প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ "
পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাস প্রথম পর্ব - "স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "
সম্পুর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "; "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "
পঁচিশে জুলাই, ২০২৬, মঙ্গলবার – সন্ধে সোয়া ছটা
ভিজিটিং আওয়ার্স সমাপ্তির থার্ড বেল বেজে উঠতে অহীনরা উঠে দাঁড়াল, অহীন বলল, “আজ তবে আসি বিনুদা। কাল আবার
আসব। তোমার খ্যাঁদা আর তার বউকেও নিয়ে আসব”।
অবিনবাবু হেসে ফেললেন, বললেন, “হতচ্ছাড়া,
খ্যাঁদা তোর ঠাকুদ্দা হয় রে”।
অহীন অবিনবাবুর একটা হাত চেপে ধরে বলল,
“উঁহুঁ, খ্যাঁদা হল আমার বিনুদার ভাইপো, সেই সূত্রে আমারও ভাইপো”। একটু হাসল অহীন,
বলল, “আসি”?
অবিনবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে অহীনরা ডাক্তার
সরকারের চেম্বারে গেল। রিসেপশনিষ্ট মহিলার নাম চঞ্চলা। ওদের দেখে এগিয়ে এসে বললেন,
“আপনাদের একটু ওয়েট করতে হবে। স্যারের চেম্বারে পেশেন্ট রয়েছে। এই সোফাতে বসুন না,
এখনই হয়ে যাবে”।
অহীনরা সোফায় বসতে চঞ্চলা জিজ্ঞাসা করলেন,
“দাদু এখন ভালই তো আছেন, না? ভাবা যায়, আমরা যাঁদের কাহিনী ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, বিনয়-বাদল-দিনেশ,
মাস্টারদা, বাঘা যতীন – তাঁদেরই সময়ের একজন আজ
আমাদের সঙ্গে রয়েছেন!”
অহীন একটু হাসল, কোন উত্তর দিল না। মেয়েটি
কোন উত্তরের প্রত্যাশাও করেননি। নানাবিধ অসুখ নিয়ে অজস্র অসুখী মানুষ নার্সিং হোমে
আসে। তাদের দেখে দেখে, আর তাদের অসুখের ইতিহাস শুনে শুনে মেয়েটি আবেগরহিত যন্ত্রবৎ
হয়ে উঠেছেন। তাঁর সেই থোড়-বড়ি-খাড়া পেশাদারিত্বে হঠাৎই কাঁপন ধরিয়েছেন অবিনবাবু। তিনি
কোন অসুখেই অসুস্থ নন। পোড়োবাড়ির গোপন কুঠরি থেকে অকস্মাৎ আত্মপ্রকাশ করেছেন এই বিস্ময়
মানুষ। যাঁর বয়েস নাকি একশ, কিন্তু দেখে মনে হয় সোফায় অপেক্ষারত ওই ছোকরার সমবয়সি।
মিনিট দশেক অপেক্ষার পর, চেম্বারে ঢোকার
অনুমতি পেল অহীনরা। ডাক্তারবাবু ওদের দেখেই বললেন, “আরে আসুন, আসুন। কেমন দেখলেন, নবীনদা?
কথাবার্তা হল?”
চেয়ার টেনে বসতে বসতে নবীনবাবু
বললেন, “এমনিতে তো ভালই লাগল। তবে কথাবার্তা বেশ চাঁছাছোলা”।
ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, “যেমন”?
নবীনবাবু বললেন, “উনি আমাদের সকলেরই দাদু
হন, কিন্তু আমাদের “দাদু” ডাক শুনেই খুব গোঁসা করলেন। বললেন, আমাকে দেখে কি তোদের
“দাদু” বলে মনে হচ্ছে? শেষে অহীন ওঁনাকে “বিনুদা” ডেকে পরিস্থিতির
সামাল দিল”।
ডাক্তারবাবু হাসলেন, বললেন, “আসল সমস্যার
এই তো সবে শুরু। চা বলি? অনেকক্ষণ এসেছেন, নিশ্চয়ই চা খাননি”। ফোন তুলে চঞ্চলাকে তিনটে চা দিতে বলে, আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কিছু? ভারতের স্বাধীনতা
নিয়ে?”
অহীন বলল, “স্বাধীনতা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন
বৈকি। আপনার কথা বললেন, আপনি নাকি খুব ব্যস্ত বলে এড়িয়ে গিয়েছেন! আর ওঁনার নার্স পারুল
ম্যাডাম যা বলেছেন, সে তো সাংঘাতিক”।
ডাক্তারবাবু বললেন, “তাই নাকি? কী বলেছে,
পারুল?”
অহীন বলল, “উনি নাকি বলেছেন, সবাই তো
বলে, আমি তো তেমন কিছু বুঝি না”।
ডাক্তারবাবু গভীর স্বরে বললেন, “হুঁ বাচ্চা
মেয়ে। খুবই অভাবী সংসার থেকে এসেছে। ছোটবেলা থেকে দেখেছে স্বাধীনতা দিবসে পাড়ায় পাড়ায়
দেশভক্তির গান চালিয়ে উৎসব হয়। সে সময় ওদের বাড়িতে হয়তো রান্না হয়নি। ওদের ছোটবেলাতেই ওর বাবা সংসারের দায় ফেলে পালিয়েছে। মা-ভাই-বোন মিলে
ওরা আধপেটা খেয়ে থেকেছে দিনের পর দিন। ওর মা লোকের বাড়ি-বাড়ি কাজ করে। বাড়িতে ওই সবার
বড়, দুটো ছোট ভাই আছে। এই বছর দুয়েক হল, আমার এখানে কাজ করে তবু হয়তো দুবেলা দুমুঠো
অন্ন-সংস্থান হচ্ছে। তাই ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ওরা তো আর ব্রিটিশ রাজত্ব
চাক্ষুষ করেনি। কাজেই, স্বাধীনতা ব্যাপারটা ওর কাছে, ধোঁয়াটে,
অস্পষ্ট। কোন আবেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি”।
ডাক্তারবাবুর কথার মধ্যেই চা এসে গিয়েছিল।
অহীনরা চুপ করে কথা শুনছিল। কথা শেষ করে ডাক্তারবাবু স্বাভাবিক
মুডে ফিরে বললেন, “আরে, হাত গুটিয়ে বসে কেন, নবীনদা। চা খান। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে…তা তুমি
কী বললে, অহীন?”
অহীন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “বললাম, ১৯৪৭
সালের পনেরোই আগস্ট মাঝরাতে আমরা স্বাধীন হয়েছি”।
ডাক্তারবাবু চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন,
“বলে দিলে? তারপর? উনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করেননি? দেশভাগ, টেশভাগ নিয়ে…”?
অহীন হাসল, বলল, “সে সব প্রসঙ্গ আসার
আগেই আমি ওঁনাকে চেপে দিয়েছি। বলেছি, তুমি কি একদিনেই স্বাধীন ভারতের ৭৯ বছরের সব খবর নিয়ে ফেলবে নাকি? বাড়িতে চল, ধীরেসুস্থে সব শুনবে”।
ডাক্তারবাবু খুব দুশ্চিন্তার সুরে বললেন,
“কতদিন? কতদিন আমরা ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারব, অহীন? তুমি কি জান? আমি ওঁনার ঘর থেকে
টিভি রিমোট সব সরিয়ে দিয়েছি। সেই ফ্রেমে ঝুলিয়ে দিয়েছে একটা গভীর অরণ্যের ছবি?”
অহীন বলল, “দেখেছি। মনে হল, ওঁনার ছবিটা
বেশ পছন্দও হয়েছে। ওঁনার সেই ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি আলোচনা করতে
করতে বার বার ছবিটা দেখছিলেন। আর গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলেন”।
ডাক্তারবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“খুব কঠিন সময় আসছে, নবীনদা। উনি যেভাবে দ্রুত রিকভার করছেন,
খুব শিগ্গিরি ওঁনাকে ছেড়ে দিতে হবে। বাড়িতে গিয়ে ওঁকে সামলাতে পারবেন, নবীনদা? খবরের
কাগজ। টিভি। ওঁকে দেখতে আসা অজস্র লোকের কথাবার্তা…। ওঁনাদের সময় থেকে আধুনিক সময়টা
যে কত বদলে গিয়েছে, সেটা উনি যত বুঝতে পারবেন, ততই অসহায় বিপন্ন বোধ করবেন। এ আমি নিশ্চিত
বুঝতে পারছি।”
নবীনবাবু বললেন, “এমন কেন
বলছেন, ডাক্তার সরকার? সে সময়ের থেকে আজ কত উন্নতি হয়েছে – ঘরে ঘরে বিজলি আলো,
টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেসিন, ল্যাপটপ, মোবাইল...। প্রচুর গাড়ি, ভালো ঘরবাড়ি,
রাস্তাঘাট...। আমাদের বিজ্ঞানীরা চাঁদে যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে ছবি তুলছেন। স্বাধীনতার
পর আমাদের দেশের এই উন্নতিতে উনি তো খুশিই হবেন”।
অহীন বলল, “দেশের
উন্নতিতে উনি নিশ্চয়ই আনন্দ পাবেন, বাবা। কিন্তু আমারও ধারণা, প্রত্যেকদিন কাগজে
যেভাবে একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসছে। টিভির সংবাদে, রাজনৈতিক
আলোচনায় – প্রতিটি দলের প্রতিনিধিরা যে সব বিষয় নিয়ে তুমুল এবং
অবান্তর তর্ক-বিবাদ করছেন, একে অন্যকে দোষারোপ করছেন।
এ সব কিছুই আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে – আমরা ওসব
আর গায়ে মাখি না। কিন্তু উনি?”
ডাক্তারবাবু বললেন, “আমারও
সেটাই দুশ্চিন্তা, অহীন। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে পুরোন মূল্যবোধের সঙ্গে
যখন নিজেকে তুলনা করবেন, হয়তো ডিপ্রেস্ড্ হয়ে পড়বেন। ভয়ংকর বিপদের মধ্যে আমরা
ওঁকে টেনে নিয়ে চলেছি, নবীনদা। এর থেকে ওঁনাকে কী ভাবে মুক্ত রাখব সে উপায়ও আমার জানা
নেই”।
তিনজনেই চুপ করে বসে রইলেন
অনেকক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডাক্তারবাবু বললেন, “আমার রাউণ্ডে যাওয়ার সময় হয়ে
এল। নবীনদা তোমরা এখন এস। বৌমার দাদা সর্বজিৎকে অনেকদিন দেখছি না। এক কাজ করো না,
ওকে ডাক না একদিন। অবিনদাদুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে, আমরা সবাই মিলে আর একবার
বসি...। মহীন কি ছুটি পাবে, আসতে পারবে একবার?”
অহীন বলল, “সরুদা নার্সিং
হোমে আসতে চায়নি। বলেছিল, দাদুকে বাড়ি নিয়ে গেলে দেখা করতে আসবে। সরুদাকে বললে হয়তো
চলে আসবে। কিন্তু দাদার পক্ষে এখনই আসা শক্ত। এই তো লম্বা ছুটির পর ফিরে গেল। কথা
বলে দেখব। এখন আসি, কাকু। কাল আসব সবাইকে নিয়ে”।
“ঠিক আছে, এসো”।
চলবে...