রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

একটি শিশিরবিন্দু....

   

এর আগের রম্যকথা - " ...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু " 


যতদূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ি, সাল ১৯৬৮ কিংবা ৬৯, ডোনেশানের জন্যে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল কমিটির প্রতিনিধিরা এসেছিলেন আমাদের স্কুলেও। পরেরদিন বাবার থেকে টাকা এনে জমা করেছিলাম, কত ঠিক মনে নেই, তবে দশটাকার বেশি বলে মনে হয় না। তখন তের পয়সার ট্রাম ভাড়ায় ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার যাওয়া চলত, আর পাঁঠার মাংসের দর ছিল পঁচিশ-তিরিশ টাকা কিলো। কাজেই দশ টাকাও তখনকার দিনে নেহাত কম ছিল না! স্কুল থেকে আমাদের হাতে দিয়েছিল ভাঁজ করা একটি সুন্দর লিফলেট। তাতে লেখা ছিল কন্যাকুমারীতে কিভাবে গড়ে উঠছে বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির। আর ছিল মন্দিরের একটি ছবি। নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের পটভূমিকায় গেরুয়া রঙের সেই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের মাঝখানে একখানি পাথরের দ্বীপে।

১৯৮২ সালে কন্যাকুমারীর ভারতভূমি থেকে বিবেকানন্দ রকে যাবার লঞ্চে ওঠার মুখে সেই ছবিটিই আবার যেন দেখতে পেলাম। তবে এখন আর ছবি নয় পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য। সাধারণতঃ কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিল কম হয়ে থাকে বলে আমরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকি। কিন্তু এবারে যে দৃশ্য দেখলাম, তা কল্পনার চেয়েও অনেকটাই বেশি। তিনদিকে অনন্ত সুনীল সমুদ্র। পিছনে শরতের নীল আকাশ, আকাশে হাল্কা-পুল্কা ছিট-ছাট সাদা মেঘ। মাঝখানে মাটি আর গিরি রঙের সুন্দর স্থাপত্য। জবরজং নকশা নেই, অজস্র মূর্তির কাহিনী নেই, ছিমছাম সুন্দর। সমস্ত পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোত মিশে গেছে। অন্যরকম কিছু হলে চোখে লাগত নির্ঘাৎ।

 গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের দেহরক্ষার পর বেশ কিছুদিন পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নরেন্দ্রনাথ দুবছর টানা ভারতভ্রমণ করে ১৮৯২ সালের ডিসেম্বরে কন্যাকুমারী পৌঁছেছিলেন। শোনা যায় কন্যাকুমারী মন্দিরে বসে পূর্বদিকে সমুদ্রের মধ্যে এই পাথর তাঁর চোখে পড়ে। কথিত আছে, ওই পাথরে বসেই কুমারী পার্বতী শিবকে স্বামীরূপে পাবার জন্যে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছিলেন। নরেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ওই পবিত্র পাথরে বসে তিনিও ধ্যান করবেন। কপর্দ্দকহীন নরেন্দ্রনাথকে বিনা পয়সায় পার করে দিতে কোন জেলে নৌকাই তখন রাজি হয়নি। অগত্যা অদম্য নরেন্দ্রনাথ শীতের সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সাঁতরে পার হয়েছিলেন প্রায় শপাঁচেক মিটার দূরত্ব! তিনদিন ২৫ থেকে ২৭শে ডিসেম্বর তিনি সেই পাথরে বসে ধ্যান করেছিলেন। পর্যালোচনা করেছিলেন তাঁর সমগ্র ভারত ভ্রমণের ফলাফল এবং স্থির করেছিলেন তাঁর পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা। অনেকেই অবিশ্যি এই ঘটনাকে কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, কারণ বিবেকানন্দের নিজস্ব রচনায় এবং সেই সময়কার কোন চিঠিপত্রেই এমন কোন ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায় নি।

 সিমলের নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দে উত্তরণের পথে শ্রী রামকৃষ্ণ ছাড়া আর কোন বাঙালীর তেমন কোন অবদানের কথা শোনা যায় না, বরং শোনা যায় অনেক বিরুদ্ধতার কথা। তাঁর শিকাগো ধর্ম মহা সম্মেলনে যোগদান এবং বিশ্বের দরবারে বেদান্ত দর্শনের কথা তুলে ধরার পিছনে মানসিক এবং ব্যবহারিক সাহায্য ছিল অজস্র অবাঙালী ভারতীয়ের। মাদ্রাজের আলাসিঙ্গা পেরুমল, ক্ষেত্রীর মহারাজা অজিত সিংয়ের মতো ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া তাঁর বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা সহজ হত না।

 বিবেকানন্দের মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পরে তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ শ্রীযুক্ত একনাথ রানাডের এই উদ্যোগও কম অলৌকিক নয়। একদিকে তিনি গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের মতো অদ্ভূত স্মারক, যা আজ ভারতের অন্যতম দর্শনীয় তীর্থস্থান। অন্যদিকে গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ কেন্দ্র, যেখানে বিবেকানন্দের আদর্শে গড়ে উঠবে আধুনিক যুব সমাজ, বড়ো হয়ে তারা গড়ে তুলবে বিবেকানন্দের স্বপ্নের ভারতবর্ষ।

 বিবেকানন্দ রকে দাঁড়ালাম, আমাদের পিছনে পড়ে রয়েছে আমাদের বিশাল দেশ ভারতবর্ষ। ওখান থেকে চাক্ষুষ করলাম, তিন সমুদ্রের অদ্ভূত সঙ্গম। বাঁদিকে বঙ্গোপসাগরের সবুজাভ জলরাশি, ডানদিকে ফিকে নীল আরব সাগর আর সামনে গভীর নীল ভারত মহাসাগর। এই প্রশস্ত প্রস্তরদ্বীপের গায়ে এসে অনবরত আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউ। এই ঢেউগুলি কোন সাগরের? তারা কি জানে আমরা তাদের কি নাম দিয়েছি?  আরেকবার উপলব্ধি হল এই বিশাল পৃথিবীতে কি সামান্য আর ক্ষুদ্র আমাদের অস্তিত্ব!

 বিশাল প্রান্তরে, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখেছিলাম, দেখেছিলাম সূর্যাস্তও। কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমনটা আর কোথাও দেখিনি। বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে যে শিশু সূর্যের উদয় হয়েছিল, দিনান্তে সেই সূর্যই ক্লান্ত হয়ে ডুব দিলেন আরব সাগরের জলে।

 পরদিন ভোরে আরেকবার সূর্যোদয় দেখে আমরা সকালের ট্রেনে রওনা হলাম ত্রিবান্দ্রম। ঘন্টা তিনেকের জার্নি শেষে আমরা ত্রিবান্দ্রম পৌঁছে বিকেলের দিকে দেখতে গেলাম কোবালাম বীচ। কন্যাকুমারীতে যে সূর্যোদয় দেখেছিলাম, এখানে এসে দেখলাম সেই সূর্যাস্ত। অজস্র নারকেল গাছের সবুজ, সোনালী বালুর চর, সুনীল আরব সাগরের জল, বিকেলের আকাশে অস্তগামী সূর্যের বিচিত্র রঙের খেলা। সাগরের বেলাভূমি নিয়ে এতদিন যে রোমান্টিক সব বর্ণনা পড়েছি বা সিনেমার পর্দায় দেখেছি, তার নিখুঁত দৃশ্য এই কোবালাম বীচ। পণ্ডিচেরী, রামেশ্বরম, কন্যাকুমারীতে সমুদ্রতট আছে, নেই এমন স্বর্গতুল্য বেলাভূমি। লবণাম্বু সাগরের মধ্যম ঢেউয়ে সমুদ্রস্নান সেরে আরো নমকীন হলাম কিনা জানিনা, তবে সম্পূর্ণ হল আমার সমুদ্রপাঠ। মনের মধ্যে পাহাড়ের প্রতি যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা আর রইল না, প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমিকের মতো দুজনকেই ভাগ করে দিলাম আমার মুগ্ধতা।

 ত্রিবান্দ্রম থেকে বাসে সারা রাতের জার্নি শেষে কোয়েমবাতোর হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম নীলগিরির রাণী উডাগামন্ডলম, যার আদুরে নাম উটি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ নীলগিরি পাহাড়ের চোখ জুড়োনো সবুজ ইউক্যালিপটাস, পাইনের জঙ্গল, চা বাগান, নীল জলের লেক, সব মিলিয়ে সুন্দর শহর। সবচেয়ে উঁচু পর্বত চূড়া দোদাবেতা ২৬২৩ মি, দারজিলিংযের পথে ঘুমের উচ্চতা ২২৫৭ মি আর দারজিলিং ২০৪৫ মি, উচ্চতায় অনেকটাই বেশিএতসব সৌন্দর্য থাকলেও অজস্র পাহাড়ের অনন্ত বিস্তার নেই, নেই কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজসিক সিংহাসন।  চারদিন উটিতে ভালোই লাগল, কিন্তু কোন নতুনত্ব মনে ধরা দিল না।

 উটি থেকে আমরা এবার গাড়িতে নেমে এলাম মাইশোর। ঘন্টা পাঁচেকের পথে মাঝে পড়ল বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্ট। মুদুমালাই চেকপোস্টের ফরেস্ট গার্ডদের কাছে খবর পাওয়া গেল এই ফরেস্টে বাঘ আছে, আছে চিতা। ভাগ্যে থাকলে দেখা মিলতেও পারে। আমাদের গাড়ির সারথিও চেষ্টার কসুর করল না, কিন্তু দেখা মিলল না কোন বাঘের। বাঘেরা নিশ্চয়ই জাতীয় সড়কের চেয়ে ঘন জঙ্গলের রাস্তাই বেশি পছন্দ করে। তবে চিতল হরিণের দল, সম্বর আর অনেক ময়ুর দেখা দিল পথের দুপাশে।

মাইশোর শহরের রাজবাড়ির জাঁকজমক, চামুণ্ডি হিলসে চামুণ্ডি দেবীর মন্দির দর্শন ও শহর দর্শনের পর মাইশোর আর্ট গ্যালারিতে ঘনিষ্ঠ জানাশোনা হল রাজা রবি বর্মার ছবির সঙ্গে। ত্রিবান্দ্রাম আর্ট গ্যালারিতেও বেশ কয়েকখানি ছবি দেখেছিলাম, কিন্তু এখানে অনেক। রামায়ণ, মহাভারত, পৌরাণিক নানান কাহিনীর ছবি ছাড়াও, এখানে বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে সাধারণ জীবনের নারী। আজও মনে আছে একটি ছবি। এক মহিলার বুকের কাছে বাঁহাতে ধরে থাকা প্রদীপের শিখাটি ডান হাতে আড়াল করা। মহিলার মুখে আর বুকের ওপর এবং পিছনের দেয়ালে সেই দীপের আলো আর ছায়ার অদ্ভূত মিশ্রণ। অসাধারণ সেই ছবিতে রাজা রবি বর্মার অবিশ্বাস্য রং আর তুলির দক্ষতা ভোলা যায় না। মনে থাকবে সারা জীবন।

 বৃন্দাবন গার্ডেনের মিউজিক্যাল ফাউন্টেন দেখতে আমরা যেদিন গেছিলাম, সেদিন ছিল মাইশোরের দশেরা উৎসব। অজস্র জনসমাগম এবং চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সে ছিল এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।

 মাইশোর দর্শনের পর সকালের ট্রেন ধরে আমরা রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর। ট্রেনের রিজার্ভ কামরাতেও শান্তি পাওয়া গেল না এত ভিড়। মাইশোরের দশেরা উৎসব দেখে ঘরে ফেরা দেহাতি লোকের ভিড়ে অসহায় টিকিট চেকারও রণে ভঙ্গ দিল। রিজার্ভড আসনে বসার আশা ত্যাগ করে বাবা মা কোনমতে একটু বসার জায়গা পেলেন, আমাদের দুই ভাই দাঁড়ানোর মতো আশ্রয় পেলাম টয়লেটের সামনে প্যাসেজে। প্রায় চার ঘন্টার এই ট্রেন জার্নিতে নড়া চড়া করাও বিড়ম্বনা, এমনই নিশ্ছিদ্র সেই ভিড়।

 ট্রেনের যাত্রা পথে অনেক স্টেশন পার হল – মান্ড্য, মাড্ডুর, চানাপটনা, রামনগর, বিরডি। সেদিন এই সব স্টেশনের কোন গুরুত্ব ছিল না আমার কাছে। তখন কে আর জানত আমাকে আবার কর্মসূত্রে এই অঞ্চলে ফিরে আসতে হবে। বেশ কিছুদিন থাকতেও হবে ছোট্ট শহর এই চানাপটনায়। সে সব সুদূর ভবিষ্যতের কথা। সেদিন আমাদের ট্রেন ব্যাঙ্গালোর শহরে ঢুকল প্রায় ঘন্টা দুয়েক লেট করে।

 ব্যাঙ্গালোর শহর দেখা হল। আর সিনেমা দেখা হল। সেই সময়ে ব্যাঙ্গালোরের সুনাম ছিল সিনেমাহলের প্রাচুর্যের জন্যে। একই বাড়ির তিনটে ফ্লোরে তিনটে হল অনেকগুলি ছিল এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই অত্যাধুনিক। আমাদের কলকাতায় ওই রকম হল ছিল না বললেই চলে, আর আধুনিক হল বলতে ধর্মতলার সাকুল্যে তিনটে কি মেরে কেটে চারটে হল। ব্যাঙ্গালোর সাঙ্গ করে আমরা ঘরে ফেরার দিকে রওনা হলাম – আবার ম্যাড্রাস।

মাদ্রাজের প্রায় তের কিমি লম্বা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মেরিনা বীচ দেখে তেমন মজা পেলাম না। হয়তো এর আগে অনেক ধরণের সমুদ্র দেখা হয়ে গেছে এবং কোবালাম বীচের সৌন্দর্যের ধারে কাছে আসতে পারে না বলে। যাবার সময় দেখলে প্রথম দেখা সমুদ্রতট হিসেবে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতাম, অবাক হতাম।

 টলেমি এবং পেরিপ্লাসের বর্ণনা থেকে জানা যায় সে কালে মামল্লপুরম বন্দরের খুব রমরমা ছিল। আমাদের তাম্রলিপ্তি বন্দরও তো প্রায় সমসাময়িক। কে জানে কত বাঙালি নাবিক এবং তামিল নাবিক যাওয়া আসা করেছে এই দুই বন্দরে! আজ সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় ক্ষয়ে যেতে থাকা পরিত্যক্ত মামল্লপুরমের মন্দির, পঞ্চরথ, এবং পাথরে খোদাই অজস্র শিল্প দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়, সেই সব দিনের গৌরব।

 একদিন খুব ভোরে আমরা রওনা দিলাম পূর্বঘাট পর্বতমালার ছোট্ট তিরুমালা পাহাড়ের চূড়ায় বিশ্বের ব্যস্ততম ও ধনীতম বালাজি তিরুপতি ভেংকটেশ্বরস্বামী মন্দির দর্শনে। তিরুপতি শহর তিরুমালা পাহাড়ের ঠিক নীচে, সেখান থেকে “তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম” –এর ছোট ছোট বাস অনবরত নিয়ে চলেছে ৮৫৩ মি উঁচু পাহাড়ের ওপর। পাহাড়ের মাথায় বিস্তীর্ণ সমতল। মাঝখানে ঈপ্সিত মন্দির, চারদিকে দোকানপাট জমজমাট। গৃহস্থ সরঞ্জাম থেকে খাবার দাবার কি না পাওয়া যায় সে সব দোকানে।

 মন্দিরের দরজা সামনে হলেও সে পথে যাওয়া যাবে না। সে পথে যেতে গেলে হয় ভি আই পি হতে হবে অথবা মাথাপিছু একশ টাকার টিকিট কাটতে হবে। বিনি পয়সায় দর্শনও সম্ভব, সেক্ষেত্রে লোহার খাঁচায় ঘুরে ঘুরে আসতে হবে মানুষের সুদীর্ঘ লাইনের পিছনে। মাত্র একশ টাকার বিনিময়ে ভি আই পি হতে মা কিছুতেই রাজি হলেন না, অগত্যা আমরা আম জনতার লাইনে সামিল হলাম। প্রায় ঘন্টা তিনেক লোহার খাঁচার নানান গোলকধাঁধায় ঘুরে আমরা দর্শন পেলাম বাবা তিরুপতির। সামান্য কয়েক মূহুর্তের দর্শন, পিছনের এবং আশেপাশের মন্দির সঞ্চালকদের নিরন্তর ধাক্কায় তার বেশী দাঁড়াবার জো নেই।

 বাবা তিরুপতির মন্দিরে পুজো দিয়ে তাঁর আশীর্বাদ ও প্রসাদী লাড্ডু নিয়ে আমরা ফিরে এলাম মাদ্রাজ। এখান থেকেই আমাদের আগামীকাল ঘরে ফেরার ট্রেন। দীর্ঘ একুশদিনের যাত্রা শেষ, এবার ঘরে ফেরার জন্যে মন অস্থির। বাড়ি গিয়ে নিজের ঘরে পা ছড়িয়ে বসা আর ভাতের সঙ্গে বিউলিডাল আর আলুপোস্ত মেখে খাওয়ার শান্তি ফিরে পাওয়া।


যা দেখলাম, যা পেলাম তার হিসেব করার সময় এখন নয়। তার হিসেব করতে হবে অনেক দূরে অনেক দিনের পর। ততদিনে মন থেকে মুছে যাবে পথ চলার ছোটখাটো বাধা-বিঘ্ন, দুঃখ-কষ্টের স্মৃতি। মনে থাকবে শুধু বিচিত্র প্রকৃতি, যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা মহিমময় ইতিহাস নিয়ে তীর্থস্থান, মানুষের গড়ে তোলা অসাধারণ শিল্পসৃজন। আর সবার ওপরে মনে থাকবে চলার পথে মনে থাকা আর মনে না থাকা অগণিত মানুষ।

চলবে...



শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৩

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দ্বাদশ পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১২ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

ত্রয়োদশ পর্বাংশ 

৪.৭.২ কাশ্মীর

কাশ্মীরের ইতিহাসের সব থেকে নির্ভরযোগ্য নথি কলহনের “রাজতরঙ্গিণী”। কিন্তু কলহনের এই অমূল্য গ্রন্থের রচনাকাল ১১৫০ সি.ই., অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই সপ্তম শতাব্দী বা তারও আগেকার ঘটনার ব্যাপারে রাজতরঙ্গিণী আমাদের খুব একটা সাহায্য করতে পারে না। সম্রাট অশোকের সময় কাশ্মীর মৌর্য সাম্রাজ্যেরই অংশ ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, কারণ সম্রাট অশোক কাশ্মীরে অনেকগুলি বৌদ্ধবিহার ও স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন এবং শ্রীনগর শহরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অশোকের মৃত্যুর পর, শোনা যায়, তাঁর এক পুত্র জালুক বা জলোকা স্বাধীন কাশ্মীর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কয়েক শতাব্দী পরে কণিষ্ক এবং তাঁর পরবর্তী কুষাণ রাজারা কাশ্মীর শাসন করেছিলেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে কাশ্মীর স্বাধীন রাজ্য থাকলেও, হুণরাজ মিহিরকুল কাশ্মীরেই তাঁর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 ৪.৭.২.১ কাশ্মীরের করকোটক রাজবংশ

রাজা হর্ষবর্ধনের সঙ্গে কাশ্মীরের রাজা দুর্লভবর্ধনের ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ছিল। এই রাজা দুর্লভ ছিলেন নাগ-করকোটক বংশের রাজা, এবং শোনা যায় তাঁরা নাকি পৌরাণিক গো-নন্দ বংশের বংশধর। রাজা দুর্লভ রাজা হর্ষকে ভগবান বুদ্ধের একটি “দাঁত”-এর অবশেষ উপহার দিয়েছিলেন, যেটি কনৌজের স্তূপে রাজা হর্ষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেই হুয়ান সাং কাশ্মীরে ৬৩১-৬৩৩ সি.ই. দু বছর ছিলেন।

এই বংশের সব থেকে শক্তিশালী এবং উদ্যোগী রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় (৭২৪-৭৬০ সি.ই.)। ললিতাদিত্য পাঞ্জাবের বেশ বড়ো একটা অংশ জয় করেছিলেন এবং তাঁর দিগ্বিজয়ের মধ্যে গৌড় এবং তিব্বতও ছিল। যদিও তিনি গৌড় অথবা তিব্বতে রাজ্য বিস্তার করেননি। মুক্তাপীড় চীনের সম্রাটের সভায় রাজদূত পাঠিয়েছিলেন। জানা যায় কাশ্মীরের সঙ্গে চীনের তার আগে থেকেই সুসম্পর্ক ছিল, কারণ মুক্তাপীড়ের পূর্ববর্তী রাজা চন্দ্রাপীড়কে সমসাময়িক চীন সম্রাট বিভূষিত করে সম্মান জানিয়েছিলেন। ললিতাদিত্য অনেকগুলি হিন্দু এবং বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মধ্যে সূর্যদেবের–মার্তণ্ড মন্দির বিখ্যাত।

ললিতাদিত্যর নাতি জয়াপীড় বিনয়াদিত্য (৭৭৯-৮১০ সি.ই.) ককোটক বংশের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা। জয়াপীড় নেপাল এবং পৌণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ) পর্যন্ত অভিযান করেছিলেন। তিনি বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায় বেশ কয়েকজন বিদ্বান ও পণ্ডিত মনীষীর নাম জানা যায়, যেমন উদ্ভাট, বামন এবং দামোদরগুপ্ত। জীবনের শেষ দিকে তিনি নাকি অর্থলিপ্সু এবং প্রজাপীড়ক রাজা হয়ে উঠেছিলেন, তার কারণ হয়তো বিভিন্ন অভিযানের জন্যে বিপুল অর্থব্যয় এবং রাজকোষ শূন্য হয়ে ওঠা! জয়াপীড়ের পরের রাজারা গুরুত্বহীন এবং দুর্বল হয়ে উঠেছিলেন এবং যার ফলে কিছুদিনের মধ্যে করকোটক বংশের পর নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি উৎপল বংশের সৃষ্টি হয়েছিল।

 ৪.৭.২.২ কাশ্মীরের অন্যান্য রাজবংশ

উৎপল বংশের প্রথম রাজা অবন্তিবর্মন ৮৫৫ সি.ই.-তে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। করকোটকদের রেখে যাওয়া শূন্যগর্ভ রাজকোষের জন্যে তিনি রাজ্যবিস্তার ছেড়ে, মন দিয়েছিলেন রাজ্যের আর্থিক উন্নতিতে। তিনি কাশ্মীরের সেচ ব্যবস্থার বিপুল উন্নতি করেছিলেন। এমনকি বাঁধ দিয়ে বিতস্তা (ঝিলাম) নদীর বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জলও সেচের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। রাজা অবন্তিবর্মনের নাম কাশ্মীরের মানুষ আজও মনে রেখেছেন, তাঁদের শহর অবন্তিপুরের নামে। অবন্তিবর্মনের পর কাশ্মীরের রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র শংকরবর্মন– ৮৮৩ সি.ই.-তে। শংকরবর্মন পিতার পথ অনুসরণ না করে রাজ্য জয় এবং অভিযানে মন দিয়েছিলেন। শংকরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল ৯০২ সি.ই.-তে। শংকরবর্মনের পুত্র গোপালবর্মন রাজা হলেও তিনি একটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ৯০৪ সি.ই.-তে নিহত হন, তারপরেও ৯৩৯ সি.ই. পর্যন্ত উৎপল বংশের গুরুত্বহীন অস্তিত্বটুকুই অবশিষ্ট ছিল।

৯৩৯ সি.ই.-তে ব্রাহ্মণেরা রাজা গোপালবর্মনের মন্ত্রীর পুত্র প্রভাকরদেবকে রাজা নির্বাচিত করেছিলেন। তাঁর ৯৪৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্বে রাজ্যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ৯৪৯ সি.ই.-তে তাঁর পুত্র সংগ্রাম এবং অন্যান্য বংশধরকে হত্যা করে, নিজেই সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর মন্ত্রী পর্বগুপ্ত। এই বংশের সব থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব একজন মহিলা, নাম দিদ্দা। দিদ্দা ছিলেন ভীমশাহির নাতনি এবং পুঞ্চের রাজা লোহার রাজসিংহর কন্যা। তিনি রাজা ক্ষেমগুপ্তর রানি হিসেবে (৯৫০-৯৫৮ সি.ই.), তারপর পুত্রের অভিভাবিকা হিসেবে এবং পরে নিজের হাতেই (৯৮০-১০০৩ সি.ই.) রাজ্যের শাসনভার তুলে নিয়েছিলেন।

রানি দিদ্দা মৃত্যুর আগেই, তাঁর ভাইয়ের পুত্র সংগ্রামরাজাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার দিয়েছিলেন। সুতরাং ১০০৩ সি.ই.-তে রাণির মৃত্যুর পর কাশ্মীরের রাজা হলেন লোহার বংশের সংগ্রামরাজ (১০০৩-২৮ সি.ই.)। সংগ্রামরাজ খুব সফল রাজা হয়ে উঠতে পারেননি, যার ফলে কাশ্মীরে বিশৃঙ্খলা এবং অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই রাজা হয়ে কিছুদিনের জন্যে সিংহাসনে বসেছেন, আবার কেউ না কেউ এসে তাঁদের সরিয়েও দিয়েছেন। যাই হোক এই ভাবে ১৩৩৯ সি.ই. পর্যন্ত কাশ্মীরে যে হিন্দু রাজত্ব কোনরকমে চলছিল, তার সমাপ্তি হল মুসলিম অভিযানকারী শাহ্‌ মিরের হাতে, তিনি শামসুদ্দিন রাজ বংশের সূচনা করলেন।

 ৪.৭.৩ বঙ্গ

নানান প্রত্ন-নিদর্শন থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দীতে বঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে বঙ্গ কয়েকটি (সম্ভবতঃ চারটি) স্বাধীন রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। অন্ততঃ তিনজন রাজার নাম জানা যায়, যাঁরা দুর্বল গুপ্তদের বশ্যতা অস্বীকার করেছিলেন, যেমন ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র এবং সমাচারদেব। ষষ্ঠ শতাব্দীতে বঙ্গের গৌড় অঞ্চল (পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব বঙ্গ) মৌখরিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল।

 ৪.৭.৩.১ শশাঙ্ক

গৌড়ের সব থেকে বিতর্কিত রাজার নাম শশাঙ্ক। তাঁর সঙ্গে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি এবং কনৌজের মৌখরিদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা ছিল। রাজা শশাঙ্কের পূর্বপুরুষ কিংবা তাঁর পরবর্তী কোন রাজাদের নামও শোনা যায় না। তবে অনুমান করা হয়, গুপ্ত রাজত্বের শেষ দিক থেকেই গৌড়ের সঙ্গে মৌখরিদের বিবাদের সূত্রপাত। সে সময় শশাঙ্ক  সম্ভবতঃ গুপ্তদের সামন্তরাজা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে গুপ্তদের শক্তি হ্রাস হওয়াতে, শশাঙ্ক স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন এবং গুপ্ত এবং মৌখরিদের শত্রুতা কাজে লাগিয়ে, গৌড়ের সীমা পশ্চিমে বাড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমেই তিনি মালবের গুপ্ত-রাজ দেবগুপ্তর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করলেন এবং যৌথভাবে মৌখরি রাজ্য আক্রমণ করলেন। এই যুদ্ধে মৌখরি রাজ গ্রহবর্মন নিহত হলেন, এবং তাঁর স্ত্রী রাজ্যশ্রীকে, যিনি থানেশ্বরের রাজা প্রভাকর বর্ধনের কন্যা ছিলেন, কনৌজের কারাগারে বন্দিনি করে রাখলেন।

প্রভাকর বর্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্ধন বিশাল সৈন্য নিয়ে কনৌজ আক্রমণ করলেন, তাঁর বোনকে উদ্ধার করতে। রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তকে পরাজিত করলেন, কিন্তু ৬০৬ সি.ই.-তে নিজেই নিহত হলেন শশাঙ্কের হাতে। পূষ্যভূতি বংশের ঘনিষ্ঠ মিত্র, কবি বাণভট্ট এবং হুয়েনসাং–এর লেখা থেকে জানা যায়, শশাঙ্ক নাকি রাজ্যবর্ধনকে বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছিলেন। যাই হোক শশাঙ্ক খুব বেশি দিন কনৌজ অধিকারে রাখতে পারেননি।

রাজ্যবর্ধনের ভাই হর্ষবর্ধন নিশ্চয়ই তাঁর দাদা এবং বোনের প্রতি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শশাঙ্কের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা স্পষ্ট করে কিছুই জানা যায় না। এটুকু জানা যায়, হর্ষের সঙ্গে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মনের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ জেলা, পঃবঙ্গ)। শশাঙ্কর রাজ্য গঞ্জাম (উড়িষ্যা) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শশাঙ্ক মারা যান হয় ৬১৯ অথবা ৬৩৭ সি.ই.-তে। সম্ভবতঃ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ অধিকার করেছিলেন, এবং শশাঙ্কের উত্তরসূরিকে সিংহাসন চ্যুত করেছিলেন।

 ৪.৭.৩.২ বঙ্গের পালবংশ

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বঙ্গে অরাজক অবস্থা চলেছিল বহুদিন, সংস্কৃতে যাকে “মাৎস্যন্যায়” যুগ বলা হয়ে থাকে। শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুদিন পরে হুয়েন সাং বঙ্গে এসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, বঙ্গে তখন প্রধান রাজ্য ছিল চারটি পুণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ), কর্ণসুবর্ণ (পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগ), সমতট (দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ) এবং তাম্রলিপ্তি (তমলুক–মেদিনিপুর এবং উড়িষ্যার পূর্বাংশ)। ভাস্করবর্মন কর্ণসুবর্ণ অধিকার করলেও, কর্ণসুবর্ণের প্রশাসনিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করেছিলেন বলে মনে হয় না, তিনি করদ রাজ্য থেকে কর আদায়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। ভাস্করবর্মনের পরে কনৌজের যশোবর্মন সম্পূর্ণ বঙ্গ অধিকার করেছিলেন বলে শোনা যায়, এমনকি কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য জয়াপীড়ও কিছুদিনের জন্যে বঙ্গ অধিকার করেছিলেন।

এইরকম অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি কোন সময়ে “জনগণ এই অরাজক (মাৎস্যন্যায়) পরিস্থিতি - প্রত্যেকেই যেন তার প্রতিবেশীর সহজ শিকার – থেকে মুক্তির জন্যে গোপালকে রাজা করলেন”! কোন দিক থেকেই গোপালের বংশ বা তাঁর পারিবারিক পটভূমি নিয়ে কোন কথাই শোনা যায় না। এমনকি গোপাল রাজা হয়েও, কোন পৌরাণিক কিংবা প্রাচীন রাজবংশের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করেননি। যদিও অনেক পরবর্তীকালের লিপিতে পালবংশকে সৌরবংশের উত্তরসূরি বলে দাবি করা হয়েছে। গোপালকে বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ) এবং গৌড়ের (পশ্চিমবঙ্গের) প্রভু বলা হলেও, তাঁর রাজনৈতিক কৃতিত্বের কোন তথ্য পাওয়া যায় না এবং অনুমান করা হয়, তাঁর রাজত্বকাল ৭৫০-৭৭০ সি.ই.।

গোপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ সি.ই.)। তাঁর সময়েই পালরাজ্য প্রায় সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর সমসাময়িক প্রতিহার রাজারা ছিলেন, বৎসরাজা (৭৩৮-৭৮৪ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় নাগভাট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটবংশীয় রাজা ছিলেন ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৩ সি.ই.) এবং তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৩ – ৮১৪ সি.ই.)। উত্তর ভারতের সার্বভৌম অধিকার পাওয়ার জন্যে এই রাজারা দীর্ঘদিন নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু শেষ অব্দি প্রতিহাররাই আয়ত্ত্বে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে কিছুদিনের জন্যে ধর্মপাল কনৌজ অধিকার করে চক্রায়ুধকে সামন্তরাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এবং কখনো কখনো সমগ্র উত্তরভারত অধিকার করলেও স্থায়ীভাবে এবং স্বস্তিতে সাম্রাজ্য ভোগ করতে পারেননি।

ধর্মপালের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র দেবপাল (৮১০ -৮৫০ সি.ই.), কিছু লিপি থেকে জানা যায়, তিনি উড়িষ্যা, প্রাগজ্যোতিষ বা কামরূপ, হুণ, গুর্জর এবং দ্রাবিড়দের পরাজিত করেছিলেন। তবে লিপি যাই বলুক, কামরূপ এবং উড়িষ্যা ছাড়া, তাঁর সম্পূর্ণ রাজত্বকাল ধরেই তাঁকে গুর্জর-প্রতিহার, রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে হয়েছে। দেবপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্য বা সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে সংকীর্ণ ছোট এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিল। দেবপালের পর পালবংশের রাজারা হলেন, প্রথম বিগ্রহপাল (৮৫০–৮৫৪ সি.ই.) এবং নারায়ণপাল (৮৫৪-৯০৮ সি.ই.)। নারায়ণপালের পর কামরূপ এবং উড়িষ্যা স্বাধীন রাজ্য হয়ে উঠেছিল। নারায়ণপালের পর রাজা হয়েছিলেন রাজ্যপাল (৯০৮-৯৪০ সি.ই.) এবং তারপর দ্বিতীয় গোপালের (৯৪০-৯৬০ সি.ই.) সময় পালরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল মগধ এবং উত্তরবঙ্গ। রাজ্যপালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূট রাজকুমারীর সম্ভবতঃ বিবাহ হয়েছিল, হয়তো এই বৈবাহিক সম্পর্ক পালরাজাদের কিছুদিন স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিহারদের পতনের পর অনেকগুলি নতুন রাজবংশ উত্তরভারতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, যেমন বুন্দেলখণ্ডের চান্দেল, চেদির (মধ্যপ্রদেশের) কলচুরি, মালবের পরমার, গুজরাটের চালুক্য এবং শাকম্ভরির (রাজপুতানা) চাহমান বা চৌহান। এই রাজবংশগুলির মধ্যে চান্দেল এবং কলচুরি বঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন দ্বিতীয় গোপাল এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের (৯৬০-৯৮৮ সি.ই.) রাজত্বে। সে সময় পালরাজাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত হয়ে পড়েছিল। এরপর প্রথম মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮ সি.ই.) পালরাজ্যের কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু বারবার চোল এবং কলচুরিদের আক্রমণের বিরুদ্ধে খুব একটা কিছু করতে পারেননি। তাঁর পরবর্তী পালরাজারা হলেন, নয়পাল (১০৩৮-১০৫৫ সি.ই.), তৃতীয় বিগ্রহপাল (১০৫৫-১০৭০ সি.ই.) এবং দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭০-১০৭৫ সি.ই.)। উত্তরবঙ্গের একটি বিদ্রোহ সামলাতে গিয়ে সেখানেই দ্বিতীয় মহীপালের পরাজয় এবং মৃত্যু ঘটে, উত্তরবঙ্গের রাজা হন এক কৈবর্ত, দিব্য। এরপর পালরাজারা বাংলার ইতিহাসেও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পালরাজারা সকলেই বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রধানতঃ পাল রাজাদের সময়েই বিহার ও বঙ্গে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বাকি ভারতবর্ষের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিল। পালরাজাদের পতনের পরপরই বৌদ্ধধর্মের প্রাধান্য ভারতবর্ষ থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। পালরাজাদের আমলে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয়েছিল, যেমন বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরি, রক্তমৃত্তিকা, সোমপুরা ইত্যাদি। এ সময়েই বাংলার সঙ্গে তিব্বত, নেপাল এবং বার্মার নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

পালরাজাদের সময়ে বাংলায় সংস্কৃতের গুরুত্ব বেড়ে উঠেছিল, যদিও মাগধী প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং বাংলাও প্রচলিত ছিল। এই সময়েই বাংলা ভাষার নিজস্ব লিপির প্রচলন হয়েছিল। প্রথম বাংলা ভাষার গ্রন্থ “চর্যাপদ” এই সময়কালেই রচিত।

 ৪.৭.৩.৩ বঙ্গের সেনবংশ

বঙ্গ থেকে পালবংশকে মুছে দিয়ে নতুন সেনবংশের সূত্রপাত করেছিলেন সামন্তসেন। যতদূর জানা যায় সেনরা দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটপ্রদেশ থেকে বঙ্গের রাঢ় অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁরা নিজেদের কর্ণাট-ক্ষত্রিয় এবং ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় নামে পরিচয় দিতেন এবং বলতেন সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীরসেন ছিলেন চন্দ্রবংশের বংশধর। সামন্তসেনের পৌত্র বিজয়সেন দীর্ঘ বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন, (১০৯৫ -১১৫৮ সি.ই.)। তাঁর সময়েই সেনরাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল এবং সম্পূর্ণ বঙ্গ সেন রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তিনি একসময় গঙ্গার তীর ধরে যুদ্ধ অভিযানে বেরিয়েছিলেন এবং পশ্চিমের বহু রাজ্যই নাকি তাঁর অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিল। অন্যদিকে তিনি হয়তো  কামরূপ এবং কলিঙ্গও অধিকার করেছিলেন।

 বিজয়সেনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র বল্লাল সেন, তাঁর মাতা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শূর বংশের রাজকুমারী বিলাসদেবী। বল্লাল সেন কোন নতুন রাজ্য জয় করেননি, কিন্তু পিতার রাজ্য অক্ষত রাখতে পেরেছিলেন। পিতা বিজয়সেনের মতোই বল্লালসেনও শৈব ছিলেন। কথিত আছে বল্লালসেন বঙ্গের বর্ণ প্রথার সংস্কার করেছিলেন এবং তিনিই কৌলিন্য প্রথার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এই প্রবাদের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। বল্লালসেন পণ্ডিত এবং বিদ্বান রাজা ছিলেন বলে শোনা যায়। তাঁর গুরুদেবের নির্দেশে তিনি দুটি গ্রন্থ সংকলন শুরু করেছিলেন - “দানসাগর” এবং “অদ্ভুতসাগর” - কিন্তু শেষ করতে পারেননি।

বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণসেনের যুদ্ধ জয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি অভিযানে বেরিয়ে যে যে অঞ্চল জয় করেছিলেন, সেখানে বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। এরকম বিজয়স্তম্ভের নিদর্শন পাওয়া গেছে, বেনারস এবং এলাহাবাদে। সমসময়ে ওই দুই অঞ্চলের রাজা ছিলেন গাড়োয়াল বংশীয় শক্তিশালী রাজা জয়চন্দ্র। অতএব বেনারস ও এলাহাবাদ বিজয়ের কথা সত্যি হলে, তাঁকে বীর একথা মানতেই হয়। কিন্তু মুসলিম সেনাপতি মহম্মদ ইব্‌ন্‌ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করে, যখন নদিয়া আক্রমণ করেছিলেন, সেসময় রাজা লক্ষ্মণসেন নাকি প্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গঙ্গা পথে পূর্ববঙ্গে পালিয়েছিলেন! ১১৯৯ সি.ই.-তে নদিয়ার এই ঘটনায় রাজা লক্ষ্মণসেনের বীরত্বের কোন নিদর্শন পাওয়া যায়নি।

যদিও সম্পূর্ণ ঘটনাটি চিন্তা করলে পুরোটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। কারণ বখতিয়ার খিলজি বিহার জয় করেছিলেন ১১৯৭ সি.ই.-তে, শোনা যায়, তিনি সেখানে “মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের গণহত্যা করিয়েছিলেন”। তারপর তিনি নদিয়ার – লক্ষ্মণ সেনের তৎকালীন রাজধানী - দিকে এগিয়েছিলেন। বঙ্গ-বিহারের সীমান্ত থেকে রাজধানী নদিয়া পর্যন্ত বখতিয়ার খিলজি (শোনা যায় তাঁর সঙ্গে মাত্র আঠারোজন অশ্বারোহী সৈন্য ছিল) কোথাও কোন বাধা পেলেন না, সরাসরি রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করতে সক্ষম হলেন! এই বিষয়েই মনে ঘোরতর সন্দেহ আসে। সেনরাজাদের প্রশাসনিক এবং সামরিক ও নিরাপত্তা আধিকারিকদের চরম দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্র ছাড়া এমন ঘটনা কী করে সম্ভব?

সে যাই হোক, লক্ষ্মণসেন এর পরেও ১২০৬ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরেও সেনবংশ পূর্ববঙ্গে আরও প্রায় পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করার পর, সমগ্র বঙ্গ মুসলিম অধীনে চলে গিয়েছিল। সম্প্রতি কিছু সূত্র থেকে জানা যায় লক্ষ্মণসেনের এক পুত্র রূপসেন ভাগ্যান্বেষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং পাঞ্জাবে ছোট্ট একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার রাজধানী ছিল রূপনগর (রোপার)। পরবর্তীকালে, তাঁর বংশধরেরা আরও উত্তরে মান্ডি (হিমাচল প্রদেশ) অঞ্চলে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন[1]

পিতা বল্লাল সেনের মতো লক্ষ্মণসেনও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন বিখ্যাত কবি জয়দেব এবং ধোয়ি। জয়দেবের কাব্য “গীতগোবিন্দ”-এর কথা আগেই বলেছি। ধোয়ির কাব্য “পবন-দূত”, মহাকবি কালিদাসের লেখা “মেঘদূত”-এর অক্ষম অনুসরণ। লক্ষ্মণসেন তাঁর পিতার অসমাপ্ত কাব্যগ্রন্থ “অদ্ভুতসাগর” সম্পূর্ণ করেছিলেন।


চলবে...


[1] কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন হিমাচলের কুলু ও মাণ্ডি অঞ্চলে আমাকে বাস করতে হয়েছিল এবং সেই সময়েই বেশ কয়েকজন স্থানীয় “সেন-মহাশয়”-এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তাঁদের কেউই বাংলার সঙ্গে তাঁদের কোনরকম যোগসূত্রের কথা কোনদিনই শোনেননি, বরং আমার কৌতূহলে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ বিরক্তই হয়েছিলেন। কিন্তু আমার কৌতূহল তাতে নিবৃত্ত হয়নি, মাণ্ডি অঞ্চলের অনেক তথ্য ঘেঁটে রূপসেনের ঘটনাটি জানতে পারি। এই ঘটনার সঙ্গে হয়তো অনেক মিথ জড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু রোপার ও মাণ্ডির সঙ্গে বাংলার সেনবংশের কোন একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র যে ছিল, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার সমর্থনে একটি লিংক এখানে শেয়ার করলাম - https://hpmandi.nic.in/history/  


শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩ "


 

শৌনক জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সূত, দেবর্ষি চলে যাবার পর, মহামুনি বেদব্যাস তাঁর ইচ্ছার কথা যা শুনলেন, সে বিষয়ে কী করলেন?”

সূত বললেন, “সরস্বতী নদীর পশ্চিমতীরে ঋষিদের যজ্ঞ অনুষ্ঠানের অনুকূল শম্যাপ্রাস নামে এক বিখ্যাত আশ্রম আছে। সেই আশ্রমে অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আসনে উপবেশন করে, মহামুনি বেদব্যাস আচমন করে সমাধিযোগে চিত্তকে স্থির করলেন। ভক্তিযোগে তাঁর নির্মল চিত্ত নিশ্চল হওয়ার পর তিনি পূর্ণপুরুষ ভগবান ও তাঁর অধীন মায়াকে উপলব্ধি করলেন। এই মায়ায় মুগ্ধ জীব ত্রিগুণের অতীত নিজের স্বরূপ বুঝতে না পেরে, “আমিই কর্তা, আমিই ভোক্তা” ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনর্থ লাভ করে। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন, অধোক্ষজে ভক্তি হলে, সমস্ত অনর্থের নিষ্পত্তি হয়। এই কারণেই তিনি অজ্ঞ লোকের হিত কামনায় শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করলেন। এই ভাগবত শুনতে শুনতেই শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তির উদয় হয় এবং জীবের শোক, মোহ ও ভয় দূর হয়ে যায়। তিনি ভক্তি প্রধান শ্রীভাগবৎসংহিতা রচনা করে, নিজের পুত্র যোগীশ্রেষ্ঠ শুকদেবকে এই গ্রন্থ পাঠ করালেন”

শৌণক জিজ্ঞাসা করলেন, “মহাযোগী শুকদেব সর্বদাই নিবৃত্তিমার্গে বিচরণ করে থাকেন; কোন বিষয়েই তাঁর প্রবৃত্তি বা আসক্তি ছিল না, সুতরাং তিনি কিসের হেতু এই গ্রন্থ পাঠ করলেন”?

সূত বললেন, “এও শ্রীহরির অলৌকিক গুণমাধুর্য। হরিভক্তগণ শ্রীশুকদেবের অত্যন্ত প্রিয়, তিনি শাস্ত্র ইত্যাদির ব্যাখ্যা উপলক্ষে তাঁদের সঙ্গে শ্রীহরির গুণকীর্তন করতে ভালবাসেন। এই কারণেই তিনি শ্রীহরির গুণ কীর্তন মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে, এই সুবৃহৎ ভাগবতসংহিতা পাঠ করেছিলেন।

এখন আমি আপনাদের রাজর্ষি পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মুক্তি, যার থেকে কৃষ্ণকথার প্রসঙ্গও আসবে এবং পাণ্ডুপুত্রদের মহাপ্রস্থানের আখ্যান বর্ণনা করব, শুনুন।  


অশ্বত্থামার শাস্তিবিধান

কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ তখন প্রায় শেষ। কুরু এবং পাণ্ডব পক্ষের অনেক বীর এই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছেন। মহাবীর ভীমের গদার আঘাতে, দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হয়েছে। বহু প্রিয়জন, আপনজন হারিয়ে পঙ্গু দুর্যোধন এখন বিষণ্ণ ও বিধ্বস্ত। তাঁকে খুশী করার জন্যে আচার্য দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা একটি বীভৎস কাণ্ড করে ফেললেন। দ্রৌপদীর ঘুমিয়ে থাকা পাঁচ শিশু পুত্রের মাথা কেটে নিয়ে এলেন দুর্যোধনের সামনে, তাঁর আশা শত্রুপক্ষের এই নিদারুণ ক্ষতি দেখে দুর্যোধন যদি একটু শান্তি পান। কিন্তু দুর্যোধন মোটেই খুশী হলেন না বরং আরো হতাশার মধ্যে ডুবে গেলেন। অশ্বত্থামার মতো বীর তাঁর পক্ষে আছে ভেবে, একসময় তিনি গর্ব বোধ করতেন। আজ সেই অশ্বত্থামার এই উৎকট দুর্মতি দেখে তিনি নিজেকেই ধিক্কার দিলেন বারবার।  তীব্র ঘৃণায় তিনি মুখ ফিরিয়ে রইলেন।

[মহাভারতেও আছে দ্রৌপদীর পাঁচ শিশু বা বালক পুত্রকে হত্যা করার জন্যে দুর্যোধন অশ্বত্থামাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিলেন, ধিক্কার দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এই কাজ সনাতনী যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধ। অর্থাৎ পরমশত্রুর শিশুপুত্রদেরও হত্যা করে, তাদের নির্বংশ করাটা ভারতের যুদ্ধনীতি ছিল না। কিন্তু পরবর্তীযুগে বিধর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধকালে এই নীতির কারণে সনাতনী যোদ্ধাদের বারবার মাশুল গুনতে হয়েছে।]           

এদিকে জননী দ্রৌপদী, তাঁর নিরীহ পাঁচপুত্রের হত্যার সংবাদে ভেঙে পড়লেন। শোকে, দুঃখে পাগলিনীর মতো তিনি বিলাপ করতে লাগলেন। তাঁর এই করুণ অবস্থা দেখে অর্জুন প্রতিজ্ঞা করলেন, অশ্বত্থামাকে তিনি হত্যা করে, তিনি এর প্রতিশোধ নেবেন। বললেন, হে কৃষ্ণা, যেদিন আমি ঐ অশ্বত্থামার কাটা মাথা নিয়ে আসব, সেদিন ওই মাথার ওপর বসে তুমি স্নান করো, সেই দিন তোমার পুত্রশোকের জ্বালা কমবে। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আর দ্রৌপদীকে বারবার সান্ত্বনা দিয়ে, অর্জুন আবার যুদ্ধ সাজে সাজলেন, চড়ে বসলেন তাঁর কপিধ্বজ রথে। এবারেও সেই রথের সারথি হলেন, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।

দূর থেকে কপিধ্বজ রথ আসতে দেখেই, শিশু হত্যাকারী অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ আসছেন, তাঁকেই হত্যা করতে। ভয়ে তিনি পালাতে লাগলেন, প্রাণপণে ছুটিয়ে দিলেন, তাঁর রথের ঘোড়া। অনেকক্ষণ এই ভাবে দৌড়তে দৌড়তে, অশ্বত্থামার ঘোড়াগুলি ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তাদের গতি কমে আসতে লাগল। অশ্বত্থামা বুঝতে পারলেন, পালিয়ে বাঁচা যাবে না, যদি কোনভাবে অর্জুনকে আটকে রাখা যায়, অথবা হত্যা করা যায়, তবেই প্রাণ রক্ষা সম্ভব। বাঁচার একমাত্র রাস্তা প্রতি-আক্রমণ। অশ্বত্থামা ঘুরে দাঁড়ালেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর যে তির ছিল, তার নাম ব্রহ্মশির। এই ব্রহ্মশিরের প্রয়োগ করার নিয়ম তাঁর জানা থাকলেও, এর নিবারণের নিয়ম তাঁর জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর তখন এতসব ভাবনার অবকাশ নেই, বাঁচার একমাত্র আশায় তিনি অর্জুনের প্রতি ব্রহ্মশির নিক্ষেপ করলেন।

ব্রহ্মশিরের তেজে চারদিক ঝলসে উঠল। মহাবীর অর্জুনও চমকে উঠলেন এই অস্ত্রের তেজে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিগ্যেস করলেন, “হে কৃষ্ণ, চারিদিকে এই যে প্রচণ্ড তেজ, সবদিক মনে হচ্ছে যেন গ্রাস করে ফেলবে, এ সব কী, কোথা থেকে হল”?

শ্রীকৃষ্ণ খুব শান্তভাবে, বললেন, “হে পার্থ, এ হচ্ছে ব্রহ্মশির, ব্রহ্মাস্ত্র। আচার্য দ্রোণের পুত্র অশ্বত্থামা এই তির আমাদের দিকে নিক্ষেপ করেছেনঅশ্বত্থামা এই তির শুধু ছুঁড়তেই জানেন, একে নিরস্ত করতে শেখেননি। তোমার কাছেও ব্রহ্মাস্ত্র রয়েছে, অর্জুন, এবং তুমি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ ও নিবারণ দুটোই জানো। কাজেই তুমি তোমার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে, ওই ব্রহ্মাস্ত্রের তেজ নিবারণ করো। কারণ, এই অস্ত্রে এই জগতের বহু নিরীহ জীবের অকারণ বিনাশ আমি চাই না”

[তখনকার যুগে প্রকৃত বীরদের ভয়ানক অস্ত্র প্রয়োগ এবং নিবারণ অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের বিধিও জানতে হত। আজকের যুগে নিউক্লিয়ার অস্ত্র প্রয়োগের টেকনোলজি বিশ্বে অনেকেই জানে, কিন্তু তাকে নিবারণ করার উপায় কি কারো জানা আছে?]     

অর্জুন তাই করলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রদক্ষিণ করে, তাঁর নিজের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়োগ করলেন, অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ নিবারণের জন্যে।

ব্রহ্মাস্ত্র নিবারণের পর অর্জুন, ভীত, পরাস্ত অশ্বত্থামাকে বলির পশুর মতো, দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন।  তারপর রথে চাপিয়ে ফিরে চললেন হস্তিনাপুরের দিকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে প্রিয়সখা অর্জুন, তুমি অশ্বত্থামাকে হত্যা করছো না কেন? ধরিত্রীর বোঝা স্বরূপ এই পাপিষ্ঠকে রথে চড়িয়ে তুমি কোথায় নিয়ে চললে”?

অর্জুন বললেন, “হে কৃষ্ণ, ওকে হত্যা করা আমার পক্ষে অসম্ভব। কারণ ওর পিতা ছিলেন আমার গুরু”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “কিন্তু তুমি তো পাঞ্চালীর কাছে প্রতিজ্ঞা করে এসেছ, যে তুমি ওর কাটা মুণ্ড নিয়ে আসবে। যে নীচ, ঘুমন্ত শিশু এবং বালককে হত্যা করতে পারে, তাকে ক্ষমা করতে চাও কোন ধর্মের নীতিতে? এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণের কলঙ্ক। এই ব্রাহ্মণকে হত্যা করলে কোন পাপ হয় না। কারণ অশ্বত্থামা যে পাপ করেছে, তার শাস্তি মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না”

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বারবার অর্জুনকে এই কথা বলে উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু অর্জুন অশ্বত্থামাকে হত্যা করলেন না।

শোকবিহ্বলা দ্রৌপদী যে শিবিরে ছিলেন, অর্জুন বন্দী অশ্বত্থামাকে সেইখানে নিয়ে গিয়ে দ্রৌপদীর সামনে নিক্ষেপ করলেনদড়িতে আবদ্ধ পশুর মতো নির্জীব এই অশ্বত্থামাকে দেখে দ্রৌপদীর মনে মায়া হলতিনি অর্জুনকে প্রণাম করে বললেন, “হে স্বামী, অশ্বত্থামাকে, মুক্ত করো, ওঁকে ছেড়ে দাও। এই অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণ, তোমার গুরুর পুত্র। আচার্য দ্রোণ যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই আচার্যই তো আমাদের সামনে রয়েছেন তাঁর এই পুত্রের রূপে। এঁকে হত্যা করলে এঁর বৃদ্ধা মা গৌতমী, আমার মতোই শোকে পাগল হয়ে যাবেন। সে আমি আদৌ চাই না। এই অশ্বত্থামার জঘন্য একটা পাপের শাস্তি বিধান করতে গিয়ে, আরো একটা পাপ কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত নয়, হে বীরশ্রেষ্ঠ”

[এও এক আশ্চর্য ক্ষতিকারক ভারতীয় ধর্মনীতি - পুত্রহন্তারকের প্রতিও এত মমত্ববোধ!]   

অর্জুন ও দ্রৌপদীর এই ধর্ম ও ন্যায় বিচারকে উপস্থিত সকলেই সমর্থন করলেও, ভীম সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, “নিদ্রিত পাঁচটি নিষ্পাপ শিশুকে যে হত্যা করতে পারে, তাকে হত্যা করাই একমাত্র বিচার এবং আমিই এই অশ্বত্থামাকে হত্যা করব”।  এই বলে তিনি অশ্বত্থামাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে, দ্রৌপদী তাঁকে নিরস্ত করতে গেলেন। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভীমকেও নিরস্ত করে, অর্জুন এবং উপস্থিত সকলের প্রতি মৃদু হেসে বললেন, “ব্রাহ্মণ অধম হলেও তাঁকে বধ করা যায় না এবং স্বজন হত্যাকারীর শাস্তি মৃত্যু – এই দুটি বিধিই আমার তৈরি। হে পার্থ, তুমি আবার অশ্বত্থামাকে বধ করবে বলে দ্রৌপদীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব সবার সব দিক যাতে রক্ষা হয়, সে ব্যবস্থা এখন তোমাকেই করতে হবে”

ভগবানের পরমভক্ত অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণের এই ইঙ্গিত বুঝতে পেরে খড়্গ দিয়ে অশ্বত্থামার মাথার চুল এবং চুলের সঙ্গে তার মাথার মণি কেটে নিলেন। তারপর তাঁকে শিবির থেকে বের করে দিয়ে, রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সর্বহারা ব্রাহ্মণের জনসমক্ষে এই অসম্মান ও নির্বাসন, তাঁর মৃত্যুর সমান”

[অশ্বত্থামার মাথার মণি ব্যাপারটা ঠিক কি বোঝা যায় না। জন্ম থেকেই তাঁর মাথায় বা কপালে কি কোন টিউমার ছিল? শ্রীকৃষ্ণের ইঙ্গিতে অর্জুন সেই টিউমার কেটে ফেললেন, তাতে অশ্বত্থামার মৃত্যু হল না - কিন্তু মৃত্যু-তুল্য অভিঘাতই বা হল কী করে?

মহাভারতে কর্ণের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনার কথা আছে। সূর্য-তনয় কর্ণ নাকি জন্ম থেকেই (রক্ষা) কবচধারী ছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে দেবরাজ ইন্দ্র সেই কবচ কর্ণের থেকে দান হিসাবে গ্রহণ করে নেওয়ার ফলে কর্ণের (সূর্যের থেকে পাওয়া) দৈবী-রক্ষণশক্তি বিনষ্ট হয়। এই কবচ ব্যাপারটাই বা কি, সেটাও বোঝা যায় না।]      

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

বায়স-কুহু

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

ছোটদের  প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " বাসা বদল "


স্থানঃ লালটুকটুকে ফলে ভরা বিশাল এক বটগাছ।

সময়ঃ সকাল

পাত্র-পাত্রীঃ কাক, কাকের বউ কাকী আর কোকিল

(বড়ো সাইজের একটা কুটো ঠোঁটে নিয়ে কাকটা উড়ে এসে বসল বটগাছের মস্ত ডালে। ওখানে ওরা বাসা বানাচ্ছে। বাসার মধ্যে কুটোটা রেখে, একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে কাক তার বউকে বলল,)

 

কাকঃ        আজকের মধ্যে বাসাটা বানিয়ে ফেলতেই হবে, গিন্নি। আর কী কী আনতে হবে, চটপট ফর্দ করে দাও দেখি।

কাকীঃ        আগে একটু জিরিয়ে নাওসেই কোন সকাল থেকে তোমার কুটো বওয়া শুরু হয়েছে, যাও, কা কা খা খা - একটু খেয়েদেয়ে ঘুরেঘেরে এসো অল ওয়ার্ক অ্যাণ্ড নো প্লে, মেক্স কাক এ ডাল বয়, শোনোনি নাকি?

কাকঃ        খা খা খাবার কথা বলে খিদেটা বাড়িয়ে দিলে গিন্নি। দাঁড়াও, দাঁড়াও একটু বসে নিই, তারপর খা খা খেতে যাবো আচ্ছা, ওই যে বললে, ডাল বয়, ওটার মানে কী বলো তো? ডাল মানে কী মুশুর ডাল, মুগ ডাল? নাকি গাছের ডাল। আমরা তো গাছের ডালেই থাকি। হে হে হে, আমি তো ডাল বয়ই, আর তুমিও তো ডাল গার্ল।

কাকীঃ        ডাল গার্ল! হে হে, এমন কথা কোনদিন শুনিনি! তবে মানেটানে অতশত জানি না, বাপু। ঘরে বসে মানুষের ছেলেমেয়েগুলো পড়ে, জানালার পাল্লায় বসে শুনেছি, তাই বললাম।  

 

(পাতার আড়ালে একটা কোকিল বসেছিল, আর টুকটুকে লাল চোখ ঘুরিয়ে দেখছিল চারদিক। মনের আনন্দে সে মাঝে মাঝে পাকাপাকা টুকটুকে লাল বটফল খাচ্ছিল, আর ডাকছিল কুউ কুউকাক আর কাকীর কথাবার্তা শুনে সে বলে উঠল,)

 

কোকিলঃ     কুউঃ। ভোর থেকে কু আরম্ভ করেছিস বলতো, কাক? সকাল থেকে এত হুটোপাটি করছিস, এত হাঁফাচ্ছিস কেন?

কাকঃ        তোর আর কী? বেড়ে আছিস, বাসা বানাতেও জানিস না, জানিস কেবল গান গাইতে! তুই আর বুঝবি কী?

কোকিলঃ     অত বুঝে আর কাজ নেই, ভাইসারাদিন তোদের কেবল খা খাখাওয়ার চিন্তাআর এই ছুটছিস, সেই উড়ছিস। তোদের এই সর্বদা খা খা অব্যেসের জন্যেই মানুষগুলো তোদের হুস হুস করে। কাছাকাছি বসতেই দেয় না।

কাকঃ        হুস হুস করলেই শুনছি আমি আর, আমার কাছে বুঝি এমনি পাবে পার? সেদিন একটা পুঁচকে ছেলে করছিল হুসহুস; তাকে আচ্ছা করে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমরাও মানুষ!!

কোকিলঃ      সে কি রে? তুই ঝগড়া করেছিস? তাও একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে? তোকে হুস হুস করবে না, তো কাকে করবে, রে কাকে? বড়ো মুখ করে, তুই আবার নিজেকে বলছিস মানুষ? ছি ছি তুই খুব কুউঃ। আর দেখ, আমার গান শোনার জন্যে ওরা সারা বছর হা পিত্যেশ করে বসে থাকে। আমার ডাক শুনতে পেলেই বলে, “ওই ওই, শীতবুড়িটা বিদেয় হয়ে, আসবে এবার বসন্ত ”

কাকঃ       ছোঃ, তোর ওই একঘেয়ে সুর কু-কু-কু ডাকে, মানুষগুলো বোকা বলেই বেজায় মজে থাকে!

কোকিলঃ    কুউঃ কুউঃ কুউঃ কুউঃ, আমার গানে তুই কু পাস? তোর মনটাই যে কু সেটা কি তুই জানিস? এই জন্যেই অনেকে কাকাকে কাকু বলে! সে যাক, তা কী বললি সেই পুঁচকে ছেলেকে, শুনি!

কাকঃ       সেদিন বসেছিলাম ওদের পুবদিকের জানলায়, দেখছিলাম পাশের বাড়ি খাবার কী পাওয়া যায় ঝপ করে ছোঁ দিতে করছিলাম উশখুশ, সেই সময়ই ছেলেটা আমায় বললে “যাঃ যাঃ হুস হুস”?

কাকীঃ      তাতে কী হয়েছে? ছেলেমানুষ, অত কী আর বোঝে? তুমিই তো অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারতে! আমাদের কি আর বসার জায়গার অভাব, নাকি কা কা খা খা খাবার অভাব?

কাকঃ       তা ঠিক, কিন্তু ভাবো তো একবার, চেষ্টায় রয়েছি তখন কিছুমিছু খাবার! হুসহুস বললে কী না আমায়, আমাদের who’s who নিয়ে ওরা, কেউ কি মাথা ঘামায়?

কোকিলঃ     কী বললি, সেটা বল না!

কাকঃ       সে সব কথা যদিও তেমন কিছু নয়, সত্যি কথা বলতে আমি থোড়াই করি ভয়? বললাম, আমার দুইটি ডাকে কাকা, আর তার বৌকে বলো কাকী, তোমাদের সঙ্গে আমাদের কীই বা রইল বাকি?

কোকিলঃ      বাঃ বেশ বলেছিস। কুউঃ! কুউকথায় তোর সঙ্গে কেউ পারবে? তারপর?

কাকঃ        বললাম কাকের ইংরিজি you know নিশ্চয়ই crow, দেবতার হাতে থাকলে সেই আমরা হই চক্র!  তোমাদের যত বিক্রম তার মাঝেও থাকি আমরা, আর বক্র, মানে ব্যাঁকা চিন্তায়, তক্র খাও তোমরা!

কোকিলঃ    তুই বলতে চাস, আক্রম, বিক্রম, পরাক্রম সবেতেই তোরা আছিস? এমন বক্র চিন্তা করিস বলেই, আমরা বলি কুউঃ – কুচিন্তা!

কাকীঃ      কা কা খা খা খারাপ কী বলেছে কথাটা। কোকিলদাদার কথা ছাড় তো, তারপর তুমি আর কী বললে, বলো?

কাকঃ      বললাম, নক্র মানে কুমীর আর তক্র মানে ঘোল। কাকের নামেই ক্রমাগত পালটে যাচ্ছে ভোল।তোমাদের ঠাকুরদাদা ছিলেন ক্রোম্যাগনন, ক্রমান্বয়ে মানুষ হলে, হোমো স্যাপিয়েন।

কোকিলঃ    বাবা, এত কথাও জানিস তুই? আরও কিছু জানিস নাকি, বল না!

কাকঃ       কায়দা করা জুলফির নাম জেনো কাকপক্ষ, কাকনিদ্রা যে লোকের হয়, সেই জেনো দক্ষ

কাকীঃ       ঠিক আমাদের মতো, গভীর ঘুমের মধ্যেও তারা সতর্ক থাকে। তারপর?

কাকঃ        কাক ডাকলেই তাল পড়ে, আর না কভু বলিও। সমাপতন ঘটলেই, হয় কি গো কাকতালীয়?

কাকীঃ      ওরা তাই বলে বুঝি? কাক ডাকলেই তাল পড়ে! ওমা, মানুষ কী বোকা! তারপর আর কিছু বলোনি?

কাকঃ       বলিনি আবার? আরো বললাম, সাধু ভাষায় কাককে বায়স বলে, জানো তো? সত্যজিতের বিশ্বখ্যাতি বায়সকোপ বানিয়ে, মানো তো?

কোকিলঃ     সত্যিই তো! এমন তো ভাবিনি রে? এত বয়স হল, তবু বায়স্কোপ ব্যাপারটাতে তোরা আছিস, এটা বুঝিইনি!

কাকঃ       তার পরে আরও বললাম, BIOS ছাড়া কম্পিউটার শুধুই বাক্স যে একখান, কাক ছাড়া তোমাদের থাকবে কি সম্মান?

কোকিলঃ    কুউঃ কুউঃ, যাই বলিস আর তাই বলিস, তুই খুব কুউওইটুকুউ একটা ছেলেকে এমন করে কেউ বলে? নিশ্চয়ই খুব দুঃখুউ পেয়েছিল, বেচারা? নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলেছিল?

কাকঃ       না না কাঁদবে কেন? চেঁচিয়ে ডাকল তার মাকে, বলল ‘অ মা দেখে যাও কী বলছে কাকে!’

কাকীঃ       সর্বনাশ, তখন তুমি কী করলে?

কাকঃ       কী আর করবো, হুস করে উড়ে গিয়ে বসলাম পাশের জামরুল গাছের ঘন পাতার ফাঁকে।

কোকিলঃ    কী ভিতু রে তুই কাক! পুঁচকে একটা ছেলের ওপর খুব জারিজুরি করলি, আর তার মা আসছে শুনেই পালিয়ে গেলি?

কাকঃ       কোকিল সেই থেকে তুই অনেক আকথা কুকথা বলছিস। তুই কোন সাহসী রে? মানুষের কাছে তোর যাওয়ার সাহস আছে? বসে থাকিস তো শুধু বট আর আমগাছের ঘন পাতার আড়ালে। টপাটপ বটফল খাস, আর কুকু ডাকিস। নিজের বাসাটুকু বানানোরও তোর মুরোদ নেই। বুঝলে গিন্নি, এবার কোকিলের বউ আমাদের বাসায় ডিম পাড়তে এলে ঠুকরে তাড়িয়ে দেবে।

কোকিলঃ    অ্যাই দেখো, রাগ করছিস কেন, মিছিমিছি। তোকে দু একবার কু বলা ছাড়া কু এমন বলেছি, বল তো? তাতেই এত ক্রোধী হচ্ছিস? ওই দ্যাখ, ক্রোধের সামনেও crow আছে!  বাসা বানানোর অনেক ঝক্কি, সে ভাই আমরা পারি না। কাক ছাড়া কাকে আমরা ভরসা করতে পারি বল তো? ঠিক কথা তোর বাসায় আমার বউ ডিম পাড়তে যায়এত বাসা থাকতে, তোর বাসাতেই কেন যায়, সেটা জানিস কি?

কাকঃ      দ্যাখ কোকলে, শুধু ডিম পাড়তে যায়, তাই নয়, আমাদের একটা দুটো ডিম, সে পায়ে করে বাসার বাইরে ফেলেও দেয়!

কোকিলঃ    না, না, ছি ছি এমন হতেই পারে না। হতে পারে আমার বউয়ের পায়ে বা ডানায় লেগে একটা আধটা ডিম পড়ে গেছে। কিন্তু ইচ্ছে করে ডিম ফেলে দেয়, এমনটা হতেই পারে না।

কাকঃ       তোর ওই কুউ কথায় আর কুউ ডাকে আমরা আর ভুলছি না। আমাদের বাসার ত্রিসীমানায় যদি তোকে কোনদিন আর দেখেছি, ঠুকরে তোর পালক খসিয়ে দেব! এবারে তোর বউ আসুক, ঠুকরে ঠুকরে 2ক্রো 2ক্রো করে রাখবো, বলে দিলাম।

কোকিলঃ    কাক, অ্যাই কাক, শোন না। এত রেগে যাচ্ছিস কেন? তোদের বাসায় আমরা কেন ডিম পাড়ি জানিস? সেটা তো জানিস না। জানলে আর এমন কথা বলতিস না।

কাকঃ        কেন? (খুব রাগত স্বরে)

কোকিলঃ    আমাদের মধ্যে, একমাত্র তোরই বেশ একটা ইয়ে, মানে তেজ আছে। হাঁকডাক করা, ঠোক্কর মারা। অনেক কাক মিলে একসংগে কা কা খা খা করা, এসব আমরা কেউ পারি, বল? তোদের কে না ডরায় বলতো? বেড়াল, কুকুর থেকে শুরু করে মানুষও তোদের ঠোক্করকে ভয় পায়।

কাকঃ       গিন্নি শুনছো, কোকিল এই মাত্র আমাকে বলল ভিতু, এখন আবার বলছে আমাদের মানুষ ভয় পায়।

কাকীঃ      কথাটা ভুল কিছু বলে নি। আমরা একা একা মানুষকে ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু একজোট হলে মানুষও আমাদের ভয় পায়!

কোকিলঃ    অ্যাই, এই কথাটাই বলছিলাম, কাককে একটু বুঝিয়ে বলো দেখি, বৌদিভাই। আর ঠিক এই জন্যেই আমরা তোদের বাসায় ডিম পাড়ি।

কাকঃ        তার মানে? মামার বাড়ির আবদার,  নাকি কাকার বাড়ির?

কোকিলঃ    ওফ, তুই বুঝছিস না কাক, তোরা যে ডালে বাসা বানাস, সেই ডালে তোরা উটকো কাউকে বসতেই দিস না। তোদের ভয়ে, বেড়াল বা ভাম কিংবা চিল কেউই কাছ ঘেঁষে না। তাই তোদের বাসা সব থেকে নিরাপদতোদের বাসায় তোদের বাচ্চাদের সঙ্গে আমাদের ছানারাও নিশ্চিন্তে বড়ো হয়।

কাকঃ        তাহলে? আমরা তোর এত্তো উপকার করি, তাও আমাদের নিন্দে করছিলি কেন? খালি বলছিলি কু?

কোকিলঃ       (লাজুক মুখে মাথা চুলকোতে চুলকোতে) ওটা শিখেছি মানুষের থেকে।

কাকঃ          তার মানে?

কোকিলঃ      একজন মানুষ যার থেকে উপকার নেয়, তারই সব থেকে নিন্দে করে। হে হে আমরাও তাই শিখেছি।

কাকঃ        এ কথাটা মন্দ, মানে কু বলিসনি। পথেঘাটে সারাদিন মানুষ যতো নোংরা ফেলে, তার কত কিছু আমরা খেয়ে সাফ করে ফেলি। এতটুকু কৃতজ্ঞ তো হয়ই না, উলটে জানালা, কিংবা বারান্দার রেলিং একবার পা দিলেই হুস হুস করে তাড়িয়ে দেয়। খুব রাগ হয় জানিস?

কোকিলঃ     হবারই তো কথা। একশবার রাগ করবি। কিন্তু আমার ওপর রাগ করে থাকিস না, ভাই। তোদের বাসায় যদি ডিম পাড়তে না দিস, আমাদের কোকিল বংশই ধ্বংস হয়ে যাবে, সে কথাটা একবারও ভেবে দেখবি না, ভাই?

কাকীঃ        (চোখের জল মুছে) হ্যাঁগো, শুনছো? তুমি আর রাগ করে থেকো না গো। আমাদের ছানাদের সঙ্গে দুতিনটে কোকিলের ছানাও আমরা দিব্যি বড়ো করে তুলতে পারবো গো, ওতে আমদের কোন কষ্ট হবে না।

কাকঃ          হুম। মনটা একটু বড়ো করার সঙ্গে সঙ্গে বাসাটাও একটু বড়ো করে নিলেই হয়।

কাকীঃ       তা তো হয়ই। সে আমরা করেও ফেলব, গো। তোমাকে আরো বেশ কিছু কুটোকাটা বয়ে আনতে হবে, এই যা। শোনো, তুমি আর দেরি করো না। যাও যাও, কা কা খা খা খেয়ে এসো, আর ফেরার সময় আর একটু বড়ো বড়ো কুটো খুঁজে পেতে এনো।

কোকিলঃ      কুক কুক কুউউউরে, কাকবৌদি তোমার কাকচরণে প্রণাম, কাক তোকেও অনেক অনেক থাংকুউউ ভাই। তোর মতো সুজন আর কুউউথায় গেলে পাই? তোদের সাহায্যে আমরা কোকিল কূজনে ভরে তুলব দশদিক...কুউউ কুউউ

কাকঃ        কা কা খা খা খেয়ে আসি দাঁড়া, তারপর তোর গান শুনতে শুনতে বাসাটা আজই চটপট বানিয়েই ফেলব।

 

-০০-         


নতুন পোস্টগুলি

একটি শিশিরবিন্দু....

    এর আগের রম্যকথা - "  ...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু  "  যতদূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ি, সাল ১৯৬৮ কিংবা ৬৯, ডোনেশানের জন...