সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/২০

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৯"]


৫.৬.২ শক্তি, শাক্ত ও তন্ত্রধর্ম

৫.৬.২.১ শক্তির দেবী

শৈব ধর্মের আরেকটি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী শাখা হল শাক্ত। শাক্ত ধর্মের মূলকথা শক্তি – যে আদ্যাশক্তির কথা শৈবধর্মে বলা হয়েছে, সেই শক্তিই এখানে প্রধানা দেবী এবং তাঁর ভক্তরা শক্তির উপাসক। শাক্তদের উপাস্য দেবী প্রধানতঃ দশজন, তাঁদের একত্রে দশমহাবিদ্যা বলা হয়ে থাকে। এই দশমহাবিদ্যা হলেন, কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা। এই দেবীরা সকলেই শিবজায়া সতী ও পার্বতীর বিভিন্ন রূপ। প্রসঙ্গতঃ পৌরাণিক মতে সতী ও পার্বতীও একই দেবী, দক্ষের যজ্ঞে দেহত্যাগ করার পর সতীদেবীই পরজন্মে পার্বতী হয়েছিলেন, সেকথা আগেই বলেছি। এই দশমহাবিদ্যার উৎপত্তি নিয়ে বহু পুরাণে বহু কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে, তার মধ্যে যে কাহিনী সব থেকে প্রচলিত, সেটি এরকম,-

নিমন্ত্রণ ছাড়াই সতীদেবী পিতা দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায়, মহাদেব তাঁকে যখন বারবার নিষেধ করেছিলেন, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে সতীদেবী স্বামীকে তাঁর এই দশরূপ দেখিয়েছিলেন।

কালী - এলোকেশী, ঘন মেঘের মতো কালো গায়ের রং, ত্রিনয়না, বড়বড় দাঁত ও লোলজিহ্বা। গলায় মুণ্ডমালা, তার থেকে রক্ত ঝরছে, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন শবের বুকে। তিনি চতুর্ভুজা, তাঁর বাঁহাতের একটিতে তীক্ষ্ণ খড়গ, অন্যটিতে কাটা মুণ্ড। দুই ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা। ইনি কৈবল্যদায়িনী– সংসারে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি দেন।

তারা - তাঁর গায়ের রং নীল, লোলজিহ্বা, ত্রিনয়না, করালবদনা, মাথার জটাতে খেলে বেড়াচ্ছে সাপ। কপালে পাঁচটি অর্ধচন্দ্রের ভূষণ, পরনে বাঘছাল। তিনি শিবের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর চারহাতে নীলপদ্ম, খড়গ, কাতি[1] ও নরখুলি। ইনি বিপদ-আপদ, ভূত-প্রেত থেকে সকলকে ত্রাণ বা তারণ করেন, তাই তারা।

ষোড়শী (রাজরাজেশ্বরী) - তাঁর গায়ের রং লাল, ত্রিনয়না, কপালে চন্দ্রভূষণ, তাঁর চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ, তীর ও ধনুক, তিনি বসে আছেন যে মঞ্চে সেই মঞ্চ ধারণ করে আছেন, পাঁচ দেবতা - ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ঈশ্বর, মহেশ ও রুদ্র। ইনি ত্রিগুণাতীতা–অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের ঊর্ধে অবস্থিতা।

ভুবনেশ্বরী - এই রূপে তিনি পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, চার হাতে পাশ, অঙ্কুশ ও বরাভয় মুদ্রা। ইনি এই বিশ্ব ভুবনকে পালন করেন।

ভৈরবী - ইনিও পদ্মাসনা, রক্তবর্ণা, ত্রিনয়না, সালংকারা, কপালে চন্দ্রভূষণ, গলায় মুণ্ডমালা, চার হাতে অক্ষমালা[2], পুঁথি ও বরাভয় মুদ্রা। ইনি ভৈরবের ভার্যা - সকল দুঃখ নাশ করেন।

ছিন্নমস্তা - প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর বিপরীত রতিক্রিয়ায় মগ্ন মিথুনের উপর তিনি দণ্ডায়মানা, তিনি দ্বিভুজা, দিগম্বরী, উপবীতের মতো তাঁর কাঁধে মুণ্ডমালা এবং সাপ। একহাতের খড়্গ দিয়ে তিনি নিজের মুণ্ড কেটে ফেললেন, অন্য হাতে ধরলেন, নিজেরই কাটা মুণ্ড। কণ্ঠ থেকে উৎসারিত হল তিনটি রক্তধারা। দুই পাশের রক্তধারা পান করতে লাগল তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ডাকিনী সহচরী এবং মধ্যের রক্তধারাটি পান করলেন হাতে ধরে থাকা নিজের কাটা মুণ্ডটির মুখ দিয়ে। ইনি ত্রিশক্তিরূপিণী, মোহনাশিনী ও মোক্ষদায়িনী।

ধূমাবতী - ধূমাবতী অতি বৃদ্ধা বিধবা, তাঁর গায়ের রং ধূসর ধোঁয়ার মতো, তাঁর দুই স্তন বাতাসে দুলছে, তিনি শীর্ণা, ক্ষুধায় আকুল, তাঁর একহাতে একটি কুলা, অন্য হাত কাঁপছে থরথর করে। ইনি ধূম্রাসুরকে বধ করেছিলেন। ইনি চতুর্বর্গ – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ দান করেন।

বগলা – রত্নময় গৃহে, রত্নময় সিংহাসনে তিনি বসে আছেন, তিনি পীতবর্ণা, পীতবসনা, সালংকারা, তাঁর ত্রিনয়নে চন্দ্র, সূর্য এবং অগ্নি, কপালে চন্দ্রকলা, একহাতে তিনি এক অসুরের জিভ টেনে ধরে আছেন, অন্য হাতে মুগুর। ইনি স্বয়ং চৈতন্যরূপিণী

মাতঙ্গী – রক্তপদ্মাসনা, শ্যামবর্ণা, রক্তবসনা, চতুর্ভুজা – খড়্গ, চর্ম, পাশ, অঙ্কুশধারী, ত্রিনয়না, কপালে অর্ধচন্দ্র। ইনি মতঙ্গ অসুরকে বধ করেছিলেন, সকল বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।

কমলা (মহালক্ষ্মী)– সুবর্ণ বর্ণা, কমলাসনা, চার হাতের দুই হাতে পদ্ম, দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা, দুই পাশে দুই-দুই হাতি তাদের চারটি করে দাঁত। দুই হাতি সোনার ঘট থেকে রত্ন এবং অন্য দুই হাতি সোনার কলস থেকে অমৃত ঢেলে দেবীকে অভিষিক্তা করছে।

দেবাদিদেব মহাদেব মনে করলেন, এঁরা কেউই তাঁর নরম-সরম পত্নী সতীদেবী নয়, অন্য কেউ। তিনি আতঙ্ক ও ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনারা কে? আমার সতী কোথায় গেল?” উত্তরে কালীরূপী সতীদেবী বললেন, “তুমি তো সবই জান, এখন কেন ভুলে গেলে? চিন্তা করে দেখ আমিই পরমা প্রকৃতি। সৃষ্টির আদিতে তুমি, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা যখন কারণ জলে ছিলে, আমিই তোমাদের তিনজনকে প্রসব করেছিলাম। তোমরা তিনজনেই তখন সৃষ্টির জন্যে তপস্যা করছিলে, এমন সময় আমি শব হয়ে জলে ভেসে সেখানে উপস্থিত হলাম। শবের পূতি গন্ধে বিষ্ণু উঠে গেলেন, ব্রহ্মা মুখ ফিরিয়ে চতুর্মুখ হলেন। একমাত্র তুমিই ঘৃণা না করে, আমাকে আসন করলে এবং আমি প্রকৃতি রূপে তোমার পুরুষ রূপের ভজনা করলাম। সেই তুমি, সেই আমি – এবার মনে পড়েছে?” এই কথা শুনে মহাদেবের সব মনে পড়ে গেল, সেই শবসাধনা, সেই তন্ত্রমন্ত্র। সতীদেবীই যে সেই মহামায়া সে কথা মনে করে, তিনি সতীদেবীকে দক্ষের যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন।

 

প্রসঙ্গতঃ এখানে সৃষ্টি তত্ত্বের শাক্তমতের কাহিনীটিও জানা গেল।

 

৫.৬.২.২ মহাভারতে শক্তিপূজা

মহাভারতে শক্তি দেবীদের পূজার বহু উল্লেখ আছে। সবগুলির আলোচনায় না গিয়ে, খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটিমাত্র ঘটনার উল্লেখ এখানে করতে চাই। পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী বারো বছর বনবাসের পর, এক বছর অজ্ঞাতবাসের জন্যে বিরাটরাজ্যে আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু মানসিক উদ্বেগের শেষ নেই, অজ্ঞাতবাসের সময় দুর্যোধনাদি কৌরবপক্ষ যদি তাঁদের অবস্থান জেনে ফেলে, তাহলে আবার তের বছরের জন্যে দুর্ভোগ চলবে।

উদ্বিগ্ন রাজা যুধিষ্ঠির ভগবতী দুর্গার কৃপা প্রার্থনার জন্যে, তাঁর স্তব শুরু করলেন, “হে যশোদাকন্যা, নারায়ণপ্রিয়া, কংসের ধ্বংসকারিণি, অসুরবিনাশিনি, ভগবতি, বরদায়িণি, আপনাকে নমস্কার।  আপনি ব্রহ্মচর্য্যস্বরূপা, বাসুদেবের ভগিনী। দুর্ধর্ষ কংস আপনাকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, শিলাতলে আছাড় মারতে গেলে, আপনি তার হাত থেকে অনায়াসে নিজেকে মুক্ত ক’রে, আকাশে অদৃশ্য হয়েছিলেন। হে ভুবনেশ্বরি, আপনি দিব্য বস্ত্র ও মালায় সুসজ্জিতা। আপনার হাতে তীক্ষ্ণ খড়্গ ও ঢাল শোভা পাচ্ছে। হে ত্রৈলোক্যতারিণি, যাঁরা পাপের ভার ক্ষালনের জন্যে আপনাকে একান্ত ভাবে স্মরণ করেন, আপনি তাঁদের দুস্তর পাপের পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে থাকেন”।

তারপর রাজা যুধিষ্ঠির, সকল ভাই ও স্ত্রী দ্রৌপদী মিলে দেবীকে দর্শনের ইচ্ছায় আরো অনেকরকম স্তব করতে লাগলেন, “হে নবোদিত সূর্যের মতো স্নিগ্ধ উজ্জ্বল দেবি, আপনার চার হাত, চার মুখ, আপনি ময়ুরপুচ্ছ বলয়ধারিণী, পীনস্তনী, গুরুনিতম্বিনী, কেয়ুরধারিণী দেবী। আপনি লক্ষ্মীর মতো শোভা লাভ করে থাকেন। আপনার মুখমণ্ডলের আভায় চাঁদের জ্যোৎস্নাও লজ্জিত হয়। আপনার দুই কান, সোনার কুণ্ডলে অলংকৃত। বিচিত্র আপনার মাথার মুকুট এবং অত্যন্ত রমণীয় আপনার কেশবন্ধন। হে বিবিধ অস্ত্রধারিণি, আপনার বিপুল বাহুসমূহ শক্রধ্বজার মতো। আপনার কটিতটে  ভুজঙ্গের অলঙ্কারে, আপনি মহানাগ বেষ্টিত মন্দর গিরির মতো রূপ ধারণ করেছেন। ময়ুরের পাখায় সাজানো আপনার ধ্বজদণ্ডের কী অপূর্ব শোভা হয়েছে। হে  ত্রিদশেশ্বরি, আপনি কৌমার ব্রতে সুরলোক পবিত্র করেছিলেন, সেই কারণে ত্রিদশগণ সর্বদা আপনার স্তব ও পূজা করেন। আপনি ত্রিলোককে রক্ষা করার জন্য মহাসুর মহিষাসুরকেও সংহার  করেছিলেন। আপনি জয়া, বিজয়া, বরদা এবং আপনি সংগ্রামে বিজয় দান করেন, অতএব আমাদের প্রতি এখন প্রসন্ন হোন, কৃপা করে আমাদের বিজয় দান করুন। হে মদ্য ও পশুমাংসপ্রিয়ে[3], কামচারিণি, নগেন্দ্র বিন্ধ্যাচল আপনার শাশ্বত বাসস্থান, প্রলয়কালে নিখিল জীব ও জড় আপনাতেই লীন হয়। হে কালি, হে মহাকালি, যাঁরা প্রভাতে আপনাকে স্মরণ ও প্রণাম করেন, তাঁদের সকল দুঃখের ভারমুক্তি ঘটে এবং প্রভূত ধন-পুত্র লাভ সুলভ হয়। হে দুর্গে, আপনি বিপদের দুর্গ থেকে লোককে উদ্ধার করেন বলেই আপনার নাম দুর্গা। গহন অরণ্যে অবসন্ন, সাগরজলে নিমগ্ন ও দস্যু কবলে আক্রান্ত জনের আপনিই একমাত্র গতি। হে দেবি, জলপোতে, নির্জন প্রান্তরে কিংবা গভীর অরণ্যে বিপন্ন হয়ে, আপনাকে ভক্তিভরে স্মরণ করলেই, আর বিপদের ভয় থাকে না, বিপদ থেকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার পাওয়া যায়। হে সুরেশ্বরি, আপনি কীর্তি, লক্ষ্মী, ধৃতি, সিদ্ধি, লজ্জা, বিদ্যা, সন্ততি, বুদ্ধি, সন্ধ্যা, রাত্রি, প্রভা, নিদ্রা, জ্যোৎস্না, কান্তি, ক্ষমা ও দয়া। আপনার পূজা করলে মানুষের বন্ধন, মোহ, পুত্রনাশ, ধনক্ষয়, ব্যাধি, মৃত্যুভয় কিছুই থাকে না। হে ভক্তবৎসলে, শরণাগতপালিকে, দুর্গে, আমি রাজ্যভ্রষ্ট হয়েছি। এখন আপনার শরণাপন্ন হয়েছি, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি আমাদের সকলকে রক্ষা করুন”

রাজা যুধিষ্ঠিরের এই স্তবে দেবী প্রসন্না হলেন, তাঁদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে বললেন, “হে রাজা, আমার প্রসাদে তোমাদের অচিরকালের মধ্যেই বিজয় লাভ হবে। তুমি ও তোমার ভ্রাতৃগণ নিখিল কৌরবদের পরাজিত করে, নিষ্কণ্টকে রাজ্য ভোগ করবে, সুখে এবং শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করবে। হে ধর্মরাজ, যে সকল নিষ্পাপ লোকেরা আমার নামসঙ্কীর্তন করে, আমি তাদের প্রতি প্রসন্ন হই এবং আমি তাদের রাজ্য, আয়ু, সম্পদ, সুন্দর স্বাস্থ্য ও সন্তান প্রদান করি। প্রবাসে, নগরে, যুদ্ধে, সংগ্রামে, অরণ্যে, দুর্গম পাহাড়ে ও সাগরের যে কোন দুর্গম স্থানে বিপন্ন হলেই, যারা আমাকে স্মরণ করে, তাদের আর কিছুই দুর্লভ থাকে না।  তোমার এই স্তব ও স্তোত্র শুনলে অথবা পাঠ করলে তাদের সমস্ত কাজ সুসম্পন্ন হয়, সকল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। হে পাণ্ডবগণ, আমি প্রসন্ন হয়েই বলছি, তোমরা এই বিরাটনগরে বাস করলে, এখানকার লোকেরা এবং কৌরবরাও, কেউ তোমাদের সঠিক পরিচয় জানতে পারবে না”। (বিরাট/ ৬)। যুধিষ্ঠিরকে এই কথা বলে, দেবী পাণ্ডবদের আশীর্বাদ করলেন এবং সেখানেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

রাজা যুধিষ্ঠিরের এই দুর্গা স্তবের কাহিনী, মহাভারতে যুক্ত হয়েছে হয়তো খ্রিস্টিয় তৃতীয় চতুর্থ শতাব্দীতে। মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি সময় মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত মূল মহাভারতে এই কাহিনী নিশ্চয়ই ছিল না। কারণ আগেই বলেছি মহাভারতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম থেকে কংস বধ (অর্থাৎ বৃন্দাবন থেকে মথুরা) কাহিনীর কোন উল্লেখ আমরা পাই না। তাহলে রাজা যুধিষ্ঠির কী করে জানলেন, তিনি যশোদা কন্যা, এবং কংস তাঁকে পাথরে আছাড় মারতে গিয়েছিলেন? উপরন্তু আমরা আগেই দেখেছি, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বা মহাভারত রচনার কাল থেকে প্রায় পনেরশ (!) বছর বাদে দেবর্ষি নারদের বকাবকিতে, মহর্ষি ব্যাসদেব ভাগবত ও অন্যান্য বহু পুরাণ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন (অধ্যায় ৫.৩.৩)। অতএব মহাভারতে ভগবতী দুর্গা যখন রাজা যুধিষ্ঠিরের স্তবে আবির্ভূতা হয়েছেন, ততদিনে ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অতএব এই কাহিনীটি প্রক্ষিপ্ত, কাক-ভক্ষ্য মহাভারতকে হংস-বিহারী মহাভারতে রূপান্তরিত করার বহু প্রয়াসের মধ্যে এটি একটি।   



[1] কাতি – শাঁখ কাটার দুমুখো করাত, এখানে নিশ্চয়ই দুমুখী ধারাল কোন অস্ত্র।

[2] অক্ষমালা –জপমালা, জপসংখ্যা গোনার জন্যে সাধারণতঃ রুদ্রাক্ষ, কমলাক্ষ ফল অথবা তুলসীকাঠ থেকে বানানো হত। কাচ, স্ফটিক বা সোনার গুটিকা বা পুঁতি দিয়েও জপমালা বানানোর প্রচলন আছে।

[3] কী কাণ্ড, মহাভারত বলছে মদ্য ও পশুমাংস দেবী দুর্গার প্রিয় খাদ্য – কিন্তু আধুনিক ভারত তা মানবে কেন?  


চলবে...    


রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৭

প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "



এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৬"


২৭  

না সে সব কিছুই ঘটল না। আমি ওর মনের কথা বোঝার জন্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। এবং আমার সঙ্গে অথবা ওর দাদু-দিদার সঙ্গে ওর প্রাত্যহিক আচরণেও এতটুকু ব্যত্যয় লক্ষ্য করলাম না। যার থেকে আন্দাজ করা যায় – ওর মনের মধ্যে কোন অভিমান রয়েছে, ক্ষোভ বা রাগ রয়েছে। এবার আমার নিজের ওপরেই প্রচণ্ড হতাশা এল সুনুদা। আমি মা। আমি আমার একমাত্র সন্তানকেই বুঝতে পারছি না। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই এগারো বছর তিনমাস, আমরা যে একসঙ্গে রইলাম, তখনও কি বাম্বাইকে প্রকৃত অর্থে বুঝতে পেরেছিলাম? মনে হয় না। তাহলে আমি কেমন মা?

আমি কি অত্যন্ত স্বার্থপর একজন মহিলা নই? নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যে, এককথায় নিজের কেরিয়ার গড়ার জন্যে আমি এতটাই নিবিষ্ট হয়ে রয়েছি যে, আমার নিজের সন্তানের সঙ্গে আমার সেভাবে কোন বন্ধনই গড়ে উঠল না?

অথবা এমনও হতে পারে বড়ো হতে হতে আমাদের সংসারের অনেক কিছুই ও বুঝে গেছে। বহু সময়েই আমরা বয়স্করা নিজেদের মধ্যে নানান সমস্যা নিয়ে যখন কথা বলি, সামনে বাম্বাইয়ের উপস্থিতিকে ইগনোর করেছি। ভেবেছি ও ছেলেমানুষ এসবের কী বুঝবে? আসলে ছেলেমানুষরাও অনেক কিছু বোঝে – কখনো কখনো নিজের মতো করে বেশ গভীরেই বোঝে হয়তো। ওরা আমাদের মতো তেমন আউপাতালেপনা করে না, কিন্তু প্রত্যেকটা ঘটনা প্রবাহ নিজের মস্তিষ্কে সেভ করে রাখে এবং সময় সুযোগ মতো সেগুলিকে নিজের মতো বিশ্লেষণ করে থাকে। সে বিচার-বিশ্লেষণ আমাদের মতো ঘরপোড়া গরুদের থেকে অনেকটাই আলাদা। এসবই আমার অনুমান – ওর মনের মধ্যে কী আছে – সে কথা আমি ওর মা হয়েও জানতে পারিনি। ছেলেমানুষ বা বাচ্চা বলে যাকে ধর্তব্যে আনিনি - হয়তো সেই হয়ে উঠেছে ম্যাচিওরড্‌, আমাদের সকলের থেকে।

যাই হোক বাম্বাইয়ের বাইরে কোথাও পড়তে যাওয়ার কথাটা যখন মোটামুটি ফাইন্যাল হয়ে উঠল। তখনই আমার মাথায় এল – কোথায়, কতদূরে, কোন স্কুলে ভর্তি করাবো, সে কথা তো কিছুই চিন্তা করিনি। খরচই বা কত হবে, সেই ব্যয় সংকুলান করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে তো? তা নাহলে আমি আবার নতুন এক সঙ্কটের সম্মুখীন হব।

অতএব আবারও সেই শশাঙ্কেরই শরণাপন্ন হতে হল। শশাঙ্কর অনেক জানাশোনা, অনেক যোগাযোগ। একদিন শশাঙ্ককে বলেই ফেললাম কথাটা।

আমার সব কথা মন দিয়ে শুনে বলেছিল, “সব দিক চিন্তাভাবনা করে দেখে নিয়েছেন তো? এই সিদ্ধান্তের জন্যে কিছুদিন আপনার ও আপনার পুত্রের মন খারাপ হবে, তা হোক, তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যেন কখনও কোন অনুশোচনার বিষয় না হয়ে ওঠে। তাতে যে ক্ষতি হবে – আপনাদের দুজনের পক্ষেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত হতাশাজনক হয়ে উঠতে পারে”।

একটু সময় নিয়ে আমি উত্তর দিয়েছিলাম, “না, সেরকম কিছু হবে না, আশা করি”।

শশাঙ্ক একটু চিন্তা করে বলল, “আমার এক খুড়তুতো ভাই, ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময়, পাড়ার কিছু বখাটে ছেলের পাল্লায় পড়ে ভীষণ দুরন্ত এবং অবাধ্য হয়ে উঠেছিল। সে সময় কোন এক বন্ধুর রেকমেণ্ডেশনে আমার কাকা তাকে কার্সিয়াংয়ের এক মিশনারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। প্রথম মাস দুই-তিন আমার ভাইয়ের ওখানে অ্যাডজাস্ট করতে কিছুটা অসুবিধে হয়েছিল ঠিকই - কিন্তু আলটিমেটলি ওখানে ওর মন বসে যায়। এবং টাচ্‌-উড্‌ - ওখান থেকে সেকেণ্ডারিতে খুব ভালোভাবেই পাশ করে কলকাতায় যখন ফিরে আসে, সে তখন একেবারেই অন্য ছেলে। দারুণ স্মার্ট, পোলাইট এবং অবশ্যই ব্রিলিয়ান্ট। এখন সেই ছেলে জার্মানির একটি ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্স পড়ায়।

আপনি চাইলে, ওই স্কুলের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে পারি। অ্যাডমিশন নিয়ে মনে হয় না কোন সমস্যা হবে। আর খরচাপাতিও কলকাতার সাধারণ স্কুলের তুলনায় বেশি তো বটেই – তবে সেটা ইজিলি অ্যাফোর্ডেব্‌ল্‌। আমার ওই ভাইয়ের রেকমেণ্ডেশন পেলে কোন দিক দিয়েই কোন অসুবিধে হবে না। ঠিক কবে থেকে সুধন্বাকে শিফ্‌ট্‌ করাতে চাইছেন?”

“এই মিডসেশনেই ওকে ডিস্টার্ব করতে চাইছি না। নেক্সট সেশন, মানে ক্লাস সিক্সের শুরু থেকে হলে বেটার”।

“গুড। হাতে প্রায় মাস চারেক সময় পাওয়া যাবে। আপনি ফাইন্যাল কনফার্মেশন দিলেই, আমি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন শুরু করে দেব”।

আমি মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, “ফাইন্যাল কনফার্মেশন আপনাকে আজই দিয়ে দিলাম, শশাঙ্কবাবু। আমাদের বাড়ির বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখলে, ওর পক্ষে মনে হয় ভালোই হবে”।

এই কথা হওয়ার দিন পনেরর মধ্যে আমার নামে অফিসের ঠিকানায় কার্সিয়াংয়ের একটি স্কুল থেকে আমার কাছে বেশ বড়োসড়ো একটা ক্যুরিয়ার পোস্ট এল। খুলে দেখলাম, তার মধ্যে অ্যাডমিশন ফর্ম, প্রসপেক্টাস এবং আরও কয়েকটা ব্রসিওর। তার মধ্যে স্কুলে ভর্তি হওয়ার নিয়মকানুন যেমন ছিল, তেমনি ছিল ঝকঝকে কিছু ছবি। তার মধ্যে ছিল স্কুল ক্যাম্পাস, প্লে-গ্রাউণ্ড, লাইব্রেরি, হস্টেল ফেসিলিটির নানান ছবি। তেমনি ছিল নানান এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে পার্টিসিপেট করা উজ্জ্বল হাসিমুখের কিছু ছেলেমেয়ের ছবি। আমার তো ভীষণ ভালো লাগল, আমাদের পরিচিত কলকাতার কাঠখোট্টা স্কুলের মতো নয়, যেন স্বপ্নের দেশ। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ছবিগুলো দেখাতে বাম্বাইও খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, “আমরা কবে যাবো, মা?”

ওর উৎসাহে মনে মনে আমি একটু কষ্ট পেলাম, বললাম, “দাঁড়া, ওইসব স্কুলে ভর্তি হওয়া অত সহজ নাকি? ওখানে গিয়ে তোকে আমাকে পরীক্ষা দিতে হবে, ওদের অনেক নিয়ম-কানুন আছে। সে সব কিছু ঠিকঠাক হলে, তবে না ভর্তি! এত তাড়া কেন বল তো, এখানকার স্কুলে কি তোর মন টিকছে না?”

বাম্বাই খুব উদাস গলায় বলল, “তা নয়, তবে অমন সুন্দর কুয়াশা মাখা পাহাড়ি জঙ্গল, সবুজ চা বাগান। স্কুল বিল্ডিং আর হস্টেল বাড়িগুলোও কি সুন্দর, তাই না, মা? কলকাতায় আমার ভালো লাগছে না, মা।”

“সে কি? আমরা তো তোর বয়েসে স্কুলে যেতাম, বন্ধুদের টানে। স্কুলবাড়ি কেমন, সেখানে টিচাররা কেমন পড়ান, সে কথা তো আমরা কোনদিন ভাবিইনি! এখানকার স্কুলের বন্ধুদের তুই মিস করবি না?”

খুব গম্ভীর গলায় বাম্বাই বলল, “আমার এখানে কোন বন্ধু নেই, মা”।

কথাটা শুনে আমি কেমন যেন বোবা হয়ে গেলাম। আমার মনে হল, আমার জীবনটাই হয়তো এর জন্যে দায়ী। বাল্যাবস্থায় পরিবারের বাইরে একটি ছেলে বা মেয়ের কাছে প্রথম বহির্জগৎ তো তার স্কুল। স্কুল বাড়ি, তার সামনে ছুটোছুটি করার জন্যে একটা প্রশস্ত অঙ্গন। অঙ্গনের সীমানা ধরে কিছু কিছু গাছপালা। স্কুলের মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরা, শিক্ষাকর্মীরা। এবং সবার উপরে থাকে বহু সংখ্যক সহপাঠী এবং তাদের মধ্যে অন্ততঃ সাত-আটজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সব নিয়েই প্রায় আমৃত্যু আমরা বহন করে চলি আমাদের বাল্য এবং শৈশবের অজস্র সুখস্মৃতি। আমার মায়ের মুখে শুনেছি। আমার বাবার মুখে শুনেছি। আমিও সেই সুখস্মৃতি থেকে বঞ্চিত নই। বাম্বাইয়ের ক্ষেত্রে কি সেরকমটা ঘটেনি?

অথচ আমি তো কোনভাবেই টের পাইনি এতদিন। মনে পড়ল, ওর মুখে ওর স্কুলের বন্ধুদের কথা, টিচারদের কথা, ক্বচিৎ কখনো শুনেছি। মনে পড়ল বাম্বাই গরমের বা পুজোর ছুটিতে কোনদিন কোন বন্ধুর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্যে বায়না করেনি। ওর বন্ধুদের মধ্যেও কেউ কোনদিন আমাদের বাড়ি আসেনি। অবশ্য একথাও ঠিক, দশ-এগারো বছর বয়সে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে নিজস্ব সময় কাটানোর বোধ আসে না। সেটা আসে ক্লাস এইট-নাইন থেকে।

অবশ্য শৈশবের পাড়ার সমবয়সী ছেলে-মেয়েদের সঙ্গেও বাম্বাইয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সেটার কারণ অবশ্যই আমি। ডিভোর্সের পর আমাদের পাড়াতে আমি রীতিমতো খ্যাতিময়ী মহিলা হয়ে উঠেছিলাম, আর সেই কারণেই আমার মনের মধ্যে একটা ভীতি ছিল। এই ভয়টা মনে কেন এসেছিল, তার কারণটাও বলি। বাবার সঙ্গে পথে ঘাটে, অথবা বাজারে সমবয়সী প্রতিবেশীদের দেখা হলেই, তাঁরা বাবাকে নাকি গায়ে পড়ে প্রশ্ন করতেন, “আপনার কন্যা এখন কী করছে?”

“চাকরি করছে, প্রাইভেট একটা কোম্পানিতে”।

“অ, চাকরি করছে? বেশ বেশ, তা ভালই করেছে। তাহলে তো বিয়ে-থা হতে আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। আজকের যুগেও যতই আমরা নিজেদের মডার্ন বলে ক্লেম করি না কেন, বিধবা আর ডিভোর্সি পাত্রীকে কোন পরিবারই সংসারে ঢোকাতে চায় না। তবে পাত্রী রোজগেরে হলে, তার কদর একটু বাড়ে...”। বাবা যতই ব্যস্ততা দেখিয়ে, সেই ভদ্রলোককে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন না কেন, ওই ভদ্রলোকরা তাঁদের হিতাকাঙ্ক্ষা আর উপদেশের ভাণ্ডার নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত বাবাকে ছাড়তেন না। এসব কথা বাবা সরাসরি আমাকে কোনদিন বলেননি, মাকে বলতেন। আমি শুনেছি মায়ের কাছে।          

এই কারণেই আমার মনে হত, পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দিলে, অথবা প্রতিবেশীর বাড়িতে খেলতে পাঠালে, কেউ যদি কিছু বলে! ওর মায়ের সম্পর্কে অবান্তর ও মনগড়া প্রশ্ন বা মন্তব্য শুনে বাম্বাইয়ের মন আমার এবং আমার পরিবারের প্রতি যদি প্রতিকূল হয়ে ওঠে!

সব মিলিয়ে সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, আশৈশব কলকাতায় থেকেও বাম্বাইয়ের সেই অর্থে কোন বন্ধু হয়নি – না পাড়ায়, না স্কুলে। এবং সেই অভাবটা টের পেয়েই বাম্বাই আমার প্রথম প্রস্তাবেই বাড়ি ছেড়ে দূরের স্কুলে পড়তে যেতে অনাগ্রহী হয়নি।

অতএব বাম্বাইয়ের সঙ্গ ছাড়া হয়ে থাকার ব্যাপারে আমার মাতৃ হৃদয়ে যেটুকু দ্বিধা অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুকেও বর্জন করলাম রাশি রাশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এবং খুব আন্তরিক ভাবেই কার্সিয়াংয়ের স্কুলে অ্যাডমিশনের ব্যাপারে আর এতটুকু আলস্য করলাম না।

প্রচুর লটবহর নিয়ে ও বাম্বাইয়ের হাত ধরে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শশাঙ্কর সঙ্গে আমি যেদিন রওনা হয়েছিলাম, নিজের বুকের মধ্যে শেকড় ছেঁড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। আর তার যন্ত্রণাটা সহ্য করেছিলাম মুখ বুজে নীরবে। অবশ্য এর আগেও আমরা আরও তিনবার গিয়েছিলাম। প্রথমবার গিয়েছিলাম ইন্টারভিউ দিতে, সেবারও শশাঙ্ক ছিল সঙ্গে। আর পরের দুবার আমি একলাই গিয়েছিলাম বাম্বাইকে নিয়ে। কোনবারই ফ্লাইটে যাইনি, গিয়েছিলাম ট্রেনে – দার্জিলিং মেল, অথবা কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। ফ্লাইটটা তখন অ্যাভয়েড করেছিলাম, দুটো কারণে – প্রথমতঃ খরচের সাশ্রয়। স্কুলের অ্যানুয়াল ফিজ ছাড়াও আনুষঙ্গিক খরচ কত হতে পারে সে ধারণা ছিল না, তাই সাবধানী পদক্ষেপ। আর দ্বিতীয়তঃ বাম্বাইয়ের জীবনের শুরুতেই প্লেনে চড়ার অভ্যেস বানিয়ে তোলার পক্ষপাতী আমি ছিলাম না। আসলে আমি নিজেও তখনও কোনদিন প্লেনে চড়িনি, কাজেই প্লেনে চড়ার রহস্য ও আনন্দটা - ওর এবং আমার দুজনেরই - ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখলাম।

আজও আমি মনে করি বিদেশ বা বহুদূরের যাত্রা না হলে অথবা সময়াভাব না থাকলে, প্লেনে চড়াটা বিলাসিতার নামান্তর। আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থা সমূহের মধ্যে ট্রেন জার্নির মতো স্বস্তি আর কোথাও পাইনি। আট-দশ ঘন্টার জার্নিতে - বসে, শুয়ে, হেঁটে-চলে বেড়িয়ে, বই-টই পড়ে, জানালার বাইরের নানান শহর-গ্রাম-প্রান্তর দেখতে দেখতে, নিজের দেশকে জানতে জানতে, অথবা গভীর আলস্যে ঘুমোতে ঘুমোতে এমন পথ চলার আনন্দ ট্রেন ছাড়া কোথায় পাব বলো তো সুনুদা?

 তোমার কনি। 

চলবে...

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৮

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

পঁচিশে জুলাই, ২০২৬, মঙ্গলবার – সন্ধে সোয়া ছটা

ভিজিটিং আওয়ার্স সমাপ্তির থার্ড বেল বেজে উঠতে অহীনরা উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আজ তবে আসি বিনুদা। কাল আবার আসব। তোমার খ্যাঁদা আর তার বউকেও নিয়ে আসব”।

অবিনবাবু হেসে ফেললেন, বললেন, “হতচ্ছাড়া, খ্যাঁদা তোর ঠাকুদ্দা হয় রে”।

অহীন অবিনবাবুর একটা হাত চেপে ধরে বলল, “উঁহুঁ, খ্যাঁদা হল আমার বিনুদার ভাইপো, সেই সূত্রে আমারও ভাইপো”। একটু হাসল অহীন, বলল, “আসি”?

অবিনবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে অহীনরা ডাক্তার সরকারের চেম্বারে গেল। রিসেপশনিষ্ট মহিলার নাম চঞ্চলা। ওদের দেখে এগিয়ে এসে বললেন, “আপনাদের একটু ওয়েট করতে হবে। স্যারের চেম্বারে পেশেন্ট রয়েছে। এই সোফাতে বসুন না, এখনই হয়ে যাবে”।

অহীনরা সোফায় বসতে চঞ্চলা জিজ্ঞাসা করলেন, “দাদু এখন ভালই তো আছেন, না? ভাবা যায়, আমরা যাঁদের কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, বিনয়-বাদল-দিনেশ, মাস্টারদা, বাঘা যতীন – তাঁদেরই সময়ের একজন আজ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন!”

অহীন একটু হাসল, কোন উত্তর দিল না। মেয়েটি কোন উত্তরের প্রত্যাশাও করেননি। নানাবিধ অসুখ নিয়ে অজস্র অসুখী মানুষ নার্সিং হোমে আসে। তাদের দেখে দেখে, আর তাদের অসুখের ইতিহাস শুনে শুনে মেয়েটি আবেগরহিত যন্ত্রবৎ হয়ে উঠেছেন। তাঁর সেই থোড়-বড়ি-খাড়া পেশাদারিত্বে হঠাৎই কাঁপন ধরিয়েছেন অবিনবাবু। তিনি কোন অসুখেই অসুস্থ নন। পোড়োবাড়ির গোপন কুঠরি থেকে অকস্মাৎ আত্মপ্রকাশ করেছেন এই বিস্ময় মানুষ। যাঁর বয়েস নাকি একশ, কিন্তু দেখে মনে হয় সোফায় অপেক্ষারত ওই ছোকরার সমবয়সি।

মিনিট দশেক অপেক্ষার পর, চেম্বারে ঢোকার অনুমতি পেল অহীনরা। ডাক্তারবাবু ওদের দেখেই বললেন, “আরে আসুন, আসুন। কেমন দেখলেন, নবীনদা? কথাবার্তা হল?”

চেয়ার টেনে বসতে বসতে নবীনবাবু বললেন, “এমনিতে তো ভালই লাগল। তবে কথাবার্তা বেশ চাঁছাছোলা”।

ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, “যেমন”?

নবীনবাবু বললেন, “উনি আমাদের সকলেরই দাদু হন, কিন্তু আমাদের “দাদু” ডাক শুনেই খুব গোঁসা করলেন। বললেন, আমাকে দেখে কি তোদের “দাদু” বলে মনে হচ্ছে? শেষে অহীন ওঁনাকে “বিনুদা” ডেকে পরিস্থিতির সামাল দিল”।

ডাক্তারবাবু হাসলেন, বললেন, “আসল সমস্যার এই তো সবে শুরু। চা বলি? অনেকক্ষণ এসেছেন, নিশ্চয়ই চা খাননি”। ফোন তুলে চঞ্চলাকে তিনটে চা দিতে বলে, আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু? ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে?”

অহীন বলল, “স্বাধীনতা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন বৈকি। আপনার কথা বললেন, আপনি নাকি খুব ব্যস্ত বলে এড়িয়ে গিয়েছেন! আর ওঁনার নার্স পারুল ম্যাডাম যা বলেছেন, সে তো সাংঘাতিক”।

ডাক্তারবাবু বললেন, “তাই নাকি? কী বলেছে, পারুল?”

অহীন বলল, “উনি নাকি বলেছেন, সবাই তো বলে, আমি তো তেমন কিছু বুঝি না”।

ডাক্তারবাবু গভীর স্বরে বললেন, “হুঁ বাচ্চা মেয়ে। খুবই অভাবী সংসার থেকে এসেছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছে স্বাধীনতা দিবসে পাড়ায় পাড়ায় দেশভক্তির গান চালিয়ে উৎসব হয়। সে সময় ওদের বাড়িতে হয়তো রান্না হয়নি। ওদের ছোটবেলাতেই ওর বাবা সংসারের দায় ফেলে পালিয়েছে। মা-ভাই-বোন মিলে ওরা আধপেটা খেয়ে থেকেছে দিনের পর দিন। ওর মা লোকের বাড়ি-বাড়ি কাজ করে। বাড়িতে ওই সবার বড়, দুটো ছোট ভাই আছে। এই বছর দুয়েক হল, আমার এখানে কাজ করে তবু হয়তো দুবেলা দুমুঠো অন্ন-সংস্থান হচ্ছে। তাই ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ওরা তো আর ব্রিটিশ রাজত্ব চাক্ষুষ করেনি। কাজেই, স্বাধীনতা ব্যাপারটা ওর কাছে, ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট। কোন আবেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি”।

ডাক্তারবাবুর কথার মধ্যেই চা এসে গিয়েছিল। অহীনরা চুপ করে কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ডাক্তারবাবু স্বাভাবিক মুডে ফিরে বললেন, “আরে, হাত গুটিয়ে বসে কেন, নবীনদা। চা খান। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে…তা তুমি কী বললে, অহীন?”

অহীন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “বললাম, ১৯৪৭ সালের পনেরোই আগস্ট মাঝরাতে আমরা স্বাধীন হয়েছি”।

ডাক্তারবাবু চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, “বলে দিলে? তারপর? উনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করেননি? দেশভাগ, টেশভাগ নিয়ে…”?

অহীন হাসল, বলল, “সে সব প্রসঙ্গ আসার আগেই আমি ওঁনাকে চেপে দিয়েছি। বলেছি, তুমি কি একদিনেই স্বাধীন ভারতের ৭৯ বছরের সব খবর নিয়ে ফেলবে নাকি? বাড়িতে চল, ধীরেসুস্থে সব শুনবে”।

ডাক্তারবাবু খুব দুশ্চিন্তার সুরে বললেন, “কতদিন? কতদিন আমরা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারব, অহীন? তুমি কি জান? আমি ওঁনার ঘর থেকে টিভি রিমোট সব সরিয়ে দিয়েছি। সেই ফ্রেমে ঝুলিয়ে দিয়েছে একটা গভীর অরণ্যের ছবি?”

অহীন বলল, “দেখেছি। মনে হল, ওঁনার ছবিটা বেশ পছন্দও হয়েছে। ওঁনার সেই ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি আলোচনা করতে করতে বার বার ছবিটা দেখছিলেন। আর গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলেন”।

ডাক্তারবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “খুব কঠিন সময় আসছে, নবীনদা। উনি যেভাবে দ্রুত রিকভার করছেন, খুব শিগ্‌গিরি ওঁনাকে ছেড়ে দিতে হবে। বাড়িতে গিয়ে ওঁকে সামলাতে পারবেন, নবীনদা? খবরের কাগজ। টিভি। ওঁকে দেখতে আসা অজস্র লোকের কথাবার্তা…। ওঁনাদের সময় থেকে আধুনিক সময়টা যে কত বদলে গিয়েছে, সেটা উনি যত বুঝতে পারবেন, ততই অসহায় বিপন্ন বোধ করবেন। এ আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি।”

নবীনবাবু বললেন, “এমন কেন বলছেন, ডাক্তার সরকার? সে সময়ের থেকে আজ কত উন্নতি হয়েছে – ঘরে ঘরে বিজলি আলো, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেসিন, ল্যাপটপ, মোবাইল...। প্রচুর গাড়ি, ভালো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট...। আমাদের বিজ্ঞানীরা চাঁদে যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে ছবি তুলছেন। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের এই উন্নতিতে উনি তো খুশিই হবেন”।   

অহীন বলল, “দেশের উন্নতিতে উনি নিশ্চয়ই আনন্দ পাবেন, বাবা। কিন্তু আমারও ধারণা, প্রত্যেকদিন কাগজে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসছে। টিভির সংবাদে, রাজনৈতিক আলোচনায় – প্রতিটি দলের প্রতিনিধিরা যে সব বিষয় নিয়ে তুমুল এবং অবান্তর তর্ক-বিবাদ করছেন, একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। এ সব কিছুই আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে – আমরা ওসব আর গায়ে মাখি না। কিন্তু উনি?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “আমারও সেটাই দুশ্চিন্তা, অহীন। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে পুরোন মূল্যবোধের সঙ্গে যখন নিজেকে তুলনা করবেন, হয়তো ডিপ্রেস্‌ড্‌ হয়ে পড়বেন। ভয়ংকর বিপদের মধ্যে আমরা ওঁকে টেনে নিয়ে চলেছি, নবীনদা। এর থেকে ওঁনাকে কী ভাবে মুক্ত রাখব সে উপায়ও আমার জানা নেই”।

তিনজনেই চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডাক্তারবাবু বললেন, “আমার রাউণ্ডে যাওয়ার সময় হয়ে এল। নবীনদা তোমরা এখন এস। বৌমার দাদা সর্বজিৎকে অনেকদিন দেখছি না। এক কাজ করো না, ওকে ডাক না একদিন। অবিনদাদুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে, আমরা সবাই মিলে আর একবার বসি...। মহীন কি ছুটি পাবে, আসতে পারবে একবার?”

অহীন বলল, “সরুদা নার্সিং হোমে আসতে চায়নি। বলেছিল, দাদুকে বাড়ি নিয়ে গেলে দেখা করতে আসবে। সরুদাকে বললে হয়তো চলে আসবে। কিন্তু দাদার পক্ষে এখনই আসা শক্ত। এই তো লম্বা ছুটির পর ফিরে গেল। কথা বলে দেখব। এখন আসি, কাকু। কাল আসব সবাইকে নিয়ে”।

“ঠিক আছে, এসো”।  

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৫/২০

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম তৃ...