রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

  

এর আগের রম্যকথা - " আকাশের অর্ঘ্য " 


আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মানুষের মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে অচিন পাখি, কে জানে। এ কি সেই কয়েক হাজার বছর আগে ফেলে আসা যাযাবর জীবনের উপর সুপ্ত টান? যখন ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ এক জঙ্গল থেকে অজানা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াত স্বচ্ছল ফলমূল, সহজলভ্য শিকার আর মিষ্টি জলের সন্ধানে! কিন্তু এইভাবে হাজার হাজার বছর ঘোরার পর, চাষবাস শিখে, বাণিজ্য বুঝে মানুষ তো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে নিজের গন্ডীর মধ্যে থিতু হয়ে থাকতে। তাও কেন দৌড়ে বেড়ায় অজানা দেশে, অচেনা পরিবেশে? সুখে থাকতে ভূতে্র কিল খাওয়ার এমন অমোঘ টান কেন আসে?

বিরাশির মাঝামাঝি কোন এক দিন, এভাবেই ডেকে উঠল আমাদের প্রাণের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই অচিন পাখি। চলো মন যাই অদেখা দেশে, অচেনা তীর্থক্ষেত্রে, দু চোখ ভরে দেখে আসি নতুন জায়গার নতুন মানুষজন পরকালের কাজে লাগতে পারে সেই আশায়, দু হাত ভরে গুছিয়ে আনি পুণ্য এতদিন আমাদের দুইভাইয়ের লেখাপড়ার চাপে এমন ডাক বহুবার এসেও ফিরে গেছে। এখন সেই চাপ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। উপরন্তু তীর্থভ্রমণের বহুল ব্যয় বাবার আপিসের এলটিসির দৌলতে যতটা হ্রাস হয়, সমানুপাতে ততটাই কি বৃদ্ধি হয় না ভ্রমণের আনন্দ বৃদ্ধি?

দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্বের পর সেপ্টেম্বর শেষের এক রাত্রে হাওড়া স্টেশান থেকে আমরা চারজন মৌরসীপাট্টা বিছিয়ে বসে পড়লাম ম্যাড্রাস মেলের প্রথমশ্রেণীর একটি কামরায়। দুটি রাত ও একটি পুরো দিনের যাত্রায় সেই কামরাটি এতই পারিবারিক হয়ে উঠেছিল, যেন আমাদের বাসারই একখানি ঘর চাকার ওপরে চলমান। জমে উঠল ঘনিষ্ঠ নিরবচ্ছিন্ন পারিবারিক আড্ডাএকসঙ্গে এক ছাদের তলায় এতদিন বসবাস করেও, আমার স্বভাবগম্ভীর বাবার সঙ্গে এমন আত্মিক যোগাযোগ এর আগে কোনদিন অনুভব করিনি।

ম্যাড্রাস সেন্ট্রাল (চেন্নাই নাম পেতে তখনো ঢের দেরি) থেকে ট্যাক্সি করে এগমোর স্টেশন, সেখানে  অন্য ট্রেন ধরে আমরা পৌঁছলাম পণ্ডিচেরি। বিকেলের দিকে হোটেলে যাবার পথে ট্যাক্সি চলল গোবার্ত অ্যাভিনিউ ধরে, ডানদিকে বরাবর কোমর সমান পাঁচিল। ট্যাক্সিতে বসে পাঁচিলের ওপাশে কি আছে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বহুদূর পর্যন্ত নীল আকাশ আর সীমাহীন দিগন্তখুব অবাক লাগল, জিগ্যেস করলামএদিকটায় এরকম বরাবর দেওয়াল কেন, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ওপাশে কি আছেটা কি?

ট্যাক্সি চালক – যিনি আমাদের গাইডও বটেন মৃদু হেসে বললেন, “ওপাশেই তো সমুদ্র। ঝড়ের সময় যখন বড়ো বড়ো ঢেউ ওঠে, সেটাকে আটকানোর জন্যেই এই দেওয়াল”।  

সমুদ্র? ওটাই সমুদ্র? দাঁড়ান, ভাই দাঁড়ান – দেখতেই এসেছি যে... দেখি দুচোখ ভরে”!   

রাস্তার ধারে ট্যাক্সিটা সাইড করে দাঁড়াতে আমরা সকলেই নামলাম। দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে অবাক চোখের সামনে ভেসে উঠল সীমাহীন বিস্তার। হালকা সবুজ রংয়ের বিপুল সমুদ্র মিশে গেছে নীল আকাশের দিগন্তে। বড় বড় ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে পাথর বিছানো সমুদ্রের পাড়ে। ক্লান্তিহীন সেই ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বিশালতার এক অনুভূতি ঢুকে পড়ল আমার ভিতরে। এর আগে দেখেছি হিমালয়ের দিগন্তজোড়া পাহাড়ের ঢেউ, শান্ত সমাহিত গম্ভীর। এই সমুদ্রও পারাপারহীন বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন অস্থির এবং চূড়ান্ত উদাসীন। প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রে আমি বা আমরা থাকি বা না থাকি, তাদের কিচ্ছু যায় আসে না, এতটুকুও ব্যত্যয় হবে না তাদের। ফলতঃ আমার সেই একই অনুভব হল - নিজেদের অতীব সামান্যতা। 

পূর্বাশ্রমের চরমপন্থী বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ থেকে ঋষি অরবিন্দে উত্তরণের অলৌকিক প্রক্রিয়া আমার ধারণার অতীত। তাঁর আশ্রম ঘুরে এবং সেখানে মধ্যাহ্নভোজনে সামিল হয়ে আমরা যেন অনুভব করলাম তাঁর ঐশী সান্নিধ্য। কিন্তু আমাদের উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলি যখন আমাদের হাত থেকে হাসিমুখে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন ভক্ত ফরাসী ও ফরাসীণীগণ, ভীষণ অস্বস্তি হল। ফরাসী উচ্চারণে তাঁরা বললেন – “উ আর দ গেস্ত”। মনে হল, আমরা ভারতীয় এবং ঋষি অরবিন্দর দেশোয়ালি হয়েও গেস্ট হয়েই রইলাম, আর ওঁনারা হলেন কিনা হোস্ট!

পণ্ডিচেরি থেকে আবার ট্রেন ধরে বিল্লুপুরম জংশন, সেখান থেকে ট্রেন পাল্টে মন্ডপম, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রামেশ্বরম। রামেশ্বরম এমনই এক জায়গা যেখানে হিন্দু পৌরাণিক ঘটনার অনেক ঘনঘটা। শ্রীরামচন্দ্র এখান থেকেই সেতুবন্ধ করে লংকা গিয়েছিলেন রাবণের খপ্পর থেকে তাঁর পত্নী সীতাকে উদ্ধারের জন্যে। কিডন্যাপ্‌ড্‌ সীতা উদ্ধারের পর সস্ত্রীক শ্রীরামচন্দ্র এইখানেই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শিবের আরাধনা করেছিলেন, পাপমুক্তির জন্যে, তাই এই জায়গার নাম রামেশ্বরশ্রীরামচন্দ্র বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হওয়া সত্ত্বেও, রাবণকে হত্যা করে, তাঁর নাকি ব্রহ্মহত্যার পাপ অর্শেছিল! 

রামায়ণ অনুযায়ী রাবণ ছিলেন বিখ্যাত ঋষি বিশ্বশ্রবা ও দৈত্যরাজকুমারী কৈকেশীর পুত্র। ঋষি বিশ্বশ্রবার পিতা ছিলেন পুলস্ত্য মুনি। এই পুলস্ত্যমুনি ছিলেন ব্রহ্মার দশ মানসপুত্র, প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের মধ্যে অন্যতম। অতএব জন্মসূত্রে তিনি ব্রাহ্মণ। তাছাড়াও তিনি ছিলেন ডাকসাইটে বেদজ্ঞ, রণবিদ্যায় সুপণ্ডিত এবং বীণাবাদনেও সুদক্ষ। ব্রহ্মা ও শিবের একান্ত ভক্ত রাবণ, তপস্যা করে অমর হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ণ অমরত্ব পেলেন না – পেলেন দেব, সুর, নাগ, রক্ষ, যক্ষ এবং বন্য পশুর কাছে অজেয় থাকার বর। রাবণ সন্তুষ্টই ছিলেন, কারণ নর অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে তিনি শত্রু হিসেবে ধর্তব্যেই আনেননি। আর এই ছিদ্র পথেই নররূপী অবতার শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করে শ্রীলংকা জয় করতে পেরেছিলেন। 

ভাগবতপুরাণে অবিশ্যি অন্য গল্প আছে, পরম বিষ্ণুভক্ত জয়-বিজয় দুই ভাই ছিলেন বিষ্ণুলোক বৈকুণ্ঠের সিংদরজার দারোয়ান। একদিন চিনতে না পেরে তাঁরা চারজন তাপসবালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে দিলেন নাএই চারজন তাপসবালক ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত চার ভাই - সনক, সনাতন, সনান্দন এবং সনৎকুমার, ব্রহ্মার আদি মানসপুত্র। এই চার বালক চার বেদেই পারদর্শী ছিলেন এবং ঋষি মুনিদের কাছে জ্ঞান প্রচার করাই ছিল এঁনাদের একমাত্র ব্রত। দেবলোকের সর্বত্র এই চার ভাইয়ের ছিল অবারিত দ্বারএই চার বালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে না দেওয়ায়, তাঁরা জয়-বিজয়কে বৈকুণ্ঠ থেকে নির্বাসন দিলেন আর অভিশাপ দিলেন ধরণীর মর্ত্যধুলিতে জন্ম নিতে। স্বয়ং বিষ্ণু যখন পুরো ব্যাপারটি অবগত হলেন, তিনিও এই অভিশাপ রদ করতে পারলেন না। তিনি কিছুটা নরম হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার দুটো অপশন রাখলেন জয়-বিজয়ের কাছে। 

বিষ্ণু বললেন - প্রথম অপশন, বিষ্ণুভক্ত হয়ে সাধারণ মানবজীবনে সাতজন্ম পার করতে হবে, আর দ্বিতীয় অপশন, দুর্ধর্ষ বিষ্ণুশত্রু হয়ে মর্ত্যজীবনে মাত্র তিনজন্ম পার করতে হবে। তাহলেই তারা দুইভাই শাপমুক্ত হয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে বৈকুণ্ঠে। চয়েস ইজ ইয়োরস। জয়-বিজয় বিনা দ্বিধায় তিন জন্মের শর্টকাট চুজ করল। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর সাহচর্য তাদের কাছে অতীব কাম্য, তাতে যদি বিষ্ণুর চরম শত্রুতা করতে হয়, তাও। কারণ, বিষ্ণুর দুর্ধর্ষ শত্রুকে বিষ্ণু ছাড়া কে আর হত্যা করবেন! স্বয়ং ভগবানের হাতে ভক্তের মৃত্যু এবং তার ওপর মাত্র তিনজন্ম পরেই আবার ভগবানের স্নেহময় সদাসাহচর্য, এমন সুযোগ ছেড়ে দেবার মতো মূর্খ ভক্ত, জয়-বিজয় ছিলেন না।

সেই মতোই সব ঠিক হয়ে গেল। প্রথম জন্ম সত্যযুগে, দুই ভাই হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুর  মৃত্যু হল যথাক্রমে বরাহ ও নৃসিংহ, বিষ্ণুর তৃতীয় ও চতুর্থ অবতারের হাতে। দ্বিতীয় জন্ম ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার শ্রীরামচন্দ্রের হাতে মৃত্যু হল দুই ভাই রাবণ ও কুম্ভকর্ণের। তৃতীয় জন্ম দ্বাপরে দুই ভাই দন্তবক্র ও শিশুপালের মৃত্যু হল বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণের হাতে। শাপমুক্ত হয়ে মহানন্দে জয়-বিজয় ফিরে গেলেন বৈকুণ্ঠের স্বস্থানে।

যেভাবেই চিন্তা করা যাক না কেন, রাবণ যে মহাব্রাহ্মণ সে কথা স্বীকার করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং। শত্রু হলেও রাবণ এবং তাঁর অগণিত প্রজাহত্যায় শ্রীরামচন্দ্রের যে পাপবোধ, তার প্রায়শ্চিত্তেই এই রামেশ্বরমে রামনাথন শিব মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। যে কোন হত্যাই পাপ, সে যতবড়ো দুর্ধর্ষ শত্রুই হোক না কেন এবং তিনি নিজে অবতার হয়েও সেই নীতি ভুলে যাননি, সেখানেই তাঁর মহত্ত্ব।

মূল ভূখন্ড থেকে একটু আলাদা একটি ছোট্ট দ্বীপ এই রামেশ্বরম। আমরা পাম্বান ব্রিজ দিয়ে পাম্বান ক্যানেল পার হলাম ট্রেনে। গভীর নীল সমুদ্রের উপর, প্রায় দু”কিলোমিটার লম্বা এই ব্রিজ সেসময় ছিল ভারতবর্ষের দীর্ঘতম সাগরসেতুপণ্ডিচেরির সমুদ্রের পর, রেল যাত্রাপথে দুপাশের দিগন্তবিস্তৃত সুনীল সমুদ্র, আমাকে আরেক সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দিল। হিমালয় ও পাহাড়ের প্রতি আমার যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা ভেঙে দেওয়ার জন্যেই, সমুদ্র যেন উঠে পড়ে লাগল তার নতুন নতুন রূপের ভাণ্ডার নিয়ে।

পরের দিন ভোরবেলা মন্দিরের মাইকে দক্ষিণীসুরে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ শুনে ঘুম ভাঙল। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। নারকেল গাছের ঝিরিঝিরি পাতায় ভোরের একটানা হাওয়ার ঝরঝর শব্দ এবং মন্দির থেকে ভেসে আসা স্তোত্র উচ্চারণ শুনতে শুনতে কিছুটা হেঁটে দাঁড়ালাম আরেক সমুদ্রের সামনে। ঢেউ নেই বললেই চলে, মস্ত দীঘির সামনে দাঁড়ালেও জলের উপর সঞ্চরণশীল এমন তরঙ্গ দেখা যায়। এই সমুদ্রকে ঢেউ দিয়ে চেনা যায় না, চেনা যায় এর বিস্তার দিয়েসুনীল সীমাহীন বারিধি, বহুদূরে দিগন্তের কাছাকাছি দু একটা দ্বীপের আভাস। পায়ের গোছ ডোবানো জলে আমরা সমুদ্রের ভেতর অনেকখানি হেঁটে এলাম। পণ্ডিচেরির সাগরবেলায় কঠোর নিষেধ ছিল, এখানে নেই সমুদ্রকে স্পর্শ করে, আনন্দ করতে কোন বাধা নেই। দু এক বিন্দু জিভে ঠেকতেই বোঝা গেল লবণাম্বুর স্বাদ।

রামেশ্বরমের অগ্নিতীর্থ বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে উপবাসী আমরা প্রবেশ করলাম মন্দিরে। বিশাল উঁচু পোক্ত পাথরে গাঁথা প্রাচীর ঘেরা সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গণ। চার দিকে চারটি সুউচ্চ গোপুরম, তার একটি পার হয়ে প্রধান মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সবচেয়ে সুন্দর এবং উঁচু রাজগোপুরমের উচ্চতা প্রায় ৫৩.০ মি। মন্দিরের ভিতরে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫.০ মি চওড়া, প্রায় ৯.০ মি উঁচু এবং উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিক মিলে প্রায় ১২০০ মি লম্বা অলিন্দ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দ্বাদশ শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজবংশের হাতে এই অপূর্ব স্থাপত্যের সূত্রপাত তারপর ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলংকার অনেক রাজার হাতেই ঘটে গেছে এই মন্দিরের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। ভারতীয় স্থাপত্যের এমন সুন্দর অথচ বলিষ্ঠ কারিগরি নিদর্শন দেখে বেশ গর্ব অনুভব করলাম। প্রায় ১২০০ স্তম্ভের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অসাধারণ স্থাপত্যের কি অপূর্ব সে মহিমা! প্রায় সাতশ বছর ধরে অনেক প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক পালাবদল সামলেও প্রত্যেকটি স্তম্ভ আজও অটুট এবং অদ্ভূত সুন্দর।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম রামনাথস্বামীর পুজো সেরে মন্দিরের বাইরে আমরা উপবাস ভঙ্গ করলাম। সম্বর আর নারকেলের চাটনি সহযোগে নারকেল তেল সিক্ত মশলা দোসা এবং স্টেনলেসস্টিলের কাপে  উত্তপ্ত কফি। সেখানেই আলাপ হল মুরুগানের সঙ্গে। আসমুদ্রহিমাচল লক্ষ লক্ষ বালশ্রমিকের একজন মুরুগান। দোসা, ইডলি, উত্থাপম, কফির অর্ডার নেয়, টেবিলে সার্ভ করে, খাওয়ার পর এঁটো বাসন তুলে নিয়ে যায়। তামিল ছাড়া কোন ভাষাই তার বোধগম্য নয়, তামিলের বিন্দুবিসর্গও মায়ের জানা ছিল না। অথচ খুব অল্প সময়েই মা জেনে নিতে পেরেছিলেন, মুরুগানের ছোট্ট জীবনের ইতিহাস। মা মরা, বাপে খেদানো অসহায় বালক মুরুগানের খুব ইচ্ছে লেখা পড়া শেখার, কিন্তু পেটের দায় বড়ো দায়। মুরুগান তার এই ছোট্ট শহর রামেশ্বরমের সব চেনে, তার মতো করে জানে এই শহরের এবং রামনাথস্বামী মন্দিরের অনেক ইতিহাস।

আমাদের অনুরোধে হোটেলের মালিক, মুরুগানকে অনেকক্ষণের ছুটি দিলেন। আমাদের সঙ্গেই ছোট্ট শহরের  গাইড হয়ে সে অনেকক্ষণ ঘুরল। মায়ের অনেকদিনের শখ ছিল একটি পঞ্চমুখী শাঁখ নেবার মুরুগান অনেক দোকান ঘুরে, অনেক দরদাম করে কিনে দিল সুন্দর একখানি পঞ্চমুখী শাঁখ। মায়ের ইচ্ছেয় তার ওপর আমাদের দুইভাইয়ের নামও লিখিয়ে দিল মুরুগান।

রাত্রের ট্রেন ধরে আমাদের এবারের গন্তব্য কন্যাকুমারী। রাত সাড়ে নটা নাগাদ মুরুগানের হোটেলেই আমরা দক্ষিণী থালির নৈশাহার করে বিদায় নিলাম মুরুগানের কাছে। মায়ের চোখে জল, মুরুগানেরও চোখে জল। টাঙ্গায় লটবহর নিয়ে উঠে পড়তে মুরুগান হাত নেড়ে বলল – আম্মা, ভা মিন্তুম।

পিছনে পড়ে রইল প্রাচীন ভারতের অদ্ভূত গৌরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সনাতন ভারতের বঞ্চনার পরম্পরা। নির্জন হতে থাকা ছোট্ট শহরের পথে আমাদের টাঙ্গা চলতে লাগল ষ্টেশনের দিকে। পথের দুপাশে গাছের পাতায় পাতায় সাগরের হাওয়ার মর্ম্মর শব্দের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ মিলে সূদুর অতীতের পরশ রয়ে গেল আমার সমগ্র অনুভূতিতে।

চলবে...


শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮ 


১৫

 

যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র রাখার জন্যে ভল্লা তার নির্বাসন কুটির থেকে কিছুটা দূরে দুটি বিশাল গাছ নির্দিষ্ট করেছিল। সেই গাছের মাঝামাঝি উচ্চতায় দুটি শক্তপোক্ত মাচানও সেই বাঁধিয়ে রেখেছিল। ঘন পাতার আড়ালে সে মাচানের অবস্থান যথেষ্ট গোপন। ভূমি থেকে উপরের দিকে তাকালে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। গাছগুলিতে গুটি গুটি ফল হয়। সে ফল মানুষ কিংবা বাঁদরের ভক্ষ্য নয়। অতএব বাইরের উপদ্রব মুক্ত। হেমন্ত বা শীতেও সে গাছদুটির পাতা ঝরে না, চিরহরিৎ।

মধ্যরাত্রি শেষের দণ্ড দেড়েক আগেই সেই গন্তব্যে পৌঁছে, টানা-শকটদুটি খালি করে সমস্ত অস্ত্র সম্ভার উঠে গেছে, দুই গাছের দুই মাচায়। অতএব এতক্ষণে অস্ত্র অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করল ভল্লা। সকলকে ডেকে চাপা স্বরে বলল, “ছেলেরা, আমাদের আপাততঃ কাজ শেষ, এই স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আমরা দণ্ড দুয়েক বিশ্রাম নেব। তারপর ঊষাকালে যে যার বাড়ি ফিরে যাবি”। ছেলেরা ভল্লাকে ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে নানান কথাবার্তা বলতে লাগল। সকলেই প্রথম এই অভিযানের সাফল্যে গর্বিত, উচ্ছ্বসিত। একজন বলল, “ভল্লাদাদা, রাজার রক্ষীরা কোন ভুট্টার রুটি খায় গো? গুটিচারেক লোক ছাড়া কেউ আটকাতেই এল না! এই রক্ষীদের নিয়ে রাজ্য শাসন চলে?”

ভল্লা হাসল, কোন উত্তর দিল না। অন্য আরেকজন বলল, “সত্যিই, আস্থান থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুঠ করা যে এত সহজ হবে, কে জানত? যাবার সময় আমার তো রীতিমতো হাত-পা কাঁপছিল। ফুস্‌, গিয়ে দেখলাম কিছুই না, ছেলের হাতের মোয়া”!

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “এই অভিযানটাকে তেমন গুরুত্ব দিস না। এর পরের অভিযানগুলোতে টের পাবি, লড়াই কাকে বলে। কী ভাবে সত্যিকার লড়াই লড়তে হয়। এসব কথা এখন থাক। মন থেকে এই অভিযানের কথা সম্পূর্ণ সরিয়ে দে। বাড়ি গিয়ে বাবা-মা ভাইবোন যখন প্রশ্ন করবে কী জবাব দিবি, সেটা এখনি ঠিক করে নে”

“কেন? তুমি গত পরশুই বাড়িতে বলতে বলেছিলে, আমরা রাম-কথা শুনতে যাবো, পাশের রাজ্যে। আমরা সেকথা বলেই তো এসেছি”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “রামায়ণের কাহিনী বিশাল, তার মধ্যে কোন কাহিনী নিয়ে আমরা রামকথা শুনলাম, সেটা ভেবেছিস? নাকি নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে সকলে আলাদা আলাদা গল্প শোনাবি?  কেউ বলবি হরধনু ভঙ্গ, কিংবা বালি বধ, কিংবা সীতা হরণ – কোনটা? কিশনা ধর তুই তোর মাকে বললি, জটায়ূ বধের গল্প, আর মিকানি তার মাকে বলল মারীচবধের গল্প। এবার তোদের দুই মায়ের যখন দেখা হবে, তোদের মিথ্যে কথা ধরতে তাঁদের খুব সময় লাগবে কি?”

কেউ কোন উত্তর দিতে পারল না। ভল্লা হাসল, বলল, “আবারও বলছি, আজকের এই অভিযানের কথা ভুলে যা। নিজেদের মধ্যে এখন রামকথা নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা কর। আমি যতদূর জানি, গতকাল রাত্রে হরধনু ভঙ্গ নিয়ে রামকথা হয়েছে। অতএব তোদের সবাইকে হরধনু ভঙ্গ নিয়েই কথা বলতে হবে। এর আগে কোথাও যদি দেখে বা শুনে থাকিস, সেটাকে সকলে মিলে মনে করার চেষ্টা কর। নইলে সবাই – সব্বাই - ধরা পড়ে যাবি। শুধু এ গাঁয়ে নয় আশপাশের গাঁয়েও ঢি ঢি পড়ে যাবে। আমি সুকরার চারজনকে রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের চলে আসা উচিৎ”।

কিশনা বলল, “তারা এসে কী করবে?”

“আজকের রামকথা তারা কেমন দেখল, কী দেখল, সে কথা তোদের বলবে। বিষয়টা কেন গুরুতর তোরা বুঝতে পারছিস না। আস্থানের অস্ত্র লুঠের সংবাদ আগামী কাল দুপুর থেকেই গ্রামের সকলে জেনে যাবে। তখন তোদের মিথ্যে গল্পের সঙ্গে আস্থান লুঠের যোগসূত্র বুঝে যাবে তোদের গ্রামের কুকুর-ছাগলগুলোও”!

বিষাণ বলল, “আমি এর আগে দু বার হরধনু ভঙ্গ দেখেছি…তাহলে সে নিয়েই আলোচনা হোক”।

ভল্লা হেসে মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক। আরও একটা ঝুঁকির কথা বলি। ওই রামকথা শুনতে আশেপাশের গ্রাম থেকেও কিছু লোক গিয়ে থাকতে পারে। তারা তোদের কাউকে কাউকে হয়তো চেনে। তাদের কেউ বলতেই পারে – আমি তো কাল গেছিলাম, কই তোদের তো দেখলাম না! কোথায়, কোনদিকে বসেছিলি? সে বিপদের কথাও ভেবে রাখিস”।

ছেলেরা ভল্লার কথায় অবাক হয়ে নির্বাক হয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভল্লা আবার হেসে বলল, “এই অভিযানটা  তোদের ছেলের হাতের মোয়া মনে হচ্ছে তো? তার কারণ আমার কাছে খবর ছিল, গতকাল সন্ধ্যে থেকে  আস্থানে পূর্ণিমা-উৎসব পালন করছে। রক্ষীদের অধিকাংশই তাড্ডির নেশায় মাতাল ছিল। সেই সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি মাত্র”। একটু থেমে আবার বলল, “এই অভিযান তখনই সফল হবে, যদি তোদের একজনও কেউ ধরা না পড়িস। মনে রাখিস, একজনও কেউ ধরা পড়লে, তার পেট থেকে সকলের নাম-ধাম বের করে নেওয়াটা রাজরক্ষীদের কাছে – ছেলের হাতের মোয়া”।

ভল্লা ছেলেদের মুখ আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেল, বলল, “ভয় পাস না। চিন্তা কর, ভাবনা কর। আর যেমন যেমন বললাম, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নে – সকলের বক্তব্য যেন একই হয়”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে আসা জরুরি। কথা বলতে বলতেও সে হানো, শলকু আর আহোকের দিকেও লক্ষ্য রাখছিল। হানোর অবস্থা এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি। বরং তার পাগলামি বাড়ছে। ভল্লা হানোর কাছে গেল, তার কাঁধে হাত রেখে অনুভব করল ধূম জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। ভল্লার ভুরু কুঁচকে উঠল। একটু পাশে সরে এসে সে চিন্তা করতে লাগল, কী করে হানোকে নির্বিঘ্নে সরিয়ে ফেলা যায়তার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল রামালি। “ভল্লাদাদা, হানোর জন্যে আমরা সবাই মনে হচ্ছে ডুববো”।

ভল্লা তীক্ষ্ণ চোখে রামালির দিকে তাকাল, বলল, “হুঁ। কিন্তু কী করা যায়?”

“সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর তো কোন পথ দেখছি না”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল। রামালির মতো ছেলের মুখে এমন নির্বিকার সিদ্ধান্তের কথা, ভল্লা আশা করেনি। রামালি তার দলে ভিড়েছে প্রথম দিন থেকে। যে কোন বিষয় জানার এবং শেখার জন্যে তার যে তীব্র নিষ্ঠা, সেটা ভল্লার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু ছেলেটার চোখেমুখে কোনদিন কোন উচ্ছ্বাস, আনন্দ, কষ্টবোধ সে লক্ষ্য করেনি। সে শুনেছে শৈশবে বাপ-মা মরা ছেলেটি বড়ো হয়েছে কাকা-কাকিমার সংসারে। রামালির প্রতি তার কাকার স্নেহ ও সহানুভূতি থাকলেও, কাকিমা তার ওপর সর্বদাই খড়্গহস্তা। ভল্লার মনে হয়েছে আশৈশব নানান অত্যাচার, বঞ্চনা এবং নির্স্নেহ - তার মানসিক চরিত্রটাকেই এভাবে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে রামালির আশ্চর্য উদাসীন ব্যবহার চমকে দিল ভল্লাকে

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল “এখানে এতজনের সামনে, কী ভাবে?”

এতটুকু সময় না নিয়ে রামালি বলল, “সাপ। দুর্ঘটনা – অপঘাত মৃত্যু। এই জঙ্গলে বেশ কিছু সাপের বাসা আমার জানা আছে – কেউটে, গোখরো”।

অন্ধকারে, গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া চাঁদের ঝিলিমিলি আলোয় ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। রামালি বলল, “তুমি অনুমতি দিলেই…”। ভল্লা তাকিয়েই রইল রামালির দিকে। একটু পরে রামালি দৌড়ে মিশে গেল অন্ধকার জঙ্গলে। ভল্লা সরে গেল অন্য দিকে। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হরধনু ভঙ্গ প্রসঙ্গে গবেষণায় নিবিষ্ট। ভল্লা সবার মুখই দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। এখন হানোকে সে আর দেখছে না। তার চোখ বারবার ফিরে আসছে শলকু আর আহোকের মুখে। দুজনেই এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তাও সে স্বস্তি পাচ্ছে না। 

এই সময়েই সুকরার চারজন ছোকরা এসে যোগ দিল ওদের দলে, ভল্লা যাদের রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিল। ওদের কাছে গিয়ে ভল্লা বলল, “যা ওরা সবাই রামকথা নিয়েই আলোচনা করছে, ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দে, তোরা ঠিক ঠিক কী দেখলি, কেমন দেখলি”।

তার পরিকল্পনায় এখনও পর্যন্ত কোন ত্রুটি ঘটেনি – শুধু হানোর ব্যাপারটা ছাড়া। হানোর মতো উদ্যোগী এবং কর্মঠ এক যুবক যে মানসিকভাবে এত দুর্বল – সেকথা ভল্লা বুঝতে পারেনি। ভল্লা এখনও পর্যন্ত তার এই ভুলটুকুই খুঁজে পেয়েছে – তবে ভুলটা সামান্য নয়। এর ফল হতে পারে মারাত্মক।     

প্রত্যূষের দণ্ডখানেক পার হওয়ার পরেও ভল্লা কারও চোখেমুখে ক্লান্তি বা ঘুমের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রায় সারারাত পালাগান বা রামকথা শুনে, কবে কোন লোকের চোখেমুখে বিনিদ্র-ক্লান্তির লক্ষণ ফোটে না? কিন্তু এদের চোখে মুখে কোথাও ক্লান্তির লেশমাত্র নেই! প্রথম অভিযান এমন নির্বিঘ্নে সফল হওয়ার আনন্দে তাদের মন এতই আত্মতুষ্ট এবং গর্বিত যে তাদের ক্লান্তি নেই? ঘুম আসছে না? এদিকে ভোর হতেআর দেরি নেই – ভোরে সকলের ঘরে ফেরা উচিৎ। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেলেরা এবার তোদের ঘরের দিকে রওনা হওয়া প্রয়োজন। এখনই রওনা হলে ভোরের দিকে গ্রামে পৌঁছতে পারবি। আশা করি নিজেদের মধ্যে আলোচনায় রাত্রের হরধনু-ভঙ্গ পালার প্রতিটি ঘটনা সকলেই জেনে গিয়েছিস। বাড়িতে জিজ্ঞাসা করলে সকলেই একই রকম কথা বলতে পারবি নিশ্চয়ই”।

দলের ছেলেদের অধিকাংশই বলে উঠল, “পারবো, তুমি চিন্তা করো না, ভল্লাদাদা।“

“বাঃ বেশ। আরেকটা কথা বলে রাখি। আগামীকাল তোদের বাবা-জ্যাঠারা হয়তো জেনে যাবেন, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে। হয়তো তাঁদের মুখে শুনবি – দু তিনজন রক্ষীর মৃত্যু সংবাদও!”

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? হত্যা? আমাদের কেউ করেছে নাকি?” ছেলেরা আঁতকে উঠল ভয়ে।

ভল্লা বলল, “হতে পারে। নাও হতে পারে। অনেক সময় প্রশাসন থেকে মিথ্যে কথাও বলা হয়, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে”।

ছেলেরা ভল্লার মুখের দিকে আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভল্লা তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত ভয় পাচ্ছিস কেন? এরকম উড়ো খবর শুনে বাবা-জ্যাঠাদের সামনে অমন ভয়ে শিউরে উঠবি নাকি? ডাকাতির সংবাদ শুনে, সবাই অবাক হয়ে যেমন “তাই নাকি?”, "কখন হল?" "ডাকাতের দল এল কোথা থেকে?" বলে, সেরকমই বলবি। মৃত্যুর সংবাদ শুনেও একই ভাবে বলবি “বলছো কী? ইস্‌ কি ভয়ংকর”!  ব্যস। তার বেশি বা কম নয়”।

ভল্লা একটু সময় নিল, তারপর আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস, শুধু অভিযান করলেই বীর হওয়া যায় না। তার পরেও প্রতিটি পা ফেলতে হয় বুদ্ধি আর বিবেচনা করে। এতটুকু ভুল কথা, সামান্য বেঠিক আচরণে তোরা সবাই বিপদে পড়ে যেতে পারিস। আশা করি এই একটা মাত্র অভিযান করেই, তোদের কেউই চাইবি না, রাজার কারাগারে সারাজীবনটা কাটুক। প্রকৃত বীরকে অনেক পথ চলতে হয় অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে। যা, এবার রওনা হয়ে পর। আর দেরি করিস না”।

ছেলের দল উঠে দাঁড়াল। শলকু বলল, “আজকে আর সকালের মহড়ার কথা বলো না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, শলকুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোদের মহড়া আজ বন্ধ। তবে আমি আজ সকালের দিকে চাষিভাইদের সঙ্গে মাঠে থাকবো। ওদের কাজকর্ম দেখাশোনা করবো। বাঁধটার আরও কিছু মেরামতি দরকার”।

শলকু বলল, “তুমিও তো সারারাত ঘুমোওনি। আজ বিশ্রাম নিতে পারতে”।

ভল্লা হেসে বলল, “কে বলল আমি কাল সারারাত ঘুমোইনি? আমি তো রামকথা দেখতে যাইনি। তোরা কাল রাত্রি দেড়প্রহরে বেরিয়ে যেতেই, আমি রান্নাবান্না করেছি, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছি…। তোদের কারও সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি...।

ভল্লার কথা শেষ হল না, একজন দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, হানোর কোন সাড়াশব্দ নেই, চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, মারা গেছে”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কী যাতা বলছিস? কই চল তো দেখি”।

সকলে হানোর পড়ে থাকা শরীরটার দিকে দৌড়ে গেল। ভল্লা উবু হয়ে বসে নাকের নীচে আঙুল রাখল, কবজি ধরে নাড়ি পরখ করল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, না প্রাণ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল হানোর বাঁ কানের নীচেয় – কালচে নীল হয়ে রয়েছে জায়গাটা। তার মাঝখানে দুটো সূক্ষ্ম ছিদ্র – সাপের ছোবল। ভল্লা কিছু বলল না। কিছু বলার দরকারও ছিল না। বছরে এমন একটা-দুটো সর্পদংশনের ঘটনা গ্রামের ছেলেরা ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখেছে। তবে সেগুলো সাধারণতঃ হয় পায়ে, অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে, অথবা জমিতে নীচু হয়ে কাজ করতে গিয়ে, হাতে। সে সব ক্ষেত্রে কখনও সখনও মানুষ বেঁচেও যায়। কিন্তু হানোকে ছুবলেছে – মোক্ষম জায়গায়, বেঁচে ফেরার কথাই ওঠে না।  

কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “চটপট একটা হালকা মাচা বানিয়ে, হানোকে সাবধানে নিয়ে যা। ছেলেটা সবে তৈরি হয়ে উঠছিল রে…এভাবে বেঘোরে মারা পড়ল…” ভল্লার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

গাছের ডাল কেটে মাচা বানিয়ে চার জন ছেলে হানোকে কাঁধে চাপিয়ে নিল। ছেলেদের সকলের মুখই এখন বিষণ্ণ। ক্লান্ত। অবসন্ন। এতক্ষণ তাদের মনে যে উত্তেজনা ও আনন্দ ছিল, সে সব মুছে দিয়ে গেল হানোর এই ভয়ংকর মৃত্যু। ভল্লা তাকিয়ে রইল দলটার দিকে। দলের পিছনে ছিল রামালি। রামালির সঙ্গে ভল্লার ক্ষণিকের চোখাচোখি হল। রামালির মুখও এখন আশ্চর্য অবসন্ন।

ভল্লা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া লক্ষ্য করল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। এখনও অন্ধকার। পাখিরা ঘুম ভেঙে সবে ডাকতে শুরু করেছে। ভোরের বাতাস গাছের পাতায় পাতায় তুলছে মর্মর শব্দ।    



চলবে...

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৫শ পর্ব

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের চতুর্দশ অধ্যায়ঃ গুণত্রয়বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৪শ পর্ব "


পঞ্চদশ অধ্যায়ঃ পুরুষোত্তমযোগ


শ্রীভগবানুবাচ

ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম্‌।

ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ঊর্ধ্ব-মূলম্‌-অধঃশাখম্‌-অশ্বত্থং প্রাহুঃ অব্যয়ম্‌।

ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যঃ তং বেদ স বেদবিৎ।।

শ্রীভগবান বললেন- জ্ঞানীজনেরা বলেন এই সংসার যেন একটি অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার ঊর্ধে শিকড় আর নীচেয় শাখা প্রশাখা, চারবেদ যেন এই বৃক্ষের পাতা। এই বৃক্ষটির স্বরূপ যিনি বোঝেন, তিনিই বেদজ্ঞ।

[অশ্বত্থ কথার মূল অর্থ যা কাল পর্যন্ত থাকে না, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। ইহলোকে সংসারে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে আবদ্ধ ক্ষণস্থায়ী জীবনের নিরন্তর জীবন চক্রকেই অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।]

[এই শ্লোকটির অনুরূপ শ্লোক পাওয়া যায় কঠোপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর প্রথমেই। ধর্মরাজ যম সেখানে অশ্বত্থ বৃক্ষকে সনাতন বলেছেন, এখানে ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন অব্যয়। বাকি বক্তব্য প্রায় একই। কঠোপনিষদের ওই পর্বটি এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - কঠোপনিষদ - ২/৩ (শেষ পর্ব)। এই কারণেই পণ্ডিতেরা বলেন, গীতা হল সকল উপনিষদের সারাংশ - অতএব আমাদের সনাতন ধর্মের মূল-তত্ত্বকথাগুলি এক গীতার মধ্যেই যেন বিধৃত।]     

 

অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ।

অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি কর্মানুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে।।

অধঃ চ ঊর্ধ্বং প্রসৃতাঃ তস্য শাখা গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়-প্রবালাঃ।

অধঃ চ মূলানি অনুসন্ততানি কর্ম-অনুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে।।

এই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা ত্রিগুণের প্রভাবে বেড়ে উঠে বিষয়রূপ পল্লব হয়ে নীচের থেকে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আবার ঊর্ধের মূলসমূহ মানুষের সুকর্ম এবং কুকর্মের ফলস্বরূপ নীচের দিকেও প্রসারিত হয়ে থাকে।

 

৩,৪

ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে

নান্তো ন চার্দিন চ সম্প্রতিষ্ঠা।

অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলমসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।।

ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং

যস্মিন্‌ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ।

তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে

যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী।।

ন রূপম্‌ অস্য ইহ তথা উপলভ্যতে

ন অন্ত ন চ আদিঃ ন চ সম্প্রতিষ্ঠা।

অশ্বত্থম্‌ এনং সুবিরূঢ়মূলম্‌ অসঙ্গ-শস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা।। ৩

ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং

যস্মিন্‌ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ।

তম্‌ এব চ আদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে

যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী।। ৪

ইহলোকে সংসাররূপ এই অশ্বত্থের রূপ সঠিক উপলব্ধি করা যায় না, কারণ এই বৃক্ষের শেষ নেই, শুরু নেই, এমনকি মধ্যবর্তী স্থিতাবস্থাও নেই। এই বদ্ধমূল অশ্বত্থবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রে কেটে ফেলার পর, যে ব্রহ্মপদ লাভ করলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না, সেই পরম ব্রহ্মপদের অন্বেষণ করা উচিৎ। আমি সেই আদি পরমব্রহ্মপুরুষেরই শরণাপন্ন হই, যাঁর থেকে এই চিরন্তনী সংসার-প্রবৃত্তি প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

  

     ৫

নির্মানমোহা জিতসঙ্গদোষা

অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তিকামাঃ।

দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈর্গচ্ছন্ত্যমূঢ়া

পদমব্যয়ং তৎ।।

নিঃ-মান-মোহা জিত-সঙ্গ-দোষা

অধ্যাত্ম-নিত্যাঃ বিনিবৃত্তি-কামাঃ।

দ্বন্দ্বৈঃ-বিমুক্তাঃ সুখ-দুঃখ-সংজ্ঞৈঃ গচ্ছন্তি অমূঢ়া

পদম্‌ অব্যয়ং তৎ।।

অহংকারহীন ও মোহবর্জিত হয়ে, আসক্তির সমস্ত দোষ জয় করে, পরমাত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা নিয়ে, বাসনা ত্যাগ করে, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে, জ্ঞানী ও বিবেকী ব্যক্তিরাই সেই অব্যয় পরমব্রহ্মপদ লাভ করেন।

  

ন তদ্ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।

যদ্‌ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।

ন তৎ ভাসয়তে সূর্যঃ ন শশাঙ্কঃ ন পাবকঃ।

যৎ গত্বা ন নিবর্তন্তে তৎ ধাম পরমং মম।।

যে পদ লাভ করলে আবার জন্ম নিতে হয় না, সূর্য, চন্দ্র কিংবা অগ্নি যাঁকে প্রকাশ করতে পারেন না, সেই পদই আমার কাছে পরম ব্রহ্মপদ।

  

মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।

মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।

মম এব অংশঃ জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।

মনঃ-ষষ্ঠানি-ইন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি।।

কারণ আমারই সনাতন একটি অংশ জীবলোকে জীবভূতরূপে, প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও ছয় ইন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে।

 

শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ।

গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ।।

শরীরং যৎ অবাপ্নোতি যৎ চ অপি উৎক্রামতি ঈশ্বরঃ।

গৃহীত্বা এতানি সংযাতি বায়ুঃ-গন্ধান-ইব-আশয়াৎ।।

যেমন বায়ু পুষ্প থেকে গন্ধ আহরণ করে, তেমনি দেহের অধিকারী, শরীর ত্যাগের সময়, পূর্ব দেহ থেকে সমস্ত ইন্দ্রিয় আহরণ করে প্রস্থান করেন ও নতুন শরীর ধারণ করেন।

 

শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনঞ্চ রসনং ঘ্রাণমেব চ।

অধিষ্ঠায় মনশ্চায়ং বিষয়ানুপসেবতে।।

শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনং চ রসনং ঘ্রাণম্‌ এব চ।

অধিষ্ঠায় মনঃ চ অয়ং বিষয়ান্‌ উপসেবতে।।

দেহের অধিকারী এই জীবাত্মা কান, চোখ, ত্বক, জিভ ও নাক এমনকি মনকেও আশ্রয় করে বিষয় সম্পদ উপভোগ করেন।

 

     ১০

উৎক্রামন্তং স্থিতং বাপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্‌।

বিমূঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ।।

উৎক্রামন্তং স্থিতং বা অপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্‌।

বিমূঢ়া ন অনুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ।।

যে জীবাত্মা অন্য শরীরে গমন করেন ও অবস্থান করেন, যিনি ইন্দ্রিয় ও তিনগুণের প্রভাবে বিষয় ভোগ করতে থাকেন, তাঁকে অজ্ঞান ব্যক্তি দেখতে পায় না, কিন্তু আত্মজ্ঞানীরা তাঁকে দেখতে পান।

 

১১

যতন্তো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্ত্যাত্মন্যবস্থিতম্‌।

যতন্তোঽপ্যকৃতাত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ।।

যতন্তঃ যোগিনঃ চ এনং পশ্যন্তি আত্মনি অবস্থিতম্‌।

যতন্তঃ অপি অকৃত আত্মানঃ ন এনং পশ্যন্তি অচেতসঃ।।

সমাহিত চিত্তের যোগীগণ এই আত্মাকে নিজের আত্মায় প্রতিষ্ঠিত দেখতে পান, কিন্তু অশুদ্ধচিত্তের বিবেকহীন মানুষ এই আত্মাকে দেখতে পায় না।

 

    ১২

যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ভাসয়তেঽখিলম্‌।

যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্‌।।

যৎ আদিত্য-গতং তেজঃ জগৎ ভাসয়তে অখিলম্‌।

যৎ চন্দ্রম্‌ অসি যৎ চ অগ্নৌ তৎ তেজঃ বিদ্ধি মামকম্‌।।

সূর্যের যে তেজে, চন্দ্রের যে জ্যোতিতে এবং অগ্নির যে দাহিকাশক্তিতে এই অখিল জগৎ উদ্ভাসিত হয়, জেনে রাখো, সেই তেজ আমারই।

 

১৩

গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়ম্যহমোজসা।

পুষ্ণামি চৌষধীঃ সর্বাঃ সোমো ভূত্বা রসাত্মকঃ।।

গাম্‌ আবিশ্য চ ভূতানি ধারয়মি অহম্‌ ওজসা।

পুষ্ণামি চ ঔষধীঃ সর্বাঃ সোমঃ ভূত্বা রস-আত্মকঃ।।

এই নিখিল ভুবনে প্রবেশ ক’রে, আমার ঐশ্বরিক শক্তি দিয়ে স্থাবর জঙ্গম সকল ভূতকে আমিই ধারণ করি। রসাত্মক চন্দ্র হয়ে আমিই সমস্ত শস্যকে পুষ্টি দান করি।

 

    ১৪

অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।

প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্‌।।

অহং বৈশ্বানরঃ ভূত্বা প্রাণিনাং দেহম্‌ আশ্রিতঃ।

প্রাণ-অপান-সমাযুক্তঃ পচামি অন্নং চতুঃ-বিধম্‌।।

আমিই অগ্নি রূপে জীবদেহে অবস্থান করি এবং প্রাণ ও অপানবায়ুর সংযোগে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, এই চার প্রকারের খাদ্য পরিপাক করি।

 

১৫

সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো

মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনঞ্চ।

বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো

বেদান্তকৃদ্‌ বেদবিদেব চাহম্‌।

সর্বস্য চ অহং হৃদি সন্নিবিষ্টো

মত্তঃ স্মৃতিঃ-জ্ঞানম্‌ অপোহনং চ।

বেদৈঃ চ সর্বৈঃ অহম্‌ এব বেদ্যঃ

বেদান্ত-কৃৎ বেদ-বিৎ এব চ অহম্‌।

আমিই সকল জীবের হৃদয়ে সম্যকরূপে নিবিষ্ট থাকি, আমার থেকেই স্মৃতি ও জ্ঞানের উপলব্ধি হয় আবার অবলুপ্তিও ঘটে। সকল বেদে আমিই জ্ঞানের বিষয়, বেদান্তের অধিকারী আমিই বেদজ্ঞ।

  

   ১৬

দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ।

ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থোঽক্ষর উচ্যতে।।

দ্বৌ ইমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরঃ চ অক্ষরঃ এব চ।

ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কূটস্থঃ অক্ষরঃ উচ্যতে।।

ক্ষর ও অক্ষর এই দুইধরনের পুরুষ জগতে প্রসিদ্ধ।  বিনাশী বিকার থেকে উৎপন্ন সমস্ত ভূতকে ক্ষর পুরুষ এবং কূটস্থ নির্বিকার পুরুষকে অক্ষর বলে।

[ক্ষর কথার অর্থ যার ক্ষরণ বা ক্ষয় হয় - অর্থাৎ বিনাশী, নশ্বর। আর অক্ষর হল তার বিপরীত, অর্থাৎ অবিনাশী, অব্যয়, অবিনশ্বর]  

 

১৭

উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃতঃ।

যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ।।

উত্তমঃ পুরুষঃ তু অন্যঃ পরমাত্মা ইতি উদাহৃতঃ।

যঃ লোকত্রয়ম্‌ আবিশ্য বিভর্তি অব্যয়ঃ ঈশ্বরঃ।।

এই দুই পুরুষ ছাড়া আরেক জন শ্রেষ্ঠ পুরুষ আছেন, তিনিই পুরুষোত্তম নামে অভিহিত হন। ভূঃ, ভুবঃ আর স্বঃ -এই তিন ভুবনের মধ্যে অবস্থান ক’রে, তিনিই অব্যয় ঈশ্বররূপে সকলকে পালন করেন।

 

    ১৮

যস্মাৎ ক্ষরমতীতোঽহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ।

অতোঽস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।

যস্মাৎ ক্ষরম্‌ অতীতঃ অহম্‌ অক্ষরাৎ অপি চ উত্তমঃ।

অতঃ অস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ।।

যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষরের অনেক ঊর্ধে, সেহেতু সর্বলোকে এবং সকল বেদে, আমিই পুরুষোত্তম নামে প্রখ্যাত।

 

১৯

যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্‌।

স সর্ববিদ্‌ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।

যঃ মাম্‌ এবম্‌ অসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষ-উত্তমম্‌।

স সর্ববিদ্‌ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।

হে অর্জুন, সমস্ত মোহমুক্ত হয়ে, অভিমানশূণ্য চিত্তে যিনি আমাকেই পুরুষোত্তম উপলব্ধি করেন, সেই সর্বজ্ঞ ব্যক্তি সর্বতোভাবে আমারই উপাসনা করেন।

 

২০

ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রমিদমুক্তং ময়াঽনঘ।

এতদ্‌ বুদ্ধা বুদ্ধিমান্‌ স্যাৎ কৃতকৃত্যশ্চ ভারত।।

ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রম্‌ ইদম্‌ উক্তং ময়া অনঘ।

এতদ্‌ বুদ্ধা বুদ্ধিমান্‌ স্যাৎ কৃতকৃত্যঃ চ ভারত।।

হে অপাপবিদ্ধ অর্জুন, এই যে পরমরহস্যময় শাস্ত্রতত্ত্ব আমি তোমাকে ব্যাখা করলাম, এই তত্ত্ব জানতে পারলে যে কোন ব্যক্তি পরম জ্ঞানী ও কৃতার্থ হয়ে থাকেন। 


পুরুষোত্তমযোগ সমাপ্ত

চলবে...





নতুন পোস্টগুলি

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

   এর আগের রম্যকথা - "  আকাশের অর্ঘ্য  "  আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মান...