নাটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নাটক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫

কুমীরের বন্ধু (ছোটদের নাটক)

    এর আগের ছোটদের গল্প - " নতুন গাড়ি "



[কৃতজ্ঞতাঃ পণ্ডিতেরা বলেন, বাইবেলের পরে সব থেকে যে প্রাচীন গ্রন্থটি পৃথিবীতে সব থেকে বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, সেই গ্রন্থের নাম “পঞ্চতন্ত্র”। পঞ্চতন্ত্রের রচয়িতা পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, খ্রিষ্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যের মহিলারোপ্য নামক কোন এক রাজ্যের রাজা অমরশক্তির তিন মূর্খ পুত্রকে মাত্র ছয়মাসে নীতিশাস্ত্রের পণ্ডিত করে তোলার ব্রত নিয়ে পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা, এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন়। প্রধানতঃ জঙ্গলের পশুপাখিদের নিয়ে সেই সব নীতিশিক্ষার গল্পগুলির একটি নিয়েই এই নাট্যরূপ।] 


প্রথম দৃশ্য

[সামনে বেশ চওড়া এক নদী। এপাড়ে বেশ কিছু গাছপালা। সেখানে জামগাছের ডালে বসে একটি বাঁদর জাম খাচ্ছে, তার কপিকান্ত ।]

বাঁদরঃ  হেউ...হেএএউ.. নাঃ, আর পারা যাচ্ছে না, পেট ফুলে জয়ঢাক হয়ে গেল! এরপর আরও খেলে পেটটাই হয়তো ফেটে যাবে ফটাস করে! না, আর খাবো না। এবার নদীর জলে হাত-মুখ ধুয়ে একটু বসি আরাম করে। (গাছ থেকে নেমে নদীর ধারে গিয়ে হাত-মুখ ধুল, তারপর পাড়ে বসে, ভুঁড়ি চুলকোতে চুলকোতে মহানন্দে গান ধরলো....)

         গাছে গাছে নেচে বেড়াই এই ডালে ওই ডালে।

         পাকা পাকা ফলগুলি ভাই, টপ করে নিই গালে।

         বগলদুটি চুলকোই খুব, আরো চুলকোই ভুঁড়ি।

         বাঁদরামিতে এই দুনিয়ায় নেই গো মোদের জুড়ি... [ হঠাৎ গান থামিয়ে..]

আরেঃ, ওটা আবার কী রে বাবা, নদীর জলে ভেসে আসছে, মস্ত গাছের গুঁড়ির মতো! উঁহুঃ, ভালো ঠেকছে না।  গাছে উঠে পড়ে, আড়াল থেকে ঘাপটি মেরে দেখি, ব্যাপারটা কী? 

[বাঁদর তরতরিয়ে গাছে উঠতেই, হাপুস হুপুস শব্দ করে পাড়ে উঠল একটা কুমীর। বিশাল হাঁই তুলে বলল]

কুমীরঃ  ওফ সেই থেকে সাঁতার কাটতে কাটতে, গায়ে শ্যাওলা পড়ে গেল! মাছেরা সারা দিন রাত জলের মধ্যে কী করে থাকে কে জানে! আমার তো আধ ঘন্টা থাকলেই হাঁফ ধরে যায়। পাড়ে উঠে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে চুপ করে একটু শুয়ে থাকলে ধড়ে প্রাণ আসে। ঘন্টা খানেক ঘুমিয়ে নিই, তারপর ফেরার পথে বউ আর ছেলেমেয়েদের জন্যে মাছ ধরে নিয়ে যাবো। এ তল্লাটে নদীর মাছ ছাড়া আর কিছু পাওয়াও যায় না ছাতা। দু একটা জন্তুজানোয়ার পেলে মাঝে মাঝে একটু মুখ বদল হতে পারতো। এমন ওঁচা জঙ্গল এর আগে কোনোদিন দেখিনি বাপু!

[জঙ্গলের নিন্দে শুনে বাঁদর বেজায় রেগে গেল, উত্তেজিত হয়ে বলল, ]

বাঁদরঃ  অ্যাইও, কে হে আপনি, হঠাৎ এসেই জঙ্গলের নিন্দে শুরু করে দিয়েছেন?

[থতমত খেয়ে কুমীর চারদিকে তাকাল, কাউকে দেখতে না পেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল,]

কুমীরঃ  কে ভাই? আপনি কোথায় ভাই? কিছু ভুল বলে ফেললাম কী, ভাই?

বাঁদরঃ  আপনি বেশ নড়েভোলা তো! চারদিকে তাকালেন, আর ওপরেই তাকালেন না? এই যে এদিকে, এখানে, গাছের ওপর। [কুমীর ওপরের দিকে তাকিয়ে, বাঁদরকে দেখতে পেল, বলল]

কুমীরঃ  অ, আপনি গাছের মগডালে উঠে বসে আছেন, আপনি উট নাকি?

বাঁদরঃ  আপনি বেশ গোলমেলে জীব তো মশাই, গাছে উঠলেই বুঝি সব উট হয়ে যায়! উট থাকে মরুভূমিতে, যেখানে জল পাওয়া যায় না।

কুমীরঃ  তাই বুঝি? আমি তো কোনোদিন মরুভূমিতে যাই নি, তাই চিনি না। আমি কুমীর, আমি জলেও থাকি আবার ডাঙাতেও থাকি। মানে উভচর, আর কি, হে হে হে।

বাঁদরঃ  আমি কপি। আমাদের আরো অনেক নাম আছে, যেমন, বানর, শাখামৃগ। মানুষরা আমাদের বাঁদরও বলে। শুনেছি তারা নিজের ছেলেমেয়েদের আদর দিয়ে দিয়ে বাঁদর বানায়। আমরা গাছেও থাকি, আবার মাটিতেও হাঁটাচলা, লাফালাফি করতে পারি। কিন্তু আমাদের কেউ উভচর বলে না।

কুমীরঃ  বলে না বুঝি?  

বাঁদরঃ  না না, বলে না। স্যরি, একটা কথা মনে পড়লো, তাই বলছি, আপনারা সরীসৃপ না?

কুমীরঃ  ঠিক ঠিক, আমরা সরীসৃপই তো! আমরা যে বুকে হাঁটি। কিন্তু এতে স্যরি হবার কী আছে?

বাঁদরঃ  একে উভচর, তাতে আবার সরীসৃপ, এর পরেও স্যরি না হলে, আর কিসে হবেন? যাগ্গে, ওকথা থাক। তা আপনাদের খাবার দাবারের কী ব্যবস্থা?

কুমীরঃ  আমাদের আবার খাবারের অভাব? জলে মাছ ধরে খাই। ডাঙায় গরু, ছাগল, কুকুর, হরিণ যখন যা জোটে খাই। সুযোগ পেলে মানুষও খাই। তবে এ জঙ্গলে তেমন কিছুই মেলে না, সেই জন্যেই বলছিলাম, বাজে জঙ্গল। 

বাঁদরঃ  বাজে বললেই শুনবো? এমন সুন্দর জায়গা ভূভারতে আর কেউ দেখেছে? দেখেনি। আমি বলছি কেউ দেখেনি। সামনেই এমন তিরতিরে নদী। নদীর ধারে এমন জমকালো জঙ্গল। আর সেই জঙ্গলে ফল ভরা এমন গাছ, পাবে কেউ? গরমকালে আম জাম লিচু। সারা বছরভর কলাটা, পেয়ারাটা- কত ফল খাবে খাও না। আর সে ফলে ভাগ বসাতে, দুচারটে পাখি ছাড়া, আর কেউই নেই এ জঙ্গলে!

কুমীরঃ  [খুব অবাক হয়ে] ফল খাবো? গাছের? আমরা?

বাঁদরঃ  উঠলে তো নদীর জল থেকে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আকাশ থেকে পড়লে! কোনোদিন খেয়েছো? খেয়ে দেখেছো?

কুমীরঃ  না তা খাইনি।

বাঁদরঃ  তবে? সর্বদা মাংস খাবার জন্যে হাঁকপাক না করে, মাঝে মাঝে ফল-টল খেয়েও দেখো না!

কুমীরঃ  না মানে, ইয়ে ফল খাবার কথা আমাদের মাথাতেই আসেনি কোনদিন। বলি পেট-ফেট খারাপ হবে না তো?

বাঁদরঃ  হে হে, খুব অবাক করলে যা হোক। পাকা ফল খেয়ে কারো পেট খারাপ হয়েছে, এমন শুনিনি ভাই।

কুমীরঃ  [লেজ দিয়ে পিঠ চুলকে] আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখবো না হয়।

বাঁদরঃ  আরে ধুর চেষ্টা করবে কী? গোটা কয়েক ফল দিচ্ছি, এখনই খেয়ে দেখো দেখি! হাঁ করো, হাঁ করো...ও বাবা, অত্তো বড়ো হাঁ! ঠিক আছে এই নাও। [বাঁদর বেশ কটা পাকা জাম ছুঁড়ে দিল কুমীরের মুখে, কুমীর চিবোতে লাগল] কি, কেমন?

কুমীরঃ  বাঃ, সত্যিই দারুণ তো! কী মিষ্টি! আরও আছে নাকি? আমাকে আরো কটা দাও দেখি, বাড়ির জন্যেও কটা নিয়ে যাবো! বউ ছেলেমেয়েরাও এ জিনিষ পেলে অবাক হয়ে যাবে! কোনোদিন খায়নি তো! কী নাম বলো তো এগুলোর?

বাঁদরঃ  হে হে, এ হল জাম। এ তো কিছুই না, এর থেকেও কতো ভালো ভালো ফল আছে! সে সব খেলে তো আর মাছ-মাংসের ধার ঘেঁষবে না! আচ্ছা সে হবে খন, আমার সঙ্গে কদিন কাটাও, তোমাকে আরো অনেক ফল খাওয়াবো। আজ এই জামগুলো নিয়ে গিয়ে বাড়িতে সকলকে খাওয়ায়, কাল এসে বলবে, বাড়িতে কে কী বলল!

[বাঁদর গাছের ডালপালা ঝাঁকিয়ে অনেক জাম ফেলল মাটিতে, কুমীর সেগুলো কুড়িয়ে নিল চটপট।]

কুমীরঃ  তোমার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল, বাঁদর ভাই। অনেক কিছু জানা হল, শেখা হল। কাল এরকম সময়েই আবার আসবো।

বাঁদরঃ  আচ্ছা। কুমীরভাই। কাল আসবে কিন্তু আবার। আজ তো তেমন কোন কথাই হল না। কাল অনেক গল্প হবে, কেমন? কাল সকালে আরো নতুন কিছু ফল তোমার জন্যে যোগাড় করে রাখবো।

কুমীরঃ  একটা কথা তোমাকে বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু কী জানি তুমি কী ভাববে, সেই ভেবে বলতে ভরসা পাচ্ছি না।

বাঁদরঃ  কী কথা বলো তো?

কুমীরঃ  আমার তো কোনো বন্ধু নেই! তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলে বেশ হতো!

বাঁদরঃ  হা হা হা হা। আমরা তো বন্ধু হয়েই গেছি! তা, এ কথাটা বলতে এতো কিন্তু কিন্তু করছো কেন, বন্ধু?

কুমীরঃ না অনেকে বলে, সমান সমান না হলে বন্ধুত্ব হয় না। তাই একটু কিন্তু কিন্তু করছিলাম।

বাঁদরঃ  সমান সমান বলতে?

কুমীরঃ  মানে এই যেমন ধরো আমি সরীসৃপ আর তুমি স্তন্যপায়ী। তারপর যেমন ধরো, আমার তুলনায় তোমার চেহারা অনেক ছোট্ট। তুমি ফলটল খাও, আর আমরা মাংস খাই। আমাদের গায়ের জোরও তোমার তুলনায় অনেক অনেক বেশি...

বাঁদরঃ  বুঝেছি বুঝেছি, আর বলতে হবে না। ওই সব কথা পণ্ডিতেরা বলে। ওদের সব কথায় কান দিতে আছে, নাকি? সব কিছু সমান যদি নাও হয়, তবু মনের মিল বলে একটা ব্যাপার আছে, বলি সেটা মানবে তো?

কুমীরঃ  সে কথা তো একশ বার।

বাঁদরঃ  ব্যস্, ব্যস্, ওটুকুই যথেষ্ট। মনের মিল যখন হয়েছে, তখন আমরা বন্ধু।

কুমীরঃ  বড়ো আনন্দ পেলাম, বন্ধু। আজকে বাড়ি গিয়ে বলবো, এতদিনে আমি একজন বন্ধু পেয়েছি। আজ তবে আসি বন্ধু?

বাঁদরঃ  এসো বন্ধু, এসো। কাল আসবে কিন্তু। বেশ জমিয়ে গল্প করা যাবে।           

 

দ্বিতীয় দৃশ্য

 

[কুমীরের বাসা। কুমীর আর তার ছানাপোনারা কচর মচর করে ফল খাচ্ছে। কুমীরের বউ চোখকুঁচকে দেখতে দেখতে বলল- ]

কুমীরীঃ পরশু আবার যেন হুট করে কোথাও বেরিয়ে পড়ো না।

কুমীরঃ  কেন? পরশু কী আছে?

কুমীরীঃ পরশু ছেলেমেয়ের স্কুল থেকে আমাদের দুজনকেই ডেকেছে।

কুমীরঃ  [ছানাপোনাদের ধমকে] কেন রে? কী করেছিস তোরা? নিশ্চয়ই নিয়মিত হোম টাস্ক করিস না। নাকি পড়া পারিসনি? পড়াশুনোর নাম নেই, দিন রাত কেবল খেলা আর খেলা। পিঠের চামড়া তুলে দিতে হয়!

কুমীরীঃ পুরোটা না শুনেই ছেলেমেয়েদের বকছো কেন? আমার ছেলেমেয়েদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম হতে পারে, কিন্তু ফাঁকি দেয় না।

কুমীরঃ  তাহলে স্কুল থেকে ডাকল কেন? তার মানে নিশ্চয়ই কোন বদমায়েশি করেছে! দুষ্টুমি করে থাকলে, দুটোরই লেজ মুচড়ে দেব – এই বলে রাখলাম।

কুমীরীঃ ধ্যাত্তেরিকা, খালি পিঠের চামড়া তুলছে, নয় লেজ মুলে দিচ্ছে!  আর অন্য কোন কথা নেই মুখে? বেশ কদিন ধরেই তোমার রকমসকম কিন্তু আমার ভালো ঠেকছে না। ছেলেমেয়েরাও দেখছি তোমার চোখের বালি হয়ে উঠছে দিন দিন।

কুমীরঃ  [ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আম খেতে খেতে] বাজে না বকে, কী ব্যাপার হয়েছে খুলে বলবে নাকি?

কুমিরীঃ আগে বলো তো, আজকাল রোজই তোমার এই হাবিজাবি ফলপাকুড় নিয়ে আসার মতি হচ্ছে কেন? তুমি কী আমার ছেলেমেয়েদের ছাগল-গরু বানিয়ে তুলতে চাইছো?

কুমীরঃ  [ভারি অবাক হয়ে] তার মানে?

কুমীরীঃ তা নয়তো কি? কুমীরের বাচ্চারা, কবে কোথায় ওই সব ছাইপাঁশ খেয়ে বড়ো হয়েছে, শুনি?

কুমীরঃ  ছাইপাঁশ মানে? জানো, আমার বন্ধু বলেছে,  এইসব ফল মানুষেরাও খায়আম, জাম, কাঁঠাল, কলা এসব ছাইপাঁশ! কী বলছো গো, গিন্নি?

কুমীরীঃ রাখো তোমার বন্ধু। ওই বন্ধুই তোমার মাথাটা খেয়েছে। কুমীরের বন্ধু বাঁদর! এমন শুনেছে কেউ, নাকি দেখেছে? লজ্জায় মরি আর কি! কুমীর সমাজে কেউ শুনলে, ছি ছি করবে। আমাদের সঙ্গে আর কেউ সম্পর্ক রাখবে? আমাদের এক ঘরে করবে।

কুমীরঃ  আহা, ব্যাপারটা বুঝছো না, গিন্নি! এতদিন আমাদের কেউ কোন ফল পায়নি, তাই খায়নি কোন কুমীর কি কোনদিন গাছে চড়েছে, নাকি ফল পেড়ে খেয়েছে? কুমীর তো গাছে চড়তেই পারে না! সে আবার ফল খাবে কী করে? আমার বন্ধু বাঁদর, গাছে চড়তে পারে। তার দৌলতেই আমরা ফলের স্বাদ পেয়েছি। আমি বলি কী – আমাদের পাড়ার সবাইকে একদিন নেমন্তন্ন করো, সক্কলকে ফল খাওয়াই!

কুমীরীঃ বোঝো নেমন্তন্ন করে কী করবে শুনি? তোমার ছেলেমেয়ের পেটে কোন কথা থাকে? স্কুলে গিয়ে তারা বন্ধুদের গিয়ে গল্প করেছে। ওদের ক্লাসের বন্ধুরা আবার তাদের বাবা-মাকে গিয়ে বলেছে, “ও বাবা, ফল খাবো, ফল এনে দাও! ও মা, বাবাকে বলো না অনেক অনেক ফল আনতে”ছেলেমেয়েদের নাকে কান্না শুনে তাদের বাবা-মায়েরা কমপ্লেন করেছেন স্কুলের হেড দিদিমণির কাছে...

কুমীরঃ  হা হা হা হা, এ হচ্ছে হিংসে, গিন্নি, হিংসে! তুমি কিচ্ছু ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কুমীরীঃ ঘোড়ার ডিম ঠিক হবে! অলরেডি ক্লাসের বন্ধুবান্ধবেরা ওদের সঙ্গে কথা বলে না। ওদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে না। তাদের গার্জেনরা একসঙ্গে হেডদিদিমণিকে চিঠি দিয়ে বলেছে, আমাদের ছেলেমেয়েদের যদি স্কুল থেকে বের করে না দেওয়া হয়, তারাই নিজেদের ছেলেমেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দেবে!

কুমীরঃ  তার মানে? আমাদের ছেলেমেয়ে পড়াশুনো করে, অসভ্য নয়, দুষ্টু নয়, তাদের স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবে, তারা ফল খায় বলে? এ কি মগের মুল্লুক নাকি? আমরা আমাদের মতো যা খুশি খেতে পারবো না? আমরা কী খাব না খাব, সেটা আর পাঁচ জনে ঠিক করে দেবে? আর স্কুলও সেটা মেনে নেবে? দেখে নিও, স্কুল নিশ্চয়ই এই অন্যায় আবদার মানবে না!

কুমীরীঃ ওই ভরসায় থাকলেই হয়েছে আর কী! অলরেডি স্কুল ঠিক করে ফেলেছে আমাদের ছেলেমেয়েদের তাড়িয়ে দেবে! পরশু হেডদিদিমণি আমাদের সেই কথাই বলবেন, আর শেষ বারের মতো হয়তো দুচারদিন সময় দেবেন। আমরা যদি আর কোনোদিন ফল-টল খাবো না বলে প্রমিস করি, তাহলে স্কুল ওদের পড়তে দেবে।

কুমীরঃ  এ তো অত্যাচার। কুমীরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। এ চলতে পারে না। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করছি।

কুমীরীঃ ভালো, তুমি প্রতিবাদ করো। আর আমাদের ছেলেমেয়েরা মুখ্যু হয়ে বড়ো হোক। অন্য কুমীরের ছানারা স্কুল থেকে পাস করে, বড়ো বড়ো হরিণ, গরু, ছাগল, মানুষ-টানুষ শিকার করার নানান ফন্দি ফিকির শিখে, দুবেলা ভরপেট মাংস খাবে! আর আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের আশেপাশে ঘুরঘুর করবে, আর কেঁদে কেঁদে ভিক্ষে করবে, “দুপিস মাংস হবেএএএ..”! দুএকজন হয়তো দয়া করে একটা কান বা দুটো ক্ষুর ছুঁড়ে দেবে, ওদের দিকে!

কুমীরঃ  কী ভয়ানক কথা বলছো, গিন্নি! আমার তো চোখে জল চলে আসছে!

কুমীরীঃ যাক এতদিন মানুষরা “কুমীরের কান্না”, “কুমীরের চোখে জল” বলে, যে সব ঠাট্টা বিদ্রূপ করত, তোমার চোখের জল দেখে, সে সব বন্ধ হয়ে যাবে!

কুমীরঃ  এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, গিন্নি?

কুমীরীঃ খুব সহজ। ওই কুচুটে বাঁদরটাকে মেরে ফেললেই সব ল্যাঠা চুকে যাবে। বরং কুমীরেরা তোমাকে ধন্য ধন্য করবে!

কুমীরঃ  ধন্য ধন্য করবে? কী বলছো, গিন্নি?

কুমীরীঃ ঠিকই বলছি। এখন পর্যন্ত কুমীরের দল, অনেক জন্তু জানোয়ারের স্বাদ পেলেও, বাঁদরের স্বাদ খুব একটা পায়নি মনে হয়। একে তারা গাছে থাকে, আর খুব সেয়ানা হয়, তাদের ধরা কুমীরের পক্ষে বেশ শক্ত!

কুমীরঃ  তাতে কী?

কুমীরীঃ [মুচকি হেসে] তাতেই আমাদের কপাল খুলে যাবে! ধরো বাঁদরটাকে তুমি মেরে আনলে, তারপর বাঁদরের মাংসের টুকরো আমরা পাড়ার মাতব্বর কিছু কুমীরকে, স্কুলের হেড দিদিমণির বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম।

কুমীরঃ  তাতে লাভ কী হবে?

কুমীরীঃ বুঝলে না? পাড়ার লোক বুঝবে, বাঁদরটাকে ধরার জন্যেই তুমি এতদিন, বন্ধু সেজে, ওই সব ছাই-পাঁশ ফল-টল খাচ্ছিলে! লোকে তোমার বুদ্ধির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, দেখে নিও।

কুমীরঃ  যা বললে সেটা হয়তো ঠিকই বললে! কিন্তু আমি সত্যিই বাঁদরকে বন্ধু বলে মনে করি। আমি বাঁদরকে কোনমতেই মারতে পারবো না।

কুমীরীঃ সে আমি জানি, তুমি শুধু তাকে এখানে নিয়ে এসো, তোমাকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। তারপর যা করার আমিই করবো।

কুমীরঃ  কিন্তু, বন্ধু হয়ে বন্ধুর সঙ্গে এমন শয়তানী করা উচিৎ হচ্ছে না, গিন্নি!

কুমীরীঃ তুমি তো কিছু করছো না গো, তুমি শুধু নেমন্তন্ন করে ডেকে আনবে।

কুমীরঃ  নেমন্তন্ন করলেই চলে আসবে! প্রথম কথা সে সাঁতার জানে না। তার ওপর আমরা যে মাংস ছাড়া কিছুই খাই না, সেও সে জানে! আমরা তাকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবো কী? নেমন্তন্ন করলেই সন্দেহ করবে।

কুমীরীঃ ধুর বাবা, তুমি বড্ডো বোকা। নেমন্তন্ন মানে বলবে, “আমাদের ও পাড়েও অনেক গাছপালা আছে, তাতে অনেক রকম ফলও ফলে। আমরা তো ফল চিনি না, আর ফল পাড়তেও পারি না। বন্ধু, তুমি যদি আমাদের ওখানে গিয়ে ফলগুলো চিনিয়ে দাও, আর কিছু পেড়ে দাও, তাহলে খুব উপকার হয়। আমাদের ওখানে সারাদিন থেকে, তুমিও যতো খুশি ফল খাবে, তারপর বিকেল হলে তুমি এপাড়ে ফিরে আসবে”!

কুমীরঃ  ওফ্ তুমি তো আমার প্রথম কথাটা শুনলেই না, ও আসবে কী করে? ও তো সাঁতারই জানে না!

কুমীরীঃ ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয় গো, উপায় হয়। বাঁদর এমন কী আর বড়ো আর ভারি হয়? তুমি পিঠে চাপিয়ে নিয়ে চলে আসবে। নিয়ে আসতেই তোমার যা একটু কষ্ট হবে। তারপর আমরা তো সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েই নেব। পিঠের ভার, পেটে এলে, দেখবে মন্দ লাগবে, না গো!

কুমীরঃ  হুঁ, যে ফন্দি তুমি বের করেছো, তাতে আমার বন্ধু, বাঁদর বিশ্বাস করে নেবে এবং সত্যিই চলে আসবে।

কুমীরীঃ আসবে গো আসবে। নিশ্চয়ই আসবে দেখে নিও। ওফ্, আমার যা আনন্দ হচ্ছে না! সারা জীবন মিষ্টি মিষ্টি ফল খেয়ে তোমার বন্ধুর কলজেটার যা স্বাদ হয়েছে, ভাবতেই আমার জিভে জল আসছে গো!

কুমীরঃ  [খুব মনমরা মুখে] সেই তো মানলে, যে ফল খেতে মিষ্টি আর মজাদার!

কুমীরীঃ বাজে কথা বকো না তো। তোমার ওই ফলের জন্যে ছেলেমেয়েদের, আমাদের ভবিষ্যৎ-টবিষ্যৎ - সব জলাঞ্জলি দেবো নাকি? যা বললাম, তা যদি না করেছো, তাহলে আমি কালই ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবো। তখন থেকো তোমার মিষ্টি ফল আর প্রাণের বন্ধুকে নিয়ে।

[দুমদুম পা ফেলে, মুখ হাঁড়ি করে, কুমীরী বেরিয়ে গেল অন্য জলায়।] 

কুমীরঃ  [দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল] হায় বন্ধু, আমাদের এই বন্ধুত্ব না হলেই ভালো হত। ছি ছি বন্ধু হয়ে বন্ধুকে কী বিপদেই ফেললাম!!

 

তৃতীয় দৃশ্য

 

[প্রথম দৃশ্যের নদীর পাড়। পাড়ে বসে বাঁদর। নদী থেকে মাথা তুলল কুমীর।]

বাঁদরঃ  গুডমর্নিং, কুমীরভাই। আজ একটু দেরি করে ফেললে, আসতে!

কুমীরঃ  হ্যাঁ, ঘরের কিছু কাজকর্ম সেরে আসতে, একটু দেরি হল।

বাঁদরঃ  খুব কাজের চাপ, নাকি বন্ধু? মুখটাও কেমন ভার ভার দেখছি!

কুমীরঃ  মুখভার? না না মুখভার হবে কেন? এই তো হাসছি। আজ আমাদের ওখানে তোমার নেমন্তন্ন, আমার সঙ্গে তোমাকে একবার যেতেই হবে বন্ধু।

বাঁদরঃ  ওয়াও, অনেকদিন নেমন্তন্ন খাইনি! কিসের নেমন্তন্ন, ভাই? বিবাহ-বার্ষিকী নাকি ছেলেমেয়ের জন্মদিন? তা কী কী খাওয়াবে গো, বন্ধু?

কুমীরঃ  আমরা তো মাংস খাই, সে তো তুমি খাবে না, বন্ধু। তাই আমার বউ বলল, আমরা যে জলা জঙ্গলে থাকি সেখানেও তো অনেক ফল-ফুলুরির গাছ আছে। সে সব ফলের কোনটা খাদ্য কোনটা অখাদ্য, সেও তো আমরা জানি না। তুমি একবার গিয়ে আমাদের চিনিয়ে দেবে, আর ওই সঙ্গে তুমি নতুন নতুন ফলও খেয়ে আসতে পারবে পেট ভরে।

বাঁদরঃ  কথাটা মন্দ বলোনি, কিন্তু যাবো কী করে? আমি তো সাঁতারই জানি না।

কুমীরঃ  ধুর বাবা, আমি থাকতে ও নিয়ে তুমি ভাবছো কেন? আমার পিঠে চেপে পড়বে, নৌকোর মতো ভেসে ভেসে, হাওয়া খেতে খেতে দিব্যি আরামে যাবে আর আসবে।

বাঁদরঃ  হে হে এত করে যখন বলছো, তখন তো যেতেই হয়। কিন্তু আজ তো অনেক দেরী হয়ে গেল, আজ কী আর হবে, বরং কাল একটু সকাল সকাল চলে এসো, কাল বেরিয়ে পড়বো দুই বন্ধুতে।

কুমীরঃ  না না বন্ধু, আজই যেতে হবে, আমার বউ আরো অনেককে বলে রেখেছে, তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে -  তারা সব এসে বসে থাকবে যে!

বাঁদরঃ  [জনান্তিকে] হঠাৎ হুটোপাটি করে কিসের নেমন্তন্ন কে জানে? গতিক সুবিধের ঠেকছে না। কিন্তু যেভাবে উৎসাহ দেখাচ্ছে, না করাও বেশ মুশকিল।

কুমীরঃ  কী এতো ভাবছো, বলো তো, বন্ধু? একেবারে চুপ মেরে গেলে যে? বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর বাড়ি যেতেও তোমার এত ভাবনা?

বাঁদরঃ  না না, ভাবনা আর কিসের? চলো তবে যাওয়া যাক

[পাড় থেকে নেমে, বাঁদর কুমীরের পিঠে উঠে বসতেই, কুমীর জলে নামল প্রথম প্রথম একটু ভয় ভয় লাগলেও পরে বেশ মজাই লাগল বাঁদরের!]

কুমীরঃ  কেমন লাগছে, বন্ধু? ভয় লাগছে না তো? হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে বসো, বন্ধু। আমার পিঠটা তেমন ছোট তো নয়

বাঁদরঃ  না, না বন্ধু, তোমার মতো বন্ধু থাকতে আবার ভয় কীসের? আর সত্যিই, নদীর মাঝখান থেকে দুই পাড় যে এত সুন্দর দেখায়, তোমার সঙ্গে না এলে জানতেই পারতাম না!

কুমীরঃ  তবে? আমার সঙ্গে এসে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হল বলো?

বাঁদরঃ  তা হলো। কিন্তু আজকে আমার কিসের জন্যে নেমন্তন্ন সেটা বললে না তো, বন্ধু?

কুমীরঃ  কিসের নেমন্তন্ন? বন্ধুর বাড়ি বন্ধু যাচ্ছে, তাতে আবার কারণ দরকার হয় নাকি?

বাঁদরঃ সে কথা একশ বার। কিন্তু তুমি বললে না, আজকে আমার নেমন্তন্ন! কিসের নেমন্তন্ন সেটা জানলে একটু সুবিধে হতো!

কুমীরঃ  কিসের সুবিধে?

বাঁদরঃ  বাঃরে, প্রথম দিন তোমার বাড়ি যাচ্ছি নেমন্তন্ন খেতে, খালি হাতে যাওয়া ভাল দেখায় না, বন্ধু।

কুমীরঃ  খালি হাতে মানে?

বাঁদরঃ মানে কোন উপহার-টুপহার নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল আর কী! ধরো ছেলে-মেয়ের জন্মদিন হলে, একটা দুটো চকোলেট। অথবা বিবাহ-বার্ষিকী হলে বৌদির জন্যে এক গোছা ফুল...

কুমীরঃ ভুল করছো, বন্ধু, মস্তো বড়ো ভুল। সত্যি কথাটা তাহলে তোমাকে বলেই ফেলি। তোমাকে মিথ্যে বলতে আমার ভালোও লাগছে না!

বাঁদরঃ মিথ্যে কথা? কী মিথ্যে কথা, বন্ধু? [ভয়ে বুক কেঁপে উঠল বাঁদরের]

কুমীরঃ নেমন্তন্ন-টেমন্তন্ন কিচ্ছু না। তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি...

বাঁদরঃ  নেমন্তন্ন নয়? তাহলে কী?

কুমীরঃ আমার বউ তোমার দেওয়া মিষ্টি ফল খেয়ে খুব খুশী হয়েছে। তার ধারণা, সারাজীবন এমন মিষ্টি মিষ্টি ফল খেয়ে তুমিও নিশ্চয়ই মিষ্টি হয়ে উঠেছো!

বাঁদরঃ  আমি মিষ্টি হয়ে উঠেছি? যাঃ, কোনদিন টের পাইনি তো!

কুমীরঃ  তুমি না পেলে কী হবে? আমার বউ টের পেয়েছে! তার খুব ইচ্ছে আজ তোমার কলজে খাবে...

বাঁদরঃ  কী খাবে? [বাঁদরের মাথা ঘুরতে লাগল, কোন রকমে বলল]

কুমীরঃ   কলজে, কলজে...মানে হৃৎপিণ্ড!

[ভয়ে বাঁদরের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসতে লাগল। কী সর্বনাশ। এখন কী উপায়? মাঝনদীতে সে বসে আছে মস্তো এক কুমীরের পিঠে, সেখান থেকে পালাবার কোন উপায় নেই! জলে ঝাঁপ দিলেও কুমীর অনায়াসে ঝপ করে কামড়ে ধরবে! কী করা যায়, ভাবতে লাগল, বাঁদর। এদিকে অনেকক্ষণ সাড়া না পেয়ে কুমীর বলল,]

কুমীরঃ  কী হল? চুপ করে গেলে যে? কিছু বলছো না তো! ভয় পেলে নাকি? ভয় কী? আর মিনিট পাঁচেক গেলেই আমার বাসা, সেখানে গেলেই আমার বৌ তোমার গলাটা টিপে দেবে...ব্যস্‌, ভয়-ভরসা সব মিটে যাবে, বন্ধু। 

বাঁদরঃ  হো হো হো হো [হাসতে হাসতে বাঁদর লাফিয়ে লাফিয়ে উঠল কুমীরের পিঠে] হো হো হো হো...

কুমীরঃ [অবাক হয়ে] পাগল হয়ে গেলে নাকি? বন্ধু, এত হাসছো কেন?

বাঁদরঃ  হো হো হো হো ...

কুমীরঃ কী বিপদ, কেন হাসছো বলবে তো?

বাঁদরঃ এ কথাটা তুমি আমাকে আগে বলতে পারলে না? হা হা হা হা হা, হাসবো না তো কী?

কুমীরঃ  কোন কথাটা?

বাঁদরঃ  হো হো হো হো ...ওই ওই ... আমার কলজের কথাটা।

কুমীরঃ  কেন...কী হতো বললে?

বাঁদরঃ কী হতো? তুমি যে এতটা মুখ্যু আমি বুঝতেই পারিনি, বন্ধু। বাঁদরেরা বুঝি সর্বদা কলজে নিয়ে ঘোরে?

কুমীরঃ  তার মানে?

বাঁদরঃ  বলি বাঁদরের কলজে কটা হয়?

কুমীরঃ  একটাই তো হয়!

বাঁদরঃ তবে? আমরা যে গাছের এডালে ওডালে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াই, যদি হাত ফস্কে পড়ে যাই?

কুমীরঃ  হাত - পা ভাঙবে, সে আর আশ্চর্য কী?

বাঁদরঃ  আজ্ঞে না, স্যার, হাত-পা ভাঙলে সেরে যায়, তার জন্যে আমরা চিন্তা করি না। চিন্তা করি কলজের জন্যে। পড়ে গিয়ে কলজেটা ফাটলেই – শেষ, অক্কা।

কুমীরঃ  তাহলে?

বাঁদরঃ তাহলে? কলজেটা খুলে গাছের কোটরে আমাদের বাসায় রেখে দিই। তারপর গাছে গাছে লাফালাফি করি।

কুমীরঃ  তারপর?

বাঁদরঃ  তারপর আবার কী? সন্ধেয় ঘরে ফিরে কলজে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত্রিবেলা ছাড়া কলজের দরকারই বা কী?

কুমীরঃ  তাই? তার মানে, তোমার কাছে এখন কলজে নেই?

বাঁদরঃ  হা হা হা হা, সেই থেকে কী বলছি কী তোমায়? আর হাসছিই বা কেন? তুমি যদি তখনই বলতে তোমার মিষ্টি বৌ আমার মিষ্টি কলজে খেতে চেয়েছে, তখনই তোমায় দিয়ে দিতাম!

কুমীরঃ তাই বুঝি? তাহলে এখন উপায়?

বাঁদরঃ  উপায় আর কী? আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। নয়তো আমার কলজেহীন ফাঁপা শরীরটা পেলে তোমার বউ খুব দুঃখ পাবে - হয়তো কেঁদেই ফেলবে, বেচারি!

কুমীরঃ  কাঁদবে না, ছাই! গাল দিয়ে আমার ভূত তাড়াবে! না হে, বন্ধু, চলো ফিরেই যাই।

বাঁদরঃ  সেই ভালো। একটু দেরি হয়তো হবে, কিন্তু কলজেটা পেয়ে যাবে!

[কুমীর ঘুরে উল্টোমুখে সাঁতার দিতে লাগল।]

কুমীরঃ  ভাগ্যে তোমায় সময় থাকতে বলেছিলাম, বন্ধু, তা না হলে ঘরে আজ কী অশান্তিটাই না হতো!

বাঁদরঃ  যাই বলো, আর তাই বলো, বন্ধুতুমি কিন্তু আমাকে সত্যিকারের বন্ধু বলে মনে করো না!

কুমীরঃ  কেন কেন? এ কথা বলছো কেন?

বাঁদরঃ প্রথমেই আমায় যদি সব কথা খুলে বলতে, তাহলে এই হয়রানি হতো, বলো?

কুমীরঃ সে কথা সত্যি! আমার খুব ভুল হয়ে গেছে, বন্ধু!

বাঁদরঃ  যাগ্‌গে, যা হবার হয়ে গেছে, এখন তাড়াতাড়ি চলো, দেরি দেখে, ওদিকে তোমার বৌ আবার উতলা হয়ে উঠবে। [বাঁদরের কথায় কুমীর সাঁতারের গতি বাড়ালো। নদীর পাড়ে তার গাছটাকে দূর থেকে দেখতে দেখতে বাঁদরের বুক মানে কলজে দ্রুত ধুক ধুক করতে লাগল। পাড়ের কাছাকাছি এসে পড়ার পর, কুমীর জিগ্যেস করল,]

কুমীরঃ  আচ্ছা, বাঁদর ভাই, কলজে ছাড়া কোন জীব বাঁচতে পারে?

বাঁদরঃ হা হা হা হা, কী যে বলো তার কোন মাথামুণ্ডু বুঝি নাকলজে ছাড়া যদি বাঁচা না যায় তো, আমি রয়েছি কী করে?

[নদীর পাড় এসে যাওয়াতে, বাঁদর বিশাল লাফ দিয়ে কুমীরের পিঠ থেকে লাফ মারল পাড়ে, সেখান থেকে তরতরিয়ে উঠে গেল গাছের মগডালে। আরাম করে গাছের মগডালে বসে লেজ দুলিয়ে বলল]

         ওরে হতভাগা কুমীর, শুধু কলজে নয়, মগজ ছাড়াও দিব্যি বেঁচে বর্তে থাকা যায়! তা নইলে তোদের মতো শয়তান কুমীরকে বিশ্বাস করে, আমি তোর পিঠে চড়তে যাই? আর ভাগ্যে তুইও মগজ ছাড়াই জন্মেছিস, নইলে কী আর আমার কলজের কথায় বিশ্বাস করে, ফিরে আসতিস? যাঁরা বলেন সমানে সমানে ছাড়া বন্ধু হয় না, তাঁরা ঠিকই বলেন, তাঁরা সত্যিকারের পণ্ডিত! তাঁদের কথা না শুনলে, আমার মতোই বিপদে পড়তে হয় রে, বজ্জাত কুমীর। যা, এবার কেটে পড়, কোনদিন যদি তোকে আর এপাড়ে দেখি, পাথর ছুঁড়ে তোর মাথা ভাঙবো, এই বলে রাখলাম!

 

[কুমীর ডুব দিল জলে। পর্দানেমে এল।]

 


   এর পরের ছোটদের গল্প - বেড়াল "

বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫

ভেন্টিলেশান

 এর আগের বড়োদের গল্প - " বুনো ওল "






[বিছানায় টানটান শুয়ে ঠ্যাং নাচাচ্ছিল পৈলান, পৈলান মণ্ডলঘাড়ের নিচে ভাঁজ করা হাত। বেশ হাল্কাপুল্কা মেজাজ। এখন সবে ভোর। আরেকটু বেলা হলেই লোকজন আসা শুরু হবে। সঠিক কতদিন তা মনে নেই, তবে অনেকদিন কেটে গেল বিছানায় শুয়ে। আজকে একটু বেরোবে ভাবছে। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে যে ঢুকল, সে বেঁটেখাটো, লাল্টুস দেখতে একজন। তার নাম হুহু!]

 

হুহুঃ               সুপ্রভাত! আপনার ঘুম ভেঙে গেছে, দেখছি! তাহলে একটু চা দিয়ে যাই, প্রভু’?

পৈলানঃ           সুপ্পোভাত? এখানে গুডমন্নিং বলার রেওয়াজ নেই নাকি হে? তার ওপর আবার পোভু? এমন তো শুনি নাই কভু? হা হা হা হা। বলি যাত্রা-পালা হচ্ছে নাকি বলো তো, পৌরাণিক পালার রিহার্শল করছো? আমি বাপু, ওসব একদম পছন্দ করি না। আমি খাঁটি বাঙালি, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে। আমি গুডমন্নিং, স্যার, এই সব শুনতেই অভ্যস্ত। ওই সব আলফাল বকে আমার মেজাজ খিচড়ে দিও না, বুঝলে?

হুহুঃ               আজ্ঞে হ্যাঁ, প্রভু...ইয়ে মানে, স্যার। আর ভুল হবে না। আজ্ঞে, এখানে নতুন নতুন তো, সড়গড় হতে একটু সময় লাগবে বৈকি। তবে স্যার, ওই যে বলছিলাম, চা দেবো, না কফি দেবো, স্যার?

পৈলানঃ           চা-ই দাও। সকাল সকাল কফিটা তেমন জমে না। আমার চাটা কেমন হয় জানো তো? চিনি ছাড়া, হাল্কা লিকার, মিষ্টির বড়ি - দুটো

হুহুঃ               লিকার চায়ে মিষ্টির বড়ি? তাহলে একটা কথা জিগ্যেস করি, স্যার? আপনি লিকার চা কী ভালোবেসে খান? নাকি নাচার হয়ে খান?

পৈলানঃ           চিনি ছাড়া লিকার চা শখ করে, কে খায় চাঁদ? সাড়ে চারশোর ওপর সুগার, তার ওপর বুকজ্বলা অম্বল। বাধ্য হয়ে খাই। তিন চামচ চিনি, ঘন দুধের সর জমে ওঠা চা। তবে না চা খেয়ে আরাম, চা খেয়ে মজা!

হুহুঃ               সে আর বলতে, স্যার? কিন্তু এখানে স্যার নো সুগার, নো অম্বল। এক কাপ নিয়ে আসছি খেয়ে দেখুন, স্যার। এখানকার সুগারে সুগার হয় না। এখানকার চায়ে চাইলেও চোঁয়া ঢেঁকুর কিংবা অম্বল হয় না।

পৈলানঃ           গ্রান্টি দিচ্ছ? তবে হলেই বা, আমার আর কী হবে? তোমারই ভোগান্তি হবে। ডাক্তারবাবুকে বলে তোমার চাকরিটা খাবো। তেমন তেমন হলে জেলেও ভরে দেব। বিনা বিচারে সতের বছর। আমাকে বিভভান্ত করার চেষ্টা এবং আমাকে হোত্তা করা চক্কান্ত..., এমন কেস খাওয়াবো না, টের পেয়ে যাবে বাছাধন!

হুহুঃ               [হেসে] না স্যার। গ্যারান্টি। একবার তো ট্রাই করে দেখুন। [দরজার দিকে ফিরতে যায়]

পৈলানঃ           ওহে, শোনো হে, শোনো। হন হন করে তো চললে, বলি নামটা কী তোমার? কী বলে ডাকব?

হুহুঃ               হে হে, স্যার। আমার নাম? আমার নাম শুনে হাসবেন, স্যার।

পৈলানঃ            হে হে ? সে না হয় হাসলামই, কিন্তু নামটা কী শুনিই না।

হুহুঃ               হুহু, স্যার। হুহু গন্ধর্ব

পৈলানঃ           [ভুরু কুঁচকে] হুহু? বেশ বেআক্কেলে নামটা তো, হে! বাঙালি যে নও, সে তো বুঝতেই পারছি। ইউপি না বিহার, নাকি তেলেগু? তা এখানে জুটলে কোত্থেকে?

হুহুঃ               আমরা বহিরাগত নই, স্যার! এইখানেই আমাদের বরাবরের বাসবহুদিনের।

পৈলানঃ           তবে যে একটু আগে বললে, এখানে নতুন নতুন, সড়গড় হতে সময় লাগবে! তোমার রকম সকম আমার একটুও ভাল ঠেকছে না, হে। তোমার ওপর আমার নজর থাকবে, এই বলে দিলাম। এখন যাও, চাটা নিয়ে এসো, তারপর তোমার হচ্ছে...তোমার ওই গন্ধটাও ধরবো।

হুহুঃ               হে হে, গন্ধ নয় স্যার, গন্ধর্ব। [হুহু হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে]

 

[পৈলান বিছানা থেকে নেমে মেঝেয় দাঁড়ালনিজেকে খুব হাল্কা মনে হচ্ছে তার, যেন কোন ভার নেই! ফাঁকা ঘরে কিছুটা নেচেও নিল আপন মনেতার এই হুমদো চেহারাটার জন্যে গত বছর তিরিশেক নানান অসুবিধে হচ্ছিল, কিন্তু এখন আর সে সব নেই। নিজেকে বিশ-বাইশ বছরের ছোকরা মনে হচ্ছে। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেওয়ালে টোকা মেরে...]

পৈলানঃ           এ ঘরের দেওয়ালগুলো কাচের, নাকি পেলাস্টিকের, কে জানে! একটাও জানালা নেই। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাইরে কি কুয়াশা হয়েচে, নাকি মেঘ করেচে? সুজ্যি ওঠার নাম নেই। সেই থেকে মনে হচ্ছে যেন ভোর। মেঘে মেঘে বেলা কত হল কে জানে? এ ঘরে, ব্যাটারা একটা ঘড়িও দেয়নি। ওই গন্ধধরবো নাকি, ব্যাটাকে বলতে হবে একটা ঘড়ি দিতে। আরেকটা...আরেকটা কি যেন, হ্যাঁ মনে পড়েছে, ফোন, ইন্টারকম। না, না ইন্টারকম নয় কলিংবেল হলেই ভালো। বেলটা হাতের কাছে রেখে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। বারবার উঠে ফোন ডায়াল করতে হবেনা। তবে ব্যাটাদের ঘরদোর, বিছানাপত্র বেশ ভালোই। বেশ একটা ঠাণ্ডাঠাণ্ডা ভাব আছে। দেওয়ালে ইস্প্লিট কিংবা কোন এসি দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু...অ, বুঝেছি, এখানে সেন্টাল এসি। শালা সবকিছুই সেন্টালের হাতে!  

                   [হুহু হাতে ট্রের ওপর চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল]

                   অ্যাই। শোনো হে, তোমাকে কটা কথা বলবো বলেই ভাবছিলাম। ঘরে একটা ঘড়ি রাখোনি কেন বলতো? এটাও কী আমাকে বলে দিতে হবে? তোমার ম্যানেজার কে আছে? ডেকে দিও তো। আর ওই সঙ্গে একটা কলিং বেলও যেন ব্যবস্থা করে। আশ্চর্য। এতটুকু সাধারণ কমন সেন্স যদি থাকে!  আর এই ঘরটাতে জানালা নেই কেন, হে? বাইরের আলো হাওয়া একটু পাওয়া যেত। 

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার এই যে আপনার চা, একটু চুমুক দিয়ে দেখুন তো। মনোমত হল কিনা?

[চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুড়ুৎ শব্দে লম্বা চুমুক দিয়ে]

পৈলানঃ           আঃ। বেড়ে হয়েছে চাটা। মাইরি। মনে হচ্ছে সেই ইয়ং বয়সে যেমন খেতাম আর কি। যেমন মিঠে, তেমনি কড়া লিকারে ঘন দুধ। না তোমাকে যতটা অকম্মা মনে হচ্ছিল, ততটা নও। কিন্তু সেই সুগার আর অম্বলের ব্যাপারটা কিন্তু আমি ভুলছি না, মনে রেখো।

হুহুঃ               ওসব, একদম ভুলে যাবেন স্যার। কোনদিন যে ছিল এমন মনেও হবে না।

পৈলানঃ           বাইরে কি, কুয়াশা করে আছে? নাকি মেঘলা? সেই থেকে সুজ্যি দেখা যাচ্ছে না কেন?

হুহুঃ               আজ্ঞে স্যার, এখানে সবসময় এরকমই – ভোরের আলোর মতো। রোদ্দুরের ধাঁধানো আলোও হয় না, আবার অমবস্যার মিশমিশে অন্ধকারও হয় না।

পৈলানঃ           অ, সব চাইনিজ এলইডি মাল- বুজে গেছি, আমাকে আর বোকা বুঝিও না হে, তোমার চালবাজির কথায় আমি ভুলছি না। ম্যানেজারকে বলে এক্ষুনি একটা ঘড়ি, ওই সঙ্গে ক্যালেন্ডার আমার চাই। আজকে কত তারিখ আর এখন কটা বাজছে, বলো দেখি।

হুহুঃ               আজ্ঞে, এখানে ঘড়ি পাওয়া যায় না, স্যার। ক্যালেণ্ডারও না। এখানে কেউ সময়ও মাপে না, কারো মেয়াদও ফুরোয় না, স্যার। এখানে আসতেই যা কষ্ট, তারপরেই ব্যস - হয়ে গেল। সময় থমকে যায়!

পৈলানঃ           [ভুরু কুঁচকে ধমকের সুরে] কোথায় এসেছি আমি? কিসের কী হয়ে গেল? কী সব আবোলতাবোল বকছো বলো তো?

হুহুঃ               মানে স্যার, ব্যাপারটা চট করে বুঝে ওঠা ভারি শক্ত। নতুন নতুন তো, কদিন থাকুন, ধীরে ধীরে সবই বুঝে যাবেন। এখানে এলে সবাই অনাদি আর অনন্ত হয়ে যায়

পৈলানঃ           [খুব রেগে। আঙুল তুলে] অ্যাই শালা, অনাদি, অনন্তর নাম তুলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস? ওদের সব খবর আমি জানতাম বলেই, ওদের দুটোরই আমি খবর লিয়ে লিয়েচিলাম, হ্যাঁ[একটু থেমে] অ, তাই বল, এইবার বুঝেচি, তোরা সব শালা কোন দলের লোক। কিন্তু ভালো কথা বলচি শোন, আমাকে একদম ঘাঁটাস না। সেই থেকে আমাকে তাপ্পি মারচিস? শালা, তোরা আমায় কিডন্যাপ করে এনেচিস, না? [চাটা শেষ করে, হুহুর হাতে খালি কাপটা ধরিয়ে দিল]

হুহুঃ               ব্রেকফাস্টে কী খাবেন, স্যার? মাংসের হালকা ঝোল আর মাংসেরপুর দেওয়া পাঁউরুটি টোস্ট, দিই?

পৈলানঃ           সোজা কথার উত্তর দিবি না, না? তুই খুব হারামি, জানিস তো? সাত হারামির এক হারামি বললেও কম বলা হয়। তোর নামটা বললি গানধরবো! তখন বুঝিনি, আমিও শ্লা টিউবলাইট মেরে গেচি, এখন বুঝছি তুই পাক্কা টেররিস্ট। শুরুর থেকেই তুই আমাকে, গান ধরবো, গান ধরবো করে থ্রেট করচিস, বন্দুক ধরবি? ভেবেছিস আমি গেঁড়ে ভোঁৎনা? ভয় দেখালেই সিঁটিয়ে কাদা? এখন আবার মাংসের ইস্টু, সেন্ডউইচ টুচ খাইয়ে আমার মন ভুলোতে চাচ্চিস? আমার পছন্দ-অপছন্দ সবই তোদের খবরে আছে, কেমন?

হুহুঃ               আপনি খুব বিচলিত হয়ে উঠছেন, স্যার। সবার সব খবরই, আমাদের রাখতে হয়, সেটাই আমাদের কাজ স্যার। যে যেমন কাজ করে, সে তেমনই ফল পায়, এ নিয়ম স্যার, আমাদেরও, আপনাদেরও। বিচলিত হবেন না স্যার। খাবারের সঙ্গে এবার কফি এনে দিই স্যার? আরাম করে খান।

পৈলানঃ           [ভুরু কুঁচকে] অ্যাই, বিচলিত আবার কী রে? তোকে আগেই বললাম না, বাংলায় বল।

হুহুঃ               হে হে। বিচলিত-র বাংলা টেনসান, স্যার।

পৈলানঃ           টেনসান? অ তাই বল। অ্যাঁ কী বললি, টেনসান? শালা তুই আমাকে টেনসান শেখাচ্চিস? আমার মোবাইলটা কোতায়? আমার মোওওবাইলটা কোতায়? ওটা আমাকে একবার দে, তারপর তোদের কেমন টেনসনে দৌড় করাই দেখ। আমার ছেলেরা একবার খবর পেলে না? তোদের হাঁড়ির হাল করে ছাড়বে জেনে রেখে দে।

হুহুঃ               আপনার খাবারটা আমি নিয়ে আসি, স্যার। আরাম করে খানখেতে খেতে না হয় আপনার কথার উত্তর দেওয়া যাবে। [হুহু বেরিয়ে গেল]

পৈলানঃ           [চিন্তিত মুখে, পায়চারি করতে করতে] ছিলাম তো শালা কলকাতার সেরা নার্সিং হোমে। কতদিন ছিলাম, সে তো মনেও নেই ছাতা। কখন ঘুমোতাম, কখন জাগতাম কে জানে। মাঝে মাঝে চোখ মেলে দেখতাম মাথার ওপর সিলিংয়ের ফুটোয় লুকোনো মিটমিটে আলো। বিছানায় শুয়ে আচি বুঝতে পারতাম। আড়ষ্ট ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার ক্ষমতাও ছিল না। তবে সারা গায়ে, নাকে, মুখে গুচ্ছের নল লাগানো ছিল দেখতাম। ডানপাশের দেওয়ালে একটা টিভির মতো নীল পর্দার বাস্কো! বাস্কো নয়, বাস্কো নয়, কি যেন বলে, হ্যাঁ মনে পড়েচে মনিটর মনিটর। স্কুলে ন বছর পড়েছিলাম, সব কেলাসে আমিই মনিটর হতাম। মনিটর মানেই মাতব্বরি। মাতব্বরি ব্যাপারটা আমার জন্ম থেকেই। সেই ভাঙিয়েই তো এত ক্ষমতা আর দাপট। আমার নাম শুনলে, পোয়াতি মেয়েদের গবভোপাত হয়ে যায়। মায়ের কোলে ঘুমকাতুরে খোকারা ডুকরে কেঁদে ওঠে। বিরোধী দলের নেতাদের ধুতি হলুদ হয়ে কেচ্ছা কেলেংকারি হয়। কিন্তু এ ব্যাটারা কারা? কোন দলের? আমাকে তুলে এনেছে বুঝতে পারচিকিন্তু কী চায় কি আমার থেকে! দু-চার পেটি হলে, তেমন পবলেম নেই। সে আমার ঘরেই গোয়ালের মাচায় রাখা আচে। কিন্তু না হলে? এ জায়গাটা কোথায়? এখান থেকে বেরোনোর উপায় কী? তবে হ্যাঁ, একবার বেরোতে পারলে, শালাদের গুষ্টির ষষ্টিপুজো যদি না করে ছাড়ি তো আমার নাম পৈলেন নয়। ওই গান ধরবোটা এবার এলেই, একটু ধাতানি দিয়ে কথা বলতে হবে। আমার ধাতানি হজম করার লোক এ তল্লাটে তেমন আর কই?

[ট্রে হাতে হুহু ঢুকল। প্লেটে স্যাণ্ডউইচ টোস্ট, বোওলে মাংসের স্টু আর কাপে গরম কফি]

হুহুঃ               একদম গরম গরম খেয়ে নিন, স্যার।

পৈলানঃ           হুঁ। তেমন খিদে মনে হচ্চিল না, কিন্তু গন্ধটা হেবি ছেড়েচে, তাতেই কেমন যেন খিদেটা চনমনে হয়ে উঠেচেতোদের পেটের মধ্যে কী মতলবটা আচে বুঝতে পারচি না, তবে ভয় পেয়ে আমি পেটে না খেয়ে দুব্বল হবো, এমন আহাম্মক আমায় ভাবিসনি, রে!

                   [স্যাণ্ডউইচে কামড় দিয়ে, এক চামচ সুপ নিল]

                   বাঃ। রান্নাবান্না তো ভালই তোদের ক্যান্টিনে। তা তোদের মতলবটা কী খুলে বলবি? আমাকে এখানে এনে বন্দী রেখে তোদের লাভটা কী হবে? এই এত দামি ঘর, এই রকম খাওয়া দাওয়া...তোদের বস কে আচে? তাকে বল না, এসব ভাঁটের খরচা আর সময় নষ্ট না করে, সামনে এসে ঝেড়ে কাশতে!

হুহুঃ               না, না, আপনাকে বন্দী রাখা হয়েচে, এ আপনার ভ্রান্ত ধারণা স্যার! আপনি তো বন্দী নন। আপনি মুক্ত হয়েই তো এখানে এসেছেন! বরং এতদিন যেখানে ছিলেন, সেখানেই আপনি বন্দী ছিলেন!

পৈলানঃ           এখানে বন্দী নই? এই ঘরের বাইরে, যেখানে খুশি আমি যেতে পারি? কী ফালতো বকচিস মাইরি।

হুহুঃ               হ্যাঁ স্যার। যেখানে খুশি আপনি যেতে পারেন। কোন বাধা নেই। তবে এই লোকে পনের দিনের মেয়াদ, তার পরে অন্য লোক।

পৈলানঃ           অ তোর ওই সময় ডিউটি চেঞ্জ হয়ে যাবে বুঝি? অন্য লোক আসবে? তবে পনের দিন তো অনেক দিন রে? তার আগেই আমি চলে যাবো। আচ্ছা, আমি যদি বন্দী না হই, তাহলে আমার মোবাইলটা দিচ্চিস না কেন?

হুহুঃ               এখানে ওটার কাজ কী, স্যার? টালির টুকরো। এখানে নেট ওয়ার্ক নেই, মোবাইল থাকা না থাকা সমান।

পৈলানঃ           এ জায়গাটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে?

হুহুঃ               তা স্যার, বেশ খানিকটা দূরেই।

পৈলানঃ           [মুখ ভেংচে] বেশ খানিকটা দূরে, আবে কতটা দূরে বল না?  হতভাগা, আমাকে বন্দী করেই যদি না রাখবি, তাহলে কলকাতা ছেড়ে এখানে নিয়ে এলি কী করতে?

হুহুঃ               আজ্ঞে মুক্তি পেলে এখানেই আসতে হয় প্রথমে, তারপর অন্য লোকে। হে হে, আপনি এতদিন যে ফাঁদে বন্দী ছিলেন, তারপরে আপনাকে কে আবার বন্দী করবে?

পৈলানঃ           আমি বন্দী ছিলাম? হারামজাদা, এমন দেব না কানের গোড়ায়। আমাকে বন্দী করতে পারে এমন কারো ক্ষমতা ছিল বাংলায়?

হুহুঃ               হে হে ছিলেন বৈকি, স্যার। সে এমনই বন্দী, বুঝতেও পারেননি। এই এখন যেমন বুঝতে পারছেন না, যে আপনি মুক্ত। আর আপনি স্যার এখন বাংলাতেও আর নেই।

পৈলানঃ           (চমকে) বাংলাতেও নেই মানে? আমি তাহলে এখন কোথায়? বিহার, ইউপি না দিল্লিতে? কী ভজকট বকচিস মাইরি!

হুহুঃ               ওসব নয়, ওসব নয়, হে হে এ একেবারে অন্যলোকের জায়গা। তবে এ লোকে সবাইকেই একবার আসত হয়। 

পৈলানঃ           হতভাগা জেনে রাখ, অন্যলোকের এলাকাতে আমি একলা যাই না। আমার সঙ্গে সাঙ্গপাঙ্গ থাকে, তাদের হাতে দানা থাকে, নারকেল থাকে। বলা নেই কওয়া নেই, অন্য লোকের এলাকায় এনেচিস কেন বে, আঁটকুড়ির ব্যাটা?

হুহুঃ               আপনি স্যার, সেই থেকে অনেক আকথা কুকথা বলছেন, সেটা না বললেই ভালো, স্যার। আমি আপনার নাড়ি নক্ষত্র, হাঁড়ির খবর সব জানি, কিন্তু আপনি আমার কিছুই জানেন না। কার মধ্যে কী লুকিয়ে আছে কে জানে, স্যার? আর কী কথায় কখন কী ঘটে যায়, কে বলতে পারে? এখানে আবার সব কথার এবং কাজের হিসেবও রাখা হয়, সেটাই মুশকিল।

পৈলানঃ           (সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে স্যুপ খেতে খেতে) (জনান্তিকে) ব্যাটাকে অ্যাত হড়কাচ্চি, তাও হেব্বি ক্যাজুয়াল রয়েছে কিন্তু। উলটে মাঝে মাঝে, আমাকেই দেখচি কচি করে হড়কে দিচ্চে হারামীটার পেছনে বেশ লম্বা হাত আচে বোঝা যাচ্চেহয়তো সিবিআই, ইডি। বুঝেচি, এ শালা নিগ্‌ঘাৎ কেন্দের চক্কান্ত। যাই হোক মাথা গরম করে লাভ হবে না মনে হচ্চেব্যাটাকে অন্য ভাবে ম্যানেজ করা যায় কিন দেখি।

                   (স্যুপ স্যাণ্ডউইচ শেষ, এবার কফির কাপে চুমুক দিয়ে) (প্রকাশ্যে) তা বাপু, তোমার ওপর যতোই রাগটাগ করি না কেন, একটা কথা মানতেই হবে, রান্নার হাতটা খাসা। কিসের মাংস ঠিক বুঝলাম না, তবে খুব তার হয়েচে রান্নায়! কোথাকার ঠাকুর হে? আর মাংসটাই বা কিসের?

হুহুঃ               ঠাকুর বলে এখানে কেউ নেই, রান্নাটান্নাও করতে হয় না, স্যার। যে যেমন কর্ম করে, তার মনোমত ঠিকঠাক জিনিষ এখানে তৈরি হয়েই থাকে।

পৈলানঃ           এতো বেশ বেড়ে জায়গা মাইরি। এর পর যেন বলে বসো না, যে এর জন্যে কোন খরচাও হয় না!

হুহুঃ               হে হে, স্যার ঠিকই ধরেছেন, সত্যিই কোন খরচা নেই। সারা জীবনের লুঠপাট, চুরিচামারি করে জমানো পয়সায় ছ্যাদলা ধরে। তারপর সাত ভুতে কামড়াকামড়ি করে সে পয়সার ষষ্ঠীপুজো করে।

পৈলানঃ           তা ঠিক, তবু মন তো মানে না। পোথম পোথম তোমার ওপর একটু বিরক্ত হয়েচিলাম ঠিকই, এখন দেখচি তোমার মধ্যে অনেক গুণ আচে হে। আর পৈলেন মণ্ডল গুণের কদর জানে। ঐ যে অনন্ত, ব্যাটার অনেক গুণ ছিল, খালপাড়ের বস্তি থেকে একদিন ভোরবেলা ফেরার সময় ওকে দেখেছিলাম। আর দেখেই বুঝেছিলাম ওর ভেতরে মাল আচেতুলে এনে সঙ্গে রাখলাম কদিন। ঝট করে তৈরি হয়ে গেল, জান?

হুহুঃ               হে হে, সে আপনার হাত যশ।

পৈলানঃ           সেই অনন্ত, আস্তাকুঁড় থেকে তুলে এনে, দু বছরে রাজার ব্যাটা কেরাসিনওয়ালা বানিয়ে দিলাম! আর সেই কিনা এলো আমার পেছনে কাটি করতে? এমন বিশ্বেসঘাতক! দিলেম শালাকে টপকে।

হুহুঃ               জানি, স্যার।

পৈলানঃ           আর ওই অনাদি? আমার বিরোধী দলে ছিল, ওখানে ব্যাটাকে ল্যাজেগোবরে অবস্থা করে ছেড়েছিল। যে কোনদিন লাশ হয়ে ভুরভুরি কাটত পোড়ো সেপটিক ট্যাংকে। একদিন মাঝ রাত্রে ধড়াস করে পায়ে এসে পড়ল, পলুদা বাঁচাও। আমার চোখের কোলটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে উঠল।

হুহুঃ               হে হে, সে আর বলতে? আপনার দয়ার শরীর।

পৈলানঃ           আরে তা নয়, তা নয়। পেটে জল পড়লে আমার মনটা কেমন যেন মাখো মাখো হয়ে যায়। সেই অনাদি অনন্তর সঙ্গে ভিড়ে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবার ছক কষছিল। দিলাম শালার ঘন্টা বাজিয়ে।

হুহুঃ               হে হে, আপনিই তো শেষ বিচারের মালিক। এই তুলছেন, এই খালাস করছেন।

পৈলানঃ           ছেঁদো গ্যাস দিয়ে লাভ নেই, গন্ধকাজের কথাটা শোন। এখানে কত পাও? বলি ফিউচারের কথা কিছু ভেবেছ? সারা জীবন এভাবেই কাটাবে? নাকি দু পয়সা কামিয়ে, একটু রোখঠোক রোয়াবি দেখিয়ে রাজার হালে থাকবে?

হুহুঃ               আজ্ঞে, সে আর বলতে? আর উণিশ বিশ হলেই খালে লাশ - একেবারে খাল্লাস।

পৈলানঃ           আরে তা কেন? সবাই কী আর ওদের মতো নাকি? ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।

হুহুঃ               সে কথা একশবার, আমাদের ভাবনা তো আপনি ভেবেই রেখেছেন। আপনার নিজের দলেরই আটত্রিশজন এখন মাটির তলায় কংকাল হয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আর ষোলজনের, বানিয়ে তোলা মামলায় যাবজ্জীবন চলছে।

পৈলানঃ           (ভুরু কুঁচকে) বেশ ছোকরা হে, তুমি! আমার থেকেও তোমার দেখি সব হিসেব একেবারে মুখস্থ!

হুহুঃ               আজ্ঞে তা তো হবেই! আপনার হরেক লীলা, সব কী আর আপনার মনে রাখা ঠিক হয়? এরপর আছে বিরোধী দলের একশ আটত্রিশ জন, আর নিরীহ আম জনগণ গোটা চল্লিশেক তো হবেই!

পৈলানঃ           (কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে) সব কী আর মনে আছে? কাজের মধ্যে অমন দু চারটে হয়েই যায়। আর ওসব না করলে লোকে মান্যিগণ্যিই বা করবে কেন? আর পাব্লিকের মনে ভয়ভক্তিই বা আসবে কোত্থেকে, হে? ওটাই তো আমাদের পোফেসন, ওটাই তো আমাদের ইউএসপি। ওটুকু না থাকলে, পলিটিক্যাল ন্যাতারা আমাদের দিয়ে ঘরও মোছাবে না, হে।

হুহুঃ               আর পলিটিক্যাল হাতটা যদি মাথায় না থাকে, ক্ষমতার ল্যাজ নাড়াই বা থাকবে কোথায়?

পৈলানঃ           তুমি বেশ চালাকচতুরও আচো, অ্যাঁ? ভেজা বেড়ালটা সেজে থাকো, দেখে বোঝাই যায় না। এখনই কিছু বলতে হবে না। ভালো করে চিন্তা ভাবনা করে দেখ। এখান থেকে সটকে নিয়ে একবারটি আমায় কলকাতায় নিয়ে চলো, তারপর তোমার লাইফ কেমন বানিয়ে দিই দেখবে! হে হে, এটুকু না বোঝার মতো বোকা তুমি তো নও হে!

হুহুঃ               আজ্ঞে, ভাবনা চিন্তার বাকি আর কী রাখলেন বলুন দেখি?

পৈলানঃ           বলো কী হে, ভাবনা চিন্তা করেই ফেলেছ? বা বেশ বেশ। তা বেরোবার আগে লাঞ্চের ব্যবস্থা কিছু করেচ নাকি? দুপুরে ওই মাংসের কষা আর খান কতক পরোটা বানাবে নাকি? যাওয়ার আগে এ পাড়ার খাবারটা জমিয়ে খেয়েই যায়। আচ্ছা, ওই মাংসটা কিসের বলো তো হে, অমন স্বাদ এর আগে কোনদিন পাই নি।

হুহুঃ               ও তেমন কিছু না, স্যার। যেমন সস্তা, তেমনি সহজেই পাওয়া যায়। মানে এ মাংসের কোনদিন অভাব হয় না, স্যার। হালাল কিংবা ঝটকা; গরু কিংবা শুয়োর –এসব কোন লাফড়াও নেই, স্যার!।

পৈলানঃ           বলো কী হে? সস্তায় এমন মাংস, কিসের বলো তো?

হুহুঃ               আপনি জানেন, স্যার, আপনার খুবই প্রিয় মাংস। ওটা নরমাংস, স্যার।

পৈলানঃ           অ তাই বলো! অ্যাঁঃ কী বললি? নরমাংস? আরে ছ্যাঃ ছ্যাঃ তোর পেটে পেটে এই ছিল, গন্ধ?

হুহুঃ               কেন স্যার? কিছু অন্যায় করে ফেললাম নাকি, স্যার? একটা মানুষখেকো বাঘ, কিংবা একটা হাঙর সারা জীবনেও অতো মানুষ খেতে পারে না স্যার, এই ক বছরে আপনি যা খেয়েছেন।

পৈলানঃ           হ্যাক থুঃ থুঃ। ছিঃ ছিঃ। কোন শালা বলে আমি নরমাংস খেয়েছি? লাশ ফেললেই তার মাংস খাওয়া হয়ে যায়? আমার মতো একজন সমাজসেবীকে তুই নরমাংস খাওয়ালি?

হুহুঃ               এ হে হে, আপনি এত ছ্যাছ্যা থুথু করছেন কেন স্যার, মানুষ কি এতই অখাদ্য স্যার? বাঘ ভাল্লুক স্যার কখনো কখনো মানুষ মারে পেটের জ্বালায়, আপনি মারেন, স্যার ক্ষমতা আর টাকার জ্বালায়। তা স্যার একটু খেয়ে দেখতে দোষ কী?

পৈলানঃ           তোকে আমি ফাঁসিতে চড়াবো। তোকে আমি... আমি...ওয়াক ওয়াক...ওরে বাবা আমার কেমন গা গুলোচ্ছে...ইস...ইস...ছ্যাঃ ছ্যাঃ...ওয়াক ওয়াক...

 

[আলো নিভে গেল, কিছুক্ষণ পৈলানের ‘ওয়াক ওয়াক, থু থু’ আর হুহুর ‘ঘাবড়াবেন না স্যার, সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম প্রথম অমন হতে পারে স্যার’ শোনা যেতে লাগল...তারপর হুহুর কণ্ঠের বদলে একটি মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘স্যার, স্যার একটু শান্ত হোন স্যার, ও স্যার, স্যার...’আলো জ্বলে উঠলে দেখা গেল, হস্পিট্যালের বেডে পৈলেন শুয়ে শুয়ে ছটফট করছে, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে একটি নার্স, নাম পিংকি পৈলানের সারা গায়ে নাকে মুখে নানান টিউব, সে সব খুলে সে উঠে পড়তে চাইছে।]

 

পিংকিঃ            বীণাদি, শিখাদি একবার আসবে গো, পেশেন্ট হঠাৎ কেমন করছে দেখে যাও। সামলাতে পারছি না। ও বীণাদি, ও শিখাদি।

                   [আরো দুই নার্স বীণা আর শিখা দৌড়ে ঢুকল কেবিনে]

বীণাঃ              ও মা, এ আবার কী হল রে? কোমার পেশেন্ট এমন কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করে এই প্রথম দেখছি শিখা তুই স্যারকে বরং একবার ফোন কর। আমি আর পিংকি ততক্ষণ দেখছি একে শান্ত করা যায় কি না

                   [শিখা মোবাইলে ডায়াল করতে থাকে]

শিখাঃ             যাচ্চলে, নেট ওয়ার্ক সীমার বাইরে বলছে।

বীণাঃ              যাচ্ছেতাই নেট ওয়ার্ক। আবার কর

শিখাঃ             দাঁড়া দাঁড়া রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...রিং হচ্ছে...যাঃ, স্যার তুললেন না।

বীণাঃ              ছেড়ে দে, এখন আর তাড়া নেই। পেশেন্ট ঠাণ্ডা মেরে গেছে...এখন আর কোমা নয়, একদম ফুলস্টপ।

পিংকিঃ            তাহলে, ভেন্টিলেশান খুলে দিই?

বীণাঃ              পাগল হয়েছিস? ভেণ্টিলেশন চলুক...বড়ো বড়ো ডাক্তাররা আসুক, তাঁরা যা করার করবেনরাত এখনো ঢের বাকি, যা একটু ঘুমিয়ে নে। কাল সকাল থেকে আবার কোমার ডিউটি... এ কোমা কবে কমবে, কে জানে? 

 

[তিনজন বেডের দুপাশে দাঁড়িয়ে পৈলানের দিকে তাকিয়ে রইল। পর্দা নেমে এল]

 

..০০..   

এর পরের বড়োদের গল্প - মশা-ই          

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...