ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬

মুদ্রা ও টাকাকড়ি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "



এর আগের পর্ব - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ৬ 


শেষ পর্ব 


ভারতে কাগজের টাকা (cuurency note) 

ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা শহরে ভারতের প্রথম ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৭৩ সালে, সে ব্যাংকের নাম ছিল “ General Bank of Bengal and Bahar”বেঙ্গলের সঙ্গে “বাহার” শুনে জায়গাটা কোথায় – এমন কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু জায়গাটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য বিহার। সেসময় দেহাতি উচ্চারণে “বিহার”-কে হেস্টিংস ও তাঁর গোরা সঙ্গীরা “বেহার” শুনেছিল বলেই হয়তো এই বিপত্তি! যাই হোক এই ব্যাংক থেকেই প্রথম কাগজের নোটের প্রচলন শুরু হয়। সরকারিভাবে এই নোটের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও এই ব্যাংক এবং তার নোট অচিরেই ১৭৭৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে মনে রাখতে হবে “সরকারিভাবে” মানে ব্রিটিশ সরকার নয়, সে সময় ভারতের শাসনকর্তা ছিল কোম্পানি-রাজ অর্থাৎ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি।

এর পরেও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনেক প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতার পর ১৮০৬ সালে কলকাতায় পঞ্চাশ লাখ সিক্কা রুপি মূলধন নিয়ে খোলা হল ব্যাংক অফ বেঙ্গল। সিক্কা কথাটা এখন সাধারণ মুদ্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, ক্রিকেট খেলার আগে “টস” করাকে হিন্দিতে “সিক্কা উছালনা” বলে। কিন্তু সে সময় “সিক্কা” ছিল খাঁটি রূপোর মূল্যবান মুদ্রা। এই মুদ্রা ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি প্রধানতঃ বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যা – অর্থাৎ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জন্যে প্রচলন করেছিল।

কোম্পানি-রাজ এই ব্যংককে দিল কাগজের নোট ছাপা এবং বাজারে নোট চালু করার অনুমতি। এই সময়ে বেঙ্গল ব্যাংক থেকে তিন ধরনের নোট প্রকাশ করেছিল, যেমন (১) এক-পার্শ্বিক নোট (unifaced), (২) বাণিজ্যিক নোট (commerce) এবং (৩) “ব্রিটানিয়া” নোট (Britannia)। প্রথম অবস্থায় এক-পার্শ্বিক নোট অর্থাৎ যা কিছু লেখার কাগজের একদিকেই লেখা থাকত, উলটো দিক থাকত সাদা (blank).

নীচেয় “ব্যাঙ্কবেঙ্গল” থেকে প্রকাশিত সিক্কা ২৫০ টাকার একটি নোটের অত্যন্ত বিরল একটি নমুনা দিলাম। এই চিত্রটির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই “livehistoryindia.com/story/forgotten-treasures/indias-first-currency-note” ওয়েবসাইটের Author Krutika Haraniya-কে।   

 

Two hundred and Fifty Sicca Rupee note of Bank of Bengal with cancelled mark

 ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম এক-পার্শ্বিক (unifaced) নোট     

    ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম বাণিজ্যিক (commerce) নোটের উভয় পিঠ।

 

   ব্যাংক অফ বেঙ্গলের প্রথম ব্রিটানিকা (Britannica) নোটের উভয় পিঠ।

কলকাতার পর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৪০ সালে বোম্বেতে (আধুনিক মুম্বাই) এবং তৃতীয়টি হল ১৮৪৩ সালে ম্যাড্রাসে (আধুনিক চেন্নাই)।  

 ব্যাংক অফ বম্বের প্রথম নোটের উভয় পিঠ

১৮৫৭-র প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পরপরই ভারতের শাসনব্যবস্থা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে তুলে নিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ব্রিটিশ-অধীনস্থ ভারতের রাণি হলেন তৎকালীন ইংল্যাণ্ডের রানি ভিক্টোরিয়া। শাসন ক্ষমতা অধিগ্রহণের পর ১৮৬৭ সালে সবকটি প্রেসিডেন্সি ব্যাংককে বন্ধ করে দেওয়া হল, এবং কাগজের নোট প্রচলনের পূর্ণ দায়িত্ব নিল ভারত সরকার (Government of India).

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম যে নোটগুলি ছাপা হয় – সেগুলিকে ভিক্টোরিয়া সিরিজ (Victoria Series) বলা হয়, কারণ এই নোটগুলিতে তৎকালীন রাণি ভিক্টোরিয়ার ছবি থাকত। এই নোটগুলিও ছিল একপার্শ্বিক (unifaced) নোট। টাকার মূল্য দুটি ভাষায় থাকত, এবং নিরাপত্তার জন্যে নোটের উপর Government of India লেখা জলছবি (water mark) থাকত, দুই আধিকারিকের স্বাক্ষর এবং ঢেউ-খেলানো কিছু রেখা থাকত। আর থাকত নোটের  রেজিস্ট্রেশন নাম্বার। এই নোটের জন্যে হাতে বানানো কাগজ আসত ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত কাগজ কারখানা Laverstoke Mill, Hampshire থেকে। নীচেয় কয়েকটি নোটের নমুনা –

 Image : Rupees Ten   Image : Rupees Hundred

দশ টাকার নোট                     একশ টাকার নোট 

 প্রথম দিকে এই নোটগুলি বিভিন্ন সার্কল বা অঞ্চল বিশেষে প্রকাশ করা হত এবং সেই হিসেবে নোটের স্থানীয় ভাষাও পালটে দেওয়া হত – অর্থাৎ ইংরিজি ভাষাটা সর্বদাই থাকত, সঙ্গে থাকত উত্তর ভারত হলে হিন্দি বা উর্দু, পূর্ব ভারতে বাংলা, দক্ষিণ ভারতে তামিল ইত্যাদি। এর পরে এল সবুজ (green series) রঙের চার ভাষার নোট, তারপরে এল লাল (red series) রঙের আট ভাষার নোট। এই নোটগুলি আর অঞ্চল ভিত্তিক নয়, সারা ভারতেই ব্যবহারের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল।    

Image : Green Underprint Rs.500           Image : Red Underprint Rupees Fifty           

পাঁচশ টাকার চার ভাষার সবুজ নোট        পঞ্চাশ টাকার আট ভাষার লাল নোট

এই ধরনের নোটগুলি ১৯২৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিল, তার পরে এল রাজা সিরিজের নোট। এই নোটের মূল্যমানও সব মানুষের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করা হল, যেমন Rs ৫, 10, 50, 100, 500, 1000 এবং 10,000-এর নোট। নীচেয় রইল এক হাজার ও দশ হাজার টাকার ছবি - 

 



  ১৯৩৫ সালের ১লা এপ্রিল, ভারতে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইণ্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং এর কেন্দ্রীয় অফিসটি হয় কলকাতা শহরে। এতদিন পর্যন্ত চলতে থাকা লণ্ডনে ইম্পিরিয়াল ব্যাংক এবং এদেশের নানা আঞ্চলিক ব্যাংকের মুদ্রা বা নোট প্রকাশের ক্ষমতাকে অধিগ্রহণ করে, এই বিষয়ের সমস্ত ব্যবস্থাই কেন্দ্রীভূত করা হল এই রিজার্ভ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র ভারতের অর্থ ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা রইল কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে। এতদিনের কলকাতা, বোম্বাই, ম্যাড্রাস, লাহোর, রেঙ্গুন, কানপুর, করাচির আঞ্চলিক ব্যাংকগুলিকেও যুক্ত করে নেওয়া হল রিজার্ভ ব্যাংকের শাখা এবং সহযোগী হিসেবে। দিল্লি তখন ব্রিটিশ-রাজের রাজধানী হলেও, দিল্লিকে এর বাইরেই রাখা হয়েছিল।    

Image : Rupees Five

রিজার্ভ ব্যাংক থেকে প্রকাশিত প্রথম নোট

রিজার্ভ ব্যাংক নোট বা মুদ্রা প্রকাশের পূর্বপন্থাই অনুসরণ করল, অর্থাৎ রাজা সিরিজের নোটই প্রকাশ করতে লাগল এবং স্বাভাবিকভাবেই রাজা বদলের সঙ্গে তাল রেখে ছবি বদলে টাকাও ছাপা হয়েছে বার বার। তবে দেশের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কম মূল্যমানের, যেমন এক বা দুটাকার নোটও প্রকাশ করেছে তারা।  

  Image : Rupee One - Obverse Image : Rupee One -Reverse

চতুর্থ জর্জের নামে ছাপা এক টাকার নোটের উভয় পিঠ (১৯৪০)

George VI Frontal

ষষ্ঠ জর্জের নামে ছাপা দশ টাকার নোট (১৯৪৩)

 

এই নোটগুলি ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরেও ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভারতে চালু ছিল। এরপর এই নোটগুলি বাতিল করে স্বাধীন ভারতের নোট চালু হয়ে যায়। সে কথা আসবে পরের পর্বে।  

স্বাধীন ভারতের নোট ও আধুনিক নোটহীনতা

মুদ্রা এবং নোটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সর্বদাই রাজা কিংবা শাসকের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থেকেছে। সে আধিপত্য এসেছে শাসকের ক্ষমতাজনিত আবেগ বা অহংকার থেকে, এবং আজও বহু রাজতান্ত্রিক বা একনায়ক-তান্ত্রিক দেশের পক্ষেই সেটা যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশে এই পরিসরটা  অনেকটাই অন্যরকম – দেশের গৌরব, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মহান নেতাদের স্মারক সম্মান প্রভৃতি প্রদর্শনই এই নোটগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য।   

১৫ই আগস্ট ১৯৪৭-এর মধ্য রাত্রে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া ভারত কিন্তু মুদ্রা কিংবা নোট ব্যবস্থায় যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল। যদিও ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ সালে গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথ চলা শুরু হলেও, স্বাধীন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অন্তর্বতীকালীন নোটের প্রচলন শুরু করেছিল।

 

স্বাধীন ভারতের প্রথম এক টাকার নোট

এই নোট ছাপানোর আগে চিন্তা করা হয়েছিল, জাতির জনক গান্ধীর ছবি ছাপা হবে। কিন্তু তারপরে ঠিক হয়, স্বাধীন দেশের জাতীয় প্রতীক ব্যবহার করাই সমীচীন, জনমতও এই পক্ষেই সায় দিয়েছিল। এর পরেই গান্ধীর চিত্রের পরিবর্তে সারনাথের অশোকস্তম্ভের উপরে স্থাপিত সিংহমূর্তিটির ছবি নোটে মুদ্রিত হয়। এবং এর পরবর্তী নোটেও মূলতঃ এই নীতিই গৃহীত হয়ে থাকে।

 

যদিও সে সময় তুলনামূলক বিচারে নোটের নকশা বৃটিশ যুগের মতোই রইল, শুধু রাজার চিত্রের বদলে এল ভারতের জাতীয় প্রতীক। ওপরের দুটি নোট লক্ষ্য করলে দুটির মধ্যে মিল ও তফাৎটুকু সহজেই বোঝা যাবে।

১৯৫৪ সালে বড়ো অংকের কিছু নোট ছাপা হয় ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এমন কিছু বিখ্যাত স্থাপত্যর চিত্র দিয়ে –

   

হাজার টাকার নোটে তাঞ্জোরের মন্দির, পাঁচ হাজারের নোটে গেটওয়ে অফ ইণ্ডিয়ার ছবি।

 ষাটের দশকের অর্থনৈতিক সঙ্কট কালে (এর কারণ দুটি যুদ্ধ – ১৯৬২-তে চিনের সঙ্গে এবং ১৯৬৫-তে পাকিস্তানের সঙ্গে) নোটের সাইজ অনেকটাই ছোট করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধির জন্মশতবার্ষিকীর স্মরণে প্রকাশিত হল নতুন একশ টাকার নোট -

  

গান্ধীজীর জন্মশতবার্ষিকী স্মারক নোট।  

  এরপর ব্যয় সংকোচের উদ্দেশে যথাক্রমে ১৯৭২ ও ১৯৭৫ সালে প্রকাশ করা হল ২০ ও ৫০ টাকার নোট।

    

এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে গান্ধী সিরিজের নোট সমূহ। প্রতিবার নতুন নোট প্রকাশের সময় নোটের মূল ডিজাইনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলেও যুক্ত করা হয় নিরাপত্তাজনিত নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ৫০০ টাকার নতুন নোটের উভয় পিঠের বৈশিষ্ট্যগুলি নীচেয় দেওয়া হল -    

১. অর্ধস্বচ্ছ সংখ্যায় নোটের মূল্যমান।

২. সুপ্তভাবে চিত্রিত নোটের মূল্যমান।

৩. দেবনাগরী ভাষায় নোটের মূল্যমান।

৪. মাঝখানে মহাত্মা গান্ধীর ডানদিকে তাকানো মুখের ছবি।

৫. RBI লেখা নিরাপত্তা সূত্র – নোটটিকে নাড়াচাড়া করলে এই সূত্রের রঙ নীল ও সবুজ হতে থাকে।

৬. নোটের প্রতিজ্ঞা পত্র, গভর্নরের স্বাক্ষর, এবং RBI -এর প্রতীক।

৭. ইলেক্ট্রোটাইপ ওয়াটার মার্ক দিয়ে গান্ধীর ছবি টাকার মূল্যমান।

৮. নোটের রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ছোট থেকে বড় ফন্টে লেখা – বাঁদিকের ওপরে এবং ডানদিকের নীচেয়।

৯. রুপি সিম্বল সহ টাকার মূল্যমান – নাড়াচাড়া করলে এটির রঙও নীল ও সবুজ হতে থাকে।

১০. অশোক স্তম্ভ প্রতীক।

১১.একটি বৃত্তের মধ্যে ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা ৫০০

১২. বাঁদিকে ও ডানদিকে পাঁচটি করে দাগ একটু উঁচু করে ছাপা।  

 ওপরের বারোটি বৈশিষ্ট্যই নিরাপত্তাজনিত কারণে - যাতে জাল নোট ছাপানো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে; আবার ১০, ১১, ১২ বৈশিষ্ট্যগুলি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নোট চিনতে সুবিধার জন্যও বটে।

     ১. নোটটির মুদ্রণ বছর।

২. স্বচ্ছ ভারত প্রতীক ও স্লোগান।

৩. ভাষার প্যানেল।

৪. ভারতের জাতীয় পতাকা সহ লাল কিল্লার ছবি

৫. দেবনাগরি সংখ্যায় টাকার মূল্যমান। 

 

বৈদ্যুতিন লেনদেন (Electronic Transactions) 

মুদ্রা ও নোটের পাশাপাশি ভারতে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে টাকার লেনদেনের সূত্রপাত হল আশির দশকে, তার নাম ডেবিট কার্ড। ১৯৮৭ সালে ডেবিট কার্ডের সূচনা করেছিল সিটি ব্যাংক এবং একই সঙ্গে HSBC ব্যাংক চালু করেছিল ATM (অটোমেটেড টেলার মেশিন)। এরপর নব্বইয়ের দশক থেকে ভারতের অধিকাংশ ব্যংকই ডেবিট কার্ড ও এটিএম ব্যবস্থা চালু করে। ব্যাংকের সেভিংস ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত এই ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ টাকার ব্যবহার না করেও জিনিষপত্র কেনাকাটা, হোটেলে রেস্টুরেন্টে ভূরিভোজ, প্লেন বা ট্রেনের টিকিট কাটা সবই সম্ভব হয়ে উঠতে লাগল। ডেবিট কার্ড যেন আলিবাবার চিচিং-ফাঁক মন্ত্র – নিজের অফিসে বা বাড়িতে বসে কম্পিউটার, ল্যাপটপ থেকেই বুক করে নেওয়া যায় টিকিট। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কাটার প্রয়োজন নেই অথবা ব্যাংকে গিয়ে প্রয়োজন নেই লাইন দিয়ে নগদ টাকা তোলার। যদি পকেটে থাকে ডেবিট কার্ড এবং ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে থাকে পর্যাপ্ত টাকা, তাহলে হোটেলে খেতে গিয়ে বাজেটের অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে গেলেও দুশ্চিন্তা নেই। পুজোর বাজার করতে গিয়েও নগদ টাকার বাজেট করতে হয় না – মনে-ধরে-যাওয়া শাড়ি-জামা-কাপড় কিনে ফেলাই যায় - কারণ পকেটে আছে ডেবিট কার্ড।

ডেবিট কার্ডের প্রায় সমসময়েই এসে গেল ক্রেডিট কার্ড ব্যবস্থাও। নব্বইয়ের দশকে অনেক ব্যাংকই ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন শুরু করে দিল। এই কার্ড পদ্ধতির মূল মন্ত্র হল ভারতের লোকায়ত দর্শনের জনক চার্বাক ঋষির প্রচলিত উপদেশ – “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ”। ক্রেডিট কার্ডের যোগাযোগ সরাসরি কোন ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে নয়। বিগত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব, চাকরি, ব্যবসা বা উপার্জনের স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রেডিট কার্ড পেয়ে যেতে পারে যে কোন গ্রাহক। অর্থাৎ পুরোটাই ঋণ –  ঋণসীমার মধ্যে থেকে যা খুশি খরচ করা যায়, পিছনে উপদেশ দেওয়ার অথবা চোখ রাঙাবার কেউ রইল না। মোটামুটি ৫০/৫১ দিনের মধ্যে ক্রেডিট-কার্ড-দাতা ব্যাংকের পাঠানো ঋণের হিসেবটি চুকিয়ে দিতে পারলেই – কোন চিন্তা নেই।  

প্রথম তিন-চার মাস হিসেব চোকাতে না পারলেও দিন চলে যাবে, তবে ঋণের হিসাব চড়তে থাকবে ২.৫%-৩% অথবা তারও বেশি মাসিক সুদে। তার পরেও ঋণ শোধ না করতে পারলে, বাড়িতে এবং অফিসে এসে হানা দেবে উদার ঋণদাতার বলিষ্ঠ লোকজন – তারা সকলেই চোখ রাঙিয়ে ধমক-ধামক দেওয়ায় দক্ষ। তাদের অত্যাচারে ঋণ শোধ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না – হয়তো সর্বস্বান্ত হয়েই। তখন ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ" ভুলে, মনে পড়বে চণ্ডীদাসের গান, “সুখ-দুখ দুটি ভাই, সুখের লাগিয়া যে করে পীরিতি দুখ যায় তার ঠাঁই”।

এর মধ্যেই আধুনিক ভারতে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল –

১. ১৯৯৫ সালের ৩১শে জুলাই ভারতীয় জনগণের জন্যে প্রথম মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের প্রচলন হল। ২. ১৯৯৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের সর্বসাধারণের জন্যে প্রথম ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে এল বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড (VSNL)।

 

সূত্রপাতের পর থেকেই ইন্টারনেট এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবার উন্নতি হতে লাগল অতি দ্রুত। সরকারি পরিষেবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামল ভারতের এবং বিদেশের অনেকগুলি টেলিকমিউনেকেশন সংস্থা – একক এবং যৌথভাবে। কারণ সূচনাকালেই বোঝা গিয়েছিল, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার প্রেক্ষীতে এই পরিষেবা প্রদান – শুধু সেবা নয়, অত্যন্ত লোভনীয় ব্যবসাও বটে। সেই লোভের কারণেই বিভিন্ন পরিষেবা বৃত্তে ঢুকে পড়ল পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের বিচারে অনেক বড়ো বড়ো নেতা-নেত্রী ও ব্যবসাদারকে কারারুদ্ধ থাকতে হল দীর্ঘদিন। কিছুদিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবসাতে নামল কিছুটা শূণ্যতা। পিছিয়ে পড়ল VSNL BSNL এর মতো সরকারি সংস্থাগুলিও।

 

এই শূণ্যতার সুযোগেই, ২০১৬ সালে এই ব্যবসাতে নতুন উদ্যোগ ও উদ্যমে নেমে পড়ল জিও (Jio)। তাদের আগ্রাসী পদক্ষেপে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ল এই ব্যবসার পুরানো খেলোয়াড়রা, যেমন এয়ারটেল (Airtel) (১৯৯৫), BSNL (২০০০)। নতুন আরেকটি কোম্পানি – ভি (Vi) এই ব্যবসায় নামল ২০১৮ সালে। ৩১শে অক্টোবর ২০২৫ সালের মধ্যে সতেরোটি টেলিকম কোম্পানি – যারা প্রায় শুরু থেকেই এই ব্যবসায় যুক্ত ছিল – পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

 

যাই হোক ২০১৬ সালেই Jio এসে ফাইবার কানেকশনের মাধ্যমে এনে ফেলল দ্রুতগতির ৪জি (4G Fourth generation wireless network) এবং তার সঙ্গে সঙ্গে আনল WiFi (Wireless Fidelity) connection। এই দুয়ের সংযোগে মোবাইল ফোন হয়ে উঠল আধুনিক জীবনের এক অনিবার্য অঙ্গ। কোনরকম তারের সংযোগ ছাড়াই – ফোনে কথা বলা যায়, গান শোনা যায়, সিনেমা দেখা যায়, খেলা দেখা যায়...মোবাইল ফোনগুলি হয়ে উঠল স্মার্টফোন।

এই উন্নত পরিষেবার উপর ভর করে ১১ই এপ্রিল, ২০১৬ সালে এসে গেল ইউপিআই (UPI – Unified Payments Interface) পরিষেবা। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ডঃ রঘুরাম রাজন এই পরিষেবার উদ্বোধন করলেন। এই পরিষেবার মাধ্যমে কোন তারের সংযোগ ছাড়াই – সারাদিন-রাত, সপ্তাহের সাতদিন (২৪/৭) – মোবাইল ফোন থেকেই ব্যাংকের যাবতীয় কাজ সেরে ফেলা যায়। পথে ঘাটে, ঘরে-অফিসে, ট্রেনে-বাসে অর্থাৎ যে কোন অবস্থায় নিজের ব্যাংক অ্যাকাঊন্টের ব্যালান্স চেক করা, কিংবা নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যাকে খুশি টাকা ট্রান্সফার করা, মাসের নানান খরচ – ইলেকট্রিকের বিল, গ্যাস বুকিং, ছেলেমেয়ের স্কুল-কলেজের ফি, হসপিট্যালের বিল, ইন্সিওরেন্সের প্রিমিয়াম... এমনকি ফুটপাথের দোকান থেকে ৭/১০ টাকার একভাঁড় চায়ের দাম মেটানো - সবকিছুই এখন হাতের মুঠোর মধ্যে – UPI transactions – সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, খুব বেশি হলে মিনিটখানেক। হাতে নগদ মুদ্রা নেই, নেই কাগজের নোট – আছে শুধু একটি মোবাইল ফোন।

 

পরিসংখ্যান বলছে, এই ইউপিআই বা ডিজিট্যাল টাকার লেনদেনে ভারত এখন বিশ্বের শীর্ষে। অনেকটাই পিছিয়ে আছে আমেরিকা বা ইওরোপের মতো বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশগুলি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এই ডিজিট্যাল লেনদেনের মাসিক হিসাব নাকি ছিল প্রায় ২৪ লক্ষ কোটি টাকা এবং প্রতিমাসে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে এবং প্রায় ৬.৫ কোটি ছোট ব্যবসায়ী ডিজিট্যাল লেনদেনেই বেশি বিশ্বাস রাখে।

 

অর্থাৎ ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে পড়ছি মুদ্রাহীন, নোটহীন, অধরা এবং স্পর্শহীন এক অর্থ ব্যবস্থার জগতে। 


 আগের পর্বে বলেছিলাম, কোন এক যুগের কয়েকটি মুদ্রা পেলেই, একালের বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, প্রত্নবিদ,  ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি অপরাধ-বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পান অজস্র তথ্য ও তত্ত্বের ভাণ্ডার। আমাদের এই ডিজিট্যাল যুগে কোন মুদ্রা নেই – অতএব কোন কারণে আমাদের এই সভ্যতা যদি হারিয়ে যায় – পরবর্তী যুগের মানুষরা খুঁজেও পাবে না আমাদের এই অত্যাধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাস। কিন্তু সে কথা ভেবে দুঃখ করার এক কানাকড়িও মূল্য নেই আর।    


সমাপ্ত 


কৃতজ্ঞতাঃ 

https://www.rbi.org.in/commonman/english/Currency/Scripts/Ancient.aspx 

বং Wikipedia.   



বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬

বায়স-কুহু

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

ছোটদের  প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " বাসা বদল "


স্থানঃ লালটুকটুকে ফলে ভরা বিশাল এক বটগাছ।

সময়ঃ সকাল

পাত্র-পাত্রীঃ কাক, কাকের বউ কাকী আর কোকিল

(বড়ো সাইজের একটা কুটো ঠোঁটে নিয়ে কাকটা উড়ে এসে বসল বটগাছের মস্ত ডালে। ওখানে ওরা বাসা বানাচ্ছে। বাসার মধ্যে কুটোটা রেখে, একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে কাক তার বউকে বলল,)

 

কাকঃ        আজকের মধ্যে বাসাটা বানিয়ে ফেলতেই হবে, গিন্নি। আর কী কী আনতে হবে, চটপট ফর্দ করে দাও দেখি।

কাকীঃ        আগে একটু জিরিয়ে নাওসেই কোন সকাল থেকে তোমার কুটো বওয়া শুরু হয়েছে, যাও, কা কা খা খা - একটু খেয়েদেয়ে ঘুরেঘেরে এসো অল ওয়ার্ক অ্যাণ্ড নো প্লে, মেক্স কাক এ ডাল বয়, শোনোনি নাকি?

কাকঃ        খা খা খাবার কথা বলে খিদেটা বাড়িয়ে দিলে গিন্নি। দাঁড়াও, দাঁড়াও একটু বসে নিই, তারপর খা খা খেতে যাবো আচ্ছা, ওই যে বললে, ডাল বয়, ওটার মানে কী বলো তো? ডাল মানে কী মুশুর ডাল, মুগ ডাল? নাকি গাছের ডাল। আমরা তো গাছের ডালেই থাকি। হে হে হে, আমি তো ডাল বয়ই, আর তুমিও তো ডাল গার্ল।

কাকীঃ        ডাল গার্ল! হে হে, এমন কথা কোনদিন শুনিনি! তবে মানেটানে অতশত জানি না, বাপু। ঘরে বসে মানুষের ছেলেমেয়েগুলো পড়ে, জানালার পাল্লায় বসে শুনেছি, তাই বললাম।  

 

(পাতার আড়ালে একটা কোকিল বসেছিল, আর টুকটুকে লাল চোখ ঘুরিয়ে দেখছিল চারদিক। মনের আনন্দে সে মাঝে মাঝে পাকাপাকা টুকটুকে লাল বটফল খাচ্ছিল, আর ডাকছিল কুউ কুউকাক আর কাকীর কথাবার্তা শুনে সে বলে উঠল,)

 

কোকিলঃ     কুউঃ। ভোর থেকে কু আরম্ভ করেছিস বলতো, কাক? সকাল থেকে এত হুটোপাটি করছিস, এত হাঁফাচ্ছিস কেন?

কাকঃ        তোর আর কী? বেড়ে আছিস, বাসা বানাতেও জানিস না, জানিস কেবল গান গাইতে! তুই আর বুঝবি কী?

কোকিলঃ     অত বুঝে আর কাজ নেই, ভাইসারাদিন তোদের কেবল খা খাখাওয়ার চিন্তাআর এই ছুটছিস, সেই উড়ছিস। তোদের এই সর্বদা খা খা অব্যেসের জন্যেই মানুষগুলো তোদের হুস হুস করে। কাছাকাছি বসতেই দেয় না।

কাকঃ        হুস হুস করলেই শুনছি আমি আর, আমার কাছে বুঝি এমনি পাবে পার? সেদিন একটা পুঁচকে ছেলে করছিল হুসহুস; তাকে আচ্ছা করে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমরাও মানুষ!!

কোকিলঃ      সে কি রে? তুই ঝগড়া করেছিস? তাও একটা বাচ্চা ছেলের সঙ্গে? তোকে হুস হুস করবে না, তো কাকে করবে, রে কাকে? বড়ো মুখ করে, তুই আবার নিজেকে বলছিস মানুষ? ছি ছি তুই খুব কুউঃ। আর দেখ, আমার গান শোনার জন্যে ওরা সারা বছর হা পিত্যেশ করে বসে থাকে। আমার ডাক শুনতে পেলেই বলে, “ওই ওই, শীতবুড়িটা বিদেয় হয়ে, আসবে এবার বসন্ত ”

কাকঃ       ছোঃ, তোর ওই একঘেয়ে সুর কু-কু-কু ডাকে, মানুষগুলো বোকা বলেই বেজায় মজে থাকে!

কোকিলঃ    কুউঃ কুউঃ কুউঃ কুউঃ, আমার গানে তুই কু পাস? তোর মনটাই যে কু সেটা কি তুই জানিস? এই জন্যেই অনেকে কাকাকে কাকু বলে! সে যাক, তা কী বললি সেই পুঁচকে ছেলেকে, শুনি!

কাকঃ       সেদিন বসেছিলাম ওদের পুবদিকের জানলায়, দেখছিলাম পাশের বাড়ি খাবার কী পাওয়া যায় ঝপ করে ছোঁ দিতে করছিলাম উশখুশ, সেই সময়ই ছেলেটা আমায় বললে “যাঃ যাঃ হুস হুস”?

কাকীঃ      তাতে কী হয়েছে? ছেলেমানুষ, অত কী আর বোঝে? তুমিই তো অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারতে! আমাদের কি আর বসার জায়গার অভাব, নাকি কা কা খা খা খাবার অভাব?

কাকঃ       তা ঠিক, কিন্তু ভাবো তো একবার, চেষ্টায় রয়েছি তখন কিছুমিছু খাবার! হুসহুস বললে কী না আমায়, আমাদের who’s who নিয়ে ওরা, কেউ কি মাথা ঘামায়?

কোকিলঃ     কী বললি, সেটা বল না!

কাকঃ       সে সব কথা যদিও তেমন কিছু নয়, সত্যি কথা বলতে আমি থোড়াই করি ভয়? বললাম, আমার দুইটি ডাকে কাকা, আর তার বৌকে বলো কাকী, তোমাদের সঙ্গে আমাদের কীই বা রইল বাকি?

কোকিলঃ      বাঃ বেশ বলেছিস। কুউঃ! কুউকথায় তোর সঙ্গে কেউ পারবে? তারপর?

কাকঃ        বললাম কাকের ইংরিজি you know নিশ্চয়ই crow, দেবতার হাতে থাকলে সেই আমরা হই চক্র!  তোমাদের যত বিক্রম তার মাঝেও থাকি আমরা, আর বক্র, মানে ব্যাঁকা চিন্তায়, তক্র খাও তোমরা!

কোকিলঃ    তুই বলতে চাস, আক্রম, বিক্রম, পরাক্রম সবেতেই তোরা আছিস? এমন বক্র চিন্তা করিস বলেই, আমরা বলি কুউঃ – কুচিন্তা!

কাকীঃ      কা কা খা খা খারাপ কী বলেছে কথাটা। কোকিলদাদার কথা ছাড় তো, তারপর তুমি আর কী বললে, বলো?

কাকঃ      বললাম, নক্র মানে কুমীর আর তক্র মানে ঘোল। কাকের নামেই ক্রমাগত পালটে যাচ্ছে ভোল।তোমাদের ঠাকুরদাদা ছিলেন ক্রোম্যাগনন, ক্রমান্বয়ে মানুষ হলে, হোমো স্যাপিয়েন।

কোকিলঃ    বাবা, এত কথাও জানিস তুই? আরও কিছু জানিস নাকি, বল না!

কাকঃ       কায়দা করা জুলফির নাম জেনো কাকপক্ষ, কাকনিদ্রা যে লোকের হয়, সেই জেনো দক্ষ

কাকীঃ       ঠিক আমাদের মতো, গভীর ঘুমের মধ্যেও তারা সতর্ক থাকে। তারপর?

কাকঃ        কাক ডাকলেই তাল পড়ে, আর না কভু বলিও। সমাপতন ঘটলেই, হয় কি গো কাকতালীয়?

কাকীঃ      ওরা তাই বলে বুঝি? কাক ডাকলেই তাল পড়ে! ওমা, মানুষ কী বোকা! তারপর আর কিছু বলোনি?

কাকঃ       বলিনি আবার? আরো বললাম, সাধু ভাষায় কাককে বায়স বলে, জানো তো? সত্যজিতের বিশ্বখ্যাতি বায়সকোপ বানিয়ে, মানো তো?

কোকিলঃ     সত্যিই তো! এমন তো ভাবিনি রে? এত বয়স হল, তবু বায়স্কোপ ব্যাপারটাতে তোরা আছিস, এটা বুঝিইনি!

কাকঃ       তার পরে আরও বললাম, BIOS ছাড়া কম্পিউটার শুধুই বাক্স যে একখান, কাক ছাড়া তোমাদের থাকবে কি সম্মান?

কোকিলঃ    কুউঃ কুউঃ, যাই বলিস আর তাই বলিস, তুই খুব কুউওইটুকুউ একটা ছেলেকে এমন করে কেউ বলে? নিশ্চয়ই খুব দুঃখুউ পেয়েছিল, বেচারা? নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলেছিল?

কাকঃ       না না কাঁদবে কেন? চেঁচিয়ে ডাকল তার মাকে, বলল ‘অ মা দেখে যাও কী বলছে কাকে!’

কাকীঃ       সর্বনাশ, তখন তুমি কী করলে?

কাকঃ       কী আর করবো, হুস করে উড়ে গিয়ে বসলাম পাশের জামরুল গাছের ঘন পাতার ফাঁকে।

কোকিলঃ    কী ভিতু রে তুই কাক! পুঁচকে একটা ছেলের ওপর খুব জারিজুরি করলি, আর তার মা আসছে শুনেই পালিয়ে গেলি?

কাকঃ       কোকিল সেই থেকে তুই অনেক আকথা কুকথা বলছিস। তুই কোন সাহসী রে? মানুষের কাছে তোর যাওয়ার সাহস আছে? বসে থাকিস তো শুধু বট আর আমগাছের ঘন পাতার আড়ালে। টপাটপ বটফল খাস, আর কুকু ডাকিস। নিজের বাসাটুকু বানানোরও তোর মুরোদ নেই। বুঝলে গিন্নি, এবার কোকিলের বউ আমাদের বাসায় ডিম পাড়তে এলে ঠুকরে তাড়িয়ে দেবে।

কোকিলঃ    অ্যাই দেখো, রাগ করছিস কেন, মিছিমিছি। তোকে দু একবার কু বলা ছাড়া কু এমন বলেছি, বল তো? তাতেই এত ক্রোধী হচ্ছিস? ওই দ্যাখ, ক্রোধের সামনেও crow আছে!  বাসা বানানোর অনেক ঝক্কি, সে ভাই আমরা পারি না। কাক ছাড়া কাকে আমরা ভরসা করতে পারি বল তো? ঠিক কথা তোর বাসায় আমার বউ ডিম পাড়তে যায়এত বাসা থাকতে, তোর বাসাতেই কেন যায়, সেটা জানিস কি?

কাকঃ      দ্যাখ কোকলে, শুধু ডিম পাড়তে যায়, তাই নয়, আমাদের একটা দুটো ডিম, সে পায়ে করে বাসার বাইরে ফেলেও দেয়!

কোকিলঃ    না, না, ছি ছি এমন হতেই পারে না। হতে পারে আমার বউয়ের পায়ে বা ডানায় লেগে একটা আধটা ডিম পড়ে গেছে। কিন্তু ইচ্ছে করে ডিম ফেলে দেয়, এমনটা হতেই পারে না।

কাকঃ       তোর ওই কুউ কথায় আর কুউ ডাকে আমরা আর ভুলছি না। আমাদের বাসার ত্রিসীমানায় যদি তোকে কোনদিন আর দেখেছি, ঠুকরে তোর পালক খসিয়ে দেব! এবারে তোর বউ আসুক, ঠুকরে ঠুকরে 2ক্রো 2ক্রো করে রাখবো, বলে দিলাম।

কোকিলঃ    কাক, অ্যাই কাক, শোন না। এত রেগে যাচ্ছিস কেন? তোদের বাসায় আমরা কেন ডিম পাড়ি জানিস? সেটা তো জানিস না। জানলে আর এমন কথা বলতিস না।

কাকঃ        কেন? (খুব রাগত স্বরে)

কোকিলঃ    আমাদের মধ্যে, একমাত্র তোরই বেশ একটা ইয়ে, মানে তেজ আছে। হাঁকডাক করা, ঠোক্কর মারা। অনেক কাক মিলে একসংগে কা কা খা খা করা, এসব আমরা কেউ পারি, বল? তোদের কে না ডরায় বলতো? বেড়াল, কুকুর থেকে শুরু করে মানুষও তোদের ঠোক্করকে ভয় পায়।

কাকঃ       গিন্নি শুনছো, কোকিল এই মাত্র আমাকে বলল ভিতু, এখন আবার বলছে আমাদের মানুষ ভয় পায়।

কাকীঃ      কথাটা ভুল কিছু বলে নি। আমরা একা একা মানুষকে ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু একজোট হলে মানুষও আমাদের ভয় পায়!

কোকিলঃ    অ্যাই, এই কথাটাই বলছিলাম, কাককে একটু বুঝিয়ে বলো দেখি, বৌদিভাই। আর ঠিক এই জন্যেই আমরা তোদের বাসায় ডিম পাড়ি।

কাকঃ        তার মানে? মামার বাড়ির আবদার,  নাকি কাকার বাড়ির?

কোকিলঃ    ওফ, তুই বুঝছিস না কাক, তোরা যে ডালে বাসা বানাস, সেই ডালে তোরা উটকো কাউকে বসতেই দিস না। তোদের ভয়ে, বেড়াল বা ভাম কিংবা চিল কেউই কাছ ঘেঁষে না। তাই তোদের বাসা সব থেকে নিরাপদতোদের বাসায় তোদের বাচ্চাদের সঙ্গে আমাদের ছানারাও নিশ্চিন্তে বড়ো হয়।

কাকঃ        তাহলে? আমরা তোর এত্তো উপকার করি, তাও আমাদের নিন্দে করছিলি কেন? খালি বলছিলি কু?

কোকিলঃ       (লাজুক মুখে মাথা চুলকোতে চুলকোতে) ওটা শিখেছি মানুষের থেকে।

কাকঃ          তার মানে?

কোকিলঃ      একজন মানুষ যার থেকে উপকার নেয়, তারই সব থেকে নিন্দে করে। হে হে আমরাও তাই শিখেছি।

কাকঃ        এ কথাটা মন্দ, মানে কু বলিসনি। পথেঘাটে সারাদিন মানুষ যতো নোংরা ফেলে, তার কত কিছু আমরা খেয়ে সাফ করে ফেলি। এতটুকু কৃতজ্ঞ তো হয়ই না, উলটে জানালা, কিংবা বারান্দার রেলিং একবার পা দিলেই হুস হুস করে তাড়িয়ে দেয়। খুব রাগ হয় জানিস?

কোকিলঃ     হবারই তো কথা। একশবার রাগ করবি। কিন্তু আমার ওপর রাগ করে থাকিস না, ভাই। তোদের বাসায় যদি ডিম পাড়তে না দিস, আমাদের কোকিল বংশই ধ্বংস হয়ে যাবে, সে কথাটা একবারও ভেবে দেখবি না, ভাই?

কাকীঃ        (চোখের জল মুছে) হ্যাঁগো, শুনছো? তুমি আর রাগ করে থেকো না গো। আমাদের ছানাদের সঙ্গে দুতিনটে কোকিলের ছানাও আমরা দিব্যি বড়ো করে তুলতে পারবো গো, ওতে আমদের কোন কষ্ট হবে না।

কাকঃ          হুম। মনটা একটু বড়ো করার সঙ্গে সঙ্গে বাসাটাও একটু বড়ো করে নিলেই হয়।

কাকীঃ       তা তো হয়ই। সে আমরা করেও ফেলব, গো। তোমাকে আরো বেশ কিছু কুটোকাটা বয়ে আনতে হবে, এই যা। শোনো, তুমি আর দেরি করো না। যাও যাও, কা কা খা খা খেয়ে এসো, আর ফেরার সময় আর একটু বড়ো বড়ো কুটো খুঁজে পেতে এনো।

কোকিলঃ      কুক কুক কুউউউরে, কাকবৌদি তোমার কাকচরণে প্রণাম, কাক তোকেও অনেক অনেক থাংকুউউ ভাই। তোর মতো সুজন আর কুউউথায় গেলে পাই? তোদের সাহায্যে আমরা কোকিল কূজনে ভরে তুলব দশদিক...কুউউ কুউউ

কাকঃ        কা কা খা খা খেয়ে আসি দাঁড়া, তারপর তোর গান শুনতে শুনতে বাসাটা আজই চটপট বানিয়েই ফেলব।

 

-০০-         


নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...