শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২১

প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০ "  


২১ 

একটু পরে মিঃ মিত্র আবার বললেন, “এনিওয়ে, অতীতের কথা ছেড়ে বর্তমানে ফিরি। দিন দশেক আগে জ্যোতিষ আমাদের ঝাড়খণ্ডের সাইটে ভিজিট করতে গিয়েছিল। এখন সে মোটামুটি আট-ন বছরের এক্সপিরিয়েন্সড্‌ গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। তার থেকে আমরা রিজনেব্‌ল্‌ রেস্পনসিব্‌লিটি এক্সপেক্ট করি, অধিকাংশই ক্ষেত্রে তাই হয়েও থাকে। যেমন ওই সাইটেরই আমাদের যে প্রজেক্ট ম্যানেজার, তার নাম সুদীপ্ত – সে জ্যোতিষেরই ব্যাচমেট। এই প্রজেক্টটা শুরুর থেকেই সুদীপ্ত খুব ভালো ম্যানেজ করছে। আমাদের কাস্টমার – ওখানকার হেলথ ডিপার্টমেন্টও ওর পারফর্ম্যান্সে বেশ খুশি।

এই সোমবারের আগের সোমবার, আমাদের খুব ক্রিটিক্যাল একটা স্ল্যাব কংক্রিটিংয়ের শিডিউল ছিল। আর আগের সপ্তাহে, বুধবার আমি নিজেই ওই সাইটে গিয়েছিলাম, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম জ্যোতিষকে। ভেবেছিলাম জ্যোতিষ থাকলে সুদীপ্তর খানিকটা হেল্প হবে। দুজনে মিলে কাজটা সাকসেসফুলি কমপ্লিট করতে কোন অসুবিধে হবে না। আমি নিজে দুদিন সাইটে থাকার পর বেষ্পতিবার রাত্রে রওনা হয়ে আমি কলকাতায় পৌঁছই শুক্রবার ভোরে। বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হতে না হতেই, আমার কাছে সুদীপ্তর ফোন এল, “শশাঙ্কদা, জ্যোতিষ কাল রাত্রেই কলকাতা চলে গেছে”। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?” তার উত্তরে ও বলল, “আপনি বেরিয়ে যাওয়ার পরেই, জানি না কোথা থেকে এক পেট ড্রিংক করে এসে, তপন, জগন্নাথ, ত্রিদিবদের সঙ্গে বিশ্রী দুর্ব্যবহার করেছে। আপনার আর আমার নামেও নাকি অশ্রাব্য গালাগাল দিয়েছে”। তপন, জগন্নাথ এরা আমাদের নন টেকনিক্যাল এমপ্লয়ি, যেমন তপন স্টোর সামলায়, জগন্নাথ লেবারদের রেকর্ড মেনটেন করে, আর ত্রিদিব হচ্ছে আমাদের সাইট-অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

আমি সেই শুক্রবার অফিসে গিয়েই জ্যোতিষের খোঁজ করলাম, অফিসে আসেনি। ওর বাড়িতে লোক পাঠালাম। সে ফিরে এসে বলল, “জ্যোতিষের মা নাকি বলেছে জ্যোতিষের খুব শরীর খারাপ, সাইটে গিয়ে রোদে-গরমে খেটে ওর শরীর নাকি ঝলসে গিয়েছে”। আমাদের লোকটিকে ওর সঙ্গে দেখা করতেও দেয়নি। যাই হোক আমার লোকটি বলে এসেছিল, জ্যোতিষকে আমি ডেকেছি, অতি অবশ্যই যেন সেদিন বিকেলের মধ্যে দেখা করে।

জ্যোতিষ এসেছিল। নেশাক্রান্ত মানুষ সারারাত অপরিমিত নেশা করার পর, পরেরদিন বেলা বারোটা-একটা পর্যন্ত বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকার পর যখন উঠে দাঁড়ায় – ঠিক সেরকম চেহারা ওর। ঘৃণায় আর বিরক্তিতে আমার মনটা ভরে উঠল। কিছুক্ষণ কথা-বার্তা বলেও বুঝলাম, ওর থেকে অবান্তর এবং উদ্ভট মিথ্যা কথা ছাড়া আর কিছু শোনার নেই। ওকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, আমি আমার এইচ-আর অফিসার বিভাসকে ডাকলাম। ওর টার্মিনেশন লেটারের ড্রাফ্‌ট্‌ আগেই করে রাখতে বলেছিলাম, অতএব বিভাস সেই ফাইলটা নিয়েই আমার চেম্বারে এল।

বললাম, “লেটারটা এখনই ইস্যু করে দাও, জ্যোতিষকে। আর ওর ফুল এণ্ড ফাইন্যাল পেমেন্টও আজই হয়ে যাওয়া চাই”।

“হয়ে যাবে, স্যার। ওর পেমেন্ট স্টেটমেন্টটা আমি রেডি করেই নিয়ে এসেছি, একবার দেখে নেবেন স্যার”।

দেখলাম, খুবই সামান্য - পঁচিশ-হাজার সামথিং ডিউ হচ্ছে। দেখে আমি একটু অবাক হলাম, জিজ্ঞেস করলাম, “অ্যামাউন্টটা এত কম কেন, বিভাস? ওকে তো আমরা নোটিস না দিয়েই টার্মিনেট করছি, অতএব তিনমাসের স্যালারি তো ওর এমনিই পাওনা হয়। তার ওপর আছে এ মাসের প্রায় ষোল দিনের স্যালারি, লিভ এনক্যাশমেন্ট, পার্ট অফ এক্সগ্রাসিয়া...”।

বিভাস বলল, “জ্যোতিষবাবু মোটামুটি আটবছর সাড়ে চারমাস আমাদের এখানে রয়েছেন। এতগুলি বছরে উনি যে ভাবে ছুটি নিয়েছেন, তাতে এখনও পর্যন্ত ওঁনার ছুটির হিসেব নেগেটিভে রান করছে - মাইনাস একশ সাত দিন। সেই হিসেবে ওঁনার লিভ এনক্যাশমেন্ট তো হচ্ছেই না, বরং নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর আছে ওঁনার অনেক আন-অ্যাডজাস্টেড অ্যাকাউন্ট্‌স্‌। সাইট থেকে উনি বেশ কয়েকবার টাকা তুলেছেন, কিন্তু ফেরত দেননি। ওঁর অ্যাকাউন্টে ট্র্যাভেলিং অ্যাডভান্সে জমা হয়ে আছে বহু টাকা, কিন্তু তার এগেনস্টে যে বিল জমা দিয়েছেন, প্রত্যেক বিলেই রয়েছে অজস্র ডিসপিউট। প্রতি ফিনান্সিয়াল ইয়ারেই এই ব্যাপারটা নিয়ে ওঁনার সঙ্গে আমাদের লড়তে হয় স্যার...”।

“ডিসপিউট মানে?”

“সব সাইটেই আমরা একটা-দুটো হোটেলের সঙ্গে টাই-আপ রাখি স্যার, সে তো আপনি জানেন। এয়ারপোর্ট বা স্টেশন থেকে পিক-আপের জন্যে অথবা সাইটে যাওয়ার জন্যে গাড়িও ওই হোটেল থেকেই ঠিক করে দেয়। তার জন্যে ওরা আমাদের অনেকটাই ডিসকাউন্ট দেয়, এবং বেশ কিছু প্রিভিলেজও দেয়। সাইটে গেলে আপনিও স্যার ওই সব হোটেলেই ওঠেন...”।

“তাই তো। তাতে ডিসপিউটের কী আছে”?

“জ্যোতিষবাবু ওই হোটেলগুলিতে প্রায় কোন সময়েই যান না। খবর নিয়ে জেনেছি, তিনি অত্যন্ত সস্তা - লো বাজেটের হোটেলে ওঠেন। তাদের থেকে ব্ল্যাংক-বিল তুলে, নিজের খুশি মতো বিল বানিয়ে জমা দেন, উইথ হিজ ওন হ্যাণ্ডরাইটিং...”।

“কী বলছো, বিভাস? এতদিন এসব আমায় জানাওনি কেন?”

“আপনাকে এসব নিয়ে বিরক্ত করিনি স্যার, কারণ আমরা ওঁকে প্রথম ছমাসের মধ্যেই চিনে গেছিলাম, এবং ওঁনাকে কিভাবে হ্যাণ্ড্‌ল্‌ করতে হবে সেটাও বুঝে গেছি। এই ক’বছরে আপনি যত বার আমাদের জন্যে এক্স-গ্রাসিয়া বা ইন্সেন্টিভ ডিক্লেয়ার করেছেন, তার থেকেই আমরা ওঁনার যাবতীয় ডিসপিউট নিউট্রালাইজ করে নিয়েছি। ওঁর এই ফুল অ্যাণ্ড ফাইন্যাল সেট্‌ল্‌মেন্টেও, ওঁনার যাবতীয় গোঁজামিল ক্লিয়ার হয়ে যাবে”।

শশাঙ্কবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “সেই দিনই ওকে বিদেয় করলাম, বা বলা ভালো করতে বাধ্য হলাম। কিন্তু গত পরশুদিন বিভাস আপনার সংবাদটা আমাকে দিল – আপনি নাকি জ্যোতিষের বিরুদ্ধে ডিভোর্স ফাইল পুট-আপ করেছেন। শুনেই মনে হল, মস্তো বড়ো একটা ভুল হয়ে গেছে আমার। জ্যোতিষের জীবনের সঙ্গে আপনি যে জুড়ে আছেন, এবং সম্প্রতি জুড়ে গিয়েছে আপনার শিশু পুত্রটির জীবনও, সে কথাটিই আমি রাগের মাথায় ভুলে গিয়েছিলাম”।

বাবা এবং আমি দুজনেই এতক্ষণ শুধু শ্রোতা হয়েই ছিলাম, একটা কথাও বলিনি। কিন্তু বাবা এবার বেশ বিরক্ত স্বরে বললেন, “কথাটা আপনার মনে থাকলে আপনি কী করতেন, চাকরি থেকে ওকে তাড়াতেন না? এবং ওর চাকরি থাকলে আমরা ওর এগেনস্টে ফাইল পুট-আপ করতাম না, এরকমই আপনার ধারণা?

আচ্ছা শশাঙ্কবাবু, সুকন্যার সঙ্গে বিয়ের বেশ কিছুদিন আগে, আপনাদের অফিসে আমি নিজে গিয়েছিলাম জ্যোতিষের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নিতে। সেদিন আপনাদের এইচ-আর হেড, খুব সম্ভবতঃ ওই বিভাসবাবুই, আমাকে কিন্তু বলেছিলেন, জ্যোতিষ অত্যন্ত সচ্চরিত্র, ব্রাইট ইয়ংমেন। তার ফিউচারও খুব ব্রাইট...। অথচ আজ আপনি এসে বলছেন, আপনারা প্রায় শুরুর থেকেই সকলে জানতেন, জ্যোতিষ নানান গুণের গুণী। তাহলে সেদিন আপনাদের অফিস থেকে আমাকে কেন মিথ্যা কথা বলা হয়েছিল? আমার একমাত্র কন্যার জীবনটাকে এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার পিছনে আপনাদের ওই নির্জলা মিথ্যাচারও কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ - তাই নয় কি, শশাঙ্কবাবু?”

অনেকক্ষণ শশাঙ্কবাবু কোন কথা বললেন না, মাথা নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই ব্যাপারটা আমি যদিও জানতাম না, কিন্তু তাতেও আমি বা আমার কোম্পানি কোনভাবেই এই দায় এড়াতে পারি না। আমি আপনাদের দুজনের কাছেই আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। তার সঙ্গে আরও বলি, যে উদ্দেশে আজ আপনাদের কাছে আমার আসা, এই ঘটনাটি জানার পর আমার সেই উদ্দেশ্যটি আরও দৃঢ় হল।

কাকাবাবু, আপনার মেয়ে ও নাতির কথা মনে পড়লে জ্যোতিষকে আমি বিদায় করতাম না। আমি তাকে বিদায় না করলে আপনারা ডিভোর্স স্যুট করতেন না, একথা বলার জন্যে আমি আসিনি। আমি এসেছি, সুকন্যা এবং ওর শিশু পুত্রের কথা ভেবে...কোন ভাবে যদি কিছু সাহায্য করতে পারি”।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কিভাবে?”

“সুকন্যার যদি একটা কাজ বা একটা স্থায়ী চাকরি হয়ে যায়, সুকন্যার পক্ষে জীবনটা যথেষ্ট সম্মানজনক হবে। আপনার ওপর ওকে পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে হবে না”।

শশাঙ্কবাবুর এতক্ষণ ধরে, এত কথা শুনতে খুব বিরক্ত বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এসব কথা এখন আর শুনে লাভ কি? যে ঘূণধরা জীবনটা আমি পেরিয়ে এলাম, এসব কথায়, সে জীবনটা কি মুছে যাবে? কিন্তু এই কথাটা, সত্যি বলতে আমার খুব মিনিংফুল মনে হল। আমি বললাম, “আপনাদের কোম্পানিতে? কী ধরনের চাকরি? আমি তো আর ইঞ্জিনিয়ার নই। আমি কমার্স নিয়ে পড়েছিলাম – এম.কম”।

শশাঙ্কবাবু আমাদের বাড়ি আসার পর থেকে, এই প্রথম হাসলেন, বললেন, “এম.কম? তাহলে তো হয়েই গেল। ভাগ্যিস ইংলিশ বা হিস্ট্রি নিয়ে এমএ করেননি, সেক্ষেত্রে আমাকে একটু বেগ পেতে হত। ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের মতো কোম্পানির মূল স্তম্ভ সুকন্যা, কিন্তু আমাদের অ্যাকাউন্টস বা কমার্স ডিপার্টমেন্টটা হল সেই স্তম্ভের মাথায় ছাদ। রেগুলার অ্যাকাউন্টস্‌ ছাড়াও আজকাল এত রকমের ট্যাক্স এবং তার সঙ্গে যুক্ত এত নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান মেনে চলতে হয়...যার সব কিছু আমি বুঝিও না। তবে এটুকু বুঝি ও জানি, এই নিয়ম-কানুনের একটি দুটি ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেই, কোম্পানির ঘাড়ে নেমে আসবে প্রশাসনিক খাঁড়া। সে বিপদ থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে ইঞ্জিনিয়াররা নয়, আপনাদের মতো কমার্সের লোকরাই। মাথার ওপর ছাদ না থাকলে, প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে কতদিন টিকে থাকতে পারবে এই কোম্পানি ও তার স্তম্ভগুলো?”

এই প্রথম শশাঙ্কবাবুকে আমার বেশ লাগল, আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনিও কিছুটা প্রসন্ন। একটু বিরতি দিয়েই শশাঙ্কবাবু বললেন, “আপনি কবে থেকে জয়েন করতে পারবেন, সুকন্যা?”

আমি আঁতকে উঠে বললাম, “এখনই জয়েন? এখনও একমাসও হয়নি আমি নার্সিং হোম থেকে ফিরেছি...”।

শশাঙ্কবাবু আবারও হাসলেন, বললেন, “আমি কি বলেছি কালই আপনাকে জয়েন করতে হবে? টেক ইয়োর টাইম...ধরুন মাস তিনেক পর... সরকারি নিয়মে ডেলিভারির পর আঠারো উইকের মেটার্নিটি লিভ পাওনা হয়, তার মধ্যে অলরেডি চারটে উইক ধরুন চলে গেছে...আশা করি অসুবিধে হবে না”।

এবার বাবা উত্তর দিলেন, “আমরা নিজেদের মধ্যে – মানে ওর মায়ের সঙ্গেও একটু আলোচনা করে আপনাকে কয়েকদিনের মধ্যেই জানাবো”।

“অবশ্যই”। শশাঙ্কবাবু ওঁনার পকেট থেকে কার্ড-হোল্ডার বের করে, বাবার হাতে একটা কার্ড দিয়ে বললেন, “এখানে আমার নাম্বার আছে... ফোনে জানিয়ে দেবেন। আশা করি পজিটিভ রিপ্লাইই পাবো...পেলে বাকি ব্যবস্থা আমি করে নেব...”।

শশাঙ্কবাবু চলে গেলেন। তারপরে ক’দিন ধরে, আমাদের তিনজনের মধ্যে চলল নানান বিশ্লেষণ। আমি তো রাজি ছিলামই – বাবাও  ছিলেন মোটামুটি অনুকূল। মা ছিলেন বড্ডো প্রতিকূল, বলেছিলেন, “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেই ডরায়। আমার বাপু ভালো লাগছে না। চেনা নেই, শোনা নেই, হঠাৎ গায়ে পড়ে, বাড়ি বয়ে এসে চাকরি দিতে চাইছে তোকে... লোকটা ভদ্র নাকি ওই জ্যোতিষের মতোই মুখোশ-পরা অভদ্র – কী করে বুঝবো বল তো? আজকাল কে যে কোন মতলব পুষে রেখেছে মনে মনে...কে জানে?” অনেক পর্যালোচনা করার পর, পাঁচদিন পর আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, আমি জয়েন করবো...।

এর পিছনেও ছিল, সুনুদা, তোমার প্রিয় রবি ঠাকুর। কথাটা বাবা উল্লেখ করেছিলেন - “সভ্যতার সংকট” নামে একটি প্রবন্ধে রবি ঠাকুর নাকি বলেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ”। অতএব আমরা সেই পাপ কর্মটি করতে পারলাম না। আমি ফোন করে শশাঙ্কবাবুকে বললাম, “আমি মাস তিনেক পর জয়েন করতে রাজি আছি”।

আমার কথা শুনে শশাঙ্কবাবু উত্তর দিলেন, “আমাদের কোম্পানিতে মোস্ট ওয়েলকাম ম্যাডাম। আশা করি দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব। আমি দু’-তিনদিনের মধ্যেই আপনার বাড়িতে একটি ছেলেকে পাঠাবো, ইদার বিকাশ অর অতুল। তার হাত দিয়ে আপনি একটা অ্যাপ্লিকেশন পাঠাবেন, আর তার সঙ্গে দেবেন, মাধ্যমিক থেকে এম.কম পর্যন্ত আপনার কোয়ালিফিকেশন সার্টিফিকেটের ফটোস্ট্যাট কপি। ঠিক আছে?”

হ্যাঁ অতুল নামে একটি ছেলে এসেছিল, তার হাতে আমি তুলেও দিয়েছিলাম আমার বিদ্যের পুরো জাহাজটা। তার দিন পনের পরে, আমার নামে বাড়িতে একটা চিঠি এল, শশাঙ্কবাবুর কোম্পানির নাম-ছাপানো খামে। খুব খুশি হয়েছিলাম, নিজেকে বেশ একটা কেউকেটাও মনে হয়েছিল। কারণ এর আগে তুমি ছাড়া খামে বা ইনল্যাণ্ডে, সরাসরি আমাকে কেউ কোনদিন চিঠি দেয়নি। কিন্তু মামিমার কাছে, আমার বিয়ে ফাইন্যাল হয়ে গেছে শুনে, তোমার সেই দুরন্ত কলমের মিষ্টি কালি শুকিয়ে গিয়েছিল। তুমি আমাকে চিঠি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলে। একদিক থেকে অবশ্য ভালই করেছিলে। আমার উপকারই করেছিলে। শ্বশুরবাড়ি গিয়েও নিয়মিত তোমার চিঠি পাওয়াটা, ওদের হাতে একটা অস্ত্র হয়ে উঠত। তোমার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্কের একটা কল্প-গল্প গড়ে তুলে, আমার এবং আমার বাবা-মায়ের মুখগুলো পুড়িয়ে দিতে পারলে ওরা খুব আনন্দ পেত। অনায়াসে ঢেকে ফেলতে পারত ওদের সুপুত্রের কীর্তিকলাপ।

যাগ্‌গে, তোমার সঙ্গে বোঝাপড়াটা এখন নয়, সামনাসামনি বসেই সারব। এখন আবার আমার অতীতেই ফিরে যাই।

খামটা খুলে পড়লাম, সুন্দর টাইপ করা বেশ কয়েক পাতার চিঠি...অনেক ক্লজ, অনেক টার্ম্‌স্‌ এণ্ড কণ্ডিশন্‌স্‌। সবটা পড়ার ধৈর্য ছিল না, পড়তে পারিওনি, কারণ আমার চোখটা আটকে গিয়েছিল, রেমিউনারেশনের পৃষ্ঠাটায়। অনেকগুলি সংখ্যা জুড়ে, আবার অনেক সংখ্যা কেটে আমার হাতে এসে যে টাকাটা জমবে...সেটা হল চব্বিশ হাজার সামথিং। বেশ কিছুক্ষণ, আদর করার মতো আঙুল বুলিয়েছিলাম সংখ্যাটার ওপর। সে সময় মনে হয়েছিল এ যেন সেই চিচিং ফাঁক - আলিবাবার গুহার সন্ধান।

বাবার হাতে তুলে দিলাম চিঠিটা। বাবা গোটা চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন। তারপর মাকে বললেন, “মনে হচ্ছে সুনুর কোম্পানিটা বেশ ভালই, বুঝেছ? ওদের নিয়ম-কানুনগুলো বেশ বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো এমনকি সরকারি চাকরির নিয়মের মতোই অনেকটা। পিএফ আছে, গ্র্যাচুইটি আছে, গ্রুপ ইন্সিওরেন্স আছে, তারপর ধরো, বছরে ৩০ দিন পিএল, ১০টা সিএল, ১৫টা এমএল...। তিনমাসের নোটিস পিরিয়ড। মাইনেপত্রও নেহাৎ মন্দ নয়, আমাদের সুকুর পড়াশোনা আছে ঠিকই, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা নেই একটুও। সে তুলনায় ভালই বলতে হবে...”।

 

মায়ের জিম্মায় পুত্রকে রেখে, প্রথম দিন বাবার সঙ্গে আমি অফিসে রওনা হলাম। বাবা অফিসের সামনে আমায় ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আমি এবার চলি। তুই ভেতরে যা, দেখ কেমন লাগে, কোন অসুবিধে হলেই ফোন করবি...”। শুরু হল যেন আমার একটা আনকোরা জীবন। 

চলবে...     



শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ২

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]


 

প্রবীণবাবু অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে থামলেন। ঘরের সকলেই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই দিনগুলির কথা কল্পনা করছিলেন। ব্রিটিশদের হিংস্র থাবা থেকে ভারতবর্ষকে বাঁচাতে কত মানুষকেই যে সে সময় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল, সে কথা ভাবতে গেলেই মন ভার হয়ে যায়। সেই সব মানুষদের লড়াই আর সহ্যশক্তির ফসল আজকের স্বাধীনতা। অহীন ভাবল, স্বাধীনতা অর্জন করে বৃটিশের হিংস্রতা থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশের শাসকরা যেভাবে সাধারণ মানুষকে যন্ত্রণা আর দুর্ভোগের আবর্তে ঠেলে দিচ্ছে – সেটা কি ওই স্বদেশপ্রেমী মানুষরা কোনদিন কল্পনা করতে পেরেছিলেন?

প্রবীণবাবু অহীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “অহীনবাবু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস তো তোমরা পড়েছ?”

অহীন বলল, “পড়েছি – আমাদের স্কুলের সিলেবাসে ছিল”।

প্রবীণবাবু বললেন, “সে পড়ে কিস্‌সু বোঝা যাবে না। খুব সংক্ষেপে তোমাকে বলছি শোন। বলা হয় ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু। ওই দিন জার্মানি পোল্যাণ্ড দখল করার জন্যে যুদ্ধ শুরু করল, আর তার দুদিন পরে জার্মানিকে শায়েস্তা করতে ব্রিটিশ আর ফরাসী বাহিনী যুদ্ধ করতে মাঠে নামল। অবিশ্যি তার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ইওরোপের নানান দেশে, এমনকি এশিয়াতেও জাপান আর চিনের মধ্যে লাগাতার যুদ্ধ চলছিল।

ব্রিটিশদের তখন খুব দেমাক – তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। তাদের সাম্রাজ্যে কোনদিন সূর্য অস্ত যায় না। আর তাদের সাম্রাজ্যের সব থেকে দামি রাজ্যটি হল আমাদের এই ভারতবর্ষ। ভারতের মাঠে মাঠে অজস্র শস্য, মাটির তলায় অঢেল খনিজ সম্পদ। তার ওপর সোনা, রূপো, মণি রত্নের অফুরন্ত ভাণ্ডার। প্রচুর লুঠ করা গেছে – কিন্তু তাতেও আশ মেটেনি – তাদের লোভ আরও আরও অনেক কিছু লুঠ করার – যতদিন ইচ্ছা।

সে সময় গুটিকতক সর্বভারতীয় নেতা চাইছিলেন ব্রিটিশ রাজত্বই থাক। তাঁরা ব্রিটিশদের থেকে কিছু কিছু সুযোগ সুবিধে পেলেই খুশি। তাদের নিয়ে ব্রিটিশদের খুব মজা। ধরা যাক ওই নেতারা খেতে চাইলেন রসগোল্লা। অনেক হম্বিতম্বি, টালবাহানা করে ব্রিটিশরা তাঁদের দিল একটা নকুলদানা। সেই নকুলদানা নিয়েই ওই নেতারা খুশি। তাঁরা ভাবলেন আজ পেয়েছি নকুলদানা, এরপর কোনদিন পাব বাতাসা। এভাবেই একদিন ঠিক রসগোল্লা পেয়ে যাবো। আমার মনে হয় ব্রিটিশরা ওই নেতাদের কীর্তির কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করত আর আমাদের আহাম্মকিতে হেসে কুটিপাটি হত।    

কিন্তু অন্যদিকে বেশ কিছু নেতা চাইছিলেন ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে। ব্রিটিশদের কাছে এই নেতারা খুবই বিপজ্জনক – এরা দিন কে দিন দলে ভারি হচ্ছিল। শুধু রাজধানী কিংবা বড়ো শহরে নয় – জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে এই নেতাদের অনুগামীরা বিপ্লবের দীক্ষা নিয়ে, ব্রিটিশদের জ্বালিয়ে মারছিল। এই রেল লাইন উপড়ে ফেলছে। এই টেলিগ্রাফের তার, টেলিফোনের তার ছিঁড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছে বারবার। পোস্ট অফিস, ট্রেজারি থেকে টাকা লুঠ করছে। বাঘা বাঘা ব্রিটিশ অফিসারদের তারা গুলি করে মারছে, কিংবা মারার চেষ্টা করছে বারবার।

কথায় আছে বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করা দেশীয় অফিসাররা ব্রিটিশদের থেকেও স্বদেশী-বিপ্লবীদের ওপর অত্যাচারে ছিল অনেক কাঠি ওপরে। তাদেরকেও ছেড়ে কথা বলছে না স্বদেশী বিপ্লবীরা।  টিপে টিপে মারছিল ছারপোকার মতো।

এক কথায় ভারতবর্ষ নামক সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে সামলাতে সে সময় ব্রিটিশরা তাদের সর্বশক্তি নিয়েও হাঁসফাঁস করছিল। তাদের অহরহ ব্যতিব্যস্ত করে রাখছিল, স্বদেশী করা এই সংগ্রামী মানুষগুলো। ওদিকে ইওরোপে নিজের প্রতিবেশী জার্মানিদের খোঁচা দিয়ে – বেশ প্যাঁচে পড়ে গেল ব্রিটিশরা। তারা ভেবেছিল খুব সহজেই জার্মানিদের ঢিট করে যুদ্ধ করার শখ মিটিয়ে দেবে। সে তো হলই না – বরং যুদ্ধের তেজ বেড়ে উঠল এবং বিয়াল্লিশ সাল নাগাদ গোটা ইওরোপ জুড়েই যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল। চরমে উঠল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

ভারতের নরমপন্থী নেতাদেরও এবার চোখ খুলল, এই সুযোগটা ছাড়লেন না, তাঁরা ওই বিয়াল্লিশেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন। আর নেতাজী সুভাষ বিদেশে গিয়ে ব্রিটিশদের শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলালেন এবং জাপানের সাহায্যে ব্রিটিশ ভারতকে আক্রমণ করার জন্যে বিয়াল্লিশ সালেই গড়ে তুললেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই সবের মধ্যে ব্রিটিশরা যে চরম বজ্জাতিটা করল, সেটা হল বাংলার মুখের গ্রাস কেড়ে নিল। ইওরোপের নানান যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সৈন্যদের রসদ যোগাতে তারা বাংলা থেকে শয়ে শয়ে জাহাজ ভরে পাচার করতে লাগল খাদ্য শস্য, মানে চাল-ডাল-গম এইসব। বিয়াল্লিশ থেকে তেতাল্লিশ সাল পর্যন্ত গোটা অভিন্ন বাংলা এবং পূর্ব ভারত জুড়ে চলল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লক্ষ লক্ষ – কেউ বলে শুধু বাংলাতেই আট লাখ, আর গোটা ভারতে প্রায় তিরিশ লাখ - মানুষ মারা গেল অনাহারে। বাংলার ইতিহাসে যাকে ১৩৫০ বা পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে।

পঁয়তাল্লিশ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল, জাপান ও জার্মানির চূড়ান্ত হার হল ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশদেরও কোমর ভেঙে গিয়েছিল। এর দুবছরের মধ্যেই সাতচল্লিশের আগষ্টে ব্রিটিশদের ভারত থেকে পাততাড়ি গোটাতে হল। পলাশীর যুদ্ধ জয় থেকে যদি ব্রিটিশদের রাজত্বকাল ধরা হয় তাহলে একশ নব্বই বছরের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত স্বস্তি পেল। কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তার যন্ত্রণা বেড়ে গেল। দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেল না আমার ছোটকা!”

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কেন?”

মেঝের দিকে তাকিয়ে প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “মা, ঠাকুমার মুখে শুনেছি ঠাকুর সিদ্ধানন্দ নাকি ত্রিকালদর্শী। ত্রিকালদর্শী মানে জানো তো? অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ যিনি দেখতে পান। তা সে ত্রিকাল তো অনেক দূরের কথা, বছর চারেকের মধ্যেই যে আমরা স্বাধীন হতে চলেছি সেটা তিনি দেখতেই পেলেন না! বাবা ও মায়ের কাছে শুনেছি, তেতাল্লিশ সালে বসে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ভেবেছিলেন, পঞ্চাশ-ষাট বছরের আগে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে বিদেয় করা যাবে না। কাজেই অতি সাবধানী হয়ে, তিনি অনেক ভেবেচিন্তে ছোটকাকে প্রায় আশি বছরের জন্যে সমাধির ব্যবস্থা করেছিলেন। অর্থাৎ ছোটকার বয়েস একশ বছর পূর্ণ হলে, তবেই তার সমাধি ভাঙবে। এদিকে ভারত তো স্বাধীন হয়ে গেল চার বছরের মধ্যে! বেচারা ছোটকাকে অকারণে এতগুলো বছর ওই পাতালঘরে বন্দী থাকতে হবে? কোন মানে হয়?

আমার ঠাকুমা, বাবা-মা সকলেই পাগলের মতো ঠাকুর সিদ্ধানন্দের খোঁজ শুরু করলেন। তাঁকে খবর দেওয়ার নানান ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু প্রায় বছর চারেক তাঁর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না। তারপর একদিন বাবার নামে একটা চিঠি এল। সেই ভদ্রলোকও ঠাকুর সিদ্ধানন্দের কাছে দীক্ষা নেওয়া শিষ্য, অর্থাৎ আমার বাবা-মায়ের গুরুভাই”।

উদ্বিগ্ন অহীন জিজ্ঞাসা করল, “তিনি কী লিখেছিলেন, দাদু”?

প্রবীণবাবু সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। দেওয়াল আলমারির সামনে গিয়ে, তার পাল্লা খুলে একটা বহু পুরোন ফাইল বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে সোফায় এসে বসলেন। ফাইলের ফিঁতে খুলে, অনেক কাগজ পত্রের মধ্যে থেকে একটা চিঠি বের করলেন। সেটা হাতে নিয়ে বললেন, “এই সেই চিঠি। পড়ছি, মন দিয়ে শোন”। 

“।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরবে নমঃ।। ওঁ শ্রী শ্রী গুরু কৃপাহি কেবলম্‌।। 

ভবদীয় সুধীনবাবু মহাশয়,

পত্রারম্ভে আপনার ও আপনার পরিবারের সকলের সর্ব্বাঙ্গীন কুশল কামনা করি।

শ্রীশ্রী গুরুদেবকে আপনি যে তিনখানি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন, সেগুলি একত্রে গতকল্য আমার হস্তগত হইয়াছে। লিফাফার উপর আপনার লিখিত ঠিকানার বারংবার পরিশোধন দেখিয়া, বুঝিতে অসুবিধা হয় নাই যে, পত্রগুলি বহুজনের হস্ত মারফৎ redirect হইয়া অবশেষে আমার নিকট আসিয়া পঁহুছিয়াছে।

শ্রীশ্রী গুরুদেব আমাদিগের ন্যায় অভাগা শিষ্যদের বিবিধ দুর্ভোগ ও দুর্দশা হইতে উদ্ধার করিতেন। সে সব গোপন দুর্ভাগ্যের কাহিনী তৃতীয় কোন ব্যক্তির অবজ্ঞাত হওয়া সমীচিন নহে বিবেচনা করিয়া, আমি আপনার কোন পত্রই পাঠ করি নাই, এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন। এই পত্রের সঙ্গে আপনার অন্য তিনখানি লিফাফাও আমি প্রেরণ করিলাম। কারণ এই পত্রাদি কোন দুর্জনের হস্তগত হইলে কী বিপদ ঘটিতে পারে, সে কথা কে বলিতে পারে?      

এই ঝঞ্ঝাসংকুল ভব-সাগরে নিশ্চিন্ত তরণী হইয়া যিনি আমাদের বারংবার উদ্ধার করিয়াছিলেন। বিশাল বটবৃক্ষের ন্যায় যিনি আমাদের শরণস্বরূপ সদা বিরাজ করিতেন। একমাত্র তিনিই সকল বিপদে আপনার সহায় হইতে পারিতেন।  কিন্তু হৃদয়বিদারী দুঃখের কথা আর কী বলিব - আজ দ্বিবৎসর হয়, তিনি আমাদিগের ন্যায় অভাগাজনকে ত্যাগ করিয়া পরমলোকে পরমপদ লাভ করিয়াছেন।

ইহজগতে কেহই অমর নহে, সে কথার উল্লেখ বাহুল্যমাত্র। কালের অনুশাসনে তাঁহার দেহাবসানের শোক অচিরেই হয়তো অপনোদন হইত। কিন্তু যাবজ্জীবিত রহিব, একথা কখনও বিস্মৃত হইব না যে, তাঁহার মৃত্যু স্বাভাবিক নহে, সে মৃত্যু বড়ই মর্মন্তুদ। আপনি অবগত আছেন, দেশবিভাগের ডামাডোলে, হিন্দু-মুসলিম পরষ্পরকে হত্যার যজ্ঞে মাতিয়া উঠিয়াছিল। সেই প্রবল দাঙ্গার পরিস্থিতিতে, ৪৬ সালে আমাদিগের গুরুদেব যশোহর জিলার শিমুলিয়ায় জনৈক শিষ্যভবনে অধিষ্ঠান করিতেছিলেন। সেখানেই বীভৎস এক সাম্প্রদায়িক ঘটনায় আমাদিগের গুরুদেব সহ ওই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা সকলেই নিহত হন। শুনিয়াছি বাড়ির মহিলা ও শিশুরা প্রতিবেশী কোন বাড়িতে আশ্রয় পাইয়াছিলেন এবং এক্ষণে জীবন্মৃতবৎ দুর্দশায় কাল কাটাইতেছেন।

আর লিখিতে পারি না। আমার চক্ষুদ্বয় বাষ্পময় হইয়া উঠিতেছে। ইদৃশ দুঃসংবাদে সপরিবার আপনিও স্তম্ভিত হইবেন জানি। শোকে, আক্ষেপে ব্যাকুল হইবেন। কিন্তু কোন ভাষায় আপনাকে সান্ত্বনা জানাইব, তাহা জানা নাই।

ইতি

শ্রী সজনীকান্ত মল্লিক,

পানিসারা, জিলা যশোর, পূর্ব পাকিস্তান”।

চলবে... 


বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৮

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৭ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৮

হিরণ্যাক্ষের জন্ম, বিষ্ণুবৈরীতা ও বিনাশ    

সাধ্বী দিতি একশ বছর গর্ভ ধারণের পর যমজ পুত্রের জন্ম দিলেন। তাদের জন্মক্ষণে সর্ব লোকে ভয়ংকর উপদ্রব শুরু হয়ে গেল। দিতির পুত্র সেই আদি দৈত্য দুই ভাইয়ের নাম হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষ। তাদের শরীর পাহাড়ের মতো বিশাল, পাথরের মতো কঠিন ও শক্তিশালী। বাহুবলে তারা অসাধারণ বীর এবং একমাত্র ভগবান বিষ্ণু ছাড়া তাদের মৃত্যুর ভয়ও ছিল না। অতএব হিরণ্যকশিপু খুব অল্প দিনের মধ্যেই লোকপালদের ও সেই সঙ্গে সকল লোকই জয় করে ফেলল। আর তার প্রিয় ভাই হিরণ্যাক্ষ দাদাকে খুশি করার জন্যে গদাহাতে বেরিয়ে পড়ল স্বর্গ জয়ের ইচ্ছায়।

তার পায়ে সোনার নূপুর, গলায় বৈজয়ন্তী মালা আর কাঁধে বিশাল গদা। হিরণ্যাক্ষকে দুর্দান্ত গতিতে স্বর্গের দিকে আসতে দেখেই, দেবতারা স্বর্গ ছেড়ে গা ঢাকা দিল। কারণ দেবরাজ ও অন্যান্য দেবতারা তার শৌর্য, বীর্য, সাহস আর পরাক্রমের কথা সবই জানতেন। কিন্তু দৈত্যরাজ মনে করল, দেবতারা কাপুরুষ এবং তার তেজেই দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করে পালিয়েছে।  স্বর্গে যুদ্ধ  হল না বলে, হিরণ্যাক্ষ খ্যাপা হাতির মতো সমুদ্রের জলে আলোড়ন তুলতে লাগল। জলের দেবতা বরুণের জলচর সৈনিকেরা, সেই ভয়ংকর আলোড়নে ভয়ে ও আতঙ্কে দূরে পালিয়ে গেল। মহাবল হিরণ্যাক্ষ এরপর সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করল, তার নিঃশ্বাসের ধাক্কায় বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঢেউ সৃষ্টি হতে থাকল। হিরণ্যাক্ষ পাতালপতি ও জলচর প্রাণিদের দেবতা বরুণের ভবনে গিয়ে উপস্থিত হল।

[দাদারা দাদাগিরি করতে গিয়ে অন্য পাড়ায় ঢুকে যদি দেখে যে, সে পাড়ায় কেউ নেই - সব্বাই গা ঢাকা দিয়েছে, কেমন লাগবে সেই দাদার? রাগে ফেটে পড়বে না? স্বর্গ জয় করতে গিয়ে হিরণ্যাক্ষর মনেও ঠিক সেই অনুভূতি হয়েছিল।] 

সেখানে হিরণ্যাক্ষ তাঁকে উপহাস করে বলল, “হে মহারাজ, দয়া করে আপনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন কি? শুনেছি আপনি লোকপালের অধিপতি। আপনি অনেক দুর্দান্ত বীরের দর্প চূর্ণ করেছেন। অনেক অসুর ও দানবদের হারিয়ে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। এখন আমাকে হারিয়ে আপনার বীরত্বের সুনাম রক্ষা করুন”

জলপতি বরুণের মনে ক্রোধ সঞ্চার হলেও, অকারণ যুদ্ধে লোকক্ষয় এড়ানোর জন্যে তিনি সংযত হলেন, বললেন, “হে অসুররাজ,  আজ অনেক কাল আমি এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে দিয়েছি। আর তোমার মতো যুদ্ধনিপুণ মহাবীরের সমান বীর কাউকেই তো দেখছি না। একমাত্র বিষ্ণুই তোমার এই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিতে পারেন। তুমি তাঁর কাছে যাও, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধেই তুমি বীরগতি পাবে। ভগবান বিষ্ণু তোমার মতো বীরের জন্যেই অপেক্ষা করছেন”

উদ্ধত হিরণ্যাক্ষ বরুণদেবের কথায় উন্মত্তের মতো বিষ্ণুর খোঁজ করতে লাগল এবং মহামুনি নারদের কাছে সংবাদ পেল, শ্রীবিষ্ণু পৃথিবী উদ্ধারের জন্যে এখন রসাতলে রয়েছেন। হিরণ্যাক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই রসাতলে প্রবেশ করল, সেখানে গিয়ে সে দেখল বিশাল পাহাড়ের মতো এক প্রাণী, তার দুই দাঁতের উপর পৃথিবীকে তুলছে। সেই প্রাণির অঙ্গ প্রভায় হিরণ্যাক্ষর জ্যোতি ঢাকা পড়ে গেল

হিরণ্যাক্ষ সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে এক জলচর বরাহকে দেখে হেসে উঠে বলল, “আমি বিষ্ণুর সন্ধানে এখানে এলাম, এসে দেখছি এতো একটা বরাহ। মূর্খ বিষ্ণু, শূকরের বেশ ধরেছ বলে তুমি আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে, এমন চিন্তাও করো না। পৃথিবীকে রেখে দাও, প্লাবনে ভেসে আসা পৃথিবী এখন রসাতলেই থাকবে, কারণ এই রসাতল আমারই অধীন। তুমি আমার সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। তোমার যুদ্ধজয়ের যত কাহিনী শুনেছি, সে সবে তোমার পৌরুষ নামমাত্র, তোমার যোগমায়াই তোমার আসল শক্তি। মূঢ়, আজ আমি তোমাকে হত্যা করে, আমার নিহত বন্ধুদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব। আমার ভীষণ গদার আঘাতে তোমার মাথা চূর্ণ করে দিলেই, তোমার ভরসায় থাকা যতো ব্রাহ্মণ, দেবতা, মুনি, ঋষি সকলেই অনাথ অসহায় হয়ে পড়বে”

বরাহরূপী ভগবান সেই অসুরের কুকথা শুনেও কর্ণপাত করলেন না। তাঁর দুই দাঁতের উপর ধরে রাখা পৃথিবীকে নিয়ে তিনি জলের উপরে উঠে এলেন। জল থেকে বাইরে এসে, তিনি পৃথিবীকে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং পৃথিবীর মধ্যে আধারশক্তি সঞ্চার করলেন। সেই ক্ষণ থেকেই পৃথিবী সকল ভূতের বাসযোগ্য হয়ে উঠল। এই আশ্চর্য ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে, ব্রহ্মা শ্রীবরাহের স্তব করতে লাগলেন, স্বর্গ থেকে দেবতারা আনন্দে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন।  

ভগবানের পিছনে তাড়া করে আসছিল হিরণ্যাক্ষ, তাঁকে জলের বাইরে চলে আসতে দেখে, সে বলল, “তোমার মতো নির্লজ্জ আর কাপুরুষের নিন্দার ভয় না থাকাই স্বাভাবিক, সেই কারণেই তুমি পালিয়ে আসতে পারলে”

ভগবান পৃথিবীর প্রতিষ্ঠার জন্যে অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে ছিলেন, এবার তিনিও ক্রোধে গর্জন করে বললেন, “ওরে অভদ্র অসুর, তুই যে আমাকে জলচর বরাহ বললি, সত্যিই আমি তাই, কিন্তু আমি তোর মতো কুকুরেরই সন্ধান করে থাকি। আমি তোর ভয়ে পাতালে বদ্ধ থাকা পৃথিবীকে নিয়ে নির্লজ্জের মতো পালিয়ে এলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তোর মতো বীরের থেকে পালিয়ে আমি কোথায় যাবো? আয়, আমাকে হত্যা করে তোর আত্মীয়দের চোখের জল মুছিয়ে দেবার তোর প্রতিজ্ঞা তুই রক্ষা কর, তা নইলে তুই আর কিসের বীর”?

ভগবানের এই বিদ্রূপে হিরণ্যাক্ষ ক্রোধে উন্মাদের মতো ভগবানের বুকে গদার আঘাত করতে গেল, কিন্তু ক্ষিপ্রবেগে সেই আঘাত এড়িয়ে গেলেন ভগবান বিষ্ণু। অসুর হিরণ্যাক্ষ বীর্যে, শক্তিতে ও রণকৌশলে অত্যন্ত দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, ভগবান বিষ্ণু তার আক্রমণ বারবার প্রতিহত করছিলেন, কিন্তু নিজে আঘাত করছিলেন না। চপল বালক খেলার ছলে যেমন ক্রুদ্ধ সাপের লেজ আকর্ষণ করে, তার ছোবলকে ব্যর্থ করে দেয়, তিনিও হিরণ্যাক্ষকে নিয়ে যেন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মত্ত হলেন।

এইভাবে দুপুর পার হয়ে যখন বিকেল হতে চলল, ঋষিদের নিয়ে ব্রহ্মা সেখানে উপস্থিত হলেন, ব্রহ্মা বললেন, “হে অচ্যুত, এই দৈত্য অত্যন্ত দুর্ধর্ষ দুর্বৃত্ত, একে হত্যা না করলে, তোমার আশ্রয়ে থাকা দেবতা, গো, ব্রাহ্মণ ও নিরপরাধ জীব বিপন্ন বোধ করবে। হে দেব, এর সঙ্গে যুদ্ধের খেলায় সময় নষ্ট করো না। দেখ সন্ধ্যা আসতে আর দেরি নেই, আর সন্ধ্যা উপস্থিত হলে, এই অসুরকে আজ হত্যা করা সম্ভব হবে না। হে ভগবান, জয় ও বিজয়ের শাপ মোচনের বিধানে, তুমি স্বয়ং এই অসুরকে বধ করবে, এমনই বিধান দিয়েছিলে। অতএব আর বিলম্ব করো না”    

 তারপর সেই ভয়ংকর যুদ্ধে হিরণ্যাক্ষের গদা ও ত্রিশূল বিনষ্ট হল।  নিরস্ত্র হিরণ্যাক্ষ বরাহরূপী ভগবানের বক্ষে বজ্রমুষ্টিতে আঘাত করল। সেই আঘাতে পাহাড় কেঁপে ওঠে কিন্তু ভগবান এতটুকুও বিচলিত হলেন না। হিরণ্যাক্ষ এবার ভগবানকে দুই বাহুর আলিঙ্গনে পীড়িত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল। কিন্তু কি আশ্চর্য, ভগবান সেই ভীষণ আলিঙ্গনের মধ্যে থেকেও, অসুরের কর্ণমূলে তাঁর চরণের ক্ষুর দিয়ে বজ্রের মতো আঘাত করলেন। সেই আঘাতেই সেই দুর্দান্ত অসুর ছিন্নমূল বিশাল গাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল। ধরাশায়ী মহাদৈত্য হিরণ্যাক্ষ বরাহরূপী শ্রীবিষ্ণুর মুখ দর্শন করতে করতেই প্রাণ ত্যাগ করল।

মৈত্রেয় বললেন, “এই ভাবেই আদিবরাহ শ্রীহরি দুর্দান্তবিক্রম হিরণ্যাক্ষকে খেলার ছলে সংহার করেছিলেন এবং তারপর তাঁর আনন্দের নিলয় নিজের বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গিয়েছিলেন”


মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয়

বিদুর বললেন, “হে ঋষিবর, সাধুজনেরা স্বায়ম্ভূব মনুর বংশের খুব প্রশংসা করে থাকেন। এই বংশেই স্ত্রী-পুরুষ সংসর্গে প্রজা সৃষ্টি হয়েছিল, অতএব এই বংশের কথা আমাকে বর্ণনা করুন। স্বায়ম্ভূব মনুর দুই পুত্র প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ এবং এক কন্যা দেবহূতি। এই দেবহূতির পাণিগ্রহণ করেছিলেন, ব্রহ্মার ছায়া থেকে উৎপন্ন প্রজাপতি ঋষি কর্দমআমাকে সেই বৃত্তান্ত দয়া করে বর্ণনা করুন”

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “প্রজাপতি কর্দমের জন্মের পর, তাঁকে ব্রহ্মা প্রজা সৃষ্টি করার নির্দেশ দিলেন। সেই নির্দেশ পালনের জন্য মহর্ষি কর্দম সরস্বতীনদীর তীরে দশ হাজার বছর ধরে ভক্তিভরে শ্রীহরির তপস্যা করলেন। এইভাবে তপস্যার পর, সত্যযুগে তাঁর আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীহরি ব্রহ্মময় তনুতে তাঁর সামনে প্রকাশিত হলেন। শ্রীহরির সেই রূপ নির্মল ও সূর্যের মতো উজ্জ্বলতাঁর কণ্ঠে দিনের প্রকাশরূপ শ্বেতপদ্ম ও রাত্রির প্রকাশরূপ নীল উৎপলের মালা। তাঁর বসন নির্মল; তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, কানে সোনার কুণ্ডল।  তাঁর তিন হাতে তিনি শঙ্খ, চক্র ও গদা ধারণ করে আছেন। চতুর্থ হাতে শ্বেত লীলাপদ্ম। তাঁর গলায় কৌস্তুভমণির মালা, তাঁর বক্ষে লক্ষ্মীদেবীর নিলয়। তাঁর দুই চরণকমল গরুড়ের কাঁধে বিন্যস্ত। তাঁর অধরে মৃদু হাসি এবং দুই নয়নে মনোহর দৃষ্টি। প্রজাপতি কর্দম আকাশবিহারী শ্রীহরির এই রূপ দেখে ধন্য হলেন। 

[আজকাল কৌস্তভ নামটি বাঙালীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত, কিন্তু নামটি হওয়া উচিৎ ছিল কৌস্তুভ - স্ত-এর সঙ্গে একটি হ্রস্ব-উ যোগ করলে - স্তু হয় - বিষ্ণুর কণ্ঠে কৌস্তুভমণিরই মালা থাকে - কৌস্তভ মণির নয়।]

পরমানন্দে তিনি শ্রীহরিকে প্রণাম করে, জোড়হাতে নিবেদন করলেন, “হে পূজনীয় দেব, তুমি অখিল সত্ত্বার আধার, আজ তোমাকে দর্শন করে আমার নয়নযুগল সার্থক হল। হে পরমেশ, তুমি প্রজাপতি ব্রহ্মারূপে আমাকে প্রজা সৃষ্টি করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেই আজ্ঞা পালনের জন্যে আমি তোমার কাছে একজন যোগ্য সহধর্মিণী প্রার্থনা করছি। গৃহাশ্রমে ভার্যার থেকেই ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ লাভ করা সম্ভব। ধর্মপত্নী থেকে শুধু যে লোকসৃষ্টি সম্ভব তাই নয়; ঋষি-ঋণ, দেব-ঋণ ও পিতৃ-ঋণ এই তিন রকমের ঋণ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। হে দেব, তুমি এক হয়েও জগৎ সৃষ্টির জন্যে নিজের মধ্যেই স্থিত যোগমায়ার প্রভাবে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছ, পালন করছ আবার তুমিই এই বিশ্বের বিনাশও করবে। হে ভগবান, তুমিই মুক্তি দান করো, কারণ তোমার পরমজ্ঞানের জন্যে কর্মের ফল তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। আবার তুমি ভোগও দান করে থাকো, কারণ তুমিই তোমার মায়ায় বিশ্বের সকল ভোগের উপকরণ উৎপাদন করে থাকো। তুমি কামনায় আসক্ত ব্যক্তিদের বাসনাও পূর্ণ করে থাকো। এই কারণেই কামনায় আসক্ত অথবা নিরাসক্ত, সকলেই তোমার চরণে আশ্রয় নিয়ে থাকে। আমিও তোমার ঐ চরণ কমলে অসংখ্য প্রণাম করি”

ঋষিবর কর্দমের এই স্তব শুনে, ভগবান শ্রীহরি বললেন, “হে প্রজাপতি কর্দম, আমার অর্চনা কোনদিন ব্যর্থ হতে পারে না। আমি তোমার এই উদ্দেশ্য আমি জানি, তাই আগে থেকেই তোমার জন্যে আমি সব ঠিক করেই রেখেছি। যিনি সসাগরা এই ধরণী শাসন করছেন, ব্রহ্মার পুত্র সেই রাজর্ষি স্বায়ম্ভূব মনু তাঁর ধর্মপত্নী শতরূপাকে নিয়ে পরশুদিন আসছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর দেবহূতি নামে এক কন্যা আছেতিনি নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। রাজর্ষি মনু তোমাকেই সেই কন্যা সম্প্রদান করবেন। হে ব্রহ্মন, তোমার এই ভার্যা তোমার নয়টি কন্যার জননী হবেন এবং এই নয় কন্যার সহিত মরীচি প্রমুখ ঋষিদের বিবাহ হয়ে বহু সন্তান সৃষ্টি হবে। হে মহামুনি, তোমার ভার্যা দেবহূতির গর্ভে স্বয়ং আমি নিজের অংশকলায় জন্ম নেব এবং তত্ত্বসংহিতা রচনা করব”

[দশ হাজার বছরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে, শ্রীহরি নিজেই ঘটকালি করে, দশহাজার বছরের বুড়ো ঋষি কর্দমের জন্যে যে পাত্রী ঠিক করে দিলেন, তিনি নবীনা, সুশীলা ও বহুগুণের আধার। এর তুলনায় আমাদের কৌলীন্যপ্রথায় আশি বছরের বুড়োর সঙ্গে যে আট বছরের বালিকার বিয়ে হত, সে তো তুচ্ছ।]    

ভগবান শ্রীহরি মহর্ষি কর্দমকে এই উপদেশ দিয়ে সরস্বতীনদীতীরের বিন্দুসর নামের সেই আশ্রম থেকে বিদায় নিলেন ও গরুড়ের পিঠে আরোহণ করলেন মহর্ষি দেখলেন, শ্রীহরি গরুড়ের পিঠে চড়ে চলেছেন এবং সিদ্ধগণ নিখিল তপোমন্ত্র সাধনায় তাঁর স্তব করছেন। এদিকে গরুড়ের পাখার ধ্বনিতে সামবেদের অভিব্যক্তি ও সামবেদের আধারস্বরূপ ঋকবেদ সমূহ উচ্চারিত হয়ে শোনা যাচ্ছিল। শ্রীহরি দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার পর, মহর্ষি কর্দম স্বায়ম্ভূব মনুর আসার অপেক্ষায় বিন্দুসর আশ্রমেই রয়ে গেলেন”। 

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “এদিকে উপযুক্তা কন্যার জন্য পতির সন্ধানে স্বায়ম্ভূব মনু তাঁর সোনার অলংকারে সাজানো রথে বেশ কিছুদিন ধরেই পর্যটন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পত্নী শতরূপা ও সুশীলা কন্যা দেবহূতি। নানান দেশ, নানান রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা এসে পৌঁছলেন, সরস্বতী নদীর তীরে বিন্দুসর আশ্রমে। এই ক্ষেত্রে শরণাপন্ন কর্দমের প্রতি করুণাবশতঃ ভগবানের নয়ন থেকে একবিন্দু আনন্দ অশ্রু পড়েছিল, সেই থেকেই ওই স্থানের নাম বিন্দুসরঃ হয়েছিল। এই আশ্রম সরস্বতীর পুণ্যজলে সিক্ত এবং মহর্ষিগণের অবস্থানে পবিত্র

রাজর্ষি মনু তাঁর অনুচরদের সঙ্গে আশ্রমে প্রবেশ করলেন। সেই সময় মুনিবর কর্দম সবেমাত্র হোম সমাধা করে বিশ্রাম করছেন। সদ্য হোম সমাপনের জন্যে তাঁর শরীর উজ্জ্বল তেজময় ছিল। রাজর্ষি তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন, মহর্ষির শরীর ঋজু, তাঁর দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো, তাঁর মাথায় জটা এবং অঙ্গে বল্কল বসন। অসংস্কৃত মহামণিকে যেমন কিছুটা মলিন দেখায়, তাঁকে দেখে রাজর্ষির সেরকমই মনে হল। রাজর্ষি তাঁর পায়ের কাছে প্রণত হলে, মহামুনি কর্দম তাঁকে আশীর্বাদ করলেন ও অভিনন্দন করে হাত পা ধোবার জল ও বসার জন্য দিলেন কুশাসন। 

হাত পা ধুয়ে রাজর্ষি আসনে বসার পর, মহর্ষি কর্দম বললেন, “আপনি সাধু ব্যক্তির রক্ষা ও অসাধু ব্যক্তিদের শাস্তি বিধানের জন্য সর্বদাই ব্যস্ত থাকেন। কারণ আপনিই ভগবান শ্রীহরির পালনী শক্তি। আপনি প্রতাপে সূর্য, যশে চন্দ্র, পরাক্রমে অগ্নি, ঐশ্বর্যে ইন্দ্র এবং দুষ্ট নিগ্রহে যম। আমার মনে হচ্ছে, আমার ইষ্টদেব শ্রীবিষ্ণুই যেন আপনার রূপ ধরে আর একবার আমার সামনে উপস্থিত হয়েছেন, আপনি আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। রাজ্য শাসনের স্বাভাবিক নিয়মেই আপনি ঘুরতে ঘুরতে হয়তো আমাদের আশ্রমে এসেছেন, কিন্তু আপনার এই আশ্রমে আসার যদি বিশেষ কোন কারণ থেকেও থাকে, অনুগ্রহ করে ব্যক্ত করুন, হে মহারাজ। আমরা খুব আনন্দের সঙ্গে আপনার উদ্দেশ্যসাধনের প্রয়াস করবো”। 

চলবে...

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৬

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫ "


 

কমলিমায়ের উঠোনে নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল ভল্লা আর রামালি। ঘরের দরজাটা বন্ধ নয়, ভেজানো। দরজার ফাঁক দিয়ে দীপের ম্লান আলোর আভাস আসছে। ভল্লা দাওয়ায় উঠল – হাল্কা চাপ দিতে খুলে গেল দরজাটা। কমলিমা মেঝেয় বসে আছেন, খাটিয়ার ওপর দুহাতের মধ্যে মাথা রেখে। খাটিয়ায় পরিষ্কার বিছানা টানটান করে পাতা, যেন কেউ এখনই আসবে – এসে শোবে। আর তার অপেক্ষাতেই বসে থেকে থেকে কমলিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভল্লার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কী অসহায় শূণ্যতা নিয়েই না এখন বেঁচে রয়েছেন কমলিমা। ভল্লা নিঃশব্দে কমলিমায়ের পাশে গিয়ে বসল। তার পিছনে সামান্য দূরে বসল রামালি।

ভল্লা অতি সন্তর্পণে কমলিমায়ের কাঁধে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল, “এমন করে বসে আছিস, কেন রে মা?”

কমলিমা মাথা তুলে তাকালেন, ভল্লাকে দেখে বললেন, “ভল্লা? কতক্ষণ এসেছিস, তুই? জানতেই পারিনি”। কমলিমা হাসলেন – সে হাসির মধ্যে এতটুকু আনন্দ প্রকাশ পেল না, বরং ফুটে উঠল বিষণ্ণ নির্লিপ্তি। কমলিমা আবার বললেন, “এতদিনে তোর সময় হল? ওই দিন আমার কাছে একটি বারের জন্যেও আসতে পারলি না? কিন্তু শুনলাম তুই শ্মশানে গিয়েছিলি?”

“হুঁ। গিয়েছিলাম। তোর কাছে আসতে সেদিন ভয় পেয়েছিলাম মা। সেদিন গ্রামের মেয়ে-পুরুষ অনেকেই তোর কাছে ছিল...তারা কে কী বলবে...সেই ভয়...”।

“হ্যাঁ এসেছিল, গ্রামের সবাই। কবিরাজদাদা আর তুই - ছাড়া। সেদিন গ্রামের সবাই বলছিল আমাকে মুখে আগুন দিতে হবে। আমাকে শ্মশানে যেতে হবে। পাগল নাকি? তাই কখনও হয়, বল? মেয়েরা শ্মশানে যায়? আর আমি কেন মুখে আগুন দিতে যাব? আমি কী আঁটকুড়ি নাকি? গাঁয়ের লোক কী যে বলে না...”। ভল্লা কোন কথা বলল না, তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের শীর্ণ অবসন্ন মুখের দিকে।

“তুই এলে, তোকেই বলতাম। যা ছেলের কাজটা করে আয়। এলি না। হ্যারে মুখে আগুন না দিলে আত্মার সদ্গতি হয় না, না? তাহলে কী হবে? এখন মনে হচ্ছে ভুলই করেছি...লোকের কথা শুনে...শ্মশানে গেলেই হত...হ্যারে আমার কী পাপ হল?” গলার কাছে রুদ্ধ হয়ে থাকা কষ্টটাকে ভল্লা এতক্ষণ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মুখ তুলে কমলিমায়ের শিরা-বিকীর্ণ কঙ্কালসার হাতটা দুহাতে ধরে বলল, “পাপ কেন হতে যাবে রে, মা? আর প্রধানমশাইয়ের আত্মার সদ্গতিই বা হবে না কেন? এইসব কথা চিন্তা করে তুই বসে বসে রাত জাগছিস, মা? গ্রামের মেয়েদের কেউ রাত্রে তোর কাছে থাকে না”?

“ধুর। সন্ধে হলেই আমি তাদের তাড়িয়ে দিই। খুব ভয় করে জানিস? কচি কচি মেয়েগুলো সারারাত  আমার সঙ্গে থাকবে – যদি কিছু হয়ে যায়? খুব ভয় করে। বলি পালা আমার সামনে থেকে”।

“কিসের ভয় মা?”

“নিজের পেটের দু-দুটো ছেলেকে খেয়েছি। স্বামীকে খেয়েছি। আমার বিয়ে হয়েছিল আট বছর বয়সে, এ বাড়িতে এসেছি আমার তের বছর বয়সে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বলতেন আমি নাকি খুব লক্ষ্মীমন্ত। কবিরাজদাদা বলত তুই খুব ডাকাবুকো ছেলে – ভয়ডর কম। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল তো – ভয় করছে না? আমার চোখে অকল্যাণের ছায়া দেখতে পাচ্ছিস না? পুকুরে চান করতে গিয়ে জলে ছায়া পড়ে – স্পষ্ট দেখতে পাই একজোড়া ডাইনীর চোখ”।

চণ্ড রাগে ভল্লা বলে উঠল, “কী আজেবাজে বকছিস, মা? মা কোনদিন ডাইনী হয়? তুই আমার সঙ্গে চল, মা। এই ঘরে একা একা সারাদিন এইসব চিন্তা করে তুই নিজেকে শেষ করে দিবি নাকি? কোন কথা নয় - এখনই ওঠ। সারাদিন তোর কাজ নেই কম্মো নেই, নাওয়া নেই খাওয়া নেই, ঘুম নেই...। আর তাকিয়ে দ্যাখ, রামালি আর আমি সারাদিন-রাত খেটে মরছি। তারপরেও ঘরে ফিরে রামালি দু বেলা হাত পুড়িয়ে রান্না করে – নিজে খায়, আমাকে খাওয়ায়...। আজ তুই চ আমাদের সঙ্গে – এ ঘরে তোকে আমি রাখব না। কত বড়ো ডাইনী তুই হয়েছিস, আমাদের দেখা তো, মা? তোর চোখের বিষে আমাদের কেমন শুকিয়ে মারতে পারিস – চল আমাদের সঙ্গে – দেখি। ওঠ। না উঠলে, তোর ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে যাবো, এই বলে রাখলাম, মা। এই গোঁয়ার-গোবিন্দ ছেলেকে তুই ভালই চিনিস। এখনই ওঠ...”।

“পাগল হয়েছিস, ভল্লা? এ আমার স্বামীর ভিটে – এ আমার শ্বশুরের ভিটে...এ সব ছেড়ে...। তাছাড়া তোরা সব উড়নচণ্ডে ছেলে...দল বেঁধেছিস লড়াই করবি বলে...”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, “হ্যাঁ, তাই...কিন্তু উড়নচণ্ডেদেরও মা থাকে, ভাইবোন থাকে...রামালি ওঠ। এই বিছানা, আর কমলিমায়ের শাড়ি-টাড়ি গামছা-টামছা – হাতের সামনে যা পাচ্ছিস নিয়ে একটা পুঁটলি বানা...চল। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়...”। রামালি উঠে পড়ল - দ্রুত হাতে গুছিয়ে তুলতে লাগল কমলিমায়ের কাপড়-চোপড়।

কমলিমা চেঁচিয়ে উঠলেন, “অ্যাই, রামালি – যেমন ছিল সব রেখে দে - কিচ্ছুতে হাত দিবি না – মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেব...”।

ভল্লা হা হা করে হেসে উঠল, পাঁজাকোলা করে দুহাতে তুলে নিল কমলিমাকে, বলল, “তুই যদি রামালির ঠ্যাং ভাঙতে পারিস, তাহলে আমরাও তোর ঘাড় ভাঙতে পারি, মা। কী শরীর, রে তোর? আমাদের ওদিকের পায়রাগুলোও তোর থেকে ভারি হয় ...হা হা...”।

কমলিমা কঠোর চোখে ভল্লার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায় নামিয়ে দে ভল্লা। সেবা-যত্ন করে তোকে সুস্থ করে তুলেছিলাম, আমার সঙ্গে এই ব্যবহার করবি বলে?”

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “তোর ওই ডাইনী চোখের ভিরকুটিতে আমি ডরাবার পাত্র নই... আর আমি যে ডাকাত - সে কথা কবিরাজদাদা তোকে বলেনি? সারা জীবনে অনেক ডাকাতি করেছি - অস্ত্র-শস্ত্র, টাকাকড়ি...কিন্তু মা ডাকাতি কোনদিন করিনি...”।

ভল্লা দাওয়া পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নামল, রামালি প্রদীপ নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার শেকল তুলে দিল। তার কাঁধে বেশ বড়ো একটা পুঁটলি। দুজনে অন্ধকারের মধ্যে কমলিমায়ের বাড়ির বেড়া টপকে এগিয়ে চলল জঙ্গলের দিকে। ভল্লার বুকের মধ্যে শীর্ণ পাখির মতোই আবদ্ধ কমলিমা অনর্গল বকাবকি করতে লাগলেন ভল্লাকে...হতভাগা ছেলে, গাঁয়ের লোক কি বলবে? আমার সন্তান গেছে – আমার স্বামীও গেল – এ গ্রামে বাকি ছিল একটু মান-সম্মান – সেটাও গেল তোর জন্যে – কাল সকালে গাঁয়েগাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যাবে প্রধানের বউ – ভল্লার সঙ্গে পালিয়েছে – এখনও বলছি আমায় নামিয়ে দে ভল্লা – মুখপোড়া বাঁদর – তোর জ্বালায় আমাকে শেষ অব্দি গলায় দড়ি দিতে হবে…”!

উপানুদের মারে মারাত্মক আহত হয়ে গ্রামপ্রধান জুজাক যেদিন থেকে নিশ্চেতন অবস্থায় শয্যাশায়ী হলেন – সেই দিন থেকেই কমলিমায়ের অনিয়ম শুরু হয়েছিল। তাঁর জীবন থেকে মুছে গিয়েছিল নিয়মিত নাওয়া-খাওয়া, ঘুম-বিশ্রাম, হাসি-আনন্দ, এমনকি প্রতিবেশী মহিলাদের সঙ্গে স্বাভাবিক বাক্যালাপও। আজ ভল্লার সঙ্গে দীর্ঘ বাক-যুদ্ধের উত্তেজনা এবং ভল্লার উদ্ভট এই আচরণের অসহায় প্রতিবাদ করতে করতে তিনি একসময় ভেঙে পড়লেন। তিনি যেন ভল্লার বুকেই নিজেকে সমর্পণ করে ফেললেন। জুজাকের মৃত্যুতেও যিনি এতটুকু অশ্রুপাত করেননি, আজ ভল্লার ওপর রাগে, অভিমানে তাঁর দুচোখে নেমে এল রুদ্ধ অশ্রুস্রোত।

ভল্লা অন্ধকারেও টের পেল, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “কেঁদে নে মা, কেঁদে নে…বুকের মধ্যে অনড় পাথরের মতো জমে ওঠা যত অপমান, দুঃখ-শোক বেরিয়ে আসুক চোখের জল হয়ে। একদিন সকলকেই মরতে হবে। কিন্তু এভাবে তুই নিজেকে শেষ করতে পারিস না, মা – আমাদের জন্যেই তোকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হবে রামালির জন্যে – এই গ্রামের জন্যে       

জঙ্গলে ঢুকে ভল্লা কমলিমাকে সাবধানে ঘাসে বসাল, তারপর রামালিকে বলল, “তোর পুঁটলি থেকে একটা শাড়ি বের কর তো, রামালি। তারপর ঝোলা বানিয়ে আমার পিঠে শক্ত করে বেঁধে দে বুড়িটাকে। দেখিস একটুও যেন নড়তে না পারে”।

কান্না রুদ্ধ গলায় কমলিমা বলে উঠলেন, “কেন? আমি তো পাখির মতো হাল্কা, আমাকে নিয়ে এটুকু আসতেই তোর হাঁফ ধরে গেল?”

ভল্লা কমলিমায়ের পায়ের ওপর হাত রেখে বলল, “আমরা এখন রণপা চড়ে যাবো, তোকে দুহাতে ধরতে পারবো না, সেই জন্যেই রামালিকে বলছি আমার পিঠে তোকে ঝুলিয়ে দিতে। রাগ করিস নে মা। একজন মা স্বেচ্ছায় তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে, সে কথা বুঝেও কোন ছেলের পক্ষে ঠাণ্ডা থাকা সম্ভব? আচ্ছা বেশ, আমি তো তোর ছেলে নই – তাহলে তুই কেন নাওয়া-খাওয়া ভুলে আমার সেবা করে সুস্থ করেছিলি? আমি তোর ছেলে নই, তাই কোন অধিকারে আমি তোর ওপর এমন জোর খাটাচ্ছি, এখন তোর তাই মনে হচ্ছে, না রে মা…?”

কমলিমা হঠাৎই ফুঁসে উঠলেন, দুহাতে ভল্লার চুলের মুঠি ধরে বললেন, “আমি তোকে তাই বললাম বুঝি?” তারপর দুহাতে ভল্লার মাথাটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ভল্লা ভীষণ নরম গলায় বলল, “কাঁদ মা, কাঁদ – কেঁদে হাল্কা হ। কিন্তু এত উত্তেজিত হস না, তোর দুর্বল শরীর…”। রামালি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল কমলিমাকে, এরকমই কী হয় মায়েরা? ধীরে ধীরে সেও ওদের কাছে এসে বসল। ভল্লা রামালিকে দেখিয়ে বলল, “দ্যাখ মা, রামালির মুখটা দ্যাখ। হতভাগা বাচ্চাবেলায় মাকে হারিয়েছে – বড়ো হয়েছে কাকির গালমন্দ খেতে খেতে – কেমন অবাক হয়ে তোকে দেখছে দ্যাখ…”। রামালিকেও কাছে টেনে তার মাথায় হাত রেখে কমলিমা কান্নাভেজা গলায় বললেন, “কোন চুলোয় নিয়ে যাবি চল, রাত শেষ হতে চলল – ছেলেরা বলে তুই আর রামালি নাকি খুব খাটিস সারাদিন… ঘুমোবি কখন?”

চলবে...

নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২১

প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রা...