উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫  


২২ 

ভোর হতে আর দণ্ড তিনেক দেরি আছে হয়তো বা। ভল্লার ইচ্ছে ছিল এটুকু সময় সে একটু ঘুমিয়ে নেবে। সে আর হবে না। রামালির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মায়া হল। ছেলেটা কখন এসেছিল তার কাছে? তার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়েই পড়েছে বেচারা। রামালির পাশেই মাটিতে বসল ভল্লা। ছেলেটির বাহুতে হাত রেখে মৃদু স্বরে ডাকল, “রামালি, এই রামালি”।

রামালি ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসল। ভল্লার দিকে তাকিয়ে দেখল, দেখল তার চারপাশ। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই রামালি বলল, “এঃ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!”

ভল্লা হাসল, “এসেছিস কখন?”

“অনেকক্ষণ। দেখলাম তোমার ঘর খালি। তুমি নেই। ভাবলাম গেছ কোথাও, চলে আসবে এখনই। তাই বসে পড়লাম তোমার অপেক্ষায়। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি...”।

ভল্লা বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিস, বেশ করেছিস। কিন্ত এই মাঝরাতে আমার কাছে কেন? কোন সমস্যা হয়েছে?”

মাথা নীচু করে রামালি বলল, “আমার সমস্যা তো তুমি জানই, ভল্লাদাদা। কাকিমা। হানোর মৃত্যু। আমাদের রামকথা শুনতে যাওয়া। আস্থানের ডাকাতি। কাল সারাদিনই গ্রামের বয়স্করা ব্যতিব্যস্ত ছিল নানান জল্পনায়। সন্ধের পর বাড়ি ফিরতে দেখি তুলকালাম কাণ্ড। দেখি কাকিমা কাকাকে যাচ্ছেতাই গালাগালি করছে আর শাপশাপান্ত করছে। কাকা বাইরের দাওয়ায় ভিজে বেড়ালের মতো বসে আছে। তার দুপাশে বসে আছে কাকার তিন ছেলেমেয়ে। আমি বাড়িতে পা দিতেই মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, “মা, মা, রামালিদাদা এসেছে”। ব্যস, আর যায় কোথায়? কাকিমা ভেতর থেকে বেরিয়ে এল হাতে ঝ্যাঁটা নিয়ে। প্রথমেই অশ্রাব্য কিছু গালাগাল দিল, তারপর দাওয়া থেকে তাড়াহুড়োয় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে, আছড়ে পড়ল মাটিতে। মাথার পিছনটা ঠুকে গেল সিঁড়ির নীচের ধাপিতে। অজ্ঞান হয়ে উঠোনে পড়ে রইল হাত-পা ছড়িয়ে। আমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কাকা আর তার তিন ছেলেমেয়ে হাহাকার করে দৌড়ে গেল কাকিমার দিকে। তাদের চেঁচামেচি শুনে পাশের বাড়ির লোকজনও দৌড়ে এল। অনেকে মিলে কাকিমাকে তুলে নিয়ে গেল দাওয়ায়। মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ তার মুখে মাথায় জলের ছিটে দিতে লাগল, কেউ পাখার হাওয়া করতে লাগল। আমি কী করব, কী করা উচিৎ না বুঝে, একইভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। একফাঁকে কাকা এসে কানে কানে, তুই এখন যা রামালি। অশথ তলায় অপেক্ষা করিস। তোর কাকিমা একটু সুস্থ হলেই আমি যাবো। তুই এখন যা”।

এতক্ষণ ভল্লা চুপ করে শুনছিল। রামালি থামতেই ভল্লা উঠে গিয়ে চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালল। উনুনের মধ্যে আগুনটা গুঁজে দিয়ে আরো কিছু কাঠকুটো রাখলো উনুনের মধ্যে। তারপর ঘর থেকে গতকালের মালসাতে জল নিয়ে বসিয়ে দিল উনুনের ওপর। পাঁচ মুঠি চাল ফেলে দিল মালসায়। তারপর উনুনের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা এসেছিল?”

“এসেছিল। বলল, তুই আর বাড়িতে আসিস না, রামালি। দেখতে পাচ্ছিস তো, তোর কাকিমার অবস্থা? আমাকেও স্বস্তিতে বসতে দিচ্ছে না এক দণ্ড। এতদিন এসব সহ্য করেও চলছিলাম। কিন্তু আজ গ্রামে একটা কথা উঠেছে। কাল রাত্রে নাকি তোরা রামকথা শুনতে যাসনি? আস্থানে গিয়েছিলি ডাকাতি করতে! সে কথা তোর কাকিমার কানেও গেছে। সে কথা শোনার পর থেকেই উন্মত্ত হয়ে গেছে তোর কাকিমা”।

তার মানে কাকার অন্ন তোর ঘুঁচল। তোদের জমিজমা কত আছে?”

“তা আছে – ওই সাত-আট বিঘে মতো”।

“তাতে তোর মানে তোর বাবার অংশ নেই?”

“আছে বৈকি। যা জমি তার অর্ধেকটা তো বটেই। সেটাই তো কাকিমার আক্রোশ, ভল্লাদাদা। বড় হচ্ছি, আমি যদি বাবার অংশের ভাগ চাই? সংসারে ভাইপো পোষা আর দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা একই ব্যাপার”। রামালি বিষণ্ণ হাসল, তারপর বলল, “কী হবে ওই ভাগের জমি নিয়ে? আমারও পেট ভরবে না, কাকারও নয়। মাঝের থেকে উঠতে-বসতে কাকিমা বাপান্ত করবে আমার এবং কাকারও”।

“হুঁ। তাহলে? এখন কোথায় থাকবি? খাবি কি?”

একটু ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “তুমিও নির্বাসিত, আমিও তাই। তোমাকে নির্বাসন দিয়েছে রাষ্ট্র, আমাকে আমার পরিজন। তোমার কাছেই থাকব। তুমিই খাওয়াবে!”

ভল্লা উনুনের মুখে আরো কিছু কাঠকুটো গুঁজে দিয়ে, ফুটন্ত জলের থেকে দু-চারদানা ভাত তুলে দেখল, সেদ্ধ হয়েছে কিনা। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “বাঃ বেড়ে বুদ্ধি খাটিয়েছিস, তো? কাকাকে ছেড়ে দিয়ে এখন আমার ঘাড়ে এসে চড়বি?”

রামালি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভল্লার চোখের দিকে। তারপর মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর আবার মাথা তুলে, চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি শক্তি চাই। আমি দক্ষতা চাই। তোমার মতোই জীবন-মৃত্যুকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চাই। এতদিন যে মরার মতো বেঁচে রয়েছি, তার থেকে মুক্তি চাই। মাথা তুলে বুক চিতিয়ে লড়তে চাই। বাঁচতে গিয়ে যদি মরতেও হয় – তাতেও আমি রাজি। তুমি আমাকে গড়ে তোল, ভল্লাদাদা”। তীব্র জেদ আর ক্রোধে রামালির দুই চোখ এখন আগুনের মতো জ্বলছে।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরে ঢুকে বাঁদিকের কোনায় দেখবি একটা ঝুড়িতে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা আছে, নিয়ে আয়। ওই সঙ্গে একটা সরাও আনবি আর নুনের পাত্রটা…” রামালি উঠে ঘরের দিকে যেতে ভল্লা বলল, “তুই তো আর নরম কাদার তাল নোস, রামালি, আর আমিও কুমোর নইগড়তে হলে, তোকে নিজেকেই গড়তে হবে – আমি পাশে থাকব – মাঝেসাঝে দেখিয়ে দেব, ব্যস্‌ ওইটুকুই”।

ভাতটা হয়ে এসেছিল। উনুনের গর্ত থেকে জ্বলন্ত কাঠ-কুটো সরিয়ে নিয়ে ভল্লা বলল, “সরাটা নিয়ে বস, গরমগরম দুটো ফ্যানভাত খা। পেঁয়াজ-লঙ্কা যা নেবার নিয়ে নে”। কাঠের হাতা দিয়ে মাটির সরায় ভাত তুলতে তুলতে ভল্লা আরও বলল, “কাল নিশ্চয়ই সারাদিন-রাত পেটে কিছু পড়েনি? খিদে পেলে না, আমারও মাথা গরম হয়ে যায়। মনে হয় সব শালাকে দেখে নেবওই তাদের – যাদের দুবেলা দুমুঠো খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও, দেয় না। যেমন তোর কাকা-কাকিমা, তোর পৈতৃক জমির ভাগও দেবে না, আবার তোকে খেতে না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে…। নে, শুরু কর”।

ভল্লা যে তার কথা ভেবেই এই শেষ রাত্রে ভাত রান্না করল, এই সামান্য আন্তরিকতায় রামালি অভিভূত হয়ে পড়ল। বলল, “ভল্লাদাদা, তুমি শুধু আমার জন্যেই…”?

ভল্লা হাসল, বলল, “তা নয়তো কি, আমার জন্যে? শেষ রাতে কেউ, নিজের জন্যে রাঁধতে বসে? কিন্তু এতক্ষণ তো তোর চোখে দিব্যি আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম, সামান্য ফানভাত আর পেঁয়াজেই চোখে জল এসে গেল? চোখে জল নিয়েই কি তুই বুক চিতিয়ে লড়বি, রামালি?”

রামালি বাঁহাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ফেলল, গরমভাত মুখে তুলে পেঁয়াজে কামড় দিয়ে বলল, “না ভল্লাদাদা, বেশ কিছু দিন ধরেই মনে হচ্ছিল এভাবে সারাক্ষণ লাথি-ঝ্যাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকার মানে হয় না। হয় লড়তে হবে নয় মরতে হবে। এসময়েই তুমি আমাদের গ্রামে এলে…”।

ভল্লা রামালির সরায় আরও দুহাতা ভাত দিয়ে বলল, “গ্রামের কী পরিস্থিতি বল তো? শালু আর আহোক ঠিক আছে?”

“হানোর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ পাওয়া ছাড়া গ্রামের মানুষদের তেমন কোন হেলদোল নেই, ভল্লাদাদা। দুপুরের পরে গ্রামে বার্তা এল, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে, তিনজন রক্ষী মারা গেছে। তাতেও গ্রামের লোক তেমন উৎসাহ দেখাল না। বিকেলের দিকে শুনলাম, কেউ নাকি বলেছে, সে রাত্রে রামকথা দেখতে যাওয়ার নাম করে, আমরাই নাকি আস্থানে ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম”।

“কে ছড়ালো কথাটা, জানিস? আমাদের মধ্যেই কেউ বলে দেয়নি তো? শালু বা আহোক, বা অন্য কেউ?”

“মনে হয় না। আমরা তো প্রায় সারাক্ষণই হানোকে নিয়ে ছিলাম। একটু বেলা হলে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করা হল। ওর বাবা চিতাগ্নি করল। আমাদের মধ্যে কেউ বলেছে বলে মন হয় না, ভল্লাদাদা”।

“সারা দিনে কেউ বাড়ি যায়নি? দুপুরে খেতেও যায়নি”।

“না, ভল্লাদাদা। একবার মড়া ছুঁয়ে ফেললে, সে দেহের দাহ সৎকার না করলে, বাড়ির লোকেরা আমাদের ঢুকতেই দেয় না। হানোর সৎকার করতে করতে সন্ধে হয়ে গেল, তারপরেই দীঘির জলে স্নান সেরে আমরা যে যার বাড়ি ফিরেছিলাম”।

“খাওয়া হয়ে গেছে? যা মুখ হাত ধুয়ে আয়। ওই সঙ্গে এই মালসা, সরাগুলোও ধুয়ে আনবি। বাড়ির বাইরে যখন বেরিয়েছিস, নিজের কাজ এখন থেকে নিজেকেই করতে হবে”।

ভল্লার কথায় রামালি উজ্জ্বল চোখে হাসল, “করবো, ভল্লাদাদা। আমি এ সবই করেছি। ছোটবেলায় বাপ-মা মরা ছেলেদের এ সব করতেই হয়”।

ভল্লা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “ঠিক আছে, ঠিক আছে যা। সব কথাতেই এমন নাকে কান্না শোনাস না তো! জগতে তোর নাকে কান্না শোনার জন্যে কেউ বসে নেই। কথাটা মনে রাখিস”। রামালি পুকুর থেকে ফিরতে ফিরতে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। ধোয়া পাত্রগুলো ভল্লার ঘরে সাজিয়ে রেখে  রামালি বাইরে আসতেই ভল্লা বলল, “চ তোকে একটা যন্ত্র দেখাই”। ঝোপের আড়াল থেকে লুকোনো দুজোড়া রণপা বের করে ভল্লা এক জোড়া রামালির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এ দুটো কি জানিস”?

রামালি বলল, “বাঁশ, আমাদের এখানে হয়না। শুনেছি পূবের জঙ্গলে হয়। খুব কাজের জিনিষ”।

ভল্লা মুখ ভেটকে বলল, “ব্যাঁশ...বাঁশ তো সবাই জানে...বাড়িতে তুই যে কাঠের পিঁড়িতে বসিস, সেটা কি শুধুই কাঠ? চাষের সময় যে লাঙল ঠেলিস, সেটাকেও কি কাঠ বলিস?” রামালি কিছু বলতে পারল না। বাঁশের গায়ে হাত বুলিয়ে সে ভাবতে লাগল।

“বুঝতে পারলি না তো? এটাকে রণপা বলে”।

“রণপা? তাই? শুনেছি, এতে চড়ে লোকেরা নাকি খুব দৌড়তে পারে। দেখিনি কোনদিন”। রামালি এবার বাঁশের খুঁটি দুটোকে অন্য চোখে দেখতে লাগল।

“এই দ্যাখ” বলে, দুহাতে বাঁশ দুটো ধরে, ভল্লা তুড়ুক লাফে উঠে পড়ল বাঁশের গায়ে বেরিয়ে থাকা দুটো ফেঁকড়ি কঞ্চির ওপর। তারপর চারপাশে কিছুক্ষণ হেঁটে চলে দেখাল। রামালি অবাক হয়ে দেখছিল, আর ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। মানুষের পাদুটোকে যদি আরও হাত দেড়-দুয়েক লম্বা করে ফেলা যায় – তাহলে হাঁটার গতি তো বাড়বেই। আর দৌড়তে পারলে তো কথাই নেই।

রামালি দুহাতে চেপে ধরল বাঁশদুটোকে, তারপর লাফ দিয়ে উঠে পড়ল কঞ্চির ওপর। টলমল করছিল, কিন্তু চেষ্টা করতে লাগল দুই রণপায়ে সমান ভর দিয়ে দাঁড়াতে। এবার ভল্লাই বেশ অবাক হল, বলল, “বাঃ, তোর বেশ এলেম আছে তো? প্রথম বারেই দিব্যি চেপে পড়লি। আমি বাবার কাছে শিখেছিলাম, প্রথমবার চড়তে গিয়ে কতবার যে আছাড় খেয়েছিলাম...। এই দ্যাখ, এইভাবে সোজা হয়ে দাঁড়া। ও দুটো যে বাঁশের লাঠি, ভুলে যা। মনে কর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস, সোজা। চেষ্টা কর পারবি...”।

রামালি পারছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্যে...তারপরেই টলমল করছিল আবার। ভল্লা বলল, “বাচ্চারা যখন প্রথম হাঁটতে শেখে দেখিসনি? তোকেও কি এখন হাঁটতে শেখাতে হবে? বলছি না, ওদুটো যে তোরই পা, সেটা মনে গেঁথে ফ্যাল। হাতের টানে আর পায়ের ঠেলায় হাঁটতে চেষ্টা কর। ভল্লা বার কয়েক হেঁটে দেখাল। রামালি পারল না, হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে খুলে গেল লাঠি দুটো।

ভল্লা কোন গুরুত্বই দিল না, বলল, “ঠিক আছে, আবার চেষ্টা কর, হয়ে যাবে...মনে রাখিস সকাল হলেই তুই রণপা চড়ে এই জঙ্গলের সীমানায় যাবি। রণপা চড়ে গ্রামে ঢুকবি না। সেখানে রণপা রেখে, শল্কু, আহোক এবং আমাদের দলের আরও কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে আসবি। বলবি ভল্লাদাদা ডাকছে। তারপর আবার রণপা চড়েই আমার কাছে ফিরে আসবি। রাত জেগে তোকে ভাত রেঁধে খাওয়ালাম, কি অমনি অমনি? ও হ্যাঁ, গ্রামের লোকদের বলে দিস, আজ বা কাল আস্থান থেকে রক্ষীদের দল আসতে পারে...ডাকাতির সূত্র-সন্ধান খুঁজতে। আমাদের ছেলেদের মানা করে দিবি, ওদের সামনে যেন না যায়। কোন তর্কাতর্কি, ঝগড়া-ঝাঁটিতে জড়াতে নিষেধ করবি। .গ্রামের বয়স্ক মানুষরাই যেন ঠাণ্ডা মাথায় ওদের মুখোমুখি হয়। মনে থাকবে? এখন কিছুক্ষণ অভ্যাস করে নে, তারপর রণপায় চড়ে ঘুরে আয়”।

টলমল করে রামালি একটু একটু এগোচ্ছিল, আর উলটে পড়ছিল ধপ ধপ করে। জঙ্গলের সরু পথে দুপাশেই রয়েছে ছোটছোট ঝোপঝাড়। পড়ে গেলে খোঁচা-টোঁচা লাগবে, ছড়ে-টড়ে যাবে – তবে বড়ো কোন আঘাত লাগবে না। ভল্লা সেদিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে মৃদু হাসল। তারপর চেঁচিয়ে বলল, “আমার চোখের আড়াল হলেই, তুই যে রণপা ছেড়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে যাবি আর ফিরে এসে আমাকে ফাঁকি দিবি, সে কথা মনেও ঠাঁই দিস না, রামালি। বুঝতে পারলে তোর ঠ্যাং ভেঙে আমিই গিয়ে তোর কাকি কাছে আবার ফেলে আসব। বলব, আমার কাছে যাতে আর না আসতে পারে, তাই ওকে রেখে গেলাম। মনে থাকে যেন”।

রামালি চেঁচিয়ে উত্তর দিল, “আর যদি পারি?”

“তাহলে ওই রণপাজোড়া তোর – আর ওই সঙ্গে পাবি নতুন একটা বল্লম”।

“আমি আসছি ভল্লাদাদা, বল্লমটা এনে রাখো”।

রামালি দৃষ্টির বাইরে চলে যেতে ভল্লা রণপা থেকে নেমে কিছুক্ষণ বসে রইল। এখন তার তেমন কিছু করার নেই। বসে থাকলে নানান চিন্তায় মাথাটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবে – কিছু কাজ হবে না। ভল্লা উঠে দাঁড়াল, রণপা দুটো আগের জায়গাতেই লুকিয়ে রেখে উঠে পড়ল সামান্য দূরের একটা বড়ো গাছে। ওই গাছের ওপরেই রয়েছে তার ঘুমোনোর ঠেক। ভল্লা নিজের কুটিরে কখনোই ঘুমোয় না, বেশিক্ষণ থাকেও না। তার কাজটা এমনই, নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু তারই। সে প্রশাসনের গোপন কাজ করছে বলেই, প্রশাসন তার জীবনের দায় নিয়ে নিয়েছে এমন নয়।  কোন শত্রু বা গুপ্ত ঘাতকের হাতে তার প্রাণ গেলে, প্রশাসন বিন্দুমাত্র দায় নেবে না। কিংবা বলবে না, আমাদের কাজ করতে গিয়ে মহান ভল্লা তার প্রাণটাকে উৎসর্গ করেছে!

এই কুটিরের আশেপাশের চারটে গাছে তার শোয়ার জায়গা বানানো আছে। কবে কোথায় সে শোবে, সে নিজেও জানে না। ভল্লা সেরকমই একটা গাছে উঠে পড়ল। অনেকটা উঁচুতে দুই ডালের মধ্যে বানানো কাঠের মাচায় উঠে সে এলিয়ে দিল শরীরটাকে। রামালির ফিরতে প্রহরখানেক তো লাগবেই। অতএব এখন কোন কাজ যখন নেই, শরীরটাকে কিছুক্ষণ আরাম দেওয়া যাক। 

চলবে...     

সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৪ 


২১ 

মারুলা আর ভল্লা রণপা নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকে একটা নির্দিষ্ট বিশাল গাছে উঠে বসল। বিশাল এই মহানিম গাছের মস্ত মোটা একটা ডালে দুজনে মুখোমুখি বসল, পা ঝুলিয়ে, বেশ আরাম করে। তাদের পায়ের নীচে এবং মাথার ওপর ঘন পাতার ছাউনি। নীচ থেকে কেউ ওপরে তাকালেও সহজে তাদের কেউ খুঁজে পাবে না। তার ওপর মধ্যরাতের একটানা হাওয়ায় পাতায় পাতায় যে রকম ঝরঝর শব্দ হচ্ছে, তাতে গাছের তলা থেকে তাদের কোন কথাই, নীচের থেকে শুনতে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। গাছের ডালে রণপা জোড়া ঝুলিয়ে রেখে মারুলা বলল, “কী বলল, তোর কমলিমা?”

ভল্লা খুব চিন্তিত ও বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “খুবই খারাপ বার্তা রে মারু। যে কাজটা করতে আমার মন থেকে একটুও সায় নেই...সে কাজটাই এখন খুব শিগ্‌গির আমাকে করতে হবে অথবা কাউকে দিয়ে করাতে হবে”।

অবাক হয়ে মারুলা বলল, “কী কাজ? কী করতে হবে তোকে?”

ভল্লা উপরের দিকে তাকিয়ে ঝিলিমিলি পাতার ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশের দিকে চোখ রেখে  বলল, “যে কবিরাজের কথা তোকে তখন বলছিলাম না? সেই কবিরাজ। হতভাগা বুড়ো বড়ো বেশি বুঝে ফেলেছে। বুঝেছিস তো বুঝেছিস, সে বেশ কথা, নিজের মনে চুপ করে থাকলে কোন ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তা না, বুড়ো সেসব কথা লোককে বলেও বেড়াচ্ছে। গ্রামপ্রধান জুজাক জানে, জানে কমলিমা...হয়তো আরও অনেকে”।

মারুলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী বুঝে ফেলেছে?”

ভল্লা বলল, “আমি এ গাঁয়ে আসার পরেই, জানিস নিশ্চয়ই, ওই বুড়োই আমার চিকিৎসা করেছিল। শুনেছি, আমি যখন অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম – সে সময়েই নাকি বুড়ো বলেছিল, এ ছোকরা, অর্থাৎ আমি, নাকি সাধারণ লোক নই। বলেছিল, বহুদূর থেকে আসা, ভয়ংকর অসুস্থ এই ছোকরা আমাদের গ্রামে যে আচমকা এসে পড়েছে – এমনটা হয়তো নয়। হয়তো এখানে আসার পিছনে বড়ো কোন পরিকল্পনা আছে”!

“বলিস কী? এ কথা শষ্পককে বলেছিলি?”

“না, বলিনি। আসলে সে সময় বুড়োর কথায় আমি কেন, গাঁয়ের কেউই তেমন কান দেয়নি। কিন্তু আজ জানতে পারলাম, বুড়ো অসাধারণ বুদ্ধি ধরে। জুজাককে সে বলেছে, গত রাত্রে নোনাপুর গাঁয়ের কেউই নাকি রামকথা শুনতে যায়নি। তার মানে, এই গাঁয়ের ছোকরারাই যে আস্থানে ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত – সে ইঙ্গিতও বুড়ো দিয়ে গেছে”।

“কী বলছিস? বুড়ো তো তার মানে সবটাই বুঝে গেছে”।

“হুঁ। সবটাই। আমার সঙ্গে রতিকান্তর রাজধানীতে ঘটা সেই ঘটনার দিন থেকে মাত্র তিনরাত-তিনদিনে, কীভাবে আমি নোনাপুর পৌঁছলাম, বুড়োর মনে সেটাও সন্দেহ জাগিয়েছে। কোন সুস্থ সবল মানুষের পক্ষেও ওই সময়ে এতটা পথ পায়ে হেঁটে আসা সম্ভব নয়। অতএব, আমি অধিকাংশ পথই যে ঘোড়ায় চড়ে বা রণপায়ে এসেছি...সেটা এই বুড়ো অনুমান করে নিয়েছে। নির্বাসনে যেতে সুবিধে হবে বলে, কোন প্রশাসন একজন অপরাধীকে ঘোড়া দিয়ে সাহায্য করে বল তো?”

“অর্থাৎ, তুই হয় অত্যন্ত ক্ষমতাশালী কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিস। অথবা তোকে রাষ্ট্রই পাঠিয়েছে অত্যন্ত গোপন কোন উদ্দেশে”।

“ঠিক তাই। বুড়োর মনে হচ্ছে দ্বিতীয়টা”।

“সর্বনাশ, এসব কথা পাঁচকান হলে, আমরা সকলেই  ফেঁসে যাবো রে...। তা, তুই এখন কী করতে চাইছিস?”

ভল্লা ম্লান হেসে বলল, “আগেই বললাম না, যে কাজটা করতে আমি চাইছি না - সেটাই খুব তাড়াতাড়ি করাতে হবে। কবিরাজবুড়োকে সরাতে হবে”। ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “নিজের গ্রাম, প্রতিবেশী গ্রামের মানুষজন এমনকি এই রাজ্যের সকলের ভালোর জন্যে সারাজীবন চিন্তা করে গেছে যে বুড়ো। অত্যন্ত বিদ্বান, বুদ্ধিমান কিন্তু বড্ডো সরল এবং একরোখা সেই বুড়োটা মরবার সময়েও বুঝতে পারবে না,  ঠিক কী অপরাধে ওর মৃত্যু হল…”। ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ।  

মারুলা ভল্লার কাঁধে হাত রেখে বলল, “ও ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দে ভল্লা। বুড়োর আয়ু ফুরিয়ে গিয়েছে, হয়তো আগামী দিনটাই তার শেষ...”।

নিজের কাঁধে রাখা মারুলার হাতটা ধরে ভল্লা বলল, “দেখিস আমার নাম যেন কোনমতেই সামনে না আসে”

“নিশ্চিন্ত থাক, ভল্লা। তোর নাম সামনে আসবে কেন?”

“প্রশাসনের হাতে বুড়োর মৃত্যু হলে - আমার কাজটা অবশ্য এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে যাবে”।

মারুলা ভল্লার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “তোর মতো তিলে খচ্চর আমি আর দুটি দেখিনি ভল্লা। একদিকে তুই বলছিস, বুড়োকে তুই বেজায় শ্রদ্ধা করিস। অন্যদিকে তুই তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে দিলি। আবার আমাদের হাতে বুড়ো মরলে, গাঁয়ের ছেলেদের মনে যে ক্রোধ জমবে – সেটাকে ভাঙিয়ে তুই বিদ্রোহের আগুনটা আরও উস্কে নিবি। এই না হলে, তুই শালা ভল্লা?”।

ভল্লা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে বলল, “হ্যাঁ, রাজনীতি ব্যাপারটা আদতে খচ্চরদেরই সৃষ্টি। ভালো আর মন্দ, ঔদার্য আর তঞ্চকতা, সহমর্মীতা আর নিষ্ঠুরতাকে মনের মধ্যে পাশাপাশি বসিয়ে রাজনীতির চর্চা করতে হয়। তাঁর বিচক্ষণতার জন্যে রাষ্ট্রের অভিনব এই পরিকল্পনাটাই হয়তো ভেস্তে যাবে। অতএব মরতে তাঁকে হবেই। কবিরাজবুড়োর জন্যে আমি বাইরে শুধু লোক-দেখানে কাঁদব - তা নয়, মনে মনে সত্যিই কষ্ট পাবো। তবে মনে মনে একথা চিন্তা করেও সান্ত্বনা পাব যে, উনি নিজের জীবন দিয়ে আমার কাজটাকেই অনেক সহজ করে দিয়ে গেলেন। জীবনে বহুবার দেখেছি, প্রত্যেক অশুভ কাজের মধ্যেও মঙ্গল লুকিয়ে থাকে, বুঝেছিস মারুলা?” কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে, ভল্লা নিজের আবেগটা সামলে নিল, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাগ্‌গে এবার ওদিকের সংবাদ বল? শষ্পকের নির্দেশ কী?

মারুলা বলল, “আস্থানে ডাকাতির সংবাদ শষ্পক রাজধানীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেক তেলমশলা মাখিয়ে বাড়িয়ে-চাড়িয়ে। কিন্তু ডাকাতির কারণে উনি এখনই কোন গ্রামের ওপরে কোন পদক্ষেপ করতে চাইছেন না। বলছেন যে তাতে তোর নতুন চেলারা ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যাবে”।

ভল্লা মাথা নাড়ল, “না, না আমার মনে হয় এটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। আস্থানের রক্ষীদল গ্রামে এসে আমাকে পাগলের মতো খুঁজুক। সরাসরি ছেলেদের নয় – বয়স্কমানুষগুলোকে ভয় দেখাক, অপমান করুক। এক কথায় বেশ গভীর একটা সন্ত্রাসের আবহ পাকিয়ে তুলুক। বাবা-জ্যাঠার অপমান হলে গ্রামের ছেলেগুলো আরও তেতে উঠবে। শুধু এই গ্রামেই নয়, আশেপাশের গ্রামগুলোতেও। এর মধ্যেই তো কবিরাজের মৃত্যুটা হতে হবেকীভাবে সেটা তোরাই ঠিক করে নিস। আর গ্রামপ্রধান জুজাকেরও যেন ভালোরকম অপমান হয়। তবে না খেলা জমবে”।

মারুলা অবাক হয়ে ভল্লার কথা শুনছিল, ভল্লার কথা শেষ হলে বলল, “ঠিক আছে তাই বলবো। আর একটা কথা, শষ্পক বলেছেন চৈত্র মাসের পূর্ণিমাতে তিনি এদিকের আস্থান তুলে উত্তরের দিকে রওনা হবেন। তোর কথা মতো জায়গাতেই অস্থায়ী শিবির ফেলে পক্ষকাল বিশ্রাম নেবেন”।

“চৈত্রের পূর্ণিমা? গতকাল মাঘের পূর্ণিমা গেল। তার মানে মোটামুটি মাস দেড়েক। ঠিক আছে, কতদূর কী করা যায়, দেখি! আজ বিকেলেই পাশের রাজ্যের কিছু ছোকরা এসেছিল। তারাও তাদের রাজার বিরুদ্ধে লড়তে চায় এবং প্রচুর অস্ত্র-শস্ত্র কিনতে চা। শষ্পককে জিজ্ঞাসা করিস, কোন অস্ত্রের কত মূল্য ধরা হবে, সেটা যেন তিনি নির্দেশ করে দেন। অথবা যে বণিক এই অস্ত্র-শস্ত্র বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছে সে যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়, তাহলে বাকিটা আমি বুঝে নেব

“আমার মনে হয় প্রতিবেশী রাজ্যের বিদ্রোহীদের অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রির নির্দেশ রাজধানী কখনোই দেবে না। প্রতিবেশী রাজ্যের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক। তারা যদি জেনে যায়, তাদের রাজ্যের বিদ্রোহীদের আমরা অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছি, তাতে দু রাজ্যের সম্পর্ক নষ্ট হবে। নষ্ট হবে বাণিজ্যিক সম্পর্কও”।

ভল্লা একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “না বুঝেই পোঁদপাকামি করিস না তো, মারুলা। আমাদের প্রশাসন ওদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিচ্ছে নাকি?  দিচ্ছি তো আমি! আমি কে? আমি এ রাজ্যের একজন বিদ্রোহী রাজরক্ষী। আমার অপরাধের জন্যে রাষ্ট্র আমাকে অনেক দিন আগেই নির্বাসন দণ্ড দিয়েছে। আমি রয়েছি আমার রাজ্য-সীমানার বাইরে।  আমি যদি কাউকে অস্ত্র-শস্ত্র বিক্রি করি – রাষ্ট্রের দায় কোথায়?”

“তা হয়তো ঠিক। কিন্তু তুই অস্ত্র পাচ্ছিস কোথা থেকে? তোর তো আর নিজস্ব অস্ত্রের কারখানা নেই”!

মারুলার সরলতায় ভল্লা এবার হেসে ফেলল, বলল, “আমাদের রাষ্ট্রীয় অস্ত্রাগার থেকে পুরোন অস্ত্র-শস্ত্র বাতিল করে, বিশেষ কয়েকজন বণিককে বিক্রি করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বণিক সেই অস্ত্র কিনে কী করবে - মাটির তলায় পুঁতে দেবে। নাকি নদীর জলে ভাসিয়ে দেবে। নাকি খেলনার মতো ভিন্ন রাজ্যের ছোকরাদের হাতে বেচে দেবে – সে তো বণিকদের মাথাব্যথা। তাতে রাষ্ট্রের কী করার আছে? আমি, জনৈক নির্বাসিত অপরাধী হলাম, একজন মাধ্যম – যার কাজ ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সম্পূর্ণ ব্যাপারটার মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রের ভূমিকা কোথায়?”

মারুলা তাও ইতস্ততঃ করে বলল, “কী জানি আমার তাও মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা এতই সহজ? রাষ্ট্র এত সহজে দায় এড়াতে পারবে? আমাদের মন্ত্রী আর প্রশাসনিক কর্তারাই শুধু ধূর্ত – আর ও রাজ্যের প্রশাসন একেবারেই বোকাসোকা-ভোঁদাই এমন তো হতে পারে না।

“ছাড় না। আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে আমাদের কী প্রয়োজন? রাষ্ট্র কী করবে সেটা রাষ্ট্রকেই বুঝতে দে। আমাদের দায়িত্ব প্রশাসনের নির্দেশ মতো কাজ করা। ব্যস্‌। রাত্রি শেষ হতে আর হয়তো দণ্ড তিনেক বাকি আছে। তুই কেটে পড়। আমার সঙ্গে তোকে কেউ দেখে ফেললে, ভবিষ্যতে অসুবিধেয় পড়তে হবে।  শষ্পককে সব কথা জানাবি। বলবি, তাঁর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় আমি রইলাম”।

মারুলা গাছে থেকে নেমে আসার উদ্যোগ করতেই, ভল্লা বলল, “মারুলা, কবিরাজকে মেরে না ফেলে, আমাদের উচিৎ তাঁকে একটা সুযোগ দেওয়া, তাই না রে?”

মারুলা কিছু বলল না, ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল চুপ করে। ভল্লা বলল, “না মানে বলছিলাম, বুড়োকে কিছুটা মারধোর করে, আস্থানের বন্দীশালায় যদি ফেলে রাখা হয়। বিনা বিচারে। এখানে বিচার করবেই বা কে? বিচার তো হবে সেই রাজধানীতে। অতএব বিনা বিচারে দীর্ঘ দিন বন্দী। বুড়ো জব্দ হবে, কিন্তু প্রাণে তো বেঁচে থাকবে। কী বলিস?”  

মারুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভল্লাকে বলল, “ঠিক আছে, তাহলে শষ্পককে গিয়ে আমি তাই বলি?”

“কাজের সূত্রে আমি বহু মানুষের প্রাণ নিয়েছি, মারুলা। তারা কোনদিন আমার মনে দাগ কাটেনি। কিন্তু আমাদের হাতে ইনি মারা গেলে, আমার হাত থেকে ওঁর রক্তের দাগ কোনদিন মুছে উঠতে পারব না। হ্যাঁ শষ্পককে গিয়ে তাই বল, আপাততঃ বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাসই হোক ওঁনার ভবিষ্যৎ”।         

গাছ থেকে নেমে মারুলা রওনা হল আস্থানের দিকে। মারুলা নেমে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর ভল্লা রণপা জোড়া কাঁধে নিয়ে মাটিতে নামল। ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল তার বাসার দিকে। সে এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের দ্বিধাদ্বন্দ্বে তার মন এখন বিক্ষিপ্ত।

নির্দিষ্ট ঝোপের আড়ালে দুজোড়া রণপা আগে লুকিয়ে রেখে, নিজের বাসার সামনে এসে চমকে উঠল ভল্লা। রামালি! রামালি শুয়ে আছে, তার ঘরের সামনে মাটিতে। অঘোরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৬ "    


বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - শেষ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৮শ পর্ব "



৩২

রাজপ্রাসাদে দ্বিতলের প্রশস্ত অলিন্দে মহারাণি সুনীথার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষি ভৃগু এবং তাঁদের কিছুটা পিছনে দাসী পদ্মবালা। সেখান থেকে প্রাসাদে আসার প্রশস্ত রাজপথটি সম্পূর্ণ দেখা যায়। মহারাণি সুনীথা দেখছিলেন, সুসজ্জিত অশ্বশকটে রাজদম্পতির আগমন। পথের দুপাশে সশস্ত্র নিরাপত্তাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র মানবপ্রাচীর। তার দুপাশে পরিখার সীমানা পর্যন্ত জনতার কালো মাথার সারি। তাঁরা শুনছিলেন, তাদের সমবেত ও স্বতঃস্ফূর্ত জয়ধ্বনির গর্জন, “জয় মহারাজা পৃথুর জয়। জয় মহারাণি অর্চ্চির জয়”। মহারাণি নিজের আবেগকে সংযত করার চেষ্টা করছিলেন, তবু তাঁর দুই চোখে ভরে উঠল অশ্রু! মহর্ষি ভৃগু, লক্ষ্য করলেন, কিছু বললেন না।

দাসী পদ্মবালা পিছন থেকে বলে উঠল, “যাই বলো রাজকুমারী, রাজকোষের অর্থ এভাবে জলের মতো ব্যয়, মহারাজ অঙ্গ কোনদিন করেননি, বেণের অভিষেকে তুমিও করোনি। আমাদের বেণ কিন্তু সেদিক থেকে খুব মিতব্যয়ী ছিল। সেও কী পারতো না, এরকম জাঁকজমক করতে? তার অভিষেকের সময় এত জনসমাগমও হয়নি, তাই না রাজকুমারী?”

রুদ্ধকণ্ঠে মহারাণি সুনীথা বললেন, “চুপ কর পদ্ম, চুপ কর। সে অভিষেকের সঙ্গে এ অভিষেকের বিস্তর পার্থক্য, তুই কী বুঝিস রাজনীতির?”

“তা বুঝিনা, আমার আর এ বয়সে বুঝে কাজও নেই। যা মনে হল, বললাম, সে তুমি যাই মনে করো রাজকুমারী”।

সেকথার কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথা, তিনি নিজের মনেই যেন বললেন, “রাজা অঙ্গের অন্তর্ধানের পর থেকে এই রাজ্য যেন রাহুগ্রস্ত ছিল। বেণের জোরাজুরিতে আমিই তাকে তার পিতার সিংহাসনে বসার অনুমতি দিয়ে অভিষেকের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের কেউই সেটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, না মন্ত্রীমণ্ডলী, না জনগণ। এমনকি আমিও!”

“কী বলছো, রাজকুমারী, তুমি বেণের মা, তুমিও মন থেকে চাওনি?”

“মহারাজ অঙ্গের মতো অজাতশত্রু প্রজাপিতা এক রাজা কেন অন্তর্ধান করলেন? তাঁর এমন পরিণতি আদৌ প্রাপ্য ছিল না। তাঁর এই আকস্মিক অন্তর্ধানের রহস্য আমার কাছে আজও স্পষ্ট হল না। হয়তো হবেও না কোনদিন। তিনি যদি আমার এবং পুত্রের প্রতি ক্ষোভে, অভিমানে সত্যিই বাণপ্রস্থে গিয়ে থাকেন, আমার কাছে সে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। মহর্ষি ঠাকুর, শুনেছি, পত্নীকে সঙ্গী করেই বাণপ্রস্থে যাওয়ার বিধান আছে আপনাদের শাস্ত্রে! মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থে গিয়েই থাকেন, তিনি আমাকে একবার বলারও প্রয়োজন মনে করলেন না? আমি অধর্মের কন্যা, কিন্তু আমাদের দীর্ঘ দাম্পত্যে তাঁর সেবায় কোনদিন কোন ত্রুটি করেছি, কিংবা তাঁকে অসম্মান করেছি এমন তো স্মরণে আসছে না! আমার প্রতি তাঁর আচরণেও কোনদিন কোন দ্বেষ বা বিরক্তি তো অনুভব করিনি। তাহলে? তিনি কী বাণপ্রস্থে আদৌ যাননি? কী হল তাঁর? কোথায় গেলেন? ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পুত্র বেণ একবার যে কথার ইঙ্গিত দিয়েছিল, সেই কী তবে তাঁর শেষ পরিণতি...কিন্তু সে কথা...?”

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন একটু অধৈর্যের সঙ্গেই বললেন, “মহারাণি, আপনি শান্ত হোন, অনর্থক অস্পষ্ট অতীতের কথা চিন্তা করে, নিজেকে পরিতপ্ত করবেন না। আজকের মতো এক মঙ্গললময় দিনে আপনার এই শোকবিলাপ মানায় না। আপনার একমাত্র পুত্র বেণের মানসপুত্র, পৃথুর আজ রাজ্যাভিষেক এবং বিবাহ। মহারাজা অঙ্গের কৃতজ্ঞ প্রজারা আজ আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তারা দুহাত ভরে অভিষিক্ত রাজদম্পতিকে উপহার দিয়েছে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজকরে, কোষভাণ্ডার পূর্ণ, উদ্বৃত্ত। তাদের আন্তরিক আশীর্বাদের ধ্বনি আপনি শুনতে পাচ্ছেন, মহারাণি”। মহারাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুর এই কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন।

কিছুক্ষণ পর মহর্ষি ভৃগুর চোখে চোখ রেখে বললেন, “এই আয়োজন ও অনুষ্ঠানের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ, মহর্ষিঠাকুর। এমন রাজসিক আয়োজন মহারাজ অঙ্গের প্রাসাদের উপযুক্ত। কিন্তু মহর্ষিঠাকুর, আমি জানি পৃথু ও অর্চ্চি কোন অবতার নয়, ওরা আমার পুত্র বেণের মানসপুত্রও নয়। এ সমস্তই আপনার বানিয়ে তোলা, সাজানো ঘটনা”। মহর্ষি ভৃগু কোন উত্তর দিলেন না, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

একটু থেমে মহারাণি আবার বললেন, “আপনিও জানেন না, মহর্ষি ঠাকুর, আমিও জানি না – রাজা পৃথু মহারাজ অঙ্গের যোগ্য উত্তরাধিকারী হতে পারবে কি না! যদি না হয় আপনার এই প্রয়াস ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে”।

মহর্ষি ভৃগু মহারাণি সুনীথার চোখে চোখ রেখে বললেন, “আপনি তো জানেন, মহারাণি, আপনার পুত্র বেণ, মহারাজা অঙ্গের অত্যন্ত অযোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন, তাঁর মাত্র ঊণিশ মাসের শাসনকালেই রাজ্যের সর্বত্র হাহাকার শুরু হয়ে গিয়েছিল”।

ক্রোধে মহারাণি সুনীথার দুই চোখ ঝলসে উঠল, তিনি রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন, “আপনি, একজন মাতার সামনে পুত্রের নিন্দা করছেন, মহর্ষিঠাকুর, আপনার এত ঔদ্ধত্য?”

মহর্ষি ভৃগু অত্যন্ত শান্তস্বরে বললেন, “না, মহারাণি, আমি এই রাজ্যবাসীর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মাতার কাছে, এক দুর্ধর্ষ অত্যাচারী রাজার সমালোচনা করছি। যে রাজার কারণে মহারাণি নিজেও অত্যন্ত মনঃকষ্টে ছিলেন”।

মহারাণি অনেকক্ষণ কোন কথা না বলে মহর্ষি ভৃগুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর শান্তস্বরে বললেন, “হে মহর্ষিঠাকুর, আপনি আমার স্বামী মহারাজ অঙ্গের অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রিয়সখা ও মন্ত্রণাদাতা। অনেক দুঃখে-কষ্টে বিপদে-আপদে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। সেকথা ভুলিনি মহর্ষিঠাকুর! এবারেও অনুপস্থিত প্রিয়সখা মহারাজ অঙ্গের বংশমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে আপনি অজস্র ষড়যন্ত্র এবং ছলনার আশ্রয় নিলেন। একমাত্র পুত্র বেণের মাতা হয়ে, আপনাকে অভিশাপ দেওয়াই আমার উচিৎ ছিল, কিন্তু আমার এই পুত্রের মাতা হওয়ার পিছনেও ছিল, আপনার ছলনা। আপনি ধর্ম পথের পথিক হয়েও বারবার এত ছলনার আশ্রয় নেন, কোন ধর্মমতে?” মহারাণি সুনীথার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল আবেগে!

মহর্ষি ভৃগু অস্ফুট স্বরে বললেন, “মহারাণি, রাজদম্পতি নীচেয় এসে গেছে, আপনার আশীর্বাদের জন্য অপেক্ষা করছে, আপনি বরণ করবেন না?”

“বরণ? আমি বরণ করবো? কোন সম্পর্কে মহর্ষি ঠাকুর?”

“পিতামহী”।

“পিতামহী?” মহারাণি সুনীথা মাথা নত করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর চেঁচিয়ে বললেন, “পদ্ম, বরণডালা কোথায়, এখনই নীচেয় যা, বরণডালা সাজা, দীপ জ্বালা...আমি আসছি। ছেলেমেয়ে দুটোকে বরণ করতে হবে না?” দাসী পদ্মবালা আকস্মিক এই আদেশে দৌড়ে নীচেয় চলে গেল। পদ্মবালা চলে যাওয়ার পর মহারাণি সুনীথা মেঝেয় বসে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন মহর্ষি ভৃগুকে।

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “আপনাদের ভগবান বিষ্ণুকে আমি জানি না, শুনেছি তাঁকে প্রত্যক্ষ করা দুঃসাধ্য! মহর্ষিঠাকুর, আপনার মহাপুণ্যময় প্রবোধিনী একাদশী তিথির কপট যজ্ঞ অনুষ্ঠানকালেও, আমি মনকে এই বলে প্রবোধ দিয়েছি, আপনি যা কিছু করছেন, সব কিছুই মহারাজ অঙ্গ এবং তাঁর আপামর রাজ্যবাসীর কল্যাণের জন্যই করছেন। অতএব আমার উপলব্ধিতে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু না থাকুন, আমার কাছে আপনিই তাঁর অবতার – কপট, লীলাময়, অপ্রতিরোধ্য - কিন্তু আশ্চর্য মঙ্গলময়। আপনি যা কিছু করেন আমাদের মঙ্গলের জন্যই করেন”।

একটু বিরতি দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহারাণি সুনীথা আবার বললেন, “আমায় অনুমতি দিন, মহর্ষি ঠাকুর, আমি নীচেয় গিয়ে ছেলেমেয়েদুটিকে বরণ করি। আপনার অনুগ্রহে আমিই তো এখন এ রাজ্যের রাজপিতামহী...!” এই কথা বলে মহারাণি ধীর পদক্ষেপে চলে গেলেন নিম্নগামী সোপানের দিকে।  

 

তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মহর্ষি ভৃগু বরাভয় মুদ্রায় ডান হাত তুলে, অস্ফুট স্বরে আশীর্বাদ করলেন মহারাণি সুনীথাকে। দ্বিতলের এই প্রশস্ত অঙ্গন এখন দ্বাদশীর জোৎস্নায় প্লাবিত। মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন – নিঃসঙ্গ দ্বাদশীর চাঁদ এখন আকাশে বিরাজমান এবং এখন এই রাজ্যে, এই প্রাসাদে তিনিও একা এবং নিঃসঙ্গ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কলঙ্কযুক্ত কিন্তু প্রায়-পূর্ণ চন্দ্রের দিকে।   

 

সমাপ্ত

 

[গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগের পঞ্চবিংশতি শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,

“মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ”।।

অর্থাৎ, মহর্ষিদের মধ্যে আমিই ভৃগু, সমস্ত বাক্যের মধ্যে আমিই একাক্ষর প্রণব, সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে আমিই জপযজ্ঞ, সমস্ত স্থাবরের মধ্যে আমিই হিমালয়।

গীতার দশম অধ্যায়ঃ বিভূতি যোগ – পড়ে নিতে পারেন - গীতা - ১০ম পর্ব ]


সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৪

    এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৩  



২০

 নোনাপুর গ্রামের সীমানার বাইরেই ঘন একটা ঝোপের আড়ালে মারুলা রয়ে গেল। ভল্লা তার কাছেই রণপাজোড়া রেখে পায়ে হেঁটে গ্রামের ভেতরে ঢুকল। ঘন গাছপালার আড়ালে, বিড়ালের মত নিঃশব্দ পায়ে দৌড়ে চলল গ্রামপ্রধানের বাড়ির পিছনদিকে। জ্যোৎস্না রাত, ঝিঁঝিঁর একটানা শব্দ আর গাছের পাতায় পাতায় হাওয়ার মর্মর-রব ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই। পাড়ার কুকুরগুলোও আজ রাত্রে চুপচাপ। তারাও হয়তো বোঝে এ গ্রামে আজ শোকের পরিবেশ। সারাদিন ঘরে ঘরে আজ একটাই আলোচনা – হানোর মৃত্যু। সারাদিনের পর এই চাঁদনি রাতও আজ যেন সকলের কাছে অশুভ। কোথাও একটা পেঁচা দুবার ডেকে উঠল গম্ভীর সুরে। তারপরেই হঠাৎ ডেকে উঠল একটা দাঁড় কাক। সে শব্দে অবাক হল গাছের ডালে বসে ঘুমিয়ে থাকা কাকগুলো। পেঁচাটাও যেন ভয় পেয়ে নিঃশব্দে উড়ে গেল দূরের পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের দিকে।

কমলিমা ঘরের দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন। ঘরের পিছনে এসে দেখতে পেলেন বড়ো একটা গাছের ছায়ায় ভল্লা দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত পায়ে ভল্লার কাছে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কমলিমা, ভল্লা ইশারা করল চুপ। তারপর কমলিমায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল, একটু দূরে। ছায়াময় বিশাল এক বটগাছের তলায় নিয়ে গিয়ে মোটা একটা শিকড় দেখিয়ে বলল, “এই খানে বস মা, কেমন আছিস বল”? তারপর নিজে বসল কমলিমায়ের পায়ের কাছে।

“আমার কথা ছাড়, তুই কেমন আছিস বল? এতদিন পর তোর কমলিমাকে মনে পড়ল?

মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ভল্লা, তারপর মুখ তুলে বলল, “ভাল আছি তো বলতে পারবো না, মা। সে কথা বললে মিথ্যে বলা হবে। তোর কাছে যে কদিন ছিলাম, বড়ো নিশ্চিন্তে আর স্বস্তিতে ছিলাম। এখন চলে যাচ্ছে, কোন মতে। নির্বাসনে থাকা একজন অপরাধীকে তো এভাবেই থাকতে হবে, মা”। কমলিমা ভল্লার মাথায় হাত রাখলেন। তার চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাঁর বড় পুত্রকেই যেন অনুভব করলেন। অন্ধকারে দেখতে না পেলেও ভল্লা বুঝতে পারল, কমলিমায়ের দুচোখ এখন জলে ভরে উঠেছে।

“প্রধানমশাই ভাল আছেতো?”

“হুঁ। ভালোই আছে”।

“প্রধানমশাই যে আস্থানের আধিকারিককে কিছু কর ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, সেটার কী হল, কিছু জানিস, মা?”

“দেয়নি। গ্রামের লোক তোকে আশ্রয় দিয়েছে। চিকিৎসা করে তোকে সারিয়ে তুলেছে। এসব শুনে রাজা নাকি বলেছে এই গ্রামের জন্যে কোনরকম দয়া বা অনুগ্রহ দেখানো যাবে না”।

ভল্লা কিছু বলল না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল।

কমলিমা হঠাৎ ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন, “সেই জন্যেই তো তোর ওপরে ওদের খুব রাগ”।

“কাদের, মা?”

“প্রধান আর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা”!

ভল্লা হেসে ফেলে বলল, “তুই বড্ডো বাড়িয়ে বলিস মা। রাগ কেন করতে যাবেন? হ্যাঁ বিরক্ত হতেই পারেন। একটা মরণাপন্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাষ্ট্রের রোষদৃষ্টিতে পড়া...। একদিকে বিবেক বলছে যা করেছি ঠিক করেছি, আর অন্যদিকে বাস্তববুদ্ধি বলছে, বিবেক দেখিয়ে পোঁদপাকামি করার কী দরকার ছিল? এখন তার ফল ভোগ করো...”।

কমলিমা অবাক হয়ে গেলেন ভল্লার কথায়, তিনি আলো-আঁধারিতে ভল্লার মুখের দিকে তাকালেন। ভাবলেন ছোঁড়ার আশ্চর্য চিন্তাশক্তি তো! তিনি এভাবে কখনো ভাবতে পারেননি। তিনি ঘরে থাকেন, কাজকর্ম করেন, গ্রামের মধ্যেই তাঁর সীমানা। তাঁর চিন্তা একমুখী। কিন্তু প্রধান বা কবিরাজদাদার তো তা নয় – তাঁদের চাষবাস করতে হয়, বাইরের লোকজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় রাখতে হয়। এই গ্রামের সকল মানুষের স্বার্থ চিন্তা করে, গ্রামবাসীদের হয়ে রাজাধিকারিকদের সামনে গিয়েও তাঁদের দাঁড়াতে হয়। তাঁদের বিবেক এবং বাস্তব বিবেচনা – দুই কূল সামলে চলতে হয় বৈকি

“চুপ করে কেন, মা? কি ভাবছিস, বল তো? যাগ্‌গে ওসব কথা ছাড়, হানোর বাড়ির কী পরিস্থিতি? শুনলাম হানো নাকি সাপের কামড়ে মারা গেছে?”

ভল্লার আগের কথায় কমলিমায়ের মনটা একটু নরম হয়েছিল, এখন এই প্রশ্নে তিনি আবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে বললেন, “সে কথাই তো বলছি, আজ সন্ধের সময় কবিরাজদাদা এসেছিল, প্রধানের সঙ্গে অনেক কথা বলল। কিন্তু দুজনের কেউই হানোকে নিয়ে একটা কথাও বলল না। অমন একটা জলজ্যান্ত তরতাজা ছেলে চোখের সামনে মরে গেল – দুজনের কারো মনেই যেন হেলদোল নেই”!

ভল্লা হেসে ফেলল, বলল, “আজ দেখছি খুব রেগে আছিস মা? কী ব্যাপার বল তো? কী বলল কবিরাজবুড়ো?”

ভল্লার কথাটা কমলিমায়ের বেশ মনঃপূত হল, বললেন, “যা বলেছিস। বুড়ো তো বুড়োই – মনে হয় ভীমরতি ধরেছে। যতসব মনগড়া কথা বলে প্রধানের আর আমার মনে বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। আমাকে বোঝাতে পারেনি, তবে প্রধানের মাথাটি মনে হয় চিবিয়ে ফেলেছে”।

ভল্লা একটু জোরে হেসে উঠেই সতর্ক হয়ে গলা নামিয়ে বলল, “বলিস কী মা? কবিরাজবুড়ো ওষুধ না দিয়ে এখন সাপের মতো বিষঢালছে নাকি? তা সে বিষ কেমন একটু শুনি”।

“তুই হাসছিস? কী বলেছে শুনলে তুই চমকে যাবি। বলে কিনা আমাদের গ্রামের কোন ছেলেই নাকি কাল পাশের রাজ্যে রামকথা শুনতে যায়নি? তারা আস্থানে গিয়েছিল ডাকাতি করতে। গতকাল রাত্রে আস্থানে ডাকাতি হয়েছে শুনেছিস তো? কবিরাজদাদা বলল, ডাকাতের দল সেখানকার তিনরক্ষীকে নাকি মেরে ফেলেছে! হরে দরে যা বোঝাতে চাইল, সে সব নাকি আমাদের এই গ্রামের ছেলেদেরই কাজ”।

ভল্লা খুব সতর্ক দৃষ্টিতে কমলিমায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এবং অবাক হল কবিরাজবুড়োর আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতায়। তবু খুব হাল্কা চালে বলল, “আচ্ছা? ছেলেরা রামকথা শুনতে না গিয়ে, আস্থানে গেছিল ডাকাতি করতে – এ সংবাদটা তোর কবিরাজদাদা কী করে টের পেল বল তো? কবিরাজবুড়ো কী আজকাল জ্যোতিষচর্চাও শুরু করছে নাকি?”

“কে জানে? বুড়োর মাথায় যত রাজ্যের কুচুটে চিন্তা দিনরাত কিলবিল করছেপুঁইয়ে সাপের মতো। প্রধানকে বললে, ছোকরাদের অত বড়ো দলকে একসঙ্গে কোনদিন রামকথার আসরে যেতে দেখেছ? সে আমাদের গ্রামেই হোক বা পড়শি গ্রামে? তারা কিনা ঠিক কালকেই দল বেঁধে জঙ্গল পার হয়ে এতটা পথ হেঁটে পাশের রাজ্যে গেল রামকথা শুনতে? আচ্ছা, ছেলে ছোকরাদের মতিগতি কি আমাদের মতো বুড়ো-বুড়ীদের ভাবনা-চিন্তার মতো হবে? তাদের মাথায় কখন কোন বাই চাপে কে বলতে পারে?” ভল্লা নিঃশব্দে শুনতে লাগল কমলিমায়ের কথা। তার দৃষ্টি এখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। কবিরাজবুড়ো অত্যন্ত বুদ্ধিমান – সন্দেহ নেই। কিন্তু এত সব বুঝে ফেলে তিনি যে নিজের সমূহ বিপদই ডেকে আনছেন – সেই কথাটা বুড়ো বুঝছেনা কেন?  

কমলিমা কিছুটা উত্তেজিত সুরে আরও বললেন, “কত কি আবোল-তাবোল যে বকে গেল – শুনলে তোর মাথা গরম হয়ে যেত ভল্লা! বলে কিনা রাজধানীতে মারধোর খেয়ে, তুই যে রাত্রে রওনা হয়েছিলি – আর এখানে এসে তুই যেদিন ভোরে পৌঁছলি –  হেঁটে এলে ওই সময়ের মধ্যে পৌঁছনো নাকি কক্‌খনো সম্ভব নয়”।

ভল্লা মনে মনে চমকে উঠল। কবিরাজবুড়ো যে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে দৌড়ে চলেছেন, এখন তার মনে আর কোন সন্দেহ নেই। তবু চোখেমুখে মুচকি হাসির রেশ ধরে রেখে বলল, “তোর কবিরাজদাদা, শুধু চিকিৎসার কবিরাজ নয় মা, কবিরাজ – মানে কল্পনা দিয়ে কাব্য রচনার কবিরাজও বটে”!

কমলিমা সে কথায় কান না দিয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ আরও বলল, ডাকাতি মানে আমরা জানি ডাকতরা টাকা-পয়সা, শস্য-টস্য, অস্ত্র-শস্ত্র যা পায় সবই লুঠ করে। কিন্তু আস্থান থেকে নাকি শুধু অস্ত্র-শস্ত্রই ডাকাতি হয়েছে? সত্যি? তুই জানিস?”

নিরীহ গলায় ভল্লা বলল, “আমি কী করে জানব বল তো, মা?”  

কমলিমা কেমন এক ঘোরের মধ্যে বলে চললেন, “এ কেমন ডাকাতি কবিরাজদাদা বুঝতে পারছেন না। আমি একবার ঝেঁজে উঠেছিলাম। বললাম, ছেলেটা গাঁয়ের আলসে আর ঝিমোনো ছেলেদের নিয়ে দল বানিয়ে তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করে তুলছে। মাথা খাটিয়ে নালায় বাঁধ দিয়ে চাষের নতুন জমি বানিয়ে তুলল। সেই ছেলেকে নিয়ে তোমরা এভাবে বদনাম করছ?”

ভল্লা কিছু বলল না, অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল কমলিমায়ের মুখের দিকে। কমলিমায়ের থেকে যতটুকু জানার সে জেনে গেছে, বুঝে গেছে। এবার তাকে ফিরতে হবে।

ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তুই এবার ঘরে যা, মা। অনেকক্ষণ বাড়ির বাইরে আছিস। আমিও পালাই। কেউ দেখে ফেললে আরও অনেক কথা উঠবে। তুই এবং প্রধান দুজনেই বিপদে পড়বি”।

কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন, ধরা গলায় বললেন, “তোর জন্যে কত রাত যে জেগে কাটিয়েছি...এতদিনে তোর মায়ের কথা মনে পড়ল? কোথায় আছিস, কী খাচ্ছিস কিছুই তো জানা হল না। কী সব আজেবাজে কথায় সময়টা পার হয়ে গেল। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, তোর নিজের বাড়ি কোনদিকে রে?”

ভল্লা খুবই সতর্ক হয়ে উঠল কমলিমায়ের এই প্রশ্নে, বলল, “কেন বল তো? রাজধানী থেকে পূবে”।

“বুড়োটা তার মানে ঠিকই বলেছে”।

ভল্লা উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, “কী ঠিক বলেছে, রে মা?”

একটু আনমনা হয়ে কমলিমা বললেন, “বলল, তোর নির্বাসন দণ্ড যদি হয়ে থাকে, তাহলে রাজধানী থেকে রাজ্যের পূর্বসীমান্ত তো কাছে – সেদিকে না গিয়ে এত দূরে পশ্চিমসীমান্তে তুই এলি কেন? আমার সামনে আর কিছু বলতে সাহস পায়নি। বুড়োর বাড়ি ফেরার সময় প্রধান তার সঙ্গে গিয়েছিল একটু এগিয়ে দিতে। তাকে নাকি বলেছে – তোর এই নির্বাসন-টির্বাসন একদম মিথ্যা কথা, তুই এসেছিস প্রশাসনেরই কোন কাজে…”।

ভল্লা এবার রীতিমত বিভ্রান্ত বোধ করতে লাগল। কমলিমা এসব নিয়ে তাকে সরাসরি কোন প্রশ্ন করলে, তার পক্ষে সব কিছু ঢেকেঢুকে, সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যে বলা এখনই তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। অতএব সে হাসতে হাসতে কমলিমাকে থামিয়ে দিল, বলল, “তোর ওই বুড়ো কবিরাজদাদা হয় গাঁজা খায় নয়তো আফিং। কবিরাজ তো, ওরা ভালই জানে কোন গাছ-গাছড়ায় নেশা জমে ওঠে – সন্ধের মুখে এসেছিল বললি না, মা? তার আগেই চড়িয়ে এসেছে…” আবার খানিক হাসল ভল্লা, তারপর বলল, “তোর থেকে এমন মজার গল্প আরও শুনব মা, তবে আজ নয়, পরে আরেকদিন। আজ চলি রে, মা, তুইও ঘরে যা, প্রধান টের পেলে খুব রেগে যাবে”।            

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিমা উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আবার কবে আসবি?”

ভল্লা হাসল, বলল, “যত শিগ্‌গির পারি আসব, মা। তুই ভাবিস না। এখন যা। আরেকটা কথা আমার সঙ্গে তোর যে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে – একথা কাউকে বলবি না, মা। প্রধানকেও না। আমার দিব্ব্যি দিলাম”।

“এই মাঝরাতে ওভাবে কেউ দিব্ব্যি দেয়, তাও মায়ের কাছে…হতভাগা, মুখপোড়া…? বলতে বলতে বিরক্ত মুখে কমলিমা ত্রস্ত পায়ে ঘরের আড়ালে চলে গেলেন। ভল্লা নিঃশব্দ দ্রুততায় দৌড়ে চলল, গ্রামের সীমানায় – যেখানে মারুলা তার জন্যে অপেক্ষা করছে।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৫ "


নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...