প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
এর আগের পর্ব - "শুধু _তুই .কম - পর্ব ২৪"
২৫
সুনুদা,
তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? বিগত কয়েকদিন ধরে সময় পেলেই
তোমাকে পাতার পর পাতা মেল লিখে চলেছি। তার কোন উত্তর বা মন্তব্য দিচ্ছ না? তুমি যে
মেলগুলো পড়ছো, কিংবা পড়ছো না, সেটাই তো বুঝতে পারছি না, ছাতার মাথা। নাকি আমার
জীবনের সুদীর্ঘ দুঃখের কথা, যাকে সাদা বাংলায় ভ্যাজর-ভ্যাজর করা বলে, তোমার পড়তে
ভালো লাগছে না? বোর হচ্ছো? সে কথাটাও তো স্পষ্ট করে বলে দিতে পারো, তাহলে অকারণ এত
সময় নষ্ট করতাম না।
কলকাতায় ফিরে আজ অনেকদিন পর অফিসে যেতে হয়েছিল। একটু কাজের
চাপও ছিল অফিসে। একটু আগে অফিস থেকে ফিরে ডিনার সারলাম। ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবলাম
মেলটা চেক করি – তুমি যদি কিছু লিখে থাকো।
ঘোড়ার ডিম - দেখলাম, কিছুই লেখনি।
ঘুম পাচ্ছে খুব।
কনি।
কাগজে কলমে চিঠি লেখা আজকাল উঠেই গেছে, বদলে এসেছে এই ইমেল। খটখটে একান্ত কাজের জিনিষ ইমেলকেও যে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার মতোই এমন প্রাণবন্ত করে তোলা যায়, সেটা কনিই করে দেখাল। কনির কত অজানা কথা যে সে জানল। ওর ওই ডিঙা-ভাঙা জীবনে কনি যখন ভেসে চলেছিল অজানা জীবন-তটিনীতে – সে সময়েই সে কনিকে এড়িয়ে চলত। তার প্রতি নির্লিপ্ত আচরণ করত। এর সবটাই ছিল তার দেখনদারি। মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাইদের কাছে তুলে ধরতে চাওয়া, যে সুনেত্র আর কোনভাবেই সুকন্যার প্রতি দুর্বল নয়। তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
অথচ কী আশ্চর্য, কনির সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাতে সে নিজের
ভেতরে ভেতরে যতটুকু ভেঙেছে, বাইরে চেষ্টা করেছে এতটুকুও না মচকাতে। কিন্তু আরো
আশ্চর্যের ব্যাপার, তার এই কাঁচা অভিনয় ধরা পড়ে গেছে সবার কাছে। বিশেষ করে মা,
পিসিমা এবং সবার উপরে কনির কাছেও! যে অহমিকা নিয়ে সেদিন ওই সব দিনের নাট্যমঞ্চে সে
নিজেকে সেরা নট বলে ভেবে এসেছে এতদিন, আজ বুঝতে পারছে সে একেবারেই ধরা পড়ে গেছে।
কলে পড়া ইঁদুরের মতো। সাধারণ গৃহস্থ রাত্রে পেতে রাখা কলে ইঁদুর ধরে, কিন্তু পরের
দিন সকালে তাকে নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না। ইঁদুরের দুই চোখের দিকে তাকিয়ে, তারা
নির্মম হাতে বধ করতে পারে না। আবার বাইরে খোলা মাঠে তারা ছেড়েও দিতে পারে না, পাছে
কাক-চিল এসে ছোঁ মেরে তাকে তুলে নিয়ে যায়!
স্লিপ মোডে চলে যাওয়া ল্যাপটপের অন্ধকার পর্দার দিকে তাকিয়ে
সুনেত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবল, এভাবে স্লিপমোডে থেকে তার নিজের এবং কনির জীবনটাকে
অন্ধকার করে রাখার সময় আর নেই। সেকথা শম্পাদিদিও সেদিন বলেছিল, রীতিমতো অভিযোগের
সুরে।
কনির প্রথম বিবাহের জন্যে সুনেত্রকে নিশ্চয়ই দায়ী করা যায়
না। কারণ দুই পরিবারের কেউই এমনকি কনি নিজেও তাদের সম্পর্কটাকে কোন আনুষ্ঠানিক
বন্ধনে বাঁধতে চায়নি। সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান দিয়েই সুনেত্র কনির সঙ্গে দূরত্ব
বাড়িয়েছিল এবং খুব আন্তরিকভাবেই কনির জীবনে তার ছায়াটুকুও পড়ুক, এমনটা চায়নি।
কিন্তু ডিভোর্স পরবর্তী জীবনে তাদের দুই পরিবার এবং কনি নিজেও যে মত বদলেছিল সে
কথা সুনেত্র জানবে কী করে? কেউই কোন আভাসও তো দেয়নি।
নাকি সকলেই আশা করেছিল অন্ধকারের মধ্যে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ুক সুনেত্র?
কনির সংকটের সময় কোন একদিন সুনেত্র বুক চিতিয়ে কনির সামনে এসে দাঁড়াক এবং গভীর প্রত্যয়
নিয়ে বলুক, “যা হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। জীবন নিয়ে তোর এই ছিনিমিনি পুতুলখেলার
আসর ছেড়ে উঠে আমার পাশে আয়, কনি। সমাজ যা খুশি বলুক, আজ থেকে আমি তোর পূর্ণ
দায়িত্ব নিলাম। তোর যত সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দ, আমি গ্রহণ করলাম। এবার তোর বাকি জীবনটুকু
নাহয় আমাকেই সমপর্ণ কর”। নারী চরিত্র বিষয়ে সুনেত্র একেবারেই আনাড়ি। তবে অনেকের
কাছে শুনেছে বা কোথাও কোথাও পড়েছে, মেয়েরা পুরুষদের থেকে জোর প্রত্যাশা করে। হ্যাঁ,
ভালোবাসার জোর। আর সেই জোরেই নাকি মনের জোড় পোক্ত হয়।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুনেত্র একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবল, কিন্তু
এখন আর সে চিন্তা করে লাভ কি? প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন বেরিয়ে গেছে বহুক্ষণ। সিগ্ন্যালের
অপেক্ষায় ট্রেনটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও। দেরিতে
হলেও সে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছেওছিল, কিন্তু দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে উঠতে পারেনি। আজ
কোনভাবেই সেই ছুটে যাওয়া জীবনটাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
কিন্তু কনিও তো তার ওপর তখন জোর করতে পারত। তার হাত চেপে
ধরে বলতে পারত, “সুনুদা, তোমাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। তোমাকে শুনতেই হবে। যদিও আমার
সব কথা শোনার পর তুমি কী করবে বা না করবে, সে সিদ্ধান্ত একান্ত তোমারই। তার ওপর
আমি কোন জোর খাটাতে যাবো না। কিন্তু সব কথা তোমাকে জানতেই হবে”। কনি তো তেমন কিছুই বলেনি কোনদিন।
তাহলে, আজ এতদিন পরে এত কথা হঠাৎ বলতে শুরুই বা করল কেন? সে
কি শুধু তার মনের ভার লাঘব করার জন্যে? নাকি তার মনে কোন প্রত্যাশা আছে? সে
প্রত্যাশাটা কিসের?
দীর্ঘ অসাক্ষাতের পর সেদিন সন্ধেয় হাইওয়ের মাঝখানে দেখা হয়ে
যাওয়ায়, কনির সঙ্গে তার সম্পর্কটা এখন অনেকটাই সাবলীল। সত্যি বলতে আজ তার জীবনে কনি
উপস্থিত হয়েছে নিজের সমস্ত মাধুরীর ডালা নিয়ে - সে কথাও অনস্বীকার্য। তার জীবনের
বাকি প্রত্যেকটি দিন কনি যদি এমনই মাধুর্য মিশিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেটাই
সুনেত্রর কাছে অশেষ পাওনা। এবং সেই পাওনাটুকু সে আদায় করে নিতে চায় – অত্যন্ত
নির্লজ্জভাবেই, চরম স্বার্থপরের মতো।
কিন্তু তার বেশি সে আর কী আশা করতে পারে? নিজের জীবনের
সঙ্গে কনির জীবনটাকে জুড়ে নেওয়ার স্বপ্ন তার মনে আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই আছে। কিন্তু সব স্বপ্ন তো
পূরণ হয় না। এমনকি কনির জীবনের এখন যা পরিস্থিতি, তাতে সুনেত্র বিশ্বাস করে – সে
স্বপ্ন কোন ভাবেই পূরণ না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
শশাঙ্ককে বিয়ে করে কনি তো সুখেই আছে। অন্ততঃ সুনেত্র ওদের
দুজনকে একসঙ্গে যতখানি দেখেছে, তাতে সুনেত্রর তাই ধারণা। তার পুত্র সুধন্বার
পিতৃত্বও স্বীকার করে নিয়েছে শশাঙ্ক। সুনেত্রর যদিও ধারণা নেই কনির পুত্রের এখন সঠিক
কত বয়েস? কোন ক্লাসে পড়ছে? তবু আন্দাজ করে নেওয়া যায় চোদ্দ-পনেরতো বটেই।
সেক্ষেত্রে তার এখন ক্লাস নাইনে বা টেনে পড়া উচিৎ। কাজেই অনেকটাই বড়ো হয়েছে এমন ধরে
নেওয়াই যায়। সুধন্বা নামক মোটামুটি প্রি-সাবালক পুত্রের তরফেও তাদের এই সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চয়ই কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। অর্থাৎ ওদের এখন নিবিড় সংসার।
এই পরিস্থিতিতে তার পক্ষে কীভাবে বলা সম্ভব “এতদিন পরে যখন
তোর সঙ্গে দেখা হয়েই গেল কনি, তুই আমাকে বিয়ে করে, নতুন এক জীবনের সন্ধানে, আয় নতুন
পথে বেড়িয়ে পড়ি?” এরকম একটা বোকাবোকা মেলোড্রামাটিক প্রস্তাবের কথা ভাবতেও নিজেকে
অত্যন্ত হাস্যকর মনে হল সুনেত্রর। এমন একটা প্রস্তাবে, অবধারিত ভাবেই তার কনির
পক্ষ থেকে একমাত্র পাওনা হবে চরম প্রত্যাখ্যান। এবং এখনকার এই প্রত্যাখ্যান তাকে
সাংঘাতিক এক সঙ্কটের মধ্যে ঠেলে দেবে নাকি? যে মাধুরী নিয়ে কনি আজ তার জীবনে এসে
পৌঁছেছে, সে সবই শুকিয়ে যাবে বাস্তবের নিষ্ঠুর দাবদাহে। সুনেত্রর জীবনে পাওয়ার মতো
কিছুই আর থাকবে না।
সুনেত্র এখন প্রচণ্ড লোভী – তার লোভ কনির মাধুরী মাখানো
স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় অবগাহনে। সমূলে উচ্ছিন্ন করে সামাজিক ও সাংসারিক ঘূর্ণাবর্তের
মধ্যে কনিকে টেনে আনায় নয়। সুখী, শান্ত, নিরিবিলি একটা জীবন থেকে তাকে তুলে, গভীর
রাত্রের তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় বিক্ষুব্ধ দিগন্ত বিস্তৃত এক উন্মুক্ত মাঠের মধ্যে সে যেন
কনিকে হিঁচড়ে টেনে আনতে চাইছে।
প্রথমেই কনিকে তার সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে শশাঙ্ককে ডিভোর্স দিতে
হবে। শশাঙ্কর পত্নী হিসেবে সে আজ আর নিশ্চয়ই শশাঙ্কর অফিসে একজন সাধারণ কর্মতৎপর সহকর্মী
নয়। তার অধিকার সূত্রে সে এখন শশাঙ্কর কোম্পানীরও নিশ্চয়ই সমান অংশীদার।
তার থেকেও বড়ো কথা কনির পুত্র সুধন্বা তো আর কচি শিশুটি নয়,
সে এখন কিশোর। এতদিনে তার মা ও বাবার সম্পর্ক নিয়ে সে এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এতদিন পরে হঠাৎ তার মায়ের
জীবনে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন এক সুনেত্র বসুকে কেন সে মেনে নেবে? কেন সে মুখ বুজে
সমর্থন করবে অথবা মেনে নেবে তার মায়ের এই আজগুবি উতলতা? তার কিশোর মনেও কি পুঞ্জীভূত
হবে না, তার মায়ের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং ক্রোধ? সেই অভিঘাতে সে হয়তো এমন কিছু অনভিপ্রেত
ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে পারে, যা তাদের দুজনের কাছে আদৌ কাম্য নয়। তেমন কিছু ঘটলে সুনেত্র নিজেকে কি কোনদিন কোনভাবে ক্ষমা করতে
পারবে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনেত্র আবার একটা সিগারেট ধরাল। তারপর স্লিপ মোডে চলে যাওয়া ল্যাপটপের ঘুম ভাঙিয়ে উত্তর দিতে বসল,
প্রিয় কনি,
তোর সব লেখাই পড়েছি, একবার নয় – বেশ কয়েকবার। তোর জীবনের এই
কথকতা আমার অজানা ছিল এতদিন। কিছু কিছু আভাস হয়তো পেয়েছিলাম কিন্তু একথাও সত্যি অভিমানী
অহংকারে আমি তোর জীবনের এই চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝখানটিতে কোনদিনই অনুপ্রবেশের চেষ্টাও
করিনি। নিরুদ্বিগ্ন উদাসীনতায় নিজেকে পাথর বানিয়ে রেখেছিলাম।
আজ এই চিঠিগুলি পড়ার পর ঠিক কী উত্তর দেব। সমবেদনা জানাতে
ঠিক কতখানি আবেগ ও বিস্ময় মিশিয়ে “ইস্” কিংবা “আহা রে”, বলে নিজের দায়িত্বভার লাঘব
করব। সেটাই তো বুঝতে পারছি না রে, কনি।
আমার শুষ্ক স্তোকবাক্য অথবা সমবেদনার প্রত্যাশায় তুই থেমে
যাস না। তোর মনের সব কথা প্রকাশ করে তুই হাল্কা হ। আর কিছু পারি বা না পারি, আমি
তোর সব কথা যে শুনছি – সমস্ত অন্তর দিয়ে, এটুকু বিশ্বাস করতেই পারিস,
তোর সুনুদাকে।
চলবে...