ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

অপূর্ব কোপি

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " শ্রীমান "


 আমরা তখন তোমাদের মতোই ছোট্ট, থুড়ি বড়ো; আসলে ক্লাস-এইট পর্যন্ত আমরা নিজেদের বাচ্ছাই মনে করতাম, আর ক্লাস নাইন থেকেই বেশ বড়ো। তোমরাও নিশ্চয়ই তাই মনে করো। তবে আমাদের তুলনায় তোমরা এখন অনেকটাই বড়ো, কারণ আমাদের দৌড় ছিল রেডিওতে গান আর খবর শোনা। সে তুলনায় তোমরা ছোট্ট থেকেই টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল দেখতে দেখতে আমাদের থেকেও কত্তো বড়ো যে হয়ে ওঠো তার হদিস তোমরাও জানো না। তাও আমরা সেই রেডিও ছুঁতে পেরেছিলাম, আরো অনেক বড়ো বয়সে। আমরা যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম, আমাদের বাড়িতে রেডিও চালানোর দায়িত্ব ছিল মাত্র তিনজনের, জ্যেঠু, বাবা আর মা। আমার জ্যেঠিমা ছিলেন সরল আলাভোলা মানুষ, তিনি ওই নব ঘুরিয়ে রেডিও চালু করা, কিংবা অন্য নব ঘুরিয়ে স্টেশন খুঁজে বেড়ানোটাকেও খুব জটিল এক কর্মকাণ্ড ভাবতেন। অতএব, বাড়ির বড়োরা অফিসে চলে গেলে, জ্যেঠিমা আমার মাকে ডাকতেন, “অ মেজো, রেডিওটা একটু চালু করে দিয়ে যা তো”। আমার মা ছিলেন আমাদের বাড়ির মেজবৌমা।

স্কুলে গরমের ছুটি পড়তে তখনো বেশ কটা দিন বাকি, তবে গরম পড়েছিল বেজায়। গলায় ঘাড়ে, পিঠে ঘামাচি বেরোচ্ছে বিস্তর। খেলার মাঠ থেকে বিকেলে বাড়ি ফিরে, আমরা ঠাকুমার শরণাপন্ন হতাম। তাঁর ছড়ানো দুই পায়ের ওপর মাথা রেখে আমরা অবলীলায় শুয়ে পড়তাম। ঠাকুমাকে কিছু বলতে হত না, তিনি তাঁর বুড়ো আঙুলের ভোঁতা নখ দিয়ে, পিট পিট শব্দে ঘামাচি গেলে দিতেন, আর হাত বুলিয়ে দিতেন বুকে পিঠে। সেই আরামে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসত। মনে হত ভাগ্যিস গরম পড়ে, তা নইলে কী আর ঠাকুমার হাতের এমন পরশ বুঝতে পারতাম। তবে “বাব্বাঃ কী গরম পড়েছে”, বললেই ঠাকুমা বেশ রেগে যেতেন, বলতেন, “মুখপোড়া, গরম না পড়লে খাবি কি? আম, জাম, কাঁঠালই বা পাকবে কী করে?” তা ঠিক, পাকা এবং আধপাকা আমের নাম শুনলেই তখন জিভে জল আসত। আর আমাদের দিদিরা সর্ষেবাঁটা, তেল, নুন, লংকার গুঁড়ো দিয়ে কুষ্টি আম মেখেই মুখপোড়া গরমের তাপকে আবাহন করত।

মুখপোড়ার কথায় হনুমানের কথা মনে পড়ল। আমাদের সেই মফস্বল শহরে মাঝে মাঝেই বিস্তর হনুমান আসত। তারা দল বেঁধে সকাল সকাল হাজির হত, ঘুরে বেড়াত পাড়ার সবার বাড়ির গাছে গাছে। কাঁচা হোক পাকা হোক সব ফলেই দাঁত বসিয়ে দেখাটা তাদের রেওয়াজ ছিল। পেয়ারা, কাঁচা আম, কাঁচা সবেদা, সবুজ জাম, জামরুলের কুশি কিছুই তারা ছেড়ে দিত না। আর ছোট ছোট ইঁচড়গুলোকে গাছ থেকে ছিঁড়ে ফেলে দিত মাটিতে। তাদের দৌরাত্ম্যে বিরক্ত হয়ে উঠত মানুষজন। পাড়ার লোকেরা থালাবাটি আর খালি ক্যানেস্তারা বাজিয়ে তাদের তাড়িয়ে বেড়াত। সে আওয়াজে আমাদেরই কান ঝালাপালা হয়ে উঠত, হনুমানদের কথা না বলাই ভাল।

স্কুলে সেদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল সংস্কৃতর ক্লাস। প্রত্যেকদিন ফোর্থ পিরিয়ডটা ছিল আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পিরিয়ড। কারণ এরপরেই আমাদের টিফিনের ঘন্টা পড়ত, আধ ঘণ্টার বিরতিএই ফোর্থ পিরিয়ড চলার সময়েই দিবাকরদা প্রত্যেক ক্লাসরুমে টিনের ট্রেতে আমাদের মাথা গুণে টিফিনের প্যাকেট রেখে যেত। তেলে ভিজে ওঠা বাদামি সেই প্যাকেট থেকে খাবারের গন্ধ বেরিয়ে, আমাদের নাকগুলোকে সচল করে তুলত, যেভাবে কাঠবিড়ালি বা ইঁদুররা খাবারের গন্ধ পেলে নাক চুলবুল করে, অনেকটা সেরকম। তার মধ্যে সহদেব স্যারের সংস্কৃত শ্লোক, আমাদের মাথা-কান-মন সব ঘেঁটে একসা করে তুলল

সেদিন সহদেব স্যার যে শ্লোকটা পড়াচ্ছিলেন, সেটি ছিল একটি চাণক্য শ্লোক, “অপূর্ব কোঽপি ভাণ্ডারস্তব ভারতি দৃশ্যতে, ব্যয়তো বৃদ্ধিমায়াতি ক্ষয়মায়াতি সঞ্চয়াৎ”। খুব সহজ করে বললে, শ্লোকটির মর্মার্থ হল, “হে সরস্বতি, তোমার ভাণ্ডারটির মতো অপূর্ব আর কীই বা দেখা যায়? যা খরচ করলে বেড়ে ওঠে আর সঞ্চয় করলে কমে যায়”! এই ভাণ্ডারটি হল আমাদের বিদ্যা বা জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিদ্যাচর্চা বা আলোচনা করলে আমাদের জ্ঞান বেড়ে ওঠে। কিন্তু চর্চার অভাবে আমাদের সেই জ্ঞানই হারিয়ে যায়, তার মানে আমরা ভুলে যেতে থাকি। এই শ্লোকের “ভারতি” হচ্ছেন মা সরস্বতী। ভারতী মা সরস্বতীর আরেকটি নাম, সে কথা নিশ্চয়ই জানো। তাঁর ভারতী নামটিই এখানে সম্বোধনে “ভারতি” হয়েছে – সংস্কৃতে সেটাই নিয়ম।  সরস্বতী বানানটাও একই নিয়মে সরস্বতি লিখতে হয়েছে। সে যাই হোক, এই শ্লোকটির মানে আজ যত সহজে তোমাদের বলতে পারলাম, সেদিন আমাদের সেটা বুঝতে কিন্তু বেজায় বেগ পেতে হয়েছিল।

শ্লোকটি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করে, সহদেব স্যার আমাদের জিগ্যেস করলেন, “‘কোঽপি’ শব্দের অর্থ তোদের মধ্যে কে বলতে পারিস?” আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়, সব স্যারদের চোখের মণি, পুলক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হনুমান, স্যার”। এখানে ছোট্ট করে বলে রাখি, এই ঘটনার পর পুলকের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘পুলকপি’।

সহদেব স্যার, অদ্ভূত এক মুখভঙ্গি করে বললেন, “তোরা যে সবাই এক একজন কপি, সে বেপারটা বুঝতে আমার বাকি নেই। এই ‘কোঽপি’ সে কপি নয়, কঃ অপি সন্ধি হয়ে কোঽপি, অর্থ হল ‘আর কে’? কিংবা ‘আর কী?’” দীর্ঘ শব্দে নাকে নস্যি নিয়ে সহদেব স্যার, সামান্য নাকি স্বরে বললেন, “সংস্কৃত হল ভাষার রাজা, প্রত্যেকটি শব্দের মধ্যে রহস্য লুকোনো থাকে, সে সব খুঁজে বের করাতেই আসল মজা”।

আমি অবিশ্যি সে সব মজার কিছুই টের পেলাম না। চিন্তা করতে লাগলাম, কপি মানে আমি এতদিন জানতাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি। শীতকাল হলেই ভুদেবকাকা বাজার থেকে আনে। আরেকটা কপি জানি, সেটা ইংরিজি - কপিবুক, কপি করা। কিন্তু কপি মানে বাঁদরও হয়? যদিও সহদেবস্যারের কথায় আর আমার মন ছিল না, ভাবছিলাম কতক্ষণে টিফিনের ঘন্টা পড়বে, আর আমরা টিফিনের প্যাকেট হাতে নিয়ে দৌড়ে নেমে যাবো স্কুলের মাঠে।

এমন সময় ক্লাশের বাইরে হঠাৎ খুব দুপদাপ হুপহাপ আওয়াজ উঠল। আমাদের জানালার পাশেই একটা বড়ো তেঁতুলগাছ ছিল, দেখলাম তার ডালপালাগুলোয় ভীষণ ঝাঁকুনি উঠেছে। সহদেব স্যার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? এই অসময়ে ঝড় উঠল নাকি?” ওপাশে জানালার ধারেই বসে দীপক, সে বলল, “ঝড় নয় স্যার, হনুমান। একদল হনুমান হানা দিয়েছে”।

সহদেব স্যার বললেন, “অর্বাচীন কোথাকার, হনুমান কী ডাকাত না মারাঠিসেনা? যে হানা দেবে?” কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় একদল হনুমানকে দৌড়োদৌড়ি করতে দেখা গেল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বারান্দার দিকের খোলা জানালায় মুখ রেখে আমাদের দিকে লক্ষ্যও করতে লাগল। জানালায় গ্রিল ছিল, তাই আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম, ওরা কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তারপরেই তারা যা ক্ষতি করল, সে কথা মনে পড়লে, আজও আমার মন দুঃখে হু হু করে ওঠে।  

হনুমানের দলের বেশ কয়েকজন প্রথমদিকে একটু ইতস্ততঃ করলেও, একটু পরেই তারা স্যারের অনুমতি না নিয়েই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। তারপর সহদেব স্যারের টেবিলের কোণায় রাখা টিফিনের ট্রে থেকে আমাদের খাবারের প্যাকেটগুলি নিমেষের মধ্যে হাতিয়ে নিল এবং আগের মতোই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকেআমরা সত্যি বলতে নিঃস্ব হয়ে গেলাম তৎক্ষণাৎ। ঘরের মধ্যে আমরা সকল ছেলেরা এবং সহদেব স্যারও স্তম্ভিত হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। আমাদের ক্লাসের শ্যামল গোটা স্কুলেই বিখ্যাত ছিল। হেডস্যার থেকে শুরু করে সব স্যারেরাই মনে করতেন শ্যামলের মত ফক্কোড় আর ইঁচড়ে-পাকা ছেলে ভূ-হুগলি জেলায় আর একটিও নেইক্লাসের সবাইকে বেশ কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থাকতে দেখে, শ্যামল অত্যন্ত নিরীহ মুখ করে, বলল, “স্যার এটাকে কী, ‘কোপি দৃশ্যতে মারাঠীসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা’ বলা যাবে?  যার অর্থ হতে পারে - মারাঠী সেনার মতো এমন কপিসেনা আর কে দেখেছে?” শ্যামলের ভুল-ভাল সংস্কৃত বাক্য শুনে সহদেবস্যার খুব রেগে উঠে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই একতলা থেকে বেজে উঠল স্কুলের ঘন্টা, একটানা। এই ঘন্টা টিফিনের ঘন্টা নয়, এমার্জেন্সি ঘণ্টা – কোন বিশেষ কারণে, সবাইকে একত্র হওয়ার সংকেত দিতেই এমন একটানা ঘণ্টা বাজানো হয়। বুঝতে পারলাম, বইখাতার ব্যাগ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি নীচেয় নামতে হবে।

তোমাদের হয় কিনা জানি না, আমাদের সময়, স্কুলের একতলায় ঘন্টা বাজলেই আমাদের মাথায় যেন পোকা নড়ে উঠত। সে ক্লাস শেষের ঘন্টা হোক, কিংবা টিফিনের অথবা ছুটির। আর এমন জরুরি ঘন্টা হলে তো কথাই নেই। মূহুর্তের মধ্যে ব্যাগের মধ্যে বই-টই ঢুকিয়ে আমরা দৌড়ে বেরোতে লাগলাম বারান্দা দিয়ে। এক একটা ক্লাসরুম থেকে নানান বয়েসের ছেলের দল বন্যার মতো বেরিয়ে আসছিল। তারপর বারান্দার নদীতে মিশে গিয়ে জলপ্রপাতের মতো সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে আমরা নেমে এলাম একতলায়।

নীচের বারন্দাতে এসেই আমাদের আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তে হল, কারণ হেডস্যারের ঘরের সামনে, হেডস্যার নিজে এবং মাষ্টারমশাইদের অনেকে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দাঁড়িয়ে আছেন থানার বড়োবাবু এবং শহরের বেশ কিছু গণ্যমান্য ভদ্রলোক। ওঁনারা সকলেই যেন আমাদেরই অপেক্ষা করছিলেন। ওপর থেকে নেমে আসা ছেলেদের-স্রোতের বেগ কিছুটা শান্ত হতে, থানার বড়োবাবু বললেন, “মনে হচ্ছে, সকলেই নেমে এসেছে”? হেডস্যার বললেন, “হুঁ, তাই তো মনে হচ্ছে”।

মস্ত ভুঁড়ির ওপর ট্রাউজারটা টেনে তুলতে তুলতে বড়োবাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারো হাতে পায়ে খিমচে-খামচে দেয়নি তো?” আমাদের মধ্যে কেউই কোন উত্তর দিলাম না।

আমরা তো বুঝতেই পারলাম না, কে আমাদের খিমচে দেবে, আর সেটা জানার জন্যে আমাদের নীচেয় ডাকাই বা হল কেন? শ্যামল একটু পিছনের দিকে ছিল, আমাদের ধাক্কা দিয়ে আর গুঁতিয়ে সে একটু সামনে এগিয়ে হাত তুলে বলল, “স্যার, অপূর্ব কোপি দৃশ্যতে মারাঠিসেনাবৎ ইদৃশ কপিসেনা”। আমরা তো বটেই স্যারেরা এবং উপস্থিত মানী মানুষরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শ্যামলের দিকে। বড়োবাবু আতঙ্কিত স্বরে হেডস্যারকে বললেন, “ও ওসব কী বলছে? কী ভাষা? স্যার এই ছেলেটিকে মনে হয়, হনুমান খিমচে বা আঁচড়ে দিয়েছে। জলাতঙ্ক হওয়ার আগেই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার”।

“তোর কী হয়েছে, শ্যামল? হঠাৎ সংস্কৃত বলা শুরু করলি কেন?” হেডস্যার বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। তবে তিনি শ্যামলকে ভরসা না করে, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ফার্স্টবয় পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোদের ক্লাসে হনুমান ঢুকেছিল?”

“হ্যাঁ, স্যার দশ-বারোটা”।

শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দুজন বলে উঠলেন, “সর্বনাশ। হনুমানের বিশাল দলটাকে আমরা এই দিকে আসতে দেখে এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম, গোলোকবাবু। স্কুলের ছেলেদের ওপর এরা কী না কী দৌরাত্ম্য করে বসে”গোলোকবাবু থানার বড়োবাবু, এমন সার্থক নামের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। প্রকাণ্ড ভুঁড়ি সহ গোলগাল মানুষটির নাম গোলক ছাড়া আর কী হতে পারে? অবশ্য আরও বড়ো হয়ে জেনেছিলাম – গোলোক মানে বৈকুণ্ঠ বা বিষ্ণুলোক; তার সঙ্গে গোল বা গোলকের কোন সম্পর্ক নেই।

যাই হোক, গোলোকবাবু ট্রাউজারটা আরেকবার টেনে তুলে বললেন, “আপনাদের আশঙ্কার কথা শোনা মাত্র আমরাও তো থানা থেকে চলে এসেছি, স্যার”।

“আঃ, আপনারা একটু শান্ত হবেন?” হেডস্যার বিরক্ত স্বরে বললেন, “কী হয়েছে ঘটনাটা শোনাই যাক না। পুলক, হনুমান ঘরে ঢুকে কী করেছে?”

“আমাদের সবার টিফিনের প্যাকেট লুঠ করে নিয়ে গেছে, স্যার”। পুলকের স্বরে হাহাকার, আমাদের  মনের কথাই সে বলল। আমরা সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখে-শোকে মাথা নীচু করলাম।

“কী ছিল টিফিনে? হনুমানরা আজকাল কলা-মূলো-বেগুন ছেড়ে দিয়ে টিফিন খাচ্ছে?” অবাক গোলোকবাবু নেমে যাওয়া প্যান্ট আবার টেনে তুলে নিয়ে বললেন।

“টিফিনে কী ছিল জানি না, স্যার। আমরা দেখার আগেই তো ওরা...” পুলক কথা শেষ করতে পারল না, স্বাভাবিক, এমন দুঃখের কথা মুখ ফুটে বলাও শক্ত বৈকি!

“ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে আমি দেখছি। কিন্তু শ্যামল সংস্কৃত শ্লোক বলছে কেন?” হেডস্যার জিজ্ঞাসা করলেন। পুলক বলল, “আমাদের ওই পিরিয়ডে সংস্কৃত পড়াচ্ছিলেন সহদেব স্যার। চাণক্য শ্লোকঅপূর্ব কোপি ভাণ্ডারস্তব। আমি বলেছিলাম কোপি মানে হনুমান। কিন্তু স্যার বললেন, এই কোপি সেই কপি নয়”

“এই কপি ফুলকপি বা বাঁধাকপিও নয় স্যার। এ কোপি অন্য কোন কপি”। আমিও ফোড়ন দিলাম পুলকের সঙ্গে। স্যারেরা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। গোলোকবাবু, আরও একবার প্যান্ট টেনে তুলে বললেন, “স্কুলে এত রকমের কপি নিয়ে আলোচনার দরকারটা কী, স্যার? হনুমানরা কী জানে, কোন কপি মানে হনুমান আর কোন কপিতে হনুমান নয়?  বাঁধাকপি শুনে ওরা ভেবে নিয়েছে – ওদের বেঁধে রাখার ফন্দি করছে মানুষগুলো, আর তাই খামোখা ওরা খেপে গিয়ে ছেলেদের টিফিন নিয়ে চলে গেছে! তোমাদের সংস্কৃত কোন স্যার পড়ান, খোকা?” গোলোকবাবু পুলকপিকে জিজ্ঞাসা করলেন। পুলকপি উত্তর দিল, “সহদেবস্যার, স্যার”।

নিজের নাম শুনে সহদেবস্যার এগিয়ে এলেন, বললেন, “আমিই সহদেব, সহদেব চক্রবর্তী, ছেলেদের সংস্কৃতের টিচার। সংস্কৃতে ওরকম থাকলে পড়াবো না?” “আহা, পড়াবেন না কেন? একশবার পড়াবেন। কিন্তু এদিকটা বিবেচনা করবেন না? দেখছেন শহরে হনুমানের উপদ্রব। এইসময় ওই কপি-টপি উচ্চারণ করে মিছিমিছি ওদের কোপে পড়ার দরকারটা কী?” সহদেববাবু বেশ রেগেই গেলেন এবার, বেশ ওজস্বিনী স্বরে বললেন, “থানার বড়োবাবু হয়ে, এই কটা হনুমান সামলাতে আপনি হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন গোলোকবাবু? আর আমরা যে বছরের পর বছর কত শত হনুমানকে মানুষ করে তুলছি? সে কথাটা ভেবে দেখেছেন?”

গোলোকবাবু একটু থতমত খেয়ে কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। ওদিকে স্যারেরা এবং শহরের মান্যিগণ্যি লোকেরা হেসে উঠলেন হো হো করে। আমরাও, যদিও সংস্কৃতস্যার আমাদেরই হনুমান বললেন, রাগ করব কিনা ভাবতে ভাবতেই, হি হি করে সবাই হেসেই ফেললাম।

গোলোকবাবুও কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝে, যখন সকলের হাসি থেমে গিয়েছে, তখন খুব হাসলেন খানিকক্ষণ, তারপর বললেন, “কথাটা মন্দ বলেননি, স্যার। আমরাও কী ছোটবেলায় কম বাঁদরামি করেছি? হে হে হে হে। যাকগে হনুমান হানা দিলেও তেমন কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, সেটাই রক্ষেআপনারা আপনাদের হনুমান সামলান, আর আমি চলি শহরের হনুমান সামলাতে”। গোলোকবাবু সহদেবস্যারের থেকে নস্যির ডিবে নিয়ে নাকে একটিপ নস্যি নিলেন জোরসে। ওদিকে আমাদের হেডস্যার ঘোষণা করলেন, “ছেলেদের টিফিন যখন হনুমান নিয়ে চলে গেছে, তখন আজকে আর স্কুল হবে না, আজকে হাফ-ছুটি। ছেলেরা, সব বাড়ি যাও”।

রতনমণিদা আমাদের স্কুলের ঘন্টা বাজাতেন, তিনি ঘন্টা বের করে, ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন ঢং ঢং করে। আমরাও সকলে একসঙ্গে হৈ হৈ করে দৌড় দিলাম স্কুলের মাঠ পেরিয়ে মেন গেটের দিকে।

নস্যি ভরা নাকের জন্যে খোনা স্বরে গোলোকবাবু বললেন, “আঁহা, আঁমাদেরও যদি এমন একজন হেডস্যার থাকতেন, কেমন মজার একটা হাঁফ ছুটি পেয়ে, আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।”

..০০..


রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

শ্রীমান

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ গল্প - " খাই খাই - পর্ব ১ "

এর আগের গল্প - " সম্মোহন "


তোয়া ছোটকার টেবিলে চা রেখে বলল, “ছোটকা, চা দিয়ে গেলাম, মনে করে খেয়ে নিও কিন্তু, ভুলে যেও না, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে” ছোটকা উত্তর দিল, “হুপ

ছোটকাটা এমনই একটু পাগলাটে ধরনের সর্বদাই পড়াশোনার রাজ্যে ডুবে থাকে যতক্ষণ ঘরে থাকে খালি বই আর বই বই বৈ আর কিছুই জানে না আগে কলেজে পড়াতে যেত, এখন লকডাউন হয়ে, ছোটকার দারুণ মজা, সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে দাদুন আক্ষেপ করে বলেন, কর্কটরাশিতে জন্মেও ছোঁড়াটা এমন মর্কট কী করে হয়ে গেল কে জানে? আর ঠাম্মি দুঃখ করে বলেন, “তোর দাদুর জন্যেই আমার মুকুলটা নষ্ট হয়ে গেল ছোট বেলা থেকে ও বাবার মুখে সারাদিন “পড়তে বস, পড়তে বস” শুনে এসেছে আর কে না জানে অল ওয়ার্ক এন্ড নো প্লে মেকস জ্যাক এ ডাল বয় সেই থেকেই ও ডাল হয়ে গেল, তারপর বিদ্যার ডালে ডালে ঘুরে আর বইয়ের গন্ধমাদন বইতে বইতে হনুমান হয়ে উঠলো তবে দাদুন আর ঠাম্মি যাই বলুন, তোয়া জানে তার ছোটকার মতো লেখাপড়া জানা মানুষ এই মনোহরপুর শহরে আর কেউ নেই পাড়াপড়শিতে, তার স্কুলের দিদিমণিরা সকলেই ছোটকার নাম শুনলে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন বলেন ওঁনার মতো শিক্ষিত সজ্জন মানুষ আজকাল আর দেখা যায় কই? আর সেই দৌলতে তোয়াও সকলের থেকে একটু বেশিই স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। 

আজকাল লকডাউন বলে তোয়াদের স্কুল হয় ঘরে বসেই অনলাইনে এ যে কী বিচ্ছিরি ব্যাপার, তোয়ার একটুও পছন্দ হয় না সকাল এগারোটা থেকে ক্লাস শুরু হয় ল্যাপটপে বইখাতা নিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসলেই দিদিমণি চলে আসেন কম্পিউটারের পর্দায় রোলকল করেই পড়া চালু এভাবে পড়া করায় কোন মজা আছে বলো? আশেপাশে তার প্রিয় বন্ধুরা কেউ নেই, রাণি, মৌটুসি, পিয়ালি ক্লাস শুরুর আগে একটু গপ্পোসপ্পো, ক্লাস চলাকালীন একটু ফিসফাস কিংবা চোখেচোখে কথা না বললে আবার স্কুলের পড়া হবে কী করে?

তারপর সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল টিফিনের সময় চারবন্ধু মিলে বাড়ি থেকে আনা টিফিন ভাগ করে খাওয়া? ওফ, সে যে কী মজার আলুর দম দিয়ে নুডলস, দইবড়া দিয়ে পরোটা, কিংবা মোমোর সঙ্গে চিঁড়ের  পোলাও এই লকডাউনের সময় তোয়া মাকে একদিন বলেছিল নুডলস দিয়ে চিঁড়ের পোলাও বানাতে মা গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “অমন রান্না আমি কোনদিন শুনিনি কিন্তু এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই কোরোনা থেকে বাঁচতে গেলে এছাড়া অন্য উপায়ও নেই বাবান অফিস যান, সপ্তাহে এক-দুদিন, বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ করেন আর যেদিন যান, মুখে মাস্ক পরা বাবানকে দেখলে মনে হয়, জলদস্যুদের সর্দার কার্ভালো!

আজকে রবিবার তাই তোয়ার অনলাইন ক্লাস নেই ছোটকার ঘরে চা দিয়ে সে ছাদে গেল এই সময় তাদের ছাদে আর আশেপাশের গাছপালায় অনেক পাখপাখালি আসে তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে তোয়ার খুব মজা লাগে

ছাদে গিয়ে তোয়া অবাক, ওমা ছোটকা ছাদে কখন এল? “ছোটকা, তোমাকে এই মাত্র চা দিয়ে এলাম, আর তুমি এরই মধ্যে ছাদে এলে কী করে? এত তাড়াতাড়ি তোমার চা খাওয়া হয়ে গেল? আর আমার আগে কোন দিক দিয়ে ছাদে এসে গেলে”?

আমাকে চা দিয়ে এলি? ধুস তা কী করে হয়? আমি তো সেই কোন সকাল থেকেই ছাদে রয়েছি

কী বলছো? আমি এইমাত্র দেখে এলাম, তুমি চেয়ারে বসে টেবিলে বই পড়ছো তোমার গায়ে সেই মিষ্টি নীল রঙের জামাটা, ও হ্যাঁ, এর মধ্যে তুমি জামাটা পালটে, মেরুন টিশার্টও পরে নিয়েছ”?

তুই শিয়োর আমিই ঘরে ছিলাম, আর আমাকেই চা দিয়েছিস”? ছোটকা একটু যেন ধন্দে পড়েছে

বাঃ রে তোমাকেই তো দিলাম তোমাকে এও বললাম, ছোটকা ভুলে যেওনা, চাটা খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে উত্তরে তুমি বললে হুঁ সব ভুলে গেলে”?

খুবই চিন্তিত মুখে, তোয়ার ছোটকা বললেন, “তবে কী আমি এখানেও আছি, আবার আমার ঘরেও আছি? এটা আমার দ্বৈত সত্ত্বা?”

সেটা আবার কী জিনিষ? ঠাম্মির আমসত্ত্বের মতো কিছু?”

ছোটকা হেসে ফেললেন, “নারে, আমার পুঁচকি মা, আমরা যখন খুব গভীর কিছু চিন্তা করি, তখনও তো আমাদের স্নান-টান, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া সবই করতে হয়! তখন একটা সত্ত্বা চিন্তা করতে থাকে, আর অন্যটা নানান কাজ করে, এই আমি যেমন এখন আমার পুঁচকি মায়ির সঙ্গে গল্প করছিআর একই সঙ্গে হয়তো নীচেয় চেয়ারে বসে তোর চা খেতে খেতে মন দিয়ে বই পড়ছি

তোয়ার ব্যাপারটা ঠিক মনঃপূত হল না, সে একটা ছোটকাকেই বড্ডো ভাল বাসে, তার মধ্যে কোনটা এখন নীচের ঘরে বসে আছে, আর কোনটা রয়েছে ছাদে, এর সমাধান সে করে কী করে? ডবল ছোটকা নিয়ে তার কাজ কী?

এমন সময় নীচের তলা থেকে বেজায় এক গোলমালের শব্দ পাওয়া গেল প্রথমে চায়ের কাপ-প্লেট ভাঙার আওয়াজ, তারপর চেয়ার বা টেবিল উলটে যাওয়ার হুড়মুড় শব্দ, তারপর হুফ হুফ আওয়াজ তারপরেই প্রতিমাদিদির হৈচৈ চিৎকার, “ওরে বাবারে, এ কী অলক্ষুণে কারবার গো, ও বড়োমা, ও বৌদি, শিগগির এসে দেখে যাও ছোড়দা কী করচে”? প্রতিমাদিদি তোয়াদের বাড়িতে কাজ করেন, তিনি ঠাম্মিকে ডাকেন বড়োমা আর তোয়ার মাকে, ডাকেন বৌদি

নিচের গোলমাল শুনে ছোটকা এবং তোয়া দুজনেই দৌড়ে নীচে নামল ছোটকার ঘরের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে, দাদুন, ঠাম্মি, বাবা, মা আর প্রতিমাদিদি, ঘরের মেঝেয় বসে রীতিমতো কান্নাকাটি করছেন, “ও জ্যেঠু, ও বড়োদাদা, ছোড়দার এ কী হল গো?”

দাদু জোর এক ধমক দিলেন প্রতিমা দিদিকে, বললেন, “আঃ, চেঁচাস না, চুপ কর মুকুলের কী হয়েছে”? তোয়ার ছোটকার ডাক নাম মুকুল আর ঘরের ভিতরে বসে থাকার কারণে প্রতিমাদিদি ঘরের বাইরের সকলের পেছনে দাঁড়ানো ছোটকাকে দেখতে পাননি।

দাদুনের বকা খেয়ে প্রতিমা দিদি কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, “ঝাঁট দেব বলে আমি ঘরে ঢুকেছিলাম, দেখি ছোড়দা চেয়ারে বসে বই পড়ছে আর টেবিলে রাখা কাপের চাটা ছুঁয়েও দেখেনি তাই আমি বললাম, ও ছোড়দা, চাটা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল গো”?

তারপর?”

তারপর, যেমনি চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে গিয়েছে, ওরে বাপরে, ছোড়দার সেকি চেঁচামেচি আর লাফালাফি চেয়ার টেবিল উলটে, চায়ের কাপডিস ভেঙে, মেঝেয় চা ছড়িয়ে কুরুক্ষেত্র কাণ্ড! আমি তো ভয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম ছোড়দার কাণ্ডকারখানা ও বড়ো মা, ও বৌদি, দেখি কী, রাগে ছোড়দার মুখটা পুড়ে একেবারে কালো হয়ে গেছে, তাতে আবার চশমা হাতে পায়ে এত্তো এত্তো লোম, আবার পেছনে এই লম্বা একখান লেজও”!  

প্রতিমাদিদির বর্ণনায় সকলেই স্তম্ভিত কারো মুখে কোন কথা নেই প্রতিমাদিদি আবারও কান্নার সুরে টেনেটেনে বলল, “এবার কী হবে, বড়োমা? ছোড়দা কলেজে পড়াতে গেলে, বদমায়েশ ছেলেরা যে ছোড়দার লেজ নিয়ে টানাটানি করবে ছিছি এমন অবাক কাণ্ড কী করে হল গো, বৌদি”?

তোয়া খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “ছোটকা তো আমার সঙ্গে ছাদে ছিল, কোন সকাল থেকে তুমি নীচেয় যে ছোটকাকে দেখেছ প্রতিমাদিদি, সেটা অন্য ছোটকা”।

তোয়ার মা জিজ্ঞাসা করলেন, “সকালে চা করে তোকে যে বললাম, ছোটকার ঘরে চাটা দিয়ে আয়, তুই দিসনি?”

দিয়েছিলাম তো কিন্তু সেটাতো আসল ছোটকা নয়, ছোটকার দৈত্য না কী একটা যেন

দৈত্য নয় দ্বৈত সত্ত্বা ছোটকা গম্ভীর গলায় বললেন

ঠাম্মি বললেন, “ও বাবা, সেটা আবার কী বস্তু?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “আমি বলছি, মা, কী বস্তু মুকুল খুব সকালেই ছাদে গিয়ে পায়চারি করছিল আমার ঘরে শুয়ে ওর পায়ের শব্দ পেয়েছি এদিকে ঘর খালি দেখে, তোমার প্রিয় শ্রীমান, মুকুলের ঘরে ঢুকেছে মুকুলের নীলজামাটা গায়ে দিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে বসেছে তারপর চশমাটাও পরেছে আর তারপরেই আমাদের তোয়ারাণি তার ঘরে ঢুকে টেবিলে চা রেখে এসেছে পেছন থেকে নীলজামা, আর চোখে চশমা দেখে, বেচারা ভেবেছে ওর ছোটকাই চেয়ারে বসে আছে

তোয়ার বাবা একটু থামলেন তারপর আবার শুরু করলেন, “এর কিছুক্ষণ পরেই ঝাড়ু হাতে প্রতিমা ঘরে ঢুকে বকবক শুরু করাতে, শ্রীমান ঘাবড়ে গিয়ে গরম চায়ের কাপে কিংবা চায়ে হাত-টাত লাগিয়ে ফেলাতেই যত বিপত্তি ওরা তো রান্নাবান্না করে না, গরম চা বা গরম ঝোলও খায়না কাজেই হাতে ছেঁকা লাগাতে মনে হয় বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছিল তারপরেই চেয়ার টেবিল উলটে হুলুস্থুল বাধিয়েছে এরপর প্রতিমা মেঝেয় বসে কান্নাকাটি করাতে বেচারা সুযোগ পেয়ে পালিয়েছে”

তোয়ার দাদুন জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু তুমি এত কিছু জানলে কী করে?”

তোয়ার বাবা হাসতে হাসতে বললেন, “বারান্দার পূবের কোণা থেকে দেখে এস, আমাদের কাঁঠালগাছের ডালে, মায়ের শ্রীমান, কেমন মুকুল সেজে বসে আছে! গায়ে তার নীল জামা, চোখে ঝুলছে চশমা পিছনে অবিশ্যি মস্ত লেজটাও আছে”

সকলেই, বারান্দার কোণ থেকে, এমনকি ছোটকা নিজেও দেখে এলেন সত্যিই শ্রীমান গায়ে জামা পরে বসে আছে যদিও বুকের বোতাম লাগাতে পারেনি, আর সাইজে বড় হওয়াতে জামাটা খুব ঢলঢল করছে চশমাটাও ওর দু'কান থেকে ঝুলছে আর নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল বারবার চুষছে বারান্দায় তোয়াদের সকলকে দেখে, শ্রীমান মিটমিট করে তাকাল, তারপর বেশ কয়েকটা দাঁত দেখালবাঁ হাতে পেট চুলকোতে চুলকোতে। ওটাই কী ওর 'সরি' বলার নমুনা? প্রতিমাদিদি ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম ছোড়দা, তুমি কিনা শেষ অব্দি, হিহি হিহি, লেজ নিয়ে ঘোরাফেরা করবে?”

ছোটকা গম্ভীর মুখে বললেন, “বাজে বক বক করিসনা, প্রতিমা। কিন্তু আমার চশমার কী হবে? চশমা ছাড়া আমি পড়ব কী করে?”

তোয়ার ছোটকার প্রিয় নীল জামাটা না হয় গেল কিন্তু এই লকডাউনে নতুন চশমা পাবে কোথায়? চশমার দোকান-টোকানতো সব বন্ধ কবে খুলবে কে জানে; এদিকে ছোটকার চলবে কী করে? চশমা ছাড়া বই পড়বেন কী করে?

ঠাম্মি সব্বাইকে বললেন, “এখানে ভিড় করিস না, সব্বাই যে যার ঘরে যা আমি দেখছি কী করা যায়

শ্রীমান নামের হনুমানটি, অনেকদিন ধরেই দল ছুট হয়ে তোয়াদের এবং আশেপাশের বাগানের গাছে থাকে তেমন কোন উপদ্রব কিংবা বিরক্ত করে না আর তোয়ার ঠাম্মি শ্রীমানকে খুবই স্নেহ করেন ও যত্ন-আত্তি করেন বাড়িতে নিত্য সেবার পুজোয় একটু বেশিই ফলটল নৈবেদ্য দেন, কলা, শসা, পাকা পেঁপে, পেয়ারা, সবেদা ঠাম্মি ভগবান রামের খুব ভক্ত, তাঁর নিত্যসেবার দেবতাটি রঘুপতি রামচন্দ্র ঠাম্মির দৃঢ় বিশ্বাস, তিনিই তাঁর ভক্ত হনুমানটিকে পাঠিয়েছেন, তাঁর নিবেদন করা ফলগুলির সদ্ব্যবহারের জন্যে

ঠাম্মি আজও দেবতার পুজো দিলেন, অনেক ফল দিয়ে তারপর ছাদ থেকে হাঁক পাড়লেন, “অ শ্রীমান, খাবি আয় কাঁঠাল গাছ থেকে মুখ বাড়িয়ে শ্রীমান ঠাম্মির হাতের ফলভরা রেকাবিটা দেখল একবার পেট চুলকে ডানহাতের দুটো আঙুল চুষল তোয়া ফিসফিস করে ঠাম্মিকে বলল, “শ্রীমানদাদার ওই আঙুল দুটোতেই মনে হয় ছেঁকা লেগেছে, তাই না, ঠাম্মি?”

দেখি, কাছে এলে বুঝতে পারবো

চোখে চশমা, গায়ে নীল জামা শ্রীমান একটু ইতস্তত করলেও এল। ছাদের আলসেতে বসে ঠাম্মির দিকে আর তাঁর হাতের রেকাবিটা দেখল মন দিয়ে তারপর ছাদের মেঝেয় নেমে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল ঠাম্মি ছাদের মেঝেয় বসে, যত্ন করে একটা একটা করে কাটা ফল দিতে লাগলেন, শ্রীমান বাঁহাত বাড়িয়ে মুখে পুরে কচমচ চিবোতে লাগল

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, দৌড়ে যা তো, তোর মাকে বলে, ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ নিয়ে আয় ছেঁকালাগা আঙুলে ঠাণ্ডা পেলে একটু আরাম পাবে বেচারা তোয়া এক ছুট্টে নিচেয় গেল বরফ আনতে

শ্রীমান যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, ঠাম্মি প্রথমেই খুলে নিলেন, চশমাটা শ্রীমান আপত্তি তো করলই না, বরং শান্ত ভাবে বসে রইল চুপটি করে এরপর তোয়া বরফের কিউব নিয়ে এল আর ঠাম্মি শ্রীমানের ডানহাতের আঙুলে বরফ থেকে ফোঁটা ফোঁটা টোপানো জল দিতে শুরু করলেন আঙুলে গরম ছেঁকার পর এখন বরফজলের শৈত্যে শ্রীমান একটু থমকে গেল সে ডান হাতটা তুলে মন দিয়ে দেখল তারপর আবার ছাদের মেঝেয় পেতে দিল ডান হাতটা

ঠাম্মি ফিসফিস করে তোয়াকে বললেন, মনে হয়, আরাম পাচ্ছে, বুঝেছিস তোয়ারাণি প্রতিবছরই দুএকদিন শিলাবৃষ্টি তো হয়ই, কাজেই ঠাণ্ডার অভিজ্ঞতা হয়তো ওর আছে তুই এক কাজ কর, তুই ওর আঙুলে বরফজলের ফোঁটা দিতে থাক। আমি ততক্ষণে ওর জামাটা খুলে নিই

বারে, জামাটা খুলে নিলে ও রেগে যাবে না 

কিচ্ছু না, ওদের জামা-টামা পরার অভ্যেস আছে নাকি? আমাদের দেখে বাঁদরামি করে জামাটা গায়ে চাপিয়েছিল গাছের ডালে লাফালাফি করতে গিয়ে, কোন খোঁচায় ওই ঝুলঝুলে জামা আটকে পড়ে গিয়ে হাতপা ভাঙবে মুখপোড়াসে হবে আরেক বিপদ।”

সত্যিই জামাটা খুলে দেওয়াতে শ্রীমান যেন স্বস্তি পেল, এদিকে ফলও শেষ হয়ে গিয়েছিল ঠাম্মি বললেন, “যা, গাছে ফিরে যা, শ্রীমান, আর কক্ষণো এমন বাঁদরামি করিস না, কেমন? তোয়ার মনে হল, শ্রীমান যেন বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল ঠাম্মির কথায়

তোয়া মজা পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ও ঠাম্মি, ওরা বাঁদরামি না করলে, কারা করবে?”

কেন তুই আর তোর ছোটকা আছিস কী করতে? তোরা করবি!ঠাম্মিও হেসে ফেলে বললেন

ঠাম্মির কথায় দারুণ মজা পেয়ে তোয়া হাসতে লাগল খুব, আর মনে মনে ভাবল, তার ছোটকা দৈত্য না কী যেন হয়ে ভাগ্যিস দুজন হয়ে যায়নি! হলে তার কী বিপদই না হত কাঁঠাল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তোয়াকে হাসতে দেখে, শ্রীমানও তার অনেকগুলি দাঁত বের করল মনে হয় সেও হাসছিল 

-oo-

পরের ছোটদের গল্প - " অপূর্ব কোপি


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...