রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

মাথার পোকা



স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পরিবর্তিনি সংসারে... "

 

‘স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুট্‌ঔ’

স-এ তীক্ষ্ণ সিটি দিয়ে শুরু করে, কণ্ঠের অদ্ভূত ইয়ডলিংয়ে ‘ঔ’ হেঁকে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় বিহারি শিল কুটোনোওয়ালা।  তার ডাক শুনে দৌড়ে বারান্দায় গেল পান্না।

ওই লোকটি তার চেনা, কয়েকদিন আগেই মা ওর থেকে শিল নোড়া কুটিয়েছিল। শিলকুটোনোর সময় পান্না বসেছিল তার সামনে। ছোট্ট ছেনিতে হাতুড়ির ঠুকঠুক ঘায়ে সে খড়খড়ে করে তুলেছিল শিল আর নোড়ার মসৃণ হয়ে যাওয়া গা। হাতুড়ির আঘাতে ছেনির আগায় মাঝে মাঝেই ছিটকে উঠছিল ছোট্ট ছোট্ট ফুলকি আর পাথরের মিহিন কুচি। বিহারী শিলকুট্‌নেওয়ালা তাকে সতর্ক করেছিল, “হঠ যাও খোখাবাবু, আঁখমে পাত্থর গিরবা করেগা, তো বহোত দরদ হোবে”।

মাও ঘরের ভেতর থেকে বলেছিলেন, “ওখান থেকে সরে আয় ভুট্‌কু, চোখে লাগবে”। পান্না তার ডাকনাম হলেও, সোনা ছোটপুত্রকে আদর করে ডাকেন ভুট্‌কু। পান্না একটু সরে এসে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আর অবাক হয়ে দেখেছিল ছেনির ঘায়ে ছোট্ট ছোট্ট গর্তে বুনে ওঠা মাছের নকশা, আর তার পাশে যেন অজস্র বৃষ্টির ধারাশিল কুটোনো হয়ে গেলে বিহারী ডাক দিয়েছিল, “লিয়ে যান, মাজী, হোইয়ে গেলো”

মায়ের সাহায্য হবে ভেবে, পান্না শিল তুলে ঘরের ভেতরে আনতে যাওয়াতে, শিলকুটোনোওয়ালা বলেছিল, “বহোৎ ভারি, তুমি শকবে না, খোখাবাবু, ছোড় দো, মাজি লিয়ে যাবে” এবং পিছন থেকে মা হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন, “তুই কখনো শিল তুলতে পারিস ভুট্‌কু? পায়ে পড়লে আঙুল থেঁতলে যাবে, সর সর, আমি দেখছি”। 

তুলে নেওয়ার আগে শিল আর নোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন মা, ঠিকঠাক খসখসে হল কি না, বিহারী কুটনোওয়ালা বলল, “দিখা লাগবে না, মাজি, ছোমাস কুছু করতে হোবে না, দেখে লিবেন”

“ছমাস যাবে, না ছাই যাবে, একমাসেই পাথরের গা তেলা হয়ে যায়”সোনার কথায় টেনে টেনে হেসেছিল বিহারী কুটনেওয়ালা, “ওইসান না হলে, হামাদের ভি চলবে কী করে, মাজি?”

সোনা আর কথা বাড়াননি, শিল-নোড়া তুলে ঘরে এনে, পান্নার হাতে দশপয়সা দিয়ে বলেছিলেন, “যা তো গিয়ে দিয়ে আয়”একটা দায়িত্ব পেয়ে উত্তেজিত পান্না দৌড়ে গিয়ে পয়সাটা তুলে দিল কুটনোওয়ালার হাতে। উপার্জিত অর্থ পেয়ে খুশী কুটনোওয়ালা পান্নার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর কোমরে বাঁধা ময়লা বটুয়া বের করে, তার মধ্যে রাখল পয়সাটা। তারপর বেরিয়ে গেল ছেনি-হাতুড়িওয়ালা ছোট্ট চটের ব্যাগ নিয়ে। রাস্তায় নেমে, হাঁক দিল, “স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুটঔ”

ঘরে এসে শিশু পান্না জিজ্ঞাসা করেছিল, “শিল কোটালে কেন গো, মা?”

“শিল-নোড়ার গা তেলতেলে মসৃণ হয়ে গেলে, মশলা বাঁটতে অসুবিধে হয় যে! আদা, পেঁয়াজ তাও বাঁটা যায়, কিন্তু শিল-নোড়া খসখসে না হলে পোস্ত, সরষে, ধনে, জিরে বাঁটাই যায় না!”

 

আজ পান্নাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, সেই কুটনোওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, “মাজিকো বোলো, শিল কুটতে হোবে?” তার কথায় পান্না ঘরে ঢুকে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “মা, মা, সেই শিলকুটোনোওয়ালা আজ আবার এসেছে, আজও শিল কোটাবে?”

সোনা বালতিতে বাসি জামাকাপড় ভেজাচ্ছিলেন, ভুরু কুঁচকে তাকিয়েও হেসে ফেললেন, বললেন, “বলেছিল ছমাস যাবে, সাতদিন না হতেই আজ আবার এসেছে? বলে দাও, দরকার হলে, তুমিই ওকে ডাকবে” এরকম একটা দায়িত্ব পেয়ে পান্না অভিভূত হয়ে গেল, অবাক আনন্দে বলল, “আমি ডাকবো, মা?”

সোনা স্মিতমুখে বললেন, “হুঁ, তুমিই তো ডাকবে...কত্তো বড়ো হয়ে গেছো তুমি, আমার আর চিন্তা কী? এখন থেকে তুমিই তো ডাকবে!” পান্না আবার দৌড়ে গেল বারান্দায়, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিলকুটোনোওয়ালাকে, ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “আজ নয়, দরকার হলে, আমিই তোমায় ডাকবো, কেমন?”

 

২  

এ সময় এজমালির বাথরুমটাও খালি থাকেদোতলার ভাড়াটেরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই অফিসে বেরিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে, একরাশ ভেজানো জামাকাপড় মেঝেয় ফেলে, তাতে বার সাবান ঘষতে বসলেন সোনা। বাইরে দাঁড়িয়ে পান্না ব্যস্ত মায়ের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ ঘাড়ের কাছে এলিয়ে পড়েছে আলগাবাঁধা খোঁপা। কপালের ওপর দু একটা আলগা চুলের গুছি। কপালে, নাকের ডগায়, চিবুকে জমে উঠেছে, বিন্দুবিন্দু ঘাম। সাবান ঘষা, থুবি দিয়ে কাচার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠছে মায়ের হাতের শাঁখা, নোয়া, পলা আর সোনার চুরি।

পান্না ঘুম থেকে ওঠার আগে থেকে সোনার কাজ শুরু হয়ে যায়। উনুন ধরানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কুটনোকোটা, বাঁটনা বাঁটা, রান্না-বান্না, এঁটো থালাবাসন ধোয়ার পর, এই জামাকাপড় কাচতে বসা...মায়ের কাজের যেন অন্ত নেই!  বাবা অফিসে, দাদা স্কুলে। এখন কে হবে তার সঙ্গী? কিছুক্ষণ মায়ের কাজ দেখে, সে আবার চুপচাপ বারান্দায় গেল। এই সময় মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করলে, বকুনি জুটবে, হয়তো পিঠে দু একটা চড়-চাপড়ও।

প্রাক দ্বিপ্রহরে সামনের রাস্তাটাও একটু ফাঁকা, পথচারীর সংখ্যা কমপাড়ার বড়োরা সবাই অফিসে, ছোটরা, যারা তার মতো ছোটও নয়, তারাও সবাই স্কুলে। বিহারি টানা-রিকশাওয়ালারা সকাল থেকে বেরিয়েছিল, এখন এক এক করে ফিরছে। রিকশাগুলো রাস্তার ধারে, পান্নাদের বারান্দা ঘেষে দাঁড় করিয়ে, এখন একটু বিশ্রাম নেবে। উল্টোদিকের টিউবওয়েল থেকে জল ভরে আনবে ঘটিতে। তারপর কাগজের ঠোঙা থেকে কিনে আনা ছাতু ঢালবে কানা উঁচু কাঁসার  থালায়সেই ঠোঙাতেই থাকে দুটুকরো পেঁয়াজ, দুটো কাঁচা লংকা, একটু তেঁতুলের আচার। থালার ওপর চূড়ো করা ছাতুর কোল ভেঙে থালাতেই একটু জল নিয়ে ছাতু ভিজিয়ে গোল্লা পাকিয়ে মুখে তুলবে। কখনো পেঁয়াজ, কখনো লংকায় কামড় দেবে, কখনো জিভের ডগায় ঠেকাবে তেঁতুলের আচার। খাওয়া সেরে তারা টিউবওয়েলে গিয়ে থালা এবং ঘটি সুন্দর করে মেজে নেবে। রাস্তার বাঁদিকে বিশাল পুরোনো বাড়িটার একতলায়, ওদের একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে। সেই ঘরে থাকে না কেউ। সেই ঘরে থাকে ওদের ওই থালা-বাটি-ঘটি। এক আধটা ধুতি। চটের বস্তায় জড়ানো ওদের বিছানা। একপাশে থাকে কয়লা, ঘুঁটে, কেরাসিন তেলের শিশি, তোলা উনুন। ওদের ওই ঘরের সামনের বারান্দাতে, রাত্রে ওরা রুটি আর সবজি বানিয়ে খায়। তারপর গরমের সময়, অনেক রাত অব্দি নিজেদের মধ্যে গল্প করে, তাদের গ্রামের খেতি-জমিন, গায়-ভ্যাঁয়েস, গেঁহু, চানা...। তারপর অনেক রাতে ওই বাড়ির রোয়াকে বিছানা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মতিহারি, ছাপরা থেকে আসা বিশ-পঁচিশ জন দেহাতি মানুষের বৈচিত্র্যহীন দিনযাপনের এই চিত্রগুলি মুখস্থ হয়ে গেছে পান্নার

বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের ফিরে আসা দেখতে দেখতে, পান্নার মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই রথের মেলা থেকে সে একটা বাঁশি কিনে এনেছিল। মেলায় দেখা সেই বাঁশিওয়ালার ঝুড়িতে ছিল একগাদা বাঁশি, আর একটা বাঁশি হাতে নিয়ে সে খুব সুন্দর সুর তুলছিল বাঁশিতে। সেই সুরে মুগ্ধ পান্না বাঁশি কেনার জন্য বায়না ধরল। অবশেষে বাবার একটা হাত ধরে ঝুলে পড়ে, দুপয়সা দিয়ে একটা বাঁশি কিনতে বাধ্য করিয়েছিল বাবাকে বাড়িতে এনে সে বাঁশিটা বাজাতে চেষ্টা করেছে অনেক। কিন্তু যতবার ফুঁ দিয়েছে কিছুতেই সুর বেরোয় নি। বরং বিদঘুটে ভাঙাগলা এক আওয়াজ বেরোচ্ছিল

সেই বাঁশিটা নিয়েই এখন সে ক্যাঁ ক্যাঁ বাজাতে লাগল। সোনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন ছেলেকে বাঁশির বিচ্ছিরি আওয়াজটা তাঁর কানে লাগছিল, বিরক্তির সৃষ্টি করছিলকিন্তু তাও কিছু বললেন না, ছেলেটাই বা করে কী? এই বয়সের বালক চঞ্চল ও অস্থির তো হবেই, গ্রামের বাড়িতে থাকলে, সমবয়সী পড়শী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হুটোপুটি, দৌড়োদৌড়ি করলে, একটু আনন্দ পেত, মজা পেত। কিন্তু কলকাতার এই একখানা ঘরের বাসায় সেই উপায় কই? তাছাড়া, তিনি নিজেও চান না, এই পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে ছাড়তে। কলকাতার লোকজন সম্বন্ধে তাঁর একটা ভীতি মনের মধ্যে কাজ করে। এখানে ছেলে-ধরা কিংবা ছেলেকে বখাটে বানিয়ে তোলার হরেক আয়োজন এবং কে জানে তাঁর ছেলের জন্যেই ওই সব লোকেরা উদ্গ্রীব হয়ে আছে হয়তো বা!

 

 

“ভুটকু আয়, ছাদে কাপড় মেলতে যাবো”সোনার কাপড়-চোপড় কাচা হয়ে গেছিল। বালতিতে আধভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে তিনি দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে পান্নাকে ডাকলেন। পান্না বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছিল। দৌড়ে এসে মায়ের সামনের সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠল।

সোনা বললেন, “ওকি, ঘরের দোরটা ভেজিয়ে দিলি না?”

পান্না বলল, “আমরা এখনই নেমে আসবো তো” সোনা একটু অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, “তা হলেই বা, বেড়াল-টেড়াল আছে। উটকো লোকজনও ঢুকে পড়তে পারে। যা চেপে দিয়ে আয় দরজাটা”। পান্না আবার দৌড়ে নেমে দরজাটা চেপে দিল, তারপর মুখে কু-উ-উ-উ আওয়াজ তুলে একছুট্টে উঠে গেল সিঁড়ির মাথায়। সেখানে দাঁড়িয়ে বলল, “কই এসো?”। সোনা হাসলেন, তাঁর ডানহাতের বালতিতে ভেজা কাপড়ের যথেষ্ট ওজন, এক এক ধাপ উঠতে উঠতে বললেন, “অত তাড়াতাড়ি পারি? দেখছিস না, আমার হাতে বালতি”! 

“আমায় দাও না, বালতিটা”। সিঁড়ির মাথায় উঠে সোনা বালতিটা নামালেন। হাতটা ভেড়ে গিয়েছিল, একটু জিরিয়ে নিতে থামলেন। পান্না বালতিটা তোলার চেষ্টা করছিল, পারল না, বলল, “বাব্বাঃ কী ভারি? তুললে কী করে, মা?”

বালতি তুলে দোতলা থেকে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সোনা বললেন, “চল, ছাদে চল”। এবারে পান্না আর তাড়তাড়ি উঠল না, মায়ের আগে আগে সিঁড়ির একধাপ একধাপ উঠতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, ওই ভারি বালতিটা নিয়ে এতগুলো সিঁড়ি ভেঙে ছাদে ওঠা মোটেই মজার ব্যাপার নয়।

ছাদের দরজা খুলে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে পান্না আবার আনন্দে দৌড়ে নিল খানিকবাঁশি বাজাতে বাজাতে ছুটোছুটি করতে লাগল ছোট্ট ছাদের এ কোণ থেকে সে কোণে তার মাথার থেকেও উঁচু প্যারাপেটের আড়ালে আশেপাশের বাড়ি তেমন দেখা না গেলেও, মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ তাকে অদ্ভূত মুক্তির স্বাদ এনে দিল।

সোনা ছাদের কাপড় মেলা দড়ির নীচে বালতি রেখে, ভেজা কাপড়গুলো চেপে নিংড়ে দড়িতে টাঙাতে শুরু করলেন। অধিকাংশ কাপড় দড়িতে মেলে দেওয়ার পর, নিংড়োনো জলটা জমে ছিল বালতিতে। বাঁশির একঘেয়ে বেসুর ডাকে বিরক্ত হয়ে পান্না, নতুন কিছু করার উৎসাহে, বালতির জলে ডুবিয়ে দিল বাঁশিটা। তারপর অন্যপ্রান্তে ফুঁ দিতেই এবার আর শব্দ হল না, জলের মধ্যে গুলগুল করে উঠল বুদবুদ। ক্ষণস্থায়ী সেই বুদবুদের গায়ে সূর্যের আলোয় খেলতে লাগল সপ্তবর্ণ। কী আশ্চর্য, অবাক করা কাণ্ড। বাঁশিতে ফুঁ দিলে শুধু আওয়াজই নয়, সাতরঙা রংও ফুটে ওঠে স্বচ্ছ জলে! অবাক পান্না চিৎকার করে উঠল, “মা, মা, দেখ, কী সুন্দর রঙ...”।

শ্রান্ত সোনা শেষ কাপড়টা নিঙড়ে দড়িতে শুকোতে দিতে দিতে দেখলেন ছেলের কীর্তি, ক্লান্ত স্বরে বললেন, “বাঃ, ভারি সুন্দর তো, আমার ভু্‌ট্‌কুটা কত কী শিখে ফেলল!” 

 

সব জামা কাপড় শুকোতে দেওয়ার পর সামান্য অবসর। সোনা ছাদের আলসেতে ভর দিয়ে একটু দাঁড়ালেন, রাস্তার ওপারের মাসিমাও ছাদে এসেছিলেন গুল দিতে। সোনাকে দেখে মাসিমা হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কাপড় শুকোতে দেওয়া হল, বৌমা?”

শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে সোনা বললেন, “হ্যাঁ, মাসিমা। আপনি এই দুপুর রোদ্দুরে ছাদে কী করছেন”?

“গুল দিতে এসেছিলাম। আমারও হয়ে গেল, এবার নীচেয় যাবো, চান-টান করবো”।

“কয়লার গুল?”

“হ্যাঁ, কয়লার গুঁড়ো জমা হয়েছিল, একগাদা। আজ দিয়ে ফেললাম”।

“তাই? আমাদের কয়লার চৌবাচ্চাটাও গুঁড়োয় আদ্দেক ভরে গেছে। একমণের বস্তা ঢাললে উপচে পড়ে, চৌবাচ্চায় পুরোটা ধরে না। ভাবছিলাম, কয়লার গুঁড়ো ফেলে দেব, কিন্তু...”।

“ফেলে দেবে কী গো, বৌমা, দুদিন সময় করে, গুল দিয়ে ফেল, পনেরদিনের জ্বালানি হয়ে যাবে”!

“তাই তো! কিন্তু কী করে গুল দেব মাসিমা?”

“ও মা, তাও জানো না। কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে একটু মাটি আর ভাতের ফ্যান মিশিয়ে, গুল বানিয়ে রোদ্দুরে শুকিয়ে নাও, বাস্‌ গুল তৈরি! গাঁয়ে থাকতে তোমরা গুল বানাতে না?”

শহরের আদব-কায়দা না জানা সোনা, একটু যেন লজ্জা পেলেন, বললেন, “তা না মাসিমা, আমাদের ওদিকে ঘুঁটে, ধানের তূষ আর কাঠকুটোতেই রান্না-বান্না হয়ে যায়। কয়লা ব্যবহার হয়, তবে কম। তাতে যেটুকু গুঁড়ো হয়, তার ধিকিধিকি জ্বালনে ধানসেদ্দ কিংবা রোজকার দুধের জ্বাল দিতেই খরচা হয়ে যায়”

“তোমাদের বাড়ি বদ্দোমানে, না? কতায় বলে “জেলার সেরা বদ্দোমান, আর কলার সেরা মত্তোমান”। তার মানে তোমরা ঘটি। তোমরা তো তাও ভালো, তোমাদের ওপরে যে বাঙালরা ভাড়া থাকে, তাদের রীতকরণ দেখেছো? যেমন কতাবাত্তা, তেমন আচার-আচরণ। খাইসে, ইসে, পোলা, মাইয়া – শুঁটকি মাছও খায়, তোমরা গন্ধ পাও না? ছ্যা, ছ্যা, আমার তো নাকে কাপড় দিলেও গা গুলোয়!”

সোনা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে একটু হাসলেন, তিনি জানেন বাড়িওয়ালি মাসিমা, আড়ালে তাঁদের সম্বন্ধেও অনেক কথা বলে থাকেন। তাঁরাও ভাড়াটে, কিন্তু ঘটি – অতএব বাঙাল ভাড়াটেদের তুলনায় তাঁরা মন্দের ভালো! কিন্তু শুধু ভাড়াটে বলেই নয়, বাড়িওয়ালী মাসিমা একবার শুরু করলে, এ পাড়ার সকল প্রতিবেশী – বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে নির্বিশেষে – সকল পরিবারের দোষ, ত্রুটির হাঁড়ির খবর সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে থাকেনকার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনা নেই। কার বাড়ির কর্তার চরিত্র দোষ আছে। ওপাশের কোন বাড়িতে ভর দুপুরবেলা প্রায়ই এক উটকো পুরুষ ঢোকে, বিকেল হলেই বেরিয়ে যায়! বৌটাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, পিসতুতো দাদা! চোখে অদ্ভূত ইশারা এবং মুখে রহস্যের হাসি নিয়ে, মাসিমা বলেন, “অ বৌমা, কেমন পিসতুতো দাদা গো, দুপুর ছাড়া অন্য সময়ে তার আসার সময় হয় না?”

যে মহিলার সম্পর্কে মাসিমা এই গোপন সংবাদ দিলেন, সে মহিলাকে সোনা চেনেন। অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখের নির্বিকার নিঃসন্তান এক মহিলা! পাড়ার কারো সঙ্গে তেমন মেশেন না। মুখরোচক এই সংবাদে সোনা এতটুকুও কৌতূহলী না হওয়ায়, মাসিমা মোটেই হতাশ হলেন না, বরং আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ওই বউয়ের আরো কিত্তি শুনলে, তুমি আঁতকে উঠবে বৌমা! শুধু পিসতুতো দাদাই নয়, আরো একজন আসে, হ্যাঁ গো! বলে, ওর দেওর, সে নাকি ওর বরের খুড়তুতো ভাই! সেও আসে ওই দুপুরেই! ভদ্দোরনোকের পাড়ায় এ সব কী বলো তো, বউমা? ছি ছি ছি”। তারপর চোখের অদ্ভূত এক ইঙ্গিত করে, মাসিমা গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “আমি কী ভাবি জানো তো বৌমা, যদি দুজনে একই দিনে একই সময়ে এসে উপস্থিত হয়? তখন ওই মাগি কী করবে, বল দেকি? হি হি হি হি...”!    

মাসিমাকে আর বাড়তে না দিয়ে, সোনা বললেন, “আমি আসি মাসিমা, নীচেয় রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, ছেলেটাকেও চান করাতে হবেভুটকু নীচেয় চ।  আসছি, মাসিমা”

 

 

পান্না একমনে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে, বালতির জলের মধ্যে বুদবুদ তৈরি করছিল, বুদবুদের গায়ে নানা রঙের রামধনু সৃষ্টি করছিল! সোনা সে বালতিটা টেনে নিয়ে ঝাঁঝরির মুখে ঢেলে দিলেন জলটা। তারপর খালি বালতি হাতে নিয়ে পান্নার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চঃ, নীচেয় যাই। নাওয়া খাওয়া সেরে একটু শুই। সেই ভোর থেকে যা চলছে”।

সোনা ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন, দেখলেন পান্না আসছে না, মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের মাঝখানে। “কী রে, আয়! নীচেয় যাবি না?” পান্না নিরুত্তর। তার মনের মধ্যে তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং অভিমান। মা বিনা বাক্যে ঝাঁঝরির মুখে জলটা ঢেলে দিলেন? একবারের জন্যেও তাঁর মনে হল না, পান্নার কথা, পান্নার নতুন আবিষ্কারের কথা! এমন নিষ্ঠুর মায়ের সঙ্গে সে আর কোন কথা বলবে না!

সোনা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা আন্দাজ করলেন, বললেন, “সোনু তোমার সেই রামধনুর জলটা ফেলে দিয়েছি বলে, মায়ের ওপর রাগ করেছো? আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, আমার ঘাট হয়েছে, এর পরের দিন, তোমার জন্যে অনেকটা সাবান জল রেখে দেব। কেমন? এখন চলো, নীচেয় যাই”। পান্না এতটুকুও বিচলিত হল না, মায়ের এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সে একই ভাবে ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।

সোনা এবার বললেন, “বেশ, থাকো তুমি দাঁড়িয়ে, আমি নীচেয় চললাম”।  সোনা তিন চার ধাপ নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে, তারপর একটু অপেক্ষা করে আবার উঠে এলেন, দেখলেন, পান্না একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ টুটল, বললেন, “পান্না, সোজা কথায় নীচেয় আসবি, নাকি পিঠটা ফাটাবো?”

মায়ের কণ্ঠস্বর এবং ওই “পান্না” ডাক, পান্নাকে ভয় পাইয়ে দিল, সে বুঝল, মা রেগে গেছেন। মায়ের হাতের দু একটা চড় চাপড়ের স্বাদ, এর আগে সে দু একবার পেয়েছে! সেই স্মৃতি মনে করে, সে আস্তে আস্তে নীচেয় নেমে এল। 

নীচেয় নেমে সোনা হাতের বালতি রেখে, পান্নার হাতে গামছা দিয়ে বললেন, “যাও, সোনু মাথায় তেল দিয়ে ঝপ করে চান সেরে এসো। তোমার হলে, আমি যাবো। ততক্ষণ আমি ঘর দোর একটু গুছিয়ে নিই”।

মায়ের কণ্ঠের স্বাভাবিক সুরে, পান্না তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে পেল, ঘরের এক কোণে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, মেঝের দিকে তাকিয়ে। সোনা কাজ সারছিলেন, পান্নাকে লক্ষ্য করেননি। কিছুক্ষণ পরে তিনি খেয়াল করলেন, পান্না মুখভার করে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে...একটু মায়া হল, আবার বিরক্তও হলেন, “আর ভাল লাগছে না, সোনু, যা না তেল মেখে চানটা করে আয়, না”। পান্না আড়চোখে মায়ের মুখটা দেখল এবং একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

আর সেই সময়েই রাস্তা থেকে হাঁক শোনা গেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”।

বৃদ্ধা এক পৃথুলা মহিলা, পরনে সাদা থান আর সাদা ব্লাউজ, হাতে মাঝারি সাইজের পেটমোটা একটা কাপড়ের থলি। মাথার পেছনদিকে বড়ি করে বাঁধা সাদা-কালো চুলের খোঁপা। এই সময়েই সে রোজ আসে, দাঁতের পোকা বের করতে। এ পাড়ার মেয়ে-বউদের দাঁতে ব্যথা হলে, তারা ডেন্টিস্টের চেম্বারে গিয়ে দাঁত বের করে বসে পড়ার কথা কেউ চিন্তাও করে না। পুরুষহীন নির্ঝঞ্ঝাট দুপুরে এই বৃদ্ধা তাদের দাঁতের ‘চিকিচ্ছে করে’তার হাতের কারসাজিতে ব্যথা হওয়া দাঁত থেকে বের হয়ে আসে মুড়ির মতো দেখতে জ্যান্ত বড়ো পোকা! পোকা বের করে দেওয়ার পর দাঁতের গোড়ায় ঘষে দেওয়া কোন ওষুধের গুণে, ব্যাথা সেরে যায় বেশ কদিনের জন্যে। আশ্চর্য তার হাত যশ। পাড়ার মেয়েরা বৃদ্ধা ওই মহিলাকে বলে “বেদে বুড়ি”!

সোনা ওই বেদে বুড়ির ডাক শুনেই বলে উঠলেন, “দাঁড়া তো, ওই বেদে বুড়িকে ডাকি, আমার ছেলের মাথার পোকাগুলোকে সব বের করে দিক। সেদিন হারুর মা, ওকে ডেকে হারুর মাথার সব পোকা বের করে নিয়েছে”!

পান্না এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল, মাথার ভেতরে পোকা থাকা এবং সেই পোকা বের করা ব্যাপারটা তার বুদ্ধির বাইরে! সে ভয়ে ভয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “তারপর, হারুর কী হল, মরে গেল?”

সোনা মুখ টিপে হেসে বললেন, “বালাই ষাট মরবে কেন? পোকাগুলো বের করে দেওয়াতে হারু একদম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে গেল, ওর মা যখন যা বলত, সব শুনত। কক্‌খনো দুষ্টুমি করত না! ডাকবো বেদে বুড়িকে?”

পান্না হারু বা হারুর মা কাউকেই চেনে না, কিন্তু মায়ের ওপর রাগ করে আর অবাধ্য হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, সে দৌড়ে গেল বাথরুমে। চৌবাচ্চার মধ্যে মগ ডুবিয়ে সে জল ঢালতে লাগল মাথায়। জল ঢালার আওয়াজের মধ্যেও, সে বেদে বুড়ির ডাক শুনতে পেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”। তবে শব্দটা বেশ দূরের শব্দ, মা এখন ডাকলেও বেদে বুড়ির সে ডাক শোনার সম্ভাবনা কম। পান্না নিশ্চিন্তে মাথায় জল ঢালতে ঢালতে হৈ হৈ করে গান ধরল, “গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রঙ ছড়ায়, এ গানে রামধনু তার সাতটি রঙ ঝরায়...”।

সোনার মুখে প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “পাগল, সত্যি সত্যিই আমার এ ছেলেটার মাথায় পোকা আছে!” 

..০০..       

চলবে...

                

            

 

 


শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বুলেট রিকশ

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

এর আগের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "


এক

 

জামা কাপড় ছেড়ে আবার শুয়ে পড়বো ভাবছিলাম। বাইরে থেকে ডাক এল, “ছোড়দা, ও ছোড়দা”। গলা শুনেই বুঝলাম, বাদলদা, আমাদের খুবই পরিচিত রিকশওয়ালা। বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম, পৌনে দুটোর সময় আসতে, দুটো দশের ট্রেনটা ধরতেই হবে। ওটা ধরতে পারলে কলকাতায় সকাল ছটা নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যায়, তার পরে গেলে, আমার কাজ হবে না, কলকাতা যাওয়ার কোন মানেই থাকবে না। আর হতভাগা এল দেখ, এখন বাজছে দুটো পাঁচ। বাদলদার জন্যে আমিই বা হা পিত্যেশ করে বসে ছিলাম, কেন? পাড়ায় আর কী রিকশ নেই? আছে বৈকি, বিস্তর আছে, কিন্তু রাত দুটোর সময় কাকে পাবো? কে আসবে? সেইজন্যেই বাদলদাকে বলে রেখেছিলাম। বাদলদা এমন করে না, এবারেই এত দেরি করে ফেলল।

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললাম, “এত দেরি করে এলে? ট্রেন কী আমার জন্যে ওয়েট করবে নাকি? আর এখন গিয়ে লাভ নেই, বাদলদা”।

“তুমি বেরিয়ে এসো তোট্রেন আমাদের ছেড়ে কোথায় যায় একবার দেখি”!

“হাতে পাঁচমিনিট সময়, বাদলদা। মানছি এখন রাত, রাস্তাঘাট ফাঁকা তাহলেও কুড়ি মিনিটের রাস্তা পাঁচমিনিটে পৌঁছে দেবে? কী যে বলো না”!

“অযথা বকবক না করে বেরিয়ে এসো দিকি, চেষ্টা করে দেখতে ক্ষেতি আছে?”

তা নেই। আমি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রিকশয় চেপে পড়লাম। দরজায় দাঁড়িয়ে মা বললেন দুগ্‌গা দুগ্‌গা, আর বাবা হাত নাড়লেন। দেখা যাক কী আছে কপালে!

 

ফাঁকা রাস্তায় ভয়ংকর স্পিডে চালিয়েও ট্রেনটা ধরা গেল না। প্রত্যেকবারই ট্রেন আসার শিডিউল্‌ড্ টাইমের আগে এসে দেখেছি, ট্রেনটা প্রায়ই দশ-পনের মিনিট লেট করে! আজ আমিই লেট কী না, তাই আজ ট্রেন লেট করেনি! বাদলদা জিগ্যেস করল, “কী করবে, বাড়ি ফিরে যাবে? নাকি স্টেশনে ওয়েট করে, পরের ট্রেনে যাবে?”

“পরের ট্রেন তো প্রায় আড়াই ঘন্টা পরে। তার ওপর ওটা সব স্টেশনে দাঁড়ায়, এটার মতো গ্যালপিং নয়। কলকাতা পৌঁছোতে দশটা-সাড়ে দশটা বেজে যাবে। অতো দেরি হলে, আজ আমার কলকাতার কাজটাই হবে না। নাঃ, আজকের দিনটাই বরবাদ গেল। চলো, বাড়ি ফিরে যাই, কাল আবার চেষ্টা করবো। আজকের মতো কালও আবার ডুবিও না, বাদলদা, খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।”

বাদলদা আমার কথায় বেশ লজ্জা পেল, মাথা নিচু করে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি রিকশয় বসো দেখি, একটা কোন উপায় ঠিক বের করে ফেলবো।” আমি চটপট রিকশয় উঠে পড়লাম, যা হয়ে গেছে তার জন্যে অনুতাপ করে তো লাভ নেই। বরং ঘরে ফিরে বকেয়া ঘুমটা মিটিয়ে নিলে হয়। আমি উঠে পড়তে বাদলদা রিকশ চালু করল, কিন্তু বাড়ির দিকে নয় উল্টোদিকে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, “এ কী, ওদিকে কোথায় চললে?” বাদলদার রিকশ তখন হাওয়ার বেগে ছুটছে।

“বকবক করে মাথা খারাপ করো না দেখি। সিটবেল্ট বেঁধে চুপটি করে বসো। একটু ঘুমিয়েও নিতে পারো নিশ্চিন্তে। আমাকে আমার মতো চালাতে দাও” রিকশয় সিটবেল্ট! বাদলদার মাথাটা গেছে। তবে রিকশটা চালাচ্ছে খাসা। এত স্পিডে চালাচ্ছে, কিন্তু এতটুকু ঝাঁকুনি নেইদুকানে হাওয়ার শোঁশোঁ ঝাপটা, হাওয়ার দাপটে ঠিকমতো তাকানো যাচ্ছে না। এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের দরজা দিয়ে মুখ বাড়ালে যেমন হয়। কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল। যতোই হোক সাইকেল রিকশ, যা স্পিডে চলছে, ছিটকে পড়লে আর দেখতে হবে না! ঘুটঘুটে অন্ধকারে সিটের ডানপাশে হাতড়ে সত্যিই সিটবেল্টটা পেয়ে গেলাম, টেনে নিয়ে লক করে দিলাম, বাঁদিকের পিঠের কাছে। বেশ টাইট, পোক্ত বেল্ট। কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মতো, ল্যাতপেতে পৈতের মতো নয়। বেল্টটা এঁটে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। 

আমাদের শহর ছাড়িয়ে কতদূরে চলে এসেছি কে জানে? দুপাশেই অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। রাস্তার দুপাশে ধানজমি। দিনের বেলা হলে চোখজুড়োনো সবুজ চোখে পড়ে, এখন এই রাত আড়াইটের সময়, কে আর আমার জন্যে মাঠের মধ্যে আলো জ্বালিয়ে রাখবে! আর চলন্ত গাড়ি থেকে, সে ট্রেনই হোক বা রিকশ, দুপাশে কিছুই দেখা না গেলে, আমার খুব ঘুম পায়। কানের মধ্যে বোঁ বোঁ হাওয়ার প্রবল ঝাপটার মধ্যেও আমার চোখ বুজে এল।

চোখ বুজলেও ঘুমুইনি। একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল। এতো হাওয়ার মধ্যে ঘুম আসে নাকি? তন্দ্রা কেটে গেল, ট্রেনের আওয়াজে! আজকাল ট্রেন আর কুউউউ করে না,  ভোঁওঁওঁওঁ আওয়াজ করে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম, বিশাল একটা কেন্নো যেন দৌড়ে চলেছে অন্ধকার মাঠের মধ্যে দিয়ে। তার মাথায় আলো, সারা গায়ে আলোর চৌখুপি। হেডলাইট আর ট্রেনের জানালাগুলো। কিন্তু ট্রেনটা আমাদের থেকে অনেকটা নিচে দিয়ে দৌড়োচ্ছে! আমরা কী কোন পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি? এই রাস্তা দিয়ে বাসে এবং ওই লাইনের ট্রেনে বহুবার যাতায়াত করেছি, কিন্তু এদিকে কোনো পাহাড় আছে কোনদিন চোখেও পড়েনি!  কী মনে হতে ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিচে তাকালাম, আর শিউরে উঠলাম ভয়ে। হাতপা অবশ হয়ে এল। সিট বেল্ট বাঁধা ছিল, তা না হলে টুপ করে খসে পড়তাম, কালবোশেখীর ঝড়ে, ঝরে পড়া কচি আমের মতো! কী দেখলাম? দেখলাম, আমাদের থেকে অনেকটা নিচে কালো ফিঁতের মতো রাস্তা, আর রাস্তা দিয়ে লাইন দিয়ে হেডলাইট আর টেললাইট জ্বালিয়ে দৌড়ে চলেছে লরি, আর কিছু ছোট গাড়িও!

এসব কী করে সম্ভব! মাটি থেকে এতটা ওপরে, এত স্পিডে একটা সাইকেল রিকশ কী করে উড়ছে? আমি এ কার পাল্লায় পড়েছি? আমার সামনে যে রিকশ চালাচ্ছে, সে কী বাদলদা? আমি যত ভাবতে লাগলাম, ততই আমার হাতপা ঠাণ্ডা হতে লাগল। তার মানে, অনেক গল্পেটল্পে যেমন পড়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করিনি, বাদলদাও এখন সেরকম কিছু! আমি চোখ বন্ধ করে রাম নাম জপতে লাগলাম। আর কিছু করার কথা মাথাতেও এল না।

 

দুই

 

ট্রেনটার শেয়ালদা পৌঁছোনোর শিডিউল্‌ড্ টাইম ছিল পাঁচটা পঞ্চাশে, কিন্তু ঢুকল কুড়ি মিনিট লেটে। তাহলেও আমার কোন অসুবিধে হয়নি। যে কাজের জন্যে এসেছিলাম, সে কাজও মিটে গেল এগারোটার মধ্যে। দেড়টার সময় ফেরার ট্রেন। হাতে কিছুটা সময় ছিল বলে, কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া থেকেও ঘুরে এলাম। বাচ্চুদা দুটো বই কিনতে দিয়েছিল, সে দুটো কিনলাম। আর আমার জন্যে কিনলাম, “অশরীরি অমনিবাস”। বইটা সম্পর্কে আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম। তখন গা করিনি। কিন্তু ট্রেন ধরতে গিয়ে আজ রাত্রে যে অভিজ্ঞতা হল, তার পরে বোকার মতো, “ভূত বলে কিছু আছে নাকি?”, বলে হ্যা হ্যা করে হাসার অবস্থা, অন্ততঃ আমার আর নেই।  বরং ওঁনাদের সম্পর্কে খুব সিরিয়াসলি চিন্তাভাবনা করা উচিৎ বলেই আমার এখন মনে হচ্ছে!

এই ফাঁকে বলে রাখি, গতকাল রাত্রে চোখ বন্ধ করে কতক্ষণ রামনাম করেছিলাম জানি না। তবে বাদলদার ডাকে চমকে উঠেছিলাম, “ছোড়দা, ও ছোড়দা, স্টেশন চলে এসেছে। তোমার ট্রেন ঢুকতে এখনো মিনিট পাঁচেক দেরি আছে। দৌড়ে যাও”খুব ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে দেখলাম, আমি পরের স্টেশনের রিক্সা স্ট্যাণ্ডে, বাদলদার রিক্সায় বসে আছি! তার মানে আমার বাড়ির স্টেশন ছেড়ে পরের স্টেশন ঝিঙেরদহে ট্রেন এসে পৌঁছোনোর মিনিট পাঁচেক আগেই, বাদলদা আমাকে এখানে এনে পৌঁছে দিয়েছে! আমার অবস্থা তখন ভূতে পাওয়া লোকের মতো। মাথা ঝিমঝিম করছিল

বাদলদা আবার তাড়া দিল, “কী ভাবছো বলো তো? এখানেও ট্রেনটা ফেল করবে নাকি?” একথার পর আমি আর দাঁড়ালাম না, রিকশ থেকে লাফিয়ে নেমে, দৌড়োলাম স্টেশনের দিকে। রাতের ট্রেনের জন্যে লোকজন তেমন নেই। তার থেকে আশেপাশে অনেক বেশি নেড়ি কুকুর রয়েছেতাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এল। ভাগ্যিস্ ওরা কামড়ায় না। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে আমি যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকলাম, তখন দেখলাম ট্রেনও প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে!

 

বেলা দেড়টার ট্রেনে ভিড় একটু কমই হয়। কাজেই সিট পেতে অসুবিধে হল না। ট্রেন যখন ঠিক সময়েই ছাড়ল, গুছিয়ে “অশরীরি অমনিবাস” খুলে বসলাম। প্রথম অধ্যায় “বাঙালী ভূতের উৎপত্তি এবং তাদের ক্রমবিকাশ”, পড়তে শুরু করলাম। যদিও বেশিক্ষণ পড়তে পারলাম না, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। ট্রেন ধরার তাড়ায় রাত দেড়টায় উঠে পড়ার পর, যা যা হল, তাতে ঘুমের আর দোষ কী?

ঘন্টাদুয়েক পর যখন ঘুম ভাঙল, দেখি কামরায় অনেক লোক। সব সিট ভরে গিয়ে, দু একজন লোক সিট না পেয়ে দাঁড়িয়েও আছে। আমার উল্টো দিকের সিটে একটি পরিবার বসেছেন। তাঁদের দুটি ছেলেমেয়ে। বড়োটি ছেলে, সে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি ছোট, সেও বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, আর ভয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরছে! খুব আশ্চর্য হলাম, বাচ্চাদুটোর এমন অবস্থা যেন ভূত দেখছে! মহিলার বয়েস আমার দিদির মতোই, তিনিও আমার ঘুম ভাঙতে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন মনে হল, বললেন, “বাবা, আপনি যা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, আওয়াজে ভূত পালাবে।”

আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম, “না মানে, ইয়ে গতকাল রাত্রে দেড়টায় উঠে, দুটো দশের ট্রেনে কলকাতা এসেছিলাম, এই ফিরছি। অনেক দৌড়োদৌড়ি...”  

দিদিটাইপ ওই মহিলার স্বামী হাসতে হাসতে বললেন, “বুঝেছি, তার মানে মাঝরাত থেকে যাকে বলে “ভূতের কেত্তন” - তাই ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?” আমি লাজুক হেসে ঘাড় নাড়লাম ঠিকই, কিন্তু একটু দমেও গেলাম। আমাকে ঘিরে এতো ভূত কেন রে বাবা! আমার নাকের আওয়াজে “ভূত পালাবে”, মাঝরাত থেকে “ভূতের কেত্তন”। ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, “কতদূর যাওয়া হবে?”

 আমি আমার স্টেশনের নাম বললাম, শুনে মহিলা বললেন, “আমাদের তিনটে স্টেশন আগেই নামবেন, কিন্তু আর ঘুমোবেন না, প্লিজ। আমার মেয়েটা এত ভীতু, ভূতে পাওয়ার মতো আমাকে আঁকড়ে ধরছে বারবার!”

ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “অদ্ভূত আবদার তো তোমার, আমাদের মেয়ে ভয় পাচ্ছে বলে উনি ঘুমোবেন না!”

দিদিভাই মহিলা একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “তা ঠিক, তবে রিকোয়েস্ট করছিলাম আর কি।” এ প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল, কামরায় ঝালমুড়িওয়ালা আসাতে। দিদিভাইয়ের ছেলেটি বায়না ধরল, ঝালমুড়ি খাবে। আমি বললাম, “ঝালমুড়ি খাবেন তো? চারটে মুড়ি বানান তো, কাকু”

দিদিভাই খুব আপত্তি করে উঠলেন, “না না। আপনি খাওয়াবেন কেন?”

আমি  হাসতে হাসতে বললাম, “মাথায় ভূত চেপেছে, দিদিভাই।” বোঝো কাণ্ড, আমিও ভূত বলে ফেললাম!

দিদিভাইও হেসে ফেললেন, বললেন, “তা কেন? আমরা খাওয়াবো আপনাকে। দিবানিদ্রার পর ঝালমুড়ি আর চা না হলে জমবে কেন? আপনি তিনটে বানান কাকু, কিন্তু আমরা দাম দেবো।” শেষ কথাগুলো দিদিভাই ঝালমুড়িওয়ালাকে বললেন। ভদ্রলোক মুড়ির টিনের ঢাকনা খুলে মুঠো করে মুড়ি তুলে গোল স্টিলের ডাব্বায় ভরতে লাগলেন।

“আমারটায় কিন্তু লংকা বেশি দেবেন, আজকাল আপনাদের কাঁচা লংকা আর শসায় একই রকম টেস্ট লাগে।” দিদিভাইয়ের কথায় আমি চমকে উঠলাম, বাপরে এত ঝাল খান! ঝালমুড়িওয়ালা, স্টিলের ডাব্বায় নানান বক্কাল মেলাতে মেলাতে বললেন, “আমার কাছে ওসব লংকা পাবেন না, বৌদি। আমার লংকা মানে লংকাদহন– দাউ দাউ জ্বলবে!” প্লাস্টিক বোতলের ছিপির ফুটো দিয়ে সরষের তেল ঢালতে ঢালতে বললেন, “একবার আমাদের পাশের গাঁয়ের এক বউকে ভূতে ধরেছিল। এই বছর তিন চার আগের কথা। ওঝা এল, ঝাড়ফুঁক চলল। সরষে ছেটানো, হলুদ আর শুকনো লংকা পোড়ানো, সব হল। ঝ্যাঁটাপেটাও চলল বেশ কিছুক্ষণ..” ভদ্রলোক ডাব্বার মধ্যে কাঠের ডাণ্ডা দিয়ে মুড়ি ঘাঁটতে লাগলেন ঘট, ঘট, ঘট... “কিস্স্যু হল না।” ঝালমুড়ি রেডি, এবার কাগজের ঠোঙা নিয়ে তাতে মুড়ি ভরার জন্যে ফুঁ দিয়ে ঠোঙার মুখ খুলতে খুলতে বললেন, “ফু..ফু...আমাদের গাঁয়ের করিমচাচা জামাই বাড়ি যাচ্ছিলেন, ক্ষেতের সব্জিটব্জি নিয়ে...ফু...ফু...তাঁর থলিতে কিছু কাঁচা লংকাও ছিল!  তার থেকে চার পাঁচটা লংকা ওঝাকে দিয়ে করিমচাচা বললেন, ফু..ফু... এই লংকাগুলা বৌমার গায়ে একে একে ছোড়েন তো, দেখি ভূতবাবাজি  কতক্ষণ থাকে....তিরিশ টাকা।”

তিনটে মুড়ির ঠোঙা আমাদের তিনজনের হাতে দিয়ে, মুড়িওয়ালা তার দাম চাইল। দিদিভাই সেটা বুঝতে না পেরে, অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, “ভূতটা তিরিশ টাকা নিয়ে ছেড়ে দিল?”

দিদিভাইয়ের স্বামী পার্স থেকে তিনটে নোট বের করে মুড়িওয়ালার হাতে দিয়ে বললেন, “তিন লংকাতেই ভূত বাছাধন কুপোকাত, ওঝার হাতে পায়ে ধরে পালিয়ে উঠল, শ্যাওড়া গাছের মগ ডালে”“ঝালমুড়িইই”, “মশলামুড়িইই” হাঁকতে হাঁকতে ঝালমুড়িওয়ালা চলে গেল অন্যদিকেদিদিভাই আরো অবাক হয়ে বললেন, “বা রে, তুমি কেমন করে জানলে?”

“আমাদের অফিসের গদাইয়ের বাড়ি ওদিকেই। তার মুখে শুনেছি।” একমুঠো মুড়ি গালে পুরে, আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আরো বললেন, “আর সেই লংকার ঝাঁঝে ওই ওঝার কী হল জানো?”

দিদিভাই জিগ্যেস করলেন, “কী হল?”

“ওঝাগিরি ছেড়ে দিয়ে এখন ট্রেনের কামরায় ঝালমুড়ি বেচে।”

“সে কী? কেন?”

“গায়ে তিনটে লংকা ছুঁড়লেই, যেখানে ভূত পালায়, সে গাঁয়ে ওঝার আর দরকার কী? ওঝা হয়ে ভূতের বেগার খেটে লাভ কী?”

“তা ঠিক। তবে লংকাগুলোয় ভালোই ঝাল আছে”ঝাল লাগা জিভে সি সি আওয়াজ করতে করতে দিদিভাই বললেন।

আমি লংকাগুলো বেছে, জানালার বাইরে ফেলতে ফেলতে খুব ভাবনায় পড়ে গেলাম! গদাই যে ঝালমুড়িওয়ালার পাশের গাঁয়ের লোক, সেটা দিদিভাইয়ের স্বামী জানলেন কী করে? ঝালমুড়িওয়ালা কোন গাঁয়ের নাম তো বলেনি!

 

তিন

 

ট্রেনের মধ্যে আমি আর কথাবার্তা না বলে, বই মুখে নিয়ে পড়তে লাগলাম। কারণ আমার আশেপাশে কেমন একটা যেন ভৌতিক পরিবেশ ঘিরে রয়েছে বুঝতে পারছিলাম। যাই বলছি, যাই করছি, কোথা থেকে যেন বারবার ভূতের প্রসঙ্গ চলে আসছিলআমার স্টেশন চলে আসাতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। দিদিভাইদের বিদায় জানিয়ে, আবার দেখা হবে বলে নেমে পড়লাম স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে রিক্সা স্ট্যাণ্ডে অনেক রিকশ, কিন্তু গত রাত্রের কথা ভেবে, কোন রিকশতেই আর উঠতে ভরসা হচ্ছিল না। ঠিক করলাম টোটোয় যাবো। টোটোয় উঠে মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি, বাচ্চুদার চারটে মিসড্ কল রয়েছে। চলন্ত ট্রেনের আওয়াজে শুনতে পাইনি। কল ব্যাক করলাম বাচ্চুদাকে।

বাচ্চুদা কানেক্ট করেই খুব ঝাড়তে লাগল, “কোথায় থাকিস কোথায়, হতভাগা? কল করলে ফোন তুলিস না কেন?”

“ট্রেনে ছিলাম তো। এইমাত্র স্টেশনে নামলাম, টোটোয় উঠে দেখলাম তোমার চারটে মিসড্ কল।”

“অ। কলকাতার কাজ মিটল?”

“হ্যাঁ, ঠিকঠাক মিটে গেছে।”

“বাদলদার মুখে শুনলাম, ওর জন্যে তোর ট্রেন মিস্ হয়েছিল। পরের স্টেশনে গিয়ে তোর ট্রেন ধরিয়ে দিয়েছে”!

“তোমার সঙ্গে বাদলদার দেখা হয়েছে? বাদলদা বলেছে তোমাকে? বাদলদার সঙ্গে বেশি মিশো না, বাচ্চুদা। লোকটা সুবিধের নয় মোটেই।”

“সে কী রে? কেন বলতো?”

“সব কথা ফোনে বলা যায় নাকি! দেখা হলে বলবো।”

তুই এক কাজ কর তাহলে, তোর বাড়ি না গিয়ে, সোজা আমাদের বাড়ি চলে আয়। রাত্রে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরবিআমি কাকিমাকে বলে দিচ্ছি” বাচ্চুদা আমার মাকে কাকিমা বলে।

“কাল রাত থেকে ভালো ঘুম হয়নি, খুব টায়ার্ড বাচ্চুদা। আজকের প্রোগ্রামটা বাদ দাও।”

“আমি জানি না। মা সামনে আছেন, বলছেন, গজুকে বল, রাত্রে পরোটা আর হাঁসের ডিমের ডালনা খাওয়াবো”

একথার পর আর কিছু বলার নেই, টোটোওয়ালাকে, বাচ্চুদার পাড়ার নাম বললাম। টোটোওয়ালা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল, “দশটা টাকা বেশি দেবেন, ভাই”!

 

যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই রাত্রি হয়। টোটো থেকে নেমে বাচ্চুদার বাড়ির সদর দরজায় ঢুকেই দেখি বাদলদার রিকশটা দাঁড়িয়ে। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। স্বস্তির কথা বাদলদাকে দেখলাম না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। বাদলদা অশরীরি হয়েছে, তার রিকশটা তো আর হয়নি। আবছা অন্ধকারে দাঁড় করানো রিকশটাকে একটু দূর থেকে এড়িয়ে মস্তো উঠোনটা পার হয়ে গেলাম। বাচ্চুদার একতলার বৈঠকখানায় ঢুকে ডাকলাম, “বাচ্চুদা”  

বাচ্চুদা পাশের ঘর থেকে এ ঘরে এসেই কথা শুরু করে দিল, “এসে গেছিস। ভালই হয়েছে। তোর জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। কাকিমাকে বলে দিয়েছি। তুই আমাদের বাড়ি আছিস। রাত্রে একেবারে খেয়েদেয়ে যাবি। কদিন একটা কাজে খুব ব্যস্ত থাকার জন্যে তোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগই হয়নি। তার মধ্যে গত কাল রাত্রের ঘটনাটা হয়ে গেল, তোকে আগে থেকে বলেকয়ে করা উচিৎ ছিল। সে কথা পরে হবে,  আগে তুই এক কাজ কর, বাথরুমে গিয়ে ভাল করে ফ্রেশ হয়ে নে। কাল রাত থেকে অনেক দৌড়োদৌড়ি করেছিস। মা খাবার দাবার আনছেন, শান্তিতে খাওয়াদাওয়া কর, তারপর কাজের কথায় আসবো”

বাচ্চুদা একবার শুরু করলে, আর কাউকে কথা বলতে দেয় না, বকতেই থাকে। সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগছিল, বাচ্চুদার বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অনেকটা আরাম পেলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে আসতেই কাকিমা দুটো প্লেটে নোনতা সুজি নিয়ে এল। কাকিমার দারুণ রান্নার হাত, যা খাবার বানান, খাওয়ার পর মুখে লেগে থাকে। বাচ্চুদা নিজের প্লেট হাতে নিয়ে বলল, “নে চালু কর”

কাকিমা জিগ্যেস করলেন, “চা খাবি না, কফি খাবি, গজু? কাল রাত্রে খুব হয়রান হয়েছিস শুনলাম। বাচ্চুটার মাথায় মাঝে মাঝে কী যে ভূত চাপে বুঝি না বাপু। আদ্যিকালের এই বাড়িটাকেও দিনদিন ভূতুড়ে বাড়ি বানিয়ে তুলছে! গজু কফি খেতে ভালোবাসিস তো! তোরা খা আমি কফি করে আনছি”

কাকিমা ভেতরে চলে যেতেই, বাচ্চুদা একগাল সুজি নিয়ে ভরাট গলায় বলল, “বেশ কিছুদিন ধরে একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। দুচারদিনের মধ্যেই তোকে ডেকে নিয়ে একটা ট্রায়াল দেব ভাবছিলাম। কিন্তু বাদলদার...আচ্ছা, বাদলদা সম্পর্কে তুই তখন কী যেন বলছিলি? লোকটা নাকি সুবিধের নয়! কী ব্যাপার বল তো?”

“তোমাকে বললে তুমি শক্ পাবে বাচ্চুদা। বাদলদা আমাদের মধ্যে আর নেই। নেই মানে, আছে তবে ওই না থাকাই, মানে, থাকা না থাকা সমান...”

বাচ্চুদা বিরক্ত হয়ে আমায় ধমকে দিল, “ধ্যাত্তেরি, কী তখন থেকে মানে, মানে করছিস্, যা বলবি ঝেড়ে বল না”

“বলছি তো! বাদলদা ইয়ে, মানে, বাদলদা অশরীরি হয়ে গেছে! কাল রাত্রে যেভাবে গাড়ি চালাল, কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়!” আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাচ্চুদা এমন হেসে উঠল হো হো করে, কাকিমা পর্যন্ত দৌড়ে এলেন কফি বানানো ছেড়ে।

বাচ্চুদাকে ধমকে জিগ্যেস করলেন, “ভূতের মতো, গোটা পাড়া মাথায় করে, ও আবার কী হাসি, বাচ্চু? কী হয়েছে রে, গজু?”

আমি কিছু বলার আগেই বাচ্চুদা বলল, “বলছি মা, বলছি। গজুর কথা শুনলে তুমি আমার থেকেও জোরে হাসবে। গজু বলছে, বাদলদা নাকি অলরেডি পটল তুলেছে! আর ভূত হয়ে ওকে গতকাল রাত্রে ঝিঙেরদা স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছে, ট্রেন পৌঁছোনোর আগেই!”

“খারাপ কী বলেছে শুনি? বলা নেই কওয়া নেই, গজুকে নিয়ে তোদের অমন বাঁদরামি করাটা মোটেই উচিত হয়নি। সেই নিয়ে তুই অমন হ্যা হ্যা করে হাসছিস? কিছু একটা হয়ে গেলে? গজু আমাদের সরল মনের ছেলে, ও কী করে বুঝবে, তোরা দুই ভূত মিলে কী ফন্দি আঁটছিস?”

কাকিমার ধমকানিতে বাচ্চুদা একটু অপ্রতিভ হল, বলল, “তা ঠিক। বাদলদা যে নিজের বুদ্ধিতে হুট করে এমন কাণ্ড করে বসবে, আমি ভাবিইনি মা! তবে আমার এক্সপেরিমেন্টটা সফল হয়েছে, সেটা তো মানবে?”

কাকিমা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, “থাক, আর বাহাদুরি ফলাতে হবে না। টিআইআই থেকে বিটেক, এমটেক করে, তোর মতো ছেলেরা বিদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে! আর এক তুই হয়েছিস, একপেট বিদ্যে নিয়ে চোদ্দপুরুষের ভিটে আগলে, এক্সপেরিমেন্ট করছিস!” কাকিমা গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। আমরা দুজনেই চুপ করে সুজির বাটি শেষ করতে মন দিলাম।

কাকিমা যা বললেন, সেটা আমাদেরও মনের কথা। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চুদা অদ্ভূত ব্রিলিয়ান্ট। এই গোবিন্দপুরে থেকে মাধ্যমিক, হায়ারসেকেণ্ডারিতে যা রেজাল্ট করেছিল, জাস্ট ভাবা যায় না! জয়েন্ট দিয়ে টিআইআইতে চান্স পেয়ে চলে গেল খড়দাসেখান থেকে পাস করে বীজপুর থেকে এমটেক করল। বাচ্চুদার দুতিনজন বন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ আছে। তারা ছুটিতে বার তিনেক বাচ্চুদার বাড়ি এসেছিল, সেই সময়েই পরিচয়। তাদের কাছে শুনেছি, ক্যাম্পাসিংয়ে পাঁচখানা বাঘা কোম্পানি বাচ্চুদাকে সিলেক্ট করেছিল। তার মধ্যে দুটো ইউএসএ, একটা জার্মানি! সে সব ছেড়ে আমাদের গোবিন্দপুরেই বাচ্চুদা ফিরে এল! কাকিমাকে ফিরে এসে নাকি বলেছিল, যতই মাইনে, গাড়িবাড়ি দিক মা, চাকরি মানে চাকরই! ও আমার পোষাবে না! আমিও কাজ করবো, কিন্তু সে নিজের আনন্দে। নিজের ব্যবসার স্বার্থে কেউ আমার ইচ্ছের ওপর দুরমুশ চালাবে, সেটি হতে দিচ্ছি না। গোবিন্দপুরের লোকজন তার পর থেকেই বাচ্চুদাকে আড়ালে বলে, খ্যাপাটে, ছিটিয়াল, আলসে।

তবে একথাও সত্যি, বাচ্চুদার পক্ষে এই ডিসিশান নেওয়া সহজ হয়েছিল, বাচ্চুদার পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পত্তির সাপোর্ট ছিল বলে। বাচ্চুদা নিজেই বলে, আমাদের যা আছে, ভদ্রভাবে চললে ছ সাত পুরুষ আরামসে চালিয়ে দেওয়া যাবে! কাজেই দুটো টাকা কামানোর জন্যে খামোখা দৌড়োদৌড়ি করার কোন মানে হয়? এক পুকুর জলে, দশবিশ বালতি জল ঢেলে খুব কিছু লাভ হবে কী?  বাচ্চুদা যাই বলুক, কাকা, কাকিমা এবং আমরাও ফিল করি, বিদেশে চাকরি করলে বাচ্চুদার চালচলন, ঠাটবাট হয়ে একজন কেউকেটা হতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে বাচ্চুদা আমাদের একজন হয়েই রয়ে গেল!

 

চার 

কাকিমা কফি নিয়ে ঘরে এলেন, সুজির খালি বাটি নিয়ে চলেও গেলেন। কথা বললেন না কোন, এখনো রেগে আছেন। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বাচ্চুদা বলল, “কালকের ব্যাপারটার জন্যে আমি খুব সরি রে। বাদলদার যে তর সইবে না! গতকাল তোর ট্রেন ধরানোর জন্যে ওরকম ঝুঁকি নিয়ে নেবে, বুঝিনি।”

“আরে না না, আমার কলকাতার কাজটাও তো মিটে গেছে, বাদলদা ট্রেনটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু অত স্পিডে রিকশটা ওড়াল কী করে, সেটা বোঝাও তো।”

বাইরে থেকে এই সময় কেউ একজন ডাকল, “এইটাই কোমলাক্ষবাবুর বাড়ি হল কী?” আমরা দুজনেই বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, নাদুসনুদুস একজন ভদ্রলোক, সঙ্গে একজন টিকটিকির মতো লোককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিকটিকির হাতে একটা ব্রিফ কেস, আর  নাদুসনুদুস লোকটি আট আঙুলে দশ আংটি পরা দু হাত তুলে নমস্কার করল

বাচ্চুদা বলল, “নমস্কার, আমিই কমলাক্ষ বক্সি। আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।”

“আরে ছো ছো হামাকে চিনবেন কী কোরে? আমি তো এমন কিছু ফেমুস হল না! হামার নাম সুরযরাম মিনা”

আমরা সবাই ঘরে এসে বসার পর বাচ্চুদা বলল, “তা সুরযবাবু, হঠাৎ আমার কাছে, কী ব্যাপার বলুন তো?”

“বলবো বোলেই তো আসলাম, দাদা। তার আগে হামার পোরিচোয়ভি জেনে লিন। হামাদের এখানে তিশপয়তিশ সাল হয়ে গেলো। হামার দাদা, মানে গ্র্যাণ্ডফাদার, রাজস্থানসে ইখানে এসে বেওসা শুরু করল। হামার পিতাজী সেই বেওসামে বহুত তরক্কি আনল। ইখন হামাদের জিতনা কারোবার সোব হামি সামলাই। দাদাজী বহুদিন গুজরে গেল। পিতাজী আভি ভি বিজিনেস দেখেন, কিন্তু যো কুছ ডসিশন সো হামিই লিয়ে থাকি। ইখন হামি এসেছি আপনার সঙ্গে একটা বিজিনেস ডিল ফাইন্যাল করতে।”

বাচ্চুদা আকাশ থেকে পড়ল, “কিন্তু আমি তো কোন বিজনেস করি না, সুরযবাবু। আমার দাদু, বাবাও কখনো কোন বিজনেস করেননি”!

“সোতো হামি জানে, কোমোল বাবু। বাঙ্গালীরা লিখাপড়া কোরে, বাঙ্গালীরা ইনটেলিজেন হোয় টাগোর আছেন। সোত্তোজিত রে আছেন। কিন্তু বাঙ্গালীরা বিজিনেস পোছোন্দ কোরলো না। হামি বিজিনেসভি করি, গুণের কদরভি কোরি। হামি টাগোর পড়িয়েছে, রের ফিলম্‌ভি দেখিয়েছে। আপনার মারভিলাস ইনভেনসনভি দেখল। এ যোগেন্দর্, ব্রিফকেস দেকে তু বাহার রুক”সূরযবাবু শেষ কথাটা বলল টিকটিকির মতো সেই লোকটাকে। বাচ্চুদার সঙ্গে যতক্ষণ কথা বলছিল, কি নরম আর মোলায়েম গলা, কিন্তু টিকটিকির মতো দেখতে যোগেন্দরকে যখন বলল, গলা কর্কশ হয়ে উঠল। যোগেন্দর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই, সূরযবাবু ব্রিফকেস খুলে বাচ্চুদার দিকে ঘুরিয়ে ধরল, বলল, “ইখানে দোশলাখ আছে, কোমোলবাবু। আপনার ইনভেনশনটা হামার চাই। না বোলবেন না।”

“তার মানে? কিসের কথা বলছেন বলুন তো?”

“হামি সোব জানে কোমোলবাবু। বাদলদাদার রিকশ জানে। আপনার এই ব্রাদার লাস্ট নাইটে হামাদের স্টিশনে ট্রেন ফেল কোরে নেক্সট স্টিশনে গিয়ে সেই ট্রেনে বোর্ড কোরে নিলো। সোব জানে!”

বাচ্চুদা আরো অবাক হয়ে বলল, “গজুর ট্রেন ধরার সঙ্গে আপনার আমাকে টাকা দেওয়ার কী সম্পর্ক?”

“হামি ওই রিকশর ফেকটোরি বানাবে। আপনি হামার লোককে সোব শিখিয়ে দিবেন।”

“আচ্ছা, এবার বুঝেছি। কিন্তু আপনি এতসব কী করে জানলেন?”

“ইটা আপনি কী করে বোললেন, কোমোলবাবু? আপনি টিআইআই থেকে বিলিরিয়ান্ট রেজাল্ট করলেন, অচ্ছা অচ্ছা নোকরি মিলল, ফিরভি কোরলেন না, বাড়িতে বোসে গেলেন! বাড়িতে আপনি চুপচাপ বোসে থাকবেন? কুছু কোরবেন না? আপনার বেরেনটা আইডিয়াল হইয়ে থাকবে? আপনি বাদলদাদার রিকশ লিয়ে খুটখুট কামে লাগলো। সে কাম সকসেস ভি হোলো। ই খবোর হামি না রাখলে বিজিনেস চালাবো কী করে বোলেন তো?”

“কিন্তু, এ রিকশ কমার্শিয়ালি চালাবার আগে প্রশাসনের অনুমতি লাগবে, পারমিট বের করতে হবে।”

“ওসোব কুছু না। পেপার-উপার, পারমিট-উরমিট সূরযরামের বাঁয়া হাত কা খেল হ্যায়, দাদা। উসব লেকে আপ বেফিকর রহিয়ে। মশাডিহিমে হামার একটা শেড হোলো, ওখানে একদিন আপনাকে লিয়ে যাব। আপনি যেমন বোলবেন, সোব কিছু বানিয়ে লিব। এক-দো মাহিনার অন্দর প্রাডাকশনভি চালু কোরে দেবো।”

বাচ্চুদা কিছু বলল না, চিন্তা করতে লাগল। সূরযবাবু আবার বলল, “আপনি কুছু চিন্তা কোরবেন না, দাদা। দোশলাখ এখোন দিয়েছি। আপনি টাইম লিন, চিন্তা করে বলুন, আপনার কোতো লাগবে। আমি আরো দেবে। আজ বুধবার, নেক্সট সোমবার হামি আবার আসবে। সেইদিন ডিলটা ফাইন্যাল করে লিবে। আমাদের মধ্যে লিখাপড়া যো করার সোব কোরে লিবে। হাঁ, লেকিন একবাত জরুর সোচে লিন, আপনার এহি নয়া রিকশর নাম কী হোবে? ঠিক আছে দাদা, আপনাকে আর বিরক্ত করবো না। আমি এখন চলি। সোমবার হামি আসবে।”

সূরযরাম চলে যেতে আমি লাফিয়ে উঠলাম, “বাচ্চুদা কী করেছো, বাদলদার রিকশ বানিয়ে দশ লাখ!”

“একটি গাঁট্টা খাবি খটাস্ করে। বাদলদার রিকশ? ওটার পেছনে কত দিমাগ আর খাটনি গেছে তুই জানিস? তুই তো ভেবেছিলি, বাদলদার ভূতের পাল্লায় পড়েছিস! মাটি থেকে মোটামুটি কুড়ি মিটার ওপরে রেখে, ওই স্পিডে রিকশ চালানো ছেলেখেলা নয় রে, গজু

“সে তো নয়ই, তা নাহলে সূরয টাকা ঢালতে আসে?”

“দশ লাখ ক্যাশ দিয়ে গেল, কোন রিসিট নিল না। টাকা পয়সা ওর কাছে খোলামকুচি, সেটা কী বুঝতে পারছিস?”

“টাকাটা নিয়ে কী করবে বাচ্চুদা?”

“ভাবছি বাচ্চাদের জন্যে একটা স্কুল খুলবো। ওই “অএ অজগর আসছে তেড়ে” কিংবা “এ ফর অ্যাপল্” টাইপের নয়। আর বাচ্চারাও কোন বড়লোকের বাচ্চা নয়! যাদের জন্ম থেকেই বাবা-মায়েরা, ডাক্তার বা ইঞ্জিনীয়ার বানানোর জন্যে ঘোড়ার মতো দৌড় করায়!”

“সে আবার কেমন স্কুল গো, বাচ্চুদা!”

“সে তুই বুঝবি না। আমার মাথায় আছে। বেশি লেখাপড়া না শিখলেও চলবে, কিন্তু হাতের কাজ শিখতে হবে। যে যেরকম কাজ করে আনন্দ পাবে, সেই কাজই শিখবে। দাঁড়া মাকে টাকা কটা দিয়ে আসি। সাবধানে রেখে দিক।”

 

রাত্রে হাঁসের ডিমের ডালনা দিয়ে পরোটা খেতে খেতে বাচ্চুদাকে জিগ্যেস করলাম, “তোমার ওই বুলেট রিকশর টেকনোলজিটা কী গো?”

পরোটা মুখে নিয়ে বাচ্চুদা বলল, “বাঃ, বুলেট রিকশ নামটা বেড়ে দিয়েছিস তো! নামটা রেখে দিলাম। এর থেকে ভালো নাম মাথায় না এলে বুলেট রিকশই হয়ে যাবে। টেকনোলজির কথা জিগ্যেস করছিলি, সবটা তো আর খুলে বলা যাবে না। তাহলে তো সবাই বানাতে লেগে যাবে! কয়েকটা সমস্যার কথা মাথায় রেখে সেগুলোর সহজ সমাধানের চেষ্টা করেছিযেমন ধর, মাটি থেকে, রিকশর ওজন, কিছু ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে দুই যাত্রী, প্লাস যে চালাবে, অন্ততঃ আড়াইশ-তিনশ কিলো ওজন, মিটার কুড়ি পঁচিশ ওপরে তুলতে হবে। সেটার জন্যে জোরোলো কিন্তু হাল্কাপ্রপেলার, ইঞ্জিন এসব লাগবে। ইঞ্জিন চলবে কিসে? পাওয়ার লাগবে! হাল্কা ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, প্লাস রিকশর প্যডেল ঘুরিয়ে সেই পাওয়ার জেনারেট করতে হবে। এবার ওপরে উঠে গিয়ে সামনে চলবে কেন? তার জন্যেও টারবো ফ্যান, জেট ইঞ্জিন লাগবে। সেগুলো চালাতেও পাওয়ার চাইব্যাপারগুলো এমন কিছু কঠিন নয়, বরং বেশ সহজ! ইঞ্জিনিয়াররা সবই জানে, কিন্তু অধিকাংশই বাঁধা গতের বাইরে চিন্তাই করে না”

কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে গরম পরোটা দিতে দিতে জিগ্যেস করলেন, “বাদলের রিকশ নিয়ে কী কদিন খুটখুট করলি, তারই দাম হয়ে গেল দশ লাখ! আজকাল টাকা পয়সা এত সস্তা হয়ে গেল, না কি রে?”

বাচ্চুদা হেসে কাকিমাকে বলল, “ওটা এখন বাদলের রিকশ নয় মা, বুলেট রিকশ – গজু নাম দিয়েছে!”

কাকিমা খুব অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, “সে কী রে? বাদল এই বয়সে, তার নাম বদলে নিল? তাও আবার বুলেট? ওর মা জানে?”

বাচ্চুদা বলল, “ওঃ, মা, তুমি না...বাদলদার নাম বুলেট হতে যাবে কেন? আমি যে রিকশর মডেলটা আবিষ্কার করেছি, গজু তার নাম রেখেছে, “বুলেট রিকশ”।

“হ্যাঁ কাকিমা, রিকশটা কাল আমাকে একদম বুলেটের মতো, ঝিঙেরদ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল, বলেই না, ট্রেনটা ধরতে পারলাম!”

কাকিমা মুচকি হাসলেন, বললেন, “তুই যে কাজের ছেলে হয়ে গেলি, বাচ্চু? একেবারে আবিষ্কর্তা হয়ে গেলি? শোন, কাল তোর ওই রিকশতে আমায় কালীবাড়ি নিয়ে যাবি, আমি মায়ের পুজো দেবো। তোর বাবাও বলছিল, আমার সঙ্গে যাবে”

“বাবাকে বলেছো? বাবা কী বললেন?”

“তোর বাবা বলল, আমি জানতাম বাচ্চুটা এমন কিছু একটা করে সবাইকে চমকে দেবে! আমাদের খুব খারাপ লাগতো রে, তোকে নিয়ে পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়পরিজন বড্ডো হাসাহাসি করত। এতদিনে আমাদের মনে শান্তি হল, বাবা”

তারপর লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাকিমা আমাদের পাতে আরেকটা করে হাঁসের ডিম দিলেন। আমি খুব একটা আপত্তি করলাম না, এমন আনন্দের দিনে হাসতে হাসতে একটার বেশী হাঁসের ডিম খাওয়াই যায়।

 -০০-

 গল্পটি আমার "এককুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত -


বইটি ঘরে বসে সংগ্রহ করতে ইচ্ছে হলে এই সূত্রে যোগাযোগ করবেন  

EK KURI KISHOR

                                        

নতুন পোস্টগুলি

মাথার পোকা

স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - "  লিটিং লিং - পর্ব ১  " এর আগের পর্ব - "  পরিবর্তিনি সংসারে...  "   ১ ‘স্‌স্‌স্‌স্‌শি...