ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ২

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


এর আগের পর্ব - "  ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "


পর্ব - ২


সূর্য ঘড়ি, জল ঘড়ি দিয়ে যে সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ করা যায় না, তাছাড়া তাদের নানান সমস্যার কথা গত পর্বেই লিখেছি। সে সব সমস্যা মিটিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে সময়ের পরিমাপ করার চেষ্টা কম হয়নি সে যুগে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর এমন ঘড়ি তৈরি সম্ভব হল এই সেদিন, মোটামুটি ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে। এই ঘড়িগুলিই প্রথম দিককার যান্ত্রিক ঘড়ি। এই ঘড়ি বানানোর বিষয়ে সে যুগে কাদের অবদান সবথেকে বেশি, সেটা জানলে ভীষণ আশ্চর্য হবে! সে যুগে যান্ত্রিক ঘড়ি বানানোর ব্যাপারে সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল চার্চের monk বা সন্ন্যাসীদের। ৯৯৬ সালে আবিষ্কার করা প্রথম যে যান্ত্রিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করলাম, সেই ঘড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী কালে জার্মানের ম্যাগড়েবুর্গ (Magdeburg) শহরের পোপ হয়েছিলেন, নাম পোপ সিলভেস্টা টু (Pope Sylvester II) চার্চের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রীতিনিয়মের জন্যে সময়ের সূক্ষ্ম পরিমাপ এতটাই জরুরি ছিলে যে, ধর্ম আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি বানানোতেও তাঁরা গভীর মনোনিবেশ করতেন। তবে সে ঘড়ির আর অস্তিত্ব নেই। সবচেয়ে প্রাচীন যে যান্ত্রিক ঘড়ি লণ্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে রাখা আছে, সেটি চতুর্দশ শতাব্দীর এক সন্ন্যাসীর বানানো। তাঁর নাম পিটার লাইটফুট (Peter Lightfoot), তিনি গ্ল্যাসটনবেরির (Glastonbury) সন্ন্যাসী ছিলেন।

যান্ত্রিক ঘড়ির রহস্যটা বুঝতে গেলে প্রথমেই এস্কেপমেন্ট (Escapement) ব্যাপারটা বোঝা দরকার। ইংরিজিতে to escape মানে পালানো, সে তো জানোই। যান্ত্রিক ঘড়ির মধ্যে পালানো আর ধরে ফেলা এই  চলতে থাকে নিরন্তর। পাশের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।

ছবিতে দেখ অনেক খাঁজকাটা একটা লোহার চাকা রয়েছে, যার কেন্দ্রে একটা পিন দিয়ে তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা হয়েছে। ধরে আছে মানে চাকাটা নড়াচড়া করতে পারবে না, কিন্তু পিনটাকে অক্ষ করে ঘুরতে পারবে।  এই চাকার পিছনে ঝোলানো থাকে তিরের ফলার মতো দেখতে লম্বা লোহার একটা কাঠি, ওই তিরের ফলার দুই ধারে হুকের মতো খাঁজ কাটা আছে। ওই তিরের মতো কাঠিটাও নড়বে চড়বে না, কিন্তু তার ভরকেন্দ্রে, মাথার কাছে ছোট্ট ছিদ্রটাকে অক্ষ করে দু পাশে দুলতে পারবে।

এইবার ওই লোহার কাঠিটাকে নির্দিষ্ট মাপে যদি দোলানো যায়, তাহলে তার হুকের ধাক্কায় লোহার চাকাটা ঘুরবে, কিন্তু দুলতে থাকা তিরের অন্য হুকের জন্যে চাকাটা মাত্র এক ঘাটের বেশি ঘুরতে পারবে না। অর্থাৎ তিরের ধাক্কায় চাকাটা যেন পালাতে চাইছে, কিন্তু অন্য ঘাটটা চাকাটাকে পালাতে দিচ্ছে না। এই ব্যাপারটাই এস্কেপমেন্টের মূল তত্ত্ব।

এবার তীরের মতো কাঠিটাকে দোলানোর জন্যে প্রথমদিকে ভারি ওজন ঝোলানো হত, পরের দিকে স্প্রিংয়ের সঙ্গে পেণ্ডুলাম এবং তারও পরে ব্যলান্স-হুইল (balance wheel) ব্যবহার করা হত। খাঁজকাটা ওই চাকার নাম হুইল গিয়ার (wheel gear) দুলতে থাকা ওই কাঠি আর হুইল গিয়ারের ধাক্কার থেকেই আওয়াজ হত “টিক-টক” বা “টিক-টিক” আর সেই থেকে কিছু দিন আগে পর্যন্ত, ঘড়ি আর ওই আওয়াজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

ভারি ওজন ঝোলানো ঘড়িগুলো আকারে বিশাল বড়ো আর ভারি হত। এই ঘড়িগুলি সাধারণতঃ বড় বড়ো চার্চের মাথায় কিংবা শহরের প্রধান জায়গায় বেশ উঁচু ঘড়িঘর বানিয়ে তার মাথায় বসিয়ে রাখা হত। ওই সব ঘড়িতে প্রহর ঘোষণার জন্যে ঘড়ির সঙ্গে বড় বড় ঘন্টাও রাখা হত। প্রতি ঘন্টায় সে সব ঘন্টা গম্ভীর আওয়াজ তুলে বাজত, ঢং ঢং। শহরের লোক নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঘন্টা শুনে বুঝতে পারতো কটা বাজে। আমাদের দেশে সময়ের পরিমাপ ঘটিকা বা ঘন্টা (hour) এইভাবেই পেতল বা অন্য ধাতু দিয়ে বানানো ঘন্টা (bell)-র সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।

 

পেণ্ডুলাম ঘড়ি

এতদিন ধরে যে যান্ত্রিক ঘড়ি চলছিল, সেগুলো বেশ জবড়জং জটিল আর খুব ভারি লোহা, ইস্পাত দিয়ে বানানো ভজকট ব্যাপার। ওপরের ছবিটা দেখ না, দেখে কী মনে হচ্ছে, যে ওটা একটা ঘড়ির অন্দরমহল!  কাজেই এই ঘড়িকে আরো উন্নত করে, কীভাবে আরো সহজ সরল যন্ত্র তৈরি করা যায়, যা দিয়ে আরো সূক্ষ্ম সময়ের হিসাব করা সম্ভব, সে প্রচেষ্টা চলছিলই!  তাছাড়া দেশের ধনী ব্যক্তিরাও চাইছিল, তাদের প্রাসাদে এবং সম্ভব হলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সুন্দর সাজিয়ে রাখার মতো একটা করে ঘড়ি হোক, যাতে সাধারণ মানুষের মতো ঘড়িঘরের ঘন্টার আওয়াজ শুনে সময়ের হিসেব করতে না হয়।


    ১৫৮০ সালে ইটালির গ্যালিলিও গ্যালিলি পেণ্ডুলাম আবিষ্কার করলেন এবং তিনি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য এক তত্ত্ব। একটি সাধারণ পেণ্ডুলাম বলতে সুতোয় ঝোলানো একটি বল বা ওজনকে বোঝায়, ওই সুতো যতো সূক্ষ্ম ও হাল্কা হবে পেণ্ডুলাম তত ভালো কাজ করবে, অবিশ্যি সুতোটা যথেষ্ট শক্তও হতে হবে, যাতে বলটি ছিঁড়ে না পড়ে যায়। এবার ওই সুতোর অন্য প্রান্তটি কোন একটি কীলক বিন্দুতে (pivot point) ঝুলিয়ে, যদি দুলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সুতোয় বাঁধা বলটি নির্দিষ্ট গতিতে ডান থেকে বাঁদিকে সমান দূরত্বে  দুলতে (oscillate) থাকে।  আদর্শ শর্ত (ideal conditions) অনুযায়ী এই বলটির অনন্তকাল একই দূরত্বে, একই গতিতে দুলতে থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না, কারণ, সূক্ষ্ম ভরহীন সূতো (mass-less rod or thread) দিয়ে ভরগোলক (mass bob) ঝোলানো অসম্ভব, যাকে কেন্দ্র করে পেন্ডুলাম দুলবে, সেই কীলকটি ঘর্ষণহীন (frictionless pivot) হওয়াও অসম্ভব।  তাছাড়া আছে বাতাসের ঘর্ষণ।

পেণ্ডুলামের এই নির্দিষ্ট সময়ের দোলাকে (oscillation) কাজে লাগিয়ে যে ঘড়ি বানানো সম্ভব, সে কথা গ্যালিলিও আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এবং ঘড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানাতে পারেননি। তার পরিবর্তে ১৬৫৬ সালে ক্রিস্টিয়ান হিউজেন্স (Christiaan Huygens) নামে একজন ডাচ অংকবিদ ও বিজ্ঞানী প্রথম এই পেণ্ডুলাম ব্যবহার করে ঘড়ি বানিয়েছিলেন। 

      

ওপরের ছবিদুটি হিউজেন্স সায়েবের বানানো প্রথম পেণ্ডুলাম ঘড়ির ছবি। বাঁদিকের ছবিটি বাইরে থেকে ঘড়ির চেহারা, আর ডানদিকের ছবিটি ঘড়ির অন্দরের কলকব্জার ছবি। দুটি ছবিতেই পেণ্ডুলামের গোলকদুটি চিনতে পারছো নিশ্চয়ই। ওই পেণ্ডুলামের সাহায্যে এস্কেপমেন্ট সিস্টেম কাজে লাগিয়ে এই ঘড়ি বানানো হয়েছিল। প্রথম দিকের এই ঘড়িতে দিনে মাত্র এক মিনিটের ভুল (error) হতো!

গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক 


একবার পেণ্ডুলাম ঘড়ি চালু হয়ে যাওয়াতে, ইংল্যাণ্ডে এই ঘড়ি বানানোর যেন হিড়িক পড়ে গেল। ১৬৭০-৭১ সালে উইলিয়াম ক্লিমেন্ট নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক, বিশাল বাক্সের মধ্যে  পেণ্ডুলাম ঘড়ি বানিয়ে ফেললেন, সে ঘড়ির নাম ঠাকুরদাদা ঘড়ি (Grandfather clock)।

১৭০০ সালের এরকমই একটি গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লক দোরাব টাটাজি মুম্বাইয়ের প্রিন্স অব ওয়েল্‌স্‌ মিউজিয়ামে দান করেছিলেন। এই ঘড়ির ডায়ালে তামিল ভাষায় ১ থেকে ১২ সংখ্যা লেখা আছে। মনে করা হয়, ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে মাদ্রাজের শিল্পকলা স্কুল থেকে এটির বাইরের বাক্সটি বানানো হয়েছিল, সেই সময়েই তামিল ভাষায় সংখ্যাগুলি লেখা হয়েছিল।



ক্লিমেন্ট সায়েবের পরে কয়েক বছরের মধ্যে পেণ্ডুলাম ও এস্কেপমেন্ট পদ্ধতির অনেক উন্নতি হয়ে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানোর মতো সুদৃশ্য ছোট ঘড়ি, প্রচুর পরিমাণে বানানো শুরু হয়ে গেল। সে সব ঘড়ি আমাদের ছোটবেলাতেও অনেক উচ্চবিত্ত বাড়িতেই দেখা যেত। এইগুলিকেই আমরা দেওয়াল-ঘড়ি (wall clock) বলতাম   





আকারে বড়ো হোক কিংবা ছোট, পেণ্ডুলাম ঘড়ি, বড় হল ঘরের মেঝেয় বসিয়ে কিংবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে সময় দেখার জিনিষ। পথে ঘাটে, দূর বিদেশের অপরিচিত জায়গায় সময় জানতে গেলে সে ঘড়ি কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাছাড়া পেণ্ডুলাম ঘড়ি ভালো কাজ করে, একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে অথবা ঝুলে থাকলে, একটু নড়াচড়া হলেই ঘড়ি বিগড়ে যেত। অতএব, আকারে ছোট্ট, পকেটে রাখা যায় এবং ঠিকঠাক সময়ও দেখা যায় এমন ঘড়ির ভাবনা চিন্তা শুরু হয়ে গেল।

ক্রিশ্চিয়ান হিউজেন্স, যাঁর উন্নত পেণ্ডুলাম ঘড়ি আবিষ্কারের কথা আগেই বলেছি, তিনি পেণ্ডুলামের পরিবর্তে ব্যালান্স স্প্রিং (Balance Spring) এবং ব্যালান্স হুইল (Balance Wheel) দিয়ে ছোট্ট ঘড়ি যে বানানো সম্ভব সেই আবিষ্কারের কথা তখনকার দিনের বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশ করলেন। এবং  ১৬৭৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, স্পাইর‍্যাল ব্যালান্স স্প্রিং (Spiral balance spring) বা স্পাইর‍্যাল হেয়ার স্প্রিং (spiral hair-spring) ব্যবহার করে, সর্বদা কাছে রাখার মতো ছোট্ট ঘড়ি বানিয়ে ফেলে নতুন যুগের সূচনা করে ফেললেন!  এই ঘড়িরও মূল তত্ত্ব সেই এস্কেপমেন্ট তত্ত্ব, যার কথা তোমাদের আগেই বলেছি। এর পরের পর্বে আসবে টাইম পিস (time piece) এবং পকেট ঘড়ি (Pocket watch) নিয়ে আলোচনা। 

তথ্য ও চিত্র ঋণঃ - আই আই টি, কানপুর ও উইকিপিডিয়া। 

চলবে...



বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


পর্ব - ১

এই লেখাটা পড়ার সময় কী তোমাদের হবে? সকাল থেকে উঠে হোমটাস্ক, স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফিরে ক্রিকেট কোচিং, নয়তো সাঁতার, নয়তো নাচ শেখা! সেটা সেরে আবার টিউশন যাওয়া! ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে আটটা-নটা! সত্যি বলতে তোমাদের সকলের প্রতিটা দিন এবং রাত ঘন্টা-মিনিটের ঘড়ি ধরে হিসেব করা সেখান থেকে একচুলও এদিক সেদিক হবার জো নেই সময়কে এভাবে ঘন্টা মিনিটে যদি ভাগ করা না যেত, তাহলে কী হত, আমাদের প্রত্যেকদিনের কার্যপ্রণালী? যাকে ইংরিজিতে বলে ডেলি শিডিউল!

 আদিম মানুষের সময়ের হিসেব ছিল খুবই সহজ আর সাধারণ দিন আর রাত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত হল কাজের সময়কাজ বলতে ছিল খাদ্যের সন্ধান আর খাওয়া তারপর সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রাত্রের কাজ ছিল অল্পস্বল্প গল্পগাছা, বিশ্রাম আর গভীর ঘুম সময়ের এইটুকু অভিজ্ঞতা দিয়েই তাদের দিব্যি চলে গেছে হাজার হাজার বছর, অন্য কোন শিডিউল দরকারই হয়নি। প্রথমে আগুন জ্বালাতে শেখা, তারপর কৃষি এবং পশুপালন শিখে ফেলার পর, তাদের কাছে সময়ের একটা হিসেব মনের মধ্যে গড়ে উঠতে লাগল। কীভাবে গড়ে উঠল তাদের এই বোধ?

আদিম মানুষদের দলে কিছু বৃদ্ধ মানুষ থাকতেন, যাঁদের শিকার করতে যাওয়ার মতো কঠিন পরিশ্রমের সাধ্য হত না। তাঁরা গুহা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়েই থাকতেন, দলের শিশু, বালকদের দেখাশোনা করতেন, অসুস্থ কিংবা আহত সঙ্গীদের দেখভাল করতেন।  তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ লক্ষ্য করলেন, সূর্য উঠলে দিন হয়, সূর্য অস্ত গেলে রাত আসে। কিন্তু সূর্যটা এক জায়গায় স্থির নেই। সূর্য যেদিক থেকে ওঠে, সেদিকের নাম যদি পূর্ব দেওয়া হয়, তাহলে সূর্য অস্ত যায় তার উল্টোদিকে, সে দিকটার নাম দেওয়া হল পশ্চিম। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, সূর্যের আলোর উল্টোদিকে গাছপালা, খুঁটি এমনকি নিজেদেরও ছায়া পড়ে। সেই ছায়ার রকমসকম সারা দিনে একই থাকে না। ছোট হয়, লম্বা হয়, মানুষের সামনে অথবা পিছনে পড়ে থাকে। আর সূর্য যখন মধ্য আকাশে থাকে, তখন ছায়া পড়ে থাকে পায়ের নিচে – ছোট্ট হয়ে তেমনই রাত্রের চাঁদটাও সব দিন সমান থাকে না। পুরো চাঁদ দেখা যায় যে রাতে, সেই রাতকে যদি পূর্ণিমা বলা যায়, তারপরের রাত থেকেই রোজই চাঁদের আকার কমতে থাকে। কমতে কমতে এমন হয়, এক রাত্রে চাঁদকে দেখাই যায় না, সে রাতের নাম দেওয়া হল অমাবস্যা।             

 এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করতে করতে আদিম মানুষের বিজ্ঞ জনেরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব পেতে শুরু করলেন। তাঁরা দেখলেন পনেরদিন অন্তর চাঁদটা একবার পূর্ণিমা হয়, পরের পনেরদিনে হয় অমাবস্যা! এক একটা পনেরদিনের তাঁরা নাম দিলেন পক্ষ। অমাবস্যার পরের পনেরদিন শুক্লপক্ষ, পূর্ণিমার পরের পনেরদিনের নাম দিলেন কৃষ্ণপক্ষ। শুক্ল মানে সাদা, অমাবস্যার পর চাঁদ রোজই বাড়ে, প্রতি রাত্রিতে বাড়ে চাঁদের উজ্জ্বলতাও, তাই নাম শুক্লপক্ষ। আর পূর্ণিমার পর চাঁদ যতো ছোট হতে থাকে, প্রতি রাত্রে চাঁদের উজ্জ্বলতা কমতে থাকে, অন্ধকার হতে থাকে রাত্রের আকাশ, তাই তার নাম কৃষ্ণপক্ষ!

তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, বছরের সব সময় সূর্য পূর্ব দিকের একই জায়গা থেকে উদয় হয় না, আবার পশ্চিমের একই জায়গায় অস্তও যায় না, কিছুট করে সরে যায়। যার ফলে, বছরের কিছুদিন সূর্যের তেজ প্রখর হয়, সেই সময়ের নাম দেওয়া হল গ্রীষ্ম (summer)। এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে দীর্ঘতম হয়ে ওঠে। আর যে সময়ে সূর্যের তেজ বেশ কম থাকে সেই সময়ের নাম দেওয়া হল শীত (winter) এই সময়ে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে হ্রস্বতম হয়ে ওঠে।

নির্মল রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা আরও লক্ষ্য করলেন, আকাশের অজস্র নক্ষত্র, কিছু কিছু গ্রহ। অজস্র সেই নক্ষত্রের মধ্যে তাঁরা কয়েকটি নক্ষত্র চিনে ফেললেন! কয়েকটি নক্ষত্রের সমষ্টিকে একত্রে এক একটা বিশেষ আকার কল্পনা করে তাদের নামও রাখতে শুরু করতে লাগলেন। যেমন কালপুরুষ (Orion) এবং তার পায়ের কাছে থাকে একটি কুকুর এবং একটি শশক। এইভাবেই তাঁরা খুঁজে নিতে পারলেন, আরো বেশ কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী, যেমন সপ্তর্ষিমণ্ডল (Great bear), তুলা (Libra), মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), ধনু (Sagittarius) ইত্যাদি। তাঁরা আরো লক্ষ্য করলেন, এই নক্ষত্রমণ্ডলীগুলির কোনোটিই আকাশের এক জায়গায় স্থির থাকেনা। এক এক সময় আকাশে কিছু কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী দেখা যায়। তারা প্রতিদিন অল্প অল্প সরে সরে যায়, কিছুদিন পর তাদের আর দেখাই যায় না। তখন আকাশে উদয় হয় নতুন কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী। আরো আশ্চর্য ব্যাপার বেশ কিছুদিন, মোটামুটি প্রতি ৩৬৫ দিনের পর পর, নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীগুলিই আকাশের নির্দিষ্ট অবস্থানে বার বার ফিরে আসে।


বিভিন্ন মাসের আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থান 

দীর্ঘ দিন লক্ষ্য করতে করতে তাঁরা নির্দিষ্ট একটা হিসেব গড়ে তুলতে পারলেন। তাঁরা সেই নির্দিষ্ট সময়ের নাম রাখলেন বর্ষ বা বছর। আকাশে নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রের নির্দিষ্ট উপস্থিতি অনুযায়ী, তাঁরা আরও একটা হিসাব করে ফেললেন, সেটির নাম দিলেন মাস। যেমন বিশাখা নক্ষত্র, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, আষাঢ়, শ্রবণা, ভদ্রা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা ইত্যাদি। নক্ষত্র অনুযায়ী মাসের নাম রাখলেন বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক। এরকমই পুষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

তাঁরা বুঝতে পারলেন, আমাদের এই ধরিত্রী এবং আকাশের ওই সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সকলেই নির্দিষ্ট নিয়মের এক শৃঙ্খলে বাঁধা। সূর্য, গ্রহ-তারাদের নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্যই পৃথিবীতে গ্রীষ্ম আসে। মাস দুয়েক সময় সূর্যের প্রখর তাপে জলাশয়ের জল শুকিয়ে যায়, জলের অভাবে কাতর হয়ে ওঠে সকল জীব, প্রাণী, গাছপালা প্রকৃতি। তারপরেই আকাশ জুড়ে ভেসে আসে ঘন মেঘ, প্রখরতাপে তপ্ত মাটি ভিজিয়ে নেমে আসে বৃষ্টি ধারা। দুই মাস ধরে চলা নিয়মিত বর্ষণে মাঠ ভরে ওঠে সবুজ শস্যে। গাছপালা প্রকৃতি পুষ্টি পায়, নদী নালা, খাল, বিল জলে ভরে ওঠে। এইভাবেই গড়ে উঠল ঋতুর ভাবনা। এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে প্রকৃতির পরিবর্তনগুলোও তাঁদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। তাঁরা বুঝতে শিখলেন বর্ষচক্র (Wheel of the year)। এই বর্ষচক্রর ধারণা থেকেই তাঁরা কৃষিকাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত, বীজ বপন থেকে ফসল তোলা - সমস্ত কাজের সঠিক সময় নির্দিষ্ট করে ফেললেন। তাঁরা নির্দিষ্ট করে ফেললেন মৃগয়া ও শিকার উৎসবের সময় শরৎ, ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উৎসবের সময়!

সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রদের পর্যবেক্ষণ করে, পক্ষ, মাস, ঋতু এবং বছরের হিসেব বুঝতে মানুষের কয়েক হাজার বছর লেগে গিয়েছিল। প্রাচীন যুগে খালি চোখে পর্যবেক্ষণের যে হিসেব, তার সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হিসেবে কিছু কিছু ভুল ভ্রান্তি ধরা পড়েছে, কিন্তু সেগুলো খুব একটা মারাত্মক নয়। সে কথায় পরে আসবো।

 

প্রাচীন যুগের মানুষেরা দিন ও রাতের হিসেব, সূর্যোদয় – সূর্যাস্ত – সূর্যোদয়, এই নিয়মেই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কৃষি, ও বাণিজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানান বৃত্তি ও পেশার সৃষ্টি হল, তার সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামাজিক জটিলতা যতো বাড়তে লাগল, ততই সময়ের সূক্ষ্মতর পরিমাপ জরুরি হয়ে উঠতে লাগল। প্রথম দিকে দিনও রাতকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হত, এভাবে - ভোর, সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যে, মধ্যরাত্রি, শেষরাত্রি। প্রাচীন ভারতে দিন ও রাতকে ৬০ ভাগে ভাগ করা হত, প্রত্যেকটি ভাগকে বলা হত ঘড়ি। দিন ও রাত প্রত্যেককে আবার চারটি প্রহরেও ভাগ করা হত। আমাদের আধুনিক যে নিয়মে দিন ও রাতকে পরিমাপ করা হয়, সেই ২৪ ঘন্টার নিয়মের সূত্রপাত করেছিলেন ব্যবিলনের বাসিন্দারা - ১৯০০-১৬৫০ বিসিইতে। ৬০ মিনিটে এক ঘন্টা এবং ৬০ সেকেণ্ডে এক মিনিট – এই নিয়মও তাঁরাই শুরু করেছিলেন। 

 

সূর্যঘড়ি (Sun clock or Sun dial)

সব থেকে প্রাচীন ও সহজ যে সময় মাপার যন্ত্রের কথা জানা যায়, তার নাম সূর্য ঘড়ি। এই ঘড়ি সারা বিশ্বেই বহুল প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ছিল। সমতল মাটিতে একটি লম্বা খুঁটি পুঁতে, দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোয়, তার ছায়ার অবস্থান ও দৈর্ঘ থেকে সময়ের আন্দাজ পাওয়া যেত। তবে ঘড়ি হিসেবে সূর্যঘড়ির ব্যবহার সর্বপ্রথম মিশরে শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন।

মিশরের ভ্যালি অব কিংস থেকে পাওয়া প্রথম সূর্যঘড়ির নিদর্শন (১৫০০ বিসিই) - 


চিনের হান সাম্রাজ্যের সমসাময়িক সূর্যঘড়ি (৩০০ - ২০০ বিসিই)


 

ওপরের ছবিতে ইংল্যাণ্ডের সেন্ট মাইকেল’স মাউন্ট পাহাড়ে অবস্থিত দুর্গের প্রাচীরে রাখা মধ্যযুগের উন্নত সূর্যঘড়ি। মাঝের কোনাকুনি খাড়া করা খুঁটির ছায়া দেখে সময় বুঝতে কোন অসুবিধে হত না। 

সূর্য ঘড়ি পরিষ্কার রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের পরিমাপ করতে খুবই উপযোগী ছিল, কিন্তু সমস্যা হত মেঘলা দিনগুলিতে। কারণ সূর্যের আলোয় ছায়া না হলে, এই ঘড়ি অচল! 

 

জলঘড়ি (Water Clock)

প্রাচীন মিশর সভ্যতায় প্রথম জলঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। এই ঘড়ি পরবর্তীকালে প্রাচীন গ্রীসেও বহুল ব্যবহৃত হত। নির্দিষ্ট আকারের একটি পাত্রের নিচের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে, পাত্রে ভরা জল যতক্ষণে খালি হয়ে যেত, সেই সময়কে একঘন্টা ধরা হতো। চিনের ঝাউ রাজাদের আমলে (মোটামুটি ২০০০ বিসিই) এই ধরনের ঘড়ি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।      

আমাদের দেশে প্রাচীনতম যে জলঘড়ির নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার নাম “ঘটিকা যন্ত্র”। ঘটিকা, ঘড়ি শব্দগুলির উৎপত্তি একই শব্দমূল থেকে। লক্ষ্য করে থাকবে আমরা আজও আমন্ত্রণ ও নিমন্ত্রণ পত্রে এবং পূজার নির্ঘন্টে “ঘটিকা” কথা ব্যবহার করে থাকি। প্রাচীন রাজাদের প্রাসাদে এই ঘটিকা যন্ত্রের প্রচলন ছিল। যে রাজকর্মচারীরা এই ঘড়ি ব্যবহার করে সময় ঘোষণা করত, তাদের বলা হত “ঘড়িয়ালি”। নিচের দিকে ছোট্ট ছিদ্রওয়ালা একটি খালি পাত্র, জলভরা একটি বড়ো পাত্রের মধ্যে রেখে দেওয়া হত। বড় পাত্রের জল, ছোট্ট ছিদ্রপথে ছোট পাত্রের ভেতরে ঢুকে, ছোট পাত্রটি জলে ভরে উঠে ডুবে গেলেই – নির্দিষ্ট সময়ের হিসেব পাওয়া যেত। পাত্রের আকার অনুযায়ী, সে সময়ের মাপ হত, কোথাও অর্ধ প্রহর, কোথাও পূর্ণ প্রহর। ঘড়িয়ালিরা ঘটিকা যন্ত্রের হিসেব অনুসারে, কাঠের হাতুড়ি দিয়ে উঁচুতে ঝোলানো কাঁসা বা পেতলের বড়ো ঘন্টা বাজিয়ে প্রাসাদের সকলকে প্রহর বা অর্ধপ্রহর সম্পর্কে অবহিত করত।

 

বালু ঘড়ি (Sand clock or Hour Clock)

বালু ঘড়িতে কিছু মিনিট অথবা ঘণ্টা খানেক সময়ের পরিমাপ করা চলত। এই ঘড়ির প্রথম কোথায় প্রচলন হয়েছিল বলা শক্ত, তবে মধ্য যুগের শুরুতে সারা বিশ্বেই এই ঘড়ির বহুল প্রচলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ছবিতে দেখানো দুটি কাচের ফানুস (Glass Bulbs), কাঠ বা সুদৃশ্য ধাতব ফ্রেমে বসানো থাকত। কাচের ফানুসদুটি মুখোমুখি জোড়া থাকত এবং তার মধ্যে থাকত খুব ছোট্ট একটি ছিদ্র। কাচের ফানুস বানানোর সময়েই তার মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে শুকনো দানাদার বালু ভরে দেওয়া হত। এবার ওপরের ফানুস থেকে সমস্ত বালু নিচের ফানুসে ঝরে পড়তে যে সময় লাগত, সেই সময়কেই ঘন্টা বা কয়েক মিনিটে পরিমাপ করা যেত। ওপরের ফানুসের বালি নিঃশেষ হয়ে গেলে, যন্ত্রটিকে উলটে বসিয়ে দিলেই, আবার চালু হয়ে যেত পরবর্তী সময়ের পরিমাপের জন্যে! 

    

বাতি ঘড়ি (Candle Clock)

চিনা কবি ইউ জিয়ানফুর (৫২০ সিই) কবিতায় প্রথম বাতি ঘড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। এই ঘড়ি বিশেষতঃ রাত্রের সময় পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হত। জাপানে এই ধরনের বাতি-ঘড়ির প্রচলন মোটামুটি দশম শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এই ঘড়িতে সারাদিনের জন্য সাধারণতঃ ছটি উৎকৃষ্ট মোমের বাতি ব্যবহার করা হত এবং প্রত্যেকটি বাতি চার ঘন্টা করে জ্বলত। প্রত্যেকটি বাতির আকার নির্দিষ্ট হত এবং তাতে বারোটি করে সমান ভাগ করা থাকত। এক একটি ভাগ পুড়তে সময় লাগত মোটামুটি কুড়ি মিনিট। বাতি জ্বালানোর পর পুরো যন্ত্রটিকে কাঠের ফ্রেম দিয়ে বানানো কাচের বাক্সে রেখে দেওয়া হত, যাতে বাইরের হাওয়া লেগে, মোমবাতি তাড়াতাড়ি না জ্বলে যায়।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নানা রকমের ঘড়ির প্রচলন ছিল। তার মধ্যে  দীপ-ঘড়ি (Oil-lamp clock), গন্ধ-ঘড়ি (Incense clock) উল্লেখযোগ্য। আমাদের দেশেও প্রাচীন কালে এই দুই ঘড়ির বহুল প্রচলন ছিল। বাতি ঘড়ির মোমের পরিবর্তে, দীপ ঘড়িতে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হত এবং নির্দিষ্ট সলতে দিয়ে দীপ জ্বালানোর ফলে, তেলের পরিমাণ কমে যাওয়া অনুযায়ী সময়ের পরিমাপ করা হত!

             দীপ ঘড়ি                                              গন্ধ বা ধূপ ঘড়ি

গন্ধ ঘড়িকে সহজ ভাষায় ধূপ-ঘড়িও বলা যায়। চন্দন কাঠের গুঁড়ো, ধুনো, গুগ্‌গুল, রজন (Resin)-এর সঙ্গে মিশিয়ে লম্বা এবং মোটা কাঠি বানানো হত। সময়ের হিসেবের জন্যে সেই কাঠির গায়ে নির্দিষ্ট দাগ কেটে দেওয়া হত।       

পরবর্তী সময়ে সেই দাগের ওপর সুতোয় বাঁধা ছোট্ট ছোট্ট ধাতুর বল ঝুলিয়ে দেওয়া হত। ধুপ পুড়তে পুড়তে এক একটি দাগে পৌঁছোলেই দাগের ওপর রাখা সুতো আগুনে পুড়ে যেত এবং ধাতব বলটি পড়ে যেত গন্ধ-ঘড়ির তলায় রাখা ধাতব থালায়। তাতে যে ঠং বা টুং শব্দ হতো তাতে ঘরের লোক সময় সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠত। 

পণ্ডিতেরা বলেন, এই ধূপ-ঘড়ির প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ভারতে এবং বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে এই ধুপ-ঘড়ির প্রযুক্তি তিব্বত ও চিনেও বহুল প্রচলিত হয়েছিল। বৌদ্ধ গুম্ফাতে আজও এই ধূপ-ঘড়ি ব্যবহার হয়ে থাকে, সময়ের পরিমাপ করার জন্যে ততটা নয়, বরং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উপকরণ হিসেবে!

বাতি ঘড়ি কিংবা দীপ ঘড়ির থেকে ধূপ ঘড়ি অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল, তার কারণ ঘরের মধ্যে বাতি বা দীপের আগুনের তুলনায় ধূপের আগুন অনেক নিরাপদ। উপরন্তু ধূপের পবিত্র গন্ধ দীর্ঘ সময়ের জন্যে, ঘরের পরিবেশকে বদলেও দিতে পারে।

এতক্ষণ যে ঘড়িগুলির কথা বললাম, তার মধ্যে ধূপ-ঘড়িটিই আমার খুব পছন্দের! কিন্তু এই ঘড়ির ভরসায় শেয়ালদা থেকে সন্ধে ৭-৪২ এর বনগাঁ লোকাল, অথবা দমদম থেকে সকাল ৬-১৫-র দিল্লির ফ্লাইট ধরা যাবে কি? মনে হয় না, সেক্ষেত্রে অন্য রকম ঘড়ি দরকার, সে সব ঘড়ির কথা বলবো পরের পর্বে।

     পরের পর্ব - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ২ "

শনিবার, ২ মে, ২০২৬

আগুনের পরশমণি - শেষ পর্ব

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "

আগের প্রবন্ধ গল্প - " অস্ত্রের ঝংকার "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " মুদ্রা ও টাকাকড়ি - পর্ব ১ "

ছোটদের প্রবন্ধ -গল্প - " আগুনের পরশমণি - পর্ব ১ "


এর আগের গল্প - " মানিকজোড় "


শেষ পর্ব 


 


    পাথরে ঠোকাঠুকি করলে ছোটখাটো যে আগুনের ফুলকি দেখা যায়, তা দিয়ে কিন্তু আগুন জ্বালানো যায় না। আগুন জ্বালানোর জন্য অনেক বড়ো ফুলকির দরকার হয়, আর যে দুটো পাথর ঘষে আগুন জ্বালানোর মতো ফুলকি তৈরি করা যেত তারা প্রধানতঃ হল ফ্লিন্ট (Flint) আর পাইরাইট (Pyrite) পাথর। এই পাইরাইট যদি লোহা মিশ্রিত হয়, তবে তার ফুলকি হয় সবচেয়ে জোরদার। চক বা চুণাপাথরের (Lime stone) মধ্যে কেলাসিত (crystallized)  একটি বিশেষ কোয়ার্জ (Quartz) পাথরকে ফ্লিন্ট বলে। উপরের ছবিটি প্রস্তর যুগের একটি ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র।  এই ফ্লিন্ট পাথরের বিশেষত্ব হল, একটা বিশেষ দিক থেকে আঘাত করলে, বেশ পাতলা, মসৃণ অথচ শক্ত স্তরে ভেঙে যায়। তারপর একটু ঘষাঘষি করলে, পাথরের ধারালো অস্ত্র বানিয়ে তোলা যেত সহজেই। প্রস্তর যুগের মানুষেরা যখন পাথরের অস্ত্রশস্ত্রই বহুল ব্যবহার করত, তাদের কাছে ফ্লিন্ট পাথরের অস্ত্র ছিল সব থেকে কাজের জিনিষ। পাইরাইট একধরনের খনিজ পাথর, প্রধানত লোহা বা তামার সালফাইড; পাললিক (sedimentary) পাথরের স্তরে মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। বহুদিন পরে মানুষ যখন লোহা আবিষ্কার করতে পেরেছিল, তখনও লোহা আর এই ফ্লিন্ট পাথরের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ব্যবহার করেই আগুন জ্বালাত। সত্যি বলতে আজও আমরা যে গ্যাসলাইটারে লোহার চাকায় চাপ দিয়ে আগুন জ্বালি, তার নিচেয় থাকে ফ্লিন্ট পাথরের ছোট্ট একটা কুচি, যাকে চলতি বাংলায় আমরা চকমকি পাথর বলি।

তখনকার দিনে এই ফ্লিন্ট পাথর আর আয়রন পাইরাইট দিয়ে আগুন জ্বালানোতেও কিন্তু অনেক ঝামেলা ছিল। প্রথমতঃ জরুরি ছিল দক্ষতা এবং ধৈর্য, দ্বিতীয়তঃ শুকনো ঘাসপাতা, ডালপালার যোগাড়। সারা বছরের সামান্য কয়েকটি মাস ছাড়া, বৃষ্টি বা শিশিরের প্রকোপে শুকনো ঘাসপাতা যোগাড় করা এবং সঞ্চয় রাখা কম মুস্কিল ছিল না। তার থেকে আগুনকে না নিভিয়ে, স্তিমিত অবস্থায় জ্বালিয়ে রাখা অনেক সহজ ছিল এবং আগুনের নিয়ন্ত্রণ শিখে যাওয়ার পর, তখনকার মানুষ তাই করত। যদিও এতে বিপদ এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল বিস্তর।

আগুনকে না নিভিয়ে, তাকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে জ্বালিয়ে রাখার চিন্তা ভাবনা থেকেই এসে গেল, জ্বালানি তেলের আবিষ্কার। পৃথিবীতে প্রথম জ্বালানি তেল পশুচর্বি। বড় পাথরের পাত্রে, অনেকটা চর্বিতে ভিজিয়ে রাখা শুকনো ঘাস বা শুকনো শ্যাওলায় আগুন ধরালে, দাউদাউ করে জ্বলে না উঠে, ছোট্ট শিখায় আগুন অনেকক্ষণ জ্বালিয়ে রাখা যেত। এরপর আরো অনেক ভাবনা চিন্তার হাত ধরে, এই আবিষ্কার প্রদীপ হয়ে উঠল। কারণ ততদিনে মানুষ চাষবাস শিখে গিয়ে তৈলবীজের সন্ধান পেয়ে গেছে, তারা জেনে গেছে, তিল, নারকেল, রেড়ি, সরষে এমন নানান বীজ থেকে তেল বের করা যায়, এই তেল রান্নার জন্যেও যেমন ভীষণ উপযোগী, তেমনি স্নিগ্ধ শিখার প্রদীপ জ্বালাতেও দারুণ কার্যকর। আগুনের ভয়ংকর লকলকে শিখাকে সুন্দর স্নিগ্ধ নরম আলোর শিখায় রূপান্তর করাও একটা দারুণ আবিষ্কার। এই প্রদীপ উৎসব, ধর্ম অনুষ্ঠান এবং প্রত্যেকদিনের মঙ্গল আচরণের সঙ্গেও জুড়ে গেল। সেই তেলের প্রদীপের আলোর এমনই মাহাত্ম্য, প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে, আমাদের জীবনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে, আজ এই এত উন্নত বিদ্যুতের আলোর যুগেও!

 

আগুন নিয়ন্ত্রণের পর মানুষের উন্নতির প্রথম ধাপ যদি হয় শীতে হাত-পা সেঁকা, অন্ধকার দূর করা আর রান্না করা, তাহলে তার পরের ধাপ অবশ্যই ধাতু আবিষ্কার। আগুনের ব্যবহার শিখে, প্রথম যে ধাতু তারা নিষ্কাশন করে ব্যবহার করতে শিখল, তার নাম তামা। তামা প্রধান ধাতু হলেও, তার সঙ্গে টিনের মিশ্রণে সংকর ধাতু ব্রোঞ্জেরও বহুল ব্যবহার শুরু হয়, আজ থেকে মোটামুটি হাজার ছয়েক বছর আগে। এই দুটি ধাতুই অস্ত্রশস্ত্র, চাষবাস এবং গেরস্থালির নানান উপকরণে অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। এই কারণে মানবসভ্যতার এই পর্যায়টাকে তাম্রযুগ বলা হয়। আগুনের ব্যবহার না জানলে, এই ধাতুর ব্যবহার, খনিজ পাথর থেকে তামা ও টিন নিষ্কাশন, ব্রোঞ্জের মতো সংকর ধাতু তৈরি, কোনাটাই সম্ভব হত না। এই যুগেই মানুষের সামাজিক কাঠামোটাও দ্রুত বদলে জটিল হতে শুরু করল। দক্ষতা ও কাজ অনুযায়ী মানুষের নতুন নতুন পেশা তৈরি হয়ে উঠতে লাগল। যেমন তামা, ব্রোঞ্জের মতো ধাতু দিয়ে, যারা অস্ত্রশস্ত্র, উপকরণ কিংবা অলংকার তৈরি করত, তারা হয়ে উঠল কারিগর বা শিল্পী, তাদের চাষবাস কিংবা শিকার করতে হতো না। স্থানীয় অঞ্চলে তামার খনিজ না পাওয়া গেল, দূর দেশ থেকে যারা সেই খনিজ কিনে নিয়ে আসত, তারা হয়ে উঠল বণিক। কারিগরদের দক্ষতায় বানানো উপকরণের চাহিদা অনুযায়ী, এই বণিকরাই অঞ্চলের বাইরে, এমনকি দেশের বাইরেও এই সব উপকরণ বিক্রি করত। অর্থাৎ, মানব সভ্যতার দ্রুত উন্নতিতে আগুনের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক এবং সত্যি বলতে আমরা যত ভালোভাবে আগুনকে ব্যবহার করতে শিখেছি, ততই আমাদের সভ্যতা দ্রুত উন্নত হয়েছে।

কিছু মানুষ চিরকালই থাকেন, যাঁরা যে কোন আবিষ্কারের পরেও আরো চিন্তা ভাবনা দিয়ে, মানবজাতির উন্নতির চিন্তা করে যান, আর কিছু মানুষ সেই সব আবিষ্কারকেই অন্য মানুষের ক্ষতি করার কাজে ব্যবহার করে। আগুনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, আগুনের ব্যবহার শিখে মানুষ, অন্য দলের বা শত্রুদের সর্বনাশ করার এক অতি সহজ উপায় হাতে পেয়ে গেল। শত্রুদের বাড়িতে, গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তিরের ডগায় চর্বি মাখানো কাপড়ে আগুন লাগিয়ে, দূর থেকেই গ্রামে আগুন লাগানো। এমন সব যুদ্ধের ভয়ংকর উপকরণও আবিষ্কার করে ফেলল, তখনকার মানুষ। এমন সব তিরের কথা মহাভারতে অনেক আছে। তারপর যখন বারুদ আবিষ্কার করে ফেলল, তখন বারুদ আর আগুন দিয়ে ভয়ংকর সব যুদ্ধের অস্ত্রও বানিয়ে ফেলতে শুরু করল। এরকম অস্ত্র ব্যবহারে যে যত দক্ষ, সেই দেশ বা রাজ্য তত শক্তিশালী হয়ে উঠল।

 

 আগুন ব্যাপারটাকে বেশ ভালোভাবে রপ্ত করে, তাকে নানান কাজে সফল ব্যবহার শুরু হতে কিন্তু আরো অনেকদিন পার হয়ে গেল। আসলে আগুন জ্বলা, তার তাপ আর আলো দেওয়ার ক্ষমতাকে ঠিকঠাক বুঝতেই মানুষের এতদিন সময় লেগে গিয়েছিল। কাজেই আগুন ব্যাপারটা কী, সেটা অল্প কথায় একটু বুঝে নেওয়া যাক।

বিশেষ এক ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া থেকে আমরা যে তাপ আর আলো পাই, সেই তাপ আর আলোকেই আগুন বলি, আর ওই রাসায়নিক প্রক্রিয়াটিকে বলি দহন (combustion)দহনের জন্য তিনটি বিষয় থাকতেই হবে, জ্বালানি (fuel), বাতাসের অক্সিজেন (O2), আর দহন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় তাপ।

জ্বালানি বলতে এতক্ষণ আমরা কাঠ-কুটো, শুকনো পাতা, পশুচর্বি, নানান ভেষজ তেলের কথা উল্লেখ করেছি। এই সমস্ত জ্বালানির মধ্যেই অনেক পদার্থের সঙ্গে একটি মৌল পদার্থ প্রচুর পরিমাণে থাকে, তার নাম কার্বন। মোটামুটি ১৫০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায়, কাঠের মধ্যে কার্বনের যে যৌগ থাকে, সেটি অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু করে এবং তার ফলে আমরা পাই তাপ, প্রচুর জলীয় বাষ্প (H2O), কার্বন ডায়ক্সাইড (CO2), কার্বন মনক্সাইড (CO) এবং আরো নানা ধরনের গ্যাস তৈরি হয়। অক্সিজেনের সঙ্গে এই বিক্রিয়াকে অক্সিডেশান (oxidation) বলে, এই বিক্রিয়া তাপদায়ী (exo-thermic), তার কারণ এই বিক্রিয়া থেকে আমরা তাপ আর আলো পাই।  দহন শুরু করার জন্যে যে জরুরি তাপমাত্রার দরকার হয় তাকে জ্বলন উত্তাপ (ignition temperature) বলা হয়, কাঠের ক্ষেত্রে এই তাপ ১৫০ সেলসিয়াস আগেই বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানির জন্য এই তাপ ভিন্ন হয়ে থাকে।

একবার এই দহন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে, আগুন নিভবে না, কারণ দহনের জন্য যে তিনটি বিষয়ের কথা আগে বলেছি, তার মধ্যে জ্বালানি আর অক্সিজেন যদি থাকে, আগুন তার নিজের উত্তাপেই দহন চালিয়ে যেতে থাকে, অর্থাৎ আগুনের জ্বলতে থাকা একটি শৃঙ্খল-বিক্রিয়া (chain reaction)এই বিক্রিয়াকে বন্ধ করার অর্থ, আগুন নেভানো; সেক্ষেত্রে ওই তিনটি বিষয়ের কোন একটি বিষয়কে সরিয়ে ফেলতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। যেমন, যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, অথবা পাথর, বালি কিংবা বড়ো পাত্র চাপা দিয়ে যদি বাতাসের অক্সিজেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। অথবা জল বা অন্য কোন অদাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ঢেলে, আগুনের উত্তাপকে যদি শীতল করে দেওয়া যায়।

এই লেখার প্রথম পর্বের সেই আদিম যুবক, যে প্রথম আগুন নেভাতে এবং জ্বালাতে শিখেছিল, সে এত সব জানতই না এবং সত্যি বলতে আগুন জ্বলা ও নেভার এই রহস্য বুঝতে বুঝতে আমাদের প্রায় একলাখ পঁচিশ হাজার বছর পার হয়ে গেল!

আগুনের এই রহস্য বুঝে ফেলার পর মানুষ উন্নত মানের জ্বালনির সন্ধান শুরু করল। বহুদিন পর্যন্ত আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাঠ, নানান ভেষজ তেল, পশুচর্বির ব্যবহার হত, একথা আগেই বলেছি। তার থেকে অনেক ভাল জ্বালানি হল কয়লা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাটির ওপরেই পাওয়া কিছু কিছু কয়লার ব্যবহার মোটামুটি তিন হাজার বছর আগে থেকে চালু হলেও, খনির মধ্যে কয়লার সন্ধান এবং সেখান থেকে কয়লা তুলে, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার শুরু হল মোটামুটি দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। সেই সময় অবশ্য কয়লা প্রধানতঃ ব্যবহার হত ঘরের কাজে, চূণভাটি আর ধাতু নিষ্কাশনের ছোটখাটো কারখানায়কিন্তু কয়লার ধোঁয়ার দূষণ থেকে বহুলোকের শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়াতে, ১৩০৬ সালে কয়লার ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সময়, মোটামুটি ১৭৬০ থেকে ১৮২০ বা ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ধরা হয়।  জলকে বাষ্প করে তার শক্তিতে নানান ইঞ্জিন চালানো, সেই ইঞ্জিন দিয়ে বড়ো বড়ো কারখানা তৈরি হতে লাগল। কারখানা ও উন্নত যন্ত্রপাতি বানাতে বেড়ে গেল লোহার ব্যবহার। লোহা ও অন্যন্য ধাতু নিষ্কাশনের জন্যেও বিশাল বিশাল কারখানার প্রতিষ্ঠা হতে লাগল। সেই সময় ইউরোপে শিল্পের এই অদ্ভূত উন্নতির জন্য সবথেকে বেশি জরুরি ছিল উচ্চ তাপমাত্রার আগুন, আর সেই আগুনের জন্যেই সারা বিশ্ব জুড়ে খনি থেকে কয়লা তোলার কাজও শুরু হয়ে গেল।

ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের মাঝামাঝি সময়েই কয়লা-পোড়ানো আগুনে জল ফুটিয়ে বাষ্পশক্তির প্রয়োগ করে সূচনা হল রেল ব্যবস্থার ইঞ্জিন। বেশ কম খরচে বহু যাত্রী ও পণ্য বহন করা শুরু হল লোহার রেলপথ বিছিয়ে, তার ওপর দিয়ে ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি ছুটিয়ে। সারা বিশ্বেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল এই রেলপথ ও রেলগাড়ি। বিশ্বজুড়ে হিড়িক পড়ে গেল রেলগাড়ি চালানোর। এমনকি এই বাষ্প-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের জাহাজ এবং নদীতে স্টিমারও চালু হয়ে গিয়েছিল। শেষ হয়ে গিয়েছিল দাঁড়-টানা বৈঠা-বাওয়া পালতোলা জাহাজের যুগ।     

         

আজ যে বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের সভ্য জীবন অচল হয়ে উঠেছে, এর পেছনেও আগুনের অবদান সব থেকে বেশি। আজ সারা বিশ্বে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তার অধিকাংশই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Thermal Power Station)সেই তাপ বিদ্যুৎ কারখানাতেও কয়লা পুড়িয়ে আগুন জ্বালতে হয়, জলকে বাষ্প করার কাজে। আর সেই বাষ্পের তীব্র ধাক্কায় টার্বো জেনারেটর ঘুরিয়ে উৎপন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে যায় আমাদের ঘরে ঘরে। এই বিদ্যুৎ দিয়েই শুরু হয়ে গেল রেল চলাচল ব্যবস্থাও। সারা বিশ্বে এখন বাষ্প-চালিত ইঞ্জিনের রেলগাড়ি প্রায় উঠে গেছে, অধিকাংশই এখন ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। ইলেক্ট্রিক ট্রেনে যাত্রা করার সময়েও মনে রেখো, তার বিদ্যুৎটি সরবরাহ হচ্ছে তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের  কয়লা পুড়িয়ে জল ফোটানো বাষ্প দিয়ে চালিত টার্বো জেনারেটর থেকে।

 বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কয়লার বিকল্প হিসেবে আগুন জ্বালানোর নতুন ইন্ধন এসে গেল - খনিজ তেল। ভূগর্ভের অনেক নীচে জমে থাকা প্রাকৃতিক এই খনিজ তেলকে তুলে এনে, পরিশ্রুত করে আমরা উৎপন্ন শুরু করলাম, নানা ধরনের ইন্ধন-তেল, যেমন অ্যাভিয়েশন ফুয়েল, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন ইত্যাদি। অ্যাভিয়েশন ফুয়েল দিয়ে – উড়োজাহাজ চালানো হয়। পেট্রল, ডিজেলে চলে ছোট গাড়ি বড়োগাড়ি, এমনকি দুরন্ত গতি রেলের ইঞ্জিনও। আর গৃহস্থালির আগুন জ্বালাবার কাজে লাগে কেরোসিন। খনিজ ইন্ধনের আরেকটি প্রকার হল, প্রাকৃতিক গ্যাস। ভূগর্ভের ভাণ্ডার থেকে এই গ্যাস তুলে এনে, লোহার সিলিণ্ডারে ভরে আমাদের ঘরে ঘরে সরবরাহ করা হয় রান্নার জন্যে।         

  অতএব, আজ আমাদের সভ্যতা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা মানুষ হিসেবে যে বিজ্ঞানের জন্যে এত গর্ব অনুভব করি, তার পিছনে সেই আদিম লোকগুলির অবদান আমরা যেন ভুলে না যাই। তাদের সেই কৌতূহল বা আগ্রহ যদি না থাকত, আমরা হয়তো কোন গুহার অন্ধকারে আজও ভয়ে মায়ের কোল ঘেঁষটে শুয়ে থাকতাম। এই লেখা পড়ে মজা পাওয়াটা তোলা থাকত আরো কয়েক হাজার বছর পরে!  

-০-

পরের প্রবন্ধ গল্প - " ঘড়ি করে টিক টিক - পর্ব ১ "

 

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...