রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রম্য রচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পরিবর্তিনি সংসারে...

 


স্মৃতি মেদুর এই রম্যকথার শুরু - " লিটিং লিং - পর্ব ১ "


এর আগের পর্ব - " পাখির চোখ "

 

নন্টু আসছেন, নিভাননী সংবাদ পেয়েছিলেন। নন্টু অচ্যুতের ডাকনাম, মা নিভাননী ওই নামেই ডাকেন, ডাকে গাঁয়েঘরের লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাওনন্টুর আসার সংবাদে তিনি আদৌ খুশী হননি। বরং তীব্র রাগ হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলেই মাগ-ছেলে নিয়ে নন্টু কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেল!  সেখানে বড় নাতি হীরুকে কোন একটা স্কুলে যেন ভর্তিও করে দিয়েছে! কলকাতার স্কুলে ছেলেকে পড়িয়ে, নাকি ‘জজ ব্যারিষ্টর’ করে তুলবে! কেন পাড়াগাঁয়ে থেকে কেউ কী বড়ো মানুষ হয় না?  গাঁয়ের স্কুলেই পড়া শেষ করে, বর্ধমানের কলেজে পড়ে মনা হাজরা, গোপাল চাটুজ্জ্যে, বিশু সামন্তরা বড়ো মানুষ হয়নি? হাজরাদের মনা কলকাতা হাইকোর্টের দুঁদে উকিল। গোপাল চাটুজ্জে “ম্যাজিস্টর”, তার হুকুমে সবাই হুজুরে হাজির থাকে। বিশু সামন্ত বায়স্কোপ বানায়, দেশে-বিদেশে তার নাকি খুব “সুখ্যাৎ”এঁদো গাঁয়ের স্কুলের জন্যে ওদের কী কিছু আটকেছে? যার হবার তার হবেই, আর যার হবার নয়, তার কোথাও হবে না। কলকাতার স্কুলে পড়লেই বুঝি সবাই ডাক্তার-মোক্তার হয়?

 বিয়ের আগে নিভাননী কলকাতা না হলেও, কাশীপুরে অনেকদিন থেকেছেন বড়োদাদার বাসায়। তাঁর বড়োদাদা থানার ছোটবাবু ছিলেন। কলকাতার মতো ইল্লুতে জায়গা আর দুটো নেই। বড়োদাদার বাসার কাছেই একটা পাঁউরুটির কারখানা ছিল। সেখানে তিনি দেখেছেন, কারখানার লোকেরা পায়ে দলিয়ে পাঁউরুটির ময়দা মাখছে। সেই পাঁউরুটি নাকি কলকাতার বাবুরা মাখন মাখিয়ে খায়। ঝ্যাঁটা মার, ঝ্যাঁটা মার – জাত ধম্মো আর কিছু বাকি আছে কলকাতায়? তাছাড়া বখাটে, বাউন্ডুলে, মাতাল, ঘর পালানে “মিন্‌সে” চারদিকে কিলবিল করছে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই বুক কাঁপে! বউ বগলে করে, সেই শহরেই গিয়ে বাসা বাঁধল নন্টু? এই বাড়ির বড়বৌ, ঘরের লক্ষ্মী - একটা অসৈরণ-সৈরণ নেই? বামুনের ঘরের বউ, সেজেগুজে নচ্ছার মাগীর মতো বাজার-হাট করবে? ট্রামে-বাসে ব্যাটাছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাওয়া আসা করবে? আজ থাকতেন নন্টুর বাবা, খড়মপেটা করে ছেলের এই বারটান আর বাউন্ডুলেপনা, শায়েস্তা করে দিতেন

নন্টুর বাবা যখন মারা গেলেন, নন্টু তখন কলকাতার কলেজে পড়ে। সে আজ বেশ কবছর হল। নিভাননীর ছোট ছেলে শান্টুর বয়েস তখন বছর পাঁচেকতার ওপরের দিদি চিত্রার বয়েস ষোলো। বাবার মৃত্যুর পর, নন্টু যোগ্য বড়ো ছেলের মতোই সংসারের হাল ধরেছিল। কলেজের পড়ায় পাশ দিয়েই, মেজঠাকুরপোর সুপারিশে  সরকারি চাকরিটাও সে পেয়ে গিয়েছিল। মেজ ঠাকুরপোও সেই দুর্দিনে নন্টুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সত্যিকারের অভিভাবকের মতো। নন্টু চাকরিটা পাওয়ার পরেই, সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে, বেশ ধুমধাম করেই ছোটবোনের বিয়ে দিয়েছিল।

চিত্রার বিয়ে মিটে যাওয়ার পর, নিভাননী  বলেছিলেন, এবার বিয়ে থা করে, তুইও সংসারী হ, নন্টু। তোর বিয়ে হয়ে গেলে, আমি ঝাড়া হাত পা হবো, বেরিয়ে পড়বো তীর্থ দর্শনে। সংসারের এই টানাপোড়েন আর ভাল লাগছে না, রে

সে কথায় নন্টু খুব উৎসাহ দেখিয়েছিল, বলেছিল,সেই ভালো, মা। শান্টুকে ভালো কোন একটা বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দিই দাঁড়াও, তারপর তোমাকে নিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়বে তীর্থ যাত্রায়। বিয়ে থা করে আর কাজ নেই। সারা বছর ঘুরে বেড়াবো, সব ঠিকঠাক চলছে কিনা মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবো

বড়ছেলের ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলেছিলেন, নিভাননী, বলেছিলেন,তাই কী হয় নাকি? চাকরি বাকরি শিকেয় তুলে, তুই কোথায় যাবি, বাবা? আর মায়ের চোখের সামনে সোমত্ত ছেলে আইবুড়ো বসে থাকবে, এ আবার একটা কথা হল? আমি খোঁজখবর করছি। তোর একটা গতি না করে, আমি তীর্থে গিয়েও যে শান্তি পাবো না, বাবা!

না, না, মা, এই বেশ আছিতুমি আমাকে আর ওসবের মধ্যে জড়িও না। ছেলের এই আপত্তি যে কথার কথা সেটা বুঝতে ভুল করেননি নিভাননী। তিনি খোঁজখবর করেছেন। মেয়ে দেখতে, মেয়ের ঘরদোর বুঝতে, কথাবার্তা বলতে মেজঠাকুরপোকে পাঠিয়েছেন। নন্টু সবই শুনেছে, বুঝেছে, মেয়ে পছন্দ করে বিয়েও করেছে – কোন আপত্তি করেনি। তারপর দুটি ছেলেও হয়েছে। তিনি নিজেও সংসারে আর জড়াবেন না ভাবলেও, জড়িয়ে পড়েছেনতিনি বিধবা, ছোটছেলে শান্টুর লেখাপড়াও শেষ হয়নি এখনো নাবালক। তার একটা হিল্লে না হওয়া পর্যন্ত, তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। মেজছেলে চাকরি নিয়ে চলে গেছে বহুদূরে। বছরে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে আসে। কোন খোঁজখবর নেয় না, সংসারের কোন দায়দৈবে মাথাও ঘামায় না। সেজছেলে একটা চাকরি নিয়ে কলকাতার মেসে থাকে। সেও কমাস আগেই বিয়ে করেছে। সেজবৌ বাড়িতেই থাকে

বড়ছেলে নন্টু ছাড়া তিনি আর কাউকেই তেমন ভরসা করতে পারেন না! কিন্তু পরের ঘরের মেয়ে যদি কান ভাঙানি দেয়, পর করে দেয় তাঁর নন্টুকে? প্রত্যক্ষ কোন কারণ না ঘটলেও, সেই আতঙ্কে তিনি তটস্থ থেকেছেন অহরহ। আজ সেটাই সত্যি হল, নন্টু পরই হয়ে গেল? মা-ভাইকে ভুলে বাসা নিয়ে ফেলল কলকাতায়! তাও তাঁর বিনা অনুমতিতে?

স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে সোনা, এ বাড়ির বৌ হয়ে এসে, অনটনের সংসারে মানিয়ে নিয়েছেন বিস্তর। তাঁর আচরণে কাজে কর্মে কোথাও তেমন কোন ত্রুটি ধরা পড়ে নি কোনদিন। কিন্তু এই অত্যধিক মেনে নেওয়াটাও যে মেনে নেওয়া যায় না! কোন প্রতিবাদ না করে, সব অভাব, সব অনটন যদি কেউ মুখ বুজে, হাসি মুখে সহ্য করে নেয়, সেটাই বা কেমনতর! এও তো একধরনের স্পর্ধাই। আমি কত ভালো, আমার বাপের ঘরের শিক্ষা কতো ভালো, এ যেন তার দেখনদারি!

পুত্রবধূর অস্পষ্ট অথচ অসহ্য এই গুমোর কল্পনা করে নিভাননীর গাত্রদাহ হয়পাড়া প্রতিবেশী যত তাঁর বড়োবউয়ের প্রশংসা করে, সোনা তত তাঁর চোখের বালি হতে থাকেন পুকুরঘাটে গাঁয়ের মেয়েবউদের সঙ্গে স্নান থেকে ফিরতে দেরি হলে বিরক্ত হন, মুখ ঝামটা দেন। ঘরের সব কাজ সেরে প্রতিবেশী-জ্ঞাতি মেয়েবউদের সঙ্গে বসে দুপুরে বিন্তি বা রঙ মেলান্তি খেললেও বিরক্ত হন। নন্টুর বাবা ছিলেন কট্টর শুদ্ধাচারী নীতিবাগীশ ব্রাহ্মণ। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর ব্রাহ্মণ্যে গ্রামের লোকেরা ভয়ে এবং ভক্তিতে তটস্থ থাকত।

স্বামীর জীবদ্দশায় তিনি নিজেও সর্বদা আতঙ্কে থাকতেন, ঘরভরা ছেলেমেয়ের সংসারে সর্বদা সব বিধান কী আর মেনে চলা যায়? পান থেকে চূণ খসলেই স্বামীর বাক্যবাণে বিদ্ধ হতেন এবং আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। অথচ বিধবা হয়ে, সেই তিনিই পালা-পার্বণ, তিথি-নক্ষত্র, বার-ব্রত, আমিষ-নিরামিষ, ছ্যুৎ-অছ্যুৎ, কাচা-আকাচা, আচার-বিচারের মোড়কে নিজেকে মুড়ে ফেলেছেন। একাদশীর দিন তিনি নির্জলা উপবাস করেন। সমস্ত বার-ব্রত-তিথি-নক্ষত্র পালনে তিনি স্বয়ং মনুর থেকেও নিষ্ঠুর এবং অমোঘ।

সেই সব তিথির পালনীতে সামান্য চ্যুতি হলে, তিনি পুত্রবধূকে ছেড়ে কথা বলেন না, “তুমি আর এসব জানবে কী করে মা, তোমরা বড়োমানুষের মেয়ে। তোমাদের বাড়িতে শুনেছি কত জাতের কত কাজের লোক। তোমাদের বাপের ঘরে অমন চলতে পারে, কিন্তু এখানে তো ওসব চলবে না, বৌমা। তোমার শ্বশুরঠাকুর ছিলেন এই দিগড়ের বিধান দাতা। তাঁর নির্দেশ ছাড়া এই গাঁয়ের লোকের একপাও চলার ক্ষমতা ছিল? বাপরে, কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে তুলতেন! কেউ কিছু অনাচার করে ফেললে, তার প্রায়শ্চিত্তের যা বিধান দিতেন, সে সব শুনলে তোমরা ভিরমি খাবে!”

প্রখর গ্রীষ্মে, একাদশীর নির্জলা উপবাসের দিন, মেঝেয় আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকা নির্জীব শ্বশ্রুমাতাকে, সোনা একবার এক গেলাস লেবুমিছরির সরবৎ খাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, তাতে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “ছি, ছি, বৌমা, এ তুমি কী করলে? এ যে পাপ। বামুনের ঘরের বেধবাকে একাদশীর ব্রতভঙ্গ করাতে এলে? তোমার কি একবারও মনে হল না, এ অনাচার?”

“ভোর থেকে এত বেলা হল, এই প্রচণ্ড গরমে আপনি একবিন্দু জলও মুখে দিলেন না। আমরা এবার ভাত খেতে যাবো, আর আপনি এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, মা, তাই...”।

তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে নিভাননী উত্তর দিয়েছিলেন, “রক্ষে করো, বৌমা, আমার জন্যে তোমার অত দরদে আর কাজ নেই! ওসব তুমি বুঝবে না, মা। উপোসে শরীর-মন শুদ্ধ হয়, কষ্ট হয় না, তোমার বড়লোক বাপ-মা এই শিক্ষাটুকুও দেননি, বাছা? যাও যাও, বেলা অনেক হল, খেয়ে নেবে যাও। আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও”।

সোনা, মাথা নীচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, গেলাসের সরবত উঠোনের মাটিতে ফেলে দিয়ে, নিজের ঘরে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কেঁদেছিলেন খুব। ছোট্ট হীরু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, জিগ্যেস করেছিল, “ও মা, কাঁদছো কেন? খেতে দেবে না? ও মা, চলো না খিদে পেয়েছে”। সেজজা এসে সোনাকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, “ও দিদি, মন খারাপ করো না তো! কচি ছেলেটার খিদে পেয়েছে, চলো খেতে দাও”।   

 

 

অচ্যুত যখন বাড়িতে ঢুকলেন, নিভাননী খুঁটিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দাওয়ায়। ছোট করে ছাঁটা সাদা-কালো কদমফুলি চুল। পরনে পাড়হীন সাদা থান, সাদা ব্লাউজ। সমস্ত শরীর পাথরের মতো কঠোর আবেগহীন।   

“কেমন আছো, মা?” নীচু হয়ে চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন অচ্যুত। নির্বিকার স্বরে নিভাননী উত্তর দিলেন, “যেমন তোমরা, রেখেছো, বাছা! আমাদের আর থাকা না থাকা, শেষের প্রহর গোনা বৈ আর কাজ কী?”

মায়ের অনুমতি ছাড়া পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া নিয়ে অচ্যুতের মনে অপরাধবোধ ছিলই, কুণ্ঠিত স্বরে বললেন, “ওভাবে বলছো কেন, মা? তড়িঘড়ি সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, তোমাকে জানাতে পারিনি। অন্যায় যে হয়েছে, সেটা কী আমি বুঝতে পারছি না, মা?”

ঠাকুরঘরের দিকে যেতে যেতে নিভাননী বললেন, “অন্যায় হবে কেন, বাবা? যা করেছো ঠিকই করেছ। সেই কোন ভোরে রওনা হয়েছো, হাতমুখ ধুয়ে এসো। একটু জিরিয়ে নাও। বৌমা, নন্টু এসেছে সরবৎ দাও, জল দাও”।

নিভাননী যদি দুটো কথা কটকট করে শুনিয়ে দিতেন, কিংবা অভিযোগ করে কান্নাকাটি করতেন, অচ্যুতের পক্ষে পরিস্থিতি সামলাতে সুবিধে হত। কিন্তু উদাসীনতার এমন নিরেট দেওয়াল তিনি তুলে দিলেন, তার মধ্যে প্রবেশের আর কোন পথ খুঁজে পেলেন না। মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে, অচ্যুত দাওয়াতে হাতের ব্যাগটা রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, ছোটভাই শান্টু, তার হাতে কাচের গেলাসে শরবৎ। তার হাত থেকে গেলাস নিতে নিতে তিনি রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকালেন, দরজার আড়ালে সেজবৌমার শাড়ির প্রান্ত দেখতে পেলেন।

শরবৎ শেষ করে, শান্টুর মাথায় হাত রেখে অচ্যুত বললেন, “কেমন আছিস রে, শান্টু?”

একগাল লাজুক হেসে শান্টু অচ্যুতকে প্রণাম করে বলল, “ভালো আছি, বড়দা। তোমাদের বাসায় আমাকে নিয়ে যাবে না, দাদা?”

ছোটভাইয়ের কথায় অচ্যুত আবেগে আপ্লুত হলেন, “দেখ বোকা ছেলে কেমন প্রশ্ন করে! নিয়ে যাবো না, কেন? আমার বাসা তো তোদেরও বাসা। যাবি, থাকবি, ওখানে থেকেই লেখাপড়া করবিহীরু তোর কথা খুব বলে, তোর বৌদিও বলে, শান্টুটা কী করছে কে জানে!”

যে অপরাধবোধের জন্যে অচ্যুত মায়ের সামনে আড়ষ্ট হয়ে ছিলেন, ভাইয়ের আন্তরিক কথায় তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করলেন, গলা তুলে বললেন, “বৌমা, তোমাদের খবর সব ভালো তো মা? তোমার বড়দি তোমাদের কথা খুব বলে। তোমরা দুজনে সারাদিন একসঙ্গেই তো থাকতে; বলে, মালতী আমার আর জন্মের বোন ছিল”

“সঙের মতো দাঁড়িয়ে কী শুনছিস, শান্টু? দাদার হাত থেকে খালি গেলাসটা নে। কলকাতা যাওয়ার জন্যে তোর এত আদেখলামোই বা কেন রে? কলকাতা কী পালিয়ে যাচ্ছে? দাদা-বৌদি কলকাতায় বাসা নিয়ে চলে গেছে, তোদের মতো অপোগণ্ড পোষবার জন্যে? বৌমা, দরজায় দাঁড়িয়ে আর আদিখ্যেতা করো না, বাছা। কত বেলা হল, সে খেয়াল আছে? নন্টু এতদিন পরে এল, শুধু ডালভাত বেড়ে দেবে নাকি”? ঠাকুরঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলা, নিভাননীর কর্কশ কথাগুলো, হাল্কা হওয়া পরিস্থিতিকে আবার বিষাক্ত করে তুলল। কথাগুলি বলে তিনি ঠাকুরঘরের দরজা বন্ধ করে জপে বসলেন। কম্বলের আসনে বসে, ইষ্টদেবতার মুখ মনে করার চেষ্টা করলেন বহুক্ষণ, পারলেন না। চোখ বন্ধ করলে, একটাই মুখ তিনি দেখতে পাচ্ছেন, সুন্দর অথচ কুটিল সেই মুখটি তাঁর বড়পুত্রবধূর। জপের আসনে বসেও তিনি শান্ত হলেন না, বরং ক্রোধের নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তিনি তাকিয়ে রইলেন, রাধা-কৃষ্ণের স্মিত যুগলমুখের দিকে।


 

জলখাবার সেরে কাঁধে গামছা ফেলে অচ্যুত গ্রামে বেরিয়েছিলেন, পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করতে। উদ্দেশ্য সকলের সংবাদ নেওয়া এবং তাঁর কলকাতায় বাস নিয়ে প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া জানা। তিনি ভেবেছিলেন, গ্রামের সকলেই হয়তো ছি ছি করবে! কিন্তু যতটা ভেবেছিলেন, ততটা হয়নি।

দুয়েকজন বয়স্ক বললেন, “এ তোমার উচিৎ হল না, নন্টু। তুমি বাড়ির বড়ো ছেলে হয়ে, সব দায় ঝেড়ে ফেলে পরিবার নিয়ে একেবারে কলকাতায় বাসা করে ফেললে! বিধবা মা, নাবালক ভাইয়ের প্রতি যে কর্তব্য, তোমার মতো উপযুক্ত শিক্ষিত ছেলেরাও যদি এড়িয়ে যায়, তাহলে গাঁয়ে ঘরে আর রইল কী? এমন চললে কদিনেই, দেশ, সমাজ, এ সবই তো উচ্ছন্নে যাবে, হে! পরিবার মানে কী শুধুই মাগ-ভাতার আর ছেলেপুলে? বাপ-মা, ভাই-বোন, খুড়ো, খুড়ি তাঁরা কী পরিবারের কেউ নয়”?

কিন্তু অধিকাংশই সমর্থন করল, “বেশ করেছো। এই এঁদো গাঁয়ে পড়ে থাকার কোন মানে হয় না। আমাদের উপায় নেই, তাই পড়ে পড়ে মার খাওয়া! একটা স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই, বিজলি নেই। বর্ষায় পথে ঘাটে এক হাঁটু কাদা। এখানে মানুষ থাকে, পোকার মতো কিলবিল করা! একবার যখন বেরিয়ে পড়েছো, ভায়া, ভুলেও আর এমুখো হয়ো না!”

পুকুর থেকে একেবারে চান করে মাঝদুপুরে বাড়ি ফিরলেন অচ্যুত। ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে শুকোতে দিলেন, উঠোনের দড়িতে, তারপর দোতলার ঘরে গিয়ে শুলেন নিজের বিছানায়। মাথার নিচে হাত রেখে চিত হয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলেন নানান কথা। আশৈশব তিনি যে মাকে দেখেছেন, চিনেছেন, সেই মা এখন যেন অচেনা। বাবার অত্যধিক নিয়মনিষ্ঠায় তাঁরা সকলেই অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন। বিশেষ করে তাঁর এই মা, ধর্মপালনের নামে বাবার কত যে অদ্ভূত বায়না, তিনি মুখ বুজে সহ্য করেছেন, তার সাক্ষী আর কেউ না থাক, তিনি তো আছেন! রান্নাঘরে গোপনে চোখের জল ফেলা মাকে, তখন সান্ত্বনা দেবার কে ছিল আর, নন্টু ছাড়া?

অথচ বাবার মৃত্যুর পর বাবার ছেড়ে যাওয়া খড়মেই যেন মা পা রাখলেন। কলেজে পড়ার থেকেই তিনি বাইরে বাইরে থাকতেন, অতটা বুঝতে পারেননি। বিয়ের পর স্ত্রীর মুখে অজস্র অভিযোগের কথা শুনে আশ্চর্য হতেন খুব, বিরক্তও হতেন। একজন মানুষ যে যন্ত্রণায় সারা জীবন জ্বলেছেন, সেই যন্ত্রণা তিনি কী ভাবে পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে পারেন? কিন্তু আজ প্রায় মাস চারেক অদেখার পর, মায়ের সকালের আচরণে তিনি নিশ্চিত হলেন, এই মানুষটি তাঁর সেই শৈশবের-বাল্যের স্নেহময়ী মা নন। তিনি এখন নীতি ও ধর্ম আচরণের নিষ্ঠুর প্রতিষ্ঠান, জেদী এবং অহংকারী। এ সময় হঠাৎ তাঁর আর একটা কথা মনে এল, তিনি কী এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যেতেই কলকাতায় বাসা করলেন? ছেলেদের লেখাপড়াটা একটা বাড়তি অজুহাত!

বন্ধুবান্ধব ও কিছু প্রতিবেশী তাঁকে সমর্থন করে এই যে কথাগুলো বলল, সেটা কী তাদের শুভেচ্ছা? নাকি ঈর্ষা? নাকি তাঁর এই পালিয়ে যাওয়ার প্রতি বিদ্রূপ? মনের অবচেতনে তিনিও কী মুক্তিই খুঁজছিলেন? দীর্ঘদিন কলকাতাবাসী হওয়ার দৌলতে তিনি কী শহরের পরিবেশ, শহরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন? আসলে তিনিও কী এই বদ্ধ গ্রামজীবনকে এড়িয়ে সহজ স্বস্তির জীবনে উত্তরণ চাইছেন? তাঁর এই পলায়নপর মনোভাব কী ধরা পড়ে গেল, মায়ের কাছে, পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে?

“বড়দা, খাবে চলো। নিচেয় খাবার বেড়েছে”। শান্টুর কথায় অচ্যুতের চিন্তা থমকে গেল। মেঝেয় পা দিয়ে অচ্যুত ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন, “তুইও খাসনি তো”? লাজুক হেসে শান্টু ঘাড় নাড়ল। না। “চ, একসঙ্গে খাবো”।

খাবার সময় মা সামনে বসে থাকলে বেশ লাগে। এই বয়সেও তিনি যেন বাল্যের দিনে ফিরে যান। এতক্ষণে মা নিশ্চয়ই শান্ত হয়েছেন, আগের মতোই হয়তো স্বাভাবিক কথাবার্তা বলবেন। নিচেয় এসে শান্টু তাঁকে সেজভাইয়ের ঘরে নিয়ে যেতে, তিনি বেশ অবাক হলেন। দেখলেন ঘরের মেঝেয় দুটি আসন পাতা, আসনের সামনে ঢাকা দেওয়া কাঁসার গেলাসে জল। এতদিন তিনি এবং তাঁর ভাইয়েরা একত্র হলে, মায়ের ঘরেই খাবার ব্যবস্থা হয়, আজ তার ব্যত্যয় কেন?

শান্টুকে তিনি জিগ্যেস করলেন, “মা কোথায়?”

শান্টু উত্তর দিল, “মা ছোটকাকীমার সঙ্গে দেখা করতে গেছে”। অচ্যুতের বাবারা তিনভাই, মেজকাকা থাকেন হাওড়ায়, ছোটকাকা-কাকীমা খুড়তুতো ভাইবোনেরা থাকেন, পাশের বাড়ীতে। বাড়ি আলাদা হলেও দুই পরিবারে হৃদ্যতার অভাব নেই।

অচ্যুত খুব বিস্মিত হয়ে বললেন, “আমি তো একটু আগেই ওবাড়ি ঘুরে, দেখা করে এলাম!” এইসময় অচ্যুতের খুড়তুতো বোন বিশাখা ভাতের থালা সাজিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর পিছনে আরেকটা থালা নিয়ে এক গলা ঘোমটা দিয়ে আড়ালে রইলেন সেজবৌমা।

অচ্যুতের আসনের সামনে থালা রেখে বিশাখা বললেন, “বড়দা, শুরু করো। অনেক বেলা হয়ে গেল”

সমস্ত ব্যাপারটাতে অচ্যুতর মন বিরূপ হয়ে উঠল। মায়ের এই আচরণ তাঁর অত্যন্ত বাড়াবাড়ি মনে হল। তাঁর মনে অপরাধবোধের যে কাঁটা এতদিন খচখচ করছিল, সেটা যেন সরে গেল। তিনি যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। বিশাখা শান্টুর ভাতের থালাও আসনের সামনে নামিয়ে দেওয়ার পর, অচ্যুত গেলাসের জল নিয়ে গণ্ডূষ করে বললেন, “তোদেরও তো খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। তুই কী এখানেই খাবি? নাকি আবার ও বাড়ি যাবি?”

“না গো। আজ সেজবৌদির সঙ্গে খাবো”।

“মা হঠাৎ এই ভরদুপুরে তোদের বাড়ি গেলেন কেন?”

বিশাখা হাসলেন, “বড়মা, ওইরকম হয়ে গেছেন আজকাল। কোন কিছুই ওঁর পছন্দ হয় না। সবার সঙ্গেই খিটিমিটি করেন।  মায়ের সঙ্গে ওঁর রোজ ঝামেলা হয়। গতকাল পর্যন্ত মুখ দেখাদেখি ছিল না। আজ তুমি এলে, আর আজই উনি মায়ের সঙ্গে গল্প করতে গেলেন! বড়দা, সেজবৌদি জিগ্যেস করছে, পান্নার আঙুলটা সেরেছে কিনা?”

অন্য প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়াতে অচ্যুত কিছুটা স্বস্তি পেলেন। হেসে বললেন, “হ্যাঁ বৌমা, ওর মামার বাড়িতে মাসীরা সবাই মিলে সারিয়ে দিয়েছে। এখন ভালই আছে”।

বিশাখা বললেন, “বৌদির বাবাও তো হঠাৎ মারা গেলেন, শুনেছি। এরপরেও একা একা কলকাতার বাসায় নতুন সংসার  সামলানো- বৌদির কিন্তু খুব মনের জোর, না বড়দা? বৌদির বোনেদের কেউ সঙ্গে গেল না কেন? মাস কয়েক থেকে একটু গুছিয়ে দিয়ে আসত!”

“কথা সেরকমই ছিল। কিন্তু শ্বশুরমশাই মারা যাওয়াতে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল”।

“তা ঠিক। বাপ-মা মানে বটগাছ, মাথার ওপর থেকে তাঁদের ছায়া চলে যাওয়া কী চাট্টিখানি কথা? হীরু আমাদের কথা বলে, বড়দা? নাকি ভুলে গেছে?”

“দ্যাখো, ভুলে যাবে কেন? হীরু এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, স্কুলে যাচ্ছে। তার আগে দুপুরবেলা হলেই মন খারাপ করত। সারা দুপুর নাকি ওবাড়িতে তোদের সঙ্গে দৌরাত্ম্য করত!”

“দৌরাত্ম্য কী বলছো, বড়দা? ছেলেমানুষ চঞ্চল হবে না? মাঝে মাঝে বড়োমা হীরুকে আটকে রাখতেন, আমাদের বাড়ি যেতে দিতেন না, আমি এসে তুলে নিয়ে যেতাম। বড়োমা আমাকে কিছু বলতেন না, জানেন তো বিশাখাও কম মুখরা নয়”।

অচ্যুত বোনের একথায় খুব হাসলেন হা হা করে, বললেন, “বাবা। সেই বিশাখা, এত্তোটুকুন মেয়ে, তুই এখন এত পাকা হয়েছিস? আমার মায়ের সঙ্গেও ঝগড়া করিস?”

মুখ টিপে হেসে বিশাখা বললেন, “করবো না? আরেকটু ভাত দিই, বড়দা?”

“না রে, একটুও না। যা দিয়েছিস, এই পুরোটা খেতে পারলে হয়”।

মুচকি হেসে বিশাখা বলল, “তোমার খাওয়া অনেক কমে গেছে, বড়দাসেজবৌদি বলছে”

“না গো বৌমা, শুরুতেই অনেক ভাত দিয়ে ফেলেছো যে!” হাসতে হাসতে বললেন অচ্যুত। 

 

 

খাওয়া দাওয়া সেরে নিজের ঘরের বিছানায় একটু গড়িয়ে নিয়েই অচ্যুত আবার পাড়ায় বেরিয়ে পড়েছিলেন।  ফিরলেন সন্ধের বেশ কিছুটা পরে। বাড়ি এসে হাতপা ধুয়ে দাওয়ায় বসতেই, ছোটভাই শান্টু এসে জিগ্যেস করল, “বড়দা, চা খাবে? সেজবৌদি জিগ্যেস করতে বলল”।

“নাঃ রে। আমি তো চা খাই না। মা কোথায় রে?”

“ঠাকুর ঘরে, আহ্নিক করছে”।

“ও আচ্ছা”। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এখনও সন্ধ্যা আহ্নিক!

শান্টুকে বললেন, “ভেতর থেকে একটা মাদুর নিয়ে আয় তো, দাওয়ায় বসি, আর তোর বই খাতাও নিয়ে আয়, কেমন লেখাপড়া করছিস দেখি?” শান্টু দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর থেকে একটা মাদুর এনে বিছিয়ে দিল দাওয়ায়। অচ্যুত দাওয়ায় উঠে বসলেন। শান্টু দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে হ্যারিকেনটাও এনে দাওয়াতে রাখল। হ্যারিকেনের পলতে নামানো ছিল, সেটাকে বাড়িয়ে দিতে আলোটা বাড়ল কিছুটা।  তারপর আবার ঘরের ভেতরে গেল বই-খাতা আনতে।

অচ্যুত বললেন, “আরে, অন্ধকার ঘরের মধ্যে কোথায় হাঁটকাবি, হ্যারিকেনটা নিয়ে যা”।

“তুমি অন্ধকারে থাকবে, বড়দা?”

“কেন? আমি অন্ধকারে বসলে, আমায় ভূতে ধরবে বুঝি? যাঃ যাঃ মেলা পাকামি করিস না, আমি তোর বড়দা, না তুই আমার? আলোটা নিয়ে অংক, ইংরিজি আর সংস্কৃত বইটা নিয়ে আয়, দেখি কেমন পড়েছিস”? শান্টু হ্যারিকেন নিয়ে ঘরের ভেতরে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যে বইগুলো সঙ্গে নিয়ে, দাদার সামনে এসে বসল

অচ্যুত হ্যারিকেনের পলতেটা একটু কমিয়ে দিলেন, পলতের আগুন ব্যাঁকা হয়ে জ্বলছিল, বললেন, “পলতেটা ঠিক করে কাটা হয়নি রে, ব্যাঁকা হয়ে গেছে। এভাবে জ্বললে কাচের একদিকে কালি পরে ভূতুষি হয়ে যাবে একটু পরেই। অনেক সময় কাচ ফেটেও যায়। শব্দরূপ ধাতুরূপ মুখস্থ করিস? লতা শব্দের পঞ্চমীর দ্বিবচনে কী হয়?” শান্টু খুব অস্বস্তিতে পড়লতার মেজকাকা আর বড়দার লেখাপড়া নিয়ে গাঁয়ে এখনো চর্চা হয়, সংস্কৃতে আর ইংরিজিতে দুজনেরই এখনও খুব নাম আছে এ অঞ্চলে। সেই বড়দা অনেকদিন পর হঠাৎ এসে পড়া ধরতে বসলে ভয় পাওয়ারই কথা।

শান্টু শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে বলল, “ল--লতাভ্যাম্‌”

“বাঃ ভেরি গুড। তোৎলাচ্ছিস কেন? ঠিকই তো বলেছিস। শ্রী শব্দের সপ্তমীর বহুবচন?”

“স্‌-স্‌ শ্রীণাম্‌”।

“এঃ পারলি না? শ্রীণাম ষষ্ঠীর বহুবচন। সপ্তমীর বহুবচনে শ্রীষু। “পুষ্পিতৌ লতে” কথাটা ঠিক না ভুল?”

“ভুল”।

“ঠিকটা কী হবে?”

অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে পায়ের নখ খোঁটার পর শান্টু বলল, “পুষ্পিতৌ লতৌ”।

অচ্যুত জিভে আক্ষেপের চিক শব্দ করলেন, বললেন, “এখানে বিশেষ্য কোনটা আর বিশেষণ কোনটা?”

শান্টু খুব ভয়ে ভয়ে বলল, “লতা বিশেষ্য আর পুষ্পিতা বিশেষণ”।

“তাহলে? বিশেষ্যর যে লিঙ্গ, বিভক্তি এবং বচন হবে, বিশেষণেরও তাই হবে। লতা স্ত্রীলিঙ্গ, তার প্রথমার দ্বিবচনে লতে। তার বিশেষণ পুষ্পিতারও তাই হবে। কী হবে তাহলে?”

“পুষ্পিতে লতে”।

“গুড। বুঝতে পেরেছিস? সংস্কৃত অনেকটা অংকের মতো, নিয়মটা একবার বুঝতে পারলে আর কোনদিন ভুল হবে না...”।

নিজের পড়া হোক কিংবা অন্যকে পড়ানো – দুটো ব্যাপারেই অচ্যুতের ভীষণ ঝোঁক। লেখাপড়ার চর্চায় অবগাহন করতে তিনি বড়ো আনন্দ পান। ছোট ভাইকে পড়াতে পড়াতে তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন, নিভাননী কখন এসে তাঁর পিছনে দাঁড়িয়েছেন তিনি লক্ষ্যও করেননি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিভাননী বললেন, “নন্টু, সেই কোন ভোর কলকাতার বাসা থেকে বেরিয়ে এতদূর পাড়াগাঁয়ে এলি! কোথায় একটু বিশ্রাম করবি তা না, এখন আবার শান্টুকে নিয়ে পড়লি?” লেখাপড়ার রাজ্যে অচ্যুত ডুবে ছিলেন, কলকাতায় বাসা নিয়ে তাঁর চলে যাওয়া আর সেই নিয়ে তাঁর মায়ের বিদ্বিষ্ট আচরণের কথা তিনি ভুলেই গেছিলেন।

মায়ের হঠাৎ এই উদ্বিগ্ন কথার শ্লেষ তিনি ধরতে পারলেন না, তিনি বললেন, “না, না, মা, আমার কিচ্‌ছু কষ্ট নেই! শান্টু লেখাপড়ায় খুব অবহেলা করছে!”

“এতদিন পরে একবেলা পড়িয়ে তুমি ভাইকে কী দিগ্‌গজ পণ্ডিত বানিয়ে তুলবে, বাবা? শান্টু, বইপত্তর নিয়ে ঘরে যা, নিজে নিজে যা পারিস পড়। দাদাকে বিরক্ত করিস না”।

নিভাননীর এই কথায় অচ্যুত আবার বাস্তবে ফিরলেন। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন। শান্টু ম্লানমুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিল, চোখাচোখি হতে মুখ নামাল। সামনে খুলে রাখা ব্যাকরণ কৌমুদী বন্ধ করে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে সব বই তুলে নিয়ে চলে গেল ঘরের ভিতর। অচ্যুতর মনে ভীষণ এক বিরোধ বিদ্রোহের মতো ঝলসে উঠল। ইচ্ছা হল মায়ের এই নিষ্ঠুর আচরণের জবাব দেওয়ার। শান্টু ঘরে চলে যাবার পর, নিভাননী পিছন ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন।

অচ্যুত পিছন থেকে একটু উদ্ধত স্বরে বললেন, “মা, কাল সকালেই আমি বেরিয়ে যাবো। তোমার বৌমার একটা ট্রাংক আছে, সেটাও নিয়ে যাবো। তাছাড়া আমাদের যা টুকটাক জিনিষ পত্র রয়ে গেছে, সেসবই আমি কাল নিয়ে যাচ্ছি”

নিভাননী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বড়ো ছেলের মুখের দিকে, চোখে চোখ রেখে বললেন, “যেও”। তারপর  ধীর পায়ে উঠে গেলেন পাশের ঘরে দাওয়ায়।

অচ্যুত মাথা নীচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ, হ্যারিকেনের কল ঘুরিয়ে পলতে কমিয়ে দিলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললেন,

“পরিবর্তিনি সংসারে মৃতঃ কো বা ন জায়তে।

স জাতো যেন জাতেন যাতি বংশঃ সমুন্নতিম্‌”।।

পরিবর্তনের এই সংসারে মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম কার না হয় ?

কিন্তু যে জন্মে বংশের সম্যক উন্নতি হয় সেই জন্মই (সার্থক)

..০০..

চলবে...




রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

  

এর আগের রম্যকথা - " আকাশের অর্ঘ্য " 


আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মানুষের মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে অচিন পাখি, কে জানে। এ কি সেই কয়েক হাজার বছর আগে ফেলে আসা যাযাবর জীবনের উপর সুপ্ত টান? যখন ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ এক জঙ্গল থেকে অজানা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াত স্বচ্ছল ফলমূল, সহজলভ্য শিকার আর মিষ্টি জলের সন্ধানে! কিন্তু এইভাবে হাজার হাজার বছর ঘোরার পর, চাষবাস শিখে, বাণিজ্য বুঝে মানুষ তো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে নিজের গন্ডীর মধ্যে থিতু হয়ে থাকতে। তাও কেন দৌড়ে বেড়ায় অজানা দেশে, অচেনা পরিবেশে? সুখে থাকতে ভূতে্র কিল খাওয়ার এমন অমোঘ টান কেন আসে?

বিরাশির মাঝামাঝি কোন এক দিন, এভাবেই ডেকে উঠল আমাদের প্রাণের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই অচিন পাখি। চলো মন যাই অদেখা দেশে, অচেনা তীর্থক্ষেত্রে, দু চোখ ভরে দেখে আসি নতুন জায়গার নতুন মানুষজন পরকালের কাজে লাগতে পারে সেই আশায়, দু হাত ভরে গুছিয়ে আনি পুণ্য এতদিন আমাদের দুইভাইয়ের লেখাপড়ার চাপে এমন ডাক বহুবার এসেও ফিরে গেছে। এখন সেই চাপ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। উপরন্তু তীর্থভ্রমণের বহুল ব্যয় বাবার আপিসের এলটিসির দৌলতে যতটা হ্রাস হয়, সমানুপাতে ততটাই কি বৃদ্ধি হয় না ভ্রমণের আনন্দ বৃদ্ধি?

দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্বের পর সেপ্টেম্বর শেষের এক রাত্রে হাওড়া স্টেশান থেকে আমরা চারজন মৌরসীপাট্টা বিছিয়ে বসে পড়লাম ম্যাড্রাস মেলের প্রথমশ্রেণীর একটি কামরায়। দুটি রাত ও একটি পুরো দিনের যাত্রায় সেই কামরাটি এতই পারিবারিক হয়ে উঠেছিল, যেন আমাদের বাসারই একখানি ঘর চাকার ওপরে চলমান। জমে উঠল ঘনিষ্ঠ নিরবচ্ছিন্ন পারিবারিক আড্ডাএকসঙ্গে এক ছাদের তলায় এতদিন বসবাস করেও, আমার স্বভাবগম্ভীর বাবার সঙ্গে এমন আত্মিক যোগাযোগ এর আগে কোনদিন অনুভব করিনি।

ম্যাড্রাস সেন্ট্রাল (চেন্নাই নাম পেতে তখনো ঢের দেরি) থেকে ট্যাক্সি করে এগমোর স্টেশন, সেখানে  অন্য ট্রেন ধরে আমরা পৌঁছলাম পণ্ডিচেরি। বিকেলের দিকে হোটেলে যাবার পথে ট্যাক্সি চলল গোবার্ত অ্যাভিনিউ ধরে, ডানদিকে বরাবর কোমর সমান পাঁচিল। ট্যাক্সিতে বসে পাঁচিলের ওপাশে কি আছে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বহুদূর পর্যন্ত নীল আকাশ আর সীমাহীন দিগন্তখুব অবাক লাগল, জিগ্যেস করলামএদিকটায় এরকম বরাবর দেওয়াল কেন, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ওপাশে কি আছেটা কি?

ট্যাক্সি চালক – যিনি আমাদের গাইডও বটেন মৃদু হেসে বললেন, “ওপাশেই তো সমুদ্র। ঝড়ের সময় যখন বড়ো বড়ো ঢেউ ওঠে, সেটাকে আটকানোর জন্যেই এই দেওয়াল”।  

সমুদ্র? ওটাই সমুদ্র? দাঁড়ান, ভাই দাঁড়ান – দেখতেই এসেছি যে... দেখি দুচোখ ভরে”!   

রাস্তার ধারে ট্যাক্সিটা সাইড করে দাঁড়াতে আমরা সকলেই নামলাম। দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে অবাক চোখের সামনে ভেসে উঠল সীমাহীন বিস্তার। হালকা সবুজ রংয়ের বিপুল সমুদ্র মিশে গেছে নীল আকাশের দিগন্তে। বড় বড় ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে পাথর বিছানো সমুদ্রের পাড়ে। ক্লান্তিহীন সেই ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বিশালতার এক অনুভূতি ঢুকে পড়ল আমার ভিতরে। এর আগে দেখেছি হিমালয়ের দিগন্তজোড়া পাহাড়ের ঢেউ, শান্ত সমাহিত গম্ভীর। এই সমুদ্রও পারাপারহীন বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন অস্থির এবং চূড়ান্ত উদাসীন। প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রে আমি বা আমরা থাকি বা না থাকি, তাদের কিচ্ছু যায় আসে না, এতটুকুও ব্যত্যয় হবে না তাদের। ফলতঃ আমার সেই একই অনুভব হল - নিজেদের অতীব সামান্যতা। 

পূর্বাশ্রমের চরমপন্থী বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ থেকে ঋষি অরবিন্দে উত্তরণের অলৌকিক প্রক্রিয়া আমার ধারণার অতীত। তাঁর আশ্রম ঘুরে এবং সেখানে মধ্যাহ্নভোজনে সামিল হয়ে আমরা যেন অনুভব করলাম তাঁর ঐশী সান্নিধ্য। কিন্তু আমাদের উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলি যখন আমাদের হাত থেকে হাসিমুখে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন ভক্ত ফরাসী ও ফরাসীণীগণ, ভীষণ অস্বস্তি হল। ফরাসী উচ্চারণে তাঁরা বললেন – “উ আর দ গেস্ত”। মনে হল, আমরা ভারতীয় এবং ঋষি অরবিন্দর দেশোয়ালি হয়েও গেস্ট হয়েই রইলাম, আর ওঁনারা হলেন কিনা হোস্ট!

পণ্ডিচেরি থেকে আবার ট্রেন ধরে বিল্লুপুরম জংশন, সেখান থেকে ট্রেন পাল্টে মন্ডপম, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রামেশ্বরম। রামেশ্বরম এমনই এক জায়গা যেখানে হিন্দু পৌরাণিক ঘটনার অনেক ঘনঘটা। শ্রীরামচন্দ্র এখান থেকেই সেতুবন্ধ করে লংকা গিয়েছিলেন রাবণের খপ্পর থেকে তাঁর পত্নী সীতাকে উদ্ধারের জন্যে। কিডন্যাপ্‌ড্‌ সীতা উদ্ধারের পর সস্ত্রীক শ্রীরামচন্দ্র এইখানেই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শিবের আরাধনা করেছিলেন, পাপমুক্তির জন্যে, তাই এই জায়গার নাম রামেশ্বরশ্রীরামচন্দ্র বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হওয়া সত্ত্বেও, রাবণকে হত্যা করে, তাঁর নাকি ব্রহ্মহত্যার পাপ অর্শেছিল! 

রামায়ণ অনুযায়ী রাবণ ছিলেন বিখ্যাত ঋষি বিশ্বশ্রবা ও দৈত্যরাজকুমারী কৈকেশীর পুত্র। ঋষি বিশ্বশ্রবার পিতা ছিলেন পুলস্ত্য মুনি। এই পুলস্ত্যমুনি ছিলেন ব্রহ্মার দশ মানসপুত্র, প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের মধ্যে অন্যতম। অতএব জন্মসূত্রে তিনি ব্রাহ্মণ। তাছাড়াও তিনি ছিলেন ডাকসাইটে বেদজ্ঞ, রণবিদ্যায় সুপণ্ডিত এবং বীণাবাদনেও সুদক্ষ। ব্রহ্মা ও শিবের একান্ত ভক্ত রাবণ, তপস্যা করে অমর হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ণ অমরত্ব পেলেন না – পেলেন দেব, সুর, নাগ, রক্ষ, যক্ষ এবং বন্য পশুর কাছে অজেয় থাকার বর। রাবণ সন্তুষ্টই ছিলেন, কারণ নর অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে তিনি শত্রু হিসেবে ধর্তব্যেই আনেননি। আর এই ছিদ্র পথেই নররূপী অবতার শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করে শ্রীলংকা জয় করতে পেরেছিলেন। 

ভাগবতপুরাণে অবিশ্যি অন্য গল্প আছে, পরম বিষ্ণুভক্ত জয়-বিজয় দুই ভাই ছিলেন বিষ্ণুলোক বৈকুণ্ঠের সিংদরজার দারোয়ান। একদিন চিনতে না পেরে তাঁরা চারজন তাপসবালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে দিলেন নাএই চারজন তাপসবালক ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত চার ভাই - সনক, সনাতন, সনান্দন এবং সনৎকুমার, ব্রহ্মার আদি মানসপুত্র। এই চার বালক চার বেদেই পারদর্শী ছিলেন এবং ঋষি মুনিদের কাছে জ্ঞান প্রচার করাই ছিল এঁনাদের একমাত্র ব্রত। দেবলোকের সর্বত্র এই চার ভাইয়ের ছিল অবারিত দ্বারএই চার বালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে না দেওয়ায়, তাঁরা জয়-বিজয়কে বৈকুণ্ঠ থেকে নির্বাসন দিলেন আর অভিশাপ দিলেন ধরণীর মর্ত্যধুলিতে জন্ম নিতে। স্বয়ং বিষ্ণু যখন পুরো ব্যাপারটি অবগত হলেন, তিনিও এই অভিশাপ রদ করতে পারলেন না। তিনি কিছুটা নরম হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার দুটো অপশন রাখলেন জয়-বিজয়ের কাছে। 

বিষ্ণু বললেন - প্রথম অপশন, বিষ্ণুভক্ত হয়ে সাধারণ মানবজীবনে সাতজন্ম পার করতে হবে, আর দ্বিতীয় অপশন, দুর্ধর্ষ বিষ্ণুশত্রু হয়ে মর্ত্যজীবনে মাত্র তিনজন্ম পার করতে হবে। তাহলেই তারা দুইভাই শাপমুক্ত হয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে বৈকুণ্ঠে। চয়েস ইজ ইয়োরস। জয়-বিজয় বিনা দ্বিধায় তিন জন্মের শর্টকাট চুজ করল। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর সাহচর্য তাদের কাছে অতীব কাম্য, তাতে যদি বিষ্ণুর চরম শত্রুতা করতে হয়, তাও। কারণ, বিষ্ণুর দুর্ধর্ষ শত্রুকে বিষ্ণু ছাড়া কে আর হত্যা করবেন! স্বয়ং ভগবানের হাতে ভক্তের মৃত্যু এবং তার ওপর মাত্র তিনজন্ম পরেই আবার ভগবানের স্নেহময় সদাসাহচর্য, এমন সুযোগ ছেড়ে দেবার মতো মূর্খ ভক্ত, জয়-বিজয় ছিলেন না।

সেই মতোই সব ঠিক হয়ে গেল। প্রথম জন্ম সত্যযুগে, দুই ভাই হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুর  মৃত্যু হল যথাক্রমে বরাহ ও নৃসিংহ, বিষ্ণুর তৃতীয় ও চতুর্থ অবতারের হাতে। দ্বিতীয় জন্ম ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার শ্রীরামচন্দ্রের হাতে মৃত্যু হল দুই ভাই রাবণ ও কুম্ভকর্ণের। তৃতীয় জন্ম দ্বাপরে দুই ভাই দন্তবক্র ও শিশুপালের মৃত্যু হল বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণের হাতে। শাপমুক্ত হয়ে মহানন্দে জয়-বিজয় ফিরে গেলেন বৈকুণ্ঠের স্বস্থানে।

যেভাবেই চিন্তা করা যাক না কেন, রাবণ যে মহাব্রাহ্মণ সে কথা স্বীকার করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং। শত্রু হলেও রাবণ এবং তাঁর অগণিত প্রজাহত্যায় শ্রীরামচন্দ্রের যে পাপবোধ, তার প্রায়শ্চিত্তেই এই রামেশ্বরমে রামনাথন শিব মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। যে কোন হত্যাই পাপ, সে যতবড়ো দুর্ধর্ষ শত্রুই হোক না কেন এবং তিনি নিজে অবতার হয়েও সেই নীতি ভুলে যাননি, সেখানেই তাঁর মহত্ত্ব।

মূল ভূখন্ড থেকে একটু আলাদা একটি ছোট্ট দ্বীপ এই রামেশ্বরম। আমরা পাম্বান ব্রিজ দিয়ে পাম্বান ক্যানেল পার হলাম ট্রেনে। গভীর নীল সমুদ্রের উপর, প্রায় দু”কিলোমিটার লম্বা এই ব্রিজ সেসময় ছিল ভারতবর্ষের দীর্ঘতম সাগরসেতুপণ্ডিচেরির সমুদ্রের পর, রেল যাত্রাপথে দুপাশের দিগন্তবিস্তৃত সুনীল সমুদ্র, আমাকে আরেক সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দিল। হিমালয় ও পাহাড়ের প্রতি আমার যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা ভেঙে দেওয়ার জন্যেই, সমুদ্র যেন উঠে পড়ে লাগল তার নতুন নতুন রূপের ভাণ্ডার নিয়ে।

পরের দিন ভোরবেলা মন্দিরের মাইকে দক্ষিণীসুরে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ শুনে ঘুম ভাঙল। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। নারকেল গাছের ঝিরিঝিরি পাতায় ভোরের একটানা হাওয়ার ঝরঝর শব্দ এবং মন্দির থেকে ভেসে আসা স্তোত্র উচ্চারণ শুনতে শুনতে কিছুটা হেঁটে দাঁড়ালাম আরেক সমুদ্রের সামনে। ঢেউ নেই বললেই চলে, মস্ত দীঘির সামনে দাঁড়ালেও জলের উপর সঞ্চরণশীল এমন তরঙ্গ দেখা যায়। এই সমুদ্রকে ঢেউ দিয়ে চেনা যায় না, চেনা যায় এর বিস্তার দিয়েসুনীল সীমাহীন বারিধি, বহুদূরে দিগন্তের কাছাকাছি দু একটা দ্বীপের আভাস। পায়ের গোছ ডোবানো জলে আমরা সমুদ্রের ভেতর অনেকখানি হেঁটে এলাম। পণ্ডিচেরির সাগরবেলায় কঠোর নিষেধ ছিল, এখানে নেই সমুদ্রকে স্পর্শ করে, আনন্দ করতে কোন বাধা নেই। দু এক বিন্দু জিভে ঠেকতেই বোঝা গেল লবণাম্বুর স্বাদ।

রামেশ্বরমের অগ্নিতীর্থ বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে উপবাসী আমরা প্রবেশ করলাম মন্দিরে। বিশাল উঁচু পোক্ত পাথরে গাঁথা প্রাচীর ঘেরা সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গণ। চার দিকে চারটি সুউচ্চ গোপুরম, তার একটি পার হয়ে প্রধান মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সবচেয়ে সুন্দর এবং উঁচু রাজগোপুরমের উচ্চতা প্রায় ৫৩.০ মি। মন্দিরের ভিতরে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫.০ মি চওড়া, প্রায় ৯.০ মি উঁচু এবং উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিক মিলে প্রায় ১২০০ মি লম্বা অলিন্দ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দ্বাদশ শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজবংশের হাতে এই অপূর্ব স্থাপত্যের সূত্রপাত তারপর ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলংকার অনেক রাজার হাতেই ঘটে গেছে এই মন্দিরের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। ভারতীয় স্থাপত্যের এমন সুন্দর অথচ বলিষ্ঠ কারিগরি নিদর্শন দেখে বেশ গর্ব অনুভব করলাম। প্রায় ১২০০ স্তম্ভের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অসাধারণ স্থাপত্যের কি অপূর্ব সে মহিমা! প্রায় সাতশ বছর ধরে অনেক প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক পালাবদল সামলেও প্রত্যেকটি স্তম্ভ আজও অটুট এবং অদ্ভূত সুন্দর।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম রামনাথস্বামীর পুজো সেরে মন্দিরের বাইরে আমরা উপবাস ভঙ্গ করলাম। সম্বর আর নারকেলের চাটনি সহযোগে নারকেল তেল সিক্ত মশলা দোসা এবং স্টেনলেসস্টিলের কাপে  উত্তপ্ত কফি। সেখানেই আলাপ হল মুরুগানের সঙ্গে। আসমুদ্রহিমাচল লক্ষ লক্ষ বালশ্রমিকের একজন মুরুগান। দোসা, ইডলি, উত্থাপম, কফির অর্ডার নেয়, টেবিলে সার্ভ করে, খাওয়ার পর এঁটো বাসন তুলে নিয়ে যায়। তামিল ছাড়া কোন ভাষাই তার বোধগম্য নয়, তামিলের বিন্দুবিসর্গও মায়ের জানা ছিল না। অথচ খুব অল্প সময়েই মা জেনে নিতে পেরেছিলেন, মুরুগানের ছোট্ট জীবনের ইতিহাস। মা মরা, বাপে খেদানো অসহায় বালক মুরুগানের খুব ইচ্ছে লেখা পড়া শেখার, কিন্তু পেটের দায় বড়ো দায়। মুরুগান তার এই ছোট্ট শহর রামেশ্বরমের সব চেনে, তার মতো করে জানে এই শহরের এবং রামনাথস্বামী মন্দিরের অনেক ইতিহাস।

আমাদের অনুরোধে হোটেলের মালিক, মুরুগানকে অনেকক্ষণের ছুটি দিলেন। আমাদের সঙ্গেই ছোট্ট শহরের  গাইড হয়ে সে অনেকক্ষণ ঘুরল। মায়ের অনেকদিনের শখ ছিল একটি পঞ্চমুখী শাঁখ নেবার মুরুগান অনেক দোকান ঘুরে, অনেক দরদাম করে কিনে দিল সুন্দর একখানি পঞ্চমুখী শাঁখ। মায়ের ইচ্ছেয় তার ওপর আমাদের দুইভাইয়ের নামও লিখিয়ে দিল মুরুগান।

রাত্রের ট্রেন ধরে আমাদের এবারের গন্তব্য কন্যাকুমারী। রাত সাড়ে নটা নাগাদ মুরুগানের হোটেলেই আমরা দক্ষিণী থালির নৈশাহার করে বিদায় নিলাম মুরুগানের কাছে। মায়ের চোখে জল, মুরুগানেরও চোখে জল। টাঙ্গায় লটবহর নিয়ে উঠে পড়তে মুরুগান হাত নেড়ে বলল – আম্মা, ভা মিন্তুম।

পিছনে পড়ে রইল প্রাচীন ভারতের অদ্ভূত গৌরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সনাতন ভারতের বঞ্চনার পরম্পরা। নির্জন হতে থাকা ছোট্ট শহরের পথে আমাদের টাঙ্গা চলতে লাগল ষ্টেশনের দিকে। পথের দুপাশে গাছের পাতায় পাতায় সাগরের হাওয়ার মর্ম্মর শব্দের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ মিলে সূদুর অতীতের পরশ রয়ে গেল আমার সমগ্র অনুভূতিতে।

চলবে...


রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আকাশের অর্ঘ্য



 

এর আগের রম্যকথা - " রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম


সেবার হস্টেলে মহালয়ার আগের রাত্রে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আড্ডার বিষয় ছিল, রেডিওর পুরো মহালয়া কে শুনেছে? কেউ কি শুনেছে? বহুক্ষণ তর্ক বিতর্কের পর আমরা নিজেদের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে দেখলাম, না, জ্ঞান হওয়া ইস্তক প্রত্যেকবারই মহালয়ার ভোরে রেডিওতে কান পেতেছি, কিন্তু পুরোটা কোনবারই শোনা হয়নি। প্রথমদিকের পনের-বিশ মিনিট ও শেষের দিকে পাঁচ-দশ মিনিট মনে করতে পারা যাচ্ছে, কিন্তু মাঝের ঘন্টাখানেকর কোন স্পষ্ট স্মৃতি নেই। যা আছে, সেটা হল, ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শোয়ার সময় তন্দ্রাঘোরে আবছা দু একটা গানের কলি, অথবা চণ্ডী পাঠের অংশ!

এত বছর ধরে আমরা মহালয়ার ভোরে রেডিওয় কান রাখছি, কিন্তু শুনছি না। এ যেন “ঠোঙা ভরা বাদামভাজা খাচ্ছি, কিন্তু গিলছি না”। উঁহু, এতো ভালো কথা নয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আর বিলম্ব নয়, আমাদের আশু কর্তব্য, আজ সমস্ত রাত্রি জাগরণ ও রাত্রি ভোরে পূর্ণ মহালয়া শ্রবণ। সিদ্ধান্ত তো হল, কিন্তু শুনবো কিসে, রেডিও কোথায়?

রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময় আমরা তিনজন টর্চ নিয়ে, হস্টেলের রুমে রুমে ঘুরতে লাগলাম একজন দরদী সহপাঠীর সন্ধানে। যার আছে একটি সচল ট্রানজিস্টার রেডিও। যে বিশ্বাস করে একরাত্রের জন্য আমাদের হাতে তুলে দেবে তার রেডিওখানি। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর সেরকম সহপাঠী পাওয়া গেল, পাওয়া গেল একখানি বড়সড়ো সন্তোষজনক রেডিও। সে সহপাঠী খুব সংকোচের সঙ্গে বলল-

-রেডিও তো আছে, আমি তো একটু আগেই গান শুনছিলাম। কিন্তু ব্যাটারির অবস্থা খুব খারাপ, কদিন ধরেই ভাবছি, ব্যাটারি কিনব, রোজ ভুলে যাচ্ছি। হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আমরা সমস্বরে বললাম-

-ও নিয়ে তুই ভাবিস না, টর্চের ব্যাটারি দিয়ে ম্যানেজ হয়ে যাবে, বস।

ঘরে এনে টর্চের ব্যাটারি ভরে চালু করলাম রেডিওটা। দিব্বি চালু হল, যদিও ততক্ষণে কলকাতার সব স্টেশন নিঃশব্দ হয়ে গেছে। চালু রয়েছে শর্ট ওয়েভের বিদেশী স্টেশন। ব্যাটারির অপচয় এড়াতে আমরা রেডিও বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু তখন আমাদের নিজেদের ওপরেই আর বিশ্বাস থাকছিল না। ঘরের মধ্যে আরাম করে বসার জায়গা বলতে বিছানা। বিছানায় বসলেই, কাত হতে ইচ্ছে হবে, তখন কি আর  ঘুমের জাদুস্পর্শ এড়াতে পারবো? অসম্ভব। আমরা তিনজন, বিছানার চাদর উঠিয়ে নিয়ে উঠে গেলাম হস্টেলের বিশাল ছাদে। ঘুম এড়ানোর পক্ষে ছাদও নিরাপদ নয়, আমরা উঠে পড়লাম জলের কংক্রিট ট্যাংকির উপর। এখানে সংকীর্ণ জায়গা, কোন রেলিং বা দেওয়াল নেই, খোলা ছাদ। নিরাপদ নয়, কিন্তু নিরাপদ। পড়ে যাওয়ার আশংকায় নিরাপদ নয়, কিন্তু সেই ভয়ে ঘুম না আসার পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

ভাঁজ করে বিছানার চাদর বিছিয়ে মুখোমুখি বসা গেল তিনজনে। সামনে বিড়ির বাণ্ডিল আর দেশলাই। মাথার উপর কুচকুচে মখমলি কালো প্রাকঅমাবস্যার আকাশ। তার গায়ে অগণিত তারার চুমকি।  আমার গ্রামের বাড়িতেও এমন তারায় ভরা রাতের আকাশ দেখেছি। কিন্তু হাল্কা হিম পড়া সেই রাত্রে, এমন স্পষ্ট তারার সমাহার দেখার অবকাশ খুব একটা আসে নি জীবনে। আকাশের অনেকখানি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে কালপুরুষ ঝুঁকে অবাক তাকিয়ে রইল সারাটারাত, দেখতে লাগল আমাদের হুজুগের বহর।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই কালপুরুষ চিনেছিলাম, তার মাথা, কোমরের বেল্ট, হাত পা, মায় তার সঙ্গের কুকুরটিও, যার নাম লুব্ধক। মাথার তারামণ্ডলের নাম মৃগশিরা, কোমরের তিনটি তারা ঊষা, অনিরুদ্ধ আর চিত্রলেখ। সেদিন তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্য কথা আর তেমন জমল না। মনে তারাময় আবেগ।

মনে পড়ল, প্রেমেন্দ্র মিত্রর অন্যরকম কবিতা – “হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে/হৃদয়ে কি জং ধরে পুরোন খাপে। কার চুল এলোমেলো, কি বা তাতে এল গেল, কার চোখে কত জল কে বা তা মাপে? ...হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে”। আমাদের ত্র্যহ স্পর্শে জেগে উঠলেন চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ। “তারাগুলি সারারাতি কানে কানে কয়, সেই কথা ফুলে ফুলে ফুটে বনময়”। “তারার দীপ জ্বালেন যিনি গগনতলে, থাকেন চেয়ে ধরার দীপ কখন জ্বলে”। বিশাল বিস্তারের ঐ নক্ষত্রময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেদের সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলার যে অনুভূতি, কে আর পারেন তাকে অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলতে, 

“তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে

ফিরে গিয়ে ছাতে

মনে হল আকাশপানে চেয়ে

আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে

নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে

দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।

নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি

আকাশ ভরে উঠত কেঁদে “হারিয়ে গেছি আমি”।”

চৈত্র না হোক, সেই  আশ্বিনের রাতের আকাশেও আমাদের এই অনুভব এতটুকুও কম হয় নি।  

 

অবশেষে এসে গেল সেই সময়। রেডিও চালু করে আমরা কলকাতা-কয়ের মহিষাসুরমর্দ্দিনী চালু করলাম। এবং নিশ্ছিদ্র নীরবতায় শুনতে লাগলাম অনুষ্ঠান। শুনছিলাম না, সমস্ত চেতনা দিয়ে অনুভব করছিলাম। চোখের সামনে বিশ্বচরাচর ধীরে ধীরে ভরে উঠতে লাগল ঊষার আবছা আলোয়। ভোরের শারদ বাতাসের হাল্কা হিমের নির্মল স্পর্শ। ঘুমভাঙা পাখিদের অনবদ্য কলকাকলি।

 

পুবের আকাশের আলোয় স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল আমাদের চারিপাশের অন্ধকার। উত্তরে আমাদের হস্টেলের সামনে মাঠ। তারপরে কলেজ বাউণ্ডারির ওপার থেকে যতদূর চোখ যায়, সবুজ গালিচার চা বাগান। তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আসাম-দিল্লী রেলপথ। তারও ওপারে কালচে সবুজ ঘন গাছের সারির মাথার উপর ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত কাঞ্চনজংঘার পঞ্চশৃঙ্গের বৈভব। তাদের শরীরে তখন হালকা কমলা আভা। 

 

আমাদের শ্রবণে দেবী দুর্গার মহিমা স্তোত্র, দৃষ্টিতে অপরূপ কাঞ্চনজংঘা, বিপুল দিগন্তের হরিৎ বিস্তার। অচেনা এক অনুভবে আচ্ছন্ন হয়ে রইল সমস্ত চেতনা। রেডিওর অনুষ্ঠান যখন শেষ হল, সকালের সোনা রোদ্দুরে ভরে উঠেছে টানটান মসৃণ নীল আকাশ। সাদা মেঘের এলোমেলো কয়েকটা টুকরোয়, সকালের আলোর বর্ণচ্ছটা। আর ওদিকে কাঞ্চনজংঘা রং বদলে হয়ে উঠেছে সোনালী।

 আমরা নেমে এলাম নীচে। রাত্রিজাগরণের কোন ক্লান্তি বা গ্লানি মনেও এল না। রেডিও, বেডশীট ঘরে রেখে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম হস্টেল থেকে। কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম জলপাইগুড়ি শহরের রাস্তায়। মাষকলাইবাড়ি যাবার পথে চোখে পড়ল অনেক লোক চলেছেন আমাদের উল্টো মুখে, অধিকাংশই মেয়ে এবং মহিলা। তাদের সকলের হাতে পুষ্পগুচ্ছ। এত সকাল সকাল, এমন সুন্দর এক দিনে, কোথায় চলেছে তারা? আমাদের কলেজের অদূরে হাইওয়ের ধারেই আছে তারা মায়ের প্রাচীন মন্দির। জনশ্রুতি, কোন এক কালে সেই মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন দস্যুসর্দার ভবানী পাঠক। এই ভবানী পাঠকের মন্ত্র শিষ্যা ছিলেন দেবীচৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র যাঁর কাহিনী নিয়ে রচনা করেছিলেন উপন্যাস। সেই জাগ্রতা দেবী মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতেই সকলের এই পুষ্প উপচার। আমরাও সঙ্গী হলাম তাঁদের, এমন প্রভাতে দেবী মায়ের রাতুল চরণে আমাদের কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য ছাড়া আর কিই বা দিতে পারি?


“-তোমার এখানে আকাশে যেন অর্ঘ্য সাজানো, যেন শিশিরধোওয়া সকালবেলার স্পর্শ। তুমি এখানকার বাতাসে কি ছিটিয়ে দিয়েছ বলো দেখি।

-সুর ছিটিয়েছি।

-আমাকে সেই রাজাধিরাজের কথা বলো সুরঙ্গমা, আমি শুনি।

-মুখের কথায় বলে উঠতে পারি নে।

-বলো, তিনি কি খুব সুন্দর?

-সুন্দর? একদিন সুন্দরকে নিয়ে খেলতে গিয়েছিলুম, খেলা ভাঙল যেদিন, বুক ফেটে গেল, সেইদিন বুঝলুম সুন্দর কাকে বলে। একদিন তাকে ভয়ংকর বলে ভয় পেয়েছি, আজ তাকে ভযংকর ব”লে আনন্দ করি। তাকে বলি তুমি দুঃখ, তাকে বলি তুমি মরণ, সবশেষে বলি তুমি আনন্দ!”*

 

জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে চার বছরে বিদ্যের ভারে কতটা বোঝাই হয়েছিলাম, তাতে আজও আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। কিন্তু, যে আনন্দের পূর্ণ উপলব্ধি এসেছিল, তা অন্য কোথাও আর মেলেনি।

 

*রবীন্দ্রনাথের “অরূপরতন” নাটকের ভগ্নাংশ।  

এর পরের রম্যকথা - " ...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

 


রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম

 এর আগের রম্যকথা পাশের সূত্রে - " ছিন্ন শিকল পায়ে



রুদ্র সুন্দর 

এক একটা সেমেস্টার শেষ হলেই, আমরা তিন চারজন বেরিয়ে পড়তাম ভ্রমণে। না-খাওয়া ব্রেকফাস্ট আর টিফিনের পয়সা সঞ্চয় করা সামান্য পুঁজি নিয়েই প্রত্যেকবার বেরিয়ে পড়তাম এক এক জঙ্গলে। এভাবেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উত্তরবঙ্গের পাহাড় ঘেরা, তিস্তা-তোর্সা আর তাদের অজস্র শাখা নদী অধ্যুষিত গহন জঙ্গলের। যার সামগ্রিক নাম ডুয়ার্স অথবা বাংলার তরাই - হাসিমারা, গরুমারা, মাল, ধুপগুড়ি, লাটাগুড়ি, বিন্নাগুড়ি, চালসা, মাদারিহাট...। শাল, শিরীষ, শিমূল আর সেগুনের গহন জঙ্গল আর বর্ষায় গজিয়ে ওঠা নিবিড় গজ-তৃণের (Elephant grass) ঘন সবুজের সমারোহ! আশ্চর্য এক নেশায় আপ্লুত করে রাখত আমাদের।

আমাদের আরও এক নতুন নেশা জুটেছিল - পাহাড়ের নেশাদারজিলিং, কালিম্পং এবং সিকিমের অন্তহীন পাহাড়শ্রেণীর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম – পরীক্ষা শেষ হলেই যেন বেরিয়ে পড়ার ডাক আসত।

একবার মনে আছে হস্টেল থেকে বেরিয়ে পরীক্ষা হলে ঢোকার মুখে আমরা দুই বন্ধু হঠাৎ ঠিক করে ফেললাম এ পরীক্ষাটা আর দেব না। পঞ্চাশ নম্বরের তিনটে ইন্টারন্যাল অ্যাসেসমেন্ট হত আমাদের – বেস্ট অব টু থেকে গড়নাম্বার যোগ হত এক্সটারনাল সেমিস্টারের মার্কসের সঙ্গে। আগের দুটো পরীক্ষায় আমাদের ৪৭/৪৮ মার্কস তোলা ছিল, থার্ড পরীক্ষাটা আর দিতে ইচ্ছে হল না। কারণ কলেজে ঢোকার মুখে আমাদের চোখে পড়ল উত্তর দিকে ঘন কালো পুঞ্জীভূত মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। আকাশজুড়ে জমে ওঠা শ্যামল জলদরাশির সে কি অপরূপ রূপ! তার সঙ্গে এলোমেলো শীতল জলো হাওয়া। তুমুল বর্ষার পূর্বাভাস!। মনে হল এমন দিনে পরীক্ষা হলে বসে পঞ্চাশে ঊণপঞ্চাশ তোলার চেষ্টা করার কোন মানে হয় না। 

বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে আমরা কলেজ মোড়ের হাইওয়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা আর বাড়ির বাণ্ডিল কিনে উঠে পড়লাম বাসে। সরকারি বাস – যাবে ময়নাগুড়ি। একটু যাবার পরেই প্রবল বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগান আর জঙ্গল। মাথার ওপর ঘন কালো নিশ্ছিদ্র নিরেট মেঘ। সুদীর্ঘ তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে যাবার সময়  - তুমুল বৃষ্টি আর এলোমেলো হাওয়ায় কেঁপে উঠছিল বাসটা। ব্রিজের নীচে বিস্তীর্ণ নদীর চরে অঝোরে বৃষ্টির সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে বয়ে যাচ্ছিল তীব্র স্রোতস্বিনী তিস্তা – ত্রিস্রোতা। প্রকৃতির এমন বিস্তার – এমন অসহায় বিপুল নিবিড় রূপ কোনদিন অনুভবেই ছিল না আমার। কলকাতায় বসে এমন অনুভব কোনদিনই হতে পারেনি ... “জম্বুপুঞ্জে শ্যাম বনান্ত, বনবীথিকা ঘনসুগন্ধ। মন্থর নব নীল নীরদ – পরিকীর্ণ দিগন্ত...চিত্ত মোর পন্থহারা কান্তবিরহ কান্তারে, নীলাঞ্জনছায়া...”

নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে আমরা তাকিয়ে রইলাম জানালার বাইরে। বাসের ছাদ ও জানালার ফাঁক থেকে ঝরে পড়া জলধারায় ভিজতে লাগলাম। ঘন মেঘের দুর্যোগে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল অসময়ে। “রুদ্রবেশে কেমন খেলা, কালো মেঘের ভ্রূকুটি! সন্ধ্যাকাশের বক্ষ যে ওই বজ্রবাণে যায় টুটি। সুন্দর হে, তোমার চেয়ে ফুল ছিল সব শাখা ছেয়ে, ঝড়ের বেগে আঘাত লেগে ধুলায় তারা যায় লুটি”।

রুদ্র সুন্দরের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল মন – সে নেশা থেকে কোনদিনও আর মুক্তি মেলে নি এ জীবনে।            

 


অধরা অসীম


একবার আমাদের পরিকল্পনা হল ট্রেক করে সিকিমের জোংরি যাবার। গেজিং পর্যন্ত বাসরুট আছে, আমরা দারজিলিং থেকে রওনা হয়ে বাসে গেজিং পৌঁছে গেলাম আগের দিন বিকেলবেলা। পরেরদিন সকাল ছটার সময় আমাদের পদযাত্রা শুরু হল। প্রায় ছাব্বিশ কিলোমিটার যাত্রার পর পেমিয়াংসি যখন পৌঁছলাম সূর্য তখন মধ্যগগনে। এতটা পথের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বসতি চোখে পড়েছিল কিন্তু সেখানে কোথাও তৃষ্ণা নিবারণের বিশ্বস্ত জল এবং কোন খাবারের সন্ধান আমরা পাইনি। সে সন্ধান পাওয়া গেল পেমিয়াংসিতে। খুবই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। একটি মাত্র দোকান। সে দোকানে সব কিছু মেলে চাল ডাল নুন তেল জামা কাপড় থেকে মায় পোষ্টকার্ড, লিফাফা পর্যন্ত! সে দোকানে পাওয়া গেল হাতে বানানো গোল গোল পাঁউরুটি আর দেশি কলা। সঙ্গে ড্রাম ভর্তি জল – মগ ডুবিয়ে যত খুশি পান করা যায়, ঝর্ণার বিশুদ্ধ জল। বীভৎস খিদে আর তৃষ্ণার সময় আমরা সকলে প্রাণ ফিরে পেলাম বলা যায়।

পেমিয়াংসির দোকানে জানা গেল এখানে রাত্রিবাসের কোন ব্যবস্থা নেই, সে ব্যবস্থা হতে পারে একমাত্র ইয়াকসামে। ইয়াকসাম এখান থেকে প্রায় চৌত্রিশ কিলোমিটার। সন্ধের আগে সেখানে পৌঁছতে না পারলে সমূহ বিপদ! ইয়াকসাম একটু বড়ো জায়গা – কিন্তু পাহাড়ি গ্রাম বলে সন্ধের পর সব বন্ধ হয়ে যায়। যাবার পথে অনেকটাই জঙ্গল – সন্ধের মুখে ভালুকের উপদ্রবও নাকি প্রায়শঃ শোনা যায়! কাজেই আমরা এতটুকু বিলম্ব না করে যেন বেরিয়ে পড়ি ইয়াকসামের উদ্দেশে। পেমিয়াংসির দোকানদার আমাদের আরো পরামর্শ দিল যতক্ষণ আলো আছে ততক্ষণ “চোরা বাটো” ধরে পথ চলার – তাতে সময় বাঁচবে অনেক। “চোরা বাটো” মানে পাকদণ্ডী রাস্তা নয়, পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলা পথ – স্থানীয় লোকেরা যে পথ নিত্য ব্যবহার করে শর্টকাট হিসেবে।

তার উপদেশ মতো আমরা “চোরা বাটো”তে চলা শুরু করলাম। ঘন্টা তিনেক চলার পর কতটা পথ এলাম জানা নেই, কিন্তু সূর্য ঢলে পড়ল পিছনের পাহাড়ের আড়ালে, চট করে নেমে এল বিকেল। পথের পাশে জনবসতি খুব কম।  আধঘণ্টা, একঘণ্টা চলার পর দু চারখানা ঘরের ক্বচিৎ বসতি চোখে পড়ে। এরকমই এক বসতির লোককে জিগ্যেস করাতে তারা চমকে উঠল আতঙ্কে। পথে ভালুকের হাত থেকে আমরা যদি পরিত্রাণ পেয়েও যাই, রাত দশটার আগে ইয়াকসাম পৌঁছনোর কোন সম্ভাবনাই নেই, সেক্ষত্রে...।

সেক্ষেত্রে কি সেটা উহ্য রাখলেন স্থানীয় ভদ্রলোক। তাঁর না বলা কথা আমাদের বুঝতে এতটুকুও অসুবিধে হল না। তিনি উপদেশ দিলেন – চোরা বাটো আর নয় – রাতের অন্ধকারে সে পথ হারানোর সমূহ সম্ভাবনা, তার চেয়ে ভালো সোজা পথ। তিনি নিজে আমাদের সঙ্গে এসে উঠিয়ে দিলেন সোজা পথের ওপর আর ইয়াকসামের দিক নির্দেশ করে দিয়ে বললেন – যত দ্রুত সম্ভব পথচলার।

পাহাড়ি পথে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে এসে গেল হুড়মুড়িয়ে। তার সঙ্গে বাড়তে লাগল হিমের পরশ – ফুলস্লিভ সোয়েটারের ভিতরেও কেঁপে উঠতে লাগল আমাদের বুক! অদ্ভূত নিরেট ঘন অন্ধকারের মধ্যেও আমরা হেঁটে চলতে লাগলাম দ্রুত। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ আমাদের হাঁটার শক্তি তখন প্রায় শেষক্লান্তির ভারে সমস্ত শরীর তখন আড়ষ্ট। খিদে তেষ্টার অনুভূতিও মরে গিয়ে – তখন একমাত্র চিন্তা একটা নিরাপদ আশ্রয়ের! ঠিক তখনই চোখে পড়ল – কয়েকটা ম্লান আলো। ম্লান হলেও – আলো – তার মানেই মানুষের বসতি! আমাদের নির্জীব শরীরেও প্রাণ এল আবার – হাঁটার বেগ বেড়ে গেল যে শরীর প্রায় জবাব দিতে বসেছিল – বাকি থাকা সমস্ত শক্তিটুকু সঞ্চারিত হল আমাদের দুই পায়েপৌঁছতেই হবে ওই গ্রামে – যেখানে আছে লোকালয় – যেখানে মিলতে পারে মাথার ওপর একটা ছাদ, একটা যেমন তেমন বিছানা। যার উপরে বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে এই ক্লান্ত শরীরগুলো। খাবার কিছু পেলে ভালো – না পেলেও ক্ষতি নেই!

প্রায় আধঘণ্টা পর গ্রামের শুরুতেই যে বাড়ির ভেতর থেকে আলো আসছিল, সে বাড়িতেই বন্ধ দরজায় আমরা ধাক্কা দিলাম। বেরিয়ে এলেন এক মহিলা, দুচোখে তাঁর অবিশ্বাস আর বিস্ময়। রাতটুকু থাকার জায়গা চাই শুনে তিনি মাথা নাড়লেন। তারপর ডাক দিলেন বাড়ির ভিতরে। একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন – তিনিই মহিলার স্বামী আর এলেন এক বৃদ্ধা – মহিলার শ্বাশুড়ি। পিছনে দুজন বালক ও একজন বালিকা। সকলেরই চোখে বিস্ময়। জীবনের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ বৃদ্ধার মুখে অজস্র ভাঁজ, কিন্তু চোখে সহজ সহানুভূতির আলো। তিনি বললেন – থাকার ব্যবস্থা হতে পারে কাছেই স্কুলের বোর্ডিংয়ে। ছেলেকে বললেন হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্যে। থাকার ব্যবস্থা হতে পারে শুনে কিছুটা নিশ্চিন্ত আমরা এবার জিজ্ঞেস করলাম খাবার পাওয়া যাবে কিনা? বৃদ্ধা হাসলেন – বললেন ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলে মিলবে ভাত আর ডিমের তরকারি! তারপর দরজা খুলে দিয়ে আমাদের সকলকে বসতে দিলেন খাবার ঘরে। অসমান কাঠের সঙ্কীর্ণ বেঞ্চে, অসমান কাঠের টেবিলে। আমরা বসে পড়লাম, শুধুমাত্র বসতে পাওয়াতেও যে কি আরাম!

মিনিট পনের পর মহিলা চিনেমাটির বড়ো বৌলে প্রত্যেকের জন্যে ভীষণ গরম কিছু একটা পানীয় নিয়ে এলেন। বললেন - চিয়া। আচ্ছা হ্যায়। পিকে দেখিয়ে আচ্ছা লাগেগা। চিয়া মানে চা। কিন্তু চেহারাতে বা গন্ধে আমাদের চেনা চা বলে মনে হল না। চায়ের মধ্যে দুধ নেই, চিনি আছে খুব সামান্য। চেনা গন্ধের মধ্যে এলাচ আর তেজপাতার গন্ধ পেলাম, আর কি ছিল জানা নেই। খুব যে স্বাদ পেলাম তা নয়, কিন্তু পানীয়টা শেষ করে অনুভব করলাম অদ্ভূত এক মানসিক স্থিতি। সারাদিনের পথশ্রমের অসহ্য ক্লান্তিটা বেশ সহনীয় হয়ে উঠল। আজকের ভাষায় বললে, সে এক আশ্চর্য এনার্জি ড্রিংক। উপাদান ছিল সবুজ চা, সামান্য মাখন, সামান্য চিনি, সঙ্গে ছোট এলাচ, তেজপাতা আরো কিছু গাছগাছড়ার পাতা – যার নাম সেই মহিলা বলেছিলেন, আজ আর মনে নেই।

ঘন্টা খানেক পরে গরম ভাতের সঙ্গে আলু আর সেদ্ধ ডিমের গরম ঝোল এক পেট করে খেয়ে সীমাহীন তৃপ্তি অনুভব করলাম আমরা সকলে। অমৃতের স্বাদ কোনদিন পাইনি – পাওয়ার ইচ্ছেও আর তেমন রইল না। অসংখ্য ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা রওনা হলাম নিকটবর্তী স্কুলের দিকে – যেখানে আমাদের শয়ন ব্যবস্থা হয়ে আছে। পিছনে হাসি মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন সেই বৃদ্ধা আর মহিলা। অতিথিবৎসল সনাতন ইতিহাসকে পিছনে ফেলে আমরা অন্ধকারে এগিয়ে চললাম রাতটুকু নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর আশায়।

বোর্ডিংয়ের বিশাল একটি ঘরে আমাদের শোওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের আপ্যায়ন করলেন স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। হেডমাস্টার বলতে সচরাচর যেমন গম্ভীর এক প্রৌঢ়ের চেহারা কল্পনায় ফুটে ওঠে – ইনি একদম তার বিপরীত। তিরিশের কাছাকাছি চনমনে এক শিখ যুবক! সুদূর সিকিমের এই প্রত্যন্ত গ্রামে  তাঁর এই আবির্ভাব আমাদের খুব বিস্মিত করেছিল। সেরাত্রে যদিও বিস্ময়ের চেয়েও আমাদের ঘুমের ঘোর ছিল অনেক বেশী শক্তিশালী। কাজেই প্রায় বিনা বাক্যব্যয়ে আমরা কাঠের মেঝেয় পাতা ঢালা বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেবার আগে একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিলাম, আমাদের অদূরেই আলাদা শয্যায় অনেকগুলি বালকের অবাক চোখের দৃষ্টি, তারাও কম্বলের ভেতরে শুয়ে আমাদের দেখছিল। বুঝলাম আমরা এই বোর্ডিংয়ে আবাসিক ছাত্রদের শয্যায় ভাগ বসিয়েছি।

পরেরদিন খুব ভোরে কম্বলের উৎকট গন্ধে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের অদূরে শুয়ে থাকা ছেলেরা কখন উঠে পড়ে বিছানা পত্র গুটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছেআমরাও উঠে পড়লাম আর অনুভব করলাম শরীরে একবিন্দুও ক্লান্তি নেই। বিছানা তুলতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ধুলো আর উৎকট গন্ধের বহর। কাল চরম ক্লান্তির সময় ওসব মনেও হয় নি, আজ ক্লান্তিহীন চাঙ্গা শরীরে মন ফিরে এসেছে যথাস্থানে – তার শহুরে মানসিকতার উঁচু নাক নিয়ে!

সকালে হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে চা পান করতে করতে আলোচনা হচ্ছিল আমাদের পরবর্তী গন্তব্য জোংরি নিয়ে। ইয়াকসামের হাইট ১৭৮০ মি। ইয়াকসাম থেকে জোংরি মোটামুটি ২৬ - ২৭ কিমি। কিন্তু হাইট ৪০৩০ মি। তিনি আমাদের পোষাকপরিচ্ছদ আর জোংরি যাবার যোগাড় দেখে মন্তব্য করলেন যদি সদলবলে আত্মহত্যার ইচ্ছে হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের জোংরি যাওয়া উচিৎ। কারণ এই প্রস্তুতি নিয়ে জোংরি গেলে নির্ঘাৎ নিউমোনিয়া। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসারও কোন সুযোগ নেই। কাজেই নিউমোনিয়া বাধিয়ে স্থানীয় অসহায় মানুষগুলোকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলারও কোন মানে হয় না। কাজেই, ভেবে দেখুন কি করা উচিৎ।

আমরা তাঁর উপদেশ মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে প্রচুর কলা আর পাঁউরুটির স্টক নিয়ে। আমাদের লক্ষ্য দেখাই যাক না কি হয়, কদ্দূর যাওয়া যায়। দুস্তর চড়াই ভেঙে ১৬ কিমি রাস্তা পার হয়ে আমরা যখন বাখিম পৌঁছলাম সূর্য মধ্যগগনে, ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। বাখিমের হাইট ৩০০৫ মিটার। বাখিম পৌঁছে আমরা অনুভব করলাম সেই শিখ হেডমাস্টারমশাইয়ের কথার সারমর্ম। আমাদের হাল্কা সোয়েটার ভেদ করে তীক্ষ্ণ হিমেল হাওয়া ঢুকে বুকের ভিতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া আর অন্য উপায় রইল না আমাদের। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে নেমে আসার সিদ্ধান্তই সাব্যস্ত হল।

আমাদের জোংরি জয়ের সাধ অপূর্ণ রয়ে গেল। জোংরি থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে ১৫০০০ ফিট উচ্চতায় বিখবাড়িতে কাঞ্চনজঙ্ঘার বেস ক্যাম্প। জোংরি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা গেল নাপিছনে পড়ে রইল ঘন সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড় আর পাহাড়। আর তাদের নিরন্তর লুকোচুরি খেলা! প্রকৃতির এক অদ্ভূত জাদু। কখনো সব কিছু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঘন মেঘ আর কুয়াশার চাদরে। পরক্ষণেই ঝলমলে রোদ্দুরে হেসে উঠছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের নিরন্তর শ্রেণী। বিশাল এই পটভুমিতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির আশ্চর্য মনোমোহিনী লীলা প্রত্যক্ষ করে ভারি হয়ে এল মন। পথের শেষে এবং দু ধারে আরো কত লীলা অপেক্ষা করছিল, বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হওয়ার জন্যে - সে সব পিছনে পড়ে রইল।

অধরা রয়ে গেল অসীমের অরূপ রূপ। সীমিত সাধ্যে পার হওয়া গেল না সীমার বাঁধন।


এর পরের পর্ব - " আকাশের অর্ঘ্য "


নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...