এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
এই উপন্যাসের আগের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১২ "
১৯
বটতলির ছোকরা পাঁচজন চলে যাওয়ার পর, ভল্লা চুপ করে বসেই রইল দণ্ড তিনেক। জঙ্গলের অন্ধকারে চুপচাপ বসে নানান চিন্তাভাবনা করতে তার ভালই লাগে। আঁধারে চোখের কাজ সীমিত হয়ে যায়। অবশ্য আজ কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ। জঙ্গলের বাইরে পূর্ণিমার মতোই জ্যোৎস্না ফুটেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জঙ্গলে ঘন গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে তার ঝিলিমিলিটুকুই চোখে পড়ে। সেই আলো-আঁধারী ছায়া-প্রচ্ছায়াতে চোখে বেজায় বিভ্রম সৃষ্টি করে। এ সময় ভল্লা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার কানের ওপর। ভল্লার মনে হয়েছিল এসময় রামালি আসতে পারে। কিন্তু সন্ধের পর প্রায় তিন দণ্ড পার হয়ে গেল, রামালি এল না দেখে, সে রান্নার যোগাড়ে লাগল।
কিছু কাঠকুটো জ্বেলে গুঁজে দিল উনুনের গর্তে। তারপর পোড়া মালসায়
জল নিয়ে তিন মুঠো ভুট্টার দানা ঢেলে দিল তাতে। চাপিয়ে দিল আগুনের ওপর। শুকনো পাতা
আর গাছের ডালের টুকরো ঠেলে দিল জ্বলন্ত উনুনের গর্তে। আগুন উলসে উঠল ভালোই। তারপর
ঘর থেকে আনল একটু নুন আর গোটা পাঁচেক গোলমরিচের দানা। আর কাঁচা লঙ্কা ভেঙে ফেলে
দিল উষ্ণ হতে থাকা মালসার জলে। এখন তার আর কিছু করার নেই, আগুনটাকে উস্কে তোলা
ছাড়া। জল ফুটবে। ভুট্টার দানা সেদ্ধ হবে, সময় নেবে – দণ্ড খানেক তো বটেই।
হঠাৎ তার পিঠে কেউ হাত
রাখল, কর্কশ শক্তিশালী হাত। ভল্লা বিদ্যুৎ বেগে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত তুলল আঘাত
করার জন্যে, আগন্তুক ভয় পেয়ে মাথা নামিয়ে বলল, “আরেঃ শালা, মারবি নাকি রে?” ভল্লা
চিনতে পারল, মারুলা। হেসে ফেলে হাত নামিয়ে বলল, “ওঃ তুই”?
“তা নয়তো কাকে ভেবেছিলি?
এই জঙ্গলে তোকে সেই কখন থেকে খুঁজছি জানিস? কিছুতেই আর ঠাহর করতে পারছিলাম না।
শেষে ওই আগুনের আলোয় বুঝতে পারলাম তুই এখানে। কী রাঁধছিস? ভুট্টার ঝোল? আমার
জন্যেও দু মুঠো ফেলে দে, ভল্লা। খিদে পেয়েছে বেশ”।
“তুই এখানে হঠাৎ
কোত্থেকে উদয় হলি, হতভাগা”? বলতে বলতে ভল্লা উঠে ঘরে গেল, মুঠো তিনেক ভুট্টা এনে মালসায়
ঢেলে দিয়ে, আরও একটু নুনের ছিরিক মেরে দিল। “আমি এখানে আছি সে বার্তা তোকে কে
দিল?”
মারুলা বলল, “তোকে এখানে
যারা পাঠিয়েছে, তারাই আমাকে বলেছে তোর পোঁদে লেগে থাকতে। এঁটুলির মতো। কিন্তু একটা
কথা ভল্লা, তুই কিন্তু বেশ ভোঁদা মেরে গেছিস। আমি তোর এত কাছে চলে এলাম, তোর পিঠে হাত
রাখলাম, তার আগে পর্যন্ত তুই টেরই পেলি না? যে ভল্লাকে আমরা সবাই চিনি, সে ভল্লা
তো তুই নোস। কী হয়েছে, ভল্লা?”
ভল্লা একটু লজ্জাই পেল।
মারুলা অত্যন্ত দক্ষ গুপ্তচর। ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছে। নিঃশব্দ চলাফেরায়
মারুলা তার মতোই দক্ষ। কিন্তু তার এত কাছে এসে পড়া সত্ত্বেও ভল্লা টেরই পেল না,
এটা আদৌ স্বস্তির বিষয় নয়। ভল্লা নিজেও চিন্তিত হল। বলল, “ঠিকই বলেছিস, মারু। আমার
আরো সতর্ক থাকা উচিৎ ছিল”।
মারুলা একটু হাল্কা
সুরেই বলল, “ঠিক আছে...হয়তো আগুন জ্বলার শব্দ, জল ফোটার শব্দ, তার ওপর মাথায় চিন্তার
জট পাকানোর শব্দ – কিছুটা আনমন হয়ে গিয়েছিলি। আচ্ছা, একটা কথা মনে পড়ে গেল, তুই
কোনদিন জঙ্গলে হাতির কাছাকাছি গিয়েছিস?”
ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “বেশ
কয়েকবার। প্রাণ হাতে করে, চুপটি করে লুকিয়ে থেকেছি ঝোপের আড়ালে। তখনই
শুনেছি হাতির পেটের শব্দ। সাত-আট হাত দূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যায় – বড়ো জালার মধ্যে
জল ফোটার মতো, কিংবা তার থেকেও ভয়ংকর। সেই
শব্দের কথাই বলছিস তো?”
“আমাদের কিংবা আমাদের কর্তাদের
মগজে যখন নানান কুবুদ্ধি খেলা করে বেড়ায় তখনও নিশ্চয়ই ওরকম আওয়াজ হয় – ভুটভাট, শোঁ
শোঁ...”।
ভল্লা হাসতে হাসতে বলল,
“তুই কি আমাকে হাতির বাতকম্মো শোনাতে এসেছিস? কী ব্যাপার বল তো?”
মারুলা একটু চাপা স্বরে
বলল, “অনেক কথা আছে, পরে বলব, এখানে নয়, অন্য কোথাও। তোর এই ঘরে আমি জানি অনেক
লোকের যাতায়াত...। ততক্ষণ একটু ফকড়েমি করি না। তুই আর শালা কোনদিন শুধরোবি না। চব্বিশ
ঘন্টা পোঁদে আটা লাগিয়ে কাজ আর কাজ। তাও যদি মুতিকান্ত না হয়ে একটু রতিকান্ত হতে
পারতিস...” বলে খিঁক খিঁক করে ফিচেল হাসতে লাগল। ভল্লাও হেসে ফেলল, বলল, “তুই শালা
পারিসও বটে”।
রতিকান্ত আর মুতিকান্ত
রাজধানীর রক্ষী শিবিরে প্রচলিত অত্যন্ত চালু রসকথা – অবশ্যই আদিরসাত্মক। দীর্ঘদিন নারীসঙ্গবর্জিত
রক্ষী শিবিরের একঘেয়ে জীবনে শব্দদুটি অত্যন্ত অর্থবহ। পুরুষের একটি বিশেষ প্রত্যঙ্গ
দুটি কর্মে ব্যবহৃত হয়, প্রস্রাব কর্মে এবং রতিকর্মে। অধিকাংশ পুরুষ প্রাকৃতিক
কারণেই দ্বিতীয় কর্মে সেই প্রত্যঙ্গের বহুল ব্যবহার কামনা করে। কিন্তু রক্ষীরা সে
ভাগ্য করে আসেনি। রাজ্য-রাজধানীর সুরক্ষার জন্যে তাদের প্রায়ই মাঠে-ঘাটে, জঙ্গলে-পাহাড়ে,
আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। অতএব তাদের পুরুষাঙ্গটি শুধুমাত্র যত্রতত্র প্রস্রাব
করাতেই ব্যবহার হয়। অতএব তারা সকলেই মুতিকান্ত। কিন্তু রাজার শ্যালক রতিকান্ত সারারাত
প্রস্রাবের থেকে রতিকর্মেই বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাই তিনি সার্থকনামা।
কাঠের হাতা দিয়ে দু-তিনটে
ভুট্টার দানা তুলে, ভল্লা টিপে টিপে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। হয়নি, আরেকটু হবে।
দানাগুলো মালসার জলে ছেড়ে দিয়ে তাকাল মারুলার দিকে। আগুনের কমলা রঙে, মারুলার
মুখটাও লালচে দেখাচ্ছে। ভল্লার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মারুলা এক চোখ টিপে দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বলল, “ভুট্টার দানা টিপেই টিপেই রাত কাটাবি, ভল্লা?”
মারুলার ইশারাটা বুঝে
ভল্লা মিচকে হাসল, বলল, “সে হিসেব তোকে দেব নাকি রে, মদনা? এমন ভাব করছিস, তুই যেন
রোজ রাতে টিপতে পাস?”
মারুলা নিরীহ মুখে বলল, “সে
টেপাটেপি তো করতেই হয়, বন্ধু। সারাদিন হেঁটেহেঁটে পায়ে যা ব্যথা হয়, রেড়ির তেল
নিয়ে পাদুটো টিপলে বেশ ভালই লাগে। তুই কোন টেপার কথা বলছিস, ভল্লা?”
ভল্লা মুখ বেঁকিয়ে হাসল,
বলল, “ন্যাকা, তুই শালা পা টেপার কথা বলছিলি, বুঝি?”
মারুলা আকাশ থেকে পড়ল,
বলল, “তুই কী ভেবেছিলি? এ রাম, ছি ছি, তোর মনটা শালা মাছির মতো, গুড়ের কলসি দেখলেই
ভনভন করে জুটে যাস...”। ভল্লা এবার উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো বের করে হাসতে
হাসতে মারুলার দিকে এগিয়ে নিয়ে বলল, “আজ তোকে ষাঁড়-দাগা করেই ছাড়বো, হতভাগা ধর্মের
ষাঁড়”।
দুহাত বাড়িয়ে আত্মরক্ষার
ভঙ্গি করে মারুলা বলল, “তোর সঙ্গে দুটো রসের কথা বললাম বলে তুই ষাঁড় বললি? তোর
সঙ্গে কাজের কথা ছাড়া আর কোন কথাই বলব না”। কপট অভিমানে মুখ গোমড়া করে বসে রইল
মারুলা। ভল্লা জ্বলন্ত কাঠটা উনুনে গুঁজে দিতে মারুলা বলল, “তুই ছোটবেলায় পাঠশালে
গেছিলি ভল্লা”?
মারুলা কথাটা কোনদিকে
নিয়ে যেতে চায় বুঝতে না পেরে, ভল্লা সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল মারুলার দিকে, বলল,
“গিয়েছি বৈকি, বছর দুয়েক মতো”।
মারুলা বলল, “দু-বছর?
তাহলে তুই তো পণ্ডিত রে? আমি তো শালা ছমাসের মাথায় পণ্ডিতমশাইয়ের হাতে এমন গোবেড়েন
খেয়েছিলাম, তারপর আর ওই মুখো হইনি”।
“কেন?”
“সে আর বলিস না। আচ্ছা,
তুই বল, ভল্লা, ষণ্ড মানে ষাঁড়, ভণ্ড থেকে ভাঁড়, তাহলে গণ্ড থেকে যে গাল হবে আমি
কী করে বুঝবো বল তো? পণ্ডিতমশাই শুধোলো – গণ্ড মানে কি? বললাম। আমার উত্তর শুনে পাঠশালের
অন্য ছেলেরা হ্যা হ্যা করে এমন হাসলে – পণ্ডিতমশাই একেবারে জ্বলে উঠল। তারপর গাল
দিয়ে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে ছড়ি দিয়ে এমন পেটাল, বাপের নাম ভুলিয়ে
দিয়েছিল শালা...”।
ভুট্টার মালসা নামিয়ে,
ঘরের ভেতর থেকে থেকে দুটো মাটির সরা আনল ভল্লা। গরম ভুট্টাসেদ্ধ সমান দুভাগ করে
ঢালল সরায়, তারপর মারুলার হাতে একটা সরা তুলে দিয়ে বলল, “কোথায় পেটাল, তোর গণ্ডে?”
মারুলা খুবই বিষণ্ণ মুখে
বলল, “তুই আর সেই ভল্লা নেই রে। আগে বন্ধুদের জন্যে তোর কত দরদ ছিল, আজ তুই আমার
দুর্দশার কথায় ঠাট্টা করছিস?”।
ভল্লা কিছু বলল না, ভুট্টা
খেতে লাগল মন দিয়ে। মারুলা ঝোলে চুমুক দিয়ে বলল, “বেড়ে বানিয়েছিস তো শালা? দুদিন
আগে জনাইয়ের চটিতে গমের রুটি আর এরকমই ভুট্টার ঝোল খেয়েছিলাম। অ্যাঃ সে শালা মুখে
তোলা যায় না। আর তুই এখানে এই জঙ্গলে, হাতের কাছে মশলাপাতি কিছুই নেই, এমন ঝোল
বানালি কী করে?”
দুজনেরই খাওয়া সাঙ্গ হতে
উনুনের আগুন নিভিয়ে দিয়ে ভল্লা ঝোপের মধ্যে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করল। একজোড়া
মারুলাকে দিয়ে বলল, “এবার চল, কোথাও গিয়ে বসে কাজের কথাগুলো সেরে ফেলে যাক। কিন্তু তার আগে নোনাপুর গ্রামের সর্বশেষ
পরিস্থিতি কেমন সেটা জানা দরকার। আজ সারাদিন নোনাপুর গ্রামের ছেলেরা কেউই
আসেনি। তাদের আসা সম্ভবও নয়। তাই ভাবছি একবার নোনাপুর গ্রামে যাবো”।
“পাগল হয়েছিস নাকি? এত
রাত্রে কে তোর জন্যে বসে থাকবে?”
ভল্লা হাসল, বলল, “আছেন,
একজন আছেন, আমার কমলিমা। যে সংবাদ আমি জানতে চাইছি, তাঁর থেকে ভাল আর কেউ বলতে
পারবে না”।
“কমলিমা? মানে
গ্রামপ্রধানের বউ? বোঝ, গ্রামপ্রধানের বুড়ি
বউ তোকে কী খবর দেবে? তোকে দেখলে হয়তো খানিক কান্নাকাটি করে পাড়া মাথায় তুলবে”।
“না রে, বুড়ি মোটেই আউপাতালে
নয়, বেশ শক্ত মনের মানুষ। কমলিমার থেকে গ্রামের আজকের পরিস্থিতিতে জুজাক কী ভাবছে,
কী বলছে, সেটা সহজেই জেনে যাব। সেই সঙ্গে, ভাগ্য ভাল হলে, আরেকজনার কথাও”।
“আরেকজন কে?”
“কবিরাজ”।
“কবিরাজ! হ্যাঁ কবিরাজের
কথা আস্থানেও শুনেছি। শুনেছি বুড়োটা খুব ধূর্ত”!
ভল্লা বলল, “ধূর্ত বলিস না,
বল বিচক্ষণ, দূরদর্শী। আমি যদি রাজরক্ষী না হয়ে, এই গ্রামের লোক হতাম, বুড়োকে বুকে
করে রাখতাম। বুড়োর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও লাগতে দিতাম না। কিন্তু কে জানে… হয়তো আমাদের কাজের স্বার্থে... হয়তো আমরাই কোনদিন ..."। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আবার বলল, "যাগ্গে পরে কী হবে পরে দেখা যাবে, এখন শোন, বেশিক্ষণ সময় লাগবে
না। তুই গাঁয়ের বাইরেই কোথাও আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাক। কমলিমায়ের সঙ্গে দেখাটা সেরেই – আমি
তোর কাছে আসছি...”।
“তাই হোক”
দুজনেই রণপায়ে চড়ে
জঙ্গলের পথে রওনা হল নোনাপুর গ্রামের দিকে।
চলবে...