ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

শ্রীমান

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " সম্মোহন "


তোয়া ছোটকার টেবিলে চা রেখে বলল, “ছোটকা, চা দিয়ে গেলাম, মনে করে খেয়ে নিও কিন্তু, ভুলে যেও না, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে” ছোটকা উত্তর দিল, “হুপ

ছোটকাটা এমনই একটু পাগলাটে ধরনের সর্বদাই পড়াশোনার রাজ্যে ডুবে থাকে যতক্ষণ ঘরে থাকে খালি বই আর বই বই বৈ আর কিছুই জানে না আগে কলেজে পড়াতে যেত, এখন লকডাউন হয়ে, ছোটকার দারুণ মজা, সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে দাদুন আক্ষেপ করে বলেন, কর্কটরাশিতে জন্মেও ছোঁড়াটা এমন মর্কট কী করে হয়ে গেল কে জানে? আর ঠাম্মি দুঃখ করে বলেন, “তোর দাদুর জন্যেই আমার মুকুলটা নষ্ট হয়ে গেল ছোট বেলা থেকে ও বাবার মুখে সারাদিন “পড়তে বস, পড়তে বস” শুনে এসেছে আর কে না জানে অল ওয়ার্ক এন্ড নো প্লে মেকস জ্যাক এ ডাল বয় সেই থেকেই ও ডাল হয়ে গেল, তারপর বিদ্যার ডালে ডালে ঘুরে আর বইয়ের গন্ধমাদন বইতে বইতে হনুমান হয়ে উঠলো তবে দাদুন আর ঠাম্মি যাই বলুন, তোয়া জানে তার ছোটকার মতো লেখাপড়া জানা মানুষ এই মনোহরপুর শহরে আর কেউ নেই পাড়াপড়শিতে, তার স্কুলের দিদিমণিরা সকলেই ছোটকার নাম শুনলে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন বলেন ওঁনার মতো শিক্ষিত সজ্জন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় কই? আর সেই দৌলতে তোয়াও সকলের থেকে একটু বেশিই স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। 

আজকাল লকডাউন বলে তোয়াদের স্কুল হয় ঘরে বসেই অনলাইনে এ যে কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, তোয়ার একটুও পছন্দ হয় না সকাল এগারোটা থেকে ক্লাস শুরু হয় ল্যাপটপে বইখাতা নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসলেই দিদিমণি চলে আসেন কম্পিউটারের পর্দায় রোলকল করেই পড়া চালু এভাবে পড়া করায় কোন মজা আছে বলো? আশেপাশে তার প্রিয় বন্ধুরা কেউ নেই, রাণি, মৌটুসি, পিয়ালি ক্লাস শুরুর আগে একটু গপ্পোসপ্পো, ক্লাস চলাকালীন একটু ফিসফাস কিংবা চোখেচোখে কথা না বললে আবার স্কুলের পড়া হবে কী করে?

তারপর সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল টিফিনের সময় চারবন্ধু মিলে বাড়ি থেকে আনা টিফিন ভাগ করে খাওয়া? ওফ, সে যে কী মজার আলুর দম দিয়ে নুডলস, দইবড়া দিয়ে পরোটা, কিংবা মোমোর সঙ্গে চিঁড়ের  পোলাও এই লকডাউনের সময় তোয়া মাকে একদিন বলেছিল নুডলস দিয়ে চিঁড়ের পোলাও বানাতে মা গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “অমন রান্না আমি কোনদিন শুনিনি কিন্তু এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই কোরোনা থেকে বাঁচতে গেলে এছাড়া অন্য উপায়ও নেই বাবান অফিস যান, সপ্তাহে এক-দুদিন, বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ করেন আর যেদিন যান, মুখে মাস্ক পরা বাবানকে দেখলে মনে হয়, জলদস্যুদের সর্দার কার্ভালো!

আজকে রবিবার তাই তোয়ার অনলাইন ক্লাস নেই ছোটকার ঘরে চা দিয়ে সে ছাদে গেল এই সময় তাদের ছাদে আর আশেপাশের গাছপালায় অনেক পাখপাখালি আসে তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে তোয়ার খুব মজা লাগে

ছাদে গিয়ে তোয়া অবাক, ওমা ছোটকা ছাদে কখন এল? “ছোটকা, তোমাকে এই মাত্র চা দিয়ে এলাম, আর তুমি এরই মধ্যে ছাদে এলে কী করে? এত তাড়াতাড়ি তোমার চা খাওয়া হয়ে গেল? আর আমার আগে কোন দিক দিয়ে ছাদে এসে গেলে”?

আমাকে চা দিয়ে এলি? ধুস তা কী করে হয়? আমি তো সেই কোন সকাল থেকেই ছাদে রয়েছি

কী বলছো? আমি এইমাত্র দেখে এলাম, তুমি চেয়ারে বসে টেবিলে বই পড়ছো তোমার গায়ে সেই মিষ্টি নীল রঙের জামাটা, ও হ্যাঁ, এর মধ্যে তুমি জামাটা পালটে, মেরুন টিশার্টও পরে নিয়েছ”?

তুই শিয়োর আমিই ঘরে ছিলাম, আর আমাকেই চা দিয়েছিস”? ছোটকা একটু যেন ধন্দে পড়েছে

বাঃ রে তোমাকেই তো দিলাম তোমাকে এও বললাম, ছোটকা ভুলে যেওনা, চাটা খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে উত্তরে তুমি বললে হুঁ সব ভুলে গেলে”?

খুবই চিন্তিত মুখে, তোয়ার ছোটকা বললেন, “তবে কী আমি এখানেও আছি, আবার আমার ঘরেও আছি? এটা আমার দ্বৈত সত্ত্বা?”

সেটা আবার কী জিনিষ? ঠাম্মির আমসত্ত্বের মতো কিছু?”

ছোটকা হেসে ফেললেন, “নারে, আমার পুঁচকি মা, আমরা যখন খুব গভীর কিছু চিন্তা করি, তখনও তো আমাদের স্নান-টান, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া সবই করতে হয়! তখন একটা সত্ত্বা চিন্তা করতে থাকে, আর অন্যটা নানান কাজ করে, এই আমি যেমন এখন আমার পুঁচকি মায়ির সঙ্গে গল্প করছিআর একই সঙ্গে হয়তো নীচেয় চেয়ারে বসে তোর চা খেতে খেতে মন দিয়ে বই পড়ছি

তোয়ার ব্যাপারটা ঠিক মনঃপূত হল না, সে একটা ছোটকাকেই বড্ডো ভাল বাসে, তার মধ্যে কোনটা এখন নীচের ঘরে বসে আছে, আর কোনটা রয়েছে ছাদে, এর সমাধান সে করে কী করে? ডবল ছোটকা নিয়ে তার কাজ কী?

এমন সময় নীচের তলা থেকে বেজায় এক গোলমালের শব্দ পাওয়া গেল প্রথমে চায়ের কাপ-প্লেট ভাঙার আওয়াজ, তারপর চেয়ার বা টেবিল উলটে যাওয়ার হুড়মুড় শব্দ, তারপর হুফ হুফ আওয়াজ তারপরেই প্রতিমাদিদির হৈচৈ চিৎকার, “ওরে বাবারে, এ কী অলক্ষুণে কারবার গো, ও বড়োমা, ও বৌদি, শিগগির এসে দেখে যাও ছোড়দা কী করচে”? প্রতিমাদিদি তোয়াদের বাড়িতে কাজ করেন, তিনি ঠাম্মিকে ডাকেন বড়োমা আর তোয়ার মাকে, ডাকেন বৌদি

নিচের গোলমাল শুনে ছোটকা এবং তোয়া দুজনেই দৌড়ে নীচে নামল ছোটকার ঘরের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে, দাদুন, ঠাম্মি, বাবা, মা আর প্রতিমাদিদি, ঘরের মেঝেয় বসে রীতিমতো কান্নাকাটি করছেন, “ও জ্যেঠু, ও বড়োদাদা, ছোড়দার এ কী হল গো?”

দাদু জোর এক ধমক দিলেন প্রতিমা দিদিকে, বললেন, “আঃ, চেঁচাস না, চুপ কর মুকুলের কী হয়েছে”? তোয়ার ছোটকার ডাক নাম মুকুল আর ঘরের ভিতরে বসে থাকার কারণে প্রতিমাদিদি ঘরের বাইরের সকলের পেছনে দাঁড়ানো ছোটকাকে দেখতে পাননি।

দাদুনের বকা খেয়ে প্রতিমা দিদি কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “ঝাঁট দেব বলে আমি ঘরে ঢুকেছিলাম, দেখি ছোড়দা চেয়ারে বসে বই পড়ছে আর টেবিলে রাখা কাপের চাটা ছুঁয়েও দেখেনি তাই আমি বললাম, ও ছোড়দা, চাটা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল গো”?

তারপর?”

তারপর, যেমনি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে গিয়েছে, ওরে বাপরে, ছোড়দার সেকি চেঁচামেচি আর লাফালাফি চেয়ার টেবিল উলটে, চায়ের কাপডিস ভেঙে, মেঝেয় চা ছড়িয়ে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড! আমি তো ভয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ছোড়দার কাণ্ডকারখানা ও বড়ো মা, ও বৌদি, দেখি কী, রাগে ছোড়দার মুখটা পুড়ে একেবারে কালো হয়ে গেছে, তাতে আবার চশমা হাতে পায়ে এত্তো এত্তো লোম, আবার পেছনে এই লম্বা একখান লেজও”!  

প্রতিমাদিদির বর্ণনায় সকলেই স্তম্ভিত কারো মুখে কোন কথা নেই প্রতিমাদিদি আবারও কান্নার সুরে টেনেটেনে বলল, “এবার কী হবে, বড়োমা? ছোড়দা কলেজে পড়াতে গেলে, বদমায়েশ ছেলেরা যে ছোড়দার লেজ নিয়ে টানাটানি করবে ছিছি এমন অবাক কাণ্ড কী করে হল গো, বৌদি”?

তোয়া খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোটকা তো আমার সঙ্গে ছাদে ছিল, কোন সকাল থেকে তুমি নীচেয় যে ছোটকাকে দেখেছ প্রতিমাদিদি, সেটা অন্য ছোটকা”।

তোয়ার মা জিজ্ঞাসা করলেন, “সকালে চা করে তোকে যে বললাম, ছোটকার ঘরে চাটা দিয়ে আয়, তুই দিসনি?”

দিয়েছিলাম তো কিন্তু সেটাতো আসল ছোটকা নয়, ছোটকার দৈত্য না কী একটা যেন

দৈত্য নয় দ্বৈত সত্ত্বা ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন

ঠাম্মি বললেন, “ও বাবা, সেটা আবার কী বস্তু?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি বলছি, মা, কী বস্তু মুকুল খুব সকালেই ছাদে গিয়ে পায়চারি করছিল আমার ঘরে শুয়ে ওর পায়ের শব্দ পেয়েছি এদিকে ঘর খালি দেখে, তোমার প্রিয় শ্রীমান, মুকুলের ঘরে ঢুকেছে মুকুলের নীলজামাটা গায়ে দিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে বসেছে তারপর চশমাটাও পরেছে আর তারপরেই আমাদের তোয়ারাণি তার ঘরে ঢুকে টেবিলে চা রেখে এসেছে পেছন থেকে নীলজামা, আর চোখে চশমা দেখে, বেচারা ভেবেছে ওর ছোটকাই চেয়ারে বসে আছে

তোয়ার বাবা একটু থামলেন তারপর আবার শুরু করলেন, “এর কিছুক্ষণ পরেই ঝাড়ু হাতে প্রতিমা ঘরে ঢুকে বকবক শুরু করাতে, শ্রীমান ঘাবড়ে গিয়ে গরম চায়ের কাপে কিংবা চায়ে হাত-টাত লাগিয়ে ফেলাতেই যত বিপত্তি ওরা তো রান্নাবান্না করে না, গরম চা বা গরম ঝোলও খায়না কাজেই হাতে ছেঁকা লাগাতে মনে হয় বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল তারপরেই চেয়ার টেবিল উলটে হুলুস্থুল বাধিয়েছে এরপর প্রতিমা মেঝেয় বসে কান্নাকাটি করাতে বেচারা সুযোগ পেয়ে পালিয়েছে”

তোয়ার দাদুন জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু তুমি এত কিছু জানলে কী করে?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “বারান্দার পূবের কোণা থেকে দেখে এস, আমাদের কাঁঠালগাছের ডালে, মায়ের শ্রীমান, কেমন মুকুল সেজে বসে আছে! গায়ে তার নীল জামা, চোখে ঝুলছে চশমা পিছনে অবিশ্যি মস্ত লেজটাও আছে”

সকলেই, বারান্দার কোণ থেকে, এমনকি ছোটকা নিজেও দেখে এলেন সত্যিই শ্রীমান গায়ে জামা পরে বসে আছে যদিও বুকের বোতাম লাগাতে পারেনি, আর সাইজে বড় হওয়াতে জামাটা খুব ঢলঢল করছে চশমাটাও ওর দু'কান থেকে ঝুলছে আর নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল বারবার চুষছে বারান্দায় তোয়াদের সকলকে দেখে, শ্রীমান মিটমিট করে তাকাল, তারপর বেশ কয়েকটা দাঁত দেখালবাঁ হাতে পেট চুলকোতে চুলকোতে। ওটাই কী ওর 'সরি' বলার নমুনা? প্রতিমাদিদি ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম ছোড়দা, তুমি কিনা শেষ অব্দি, হিহি হিহি, লেজ নিয়ে ঘোরাফেরা করবে?”

ছোটকা গম্ভীর মুখে বললেন, “বাজে বক বক করিসনা, প্রতিমা। কিন্তু আমার চশমার কী হবে? চশমা ছাড়া আমি পড়ব কী করে?”

তোয়ার ছোটকার প্রিয় নীল জামাটা না হয় গেল কিন্তু এই লকডাউনে নতুন চশমা পাবে কোথায়? চশমার দোকান-টোকানতো সব বন্ধ কবে খুলবে কে জানে; এদিকে ছোটকার চলবে কী করে? চশমা ছাড়া বই পড়বেন কী করে?

ঠাম্মি সব্বাইকে বললেন, “এখানে ভিড় করিস না, সব্বাই যে যার ঘরে যা আমি দেখছি কী করা যায়

শ্রীমান নামের হনুমানটি, অনেকদিন ধরেই দল ছুট হয়ে তোয়াদের এবং আশেপাশের বাগানের গাছে থাকে তেমন কোন উপদ্রব কিংবা বিরক্ত করে না আর তোয়ার ঠাম্মি শ্রীমানকে খুবই স্নেহ করেন ও যত্ন-আত্তি করেন বাড়িতে নিত্য সেবার পুজোয় একটু বেশিই ফলটল নৈবেদ্য দেন, কলা, শসা, পাকা পেঁপে, পেয়ারা, সবেদা ঠাম্মি ভগবান রামের খুব ভক্ত, তাঁর নিত্যসেবার দেবতাটি রঘুপতি রামচন্দ্র ঠাম্মির দৃঢ় বিশ্বাস, তিনিই তাঁর ভক্ত হনুমানটিকে পাঠিয়েছেন, তাঁর নিবেদন করা ফলগুলির সদ্ব্যবহারের জন্যে

ঠাম্মি আজও দেবতার পুজো দিলেন, অনেক ফল দিয়ে তারপর ছাদ থেকে হাঁক পাড়লেন, “অ শ্রীমান, খাবি আয় কাঁঠাল গাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে শ্রীমান ঠাম্মির হাতের ফলভরা রেকাবিটা দেখল একবার পেট চুলকে ডানহাতের দুটো আঙুল চুষল তোয়া ফিসফিস করে ঠাম্মিকে বলল, “শ্রীমানদাদার ওই আঙুল দুটোতেই মনে হয় ছেঁকা লেগেছে, তাই না, ঠাম্মি?”

দেখি, কাছে এলে বুঝতে পারবো

চোখে চশমা, গায়ে নীল জামা শ্রীমান একটু ইতস্তত করলেও এল। ছাদের আলসেতে বসে ঠাম্মির দিকে আর তাঁর হাতের রেকাবিটা দেখল মন দিয়ে তারপর ছাদের মেঝেয় নেমে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল ঠাম্মি ছাদের মেঝেয় বসে, যত্ন করে একটা একটা করে কাটা ফল দিতে লাগলেন, শ্রীমান বাঁহাত বাড়িয়ে মুখে পুরে কচমচ চিবোতে লাগল

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, দৌড়ে যা তো, তোর মাকে বলে, ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ নিয়ে আয় ছেঁকালাগা আঙুলে ঠাণ্ডা পেলে একটু আরাম পাবে বেচারা তোয়া এক ছুট্টে নিচেয় গেল বরফ আনতে

শ্রীমান যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, ঠাম্মি প্রথমেই খুলে নিলেন, চশমাটা শ্রীমান আপত্তি তো করলই না, বরং শান্ত ভাবে বসে রইল চুপটি করে এরপর তোয়া বরফের কিউব নিয়ে এল আর ঠাম্মি শ্রীমানের ডানহাতের আঙুলে বরফ থেকে ফোঁটা ফোঁটা টোপানো জল দিতে শুরু করলেন আঙুলে গরম ছেঁকার পর এখন বরফজলের শৈত্যে শ্রীমান একটু থমকে গেল সে ডান হাতটা তুলে মন দিয়ে দেখল তারপর আবার ছাদের মেঝেয় পেতে দিল ডান হাতটা

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, মনে হয়, আরাম পাচ্ছে, বুঝেছিস তোয়ারাণি প্রতিবছরই দুএকদিন শিলাবৃষ্টি তো হয়ই, কাজেই ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতা হয়তো ওর আছে তুই এক কাজ কর, তুই ওর আঙুলে বরফজলের ফোঁটা দিতে থাক। আমি ততক্ষণে ওর জামাটা খুলে নিই

বারে, জামাটা খুলে নিলে ও রেগে যাবে না 

কিচ্ছু না, ওদের জামা-টামা পরার অভ্যেস আছে নাকি? আমাদের দেখে বাঁদরামি করে জামাটা গায়ে চাপিয়েছিল গাছের ডালে লাফালাফি করতে গিয়ে, কোন খোঁচায় ওই ঝুলঝুলে জামা আটকে পড়ে গিয়ে হাতপা ভাঙবে মুখপোড়াসে হবে আরেক বিপদ।”

সত্যিই জামাটা খুলে দেওয়াতে শ্রীমান যেন স্বস্তি পেল, এদিকে ফলও শেষ হয়ে গিয়েছিল ঠাম্মি বললেন, “যা, গাছে ফিরে যা, শ্রীমান, আর কক্ষণো এমন বাঁদরামি করিস না, কেমন? তোয়ার মনে হল, শ্রীমান যেন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ঠাম্মির কথায়

তোয়া মজা পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও ঠাম্মি, ওরা বাঁদরামি না করলে, কারা করবে?”

কেন তুই আর তোর ছোটকা আছিস কী করতে? তোরা করবি!ঠাম্মিও হেসে ফেলে বললেন

ঠাম্মির কথায় দারুণ মজা পেয়ে তোয়া হাসতে লাগল খুব, আর মনে মনে ভাবল, তার ছোটকা দৈত্য না কী যেন হয়ে ভাগ্যিস দুজন হয়ে যায়নি! হলে তার কী বিপদই না হত কাঁঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তোয়াকে হাসতে দেখে, শ্রীমানও তার অনেকগুলি দাঁত বের করল মনে হয় সেও হাসছিল 

-oo-


বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

খাই খাই - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "


আগের পর্ব - " খাই খাই - পর্ব ১ "

 
শেষ পর্ব


৩ 

  চাল থেকে রান্না করা খাদ্য কিংবা গম ভাঙানো আটার রুটি থেকে যে পরিমাণ সহজপাচ্য পুষ্টি ও ভিটামিন্‌স্‌ পাওয়া যায়, অন্য কোন খাদ্যে তেমন পাওয়া যায় না।  নিচের চার্ট থেকে তোমরা বুঝতে পারবে, সমপরিমাণ খাদ্যের কী গুণাগুণঃ-

 

সাদা চাল

(১০০ গ্রাম)

গমের রুটি (২টি)

(১০০ গ্রাম)

পাঁঠা/ভেড়ার মাংস*

(১০০ গ্রাম)

কার্যকারিতা

ক্যালোরি

২২৩

২৬০

১৯৯

খাদ্য থেকে পাওয়া শরীরের শক্তির পরিমাণ

টোটাল ফ্যাট

০.৩ গ্রাম

৮ গ্রাম

৯.৩ গ্রাম

পরিমিত পরিমাণে শরীরে শক্তি দেয়, অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরের ক্ষতি করে।

কোলেস্টেরল

০.০০

০.০০

৯৩ মিগ্রা

স্বল্পমাত্রা কোলেস্টেরল শরীরের উপকারী

সোডিয়াম

১ মিগ্রা

৯৫ মিগ্রা

১১৫ মিগ্রা

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।  

ক্যালসিয়াম

১ মিগ্রা

২ গ্রাম

 

হাড়ের পক্ষে উপকারী।

আয়রন

১ মিগ্রা

 

৪ মিগ্রা

রক্তের লাল কণিকার জন্য উপকারী।

পটাসিয়াম

৩৫ মিগ্রা

 

৩৪৮ মিগ্রা

রক্তচাপ ও মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

ম্যাগনেসিয়াম

৩ মিগ্রা

 

 

হাড়ের পক্ষে উপকারী।

কার্বোহাইড্রেট

২৮ গ্রাম

২০ গ্রাম

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রোটিন

২.৭ গ্রাম

৩ গ্রাম

২৮ গ্রাম

পেশীর গঠনে সাহায্য করে।

ফাইবার

০.৪ গ্রাম

৩ গ্রাম

 

হজমের পক্ষে উপকারী।

ভিটামিন বি১২

 

৩.৮ মাইক্রোগ্রাম

রোগ প্রতিরোধ, খাদ্যের পরিপাক, শরীরের বৃদ্ধি।

ভিটামিন বি৩

 

৫.৫ মিলিগ্রা

রোগ প্রতিরোধ

ভিটামিন বি৬

৫ মিগ্রা

 

 

রোগ প্রতিরোধ

*আদিম যুগের মানুষ পশু শিকারে কোন বাছবিচার করতে পারত না, পাঁঠা বা ভেড়ার তুলনায় সে মাংস ছিল অনেক শক্ত, এবং দুষ্পাচ্য, সেই সব মাংসের পুষ্টিগুণ যোগাড় করা এখন বেশ কষ্টকর।

ওপরের চার্ট থেকে বুঝতেই পারছো, সমপরিমাণ ভাত ও রুটিতে, খাদ্যগুণে খুব একটা তফাৎ নেই – এবং  খাদ্য থেকে শরীরে পাওয়া শক্তিও (ক্যালোরি) প্রায় সমান। এই খাদ্য থেকে পাওয়া শক্তিকে যদি খাদ্যশক্তি (food energy) বলি, তাহলে এই শক্তি দিয়ে আমরা সারাদিনের সব কাজ করার ক্ষমতা পাই। এই খাদ্যশক্তি কম হতে থাকলে, আমরা দুর্বল হতে থাকি, অসুস্থ হতে থাকি, কখনো কখনো স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারাই। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশক্তিও, আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, আমরা মেদবহুল হয়ে, কর্মক্ষমতা হারাতে থাকিসারাদিনে একজন পূর্ণবয়স্ক অফিস/স্কুল/কলেজে চাকরি করা আধুনিক মানুষের মোটামুটি ২০০০ ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন! যাঁরা খেলাধুলো করেন, কিংবা শ্রমজীবী মানুষ – তাঁদের এই ক্যালোরি অনেক বেশি দরকার।

এবার এই হিসেবে আদিম মানুষদের কথা যদি চিন্তা করা যায়, তাঁদের সকলকেই জঙ্গলে, পাহাড়ে, পশু শিকারের জন্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হত, অতএব তাঁদের দিনে চার/পাঁচ হাজার ক্যালোরির কম শক্তি হলে চলত বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে অন্ততঃ চার কিলো মাংস নিয়ে তাঁদের বসতেই হতো, যাতে হাড়গোড় ফেলে দিয়ে, পেটে কেজি দুই-আড়াই হাড়হীন সলিড মাংস যায়। প্রত্যেকদিন দলের সকলের ভরপেট মাংসের যোগাড়ের জন্যে কত পশু শিকার করতে হত এবং কাজটা কতটা বিপজ্জনক ও পরিশ্রমের আশা করি বুঝতে পারছো?          

অতএব, প্রধানতঃ পশুমাংসের উপর নির্ভরশীল মানুষ যেদিন থেকে, ধান এবং গমজাত খাদ্যকে প্রধান খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করতে লাগল, তাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-ভাবনা এবং জীবন ধারায় অতি দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে লাগল। ওই রিরি আর মিকার আশ্চর্য আবিষ্কারের ফলেই, আমরা যে আদিম মানুষ থেকে আজকের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি, এ কথাটা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করতে আমার একটুও দ্বিধা নেই!    

 

 ওপরে চাল, গম আর মাংসের পুষ্টির যে চার্ট দিয়েছি, সেটা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পেরেছি, শুধু ভাত, শুধু রুটি অথবা শুধু মাংস দিয়ে মানুষের শরীরের প্রয়োজনীয় খাদ্য শক্তি অর্জন করা বেশ শক্ত। সেক্ষেত্রে মাংস-ভাত, কিংবা মাংস-রুটি, অথবা মাংস-ভাত-রুটি সঠিক পরিমাণে খেলে আমাদের সহজে শক্তিলাভ হয়, সব খাবারের মিলিত নানান পুষ্টিতে শরীর সুস্থ হয়, আবার খেতেও ভালো লাগে।

ধান, গম আবিষ্কারের পর, ধীরে ধীরে আদিম মানুষ যতো কৃষিনির্ভর হতে লাগল, ততই তাদের প্রাত্যহিক খাদ্য চিন্তা কমতে লাগল, তার কারণ - প্রত্যেকদিন ভোরে উঠে শিকারে যাওয়া, সারাদিন দুর্গম জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে মনোমত পশু পাওয়া বা না পাওয়ার অনিশ্চয়তা, শিকার করার সাফল্য ও ব্যর্থতার দুশ্চিন্তা ও বিপদ এবং দিনের শেষে পশু বয়ে এনে, তাকে খাদ্য বানানো - সব মিলিয়ে সে ছিল প্রাণান্ত পরিশ্রম! তারপর ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত শরীরে পরের দিন ভোরে আবার শিকারে যাওয়ার দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত্রের ঘুম! এইভাবেই দিনের পর দিন, মাস, বছর কেটে যেত – অবকাশ বা অবসরের জন্য প্রচণ্ড বর্ষার দিনগুলো ছাড়া, অন্য কোন সময়ই ছিল না!

অন্যদিকে বছরে পাঁচ-ছমাস অনেক কম বিপজ্জনক পরিশ্রম করে, কৃষিকাজে উৎপন্ন ফসল থেকে সারাবছরের খাদ্যসংস্থান, পরিবারের প্রত্যেকের হাতে এনে দিল পর্যাপ্ত অবসর। এই নিশ্চিন্ত অবসর সময়টা মানুষ নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে শিখল। 

আগুনের ব্যবহার এবং তারপর চাষবাস শিখে, রান্না করা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষের পৌষ্টিক তন্ত্র অনেক হাল্কা হতে লাগল; রান্না করা খাবার চিবোনো অনেক সহজ হয়ে যাওয়ায়, চোয়ালের পেশী এবং দাঁতের গঠন বদলে গিয়ে, মানুষের মুখ ও মাথার গঠনও বদলাতে লাগল। খাবার সময় কমে গিয়ে এবং খাবারের বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার ফলে, শুধু খাওয়া, ঘুম আর বেঁচে থাকার চিন্তা ছাড়াও মানুষের হাতে অনেকটা সময় বেঁচে রইল। সেই সময়টা ব্যবহার হতে লাগল নানান চিন্তা ভাবনায়, অতএব বেড়ে গেল মস্তিষ্কের ব্যবহার। সেই চিন্তাভাবনা যত সুসংহত হল, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ হতে লাগল দ্রুত। আগে শুধু কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাংস খেতে এবং হজম করতে যে পরিমাণ পুষ্টি-শক্তি ক্ষয় হত, এখন সেই উদ্বৃত্ত পুষ্টি মস্তিষ্কের শক্তি বাড়িয়ে চলল। অভিনব চিন্তা ভাবনা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আরো উন্নতির দিকে; আরো সুস্থ, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে।    

যারা খুব কাজের মানুষ তারা অবসর সময়েও বসে না থেকে, নানান ফন্দি ফিকির করে, পশুপালন আয়ত্ত করে ফেলল। গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া পালন করে, দুধ, মাংস এই সব খাদ্যের সহজ যোগান যেমন নিশ্চিত করল, তেমনি পশুদের কাজে লাগিয়ে চাষবাসের কাজেও প্রভূত সুবিধে হয়ে গেল।  কেউ চাকা আবিষ্কার করে, মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার ছোট গাড়ি আবিষ্কার করে ফেলল। কেউ কেউ মাঠ থেকে ফসল বয়ে আনার জন্যে গড়গড়িয়ে চাকা চলার মতো রাস্তা বানিয়ে ফেলল! কেউ কেউ চিন্তাভাবনা করে আবিষ্কার করতে লাগল, কৃষিকাজের সুবিধের জন্য নানান যন্ত্রপাতি। কাঠের লাঙ্গল, ধান ভাঙার ঢেঁকি, পাথরের দুই চাকার মধ্যে চেপে ডাল কিংবা গম গুঁড়ো করার জাঁতাকল। নিত্য প্রয়োজনের জন্য গৃহস্থালী হাঁড়ি, কলসী, থালা, বাটি, নানান তৈজসপত্রাদি। এইভাবে জেগে উঠল মানুষের কারিগরী সত্ত্বা! গড়ে উঠতে লাগল নানান বৃত্তি - কুম্ভকার, সূত্রধর, কর্মকার, বাস্তুকার আরো কত!

বয়স্কদের কেউ কেউ বসে বসে লক্ষ্য করতে লাগল প্রকৃতি এবং ঋতুর পরিবর্তন। শুরু হয়ে গেল, সূর্য ও চাঁদ এবং নক্ষত্রদের চিনে, দিন গোনা, পক্ষ, মাস, ঋতু ও বছর গোনা। তাঁদের মাথার মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করল অঙ্ক এবং হিসেব! জেগে উঠল মানুষের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সত্ত্বা। কারণ সেই হিসেবেই প্রাক-বর্ষায় জমি প্রস্তুত করা, প্রথম বর্ষায় বীজ বপন, শরৎ পার করে, হেমন্তে পাকা ফসল কাটার আনন্দময় দিনগুলো আসে

এই আনন্দ থেকেই জন্ম নিতে লাগল নানান উৎসব। মানুষের প্রথম উৎসব হয়তো নবান্ন।  যে উৎসব আজও সারা ভারতে পালন করা হয়, ভিন্ন ভিন্ন নামে, কিন্তু একই মকরসংক্রান্তির দিনে। এই উৎসব পাকা ফসল ঘরে তোলার উৎসব। এই উৎসব ঘিরেই শুরু হয়ে গেল পাখিদের সুরে সুর মিলিয়ে গান বাঁধা। নানান বাদ্য আবিষ্কার করে বাজনা বাজানো! নাচ, গান, বাদ্য নিয়ে জেগে উঠল মানুষের শিল্পীসত্ত্বা – কেউ হল নট-নটী, কেউ বাদক-বাদিকা কিংবা গায়ক-গায়িকা!

অভিজ্ঞ, বৃদ্ধ মানুষেরা, যাঁরা কায়িক শ্রম আর তেমন করতে পারেন না, তাঁরাও চিন্তা করতে লাগলেন, এই মানবজীবন নিয়ে! এই জীবন কোথা থেকে এল, এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই জগতের প্রকৃতি, জীব, জড় ও মানুষের সৃষ্টিকর্তা কে? সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র কার নির্দেশ মেনে এমন নিয়মিত? সূর্য আলো দেন, উত্তাপ দেন, মেঘ সৃষ্টি করেন, মেঘ বৃষ্টি ঝরায়, মাটিতে উপ্ত বীজ থেকে উদ্ভিদ জন্ম নেয়। আর চন্দ্র সেই উদ্ভিদের বৃদ্ধি দেন, ফল দেন, শস্যে রস ও পুষ্টি সঞ্চার করেন। মানুষের মধ্যে জেগে উঠল আশ্চর্য দার্শনিক সত্ত্বা। তাঁরা নিজেরাই চিন্তাভাবনা করে এই ধরনের নানান প্রশ্নের উত্তর খুঁজে, মুখে মুখে বানিয়ে তুললেন ছন্দবদ্ধ জ্ঞান, যার নাম বেদ, উপনিষদ! তাঁরা ঋষি, মুনি, তাঁরা আজও আমাদের কাছে অদ্ভূত চিন্তাশীল জ্ঞানী হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র!

শিকারী আদিম মানুষদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, নিষ্ঠুর প্রতিকূল প্রতিবেশে বেঁচে থাকার একমাত্র তাগিদ। দয়া, মায়া, মমতা, করুণা - মনের এই ধরনের সুকুমার প্রবৃত্তি জেগে ওঠার মতো পরিস্থিতিই ছিল না। যেটুকু ছিল, সেটুকুও অব্যক্ত, অস্পষ্ট। শিকারের নৃশংসতা ভুলে গিয়ে, কৃষিকাজে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তাদের মনের প্রকৃতিও দ্রুত বদলে যেতে লাগল! তাদের এখন বছরের অনেকটা সময় কাটে, সিক্ত শীতল মাটি, মেঘ মেদুর আকাশ, অবিরল বর্ষণে পূর্ণ হতে থাকা হরিৎ শস্য ক্ষেত্র। এই সংস্পর্শ মানুষের মনকে অনেক নরম, স্নিগ্ধ করে তুলতে লাগল। এমনকি, ফসল কাটার পর শূণ্য জমির দিকে তাকিয়েও তাদের মনের মধ্যে বেজে উঠতে লাগল রিক্ততার সুরসেই সুরে তাদের মনে বাজতে লাগল সবুজ শস্যের সজীব মাধুর্য এবং তার বিপরীতে ফসল ফলানো শস্যের মৃত্যুর নিঃস্বতা! বেড়ে উঠল পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধনের নিবিড়তাপরিবারের, সমাজের, গ্রামের অসুস্থ, দুর্বল মানুষের জন্য, সুস্থ মানুষদের মনে এল সহানুভূতি। কীভাবে এই অসুস্থ মানুষগুলিকে নীরোগ করা যায়, সেই চিন্তা এবং ব্যাকুলতা থেকে ধীরে ধীরে কিছু মানুষ ঝুঁকলেন চিকিৎসাচর্চায়। নানান লতাগুল্ম, শিকড়, পাতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে গড়ে উঠতে লাগল আয়ুর্বেদশাস্ত্র। অসহায়, অক্ষম মানুষদের প্রতিও তারা অনুভব করতে লাগল, দয়া -  নিঃস্বার্থ দান হয়ে উঠল মানুষের পরম পুণ্যকর্ম।  

 

শিকারী আদিম মানুষেরা ছোট ছোট দলে যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াত, এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে। এই দলগুলির অধিকাংশই হত মূলতঃ বৃহত্তর পারিবারিক সূত্রে বাঁধা। একটি দলের মানুষেরা, সাধারণতঃ অন্য দলের মানুষদের এড়িয়ে চলত। কখনো কখনো মুখোমুখি বা কাছাকাছি হলে, দুই দলে বেঁধে যেত প্রচণ্ড লড়াই, দুই দলেরই অনেক মানুষ হতাহত হত। এই লড়াই হত, প্রধানতঃ কোন এলাকার কিংবা জঙ্গলের দখল নিয়ে, কারণ একই জঙ্গলে দুই শিকারী দলের জন্য অসম্ভব ছিল পর্যাপ্ত পশুর যোগাড়!

কৃষিকাজ শিখে ফেলার পর এক একটা দল, বিস্তৃত ব্যবধানে গড়ে তুলতে লাগল এক একটা গ্রাম। প্রথম দিকে কৃষিক্ষেত্র নিয়ে তাদের মধ্যে রেষারেষি ছিল, উৎপন্ন ফসল লুঠ করে নেওয়ার প্রবণতাও ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সখ্যতা, আদানপ্রদানের সম্পর্ক। এর পিছনেও ছিল মানসিক পরিবর্তন, শিকারী মনের নিষ্ঠুর হিংস্রতা থেকে মানুষ হয়ে উঠতে লাগল সহমর্মী এবং সহিষ্ণু। এক গ্রামের উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে অন্য গ্রামের উৎপন্ন যন্ত্রপাতি, তৈজসপত্রাদি বিনিময়ের মাধ্যমে গড়ে উঠতে লাগল বাণিজ্য সম্ভাবনা। ধীরে ধীরে একধরণের মানুষ বাণিজ্যকেই বৃত্তি করে নিয়ে, পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দূর দূরান্তের গ্রামে, সমাজে নতুন এই শ্রেণীর নাম হল বণিক। এই বাণিজ্য থেকে কৃষিনির্ভর সাধারণ গ্রামগুলিও সমৃদ্ধ হতে হতে, তার গায়ে ছোঁয়াচ লাগল অর্থনীতির!

এই বণিকেরাই হয়ে উঠলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের যোগসূত্র। তাঁরা যত দূর দেশে যান, ততই নানান পরিবেশ, নানান মানুষের সংস্পর্শে আসেন। দূর দূর গ্রামের বৈশিষ্ট্যবার্তা তাঁরাই বহন করতেন অন্য গ্রামে। তাঁদের পরোক্ষ সংযোগে গড়ে উঠতে লাগল বৃহত্তর মানুষের সমাজ, সে সমাজ কয়েকখানা মাত্র গ্রামে আর সীমাবদ্ধ রইল না, ব্যাপ্ত হতে লাগল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এক এক গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার, জ্ঞান-বিদ্যা - পরষ্পরকে প্রভাবিত করে, গড়ে উঠতে লাগল সার্বজনিক দেশাচার। গড়ে উঠতে লাগল সর্বজনমান্য এক সামাজিক বিধি বিধান, যার নাম ধর্ম। ধর্ম যা ধরে থাকে মানুষকে, ধর্ম যা বেঁধে রাখে সমাজকে। এই ধর্ম কোন একক ব্যক্তির জীবনদর্শন নয়, এই ধর্ম সর্বজনের হিতের জন্য, সমাজের সকল মানুষের মঙ্গলের জন্য – সার্বজনীন, সনাতন।

এতক্ষণ যা কিছু বললাম, সবই অত্যন্ত ভালো, সুন্দর এবং যেন স্বপ্নের মতো। কিন্তু কৃষিকাজেও সর্বদাই যে সাফল্য আসবে, তেমনটা আজও হয় না, তখনও হত না। কৃষিকাজের অনেকটাই নির্ভর করে প্রকৃতির মর্জির উপর, যে বছর সুবর্ষা হয়, সে বছর ফসল খুব ভালো হয়। মাঝে মাঝে অতিবৃষ্টিতে মাঠে অতিরিক্ত জল জমে, গাছ পচে যায়, ফসল হয় না, কোন বছর আবার অনাবৃষ্টিতে ফসল হবার আগেই মাঠের গাছ শুকিয়ে মরে যায়। দু এক বছর এমন হলে, একটু কষ্টে হলেও বিপদ হয়তো সামলে নেওয়া যায়, কিন্তু এমন অনেক অনেক বছর অনাবৃষ্টি হলে অবস্থা সঙ্গীন হয়ে ওঠে।

আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও যাঁরা কৃষিজীবী, তাঁদের কৃষির জন্য আজও প্রকৃতি ও সুবর্ষার উপরেই সব থেকে বেশি নির্ভর করতে হয়।

খরার কথা যেমন বললাম, তেমনই ছিল (এবং আজও আছে) অতিবৃষ্টি। এই অতিবৃষ্টিতে নদী প্লাবিত হয়ে, ভাসিয়ে দেয় দুই পাশের গ্রাম ও কৃষিক্ষেত্র, নষ্ট করে দেয় ফসল ফলার সম্ভাবনা। সে যুগের সীমিত ক্ষমতায় বন্যা ও খরার থেকে রক্ষা পেতে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হত। যেমন বন্যার জল আটকাতে, নদীর দুপাড়ে উঁচু বাঁধ নির্মাণ। বর্ষার জলকে সঞ্চিত করার জন্যে গ্রামের ভেতরে কিংবা বাইরে পুকুর, দীঘি খনন। কিন্তু সে ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল এবং আজও আমাদের উন্নত প্রযুক্তির নানান সেচব্যবস্থায় (irrigation system) এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়নি।

সেই যুগের তুলনায় আজকের দিনে অনেক উন্নতি ও প্রগতি হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের দেশে আজও কৃষিজীবীদের কাছে কৃষিকাজ অনেকটাই প্রকৃতি-নির্ভর অসম এক লড়াই এবং অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। লক্ষ লক্ষ গ্রামের মাঠে মাঠে তাঁরা কতটা পরিশ্রম করেন তার খবরও রাখি না আমরা। তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের ফসলে আমরা দুবেলার নিশ্চিন্ত পুষ্টি পেয়ে বিজ্ঞানের নানান চর্চায় ব্যস্ত থাকি। আমরা শহরের আরামদায়ক অভ্যস্ত জীবনে যখন দূরদর্শন, কম্পিউটার এবং চৌখস-দূরভাষের পর্দায় আধুনিক বিজ্ঞানের অদ্ভূত সাফল্যে বারংবার উচ্ছ্বসিত হই, তখন হাজার হাজার বছর ধরে কৃষিজীবী ওই মানুষগুলির অবদানের কথা কী ভুলে থাকবো? আজও কি আমরা স্বীকার করে নেব না, যে ওঁদের পরিশ্রমের ফসলেই আমাদের সকলের বিদ্যা-বুদ্ধি ও এই বিজ্ঞানচর্চার বাড়বাড়ন্ত?! বিজ্ঞানের পাঠশালায়, আধুনিক বিজ্ঞানের নানান জটিল বিষয় থাকতে, হঠাৎ ধান-গম নিয়ে এই লেখাটা তাই মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়।

 --০০--


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...