ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১

   ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব "


প্রথম পর্ব 

৮ই নভেম্বর ২০১৬ রাত আটটা থেকে গোটা ভারতবর্ষে ১০০০ এবং ৫০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণার পর গোটা দেশে সোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সেই নোট বাতিল পদ্ধতি ঠিক না ভুল, আমাদের ভবিষ্যতে ভালো হবে, না খারাপ হবে! নাকি আমাদের যা অবস্থা ছিল তাইই থাকবে! এ সব বিষয় নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক, পক্ষে-বিপক্ষে জোরদার যুক্তি এবং প্রশংসা আর বিদ্রূপের বন্যা বয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ জুড়ে। সেই সব জটিল বিতর্কের মধ্যে একটুও না জড়িয়ে আমরা বরং এসো দেখে নিই মানব সভ্যতায় এই নোট বা টাকা-পয়সা কবে থেকে শুরু হল। আর কিভাবে টাকা পয়সা ছাড়া আমাদের সভ্যতা এক কথায় অচল হয়ে উঠল দিন-কে-দিন। টাকা যখন ছিলই না, তখনই বা আমাদের জীবন যাত্রা কেমন ছিল? 

 

কয়েকটি পরিবারের লোক একসঙ্গে দল বেঁধে, ছোট ছোট গোষ্ঠী তৈরি করে, আদিম মানুষেরা সভ্য জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। শুরুতে খাদ্যের জন্যে জঙ্গলে শিকার আর ফল-মূল সংগ্রহ করা ছাড়া তাদের জীবন ধারণের অন্য কোন উপায়ই ছিল না। ধীরে ধীরে তারা কিছু কিছু বন্য প্রাণীদের পোষ মানাতে শিখে ফেলল। এই গৃহপালিত পশুদের মাংস এবং দুধ তারা যেমন খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত, তেমনি ঘরের নানান কাজেও তাদের ব্যবহার করতে শিখে ফেলল। তারপর তারা আরও শিখে ফেলল আগুনের ব্যবহার, চাষবাস এবং ধাতুর ব্যবহারসভ্যতার এই উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সহজ সরল জীবন যাত্রার ক্রমশঃ ঢুকে পড়তে লাগল নানান জটিল পেশা, কেউ হয়ে উঠল দক্ষ কারিগর, পাথরের কিংবা মাটির নানান উপকরণ বানাতে পারে কেউ হয়ে উঠল ধাতুবিদ, নানান অঞ্চলে আকর খুঁজে খুঁজে খনিজ তুলে আনে, তারপর সেই খনিজ গালিয়ে বের করে ফেলে লোহা, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা, রূপো। আবার আরেক ধরনের কারিগর সেই ধাতু থেকে বানিয়ে ফেলতে পারত বিভিন্ন প্রয়োজনের যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র, কিংবা রান্নার বাসন কোসন। আবার অনেকে সোনা, রূপো কিংবা ব্রোঞ্জ দিয়ে সুন্দর নকশার গয়না বানাতে শিখে ফেলল। অনেকে তুলো কিংবা অন্য কোন তন্তু দিয়ে কাপড় বানাতে শিখল, সে সব কাপড়ও হতো কত রকমের। সাদা, রঙিন, পাতলা, মোটা কিংবা শীতের জন্যে পশমের পোশাক, চাদর।

আমাদের মানব সভ্যতার শুরু হয়েছিল, চাষবাস এবং পশুপালনকে ঘিরে, গ্রামজীবন দিয়ে। প্রধানতঃ নদীর ধারে ধারে গড়ে ওঠা এই গ্রামগুলির সব জায়গাতেই যে সব ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, এমনতো হতে পারে না। যেমন, এক ধরনের জমিতে খুব ভালো খাদ্য শস্য, যেমন ধান, গম হয়, সে জমিতে তুলোর চাষ ভালো হয় না। আবার যে জমিতে ভালো তুলো হয়, সে জমিতে ধান-গম তেমন ভালো হয় না। একই ভাবে, নদীর ধারে যে সব জমিতে চাষবাস ভাল হয়, সে সব জমিতে লোহা-তামার মতো ধাতু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ধাতুর খনিগুলো অধিকাংশই রুক্ষ পাথুরে অঞ্চলে হয়, সেখানে ফসল ফলানো দুরূহ ব্যাপার।                              

   সভ্যতার এই পর্যায়ে এসেই আমাদের বিনিময় অর্থাৎ বদল ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠতে লাগল।

 ধরা যাক আমি ‘সবুজ’ গ্রামের লোক, আমাদের গ্রামে প্রচুর খাদ্য শস্য হয়, আমাদের গ্রামের সকলের সারা বছরের প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরেও অনেক খাদ্য শস্য বাড়তি থেকে যাচ্ছে। অবিশ্যি আমাদের গ্রামে লোহা পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছি, আমরা যদি বেশ ভালো লোহার কোদাল, লাঙ্গলের ফাল, কাস্তে কিংবা খুরপি যোগাড় করতে পারি, আমাদের চাষের কাজে খুব সুবিধে হবে আরো বুঝছি, বেশ কিছু ভালো গরু, বলদ কিংবা মোষ যদি আমরা যোগাড় করতে পারি, আমাদের চাষবাসের কাজটা অনেক তাড়াতাড়ি হতে পারবে, আমাদের গ্রামে অনেক ভালো ফসল হতে পারবে। এক্ষেত্রে ‘সবুজ’ গ্রামের লোক আমরা কী করব?

আবার ধরা যাক, তুমি ‘রাঙা’ গ্রামের লোক, তোমাদের গ্রামেও চাষবাস হয়, তবে সে তেমন কিছু নয়, গ্রামের সবার সারা বছরের খাবার পক্ষে যথেষ্ট ফসল হয় না। তবে তোমাদের গ্রামে অনেক লোহা পাওয়া যায়, আর তোমাদের ধাতুবিদ আছে, সে খুঁজে খুঁজে লোহার খনিজ বের করে, আর সেই খনিজ গালিয়ে লোহার গোলা বের করে। সেই লোহাকে গলিয়ে কিংবা গরম করে পিটিয়ে লোহার যন্ত্রপাতি বানাতে তোমরা ‘রাঙা’ গ্রামের লোকেরা খুবই দক্ষ। তোমরা বুঝতে পারছো, লোহা খেয়ে তো আর বেঁচে থাকা যায় না! তোমাদের খাবার জন্যে শস্য চাই। দুর্গম অঞ্চল থেকে ভারি ভারি লোহা কিংবা তামার আকর বইবার জন্যে শক্তিশালী বলদ বা মোষ থাকলে খুব সুবিধে হত। অতএব ‘রাঙা’ গ্রামের লোকরাই বা তাহলে কি করবে?

আমাদের গ্রামের থেকে বেশ কয়েকদিন হাঁটা পথের দূরে, আরেকটি গ্রাম আছে, সেখানকার লোকজনেরা চাষবাস কিংবা অন্য কোন কাজে দক্ষ না হলেও, পশুপালন ব্যাপারটা তারা বেজায় ভালো বোঝে। তাদের গ্রামের মোষ আর বলদগুলো যেমন জোরদার, তেমনি খাটতে পারে। তাদের গাভিরাও দুধ দেয় প্রচুর। সেই গ্রামের লোকরা দুধ, মাখন খেয়ে শেষ করতে পারে না, প্রচুর নষ্ট হয়। তাদের বলদ কিংবা মোষগুলোর সারাবছর কাজ থাকে না, কিন্তু তাদের পালন করতে খরচ হয় প্রচুর খড়, ঘাস বিচালি। তারা ভাবছে যদি কিছু বদলে নেওয়া যেত।

ঠিক এই ভাবনা থেকেই শুরু হয়ে ছিল বিনিময় প্রথা, যাকে ইংরিজিতে বলে  Barter system প্রাচীন গ্রীস, রোম এমনকি ভারতেও গরু বা বলদ, এক কথায় গবাদি পশুই ছিল বিনিময়ের প্রধান উপাদান। গাভির বয়েস ও তার দুধ দেওয়ার ক্ষমতার উপর তার দাম নির্ধারণ করা হত। আমাদের সংস্কৃত শাস্ত্র ঐতরেয় ব্রাহ্মণে একবছরের গাভি কিংবা  সদ্যজাত বাছুরের বিনিময়ে কতটা সোমরস পাওয়া যায় তার উল্লেখ আছেগবাদি পশু ছাড়াও এক বস্তা শস্য কিংবা একখণ্ড মাংসের বড়ো টুকরোও তখন বিনিময়ের উপাদান হিসেবে সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত হত। এমনকি কোন কোন জায়গায় নুনের বস্তার বিনিময়েও খাদ্য শস্য, মাংস বা অন্য উপকরণ পাওয়া যেত, কারণ যে কোন খাদ্যে নুন অত্যন্ত জরুরি এবং সমুদ্র থেকে অনেক দূরের দেশে নুন মোটেই সহজলভ্য ছিল না।

এই বিনিময় প্রথায় কাজ চলে যাচ্ছিল ঠিকই, তবে সমস্যাও হচ্ছিল বিস্তর। ধরা যাক একজন তন্তুবায় একটা ধুতি বা শাড়ি বানিয়েছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে কতটা শস্যদানা কিংবা গাভি কিংবা মাংসের টুকরো তাঁর পাওনা হওয়া উচিৎ, কে ঠিক করবে? যে লোকটির অনেক গবাদি পশু আছে, সে হয়তো দুখানা ধুতি কিনতে চায়। দুখানা ধুতির সমমূল্যে একটি গাভিকে তো আর অর্ধেক বা আরো ছোট অংশে ভাগ করা যায় না! কিন্তু যার কাছে শস্যদানা আছে সে অর্ধেক বা সিকি বস্তা শস্য দিয়েই, সেই ধুতি কিনে ফেলতে পারে। অতএব দেখা যাচ্ছে, বিনিময় প্রথা সবার ক্ষেত্রে, সব অঞ্চলে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছিল না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অচল হয়ে উঠছিল এই প্রথা।

 

 

 

মানুষের সভ্যতার যত উন্নতি হল, দেশের মধ্যে এমনকি দেশের বাইরেও ততই ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে লাগল। সত্যি বলতে যে দেশ বা রাজ্য বাণিজ্যে যত বেশি সফল, তার সম্পদ-সমৃদ্ধিও তত বেশি। আর বাণিজ্য যত বেড়ে উঠল, ভীষণ জটিল হয়ে উঠতে লাগল এই বিনিময় প্রথা। এমন কোন সাধারণ উপাদান যদি ব্যবহার করা যায়, যার দ্রব্যমূল্য সকলেই মেনে নেবে এবং সেই উপাদানের প্রেক্ষীতে সকল জিনিষের দামও যদি নির্ধারণ করে ফেলা যায়, তাহলে আর বিনিময়ের ঝামেলা হয় না। বলাবাহুল্য এই নিয়মে সকলেরই সুবিধে হল এবং দ্রব্য বিনিময় প্রথা বদলে গিয়ে, এসে গেল বেচা-কেনার অর্থ বিনিময় পদ্ধতি (Money transaction system)নতুন এই ব্যবস্থায়, বিক্রেতা তার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে, তার নিজের দরকার এবং মনোমতো জিনিষপত্র কিনতে আর কোন বাধা থাকল না। এসে গেল বিনিময়ের নতুন উপাদান, যার নাম অর্থ  বা টাকা (Money)ছোটাখাটো আঞ্চলিক লেনদেন ছাড়া, বিনিময় প্রথার চল বেশ কমে গেল

 প্রথম থেকেই অর্থ বিনিময়ে বিভিন্ন ধাতুর বহুল ব্যবহার শুরু হয়েছিল। শুরুতে সোনা, রূপো কিংবা তামার মতো বিশেষ বিশেষ ধাতু, গোলা হিসেবে কিংবা পুঁটলিতে গুঁড়ো হিসেবে ব্যবহার করা হত। তারপর ধীরে ধীরে ধাতুর ছোট ছোট পাত বা পাৎলা চাকতির ব্যবহার শুরু হল। দেশের রাজা কিংবা দেশের মুখ্য প্রশাসক বিশেষ কোন ছাপ বা ছবি দিয়ে যখন এই ধাতব চাকতিগুলো সকলের ব্যবহারের জন্যে বাজারে ছাড়তেন, তখন তাকে মুদ্রা (coin) বলা হয় গ্রীসের প্রাচীনতম যে মুদ্রা পাওয়া গেছে তাতে পশুচিত্রের ছাপ দেখা যায়। মিশরের সোনা বা রূপোর মুদ্রাতেও গাভি এবং অন্যান্য পশুর ছাপ দেখা যায়।

মুদ্রার প্রধান বিশেষত্ব হল, মুদ্রায় ব্যবহার করা ধাতুর গুণ এবং ধাতুর ওজন। বিশুদ্ধ সোনা, রুপো কিংবা তামার নির্ধারিত (standard)  দ্রব্যমূল্য সারা বিশ্বে, সকলেই মেনে নেয়। কিন্তু বিশুদ্ধ ধাতু ততটা শক্ত হয় না বলে, মুদ্রা বানানোর সময় বিশুদ্ধ ধাতুতে, অন্য ধাতুর কিছুটা খাদ বা অশুদ্ধি মেশাতে হয়। সোনা বা রূপোতে এই খাদের পরিমাণের উপর মুদ্রার মূল্য নির্ভর করে। সুতরাং কম সোনার সঙ্গে বেশি খাদ মিশিয়ে, একই রকম দেখতে মুদ্রা বাজারে ছাড়লে, সাধারণ লোকের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব হত নাএর ওপর মুদ্রার ওজনে সামান্য কারচুপি করলেও চট করে ধরা সম্ভব হত না। দুর্জন প্রতারকদের এই দুর্নীতি ঠেকানোর জন্যে, রাজা কিংবা প্রশাসকরা বিশেষ ছবি, চিহ্ন, ছাপ বা সংকেত দিয়ে মুদ্রা ছাপতেন। সেই বিশেষ চিহ্নকে বলত মোহর, আবার বিশেষভাবে চিহ্নিত সোনার মুদ্রাকেও মোহর বলা হত।

 অনুমান করা যায় খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় আড়াই/তিন হাজার বছর আগে, সিন্ধু সভ্যতার আমলে, ভারতবর্ষে প্রথম মুদ্রার প্রচলন হয়েছিলসিন্ধু নদ, ঘাঘরা-হাকরা ও সরস্বতী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা, সিন্ধু সভ্যতার এই শহরগুলি পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমানা থেকে আমাদের দেশের গুজরাট, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। এখনো পর্যন্ত এই অঞ্চলে সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক ১০৫২টি শহরের হদিশ পাওয়া গেছে। পুরাতত্ত্ববিদরা গবেষণা করে দেখেছেন, হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো নগরের কুশলী ধাতুবিদরা, দক্ষিণ ভারত থেকে প্রচুর সোনা এবং রাজস্থান থেকে তামা আমদানি করত। কিন্তু ধাতুমুদ্রার হদিস না পাওয়া গেলেও, শুধুমাত্র মহেঞ্জোদারো শহরে প্রায় ১২০০ সিল পাওয়া গেছে এবং অন্যান্য শহরেও বেশ কয়েকশ সিল উদ্ধার হয়েছে। এই সিলগুলি,  নানান রকম ছবি খোদাই করা চারকোণা স্টিটাইট (Steatite) পাথরের টুকরো। স্টিটাইট পাথরের আরেক নাম সোপস্টোন, পাথরের মধ্যে সব থেকে নরম এই পরিবর্তিত (Metamorphic) শিলা ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium) সমৃদ্ধ খনিজ ট্যাল্ক(Talc)

 

 
মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া কিছু সিল

 


লোথাল থেকে উদ্ধার হওয়া নানান ধরনের সিল


এই সিলগুলির সঠিক ব্যবহার জানা না গেলেও পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, বাণিজ্যসংক্রান্ত বিনিময়ের কাজেই এগুলি ব্যবহার করা হত। হয়তো উত্তপ্ত ধাতব পাতের ওপর এই সিলগুলি দিয়ে ছাপ মেরে মুদ্রা বানানো হত - কারণ এই সিলগুলির চিত্র ও লিপিগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উলটো আঁকা হত। যেভাবে আজকের রাবার-স্ট্যাম্প কিংবা মিষ্টির দোকানে সন্দেশের ছাঁচ বানানো হয় উলটো করে, ছাপ মারলে - সোজাদিকটাই আমরা দেখতে পাই। তবে এই সিল অধিকাংশই বর্গাকার বা আয়তাকার হত। 

সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম একটি বন্দর শহর হল লোথাল, এখনকার গুজরাটের আমদাবাদ শহর থেকে মোটামুটি ৮৫ কিমি দূরে। এই বন্দর থেকে সুদূর ইজিপ্ট, সুমের, বাহারিনের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এই বন্দর শহরে বেশ কিছু গোলাকার এবং ছোট বড়ো নানান আকারের স্টিটাইট সিল পাওয়া গেছে। সিন্ধু সভ্যতার বিশাল ব্যাপ্তি, ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে এবং সুদূর আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া, ইওরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্কের নানান প্রমাণ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, দ্রব্য বিনিময় করে এই বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন শহর থেকে উদ্ধার হওয়া এই সিলগুলিতে কিছু লিপি দেখতে পাওয়া যায়, যে লিপির পাঠ এখনো সম্ভব হয়নি। এই লিপিগুলি পড়ে ফেলতে পারলে, আমাদের ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য আমরা জানতে পারব। বড়ো হয়ে তোমরা যদি এই সব লিপির অর্থ বুঝে ফেলতে পারো, আমাদের মুদ্রার ইতিহাস এমন কী প্রাচীন ভারতের ইতিহাসও নতুন করে লিখতে হবে।


চলবে...

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ৩ "


১০

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তী কালে বৃটিশ পার্লামেন্টের শাসনাধীন ভারতবর্ষে বিদেশী সাহিত্যের ছোঁয়া এসে বাংলা সাহিত্য এবং লিপিকে অকস্মাৎ জাগিয়ে তুলল, যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়। পুঁথির সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা লিপি ঢুকে পড়ল ছাপাখানার রাজ্যে। কলকাতা শহরকে রাজধানী করে, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যবিস্তারের শুরুতে বিদেশী শাসকদের অন্যতম বাধা ছিল ভাষা। শাসকের পক্ষে স্থানীয় ভাষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে প্রজাদের শাসন এবং শোষণ দুরূহ বুঝে, কোম্পানি নতুন ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য বাংলাভাষা শিক্ষার বই ছাপালেন ১৭৭৮ সালে। হুগলি থেকে ছাপা হওয়া সেই বইয়ের নাম, “A Grammar of the Bengali Language”। বইটি মূলতঃ ইংরিজিতে লেখা হলেও, বাংলা হরফের অনেক নমুনা এবং উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই কারণে এই বইটিকে বাংলা লিপির প্রথম মুদ্রণ প্রকাশ বলা যায়। এই বইটির লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালেহেড (Nathaniel Brassy Halhead) এবং মুদ্রণের কৃতিত্ব স্যার চার্লস উইল্কিন্সের (Sir Charles Wilkins)।

অবশ্য এর অনেক আগেই, ১৫৫৬ সালে পর্তুগীজ খ্রিষ্ট ধর্মপ্রচারকরা, ভারতবর্ষে প্রথম ছাপাখানা বসিয়েছিলেন গোয়াতে। বাংলার পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারকরা সুদূর লিসবন থেকে অনেকগুলি বাংলা বই ছাপিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলি সবই রোমান হরফে লেখা। সেই সব বইয়ের নমুনা এখন আর পাওয়া যায় না। বাংলাভাষার মুদ্রিত প্রথম যে বইয়ের নমুনা পাওয়া যায়, সেটি প্যারিস থেকে ১৬৮২ সালে প্রকাশিত ফরাসী ধর্মপ্রচারকদের বই। এই বইগুলির অধিকাংশই কাঠ কিংবা তামার পাতের উপর ব্লক বানিয়ে ছাপানো। বাংলা অক্ষরের আলাদা আলাদা টাইপ খোদাই করে বাংলা লিপিকে মুদ্রণ যন্ত্রের প্রকৃত উপযোগী করে তুললেন, স্যার চার্লস উইল্কিন্স। মুদ্রণের ক্রমবিকাশ এই লেখার বিষয় নয়, কিন্তু তাও মুদ্রণের উল্লেখ করলাম, কারণ এই প্রথম বাংলা লিপি সার্বজনীন ও স্থায়ী একটা রূপ পেল। তাই বাংলা লিপির (একথা পৃথিবীর সমস্ত লিপির পক্ষেই সমানভাবে প্রযোজ্য) ক্ষেত্রে মুদ্রণের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপারাটা আরেকটু স্পষ্ট করে বলি।

আগেকার দিনে গ্রন্থকার যা কিছু রচনা করতেন, সেই গ্রন্থ জনপ্রিয় হলে, রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়, সেই গ্রন্থের অনেক প্রতিলিপি বানানো হত। সে প্রতিলিপি করতেন এক বা একাধিক লিপিকার। এক এক যুগে, এই লিপিকারদের লিখন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন এবং লিপিকারদের সকলেরই লেখার স্টাইল বা ভঙ্গীও ছিল আলাদা। যেমন আজও একই ছাপার অক্ষর থেকে অনুকরণ করেও, তোমার এবং আমার হাতের লেখা এক নয়। আমাদের প্রত্যেকের লেখা আলাদা – এমনকি কারো কারো হাতের লেখা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, আবার কোন কোন হাতের লেখা দেখে আমরা বলে উঠি “বাঃ কী সুন্দর লেখা”! এইরকম সেকালেও গ্রন্থের প্রত্যেক প্রতিলিপি পাঠকের কাছে সমান পাঠযোগ্য হতে পারত না। উপরন্তু লিপিকারদের প্রতিলিপি করা গ্রন্থের সংখ্যা দেশের জন সংখ্যার তুলনায় ছিল অতি নগণ্য। যথেষ্ট আগ্রহী এবং সম্পন্ন পাঠক ছাড়া সেই গ্রন্থ সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য।

মুদ্রিত গ্রন্থ বা বই প্রকাশের ব্যয়, সেই তুলনায় যথেষ্ট কম। কাজেই শিক্ষা গ্রহণের পক্ষে মুদ্রিত বই এবং গ্রন্থকারের লেখা মুদ্রিত বই অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠল, সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে এল। অতএব শিক্ষাগ্রহণ এবং গ্রন্থপাঠের রেওয়াজ বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত!

আরও একটা বিষয়ে মুদ্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হল, গ্রন্থ রচনার পদ্ধতি। আমাদের দেশের প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ, সে সাহিত্য হোক কিংবা ধর্মশাস্ত্র, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন – সংস্কৃত হোক কিংবা বাংলা - সকল গ্রন্থই রচিত হয়েছে কোন না কোন ছন্দের বাঁধনে। তার কারণ শ্রুতিমধুরতা এবং একমাত্র উদ্দেশ্য মনে রাখার সুবিধা। পুঁথি বা গ্রন্থ যেহেতু সহজলভ্য নয়, অতএব সহজে মুখস্থ করার উপায় ছন্দের বন্ধন। সেক্ষেত্রে বুঝতেই পারছো, কোন বিষয়ে শুধুমাত্র পণ্ডিত হলেই, কারো পক্ষে গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব নাও হতে পারে! কারণ তাঁর নিজের বিষয়ের সঙ্গে, তাঁকে বুঝতে হবে ছন্দেরও নিয়ম! ছন্দের নিয়ম এবং তাল মেনে তাঁকে শব্দচয়ন করতে হবে! ছন্দের বিধান অনুসারে শব্দচয়ন করতে গিয়ে, তিনি যদি ছন্দবিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ না হন, তাঁর আসল বক্তব্যই আমাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আর পরবর্তী কালে সেই অস্পষ্ট বক্তব্যের ব্যাখ্যা এবং টীকা করবেন অন্য কোন পণ্ডিত! কে জানে, তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন, সে কথা সেই পণ্ডিতেরাও সম্যক বুঝেছেন কিনা! আজকের পরিস্থিতির তুলনায়, সে সময়ের কাজটা খুব দুরূহ মনে হচ্ছে না?

যে কোন গ্রন্থের এই ছন্দবদ্ধ রচনাশৈলী থেকে মুক্তির সন্ধান দিল, ছাপাখানা এবং ছাপার অক্ষরে লেখা বই। পদ্যে হোক কিংবা গদ্যে মনের কথা কিংবা মতামত লিখে ছাপিয়ে ফেলতে আর কোন অসুবিধে রইল না। ছাপাখানার প্রসার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল অনেক দৈনিক সংবাদপত্র, নানান পত্র-পত্রিকা। লেখার জগতেও শুরু হয়ে গেল নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ইওরোপীয় সাহিত্যের অনুসরণে এবং অনুকরণে সাহিত্যের সকল শাখাতেই বাংলার চর্চা দ্রুত বাড়তে লাগল। পদ্য, কবিতা, কাব্য, নাটক, গদ্য, উপন্যাস, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, পাঠ্য বিষয় সমূহ এবং অনুবাদ সাহিত্যও। প্রথম যুগে রামরাম বসু থেকে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখের লেখনী ধরে বাংলা ভাষা পল্লবিত হতে লাগল নানান শাখায়। এর পরবর্তী কালে এসে গেলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁর সরস এবং মৌলিক লেখনীতে বাংলা ভাষা সকল বঙ্গভাষীদের মধ্যেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তাঁর লেখা একের পর এক উপন্যাস, রম্যরচনা, ধর্মতত্ত্ব সেকালে শিক্ষিত বাঙালীর ঘরে ঘরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর আগে ইংরিজি এবং পাশ্চাত্য ভাষায় উচ্চশিক্ষিত বঙ্গসমাজে এমন একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বাংলা ভাষা নিম্নরুচির ভাষা এ ভাষায় উচ্চস্তরের সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলা ভাষাতেও যে মহৎ সাহিত্য রচনা সম্ভব, সেই ধারণা এবং বিশ্বাস সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

গীতাঞ্জলির অনুবাদ - রবীন্দ্রনাথের হস্তলিপির নমুনা



বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী যুগে, বাংলা সাহিত্যের সবথেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের সকল শাখা তাঁর আশ্চর্য প্রতিভার ছোঁয়া পেয়ে বাংলাভাষা পৌঁছে গেল অন্য উচ্চতায়। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ছড়া, কিশোরসাহিত্য সব শাখাতেই তাঁর আশ্চর্য অবদানে, বাংলাভাষা অতি দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। সত্যি কথা বলতে, বাংলা ভাষা পেয়ে গেল অত্যন্ত আধুনিক কিন্তু অনবদ্য এক শৈলী। যার পশ্চাৎপটে রইল প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের বর্ণময় ঐতিহ্য এবং অঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের বাস্তব ঋজুতা। রবীন্দ্রনাথের রচনা বাঙালীর মধ্যে আর সীমিত রইল না, ভারতের আঞ্চলিক একটি ভাষা থেকে সে ভাষা হয়ে উঠল বিশ্বজনীন – বিশ্বের দরবার থেকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ নোবেল পুরষ্কার এনে দিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে! “চর্যাপদ” দিয়ে যে ভাষায় সাহিত্যের পথ চলা শুরু হয়েছিল, সে পথচলার চরম উত্তরণ হল “গীতাঞ্জলি”তে। সার্থক হল বাংলা ভাষা, গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

"চর্যাপদ" - পুঁথির একটি পৃষ্ঠা 

 

১১

 

১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষার ওপর নেমে এল চরম আঘাত। দেশভাগ হল, বিভক্ত হয়ে গেল বাংলাভাষী মানুষেরাও। বাংলাভাষী মানুষের বৃহত্তর অংশ ধর্মের নামে হয়ে গেলেন অন্য রাষ্ট্র। বঙ্গভাষীদের এক অংশ আগের মতোই ভারতবর্ষের অঙ্গরাজ্য হিসেবে থেকে গেল, আর অন্য অংশ হয়ে গেল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ – পূর্ব পাকিস্তান।  নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের বঙ্গভাষীদের বনিবনা হল না কিছুতেই! কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল - ভাষা, আচরণ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, বিশ্বাস যদি ভিন্ন হয়, শুধু ধর্ম দিয়ে তাকে জুড়ে ফেলা যায় না। পূর্বপকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু, ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রনায়কদের এই ঘোষণা শুনে, ক্ষুব্ধ হতে লাগল বাংলাভাষী। সেই ক্ষোভ বিদ্রোহ এবং আন্দোলনের রূপ নিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি! সুদীর্ঘ আন্দোলন, রক্তপাত ও লড়াইয়ের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধানের সংশোধন করে, বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিল। জয় হল বাংলাভাষার, ভাষার প্রতি বিশ্বাসে অবিচল রইল বঙ্গভাষী!

বহু বছর পরে ১৯৯৯ সালে, মাতৃভাষার জন্যে দেশের মানুষের এই আন্দোলনের স্বীকৃতি দিল ইউনেস্কো, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে তারা ঘোষণা করল “বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে। সেই থেকে ওই দিনটি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবেই সর্বত্র পালিত হয়। এও বাংলাভাষার জয়, কিন্তু এই জয় অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জয়, মাতৃভাষার জন্যে আন্তরিক ভালবাসার জয়!

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের জন্য যে অত্যাচার ও রক্তক্ষরণ বঙ্গভাষীদের সহ্য করতে হয়েছিল, তাতে মূল পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা রইল না। চূড়ান্ত অবিশ্বাস, নিরন্তর বঞ্চনা, শাসনের নামে অসহ্য অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে তারা মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সৈন্যদের গণহত্যা, বঙ্গভাষী মানুষদের ঠেলে দিল বৃহত্তর সংগ্রামের দিকে, সে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, আগ্রাসী রাষ্ট্রের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। চরম অত্যাচার, অপমান এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে সেই সময় এল, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর! নিজস্ব একটা দেশ পেল বঙ্গভাষী মানুষেরা, স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র, যার নাম বাংলাদেশ।

এখন বাংলা আর শুধুমাত্র ভাষা নয়, একটা আবেগ, একটা সত্ত্বা, সংগ্রামের আশ্চর্য হাতিয়ার! আরেকবার সার্থক হল বাংলা ভাষা, আরও একবার গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

 

১২

 

লিখলাম বটে, কিন্তু আমরা যারা এপারের বঙ্গভাষী তারা কী এই ভাষাকে অতটাই ভালবাসি আর? খুব সত্যি কথাটা হল – বাসি না। 



বিশ্বের ৬৯০০টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে বঙ্গভাষী-জনসংখ্যার বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। অথচ পাঠকের অভাবে এই কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে চলেছে প্রচুর সুস্থ সুন্দর পত্রিকা, দুর্বল হয়ে পড়ছে পুস্তকের প্রকাশণ সংস্থাগুলি। আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভাষার প্রতি ভালোবাসায় আমাদের কোন ঘাটতি হয়তো নেই। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারিক প্রয়োগে বাংলা ভাষার দুর্দশা, ভ্রান্তি, অবহেলা সর্বদা চোখে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মহান সাহিত্যিকদের রচনা, পাঠ্যবইয়ের বাধ্যতামূলক সিলেবাসের বাইরে, বহু বঙ্গভাষী উল্টেও দেখেন না। পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা “বাংলাটা আমার তেমন আসে না”, বলতে গর্ব অনুভব করেন! সোসাল মিডিয়ার এই বিস্ফোরণের যুগে, তাঁরা বাংলা লেখেন, ইংরিজি হরফে। যদিও বাংলালিপির অনেক software বিনামূল্যে অত্যন্ত সহজলভ্য – সে কম্পিউটারের জন্যেই হোক কিংবা স্মার্টফোন। এই সফটওয়্যার গুলির মধ্যে, আমার ধারণা, সব থেকে সহজ ও সাবলীল ওমিক্রন ল্যাবের “অভ্র কি বোর্ড” – যার সৃষ্টিকর্তা বাংলাদেশের ডাঃ মেহেদি হাসান খান! বাংলাভাষাকে অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে উন্নীত করার জন্যে তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

 কিন্তু বহুযুগ ধরে অনেক উত্থান-পতনের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের এই মাতৃভাষা আমরা কী ধীরে ধীরে ভুলে যাবো? কথা বলবো হিন্দি ও ইংরিজি মিশ্রিত আধো বাংলায়? লেখার জন্যে বাংলা লিপি ভুলে, ব্যবহার করবো রোমান হরফ, আর আমাদের আবেগের ভাষা হবে, কিছু ইমোজি বা ইমোটিকন? কে জানে - সে কথা ভবিষ্যৎ বলবে, r bolbe tomra, jara ei lekhati ekhon poRcho!   

 সমাপ্ত

এর পরের ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "


সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - পর্ব ৩

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ২ "


ব্রাহ্মী লিপি

    আগেই বলেছি ভারতবর্ষের প্রাচীনতম লিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সিন্ধুসভ্যতার অবশেষে। কিন্তু ওই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব না হওয়াতে, পণ্ডিতদের অনেকেই ওগুলিকে লিপি বলে মানতে রাজি নন। আমাদের দেশে তারপর যে লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সময়কাল মোটামুটি ৩০০-২৫০ বি.সি.। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে প্রথম যে লিপির দেখা পাওয়া যায় তাকে পণ্ডিতরা ব্রাহ্মী লিপি বলেন। ১৮৩৭ সালে সম্রাট অশোকের এই শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন বিশিষ্ট প্রত্নবিদ এবং ভাষাবিদ জেমস প্রিন্সেপ। যদিও প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু বহুদিন আগে থেকেই যে এই ব্রাহ্মী লিপির চর্চা চলছিল, সে বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত নেই। তা না হলে সম্রাট অশোকের শিলালিপির এত পরিণত বর্ণ বিন্যাস সম্ভব হত না। কেউ কেউ বলেন, ব্রাহ্মীলিপির উদ্ভব সিন্ধু সভ্যতার ওই অপঠিত লিপির থেকেই এবং অন্য কোন সভ্যতার প্রভাবে নয়, ব্রাহ্মী লিপির উদ্ভব আমাদের দেশেই। ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, তার বিন্যাস এবং উচ্চারণ পদ্ধতির কথা বেদের “তৈত্তিরিয় প্রতিশক্য” অংশে বর্ণনা করা আছে। যার থেকে অনেকে মনে করেন, ব্রাহ্মীলিপির সূত্রপাত অনেকটাই প্রাচীন।


সম্রাট অশোকের ষষ্ঠ শিলালিপিতে ব্রাহ্মী লিপির নমুনা (৩০০ বি.সি.ই)

    ব্রাহ্মীলিপির উল্লেখ প্রাচীন হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে এবং তাদের চৈনিক অনুবাদেও বারবার পাওয়া যায়।  “ললিতবিস্তার সূত্র” গ্রন্থে বলা আছে সিদ্ধার্থ, যিনি পরে গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন, এক ব্রাহ্মণ লিপিকারের কাছে ব্রাহ্মী লিপি শিক্ষা করেছিলেন এবং বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৫০০ বি.সি। জৈন ধর্মশাস্ত্র “সমবায়াঙ্গ সূত্র” (সময়কাল ৩০০ বি.সি.) গ্রন্থে সেকালে প্রচলিত অন্যান্য লিপির মধ্যে ব্রাহ্মীলিপির নাম আছে প্রথমে এবং খরোষ্ঠী লিপির নাম আছে চতুর্থে। কাজেই ব্রাহ্মীলিপি যে, এই সময়ের অনেক দিন আগে থেকেই ভারতে বহুল প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত লিপি পদ্ধতি, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

    অনেক পণ্ডিত মনে করেন, প্রাচীন কালের ভারতে পাথরে খোদাই করে লেখার পদ্ধতি হয়তো জানা ছিল না। তার আগে নরম মাটিতে অথবা তালপাতা, কলাপাতা এবং ভূর্জপাতায় লেখার প্রচলন ছিল। কালের প্রভাবে সেই সব লিপির নমুনা আমাদের সময় পর্যন্ত পৌঁছোয়নি। অতএব, সম্রাট অশোকের শিলালিপিই আমাদের কাছে প্রথম ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন।


খরোষ্ঠী লিপি

ভারতের উত্তরে এবং উত্তর পশ্চিমে ব্রাহ্মীলিপির সমসাময়িক খরোষ্ঠী লিপিরও প্রচলন ছিল। এই লিপির উদ্ভব হয়েছিল গান্ধারে [যেখানকার রাজকুমারী ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী] - বর্তমান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল। সমসাময়িক কালের খরোষ্ঠী লিপির কিছু প্রভাব, ব্রাহ্মী লিপিতে থাকতেই পারে, কিন্তু দুই পদ্ধতির মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। যেমন খরোষ্ঠী লিপি প্রধানতঃ ডাকদিক থেকে বাঁদিকে লেখা হত, এখনকার উর্দু লেখার মতো। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপি বাঁদিক থেকে ডানদিকে লেখা হত, যে পদ্ধতিতে আমরা আজও লিখি।  

    

খরোষ্ঠীর সংখ্যা

মান

0

0

00

000

লিপি

Kharosthi 1.svg

Kharosthi 2a.svg

Kharosthi 3a.svg

Kharosthi 4a.svg

Kharosthi 10.svg

Kharosthi 20.svg

Kharosthi 100.svg

Kharosthi 1000.svg


 তাছাড়া ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় খরোষ্ঠী লিপির বর্ণবিন্যাস বেশ কিছুটা জটিল। আর সংখ্যা লেখার দিক থেকেও খরোষ্ঠী ছিল অনেকটাই গোলমেলে ব্যাপার। ওপরের টেব্‌লে দেখ, খরোষ্ঠী সংখ্যাতে ৫ থেকে ৯ এবং ০ -র জন্যে কোন লিপি ছিল না। ১,২,৩, ৪ সংখ্যাগুলি ছাড়া বাকি গুলি যোগ করে লেখা হত, যেমন ধর ৮ লিখতে গেলে দুবার ৪ লিখতে হত - অথবা ৯ লিখতে হলে পাশাপাশি ৪৩২ লিখতে হত। উদাহরণ হিসেবে যদি ২০১৮ লিখতে যাই তাহলে এভাবে লিখতে হবে - ১০০০ ১০০০ ১ ৪৪ - উঁহুঁ হল না - খরোষ্ঠী লিপি ডানদিক থেকে বাঁদিকে আসে - তাহলে ব্যাপারটা হবে ৪৪ ১০ ১০০০ ১০০০ - এইভাবে !  লিপি অনুযায়ী লিখতে হলে - 


Kharosthi 4a.svgKharosthi 4a.svgKharosthi 10.svg Kharosthi 1000.svgKharosthi 1000.svg 

এই সব কারণেই খরোষ্ঠী লিপি ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকল। মোটামুটি ৭০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আঞ্চলিক লিপি হিসেবে ব্যবহার চালু থাকলেও, পরে এই পদ্ধতি পুরোপুরি অবলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তাহলেও মানব সভ্যতায় এই লিপির গুরুত্ব এতটুকু কমে না, কারণ আধুনিক লিপি পদ্ধতির পথে এটিও একটি বিশেষ ধাপ।


 


কাঠের টুকরোর ওপর লেখা খরোষ্ঠী লিপি, ২০০-৩০০ বি.সি.র গান্ধার অঞ্চল থেকে পাওয়া।


ভারতে আঞ্চলিক লিপির বিকাশ

    সেই সময় এদেশের আদি বাসিন্দা দ্রাবিড় হোন কিংবা বাইরে থেকে আসা আর্য, সকলেরই জ্ঞান চর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই ব্রাহ্মী লিপি। আর্য ঋষিদের স্মৃতিনির্ভর বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থ ফুটে উঠতে লাগল রেখায়। যে লিপি শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত ঋষিদের মধ্যে সীমিত ছিল, সম্রাট অশোকের সহযোগিতায় সেই লিপি রাজকীয় লিপি হয়ে উঠল এবং রাজকার্যে ব্রাহ্মীলিপির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল সাম্রাজ্যের চারদিকে। ব্রাহ্মীলিপি সাধারণ মানুষেরও আয়ত্তের মধ্যে এসে গেল। ব্যাপ্ত এই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও বাড়তে লাগল শিক্ষা এবং জ্ঞানের চর্চা। তাঁরা নিজস্ব বাক্য বিন্যাস, শব্দসম্ভার এবং উচ্চারণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বদলে নিতে লাগলেন, লিপির বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় আত্মিক জ্ঞানের লিখিত রূপ আমাদের সময় পর্যন্ত বয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে, নতুন নতুন ভাষার বিকাশ হতে শুরু করল। 

    দেশ জুড়ে বহুল ব্যবহারের ফলে, ব্রাহ্মীলিপির আঙ্গিকে অনেক পরিবর্তন আসতে লাগল। সম্রাট অশোক যে ভাষায় শিলালিপি লিখেছিলেন, সেটি মাগধী। মগধের প্রাকৃত ভাষা এবং সংস্কৃতের মিশ্রণের এই মাগধী ভাষাতেই তখনকার আম জনতা কথা বলতেন। যদিও রাষ্ট্রভাষা কিংবা রাজসভার ভাষা ছিল সংস্কৃত। দক্ষিণ ভারতের তামিল ব্রাহ্মীলিপি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তামিল ব্রাহ্মীলিপির কিছু কিছু নিদর্শন, সম্রাট অশোকের শিলালিপির থেকেও প্রাচীন। কিছুদিন আগে শ্রীলংকার অনুরাধাপুরে  একটি পাত্রের গায়ে কিছু ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া গেছে। পণ্ডিতেরা অনুমান করছেন, এটি ৪৫০-৩৫০ বি.সি.র। অতএব ব্রাহ্মীলিপির শুরুর থেকেই অঞ্চলভেদে তার পরিবর্তন চালু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।

    গুপ্ত রাজাদের আমলে যে ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া যায়, তাকে “গুপ্ত লিপি” বলা হয়। এই সময় কাল মোটামুটি পঞ্চম শতাব্দী সি.ই.তে। মূল ব্রাহ্মীলিপি থেকে এই লিপির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছিল। এই গুপ্তলিপি থেকে দেবনাগরি এবং রঞ্জনা বা কুটিলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। দেবনাগরি লিপি আজও আমরা হিন্দি লিপি হিসেবে দেখতে পাই। কুটিলা প্রভাবিত লিপি আজও নেপাল, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, জাপান, মায়ানমার, সমুদ্রতীরবর্তী চিনের বৌদ্ধ বিহারগুলিতে দেখা যায়। এমনকি আমাদের বাংলা লিপিও অনেকটাই কুটিলা লিপির অনুসারী।  

ওপরের দুটি চার্টের একদম বাঁদিকের ২য় কলমে ব্রাহ্মীলিপির ৩য় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের নমুনা আর ডানদিকের শেষ
কলমটি আধুনিক বাংলা লিপির 


    এই সময় থেকেই হিন্দু এবং বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড়ো বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা শুরু হয়েছিল, যেখানে মেধাবী ছাত্ররা রাজপুত্র কিংবা ব্রাহ্মণ না হয়েও উচ্চশিক্ষার অধিকার পেতেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু মহাবিহার দেশের বাইরেও বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। যেমন নালন্দা মহাবিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার, রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারএই মহাবিহারগুলি ছাড়াও অনেক বিহারের সন্ধান পাওয়া যায় নানান গ্রন্থে, কিন্তু কালের প্রভাবে সে সবই আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই বিহার এবং মহাবিহারগুলিতে ছাত্রদের শিক্ষা চর্চার জন্যেই অজস্র পুঁথি রচনা করা হত। সংস্কৃত কিংবা পালি ছিল শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু নানান অঞ্চল থেকে আসা মেধাবী ছাত্রদের সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সুবিধার জন্যেও আঞ্চলিক ভাষার পুঁথি রচনা জরুরি হয়ে উঠল।

    তা ছাড়াও বদলে যেতে লাগল, ভারতবর্ষের সার্বিক রাজনৈতিক চালচিত্র। মৌর্য সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২১ বি.সি. থেকে ১৮৫ বি.সি.) পতনের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২০ এ.ডি. থেকে ৫৫০ এ.ডি.) প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরে সুলতানি আমল পর্যন্ত সর্বভারতীয় প্রভাবশালী তেমন কোন সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে পারেনি। মধ্যবর্তী সময়ে  ইন্দো-গ্রীক, ইন্দো-পারস্য, কুষাণ, সাতবাহন বংশের রাজাদের এবং গুপ্তযুগের পর পাল, পূষ্যভূতি, মৌখরী, রাষ্ট্রকূট বংশের রাজাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সীমিত। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গীও হয়ে উঠছিল কিছুটা আঞ্চলিক। যার ফলে বিভিন্ন রাজার সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাই হয়ে উঠছিল রাজভাষা। উপরন্তু নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁরা নিজেদের সভাপণ্ডিতদের উৎসাহ দিতেন নানান শাস্ত্রগ্রন্থ রচনার। অতএব আঞ্চলিক ভাষাগুলিও নিজ নিজ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত। গুপ্তযুগকে ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণ যুগ বলা হয়, পণ্ডিতেরা বলেন, এই সময়েই প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ - বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারত দেবনাগরি লিপিতে সংকলিত হয়েছিল। মনুসংহিতা এবং বেশ কয়েকখানি পুরাণও এই সময়ে রচনা করা হয়েছিল। ব্রাহ্মীলিপি যদি হয় মা, তাহলে দেবনাগরি লিপি তার কন্যা। অতএব এই সময় থেকেই ব্রাহ্মীলিপি তার মাতৃত্বের গৌরব হারাতে লাগল, কন্যা দেবনাগরির হাতে। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় দেবনাগরির মহিমাও বেশিদিন টিকে থাকতে পারল না। পুজোপার্বণে, উচ্চশিক্ষায় সংস্কৃত চালু থাকলেও, নিত্য রাজকাজে, প্রশাসনিক কাজে এমনকি সাহিত্যেও মাথা চাড়া দিতে থাকল আঞ্চলিক ভাষাগুলি। কিছু কিছু পরিবর্তন নিয়ে এই আঞ্চলিক ভাষাগুলির নিজস্ব লিপিও তৈরি হয়ে উঠতে লাগল।

    এভাবে ব্রাহ্মীলিপির দুটি প্রধান শাখাকে যদি দক্ষিণ ভারতীয় এবং উত্তর ভারতীয় হিসেবে ভাগ করে নেওয়া হয়, তাহলে উত্তর ব্রাহ্মী থেকে দেবনাগরী, অসমিয়া, বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দি, গুরুমুখী – উত্তর ভারতের প্রায় সমস্ত লিপিরই উদ্ভব। আর দক্ষিণ ব্রাহ্মী থেকে তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়লম লিপির সৃষ্টি হয়েছিল।

 

বাংলা লিপি




    মনে করা হয় বাংলা লিপির চর্চা জোরদার হয়ে উঠেছিল মহারাজ শশাঙ্কর আমলে – মোটামুটি ৫৯০ থেকে ৬২৫ এ.ডি.। মহারাজ শশাঙ্ক গুপ্তরাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গের মহাসামন্ত থেকে গৌড় রাজ্যের রাজা হয়ে ওঠেন। তাঁর সমসাময়িক কিছু তাম্রলিপিতে বাংলা লিপি নিজস্ব রূপ নিতে শুরু করে। এরপর বাংলা লিপির বহু নিদর্শন পাওয়া যায় পালবংশের রাজাদের আমলে – বিশেষ করে বিগ্রহপাল (আনুমানিক ৮৫০-৮৫৩ এ.ডি.) ও নারায়ণ পালের ( আনুমানিক ৮৫৪-৯০৮ এ.ডি.) রাজত্ব কালে। নিচের পাণ্ডুলিপিটি পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল রাজবাড়ির সংগ্রহশালা থেকে  উদ্ধার করেছিলেন। আনুমানিক অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে লেখা “চর্যাপদ”-এর পাণ্ডুলিপি এটি। বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া এবং মৈথিলি ভাষার পূর্বসূরী “অবহট্ট” ভাষাতে লেখা। তালপাতা ছেঁটে সাজিয়ে তোলা এই পুঁথিটি রাখা আছে বাংলাদেশের রাজশাহী কলেজের সংগ্রহশালায়। বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার গোপন রীতি নিয়ে লেখা এই পদগুলি অনেক বৌদ্ধ তান্ত্রিকের লেখার সংকলনপণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে “সান্ধ্যভাষা” বলেছেন। তার কারণ আপাত দৃষ্টিতে পদগুলির নিহিত অর্থের আড়ালে অন্য কোন বক্তব্যের ইশারা পাওয়া যায়। বাংলা থেকে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনা অবলুপ্ত হয়ে গেছে বহুদিন, সে কারণে এই পদগুলির গূঢ় অর্থ আজও জানা যায়নি।

    পালরাজাদের (আনুমানিক ৭৩০ – ১০২৩) আমলেই বাংলা ভাষা এবং লিপি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, তারপর সেন রাজাদের আমলেও (আনুমানিক ১০৭০ – ১২৩০ এ.ডি.) বাংলা ভাষা এবং লিপির চর্চা অব্যাহত রইল। সেন আমলেই বাংলা ভাষা তার নিজস্ব লিপিসহ এক স্বতন্ত্র সম্পূর্ণ ভাষার রূপ পেল। 

      


বাঁদিকে হরিকেল রাজবংশের আনুমানিক নবম/দশম শতাব্দীর রূপার মুদ্রায় বাংলা লিপি। 

ডানদিকে  চতুর্দশ শতাব্দীর সুলতানী আমলের রূপার মুদ্রার বাংলা লিপি। 

[এখানে হরিকেল রাজবংশের পরিচয় ছোট করে বলে নিই - আধুনিক বাংলাদেশের শ্রীহট্ট অঞ্চল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা জেলার অনেকটা এবং ভারতের ত্রিপুরা জুড়ে এই হিন্দু রাজ্যের শাসক ছিলেন হরিকেলের রাজবংশের রাজারা। আনুমানিক সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই রাজবংশের আধিপত্য বজায় ছিল। এই অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের অধিকারে ছিল, যেমন খড়্গ, দেব, চন্দ্র প্রমুখ। ]     


বাংলা সাহিত্য

    কোন ভাষা যতোই রাজকাজে কিংবা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হোক না কেন, সেই ভাষা সার্থক হয়ে ওঠে সাহিত্যের ছোঁয়ায়। কারণ সাহিত্যের ভাষা পাঠকের মন স্পর্শ করে, স্পর্শ করে তার অনুভূতি। মানুষের অন্তরের অনুভব, লিখিত ভাষায় প্রকাশ করার মতো সাবলীল শক্তি যে ভাষা অর্জন করে, সে ভাষা অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়।  অতএব বাংলা ভাষায় সাহিত্যের শুরু কবে থেকে হল, অর্থাৎ লেখকেরা কবে থেকে বাংলা ভাষাকেও মনের ভাব প্রকাশের নিজস্ব মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন, সেটা দেখে নেওয়া দরকার।   

    বাংলা ভাষায় সাহিত্যের বিকাশকে প্রধানতঃ তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রাচীন পর্যায় মোটামুটি ৯৫০ – ১৩৫০ এ.ডি., তারপর মধ্যবর্তী পর্যায় মোটামুটি ১৩৫০ থেকে ১৮০০ এ.ডি. এবং সর্বশেষে আধুনিক পর্যায় ১৮০০ থেকে আজকের দিন অব্দি।

    প্রাচীন পর্যায়ে সাহিত্য বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না। একমাত্র ‘চর্যাপদ’-এর কথাই আবার বলতে হয়। বৌদ্ধতন্ত্রে পণ্ডিতদের লিখিত রহস্যময় ৪৮টি পদের সংকলন। যেগুলির রচনা করেছিলেন লুইপা, ভুসুকুপা, কাহ্নাপা, শবরপা প্রমুখ কয়েকজন বৌদ্ধ তন্ত্র পণ্ডিত।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে সাহিত্যচর্চার অবস্থা যথেষ্ট ভাল। এই সময়ের সাহিত্য সৃষ্টিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- বৈষ্ণব সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য সাহিত্য এবং অনুবাদ সাহিত্য দ্বাদশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলীর বহু পদ লিখে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। তাঁর পরবর্তী সময়ে আরো অনেক চণ্ডীদাস, যেমন আদি চণ্ডীদাস, কবি চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস এবং দীন চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন সন্দেহ নেই। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের তুল্য কেউই হতে পারেননি। এরপর নাম করতে হয় মঙ্গলকাব্যগুলির। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিজয় গুপ্তের প্রথম মঙ্গলকাব্য “মনসামঙ্গল”, বিপ্রদাস পিপলাইয়ের “মনসাবিজয়” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের মহিমার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের আবেগ, মায়া, মমতা, ভাব, ভালবাসা, অহংকার, ঈর্ষা, দ্বেষ নিয়ে অনবদ্য মানসিক টানাপোড়েনের ছবি পাওয়া যায়। একই কথা বলা যায় মানিক দত্ত, মাধবাচার্য, দ্বিজমাধব কিংবা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্য নিয়েও।

    অনুবাদ সাহিত্যে প্রথমেই নাম করতে হয় কৃত্তিবাস ওঝার বাংলা রামায়ণের অনুবাদ এবং কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারত। এই সেদিনও আমাদের ছোটবেলায়, পঞ্চদশ শতাব্দীর রচনা কৃত্তিবাসী রামায়ণের দেখা মিলত বাঙালীর ঘরে ঘরে। পাঁচশো বছর ধরে এমন জনপ্রিয়তা যথেষ্ট ঈর্ষার বিষয় সন্দেহ নেই! কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অনেক ঘটনাই কৃত্তিবাসী কল্পনা, অনেক আচার-আচরণই মমতাময় বাঙালী পারিবারিক সম্পর্কমাখা। সেই কারণেই হয়তো মূল রামায়ণের থেকেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার ঘরে ঘরে এত জনপ্রিয় হয়েছিল। সুলতানী আমলে আরবী এবং পারসিয়ান সাহিত্যের অনুবাদ বাংলা ভাষাকে আরও ঋদ্ধ করে তুলেছিল। মধ্যযুগে শা মুহম্মদ সাগির, জৈনুদ্দিন, মুজাম্মিন, সৈয়দ সুলতান, শেখ ফইজুল্লা প্রমুখ ছিলেন বাংলার বিখ্যাত মুসলিম কবি।  মুহম্মদ সাগিরের “ইউসুফ-জুলেখা”, সৈয়দ সুলতানের “নবিবংশ” অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

    অষ্টাদশ শতকের প্রধান কবি ছিলেন ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তাঁর লেখা “অন্নদামঙ্গল” কাব্য বহুদিন অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্রের লেখা অন্নদামঙ্গলের প্রকাশকাল ১৭৫২ সাল। এই গ্রন্থের তিনটি অংশ। প্রথম অংশ- অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণার মহিমা বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশে বিদ্যা ও সুন্দরের কাহিনী, এই অংশের নাম কালিকামঙ্গল। তৃতীয় অংশে মোগল সম্রাট আকবরের বিশ্বস্ত সেনাপতি মান সিং এবং ভবানন্দ মজুমদারের কাহিনী – এই অংশের নাম অন্নপূর্ণামঙ্গল। ভারতচন্দ্র শুধু যে কাব্যচর্চাতেই প্রতিভাধর ছিলেন তা নয়, সঙ্গীতেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। শ্রীরাধা-কৃষ্ণ বিষয়ে লেখা এবং নিজের সুরে গাওয়া পদাবলী গান, যাকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বলা হত, বাংলার সঙ্গীতজগতে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেছিল। যে ধারা অনুসরণ করে রামপ্রসাদ সেন (১৭২১-১৭৮১)-এর শাক্তপদাবলী এবং শ্যামাসঙ্গীত, তিনশবছর ধরে, আজও সমান সজীব!

    ১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধে, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার বীভৎস পরাজয়ের পর, বাংলা এবং ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাদীক্ষার প্রেক্ষাপটই দ্রুত বদলে যেতে লাগল। ব্রিটিশ রাজত্বের রাজধানী হয়ে নতুন শহরের পত্তন হল কলকাতায়। ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রাচীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি থেকে কলকাতায় সরে এল। বদ্ধ জলাশয়ের মতো মধ্যযুগের পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সমাজে এসে ধাক্কা দিল, ইওরোপের- বিশেষ করে ইংল্যাণ্ডের আধুনিক শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া এবং রেনেশাঁ যুগের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা। কলকাতা রাজধানী হওয়াতে দেশের অন্য প্রান্তের থেকে বাংলার বুদ্ধিজীবিরা পশ্চিমের এই চমক লাগানো আধুনিকতায় ডুবে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল খুব সহজেই। একই সঙ্গে সদ্য কৈশোর পার হওয়া বাংলা ভাষা এবং বাংলা লিপি ইওরোপের আলোর স্পর্শে হঠাৎ যেন যুবক হয়ে উঠল। বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপি পা রাখল আধুনিক বিশ্ব-দরবারের অঙ্গনে। সে কথায় আসব পরবর্তী ও শেষ পর্বে। 


এর পরে শেষ পর্ব - " লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব "

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...