সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/৮ "]

পঞ্চম পর্ব /পর্বাংশ - ৯


৫.৩.১ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তর (শেষাংশ)

৬. অতএব অস্তিত্ব রক্ষা এবং হারিয়ে যাওয়া প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার তাগিদে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বেতসবৃত্তি অবলম্বন করতে হল। যাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে অথবা যাঁরা প্রশাসনের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত তাঁদের ঘনিষ্ঠ হতে ব্রাহ্মণ্য নিয়মকে শিথিল করতেই হল। রাজা যেই হোন, বৈশ্য, শূদ্র অথবা বিদেশী যবন বা ম্লেচ্ছ – ভিন্ন পরিচয়ে তাঁরাও ব্রাহ্মণ্য ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। আগে যাঁদের “পতিত-ক্ষত্রিয়” বা “সংকর-ক্ষত্রিয়” বলে অবহেলায় ব্রাহ্মণ্য সমাজ দূরে রেখেছিল, এখন তাঁরাই “ব্রহ্মক্ষত্রিয়”, “নাগক্ষত্রিয়”, “উগ্রক্ষত্রিয়” ইত্যাদি বিচিত্র নামে ব্রাহ্মণ্য সমাজে সসম্মানে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলেন। উপরন্তু পৌরাণিক কিছু বিখ্যাত রাজবংশ, যেমন সূর্য, চন্দ্র ইতাদির সঙ্গে যুক্ত করে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা এই সব রাজাদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও ঢুকে পড়তে সমর্থ হলেন। তাঁরা রাজাদের প্ররোচিত করলেন, রাজসূয়, বাজপেয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজনে। এই আয়োজনে একদিকে পূর্ণ হল রাজাদের আত্মশ্লাঘা এবং অন্যদিকে পুনর্প্রতিষ্ঠা পেল ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতিপত্তি ও বিপুল বিত্ত।

শুধুমাত্র রাজ-বৃত্তেও নয়, ব্রাহ্মণরা আরো নমনীয় হল অনার্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি। ততদিনে তারা চিনে ফেলেছে ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, বুঝে ফেলেছে দেশের আঞ্চলিক জনগনের মনোভাব। উপলব্ধি করতে পেরেছে, অনার্য মানুষের পরিশ্রমে উৎপন্ন শস্য এবং অজস্র সামগ্রী ছাড়া সমাজের অস্তিত্বই থাকবে না। অতএব অনার্য জনগণের বিদ্বেষ এবং বিতৃষ্ণা দূর করার লক্ষ্যে তাঁরা অনার্যদের প্রতিটি দেব-আত্মা, প্রতিটি ধর্মবিশ্বাস আত্মসাৎ করে নতুন উৎসাহে লেগে পড়লেন, সর্ব ভারতীয় ধর্মভাবনা রচনায়, যার নাম পুরাণ। তার জন্যে তাঁরা ধীরে ধীরে বৈদিক অনেক দেবতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলতে এতটুকু দ্বিধা করলেন না। আবার কিছু কিছু বৈদিক দেবতাকে নব-রূপে মহিমান্বিত করে তুললেন, বেশ কিছু গৌণ বৈদিক দেবতাকে বসালেন প্রথম সারিতে। নতুন এই দেবতাদের নব নব মহিমাতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আমাদের ধর্মধারণা  – যাকে আমরা হিন্দু ধর্ম বলে থাকি। 

সেই হিন্দু ধর্ম নিয়েই এবার আলোচনা করা যাক।          

 

৫.৩.২ হিন্দু দেব-দেবী

আর্যদের ভারতে প্রবেশ মোটামুটি ১৫০০ বি.সি.ই-তে, প্রাচীনতম ঋগ্বেদের সংকলনের সময় কাল ১০০০ বি.সি.ই-র কিছু আগে বা পরে এবং পরবর্তী ৫০০ বছরের মধ্যে সংকলিত হয়েছে ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং আরণ্যক বিভাগ সহ আরও তিনটি বেদ। ঋগ্বেদের সময় দেবতাদের সংখ্যা ছিল মাত্র আট বা নয়, খুব জোর দশ জন। পরবর্তী বেদগুলিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু আরও তিনশ বছর পর অর্থাৎ মোটামুটি খ্রী.পূ. দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই দেবতাদের সংখ্যায় বিস্ফোরণ ঘটতে লাগল।

দেবদেবীরা শুধু যে সংখ্যাতেই বৃদ্ধি পেলেন, তা নয়, তাঁদের গুণগত পার্থক্য অর্থাৎ মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে তাঁদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, কর্তব্য, দায়িত্ব এবং অধিকার বেড়ে গেল বহুগুণ। এই পর্যায়ে যে তিনজন দেবতাদের মধ্যে প্রধানতম হয়ে উঠলেন, তাঁদের একত্রে ত্রিদেব বলা হয় – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। এই  তিন দেবতার নামই আমরা বৈদিক সাহিত্যে জেনেছি। বেদের ব্রহ্ম ছিলেন, সকল দেবতাদের দেবতা – যাঁর আরেক নাম হিরণ্যগর্ভ। আমরা জেনেছিলাম, তিনিই একমাত্র সত্য, তিনিই বিভক্ত হয়ে অন্যান্য দেব-দেবী হয়েছেন। এই ব্রহ্মের অধিষ্ঠান ছিল ব্রহ্মলোকে – দ্যুলোকের উচ্চতম স্তরে। [এই স্তরের ঊর্ধে কী আছে জিজ্ঞাসা করায় বাচক্‌নু-কন্যা গার্গীকে মুণ্ডপাতের হুমকি দিয়েছিলেন মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য, সে কথা আশা করি ভুলে যাননি (অধ্যায় ৪.৪.৯)]। বিষ্ণু ছিলেন বৈদিক সূর্য-দেবতা - দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। বৈদিক সূর্য বা দ্বাদশ আদিত্য যেহেতু দ্যুলোকের দেবতা, অতএব বিষ্ণুর অধিষ্ঠান হল, দ্যুলোকের সর্বোচ্চ স্তরে, অর্থাৎ বৈকুণ্ঠলোকে। আর মহেশ্বর হলেন বৈদিক অগ্নির রুদ্ররূপ। তিনি পৃথ্বীলোকের দেবতা, অতএব তাঁর অধিষ্ঠান হল এই পৃথিবীর উচ্চতম স্তরে, হিমালয় পর্বতশ্রেণীর মধ্যে কৈলাস পর্বতে।

 

৫.৩.২.১ ব্রহ্মা

হিন্দুদের মধ্যে ব্রহ্মা খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর অন্যতম কারণ হয়তো, তাঁর নামের সঙ্গে পরমাত্মা ব্রহ্মের নাম-সাযুজ্য। পুরুষোত্তম ব্রহ্ম তথা হিরণ্যগর্ভ, বেদ ও উপনিষদের অব্যক্ত নিরাকার ঈশ্বর। তাঁকে বর্ণনা করা যায় না, ধারণা করা যায় না, তিনি অবাঙ্মনসোগোচর, তাঁকে শুধুমাত্র উপলব্ধি করা যায়। উপনিষদ এবং বেদান্তের ব্রহ্ম ধারণা এবং হিন্দু ধর্মের ব্রহ্মা ধারণা কিন্তু মোটেই এক বিষয় নয়। কারণ হিন্দুদের ব্রহ্মা সাকার। তাঁর চতুর্মুখ, মাথায় জটা। তিনি তাঁর চারটি অঙ্গ থেকে চতুর্বণের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মন থেকে জন্ম নিয়েছেন সপ্তর্ষি সহ অনেক ঋষি ও নারদ, মনু – যাঁরা পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের স্রষ্টা। কিন্তু এই অপার ঐশ্বর্য থাকলেও ভগবান ব্রহ্মা অত্যন্ত সরল দেবতা ছিলেন। দৈত্য, দানব, রাক্ষস ও মানুষদের অনেকেই তপস্যা করে ব্রহ্মাকে বেশ সহজেই সন্তুষ্ট করেছে এবং বহুবার এমন সব বর আদায় করে নিয়েছে, যার ফলে দেবতা এবং মানুষদের বারবার বিপদে পড়তে হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে হয় বিষ্ণু নয় শিবকে। তাঁর এই সারল্য এবং সহজেই সন্তুষ্ট হয়ে ওঠার কারণেই হয়তো তাঁর প্রভাব খর্ব হয়েছে, কমেছে জনপ্রিয়তা।

মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণু বা শিবের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে ব্রহ্মার উল্লেখ এসেছে বারবার, তার থেকেই তাঁর অনেক কাহিনী ও উপাখ্যান জানা যায়। এই প্রসঙ্গে হিন্দু পুরাণগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করে নেওয়া যাক। হিন্দুদের পুরাণ সংখ্যা ঠিক কতগুলি সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে আঠারোটি প্রধান পুরাণ গ্রন্থকে প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন, সেগুলিকে মহাপুরাণ বলা হয়। এই মহাপুরাণগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় এখানে দেওয়া হলঃ- 

মহাপুরাণ সারণি

মহাপুরাণের নাম             সংক্ষিপ্ত বিষয় পরিচয়                         প্রধান দেবতা

অগ্নি      নানা বিষয়ের আলোচনা, গাছ-পালা, উদ্ভিদ, বাস্তুশাস্ত্র ইত্যাদি।  অগ্নি

ভাগবত বিষ্ণুর অবতার বিবরণ, মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।              বিষ্ণু

ব্রহ্ম      নানান প্রাচীন কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, ব্রহ্মের কথা সামান্যই।          ব্রহ্মা

ব্রহ্মাণ্ড নানান কাহিনী, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি, শাসন প্রণালী ইত্যাদি।     শিব

৫   ব্রহ্মবৈবর্ত প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।               বিষ্ণু

গরুড় প্রধানতঃ বিষ্ণুর নানান মহিমা গাথা ও ধর্মতত্ত্ব।               বিষ্ণু

কূর্ম      বিষ্ণু ও শিবের উপাখ্যান, তীর্থ ব্যাখ্যা এবং ধর্মতত্ত্ব।          বিষ্ণু 

লিঙ্গ      লিঙ্গ অর্থাৎ শিবের মাহাত্ম্য, শৈব ধর্মতত্ত্ব।                    শিব

মার্কণ্ডেয় মহাভারত ও নানান পুরাণ নিয়ে আলোচনা ও ধর্ম তত্ত্ব।      বিষ্ণু ও শিব

১০ মৎস্য বিষ্ণুর দশ অবতারের উপাখ্যান।                             বিষ্ণু

১১ নারদ প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু

১২ পদ্ম      বিষ্ণু এবং শিবের নানানমাহাত্ম্য, তীর্থ কথা, বিবিধ তত্ত্ব।    বিষ্ণু ও শিব

১৩ শিব      শিবের মাহাত্ম্য।                                            শিব

১৪ স্কন্দ      কার্তিক ও শিবের মাহাত্ম্য।                                  শিব

১৫ বামন প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু 

১৬ বরাহ প্রধানতঃ বিষ্ণুর মাহাত্ম্য।                                  বিষ্ণু 

১৭ বায়ু      প্রধানতঃ শিব মাহাত্ম্য ।                                       শিব

১৮ বিষ্ণু      প্রধানতঃ বিষ্ণু মাহাত্ম্য।                                       বিষ্ণু

             

উপরের সারণি থেকে বহুল প্রচলিত অষ্টাদশ মহাপুরাণগুলির বিষয়ভিত্তিক বিচার করলে, দেখা যায়, আঠারোটির মধ্যে বিষ্ণু-মহিমা বিবৃত মহাপুরাণের সংখ্যা নটি এবং শিব-মহিমার পাঁচটি। তাছাড়া একটি করে মহাপুরাণ ব্রহ্মা এবং অগ্নির। বাকি দুটি বিষ্ণু, শিব ও অন্যান্য নানান ঘটনা নিয়ে রচিত। অতএব মোট মহাপুরাণের শতকরা ৫০ ভাগ ভগবান বিষ্ণুর ভাগে, শতকরা ২৭.৭৮ ভাগ ভগবান শিবের ভাগে। ভগবান ব্রহ্মার ভাগে মাত্র শতকরা ৫.৫৫ ভাগ। এর থেকেই বোঝা যায়, ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত বিদগ্ধ পণ্ডিতরা ভাগবত ধর্মের প্রচারে কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন। আর উল্টোদিকে ভগবান ব্রহ্মার ভক্ত ভাগ্য খুবই সঙ্গীন।

ভারতবর্ষের মন্দিরের হিসাব থেকেও এই চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ভগবান বিষ্ণু ও মহাদেবের বিখ্যাত মন্দিরগুলি ছেড়ে দিলেও, প্রতিটি হিন্দুপাড়ায় ছোট-ছোট মন্দির আছে অজস্র, সেক্ষেত্রে ব্রহ্মার মন্দিরের সংখ্যা গোটা ভারতবর্ষে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর সরোবরের তীরে; রাজস্থানের বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)। 


চলবে...

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৬

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৫ 


১৬ 

নির্দিষ্ট দিনে মা রওনা হয়ে যাওয়ার পরেই, বাড়িটা বড়ো শূণ্য মনে হল সুনেত্রর। প্রতিটা ঘরের প্রত্যেকটি কোনায় কোনায় সে অনুভব করল মায়ের হাতের স্পর্শ – মায়ের মমতা। কথায় বলে, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ বোঝে না। আজ যেন খুব স্পষ্টভাবেই সে কথাটির মর্ম উপলব্ধি করল সুনেত্র। তার মনে যে এখন শূণ্যতার বোধ তাই নয়, বারবারই তার মনে হল, দাদার কাছে মায়ের এই যাওয়াটা সুখকর হবে না। বরং এই স্মৃতি বড়ো বেদনাদায়ক হয়েই থাকবে মায়ের বাকি জীবনের অবশিষ্ট বছরগুলিতে।

মায়েরা তাঁদের সকল সন্তানের প্রতি কখনোই পক্ষপাতহীনা হয়ে উঠতে পারেন না। প্রথম সন্তান যে কোন নারীর জীবনে এনে দেয় জীবনের পূর্ণতা। প্রথম মাতৃত্বের পরম অনুভূতি। পরবর্তী সন্তান না আসা পর্যন্ত, প্রথম সন্তানই হয় মাতৃহৃদয়ের একচ্ছত্র অধিরাজ। মায়ের সবটুকু মাতৃত্ব – আদর, প্রশ্রয়, মমতা– প্রথম সন্তানই এককভাবে আদায় করে নেয়। পরবর্তী সন্তান এলে, প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অনেকটাই খণ্ডিত হয়ে যায় ঠিকই – কিন্তু সেই খণ্ডিত মমতার পুরোটাই বদলে যায় প্রথম সন্তানের প্রতি মায়ের নির্ভরতায় ও আশা-ভরসায়।

মায়ের মনের এই পরিবর্তনটুকু, বড়ো হতে হতে প্রথম সন্তান কিভাবে গ্রহণ করবে, তার ওপরেই নির্ভর করে ভবিষ্যতে দাদা-ভাই, দাদা-বোন, কিংবা দিদি-ভাই এবং দিদি-বোনের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে। ছোটভাই বা বোনকে বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে মা যদি প্রথম সন্তানকে বলেন, “ভাইকে (বা বোনকে) একটু দেখ তো, তোর বাবার চান হয়ে গেল মনে হয়, ভাতটা বেড়ে দিয়ে আসি”। অথবা “ভাইয়ের (বা বোনের) সামনে ওই ঝুমঝুমিটা বাজা তো, বাবু, কিছুতেই খেতে চাইছে না, একটু ভুলে থাকবে”। প্রথম সন্তানদের কেউ কেউ মায়ের দেওয়া এই দায়িত্ব পেয়ে খুশি হয়, ভাবে আমি বড় হয়ে গেছি, মা আমাকে ভরসা করছে। আবার কেউ কেউ মনে করে, মা সারাক্ষণ ভাইকে (বোনকে) নিয়েই ব্যস্ত। ভাইয়ের জন্যে আমি নিজে মায়ের সঙ্গে খেলতে পারছি না, উলটে তার জন্যে আমাকে খিদমদগারি করতে হচ্ছে। প্রথম সন্তানের মনে আসতে থাকে প্রবল ঈর্ষা বোধ।

প্রথম সন্তান আরও বড়ো হওয়ার পর, তার হাতে টাকা আর ছোট্ট ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে মা বলতেই পারেন, “যা তো বাবা, সাধনের দোকান থেকে এই জিনিষগুলো চট করে নিয়ে আয় তো”। সে ছেলে উত্তর দিতে পারে,

“আমি এখন ঘুড়ি ওড়াচ্ছি, ভাইকে (বোনের একটা বয়স পর্যন্ত দাদারা তাকে একটু প্রিভিলেজ দিতে তেমন কার্পণ্য নাও করতে পারে) পাঠাও না”।

“ধুর, ও পারে নাকি তাই? ছেলেমানুষ – টাকার হিসেব বুঝবে? ছোট পেয়ে সাধন ওকে কী দিতে কী দিয়ে দেবে...”।

“তবে? সে এখন ছোট নাকি, মা তার ওপর সব কিছুতেই ভরসা করছেন”, এই চিন্তায় কিছু দাদা আত্মশ্লাঘা অনুভব করবে, আর ছোট ভাইকে করবে করুণা, ভাববে “ভাইটা চিরকাল বাচ্চাই রয়ে গেল”।  আবার কিছু দাদা ভাববে, “ছেলেমানুষ না হাতি, মা ওকেই বেশি ভালোবাসে, কাছে কাছে রাখতে চায় – আর আমাকে খেলতে না দিয়ে, নানান কাজে সারাদিন খাটিয়ে মারে”। অর্থাৎ তার মনে গেঁথে যেতে থাকবে ভাইয়ের প্রতি তীব্র ঈর্ষা।

সুনেত্র বড় হতে হতে তার প্রতি দাদার এই ঈর্ষাটি টের পেয়েছে বারবার। তার কথায়-বার্তায়, আচরণে। একটা ঘটনার কথা মনে পড়লে,  দাদার প্রতি সুনেত্রর মনটা আজও বড্ডো সংকীর্ণ হয়ে ওঠে।

সুনেত্র তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে, ইলেভেনে বা টুয়েলভে। কলকাতা বইমেলা তখন বসত পার্কস্ট্রিটের মোড়ের কাছে ময়দানে। সে আর তার খুব প্রিয় বন্ধু ও ক্লাসমেট অনিমেষ ঠিক করল, সামনের শনিবার স্কুলে হাফ ছুটির পর একসঙ্গে বইমেলায় যাবে। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে অনিমেষ প্রস্তাব দিয়েছিল, সেদিন তুই আমাকে একটা বই উপহার দিবি, আমিও তোকে একটা বই দেব। প্রস্তাবটি শুনেই অনিমেষ প্রমাদ গুনল, সে জানত মায়ের কাছে সংসার চালানোর টাকা ছাড়া উদ্বৃত্ত তেমন কিছুই থাকে না। কারণ সেই সময় বাবা কলকাতা ছেড়ে দিনাজপুরে ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছিলেন, এবং সেখান থেকে খুব অনিয়মিতভাবে মানি অর্ডার আসত। তবে তার ভরসা ছিল, স্কুল থেকে নগদ পাওয়া, তার মাধ্যমিকের সরকারি স্কলারশিপের বাৎসরিক টাকাটা মায়ের কাছে অনেকটাই জমা আছে। মাকে বললে, তার থেকে কুড়িটা টাকা কি আর দেবেন না?

সুনেত্র জানত, মায়ের অনেকদিনের সাধ ছিল টুকটুকে লাল, চওড়া পাড়ওয়ালা, সাদা আর মুগা সুতোয় বোনা বেশ ভালো একখানি শাড়ি নেওয়ার। সরকারি স্কলারশিপের ওই টাকাটা হাতে আসার একদিন পরেই মাকে সঙ্গে নিয়ে বিখ্যাত এক শাড়ির দোকান থেকে কিনে দিয়েছিল মায়ের পছন্দের শাড়িটা। সেসময় টাঙ্গাইল বা ধনেখালি তাঁতের শাড়ি পাওয়া যেত ৫০/৬০ টাকায়, মায়ের এই শাড়িটার কত দাম ছিল – এখন আর মনে নেই - সাড়ে তিন/ চারশ হবে বড়ো জোর। শাড়িটা কিনে খুব খুশি হয়েছিলেন মা, কয়েকদিন পরেই মা ওই শাড়িটা পরে সেজমাসিমার বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে গর্ব করে বলেছিলেন, শাড়িটা সুনু আমায় কিনে দিয়েছে – ওর স্কলারশিপের টাকায়। মায়ের এই গর্ব করাটা দাদার যে সহ্য হয়নি মোটেই, সেটা ওই বইমেলায় যাওয়ার দিন সকালে টের পাওয়া গেল।

বইমেলা যাওয়ার দিন সকালে, স্কুলে বেরোনোর আগে মাকে টাকার কথা বলতে, মা বললেন, “দেখছিস তো সংসারের এই হাল। তোর বাবার পাঠানো টাকা কবে আসে, ঠিক নেই। এসময় ওরকম শখ-আহ্লাদ না করলেই নয়?”

সুনু মায়ের কাছে খুব স্বাভাবিক বায়নার স্বরেই বলেছিল, “তোমার ওখান থেকে কুড়িটা টাকা দাও না, মা”।

পাশে দাদা বসেছিল, বলল, “তোমার ওখান থেকে মানে? তোর ওই স্কলারশিপের টাকা থেকে? ওই টাকা কটা মায়ের হাতে ফেলে দিয়েছিস বলে, তোকে যখন খুশি টাকা ওড়াতে দিতে হবে? তুমিও পারো বটে মা, ওর কথায় নেচে তুমি শাড়ি কিনতে চলে গেলে? আমি কি স্কলারশিপ পাইনি, তোমার হাতে তুলে দিইনি? আমি কি তোমাকে কখনো এমন কথা বলার সাহস পেয়েছি? ওই শাড়িটা দিয়ে মনে হচ্ছে ও তোমাকে উদ্ধার করে দিয়েছে?” দাদার কন্ঠস্বর ধীরে ধীরে চড়তে লাগল, ঠিক যাত্রার রাবণ বা হিরণ্যকশিপুর মতোই। “ওই টাকা আর ওই শাড়ি তুমি ছুঁড়ে ফেলে দাও মা। ওই শাড়ি পরেও তোমার কাজ নেই...আর কাজ নেই ওর ওই টাকাতেও”।

সুনু খুব আশ্চর্য হয়েছিল, মা কী করে তাকে ভুল বুঝলেন? মা সঙ্গে সঙ্গেই স্টিলের আলমারি খুলে শাড়িটা আর  টাকার খামটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন মেঝেয়। খামের মুখটা মেঝেয় পড়ে খুলে গিয়েছিল, বেরিয়ে পড়েছিল গোটা কয়েক পাঁচ-দশ টাকার নোট। সুনেত্র সেই খাম থেকে কুড়িটা টাকা নিয়ে, খামের মুখ বন্ধ করে টেবিলে তুলে রাখল, আর পাটভাঙা শাড়িটা মেঝে থেকে সযত্নে তুলে রাখল মায়ের বিছানায়। তারপর একবার মায়ের মুখের দিকে আরেকবার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল – পায়ে জুতো পরে আর কাঁধে বইখাতার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে, “আসছি, মা”, বলে।

সদর দরজা পেরোতে পেরোতে সে শুনতে পেল, “দেখলে, দেখলে মা, কী রকম আস্পর্ধা হয়েছে? টাকার গরম হয়েছে? এত কাণ্ডের পরেও ও তোমার সামনে দিয়েই টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেল?”

 

চারটে ক্লাস হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেল, ছুটির পর অনিমেষের সঙ্গে বাসে উঠল সুনেত্র। যাওয়ার পথে অনিমেষ কথা বলছিল অনর্গল। বইমেলা নিয়ে। নানান সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে। রিসেন্টলি কোন কোন বই ওকে মুগ্ধ করেছে। সুনেত্র এমনিতেই কথা কম বলে, সেদিন যেন তাকে বোবায় পেয়েছিল। অনিমেষের সঙ্গে কোন মতে সায় দিয়ে কথাবার্তা চালাচ্ছিল, আর তার বারবার মনে পড়ছিল মায়ের আজকের মুখটা। সেজমাসীমার বাড়ি গিয়ে লালপেড়ে মুগা-শাড়ি পরা মায়ের – মা দুর্গার মতোই - গর্বিতা মুখটাও। সে কি সত্যিই মাকে অপমান করল?

বাস থেকে নেমে মেলাগামী জনস্রোতে মিশে অনিমেষের সঙ্গে মেলার গেটের দিকে যেতে যেতে সুনেত্রর নিশ্চিত মনে হল, না সে কোন অন্যায় করেনি। তার নাটুকে দাদাটি তার মনের মধ্যে জমিয়ে রাখা ঈর্ষার বিষটা মায়ের মনে নাটকীয়ভাবে ঢেলে দিতে পেরেছে। সুনেত্র নিশ্চিত, মায়ের মনের এই আকস্মিক অভিঘাত অচিরেই দূর হবে এবং মা চিনতে ভুল করবেন না, তাঁর গর্ভজাত দুই সন্তানের মনোভাব।

না, মা ভুল করেননি। সন্ধের মুখে সুনেত্র বাড়ি ফিরল। সন্ধে দেওয়ার জন্যে মা প্রস্তুত হচ্ছিলেন। দরজা খুলে দিয়ে প্রসন্ন মুখেই বললেন, “আয়, মেলা ঘোরা হল?”। কিন্তু তাঁর মুখটা, চোখের কোলদুটো একটু যেন ফোলা-ফোলা। এতক্ষণ সুনেত্রর মনের মধ্যে কোন অভিমান ছিল না, ছিল দাদার প্রতি তীব্র বিরক্তি। কিন্তু এখন মায়ের ওই কথায় তার মনে এল অভিমানের জোয়ার। মাথা নীচু করে জুতো খুলতে লাগল দীর্ঘসময় নিয়ে। তারপর পিঠের ব্যাগ নামাল পড়ার টেবিলের ওপর। তারপর ব্যাগ থেকে অনিমেষের দেওয়া বইটা বের করে রাখল সামনে। শীর্ষেন্দুর আশ্চর্য ভ্রমণ, মূল্য ছটাকা (প্রথম সংস্করণ- ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)।

সন্ধে দেওয়া সারা হলে, মা কাছে এলেন সুনেত্রর, মাথায় হাত রেখে বললেন, “কিরে, মায়ের ওপর অভিমান করেছিস?”

উদ্গত কান্নার আবেগ সামলাতে সামলাতে সুনেত্র বলেছিল, “অনিমেষ পরশুদিন বলেছিল, আজকে বইমেলা গিয়ে দুজনে দুজনকে, প্রিয় সাহিত্যিকের লেখা একটা বই উপহার দেব। এই দেখ, অনিমেষ আমাকে আজ এই বইটা উপহার দিল। আমি ওকে দিয়েছি শীর্ষেন্দুর ঘুণপোকা, দাম সাতটাকা। আমি যদি ওকে বইটা না দিতে পারতাম, যদি বলতাম, আমার পয়সা নেই রে - খুব ভালো দেখাত, মা? আমার তো লাগত না, ও মনে মনে ভাবত – সুনেত্রদের দেখে তো বোঝা যায় না, ওরা এতটা গরিব। ভাবত, আসলে আমার মনটাই ছোট – বন্ধুকে একটা বই কিনে দিতে হবে বলে, সুনেত্র গরিবি কান্না কাঁদছে...”। সুনেত্র পকেট থেকে ন’টা টাকা বের করে মায়ের হাতে দিয়ে বলল, “বইয়ের দাম সাত, যাতায়াতের বাসভাড়া, আর মেলাতে চা-সিঙাড়া খেয়েছিলাম, সব মিলিয়ে এগারোটাকা খরচ হয়েছে, মা”।

সুনেত্রর মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়ে মা কেঁদে ফেললেন, সুনেত্রও। সুনেত্রর মাথার ওপর গাল চেপে, মা বললেন, “সুমুটা ভয়ানক হিংসুটে – আজ আরও একবার তার প্রমাণ পেলাম। তুই বেরিয়ে যাওয়ার সময়, আমার দিকে যে তাকিয়েছিলি, তখনই আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম, সুনু...। তুই তো কিছু নিয়ে বায়না করিস না কোনদিন...।  যত ভেবেছি, ততই কেঁদেছি সারাদিন। তুই কাঁদিস না, অভিমান করে থাকিস না...”।

“জামা-কাপড়ের ছাঁট, জুতোর ডিজাইন, চুলের ফ্যাশান নিয়ে বাবাকে কতবার কত চেঁচামেচি করেছে, অপমান করেছে দাদা, সে তুমি জানো না মা? সে এখন আমার আস্পর্ধা দেখছে? আমি কোনদিন কোন বিষয়ে একদিনও তোমাকে বা বাবাকে কিছু বলেছি মা? আমি বুঝি বাবা কত কষ্ট করছেন আমাদের জন্যে...আজ তুমি আমার দেওয়া শাড়িটা, দাদার কথায় – মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলে দিলে, মা?”

“ও শাড়ি আমার বুকেই আছে, রাখব সারা জীবন। আর কাঁদিস না, সুনু, বলছি তো ভুল হয়েছে... এবার কিন্তু আমার হাতে মার খাবি...জামাকাপড় ছেড়ে মুখ-হাত ধুয়ে আয়, তোর জন্যে পরোটা আর হালুয়া বানিয়েছি – এখনও গরম আছে...”।

“হালুয়া?” চোখ-টোখ মুছে সুনেত্র হেসে ফেলল। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, “আমাকে দেওয়ার সময় বইতে আজকের তারিখটা লিখে সই করে দিয়েছে অনিমেষ – ১০ই মার্চ ১৯৭৯। এই বইটাও আমার কাছে সারাজীবন থাকবে, থাকবে এই দিনের সব স্মৃতিও...সেটা তুমি আমার মন থেকে কিছুতেই মুছতে পারবে না, মা”।

মুখ হাত ধুয়ে, ঘরে পড়ার পাজামা পরে, টেবিলে বসে, সুনেত্র বলল, “খিদে পেয়েছে মা, খাবার কই?” বলতে না বলতেই মা কাঁসার রেকাবিতে পরোটা আর বাটিতে করে হালুয়া এনে দিলেন। ভাজা পরোটার রঙে আর ঘিয়ের গন্ধমাখা হালুয়ার গন্ধে সুনেত্রর খিদেটা চনমনে হয়ে উঠল আরও। পরোটার টুকরো ছিঁড়ে তার মধ্যে একটু হালুয়া তুলে, মুখে তোলার সময়েই সে থমকে গেল, বলল, “মা, দুপুরে তুমি ভাত খেয়েছ?”

“বোঝো, খাবো না কেন? খেয়েছি...তুই শুরু কর আরও আনছি...”।

সুনেত্র রেকাবিতে পরোটার টুকরোটা নামিয়ে রেখে, দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের মেঝেয় রাখা ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা তুলে দেখল, তরকারির বাটিগুলোর ঢাকনা তুলেও দেখল। দুপুরে মা কিছুই খাননি। সারা দুপুর কেঁদেছেন, খাবেন কখন?

“ও আবার কি, সুনু? বলা নেই কওয়া নেই ভাতের সকড়ি ঘাঁটতে এলি...?”

সুনেত্র মায়ের হাত ধরে মাকে টেনে আনল টেবিলের সামনে। রেকাবি থেকে পরোটার টুকরো তুলে মায়ের মুখের কাছে তুলে বলল, “তুমি না খেলে, আমি খাবো না, মা”।

“আমার আছে, আমি খাবো, খিদে পেয়েছে বলছিলি, তুই খা না”।

“তোমার বড়ো ছেলের মতো আমি চিৎকার করতে পারি না। কিন্তু আমার জিদ কেমন সে তুমি আমার থেকেও ভালো জানো, মা”। মায়ের চোখে চোখ রেখে, খুব গম্ভীর গলায় বলেছিল সুনেত্র। “বড়ো করে হাঁ করো দেখি”।

“আমি কি রাক্ষুসী নাকি, বড়ো করে হাঁ করব?” হাসি হাসি মুখে, হাঁ করেছিলেন মা। সুনেত্র খাইয়ে দিয়েছিল মাকে। তারপর বলেছিল, “এখানে বসো, একগ্রাস নয় – আমার সঙ্গে তোমাকেও খেতে হবে...”।

“কী যে জেদ করিস না...গা জ্বালা করে...” মা বললেন, কিন্তু বাধ্য মেয়ের মতো বসেও পড়লেন সামনের চেয়ারে। দুজনে মিলেই খাওয়া শুরু করলেন। খেতে খেতে মায়ের মনে হল, একই গর্ভে জাত তাঁর দুই সন্তানের আচরণে এত পার্থক্য হয় কী করে? আজ সুনু বেরিয়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক পরে, সুমু চান করে বেরিয়েই মাকে ধমকে বলেছিল, “ভাত দাও মা, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে...ছোট ছেলের জন্যে কান্নাটা পরে কেঁদো, সারা দুপুর পড়ে আছে...”। মায়ের দু চোখ জলে ভরে উঠেছিল আবার, কী করে তিনি সুমুর কথায়, এত বড়ো আঘাতটা দিতে পারলেন, সুনুকে?

“আবার কাঁদছো কেন, মা? ঈর্ষা ব্যাপারটাতে কোন যুক্তি থাকে না। দাদার থেকে সব ব্যাপারেই আমি যে নীরেস, সবাই জানে...লেখাপড়ায়, বুদ্ধি-শুদ্ধিতে, কথাবার্তায়... তবুও...। কেঁদো না, মা। খাও। বলছিলে আরও পরোটা আছে, নিয়ে এস না, মা”।    

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/২ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - তৃতীয় পর্ব

 সৃজনেচ্ছায় শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণুস্তব

শ্রীব্রহ্মা স্তব করতে করতে বললেন, “হে ভগবান, দীর্ঘ উপাসনার পর আপনার দর্শন পেয়ে আমি ধন্য হলাম। হে প্রভু, আপনি ছাড়া এই জগতে কোন বস্তুর অস্তিত্বই নেই। জীবের ধারণায় এই জগতের যা কিছু আছে বলে মনে হয়, সে সবই ভ্রম; আসলে আপনিই আপনার মায়ার প্রভাবে সর্বরূপে প্রকাশ হয়েছেন। আপনি আমার মতো ভক্তজনের প্রতি করুণা করে প্রথম যে রূপে প্রকাশিত হলেন, সেই রূপই শুদ্ধসত্ত্বময় অনন্ত অবতারের বীজস্বরূপ। এই রূপের নাভিকমলভবন থেকেই আমার আবির্ভাব হয়েছে। আপনার এই মূর্তিই আপনার উপাস্য সকল মূর্তির মধ্যে মুখ্য। আপনার এই রূপ থেকেই বিশ্বের সৃষ্টি হয়ে থাকে, সুতরাং আপনার এই রূপ সমগ্র জগতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সমস্ত ভূত ও ইন্দ্রিয়সমূহের কারণস্বরূপ। অতএব আমি আপনার এই মূর্তির আশ্রয় নিলাম।

হে ভগবান, আপনার এই রূপ সচ্চিদানন্দস্বরূপ। আপনাকে আমি বারবার প্রণাম করি। যারা আপনার এই রূপের অসম্মান করে, তারা ঈশ্বরহীন নাস্তিক, তারা কুতর্কে সময় নষ্ট করে এবং পরিণতিতে নরকে যায়। বেদরূপ বাতাস আপনার চরণকমলের গন্ধ বহন করে থাকে, যে ভক্ত বেদ শোনার সময় তার কানে এই গন্ধ অনুভব করতে পারে সেই ধন্য; সেই ভক্তরাই পরাভক্তিতে আপনার শ্রীচরণে আশ্রয় পায়। হে প্রভু, আপনি আপনার এই ভক্তদের অন্তরে সর্বদা বিরাজ করতে থাকুন। জীব যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার চরণে আশ্রয় না নেয়, তার মন ধন, জন ও মৃত্যুর ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে। সাধারণ জীবের কথা তো বলাই বাহুল্য, আপনার প্রতি ভক্তিহীন হলে, জ্ঞানী ঋষিরাও সংসারের  সকল কষ্ট ভোগ করে থাকে।

হে ভগবান, জীব যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও সেবা দিয়েই আপনার প্রীতিলাভের চেষ্টা করবে, কারণ আপনার প্রীতিলাভই জীবের সবচেয়ে কাম্য ফল। আপনি পরমেশ্বর, যে মায়ায় এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় ঘটে চলেছে, সে সবই আপনার লীলা। আমি আপনাকেই প্রণাম করি। হে প্রভু, আপনিই কালস্বরূপ, আপনাকে প্রণাম করি। অন্যের কথা আর কি বলব, আমি নিজে সত্যলোকে বাস করেও কালকে ভয় পাই আর সেই ভয় থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়, আপনার প্রীতি লাভের জন্যে বহু তপস্যা ও যজ্ঞের অনুষ্ঠান করি

হে পুরুষোত্তম, আপনাকে প্রণাম করি। অজ্ঞান, দেহাত্মজ্ঞান, বিষয়াসক্তি, দ্বেষ ও মৃত্যুভয় এই পাঁচটি অবিদ্যার বৃত্তি। এই বৃত্তিই জীবকে মোহে আচ্ছন্ন করে রাখে। আপনি নিজে এই পাঁচটি বৃত্তি থেকেই মুক্তকিন্তু পূর্বকল্পের সমস্ত জীবের বিশ্রামের জন্যে, এই ভীষণ তরঙ্গসংকুল কারণ সমুদ্রে নাগশয্যায় আপনি যোগনিদ্রায় শুয়ে ছিলেন, আপনার অন্তরে লীন হয়েছিল সমস্ত জগতের লোক পরম্পরা। এখন তিন লোকের আরও একবার সৃষ্টির জন্যেই আমি আপনার নাভিকমল থেকে আবির্ভূত হয়েছিআপনি যে জ্ঞান ও ঐশ্বর্য দিয়ে জগতের সুখ বিধান করছেন, আমার প্রজ্ঞাকেও তার সঙ্গে যুক্ত করুন। আগের অন্যান্য কল্পের মতোই আমার মধ্যে সৃষ্টির শক্তি সঞ্চার করুন”

ব্রহ্মার এই অনুরোধ শুনে, শ্রী নারায়ণ বললেন, “হে বেদগর্ভ ব্রহ্মা, সৃষ্টির জন্যে উদ্যোগী হও। তুমি আমার কাছে এখন যা প্রার্থনা করেছ, তা আমি আগে থেকেই সম্পূর্ণ করে রেখেছি। তুমি আবার আমার বিষয়ে তপস্যা ও উপাসনা করো। এই তপস্যায় তুমি নিজের অন্তরেই সমস্ত লোক খুব স্পষ্ট দেখতে পাবে। তোমার ভক্তিযুক্ত হৃদয়ের মধ্যেই তুমি দেখতে পাবে তোমার অন্তরে এবং এই নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আমিই ব্যাপ্ত আছি। আর সমস্ত জগত ও সমস্ত জীবও আমার মধ্যেই অবস্থান করে থাকেহে ব্রহ্মা, তোমার প্রতি আমার অশেষ করুণা, এই করুণা প্রভাবে প্রজা সৃষ্টির সময় তোমার মন কোন সময়েই অবসন্ন হবে না। তুমিই জগতের আদ্য ঋষি। রজোগুণের প্রভাবে তুমি প্রজাসৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকলেও, তোমার মন সর্বদা আমাতেই নিযুক্ত থাকবে, অতএব রজোগুণে তোমার মন বিক্ষিপ্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। তুমি আজ যে আমাকে ভূত, ইন্দ্রিয় ও সত্ত্ব ইত্যাদি তিনগুণ রহিত এবং অহংকার শূণ্য বললে, তুমি সত্যিই আমার স্বরূপ বুঝতে পেরেছ। আমার প্রতি তোমার এই উপলব্ধি, দেহী জীবের পক্ষে অত্যন্ত দুর্বোধ্য।

যখন তুমি পদ্মের অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পদ্মনালের মধ্যে ব্যর্থ অনুসন্ধান করে নিরস্ত হলে, সেই সময়েই আমি তোমার অন্তরে আমার স্বরূপ তোমাকে দেখালাম। হে পদ্মাসন ব্রহ্মা, একমাত্র আমার চিন্তাই অভ্যুদয়, সকল মঙ্গলের একমাত্র উপায়। আমি লোক সৃষ্টির জন্যে আমার যে রূপ তোমার কাছে আজ প্রকাশ করলাম, সে রূপ রজোগুণের মায়া। কিন্তু আমি যে আসলে নির্গুণ এবং ত্রিগুণের অতীত, তোমার সেই উপলব্ধিতে আমি খুশি হয়েছি, তোমার মঙ্গল হোক। যে ব্যক্তি আমার স্তুতি করে, নিত্য আমার ভজনা করে, আমি তার উপর প্রীত হয়ে থাকি। জ্ঞানীরা বলেন, সমস্ত সৎকর্ম সাধন করলে যে ফল লাভ হয়, তার মধ্যে আমার প্রীতি লাভই সর্বশ্রেষ্ঠ ফল। আমার প্রীতিলাভ ছাড়া সমস্ত ফলই ব্যর্থ হয়ে যায়।

হে ব্রহ্মা, সমস্ত জীবের আমিই আত্মা। অতএব আমি সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ এবং জীবের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। জীবের কাছে দেহ, আত্মার জন্যেই প্রিয় হয়ে থাকে  অতএব, আমার প্রতি অনুরক্ত হওয়া প্রত্যেকটি জীবের পক্ষেই মঙ্গলকর। আমার থেকেই তুমি সৃষ্টি হয়েছ, তুমি সর্ববেদময়, তুমি অসীম ক্রিয়াশক্তি ও জ্ঞানশক্তির আধার। আর কোন উপদেশ বা নির্দেশের তোমার কোন প্রয়োজন হবে না। তুমি স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষ থেকে এই ত্রিলোক এবং আমার মধ্যে যে সকল জীব লীন হয়ে আছে, তাদের সকলকে আগেকার কল্পের মতোই আবার জীবন দান করো। এই আমার ইচ্ছা”

[ভাগবত পুরাণের বিশ্বসৃষ্টি তত্ত্বে ব্রহ্মা হলেন বিষ্ণুর অধীনস্থ সৃজন কর্তা, কিন্তু এখানে শিবঠাকুরের কোন ভূমিকাই নেই। কারণ এটি শ্রীবিষ্ণুর মহিমা কীর্তনের গ্রন্থ। এর পরেও এই গ্রন্থে আমরা দেখব, স্থানে স্থানে শিবঠাকুরকে বেশ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করা হয়েছে। 

আবার শিবঠাকুরের পুরাণগুলিতে দেখতে পাওয়া যায় উল্টো চিত্র। সেখানে বিশ্বসৃজনের মুখ্য দেবতা শ্রী মহাদেব এবং শ্রীবিষ্ণু ও ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ সৃজনকর্তা। বেশ মজার ব্যাপার না? জনগণের মনে নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠার জন্যে ভক্তরা কত না মজাদার গল্প মাথা খাটিয়ে রচনা করেছিলেন!!]          


ব্রহ্মার বিশ্ব সৃজন  

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ভগবান শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মার কাছে সৃজনের সকল বিষয় প্রকাশ করে অন্তর্হিত হলেন। শ্রীনারায়ণের নির্দেশে, ব্রহ্মা শ্রীবিষ্ণুতেই চিন্তা নিযুক্ত হয়ে আবার শত বছরের তপস্যায় ডুবে গেলেন। সুদীর্ঘ তপস্যার পর তিনি চোখ মেলে দেখলেন তিনি যে পদ্মের উপর বসে রয়েছেন তার চারপাশের জল বাতাসের স্পর্শে তরঙ্গ সংকুল। তিনি চিন্তা করলেন, আগেকার কল্পের মতোই আমি তিন লোক সৃষ্টি করবো। তিনি বেড়ে ওঠা জলকে শোষণ করে নিলেন, বাতাসকে সংযত করলেন। জল শুধুমাত্র সমুদ্রের মধ্যেই সীমিত হয়ে রইল, প্রকাশ পেল স্থলভাগ। তারপর তিনি দেখলেন, যে পদ্মে তিনি বসে রয়েছেন, সেই পদ্ম বিপুল আকার নিয়ে আকাশময় ব্যাপ্ত রয়েছে। ব্রহ্মা সেই পদ্মকোষে প্রবেশ করে চিন্তা করলেন, এই পদ্মকোষকেই আমি তিন লোকে বিভক্ত করে নেব। সেই পদ্মকোষের আকার এতই বিপুল যে, সেই পদ্মকোষ থেকে চোদ্দ ভুবন, সূর্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্র সকলই সৃষ্টি করা সম্ভব। এই ত্রিলোক জীবের কর্ম ও ফল ভোগের স্থান, প্রতি কল্পে এই তিন লোক ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রতি কল্পের শুরুতে এই তিন লোকের সৃষ্টি হয়, আবার কল্পান্তে এই তিন লোকের বিনাশ ঘটে। কিন্তু মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য নামে আরও চারটি লোকে বাস করেন নিষ্কাম কর্মের ফলভাগী ব্যক্তিরা। এই চার লোকের বিনাশ হয় না, এই লোকবাসীরা কল্পান্তে মুক্তি লাভ করেন।

 ভিন্ন ভিন্ন কালে ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টি ঘটে থাকে। এই সৃষ্টির পিছনে কালের অসীম প্রভাবঈশ্বর স্বয়ং সৃষ্টির কর্তা হলেও, এই কালকে অবলম্বন করেই তিনি বিশ্বরূপে সৃষ্টি করে থাকেন। এই কালের কোন মূর্তি নেই, শুরু নেই, শেষ নেই। এই বিশ্বের প্রবাহ কালেরই কার্য্য, এই কাল আগে যেমন ছিল ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে।

এই বিশ্বের সৃষ্টি নয় প্রকার। এই নয় রকম সৃষ্টি ছাড়াও আরেক রকম সৃষ্টি আছে, তাকে দশম সৃষ্টি বলে। এই দশম সৃষ্টিও প্রাকৃত ও বৈকৃতভাবে দু রকমের হয়। আবার প্রলয় তিন ধরনের হয়। কালের নিয়মে যে প্রলয় ঘটে থাকে, তাকে নিত্য প্রলয় বলে। বিষয়ের জন্য যে প্রলয় ঘটে তাকে বলে নৈমিত্তিক প্রলয়। আর সত্ত্ব, রজঃ ও তম তিনগুণ যখন নিজেদের কার্যকে গ্রাস করে, সেই প্রলয়কে বলে প্রাকৃতিক।

তিনগুণের অতীত শ্রীভগবান, প্রথম যখন তিনগুণের সংশ্লেষ করেন, তাকেই আদ্য সৃষ্টি বলে। দ্রব্য, জ্ঞান ও ক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে দ্বিতীয় সৃষ্টিতে, এই সৃষ্টির সঙ্গেই অহংকারতত্ত্বের শুরু। তৃতীয়ে সূক্ষ্মভূতের সৃষ্টি হয়, এই সূক্ষ্মভূত থেকেই মহাভূতের উৎপত্তি ঘটে থাকে। চতুর্থে সৃষ্টি হয় জ্ঞান ও কর্মের ইন্দ্রিয়সমূহ। পঞ্চম সৃষ্টিতে সাত্ত্বিক অহংকার থেকে ইন্দ্রিয়ের সঞ্চালক মনের আবির্ভাব হয়। ঈশ্বরের মায়ায় জীবের মনে মোহ ও বিক্ষেপ সৃষ্টি করে যে অবিদ্যা, এই অবিদ্যাই ষষ্ঠ সৃষ্টি। এই ছয়টি সৃষ্টিকে বলে প্রাকৃত সৃষ্টি।

বৈকৃত সৃষ্টির মধ্যে ছয় প্রকার স্থাবর সৃষ্টি হয়, এই সৃষ্টিই সপ্তম। ছটি স্থাবরের বর্ণনা এই রকম – যাদের ফুল হয় না কিন্তু ফল হয়, তাদের বলে বনষ্পতি। যাদের ফল পরিণত হবার পর বিনাশ হয়, তাদের নাম ওষধি। যাদের সার শুধুমাত্র ত্বকে তাদের বলে বেণু। যারা অন্য বৃক্ষতে আশ্রয় নেয়, তারা লতা। যারা অন্য বৃক্ষে আরোহণ করে না, তারা বীরুধ। যাদের ফুল থেকে ফলের সৃষ্টি হয় তারা দ্রুম। এ ছয়টি স্থাবরের আহার সঞ্চার হয় উপরিভাগে। এদের চৈতন্য অব্যক্ত থাকে, এরা বাইরে নয়, অন্তরে স্পর্শ অনুভব করতে পারে।

 অষ্টম সৃষ্টি হল তির্য্যক জাতি। এই জাতীয় প্রাণীগণের ভবিষ্যৎ জ্ঞান থাকে না। এদের বর্তমান ব্যস্ততা শুধু আহার সংগ্রহে এবং আহারের সন্ধানে ঘ্রাণশক্তির উপরই সর্বদা নির্ভর করে। এই প্রাণীদের আঠাশটি প্রকার আছে। দুই ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী, যেমন গরু, ছাগল, মোষ, হরিণ, শুয়োর, গবয়, রুরু, মেষ, উট ইত্যাদি। এক ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী, যেমন ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, নীলগাই, চমরী, হরিণ ইত্যাদিপঞ্চনখ প্রাণী, যেমন কুকুর, শৃগাল, নেকড়ে, বাঘ, বিড়াল, খরগোশ, (শল্লক) ভালুক , সিংহ, বাঁদর, হাতি, কচ্ছপ, গোধা। যে প্রাণিরা স্থলে বাস করে না, জলে বাস করে, যেমন মকর, মৎস্য ইত্যাদি। যারা আকাশে উড়তে পারে, যেমন শকুন, বক, চিল, ভাস, ময়ূর, হাঁস, সারস, কাক, পেঁচা ইত্যাদি।

নবম সৃষ্টি হল মানুষ। মানুষের নীচের দিকে আহার সঞ্চার হয় তাই মানুষকে অর্বাকস্রোতা বলে। মানুষের রজঃগুণ প্রধান, এরা দুঃখকে সুখ বলে মনে করে।

দশম সৃষ্টির দুই ভাগ, প্রাকৃত ও বৈকৃত। প্রাকৃত সৃষ্টি দেবতারা, যাঁরা দেবতত্ত্বসমূহের অধিষ্ঠাত্রী। আর যে দেবতারা, এঁদের চেয়ে কম, তাদের বৈকৃত সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ প্রাকৃত ও বৈকৃত উভয় প্রকারের মধ্যেই রয়েছেন, যেমন সনককুমারগণ। এঁদের মধ্যে দেব ও মানুষের উভয় ধর্মই বর্তমানবৈকৃত দেবসৃষ্টিও আট প্রকারের। তার মধ্যে বিবুধ, পিতৃ ও অসুর এই তিন প্রকার। গন্ধর্ব ও অপ্সরা অন্য এক প্রকার। আর তিন প্রকারের মধ্যে, যক্ষ, রক্ষঃ; সিদ্ধ, চারণ, বিদ্যাধর ও ভূত, প্রেত, পিশাচ। কিন্নর ও কিম্পুরুষ হল আরেক প্রকার।

এই ভাবেই ভগবান শ্রীহরি প্রত্যেক কল্পে রজঃগুণ অবলম্বন করে, নিজেই স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মারূপে নিজের স্বরূপের অনন্ত বিভাগে এই বিশ্বের সৃষ্টি করেন ও সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকেন”

চলবে...

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩১

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩০  


৩৭ 

সুকরা গ্রাম পার হয়ে, আধ-ক্রোশটাক যাওয়ার পর, রাজপথে ওঠার পথটা দেখিয়ে দিয়ে মারুলা চলে গেল দক্ষিণে আস্থানের দিকে। তারপর শুধু ভল্লা আর রামালি। ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় বিছানো বিস্তীর্ণ মাঠ চারদিকে। তার মাঝখান দিয়ে ধুসর অজগরের মতো পথ চলেছে এঁকেবেঁকে। ওদের সামনে – পুবের আকাশে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে। মাথার ওপরে ঘন কালো নির্ভাঁজ টানটান বিছানো চাদরের বুকে অজস্র অভ্রকুচির মতো চিকচিক করছে নক্ষত্রের বুটি – ওটাই আকাশ! রামালি রণপা চড়ে ভল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই হাঁটছিল – আর দু চোখ দিয়ে শুষে নিচ্ছিল আশ্চর্য এক অনুভূতি। ছোটবেলা থেকে নোনাপুর গ্রামের বাইরে সে যায়নি কোনদিন। মায়ের মুখটা তার মনেই পড়ে না বাবার মুখটা মনে পড়ে, কিন্তু ঝাপসা। এবং এতদিন তার জীবনটাও ছিল ঝাপসা। নিত্য অবহেলা, কুকথা আর মমতাহীন সম্পর্কের শিকলে তার মনটা বাঁধা পড়েছিল বড্ডো সংকীর্ণ গণ্ডীতে। আজ এই উন্মুক্ত প্রান্তরের মাঝখানে, উদার আকাশের নীচে – পায়ের তলায় পড়ে থাকা সীমানা ছাড়ানো পথে চলতে চলতে, এই প্রথম তার নিজেকে মুক্ত মনে হল।

শৈশব পার করে তার বালক বয়েসের সমস্ত স্মৃতিই বিভীষিকাময়। বালকের স্বভাবসুলভ চাপল্য, তার কাকির কাছে ছিল গুরুতর অপরাধ। একই ধরণের অপরাধ করে, তার বন্ধু আহোক, বিশুন, বাপালি, হানো, শল্কুরাও   তাদের মায়ের কাছে মার খেয়েছে, মায়ের অভিশাপও কুড়িয়েছে। কিন্তু একটু পরেই সেই মায়েরাই আবার পুত্রদের কোলে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছিয়েছে, আদর করেছে। কিন্তু তার কাকি? তার মারের মধ্যে থাকত মাতৃত্বহীন নিষ্ঠুরতা। “বাপ-মাখেকো ছেলে, তুই মরিস না কেন? মরলে যে আমার হাড় জুড়োয়” কাকির সেই অভিশাপ ছিল অন্তরের কথা। প্রচণ্ড মার খেয়ে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রামালি, কোনদিন দূর থেকে কাকির ডাক শোনেনি “রামালি কোথায় গেলি বাবা, ঘরে আয় খাবার বাড়ছি”…। দিনের পর দিন গড়িয়ে গেছে সকাল থেকে সন্ধ্যায় - কিন্তু না – কখনও কাকির ব্যবহারে অনুতাপের লেশ দেখেনি। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে, কাকা তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলে, কাকির চোখে দেখেছে তীব্র ঘৃণা, দাঁতে দাঁত চেপে বলতে শুনেছে, “মরিসনি এখনও আক্কুটে ছেলে? বাপের পিণ্ডি গিলে আমায় উদ্ধার করো”।

লজ্জায় অপমানে ঘৃণায় কতদিন সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে বনে, যে বনে এখন তার বাস। প্রথম প্রথম ছটফট করত দারুণ ভয়ে আর খিদেয়। ধীরে ধীরে সে ভয় কেটে গেল, সে বড়ো হতে লাগল। চিনে ফেলল বনের পশুপাখি, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ। তারাই যেন তার খেলার সাথী। বিষধর সাপও হয়ে উঠল তার বন্ধু – একটু বদরাগী, এই যা।

আহোক, বিনাই, শল্কু, হানো, মইলির মায়েরা তাকে প্রায়ই ডাকত…রান্নাঘরের কোনায় বসিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পেট ভরে খাওয়াত। বলত, কাকি তাড়িয়ে দিলে চুপিচুপি চলে আসবি, বাবা। আমাদের দুবেলা দুমুঠো জুটলে – তোরও জুটবে। পোড়া কপাল তোর বাবা, নইলে অমন লক্ষ্মী-জনার্দনের মতো মা-বাবা চলে যায়? রামালির চোখে জল চলে আসার উপক্রম হত  - কিন্তু না কোনদিন কাঁদেনি। বরং চোরের মতো রান্নাঘরের কোনায় বসে বসে সে অনুভব করত – মাতৃত্ব কেমন।

বিনাইয়ের মাকে খুব মনে পড়ে রামালির। পথে ঘাটে দেখা হলেই, রামালির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতেন বাড়িতে। রান্নাঘরের কোনে একটা পিঁড়িতে বসিয়ে বলতেন,  কোত্থাও যাবি না। চুপ করে বস - একপা নড়লে মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব। চুপ করে বসে, রামালি দেখত উনুনের গরমে ঘেমে-নেয়ে কী ভাবে বিনাইয়ের মা – ছেলেমেয়ে, স্বামী শ্বশুর, শাশুড়ির জন্যে খাবার বানাতেন। শ্বাশুড়ি ও মেয়েরা পাশে থেকে তাঁকে সাহায্য করত ঠিকই… কিন্তু তাঁর আচরণে সে দেখতে পেত মমতামাখা এক আশ্চর্য কর্তৃত্ব! চিনেছিল ওটাই মাতৃত্ব। মা।

প্রতিবেশী মায়েদের অনুকম্পাতে রামালির বাল্য জীবনটা এভাবেই কোনরকমে উৎরে গেল। কিন্তু সেই উৎরে যাওয়াটা আদৌ নিষ্কণ্টক হয়নি - সেটা কৈশোরে এসে রামালি টের পেয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল হানো আর শল্কু। কিন্তু তারাই একটু বড় হয়ে পাড়ার সকলের সামনে সুযোগ পেলেই তাকে টিটকিরি দিত। বিশেষ করে ডাণ্ডা-গুলি কিংবা চোরচোর অথবা কানামাছি খেলায় রামালির কাছে ওরা হেরে গেলে। বলত, মা-খেগো, আমাদের বাড়িতে গিলে এত বড়ো হলি, হতভাগা অন্নদাস, নির্লজ্জ ভিখিরি...। অন্যান্য সাথীরা বিশেষ করে বিনাইরা, প্রতিবাদ করলে, আরও ক্ষেপে উঠত ওরা – অশ্রাব্য গালিতে ছাড়িয়ে যেত বন্ধুত্বের সকল সীমানা...রামালি কিছু বলেনি কোনদিন। যোগ্য উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তার  ছিল না। কিন্তু তার মনের মধ্যে জমছিল প্রচণ্ড ক্রোধ – কাকি, হানো, শল্কুদের ওপর।

 

রাজপথে উঠে এসে ভল্লা বলল, “কীরে ব্যাটা, এতটা পথ এলি, কোন কথা নেই, কী ভাবছিস?”

রামালি ভল্লার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হাসল, বলল, “না, সেরকম কিছু না। জীবনে কোনদিন এরকম গভীর রাত্রে ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে চলিনি ভল্লাদাদা। বিশেষ করে এই রণপাজোড়া। তোমার থেকে শিখে বনের পথে দু-তিন ক্রোশ হেঁটেছি – কিন্তু এরকম দীর্ঘ পথচলা – যেন শেষ নেই – এ আশ্চর্য অভিজ্ঞতা”।

“ঠিক বলেছিস আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। আমাদের জীবন বন্দী ছিল - আমার যেমন ছোট্টগ্রাম পিপুলতলায়, তোর তেমনি নোনাপুরে। তার বাইরে বেরিয়ে দেখেছি - কী বিশাল এই রাজ্য - কতরকমের প্রকৃতি, কত মানুষজন। কত ধরনের চরিত্র আর পেশা... আশ্চর্য অভিজ্ঞতা তো বটেই...”।

“তোমার গ্রামের নাম পিপুলতলা?”

“হ্যাঁ। আমার আসল নাম ডামল”।

“ডামল? তাহলে ভল্লা নামটা?”

“ওটা ছদ্ম নাম, প্রশাসনের দেওয়া। এই কাজটার জন্যে বিশেষ নাম”। ভল্লা হেসে উত্তর দিল।

“আচ্ছা? এখানে তোমার কাজটা কী সেটা কিন্তু আজও স্পষ্ট বুঝলাম না, ভল্লাদাদা”।

“কেন? না বোঝার কী আছে? রাজার বিরুদ্ধে, প্রশাসনের বিরুদ্ধে তোদের নিয়ে বিদ্রোহ করছি?”

রামালি হেসে বলল, “সে তো বুঝতে পেরেছি। কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের খেপাচ্ছ, আবার প্রশাসন তোমাকেই পূর্ণ সমর্থন করে যাচ্ছে – কেন? সেটাই তো আমার মোটা মাথায় ঢুকছে না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “মোটা মাথা শুধু তোর নয়, আমারও। আমাকে যখন প্রথম এই কাজের কথা বলা হয়েছিল – আমিও বুঝতে পারিনি। মান্যবর সহকারী রাজ্যাধিকারিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঠিক তোর মতোই। উত্তরে তিনি বললেন, আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রের কর্মশালায় – সর্বদাই নতুন নতুন অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হচ্ছে। নতুন বলতে - আরো হালকা কিন্তু পোক্ত বল্লমের দণ্ড, ভল্ল এবং বল্লমের আরও নিশিত ফলা। এরকম তির-ধনুক – তিরের ফলা, খড়্গ...সবকিছুই আরও উন্নত হচ্ছে। মানে অস্ত্র ব্যবহারের সুবিধে হচ্ছে, এবং আরও ধারালো হচ্ছে”।

“ভালো তো। তাতে সমস্যা কিসের?”

“ওখানেই তো সমস্যা রে, রামালি। ধর গতদশ বছর ধরে যত অস্ত্র-শস্ত্র বানানো হয়েছে, আজকের নতুন অস্ত্র-শস্ত্রের তুলনায় সেগুলো গাব্দা ভারি আর ভোঁতা। তার ওপর পুরোনো অস্ত্রের লোহার ফলায় চট করে জং ধরে যায় – নষ্ট হয়ে যায় তাড়াতাড়ি”।

“হবেই তো”।

“এইবার তুই আমাকে বল, পুরোনো এই অস্ত্রগুলো তুই কি জমিয়ে রেখে দিবি? অত জায়গা কোথায়? ওগুলো কী তুই ফেলে দিবি? কোথায় ফেলবি? যারা কুড়িয়ে পাবে – তারা সকলেই তো অস্ত্র চালাতে শুরু করবে – রাজ্যে সন্ত্রাস শুরু হয়ে যাবে”।

“ঠিক, আমাদের যুদ্ধ-বিমুখ রাজা যুদ্ধ করে রাজ্যের সীমা বাড়ানোয় আগ্রহী নন। বহুকাল যুদ্ধ হচ্ছে না, অতএব বিস্তর অস্ত্র-শস্ত্র জমে উঠছে”।

“বাঃ ঠিক ধরেছিস। এবার প্রশাসনের উচ্চতম মহল থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে – নকল যুদ্ধ বানাও, সে যুদ্ধে পুরোন অস্ত্র সরবরাহ করো উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে। খালি হোক রাজধানীর অস্ত্র ভাণ্ডার – রাজধানীর কোষাগার ভরে উঠুক পুরোনো অস্ত্র বিক্রির অর্থে”।

রামালি কিছু বলল না। অনেকক্ষণ পর বলল, “এবার বুঝেছি, তোমার কাজ প্রশাসনের হয়ে কিন্তু প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওই অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করে – রাজকোষের সঞ্চয় বাড়ানো। আর সেই কারণেই তোমার এই বিপ্লব-বিপ্লব খেলা”।

হ্যাঁ, তবে এটা হল গৌণ দিক। এতে লাভের গুড় তেমন লোভনীয় হবে না। কিন্তু অন্য রাজ্যের বিপ্লবীদের হাতে এই অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারলে, প্রশাসনের লাভের গুড় কলসি উপচে পড়বে”।

“তার মানে বটতলির মিলা, জনারাই তোমার প্রধান লক্ষ্য?”

“অনেকটা তাই। আমরা পূবের লোকেরা খুব মাছ খাই, তোরা মাছ খাস?”

“খাই। তবে মাছের জন্যে আহামরি কোন আগ্রহ নেই।  কিন্তু হঠাৎ একথা কেন?”

“বলছি। আমরা যখন অনেক মাছ ধরি, তখন পুকুরে বা নদীতে জাল ফেলি – তাতে প্রচুর মাছ ওঠে। কিন্তু একটা-দুটো মাছ ধরতে হলে – ছিপ ফেলি। ছিপের আগায় বঁড়শিতে কিছু টোপ দিই, মাছকে লোভ দেখানোর জন্যে। মাছ সেই খাবার খেতে এলে, বঁড়শির কাঁটা তার মুখে আটকে যায় – এক ঝটকায় জল থেকে ছিপ তুললেই আমরা একটা মাছ পেয়ে যাই। এখানে আমাদের দল গড়া, তোদের মহড়া এবং তিনজন রক্ষীকে মেরে আস্থানে ডাকাতি …এ দৃষ্টান্তগুলো পাশের রাজ্যের গ্রামগুলোতে যত ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের অস্ত্রের ব্যবসাও তত ফুলে-ফেঁপে উঠবে”।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/৯

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃতী...