বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " তারকা "


মালতী কাল সারারাত একদমই ঘুমোতে পারেনি,  অসহ্য বেদনায় তার শরীর টনটন করছে এখনওকিন্তু তাও সকাল থেকেই পাড়ায় হৈচৈ শুনে সে বাইরে এসে দাঁড়ালতার কোলে কেঁদে ককিয়ে চলেছে দেড়মাসের মেয়েটা, নাম ফুলকি। ওর বাপেরই দেওয়া সোহাগী নাম। মুখ ফুটে কিছুই তো বলতে পারে না, কিন্তু কাঁদে। খুব খিদে পায় নিশ্চ, বড্ডো কাঁদে।

দিনের পর দিন অভুক্ত শরীরে দুধই বা মালতী পায় কোথায়? কতদিন – কতদিন সে পেট পুরে খেতেই পায় না। একমুঠি শুকনো চিঁড়ে কিংবা দু’মুঠি মুড়ি চিবিয়ে কর্পোরেশনের কল থেকে বিনাপয়সার জল ভরে নেয় তার উদরের গহ্বরে। গত দিন দশেক এমনই চলছে। এই খাদ্যে কতখানি পুষ্টি সঞ্চিত হবে, তার জীর্ণ-শীর্ণ শরীরে সে জানে না। সে জানে না, তার শরীরের কতটা পুষ্টি হলে তার দুই স্তনে সঞ্চারিত হতে পারে, তার কন্যার জীবন সুধা। তবু সে চেষ্টা করে বারবার। খুব কান্নাকাটি করলে ফুলকির ঠোঁটে তুলে দেয় তার শুকনো স্তনের বোঁটা – কিছুক্ষণ চুষে মেয়ে আবার কান্না জোড়ে। তখন তুলে দেয় অন্য স্তন। মায়ের এই ফাঁকিটা ঠিক ধরেও ফেলে একরত্তি ওই প্রাণ – সে নীরস দুই স্তনের আশা ছেড়ে আবার কাঁদতে শুরু করে। যে কান্না যেন শুধু ক্ষিদের জ্বালায় নয়, তার প্রতি তার মায়ের প্রতারণার প্রতিবাদেও হয়তো বা।

অসহায় মালতী মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলায়, ভোলায়, কাতুকুতু দেয় – ক্ষণিকের জন্যে হলেও এক আধবার ফুলকি হাসে খল খল করেমেয়ের সেই হাসি দেখতে দেখতে চোখে জল আসে মালতীর, তার নির্দুধ বুকের মধ্যেও জমে ওঠে কান্না। অভুক্ত ফুলকি আবারও কাঁদে।

কাল সকালেই মালতীর লুকোনো শেষ টাকাগুলোও হাত মুচড়ে নিয়ে গিয়েছিল নোটন। কোথায় বড়ো কাজের সন্ধান পেয়েছে – অনেকটা দূর যেতে হবে – বাসভাড়া লাগবে। কথা দিয়েছিল বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবে, চাল কিনে আনবে, রান্না হবে। আসেনি। বিকেল গেল, সাঁঝ গড়িয়ে, রাত এল। নোটন যখন ঘরে ঢুকল – বাবুদের টিভির সিরিয়ালে সালংকারা, সুবেশা সুন্দরী নায়িকাদের এবং ঝকঝকে সুন্দর সুপুরুষ নায়কদের     যাবতীয় প্রেম-প্রীতি, হিংসা-দ্বেষ, খলতা-ভালোমানুষীর স্থগিত হয়ে গেছে। বাবুরা অধীর আগ্রহে আজ সারারাত অপেক্ষায় থাকবে আগামীকাল কী হবে? প্রেমের জয় হবে? নাকি হিংস্রতা গ্রাস করবে ভালোমানুষীকে? হয়তো সেই ভাবনায় বিঘ্নিত হবে বাবুদের নিশ্চিন্ত ঘুম।  

ঠিক তখনই মালতীর ঘরে চলছে অন্য দৃশ্য। প্রচণ্ড খিদেয় ঝিম ঝিম করা মালতীর মাথায় আগুন ধরে গেল নোটনকে দেখে নোটনের ধরন ধারণ দেখে। হাতে চাল নেই। চুলো নেই, বাবু এত রাতে এসেছে এক পেট মদ গিলে! সারা গায়ে তার উৎকট নেশার গন্ধ।

দাঁতে দাঁত চেপে, খসখসে গলায় মালতী বলল, চাল কোতায়?

কিয়ের চাল? তোর বাপের চালের আড়ত আচে নাকি, যে যাবো আর নে আসব?

আমার টাকা ফেরত দে তবে!

কিয়ের টাকা?

সকালে আমার থেকে টাকা লে গেলি, বললি চাল আনবি।

সে টাকা কি আর আচে নাকি, কবে খরচ হয়ে গেচে।

কোতায় খরচা হল শুনি, মদের ঠেকে? ঘরে মেয়ে আছে, মাগ আছে মনে পড়ে না? তারা পেট শুকিয়ে ঘরে পড়ে আছে, কি খাবে মনে পড়ে না বুজি?

অ্যাই শ্যালা, মেলা জ্ঞান ঝাড়বি না তো। সারাদিন তেতেপুড়ে ঘরে ফিরেচি, তাড়াতাড়ি করে ভাত দে – বহোত খিদে পেয়েচে।

কেন মদ গিলে পেট ভরেনি আবার ভাতও চাই – তোর বাপের বুজি ভাতের হোটেল খোলা আছে, আমি যাব আর নে আসব?

তুই আমার বাপ তুললি রে, হারামজাদি মাগি – এতবড়ো তোর আস্পদ্দা...?

নোটনের বিশাল চড়ে মালতী চোখে অন্ধকার দেখল। মেয়েকে কোলে নিয়েই পড়ে গেল ঘরের মেঝেয়। তাতেও পরিত্রাণ নেই – কোমরে পেটে বারবার লাথি মারতে লাগল নোটন। দেয়ালে পিঠ চেপে উঠে বসে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল মালতী, পারল না। চোখের নীচে প্রচণ্ড এক ঘুঁষিতে সে শুয়েই পড়ল। জ্ঞান হারাল বোধ হয়। না জ্ঞান হারায়নি, কারণ এর পরেও সে নোটনের কথা শুনতে পাচ্ছিল – মরে গেলি নাকি, শালী। চুলোয় যা। জাহান্নমে যা, শ্যালো সংসারে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি। বলতে বলতে নোটনও মেঝেয় শুয়ে পড়ল। নোটনের তেজ স্তিমিত হতে থাকল ধীরে ধীরে – এক একবার সে কথা বলে উঠছিল – শ্যালো কোতাও একটু শান্তি নেই মাইরি...। শেষমেষ ঘুমিয়েই পড়ল - মদের নেশায় আর আকস্মিক উত্তেজনার প্রশমনে।

 ও বাসন্তীদি সকাল সকাল কোতায় চললে গো, দরজা থেকেই জিগ্যেস করল মালতী।

অ মা, তুই কি লা? কিচুই জানিস না। কাল বিকেলে ঠিকেদার আলি এসেচিল পাড়ায় – আজকে ঢালাই হবে যে। তিনতলার বিশাল ছাদ। সকাল থেকে চালু – সেই সন্দে অব্দি চলবে – দেড়শ টাকা হাজ্‌রি আর দুপুরে মাংসের ঝোল ভাত। আমাদের পাড়ার মেয়েরা সবাই যাচ্চে

 দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌...দুপুরে মাংস ভাত?

 মালতীর চোখের নীচে কালশিটের দাগ, কণ্ঠার হাড় বের করা শীর্ণ শরীরের কোথাও একবিন্দুও শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তার কোলে একঘেয়ে কেঁদে চলা দেড়মাসের মেয়ে কিন্তু দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌ আর দুপুরে মাংস ভাত? এই সংবাদ মালতীর শরীরের কোষে কোষে তীব্র শিহরণ সঞ্চার করল। এতটুকুও দ্বিধা করল না মালতী। শুধু একবার পিছন ফিরে দেখল নেশার ঘোরে তখনও ঘুমোচ্ছে নোটন। তার হাঁ করা মুখে ভন ভন করছে দু তিনটে মাছি। দরজাটা চেপে দিয়ে মালতী রওনা হল বাসন্তীদির সঙ্গে।

 

 

ছ’থাক সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠতেই মালতীর হাঁফ ধরে গেল বুকে। বাপরে কি উঁচু! এর পাশেই আরেকখানা বাড়ি বানানো চলছে সেটা গুনে দেখল সাততলা। তার পরেও কাজ চলছে। বাপরে এতো উঁচুতে মানুষগুলো যে থাকে, ভয় করে না? সিঁড়ি ভেঙে ওঠে কী করে মানুষগুলো? মালতী আরও অবাক হল কত যে পুরুষ ও মেয়ে নানান কাজে হাত লাগিয়েছে! ওই দেড়শটা টাকা আর মাংসভাতের আকাঙ্ক্ষায়!

নতুন পরিবেশ, অচেনা জায়গা, অনেক লোকজন দেখে মেয়েটা একটু চুপ করেছিল – কিন্তু একটু জিরিয়ে নেবার সময় দিল না মালতীকে, আবার কান্না শুরু করলমেয়েটা শুধু কাঁদেই এখন। চোখ থেকে একবিন্দুও জল গড়ায় না আর। মুখে শুধু আওয়াজ করে অ্যা অ্যা ...কর্কশ আওয়াজ।

 

বাসন্তীদি ঠিকাদার আলির কাছে নিয়ে গেল মালতীকে, বলল – ও আলি ভাই, এই লাও এই মেয়েটাও কাজ করবে...।

আলি মিয়ার মুখ ভর্তি গুটখার লালা। আকাশপানে মুখ তুলে কী যে বলল – ঠাহর করা গেল না। বাসন্তীদি বললে, আ মোলো যা, মুখের ওই কাচড়া ফেলো দিকি, কি যে কতা বলো বো বো বো করে - কিচুই বোঝা যায় না।

আলি মিয়া মুখের ভেতর জমানো, বালতি খানেক লালা উগরে দিয়ে খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসলে। তারপর খুব রসিক চোখে বাসন্তীদির দিকে তাকিয়ে, মিচকে হেসে বললে, কি কতা শুনবি রে, বাসন্তী – মনের কতা না প্রাণের কতা?

মরণ আর কি, কত ঢং...লাও, লাও ওর সংগে কতা কয়ে লাও।

আলি মিয়া এবার চোখ ফেরাল মালতীর দিকে। হাড়গিলের মতো শুঁটকে চেহারা। বগলে আবার একখান ভূতের মতো ছানা। মাথাটা হেঁড়ে। পেটটা ড্যাগরা। হাত পা গুলো কাটি কাটি। সেই থেকে নাগাড়ে ককিয়ে চলেছে কাগের ছানার মতো। দেখেই আলি মিয়ার মেজাজটা বিগড়ে গেল। এ দিয়ে তার কোন কাজই চলবে না। ও পারবেই না মাথায় ঢালাইয়ের তাগাড়ি বইতে দু তাগাড়ি মাল তুলেই হ্যা হ্যা করে হাঁপাবে।

ওর মধ্যে আর জোয়ানি নেই রে, বাসন্তী।

বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ বন্ধ করে আবার খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসল।

সে না পারুক, অন্য কত কাজ তো রয়েছে, ও মিয়া। লাগিয়ে দাও না কিচু একটাতে।

আলি উঠে দাঁড়াল – জোর হাঁক পাড়ল – সকলের উদ্দেশে, সাতটা বেজে গেচে কখন, একনো সব গুলতানি করছিস, গুয়োর ব্যাটারা? কখন শুরু হবে রে ঢালাই? এই কাশেম বেলচা ধর – বাসন্তী তোর মেয়েছেলেদের বল তাগাড়ি ধরতে।

 

উইঞ্চ মেসিনে গুড় গুড় করে উঠে আসছে ঢালাই। রডের জালির ওপর কাঠের তক্তা পেতে প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে দু জায়গায়। উইঞ্চ থেকে তরল ঢালাই হড়হড় করে নেমে আসছে প্ল্যাটফর্মে। দুপাশে বেলচা ধরে আছে দুটো লোক। এক তাগাড়িতে এক বেলচা মাল তুলে দিচ্ছে, আর সেটা মাথায় নিয়ে মেয়েগুলো চলে যাচ্ছে ছাদের অন্য প্রান্তে। ঝড়াস করে ঢেলে তাগাড়ি খালি করে দিচ্ছে ঠিক জায়গায়। ও প্রান্তে আছে মিস্তিরি – সে দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় কখন ঢালতে হবে – এই কাজ। কিছুই না। এক ঘেয়ে। এক টানা। পিঁপড়ের সারির মতো অবিরাম বয়ে চলা ঢালাই ভরা তাগাড়ি। এক সারি চলছে তাগাড়ি ভরা ঢালাই নিয়ে, আরেক সারি খালি তাগাড়ি নিয়ে আসছে ঢালাই ভরে নেওয়ার জন্যে। পায়ের তলায় রডের জালি, তার ওপর দিয়ে চপ্পল পায়ে হাঁটাটাই যা একটু শক্ত। জালি গুলো হাঁটার সময় বসে যায়। জালির ফাঁকে পা আটকে গেলে তাগাড়ি সমেত মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মালতী। মেয়েকে কোলে নিয়ে মালতী দাঁড়িয়েই ছিল, তাকে আলি মিয়া হ্যাঁ ও বলে নি, না ও বলে নি। বাসন্তীদি কাজে লাগার আগে বলে গেছে দাঁড়াতে – একটা কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 শুরুটা করতে যা একটু ঝকমারি, শুরু হয়ে গেলে ঠিক চলতে থাকে। আধা ঘন্টার মধ্যেই ঢালাইয়ের প্রক্রিয়া চলে এল বাঁধা ধরা ছন্দে, নিশ্চিন্ত মনে একধারে এসে দাঁড়াল আলি মিয়া – এক প্যাকেট গুটখা আর সঙ্গে জর্দার একটা প্যাকেট উপুড় করে দিল মুখের ভেতর – তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল – কাজের ধরনধারণ। মালতী পায়ে পায়ে আলি মিয়ার কাছে গেল। কিচু কাজ দেন না, অ বাবু?

আলি মিয়া এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল, মালতীকে দেখে মনে পড়ল – কি কাজ তরে দি বল দিকি। এক কাজ কর নীচে যা আজ সব মিলে শ’ দেড়েক লোক খাবে তাদের রান্নার যোগাড়ে তুই যা। ধোয়া মোচা। বাঁটা বাঁটি, কাটা কুটি – পারবি তো? রশিদ আছে তারে গিয়ে বল – আমি পেটিয়েচি। সে দেকিয়ে দেবে।

কত দেবে বাবু?

অ্যাঃ কত আর দেব তোকে – পঞ্চাশ দেব যাঃ, আর দুপুরের খাওয়া...যাঃ।

 মালতী নীচে নেমে এলরশিদকে খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হল না। মোবাইলে বলেই দিয়েছিল আলি মিয়া। রশিদ তাকে বসিয়ে দিল আলু পেঁয়াজ আদা রসুন ছাড়ানোর কাজে। দুটো উনোন জ্বলছে দাউদাউ করে, বিশাল হাঁড়িতে ভাত চড়ে গেছে। ভাতের গন্ধ নাকে আসতেই অদ্ভূত চনমন করে উঠল মালতীর শরীর কি সুবাস ভাতফোটার গন্ধে, সে আবেশে মালতীর নেশা হয়ে আসছিল যেন। সে বঁটি নিয়ে বসে পড়ল আলুর বস্তার সামনে। মেয়েটা এখন আর কাঁদছে না, কাঁদতে কাঁদতে সেও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলেই। অভুক্ত, অপুষ্ট শিশুর শরীরে কান্নার মতো শক্তিও এখন আর অবশিষ্ট নেই।

 সাড়ে বারোটার মধ্যে রান্না হয়ে গেল। বিশাল গামলা ভরা দেড়শ লোকের জন্যে সাত কিলো মাংসের টকটকে লাল ঝোল। বড়ো বড়ো আলুর টুকরো। মাংস দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে – তলার দিকে। এক এক দল আসছে, খেয়ে চলে যাচ্ছে, আরেক দল আসছে। ঢালাই বন্ধ হবার নয়। দেড়টা নাগাদ রশিদ বলল – যা ঐ থালটা নিয়ে আয় – তুইও খেয়ে নে মালতী।

কানা উঁচু বড়ো থালা ভর্তি ভাত আর তার মাঝখানে অনেক - অনেকটা ঝোল, তিন পিস আলু আর এক কুচি মাংস নিয়ে একধারে বসল মালতী। মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু মেয়েটা কাঁদছিল না, কোলে শুয়ে টালুক-টালুক চোখ মেলে দেখছিল মাকে। গরম ভাতের মধ্যে আলুগুলো ভেঙে মাখতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা লাগল মালতীর – আউ করে উঠল একবার। মায়ের মুখে অদ্ভূত আওয়াজ শুনে খল খল করে হেসে উঠল শিশু। সামনে ক্ষুধার লোভনীয় অন্ন, কোলে শুয়ে থাকা সন্তানের হাসি। মালতী ভুলেই গেল গত কাল ঘটে যাওয়া সমস্ত দিন ও রাত্রের গ্লানি। বড়ো এক গ্রাস মাখাভাত মুখে তুলল মালতী, জিভ থেকে সমস্ত শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভূত তৃপ্তির সমাচার। মায়ের খাওয়া দেখতে দেখতে শিশু কী বুঝল কে জানে, আবার কান্না জুড়ল।

 মালতীর মনে হল ফুলকিও চাইছে, দুটো ভাত থেতে। খেতে পারবে কি ওইটুকু শিশু? মাত্র দেড় মাস বয়েস! মালতী জানে তার স্তনে এক বিন্দু দুধও জমা হয়নি। তার উদরপূর্তির পর কতক্ষণে ভরে উঠতে পারে তার দুই স্তন, সে জানে না। নাকি বিকেলে আলি মিয়া তাকে যে পঞ্চাশটাকা দেবে, সেই টাকাতে দুধ কিনে দেবে? ততক্ষণ অভুক্ত থাকবে তার সন্তান? মাথা ঝাঁকিয়ে মাথা দুলিয়ে মালতী তার মেয়েকে জিগ্যেস করল - তুই ভাত খাবি, সোনা, ভাত খাবি? খেতে পারবি?

 মালতী ভাতের একটা দানা আঙুলে ভেঙে ফুলকির কচি ঠোঁটে ঠেকালো, ছোট্ট জিভ দিয়ে মুখের ভেতর টেনে নিল মেয়েটা। মুখটা সামান্য বিকৃত করে মুখ নাড়াতে লাগল মেয়েটা। কী বুঝল কে জানে, আবার তাকাল মায়ের মুখের দিকে। মালতী বেশ মজা পেল। মালতী নিজেও গ্রাস তুলতে লাগল, আর এক এক দানা ভাত তুলে দিতে লাগল মেয়ের মুখে। মেয়ের কৃতিত্বে খুশি মালতী এবার আলু দিয়ে মাখা চার-পাঁচটা ভাতের দানার একটা গ্রাস তুলে দিল মেয়ের মুখে। বেচারা ফুলকি এবার আর পারল না। বিষম খেল, শ্বাসনালীতে বিশ্রীভাবে আটকে গেল খাবারের দলা। মালতী প্রথমটা বোঝেনি। মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সে গ্রাস তুলছিল নিজের মুখে। যখন বুঝল, ততক্ষণে ফুলকির শ্বাসরুদ্ধ! মেয়ের যে চোখের মায়ায় মালতীর অন্তর মাতৃত্বে ভরে উঠত, সে চোখ বিস্ফারিত স্থির! শীর্ণ দুই হাত আর পা ছটফট করছে অব্যক্ত যন্ত্রণায়!

 ফুলি, অ ফুলি, কি হয়েছে মা? কি হয়েছে? এই তো আমি। হাহাকার করে উঠল মালতী। ফুলির পিঠ বার বার চাপড়ে দিতে দিতে মালতী ভুলেই গেল তার নিজের খাবার কথা। মালতীর আশেপাশে জড়ো হতে থাকল লোকজন। কেউ একজন বলল – ঐটুকু দুধের বাচ্চাকে ভাত খাওয়াচ্ছিল, আমি নিজের চোখে দেকেচি, তখনই জানি কিচু একটা অঘটন ঘটবে। ঐটুকু বাচ্চাকে কেউ ভাত খাওয়ায় – মা, না ডাইনী? আরেকজন বলল – ওরে ডাক্তারের কাচে নে যাও।

ভিড়ের থেকে রশিদ টেনে বের করে আনল বাচ্চা সমেত মালতীকে। চল ডাক্তারের কাছে চল।

 

 

রিকশা নিয়ে মালতীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল রশিদ। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললে্ন বাচ্চা মারা গেছে অনেকক্ষণ। এ তো পুলিশ কেস। কী করে হল? কেন হল? বাচ্চার পোস্টমর্টেম করতে হবে। হাসপাতাল থেকে পুলিশে খবর দেওয়া হল নিয়মমাফিক। এতক্ষণ রশিদ ছিল পাশে, মালতীর যেন ভরসা ছিল। পুলিশের নাম শুনে রশিদ সরে পড়ল পুলিশ এল। জেরা করে মালতীর থেকে জেনে নিল সমস্ত ঘটনা। দণ্ডবিধানে মালতীর নামে কেস তৈরি হয়ে গেল, মালতী শিশু হত্যার অপরাধে অপরাধী! মালতীকে নিয়ে যাওয়া হল থানার লক আপে। মালতীর মেয়ে ফুলকির ছোট্ট শরীরটা চলে গেল পোস্টমর্টেমের জন্য। ফুলকির ছোট্ট দুর্বল অপুষ্ট শরীরটা কেটেকুটে তার শীর্ণ শ্বাসনালীতে খুঁজে পাওয়া যাবে তার মৃত্যুর কারণ – কি নিষ্ঠুরভাবেই না তার মুখে তুলে দেওয়া হয়েছিল ক্ষুধার অন্ন! নিজের গর্ভের সন্তানের প্রতি কোন মা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে?    অন্ধ আইনের প্রবল ধারার প্রয়োগে বানানো হবে অমোঘ রিপোর্ট। সেই রিপোর্ট থেকে স্থির সিদ্ধান্তে গড়ে নেওয়া যাবে, তার অপরাধী মায়ের চরম নিষ্ঠুরতার কাহিনীকোন ফাঁক থাকবে না তার স্তন্যদায়িনী ডাইনী মায়ের গণতান্ত্রিক শাস্তিবিধানে! 

 

কেসটার নির্বিঘ্নে নিষ্পত্তি হয়ে গেল নিম্ন আদালতে। খুব সহজ সরল শুনানির শেষে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন মাননীয় বিচারক।

 

কারাগারে মালতীর পরনে এখন পরিচ্ছন্ন বস্ত্র। সে এখন নিয়মিত তিনবেলা খেতে পায়সকালে জলখাবার। দুপুরে ডাল ভাত তরকারি। রাত্রে রুটি ডাল সব্জি। হপ্তায় দুয়েকদিন মাছ ডিমও তার বরাদ্দ। তার শরীরে এখন পুষ্টি, তার দুই স্তনেও এখন সদা সঞ্চিত সন্তানের পুষ্টি! ফুলকির কচি অধরে তার স্তনবৃন্ত তুলে না দিতে পারার যন্ত্রণায় সে এখন ছটফট করে নিজের হাতে মাতৃধারায় সিক্ত করে তোলে কারাগার কক্ষের নিভৃত দেওয়াল। মালতী অন্ধকার ঘরের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় সেই চোখদুটি – যে চোখের টালুক-টালুক দৃষ্টিতে চোখ রেখে সে খুঁজে পেত মাতৃত্বের তৃপ্তি!

 -০০-

      

                    

         

          


মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫  


২২ 

ভোর হতে আর দণ্ড তিনেক দেরি আছে হয়তো বা। ভল্লার ইচ্ছে ছিল এটুকু সময় সে একটু ঘুমিয়ে নেবে। সে আর হবে না। রামালির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মায়া হল। ছেলেটা কখন এসেছিল তার কাছে? তার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়েই পড়েছে বেচারা। রামালির পাশেই মাটিতে বসল ভল্লা। ছেলেটির বাহুতে হাত রেখে মৃদু স্বরে ডাকল, “রামালি, এই রামালি”।

রামালি ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসল। ভল্লার দিকে তাকিয়ে দেখল, দেখল তার চারপাশ। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই রামালি বলল, “এঃ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!”

ভল্লা হাসল, “এসেছিস কখন?”

“অনেকক্ষণ। দেখলাম তোমার ঘর খালি। তুমি নেই। ভাবলাম গেছ কোথাও, চলে আসবে এখনই। তাই বসে পড়লাম তোমার অপেক্ষায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি...”।

ভল্লা বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিস, বেশ করেছিস। কিন্ত এই মাঝরাতে আমার কাছে কেন? কোন সমস্যা হয়েছে?”

মাথা নীচু করে রামালি বলল, “আমার সমস্যা তো তুমি জানই, ভল্লাদাদা। কাকিমা। হানোর মৃত্যু। আমাদের রামকথা শুনতে যাওয়া। আস্থানের ডাকাতি। কাল সারাদিনই গ্রামের বয়স্করা ব্যতিব্যস্ত ছিল নানান জল্পনায়। সন্ধের পর বাড়ি ফিরতে দেখি তুলকালাম কাণ্ড। দেখি কাকিমা কাকাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করছে আর শাপশাপান্ত করছে। কাকা বাইরের দাওয়ায় ভিজে বেড়ালের মতো বসে আছে। তার দুপাশে বসে আছে কাকার তিন ছেলেমেয়ে। আমি বাড়িতে পা দিতেই মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, “মা, মা, রামালিদাদা এসেছে”। ব্যস, আর যায় কোথায়? কাকিমা ভেতর থেকে বেরিয়ে এল হাতে ঝ্যাঁটা নিয়ে। প্রথমেই অশ্রাব্য কিছু গালাগাল দিল, তারপর দাওয়া থেকে তাড়াহুড়োয় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে, আছড়ে পড়ল মাটিতে। মাথার পিছনটা ঠুকে গেল সিঁড়ির নীচের ধাপিতে। অজ্ঞান হয়ে উঠোনে পড়ে রইল হাত-পা ছড়িয়ে। আমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কাকা আর তার তিন ছেলেমেয়ে হাহাকার করে দৌড়ে গেল কাকিমার দিকে। তাদের চেঁচামেচি শুনে পাশের বাড়ির লোকজনও দৌড়ে এল। অনেকে মিলে কাকিমাকে তুলে নিয়ে গেল দাওয়ায়। মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ তার মুখে মাথায় জলের ছিটে দিতে লাগল, কেউ পাখার হাওয়া করতে লাগল। আমি কী করব, কী করা উচিৎ না বুঝে, একইভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। একফাঁকে কাকা এসে কানে কানে, তুই এখন যা রামালি। অশথ তলায় অপেক্ষা করিস। তোর কাকিমা একটু সুস্থ হলেই আমি যাবো। তুই এখন যা”।

এতক্ষণ ভল্লা চুপ করে শুনছিল। রামালি থামতেই ভল্লা উঠে গিয়ে চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালল। উনুনের মধ্যে আগুনটা গুঁজে দিয়ে আরো কিছু কাঠকুটো রাখলো উনুনের মধ্যে। তারপর ঘর থেকে গতকালের মালসাতে জল নিয়ে বসিয়ে দিল উনুনের ওপর। পাঁচ মুঠি চাল ফেলে দিল মালসায়। তারপর উনুনের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা এসেছিল?”

“এসেছিল। বলল, তুই আর বাড়িতে আসিস না, রামালি। দেখতে পাচ্ছিস তো, তোর কাকিমার অবস্থা? আমাকেও স্বস্তিতে বসতে দিচ্ছে না এক দণ্ড। এতদিন এসব সহ্য করেও চলছিলাম। কিন্তু আজ গ্রামে একটা কথা উঠেছে। কাল রাত্রে নাকি তোরা রামকথা শুনতে যাসনি? আস্থানে গিয়েছিলি ডাকাতি করতে! সে কথা তোর কাকিমার কানেও গেছে। সে কথা শোনার পর থেকেই উন্মত্ত হয়ে গেছে তোর কাকিমা”।

তার মানে কাকার অন্ন তোর ঘুঁচল। তোদের জমিজমা কত আছে?”

“তা আছে – ওই সাত-আট বিঘে মতো”।

“তাতে তোর মানে তোর বাবার অংশ নেই?”

“আছে বৈকি। যা জমি তার অর্ধেকটা তো বটেই। সেটাই তো কাকিমার আক্রোশ, ভল্লাদাদা। বড় হচ্ছি, আমি যদি বাবার অংশের ভাগ চাই? সংসারে ভাইপো পোষা আর দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা একই ব্যাপার”। রামালি বিষণ্ণ হাসল, তারপর বলল, “কী হবে ওই ভাগের জমি নিয়ে? আমারও পেট ভরবে না, কাকারও নয়। মাঝের থেকে উঠতে-বসতে কাকিমা বাপান্ত করবে আমার এবং কাকারও”।

“হুঁ। তাহলে? এখন কোথায় থাকবি? খাবি কি?”

একটু ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “তুমিও নির্বাসিত, আমিও তাই। তোমাকে নির্বাসন দিয়েছে রাষ্ট্র, আমাকে আমার পরিজন। তোমার কাছেই থাকব। তুমিই খাওয়াবে!”

ভল্লা উনুনের মুখে আরো কিছু কাঠকুটো গুঁজে দিয়ে, ফুটন্ত জলের থেকে দু-চারদানা ভাত তুলে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “বাঃ বেড়ে বুদ্ধি খাটিয়েছিস, তো? কাকাকে ছেড়ে দিয়ে এখন আমার ঘাড়ে এসে চড়বি?”

রামালি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভল্লার চোখের দিকে। তারপর মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর আবার মাথা তুলে, চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি শক্তি চাই। আমি দক্ষতা চাই। তোমার মতোই জীবন-মৃত্যুকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চাই। এতদিন যে মরার মতো বেঁচে রয়েছি, তার থেকে মুক্তি চাই। মাথা তুলে বুক চিতিয়ে লড়তে চাই। বাঁচতে গিয়ে যদি মরতেও হয় – তাতেও আমি রাজি। তুমি আমাকে গড়ে তোল, ভল্লাদাদা”। তীব্র জেদ আর ক্রোধে রামালির দুই চোখ এখন আগুনের মতো জ্বলছে।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরে ঢুকে বাঁদিকের কোনায় দেখবি একটা ঝুড়িতে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা আছে, নিয়ে আয়। ওই সঙ্গে একটা সরাও আনবি আর নুনের পাত্রটা…” রামালি উঠে ঘরের দিকে যেতে ভল্লা বলল, “তুই তো আর নরম কাদার তাল নোস, রামালি, আর আমিও কুমোর নইগড়তে হলে, তোকে নিজেকেই গড়তে হবে – আমি পাশে থাকব – মাঝেসাঝে দেখিয়ে দেব, ব্যস্‌ ওইটুকুই”।

ভাতটা হয়ে এসেছিল। উনুনের গর্ত থেকে জ্বলন্ত কাঠ-কুটো সরিয়ে নিয়ে ভল্লা বলল, “সরাটা নিয়ে বস, গরমগরম দুটো ফ্যানভাত খা। পেঁয়াজ-লঙ্কা যা নেবার নিয়ে নে”। কাঠের হাতা দিয়ে মাটির সরায় ভাত তুলতে তুলতে ভল্লা আরও বলল, “কাল নিশ্চয়ই সারাদিন-রাত পেটে কিছু পড়েনি? খিদে পেলে না, আমারও মাথা গরম হয়ে যায়। মনে হয় সব শালাকে দেখে নেবওই তাদের – যাদের দুবেলা দুমুঠো খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও, দেয় না। যেমন তোর কাকা-কাকিমা, তোর পৈতৃক জমির ভাগও দেবে না, আবার তোকে খেতে না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে…। নে, শুরু কর”।

ভল্লা যে তার কথা ভেবেই এই শেষ রাত্রে ভাত রান্না করল, এই সামান্য আন্তরিকতায় রামালি অভিভূত হয়ে পড়ল। বলল, “ভল্লাদাদা, তুমি শুধু আমার জন্যেই…”?

ভল্লা হাসল, বলল, “তা নয়তো কি, আমার জন্যে? শেষ রাতে কেউ, নিজের জন্যে রাঁধতে বসে? কিন্তু এতক্ষণ তো তোর চোখে দিব্যি আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম, সামান্য ফানভাত আর পেঁয়াজেই চোখে জল এসে গেল? চোখে জল নিয়েই কি তুই বুক চিতিয়ে লড়বি, রামালি?”

রামালি বাঁহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেলল, গরমভাত মুখে তুলে পেঁয়াজে কামড় দিয়ে বলল, “না ভল্লাদাদা, বেশ কিছু দিন ধরেই মনে হচ্ছিল এভাবে সারাক্ষণ লাথি-ঝ্যাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকার মানে হয় না। হয় লড়তে হবে নয় মরতে হবে। এসময়েই তুমি আমাদের গ্রামে এলে…”।

ভল্লা রামালির সরায় আরও দুহাতা ভাত দিয়ে বলল, “গ্রামের কী পরিস্থিতি বল তো? শালু আর আহোক ঠিক আছে?”

“হানোর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ পাওয়া ছাড়া গ্রামের মানুষদের তেমন কোন হেলদোল নেই, ভল্লাদাদা। দুপুরের পরে গ্রামে বার্তা এল, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে, তিনজন রক্ষী মারা গেছে। তাতেও গ্রামের লোক তেমন উৎসাহ দেখাল না। বিকেলের দিকে শুনলাম, কেউ নাকি বলেছে, সে রাত্রে রামকথা দেখতে যাওয়ার নাম করে, আমরাই নাকি আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম”।

“কে ছড়ালো কথাটা, জানিস? আমাদের মধ্যেই কেউ বলে দেয়নি তো? শালু বা আহোক, বা অন্য কেউ?”

“মনে হয় না। আমরা তো প্রায় সারাক্ষণই হানোকে নিয়ে ছিলাম। একটু বেলা হলে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করা হল। ওর বাবা চিতাগ্নি করল। আমাদের মধ্যে কেউ বলেছে বলে মন হয় না, ভল্লাদাদা”।

“সারা দিনে কেউ বাড়ি যায়নি? দুপুরে খেতেও যায়নি”।

“না, ভল্লাদাদা। একবার মড়া ছুঁয়ে ফেললে, সে দেহের দাহ সৎকার না করলে, বাড়ির লোকেরা আমাদের ঢুকতেই দেয় না। হানোর সৎকার করতে করতে সন্ধে হয়ে গেল, তারপরেই দীঘির জলে স্নান সেরে আমরা যে যার বাড়ি ফিরেছিলাম”।

“খাওয়া হয়ে গেছে? যা মুখ হাত ধুয়ে আয়। ওই সঙ্গে এই মালসা, সরাগুলোও ধুয়ে আনবি। বাড়ির বাইরে যখন বেরিয়েছিস, নিজের কাজ এখন থেকে নিজেকেই করতে হবে”।

ভল্লার কথায় রামালি উজ্জ্বল চোখে হাসল, “করবো, ভল্লাদাদা। আমি এ সবই করেছি। ছোটবেলায় বাপ-মা মরা ছেলেদের এ সব করতেই হয়”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে যা। সব কথাতেই এমন নাকে কান্না শোনাস না তো! জগতে তোর নাকে কান্না শোনার জন্যে কেউ বসে নেই। কথাটা মনে রাখিস”। রামালি পুকুর থেকে ফিরতে ফিরতে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। ধোয়া পাত্রগুলো ভল্লার ঘরে সাজিয়ে রেখে  রামালি বাইরে আসতেই ভল্লা বলল, “চ তোকে একটা যন্ত্র দেখাই”। ঝোপের আড়াল থেকে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করে ভল্লা এক জোড়া রামালির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এ দুটো কি জানিস”?

রামালি বলল, “বাঁশ, আমাদের এখানে হয়না। শুনেছি পূবের জঙ্গলে হয়। খুব কাজের জিনিষ”।

ভল্লা মুখ ভেটকে বলল, “ব্যাঁশ...বাঁশ তো সবাই জানে...বাড়িতে তুই যে কাঠের পিঁড়িতে বসিস, সেটা কি শুধুই কাঠ? চাষের সময় যে লাঙল ঠেলিস, সেটাকেও কি কাঠ বলিস?” রামালি কিছু বলতে পারল না। বাঁশের গায়ে হাত বুলিয়ে সে ভাবতে লাগল।

“বুঝতে পারলি না তো? এটাকে রণপা বলে”।

“রণপা? তাই? শুনেছি, এতে চড়ে লোকেরা নাকি খুব দৌড়তে পারে। দেখিনি কোনদিন”। রামালি এবার বাঁশের খুঁটি দুটোকে অন্য চোখে দেখতে লাগল।

“এই দ্যাখ” বলে, দুহাতে বাঁশ দুটো ধরে, ভল্লা তুড়ুক লাফে উঠে পড়ল বাঁশের গায়ে বেরিয়ে থাকা দুটো ফেঁকড়ি কঞ্চির ওপর। তারপর চারপাশে কিছুক্ষণ হেঁটে চলে দেখাল। রামালি অবাক হয়ে দেখছিল, আর ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। মানুষের পাদুটোকে যদি আরও হাত দেড়-দুয়েক লম্বা করে ফেলা যায় – তাহলে হাঁটার গতি তো বাড়বেই। আর দৌড়তে পারলে তো কথাই নেই।

রামালি দুহাতে চেপে ধরল বাঁশদুটোকে, তারপর লাফ দিয়ে উঠে পড়ল কঞ্চির ওপর। টলমল করছিল, কিন্তু চেষ্টা করতে লাগল দুই রণপায়ে সমান ভর দিয়ে দাঁড়াতে। এবার ভল্লাই বেশ অবাক হল, বলল, “বাঃ, তোর বেশ এলেম আছে তো? প্রথম বারেই দিব্যি চেপে পড়লি। আমি বাবার কাছে শিখেছিলাম, প্রথমবার চড়তে গিয়ে কতবার যে আছাড় খেয়েছিলাম...। এই দ্যাখ, এইভাবে সোজা হয়ে দাঁড়া। ও দুটো যে বাঁশের লাঠি, ভুলে যা। মনে কর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস, সোজা। চেষ্টা কর পারবি...”।

রামালি পারছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্যে...তারপরেই টলমল করছিল আবার। ভল্লা বলল, “বাচ্চারা যখন প্রথম হাঁটতে শেখে দেখিসনি? তোকেও কি এখন হাঁটতে শেখাতে হবে? বলছি না, ওদুটো যে তোরই পা, সেটা মনে গেঁথে ফ্যাল। হাতের টানে আর পায়ের ঠেলায় হাঁটতে চেষ্টা কর। ভল্লা বার কয়েক হেঁটে দেখাল। রামালি পারল না, হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে খুলে গেল লাঠি দুটো।

ভল্লা কোন গুরুত্বই দিল না, বলল, “ঠিক আছে, আবার চেষ্টা কর, হয়ে যাবে...মনে রাখিস সকাল হলেই তুই রণপা চড়ে এই জঙ্গলের সীমানায় যাবি। রণপা চড়ে গ্রামে ঢুকবি না। সেখানে রণপা রেখে, শল্কু, আহোক এবং আমাদের দলের আরও কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসবি। বলবি ভল্লাদাদা ডাকছে। তারপর আবার রণপা চড়েই আমার কাছে ফিরে আসবি। রাত জেগে তোকে ভাত রেঁধে খাওয়ালাম, কি অমনি অমনি? ও হ্যাঁ, গ্রামের লোকদের বলে দিস, আজ বা কাল আস্থান থেকে রক্ষীদের দল আসতে পারে...ডাকাতির সূত্র-সন্ধান খুঁজতে। আমাদের ছেলেদের মানা করে দিবি, ওদের সামনে যেন না যায়। কোন তর্কাতর্কি, ঝগড়া-ঝাঁটিতে জড়াতে নিষেধ করবি। .গ্রামের বয়স্ক মানুষরাই যেন ঠাণ্ডা মাথায় ওদের মুখোমুখি হয়। মনে থাকবে? এখন কিছুক্ষণ অভ্যাস করে নে, তারপর রণপায় চড়ে ঘুরে আয়”।

টলমল করে রামালি একটু একটু এগোচ্ছিল, আর উলটে পড়ছিল ধপ ধপ করে। জঙ্গলের সরু পথে দুপাশেই রয়েছে ছোটছোট ঝোপঝাড়। পড়ে গেলে খোঁচা-টোঁচা লাগবে, ছড়ে-টড়ে যাবে – তবে বড়ো কোন আঘাত লাগবে না। ভল্লা সেদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে মৃদু হাসল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, “আমার চোখের আড়াল হলেই, তুই যে রণপা ছেড়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে যাবি আর ফিরে এসে আমাকে ফাঁকি দিবি, সে কথা মনেও ঠাঁই দিস না, রামালি। বুঝতে পারলে তোর ঠ্যাং ভেঙে আমিই গিয়ে তোর কাকি কাছে আবার ফেলে আসব। বলব, আমার কাছে যাতে আর না আসতে পারে, তাই ওকে রেখে গেলাম। মনে থাকে যেন”।

রামালি চেঁচিয়ে উত্তর দিল, “আর যদি পারি?”

“তাহলে ওই রণপাজোড়া তোর – আর ওই সঙ্গে পাবি নতুন একটা বল্লম”।

“আমি আসছি ভল্লাদাদা, বল্লমটা এনে রাখো”।

রামালি দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে ভল্লা রণপা থেকে নেমে কিছুক্ষণ বসে রইল। এখন তার তেমন কিছু করার নেই। বসে থাকলে নানান চিন্তায় মাথাটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে – কিছু কাজ হবে না। ভল্লা উঠে দাঁড়াল, রণপা দুটো আগের জায়গাতেই লুকিয়ে রেখে উঠে পড়ল সামান্য দূরের একটা বড়ো গাছে। ওই গাছের ওপরেই রয়েছে তার ঘুমোনোর ঠেক। ভল্লা নিজের কুটিরে কখনোই ঘুমোয় না, বেশিক্ষণ থাকেও না। তার কাজটা এমনই, নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু তারই। সে প্রশাসনের গোপন কাজ করছে বলেই, প্রশাসন তার জীবনের দায় নিয়ে নিয়েছে এমন নয়।  কোন শত্রু বা গুপ্ত ঘাতকের হাতে তার প্রাণ গেলে, প্রশাসন বিন্দুমাত্র দায় নেবে না। কিংবা বলবে না, আমাদের কাজ করতে গিয়ে মহান ভল্লা তার প্রাণটাকে উৎসর্গ করেছে!

এই কুটিরের আশেপাশের চারটে গাছে তার শোয়ার জায়গা বানানো আছে। কবে কোথায় সে শোবে, সে নিজেও জানে না। ভল্লা সেরকমই একটা গাছে উঠে পড়ল। অনেকটা উঁচুতে দুই ডালের মধ্যে বানানো কাঠের মাচায় উঠে সে এলিয়ে দিল শরীরটাকে। রামালির ফিরতে প্রহরখানেক তো লাগবেই। অতএব এখন কোন কাজ যখন নেই, শরীরটাকে কিছুক্ষণ আরাম দেওয়া যাক। 

চলবে...     

সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬ 


শেষ পর্ব 


ভারতে কাগজের টাকা (cuurency note) 

ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা শহরে ভারতের প্রথম ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৭৩ সালে, সে ব্যাংকের নাম ছিল “ General Bank of Bengal and Bahar”বেঙ্গলের সঙ্গে “বাহার” শুনে জায়গাটা কোথায় – এমন কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু জায়গাটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহার। সেসময় দেহাতি উচ্চারণে “বিহার”-কে হেস্টিংস ও তাঁর গোরা সঙ্গীরা “বেহার” শুনেছিল বলেই হয়তো এই বিপত্তি! যাই হোক এই ব্যাংক থেকেই প্রথম কাগজের নোটের প্রচলন শুরু হয়। সরকারিভাবে এই নোটের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও এই ব্যাংক এবং তার নোট অচিরেই ১৭৭৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে মনে রাখতে হবে “সরকারিভাবে” মানে ব্রিটিশ সরকার নয়, সে সময় ভারতের শাসনকর্তা ছিল কোম্পানি-রাজ অর্থাৎ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি।

এর পরেও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনেক প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতার পর ১৮০৬ সালে কলকাতায় পঞ্চাশ লাখ সিক্কা রুপি মূলধন নিয়ে খোলা হল ব্যাংক অফ বেঙ্গল। সিক্কা কথাটা এখন সাধারণ মুদ্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, ক্রিকেট খেলার আগে “টস” করাকে হিন্দিতে “সিক্কা উছালনা” বলে। কিন্তু সে সময় “সিক্কা” ছিল খাঁটি রূপোর মূল্যবান মুদ্রা। এই মুদ্রা ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি প্রধানতঃ বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যা – অর্থাৎ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জন্যে প্রচলন করেছিল।

কোম্পানি-রাজ এই ব্যংককে দিল কাগজের নোট ছাপা এবং বাজারে নোট চালু করার অনুমতি। এই সময়ে বেঙ্গল ব্যাংক থেকে তিন ধরনের নোট প্রকাশ করেছিল, যেমন (১) এক-পার্শ্বিক নোট (unifaced), (২) বাণিজ্যিক নোট (commerce) এবং (৩) “ব্রিটানিয়া” নোট (Britannia)। প্রথম অবস্থায় এক-পার্শ্বিক নোট অর্থাৎ যা কিছু লেখার কাগজের একদিকেই লেখা থাকত, উলটো দিক থাকত সাদা (blank).

নীচেয় “ব্যাঙ্কবেঙ্গল” থেকে প্রকাশিত সিক্কা ২৫০ টাকার একটি নোটের অত্যন্ত বিরল একটি নমুনা দিলাম। এই চিত্রটির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই “livehistoryindia.com/story/forgotten-treasures/indias-first-currency-note” ওয়েবসাইটের Author Krutika Haraniya-কে।   

 

Two hundred and Fifty Sicca Rupee note of Bank of Bengal with cancelled mark

 ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম এক-পার্শ্বিক (unifaced) নোট     

    ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম বাণিজ্যিক (commerce) নোটের উভয় পিঠ।

 

   ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম ব্রিটানিকা (Britannica) নোটের উভয় পিঠ।

কলকাতার পর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৪০ সালে বোম্বেতে (আধুনিক মুম্বাই) এবং তৃতীয়টি হল ১৮৪৩ সালে ম্যাড্রাসে (আধুনিক চেন্নাই)।  

 ব্যাংক অফ বম্বের প্রথম নোটের উভয় পিঠ

১৮৫৭-র প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পরপরই ভারতের শাসনব্যবস্থা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে তুলে নিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ব্রিটিশ-অধীনস্থ ভারতের রাণি হলেন তৎকালীন ইংল্যাণ্ডের রানি ভিক্টোরিয়া। শাসন ক্ষমতা অধিগ্রহণের পর ১৮৬৭ সালে সবকটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংককে বন্ধ করে দেওয়া হল, এবং কাগজের নোট প্রচলনের পূর্ণ দায়িত্ব নিল ভারত সরকার (Government of India).

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম যে নোটগুলি ছাপা হয় – সেগুলিকে ভিক্টোরিয়া সিরিজ (Victoria Series) বলা হয়, কারণ এই নোটগুলিতে তৎকালীন রাণি ভিক্টোরিয়ার ছবি থাকত। এই নোটগুলিও ছিল একপার্শ্বিক (unifaced) নোট। টাকার মূল্য দুটি ভাষায় থাকত, এবং নিরাপত্তার জন্যে নোটের উপর Government of India লেখা জলছবি (water mark) থাকত, দুই আধিকারিকের স্বাক্ষর এবং ঢেউ-খেলানো কিছু রেখা থাকত। আর থাকত নোটের  রেজিস্ট্রেশন নাম্বার। এই নোটের জন্যে হাতে বানানো কাগজ আসত ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত কাগজ কারখানা Laverstoke Mill, Hampshire থেকে। নীচেয় কয়েকটি নোটের নমুনা –

 Image : Rupees Ten   Image : Rupees Hundred

দশ টাকার নোট                     একশ টাকার নোট 

 প্রথম দিকে এই নোটগুলি বিভিন্ন সার্কল বা অঞ্চল বিশেষে প্রকাশ করা হত এবং সেই হিসেবে নোটের স্থানীয় ভাষাও পালটে দেওয়া হত – অর্থাৎ ইংরিজি ভাষাটা সর্বদাই থাকত, সঙ্গে থাকত উত্তর ভারত হলে হিন্দি বা উর্দু, পূর্ব ভারতে বাংলা, দক্ষিণ ভারতে তামিল ইত্যাদি। এর পরে এল সবুজ (green series) রঙের চার ভাষার নোট, তারপরে এল লাল (red series) রঙের আট ভাষার নোট। এই নোটগুলি আর অঞ্চল ভিত্তিক নয়, সারা ভারতেই ব্যবহারের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল।    

Image : Green Underprint Rs.500           Image : Red Underprint Rupees Fifty           

পাঁচশ টাকার চার ভাষার সবুজ নোট        পঞ্চাশ টাকার আট ভাষার লাল নোট

এই ধরনের নোটগুলি ১৯২৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিল, তার পরে এল রাজা সিরিজের নোট। এই নোটের মূল্যমানও সব মানুষের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করা হল, যেমন Rs ৫, 10, 50, 100, 500, 1000 এবং 10,000-এর নোট। নীচেয় রইল এক হাজার ও দশ হাজার টাকার ছবি - 

 



  ১৯৩৫ সালের ১লা এপ্রিল, ভারতে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইণ্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং এর কেন্দ্রীয় অফিসটি হয় কলকাতা শহরে। এতদিন পর্যন্ত চলতে থাকা লণ্ডনে ইম্পিরিয়াল ব্যাংক এবং এদেশের নানা আঞ্চলিক ব্যাংকের মুদ্রা বা নোট প্রকাশের ক্ষমতাকে অধিগ্রহণ করে, এই বিষয়ের সমস্ত ব্যবস্থাই কেন্দ্রীভূত করা হল এই রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র ভারতের অর্থ ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রইল কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে। এতদিনের কলকাতা, বোম্বাই, ম্যাড্রাস, লাহোর, রেঙ্গুন, কানপুর, করাচির আঞ্চলিক ব্যাংকগুলিকেও যুক্ত করে নেওয়া হল রিজার্ভ ব্যাংকের শাখা এবং সহযোগী হিসেবে। দিল্লি তখন ব্রিটিশ-রাজের রাজধানী হলেও, দিল্লিকে এর বাইরেই রাখা হয়েছিল।    

Image : Rupees Five

রিজার্ভ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত প্রথম নোট

রিজার্ভ ব্যাংক নোট বা মুদ্রা প্রকাশের পূর্বপন্থাই অনুসরণ করল, অর্থাৎ রাজা সিরিজের নোটই প্রকাশ করতে লাগল এবং স্বাভাবিকভাবেই রাজা বদলের সঙ্গে তাল রেখে ছবি বদলে টাকাও ছাপা হয়েছে বার বার। তবে দেশের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কম মূল্যমানের, যেমন এক বা দুটাকার নোটও প্রকাশ করেছে তারা।  

  Image : Rupee One - Obverse Image : Rupee One -Reverse

চতুর্থ জর্জের নামে ছাপা এক টাকার নোটের উভয় পিঠ (১৯৪০)

George VI Frontal

ষষ্ঠ জর্জের নামে ছাপা দশ টাকার নোট (১৯৪৩)

 

এই নোটগুলি ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরেও ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভারতে চালু ছিল। এরপর এই নোটগুলি বাতিল করে স্বাধীন ভারতের নোট চালু হয়ে যায়। সে কথা আসবে পরের পর্বে।  

স্বাধীন ভারতের নোট ও আধুনিক নোটহীনতা

মুদ্রা এবং নোটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সর্বদাই রাজা কিংবা শাসকের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থেকেছে। সে আধিপত্য এসেছে শাসকের ক্ষমতাজনিত আবেগ বা অহংকার থেকে, এবং আজও বহু রাজতান্ত্রিক বা একনায়ক-তান্ত্রিক দেশের পক্ষেই সেটা যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে এই পরিসরটা  অনেকটাই অন্যরকম – দেশের গৌরব, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মহান নেতাদের স্মারক সম্মান প্রভৃতি প্রদর্শনই এই নোটগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য।   

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭-এর মধ্য রাত্রে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া ভারত কিন্তু মুদ্রা কিংবা নোট ব্যবস্থায় যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল। যদিও ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথ চলা শুরু হলেও, স্বাধীন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অন্তর্বতীকালীন নোটের প্রচলন শুরু করেছিল।

 

স্বাধীন ভারতের প্রথম এক টাকার নোট

এই নোট ছাপানোর আগে চিন্তা করা হয়েছিল, জাতির জনক গান্ধীর ছবি ছাপা হবে। কিন্তু তারপরে ঠিক হয়, স্বাধীন দেশের জাতীয় প্রতীক ব্যবহার করাই সমীচীন, জনমতও এই পক্ষেই সায় দিয়েছিল। এর পরেই গান্ধীর চিত্রের পরিবর্তে সারনাথের অশোকস্তম্ভের উপরে স্থাপিত সিংহমূর্তিটির ছবি নোটে মুদ্রিত হয়। এবং এর পরবর্তী নোটেও মূলতঃ এই নীতিই গৃহীত হয়ে থাকে।

 

যদিও সে সময় তুলনামূলক বিচারে নোটের নকশা বৃটিশ যুগের মতোই রইল, শুধু রাজার চিত্রের বদলে এল ভারতের জাতীয় প্রতীক। ওপরের দুটি নোট লক্ষ্য করলে দুটির মধ্যে মিল ও তফাৎটুকু সহজেই বোঝা যাবে।

১৯৫৪ সালে বড়ো অংকের কিছু নোট ছাপা হয় ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এমন কিছু বিখ্যাত স্থাপত্যর চিত্র দিয়ে –

   

হাজার টাকার নোটে তাঞ্জোরের মন্দির, পাঁচ হাজারের নোটে গেটওয়ে অফ ইণ্ডিয়ার ছবি।

 ষাটের দশকের অর্থনৈতিক সঙ্কট কালে (এর কারণ দুটি যুদ্ধ – ১৯৬২-তে চিনের সঙ্গে এবং ১৯৬৫-তে পাকিস্তানের সঙ্গে) নোটের সাইজ অনেকটাই ছোট করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধির জন্মশতবার্ষিকীর স্মরণে প্রকাশিত হল নতুন একশ টাকার নোট -

  

গান্ধীজীর জন্মশতবার্ষিকী স্মারক নোট।  

  এরপর ব্যয় সংকোচের উদ্দেশে যথাক্রমে ১৯৭২ ও ১৯৭৫ সালে প্রকাশ করা হল ২০ ও ৫০ টাকার নোট।

    

এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে গান্ধী সিরিজের নোট সমূহ। প্রতিবার নতুন নোট প্রকাশের সময় নোটের মূল ডিজাইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলেও যুক্ত করা হয় নিরাপত্তাজনিত নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ৫০০ টাকার নতুন নোটের উভয় পিঠের বৈশিষ্ট্যগুলি নীচেয় দেওয়া হল -    

১. অর্ধস্বচ্ছ সংখ্যায় নোটের মূল্যমান।

২. সুপ্তভাবে চিত্রিত নোটের মূল্যমান।

৩. দেবনাগরী ভাষায় নোটের মূল্যমান।

৪. মাঝখানে মহাত্মা গান্ধীর ডানদিকে তাকানো মুখের ছবি।

৫. RBI লেখা নিরাপত্তা সূত্র – নোটটিকে নাড়াচাড়া করলে এই সূত্রের রঙ নীল ও সবুজ হতে থাকে।

৬. নোটের প্রতিজ্ঞা পত্র, গভর্নরের স্বাক্ষর, এবং RBI -এর প্রতীক।

৭. ইলেক্ট্রোটাইপ ওয়াটার মার্ক দিয়ে গান্ধীর ছবি টাকার মূল্যমান।

৮. নোটের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ছোট থেকে বড় ফন্টে লেখা – বাঁদিকের ওপরে এবং ডানদিকের নীচেয়।

৯. রুপি সিম্বল সহ টাকার মূল্যমান – নাড়াচাড়া করলে এটির রঙও নীল ও সবুজ হতে থাকে।

১০. অশোক স্তম্ভ প্রতীক।

১১.একটি বৃত্তের মধ্যে ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা ৫০০

১২. বাঁদিকে ও ডানদিকে পাঁচটি করে দাগ একটু উঁচু করে ছাপা।  

 ওপরের বারোটি বৈশিষ্ট্যই নিরাপত্তাজনিত কারণে - যাতে জাল নোট ছাপানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে; আবার ১০, ১১, ১২ বৈশিষ্ট্যগুলি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নোট চিনতে সুবিধার জন্যও বটে।

     ১. নোটটির মুদ্রণ বছর।

২. স্বচ্ছ ভারত প্রতীক ও স্লোগান।

৩. ভাষার প্যানেল।

৪. ভারতের জাতীয় পতাকা সহ লাল কিল্লার ছবি

৫. দেবনাগরি সংখ্যায় টাকার মূল্যমান। 

 

বৈদ্যুতিন লেনদেন (Electronic Transactions) 

মুদ্রা ও নোটের পাশাপাশি ভারতে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে টাকার লেনদেনের সূত্রপাত হল আশির দশকে, তার নাম ডেবিট কার্ড। ১৯৮৭ সালে ডেবিট কার্ডের সূচনা করেছিল সিটি ব্যাংক এবং একই সঙ্গে HSBC ব্যাংক চালু করেছিল ATM (অটোমেটেড টেলার মেশিন)। এরপর নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতের অধিকাংশ ব্যংকই ডেবিট কার্ড ও এটিএম ব্যবস্থা চালু করে। ব্যাংকের সেভিংস ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত এই ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ টাকার ব্যবহার না করেও জিনিষপত্র কেনাকাটা, হোটেলে রেস্টুরেন্টে ভূরিভোজ, প্লেন বা ট্রেনের টিকিট কাটা সবই সম্ভব হয়ে উঠতে লাগল। ডেবিট কার্ড যেন আলিবাবার চিচিং-ফাঁক মন্ত্র – নিজের অফিসে বা বাড়িতে বসে কম্পিউটার, ল্যাপটপ থেকেই বুক করে নেওয়া যায় টিকিট। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কাটার প্রয়োজন নেই অথবা ব্যাংকে গিয়ে প্রয়োজন নেই লাইন দিয়ে নগদ টাকা তোলার। যদি পকেটে থাকে ডেবিট কার্ড এবং ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে থাকে পর্যাপ্ত টাকা, তাহলে হোটেলে খেতে গিয়ে বাজেটের অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে গেলেও দুশ্চিন্তা নেই। পুজোর বাজার করতে গিয়েও নগদ টাকার বাজেট করতে হয় না – মনে-ধরে-যাওয়া শাড়ি-জামা-কাপড় কিনে ফেলাই যায় - কারণ পকেটে আছে ডেবিট কার্ড।

ডেবিট কার্ডের প্রায় সমসময়েই এসে গেল ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাও। নব্বইয়ের দশকে অনেক ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন শুরু করে দিল। এই কার্ড পদ্ধতির মূল মন্ত্র হল ভারতের লোকায়ত দর্শনের জনক চার্বাক ঋষির প্রচলিত উপদেশ – “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”। ক্রেডিট কার্ডের যোগাযোগ সরাসরি কোন ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে নয়। বিগত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, চাকরি, ব্যবসা বা উপার্জনের স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ড পেয়ে যেতে পারে যে কোন গ্রাহক। অর্থাৎ পুরোটাই ঋণ –  ঋণসীমার মধ্যে থেকে যা খুশি খরচ করা যায়, পিছনে উপদেশ দেওয়ার অথবা চোখ রাঙাবার কেউ রইল না। মোটামুটি ৫০/৫১ দিনের মধ্যে ক্রেডিট-কার্ড-দাতা ব্যাংকের পাঠানো ঋণের হিসেবটি চুকিয়ে দিতে পারলেই – কোন চিন্তা নেই।  

প্রথম তিন-চার মাস হিসেব চোকাতে না পারলেও দিন চলে যাবে, তবে ঋণের হিসাব চড়তে থাকবে ২.৫%-৩% অথবা তারও বেশি মাসিক সুদে। তার পরেও ঋণ শোধ না করতে পারলে, বাড়িতে এবং অফিসে এসে হানা দেবে উদার ঋণদাতার বলিষ্ঠ লোকজন – তারা সকলেই চোখ রাঙিয়ে ধমক-ধামক দেওয়ায় দক্ষ। তাদের অত্যাচারে ঋণ শোধ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না – হয়তো সর্বস্বান্ত হয়েই। তখন ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ" ভুলে, মনে পড়বে চণ্ডীদাসের গান, “সুখ-দুখ দুটি ভাই, সুখের লাগিয়া যে করে পীরিতি দুখ যায় তার ঠাঁই”।

এর মধ্যেই আধুনিক ভারতে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল –

১. ১৯৯৫ সালের ৩১শে জুলাই ভারতীয় জনগণের জন্যে প্রথম মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের প্রচলন হল। ২. ১৯৯৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের সর্বসাধারণের জন্যে প্রথম ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে এল বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড (VSNL)।

 

সূত্রপাতের পর থেকেই ইন্টারনেট এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবার উন্নতি হতে লাগল অতি দ্রুত। সরকারি পরিষেবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামল ভারতের এবং বিদেশের অনেকগুলি টেলিকমিউনেকেশন সংস্থা – একক এবং যৌথভাবে। কারণ সূচনাকালেই বোঝা গিয়েছিল, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার প্রেক্ষীতে এই পরিষেবা প্রদান – শুধু সেবা নয়, অত্যন্ত লোভনীয় ব্যবসাও বটে। সেই লোভের কারণেই বিভিন্ন পরিষেবা বৃত্তে ঢুকে পড়ল পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের বিচারে অনেক বড়ো বড়ো নেতা-নেত্রী ও ব্যবসাদারকে কারারুদ্ধ থাকতে হল দীর্ঘদিন। কিছুদিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবসাতে নামল কিছুটা শূণ্যতা। পিছিয়ে পড়ল VSNL BSNL এর মতো সরকারি সংস্থাগুলিও।

 

এই শূণ্যতার সুযোগেই, ২০১৬ সালে এই ব্যবসাতে নতুন উদ্যোগ ও উদ্যমে নেমে পড়ল জিও (Jio)। তাদের আগ্রাসী পদক্ষেপে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ল এই ব্যবসার পুরানো খেলোয়াড়রা, যেমন এয়ারটেল (Airtel) (১৯৯৫), BSNL (২০০০)। নতুন আরেকটি কোম্পানি – ভি (Vi) এই ব্যবসায় নামল ২০১৮ সালে। ৩১শে অক্টোবর ২০২৫ সালের মধ্যে সতেরোটি টেলিকম কোম্পানি – যারা প্রায় শুরু থেকেই এই ব্যবসায় যুক্ত ছিল – পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

 

যাই হোক ২০১৬ সালেই Jio এসে ফাইবার কানেকশনের মাধ্যমে এনে ফেলল দ্রুতগতির ৪জি (4G Fourth generation wireless network) এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আনল WiFi (Wireless Fidelity) connection। এই দুয়ের সংযোগে মোবাইল ফোন হয়ে উঠল আধুনিক জীবনের এক অনিবার্য অঙ্গ। কোনরকম তারের সংযোগ ছাড়াই – ফোনে কথা বলা যায়, গান শোনা যায়, সিনেমা দেখা যায়, খেলা দেখা যায়...মোবাইল ফোনগুলি হয়ে উঠল স্মার্টফোন।

এই উন্নত পরিষেবার উপর ভর করে ১১ই এপ্রিল, ২০১৬ সালে এসে গেল ইউপিআই (UPI – Unified Payments Interface) পরিষেবা। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ডঃ রঘুরাম রাজন এই পরিষেবার উদ্বোধন করলেন। এই পরিষেবার মাধ্যমে কোন তারের সংযোগ ছাড়াই – সারাদিন-রাত, সপ্তাহের সাতদিন (২৪/৭) – মোবাইল ফোন থেকেই ব্যাংকের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলা যায়। পথে ঘাটে, ঘরে-অফিসে, ট্রেনে-বাসে অর্থাৎ যে কোন অবস্থায় নিজের ব্যাংক অ্যাকাঊন্টের ব্যালান্স চেক করা, কিংবা নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যাকে খুশি টাকা ট্রান্সফার করা, মাসের নানান খরচ – ইলেকট্রিকের বিল, গ্যাস বুকিং, ছেলেমেয়ের স্কুল-কলেজের ফি, হসপিট্যালের বিল, ইন্সিওরেন্সের প্রিমিয়াম... এমনকি ফুটপাথের দোকান থেকে ৭/১০ টাকার একভাঁড় চায়ের দাম মেটানো - সবকিছুই এখন হাতের মুঠোর মধ্যে – UPI transactions – সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, খুব বেশি হলে মিনিটখানেক। হাতে নগদ মুদ্রা নেই, নেই কাগজের নোট – আছে শুধু একটি মোবাইল ফোন।

 

পরিসংখ্যান বলছে, এই ইউপিআই বা ডিজিট্যাল টাকার লেনদেনে ভারত এখন বিশ্বের শীর্ষে। অনেকটাই পিছিয়ে আছে আমেরিকা বা ইওরোপের মতো বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশগুলি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এই ডিজিট্যাল লেনদেনের মাসিক হিসাব নাকি ছিল প্রায় ২৪ লক্ষ কোটি টাকা এবং প্রতিমাসে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে এবং প্রায় ৬.৫ কোটি ছোট ব্যবসায়ী ডিজিট্যাল লেনদেনেই বেশি বিশ্বাস রাখে।

 

অর্থাৎ ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে পড়ছি মুদ্রাহীন, নোটহীন, অধরা এবং স্পর্শহীন এক অর্থ ব্যবস্থার জগতে। 


 আগের পর্বে বলেছিলাম, কোন এক যুগের কয়েকটি মুদ্রা পেলেই, একালের বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রত্নবিদ,  ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি অপরাধ-বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান অজস্র তথ্য ও তত্ত্বের ভাণ্ডার। আমাদের এই ডিজিট্যাল যুগে কোন মুদ্রা নেই – অতএব কোন কারণে আমাদের এই সভ্যতা যদি হারিয়ে যায় – পরবর্তী যুগের মানুষরা খুঁজেও পাবে না আমাদের এই অত্যাধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাস। কিন্তু সে কথা ভেবে দুঃখ করার এক কানাকড়িও মূল্য নেই আর।    


সমাপ্ত 


কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   



নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...