সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ৩০

  প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৯"


৩০

স্নেহের সুকন্যা,  

 পর পর চারটে চিঠিই পড়লাম। প্রথম তিনটি চিঠিতে তোর জীবনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মাখা দিনগুলির কথা পড়তে পড়তে মনটা বড়ো বিষণ্ণ হয়ে উঠেছিল। নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম বারবার। প্রাত্যহিক নৈকট্য না থাকলেও, কলকাতায় যখনই এসেছি আমি তো তোর এবং তোদের সকলের আশেপাশেই ছিলাম। তোর একক লড়াইয়ের চিত্রগুলি আমার যে চোখে পড়েনি, এমন কথা বললে চরম মিথ্যাই বলা হবে। কিন্তু কী এক অদ্ভূত অহংকারী মায়ায় নিজেকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলাম, ভাবলে আজ আমার মাথা হেঁট হয়ে আসছে লজ্জায়। দেখেও না দেখার ভান করেছি। কিছু কিছু বুঝেও – আরও গভীরে বোঝার প্রয়াস করিনি নির্মম উদাসীনতায়। পাঁচ-সাতদিনের জন্যে কলকাতায় গিয়ে কিছু কিছু উপদেশ এবং অনেক হাসি-ঠাট্টা-ফাজলামি দিয়ে ভুলিয়ে রাখা বসন্তের মধুকণ্ঠ কোকিলের মতোই ছিল আমার আচরণ। তোর লড়াইয়ের নিত্য সঙ্গী হয়ে বাস্তবের কর্কশ বায়স হয়ে উঠতে চাইনি।

বিগত কয়েকমাসের ঘনিষ্ঠতায়, তোর কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে কখনো কখনো উপস্থিত হয়েছি আমি। কিন্তু ওই তিনটি চিঠি পড়ার পর নিজেকে চূড়ান্ত মতলববাজ আর ধান্দাবাজ মনে হচ্ছে, বিশ্বাস কর। বহুদিন আগে জীবনসঙ্গিনী রূপে তোকে আমি পেতে চেয়েছিলাম যখন, আমাকে তুই প্রত্যাখ্যান করেছিলি। তার জন্যে মনে মনে ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, অভিমান করেছিলাম। পৃথিবীর সমস্ত মেয়েদের প্রতিই আমার মনে একধরণের তুচ্ছতা এসে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল প্রকৃত ভালোবাসার মর্ম বোঝার মত গভীর মনোভাব মেয়েদের থাকতে নেই। তারা সর্বদাই সস্তা- চটকদার জিনিষের প্রতি নিবিষ্ট থাকতে ভালোবাসে। এক কথায় মহিলা জাতির প্রতিই আমার কেমন যেন অনীহা উপস্থিত হয়েছিল।

তোর ওই দুঃসহ সময়ে নিত্য পাশে ছিলেন যিনি, সেই শশাঙ্কবাবুকেও মনে হত – হাল্কা মনের মানুষ। মেয়েদের প্রতি উদার সহায়তা বিলিয়ে তোর মন জয় করাতেই তার যেন যাবতীয় বাহাদুরি। তাচ্ছিল্য করতাম তাঁকেও। মাঝে মধ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ যে আমার হয়নি তা নয়, কিন্তু কোনদিনই তাঁকে মনে রাখার মতো আলাপ-পরিচয় করার বিষয়ে এতটুকু উৎসাহ খুঁজে পাইনি আমার মনের গভীরে।

আজ তোর চিঠি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে, কী আশ্চর্য গভীর মানসিকতা নিয়েই না তিনি সেসময় তোর পাশে থেকেছেন সর্বদা – সুখে-সম্পদে, দুঃখে-বিপদে। আমার মনের সেই সব সঙ্কীর্ণতা দূরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আজ আমি তোদের দুটিকে – তোর ও শশাঙ্কর দাম্পত্যকে সশ্রদ্ধ চিত্তে বরণ করে নিলাম। তাঁর সমস্ত পিতৃত্ব দিয়ে তোর বাম্বাইকে তিনি যেভাবে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন, অত দরাজ বক্ষ আমার কোনদিনই হবার নয়।

তোর জীবনের সঙ্কটময় নানান ঘটনার কথা জেনে ও বুঝে, আজ তোদের ছোট্ট সুখী পরিবারটিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আর আমার ঈর্ষা-জর্জরিত দৃষ্টি ও মনের বিষ-বাষ্প যেন কোন ভাবেই তোদের সংসারকে স্পর্শ করতে না পারে – সেই কামনা করি সর্বান্তঃকরণে। আমার দায়-বোধহীন বন্ধ্যা ভালোবাসার মোহ তোকে যেন কোনভাবেই গ্রাস না করে।

তোরা সক্কলে আনন্দে থাকিস। খুব ভালো থাকিস। বাম্বাইকে আমার আশীর্বাদ জানাস।

তোর

সুনেত্র দাদা।

 গত পরশু অনেক রাত পর্যন্ত জেগে সুকন্যার চিঠিগুলো পড়ছিল সুনেত্র। চিঠি পড়ার পর মাথার মধ্যে ভিড় করে এসেছিল নানান ভাবনা চিন্তা। বিছানায় শুয়েও কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বারবার উঠে সিগারেট ধরিয়ে সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়েই প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছিল সুনেত্রকে।

গতকাল রাত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারত, কিন্তু হয়নি। কারণ গত দু’রাতের সুদীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর, ওপরের চিঠিটি সুকন্যাকে পাঠিয়ে প্রায় আড়াইটে নাগাদ, শুতে গিয়েছিল সুনেত্র। এবং গতকাল রাতের ঘুমে আর কোন বিঘ্ন ঘটেনি।

আজ রবিবার তার চেম্বার বন্ধ। আলস্য মাখা সকাল সাড়ে নটার দ্বিতীয় কাপের চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েই তার মনে হল, গত রাত্রে তার অমন গভীর ঘুমের কারণ কি? সে কারণ কি, প্রত্যুত্তরে লেখা তার ওই চিঠিটা? নিজেকে অলীক এক সম্পর্কের মোহ-মায়া থেকে মুক্ত করতে পেরেছে বলে? এবং তার বুনে চলা নিপুণ ও নিবিড় স্বপ্নজালে বদ্ধ হতে কনিকেও নিরন্তর প্ররোচনা দেওয়া থেকে বিরত হওয়ার জন্যে?

চায়ের কাপটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরাল সুনেত্র এবং নিজেকে খুব তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট মনে হল। কি সহজেই না সে শেষমেষ পারল – বহু বছর ধরে মনের মধ্যে লালন করে আসা এক স্বপ্নকে নিষ্প্রাণ করে তুলতে। কিছুটা আত্মশ্লাঘাও অনুভব করল মনে। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় তার বাগানে উজ্জ্বল ফুটে থাকা নানা বর্ণের ফুলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, পৃথিবীটা বেশ সুন্দর।

এই মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়ল, হলদিয়া আসার পথে তার বিগড়ে যাওয়া গাড়ির কারণে, বহুদিন পর তার সঙ্গে কনির ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তার পরের দিন সকাল সকাল বাড়ি ফিরে এমনই চা খেতে খেতে তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা বড়ো সুন্দর।

সুনেত্রর মনে হল, ঠিক কোন পৃথিবীটা তার কাছে সুন্দর? সেদিন কনিকে বহুদিন পরে ফিরে পাওয়া। বহুদিন অবদমিত থাকা মনের বাসনা-কামনা পূরণের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে যাওয়া। সেদিনের সেই মানসিক পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছিল, এতদিনে বুঝি জীবনের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হল। তাই সেদিন পৃথিবীটাকে ভারী সুন্দর লেগেছিল।

আর আজ, সে যখন কনির জীবনের সব সত্য জেনেছে। মেল লিখে কনির সামনে নিজের মুখোসটা খুলে ফেলে নিজের নির্লজ্জ মুখটা সে মেলে দিয়েছে। নিজের মনটাকে সংযত করে উদাসীন হয়ে উঠতে পেরেছে। আজও তার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা বেশ ভালোরকমের সুন্দর! আশ্চর্য না?

আসলে পৃথিবীটা তার নিজের নিয়ম মতো বারো মাস ছয় ঋতুতে সর্বদাই সুন্দর থাকে। কিন্তু মানুষের মনোদৃষ্টির কারণেই বদলে যায় তার সৌন্দর্য। অর্থাৎ সেদিন সুনেত্রর যে মনটা রোমান্টিসিজ্‌মের আগুনে পুড়ছিল, আর আজ সেই মনের আগুনে জল ঢেলে দেওয়ার পরে, সে যখন নিঃস্ব - তাও সে দেখছে পৃথিবীটা একই রকম সুন্দর! সুনেত্র কি সত্যিই সুন্দর দেখছে পৃথিবীটাকে? নাকি নিজের মনকেই সে চোখ ঠারছে? এই যে সে ঢাকঢোল বাজিয়ে কনিকে নিয়ে তার সকল রোমান্টিক স্বপ্নের গলায় ফাঁস জড়ালো, তাতে সত্যিই কি তার মন হার মেনে নিল? নাকি, মনের গোপন কুঠিতে তার রোমান্টিসিজ্‌মকে অবদমিত রেখে, কনি এবং তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের চোখে সে মহান হতে চাইল?

সুনেত্রর অলস মস্তিষ্ক যখন তার এই মানসিক দ্বন্দ্বের মীমাংসায় নিমগ্ন, শম্পাদিদি এল চায়ের খালি কাপটা তুলে নিতে। যাওয়ার সময় বলল, “মাসকাবারি কিছু জিনিষ ফুরিয়ে গিয়েছে, দাদা, আজ একবার মার্কেটে যাবেন?”

সুনেত্র বাস্তবে নেমে এল আচমকা, বলল, “ওঃ তাই? ফর্দ বানিয়েছ? তাহলে এখনই বেরিয়ে গিয়ে বাজারটা সেরে আসি – ফর্দটা দাও দেখি”।  

“সে দিচ্ছি। কিন্তু এখনই যাবেন? না জলখাবার খেয়ে বেরোবেন? ফিরতে যদি দেরি হয়?”

“কত দেরি হবে – ঘন্টাখানেক ম্যাক্সিমাম – এগারোটার মধ্যে চলে আসব”।

“রোববারগুলোতে মার্কেটে বড্ডো ভিড় হয় কিন্তু”।

সুনেত্র হাসল, বলল, “তা হোক, আজ ব্রেকফাস্টে কী খাওয়াবে গো, শম্পাদিদি?”

“তোমার প্রিয় লুচি আর সুজির হালুয়া”। ভেতর থেকে ফর্দটা এনে সুনেত্রর হাতে দিতে দিতে শম্পাদিদি বলল।

“ওঃ গ্রেট, তাহলে ফিরে এসেই খাব - আরাম করে হাতে সময় নিয়ে”। বলতে বলতে সুনেত্র নিজের ঘরে গেল জামা কাপড় বদলাতে।

অন্য রোববারের তুলনায় আজ ভিড়টা অনেকটাই বেশি ছিল। রবিনকে সঙ্গে নিয়ে সে যখন রাস্তার পার্কিংয়ে রাখা গাড়ির সামনে এল, ঘড়িতে তখন পৌনে বারোটা বাজছে। রবিন নামের ছেলেটি বসাকবাবুর দোকানে কাজ করে, বছর চোদ্দ-পনের বয়েস হবে বড়ো জোর। কেনাকাটার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে, বসাকবাবু ওকে পাঠান, গাড়িতে থলেগুলো তুলে দিয়ে আসতে।

ডিকি খুলে দিতেই রবিন থলেদুটো ভেতরে রাখল, এবং সুনেত্র তার হাতে একশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলল, “টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নাও, রবিন, বাড়ির জন্যে কিছু...”। কোন কথা না বলে মুখে অত্যন্ত মলিন একটু হাসি নিয়ে রবিন দৌড়ে ফিরে গেল ওদের দোকানের দিকে।

সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ডিকি বন্ধ করে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরাল। রবিনদের মতো ছেলেদের জন্যে আগে তার বেশ কষ্ট হত, এখন আর হয় না। স্বাধীনতার পর প্রায় আশি বছর পার হতে চলল, কত রকমের সরকার এল এবং গেল – বুর্জোয়া সরকার, সেকুলার-সমাজতান্ত্রিক সরকার, মা-মাটি-মানুষের সরকার। রবিনদের মতো ছেলেদের অবস্থা দিন-কে-দিন আরো সঙ্গীন হয়ে চলেছে। এই ছেলেগুলো সারাদিন কি কঠিন পরিশ্রম করে সেকথা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে সুনেত্র। বসাকবাবু ক’টাকাই বা মাইনে দেয়? কিন্তু সেই টাকাকটার জন্যেই কত যে অপমান ওদের সহ্য করতে হয়। আর চাকরি-হারানোর ভয়ে সর্বদা সিঁটিয়ে থাকতে তো হয়ই। লেখাপড়া নেই, স্কুল নেই, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা নেই, বাবা-মায়ের কাছে দামি স্মার্টফোন কিনে দেওয়ার বায়না নেই। সারাক্ষণ মোবাইলে চোখ রেখে ফেসবুক, হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ, ইনস্টাগ্রামের রিলস স্ক্রোল করে যাওয়া নেই। রবিনদের মতো ছেলেদের আছে শুধু অন্নচিন্তা ও ভবিষ্যৎহীন অস্তিত্বরক্ষার দুশ্চিন্তা।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে গাড়িতে উঠতে যাওয়ার মুহূর্তে, একদম তার পাশেই আচমকা ব্রেক মেরে দাঁড়াল একটা অটো। অটো ড্রাইভার চেঁচিয়ে উঠল, “ওই তো ডাক্তারবাবু। স্যার, স্যার, এই ছেলেটি আপনারই বাড়ি যাচ্ছে...”।

অটো ড্রাইভারকে চিনতে পারল সুনেত্র, ভদ্রলোকের মা তার নিয়মিত পেশেন্ট। যদিও নামটা মনে করতে পারল না। আর পিছনের যাত্রীটি পনের ষোল বছরের একটি ছেলে – একলা। মুখটা কোথায় যেন দেখেছে সুনেত্র, চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক চিনতে পারছে না।

পিঠে একটা ব্যাকপ্যাক নিয়ে ছেলেটি অটো থেকে নেমেই সুনেত্রর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। সুনেত্র বেশ হতভম্ব হয়ে বলল, “আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না, ভাই”।

ছেলেটি খুব সপ্রতিভভাবেই বলল, “আপনিই ডাক্তার সুনেত্র বসু তো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু...”

   “আমি সুধন্বা বসু। ডাক নাম বাম্বাই”। স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুনেত্র। সুকন্যা দত্ত অথবা শশাঙ্ক মিত্রর পুত্র মিত্র নয়, দত্ত নয়, বসু হয়ে গেল কী করে? তার অন্তরে এখন আবেগের প্রবল স্রোত। সেই স্রোতের ধাক্কায় তছনছ হয়ে যেতে লাগল সযত্নে বেঁধে রাখা তার মনের ঘাটখানা। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কিছু বলার আগেই, বাম্বাই আবার বলল, “দাঁড়াও, ভাড়াটা মিটিয়ে আসছি”।

চলবে...


রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 

[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।] 

 

৩০শে জুলাই, ২০২৬ রবিবার, সকাল সাড়ে এগারোটা

ওপরে অহীনের ঘরে সর্বজিৎ আর অহীন আড্ডা দিচ্ছিল। অবশ্য সে আড্ডার অধিকাংশ আলোচনাই চলছিল অবিনবাবুকে নিয়ে। আধুনিক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে অবিনবাবুর প্রতিক্রিয়া শেষ অব্দি কোথায় পৌঁছবে, সেটাই এখন এ বাড়ির সকলের মাথাব্যথা। সেই গম্ভীর ও গভীর আলোচনার মাঝখানে তিৎলি যখন দুজনের জন্যে দুটো অমলেট আর দুকাপ কফি নিয়ে ওদের ঘরে গেল, দুজনেই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, বলল, “ওঃ এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে?”

সর্বজিৎ চামচ দিয়ে গরম অমলেটের টুকরো মুখে পুরে বলল, “বিনুদা নীচেয় কী করছে, রে তিৎলি?”

তিৎলি টুলের ওপর বসে বলল, “এমন মনোযোগী পাঠক আমি আগে কোনদিন দেখিনি, সরুদা। তাও আবার খবরের কাগজ। শুধু খবর নয়, প্রত্যেক বিজ্ঞাপনের শর্তাবলী প্রযোজ্য পর্যন্ত সবই পড়ছেন। তার ওপর একটা কাগজে কী সব লিখে চলেছেন”।  

অহীন বলল, “কাগজ-পেন কোথায় পেলেন?”

তিৎলি বলল, “আমার কাছে চাইলেন তো, আমিই দিলাম। পেনটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বললেন, এ তো ফাউন্টেন পেন নয় বৌমা! এই পেনেই এখন তোমরা লেখ বুঝি? এ পেনের নাম কি? আমি বললাম, আমরা বলপেন বলি, অনেকে ডটপেনও বলে। তারপর কাগজে দু একটা দাগ টেনে, নিজের নাম লিখলেন। বললেন, বাঃ বেশ পেন তো! কালি ভরে কোনদিক দিয়ে? আমি বললাম, ওর মধ্যে কালি ভরা যায় না। আমি পেনের মুণ্ডুটা খুলে পেনের রিফিলটা দেখালাম। বললাম, এই রিফিলটা শেষ হয়ে গেলে, নতুন কিনতে পাওয়া যায়, সেটা  ঢুকিয়ে নিলেই আবার লেখা চালু হয়ে যাবে”।   

সর্বজিৎ বলল, “দাম-টাম জিজ্ঞাসা করেননি?”

“করেননি আবার? বললাম পাঁচটাকা, আর রিফিলের দাম দুটাকা। আমাদের স্টুডেন্ট লাইফে যখন প্রচুর লিখতে হত – তখন একটা রিফিলে দিন পনের-কুড়ি আরামসে হয়ে যেত। উনি অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছিলেন আমার কথা। বললেন, পাঁআচ টাআকাআ? তিরিশটাকা মাইনেতে একটা সংসারের সারা মাস চলে যায়, বৌমা। দু-তিনটে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করলে, তাদের রিফিল কিনতেই তো মাসে দশ-বারোটাকা বেরিয়ে যাবে! কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললেন, যত দেখছি, ততই তো চমকে যাচ্ছি, বৌমা”। আরও কিছুক্ষণ হালছাড়া অবস্থায় বসে থেকে বললেন, ঠিক আছে বৌমা, তুমি যাও”। তিৎলি হাসল বলল, “আমি তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, বাবা”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কী লিখছেন কিছু দেখেছ?”

“হুঁ। এই তো কফি দিতে গিয়ে দেখে এলাম, এ-ফোর পাতার এক পৃষ্ঠা শেষ করে, পরের পাতায় লিখে চলেছেন। তবে হ্যাঁ, হাতের লেখাটি কিন্তু মুক্তোর মতো…”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “উনি এত কী লিখছেন, বলো তো, সরুদা তোমার কী মনে হয়?”

সর্বজিৎ অমলেট শেষ করে, কফির কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, “আমাদের জন্যে প্রশ্নবাণ তৈরি হচ্ছে, অহীন। ভীষ্মের শরশয্যার কথা শুনেছ? প্রস্তুত হও, আমাদের সকলেরই সেই অবস্থা হবে”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তুমি বলছ, খবরের কাগজ পড়ে ওঁর যা কিছু মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, সে সব উনি প্রশ্ন করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন?”

“ঠিক তাই। তার মধ্যে ইতিহাস থাকবে, ভূগোল থাকবে, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বেশ কিছুটা বিজ্ঞানও থাকবে… এ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি”।

অহীন আর তিৎলি হেসে উঠল হো হো করে। সর্বজিৎও হাসল, বলল, “হাসছ অহীন? এ পরীক্ষা ইউপিএসসি ধরনের – যে কোন বিষয় থেকে যে কোন প্রশ্ন আসতে পারে… রেডি হও…”।

সর্বজিতের কথা শেষ হল না, অবিনবাবু স্মিতমুখে দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বললেন, “কি, এত হাসাহাসি কিসের?”

অহীনরা সকলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আরেব্বাস, বিনুদা তুমি একেবারে ওপরে চলে এলে? এস এস আরাম করে বিছানায় বস। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক”।

অবিনবাবু অহীনের বিছানাতেই বসলেন। আরাম করেই বসলেন। তারপর তাঁর হাতের কাগজটা দুহাতে মেলে ধরে বললেন, “বুড়োদুটোর ওপর আমার তেমন ভরসা নেই, তাই তোদের কাছেই এলাম। আমার অনেক প্রশ্ন আছে”।

অহীন বলল, “ঠিক এই কথা নিয়েই আমরা হাসাহাসি করছিলাম, বিনুদা। বৌদি এসে খবর দিল, তুমি খবরের কাগজ পড়ছ আর কাগজে কি সব যেন লিখছ। সেই শুনে সরুদা বলল, তুমি কঠিন কঠিন প্রশ্নমালা সাজাচ্ছ… এবং সেগুলোর উত্তর আমাদেরকেই দিতে হবে”।

অবিনবাবু খুশি হয়ে সর্বজিতের দিকে তাকালেন, বললেন, “এই জন্যেই তো তোদের কাছে এলাম। সত্যিই অনেক কিছু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে…”।

সর্বজিৎ বলল, “তোমার প্রশ্ন শোনার আগে, আমি একটা লেকচার দিয়ে দিই, বিনুদা। তাতে হয়তো তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। এবং অনেক ব্যাপার-স্যাপার তোমার বুঝতেও সুবিধে হবে”।

অবিনবাবু হাসলেন, হাতের কাগজটা ভাঁজ করে পাশের টেবিলে রেখে বললেন, “সেই ভালো, শুরু করো তোমার বক্তৃতা”।

তিৎলি বলল, “আমি তাহলে নীচেয় যাই…অনেক কাজ আছে”।

অবিনবাবু বললেন, “না, মা তুমিও থাকবে। তুমি নীচেয় গিয়ে তোমার শাশুড়িমাকে বলে এস, আমি ডেকেছি…”। তিৎলি অহীন আর সর্বজিতের প্লেট আর কফির খালি প্লেট নিয়ে নীচেয় যেতে যেতে বলল, “আচ্ছা”।

অবিনবাবু স্মিতমুখে বললেন, “শুরু করো, সর্বজিৎ”।

সর্বজিৎ একটু সময় নিয়ে মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিল, তারপর বলল, “তুমি যখন সমাধিতে গেলে, দাদুর মুখে শুনেছি সালটা ছিল ঊণিশশ তেতাল্লিশ? তাই তো?”

“হুঁ”।

“গোটা ইওরোপ তখন যুদ্ধে জ্বলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম দিকে হিটলারের জার্মানি খুব বাজিমাত করলেও, মিত্রশক্তি অর্থাৎ আমেরিকা এবং ইটালি ছাড়া, ইওরোপের দেশগুলো পরের দিকে ভালোই পালটা মার শুরু করল। অবশ্য হিটলার তাতেও দমবার পাত্র নয়, আক্রমণ করে বসল রাশিয়াকে। রাশিয়ার স্টালিনকে আরেকজন হিটলারও বলা যায়। তফাৎ শুধু গোঁফে – একজনের টুথব্রাশ আরেকজনের মুশটাশ। স্টালিনের লাল ফৌজ হিটলারের নাজি বাহিনীকে নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছাড়ল। শেষমেষ মিত্রশক্তি আর রাশিয়ার যৌথ চাপে হিটলার বিধ্বস্ত হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯৪৫ সালে। তবে এই যুদ্ধে সবথেকে বেশি মূল্য চোকাতে হয়েছিল জাপানকে। জাপান ছিল অক্ষ শক্তিতে, অর্থাৎ জার্মানি ও ইটালির সমর্থক। আমেরিকা জাপানে দুটি অ্যাটম বম্ব ফেলে ধ্বংস করে দিল জাপানের দুটি শহর। হিরোসিমা আর নাগাসাকি। আমেরিকার রসিক ও সভ্য বিজ্ঞানীরা ওই দুটি বম্বের নাম দিয়েছিল, লিট্‌ল্‌ বয় আর ফ্যাট ম্যান। পুঁচকে ছেলে, আর ভুঁড়ো মানুষ। দুই বোমায় নিহত হল প্রায় লাখ তিনেক নিরীহ মানুষ এবং আণবিক তেজস্ক্রিয়ায় কত মানুষ যে অসুস্থ আর পঙ্গু হল তার সম্পূর্ণ হিসেব পাওয়া যায় না।

অবিনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “এই অ্যাটম বম্ব বস্তুটা কি?”

সর্বজিৎ বলল, “তোমরা নানান কেমিক্যাল দিয়ে যে হাতবোমা বানিয়ে সায়েবদের মারতে, সে বোমার ক্ষমতাকে যদি পিঁপড়ে বলি, তাহলে তার তুলনায় অ্যাটম বম্ব হল লাখখানেক বা তারও বেশি হাতির ক্ষমতা। ওই ব্যাপারটা এখন ভুলে যাও, বিনুদা। ভীষণ জটিল বিজ্ঞান – আমার যা বিদ্যে-বুদ্ধি তাতে তোমাকে কিছুটা আভাস হয়তো দিতে পারব। এখন বরং আমাদের আগের কথায় ফিরে আসি।       

এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র এবং অক্ষ শক্তির সভ্য, উচ্চশিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান রাষ্ট্রনেতাদের হাতে মারা পড়ল প্রায় সাত-সাড়ে সাত কোটি মানুষ। তাদের অধিকাংশই নিরীহ নাগরিক।  

ওই হিসেবের বাইরে, এই যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোন যোগ না থাকলেও, আমাদের এই বাংলার প্রায় তিরিশ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিলেন স্রেফ অনাহারে”।

“সে কি? কেন?”

“বিনুদা, আমরা তখনও পরাধীন। সিন্ধবাদের ঘাড়ে চেপে থাকা সেই বুড়োর মতো বৃটিশরা তখন আমাদের ঘাড়ে বসে গোগ্রাসে গিলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের সৈন্যদলের খাদ্যের সংস্থান ঠিকঠাক রাখতে বাংলা থেকে জাহাজ ভরে তারা নিয়ে গিয়েছিল আমাদের মুখের গ্রাস – চাল, গম, ডাল…। মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে গ্রামে গ্রামে যাঁরা ফসল ফলান, তাঁদের না খাইয়ে মেরে ফেলল বৃটিশ সরকার – তাদের সৈন্যদের পেট ভরাতে”।

অবিনবাবু বিস্ফারিত চোখে সর্বজিতের কথা শুনছিলেন, অস্ফুট স্বরে বললেন, “কী বলছ, সর্বজিৎ!”

“সত্যি ঘৃণায় রক্ত গরম হয়ে ওঠে। সে সময় এই সব নানান কারণে আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন চরমে উঠল। তখন ইওরোপের পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা হেরে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হলেও, বিজয়ী দেশগুলির মধ্যে বৃটিশদেরও বেজায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তার ওপর তারা ভয়ও পেল ভীষণ। এদেশ থেকে তারা বহু ভারতীয়কে নিয়ে গিয়ে, আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে পাঠিয়েছিল জার্মানির সীমান্তে। সেসময় একে তো গোটা দেশবাসী তখন উত্তাল “ভারত ছাড়ো” আন্দোলন নিয়ে, তার ওপর ওইসব সুশিক্ষিত ভারতীয় সৈন্যরা দেশে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে যদি যোগ দেয়?

ঘটেও ছিল তাই – ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ। ব্রিটিশ ভারতে এই বিদ্রোহ বিখ্যাত “রয়্যাল ঈন্ডিয়ান নেভি মিউটিনি” নামে। ১৮-ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালে এই বিদ্রোহ শুরু হয় মুম্বাই বন্দরে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতের মুখ্য বন্দরগুলিতে – যেমন করাচি, কলকাতা, মাদ্রাজ, বিশাখাপত্তনম। তাদের অনেকগুলি দাবির মধ্যে ছিল – বর্ণ বৈষম্য, জাতি বিদ্বেষ – অর্থাৎ ভারতীয় নৌসেনারা যতই দক্ষ এবং সাহসী হোক না কেন, ব্রিটিশ অফিসাররা তাদের প্রতিপদে চরম অপমান এবং দুর্ব্যবহার করত। বৃটিশ সেনাদের তুলনায় ভারতীয় সেনাদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা সবকিছুই ছিল অত্যন্ত কম। আরও দেখা যেত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সর্বদাই ভারতীয় সেনাদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হত – আর ব্রিটিশ সেনারা থাকত পিছনে নিরাপদে।

এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল জাতীয় কংগ্রেস, ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি, মুসলিম লিগের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। এবং এই বিদ্রোহে সরাসরি সামিল হয়েছিল, বায়ু সেনা এবং কিছু কিছু অঞ্চলের স্থলবাহিনীর সেনারাও। কিছু কিছু শহরের পুলিশ বাহিনীও এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়েছিল।  যাইহোক সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মধ্যস্থতায় এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬।

মাত্র এই সাতদিনের বিদ্রোহই লণ্ডনে বসে থাকা ব্রিটিশ প্রধানদের হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝেছিল প্রশিক্ষিত ভারতীয় সেনা এবং সাধারণ পুলিশও যদি এভাবে বিদ্রোহ করে, তাহলে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেতে ওঠা বিপ্লবীদের সামলাবে কে? ইওরোপের নানান দেশ থেকে সদ্য ফিরে আসা রাণির ভক্ত বৃটিশ সৈন্যরা ওই সময় কেউ এদেশে আসতে চাইবে না। অতএব চালিয়াৎ বৃটিশরা হঠাৎই উদার হয়ে গেল, ঘোষণা করল যে, তারা ধীরে ধীরে ভারতীয়দের হাতে পূর্ণ শাসন ক্ষমতা ছেড়ে যাবে। যেটা বলল না, সেটা হল, মানে মানে কেটে পড়তে পারলে বাঁচি”।

অহীন বলল, “ইতিহাসে এসব ঘটনার কথা সবই পড়েছি, মুখস্থ করেছি। পরীক্ষা দিয়ে পাশও করেছি। কিন্তু তোমার মতো ঘটনাগুলোর এমন গুরুত্ব কেউ শেখায়নি, সরুদা। ঘটনাগুলো আজ নতুন চোখে দেখছি”।

তিৎলি হেসে বলল, “কার দাদা দেখতে হবে না?”

সর্বজিৎ লাজুক হেসে বলল, “তাই তো! যাগ্‌গে, আবার আগের কথায় ফিরি। সুসভ্য বৃটিশরা অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে হিন্দু-মুসলিম বিভেদটাকে উস্কে তুলছিল, সে কথা তোমরাও নিশ্চয় জানো, বিনুদা”।

অবিনবাবু বললেন, “সে আর জানব না? বজ্জাত বৃটিশদের ওটাই তো ছিল ধূর্তামি”।

সর্বজিৎ বলল, “একদম। এইবার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তারা বিভেদটাকে একদম সামনে তুলে আনল। মুসলিমদের সামনে কংগ্রেসকে হিন্দুদল আর হিন্দুদের সামনে মুসলিম লিগকে মুসলমানদের দল হিসেবে প্রচার করে দিল। তারপর দুপক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করে দুপক্ষকেই উস্কে দিতে থাকল। ফল যা হবার তাই হল, মুসলিমরা চাইল – ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করতে হবে। অর্থাৎ যে যে অঞ্চলে মুসলিম অধিবাসীদের সংখ্যাধিক্য – সেই অঞ্চলগুলি নিয়ে দুটো আলাদা দেশ হোক। অনেক বৈঠক, আলোচনা, দেশ জুড়ে বিতর্কের ঝড় – কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বৃটিশরা মুচকি হেসে বলল, সে বেশ হবে। তোমরা ঠিক করে ফেল, কীভাবে দেশটাকে ভাগ করা যায়”।

“দেশ ভাগ?” অবিনবাবু অবাক হয়ে বললেন।

“হ্যাঁ বিনুদা। দেশ ভাগ। বৃটিশ সরকার র‍্যাডক্লিফ নামের এক ব্যারিস্টারকে দেশভাগ কমিটির চেয়ারম্যান বানিয়ে, ভারতকে ভেঙে তিন টুকরো করার দায়িত্ব দেওয়া হল। মধ্যিখানে ভারত আর দুই পাশে দুই দেশ - পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিমের পাঞ্জাব প্রদেশ আর আমাদের বাংলা দুটুকরো হল, বাকি দেশ একই রইল”।

“সে সময় গান্ধিজি, সুভাষ বসু, নেহরু কী করছিলেন?”

“১৯৪৫ সালের আঠারই আগষ্ট, নেতাজিকে শেষ দেখা গিয়েছিল, তাইওয়ানের তাইপেই শহরে। কেউ বলে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কেউ বলে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ বলে তিনি সব ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তাঁর ঠিক কী হয়েছিল, সে কথা হয়তো কিছু লোক জানে বা জানত, কিন্তু সাধারণ মানুষ আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি”।

“বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১৯৪৩ সালে সুভাষ বসু জাপান গিয়েছিলেন এই পর্যন্ত জানতাম। কিন্তু শেষ অব্দি তাঁর মতো নেতার এই পরিণতি হয়েছিল?”

“হ্যাঁ বিনুদা। আমাদের নেহরু আর মুসলিম লিগের জিন্না সায়েব দেশভাগকে সমর্থন করেছিলেন। গান্ধিজি দেশভাগ সমর্থন না করলেও – এই ব্যাপারে তাঁর আর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এই পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলার অজস্র জায়গায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বীভৎস দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল গণহত্যা – দুপক্ষেরই বহুলোক মারা গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছিল – দেশ ভাগ ছাড়া, আর অন্য উপায় রইল না। বৃটিশরা যা চেয়েছিল, তাই ঘটল। এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান আর ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হল। সেই স্বাধীনতার উল্লাসে ফিকে হয়ে গেল লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্তপাতের লজ্জা এবং বাধ্য হয়ে নিজের দেশ, গ্রাম, শহর ছেড়ে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের দুঃসহ অসহায়তার গুরুত্ব”।

সর্বজিৎ মাথা নীচু করে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “তোমরা যে আদর্শে, যে স্বাধীনতার স্বপ্নে সংগ্রাম করেছিলে, বিনুদা। তার সমাপ্তি হল, স্বাধীনতা এল। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা ক্ষমতার লোভে তাদের পছন্দ মতো ভারতটাকে ছিঁড়ে ফেলল। তাতে কত লোকের প্রাণ গেল, কতলোক উদ্বাস্তু হল তাতে ওই নেতাদের কী আসে যায়? যদিও ভারতের রাজনীতিতে গান্ধিজি তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন, তবুও নিজের মতো করে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার যাতে শান্তি ও সদ্ভাব ফিরে আসে সেই চেষ্টা করছিলেন। অনেকেরই সেটা সহ্য হল না – স্বাধীনতার ছমাসের মধ্যেই ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে হত্যা করা হল”।

“গান্ধিজিকে হত্যা? কী বলছ সর্বজিৎ। এও সম্ভব? মানছি, গান্ধিজির পথ ও মতামত সে সময়েও আমাদের  বহুবার, বহুক্ষেত্রে মনোমত হয়নি। কিন্তু তাই বলে খুন? কারা করেছিল? কেন করেছিল?”

সর্বজিৎ গম্ভীরভাবেই বলল, “এখন এই অব্দিই থাক, বিনুদা। তোমার সমাধিতে যাওয়া আর গান্ধিজিকে হত্যার মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধান। সেই পাঁচবছরের যে অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তোমাকে বললাম, তাতেই তোমার শিউরে ওঠার মতো অনেক উপকরণ আমি দিয়ে ফেলেছি। এই যে প্রবীণদাদু – তোমার খ্যাঁদা - যাঁর জন্ম  ১৯৩৪ সালে। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় তাঁর বয়েস ছিল তের। একটি বালকের জ্ঞান হওয়ার বয়স যদি পাঁচ কিংবা ছয় ধরি – সেই বয়স থেকেই এই ধরনের প্রত্যেকটি মর্মান্তিক ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রতিটি ঘটনার অভিঘাতে, দেশের প্রতি তাঁর আবেগ যেমন জর্জরিত হয়েছে, তেমনই তাঁর মন থেকে বদলে যেতে থেকেছে সনাতন মূল্যবোধের ধারণা। তিনি দেখেছেন, সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষ এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে দায়সারা কয়েকদিনের প্রতিবাদ এবং ধিক্কার জানিয়ে – নির্লিপ্ত দক্ষতায় নিজ নিজ স্বার্থে, নিজ নিজ কাজে নিযুক্ত থেকেছে।

অনেক বেলা হল, স্নান করতে যাও, বিনুদা। আমরাও যাবো। আমাদের জন্যে বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছেন”।

চলবে... 


শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৬

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ  স্কন্ধ - পর্ব ৬

ধ্রুবর রাজ্যভোগ ও মুক্তিলাভ (আগের পর্বের পরে)

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “ঋষিগণের উপদেশ শুনে, শ্রীহরিকে অন্তরে চিন্তা করে মহারাজ ধ্রুব আচমন করলেন এবং তাঁর ধনুক থেকে নারায়ণ অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। নারায়ণ অস্ত্র প্রয়োগ করার সঙ্গে সঙ্গে গুহ্যক যক্ষদের সব মায়া দূর হয়ে গেল এবং সেই মারাত্মক অস্ত্রে শতশত যক্ষ হতাহত হতে লাগল। মহারাজ ধ্রুবের অস্ত্রে যক্ষদের এই মহামৃত্যু দেখে, তাঁর পিতামহ মনু সেখানে উপস্থিত হলেন, অন্যান্য ঋষিদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বললেন, “হে বৎস, এই ভাবে নিরপরাধ যক্ষদের হত্যা করা তোমার উচিৎ হচ্ছে না। তোমার ভাইয়ের হত্যাকারী একজনমাত্র যক্ষের অপরাধে তুমি অনেক যক্ষকেই হত্যা করলে। এই অন্যায় কর্ম তোমাকে শোভা পায় না। তুমি হৃষীকেশের তপস্যা করে, তাঁর শ্রীচরণ লাভ করেছ, দেবর্ষি নারদ তোমার মহান চরিত্রের উদাহরণ সর্বত্র বর্ণনা করে থাকেন। সাধুব্যক্তিরা তোমার আচরণ অনুসরণ করেন, তাও তুমি এমন অন্যায় কাজ কিভাবে করে চলেছ? ক্রোধ ত্যাগ করে, সংযত হও, এই যুদ্ধ সমাপ্ত করো।  বৎস ধ্রুব, যক্ষরাজ কুবেরকে মহাদেব গিরীশ নিজের ভাই মনে করেন। নিরপরাধ যক্ষদের হত্যা করে তুমি মহারাজ কুবেরকে অপমান করেছ। অতএব, এখনই যুদ্ধ বন্ধ করে মহারাজ কুবেরকে প্রণাম করো, তাঁকে প্রসন্ন করো”।

[পুরাণ বলে ষড় রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য - জয় না করতে পারলে, পরমপুরুষ শ্রীহরির দর্শন লাভ অসম্ভব। তাহলে ধ্রুব কেন এত ক্রোধী হয়ে উঠতে পারলেন, নাকি ভগবান দর্শনের পরে তাঁর ক্রোধ আবার ফিরে এসেছিল?]

পিতামহের উপদেশে মহারাজ ধ্রুব যুদ্ধ থেকে বিরত হলে, যক্ষরাজ কুবের সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি জোড়হাতে ধ্রুবকে বললেন, “হে মহারাজ, পিতামহের আদেশে তুমি এই ভয়ংকর যুদ্ধ ত্যাগ করেছ, এই কারণে আমি সন্তুষ্ট হলাম। আমাদের প্রতি তোমার শত্রুভাব পরিত্যাগ করো। মনে রেখো, কালই সকল জীবের জন্ম ও মৃত্যুর নিয়ামক, অতএব তোমার ভাইকে যক্ষগণ কিংবা তুমিও কোন যক্ষকে বিনাশ করো নি। জীবের অজ্ঞান থেকেই “আমি”, “তুমি” এই মিথ্যা মায়ার সৃষ্টি হয় এবং সেই মোহবুদ্ধি থেকেই সংসারের দুঃখ অনুভব হয়। শুনেছি তুমি শ্রীহরির চরণলাভ করেছ, অতএব তুমি ভববন্ধনখণ্ডনকারী শ্রীনারায়ণের ভজনা করো। তোমার মঙ্গল হোক, তুমি নিজের ঘরে ফিরে যাও। তার আগে আমি তোমাকে বর দিতে চাই, তুমি নির্ভয়ে আমার থেকে তোমার মনোমত বর প্রার্থনা করো”। মহারাজ ধ্রুব, যক্ষরাজ কুবেরের কাছে সেই অবিচলিত হরিস্মৃতি লাভের বর প্রার্থনা করলেন, যার প্রভাবে অন্তর থেকে অজ্ঞানের সব অন্ধকার দূর হয়ে যায়। কুবের প্রসন্নমনে ধ্রুবকে এই বর দান করলেন, তারপর তিনি ফিরে গেলেন তাঁর রাজভবনে। মহারাজ ধ্রুবও ফিরে এলেন তাঁর রাজপুরীতে।

নিজের রাজ্যে ফিরে এসে মহারাজ ধ্রুব অনেক যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে যজ্ঞেশ্বরের আরাধনা করলেন ও প্রচুর দক্ষিণা দান করতে লাগলেন। তাঁর প্রজারা তাঁকে পিতার মতো মনে করত। এইভাবেই মহারাজ ধ্রুব ভোগ করতে করতে পুণ্যক্ষয় করলেন এবং যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে অশুভক্ষয় করতে করতে ছত্রিশ হাজার বছর রাজ্য শাসন করলেন। তারপর একদিন এই বিশ্বকে ভগবানের মায়ায় বিরচিত উপলব্ধি করে, তিনি পুত্রের হাতে সিংহাসন তুলে দিলেন। নিজের দেহ, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বন্ধুবর্গ, সৈন্যদল, সমৃদ্ধ রাজকোষ, অন্তঃপুর এবং সসাগরা এই পৃথিবীকেও তাঁর অনিত্য মায়া মনে হওয়ায়, সব কিছু ছেড়ে তিনি বদরিকাশ্রমে চলে গেলেন। সেখানে পবিত্র জলে স্নান করে তিনি ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, যোগাসনে বসলেন।

শ্রীহরির প্রতি পরমাভক্তিতে তিনি প্রাণকে জয় করলেন, মন থেকে সমস্ত ইন্দ্রিয় ত্যাগ করলেন। পরম আনন্দে তাঁর হৃদয় অভিভূত হল, তার দেহ পুলকিত হল, তিনি শরীরের অভিমান ত্যাগ করে নিজেকেও বিস্মৃত হলেন। এইসময় তিনি দেখতে পেলেন নির্মল জোৎস্নার মতো চারিদিক উদ্ভাসিত করে, শ্রেষ্ঠ বিমানে চড়ে দুই দেবশ্রেষ্ঠ নেমে আসছেন আকাশ থেকে। তাঁরা চতুর্ভুজ, শ্যামবর্ণ, বয়সে কিশোর এবং পদ্মের মতো তাঁদের নয়ন। তাঁদের হাতে গদা, পরনে সুন্দর বস্ত্র, অঙ্গে সুন্দর অলংকার, মাথায় মুকুট, কানে কুণ্ডল। তাঁরা মহারাজ ধ্রুবর কাছে এসে বললেন, “হে রাজা, আমরা পদ্মনাভ শ্রীবিষ্ণুর দুই পার্ষদ সুনন্দ ও নন্দ। তোমার পরমমঙ্গলের কাল উপস্থিত। মাত্র পাঁচ বৎসর বয়সে তপস্যা করে তুমি যাঁকে প্রসন্ন করেছিলে, অখিল জগতের বিধাতা সেই ভগবান, তোমাকে সশরীরে ভগবৎ ধামে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাদের পাঠিয়েছেন। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারা যাঁকে প্রদক্ষিণ করছে, তুমি সেই পরম পদ লাভ করেছ। অতএব তুমি এই বিমানে আরোহণ করো”।

ভক্তশ্রেষ্ঠ ধ্রুব, শ্রীহরির পার্ষদ দুজনের এই অদ্ভূত বাণী শুনে স্নান ও নিত্যকর্ম সম্পন্ন করলেন। তারপর উপস্থিত মুনিদের প্রণাম করে, সকলের আশীর্বাদ নিলেন। তারপর সেই দিব্য বিমান ও পার্ষদ দুইজনকে প্রদক্ষিণ করে অর্চনা করে যখন বিমানে উঠলেন, চারদিক থেকে পুষ্পবৃষ্টি শুরু হল, দুন্দুভি, মৃদঙ্গ, শঙ্খ বেজে উঠল।  বিমানে ওঠার পর, তাঁর মন মায়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল, “আমার দুঃখিনী মা সুনীতিকে ত্যাগ করে, আমি দুর্লভ বিষ্ণুলোকে যাচ্ছি”। তাঁর মনের কথা বুঝে দুই পার্ষদ বললেন, “দেবী সুনীতিও অন্য বিমানে আপনার আগে আগেই চলেছেন”। চলার পথে তিনি সকল গ্রহ দেখতে পেলেন, তারপর ত্রিলোকী এবং সপ্তর্ষিমণ্ডল পার হয়ে পৌঁছে গেলেন বিষ্ণুধামে। এইভাবেই ধ্রুবর ধ্রুব অর্থাৎ অক্ষয় গতি লাভ হল। যাঁরা সর্বদা শুভ আচরণ করেন, তাঁরাই এই লোকে পৌঁছতে পারেন।

হে বিদুর, যিনি শিশুর খেলনা এবং মায়ের কোল পরিত্যাগ করে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন, সেই বিশাল কীর্তি বিখ্যাত ধ্রুবর সজ্জনসম্মত চরিত্র আমি তোমার কাছে বর্ণনা করলাম। এই মহৎ চরিত্রের কথা জীবকে ধন, যশ, আয়ু, পুণ্য, স্বর্গ এবং পরিশেষে ধ্রুবলোক প্রদান করে থাকে।

 

ধ্রুবর পরবর্তী বংশধরগণের পরিচয়  

কুশারুপুত্র মহর্ষি মৈত্রেয়র মুখে ধ্রুবর বৈকুণ্ঠপদ লাভের বর্ণনা শুনে বিদুরের মনে ভগবান অধোক্ষজে ভক্তিভাব সঞ্চারিত হল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হে মুনিবর, দেবর্ষি নারদ মহাভাগবত, তিনি শ্রীহরির পরিচর্যাপ্রকার পাঁচরাত্রে লিখে ফেলেছিলেন। স্বধর্মশীল প্রচেতারা যখন ভগবান যজ্ঞপুরুষের যজনা করছিলেন, তখন দেবর্ষি নারদ ভগবান শ্রীহরির স্তব করছিলেন। এই প্রচেতারা কে এবং কার সন্তান? তাঁরা কোন বংশে জন্ম নিয়েছিলেন এবং কোথায় যজ্ঞ সাধনা করেছিলেন, দয়া করে বর্ণনা করুন”। 

মৈত্রেয় বললেন, “পিতা ধ্রুব সংসার ত্যাগ করে বনে চলে যাওয়ার পর, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র উৎকল রাজ্য ও রাজসিংহাসন অধিকার করলেন না। তিনি জন্ম থেকেই শান্ত, নিঃসঙ্গ ও সকল বিষয়ে সমদর্শী ছিলেন। তিনি তাঁর আত্মায় এই নিখিললোক এবং নিখিললোকে নিজের আত্মাকে সর্বদা প্রত্যক্ষ করতেন। সেই কারণে রাজ্যের কুলবৃদ্ধেরা উৎকলের ছোট ভাই বৎসরকে রাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। বৎসর ও তাঁর প্রিয় পত্নী সুবীথীর ছয় পুত্র – পুষ্পার্ণ, তিগ্মকেতু, ইষ, ঊর্জ, বসু ও জয়। পুষ্পার্ণের প্রভা ও দোষা নামে দুই পত্নী ছিলেন। প্রাতঃ, মধ্যন্দিন ও সায়ম এই তিনজন প্রভার পুত্র, আর প্রদোষ, নিশীথ ও ব্যুষ্ট এই তিন দোষার পুত্র। ব্যুষ্টের পত্নী পুষ্করিণীর গর্ভে সর্বতেজা নামে এক পুত্র হয়, তার আরেক নাম ছিল চক্ষুঃ। চক্ষুর পত্নী আকূতির গর্ভে চাক্ষুষ মনু জন্মগ্রহণ করেন। মনুর পত্নী নড্বলা বারোটি শুদ্ধচরিত্র পুত্রের মাতা, তাদের নাম, পুরু, কৃৎস্ন, ঋত, দ্যুম্ন, সত্যবান, ধৃত, ব্রত, অগ্নিষ্টোম, অতীরাত্র, প্রদ্যুম্ন, শিবি ও উল্মুক। উল্মুকের ছয় পুত্র, অঙ্গ, সুমনাঃ, স্বাতি, ক্রতু, অঙ্গিরা ও গয়। অঙ্গের পত্নী সুনীথার গর্ভে উগ্রস্বভাব বেণের জন্ম হয়। রাজর্ষি অঙ্গ পুত্র বেণের অনাচারে বিরক্ত হয়ে বৈরাগ্য নিয়ে রাজপুরী ত্যাগ করেছিলেন। ক্রুদ্ধ মুনিদের অভিশাপে বেণের প্রাণ বিয়োগ হয়, কিন্তু রাজ্যে প্রজাপালনের স্বার্থে মুনিগণ মৃত বেণের দক্ষিণ কর মন্থন করলে, নারায়ণের অংশে পৃথুর জন্ম হয়”।

শ্রীবিদুর জিজ্ঞাসা করলেন, “মহারাজ অঙ্গ সাধুচরিত্র, সদাচারী, ব্রাহ্মণভক্ত ও মহাত্মা ছিলেন, তাঁর পুত্র বেণ কিভাবে এত অনাচারী হলেন যে, তাঁকে রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হল? প্রজাপালক রাজা অপরাধী হলেও, প্রজাদের অবহেলার পাত্র হতে পারেন না, কারণ তিনি লোকপালদের প্রভাব ধারণ করে থাকেন। অতএব ধর্মজ্ঞ মুনিগণই বা কিসের কারণে তাঁর প্রতি ব্রহ্মশাপ প্রয়োগ করেছিলেন? আপনি দয়া করে আমাকে সুনীথাপুত্র বেণের চরিত্র বর্ণনা করুন”।

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “একবার রাজর্ষি অঙ্গ অশ্বমেধ মহাযজ্ঞের আয়োজন করলেন, কিন্তু ব্রহ্মবাদী যাজ্ঞিকগণ দেবতাদের আহ্বান করলেও, দেবতারা সেই যজ্ঞে উপস্থিত হলেন না। সেই যজ্ঞে পবিত্র হবি আহুতি নিবেদন এবং ব্রতশীল ব্রাহ্মণেরা শ্রদ্ধার সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণ করলেও, কোন দেবতাই তাঁদের যজ্ঞভাগ নিতে এলেন না। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার দেখে মহারাজ অঙ্গ ব্যাকুল হয়ে সমবেত ব্রাহ্মণদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে, তাঁরা বললেন, “হে মহারাজ, এই জন্মে আপনার সামান্য পাপও অবশিষ্ট নেই, কিন্তু আপনার জন্মান্তরের একটি অপরাধ রয়ে গেছে, যার কারণে আপনি এই জন্মে অপত্যহীন। অতএব, আপনি পুত্রের কামনায় শ্রীহরির অর্চনা করুন, তিনি সন্তুষ্ট হলে আপনার পুত্রলাভ নিশ্চিত। অপত্য লাভের জন্য যজ্ঞপুরুষ শ্রীহরির যজ্ঞে সকল দেবতাই তাঁদের যজ্ঞভাগ গ্রহণ করবেন”।   

“মানুষ যা কামনা করে, শ্রীহরি তাই দান করে থাকেন। অতএব ব্রাহ্মণেরা পুত্রপ্রাপ্তির জন্যে বিষ্ণুর উদ্দেশে যজ্ঞে আহুতি দিলেন। সেই যজ্ঞের আগুন থেকে এক দিব্য পুরুষ উঠে এলেন, তাঁর হাতে ধরা সোনার পাত্রে পায়েস ছিল, সেই পুরুষের গলায় সোনার মালা, পরনে অমল বসন। ব্রাহ্মণদের অনুমতি নিয়ে মহারাজ অঙ্গ সেই পায়েস দুইহাতে গ্রহণ করলেন এবং আনন্দের সঙ্গে তাঁর পত্নীর হাতে তুলে দিলেন। সেই পায়েস খাওয়ার পর স্বামীর ঔরসে দেবী সুনীথা গর্ভধারণ করলেন ও যথাসময়ে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন, তিনিই বেণ।

দেবী সুনীথার পিতা মৃত্যুর জন্ম হয়েছিল অধর্মের অংশ থেকে। বালক পুত্র মাতামহের মতোই অধার্মিক হয়ে উঠতে লাগল। বালক বেণ ব্যাধবেশে বনে গিয়ে অসহায় হরিণদের দলে দলে হত্যা করতে লাগল। খেলার সঙ্গী বালকদের সে পশুর মতো নিষ্ঠুরভাবে বধ করতে লাগল। মহারাজ অঙ্গ পুত্রকে বহুভাবে শাসন করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোন রকমেই তাকে দমন করতে পারলেন না। কুপুত্র থেকে মানুষের অখ্যাতি, অধর্ম, মানুষের সঙ্গে বিরোধ ও অশেষ মনোকষ্ট হয়। মহারাজ এই কথা চিন্তা করতে করতে বিষণ্ণমনে একরাত্রে শুতে গেলেন, কিন্তু সারারাত তাঁর ঘুম হল না। সারারাত চিন্তার পর তিনি বৈরাগ্যের সিদ্ধান্ত নিলেন, তারপর কাউকে কিছু না বলে সকলের অলক্ষ্যে রাজপুরী ত্যাগ করলেন। মন্ত্রী ও অমাত্যগণ পরদিন সকালে মহারাজ অঙ্গের অনেক সন্ধান করল, কিন্তু তাঁকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে ফিরে এল। অবশেষে অরাজক রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আশায় ভৃগুপ্রমুখ মহামুনিগণ সকল অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে রাণী সুনীথার উপস্থিতিতে বেণকেই রাজ্যে অভিষিক্ত করলেন।

[ধার্মিক রাজা অঙ্গের পুত্র বেণ কেন অধার্মিক হয়ে উঠল? এই প্রশ্নের সহজ সমাধান করে ফেললেন পুরাণকারগণ। তাঁরা বেণের মাতৃকূলকেই দোষী সাব্যস্ত করে বললেন, তাঁরা নাকি অধর্মের অংশ! রাজা অঙ্গের বিয়ের আগে পাত্রী সন্ধানের সময় রাজজোতিষীরা দেবী সুনীথার বংশ পরিচয় জানতেন না, নাকি তাঁরা দেবী সুনীথার কোষ্ঠী বিচার করেননি? নাকি তাঁদের পুত্র অত্যাচারী হয়ে উঠতেই নিজেদের দোষ ঢাকতে মাতৃকূলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেললেন!]          

চলবে...


শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪৫

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?] 



৫০

 

বিকেলে ভল্লা নোনাপুর গ্রামে গেল বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলতে। আর সেই একই সময় রাজধানী কদম্বপুরের মুখ্য প্রশাসনিক কার্যালয়ের কর্মব্যস্ততা আচমকাই কিছুটা বেড়ে উঠল। অন্যান্য আধিকারিকদের সঙ্গে রাজ্যাধিকারিক গভীর কিছু আলোচনা সেরে, হন্তদন্ত হয়ে দেখা করতে গেলেন, মহামন্ত্রীর কার্যালয়ে। মহামন্ত্রী তাঁর নিভৃত কক্ষে একলাই বসে কাজ করছিলেন। কক্ষের দ্বার ঈষৎ ফাঁক করে রাজ্যাধিকারিক বিধিবন্ত অনুমতি চাইলেন, “মান্যবর, ভেতরে আসতে পারি?”

মহামন্ত্রী মুখ তুলে বিধিবন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এস বিধিবন্ত। বস। মনে হচ্ছে খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছ? কী ব্যাপার?”

পুরু গদির ওপর দুধসাদা চাদর বিছানো তক্তপোশের এক প্রান্তে বসেছিলেন মহামন্ত্রী। বিধিবন্ত সেই তক্তপোশের অন্য  প্রান্তে বসে বললেন, “আজ্ঞে মান্যবর, রাজ্যের পশ্চিম সীমান্তের আস্থান থেকে ওখানকার করাধিকারিকের একটি দীর্ঘ পত্র পেলাম একটু আগে। ওদিকের অবস্থা সাংঘাতিক”।

মহামন্ত্রী নিরুদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রকম?”

“আজ্ঞে, মান্যবর বিগত সোমবার, ঘোর অমাবস্যার রাত্রিতে – আশেপাশে গ্রামের কিছু উদ্ধত ছোকরা মধ্যরাত্রে আস্থান আক্রমণ করেছিল। সশস্ত্র ছোকরার দল প্রায় এক ঘটিকা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে, হত্যা করেছে আস্থানের রক্ষীসর্দার উপানুকে এবং আস্থানের চোদ্দজন রক্ষীকে। ছোকরার দল চলে যাবার পরেই, অবশিষ্ট রক্ষীরা আতঙ্কে আস্থান ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। মঙ্গলবার ভোর থেকে করাধিকারিক শষ্পকের ব্যক্তিগত রক্ষীরাই আস্থানের সুরক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। মান্যবর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখানে অনেক বেশি সংখ্যক নতুন রক্ষী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে – নচেৎ আস্থানে সঞ্চিত রাজসম্পদ আর রক্ষা করা যাবে না”।

“এতে এত উত্তেজিত হয়ে উঠলে কেন, বিধিবন্ত? এরকম যে ঘটতে চলেছে, সে তো আমাদের জানাই ছিল”।

“মান্যবর, তা ছিল। কিন্তু এতগুলি রক্ষীসহ রক্ষী-সর্দারের মৃত্যু - আমাদের সুরক্ষা মন্ত্রক সহজে মেনে নেবে না। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে এটা প্রশাসনিক দুর্বলতা। গ্রামের ছাপোষা ঘরের ছেলেপুলের দল কীভাবে এত অস্ত্র পেল? এবং কীভাবেই বা তারা প্রশিক্ষিত রক্ষীদের আক্রমণ করার সাহস পেল? এ সব তো একদিনে হয়নি, মান্যবর। ওরা বলবে, আগে থেকে আমাদের গুপ্তচরবাহিনী এই ঘটনা যে ঘটতে পারে, আঁচ করতে পারেনি কেন?”

মহামন্ত্রী কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন, “বিধিবন্ত, স্বীকার করছি, প্রশাসন এই ঘটনার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কিন্তু রাজ্যে কোথায় কোন গ্রামে কী ধরনের ক্ষোভ বা অশান্তি ঘনিয়ে উঠছে – তার সংবাদ রাখার প্রধান দায়িত্ব সুরক্ষা মন্ত্রকের। তাই না?” একটু বিরতি দিয়ে তিনি আবার বললেন, “রাজধানী থেকে অস্ত্র বিপণন করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে তুমি অবহিত বিধিবন্ত। সোমবারের ঘটনা যে সেই পরিকল্পনারই অঙ্গ – একথাও তোমার না বোঝার তো কোন কারণ নেই। এ বিষয়ে আমরা সুরক্ষামন্ত্রক এবং সেনামন্ত্রককে কিছুই জানাইনি – অন্ধকারে রেখেছি। তার কারণ এ ধরনের পরিকল্পনা সকল মন্ত্রককে জানিয়ে, সকলের অনুমোদন নিয়ে করতে গেলে – গোটা কাজটাতেই বিলম্ব হত এবং নানান বিঘ্ন এবং বিরুদ্ধ মতামত উপস্থিত হয়ে ভেস্তে যেতে পারত”।

“সে কথা সত্যি, মান্যবর। এবং একথাও সত্যি – আমাদের পরিকল্পনা যে সফল হতে চলেছে, এ ঘটনা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ”।

“তাহলে? তুমি এত উতলা হয়ে উঠছো কেন বলো তো? সুরক্ষা মন্ত্রক এই প্রসঙ্গ নিয়ে আমার কাছে আসার আগেই, আগামীকাল মন্ত্রীসভায় আমি নিজেই এ প্রসঙ্গে তুলবো। সুরক্ষা মন্ত্রককে কোনভাবেই মাথা তুলতে দেওয়া যাবে না। নচেৎ আমার তো বটেই স্বয়ং মহারাজের পক্ষেও ব্যাপারটা অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে”।

একটু চিন্তা করে মহামন্ত্রী বললেন, “তোমার ওই ছোকরা আধিকারিক – কী নাম বললে যেন?”

“আজ্ঞে শষ্পক, মান্যবর”।

“হ্যাঁ শষ্পক। তার পাঠানো যাবতীয় পত্রাদি তোমার কাছে আছে?”

“আছে মান্যবর”।

“এখনই আমার কাছে নিয়ে এস। আমরা আবার বসব। তার মধ্যে আমি মহারাজার সঙ্গে একটু দেখা করে আসি। তাঁকে এই সাম্প্রতিক ঘটনার সংবাদটা দিয়ে, আগামী কাল মন্ত্রীসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুমোদনটাও নিয়ে আসি। আর শোন, তোমার কার্যালয়ে অকারণ আতঙ্ক, উদ্বেগ ছড়িও না। তোমার অধীনস্থ যে দু’জন দক্ষ গুপ্তকর্মী এই কাজে নিযুক্ত – তাদের বিশ্বস্ততা নিয়ে তুমিই আমাকে একসময় যথেষ্ট আস্থা জানিয়েছিলে। সে বিশ্বাস তোমার থাকা উচিৎ”।

“ঠিকই মান্যবর। হঠাৎ সংবাদটা পেয়ে আমি কিছুটা...মানে এত হত্যা, তাও আমাদেরই রক্ষীদের...আমি বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম, সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যদি”?

মহামন্ত্রী হাসলেন, “তুমি যাও পত্রগুলো তাড়াতাড়ি নিয়ে এস...আর আমিও মহারাজের সঙ্গে দেখা করে আসি”।

 

পরদিন প্রথম প্রহর সমাপ্তির দণ্ডখানেক আগেই সভাঘরে আহুত মন্ত্রীগণ একে একে উপস্থিত হলেন। তাঁদের সঙ্গে এলেন সকল মন্ত্রকের মুখ্য আধিকারিকগণও। পারষ্পরিক কুশলবার্তা বিনিময় করে, প্রত্যেকেই মর্যাদা অনুযায়ী নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তারপর মৃদু গুঞ্জনে আলাপ শুরু করলেন, বিশেষ এই অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় কী? আকস্মিক এই সভা আহ্বানের কারণই বা কী?

একমাত্র রাজ্যাধিকারিক ছাড়া উপস্থিক কেউই এই সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত নন। এবং রাজ্যাধারিকও সকলকে অবহিত করায় আদৌ উৎসাহী ছিলেন না। অতএব উপস্থিত মন্ত্রী ও মুখ্যাধিকারিকদের অনুমান এবং কৌতূহলী আলোচনার গুঞ্জন চলতেই থাকল।

রাজসভার বাইরে প্রহরী প্রথম প্রহর সমাপ্তির তৃতীয় ঘন্টা বাজিয়ে দিতেই – গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। সভাঘরে উপস্থিত সকলেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর ঠিক তখনই রাজান্তঃপুরের দিকের দরজা খুলে সভাঘরে প্রবেশ করল রাজরক্ষীর দল। ঘোষণা করল রাজার আগমনবার্তা। রক্ষীদলের পিছনে মহারাজা এলেন। তাঁর পিছনে এলেন মহামন্ত্রীও। সশস্ত্র রক্ষীরা নিয়মনিষ্ঠ শৃঙ্খলায় দাঁড়িয়ে পড়ল সিংহাসনের পিছনে ও দুপাশে এবং সভাঘরের প্রত্যেকটি দরজায়। মহারাজ সিংহাসনের সামনে এবং মহামন্ত্রী নিজ আসনের সামনে দাঁড়িয়ে সকলকে অভিবাদন করলেন। তারপর মহারাজ সিংহাসনে বসে সকলকে বসার অনুরোধ করতে, সকলেই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তারপর মহারাজের ইঙ্গিতে, জনৈক প্রহরী মৃদু কিন্তু গম্ভীর একটিমাত্র ঘন্টাধ্বনি দিয়ে সভার শুরু ঘোষণা করল।

মহারাজা অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন, “মহামন্ত্রী মহোদয়, আজকের এই বিশেষ অধিবেশনের আহ্বায়ক আপনিই। অতএব আপনার বক্তব্য দিয়েই আজকের সভার সূচনা করুন”।

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন, মহারাজাকে অভিবাদন করে সভাস্থ সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাননীয় সহমন্ত্রীবৃন্দ এবং আদরণীয় আধিকারিকদের সকলকেই আমার শুভেচ্ছা জানাই। গতকাল অপরাহ্নে মুখ্যাধিকারিক, বিধিবন্ত মহাশয় আমাকে ভয়ানক একটি সংবাদ শোনালেন। বার্তাটি শুনে আমি যেমন বিচলিত তেমনই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। তৎক্ষণাৎ রাজপুরীতে গিয়ে আমি মহারাজ সকাশে বার্তাটি নিবেদন করে, মহারাজের অনুমতিক্রমে আজকের এই বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করি।

বার্তাটি সংক্ষেপে বলি। বিগত সোমবার মধ্যরাত্রে, স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল সশস্ত্র যুবক বিনা প্ররোচনাতেই আমাদের পশ্চিম-সীমান্তবর্তী আস্থানে আচমকা হানা দিয়েছিল। এই আক্রমণে নিহত হয়েছেন ওই আস্থানের রক্ষীপ্রধান এবং তাঁর সহকর্মী চোদ্দজন রক্ষী”।

সভায় উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে এবং আতঙ্কে অস্ফুট আওয়াজ করে উঠল।

“যতদূর জানা গেছে হিংস্র ওই যুবকদলের উদ্দেশ্য ছিল, আস্থানে বন্দী প্রাজ্ঞ ও বৃদ্ধ এক কবিরাজকে মুক্ত করা। কিন্তু ওই বৃদ্ধ কবিরাজকে আস্থানের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করার আগেই, তিনি ইহলোকের মায়া থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু ঠিক কী কারণে হয়েছিল – স্পষ্ট জানা যায়নি। তাঁর মৃত্যুর জন্যে কারা দায়ী সে কথাও স্পষ্ট হয়নি”। সামান্য বিরতি দিয়ে মহামন্ত্রী আবার বললেন, “ওই যুবকের দল আস্থানে যদৃচ্ছা তাণ্ডব করার পর এবং কবিরাজের মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ভীত-সন্ত্রস্ত অবশিষ্ট রক্ষীদের সকলেই আস্থান ত্যাগ করে চলে গেছে। অর্থাৎ এখন আস্থান প্রায় অরক্ষিত। করাধিকারিকের ব্যক্তিগত প্রশাসনিক রক্ষী আছে আটজন। তারাই আপাততঃ রয়েছে সম্পূর্ণ আস্থানের দায়িত্বে।

আমাদের আশু কর্তব্য - যত শীঘ্র সম্ভব আস্থানের পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রশাসনের সদ্ভাব ফিরিয়ে আনা। যাতে এরকম চরম অপ্রীতিকর ঘটনা ভবিষ্যতে কোন ভাবেই আর না ঘটে। এই অধিবেশনে এই বিষয়েই পর্যালোচনা করে, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট করতে চাই”।

বক্তব্য শেষ করে মহামন্ত্রীমশাই আসন গ্রহণ করা মাত্র, আন্তঃরাজ্য সুরক্ষা মন্ত্রী উত্তেজিত হয়ে বললেন, “মহামান্য মহারাজ এবং সম্মাননীয় মহামন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন – এতগুলি রক্ষী এবং স্বয়ং রক্ষীপ্রধানের হত্যার ঘটনা ভুলে গিয়ে – আঞ্চলিক লোকদের সঙ্গে কী ভাবে সদ্ভাব ফিরিয়ে আনা সম্ভব? নিহতরা এই জঘন্য হত্যার কোন প্রতিকার পাবে না?”

মহামন্ত্রী বললেন, “কী ধরনের প্রতিকার আপনি আশা করছেন, মন্ত্রীমশাই? যে যুবকেরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট পরিচয় পাওয়া সম্ভব হবে কি? যদি সম্ভব হয় তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তিবিধান করা যেতেই পারে। আর যদি তা না করা যায় আমরা কি সন্দেহের বশে গ্রামবাসী সকল মানুষকেই উত্যক্ত করবো? ভুলে যাবেন না ওই মানুষগুলিও আমাদেরই রাজ্যবাসী। হাতে গোনা কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের জন্যে – নিরীহ গ্রামবাসীদের সকলকে বিক্ষুব্ধ করে তুললে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।   যতদূর জানি প্রথম থেকেই উভয়পক্ষের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়েছিল। আমি চাই সেই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন, “আমি মাননীয় মহামন্ত্রীর সঙ্গে পূর্ণতঃ একমত। ওই গ্রামগুলি এমনিতেই সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল অঞ্চল। তার ওপর যতদূর জানি – অনুর্বর ও রুক্ষ ওই অঞ্চলটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত দুর্বল। অতএব অধিবাসীদের আরও ক্ষুব্ধ না করে তুলে – মীমাংসা করে শান্তি স্থাপনা করাই এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায় সুরক্ষামন্ত্রী বেশ উষ্মা নিয়েই বললেন, “আমিও মীমাংসার পক্ষেই রয়েছি, মহারাজ। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত কোন পক্ষের থেকে শুরু হয়েছিল - এই মন্ত্রীসভার সেটাও জানা প্রয়োজন”।

মহারাজ বললেন, “এই সভা আহুত হয়েছে সব কথা পর্যালোচনার জন্যেই – আপনি বলুন, মন্ত্রীমশাই”।

সুরক্ষামন্ত্রী বেশ উৎসাহিত হয়ে বললেন, “এই যুবক দলটি এর আগেও একবার আস্থানে হানা দিয়েছিল মহারাজ – প্রায় মাস দেড়েক আগে। সেবারও আমাদের তিন রক্ষীকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ওই আক্রমণে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র অপহৃত হয়েছিল, এবং কোষাগার থেকে কিছু রৌপ্যমুদ্রাও চুরি গিয়েছিল”।

মহামন্ত্রী রাজ্যাধিকারিক বিধিবন্তকে বললেন, “আধিকারিকমশাই,  আপনি এ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারেন কি?”

বিধিবন্ত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে প্রণাম করে বললেন, “হ্যাঁ মন্ত্রী মহোদয় ওই ঘটনার পর আমাদের আস্থানের আধিকারিকমশাই, যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তার সংক্ষিপ্তসার হল – ওই অঞ্চলের নোনাপুর গ্রামের গ্রামপ্রধান আমাদের আধিকারিককে রাজস্ব হার কিছুটা কমানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়। কারণ ওই গ্রামপ্রধান নির্বাসন দণ্ড পাওয়া এক অপরাধীকে, নিজের বাড়িতে বেশ কিছুদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ মহারাজ, ওই ঘটনাতেই গ্রামবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আস্থান আক্রমণ করে”।

মহারাজ বললেন, “বুঝলাম, তারপর?”

বিধিবন্ত বললেন, “আস্থান আক্রমণের পর আধিকারিক রক্ষীপ্রধানকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, অপরাধী যুবকদের চিহ্নিত করতে এবং চুরি যাওয়া অস্ত্রশস্ত্রগুলির সন্ধান করতে। তাঁর ধারণা ছিল, চুরি যাওয়া রৌপ্যমুদ্রা গোপন করা সহজ হলেও, অতগুলি অস্ত্র রাতারাতি গোপন করা সহজ হবে না”।

মহারাজ বললেন, “নিঃসন্দেহে উচিৎ সিদ্ধান্ত। তারপর?”

বিধিবন্ত বললেন, “মান্যবর মহারাজ, কোন যুবককেই চিহ্নিত করা যায়নি – এবং কোন অস্ত্রশস্ত্রেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি”।

মহারাজ বিস্মিত হয়ে সুরক্ষামন্ত্রীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। সুরক্ষামন্ত্রী ইতস্ততঃ করে বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের রক্ষীপ্রধান গ্রামগুলিতে একবার অনুসন্ধানে গিয়েছিল – কিন্তু সফল হয়নি… তারপর আধিকারিকমশাইও এই ব্যাপারে তাদের আর কোন নির্দেশ দেননি”।

বিধিবন্ত অত্যন্ত বিনীতভাবে বললেন, “মান্যবর মন্ত্রীমশাই, আমাদের আধিকারিক রক্ষীপ্রধানকে আর কোন নির্দেশ দেননি – এই কথাটি ঠিক নয় – প্রকৃতপক্ষে তিনি নির্দেশ দিতে ভয় পেয়েছিলেন”।

মহারাজ অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আধিকারিক ভয় পেয়েছিলেন? কেন?”

“রক্ষীপ্রধান ও তাঁর সঙ্গীদল প্রথম দিন গ্রামে গিয়েই অনুসন্ধান করার নামে সাধারণ বয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের ওপর যে বীভৎস অত্যাচার করেছিলেন – আপনার রাজত্বকালে ওরকম লজ্জাজনক ঘটনা এর আগে কোনদিন কোথাও হয়নি, মহারাজ। রক্ষীপ্রধান নিজের হাতে পাশের সুকরা গ্রামের শ্রদ্ধেয় এক বয়স্ক ব্যক্তিকে অকারণ এমনই প্রহার করেছিলেন - সে ব্যক্তি আজও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। রক্ষীপ্রধান ও সঙ্গীরা নোনাপুর গ্রামের বৃদ্ধ প্রধানকে এমনই মেরেছিলেন – অসহায় বৃদ্ধ আটদিন অচৈতন্য থাকার পর দেহরক্ষা করেছেন। রক্ষীপ্রধান ওই অঞ্চলের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় এবং প্রাজ্ঞ ও বৃদ্ধ কবিরাজমশাইকে বন্দী করে আস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে। প্রয়োজনে অত্যন্ত মাননীয় ব্যক্তিকেও বন্দী করতে হয় মহারাজ, কিন্তু তার মধ্যেও যথেষ্ট শালীনতা বজায় রাখাই বিধি – কারণ তিনি সাধারণ উঞ্ছ প্রবৃত্তির চোর নন। তাঁর পক্ষে আস্থানে নিজে গিয়ে ডাকাতি করা অথবা যুবকদের ডাকাতি করতে প্ররোচিত করা – একেবারেই অসম্ভব। একথা বুঝেও রক্ষীপ্রধান তাঁর ঘোড়ার পিঠে বৃদ্ধকে ঝুলিয়ে প্রায় চারক্রোশ দূরের আস্থানের বন্দীশালায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধ কবিরাজমশাইয়ের দুটি পা পথের পাথরে, ঝোপেঝাড়ে ধাক্কা খেতে খেতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। আস্থানের বন্দীশালায় তিনি নিজেই নিজের চিকিৎসা করছিলেন ঠিকই, কিন্ত সুস্থ হলেও, তাঁর পক্ষে কোনদিনই আর নিজের পায়ে হাঁটা-চলা করা সম্ভব হত না। আমরা সংবাদ পেয়েছি - গত সোমবারের আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ওঁনাকে ওই আস্থানের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করা…”।

দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ বিবৃতির পর বিধিবন্ত চুপ করলেন। মহারাজ খুব বিরক্তমুখে তাকালেন সুরক্ষা মন্ত্রীর দিকে, বললেন,  “আপনার এ বিষয়ে কোন বক্তব্য আছে মন্ত্রী মহোদয়?”

সুরক্ষামন্ত্রী কিছুটা ইতস্ততঃ করে বললেন, “রক্ষীরা আস্থানে যখন থাকে তখন আধিকারিকই তাদের একমাত্র পরিচালক, মহারাজ। হয়তো তাঁর নির্দেশেই …”।

বিধিবন্ত বললেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, আধিকারিকের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল অনুসন্ধান করার এবং প্রয়োজনে কিছুটা আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করে গ্রামবাসীদের উপর মানসিক উদ্বেগ সৃষ্টি করা। তার অর্থ এই নয় গ্রামপ্রধানকেই হত্যা করতে হবে, কিংবা বৃদ্ধ কবিরাজকে বিকলাঙ্গ করে তুলতে হবে। সত্য বলতে মান্যবর, এই দুই ব্যক্তির প্রতি আমাদের রক্ষীদের এই চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার, শুধু ওই কয়েকটি গ্রামেই নয়। সুদূর বীজপুর জনপদের জনগণ – এমনকি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের সংলগ্ন গ্রামবাসীরাও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং বিচলিত”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “মাননীয় মহারাজ, আমাদের রক্ষীরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে একথা সত্যি – তার জন্যে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া যেত”।

মহামন্ত্রী বললেন, “এ সব ঘটনা প্রায় দেড়-দু’মাস আগেকার, তাই না বিধিবন্ত? এতদিনেও তাদের বিচার বা শাস্তি কিছুই না হওয়াতেই, সাধারণ প্রজা ক্রুদ্ধ হচ্ছে, হিংস্র হয়ে উঠছে…”।

সুরক্ষামন্ত্রী বললেন, “আস্থানের আধিকারিক রক্ষীপ্রধানের কোন পরামর্শই গ্রহণ করতেন না, মহামন্ত্রী মহোদয়। এই তো – সম্প্রতি নোনাপুর গ্রামের কোন এক যুবক রক্ষীপ্রধানের কাছে এসেছিল রাজসাক্ষী হয়ে – সে বলেছিল – গ্রামের যুবকদের মধ্যে কারা কারা ডাকাতি করেছে এবং অস্ত্রশস্ত্র কোথায় রাখা থাকে সব দেখিয়ে দেবে। রক্ষীপ্রধানের সে কথায় কর্ণপাতই করেননি আধিকারিক। বরং তিনি রক্ষীপ্রধানকে এই বলে নিরস্ত করেছিলেন – ওই যুবক মিথ্যা আশ্বাসে ভুলিয়ে রক্ষীদের গ্রামে নিয়ে যেতে চাইছে – এবং সেখানে ফাঁদে ফেলে সকলকেই বিপদে ফেলবে…। সেদিন রক্ষীপ্রধান আধিকারিকের সহযোগীতা পেলে, সোমবারের ভয়ানক ঘটনা হয়তো ঘটতোই না”।

বিধিবন্ত বললেন, “এ কথা যথার্থ মন্ত্রী মহোদয় – কারণ আমাদের আধিকারিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রক্ষীপ্রধানের থেকে অনেক বেশী অবহিত – এবং তাঁর দায়িত্ব গ্রামবাসীদের সঙ্গে লড়াই করা নয় – বরং গ্রামবাসীদের সহযোগীতায় প্রশাসনের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া… তাঁর কাছে নিশ্চয়ই কিছু তথ্য ছিল – যার ভিত্তিতে তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তাছাড়া আরও একটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ, আমি এই সভায় প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি, মাননীয় মহারাজ। আমার ধারণা সুরক্ষামন্ত্রীমহোদয় এই তথ্যটি জানেন না – কিন্তু আমার মাননীয় সহকর্মী সুরক্ষাধিকারিক জানেন। আমি নিজেই তাঁকে ওই রক্ষীপ্রধানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার অভিযোগ জানিয়েছিলাম।

আস্থানের রক্ষীপ্রধান একজন কদর্য চরিত্রের ব্যক্তি। তিনি আস্থানের ভিতরেই একটি বালকের সঙ্গে নিত্য ব্যাভিচারে লিপ্ত ছিলেন। শোনা যায় দূর কোন গ্রামের অনাথ ওই বালকটিকে তার অভিভাবকের থেকে কিনে এনেছিলেন রক্ষীপ্রধান – এবং প্রায় প্রতি রাত্রেই তিনি ছেলেটিকে বলাৎকার করতেন। ছেলেটি বেশ কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেছিল – কিন্তু রক্ষীবাহিনীর কেউ না কেউ তাকে আবার ধরে এনেছে। মাননীয় মহারাজ, এই ঘটনার কথা আশেপাশের গ্রাম ও জনপদগুলিতে সকলেই জানে – এবং এই নিয়ে তারা রাজ্য প্রশাসনকে রীতিমতো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে…।  মাননীয় মহারাজ, এই ধরনের উদ্ধত, অহংকারী, দূরদৃষ্টিহীন, নির্বোধ এবং চরিত্রহীন রক্ষীপ্রধানকে আমাদের আধিকারিক ভরসা করতে পারেননি – সেটা তাঁর দুর্ভাগ্য হতে পারে – কিন্তু অপরাধ নিশ্চয়ই নয়”।

বিধিবন্ত কথা শেষ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কিছুক্ষণ পর মহারাজ বেশ দৃঢ়স্বরে বললেন, “মহামন্ত্রী মহোদয়, যা হয়ে গেছে – তা নিয়ে বিচার-বিবেচনা যা করার পরে করা যাবে। কিন্তু এই ভয়ংকর অচলাবস্থার অবসান করে স্বাভাবিক অবস্থায় কী ভাবে ফেরা যায়?”

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীমহোদয়কে – এখনই এক গুল্ম সশস্ত্র সেনা ওই অঞ্চলে পাঠাতে অনুরোধ করব। তবে হাতি এবং রথ যাবে না – সাতাশটি ঘোড়া সহ মোট নব্বই জনের দল। সেনাদের উপস্থিতি গ্রামবাসীদের মনে কিছুটা ভয় এবং ভরসা দুইই দেবে। ভয় – সেনাদের সঙ্গে চট করে কোন যুবকই লড়তে চাইবে না। আর ভরসা – আস্থানের রক্ষীবাহিনী আচমকা তাদের আক্রমণ করতে পারবে না।

আর সুরক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ – রক্ষীপ্রধান সহ, বেশ ভালো একটি সুরক্ষা দল পাঠানোর ব্যবস্থা করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কারণ হয়তো আর একমাসের মধ্যেই ওখান থেকে আস্থান গুটিয়ে আধিকারিককে উত্তরের দিকে যেতে হবে”।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন, “ঠিক কতদিনের জন্যে আপনি সৈন্যবাহিনী চাইছেন মহামন্ত্রী মহোদয়?”

মহামন্ত্রী একটু চিন্তা করে বললেন, “অন্ততঃ মাস ছয়েকের জন্য তো বটেই। কারণ ওই অঞ্চলের উন্নতিবিধানের জন্য রাজশ্যালক রতিকান্ত মহোদয়কে বিষয়াধিপতি করে পাঠানোর পরিকল্পনা আমাদের আছে। তাঁর বাসভবন নির্মাণও প্রায় শেষের দিকে। কার্যভার নিয়ে তিনি সুস্থিত না হওয়া পর্যন্ত, ওঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষাবাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীকে থাকতে হবে”।

মহারাজ বললেন, “উত্তম। আজকের সভা তাহলে এখানেই সমাপ্ত হোক। মহামন্ত্রী মহোদয় আপনি সকলের সঙ্গে কথা বলে, আগামীকাল সকালে আমাকে জানাবেন – সর্বশেষ পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে। এমন লজ্জাজনক অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের রাজ্যে আর কখনও যেন না হয় – সে দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে”।  

মহামন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “যথা আজ্ঞা মহারাজ”। অন্যান্য মন্ত্রী ও আধিকারিকরাও সসম্ভ্রমে মাথা নত করে মহারাজাকে বিদায় জানালেন।  


চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ৩০

  প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন ...