শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৮

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 

    পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]

পঁচিশে জুলাই, ২০২৬, মঙ্গলবার – সন্ধে সোয়া ছটা

ভিজিটিং আওয়ার্স সমাপ্তির থার্ড বেল বেজে উঠতে অহীনরা উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আজ তবে আসি বিনুদা। কাল আবার আসব। তোমার খ্যাঁদা আর তার বউকেও নিয়ে আসব”।

অবিনবাবু হেসে ফেললেন, বললেন, “হতচ্ছাড়া, খ্যাঁদা তোর ঠাকুদ্দা হয় রে”।

অহীন অবিনবাবুর একটা হাত চেপে ধরে বলল, “উঁহুঁ, খ্যাঁদা হল আমার বিনুদার ভাইপো, সেই সূত্রে আমারও ভাইপো”। একটু হাসল অহীন, বলল, “আসি”?

অবিনবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে অহীনরা ডাক্তার সরকারের চেম্বারে গেল। রিসেপশনিষ্ট মহিলার নাম চঞ্চলা। ওদের দেখে এগিয়ে এসে বললেন, “আপনাদের একটু ওয়েট করতে হবে। স্যারের চেম্বারে পেশেন্ট রয়েছে। এই সোফাতে বসুন না, এখনই হয়ে যাবে”।

অহীনরা সোফায় বসতে চঞ্চলা জিজ্ঞাসা করলেন, “দাদু এখন ভালই তো আছেন, না? ভাবা যায়, আমরা যাঁদের কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, বিনয়-বাদল-দিনেশ, মাস্টারদা, বাঘা যতীন – তাঁদেরই সময়ের একজন আজ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন!”

অহীন একটু হাসল, কোন উত্তর দিল না। মেয়েটি কোন উত্তরের প্রত্যাশাও করেননি। নানাবিধ অসুখ নিয়ে অজস্র অসুখী মানুষ নার্সিং হোমে আসে। তাদের দেখে দেখে, আর তাদের অসুখের ইতিহাস শুনে শুনে মেয়েটি আবেগরহিত যন্ত্রবৎ হয়ে উঠেছেন। তাঁর সেই থোড়-বড়ি-খাড়া পেশাদারিত্বে হঠাৎই কাঁপন ধরিয়েছেন অবিনবাবু। তিনি কোন অসুখেই অসুস্থ নন। পোড়োবাড়ির গোপন কুঠরি থেকে অকস্মাৎ আত্মপ্রকাশ করেছেন এই বিস্ময় মানুষ। যাঁর বয়েস নাকি একশ, কিন্তু দেখে মনে হয় সোফায় অপেক্ষারত ওই ছোকরার সমবয়সি।

মিনিট দশেক অপেক্ষার পর, চেম্বারে ঢোকার অনুমতি পেল অহীনরা। ডাক্তারবাবু ওদের দেখেই বললেন, “আরে আসুন, আসুন। কেমন দেখলেন, নবীনদা? কথাবার্তা হল?”

চেয়ার টেনে বসতে বসতে নবীনবাবু বললেন, “এমনিতে তো ভালই লাগল। তবে কথাবার্তা বেশ চাঁছাছোলা”।

ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, “যেমন”?

নবীনবাবু বললেন, “উনি আমাদের সকলেরই দাদু হন, কিন্তু আমাদের “দাদু” ডাক শুনেই খুব গোঁসা করলেন। বললেন, আমাকে দেখে কি তোদের “দাদু” বলে মনে হচ্ছে? শেষে অহীন ওঁনাকে “বিনুদা” ডেকে পরিস্থিতির সামাল দিল”।

ডাক্তারবাবু হাসলেন, বললেন, “আসল সমস্যার এই তো সবে শুরু। চা বলি? অনেকক্ষণ এসেছেন, নিশ্চয়ই চা খাননি”। ফোন তুলে চঞ্চলাকে তিনটে চা দিতে বলে, আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু? ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে?”

অহীন বলল, “স্বাধীনতা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন বৈকি। আপনার কথা বললেন, আপনি নাকি খুব ব্যস্ত বলে এড়িয়ে গিয়েছেন! আর ওঁনার নার্স পারুল ম্যাডাম যা বলেছেন, সে তো সাংঘাতিক”।

ডাক্তারবাবু বললেন, “তাই নাকি? কী বলেছে, পারুল?”

অহীন বলল, “উনি নাকি বলেছেন, সবাই তো বলে, আমি তো তেমন কিছু বুঝি না”।

ডাক্তারবাবু গভীর স্বরে বললেন, “হুঁ বাচ্চা মেয়ে। খুবই অভাবী সংসার থেকে এসেছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছে স্বাধীনতা দিবসে পাড়ায় পাড়ায় দেশভক্তির গান চালিয়ে উৎসব হয়। সে সময় ওদের বাড়িতে হয়তো রান্না হয়নি। ওদের ছোটবেলাতেই ওর বাবা সংসারের দায় ফেলে পালিয়েছে। মা-ভাই-বোন মিলে ওরা আধপেটা খেয়ে থেকেছে দিনের পর দিন। ওর মা লোকের বাড়ি-বাড়ি কাজ করে। বাড়িতে ওই সবার বড়, দুটো ছোট ভাই আছে। এই বছর দুয়েক হল, আমার এখানে কাজ করে তবু হয়তো দুবেলা দুমুঠো অন্ন-সংস্থান হচ্ছে। তাই ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ওরা তো আর ব্রিটিশ রাজত্ব চাক্ষুষ করেনি। কাজেই, স্বাধীনতা ব্যাপারটা ওর কাছে, ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট। কোন আবেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি”।

ডাক্তারবাবুর কথার মধ্যেই চা এসে গিয়েছিল। অহীনরা চুপ করে কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ডাক্তারবাবু স্বাভাবিক মুডে ফিরে বললেন, “আরে, হাত গুটিয়ে বসে কেন, নবীনদা। চা খান। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে…তা তুমি কী বললে, অহীন?”

অহীন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “বললাম, ১৯৪৭ সালের পনেরোই আগস্ট মাঝরাতে আমরা স্বাধীন হয়েছি”।

ডাক্তারবাবু চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, “বলে দিলে? তারপর? উনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করেননি? দেশভাগ, টেশভাগ নিয়ে…”?

অহীন হাসল, বলল, “সে সব প্রসঙ্গ আসার আগেই আমি ওঁনাকে চেপে দিয়েছি। বলেছি, তুমি কি একদিনেই স্বাধীন ভারতের ৭৯ বছরের সব খবর নিয়ে ফেলবে নাকি? বাড়িতে চল, ধীরেসুস্থে সব শুনবে”।

ডাক্তারবাবু খুব দুশ্চিন্তার সুরে বললেন, “কতদিন? কতদিন আমরা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারব, অহীন? তুমি কি জান? আমি ওঁনার ঘর থেকে টিভি রিমোট সব সরিয়ে দিয়েছি। সেই ফ্রেমে ঝুলিয়ে দিয়েছে একটা গভীর অরণ্যের ছবি?”

অহীন বলল, “দেখেছি। মনে হল, ওঁনার ছবিটা বেশ পছন্দও হয়েছে। ওঁনার সেই ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি আলোচনা করতে করতে বার বার ছবিটা দেখছিলেন। আর গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলেন”।

ডাক্তারবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “খুব কঠিন সময় আসছে, নবীনদা। উনি যেভাবে দ্রুত রিকভার করছেন, খুব শিগ্‌গিরি ওঁনাকে ছেড়ে দিতে হবে। বাড়িতে গিয়ে ওঁকে সামলাতে পারবেন, নবীনদা? খবরের কাগজ। টিভি। ওঁকে দেখতে আসা অজস্র লোকের কথাবার্তা…। ওঁনাদের সময় থেকে আধুনিক সময়টা যে কত বদলে গিয়েছে, সেটা উনি যত বুঝতে পারবেন, ততই অসহায় বিপন্ন বোধ করবেন। এ আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি।”

নবীনবাবু বললেন, “এমন কেন বলছেন, ডাক্তার সরকার? সে সময়ের থেকে আজ কত উন্নতি হয়েছে – ঘরে ঘরে বিজলি আলো, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেসিন, ল্যাপটপ, মোবাইল...। প্রচুর গাড়ি, ভালো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট...। আমাদের বিজ্ঞানীরা চাঁদে যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে ছবি তুলছেন। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের এই উন্নতিতে উনি তো খুশিই হবেন”।   

অহীন বলল, “দেশের উন্নতিতে উনি নিশ্চয়ই আনন্দ পাবেন, বাবা। কিন্তু আমারও ধারণা, প্রত্যেকদিন কাগজে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসছে। টিভির সংবাদে, রাজনৈতিক আলোচনায় – প্রতিটি দলের প্রতিনিধিরা যে সব বিষয় নিয়ে তুমুল এবং অবান্তর তর্ক-বিবাদ করছেন, একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। এ সব কিছুই আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে – আমরা ওসব আর গায়ে মাখি না। কিন্তু উনি?”

ডাক্তারবাবু বললেন, “আমারও সেটাই দুশ্চিন্তা, অহীন। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে পুরোন মূল্যবোধের সঙ্গে যখন নিজেকে তুলনা করবেন, হয়তো ডিপ্রেস্‌ড্‌ হয়ে পড়বেন। ভয়ংকর বিপদের মধ্যে আমরা ওঁকে টেনে নিয়ে চলেছি, নবীনদা। এর থেকে ওঁনাকে কী ভাবে মুক্ত রাখব সে উপায়ও আমার জানা নেই”।

তিনজনেই চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডাক্তারবাবু বললেন, “আমার রাউণ্ডে যাওয়ার সময় হয়ে এল। নবীনদা তোমরা এখন এস। বৌমার দাদা সর্বজিৎকে অনেকদিন দেখছি না। এক কাজ করো না, ওকে ডাক না একদিন। অবিনদাদুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে, আমরা সবাই মিলে আর একবার বসি...। মহীন কি ছুটি পাবে, আসতে পারবে একবার?”

অহীন বলল, “সরুদা নার্সিং হোমে আসতে চায়নি। বলেছিল, দাদুকে বাড়ি নিয়ে গেলে দেখা করতে আসবে। সরুদাকে বললে হয়তো চলে আসবে। কিন্তু দাদার পক্ষে এখনই আসা শক্ত। এই তো লম্বা ছুটির পর ফিরে গেল। কথা বলে দেখব। এখন আসি, কাকু। কাল আসব সবাইকে নিয়ে”।

“ঠিক আছে, এসো”।  

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/৩

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ স্কন্ধ - পর্ব ৩

দক্ষ হত্যা ও যজ্ঞ বিনাশ

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “মুনি নারদের কাছে, দক্ষের যজ্ঞস্থলে পত্নী ভবানীর অপমান, সেখানে তাঁর দেহত্যাগ ও ঋভুদের কাছে তাঁর অনুচরদের পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে ভব ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। ঘোর মূর্তি ধারণ করে, ধূর্জটি তাঁর জটা থেকে একটি জটা উপড়ে নিয়ে মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। সেই নিক্ষিপ্ত জটা থেকে বীরভদ্রর আবির্ভাব হল, তাঁর আকাশছোঁয়া দেহে হাজার বাহু। তাঁর তিন চোখ, তিনটি সূর্যের মতো উজ্জ্বল। তাঁর গায়ের রঙ ঘন মেঘের মতো। তাঁর করাল দাঁত, তাঁর কেশরাশি আগুনের মতো জ্বলছে, তাঁর গলায় নরকপালের মালা, তাঁর হাজার বাহুতে বিচিত্র ও ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্র।

বীরভদ্র জোড়হাতে ভগবান ভূতনাথের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “আদেশ করুন, প্রভু”। মহাদেব ধূর্জটি বললেন, “হে মহাবীর, আমার অংশেই তোমার জন্ম, অতএব আমার অনুচরদের নেতৃত্ব দিয়ে তুমি যাও, দক্ষের যজ্ঞ বিনাশ করো এবং দক্ষকে বধ করো”। ক্রুদ্ধ রুদ্রের এই নির্দেশ পেয়ে বীরভদ্র তাঁর প্রভু দেবাদিদেবকে প্রদক্ষিণ করে, ভৈরব গর্জন করতে করতে প্রত্যক্ষ যমের মতো দৌড়ে চললেন দক্ষের যজ্ঞস্থলের দিকে।

সেইসময় যজ্ঞস্থলে উপস্থিত যাজ্ঞিকগণ, যজমান, ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণীগণ এবং অন্যান্য সদস্যরা হঠাৎ উত্তরদিকে প্রচণ্ড ধুলির ঝড় দেখতে পেলেন। তাঁরা আলোচনা করতে লাগলেন, বায়ু এমন কিছু জোরে বইছে না! রাজ্যে সুশাসন বিরাজিত, অতএব দস্যুদলের আসার সম্ভাবনাও নেই। এই অসময়ে গবাদি পশুরদেরও চারণভূমি থেকে ফেরার কথা নয়। তাহলে, এই ধুলিঝড়ের কারণ কি?  দক্ষপত্নী প্রসূতি ব্যাকুল শোকাহত কণ্ঠে বললেন, “প্রজাপতি দক্ষ আমার অন্য সকল কন্যাদের সামনে, আমার নিষ্পাপ কন্যা সতীর অপমান করলেন, সে দেহত্যাগ করল। আমার ভয় হচ্ছে, এ সেই মহাপাপেরই পরিণাম। যে ধূর্জটি প্রলয়কালে নিজের জটারাশি বিকীর্ণ করে, দিগ্‌গজদের শূলে বিদ্ধ করে অট্টহাস্য করেন এবং দশদিক উদ্বেল করে নৃত্য করতে থাকেন। ভ্রূকুটির জন্যে যাঁর চোখের দিকে তাকানো যায় না, যাঁর করাল দাঁতের আঘাতে নক্ষত্রেরাও চারদিকে ছিটকে পড়ে, সেই রুদ্রকে ক্রুদ্ধ করে তুললে স্বয়ং ভগবানও নিস্তার পান না। কাজেই তাঁর হাতে দক্ষের যে অমঙ্গল ঘটবে, এতে আমার সন্দেহ নেই”।

বলতে না বলতে বীরভদ্র তাঁর অনুচরদের নিয়ে ঝড়ের মতো যজ্ঞস্থলে ঢুকে পড়লেন। তাঁর অনুচরেরা যজ্ঞের সমস্ত আয়োজন তছনছ করে দিল। যজ্ঞের আগুন নিভিয়ে দিল। যজ্ঞবেদীর সীমাসূচক মেখলা ছিঁড়ে ফেলে দিল। যজ্ঞের পাত্র ভেঙে চুরমার করে দিল। আতঙ্কে দেবতা, ব্রাহ্মণ ও উপস্থিত সকল সদস্যরা যজ্ঞস্থল থেকে পালিয়ে গেল। তখন বীরভদ্র প্রজাপতি দক্ষকে, মণিমান মুনি ভৃগুকে, চণ্ডেশ পূষাকে এবং নন্দীশ্বর ভগকে বেঁধে ফেললেন। শিবকে অপমান করার সময়, যেহেতু মুনিভৃগু গোঁফদাড়ি নাড়িয়ে খুব হেসেছিলেন, অতএব তিনি উপড়ে ফেললেন তাঁর সব গোঁফদাড়ি। ভগকে যজ্ঞস্থলের মাটিতে ফেলে তার দুই চোখ তুলে ফেললেন, কারণ তিনি চোখের ইশারায় দক্ষকে শিবনিন্দায় উৎসাহ দিয়েছিলেন। পূষার দাঁতের পাটি উপড়ে দিলেন, কারণ শিব নিন্দায় তিনি দাঁত দেখিয়ে খুব হেসেছিলেন। তারপর দক্ষের বুকের উপর চড়ে, কণ্ঠপীড়ন করে তাঁকে হত্যা করলেন ও তাঁর দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। এরপর রুদ্রমূর্তি বীরভদ্র দক্ষিণদিকের হোমের আগুনে দক্ষের মাথা  আহুতি দিয়ে, সমস্ত যজ্ঞস্থল পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে ফিরে গেলেন কৈলাসে।  এই ভয়ংকর কাণ্ডে ভূত, প্রেত ও পিশাচেরা আনন্দে সাধুবাদ করল, কিন্তু ব্রাহ্মণ ও দেবতারা নিন্দায় মুখর হলেন। তারপর রুদ্রমূর্তি বীরভদ্র, দক্ষিণ অগ্নিতে দক্ষের মাথা দগ্ধ করে, যজ্ঞস্থল পুড়িয়ে ছাই করে  কৈলাসে ফিরে গেলেন”।

 শিবের তুষ্টির জন্য কৈলাস যাত্রা

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, এই ঘটনার পর আহত ও ভয়ে ব্যাকুল দেবতা ও ব্রাহ্মণেরা ব্রহ্মার কাছে গিয়ে, তাঁকে প্রণাম করলেন। তাঁর কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে এর প্রতিকারের জন্যে প্রার্থনা করলেন। পদ্মযোনি ব্রহ্মা ও বিশ্বাত্মা নারায়ণ দক্ষযজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়েও যজ্ঞে যান নি, কারণ তাঁরা আগে থেকেই জানতেন এমন ঘটনা ঘটতে চলেছে। সকলের কথা শুনে ব্রহ্মা বললেন, “তোমরা সকলে চিন্তা করে দেখ, তোমরাই অপরাধী। কারণ মহাদেব সর্বদাই যজ্ঞভাগের অধিকারী, তোমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছ। তিনি প্রজাপতি দক্ষের নিন্দাবাক্যে দুঃখিত, প্রিয় পত্নীর মৃত্যুতে কাতর। তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় নেই। তিনি আশুতোষ, অল্পেই সন্তুষ্ট হন, যজ্ঞের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রার্থনায় তাঁকে প্রসন্ন করো। তিনি স্বতন্ত্র প্রভু; আমি, ইন্দ্র, তোমরা, মুনিগণ কেউই তাঁর তত্ত্ব বুঝতে পারি না, তাঁর বল ও শক্তির কোন সীমা নেই”। ব্রহ্মা এই কথা বলে সকল প্রজাপতি, পিতৃগণ ও দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে ত্রিপুরারির নিবাস গিরিশ্রেষ্ঠ কৈলাসের দিকে রওনা দিলেন।

কৈলাসধাম জন্মসিদ্ধ, ওষধিসিদ্ধ, তপঃসিদ্ধ, মন্ত্রসিদ্ধ এবং যোগসিদ্ধ দেবগণের আবাসস্থান, সেখানে অপ্সরা, কিন্নর ও গন্ধর্বরাও বাস করেন। সেখানে নানান  রকমের গাছপালা, লতা, গুল্ম; নানান ধরনের পশুপাখি আর অজস্র নির্মল জলের ঝর্ণা, নদী প্রস্রবণ দেখা যায়। সেখানে ময়ুরের কেকা, কোকিলের কুহু, অলির গুঞ্জন আর অন্যান্য পাখির কাকলিতে চারদিক মুখরিত। দেবতারা নন্দা ও অলকানন্দা নদী বেষ্টিত অলকাপুরী ও সৌগন্ধিক নামক অপূর্ব কানন দেখে মুগ্ধ হলেন। ঐ দুই নদী ভগবান ভবের চরণস্পর্শে পবিত্র, এই দুই নদীর মধ্যে নন্দা আরো পবিত্র, কারণ এই নদীতেই দেবীসতী স্নান করতেন। ঐ অলকাপুরী্তেই কুবেরের নিবাস। সেখানে যক্ষ রমণীরা সোনা, রূপা ও মহামূল্য রত্নে সর্বদা অলংকৃত থাকেন। সৌগন্ধিক কানন থেকে পুষ্পের সৌরভ বয়ে আনা বাতাস যক্ষ রমণীদের মন সর্বদা প্রফুল্ল রাখে।

কুবেরপুরী অলকা ও সৌগন্ধক কানন পার হয়ে দেবতারা অদূরে এক মহাবটবৃক্ষ দেখতে পেলেন। সেই বৃক্ষ যেমন উঁচু, অজস্র শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে তেমনই বিস্তৃত। এই বটবৃক্ষের নীচে সর্বদাই ছায়াচ্ছন্ন, নিরুত্তাপ শান্ত ও কোথাও কোন উপদ্রব নেই। দেবতারা দেখলেন মহাযোগময় এই তরুমূলে দেবাদিদেব প্রশান্তভাবে বসে আছেন। তাঁর অঙ্গ সান্ধ্য মেঘের মতো রক্তবর্ণ, সেই শ্রী অঙ্গে জটা, ভস্ম ও অজিন, হাতে দণ্ড। তাঁর কপালে চন্দ্রলেখা। দক্ষিণ উরুতে বাম পাদপদ্ম, বাম জানুদেশে বাম বাহু রেখে, দক্ষিণ হাতের তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠ সংযোগ ও তিন আঙুল প্রসারিত করে  তিনি তর্কমুদ্রায় বসেছিলেন। তাঁর উপাসনা করছিলেন সনন্দন ও অন্যান্য যোগসিদ্ধ কুমারগণ এবং যক্ষ ও রক্ষদের রাজা কুবের। আর ছিলেন দেবর্ষি নারদ। তিনি কুশাসনে উপবেশন করে সকলকে বেদতত্ত্ব উপদেশ করছিলেন।

লোকপালগণের সঙ্গে দেবতা ও মুনিরাও জোড়হাতে গিরিশকে প্রণাম করলেন। পরমপিতা ব্রহ্মাকে দেখে মহাদেব আসন ছেড়ে উঠে এলেন এবং নতমস্তকে ব্রহ্মাকে প্রণাম করলেন। তারপর নীললোহিতের চারদিকে উপস্থিত সকলেই ব্রহ্মাকে প্রণিপাত করলেন। ব্রহ্মা হাসিমুখে বললেন, “হে শশাংকশেখর, যদিও তুমি আমাকে প্রণাম করলে, কিন্তু আমি তোমাকে এই বিশ্বের ঈশ্বররূপেই জানি। তুমি এই জগতের যোনিরূপা প্রকৃতির ও বীজস্বরূপ পুরুষের একমাত্র কারণ। বেদের রক্ষণের জন্যে, দক্ষকে নিমিত্ত করে তুমিই যজ্ঞের সৃষ্টি করেছিলে। তুমিই ইহলোকে বর্ণাশ্রম বিধিবদ্ধ করেছ। হে মঙ্গলময়, যারা শুভকার্য সুসম্পন্ন করে তুমি তাদের স্বর্গ ও মোক্ষ দান করে থাক এবং পাপাচরণকারীদের নরক বিধান করে থাক। তাহলে কি কারণে এই নিয়মের এমন বিপর্যয় দেখা যায়? ক্রোধ দক্ষকে অভিভূত করে ফেলেছিল। তুমি জানো, যারা ভেদদর্শী, তাদের দৃষ্টি শুধু কর্মমার্গেই আসক্ত থাকে, অন্যের সমৃদ্ধি দেখলে এরা ঈর্ষান্বিত হয় এবং দুর্ব্যবহার ও দুর্বাক্যে অপরের মর্মপীড়া সৃষ্টি করে। কিন্তু এমন ব্যক্তিও তোমার মতো অনুপম সাধুব্যক্তির বধ্য নয়। কারণ, নিজের কর্মফল ও মন্দভাগ্যই তাকে বধ করে থাকে। হে দেবাদিদেব, তুমি সর্বজ্ঞ, পরম পুরুষের মায়ায় তোমার বুদ্ধি আচ্ছন্ন নয়। যারা মায়ায় অভিভূত ও কর্মে আসক্ত, তারা অপরাধী হলেও তোমার কৃপা ও ক্ষমার যোগ্য।

হে রুদ্র, তুমি প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞ বিনষ্ট করায়, সেই যজ্ঞ অসমাপ্ত রয়েছে। তুমিই যজ্ঞফল বিধান করে থাক, অথচ মূর্খ ও মোহান্ধ যাজ্ঞিকেরা তোমাকেই যজ্ঞভাগ দান করে নি। তুমি ওই যজ্ঞের পুনরুদ্ধার করো। যজমান দক্ষকে আবার প্রাণদান করো, ভগকে তার দুই চোখ, পূষাকে তার দাঁতের পাটি ও ভৃগুর গোঁফদাড়ি তুমি ফিরিয়ে দাও। যে সব যাজ্ঞিক ও দেবতারা আহত হয়েছে, তোমার ক্ষমার প্রসাদে তারাও সকলে আরোগ্য হোক। হে রুদ্র, যজ্ঞ সম্পন্ন হলে, যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে, সে সমস্তই তোমার ভাগ, অতএব, তোমার যজ্ঞভাগ গ্রহণ করে, তুমি বিনষ্ট যজ্ঞ সম্পন্ন করাও”। 

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ব্রহ্মার অনুনয়ে সন্তুষ্ট ভব হাসিমুখে বললেন, “হে প্রজানাথ, দেবমায়ায় আচ্ছন্ন মূঢ়দের অপরাধ আমি গণ্য করি না কিংবা চিন্তাও করি না। তাদের শিক্ষার জন্যে আমি শাস্তিবিধান করেছি মাত্র। প্রজাপতি দক্ষের মাথা হোমকুণ্ডে দগ্ধ হয়েছে, এখন তাঁর ছাগলের মাথা হবে। ভগ, মিত্র নামক দেবতাদের চোখ দিয়ে নিজের যজ্ঞভাগ দেখতে পাবেন। পূষা যখন একলা যজ্ঞভাগ ভোগ করবেন, তখন পিষ্টখাদ্য ভোজন করবেন, আর অন্য দেবতাদের সঙ্গে ভোজনের সময়, যজমানের দাঁতে ভোজন করবেন। যে সব দেবতারা আমার যজ্ঞের অবশিষ্ট ভাগ নির্ধারণ করলেন, তাঁরা অচিরেই সুস্থতা লাভ করুন। যাঁদের বাহু ও হাত বিনষ্ট হয়েছে, দুই অশ্বিনীকুমারের বাহু তাঁদের বাহু হয়ে উঠুক, আর পূষার হাত তাঁদের হাত হয়ে উঠুক। এবং ভৃগুর ছাগলের মতো দাড়ি হবে”।

এরপর দেবতাদের প্রার্থনায় মহাদেব স্বয়ং ব্রহ্মা ও ঋষিদের সঙ্গে দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। সেখানে ভগবান ভবের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে, তাঁর দেহে ছাগলের মুণ্ড জুড়ে দেওয়া হল এবং ভগবান রুদ্রের কৃপা দৃষ্টিতে প্রজাপতি প্রাণ ফিরে পেয়ে, যেন সদ্য ঘুম ভেঙে জাগ্রত হলেন। আগে শিবের প্রতি বিদ্বেষের জন্যে প্রজাপতি দক্ষের চিত্ত মলিন ছিল, এখন মহাদেবকে দেখে তাঁর অন্তর শরতের সরোবরের মতো নির্মল হয়ে উঠল। তিনি ত্রিলোচন শংকরের স্তব করতে গিয়েও করতে পারলেন না, কারণ তাঁর মনে পড়ে গেল মৃতা কন্যার কথা। কন্যার প্রতি মমতায় ও শোকে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। অনেকক্ষণ পর নিজের মনকে সংযত করে প্রজাপতি দক্ষ বললেন, “হে ভগবান, দেবসভায় আপনার চরম অপমান করেছিলাম বলেই আপনি কৃপা করে আমার শাস্তি বিধান করেছিলেন। আমার তত্ত্বজ্ঞানের অভাবের জন্যে, আমি আপনাকে সভার মধ্যে কুবাক্যে নিন্দা করেছিলাম, সেই কারণে আমার অধঃপতন হয়েছিল। আপনি সে সব অপরাধ ক্ষমা করে, আপনার দয়ার দৃষ্টিতে আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার এই উপকারের ঋণ আমার পক্ষে শোধ করা সম্ভব নয়। অতএব আপনি নিজের পরোপকারে নিজেই সন্তুষ্ট হোন”।

চলবে...


মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪২

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

 তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের শুরু - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিকের শুরু - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "




[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪১"


৪৭

 

বাইরে সন্ধে নামছে। বিশাল ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। একটি মাত্র দীপের আলোয় – ঘর আলোকিত হয়নি, অন্ধকার ফিকে হয়েছে মাত্র। ছেলেদের অধিকাংশই তখনও ঘরের একদিকে মেঝেয় শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মহিলারা – কমলিমা, পালি, সুরমি – বসে আছেন মইলি, বিশুন আর দীপানের খাটুলির পাশে। কুসি আর ভুটিক বসে আছে কমলিমায়ের পাশে।  

কবিরাজমশাইয়ের সৎকার সেরে ভল্লারা ফিরল। বাইরের কুয়োতলায় হাতপা ধুয়ে সকলেই কমলিমায়ের পাশে বসল। কমলিমা একটু কড়া সুরে বললেন, “তোরা কাপড়চোপড় কেচে স্নান করে এসেছিস তো – তা নাহলে আমাদের কাউকে ছুঁবি না”।

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “ও নিয়মটা আমাদের দিকেও মানতে হয়, মা। এতটুকু নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। শ্মশানের কাজ সেরে দীঘির জলে স্নান সেরেই আমরা এসেছি”।

“মানলেই ভালো। বাড়ির বাইরে গেলেই ছেলেরা দেখি উড়নচণ্ডে হয়ে যায় – বস, আমি তোদের খাবার বেড়ে আনি”।

ভল্লা বলল, “আমি এখন আর খাব না, মা। ভাল্লাগছে না। একবারে রাত্তিরেই খাবো। ওদের দে”।

খাওয়ার তেমন ইচ্ছে কারও ছিল না। ভল্লার সঙ্গে গিয়েছিল, সুরুল, আহোক, রামালি, শুকু, অমরা, কিশনা। তারা সকলেই লোভীর মতো ঘুমন্ত সঙ্গীদের দিকে দেখছিল। কতক্ষণে চোখ বন্ধ করে ওদের মতো শরীরটা এলিয়ে দেওয়া যায়।

কুসি বলে উঠল, “বাঃ রে, জেঠিমা তোমাদের জন্যে না খেয়ে বসে আছেন – এখন তোমরা না খেলে কী করে হবে?”

ভল্লা মুহূর্তের মধ্যে সুর বদলে বলল, “আর কখন খাবার দিবি মা? খিদেয় পেট যে জ্বলে যাচ্ছে...কুসি জেঠিমার সঙ্গে যা তো, বোন – হাতে হাতে ধরে আনবি”। মহিলারা সকলেই উঠে গেলেন কমলিমায়ের সঙ্গে। আহোক ফিসফিস করে বলল, “সত্যিই এখন খেতে একটুও ইচ্ছে হচ্ছে না। ভাবছি কতক্ষণে ঘুমোব”।

ভল্লা বলল, “এখন ঘুমোলে চলবে? কমলিমা বসে আছেন, আমাদের কথা শোনার জন্যে – কাল রাত্রে কী হল, আজ সকালে কবিরাজমশাইয়ের সৎকার কেমন হল...”।

আহোক বলল, “কালকে রাতের ঘটনা - আমি আর কিশনা ভোরেই জেঠিমাকে অনেকটা বলেছি – তারপর তো আমরা বেরিয়ে গেলাম। বাকিটা নিশ্চয়ই কেউ বলেছে...”।

ভল্লা বলল, “মনে হয় না – প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা সবে সামলে উঠছিলেন, তারপরেই এসে পড়ল  কবিরাজমশাইয়ের মৃত্যু – কমলিমায়ের কাছে এ ধাক্কাটাও বড়ো সহজ নয়। তার ওপর এতগুলো ছেলের জন্যে রান্না করেছেন, খাইয়েছেন, মইলিদের দেখাশোনা করেছেন... সময় পেয়েছেন বলে মনে হয় না”।

মহিলারা সবাই মিলে খাবারের থাল এনে একে একে সবার সামনে রাখলেন। কমলিমা এসে বসলেন, ভল্লাদের সামনে। ভল্লা বলল, “তোর খাবার কই, মা? আমাদের সঙ্গে না খেলে – আমরাও খাব না।”

কুসি দৌড়ে গিয়ে কমলিমায়ের থাল এনে দিতে, কমলিমা বললেন, “এবার খুশি? গ্রামের লোকেরা কী বলল রে, কবিরাজমশাইয়ের মৃতদেহ দেখে?”

ভল্লা বলল, “কী বলবে বল দেখি মা? পর পর দু -দুটো ইন্দ্রপতন। দু-দুটো মহীরূহ – যার ছায়ায় গ্রামের মানুষ শান্তিতে বাস করত – ভরসা করত – সে দুটোই পর পর ভেঙে পড়ল ঝড়ে…। তারপর ধর মা, হানো গেল সাপের দংশনে। শল্কুটা কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল – আজ পর্যন্ত তার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। মানুষ কত শোক আর করবে বল তো, মা?”

সুরুল বলল, “এখন আর কেউ শোক করে না, জেঠিমা – সকলের চোখেমুখেই এখন আগুন। পারলে লাঠিপেটা করে আস্থানের রক্ষীদের মারবে…কুকুরের মতো”।

আহোক বলল, “আমাদের গ্রামের লোকরা বোধহয় গ্রামের নামই পালটে দেবে, জেঠিমা। ভাবনা চিন্তা করছে। নাম রাখবে জুজাকপুর কিংবা জুজাকগাঁ। আমাদের দীঘির ঘাটে যে বড় অশ্বত্থগাছটা আছে – তার নাম দেবে কবিরাজতলা”।

রামালি বলল, “শুনলাম, সামনের বছর থেকে, গ্রামের কেউ একটা কানা-কড়িও কর দেবে না রাজাকে। বরং সেই করের টাকা জমিয়ে নিজেরাই গ্রামের নানান কাজ করাবে…”।

কমলিমা অবাক হয়ে বললেন, “বলিস কী? গ্রামের লোক পাগল হয়ে গেছে নাকি? রাজা এসব চুপচাপ মেনে নেবে?”

আহোক বলল, “তা জানি না, জেঠিমা – কিন্তু গ্রামের লোক সে কথাই বলছে। তারা আরো কী ঠিক করেছে জানো? তুমি হবে আমাদের গ্রামপ্রধান”।

“আমি?” কমলিমা খাওয়া ভুলে তাকিয়ে রইলেন আহোকের মুখের দিকে, “রক্ষে কর বাবা। প্রধানকে দেখেছি তো, দুশ্চিন্তায় কত রাত ঘুমোতে পারত না…। কেন গ্রামে আর কেউ ব্যাটাছেলে নেই? আমাকে নিয়ে পড়ল কেন, সবাই?

ভল্লা বলল, “তুই কেন নয় বল দেখি মা? গ্রামের ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি সবাই তোকে মানে, ভালোবাসে – ভরসা করে – তুই হবি না কেন, মা”?

ঘুম ভেঙে গেলেও একটু ঘোর-ঘোর অবস্থায় ছিল মইলি, কমলিমার প্রধান হওয়ার কথা কানে যেতেই – সে উঠে বসার চেষ্টা করতে লাগল। কমলিমা দেখতে পেয়েই বললেন, “কুসি, একটা বল্লম নিয়ে আয় তো মা – মইলির কোমরটা ভাঙি – বলা পঞ্চাশ বার করে বলে গেছে – এখন অন্ততঃ তিনদিন তোর উঠে বসা চলবে না…লড়াই করে দাবনা ফালা করে এসে, পাকামি করছিস মুখপোড়া”?

মইলি চুপ করে শুয়ে পড়ল আবার, একটু হেসে বলল, “তুমি যদি প্রধান হও, তোমাকে আমি মা ডাকব – তোমার কথার অবাধ্যও হবো না। না হলে…”। মইলি কথা শেষ করল না, কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকাল।

 

নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল মারুলা। ভল্লার পাশে বসে বলল, “বাঃ আমাকে বাদ দিয়েই তোরা খেতে বসে গেছিস? কমলিমা, আমার কপালে দুখানা রুটি জুটবে না?” কমলিমা কিছু বললেন না, কুসিকে ইশারা করতেই মারুলার খাবার চলে এল। মারুলা খাওয়া শুরু করে বলল, “যা খিদে পেয়েছিল না… কাল দুপুরের পর থেকে পেটে কিছু পড়েনি। চরকির মতো ঘুরে চলেছি – দিন ভর…”।

কমলিমা চমকে উঠে বললেন, “সে কি বাবা? আজ সারা দিনেও খাওয়া হয়নি?”

মারুলা বলল, “না মা। আস্থানের যা অবস্থা – আমাদের জন্যে রান্না করবে কে? আর দুটো রুটি আর ডাল…হবে মা?” কুসি আবার দৌড়ল।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “আস্থানের কারো খাওয়া হয়নি?”

“তা হবে না কেন? শষ্পক আর আধিকারিকদের পাকশালায় রান্না হয়েছে। কিন্তু রক্ষীদের দল তো সব পগার পার – তাদের রাঁধুনি সহ। কেউ নেই আস্থানে। শষ্পকের বিশেষ রক্ষীরাই এখন আস্থানের রক্ষী হয়ে গেছে”।

“শষ্পক তোকে বলল না, ওদের পাকশালায় খেয়ে নিতে?”

“বলেছিল – অনেকবার বলেছিল – আমিই যাইনি। শষ্পক বললেও – সবাই তো আর সমান নয় – কে কী বলে বসবে। তার ওপর শষ্পক আমাকে পাঠালো বীজপুর – রাজধানীর চিঠি দিয়ে…সেখান থেকেই সোজা এখানে এলাম। বহুদিন পর ঘোড়ায় চড়লাম, বুঝেছিস ভল্লা – কী সুখ রে ভাই – ঝড়ের বেগে গেলাম – ঝড়ের বেগে ফিরলাম। রাত্রে আবার আস্থানে ফিরে শষ্পককে সব সংবাদ জানাতে হবে”।

খাওয়া শেষ করে মারুলা মুখ তুলে বলল, “কেমন আছিস রে, জুজাক? আর সেই দুই জুজাক? তোদের কারো নাম জানি না রে”।

মইলি হেসে বলল, “ভালই আছি, গোলোকদাদা। আমার নাম মইলি। ওরা এখনও ঘুমোচ্ছে – দীপান আর বিশুন। কবিরাজ ঘুমের বটিকা দিয়েছিল – তারই রেশ…”।

একটু পরে ভল্লা বলল, “তিনটে স্তম্ভের প্রহরীকে তো বেশ নিঃশব্দেই শেষ করলি, মারুলা, কিন্তু শেষ স্তম্ভের রক্ষীটা অমন করে নীচেয় টপকে গেল কী করে বল তো?”

মারুলা বলল, “কে জানে? ব্যাটা বোধহয় একদম ধারে দাঁড়িয়ে ঝিমোচ্ছিল, অথবা নেশা-টেশা করেছিল। আরে, ও পড়ে যেতে যা ভয়ংকর শব্দ হল, আমি তো চমকে উঠেছিলাম – এবার কী হবে? আমি তো তখনও জানি না, উপানু হতভাগাটা মরেছে কিনা, কিংবা তোরা সবার ঘরে শেকল তুলে দিতে পেরেছিস কিনা। শব্দটা হতেই আমার মনে হল, সব রক্ষীরা যদি একসঙ্গে বেরিয়ে আসে – তাহলে কী হবে?”

একটু থেমে মারুলা আবার বলল, “আমি কয়েক মুহূর্ত একটু থমকে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়াতে অনেকটা ধাতস্থ হলাম। তারপরই দেখলাম দুজন রক্ষী প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বন্দীশালার দিকে এগোচ্ছে। ওরাও শব্দটা পেয়ে কীসের শব্দ দেখতে যাচ্ছিল মনে হয়। আমাদের দিক থেকে দুই জুজাক একসঙ্গে ভল্ল ছুঁড়ে দুটোকেই এক এক ঘায়ে শেষ করল। যাই বলিস আর তাই বলিস, তোর শিষ্যরা ভালই শিখেছে, ভল্লা...। মাত্র মাস দেড়-দুয়েকের মহড়ায় এমন লক্ষ্যভেদ...।  

কিন্তু একটু গণ্ডগোল হয়ে গেল, পশ্চিমের দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে যারা ঘাপটি মেরে বসেছিল, শুরুতে তারা আমাদের লক্ষ্যই করেনি,  কিন্তু আমাদের দিক থেকে ভল্লা ছোঁড়াতে ওরা আমাদের অবস্থানটা টের পেয়ে গিয়েছিল। অতএব ওরাও আচমকা দুখানা ভল্ল ছুঁড়ল আমাদের দিকে। আমাদের দুই জুজাক আহত হয়ে গেল”।

আহোক বলল, “হ্যাঁ, দীপান আর বিশুন”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম স্তম্ভে উঠে যাওয়া আমাদের জুজাক...”।

রামালি বলল, “বাপালি”।

মারুলা বলল, “আচ্ছা। ওই বাপালি ওখান থেকে ভল্ল ছুঁড়ে অন্ততঃ একটাকে শেষ করল বুঝতে পারলাম। কিন্তু বুদ্ধি করে, ভল্লা ছুঁড়েই বাপালি মেঝেয় শুয়ে পড়েছিল। লুকিয়ে থাকা লোকগুলোকে বেশ কিছু তির ওর দিকে ছুঁড়তে দেখলাম, কিন্তু বাপালির কোন ক্ষতি করতে পারল না। আমি বুঝতে পারলাম, লুকিয়ে থাকা রক্ষীগুলো ফাঁদে পড়েছে – ওরা ওখান থেকে সংকেত দিতে শুরু করল...”।

এবার ভল্লা বলল, “উপানু আর দুই রক্ষীকে মেরে, আমি আর রামালি এগিয়ে গিয়েছিলাম পশ্চিমের দরজার দিকে। মইলির ক্ষত বেঁধে সুরুলকে বললাম, তুই মইলির সঙ্গে থাক। সহাধিকারিকের ঘরের কোনায় ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আমরা দেখলাম, ওরা তিনজন লুকিয়ে আছে। মনে মনে হিসেব করে দেখলাম, আমরা দুটো রক্ষী মেরেছি, বাপালি মেরেছে একটা, আর বাইরে থেকে ছোঁড়া ভল্লে মরেছে দুই – অতএব পশ্চিমের রক্ষীদের হিসেব মিলে গেল। আমি সংকেত দিতেই বাপালি আরেকটাকে মারল ভল্লা ছুঁড়ে, প্রায় একই সঙ্গে রামালি মারল আর একটাকে। রইল বাকি এক। আমাদের সবার কাছেই ভল্লা ছিল দুটো করে, বুঝতে পারলাম বাপালির কাছে আর ভল্লা নেই। অর্থাৎ যা করার আমাদেরই করতে হবে।

ও বাবা, তারপরেই কোনা থেকে উঁকি মেরে  দেখি, বেড়ার বাইরে থেকে একটা মুণ্ডু উঁকি মারছে – রামালি ফিসফিস করে বলল, অমরা...তার একটু পরেই অমরার ভল্ল গিঁথে গেল রক্ষীটার মাথায়। বাপালি আর অমরা একইসঙ্গে সংকেত দিল সব রক্ষী শেষ। অমরা তুই অত উঁচু বেড়ার ওপরে নিঃশব্দে উঠলি কী করে?” 

অমরা ডাল চাঁটতে চাঁটতে বলল, “গোলোকদাদা বুদ্ধিটা দিল  - আমাকে কাঁধে চাপিয়ে তুলে ধরেছিল বিঠল। এতটুকু নড়াচড়া করেনি – গায়ে খুব জোর আছে বিঠলের”। 

ভল্লা বলল, “ব্যস্‌, তারপর মারুলা দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকল। চাবি বের করে খুলে দিল দরজা। আমাদের সবাই ভেতরে ঢুকতে, প্রথমেই মইলি, দীপান আর বিশুনকে এখানে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর আমরা ছজন ছাড়া বাকিদেরও পাঠিয়ে দিলাম। আমরা রইলাম কবিরাজমশাইকে মুক্ত করার জন্যে...কিন্তু সে আর হল না”।

অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না, চুপ করে বসে রইল। একসময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা বললেন, “যা উঠে হাত মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়। জীবনের সব সাধ কী আর পূর্ণ হয়? হয় না। ওদের কোমর তো কাল তোরা ভেঙে দিয়ে এলি – ওরা কি চুপ করে বসে থাকবে? ওরা পালটা আঘাত হানবে না? আজ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নে। ওদের সেই আঘাত কী করে সামলাবি - কাল থেকে সে চিন্তা শুরু করিস”।

মারুলা বলল, “না কমলিমা, অত দুশ্চিন্তা করো না। আপাততঃ আস্থানের যা পরিস্থিতি ছেলেরা কম করে দিন পনের নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। আমার মনে হয় সকলেই নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যাক কাল সকালেই। যে তিনজনের আঘাত লেগেছে – তারাও ফিরে যেতে পারে যে যার ঘরে। তাতে কবিরাজ বড়্‌বলাকে প্রতিদিন এতদূর আসতে হবে না। এর মধ্যে রাজধানী থেকে কী সংবাদ আসে দেখা যাক। তারপর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে”।

সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মারুলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এখন বেরোব কমলিমা, আস্থানে ফিরতে হবে। আর কমলিমা, যতদিন না আস্থানে আমার দুমুঠো খাওয়ার কোন ব্যবস্থা হচ্ছে, আমার জন্যে দুবেলাই কটা রুটি বেশি বানিও”।

কমলিমা বললেন, “সে কথা বলতে হবে না, বাছা... আমি থাকতে তোর খাওয়ার অভাব কোনদিন হবে না”।

“ভল্লা চললাম রে। মা কি তোর একলার রে শালা, আমারও মা...”, হাসতে হাসতে বলে,  মারুলা বেরিয়ে গেল।

চলবে...

 


সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৯

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৮"]


৫.৫.১ অন্যান্য হিন্দু দেবতা

হিন্দুদের ত্রিদেব - অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ছাড়াও জনপ্রিয় আরও বেশ কিছু দেবতা রয়েছেন, যেমন কার্তিকেয়, গণেশ বা গণপতি। যদিও ষড়ানন কার্তিকেয় বা কার্তিকের জন্ম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে, তবু কার্তিক ও গণেশ, দুজনেই ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর পুত্র হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ভগবান গণেশের প্রধান দুটি রূপের মধ্যে প্রথমটি হল তিনি সিদ্ধেশ্বর বা সিদ্ধিদাতা এবং দ্বিতীয়টি হল বিঘ্নেশ বা বিঘ্ন নাশকারী। ভগবান গণেশ ভারতীয় হিন্দু বণিকমহলের একমাত্র দেবতা, তিনিই বাণিজ্যে সিদ্ধি এবং ঋদ্ধি দান করেন। দেবতা হনুমান, তিনি প্রধানতঃ সংকট-মোচন এবং বিঘ্ন-নাশকারী ভারতের সর্বত্র পূজিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেবতা বিশ্বকর্মা শিল্পী, কলাকুশলী ও দক্ষ কারিগর মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৫.৫.২ দেবীরূপা নদী

নদীসমূহতে দেবীত্ব আরোপ করার প্রাচীন প্রচলন যে অনার্য ভারতীয়দের মধ্যে ছিল, সেকথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ব্রাহ্মণ্যধর্ম সেই নদীগুলিকেও নানান পৌরাণিক কাহিনীতে সাক্ষাৎ দেবীরূপে বরণ করে, হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে নিল। হিন্দু ধর্মের যে কোন দেব বা দেবী পূজায় জলশুদ্ধি একটি আবশ্যিক প্রকরণ এবং তার মন্ত্রটি হল, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু”।।

মন্ত্রোক্ত সাতটি নদীকে ভারতবর্ষের পবিত্রতম নদী হিসেবে মান্য করা হয়, যদিচ এগুলির মধ্যে সরস্বতী নদী খ্রিস্টিয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যেই অবলুপ্ত হয়েছিল এবং সিন্ধু নদী ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর ভারতবর্ষের বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু তাও পূজার সময় কোশা-কুশি বা তাম্র কুণ্ডের জল স্পর্শ করে, আজও আমরা এই মন্ত্রই উচ্চারণ করি, এবং বিশ্বাস করি ওই জলে সাতটি নদীর পবিত্র জল যেন সংস্থিত হল। এই মন্ত্রটির আপডেটেড ভার্সান, “গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি মহানদী। নর্মদে কৃষ্ণা কাবেরি জলেস্মিন সন্নিধিং কুরু” হওয়া যুক্তিযুক্ত হলেও, আমরা সেই ১৩০০ সি.ই.-র আগের মন্ত্রই সংস্কারবশতঃ ব্যবহার করে চলেছি ও চলব।

 যাই হোক, এই সাতটি পবিত্র নদীর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নদী গঙ্গা ও নর্মদা। গঙ্গা এবং নর্মদা সাক্ষাৎ দেবী মূর্তিতে পূজিতা হয়ে থাকেন।

৫.৫.২.১ গঙ্গা

গঙ্গা মকরবাহনা দেবী। একদিকে গঙ্গা ও তাঁর অজস্র শাখানদী ও উপনদীর পবিত্র জলধারায় উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ জনজীবন একান্তভাবেই নির্ভরশীল। অন্যদিকে তিনিই পাপীজনের সকল পাপ ও কলুষহারিণী। গঙ্গার ভৌগোলিক উৎস যেখানেই হোক, পৌরাণিক মতে গঙ্গার উৎপত্তি ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে। ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রবল জলধারার প্রপাত ধারণ করার সাধ্য পৃথিবীর ছিল না, অতএব ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব তাঁর জটায় গঙ্গার সেই প্রপাত ধারণ করলেন। তারপর ভগীরথের প্রদর্শিত পথে গঙ্গা হিমালয় থেকে নেমে এলেন এবং দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষ করলেন বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমে।   

এ গেল পূতসলিলা গঙ্গা নদীর পৌরাণিক কাহিনী। এ ছাড়াও আছে দেবীরূপা গঙ্গার কাহিনী। তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কুরুরাজ শান্তনু, গঙ্গাদেবীকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। দেবী গঙ্গা প্রথমে নারাজ হলেও, শর্ত সাপেক্ষে শান্তনু-জায়া হতে সম্মতা হলেন। শর্ত ছিল, তাঁর গর্ভজাত পুত্রদের তিনি জন্ম মূহুর্তেই গঙ্গাজলে বিসর্জন দেবেন, এবং তাঁর এই আচরণ বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে রাজা শান্তনুকে। নচেৎ তিনি তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করবেন স্বামী ও সদ্যজাত পুত্রকে। রাজা শান্তনু নির্দ্বিধায় এই শর্ত মেনে নিলেন। তারপর “ত্রিপথগামিনী গঙ্গা রমণীয় কলেবরধারণপূর্বক পরম ভাগ্যবান শান্তনু রাজার মহিষী হইয়া মনোহর হাব-ভাব বিলাস ও সম্ভোগাদি দ্বারা নরেন্দ্রের মন মোহিত করিলেন”।

কয়েক বছরের মধ্যে দেবী গঙ্গা দেবতুল্য সাতটি পুত্র সন্তান প্রসব করেছিলেন এবং পুত্ররা ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র তাদের সকলকেই গঙ্গার ধারাস্রোতে বিসর্জন দিচ্ছিলেন। রাজা শান্তনু প্রতিবারই দেবী গঙ্গার এই আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও প্রিয়তমা জায়ার বিরহের কথা মনে করে নির্বিকার রইলেন। এরপর অষ্টম পুত্র ভূমিষ্ঠ হতেই রাজা শান্তনু আর থাকতে পারলেন না, পুত্রশোকে কাতর হয়ে বললেন, “এই পুত্রকে বিনষ্ট করিও না; তুমি কে? কী নিমিত্ত আত্মজদিগের প্রাণবধ করিতেছ? তুমি এই গর্হিত নিষ্ঠুরাচরণে ক্ষান্ত হও”।

তখন দেবী গঙ্গা বললেন, “আমি এখন থেকেই তোমার সহবাস ত্যাগ করলাম। আমি মহর্ষি জহ্নুর কন্যা, আমি গঙ্গা বা জাহ্নবী। আমি যে সাতটি পুত্রকে গঙ্গা স্রোতে বিসর্জন করেছি, তাঁরা কেউই সাধারণ মানুষ নন, তাঁরা অষ্ট বসুর সাতজন। মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপে তাঁরা মনুষ্য জন্ম নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তুমি তাদের পিতা এবং আমি তাদের মাতা হয়ে তাদের গর্ভে ধারণ করেছিলাম, এবং জন্ম মূহুর্তেই তাদের গঙ্গাস্রোতে বিসর্জন দিয়ে তাদের শাপমুক্তি ঘটিয়েছি। তাঁদের যে প্রতিশ্রুতি আমি দিয়েছিলাম, আজ আমি তার থেকে মুক্ত হলাম। অতএব আপনার সঙ্গে আমার পূর্ব শর্ত অনুযায়ী আমি ফিরে চললাম আমার নিজস্থানে। আপনি আমার এই পুত্রকে গ্রহণ করুন, সে গঙ্গাপুত্র দেবব্রত নামেই আপনার কাছে বড়ো হয়ে উঠুক”। এই শিশুই বড়ো হয়ে মহাবীর ও মহাজ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন, এবং পিতাকে সন্তুষ্ট করতে কঠোর প্রতিজ্ঞা করে “ভীষ্ম” নাম অর্জন করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই এক সময় কৌরব বংশ যেমন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ গোষ্ঠী হয়ে উঠেছিল, তেমনি তাঁর উদাসীনতায় তার ভয়ংকর পতনও হয়েছিল। তাঁর পরোক্ষ সহযোগিতায় কুরু গোষ্ঠীর জ্ঞাতিশাখা পাণ্ডবরা উঠেছিলেন উন্নতির শিখরে এবং ঘটনাচক্রে তৃতীয়-পাণ্ডব বীর অর্জুনই হয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর কারণ। [মহা/আদি/৯৮]                      


৫.৫.২.২ নর্মদা

নর্মদা গঙ্গার মতো বিষ্ণুপদী নন। তিনি রুদ্রের কন্যা - ভগবান মহাদেবের তেজ থেকে তাঁর জন্ম। গঙ্গার অপরিসীম মহিমার কথা মনে রেখেও মহর্ষি ভৃগু, কর্দম, কপিল, দুর্বাসা, অণীমান্ডব্য প্রমুখ বলেছেন নর্মদা ভারতবর্ষের সমস্ত নদীকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠা; রুদ্রের তেজ থেকে তিনি সমুৎপন্না; স্থাবর জঙ্গম সমস্ত কিছুকেই তিনি ত্রাণ করেন। শুদ্ধচিত্তে তাঁর তট পরিক্রমা করলে সর্বসিদ্ধি উপলব্ধি করা যায়।

মহাভারতের বনপর্বে ঋষি পুলস্ত্য যুধিষ্ঠিরের তীর্থ ভ্রমণের সঙ্কল্পের কথা শুনে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, “দেখ যুধিষ্ঠির তুমি অন্যান্য তীর্থে তো যাবেই, কিন্তু বিশেষ করে ত্রিলোক-প্রসিদ্ধা নর্মদা দর্শনে অবশ্যই যেও। নর্মদায় পিতৃপুরুষ এবং দেবতাদের তর্পণ করলে, অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের তুল্য ফললাভ হয়”।

নর্মদার উৎস মধ্যপ্রদেশের অনুপপুর জেলার মহাতীর্থ অমরকণ্টকে, যার অপর নাম মেকলে বা ঋষ্য – বিন্ধ্য পর্বতের একটি শৃঙ্গ। এই নদী মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাটের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমদিকে প্রবহমানা, এবং এই দুই রাজ্যের জলসম্পদের প্রধানতম উৎস। এই নদীর দৈর্ঘ প্রায় ১,৩১২ কি.মি. এবং গুজরাটের খাম্বাৎ খাঁড়ির কাছে আরব সাগরে মিলিত হয়েছে। এই মোহানা থেকে ৩০ কি.মি. দূরের ভারোচ শহর, যার প্রাচীন নাম ছিল ভৃগুকচ্ছ, প্রাচীন সমুদ্র বন্দর ও হিন্দুদের প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র।

নর্মদার উত্তর তট বরাবর দাঁড়িয়ে আছে বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণী আর দক্ষিণতটে সাতপুরা পর্বতমালা। আজ থেকে একশ বছর আগেও নর্মদার উভয় তীরে ছিল শ্বাপদসংকুল দুর্ভেদ্য অরণ্য রাজি। এই নিবিড় অরণ্য, দুই পর্বতশ্রেণী এবং তার মাঝখানে প্রবহমানা স্রোতস্বিনী নর্মদার জন্যেই উত্তরভারত থেকে দক্ষিণভারতের যাওয়ার স্থলপথ বহুদিন দুরধিগম্য ছিল। নর্মদা উপত্যকার প্রাচীনতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই, কারণ ধারণা করা হয়  এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূভাগ গণ্ডোয়ানাভূমির একটি অংশ। এই অঞ্চলের পলির নানান স্তরে বেশ কিছু ডাইনোসোরসের জীবাশ্মও উদ্ধার করা গেছে।

এই নদীর উভয়তটেই অনার্য মানুষের সম্পন্ন জনপদ ও গ্রামের প্রাগৈতিহাসিক কালের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে বিস্তর। ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক কালে আমরা যে সব সম্পন্ন নগর ও জনপদের সন্ধান পাই সেগুলি হল, মাহিষ্মতী, উজ্জয়িনী, বিদিশা, চেদি ইত্যাদি। 

নর্মদা - এই ত্র্যক্ষর শব্দটি শৈবদের কাছে “গায়ত্রী”-র সমতুল্য একটি বীজমন্ত্র। নৃ ধাতু থেকে নর্ম বা নর্মন  শব্দটি নিষ্পন্ন করা যায় – নর্ম কথার অর্থ ক্রিয়া, খেলা বা লীলা, আরও সঠিক বললে, আনন্দ-লীলা।  অতএব নর্মদা কথার অর্থ যিনি আনন্দ-বিলাস দান করেন। এই আনন্দের সংজ্ঞা মিলবে তৈত্তিরীয় উপনিষদের তৃতীয় ভৃগুবল্ল্যধ্যায়ের ষষ্ঠ অনুবাকে –

“আনন্দই যে ব্রহ্ম একথা জেনে রাখুন। কারণ আনন্দ থেকেই এই জীব ও জড় জগতের সৃষ্টি হয়, আনন্দের আবহেই তারা প্রতিপালিত হয় এবং অন্তিমে এই আনন্দেই তারা ফিরে আসে ও আনন্দেই বিলীন হয়” [বাংলায় সরল অনুবাদ – লেখক]। অতএব নর্মদা শুধু স্থূল ও সাধারণ জলধারা নয়, চিন্ময়ী রূপে তিনি ব্রহ্মস্বরূপা আনন্দময়ীও। নর্মদার অন্য নাম রেবা, এই নামও বীজমন্ত্রের মতো জপ করলে, শোনা যায়, সর্বসিদ্ধি লাভ সম্ভব।

নর্মদার পবিত্রতা সম্পর্কে আরও জনশ্রুতি হল, সারাদিন স্নানরত পাপী ও তাপীদের পাপ ও কল্মষ ধুতে ধুতে পতিতপাবনী গঙ্গা নিজেই যখন মলিন হয়ে ওঠেন, দিনান্তে তিনি নর্মদা তটের কহ্লোড়ি ঘাটে আসেন কৃষ্ণা গাভীর বেশে। এবং নর্মদার পূত সলিলে অবগাহন করে নির্মল শুভ্র গাভীরূপে ফিরে যান স্বস্থানে। শিব ভক্তগণ আরও বিশ্বাস করেন, নর্মদাতটের প্রতিটি কংকর – অর্থাৎ প্রতিটি নুড়ি এবং কাঁকরই শিবময় শংকর। অতএব উওরভারতে কাশি যেমন একটি শিবক্ষেত্র, নর্মদা তট তার থেকেও বরেণ্য শিবক্ষেত্র।              

 

৫.৬.১ হিন্দু দেবী

বৈদিক দেবীদের তুলনায় হিন্দু দেবীর সংখ্যা এবং তাঁদের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য দর্শনের প্রকৃতি, যাঁর সংযোগে পুরুষোত্তম ব্রহ্ম এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করে থাকেন, হিন্দু ধর্মে সেই প্রকৃতি হয়ে উঠলেন দেবী - তিনিই আদ্যাশক্তি, মহামায়া। ভগবান বিষ্ণু বা বলা ভাল তাঁর প্রধান অবতার শ্রীকৃষ্ণের মহিলা-মোহিনী মহিমা থাকা সত্ত্বেও, ভাগবত মতে দেবীদের প্রাধান্য নেই বললেই চলে। বিষ্ণুপ্রিয়া লক্ষ্মীদেবী বিষ্ণুর, সীতাদেবী শ্রীরামচন্দ্রের এবং শ্রীকৃষ্ণপ্রিয়া শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের পাশে পূজিতা হয়ে থাকেন। যদিও এই তিনদেবীর মধ্যে লক্ষ্মীদেবীর জনপ্রিয়তা সর্বজনীন, সম্পদের দেবী হিসেবে প্রত্যেক হিন্দুর ঘরেই তিনি স্বাধীনভাবে পূজিতা হয়ে থাকেন। তবে সেই লক্ষ্মীদেবী, যত না সমুদ্রমন্থনে উত্থিতা বিষ্ণুর পত্নী হিসেবে পূজিতা হন, তার থেকে অনেক বেশি পূজিতা হন, মহাদেব ও পার্বতীর কন্যা হিসেবে। ভাগবত মতে মাতৃকাদের যে নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল, পৌর্ণমাসী, পদ্মা, অন্তরঙ্গিকা, গঙ্গা, কলিন্দতনয়া, গোপী, বৃন্দাবতী, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী, গো, বৈষ্ণবী, শ্রীযশোদা, দেবহূতী, রোহিণী, শ্রীসতী, দ্রৌপদী, কুন্তী এবং শ্রীকৃষ্ণের দশ পত্নীগণ, যাঁদের নাম আগেই বলেছি। এঁদের মধ্যে গঙ্গা, গায়ত্রী, তুলসী, পৃথিবী ও গো মাতৃকার পূজা ভারতের সর্বত্রই প্রচলিত, অন্যান্য মাতৃকারা অঞ্চলভেদে পূজিতা হয়ে থাকেন।  

অন্যদিকে ভগবান মহেশ্বরের পত্নীদের সকলেই মহামায়া আদ্যাশক্তির বিভিন্ন রূপ। কখনো তিনি সতী, কখনো গিরিকন্যা উমা বা পার্বতী বা গৌরী। ভক্ত হিন্দুদের মনে এই দৈব দম্পতি হর-গৌরী, দাম্পত্যের আদর্শ ও প্রতীক। পার্বতী বা গৌরী একদিকে পতিনিষ্ঠ পত্নী - প্রেমে, অভিমানে, অনুরাগে, অনুযোগে মাধুর্যের শেষকথা। আবার অন্যদিকে তিনিই মাতৃস্বরূপা– তিনি শুধুমাত্র লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ জননীই নন, তিনি ভক্তজনেরও মাতা, তিনি তাদের দুর্গতিনাশিনী, পাপহারিণী, ভবতারিণী। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সময়ে তিনি ভক্তজন এমন কি দেবতাদের পরিত্রাণের জন্যেও শান্ত-পূত-পবিত্র পার্বতী রূপ ছেড়ে যোদ্ধারূপও ধারণ করেছেন বার বার। কখনো তিনি দেবী দুর্গা - মহিষাসুরমর্দিনী, কখনো দেবী চণ্ডী – চণ্ডমুণ্ড ও রক্তবীজ অসুরনাশিণী আবার কখনো তিনিই ব্যাঘ্রবাহিনী অম্বা। এই দেবীদের সকলেই ভারতের প্রায় সর্বত্র পূজিতা হয়ে এসেছেন এবং আজও পূজিতা হয়ে থাকেন। তাঁর আরেকটি রূপ অন্নপূর্ণা – এই রূপেই তিনি ভক্ত প্রজাদের সমৃদ্ধি, শস্য এবং সম্পদ দান করেন। দেবী লক্ষ্মী ধনের দেবী, সে কথা আগেই বলেছি। দেবী সরস্বতী বৈদিক কালে বাক্‌-দেবী বা ভাষার দেবী ছিলেন, এখন তিনি সর্ববিদ্যার দেবী। শৈব মতে ষোড়শ মাতৃকার নাম পাওয়া যায়, গৌরী, পদ্মা, শচী, মেধা, সাবিত্রী, বিজয়া, জয়া, দেবসেনা, স্বধা, স্বাহা, শান্তি, পুষ্টি, ধৃতি, তুষ্টি, আত্মদেবতা ও কুলদেবতা।

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৮

   প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রা...