উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব "


২৭

 অনেকক্ষণ নির্বাক অপেক্ষার পর মহামন্ত্রী বিমোহন অস্ফুট স্বরে বললেন, “আমার ধারণা আমরা সকলেই এখন তাঁর আবাহনের জন্য প্রস্তুত। আমাদের মনে যেটুকু দ্বিধার কুয়াশা ছিল, সে সব কেটে গেছে! আপনি আমাদের এখন কী নির্দেশ করবেন, মহর্ষি?”

মন্ত্রীসভার বাকি মন্ত্রীমণ্ডলীও একবাক্যে বলে উঠল, “আমরা প্রস্তুত, মহর্ষি। আপনি আদেশ করুন আমাদের এখন কী কর্তব্য!”

মহর্ষি ভৃগু গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করলেন, “চারমাস নিদ্রার পর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জাগরণ হয় যে তিথিতে, সেই প্রবোধিনী একাদশী তিথিতে আমরা তাঁকে এবং মাতা লক্ষ্মীকে বরণ করবো। তার চারদিন পর, পুণ্য কার্তিকী পূর্ণিমায় হবে তাঁর রাজ্য অভিষেক। কার্তিকী পূর্ণিমার মতো শুভ তিথি, সম্বৎসরে স্বল্পই আছে, কিন্তু এই বর্ষে পূর্ণিমার চন্দ্রক্ষেত্রে রোহিণী নক্ষত্রের অবস্থানের জন্য, ওই তিথির মহিমা আরও শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শ্রীবিষ্ণু ভগবানেরও ওই দিনটিতেই প্রকট হবার বাসনা!”

মহামন্ত্রী বিমোহন জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার এই বিশ্বাসের কারণ কী, মহর্ষি?”

মহর্ষি ভৃগু অদ্ভূত এক আবেগ নিয়ে বললেন, “তাই যদি না হবে, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, এই সময়েই কেন একের পর তাঁর অবতরণের অনুকূল ঘটনা ঘটে চলেছে! রাজাবেণের অসুস্থ হওয়া! অজানা সেই তপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী, তাঁর প্রভাবে রাজ্যময় চারণদলের গান! মহারাণি সুনীথার রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি চাওয়া! আমার ধারণা... না, না ধারণা নয়, বিশ্বাস – তিনি এইভাবেই তাঁর আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিচ্ছেন!”

মন্ত্রীমণ্ডলী সকলেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, করজোড়ে সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

তাঁদের উচ্ছ্বাস দেখে মহামন্ত্রী বিমোহন মনে মনে বিরক্ত হলেন, কিন্তু বিরক্তি গোপন করে বললেন, “তিনি স্বয়ং যখন আবির্ভাবের প্রস্তুতি নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আমাদের আর কী করণীয় আছে? তাঁর নির্দিষ্ট সময়েই তিনি নিজেই অবতীর্ণ হবেন”!

মহর্ষি ভৃগু কখনো বিরক্ত হন না, অথবা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করেন না। কিন্তু এখন তিনি স্পষ্টতঃই বিরক্তির স্বরে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, আপনার মুখে এ কথা শোভা পায় না!  আপনিও কি রাজা বেণের প্রভাবে অধর্মে বিশ্বাসী হলেন? আপনি বৃদ্ধ, আপনি প্রজ্ঞাবান্‌ - আপনি কি জানেন না, ঈশ্বরের অবতারকেও আবাহন করে আনতে হয়?  আর্তজনের আগ্রহেই তিনি ধরিত্রীতে অবতীর্ণ হন। ভক্তদের আন্তরিক ও একনিষ্ঠ আরাধনায় বিচলিত হয়েই তিনি এর আগেও  এসেছেন, - চরম বিপন্ন সাহায্যপ্রার্থী দেবতা এবং নরকুলকে রক্ষা করতে! মৎস্য, বরাহ, নৃসিংহ ও কূর্মরূপে এসেছেন, এর পরেও বারবার আসবেন! কিন্তু আমাদের তো তাঁর কাছে আকুল প্রার্থনা জানাতেই হবে!”

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে সন্দেহের দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁরা আবারও সমস্বরে বলে উঠলেন, “জয় ভগবান শ্রীবিষ্ণুর জয়!”

মন্ত্রীমণ্ডলীতে সকলের মনোভাব এবং মহর্ষি ভৃগুর বিরক্তি উপলব্ধি করে, মহামন্ত্রী বিমোহন নিজেকে সমর্পণ করে বললেন, “হে মহর্ষি, বিজ্ঞজনেরা বলেন, যে কোন তত্ত্ব বিশ্বাস করার আগে, অন্তর থেকে সকল সংশয় দূর হওয়া উচিৎ! আমার কৌতূহলে যদি আপনার বিরক্তির উদ্রেক হয়ে থাকে, সে জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। কিন্তু, এখন আমার মনে আর কোন দ্বিধা নেই, আপনি নির্দেশ করুন, এখন আমাদের কী করণীয়!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাণি সুনীথাকে অবিলম্বে রাজ্য পরিচালনা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। মন্ত্রীমণ্ডলীর এই সিদ্ধান্তের কথা আমি আজই মহারাণিকে অবহিত করাব। মহারাণি এই প্রাসাদ-পরিসরের মধ্যে থাকলে, রাজ্যের সমস্যার কথা তাঁর কর্ণগোচর হতেই থাকবে। অতএব আমার প্রস্তাব, মহারাণি সুনীথা সপুত্র নবনির্মিত উদ্যান বাটিকায় গিয়ে অবস্থান করুন। তাঁদের নিরাপত্তা, যাবতীয় সুখসুবিধা এবং সুচিকিৎসার এতটুকু অবহেলাও, সেখানে যেন না হয়, সেদিকে আপনাদের দৃষ্টি দিতে অনুরোধ করবো”।

মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “কিন্তু মহারাণি প্রাসাদ ছাড়তে সম্মত হবেন কি?”

জলদগম্ভীর স্বরে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “সে দায়িত্ব আমার, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! উদ্যান বাটিকাকে মহারাণি ও রাজার বাসযোগ্য করে তুলতে আপনাদের কতদিন লাগবে, বৎস বৃষভান্‌?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “তিন থেকে চারদিনের মধ্যে সকল আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফেলতে পারবো, মহর্ষি”।

“অতি উত্তম। মহারাণি সুনীথা এবং অসুস্থ রাজা বেণকে বহন করার মতো অশ্বশকটের আয়োজন করতেও ভুলবেন না। আচ্ছা, ওখানে রাজবৈদ্য এবং সেবিকাদের বাসের উপযুক্ত কক্ষ রয়েছে তো?”

“কক্ষের কোন অভাব নেই, মহর্ষি, কোন আয়োজনেরই কোন ত্রুটি হবে না”।

“নিশ্চিন্ত হলাম, বৎস। এদিকে এই প্রাসাদে রাজ অভিষেকের আয়োজন শুরু করুন। বন্ধু এবং শত্রু নির্বিশেষে ভারতভূমির সকল রাজাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। এই নগরের সকল ব্রাহ্মণ, বণিক ও সম্ভ্রান্ত প্রজাদের আমন্ত্রণ করবেন। রাজা বেণের অভিষেক আয়োজনের থেকেও এই অনুষ্ঠানকে অনেক বেশি আড়ম্বরপূর্ণ করে তুলতে হবে, এ কথা সর্বদা মনে রাখবেন। অর্থীদের দানের জন্য পর্যাপ্ত সবৎসা গাভী, সুবর্ণমুদ্রা, শস্য সংগ্রহ শুরু করুন”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই মহর্ষি ভৃগুর নির্দেশে সম্মত হয়ে বললেন, “আপনি নিশ্চিন্ত হোন, মহর্ষি, মহারাজ পৃথুর অভিষেক আয়োজনে কোন ত্রুটি হবে না। কিন্তু প্রবোধিনী একাদশীর অনুষ্ঠান? ওইদিনই তো মহারাজ পৃথু ও তাঁর পত্নী মহারাণি অর্চ্চির আবির্ভাব হবে!”

“সে আয়োজনের সকল দায়িত্ব আমার! কতিপয় ঘনিষ্ঠ পুণ্যাত্মা ছাড়া ওই যজ্ঞ অনুষ্ঠানে কেউ উপস্থিত থাকবেন না। যেই যজ্ঞে কারা উপস্থিত থাকবেন সে আমি আপনাদের জানিয়ে দেবো। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আবির্ভাব হবে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর আড়ালে, সেখানে কোন অবহেলা যেন না হয়!”

“হবে না, মহর্ষি!”

“অতি উত্তম। আমি নিশ্চিন্ত হলাম”। একটু বিরতির পর, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “ভোজনের কোন আয়োজন নেই?”

“অবশ্যই থাকবে, মহর্ষি”!

মহর্ষি ভৃগু স্মিতমুখে বললেন, “ওঃ। আমি অভিষেকের ভোজনের কথা বলছি না, বৎসগণ, আজকের কথা বলছি। মধ্যাহ্ন বহুক্ষণ অতিক্রান্ত, আপনারা কি ক্ষুধামান্দ্যে ভুগছেন? এখনো ভোজনের আয়োজন করছেন না!”

মহর্ষির কথায় প্রথমে সকলেই হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন, তারপর সকলেই হাসতে হাসতে বললেন, “এতক্ষণ আপনারই অনুমতির অপেক্ষা করছিলাম, মহর্ষি। সে আয়োজনও প্রস্তুত”! 


চলবে...







শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮ 


১৫

 

যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র রাখার জন্যে ভল্লা তার নির্বাসন কুটির থেকে কিছুটা দূরে দুটি বিশাল গাছ নির্দিষ্ট করেছিল। সেই গাছের মাঝামাঝি উচ্চতায় দুটি শক্তপোক্ত মাচানও সেই বাঁধিয়ে রেখেছিল। ঘন পাতার আড়ালে সে মাচানের অবস্থান যথেষ্ট গোপন। ভূমি থেকে উপরের দিকে তাকালে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। গাছগুলিতে গুটি গুটি ফল হয়। সে ফল মানুষ কিংবা বাঁদরের ভক্ষ্য নয়। অতএব বাইরের উপদ্রব মুক্ত। হেমন্ত বা শীতেও সে গাছদুটির পাতা ঝরে না, চিরহরিৎ।

মধ্যরাত্রি শেষের দণ্ড দেড়েক আগেই সেই গন্তব্যে পৌঁছে, টানা-শকটদুটি খালি করে সমস্ত অস্ত্র সম্ভার উঠে গেছে, দুই গাছের দুই মাচায়। অতএব এতক্ষণে অস্ত্র অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করল ভল্লা। সকলকে ডেকে চাপা স্বরে বলল, “ছেলেরা, আমাদের আপাততঃ কাজ শেষ, এই স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আমরা দণ্ড দুয়েক বিশ্রাম নেব। তারপর ঊষাকালে যে যার বাড়ি ফিরে যাবি”। ছেলেরা ভল্লাকে ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে নানান কথাবার্তা বলতে লাগল। সকলেই প্রথম এই অভিযানের সাফল্যে গর্বিত, উচ্ছ্বসিত। একজন বলল, “ভল্লাদাদা, রাজার রক্ষীরা কোন ভুট্টার রুটি খায় গো? গুটিচারেক লোক ছাড়া কেউ আটকাতেই এল না! এই রক্ষীদের নিয়ে রাজ্য শাসন চলে?”

ভল্লা হাসল, কোন উত্তর দিল না। অন্য আরেকজন বলল, “সত্যিই, আস্থান থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুঠ করা যে এত সহজ হবে, কে জানত? যাবার সময় আমার তো রীতিমতো হাত-পা কাঁপছিল। ফুস্‌, গিয়ে দেখলাম কিছুই না, ছেলের হাতের মোয়া”!

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “এই অভিযানটাকে তেমন গুরুত্ব দিস না। এর পরের অভিযানগুলোতে টের পাবি, লড়াই কাকে বলে। কী ভাবে সত্যিকার লড়াই লড়তে হয়। এসব কথা এখন থাক। মন থেকে এই অভিযানের কথা সম্পূর্ণ সরিয়ে দে। বাড়ি গিয়ে বাবা-মা ভাইবোন যখন প্রশ্ন করবে কী জবাব দিবি, সেটা এখনি ঠিক করে নে”

“কেন? তুমি গত পরশুই বাড়িতে বলতে বলেছিলে, আমরা রাম-কথা শুনতে যাবো, পাশের রাজ্যে। আমরা সেকথা বলেই তো এসেছি”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “রামায়ণের কাহিনী বিশাল, তার মধ্যে কোন কাহিনী নিয়ে আমরা রামকথা শুনলাম, সেটা ভেবেছিস? নাকি নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে সকলে আলাদা আলাদা গল্প শোনাবি?  কেউ বলবি হরধনু ভঙ্গ, কিংবা বালি বধ, কিংবা সীতা হরণ – কোনটা? কিশনা ধর তুই তোর মাকে বললি, জটায়ূ বধের গল্প, আর মিকানি তার মাকে বলল মারীচবধের গল্প। এবার তোদের দুই মায়ের যখন দেখা হবে, তোদের মিথ্যে কথা ধরতে তাঁদের খুব সময় লাগবে কি?”

কেউ কোন উত্তর দিতে পারল না। ভল্লা হাসল, বলল, “আবারও বলছি, আজকের এই অভিযানের কথা ভুলে যা। নিজেদের মধ্যে এখন রামকথা নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা কর। আমি যতদূর জানি, গতকাল রাত্রে হরধনু ভঙ্গ নিয়ে রামকথা হয়েছে। অতএব তোদের সবাইকে হরধনু ভঙ্গ নিয়েই কথা বলতে হবে। এর আগে কোথাও যদি দেখে বা শুনে থাকিস, সেটাকে সকলে মিলে মনে করার চেষ্টা কর। নইলে সবাই – সব্বাই - ধরা পড়ে যাবি। শুধু এ গাঁয়ে নয় আশপাশের গাঁয়েও ঢি ঢি পড়ে যাবে। আমি সুকরার চারজনকে রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের চলে আসা উচিৎ”।

কিশনা বলল, “তারা এসে কী করবে?”

“আজকের রামকথা তারা কেমন দেখল, কী দেখল, সে কথা তোদের বলবে। বিষয়টা কেন গুরুতর তোরা বুঝতে পারছিস না। আস্থানের অস্ত্র লুঠের সংবাদ আগামী কাল দুপুর থেকেই গ্রামের সকলে জেনে যাবে। তখন তোদের মিথ্যে গল্পের সঙ্গে আস্থান লুঠের যোগসূত্র বুঝে যাবে তোদের গ্রামের কুকুর-ছাগলগুলোও”!

বিষাণ বলল, “আমি এর আগে দু বার হরধনু ভঙ্গ দেখেছি…তাহলে সে নিয়েই আলোচনা হোক”।

ভল্লা হেসে মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক। আরও একটা ঝুঁকির কথা বলি। ওই রামকথা শুনতে আশেপাশের গ্রাম থেকেও কিছু লোক গিয়ে থাকতে পারে। তারা তোদের কাউকে কাউকে হয়তো চেনে। তাদের কেউ বলতেই পারে – আমি তো কাল গেছিলাম, কই তোদের তো দেখলাম না! কোথায়, কোনদিকে বসেছিলি? সে বিপদের কথাও ভেবে রাখিস”।

ছেলেরা ভল্লার কথায় অবাক হয়ে নির্বাক হয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভল্লা আবার হেসে বলল, “এই অভিযানটা  তোদের ছেলের হাতের মোয়া মনে হচ্ছে তো? তার কারণ আমার কাছে খবর ছিল, গতকাল সন্ধ্যে থেকে  আস্থানে পূর্ণিমা-উৎসব পালন করছে। রক্ষীদের অধিকাংশই তাড্ডির নেশায় মাতাল ছিল। সেই সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি মাত্র”। একটু থেমে আবার বলল, “এই অভিযান তখনই সফল হবে, যদি তোদের একজনও কেউ ধরা না পড়িস। মনে রাখিস, একজনও কেউ ধরা পড়লে, তার পেট থেকে সকলের নাম-ধাম বের করে নেওয়াটা রাজরক্ষীদের কাছে – ছেলের হাতের মোয়া”।

ভল্লা ছেলেদের মুখ আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেল, বলল, “ভয় পাস না। চিন্তা কর, ভাবনা কর। আর যেমন যেমন বললাম, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নে – সকলের বক্তব্য যেন একই হয়”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে আসা জরুরি। কথা বলতে বলতেও সে হানো, শলকু আর আহোকের দিকেও লক্ষ্য রাখছিল। হানোর অবস্থা এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি। বরং তার পাগলামি বাড়ছে। ভল্লা হানোর কাছে গেল, তার কাঁধে হাত রেখে অনুভব করল ধূম জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। ভল্লার ভুরু কুঁচকে উঠল। একটু পাশে সরে এসে সে চিন্তা করতে লাগল, কী করে হানোকে নির্বিঘ্নে সরিয়ে ফেলা যায়তার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল রামালি। “ভল্লাদাদা, হানোর জন্যে আমরা সবাই মনে হচ্ছে ডুববো”।

ভল্লা তীক্ষ্ণ চোখে রামালির দিকে তাকাল, বলল, “হুঁ। কিন্তু কী করা যায়?”

“সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর তো কোন পথ দেখছি না”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল। রামালির মতো ছেলের মুখে এমন নির্বিকার সিদ্ধান্তের কথা, ভল্লা আশা করেনি। রামালি তার দলে ভিড়েছে প্রথম দিন থেকে। যে কোন বিষয় জানার এবং শেখার জন্যে তার যে তীব্র নিষ্ঠা, সেটা ভল্লার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু ছেলেটার চোখেমুখে কোনদিন কোন উচ্ছ্বাস, আনন্দ, কষ্টবোধ সে লক্ষ্য করেনি। সে শুনেছে শৈশবে বাপ-মা মরা ছেলেটি বড়ো হয়েছে কাকা-কাকিমার সংসারে। রামালির প্রতি তার কাকার স্নেহ ও সহানুভূতি থাকলেও, কাকিমা তার ওপর সর্বদাই খড়্গহস্তা। ভল্লার মনে হয়েছে আশৈশব নানান অত্যাচার, বঞ্চনা এবং নির্স্নেহ - তার মানসিক চরিত্রটাকেই এভাবে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে রামালির আশ্চর্য উদাসীন ব্যবহার চমকে দিল ভল্লাকে

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল “এখানে এতজনের সামনে, কী ভাবে?”

এতটুকু সময় না নিয়ে রামালি বলল, “সাপ। দুর্ঘটনা – অপঘাত মৃত্যু। এই জঙ্গলে বেশ কিছু সাপের বাসা আমার জানা আছে – কেউটে, গোখরো”।

অন্ধকারে, গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া চাঁদের ঝিলিমিলি আলোয় ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। রামালি বলল, “তুমি অনুমতি দিলেই…”। ভল্লা তাকিয়েই রইল রামালির দিকে। একটু পরে রামালি দৌড়ে মিশে গেল অন্ধকার জঙ্গলে। ভল্লা সরে গেল অন্য দিকে। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হরধনু ভঙ্গ প্রসঙ্গে গবেষণায় নিবিষ্ট। ভল্লা সবার মুখই দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। এখন হানোকে সে আর দেখছে না। তার চোখ বারবার ফিরে আসছে শলকু আর আহোকের মুখে। দুজনেই এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তাও সে স্বস্তি পাচ্ছে না। 

এই সময়েই সুকরার চারজন ছোকরা এসে যোগ দিল ওদের দলে, ভল্লা যাদের রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিল। ওদের কাছে গিয়ে ভল্লা বলল, “যা ওরা সবাই রামকথা নিয়েই আলোচনা করছে, ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দে, তোরা ঠিক ঠিক কী দেখলি, কেমন দেখলি”।

তার পরিকল্পনায় এখনও পর্যন্ত কোন ত্রুটি ঘটেনি – শুধু হানোর ব্যাপারটা ছাড়া। হানোর মতো উদ্যোগী এবং কর্মঠ এক যুবক যে মানসিকভাবে এত দুর্বল – সেকথা ভল্লা বুঝতে পারেনি। ভল্লা এখনও পর্যন্ত তার এই ভুলটুকুই খুঁজে পেয়েছে – তবে ভুলটা সামান্য নয়। এর ফল হতে পারে মারাত্মক।     

প্রত্যূষের দণ্ডখানেক পার হওয়ার পরেও ভল্লা কারও চোখেমুখে ক্লান্তি বা ঘুমের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রায় সারারাত পালাগান বা রামকথা শুনে, কবে কোন লোকের চোখেমুখে বিনিদ্র-ক্লান্তির লক্ষণ ফোটে না? কিন্তু এদের চোখে মুখে কোথাও ক্লান্তির লেশমাত্র নেই! প্রথম অভিযান এমন নির্বিঘ্নে সফল হওয়ার আনন্দে তাদের মন এতই আত্মতুষ্ট এবং গর্বিত যে তাদের ক্লান্তি নেই? ঘুম আসছে না? এদিকে ভোর হতেআর দেরি নেই – ভোরে সকলের ঘরে ফেরা উচিৎ। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেলেরা এবার তোদের ঘরের দিকে রওনা হওয়া প্রয়োজন। এখনই রওনা হলে ভোরের দিকে গ্রামে পৌঁছতে পারবি। আশা করি নিজেদের মধ্যে আলোচনায় রাত্রের হরধনু-ভঙ্গ পালার প্রতিটি ঘটনা সকলেই জেনে গিয়েছিস। বাড়িতে জিজ্ঞাসা করলে সকলেই একই রকম কথা বলতে পারবি নিশ্চয়ই”।

দলের ছেলেদের অধিকাংশই বলে উঠল, “পারবো, তুমি চিন্তা করো না, ভল্লাদাদা।“

“বাঃ বেশ। আরেকটা কথা বলে রাখি। আগামীকাল তোদের বাবা-জ্যাঠারা হয়তো জেনে যাবেন, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে। হয়তো তাঁদের মুখে শুনবি – দু তিনজন রক্ষীর মৃত্যু সংবাদও!”

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? হত্যা? আমাদের কেউ করেছে নাকি?” ছেলেরা আঁতকে উঠল ভয়ে।

ভল্লা বলল, “হতে পারে। নাও হতে পারে। অনেক সময় প্রশাসন থেকে মিথ্যে কথাও বলা হয়, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে”।

ছেলেরা ভল্লার মুখের দিকে আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভল্লা তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত ভয় পাচ্ছিস কেন? এরকম উড়ো খবর শুনে বাবা-জ্যাঠাদের সামনে অমন ভয়ে শিউরে উঠবি নাকি? ডাকাতির সংবাদ শুনে, সবাই অবাক হয়ে যেমন “তাই নাকি?”, "কখন হল?" "ডাকাতের দল এল কোথা থেকে?" বলে, সেরকমই বলবি। মৃত্যুর সংবাদ শুনেও একই ভাবে বলবি “বলছো কী? ইস্‌ কি ভয়ংকর”!  ব্যস। তার বেশি বা কম নয়”।

ভল্লা একটু সময় নিল, তারপর আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস, শুধু অভিযান করলেই বীর হওয়া যায় না। তার পরেও প্রতিটি পা ফেলতে হয় বুদ্ধি আর বিবেচনা করে। এতটুকু ভুল কথা, সামান্য বেঠিক আচরণে তোরা সবাই বিপদে পড়ে যেতে পারিস। আশা করি এই একটা মাত্র অভিযান করেই, তোদের কেউই চাইবি না, রাজার কারাগারে সারাজীবনটা কাটুক। প্রকৃত বীরকে অনেক পথ চলতে হয় অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে। যা, এবার রওনা হয়ে পর। আর দেরি করিস না”।

ছেলের দল উঠে দাঁড়াল। শলকু বলল, “আজকে আর সকালের মহড়ার কথা বলো না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, শলকুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোদের মহড়া আজ বন্ধ। তবে আমি আজ সকালের দিকে চাষিভাইদের সঙ্গে মাঠে থাকবো। ওদের কাজকর্ম দেখাশোনা করবো। বাঁধটার আরও কিছু মেরামতি দরকার”।

শলকু বলল, “তুমিও তো সারারাত ঘুমোওনি। আজ বিশ্রাম নিতে পারতে”।

ভল্লা হেসে বলল, “কে বলল আমি কাল সারারাত ঘুমোইনি? আমি তো রামকথা দেখতে যাইনি। তোরা কাল রাত্রি দেড়প্রহরে বেরিয়ে যেতেই, আমি রান্নাবান্না করেছি, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছি…। তোদের কারও সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি...।

ভল্লার কথা শেষ হল না, একজন দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, হানোর কোন সাড়াশব্দ নেই, চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, মারা গেছে”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কী যাতা বলছিস? কই চল তো দেখি”।

সকলে হানোর পড়ে থাকা শরীরটার দিকে দৌড়ে গেল। ভল্লা উবু হয়ে বসে নাকের নীচে আঙুল রাখল, কবজি ধরে নাড়ি পরখ করল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, না প্রাণ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল হানোর বাঁ কানের নীচেয় – কালচে নীল হয়ে রয়েছে জায়গাটা। তার মাঝখানে দুটো সূক্ষ্ম ছিদ্র – সাপের ছোবল। ভল্লা কিছু বলল না। কিছু বলার দরকারও ছিল না। বছরে এমন একটা-দুটো সর্পদংশনের ঘটনা গ্রামের ছেলেরা ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখেছে। তবে সেগুলো সাধারণতঃ হয় পায়ে, অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে, অথবা জমিতে নীচু হয়ে কাজ করতে গিয়ে, হাতে। সে সব ক্ষেত্রে কখনও সখনও মানুষ বেঁচেও যায়। কিন্তু হানোকে ছুবলেছে – মোক্ষম জায়গায়, বেঁচে ফেরার কথাই ওঠে না।  

কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “চটপট একটা হালকা মাচা বানিয়ে, হানোকে সাবধানে নিয়ে যা। ছেলেটা সবে তৈরি হয়ে উঠছিল রে…এভাবে বেঘোরে মারা পড়ল…” ভল্লার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

গাছের ডাল কেটে মাচা বানিয়ে চার জন ছেলে হানোকে কাঁধে চাপিয়ে নিল। ছেলেদের সকলের মুখই এখন বিষণ্ণ। ক্লান্ত। অবসন্ন। এতক্ষণ তাদের মনে যে উত্তেজনা ও আনন্দ ছিল, সে সব মুছে দিয়ে গেল হানোর এই ভয়ংকর মৃত্যু। ভল্লা তাকিয়ে রইল দলটার দিকে। দলের পিছনে ছিল রামালি। রামালির সঙ্গে ভল্লার ক্ষণিকের চোখাচোখি হল। রামালির মুখও এখন আশ্চর্য অবসন্ন।

ভল্লা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া লক্ষ্য করল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। এখনও অন্ধকার। পাখিরা ঘুম ভেঙে সবে ডাকতে শুরু করেছে। ভোরের বাতাস গাছের পাতায় পাতায় তুলছে মর্মর শব্দ।    



চলবে...

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব 


২৬

 

দীর্ঘক্ষণ মহর্ষি ভৃগুকে নির্বাক দেখে মন্ত্রীসভার সকলেই পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাঁরা সকলেই মহর্ষি ভৃগুর উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাঁর প্রগাঢ় প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় তাঁদের অগাধ আস্থা। বিদেশমন্ত্রী পদ্মনাভ অত্যন্ত বিনীত স্বরে মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মহর্ষি, আপনাকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে আমরা সকলেই অসহায় বোধ করছি। রাজ্যের এই সংকটের সমাধান, আপনার পক্ষেই সম্ভব। আপনি আমাদের আদেশ করুন, মহর্ষি, আমাদের এখন কী কর্তব্য?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু মুখ তুললেন, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বললেন, “ভাবছিলাম। বৎস পদ্মনাভ, ভাবছিলাম, নিয়তি অমোঘ, অনতিক্রম্য! রাজাবেণ অসুস্থ হওয়ার পর, এই কিছুদিন পূর্বে, আমরা তাঁর জন্মকুণ্ডলী পর্যালোচনা করছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন, জ্যোতিষাচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ। রাজাবেণের স্বল্প এই জীবনকালের অদ্ভূত আচরণ ও দুরাচারী চরিত্রের কারণ, তাঁর জন্মলগ্নে গ্রহ-নক্ষত্রের আশ্চর্য অবস্থান! সে অবস্থান অত্যন্ত বিরল এবং শত বর্ষে হয়তো একবারই সম্ভব! তাঁর কোষ্ঠী গণনা করে, আচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ এবং আমি আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম এই দেখে যে, তাঁর মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর আজন্ম অধিষ্ঠান! ঈশ্বরের লীলা কে উপলব্ধি করতে পারে? নিয়তির অমোঘ গতি কে রুদ্ধ করতে পারে?”

উপস্থিত মন্ত্রীসভার সদস্যরা সকলেই বিহ্বল হয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আশ্চর্য, অত্যাশ্চর্য!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। আজ আমি এই কথাটি বলবো বলেই আপনাদের এই সভায় আমন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু আমার মনে কোথাও যেন একটু দ্বিধা ছিল! কিন্তু আপনাদের মুখে ওই চারণকবিদের গান এবং ওই মহাতপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আমি নিঃসন্দেহ হলাম - নিশ্চিত হলাম”। মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে, মহামন্ত্রী বিমোহন ও অন্য সকলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলেন। অন্য সকলের মুখে নিরঙ্কুশ বিস্ময়ের লক্ষণ দেখলেও, মহামন্ত্রী বিমোহনের চোখে দেখতে পেলেন, সন্দেহ। তিনি আবার বললেন, “এই মন্ত্রণা কক্ষে আসার পথে মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্রর মুখে একটি বার্তা শুনলাম! এই রাজ্যে অনেকের বিশ্বাস রাজাবেণের এই অসুস্থতার কারণ, বিষপ্রয়োগ এবং আমিই সেই বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রী! তখন শুনে মনে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু...”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই বিস্ময়ে চমকে উঠলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ মহর্ষি ভৃগুর কথার মধ্যেই বলে উঠলেন, “সে কী? সে তো একটা অবিশ্বাস্য রটনা মাত্র এবং এর প্রচারক কে, সেও আমরা জানি - মহারাজ বেণের বাল্যবন্ধু, পদত্যাগী উপনগরপাল শক্তিধর! ভাগ্যগুণে পেয়ে যাওয়া আকাশচুম্বী ক্ষমতার অধিকারী কোন অযোগ্য ব্যক্তি যখন অকস্মাৎ ভূমিসাৎ হয়, তখন প্রচণ্ড ঈর্ষা তার মস্তিষ্কে তপ্ত বাষ্পের উদ্রেক করে! দিশাহারা হয়ে অযৌক্তিক অপবাদ দিতে তার আর তখন কোন কুণ্ঠা হয় না”!

মহর্ষি ভৃগু অসম্মতিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না বৎস বৃষভান্‌, তা নয়। এ সমস্তই অদৃশ্য নিয়তির অমোঘ সঞ্চালন। আমাদের ষড়যন্ত্রে মহারাজ অঙ্গ এবং মহারাণি সুনীথার পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অনুষ্ঠান। যৌবনের উপান্তে এসেও, সেই যজ্ঞের ফলস্বরূপ তাঁদের পুত্রলাভ। মহারাণীর অন্ধ স্নেহে রাজপুত্র বেণের দিন দিন দুর্ধর্ষ ও দুর্দান্ত হয়ে ওঠা। অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান...”

মহর্ষি ভৃগুর কথা থামিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান আবার বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান সম্পর্কেও রাজ্যে একটি রটনা প্রচলিত আছে, মহর্ষি, আর সেটি হল, যুবরাজ বেণের ষড়যন্ত্রে...”।

মহর্ষি ভৃগু বিরক্ত মুখে হাতের ইশারায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌কে নিরস্ত করলেন, “বৎস বৃষভান, এই সকল রটনার প্রসঙ্গ এখন অবান্তর! আমরা পরষ্পরের প্রতি কদর্য কর্দম নিক্ষেপণের জন্য এই সভা আহ্বান করিনি। ও প্রসঙ্গ এখন থাক। আমার অসমাপ্ত কথার সূত্র ধরে বলি, অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান, মহারাণি সুনীথার সনির্বন্ধ অনুরোধে যুবরাজ বেণের রাজ্য অভিষেক। সিংহাসন লাভ করে রাজা বেণের উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারীতা, অনাচার, দুরাচার এবং সর্বশেষে সনাতন ধর্মের উপর চরম আঘাত! তারপরই তাঁর এই অনারোগ্য অসুস্থতা! এ সবই নিয়তি পরিচালিত পূর্বনির্ধারিত নাট্যরঙ্গ, যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কুশীলব আমাদের মধ্যে অনেকে অথবা হয়তো সকলেই”!

মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে সকলের মুখভাব পর্যবেক্ষণ করলেন। মহামন্ত্রী বিমোহনও এখন কিছুটা যেন দ্বিধাগ্রস্ত, চিন্তিত। মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতে, তিনি মাথা নত করলেন। মহর্ষি ভৃগু আবার বললেন, “এখন নিয়তির আরেকটি সংকেত আমাদের সামনে উপস্থিত। সেই ইঙ্গিত অনুসারে আমরা আমাদের কর্তব্য করব, নাকি দ্বিধা ও সংশয়ে কালবিলম্ব করবো – এই সিদ্ধান্তের জন্যেই আমি আজ এই সভা আহ্বান করেছি!”

সকলেই অধীর আগ্রহে মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “নিয়তির কোন সংকেতের কথা আপনি বলছেন, মহর্ষি?”

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কেন? রাজা বেণের মানস পুত্র ও কন্যাকে আবাহন করে বরণ করতে হবে না?”

“কী ভাবে, মহর্ষি?” মহামন্ত্রী বিমোহন এতক্ষণে কথা বললেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানবের পক্ষে এই অলৌকিক ঘটনা কী ভাবে ঘটানো সম্ভব?” শুরু থেকেই মহামন্ত্রী বিমোহনের আলাপে যে বৈরিভাব লক্ষ্য করছিলেন মহর্ষি ভৃগু, এখন সেটা যেন আর নেই। মহামন্ত্রীর কণ্ঠস্বরে এখন কিছুটা সমর্থনের সুর!

মহর্ষি ভৃগু পূর্ণ দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “অলৌকিক কোন ঘটনা তো আমরা ঘটাবো না, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! ঘটাবেন তো তিনি! যিনি মহারাজ অঙ্গের পুত্র রাজাবেণের অঙ্গে আজন্ম অধিষ্ঠান করছেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণু! তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার পরিস্থিতিও তিনিই বানিয়ে তুলেছেন, আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করবো মাত্র!”

অবাক হয়ে সকলেই তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি ভৃগুর দিকে, মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “তিনিই সেই পরিস্থিতি বানিয়ে তুলেছেন? যেমন?”

মহর্ষি ভৃগু গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বললেন, “ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ রাজা দুর্ধর্ষ বেণ, এখন নামমাত্র জীবিত! তাঁদের ধরাতলে অবতরণের এটাই কী প্রকৃষ্ট লগ্ন নয়? সনাতন ধর্মকে যিনি বিনাশ করতে চেয়েছিলেন, তিনি আজ পূর্ববৎ সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো না? অতএব, ঈশ্বর স্বয়ং সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন! এখন বিশেষ কোন শুভ মূহুর্তে আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন তিনি!”

মহামন্ত্রী বিমোহন কিঞ্চিৎ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন, ঈশ্বর?”

মহামন্ত্রী বিমোহনের বিদ্রূপে কর্ণপাত না করে, মহর্ষি ভৃগু দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, “ঠিক তাই! তিনি তো রাজাবেণের জন্যে আসছেন না, আসছেন আমাদের জন্যে, এই রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসীর জন্যে। ঈশ্বর শুধুমাত্র কোন রাজাকে কৃপা করার জন্য ধরাতলে অবতীর্ণ হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি আসেন নিঃসহায় সাধারণ জনগণের পরিত্রাণের জন্য। তিনি আসেন সনাতন ধর্মকে তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা তাঁর সেই অবদান গ্রহণ করতে উন্মুখ কিনা, আমরা আমাদের আন্তরিক আস্থা নিয়ে তাঁকে বরণ করতে আগ্রহী কিনা, সেই প্রতীক্ষায় তিনি দিবস গণনা করছেন!” মহর্ষি ভৃগুর এই প্রত্যয়ী কথায় সকলেই আশ্চর্য এবং মুগ্ধ নির্বাক হয়ে রইল, এমনকি মহামন্ত্রী বিমোহনও স্বয়ং ঈশ্বরের আবির্ভাব কল্পনা করে, শিহরিত হলেন। সকলেই মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। মহর্ষি ভৃগু আর কোন কথা বললেন না, তাঁর স্বপ্নঘন দৃষ্টি এখন উন্মুক্ত গবাক্ষ পথে দূর দিগন্তের দিকে। 

এর পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৪শ পর্ব "



শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭ " 


১৪

 

পূর্ব পরিকল্পনা মতো পূর্ণিমার মধ্য রাত্রে ভল্লা পনের জনের একটি দল নিয়ে হানা দিল আস্থানে। তার মধ্যে চারজন রইল ঠিক তার পিছনে। হানো, শলকু, আহোক আর মইলি। ভল্লা প্রথমে এবং তার পিছনে চারজন আস্থানের সদর প্রবেশদ্বার টপকে ভিতরে ঢুকল। সকলের হাতেই লাঠি। দ্বারের সুরক্ষায় তিনজন প্রহরী ছিল। তাদের লাঠির আঘাতে আহত করে প্রবেশদ্বার খুলে দলের আরও চারজনকে তারা ঢুকিয়ে নিল। সকলে মিলে অতি দ্রুত প্রহরীদের মুখে গামছা গুঁজে দিল। দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল তাদের হাত-পা। প্রহরী তিনজনকে টেনে একটু আড়ালে অন্ধকারে ফেলে রেখে, ভল্লা সকলকে নিয়ে দৌড়ল আস্থানার অন্য প্রান্তে। যেখানে অস্ত্রশস্ত্র রাখা আছে।

হানো, শলকু আর আহোক অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনটি কোনে লাঠি হাতে প্রস্তুত রইল পাহারায় – কোন রক্ষী কাছাকাছি এলেই বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের ধরাশায়ী করবে। বাকিরা আস্থানার বেড়া টপকে অস্ত্রশস্ত্র বাইরে পাচার করতে শুরু করল। বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে দলের বাকি সাতজন সেগুলি দ্রুত হাতে গুছিয়ে তুলতে লাগল বেড়া থেকে একটু দূরে একটা বড়ো গাছের ছায়ায়। সেখানে পাশাপাশি রাখা আছে কাঠের দুটি টানা-শকট।

দুজন রক্ষী দলটাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে আসছিল। শলকু আর আহোক আড়াল থেকে লাফিয়ে, এমনই লাঠির আঘাত করল, দুজনেই নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তিনজনে মিলে দেহদুটো আড়ালে সরাতে গিয়ে হানো আর শলকু দেখল, ওদের মাথার পিছন থেকে রক্ত ঝরছে। শলকু কেঁপে উঠল, বলল, “এত রক্ত? মরে গেল না তো? ভল্লাদাদা কোথায় রে?” চারদিকে তাকিয়ে তারা ভল্লাকে দেখতে পেল না। এই তো একটু আগেও সে সামনেই ছিল, গেল কোথায়? শলকু আর আহোকের হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। দুজনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মাটিতে। হানো আহত দুই রক্ষীকে খুঁটিয়ে দেখল – নাকের সামনে আঙুল রেখে দেখল শ্বাস চলছে – তবে খুব মৃদু। হানো আরেকবার ভল্লাকে খুঁজল। দেখতে না পেয়ে শলকু আর আহোকের কাঁধে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল, “তোরা এভাবে বসে থাকিস না, শলকু। বিপদ ঘটতে পারে। শরীর খারাপ লাগল, বাইরে গাছতলায় গিয়ে বস। যা। এখানে থাকিস না”।

শলকু আর আহোক নিজেদের সামলাবার চেষ্টা করছিল। মহড়া দেওয়ার সময়, ভল্লাদাদা বারবার বলেছে, লড়াই করতে হলে শত্রুপক্ষের রক্ত ঝরাতে হবে। নয়তো তোর নিজেরই রক্ত ঝরবে। আহত মানুষের আর্ত চিৎকার শুনলে, কিংবা তার রক্ত দেখলে, মন দুর্বল যেন না হয়। হানো আবারও বলল, “যা ওঠ। তাড়াতাড়ি বাইরে যা”। হঠাৎই তার পাশে এসে দাঁড়াল ভল্লাদাদা। নিঃশব্দে, বেড়ালের মতো। তার কাঁধে এখন মাঝারি আকারের একটা ঝোলা। হাতে একটা বল্লম। কোন দিক দিয়ে এল, কীভাবে এল, সে টেরই পেল না? হানো ভাবল, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রক্ষী এ আস্থানায় যদি দু-পাঁচজন থাকত, তাহলে এতক্ষণ তাদেরই হয়তো মাটি নিতে হত।

ভল্লা চাপা স্বরে বলল, “হানো ঠিক বলেছে, তোরা বাইরে যা। আমাদের ছেলেরা বেড়ার কিছুটা ভেঙে দিয়েছে। আমরা ওই পথেই পালাব”। ভল্লার কথায় শলকু চাপা ডুকরে উঠে বলল, “ভল্লাদাদা, এ আমি কী করলাম, লোকটা মনে হয় মরে গেছে…”। ভল্লা চাপা গর্জনে বলল, “তোর এই নাকে কান্নার জন্যে, আমাদের একজনারও যদি কোন ক্ষতি হয় শলকু, আমি তোকে বাঁচতে দেব না। এখনই ওঠ, বেরিয়ে যা”। শলকু আর আহোক উঠে দাঁড়াল, হেঁটে গেল তাদের দলটির দিকে।

হানো ওদের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল, বলল, “ওদের মন যে এত দুর্বল, বোঝাই যায়নি”।

ভল্লা হেসে হানোর কাঁধে হাত রাখল, বলল, “নিজের হাতে একটা - দুটো শত্রুর প্রাণ নে, তারপর… ”। কথার মাঝেই ভল্লা তার হাতের বল্লমটা বিদ্যুৎ বেগে ছুঁড়ে দিল একটা অন্ধকার কোনার দিকে। লোহার ফলা চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠল। হানো কাউকে দেখতে পেল না, কিন্তু লোকটার গলা থেকে যে আওয়াজটা বের হল, সেটা যে তাঅন্তিম কণ্ঠস্বর বুঝতে তার অসুবিধে হল না। তারপরেই ভারি কিছু মাটিতে পড়ে যাওয়ার শব্দ। ভল্লা দুটো আওয়াজই উৎকর্ণ হয়ে শুনল। তারপর নিশ্চিন্ত স্বরে আগের কথার জের টেনে বলল, “…তারপর তোকে বীর বলব। দাঁড়া বল্লমটা তুলে আনি”। ভল্লা দ্রুত পায়ে দৌড়ে গেল।

মরার আগে লোকটার ওই অস্ফুট আওয়াজটা হানোর কানে বারবার ফিরে আসছে। হানোর পেটের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। তার মাথার মধ্যে গমগম করছে সেই আওয়াজ “ওঁখ্‌”। সমস্ত শরীর দুমড়ে তার বমি আসছে। সে উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে।

ভল্লা ফিরে এল হাতে দুটো বল্লম নিয়ে। দ্বিতীয় বল্লমটা ওই মৃত প্রহরীর। হানোর অবস্থা দেখে ভল্লা মুচকি হাসল, কিন্তু একটু রুক্ষ স্বরে বলল, “চ, ওঠ। ছেলেদের হয়ে গেছে, ঝটপট কেটে পড়ি”। ভল্লা হানোর হাত ধরে টেনে তুলে, তাকে টানতে টানতে বেড়ার ওপারে পৌঁছল। ছেলেরা তাদের অপেক্ষাতেই ছিল। ভল্লার নির্দেশে টানা-শকট নিয়ে তারা দ্রুত ঢুকে পড়ল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজ্যের সীমানার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের স্বস্তি নেই।

 দলটি বেশ দ্রুতই হাঁটছিল। দণ্ড দুয়েকের মধ্যে তারা রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ল গভীর জঙ্গলে। ভল্লা হাঁটছিল দলটির পিছনে। তার আশঙ্কা আস্থানের রক্ষীরা তাদের মৃত ও আহত সঙ্গীদের দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। ওরা প্রতিশোধ নিতে দৌড়ে আসতে পারে তাদের পিছনে। তাদের অনেকেই অশ্বচালনায় এবং রণপা ব্যবহারে কুশল। তারা পিছু নিলে, অচিরেই এই দলটিকে ওরা ধরে ফেলতে পারবে। সেই উদ্বেগে ভল্লা সতর্ক ছিল। তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ। গভীর জঙ্গলের পাতার আড়ালে আকাশের দিকে তাকাল ভল্লা, চাঁদের অবস্থান দেখে তার মনে হল, রাত্রি প্রথম প্রহরের মধ্য যাম চলছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। গন্তব্যে পৌঁছেই অস্ত্রগুলির এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কাল প্রভাতে কারও চোখে না পড়ে।

ভল্লা মাঝে মাঝে চাপা স্বরে দলটিকে উৎসাহ দিচ্ছিল। আর বারবারই আগামী কর্মকাণ্ডের চিন্তায় ডুব দিচ্ছিল। পিছনের বিপদের কারণে সে সজাগ ছিল ঠিকই, কিন্তু একটা বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিল, প্রশাসন তাকে সাহায্য – সহযোগিতা করছে এবং করবে। সে অত্যন্ত জটিল একটি প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। এ কথা জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়লে, তার মৃত্যুদণ্ড ছাড়া প্রশাসনের হাতে অন্য কোন উপায় থাকবে না। অতএব তার বিপদ যেমন পিছনে, তেমনি সামনেও। তীক্ষ্ণ নজরে সে লক্ষ্য রাখছিল হানো, শলকু এবং আহোকের দিকে। শলকু আর আহোক এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তাদের ধারণা দুটি মানুষকে তারা আহত করে, সংজ্ঞাহীন করেছে মাত্র। মানুষদুটির ক্ষত সেরে উঠলেই তারা সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু ভল্লা জানে, তারা দুজনেই মৃত। আপাতত শলকু আর আহোক তার প্রধান মাথাব্যথা নয়। ভল্লা হানোর আচরণে ভীষণ উদ্বিগ্ন। হানো এতক্ষণ দলের সঙ্গে দলের মধ্যে থেকেও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছে না। অপ্রকৃতিস্থ প্রলাপ বকছে। তার দুই চোখ রক্তবর্ণ। এই ছেলেটি তার এবং প্রশাসনের পক্ষে বৃহৎ বিপদের কারণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। 

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯ "


বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব 


২৫

 

মন্ত্রণাকক্ষে নিজের আসনে বসার পরেও মহামন্ত্রী বিমোহন মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলেন, আসলে এই মন্ত্রণা কক্ষে অকস্মাৎ সকলকে আমন্ত্রণ করার কী কারণ তিনি জানেন না! কী বিষয়ের মন্ত্রণা সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন। মহর্ষি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, মন্ত্রণার কাজ শুরু করুন, আপনি কী আর কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”

“না মহর্ষি, এখানে সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। এই বিশেষ সভার আহ্বায়ক আপনি, অতএব আপনার শুরু করাই সমীচীন”। 

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি উত্তম। তবে তাই হোক”। তারপর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আপনাদের সকলকেই আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদন জানানোর পর আমি এই বলতে চাই যে, রাজাবেণের আকস্মিক অসুস্থতায় আমাদের রাজ্য যে গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, সে কথা আপনারা সকলেই অবগত আছেন। কিছুদিন আগে রাজসভার এক মন্ত্রণায় আমরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যতদিন রাজাবেণ সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন রাজমাতা আপনাদের আন্তরিক সহায়তায় রাজ্যের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করবেন!”

উপস্থিত মন্ত্রীমণ্ডলী একবাক্যে সমর্থন করল, “হ্যাঁ মহর্ষি, এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল”। মহামন্ত্রী বিমোহন কিছু বললেন না, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির দিকে।

“আজ রাজাবেণ ও রাজমাতার সন্দর্শনে গিয়েছিলাম, দেখলাম, রাজাবেণ অনেকটাই সুস্থ, তাঁর প্রাণসংশয় আর নেই! কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, তিনি জীবিত হয়েও পুত্তলিবৎ জড় হয়ে গেছেন! তাঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!” 

সকলে একই সঙ্গে বলল, “সে অত্যন্ত বেদনার কথা আমরা সকলেই শুনেছি, মহর্ষি”!

“রাজাবেণের এই অসুস্থতায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি, কিন্তু আশা ছাড়িনি। রাজমাতাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করবো, সেখানে যবন, ম্লেচ্ছ কিংবা চৈনিক প্রাজ্ঞ চিকিৎসকদের সাহায্য নেব, রাজা বেণের এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিকার করার যথাসাধ্য প্রয়াস করব!” 

এক যোগে সবাই উচ্ছ্বসিত উত্তর দিল, “সাধু সাধু, মহর্ষি, অত্যন্ত সাধু প্রস্তাব। এই কাজে আপনিই এই রাজ্যের যোগ্যতম”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “এ বিষয়ে আপনাদের মনে কোন দ্বিধা নেই তো? এই প্রস্তাবে আপনারা সকলেই সম্মত?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই প্রশ্ন কেন করলেন, মহর্ষি? আপনার এই প্রস্তাবে সর্বসম্মত না হওয়ার কোন কারণ তো ঘটেনি!” 

মহর্ষি ভৃগু তাঁর দিকে এবং অন্য সকলের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “সে কথায় পরে আসছি, বৎস বৃহচ্চারু। এখন দ্বিতীয় যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, সে কথায় আসি। তরুণ পুত্রের এই নিদারুণ অসুস্থতা, দিনের পর দিন চোখের সম্মুখে দেখা, একজন মাতার পক্ষে কতোটা বেদনাময় সেকথা আমাদের কারও না বোঝার কোন কারণ নেই”!

সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, “এ বেদনা অসহ্য, মহর্ষি!”

“এই বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনের দায়িত্ব! রাজ্য পরিচালনায় একান্তই অনভিজ্ঞা এক প্রৌঢ়া নারীর কাঁধে, বিশেষ করে এই মানসিক অবস্থায়, প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরু ভার অর্পণ করা আমাদের উচিৎ হচ্ছে কী না, সেটা সকলে ভেবে দেখবেন কী?”

“সত্যই, মহর্ষি, এ আমাদের কাছে গ্লানির, আমাদের অনুপযুক্ত কাজ”।

“রাজমাতা স্বয়ং আমাকে সবিশেষ অনুরোধ করেছেন - রাজ্য শাসনের এই গুরু দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি চেয়েছেন। সমস্ত মাতৃহৃদয় দিয়ে, তিনি পুত্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। তাঁর আশা, তাঁর ঐকান্তিক সেবায়, ঈশ্বর মুখ তুলে চাইবেন, তাঁর পুত্র সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাঁকে আমি কথা দিতে পারিনি, আপনাদের সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না”। মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে মাথা নত করে চুপ করে রইলেন, সকলেই চিন্তাগ্রস্ত। তাঁদের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীগণ, আপনারা সবাই নিরুত্তর কেন?”

কিছুক্ষণ পর বিদেশ মন্ত্রী পদ্মনাভ বললেন, “আমরা দ্বিধাগ্রস্ত, হে মহর্ষি। একদিকে পুত্রের সুস্থতার আশায় মাতার আকুল আবেদন, অন্যদিকে মহারাণির উপর পূর্ণ আস্থাবান রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসী। বঞ্চিত করবো কাকে”?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীমণ্ডলি, ঠিক এই কারণেই আমি এই বিশেষ সভার অধিবেশন আহ্বান করেছি। অত্যন্ত গোপন এই অধিবেশনে আমাদের একান্ত মত বিনিময়, আমার জরুরি বলে মনে হয়েছিল”।

এতক্ষণ নির্বাক মহামন্ত্রী বিমোহন কথা বললেন, “কিন্তু রাজা কোথায়? কে হবেন পরবর্তী রাজা? যাঁর হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে রাজমাতা নিশ্চিন্তে পুত্রসেবায় নিরত থাকবেন?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু বললেন, “সত্যি এ এক অদ্ভূত সংকট, মহর্ষি। রাজা কোথায়?” কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “আপনারা সকলেই হয়তো শুনে থাকবেন, গোটা রাজ্য জুড়ে চারণকবিরা যে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির গান তো? হ্যাঁ, সে আমি নিজের কানেই শুনেছি, বেশ কয়েকবার! আমাদের গুপ্তচর সূত্রেও সংবাদ পেয়েছি, এই গান এখন রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে গানের কথা যেমন সুন্দর, সুরও মধুর।  মনের মধ্যে রূপকথার মাধুরী বয়ে আনে!”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাস্যে বললেন, “সে চারণ কবিদের কথা আমিও শুনেছি, তবে নিজের কানে সেই সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য হয়নি। সে গানে এমন কী জাদু আছে, যার মায়ায় সেই গান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নিশ্ছিদ্র নিরাপদ অন্তরেও প্রবেশ করে গেল?”

মন্ত্রী বৃষভান্‌ হাসলেন, “সত্যিই মহর্ষি, কল্পনা হোক, আর যাই হোক, শুনতে বড়ো সুন্দর। কিন্তু আমার মতো নীরস মানুষের পক্ষে সে গানের বক্তব্য ব্যাখ্যা সম্ভব নয়! তবে আমাদের কলামন্ত্রী চারুশীল, কবি মানুষ, তিনি অবশ্যই বলতে পারবেন। মিত্র চারুশীল, মহর্ষিকে আপনি বলুন না, সে গানের কী বক্তব্য?”

কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “সে গানে রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে! তাঁরা মহারাজা অঙ্গ এবং রাজাবেণের বংশধর”!

মহামন্ত্রী বিমোহন বিরক্ত মুখে বললেন, “আমিও সে কবিদের কথা শুনেছি, কিন্তু গান শুনিনি। কিন্তু কলামন্ত্রী চারুশীলভদ্রের কথায় মনে হচ্ছে, এ কোন গঞ্জিকাসেবীর দিবাস্বপ্নের গান! রাজাবেণ কবে সুস্থ হবেন, কবে তাঁর বিবাহ হবে? কবে তাঁর বংশধর আসবে?”

মাথা নেড়ে কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “না, না, মহামন্ত্রী মহাশয়, তাঁদের জন্ম সাধারণ নয়, সে এক অসাধারণ – অলৌকিক ঘটনা ঘটবে! তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন। তাঁরা মহারাজা বেণের ঔরসজাত পুত্রকন্যা নন, তাঁরা তাঁর মানস সন্তান! রাজা পৃথু ভগবান বিষ্ণুর এবং রাণি অর্চ্চি সনতানী লক্ষ্মীর অংশ!”

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কী আশ্চর্য! কিন্তু সে গানে শুধু কী তাঁদের জন্মবৃত্তান্তই আছে, মন্ত্রী চারুশীলভদ্র?”

“না মহর্ষি! সে গানে আছে স্বপ্নপূরণের অদ্ভূত বৃত্তান্ত। মহারাজ পৃথুর রাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র প্রত্যেক বৎসর প্রচুর মেঘ দেবেন, দেবেন প্রচুর বর্ষা। সেই বর্ষার স্নিগ্ধ স্পর্শে রজঃস্বলা হবে মেদিনী, হরিৎ শস্যে ভরে উঠবে ক্ষেত্র। লেবুগন্ধী সবুজ পুষ্ট ঘাসে তুষ্টা গাভীদের পালানে আসবে দুধের প্লাবন। সুখে সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে গৃহীদের মায়ার সংসার! খরা, বন্যা, ঝঞ্ঝা, প্লাবন, মহামারি ও পঙ্গপালহীন এই রাজ্যের আপামর সুস্থ সবল ও বিনীত জনসাধারণ, আনন্দে খুশিতে দেবালয়ে দেবালয়ে দেবতাদের নিবেদন করবে সুসজ্জিত অর্ঘ। শঙ্খ, ঘন্টা ও পটহের নিশ্চিন্ত ধ্বনিতে মুখর হয়ে থাকবে সকল মন্দির”!

কথা বলতে বলতে কলামন্ত্রী চারুশীলের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান, মিত্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মহর্ষি, আপনি স্বকর্ণে না শুনলে উপলব্ধি করতে পারবেন না, সে গানের মাধুর্য! কথায় ও সুরে সে এক অদ্ভূত অনুভূতি। গ্রামের বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, গৃহবধূ, বিধবা নারী, কিশোর-কিশোরী সেই চারণ কবিদের গান শুনছে মুগ্ধ হয়ে, অশ্রু বিগলিত চক্ষে! সে গান শুনে পুরুষরাও আনমনে বসে থাকছে চণ্ডিমণ্ডপে, মাঠের আলে, হাটে বাজারে। তারা হুঁকোতে টান দিতে ভুলে যাচ্ছে !”

মহর্ষি ভৃগু খুবই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই গান তারা পেল কোথায়? কে তাদের শেখাল? এমন অদ্ভূত ঘটনার সূত্রপাত হল কী ভাবে?”

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “সে সন্ধানও আমি নিয়েছি, মহর্ষি। এ গান তারা নিজেরাই রচনা করেছে! কিন্তু এই কাহিনী শুনিয়েছেন এক তপস্বী। হিমালয়ের কোলে গভীর অরণ্যবাসী সেই মহাতপস্বী নাকি কোন এক চারণদলকে এই কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই রাজ্যের দুঃখের দিন অতিক্রান্ত প্রায়! অচিরেই এক মাহেন্দ্রক্ষণে অবতীর্ণ হচ্ছেন, স্বয়ং ভগবান, তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে নিয়ে! যাঁর নাম পৃথু। তাঁর নামেই এই জগৎ সংসারের নাম হবে পৃথিবী। সসাগরা ধরিত্রী হবে তাঁর রাজ্য। তিনি এই মর্ত্য জগতে প্রতিষ্ঠা করবেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও সনাতন ধর্ম! মহাতপস্বীর অদ্ভূত সেই ভবিষ্যবাণী শুনে সেই চারণদল যে গান বেঁধেছিল, সেই গানই এখন অন্য চারণদলের মুখে মুখে। তাদের কথা ও সুর কিছুটা ভিন্ন হলেও বক্তব্য এক!”

মহর্ষি ভৃগু কোন কথা বললেন না। নত মস্তকে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলেন। অন্য মন্ত্রীরা সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। মহামন্ত্রী বিমোহন নিজের মন্ত্রীমণ্ডলীর এই আবেগের কথা কোনদিন জানতে বা বুঝতেও পারেননি। তিনিও নির্বাক বিস্ময়ে সকলের মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলেন। 

এর পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব "


শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ " 


১৩

 

শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।

শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”

জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।

শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।

জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।

শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে”।

জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর, শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”

ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।

শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্‌গির সম্ভব, সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান, ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”

শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!

ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটা বুঝে নিতে চাই”। একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য মুদ্রা হলে ভালো হয়”।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।

“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব। তাতেই আপাতত চলে যাবে”।  

শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ? আশ্চর্য!”

“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর ডাকাতি করব”।

“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না, হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি, ভল্লা?”

“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।

শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির স্থাপনা করেন...”।

শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে! রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় নেই।”

“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।

শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”

“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।

আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।

“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।

“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।

এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড। মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস, তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে – সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”

লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ! 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮



নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...