মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১"


৪৭

 

বাইরে সন্ধে নামছে। বিশাল ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। একটি মাত্র দীপের আলোয় – ঘর আলোকিত হয়নি, অন্ধকার ফিকে হয়েছে মাত্র। ছেলেদের অধিকাংশই তখনও ঘরের একদিকে মেঝেয় শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মহিলারা – কমলিমা, পালি, সুরমি – বসে আছেন মইলি, বিশুন আর দীপানের খাটুলির পাশে। কুসি আর ভুটিক বসে আছে কমলিমায়ের পাশে।  

কবিরাজমশাইয়ের সৎকার সেরে ভল্লারা ফিরল। বাইরের কুয়োতলায় হাতপা ধুয়ে সকলেই কমলিমায়ের পাশে বসল। কমলিমা একটু কড়া সুরে বললেন, “তোরা কাপড়চোপড় কেচে স্নান করে এসেছিস তো – তা নাহলে আমাদের কাউকে ছুঁবি না”।

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “ও নিয়মটা আমাদের দিকেও মানতে হয়, মা। এতটুকু নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। শ্মশানের কাজ সেরে দীঘির জলে স্নান সেরেই আমরা এসেছি”।

“মানলেই ভালো। বাড়ির বাইরে গেলেই ছেলেরা দেখি উড়নচণ্ডে হয়ে যায় – বস, আমি তোদের খাবার বেড়ে আনি”।

ভল্লা বলল, “আমি এখন আর খাব না, মা। ভাল্লাগছে না। একবারে রাত্তিরেই খাবো। ওদের দে”।

খাওয়ার তেমন ইচ্ছে কারও ছিল না। ভল্লার সঙ্গে গিয়েছিল, সুরুল, আহোক, রামালি, শুকু, অমরা, কিশনা। তারা সকলেই লোভীর মতো ঘুমন্ত সঙ্গীদের দিকে দেখছিল। কতক্ষণে চোখ বন্ধ করে ওদের মতো শরীরটা এলিয়ে দেওয়া যায়।

কুসি বলে উঠল, “বাঃ রে, জেঠিমা তোমাদের জন্যে না খেয়ে বসে আছেন – এখন তোমরা না খেলে কী করে হবে?”

ভল্লা মুহূর্তের মধ্যে সুর বদলে বলল, “আর কখন খাবার দিবি মা? খিদেয় পেট যে জ্বলে যাচ্ছে...কুসি জেঠিমার সঙ্গে যা তো, বোন – হাতে হাতে ধরে আনবি”। মহিলারা সকলেই উঠে গেলেন কমলিমায়ের সঙ্গে। আহোক ফিসফিস করে বলল, “সত্যিই এখন খেতে একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না। ভাবছি কতক্ষণে ঘুমোব”।

ভল্লা বলল, “এখন ঘুমোলে চলবে? কমলিমা বসে আছেন, আমাদের কথা শোনার জন্যে – কাল রাত্রে কী হল, আজ সকালে কবিরাজমশাইয়ের সৎকার কেমন হল...”।

আহোক বলল, “কালকে রাতের ঘটনা - আমি আর কিশনা ভোরেই জেঠিমাকে অনেকটা বলেছি – তারপর তো আমরা বেরিয়ে গেলাম। বাকিটা নিশ্চয়ই কেউ বলেছে...”।

ভল্লা বলল, “মনে হয় না – প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা সবে সামলে উঠছিলেন, তারপরেই এসে পড়ল  কবিরাজমশাইয়ের মৃত্যু – কমলিমায়ের কাছে এ ধাক্কাটাও বড়ো সহজ নয়। তার ওপর এতগুলো ছেলের জন্যে রান্না করেছেন, খাইয়েছেন, মইলিদের দেখাশোনা করেছেন... সময় পেয়েছেন বলে মনে হয় না”।

মহিলারা সবাই মিলে খাবারের থাল এনে একে একে সবার সামনে রাখলেন। কমলিমা এসে বসলেন, ভল্লাদের সামনে। ভল্লা বলল, “তোর খাবার কই, মা? আমাদের সঙ্গে না খেলে – আমরাও খাব না।”

কুসি দৌড়ে গিয়ে কমলিমায়ের থাল এনে দিতে, কমলিমা বললেন, “এবার খুশি? গ্রামের লোকেরা কী বলল রে, কবিরাজমশাইয়ের মৃতদেহ দেখে?”

ভল্লা বলল, “কী বলবে বল দেখি মা? পর পর দু -দুটো ইন্দ্রপতন। দু-দুটো মহীরূহ – যার ছায়ায় গ্রামের মানুষ শান্তিতে বাস করত – ভরসা করত – সে দুটোই পর পর ভেঙে পড়ল ঝড়ে…। তারপর ধর মা, হানো গেল সাপের দংশনে। শল্কুটা কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল – আজ পর্যন্ত তার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। মানুষ কত শোক আর করবে বল তো, মা?”

সুরুল বলল, “এখন আর কেউ শোক করে না, জেঠিমা – সকলের চোখেমুখেই এখন আগুন। পারলে লাঠিপেটা করে আস্থানের রক্ষীদের মারবে…কুকুরের মতো”।

আহোক বলল, “আমাদের গ্রামের লোকরা বোধহয় গ্রামের নামই পালটে দেবে, জেঠিমা। ভাবনা চিন্তা করছে। নাম রাখবে জুজাকপুর কিংবা জুজাকগাঁ। আমাদের দীঘির ঘাটে যে বড় অশ্বত্থগাছটা আছে – তার নাম দেবে কবিরাজতলা”।

রামালি বলল, “শুনলাম, সামনের বছর থেকে, গ্রামের কেউ একটা কানা-কড়িও কর দেবে না রাজাকে। বরং সেই করের টাকা জমিয়ে নিজেরাই গ্রামের নানান কাজ করাবে…”।

কমলিমা অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কী? গ্রামের লোক পাগল হয়ে গেছে নাকি? রাজা এসব চুপচাপ মেনে নেবে?”

আহোক বলল, “তা জানি না, জেঠিমা – কিন্তু গ্রামের লোক সে কথাই বলছে। তারা আরো কী ঠিক করেছে জানো? তুমি হবে আমাদের গ্রামপ্রধান”।

“আমি?” কমলিমা খাওয়া ভুলে তাকিয়ে রইলেন আহোকের মুখের দিকে, “রক্ষে কর বাবা। প্রধানকে দেখেছি তো, দুশ্চিন্তায় কত রাত ঘুমোতে পারত না…। কেন গ্রামে আর কেউ ব্যাটাছেলে নেই? আমাকে নিয়ে পড়ল কেন, সবাই?

ভল্লা বলল, “তুই কেন নয় বল দেখি মা? গ্রামের ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি সবাই তোকে মানে, ভালোবাসে – ভরসা করে – তুই হবি না কেন, মা”?

ঘুম ভেঙে গেলেও একটু ঘোর-ঘোর অবস্থায় ছিল মইলি, কমলিমার প্রধান হওয়ার কথা কানে যেতেই – সে উঠে বসার চেষ্টা করতে লাগল। কমলিমা দেখতে পেয়েই বললেন, “কুসি, একটা বল্লম নিয়ে আয় তো মা – মইলির কোমরটা ভাঙি – বলা পঞ্চাশ বার করে বলে গেছে – এখন অন্ততঃ তিনদিন তোর উঠে বসা চলবে না…লড়াই করে দাবনা ফালা করে এসে, পাকামি করছিস মুখপোড়া”?

মইলি চুপ করে শুয়ে পড়ল আবার, একটু হেসে বলল, “তুমি যদি প্রধান হও, তোমাকে আমি মা ডাকব – তোমার কথার অবাধ্যও হবো না। না হলে…”। মইলি কথা শেষ করল না, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকাল।

 

নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল মারুলা। ভল্লার পাশে বসে বলল, “বাঃ আমাকে বাদ দিয়েই তোরা খেতে বসে গেছিস? কমলিমা, আমার কপালে দুখানা রুটি জুটবে না?” কমলিমা কিছু বললেন না, কুসিকে ইশারা করতেই মারুলার খাবার চলে এল। মারুলা খাওয়া শুরু করে বলল, “যা খিদে পেয়েছিল না… কাল দুপুরের পর থেকে পেটে কিছু পড়েনি। চরকির মতো ঘুরে চলেছি – দিন ভর…”।

কমলিমা চমকে উঠে বললেন, “সে কি বাবা? আজ সারা দিনেও খাওয়া হয়নি?”

মারুলা বলল, “না মা। আস্থানের যা অবস্থা – আমাদের জন্যে রান্না করবে কে? আর দুটো রুটি আর ডাল…হবে মা?” কুসি আবার দৌড়ল।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “আস্থানের কারো খাওয়া হয়নি?”

“তা হবে না কেন? শষ্পক আর আধিকারিকদের পাকশালায় রান্না হয়েছে। কিন্তু রক্ষীদের দল তো সব পগার পার – তাদের রাঁধুনি সহ। কেউ নেই আস্থানে। শষ্পকের বিশেষ রক্ষীরাই এখন আস্থানের রক্ষী হয়ে গেছে”।

“শষ্পক তোকে বলল না, ওদের পাকশালায় খেয়ে নিতে?”

“বলেছিল – অনেকবার বলেছিল – আমিই যাইনি। শষ্পক বললেও – সবাই তো আর সমান নয় – কে কী বলে বসবে। তার ওপর শষ্পক আমাকে পাঠালো বীজপুর – রাজধানীর চিঠি দিয়ে…সেখান থেকেই সোজা এখানে এলাম। বহুদিন পর ঘোড়ায় চড়লাম, বুঝেছিস ভল্লা – কী সুখ রে ভাই – ঝড়ের বেগে গেলাম – ঝড়ের বেগে ফিরলাম। রাত্রে আবার আস্থানে ফিরে শষ্পককে সব সংবাদ জানাতে হবে”।

খাওয়া শেষ করে মারুলা মুখ তুলে বলল, “কেমন আছিস রে, জুজাক? আর সেই দুই জুজাক? তোদের কারো নাম জানি না রে”।

মইলি হেসে বলল, “ভালই আছি, গোলোকদাদা। আমার নাম মইলি। ওরা এখনও ঘুমোচ্ছে – দীপান আর বিশুন। কবিরাজ ঘুমের বটিকা দিয়েছিল – তারই রেশ…”।

একটু পরে ভল্লা বলল, “তিনটে স্তম্ভের প্রহরীকে তো বেশ নিঃশব্দেই শেষ করলি, মারুলা, কিন্তু শেষ স্তম্ভের রক্ষীটা অমন করে নীচেয় টপকে গেল কী করে বল তো?”

মারুলা বলল, “কে জানে? ব্যাটা বোধহয় একদম ধারে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল, অথবা নেশা-টেশা করেছিল। আরে, ও পড়ে যেতে যা ভয়ংকর শব্দ হল, আমি তো চমকে উঠেছিলাম – এবার কী হবে? আমি তো তখনও জানি না, উপানু হতভাগাটা মরেছে কিনা, কিংবা তোরা সবার ঘরে শেকল তুলে দিতে পেরেছিস কিনা। শব্দটা হতেই আমার মনে হল, সব রক্ষীরা যদি একসঙ্গে বেরিয়ে আসে – তাহলে কী হবে?”

একটু থেমে মারুলা আবার বলল, “আমি কয়েক মুহূর্ত একটু থমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়াতে অনেকটা ধাতস্থ হলাম। তারপরই দেখলাম দুজন রক্ষী প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বন্দীশালার দিকে এগোচ্ছে। ওরাও শব্দটা পেয়ে কীসের শব্দ দেখতে যাচ্ছিল মনে হয়। আমাদের দিক থেকে দুই জুজাক একসঙ্গে ভল্ল ছুঁড়ে দুটোকেই এক এক ঘায়ে শেষ করল। যাই বলিস আর তাই বলিস, তোর শিষ্যরা ভালই শিখেছে, ভল্লা...। মাত্র মাস দেড়-দুয়েকের মহড়ায় এমন লক্ষ্যভেদ...।  

কিন্তু একটু গণ্ডগোল হয়ে গেল, পশ্চিমের দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে যারা ঘাপটি মেরে বসেছিল, শুরুতে তারা আমাদের লক্ষ্যই করেনি,  কিন্তু আমাদের দিক থেকে ভল্লা ছোঁড়াতে ওরা আমাদের অবস্থানটা টের পেয়ে গিয়েছিল। অতএব ওরাও আচমকা দুখানা ভল্ল ছুঁড়ল আমাদের দিকে। আমাদের দুই জুজাক আহত হয়ে গেল”।

আহোক বলল, “হ্যাঁ, দীপান আর বিশুন”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভে উঠে যাওয়া আমাদের জুজাক...”।

রামালি বলল, “বাপালি”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওই বাপালি ওখান থেকে ভল্ল ছুঁড়ে অন্ততঃ একটাকে শেষ করল বুঝতে পারলাম। কিন্তু বুদ্ধি করে, ভল্লা ছুঁড়েই বাপালি মেঝেয় শুয়ে পড়েছিল। লুকিয়ে থাকা লোকগুলোকে বেশ কিছু তির ওর দিকে ছুঁড়তে দেখলাম, কিন্তু বাপালির কোন ক্ষতি করতে পারল না। আমি বুঝতে পারলাম, লুকিয়ে থাকা রক্ষীগুলো ফাঁদে পড়েছে – ওরা ওখান থেকে সংকেত দিতে শুরু করল...”।

এবার ভল্লা বলল, “উপানু আর দুই রক্ষীকে মেরে, আমি আর রামালি এগিয়ে গিয়েছিলাম পশ্চিমের দরজার দিকে। মইলির ক্ষত বেঁধে সুরুলকে বললাম, তুই মইলির সঙ্গে থাক। সহাধিকারিকের ঘরের কোনায় ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম, ওরা তিনজন লুকিয়ে আছে। মনে মনে হিসেব করে দেখলাম, আমরা দুটো রক্ষী মেরেছি, বাপালি মেরেছে একটা, আর বাইরে থেকে ছোঁড়া ভল্লে মরেছে দুই – অতএব পশ্চিমের রক্ষীদের হিসেব মিলে গেল। আমি সংকেত দিতেই বাপালি আরেকটাকে মারল ভল্লা ছুঁড়ে, প্রায় একই সঙ্গে রামালি মারল আর একটাকে। রইল বাকি এক। আমাদের সবার কাছেই ভল্লা ছিল দুটো করে, বুঝতে পারলাম বাপালির কাছে আর ভল্লা নেই। অর্থাৎ যা করার আমাদেরই করতে হবে।

ও বাবা, তারপরেই কোনা থেকে উঁকি মেরে  দেখি, বেড়ার বাইরে থেকে একটা মুণ্ডু উঁকি মারছে – রামালি ফিসফিস করে বলল, অমরা...তার একটু পরেই অমরার ভল্ল গিঁথে গেল রক্ষীটার মাথায়। বাপালি আর অমরা একইসঙ্গে সংকেত দিল সব রক্ষী শেষ। অমরা তুই অত উঁচু বেড়ার ওপরে নিঃশব্দে উঠলি কী করে?” 

অমরা ডাল চাঁটতে চাঁটতে বলল, “গোলোকদাদা বুদ্ধিটা দিল  - আমাকে কাঁধে চাপিয়ে তুলে ধরেছিল বিঠল। এতটুকু নড়াচড়া করেনি – গায়ে খুব জোর আছে বিঠলের”। 

ভল্লা বলল, “ব্যস্‌, তারপর মারুলা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকল। চাবি বের করে খুলে দিল দরজা। আমাদের সবাই ভেতরে ঢুকতে, প্রথমেই মইলি, দীপান আর বিশুনকে এখানে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর আমরা ছজন ছাড়া বাকিদেরও পাঠিয়ে দিলাম। আমরা রইলাম কবিরাজমশাইকে মুক্ত করার জন্যে...কিন্তু সে আর হল না”।

অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না, চুপ করে বসে রইল। একসময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা বললেন, “যা উঠে হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়। জীবনের সব সাধ কী আর পূর্ণ হয়? হয় না। ওদের কোমর তো কাল তোরা ভেঙে দিয়ে এলি – ওরা কি চুপ করে বসে থাকবে? ওরা পালটা আঘাত হানবে না? আজ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নে। ওদের সেই আঘাত কী করে সামলাবি - কাল থেকে সে চিন্তা শুরু করিস”।

মারুলা বলল, “না কমলিমা, অত দুশ্চিন্তা করো না। আপাততঃ আস্থানের যা পরিস্থিতি ছেলেরা কম করে দিন পনের নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। আমার মনে হয় সকলেই নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যাক কাল সকালেই। যে তিনজনের আঘাত লেগেছে – তারাও ফিরে যেতে পারে যে যার ঘরে। তাতে কবিরাজ বড়্‌বলাকে প্রতিদিন এতদূর আসতে হবে না। এর মধ্যে রাজধানী থেকে কী সংবাদ আসে দেখা যাক। তারপর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে”।

সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মারুলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এখন বেরোব কমলিমা, আস্থানে ফিরতে হবে। আর কমলিমা, যতদিন না আস্থানে আমার দুমুঠো খাওয়ার কোন ব্যবস্থা হচ্ছে, আমার জন্যে দুবেলাই কটা রুটি বেশি বানিও”।

কমলিমা বললেন, “সে কথা বলতে হবে না, বাছা... আমি থাকতে তোর খাওয়ার অভাব কোনদিন হবে না”।

“ভল্লা চললাম রে। মা কি তোর একলার রে শালা, আমারও মা...”, হাসতে হাসতে বলে,  মারুলা বেরিয়ে গেল।

চলবে...

 


সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৯

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৮"]


৫.৫.১ অন্যান্য হিন্দু দেবতা

হিন্দুদের ত্রিদেব - অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ছাড়াও জনপ্রিয় আরও বেশ কিছু দেবতা রয়েছেন, যেমন কার্তিকেয়, গণেশ বা গণপতি। যদিও ষড়ানন কার্তিকেয় বা কার্তিকের জন্ম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে, তবু কার্তিক ও গণেশ, দুজনেই ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর পুত্র হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ভগবান গণেশের প্রধান দুটি রূপের মধ্যে প্রথমটি হল তিনি সিদ্ধেশ্বর বা সিদ্ধিদাতা এবং দ্বিতীয়টি হল বিঘ্নেশ বা বিঘ্ন নাশকারী। ভগবান গণেশ ভারতীয় হিন্দু বণিকমহলের একমাত্র দেবতা, তিনিই বাণিজ্যে সিদ্ধি এবং ঋদ্ধি দান করেন। দেবতা হনুমান, তিনি প্রধানতঃ সংকট-মোচন এবং বিঘ্ন-নাশকারী ভারতের সর্বত্র পূজিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেবতা বিশ্বকর্মা শিল্পী, কলাকুশলী ও দক্ষ কারিগর মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৫.৫.২ দেবীরূপা নদী

নদীসমূহতে দেবীত্ব আরোপ করার প্রাচীন প্রচলন যে অনার্য ভারতীয়দের মধ্যে ছিল, সেকথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ব্রাহ্মণ্যধর্ম সেই নদীগুলিকেও নানান পৌরাণিক কাহিনীতে সাক্ষাৎ দেবীরূপে বরণ করে, হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে নিল। হিন্দু ধর্মের যে কোন দেব বা দেবী পূজায় জলশুদ্ধি একটি আবশ্যিক প্রকরণ এবং তার মন্ত্রটি হল, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু”।।

মন্ত্রোক্ত সাতটি নদীকে ভারতবর্ষের পবিত্রতম নদী হিসেবে মান্য করা হয়, যদিচ এগুলির মধ্যে সরস্বতী নদী খ্রিস্টিয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যেই অবলুপ্ত হয়েছিল এবং সিন্ধু নদী ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ভারতবর্ষের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু তাও পূজার সময় কোশা-কুশি বা তাম্র কুণ্ডের জল স্পর্শ করে, আজও আমরা এই মন্ত্রই উচ্চারণ করি, এবং বিশ্বাস করি ওই জলে সাতটি নদীর পবিত্র জল যেন সংস্থিত হল। এই মন্ত্রটির আপডেটেড ভার্সান, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি মহানদী। নর্মদে কৃষ্ণা কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু” হওয়া যুক্তিযুক্ত হলেও, আমরা সেই ১৩০০ সি.ই.-র আগের মন্ত্রই সংস্কারবশতঃ ব্যবহার করে চলেছি ও চলব।

 যাই হোক, এই সাতটি পবিত্র নদীর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নদী গঙ্গা ও নর্মদা। গঙ্গা এবং নর্মদা সাক্ষাৎ দেবী মূর্তিতে পূজিতা হয়ে থাকেন।

৫.৫.২.১ গঙ্গা

গঙ্গা মকরবাহনা দেবী। একদিকে গঙ্গা ও তাঁর অজস্র শাখানদী ও উপনদীর পবিত্র জলধারায় উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ জনজীবন একান্তভাবেই নির্ভরশীল। অন্যদিকে তিনিই পাপীজনের সকল পাপ ও কলুষহারিণী। গঙ্গার ভৌগোলিক উৎস যেখানেই হোক, পৌরাণিক মতে গঙ্গার উৎপত্তি ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে। ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রবল জলধারার প্রপাত ধারণ করার সাধ্য পৃথিবীর ছিল না, অতএব ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব তাঁর জটায় গঙ্গার সেই প্রপাত ধারণ করলেন। তারপর ভগীরথের প্রদর্শিত পথে গঙ্গা হিমালয় থেকে নেমে এলেন এবং দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষ করলেন বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমে।   

এ গেল পূতসলিলা গঙ্গা নদীর পৌরাণিক কাহিনী। এ ছাড়াও আছে দেবীরূপা গঙ্গার কাহিনী। তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কুরুরাজ শান্তনু, গঙ্গাদেবীকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। দেবী গঙ্গা প্রথমে নারাজ হলেও, শর্ত সাপেক্ষে শান্তনু-জায়া হতে সম্মতা হলেন। শর্ত ছিল, তাঁর গর্ভজাত পুত্রদের তিনি জন্ম মূহুর্তেই গঙ্গাজলে বিসর্জন দেবেন, এবং তাঁর এই আচরণ বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে রাজা শান্তনুকে। নচেৎ তিনি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করবেন স্বামী ও সদ্যজাত পুত্রকে। রাজা শান্তনু নির্দ্বিধায় এই শর্ত মেনে নিলেন। তারপর “ত্রিপথগামিনী গঙ্গা রমণীয় কলেবরধারণপূর্বক পরম ভাগ্যবান শান্তনু রাজার মহিষী হইয়া মনোহর হাব-ভাব বিলাস ও সম্ভোগাদি দ্বারা নরেন্দ্রের মন মোহিত করিলেন”।

কয়েক বছরের মধ্যে দেবী গঙ্গা দেবতুল্য সাতটি পুত্র সন্তান প্রসব করেছিলেন এবং পুত্ররা ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র তাদের সকলকেই গঙ্গার ধারাস্রোতে বিসর্জন দিচ্ছিলেন। রাজা শান্তনু প্রতিবারই দেবী গঙ্গার এই আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও প্রিয়তমা জায়ার বিরহের কথা মনে করে নির্বিকার রইলেন। এরপর অষ্টম পুত্র ভূমিষ্ঠ হতেই রাজা শান্তনু আর থাকতে পারলেন না, পুত্রশোকে কাতর হয়ে বললেন, “এই পুত্রকে বিনষ্ট করিও না; তুমি কে? কী নিমিত্ত আত্মজদিগের প্রাণবধ করিতেছ? তুমি এই গর্হিত নিষ্ঠুরাচরণে ক্ষান্ত হও”।

তখন দেবী গঙ্গা বললেন, “আমি এখন থেকেই তোমার সহবাস ত্যাগ করলাম। আমি মহর্ষি জহ্নুর কন্যা, আমি গঙ্গা বা জাহ্নবী। আমি যে সাতটি পুত্রকে গঙ্গা স্রোতে বিসর্জন করেছি, তাঁরা কেউই সাধারণ মানুষ নন, তাঁরা অষ্ট বসুর সাতজন। মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপে তাঁরা মনুষ্য জন্ম নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তুমি তাদের পিতা এবং আমি তাদের মাতা হয়ে তাদের গর্ভে ধারণ করেছিলাম, এবং জন্ম মূহুর্তেই তাদের গঙ্গাস্রোতে বিসর্জন দিয়ে তাদের শাপমুক্তি ঘটিয়েছি। তাঁদের যে প্রতিশ্রুতি আমি দিয়েছিলাম, আজ আমি তার থেকে মুক্ত হলাম। অতএব আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব শর্ত অনুযায়ী আমি ফিরে চললাম আমার নিজস্থানে। আপনি আমার এই পুত্রকে গ্রহণ করুন, সে গঙ্গাপুত্র দেবব্রত নামেই আপনার কাছে বড়ো হয়ে উঠুক”। এই শিশুই বড়ো হয়ে মহাবীর ও মহাজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন, এবং পিতাকে সন্তুষ্ট করতে কঠোর প্রতিজ্ঞা করে “ভীষ্ম” নাম অর্জন করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এক সময় কৌরব বংশ যেমন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ গোষ্ঠী হয়ে উঠেছিল, তেমনি তাঁর উদাসীনতায় তার ভয়ংকর পতনও হয়েছিল। তাঁর পরোক্ষ সহযোগিতায় কুরু গোষ্ঠীর জ্ঞাতিশাখা পাণ্ডবরা উঠেছিলেন উন্নতির শিখরে এবং ঘটনাচক্রে তৃতীয়-পাণ্ডব বীর অর্জুনই হয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর কারণ। [মহা/আদি/৯৮]                      


৫.৫.২.২ নর্মদা

নর্মদা গঙ্গার মতো বিষ্ণুপদী নন। তিনি রুদ্রের কন্যা - ভগবান মহাদেবের তেজ থেকে তাঁর জন্ম। গঙ্গার অপরিসীম মহিমার কথা মনে রেখেও মহর্ষি ভৃগু, কর্দম, কপিল, দুর্বাসা, অণীমান্ডব্য প্রমুখ বলেছেন নর্মদা ভারতবর্ষের সমস্ত নদীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠা; রুদ্রের তেজ থেকে তিনি সমুৎপন্না; স্থাবর জঙ্গম সমস্ত কিছুকেই তিনি ত্রাণ করেন। শুদ্ধচিত্তে তাঁর তট পরিক্রমা করলে সর্বসিদ্ধি উপলব্ধি করা যায়।

মহাভারতের বনপর্বে ঋষি পুলস্ত্য যুধিষ্ঠিরের তীর্থ ভ্রমণের সঙ্কল্পের কথা শুনে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, “দেখ যুধিষ্ঠির তুমি অন্যান্য তীর্থে তো যাবেই, কিন্তু বিশেষ করে ত্রিলোক-প্রসিদ্ধা নর্মদা দর্শনে অবশ্যই যেও। নর্মদায় পিতৃপুরুষ এবং দেবতাদের তর্পণ করলে, অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের তুল্য ফললাভ হয়”।

নর্মদার উৎস মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার মহাতীর্থ অমরকণ্টকে, যার অপর নাম মেকলে বা ঋষ্য – বিন্ধ্য পর্বতের একটি শৃঙ্গ। এই নদী মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমদিকে প্রবহমানা, এবং এই দুই রাজ্যের জলসম্পদের প্রধানতম উৎস। এই নদীর দৈর্ঘ প্রায় ১,৩১২ কি.মি. এবং গুজরাটের খাম্বাৎ খাঁড়ির কাছে আরব সাগরে মিলিত হয়েছে। এই মোহানা থেকে ৩০ কি.মি. দূরের ভারোচ শহর, যার প্রাচীন নাম ছিল ভৃগুকচ্ছ, প্রাচীন সমুদ্র বন্দর ও হিন্দুদের প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র।

নর্মদার উত্তর তট বরাবর দাঁড়িয়ে আছে বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী আর দক্ষিণতটে সাতপুরা পর্বতমালা। আজ থেকে একশ বছর আগেও নর্মদার উভয় তীরে ছিল শ্বাপদসংকুল দুর্ভেদ্য অরণ্য রাজি। এই নিবিড় অরণ্য, দুই পর্বতশ্রেণী এবং তার মাঝখানে প্রবহমানা স্রোতস্বিনী নর্মদার জন্যেই উত্তরভারত থেকে দক্ষিণভারতের যাওয়ার স্থলপথ বহুদিন দুরধিগম্য ছিল। নর্মদা উপত্যকার প্রাচীনতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কারণ ধারণা করা হয়  এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূভাগ গণ্ডোয়ানাভূমির একটি অংশ। এই অঞ্চলের পলির নানান স্তরে বেশ কিছু ডাইনোসোরসের জীবাশ্মও উদ্ধার করা গেছে।

এই নদীর উভয়তটেই অনার্য মানুষের সম্পন্ন জনপদ ও গ্রামের প্রাগৈতিহাসিক কালের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে বিস্তর। ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কালে আমরা যে সব সম্পন্ন নগর ও জনপদের সন্ধান পাই সেগুলি হল, মাহিষ্মতী, উজ্জয়িনী, বিদিশা, চেদি ইত্যাদি। 

নর্মদা - এই ত্র্যক্ষর শব্দটি শৈবদের কাছে “গায়ত্রী”-র সমতুল্য একটি বীজমন্ত্র। নৃ ধাতু থেকে নর্ম বা নর্মন  শব্দটি নিষ্পন্ন করা যায় – নর্ম কথার অর্থ ক্রিয়া, খেলা বা লীলা, আরও সঠিক বললে, আনন্দ-লীলা।  অতএব নর্মদা কথার অর্থ যিনি আনন্দ-বিলাস দান করেন। এই আনন্দের সংজ্ঞা মিলবে তৈত্তিরীয় উপনিষদের তৃতীয় ভৃগুবল্ল্যধ্যায়ের ষষ্ঠ অনুবাকে –

“আনন্দই যে ব্রহ্ম একথা জেনে রাখুন। কারণ আনন্দ থেকেই এই জীব ও জড় জগতের সৃষ্টি হয়, আনন্দের আবহেই তারা প্রতিপালিত হয় এবং অন্তিমে এই আনন্দেই তারা ফিরে আসে ও আনন্দেই বিলীন হয়” [বাংলায় সরল অনুবাদ – লেখক]। অতএব নর্মদা শুধু স্থূল ও সাধারণ জলধারা নয়, চিন্ময়ী রূপে তিনি ব্রহ্মস্বরূপা আনন্দময়ীও। নর্মদার অন্য নাম রেবা, এই নামও বীজমন্ত্রের মতো জপ করলে, শোনা যায়, সর্বসিদ্ধি লাভ সম্ভব।

নর্মদার পবিত্রতা সম্পর্কে আরও জনশ্রুতি হল, সারাদিন স্নানরত পাপী ও তাপীদের পাপ ও কল্মষ ধুতে ধুতে পতিতপাবনী গঙ্গা নিজেই যখন মলিন হয়ে ওঠেন, দিনান্তে তিনি নর্মদা তটের কহ্লোড়ি ঘাটে আসেন কৃষ্ণা গাভীর বেশে। এবং নর্মদার পূত সলিলে অবগাহন করে নির্মল শুভ্র গাভীরূপে ফিরে যান স্বস্থানে। শিব ভক্তগণ আরও বিশ্বাস করেন, নর্মদাতটের প্রতিটি কংকর – অর্থাৎ প্রতিটি নুড়ি এবং কাঁকরই শিবময় শংকর। অতএব উওরভারতে কাশি যেমন একটি শিবক্ষেত্র, নর্মদা তট তার থেকেও বরেণ্য শিবক্ষেত্র।              

 

৫.৬.১ হিন্দু দেবী

বৈদিক দেবীদের তুলনায় হিন্দু দেবীর সংখ্যা এবং তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের প্রকৃতি, যাঁর সংযোগে পুরুষোত্তম ব্রহ্ম এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করে থাকেন, হিন্দু ধর্মে সেই প্রকৃতি হয়ে উঠলেন দেবী - তিনিই আদ্যাশক্তি, মহামায়া। ভগবান বিষ্ণু বা বলা ভাল তাঁর প্রধান অবতার শ্রীকৃষ্ণের মহিলা-মোহিনী মহিমা থাকা সত্ত্বেও, ভাগবত মতে দেবীদের প্রাধান্য নেই বললেই চলে। বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবী বিষ্ণুর, সীতাদেবী শ্রীরামচন্দ্রের এবং শ্রীকৃষ্ণপ্রিয়া শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের পাশে পূজিতা হয়ে থাকেন। যদিও এই তিনদেবীর মধ্যে লক্ষ্মীদেবীর জনপ্রিয়তা সর্বজনীন, সম্পদের দেবী হিসেবে প্রত্যেক হিন্দুর ঘরেই তিনি স্বাধীনভাবে পূজিতা হয়ে থাকেন। তবে সেই লক্ষ্মীদেবী, যত না সমুদ্রমন্থনে উত্থিতা বিষ্ণুর পত্নী হিসেবে পূজিতা হন, তার থেকে অনেক বেশি পূজিতা হন, মহাদেব ও পার্বতীর কন্যা হিসেবে। ভাগবত মতে মাতৃকাদের যে নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল, পৌর্ণমাসী, পদ্মা, অন্তরঙ্গিকা, গঙ্গা, কলিন্দতনয়া, গোপী, বৃন্দাবতী, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী, গো, বৈষ্ণবী, শ্রীযশোদা, দেবহূতী, রোহিণী, শ্রীসতী, দ্রৌপদী, কুন্তী এবং শ্রীকৃষ্ণের দশ পত্নীগণ, যাঁদের নাম আগেই বলেছি। এঁদের মধ্যে গঙ্গা, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী ও গো মাতৃকার পূজা ভারতের সর্বত্রই প্রচলিত, অন্যান্য মাতৃকারা অঞ্চলভেদে পূজিতা হয়ে থাকেন।  

অন্যদিকে ভগবান মহেশ্বরের পত্নীদের সকলেই মহামায়া আদ্যাশক্তির বিভিন্ন রূপ। কখনো তিনি সতী, কখনো গিরিকন্যা উমা বা পার্বতী বা গৌরী। ভক্ত হিন্দুদের মনে এই দৈব দম্পতি হর-গৌরী, দাম্পত্যের আদর্শ ও প্রতীক। পার্বতী বা গৌরী একদিকে পতিনিষ্ঠ পত্নী - প্রেমে, অভিমানে, অনুরাগে, অনুযোগে মাধুর্যের শেষকথা। আবার অন্যদিকে তিনিই মাতৃস্বরূপা– তিনি শুধুমাত্র লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ জননীই নন, তিনি ভক্তজনেরও মাতা, তিনি তাদের দুর্গতিনাশিনী, পাপহারিণী, ভবতারিণী। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সময়ে তিনি ভক্তজন এমন কি দেবতাদের পরিত্রাণের জন্যেও শান্ত-পূত-পবিত্র পার্বতী রূপ ছেড়ে যোদ্ধারূপও ধারণ করেছেন বার বার। কখনো তিনি দেবী দুর্গা - মহিষাসুরমর্দিনী, কখনো দেবী চণ্ডী – চণ্ডমুণ্ড ও রক্তবীজ অসুরনাশিণী আবার কখনো তিনিই ব্যাঘ্রবাহিনী অম্বা। এই দেবীদের সকলেই ভারতের প্রায় সর্বত্র পূজিতা হয়ে এসেছেন এবং আজও পূজিতা হয়ে থাকেন। তাঁর আরেকটি রূপ অন্নপূর্ণা – এই রূপেই তিনি ভক্ত প্রজাদের সমৃদ্ধি, শস্য এবং সম্পদ দান করেন। দেবী লক্ষ্মী ধনের দেবী, সে কথা আগেই বলেছি। দেবী সরস্বতী বৈদিক কালে বাক্‌-দেবী বা ভাষার দেবী ছিলেন, এখন তিনি সর্ববিদ্যার দেবী। শৈব মতে ষোড়শ মাতৃকার নাম পাওয়া যায়, গৌরী, পদ্মা, শচী, মেধা, সাবিত্রী, বিজয়া, জয়া, দেবসেনা, স্বধা, স্বাহা, শান্তি, পুষ্টি, ধৃতি, তুষ্টি, আত্মদেবতা ও কুলদেবতা।

চলবে...


শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৬

  প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৫"


২৬

 

সুনুদা,

অবশেষে তোমার সাড়া পেলাম এবং নিশ্চিন্ত হলাম।

আজকাল প্রায়ই শুনি আমাদের কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোনগুলির ওপর কেউ বা কারা যেন এ আই নামক কোন এক উচ্চমার্গীয় সফ্‌টওয়ারের সাহায্যে সর্বক্ষণ নজর রেখে চলেছে। আমরা কোথায় কোথায় যাচ্ছি, কোথায় কোন হোটেলে উঠছি, কার সঙ্গে অত্যধিক কথা বলছি, অথবা কাকে মেলা মেল করছি। কিংবা অনলাইন শপিং-অ্যাপ থেকে কী কী ধরনের জিনিষপত্র কিনছি বা খুঁজছি – সব নাকি তারা লক্ষ্য রেখে চলেছে। এবং সেই অনুযায়ী তারা নির্ভুল দক্ষতায় আমাদের সতত সচেতন করে রাখতে – এলোপাথাড়ি নানান বিজ্ঞাপন পাঠাতে শুরু করে। এমনকি অনেক সস্তায় আরও মনোহর ও লোভনীয় পরিষেবা ও জিনিষপত্র কোথায় এবং কীভাবে কত সহজে আমরা পেতে পারি, তার সন্ধান তারা দিতে থাকে প্রতিনিয়ত।

বিশ্বাস করো, আমার ভয় হচ্ছিল, সেরকমই কোন এ আইয়ের এয়ারকিতে আমি ধরা পড়লাম বুঝি – তোমাকে লেখা আমার সব মেলগুলি তারাই হয়তো বেমালুম গায়েব করে দিচ্ছে মাঝপথে। আমার এত কথা সবই বোধহয় ভেসে বেড়াচ্ছে অনন্ত এক ভার্চুয়াল জগতে – তোমার কাছে সে সব কিছুই পৌঁছচ্ছে না।

খুব ভয় লাগে সুনুদা, বিশ্বাস করো। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অর্থাৎ সাধারণ মানুষের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য এবং তত্ত্ব নিয়ে সত্যিসত্যিই কি ছিনিমিনি খেলবে হাতে গোনা কিছু মানুষ? মানুষের বানানো প্রযুক্তি কি প্রতিটি মানুষকেই অহরহ, তিনশ পঁয়ষট্টি দিন, ব্ল্যাকমেল করে তাদের ব্যবসা বাড়াবে? এটাই কি হতে চলেছে আমাদের সুসভ্য উন্নত বিজ্ঞানের আলোমাখা জীবনের ভবিতব্য? কে জানে? আমার মনে হয় আমাদের এই সভ্যতার থেকে বহু দূরের গ্রামে গঞ্জে খেটে খাওয়া তথাকথিত অনগ্রসর নারী ও পুরুষরাই আজকের দিনে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। আপাত অদৃশ্য অনন্ত ও অসীম প্রভাবশালী কিছু বেওসাদারের হাতের পুতুল হয়ে উঠছি আমরা প্রতিদিন এবং অচিরেই  আমরা হয়ে উঠব তাদের একান্ত দাসানুদাস।

 যাগ্‌গে, এসব ভাবনায় মাথা খারাপ করে লাভ নেই, গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে আপাততঃ ভালই আছি, হয়তো ভালই থাকব...যেভাবে ব্রিটিশ রাজত্বে আমাদের রায়বাহাদুররা সব জেনে-বুঝেও দিব্যি সুখে স্বচ্ছন্দে থাকতেন।

তার থেকে আমার নিজের জীবনের কথাতেই ফিরে আসি।

 সেবার প্রায় চোদ্দ দিন হসপিট্যালে থাকার পর, বাবাকে নিয়ে আমরা ঘরে এলাম। কিন্তু এই বাবা আর আমার আশৈশবের দেখা সুস্থ-কর্মঠ বাবা রইলেন না। তিনি অসুস্থ, আংশিক স্থবির। তাঁর শরীরের বাঁদিকটা প্যারালাইজ্‌ড্‌। মুখের একটা পাশও বিকৃত। নিজে নিজে হাঁটা চলা করতে পারেন না – বিছানা থেকে টয়লেটে যাওয়াটাও তাঁর কাছে তখন দুরূহ পথযাত্রা। তাঁর চোখের নিস্তেজ দৃষ্টি অনেকটাই নির্বাক, তাঁর জিহ্বাও কিছুটা অসাড় হয়ে যাওয়াতে, তার কথাবার্তাও অস্পষ্ট কখনও কখনও দুর্বোধ্যও মনে হয়।

খুব সংক্ষেপে বললে, বাবার মাত্র ওই কয়েকদিনের অসুস্থতাতেই আমাদের সাংসারিক স্থিতাবস্থাটা টলে গেল। এবং আমরা মুখে স্বীকার না করলেও মনে মনে সকলেই টের পাচ্ছিলাম, সংসারটাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়।

একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোজ আসতেন বাবাকে নড়াচড়ায় সাহায্য করতে। অসীম ও অলৌকিক আশায় মা তাঁকে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, “উনি আগের মতো চলাফেরা করতে পারবেন তো, বাবা?” ভদ্রলোক বলতেন, “কেন পারবেন না, কিন্তু একটু সময় লাগবে, ধৈর্য ধরতে হবে। আপনি একদম টেনশন করবেন না, মেসোমশাইয়ের মত অন্ততঃ পঁচিশ জন পেশেন্টকে আমি সুস্থ করে তুলেছি, তাঁরা সকলেই এখন একা একা রোজ পার্কে যান মর্নিং ওয়াক করতে। তাঁদের এখন আর কোন অসুবিধেই নেই। ডক্টর বিশ্বাসের মতো বিজি ডাক্তাররা তো ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা করে হসপিট্যাল থেকে ছেড়ে দেন এই ভরসাতে, যে বাকি ফিজিক্যাল ট্রিটমেন্টটা বিকাশ হালদার ঠিক সামলে নেবে”। বাবাকে যিনি রোজ ফিজিওথেরাপি করাতে আসতেন, তাঁরই নাম বিকাশ হালদার।

সুদীপবাবুর কথায় মা বুক বাঁধতেন, বলতেন, “তাই যেন হয়, আমি কালীঘাট আর ঠনঠনে কালীমায়ের কাছে ডাব-চিনির মানত মেনেছি, বাবা…”।

আমার সরলমতি মা যতই মাকালীর চরণে মানত মানুন। অথবা বিকাশবাবুর মুখের বিকশিত কাষ্ঠ-হাসিতে মুগ্ধ হন না কেন, আমি কিন্তু টের পাচ্ছিলাম আমাদের সংসারের ওপর ঘনিয়ে উঠছে গভীর সংকট। অসুস্থ বাবা, তাঁর সেবায় প্রায় চব্বিশঘন্টা প্রাণপাত পরিশ্রম করতে করতে ও মানসিক উদ্বেগের ব্যাকুলতায় মায়ের পক্ষেও আর বেশিদিন সুস্থ থাকা সম্ভব হবে না। তার ওপর আছে আমার বালক পুত্রের দেখভাল। তার স্কুল যাওয়া, তার লেখাপড়া, তার নাওয়া-খাওয়া, তার সুস্থতা-অসুস্থতা…। আর সবার শেষে কিন্তু সবার উপরে আছি আমি – বিয়ে ভেঙে বাবা-মায়ের ঘাড়ে চেপে থাকা নিজের কন্যা…।

আসলে আজও আমাদের মা-বাবারা যতই বলুন, ছেলে আর মেয়েতে কোন তফাৎ নেই। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু তফাৎ একটা থাকেই। আমি যদি সুখী বিবাহিত হতাম, আমার সঙ্গে এসে আমার বর যদি “বাবা, বাবা” কিংবা “মা, মা” করে শ্বশুর-শাশুড়ির দেখভাল করার পূর্ণ দায়িত্ব নিত, তাহলে ব্যাপারটা বেশ আনন্দ ও স্বস্তিদায়ক হত। কিন্তু পতি-বিচ্ছিন্না কন্যা? সেও তো নিরন্তর এক দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তির বোঝা! সে কন্যা যতই উপার্জনক্ষম স্বনির্ভর হোক না কেন!

আমাদের বাড়ির এই রকম পরিস্থিতিতেই আমার জীবনে শশাঙ্কর উপস্থিতিটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা প্রথমবার টের পেলাম। এবং এটাও উপলব্ধি করলাম, যেহেতু বাবা কোনদিনই আর আগের মতো সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন না, অতএব ভবিষ্যতেও শশাঙ্কর নিরন্তর সহায়তার প্রয়োজন আমার থেকেই যাবে। কাজে কাজেই শশাঙ্কর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুবই স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। যদিচ একথাও আমাকে স্বীকার করতে হবে, আমার অসহায়তার এমন সুবর্ণ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে শশাঙ্ক আমাকে কোনরকম ভাবেই আর কোনদিন কোন প্রেমবার্তা বা ওই প্রসঙ্গের কোন আভাস-ইঙ্গিতও দেয়নি। অতএব এতদিনে হৃদয়ঙ্গম করলাম শশাঙ্ক লোকটি যথেষ্ট ভদ্রলোক এবং অত্যন্ত আত্মাভিমানীও! অর্থাৎ শশাঙ্কের প্রতি আমার হৃদয়-দৌর্বল্যের সমস্ত লক্ষণই প্রকট হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু সেই দৌর্বল্যটাকে আমি প্রেম বা ভালবাসা ভাবতে বা বলতে নারাজ, তবে একথাও ঠিক শশাঙ্কের উপর আমি খুব নির্ভরশীল হয়ে উঠতে লাগলাম।        

সেই সময় বাড়ির সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে আমি খুব একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা চিন্তা করতে লাগলাম। আর সেটি হল বাম্বাইকে কলকাতার স্কুল থেকে ছাড়িয়ে বাইরে কোথাও রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠানো। ভাবলাম বাম্বাই কলকাতায় না থাকলে মায়ের এবং আমারও অনেকটাই দুশ্চিন্তা ও কাজের ভার লাঘব হবে। উপরন্তু পরিবেশের চাপে ওর লেখাপড়াটাও অনেকটাই কম বিঘ্নিত হবে।

সিদ্ধান্তটা নিঃসন্দেহে কঠিন, কারণ কথাটা মাথায় আসার পর বাম্বাই ছাড়া আমার নিজের জীবনটা কেমন হবে? রোজ সকালে উঠেই ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখতে পাব না? অফিস থেকে ফিরে রাতে শুয়ে পড়া পর্যন্ত ওকে জড়িয়ে থাকা আমার জীবনের প্রাত্যহিক মাধুর্য্যটুকুও আমাকে হারাতে হবে?

তাছাড়া কলকাতায় ওর স্কুল, ওর ক্লাসের বন্ধুদের এবং টিচারদের ছেড়ে যেতে বাম্বাই রাজি হবে কিনা। ওই স্কুলে বাম্বাই ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ছে, অতএব তার শৈশব ও বাল্যের বছরগুলোর সঙ্গে ওই স্কুল ওতপ্রোত জড়িত। আমি নিজের ছোটবেলার কথা মনে করলাম। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়, আমাকে যদি আমার মা-বাবা বলতেন, “সুকু কাল থেকে তোকে অনেক দূরের এক স্কুলে গিয়ে পড়তে হবে”। আমি কি এক কথায় মেনে নিতাম? মনে হয় না। তবে আমার দুই বন্ধুকে দেখেছি, তাদের বাবা সরকারি অফিসার ছিলেন। তাঁদের প্রায়ই এক-দেড় বছর অন্তর এক শহর থেকে অন্য শহরে ট্রান্সফার হয়ে যেত। সেই সঙ্গে আমার ওই বন্ধুদের স্কুলও এক শহর থেকে অন্য শহরে বদলে যেত। ওই বন্ধুরা দিন কয়েক খুব কান্নাকাটি করত, আমরাও তাদের সঙ্গে গলা মেলাতাম। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সেই আবেগটা থিতিয়েও আসত নির্বিঘ্নে।          

এক রাত্রে বাম্বাইকে সব কথা খুলে বললাম। আমার গলা জড়িয়ে ধরে, বাম্বাই মন দিয়ে সব কথা শুনল। কথাগুলো বলতে গিয়ে আমি নিজেই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম। চোখে জল এসে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমার গলা জড়িয়ে ধরে থাকা ঘুমন্ত বাম্বাইয়ের এমন স্পর্শ আর কোনওদিনই হয়তো পাব না। রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের নিয়ম-কানুনে বাঁধা পড়ে বাম্বাই একলা একলা বড়ো হয়ে উঠতে থাকবে, স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। তখন হয়তো মায়ের সঙ্গে একত্র শুতেও ওর অস্বস্তি হবে। গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকা তো অনেক দূরের কথা।

যাই হোক আমার সব কথা শুনে বাম্বাইয়ের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখলাম না, শুধু জিজ্ঞেস করল, “কবে যেতে হবে মা?”

আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে ওর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “ক্লাস ফাইভের মাঝ সেশনে নিশ্চয়ই সম্ভব হবে না, ধরে নে ক্লাস সিক্সের শুরু থেকে...”।

একথার পর বাম্বাই নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল, এবং অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি এতই বিস্মিত হলাম, সে আর বলার কথা নয়। মনে হল বাম্বাইয়ের ছোট্ট মনটা কি পাথর দিয়ে গড়া? ওর মা, দিদিমা, দাদু, ওর স্কুলের বন্ধুরা, এই ঘরবাড়ি, এই পাড়া – সব কিছু ছেড়ে ওকে চলে যেতে হবে বুঝেও ও এত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল কী ভাবে? ওর এই নিষ্ঠুর উদাসীনতার কথা ভেবে ভেবে  – হ্যাঁ সুনুদা, সে রাত্রে আমার ওই কথাটাই মনে হয়েছিল।  আমিই কেঁদে ভাসালাম সারা রাত, ও নিশ্চিন্তে ঘুমালো। বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে ভোরে উঠে যখন নিজের জন্যে এক কাপ চা করে আনলাম, বাম্বাইয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে, নিজের মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম, “বাচ্চা ছেলে, সারাদিন স্কুলে লেখাপড়া – দৌড়োদৌড়ি খেলাধুলো করে ক্লান্ত তাই হয়তো... সকালে ঘুম ভেঙে উঠে কাল রাত্তিরের কথা মনে পড়লেই... নিশ্চয়ই বলবে, না মা, আমি কখনও যাবো না, তোমাকে ছেড়ে...”। 

চলবে... 


শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৭

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

 পঁচিশে জুলাই, ২০২৬, মঙ্গলবার – বিকেল চারটে

বিকেল চারটে থেকে ভিজিটিং আওয়ার, অহীনের সঙ্গে নবীনবাবু পৌঁছে গেলেন কেবিনের দরজায়। সন্তর্পণে দরজা ফাঁক করে নবীনবাবু কেবিনে ঢুকলেন, পিছনে অহীন। অবিনবাবুর বিছানার মাথার দিকটা তুলে দেওয়া, পিছনে বালিশের ঠেস দিয়ে তিনি বসে আছেন। তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ঘরে ঢোকা দুই মূর্তির দিকে।

নবীনবাবু হাসি হাসি মুখে, একটু ঘাড় নামিয়ে বললেন, “প্রণাম নিও দাদু, আমি তোমার বড়দার একমাত্র ছেলে প্রবীণের পুত্র। মানে তুমি আমার বাবার ছোটকা”। অবিনদাদু তাকিয়ে রইলেন নবীনবাবুর দিকে, কোন উত্তর দিলেন না। বাবার দেখাদেখি অহীনও মাথা নামিয়ে বলল, “প্রণাম নিও, দাদু”। নবীনবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, “দাদু, এটি আমার ছোট পুত্র – অহীন, তোমার প্রপৌত্র, মানে পুতি। আমার বড় পুত্র মহীন এখানে নেই – কর্মসূত্রে গুজরাটে আছে”।  

অবিনবাবু এবার বিরক্ত হয়ে মুখ বেঁকালেন, হাত নেড়ে ওদের বসতে ইশারা করলেন, তারপর একটু চাপা স্বরে বললেন, “সবাই মিলে অ্যাতো দাদু দাদু করচিস কেন? আমাকে দেখে কি দাদু মনে হচ্চে?”

নবীনবাবু এবং অহীন দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে বিছানার পাশে রাখা টুলে বসল। নবীনবাবু হাত কচলে, অমায়িক হাসিমাখা মুখে বললেন, “তা তুমি আমার বাবার ছোটকা। তুমি আমার দুই পুত্রের ঠাকুরদাদার ছোটকা। দাদু বলবে তাতে আর আশ্চর্য কি?”

কড়া চোখে নবীনবাবুর দিকে তাকিয়ে অবিনবাবু একটু ধমকের সুরে বললেন, “না, বলবি না। অবিনদা বলবি, বা ওরকম কিছু – দাদু কক্ষণো না। এই বলে রাখলাম”।  

“আচ্ছা তাই হবে। কেমন আছ বলো। দুপুরে মাছের ঝোল ভাত দিয়েছিল, কেমন লাগল?”

মুখ বিকৃত করে অবিনবাবু বললেন, “ছ্যাঃ মুখে তোলা যায় না। যেমন পিণ্ডি চটকানো ভাত, তেমনি ঝোল। যেন পুকুরের জলে ভেসে বেড়ানো মাছ ধরে, সেই জলেই একটু নুন আর হলুদ ছেটানো”।

নবীনবাবু আর অহীন এই কথায় হেসে ফেলল। তাদের হাসি দেখে অবিনবাবু বললেন, “হাসছিস? বড়ো বৌদিদির রান্না তো খাসনি। বড় বৌদিদি মানে খ্যাঁদার মা। আহা সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে”।

কেবিনের দেয়ালে বেশ বড়ো একটা ফটো টাঙানো ছিল – গভীর অরণ্যের মধ্যে পায়ে চলা পথ বহু দূরে চলে গেছে, বনের আরও গভীরে। সেই ফটোটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবিনবাবু আবার বললেন, “ওঁনারা আর বেঁচে নেই না? বড়দা, বড়বৌদিদি? বড়বৌদিদি যখন বিয়ে করে আমাদের বাড়ি এল, ওঃ যেন সাক্ষাৎ মা জগদ্ধাত্রী। বাড়ির মেয়েরা ওঁনাকে বরণ করল, তারপর নানান মেয়েলি আচার অনুষ্ঠান হল। সে সব সম্পন্ন হতেই, আমার মা বললেন, বৌমা, যাও নিজের ঘরে গিয়ে কাপড় চোপড় ছেড়ে বিশ্রাম নাও। পিসিরা, দিদিরা বৌদিদিকে নিয়ে দোতলায় যাচ্ছিল, বৌদিদি বললেন, বিনু কোথায়, বিনু? সবাই জিজ্ঞাসা করল বিনু কে? বিনু বলে তো কেউ নেই এ বাড়িতে? অনুষ্ঠান বাড়ির ভিড়ের ভেতর থেকে আমাকে ঠিক লক্ষ্য করেছিলেন। আমার দিকে হাত তুলে ডাকলেন, বললেন, ওই তো বিনু। আমার কাছে আয়। আমি কাছে যেতে জিজ্ঞাসা করলেন, তোর নাম কী রে? আমি বললাম, অবিন, সবাই অবু বলে ডাকে। বৌদিদি বললেন, আজ থেকে আমি তোকে বিনু বলে ডাকব। বলে আমার একটা হাত ধরে ওপরে নিয়ে গেলেন। পরে জেনেছিলাম, বাপের বাড়িতে ওঁনার ছোটভাই ছিল, বিনয়, ডাকনাম বিনু - আমারই বয়সী। আমার মধ্যে উনি নিজের ছোট ভাইকে খুঁজে...”। অবিনবাবুর কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এল, তাঁর দুচোখের কোলে জমে উঠল অশ্রু।

নিজেকে সামলে নিয়ে একটু পরে অবিনবাবু বললেন, “জিজ্ঞেস করতেও ভয় হয়, খ্যাঁদা বেঁচে-বর্তে আছে তো”?

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “বিনুদা, খ্যাঁদা কে?”

এই প্রথম অবিনবাবুর মুখে হাসি ফুটল, বললেন, “বিনুদা? বাঃ বেশ নাম দিয়েছিস। খ্যাঁদা কে হয় তোর বাপকে জিজ্ঞেস কর না, ছোঁড়া”। অহীন তার বাবার দিকে তাকাল, নবীনবাবু বললেন, “ঠাম্মা চলে গেছেন প্রায় বছর কুড়ি হবে। আজ এতদিন পর তোমার মুখে বাবার ডাকনাম শুনে কত কথাই যে মনে পড়ছে – বাবা ভালই আছেন, মাও আছেন। ওঁনাদের আজকে আসতে আমিই মানা করেছি। কাল নিয়ে আসব”।

এবার অবিনবাবু গম্ভীরভাবে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কয়েকটা প্রশ্ন করব, তার সোজাসাপটা উত্তর দিবি”? ওরা দুজনেই একটু উৎকণ্ঠিত হল, কী প্রশ্ন করবেন, রে বাবা। কেউই কিছু বলল না, অবিনবাবুর প্রশ্নের অপেক্ষায় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “ডাক্তারবাবুকে সকালে আর দুপুরে দুবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তর না দিয়ে বললেন, সে অনেক কথা, এখন আমার সময় নেই, পরে একসময় বলব। পারুল, যে মেয়েটি আমার সেবা করে, সর্বদা দেখাশোনা করে, তাকেও জিজ্ঞেস করলাম, সে গম্ভীর মুখে বলল, সবাই তো তাই বলে, কিন্তু আমি তো তেমন কিছু বুঝি না”। একটু থেমে অবিনবাবু দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভারত কি স্বাধীন হয়েছে?”

সর্বজিৎ, মহীন, অহীন আর ডাক্তারকাকু এই বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আগেই আলোচনা করেছিল। অবিনদাদুর কিছু কিছু প্রশ্নের ধাক্কা আসবে, যেগুলো খুব সাবধানে সামলাতে হবে। যেমন এই স্বাধীনতা। নেতাজী সুভাষের বিতর্কিত মৃত্যু। দেশভাগ। সিদ্ধানন্দ ঠাকুরের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠলেই আসবে সেই সময়কার দুই বাংলা জুড়ে বীভৎস দাঙ্গার ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল নিঃস্ব হিন্দু উদ্বাস্তুদের এদেশে চলে আসার প্রসঙ্গ আসবে। এত লক্ষ মানুষের এদেশে কিভাবে পুনর্বাসন হয়েছে, সে কথাও উনি জানতে চাইবেন হয়তো। এসব কথা কোন না কোন সময় অবিনদাদুকে বলতেই হবে। কিন্তু উনি কী ভাবে নেবেন সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়।

নবীনবাবু এই প্রশ্নের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি অহীনের মুখের দিকে তাকালেন। অহীন বলল, “হ্যাঁ বিনুদা, ভারত ১৯৪৭ সালের পনেরই আগষ্ট মাঝ রাত্তিরে স্বাধীন হয়েছে। ব্রিটিশরা আমাদের দেশ ছেড়ে চলে গেছে”।

“সাতচল্লিশ সালে? আজ থেকে ঊণতিরাশি বছর আগে? বলিস কি? ডমিনিয়ন স্টেটাস না পূর্ণ স্বরাজ?”

অহীন বলল, “না বিনুদা, ডমিনিয়ন স্টেটাস নয়, পূর্ণ স্বরাজ। আমাদের দেশ এখন গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন হয়, আমরা সবাই ভোট দিয়ে, আমাদের সরকারকে নির্বাচিত করি”।

অবিনবাবু খুশি হলেন, অহীনের কথায়। কিন্তু তারপরই জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওই মেয়েটি, মানে পারুল, কথাবার্তা বলে বেশ শিক্ষিত মনে হল… সে ওরকম বলল কেন?”

অহীন একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আমাদের দেশটা কত বড়ো, সে তো তুমি জানোই বিনুদা। এত রকমের মানুষ। এত রকমের ভাষা, জাত, পাত, ধর্ম। তার ওপর ধনী আছে, মধ্যবিত্ত আছে, দরিদ্র আছে, হত-দরিদ্রও আছে। এদের সকলেরই আশা ছিল দেশ স্বাধীন হয়েছে, এবার নিশ্চয়ই সকলের সুদিন আসবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সর্বস্তরের সর্বসাধারণের মধ্যে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছনো যায়নি। মেয়েটির ব্যাকগ্রাউণ্ড জানি না, কাজেই সঠিক বলতে পারব না, কেন সে একথা বলল। আমাদের দেশবাসীদের মধ্যে অনেকের মনেই এমন ক্ষোভ রয়েছে”।

অবিনবাবু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে অহীনের কথা শুনছিলেন, এখন জিজ্ঞাসা করলেন, “তোর মনে কোন ক্ষোভ নেই?”

অহীন এবার হেসে ফেলল, বলল, “ক্ষোভ বলা যাবে কি না জানি না, তবে কিছু কিছু বিষয়ে আমরাও যে হতাশ হচ্ছি না, তা নয়”।

“যেমন”?

অহীন আবারও হাসল, বলল, “তুমি কী স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সব পরিস্থিতি আজকেই জেনে ফেলতে চাইছ, বিনুদা? আরও একটু সুস্থ হও, বাড়ি চলো। তারপর এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে”।

অবিনবাবু অহীনের সপ্রতিভতায় খুশি হলেন। তাঁর মনে পড়ল নিজের পিতা-মাতার কথা। বড়দাদা এবং বড়োবৌদিদির কথা। ভাইপো খ্যাঁদার কথা। সাত বছরের বালক অবস্থায় যাকে তিনি শেষ দেখেছিলেন। সেই রক্তধারাই বহন করে চলেছে – এই ছেলেটি, যার নাম অহীন। এতক্ষণে আন্তরিক এক আবেগ অনুভব করলেন ছেলেটির প্রতি। তাঁর বুকের মধ্যে এখন আশ্চর্য এক আত্মীয়তার অনুভূতি – এই ছেলেটি তাঁর প্রপৌত্র – যাকে চলিত কথায় বলে পুতি। মানুষ কেন, কোন জীবই চিরকাল বাঁচে না, এ কথাটা পূর্ণ সত্য নয়। তারা বেঁচে ছিল তাদের পূর্বপুরুষে। তারা বেঁচে থাকে তাদের উত্তরপুরুষে। সৃষ্টির আদি থেকে এ এক অবিচ্ছিন্ন ধারা। সেই ধারার মধ্যে প্রতিটি সম্পর্কের একটা প্রাকৃতিক পারম্পর্য থাকে।

সাধারণতঃ একটি মানব শিশুর জন্ম হয় তার পিতা-মাতার যৌবন অবস্থায়। সে সময় তার পিতামহ এবং পিতামহী থাকে যৌবনের উপান্তে। সে শিশুর প্রপিতামহ ও প্রপিতামহী, যদি জীবিত থাকে, তারা বৃদ্ধ নির্যৌবন জীবনযাপন করে। কিন্তু তিনি এই যে মানুষগুলির সামনে বসে কথা বলছেন, তাদের স্বাভাবিক “দাদু” ডাক শুনে তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। কেন? কারণ কোন এক অলৌকিক কারণবশতঃ তিনি ও তাঁর প্রপৌত্র অহীন সমবয়সী হয়ে উঠেছেন। তিনি নিজেই জীবনের পারম্পর্যহীন প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এবং বয়সোচিত স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছেন না! এ কথাটা বুঝতে পেরে তিনি নিজেকে বড়ো অসহায় বোধ করলেন।          

অবিনবাবু অহীনের মুখের দিকে তাকিয়ে যতক্ষণ এসব কথা ভাবছিলেন, অহীনের একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। তার শেষ কথায় অবিনবাবু কি আঘাত পেলেন? এই মানুষটিকে গতকাল পর্যন্ত তার মনে হয়েছিল আশ্চর্য এক জীব বিশেষ। প্রাগৈতিহাসিক না হোক – এক জীবন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তিরাশি বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা একটি প্রাণ। যার বয়েস থমকে রয়েছে, থমকে রয়েছে শরীর।

অহীন জানে মৃত্যুতে মানুষের বয়স এবং শরীর থমকে যায়। অহীনের এক পিসিমা বিয়ের কয়েকবছর পরে এক দুর্ঘটনায় মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে মারা যান। তাদের বাড়ির দেয়ালে, ফটো অ্যালবামে ওই পিসিমার সঙ্গে তাদের অনেকগুলি উজ্জ্বল হাসিখুশি মুহূর্তের ছবি সযত্নে রাখা আছে। আজ প্রায় দশ বছর বাদে, বেঁচে থাকলে পিসিমার বয়েস হত চুয়াল্লিশ। অথবা আজ থেকে আরও কুড়ি বছর পরে পিসিমার বয়েস হতে পারত চৌষট্টি। এই সময়ে অহীনের বয়েস বাড়বে, শরীরে আসবে নানান পরিবর্তন। ছবিতে যে বালকের সঙ্গে পিসিমার ছবি দেখে সে এখন স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়, সে এখন আর বালক নয়, যুবক। আরও কুড়ি বছর পরে সে পিসিমার বয়েস পেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওই ছবিগুলির মধ্যে পিসিমা থমকে রয়েছেন, তাঁর কোন পরিবর্তন হয়নি, হবেও না। কিন্তু সামনে বসে থাকা ওই ভদ্রলোক তো থমকে নেই, থমকে থাকবেন না। তিনি অনেকটা পথ পিছিয়ে পড়েছেন, তাঁর সঙ্গী পথিকদের সবাই এগিয়ে গিয়েছে প্রকৃতির নিয়মে। তিনি কি নিজেকে নির্বান্ধব পথভ্রষ্ট ভাবছেন?

অবিনবাবু হাত বাড়িয়ে অহীনকে ডাকলেন, “এদিকে আয়, আমার পাশে একটু বস তো”...। অহীন টুল ছেড়ে অবিনবাবুর পাশে বিছানায় বসল। অবিনবাবু তাঁর হাতটা বাড়িয়ে অহীনের ডানহাতটা ধরলেন। একটাও কথা না বলে, তাকিয়ে রইলেন ফ্রেমে বাঁধানো অরণ্যের ফটোটির দিকে। তিনি যেন গভীর অরণ্যের রহস্য ভেদ করতে চাইছেন। অহীনের হাত ধরে হাঁটতে চাইছেন, অজানা – অচেনা অরণ্যপথে...।  কেউই আর কোন কথা বলল না। অবিনবাবু অহীনের হাতটা ধরে বসেই রইলেন, দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকিয়ে।

চলবে...      


নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...