রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

নামকরণ

    

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


    শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের একটু বেশি হল তিনি মা হয়েছেন – কন্যাসন্তান। তিনি ও মেয়ের বাবা বিজন আপাততঃ মেয়েকে ফুটকি বলে ডাকছেন। আর শ্বাশুড়িমা ডাকেন “জলি”। জলি নামটা খারাপ নয়, তাঁর মেয়ে খুবই হাসিখুশি – কান্নাকাটি নেই বললেই চলে – হাত-পা ছুঁড়ে যখন হাসে বিজলির মাতৃহৃদয় টইটুম্বুর ভরে ওঠে। শ্বশুরমশাই তাঁর ও বিজনের নামের আদ্যক্ষর দুটি নিয়ে “বিবি” ডাকেন।      

কিন্তু এগুলি সবই অস্থায়ী – মেয়ের জন্যে বেশ ভালো দেখে দুটো নাম ঠিক করতে হবে। তাড়াতাড়ি। তা নাহলে এই নামগুলিই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মুখে মুখে বসে যাবে। তখন ভাল নাম যাই রাখা হোক, এই নামগুলিই তাদের মনে গেঁথে রইবে। বিজনের অফিসের একজন লেখক কলিগ আছেন। ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু লেখেন। অবিশ্যি বইমেলায় ফিবছর বই ছাপা হলেই যে কেউ লেখক হয়ে যায় – এটা বিজলি বিশ্বাস করেন না। যদিও প্রতিবার বইমেলা গিয়ে ভদ্রলোকের বই তাঁদের কিনতে হয়, ঘরে এনে সাজিয়ে রাখতেও হয়। কিন্তু তিনি বা বিজন কেউই এতবছর ধরে ভদ্রলোকের একটা বইও পড়ে উঠতে পারেননি। সময় কোথায়? তাছাড়াও আছে ধৈর্যের অভাব। অবিশ্যি শ্বশুর-শাশুড়ি ভদ্রলোকের সব বই পড়েছেন, ওঁনাদের নাকি ভালোই লেগেছে পড়ে। বইমেলা কাছাকাছি এলেই শাশুড়িমা বিজনকে মনে করিয়ে দেন, হ্যারে তোদের নবীনবাবুর কোন নতুন বই এবার বেরোচ্ছে না?

সেই নবীনবাবুই বিজনের অনুরোধে, বারোটি নামের লিস্ট পাঠিয়েছেন। তার সঙ্গে জুড়েছে, তাঁর নিজের, বিজনের, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ পূজালি এবং দেওর সুজনের প্রস্তাবিত নামসমূহ। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত আটত্রিশটা নাম জড়ো হয়েছে। সুজন বিজলিকে বৌদি বলে না, বলে দিদিমণি। সে বলে, বৌদি ডেকে কানমলা খাওয়ার থেকে, দিদিমণি ডেকে কানমলা খাওয়া ঢের ভালো। তাতে নিজেকে এখনো স্কুল-বয় টাইপ মনে হয়।

বিজনরা তিন ভাইবোন। বোন পূজালি, তার বিয়ে হয়ে গেছে। সুজন সবার ছোট, কলেজে পড়ে। খুব পাকা আর ফক্কোর, বিজলির হাতে সত্যিসত্যিই কানমলা খায় প্রায়ই। এই তো গতকাল রাত্রে খেতে বসে ফুটকির নাম নিয়ে যখন কথা উঠল, সুজন ফক্কুরি করে বলল, আটত্রিশটা হয়ে গেছে, দাদা, আর মাত্র সত্তরটা হলেই...ব্যস্‌। বিজলি প্রথমে বুঝতে পারেনি, জিজ্ঞেস করেছিল, কী হবে, আরও সত্তরটা হলে? বিজন গম্ভীর মুখে বলেছিল অষ্টোত্তরশত নাম। এ কথায় বিজলির গা জ্বালা করবে না? তিনি কষে কান-মলে দিয়েছিলেন সুজনের।

 

স্কুলে ঢুকেই বিজলি হেডমিস্ট্রেস কনকদির ঘরে গেলেন। বিজলিকে দেখেই কনকদি উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে বিজলিকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, “সুকন্যা ভালো আছে তো রে? সাবধানে রাখবি, ঠাণ্ডা-ফাণ্ডা না লেগে যায়। অবিশ্যি তোর শাশুড়ি-মা আগেকার দিনের মানুষ, নাতনিকে উনি বুকে করে আগলে রাখবেন”। কনকদির আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বিজলি উল্টোদিকের চেয়ারে বসলেন। কনকদিও চেয়ারে বসে, বেল টিপে বললেন, “তুই চা খাবি তো? মা হয়ে তোর কেমন লাগছে, চা খেতে খেতে শুনব”। বেল শুনে মল্লিকা দরজায় এল, কনকদি বললেন, “আমাদের দুজনকে দুটো ফার্স্টক্লাস চা খাওয়াবি, মল্লিকা?”

মল্লিকা হাসিমুখে বলল, “এক্ষুণি আনছি, বড়দি। ওঃ বিজলিদি, আজ জয়েন করলে? আহা, কি মিষ্টি মেয়ে গো তোমার। শুধুই হাসে! আমি তো নাম দিয়েছি “হাসি”। আজ মিষ্টি খাওয়াবে না? না খাওয়ালে, ছাড়ব না কিন্তু।”

বিজলি লাজুক হেসে বললেন, “নিশ্চয়ই খাওয়াবো”।

মল্লিকা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে কনকদি বললেন, “এবার তুই কেমন আছিস বল। এসময় তোকেও খুব সাবধানে থাকতে হবে”। বিজলি বললেন, “ভালই আছি। তবে ওই একটু দুর্বল লাগে। তাছাড়া অনেকদিন শুয়ে-বসে কাটালাম তো, একটু...”। কনকদি গম্ভীর হয়ে বললেন, “হুঁ। মেয়ে পড়ানো নেই। উইকলি টেস্ট নেই, খাতা দেখার চাপ নেই...আমার বকাঝকা নেই, একটু খালিখালি তো লাগবেই”। বিজলি হেসে ফেলে বললেন, “সত্যিই তাই, বিশেষ করে আপনার ওই বকুনি...”।

“থাক থাক বুঝে গেছি। সিনিয়র হিসেবে কিছু উপদেশ দিই। বাইরের খাওয়া এড়িয়ে, ঘরেই ভালোমন্দ পুষ্টিকর খাবার খাবি। আর নিজেও হাসিখুশি থাকবি, মেয়ের সামনে রাগারাগি, ঝগড়াঝাঁটি করবি না। জেনে রাখিস, নাড়ির যোগ ছিন্ন করেই, সন্তানগর্বের আহ্লাদে অনেক আনাড়ি মা, যা খুশি শুরু করে দেয়। তারা বোঝে না, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেও বহুকাল মায়ের ওপর নির্ভর করে থাকে। মাকেই অনুসরণ করে। সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের শাস্ত্রে মেয়েদের “প্রকৃতি” বলে, জানিস নিশ্চয়ই। শ্যামা কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি...শুনেছিস গানটা? মা আমাদের হৃদয়ে আলো দেন, সব মেয়েরাই, সব মায়েরাই অলোকসামান্যা আলোকিনী!”

মল্লিকা চা নিয়ে ঘরে আসাতে কনকদির আবেগঘন উপদেশে ছেদ পড়ল। কনকদির কথায় বিজলি বেশ বোর হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়ের জন্যে কয়েকটি সম্ভাব্য নাম পেয়ে যাওয়ায় বেশ উত্তেজিতও হচ্ছিল। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কনকদি নিজের আবেগ কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, “নে চা খা। তোর ক্লাস কখন থেকে?”

বিজলি বললেন, “সেকেণ্ড পিরিয়ড থেকে। আজ মোট তিনটে ক্লাস আছে – সিক্স, সেভেন আর এইটের”।

“প্রথম দিনেই বেশি চাপ নিস না। দুটো ক্লাস নে, এইটেরটা স্নিগ্ধা সামলে নেবে। কিন্তু কী ব্যাপার বল তো, তোকে কিছুটা আনমনা দেখছি যেন? কী হয়েছে? কোন প্রবলেম?”

“না, না, কোন প্রবলেম নেই”।

“তাহলে? কিছু একটা ভাবছিস মনে হচ্ছে?”

বিজলি একটু ইতস্ততঃ করে বললেন, “না, তেমন কিছু নয়...মেয়ের কী নাম রাখা যায় সেটাই সারাক্ষণ ভাবছি...”।

কনকদি উচ্চস্বরে হেসে ফেললেন, তারপর বললেন, “এই সময়ে এর থেকে বড়ো সমস্যা আর কিছু হয় না রে। আমার দুই ছেলেমেয়ের নাম নিয়ে, ওদের বাবা আর আমি কত বিনিদ্র রজনী যে কাটিয়েছি, তার হিসেব নেই। আমার নামটাই ধর না। আমার ঠাকুমা জেদ ধরেছিলেন, আমার নাম চাঁপা রাখতে হবে। তার উত্তরে দাদু নাকি বলেছিলেন, ছ্যাঃ, চাঁপা? হাটে গিয়ে ‘চাঁপারাণি’ হাঁক পাড়লে, শতখানেক মেয়ে এসে সামনে দাঁড়াবে। শেষমেষ আমার কনকচাঁপা নাম সাব্যস্ত করে, দাদু গৃহযুদ্ধ আটকেছিলেন”।

 

আরও কিছুক্ষণ কনকদির সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিজলি গেলেন টিচার্স রুমে। টিচার্স রুম ফাঁকা সকলেই ক্লাস নিতে বেরিয়ে গিয়েছে। বিজলি মল্লিকাকে ডেকে টাকা দিয়ে বললেন, সক্কলের জন্যে মিষ্টি আনবি, কেউ যেন বাদ না পড়ে। গেটের সুখরামজি, চারজন আয়া, সুষমা, মুকুল, তুই - কেউ যেন ছুটে না যায়। আর একরকমের মিষ্টি আনবি না, রসগোল্লা আর সন্দেশ। যা দিয়েছি হয়ে যাবে তো?” মল্লিকা বলল, “যথেষ্ট। হয়ে বেশি হবে - তোমার মিষ্টি মেয়ে আরও মিষ্টি হয়ে উঠুক দিদি”।

বিজলি বললেন, “ঠিক আছে তুই এখন যা। মিনিট দশ পরেই ঘন্টা পড়বে, আমার ক্লাস আছে। টিফিনের সময় মিষ্টিগুলো সবাইকে ভাগ করে দিবি, কেমন?” মল্লিকা চলে যেতে ব্যাগ থেকে পেন আর ফুটকির নামের লিস্টিওয়ালা কাগজটা বের করে, বিজলি কয়েকটা নতুন নাম লিখল। সুকন্যা, প্রকৃতি, আলোকিনী, হাসি, মিষ্টি। লেখার পর পুরো তেতাল্লিশটা নামের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল একবার। বিজলির চোখ অনেকক্ষণ আটকে রইল, শেষ পাঁচটা নামে। ফার্স্ট পিরিয়ড শেষের ঘন্টা পড়ল। আজই সন্ধেবেলা বিজন আর সুজন ঘরে ফিরলে সবার সঙ্গে বসে, ফাইন্যাল করে ফেলতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।      

 

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বিজলিরা সকলে মিলে বসলেন তাঁদের শোবার ঘরে। শাশুড়ি আর বিজলি বসলেন বিছানায়। বাকি তিনজন সামনের চেয়ারে। ও আরেকজন – যার জন্যে এই আয়োজন – সেও রয়েছে। ফুটকি।  খাটের ওপরেই গোলাপি বেবি-মশারির মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। মুগ্ধ চোখে মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, বিজলি মনে মনে আদর করলেন কন্যাকে – আমার হাসি ছোনাটা, মিষ্টি ছোনাটা...।

বিজন মেয়ের তেতাল্লিশটা নামের লিস্ট প্রথম থেকে শেষ অব্দি সবাইকে পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন, “এর মধ্যে আমার পছন্দের নাম দুটি হল, নবীনবাবুর দেওয়া ছন্দা আর কনকদির আলোকিনী”।

বিজলি বললেন, “ছন্দার জায়গায় হাসি হলে খারাপ হয়? কিংবা মিষ্টি?”

সুজন বলল, “আমার মনে হয় হাসি নামটাই বেটার। কারণ আমার ভ্রাতুষ্পুত্রীটি এমনিতেই দারুণ মিষ্টি।  তারওপর সারাদিন মিষ্টি-মিষ্টি ডাক শুনলে আমাদের সকলেরই সুগার ধরে যাবে...”।

বিজলি সুজনের দিকে একবার চোখ পাকিয়ে তাকালেন, তারপর সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাসি, ছন্দা না মিষ্টি?” সকলেই একসঙ্গে হাসিতেই সায় দিলেন। বিজন বললেন, “গুড। সকলের সম্মতিতে “হাসি” নামটা ডাক নাম হিসেবে ফাইন্যাল হল। তাহলে ভালো নামটা হোক আলোকিনী”?

বিজলি বললেন, “কেন? প্রকৃতি নামটা খারাপ? কিংবা সুকন্যা?”

সুজন বলল, “তুমি খেপেছ দিদিমণি। তুমি জানো, বাংলা ভাষা থেকে আজকাল র-ফলা, ঋ-ফলা সব উধাও হয়ে যাচ্ছে? প্রবলেম হয়ে যাচ্ছে পব্লেম। প্রশাসন হয়ে উঠেছে পোশাসন। তেমনি প্রকৃতি হয়ে যাবে পোকিতি। ও যদি বড়ো হয়ে প্রকৃতিপ্রেমিক হয়, লোকে বলবে পোকিতি পোকিত পোকিতিপেমিক। অসম্ভব। তার থেকে আলোকিনী অনেক সুন্দর, আন্‌কমন্‌”।

কেউ কিছু বললেন না। সকলেই সুজনের কথাগুলো মনে মনে ভাবছিলেন। সেই সময় সুজন আবার বলল, “তুমি হয়তো রেগে গিয়ে আমার কানমলে দেবে, কিন্তু তাও আমি বলব। বড়ো হয়ে হাসি যখন জানবে প্রকৃতির ডাকের ইংরিজি ‘নেচার’স কল’, তখন ও কাউকে ডাকবে? নাকি ওর বন্ধুরা কেউ ওর ডাকে সাড়া দেবে? মানছি প্রকৃতি শব্দটা ভারতীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রাচীন এবং মিনিংফুল। আমাদের সনাতন দর্শন মতে প্রকৃতি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের মুখ্য কারণ। কিন্তু লালমুখো ব্রিটিশদের জন্যে ওই শব্দটা তুমি নাম হিসেবে ব্যবহার করতেই পারবে না। আমাদের ময়ূর-সিংহাসন বা কোহিনুর ওরা যেরকম ঝেড়ে দিয়েছে, তেমনি শেষ করে দিয়েছে প্রকৃতি শব্দটার মাহাত্ম্য”।

সুজনের কথার উত্তরে কেউ কোন কথা বললেন না। কিছুক্ষণ পরে বিজলি বললেন, “ঠিক আছে প্রকৃতি চলবে না। কিন্তু সুকন্যা নামটা কেমন?”

বিজন বললেন, “বেশ ভালই তো”।

সুজন আবার বলল, “দাদা, তুই সব ভুলে গেছিস। বাবাকে জিজ্ঞেস কর, বাবা জানে। বাবাদের সময়ে শাম্মি কাপুরের বিখ্যাত গান ছিল সুকু-সুকু। তাই না, বাবা? মনে পড়ছে?”

সুজনের বাবা একটু অস্বস্তি অনুভব করলেও, ইতস্তত করে বললেন, “মনে নেই আবার – আই আই আ করুঁ ম্যায় কেয়া, সুকুসুকু। সুকু ছিল এক নর্তকীর নাম। সে গান যা হিট করেছিল! পাড়ায় পাড়ায় পুজো-প্যাণ্ডেলে চোঙা-মাইকে সারাদিন ওই গান বাজত – কান মাথা ঝাঁঝাঁ করত আমাদের”।

বিজন বললেন, “তার সঙ্গে সুকন্যার কী সম্পর্ক?”

সুজন বলল, “স্কুল-কলেজে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা সর্বদাই নাম ছোট করে ডাকে। তোমাকে ডাকত বিজু। দিদিকে ডাকত পূজা। আমাকে ডাকে সুজি। সেরকম হাসিকে ওর বন্ধুরা ডাকবে সুকু। তারপর, ওর ডেঁপো বয়ফ্রেণ্ডরা ওই গান গেয়ে নেচে নেচে পেছনে লাগবে...ইস্‌, মেয়েটা যে তখন আমাদেরই দুষবে, দাদা”।

সুজনের কথায় সকলেই গম্ভীর হয়ে যাওয়াতে, বিজলি অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আমার মেয়ের ভালো নাম কী হবে?”

সুজন বলল, “কেন? আমাদের ঘর আলো করে এসেছে যে মেয়েটি। আমাদের সক্কলের মনে যে এনে দিয়েছে খুশি এবং হাসির আলো, তার নাম আলোকিনী ছাড়া আর কী হতে পারে? বন্ধুরা ওর নাম ছোট করে দেবে? দিক না, সে নামও হবে আলো। আমাদের রবিঠাকুর আলো নিয়ে গান রচনা করতে কোনদিনই ক্লান্তি অনুভব করেননি। সেই স্নিগ্ধ আলো আমাদের চোখের সামনেই ফুটে উঠুক না, দিদিমণি”।

বিজলির চোখ ছলছল করে উঠল আবেগে। বিছানা থেকে নেমে সুজনের কাছে যেতেই, সুজন দুই হাতে কান ঢেকেছিল। কিন্তু না, সুজনকে জড়িয়ে ধরে, তার মাথায় চুমো দিল বিজলি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “সত্যিই তুই সুজন”।

 -০০-

     

                            

           

                                                  


রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২

   

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১ " 


 শেষ পর্ব 

ডাক্তাররা বর্ষায় আর শীতে খুব খুশি হয়ে ওঠেন – কারণ রুগীর সংখ্যা বেড়ে ওঠে। উকিলরা বড়োলোক বখাটে ছোকরাদের কেলোর কিত্তির কেস হাতে এলে আনন্দিত হন – রাতকে দিন করতে প্রচুর অর্থ আমদানি হয়। ইন্টিরিয়ার ডিজাইনার, বড়োলোকের আদুরি বউ চারহাজার ব.ফু.র ফ্ল্যাট সাজিয়ে মনের মতো বানিয়ে দেওয়ার বায়না নিয়ে এলে খুশি হন। অভিনেতারা নতুন ছবিতে অভিনয়ের জন্যে প্রযোজকের ফোন পেলে নেচে ওঠেন। লেখা মনোনীত হয়ে বিখ্যাত পত্রিকার সম্পাদকের দপ্তর থেকে ফোন পেলে, উঠতি লেখক আনন্দে আত্মহারা হয়ে আরেকটি গল্প লিখতে বসে যান।

ঠিক তেমনি, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বাবা কাত্যায়ন, আজ একটু হাল্কা মেজাজে রয়েছেন। বাবা কাত্যায়ন এখন রত্নধরের আসার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেনসদরের দরজা এখন বন্ধ। তাঁর চেম্বারের লাগোয়া দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে তিনি ধরাচূড়ো ছেড়ে, ফ্রেস হয়ে এসেছেন। তাঁর পরনে একখানা বারমুডা। খালি গা। মাথার জটা উধাও হয়ে, মাথা ভর্তি টাক, অল্প আলোতেও চকচক করছে। কপালের সিঁদুরের টিপ ধুয়ে এসেছেন। রুদ্রাক্ষের মালা, রঙিন পাথরের মালা সবই খুলে রেখে এসেছেন বাড়িতে। এই বেশে দেখলে, কেউ তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিককূলচূড়ামণি বলে মনে করবে না, সে তিনি ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু তাও সারাদিন রাত ওই ধরাচূড়ো পড়ে বসে থাকা তাঁর পোষায় না।        

তাঁর স্বনামধন্য বাবা, তারাপীঠ-কামরূপ-কংকালীতলাখ্যাত বাবা জটেশ্বরের মাথায় কিন্তু অরিজিনাল জটা ছিল। আর সারাদিন রক্তাম্বর আর ধরাচূড়ো সব পড়ে থাকতেনতাঁর দাপটও ছিল আলাদারকমের। অনেক তাবড় তাবড় তালেবর মানুষজন তাঁর পায়ে এসে বডি ফেলত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার অনেক রাত করে লুকিয়ে আসত; যাতে পাব্লিক না দেখতে পায়।

আজকালকার মতো তখনো গয়নার দোকানের ভেতর বুকচাপা খুপরি চেম্বারে জ্যোতিষী বসার এত হিড়িক পড়েনি। এখনকার জ্যোতিষীরা সবাই অরিজিনাল। পরশুরাম, অগস্ত্য, কপিল, মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, ভৃগু, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, বশিষ্ঠ -  পুরাণের কাল থেকে সবাই উঠে এসেছেন কলির কলকাতায়। কলকাতার বুদ্ধিমান, বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিবান বাঙালীকে ভাগ্য বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর জন্যে। তাতেও হচ্ছিল না, এখন আবার শুরু হয়েছে কম্পিউটারের ঠিকুজি বানানো, তিনশ পঁচাশি টাকা আর জাতকের ডি.ও.বি., জন্মক্ষণ আর নার্সিংহোমের ঠিকানা বলে দিলেই হল। পনের মিনিটের মধ্যে এ-ফোর সাইজে পনের পাতার ঠিকুজি হাতে পাওয়া যায়। অষ্টোত্তরি দশা, বিংশোত্তরি দশা, ফলাফল, উপকার, প্রতিকার কিচ্ছু বাকি থাকে না।

 বাবা জটেশ্বরের সময় একশ টাকার ঠিকুজি বানাতে পনের-বিশ দিন লেগে যেত। তখনকার একশ টাকা আজকের হাজার দুয়েকের সমান। ঠিকুজি বানাতেন ভটচাজ্জি আর চক্কোত্তি কাকুরা। তাঁদের সঙ্গে বাবার হিসেব ছিল ঠিকুজি প্রতি চল্লিশটাকা। আমাদের ষাট টাকা নিট লাভ। ভটচাজ্জি আর চক্কোতি কাকুরা সরকারি আপিসে চাকরি করতেন, মাইনে ছিল মাস গেলে দেড়শ দুশো টাকা। ঠিকুজি বানানোটা ছিল তাঁদের উপরি রোজগার। একএকটা ঠিকুজি বানাতে দিন পাঁচ-ছয় সময় লাগত, রাত জেগে হলুদ হ্যান্ডমেড পেপারের ওপর ফাউন্টেন পেনে লিখে রোল পাকিয়ে দিয়ে যেতেন সকালবেলা। এগরোল নয় – ভাগ্য-রোল।         

সে সময় দিনকালই ছিল অন্যরকম। লোকের মনে ভক্তি-ছেদ্দা ছিল। ভীতি-প্রীতি ছিল। এমন দিন আসছে, বাবা জটেশ্বর বুঝতে পারতেন। এই লাইনে না এসে, তিনি তাঁর ছেলে কাত্যায়নকে লেখাপড়া করে, চাকরি বাকরি দেখারই পরামর্শ দিতেন বারবার। কিন্তু হল না। বাবা জটেশ্বরবাবার দেওয়া মাদুলি, তাবিজ, পাথর, রত্ন ধারণ করেও, কাত্যায়ন কিছুতেই আর ক্লাস এইটের গণ্ডি পেরোতে পারল না। অগত্যা, জীবনে করে খাওয়ার পৈতৃক এই পথটাই কাত্যায়নবাবাকে বেছে নিতে হল। রক্তাম্বর পড়ে বসতেই হল বাবার রেখে যাওয়া তেলচিটে রোঁয়াওঠা হরিণের চামড়ার আসনে!

সামনের দেয়ালে বাবার বড়ো একটা ছবি টাঙানো। মেঝেতে পাতা অজিনাসনের ওপর পদ্মাসনে বসা, জটাজুটধারী যোগী।  সোজাসুজি তাকিয়ে আছেন বাবা কাত্যায়নের দিকে।

বাবা কাত্যায়নের মনে হল, বাবা যেন বলছেন, “বারবার তোকে বলেছিলাম রে, কেতো, এ লাইনে আসিস না। এসব জিনিষ লোকে আর তেমন খাচ্ছে না, পুজো-টুজো, তন্ত্র-মন্ত্রকে লোকে বুজরুকি ভাবে। তাছাড়াও তুই একটু মেনিমুখো টাইপ, আমাদের লাইনে একটু গলাবাজি, হম্বিতম্বি করলে লোকে ভয় পায়, সমঝে চলে, ভক্তি করে। তোর দ্বারা এসব হবে না। এখনো বলছি, সময় আছে, কাউকে ধরে-টরে কোন নামকরা রত্ন বা গয়নার দোকানে ঢুকে পড়, বেঁচে যাবিএ.সি. লাগানো, ঝাঁ চকচকে চেম্বার, রোজগারের থার্টি পার্সেন্ট কমিসন দিয়েও, যা পাবি মন্দ নয়। তার সঙ্গে এটাও থাক না সাইড বিজনেস হয়ে। আমার ভয় হচ্ছে রে, কেতো আর কদিন এই ধান্দা চালাতে পারবি!”

বাবা কাত্যায়ন মনে মনে বললেন, “আমার ভবিষ্যৎটা কী দাঁড়াবে একটু বলে দাও না, বাবা”। পিঠের ওপর কি যেন একটা পড়ল থপাস করে। অবাক হয়ে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাবা কাত্যায়ন, যেন বাবার বাজখাঁই গলা শুনতে পেলেন, “চটি পেটা করবো, হতভাগা বাঁদর। তুই জানিস না, ভবিষ্যতের কথা আমাদের দু একটা বাই চান্স লেগে গেলেও, আমরা ভবিষ্যৎ বদলাতে পারি না”।

ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা কাত্যায়ন দেখলেন, তাঁর বাঁদিক দিয়ে গোদা একটা টিকটিকি সরসরিয়ে চলে গেল, মা কালীর মূর্তির আড়ালে। অ, ওই ব্যাটাই তবে সিলিং থেকে তাঁর পিঠে পড়েছিল, আর তিনি ভাবলেন কিনা তাঁর বাবার চটির চাপড়! বাবা কাত্যায়ন মুখে হাল্কা হাসি নিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন, আটটা বেজে ছেচল্লিস। মান্ধাতার আমলের ঘড়িটার সেকেণ্ডের কাঁটা এক এক ঘর চলার সময় খুব চাপা একটা শব্দ শোনা যায়, ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ওই শব্দটা কানে এলেই, তাঁর মনে হয়, ঘড়িতো নয়, শালা বিবেক!

রত্নধর পাশের ঘরের দরজা ঠেলে, ঘরে ঢুকলো। বাবা কাত্যায়ন খেঁকিয়ে উঠলেন একটু, “কী করছিলি, কি, এতক্ষণ”?

“ব্যাটা টাকা নিয়ে আসেনি। মোটে পাঁচশ টাকা অ্যাডভান্স ঠেকাতে এসেছিল। বাকি অ্যাডভান্স কাল দিয়ে যাবে”।

“তুই কত চেয়েছিল?”

“দশ হাজার”।

“দঅঅঅঅশ হাআআআআজার? রতনা, দিন দিন তুই একটা চামার হয়ে উঠছিসতা শেষমেষ কত দিল?”

“দশই দিল, বউকে বসিয়ে রেখে, এটিএম থেকে তুলে আনল”। ঘড়ির ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ আওয়াজটা আবার যেন বাবা কাত্যায়নের কানে এল।

বাবা কাত্যায়ন খ্যাঁ খ্যাঁ করে হেসে নিলেন খানিকটা, বললেন, “তুই পারিস ও বটে”। তক্তপোশের তলা থেকে একটা বোতল আর দুটো গেলাস বের করতে করতে রত্নধর বলল, “না পারলে হবে, কেতোদা? তুমি যা পাইকারি হারে রত্ন ধারনের কথা বললে, কাল বিকেলে যদি কোন গয়নাদোকানের জ্যোতিষীর কাছে যেত, সে আর ফিরে আসত তোমার কাছে”?  দুটো গেলাসে পরিমাণ মতো মদ ঢেলে রত্নধর তেলচিটে খাবার জলের ঢাউস বোতল থেকে জল ঢালল, কলকল আওয়াজে।

বাবা কাত্যায়নের দিকে একটা গেলাস এগিয়ে দিতে দিতে বলল, “তুমি মুরগি যখন ধরেছ, কেতোদা, আমি জবাই না করে ছাড়ি? এই যে আজ দশহাজার টাকা নিয়ে ওদের গেঁথে ফেললাম, যাক না কোথায় যাবে? ঠিক ফিরে আসবে দেখে নিও”।

বাবা কাত্যায়ন, গেলাসের মদে অনামিকা ডুবিয়ে, মাটিতে তিনবার ছিটে ফেললেন। তারপর বললেন, “চিয়ার্স”। রত্নধরও চিয়ার্স বলল, তারপর দুজনে একসঙ্গেই গেলাসে চুমুক দিলেন।

চুমুক দেওয়ার পর গেলাস মেঝেয় রেখে রত্নধর বলল, “একসঙ্গে এতগুলো রত্ন না দিলেই পারতে, কেতোদা, কাস্টমার চমকে যায়। নেহাত বউটা বোকা-সোকা, নইলে এ মাল নিগ্‌ঘাত কেটে পড়ত”।

তক্তপোষের তলা থেকে একটা কাঁচা লংকার প্যাকেট আর নুনের ডাব্বা বের করল রত্নধর। একটা খবরের কাগজ এনে তার মধ্যে গোটা বিশেক লংকা আর এক খাবলা নুন রাখল।

কচমচিয়ে দুটো লংকা চিবিয়ে, বাবা কাত্যায়ন বলল,  “ধ্যাত শালা, তোরা ওসব বুঝবি না, আমি বুঝিকেটে যাবে বলে, এ মক্কেল ধরা দেয়নি। বেটাদের সাধ্যি নেই কিন্তু সাধ অনেক। নিজেদের মনে মনেই সারাটাদিন এরা ঘ্যানর ঘ্যানর করে, বুঝেছিস? বিকাশদার মতো একটা ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট চাই, কিন্তু বিকাশের মতো দারুণ কাজ করে প্রমোশন পাওয়ার ক্ষমতা নেই। পরিমলদার মতো একটা গাড়ি চাই, পরিমলদা চাকরি ছাড়াও অনলাইনে শেয়ার কেনাবেচা করে। অনুপদার মতো দু বছরে একবার ফরেন ট্যুর করতে চাই, অথচ অনুপদার মতো ঠিকাদার কিংবা সাপ্লায়ারদের থেকে কমিসন খাওয়ার সাহস নেই। মিলনের ছেলেটা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, তুখোড় ইংরিজি বলে আর হেবি স্মার্ট, স্কুলের ফিজ বছরে সাড়েচার লাখ...”

অবাক হয়ে রত্নধর বললে, “তুমি গুরু এ লোকগুলোর নাম জানলে কি করে, কেতোদা? তুমি এত ভালো হাত দেখতে পারো, বন্ধুবান্ধব, কোলিগদের নামও বলে দিতে পারো? তুমি, মাইরি জিনিয়াস”।

বাবা কাত্যায়ন গেলাসে আর এক চুমুক দিয়ে বললেন, “আরে বাবা নামটা ছাড় না, নাম অন্যকিছু হতে পারে; ধরে নে, এক্স, ওয়াই জেড, কি আসে যায়? আসল ব্যাপারটা হল, ওদের মতো ও সবকিছু পেতে চায়। আর সেটা না পাওয়ার জন্যে মনের মধ্যে ভরপুর হতাশা। আমার কাছে এসেছে, অলৌকিক কোন রাস্তায় যদি পাওয়া যায়! যজ্ঞ-টজ্ঞ করে, কিংবা হাতে রত্ন ধারণ করে...”।

“হুঁ, বুঝলাম। কিন্তু ওর ছোটবেলায় কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল, এটা কি করে ধরলে”?

গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে কাত্যায়ন মুখে দারুণ বোদ্ধার মতো মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “একটা ছেলে দুরন্ত বয়সে কিছু বিপদই যদি না ঘটায়, তো সে ছেলে ছেলেই নয়, ম্যাদামারা ঢ্যাঁড়স। তেমন কিছু না হলেও, ছোটবেলায় জমিয়ে পক্স হয়নি, বা হাম-মিলমিলে হয়নি, অথবা টাইফয়েড হয়নি, কিংবা টনসিল অপারেশন হয়নি, এ হতেই পারে না। ছোটবেলায় সাইকেল চড়া শিখতে গিয়ে আমি দাঁত ভেঙেছিলাম, এই দ্যাখ। সবারই হয়। তোর ছোটবেলায় কিচ্ছু হয়নি”?

“হয় নি আবার, স্কুলের সাতফুট পাঁচিল টপকে পালাতে গিয়ে, মেরেছিলাম লাফ, বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড় সরে গিয়ে কেলেংকারি কাণ্ড। আজও পূর্ণিমা অমাবস্যায়, বাঁ পাটা কন কন করে”

গেলাসে চুমুক দিতে দিতে বাবা কাত্যায়ন তাকিয়ে রইলেন, রত্নধরের দিকে, তারপর বললেন, “শেষমেষ কতোয় রফা করলি”?

রত্নধর খুঁ খুঁ করে হেসে, গেলাসে লম্বা চুমুক দিল, বলল, “একলাখ আশি দিয়ে শুরু করেছিলাম, একলাখ পঞ্চান্নয় ফাইন্যাল হল”।

“একলাখ পঞ্চান্ন? তুই তো ডাকাত রে, রত্নধর। এত দাম?”

“লাও, যার জন্যে করি চুরি, সেই বলে চোর। সাতখানা রত্ন, তার সঙ্গে সোনার আংটি, রূপোর আংটি, রূপোর চেন, বাণি, তুমি কি ভাবছ বিশ-পঁচিশে হয়ে যাবে”?

বাবা কাত্যায়ন একটু উৎসুক হয়েই জিগ্যেস করলেন, “তা, ফেলে থুয়ে, আমাদের কত থাকবে মনে হয়”?

মৃদু হেসে রত্নধর বলল, “চল্লিশতো থাকা উচিৎ, কাল “রত্নখনি”তে কথা বললে ফাইন্যাল বোঝা যাবে”।

বাবা কাত্যায়নের গলায় এখন যেন একটু অসহায় সুর, তিনি বললেন, “দ্যাখ কি হয়। চল্লিশও নেহাত মন্দ নয়। এল.আই.সি.র একটা প্রিমিয়াম বাকি পড়ে গেছে, ওটা দিয়ে দেওয়া যাবে”।

 

দুজনের খালি গেলাসে আবার মদ আর জল দিয়ে ভরে তুলল রত্নধর, বাবা কাত্যায়নের দিকে গেলাস বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, “বউয়ের হাত দেখে স্বামীর জন্মমাসটা কি করে ঠিকঠাক বলে দিলে বলো তো, কেতোদা”?   

“ধুর ব্যাটা, ঠিকঠাক বলতে পারলাম কই? আন্দাজ করেছিলাম, চোত নয়তো মাঘ। মিলল না, বলল আষাঢ়”।

“সে ঠিক আছে, কিন্তু চোত, মাঘ, আষাঢ় - তিনমাসের ফল যে একই, সেটা তো ধরে ফেলেছিলে”!

গেলাসে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেলেন, বাবা কাত্যায়ন। সামলে নিয়ে হ্যা হ্যা করে হাসতে হাসতে বললেন, “ও ওই শ্লোকটা? “চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”? ও শ্লোকের রচয়িতা কে জানিস? বাবা কাত্যায়ন শাস্ত্রী। হে হে হে হে। সংস্কৃত শ্লোকটোক শুনলে পাব্লিক খুব বিশ্বাস করে ফেলে, ভাবে শাস্ত্রে আছে। মোক্ষম কাজ দেয়। ও যদি ভাদ্র বলতো, তাহলে শ্লোকটা হত “চৈত্রভদ্রামাঘ মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং”!

রত্নধর বাবা কাত্যায়নের কথায় খুব হাসতে লাগল খুঁ খুঁ করে, বাবা কাত্যায়নও হাসতে হাসতে গেলাসে লম্বা চুমুক দিলেন, তারপর শসা চিবোনোর মতো কচকচিয়ে চারটে কাঁচালংকা চিবিয়ে, এক চিমটি নুন ফেললেন জিভে, তারপর বললেন, “মানুষের আর একটা বড়োগুণ কী বলতো, নিজেকে সবসময় “একঘর” ভাবা। যে কোন বিষয়ে ব্যাপক জানে। বোকা, হাঁদা বললে রেগে যাবে, কিন্তু সাধাসিধে ভালোমানুষ বল, হেবি খাবে। ঘরে বউ, অফিসে বস - যা বলে, মেনে নেয়, তেলকে জল বললে কিংবা জলকে তেল বললে, যা বলেছেন, স্যার বলে। কিন্তু তাকে তুই স্পষ্টবাদী বল, হেবি ভাও খাবে। দুটো পয়সার জন্যে আর নিজের ধান্দার জন্যে, লোক যা খুশি করে, কিন্তু তাকে ন্যায়বাদী, বিবেকি বল, বুক ফুলে এই অ্যাত্তোটা “ক্যাও” খেয়ে নেবে”       

লম্বা চুমুকে গেলাস খালি করে, বাবা কাত্যায়ন হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলেন। রত্নধর বলল, “আরেকটু দেব নাকি, কেতোদা, তুমি আজ মাইরি চোঁ চোঁ করে টানছো। নেশা হয়ে গেলে, বউদি খুব রাগ করবে”।

“চোপ শালা। তান্ত্রিকদের কোনদিন নেশা হয় না। আমায় কি পেঁচো পেয়েছিস, যে গন্ধ শুঁকলেই মাতাল! মাই ফাদার ওয়াজ এ তান্ত্রিক, আই অ্যামি হিজ সান, ওনলি সান, আমিও তান্ত্রিক। আমাদের মদে নেশা হয় না, রে ব্যাটা। “সুরা পান করিনে আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। মন-মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে” “হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে উঠলেন বাবা কাত্যায়ন। রত্নধর চমকে উঠে, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আস্তে গাইতে বলল।

“কেতোদা, কি হচ্ছে কি? বৌদি শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না!”

বৌদির কথায় বাবা কাত্যায়ন একটু যেন ঝিমিয়ে গেলেনতাঁর বৌ পুতুলরাণিদেবী তাবিজ-মাদুলি, তন্ত্র–টন্ত্রের ধার ধারেন না। কোমরের কষিতে শক্ত করে শাড়ির আঁচল বেঁধে সামনে এসে দাঁড়ালে, বহুলোকের ঘাড় থেকে ভুত-প্রেত নেমে যায়। বাবা কাত্যায়নের মা নমিতাদেবীও এমনই ছিলেন। সত্যি বলতে তিনিই স্বর্গে যাবার আগে বৌমাকে পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এই ভুরুংগে বজ্জাত পুরুষদুটোকে কিভাবে জব্দ করে রাখতে হয়।

তিনি বলতেন, “বৌমা, আমার ছেলে বলে, কোলে ঝোল টেনে বলবো, এমন শাউড়ি আমায় পাওনি। ওই বাপ-বেটাকে একটু ঢিলে দিয়েছ কি, নাগালের বাইরে চলে যাবে। ত্যাকন আর কেঁদেও কূলকিনেরা পাবে না, বৌমা। সংসারটা তোমার, এতটুকু বেচাল দেখলেই শক্ত হাতে ন্যাজ চেপে ধরবে”। বাবা কাত্যায়ন দেখেছেন, তাঁর মায়ের হাতে বাবার ন্যাজ কেমন ধরা ছিল। কাজেই বৌকে তিনি খুব সমঝে চলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে ভেতর বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার, ভেজানো আছে দেখে একটু নিশ্চিন্ত হলেন।

গেলাসে হাল্কা একটা  চুমুক দিয়ে বললেন, “হ্যারে, রত্না, টাকা পয়সার হিসেব কিছু বলছিস না যে, বড়ো?”

“বললাম যে, কেতোদা। তোমার কাছে কিচ্ছু লুকোই নি তো”।

“অ্যাডভান্স থেকে হাজার পাঁচেক ছাড়”।

“অসম্ভব কেতোদা, “রত্নখনি”কে অন্ততঃ আট না দিলে ওরা কিচ্ছু বানাবে না। তোমার মক্কেলের কাছে কথার খেলাপ হয়ে যাবে। তুমি এখন দেড়হাজার রাখো, দাদা, আমি পাঁচশ” রাখছি। তোমারও চলুক, আমারও চলুক। তোমার তো তাও মায়ের দান-পেটি আছে, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো দেখি, দাদা?” রত্নধর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেড়হাজারটাকা তুলে দিল, বাবা কাত্যায়নের হাতে। বাবা কাত্যায়ন টাকাকটা গুণে নিয়ে, বারমুডার পকেটে ঢোকালেন।

তারপর গেলাসে আরেক চুমুক দিয়ে বললেন, “পার্টিকে কবে আসতে বলেছিস?”

“পরের মঙ্গলবার বলেছি। কাল দেখি “রত্নখনি” কি বলে? রত্নখনির মালিক আঢ্‌ঢিবাবুর আজকাল বড্ডো খাঁই জানো, দাদা। দোকানে সব রেডিমেড মাল আছে, একটু পালিশ করে দেবে, ব্যস। কিন্তু এমন কথা বলবে যেন, আমাদের থেকে অ্যাডভান্স নিয়ে খাদানে লোক নামাবে রত্ন তুলতে, আর সাগরে ডুবুরি ডোবাবে মুক্তো তুলতে। ক’বছর আগেও নিজে ফুৎনলে ফুঁ মেরে মুর্শিদাবাদের চোরাই সোনা দিয়ে নাকছাবি বানাতো আজ তার দোকানে দুজন কর্মচারী, পাঁচজন কারিগর, চারজন জ্যোতিষী, চার শিফটে দুনিয়ার লোকের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আঢ্‌ঢিবাবু কোনদিন কাউকে হাতও দেখায় না, আর হাতে বিয়ের আংটি ছাড়া কোন আংটিও পড়ে না। অথচ দেখ, ব্যাটার কি রকম ভাগ্য ঘুরে গেল। এখন ক্যাশ কাউন্টারে বসেবসে টাকা গোনে, আর ঠ্যাং নাচায়”।

রত্নধরের এই কথায় বাবা কাত্যায়নও একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিলেন। বললেন, “ভাগ্য কি আর বদলানো যায় রে, রত্না? যায় না। তাই যদি হতো ক্লাসে সবাই ফাস্ট হতো। সেকেণ্ড বলে কিছু থাকতো না। দেশের সব লোক প্রধানমন্ত্রী হতো কিংবা টাটা-আম্বানি হতো, অথবা রবি ঠাকুর হতো। ওসব হতে গেলে এলেম লাগে রে, ক্ষ্যাপা, সে কি আর ওই আঙুলে পাথর ঘষলে হয়? আমার বাবাই কি আমার আঙুলে কম পাথর পড়িয়েছিলেন, কী হয়েছে? সেই তো তান্ত্রিক সেজেই লোককে ভুজুং দিচ্ছি”। গেলাস খালি করে, আবার বললেন, “বাড়ি যা রত্না, অনেক রাত হলো। তবে অন্য কিছু ভাব, এইসব করে বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না”।

“তোমার মতো ন্যায়বাদী, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং  ক্ষণ-ক্রোধী ব্যক্তিও যদি এমন কথা বল, তাহলে আমাদের কী হবে, দাদা”? রত্নধরের এই কথায় বাবা কাত্যায়ন কটমট করে তাকালেন, কিছু বললেন না।

বোতল, গেলাস, লংকা, নুন তক্তপোশের তলায় আবার চালান করে দিয়ে রত্নধর মুচকি হেসে বলল, “আসছি, তাহলে, দাদা? কাল বিকেলে আবার দেখা হবে”।

 

বাবা কাত্যায়ন নিঃশব্দ ঘরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। বিবেকী ঘড়িটা সুযোগ বুঝে একভাবে বলে চলেছে ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ...। চেম্বারের আলো নিভিয়ে বাবা কাত্যায়ন ভেতরে গেলেন, তাঁর হাতে কড়কড়ে দেড়হাজার টাকা। ছোট্ট উঠোন পেরোতে পেরোতে ডাক দিলেন, “কই রে মিনু, তোর মা কোথায় গেল রে...”।  

--০০--

পরের রম্যকথা - " নামকরণ "


রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১

   

এর আগের রম্যকথা - " নিত্যযাত্রী "


পাড়ার বিশাখা বৌদির সঙ্গে হরিপদর বৌয়ের গলায় গলায় ভাব। বিশাখাবৌদির ননদের বড়ো জায়ের কাকিমা এক মহাতান্ত্রিকের খবর দিয়েছেন, বাবা কাত্যায়ন তন্ত্রার্ণববিশাখাবৌদি হরিপদর বৌকে বলেছে, হরিপদকে নিয়ে গিয়ে বাবা কাত্যায়নের সামনে ফেলে দে, তারপর দেখ তোদের কপাল কেমন খুলে যায়! হরিপদর বাবা ছিলেন বৈষ্ণব, হরির একান্ত ভক্ত। যখন তখন হরিপদর নাম ধরে ডাকলে, তাঁর নাকি হরিনামও করা হবে, তাই ওই নাম। কিন্তু প্রথম বিড়ি খেয়ে হরিপদ যেদিন বাড়িতে ধরা পড়েছিল, “হতভাগা হোর‍্যা, তুই বিড়ি খাওয়া ধরেছিস, হতচ্ছাড়া”? বলে পিঠে গুম গুম কিল বসিয়েছিলেন তার বাবা, সেদিন শ্রীহরি কাছে পিঠে কোথাও ছিলেন কি না, কে জানে?

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন, স্বর্ণপদক প্রাপ্ত, তান্ত্রিক-কূল-চূড়ামণি বাবা কাত্যায়নের কাছে হরিপদ ও তার বৌ প্রথম গিয়েছিল মঙ্গলবারের সন্ধেতে। উত্তরকলকাতার ঠনঠনে কালিবাড়ির কাছে, ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো বাড়ির একতলায়, মাথা নোয়ানো দরজাওয়ালা গুমোট ঘরে বাবার চেম্বার। হরিপদ ফেডেড জিন্স দেখেছে, এখানে এসে প্রথম দেখল, ফেডেড অজিন। নিচু জলচৌকির উপর বিছানো রোঁয়াওঠা হাতপা ছড়ানো হরিণের চামড়ার পিঠে বাবা কাত্যায়ন বসে আছেন বাবু হয়ে। মাথায় বিড়েবাঁধা তেলচিটে জটা। পোড় খাওয়া তামাটে কপালে দেড় ইঞ্চি চওড়া সিঁদুরের তিলক। গলায় রুদ্রাক্ষ, আর রংচঙে পাথরের মালা। দু হাতেও রুদ্রাক্ষের মালার বালা। খালি গা, ভালুকের মতো লোমওলা বুকে ধবধবে মোটা পৈতে। পরনে হ্রস্ব একটি রক্তাম্বর, ঘরের গুমোট গরমে সেটাও গুটিয়ে তোলা, উরুর অনেকখানি উপরে। সামান্য নড়চড়ায় বিপজ্জনক হয়ে ওঠা কিছু আশ্চর্যের নয়।

বাইরে জুতো খুলে এসে, ঘরে ঢুকে ওরা দুজনে বাবাকে প্রণাম করলপায়ের নখগুলো বাবার জন্মের পর থেকে নরুনের সংস্পর্শ রহিত, দেখেই বোঝা যায়। অন্য একজনের হস্ত রেখা বিচার করছিলেন, আর ফিসফিস করে কথা বলেছিলেন চশমার উপর দিয়ে রক্তচক্ষু তুলে ওদের দেখলেন, বললেন, “অফিসে বড়ো অশান্তি, না রে? তারা মার কাছে এসে পড়েছিস যখন আর চিন্তা নেই, যা বোস ওইখানটাতে”। 

হরিপদর বউ মুগ্ধ নেত্রে বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, হরিপদর কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল, “দেকলে, বিশাকাদি ঠিকই বলেছিল, বাবা পুরো অন্তজ্জামি”হরিপদ ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি দিল অপেক্ষা করতে লাগল বাবা কখন ডাকেনএকটু ভয়ও যে করছিল না তা নয়, বাবা যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, হরিপদর যৌবন কালে অনেক কেলেংকারির কথা আছে, যা হরিপদর বৌ জানে না। সে সব ফাঁস হয়ে গেলেই হয়েছে আর কি!

 মোটা কাঠের কড়ি-বর্গাওয়ালা নিচু ছাদের ঘর। সিলিংএ ঝুলে ঘাড় দোলাচ্ছে ফ্যানটা। দেখে মনে হল এ ফ্যানটা এই বাড়ির থেকেও পুরোনো। বৃটিশ জমানার হাল হকিকত বিস্তর দেখে এসেছে এখন বাবার কীর্তি দেখে অনবরত ঘাড় দুলিয়ে চলেছে। আওয়াজ উঠছে ঘট ঘট ঘট ঘট। মেঝে থেকে দেওয়ালের ফুটতিনেক অব্দি টকটকে লাল প্লাসিক পেন্টের আস্তর। বাকি দেওয়াল থেকে সিলিং ঘন সবুজ রঙের প্লাস্টিক পেণ্ট করাঘরে তিনটে ছানার জিলিপির মতো দেখতে সিএফএল জ্বলছে। রঙের জেল্লায় একটুও আলো ফুটছে না। বাবার বাঁ হাতের সামনে কাঠের একটা বহু পুরোনো ডেস্ক। তার ওপরে লেখার প্যাড আর ফাউন্টেন পেন। সামনে কালির দোয়াত।  ডেস্কের এক পাশে গুচ্ছের কোণা দুমড়ানো কাগজের তাড়া।

ডেস্কের ওপাশে মা কালীর কুচকুচে কালো মূর্তি। ফুট চারেক উঁচু। টকটক করছে তাঁর মুখের চারপাশ, জিভ, হাতের তালু আর চরণতল। চরণতলে শুয়ে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব। মায়ের উপরের একহাতে বরাভয়, অন্য হাতে টিনের পাতলা খড়্গ। নিচের একহাতে কাটা মুণ্ডু, অন্য হাত খালি। গলায় নরমুণ্ড মালা। মায়ের লজ্জা নিবারণ হয়েছে অজস্র কাটা হাত ও পায়ের মালায়। মায়ের গলায় ঝুলছে একগোছা রক্তজবার মালা, একদম টাটকা। অনালোকিত এই ঘরের আলোয়, মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে, হরিপদর আবার মনে হল, বাবা কাত্যায়ন যদি সত্যিই অন্তর্যামী হন, তাহলে কী হবে?

 

যে লোকটি হাত দেখাতে এসেছিল, তার মনে হচ্ছে হয়ে গেল, কাত্যায়ন বাবা, জোরে বলে উঠলেন, “যাঃ, বেশি ভাবিস না। যেমন বললাম, মায়ের ওপর ভরসা করে, সব মেনে চল। তোর ভালো দিন আসছে, মনে রাখিস”।

“সবই আপনার কৃপা, বাবা” বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে করতে বলল ভদ্রলোক।

“ছি, ছি। অমন কথা মুখেও আনিস না রে, ব্যাটাআমি কৃপা করার কে রে? কৃপা করছেন, জগত্তারিণী মহামায়া, মা তারাওই মাকে প্রণাম কর, মা-ই তোকে ঠিক পথে চালিয়ে এখানে নিয়ে এসেছেন। সামনের ঘোর অমাবস্যায় নীল সরেস্বতী মহাকালী যজ্ঞের আয়োজন কর, যেটুকু বিপদের জের এখনো আছে, কেটে যাবে একদম”।

“এই অমাবস্যায় হবে না, বাবা। ছেলেটার সামনে পরীক্ষা”।

“পরেরটায় দ্যাখ, নয়তো তার পরেরটা? মা অপেক্ষায় থাকবেন, চিন্তা করিস না”।

ঘাড় নেড়ে ভদ্রলোক মায়ের পায়ে প্রণাম করে উঠে যেতে বাবা কাত্যায়ন হরিপদদের ডাকলেন, “মন্ত্রে তন্ত্রে, পুজো পাঠে কিছুতেই তোর বিশ্বাস হয় না, না রে? সবটাই বুজরুকি, কি বল”?

“কি বলছেন, বাবা, বিশ্বাস না থাকলে আপনার কাছে, আসতাম”? হরিপদর বউ চমকে বলে উঠল।

“তোর কথা বলছি না, রে পাগলি? তোর স্বামীর কথা বলছি। দে তোর হাতটা বাড়া। ডানহাত নয় রে, বাঁ হাত, মেয়েছেলেদের বাঁহাত আর ব্যাটাছেলেদের ডানহাতে লেখা থাকে তাদের নিয়তি। আয়, আরেকটু সরে আয় তোর স্বামী সেই থেকে সব দেখে চলেছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তান্ত্রিক-বাবাটা লোক কেমন। জোচ্চোর কিনা। চুক্কি মারছে, নাকি সত্যি কিছু জানে? তাই না রে। ভক্তি আন রে ব্যাটা, মনে ভক্তি আন”।

হরিপদর বউ আরেকটু সামনে সরে বসতে, বাবা কাত্যায়ন তার বাঁহাতটা ধরে কোলের উপর রাখলেন, বললেন, “ন্যায়নিষ্ঠ, বিবেকী, তত্ত্বজ্ঞানী, স্পষ্টবাদী এবং ক্ষণক্রোধীকি তোর স্বামীর মধ্যে এই গুণগুলো নেই”? হরিপদর গা জ্বলছিল কারণ, কথা বলতে বলতে বাবা কাত্যায়ন তাঁর কোলে তার বউয়ের হাতটা রেখে বিপজ্জনকভাবে ডলছিলেন

“ময়লা, ময়লা। ময়লা আমাদের সবখানে। ময়লা আমাদের মনে। ময়লা আমাদের দৃষ্টিতে। ময়লা আমাদের অতীত জীবনে। হাতের ময়লা না তুললে কি আর হাতের রেখা ফুটে ওঠে”? হরিপদর পাপী মন এবার চমকে উঠল, বাবা কাত্যায়ন কি সত্যি অন্তর্যামী?

“আজকের যুগে তোর স্বামীর মতোন লোক অচল। এমন লোওওওক অচঅঅঅঅল। একটুতেই রেগে ওঠে। অন্যায় করতে দেখলে ওপরওলাদেরও ছেড়ে কথা কয় না। এমন আহাম্মক। ওপরওলাদের তেল মাখাতে পারে না। উলটে কটকট করে সত্যি কথা শুনিয়ে দেয়! আশে পাশে সবাই দুনম্বরি পয়সা পকেটে ঢোকাচ্ছে, তোর স্বামী ন্যায় দেখছে, নীতি দেখছে। বিবেকের কুটুস কাটুস কামড় খাচ্ছে। ওর চেয়ে বয়সে ছোট, কিস্‌সু জানে না, আকাট মুখ্যু। শুধু তেল মেরে মেরে প্রমোশন পেয়ে কোথায় চলে গেল। তুই কতদিন একই জায়গায় পচছিস, দাঁড়া আমি বলছি, তা বছর সাতেক তো হবেই”?

সামনে বসে বিস্ফারিত চোখে এতক্ষণ হরিপদর বউ বাবার কথা শুনছিল, বউয়ের পিছনে বসে হরিপদও শুনছিল। বাবার এই  কথায় দুজনেই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাবার পায়ে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে হরিপদর বউ বলল, “আপনি সব জানেন, বাবা। আপনার কাচে কিচ্চুটি গোপন নেই, আপনি অন্তজ্জামী। আটবছর ধরে ও একই জায়গায় পড়ে রয়েচেওর ওপরওলাগুলো কি যে বিষ নজরে ওকে দ্যাকে, সে আপনি জানেন, বাবা। আপনাকে এর একটা বিহিত করতেই হবে।”

“উতলা হোস না। শান্ত হস্বামীর জন্যে কত কী করতে হয়, সাধ্বী মেয়েদের। দাঁড়া তোর হাতটা এবার দেখি”। রক্তাম্বরে ঢাকা পড়ে যাওয়া হাতটা নিয়ে বাবা এবার খুব মন দিয়ে দেখতে লাগলেনহরিপদ আর তার বৌ দম বন্ধ করে অপেক্ষায় রইল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে।

“ভৌম দোষ কি জানিস”?

“না বাবা, জানি না”।

“তোর ভৌম দোষ আছে। খুব খারাপ দোষ, সে কথা উচ্চারণ করতেও মন শিউরে ওঠেতোর স্বামী ছোটবেলায় মস্ত এক ফাঁড়া থেকে বেঁচে উঠেছিল না”?

“হ্যাঁ উঠেছিল, তো। আমার শ্বাশুড়ি মায়ের মুখে শুনেছি। বলো না গো, চুপ করে আছো কেন? বাবার কাছে সব খুলে বলতে হয়”। হরিপদর বউ কান্না ধরা গলায় বলল। হরিপদ বাবা কাত্যায়নের অলৌকিক ক্ষমতায় একদম কাবু হয়ে গেল, আমতা আমতা করে বলল, “আমি তখন ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। আমাদের স্কুলের পুকুরের গায়েই একটা বড়ো আমগাছ ছিল। সেই আমগাছ থেকে আম পাড়তে গিয়ে ডাল ভেঙে পড়েছিলাম পুকুরের জলে...”।

“পড়তেই হবে। পঞ্চমে শনি আর তৃতীয়ে মঙ্গল। একেবারে মোক্ষম মৃত্যুর যোগ। বেঁচে থাকার কথাই নয়। বেঁচে আছে সপ্তমে বৃহষ্পতি ছিল বলে। সে যাত্রায় রক্ষে পেলেও এবারে কিন্তু ভীষণ সংকট। আজ থেকে মোটামুটি দু বছর বাদে, মোটামুটিই বা কেন? তোর জন্ম মাসটা কবে? চোত না মাঘ”?

“আজ্ঞে বাবা, আষাঢ় মাসে”।

“ওই একই হল। চৈত্রমাঘাষাঢ় মাসঞ্চ আপ্নোতি জাতকঃ সমফলং অর্থাৎ কিনা, চোত, মাঘ কিংবা আষাঢ় মাসের জাতকদের ভাগ্যফল একই হয়ে থাকে”চোখ বন্ধ করে বাবা কাত্যায়ন কিছু চিন্তা করে আবার বললেন, “আজ থেকে ঠিক এক বছর ন মাস পড়ে তোর বৈধব্য যোগ রয়েছে। বৈধব্য যোগ কিংবা ভৌম দোষ, জীবনে খুবই কঠিন সংকটময় কাল”।

রুদ্ধ কান্না আবার উথলে নিয়ে হরিপদর বউ বলল, “তাহলে আমার কী হবে, বাবা। কোন কী উপায় নেই? একটা কিছু উপায় আপনাকে করতেই হবে, বাবা”।

“শনিকে সামলানো যায়, কেতু কে সামলানো যায়, কিন্তু শনি আর কেতু একসঙ্গে হলে রক্ষা পাওয়া মুশকিলচারদিক থেকে ছেঁকে ধরেছে শত্রুরা। ভেতরে শত্রু, বাইরে শত্রু। মুখে মিষ্টি হাসি, মিষ্টি কথা, কিন্তু পিঠে ছুরি বসিয়ে যাচ্ছে, খুব কাছের লোকরাও কর্মক্ষেত্রে রাহুর দৃষ্টি, তোর কত্তাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না”।  

“ওসব আমি কিচ্চুটি জানি না বাবা, এই আমি আপনার চরণে পড়ে থাকবো, যতক্ষণ না আপনি এর বিহিত করছেন”। হরিপদর বউ বাবা কাত্যায়নের চরণ ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।

“আহা, আহা করিস কি? করিস কি? মেয়েছেলের চোখের জল, আমি যে আবার সহ্য করতে পারি নে। আছে আছে, উপায় আছে, কিন্তু সে তো আমার হাতে নেই রে! সে আছে আমার খ্যাপা মায়ের হাতে। কুপিত গ্রহশান্তির জন্যে খরচের ব্যাপারে কিন্তু কোন কার্পণ্য করলে চলবে না”।

“বাবা, খরচ আগে, না আমার মানুষটা আগে? মানুষ বাঁচলে অনেক টাকা রোজগার করবে, বাবা। আপনি শুধু উপায় বলুন”।         

“অতি উত্তম। কই হে, রত্নধর, শুনলে তো সব কথা”?

লাল ফতুয়া পড়া রত্নধর ঘরেই দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিল, এতক্ষণ চোখেই পড়েনি। ছায়া মাখা লাল দেয়ালে মিশে ছিল তার চিমসে হাড়গিলে শরীর। সামনে সরে এসে জোড়হাতে বলল, “আজ্ঞে শুরু থেকে সবই দেখলাম, বুঝলাম এবং শুনলাম, গুরুদেবএখন আদেশ করুন”

“ছ রতির পীতাম্বরি নীলা, মধ্যমায়। আট রতির রক্ত প্রবাল অনামিকায়। চার রতির সিংহলী চূণী কনিষ্ঠায়। চার রতির বসরাই মুক্তা তর্জনীতে। ছ”রতির পান্না, ছ”রতির গোমেদ আর চার রতির পোখরাজ”।

হরিপদ অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “বাবা, হাতে অত আঙুল কোথায়”? বাবা অভয় হাত তুলে বললেন,

“সব বলে দেব। কথার মাঝখানে কথা বলিস না, মূর্খ। রত্নধর কি বলছিলাম যেন”? রত্নধর প্যাডে লিখতে লিখতে বলল, “আজ্ঞে, গুরুদেব, নীলা, পলা, চূণী, মুক্তো, পান্না, গোমেদ, -পোখরাজ। শুধু হীরে আর ক্যাট্‌স্‌ আইদুটো বাকি রয়ে গেল”।

“হ্যাঁ ঠিক আছে। নীলা, আর পলা বসবে রূপোর আংটিতে। চূণি আর মুক্তো সোনার আংটিতে। বাকি পান্না, গোমেদ আর পোখরাজ রূপোর চেনে বসিয়ে ঊর্ধ্ববাহুতে ধারণ করতে হবে। এসব হচ্ছে তোর স্বামীর জন্যে বুঝেছিস? তোর জন্যে তেমন কিছু না হলেও চলে যায়। তবুও চার রতির পান্না আর ছরতির গোমেদ ধারণ করলে লাভ বৈ কোন ক্ষতি তো নেই।  তারা তারা, মাগো, তাড়া। রত্নধর আমার এখন মাতৃসেবার সময় হয়েছে। তুমি ওদের নিয়ে ও ঘরে যাও, তোমাদের এই অর্থ অনর্থের টানা-পোড়েনের মধ্যে আমি থাকতে চাই না, ওসবে আমার একেবারেই রুচি হয় না”।  হরিপদর বউ এবং হরিপদ শেষ বারের মতো প্রণাম করে বলল, “বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে তো”?

“চেষ্টা তো করছি রে, পাগলি? এখন সবই মায়ের ইচ্ছে। সব কটা রত্ন সামনের মঙ্গলবারের মধ্যে আমার কাছে নিয়ে আয়। দেরি করিস না। কটা রত্ন এ মাসে ধারণ করবি, পরের মাসের মাইনে পেলে বাকিগুলো! ওসব কথা মনেও ঠাঁই দিস নে। যত দেরি করবি, ততই গুঁড়ি মেরে বিপদ ঘনিয়ে আসবে...। আমার কাছে নিয়ে আসবি, মায়ের চরণ ধোয়া জলে আমি শোধন করে দেব। বলে দেব রত্ন ধারণ করার মোক্ষম সময় আর দিন। তারপর রাখলে মা তারাই রাখবেন, মারলে তিনিই মারবেন”।

“তাই হবে, বাবা, তাই হবে। আপনি যে একটা উপায় বলে দিয়েছেন, এ যে আমাদের কি ভাগ্যি, বাবা। বাবা আপনার দক্ষিণা”?

“ও কথা মুখেও আনিস না রে, ওরে পাগলি, আমি যে দক্ষিণা নিতে পারি নামায়ের সেবায় আবার দক্ষিণা কি রে? মায়ের আদেশ, “কাত্যায়ন, শোকেতাপে, সংসারের জ্বালায় পোড়া-মানুষগুলো, তোর কাছে আসে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে। তোর অন্ন বস্ত্রের অভাব আমি রাখবো না, বাবা। তুই শুধু ওদের থেকে কোন পয়সা নিতে পাবি না”। ন্যাংটা মায়ের আমি ন্যাংটা ব্যাটা, আমার আবার অভাব কিসের, যে টাকা হাতাবো? যা কিছু দিবি মায়ের পায়ের কাছে রাখা ওই দান-পেটিতে ঢেলে দে। তবে মায়ের সেবায়, দুশো একান্নর নিচে না দেওয়াই ভালো, ওর কমে মায়ের সেবা হয় না”।

হরিপদর কানে কানে হরিপদর বউ কিছু বলল। হরিপদ, তিনশ টাকা আর একটাকার একটা কয়েন গুঁজে দিল মায়ের পায়ের কাছে রাখা দান-পেটির স্লটে বাবা নির্লিপ্ত চোখে দেখে বললেন, “যা। এবার আমার মায়ের সঙ্গে  আলাপের সময় হলওঘরে গিয়ে সব রত্নের মাহাত্ম্য বুঝে নে রত্নধরের থেকে শুভকাজে দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি যা। মা তারা, তাড়া, তাড়া, সবার বিপদ তাড়া, বিপত্তারিণী মাগো”

পরের পর্ব - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ "

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নিত্যযাত্রী

  

এর আগের রম্যকথা - " অবিচলিত থাকা "


হেউ।

মুখে ভাজা মৌরির দানা ফেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই ঢেঁকুরটা উঠল। লোহার গেটের হাঁসকল বন্ধ করতে করতে বললাম ‘শুনছো, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিও, বেরোলাম’।  ‘দিচ্ছিইইই, দুগ্‌গা, দুগ্‌গা’, ভেতর থেকে বউয়ের কণ্ঠ শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। 

বউয়ের হাতের রান্না; কুচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি। আর ফালি ফালি লম্বা দুটো আলু ডোবানো চারাপোনার পাতলা ঝোল দিয়ে চারটি ভাত খেয়ে বের হতে একটু দেরিই হয়ে গেল। গেট থেকে বের হলাম নটা ছেচল্লিশে। তরিবতের রান্না জুত করে খেতে একটু সময় লাগেই। আর খাওয়াটাও বেশী হয়ে যায়। তার ওপর কাঁধে আছে রেক্সিনের ছোট ব্যাগে লাঞ্চ বক্স। তাতে তিনটে রুটি আর আলু-কুমড়োর ছেঁচকি। ছাড়ানো শসা দু’ ফালি।

চিন্তা হচ্ছে, নটা বাহান্নর মিনিটা পাবো কিনা। ওটা না পেলে কপালে আজ দুঃখ আছে। এমনিতে আমাদের অফিস শুরু দশটা থেকে তবে এগারোটা পর্যন্ত ঢুকলেও চলে। এই মিনিটা পেলে আরামসে পৌঁছে যাওয়া এগারোটার আগেই। কিন্তু এটা না পেলে যদি পরেরটায় যাই, সেটা দশটা আঠেরোয়। সেটাতে অফিস পৌঁছতে সাড়ে এগারোটা হয়েই যায়। কেউ কিছু বলে না, তবে কান্তিদুলালবাবু ভুরু তুলে, একবার আমাকে দেখেন, তারপর দেখেন হলের দেয়ালঘড়িটা। কান্তিদুলালবাবু আমার বড়োবাবু।

আমাদের বাড়ি থেকে বড়োরাস্তা পর্যন্ত গলিতে দুটো ভাঁজ আছে। অন্যদিনের চেয়ে আজকে একটু বেশ জোরেই পা চালাচ্ছি, তবে চালাবো বললেই কি আর চালানো যায়? শরীরের ওজনটি তো আর কম নয়। তারওপর সবে খেয়ে উঠে ভরা পেটের ভরটা শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে চাইছে। আমার পেটটি, কি আর বলব, মোশায়, আমার মধ্যে তো আর নেই, ঠেলে বেড়ে উঠছে দিন কে দিন। শীতকালে ছাদে উঠে রোদ্দুরে বসে, সারা গায়ে সরষের তেল মেখে বড়ো আনন্দ পাই। বাবা বলতেন, ‘শীতকালে নাভিতে অবশ্যই তেল দিবি রে, পটোল, পেটটা শীতল থাকবে’। বাবার কথা মতো নাভিতে তেল মাখাতে হাতড়াতে হয়, নাভিটা কোনখানে। চোখে তো আর খুঁজে পাই না।

গলির লাস্ট ভাঁজটা ঘুরলে, বড়ো রাস্তাটা চোখে পড়ে। অটো যাচ্ছে, গাড়ি যাচ্ছে, বাইক যাচ্ছে হুস হুস করে। ঘড়িতে দেখলাম তিপ্পান্ন হয়ে গেছে। মিনিটা কি চলে গেলো। দু’ পাঁচ মিনিট দেরি তো হামেশা করে, আজ কি আর করবে না? ব্যাটারা আমার যেদিন দেরি হয় সেদিনই রাইট টাইমে বেরিয়ে যায়। আর আমি রাইট টাইমে এলে, লেট করে। বাস পাবো কি পাবো না, এই দ্বিধায় যখন দুলছি, কানে এল, সেই চেনা ডাকটি- ‘আই, টালিগঞ্জ, মেট্রো, মেট্রো, রাসবিয়ারি, হাজরা, ভওয়ানিপুর, এক্সাইড, পাকিস্টিট, ডালহাউসি’

বাঁশির সুরে শ্রীমতীর কি হতো ঠিক জানি না, কিন্তু ওই ডাক শুনে আমি ব্যাকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘অ্যাই মিনি, রোককে। রোককে’।  মিনির হেল্পারটা শুনতে পেয়েছে। ‘আস্তেপ্পাসেঞ্জার’ বলে নেমে পড়ল রাস্তায়। আগের মতোই ডাক পাড়তে পাড়তে বলল, ‘একটু পা চালিয়ে, কাকু’।

ঠিক চুয়ান্নতে বাসের পাদানি বেয়ে উঠতেই বিপত্তি। ওপরে ওঠার জায়গা নেই। হেল্পার আমার পশ্চাতে গুঁতো দিচ্ছে ভেতরে ঢোকার জন্যে। ঢুকবো কোথায়? ভর্তি বাস! সকলেই দুর্যোধন। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জায়গাও কেউ ছাড়বে না। কন্ডাকটার অনবরত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে, ‘পিছনের দিকে এগিয়ে যান। গেটের মুখটা ছেড়ে দিন’। সারা জীবন শুনে এলাম, পিছনে তাকিও না, সামনে এগিয়ে যাও। মিনিবাসে নিয়ম উলটো পিছনের দিকে এগোতে হয়। গুঁতোগুঁতি করে ঠেলে ধাক্কা মেরে ঢুকেই গেলাম। আমার চোখ দু দিকের সিটে বসা লোক ও মেয়েদের মুখগুলোর দিকে। চেনামুখ যদি পাওয়া যায়, যারা মেট্রো কিংবা রাসবিহারী মোড়ে নামবে, তাহলে সেই সিটটার সামনে দাঁড়াবো।

পেয়েও গেলাম, এক ছোকরাকে কানে হেড ফোন নিয়ে রোজ গান শোনে, আর মাথা নীচু করে মোবাইলে মহাভারত লিখে চলে। এই ছোকরা রোজ টালিগঞ্জ মেট্রোতে নামে। সিটটার কাছে আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল, তার ঘাড়ে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে, মুচকি হেসে বললাম, ‘সরি ভাই, যা ভিড়। ভদ্রভাবে দাঁড়ানো যাচ্ছে না’। তার ওপর আমার উদ্ধত ও উদ্গত পেটটি দিয়ে চেপে ধরলাম, উটকো লোকটিকে। উটকো লোকটি আহাম্মক ও ভদ্রলোক, সরে গিয়ে আমায় জায়গা ছেড়ে দিয়ে পিছনের দিকে চলে গেল। আমি সযত্নে নিজেকে ছোকরার সিটের পাশে প্রতিষ্ঠা করলাম। যাক বাবা, আজ সব কিছু ভালোয় ভালোয় চলছে। আর পাঁচটা স্টপেজ পরেই মেট্রো, ছোকরা নেমে গেলে, সিটটাতে বসে একটু চোখ বুজবো।

এতক্ষণ অন্যদিকে খেয়াল করিনি, এখন শুনলাম অনেক যাত্রী বাসের ড্রাইভার আর কণ্ডাকটারের খুব পেছনে লেগেছে

‘কি হল, বাসটা এবার চালা’? ‘কণ্ডাক্টার, বাসটা এবার চালাতে বলো, সেই থেকে লোক তোলা হল তো’। ‘আধাঘন্টা হয়ে গেল, এইটুকু আসতে। এবার একটু টান, বাপ’। ‘এ শালা, গরুর গাড়ির ড্রাইভার নাকি রে?’ আমারও খুব মজা লাগে পেছনে লাগতে। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে মন্তব্য ছুঁড়ে দিতে। মেঘের আড়াল থেকে তির ছোঁড়ার মজাই আলাদা। আর হবি তো হ, সুযোগ চলে এল হাতের মুঠোয়। কোন স্টপেজ নেই, বাসটা খামোখা থেমে পড়ে দুটো প্যাসেঞ্জার তুলল। এমন সুযোগ হাতছাড়া করার লোক আমি অন্ততঃ নই। গলাটা একটু ভারি করে বললাম, ‘কিরে, এবার কি লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক তুলবি নাকি? যেখান সেখান থেকে লোক তুলছিস’? আমিই একটু আগে তাই করেছি, অস্টপেজে না দাঁড়ালে, এ বাসে আমার আজ চড়াই হত না। কিন্তু তাতে কি? আমারটা তো গুছোনো হয়ে গেছে! আশেপাশের দু’ চারজন আমার দিকে তাকালো, একজন শুঁটকে টাকমাথা বুড়ো বলল, ‘যা বলেছেন, ভাই’।

 আমি একটু জোর পেয়ে গেলাম, আবার বললাম, ‘এরা মানুষকে মানুষ বলেই গণ্যি করে না, ছোটলোকের দল। ছাগল ভেড়ার মতো লোক গাদাই করেই চলেছে’।  আমার কথায় কাজ হল বেশ, আরো কিছু লোক খুব তেতে উঠে তেড়ে গালাগাল দিতে লাগল ড্রাইভার আর কণ্ডাক্টারকে। দু’তিনজন বাসের গায়ে ধপ ধপা ধপ চাপড় মারতে শুরু করল। বাসের ভিড়টা বেশ খেপে উঠেছে। বাসটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল, এইসময় আমি আর একটা দিলাম ছোট্ট করে, ‘দেখলেন, শালারা সেই থেকে কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে এসে কিরম সিগন্যালটা খেলো? এখন দাঁড়িয়ে থাকুন পাঁচমিনিট’। একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘আমাদের কি কাজকম্মো নেই নাকি রে, শালা’? ‘এই ড্রাইভারটা কী করে লাইসেন্স পেল রে’? ‘লাইসেন্স আছে কিনা, তাই বা কে জানে’? 

জনগণের এই সব কথা বার্তায় আমার মনটা পুলকিত হয়ে উঠতে লাগল বারবার। নিজেকে মনে হচ্ছে জব্বর ন্যাতা, যার উস্কানিতে খেপে উঠছে জনতা। কি আনন্দ, কি আনন্দ! এদিকে আমার সামনের সিটে বসা ছোকরা কানের হেডফোন গুটিয়ে ব্যাগে রাখলপরের স্টপেজ হচ্ছে, টালিগঞ্জ মেট্রো। ছোকরা নামার জন্যে রেডি হচ্ছে। তার মানে এবার আমার সিটে বসার পালা। আমাদের ছোটবেলায় স্লেট পেন্সিলে অ আ ক খ লিখতাম, ছোকরা স্লেটের মতো ঢাউস মোবাইলটা চাপা জিন্সের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে সিট ছাড়ল। আমি তেরছা হয়ে দাঁড়িয়ে ছোকরাকে বেরোনোর রাস্তা করে দিলাম, আর উল্টোদিকটা ব্লক করে দিলাম, যাতে অন্য কেউ ঢুকে পড়ে, আমার সিটটা দখল না করে নেয়। বাসে চলা ফেরা করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার রে ভাই? অনেক স্ট্রাটেজি, বিবিধ কৌশল, বিস্তর কায়দা।

সিটে বসে পড়ে নিজেকে মনে হল, এ সিট যেন বাসের আসন নয়, যেন রাজ্যসভা, লোকসভা কিংবা নিদেনপক্ষে বিধানসভার সিট। কাঁধ থেকে নামিয়ে বউয়ের রান্না ভরা ব্যাগটা কোলে নিয়ে জুত করে বসলাম। মেট্রো স্টেশান চলে এসেছে, হুড় হুড় করে লোক নেমে, প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল বাসটা। সিটগুলো সব দখল, চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে আছে এদিকে সেদিকে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার সামনে দাঁড়ানো সেই আহাম্মক ভদ্রলোক। মনে হল, ওর কাটা ঘায়ে একটু নুনের ছিটে দিই। চোখাচোখি হতে বললাম, ‘এতো সিট খালি হল, আপনি একটা সিট পেলেন না’? ভদ্রলোক হাসলেন একটু, বোকার হাসি। ভাবখানা, ঠিক আছে, কী আর করা যাবে। আহাম্মক ভদ্রলোক আর কাকে বলে?

মেট্রোতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করেও তেমন প্যাসেঞ্জার হল না, বাস আবার ছেড়ে দিল। ফাঁকা বাসে আমার এবার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ভিড়ের মধ্যে আমি যে কথাগুলো বলেছিলাম, সেগুলোর অনেক কথাই যে আমি বলেছিলাম, কণ্ডাক্টারটা বুঝতে পারেনি তো? বাস ছাড়ার পরই কন্ডাকটার আমার কাছেই দৌড়ে এল দেখে আমি চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, এখন ও যদি কিছু বলে? দেখলাম সেরম কিছু নয়, ব্যাটা টিকিট চাইতে এসেছে। কন্ডাক্টারের হাতে দশটাকা দিয়ে বললাম, আটটাকা। আসলে আমার গলির মুখ থেকে ভাড়া হয় দশ টাকা। ও কি আর অতো মনে রেখেছে? জিগ্যেস করলে বলব, মেট্রোর একটা স্টপেজ আগে উঠেছি। 

আট টাকার টিকিট আর দুটাকা ফেরত নিতে নিতে খুব দরদ ভরা গলায় বললাম, ‘কি হল হে? বাস তো একদম খালি, লোসকান হয়ে যাবে যে, ভাই’। 

আমার সহানুভূতিতে কণ্ডাকটার গলে গেল, বলল, ‘কি বলব বলেন, কাকু। স্ট্যান্ড থেকে মেট্রো অব্দি যা প্যাসেঞ্জার পাই, ওতেই আমাদের দুটো পয়সা থাকে। তা পাব্লিক এমন গালাগাল দেয়...’  

আমি মাখো মাখো গলায় বললাম, ‘সব লোক কি আর সমান হয় রে, ভাই? হাতের পাঁচটা আঙুল কি সমান? তবে? ও সব কথা কানে দিও না’।

নিশ্চিন্ত হয়ে গুছিয়ে বসে আমি চোখ বুজলাম, মনে মনে বললাম, আর বকিস না বাপ, এবার একটু ঝিমোতে দে                                           

                                                            -০০- 

এর পরের রম্যগল্প - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ১ "

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...