বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "
বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "
এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ "
এর আগের বড়োদের গল্প - " লিলির বিয়ে "
১
সন্ধে নেমে এল প্রায়। শেষ বিকেলের মনখারাপি আলো গাছের মাথায়
মাথায় এখনও কিছুটা লেগে আছে বটে, কিন্তু নিচেয় এই পোড়ো জঙ্গলের মধ্যে আধো অন্ধকার
তার আঁচল বিছিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুরু কাঁথার মতো ঘন অন্ধকার
ছেয়ে ফেলবে সমস্ত বনাঞ্চল। আর এই সময়েই আমার মনটা বিচ্ছিরি রকমের খারাপ হয়ে যায়।
আমার বয়েস হয়েছে ঢের, নাম ভাদু। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে, এখন
রোজই আমি শালগাছের এই মোটাগুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসি। সমস্ত
আলো ঠেলে সরিয়ে দিয়ে অন্ধকারের বেনো জল কীভাবে জঙ্গলের মধ্যে মৌরসী পাট্টা বিছিয়ে
দেয়, বসে বসে দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু
যৌবনে এই সময়টাতেই আমার, এই ভাদু শেয়ালের শরীরটা সমস্ত দিনের আলসেমি ঝেড়ে ফেলে
একেবারে, চনমনে চাঙ্গা হয়ে উঠত! অন্ধকার মানেই শিকারে বেরোনোর সময়। রাতের অন্ধকারে
এই জঙ্গলের আনাচেকানাচে ছোটখাট শিকার হোক। কিংবা লোকালয়ের কাছাকাছি ঘর-হারানো হাঁস মুরগী হোক, অথবা এক একদিন দলছুট ছাগলছানা, বাছুর
পেয়ে গেল, সেদিন হতো মহাভোজ। পুরো দলটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার করার আনন্দ আর
উত্তেজনাই আলাদা। তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি, শব্দ চেনার দক্ষতা আর সঠিক ধূর্তামির জন্যেই
আমি বড়ো একটা দলের সর্দার হয়েছিলাম বহুদিন। কিন্তু হলে কী হবে? চিরকাল কী আর সমান
যায়? যায় না।
আমার এখন অনেক বয়েস। আজকাল শরীরে তেমন জুত পাই না, চোখে কম
দেখি, কানেও কম শুনি। ইদানীং নাকেও কিছু গণ্ডগোল হয়ে
থাকবে, গন্ধটাও আর আগের মতো মালুম পাচ্ছি না। আসলে শরীরের সঙ্গে ইন্দ্রিয়গুলো
তালমিল হারিয়ে ফেলছে, বেইমানি করছে। তবু এই
সময়টার টানেই আমি গর্তের বাইরে এসে বসি, জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে নিজের পুরোন জীবনের
কথা ভাবি, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি বারবার। আমি এখন দাদু, আমাকে দেখে, গর্তের বাইরে চলে
আসে আমাদের দলের যতো ছানাগুলোও। দাদুকে ঘিরে তারা লাফালাফি করে, নিজেদের মধ্যে নকল
লড়াই করে। কখনো কখনো তারা আমার কাঁধে, পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমার লেজ নিয়ে খেলা করে। আমি
কিছু বলি না, মজা পাই। খুব খানিক বিরক্ত করলে, মৃদু ধমক দিই,
কা হুয়া? ব্যস ওই পর্যন্তই।
আমার মতোই আমার ছেলে নাদুও বেশ ডাকাবুকো আর ধুরন্ধর, চৌখস। আমার
এই ছেলের জন্যে আমার গর্বই হয়। ছেলেমেয়ে মিলে আমাদের সতের জনের দলে, নাদুই এখন
সর্দার! কিছুক্ষণ পরেই নাদু এল, পিছনে তার দলবল নিয়ে।
“বাবা, বেরোচ্ছি, আশীর্বাদ করো, আজকে যেন ভাল শিকার পাই। গর্তে
আর এককুচি মাংসও নেই। কাল থেকে ছানাগুলোই বা কী খাবে? আর তোমাকেই বা কী দেব”?
“বেরোচ্ছি, বলতে নেই, আসছি বল। আর ভাবিস না, মা শিবানী কিছু
একটা ব্যবস্থা ঠিক করে দেবেন। অনেক শিকার পেয়ে যাবি। দুশ্চিন্তা করে বেশি ঝুঁকি
নিস না। বিপদ বাড়াস না”।
“ও নিয়ে তুমি ভেবো না, বাবা। আমরা ঠিকই থাকবো। আসি
এখন”?
“আর শোন, যাবার সময়, স্বপনবেড়ে গ্রামের পাশ দিয়েই একবার
ঘুরে যাস। ওদিকের গোচারণের মাঠে এক আধটা দলছুট ছাগল-টাগল পেয়ে গেলে, তোদের আর বেশি
খাটতে হবে না। আর হ্যাঁ, ওই পিচের রাস্তাটা খুব সাবধান – দলের সবাইকে নিয়ে সাবধানে
পার হবি। খুব ভয় লাগে আমার। ওই জানোয়ারগুলো গাঁকগাঁক করে, চোখে আলো ফেলে এমন দৌড়ে
আসে...কত শেয়াল যে বেঘোরে মারা পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই”।
“মনে রাখবো, বাবা, তুমি ভেবো না। ছানাগুলোর দিকে একটু নজর
রেখো। এত বদমাইশ আর ধূর্ত হয়েছে...আসছি, বাবা”।
“তোরা এমন সব কথা বলিস, তার মানে হয় না। শেয়ালের ছানা ধূর্ত
হবে না তো কি, ছাগলছানা ধূর্ত হবে? আয়, বাবা, আয়। ভোরের আলো ফোটার আগে ফিরে আসবি
কিন্ত।”
আমার কথায় নাদু খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলল, “তোমার
আদরে আদরে ছানাগুলো খুব শয়তান হচ্ছে। যাগ্গে দেরি হয়ে যাচ্ছে, আসছি বাবা”।
ওদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, আমি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ঘাড় ঘুরিয়ে ছানাগুলোর দিকে তাকিয়ে, স্নেহ মাখা স্বরে একবার ধমকে দিলাম, “অ্যাই, কা হুয়ারে? তোরা সব ধূর্ত হুয়া? আচ্ছা হুয়া, বেশ হুয়া!” ছানারা আমার দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে, কিছুক্ষণ শান্ত থেকে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর যে কে সেই, চঞ্চল হয়ে খেলতে লাগল নিজেদের মধ্যে।
এই জঙ্গলটা শুরু হয়েছে এদিকে ঝিমলি নদীর ধার থেকে, সেই সেপাশের চুমকি নদীর ধার অব্দি। এক সময় এক রাতের মধ্যে পুরো জঙ্গলটাই চষে বেড়াতে পারতাম আমি। আমার দলের অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে ছুটতে ছুটতে হাঁফিয়ে জেরবার হয়ে পড়ত। এত বড়ো জঙ্গলের মধ্যে শিকারের অভাব হত না। এই জঙ্গলের মধ্যে, গোটা চারেক গ্রাম আছে, বসতি আছে। গ্রামের লোকেদের ক্ষেতের জমি আছে, গরুছাগল চড়ানোর ঘেসো গোচারণ আছে। এ পাশের গ্রামে সন্ধের দিকে ঘণ্টা বাজত ঢং ঢং, জঙ্গলের মধ্যে বসেও আমার কানে সে শব্দ এসে পৌঁছতো। এখনও সে ঘন্টা হয়তো বাজে, কিন্তু আমার কানে সে শব্দ আর পৌঁছোয় না। বয়েসের দোষ, কানে কম শুনি। সারারাত শিকার করে, যখন ক্লান্তি আসত, ওপাশের গ্রাম থেকে ফজরে নামাজের আজান শোনা যেত। সেই আজানের শব্দ শুনেই আমি সতর্ক হয়ে উঠতাম, দলের সকলকে ডেকে দ্রুত ফিরে আসতাম, নিজেদের এই বাসায়। যেখানে ছানাদের নিয়ে অপেক্ষায় থাকত, আমার বুড়োবাপ আর বুড়িমা। এখন সে আজানও আর শুনতে পাই না।
বেশ কবছর হল, এই জঙ্গলের বুক চিরে, প্রচুর গাছপালা কেটে
তৈরি হয়েছে পিচ ঢালা সদর রাস্তা। গোটা জঙ্গলটাই দু আধখানা হয়ে গেছে। ওই রাস্তা
দিয়ে রাতের বেলা দৌড়ে দৌড়ে যায় বড়ো বড়ো জন্তু, তাদের চলায় যেমনি গাঁ গাঁ আওয়াজ,
তেমনি ভয়ংকার তাদের ডাক। আর তার চেয়েও ভয়ংকর তাদের দুটো চোখ! সে চোখ থেকে আলো
ঠিকরে পড়ে, সেই চোখে চোখ পড়লে আর রক্ষে নেই, মাথা গুলিয়ে যায়। সামনে যাবো, না
পিছনে যাবো ভাবতে ভাবতেই পিষে দিয়ে যায় তাদের পায়ের তলায়। নিজের চোখের সামনে এমন
দু বার দেখেছি আমি। কী বীভৎস আর ভয়ংকর। এখনও সে কথা ভাবলে ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা
দেয়। তবে একটা ব্যাপার আমি অনেক ভেবেও বুঝতে পারিনি। ওই দৌড়ে চলা জন্তুগুলো দৌড়েই
চলে, আর সামনে যা পড়ে, পায়ের তলায় পিষে দিয়ে যায়। কিন্তু একবারের জন্যে ফিরেও
তাকায় না, কিংবা মরা জন্তু খায়ও না। তাহলে ওরা মারে কেন? ওই জন্তুগুলো দোপেয়ে নয়,
কিন্তু স্বভাবটা যেন দোপেয়েরই মতো। দোপেয়েও শেয়াল দেখলেই মেরে ফেলতে চায়, কিন্তু
খায় না। কী যে ওদের প্রবৃত্তি কে জানে? খাবিই না যদি, মারিস কেন?
অনেকদিন আগে এই ঘটনাটাও আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল। ওপাশে
চুমকি নদীর ধারে সাজাদবাগ গ্রাম। সেদিন
শিকারের আশায়, দলবল নিয়ে আমরা সাজাদবাগের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। মাঠের
ধারে একটা খামারে বড়সড়ো একটা মোরগ দেখে লুগিশেয়ালনী লোভ সামলাতে পারল না। বেড়ার
ফাঁক গলে, খামারের ভেতরে ঢুকে তাড়া করে গেল মোরগটাকে। মোরগগুলো খুব তেজিয়াল হয়।
কঁক কঁক করে ডেকে উঠে দৌড়ে দৌড়ে পালাতে লাগল খামারের উঠোনময়। লুগিশেয়ালনীর মাথায়
তখন জেদ চড়ে গিয়েছিল, সেও ছাড়বে না। নিজের
বিপদের কথা সে ভুলেই গেল। বেড়ার বাইরে বসে আমি দেখছিলাম, বেশ কবার ডাকলাম। বললাম,
ছেড়ে দে পালিয়ে আয়। লুগিশেয়ালনী আমার কথায় কানই দিল না।
এদিকে মোরগের ডাক আর হুটোপুটির শব্দে পাঁচজন দোপেয়ে বেরিয়ে
এল খামার ঘর থেকে, হাতে তাদের মোটা মোটা লাঠি। তারা
ঘিরে ধরল লুগিশেয়ালনীকে। এতক্ষণে লুগি বুঝতে পারল, কী বিপদে সে পড়েছে! দোপেয়েগুলো একবার ঘিরে ফেললে, সেখান থেকে চট করে
বেরিয়ে আসা কঠিন ব্যাপার! শরীর টানটান করে লুগি ডাক দিল, সেই ডাকে কী ভয়ানক আতঙ্ক
ছিল সে আমিই জানি। এক ঝলকের জন্যে সে আমার দিকে তাকাল, তার দু চোখে তখন কী ভয়, আর
বাঁচার কী আগ্রহ! সে সব কথা মনে পড়লে আজও আমার মনটা ভারি হয়ে যায়। দোপেয়েগুলো
একসঙ্গে লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল লুগির দিকে। লুগি তখন বেড়ার দিকে দৌড়তে শুরু করেছে,
বাইরে এসে আমাদের দলে ফিরে আসার জন্যে। বেড়া টপকানোর একটু আগেই একজনের লাঠির ঘা
পড়ল লুগির ঠিক কোমরে। বীভৎস আর্ত চিৎকার করে লুগি মাটিতে পড়ে গেল। উঠতে পারল না
আর, বেচারার কোমর ভেঙে গিয়েছিল। শুয়ে শুয়েই হাঁচোড় পাঁচোড় করছিল বেড়ার দিকে এগোনোর
জন্যে। কিন্তু সে আর হল না, সবকটা দোপেয়ে মিলে পিটিয়ে শেষ করে দিল লুগিশেয়ালনীকে।
লুগি আমার দ্বিতীয় বউ, আমার নাদু, সেই লুগির ছেলে।
তারপর দোপেয়েগুলো লুগির মড়া থ্যাঁতলানো শরীরটা, এক ঠ্যাং ধরে তুলে এনে, বেড়ার বাইরে ফেলে দিল, আর ফিরে গেল তাদের খামারঘরে। লুগিকে ওরা খেলও না। আচ্ছা, যদি ওরা আমাদের নাই খায়, তাহলে এভাবে মারল কেন? বেচারা লুগি নিশ্চিত ছিল, বেড়াটা টপকাতে পারলে, বেঁচে যাবে। বেড়াটা সেই টপকাল, কিন্তু তখন সব শেষ। কিছুক্ষণ পর যখন সব শান্ত হয়ে গেছে, চারদিক নিঝুম নিস্তব্ধ, আমরা সবাই গেলাম লুগির মড়া শরীরটার কাছে। শুঁকে শুঁকে নিশ্চিত হলাম, ওর শরীরে আর কোন সাড়া নেই। মনের দুঃখে আকাশের দিকে মুখ তুলে ডেকে উঠলাম কয়েকবার, হে মা শিবানী, অকারণ এই মৃত্যু কেন দিলে লুগির?
২
এখন বসে এ সব কথা ভাবলেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে। কী সব দিন ছিল, আর
এখন কী হয়েছে! সে সব কথা এখন মনে পড়লে, স্বপ্ন মনে হয়। আহা, কি ঘন জঙ্গলই না ছিল,
এই গোটা এলাকাটা! এই বিশাল এলাকায় আনন্দে দিন কাটত শেয়ালদের। ঝোপঝাড়ের আড়ালে
গর্তের মধ্যে কত যে শেয়ালদের দল ছিল, সে গুনে শেষ করা যেত না। বর্ষাকালে আগাছা আর
পরগাছা গজিয়ে জঙ্গল যখন আরো অনেক নিবিড় হয়ে উঠত, কখনো সখনো চিতাও চলে আসত, সেই
দূরের জঙ্গল থেকে। তখন শিকারে গিয়েও নিশ্চিন্তে থাকা যেত না। আমাদের ছানাদের ওপর
চিতার খুব লোভ। সেই সময়ে অনেক শেয়ালের দল থেকে একজন দুজন করে থেকে যেত বাসায়,
সারারাত পাহারা দিত নিজের নিজের দলের ছানাদের। শেয়ালদের দলে দলে ঝগড়াও যেমন হত,
মিলমিশও ছিল। এখন শেয়ালদের দল দু চারটেতে এসে ঠেকেছে, চিতার ভয় আর নেই, কিন্তু দোপেয়েদের
ভয় বেড়েই চলেছে দিন-কে-দিন।
তখনকার দিনে ঝিমলি নদীর চড়া থেকে কাঁকড়া ধরে, কিংবা বুনো
খরগোশ ধরে এনে, বাচ্চা ছেলেপুলেদের জন্যে নিশ্চিন্তে নিয়ে আসার জো ছিল না। পথে কোন
না কোন বজ্জাত ডাকাতে শেয়াল হামলা করত। হতভাগারা, একদম যেন দোপেয়ের বাচ্চা! সবাই
নয়, কিন্তু কিছু কিছু দোপেয়ে আছে, নিজেরা কোন কাজকম্মোর ধারে কাছে যায় না। কিন্তু
অন্যে কিছু একটা যোগাড় করেছে দেখলেই, কেড়ে নেবার জন্যে হামলে পড়বে। এমন শয়তান!
আমি ছানাগুলোর দিকে নজর দিলাম। সব মিলিয়ে সাতটা। সবকটাই
সমান দুষ্টু আর চঞ্চল। ওদের দেখতে দেখতে বুকটা ভরে ওঠে, আবার খুব দুশ্চিন্তাও হয়।
আমাদের জীবনটা তো মোটামুটি কেটেই গেল প্রায়। ওদের কী হবে? দোপেয়েগুলো যে ভাবে
গ্রাম বাড়াচ্ছে, বসতি বাড়াচ্ছে। এটুকু জঙ্গলও আর থাকবে বলে মনে হয় না। অথচ শুনেছি
আমাদের সংরক্ষণের জন্যে দোপেয়েদের চোখে নাকি ঘুম নেই! সেদিন নাদুকে বলছিলাম কথাটা,
বিশ্বাসই করে না। না করারই কথা। নাদু বলেছিল, “আজও দোপেয়েগুলো আমাদের দলকে দেখলে
কিছু বলে না, দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। কিন্তু একলা দেখলেই রে রে করে দৌড়ে
আসে লাঠিসোঁটা নিয়ে। আর তুমি বলছ, আমাদের বাঁচানোর জন্যে দোপেয়েরা কাঁদছে? তুমি
অনেক দেখেছ ঠিকই বাবা, কিন্তু দোপেয়েকে এখনো, চিনতে পারোনি। আমাদের শেষ করার জন্যে
রাস্তার দুধারে বেড়া দিয়েছে দেখনি? লোহার খুঁটি আর ঘন জালের সেই বেড়া টপকানোও যায়
না, ভেঙে পার হবার তো প্রশ্নই নেই! কেন করেছে জানো?”
“রাতে আমরা রাস্তা পার হয়ে, ও পারের জঙ্গলে যেতে গিয়ে, সেই
আলো-চোখো জন্তুটার পায়ের তলায় চিপটে যাতে মারা না পড়ি, সেই জন্যে। দেখবি রাস্তার
ধারে ধারে লেখাও আছে, “অভয়ারণ্য”,
“বন্যপ্রাণী বাঁচান”। এসব কাদের জন্যে, আমাদের জন্যে নয়?”
“কাদের জন্যে জানি না। তবে আমাদের জন্যে নয়। আমি তো তখন
ছোট্ট ছানা ছিলাম। তোমার মুখেই শুনেছি, বাবা। আমাদের মাকে কীভাবে অকারণ পিটিয়ে
মেরেছিল, মনে নেই? তুমিই বলেছিল, দোপেয়েরা মোরগ, মুরগি পোষে খাবার জন্যে। দোপেয়েরা
শেয়াল খায় না। কিন্তু সেই মোরগটাকে বাঁচানোর জন্যে, ওরা মাকে মেরেছিল। দোপেয়েরা
আমাদের হিংস্র জন্তু বলে, কিন্তু আমরা তো এমন করিনা, বাবা। যাকে খাই না, তেমন
কাউকেই তো মারি না”।
“সে সব অন্য দিন ছিল রে, নাদু। এখন দিন অনেক বদলে গেছে। দোপেয়ে
তো অন্য দোপেয়েকে খায় না। কিন্তু ওই ঝিমলি নদীর ধারে কম দোপেয়ে মরতে দেখেছি? সে দোপেয়েদের
মারত, কিছু ডাকাত দোপেয়ে। কেন মারত ঠিক বুঝিনি। কিন্তু বিস্তর
মারত। বর্ষার পর নদীর জল কমে গেলে, পথ ঘাট যখন আবার সুগম হত। ঝিমলি নদীর চর দিয়ে
কত দোপেয়ে যাওয়া আসা করত। দিনের বেলা কিছু হত না, কিন্তু রাত্রে পথচলা এক আধটা ছোটখাটো
দল দেখলেই, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা আরেকদল দোপেয়ে তাদের ধরে মেরে ফেলত। খেতও না, কিছুই
করত না। মরা দোপেয়েগুলোর কাপড়চোপড় ঘেঁটে কী পেত কে জানে, আর তাদের পোঁটলা-পুঁটলি, বাক্সগুলো
ছিনিয়ে নিত। তারপর নদীর চরায় বালি খুঁড়ে পুঁতে দিত মরা শরীরগুলো। আমাদের অবশ্য তাতে
ভালই হতো। নরম বালি খুঁড়ে, সেই মরা দোপেয়েগুলো দিয়ে আমাদের বেশ ভোজ হত কটাদিন”।
“তবে? তারপরেও তুমি ওই দোপেয়েদের কথায় বিশ্বাস করো”? নাদুর
এই কথায় আমি সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তবুও বলছিলাম,
“ওরা আমাদের পুজো করে, তা জানিস?”
“জানি তুমি বলবে, শিবানীমায়ের মূর্তির দুপাশে আমাদের যে
পুতুল রাখে, তার কথা, তাই তো?”
“ঠিক তাই। দোপেয়েরা আমাদের শেয়ালও বলে, আবার শিবাও বলে
জানিস তো?”
“জানি”।
“তবে? শিবানীমায়ের হাতে ধরা দোপেয়ের কাটামুণ্ডু থেকে রক্ত
ঝরে পড়ছে, আর সেই রক্ত খাবার জন্যে আমাদের কোনও পূর্বপুরুষশেয়াল, মুখ তুলে মায়ের
পাশে থাবা গেড়ে বসে আছেন, দেখিসনি?”
“দেখেছি, স্বপনবেড়ে গ্রামে কালীপুজোর সময় দেখেছি। সে সময়
ধারে কাছে যাওয়া যায় না। এত ঢাকের আওয়াজ আর বাজির আলো আর শব্দ। সেখানে আমাদের
জায়গা কোথায়, যে আমাদের পুজো হবে? আমাদের ওই পূর্বপুরুষশেয়ালটি নেহাত খড়-মাটির
পুতুল, তা নইলে উনিও কানে থাবা চেপে পালিয়ে এসে তোমার পাশেই বসতেন, বাবা!”
আজকালকার ছেলে ছোকরারা কোন কথাই চট করে মেনে নেয় না। আমরা
এমন ছিলাম না, আমাদের বাবা, মা, দাদুরা যা বলতেন আমরা শুনেও নিতাম আর মেনেও নিতাম।
আমার পাশে খেলতে থাকা ছানাগুলো হঠাৎ সবাই মিলে আমার কাছে
চলে এল। ছোট্টু, নাদুর ছোটছেলেটা, আমাকে বলল, “দাদু, দাদু। বাবা আসছে। পায়ের শব্দ
শুনতে পাচ্ছি”।
আমি খুব অবাক হলাম, বিশ্বাসই হল না, বললাম, “ধুর, কী শুনতে
কী শুনেছিস, এই তো গেল, এর মধ্যে ফিরবে কী করে”? আমি কান পাতলাম, ঝিঁঝিঁর ডাক, আর
বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না। হঠাৎ আমার মাথায় অন্য
চিন্তা এল, ছোট্টু শিশু শেয়াল, ওর এখন শোনার ক্ষমতা প্রখর, ও যদি ঠিক শুনে থাকে,
নাদু যদি সত্যিই ফিরে আসে, তার মানে আমাদের দলের কারও ভয়ংকর বিপদ হয়েছে!
দুশ্চিন্তায় আমার পিঠের রোম খাড়া হয়ে উঠল, আমাদের কী কেউ রাস্তায় চাপা পড়ল? কিংবা দোপেয়ের
খপ্পরে পড়ে প্রাণ খোয়ালো? আমি উদ্বেগে আর বসে থাকতে পারলাম না, উঠে দাঁড়ালাম,
তারপর ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম। আমার পিছনে
ছানাগুলোও আসতে লাগল। ওরা এখন আর খেলা করছিল না, আমার অস্থিরতা টের পেয়ে, শান্ত
কিন্তু টানটান সতর্কতায়, নিঃশব্দে পিছনে আসছিল। কিছুটা এগোতেই নাদুকে দেখতে পেলাম।
দৌড়তে দৌড়তে আসছে, পিছনে আরো জনা পাঁচেক।
আমাকে দেখতে পেয়ে নাদু বলল, “কী হল, বাবা? কোথায় চললে তুমি,
ছানাদের নিয়ে”? কথা বলার আগে নাদু কিছু একটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। আমার ভোঁতা নাকেও
কাঁচা রক্তমাংসের গন্ধ পেলাম - মাংসের টুকরো? সামনে খাবার দেখে ছানাগুলো চঞ্চল হয়ে
উঠল আবার।
আমি বললাম, “এই
অসময়ে তোরা ফিরে এসেছিস, ভাবলাম, নির্ঘাৎ কোন বিপদ হয়েছে”!
নাদু হুয়া হুয়া করে হাসল, “না গো, বাবা, না, গর্তে চলো।
দারুণ খবর। আজ মা শিবানীর কৃপায় আমাদের কপাল খুলে গেছে। এসো এসো, আমরা আবার ফিরে
যাবো, তাড়াতাড়ি এসো”।
নাদু দৌড়ে চলে গেল, গর্তের দিকে। ওর পিছনে দলের পাঁচজন আর
আমাদের ছানাগুলোও। তাজা মাংসের গন্ধে ওদের আর তর সইছিল না। আমিও
ফিরে চললাম ওদের পিছনে।
দলের পাঁচজন ছানাদের মাংস খেতে দিয়ে আবার ফিরে গেল। নাদু
ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা এগিয়ে চল, বাবার সঙ্গে কথা সেরে আমি এখনই আসছি।
কিন্তু খুব সাবধানে, কোন ঝুঁকি নিবি না”।
“না, না, তুমি এসো সর্দার, আমরা এগোচ্ছি”।
ওরা চলে যেতে, নাদু আমার সামনে বড়ো মাংসের টুকরোটা নামিয়ে
দিয়ে বলল, “খেয়ে দেখ তো, বাবা, কিসের মাংস এটা”? নাদুর চোখে মুচকি হাসি। টুকরোটা
চেঁটে দেখলাম, জিভে কাঁচা রক্তের স্বাদ নিয়ে বুঝতে বাকি রইল না, এটা কিসের মাংস।
নাদু, আমার ছেলে, সে আমার পরীক্ষা নিচ্ছে?
আমি খুব ভারিক্কি চালে হাসলাম, বললাম, “হেঃ তুই খুব তালেবর
হয়েচু, না? বাপের পরীক্ষা নিচ্চু? এ মাংস কমই পাওয়া যায়। এরা দুপায়ে হাঁটে, খুব
বুদ্ধি...সবাইকে মারে, নিজেদের মধ্যেও মারামারি করে মরে...কি, ঠিক বললাম কিনা?”
নাদু হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল, ওকে এত আনন্দ পেতে
অনেকদিন দেখিনি, বললাম, “কি রে? এত হাসছিস?”
“ঠিক বলেছো, মানে? তুমি আমার বাবা, আর তুমি ভুল বলবে?
প্রচুর...প্রচুর দোপেয়ে মরে পড়ে আছে, দুটো গ্রামে। আমরা গিয়েছিলাম, স্বপনবেড়ে
গ্রামে, আর ওদিকের শেয়ালের দলটা সাজাদগড়ে। গ্রামের সবাই প্রায় শব। বুড়ো-বুড়ি, বাচ্চা-কাচ্চা,
ছেলে-মেয়ে...কত খাবে খাও না...একমাস খেলেও মাংস শেষ হবে না”।
প্রথমে খুব আনন্দ হলেও হঠাৎ একটা কথা আমার মাথায় এলো।
বললাম, “এত দোপেয়ে কী করে মারা গেল, জানিস? মড়ক নয় তো?” নাদু থমকে গেল। ইদানীং মড়ক
খুব একটা হয় না। আমাদের সময় মাঝে মাঝে হত, অনেক দোপেয়ে পরের পর মারা যেত, প্রায় একসঙ্গে।
মরা দোপেয়ের ঢের লেগে যেত গ্রামে গ্রামে। নাদু তেমনটা দেখেনি। ও জানে না। ও আমার
চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করল, “মড়ক কি?”
“কিছু একটা রোগ বা অসুখ, যাতে লাগাতার অনেক দোপেয়ে মারা
যায়। আর রোগটা ভীষণ ছোঁয়াচে। গ্রামে এক দুজনার হলে, সে রোগ সকলের মধ্যে ছড়িয়ে যায়
খুব তাড়াতাড়ি। বুড়োবুড়ি আর বাচ্চারা সব চেয়ে আগে মরে, তারপর জোয়ানরা। প্রাণের দায়ে তাই জোয়ানরা অনেক সময়
গ্রাম ছেড়ে পালিয়েও যায়। সে রকম কিছু নয় তো? তুই যেমন বললি আমার তেমনই মনে হচ্ছে।
মড়কের মরা, বেশি খাওয়া ভালো নয়। আমরা পেটের মাংস খেতাম না। কাঁধ, বুক, পিঠ,
পাছা...এরকম বেছে বেছে খেতাম”।
“আর যদি গলাকাটা, মাথা থ্যাঁতলানো, হাত-পা কাটা হয়? সেটা কী
মড়ক হতে পারে”?
নাদুর এই কথায় আমি উত্তেজিত হয়ে, খুব হাসতে হাসতে বললাম, “তা
যদি হয়, কোন চিন্তা নেই। নিশ্চিন্তে ভরপেট খাওয়া চলে। এটা তার মানে দাঙ্গা,
খুনোখুনি। দুপেয়েরা এটা খুব করে, নিজেদের মধ্যে কাটাকাটি। নানান কারণে। কেউ বলে,
হর হর মহাদেও। কেউ বলে আল্লা হো আকবর। কখনো বলে, লাল সেলাম। কখনো বলে বন্দে মাতরম,
কখনো বলে জয় বজরংবলী। আবার কেউ বলে, মাও! ব্যস, দলে দলে বেরিয়ে পড়ে কাটতে আর
মারতে। গ্রামকে গ্রাম প্রায় সাফ করে দেয়”।
“যাক বাবা, যা চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে। মড়ক হলে খুব বিপদে
পড়তাম না? আমাদের দলের সবাই তো ভরপেট খেয়ে ফেলেছে”।
আমি আবার খুব ভারিক্কি চালে হাসলাম, বললাম, “বিপদ আর কী? সে
রকম হলে তার দাওয়াইও আমার জানা আছে। তুই কি তোর বাবাকে তোর থেকে কম ধূর্ত ভাবিস?”
লম্বা লম্বা কান চুলকে নাদু লজ্জা লজ্জা মুখে হাসল, বলল, “কী
যে বলো, তোমার মতো অভিজ্ঞতা আর ধূর্তামি শিখতে আমাকে আরো কয়েক জন্ম নিতে হবে”।
আমি আলতো পায়ে নাদুর পিঠ আর মাথায় থাবা বুলিয়ে বললাম, “আরে
না, না। তুই আমার ছেলে, তোর ওপর আমার গর্ব হয়। খারাপ, বিষাক্ত কিংবা অসুখের মাংস
খেয়ে যদি কোন অস্বস্তি হয়, কচি কচি দুর্বো ঘাসের ডগা খাবি”।
“কচি ঘাস? ওতো ছাগলে খায়। শেয়াল হয়ে ঘাস খাবো?”
“হ্যাঁ। ঠিক তাই। শেয়াল হয়ে কচি কচি ঘাস খাবি। দেখবি পেটের
মধ্যে থেকে হজম না হওয়া মাংস সব বমি হয়ে বেরিয়ে আসবে। তারপর নদী থেকে একপেট জল
খেয়ে নিবি। ব্যস, পেট সাফ, অস্বস্তি সাফ!”
“বাঃ। এটা বেশ ভালো টোটকা দিলে তো! মনে রাখবো, বাবা। নাও, এখন
তুমি বসে আরাম করে মাংসটা খেয়ে নাও, আমি আরেকবার যাই। নিজে ভরপেট খেয়ে আসি, আর
ফেরার সময় যতটা পারি নিয়ে আসবো। আচ্ছা, বাবা, একটা কথা। অনেকে মিলে যদি একটা গোটা
শব টেনে নিয়ে আসি কেমন হয়? এখানে রেখে দেব। চার পাঁচদিন আমাদের সকলের চলে যাবে”।
“মোটেই না! অমন কাজ ভুলেও করিস না। গ্রামের যে সব দুপেয়েরা
মারা গেছে, সেখান থেকে খাবলে খুবলে খেয়ে আয়। কিন্তু গোটা শব নিয়ে এলে, কাল সকালেই
ওরা বুঝে যাবে। রক্তের দাগ, তোদের পায়ের দাগ আর শব টেনে আনার দাগ ধরে ধরে, ওদের
অন্য দুপেয়েরা এখানে চলে আসবে। তারপর আমাদের সক্কলকে পিটিয়ে মারবে”।
“ঠিক বলেছো। এদিকটা তো চিন্তা করিনি! ঠিক আছে, তুমি খেয়ে
নিয়ে বিশ্রাম করো বাবা, আমি আসছি”।
“তুই আয়, তুই এলে একসঙ্গে বসে খাবো। ছানাগুলো সবাই খেয়ে
দেয়ে কেমন ঢুলছে, দেখ। বেচারারা, অনেকদিন পর ভরপেট খেয়ে বেশ আরাম পেয়েছে। আয়, তুই
চট করে ঘুরে আয়। সাবধানে যাবি, সহজ মাংসের লোভে সতর্ক থাকতে কক্ষনো ভুলিস না যেন!
দলের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আসিস”।
“আচ্ছা, বাবা”।
নাদুর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমার আবার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। নাদু ছেলেটা খুব ধূর্ত হয়ে উঠছে, দিন দিন। কিছুদিনের মধ্যে আমার থেকেও ধুরন্ধর হয়ে উঠবে নির্ঘাৎ। আজ লুগি থাকলে খুব আনন্দ করত, সে যেমন ছিল সুন্দরী, তার তেমনি ছিল দেমাকে, বলত, আমার ছেলে, হবে না? আশেপাশে ছানাগুলো সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, দু একজন একটু দূরে শুয়ে ছিল, তাদের আমার কাছটিতে টেনে আনলাম। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লুগির কথা খুব মনে পড়তে লাগল। মাংসের টুকরোটা ঘাসের ওপর রেখে শালের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আবার বসলাম।
৩
নাদু আর আমি খাওয়া দাওয়া সেরে ঘাসের ওপর যখন শুলাম, তখনও
ভোরের আলো ফুটতে দেরি আছে। আজ একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেল, নাদুর জোরাজুরিতে। আজকাল
হাড়গোড় তেমন চিবোতে পারি না, দাঁতে ব্যথা হয়।
পাশে শুয়ে নাদু বলল, “সবাই মিলে যা মাংস এনেছি, তাতে দিন দু
তিনেক আরামসে চলে যাবে, বাবা”।
“আরো কটাদিন মাংস পাওয়ার আরেকটা উপায় আমি জানি”।
নাদু তড়াক করে উঠে বসে, আমার দিকে মুখ ফেরাল, “কী রকম?”
“দু গ্রামের দুপেয়েরাই কাল সকালে ফিরে আসবে। অনেক শোক-টোক
করবে, কান্না-কাটি করবে, তারপর সৎকার করার ব্যবস্থা করবে”।
“সৎকার করলে আর আমাদের কী লাভ হবে? একদল পুড়িয়ে দেবে আর এক
দল গোর দেবে”।
“ধুর বোকা, এতগুলো দোপেয়েকে একসঙ্গে পোড়ানো, কিংবা গোর
দেওয়া কী চাট্টিখানি কথা নাকি? একদল নদীর ধারে বড়ো চিতা জ্বেলে সব মরা একসংগে
পোড়াতে যাবে। দেখে নিস, পুরো পুড়বে না, আধপোড়া হলেই নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। তক্কে
তক্কে থাকিস, যা বললাম তাই হবে। একটু দূরে ভাঁটির দিকে গিয়ে দাঁড়াবি, জল থেকে তুলে
আধপোড়া লাশ টেনে খা না কত খাবি”।
“আর অন্যদল?”
“ওদল বড়ো একটা গর্ত করে, সবকটা মরাকে ফেলে, ওপর থেকে কিছু
মাটি চাপা দিয়ে ঢিবি বানিয়ে রেখে চলে যাবে। রাত্রের দিকে ওই ঢিলে মাটি সরিয়ে ছোট
ছোট গর্ত বানিয়ে, মরা তুলে ফেলতে কতক্ষণ লাগবে?”
“সত্যি এমন হলে, আমাদের ছানাগুলোর গায়ে একটু গত্তি লাগবে,
বাবা”।
“লাগবেই তো। এরপর আরো আছে”।
“আরো আছে? বলো কী, বাবা? এবার তুমি কিন্তু বেশি স্বপ্ন দেখে
ফেলছো”।
“না রে, বাবা না। যা বলছি শোন, পরে মিলিয়ে দেখে নিস। এই
সবের মধ্যে, দুদলেরই কিছু কিছু দোপেয়ে প্রতিশোধ নেবার শপথ নেবে। তারা আবার চার-ছজন
মিলে ছোট ছোট দল গড়বে। আর সুযোগ সুবিধে পেলেই অন্য দলের এক দু জনকে মাঝে মাঝেই
মেরে ফেলে রেখে দেব, নদীর ধারে, মাঠের মাঝখানে, কিংবা পথের নয়ানজুলির জলে। একটু
সতর্ক থাকিস। যেমনটা বললাম তেমনই হবে। হতেই থাকবে”।
“ওফ, অ্যাদ্দিনে তবে মা শিবানী মুখ তুলে চেয়েছেন। ওই
কালীমূর্তি যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। মায়ের হাতে ধরা দোপেয়েদের কাটামুণ্ডু
থেকে রক্ত টুপিয়ে ঝরছে, আর শিবার দল মুখ আকাশের দিকে করে, সে রক্ত পান করছে।
আনন্দে নাদু চেঁচিয়ে উঠল, “হুক্কা হুয়া, হুয়া, হুয়া”। ওর
দেখাদেখি আমদের দলের সকলেই, এমনকি আমিও, দলের সর্দার শ্রীমান নাদুশেয়ালের বাবা
ভাদুও, চেঁচিয়ে উঠলাম একসঙ্গে, “হুয়া হুয়া, আচ্ছা, হুয়া”।
নাদু খুশিতে হাসতে হাসতে বলল, “বাবা, তুমিও”?
আমি হাসতে হাসতে নাদুকে জড়িয়ে ধরলাম, “কেন? জানিস না,
দোপেয়েরা বলে, সব শেয়ালের এক রা?”
ভোর হয়ে আসছে দেখে, ছানাগুলোকে গর্তে পাঠিয়ে, আমরা ঘন ঝোপের
নিশ্চিন্ত আড়ালে, আরামে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমাদের সেবার জন্যে, আমাদের সংরক্ষণের জন্যে
দোপেয়েরা নিজেরাই দলে দলে মরতে লেগেছে! আমাদের আর ভাবনা কী?
--০০--