রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

একটি শিশিরবিন্দু....

   

এর আগের রম্যকথা - " ...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু " 


যতদূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ি, সাল ১৯৬৮ কিংবা ৬৯, ডোনেশানের জন্যে বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল কমিটির প্রতিনিধিরা এসেছিলেন আমাদের স্কুলেও। পরেরদিন বাবার থেকে টাকা এনে জমা করেছিলাম, কত ঠিক মনে নেই, তবে দশটাকার বেশি বলে মনে হয় না। তখন তের পয়সার ট্রাম ভাড়ায় ধর্মতলা থেকে শ্যামবাজার যাওয়া চলত, আর পাঁঠার মাংসের দর ছিল পঁচিশ-তিরিশ টাকা কিলো। কাজেই দশ টাকাও তখনকার দিনে নেহাত কম ছিল না! স্কুল থেকে আমাদের হাতে দিয়েছিল ভাঁজ করা একটি সুন্দর লিফলেট। তাতে লেখা ছিল কন্যাকুমারীতে কিভাবে গড়ে উঠছে বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির। আর ছিল মন্দিরের একটি ছবি। নীল আকাশ আর নীল সমুদ্রের পটভূমিকায় গেরুয়া রঙের সেই মন্দির দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের মাঝখানে একখানি পাথরের দ্বীপে।

১৯৮২ সালে কন্যাকুমারীর ভারতভূমি থেকে বিবেকানন্দ রকে যাবার লঞ্চে ওঠার মুখে সেই ছবিটিই আবার যেন দেখতে পেলাম। তবে এখন আর ছবি নয় পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য। সাধারণতঃ কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিল কম হয়ে থাকে বলে আমরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে থাকি। কিন্তু এবারে যে দৃশ্য দেখলাম, তা কল্পনার চেয়েও অনেকটাই বেশি। তিনদিকে অনন্ত সুনীল সমুদ্র। পিছনে শরতের নীল আকাশ, আকাশে হাল্কা-পুল্কা ছিট-ছাট সাদা মেঘ। মাঝখানে মাটি আর গিরি রঙের সুন্দর স্থাপত্য। জবরজং নকশা নেই, অজস্র মূর্তির কাহিনী নেই, ছিমছাম সুন্দর। সমস্ত পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোত মিশে গেছে। অন্যরকম কিছু হলে চোখে লাগত নির্ঘাৎ।

 গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের দেহরক্ষার পর বেশ কিছুদিন পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নরেন্দ্রনাথ দুবছর টানা ভারতভ্রমণ করে ১৮৯২ সালের ডিসেম্বরে কন্যাকুমারী পৌঁছেছিলেন। শোনা যায় কন্যাকুমারী মন্দিরে বসে পূর্বদিকে সমুদ্রের মধ্যে এই পাথর তাঁর চোখে পড়ে। কথিত আছে, ওই পাথরে বসেই কুমারী পার্বতী শিবকে স্বামীরূপে পাবার জন্যে দীর্ঘদিন তপস্যা করেছিলেন। নরেন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ওই পবিত্র পাথরে বসে তিনিও ধ্যান করবেন। কপর্দ্দকহীন নরেন্দ্রনাথকে বিনা পয়সায় পার করে দিতে কোন জেলে নৌকাই তখন রাজি হয়নি। অগত্যা অদম্য নরেন্দ্রনাথ শীতের সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং সাঁতরে পার হয়েছিলেন প্রায় শপাঁচেক মিটার দূরত্ব! তিনদিন ২৫ থেকে ২৭শে ডিসেম্বর তিনি সেই পাথরে বসে ধ্যান করেছিলেন। পর্যালোচনা করেছিলেন তাঁর সমগ্র ভারত ভ্রমণের ফলাফল এবং স্থির করেছিলেন তাঁর পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা। অনেকেই অবিশ্যি এই ঘটনাকে কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, কারণ বিবেকানন্দের নিজস্ব রচনায় এবং সেই সময়কার কোন চিঠিপত্রেই এমন কোন ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায় নি।

 সিমলের নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দে উত্তরণের পথে শ্রী রামকৃষ্ণ ছাড়া আর কোন বাঙালীর তেমন কোন অবদানের কথা শোনা যায় না, বরং শোনা যায় অনেক বিরুদ্ধতার কথা। তাঁর শিকাগো ধর্ম মহা সম্মেলনে যোগদান এবং বিশ্বের দরবারে বেদান্ত দর্শনের কথা তুলে ধরার পিছনে মানসিক এবং ব্যবহারিক সাহায্য ছিল অজস্র অবাঙালী ভারতীয়ের। মাদ্রাজের আলাসিঙ্গা পেরুমল, ক্ষেত্রীর মহারাজা অজিত সিংয়ের মতো ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়া তাঁর বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা সহজ হত না।

 বিবেকানন্দের মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পরে তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ শ্রীযুক্ত একনাথ রানাডের এই উদ্যোগও কম অলৌকিক নয়। একদিকে তিনি গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়ালের মতো অদ্ভূত স্মারক, যা আজ ভারতের অন্যতম দর্শনীয় তীর্থস্থান। অন্যদিকে গড়ে তুললেন বিবেকানন্দ কেন্দ্র, যেখানে বিবেকানন্দের আদর্শে গড়ে উঠবে আধুনিক যুব সমাজ, বড়ো হয়ে তারা গড়ে তুলবে বিবেকানন্দের স্বপ্নের ভারতবর্ষ।

 বিবেকানন্দ রকে দাঁড়ালাম, আমাদের পিছনে পড়ে রয়েছে আমাদের বিশাল দেশ ভারতবর্ষ। ওখান থেকে চাক্ষুষ করলাম, তিন সমুদ্রের অদ্ভূত সঙ্গম। বাঁদিকে বঙ্গোপসাগরের সবুজাভ জলরাশি, ডানদিকে ফিকে নীল আরব সাগর আর সামনে গভীর নীল ভারত মহাসাগর। এই প্রশস্ত প্রস্তরদ্বীপের গায়ে এসে অনবরত আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউ। এই ঢেউগুলি কোন সাগরের? তারা কি জানে আমরা তাদের কি নাম দিয়েছি?  আরেকবার উপলব্ধি হল এই বিশাল পৃথিবীতে কি সামান্য আর ক্ষুদ্র আমাদের অস্তিত্ব!

 বিশাল প্রান্তরে, পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যোদয় দেখেছিলাম, দেখেছিলাম সূর্যাস্তও। কিন্তু একই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমনটা আর কোথাও দেখিনি। বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে যে শিশু সূর্যের উদয় হয়েছিল, দিনান্তে সেই সূর্যই ক্লান্ত হয়ে ডুব দিলেন আরব সাগরের জলে।

 পরদিন ভোরে আরেকবার সূর্যোদয় দেখে আমরা সকালের ট্রেনে রওনা হলাম ত্রিবান্দ্রম। ঘন্টা তিনেকের জার্নি শেষে আমরা ত্রিবান্দ্রম পৌঁছে বিকেলের দিকে দেখতে গেলাম কোবালাম বীচ। কন্যাকুমারীতে যে সূর্যোদয় দেখেছিলাম, এখানে এসে দেখলাম সেই সূর্যাস্ত। অজস্র নারকেল গাছের সবুজ, সোনালী বালুর চর, সুনীল আরব সাগরের জল, বিকেলের আকাশে অস্তগামী সূর্যের বিচিত্র রঙের খেলা। সাগরের বেলাভূমি নিয়ে এতদিন যে রোমান্টিক সব বর্ণনা পড়েছি বা সিনেমার পর্দায় দেখেছি, তার নিখুঁত দৃশ্য এই কোবালাম বীচ। পণ্ডিচেরী, রামেশ্বরম, কন্যাকুমারীতে সমুদ্রতট আছে, নেই এমন স্বর্গতুল্য বেলাভূমি। লবণাম্বু সাগরের মধ্যম ঢেউয়ে সমুদ্রস্নান সেরে আরো নমকীন হলাম কিনা জানিনা, তবে সম্পূর্ণ হল আমার সমুদ্রপাঠ। মনের মধ্যে পাহাড়ের প্রতি যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা আর রইল না, প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমিকের মতো দুজনকেই ভাগ করে দিলাম আমার মুগ্ধতা।

 ত্রিবান্দ্রম থেকে বাসে সারা রাতের জার্নি শেষে কোয়েমবাতোর হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম নীলগিরির রাণী উডাগামন্ডলম, যার আদুরে নাম উটি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ নীলগিরি পাহাড়ের চোখ জুড়োনো সবুজ ইউক্যালিপটাস, পাইনের জঙ্গল, চা বাগান, নীল জলের লেক, সব মিলিয়ে সুন্দর শহর। সবচেয়ে উঁচু পর্বত চূড়া দোদাবেতা ২৬২৩ মি, দারজিলিংযের পথে ঘুমের উচ্চতা ২২৫৭ মি আর দারজিলিং ২০৪৫ মি, উচ্চতায় অনেকটাই বেশিএতসব সৌন্দর্য থাকলেও অজস্র পাহাড়ের অনন্ত বিস্তার নেই, নেই কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজসিক সিংহাসন।  চারদিন উটিতে ভালোই লাগল, কিন্তু কোন নতুনত্ব মনে ধরা দিল না।

 উটি থেকে আমরা এবার গাড়িতে নেমে এলাম মাইশোর। ঘন্টা পাঁচেকের পথে মাঝে পড়ল বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্ট। মুদুমালাই চেকপোস্টের ফরেস্ট গার্ডদের কাছে খবর পাওয়া গেল এই ফরেস্টে বাঘ আছে, আছে চিতা। ভাগ্যে থাকলে দেখা মিলতেও পারে। আমাদের গাড়ির সারথিও চেষ্টার কসুর করল না, কিন্তু দেখা মিলল না কোন বাঘের। বাঘেরা নিশ্চয়ই জাতীয় সড়কের চেয়ে ঘন জঙ্গলের রাস্তাই বেশি পছন্দ করে। তবে চিতল হরিণের দল, সম্বর আর অনেক ময়ুর দেখা দিল পথের দুপাশে।

মাইশোর শহরের রাজবাড়ির জাঁকজমক, চামুণ্ডি হিলসে চামুণ্ডি দেবীর মন্দির দর্শন ও শহর দর্শনের পর মাইশোর আর্ট গ্যালারিতে ঘনিষ্ঠ জানাশোনা হল রাজা রবি বর্মার ছবির সঙ্গে। ত্রিবান্দ্রাম আর্ট গ্যালারিতেও বেশ কয়েকখানি ছবি দেখেছিলাম, কিন্তু এখানে অনেক। রামায়ণ, মহাভারত, পৌরাণিক নানান কাহিনীর ছবি ছাড়াও, এখানে বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে সাধারণ জীবনের নারী। আজও মনে আছে একটি ছবি। এক মহিলার বুকের কাছে বাঁহাতে ধরে থাকা প্রদীপের শিখাটি ডান হাতে আড়াল করা। মহিলার মুখে আর বুকের ওপর এবং পিছনের দেয়ালে সেই দীপের আলো আর ছায়ার অদ্ভূত মিশ্রণ। অসাধারণ সেই ছবিতে রাজা রবি বর্মার অবিশ্বাস্য রং আর তুলির দক্ষতা ভোলা যায় না। মনে থাকবে সারা জীবন।

 বৃন্দাবন গার্ডেনের মিউজিক্যাল ফাউন্টেন দেখতে আমরা যেদিন গেছিলাম, সেদিন ছিল মাইশোরের দশেরা উৎসব। অজস্র জনসমাগম এবং চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সে ছিল এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।

 মাইশোর দর্শনের পর সকালের ট্রেন ধরে আমরা রওনা হলাম ব্যাঙ্গালোর। ট্রেনের রিজার্ভ কামরাতেও শান্তি পাওয়া গেল না এত ভিড়। মাইশোরের দশেরা উৎসব দেখে ঘরে ফেরা দেহাতি লোকের ভিড়ে অসহায় টিকিট চেকারও রণে ভঙ্গ দিল। রিজার্ভড আসনে বসার আশা ত্যাগ করে বাবা মা কোনমতে একটু বসার জায়গা পেলেন, আমাদের দুই ভাই দাঁড়ানোর মতো আশ্রয় পেলাম টয়লেটের সামনে প্যাসেজে। প্রায় চার ঘন্টার এই ট্রেন জার্নিতে নড়া চড়া করাও বিড়ম্বনা, এমনই নিশ্ছিদ্র সেই ভিড়।

 ট্রেনের যাত্রা পথে অনেক স্টেশন পার হল – মান্ড্য, মাড্ডুর, চানাপটনা, রামনগর, বিরডি। সেদিন এই সব স্টেশনের কোন গুরুত্ব ছিল না আমার কাছে। তখন কে আর জানত আমাকে আবার কর্মসূত্রে এই অঞ্চলে ফিরে আসতে হবে। বেশ কিছুদিন থাকতেও হবে ছোট্ট শহর এই চানাপটনায়। সে সব সুদূর ভবিষ্যতের কথা। সেদিন আমাদের ট্রেন ব্যাঙ্গালোর শহরে ঢুকল প্রায় ঘন্টা দুয়েক লেট করে।

 ব্যাঙ্গালোর শহর দেখা হল। আর সিনেমা দেখা হল। সেই সময়ে ব্যাঙ্গালোরের সুনাম ছিল সিনেমাহলের প্রাচুর্যের জন্যে। একই বাড়ির তিনটে ফ্লোরে তিনটে হল অনেকগুলি ছিল এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই অত্যাধুনিক। আমাদের কলকাতায় ওই রকম হল ছিল না বললেই চলে, আর আধুনিক হল বলতে ধর্মতলার সাকুল্যে তিনটে কি মেরে কেটে চারটে হল। ব্যাঙ্গালোর সাঙ্গ করে আমরা ঘরে ফেরার দিকে রওনা হলাম – আবার ম্যাড্রাস।

মাদ্রাজের প্রায় তের কিমি লম্বা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মেরিনা বীচ দেখে তেমন মজা পেলাম না। হয়তো এর আগে অনেক ধরণের সমুদ্র দেখা হয়ে গেছে এবং কোবালাম বীচের সৌন্দর্যের ধারে কাছে আসতে পারে না বলে। যাবার সময় দেখলে প্রথম দেখা সমুদ্রতট হিসেবে নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতাম, অবাক হতাম।

 টলেমি এবং পেরিপ্লাসের বর্ণনা থেকে জানা যায় সে কালে মামল্লপুরম বন্দরের খুব রমরমা ছিল। আমাদের তাম্রলিপ্তি বন্দরও তো প্রায় সমসাময়িক। কে জানে কত বাঙালি নাবিক এবং তামিল নাবিক যাওয়া আসা করেছে এই দুই বন্দরে! আজ সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় ক্ষয়ে যেতে থাকা পরিত্যক্ত মামল্লপুরমের মন্দির, পঞ্চরথ, এবং পাথরে খোদাই অজস্র শিল্প দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়, সেই সব দিনের গৌরব।

 একদিন খুব ভোরে আমরা রওনা দিলাম পূর্বঘাট পর্বতমালার ছোট্ট তিরুমালা পাহাড়ের চূড়ায় বিশ্বের ব্যস্ততম ও ধনীতম বালাজি তিরুপতি ভেংকটেশ্বরস্বামী মন্দির দর্শনে। তিরুপতি শহর তিরুমালা পাহাড়ের ঠিক নীচে, সেখান থেকে “তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম” –এর ছোট ছোট বাস অনবরত নিয়ে চলেছে ৮৫৩ মি উঁচু পাহাড়ের ওপর। পাহাড়ের মাথায় বিস্তীর্ণ সমতল। মাঝখানে ঈপ্সিত মন্দির, চারদিকে দোকানপাট জমজমাট। গৃহস্থ সরঞ্জাম থেকে খাবার দাবার কি না পাওয়া যায় সে সব দোকানে।

 মন্দিরের দরজা সামনে হলেও সে পথে যাওয়া যাবে না। সে পথে যেতে গেলে হয় ভি আই পি হতে হবে অথবা মাথাপিছু একশ টাকার টিকিট কাটতে হবে। বিনি পয়সায় দর্শনও সম্ভব, সেক্ষেত্রে লোহার খাঁচায় ঘুরে ঘুরে আসতে হবে মানুষের সুদীর্ঘ লাইনের পিছনে। মাত্র একশ টাকার বিনিময়ে ভি আই পি হতে মা কিছুতেই রাজি হলেন না, অগত্যা আমরা আম জনতার লাইনে সামিল হলাম। প্রায় ঘন্টা তিনেক লোহার খাঁচার নানান গোলকধাঁধায় ঘুরে আমরা দর্শন পেলাম বাবা তিরুপতির। সামান্য কয়েক মূহুর্তের দর্শন, পিছনের এবং আশেপাশের মন্দির সঞ্চালকদের নিরন্তর ধাক্কায় তার বেশী দাঁড়াবার জো নেই।

 বাবা তিরুপতির মন্দিরে পুজো দিয়ে তাঁর আশীর্বাদ ও প্রসাদী লাড্ডু নিয়ে আমরা ফিরে এলাম মাদ্রাজ। এখান থেকেই আমাদের আগামীকাল ঘরে ফেরার ট্রেন। দীর্ঘ একুশদিনের যাত্রা শেষ, এবার ঘরে ফেরার জন্যে মন অস্থির। বাড়ি গিয়ে নিজের ঘরে পা ছড়িয়ে বসা আর ভাতের সঙ্গে বিউলিডাল আর আলুপোস্ত মেখে খাওয়ার শান্তি ফিরে পাওয়া।


যা দেখলাম, যা পেলাম তার হিসেব করার সময় এখন নয়। তার হিসেব করতে হবে অনেক দূরে অনেক দিনের পর। ততদিনে মন থেকে মুছে যাবে পথ চলার ছোটখাটো বাধা-বিঘ্ন, দুঃখ-কষ্টের স্মৃতি। মনে থাকবে শুধু বিচিত্র প্রকৃতি, যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা মহিমময় ইতিহাস নিয়ে তীর্থস্থান, মানুষের গড়ে তোলা অসাধারণ শিল্পসৃজন। আর সবার ওপরে মনে থাকবে চলার পথে মনে থাকা আর মনে না থাকা অগণিত মানুষ।

চলবে...



রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ২

  


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "





 

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্কুল শুরু। এরমধ্যে অচ্যুত একদিন গিয়ে স্কুলের নিয়ম কানুন, ফর্ম ফিল-আপ, টাকা-পয়সা জমা দেওয়া সব করে এসেছেন। তার সঙ্গে ক্লাসের রুটিন, বুকলিস্ট, কেমন জামাপ্যান্ট পরতে হবে সব জেনে এসেছেন, পাছে কোন কথা ভুলে যান তাই লিখেও এনেছেন। সেদিন পান্নাও স্কুলে গিয়েছিল বাবার সঙ্গেতার বয়সি আরো কিছু ছেলে ছিল সেখানে। তাদেরও সঙ্গে ছিল বাবা, কিংবা বাবা-মা দুজনেই। নিজের নিজের ছেলেদের সঙ্গে বাবা-মায়েরা পরিচয় করিয়ে দিলেন, তাঁরা খুশি খুশি মুখে বললেন, “তোরা সব একই ক্লাশে পড়বি। বন্ধু হবি, এখন থেকেই পরিচয় করে নে”! কিন্তু প্রথম পরিচয়েই তো বন্ধুত্ব হয় না। অচেনা সমবয়সীদের সামনেও কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগে, বাধো বাধো ঠেকে!

বাবা যতক্ষণ স্কুলের কাজকর্ম সারছিলেন, পান্না স্কুলের সিমেন্ট বাঁধানো উঠোনে ঘুরে ঘুরে বেড়ালো। এই আমার স্কুল! বিরাট চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে, সে অবাক হয়ে গেল। এই স্কুল আমার! উঠোনের দু ধারে বেশ কয়েকটা উঁচু উঁচু গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পাতায় ভরা মাথাগুলো স্কুলের চারতলা বাড়ির প্রায় সমান। উঠোনের ওপারে, বিশাল মোটা মোটা থামওয়ালা উঁচু ছাদের বাড়ি। অবাক হয়ে পান্না সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাদের স্কুলের একতলায় এখন খুব ব্যস্ততা। কিন্তু বিশাল এই বাড়িটা একদম নির্জন। কয়েকধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে সিমেন্টের বিরাট চাতাল, চাতালের পরে বিরাট দরজা। সে দরজা কত্তো উঁচু – হাতিও যেন ঢুকে যাবে সেই দরজা দিয়ে। পান্না সিঁড়ি দিয়ে উঠে চাতালে পা দিল, তারপর ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল! ভীষণ কৌতূহল - কী আছে ভেতরে?

“উঁহুহুঁহুঁ...ওপটে যিবে না, ওপটে যিবে না”। পান্না পেছন ফিরে দেখল, একজন লোক তাকেই বলছে কথাটা। তার গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি আর পরনে ফুলপ্যান্ট। কিন্তু পেটের কাছে গেঞ্জিটা খুব ফুলে আছে, বেশ বড়োসড়ো ভুঁড়ির জন্যেপান্না লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে কোন রাগ বা বিরক্তি দেখতে পেল না, কিন্তু ভেতরের দিকেও আর গেল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল স্কুলের উঠোনে। নিচেয় নেমে আসতে লোকটা তার কাঁধে হাত রাখল, বলল, “কী নাম তোমার? আজ ভর্তি হচ্ছ স্কুলে?” পান্না ঘাড় নাড়ল। কিন্তু নিজের নাম বলতে বেশ বেগ পেল। অপরিচিত লোক তার নাম জিগ্যেস করলেই, তার এমন হয়। কথা আটকে যায়। লোকটা ধৈর্য ধরে শুনল, তারপর হেসে বলল, “মোরঅ নাম দুর্যোধন অছি। দুর্যোধনদা কহিবা, কেমন? মু তম সবকু দেখিবি, আউ।  আউ দুষ্টুমি করিলে কঁড় হব দেখিবা ...।” কথা শেষ করল না, কিন্তু চোখ বড় বড় করে হাসল, বলল, “সঙ্গরে কউ অছন্তি, বাপঅ, না মা?”

“ব্‌-বাবা” দুর্যোধনদা তার হাত ধরে বলল, “চলো তোমাকে স্কুলটা দেখাই”।

 

পান্নার স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত মর্নিং সেশন।  অতএব তাকে এখন রোজ সকালবেলা বাবার হাত ধরে, স্কুলে যেতে হয়। তার পরনে স্কুলের ড্রেস, সাদা হাফ-প্যান্ট আর সাদা শার্ট। পায়ে নটিবয় শু।  জানুয়ারির মাঝামাঝি যখন স্কুল শুরু হল, তখন গায়ে ছিল শীতের সোয়েটার, তার রং বট্‌ল্‌ গ্রিন। আর হাতে স্টিলের চারচৌকো স্যুটকেশ। তার মধ্যে স্কুলের রুটিন অনুযায়ী ভরে নেয় বই খাতা, পেন্সিল বক্স, রবার, পেন্সিল ছোলার কল, একফুট লম্বা কাঠের স্কেল

শ্রী গোপাল মল্লিকের গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তা মির্জাপুর স্ট্রিটের ওপারে আছে বিহারি দেবলালকাকুর মনিহারি দোকান। বাবা স্কুল যাবার পথে, সে দোকান থেকে রোজ কিনে দেন, চারটে বিস্কুট আর রাংতায় মোড়া দুটো লজেঞ্চুস বা চকোলেট, কোনদিন বাপুজি কেকদেবলালকাকু কাগজের ঠোঙায় টিফিন ভরতে ভরতে মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করেন, “এতেই হয়ে যায়, খোখাবাবা? ভুখ লাগে না?” স্টিলের বাক্সের মধ্যে ঠোঙাটা নিতে নিতে পান্নার রোজই মনে হয়, স্কুলের টিফিন হতে এখনও অনেক দেরি, তিনটে পিরিয়ড শেষ হলে তারপর। তার তো এখনই খিদে পাচ্ছে, বিস্কুট আর লজেঞ্চুসের খিদে!

কিন্তু সে উপায় তো নেই, বাড়ি থেকে সেদ্ধ চিঁড়ে, চিনি আর লেবু মেখে খেয়ে এসেছে। কারণ সে বড্ডো পেটরোগা, কালমেঘ দেওয়া “কুমারেশ” সিরাপ কিংবা থানকুনি পাতার রস এখন তার নিত্য সেব্য। তার সঙ্গে ওই চিঁড়ে! অতএব এখনই বিস্কুটে কামড় দিলে, বাবার হাতে তার কানটা আর আস্ত থাকবে না।

বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রিট ধরে এগিয়ে, মহাবোধি সোসাইটির উল্টোদিকের গেট দিয়ে ঢুকে, কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে, স্কুলের রাস্তাটা বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। সোজা গিয়ে ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউটের কাছে মোড় নিয়ে, বাঁদিকে সোজা গেলেও কফি হাউসের উল্টোদিকের গেট দিয়ে স্কুলে যাওয়া যায়, কিন্তু সে পথটা কিছুটা ঘুরপথ। তাছাড়া সকাল-সকাল কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে গেলে বিস্তর মজা পাওয়া যায়। কত মোটা-সোটা মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন হাঁস-ফাঁস করতে করতে। বেঞ্চে বসে বৃদ্ধরা গল্প করছেন। সাঁতারের ক্লাবের বাগানের ফুলগাছ থেকে ফুল তুলে সাজি ভরে তুলছেন দু একজন বয়স্কা মহিলা। বড়রা ঝুপুস ঝুপুস ঝাঁপ মারছেন গোলদীঘির জলে, জলছিটিয়ে সাঁতার কাটছে অনেকে। সে সব সাঁতারের নানান স্টাইল – চিৎসাঁতার, বাটারফ্লাই, ফ্রিহ্যান্ড - পান্না এসব নাম অবিশ্যি শিখেছে অনেক পরে। কিন্তু তার স্কুল যাওয়ার পথে – এমন দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায় পান্না। কোন কোন দিন স্কুল পৌঁছতে দেরি হবার আশঙ্কায়, বাবা ধমকান, “কী দেখছিস কি হাঁ করে, স্কুলের ঘন্টা পড়ে গেলে আর ঢুকতে দেবে না যে! তাড়াতাড়ি পা চালা”!

প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরিই হয়েছিলএকতলাতেই বাবার হাত ছেড়ে দিতে হল, প্রভাকরদা হাত ধরল। বলল, চল তোমাকে ক্লাশে পৌঁছে দিই। বাবা নিচেয় দাঁড়িয়ে রইলেন, পান্না চওড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে বার বার দেখছিল বাবার দিকে, তার বুকের মধ্যে এখন জমে উঠছে ভয় আর কেমন এক কান্না-কান্না অনুভূতি। বাবা স্মিতমুখে হাত নাড়লেন বার দুয়েক। শক্ত হাতে পান্নার হাত ধরে প্রভাকরদা বলতে বলতে চলল, “ভয় পাচ্ছো কেন? কেলাসে গিয়ে দেখবে তোমার বয়সি কত্তো বন্ধু ... লেখাপড়া করে বাবার মতো হতে হবে না...”? সিঁড়ির ল্যাণ্ডিংয়ে উঠে দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠতে বাবাকে আর দেখতে পেল না পান্না, দোতলার দীর্ঘ করিডরে উঠে, ডানদিকের প্রথম ঘরটাতেই ক্লাস ওয়ানের ঘর, পান্নাকে দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল প্রভাকরদা। ক্লাসের ছেলেরা নিজের নিজের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বেঁটেখাটো সুদর্শন মাস্টারমশাইও দাঁড়িয়ে দুই চোখ বন্ধ করে, জোড়হাতে গান করছেন, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্যসুন্দর”প্রভাকরদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় পান্নাকে চুপ করে দাঁড়াতে বলল এ গানটা পান্নার বেশ পছন্দের গান, বহুবার তার মাকে এই গান গাইতে শুনেছে। কিন্তু আজ স্কুলের প্রথম দিনে,  শীতের সুন্দর এই সকালে, তারই সমবয়সি একঘর ছেলেদের সঙ্গে তন্ময় মাষ্টারমশাইয়ের গাওয়া সমবেত গান, পান্না মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। তার খুবই পরিচিত গানটিই আজ যেন নতুন মহিমা নিয়ে পান্নার জীবনকে উদ্ভাসিত করে তুলল।

একটু পরেই গান শেষ হলে, প্রভাকরদা পান্নাকে মাস্টারমশাইয়ের হাতে সমর্পণ করে চলে গেল, আর পান্না নিজের অজান্তেই তার সমস্ত শৈশব সমর্পণ করে দিল, এই স্কুলের মাতৃক্রোড়ে। পান্নাকে তার নির্দিষ্ট বেঞ্চ আর ডেস্ক দেখিয়ে দিলেন, মাস্টারমশাই। প্রথম দিন স্কুলে এসেই, নিজের অধিকারে একটি ডেস্কের অর্ধেক আর বসার বেঞ্চের অর্ধেক পেয়ে, পান্না আনন্দ ও উত্তেজনায়, খুব কষ্ট করে বলল, “গুডমর্নিং, স্যার”মাস্টারমশাই সস্নেহে তার মাথায় হাত রাখলেন, মৃদু হেসে বললেন, “বসো”।

প্রথম কটাদিন কেটে গেল স্কুল এবং তার নিয়ম কানুন বুঝতে। মাস্টারমশাই এবং দিদিমণিদের চিনতে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারি ভালো, পড়া না পারলে বা হোমটাস্ক করে না আনলে বকা দেন, কিন্তু সে বকার মধ্যে কোন ভয় লাগে না। বরং তাঁরা যখন মাথায় হাত রেখে জিগ্যেস করেন, “কেন পড়িসনি রে?”, অথবা “হোমটাস্ক করতে ভালো লাগে না?” তখন পান্নার বেশ লজ্জাই লাগে। আর যাঁরা খুব বকাবকি করেন, চেঁচামেচি করে বলেন, “তোদের বাবা-মায়েরা কেমন রে? ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েই নিশ্চিন্ত, তার লেখাপড়ার কোন খোঁজখবর রাখে না?” তাঁদের অনেকেই কষ কষ করে কান মলে দেন, ক্লাসের বাইরে কানধরে নিল-ডাউন করিয়ে রাখেন, দুই আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল রেখে চিপে ধরেন পান্নাদের ছোট্ট ছোট্ট আঙুল। একজন বয়স্ক মাস্টারমশাই আবার জুলপির চুল ধরে, এমন টেনে দেন, ব্যথায় ঝনঝন করে ওঠে মাথা!

প্রথমদিন এবং প্রত্যেকদিন যে মাস্টারমশাই “আনন্দলোকে...” প্রার্থনা গেয়ে ক্লাস শুরু করেন, তাঁর নাম পান্না জেনেছে, পূর্ণেন্দুবাবু। পূর্ণেন্দুবাবু পান্নার খুব প্রিয় মাস্টারমশাই, শান্ত-ধীর-স্থির মানুষটি যেমন সুন্দর পড়ান, তেমন ভালোবাসেন প্রত্যেক ছেলেকে। হোমওয়ার্ক হোক বা ক্লাসের খাতা, সুন্দর নির্ভুল উত্তর লিখলে তিনি “ভেরি গুড” লিখে দেন খাতার পাতায়। তাছাড়াও খাতা বিচার করে, তিনি “গুড”, “ফেয়ার”, “ব্যাড”ও লিখে দিতেন। পান্না আপ্রাণ চেষ্টা করত রোজ, “ভেরি গুড” বা “গুড” অর্জন করতে, যেদিন বড়সড় ভুলচুক করে “ব্যাড” জুটত, সেদিন তার মনটাই খারাপ হয়ে থাকত সারাটা দিন। ছেলেদের খাতায় “ব্যাড” লিখতে পূর্ণেন্দুবাবুও যে খুব কষ্ট পেতেন, সেটা বোঝা যেতে তাঁর মুখের দিকে তাকালে আর তাঁর চোখের চাউনিতে।

যে দুজন দিদিমণি পান্নার খুব প্রিয়, তাঁরা হলেন, কনকদিদি আর ইন্দিরাদিদি। ইন্দিরাদিদি তাও মাঝে মধ্যে একটু রেগে যেতেন, কিন্তু সে ছেলেরা যখন দুষ্টুমি করত তখন। পড়ানোর সময় কাটাকুটি খেললে, কিংবা তাঁর পড়ানোর সময় পাশের বন্ধুর সঙ্গে নিচু গলায় গল্প করলে, কিংবা পাশের বন্ধুকে ঢিসুম করে ঘুঁষি মারলে, ইন্দিরাদিদি খুব রেগে যেতেন। বলতেন, “সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাক, হনুমান”।  আর কনকদিদি ছিলেন পরম মমতাময়ী, পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সুন্দর গল্প করতেন, কাউকে কক্‌খনো উঁচু গলায় ধমকাতেন না, কিন্তু তাঁর ক্লাশে সব্বাই চুপ করে পড়া শুনত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত তাঁর মুখের দিকে। তিনি কখনো নিজের চেয়ার-টেবিলে বসতেন না, পড়ানোর সময় সারাক্ষণ পায়চারি করতেন, ঘরের এধার থেকে ওধার।

            

 

স্কুল কী শুধু লেখাপড়া শেখায়? নানারকম খেলাধুলো, ড্রিল-পিটি শেখায়। ছবি আঁকতে শেখায়। গান গাইতেও শেখায়। ক্লাস-টু থেকে নাচ-গানের ক্লাশ ছিল সপ্তাহে দুদিন। সে দুটো দিন বড়ো মজার। মীনাদিদি গান শেখাতেন, শেখাতে চেষ্টা করতেন নাচের নানান অঙ্গভঙ্গি। ক্লাশের সব ছেলে মিলে ধুপধাপ শব্দে “মেঘের কোলে রোদ হেসেছে...”, “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে...” অথবা “আজি ধানের ক্ষেতে...” গান গাইতে গাইতে যখন নাচের প্রচেষ্টায় হাত-পা নাড়ত, সে এক আশ্চর্য অনুভব। বসে বসে গান না গেয়ে নাচের চেষ্টা করতে করতে গানগাওয়ার মধ্যে সে বিস্তর ফারাক টের পেত। মজা লাগত বেশ। ওই নাচ-গানের ক্লাশ থেকে, মীনাদিদি গান গাওয়ার জন্যে দুজনকে বেছে নিলেন, একজন পিনাকী আর অন্যজন পান্না। পিনাকী বড়ো ভালো গাইত, আর পান্নার কাজ ছিল পিনাকীর গলায় গলা মেলানো। ওইভাবেই ক্লাস টু থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, প্রাইমারি সেশনের, যে কোন অনুষ্ঠানে – বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী বা পুজোর ছুটির আগে শারদোৎসবে - পিনাকী আর পান্নার দু-চারটে যৌথগান অবধারিত ছিল।           

পনেরই আগষ্টের দিন স্কুলে ফ্ল্যাগ তোলা হত, পতাকার নীচেয় দাঁড়িয়ে হেডস্যার ওজস্বিনী ভাষায় দেশভক্তি, স্বাধীনতা আর ছাত্রদের কর্তব্য নিয়ে সেদিন বক্তৃতা দিতেন। সেদিন সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে হত, বন্দে মাতরম আর জোড়হাতে একসঙ্গে গাইতে হত “জনগণমন অধিনায়ক...” জাতীয় সঙ্গীত। তারপরেই হুটোপুটি করে লাইনে দাঁড়াতে হত পুঁটিরামের সিঙাড়া আর দরবেশের বাদামী প্যাকেট সংগ্রহের জন্যে।

এর কিছুদিন আগেই কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ-পূর্ব কোনার কাছে পাহাড়ের মতো জমে উঠত ইয়া মোটা মোটা শালের খুঁটি আর অজস্র বাঁশ। স্কুলে যাওয়ার পথে বাবা, আর ফেরার পথে মাকে জিগ্যেস করে জেনেছিল ওগুলো দিয়ে মা দুগ্‌গার প্যাণ্ডেল হবে। শালের খুঁটি আর বাঁশের ধাঁচা বানিয়ে তার ওপর ত্রিপল আর রঙিন কাপড় দিয়ে তৈরি হবে ওই প্যান্ডেল। তার মানে পুজো আসতে আর দেরি নেই? মা বলতেন, “এই তো আর মাস দেড়েক পরেই পুজো, এসেই তো গেল, দেখতে দেখতে কেটে যাবে দিনগুলো”।

তারপর থেকে রোজ স্কুলে যাওয়া আসার পথে চোখের সামনে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল মা দুগ্‌গার বিশাল প্যাণ্ডেল। বেশ কিছুদিন ধরে গড়ে উঠল অজস্র বাঁশের হাড়গোড় বের করা কঙ্কালের মতো খাঁচার কাঠামো। তারপর একদিন সে কাঠামো ঢাকা পড়ে যেত ত্রিপলের আস্তরেএরপর শুরু হত কাপড়ের কাজ। স্কুলে যাওয়ার তাড়ায়, সকালে না হলেও, ফেরার সময় মাকে বায়না করে প্যাণ্ডেলের ভেতর ঢুকত এক একদিন। অজস্র রঙিন আর সাদা কাপড় আর কাপড়ের ফালি ঝুলছে চারদিকে, তার সঙ্গে সুতো আর দড়ি। অনেক অনেক লোক একসঙ্গে বসে কাপড় কুঁচিয়ে তুলছেন, অন্য অনেকে সেই কুঁচি দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন প্যাণ্ডেল। সেই কাপড়ের সাজে অপরূপ হয়ে উঠতে লাগল দিনের পর দিন, ঠিক পান্নার স্বপ্নের মতো। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত পান্না, ওখান থেকে পা সরত না, কিন্তু মায়ের তাড়া থাকত, ঘরে ফিরে তাঁর কাজের শেষ নেই যে!

পান্না বড় হয়ে উঠতে উঠতে স্কুলের সঙ্গে ওই কলেজ স্কোয়ারটাও তার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল। বাল্য থেকে কৈশোর, কৈশোর পার হয়ে তারুণ্য পর্যন্ত তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে রইল তার স্কুল আর কলেজ স্কোয়ার।

-০০-



রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ১

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " মাথার পোকা "

 



 কাজের ফাঁকে ফাঁকেই সোনা পান্নাকে পড়ানো শুরু করে দিলেন। প্রথম দিকে মুখে মুখে পাখি পড়ানোর মত। ঘরের কাজ সারতে সারতে, তিনি নানান প্রশ্ন করতেন আর উত্তরও বলে দিতেন। সূর্য কোনদিকে ওঠে। সপ্তাহে কটা দিন। পক্ষ কতদিনে হয়। ক মাসে হয় বছর। গ্রহ কি, নক্ষত্র কি? মুখে মুখে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। এভাবে কিছুদিন চলার পর দুপুরে খাওয়ার পর হীরুর পুরোন বইগুলো নিয়ে পড়াতে বসলেন। স্লেট আর চকপেন্সিল দিয়ে লেখাতেও শুরু করলেন। ভোর থেকে উঠে রান্না-বান্না ছাড়াও নানান কাজ সেরে দুপুরে খাওয়ার পর যদিও ক্লান্তিতে তাঁর দুই চোখ ঝামড়ে ঘুম আসে, তবু নিয়ম করে তিনি রোজ বসেন পুত্র পান্নাকে নিয়ে। বাংলা বর্ণমালা, ইংরিজি বর্ণমালা লেখা অভ্যাস করান। বাংলা এবং ইংরিজি সংখ্যা লেখাও অভ্যাস করান। মায়ের হাত ধরেই পান্না একে একে পার হয়ে চলল বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ, নিজে পড়, নিজে শেখ, ফার্স্ট বুক অব রিডিং ইত্যাদির পর্ব।

        

দীর্ঘ এই প্রস্তুতি চলতে চলতেই স্কুলে ভর্তির জন্যে পান্না পরীক্ষা দিল। পরীক্ষার দিন পনের পরে অচ্যুত খুব দুশ্চিন্তা নিয়েই স্কুলে গিয়েছিলেন - অ্যাডমিশান লিস্টে পান্নার নাম আছে কিনা দেখতে! পান্নার নাম সে লিস্টে ছিল! বাড়ি ফেরার সময় বড়ো এক মাটির হাঁড়িতে অনেক রসগোল্লা কিনে অচ্যুত বাড়ি ফিরলেন। সোনার হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “পান্নাটারও একটা হিল্লে হয়ে গেল, বুঝলে?” 

দু চোখে খুশির চিকিমিকি আলো নিয়ে সোনা বললেন, “তবে? তুমি যে বলতে, আমার ভুট্‌কু, হীরুর মতো নয়, বোকাসোকা হাঁ-করা...হাত-মুখ ধুয়ে এসো, মিষ্টি দিচ্ছি, খাও...”

সোনা দুটো প্লেটে দুই ছেলেকে দুটো করে দিলেন, আর অচ্যুতের জন্যে চারটে আনলেন অন্য প্লেটে। কলতলা থেকে ঘরে ঢুকেই অচ্যুত প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো কেন? দুটো দাও। তোমার কই?”

“আমি খাচ্ছি, তোমরা খাও না?”

চৌকিতে আরাম করে বসে, একটা রসগোল্লা মুখে পুরে বললেন, “বুঝেছ, যে স্বপ্ন নিয়ে গাঁ ছেড়ে আসা, তার প্রথম ধাপটা হল। কলকাতার সেরা স্কুলে দুজনেই ভর্তি হয়ে গেল। এবার বাকিটা...”।

কাঁসার গেলাসে খাবার জল এনে অচ্যুতের প্লেটের পাশে রেখে সোনা বললেন, “সব হবে, দেখে নিও, আমাদের এত কষ্ট কী ভগবান দেখতে পাচ্ছেন না?” দুই পুত্রের দিকে তাকিয়ে অচ্যুত বড়ো তৃপ্তির হাসি হাসলেন। সোনা আরো চারটে রসগোল্লা এনে হিরুকে দুটো দিলেন, পান্নার প্লেটেও দুটো।

পান্না খুব জোরে মাথা নেড়ে, ইঁড়ো পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমি আর খাবো না, মা। আমার পেট ভরে গেছে। ওদুটো তুমি খাও”। তার ঘাড় নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাসের পাকামি, সোনার চোখ এড়াল না, তিনি বেশ উপভোগ করলেন পান্নার এই বড়ো হয়ে ওঠার অনুভব। স্নেহের হাসিমাখা মুখে বললেন, “আচ্ছা বেশ, আমি একটা খাচ্ছি, আরেকটা তুই খেয়ে নে”।

পান্না রাজি হল না, বলল, “নাঃ তুমি দুটো খাও”। পান্নার প্লেট থেকে তুলে, সোনা একটা রসগোল্লায় কামড় দিয়ে বললেন, “এত্তো আনলে কেন? খাবে কে?”

রসগোল্লা শেষ করে অচ্যুত গেলাসের জল খেলেন ঢকঢক করে, তৃপ্তির ছোট্ট ঢেঁকুর তুলে বললেন, “সন্ধ্যেবেলায় লাইব্রেরিতে পাড়ার অনেক লোকজন আসে, ওদের ডাকবো। খুশি হবে সবাই। দশ বারোজন হবে, সবার কুলোবে না?”

“আমি তো গুনিনি। কত এনেছো, আমার তো দেখে মনে হল, তাতেও বেশি হবে”।

অচ্যুত হাসতে হাসতে বললেন, “পঞ্চাশটা, তার ওপর আবার দুটো ফাউ দিয়েছে”।

“তবে? আরামসে হবে। শোনো না, ওবাড়ির দিদি আমায় খুব ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, হিন্দু-হেয়ার-সংস্কৃত ওসব বড়ো বড়ো স্কুল... ওসব স্কুলে এক পুঁটুলি করে না দিলে, নাকি ছেলে ভর্তি হয় না। সন্ধেবেলায় হিরুর হাত দিয়ে কটা মিষ্টি পাঠিয়ে দেব?”

“কেন দেবে না, একশ বার দেবে!”

“কিন্তু, কিছু ভাববে না তো?”

“কী আবার ভাববে?”

“ওদের দু ছেলের কেউই নাকি ভর্তি হতে পারেনি, ওরা অন্য স্কুলে পড়ে। আজ আমি মিষ্টি দিলে হয়তো ভাববে, আমরা পুঁটলি ভরা টাকা দিয়ে ভর্তি করেছি? হয়তো ভাববে, মিষ্টি দিয়ে আমরা দেমাক দেখাচ্ছি”?

“যারা ভাবার, তুমি মিষ্টি  দাও বা না দাও তারা ভাববেই। কিন্তু এমন আনন্দটা পাড়াপড়শিদের সঙ্গে ভাগ না করে নিলে চলবে কেন? ও সব নিয়ে অত ভেবো না তো, তুমি!”

এর আগে মা আর বাবাকে এত খুশি হতে পান্না কোনদিন দেখেনি। আর এই খুশির কারণ যে সে নিজে, সেটাও টের পাচ্ছে বেশ!  তার মনে এখন যে অনুভূতি সেটা নিছক আনন্দের নয়, অন্য কিছুর। সেটা ঠিক কী, তা সে জানে না, বড় হতে হতে সে একদিন বুঝবে, এরই নাম সাফল্য! সন্ধেবেলা পাড়ার অনেক জ্যেঠু – কাকুরা এলেন। সকলেই খুব প্রশংসা করলেন দুই ভাইয়ের। এক কাকু, বললেন, “তুইও পান্না, আমিও পান্না। আমারও নাম পান্না, জানিস তো? তুই আর আমি আজ থেকে ভাই-ভাই, বুঝলি?” হেসে পান্নার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তাঁদের মধ্যে সব থেকে বয়স্ক এ পাড়ার গণ্য-মান্য বিজয় জ্যেঠু বললেন, “আপনি দেখালেন বটে অচ্যুতবাবু, এ পাড়ায় আমার সাতপুরুষের বাস, এ পাড়ার কোন ছেলে হিন্দু স্কুলে পড়েছে...কই তেমন তো মনে আসছে না! আর আপনি এই কবছর আগে এপাড়ায় ভাড়া এসে, দুই ছেলেকেই ঢুকিয়ে ফেললেন? নাঃ আপনাকে আর বৌমাকেও...বলিহারি যাই...এ একেবারে যেন অসাধ্য সাধন! আপনার ছেলেদুটিও যে রত্ন, এ কথা স্বীকার করতেই হবে”। পান্নাকাকু সেকথার জের টেনে হাসতে হাসতে বললেন, “হীরক আর পান্না, যেমন নাম তেমনই কাম...”!

সোনা বাইরে বের হননি, মাথায় ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন। পান্না দাঁড়িয়েছিল দরজার সামনে। তার দায়িত্ব ছিল, কাকু-জ্যেঠুদের মিষ্টি দেওয়া, খাবার জল দেওয়া – অন্তরালে থাকা মায়ের সাহায্য করা। হঠাৎ পান্না দেখল, ঘোমটার মধ্যে মুখ ঢেকে মা যেন কাঁদছেন! কী আশ্চর্য, সব্বাই আনন্দ করছে, কত কত ভালো ভালো কথা বলছে, কিন্তু মা কাঁদছেন কেন? পান্না মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ের হাতে নাড়া দিয়ে মৃদুস্বরে জিগ্যেস করল, “ও মা, কাঁদছো কেন?”

ঘোমটা সামান্য ফাঁক করে, মুখে আঙুল দিয়ে সোনা পান্নাকে ইশারা করলেন, চুপ। পান্না আরো অবাক হয়ে দেখল, মায়ের মুখে অদ্ভূত এক মায়ার হাসি, কিন্তু তাঁর দুচোখ ভেসে যাছে অশ্রুতে! সোনা একটা হাত ধরে পান্নাকে কাছে টেনে নিলেন, পান্নার মাথায় হাত রেখে, ঘোমটার খুঁট দিয়ে চোখদুটো মুছে নিলেন; তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে পান্নাকে অস্ফুট স্বরে বললেন, “কই কাঁদছি?”

পরের পর্ব - " আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ২


রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

মাথার পোকা



স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পরিবর্তিনি সংসারে... "

 

‘স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুট্‌ঔ’

স-এ তীক্ষ্ণ সিটি দিয়ে শুরু করে, কণ্ঠের অদ্ভূত ইয়ডলিংয়ে ‘ঔ’ হেঁকে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় বিহারি শিল কুটোনোওয়ালা।  তার ডাক শুনে দৌড়ে বারান্দায় গেল পান্না।

ওই লোকটি তার চেনা, কয়েকদিন আগেই মা ওর থেকে শিল নোড়া কুটিয়েছিল। শিলকুটোনোর সময় পান্না বসেছিল তার সামনে। ছোট্ট ছেনিতে হাতুড়ির ঠুকঠুক ঘায়ে সে খড়খড়ে করে তুলেছিল শিল আর নোড়ার মসৃণ হয়ে যাওয়া গা। হাতুড়ির আঘাতে ছেনির আগায় মাঝে মাঝেই ছিটকে উঠছিল ছোট্ট ছোট্ট ফুলকি আর পাথরের মিহিন কুচি। বিহারী শিলকুট্‌নেওয়ালা তাকে সতর্ক করেছিল, “হঠ যাও খোখাবাবু, আঁখমে পাত্থর গিরবা করেগা, তো বহোত দরদ হোবে”।

মাও ঘরের ভেতর থেকে বলেছিলেন, “ওখান থেকে সরে আয় ভুট্‌কু, চোখে লাগবে”। পান্না তার ডাকনাম হলেও, সোনা ছোটপুত্রকে আদর করে ডাকেন ভুট্‌কু। পান্না একটু সরে এসে উঠে দাঁড়িয়েছিল, আর অবাক হয়ে দেখেছিল ছেনির ঘায়ে ছোট্ট ছোট্ট গর্তে বুনে ওঠা মাছের নকশা, আর তার পাশে যেন অজস্র বৃষ্টির ধারাশিল কুটোনো হয়ে গেলে বিহারী ডাক দিয়েছিল, “লিয়ে যান, মাজী, হোইয়ে গেলো”

মায়ের সাহায্য হবে ভেবে, পান্না শিল তুলে ঘরের ভেতরে আনতে যাওয়াতে, শিলকুটোনোওয়ালা বলেছিল, “বহোৎ ভারি, তুমি শকবে না, খোখাবাবু, ছোড় দো, মাজি লিয়ে যাবে” এবং পিছন থেকে মা হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন, “তুই কখনো শিল তুলতে পারিস ভুট্‌কু? পায়ে পড়লে আঙুল থেঁতলে যাবে, সর সর, আমি দেখছি”। 

তুলে নেওয়ার আগে শিল আর নোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন মা, ঠিকঠাক খসখসে হল কি না, বিহারী কুটনোওয়ালা বলল, “দিখা লাগবে না, মাজি, ছোমাস কুছু করতে হোবে না, দেখে লিবেন”

“ছমাস যাবে, না ছাই যাবে, একমাসেই পাথরের গা তেলা হয়ে যায়”সোনার কথায় টেনে টেনে হেসেছিল বিহারী কুটনেওয়ালা, “ওইসান না হলে, হামাদের ভি চলবে কী করে, মাজি?”

সোনা আর কথা বাড়াননি, শিল-নোড়া তুলে ঘরে এনে, পান্নার হাতে দশপয়সা দিয়ে বলেছিলেন, “যা তো গিয়ে দিয়ে আয়”একটা দায়িত্ব পেয়ে উত্তেজিত পান্না দৌড়ে গিয়ে পয়সাটা তুলে দিল কুটনোওয়ালার হাতে। উপার্জিত অর্থ পেয়ে খুশী কুটনোওয়ালা পান্নার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর কোমরে বাঁধা ময়লা বটুয়া বের করে, তার মধ্যে রাখল পয়সাটা। তারপর বেরিয়ে গেল ছেনি-হাতুড়িওয়ালা ছোট্ট চটের ব্যাগ নিয়ে। রাস্তায় নেমে, হাঁক দিল, “স্‌স্‌স্‌স্‌শিল কুটঔ”

ঘরে এসে শিশু পান্না জিজ্ঞাসা করেছিল, “শিল কোটালে কেন গো, মা?”

“শিল-নোড়ার গা তেলতেলে মসৃণ হয়ে গেলে, মশলা বাঁটতে অসুবিধে হয় যে! আদা, পেঁয়াজ তাও বাঁটা যায়, কিন্তু শিল-নোড়া খসখসে না হলে পোস্ত, সরষে, ধনে, জিরে বাঁটাই যায় না!”

 

আজ পান্নাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, সেই কুটনোওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, “মাজিকো বোলো, শিল কুটতে হোবে?” তার কথায় পান্না ঘরে ঢুকে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “মা, মা, সেই শিলকুটোনোওয়ালা আজ আবার এসেছে, আজও শিল কোটাবে?”

সোনা বালতিতে বাসি জামাকাপড় ভেজাচ্ছিলেন, ভুরু কুঁচকে তাকিয়েও হেসে ফেললেন, বললেন, “বলেছিল ছমাস যাবে, সাতদিন না হতেই আজ আবার এসেছে? বলে দাও, দরকার হলে, তুমিই ওকে ডাকবে” এরকম একটা দায়িত্ব পেয়ে পান্না অভিভূত হয়ে গেল, অবাক আনন্দে বলল, “আমি ডাকবো, মা?”

সোনা স্মিতমুখে বললেন, “হুঁ, তুমিই তো ডাকবে...কত্তো বড়ো হয়ে গেছো তুমি, আমার আর চিন্তা কী? এখন থেকে তুমিই তো ডাকবে!” পান্না আবার দৌড়ে গেল বারান্দায়, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিলকুটোনোওয়ালাকে, ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “আজ নয়, দরকার হলে, আমিই তোমায় ডাকবো, কেমন?”

 

২  

এ সময় এজমালির বাথরুমটাও খালি থাকেদোতলার ভাড়াটেরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই অফিসে বেরিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে, একরাশ ভেজানো জামাকাপড় মেঝেয় ফেলে, তাতে বার সাবান ঘষতে বসলেন সোনা। বাইরে দাঁড়িয়ে পান্না ব্যস্ত মায়ের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ ঘাড়ের কাছে এলিয়ে পড়েছে আলগাবাঁধা খোঁপা। কপালের ওপর দু একটা আলগা চুলের গুছি। কপালে, নাকের ডগায়, চিবুকে জমে উঠেছে, বিন্দুবিন্দু ঘাম। সাবান ঘষা, থুবি দিয়ে কাচার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠছে মায়ের হাতের শাঁখা, নোয়া, পলা আর সোনার চুরি।

পান্না ঘুম থেকে ওঠার আগে থেকে সোনার কাজ শুরু হয়ে যায়। উনুন ধরানো, ঘর ঝাঁট দেওয়া, কুটনোকোটা, বাঁটনা বাঁটা, রান্না-বান্না, এঁটো থালাবাসন ধোয়ার পর, এই জামাকাপড় কাচতে বসা...মায়ের কাজের যেন অন্ত নেই!  বাবা অফিসে, দাদা স্কুলে। এখন কে হবে তার সঙ্গী? কিছুক্ষণ মায়ের কাজ দেখে, সে আবার চুপচাপ বারান্দায় গেল। এই সময় মায়ের কাছে ঘ্যানঘ্যান করলে, বকুনি জুটবে, হয়তো পিঠে দু একটা চড়-চাপড়ও।

প্রাক দ্বিপ্রহরে সামনের রাস্তাটাও একটু ফাঁকা, পথচারীর সংখ্যা কমপাড়ার বড়োরা সবাই অফিসে, ছোটরা, যারা তার মতো ছোটও নয়, তারাও সবাই স্কুলে। বিহারি টানা-রিকশাওয়ালারা সকাল থেকে বেরিয়েছিল, এখন এক এক করে ফিরছে। রিকশাগুলো রাস্তার ধারে, পান্নাদের বারান্দা ঘেষে দাঁড় করিয়ে, এখন একটু বিশ্রাম নেবে। উল্টোদিকের টিউবওয়েল থেকে জল ভরে আনবে ঘটিতে। তারপর কাগজের ঠোঙা থেকে কিনে আনা ছাতু ঢালবে কানা উঁচু কাঁসার  থালায়সেই ঠোঙাতেই থাকে দুটুকরো পেঁয়াজ, দুটো কাঁচা লংকা, একটু তেঁতুলের আচার। থালার ওপর চূড়ো করা ছাতুর কোল ভেঙে থালাতেই একটু জল নিয়ে ছাতু ভিজিয়ে গোল্লা পাকিয়ে মুখে তুলবে। কখনো পেঁয়াজ, কখনো লংকায় কামড় দেবে, কখনো জিভের ডগায় ঠেকাবে তেঁতুলের আচার। খাওয়া সেরে তারা টিউবওয়েলে গিয়ে থালা এবং ঘটি সুন্দর করে মেজে নেবে। রাস্তার বাঁদিকে বিশাল পুরোনো বাড়িটার একতলায়, ওদের একটা ঘর ভাড়া নেওয়া আছে। সেই ঘরে থাকে না কেউ। সেই ঘরে থাকে ওদের ওই থালা-বাটি-ঘটি। এক আধটা ধুতি। চটের বস্তায় জড়ানো ওদের বিছানা। একপাশে থাকে কয়লা, ঘুঁটে, কেরাসিন তেলের শিশি, তোলা উনুন। ওদের ওই ঘরের সামনের বারান্দাতে, রাত্রে ওরা রুটি আর সবজি বানিয়ে খায়। তারপর গরমের সময়, অনেক রাত অব্দি নিজেদের মধ্যে গল্প করে, তাদের গ্রামের খেতি-জমিন, গায়-ভ্যাঁয়েস, গেঁহু, চানা...। তারপর অনেক রাতে ওই বাড়ির রোয়াকে বিছানা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মতিহারি, ছাপরা থেকে আসা বিশ-পঁচিশ জন দেহাতি মানুষের বৈচিত্র্যহীন দিনযাপনের এই চিত্রগুলি মুখস্থ হয়ে গেছে পান্নার

বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিকশাওয়ালাদের ফিরে আসা দেখতে দেখতে, পান্নার মনে পড়ল, কিছুদিন আগেই রথের মেলা থেকে সে একটা বাঁশি কিনে এনেছিল। মেলায় দেখা সেই বাঁশিওয়ালার ঝুড়িতে ছিল একগাদা বাঁশি, আর একটা বাঁশি হাতে নিয়ে সে খুব সুন্দর সুর তুলছিল বাঁশিতে। সেই সুরে মুগ্ধ পান্না বাঁশি কেনার জন্য বায়না ধরল। অবশেষে বাবার একটা হাত ধরে ঝুলে পড়ে, দুপয়সা দিয়ে একটা বাঁশি কিনতে বাধ্য করিয়েছিল বাবাকে বাড়িতে এনে সে বাঁশিটা বাজাতে চেষ্টা করেছে অনেক। কিন্তু যতবার ফুঁ দিয়েছে কিছুতেই সুর বেরোয় নি। বরং বিদঘুটে ভাঙাগলা এক আওয়াজ বেরোচ্ছিল

সেই বাঁশিটা নিয়েই এখন সে ক্যাঁ ক্যাঁ বাজাতে লাগল। সোনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন ছেলেকে বাঁশির বিচ্ছিরি আওয়াজটা তাঁর কানে লাগছিল, বিরক্তির সৃষ্টি করছিলকিন্তু তাও কিছু বললেন না, ছেলেটাই বা করে কী? এই বয়সের বালক চঞ্চল ও অস্থির তো হবেই, গ্রামের বাড়িতে থাকলে, সমবয়সী পড়শী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হুটোপুটি, দৌড়োদৌড়ি করলে, একটু আনন্দ পেত, মজা পেত। কিন্তু কলকাতার এই একখানা ঘরের বাসায় সেই উপায় কই? তাছাড়া, তিনি নিজেও চান না, এই পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে ছাড়তে। কলকাতার লোকজন সম্বন্ধে তাঁর একটা ভীতি মনের মধ্যে কাজ করে। এখানে ছেলে-ধরা কিংবা ছেলেকে বখাটে বানিয়ে তোলার হরেক আয়োজন এবং কে জানে তাঁর ছেলের জন্যেই ওই সব লোকেরা উদ্গ্রীব হয়ে আছে হয়তো বা!

 

 

“ভুটকু আয়, ছাদে কাপড় মেলতে যাবো”সোনার কাপড়-চোপড় কাচা হয়ে গেছিল। বালতিতে আধভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে তিনি দোতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে পান্নাকে ডাকলেন। পান্না বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছিল। দৌড়ে এসে মায়ের সামনের সিঁড়িতে লাফিয়ে উঠল।

সোনা বললেন, “ওকি, ঘরের দোরটা ভেজিয়ে দিলি না?”

পান্না বলল, “আমরা এখনই নেমে আসবো তো” সোনা একটু অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, “তা হলেই বা, বেড়াল-টেড়াল আছে। উটকো লোকজনও ঢুকে পড়তে পারে। যা চেপে দিয়ে আয় দরজাটা”। পান্না আবার দৌড়ে নেমে দরজাটা চেপে দিল, তারপর মুখে কু-উ-উ-উ আওয়াজ তুলে একছুট্টে উঠে গেল সিঁড়ির মাথায়। সেখানে দাঁড়িয়ে বলল, “কই এসো?”। সোনা হাসলেন, তাঁর ডানহাতের বালতিতে ভেজা কাপড়ের যথেষ্ট ওজন, এক এক ধাপ উঠতে উঠতে বললেন, “অত তাড়াতাড়ি পারি? দেখছিস না, আমার হাতে বালতি”! 

“আমায় দাও না, বালতিটা”। সিঁড়ির মাথায় উঠে সোনা বালতিটা নামালেন। হাতটা ভেড়ে গিয়েছিল, একটু জিরিয়ে নিতে থামলেন। পান্না বালতিটা তোলার চেষ্টা করছিল, পারল না, বলল, “বাব্বাঃ কী ভারি? তুললে কী করে, মা?”

বালতি তুলে দোতলা থেকে ছাদের সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সোনা বললেন, “চল, ছাদে চল”। এবারে পান্না আর তাড়তাড়ি উঠল না, মায়ের আগে আগে সিঁড়ির একধাপ একধাপ উঠতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, ওই ভারি বালতিটা নিয়ে এতগুলো সিঁড়ি ভেঙে ছাদে ওঠা মোটেই মজার ব্যাপার নয়।

ছাদের দরজা খুলে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে পান্না আবার আনন্দে দৌড়ে নিল খানিকবাঁশি বাজাতে বাজাতে ছুটোছুটি করতে লাগল ছোট্ট ছাদের এ কোণ থেকে সে কোণে তার মাথার থেকেও উঁচু প্যারাপেটের আড়ালে আশেপাশের বাড়ি তেমন দেখা না গেলেও, মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ তাকে অদ্ভূত মুক্তির স্বাদ এনে দিল।

সোনা ছাদের কাপড় মেলা দড়ির নীচে বালতি রেখে, ভেজা কাপড়গুলো চেপে নিংড়ে দড়িতে টাঙাতে শুরু করলেন। অধিকাংশ কাপড় দড়িতে মেলে দেওয়ার পর, নিংড়োনো জলটা জমে ছিল বালতিতে। বাঁশির একঘেয়ে বেসুর ডাকে বিরক্ত হয়ে পান্না, নতুন কিছু করার উৎসাহে, বালতির জলে ডুবিয়ে দিল বাঁশিটা। তারপর অন্যপ্রান্তে ফুঁ দিতেই এবার আর শব্দ হল না, জলের মধ্যে গুলগুল করে উঠল বুদবুদ। ক্ষণস্থায়ী সেই বুদবুদের গায়ে সূর্যের আলোয় খেলতে লাগল সপ্তবর্ণ। কী আশ্চর্য, অবাক করা কাণ্ড। বাঁশিতে ফুঁ দিলে শুধু আওয়াজই নয়, সাতরঙা রংও ফুটে ওঠে স্বচ্ছ জলে! অবাক পান্না চিৎকার করে উঠল, “মা, মা, দেখ, কী সুন্দর রঙ...”।

শ্রান্ত সোনা শেষ কাপড়টা নিঙড়ে দড়িতে শুকোতে দিতে দিতে দেখলেন ছেলের কীর্তি, ক্লান্ত স্বরে বললেন, “বাঃ, ভারি সুন্দর তো, আমার ভু্‌ট্‌কুটা কত কী শিখে ফেলল!” 

 

সব জামা কাপড় শুকোতে দেওয়ার পর সামান্য অবসর। সোনা ছাদের আলসেতে ভর দিয়ে একটু দাঁড়ালেন, রাস্তার ওপারের মাসিমাও ছাদে এসেছিলেন গুল দিতে। সোনাকে দেখে মাসিমা হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কাপড় শুকোতে দেওয়া হল, বৌমা?”

শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে সোনা বললেন, “হ্যাঁ, মাসিমা। আপনি এই দুপুর রোদ্দুরে ছাদে কী করছেন”?

“গুল দিতে এসেছিলাম। আমারও হয়ে গেল, এবার নীচেয় যাবো, চান-টান করবো”।

“কয়লার গুল?”

“হ্যাঁ, কয়লার গুঁড়ো জমা হয়েছিল, একগাদা। আজ দিয়ে ফেললাম”।

“তাই? আমাদের কয়লার চৌবাচ্চাটাও গুঁড়োয় আদ্দেক ভরে গেছে। একমণের বস্তা ঢাললে উপচে পড়ে, চৌবাচ্চায় পুরোটা ধরে না। ভাবছিলাম, কয়লার গুঁড়ো ফেলে দেব, কিন্তু...”।

“ফেলে দেবে কী গো, বৌমা, দুদিন সময় করে, গুল দিয়ে ফেল, পনেরদিনের জ্বালানি হয়ে যাবে”!

“তাই তো! কিন্তু কী করে গুল দেব মাসিমা?”

“ও মা, তাও জানো না। কয়লার গুঁড়োর সঙ্গে একটু মাটি আর ভাতের ফ্যান মিশিয়ে, গুল বানিয়ে রোদ্দুরে শুকিয়ে নাও, বাস্‌ গুল তৈরি! গাঁয়ে থাকতে তোমরা গুল বানাতে না?”

শহরের আদব-কায়দা না জানা সোনা, একটু যেন লজ্জা পেলেন, বললেন, “তা না মাসিমা, আমাদের ওদিকে ঘুঁটে, ধানের তূষ আর কাঠকুটোতেই রান্না-বান্না হয়ে যায়। কয়লা ব্যবহার হয়, তবে কম। তাতে যেটুকু গুঁড়ো হয়, তার ধিকিধিকি জ্বালনে ধানসেদ্দ কিংবা রোজকার দুধের জ্বাল দিতেই খরচা হয়ে যায়”

“তোমাদের বাড়ি বদ্দোমানে, না? কতায় বলে “জেলার সেরা বদ্দোমান, আর কলার সেরা মত্তোমান”। তার মানে তোমরা ঘটি। তোমরা তো তাও ভালো, তোমাদের ওপরে যে বাঙালরা ভাড়া থাকে, তাদের রীতকরণ দেখেছো? যেমন কতাবাত্তা, তেমন আচার-আচরণ। খাইসে, ইসে, পোলা, মাইয়া – শুঁটকি মাছও খায়, তোমরা গন্ধ পাও না? ছ্যা, ছ্যা, আমার তো নাকে কাপড় দিলেও গা গুলোয়!”

সোনা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে একটু হাসলেন, তিনি জানেন বাড়িওয়ালি মাসিমা, আড়ালে তাঁদের সম্বন্ধেও অনেক কথা বলে থাকেন। তাঁরাও ভাড়াটে, কিন্তু ঘটি – অতএব বাঙাল ভাড়াটেদের তুলনায় তাঁরা মন্দের ভালো! কিন্তু শুধু ভাড়াটে বলেই নয়, বাড়িওয়ালী মাসিমা একবার শুরু করলে, এ পাড়ার সকল প্রতিবেশী – বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে নির্বিশেষে – সকল পরিবারের দোষ, ত্রুটির হাঁড়ির খবর সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে থাকেনকার বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীতে বনিবনা নেই। কার বাড়ির কর্তার চরিত্র দোষ আছে। ওপাশের কোন বাড়িতে ভর দুপুরবেলা প্রায়ই এক উটকো পুরুষ ঢোকে, বিকেল হলেই বেরিয়ে যায়! বৌটাকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, পিসতুতো দাদা! চোখে অদ্ভূত ইশারা এবং মুখে রহস্যের হাসি নিয়ে, মাসিমা বলেন, “অ বৌমা, কেমন পিসতুতো দাদা গো, দুপুর ছাড়া অন্য সময়ে তার আসার সময় হয় না?”

যে মহিলার সম্পর্কে মাসিমা এই গোপন সংবাদ দিলেন, সে মহিলাকে সোনা চেনেন। অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখের নির্বিকার নিঃসন্তান এক মহিলা! পাড়ার কারো সঙ্গে তেমন মেশেন না। মুখরোচক এই সংবাদে সোনা এতটুকুও কৌতূহলী না হওয়ায়, মাসিমা মোটেই হতাশ হলেন না, বরং আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন, “ওই বউয়ের আরো কিত্তি শুনলে, তুমি আঁতকে উঠবে বৌমা! শুধু পিসতুতো দাদাই নয়, আরো একজন আসে, হ্যাঁ গো! বলে, ওর দেওর, সে নাকি ওর বরের খুড়তুতো ভাই! সেও আসে ওই দুপুরেই! ভদ্দোরনোকের পাড়ায় এ সব কী বলো তো, বউমা? ছি ছি ছি”। তারপর চোখের অদ্ভূত এক ইঙ্গিত করে, মাসিমা গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, “আমি কী ভাবি জানো তো বৌমা, যদি দুজনে একই দিনে একই সময়ে এসে উপস্থিত হয়? তখন ওই মাগি কী করবে, বল দেকি? হি হি হি হি...”!    

মাসিমাকে আর বাড়তে না দিয়ে, সোনা বললেন, “আমি আসি মাসিমা, নীচেয় রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, ছেলেটাকেও চান করাতে হবেভুটকু নীচেয় চ।  আসছি, মাসিমা”

 

 

পান্না একমনে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে, বালতির জলের মধ্যে বুদবুদ তৈরি করছিল, বুদবুদের গায়ে নানা রঙের রামধনু সৃষ্টি করছিল! সোনা সে বালতিটা টেনে নিয়ে ঝাঁঝরির মুখে ঢেলে দিলেন জলটা। তারপর খালি বালতি হাতে নিয়ে পান্নার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চঃ, নীচেয় যাই। নাওয়া খাওয়া সেরে একটু শুই। সেই ভোর থেকে যা চলছে”।

সোনা ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালেন, দেখলেন পান্না আসছে না, মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে ছাদের মাঝখানে। “কী রে, আয়! নীচেয় যাবি না?” পান্না নিরুত্তর। তার মনের মধ্যে তখন প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং অভিমান। মা বিনা বাক্যে ঝাঁঝরির মুখে জলটা ঢেলে দিলেন? একবারের জন্যেও তাঁর মনে হল না, পান্নার কথা, পান্নার নতুন আবিষ্কারের কথা! এমন নিষ্ঠুর মায়ের সঙ্গে সে আর কোন কথা বলবে না!

সোনা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা আন্দাজ করলেন, বললেন, “সোনু তোমার সেই রামধনুর জলটা ফেলে দিয়েছি বলে, মায়ের ওপর রাগ করেছো? আচ্ছা, বাবা আচ্ছা, আমার ঘাট হয়েছে, এর পরের দিন, তোমার জন্যে অনেকটা সাবান জল রেখে দেব। কেমন? এখন চলো, নীচেয় যাই”। পান্না এতটুকুও বিচলিত হল না, মায়ের এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সে একই ভাবে ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।

সোনা এবার বললেন, “বেশ, থাকো তুমি দাঁড়িয়ে, আমি নীচেয় চললাম”।  সোনা তিন চার ধাপ নেমে গেলেন সিঁড়ি দিয়ে, তারপর একটু অপেক্ষা করে আবার উঠে এলেন, দেখলেন, পান্না একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এবার তাঁর ধৈর্যের বাঁধ টুটল, বললেন, “পান্না, সোজা কথায় নীচেয় আসবি, নাকি পিঠটা ফাটাবো?”

মায়ের কণ্ঠস্বর এবং ওই “পান্না” ডাক, পান্নাকে ভয় পাইয়ে দিল, সে বুঝল, মা রেগে গেছেন। মায়ের হাতের দু একটা চড় চাপড়ের স্বাদ, এর আগে সে দু একবার পেয়েছে! সেই স্মৃতি মনে করে, সে আস্তে আস্তে নীচেয় নেমে এল। 

নীচেয় নেমে সোনা হাতের বালতি রেখে, পান্নার হাতে গামছা দিয়ে বললেন, “যাও, সোনু মাথায় তেল দিয়ে ঝপ করে চান সেরে এসো। তোমার হলে, আমি যাবো। ততক্ষণ আমি ঘর দোর একটু গুছিয়ে নিই”।

মায়ের কণ্ঠের স্বাভাবিক সুরে, পান্না তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে পেল, ঘরের এক কোণে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, মেঝের দিকে তাকিয়ে। সোনা কাজ সারছিলেন, পান্নাকে লক্ষ্য করেননি। কিছুক্ষণ পরে তিনি খেয়াল করলেন, পান্না মুখভার করে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে...একটু মায়া হল, আবার বিরক্তও হলেন, “আর ভাল লাগছে না, সোনু, যা না তেল মেখে চানটা করে আয়, না”। পান্না আড়চোখে মায়ের মুখটা দেখল এবং একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

আর সেই সময়েই রাস্তা থেকে হাঁক শোনা গেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”।

বৃদ্ধা এক পৃথুলা মহিলা, পরনে সাদা থান আর সাদা ব্লাউজ, হাতে মাঝারি সাইজের পেটমোটা একটা কাপড়ের থলি। মাথার পেছনদিকে বড়ি করে বাঁধা সাদা-কালো চুলের খোঁপা। এই সময়েই সে রোজ আসে, দাঁতের পোকা বের করতে। এ পাড়ার মেয়ে-বউদের দাঁতে ব্যথা হলে, তারা ডেন্টিস্টের চেম্বারে গিয়ে দাঁত বের করে বসে পড়ার কথা কেউ চিন্তাও করে না। পুরুষহীন নির্ঝঞ্ঝাট দুপুরে এই বৃদ্ধা তাদের দাঁতের ‘চিকিচ্ছে করে’তার হাতের কারসাজিতে ব্যথা হওয়া দাঁত থেকে বের হয়ে আসে মুড়ির মতো দেখতে জ্যান্ত বড়ো পোকা! পোকা বের করে দেওয়ার পর দাঁতের গোড়ায় ঘষে দেওয়া কোন ওষুধের গুণে, ব্যাথা সেরে যায় বেশ কদিনের জন্যে। আশ্চর্য তার হাত যশ। পাড়ার মেয়েরা বৃদ্ধা ওই মহিলাকে বলে “বেদে বুড়ি”!

সোনা ওই বেদে বুড়ির ডাক শুনেই বলে উঠলেন, “দাঁড়া তো, ওই বেদে বুড়িকে ডাকি, আমার ছেলের মাথার পোকাগুলোকে সব বের করে দিক। সেদিন হারুর মা, ওকে ডেকে হারুর মাথার সব পোকা বের করে নিয়েছে”!

পান্না এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল, মাথার ভেতরে পোকা থাকা এবং সেই পোকা বের করা ব্যাপারটা তার বুদ্ধির বাইরে! সে ভয়ে ভয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করল, “তারপর, হারুর কী হল, মরে গেল?”

সোনা মুখ টিপে হেসে বললেন, “বালাই ষাট মরবে কেন? পোকাগুলো বের করে দেওয়াতে হারু একদম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে গেল, ওর মা যখন যা বলত, সব শুনত। কক্‌খনো দুষ্টুমি করত না! ডাকবো বেদে বুড়িকে?”

পান্না হারু বা হারুর মা কাউকেই চেনে না, কিন্তু মায়ের ওপর রাগ করে আর অবাধ্য হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, সে দৌড়ে গেল বাথরুমে। চৌবাচ্চার মধ্যে মগ ডুবিয়ে সে জল ঢালতে লাগল মাথায়। জল ঢালার আওয়াজের মধ্যেও, সে বেদে বুড়ির ডাক শুনতে পেল, “দাঁআআআআআতের পোকা, বেএএএএর করি”। তবে শব্দটা বেশ দূরের শব্দ, মা এখন ডাকলেও বেদে বুড়ির সে ডাক শোনার সম্ভাবনা কম। পান্না নিশ্চিন্তে মাথায় জল ঢালতে ঢালতে হৈ হৈ করে গান ধরল, “গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রঙ ছড়ায়, এ গানে রামধনু তার সাতটি রঙ ঝরায়...”।

সোনার মুখে প্রশ্রয়ের মৃদু হাসি, অস্ফুট স্বরে বললেন, “পাগল, সত্যি সত্যিই আমার এ ছেলেটার মাথায় পোকা আছে!” 

..০০..       

পরের পর্ব - " আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে...পর্ব ১ "

                

            

 

 


মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পরিবর্তিনি সংসারে...

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পাখির চোখ "

 

নন্টু আসছেন, নিভাননী সংবাদ পেয়েছিলেন। নন্টু অচ্যুতের ডাকনাম, মা নিভাননী ওই নামেই ডাকেন, ডাকে গাঁয়েঘরের লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাওনন্টুর আসার সংবাদে তিনি আদৌ খুশী হননি। বরং তীব্র রাগ হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলেই মাগ-ছেলে নিয়ে নন্টু কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেল!  সেখানে বড় নাতি হীরুকে কোন একটা স্কুলে যেন ভর্তিও করে দিয়েছে! কলকাতার স্কুলে ছেলেকে পড়িয়ে, নাকি ‘জজ ব্যারিষ্টর’ করে তুলবে! কেন পাড়াগাঁয়ে থেকে কেউ কী বড়ো মানুষ হয় না?  গাঁয়ের স্কুলেই পড়া শেষ করে, বর্ধমানের কলেজে পড়ে মনা হাজরা, গোপাল চাটুজ্জ্যে, বিশু সামন্তরা বড়ো মানুষ হয়নি? হাজরাদের মনা কলকাতা হাইকোর্টের দুঁদে উকিল। গোপাল চাটুজ্জে “ম্যাজিস্টর”, তার হুকুমে সবাই হুজুরে হাজির থাকে। বিশু সামন্ত বায়স্কোপ বানায়, দেশে-বিদেশে তার নাকি খুব “সুখ্যাৎ”এঁদো গাঁয়ের স্কুলের জন্যে ওদের কী কিছু আটকেছে? যার হবার তার হবেই, আর যার হবার নয়, তার কোথাও হবে না। কলকাতার স্কুলে পড়লেই বুঝি সবাই ডাক্তার-মোক্তার হয়?

 বিয়ের আগে নিভাননী কলকাতা না হলেও, কাশীপুরে অনেকদিন থেকেছেন বড়োদাদার বাসায়। তাঁর বড়োদাদা থানার ছোটবাবু ছিলেন। কলকাতার মতো ইল্লুতে জায়গা আর দুটো নেই। বড়োদাদার বাসার কাছেই একটা পাঁউরুটির কারখানা ছিল। সেখানে তিনি দেখেছেন, কারখানার লোকেরা পায়ে দলিয়ে পাঁউরুটির ময়দা মাখছে। সেই পাঁউরুটি নাকি কলকাতার বাবুরা মাখন মাখিয়ে খায়। ঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার – জাত ধম্মো আর কিছু বাকি আছে কলকাতায়? তাছাড়া বখাটে, বাউন্ডুলে, মাতাল, ঘর পালানে “মিন্‌সে” চারদিকে কিলবিল করছে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই বুক কাঁপে! বউ বগলে করে, সেই শহরেই গিয়ে বাসা বাঁধল নন্টু? এই বাড়ির বড়বৌ, ঘরের লক্ষ্মী - একটা অসৈরণ-সৈরণ নেই? বামুনের ঘরের বউ, সেজেগুজে নচ্ছার মাগীর মতো বাজার-হাট করবে? ট্রামে-বাসে ব্যাটাছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাওয়া আসা করবে? আজ থাকতেন নন্টুর বাবা, খড়মপেটা করে ছেলের এই বারটান আর বাউন্ডুলেপনা, শায়েস্তা করে দিতেন

নন্টুর বাবা যখন মারা গেলেন, নন্টু তখন কলকাতার কলেজে পড়ে। সে আজ বেশ কবছর হল। নিভাননীর ছোট ছেলে শান্টুর বয়েস তখন বছর পাঁচেকতার ওপরের দিদি চিত্রার বয়েস ষোলো। বাবার মৃত্যুর পর, নন্টু যোগ্য বড়ো ছেলের মতোই সংসারের হাল ধরেছিল। কলেজের পড়ায় পাশ দিয়েই, মেজঠাকুরপোর সুপারিশে  সরকারি চাকরিটাও সে পেয়ে গিয়েছিল। মেজ ঠাকুরপোও সেই দুর্দিনে নন্টুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সত্যিকারের অভিভাবকের মতো। নন্টু চাকরিটা পাওয়ার পরেই, সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে, বেশ ধুমধাম করেই ছোটবোনের বিয়ে দিয়েছিল।

চিত্রার বিয়ে মিটে যাওয়ার পর, নিভাননী  বলেছিলেন, এবার বিয়ে থা করে, তুইও সংসারী হ, নন্টু। তোর বিয়ে হয়ে গেলে, আমি ঝাড়া হাত পা হবো, বেরিয়ে পড়বো তীর্থ দর্শনে। সংসারের এই টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না, রে

সে কথায় নন্টু খুব উৎসাহ দেখিয়েছিল, বলেছিল,সেই ভালো, মা। শান্টুকে ভালো কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দিই দাঁড়াও, তারপর তোমাকে নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়বে তীর্থ যাত্রায়। বিয়ে থা করে আর কাজ নেই। সারা বছর ঘুরে বেড়াবো, সব ঠিকঠাক চলছে কিনা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো

বড়ছেলের ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলেছিলেন, নিভাননী, বলেছিলেন,তাই কী হয় নাকি? চাকরি বাকরি শিকেয় তুলে, তুই কোথায় যাবি, বাবা? আর মায়ের চোখের সামনে সোমত্ত ছেলে আইবুড়ো বসে থাকবে, এ আবার একটা কথা হল? আমি খোঁজখবর করছি। তোর একটা গতি না করে, আমি তীর্থে গিয়েও যে শান্তি পাবো না, বাবা!

না, না, মা, এই বেশ আছিতুমি আমাকে আর ওসবের মধ্যে জড়িও না। ছেলের এই আপত্তি যে কথার কথা সেটা বুঝতে ভুল করেননি নিভাননী। তিনি খোঁজখবর করেছেন। মেয়ে দেখতে, মেয়ের ঘরদোর বুঝতে, কথাবার্তা বলতে মেজঠাকুরপোকে পাঠিয়েছেন। নন্টু সবই শুনেছে, বুঝেছে, মেয়ে পছন্দ করে বিয়েও করেছে – কোন আপত্তি করেনি। তারপর দুটি ছেলেও হয়েছে। তিনি নিজেও সংসারে আর জড়াবেন না ভাবলেও, জড়িয়ে পড়েছেনতিনি বিধবা, ছোটছেলে শান্টুর লেখাপড়াও শেষ হয়নি এখনো নাবালক। তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত, তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। মেজছেলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে বহুদূরে। বছরে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে আসে। কোন খোঁজখবর নেয় না, সংসারের কোন দায়দৈবে মাথাও ঘামায় না। সেজছেলে একটা চাকরি নিয়ে কলকাতার মেসে থাকে। সেও কমাস আগেই বিয়ে করেছে। সেজবৌ বাড়িতেই থাকে

বড়ছেলে নন্টু ছাড়া তিনি আর কাউকেই তেমন ভরসা করতে পারেন না! কিন্তু পরের ঘরের মেয়ে যদি কান ভাঙানি দেয়, পর করে দেয় তাঁর নন্টুকে? প্রত্যক্ষ কোন কারণ না ঘটলেও, সেই আতঙ্কে তিনি তটস্থ থেকেছেন অহরহ। আজ সেটাই সত্যি হল, নন্টু পরই হয়ে গেল? মা-ভাইকে ভুলে বাসা নিয়ে ফেলল কলকাতায়! তাও তাঁর বিনা অনুমতিতে?

স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে সোনা, এ বাড়ির বৌ হয়ে এসে, অনটনের সংসারে মানিয়ে নিয়েছেন বিস্তর। তাঁর আচরণে কাজে কর্মে কোথাও তেমন কোন ত্রুটি ধরা পড়ে নি কোনদিন। কিন্তু এই অত্যধিক মেনে নেওয়াটাও যে মেনে নেওয়া যায় না! কোন প্রতিবাদ না করে, সব অভাব, সব অনটন যদি কেউ মুখ বুজে, হাসি মুখে সহ্য করে নেয়, সেটাই বা কেমনতর! এও তো একধরনের স্পর্ধাই। আমি কত ভালো, আমার বাপের ঘরের শিক্ষা কতো ভালো, এ যেন তার দেখনদারি!

পুত্রবধূর অস্পষ্ট অথচ অসহ্য এই গুমোর কল্পনা করে নিভাননীর গাত্রদাহ হয়পাড়া প্রতিবেশী যত তাঁর বড়োবউয়ের প্রশংসা করে, সোনা তত তাঁর চোখের বালি হতে থাকেন পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েবউদের সঙ্গে স্নান থেকে ফিরতে দেরি হলে বিরক্ত হন, মুখ ঝামটা দেন। ঘরের সব কাজ সেরে প্রতিবেশী-জ্ঞাতি মেয়েবউদের সঙ্গে বসে দুপুরে বিন্তি বা রঙ মেলান্তি খেললেও বিরক্ত হন। নন্টুর বাবা ছিলেন কট্টর শুদ্ধাচারী নীতিবাগীশ ব্রাহ্মণ। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর ব্রাহ্মণ্যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে এবং ভক্তিতে তটস্থ থাকত।

স্বামীর জীবদ্দশায় তিনি নিজেও সর্বদা আতঙ্কে থাকতেন, ঘরভরা ছেলেমেয়ের সংসারে সর্বদা সব বিধান কী আর মেনে চলা যায়? পান থেকে চূণ খসলেই স্বামীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হতেন এবং আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। অথচ বিধবা হয়ে, সেই তিনিই পালা-পার্বণ, তিথি-নক্ষত্র, বার-ব্রত, আমিষ-নিরামিষ, ছ্যুৎ-অছ্যুৎ, কাচা-আকাচা, আচার-বিচারের মোড়কে নিজেকে মুড়ে ফেলেছেন। একাদশীর দিন তিনি নির্জলা উপবাস করেন। সমস্ত বার-ব্রত-তিথি-নক্ষত্র পালনে তিনি স্বয়ং মনুর থেকেও নিষ্ঠুর এবং অমোঘ।

সেই সব তিথির পালনীতে সামান্য চ্যুতি হলে, তিনি পুত্রবধূকে ছেড়ে কথা বলেন না, “তুমি আর এসব জানবে কী করে মা, তোমরা বড়োমানুষের মেয়ে। তোমাদের বাড়িতে শুনেছি কত জাতের কত কাজের লোক। তোমাদের বাপের ঘরে অমন চলতে পারে, কিন্তু এখানে তো ওসব চলবে না, বৌমা। তোমার শ্বশুরঠাকুর ছিলেন এই দিগড়ের বিধান দাতা। তাঁর নির্দেশ ছাড়া এই গাঁয়ের লোকের একপাও চলার ক্ষমতা ছিল? বাপরে, কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে তুলতেন! কেউ কিছু অনাচার করে ফেললে, তার প্রায়শ্চিত্তের যা বিধান দিতেন, সে সব শুনলে তোমরা ভিরমি খাবে!”

প্রখর গ্রীষ্মে, একাদশীর নির্জলা উপবাসের দিন, মেঝেয় আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকা নির্জীব শ্বশ্রুমাতাকে, সোনা একবার এক গেলাস লেবুমিছরির সরবৎ খাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তাতে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “ছি, ছি, বৌমা, এ তুমি কী করলে? এ যে পাপ। বামুনের ঘরের বেধবাকে একাদশীর ব্রতভঙ্গ করাতে এলে? তোমার কি একবারও মনে হল না, এ অনাচার?”

“ভোর থেকে এত বেলা হল, এই প্রচণ্ড গরমে আপনি একবিন্দু জলও মুখে দিলেন না। আমরা এবার ভাত খেতে যাবো, আর আপনি এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, মা, তাই...”।

তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “রক্ষে করো, বৌমা, আমার জন্যে তোমার অত দরদে আর কাজ নেই! ওসব তুমি বুঝবে না, মা। উপোসে শরীর-মন শুদ্ধ হয়, কষ্ট হয় না, তোমার বড়লোক বাপ-মা এই শিক্ষাটুকুও দেননি, বাছা? যাও যাও, বেলা অনেক হল, খেয়ে নেবে যাও। আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও”।

সোনা, মাথা নীচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, গেলাসের সরবত উঠোনের মাটিতে ফেলে দিয়ে, নিজের ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কেঁদেছিলেন খুব। ছোট্ট হীরু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, জিগ্যেস করেছিল, “ও মা, কাঁদছো কেন? খেতে দেবে না? ও মা, চলো না খিদে পেয়েছে”। সেজজা এসে সোনাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, “ও দিদি, মন খারাপ করো না তো! কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে, চলো খেতে দাও”।   

 

 

অচ্যুত যখন বাড়িতে ঢুকলেন, নিভাননী খুঁটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দাওয়ায়। ছোট করে ছাঁটা সাদা-কালো কদমফুলি চুল। পরনে পাড়হীন সাদা থান, সাদা ব্লাউজ। সমস্ত শরীর পাথরের মতো কঠোর আবেগহীন।   

“কেমন আছো, মা?” নীচু হয়ে চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন অচ্যুত। নির্বিকার স্বরে নিভাননী উত্তর দিলেন, “যেমন তোমরা, রেখেছো, বাছা! আমাদের আর থাকা না থাকা, শেষের প্রহর গোনা বৈ আর কাজ কী?”

মায়ের অনুমতি ছাড়া পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া নিয়ে অচ্যুতের মনে অপরাধবোধ ছিলই, কুণ্ঠিত স্বরে বললেন, “ওভাবে বলছো কেন, মা? তড়িঘড়ি সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, তোমাকে জানাতে পারিনি। অন্যায় যে হয়েছে, সেটা কী আমি বুঝতে পারছি না, মা?”

ঠাকুরঘরের দিকে যেতে যেতে নিভাননী বললেন, “অন্যায় হবে কেন, বাবা? যা করেছো ঠিকই করেছ। সেই কোন ভোরে রওনা হয়েছো, হাতমুখ ধুয়ে এসো। একটু জিরিয়ে নাও। বৌমা, নন্টু এসেছে সরবৎ দাও, জল দাও”।

নিভাননী যদি দুটো কথা কটকট করে শুনিয়ে দিতেন, কিংবা অভিযোগ করে কান্নাকাটি করতেন, অচ্যুতের পক্ষে পরিস্থিতি সামলাতে সুবিধে হত। কিন্তু উদাসীনতার এমন নিরেট দেওয়াল তিনি তুলে দিলেন, তার মধ্যে প্রবেশের আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না। মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে, অচ্যুত দাওয়াতে হাতের ব্যাগটা রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, ছোটভাই শান্টু, তার হাতে কাচের গেলাসে শরবৎ। তার হাত থেকে গেলাস নিতে নিতে তিনি রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকালেন, দরজার আড়ালে সেজবৌমার শাড়ির প্রান্ত দেখতে পেলেন।

শরবৎ শেষ করে, শান্টুর মাথায় হাত রেখে অচ্যুত বললেন, “কেমন আছিস রে, শান্টু?”

একগাল লাজুক হেসে শান্টু অচ্যুতকে প্রণাম করে বলল, “ভালো আছি, বড়দা। তোমাদের বাসায় আমাকে নিয়ে যাবে না, দাদা?”

ছোটভাইয়ের কথায় অচ্যুত আবেগে আপ্লুত হলেন, “দেখ বোকা ছেলে কেমন প্রশ্ন করে! নিয়ে যাবো না, কেন? আমার বাসা তো তোদেরও বাসা। যাবি, থাকবি, ওখানে থেকেই লেখাপড়া করবিহীরু তোর কথা খুব বলে, তোর বৌদিও বলে, শান্টুটা কী করছে কে জানে!”

যে অপরাধবোধের জন্যে অচ্যুত মায়ের সামনে আড়ষ্ট হয়ে ছিলেন, ভাইয়ের আন্তরিক কথায় তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করলেন, গলা তুলে বললেন, “বৌমা, তোমাদের খবর সব ভালো তো মা? তোমার বড়দি তোমাদের কথা খুব বলে। তোমরা দুজনে সারাদিন একসঙ্গেই তো থাকতে; বলে, মালতী আমার আর জন্মের বোন ছিল”

“সঙের মতো দাঁড়িয়ে কী শুনছিস, শান্টু? দাদার হাত থেকে খালি গেলাসটা নে। কলকাতা যাওয়ার জন্যে তোর এত আদেখলামোই বা কেন রে? কলকাতা কী পালিয়ে যাচ্ছে? দাদা-বৌদি কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেছে, তোদের মতো অপোগণ্ড পোষবার জন্যে? বৌমা, দরজায় দাঁড়িয়ে আর আদিখ্যেতা করো না, বাছা। কত বেলা হল, সে খেয়াল আছে? নন্টু এতদিন পরে এল, শুধু ডালভাত বেড়ে দেবে নাকি”? ঠাকুরঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলা, নিভাননীর কর্কশ কথাগুলো, হাল্কা হওয়া পরিস্থিতিকে আবার বিষাক্ত করে তুলল। কথাগুলি বলে তিনি ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ করে জপে বসলেন। কম্বলের আসনে বসে, ইষ্টদেবতার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন বহুক্ষণ, পারলেন না। চোখ বন্ধ করলে, একটাই মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সুন্দর অথচ কুটিল সেই মুখটি তাঁর বড়পুত্রবধূর। জপের আসনে বসেও তিনি শান্ত হলেন না, বরং ক্রোধের নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তিনি তাকিয়ে রইলেন, রাধা-কৃষ্ণের স্মিত যুগলমুখের দিকে।


 

জলখাবার সেরে কাঁধে গামছা ফেলে অচ্যুত গ্রামে বেরিয়েছিলেন, পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করতে। উদ্দেশ্য সকলের সংবাদ নেওয়া এবং তাঁর কলকাতায় বাস নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া জানা। তিনি ভেবেছিলেন, গ্রামের সকলেই হয়তো ছি ছি করবে! কিন্তু যতটা ভেবেছিলেন, ততটা হয়নি।

দুয়েকজন বয়স্ক বললেন, “এ তোমার উচিৎ হল না, নন্টু। তুমি বাড়ির বড়ো ছেলে হয়ে, সব দায় ঝেড়ে ফেলে পরিবার নিয়ে একেবারে কলকাতায় বাসা করে ফেললে! বিধবা মা, নাবালক ভাইয়ের প্রতি যে কর্তব্য, তোমার মতো উপযুক্ত শিক্ষিত ছেলেরাও যদি এড়িয়ে যায়, তাহলে গাঁয়ে ঘরে আর রইল কী? এমন চললে কদিনেই, দেশ, সমাজ, এ সবই তো উচ্ছন্নে যাবে, হে! পরিবার মানে কী শুধুই মাগ-ভাতার আর ছেলেপুলে? বাপ-মা, ভাই-বোন, খুড়ো, খুড়ি তাঁরা কী পরিবারের কেউ নয়”?

কিন্তু অধিকাংশই সমর্থন করল, “বেশ করেছো। এই এঁদো গাঁয়ে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না। আমাদের উপায় নেই, তাই পড়ে পড়ে মার খাওয়া! একটা স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, বিজলি নেই। বর্ষায় পথে ঘাটে এক হাঁটু কাদা। এখানে মানুষ থাকে, পোকার মতো কিলবিল করা! একবার যখন বেরিয়ে পড়েছো, ভায়া, ভুলেও আর এমুখো হয়ো না!”

পুকুর থেকে একেবারে চান করে মাঝদুপুরে বাড়ি ফিরলেন অচ্যুত। ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে শুকোতে দিলেন, উঠোনের দড়িতে, তারপর দোতলার ঘরে গিয়ে শুলেন নিজের বিছানায়। মাথার নিচে হাত রেখে চিত হয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন নানান কথা। আশৈশব তিনি যে মাকে দেখেছেন, চিনেছেন, সেই মা এখন যেন অচেনা। বাবার অত্যধিক নিয়মনিষ্ঠায় তাঁরা সকলেই অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন। বিশেষ করে তাঁর এই মা, ধর্মপালনের নামে বাবার কত যে অদ্ভূত বায়না, তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, তার সাক্ষী আর কেউ না থাক, তিনি তো আছেন! রান্নাঘরে গোপনে চোখের জল ফেলা মাকে, তখন সান্ত্বনা দেবার কে ছিল আর, নন্টু ছাড়া?

অথচ বাবার মৃত্যুর পর বাবার ছেড়ে যাওয়া খড়মেই যেন মা পা রাখলেন। কলেজে পড়ার থেকেই তিনি বাইরে বাইরে থাকতেন, অতটা বুঝতে পারেননি। বিয়ের পর স্ত্রীর মুখে অজস্র অভিযোগের কথা শুনে আশ্চর্য হতেন খুব, বিরক্তও হতেন। একজন মানুষ যে যন্ত্রণায় সারা জীবন জ্বলেছেন, সেই যন্ত্রণা তিনি কী ভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে পারেন? কিন্তু আজ প্রায় মাস চারেক অদেখার পর, মায়ের সকালের আচরণে তিনি নিশ্চিত হলেন, এই মানুষটি তাঁর সেই শৈশবের-বাল্যের স্নেহময়ী মা নন। তিনি এখন নীতি ও ধর্ম আচরণের নিষ্ঠুর প্রতিষ্ঠান, জেদী এবং অহংকারী। এ সময় হঠাৎ তাঁর আর একটা কথা মনে এল, তিনি কী এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যেতেই কলকাতায় বাসা করলেন? ছেলেদের লেখাপড়াটা একটা বাড়তি অজুহাত!

বন্ধুবান্ধব ও কিছু প্রতিবেশী তাঁকে সমর্থন করে এই যে কথাগুলো বলল, সেটা কী তাদের শুভেচ্ছা? নাকি ঈর্ষা? নাকি তাঁর এই পালিয়ে যাওয়ার প্রতি বিদ্রূপ? মনের অবচেতনে তিনিও কী মুক্তিই খুঁজছিলেন? দীর্ঘদিন কলকাতাবাসী হওয়ার দৌলতে তিনি কী শহরের পরিবেশ, শহরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন? আসলে তিনিও কী এই বদ্ধ গ্রামজীবনকে এড়িয়ে সহজ স্বস্তির জীবনে উত্তরণ চাইছেন? তাঁর এই পলায়নপর মনোভাব কী ধরা পড়ে গেল, মায়ের কাছে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে?

“বড়দা, খাবে চলো। নিচেয় খাবার বেড়েছে”। শান্টুর কথায় অচ্যুতের চিন্তা থমকে গেল। মেঝেয় পা দিয়ে অচ্যুত ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন, “তুইও খাসনি তো”? লাজুক হেসে শান্টু ঘাড় নাড়ল। না। “চ, একসঙ্গে খাবো”।

খাবার সময় মা সামনে বসে থাকলে বেশ লাগে। এই বয়সেও তিনি যেন বাল্যের দিনে ফিরে যান। এতক্ষণে মা নিশ্চয়ই শান্ত হয়েছেন, আগের মতোই হয়তো স্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন। নিচেয় এসে শান্টু তাঁকে সেজভাইয়ের ঘরে নিয়ে যেতে, তিনি বেশ অবাক হলেন। দেখলেন ঘরের মেঝেয় দুটি আসন পাতা, আসনের সামনে ঢাকা দেওয়া কাঁসার গেলাসে জল। এতদিন তিনি এবং তাঁর ভাইয়েরা একত্র হলে, মায়ের ঘরেই খাবার ব্যবস্থা হয়, আজ তার ব্যত্যয় কেন?

শান্টুকে তিনি জিগ্যেস করলেন, “মা কোথায়?”

শান্টু উত্তর দিল, “মা ছোটকাকীমার সঙ্গে দেখা করতে গেছে”। অচ্যুতের বাবারা তিনভাই, মেজকাকা থাকেন হাওড়ায়, ছোটকাকা-কাকীমা খুড়তুতো ভাইবোনেরা থাকেন, পাশের বাড়ীতে। বাড়ি আলাদা হলেও দুই পরিবারে হৃদ্যতার অভাব নেই।

অচ্যুত খুব বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমি তো একটু আগেই ওবাড়ি ঘুরে, দেখা করে এলাম!” এইসময় অচ্যুতের খুড়তুতো বোন বিশাখা ভাতের থালা সাজিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পিছনে আরেকটা থালা নিয়ে এক গলা ঘোমটা দিয়ে আড়ালে রইলেন সেজবৌমা।

অচ্যুতের আসনের সামনে থালা রেখে বিশাখা বললেন, “বড়দা, শুরু করো। অনেক বেলা হয়ে গেল”

সমস্ত ব্যাপারটাতে অচ্যুতর মন বিরূপ হয়ে উঠল। মায়ের এই আচরণ তাঁর অত্যন্ত বাড়াবাড়ি মনে হল। তাঁর মনে অপরাধবোধের যে কাঁটা এতদিন খচখচ করছিল, সেটা যেন সরে গেল। তিনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। বিশাখা শান্টুর ভাতের থালাও আসনের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর, অচ্যুত গেলাসের জল নিয়ে গণ্ডূষ করে বললেন, “তোদেরও তো খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। তুই কী এখানেই খাবি? নাকি আবার ও বাড়ি যাবি?”

“না গো। আজ সেজবৌদির সঙ্গে খাবো”।

“মা হঠাৎ এই ভরদুপুরে তোদের বাড়ি গেলেন কেন?”

বিশাখা হাসলেন, “বড়মা, ওইরকম হয়ে গেছেন আজকাল। কোন কিছুই ওঁর পছন্দ হয় না। সবার সঙ্গেই খিটিমিটি করেন।  মায়ের সঙ্গে ওঁর রোজ ঝামেলা হয়। গতকাল পর্যন্ত মুখ দেখাদেখি ছিল না। আজ তুমি এলে, আর আজই উনি মায়ের সঙ্গে গল্প করতে গেলেন! বড়দা, সেজবৌদি জিগ্যেস করছে, পান্নার আঙুলটা সেরেছে কিনা?”

অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়াতে অচ্যুত কিছুটা স্বস্তি পেলেন। হেসে বললেন, “হ্যাঁ বৌমা, ওর মামার বাড়িতে মাসীরা সবাই মিলে সারিয়ে দিয়েছে। এখন ভালই আছে”।

বিশাখা বললেন, “বৌদির বাবাও তো হঠাৎ মারা গেলেন, শুনেছি। এরপরেও একা একা কলকাতার বাসায় নতুন সংসার  সামলানো- বৌদির কিন্তু খুব মনের জোর, না বড়দা? বৌদির বোনেদের কেউ সঙ্গে গেল না কেন? মাস কয়েক থেকে একটু গুছিয়ে দিয়ে আসত!”

“কথা সেরকমই ছিল। কিন্তু শ্বশুরমশাই মারা যাওয়াতে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল”।

“তা ঠিক। বাপ-মা মানে বটগাছ, মাথার ওপর থেকে তাঁদের ছায়া চলে যাওয়া কী চাট্টিখানি কথা? হীরু আমাদের কথা বলে, বড়দা? নাকি ভুলে গেছে?”

“দ্যাখো, ভুলে যাবে কেন? হীরু এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, স্কুলে যাচ্ছে। তার আগে দুপুরবেলা হলেই মন খারাপ করত। সারা দুপুর নাকি ওবাড়িতে তোদের সঙ্গে দৌরাত্ম্য করত!”

“দৌরাত্ম্য কী বলছো, বড়দা? ছেলেমানুষ চঞ্চল হবে না? মাঝে মাঝে বড়োমা হীরুকে আটকে রাখতেন, আমাদের বাড়ি যেতে দিতেন না, আমি এসে তুলে নিয়ে যেতাম। বড়োমা আমাকে কিছু বলতেন না, জানেন তো বিশাখাও কম মুখরা নয়”।

অচ্যুত বোনের একথায় খুব হাসলেন হা হা করে, বললেন, “বাবা। সেই বিশাখা, এত্তোটুকুন মেয়ে, তুই এখন এত পাকা হয়েছিস? আমার মায়ের সঙ্গেও ঝগড়া করিস?”

মুখ টিপে হেসে বিশাখা বললেন, “করবো না? আরেকটু ভাত দিই, বড়দা?”

“না রে, একটুও না। যা দিয়েছিস, এই পুরোটা খেতে পারলে হয়”।

মুচকি হেসে বিশাখা বলল, “তোমার খাওয়া অনেক কমে গেছে, বড়দাসেজবৌদি বলছে”

“না গো বৌমা, শুরুতেই অনেক ভাত দিয়ে ফেলেছো যে!” হাসতে হাসতে বললেন অচ্যুত। 

 

 

খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরের বিছানায় একটু গড়িয়ে নিয়েই অচ্যুত আবার পাড়ায় বেরিয়ে পড়েছিলেন।  ফিরলেন সন্ধের বেশ কিছুটা পরে। বাড়ি এসে হাতপা ধুয়ে দাওয়ায় বসতেই, ছোটভাই শান্টু এসে জিগ্যেস করল, “বড়দা, চা খাবে? সেজবৌদি জিগ্যেস করতে বলল”।

“নাঃ রে। আমি তো চা খাই না। মা কোথায় রে?”

“ঠাকুর ঘরে, আহ্নিক করছে”।

“ও আচ্ছা”। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এখনও সন্ধ্যা আহ্নিক!

শান্টুকে বললেন, “ভেতর থেকে একটা মাদুর নিয়ে আয় তো, দাওয়ায় বসি, আর তোর বই খাতাও নিয়ে আয়, কেমন লেখাপড়া করছিস দেখি?” শান্টু দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর থেকে একটা মাদুর এনে বিছিয়ে দিল দাওয়ায়। অচ্যুত দাওয়ায় উঠে বসলেন। শান্টু দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে হ্যারিকেনটাও এনে দাওয়াতে রাখল। হ্যারিকেনের পলতে নামানো ছিল, সেটাকে বাড়িয়ে দিতে আলোটা বাড়ল কিছুটা।  তারপর আবার ঘরের ভেতরে গেল বই-খাতা আনতে।

অচ্যুত বললেন, “আরে, অন্ধকার ঘরের মধ্যে কোথায় হাঁটকাবি, হ্যারিকেনটা নিয়ে যা”।

“তুমি অন্ধকারে থাকবে, বড়দা?”

“কেন? আমি অন্ধকারে বসলে, আমায় ভূতে ধরবে বুঝি? যাঃ যাঃ মেলা পাকামি করিস না, আমি তোর বড়দা, না তুই আমার? আলোটা নিয়ে অংক, ইংরিজি আর সংস্কৃত বইটা নিয়ে আয়, দেখি কেমন পড়েছিস”? শান্টু হ্যারিকেন নিয়ে ঘরের ভেতরে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যে বইগুলো সঙ্গে নিয়ে, দাদার সামনে এসে বসল

অচ্যুত হ্যারিকেনের পলতেটা একটু কমিয়ে দিলেন, পলতের আগুন ব্যাঁকা হয়ে জ্বলছিল, বললেন, “পলতেটা ঠিক করে কাটা হয়নি রে, ব্যাঁকা হয়ে গেছে। এভাবে জ্বললে কাচের একদিকে কালি পরে ভূতুষি হয়ে যাবে একটু পরেই। অনেক সময় কাচ ফেটেও যায়। শব্দরূপ ধাতুরূপ মুখস্থ করিস? লতা শব্দের পঞ্চমীর দ্বিবচনে কী হয়?” শান্টু খুব অস্বস্তিতে পড়লতার মেজকাকা আর বড়দার লেখাপড়া নিয়ে গাঁয়ে এখনো চর্চা হয়, সংস্কৃতে আর ইংরিজিতে দুজনেরই এখনও খুব নাম আছে এ অঞ্চলে। সেই বড়দা অনেকদিন পর হঠাৎ এসে পড়া ধরতে বসলে ভয় পাওয়ারই কথা।

শান্টু শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলল, “ল--লতাভ্যাম্‌”

“বাঃ ভেরি গুড। তোৎলাচ্ছিস কেন? ঠিকই তো বলেছিস। শ্রী শব্দের সপ্তমীর বহুবচন?”

“স্‌-স্‌ শ্রীণাম্‌”।

“এঃ পারলি না? শ্রীণাম ষষ্ঠীর বহুবচন। সপ্তমীর বহুবচনে শ্রীষু। “পুষ্পিতৌ লতে” কথাটা ঠিক না ভুল?”

“ভুল”।

“ঠিকটা কী হবে?”

অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে পায়ের নখ খোঁটার পর শান্টু বলল, “পুষ্পিতৌ লতৌ”।

অচ্যুত জিভে আক্ষেপের চিক শব্দ করলেন, বললেন, “এখানে বিশেষ্য কোনটা আর বিশেষণ কোনটা?”

শান্টু খুব ভয়ে ভয়ে বলল, “লতা বিশেষ্য আর পুষ্পিতা বিশেষণ”।

“তাহলে? বিশেষ্যর যে লিঙ্গ, বিভক্তি এবং বচন হবে, বিশেষণেরও তাই হবে। লতা স্ত্রীলিঙ্গ, তার প্রথমার দ্বিবচনে লতে। তার বিশেষণ পুষ্পিতারও তাই হবে। কী হবে তাহলে?”

“পুষ্পিতে লতে”।

“গুড। বুঝতে পেরেছিস? সংস্কৃত অনেকটা অংকের মতো, নিয়মটা একবার বুঝতে পারলে আর কোনদিন ভুল হবে না...”।

নিজের পড়া হোক কিংবা অন্যকে পড়ানো – দুটো ব্যাপারেই অচ্যুতের ভীষণ ঝোঁক। লেখাপড়ার চর্চায় অবগাহন করতে তিনি বড়ো আনন্দ পান। ছোট ভাইকে পড়াতে পড়াতে তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন, নিভাননী কখন এসে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়েছেন তিনি লক্ষ্যও করেননি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিভাননী বললেন, “নন্টু, সেই কোন ভোর কলকাতার বাসা থেকে বেরিয়ে এতদূর পাড়াগাঁয়ে এলি! কোথায় একটু বিশ্রাম করবি তা না, এখন আবার শান্টুকে নিয়ে পড়লি?” লেখাপড়ার রাজ্যে অচ্যুত ডুবে ছিলেন, কলকাতায় বাসা নিয়ে তাঁর চলে যাওয়া আর সেই নিয়ে তাঁর মায়ের বিদ্বিষ্ট আচরণের কথা তিনি ভুলেই গেছিলেন।

মায়ের হঠাৎ এই উদ্বিগ্ন কথার শ্লেষ তিনি ধরতে পারলেন না, তিনি বললেন, “না, না, মা, আমার কিচ্‌ছু কষ্ট নেই! শান্টু লেখাপড়ায় খুব অবহেলা করছে!”

“এতদিন পরে একবেলা পড়িয়ে তুমি ভাইকে কী দিগ্‌গজ পণ্ডিত বানিয়ে তুলবে, বাবা? শান্টু, বইপত্তর নিয়ে ঘরে যা, নিজে নিজে যা পারিস পড়। দাদাকে বিরক্ত করিস না”।

নিভাননীর এই কথায় অচ্যুত আবার বাস্তবে ফিরলেন। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন। শান্টু ম্লানমুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিল, চোখাচোখি হতে মুখ নামাল। সামনে খুলে রাখা ব্যাকরণ কৌমুদী বন্ধ করে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে সব বই তুলে নিয়ে চলে গেল ঘরের ভিতর। অচ্যুতর মনে ভীষণ এক বিরোধ বিদ্রোহের মতো ঝলসে উঠল। ইচ্ছা হল মায়ের এই নিষ্ঠুর আচরণের জবাব দেওয়ার। শান্টু ঘরে চলে যাবার পর, নিভাননী পিছন ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।

অচ্যুত পিছন থেকে একটু উদ্ধত স্বরে বললেন, “মা, কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাবো। তোমার বৌমার একটা ট্রাংক আছে, সেটাও নিয়ে যাবো। তাছাড়া আমাদের যা টুকটাক জিনিষ পত্র রয়ে গেছে, সেসবই আমি কাল নিয়ে যাচ্ছি”

নিভাননী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বড়ো ছেলের মুখের দিকে, চোখে চোখ রেখে বললেন, “যেও”। তারপর  ধীর পায়ে উঠে গেলেন পাশের ঘরে দাওয়ায়।

অচ্যুত মাথা নীচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ, হ্যারিকেনের কল ঘুরিয়ে পলতে কমিয়ে দিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললেন,

“পরিবর্তিনি সংসারে মৃতঃ কো বা ন জায়তে।

স জাতো যেন জাতেন যাতি বংশঃ সমুন্নতিম্‌”।।

পরিবর্তনের এই সংসারে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম কার না হয় ?

কিন্তু যে জন্মে বংশের সম্যক উন্নতি হয় সেই জন্মই (সার্থক)

..০০..

পরের পর্ব - " মাথার পোকা "





নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড ...