উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস (বড়োদের) লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬ " 


 

বেষ্পতিবার/ দুপুরঃ ২:

 সুনুদা,

 শুধু কথা আর কথা। এত কথাও তুমি বলতে পারো।

তোমার কথার জালে জড়িয়ে পড়ে অনেক সময়েই আমার মনে হত, সত্যি সত্যি তুমি কতটা সিরিয়াস? তোমার কথায় এমন একটা অদ্ভূত সুন্দর স্বপ্ন-রাজ্যের হদিশ দিতে, মনে হত আমি যেন এক পরি। ডানাকাটা নয় আস্ত দুটো ডানাওলা। মনে হত, আমি এই দুটো ডানা ছড়িয়ে তোমার মনের দাঁড়ে ঠিকঠাক বসতে পারবো তো? শেষে এমন তো হবে না, বাস্তবের ঝিঙে, পটল, তেল নুন মশলার অভিঘাতে তোমারই স্বপ্নের ডানা খসে পড়ল! আর আমি তোমার কাছে হয়ে উঠলাম রোঁয়া ওঠা পালক ঝরা অপয়া এক শালিক।

সেদিন তোমার ডাকে সাড়া দিইনি, সে ঐ বাস্তবের চিন্তায়। আমাদের ভালোবাসার জন্যে মূল্য বড়ো কম দিতে হত তুমি ভেবেছিলে? তোমার বাড়ি, আমার বাড়ি - আমাদের এই পথচলা - কেউ কি মেনে নিত, বলো? শুধু সপ্তপদ নয়গো, তুমি কি জানো আমি তোমার সঙ্গে লক্ষ যোজন পথ চলতেও উন্মুখ ছিলাম। জীবনতো শুধু পথচলা নয় সুনুদা, এটা তো মানবে? জীবন মানে নির্জনে তোমার বাহুতে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত শুয়ে থাকা। জীবন মানে আমার কোলে তোমার মাথা রাখা, আর তোমার চুলে আমার করাঙ্গুলির বিলি কাটা। জীবন মানে তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে মুগ্ধ নেত্রে চেয়ে বসে থাকা।

তোমার ওই কুয়োর জলে ঝপ্‌পাস করে ফেলে দেওয়া ছোট্ট সিন্দুকের মধ্যে, আমাকে কাছে পাওয়ার কতোখানি স্বপ্ন আর কতোখানি বাসনা তুমি ভরতে পেরেছিলে আমি জানি না। আমি কিন্তু সবুজ ঘাসের জমিনে আমার আঁচলের মতো আজও বিছিয়ে রেখেছি, তোমাকে ঘিরে থাকা আমার সমস্ত সত্ত্বা। তোমরা ছেলেরা বড়ো অধৈর্য আর আউপাতালে, একটুতেই হাল ছেড়ে দাও। কেন বলো তো?

একদিন চলো না, সেই কুয়োটার পাড়ে। যে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়েছিলে তোমার স্মৃতিভরা সিন্দুক। কুয়োতে পড়ে যাওয়া জিনিষ তোলার জন্যে লোক পাওয়া যায়, জানো তো? তাদের একজনকে ধরে তুলে আনি তোমার সিন্দুকটা। কোন চাবিওলা ডেকে সিন্দুকটা না হয় আমিই খুলিয়ে নেব। দেখে নিও, তোমার ক্ষুব্ধ হৃদয়টিকে খুব আদরে আর খুব যত্নে বুকের মধ্যে আজীবন ধরে রাখবে,

 তোমারই কনি।

 বেষ্পতিবার/ রাত ১২:৩৫

আমার কনি, 

আমাকে কি তোর সেই রূপকথার রাক্ষস বলে মনে হয়? যার প্রাণভোমরা লুকিয়ে রাখা থাকত গোপন চাবির সিন্দুকের মধ্যে। তুই কি কোন রাজকন্যা, কুয়োর জল ছেঁচে তুলে আনবি আমার হৃদয়, তারপর তোর বুকে নিয়ে  তাকে পুষবি শুকপাখির মতো? শুকপাখি নাকি সুখ-পাখি? তোর বুকের বাসায় থাকার চির দিনের আশ্বাসেও, সে যদি কোনদিন বিশ্বাস হারায়? যদি সে আঁচড়ে দেয়, ঠুকরে দেয় তোর নরম নরম বুক? বললি না, আমরা ছেলেরা খুব আউপাতালে? আমি যদি ধৈর্য হারাই? এরপর যেদিন যাবো, তোর জন্যে এটিএস নিয়ে যাবো তিন ফাইল। প্রথমটার চব্বিশঘন্টা পরে দ্বিতীয় আর দ্বিতীয়ের বাহাত্তর ঘন্টা পরে তৃতীয়সুখ পাখির নখ এবং চঞ্চুর আঁচড়ে সেপটিক হয়ে যাওয়া কিছু বিচিত্র নয়।

অথবা এমনও তো হতে পারে, তুইই একদিন বিরক্ত হয়ে আমার প্রাণভোমরাটাকে নিজের উরুর ওপর রেখে টিপে মেরে ফেললি, এতটুকুও রক্ত ঘরের মেঝেতে পড়তে না দিয়ে। থোড়ের মতো তোর মসৃণ উরুতে একটা হালকা দাগ হয়ে রয়ে গেলাম কিছুদিন। তারপর সুগন্ধী সাবান, অলিভ অয়েল আর বডি লোশনের প্রাত্যহিক প্রয়োগে সেই দাগটুকুও আর থাকবে না কোথাও। তারপর কোন এক শীতের একান্ত সন্ধ্যায় হঠাৎ আমার কথা মনে হলে, বসন সরিয়ে খুঁজতে থাকবি আমায়। বাম উরু নাকি ডান উরু – কোথায় যেন ছিল সেই দাগটা। তোর মনে হবে, জীবনে কোথাও এতটুকু দাগও রেখে যেতে না পেরে শেষে হয়তো হারিয়েই গেল,

 তোর সুনুদা।

শুক্রবার/ দুপুর ১২:৫৫

সুনুদা,

 আমার ছোটবেলায় আমার এক ব্যাচেলার দাদুর বাড়িতে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। তিনি আমার বাবার দূর সম্পর্কের মামা আর থাকতেন উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এক বাড়ির উত্তর-পশ্চিম টেরে। দি মোস্ট শ্যাবি অ্যান্ড স্যাঁতসেঁতে কর্ণার দ্যাট আই হ্যাভ এভার সিন ইন মাই লাইফ। তাঁর মালিকানায় ছিল দুটো মাত্র ঘর – একটা বসার, আরেকটা শোবার আর একটা বাথরুম-টয়লেট। তাঁর খাবার আসত পাড়ার একটি দোকান থেকে। আমরা ওঁর বাড়িতে গেলেই খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন, কিছুক্ষণ কথা বার্তার পর তিনি বেরিয়ে যেতেন পাড়ার দোকানে, কিনে আনতেন অনেক খাবার দাবার, আমার জন্যে গাদাখানেক চকলেট, লজেন্স। একবার উনি যখন ছিলেন না, কি খেয়াল হতে আমি ওঁনার শোবার ঘরে ঢুকেছিলাম। বিছানায় ওঁনার তেলচিট ময়লা মাথার বালিশের নীচে দেখেছিলাম একটি বাংলা পর্নোগ্রাফির বই। বইটার দু এক পাতা উল্টে দেখেছিলাম, কি জঘন্য সব ছবি আর লেখা। তাঁর ঘরে অনেক দেয়াল আলমারি, কাঠের আলমারি ছিল, সবকটাই নানান জিনিষে ঠাসা। কিন্তু সেখানে কোথাও একটাও পাঠযোগ্য গল্প উপন্যাসের বই দেখিনি। কি মনে হতে বিছানার তোষক তুলে দেখেছিলাম, তাঁর বিছানার তলায় সাজানো অজস্র বই, সবই ওই রকম অশ্লীল আর অপাঠ্য।

ভদ্রলোক কি ভীষণ আমুদে আর অমায়িক ছিলেন, তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা সকলেই তাঁকে বেশ রেসপেক্ট করতাম, কিন্তু সেদিনের পর তাঁর চোখের দিকে আর কোনদিন তাকাতে পারিনি। তাঁর বাড়িতেও আর কোনদিন যাইনি তারপর থেকেকয়েকবছর পর তাঁর যখন মৃত্যুসংবাদ এসেছিল, প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, তাঁর ঘরের সেই বইগুলির কথা। আমরা কেউ যাইনি, বাবা গিয়েছিলেন। বাবাকে জিজ্ঞেসও করতে পারিনি, শয্যার নীচে তাঁর ওই অজস্র বইয়ের কী গতি হয়েছিল!

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার ওই দাদু প্রথম যৌবনে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেনউচ্চবংশ ও ধনী বাড়ির সেই মেয়েটির সঙ্গে আমার দাদুর নাকি সঠিক অর্থে আলাপও ছিল না। বিয়ের প্রস্তাব করা তো অনেক দূরের ব্যাপার। মেয়েটির যথাসময়ে বিয়ে হয়ে যাবার পর, আমার দাদু ধনুকভাঙা পণ করেছিলেন আর বিয়ে থা না করে সারা জীবন কুমার থাকবেন। তাই ছিলেন – তবে তাঁর সঙ্গী হয়েছিল ওই ইতর বইগুলো!

এত কথা বললাম, তোমার ওই চিঠিটা পড়ে। কি জঘন্য আর কদর্য। তোমাকে আমার সেই ব্যাচিলার দাদুর মতোই লাগছে, অস্পষ্ট এক ভালোবাসার কল্পনায় যিনি নিজেকে বিকৃত করে তুলেছিলেন দিন কে দিন।

কোন একটি মেয়ে তার নিখাদ কিন্তু অক্ষম ভালোবাসা দিয়ে যে তোমার জীবন, কোন একদিন ভরে তুলেছিল, সেকথাটা তোমার এখন ভুলে যাওয়াই উচিৎ। প্লিজ, তোমার ওই নোংরা মুখে আর কোনদিন যেন না শুনি, আমার ওই একান্ত আপনার নামটি-

“কনি”

শুক্রবার/রাত্রি ২:১৫

 ওরে আমার কনকনানি,

 দেখলি তোর হুমকিতে ত্রস্ত হয়ে তোকে আর “কনি” বলে ডাকতে ভরসা পেলাম না।

বাপরে, ইৎনা গুস্‌সা? এত রেগে গেলি আমার ওই চিঠিটা পড়ে? তোকে আর ডাকতেও দিবি না, “কনি” বলে? এতটুকু মায়াও কি তোর হল না তোর সুনুদার ওপর? তোর দাদু না হয়, হলেও হতে পারতেন ঠাকুমার সঙ্গে আলাপটুকুও করে উঠতে পারেননি। আমাদের তো তা নয়? আমি তো তোকে বিয়ের প্রস্তাবও করেছিলাম। করিনি বল? হে আমার কনি, সুকন্যা দত্ত, তোকে তো এও বলেছিলাম আমাদের বিয়ের পর তুই একদম আমার হয়ে যাবি, মিসেস সুকন্যা বসু। সে নাম শুনে তুই কি লিখেছিলি মনে আছে, কনি? লিখেছিলি “সুকন্যা বসু” নামটা শুনেই তোর সমস্ত শরীর যেন শিরশির করে উঠেছিল অদ্ভূত এক অজানা আবেগে বলিসনি বল?

তোর দাদুর একান্তই ব্যাডলাক, তিনি যে সময়ের লোক, তখন না ছিল, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, না ছিল ইন্টারনেট। থাকলে তাঁকে তোর কাছে ধরা পড়তে হত না। অথবা তাঁর মৃত্যুর পর বিছানার তলায় সাজানো বই নিয়েও তাঁর পরিজনদের আতান্তরে পড়তে হত না। মিচকে হেসে পাড়ার ফক্কোর ছেলেদের বলতেও হত না, “বুড়ো শালার খুব রস ছিল তো, কোনদিন বোঝাই যায়নি”। বরং নেট সার্ফিং করে যখন তখন কল্পনার নীল জগতে ঢুকে পড়তে পারতেনভদ্রলোক সারাটা জীবন তাঁর সেই একটিমাত্র মহিলার মধ্যেই ডুবে রইলেন, কল্পনার একটু সুবিধের জন্যে সাহায্য নিয়েছেন ওই বইগুলির। কিন্তু যাই করুন না কেন, আমি দৃঢ় নিশ্চিত, তাঁর একা একা চরম আনন্দের মুহূর্তগুলিতে ওই বই তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। তাঁর মনেও আসত না ওই বইয়ের ছবির শরীর আর মুখগুলো, তাঁর স্বপ্নে আসত তোর সেই হলেও হতে পারত ঠাকুমারই মুখটাই। এটাও কি কম একনিষ্ঠতা? সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এটা ভীষণ অদ্ভূত এক বিকৃতি। কিন্তু সত্যিই বিকৃতি কি?

তোর এই দাদু ভদ্রলোকটি কোনোদিন দুষ্টু পাড়ামুখো হয়েছেন বলেও আমার মনে হয় না। অন্ততঃ আমার তাই বিশ্বাস। যদি হতেন, বাস্তব নারীর সংসর্গে তিনি কবেই ভুলে যেতেন তাঁর সেই মনের মানুষটিকে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে চরম লজ্জাকর হবে জেনেও, তাঁকে এত বইও কিনতে হত না। তোরা মেয়েরা কেন যে এত একবগ্‌গা, বাঁধা পথে ভাবিস, বুঝি না। এরকম অদ্ভূত কিন্তু নিষ্ফল ভালোবাসা নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া, এমন একজন বেচারা মানুষ তোর থেকে শ্রদ্ধা না পান, একটু মায়া কিন্তু পেতেই পারতেন। এভাবে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ নিষ্ফলা করে তোলা, এবং মনটাকে এমন নিবিড় স্বপ্নের গহীনে ডুবিয়ে রাখার মানসিকতা - আজকাল কেউ কল্পনাও করতে পারে কি? না, পারে না।

আজকাল কেউ মুখে অ্যাসিড ছোড়ে, কেউ হত্যা করে। কেউ কেউ হত্যা করে, দেহটাকে কুচি কুচি করে কেটে, স্যুটকেশে ভরে গঙ্গায় ফেলে দিতে যায়...।

আমি কিন্তু পেরেছিআমি জানি এই চিঠিটা পড়ে, তুইও স্বীকার করবি, তোকে “কনি” বলে ডাকার অধিকার, ন্যায্যতঃ যদি কারোর থাকে, আর কারও নয়, সে শুধু থাকবে

তোর সুনুদার

শনিবার/সকাল ১১:৩৫

সুনুদা,

আমি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলাম, ভাঙা আয়নার মতো। ঘরের মেঝেতে আমার অজস্র সত্ত্বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে।

আজ একবার আসবে, প্লিজ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

তোমার কনি।

পুনশ্চঃ ঘরে সাবধানে পা ফেল, আয়নার কাচে পা কেটে না যায়।


চলবে...




মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ 


২৮

 

পরের দিন সকালে বসে অনেকক্ষণ ছেলেদের মহড়া দেখছিল ভল্লা। একসময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিছুই হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না...এভাবে তোরা কোনদিনই কোথাও পৌঁছতে পারবি না...”। ভল্লার কথায় ছেলের দল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরে শল্কু বলল, “তুমি তো এভাবেই আমাদের অভ্যাস করতে বললে, ভল্লাদাদা”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “বলেছি। কিন্তু এমন তো বলিনি এটুকু শিখলেই আমাদের শিক্ষা সব শেষ? রণপায় চড়ে স্বাভাবিক হাঁটাহাঁটি করতেই কাল সারাটা দিন চলে গেল – এখনও ঠিকঠাক চলতে পারছিস না। টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিস বারবার। ভল্ল ছোঁড়ার অভ্যেস করতে বললাম, কুড়িবার ছুঁড়লে খুব জোর তিনবার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছিস। বাকিগুলো বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে নয়তো গাছের গুঁড়িতে বিঁধছে...। একই জিনিষ নিয়ে কতদিন কতবার রগড়াবি?”

কেউ কোন কথা বলল না, মাথা নীচু করে রইল। শল্কু বলে উঠল, “আহা একদিনেই সবাই পারে নাকি...সবাই কী আর তোমার মতো হতে পারে? তুমিই কী একদিনে সব শিখে ফেলেছিলে?”

ভল্লা বিরক্ত মুখে বলল, “একদিনে শিখে ফেলা যায় না, সে কথা তোর থেকে আমি অনেক ভালো জানি, শল্কু। কিন্তু কালকের শিক্ষার থেকে আজকের শিক্ষায় যদি কোন উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় – সে রকম দায়সারা শিক্ষায় লাভ কী? মনে এই সামান্য জেদটুকুই যদি না আসে – আজ যেটুকু শিখব সেটা নিখুঁত শিখব। আগামীকাল সেটাকে নিয়ে আবার না রগড়ে – নতুন কিছু শিখবো। তা নাহলে এতো অনন্তকাল চলতেই থাকবে...”।

ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “দ্যাখ সব জিনিষ সবাইকে দিয়ে হয় না। একলক্ষ লোকের মধ্যে খুব জোর হলে হাজার পাঁচেক রক্ষী হয় আর হাজার দুয়েক সৈন্য হয়। আমি আর দু’-তিনদিন দেখব...উন্নতির কোন লক্ষণ না দেখলে বলব”...ভল্লা হঠাৎ হাতজোড় করে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “ক্ষ্যামা দাও বাপাসকল, অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যাও – বাপের সঙ্গে চাষবাসের কাজে লাগো গে...নয়তো দীঘীর পাড়ের অশথ তলায়, গুটি সাজিয়ে বাঘবন্দী খেলো গে...”।  ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে রণপা নিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেদের অনুশীলনের মাঠ থেকে।

 

দুপুরে খেতে এসে রামালি বাসায় ফিরে দেখল, ভল্লা ঘরের সামনে নির্দিষ্ট পাথরে বসে গম্ভীর মুখে কিছু চিন্তা করছে। রামালি কিছু বলল না। ঘরে ঢুকে জলের কলসি নিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর স্নান সেরে ভরা কলসিটা ঘরে রেখে রান্নার যোগাড় করতে করতে লক্ষ্য করল, ভল্লা একই ভাবে বসে আছে। রামালি উনুন ধরিয়ে বলল, “কী ভাবছো, ভল্লাদাদা? তুমি রাগ করে চলে আসার পর ছেলেরা সত্যিই ভয়ানক পরিশ্রম করছে। ওরা আজ খেতেও যায়নি। বলেছে সন্ধ্যে পর্যন্ত অভ্যাস করে, কাল তোমাকে ওরা চমকে দেবে...”।

ভল্লা মুখ তুলে রামালির মুখের দিকে তাকাল। বলল, “তাই? আর ওই শল্কু?”

রামালি হাসল, বলল, “ওর তেমন হেলদোল নেই, ওর ধারণা ও সব শিখে ফেলেছে”।

“তাই, না? হতভাগার ডানা গজিয়েছে – পিমড়ে – ডানা গজালেই ভাবে উড়তে শিখেছে...মরবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া আর আসে না কেন রে?” বালিয়া নোনাপুর গ্রামেই থাকে, বাপ-ঠাকুদ্দাদের সময় থেকেই তারা লোহার কাজ করে। রামালি বলল, “লড়াই-টড়াই করা ওর পছন্দ নয়। শান্তিপ্রিয় নিরীহ ছেলে। ও বলে আমাদের খেটে খেতে হবে রামালিদা – লড়াই শিখে করবো কী আর খাবোই বা কী? ভল্লাদাদাকে বলো অন্য কাজ থাকলে, আমাকে যেন বলে”।

ভল্লা খুশি হল, বলল, “বাঃ, বালিয়া বেশ বুঝদার ছেলে তো! ঠিকই বুঝেছে - লড়াই সবার জন্যে নয়। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে, ওকে খবর পাঠাস তো। ওকে দিয়ে কিছু কাজ করাব। রণপাগুলোর তলায় লোহার খুড়ো আর ডগায় লোহার ফলা বসাতে হবে। এখন আমরা মাটিতে চলাফেরা করছি বলে তেমন ক্ষইছে না। কিন্তু পাথরে বাঁধানো পাকা রাস্তায় চললে বাঁশের ডগাগুলো দাঁতনের মতো ছরকুটে যাবে। লোহার খুড়ো দিয়ে বাঁধিয়ে নিলে বেশি দিন টিকবে”।

“আজ বিকেলেই এক ফাঁকে গিয়ে বলে আসবো”।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু কথা বলল না। রামালি রান্না নিয়ে ব্যস্ত, ভল্লা আগের মতোই চুপ করে বসে কিছু চিন্তা করতে লাগল। রান্নাটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি বটতলির সনাতন কবিরাজকে আমাদের গ্রামে পাঠিয়েছিলে?” রামালির আচমকা এই প্রশ্নে ভল্লা আকাশ থেকে পড়ল, “বটতলির সনাতন কবিরাজ? আমি তাকে চিনিই না, ডাকব কী করে?”।

অবাক হয়ে রামালি বলল, “তাহলে? কে ডাকল তাঁকে? আজ সকালে আমাদের গ্রামে এলেন। প্রধানমশাইকে, আমার কাকাকে দেখে গেলেন। বিনা দক্ষিণায় ওষুধ-পথ্যি করে গেলেন। কেন?” ভল্লার মনে পড়ল এবার, বলল, “ও হ্যাঁ হ্যাঁ। গতকাল বণিক অহিদত্তকে বলেছিলাম বটে। আমাদের কবিরাজকাকা তো গ্রামে নেই, যদি ওদিক থেকে কাউকে... বাঃ, তার মানে বণিক অহিদত্ত কথা রেখেছে? দেখে কী বলল?”।

রামালি মাথা নাড়ল, বলল, “কাকার অবস্থা তেমন কিছু নয়, দু-পাঁচদিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। কিন্তু প্রধানমশাইয়ের অবস্থা ভয়ংকর। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি অচৈতন্য থাকেন। সনাতন কবিরাজ তেমন ভরসা পাচ্ছেন না”।

“বলিস কী?”

রামালি কোন উত্তর দিল না, রান্না সারতে লাগল চুপ করে। ভল্লা আবার জিজ্ঞাসা করল, “আর ভীলককাকা?”

“ভীলককাকার তিনটে দাঁত ভেঙে গেছে – মাড়ি ফেটে গেছে। জিভও কেটে গেছে অনেকটা। চোয়ালে গভীর ক্ষত। কিছু বটিকা দিয়েছেন, জলে গুলে খাওয়াতে হবে আর প্রলেপ দিয়েছেন। বলেছেন সামনের তিন-চারদিন খুবই সংকট – সাবধানে থাকতে হবে। এরমধ্যে ক্ষতগুলো যদি বিষিয়ে না যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সেরে উঠবেন, নচেৎ...”।

ভল্লা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। রামালির রান্না হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করল, “চান করেছ ভল্লাদাদা? আমার রান্না হয়ে গেছে”।

ভল্লা বিষণ্ণ মুখে বলল, “এদিকে প্রধানমশাইকে প্রায় শেষ করে দিল আর ভীলককাকারও যা অবস্থা কতদিনে সুস্থ হবেন তার ঠিকানা নেই। ওদিকে কবিরাজমশাইকেও আস্থানে নিয়ে গিয়ে, কী অত্যাচার করছে, কে জানে? ওই কটা রক্ষী এসে, নোনাপুর আর সুকরা গ্রামদুটোকে একেবারে কানা করে দিয়ে গেল”।

রামালি কিছুক্ষণ ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুমি চলে আসার পর মহড়ার মাঠে শল্কু বলছিল, তুমি রাজি হলে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা আস্থান আক্রমণ করব। গ্রামে এসে রক্ষীদের অত্যাচারের চরম শোধ তুলব আমরা”।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয়, তোরা পারবি?”

“আমাদের মধ্যে অন্ততঃ জনা ছয়েক বল্লম চালানো আর রণপা ব্যবহারে মোটামুটি দক্ষ তো হয়েছি”, ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “অবশ্য, সে বিচার তুমিই ভাল করতে পারবে। কিন্তু সুরুল আর আমার মত অন্য। এত তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বিপদ বাড়ানোর মানে হয় না। আমরা যতটুকু শিখেছি, তাতে রক্ষীদলের কোমর ভাঙা সম্ভব হবে না। উলটে আমাদেরই কোমর ভেঙে যেতে পারে। রক্ষীদলের দু-তিনজন হয়তো আমাদের হাতে মরবে, কিন্তু আমাদের মরবে কিংবা আহত হবে তার থেকে অনেক বেশি। আমাদের এই ছোট্ট দলের পক্ষে সে আঘাত হবে মারাত্মক। এবং সেই আঘাত সেরে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ই পাবো না। তার আগেই রক্ষীরা আমাদের গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে আমাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চিন্ত আশ্রয়গুলোকে উচ্ছন্ন দেবে”।

ভল্লা রামালির বিচক্ষণতায় আশ্চর্য হল। রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আস্থান থেকে যেদিন আমরা অস্ত্র লুঠ করলাম, সেদিন আমাদের গায়ে কোন আঁচও তো লাগেনি। তখন তো তোরা লড়াই করার কিছুই জানতিস না, তাই না? উলটে ওদেরই তো তিনজন পটল তুলল”।

রামালি অনেকক্ষণ ভল্লার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ভল্লাদাদা, একথার উত্তর দিলে ছোট মুখে বড়ো কথা হয়ে যাবে কিন্তু”।

ভল্লা রামালির মুখের ওই হাসি এবং তার কথা বলার ভঙ্গিতে রীতিমতো সতর্ক হয়ে উঠল। আচমকা বলে উঠল, “না রে, তোর কথা পরে শুনব। এখানে নয়, নিরিবিলিতে। খুব খিদে পেয়েছে। চট করে পুকুরে কটা ডুব দিয়ে আসি দাঁড়া – তুই খাবার বাড়…”।

রামালি গম্ভীর হয়েই ভল্লাদাদার কথাগুলো শুনলো, তার মুখে হাসি নেই। তবে তার মনে তৃপ্তির হাসি, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রাজাধিকারিকও তার কথায় এমন চমকে উঠল?

চলবে...

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫ " 


ষষ্ঠ পর্ব


সোমবার/রাতঃ এগারোটা বিয়াল্লিশ।

 আদরের কনি,

ঘরের একটা জানালা দীর্ঘদিন না-খোলা ছিল, গতকাল তুই সেটা খুলে দিলি। খোলা হাওয়ায় বুকটা ভরে উঠল আর চোখে এসে লাগল আলোর উদ্ভাস। এত ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ননিজেকে এমনিতেই মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত, তাই শশাঙ্কবাবু বার বার বলা সত্ত্বেও হুইস্কির নেশায় সেটাকে কাটাতে মন চাইছিল না। শশাঙ্কবাবু কী ভাবলেন কে জানে, তুই সামলে নিস।

ত হপ্তার শেষ দুটো দিন ছিলাম না, তাই আজ চেম্বারে খুব চাপ ছিল। তোদের ওখান থেকে ফিরে মাথার তলায় হাত রেখে টানটান বিছানায় শুয়ে তোর কথা যে দু দণ্ড ভাবব তার অবকাশই পেলাম না। মিনিট পনের ঘরে ছিলাম টয়লেটে একটু ফ্রেশ হবার জন্যে, তার মধ্যেই দু দুবার তাগাদা দিয়ে গেল রিসেপশনের মেয়েটি। মানুষ যে কেন এত অসুখে ভোগে কে জানে? নিজেদের সুখের জন্যেই একটু সুস্থ থাকতে পারে না? আজ যদি এরা না ভুগত, চিন্তা করে দ্যাখ, তোর চিন্তার বন্দরে আমি নোঙর ফেলে মাপতে পারতাম বিস্তর জলের তল – একে বাঁও, দুইয়ে বাঁও হয়তো বা। সে যাক শেষমেষ যেতেই হল চেম্বারে। সকলা নটা থেকে দুপুর একটা, কুড়ি জনের বেশি সাধারণত দেখি না। আজ একেবারে পঁয়ত্রিশজন! ধমকে ওঠার আগেই মিলকি বলে উঠেছিল – বকবেন না স্যার, কিচ্‌ছু করার নেই। শুক্রবার, শনিবার থেকে সব্বাই ফোন করে করে এমন রিকোয়েস্ট করে রেখেছিল যে ফেরাতে পারিনি। মিলকি আমার রিসেপসনিস্ট।

সকলের নিরাময়ের বিধান দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর কি! ঘরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। চান খাওয়া করে একটু রেস্ট না নিতেই আবার ডাক পড়ল নার্সিং হোমে, সেখানে দুজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট অ্যাটেণ্ড করে আবার সন্ধ্যের চেম্বার সাতটা থেকে।

এখন রাত এগারোটা আট। পাশের বাড়ির টিভিতে কোন বাংলা সিরিয়াল চলছে, নাটকীয় মুহূর্তে উচ্চৈঃস্বর মিউজিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নিশ্চিন্ত শব্দহীন চারিপাশ। এখন শুধু তুই আর আমি। আর কেউ নেই আমার সময়ে ভাগ বসাতে।

কি করছিস এখন? ঠিক একখুনি? ঘুমিয়ে পড়েছিস? নাকি উল্টোদিকের সোফায় পা তুলে দিয়ে সিরিয়াল দেখছিস? দুই জা, ননদ আর শাশুড়ির লাগাতার ক্যাঁচাল মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চলেছিস? নাকি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিস? কি বই? ইন্টারেস্টিং না একটু বোর? বই পড়তে পড়তে কি আমার কথাও তোর মনে আসছে? যে পাতাটা খুলে পড়া শুরু করেছিলি, সেই পাতাতেই কি আটকে রয়েছিস অনেকক্ষণ – আমার ভাবনায়? ভাবিস কী না ভাবিস, আমার ভাবতে ভাল লাগছে যে তুই আমার কথা ভাবছিস। এই যে আমি তোকে মেল লিখছি, তার মানে তোর কথাই তো ভাবছি। তুইই তো রয়েছিস আমার সারাটা মন জুড়ে। এর কি কোন টেলিপ্যাথিক এফেক্ট হতে পারে না?

আমার কাজের মাঝে, কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে। আমায় পরশ করে প্রাণ সুধায় ভরে তুমি যাও যে সরে – বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো, ওগো দুখজাগানিয়া।

এখনো কি তুই দাঁড়িয়ে আছিস, কনি? অন্ততঃ মনে মনে হলেও! আমার কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে তুই আজও যেন দাঁড়িয়ে আছিস শুধু আমারই জন্যে।

 ভালোবাসা নিস।

 তোর সুনুদা

 

মঙ্গলবার/রাতঃ বারোটা দশ

প্রিয় কনি,

শীতের শীর্ণতোয়া পাহাড়ি নদী দেখেছিস খুব কাছ থেকে? তরতরিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যায়। জলের মধ্যে খেলে বেড়ানো ছোট্ট ছোট্ট মাছ, জলের নীচেয় নুড়ি পাথর সব - সব দেখা যায়। উজ্জ্বল রোদ্দুরে চিক চিক করে স্বচ্ছতা। আর বর্ষার প্লাবনে সেই নদীই যখন জলপ্রবাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তার বুকে তখন ঘোলা জল। জলের মধ্যে, জলের নীচে কী কী রহস্য জমা করা আছে কিছুই দেখা যায় না।

এতদিন অদর্শনে শীর্ণ স্মৃতির বহতায় যা ছিল স্বচ্ছ, সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হবার পর কেমন যেন সব ঘেঁটে ঘুলিয়ে ঘ হয়ে গেল। দেখা না হলেই বুঝি ভালো ছিল। বেশ তো ছিলাম/ছিলি – কেন যে সেদিন গাড়িটা খারাপ হল মাঝ রাস্তায়! উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে সব চিন্তা আর ভাবনা। কত কথাই যে বলতে ইচ্ছে জাগছে – কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না হে আমার কনি, পরস্ত্রী!

গতকাল আমার মেলের উত্তর দিসনি। মেল খোলার অবকাশ হয়নি, নাকি উত্তর দিবি না ঠিক করেছিস?

 ভালো থাকিস, ভালোবাসা নিস।

তোর সুনুদা।

 

বুধবার/দুপুরঃ দুটো বত্রিশ

 সুনুদা,

 ভালোই তো আছো, বস, একদম রসে ভরা রসবড়া। এতটুকুও টসকাওনি।  

তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় – দুটো মেলই পড়েছি যথাযথ সময়েই। এমনিতেই তোমার সঙ্গে (নাকি তোমার প্রিয় রবিঠাকুরের ভাষায় “তোমার সনে” বলব?) এতদিন পর দেখা হবার একটা হ্যাং ওভার তো ছিলই, তার ওপর তোমার ওরম মেল, বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আজও তুমি এভাবে ভাবতে পারো? আজও কি আমি তোমার কাছে একই রয়ে গেলাম! মনে হল তাই আর বুকের মধ্যে জমাট বাঁধল দীর্ঘশ্বাস – কী কথা ছিল বলবার? কী কথা আর আছে বলবার? সমস্ত ভাবনা আমাকে বোবা করে দিল, সুনুদা।

 তোমার স্বভাবটা আর পাল্টালো না, সুনুদা। এমন মন আকুল করা বক্তব্য শেষ করলে “পরস্ত্রী” দিয়ে? হেমন্তের চাঁদনি রাতে কাশবনে হারিয়ে যাবার লোভ দেখাও আবার মাথায় হিম লেগে ঠান্ডা লাগার ভয়ও দেখাও। শীতের ঝরাপাতার বনে হারিয়ে যাওয়ার ডাক দাও কিন্তু পথ হারানোর ভয়ে বনে ঢুকতেও মানা করো। আমি তো হারাতে চেয়েছিলাম তোমার ডাকে – কিন্তু বারবার তুমিই দিয়েছ পিছুটান।

পিছুটান ভুলে একবার ডেকেই দেখো আমায়, আমি আজও আছি শুধু

 তোমারই কনি।

 

বুধবার/রাতঃ ১১:৪৫

কনি,

তোকে ডাকিনি একথাটা তোর মুখে মানায় নাডেকেছিলাম, তোকেই ডেকেছিলাম, সমস্ত অন্তর থেকে। এমন আহ্বান, নাঃ আহ্বান নয়, আবাহন আর কেউ কোনোদিন করতে পেরেছে বলে আমার অন্ততঃ বিশ্বাস হয় না। তুই সেদিনের সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিলি। হয়তো তেমন ভরসা করতে পারিসনি। অথবা আমার ডাকে সেসময় সাড়া দিলে তোকে এবং আমাকে যে ঝঞ্ঝার মুখে পড়তে হতো, সে আশঙ্কায় বিকল হয়েছিলি তুই। সেই ঝড়ের রাতে তোর নিরাপদ ঘরের দুয়ার রুদ্ধ রেখেছিলি। খিড়কির দরজাতেও এতটুকুও ফাঁক রাখিসনি। পাছে উড়ে যায় সব বাঁধনের শিকল, এলোথেলো হয়ে যায় তোর সহজ জীবনের যাবতীয় পথচলা।

সেই ঝড় থেমে গেছে কবেই। পিছল পথে পা টিপে টিপে আমি পৌঁছে গিয়েছি, একা এক নির্জন পথের পরিত্যক্ত পান্থশালায়। আমি তোকে আমার সঙ্গে সেদিন মাত্র সাত পা হাঁটতে বলেছিলাম, কনি, তাহলেই আমরা জীবনের অনন্ত পথচলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারতাম। সে তো হয়ে উঠল না কনি। সেদিন আমার সেই ডাকে তুই মুখ ফিরিয়েছিলি, কনি, আজ কোন অধিকারে তোকে ডাকি বল তো? তোকে খুব কাছে পাবার লোভটুকুও এখন রয়ে গেছে বহুদিন পিছনে ফেলে আসা অস্ফুট স্মৃতিতে। যে স্মৃতি একটা লোহার সিন্দুকে ভরে, শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছিলাম গভীর এক কুয়োর জলে। সে সিন্দুকটা জলে পড়ার সময় আওয়াজ উঠেছিল - ঝপ্‌পাস। আমার স্মৃতিতে এখন রয়ে গেছে শুধু ওই আওয়াজটুকুই!

আজ তোকে ডাকতে গেলে, আমার একা এই নির্জন ঘরে সেই শব্দটাই কানে আসছে বারবার। এই শব্দটুকু ছাড়া আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, 

তোর সুনুদার।

পরের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭ "

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০ 


২৭

 

সেদিন সন্ধের একটু পরে, ভল্লা ঘরের বাইরে বসেছিল, রামালি পুকুরে গিয়েছিল জল আনতে। হঠাৎই চার-পাঁচজন মানুষের পায়ের শব্দে ভল্লা সতর্ক হয়ে উঠল। যে পাথরে সে সাধারণতঃ বসে, তার ঠিক পিছনের দিকে মাটির কাছাকাছি একটা বড়ো খোঁদলের মধ্যে রাখা আছে ছোট্ট একটা ভল্ল। খোঁদলের মুখে ঘন ঝোপ-ঝাড়ের জন্যে সহজে তার সন্ধান পাওয়া যায় না। ভল্লা হাত বাড়িয়ে ভল্লটা ধরে থাকল। কে হতে পারে লোকগুলো? এই সন্ধেয় তাদের কী দরকার? একটু পরেই বেড়ার বাইরে থেকে কেউ ডাকল, “ভল্লামশাই, রয়েছেন নাকি? আমি বণিক অহিদত্ত”।

কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভল্লা উঠে দাঁড়াল, বলল, "বণিকমশাই ওদিকে নয়, আপনি বাঁদিক দিয়ে ঘুরে আসুন। অনেকদিন পর, কী ব্যাপার?”

অহিদত্ত উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বললেন, “এই তাহলে আপনার নির্বাসনের বাসা?”

ভল্লা কিছু বলল না, হাসল।

“আপনার সঙ্গে কিছু গভীর কথা ছিল। এখানে কি নিরাপদ? তাছাড়া আমার সঙ্গে চারজন রক্ষীও রয়েছে...”।

এই সময়েই রামালি কলসিতে জল ভরে ফিরে এল। উঠোনে অপরিচিত লোকটিকে দেখে একটু অবাক হল। ঘরে ঢুকে চর্বির প্রদীপ জ্বালিয়ে বাইরে আনতে, ভল্লা বলল, “রামালি, ইনি অহিদত্ত। বিখ্যাত বণিক। তুই এখন রান্নাবান্না করবি তো? আমি ওঁনার সঙ্গে দণ্ড দুয়ের জন্যে ঘুরে আসছি। বণিকমশাই এই ছেলেটিকে চিনে রাখুন, রামালি। আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। আমার সঙ্গেই থাকে। আপনার রক্ষীদের বলুন, তারা এখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক  চলুন, আমরা ঘুরে আসি”।

 

জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছুটা গিয়ে ভল্লা অহিদত্তকে নিয়ে ফাঁকা একটা জায়গায় বসল। আশপাশে ছোটছোট ঝোপ ঝাড়, কাছাকাছি কোন বড় গাছ নেই। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের কথা কেউ শুনবে, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

“বাঃ জায়গাটা বেশ বেছেছেন তো! চারদিকের জঙ্গল থেকে ঝিঁঝির যা আওয়াজ আসছে...এমনিতেই কিছু শোনা যাবে না...”।

ভল্লা হাসল, বলল, “কী সংবাদ বলুন। তার আগে আমার একটা অনুরোধ আছে, রাখতে হবে”।

“কী অনুরোধ?”

“আপনাদের ওদিক থেকে ভালো কোন কবিরাজকে পাঠাতে পারবেন?”

“প্রধানমশাইয়ের চিকিৎসার জন্যে?”

“শুনেছেন?”

“বাঃ শুনব না? কালকে দুপুরে আস্থানের রক্ষীরা নোনাপুর আর সুকরা গ্রামে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সে খবর তো দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভল্লামশাই। প্রধানমশাইকে যাচ্ছেতাই মেরেছে। কবিরাজমশাইকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। সুকরার ভীলকদাদাকেও বিচ্ছিরি মেরেছে কোন কারণ ছাড়াই। আস্থানের রক্ষীদের ভয়ে সহজে কেউ আসতে চাইবে না হয়তো। তবু আমি পাঠিয়ে দেব, কাল সকালেই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন”।

“প্রধানমশাই ছাড়াও, রামালির কাকাকে একবার দেখতে হবে। আর সুকরার ভীলককাকাকেও...”।

“রামালি? যার সঙ্গে আপনি এই মাত্র পরিচয় করিয়ে দিলেন?”

“হ্যাঁ ওর কাকা। ওঁনার অবস্থা ততটা সঙ্গীন নয়, তবুও আপনাদের কবিরাজমশাই যাচ্ছেন যখন একবার দেখে এলে ভাল হয়”।

“ঠিক আছে, হয়ে যাবে। আর কিছু?”

ভল্লা হাসল, বলল, “নাঃ আর কিছু না। এবার কাজের কথা বলুন”।

অহিদত্ত মুচকি হেসে বললেন, “আপনি এদিকের পরিস্থিতি যে ভাবে পাকিয়ে তুলেছেন, তাতে আপনার অনেক অস্ত্রশস্ত্র লাগবে তো?”

ভল্লাও হাসল, বলল, “শুধু এদিকের না, আপনাদের দিকের ছেলেরাও অস্ত্র কিনতে চাইছে...আমার কাছে ওরা তিন-চারদিনের মধ্যেই আসবে পাকা কথা শোনার জন্যে”।

“আমাদের দিকের ছেলেরা? কী বলছেন, ভল্লামশাই?”

“আপনাদের রাজা নাকি, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে রাস্তা-ঘাট না বানিয়ে, সেচব্যবস্থা না করে, গ্রামে গ্রামে মন্দির বানিয়ে চলেছেন?”

“হুঁ, তা চলেছেন। আর সে মন্দির বানানোর কাজ পাচ্ছে রাজধানীর জনা তিনেক বড়োবড়ো শ্রেষ্ঠী। বজ্জাতরা এক-একজন টাকার কুমীর। রাজ্যের ছোট-বড়ো সমস্ত আধিকারিকদের সঙ্গে জোটপাট করে, রাজ্যের সবদিকে তারা অজস্র মন্দির বানিয়ে চলেছে। কিন্তু তার সঙ্গে গ্রামের সাধারণ ছেলেদের কী সম্পর্ক?”

“তারা নিজেদের আর আশেপাশের গ্রামের ওই দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের জব্দ করতে চাইছে। তার জন্যে ওদের অস্ত্র চাই”।

অহিদত্ত বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “আপনি কি জানেন, আপনাদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে পুরোনো অস্ত্র কেনার একটা দায়িত্ব আমি পেয়েছি? সে অস্ত্র আপনি আমার থেকেই পাবেন, এদিককার আন্দোলনের জন্যে। কিন্তু আমাদের রাজ্যের ছেলেদের...না ভল্লামশাই, আমাদের রাজ্যের ছেলেদের অস্ত্র দিলে আমি ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবো। আমাদের রাজধানীতে এই খবর একবার পৌঁছলে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী বণিকরা আমার পিছনে লাগার দারুণ সুযোগ পেয়ে যাবে। আধিকারিকদের সঙ্গে মিলে আমার ভিটেমাটি চাঁটি করে দেবে...”।

“তাহলে? ওরা অস্ত্র পাবে না?”

“পাবে না কেন? আপনি ওদের দেবেনআমি দেব আপনাকে। তাতে সবারই শুভ লাভ হবে”।

শুভ লাভ?”

“বুঝলেন না? ধরুন আমি আপনাকে কিছু অস্ত্র দিলাম এক টাকার বিনিময়ে। আপনি ওদের দেবেন, সোয়া দুটাকা কিংবা আড়াই টাকা দরে। এক টাকায় আপনি আমার দেনা শোধ করে দেওয়ার পরেও, আপনার হাতে থাকবে দেড়টাকা। আপনাদের খরচ-খরচা, আর ভবিষ্যতের সঞ্চয়। আপনার দল বাড়লে তার খরচও তো বাড়বে ভল্লামশাই”।

“কিন্তু আপনাদের ছেলেরা কতদিন আর অস্ত্র কিনবে, কতটুকুই বা কিনবে?”

বণিক অহিদত্ত অদ্ভূতভাবে হাসলেন, বললেন, “আমি আপনাদের রাজধানীতেই অতি বিচক্ষণ একজন মানুষের কাছে, কিছুদিন আগেই, একটা কথা শুনলাম। সেটাই আপনাকে বলি। আপনি আমার থেকেও অনেক বেশী প্রত্যক্ষদর্শী, বিচক্ষণওঁনার কথাগুলোর মর্ম আপনি আমার থেকেও ভালো ধরতে পারবেন।

উনি বলছিলেন, ক্ষমতার মতো দুর্ধর্ষ নেশা আর হয় না। তার তুলনায় অর্থ, মদ, গাঁজা, চরস, ভাঙ, নারীর যৌবন কিস্‌সু না। একবার যদি কেউ এই ক্ষমতার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে, তার ফিরে আসার সব পথ বন্ধ। এই ক্ষমতা সে কিভাবে অর্জন করতে পারে? প্রথমে ছোট করেই শুরু হবে...কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ জোটাবে, ছোটখাটো অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে খুচখাচ কিছু চুরি, ডাকাতি করবে...কিছু অর্থ উপার্জন করবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা আরো অস্ত্রশস্ত্র কিনবে, আরও বড়ো বড়ো ডাকাতি করবে। তার ক্রিয়াকলাপে আকৃষ্ট হয়ে আরো অনেক সাঙ্গোপাঙ্গ এসে জুটবে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে তার ক্ষমতার চারাগাছটি – মহীরূহে পরিণত হবে...। ব্যস্‌, এই পরিস্থিতিতে তার কাছে সব আছে... ক্ষমতা, অর্থ, লোকবল। এখন সে একটা ছোট্ট অঞ্চলের রাজাই বলা চলে।

কোন রাজার পক্ষেই রাজ্যের আপামর জনসাধারণকে সমভাবে তুষ্ট রাখা অসম্ভব। তার কারণ প্রশাসনের গাফিলতি থাকতে পারে। তার কারণ আঞ্চলিক পরিবেশ – মানে কোথাও সুজলা, সুফলা উর্বর, আবার কোথাও রুক্ষ, ঊষর – হতে পারে। কোথাও প্রচুর খনিজ সম্পদ, আমাদের এদিকে যেমন সবই ঢুঢু। সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং নদীবহুল অঞ্চলে বাণিজ্যের যেমন সহজ প্রসার হয়, আমাদের এই অঞ্চলে দেখুন, সে সম্ভাবনাও অপ্রতুল। অতএব নানান কারণে কোন কোন অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের বঞ্চনার শিকার মনে করে ক্ষুব্ধ হতে থাকে।

সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ওই আঞ্চলিক রাজা এবার মূল প্রশাসনের সমান্তরালে, জনদরদী এক আঞ্চলিক   প্রশাসন গড়ে তুলতে শুরু করবে। এদের ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গোরা হয়ে উঠবে ওই প্রশাসনের আধিকারিক। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী জনগণ হবে এদের অনুগামী সমর্থক। তখন কিন্তু ওরা আর ডাকাত নয়, নিজেদের পরিচয় দেবে বিদ্রোহী, বিপ্লবী কিংবা সমাজ-সংস্কারক। উল্টোদিকে মূল রাষ্ট্র এবং প্রশাসন, তাদের নাম দেয় বিচ্ছিন্নতাকামী, সন্ত্রাসবাদী – রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নাশক পরজীবী গোষ্ঠী

এবার সে রাজ্যের রাজার সঙ্গেই বিপ্লবে নামতে পারে। সরাসরি বিচ্ছিন্ন কিছু যুদ্ধেও নামতে পারে। আর সে রাজ্যের রাজা যদি সাধারণ প্রজাদের অপছন্দের রাজা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। দেখা যাবে, ধীরে ধীরে সে রাজাকেই পরাস্ত এবং হত্যা করে – রাজ্যের অধীশ্বরও হয়ে উঠতে পারে। অবিশ্যি সবাই যে অতদূর যেতে পারবে, তা নয়, ক্বচিৎ দু একজনই পারে। আপনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নাম শুনেছেন?”

ভল্লা মাথা নাড়ল, না।

“আমিও শুনিনি। উনি কোন এক সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের নাম বললেন। তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, নাম চাণক্য। বহু যুগ আগে দুজনে মিলে পরাক্রমশালী নন্দবংশের সম্রাটকে পরাস্ত করে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন”।

“তিনি তো সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই করেছিলেন। তিনি বিদ্রোহী হতে পারেন, কিন্তু ডাকাত হতে যাবেন কেন?”

“আমিও একই প্রশ্ন করেছিলাম, ভল্লামশাই। তিনি উত্তরে বললেন, ইতিহাসে তিনি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত নামেই প্রসিদ্ধ। শুরুর দিকে, যখন তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক চন্দ্রগুপ্ত মাত্র, যখন নন্দ-সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী কিছু কিছু অঞ্চল তিনি নিজের আয়ত্তে আনছিলেন, রাজধানীতে নন্দরাজার সেনাপ্রধানরা, তাঁকে ডাকাতই মনে করেছিল। তারা ভাবত, হতভাগা ডাকাতটাকে, একবার ধরতে পারলে শূলেই চড়াবো। সেনাপ্রধানদের সে স্বপ্ন অবশ্য পূর্ণ হয়নি।

ওসব বড়ো বড়ো কথা ছেড়েই দিন ভল্লামশাই। এখানেই দেখুন না, প্রশাসন আপনাকে এখানে পাঠিয়েছে, রাজার বিরুদ্ধে কিছু বিদ্রোহ বানিয়ে তোলার জন্যে। আপনার ছেলেরা সবাই ভাবছে তারা বিদ্রোহ করছে। কিন্তু আপনার প্রশাসন গতকাল গ্রামে গিয়ে, বিদ্রোহের নয় - ডাকাতির তদন্ত করেছেগ্রামের বয়স্ক মানুষদের পীড়ন করেছে, ভয় দেখিয়েছে, যাতে তারা এই ধরনের ডাকাতি ভবিষ্যতে আর না করে”।

অতএব, কে কি নামে ওদের ডাকল, তাতে কিছু এসে যায় না, ভল্লামশাই। আসল কথাটা হল, ক্ষমতার নেশায় মজে থাকা এই গোষ্ঠীগুলির নিয়মিত অস্ত্রের সরবরাহ না পেলে চলবে কী করে ভল্লামশাই? ও নিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন”।

ভল্লা চুপ করে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “ঠিক কবে থেকে আপনি অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন?”

“রাজধানী থেকে গত পরশু রওনা হয়েছে। আপাততঃ চারটি গোশকটে। আশা করি দিন দশেকের মধ্যে আস্থানে পৌঁছে যাবে”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “অস্ত্র-শস্ত্রের মূল্য কী রকম ধরছেন?”

অহিদত্ত হেসে বললেন, “আমি কে মশাই? মূল্য তো আপনি ঠিক করে দেবেন। শষ্পকমশাই নির্দিষ্ট দিনে তাঁর লোক পাঠাবেন...আমিও থাকব...সকলে মিলে বসে মূল্য ঠিক করা যাবে। কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গেল ভল্লামশাই – আমি আজ উঠি – অনেকটা পথ যেতে হবে...। রাজধানীর অস্ত্র কাছাকাছি পৌঁছলেই আমি আবার আসব...”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল, গম্ভীর মুখে বলল, “হ্যাঁ চলুন এগোনো যাক – ভয়ংকর এক বিদ্রোহের দিকে...”।

অহিদত্ত ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে বললেন, “নাঃ, সে এখনও দেরি আছে। আপাততঃ আপনার বাসার দিকেই যাওয়া যাক...”।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২ "

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...