উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয়  ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

পঞ্চম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১ "

সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য ";  "অচিনপুরের বালাই" ; " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৯ 


২০

 

রাতের খাওয়ার সময় অন্যদিন শম্পাদিদির সঙ্গে তার দু চারটে কথা হয়, নিতান্তই সাংসারিক কথা। যেমন আগামীকাল দাদাবাবুর জন্যে কি কি রান্না করা যাবে, তার পরিকল্পনা। অথবা দাদাবাবু, আজকে নতুন সিলিণ্ডার চালু করলাম, কাল -পরশুর মধ্যে একটা গ্যাস বুক করে দিও। অথবা বাজারে কদিন ধরেই টাটকা মৌরলা উঠছে, কালকে ভাবছি আনব।

আজ সেরকম কোন কথা হল না, কারণ সন্ধ্যার আলাপের পর দুজনেই খুব গম্ভীর। দুজনের কেউই অতি তুচ্ছ সাংসারিক কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই।

অতএব রাতের খাওয়াদাওয়া সাঙ্গ হলে, রান্নাঘরের কাজ সেরে শম্পাদিদি বাড়ি যাওয়ার সময়, “আসছি, দাদাবাবু” বলার পর, সুনেত্র সদর দরজাটা বন্ধ করে বেশ নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলল। ভাবল, শম্পাদিদি তার জীবনের এমন অনেক সংবাদ জানে – যার অনেকটাই সে জানে না। সেই তথ্যগুলি কী, না জানা পর্যন্ত শম্পাদিদির সামনে দাঁড়াতে তার অস্বস্তি তো হবেই।

সুনেত্র টেবিলে বসে ল্যাপটপ চালু করল। কনি কি সারাদিনে আর কোন মেল লেখার সময় পেয়েছে? হ্যাঁ মেল করেছে...অধীর আগ্রহে সুনেত্র মেলটা খুলল –

সুনুদা,

সকাল এগারোটা নাগাদ বাবা-মায়ের সঙ্গে নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরলাম। সারাটা পথ মা বুকে করে জড়িয়ে রেখেছিলেন আমার পুত্রকে। খুব সুখী হয়ে ওঠার যথেষ্ট কারণ ছিল, সুনুদা। কিন্তু হইনি। মঞ্জরীম্যাডাম আমাকে মিষ্টি খাওয়ানোর আবদার করেছিলেন, আমার ‘প্রমোশন’ হওয়ার জন্যে। আমার মনে হল, আমার প্রমোশন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা আধাখেঁচড়া ধরনের। কারণ বাম্বাইয়ের বাবা ও তার দিকের সম্পর্কগুলো সূক্ষ্ম সুতোয় ঝুলছে। এবং সেই সময় আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি, সেই সুতোটুকু আমাকে ছিঁড়তেই হবে।            

 ওই দিন সন্ধের দিকে পিন্টুর বাবা এসেছিলেন। শুনেছি, যে কদিন আমি নার্সিং হোমে ছিলাম, উনি প্রতিদিনই বিকেলের দিকে ওখানে যেতেন। অপেক্ষা করতেন আমার বাবা-মায়ের জন্যে। ওঁদের থেকে আমাদের সব সংবাদ নিয়ে উনি বাড়ি ফিরতেন। ওই প্রথমদিন ছাড়া, উনি আর একদিনও আসেননি আমার সঙ্গে দেখা করতে।

উনি বাড়ি আসাতে, আমি হাল্কা অনুযোগের সুরে জিজ্ঞেস করলাম, “প্রথম দিনের পর, আমাদের দেখতে আর ওপরে যাননি কেন?”

“কোন মুখে যাবো বল দেখি, মা? তোর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে, তোদের দুজনের সব খবর রোজ নিয়েছি...কিন্তু যেতে পারিনি লজ্জায়। সেদিন পিন্টু আর ওর মা নীচেয় যে কেলেংকারিটা ঘটাল, তাতে তোর এবং তোর পরিবারের মাথাগুলো কতটা হেঁট হয়ে গেল, সে কি আমি বুঝিনি, মা?”

ঘরে বাবা আর আমি ছিলাম বাম্বাইকে নিয়ে। ওঁনার কথার কেউই কোন উত্তর দিতে পারলাম না, আমরা, চুপ করে রইলাম। উনিও অনেকক্ষণ চুপ করে বসেই রইলেন।

একটু পরে মা ঢুকলেন, দুটো সন্দেশ - দুটো সিঙাড়া আর চায়ের কাপ নিয়ে, মুখে হাসি নিয়ে বললেন, “বেয়াই মশাই, একটু চা খান। ওদের নিয়ে আজই বাড়ি এলাম তো...ওদের ঘর গোছগাছ করে, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সারতেই বেলা গড়িয়ে গেল, তাই আর ঘরে কিছু বানাতে পারিনি। আমি জানি বাইরের তেলেভাজা-টাজা আপনি খান না...তবু আজকে এছাড়া অন্য আর উপায় ছিল না”।

পিন্টুর বাবা, ম্লান হাসলেন, বললেন, “আজ সব খেয়ে নেব, বেয়ান, আপনি নিজে হাতে এনেছেন, আপনাদের ঘর আলো করে এসেছে আপনাদের নাতি...। এই আনন্দের দিনে ওটুকু অনিয়মে কিছু এসে যাবে না”।

মা আমাদের জন্যে এবং নিজের জন্যেও সিঙাড়ার প্লেট আর চায়ের কাপ নিয়ে এসে আমার পাশে বসে বললেন, “ও কথা বলছেন কেন? নাতি তো আপনারও। কিন্তু সিঙাড়াগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেলে, ভালো লাগবে না, বেয়াই মশাই, শুরু করুন”।

খুব সংকোচের সঙ্গে উনি খাওয়া শুরু করলেন। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “নাতি যে আমারও, সে কথা একশবার, বেয়ান। কিন্তু আমার পরিবার তার মাকেই যে সঠিক সম্মানে গ্রহণ করতে পারল না। নিজেকে ওই শিশুটির দাদু বলে দাবি করব, কোন অধিকারে”?

আমরা তিনজনেই কেউ কোন কথা বললাম না, ওঁর কথার উত্তরে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে উঠে পড়লেন ভদ্রলোক। করজোড়ে আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ তবে আসি? আমি কিন্তু মাঝে মধ্যেই তোদের বিরক্ত করতে চলে আসব, সুকু মা, আমার দাদুভাইকে একবার চোখের দেখা দেখতে...”।

উনি চলে গেলেন। আমরা তিনজনেই অনুভব করলাম, ওঁনার অসহায়তা।  

এর পাঁচ-ছদিন পরেই এক সকালবেলা, প্রভাতকাকু, বাবার এক অ্যাডভোকেট বন্ধু আমাদের বাড়ি এলেন। আমার পীড়া-পীড়িতে বাবাই ওঁনাকে ডেকেছিলেন। সাধারণ কথাবার্তার পর তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি সত্যিই ডিভোর্স চাইছ, সুকন্যা”।

আমি বললাম, “চাইছি, প্রভাতকাকু”।

“সব দিক ভেবেচিন্তে, মানে তোমার পুত্রের ভবিষ্যৎ, তোমাদের পরিবারের সুনাম, মানসম্মান...”।

“ভেবেছি”।

“কি জানো মা, একটা সম্পর্ক ভেঙে ফেলতে কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু গড়তে লাগে দীর্ঘ সময়...। আরেকবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী, সুকু মা? আজ নয় ছমাস-একবছর পর – দেশে আইন যখন আছে, তখন বিবাহ-বিচ্ছেদ তো যে কোন সময়েই করে ফেলা সম্ভব। কিন্তু একবার ভেঙে গেলে, সেটাকে জোড়া দেওয়া...”।

আমি কিছুটা রূঢ় স্বরেই বলে ফেললাম, “জোড়া দেওয়ার ভাবনা, আমি কোনদিনই ভাবতে যাবো না, কাকু”।

উনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, “তোমার বাবার কাছে তোমাদের সব কথাই শুনেছি, মা। এবং একথা সত্যি, এই ঘটনার ভালো-মন্দ ব্যক্তিগতভাবে একলা তোমাকেই ভোগ করতে হয়েছে। আমাদের – এমন কি তোমার বাবা-মাকেও ভোগ করতে হয়নি। এবং একথাও সত্যি, এই জীবনটাও একলা তোমারই – আমরা কেউই তোমার সেই দৈনন্দিন জীবনের অংশীদার হতে পারব না। কিন্তু, তোমার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে, তুমি কি হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত, মা?”

“হ্যাঁ কাকু। হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট”।

“বারবার আমি জিজ্ঞেস করছি বলে, বিরক্ত হয়ো না, মা। রাগের মাথায় অনেক সময় ডিভোর্স কেস ফাইল তো হয়ে যায় – তারপর কোর্ট যখন উভয়পক্ষকে ডাকে... তখন, আমার অভিজ্ঞতায় বহুবার দেখেছি, কমপ্লেন্যান্টের মন অনেকটাই সফ্‌ট্‌ হয়ে যায়।  কেস চলাকালীন অপোনেন্ট সেটা বুঝতে পারলে, তাদের উকিল ব্যাপারটাকে বিশ্রীভাবে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করে..। তারা তোমার যাবতীয় অভিযোগকে মিথ্যা অপবাদ বলে, মানহানির অভিযোগ করতে পারে...। আমি কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছো মা? কোর্টে কেস যখন চলবে, অনেক আজে-বাজে, অপ্রাসঙ্গিক কুৎসা, তর্কবিতর্ক চলবে, সেসময় দৃঢ় থাকতে পারবে তো? তাতে তুমি এবং তোমার পরিবার হাস্যাস্পদ হয়ে উঠতে পারো...”।

একটু চিন্তা করে আমি বলেছিলাম, “আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে... আমি কোন ভাবেই সফ্‌ট্‌ হবো না, কাকু”।

আমার কথাশুনে প্রভাতকাকু তাঁর ফোল্ডার ফাইল থেকে একগোছা কাগজ বের করে বললেন, “বেশ, তবে তাই হোক। তুমি কি অ্যালিমনি ক্লেম করতে চাও?”

“না”।

“না কেন? এবার একটু ছেলেমানুষি করে ফেলছ, মা। তোমার একটা ভবিষ্যৎ আছে। তার থেকেও বড়ো বিষয় তুমি এখন আর একলাটি নও। তোমার ছেলেকে সুস্থভাবে বড়ো করে তোলা, তার লেখাপড়া...অনেক খরচ মা। তুমি যেখানে কোন ভাবেই আপোস করতে চাইছ না, সেখানে ওদের থেকে অ্যালিমনি ক্লেম করতে আপত্তি কোথায়?”

“আমি চাই না, একজন মাতালের পয়সায় আমি এবং আমার ছেলে বেঁচে থাকি...। ছেলে একটু বড়ো হলেই আমি যে কোন একটা কাজ জুটিয়ে নেব...তাতে আশা করি আমাদের দুজনের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে উঠবে না”।

মৃদু হেসে প্রভাতকাকু বললেন, “বেশ তাই হোক, তোমার যেমন ইচ্ছে...”। 

এভাবেই, সুনুদা, কেস ফাইল হয়ে গেল, এবং মোটামুটি মাস ছয়েকের মাথায় আমি ডিভোর্সও পেয়ে গেলাম নির্বিঘ্নে। আমার শাশুড়ি কিছুটা লড়াই দেওয়ার চেষ্টা করলেও, জ্যোতিষ এবং আমার শ্বশুরমশাই লড়ার কোনরকম চেষ্টাই করলেন না। আমি স্বস্তির শ্বাস ফেললাম ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে আরেকটা ঘটনা ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠল।

আমরা ডিভোর্স কেস রুজু করার দিন পনের পর, হঠাৎ জ্যোতিষের কোম্পানির মালিক, শশাঙ্ক মিত্র আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। তুমি তো দেখেছ শশাঙ্ককে, যথেষ্ট সুদর্শন, সুপুরুষ, বয়সে জ্যোতিষের তুলনায় চার-পাঁচ বছরের বড়ো। ওর থেকেই জানলাম শশাঙ্ক আর জ্যোতিষ একই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাস আউট, যদিও জ্যোতিষের তুলনায় ও পাঁচ বছরের সিনিয়ার।

শশাঙ্কর কোম্পানিটা ওর পৈতৃক কোম্পানি – কন্সট্রাকশনের ব্যবসা। বাংলা করে বললেন, ঠিকাদারি সংস্থা। ওর বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, সাধারণ গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরে কোম্পানিটাকে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। অতএব তাঁর ইচ্ছে, তাঁর বানিয়ে তোলা রাজ্যটাকে, তাঁর ইঞ্জিনিয়ার পুত্র সাম্রাজ্য বানিয়ে তুলুক। অতএব কলেজ থেকে বেরিয়ে শশাঙ্ক বাবার কোম্পানিতেই ঢুকেছিল। এবং সে জয়েন করার দশ বছরের মধ্যেই, সে নাকি তার বাবার কোম্পানির টার্নওভার এবং প্রফিট মার্জিন অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিল। সে সময় ওদের কোম্পানি নাকি কলকাতা ছাড়াও, দিল্লি এবং চেন্নাইতেও ব্র্যাঞ্চ অফিস খুলে ফেলেছিল। 

সে যাগ্‌গে, মিঃ মিত্র (মিঃ মিত্রই বলি, কারণ আমার জীবনে তার শশাঙ্ক হয়ে উঠতে বেশ কয়েকবছর পার হয়ে গিয়েছিল) একদিন আমাদের বাড়িতে উদয় হয়ে, নিজের পরিচয় দিয়ে, বাবা এবং আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। সব কথা বলে তোমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না, কিন্তু আলাপের শুরুটা তোমার জেনে রাখা ভালো। কেন সেকথা তুমি পরে বুঝতে পারবে। 

পরিচয় পর্ব শেষ হয়ে আলাপের শুরুতেই মিঃ মিত্র বললেন, “কলেজের ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে আমিই জ্যোতিষকে তুলেছিলাম। যেহেতু আমিও ওই কলেজেই পড়েছি, ওই কলেজের ছেলেদের ওপর আমার সর্বদাই একটা সফ্‌ট্‌ কর্নার ছিল, আজও আছে। আশা করি ভবিষ্যতেও থাকবে। কলেজে পড়তে, হস্টেলে থাকতে সকল ছাত্রই, বাড়ির বাইরে এসে কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে, এবং কমবেশি নেশা-ভাংও করে। সেটাকে আমরা খুব একটা  বড়ো ব্যাপার বলে ভাবি না। এবং আমরা এও দেখেছি সব ব্যাচেই কয়েকজন ছেলে অ্যাডিক্টেড হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ ছেলেই পাস করার পর, কর্মজগতে এসে অনেকটাই শুধরে যায়। জ্যোতিষকে যখন আমি সিলেক্ট করি, ওর মধ্যে অ্যাডিকশনের কোন লক্ষণ আমি বুঝতে পারিনি – অবশ্যই সেটা আমার ভুল।

লাস্ট সেমেস্টার পাস করে গেল জ্যোতিষ। কলেজ থেকে মার্কশীট এবং সার্টিফিকেট পেয়ে আমাদের অফিসে জমা করল এবং নিয়ম-মাফিক আমাদের কোম্পানিতে যথা সময়ে জয়েনও করে গেল। অবশ্য ইন্টারভিউয়ের সময়েই আমার প্রথম খটকা লেগেছিল ওর মার্কশীটের প্যাটার্ন দেখে। ফার্স্ট থেকে সেভেন্থ সেমেস্টার পর্যন্ত ওর নাম্বারগুলো ছিল কনসিস্ট্যান্টলি ডিক্লাইনিং। ইন্টারভিউতে ওকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম, এর কারণ কি? ও উত্তরে বলেছিল, ওর বাড়িতে নানান দুর্ঘটনা, মায়ের অসুস্থতা, বাবার চাকরি চলে যাওয়া...ইত্যাদি নানা কারণে ও খুব মানসিক উদ্বেগে ছিল, তাই রেজাল্ট ভালো হয়নি। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, এবং সিম্প্যাথেটিক হয়েও উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম, পাশ করে বেরিয়েই একটা জব এনশিয়োর করতে পারলে, ওর এই উদ্বেগটা নিশ্চয়ই কমবে। ইন্টারভিউয়ের পরে ওর লাস্ট সেমেস্টার ছিল প্রায় মাস তিনেক পরে। আমি ভেবেছিলাম এবং ওকে বলেওছিলাম, আশা করি তোমার লাস্ট সেমেস্টারের মার্কস যথেষ্ট ভালো হবে। জ্যোতিষ সেদিন কৃতজ্ঞ চোখে আমাকে কথাও দিয়েছিল, “আপনি যেভাবে আমাকে হেল্প করলেন, আমার ফাইন্যাল সেমেস্টারে আমি সবাইকে দেখিয়ে দেব”।

মিঃ মিত্র একটু থেমে মৃদু হেসে বলেছিলেন, “ও কথা রাখেনি। আমাদের কোম্পানিতে ওর জয়েন করার খবর যখন সবাই জেনে গেল। অনেকেই আমাকে বলেছিল, “শশাঙ্কদা, আপনি আর ছেলে পেলেন না, শেষ পর্যন্ত জ্যোতিকে”? ওর থেকে এক, দুই বা তিন বছরের সিনিয়র ছাত্রদের কয়েকজন আমাদের সঙ্গেই রয়েছে, দে আর ফেয়ার এনাফ, অ্যান্ড উই আর রিয়্যালি হ্যাপি হ্যাভিং দেয়ার সিনিসিয়ার সার্ভিসেস টিল দিস ডেট – তারাই বলল। এমনকি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন এবং আমাদের বিজ্‌নেসের ব্যাপারে খুবই সাহায্য করেন, কলেজের এমন কয়েকজন প্রফেসরও আমাকে একই কথা বলেছিলেন। ভুলটা বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু তখনই কোন উপায় ছিল না, কারণ একজনকে অ্যাপয়েন্ট করার কয়েকদিনের মধ্যেই, উইদাউট এনি ভ্যালিড রিজ্‌ন্‌, তাকে ডিসমিস করলে, আমার এবং কোম্পানির বদনাম হয়ে যেত। সে সময় ওকে আলাদা ডেকে এই সব কথাই বলেছিলাম। জ্যোতিষ আমাকে কথাও দিয়েছিল, ও শুধরে যাবে। কিন্তু ও কথা রাখেনি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম ও কথা রাখে না”।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন মিঃ মিত্র। আমরা কেউই এতক্ষণ কোন কথা বলিনি। বাবা উদাস চোখে তাকিয়ে ছিলেন জানালার বাইরে, আর আমি মেঝের দিকে। 

চলবে...


শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ১

 প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

তৃতীয় ধারাবাহিক উপন্যসের প্রথম পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

চতুর্থ ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১

 উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "





মুখবন্ধ ঃ 
[১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে বৃটিশ অপশাসন থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নেহরুজির বক্তব্যের প্রথম বাক্যটি ছিল, Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially”.। আজ স্বাধীনতার আশিতম বছরে পা রেখে, সত্যিই কি আমরা পেরেছি এবং পারছি আমাদের যাবতীয় pledge redeem করতে? এক কল্পিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আজকের জেন-জি তরুণের কথোপকথনের মাধ্যমে এই উপন্যাস তুলে ধরবে আমাদের যাবতীয় পাওয়া-না পাওয়ার কাহিনী।]       


বারোই জুলাই, ২০২৬ শনিবার  

শনিবার সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ উঠে অহীন দাঁত ব্রাশ করছিল, বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সামনের বাগানে প্রচুর ফুল এসেছে। নয়নতারা, টগর, রঙ্গন, সূর্যমুখী, দোপাটি – কেউই তেমন নামকরা ফুল নয়। কিন্তু সজীব সবুজ পাতার সঙ্গে সদ্যফোটা ফুলের ঔজ্জ্বল্যে চোখ এবং মন ভরে ওঠে। খুব মন দিয়ে দেখছিল অহীন, পিছনে এসে দাঁড়ালেন অহীনের বাবা নবীনবাবু, তাঁর হাতে চায়ের কাপ। ছেলেকে ব্রাশ করতে দেখে বললেন, “এতক্ষণে উঠলি? রাত করে শুবি, তারপর বেলা করে উঠবি”।

মুখে ফেনা নিয়েও অহীন হেসে ফেলল, মুখটা ওপর দিকে তুলে বলল, “সকাল সাড়ে ছটাও তোমার কাছে বেলা হয়ে গেল, বাবা?”

নবীনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “মুখে ফেনা নিয়ে বক বক করিস না, যা চট করে মুখটা ধুয়ে আয়। বাবা আজ সকালে মিটিং ডেকেছেন, ভুলে গেলি? গতকাল রাত্রে আমাকে বললেন, আমরা সবাই মিলে, ওঁনার ঘরে যেন যাই, আজ ঠিক সকাল ছটায়। তোর জন্যে দেরি হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে এখন আমাকে বকা খেতে হবে”।

অহীন অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাল, বলল, “পি, প্যাপা পও পো?” কথাটা, কি ব্যাপার বলো তো? কিন্তু মুখভরা পেস্টের ফেনা নিয়ে প-বর্গের আদ্যাক্ষর ছাড়া কিছুই বোঝা গেল না। নবীনবাবু এবার বিরক্ত হলেন, বললেন, “প-প না করে মুখটা ধুয়ে আয় না, তাড়াতাড়ি”। অহীন কথা না বাড়িয়ে বেসিনের দিকে গেল, নবীনবাবু ছেলেকে বললেন, “আমি বাবার ঘরে যাচ্ছি, মুখ ধুয়ে বৌমার থেকে চা নিয়ে তুই তোর মা, আর বৌমাকে নিয়ে সোজা চলে আসবি”। অহীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

মুখটুক ধুয়ে চায়ের কাপ নিয়ে মা আর বৌদির সঙ্গে দাদুর ঘরে ঢুকল অহীন। ঠাকুমা ঘরেই ছিলেন, বিছানায় বসেছিলেন তাঁর পাশে অহীনের মা আর বৌদি গিয়ে বসলেন, অহীন বসল বাবার পাশে সোফায়, দাদুর উল্টোদিকে।

প্রবীণবাবু পুত্র নবীনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ ১২ই জুলাই। আর ঠিক সাতদিন পর, আমার ছোটকা, তোর ছোড়দাদু অবিনের সমাধি ভঙ্গ এবং জাগরণ দিবস, মনে আছে?”

অহীন আকাশ থেকে পড়ল, ছোটবেলা থেকে সে মা-দাদু-ঠাকুমার কাছে শুনেছে বটে। ঠাকুরদাদার ছোটকাকা তাদের প্রাচীন বাড়ির কোন এক পাতালঘরে নাকি বন্দী হয়ে বহুদিন ধরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন আছেন। সেই ছোড়- প্রপিতামহর একশ বছর পূর্ণ হলেই তিনি আবার নাকি ঘুম ভেঙে জেগে উঠবেন। কথাটা সে মোটেই বিশ্বাস করেনি। এমন আবার হয় নাকি? আজগুবি গল্প বলেই, সে মন থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা। কিন্তু আজ সাতসকালে তার দাদুর মুখে সে কথাটা শুনে সে বেশ তাজ্জব হয়ে গেল। দাদু তার মানে এ কথাটা বিশ্বাস করেন শুধু নয়, সেই দিনটি তিনি সিরিয়াসলি মনেও রেখেছেন! অহীন কিছু বলল না, দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

নবীনবাবু মুচকি হেসে বললেন, “ওসব কথা এখনও তুমি মনে করে রেখে দিয়েছ, বাবা? ওসব কথা কি আর সত্যি? স্বদেশী করা ছোটদাদু হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন বলে, ও রকম একটা গুজব রটেছিল। অনেককে তো বলতে শুনেছি, ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ তাঁকে মেরে ফেলেছিল। আবার কেউ কেউ বলে, তিনি সন্ন্যাসী হয়ে সুদূর হিমালয়ে চলে গেছিলেন – পরে সেখানেই দেহরক্ষা করেছেন”।

প্রবীণবাবু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পুত্রের কথা শুনছিলেন, কথা শেষ হতে বেশ রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি চিরকালই পরের মুখে ঝাল খেতে ভালোবাস। বাবা-মা, গুরুজনদের কথা কোনদিনই তোমার কানে ঢোকেনি আর কোনদিন ঢুকবেও না। নিজের চোখে আমি যা দেখেছি, তুমি তাকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চাও?”

ব্যাপারটা বেশ রাগারাগির দিকে চলে যাচ্ছে দেখে, আর দাদুর কাছে নিজের বাবাকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে অহীনের খুব খারাপ লাগছিল। সে বলল, “দাদু তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”

প্রবীণবাবু নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন, “একরকম ভাবে নিজের চোখেই দেখা বলতে পার। তবে আমাকে কি আর সেই পাতালঘরে কেউ ঢুকতে দিয়েছিল? আমি যে তখন বছর সাতেকের বালক মাত্র!”

অহীন খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “পুরো ঘটনাটা বলো না, দাদু। ঠাকুমার কাছে ছোটবেলায় শুনেছিলাম, মনে নেই তেমন”।

নাতির আগ্রহে প্রবীণবাবু খুশিই হলেন। পাশের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।  হয়তো পুরোনো সেই সব দিনের স্মৃতিগুলি তিনি মনের মধ্যে গুছিয়ে তুলছিলেন।  তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন।

“১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। আর যে ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি, সে ঘটনা ঘটেছিল তেতাল্লিশ সালে। আমার ছোটকা তখন বছর সতেরর টগবগে তরুণ, আর আমার বয়স সাত। আমার বাবা এবং আমার দাদু দুজনেই ছিলেন জাঁদরেল সরকারি অফিসার। অবিশ্যি দাদুকে আমার মনে পড়ে না। কারণ তিনি যখন মারা যান, আমার বয়েস তখন দেড় কি দু বছর। গোরা সায়েবদের সঙ্গে তাঁদের বেশ ভালই দহরম-মহরম ছিলআরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, ওই রকম সাহেবঘেঁষা পরিবারের ছেলেদের অনেকেই কেমন করে  যে স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন, কে জানে? আমার মেজকা, সেজকা দুজনেই স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। মেজকা পুলিশের গুলিতে মারা যান তাঁর ছাব্বিশ বছর বয়সে। কাকিমা চার বছরে মেয়ে আর দুবছরের ছেলে নিয়ে বিধবা হয়েছিলেন।  আর সেজকা নিরুদ্দেশ হয়ে যান ঊণিশ বছর বয়সে। তার পর থেকে তাঁর আর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। দুই দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, এক সময় ছোটকাও স্বদেশী দলে ভিড়ে গিয়েছিল

তবে বড়ো হয়ে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বিশাল পরিবারের সব ঠাট-বাট বজায় রাখতে গিয়ে আমার বাবাকে বাধ্য হয়েই ব্রিটিশদের গোলামি করতে হয়েছিল। সায়েবদের সঙ্গে কিছুটা আমড়াগাছিও যে করতেন না, তা নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁর মনে কোথাও একটা প্রশ্রয় এবং সহানুভূতি ছিল। আর সেই কারণেই, স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে মেতে ওঠা ছোটভাইদের তিনি কোনদিনই তেমন কঠোরভাবে নিষেধ করেননি।

বিয়াল্লিশ সালে মহাত্মাজির ডাকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছিল। শিক্ষিত যুবক এবং ছোকরারা দলে দলে স্বদেশী বিপ্লবে নাম লেখাল। ছোটকাও সে দলে ভিড়ে গেল আর কিছুদিনের মধ্যেই তার নাম জড়িয়ে গেল একটি ডাকাতির কেসে। ছোটকা হয়ে গেল স্বদেশী ডাকাত”।

অহীন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “স্বদেশী ডাকাত মানে?”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রবীণবাবু বললে, “দেখ বাপু, বিপ্লব, আন্দোলন কিংবা সংগ্রাম যাই বলো না কেন – একটা সংগঠন গড়ে, ছেলেপুলেদের শিখিয়ে পড়িয়ে দেশের কাজে নামাতে গেলে, অনেক খরচা আছে। এসবের জন্যে ভাল রকম টাকাকড়ির যোগাড় রাখতে হয়। বিশেষ করে সে আন্দোলন যদি আবার সশস্ত্র সংগ্রাম হয়। টাকা ছাড়া বন্দুক, গোলাগুলি, বোমা বানানোর সরঞ্জাম কোথা থেকে আসবে? এছাড়াও সাধারণ খরচ-খরচাও তো কম নয়। এদিক-সেদিক যেতে আসতে ট্রেনের ভাড়া, লঞ্চের ভাড়া, খেয়ার পারানি, খাইখরচ

কিছু কিছু ধনী মানুষ – শুনেছি আমার বাবাও - সে সময় গোপনে দান-টান করতেন ঠিকই, কিন্তু সে টাকায় সংকুলান হত না। অতএব ডাকাতি করতে হত। কোন কৃপণ দেশীয় বড়োলোক মহাজনের বাড়িতে হোক, কিংবা পোস্ট অফিস বা সরকারি ট্রেজারিই হোক।

সরকারি ট্রেজারি লুঠ করার ভয়ংকর ঝুঁকি ছিল ঠিকই। কিন্তু করতে পারলে, অনেক দিক থেকেই লাভ হত। এক, টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। দুই, গোরা প্রশাসনের মুখে ঝামা ঘষে তাদের ওপরে বেশ একটা চাপ সৃষ্টি করা যেত। এবং তিন, এই ধরনের কাজ দু চারটে ঠিকঠাক করতে পারলে, স্বদেশী করা ছেলেদের মনোবল বাড়িয়ে তোলা যেত। নতুন নতুন তরুণ এবং যুবকদের স্বদেশী দলে টানা সহজ হত। অতএব যারা এই ধরনের লুঠপাটের কাজ করত তাদেরকে “স্বদেশী ডাকাত” বলা হত”।

অহীন জিজ্ঞাসা করল, “কারা বলত? নিশ্চয়ই ব্রিটিশরা এবং তাদের ধামাধরা ভারতীয় অফিসাররা?”

প্রবীণবাবু হাসলেন, বললেন, “ইংরেজরা তাদের এক্সট্রিমিস্ট বলেছে, টেররিস্ট বলেছে। তারা ওসব বলতেই পারে, কারণ তাদের ট্রেজারি লুঠ হলে, তাদের গায়েই তো সব থেকে বেশী জ্বালা ধরত। কিন্তু “স্বদেশী ডাকাত” নামটা দিয়েছিল দেশীয় সাধারণ মানুষরাই! যারা বিশ্বাস করত সায়েবরা হল রাজার জাত, আর আমরা সবাই মহারাণির প্রজা। তাদের কাছে আমরা কৃপা বা করুণা ভিক্ষা করতে পারি। ইংল্যাণ্ডে রাণির কাছে দরবার করতে পারি। তা না করে, গোরাদের কোষাগার লুঠ করা, সায়েবদের পেটানো বা খুন করে ফেলা। এ সবই সাধারণ মানুষদের চোখে ঘোরতর অন্যায় মনে হত। তারা বলত, যারা এসব করে, তারা স্বদেশী আন্দোলনের নামে আসলে ডাকাতি করছে”।

প্রবীণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, আবার বললেন, “সাতচল্লিশে ভারত যখন স্বাধীন হল, আমার বয়স তখন এগারো বা সাড়ে এগারো। তখন দেখেছিলাম, স্বাধীনতার উৎসবে ওই সাধারণ মানুষগুলোই সব থেকে বেশি নাচানাচি শুরু করেছিল। পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে তখন প্রত্যেকটি লোকই নিজেদের “স্বাধীনতা-সংগ্রামী” ঘোষণা করে দিয়েছিল। পাড়ার কুকুর-বেড়ালগুলো নেহাত অবলা নাহলে তারাও বলে উঠত “জয় হিন্দ”। আর এই ডামাডোলের সুযোগেই, রাতারাতি গজিয়ে উঠল অনেক ডান ও বাম নেতা, যারা কোনদিন স্বদেশী তো করেইনি, বরং বহুক্ষেত্রে তারা স্বদেশীদের ঢিট করতে ব্রিটিশ পুলিশকে সাহায্য করেছিল। এবং তারাই স্বাধীনতা অর্জনের সমস্ত গৌরবটা চেঁটেপুটে খেল”।  

অহীন বলল, “প্রকৃত স্বদেশী নেতারা এসব মেনে নিলেন কেন?”

প্রবীণবাবু বিষণ্ণ হাসলেন, বললেন, “কী জানো দাদুভাই। স্বদেশীদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দেশকে স্বাধীন করা। স্বাধীনতার জন্যে তাদের সকলের মনে ছিল আশ্চর্য এক আবেগ আর আদর্শ। তাঁরা তো কেউ নেতা হয়ে নিজের আখের গোছানোর কথা চিন্তা করেননি। তাছাড়া আগেই যে বললাম, সাধারণ জনগণ এই স্বদেশী কর্মীদের আবেগটা কোনদিন বুঝতেই পারেনি। স্বদেশীরা ডাকাতি করে, সায়েবদের বোমা মারে। দলে দলে মিছিল করেজেলে যায়, জেল থেকে অসুস্থ হয়ে ফেরে। জেল থেকে ছাড়া পেয়েও তারা পুলিশের নজরে থাকে। এই সব লোকের সংস্রব সাধারণ মানুষ কোন ভরসায় রাখবে? তার থেকে, যাদের সঙ্গে থানার কিংবা প্রশাসনের অফিসারদের নিত্য ওঠাবসা, সেই সব মুরুব্বি-মাতব্বর নেতাদের তারা দিব্যি বুঝতে পারত। তাদের মান্যিগণ্যি করে কৃতার্থ হত।

স্বাধীনতার পর প্রশাসনের ব্রিটিশকর্তারা তো চলে গেল, কিন্তু দেশীয় অফিসাররা? যারা এতদিন ব্রিটিশ সরকারের হয়ে কাজ করছিল, স্বাধীন ভারতে তারাই তো হয়ে উঠল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা! তারাই বা স্বদেশী করা নেতাদের ভরসা করবে কোন মুখে? স্বাধীনতার কয়েকদিন আগেও তো তারা ওই স্বদেশী নেতাদের থানায় ধরে এনে উত্তম-মধ্যম ঠেঙিয়েছে! রাতবিরেতে তাদের গ্রেফতার করতে গিয়ে বাড়ির মা-বোনদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে! দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে, সেই অফিসারদের পক্ষে, রাতারাতি সেই সব স্বদেশী নেতাদের “স্যার, স্যার” বলা সম্ভব? আমলারা যতই আমড়াগাছির চেষ্টা করুক না, তেলে-জলে কোনদিন মিশ খায়?      

বরং এতদিন যাদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা ছিল। যাদের হাত থেকে তারা নিয়মিত ডুডুও খেত, তামুকও খেত।  সেই সব মাতব্বরদের সাহায্য করাই তাদের পক্ষে তখন অনেক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠল! অতএব বলা যায় স্বাধীনতার পরদিন থেকেই প্রশাসন আর ধান্দাবাজ নেতা ও বণিকদের মধ্যে গড়ে উঠল নিখুঁত আদান-প্রদানের সখ্যতা। দু পাঁচজন ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার সামিল। আর স্বদেশী করা, পুলিশের মার খাওয়া, জেলখাটা বিপ্লবের নেতারা হয়ে উঠলেন অপ্রাসঙ্গিক। তাঁদের তাম্রফলক আর সাম্মানিক শংসাপত্র দিয়ে। অনেক দুস্থ সংগ্রামীকে মাসিক ভাতা-টাতা দিয়ে, আসলে দূরে ঠেলে দেওয়া হল।

অহীন গম্ভীর মুখে বলল, “বুঝলাম”।

গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাদু বললেন, “যাগ্‌গে, সে সব কথা এখন থাক, ছোটকার কথায় ফিরে আসি। যে স্বদেশীরা আমাদের জেলার ট্রেজারি লুঠ করেছিল, শুনেছি সেই দলে ছোটকাও ছিল। ওই ঘটনায় নাকি দুজন দেশীয় সেপাই মারা গিয়েছিল এবং এক গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। যার ফলে, পুলিশের দল ঘেয়ো কুকুরের মতো খুঁজতে বের হল স্বদেশী ডাকাতদের ধরতে। ছোটকার নামে অনেক কিছু শুনেছিলাম। ছোটকার কাছে নাকি দেশি পিস্তল ছিল আর সেই পিস্তলের গুলিতেই নাকি ওই গোরা সায়েব জখম হয়েছিল। অতএব, ছোটকা ধরা পড়লে ফাঁসি না হলেও, দ্বীপান্তর-বাস ছিল বাঁধা”।

“দ্বীপান্তর মানে – আন্দামান? সেলুলার জেল?”

“সেলুলার জেল। এই খবরে আমার ঠাকুমা তো ভেঙে পড়লেন। এর আগেই তিনি দুটি ছেলেকে হারিয়েছেন। এবার ছোট ছেলের শোকে তিনি নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। আমি তখন সব কিছু যে বুঝতে পেরেছিলাম, তা নয়। তবে বাড়িতে বড়োদের সবার আচরণেই ভয়ানক দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের লক্ষণগুলো বুঝতে পারছিলাম। এই সময়েই এক দুপুরে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হলেন, দাদু ও ঠাকুমার গুরুদেব, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ। তাঁর কাছে আমার বাবা-মাও দীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং সকলেই তাঁকে সাক্ষাৎ শিবজ্ঞানে ভক্তি করতেন।

ঠাকুর সিদ্ধানন্দ আমার ঠাকুমা আর মায়ের কাছে সব শুনে বললেন, “কিচ্‌ছু চিন্তা করিস না, মা। সন্ধে বেলা বড়োখোকা সুধীন সেরেস্তা থেকে ফিরলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস”। তখনকার দিনের মানুষরা যে কোন সরকারি দপ্তরকেই সেরেস্তা বলতেন। আর আমার বাবা হলেন বড়োখোকা - বাড়ির বড়ো ছেলে।

বাবা অফিস থেকে ফিরে অফিসের ধরাচূড়ো না ছেড়েই সোজা গেলেন গুরুদেবের ঘরে। বাবা আর ঠাকুমা ছাড়া সে সময় তিনি কাউকেই ঘরে থাকতে দিলেন না। কাজেই তাঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হল, বাড়ির আর কেউ জানতে পারলেন না।

তবে বড়ো হয়ে শুনেছি। ছোটকা সে সময় কোন গোপন জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিল। সে জায়গার হদিশ বাবা নাকি খুব ভাল করেই জানতেন। অতএব গুরুদেবের সঙ্গে কথাবার্তার পরেই, তিনি সেই সন্ধেতেই অফিসের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, ম্যজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করতে। গোপনীয়তার জন্যে, তাঁর গাড়ির ড্রাইভার বলাইকাকুকেও সঙ্গে নিলেন না বাবা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে গেলেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েবের সঙ্গে দেখা করে বাবা নাকি কথা দিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং এরপরে অবিন কোনভাবেই কোন স্বদেশী দলের সঙ্গে সংস্রব রাখবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে যেন অন্ততঃ চব্বিশ ঘন্টা সময় দেন। ম্যাজিস্ট্রেট সায়েব বাবাকে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলেন এবং কথাও দিয়েছিলেন। তারপর বাবা ছোটভাইকে তার গোপন ডেরা থেকে তুলে আনতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।   

ওদিকে ঠাকুমা আর আমার মা ঠাকুরঘরে জপ করতে বসলেন। অন্যদিকে ঠাকুর সিদ্ধানন্দ তাঁর দুই সেবক শিষ্যকে নিয়ে যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরের দরজায় খিল দিয়ে যোগাড়-যন্ত্র শুরু করলেন। সারা বাড়ি তখন উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তায় থমথম করছে। আমরা ছোটরা অর্থাৎ আমরা চার ভাইবোন এবং খুড়তুতো ভাই-বোনরাও সবাই সেদিন অবস্থা বুঝে পড়ার ঘরে চুপটি করে বই খুলে বসে পড়লাম। নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম ফিসফিস করে। এটুকু বুঝেছিলাম, সেদিন বড়োদের বিরক্ত করলে আমাদের পিঠ বাঁচাতে ঠাকুমা আসতে পারবেন না।

সেদিন রাত প্রায় সাড়ে নটা নাগাদ, বাবা বাড়ি ফিরলেন। তাঁর পিছনে পিছনে এল একজন লোক। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার কালো চাদরে ঢাকা। চেনবার কোন জো ছিল না। আমরা সবাই গাড়ির শব্দ পেয়ে কৌতূহলে দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, কিন্তু লোকটিকে চিনতে পারলাম না। লোকটিকে নিয়ে বাবা সোজা গুরুদেবের ঘরের বন্ধ দরজায় দুবার টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “গুরুদেব, আমরা এসেছি”। গুরুদেবের ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক হল এবং কালো কাপড় পরা লোকটিকে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়ে, ঠাকুর সিদ্ধানন্দ বললেন, “তোমাকে এখন আর দরকার নেই, সুধীন। দুশ্চিন্তা করো না। খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম কর। রাত সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ আমিই তোমাদের ডাকব। তার আগে কেউ যেন আমাদের বিরক্ত না করে”।

বাবা দোতলায় গিয়ে মা আর ঠাকুমার সঙ্গে চাপাস্বরে কিছুক্ষণ কথা বললেন, তারপর বললেন “সকলকে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে বল। গুরুদেবকে এখন বিরক্ত করা যাবে না, তাঁর কাজ শেষ হলে তিনিই আমাদের ডাকবেন”। এতক্ষণ গোটা বাড়িতে কিছুটা হলেও যেন প্রাণ ফিরল। মা-মেজকাকিমা, পিসিমারা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কাজের মাসি, রান্নার ঠাকু্ররাও চঞ্চল হয়ে উঠল। সদর দরজায় তালা পড়ে গেল। পালোয়ান সুভগরাম – আমাদের দারোয়ান - অন্যদিন শোয়ার আগে রামসীতার ভজন গাইত, সেদিন একদম নিস্তব্ধ। আমরা ছোটরাও কাকিমার তত্ত্বাবধানে চুপচাপ খেয়ে উঠে ঠাকুমার ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, ঠাকুমা কখন তাঁর কাজ সেরে ঘরে ফিরবেন। তখন কিছু খবর অন্ততঃ পাওয়া যাবে।

তা কিন্তু হল না। অপেক্ষা করতে করতে কখন আমরা ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। ঠাকুমার ডাকে আমাদের যখন ঘুম ভাঙল তখন ভোর। দেখলাম প্রত্যেকদিনের মতোই তিনি স্নান সেরে ফেলেছেন। তাঁর হাতে ফুলের সাজি - পুজোয় বসার আগে আমাদের ডাকতে এসেছেন।

ঘুম থেকে উঠে আমরা গোটা বাড়িটাই এক চক্কর ঘুরে এলাম। চার জন মানুষের কোন সন্ধান পেলাম না। ঠাকুর সিদ্ধানন্দ ও তাঁর দুই শিষ্য এবং কালো চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা সেই লোকটি। বলা বাহুল্য সেই লোকটিই আমার ছোটকা”।


চলবে...

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৫

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪ 

৪০

 

ভল্লা উঠে গিয়ে প্রদীপটা নিয়ে এসে উঠোনে বসল, বলল, “মারুলা এদিকে আয়”। তারপর মাটিতে কাঠি দিয়ে আস্থানের রেখাচিত্র আঁকতে লাগল। আঁকা শেষ হওয়ার আগেই রামালিও এসে ভল্লার পাশে বসল। মারুলা কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখল, বলল, “আস্থানে তুই দুবার গিয়েছিলি, না? একবার দিনে আরেকবার রাত্রে…নিখুঁত এঁকেছিস। কিন্তু তোর ছেলেদের আক্রমণের পর – শষ্পককে বলে, উপানু চার কোনে চারটে প্রহরী-স্তম্ভ বানিয়ে তুলেছে। কাঠের কাঠামো - বারো হাত উঁচুতে বাঁধা মাচায় একজন করে রক্ষী সারারাত পাহারা দেয়”। মারুলা খিঁকখিঁক করে একটু হাসল, বলল, “অবিশ্যি মাঝরাতে পেচ্ছাপ ফিরতে উঠে – ব্যাটাদের প্রতিদিনই  নিশ্চিন্তে ঝিমোতে দেখেছি…। যাগ্‌গে এবার তোর পরিকল্পনাটা শুনি। ঠিক কিসের জন্যে আক্রমণ করতে চলেছিস”?

ভল্লা মুখ তুলে তাকাল মারুলার দিকে, বলল, “মুখ্য উদ্দেশ্য শোধ নেওয়া – বেশ কিছু রক্ষীকে যমের দুয়োরে পাঠানো – পারলে উপানুকেও!”

মারুলা উত্তেজিত হয়ে বলল, “শালা উপানুকেও? শষ্পক শুনলে তোকে মাথায় করে নাচবে”।

“তার মানে? তার রক্ষী-সর্দারকে মারলে সে খুশি হবে?”

“রক্ষী-সর্দার না, ব্যাঙের মাথা। ওর ধামাধরা জনা আষ্টেক রক্ষী ছাড়া, অন্য রক্ষীরাই সুযোগ পেলে শালাকে মাটিতে পুঁতে দেবে। উপানু কোন ঘরে শোয় জানিস?” ভল্লা রেখাচিত্রের ওপর আঙুল দিয়ে উপানুর ঘরটা দেখাল। মারুলা আবার খিঁক খিঁক করে হাসল খানিকক্ষণ, তারপর বলল, “ঠিকই দেখিয়েছিস…কিন্তু বেজন্মটা একটু রাত হলেই – এই যে এই ঘরে...”, আঙুল দিয়ে ঘরটা দেখিয়ে মারুলা বলল, “এই ঘরে পীরিত করতে যায়?”

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই অবাক হয়ে বলল, “তার মানে?” রামালি বলল, “আস্থানে মেয়েরাও থাকে নাকি”?

মারুলা রামালির কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোকে এসব কথা বলতে লজ্জা করে, রামালি। কিন্তু না বলারও কোন মানে হয় না। বড়ো হচ্ছিস, নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো একটা জায়গা তৈরি করছিস। জগৎটাকে জানতে এবং চিনতে তো হবেই। জেনে রাখ, ছেলেতে ছেলেতেও পীরিত হয় – বিরল ঘটনা যদিও – কিন্তু হয়। মাস ছয়েক আগে উপানু এই ছেলেটিকে ওর নিজের সহকারী বলেই আস্থানে এনেছিল। দেখতে-শুনতে ভালো, একটু নাদুস-নুদুস ধরনের। কত বয়েস হবে – চোদ্দ-পনের? কিছুদিনের মধ্যেই উপানুর দুর্মতি টের পাওয়া গেল। ওই ঘরটিতেই সে ছেলেটিকে থাকতে দিল এবং রাত্রে নিয়মিত ছেলেটির বিছানায় যাওয়া শুরু করল। প্রথম দিকে ছেলেটি চেঁচামেচি করত, কান্নাকাটি করত। উপানু মারধোর করত। দু’-তিনবার পালাবার চেষ্টাও করেছিল। পারেনি – উপানুর আমড়াগেছো রক্ষীরা তাকে ঘাড় ধরে আস্থানে ফিরিয়ে এনেছে। উপানু মরলে অসহায় ছেলেটাও পিশাচের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে”

ভল্লা বলল, “শষ্পক জানে না? সে কিছু করছে না কেন?”

মারুলা বলল, “তুই তো জানিস, ভল্লা। শষ্পক প্রসাশনের লোক আর উপানুরা হল, নগরকোটালের অধীন। এখানে শষ্পকের নির্দেশ মানতে উপানু বাধ্য – কিন্তু উপানুর ব্যক্তিগত বিষয়ে কিংবা ওর অধীনস্থ কোন কর্মচারীর ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার অধিকার শষ্পকের নেই। সেই সুযোগটাই উপানু নিয়ে যাচ্ছে”। মারুলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আমার হাতেই উপানুর মৃত্যু লেখা আছে…একবার সুযোগ যদি পাই…”।

“না মারুলাদাদা, উপানু আমার শিকার, আমার হাতেই ও মরবে…”। রামালি দাঁতে দাঁত চেপে মারুলার দিকে তাকিয়ে বলল, “কবে থেকে আমি ওর আয়ু গুনছি…”। মারুলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রামালির চোখের দিকে, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ঠিক আছে, তোকেই দিলাম… পাঁঠাটাকে তুইই বলি দিবি…কিন্তু আমি তোর কাছাকাছি থাকবো…শালা ভয়ানক ঘুঘু…একটু ঊণিশ-বিশ হলেই ফস্কে যাবে”।

অনেকক্ষণ পর ভল্লা বলল, “উপানুর স্থায়ী ব্যবস্থা তো তোরা করেই ফেললি। এবার মূল পরিকল্পনাটা বলছি, শোন মারুলা। আমরা ঢুকবো পূবের দরজা দিয়ে। যতদূর জানি মাঝরাত্রে ওই দরজায় প্রহরা কিছুটা দুর্বল থাকে”।

একদম ঠিক। আমি বলব, পূব দিকের দুই স্তম্ভের দুই প্রহরীকে প্রথমেই টপকে দে। অন্ধকারে বেড়ার বাইরের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভল্ল বা তীর ছুঁড়ে। তারপর তিন থেকে চারজন বন্ধ দরজা টপকে নিঃশব্দে ঢুকে পড়, আর প্রহরীগুলোকে ঝপাঝপ সাবড়ে দে। রাত্রে ওদিকে জনা তিন-চার থাকে সবকটাই ঢ্যাঁড়স, সুযোগ পেলেই ঝিমোয়। তারপর বাঁদিকের রক্ষীদের ঘরের চারটে দরজায় শেকল তুলে দে। ব্যাটারা থাক বন্দী হয়ে, হঠাৎ কেউ বেরিয়ে পড়লেই বিপদ। এবার পশুশালা পার হয়ে পশ্চিমদিকে যেতে যেতে করণিক আর পাকশালার দরজাগুলোও বন্ধ করে দে। তারপর প্রথমে চল উপানুর অভিসার ঘরে। সেখানে উপানুকে শেষ করে, চারজন ছোট পাকশালার ঘুপচিতে গা ঢাকা দিয়ে প্রস্তুত থাক। সুবিধে হল, ওখান থেকে দুটো দিকেই লক্ষ্য রাখা যাবে”।

এইবার আমাদের সব থেকে কঠিন কাজটার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে। পাকশালার ঘুপচিতে ঢুকেই বাইরের ছেলেদের সংকেত দিতে হবে। তারা আগের মতোই বাইরে থেকে দুই স্তম্ভের দুই প্রহরীকে শেষ করবে। এবং একই সময়ে পশ্চিমের প্রধান দরজার উল্টোদিকে - রাজপথের ওপাড়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে থাকা ছেলেরা আক্রমণ করবে। ওখানে দরজার সামনে থাকা দু-তিনজন রক্ষীকে মারতে পারলে, বাকি রক্ষীরা পিছিয়ে যেতে যেতে আস্থানের অন্যান্য রক্ষীদের বেরিয়ে আসার সংকেত দেবে...কিন্তু রক্ষীদের ঘর বন্ধ এবং ততক্ষণে উপানু টেঁশে গেছে – আমাদের পেছনে চট করে কেউ আসতে পারবে না। এইসময় আমাদের ছেলেরা ঘুপচি থেকে হঠাৎ বেরিয়ে পিছিয়ে আসা রক্ষীদের আক্রমণ করবে। এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোনের প্রহরা-স্তম্ভে উঠেও আমাদের ছেলেরা রক্ষীদের আক্রমণ করতে পারবে।

এই কাজটা যত অল্প সময়ে যত নিখুঁত আমরা করতে পারবো, ততই আমাদের পক্ষে মঙ্গল”।  

    

   ভল্লা আর রামালি ছবিটার দিকে তাকিয়ে মারুলার পুরো পরিকল্পনাটা নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “আমার তো ভালই লাগছে পরিকল্পনাটা। তুই খেয়ে দেয়ে কেটে পর মারুলা। কালকে দিনের বেলা ছেলেদের সঙ্গে একটু আলোচনা করে, কাল রাত্রে আবার তোর সঙ্গে বসব...। দক্ষতা অনুযায়ী কোন ছেলে কোথায় থাকবে – সেটা আমাদের কালকেই ঠিক করে নিতে হবে”।

রামালি খাবার বাড়তে বসে গেল দেখে, মারুলা বলল, “আমাকেও তোর দলে নিতে পারিস, তবে আমি বাইরে থাকব, আস্থানে ঢুকব না। আমি উত্তরের দুটো প্রহরা-স্তম্ভের প্রহরীকে মেরে পশ্চিমের দরজার উল্টোদিকে ঝোপের আড়ালে থাকবো। সংকেত পেলেই দরজার সামনে থাকা কম করে দুটো রক্ষীকে তো আমি খসাবোই! ভালো কথা সংকেতটা কী হবে? সেটাও ভেবে ঠিক করে নিস”।

“বাঃ তুমি যে বললে, উপানুকে মারার সময় তুমি পাশে থাকবে?” রামালি ভল্লা আর মারুলার হাতে খাবারের থালা দিতে দিতে বলল।

ভল্লা বলল, “না রে, আমাদের সঙ্গে আস্থানের ভেতরে ঢুকলে মারুলাকে ওরা চিনে ফেলবে। তোর পাশে আমি থাকবো রামালি, তোর পাঁঠাকে তুই কাট না – তবে লেজ নয় – ব্যাটার মুড়োটাই কাটিস”।

মারুলা খেতে খেতে বলল, “তোদের ছেলেরা সাদা ধুতি পরলে – অন্ধকারেও কিন্তু বোঝা যাবে ভল্লা, বেশি সময় নেই – তা নাহলে কালো ধুতি যোগাড় করতে বলতাম”। ভল্লা রামালির মুখের দিকে তাকাল, কিছু বলল না। রামালি হেসে বলল, “কালো ধুতি আমরা কিনেছি তো, বীজপুর থেকে”।

মারুলা বলল, “জানি ভল্লাব্যাটার সব দিকেই লক্ষ্য, তবু একবার মনে করালাম। আচ্ছা শোন, তোর জন্যে শষ্পক চার বটুয়া রূপো পাঠিয়েছে…খেয়ে উঠে দিচ্ছি। শষ্পককে বলেছিলাম – তোরা বীজপুর গেছিস, ঘর-টর বানাতে হবে – শুনেই বলল, ভল্লার টাকা চাই তো…নিয়ে যাও… আরও দুটো বটুয়া থাকল আমার কাছে...। তোর ওই গচ্ছিত টাকার জন্যে শষ্পকের রাত্রে ঘুম হয় না, মনে হয়”।     

ভল্লা বলল, “ঠিক আছে, দিয়ে যাকিন্তু মারুলা, আমি ভাবছিলাম, আমাদের একজন কবিরাজ বা বৈদ্যকে দরকার – কিছুদিনের জন্যে। কী করা যায় বল তো?”

“কিসের জন্যে?”

“ধর আমাদের মধ্যে ওই দিন কেউ কেউ আহত হলাম, চিকিৎসার জন্যে কাউকে তো দরকার…”।

মারুলা বলল, “হ্যাঁ দরকার তো বটেই – কিন্তু হুট করে বিশ্বাসযোগ্য পাবি কাকে? যে ব্যাটাকে আনবি সে ব্যাটা হয়তো তোদের ওই শল্কুর মতো আস্থানে চলে গেল… তখন? তাকে ঘুম পাড়াতে আবার এই মারুলার খোঁজ পড়বে!

রামালি বলল, “একজন আছে ভল্লাদাদা, আমাদেরই গ্রামে – নাম বড়্‌বলা।  আমাদের গ্রামে আরেকজন বলা আছে, তাকে আমরা ‘ছোট্‌বলা’ ডাকি। আমাদের কবিরাজমশাইয়ের সঙ্গে বড়্‌বলা দীর্ঘদিন ছিল। কবিরাজ নয় কিন্তু কিছু কিছু শিখেছে - ক্ষত সেলাই, প্রলেপ বানানো, কিছু কিছু জড়িবুটি বানানো...কবিরাজমশাই না থাকাতে, এখন তো তাকেই ডাকছে গ্রামের লোকরা”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে করবে?”

“কেন করবে না? এখন আমাদের আর সুকরা গ্রামের সমস্ত লোক আমাদের সাহায্য করার জন্যে মুখিয়ে আছে – করবে না মানে? আরেকজন আছেন সুকরা গ্রামের কুশানকাকা – বলার থেকে কুশানকাকা ভালো কবিরাজি করে – তবে কুশানকাকা, সুরুলের মুখে শুনেছি, একটু বেশি রাজভক্ত। কাজেই কুশানকাকাকে দিয়ে আমাদের চলবে না

“বড়্‌বলাকে কাল একবার ডাক না, কথাবার্তা বলি”। ভল্লা বলল।

সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। রামালি এঁটো বাসন তুলতে তুলতে বলল, “ঠিক আছে”।

রামালি পুকুরের দিকে চলে যেতে ভল্লা মারুলাকে বলল, “ভাবছি, পরশু ছেলেদের নিয়ে একবার অস্ত্রভাণ্ডার থেকে ঘুরে আসব। কোন সময় যাওয়া ঠিক হবে বল তো”?

“দিনের বেলায় যা – আলো থাকতে থাকতে। কুলিকপ্রধানকে আমি বলে দেব - পরশু কেউ যেন কাজে না আসে। নিশ্চিন্তে ঘুরে আয় – সামনের দরজা নয়, পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকবি। কোন সময় যাবি – আমিও থাকব তাহলে”।

একটু চিন্তা করে ভল্লা বলল, “উঁহু। এখনই ছেলেদের সঙ্গে তোর পরিচয় হওয়াটা ভয়ানক ঝুঁকি হয়ে যাবে। এই দলটার মধ্যে থেকে যদি আরেকজন শল্কু বেরিয়ে পড়ে – তুই এবং শষ্পক দুজনেই বিপদে পড়ে যাবি। এবং আমাদের আস্থান আক্রমণের পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যাবে”।

এই সময় রামালি ফিরে এল পুকুর থেকে। ঘরের মধ্যে থালাবাটি হাঁড়িকুড়ি রেখে দিয়ে বাইরে এল।

মারুলাও চিন্তা করে বলল, “ঠিকই বলেছিস”।

ভল্লা তারপর রামালির দিকে তাকিয়ে বলল, “এক কাজ করতে পারিস। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করেই পরশুদিন রামালি চলে যাক। ওর সঙ্গে তুই ওখানে দেখা করে নে। আমি ছেলেদের নিয়ে বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাবো”।

“কিন্তু রামালি চেনে না, তো”!

“ধ্যার ব্যাটা। জঙ্গলের পথে সোজা দক্ষিণে – অতখানি জায়গা জুড়ে অস্ত্রভাণ্ডার – রামালি চিনতে পারবে না? কী যে বলিস!”      

“ঠিক আছে, তাহলে ওই কথাই রইল। আমি এবার কেটে পড়ি। এই নে শষ্পকের দেওয়া বটুয়া চারটে রাখ”।

“যা। আমি আর রামালি এখন কমলিমায়ের বাড়ি যাবো”।

চলবে...


শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৮ 


১৯ 

সুনেত্র বরাবর দেখেছে, সোমবার দিন চেম্বারে পেশেন্টের সংখ্যা একটু বেড়ে ওঠে। সকালের দিকে কিছুটা বেশি, সন্ধের চেম্বারে বেশ কয়েকজন। অবশ্য একথাও ঠিক সকালের থেকে সন্ধ্যাতেই তার চেম্বারে বেশি ভিড় জমে। সকালের দিকে সাধারণতঃ বয়স্ক মানুষ ও মহিলাদের সংখ্যা বেশি থাকে। পুরুষরা সাধারণতঃ অবসরপ্রাপ্ত হন এবং মহিলারা হন বয়স্কা শ্বাশুড়ি, যাঁরা পুত্রবধূর হাতে সংসারের ভার তুলে দিয়ে চেম্বারে আসেন নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে কিছুটা আলোচনা করতে। এই বয়স্ক মানুষরা সাধারণতঃ স্বচ্ছল এবং অতিমাত্রায় স্বাস্থ্য-সচেতন বা আরও একটু খুলে বললে, বাতিকগ্রস্ত হয়ে থাকেন। সামান্যতম শারীরিক অস্বস্তি হলেই তাঁরা ব্যস্ত হয়ে চলে আসেন ডাক্তারের কাছে।   

আর সন্ধ্যেয় আসেন অফিস বা কাজ থেকে ফেরা মানুষরা। কখনো নিজের জন্যেই, কখনো বা ছেলে-মেয়েদের জন্যে অথবা স্ত্রী-ভাই-বোনদের জন্যে। তাঁরা বৃদ্ধ বাবা-মাকেও নিয়ে আসেন, যাঁরা নিজেদের যে কোন অসুস্থতাকেই, মনে করেন সেরকম কিছুই হয়নি, কটা দিন ধৈর্য ধরলেই সেরে যাবে। অর্থাৎ সান্ধ্যকালীন চেম্বারেই শিশু থেকে বৃদ্ধ – সব বয়সের পেশেন্টদের বিচিত্র অসুস্থতা ও জটিলতা নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে হয়।

মা মারা যাবার কয়েকমাস পর, সে কর্পোরেট চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে, নিজস্ব চেম্বারে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রথম প্রথম সে বেশ বিবেকবান ডাক্তার হিসেবেই সকল নেট-ওয়ার্ক থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিল। প্রায় বছর তিনেক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে করতে সুনেত্র বুঝে গেছে, আজকাল মেডিক্যাল জগতটা আশ্চর্য নিখুঁত এক নেটওয়ার্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অবশ্য এ নেটওয়ার্ক যে কর্পোরেট জগতে ছিল না তা নয়। কিন্তু তার অধিকাংশটাই নিঃশব্দে ঘটে যেত, এবং তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সে জড়িত ছিল না। বুঝতে পারত সবই, কিন্তু সব কিছুই ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কিন্তু আজ সে প্রত্যক্ষভাবেই এই নেট-ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। শহরের উল্লেখযোগ্য ডায়াগ্নস্টিক ল্যাবরেটরিগুলির সকলেই তার পক্ষপাতের প্রত্যাশা করে। এই ব্যাপারটা তার কাছে নতুন। কারণ তার কর্পোরেট হসপিট্যালেই ছিল ইন-হাউস অত্যন্ত উন্নতমানের ল্যাবরেটরি। সেখানে পক্ষপাতিত্বের কোন বিষয় কোনদিন স্থান পায়নি। কিন্তু আজ তার রেকমেণ্ড করা প্যাথলজিক্যাল বা অন্যান্য নানান টেস্ট-রিপোর্ট, তার পেশেন্টরা যে ল্যাবরেটরি থেকেই করিয়ে আনুক না কেন, মাসান্তে তার কাছে চলে আসে তার কমিশনের টাকা এবং কতজন পেশেন্ট সেখান থেকে কি কি টেস্ট করিয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসেব। এই টাকাটা আগে চেকে আসত, আজকাল সে নগদে নেয়। পরিস্থিতির চাপে কিছুটা চতুর তাকেও হতে হয়েছে।

এ ছাড়া আছে মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভদের চিরন্তনী নেট-ওয়ার্ক। এই নেট-ওয়ার্ক তার কর্পোরেট হসপিট্যালেও ছিল, এখানেও আছে। আরও আছে। কোন ক্রিটিক্যাল পেশেন্টকে কোন বিশেষ প্রাইভেট হসপিট্যালে রেফার করলে, সেখান থেকে চিকিৎসান্তে ডাক্তারের কমিশন।

অর্থাৎ আজকাল প্রেস্ক্রিপশনের প্রতিটি লাইন লিখতে লিখতে, তার সম্ভাব্য পাওনা কমিশন-মূল্যের একটা ধারণাও তার মনে মনে তৈরি হয়ে যায়। জটিল অসুখের পেশেন্টকে একদিকে সারিয়ে তোলাটা যেমন তার একটা চ্যালেঞ্জ মনে হয়, তেমনি তার কাছে সেই পেশেন্ট, দীর্ঘদিনের - হয়তো লাগাতার দু’-তিনমাসের – স্বর্ণাণ্ড-প্রসবকারী হাঁসও হয়ে উঠতে পারে। এভাবে ভাবতে সুনেত্রর ভালো লাগে না, কিন্তু আজকের দিনের মেডিকেল নেট-ওয়ার্ক তাকে এই পথেই চালিত করে চলেছে। তার সাধ্য কি, এর বাইরে সে বের হয়ে আসবে?

সকালের চেম্বার সেরে, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সুনেত্র ল্যাপটপ খুলে বসেছিল একবার, কনির কোন নতুন মেল এল কিনা চেক করতে। আসেনি। কনি লিখেছিল “অধৈর্য হয়ে আবার ফোন কোর না, বা চলে এস না আমার কাছে”। না সুনেত্র অধৈর্য হবে না, এতদিন অপেক্ষা করেছে যখন, আরও এক-দুদিন অপেক্ষা করতে কোন আপত্তি নেই তার। যে কথা মা এবং পিসিমা তাকে কোনদিন বলেননি বা বলতে পারেননি, সে কথার কিছুটা কাল রাত্রে জেনেছে। বুঝেছে, কনি নিজের জীবনে যে দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, সেই যন্ত্রণার অংশীদার হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের চোখে সন্তানের এই কষ্ট দিনের পর দিন প্রত্যক্ষ করার অসহ্য মনোকষ্ট তার মা-বাবা অর্থাৎ পিসিমা-পিসেমশাইয়ের কাছেও কম ভয়ানক নয়। সম পরিমাণ না হলেও তার নিজের মায়ের পক্ষেও, যথেষ্ট বেদনার।

মানসিক এই কারণেই পিসিমা হয়তো এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন - তার গৃহপ্রবেশের কয়েক-মাস পরেই। অথচ পিসেমশাই, যাঁর শরীর সেরিব্রাল অ্যাটাকে অনেকটাই ভঙ্গুর হয়ে উঠেছিল। সকলে ভেবেছিল তিনি পিসিমার অনেক আগেই চলে যাবেন। তিনি মারা গেলেন বছর খানেক আগে। সুনেত্রর দুর্ভাগ্য সে সময় দেশের বাইরে গিয়েছিল, বিখ্যাত এক মেডিসিন কোম্পানি-প্রায়োজিত সেমিনারে। পিসেমশাইয়ের শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ মিটে যাওয়ার পাঁচ-ছদিন পর সুনেত্র কলকাতা ফিরেছিল। পিসেমশাইয়ের বাড়িও গিয়েছিল, কনির সঙ্গে যদি দেখা হয়। দেখা হয়নি। প্রতিবেশীদের কাছে সুকন্যার খবর নিতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিল, তারা কেউই সুকন্যার ব্যাপারে কোন কথা বলতে উৎসাহী নয়। তেমন খোঁজও রাখে না কেউ। একটি মেয়ে বলেছিল, “সুকুআন্টি শুনেছি কার্সিয়াং গিয়েছেন। কোথায় তা তো জানি না, আংকল”। বাড়ির তালাবন্ধ দরজা দেখেই তাকে হলদিয়ায় ফিরে আসতে হয়েছিল।

তার সামনে খুলে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিন স্লিপ মোডে চলে গেছিল অনেকক্ষণ। একসময় সুনেত্রর খুব ঘুম পেল। তার স্বভাবে ভাত-ঘুমের অভ্যাস এখনও বাসা বাঁধতে পারেনি, বেলা দুটো-আড়াইটে থেকে বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, যথেষ্ট অবসর থাকা সত্ত্বেও। কিন্তু বিগত রাত্রের প্রায় নিদ্রাহীন মস্তিষ্ক এখন বিশ্রাম চায়। টেবিলে মাথা রেখে গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল।

 

বিকেল সোয়া পাঁচটা নাগাদ, সুনেত্রর ঘরে এল শম্পাদিদি। সুনেত্রর টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে ডাকল, “দাদাবাবু, উঠে পড়ো, পাঁচটা বেজে গেছে অনেকক্ষণ। মিলকিদিদিভাই এখনই চলে আসবে”।

ঘুম ভেঙে তাকাল সুনেত্র, বলল, “এঃ এমন অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি না, প্রায় ঘন্টা তিনেক?”

“আজ সকাল থেকেই দেখছি, তুমি কী যেন এক ভাবনার মধ্যে ডুবে রয়েছ, সারাক্ষণ। কী হয়েছে বলো তো তোমার?”

“কিচ্ছু হয়নি শম্পাদিদি, এমনিই একটু চোখ লেগে গিয়েছিল”। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে সুনেত্র বলল। মুখে চোখে জলের ছিটে দিয়ে বেশ আরাম পেল, সুনেত্র। ঘুমঘুম ভাবটা কেটে গেল, এবং লক্ষ্য করল ঘন্টা তিনেকের ঘুমটা ক্লান্তি এবং অবসাদ থেকেও তাকে অনেকটা মুক্তি দিয়েছে।

ঘরে ফিরে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে নিজেকে খুব ফ্রেশ অনুভব করল সুনেত্র। রান্নাঘর থেকে শম্পাদিদির গলা পেল, “মাসিমা তো তোমাকে বলে বলে, হয়রান হয়ে চলেই গেলেন। এবার একটা বিয়ে করে স্থিতু হও দেখি দাদাবাবু”।

সুনেত্র হেসে ফেলল হো হো করে, তারপর বলল, “এতদিন পরে তোমার মাথায় এ ভূত কে ঢোকালো, শম্পাদিদি”?

শম্পাদিদি ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এই রোববারে তোমাদের দুটিকে একসঙ্গে দেখেই ভূতটা আমার মাথায় ঢুকেছে, দাদাবাবু”।

“তুমি কি সুনুর কথা বলছো, শম্পাদিদি? তুমি কি জানো তুমি কী বলছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?” অবাক বিস্ময়ে শম্পাদিদির মুখের দিকে তাকিয়ে সুনেত্র বলল।

“আমি সব জানি। তোমাদের দুজনের সব কথা। মাসিমা, পিসিমণি দুজনেই আমাকে সব বলেছেন”। একটু থেমে আবার বলল, “তোমরা ছেলেরা চোখ থেকেও যেন কানা, সুনুদিদির মানসিক অবস্থাটা কি তুমি কিছুতেই বুঝবে না, দাদাবাবু?” শম্পাদিদি আর কিছু বলল না, ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে নিজের কাজে চলে গেল।

সুনেত্র পাথরের মতো বসে রইল টেবিলের সামনে। কাপের অর্ধেক চায়ের ওপর জমতে লাগল সর।

 

মিনিট পনের পর, শম্পাদিদি ঘরে এল, বলল, “মিলকি দিদিভাই এসে চাবি নিয়ে গেল, দাদাবাবু। এঃ চাটা খেতে দেখছি ভুলেই গেছ, ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল। আরেক কাপ বানিয়ে নিয়ে আসছি, তুমি রেডি হয়ে নাও”।

শম্পাদিদিকে কী বলে গিয়েছেন, তার মা ও পিসিমা? সেকথা সে জানে না, কেন? মা বা পিসিমা তাকে সরাসরি সে কথা বলতে পারেননি, কেন? কনির জীবনে এত দুর্যোগ ঘটে গেছে, সে কথা তাঁরা দুজনেই জানতেন, নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু সকল সঙ্কোচ ভেঙে কেন তাঁরা সুনেত্রকে বলতে পারলেন না? যে কথার অর্ধেকটা সে জেনেছে গতকাল রাত্রে এবং বাকিটা হয়তো জানবে আজ রাত্রে।

সুনেত্র চটপট রেডি হতে না হতেই, শম্পাদিদি এক কাপ চা, আর এক পিস কেকের টুকরো দিয়ে গেল প্লেটে। ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল শম্পাদিদি, সুনেত্র তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “শম্পাদিদি, মা পিসিমা, তোমাকে সব কথা বলতে পারলেন, অথচ আমাকে বলতে পারলেন না, কেন?”

শম্পাদিদি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল সুনেত্রর দিকে, তারপর বলল, “ওঁনারা দুজনেই বড়ো দ্বিধায় ছিলেন, দাদাবাবু। সুকুদিদির জীবনটা যে ভাবে তাঁরা দুজনে ছন্নছাড়া করে দিয়েছিলেন, সে কথা মুখ ফুটে নিজের ছেলেকে কী করে বলবেন, বলো তো, দাদাবাবু? কী করে বলবেন, সুকুদিদির জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোকে মন থেকে মুছে ফেলে, এতবছর পরে তুমি তাকেই গ্রহণ করো...। আমি হলেও বলতে পারতাম না, দাদাবাবু। তুমি কী করে বুঝবে মায়েদের বুকের জ্বালা?”। একটু থেমে শম্পাদিদি আবার বলল, “যাগ্‌গে এখন ওসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, তুমি চেম্বারে যাও, দাদাবাবু। মিলকি দিদিভাই বলছিল অনেক পেশেন্ট নাকি চলে এসেছে”।

সাড়ে নটা নাগাদ চেম্বার থেকে যখন মুক্তি পেল সুনেত্র, নিজেকে খুব ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মনে হচ্ছিল। আজ পেশেন্টের সংখ্যা কিছু বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু তার ক্লান্তিটা ঠিক সে জন্যে নয়। তার মনটাকে জাস্ট সুইচ অফ করে, মনের মধ্যে নিরন্তর ঘটে চলা দ্বন্দ্বটাকে যদি বন্ধ করা যেত। এবং অন করে দেওয়া যেত তার প্রফেসন্যাল মনটাকে...তাহলে এই ক্লান্তিটা অনায়াসে এড়িয়ে যাওয়া যেত।

মনটাকে এই সুইচ-অফ/ সুইচ-অন মোডে রাখার উপদেশটা সে শুনছিল তাদের কর্পোরেট অফিসে। তাদের অফিসে প্রায়ই বাইরে থেকে কিছু ম্যানেজমেন্ট টিমকে ডেকে আনা হতো, যাদের অ্যাজেণ্ডা হতো রীতিমতো রোমহর্ষক। যেমন “প্রফেশনালিসম অ্যাণ্ড লাইফ – ইয়র পার্স্পেক্টিভ”, “ইয়োর ওয়ার্ক অ্যাণ্ড ইয়র লাভ”, ইত্যাদি। এরকমই একটা প্রোগ্রামে নানান গ্রাফিক্স এবং বার-চার্ট থেকে সে জেনেছিল, তার প্রফেশন এবং তার জীবনটাকে সুন্দর কয়েকটা ছকে বেঁধে ফেলা যায়। না, ভুল বলল সে, নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলতে হবে। এবং তার সার কথাটি হল, যতক্ষণ তুমি কাজের মধ্যে রয়েছ নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাকে মুছে ফেল। অর্থাৎ অসুস্থ মা-বাবা, কিংবা স্ত্রীর শপিং করার আব্দার, অথবা ছেলে-মেয়ের স্কুল থেকে ডাকা পেরেন্ট’স মিটিং অ্যাটেণ্ড করার টেনশন – বিলকুল মুছে ফেলতে হবে মন থেকে। ডাস্টার দিয়ে আঁকিবুকি লেখা বোর্ডটাকে এক লহমায় মুছে ফেলার মতো – ব্ল্যাংক করে ফেল মনটাকে। এটাই হল মনের সুইচ অফ মোড।

এর সঙ্গে সঙ্গেই অফিসের কাজের জন্যে তোমার মনটাকে সুইচ অন করে ফেল। গতকাল কী কী কাজ পেণ্ডিং ছিল, সেগুলো আজ কমপ্লিট করতে হবে। আজ কোন কোন মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে হবে, তার জন্যে ডিসকাশন পয়েন্ট্‌স্‌ জট ডাউন করতে হবে। কাস্টমার ও সার্ভিস প্রোভাইডারদের ফলো আপ করে ফিড-ব্যাক নেওয়া...। তার মধ্যে কোনভাবেই তোমার মনে সংসার যেন উঁকি না মারতে পারে। দৈবাৎ, উঁকি মারলেই, ইউ উইল বি ইন মেস। বাংলা করে বললে, তুমি কেলোর কিত্তি বাধিয়ে তুলেছ, হে।

আবার সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ অফিসের লিফটের গেট বন্ধ হওয়ার পর বেসমেন্ট ওয়ানে – যেখানে তোমার গাড়ি পার্ক করা আছে – নামার সুইচটা যখন টিপছ – তখনই সুইচ অফ করে দাও তোমার মনের অফিস মোডটাকে...। আর অন করে নাও তোমার ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক মোড।

ব্যাপারটা এতই সহজ আর সরল, অন্ততঃ ওই প্রফেশনাল টিমগুলো যা বোঝাতো, তাতে প্রত্যেক মানুষের জীবন পাখির হালকা পালকের মতো ভেসে চলবে চিরকাল।

এই উপদেশ এবং স্বপ্নময় জীবনের নিশ্চিত আশ্বাস সত্ত্বেও সুনেত্র কোনদিনই ওই অন-অফ মোডে মনটাকে আনতে পারেনি। অফিসে গেলেও তার মনের মধ্যে কলকল ধ্বনিতে ঢুকে পড়েছে বাড়ির কথা এবং বাড়ি এসেও মনে মনে আফশোস করেছে, অফিসের কিছু কিছু কাজ সেরে আসতে ভুলে যাওয়ার জন্যে। এর কারণ কি তার মধ্যবিত্তসুলভ আবেগপ্রবণতা? না, তাও নয়, কারণ সে তার দাদাকে দেখেছে, বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে তুচ্ছ ও গুরুতর কারণে তুমুল ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়েই, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা দিতে। এটাও সেই মনের অন-অফ মোড, তার দাদা অর্জন করেছিল বাই ডিফল্ট।

কিন্তু সে পারেনি – সেদিনও না, আজও না। এরকম ঘটনার পরে স্কুলে গেলে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তার মুখ দেখেই বুঝে যেত, আজ সুনেত্রর মুড খারাপ। মুখটা হাঁসের পেছন বানিয়ে তুলেছে। প্রতিটা ক্লাস, টিফিন - এমনকি ছুটির সময়েও তার মনের মোডটাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারেনি কতদিন...। আজও চেম্বারে ঢোকার আগে সে পারেনি মন থেকে শম্পাদিদির কথার অভিঘাত মুছে ফেলতে। আজও সে চিন্তাক্লিষ্ট আনমনা মুখেই কি সবার চিকিৎসা করল না? অথচ সে বহু পেশেন্টদের থেকে বহুবার কমপ্লিমেন্ট শুনেছে, “আপনার সামনে বসে আপনার মুখের হাসিটুকু দেখলেই আমাদের আর্ধেক রোগ পালায়, ডাক্তারবাবু। মনে হয় নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায় আপনাকে”। আজকের পেশেন্টদের জন্যে সে কথাটা নিশ্চয়ই খাটল না। তার মুখখানা দেখেই পেশেন্টদের অর্ধেক অসুখও আজ সারল না। সেক্ষেত্রে তার ফিজ্‌টাকেও অর্ধেক করা কি তার উচিৎ ছিল না?

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০ "


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...