এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
১
কোলাঘাট পার হয়ে কিছুটা এগিয়েই গাড়িটা বিগড়ে
গেল। হঠাৎ হেঁচকি তুলে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাবার পর আর
স্টার্ট নিচ্ছে না কিছুতেই। কি যে হল বোধগম্য হল না সুনেত্রর। গাড়ি বলতে সে বোঝে
চাবি, স্টিয়ারিং, গিয়ার, ক্লাচ আর অ্যাক্সিলেটার। বনেট খুলে গাড়ির কলকব্জার দিকে
তাকালে তার পুরো ব্যাপারটাই অসম্ভব এক ধাঁধা মনে হয়। কোথাকার পাইপ, কোথাকার তার
কোথায় গিয়ে কি কাণ্ড কারখানা ঘটালে গাড়িটা চলে আর কোনটা বিগড়োলে গাড়ি থমকে যায়,
সেটা তার মাথায় ঢোকে না, কোনোদিন চেষ্টাও করেনি বোঝার। রাস্তায় ঘাটে এমন পরিস্থিতি
অনেকবারই হয়েছে, সে সব সময়ে বনেট খুলে মুণ্ডু ঢুকিয়ে সামলে দিয়েছে দিবাকর – তার
ড্রাইভার। সে পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টেনেছে পর পর দু তিনটে। ব্যস ওই টুকুই।
দিবাকরের
বাড়ি মেচেদায়। গতকাল
কলকাতা যাবার সময় দিবাকরকে মেচেদায় নামিয়ে নিজেই ড্রাইভ করে
কলকাতা গিয়েছিল। কথা ছিল আজ সন্ধ্যে আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ মেচেদার একই জায়গা থেকে তুলে নেবে দিবাকরকে – একসঙ্গে চলে যাবে হলদিয়া। একশটা
টাকা খসিয়ে চারজন ছোঁড়াকে দিয়ে গাড়িটা ঠেলে স্টার্ট করা যায় কিনা, সে চেষ্টাও
করেছিল, কিন্তু কিছু লাভ হয় নি। অবশেষে নাচার হয়ে, সুনেত্র দিবাকরকেই ফোন করল। দিবাকরকে
মোটামুটি তার লোকেশনটা বুঝিয়ে দিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে উদ্ধার করার জন্যে। আপাততঃ
তার আর কিছু করার নেই, গাড়িতে হেলান দিয়ে সিগারেট ধ্বংস করা ছাড়া – দিবাকরের এখানে
এসে পৌঁছতে অন্ততঃ আধঘন্টা, পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো লাগবেই। একটু বেশিও হতে পারে –
কারণ আজ একে রোববার তার ওপর রাত প্রায় সাড়ে আটটা, এসময় গাড়ি যোগাড় করে অকুস্থলে
পৌঁছনো কম ঝকমারি নয়।
গাড়িতে
হেলান দিয়ে চার নম্বর সিগারেটটা যখন টানছিল সুনেত্র, একটা গাড়ি তাকে ক্রস করে সামনেই
বাঁদিকে সাইড করে দাঁড়াল। এখানে গাড়ি দাঁড়ানোর কথা নয়, কেন দাঁড়াল – সুনেত্রর চেনা
কেউ? লিফট দিতে চায়? সুনেত্র নিজের জায়গা থেকেই দেখছিল গাড়িটাকে। ড্রাইভারের দরজা
খুলে একজন মহিলা নেমে এগিয়ে এল তার দিকে!
“সুনুদা,
না? এখানে দাঁড়িয়ে, কী করছো”? মহিলার কণ্ঠস্বরে বহুদিনের পূর্বস্মৃতি ফিরে এল
সুনেত্রর। এই ডাক, এই গলা শোনার জন্যে একসময়ে তার সমস্ত মন উদগ্রীব হয়ে থাকত। আজ
আচমকা এই রকম জায়গায় সেই মেয়েটির আবির্ভাব ঝাঁকিয়ে দিলে সুনেত্রর ভিতরটা।
নিজেকে
যথাসম্ভব সামলে রেখে সে উত্তর দিল, “কনি, তুই? এখানে কোত্থেকে”?
“যাক, চিনতে
পেরেছো তাহলে? আমি বাড়ি ফিরছি – হলদিয়া! কত্তা আছেন সঙ্গে, তবে আমিই ড্রাইভ
করছিলাম। গাড়িতে হেলান দিয়ে তোমার ওই দাঁড়ানোর ভঙ্গীটা খুব চেনা লাগল, তাই
দাঁড়ালাম, চিনতে ভুল করিনি, দেখছো তো”? হাসল সুকন্যা, পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অজস্র
গাড়ির আলোর চকিত চমকানিতে তার মুখের একটা পাশই শুধু দেখা যাচ্ছিল। এ যেন নিছক মুখ
দর্শন নয় – সুদূর অতীত থেকে বর্তমানের খণ্ড খণ্ড চলচিত্র!
“তোর সঙ্গে
শেষ দেখা অন্ততঃ বছর আষ্টেক আগে। তখন আমার গাড়িও ছিল না, কাজেই গাড়িতে হেলান দিয়ে
দাঁড়ানোর কোন ভঙ্গীই তুই আমার দেখিসনি কোনদিন, কাজেই এটা কিন্তু তুই ডাঁহা ঢপ দিলি”।
সুকন্যা এ
কথায় এতটুকুও অপ্রতিভ না হয়ে বলল, “হতে পারে গাড়িতে হেলান দেবার ভঙ্গী দেখিনি, তবে
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে, বাসস্টপের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে তোমাকে বহুবার
দেখেছি। আর সত্যি বলতে মেয়েরা এগুলো ভুলতে পারে না, তোমরা ছেলেরা এসব বুঝবে না”।
সুকন্যা
আবার হাসল, শাড়ির আঁচলে হাসিটা মুছে বলল, “প্রায় আট বছর বাদেও, আধো অন্ধকারে - গাড়ির
হেডলাইটের আলোয়, তোমাকে দেখেই চিনতে পারলাম, এইটুকু কৃতিত্বও
তুমি দেবে না”? কথাটা সত্যি। কাজেই সঠিক কোন উত্তর মনে এল না সুনেত্রর।
তাকে চুপ
করে থাকতে দেখে সুকন্যা বলল, “সে যাক গে, তুমি এসময় এখানে দাঁড়িয়ে কেন? গাড়ি
বিগড়েছে”?
“আর কি?
যাচ্ছিলাম হলদিয়া, হঠাৎ স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল, ঠেলেঠুলেও চেষ্টা করলাম, কী হল কে
জানে। আমার ড্রাইভার দিবাকরকে ডেকেছি – মহিষাদলে থাকে - আসছে, এসে যাবে যে কোন সময়”।
“এক কাজ করো
না, তোমারটা লক করে, আমার গাড়িতে উঠে পড়ো। তোমার দিবাকর এসে দেখবে, বুঝে শুনে
সারাতেও তো সময় লাগতে পারে, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে রাস্তায়? ও সারিয়ে টারিয়ে গাড়ি নিয়ে
চলে যাবে”।
“এভাবে
মাঝরাস্তায় গাড়িটা ফেলে রেখে চলে যাবো? কিছু হয়ে গেলে”?
“ফোন করে
দেখ না, তোমার দিবাকর এখন কোথায়, কতক্ষণ আর ফেলে রাখতে হবে, সেই একই রকম রয়ে গেলে
তুমি, সুনুদা”। সুকন্যা মুখ টিপে হাসল, অস্ফুটে বলল, “এক নম্বরের ভিতু”।
সুনেত্রর
ঠোঁটে জুৎসই একটা উত্তর চলে এসেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল নয় বুঝে কিছু বলল না।
বরং কথাটা না শোনার ভান করে, সুনেত্র ফোন করল দিবাকরকে। দিবাকর যা বলল তাতে মনে হল
সে পনের বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসতে পারবে আর ডুপ্লিকেট একটা চাবিও দিবাকরের কাছেই
আছে। কাজেই দিবাকরকে পুরো ব্যাপারটা বলাতে দিবাকর বলল, “আপনি নিশ্চিন্তে বেরিয়ে
যান, স্যার, কোন টেনসান নেবেন না, আমি দেখে নিচ্ছি সব”।
ল্যাপটপের
ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে
গাড়ি লক করে সুনেত্র সুকন্যার গাড়ির কাছে গেল।
“তুমি সামনে
বসো সুনুদা, পিছনের সিটে আমার কত্তাটি লাট খাচ্ছে”। সুকন্যা ড্রাইভারের সিটে বসতে
বসতে বলল। ল্যাপটপ কোলে নিয়ে সুনেত্র সামনের সিটে বসে দরজা বন্ধ করল।
“কি
ল্যাংগোয়েজ তোর, কনি? তোর কত্তা শুয়ে কেন – শরীর খারাপ নাকি”? ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের
দিকে তাকিয়ে সুনেত্র জিজ্ঞেস করল। সুকন্যা গাড়ি স্টার্ট করেছিল, গাড়ি গিয়ারে দিতে
গিয়েও থমকে গেল, সুনেত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কতদিন পরে তোমার মুখে সেই “কনি”
ডাক শুনলাম, সুনুদা”।
কিছুক্ষণ
তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুকন্যা গাড়িটাকে মাঝরাস্তায় এনে চালাতে শুরু
করল, তারপর বলল, “তুমি ড্রিংক করো”?
“করি, সে তেমন
কিছু নয়, অবরে সবরে। সিগারেট ছাড়া আর কোন নেশা নেই”।
“তুমি তো তা
হলে লক্ষ্মী ছেলে, সোনা ছেলে”। সুকন্যার
অধরে মিচকে হাসি। “আমার কত্তাটি এদিক দিয়ে খুব রসিক। আনন্দই হোক কিংবা দুঃখ –
রোদ্দুর হোক বা বৃষ্টি, বোতল না খুললে ঠিক সেলিব্রেসান হয় না। আর সেও আকণ্ঠ
সেলিব্রেসান! যার ফল ওই – পিছনের সিটে লাট খাচ্ছেন – থুড়ি, শুয়ে আছেন। আমার ভাষা আমি সামলে নিয়েছি, সুনুদা, আমাকে আর ল্যাংগোয়েজ নিয়ে ল্যাং মেরো না, প্লিজ”।
“তুই খাস না”?
“খাই না, তা
নয়, তবে আজ খাইনি। ভাগ্যিস খাইনি, যদি খেতাম আজকে পথ হারানো এই পথিককে খুঁজে
পেতাম? তোমাকে নিয়ে এমন রথযাত্রা সম্ভব হতো, বলো? দ্বারকা থেকে রথ চালিয়ে সুভদ্রাই
পালিয়ে এসেছিলেন না, অর্জুনকে নিয়ে”? অবাক হয়ে সুনেত্র সুকন্যার দিকে তাকাল, সুকন্যার
মুখ গম্ভীর, সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির আলো
আঁধারিতে তার মুখভাব স্পষ্ট বোঝা গেল না, সুনেত্র বলল, “কি উল্টোপাল্টা বকছিস?
নেশা করিসনি বলছিস, কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে...।”?
“কী মনে
হচ্ছে গো, নেশা করেছি”? এবার সুকন্যা বেশ জোরেই হাসল। এক ঝলক সুনেত্রর দিকে তাকিয়ে
বলল, “এক্স্যাক্টলি, নেশাই তো, তবে এ নেশা মোটেই দারুর নেশা নয় – পেয়ার কা নাশা-
ইয়ে নাশা পেয়ার কা নাশা হ্যায় – একটা হিন্দী গান আছে না? শুনেছ?”
“ফক্কুড়ি
করছিস”? সুনেত্র হাসল, কিন্তু সে হাসিতে অস্বস্তি, তার বুকের মধ্যে কোথাও যেন একটা
ব্যথার অনুভব, এতদিন পরে সব মনে পড়ে যাচ্ছে তার।
চলবে...