ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/২২"]
৫.৬.৫ তন্ত্রশাস্ত্র (আগের পর্বের পরে)
অষ্টম উল্লাসে দেবী পার্বতী প্রশ্ন করলেন, “হে বিভো, বর্তমানে (কলিকালে) বর্ণ ও আশ্রম
কী কী? সেই বর্ণে ও আশ্রমে যে
আচার-আচরণ বিহিত আছে, সে
কথাও আমায় বল”। দেবাদিদেব সদাশিব বললেন, “হে সুব্রতে, সত্য প্রভৃতি তিন যুগে চার বর্ণ ও চার আশ্রমের কথা বলা
আছে। কিন্তু কলিকালে বর্ণ পাঁচ - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং সামান্য, আর আশ্রম দুই –
গার্হস্থ্য ও ভৈক্ষুক– ব্রহ্মচর্য ও বাণপ্রস্থ নেই। কলিকালে গৃহস্থদের সকল কাজই
আগমোক্ত ও তন্ত্রমতে কর্তব্য। কলিযুগে ভৈক্ষুকাশ্রমেও বেদোক্ত দণ্ডধারণ নেই, কারণ ওটা বৈদিক সংস্কার।
কলিতে শৈব সংস্কার বিধি অনুসারে, অবধূতাশ্রম ধারণকেই “সন্ন্যাস গ্রহণ” বলা হয়। কলিযুগে
ব্রাহ্মণ এবং অন্য সকল বর্ণেরই এই দুই আশ্রমে অধিকার থাকবে।
বৃদ্ধ মাতা-পিতা, শিশু পুত্রকন্যা, পতিব্রতা ভার্যা, অসমর্থ বন্ধুজনকে ত্যাগ করে প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস গ্রহণ
নিষিদ্ধ। সাধক গৃহস্থোচিত কর্তব্য শেষ করে, আত্মীয়-স্বজন সকলকে পরিতুষ্ট করে, মমতাশূণ্য, কামনাশূণ্য ও জিতেন্দ্রিয়
হয়ে গৃহত্যাগ করতে পারে। গৃহস্থাশ্রম ছেড়ে যদি কেউ সন্ন্যাস গ্রহণে ইচ্ছা করে, সেক্ষেত্রে তাকে
আত্মীয়-স্বজন,
বন্ধু, প্রতিবেশী এবং গ্রামের
সকলের শুভেচ্ছা ও অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। এর আগের পর্বে (৪.৩.১) আমি লিখেছিলাম
বৌদ্ধ ধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তার কালে, সমাজের বহু তরুণ এবং যুবক সংসারের দায়িত্ব এড়াতে, সংসার ত্যাগ করে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে
বৌদ্ধ-বিহারে যোগ দিত। অতএব তন্ত্র-শাস্ত্র রচনার কালে, সমাজের যুবসম্প্রদায়ের সেই
প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের জন্যেই সন্ন্যাস গ্রহণে এত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল।
সন্ন্যাসীর দেহ কখনও দাহ করা যাবে না, মরদেহ গন্ধপুষ্পে অর্চনা করে, ভূমিতে সমাধি অথবা জলে
নিমগ্ন করতে হবে।
এখানে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই, দশম উল্লাসের ৭৯ ও ৮০
সংখ্যক শ্লোকে দেবাদিদেব শঙ্কর বলেছেন, “কুলকামিনীকে মৃতা স্বামীর সঙ্গে দগ্ধ করবে না, যেহেতু ওই রমণী জগতে
অপ্রকাশিত শরীরা তোমারই (দেবী পার্বতীর) স্বরূপ। মোহবশতঃ কোন রমণী স্বামীর চিতায়
উঠলে, সে অবশ্যই নরকগামিনী
হবে”। এমন স্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও এই সেদিন পর্যন্ত সহমরণ ও সতীদাহের হিড়িক উঠেছিল
কেন? এই সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ
করার উদ্যোগের জন্যেই ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়কে সমাজচ্যুত করেছিলেন তৎকালীন
হিন্দুসমাজের মাতব্বরেরা। এই ধর্ম প্রথার উৎপত্তি কি, বিধবার সম্পত্তি গ্রাস এবং সংসারে
বিধবাকে পালনের ঝামেলা এড়াতে, ব্রাহ্মণ ও সমাজপতিদের বানানো স্বার্থ-ধর্ম? তা ছাড়া আর কীই বা হতে
পারে?
সকল উপাসক বা সাধকের গুরুর কাছে অভিষিক্ত এবং দীক্ষিত হওয়া আবশ্যিক।
গুরু ছাড়া তন্ত্র সাধনা হতে পারে না। কৌলগুরু যে কোন সম্প্রদায়ের গুরুপদের জন্য
প্রশস্ত,
কৌলগুরুর
অভাবে নিজ সম্প্রদায়ের গুরু গ্রহণই প্রশস্ত, যেমন শাক্তদের শাক্তগুরু, বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবগুরু
ইত্যাদি। যিনি সকল বিষয় ব্রহ্মে এবং সকল বিষয়েই ব্রহ্মকে দেখতে পান, তিনিই জীবন্মুক্ত সৎকৌল, তিনিই প্রকৃত
কৌলগুরু।
মহানির্বাণ তন্ত্রের অন্তিম ও চতুর্দশ উল্লাসে মহেশ্বর শিব সাধকের
মুক্তি বিষয়ে বলেছেন, “ব্রহ্মা
থেকে সামান্য তৃণ পর্যন্ত সমস্ত জগৎই মায়া এবং মিথ্যা –এক পরমব্রহ্মই সত্য, এই জ্ঞানই পরমজ্ঞান। এই
জ্ঞান অর্জন করতে পারলে সমস্ত কর্মবন্ধন এবং “অহং” জ্ঞান থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
যতক্ষণ দেহাদিতে “অহং” জ্ঞান থাকে, ততক্ষণ জপ, হোম, শতশত উপবাস করলেও মুক্তি হয় না। কিন্তু, “ব্রহ্মই আমি” এই উপলব্ধি
হলে, দেহী মুক্ত হয়। “ব্রহ্মই
সত্য, আর সমুদায় মিথ্যা” – এই
ভাবই উত্তম। ধ্যানভাব মধ্যম। স্তব ও জপতপ অধম। বাহ্যপূজা অধমের থেকেও অধম। যাঁর
মনে পরম জ্ঞান উপলব্ধি হয়েছে, তাঁর জপ, যজ্ঞ, তপস্যা, নিয়ম ব্রত প্রভৃতি কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। মায়ার বশে
জ্ঞান, জ্ঞেয়, ও জ্ঞাতা এবং ধ্যান, ধেয় ও ধাতা – এই তিনকে
ভিন্ন স্বরূপ মনে হয়, কিন্তু
বিচার করলে দেখা যায়, আত্মাই
অবশিষ্ট থাকেন। চিন্ময় আত্মাই জ্ঞান ও ধ্যান, চিন্ময় আত্মাই জ্ঞেয় ও ধেয় এবং
সেই আত্মাই জ্ঞাতা ও ধাতা। যাঁর এই জ্ঞান হয়েছে, তিনিই আত্মবিৎ - এই জ্ঞান
চতুর্বিধ অবধূতের পরমধন”।
শ্রীভগবতী বললেন, “একটু আগেই তুমি গৃহস্থ ও ভৈক্ষুক – এই দুই আশ্রমের কথা
বললে, এখন আবার চার
অবধূতাশ্রমের কথা বলছ? চার
অবধূত কারা,
তাঁদের
লক্ষণ কী?”
শ্রীসদাশিব বললেন, “হে প্রিয়ে, ব্রহ্মমন্ত্রের উপাসক গৃহস্থাশ্রমে বাস করলেও, তাঁদের “যতি” বা
ব্রাহ্মাবধূত বলে জানবে। যে সকল মানুষ পূর্ণ অভিষিক্ত হয়ে সংস্কৃত হয়েছেন, তাঁরা শৈবাবধূত। এঁরা
সকলের পূজনীয়। এই অবধূতও দুই প্রকার –
পূর্ণ ও অপূর্ণ। পূর্ণ শৈবাবধূত ও ব্রাহ্মাবধূতের নাম পরমহংস। আর যে অবধূতের
অদ্বৈতভাবের জ্ঞান পূর্ণ হয়নি, তিনি অপূর্ণ অবধূত। তিনি সর্বদা ব্রহ্মনিষ্ঠ থেকে “ওঁ
তৎসৎ” এই মন্ত্র উচ্চারণ করে, “সোঽহমস্মি” এই ধ্যান করতে থাকবেন। “ওঁ তৎসৎ” এই মন্ত্র
সর্ব সুখসাধ্য,
এই মন্ত্রে
কোন বাহুল্য নেই, কিন্ত
এই মন্ত্র অনন্ত ফলদায়ক। এই মন্ত্র নিগম, আগম ও তন্ত্র সমুদায়ের সারাৎসার”।
মহানির্বাণ তন্ত্রে, বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও, তন্ত্রতত্ত্বে শব-সাধনাও একটি
গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। এই সাধনা বীরভাব-সাধনার অন্তর্গত। বীরভাবের সাধক নির্জন ঘরে, নদী তীরে, পাহাড়, নির্জন স্থানে, বেলগাছের তলায় অথবা
শ্মশানের কাছকাছি নির্জন বনে শব সাধনা করতে পারেন। শবসাধনার সময়ের নির্দেশে বলা
হয়েছে, কৃষ্ণ কিংবা শুক্ল পক্ষের
অষ্টমী ও চতুর্দশী তিথিতে মঙ্গলবারের রাত্রে, এই সাধনা করলে সাধক উত্তমা সিদ্ধি
লাভ করতে পারে।
সাধারণ জনসমাজে তন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে যতই বিরূপতা এবং আতঙ্ক থাক, হিন্দু দেব-দেবীর পূজার
সঙ্গে তন্ত্র তার মন্ত্র ও যন্ত্র নিয়ে ওতপ্রোত মিশে আছে। যে কোন দেবদেবীর পূজার
অধিকাংশই পদ্ধতিই, আমরা
না জেনে,
তন্ত্রমতের
অনুসরণ করে থাকি। যেমন, সমস্ত পূজার সাধারণ কর্মানুষ্ঠান, যেমন আচমন, স্বস্তিবাচন, গন্ধাদির অর্চনা, সঙ্কল্প, ঘটস্থাপন, সামানার্ঘ্য, জলশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, করশুদ্ধি, পুষ্পশুদ্ধি, দ্বারদেবতাপূজা, ভূতাপসারণ ও দিগ্বন্ধন, পঞ্চামৃত শোধন, প্রতিমার চক্ষুর্দান, প্রাণপ্রতিষ্ঠা, আবাহন ইত্যাদির সবই আমরা
তন্ত্রমতে করে থাকি। দেব-দেবীর স্তব, পূজা, প্রণাম মন্ত্রগুলি এসেছে, বেদ থেকে, কিছু আচার্য শঙ্করের রচনা, কিছু মন্ত্রের সৃষ্টি
করেছেন পুরাণ এবং তন্ত্র।
তন্ত্রে যন্ত্র বলতে নানান জ্যামিতিক আকারকে বোঝায়। পূজার যজ্ঞবেদী নির্মাণের অনেক বিধি-নিয়ম বেদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু তন্ত্র যজ্ঞ ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকটি পূজা পদ্ধতির মধ্যে সরল ও বক্র রেখা ব্যবহার করে, তার মধ্যে প্রধানতঃ পাঁচ রঙের চূর্ণ(গুঁড়ি)-র প্রয়োগ আছে। সে আকার ত্রিভুজ, আয়ত, বর্গ, বৃত্ত, স্বস্তিকা, পদ্ম, মীন, কূর্ম ইত্যাদি নানান আকারের হতে পারে। যে কোন পূজায় মেঝে কিংবা দেওয়ালে আল্পনা আঁকার প্রচলনও তন্ত্র-তত্ত্বের শৈল্পিক বিবর্তন বলেই মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বলি, স্বস্তিকা, পদ্ম, মীন, কূর্ম ইত্যাদি অনেক প্রতীক বা চিহ্ন সিন্ধুসভ্যতার সিলগুলিতে এবং মৃৎপাত্রের গায়ে চিত্রিত পাওয়া গেছে। অতএব তন্ত্র-ধর্মর অনার্য-সংযোগ এবং তার প্রাচীনতা নিয়ে কোন সংশয় থাকে না।
৫.৭.১ যুগপুরুষ শঙ্করাচার্য
হিন্দুধর্মের আলোচনায় আচার্য শঙ্করের অবদানের কথা স্বীকার না করলে, হিন্দু ধর্মের ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য
ধর্মের শত শত ঋষি, মুনি
ও পণ্ডিতদের কথা আমরা পৌরাণিক কাহিনীতে জেনেছি। কিন্তু আজকের হিন্দুধর্মে, তাঁদের সকলের তুলনায়, আচার্য শঙ্করের অবদান
অনন্য। আচার্য শঙ্করের জীবন কাহিনী সংক্ষেপে আলোচনা করেই আমরা হিন্দু ধর্মের
তত্ত্বালোচনা শেষ করব।
যুগপুরুষ শঙ্করাচার্যের আবির্ভাব কাল সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ
আছে। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর জীবনকাল মোটামুটি ৭৮৮ থেকে ৮২০ সি.ই.। তাঁর পিতা
শিবগুরু,
পিতামহ
বিদ্যাধর। মাতা বিশিষ্টা, মাতামহ মঘ। তাঁর জন্মস্থান ভারতের দক্ষিণতম প্রান্তে
কেরলের আলোয়াই নদীর উত্তরতীরের কালাড়ি নামের ছোট্ট একটি গ্রামে। আমরা সকলেই জানি
আচার্য শঙ্কর স্বল্পায়ু (মাত্র বত্রিশ বছর) ছিলেন, তবে কিছু বিক্ষিপ্ত তত্ত্বে তাঁর
দীর্ঘায়ুর কথাও শোনা যায়।
শিশু শঙ্কর মাত্র তিন বছর বয়সে, পিতৃহারা হন। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর
উপনয়ন সংস্কার করে, তাঁর
মাতা তাঁকে গুরুগৃহে পাঠিয়েছিলেন। তীক্ষ্ণ মেধা ও স্মৃতিশক্তির জন্যে, মাত্র দু’বছরের মধ্যেই
গুরুগৃহের যাবতীয় শিক্ষা তিনি সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন এবং মাত্র আট বছর বয়সেই
অধ্যাপনা শুরু করেছিলেন। তখনকার দিনে শিক্ষান্তে পুত্রের বিবাহ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, মায়ের শত অনুরোধেও শঙ্কর
বিয়ে করতে রাজি হলেন না। বরং তিনি মায়ের কাছে সন্ন্যাসী হওয়ার অনুমতি চাইলেন। খুব
স্বাভাবিকভাবেই শঙ্করমাতা পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেননি। কিন্তু এর
কিছুদিনের মধ্যে এমন এক ঘটনা ঘটল, যার ফলে তিনি পুত্রকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিতে বাধ্য
হলেন।
মাতা ও পুত্র একদিন আলোয়াই নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন, হঠাৎ একটি কুমীর শঙ্করের
পা কামড়ে,
তাঁকে গভীর
জলের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। আতঙ্কিত বালক শঙ্কর বললেন, “মা আমি চললাম। তুমি তো আমাকে
সন্ন্যাসী হতে দিলে না, এখন দেখ কুমীরের গ্রাসে আমার প্রাণ যায়। এখনও যদি তুমি
অনুমতি দাও,
তাতেও
সন্ন্যাসী হয়ে,
আমি পরলোকে
মুক্তি পেতে পারি”। নদীর ঘাটে উপস্থিত নরনারী সকলেই অবাক হয়ে গেল শঙ্করের কথায়, মাতা বিশিষ্টাও অন্য কোন
উপায় না দেখে,
কাঁদতে
কাঁদতে বললেন,
“তাই হোক, শংকর, এ যদি দৈব বিধান হয় তবে তুই সন্ন্যাসীই হ, বাবা”। এরপর নদীতে মাছ
ধরতে থাকা জেলেরা জাল ফেলে সেই কুমীরকে ধরে ফেলল এবং শঙ্করের পাও কুমীরের গ্রাস
থেকে মুক্ত হল। কিছুদিন পরে যখন তাঁর পায়ের ক্ষতস্থানগুলি সেরে উঠল, তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ
করলেন।
সন্ন্যাস গ্রহণের পরেই কেরল থেকে তিনি রওনা হলেন, সুদূর নর্মদা তীরে
মহাযোগী গোবিন্দপাদের দর্শন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্যে। শোনা যায়, এই মহাযোগী গোবিন্দপাদই
নাকি ঋষি পতঞ্জলি (যাঁর আবির্ভাব কাল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে অনুমান করা
হয়!), গুরুগৃহে যাঁর ভাষ্য পাঠ
করে বালক শঙ্কর মুগ্ধ হয়েছিলেন। শঙ্করের উপস্থিতিতে সুদীর্ঘ সমাধি ভঙ্গ করে, মহাযোগী বহুদিন পর চোখ
মেলে তাকালেন এবং তাঁকে শিষ্যত্বে বরণ করলেন। শঙ্কর মহাযোগী গোবিন্দপাদের কাছে
যোগসাধনা শিখতে শুরু করলেন এবং তিনবছর পরে তাঁর সাধনা সম্পন্ন হল।
মহাযোগী গোবিন্দপাদ বললেন, “বৎস শঙ্কর, তোমার জ্ঞান সম্পূর্ণ। আমার গুরু গৌড়পাদে[1]-র (এই মহাগুরু গৌড়পাদের সঙ্গে
আচার্য শঙ্করের দেখা হয়েছিল, তাঁর গৌড়দেশ ভ্রমণের সময়) নির্দেশে আমি সহস্রাধিক বছর
তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। আমার কার্য সম্পূর্ণ হয়েছে, এবার আমি দেহ রক্ষা করব। এখান
থেকে তুমি কাশীধামে যাও এবং অদ্বৈত ব্রহ্ম-জ্ঞানের প্রচার করো। দেশে এসময় নানান
অবৈদিক ধর্মমত প্রচলিত রয়েছে, নানান ভ্রান্ত তত্ত্বে পণ্ডিতেরা দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করে, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি
করছে। এই সমস্ত ধর্মমত খণ্ডন করে, তুমি আচার্য শঙ্কর হও, ভারতভূমিতে বৈদিক ধর্ম
পুনঃপ্রতিষ্ঠা করো”।
গুরু গোবিন্দপাদের দেহরক্ষার পর শঙ্করাচার্য কাশীর উদ্দেশে রওনা হলেন, তাঁর লক্ষ্য এখন সর্বধর্ম সমন্বয়।
[1] মহাগুরু
ও যোগী গোবিন্দপাদই যদি ঋষি পতঞ্জলি হন, তাঁরও গুরু কিনা গৌড় নিবাসী মহাগুরু গৌড়পাদ! তাঁর সঙ্গে
দেখাও হয়েছিল আচার্য শংকরের! কি অসাধারণ ইতিহাস! অবিশ্যি অনেকেই অনুমান করে নেবেন, এই পতঞ্জলি সেই পতঞ্জলি
নন, এই গৌড়পাদও সেই গৌড়পাদ নন
- একই নামের ঐতিহ্যবাহী সহস্রাধিক বছরের গুরু-শিষ্য পরম্পরা!