মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পরিবর্তিনি সংসারে...

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পাখির চোখ "

 

নন্টু আসছেন, নিভাননী সংবাদ পেয়েছিলেন। নন্টু অচ্যুতের ডাকনাম, মা নিভাননী ওই নামেই ডাকেন, ডাকে গাঁয়েঘরের লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাওনন্টুর আসার সংবাদে তিনি আদৌ খুশী হননি। বরং তীব্র রাগ হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলেই মাগ-ছেলে নিয়ে নন্টু কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেল!  সেখানে বড় নাতি হীরুকে কোন একটা স্কুলে যেন ভর্তিও করে দিয়েছে! কলকাতার স্কুলে ছেলেকে পড়িয়ে, নাকি ‘জজ ব্যারিষ্টর’ করে তুলবে! কেন পাড়াগাঁয়ে থেকে কেউ কী বড়ো মানুষ হয় না?  গাঁয়ের স্কুলেই পড়া শেষ করে, বর্ধমানের কলেজে পড়ে মনা হাজরা, গোপাল চাটুজ্জ্যে, বিশু সামন্তরা বড়ো মানুষ হয়নি? হাজরাদের মনা কলকাতা হাইকোর্টের দুঁদে উকিল। গোপাল চাটুজ্জে “ম্যাজিস্টর”, তার হুকুমে সবাই হুজুরে হাজির থাকে। বিশু সামন্ত বায়স্কোপ বানায়, দেশে-বিদেশে তার নাকি খুব “সুখ্যাৎ”এঁদো গাঁয়ের স্কুলের জন্যে ওদের কী কিছু আটকেছে? যার হবার তার হবেই, আর যার হবার নয়, তার কোথাও হবে না। কলকাতার স্কুলে পড়লেই বুঝি সবাই ডাক্তার-মোক্তার হয়?

 বিয়ের আগে নিভাননী কলকাতা না হলেও, কাশীপুরে অনেকদিন থেকেছেন বড়োদাদার বাসায়। তাঁর বড়োদাদা থানার ছোটবাবু ছিলেন। কলকাতার মতো ইল্লুতে জায়গা আর দুটো নেই। বড়োদাদার বাসার কাছেই একটা পাঁউরুটির কারখানা ছিল। সেখানে তিনি দেখেছেন, কারখানার লোকেরা পায়ে দলিয়ে পাঁউরুটির ময়দা মাখছে। সেই পাঁউরুটি নাকি কলকাতার বাবুরা মাখন মাখিয়ে খায়। ঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার – জাত ধম্মো আর কিছু বাকি আছে কলকাতায়? তাছাড়া বখাটে, বাউন্ডুলে, মাতাল, ঘর পালানে “মিন্‌সে” চারদিকে কিলবিল করছে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই বুক কাঁপে! বউ বগলে করে, সেই শহরেই গিয়ে বাসা বাঁধল নন্টু? এই বাড়ির বড়বৌ, ঘরের লক্ষ্মী - একটা অসৈরণ-সৈরণ নেই? বামুনের ঘরের বউ, সেজেগুজে নচ্ছার মাগীর মতো বাজার-হাট করবে? ট্রামে-বাসে ব্যাটাছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাওয়া আসা করবে? আজ থাকতেন নন্টুর বাবা, খড়মপেটা করে ছেলের এই বারটান আর বাউন্ডুলেপনা, শায়েস্তা করে দিতেন

নন্টুর বাবা যখন মারা গেলেন, নন্টু তখন কলকাতার কলেজে পড়ে। সে আজ বেশ কবছর হল। নিভাননীর ছোট ছেলে শান্টুর বয়েস তখন বছর পাঁচেকতার ওপরের দিদি চিত্রার বয়েস ষোলো। বাবার মৃত্যুর পর, নন্টু যোগ্য বড়ো ছেলের মতোই সংসারের হাল ধরেছিল। কলেজের পড়ায় পাশ দিয়েই, মেজঠাকুরপোর সুপারিশে  সরকারি চাকরিটাও সে পেয়ে গিয়েছিল। মেজ ঠাকুরপোও সেই দুর্দিনে নন্টুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সত্যিকারের অভিভাবকের মতো। নন্টু চাকরিটা পাওয়ার পরেই, সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে, বেশ ধুমধাম করেই ছোটবোনের বিয়ে দিয়েছিল।

চিত্রার বিয়ে মিটে যাওয়ার পর, নিভাননী  বলেছিলেন, এবার বিয়ে থা করে, তুইও সংসারী হ, নন্টু। তোর বিয়ে হয়ে গেলে, আমি ঝাড়া হাত পা হবো, বেরিয়ে পড়বো তীর্থ দর্শনে। সংসারের এই টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না, রে

সে কথায় নন্টু খুব উৎসাহ দেখিয়েছিল, বলেছিল,সেই ভালো, মা। শান্টুকে ভালো কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দিই দাঁড়াও, তারপর তোমাকে নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়বে তীর্থ যাত্রায়। বিয়ে থা করে আর কাজ নেই। সারা বছর ঘুরে বেড়াবো, সব ঠিকঠাক চলছে কিনা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো

বড়ছেলের ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলেছিলেন, নিভাননী, বলেছিলেন,তাই কী হয় নাকি? চাকরি বাকরি শিকেয় তুলে, তুই কোথায় যাবি, বাবা? আর মায়ের চোখের সামনে সোমত্ত ছেলে আইবুড়ো বসে থাকবে, এ আবার একটা কথা হল? আমি খোঁজখবর করছি। তোর একটা গতি না করে, আমি তীর্থে গিয়েও যে শান্তি পাবো না, বাবা!

না, না, মা, এই বেশ আছিতুমি আমাকে আর ওসবের মধ্যে জড়িও না। ছেলের এই আপত্তি যে কথার কথা সেটা বুঝতে ভুল করেননি নিভাননী। তিনি খোঁজখবর করেছেন। মেয়ে দেখতে, মেয়ের ঘরদোর বুঝতে, কথাবার্তা বলতে মেজঠাকুরপোকে পাঠিয়েছেন। নন্টু সবই শুনেছে, বুঝেছে, মেয়ে পছন্দ করে বিয়েও করেছে – কোন আপত্তি করেনি। তারপর দুটি ছেলেও হয়েছে। তিনি নিজেও সংসারে আর জড়াবেন না ভাবলেও, জড়িয়ে পড়েছেনতিনি বিধবা, ছোটছেলে শান্টুর লেখাপড়াও শেষ হয়নি এখনো নাবালক। তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত, তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। মেজছেলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে বহুদূরে। বছরে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে আসে। কোন খোঁজখবর নেয় না, সংসারের কোন দায়দৈবে মাথাও ঘামায় না। সেজছেলে একটা চাকরি নিয়ে কলকাতার মেসে থাকে। সেও কমাস আগেই বিয়ে করেছে। সেজবৌ বাড়িতেই থাকে

বড়ছেলে নন্টু ছাড়া তিনি আর কাউকেই তেমন ভরসা করতে পারেন না! কিন্তু পরের ঘরের মেয়ে যদি কান ভাঙানি দেয়, পর করে দেয় তাঁর নন্টুকে? প্রত্যক্ষ কোন কারণ না ঘটলেও, সেই আতঙ্কে তিনি তটস্থ থেকেছেন অহরহ। আজ সেটাই সত্যি হল, নন্টু পরই হয়ে গেল? মা-ভাইকে ভুলে বাসা নিয়ে ফেলল কলকাতায়! তাও তাঁর বিনা অনুমতিতে?

স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে সোনা, এ বাড়ির বৌ হয়ে এসে, অনটনের সংসারে মানিয়ে নিয়েছেন বিস্তর। তাঁর আচরণে কাজে কর্মে কোথাও তেমন কোন ত্রুটি ধরা পড়ে নি কোনদিন। কিন্তু এই অত্যধিক মেনে নেওয়াটাও যে মেনে নেওয়া যায় না! কোন প্রতিবাদ না করে, সব অভাব, সব অনটন যদি কেউ মুখ বুজে, হাসি মুখে সহ্য করে নেয়, সেটাই বা কেমনতর! এও তো একধরনের স্পর্ধাই। আমি কত ভালো, আমার বাপের ঘরের শিক্ষা কতো ভালো, এ যেন তার দেখনদারি!

পুত্রবধূর অস্পষ্ট অথচ অসহ্য এই গুমোর কল্পনা করে নিভাননীর গাত্রদাহ হয়পাড়া প্রতিবেশী যত তাঁর বড়োবউয়ের প্রশংসা করে, সোনা তত তাঁর চোখের বালি হতে থাকেন পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েবউদের সঙ্গে স্নান থেকে ফিরতে দেরি হলে বিরক্ত হন, মুখ ঝামটা দেন। ঘরের সব কাজ সেরে প্রতিবেশী-জ্ঞাতি মেয়েবউদের সঙ্গে বসে দুপুরে বিন্তি বা রঙ মেলান্তি খেললেও বিরক্ত হন। নন্টুর বাবা ছিলেন কট্টর শুদ্ধাচারী নীতিবাগীশ ব্রাহ্মণ। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর ব্রাহ্মণ্যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে এবং ভক্তিতে তটস্থ থাকত।

স্বামীর জীবদ্দশায় তিনি নিজেও সর্বদা আতঙ্কে থাকতেন, ঘরভরা ছেলেমেয়ের সংসারে সর্বদা সব বিধান কী আর মেনে চলা যায়? পান থেকে চূণ খসলেই স্বামীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হতেন এবং আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। অথচ বিধবা হয়ে, সেই তিনিই পালা-পার্বণ, তিথি-নক্ষত্র, বার-ব্রত, আমিষ-নিরামিষ, ছ্যুৎ-অছ্যুৎ, কাচা-আকাচা, আচার-বিচারের মোড়কে নিজেকে মুড়ে ফেলেছেন। একাদশীর দিন তিনি নির্জলা উপবাস করেন। সমস্ত বার-ব্রত-তিথি-নক্ষত্র পালনে তিনি স্বয়ং মনুর থেকেও নিষ্ঠুর এবং অমোঘ।

সেই সব তিথির পালনীতে সামান্য চ্যুতি হলে, তিনি পুত্রবধূকে ছেড়ে কথা বলেন না, “তুমি আর এসব জানবে কী করে মা, তোমরা বড়োমানুষের মেয়ে। তোমাদের বাড়িতে শুনেছি কত জাতের কত কাজের লোক। তোমাদের বাপের ঘরে অমন চলতে পারে, কিন্তু এখানে তো ওসব চলবে না, বৌমা। তোমার শ্বশুরঠাকুর ছিলেন এই দিগড়ের বিধান দাতা। তাঁর নির্দেশ ছাড়া এই গাঁয়ের লোকের একপাও চলার ক্ষমতা ছিল? বাপরে, কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে তুলতেন! কেউ কিছু অনাচার করে ফেললে, তার প্রায়শ্চিত্তের যা বিধান দিতেন, সে সব শুনলে তোমরা ভিরমি খাবে!”

প্রখর গ্রীষ্মে, একাদশীর নির্জলা উপবাসের দিন, মেঝেয় আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকা নির্জীব শ্বশ্রুমাতাকে, সোনা একবার এক গেলাস লেবুমিছরির সরবৎ খাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তাতে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “ছি, ছি, বৌমা, এ তুমি কী করলে? এ যে পাপ। বামুনের ঘরের বেধবাকে একাদশীর ব্রতভঙ্গ করাতে এলে? তোমার কি একবারও মনে হল না, এ অনাচার?”

“ভোর থেকে এত বেলা হল, এই প্রচণ্ড গরমে আপনি একবিন্দু জলও মুখে দিলেন না। আমরা এবার ভাত খেতে যাবো, আর আপনি এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, মা, তাই...”।

তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “রক্ষে করো, বৌমা, আমার জন্যে তোমার অত দরদে আর কাজ নেই! ওসব তুমি বুঝবে না, মা। উপোসে শরীর-মন শুদ্ধ হয়, কষ্ট হয় না, তোমার বড়লোক বাপ-মা এই শিক্ষাটুকুও দেননি, বাছা? যাও যাও, বেলা অনেক হল, খেয়ে নেবে যাও। আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও”।

সোনা, মাথা নীচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, গেলাসের সরবত উঠোনের মাটিতে ফেলে দিয়ে, নিজের ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কেঁদেছিলেন খুব। ছোট্ট হীরু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, জিগ্যেস করেছিল, “ও মা, কাঁদছো কেন? খেতে দেবে না? ও মা, চলো না খিদে পেয়েছে”। সেজজা এসে সোনাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, “ও দিদি, মন খারাপ করো না তো! কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে, চলো খেতে দাও”।   

 

 

অচ্যুত যখন বাড়িতে ঢুকলেন, নিভাননী খুঁটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দাওয়ায়। ছোট করে ছাঁটা সাদা-কালো কদমফুলি চুল। পরনে পাড়হীন সাদা থান, সাদা ব্লাউজ। সমস্ত শরীর পাথরের মতো কঠোর আবেগহীন।   

“কেমন আছো, মা?” নীচু হয়ে চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন অচ্যুত। নির্বিকার স্বরে নিভাননী উত্তর দিলেন, “যেমন তোমরা, রেখেছো, বাছা! আমাদের আর থাকা না থাকা, শেষের প্রহর গোনা বৈ আর কাজ কী?”

মায়ের অনুমতি ছাড়া পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া নিয়ে অচ্যুতের মনে অপরাধবোধ ছিলই, কুণ্ঠিত স্বরে বললেন, “ওভাবে বলছো কেন, মা? তড়িঘড়ি সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, তোমাকে জানাতে পারিনি। অন্যায় যে হয়েছে, সেটা কী আমি বুঝতে পারছি না, মা?”

ঠাকুরঘরের দিকে যেতে যেতে নিভাননী বললেন, “অন্যায় হবে কেন, বাবা? যা করেছো ঠিকই করেছ। সেই কোন ভোরে রওনা হয়েছো, হাতমুখ ধুয়ে এসো। একটু জিরিয়ে নাও। বৌমা, নন্টু এসেছে সরবৎ দাও, জল দাও”।

নিভাননী যদি দুটো কথা কটকট করে শুনিয়ে দিতেন, কিংবা অভিযোগ করে কান্নাকাটি করতেন, অচ্যুতের পক্ষে পরিস্থিতি সামলাতে সুবিধে হত। কিন্তু উদাসীনতার এমন নিরেট দেওয়াল তিনি তুলে দিলেন, তার মধ্যে প্রবেশের আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না। মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে, অচ্যুত দাওয়াতে হাতের ব্যাগটা রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, ছোটভাই শান্টু, তার হাতে কাচের গেলাসে শরবৎ। তার হাত থেকে গেলাস নিতে নিতে তিনি রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকালেন, দরজার আড়ালে সেজবৌমার শাড়ির প্রান্ত দেখতে পেলেন।

শরবৎ শেষ করে, শান্টুর মাথায় হাত রেখে অচ্যুত বললেন, “কেমন আছিস রে, শান্টু?”

একগাল লাজুক হেসে শান্টু অচ্যুতকে প্রণাম করে বলল, “ভালো আছি, বড়দা। তোমাদের বাসায় আমাকে নিয়ে যাবে না, দাদা?”

ছোটভাইয়ের কথায় অচ্যুত আবেগে আপ্লুত হলেন, “দেখ বোকা ছেলে কেমন প্রশ্ন করে! নিয়ে যাবো না, কেন? আমার বাসা তো তোদেরও বাসা। যাবি, থাকবি, ওখানে থেকেই লেখাপড়া করবিহীরু তোর কথা খুব বলে, তোর বৌদিও বলে, শান্টুটা কী করছে কে জানে!”

যে অপরাধবোধের জন্যে অচ্যুত মায়ের সামনে আড়ষ্ট হয়ে ছিলেন, ভাইয়ের আন্তরিক কথায় তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করলেন, গলা তুলে বললেন, “বৌমা, তোমাদের খবর সব ভালো তো মা? তোমার বড়দি তোমাদের কথা খুব বলে। তোমরা দুজনে সারাদিন একসঙ্গেই তো থাকতে; বলে, মালতী আমার আর জন্মের বোন ছিল”

“সঙের মতো দাঁড়িয়ে কী শুনছিস, শান্টু? দাদার হাত থেকে খালি গেলাসটা নে। কলকাতা যাওয়ার জন্যে তোর এত আদেখলামোই বা কেন রে? কলকাতা কী পালিয়ে যাচ্ছে? দাদা-বৌদি কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেছে, তোদের মতো অপোগণ্ড পোষবার জন্যে? বৌমা, দরজায় দাঁড়িয়ে আর আদিখ্যেতা করো না, বাছা। কত বেলা হল, সে খেয়াল আছে? নন্টু এতদিন পরে এল, শুধু ডালভাত বেড়ে দেবে নাকি”? ঠাকুরঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলা, নিভাননীর কর্কশ কথাগুলো, হাল্কা হওয়া পরিস্থিতিকে আবার বিষাক্ত করে তুলল। কথাগুলি বলে তিনি ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ করে জপে বসলেন। কম্বলের আসনে বসে, ইষ্টদেবতার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন বহুক্ষণ, পারলেন না। চোখ বন্ধ করলে, একটাই মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সুন্দর অথচ কুটিল সেই মুখটি তাঁর বড়পুত্রবধূর। জপের আসনে বসেও তিনি শান্ত হলেন না, বরং ক্রোধের নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তিনি তাকিয়ে রইলেন, রাধা-কৃষ্ণের স্মিত যুগলমুখের দিকে।


 

জলখাবার সেরে কাঁধে গামছা ফেলে অচ্যুত গ্রামে বেরিয়েছিলেন, পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করতে। উদ্দেশ্য সকলের সংবাদ নেওয়া এবং তাঁর কলকাতায় বাস নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া জানা। তিনি ভেবেছিলেন, গ্রামের সকলেই হয়তো ছি ছি করবে! কিন্তু যতটা ভেবেছিলেন, ততটা হয়নি।

দুয়েকজন বয়স্ক বললেন, “এ তোমার উচিৎ হল না, নন্টু। তুমি বাড়ির বড়ো ছেলে হয়ে, সব দায় ঝেড়ে ফেলে পরিবার নিয়ে একেবারে কলকাতায় বাসা করে ফেললে! বিধবা মা, নাবালক ভাইয়ের প্রতি যে কর্তব্য, তোমার মতো উপযুক্ত শিক্ষিত ছেলেরাও যদি এড়িয়ে যায়, তাহলে গাঁয়ে ঘরে আর রইল কী? এমন চললে কদিনেই, দেশ, সমাজ, এ সবই তো উচ্ছন্নে যাবে, হে! পরিবার মানে কী শুধুই মাগ-ভাতার আর ছেলেপুলে? বাপ-মা, ভাই-বোন, খুড়ো, খুড়ি তাঁরা কী পরিবারের কেউ নয়”?

কিন্তু অধিকাংশই সমর্থন করল, “বেশ করেছো। এই এঁদো গাঁয়ে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না। আমাদের উপায় নেই, তাই পড়ে পড়ে মার খাওয়া! একটা স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, বিজলি নেই। বর্ষায় পথে ঘাটে এক হাঁটু কাদা। এখানে মানুষ থাকে, পোকার মতো কিলবিল করা! একবার যখন বেরিয়ে পড়েছো, ভায়া, ভুলেও আর এমুখো হয়ো না!”

পুকুর থেকে একেবারে চান করে মাঝদুপুরে বাড়ি ফিরলেন অচ্যুত। ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে শুকোতে দিলেন, উঠোনের দড়িতে, তারপর দোতলার ঘরে গিয়ে শুলেন নিজের বিছানায়। মাথার নিচে হাত রেখে চিত হয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন নানান কথা। আশৈশব তিনি যে মাকে দেখেছেন, চিনেছেন, সেই মা এখন যেন অচেনা। বাবার অত্যধিক নিয়মনিষ্ঠায় তাঁরা সকলেই অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন। বিশেষ করে তাঁর এই মা, ধর্মপালনের নামে বাবার কত যে অদ্ভূত বায়না, তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, তার সাক্ষী আর কেউ না থাক, তিনি তো আছেন! রান্নাঘরে গোপনে চোখের জল ফেলা মাকে, তখন সান্ত্বনা দেবার কে ছিল আর, নন্টু ছাড়া?

অথচ বাবার মৃত্যুর পর বাবার ছেড়ে যাওয়া খড়মেই যেন মা পা রাখলেন। কলেজে পড়ার থেকেই তিনি বাইরে বাইরে থাকতেন, অতটা বুঝতে পারেননি। বিয়ের পর স্ত্রীর মুখে অজস্র অভিযোগের কথা শুনে আশ্চর্য হতেন খুব, বিরক্তও হতেন। একজন মানুষ যে যন্ত্রণায় সারা জীবন জ্বলেছেন, সেই যন্ত্রণা তিনি কী ভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে পারেন? কিন্তু আজ প্রায় মাস চারেক অদেখার পর, মায়ের সকালের আচরণে তিনি নিশ্চিত হলেন, এই মানুষটি তাঁর সেই শৈশবের-বাল্যের স্নেহময়ী মা নন। তিনি এখন নীতি ও ধর্ম আচরণের নিষ্ঠুর প্রতিষ্ঠান, জেদী এবং অহংকারী। এ সময় হঠাৎ তাঁর আর একটা কথা মনে এল, তিনি কী এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যেতেই কলকাতায় বাসা করলেন? ছেলেদের লেখাপড়াটা একটা বাড়তি অজুহাত!

বন্ধুবান্ধব ও কিছু প্রতিবেশী তাঁকে সমর্থন করে এই যে কথাগুলো বলল, সেটা কী তাদের শুভেচ্ছা? নাকি ঈর্ষা? নাকি তাঁর এই পালিয়ে যাওয়ার প্রতি বিদ্রূপ? মনের অবচেতনে তিনিও কী মুক্তিই খুঁজছিলেন? দীর্ঘদিন কলকাতাবাসী হওয়ার দৌলতে তিনি কী শহরের পরিবেশ, শহরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন? আসলে তিনিও কী এই বদ্ধ গ্রামজীবনকে এড়িয়ে সহজ স্বস্তির জীবনে উত্তরণ চাইছেন? তাঁর এই পলায়নপর মনোভাব কী ধরা পড়ে গেল, মায়ের কাছে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে?

“বড়দা, খাবে চলো। নিচেয় খাবার বেড়েছে”। শান্টুর কথায় অচ্যুতের চিন্তা থমকে গেল। মেঝেয় পা দিয়ে অচ্যুত ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন, “তুইও খাসনি তো”? লাজুক হেসে শান্টু ঘাড় নাড়ল। না। “চ, একসঙ্গে খাবো”।

খাবার সময় মা সামনে বসে থাকলে বেশ লাগে। এই বয়সেও তিনি যেন বাল্যের দিনে ফিরে যান। এতক্ষণে মা নিশ্চয়ই শান্ত হয়েছেন, আগের মতোই হয়তো স্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন। নিচেয় এসে শান্টু তাঁকে সেজভাইয়ের ঘরে নিয়ে যেতে, তিনি বেশ অবাক হলেন। দেখলেন ঘরের মেঝেয় দুটি আসন পাতা, আসনের সামনে ঢাকা দেওয়া কাঁসার গেলাসে জল। এতদিন তিনি এবং তাঁর ভাইয়েরা একত্র হলে, মায়ের ঘরেই খাবার ব্যবস্থা হয়, আজ তার ব্যত্যয় কেন?

শান্টুকে তিনি জিগ্যেস করলেন, “মা কোথায়?”

শান্টু উত্তর দিল, “মা ছোটকাকীমার সঙ্গে দেখা করতে গেছে”। অচ্যুতের বাবারা তিনভাই, মেজকাকা থাকেন হাওড়ায়, ছোটকাকা-কাকীমা খুড়তুতো ভাইবোনেরা থাকেন, পাশের বাড়ীতে। বাড়ি আলাদা হলেও দুই পরিবারে হৃদ্যতার অভাব নেই।

অচ্যুত খুব বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমি তো একটু আগেই ওবাড়ি ঘুরে, দেখা করে এলাম!” এইসময় অচ্যুতের খুড়তুতো বোন বিশাখা ভাতের থালা সাজিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পিছনে আরেকটা থালা নিয়ে এক গলা ঘোমটা দিয়ে আড়ালে রইলেন সেজবৌমা।

অচ্যুতের আসনের সামনে থালা রেখে বিশাখা বললেন, “বড়দা, শুরু করো। অনেক বেলা হয়ে গেল”

সমস্ত ব্যাপারটাতে অচ্যুতর মন বিরূপ হয়ে উঠল। মায়ের এই আচরণ তাঁর অত্যন্ত বাড়াবাড়ি মনে হল। তাঁর মনে অপরাধবোধের যে কাঁটা এতদিন খচখচ করছিল, সেটা যেন সরে গেল। তিনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। বিশাখা শান্টুর ভাতের থালাও আসনের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর, অচ্যুত গেলাসের জল নিয়ে গণ্ডূষ করে বললেন, “তোদেরও তো খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। তুই কী এখানেই খাবি? নাকি আবার ও বাড়ি যাবি?”

“না গো। আজ সেজবৌদির সঙ্গে খাবো”।

“মা হঠাৎ এই ভরদুপুরে তোদের বাড়ি গেলেন কেন?”

বিশাখা হাসলেন, “বড়মা, ওইরকম হয়ে গেছেন আজকাল। কোন কিছুই ওঁর পছন্দ হয় না। সবার সঙ্গেই খিটিমিটি করেন।  মায়ের সঙ্গে ওঁর রোজ ঝামেলা হয়। গতকাল পর্যন্ত মুখ দেখাদেখি ছিল না। আজ তুমি এলে, আর আজই উনি মায়ের সঙ্গে গল্প করতে গেলেন! বড়দা, সেজবৌদি জিগ্যেস করছে, পান্নার আঙুলটা সেরেছে কিনা?”

অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়াতে অচ্যুত কিছুটা স্বস্তি পেলেন। হেসে বললেন, “হ্যাঁ বৌমা, ওর মামার বাড়িতে মাসীরা সবাই মিলে সারিয়ে দিয়েছে। এখন ভালই আছে”।

বিশাখা বললেন, “বৌদির বাবাও তো হঠাৎ মারা গেলেন, শুনেছি। এরপরেও একা একা কলকাতার বাসায় নতুন সংসার  সামলানো- বৌদির কিন্তু খুব মনের জোর, না বড়দা? বৌদির বোনেদের কেউ সঙ্গে গেল না কেন? মাস কয়েক থেকে একটু গুছিয়ে দিয়ে আসত!”

“কথা সেরকমই ছিল। কিন্তু শ্বশুরমশাই মারা যাওয়াতে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল”।

“তা ঠিক। বাপ-মা মানে বটগাছ, মাথার ওপর থেকে তাঁদের ছায়া চলে যাওয়া কী চাট্টিখানি কথা? হীরু আমাদের কথা বলে, বড়দা? নাকি ভুলে গেছে?”

“দ্যাখো, ভুলে যাবে কেন? হীরু এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, স্কুলে যাচ্ছে। তার আগে দুপুরবেলা হলেই মন খারাপ করত। সারা দুপুর নাকি ওবাড়িতে তোদের সঙ্গে দৌরাত্ম্য করত!”

“দৌরাত্ম্য কী বলছো, বড়দা? ছেলেমানুষ চঞ্চল হবে না? মাঝে মাঝে বড়োমা হীরুকে আটকে রাখতেন, আমাদের বাড়ি যেতে দিতেন না, আমি এসে তুলে নিয়ে যেতাম। বড়োমা আমাকে কিছু বলতেন না, জানেন তো বিশাখাও কম মুখরা নয়”।

অচ্যুত বোনের একথায় খুব হাসলেন হা হা করে, বললেন, “বাবা। সেই বিশাখা, এত্তোটুকুন মেয়ে, তুই এখন এত পাকা হয়েছিস? আমার মায়ের সঙ্গেও ঝগড়া করিস?”

মুখ টিপে হেসে বিশাখা বললেন, “করবো না? আরেকটু ভাত দিই, বড়দা?”

“না রে, একটুও না। যা দিয়েছিস, এই পুরোটা খেতে পারলে হয়”।

মুচকি হেসে বিশাখা বলল, “তোমার খাওয়া অনেক কমে গেছে, বড়দাসেজবৌদি বলছে”

“না গো বৌমা, শুরুতেই অনেক ভাত দিয়ে ফেলেছো যে!” হাসতে হাসতে বললেন অচ্যুত। 

 

 

খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরের বিছানায় একটু গড়িয়ে নিয়েই অচ্যুত আবার পাড়ায় বেরিয়ে পড়েছিলেন।  ফিরলেন সন্ধের বেশ কিছুটা পরে। বাড়ি এসে হাতপা ধুয়ে দাওয়ায় বসতেই, ছোটভাই শান্টু এসে জিগ্যেস করল, “বড়দা, চা খাবে? সেজবৌদি জিগ্যেস করতে বলল”।

“নাঃ রে। আমি তো চা খাই না। মা কোথায় রে?”

“ঠাকুর ঘরে, আহ্নিক করছে”।

“ও আচ্ছা”। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এখনও সন্ধ্যা আহ্নিক!

শান্টুকে বললেন, “ভেতর থেকে একটা মাদুর নিয়ে আয় তো, দাওয়ায় বসি, আর তোর বই খাতাও নিয়ে আয়, কেমন লেখাপড়া করছিস দেখি?” শান্টু দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর থেকে একটা মাদুর এনে বিছিয়ে দিল দাওয়ায়। অচ্যুত দাওয়ায় উঠে বসলেন। শান্টু দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে হ্যারিকেনটাও এনে দাওয়াতে রাখল। হ্যারিকেনের পলতে নামানো ছিল, সেটাকে বাড়িয়ে দিতে আলোটা বাড়ল কিছুটা।  তারপর আবার ঘরের ভেতরে গেল বই-খাতা আনতে।

অচ্যুত বললেন, “আরে, অন্ধকার ঘরের মধ্যে কোথায় হাঁটকাবি, হ্যারিকেনটা নিয়ে যা”।

“তুমি অন্ধকারে থাকবে, বড়দা?”

“কেন? আমি অন্ধকারে বসলে, আমায় ভূতে ধরবে বুঝি? যাঃ যাঃ মেলা পাকামি করিস না, আমি তোর বড়দা, না তুই আমার? আলোটা নিয়ে অংক, ইংরিজি আর সংস্কৃত বইটা নিয়ে আয়, দেখি কেমন পড়েছিস”? শান্টু হ্যারিকেন নিয়ে ঘরের ভেতরে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যে বইগুলো সঙ্গে নিয়ে, দাদার সামনে এসে বসল

অচ্যুত হ্যারিকেনের পলতেটা একটু কমিয়ে দিলেন, পলতের আগুন ব্যাঁকা হয়ে জ্বলছিল, বললেন, “পলতেটা ঠিক করে কাটা হয়নি রে, ব্যাঁকা হয়ে গেছে। এভাবে জ্বললে কাচের একদিকে কালি পরে ভূতুষি হয়ে যাবে একটু পরেই। অনেক সময় কাচ ফেটেও যায়। শব্দরূপ ধাতুরূপ মুখস্থ করিস? লতা শব্দের পঞ্চমীর দ্বিবচনে কী হয়?” শান্টু খুব অস্বস্তিতে পড়লতার মেজকাকা আর বড়দার লেখাপড়া নিয়ে গাঁয়ে এখনো চর্চা হয়, সংস্কৃতে আর ইংরিজিতে দুজনেরই এখনও খুব নাম আছে এ অঞ্চলে। সেই বড়দা অনেকদিন পর হঠাৎ এসে পড়া ধরতে বসলে ভয় পাওয়ারই কথা।

শান্টু শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলল, “ল--লতাভ্যাম্‌”

“বাঃ ভেরি গুড। তোৎলাচ্ছিস কেন? ঠিকই তো বলেছিস। শ্রী শব্দের সপ্তমীর বহুবচন?”

“স্‌-স্‌ শ্রীণাম্‌”।

“এঃ পারলি না? শ্রীণাম ষষ্ঠীর বহুবচন। সপ্তমীর বহুবচনে শ্রীষু। “পুষ্পিতৌ লতে” কথাটা ঠিক না ভুল?”

“ভুল”।

“ঠিকটা কী হবে?”

অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে পায়ের নখ খোঁটার পর শান্টু বলল, “পুষ্পিতৌ লতৌ”।

অচ্যুত জিভে আক্ষেপের চিক শব্দ করলেন, বললেন, “এখানে বিশেষ্য কোনটা আর বিশেষণ কোনটা?”

শান্টু খুব ভয়ে ভয়ে বলল, “লতা বিশেষ্য আর পুষ্পিতা বিশেষণ”।

“তাহলে? বিশেষ্যর যে লিঙ্গ, বিভক্তি এবং বচন হবে, বিশেষণেরও তাই হবে। লতা স্ত্রীলিঙ্গ, তার প্রথমার দ্বিবচনে লতে। তার বিশেষণ পুষ্পিতারও তাই হবে। কী হবে তাহলে?”

“পুষ্পিতে লতে”।

“গুড। বুঝতে পেরেছিস? সংস্কৃত অনেকটা অংকের মতো, নিয়মটা একবার বুঝতে পারলে আর কোনদিন ভুল হবে না...”।

নিজের পড়া হোক কিংবা অন্যকে পড়ানো – দুটো ব্যাপারেই অচ্যুতের ভীষণ ঝোঁক। লেখাপড়ার চর্চায় অবগাহন করতে তিনি বড়ো আনন্দ পান। ছোট ভাইকে পড়াতে পড়াতে তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন, নিভাননী কখন এসে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়েছেন তিনি লক্ষ্যও করেননি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিভাননী বললেন, “নন্টু, সেই কোন ভোর কলকাতার বাসা থেকে বেরিয়ে এতদূর পাড়াগাঁয়ে এলি! কোথায় একটু বিশ্রাম করবি তা না, এখন আবার শান্টুকে নিয়ে পড়লি?” লেখাপড়ার রাজ্যে অচ্যুত ডুবে ছিলেন, কলকাতায় বাসা নিয়ে তাঁর চলে যাওয়া আর সেই নিয়ে তাঁর মায়ের বিদ্বিষ্ট আচরণের কথা তিনি ভুলেই গেছিলেন।

মায়ের হঠাৎ এই উদ্বিগ্ন কথার শ্লেষ তিনি ধরতে পারলেন না, তিনি বললেন, “না, না, মা, আমার কিচ্‌ছু কষ্ট নেই! শান্টু লেখাপড়ায় খুব অবহেলা করছে!”

“এতদিন পরে একবেলা পড়িয়ে তুমি ভাইকে কী দিগ্‌গজ পণ্ডিত বানিয়ে তুলবে, বাবা? শান্টু, বইপত্তর নিয়ে ঘরে যা, নিজে নিজে যা পারিস পড়। দাদাকে বিরক্ত করিস না”।

নিভাননীর এই কথায় অচ্যুত আবার বাস্তবে ফিরলেন। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন। শান্টু ম্লানমুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিল, চোখাচোখি হতে মুখ নামাল। সামনে খুলে রাখা ব্যাকরণ কৌমুদী বন্ধ করে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে সব বই তুলে নিয়ে চলে গেল ঘরের ভিতর। অচ্যুতর মনে ভীষণ এক বিরোধ বিদ্রোহের মতো ঝলসে উঠল। ইচ্ছা হল মায়ের এই নিষ্ঠুর আচরণের জবাব দেওয়ার। শান্টু ঘরে চলে যাবার পর, নিভাননী পিছন ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।

অচ্যুত পিছন থেকে একটু উদ্ধত স্বরে বললেন, “মা, কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাবো। তোমার বৌমার একটা ট্রাংক আছে, সেটাও নিয়ে যাবো। তাছাড়া আমাদের যা টুকটাক জিনিষ পত্র রয়ে গেছে, সেসবই আমি কাল নিয়ে যাচ্ছি”

নিভাননী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বড়ো ছেলের মুখের দিকে, চোখে চোখ রেখে বললেন, “যেও”। তারপর  ধীর পায়ে উঠে গেলেন পাশের ঘরে দাওয়ায়।

অচ্যুত মাথা নীচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ, হ্যারিকেনের কল ঘুরিয়ে পলতে কমিয়ে দিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললেন,

“পরিবর্তিনি সংসারে মৃতঃ কো বা ন জায়তে।

স জাতো যেন জাতেন যাতি বংশঃ সমুন্নতিম্‌”।।

পরিবর্তনের এই সংসারে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম কার না হয় ?

কিন্তু যে জন্মে বংশের সম্যক উন্নতি হয় সেই জন্মই (সার্থক)

..০০..

চলবে...




সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১

   ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব "


প্রথম পর্ব 

৮ই নভেম্বর ২০১৬ রাত আটটা থেকে গোটা ভারতবর্ষে ১০০০ এবং ৫০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণার পর গোটা দেশে সোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সেই নোট বাতিল পদ্ধতি ঠিক না ভুল, আমাদের ভবিষ্যতে ভালো হবে, না খারাপ হবে! নাকি আমাদের যা অবস্থা ছিল তাইই থাকবে! এ সব বিষয় নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক, পক্ষে-বিপক্ষে জোরদার যুক্তি এবং প্রশংসা আর বিদ্রূপের বন্যা বয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ জুড়ে। সেই সব জটিল বিতর্কের মধ্যে একটুও না জড়িয়ে আমরা বরং এসো দেখে নিই মানব সভ্যতায় এই নোট বা টাকা-পয়সা কবে থেকে শুরু হল। আর কিভাবে টাকা পয়সা ছাড়া আমাদের সভ্যতা এক কথায় অচল হয়ে উঠল দিন-কে-দিন। টাকা যখন ছিলই না, তখনই বা আমাদের জীবন যাত্রা কেমন ছিল? 

 

কয়েকটি পরিবারের লোক একসঙ্গে দল বেঁধে, ছোট ছোট গোষ্ঠী তৈরি করে, আদিম মানুষেরা সভ্য জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। শুরুতে খাদ্যের জন্যে জঙ্গলে শিকার আর ফল-মূল সংগ্রহ করা ছাড়া তাদের জীবন ধারণের অন্য কোন উপায়ই ছিল না। ধীরে ধীরে তারা কিছু কিছু বন্য প্রাণীদের পোষ মানাতে শিখে ফেলল। এই গৃহপালিত পশুদের মাংস এবং দুধ তারা যেমন খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত, তেমনি ঘরের নানান কাজেও তাদের ব্যবহার করতে শিখে ফেলল। তারপর তারা আরও শিখে ফেলল আগুনের ব্যবহার, চাষবাস এবং ধাতুর ব্যবহারসভ্যতার এই উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সহজ সরল জীবন যাত্রার ক্রমশঃ ঢুকে পড়তে লাগল নানান জটিল পেশা, কেউ হয়ে উঠল দক্ষ কারিগর, পাথরের কিংবা মাটির নানান উপকরণ বানাতে পারে কেউ হয়ে উঠল ধাতুবিদ, নানান অঞ্চলে আকর খুঁজে খুঁজে খনিজ তুলে আনে, তারপর সেই খনিজ গালিয়ে বের করে ফেলে লোহা, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা, রূপো। আবার আরেক ধরনের কারিগর সেই ধাতু থেকে বানিয়ে ফেলতে পারত বিভিন্ন প্রয়োজনের যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র, কিংবা রান্নার বাসন কোসন। আবার অনেকে সোনা, রূপো কিংবা ব্রোঞ্জ দিয়ে সুন্দর নকশার গয়না বানাতে শিখে ফেলল। অনেকে তুলো কিংবা অন্য কোন তন্তু দিয়ে কাপড় বানাতে শিখল, সে সব কাপড়ও হতো কত রকমের। সাদা, রঙিন, পাতলা, মোটা কিংবা শীতের জন্যে পশমের পোশাক, চাদর।

আমাদের মানব সভ্যতার শুরু হয়েছিল, চাষবাস এবং পশুপালনকে ঘিরে, গ্রামজীবন দিয়ে। প্রধানতঃ নদীর ধারে ধারে গড়ে ওঠা এই গ্রামগুলির সব জায়গাতেই যে সব ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, এমনতো হতে পারে না। যেমন, এক ধরনের জমিতে খুব ভালো খাদ্য শস্য, যেমন ধান, গম হয়, সে জমিতে তুলোর চাষ ভালো হয় না। আবার যে জমিতে ভালো তুলো হয়, সে জমিতে ধান-গম তেমন ভালো হয় না। একই ভাবে, নদীর ধারে যে সব জমিতে চাষবাস ভাল হয়, সে সব জমিতে লোহা-তামার মতো ধাতু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ধাতুর খনিগুলো অধিকাংশই রুক্ষ পাথুরে অঞ্চলে হয়, সেখানে ফসল ফলানো দুরূহ ব্যাপার।                              

   সভ্যতার এই পর্যায়ে এসেই আমাদের বিনিময় অর্থাৎ বদল ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠতে লাগল।

 ধরা যাক আমি ‘সবুজ’ গ্রামের লোক, আমাদের গ্রামে প্রচুর খাদ্য শস্য হয়, আমাদের গ্রামের সকলের সারা বছরের প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরেও অনেক খাদ্য শস্য বাড়তি থেকে যাচ্ছে। অবিশ্যি আমাদের গ্রামে লোহা পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি, আমরা যদি বেশ ভালো লোহার কোদাল, লাঙ্গলের ফাল, কাস্তে কিংবা খুরপি যোগাড় করতে পারি, আমাদের চাষের কাজে খুব সুবিধে হবে আরো বুঝছি, বেশ কিছু ভালো গরু, বলদ কিংবা মোষ যদি আমরা যোগাড় করতে পারি, আমাদের চাষবাসের কাজটা অনেক তাড়াতাড়ি হতে পারবে, আমাদের গ্রামে অনেক ভালো ফসল হতে পারবে। এক্ষেত্রে ‘সবুজ’ গ্রামের লোক আমরা কী করব?

আবার ধরা যাক, তুমি ‘রাঙা’ গ্রামের লোক, তোমাদের গ্রামেও চাষবাস হয়, তবে সে তেমন কিছু নয়, গ্রামের সবার সারা বছরের খাবার পক্ষে যথেষ্ট ফসল হয় না। তবে তোমাদের গ্রামে অনেক লোহা পাওয়া যায়, আর তোমাদের ধাতুবিদ আছে, সে খুঁজে খুঁজে লোহার খনিজ বের করে, আর সেই খনিজ গালিয়ে লোহার গোলা বের করে। সেই লোহাকে গলিয়ে কিংবা গরম করে পিটিয়ে লোহার যন্ত্রপাতি বানাতে তোমরা ‘রাঙা’ গ্রামের লোকেরা খুবই দক্ষ। তোমরা বুঝতে পারছো, লোহা খেয়ে তো আর বেঁচে থাকা যায় না! তোমাদের খাবার জন্যে শস্য চাই। দুর্গম অঞ্চল থেকে ভারি ভারি লোহা কিংবা তামার আকর বইবার জন্যে শক্তিশালী বলদ বা মোষ থাকলে খুব সুবিধে হত। অতএব ‘রাঙা’ গ্রামের লোকরাই বা তাহলে কি করবে?

আমাদের গ্রামের থেকে বেশ কয়েকদিন হাঁটা পথের দূরে, আরেকটি গ্রাম আছে, সেখানকার লোকজনেরা চাষবাস কিংবা অন্য কোন কাজে দক্ষ না হলেও, পশুপালন ব্যাপারটা তারা বেজায় ভালো বোঝে। তাদের গ্রামের মোষ আর বলদগুলো যেমন জোরদার, তেমনি খাটতে পারে। তাদের গাভিরাও দুধ দেয় প্রচুর। সেই গ্রামের লোকরা দুধ, মাখন খেয়ে শেষ করতে পারে না, প্রচুর নষ্ট হয়। তাদের বলদ কিংবা মোষগুলোর সারাবছর কাজ থাকে না, কিন্তু তাদের পালন করতে খরচ হয় প্রচুর খড়, ঘাস বিচালি। তারা ভাবছে যদি কিছু বদলে নেওয়া যেত।

ঠিক এই ভাবনা থেকেই শুরু হয়ে ছিল বিনিময় প্রথা, যাকে ইংরিজিতে বলে  Barter system প্রাচীন গ্রীস, রোম এমনকি ভারতেও গরু বা বলদ, এক কথায় গবাদি পশুই ছিল বিনিময়ের প্রধান উপাদান। গাভির বয়েস ও তার দুধ দেওয়ার ক্ষমতার উপর তার দাম নির্ধারণ করা হত। আমাদের সংস্কৃত শাস্ত্র ঐতরেয় ব্রাহ্মণে একবছরের গাভি কিংবা  সদ্যজাত বাছুরের বিনিময়ে কতটা সোমরস পাওয়া যায় তার উল্লেখ আছেগবাদি পশু ছাড়াও এক বস্তা শস্য কিংবা একখণ্ড মাংসের বড়ো টুকরোও তখন বিনিময়ের উপাদান হিসেবে সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত হত। এমনকি কোন কোন জায়গায় নুনের বস্তার বিনিময়েও খাদ্য শস্য, মাংস বা অন্য উপকরণ পাওয়া যেত, কারণ যে কোন খাদ্যে নুন অত্যন্ত জরুরি এবং সমুদ্র থেকে অনেক দূরের দেশে নুন মোটেই সহজলভ্য ছিল না।

এই বিনিময় প্রথায় কাজ চলে যাচ্ছিল ঠিকই, তবে সমস্যাও হচ্ছিল বিস্তর। ধরা যাক একজন তন্তুবায় একটা ধুতি বা শাড়ি বানিয়েছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে কতটা শস্যদানা কিংবা গাভি কিংবা মাংসের টুকরো তাঁর পাওনা হওয়া উচিৎ, কে ঠিক করবে? যে লোকটির অনেক গবাদি পশু আছে, সে হয়তো দুখানা ধুতি কিনতে চায়। দুখানা ধুতির সমমূল্যে একটি গাভিকে তো আর অর্ধেক বা আরো ছোট অংশে ভাগ করা যায় না! কিন্তু যার কাছে শস্যদানা আছে সে অর্ধেক বা সিকি বস্তা শস্য দিয়েই, সেই ধুতি কিনে ফেলতে পারে। অতএব দেখা যাচ্ছে, বিনিময় প্রথা সবার ক্ষেত্রে, সব অঞ্চলে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছিল না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অচল হয়ে উঠছিল এই প্রথা।

 

 

 

মানুষের সভ্যতার যত উন্নতি হল, দেশের মধ্যে এমনকি দেশের বাইরেও ততই ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে লাগল। সত্যি বলতে যে দেশ বা রাজ্য বাণিজ্যে যত বেশি সফল, তার সম্পদ-সমৃদ্ধিও তত বেশি। আর বাণিজ্য যত বেড়ে উঠল, ভীষণ জটিল হয়ে উঠতে লাগল এই বিনিময় প্রথা। এমন কোন সাধারণ উপাদান যদি ব্যবহার করা যায়, যার দ্রব্যমূল্য সকলেই মেনে নেবে এবং সেই উপাদানের প্রেক্ষীতে সকল জিনিষের দামও যদি নির্ধারণ করে ফেলা যায়, তাহলে আর বিনিময়ের ঝামেলা হয় না। বলাবাহুল্য এই নিয়মে সকলেরই সুবিধে হল এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা বদলে গিয়ে, এসে গেল বেচা-কেনার অর্থ বিনিময় পদ্ধতি (Money transaction system)নতুন এই ব্যবস্থায়, বিক্রেতা তার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে, তার নিজের দরকার এবং মনোমতো জিনিষপত্র কিনতে আর কোন বাধা থাকল না। এসে গেল বিনিময়ের নতুন উপাদান, যার নাম অর্থ  বা টাকা (Money)ছোটাখাটো আঞ্চলিক লেনদেন ছাড়া, বিনিময় প্রথার চল বেশ কমে গেল

 প্রথম থেকেই অর্থ বিনিময়ে বিভিন্ন ধাতুর বহুল ব্যবহার শুরু হয়েছিল। শুরুতে সোনা, রূপো কিংবা তামার মতো বিশেষ বিশেষ ধাতু, গোলা হিসেবে কিংবা পুঁটলিতে গুঁড়ো হিসেবে ব্যবহার করা হত। তারপর ধীরে ধীরে ধাতুর ছোট ছোট পাত বা পাৎলা চাকতির ব্যবহার শুরু হল। দেশের রাজা কিংবা দেশের মুখ্য প্রশাসক বিশেষ কোন ছাপ বা ছবি দিয়ে যখন এই ধাতব চাকতিগুলো সকলের ব্যবহারের জন্যে বাজারে ছাড়তেন, তখন তাকে মুদ্রা (coin) বলা হয় গ্রীসের প্রাচীনতম যে মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে পশুচিত্রের ছাপ দেখা যায়। মিশরের সোনা বা রূপোর মুদ্রাতেও গাভি এবং অন্যান্য পশুর ছাপ দেখা যায়।

মুদ্রার প্রধান বিশেষত্ব হল, মুদ্রায় ব্যবহার করা ধাতুর গুণ এবং ধাতুর ওজন। বিশুদ্ধ সোনা, রুপো কিংবা তামার নির্ধারিত (standard)  দ্রব্যমূল্য সারা বিশ্বে, সকলেই মেনে নেয়। কিন্তু বিশুদ্ধ ধাতু ততটা শক্ত হয় না বলে, মুদ্রা বানানোর সময় বিশুদ্ধ ধাতুতে, অন্য ধাতুর কিছুটা খাদ বা অশুদ্ধি মেশাতে হয়। সোনা বা রূপোতে এই খাদের পরিমাণের উপর মুদ্রার মূল্য নির্ভর করে। সুতরাং কম সোনার সঙ্গে বেশি খাদ মিশিয়ে, একই রকম দেখতে মুদ্রা বাজারে ছাড়লে, সাধারণ লোকের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব হত নাএর ওপর মুদ্রার ওজনে সামান্য কারচুপি করলেও চট করে ধরা সম্ভব হত না। দুর্জন প্রতারকদের এই দুর্নীতি ঠেকানোর জন্যে, রাজা কিংবা প্রশাসকরা বিশেষ ছবি, চিহ্ন, ছাপ বা সংকেত দিয়ে মুদ্রা ছাপতেন। সেই বিশেষ চিহ্নকে বলত মোহর, আবার বিশেষভাবে চিহ্নিত সোনার মুদ্রাকেও মোহর বলা হত।

 অনুমান করা যায় খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় আড়াই/তিন হাজার বছর আগে, সিন্ধু সভ্যতার আমলে, ভারতবর্ষে প্রথম মুদ্রার প্রচলন হয়েছিলসিন্ধু নদ, ঘাঘরা-হাকরা ও সরস্বতী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা, সিন্ধু সভ্যতার এই শহরগুলি পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমানা থেকে আমাদের দেশের গুজরাট, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। এখনো পর্যন্ত এই অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক ১০৫২টি শহরের হদিশ পাওয়া গেছে। পুরাতত্ত্ববিদরা গবেষণা করে দেখেছেন, হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো নগরের কুশলী ধাতুবিদরা, দক্ষিণ ভারত থেকে প্রচুর সোনা এবং রাজস্থান থেকে তামা আমদানি করত। কিন্তু ধাতুমুদ্রার হদিস না পাওয়া গেলেও, শুধুমাত্র মহেঞ্জোদারো শহরে প্রায় ১২০০ সিল পাওয়া গেছে এবং অন্যান্য শহরেও বেশ কয়েকশ সিল উদ্ধার হয়েছে। এই সিলগুলি,  নানান রকম ছবি খোদাই করা চারকোণা স্টিটাইট (Steatite) পাথরের টুকরো। স্টিটাইট পাথরের আরেক নাম সোপস্টোন, পাথরের মধ্যে সব থেকে নরম এই পরিবর্তিত (Metamorphic) শিলা ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium) সমৃদ্ধ খনিজ ট্যাল্ক(Talc)

 

 
মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া কিছু সিল

 


লোথাল থেকে উদ্ধার হওয়া নানান ধরনের সিল


এই সিলগুলির সঠিক ব্যবহার জানা না গেলেও পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিনিময়ের কাজেই এগুলি ব্যবহার করা হত। হয়তো উত্তপ্ত ধাতব পাতের ওপর এই সিলগুলি দিয়ে ছাপ মেরে মুদ্রা বানানো হত - কারণ এই সিলগুলির চিত্র ও লিপিগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উলটো আঁকা হত। যেভাবে আজকের রাবার-স্ট্যাম্প কিংবা মিষ্টির দোকানে সন্দেশের ছাঁচ বানানো হয় উলটো করে, ছাপ মারলে - সোজাদিকটাই আমরা দেখতে পাই। তবে এই সিল অধিকাংশই বর্গাকার বা আয়তাকার হত। 

সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম একটি বন্দর শহর হল লোথাল, এখনকার গুজরাটের আমদাবাদ শহর থেকে মোটামুটি ৮৫ কিমি দূরে। এই বন্দর থেকে সুদূর ইজিপ্ট, সুমের, বাহারিনের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এই বন্দর শহরে বেশ কিছু গোলাকার এবং ছোট বড়ো নানান আকারের স্টিটাইট সিল পাওয়া গেছে। সিন্ধু সভ্যতার বিশাল ব্যাপ্তি, ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে এবং সুদূর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, ইওরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্কের নানান প্রমাণ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, দ্রব্য বিনিময় করে এই বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন শহর থেকে উদ্ধার হওয়া এই সিলগুলিতে কিছু লিপি দেখতে পাওয়া যায়, যে লিপির পাঠ এখনো সম্ভব হয়নি। এই লিপিগুলি পড়ে ফেলতে পারলে, আমাদের ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য আমরা জানতে পারব। বড়ো হয়ে তোমরা যদি এই সব লিপির অর্থ বুঝে ফেলতে পারো, আমাদের মুদ্রার ইতিহাস এমন কী প্রাচীন ভারতের ইতিহাসও নতুন করে লিখতে হবে।


চলবে...

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

  

এর আগের রম্যকথা - " আকাশের অর্ঘ্য " 


আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মানুষের মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে অচিন পাখি, কে জানে। এ কি সেই কয়েক হাজার বছর আগে ফেলে আসা যাযাবর জীবনের উপর সুপ্ত টান? যখন ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ এক জঙ্গল থেকে অজানা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াত স্বচ্ছল ফলমূল, সহজলভ্য শিকার আর মিষ্টি জলের সন্ধানে! কিন্তু এইভাবে হাজার হাজার বছর ঘোরার পর, চাষবাস শিখে, বাণিজ্য বুঝে মানুষ তো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে নিজের গন্ডীর মধ্যে থিতু হয়ে থাকতে। তাও কেন দৌড়ে বেড়ায় অজানা দেশে, অচেনা পরিবেশে? সুখে থাকতে ভূতে্র কিল খাওয়ার এমন অমোঘ টান কেন আসে?

বিরাশির মাঝামাঝি কোন এক দিন, এভাবেই ডেকে উঠল আমাদের প্রাণের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই অচিন পাখি। চলো মন যাই অদেখা দেশে, অচেনা তীর্থক্ষেত্রে, দু চোখ ভরে দেখে আসি নতুন জায়গার নতুন মানুষজন পরকালের কাজে লাগতে পারে সেই আশায়, দু হাত ভরে গুছিয়ে আনি পুণ্য এতদিন আমাদের দুইভাইয়ের লেখাপড়ার চাপে এমন ডাক বহুবার এসেও ফিরে গেছে। এখন সেই চাপ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। উপরন্তু তীর্থভ্রমণের বহুল ব্যয় বাবার আপিসের এলটিসির দৌলতে যতটা হ্রাস হয়, সমানুপাতে ততটাই কি বৃদ্ধি হয় না ভ্রমণের আনন্দ বৃদ্ধি?

দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্বের পর সেপ্টেম্বর শেষের এক রাত্রে হাওড়া স্টেশান থেকে আমরা চারজন মৌরসীপাট্টা বিছিয়ে বসে পড়লাম ম্যাড্রাস মেলের প্রথমশ্রেণীর একটি কামরায়। দুটি রাত ও একটি পুরো দিনের যাত্রায় সেই কামরাটি এতই পারিবারিক হয়ে উঠেছিল, যেন আমাদের বাসারই একখানি ঘর চাকার ওপরে চলমান। জমে উঠল ঘনিষ্ঠ নিরবচ্ছিন্ন পারিবারিক আড্ডাএকসঙ্গে এক ছাদের তলায় এতদিন বসবাস করেও, আমার স্বভাবগম্ভীর বাবার সঙ্গে এমন আত্মিক যোগাযোগ এর আগে কোনদিন অনুভব করিনি।

ম্যাড্রাস সেন্ট্রাল (চেন্নাই নাম পেতে তখনো ঢের দেরি) থেকে ট্যাক্সি করে এগমোর স্টেশন, সেখানে  অন্য ট্রেন ধরে আমরা পৌঁছলাম পণ্ডিচেরি। বিকেলের দিকে হোটেলে যাবার পথে ট্যাক্সি চলল গোবার্ত অ্যাভিনিউ ধরে, ডানদিকে বরাবর কোমর সমান পাঁচিল। ট্যাক্সিতে বসে পাঁচিলের ওপাশে কি আছে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বহুদূর পর্যন্ত নীল আকাশ আর সীমাহীন দিগন্তখুব অবাক লাগল, জিগ্যেস করলামএদিকটায় এরকম বরাবর দেওয়াল কেন, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ওপাশে কি আছেটা কি?

ট্যাক্সি চালক – যিনি আমাদের গাইডও বটেন মৃদু হেসে বললেন, “ওপাশেই তো সমুদ্র। ঝড়ের সময় যখন বড়ো বড়ো ঢেউ ওঠে, সেটাকে আটকানোর জন্যেই এই দেওয়াল”।  

সমুদ্র? ওটাই সমুদ্র? দাঁড়ান, ভাই দাঁড়ান – দেখতেই এসেছি যে... দেখি দুচোখ ভরে”!   

রাস্তার ধারে ট্যাক্সিটা সাইড করে দাঁড়াতে আমরা সকলেই নামলাম। দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে অবাক চোখের সামনে ভেসে উঠল সীমাহীন বিস্তার। হালকা সবুজ রংয়ের বিপুল সমুদ্র মিশে গেছে নীল আকাশের দিগন্তে। বড় বড় ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে পাথর বিছানো সমুদ্রের পাড়ে। ক্লান্তিহীন সেই ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বিশালতার এক অনুভূতি ঢুকে পড়ল আমার ভিতরে। এর আগে দেখেছি হিমালয়ের দিগন্তজোড়া পাহাড়ের ঢেউ, শান্ত সমাহিত গম্ভীর। এই সমুদ্রও পারাপারহীন বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন অস্থির এবং চূড়ান্ত উদাসীন। প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রে আমি বা আমরা থাকি বা না থাকি, তাদের কিচ্ছু যায় আসে না, এতটুকুও ব্যত্যয় হবে না তাদের। ফলতঃ আমার সেই একই অনুভব হল - নিজেদের অতীব সামান্যতা। 

পূর্বাশ্রমের চরমপন্থী বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ থেকে ঋষি অরবিন্দে উত্তরণের অলৌকিক প্রক্রিয়া আমার ধারণার অতীত। তাঁর আশ্রম ঘুরে এবং সেখানে মধ্যাহ্নভোজনে সামিল হয়ে আমরা যেন অনুভব করলাম তাঁর ঐশী সান্নিধ্য। কিন্তু আমাদের উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলি যখন আমাদের হাত থেকে হাসিমুখে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন ভক্ত ফরাসী ও ফরাসীণীগণ, ভীষণ অস্বস্তি হল। ফরাসী উচ্চারণে তাঁরা বললেন – “উ আর দ গেস্ত”। মনে হল, আমরা ভারতীয় এবং ঋষি অরবিন্দর দেশোয়ালি হয়েও গেস্ট হয়েই রইলাম, আর ওঁনারা হলেন কিনা হোস্ট!

পণ্ডিচেরি থেকে আবার ট্রেন ধরে বিল্লুপুরম জংশন, সেখান থেকে ট্রেন পাল্টে মন্ডপম, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রামেশ্বরম। রামেশ্বরম এমনই এক জায়গা যেখানে হিন্দু পৌরাণিক ঘটনার অনেক ঘনঘটা। শ্রীরামচন্দ্র এখান থেকেই সেতুবন্ধ করে লংকা গিয়েছিলেন রাবণের খপ্পর থেকে তাঁর পত্নী সীতাকে উদ্ধারের জন্যে। কিডন্যাপ্‌ড্‌ সীতা উদ্ধারের পর সস্ত্রীক শ্রীরামচন্দ্র এইখানেই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শিবের আরাধনা করেছিলেন, পাপমুক্তির জন্যে, তাই এই জায়গার নাম রামেশ্বরশ্রীরামচন্দ্র বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হওয়া সত্ত্বেও, রাবণকে হত্যা করে, তাঁর নাকি ব্রহ্মহত্যার পাপ অর্শেছিল! 

রামায়ণ অনুযায়ী রাবণ ছিলেন বিখ্যাত ঋষি বিশ্বশ্রবা ও দৈত্যরাজকুমারী কৈকেশীর পুত্র। ঋষি বিশ্বশ্রবার পিতা ছিলেন পুলস্ত্য মুনি। এই পুলস্ত্যমুনি ছিলেন ব্রহ্মার দশ মানসপুত্র, প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের মধ্যে অন্যতম। অতএব জন্মসূত্রে তিনি ব্রাহ্মণ। তাছাড়াও তিনি ছিলেন ডাকসাইটে বেদজ্ঞ, রণবিদ্যায় সুপণ্ডিত এবং বীণাবাদনেও সুদক্ষ। ব্রহ্মা ও শিবের একান্ত ভক্ত রাবণ, তপস্যা করে অমর হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ণ অমরত্ব পেলেন না – পেলেন দেব, সুর, নাগ, রক্ষ, যক্ষ এবং বন্য পশুর কাছে অজেয় থাকার বর। রাবণ সন্তুষ্টই ছিলেন, কারণ নর অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে তিনি শত্রু হিসেবে ধর্তব্যেই আনেননি। আর এই ছিদ্র পথেই নররূপী অবতার শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করে শ্রীলংকা জয় করতে পেরেছিলেন। 

ভাগবতপুরাণে অবিশ্যি অন্য গল্প আছে, পরম বিষ্ণুভক্ত জয়-বিজয় দুই ভাই ছিলেন বিষ্ণুলোক বৈকুণ্ঠের সিংদরজার দারোয়ান। একদিন চিনতে না পেরে তাঁরা চারজন তাপসবালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে দিলেন নাএই চারজন তাপসবালক ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত চার ভাই - সনক, সনাতন, সনান্দন এবং সনৎকুমার, ব্রহ্মার আদি মানসপুত্র। এই চার বালক চার বেদেই পারদর্শী ছিলেন এবং ঋষি মুনিদের কাছে জ্ঞান প্রচার করাই ছিল এঁনাদের একমাত্র ব্রত। দেবলোকের সর্বত্র এই চার ভাইয়ের ছিল অবারিত দ্বারএই চার বালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে না দেওয়ায়, তাঁরা জয়-বিজয়কে বৈকুণ্ঠ থেকে নির্বাসন দিলেন আর অভিশাপ দিলেন ধরণীর মর্ত্যধুলিতে জন্ম নিতে। স্বয়ং বিষ্ণু যখন পুরো ব্যাপারটি অবগত হলেন, তিনিও এই অভিশাপ রদ করতে পারলেন না। তিনি কিছুটা নরম হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার দুটো অপশন রাখলেন জয়-বিজয়ের কাছে। 

বিষ্ণু বললেন - প্রথম অপশন, বিষ্ণুভক্ত হয়ে সাধারণ মানবজীবনে সাতজন্ম পার করতে হবে, আর দ্বিতীয় অপশন, দুর্ধর্ষ বিষ্ণুশত্রু হয়ে মর্ত্যজীবনে মাত্র তিনজন্ম পার করতে হবে। তাহলেই তারা দুইভাই শাপমুক্ত হয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে বৈকুণ্ঠে। চয়েস ইজ ইয়োরস। জয়-বিজয় বিনা দ্বিধায় তিন জন্মের শর্টকাট চুজ করল। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর সাহচর্য তাদের কাছে অতীব কাম্য, তাতে যদি বিষ্ণুর চরম শত্রুতা করতে হয়, তাও। কারণ, বিষ্ণুর দুর্ধর্ষ শত্রুকে বিষ্ণু ছাড়া কে আর হত্যা করবেন! স্বয়ং ভগবানের হাতে ভক্তের মৃত্যু এবং তার ওপর মাত্র তিনজন্ম পরেই আবার ভগবানের স্নেহময় সদাসাহচর্য, এমন সুযোগ ছেড়ে দেবার মতো মূর্খ ভক্ত, জয়-বিজয় ছিলেন না।

সেই মতোই সব ঠিক হয়ে গেল। প্রথম জন্ম সত্যযুগে, দুই ভাই হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুর  মৃত্যু হল যথাক্রমে বরাহ ও নৃসিংহ, বিষ্ণুর তৃতীয় ও চতুর্থ অবতারের হাতে। দ্বিতীয় জন্ম ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার শ্রীরামচন্দ্রের হাতে মৃত্যু হল দুই ভাই রাবণ ও কুম্ভকর্ণের। তৃতীয় জন্ম দ্বাপরে দুই ভাই দন্তবক্র ও শিশুপালের মৃত্যু হল বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণের হাতে। শাপমুক্ত হয়ে মহানন্দে জয়-বিজয় ফিরে গেলেন বৈকুণ্ঠের স্বস্থানে।

যেভাবেই চিন্তা করা যাক না কেন, রাবণ যে মহাব্রাহ্মণ সে কথা স্বীকার করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং। শত্রু হলেও রাবণ এবং তাঁর অগণিত প্রজাহত্যায় শ্রীরামচন্দ্রের যে পাপবোধ, তার প্রায়শ্চিত্তেই এই রামেশ্বরমে রামনাথন শিব মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। যে কোন হত্যাই পাপ, সে যতবড়ো দুর্ধর্ষ শত্রুই হোক না কেন এবং তিনি নিজে অবতার হয়েও সেই নীতি ভুলে যাননি, সেখানেই তাঁর মহত্ত্ব।

মূল ভূখন্ড থেকে একটু আলাদা একটি ছোট্ট দ্বীপ এই রামেশ্বরম। আমরা পাম্বান ব্রিজ দিয়ে পাম্বান ক্যানেল পার হলাম ট্রেনে। গভীর নীল সমুদ্রের উপর, প্রায় দু”কিলোমিটার লম্বা এই ব্রিজ সেসময় ছিল ভারতবর্ষের দীর্ঘতম সাগরসেতুপণ্ডিচেরির সমুদ্রের পর, রেল যাত্রাপথে দুপাশের দিগন্তবিস্তৃত সুনীল সমুদ্র, আমাকে আরেক সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দিল। হিমালয় ও পাহাড়ের প্রতি আমার যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা ভেঙে দেওয়ার জন্যেই, সমুদ্র যেন উঠে পড়ে লাগল তার নতুন নতুন রূপের ভাণ্ডার নিয়ে।

পরের দিন ভোরবেলা মন্দিরের মাইকে দক্ষিণীসুরে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ শুনে ঘুম ভাঙল। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। নারকেল গাছের ঝিরিঝিরি পাতায় ভোরের একটানা হাওয়ার ঝরঝর শব্দ এবং মন্দির থেকে ভেসে আসা স্তোত্র উচ্চারণ শুনতে শুনতে কিছুটা হেঁটে দাঁড়ালাম আরেক সমুদ্রের সামনে। ঢেউ নেই বললেই চলে, মস্ত দীঘির সামনে দাঁড়ালেও জলের উপর সঞ্চরণশীল এমন তরঙ্গ দেখা যায়। এই সমুদ্রকে ঢেউ দিয়ে চেনা যায় না, চেনা যায় এর বিস্তার দিয়েসুনীল সীমাহীন বারিধি, বহুদূরে দিগন্তের কাছাকাছি দু একটা দ্বীপের আভাস। পায়ের গোছ ডোবানো জলে আমরা সমুদ্রের ভেতর অনেকখানি হেঁটে এলাম। পণ্ডিচেরির সাগরবেলায় কঠোর নিষেধ ছিল, এখানে নেই সমুদ্রকে স্পর্শ করে, আনন্দ করতে কোন বাধা নেই। দু এক বিন্দু জিভে ঠেকতেই বোঝা গেল লবণাম্বুর স্বাদ।

রামেশ্বরমের অগ্নিতীর্থ বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে উপবাসী আমরা প্রবেশ করলাম মন্দিরে। বিশাল উঁচু পোক্ত পাথরে গাঁথা প্রাচীর ঘেরা সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গণ। চার দিকে চারটি সুউচ্চ গোপুরম, তার একটি পার হয়ে প্রধান মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সবচেয়ে সুন্দর এবং উঁচু রাজগোপুরমের উচ্চতা প্রায় ৫৩.০ মি। মন্দিরের ভিতরে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫.০ মি চওড়া, প্রায় ৯.০ মি উঁচু এবং উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিক মিলে প্রায় ১২০০ মি লম্বা অলিন্দ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দ্বাদশ শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজবংশের হাতে এই অপূর্ব স্থাপত্যের সূত্রপাত তারপর ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলংকার অনেক রাজার হাতেই ঘটে গেছে এই মন্দিরের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। ভারতীয় স্থাপত্যের এমন সুন্দর অথচ বলিষ্ঠ কারিগরি নিদর্শন দেখে বেশ গর্ব অনুভব করলাম। প্রায় ১২০০ স্তম্ভের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অসাধারণ স্থাপত্যের কি অপূর্ব সে মহিমা! প্রায় সাতশ বছর ধরে অনেক প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক পালাবদল সামলেও প্রত্যেকটি স্তম্ভ আজও অটুট এবং অদ্ভূত সুন্দর।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম রামনাথস্বামীর পুজো সেরে মন্দিরের বাইরে আমরা উপবাস ভঙ্গ করলাম। সম্বর আর নারকেলের চাটনি সহযোগে নারকেল তেল সিক্ত মশলা দোসা এবং স্টেনলেসস্টিলের কাপে  উত্তপ্ত কফি। সেখানেই আলাপ হল মুরুগানের সঙ্গে। আসমুদ্রহিমাচল লক্ষ লক্ষ বালশ্রমিকের একজন মুরুগান। দোসা, ইডলি, উত্থাপম, কফির অর্ডার নেয়, টেবিলে সার্ভ করে, খাওয়ার পর এঁটো বাসন তুলে নিয়ে যায়। তামিল ছাড়া কোন ভাষাই তার বোধগম্য নয়, তামিলের বিন্দুবিসর্গও মায়ের জানা ছিল না। অথচ খুব অল্প সময়েই মা জেনে নিতে পেরেছিলেন, মুরুগানের ছোট্ট জীবনের ইতিহাস। মা মরা, বাপে খেদানো অসহায় বালক মুরুগানের খুব ইচ্ছে লেখা পড়া শেখার, কিন্তু পেটের দায় বড়ো দায়। মুরুগান তার এই ছোট্ট শহর রামেশ্বরমের সব চেনে, তার মতো করে জানে এই শহরের এবং রামনাথস্বামী মন্দিরের অনেক ইতিহাস।

আমাদের অনুরোধে হোটেলের মালিক, মুরুগানকে অনেকক্ষণের ছুটি দিলেন। আমাদের সঙ্গেই ছোট্ট শহরের  গাইড হয়ে সে অনেকক্ষণ ঘুরল। মায়ের অনেকদিনের শখ ছিল একটি পঞ্চমুখী শাঁখ নেবার মুরুগান অনেক দোকান ঘুরে, অনেক দরদাম করে কিনে দিল সুন্দর একখানি পঞ্চমুখী শাঁখ। মায়ের ইচ্ছেয় তার ওপর আমাদের দুইভাইয়ের নামও লিখিয়ে দিল মুরুগান।

রাত্রের ট্রেন ধরে আমাদের এবারের গন্তব্য কন্যাকুমারী। রাত সাড়ে নটা নাগাদ মুরুগানের হোটেলেই আমরা দক্ষিণী থালির নৈশাহার করে বিদায় নিলাম মুরুগানের কাছে। মায়ের চোখে জল, মুরুগানেরও চোখে জল। টাঙ্গায় লটবহর নিয়ে উঠে পড়তে মুরুগান হাত নেড়ে বলল – আম্মা, ভা মিন্তুম।

পিছনে পড়ে রইল প্রাচীন ভারতের অদ্ভূত গৌরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সনাতন ভারতের বঞ্চনার পরম্পরা। নির্জন হতে থাকা ছোট্ট শহরের পথে আমাদের টাঙ্গা চলতে লাগল ষ্টেশনের দিকে। পথের দুপাশে গাছের পাতায় পাতায় সাগরের হাওয়ার মর্ম্মর শব্দের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ মিলে সূদুর অতীতের পরশ রয়ে গেল আমার সমগ্র অনুভূতিতে।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

পরিবর্তিনি সংসারে...

  স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - "  লিটিং লিং - পর্ব ১ " এর আগের পর্ব - "  পাখির চোখ " ১   নন্টু আসছেন, নিভাননী সংবাদ...