বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের পঞ্চম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৫ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)


৪.৩.২ গুপ্ত সাম্রাজ্য

ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর্বকে সব থেকে উজ্জ্বল পর্যায় বলা হয়, তার কারণ এই সময়ের সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রাচুর্য। যার থেকে সমসাময়িক ভারতবর্ষের পরিস্থিতি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্যক ধারণা করা যায়।

গুপ্তদের বংশ পরিচয় অস্পষ্ট, অনেক ঐতিহাসিক তাঁদের নামে “গুপ্ত” সংযোগ দেখে বৈশ্য বলে মনে করেন। কিন্তু গুপ্ত দেখেই বৈশ্য ধারণা করা হয়তো সঠিক নয়, কারণ সমসাময়িক কালে ব্রহ্মগুপ্ত নামে এক জ্যোতির্বিদের নাম পাওয়া যায়, যিনি একজন বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত।

গুপ্ত বংশের প্রথম যে রাজার নাম পাওয়া যায় তাঁর নাম শ্রীগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল “মহারাজা”। অনুমান করা হয় মগধ অঞ্চলের ছোট কোন রাজ্যে তাঁর রাজত্ব ছিল। চৈনিক পর্যটক ই-ৎসিং-এর বর্ণনা থেকে তাঁকে চিহ্নিত করা যায়। ওই বর্ণনা অনুযায়ী মহারাজা চি-লি-কি-তো (শ্রীগুপ্ত) চৈনিক তীর্থযাত্রীদের জন্য মৃগশিখাবনে একটি বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ই-ৎসিংয়ের ভারতভ্রমণ কাল ৬৭৩-৬৯৫ সি.ই., তিনি লিখেছেন, মন্দিরটি প্রায় পাঁচশ বছর আগে নির্মিত হলেও, তাঁর ভ্রমণকালে খুব সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে দেখেছেন। সেক্ষেত্রে শ্রীগুপ্তর সময়কাল হওয়া উচিৎ ১৭৩ সি.ই., কিন্তু ই-ৎসিংয়ের “পাঁচশ বছর”কে নির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে না ধরে, যথেষ্ট প্রাচীন হিসেবে কথার-কথা ধরা যেতে পারে। শ্রীগুপ্তর সময় যদি ২৭৩ সি.ই. ধরা যায়, সেক্ষেত্রেও ই-ৎসিং-য়ের সময় ওই মন্দিরের বয়স প্রায় চারশ বছরের কাছাকাছি!

শ্রীগুপ্ত-র পুত্রের নাম ঘটোৎকচ, তিনিও মহারাজা উপাধি ব্যবহার করতেন, তবে তাঁর সম্পর্কে তেমন আর কিছুই জানা যায় না।

 

৪.৩.২.১ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত

ঘটোৎকচের পর তাঁর পুত্র চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন এবং তিনি “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। যার থেকে ধারণা করা যায় গুপ্তবংশের তিনিই প্রথম রাজা, যিনি এই বংশের শক্তি এবং মর্যাদা বাড়িয়ে তুলতে পেরেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবির রাজকুমারী কুমারদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শিলানির্দেশে নিজেকে “লিচ্ছবিদৌহিত্র” বলে উল্লেখ করেছেন। চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে লিচ্ছবি রাজকুমারীর এই বিবাহের আরও সমর্থন পাওয়া যায়, তাঁর প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রায়। তাঁর মুদ্রার একদিকে মুদ্রিত আছে, চন্দ্রগুপ্ত তাঁর পত্নীকে সোনার বলয় উপহার দিচ্ছেন, এবং ডানদিকে লেখা আছে চন্দ্র এবং বাঁদিকে কুমারদেবী। মুদ্রার অপরদিকে মুদ্রিত সিংহবাহিনী দেবীর চিত্র এবং লেখা আছে “লিচ্ছবায়া”। এই মুদ্রার মুদ্রণ এবং সূক্ষ্ম গুণমান, সমসাময়িক রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রাগুলির সমতুল্য।

ভগবান মহাবীর ও ভগবান বুদ্ধের সময়ে এই লিচ্ছবি-গণরাজ্যের রাজধানী বৈশালী (আধুনিক বিহারের মজঃফরপুর অঞ্চল) গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পন্ন শহর ছিল। অজাতশত্রুর হাতে পরাজয়ের পর, লিচ্ছবিরা নেপালের কাঠমাণ্ডু অঞ্চলে নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অতএব কয়েক শতাব্দী পরে হলেও, বিখ্যাত লিচ্ছবিদের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা, নিঃসন্দেহে উভয় পক্ষেরই সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধির সূচনা করেছিল।

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের সময়সীমা ৩২০ থেকে ৩৩৫ সি.ই.। সমসাময়িক নানান উল্লেখ থেকে অনুমান করা হয় তাঁর রাজ্যের সীমা দক্ষিণ বিহার, মগধ, প্রয়াগ, সাকেত এবং অবশ্যই বৈশালী এবং তার সংলগ্ন অঞ্চল।

 

৪.৩.২.২ সমুদ্রগুপ্ত                                

প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত। যদিও মনে করা হয় তিনি প্রথম চন্দ্রগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, কিন্তু পিতা তাঁকেই রাজপদে নির্বাচিত করেছিলেন। অতএব প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর রাজ পরিবারে কিছুটা অশান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। যাই হোক, সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসে, পিতার আস্থার মর্যাদা রাখতে পেরেছিলেন এবং গুপ্ত রাজ্যকে সাম্রাজ্য বানিয়ে তুলেছিলেন।

সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য বিস্তারের বিবরণ পাওয়া যায়, এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে। ঘটনাচক্রে এই শিলালিপিটি ছিল সম্রাট অশোকের, যার ওপর তিনি শান্তি ও মৈত্রীর নির্দেশ লিখিয়েছিলেন। সেই শিলারই অন্য অংশে সমুদ্রগুপ্ত লেখালেন তাঁর রক্তক্ষয়ী “দিগ্বিজয়”-এর বৃত্তান্ত! এই শিলা লেখের সময়কাল ৩৬০ সি.ই.। এই শিলালিপিতে তিনি বহু রাজ্যের রাজা, আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী নেতার নাম উল্লেখ করেছেন, যার থেকে গুপ্তযুগের আগে সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক পটভূমি এবং তার বিচিত্র অনৈক্য এবং বিভাজনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই শিলালিপির বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা - পূর্বের চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাজস্থান, পাঞ্জাব। পশ্চিমের মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। মধ্যভারত, আর্যাবার্ত এবং দাক্ষিণাত্যের চের (কেরালা) রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত। যদিও ঐতিহাসিকরা তাঁর এই শিলালিপির বর্ণনাকে অতিরঞ্জিত মনে করেন, কারণ সমুদ্রগুপ্তের উল্লেখ করা সবকটি প্রান্তে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্তির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়নি। সে যাই হোক, তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই জানা যায়, কিছু কিছু রাজ্যের রাজাদের তিনি হত্যা করে নির্বংশ করে দিয়েছিলেন। কিছু কিছু রাজাদের বন্দী করার পর, তাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অনেক রাজ্য নিজে থেকেই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। 

৪.৩.২.৩ বৈদেশিক সম্পর্ক

সমুদ্রগুপ্তের বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর প্রতিবেশী দেশ এবং রাজ্যগুলির রাজারা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল এবং মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছিল। সমসাময়িক সিংহলের রাজা মেঘবন্ন বা মেঘবর্ণ (৩৫২-৩৭৯ সি.ই.), দুজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে পাঠিয়েছিলেন ধর্মদূত হিসেবে। শোনা যায় ওই দুই ধর্মদূত সমুদ্রগুপ্তের রাজসভায় কোন স্বীকৃতি এবং আতিথ্য পাননি। এর পর মেঘবর্ণ সমুদ্রগুপ্তের সভায় প্রথাগতভাবে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল মেনে রাজদূত পাঠিয়েছিলেন এবং সিংহলী তীর্থযাত্রীদের জন্যে একটি বৌদ্ধ বিহার বানানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। এবার সমুদ্রগুপ্ত সসম্মান অনুমতি দিয়েছিলেন এবং বোধগয়ায় বিখ্যাত “মহাবোধি সংঘারাম” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপিতে দৈবপুত্র-শাহি–শাহানুসাহি-শক-মুরুণ্ড নামে কিছু রাজারও বশ্যতা স্বীকারের কথা উল্লেখ আছে। এই নামগুলি থেকে অনুমান করা হয় এঁরা আফগানিস্তান এবং বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্দ অঞ্চলের শক এবং কুষাণ রাজা। এঁরা বশ্যতা স্বীকার না করলেও, নিঃসন্দেহে সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনা করেছিলেন।

 এই দিগ্বিজয়ের পরই তিনি ৩৬০ সি.ই.-র কোন সময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, যদিও এই বিষয়ে তাঁর শিলালিপিতে কোন উল্লেখ নেই। এই যজ্ঞে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছিলেন এবং এই যজ্ঞ উপলক্ষে সোনার মুদ্রার প্রকাশ করেছিলেন। সেই মুদ্রার একদিকে “যূপকাষ্ঠ”[1] -এর সামনে একটি ঘোড়ার চিত্র এবং অন্য দিকে রাণির ছবি ও লেখা “অশ্বমেধপরাক্রম” মুদ্রিত ছিল। এই যজ্ঞের আয়োজনকে তিনি সগৌরবে “চিরোৎসন্নাশ্বমেধাবর্তূঃ” বলে উল্লেখ করেছেন, এই কথার অর্থ “বহু যুগ আগে উৎসন্নে যাওয়া অশ্বমেধ (যজ্ঞ) আবার পালিত হল।” 

 অশ্বমেধ যজ্ঞের স্মারক সমুদ্রগুপ্তর স্বর্ণমুদ্রা  

অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেও, তিনি ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এমন নয়। সে আলোচনা যথা সময়ে আসবে। তাঁর প্রশাসনিক সিলমোহরের প্রতীক ছিল “গরুড়”।


৪.৩.২.৪  সমুদ্রগুপ্তর গুণাবলী ও সুকৃতি

শুধুমাত্র যুদ্ধ জয় এবং দিগ্বিজয়ই নয়, সমুদ্রগুপ্ত নানা দিকেই প্রতিভাশালী ছিলেন। তিনি নিজেই বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন এবং গুণীজন ও পণ্ডিতদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। কাব্য রচনাতেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল, সেই কারণে তাঁকে “কবিরাজ” উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি খুব ভালো বীণা বাজাতে পারতেন। তাঁর প্রকাশিত কিছু কিছু মুদ্রায় সিংহাসনে বসে বীণাবাদন রত অবস্থায় তাঁর চিত্র মুদ্রিত পাওয়া যায়। 

সমুদ্রগুপ্তের বীণাবাদনরত চিত্র মুদ্রিত স্বর্ণমুদ্রা 


এলাহাবাদ শিলালিপিতে বর্ণনা আছে “তীক্ষ্ণ মেধা এবং রুচিশীলতায় তিনি দেবতাদের গুরুকে (বৃহষ্পতি) এবং সুমধুর সঙ্গীত চর্চায় তুম্বুরু[2] ও নারদকেও লজ্জা দিয়ে থাকেন”।

সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যু সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্প্রতি আবিষ্কৃত মথুরার এক লিপি থেকে  অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল শুরু হয়েছিল ৩৭৫ সি.ই. থেকে, সে ক্ষেত্রে ৩৭২ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন এক সময়ে সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর সম্ভাবনা।

 ৪.৩.২.৫ রামগুপ্ত

সমুদ্রগুপ্তের অনেক পুত্রের মধ্যে অনুমান করা হয় রামগুপ্ত তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। যাঁর কথা বিশাখদত্তের লেখা “দেবী-চন্দ্রগুপ্তম” নাটক থেকে পাওয়া যায়। যদিও মূল নাটকটি পাওয়া যায় না, এর কিছু উদ্ধৃতি পাওয়া যায় রামচন্দ্র এবং গুণচন্দ্রের লেখা নাট্যতত্ত্ব - “নাট্য-দর্পণ” থেকে। রামগুপ্ত অত্যন্ত ভীতু এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। শোনা যায় তিনি শকরাজার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং শক রাজার আদেশে নিজের স্ত্রী ধ্রুবদেবীকেও তাঁর হাতে সমর্পণ করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ধ্রুবদেবীর সম্মান রক্ষা করেছিলেন তাঁর দেবর, চন্দ্রগুপ্ত - তিনি নারীর ছদ্মবেশে গিয়ে শক রাজাকে হত্যা করেছিলেন। এরপর চন্দ্রগুপ্ত দাদা রামগুপ্তকে সরিয়ে নিজেই পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন এবং বিপুল জনপ্রিয়তা ও জনগণের প্রশংসা নিয়ে, তিনি ধ্রুবদেবীকেই বিবাহ করেন। এই কাহিনীর আভাস পাওয়া যায় পরবর্তীকালের কবি বাণের লেখা “হর্ষচরিত”-এ। এই কাহিনীর আরও সমর্থন পাওয়া যায় ভোজের লেখা “শৃঙ্গার-প্রকাশ” এবং রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষের সন্‌জন লিপিতে। এসব সত্ত্বেও ঐতিহাসিকেরা এই কাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না, তাঁরা বলেন, আজ পর্যন্ত রামগুপ্তর নামে কোন মুদ্রা পাওয়া যায়নি এবং গুপ্তরাজাদের নথির কোথাও রামগুপ্তের নাম পাওয়া যায় না। অতএব তাঁরা মনে করেন, রামগুপ্ত কোনদিনই রাজা হননি।

 ৪.৪.১ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত– বিক্রমাদিত্য (৩৭৫ – ৪১৫ সি.ই.)

তাঁর পিতামহের থেকে আলাদা পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে সাধারণতঃ বিক্রমাদিত্য বলা হত। তিনি সমুদ্রগুপ্ত ও দত্তাদেবীর পুত্র। সিংহাসনে আরোহণের পর বিক্রমাদিত্যকে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে তেমন কিছু করতে হয়নি, কারণ তাঁর পিতা সমুদ্রগুপ্ত শক্ত হাতেই সাম্রাজ্যের সীমানা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে শুধুমাত্র পশ্চিমের বাকাতক এবং কিছু শক ক্ষত্রপ, সাম্রাজ্যের বিরক্তি উৎপাদন করছিল। বিক্রমাদিত্য বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে, বাকাতকদের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তুললেন। তিনি তাঁর রাণি কুবেরনাগার (নাগ রাজকুমারী) গর্ভজাতা কন্যা প্রভাবতীর সঙ্গে বাকাতক রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। এই মৈত্রী বন্ধনের পর তাঁর সামনে শক ছাড়া আর কেউ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রইল না।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজেই তাঁর বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে শকরাজ্য জয়ের অভিযান করেছিলেন। এই অভিযানের সময় এবং ঠিক কবে তিনি শকরাজ্য জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে পশ্চিম-ক্ষত্রপ রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহর শেষ মুদ্রাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল ৩৮৮ সি.ই.তে এবং প্রায় একই সময়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ওই অঞ্চলে তাঁর রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অতএব ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন ওই সময়ের কাছাকাছি সময়েই পশ্চিমের শকরাজ্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত অধিকার করেছিলেন। শকরাজ্য জয়ের ব্যাপারে অন্যরকম এক ঘটনার আভাস দিয়েছেন বাণ, তাঁর “হর্ষচরিত” গ্রন্থে।  দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নাকি এবারেও মহিলা পরিচারিকার ছদ্মবেশে প্রমোদসভায় গিয়ে শকরাজাকে হত্যা করেছিলেন। অতএব কবি বাণের “হর্ষচরিত”, ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের হাতে শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহের পরাজয়ের ফলে, গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হল, মালব যার রাজধানী উজ্জয়িনী এবং গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। এই রাজ্যগুলি জয়ে, তাঁর সব থেকে লাভ হল, পশ্চিমের সম্পন্ন সমুদ্রবন্দরগুলি – ভৃগুকচ্ছ, সোপারা, কল্যাণ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অতএব পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবাধ বাণিজ্যের দরজাগুলি খুলে গেল। এমনকি এই অন্তর্ভুক্তিতে বণিক সম্প্রদায়েরও প্রভূত লাভ হল, তাদের একই দ্রব্যের জন্যে বিভিন্ন রাজ্যের সীমানায় বারবার আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার ঝামেলা দূর হয়ে গেল। এই রাজ্য জয়ের ফলে আরও একটি লাভ হল উজ্জয়িনী শহরের অধিকার। উজ্জয়িনী তখনকার সময়ে ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পশ্চিম থেকে পূর্বে অথবা উত্তর থেকে দক্ষিণের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র ছিল এই শহর। অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই শহর গুপ্তসাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠল এবং প্রকৃত অর্থে পরবর্তী সময়ে উজ্জয়িনী, পাটলিপুত্রর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি প্রত্ন-নিদর্শনের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দিল্লির কুতব মিনারের কাছে একটি লৌহস্তম্ভ আছে, তার গায়ের লিপিতে “চন্দ্র” নামে কোন এক রাজার রাজ্য জয়ের বিবরণ আছে। সেখানে লেখা আছে রাজা “চন্দ্র” যে যে শত্রুরাজ্য অধিকার করেছিলেন, সেগুলি হল “বঙ্গ”, “তাঁর পরাক্রমের সৌরভে সুরভিত হয়েছিল দক্ষিণের সমুদ্র”, সিন্ধু অববাহিকার “সপ্ত(ব)দ্বীপের বাহ্লিক (কুষাণ)”। এই রাজা যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত নন, যদি একই হন, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক, বঙ্গ এবং কুষাণদের জয় করে সমুদ্রগুপ্তের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিস্তার অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিলেন।

৪.৪.১.১ ফা-হিয়েনের বিবরণ (৪০৫-৪১১ সি.ই.)

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের মধ্যেই বিখ্যাত চৈনিক বৌদ্ধ-সন্ন্যাসী, ফা-হিয়েন এদেশে তীর্থযাত্রায় এসেছিলেন। ফা হিয়েন চীন থেকে ভারতে এসেছিলেন স্থলপথে – ভয়ংকর গোবি মরুভূমি পার হয়ে, খোটান, পামিরের দুর্গম পাহাড়ি পথে, সোয়াৎ উপত্যকা এবং গান্ধার হয়ে। ভারতবর্ষ ও নেপালের সবগুলি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থে - মথুরা, সংকাশ্য[3], কনৌজ, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, কুশিনগর, বৈশালি, পাটলিপুত্র, কাশি ইত্যাদি – তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। এরপর তিনি তাম্রলিপ্তি বন্দর থেকে সমুদ্রপথে সিংহল যান এবং সেখান থেকে জাভা হয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।

ফা-হিয়েন বৌদ্ধ পুঁথি পাঠ এবং সংগ্রহে এতই নিবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে, যাঁর সাম্রাজ্যে তিনি প্রায় ছ’বছর নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালেন, সেই সম্রাট বা রাজার নামও উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা তাঁর আগের গুপ্তরাজাদের কেউই বৌদ্ধ ছিলেন না বলেই কি তিনি সম্রাটের নামোচ্চারণেও আগ্রহী হননি? তবে তাঁর লেখা থেকে বিভিন্ন শহর, তার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ফা-হিয়েন রাজধানী পাটলিপুত্রে ছিলেন তিন বছর, এখানে তিনি সংস্কৃত শিখেছিলেন। পাটলিপুত্রে “মনোরম ও সৌম্য” দুটি বৌদ্ধ বিহার তিনি দেখেছিলেন, তাদের একটি হীনযানী এবং অন্যটি মহাযানী। দুটিতেই ছ’শ থেকে সাতশ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে আসত শিক্ষালাভের জন্যে। সম্রাট অশোকের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন (খুবই স্বাভাবিক, সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন), তাঁর মনে হয়েছিল এই স্থাপত্য অসাধারণ কোন শিল্পী মানবের নির্মাণ। মগধের সমসাময়িক সম্পদ এবং সমৃদ্ধি দেখেও তিনি অভিভূত হয়েছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের প্রশংসায় তিনি লিখেছেন, “এখানকার অধিবাসীরা পরোপকার এবং ধার্মিকতার জন্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে”! আরও লিখেছেন শহরের বণিকসম্প্রদায় চমৎকার একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে দরিদ্র এবং দুঃস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সেবা দান করা হত।

ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সামাজিক পরিস্থিতিরও কিছু কিছু চিত্র পাওয়া যায়। যেমন মধ্যদেশের শহরগুলির বাসিন্দারা অধিকাংশই নিরামিষাশী এবং অহিংস মতে বিশ্বাসী, শহরের বাজারে তিনি কোন কসাইখানা বা মদের দোকান দেখেননি, নগরবাসী শূকর বা মুরগী পুষত না, পেঁয়াজ-রসুন খেত না, মদ্যপান করত না। তবে চণ্ডালরা শিকার করত এবং মাংসের ব্যবসা করত। তারা শহরের বাইরে বাস করত এবং যখনই তারা শহরে ঢুকত, কাঠের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে সতর্ক করে দেওয়া হত – কেউ যেন তাদের ছুঁয়ে না ফেলে! এই বিবরণ হয়তো আংশিক সত্য, কারণ তিনি নিজে বিদেশী এবং বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী – অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বৌদ্ধবিহারেই থাকতেন এবং তাঁর এদেশীয় সঙ্গী-সাথিরাও সকলেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন, অতএব তাঁর কাছে বৌদ্ধ আচরণগুলিই স্পষ্ট ধরা দিয়েছে। তবে অস্পৃশ্য চণ্ডালের বিবরণের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

 ৪.৪.২ গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামো

রাজা চন্দ্রগুপ্ত (২য়) মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ এবং সহায়তায় সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। এই মন্ত্রীপরিষদ নাগরিক এবং সামরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এবং এই মন্ত্রীপরিষদের অনেককেই যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত থাকতে হত। সমগ্র সাম্রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধের জন্যে অনেকগুলি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল, যাদের “দেশ” বা “ভুক্তি” বলা হত। এই ভুক্তির প্রশাসকদের বলা হত উপরিক মহারাজা বা গোপ্তা। সাধারণতঃ, এই প্রশাসনের প্রধান হতেন রাজপুত্র বা রাজবংশের লোকরা। প্রত্যেকটি ভুক্তিকে অনেকগুলি জেলায় ভাগ করা হত, যাদের বলা হত “বিষয়”। বিষয়গুলির প্রশাসকদের মধ্যে থাকতেন, কুমারামাত্য (রাজকুমারদের মন্ত্রী), মহাদণ্ডনায়ক (প্রধান বিচারক), বিনয়স্থিতিস্থাপক (পৌরনিগম?), মহা-প্রতিহার (গৃহমন্ত্রক), ভতাশ্বপতি (সেনানায়ক?), দণ্ডপাশাধিকরণ (পুলিশ প্রধান) ইত্যাদি। প্রতিটি “বিষয়”-এর প্রধানকে “বিষয়পতি” বলা হত এবং তাঁর দায়িত্ব ছিল মহারাজা বা গোপ্তার কাছে জবাবদিহি করা। বিষয়পতি যেখানে থাকতেন তাকে “অধিস্থান” বলা হত, এবং তাঁর কার্যালয়ের নাম ছিল “অধিকরণ”। বিষয়পতিকে সহায়তা করতেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, তাঁদের মধ্যে বণিকসমবায় বা গিল্ড (Guild)-এর প্রধান বা ব্যাংকার (“নগর-শ্রেষ্ঠীন্‌”), প্রধান ব্যবসায়ীরা (“সার্থবাহ”), প্রধান শিল্পী (“প্রথম কুলিক”) এবং প্রধান হিসাবরক্ষক (“প্রথম কায়স্থ”)। আরও এক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের নাম পাওয়া যায় “পুস্তপাল”- যাঁর দায়িত্ব ছিল যাবতীয় জমি-জায়গার নথিপত্র তৈরি করা এবং সুরক্ষিত রাখা। প্রশাসনের নিম্নতম একক ছিল গ্রাম, গ্রামের প্রধানকে বলা হত “গ্রামিক”। তিনি গ্রামের বৃদ্ধ (“গ্রামবৃদ্ধ”) এবং অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে গড়া “পঞ্চমণ্ডলী” বা “পঞ্চায়েত”-এর মতামত নিয়ে গ্রামের প্রশাসন পরিচালনা করতেন।

প্রসঙ্গতঃ মনে করিয়ে দিই, মুসলিম রাজা ও বাদশাদের যুগ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষের সকল হিন্দু রাজ্যেই এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হত। 

চলবে... 



[1] যূপকাষ্ঠ – যজ্ঞে পশু বলিদানের জন্য হাড়িকাঠ।

[2] পৌরাণিক কাহিনীতে তুম্বুরু বা তুম্বরু গন্ধর্ব সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি কুবের ও দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় প্রধান বীণাবাদক ও সুগায়ক ছিলেন।

[3] সংকাশ্য বা সংকাশিয়া প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ শহর। আধুনিক উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ জেলায় কনৌজ থেকে ৪৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এখানে সম্রাট অশোক একটি স্তম্ভনির্দেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্তম্ভের “হস্তীমূর্তি” ক্যাপিটালের অবশেষ, বৌদ্ধ মন্দির, বিহার এবং স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।


বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব 


২৬

 

দীর্ঘক্ষণ মহর্ষি ভৃগুকে নির্বাক দেখে মন্ত্রীসভার সকলেই পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাঁরা সকলেই মহর্ষি ভৃগুর উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাঁর প্রগাঢ় প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় তাঁদের অগাধ আস্থা। বিদেশমন্ত্রী পদ্মনাভ অত্যন্ত বিনীত স্বরে মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মহর্ষি, আপনাকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে আমরা সকলেই অসহায় বোধ করছি। রাজ্যের এই সংকটের সমাধান, আপনার পক্ষেই সম্ভব। আপনি আমাদের আদেশ করুন, মহর্ষি, আমাদের এখন কী কর্তব্য?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু মুখ তুললেন, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বললেন, “ভাবছিলাম। বৎস পদ্মনাভ, ভাবছিলাম, নিয়তি অমোঘ, অনতিক্রম্য! রাজাবেণ অসুস্থ হওয়ার পর, এই কিছুদিন পূর্বে, আমরা তাঁর জন্মকুণ্ডলী পর্যালোচনা করছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন, জ্যোতিষাচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ। রাজাবেণের স্বল্প এই জীবনকালের অদ্ভূত আচরণ ও দুরাচারী চরিত্রের কারণ, তাঁর জন্মলগ্নে গ্রহ-নক্ষত্রের আশ্চর্য অবস্থান! সে অবস্থান অত্যন্ত বিরল এবং শত বর্ষে হয়তো একবারই সম্ভব! তাঁর কোষ্ঠী গণনা করে, আচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ এবং আমি আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম এই দেখে যে, তাঁর মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর আজন্ম অধিষ্ঠান! ঈশ্বরের লীলা কে উপলব্ধি করতে পারে? নিয়তির অমোঘ গতি কে রুদ্ধ করতে পারে?”

উপস্থিত মন্ত্রীসভার সদস্যরা সকলেই বিহ্বল হয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আশ্চর্য, অত্যাশ্চর্য!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। আজ আমি এই কথাটি বলবো বলেই আপনাদের এই সভায় আমন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু আমার মনে কোথাও যেন একটু দ্বিধা ছিল! কিন্তু আপনাদের মুখে ওই চারণকবিদের গান এবং ওই মহাতপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আমি নিঃসন্দেহ হলাম - নিশ্চিত হলাম”। মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে, মহামন্ত্রী বিমোহন ও অন্য সকলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলেন। অন্য সকলের মুখে নিরঙ্কুশ বিস্ময়ের লক্ষণ দেখলেও, মহামন্ত্রী বিমোহনের চোখে দেখতে পেলেন, সন্দেহ। তিনি আবার বললেন, “এই মন্ত্রণা কক্ষে আসার পথে মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্রর মুখে একটি বার্তা শুনলাম! এই রাজ্যে অনেকের বিশ্বাস রাজাবেণের এই অসুস্থতার কারণ, বিষপ্রয়োগ এবং আমিই সেই বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রী! তখন শুনে মনে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু...”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই বিস্ময়ে চমকে উঠলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ মহর্ষি ভৃগুর কথার মধ্যেই বলে উঠলেন, “সে কী? সে তো একটা অবিশ্বাস্য রটনা মাত্র এবং এর প্রচারক কে, সেও আমরা জানি - মহারাজ বেণের বাল্যবন্ধু, পদত্যাগী উপনগরপাল শক্তিধর! ভাগ্যগুণে পেয়ে যাওয়া আকাশচুম্বী ক্ষমতার অধিকারী কোন অযোগ্য ব্যক্তি যখন অকস্মাৎ ভূমিসাৎ হয়, তখন প্রচণ্ড ঈর্ষা তার মস্তিষ্কে তপ্ত বাষ্পের উদ্রেক করে! দিশাহারা হয়ে অযৌক্তিক অপবাদ দিতে তার আর তখন কোন কুণ্ঠা হয় না”!

মহর্ষি ভৃগু অসম্মতিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না বৎস বৃষভান্‌, তা নয়। এ সমস্তই অদৃশ্য নিয়তির অমোঘ সঞ্চালন। আমাদের ষড়যন্ত্রে মহারাজ অঙ্গ এবং মহারাণি সুনীথার পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অনুষ্ঠান। যৌবনের উপান্তে এসেও, সেই যজ্ঞের ফলস্বরূপ তাঁদের পুত্রলাভ। মহারাণীর অন্ধ স্নেহে রাজপুত্র বেণের দিন দিন দুর্ধর্ষ ও দুর্দান্ত হয়ে ওঠা। অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান...”

মহর্ষি ভৃগুর কথা থামিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান আবার বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান সম্পর্কেও রাজ্যে একটি রটনা প্রচলিত আছে, মহর্ষি, আর সেটি হল, যুবরাজ বেণের ষড়যন্ত্রে...”।

মহর্ষি ভৃগু বিরক্ত মুখে হাতের ইশারায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌কে নিরস্ত করলেন, “বৎস বৃষভান, এই সকল রটনার প্রসঙ্গ এখন অবান্তর! আমরা পরষ্পরের প্রতি কদর্য কর্দম নিক্ষেপণের জন্য এই সভা আহ্বান করিনি। ও প্রসঙ্গ এখন থাক। আমার অসমাপ্ত কথার সূত্র ধরে বলি, অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান, মহারাণি সুনীথার সনির্বন্ধ অনুরোধে যুবরাজ বেণের রাজ্য অভিষেক। সিংহাসন লাভ করে রাজা বেণের উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারীতা, অনাচার, দুরাচার এবং সর্বশেষে সনাতন ধর্মের উপর চরম আঘাত! তারপরই তাঁর এই অনারোগ্য অসুস্থতা! এ সবই নিয়তি পরিচালিত পূর্বনির্ধারিত নাট্যরঙ্গ, যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কুশীলব আমাদের মধ্যে অনেকে অথবা হয়তো সকলেই”!

মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে সকলের মুখভাব পর্যবেক্ষণ করলেন। মহামন্ত্রী বিমোহনও এখন কিছুটা যেন দ্বিধাগ্রস্ত, চিন্তিত। মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতে, তিনি মাথা নত করলেন। মহর্ষি ভৃগু আবার বললেন, “এখন নিয়তির আরেকটি সংকেত আমাদের সামনে উপস্থিত। সেই ইঙ্গিত অনুসারে আমরা আমাদের কর্তব্য করব, নাকি দ্বিধা ও সংশয়ে কালবিলম্ব করবো – এই সিদ্ধান্তের জন্যেই আমি আজ এই সভা আহ্বান করেছি!”

সকলেই অধীর আগ্রহে মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “নিয়তির কোন সংকেতের কথা আপনি বলছেন, মহর্ষি?”

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কেন? রাজা বেণের মানস পুত্র ও কন্যাকে আবাহন করে বরণ করতে হবে না?”

“কী ভাবে, মহর্ষি?” মহামন্ত্রী বিমোহন এতক্ষণে কথা বললেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানবের পক্ষে এই অলৌকিক ঘটনা কী ভাবে ঘটানো সম্ভব?” শুরু থেকেই মহামন্ত্রী বিমোহনের আলাপে যে বৈরিভাব লক্ষ্য করছিলেন মহর্ষি ভৃগু, এখন সেটা যেন আর নেই। মহামন্ত্রীর কণ্ঠস্বরে এখন কিছুটা সমর্থনের সুর!

মহর্ষি ভৃগু পূর্ণ দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “অলৌকিক কোন ঘটনা তো আমরা ঘটাবো না, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! ঘটাবেন তো তিনি! যিনি মহারাজ অঙ্গের পুত্র রাজাবেণের অঙ্গে আজন্ম অধিষ্ঠান করছেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণু! তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার পরিস্থিতিও তিনিই বানিয়ে তুলেছেন, আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করবো মাত্র!”

অবাক হয়ে সকলেই তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি ভৃগুর দিকে, মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “তিনিই সেই পরিস্থিতি বানিয়ে তুলেছেন? যেমন?”

মহর্ষি ভৃগু গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বললেন, “ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ রাজা দুর্ধর্ষ বেণ, এখন নামমাত্র জীবিত! তাঁদের ধরাতলে অবতরণের এটাই কী প্রকৃষ্ট লগ্ন নয়? সনাতন ধর্মকে যিনি বিনাশ করতে চেয়েছিলেন, তিনি আজ পূর্ববৎ সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো না? অতএব, ঈশ্বর স্বয়ং সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন! এখন বিশেষ কোন শুভ মূহুর্তে আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন তিনি!”

মহামন্ত্রী বিমোহন কিঞ্চিৎ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন, ঈশ্বর?”

মহামন্ত্রী বিমোহনের বিদ্রূপে কর্ণপাত না করে, মহর্ষি ভৃগু দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, “ঠিক তাই! তিনি তো রাজাবেণের জন্যে আসছেন না, আসছেন আমাদের জন্যে, এই রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসীর জন্যে। ঈশ্বর শুধুমাত্র কোন রাজাকে কৃপা করার জন্য ধরাতলে অবতীর্ণ হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি আসেন নিঃসহায় সাধারণ জনগণের পরিত্রাণের জন্য। তিনি আসেন সনাতন ধর্মকে তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা তাঁর সেই অবদান গ্রহণ করতে উন্মুখ কিনা, আমরা আমাদের আন্তরিক আস্থা নিয়ে তাঁকে বরণ করতে আগ্রহী কিনা, সেই প্রতীক্ষায় তিনি দিবস গণনা করছেন!” মহর্ষি ভৃগুর এই প্রত্যয়ী কথায় সকলেই আশ্চর্য এবং মুগ্ধ নির্বাক হয়ে রইল, এমনকি মহামন্ত্রী বিমোহনও স্বয়ং ঈশ্বরের আবির্ভাব কল্পনা করে, শিহরিত হলেন। সকলেই মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। মহর্ষি ভৃগু আর কোন কথা বললেন না, তাঁর স্বপ্নঘন দৃষ্টি এখন উন্মুক্ত গবাক্ষ পথে দূর দিগন্তের দিকে। 

চলবে... 



মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছেলেমানুষ

 



এর আগের অণুগল্প - " গিরগিটি "


সুতনু বেরোচ্ছিল।

সুধীরবাবু ছেলে সুতনুকে বললেন, “বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে যাচ্ছো বাবা, তা যাও, তবে পাকামি করে বাইরের হাবিজাবি খেও না যেন। পেটের গণ্ডগোল বাধিয়েছিলে, এই সবে সেরে উঠলে। বেশ কদিন কলেজ কামাই হল। সামনেই পরীক্ষা মনে থাকে যেন”।

সুতনু অধৈর্য হয়ে বলল, “আমাকে কি তুমি ছেলেমানুষ পেয়েছ, বাবা?”

সুধীরবাবু মুখ তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা নয়তো কি?”

 

সুধীরবাবু বেরোচ্ছিলেন।

“এই ভোরে কোথায় চললে, বাবা? পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প জমাতে? তা যাও, কিন্তু আবার যেন ঠাণ্ডা লাগিও না। বুকে ঠাণ্ডা বসিয়ে কদিন নিজেও ভুগলে, আমাদেরও ভোগালে। মনে থাকে যেন”। সুতনুবাবু বাবাকে বললেন।

সুধীরবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “নিজের ভালোটা আমি বুঝব না? আমাকে কি তুই ছেলেমানুষ পেয়েছিস?”

সুতনুবাবু মুখ তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা নয়তো কি?”     

 


সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ৩ "


১০

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তী কালে বৃটিশ পার্লামেন্টের শাসনাধীন ভারতবর্ষে বিদেশী সাহিত্যের ছোঁয়া এসে বাংলা সাহিত্য এবং লিপিকে অকস্মাৎ জাগিয়ে তুলল, যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়। পুঁথির সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা লিপি ঢুকে পড়ল ছাপাখানার রাজ্যে। কলকাতা শহরকে রাজধানী করে, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যবিস্তারের শুরুতে বিদেশী শাসকদের অন্যতম বাধা ছিল ভাষা। শাসকের পক্ষে স্থানীয় ভাষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে প্রজাদের শাসন এবং শোষণ দুরূহ বুঝে, কোম্পানি নতুন ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য বাংলাভাষা শিক্ষার বই ছাপালেন ১৭৭৮ সালে। হুগলি থেকে ছাপা হওয়া সেই বইয়ের নাম, “A Grammar of the Bengali Language”। বইটি মূলতঃ ইংরিজিতে লেখা হলেও, বাংলা হরফের অনেক নমুনা এবং উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই কারণে এই বইটিকে বাংলা লিপির প্রথম মুদ্রণ প্রকাশ বলা যায়। এই বইটির লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালেহেড (Nathaniel Brassy Halhead) এবং মুদ্রণের কৃতিত্ব স্যার চার্লস উইল্কিন্সের (Sir Charles Wilkins)।

অবশ্য এর অনেক আগেই, ১৫৫৬ সালে পর্তুগীজ খ্রিষ্ট ধর্মপ্রচারকরা, ভারতবর্ষে প্রথম ছাপাখানা বসিয়েছিলেন গোয়াতে। বাংলার পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারকরা সুদূর লিসবন থেকে অনেকগুলি বাংলা বই ছাপিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলি সবই রোমান হরফে লেখা। সেই সব বইয়ের নমুনা এখন আর পাওয়া যায় না। বাংলাভাষার মুদ্রিত প্রথম যে বইয়ের নমুনা পাওয়া যায়, সেটি প্যারিস থেকে ১৬৮২ সালে প্রকাশিত ফরাসী ধর্মপ্রচারকদের বই। এই বইগুলির অধিকাংশই কাঠ কিংবা তামার পাতের উপর ব্লক বানিয়ে ছাপানো। বাংলা অক্ষরের আলাদা আলাদা টাইপ খোদাই করে বাংলা লিপিকে মুদ্রণ যন্ত্রের প্রকৃত উপযোগী করে তুললেন, স্যার চার্লস উইল্কিন্স। মুদ্রণের ক্রমবিকাশ এই লেখার বিষয় নয়, কিন্তু তাও মুদ্রণের উল্লেখ করলাম, কারণ এই প্রথম বাংলা লিপি সার্বজনীন ও স্থায়ী একটা রূপ পেল। তাই বাংলা লিপির (একথা পৃথিবীর সমস্ত লিপির পক্ষেই সমানভাবে প্রযোজ্য) ক্ষেত্রে মুদ্রণের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপারাটা আরেকটু স্পষ্ট করে বলি।

আগেকার দিনে গ্রন্থকার যা কিছু রচনা করতেন, সেই গ্রন্থ জনপ্রিয় হলে, রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়, সেই গ্রন্থের অনেক প্রতিলিপি বানানো হত। সে প্রতিলিপি করতেন এক বা একাধিক লিপিকার। এক এক যুগে, এই লিপিকারদের লিখন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন এবং লিপিকারদের সকলেরই লেখার স্টাইল বা ভঙ্গীও ছিল আলাদা। যেমন আজও একই ছাপার অক্ষর থেকে অনুকরণ করেও, তোমার এবং আমার হাতের লেখা এক নয়। আমাদের প্রত্যেকের লেখা আলাদা – এমনকি কারো কারো হাতের লেখা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, আবার কোন কোন হাতের লেখা দেখে আমরা বলে উঠি “বাঃ কী সুন্দর লেখা”! এইরকম সেকালেও গ্রন্থের প্রত্যেক প্রতিলিপি পাঠকের কাছে সমান পাঠযোগ্য হতে পারত না। উপরন্তু লিপিকারদের প্রতিলিপি করা গ্রন্থের সংখ্যা দেশের জন সংখ্যার তুলনায় ছিল অতি নগণ্য। যথেষ্ট আগ্রহী এবং সম্পন্ন পাঠক ছাড়া সেই গ্রন্থ সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য।

মুদ্রিত গ্রন্থ বা বই প্রকাশের ব্যয়, সেই তুলনায় যথেষ্ট কম। কাজেই শিক্ষা গ্রহণের পক্ষে মুদ্রিত বই এবং গ্রন্থকারের লেখা মুদ্রিত বই অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠল, সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে এল। অতএব শিক্ষাগ্রহণ এবং গ্রন্থপাঠের রেওয়াজ বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত!

আরও একটা বিষয়ে মুদ্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হল, গ্রন্থ রচনার পদ্ধতি। আমাদের দেশের প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ, সে সাহিত্য হোক কিংবা ধর্মশাস্ত্র, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন – সংস্কৃত হোক কিংবা বাংলা - সকল গ্রন্থই রচিত হয়েছে কোন না কোন ছন্দের বাঁধনে। তার কারণ শ্রুতিমধুরতা এবং একমাত্র উদ্দেশ্য মনে রাখার সুবিধা। পুঁথি বা গ্রন্থ যেহেতু সহজলভ্য নয়, অতএব সহজে মুখস্থ করার উপায় ছন্দের বন্ধন। সেক্ষেত্রে বুঝতেই পারছো, কোন বিষয়ে শুধুমাত্র পণ্ডিত হলেই, কারো পক্ষে গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব নাও হতে পারে! কারণ তাঁর নিজের বিষয়ের সঙ্গে, তাঁকে বুঝতে হবে ছন্দেরও নিয়ম! ছন্দের নিয়ম এবং তাল মেনে তাঁকে শব্দচয়ন করতে হবে! ছন্দের বিধান অনুসারে শব্দচয়ন করতে গিয়ে, তিনি যদি ছন্দবিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ না হন, তাঁর আসল বক্তব্যই আমাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আর পরবর্তী কালে সেই অস্পষ্ট বক্তব্যের ব্যাখ্যা এবং টীকা করবেন অন্য কোন পণ্ডিত! কে জানে, তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন, সে কথা সেই পণ্ডিতেরাও সম্যক বুঝেছেন কিনা! আজকের পরিস্থিতির তুলনায়, সে সময়ের কাজটা খুব দুরূহ মনে হচ্ছে না?

যে কোন গ্রন্থের এই ছন্দবদ্ধ রচনাশৈলী থেকে মুক্তির সন্ধান দিল, ছাপাখানা এবং ছাপার অক্ষরে লেখা বই। পদ্যে হোক কিংবা গদ্যে মনের কথা কিংবা মতামত লিখে ছাপিয়ে ফেলতে আর কোন অসুবিধে রইল না। ছাপাখানার প্রসার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল অনেক দৈনিক সংবাদপত্র, নানান পত্র-পত্রিকা। লেখার জগতেও শুরু হয়ে গেল নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ইওরোপীয় সাহিত্যের অনুসরণে এবং অনুকরণে সাহিত্যের সকল শাখাতেই বাংলার চর্চা দ্রুত বাড়তে লাগল। পদ্য, কবিতা, কাব্য, নাটক, গদ্য, উপন্যাস, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, পাঠ্য বিষয় সমূহ এবং অনুবাদ সাহিত্যও। প্রথম যুগে রামরাম বসু থেকে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখের লেখনী ধরে বাংলা ভাষা পল্লবিত হতে লাগল নানান শাখায়। এর পরবর্তী কালে এসে গেলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁর সরস এবং মৌলিক লেখনীতে বাংলা ভাষা সকল বঙ্গভাষীদের মধ্যেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তাঁর লেখা একের পর এক উপন্যাস, রম্যরচনা, ধর্মতত্ত্ব সেকালে শিক্ষিত বাঙালীর ঘরে ঘরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর আগে ইংরিজি এবং পাশ্চাত্য ভাষায় উচ্চশিক্ষিত বঙ্গসমাজে এমন একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বাংলা ভাষা নিম্নরুচির ভাষা এ ভাষায় উচ্চস্তরের সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলা ভাষাতেও যে মহৎ সাহিত্য রচনা সম্ভব, সেই ধারণা এবং বিশ্বাস সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

গীতাঞ্জলির অনুবাদ - রবীন্দ্রনাথের হস্তলিপির নমুনা



বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী যুগে, বাংলা সাহিত্যের সবথেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের সকল শাখা তাঁর আশ্চর্য প্রতিভার ছোঁয়া পেয়ে বাংলাভাষা পৌঁছে গেল অন্য উচ্চতায়। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ছড়া, কিশোরসাহিত্য সব শাখাতেই তাঁর আশ্চর্য অবদানে, বাংলাভাষা অতি দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। সত্যি কথা বলতে, বাংলা ভাষা পেয়ে গেল অত্যন্ত আধুনিক কিন্তু অনবদ্য এক শৈলী। যার পশ্চাৎপটে রইল প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের বর্ণময় ঐতিহ্য এবং অঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের বাস্তব ঋজুতা। রবীন্দ্রনাথের রচনা বাঙালীর মধ্যে আর সীমিত রইল না, ভারতের আঞ্চলিক একটি ভাষা থেকে সে ভাষা হয়ে উঠল বিশ্বজনীন – বিশ্বের দরবার থেকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ নোবেল পুরষ্কার এনে দিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে! “চর্যাপদ” দিয়ে যে ভাষায় সাহিত্যের পথ চলা শুরু হয়েছিল, সে পথচলার চরম উত্তরণ হল “গীতাঞ্জলি”তে। সার্থক হল বাংলা ভাষা, গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

"চর্যাপদ" - পুঁথির একটি পৃষ্ঠা 

 

১১

 

১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষার ওপর নেমে এল চরম আঘাত। দেশভাগ হল, বিভক্ত হয়ে গেল বাংলাভাষী মানুষেরাও। বাংলাভাষী মানুষের বৃহত্তর অংশ ধর্মের নামে হয়ে গেলেন অন্য রাষ্ট্র। বঙ্গভাষীদের এক অংশ আগের মতোই ভারতবর্ষের অঙ্গরাজ্য হিসেবে থেকে গেল, আর অন্য অংশ হয়ে গেল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ – পূর্ব পাকিস্তান।  নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের বঙ্গভাষীদের বনিবনা হল না কিছুতেই! কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল - ভাষা, আচরণ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, বিশ্বাস যদি ভিন্ন হয়, শুধু ধর্ম দিয়ে তাকে জুড়ে ফেলা যায় না। পূর্বপকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু, ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রনায়কদের এই ঘোষণা শুনে, ক্ষুব্ধ হতে লাগল বাংলাভাষী। সেই ক্ষোভ বিদ্রোহ এবং আন্দোলনের রূপ নিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি! সুদীর্ঘ আন্দোলন, রক্তপাত ও লড়াইয়ের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধানের সংশোধন করে, বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিল। জয় হল বাংলাভাষার, ভাষার প্রতি বিশ্বাসে অবিচল রইল বঙ্গভাষী!

বহু বছর পরে ১৯৯৯ সালে, মাতৃভাষার জন্যে দেশের মানুষের এই আন্দোলনের স্বীকৃতি দিল ইউনেস্কো, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে তারা ঘোষণা করল “বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে। সেই থেকে ওই দিনটি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবেই সর্বত্র পালিত হয়। এও বাংলাভাষার জয়, কিন্তু এই জয় অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জয়, মাতৃভাষার জন্যে আন্তরিক ভালবাসার জয়!

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের জন্য যে অত্যাচার ও রক্তক্ষরণ বঙ্গভাষীদের সহ্য করতে হয়েছিল, তাতে মূল পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা রইল না। চূড়ান্ত অবিশ্বাস, নিরন্তর বঞ্চনা, শাসনের নামে অসহ্য অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে তারা মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সৈন্যদের গণহত্যা, বঙ্গভাষী মানুষদের ঠেলে দিল বৃহত্তর সংগ্রামের দিকে, সে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, আগ্রাসী রাষ্ট্রের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। চরম অত্যাচার, অপমান এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে সেই সময় এল, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর! নিজস্ব একটা দেশ পেল বঙ্গভাষী মানুষেরা, স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র, যার নাম বাংলাদেশ।

এখন বাংলা আর শুধুমাত্র ভাষা নয়, একটা আবেগ, একটা সত্ত্বা, সংগ্রামের আশ্চর্য হাতিয়ার! আরেকবার সার্থক হল বাংলা ভাষা, আরও একবার গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

 

১২

 

লিখলাম বটে, কিন্তু আমরা যারা এপারের বঙ্গভাষী তারা কী এই ভাষাকে অতটাই ভালবাসি আর? খুব সত্যি কথাটা হল – বাসি না। 



বিশ্বের ৬৯০০টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে বঙ্গভাষী-জনসংখ্যার বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। অথচ পাঠকের অভাবে এই কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে চলেছে প্রচুর সুস্থ সুন্দর পত্রিকা, দুর্বল হয়ে পড়ছে পুস্তকের প্রকাশণ সংস্থাগুলি। আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভাষার প্রতি ভালোবাসায় আমাদের কোন ঘাটতি হয়তো নেই। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারিক প্রয়োগে বাংলা ভাষার দুর্দশা, ভ্রান্তি, অবহেলা সর্বদা চোখে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মহান সাহিত্যিকদের রচনা, পাঠ্যবইয়ের বাধ্যতামূলক সিলেবাসের বাইরে, বহু বঙ্গভাষী উল্টেও দেখেন না। পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা “বাংলাটা আমার তেমন আসে না”, বলতে গর্ব অনুভব করেন! সোসাল মিডিয়ার এই বিস্ফোরণের যুগে, তাঁরা বাংলা লেখেন, ইংরিজি হরফে। যদিও বাংলালিপির অনেক software বিনামূল্যে অত্যন্ত সহজলভ্য – সে কম্পিউটারের জন্যেই হোক কিংবা স্মার্টফোন। এই সফটওয়্যার গুলির মধ্যে, আমার ধারণা, সব থেকে সহজ ও সাবলীল ওমিক্রন ল্যাবের “অভ্র কি বোর্ড” – যার সৃষ্টিকর্তা বাংলাদেশের ডাঃ মেহেদি হাসান খান! বাংলাভাষাকে অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে উন্নীত করার জন্যে তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

 কিন্তু বহুযুগ ধরে অনেক উত্থান-পতনের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের এই মাতৃভাষা আমরা কী ধীরে ধীরে ভুলে যাবো? কথা বলবো হিন্দি ও ইংরিজি মিশ্রিত আধো বাংলায়? লেখার জন্যে বাংলা লিপি ভুলে, ব্যবহার করবো রোমান হরফ, আর আমাদের আবেগের ভাষা হবে, কিছু ইমোজি বা ইমোটিকন? কে জানে - সে কথা ভবিষ্যৎ বলবে, r bolbe tomra, jara ei lekhati ekhon poRcho!   

 সমাপ্ত


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...