মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৮ "


৪৪

 

কাজের কথা সেরে বালিয়া আর বড়্‌বলা চলে যেতেই, ভল্লা বলল, “এক ঘটি জল খাওয়াবি, মা? তেষ্টায় ছাতিটা ফেটে যাচ্ছে”। কমলিমা উঠে গেলেন জল আনতে, ভল্লা বলল, “তোর রাতের রান্না কী হয়ে গেছে, মা?”

কমলিমা জলের ঘটি ভল্লার হাতে দিয়ে বললেন, “খাবি তো সেই দুপুররাত্তিরে – বসাব এখন...”

“বলছিলাম, তোর আরেকটি ছেলে এই এল বলে, প্রতি রাত্রেই সে আমাদের সঙ্গে খায়। দুটো-তিনটে রুটি বেশি করিস মা”।

“সে ছেলে দিনে না এসে, রাতে কেন আসে?”

মারুলা বেড়ার কাছে চলে এসেছিল, ভল্লার বাসা থেকে মহিলার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল।

ভল্লা টের পেয়ে বলল, “সে ছেলে নিশাচর, রে মা। পেঁচা কিংবা বাদুড়ের মতো। দিনের আলোয় চোখে অন্ধকার দেখে...ওই তো এসে গেছে...অনেকদিন বাঁচবি হতভাগা, এই যে মা, এর নাম মারুলা”।

মারুলা উঠোনে এসে দাঁড়াল, কমলিমায়ের পাঁ ছুঁয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করল, “কমলিমা? আমার নামে কী বলছিল মা, মুখপোড়াটা? আমি পেঁচা, বাদুড়?”

কমলিমা হেসে ফেলে বললেন, “তার আমি কী জানি – সে তোমাদের বন্ধুদের ব্যাপার। কিন্তু তুমি আমাকে কী করে চিনতে পারলে, বাবা?”

“তোমাকে না চিনলে কী হবে, তোমার কথা এত শুনেছি এই ভল্লা আর রামালির কাছে – না চিনে যে উপায় নেই মা”।

কমলিমা হেসে বললেন, “তা বেশ বাবা, তোমরা বসে কথা বল, আমি রান্নার জোগাড় দেখি”।

ভল্লা বলল, “তোর সঙ্গেও দুটো কথা আছে মা, একটু বসে যা। আমাদের ছেলেদের একটা দল আছে নিশ্চয়ই শুনেছিস, মা। সেই দলের সবাই যদি নাম পালটে নিজেদের ‘জুজাক’ বলে ডাকে, তুই রেগে যাবি মা?”

কমলিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে, বললেন, “তার মানে? মরা মানুষটাকে নিয়ে হঠাৎ এ আবার কী পাগলামি?”

“দেখ মা। তোকে খোলাখুলিই বলি। এই অমাবস্যায় আমাদের ছেলেরা আস্থান আক্রমণ করবে – সেখানে ছেলেরা নিজেদের নাম নিয়ে ডাকাডাকি করলে, আস্থানের রক্ষীরা তাদের চিনে নেবে। সেই কারণে সবারই নাম হবে জুজাক। রক্ষীরা বুঝবে এ আক্রমণ কিসের জন্যে – তারা হাড়ে হাড়ে টের পাবে একজন জুজাককে মারলে – তিরিশজন জুজাক তার শোধ নেবে...”

কমলিমার দুই চোখ জলে ভরে উঠল, কান্নার বেগ কিছুটা সামলে ধরা গলায় বললেন, “সত্যিই তোরা শোধ নিবি? রামালি সে রাত্রে বলেছিল বটে – ভেবেছিলাম ছেলেমানুষী আবেগ...”।

“না মা, এ আবেগ নয় – প্রতিজ্ঞা। তুই জানিস না মা – রামালি, সুরুল, আহোক, কিশনা এই ক’মাসে কী দারুণ লড়াই করতে শিখেছে। এই অমাবস্যায় সেই পরীক্ষা। রামালি আর সুরুল ঠিক করেছে – নিজের হাতে উপানুকে হত্যা করবে... উপানুর নাম শুনেছিস মা?”

কমলিমায়ের অশ্রুসিক্ত দুই চোখ যেন ঝলসে উঠল, বললেন, “অনামুখো, বাঁশবুকো মিনসের নাম শুনবো না? রামালিদের হাতে ও যেদিন ঘেয়ো কুকুরের মতো মরবে, সেইদিন শান্তি পাবো আমি এবং আমার প্রধান”।

রামালি উঠে এসে কমলিমায়ের হাঁটুতে হাত রেখে বসে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি নিশ্চিন্ত থাক জেঠিমা – আমি আর সুরুল ওর এমন অবস্থা করব – ওকে চেনা যাবে না...”।

কমলিমা রামালির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি তোদের সবাইকে আশীর্বাদ করছি বাবা, তোদের প্রতিজ্ঞা নিশ্চিত পালন হবে – তোদের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগবে না...”।

একটু সময় নিয়ে ভল্লা খুব নরম করে বলল, “আমাদের দলের আমরা সবাই জুজাক, তাই তো মা?”

কমলিমা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন, অস্ফুট অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ জুজাক”।

“আরেকটা কথা আছে মা। আমাকে যেমন সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছিলি, আমার বা আমাদের ছেলেদের যদি তেমন সেবা দরকার হয়, করবি মা?”

কমলিমা উৎকণ্ঠায় বলে উঠলেন, “কেন কার কী হয়েছে?”

ভল্লা কমলিমায়ের একটা হাত ধরে বলল, “বালাই ষাট, কারও কিছু হয়নি। কিন্তু ওদিন যদি কেউ চোট-আঘাত পায় – বড়্‌বলা তাদের চিকিৎসা করবে আর তুই করবি সেবা...পারবি না, মা?”

কমলিমা বললেন, “তা করব না কেন? আমার আর কাজ কি? কিন্তু এই ঘরে তাদের রাখবি কী করে?”

ভল্লা নিশ্চিন্ত স্বরে বলল, “এ ঘরে নয় মা। এখান থেকে একটু দূরে আমাদের নতুন পাকা বড়ো বড়ো ঘর হয়েছে। অমাবস্যার দিন তোকে নিয়ে যাবো মা, সেখানেই আমরা সবাই মিলে কয়েকদিন থাকব”।

“আমার ছেলেদের সঙ্গে আমি সর্বদাই জুড়ে থাকব, ভল্লা, ভাবিস না। এখন উঠি – রাত হল অনেক...রান্না বসাই...”।

“আচ্ছা, আরেকটা কথা বলে রাখি মা, কাল থেকে আমাদের এখানেও পাকা ঘর বানানোর কাজ শুরু হবে। কাল সকালে কুলিকপ্রধান আসবে তার লোকজন নিয়ে। কোন অসুবিধে হবে না তো?”

“এখান থেকে একটু সরে করতে বলিস – হই-হট্টগোল আমার ভাল লাগে না। আর তারাও সবাই পুকুরে যাবে তো?” কমলিমা একটু উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন।

“তা তো যাবেই। কিন্তু ভাবিস না মা, ওদের বলে দেব। তোকে ওরা বিরক্ত করবে না”।

 

ভল্লা মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওদিকের কী খবর?”

“বীজপুর থেকে অস্ত্র-শস্ত্র আজ রাতে রওনা হচ্ছে। আশা করি কাল রাত্রে আমাদের ভাণ্ডারে পৌঁছে যাবে। কিন্তু উপানু শালা কাঠি করতে শুরু করেছে। আজ সকালে শষ্পকের কাছে গিয়ে নাকি বলেছে, ওর কাছে খবর এসেছে, চারখানা গোশকট বোঝাই অস্ত্র-শস্ত্র, বীজপুরের পাশে জঙ্গলের মধ্যে রাখা আছে। কোন এক বণিক – তার নাম জানে না – আমাদের রাজধানী থেকে ওগুলো কিনে এপথে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝে দ্যাখ, ভল্লা, হতভাগার আড়কাঠি সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে”।

“তা তো থাকবেই। আমাদেরও তো আছে – কিন্তু শুনে শষ্পক কী বলল?”

“শষ্পক আমাকে যা বলল, ওকে জিজ্ঞাসা করেছে,

“তোমার লোক বণিকের মোহর-পত্র দেখেছে?”

“দেখেছে, সব ঠিক আছে। কিন্তু বণিক নিজে তো সঙ্গে নেই, আছে তার করণিক আর রক্ষীদল”।

“মোহর-পত্র যদি ঠিক থাকে, তোমার - আমার মাথাব্যথা কিসের? রাজধানী বুঝবে আর বুঝবে সেই বণিক”।

“তা ঠিক কিন্তু...”।

“কিচ্ছু কিন্তু নেই, উপানু। আমি এই আস্থান আর ওই দুই গ্রাম নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে রয়েছি। আর বিপদ ডেকে এনো না””।

ভল্লা বলল, “শষ্পক তো ঠিকই করেছে। কিন্তু উপানু হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ওর সেই চরটাকে খুঁজে বের করতে পারবি?”

“পারবো। বীজপুরের জনাই – আর ওই বণিকের রক্ষীসর্দার – ওদের থেকেই ব্যাটার সব তত্ত্ব জেনে নেব – তারপর ধরতে আর কতক্ষণ”?

“তবে আর কি? যা করার করে ফ্যাল। আর উপানুর আয়ু তো অমাবস্যা অব্দি, তাই তো রামালি?”

“ওই রাতের পর উপানুর আর বাঁচার কোন আশাই নেই – আমরা কমলিমায়ের আশীর্বাদ পেয়েছি, ভয় কি?”

কমলিমা রান্না করতে করতে বললেন, “ভল্লা, আমার রান্নার ভাঁড়ার কিন্তু বাড়ন্ত – বড়ো জোর দু একদিন চলবে...”।

ভল্লা হেসে বলল, “ভাবিস না মা, কাল ভোরে উঠেই দেখবি, তোর ঘরের দরজার সামনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার রাখা আছে”।

ভল্লা মারুলাকে বলল, “বটতলির ছেলেদের তাহলে, পরশু সকাল সকাল পাঠাব – অস্ত্র-শস্ত্র আনার জন্যে?”

“পরশু সকালে? ঠিক আছে – বলে রাখব। ও হ্যাঁ, বটতলির ছেলেদের গয়না-পত্র বিক্রি হয়ে বীজপুর থেকে টাকা চলে এসেছে। কত টাকা, শুনলে চমকে যাবি”।

“কত?”

“তিনশ চল্লিশ রূপোর মুদ্রা!”

“বলিস কী? বটতলির ছেলেগুলোকে খুব হাল্কাভাবে নিয়েছিলাম – কিন্তু এখন দেখছি বেশ কাজের তো?”

“সে আর বলতে? আচ্ছা, কাল দুপুরে রামালি যাচ্ছিস তো? আর ভল্লা যাচ্ছিস বিকেলের দিকে, তাই তো?”

“হ্যাঁ রামালি দুপুরে খেয়ে সোজা চলে যাবে – আমি মাকে আর ছেলেদের নিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে যাবো”।

কমলিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাকে নিয়ে কোথায় যাবি? কালকেই নতুন ঘরে চলে যাবি নাকি?”

“না রে মা, কালকে গিয়ে তুইও একবার দেখে নে। তোর প্রয়োজন মত, কোথায় কী করতে হবে বলে দিবি। তারপর সন্ধেতেই আমরা ফিরে আসব। তারপর অমাবস্যার বিকেলে আমরা সবকিছু নিয়ে চলে যাবো – কিছুদিনের জন্যে আমরা ওখানেই থাকব”।       

মারুলা বলল, “কিন্তু কমলিমাকে নিয়ে তোরা হেঁটে যাবি নাকি?”

ভল্লা বলল, “সে চিন্তা তোকে করতে হবে না, সে মা জানে… তোকে একটা কথা বলে রাখি – সবই তো শুনলি মায়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে – আক্রমণের দিন আমরা সবাই সবাইকে ‘জুজাক’ বলে ডাকব – কারো কোন নাম থাকবে না। তুই, আমি, রামালি সবাই জুজাক – জুজাকদাদাও নয় – ঠিক আছে?”

মারুলা বলল, “ঠিক আছে

মারুলার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে বণিক অহিদত্তের ডাক শোনা গেল, “ভল্লামশাই রয়েছেন নাকি?”

“রয়েছি - চলে আসুন বণিকমশাই, আপনার রক্ষীদের বলুন আমাদের বাসাটা ঘিরে থাকুক – কেউ যেন কাছে না আসতে পারে…” ভল্লা গলা তুলে সাড়া দিল।

অহিদত্ত উঠোনে এসে একটু চমকে গেলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, “কমলিমা না? বাঃ খুব ভালো করেছেন। ছেলেগুলোর মাথার ওপরে একজন মা থাকলে – ওদের শক্তি বেড়ে যাবে”।

ভল্লা বলল, “এখানে বসুন বণিকমশাই। তারপর পরিস্থিতি কী বলুন”।

ভল্লার পাশে বসে বণিকমশাই বললেন, “এমনিতে সবই ঠিক আছে, বার্তা পেলাম বীজপুর থেকে আমাদের শকট রওনা হয়ে গেছে –  ওখান থেকে নতুন বলদ জুড়েছে, বেশ তাড়াতাড়িই টানবে মনে হয়। বলছে আগামীকাল দুপুরের আগেই... কিন্তু একটা আপদ এসে জুটেছে...এঁটুলির মতো”।

মারুলা বলল, “কোন ফেউ পিছু নিয়েছে?”

অহিদত্ত ভল্লার দিকে তাকালেন, ভল্লা বলল, “আমারই ভুল – আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি – ও হচ্ছে মারুলা – আমরা একসঙ্গেই...”

ভল্লার কথা শেষ করতে না দিয়ে অহিদত্ত বললেন, “মারুলামশাই – বিলক্ষণ রাজধানীতে আপনার কথাও বলেছে – আপনিই নাকি সবদিক দেখা শোনা করবেন। নমস্কার।”

মারুলাও নমস্কার করে বলল, “আপদটা কি?”

“আর বলবেন না, বীজপুরে ঢোকা থেকে কে একটা লোক আমাদের লোকগুলোর পিছনে পড়ে গেছে, মোহর-পত্র দেখেছে। জিগ্যেস করছে কোথায় যাবে, বণিকের নাম কী, এত অস্ত্র-শস্ত্র কী হবে...হাজারটা প্রশ্ন”।

“ও কি সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে?” মারুলা জিজ্ঞাসা করল।

“না – একটু পিছনে – নাগাড়ে অনুসরণ করে চলেছে...আমাদের রক্ষীরা কিছু করতেও পারছে না, অচেনা-অজানা – কার লোক কে জানে?”

মারুলা ভল্লার দিকে তাকাতে, ভল্লা ঘাড় নাড়ল – তারপর বলল, “ঠিক আছে ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, বণিকমশাই। আপনার সঙ্গে লোকজন আছে তো? শকট খালি করে ভাণ্ডারে ঢোকাতে বেশ কিছু লোক লাগবে কিন্তু...”।

“লোক সঙ্গেই আছে, ওরা খালি করে শকট নিয়ে ফিরে যাবে। আর আছে আটজন সশস্ত্র রক্ষী, একজন করণিক, তার একজন সহকারী, আর চারজন ভৃত্য। ভাণ্ডারে সব কিছু ঢুকে গেলেই দরজায় তালা পড়ে যাবে - সকলে নিজের নিজের কাজ সামলাবে...”।

ভল্লা বলল, “বাঃ ব্যবস্থা তো ভালোই... আগামীকাল ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে নিশ্চিন্ত। ও আরেকটা কথা বণিকমশাই – আমাদের মায়ের রান্নার ভাণ্ডার প্রায় শেষ হতে চলল, আজ রাত্রে অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার এসে যাবে তো?”

অহিদত্ত বললেন, “হ্যাঁ আজ ওর আসার কথা তো, নিশ্চয়ই দিয়ে যাবে...”

“আরেকটা অনুরোধ – অমাবস্যার রাতে আমাদের একটা বড়ো কাজ আছে – ওই দিন থেকে আমরা বেশ কিছুদিন অস্ত্র ভাণ্ডারেরই একটা ঘরে সবাই থাকব – প্রায় চল্লিশজন – তাদের পেটের সমাধানটাও আপনাকেই করতে হবে... অমাবস্যার আগেই। কোন ঘরে রাখতে হবে মারুলা, করণিকবাবুকে বুঝিয়ে দিস”।

“অনুরোধ বলবেন না ভল্লামশাই – আপনি আমার থেকে কোনদিন কোন সাহায্যই নেননি – দু মণ তুলো আর দু’মণ বাদামের বীজ দিয়েছিলাম – তার মূল্যও আপনি পাই-পয়সায় মিটিয়ে দিয়েছেন...আমার কাছে আপনার যা মুদ্রা এখনও জমা আছে...তাতে চল্লিশজনের মাসখানেকের খাদ্যের সংস্থান হয়ে যাবে...ও নিয়ে মোটেও চিন্তা করবেন না। আমি বণিক - এটাই আমার কাজ”।

“ঠিক আছে, বণিকমশাই। এরপর আমাদের সময় করে একদিন বসতে হবে – কিন্তু সেটা ওই অমাবস্যার পরেই কোন একদিন – আপনাকে সংবাদ দেব। আমরা চারজন – আপনি, মারুলা, রামালি এবং আমি বসে দর-মূল্য সব ঠিক করে নেব – ওই দিন আদান-প্রদানও সেরে নেব...”।

অহিদত্ত অবাক হয়ে বললেন, “বলছেন কী ভল্লামশাই, আদান-প্রদানও...”।

ভল্লা মৃদু হেসে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল, “এখন আর কোন কথা নয়”।

        অহিদত্ত হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আমি এখন আসি। কমলিমা, প্রণাম নেবেন। চললাম, দেখা হবে     আবার"। 


চলবে... 


সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৫ "]


৫.৫.১ সমুদ্র মন্থন

ভগবান শিবের এই দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করার রুদ্র রূপই একমাত্র রূপ নয়। তাঁর অন্য আরেকটি রূপ ভীষণ সহজ, সরল, অনাড়ম্বর এবং উদাসীন তপস্বীর মঙ্গলময় রূপ। অমৃত লাভের জন্যে দেবতা ও অসুররা সম্মিলিত হয়ে, সমুদ্রমন্থন শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের থেকে অতি উৎকট হলাহল উঠে এল। সেই হলাহলের তীব্র তেজে দেবতা, অসুর এবং লোকপালেরা সকলেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁদের রক্ষার জন্যে সকলেই দেবাদিদেব মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন। মহেশ্বর তখন কৈলাসে দেবীর সঙ্গে তপস্যা করছিলেন। দেবতাদের প্রার্থনা শুনে তিনি পত্নী ভবানীকে বললেন, “কী দুশ্চিন্তার বিষয়, সমুদ্র মন্থনে উদ্ভূত কালকূট প্রজাদের ঘোর দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রজাগণ নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এদের অভয় দেওয়াই আমার বিধেয়, যেহেতু যিনি সমর্থ, দীনজনকে রক্ষা করাই তাঁর একান্ত কর্তব্য। অতএব এই বিষ আমিই পান করব”। দেবী ভবানী পতি মহেশ্বরের সাধ্যের কথা জানতেন, তাই আপত্তি করলেন না। তখন দেবাদিদেব সমস্ত হলাহল পান করলেন এবং বিষের তীব্র তেজে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে গেল। যদিও সেই বিষ তাঁর আর কোনও ক্ষতি করতে পারল না। সেই থেকেই তাঁর আরেক নাম হল নীলকণ্ঠ। পান করার সময়, তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে কিছু বিষ মাটিতে পড়েছিল, সেই ছিটেফোঁটা বিষ পান করেই, সাপ, বৃশ্চিক, শৃগাল, কুকুর এবং কিছু লতা-গুল্ম বিষধর হয়ে উঠেছিল।

এরপর সমুদ্রমন্থন থেকে একে একে নানান ঐশ্বর্যের উদ্ভব হতে লাগল। যেমন, সুরভি নামের কামধেনু, ব্রহ্মবাদী ঋষিরা তাঁকে গ্রহণ করে তাঁদের গোয়ালে বেঁধে ফেললেন। শ্বেতবর্ণ এক ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবা, দেবরাজ ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের ঘোড়াশালে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। ঐরাবত নামের হাতি, সঙ্গে আটটি হস্তিনী- কেউ গ্রহণ করলেন কিনা, মহাভারত থেকে জানা যায় না। কিন্তু অন্য পুরাণ মতে ঐরাবত দেবরাজ ইন্দ্রই কুক্ষিগত করে নিজের পিলখানায় বেঁধে ফেলেছিলেন। কৌস্তুভ নামের পদ্মরাগ রত্ন, ভগবান বিষ্ণু গ্রহণ করলেন। পারিজাত বৃক্ষ, ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের বাগানে রোপণ করলেন। সোনার অলংকারে ভূষিতা অপ্সরাগণ, তাঁদেরও ইন্দ্র স্বর্গে নিয়ে গেলেন। এরপর আবির্ভূতা হলেন লক্ষ্মীদেবী, তিনি নিজেই ভগবান বিষ্ণুকে আশ্রয় করলেন। এরপর সুরার দেবী বারুণী আবির্ভূতা হলেন, ভগবান বিষ্ণুর অনুমতি নিয়ে অসুররা তাঁকে গ্রহণ করলেন। এরপরেই অমৃতপূর্ণ কলস হাতে আবির্ভূত হলেন, আয়ুর্বেদ পারদর্শী ধন্বন্তরি। অতএব সমুদ্রমন্থনে লব্ধ এত ঐশ্বর্যের মধ্যে ভগবান শিবের ভাগে জুটেছিল তীব্র বিষ, কারণ অমৃতের ভাগ তো, পৌরাণিক মতে, দেবতাদের সকলেই পেয়েছিলেন। এমন উদাসীনতা আর কোন হিন্দু দেবতার মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না।  

৫.৫.২ শিবের পূজা

মহাভারতে শিবের রূপ নিয়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখ আছে। ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে, দেবাদিদেব শিবের বর্ণনায় বলেছেন, “ত্রিপুরারি মহাদেব - বৃষ তাঁর বাহন, তিনি নীলকণ্ঠ, শূল ও পিনাকধারী এবং কৃত্তিবাস” (সভা/৪৫)। মহারাজ সগর পুত্রকামনায় কৈলাস পর্বতে গিয়ে তপসা করেছিলেন এবং সেখানে ভবানীপতি শূলপাণীর থেকে পুত্রলাভের বর লাভ করেছিলেন (বন/১০৬)। মহাদেবের থেকে পাশুপত অস্ত্র লাভের জন্যে অর্জুন হিমাচলের দুর্গম এক পাহাড়ে দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন। অর্জুনের তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব কিরাতের বেশে অর্জুনের সঙ্গে প্রথমে অস্ত্রযুদ্ধ পরে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হন। সে যুদ্ধে যদিও অর্জুনের পরাজয় হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরাক্রমে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে, নিজের পরিচয় জানালেন এবং পাশুপত অস্ত্র দান করলেন। তারপর এই অস্ত্রের প্রয়োগ ও নিরোধের বিধি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞ অর্জুন মহাদেবের স্তবে বলেছিলেন, “হে মহাদেব, হে নীলকণ্ঠ, হে জটাধর, হে ত্র্যম্বক (ত্রিলোচন), হে বিষ্ণুরূপ শিব, হে শিবরূপ বিষ্ণো, হে শূলপাণে, হে পিনাকধারিণ, হে মার্জ্জালীয়[1], আপনাকে প্রণাম” (বন/১৩৯)। মহাভারতে ব্যাসদেব অর্জুনের কাছে মহাদেবের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “তিনি রুদ্র, নীলকণ্ঠ, করাল, পিঙ্গলাক্ষ, কপর্দ্দী (জটাধারী), উগ্র। তিনি দিক্‌পতি, পর্জন্যপতি, ভূতপতি, বৃক্ষপতি, গোপতি, বিশ্বপতি। তিনি ধর্মাত্মা, মহেশ্বর, মহোদর, দ্বীপীচর্মবাস (বাঘছাল বসন), ত্রিশূলপাণি, পিনাকী, খড়্গ-চর্মধারী। তিনি ত্রিপুরঘ্ন, ভগনেত্রঘ্ন, বনষ্পতির পতি, নরগণের পতি, মাতৃগণের পতি, গণপতি, গোপতি, যজ্ঞপতি, দেবপতি। তাঁকে বিনীত নমস্কার কর। তাঁর অনেক পার্ষদ আছেন, তাঁরা বামন, জটিল (জটাধারী), মুণ্ডী (নরমুণ্ডধারী), হ্রস্বগ্রীব, মহোদর, মহাকায় প্রভৃতি বিকৃত বেশধারী, বিকৃত মুখ, বিকৃত পা প্রাণী” (দ্রোণ/ ২০৩)।

মহাভারতের প্রধান চরিত্রদের অনেকেই শিবভক্ত এবং মহাদেব শঙ্করের আরাধনা করতেন, যেমন দ্রৌপদী, অর্জুন, জরাসন্ধ প্রমুখ। জরাসন্ধ যখন নরবলি দিয়ে রুদ্রযজ্ঞের আয়োজন করছিলেন, সেই সময়েই কৃষ্ণের নির্দেশে ভীম তাঁকে হত্যা করেন। কৌরব প্রাসাদের দেবমন্দিরে মহাদেবের উপাসনা কে করবেন, সে নিয়ে রাণি গান্ধারী ও রাণি কুন্তীর মধ্যে নাকি বিবাদ হয়েছিল। রাজা সগর, জয়দ্রথ, অম্বা, দ্রুপদরাজা, সোমদত্ত, অশ্বত্থামা এবং স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণও শাল্ব রাজার রাজধানী সৌভনগর ধ্বংস করতে যাওয়ার আগে শিবের উপাসনা করেছিলেন।  

৫.৫.৩ শিবমূর্তি

শিবের বহু মূর্তিপূজার প্রচলন থাকলেও, সব থেকে প্রাচীন এবং আজও সব থেকে পূজিত হয়, তাঁর প্রতীক “লিঙ্গ”। যতদূর প্রমাণ পাওয়া যায় এই লিঙ্গপূজা, সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। এই লিঙ্গের বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার শহরগুলির প্রত্নখননে। লিঙ্গ প্রজননের প্রতীক। প্রচুর শস্য, সন্তান, পশু এবং সমৃদ্ধির আশায় ভারতীয় সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই লিঙ্গ পূজার বহুল প্রচলন। এবং প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনকাল থেকে লিঙ্গপূজার মতো সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা হিন্দুধর্মের আর কোন দেবতার ভাগ্যে জোটেনি।

বিবিধ লিঙ্গ এবং তার মহিমার কথা সবিস্তারে জানা যায়, “তপোভূমি নর্মদা” গ্রন্থে,

যেমন – “সাধারণতঃ আমরা শিবলিঙ্গ দেখলেই তাঁকে বাণলিঙ্গ আখ্যা দিই। কিন্তু বাণলিঙ্গের অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন, রৌদ্রলিঙ্গ, শিবনাভিলিঙ্গ, দেবলিঙ্গ, আর্ষলিঙ্গ, আগ্নেয়লিঙ্গ, নৈঋতলিঙ্গ, বারুণলিঙ্গ, বায়ুলিঙ্গ, কুবেরলিঙ্গ, বৈষ্ণব লিঙ্গ, ইত্যাদি। এছাড়া যে কোন শিবলিঙ্গের মধ্যে জ্যোতির প্রকাশ থাকলে তাকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলা হয়”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৮২)।

এই বাণলিঙ্গের সৃষ্টি সম্পর্কে যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতায়, স্বয়ং মহেশ্বর দেবী পার্বতীকে বলছেন, “বাণাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বর দিয়েছিলাম যে (ধাবড়ি কুণ্ডে) পর্বত ও নর্মদার জলস্রোতে বিঘূর্ণন ও বিঘর্ষণে আমি লিঙ্গরূপে সতত নর্মদার জলে বিরাজমান থাকব। শত সহস্র লিঙ্গের মধ্যে যেগুলির আকৃতি পাকা জাম বা হংস ডিম্বের মতো হবে, বর্ণ হবে পাকা জামের মতো কিংবা মধুবর্ণ, শ্বেত, নীল ও মরকতের মত দ্যুতিসম্পন্ন সেইগুলিকেই বাণলিঙ্গ বলে জানবে”। পুরাণের কাহিনী থেকে জানা যায়, নর্মদার তীরেই ছিল বলিরাজার পুত্র বাণাসুরের সাম্রাজ্য। সাতপুরা পর্বতের শিখরদেশে ছিল তাঁর রাজধানী”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৯১)।  

পরবর্তী কালে এই লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যোনি, যাকে গৌরীপাট বা গৌরীপট্ট বলে। উদ্দেশ্য একই ভগবান শিব ও ভগবতী গৌরীর ঐশী মিলনে ভক্তদের গোলা ভরে উঠুক শস্যে, ঘরের উঠোনে খেলে বেড়াক সুস্থ সন্তানেরা। গোয়ালে বেড়ে উঠুক সবৎসা গাভী। প্রজনন মানেই সুখ, সম্পদ ও সমৃদ্ধি। ভগবান শিবের মন্দিরের মধ্যে সব থেকে পবিত্র মনে করা হয় দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। আজও হিন্দুদের মধ্যে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের তীর্থদর্শন খুবই পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। এই বারোটি মন্দিরের অবস্থান, সোমনাথ (গুজরাট), মল্লিকার্জুন (অন্ধ্র), মহাকালেশ্বর (উজ্জয়নী), ওঙ্কারেশ্বর (মধ্যপ্রদেশ), কেদারনাথ (উত্তরাখণ্ড), ত্র্যম্বকেশ্বর (মহারাষ্ট্র), রামনাথস্বামী (তামিলনাড়ু), কাশী বিশ্বনাথ (উত্তরপ্রদেশ), ইলোরার ঘুস্মেশ্বর (মহারাষ্ট্র), বৈদ্যনাথ (ঝাড়খণ্ড), দ্বারকার নাগেশ্বর (গুজরাট), ভীমশংকর (মহারাষ্ট্র)।

দক্ষিণ ভারতে শিবের নটরাজ মূর্তি পূজার বহুল প্রচলন আছে। দক্ষিণ ভারতীয় শিবভক্তদের বিশ্বাস, মহাদেবের হিমালয়ে কৈলাস পর্বতের আবাস ছাড়াও দক্ষিণ ভারতেও তাঁর আবাস আছে। সেটি হল চিদম্বরম মন্দির বা তিল্লই মন্দির – পুদিচ্চেরি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দক্ষিণে, সমুদ্র উপকূলের কাছে। চিদম্বরম (চিৎ+অম্বরম) শব্দের অর্থ মনের আকাশ বা চেতনার আকাশ, দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির মধ্যে স্থাপত্য সৌন্দর্যে এই মন্দির অন্যতম প্রধান। এখানে মহাদেবের নটরাজ মূর্তি পূজিত হয়। এই মন্দিরের দেওয়ালে নটরাজের যে ১০৮টি নৃত্যভঙ্গি খোদিত আছে, সেগুলির বর্ণনা ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়। এই ভঙ্গীগুলি থেকেই বিখ্যাত ভারতনাট্যম নৃত্যের সৃষ্টি। 

প্রাচীন অনার্য ভারতীয়দের পূজিত আরেকটি দেবমূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে, সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নখননে। শিং-ওয়ালা মুকুট মাথায় এক দেবমূর্তি, যাঁর আশেপাশে বেশ কয়েকটি সজীব প্রাণীর মোটিফ। অনুমান করা হয় ইনি ভগবান শিবের আদিম সংস্করণ, পশুপতিদেব। একটু অন্যরকম পশুপতির মূর্তি পাওয়া গেছে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতেও। সে মূর্তি চতুর্ভুজ, একহাতে বরাভয় বা আশীর্বাদ, অন্য হাত মুক্ত যেন বরদানে উদ্যত, তৃতীয় হাতে একটি কুঠার আর চতুর্থ হাত থেকে লাফিয়ে উঠছে ছোট্ট একটি হরিণশাবক।



[1] শব্দকোষে মার্জ্জালীয় শব্দের অর্থ বলছে, ১. মার্জ্জার, ২. কিরাত বা শুদ্ধদেহ, ৩. শূদ্র। (মহাদেব কী তাহলে শূদ্র কিরাতের ছদ্মবেশে নয়, নিজের স্বাভাবিক বেশেই অর্জুনের সঙ্গে লড়াই করলেন? তা না হলে, অর্জুন তাঁকে সাক্ষাৎ মহাদেব জেনেও, তাঁর কিরাত বা শূদ্র রূপেরও সম্বর্ধনা করলেন কেন

চলবে...


শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৩

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২২ "  


২৩

 

সুনুদা,

গতকাল তোমার থেকে দু’দিনের সময় চেয়ে নিয়েছিলাম এবং তোমাকে ধৈর্য ধরতে লিখেছিলাম। তুমি যতখানি অধৈর্য হয়ে উঠেছ আমার না-বলা কথা শোনার জন্যে – আমিও ঠিক ততখানিই উতলা হয়ে উঠছি...কতক্ষণে বা কতদিনে তোমাকে আমার জীবনের সকল কথা বলে উঠতে পারব। তোমার মুখোমুখি বসে এসব কথা কি বলতে পারতাম না? না, পারতাম না। তোমার সামনে বসে, তোমার চোখে চোখ রেখে এসব কথা, আমার সকল কথা এভাবে গুছিয়ে বলার সুযোগ কোনদিনই হত না। মনের মধ্যে জড়ো হয়ে উঠত অজস্র বাধা-বিঘ্নের কড়া প্রহরা – অহমিকা, সঙ্কোচ, “এসব কথা এতদিন পরে, তোমাকে বলে আমার কীই বা লাভ? অথবা এসব কথা না শুনলেই বা তোমার কী এমন ক্ষতি” – এই চিন্তাটাও আমার মনের আগলটুকু জোর করে আগলে থাকত।

সেই সেদিন হলদিয়া ফেরার পথে তোমার সঙ্গে অকস্মাৎ যে দেখা হয়ে গেল, সেই থেকেই হেমন্তর একটা গান আজকাল ঘুরে ফিরে মনে আসে, যখন তখন –

“সব কথা বলা হল, বাকি রয়ে গেল শুধু বলিতে

যে কথা মনের কথা, কতবার থেমে গেছি

বলিতে বলিতে বলিতে বলিতে।

সব পথ শেষ হল, আর বাকি নাই পথ চলিতে

তোমার আঙিনাটুকু পার হতে থেমে গেছি

কতবার চলিতে চলিতে চলিতে”।*

 এমনিতেই একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গিয়েছি দমদম এয়ারপোর্টে। চেকইন সেরে এসে এখন আবার শুনছি – অন্ততঃ ঘন্টা খানেক ডিলে করতে পারে আমার ফ্লাইটটা। অতএব প্রায় ঘন্টাদুয়েক উটকো সময় যখন হাতে এসেই গেল, মনে হল, তোমার সঙ্গে আরও কিছু কথা বলার এমন সুযোগটা হাতছাড়া করার কোন মানে হয় না।

 

শশাঙ্কর আচমকা প্রস্তাবে যতখানি ভয় পেয়েছিলাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, অতটা আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কোন যুক্তি ছিল না। ঘর-পোড়া গরু শুনেছি রাঙা মেঘ দেখলেও ডরায়। এ কথাটা মাকে প্রায়ই বলতে শুনেছিলাম। আমার অবস্থা তখন সেরকমই। ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া যে কোন পুরুষকেই আমার মনে হত আমার জীবনের পক্ষে পোটেন্সিয়াল থ্রেট। মিঠি মিঠি স্বপ্ন দেখিয়ে তছনছ করে দেবে সদ্য মুক্তির স্বাস পাওয়া আমার এই স্বস্তির জীবনটা।  

আজ বলতে দ্বিধা নেই, সেই সেদিনের পর শশাঙ্ক কোনদিনই আর কোনরকম আভাস ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। এবং ওর অফিসে আমার চাকরিটি নির্বিঘ্নেই চলতে লাগল। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে শর্ত ছিল মিনিমাম বারো মাসের প্রভিসনাল পিরিয়ড। বারো মাস পরে ম্যানেজমেন্ট আমার পার্ফম্যান্স রিভিউ করবে – যদি তারা স্যাটিস্ফায়েড হয়, তাহলে নতুন করে পার্মানেন্ট এমপ্লয়মেন্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হবে আমাকে। বারো মাস নয় আটমাসের শেষেই আমাকে পার্মানেন্ট করে নেওয়া হল। আমার পে-স্ট্রাকচারটা পালটে গেল এবং টেক হোম অ্যামাউন্টটাও বাড়ল সিগনিফিক্যান্টলি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আমার দারুণ খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এবং হয়েওছিলাম।

সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে গড়িয়াহাট থেকে, বাবার জন্যে একটা কাশ্মীরী শাল, মায়ের জন্যে ভালো সিল্কের একটা শাড়ি, আর পুত্রের জন্যে ব্যাটারি দেওয়া তিন-কামরার একটা রেলগাড়ি কিনে বাড়ি ফিরলাম। সঙ্গে আরও নিয়েছিলাম এক বাক্স সন্দেশ। ঘরে ফিরে বাবা ও মাকে প্রণাম করলাম। সেদিন আমার অনেক বেশি বেশি আদরও কেড়ে নিল আমার সুধন্বা।  

বাবা খুব খুশী হয়ে আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন, “এই কাজটা তোকে গভীর এক সংকট থেকে উদ্ধার করেছে মা, নিশ্চিন্ত করেছে আমাদের সকলকে। ভুলেও কোনদিন অবহেলা করিস না কাজটাকে”। মা বাবার সামনে খুব খুশি খুশি ভাব দেখালেও, আড়ালে বললেন, “এ সবই তোকে ফাঁদে ফেলার টোপ, সুকু। এই সব করে তোর মন ভোলাচ্ছে”। আমার কাছে শশাঙ্কর সেইদিনের সেই প্রস্তাব রাখার কথাটা মাকে বলেছিলাম। বাবাকে বলিনি, তবে মা বাবাকে বলেছিলেন কিনা জানা ছিল না। মায়ের ওই মন্তব্যে সেদিন জানি না কেন মনে অন্যরকম একটা প্রতিক্রিয়া হল। সে প্রতিক্রিয়াটা প্রতিকূল নয়, বরং শশাঙ্কর পক্ষে খানিকটা অনুকূলই বলা যায়।

শশাঙ্ক যথেষ্ট সুপুরুষ। শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত এবং রুচিবান। আমাদের তুলনায় সে অনেকটাই অর্থবান ও সমাজে প্রতিপত্তিশালীও বটে। তার পরিচিতি মহলে প্রেমে পড়ার তো বটেই এমনকি ঘনিষ্ঠ হওয়ার মতো উদ্গ্রীব রমণীকুলের অভাব নিশ্চয়ই নেই। বিপরীতে আমি কোনদিক থেকেই এমন কিছু লোভনীয় নারী নই। আবার এতদিনের পরিচয়ে তার আচরণে এমন কোন ইঙ্গিতও পাইনি, যে সে খুব ধান্দাবাজ। আমার অসহায়তার সুযোগে সে আমাকে নানান উপকারের টোপ ফেলে তার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মায়ের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমি খুব মন দিয়ে তার নানা দিনে নানান উপলক্ষে, শুধু আমার প্রতিই নয় – অফিসের অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গেও তার আচরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করলাম বেশ কয়েকদিন। মনে হল, না শশাঙ্ককে, আর যাই হোক, ধান্দাবাজ লেডি-কিলার টাইপ ভাবার কোন কারণ এখনও পর্যন্ত কিছু ঘটেনি।

এর ফলে শশাঙ্কর প্রতি আমার মনে যে একটা ত্রস্ত ও শঙ্কিত বীতরাগ জমা হয়েছিল, সেটা দূর হতে লাগল। তা বলে ভেবে নিও না, শশাঙ্কের প্রতি আমার মনে অনুরাগের সঞ্চার শুরু হল। একেবারেই না। যেটা হল সেটা সখ্যতার অনুভব। মন থেকে বিদ্বেষ-বিষ যত কমতে লাগল, ততই বাড়তে লাগল নির্ভরতা, শুভানুধ্যায়ীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সে যাই হোক এভাবেই কেটে গেল বেশ কয়েকটা বছর। ধীরে ধীরে আমি অফিসে হয়ে উঠলাম অপরিহার্য, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্ববতী একজন সহকর্মী। অর্থাৎ অফিসে আমার কাজের দায়িত্ব একদিকে বাড়তে লাগল, অন্যদিকে বাড়তে লাগল আমার পুত্রকে বড়ো করে তোলার দায়িত্বও। এতদিন সে তার দিদিমা আর দাদুর আদর ও যত্নের গণ্ডিতে বড়ো হচ্ছিল, এবারে তার সময় হল বাইরের জগতে পা ফেলার। আমাদের পাড়ারই একটি প্রেপ স্কুলে ওকে ভর্তি করাতে গেলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার বাবা। ওখানকার হাসি-মুখ সপ্রতিভ বয়স্থা হেড-ম্যাডামের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁর সামনেই ফর্ম ফিল-আপ করে জমা করলাম।

ফর্মটি পড়ে তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি সিঙ্গল? মানে ডিভোর্সি না আনম্যারেড?” তাঁর কথার উত্তরে যা ফ্যাক্ট তাই বললাম। গম্ভীর মুখে তিনি বললেন, “ম্যাডাম, আপনার বাচ্চার স্কুলের অ্যাডমিশনের ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই। এরকম কেস আগেও দু’-তিনটে হ্যাণ্ড্‌ল্‌ করেছি, কিন্তু সমস্যা হয় বাচ্চাদের নিয়ে। ওরা নিজেদের মধ্যে পরিচয়ের সময়, বাবা না থাকাটাকে খুব অবাক করা ব্যাপার মনে করে। এবং যেহেতু ওরা বাবা না থাকাটাকে একটা ব্যতিক্রমী বিষয় মনে করে, সবাই নয়, ওদের মধ্যে কেউ কেউ, অ্যাকচুয়ালি দোজ হু থিংক দে আর ভেরি কানিং, তারা নিজেদের মধ্যে একটা গ্রুপ বানিয়ে ফেলবে। তারা আপনার ছেলেকে সুযোগ পেলেই ট্রোল করবে। আপনার ছেলেকে শুনিয়ে শুনিয়ে ঠাট্টা, হাসাহাসি করবে। আপনার ছেলের পক্ষে সেই মানসিক যন্ত্রণা ভয়ংকর হয়ে উঠবে। আমরা স্কুল থেকে ওই গ্রুপের ছেলে-মেয়েদের বকতে পারি, শাস্তি দিতে পারি, তাতে তাদের গার্ডিয়ানরা আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। আমাকে ভুল বুঝবেন না, আপনাকে আগে থেকেই বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে রাখলাম”।

বাবা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, “আজকাল শুনি ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগ। আমরা দাবি করি আমাদের সমাজ এখন আগের তুলনায় অনেক প্রগ্রেসিভ। কিন্তু আপনি যা বলছেন, তাতে তো দেখতে পাচ্ছি, আমরা আজও সেই “জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে”-র জামানাতেই পড়ে আছি। এ যুগের মোড়কটা বেশ চকচকে, দেখনদারি – কিন্তু ভেতরটা তো কদর্য, ক্লিন্ন”।

হেড-ম্যাম বললেন, “ঠিকই বলেছেন, স্যার। যে সংস্কারগুলো আজ থেকে একশ বছর আগে অত্যন্ত প্রকট ছিল, আজকের সমাজ সংস্কারের নামে আমরা সেই সংস্কারগুলোকে একটু আড়ালে রেখেছি মাত্র। সবকিছুই অটুট আছে। মাতৃপরিচয়হীন বাচ্চার পিতাকে তেমন সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু পিতৃপরিচয়হীন বাচ্চার মায়ের চরিত্রটাকেই সমাজ বাঁকা চোখে দেখে”।

আমি বললাম, “ফাদার্স নেমের জায়গায় একটা ফিকটিশাস নাম দিলে কি সমস্যাটা মিটে যেতে পারে?”

হেড-ম্যাম বললেন, “সাময়িকভাবে মিটবে তো বটেই, কিন্তু ইন দা লং রান – ধরুন পেরেন্ট-টিচার্স মিটিংয়ে, বাচ্চার বাবা কোন সময়েই না এলে – কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন, মানুষের অকারণ কৌতূহল? এমনকি আপনার বাচ্চাও বারবার জিজ্ঞেস করবে, বাবা কোথায় মা? কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন, তোমার বাবা অফিসের কাজে বাইরে গেছে। কিংবা বিদেশে থাকে, সেখানে কাজের খুব চাপ...”।

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে, ম্যাডামের টেবিল থেকে ফর্মটা তুলে নিয়ে বললাম, “ম্যাডাম, একটা ফ্রেশ ফর্ম দিতে পারেন? এই ফর্মটা আমি স্ক্র্যাপ করে দিতে চাই”।

ড্রয়ার থেকে নতুন একটা ফর্ম বের করে আমার সামনে রেখে ম্যাডাম বললেন, “ও শিওর, হিয়ার ইট ইজ”।

  ফর্মটা নিয়ে আগের মতোই নতুন করে ফিল আপ করলাম। শুধু মেরিট্যাল স্ট্যাটাসের জায়গায় “সিঙ্গল”-এর জায়গায় লিখলাম, ম্যারেড। আমার নামের পদবিটা বদলে দিলাম, আর ফাদার্স নেমের জায়গায় আমার সন্তানের পিতার নাম লিখে ফর্মটা ফেরত দিয়ে বললাম, “এবার নিশ্চয় তেমন অসুবিধে হবে না। আশা করি কোন বিতর্কেরও সম্মুখীন হতে হবে না”। বাবা আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না।

বিস্মিত ম্যাডাম বললেন, “ইনি যে আপনার সন্তানের পিতা নয়, সে তো বুঝতে পারছি। আমার কোন আপত্তি নেই, আপনার পুত্রের অ্যাডমিশনও আমি এখনই করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু ভবিষ্যতে কোন কারণে ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হলে এই ভদ্রলোক আপনার বাচ্চার পিতৃত্ব স্বীকার করবেন তো?”

আমি ম্যাডামের চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, “হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট, ম্যাডাম”।

 এখন এইটুকুই থাক, সুনুদা। বোর্ডিং কল শুরু হয়ে গেছে। সময় পেলেই লিখব আবার। ততক্ষণ না হয় একটু ধৈর্য ধরেই থাকলে।  

 তোমার কনি।

* এই গানটির সুরকার ও গীতিকার শ্রীযুক্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, "মণিহার" সিনেমায় শ্রীযুক্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওষ্ঠে গানটি সমর্পিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। 

চলবে...    

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৯

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব ...