মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০ 


২৭

 

সেদিন সন্ধের একটু পরে, ভল্লা ঘরের বাইরে বসেছিল, রামালি পুকুরে গিয়েছিল জল আনতে। হঠাৎই চার-পাঁচজন মানুষের পায়ের শব্দে ভল্লা সতর্ক হয়ে উঠল। যে পাথরে সে সাধারণতঃ বসে, তার ঠিক পিছনের দিকে মাটির কাছাকাছি একটা বড়ো খোঁদলের মধ্যে রাখা আছে ছোট্ট একটা ভল্ল। খোঁদলের মুখে ঘন ঝোপ-ঝাড়ের জন্যে সহজে তার সন্ধান পাওয়া যায় না। ভল্লা হাত বাড়িয়ে ভল্লটা ধরে থাকল। কে হতে পারে লোকগুলো? এই সন্ধেয় তাদের কী দরকার? একটু পরেই বেড়ার বাইরে থেকে কেউ ডাকল, “ভল্লামশাই, রয়েছেন নাকি? আমি বণিক অহিদত্ত”।

কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, "বণিকমশাই ওদিকে নয়, আপনি বাঁদিক দিয়ে ঘুরে আসুন। অনেকদিন পর, কী ব্যাপার?”

অহিদত্ত উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বললেন, “এই তাহলে আপনার নির্বাসনের বাসা?”

ভল্লা কিছু বলল না, হাসল।

“আপনার সঙ্গে কিছু গভীর কথা ছিল। এখানে কি নিরাপদ? তাছাড়া আমার সঙ্গে চারজন রক্ষীও রয়েছে...”।

এই সময়েই রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরে এল। উঠোনে অপরিচিত লোকটিকে দেখে একটু অবাক হল। ঘরে ঢুকে চর্বির প্রদীপ জ্বালিয়ে বাইরে আনতে, ভল্লা বলল, “রামালি, ইনি অহিদত্ত। বিখ্যাত বণিক। তুই এখন রান্নাবান্না করবি তো? আমি ওঁনার সঙ্গে দণ্ড দুয়ের জন্যে ঘুরে আসছি। বণিকমশাই এই ছেলেটিকে চিনে রাখুন, রামালি। আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। আমার সঙ্গেই থাকে। আপনার রক্ষীদের বলুন, তারা এখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক  চলুন, আমরা ঘুরে আসি”।

 

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা গিয়ে ভল্লা অহিদত্তকে নিয়ে ফাঁকা একটা জায়গায় বসল। আশপাশে ছোটছোট ঝোপ ঝাড়, কাছাকাছি কোন বড় গাছ নেই। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের কথা কেউ শুনবে, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

“বাঃ জায়গাটা বেশ বেছেছেন তো! চারদিকের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝির যা আওয়াজ আসছে...এমনিতেই কিছু শোনা যাবে না...”।

ভল্লা হাসল, বলল, “কী সংবাদ বলুন। তার আগে আমার একটা অনুরোধ আছে, রাখতে হবে”।

“কী অনুরোধ?”

“আপনাদের ওদিক থেকে ভালো কোন কবিরাজকে পাঠাতে পারবেন?”

“প্রধানমশাইয়ের চিকিৎসার জন্যে?”

“শুনেছেন?”

“বাঃ শুনব না? কালকে দুপুরে আস্থানের রক্ষীরা নোনাপুর আর সুকরা গ্রামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সে খবর তো দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভল্লামশাই। প্রধানমশাইকে যাচ্ছেতাই মেরেছে। কবিরাজমশাইকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। সুকরার ভীলকদাদাকেও বিচ্ছিরি মেরেছে কোন কারণ ছাড়াই। আস্থানের রক্ষীদের ভয়ে সহজে কেউ আসতে চাইবে না হয়তো। তবু আমি পাঠিয়ে দেব, কাল সকালেই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন”।

“প্রধানমশাই ছাড়াও, রামালির কাকাকে একবার দেখতে হবে। আর সুকরার ভীলককাকাকেও...”।

“রামালি? যার সঙ্গে আপনি এই মাত্র পরিচয় করিয়ে দিলেন?”

“হ্যাঁ ওর কাকা। ওঁনার অবস্থা ততটা সঙ্গীন নয়, তবুও আপনাদের কবিরাজমশাই যাচ্ছেন যখন একবার দেখে এলে ভাল হয়”।

“ঠিক আছে, হয়ে যাবে। আর কিছু?”

ভল্লা হাসল, বলল, “নাঃ আর কিছু না। এবার কাজের কথা বলুন”।

অহিদত্ত মুচকি হেসে বললেন, “আপনি এদিকের পরিস্থিতি যে ভাবে পাকিয়ে তুলেছেন, তাতে আপনার অনেক অস্ত্রশস্ত্র লাগবে তো?”

ভল্লাও হাসল, বলল, “শুধু এদিকের না, আপনাদের দিকের ছেলেরাও অস্ত্র কিনতে চাইছে...আমার কাছে ওরা তিন-চারদিনের মধ্যেই আসবে পাকা কথা শোনার জন্যে”।

“আমাদের দিকের ছেলেরা? কী বলছেন, ভল্লামশাই?”

“আপনাদের রাজা নাকি, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে রাস্তা-ঘাট না বানিয়ে, সেচব্যবস্থা না করে, গ্রামে গ্রামে মন্দির বানিয়ে চলেছেন?”

“হুঁ, তা চলেছেন। আর সে মন্দির বানানোর কাজ পাচ্ছে রাজধানীর জনা তিনেক বড়োবড়ো শ্রেষ্ঠী। বজ্জাতরা এক-একজন টাকার কুমীর। রাজ্যের ছোট-বড়ো সমস্ত আধিকারিকদের সঙ্গে জোটপাট করে, রাজ্যের সবদিকে তারা অজস্র মন্দির বানিয়ে চলেছে। কিন্তু তার সঙ্গে গ্রামের সাধারণ ছেলেদের কী সম্পর্ক?”

“তারা নিজেদের আর আশেপাশের গ্রামের ওই দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের জব্দ করতে চাইছে। তার জন্যে ওদের অস্ত্র চাই”।

অহিদত্ত বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “আপনি কি জানেন, আপনাদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে পুরোনো অস্ত্র কেনার একটা দায়িত্ব আমি পেয়েছি? সে অস্ত্র আপনি আমার থেকেই পাবেন, এদিককার আন্দোলনের জন্যে। কিন্তু আমাদের রাজ্যের ছেলেদের...না ভল্লামশাই, আমাদের রাজ্যের ছেলেদের অস্ত্র দিলে আমি ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবো। আমাদের রাজধানীতে এই খবর একবার পৌঁছলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বণিকরা আমার পিছনে লাগার দারুণ সুযোগ পেয়ে যাবে। আধিকারিকদের সঙ্গে মিলে আমার ভিটেমাটি চাঁটি করে দেবে...”।

“তাহলে? ওরা অস্ত্র পাবে না?”

“পাবে না কেন? আপনি ওদের দেবেনআমি দেব আপনাকে। তাতে সবারই শুভ লাভ হবে”।

শুভ লাভ?”

“বুঝলেন না? ধরুন আমি আপনাকে কিছু অস্ত্র দিলাম এক টাকার বিনিময়ে। আপনি ওদের দেবেন, সোয়া দুটাকা কিংবা আড়াই টাকা দরে। এক টাকায় আপনি আমার দেনা শোধ করে দেওয়ার পরেও, আপনার হাতে থাকবে দেড়টাকা। আপনাদের খরচ-খরচা, আর ভবিষ্যতের সঞ্চয়। আপনার দল বাড়লে তার খরচও তো বাড়বে ভল্লামশাই”।

“কিন্তু আপনাদের ছেলেরা কতদিন আর অস্ত্র কিনবে, কতটুকুই বা কিনবে?”

বণিক অহিদত্ত অদ্ভূতভাবে হাসলেন, বললেন, “আমি আপনাদের রাজধানীতেই অতি বিচক্ষণ একজন মানুষের কাছে, কিছুদিন আগেই, একটা কথা শুনলাম। সেটাই আপনাকে বলি। আপনি আমার থেকেও অনেক বেশী প্রত্যক্ষদর্শী, বিচক্ষণওঁনার কথাগুলোর মর্ম আপনি আমার থেকেও ভালো ধরতে পারবেন।

উনি বলছিলেন, ক্ষমতার মতো দুর্ধর্ষ নেশা আর হয় না। তার তুলনায় অর্থ, মদ, গাঁজা, চরস, ভাঙ, নারীর যৌবন কিস্‌সু না। একবার যদি কেউ এই ক্ষমতার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তার ফিরে আসার সব পথ বন্ধ। এই ক্ষমতা সে কিভাবে অর্জন করতে পারে? প্রথমে ছোট করেই শুরু হবে...কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ জোটাবে, ছোটখাটো অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে খুচখাচ কিছু চুরি, ডাকাতি করবে...কিছু অর্থ উপার্জন করবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা আরো অস্ত্রশস্ত্র কিনবে, আরও বড়ো বড়ো ডাকাতি করবে। তার ক্রিয়াকলাপে আকৃষ্ট হয়ে আরো অনেক সাঙ্গোপাঙ্গ এসে জুটবে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে তার ক্ষমতার চারাগাছটি – মহীরূহে পরিণত হবে...। ব্যস্‌, এই পরিস্থিতিতে তার কাছে সব আছে... ক্ষমতা, অর্থ, লোকবল। এখন সে একটা ছোট্ট অঞ্চলের রাজাই বলা চলে।

কোন রাজার পক্ষেই রাজ্যের আপামর জনসাধারণকে সমভাবে তুষ্ট রাখা অসম্ভব। তার কারণ প্রশাসনের গাফিলতি থাকতে পারে। তার কারণ আঞ্চলিক পরিবেশ – মানে কোথাও সুজলা, সুফলা উর্বর, আবার কোথাও রুক্ষ, ঊষর – হতে পারে। কোথাও প্রচুর খনিজ সম্পদ, আমাদের এদিকে যেমন সবই ঢুঢু। সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদীবহুল অঞ্চলে বাণিজ্যের যেমন সহজ প্রসার হয়, আমাদের এই অঞ্চলে দেখুন, সে সম্ভাবনাও অপ্রতুল। অতএব নানান কারণে কোন কোন অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের বঞ্চনার শিকার মনে করে ক্ষুব্ধ হতে থাকে।

সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ওই আঞ্চলিক রাজা এবার মূল প্রশাসনের সমান্তরালে, জনদরদী এক আঞ্চলিক   প্রশাসন গড়ে তুলতে শুরু করবে। এদের ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গোরা হয়ে উঠবে ওই প্রশাসনের আধিকারিক। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী জনগণ হবে এদের অনুগামী সমর্থক। তখন কিন্তু ওরা আর ডাকাত নয়, নিজেদের পরিচয় দেবে বিদ্রোহী, বিপ্লবী কিংবা সমাজ-সংস্কারক। উল্টোদিকে মূল রাষ্ট্র এবং প্রশাসন, তাদের নাম দেয় বিচ্ছিন্নতাকামী, সন্ত্রাসবাদী – রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নাশক পরজীবী গোষ্ঠী

এবার সে রাজ্যের রাজার সঙ্গেই বিপ্লবে নামতে পারে। সরাসরি বিচ্ছিন্ন কিছু যুদ্ধেও নামতে পারে। আর সে রাজ্যের রাজা যদি সাধারণ প্রজাদের অপছন্দের রাজা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। দেখা যাবে, ধীরে ধীরে সে রাজাকেই পরাস্ত এবং হত্যা করে – রাজ্যের অধীশ্বরও হয়ে উঠতে পারে। অবিশ্যি সবাই যে অতদূর যেতে পারবে, তা নয়, ক্বচিৎ দু একজনই পারে। আপনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নাম শুনেছেন?”

ভল্লা মাথা নাড়ল, না।

“আমিও শুনিনি। উনি কোন এক সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের নাম বললেন। তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, নাম চাণক্য। বহু যুগ আগে দুজনে মিলে পরাক্রমশালী নন্দবংশের সম্রাটকে পরাস্ত করে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন”।

“তিনি তো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেছিলেন। তিনি বিদ্রোহী হতে পারেন, কিন্তু ডাকাত হতে যাবেন কেন?”

“আমিও একই প্রশ্ন করেছিলাম, ভল্লামশাই। তিনি উত্তরে বললেন, ইতিহাসে তিনি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত নামেই প্রসিদ্ধ। শুরুর দিকে, যখন তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক চন্দ্রগুপ্ত মাত্র, যখন নন্দ-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী কিছু কিছু অঞ্চল তিনি নিজের আয়ত্তে আনছিলেন, রাজধানীতে নন্দরাজার সেনাপ্রধানরা, তাঁকে ডাকাতই মনে করেছিল। তারা ভাবত, হতভাগা ডাকাতটাকে, একবার ধরতে পারলে শূলেই চড়াবো। সেনাপ্রধানদের সে স্বপ্ন অবশ্য পূর্ণ হয়নি।

ওসব বড়ো বড়ো কথা ছেড়েই দিন ভল্লামশাই। এখানেই দেখুন না, প্রশাসন আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে, রাজার বিরুদ্ধে কিছু বিদ্রোহ বানিয়ে তোলার জন্যে। আপনার ছেলেরা সবাই ভাবছে তারা বিদ্রোহ করছে। কিন্তু আপনার প্রশাসন গতকাল গ্রামে গিয়ে, বিদ্রোহের নয় - ডাকাতির তদন্ত করেছেগ্রামের বয়স্ক মানুষদের পীড়ন করেছে, ভয় দেখিয়েছে, যাতে তারা এই ধরনের ডাকাতি ভবিষ্যতে আর না করে”।

অতএব, কে কি নামে ওদের ডাকল, তাতে কিছু এসে যায় না, ভল্লামশাই। আসল কথাটা হল, ক্ষমতার নেশায় মজে থাকা এই গোষ্ঠীগুলির নিয়মিত অস্ত্রের সরবরাহ না পেলে চলবে কী করে ভল্লামশাই? ও নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন”।

ভল্লা চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “ঠিক কবে থেকে আপনি অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন?”

“রাজধানী থেকে গত পরশু রওনা হয়েছে। আপাততঃ চারটি গোশকটে। আশা করি দিন দশেকের মধ্যে আস্থানে পৌঁছে যাবে”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “অস্ত্র-শস্ত্রের মূল্য কী রকম ধরছেন?”

অহিদত্ত হেসে বললেন, “আমি কে মশাই? মূল্য তো আপনি ঠিক করে দেবেন। শষ্পকমশাই নির্দিষ্ট দিনে তাঁর লোক পাঠাবেন...আমিও থাকব...সকলে মিলে বসে মূল্য ঠিক করা যাবে। কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গেল ভল্লামশাই – আমি আজ উঠি – অনেকটা পথ যেতে হবে...। রাজধানীর অস্ত্র কাছাকাছি পৌঁছলেই আমি আবার আসব...”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, গম্ভীর মুখে বলল, “হ্যাঁ চলুন এগোনো যাক – ভয়ংকর এক বিদ্রোহের দিকে...”।

অহিদত্ত ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বললেন, “নাঃ, সে এখনও দেরি আছে। আপাততঃ আপনার বাসার দিকেই যাওয়া যাক...”।

চলবে...

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

অষ্টাদশ পর্বাংশ  


৪.৮.১১ চোল বা চোড়

তামিল চোল শব্দের অর্থ “ভবঘুরে”, অনেকে বলেন, সংস্কৃত “চোর” থেকে চোড় শব্দের সৃষ্টি, অথবা দক্ষিণ ভারতের “কোল” নামে প্রাক-আর্য জনগোষ্ঠীরাই চোল। যাই হোক না কেন, চোলরা ছিলেন দক্ষিণ ভারতেরই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেদের পৌরাণিক সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।

প্রাচীন চোল-মণ্ডলম বলতে পেন্নার এবং ভেল্লারু (ভেল্লার) এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, অর্থাৎ আজকের তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লি এবং পাণ্ডুকোট্ট রাজ্যের কিছুটা। এই সীমানা অবশ্য চোল রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তি অনুযায়ী কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।

চোল বা চোড়দের নাম প্রথম শোনা যায় চতুর্থ শতাব্দী বি.সি.ই-র বৈয়াকরণ কাত্যায়নের পাণিনি-ভাষ্যে। এঁদের নাম মহাভারতে এবং সম্রাট অশোকের শিলা নির্দেশেও পাওয়া যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে বন্ধু রাজ্য হিসেবে চোল বা চোড়দের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপর সিংহলের বৌদ্ধ গ্রন্থ “মহাবংশ” থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি কোন সময়ে জনৈক চোল রাজা ইলার সিংহল দ্বীপ জয় করেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এরপর তামিল সাহিত্য গ্রন্থ “সঙ্গম”- থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টিয় কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন মহিমান্বিত চোল রাজার কথা, যাঁরা সুবিচার এবং দানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইলাঞ্জেটচেন্নির পুত্র করিকাল। তাঁর সময়েই নাকি চোল রাজ্যের বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি পাণ্ড্য ও চেরা রাজাদের এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী-প্রধানদের পরাস্ত করে চোলরাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন পেরুনারকিল্লি, তিনি রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন এবং রাজা করিকালের মতোই অনেক কীর্তি স্থাপনা করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দী সি.ই.-তে চোলরাজ্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে, পল্লব, পাণ্ড্য এবং চেরদের ক্রমাগত আক্রমণে।

চোল বংশের নতুন রাজত্বের শুরু করেছিলেন রাজা বিজয়ালয়। যদিও তাঁর সঙ্গে প্রাচীন চোলদের সম্পর্কের সঠিক সন্ধানসূত্র পাওয়া যায় না। ৮৫০ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে তিনি পল্লবদের সামন্তরাজা হয়ে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। শোনা যায় তিনি তাঞ্জাভুর বা তাঞ্জোর অবরোধ করে, পাণ্ড্য রাজার সামন্তরাজা মুত্থারাইয়ার প্রধানকে পরাজিত করেন।

প্রথম আদিত্যঃ রাজা বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য ৮৭৫ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, এবং পল্লবরাজ অপরাজিত বর্মনকে পরাজিত করে, তোণ্ডামণ্ডলম অধিকার করে নিয়েছিলেন ৮৯০ সি.ই.-তে। তারপর পশ্চিমা-গঙ্গদের রাজধানী তালকড়ও নাকি অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, বেশ কিছু শিব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।

প্রথম পরান্তকঃ প্রথম আদিত্যের পুত্র প্রথম পরান্তক যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের সীমানা বিশাল – পূর্বের কলহস্তী এবং উত্তরের মাদ্রাজ (চেন্নাই), দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত। তাঁর ৯০৭-৫৩ সি.ই.-র রাজত্বকালে এই সীমা তিনি আরও বাড়িয়েছিলেন। প্রথমে তিনি অধিকার করলেন পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহের রাজ্য, যার জন্যে জয়সিংহকে সিংহলে পালাতে হয়েছিল। এই জয়ের পর তিনি “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পল্লবরাজাদের সরিয়ে নেল্লোর পর্যন্ত পল্লব রাজ্য অধিকার করে নিলেন। অবশ্য তাঁর সিংহল বিজয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ তাঞ্জোর এবং কাঞ্চী অবরোধ করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম পরান্তকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মারা গিয়েছিলেন, এবং শোনা যায় তৃতীয় কৃষ্ণ বিনা বাধায় রামেশ্বরম পর্যন্ত বিজয় অভিযান করেছিলেন। এই সময় চোলরাজ্য ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল এবং এখান থেকে উদ্ধার পেতে তাঁদের বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম পরান্তকও শৈব ছিলেন, তিনিও তাঁর পিতার মতো অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সোনায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

৯৫৩ সি.ই.-তে পরান্তকের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন চোলদের খুব স্পষ্ট কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। শোনা যায় তাঁর দুই পুত্র গণ্ডারাদিত্য এবং অরিঞ্জয় রাজা হয়েছিলেন। তারপরে অরিঞ্জয়ের পুত্র সুন্দরচোল এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আদিত্য করিকাল এবং উত্তমচোল রাজা হয়েছিলেন। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং চোল রাজত্বে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারেননি।

প্রথম-রাজরাজ(৯৮৫-১০১৪ সি.ই.) - সুন্দরচোলের পুত্র প্রথম-রাজরাজ রাজা হওয়ার পর চোলরাজ্যের আবার গৌরবময় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা। কিন্তু তাঁর পরাক্রম, বুদ্ধি এবং রণদক্ষতা চোলরাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাজবংশ করে তুলেছিল। প্রথমেই তিনি চেরদের রাজ্য জয় করলেন, চের রাজ্যের কান্ডালুর ধ্বংস করলেন। এরপর জয় করলেন মাদুরা, সেখানকার পাণ্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গকে বন্দী করলেন। এরপর জয় করলেন কোল্লাম এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের দুর্গ শহর উদাগাই (উটি) এবং মালাইনাড়ু (কুর্গ)। এরপর তিনি উত্তর সিংহল জয় করে, ওই অঞ্চলের নাম রাখলেন, মুম্মদি চোলামণ্ডলম। এরপর তিনি গঙ্গবাড়ি এবং নোলাম্বাপাড়ি জয় করে মহীশূরের অধিকাংশ নিজের আয়ত্ত্বে আনলেন। রাজরাজের এই পরাক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালুক্যরা ভাল চোখে দেখেননি, অতএব চালুক্যদের সঙ্গেও যুদ্ধ শুরু হল। তবে চালুক্য রাজ তৈলপের ৯৯২ সি.ই.-র লিপি থেকে জানা যায়, তিনি চোলদের গর্ব খর্ব করে দিয়েছিলেন। যদিচ তৈলপের পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.) যখন রাজা ছিলেন, তখন চোলরা রাজরাত্তপাড়ি অধিকার করে চালুক্য রাজ্যের ভয়ংকর ক্ষতি করেছিলেন।

এরপর তিনি প্রাচ্য চালুক্যদের রাজ্য ভেঙ্গি অধিকার করেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্য চালুক্যদের রাজা বিমলাদিত্য রাজরাজের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই বশ্যতার পরিবর্তে রাজা বিমলাদিত্যকে, রাজরাজ তাঁর কন্যা, কুণ্ডাবাইকে দান করেছিলেন। এরপরেও তিনি কলিঙ্গ এবং লাক্ষাদ্বীপ ও মালদিভস জয় করেছিলেন। এভাবেই রাজরাজ সমগ্র তামিলনাড়ু, মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল, কলিঙ্গ, সিংহল এবং অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ জয় করে, একক প্রচেষ্টায় চোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন।

প্রথম রাজরাজের কৃতিত্ব শুধু মাত্র রাজ্য জয়েই নয়, তিনি বেশ কিছু বিস্ময়কর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের কাছে পরম গৌরবের বিষয়। যেমন তাঞ্জোরের শিবমন্দির, নিজের নামেই তিনি এই মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন, “রাজরাজেশ্বর”।  শিব মন্দির ছাড়াও তিনি বিষ্ণু মন্দিরও নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের জন্যে নেগাপতনমে একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই বিহারের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা ছিলেন সাগরপাড়ের মালয়-উপদ্বীপের রাজা শৈলেন্দ্র এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শ্রীমার-বিজয়তুঙ্গবর্মন।

প্রথম-রাজেন্দ্র গঙ্গাইকোন্ডা (১০১৪-৪৪ সি.ই.) - পিতার আসনে বসে প্রথম-রাজেন্দ্র, পিতার মতোই যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠা করা সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ তো রেখেছিলেনই, উপরন্তু জয় করেছিলেন, ইডিতুড়াইনারু (রায়চূর জেলা), বনবাসী (উত্তর কানারা), কোলিপ্পাক্কাই (কুলপক), মন্নাইক্কড়ক্কম (সম্ভবতঃ মান্যখেট)। এরপর তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র সিংহল, যার উত্তর অংশ জয় করেছিলেন, তাঁর পিতা প্রথম রাজরাজ। এরপর তিনি পাণ্ড্য এবং কেরালাও অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পুত্র জাতবর্মনসুন্দরকে প্রশাসনিক প্রধান পদে বসিয়ে, ওই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন, “চোল-পাণ্ড্য”। এরপর প্রথম-রাজেন্দ্র উত্তরের দিকে বিজয় অভিযানে মন দিলেন। একে একে তিনি জয় করলেন, ওড্ড-বিষয় (ওড্র-উড়িষ্যা), কোশলাইনাড়ু (দক্ষিণ কোশল), দন্তভুক্তির (দাঁতন- মেদিনীপুর) ধর্মপাল, তক্কন-লাঢ়মের (দক্ষিণ রাঢ়) রণশূর, বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) গোবিন্দচন্দ্র, মহীপাল, উত্তির-লাঢ়ম (উত্তর রাঢ়)। এই বিজয় অভিযানের সময়কাল মোটামুটি ১০২১ থেকে ১০২৫ সি.ই.।

                                    মানচিত্র ঋণঃ উইকিপিডিয়া। 

    প্রথম-রাজেন্দ্রর এই বিজয় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রদর্শন, রাজ্য অধিকার করা নয়। অতএব তাঁর এই বিজয় অভিযানে কোন স্থায়ী ফল হল না, শুধু বঙ্গে কয়েকজন কর্ণাটকী সেনা প্রধান রয়ে গেলেন, পরবর্তীকালে যাঁরা সম্ভবতঃ সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ফেরার পথে তিনি নিজের দেশে কয়েকজন শৈব পণ্ডিত বা সন্ন্যাসীকে নিয়ে গেলেন গঙ্গা পাড়ের কোন রাজ্য থেকে।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাজেন্দ্রই প্রথম সম্রাট যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের বেশ কিছু দেশে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালীকে তাঁর নৌবহর এবং বাণিজ্যতরী দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষ্মের (Khmer) বা কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর শুধু যে নিবিড় বাণিজ্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা নয়, দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গভীর হার্দিক সম্পর্কও। দুটি সাম্রাজ্যের মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প এবং ধর্মচিন্তার গভীর আদানপ্রদানও শুরু হয়েছিল। কম্বোজে অবস্থিত (আজকের কম্বোডিয়া) সুবিখ্যাত আঙ্কোর-ভাট মন্দির এবং ওই অঞ্চলের আরও অনেক বিক্ষিপ্ত মন্দির আজও সেই সুসম্পর্কের স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে দক্ষিণ চিনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক।  এবং শুধু এই পূর্বদিকেই নয়, সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রর এই বাণিজ্যিক নৌবহরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল পশ্চিম দিকের আরব উপমহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা, আন্তোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এবং তুর্কিয়ে সাম্রাজ্য পর্যন্ত।

        আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোজ (কম্বোডিয়া) - চিত্র ঋণ - https://www.britannica.com/         

প্রথম-রাজেন্দ্র নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম “গঙ্গাইকোণ্ডাচোলাপুরম” (আধুনিক গঙ্গাকুণ্ডপুরম)। এই রাজধানীতে তিনি দুর্ধর্ষ রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির, সরোবর, স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন, কিন্তু কালের নির্মম নিয়মে সে সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

প্রথম রাজাধিরাজঃ (১০৪৪-৫২ সি.ই.) -প্রথম-রাজেন্দ্রর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ ১০৪৪ সি.ই.তে সিংহাসনে বসলেও, তিনি যুবরাজ হয়ে পিতার প্রশাসনে সহায়তা করেছে ১০১৮ সি.ই. থেকে। পিতার বহু অভিযানেই তিনি সফল সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু চালুক্যরাজ প্রথম-সোমেশ্বর আহবমল্লের সঙ্গে যুদ্ধে ১০৫২ সি.ই.তে কোপ্পমের রণক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান।

দ্বিতীয় রাজেন্দ্র দেব (১০৫২-৬৩ সি.ই.) –চালুক্যদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বীর রাজেন্দ্র (১০৬৩-৭০ সি.ই.) - দ্বিতীয় রাজেন্দ্রর পর রাজা হলেন, তাঁর ভাই বীর রাজেন্দ্র। তাঁর সময়ে চালুক্য ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের আক্রমণ ও বিদ্রোহ দমনেই তাঁর রাজত্বকাল শেষ হয়েছিল। যদিও তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে চালুক্য রাজকুমারের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে, চালুক্যদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০-১১২২ সি.ই.) – বীর রাজেন্দ্রর পর তাঁর পুত্র অধিরাজেন্দ্র কিছুদিনের জন্য রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সিংহাসন অধিকারে রাখতে পারেননি বা অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন প্রথম কুলোত্তুঙ্গ। চোলরাজ প্রথম-রাজরাজের কন্যা কুণ্ডাবাইয়ের সঙ্গে ভেঙ্গির চালুক্য রাজ বিমলাদিত্যের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের পুত্র রাজরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল চোলরাজা প্রথম-রাজেন্দ্রর কন্যা অম্মাঙ্গ দেবীর। তাঁদের পুত্রের নাম দ্বিতীয়-রাজেন্দ্র চালুক্য ওরফে প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ। প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ আবার বিবাহ করেছিলেন, চোলরাজ দ্বিতীয়-রাজেন্দ্রদেবের কন্যা মধুরান্তকীকে। অতএব অনুমান করা যায়, যেহেতু এই সময়ে চোল রাজপরিবারে সিংহাসনে বসার মতো যোগ্য কোন উত্তরাধিকারী পাওয়া যায়নি এবং যেহেতু তাঁর ধমনীতে চালুক্যদের থেকে চোল রক্তের পরিমাণ বেশি ছিল, সেহেতু প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। সে যাই হোক, প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। যদিও হোয়সল, পরমার, প্রাচ্য-গঙ্গ, পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ বিবাদ লেগেই ছিল।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ ধর্মীয় এবং সাহিত্য বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জন্যেও অনেক দান করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি বৈষ্ণব আচার্য রামানুজমের ওপর বিরক্ত হয়ে, তাঁকে শ্রীরঙ্গম (ত্রিচিনোপল্লি) ছাড়তে বাধ্য করেন।  আচার্য রামানুজমকে হোয়সল রাজ বিত্তিগবিষ্ণুবর্ধনের মহীশূর রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তিনি জয়গোণ্ডন, যিনি “কলিঙ্গত্তুপ্পারনি”-র রচয়িতা এবং আদিয়ারক্কুনাল্লারের, যিনি “শিলপ্পধিকারম”-গ্রন্থের রচয়িতা, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

 পরবর্তী চোলরাজা

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিক্রম চোল (১১২২-৩৩ সি.ই.)। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সময়ে আচার্য রামানুজম আবার চোলরাজ্যের শ্রীরঙ্গমে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩-৪৭ সি.ই.), দ্বিতীয়-রাজরাজ (১১৪৭-৬২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয়-রাজাধিরাজ (১১৬২-৭৮ সি.ই.)। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন এবং এঁদের সময়ে চোল সাম্রাজ্য তার গৌরব দ্রুত হারাতে থাকে। হোয়সল, সিংহল, কেরালা সকলেই চোল সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। তারপরে তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৭৮-১২১৬ সি.ই.) দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও, অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেননি। এই সময় থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের আধিপত্যে চোলরাজ্যের মূল সীমানাও খণ্ডিত হতে থাকে। মোটামুটি ১২৬৭ সি.ই.তে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চোলরাজ্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

চলবে...



রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১

   

এর আগের রম্যকথা - " নিত্যযাত্রী "


পাড়ার বিশাখা বৌদির সঙ্গে হরিপদর বৌয়ের গলায় গলায় ভাব। বিশাখাবৌদির ননদের বড়ো জায়ের কাকিমা এক মহাতান্ত্রিকের খবর দিয়েছেন, বাবা কাত্যায়ন তন্ত্রার্ণববিশাখাবৌদি হরিপদর বৌকে বলেছে, হরিপদকে নিয়ে গিয়ে বাবা কাত্যায়নের সামনে ফেলে দে, তারপর দেখ তোদের কপাল কেমন খুলে যায়! হরিপদর বাবা ছিলেন বৈষ্ণব, হরির একান্ত ভক্ত। যখন তখন হরিপদর নাম ধরে ডাকলে, তাঁর নাকি হরিনামও করা হবে, তাই ওই নাম। কিন্তু প্রথম বিড়ি খেয়ে হরিপদ যেদিন বাড়িতে ধরা পড়েছিল, “হতভাগা হোর‍্যা, তুই বিড়ি খাওয়া ধরেছিস, হতচ্ছাড়া”? বলে পিঠে গুম গুম কিল বসিয়েছিলেন তার বাবা, সেদিন শ্রীহরি কাছে পিঠে কোথাও ছিলেন কি না, কে জানে?

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিক-কূল-চূড়ামণি বাবা কাত্যায়নের কাছে হরিপদ ও তার বৌ প্রথম গিয়েছিল মঙ্গলবারের সন্ধেতে। উত্তরকলকাতার ঠনঠনে কালিবাড়ির কাছে, ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো বাড়ির একতলায়, মাথা নোয়ানো দরজাওয়ালা গুমোট ঘরে বাবার চেম্বার। হরিপদ ফেডেড জিন্স দেখেছে, এখানে এসে প্রথম দেখল, ফেডেড অজিন। নিচু জলচৌকির উপর বিছানো রোঁয়াওঠা হাতপা ছড়ানো হরিণের চামড়ার পিঠে বাবা কাত্যায়ন বসে আছেন বাবু হয়ে। মাথায় বিড়েবাঁধা তেলচিটে জটা। পোড় খাওয়া তামাটে কপালে দেড় ইঞ্চি চওড়া সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষ, আর রংচঙে পাথরের মালা। দু হাতেও রুদ্রাক্ষের মালার বালা। খালি গা, ভালুকের মতো লোমওলা বুকে ধবধবে মোটা পৈতে। পরনে হ্রস্ব একটি রক্তাম্বর, ঘরের গুমোট গরমে সেটাও গুটিয়ে তোলা, উরুর অনেকখানি উপরে। সামান্য নড়চড়ায় বিপজ্জনক হয়ে ওঠা কিছু আশ্চর্যের নয়।

বাইরে জুতো খুলে এসে, ঘরে ঢুকে ওরা দুজনে বাবাকে প্রণাম করলপায়ের নখগুলো বাবার জন্মের পর থেকে নরুনের সংস্পর্শ রহিত, দেখেই বোঝা যায়। অন্য একজনের হস্ত রেখা বিচার করছিলেন, আর ফিসফিস করে কথা বলেছিলেন চশমার উপর দিয়ে রক্তচক্ষু তুলে ওদের দেখলেন, বললেন, “অফিসে বড়ো অশান্তি, না রে? তারা মার কাছে এসে পড়েছিস যখন আর চিন্তা নেই, যা বোস ওইখানটাতে”। 

হরিপদর বউ মুগ্ধ নেত্রে বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, হরিপদর কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, “দেকলে, বিশাকাদি ঠিকই বলেছিল, বাবা পুরো অন্তজ্জামি”হরিপদ ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি দিল অপেক্ষা করতে লাগল বাবা কখন ডাকেনএকটু ভয়ও যে করছিল না তা নয়, বাবা যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, হরিপদর যৌবন কালে অনেক কেলেংকারির কথা আছে, যা হরিপদর বৌ জানে না। সে সব ফাঁস হয়ে গেলেই হয়েছে আর কি!

 মোটা কাঠের কড়ি-বর্গাওয়ালা নিচু ছাদের ঘর। সিলিংএ ঝুলে ঘাড় দোলাচ্ছে ফ্যানটা। দেখে মনে হল এ ফ্যানটা এই বাড়ির থেকেও পুরোনো। বৃটিশ জমানার হাল হকিকত বিস্তর দেখে এসেছে এখন বাবার কীর্তি দেখে অনবরত ঘাড় দুলিয়ে চলেছে। আওয়াজ উঠছে ঘট ঘট ঘট ঘট। মেঝে থেকে দেওয়ালের ফুটতিনেক অব্দি টকটকে লাল প্লাসিক পেন্টের আস্তর। বাকি দেওয়াল থেকে সিলিং ঘন সবুজ রঙের প্লাস্টিক পেণ্ট করাঘরে তিনটে ছানার জিলিপির মতো দেখতে সিএফএল জ্বলছে। রঙের জেল্লায় একটুও আলো ফুটছে না। বাবার বাঁ হাতের সামনে কাঠের একটা বহু পুরোনো ডেস্ক। তার ওপরে লেখার প্যাড আর ফাউন্টেন পেন। সামনে কালির দোয়াত।  ডেস্কের এক পাশে গুচ্ছের কোণা দুমড়ানো কাগজের তাড়া।

ডেস্কের ওপাশে মা কালীর কুচকুচে কালো মূর্তি। ফুট চারেক উঁচু। টকটক করছে তাঁর মুখের চারপাশ, জিভ, হাতের তালু আর চরণতল। চরণতলে শুয়ে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব। মায়ের উপরের একহাতে বরাভয়, অন্য হাতে টিনের পাতলা খড়্গ। নিচের একহাতে কাটা মুণ্ডু, অন্য হাত খালি। গলায় নরমুণ্ড মালা। মায়ের লজ্জা নিবারণ হয়েছে অজস্র কাটা হাত ও পায়ের মালায়। মায়ের গলায় ঝুলছে একগোছা রক্তজবার মালা, একদম টাটকা। অনালোকিত এই ঘরের আলোয়, মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে, হরিপদর আবার মনে হল, বাবা কাত্যায়ন যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, তাহলে কী হবে?

 

যে লোকটি হাত দেখাতে এসেছিল, তার মনে হচ্ছে হয়ে গেল, কাত্যায়ন বাবা, জোরে বলে উঠলেন, “যাঃ, বেশি ভাবিস না। যেমন বললাম, মায়ের ওপর ভরসা করে, সব মেনে চল। তোর ভালো দিন আসছে, মনে রাখিস”।

“সবই আপনার কৃপা, বাবা” বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে করতে বলল ভদ্রলোক।

“ছি, ছি। অমন কথা মুখেও আনিস না রে, ব্যাটাআমি কৃপা করার কে রে? কৃপা করছেন, জগত্তারিণী মহামায়া, মা তারাওই মাকে প্রণাম কর, মা-ই তোকে ঠিক পথে চালিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। সামনের ঘোর অমাবস্যায় নীল সরেস্বতী মহাকালী যজ্ঞের আয়োজন কর, যেটুকু বিপদের জের এখনো আছে, কেটে যাবে একদম”।

“এই অমাবস্যায় হবে না, বাবা। ছেলেটার সামনে পরীক্ষা”।

“পরেরটায় দ্যাখ, নয়তো তার পরেরটা? মা অপেক্ষায় থাকবেন, চিন্তা করিস না”।

ঘাড় নেড়ে ভদ্রলোক মায়ের পায়ে প্রণাম করে উঠে যেতে বাবা কাত্যায়ন হরিপদদের ডাকলেন, “মন্ত্রে তন্ত্রে, পুজো পাঠে কিছুতেই তোর বিশ্বাস হয় না, না রে? সবটাই বুজরুকি, কি বল”?

“কি বলছেন, বাবা, বিশ্বাস না থাকলে আপনার কাছে, আসতাম”? হরিপদর বউ চমকে বলে উঠল।

“তোর কথা বলছি না, রে পাগলি? তোর স্বামীর কথা বলছি। দে তোর হাতটা বাড়া। ডানহাত নয় রে, বাঁ হাত, মেয়েছেলেদের বাঁহাত আর ব্যাটাছেলেদের ডানহাতে লেখা থাকে তাদের নিয়তি। আয়, আরেকটু সরে আয় তোর স্বামী সেই থেকে সব দেখে চলেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তান্ত্রিক-বাবাটা লোক কেমন। জোচ্চোর কিনা। চুক্কি মারছে, নাকি সত্যি কিছু জানে? তাই না রে। ভক্তি আন রে ব্যাটা, মনে ভক্তি আন”।

হরিপদর বউ আরেকটু সামনে সরে বসতে, বাবা কাত্যায়ন তার বাঁহাতটা ধরে কোলের উপর রাখলেন, বললেন, “ন্যায়নিষ্ঠ, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং ক্ষণক্রোধীকি তোর স্বামীর মধ্যে এই গুণগুলো নেই”? হরিপদর গা জ্বলছিল কারণ, কথা বলতে বলতে বাবা কাত্যায়ন তাঁর কোলে তার বউয়ের হাতটা রেখে বিপজ্জনকভাবে ডলছিলেন

“ময়লা, ময়লা। ময়লা আমাদের সবখানে। ময়লা আমাদের মনে। ময়লা আমাদের দৃষ্টিতে। ময়লা আমাদের অতীত জীবনে। হাতের ময়লা না তুললে কি আর হাতের রেখা ফুটে ওঠে”? হরিপদর পাপী মন এবার চমকে উঠল, বাবা কাত্যায়ন কি সত্যি অন্তর্যামী?

“আজকের যুগে তোর স্বামীর মতোন লোক অচল। এমন লোওওওক অচঅঅঅঅল। একটুতেই রেগে ওঠে। অন্যায় করতে দেখলে ওপরওলাদেরও ছেড়ে কথা কয় না। এমন আহাম্মক। ওপরওলাদের তেল মাখাতে পারে না। উলটে কটকট করে সত্যি কথা শুনিয়ে দেয়! আশে পাশে সবাই দুনম্বরি পয়সা পকেটে ঢোকাচ্ছে, তোর স্বামী ন্যায় দেখছে, নীতি দেখছে। বিবেকের কুটুস কাটুস কামড় খাচ্ছে। ওর চেয়ে বয়সে ছোট, কিস্‌সু জানে না, আকাট মুখ্যু। শুধু তেল মেরে মেরে প্রমোশন পেয়ে কোথায় চলে গেল। তুই কতদিন একই জায়গায় পচছিস, দাঁড়া আমি বলছি, তা বছর সাতেক তো হবেই”?

সামনে বসে বিস্ফারিত চোখে এতক্ষণ হরিপদর বউ বাবার কথা শুনছিল, বউয়ের পিছনে বসে হরিপদও শুনছিল। বাবার এই  কথায় দুজনেই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাবার পায়ে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে হরিপদর বউ বলল, “আপনি সব জানেন, বাবা। আপনার কাচে কিচ্চুটি গোপন নেই, আপনি অন্তজ্জামী। আটবছর ধরে ও একই জায়গায় পড়ে রয়েচেওর ওপরওলাগুলো কি যে বিষ নজরে ওকে দ্যাকে, সে আপনি জানেন, বাবা। আপনাকে এর একটা বিহিত করতেই হবে।”

“উতলা হোস না। শান্ত হস্বামীর জন্যে কত কী করতে হয়, সাধ্বী মেয়েদের। দাঁড়া তোর হাতটা এবার দেখি”। রক্তাম্বরে ঢাকা পড়ে যাওয়া হাতটা নিয়ে বাবা এবার খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলেনহরিপদ আর তার বৌ দম বন্ধ করে অপেক্ষায় রইল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।

“ভৌম দোষ কি জানিস”?

“না বাবা, জানি না”।

“তোর ভৌম দোষ আছে। খুব খারাপ দোষ, সে কথা উচ্চারণ করতেও মন শিউরে ওঠেতোর স্বামী ছোটবেলায় মস্ত এক ফাঁড়া থেকে বেঁচে উঠেছিল না”?

“হ্যাঁ উঠেছিল, তো। আমার শ্বাশুড়ি মায়ের মুখে শুনেছি। বলো না গো, চুপ করে আছো কেন? বাবার কাছে সব খুলে বলতে হয়”। হরিপদর বউ কান্না ধরা গলায় বলল। হরিপদ বাবা কাত্যায়নের অলৌকিক ক্ষমতায় একদম কাবু হয়ে গেল, আমতা আমতা করে বলল, “আমি তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। আমাদের স্কুলের পুকুরের গায়েই একটা বড়ো আমগাছ ছিল। সেই আমগাছ থেকে আম পাড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে পড়েছিলাম পুকুরের জলে...”।

“পড়তেই হবে। পঞ্চমে শনি আর তৃতীয়ে মঙ্গল। একেবারে মোক্ষম মৃত্যুর যোগ। বেঁচে থাকার কথাই নয়। বেঁচে আছে সপ্তমে বৃহষ্পতি ছিল বলে। সে যাত্রায় রক্ষে পেলেও এবারে কিন্তু ভীষণ সংকট। আজ থেকে মোটামুটি দু বছর বাদে, মোটামুটিই বা কেন? তোর জন্ম মাসটা কবে? চোত না মাঘ”?

“আজ্ঞে বাবা, আষাঢ় মাসে”।

“ওই একই হল। চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং অর্থাৎ কিনা, চোত, মাঘ কিংবা আষাঢ় মাসের জাতকদের ভাগ্যফল একই হয়ে থাকে”চোখ বন্ধ করে বাবা কাত্যায়ন কিছু চিন্তা করে আবার বললেন, “আজ থেকে ঠিক এক বছর ন মাস পড়ে তোর বৈধব্য যোগ রয়েছে। বৈধব্য যোগ কিংবা ভৌম দোষ, জীবনে খুবই কঠিন সংকটময় কাল”।

রুদ্ধ কান্না আবার উথলে নিয়ে হরিপদর বউ বলল, “তাহলে আমার কী হবে, বাবা। কোন কী উপায় নেই? একটা কিছু উপায় আপনাকে করতেই হবে, বাবা”।

“শনিকে সামলানো যায়, কেতু কে সামলানো যায়, কিন্তু শনি আর কেতু একসঙ্গে হলে রক্ষা পাওয়া মুশকিলচারদিক থেকে ছেঁকে ধরেছে শত্রুরা। ভেতরে শত্রু, বাইরে শত্রু। মুখে মিষ্টি হাসি, মিষ্টি কথা, কিন্তু পিঠে ছুরি বসিয়ে যাচ্ছে, খুব কাছের লোকরাও কর্মক্ষেত্রে রাহুর দৃষ্টি, তোর কত্তাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না”।  

“ওসব আমি কিচ্চুটি জানি না বাবা, এই আমি আপনার চরণে পড়ে থাকবো, যতক্ষণ না আপনি এর বিহিত করছেন”। হরিপদর বউ বাবা কাত্যায়নের চরণ ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।

“আহা, আহা করিস কি? করিস কি? মেয়েছেলের চোখের জল, আমি যে আবার সহ্য করতে পারি নে। আছে আছে, উপায় আছে, কিন্তু সে তো আমার হাতে নেই রে! সে আছে আমার খ্যাপা মায়ের হাতে। কুপিত গ্রহশান্তির জন্যে খরচের ব্যাপারে কিন্তু কোন কার্পণ্য করলে চলবে না”।

“বাবা, খরচ আগে, না আমার মানুষটা আগে? মানুষ বাঁচলে অনেক টাকা রোজগার করবে, বাবা। আপনি শুধু উপায় বলুন”।         

“অতি উত্তম। কই হে, রত্নধর, শুনলে তো সব কথা”?

লাল ফতুয়া পড়া রত্নধর ঘরেই দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল, এতক্ষণ চোখেই পড়েনি। ছায়া মাখা লাল দেয়ালে মিশে ছিল তার চিমসে হাড়গিলে শরীর। সামনে সরে এসে জোড়হাতে বলল, “আজ্ঞে শুরু থেকে সবই দেখলাম, বুঝলাম এবং শুনলাম, গুরুদেবএখন আদেশ করুন”

“ছ রতির পীতাম্বরি নীলা, মধ্যমায়। আট রতির রক্ত প্রবাল অনামিকায়। চার রতির সিংহলী চূণী কনিষ্ঠায়। চার রতির বসরাই মুক্তা তর্জনীতে। ছ”রতির পান্না, ছ”রতির গোমেদ আর চার রতির পোখরাজ”।

হরিপদ অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “বাবা, হাতে অত আঙুল কোথায়”? বাবা অভয় হাত তুলে বললেন,

“সব বলে দেব। কথার মাঝখানে কথা বলিস না, মূর্খ। রত্নধর কি বলছিলাম যেন”? রত্নধর প্যাডে লিখতে লিখতে বলল, “আজ্ঞে, গুরুদেব, নীলা, পলা, চূণী, মুক্তো, পান্না, গোমেদ, -পোখরাজ। শুধু হীরে আর ক্যাট্‌স্‌ আইদুটো বাকি রয়ে গেল”।

“হ্যাঁ ঠিক আছে। নীলা, আর পলা বসবে রূপোর আংটিতে। চূণি আর মুক্তো সোনার আংটিতে। বাকি পান্না, গোমেদ আর পোখরাজ রূপোর চেনে বসিয়ে ঊর্ধ্ববাহুতে ধারণ করতে হবে। এসব হচ্ছে তোর স্বামীর জন্যে বুঝেছিস? তোর জন্যে তেমন কিছু না হলেও চলে যায়। তবুও চার রতির পান্না আর ছরতির গোমেদ ধারণ করলে লাভ বৈ কোন ক্ষতি তো নেই।  তারা তারা, মাগো, তাড়া। রত্নধর আমার এখন মাতৃসেবার সময় হয়েছে। তুমি ওদের নিয়ে ও ঘরে যাও, তোমাদের এই অর্থ অনর্থের টানা-পোড়েনের মধ্যে আমি থাকতে চাই না, ওসবে আমার একেবারেই রুচি হয় না”।  হরিপদর বউ এবং হরিপদ শেষ বারের মতো প্রণাম করে বলল, “বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে তো”?

“চেষ্টা তো করছি রে, পাগলি? এখন সবই মায়ের ইচ্ছে। সব কটা রত্ন সামনের মঙ্গলবারের মধ্যে আমার কাছে নিয়ে আয়। দেরি করিস না। কটা রত্ন এ মাসে ধারণ করবি, পরের মাসের মাইনে পেলে বাকিগুলো! ওসব কথা মনেও ঠাঁই দিস নে। যত দেরি করবি, ততই গুঁড়ি মেরে বিপদ ঘনিয়ে আসবে...। আমার কাছে নিয়ে আসবি, মায়ের চরণ ধোয়া জলে আমি শোধন করে দেব। বলে দেব রত্ন ধারণ করার মোক্ষম সময় আর দিন। তারপর রাখলে মা তারাই রাখবেন, মারলে তিনিই মারবেন”।

“তাই হবে, বাবা, তাই হবে। আপনি যে একটা উপায় বলে দিয়েছেন, এ যে আমাদের কি ভাগ্যি, বাবা। বাবা আপনার দক্ষিণা”?

“ও কথা মুখেও আনিস না রে, ওরে পাগলি, আমি যে দক্ষিণা নিতে পারি নামায়ের সেবায় আবার দক্ষিণা কি রে? মায়ের আদেশ, “কাত্যায়ন, শোকেতাপে, সংসারের জ্বালায় পোড়া-মানুষগুলো, তোর কাছে আসে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে। তোর অন্ন বস্ত্রের অভাব আমি রাখবো না, বাবা। তুই শুধু ওদের থেকে কোন পয়সা নিতে পাবি না”। ন্যাংটা মায়ের আমি ন্যাংটা ব্যাটা, আমার আবার অভাব কিসের, যে টাকা হাতাবো? যা কিছু দিবি মায়ের পায়ের কাছে রাখা ওই দান-পেটিতে ঢেলে দে। তবে মায়ের সেবায়, দুশো একান্নর নিচে না দেওয়াই ভালো, ওর কমে মায়ের সেবা হয় না”।

 হরিপদর কানে কানে হরিপদর বউ কিছু বলল। হরিপদ, তিনশ টাকা আর একটাকার একটা কয়েন গুঁজে দিল মায়ের পায়ের কাছে রাখা দান-পেটির স্লটে বাবা নির্লিপ্ত চোখে দেখে বললেন, “যা। এবার আমার মায়ের সঙ্গে  আলাপের সময় হলওঘরে গিয়ে সব রত্নের মাহাত্ম্য বুঝে নে রত্নধরের থেকে শুভকাজে দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি যা। মা তারা, তাড়া, তাড়া, সবার বিপদ তাড়া, বিপত্তারিণী মাগো”

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...