে জড়িয়ে বেঁধে নিয়েছিল সাইকেলের কেরিয়ারে। তারপর শেষ রাতে সাইকেল নিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে পড়েছিল হবিবগঞ্জের দিকে। পড়শিদের সবাই মানা করেছিল। শমশান তো এখানেও ছিল, গঙ্গা নেই তো কী? আশেপাশের গ্রামগঞ্জের মানুষের দেহান্ত হলে কী সবাই হবিবগঞ্জ যায়? কী দরকার হবিবগঞ্জ যাবার? কেউ কেউ সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, তবে অনেকেই বলেছিল, “বিবিকে লিয়ে বাওরা বন গয়া শ্বশুরা, জানে দো শালে কো, কুছ দূর যানে কা বাদ আপনে আপ ওয়াপস আয়েগা...”।

জীবন আসে জন্মের নিয়মে আর মৃত্যু আসে জীবনের নিয়মে। কিন্তু শাসক মানুষের ক্ষমতা চায় সেই নিয়মকে সরকারি আইনে বেঁধে রাখতে। সেই সময়ে এসব কথা তার মাথায় আসেনি।  গ্রামে থাকলে পড়শিরাই ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করে, ভুলির মায়ের দাহকার্য সম্পন্ন করে দিতে পারত। কিন্তু এই শহরে সে একজন সন্দেহজনক বহিরাগত ব্যক্তি। তার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। তার কথা শোনার মতো ধৈর্য বা সদিচ্ছাও কারও থাকতে নেই।

খুব দুর্বল কণ্ঠে সে উত্তর দিল, “ইয়াদ নেহি থা, জি”। “শ্বশুরা, ইয়াদ নেহি থা?” অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে সজোরে থাপ্পড় চালালো সুখনরামের এক চ্যালা। লোকটা সাইকেল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ল। কিন্তু ক্যারিয়ারে বাঁধা লাশের প্যাকিংয়ের ঠেকায় সাইকেলটা পড়ে গেল না, কাত হয়ে দাঁড়িয়েই রইল রাস্তায়। লোকটার মরা বিবিই যেন সাইকেলটা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে লোকটার অপেক্ষায়।

চুলের মুঠি ধরে লোকটাকে রাস্তা থেকে তুলে ধরল সুখনরামের এক চ্যালা। অন্য চ্যালাটা বলা নেই কওয়া নেই আচমকা ঘুঁষি মারল পিছন থেকে লোকটার রগ বরাবর। সরু ধারায় রক্ত নামতে লাগল নাক দিয়ে,  লোকটা কোনমতে বলার চেষ্টা করল, “গরিব আদমি... কা কসুর মেরা, কাহে মার...”। কথা শেষ হবার আগেই তার বুকে সজোরে লাথি মারল প্রথম চ্যালা। তিন-চার দিনের বিশ্রাম হীন বিনিদ্র শরীরের দুর্বলতা ছিলই, তার সঙ্গে ছিল শোকের উন্মত্ততা এবং সুদীর্ঘ পথ সাইকেল চালিয়ে আসার ক্লান্তি। লাথির আঘাতে লোকটা উপুড় হয়ে ছিটকে পড়ল কঠিন পথের বুকে। ঝাপসা হয়ে এল তার চোখের আলো।   

সুখনরাম মুখের বয়লারে নতুন গুটকা এবং জর্দা ঢালতে ঢালতে দৃশ্যটা উপভোগ করতে লাগল। দীর্ঘ লকডাউনের নিরিমিষ নির্ঝঞ্ঝাট দৈনন্দিনে এ এক আশ্চর্য রিলিফ। তার চ্যালারা লোকটাকে মারতে মারতে যখন কিছুটা ক্লান্ত, সুখনরাম, গালভর্তি লালা নিয়ে মুখ উঁচু করে বলল, “আবে, আব তো রহম কর, শ্বশুরা”। কার প্রতি করুণা - লোকটির প্রতি নাকি তার চ্যালাদের এত পরিশ্রম থেকে বিরতির জন্যে? রাস্তায় পড়ে থাকা নির্জীব লোকটাকে ছেড়ে দুজনেই উঠে দাঁড়াল। একজন নীচু হয়ে লোকটির জামার পকেটগুলো হাতড়াল, কিছুই পেল না। গালাগাল দিয়ে একটা লাথি কষাল লোকটার শরীরে, তারপর লোকটার কোমরের ধুতির কষি ধরে টান মারতেই ময়লা কাপড়ের গেঁজ বেরিয়ে পড়ল, ছোঁ মেরে তুলে নিলে সেটা।

এখন আর মোটেই উদাসীন থাকার সময় নয়, মুখের লালা উগরে সুখনরাম ধমকে উঠল, “ইধর লে আ শ্বশুরা”। বিচ্ছিরি ময়লা কাপড়ের থলেটা নিয়ে সুখনরামের দুই চ্যালাই উপস্থিত হল, সুখনরাম ইশারা করল খুলে দেখার জন্যে। ওই ময়লা গেঁজেতে হাত লাগাবার ইচ্ছে তার নেই, কে জানে কোথা থেকে কোভিড ধরে নেয়। পাঁচটা পাঁচশ আর কয়েকটা দুশো - একশোর, কিছু দশ বিশের খুচরো নোটও রয়েছে। সুখনরাম এবার হাত বাড়াল, সব কটা নোট হস্তগত করে, দুটো দুশর নোট দুই চ্যালাকে দিয়ে বাকি সবগুলি পকেটস্থ করল। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কোন কারেন্সি নোট থেকে কদাচ হয় না, এটুকু টনটনে জ্ঞান সুখনরামের আছে।

টাকার মায়াতেই হয়তো বা স্নেহমাখা স্বরে রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “হারামি, মর তো নেহি গয়া?” এতক্ষণ চ্যালাদুটোরও কেমন সন্দেহ হল, হতভাগা সেই থেকে একভাবেই পড়ে আছে। নড়া-চড়া করছে না কেন?

এ সময় হঠাৎই শোনা গেল বাইকের আওয়াজ। ডানদিকে তাকিয়ে সুখনরাম আর তার চ্যালাদের মুখ শুকিয়ে গেল। রাউণ্ডে বেরিয়ে থানাদার সায়েব এদিকেই আসছেন। তিনজনেই রাস্তায় নেমে সায়েবের অপেক্ষা করতে লাগল। মোড়ের মাথায় এসে অদ্ভূত প্যাকিংসহ সাইকেল আর রাস্তায় পড়ে থাকা লোকটাকে দেখে থানাদার সায়েব বাইক থামিয়ে দাঁড়ালেন। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সুখনরাম স্যালুট ঠুকে বলল, “সুবে সুবে কেয়া আফৎ আ টপকা, দেখিয়ে না স্যার। এ লোকটা বিবিকে মেরে ফেলে সাইকেলে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে চুপচাপ পুড়িয়ে ফেলার তালে ছিল। আমরা পুছতাছ করতেই হারামিটা মারামারি শুরু করে দিল!”

“কোথাকার লোক। কোথা থেকে এসেছে?”

“সেটাই তো, স্যার, আমরা পুছতাছ করছিলাম। মুর্দা সার্টিপিট দেখতে চেয়েছিলাম, বাস, একদম ভড়কে মারতে এল”। থানাদার সায়েব, দূর থেকে লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “উসকো মার তো নেহি ডালা?”

“এক আধ চড়-থাপ্পড় বাস্‌, ...অ্যায়সে ক্যায়সে মর শক্‌তা?”

রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল লোকটার দেহটা। থানাদারের সন্দেহ হওয়ায় দেহটাকে চিৎ করার নির্দেশ দিল। সুখনরামের দুই চেলা দুদিক থেকে উল্টে দিল দেহটা। লোকটার গোটা মুখটাই রক্তাক্ত, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল জিন্দা, কিন্তু এখন সেও মুর্দা, তার বিবির মত। কে লিখবে, তার মুর্দা সার্টিপিট?

থানাদার সায়েব ক্রুদ্ধ মুখে ঘুরে তাকাল সুখনরামের দিকে, সপাটে এক থাপ্পড় লাগাল তার গালে, “কিতনা লুটা, মাদার**”? গালে হাত বোলাতে বোলাতে সুখনরাম মিনমিন স্বরে বলল, “কুছ ভি নেহি থা, সাব, ঢাইশ করিব, ভিখারি থা শালা”। থানাদার সায়েব সুখনরামের জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল সমস্ত টাকা। সেখান থেকে একটা দুশো টাকার নোট সুখনরামের দুই চ্যালার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এক্‌খুনি একটা ভ্যানে তুলে দুটো লাশকেই গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আয়, কিসি কো পতা চলনা নেহি চাহিয়ে। কিছু গড়বড় নেহি হোনা চাহিয়ে...”। কথাটা শেষ করল অশ্রাব্য অজাচারের আরও একটা গাল দিয়ে, তারপর বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন থানাদার।

 

ভ্যানে পাশাপাশি শুয়ে গঙ্গার দিকে চলতে চলতে আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুর্দা লোকটা তার পুঁটলি জড়ানো মুর্দা বিবিকে বলল, “বলেছিলি গঙ্গা নাইবি, দেখ, আখির হম দোনোকোই এক সাথ গঙ্গাহি তো মিলা!”

পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গায় অবগাহন স্নানে পাপ স্খালন হয়। হিন্দু উচ্চ বর্ণের সমাজপতিরা গঙ্গা স্নান সেরে স্বর্গপথের পথিক হন। সেই পূতসলিলা প্রবাহেই বেওয়ারিশ লাশ হয়ে ভেসে চলল হিন্দু ছোট জাতের এক দম্পতি। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সামান্যতম পরিচয়টুকুও হারিয়ে যাবে তাদের গলিত শবদেহের সঙ্গে।   

..০০..

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...