গোলমেলে ফুটবল ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
গোলমেলে ফুটবল ক্যোয়ারীর জন্য প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ তারিখ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৪

গোলমেলে ফুটবল

 




এর আগের ছোটদের গল্প - " চিংড়ি লো চিংড়ি "

 গত বুধবার যা হল, সে আর বলার কথা নয়। আমাদের ঝিঙেপোতা সবুজ সংঘের সঙ্গে ওপাড়ার সুহৃদ সংঘের ফুটবল ম্যাচ ছিল। তার যা রেজাল্ট হল, তাতে পাড়ায় আমাদের মুখ দেখানোই দায় হয়ে উঠল। খেলায় হার জিত আছে, সে আর কে না জানে? খেললে সব সময় জিততেই হবে, এমনও হয় না। কিন্তু তাই বলে এমন হার? ছ্যাঃ। ক্রিকেট খেলায় ছাব্বিশ রানে দু উইকেট হামেশা হয়, কিন্তু ফুটবলে, ২৬-২ গোলে হারা! আমার এই আট বছরের ফুটবল জীবনে কোনদিন ঘটে নি। সুহৃদ সংঘের ছাব্বিশ গোল, আর আমাদের দু গোল, সে গোল দুটো অবশ্য আমারই দেওয়া! আমিই এই দলের ক্যাপ্টেন বীরু।

আমাদের এই মিলনপল্লীর মাঠে সাত-আটজনের টিম করে আমরা ফুটবল খেলি। ছোট মাঠ তো, দু একবার চেষ্টা করে দেখা গেছে, বাইশজন মাঠে নামলে সেটা আর খেলা থাকে না, মেছো হাট হয়ে যায়। হাতে পায়ে জট লেগে যায়। স্কুলের গরমের ছুটিতে, এই মাঠেই আমাদের পাড়ার যত লিগ ম্যাচগুলো হয়। আর স্কুল খোলার আগে সেমি ফাইন্যাল, ফাইন্যাল হয়ে, লিগ শেষ হয়ে যায়। চ্যাম্পিয়ন ক্লাবের ঘরে ‘ঝিঙেপোতা শ্রীমতীসৌদামিনীদেবী স্মৃতি ফুটবল উন্নয়ন সমিতি’র কাপ ঢুকে পড়ে। ক্লাবঘরে নড়বড়ে টেবিলের ওপর শুকনো ফুলের মালা পড়ে চকচকে কাপ, সারাবছর শোভা পায়।

গতবার এই কাপ আমাদের ক্লাবে ছিল। লিগ শুরু হবার আগে উন্নয়ন সমিতির সেক্রেটারির কাছে সে কাপ ফেরত চলে গেছে। এবারের লিগ শেষে, সেই কাপ কোন ক্লাবের ঘরে যাবে সেটাই এখন দেখার। কিন্তু আমাদের আজকের খেলার যা নমুনা, তাতে এবার আমাদের হাতে যে চা খাবার কাপও জুটবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। আমাদের টিমে সেন্টু আর ভজা পিটোপিঠি দুই ভাই, দুজনেই সেরা খেলোয়াড়। ভজা বড়ো, আর সেন্টু বছর দুয়েকের ছোট। সেন্টু খেলে ফরওয়ার্ডে আর ভজা গোল পোস্ট সামলায়। আমাদের মাঠে গোলপোস্ট একটাই, মাঠের পশ্চিমদিকে, বাঁশের কাঠামো। আর উল্টোদিকে পাইনদের পোড়ো বাড়ির উচুঁ পাঁচিলে হলুদ রঙে আঁকা অন্য গোল পোস্ট

আমাদের সেন্টু পায়ে একবার বল পেলে, সে বল তার পা ছাড়ে না। চুম্বকের সঙ্গে কাঁচা লোহার মতো বলটা তার পায়েই যেন চিপকে থাকেসে বল গোলে ঢোকার আগে সেন্টুর পা ছাড়ে। অথচ আজ তার পা থেকে একটা গোলও পাওয়া গেল না। যে কবার বল পেয়েছে, সুহৃদ সংঘের ছেলেদের পায়ে বল তুলে দিয়ে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।  আর যে কটা গোলে শট নিয়েছে, বল উড়ে গেছে গোলপোস্টের অনেক বাইরে দিয়েফুটবলে ভাগ্যিস ওয়াইড বল হয় না, হলে আমাদের হয়তো পেনাল্টি খেতে হত।

ওদিকে আমাদের ভজা তালপাতার সেপাইয়ের মতো ঢ্যাঙা আর হাড্ডিসার চেহারা হলে কি হবে, দারুণ ছটফটে। ডিগবাজি দিয়ে, লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে, গোলমুখি বলকে খপাৎ করে পাকড়াও করে ফেলে। ঠাকুমার মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় পবনপুত্র হনুমান নাকি, ভোরের সূর্যকে টুকটুকে ফল ভেবে, আকাশ থেকে টুক করে পেড়ে এনেছিলেন। আমাদের ভজুও সেরকমই শূণ্য থেকে, যখন তখন দু হাতে গোলমুখি বল নামিয়ে আনতে পারে। আজকে পারল না। একটা বলও ধরতে পারল না। মাগুর মাছের মতো গোলমুখি বলগুলো ভজার পায়ের ফাঁক দিয়ে বগলের তলা দিয়ে, আর হাত ফস্কে একের পর এক গোলে ঢুকে গেল। ভজা নিজে এবং আমরা বাকি সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম তার আজকের এলেম

সেদিন খেলা শেষ হবার মিনিট আটেক আগেই খেলা অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল, নাহলে আরও কতো গোল আমাদের কপালে লেখা ছিল কে জানে! হয়েছিল কি, সেকেণ্ড হাফে সুহৃদসংঘ পাইনবাড়ির দেওয়ালের দিকের গোলপোস্ট সামলাচ্ছিল। সেন্টু গোল থেকে সাত ফুট দূর থেকে এমন একটা শট মারল, বল চলে গেল পাইন বাড়ির উঁচু পাঁচিল টপকে ভেতরের আগাছার জঙ্গলে। শেষ বিকেলে ওই আগাছার জঙ্গল থেকে বল খুঁজে আনার মতো বুকের পাটা আমাদের ছিল না। আর বল খুঁজে এনে শেষ আট মিনিটে চব্বিশটা বকেয়া গোল শোধ করে, আমরা খেলায় সমতা আনবো, এমন আশাও ছিল না। কাজেই আমি, আমার দলের ক্যাপ্টেন, সকলের সঙ্গে কথা বলে, হার স্বীকার করে নিলাম আর সিদ্ধান্ত দিলাম, আজকের মতো খেলা এখানেই শেষ। আর পাইনবাড়ির ভেতরে চলে যাওয়া বলটা আমাদেরই ক্লাবের বল। কাজেই ওটা ফিরিয়ে আনার কোন তাড়া নেই, কাল সকালে ধীরেসুস্থে নিয়ে এলেই হবে।

খেলা শেষ ঘোষণা হওয়ার পর রেফারি সুমন্তদা চলে গেলেন। কিছুক্ষণ থেকে, আমাদের কাটা ঘায়ে নুন-টুন ছিটিয়ে চলে গেল সুহৃদসংঘের ছেলেরাও। আমরা আটজন, সাতজন খেলছিলাম, আর হাবু একস্ট্রা, গোল হয়ে বসলাম মাঠের ধারে, পাইনবাড়ির দেওয়ালটা পিছনদিকে রেখে। তেমন কিছুই বলার ছিল না। ছাব্বিশটা গোল খেয়ে আমাদের অবস্থা কাহিল। 

হাবু ঘাসের একটা চিকন ডগা চিবুতে চিবুতে বলল, ‘সেন্টুকে কিছুক্ষণ রেস্ট দিয়ে আমাকে নামাতে পারতিস। বীরু, বরাবর দেকেচি সেন্টুর ব্যাপারে তুই একদম অন্ধ'।

আমি একথার কী আর উত্তর দেব? ক্যাপ্টেন হিসেবে এমন কথা আমাকে এখন শুনতেই হবে। আমি তো জানি হাবুর এলেম, সেন্টুর ধারে কাছেও দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু আজকে যা হল, কিছু বলার মতো আমার আর মুখ নেই। কে জানে, হাবু খেললে, আমি আর ও মিলে হয়তো আরো কয়েকটা গোল শোধ করা যেত। হাবুর কথার উত্তর না দিয়ে আমি সেন্টুর দিকে তাকালাম। জিগ্যেস করলাম, ‘তোর আজ কি হল বলতো, সেন্টু? আজ তোর কিচ্ছু ঠিকঠাক হচ্ছিল না। না পারলি বল পায়ে রাখতে। না পারলি একটাও ঠিকঠাক পাস দিতেনিজে শট নিয়ে গোলে একবারও বল ঢোকাতে পারলি না। এমন তোর কোনদিন দেখিনি’।

আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস আর ব্যাজারমুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সেন্টু বলল, ‘আউট অফ ফর্ম। বুঝেছিস বীরু, আজকে একদম আউট অফ ফর্মে ছিলাম। প্রথম থেকেই খুব নার্ভাস লাগছিল। পায়ে বল এলেই মনে হচ্ছিল, এটা কি রে বাবা, গোলমতো বলটাকে কিভাবে সামলাবো। বলের ঠিক কোনখানে মারলে ঠিকঠাক পাস হবে বুঝতে বুঝতেই সুহৃদ সংঘের ঝন্টু নয়তো মিল্টন বলটা কেড়ে নিচ্ছিল।‘

‘সে তো নেবেই, খেলতে নেমে তুই বল নিয়ে গবেষণা করবি, আর অন্য সবাই দাঁড়িয়ে দেখবে তাই হয় নাকি?’ বিরক্ত হয়েই বললাম সেন্টুকে। 

সেন্টু মাথা ঘাড় চুলকে বলল, ‘সেই। সেটাই তো। কিছুতেই বুঝতে পারলাম না, কিভাবে শট মারতে হবে। বলটা এমন গোল না হয়ে একটু ট্যাপা মতো হলে, আমার মনে হয় খেলার সুবিধে হতো’।

সেন্টুর এই কথায় আমাদের দলের সবাই হেসে উঠল হ্যা হ্যা করেআমি আরো বিরক্ত হলাম, আর অবাকও হলাম। আমাদের দলে আমি আর সেন্টু একসঙ্গে খেলছি, প্রায় বছর চারেক হতে চলল। আমাদের রেকর্ড আছে আঠারোটা পর্যন্ত গোল করার। গতবারই আমাদের ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, আর সেন্টু হয়েছিল সবচেয়ে বেশি গোলদাতা। ১৫৮টা গোল দিয়েছিল, কুড়িটা ম্যাচেতার মুখে একথা শুনে আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না। 

হতাশ হয়ে আমি এবার ভজাকে জিগ্যেস করলাম, ‘হ্যাঁরে ভজা, তোর কি মনে হয়, ফুটবলের সাইজটা কেমন হওয়া উচিৎ? তোরা দুই ভাই আজকে বাড়ি থেকে কী খেয়ে এসেছিস বলতো? একটা গোলও সেভ করতে পারলি না? চারটে গোল তো, গড়ানে বলে হল। তোর জায়গায় লালুকে দাঁড় করিয়ে দিলেও, অন্ততঃ ওই চারটে গোল কম খেতে হত’।

লালু আমাদের পাড়ারই কুকুর, আমাদের পায়ে পায়ে ঘোরাঘুরি করে, অন্যদিন আমদের দলের ঠিক পিছনেই সামনের থাবায় মুখ রেখে, চুপচাপ শুয়ে থাকে। আজকেও রয়েছে, কিন্তু বেশ খানিকটা তফাতে। ভয়ে ভয়ে দেখছে আমাদের দিকে, আর মাঝে মাঝেই মুখ তুলে ডাক ছাড়ছে, ‘ওওওউউউউউ’। আমাদের দুর্গতি দেখে লালুও কি হতাশ হয়ে আমাদের সঙ্গ ছাড়ল? কে জানে?

ভজা সেন্টুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বলটা বড্ডো গোল, এত গোল বলে খেলা যায় নাকি? হাত দিয়ে ধরবো কি করে, খালি ফস্কে যাচ্ছিলতাছাড়া কে যে কখন কোনদিক থেকে ধড়াম ধড়াম করে শট মারছে, বুঝবো কি করে? এই ডান দিক থেকে, এই বাঁদিক থেকে। কখনো ওপরে, কখনো নিচে। এ আবার কি? গোলে শট মারার একটা বাঁধাধরা নিয়ম থাকবে তো! সে সবের কোন বালাই নেই!’

ভজার উত্তর শুনে এবার কিন্তু কেউ হাসল না। সবাই গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে। আমিও চুপ করেই রইলাম, এ কথার কি উত্তর আমার জানা নেই। এই সমস্যার সমাধানটাই বা কি? আমার মাথাতে এলো না।  ভজা আমাদের দিকে তাকিয়ে ছোটভাই সেন্টুর দিকে তাকাল। তারপর নিজেদের মধ্যে চোখে চোখে ইশারা করে আমাদের বলল, ‘উঠলাম রে, বীরুকালকে কোন খেলা নেই তো’?

‘না, কাল নেই। পরশু আছে। তবে আমরা আর খেলব না’। আমি গম্ভীর মুখে উত্তর দিলাম।

‘কেন?’ সেন্টু জিগ্যেস করল।

‘কেন, আবার কি? এই খেলা খেলে লোক হাসিয়ে কী হবে’? আমি একটু ঝাঁজিয়ে উত্তর দিলাম। ‘তার ওপর তোরা যা বললি; কথা বলে দেখি বলটাকে ট্যাপা বা চ্যাপ্টা কিংবা চৌকোণা করা যায় কিন!’ ওরা যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছিল,  আমি ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম

‘দ্যাখ কি হয়’। বলে,  ভজা সেন্টুর কাঁধে হাত রেখে আস্তে আস্তে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল। আমরা ওদের দিকেই দেখছিলাম। পাইনদের পাঁচিল বরাবর হেঁটে, পাঁচিল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরে গেল, আর দেখা গেল না।  

আমরা ছ’জন এবার নিজেদের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমাদের সকলেই প্রায় একসঙ্গে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। চুপ করে বসেইছিলাম, বুদ্ধ প্রথম কথা বলল, ‘কেসটা কি বলতো, বীরু?’

‘কিছুই বুঝতে পারছি না’। আমি বললাম।

‘এবারের লিগটা মাঠে মারা গেল, মনে হচ্ছে’, দীপু বলল।

‘কুছু হয়নি, আমরা ও দোনোকো ছেড়েই খেলবো। হাবু আছে, নিমাই আছে, জিতেনভি আছে’। ভিকি বলল। ভিকি বছর দুয়েক হল আমাদের পাড়ায় এসেছে, বিহারিবাংলা বোঝে, তবে বাংলা বলে মিলিয়ে মিশিয়ে

‘ভিকি একদম ঠিক বলেছে। সেন্টু আর ভজার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বলে, লিগ খেলা ছেড়ে দিতে হবে নাকি? ওদের ছাড়াই আমরা খেলব। তুই কাল সকালেই সবাইকে ডাক, বীরুকাল বিকেলে আমাদের ম্যাচ নেই, কাল বিকেলেই আমরা নিজেদের মধ্যে প্র্যাকটিস খেলা খেলে নেব’। নরেনের এই কথায় সবাই সমস্বরে সায় দিল। 

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তাই হবে। কাল সকালে ভিকি আর দীপু আমার সংগে চল, নিমাই আর জিতেনের সঙ্গে কথা বলে নেব’। সকলেই আমার কথায় সানন্দে বলে উঠল, ‘ইয়েস, হারি বা জিতি যাই হোক, লিগ খেলা আমরা ছাড়বো না’। আমি চিন্তিত মুখে বললাম,

‘কিন্তু, সেন্টু আর ভজার কি হল, বল তো? এতবছর ধরে দিব্বি ভালো খেলছিল, হঠাৎ আজ এরকম খেলার ছিরি! তার ওপর আবার বলে কিনা, বলের শেপ পাল্টাতে হবে! আমার কিন্তু ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না!’

‘তোর কি মনে হচ্ছে, বল তো?’ হাবু আমাকে জিগ্যেস করল। 

আমি গভীর চিন্তা করতে করতে বললাম, ‘মগজে কিছুই ঢুকছে না’।

এই কথাটা আমি শেষ করেছি কি করিনি, হঠাৎ আমার পিঠে ধাঁই করে এসে নামল, আমাদের হারিয়ে যাওয়া বলটা। আমি পাইনদের পাঁচিলের দিকে পিঠ করে বসেছিলাম। মনে হল, পাঁচিলের ওপার থেকে কেউ বলটা ছুঁড়ে দিল। তবে কি সেন্টু আর ভজা ওপাশে গিয়েছিল বলটা খুঁজতে? আমরা এখানে আছি জেনে, ওরাই ছুঁড়ে দিল বলটা? নিশ্চয়ই তাই। কিন্তু এই আধো সন্ধ্যেবেলায়, সেন্টু আর ভজা পাইনদের ওই পোড়ো বাড়িতে ঢুকল কি করে? ও বাড়ির অনেক বদনাম আছে, দিনের বেলাতেই লোকে ঢুকতে সাহস পায় না, আর এই সন্ধেবেলায়, ওরা দুজনে...! নাঃ, আজ ওরা দুইভাই একটার পর একটা চমক দিয়েই চলেছে!

লালু একটু আগে আমাদের কাছে এসে শুয়েছিল রোজকার মতো। এখন এই বলটা ধুপ করে এসে পড়াতে, দৌড়ে পালিয়ে গেল অনেকটা দূরে, তারপর পাইনদের পোড়ো বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আর্ত স্বরে ডাকল, ‘ওওওউউউউউ’।

 

 সাড়ে আটটার সময় আমার টিউসনের মাস্টারমশাই চলে যাবার পর, পড়ার টেবিলে অংকের খাতা নিয়ে আমি আবার বসলাম। স্কুলে ছুটি বলে লেখাপড়ায় ফাঁকি দিলে মা খুব রেগে যান। এদিকে আমার মনে হয় সারাদিন লেখাপড়া করলেই হবে? খেলাধুলো করতে হবে না? গপ্পের বইও তো পড়তে হবে নাকি? মা সেটা বুঝতে চান না। অতএব, হাতে পেন নিয়ে, অংকের বই খুলে, অংকের লম্বা খাতার নিচেয় রেখে, আমায় টিনটিন পড়তে হয়। ‘আমেরিকায় টিনটিন’এর প্রথম পাতা পড়ে সবে দ্বিতীয় পাতায় যাবো, ঘাড়ের কাছে জানালার বাইরে থেকে সেন্টুর গলা পেলাম,

‘অ্যাই, বীরু, কি করছিস’? আমাকে এমন চমকে দেওয়ার জন্যে খুব রাগ হল আমার, বললাম,

‘দেখছিস তো পড়ছি। জিগ্যেস করছিস কেন’?

‘পড়ছিস? ছাই পড়ছিস। পড়ছিস তো টিনটিন’।

‘বেশ করেছি, তাতে তোর কি’?

‘কাকিমাকে বলে দিলে, বুঝবি আমার কি!’

এবার আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম সেন্টুর দিকে। ভালো জামা-প্যান্ট পড়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে কোথাও যাবে, বিয়ে বাড়ি কিংবা কোন নেমন্তন্ন বাড়ি। আমার দিকে তাকিয়ে হতচ্ছাড়া ভুরু নাচাচ্ছে! মাকে বলে দিলে আর রক্ষে নেই। 

আমি একটু নরম সুরে বললাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, কি বলবি বল?’

‘আজকে খেলার কি রেজাল্ট, রে? আজকে মা বাবা এমন করল না, কিছুতেই ছাড়ল না –’

আমি রাগে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলাম প্রায়, সামলে নিলাম। সারাক্ষণ মাঠে খেলে, তারপর এত কাণ্ডের পর এসেছে আমার কাছে খেলার রেজাল্ট জানতে! আমি আবার ঝাঁজালো সুরে বললাম, ‘ইয়ার্কি করিস না, সেন্টু। তুই জানিস না, খেলার কি রেজাল্ট’?

‘কি করে জানবো। আমি আর দাদা তো মা বাবার সঙ্গে জেঠুর বাড়ি গেছিলাম অনন্তপুরে, এই ফিরছি। আমরা কিছুতেই যাব না, মা-বাবাও আমাদের না নিয়ে যাবেন না। তোকে একবার যে এসে বলে যাবো, তাও পারলাম না রে’।

‘তার মানে, বলতে চাস, বিকেলে তুই আর ভজা আমাদের সঙ্গে খেলিস নি’?

‘না। কি করে খেলবো? আমরা তো এই মাত্র ফিরলাম। এখনো জামা কাপড় ছাড়িনি, তার আগেই চলে এলাম তোর সঙ্গে দেখা করতে!’

‘ইয়ার্কির সীমা আছে, সেন্টু। ভাবিস না এই সব কথায় আমি ভুলে গিয়ে তোদেরকে পরশু আবার খেলতে নেব। আমাকে অত বোকা ভাবিস না’।

‘তার মানে? আজ খেলতে পারলাম না বলে, পরশু আমাদের খেলতেই নিবি না? ক্যাপ্টেন বলে তুই যা খুশি করবি নাকি?’

‘আজ তুই একটাও গোল করতে পারলি না। ভজা একটাও গোল সেভ করতে পারল না। গোটা দলটাকে তোরা দুজনে ডুবিয়ে দিলি। আবার তোদের খেলায় নেব?’

‘কি আজেবাজে বকছিস, বীরুআমরা খেলতেই আসতে পারলাম না, তাতে গোল করা, গোল সেভ করার কথা আসছে কি করে?’

‘আমিও তো সেই কথাই বলছি, আজ তো তোরা খেলতেই পারলি না, আমাদের টিম গো হারা হারল’।

‘আরে বাবা, আমিও তো বলছি, আমরা তো ছিলামই না, খেললাম কখন’?

‘সত্যিই তাই, তোরা খেললি কখন, পুরোটাই তো ছেলেখেলা করলি’।

‘দিন-কে-দিন তুই বেশ গাধা হয়ে উঠছিস, বীরু পঞ্চাশবার বলছি, আমরা অনন্তপুর গিয়েছিলাম, জেঠতুতো দিদির ছেলের অন্নপ্রাশনে, ঝিঙেপোতায় আমরা সারাদিনই ছিলাম না। তবু তুই এক কথা বলে চলেছিস’।

‘তোরা আজ সারাটা বিকেল আমাদের সঙ্গে খেলিস নি’?

‘না’।

‘আমরা আজ ২৬-২ গোলে হেরেছি তোরা জানিস না’?         

‘২৬-২? এ রাম। এতটা খারাপ হবে আমরা বুঝিনি রে, বীরু! হাবু খেলেনি? কিংবা নিতাই, জিতেন?’

সেন্টুর এই কথায় আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। বললাম, ‘খেলার শেষে, বলটা গোল না হয়ে, ট্যাপা হলে ভালো হয়, তুই বলিস নি’? আমার কথায় সেন্টু খুব হাসল,

‘হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা, ফুটবল কখনো ট্যাপা হয় নাকি? এ আবার একটা কথা হল’?

‘বাড়ি ফেরার পথে পাইনদের বাড়ির ভেতর থেকে আমাদের বলটা তুই আমার পিঠে ছুঁড়িস নি?’

‘কখন বল তো, আজ’?

‘হ্যাঁ আজ। খেলা শেষ হয়ে যাবার পর আমরা মাঠে বসেছিলাম। তখন সন্ধে হবো হবো করছে’।

‘তুই পাগল হয়েছিস, বীরুতুই জানিস আমি কিরকম ভিতুসন্ধে বেলায় আমি যাবো ওই পাইনদের পোড়ো বাগানে, বল খুঁজতে? আমাকে কি ভূতে পেয়েছে’?

‘ভূত’? এই কথা শুনে আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল।

‘অ্যাই বীরু, কি হয়েছে, কিসের ভূত’?

‘আমাদের সঙ্গে তোরা, নাকি ওরা যে খেলছিল, ওরা কি তবে... ?’

 

চেয়ার উল্টে পড়ে যেতে যেতে আমি শুনলাম, জানালার বাইরে থেকে সেন্টু ডাকছে, ‘অ্যাই বীরু, বীরু, কি হল কী তোর?’  ওদিকে চেয়ার উল্টে পড়ার বিকট শব্দে, মায়ের গলা শুনতে পেলাম, ‘ও কিরে বীরু, চেয়ার থেকে পড়ে গেলি নাকি রে? কি হয়েছে, বীরু’?

মা দৌড়ে আসছেন আমার কেমন যেন সব অন্ধকার হয়ে গেল।

 -০০-

 ছোটদের পরের গল্প পাশের সূত্রে - " সহযাত্রী "



["তেঁনারা" গ্রন্থে গল্পটি সংকলিত।]

গ্রন্থটির ই-বুক পেতে হলে এই লিংকে গিয়ে অর্ডার করুন - 

https://play.google.com/store/books/details/%E0%A6%A4_%E0%A6%A8_%E0%A6%B0_TENARA_TENARA_JOYDHAK_PRAKASHAN?id=Nvn8EAAAQBAJ&hl=en-US&pli=1

বুধবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৪

সহযাত্রী

 

এর আগের ছোটদের গল্প - " গোলমেলে ফুটবল "






       [ এই গল্পটি যেমন পড়া যাবে তেমনই শোনাও যাবে, নীচের You Tube Link থেকে - 

                    https://www.youtube.com/watch?v=Wi-3ua61leU&t=703s 

            গল্পপাঠটি উপস্থাপন করেছে "গল্প যখন তখন" টিম - তাঁদের জানাই কৃতজ্ঞতা।  ]



বিশালাক্ষীপুর পার হয়ে ট্রেনটা আচমকা ব্রেক মেরে থমকে গেল। তার লোহার হাতপায়ে এমন আওয়াজ উঠল, আমার পিলে চমকে যাওয়ার যোগাড়। তার কারণও আছে, একে তো আমি যে কামরায় বসে আছি, সেটায় একজন লোকও নেই।  কামরার জানালা দিয়ে বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না, এমন অন্ধকার। তার ওপর কী হল কে জানে, আচমকা ব্রেক মারতেই কামরার ভেতরের লাইটগুলোও, ঝপ করে নিভে গেল একসঙ্গে।

অথচ হাওড়া থেকে এই ট্রেনে যখন উঠেছিলাম, কামরায় পা রাখার জায়গা ছিল না, এত্তো ভিড়। নানা বয়সের লোকজনের কথাবার্তায় কামরা গমগম করছিল। তার ওপর ছিল ভেণ্ডারদের ডাকাডাকি। “অ্যাই, চা। চা গরম”“সল্টেড বাদাম, ডালমুট, চিপ্‌স্‌স্‌স্‌”। “ঝালমুড়ি, মশলামুড়িইইই”। “পতিতের বিখ্যাত আলুরদম, ঘুগ্‌নি”। সে সব হইচই হট্টগোল একটু একটু করে কমতে লাগল। ব্যাণ্ডেলে এসে বসার সিট পেয়ে গেলাম, তাও জানালার ধারে! তারপর থেকে ট্রেন যতই ছুটছিল আর থামছিল, লোক কমছিল ততই। বিশালাক্ষীপুরে ট্রেন দাঁড়াতে, পুরো কামরা খালি। একলা আমিই বসে রইলাম জানালার কাঠে কনুইয়ের ভর দিয়ে, গালে হাত রেখে। আমার গন্তব্য হাবিবগঞ্জ, এই ট্রেন ওই অব্দিই যাবে। আজ রাত্রে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে, কাল ভোরে আবার রওনা হবে হাওড়ার দিকে।

ট্রেনটা হাওড়া থেকেই ছেড়েছিল মিনিট কুড়ি লেটে। সত্যি বলতে, লেট না হলে আমি ট্রেনটা ধরতেই পারতাম না। তখন অনেকে বলেছিল, এটুকু লেট, ব্যাণ্ডেলের পর মেক আপ করে নেবে। কিন্তু সে আর হয়নি, উলটে লেট বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় দেড়ঘণ্টাঠিকঠাক চললে, এতক্ষণ আমার পিসিমণির বাড়ি পৌঁছে, জল-পেঁয়াজি-মুড়ি চা খেয়ে আইপিএল দেখার কথা। সে তো হলই না, বরং যা অবস্থা, তাতে কতক্ষণে পৌঁছোব সেটাই এখন দেখার। মোবাইলের পর্দায় দেখলাম, এখনই বাজছে সাড়ে আটটা। বিশালাক্ষীপুর থেকে হাবিবগঞ্জ আধঘন্টার পথ। পিসিমণি নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন। ফোনে যে বলে দেব, তারও উপায় নেই। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই ফোনে নেটওয়ার্ক আসছে না। ফোনে চার্জের অবস্থাও সুবিধের নয়। জ্বালিয়ে রাখতে ভরসা হচ্ছে না। কে জানে পরে যদি দরকার হয়।  

আমি যাকে বলে ভিতু টাইপের ছেলে, তা কিন্তু মোটেই নয়। কিন্তু অন্ধকার কামরায় একলা! অন্ধকার যে এত ঘন থকথকে কাদার মতো হয়, আগে কোনদিন বুঝিনি। হাত নাড়ালেও চটচটে অন্ধকার লেগে যাচ্ছিল হাতে। আচ্ছা জামাকাপড়েও কী অন্ধকারের দাগ লাগে? কে জানে? আলোয় গেলে বোঝা যাবে! বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। একজন কথা বলার মতো লোক থাকলে এতটা খারাপ লাগত না। 

আর কী আশ্চর্য, চিন্তাটা মাথায় আসা মাত্রই একজন ভদ্রলোক, লাইন থেকে ট্রেনের কামরায় উঠতে উঠতে বললেন, “সেদিন তোমায় দেখেছিলেম ভোরবেলায়...”। বললেন না, গুনগুন করে গাইছিলেন। আমি মোবাইলের পর্দাটা অন করতে নীলচে আলোর আভায় দেখলাম, ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরা, মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। আমার হাতে আলোর আভা দেখে আমার দিকেই এগিয়ে এলেন। আমার সামনের সিটে বসতে বসতে বললেন, “কদ্দূর”?

“হাবিবগঞ্জ”

“অ। আমারও তাই যাবার কথা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আরো অনেকদূর...হাবিবগঞ্জে কাদের বাড়ি?” আমি আমার পিসেমশাইয়ের নাম বললাম। একবারেই চিনতে পারলেন। বললেন,

“অ ছক্কা? ছক্কা আপনার কে হয়?” আমার পিসেমশাইয়ের ডাকনাম ছকু ওঁনার বন্ধুরা শুনেছি ছক্কা বলেও ডাকেন। তবে ভাল নাম শরদিন্দু শর।

“আমার ছোট পিসেমশাই”।

“তাই বুঝি? তাহলে তো তুমি অনেকটাই ছোট। খামোখা “আপনি”, “আজ্ঞে” করছি কেন? অন্ধকারে ভালো বুঝতেই পারা যাচ্ছে না, ছাই! তা কী করা হয়?”

“আজ্ঞে, এই হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়েছি”।

“অ, তার মানে নতুন ডানা গজাচ্ছে?”  কথাটার মানে বুঝলাম না, চুপ করে রইলাম।

“কথাটা বোঝা গেল না, না? মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। এখন হয়েছে হায়ার সেকেণ্ডারি, আমাদের সময় ছিল ম্যাট্রিকম্যাট্রিক দিয়েই আমাদের মনে হত, বেশ বড়সড় হয়ে গেছি। উড়তে শুরু করতাম। একাএকা কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এখান ওখান যাওয়া আসা শুরু করে দিতাম! বাবা-মার সঙ্গ আর ভাল লাগত না!”  হাসতে হাসতে বললেন ভদ্রলোক। কথাটা খারাপ বলেননি, নতুন ডানা গজানোর কথাটা ভালই লাগল। কলকাতায় ফিরে বন্ধুদের মধ্যে কথাটা চাউর করতে হবে।

“তোমার নামটা কী যেন বললে, হে, ছোকরা?”

“আজ্ঞে বলিনি তো!”

“বলোনি? কেন বলোনি, কেন? চট করে বলে ফেল দেখি”। 

“আজ্ঞে ভূয়সী ভড়। আমার দাদু রেখেছিলেন নামটা।”

“বাঃ বাঃ, বেশ নাম। আমি তো জিস করিনি, নামটা কে রেখেছিলেন সেটা বললে কেন?”

“আজ্ঞে আমার নাম বললেই, সবাই জিজ্ঞেস করে। তাই আজকাল নিজে থেকেই বলে দিই”। হা হা করে আবার হেসে উঠলেন ভদ্রলোক, তারপর বললেন, “আমার নাম বিশাল, বিশাল চক্রবর্তী। এ নামটা আমি নিজেই রেখেছি।” আমি অবাক হয়ে তাঁর ঝাপসা চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজেই নিজের নাম রাখা যায় নাকি? 

ভদ্রলোক হয়তো আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরে বললেন, “ঠাকুরদা আমার নাম রেখেছিলেন হরিপদ চক্রবর্তী। নামটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। আইএ পরীক্ষার আগে শেয়ালদা কোর্টে এফিডেবিট করে, হয়ে গেলাম বিশাল। বাবার পয়সায় খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলাম। এতদ্বারা সর্বসাধারণকে জানানো যাইতেছে, অদ্য হইতে আমি শ্রী হরিপদ চক্রবর্তী শেয়ালদার এফিডেবিট বলে শ্রী বিশাল চক্রবর্তী হইলাম”। বিশালবাবুর কথায় মনে পড়ল, এমন বিজ্ঞাপন খবরের কাগজে দেখেছি বটে, “আমি শ্রীযুক্ত গণারাম, অদ্য হইতে শ্রীযুক্ত অর্কপ্রভ হইলাম”

“ছক্কা, মানে তোমার ওই ছোট পিসেমশাই, খেলাধুলোয় খুব তুখোড় ছিল, জানো কী? ফুটবল হোক কিংবা ক্রিকেট। স্কুল টিম হোক, কলেজ টিম হোক, ছক্কা ছাড়া টিমই হতো না। আমরা যেবার ম্যাট্রিক দিলাম, ছক্কা তখন বোধহয় সিক্সে কিংবা ফাইভে পড়ে। সেবার আমাদের স্কুল, এই মহকুমায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কার জন্যে জানো? তোমার পিসেমশাই ছক্কার জন্যে। ওইটুকুনি ছোঁড়া নিজেদের বক্স থেকে বল নিয়ে, একাএকা গোল দিয়ে এল অপোনেন্টকে! এক আধবার নয়, তিন তিন বার! সে বছর ছক্কাই হায়েস্ট গোলগেটার হয়েছিল! সেই থেকে আলাপ। বুঝেছ? পরে আমি যখন কলেজে আটকে পড়লাম, ছক্কা আমাদের কলেজেই এল। একসঙ্গে তিনবছর খেলেছি! তারপর ও গ্র্যাজুয়েট হয়ে চাকরি পেয়ে গেল, আর আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ইন্সিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হয়ে গেলাম”। 

আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, “এঃ রাম, লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন কেন?” 

বিশালবাবু খুব রেগে গেলেন, ধমক দিয়ে বললেন, “আমার সামনে ওই সব আজেবাজে কথা একদম বলবে না! গুরুজনের সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে?” আমি গুম হয়ে বসে রইলাম। যাচ্চলে, কী এমন কথা বললাম, কে জানে? আমি মোবাইল টিপে সময় দেখলাম, ৮.৫৮। ট্রেনটা যেভাবে থমকে আছে চলবে কী চলবে না, বোঝাই যাচ্ছে না। 

হঠাৎ বাইরে থেকে মুখের ওপর কেউ টর্চ মারল, জিগ্যেস করল, “খোকা কী একলা? কোথায় যাওয়া হবে? হাবিবগঞ্জ নাকি?” খোকা বলাতে আমার একটু রাগ হল, কিন্তু ওঁনার থেকে কিছু যদি জানতে পারা যায়, তাই বললাম, “হ্যাঁ কাকু। কিন্তু ট্রেনের কী হল? কখন ছাড়বে?” ভদ্রলোক হনহনিয়ে সামনের দিকে যেতে যেতে বললেন, “একটু দেরি হবে”। আমি হতাশ হয়ে আবার কামরার ভেতরে মুখ ঘোরালাম। দেখলাম ভদ্রলোক আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। 

আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে বললেন, “ইয়ে, মানে তোমাকে তখন ওরকম বকাবকি করাটা আমার ঠিক হয়নি। তোমার আর দোষ কী? ছেলেমানুষ, তুমি অতশত কী করে জানবে? তবে একটা কথা বলি, কিছু মনে কোরো না, হে। তোমার মাথাটি তেমন সরেস নয়, নিরেট। তোমাকে বললাম, তোমার পিসেমশাই যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে, তখন আমি ম্যাট্রিক দিয়েছি। তারপরে বললাম, কলেজে তোমার পিসেমশাইয়ের সঙ্গে খেলেছি! তাতেও বুঝতে পারলে না? আইএ পড়ার সময় এবং কলেজে পড়তেও বেশ কয়েকবার গাড্ডু খেয়েছিলামতোমার পিসেমশাই এক চান্সে সব পরীক্ষায় পাশ করে গেল, আমি সেবারও পারলাম না। বলি, আমার কী লজ্জা ঘেন্না থাকতে নেই? “একবার না পারিলে, দেখ শতবার” কবি বলেছেন বলেই কী আমাকে একশ বার চেষ্টা করতে হবে?” 

আমি ঠিক কী উত্তর দেব না বুঝে বললাম, “আজ্ঞে, তা তো বটেই!”

“একটা কথা জেনে রাখো, জীবনে সব কিছু হয় না। যাদের লেখাপড়া হয়, তাদের লেখাপড়াই হয়, আর কিছু হয় না। আমাকেই দেখো না। লেখাপড়া ব্যাপারটা তেমন সুবিধে করতে না পারলেও কী করিনি জীবনে? এই যে তুমি জানালায় কনুই রেখে বসে আছো। আগে হলে তোমার একটা লাইফ ইন্সিওরেন্স, আমি করিয়েই ছাড়তাম”।

“তার মানে?” আমি খুব অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।

“ধরো, ওই জানালার লোহার শাটারটা ঝপাং করে পড়ল তোমার কনুইতে। কিংবা ধরো হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় গাছের মোটা একটা ডাল ভেঙে এসে পড়ল তোমার কনুই ঘেঁষেঅথবা চারমণি সাইজের একটা বিশাল পাথর এসে গড়িয়ে পড়ল...”আমি ভয়ে ভয়ে হাতটা ভেতরে ঢুকিয়ে নিলাম, এতক্ষণ কী ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়ে আমি বসেছিলাম, ভাবতেই শিউরে উঠলাম। 

ভদ্রলোক আশ্বস্ত করার সুরে বললেন, “তবে এই বিশাল থাকতে তোমার বিশাল কোন ক্ষতি হত না। ইন্সিওর করলেই, তোমার হাত ভেঙেই যাক কিংবা কেটেই যাক, তুমি সিওর টাকা পেয়ে যেতে! তারপর বসো না যত ইচ্ছে কনুই বের করে। হাতটার ক্ষতি হবে ঠিকই, কিন্তু ইন্সিওরেন্সের টাকায় চপটা, কাটলেটটা, জিলিপি-সিঙ্গাড়াটা, সেও তো ওই হাতে না হোক অন্য হাতে মুখে তোলা যাবে!”  আমি বেশ বিরক্ত হয়ে, আবার কনুই বের করে বসলাম। কোন কথা বললাম না।  

ভদ্রলোক আবার বকতে শুরু করলেন, “এদিকে খুব পাট হয় জানো তো? পাট, পাট, ইংরিজিতে যাকে জুট বলেইন্সিওরেন্সের কাজটা ছেড়ে দিয়ে জুটের ব্যবসায় জুটে গেলাম। রূপোলী আর সোনালী পাটের গাঁট, গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাষীদের থেকে কিনতাম, দিয়ে আসতাম হাওড়ার জুট মিলে। কয়েকজন বন্ধু মিলে খুব লাভ করতাম, বুঝেছো? যে দামে কিনতাম, তার চার-পাঁচগুণ দামে মিলে বেচে দিতাম। পাটের গাঁটওয়ালা না বলে, আমাদের গাঁটকাটাও বলতে পারো!” 

নিজের বোকা বোকা রসিকতায় নিজেই, হে হে করে হাসলেন খানিকটা। তারপর আবার বললেন, “সে ব্যবসাটাও ভেস্তে গেল। কোথা থেকে কিছু লোক এসে জুটলো, তাদের গাঁটে গাঁটে পাটোয়ারি বুদ্ধি! তারা চাষীদের থেকে আমাদের চেয়ে বেশী দামে গাঁট কিনে, আমাদের থেকে কম দামে মিলকে বেচত। ওদের সঙ্গে সকলেরই বেশ মিলমিশ হয়ে গেল! অতএব আমাদের পাটব্যবসার পাট তুলে দিতে হল”। ভদ্রলোকের বাজে বকবক ভালো লাগছিল না। কিন্তু কিছু করারও নেই, ট্রেন একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। 

আমি গম্ভীরভাবে বললাম, “তার মানে আপনার পাটের ব্যবসা ডুবল পাটে, ব্যবসাটাও বোধহয় সকলে পারে না”।

“কে বলেছে তোমায়? আরশোলার ব্যবসায় কম কামিয়েছি? তারপর ব্যাং?”

“আরশোলার ব্যবসা? সে আবার কেমন? ব্যাং শুনেছি বিদেশে কোথাও কোথাও খায়”।

“বিদেশের নিকুচি করেছে। আমাদের নিজের দেশ থাকতে, বিদেশ কেন? স্কুলে কী নিয়ে পড়েছো হে?”

“আজ্ঞে আরশোলা নিয়ে তো পড়িনি! ইলেভেন টুয়েলভে সাবজেক্ট ছিল সায়েন্স”।

“বায়োলজি ছিল না? সেখানে আরশোলা, ব্যাং কাটোনি? তাদের পৌষ্টিকতন্ত্র দেখনি?” আমার মনে পড়ল। বায়োলজি প্র্যাক্‌টিক্যালে কেটেছি বৈকি!

“সেই আরশোলা আপনি সাপ্লাই করতেন?”

“তোমাদের কলকাতার কোন স্কুল বলো?” আমি স্কুলের নাম বললাম। শুনে মুখ ব্যাঁকালেন, বললেন, “নাঃ, আমরা নই। তোমাদের স্কুলে সাপ্লাই করত ন্যাপা বক্সি। হতভাগা যেমন টিকটিকির মতো দেখতে, তেমনি তার আরশোলাগুলোও! না খেতে পেয়ে শুঁটকে পাৎলা। আরে বাবা, আরশোলা ভরপেট খাবে, তবে না তার পৌষ্টিকতন্ত্র পুষ্ট হবে! তাই দেখে, তবে না আমাদের দেশের ছেলেরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে! হুঁ হুঁ ব্যবসা অত সস্তার ব্যাপার নয়। আমার আরশোলা আর ব্যাং কেটে কত্তো ছেলে বড়ো বড়ো ডাক্তার হয়ে গেল! সেদিন কলকাতায় এক ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। বুকে একটা ব্যথা ব্যথা হচ্ছিল, চেক আপ করাতে। খুব নামকরা ডাক্তার, চেস্ট স্পেশালিস্ট, বারোশো টাকা ফিস! শুনেছি বাড়িতেও অনেক চেস্ট বসিয়েছে, টাকা রাখার জন্যে!  চেস্ট মানে সিন্দুকও হয়, জানো তো? আমি তো তাকে চিনতে পারিনি। কিন্তু আমাকে দেখেই বলে উঠলে, “স্যার, আপনি এখানে?” অবাক হয়ে আমি তাকিয়ে আছি দেখে বলল, “চিনতে পারলেন না, স্যার, আপনার আরশোলা না পেলে, আজ আমি এখানে আসতে পারতাম, স্যার?” আমি হে হে হেসে ম্যানেজ করলাম। আমাকে খুব যত্ন নিয়ে দেখল, কিন্তু ফিসের একটা পয়সাও নিল না! সেও তো ওই আরশোলার জন্যেই নাকি?”

এই সময় ট্রেনটা দুবার ভোঁ ভোঁ ডাক ছেড়ে, আড়মোড়া ভাঙলো, তারপর গড়াতে শুরু করল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, কিন্তু কামরার আলো জ্বলল না। মোবাইলে টাইম দেখলাম নটা বত্রিশ! ভদ্রলোক আবার কথা বলতে শুরু করলেন, “আরশোলা নিয়ে যারা ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে তারা আমার দু চক্ষের বিষ! অনেকেই বলে “আরশোলা আবার পক্ষি, ভ্যারেণ্ডা আবার বিরিক্ষি”। তাদের কথায় কানও দেবে না। আরশোলা ছাড়া তোমাদের মতো ছেলেপুলেদের শিক্ষাটাই মাটি হয়ে যেত। আজ গাঁয়ে গঞ্জে এত যে ডাক্তার, তার জন্যে আরশোলাদের আত্মত্যাগের কথা ভুলে থাকা যায়!” ভদ্রলোকের গলাটা আবেগে কেমন বুজে এল, “আরশোলা আমাদের ভবিষ্যৎ, আরশোলা আমাদের জাতীয় শিক্ষার ভিত”ভদ্রলোক কেঁদে ফেললেন কিনা অন্ধকারে বুঝতে পারলাম না, তবে গলা শুনে তাই মনে হল। 

আমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, “আপনার মাথা-ফাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো?” 

ভদ্রলোক এতটা রেগে যাবেন বুঝতে পারিনি, “দেখ হে ছোকরা, ছোট মুখে বড়ো কথা আমার একদম সহ্য হয় না! ছক্কাকে আমি তোমার নামে কমপ্লেন করবো। পেট খারাপের কথা বলতে, চোখ খারাপের বলতে, কিচ্ছু মনে করতাম না। আমার মাথা খারাপের কী দেখলে হে? দেখাতে পারবে, আমার মাথাটা কোথায় খারাপ হয়েছে? দেখাও তো, দেখাও তো..”

ঠিক সেই সময়েই কামরার আলোগুলো জ্বলে উঠল, কিন্তু ভদ্রলোক “দেখাও তো, দেখাও তো” বলে যা দেখালেন, তাতে আমি সব অন্ধকার দেখতে লাগলাম...

 

গল্পে বা সিনেমায় যেমন বলার নিয়ম, সেভাবেই, “আমি কোথায়, আমি এখানে এলাম কী করে” কথাগুলো আমিই বললাম, কিন্তু মনে হল অন্য কেউ অনেক দূর থেকে বলছে, আমি শুনছি।

“অ ভুয়ো, আমি তোর পিসিমণি বলছি রে, চোখ মেলে তাকা। এ পাশে তোর পিসেমশাই, ওপাশে দাঁড়িয়ে মাটি আর শুঁটি। তাকা বাবা, তাকা। দেকো দিকি কী বিপদেই পড়ল আমার সোনাছেলেটা!” আরেঃ এ তো পিসিমণির গলা!  শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। আস্তে আস্তে চোখ মেলে, প্রথমে ঝাপসা তারপর স্পষ্ট দেখতে পেলাম মুখগুলো। সিনেমাতে প্রায়ই যেমন দেখায় আর কি! পিসিমণি, পিসেমশাই, পিসতুতো দাদা মাটি আর বোন শুঁটিকেও দেখলাম। তারমানে পিসিমণির বাড়িতেই শুয়ে আছি!

কিছুক্ষণ ধাতস্থ হয়ে, বিছানায় উঠে বসলাম। এক গেলাস গরম দুধ চুমুক দিয়ে খেতে খেতে বেশ আরাম পাচ্ছিলাম। পিসেমশাই সামনেই বসেছিলেন, জিগ্যেস করলেন, “কেমন বুঝছিস রে? কী হয়েছিল বলতো, ভয় পেয়েছিলি?”

“আপনার বন্ধু বিশালবাবু...”।

“বিশালদা? পাগলা বিশু - তুই তাকে চিনলি কী করে?”

“আমার কামরায় উঠলেন তো, বিশালাক্ষীপুর ছেড়ে এসে, ট্রেনটা ঘচাং করে থেমে গেল যেখানে, সেখানে”। পিসিমণি আঁতকে উঠলেন আমার কথায়, পিসেমশাই কিছু বললেন না, তাকিয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। পিসিমণি বললেন, “শুনছো, আমি কিন্তু ভালো বুঝছি না। তুমি এখনই পশুপতি ওঝাকে ডেকে আনো”।

“থামো তো! আগে ওকে বলতে দাও। কামরায় বিশালদা উঠল, তারপর?”

“খুব বক বক করতে লাগলেন। কামরাতে আর কেউ ছিল না। আলোও চলে গেছিল। একা একা ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে বসে, প্রথমে বেশ ভালই লাগছিল ভদ্রলোকের কথা শুনতে। কিন্তু পরে বড্ডো বাজে বকতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর ট্রেন ছাড়ল, তারও কিছুক্ষণ পর কামরায় আলো এল। তখন ভদ্রলোক নিজের মাথাটা...”। 

দৃশ্যটা মনে করে আমার আবার হেঁচকি উঠতে লাগল, পিসিমণি দৌড়ে গিয়ে লোহার চাবি আনলেন একটা, আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা ধরে থাক বাবা, কোন ভয় নেই। আর মনে মনে রাম-নাম জপ কর”রাম-নামের কথায় মনে পড়ল, আমি একবার “এঃ রাম” বলেছিলাম বলে, ভদ্রলোক খুব রেগে উঠেছিলেন। তবে কী ভদ্রলোক...। 

পিসেমশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন দেখে আবার বললাম, “ভদ্রলোক নিজের মাথাটা খুলে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে ধমকাচ্ছিলেন, “আমার মাথাটা কোথায় খারাপ হয়েছে? দেখাও তো, দেখাও তো”। আমার মাথাটা ঘুরে উঠল, সব কিছু অন্ধকার হয়ে এল।” 

পিসেমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বিশালদা, আজই সন্ধেতে বিশালাক্ষীপুর ছাড়িয়ে একটা লেভেল ক্রসিংয়ে তোর ট্রেনের তলাতেই কাটা পড়েছে। সেই জন্যেই আচমকা ব্রেক মেরে ট্রেনটা থেমে গেছিলতারপর বিশালদার লাশ সরিয়ে ট্রেন ছাড়তে অনেক দেরি হয়েছিল। বিশালদার লাশ পাওয়া গেছে, কিন্তু পাশে মাথাটা ছিল না! তোর ট্রেন লেট হচ্ছে শুনে আমি স্টেশনে গিয়েছিলাম, সেখানেই এই সব শুনলাম। তারপর ট্রেনটা আমাদের স্টেশনে পৌঁছালো দশটা কুড়িতে। খুঁজে খুঁজে তোকে বের করলাম, দেখলাম অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছিস ট্রেনের কামরায়”  

আমি ভয়ে রীতিমতো তোৎলাতে লাগলাম, “ত্-তার ম্-মানে যা দেখেছিলাম, সেটা সত্যি!! ত্-তার ম্-মানে, উনি আসলে বিশালবাবুর ভূ - ভূ ...”। 

পিসিমণি হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরলেন, বললেন, “চুপ কর, এ সময় ওঁদের আর নাম নিতে হবে না, বাবা”।

 -০০-

  ছোটদের পরের গল্প পাশের সূত্রে - " পঋপাটি ফে৯ওর "



ছোটদের জন্য নানান স্বাদের কুড়িটি গল্পের সংকলন "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থের একটি গল্পটি এটি। ঘরে বসে বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে নীচের সূত্রে ঠ্যালা দিয়ে বুক করতে হবে। 


     

 

     

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৪

চিংড়ি লো চিংড়ি (ছোটদের গল্প)


 

(কোলের কাছে বসে, চিংড়ি ভাজা দিয়ে ডালভাত মাখা খেতে খেতে,

দিদিমার মুখে ছোট্টবেলায় যেমনটি শুনেছিলাম, এটা সেই গল্পই – একটু আলাদা মোড়কে।)

 

ভোরের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ, পুব আকাশে এখন মায়ের কপালে সিঁদুরের টিপের চেয়েও এত্তোবড়ো সূর্য। তার রোদ্দুর একটু তেরছা হয়ে পড়ছে জামরুল গাছের পাতায় পাতায়। পাতা ভিজিয়ে রোদ্দুর গড়িয়ে পড়ছে টুপ টাপ, পুকুরের জলে। চারদিকে গাছে ঘেরা এঁদো পুকুর। সবুজ জল, খুদিপানায় ভর্তি। ঘাটের কাছে, মেয়ে বউরা বাসনকোসন মাজতে বসে, সেখানে জলটা একটু পরিষ্কার। উল্টোদিকের পাড়ে যেখানে খুব গাছপালা আর আগাছার ঝাড়, সেখানে পাতার আড়ালে বসে থাকে মাছরাঙা পাখি। আনমনে ছোট মাছেরা একটু ওপরের দিকে ভেসে উঠেছে কি, ঝপাং - মাছরাঙার ঠোঁটে রূপোর ঝিলিক।

এদিকে মাঝ পুকুর বরাবর কিছু শালুকের ডগা জেগে আছে সাদা পাপড়ি মেলে। আশেপাশে গোলগাল আসনের মতো ভাসছে সবুজ পাতাখুব হাল্কা হলে, জল থেকে উঠে বসাও যায় ওই পাতায়। যেমন আজ সকালে এসে এইমাত্র বসল, চিংড়িরাণিসারাক্ষণ জলের মধ্যে থেকে তার চুল শুকোয় না। আজ শালুকপাতায় বসে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে সে বসল চুল শুকোতে।

একটু আরাম করার কি জো আছে? হতচ্ছাড়া এক কাক, কোথায় ছিল, উড়ে এসে বসল, কাছের তেঁতুল গাছের ডালে। দুবার ডাকল, খা খা। সর্বদাই তার খাবার চিন্তা। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক দেখল, ওদিক দেখল। তারপর তার চোখ পড়ল ছোট্ট চিংড়িরাণির ওপর। লোভে তার ঠোটঁ ফাঁক হয়ে গেল, বলল,

‘চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে’!  

কাকের গলা পেয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল চিংড়িরাণিরাক্ষুসে কাকের ফাঁক করা ঠোঁট দেখে চিংড়িরাণির ভয়ও লাগল খুব, আবার রাগে হাত-পাও জ্বলতে লাগল। শালুক পাতার কানা থেকে তিড়িং করে লাফ মারল জলে। জলের মধ্যে ডুবে বেশ নিশ্চিন্তি। ভয়টা তো কাটল, কিন্তু রাগ? সেটা তো কমছে না! আকাশের কাকের সঙ্গে জলের চিংড়ির কী সম্পর্ক? চিংড়ি বুঝি ফ্যালনা, তাকে ‘তুই’ বলা যায়, ‘লো’ বলা যায়, আবার টপ করে খেয়েও ফেলা যায়? রাগে সমস্ত শরীর রি রি করতে লাগল চিংড়ির। কী করা যায়, কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে চিংড়িরাণি গেল তার কাতলা দাদার কাছে।

কাতলাদাদা আর বৌদি তখন খুব ব্যস্ত। কাতলাদাদা আপিস যাবে, বাচ্চারা যাবে স্কুলবৌদি কাতলাদাদাকে খেতে দিয়েছে, বাচ্চারাও সবাই খেতে বসে হই হট্টগোল করছে। কাতলাদাদা চিংড়িরাণিকে দেখেই বৌকে বলল,

‘কে এয়েচে দেখো। আয় রে বোন চিংড়িরাণি, ওকে শিগ্‌গির দাও পিঁড়ি-পানি’  বৌদি বলল,

‘ও মা ঠাকুজ্জি, এসো বোনটি, বোস বোনটি, এই নাও পানি, আর পিঁড়ি দিচ্ছি আনি’কাতলা চিংড়িরাণির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,  

‘কিন্তু বোন, বল তো দেখি কেন? তোর মুখটা ভীষণ ভার, মনে হচ্ছে যেন’

কাতলাদাদার কথায় ফুঁপিয়ে উঠে চিংড়িরাণি বলল,

‘সকাল বেলায় চানটি করে কীই বা করি বল, শালুকপাতায় বসে তখন শুকোচ্ছি কুন্তল। কাকটা এল উড়ে, বসল একটু দূরে। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”! বললে আমায় কাক, আমায় খাবার ঝোঁকে। কাক আমাকে খেত, সেও ভালো হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? এই অপমান থাকতে তোরা, সইতে হবে হেন’?

চিংড়িরাণির এই কথায় রেগে আগুন হয়ে উঠল কাতলাদাদা আর বৌদি। বলল,

‘হতচ্ছাড়া কাকের এতোই আস্পর্দা, কাতলা যে তোর বড়দা, গেছেই বোধ হয় ভুলে। কানটি তাহার মুলে, পাঠিয়ে দেবো খড়দা। এক কাজ কর তুই বোন, খারাপ করিস নে আর মন। এখন আমার ঘরেই থাক, তোর বৌদি আছে যখন। আপিস থেকে আসছি আমি ফিরে, দেখব আমি তখন। কি ভাবে ঢিট হতে পারে কাক বাছাধন’

কাতলাদাদার এই কথায় চিংড়িরাণি ভরসা করতে পারল না। রেগেও গেল খুব। আমি জ্বলছি কাকের কথায়, কাতলাদাদা চলল নেকটাই ঝুলিয়ে আপিস করতে! আপিস থেকে ফিরতে হবে সন্ধে। ততক্ষণ কাক বুঝি বসে থাকবে, কাতলাদাদার কাছে জব্দ হওয়ার জন্যে! প্রচণ্ড রাগে চিংড়িরাণি থড়বড়িয়ে বেরিয়ে গেল কাতলাদাদার ঘর থেকে, কাতলাদাদা বলল,

‘কোতা যাস, কোতা যাস, ও আমার বোন’বৌদি বলল,

‘ঠাকুজ্জি, ঠাকুজ্জি, একবারটি শোন’

 

কে শোনে কার কতা? চিংড়িরাণি একদণ্ডও আর দাঁড়াল না। সোওওজা গেল শোলদাদার বাড়ি। শোলদাদার বাড়িতে তখন খুব হট্টগোল। শোলদাদা নিজেই বাজায় ঢ্যাম গুড়গুড় ঢোল। বাদ্যি থামিয়ে শোলদাদা বলল,

‘আয় আয় বোন চিংড়ি, মুখটা কেন হাঁড়ি? সকাল সকাল কি হল রে, জানতে আমি পারি?’

চিংড়ি খুব রাগে গনগনে মুখে বলল,

‘শালুকপাতায় বসে আমি শুকোচ্ছিলাম চুল, সকাল সকাল সেইটা বুঝি, হল আমার ভুল? হতচ্ছাড়া কাক, করছিল হাঁকডাক। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”! বললে আমায় জেন। খেত তো ভালোই হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? এই কথাতেই হলাম আমি ভীষণ অপমান। বিহিত কিছু না করলে, দেবই আমি প্রাণ’

এই কথা শুনে শোলদাদাও খুব রেগে গেল। নিজের লেজ ঝটপট করে বলল,

‘রাগ হচ্ছে খুব। কাক ব্যাটাকে সঙ্গে নিয়ে জলেই দেব ডুব। ইচ্ছে হলেও, সত্যি সত্যি করতে কি আর পারি? চল তো দেখি, আমার সঙ্গে কাঁকড়াকাকার বাড়ি। সেথায় গেলে বেরিয়ে যাবে, একটা কোন উপায় কী করেই বা কাকব্যাটা, এমন বলতে সাহস পায়?’

 

শোলদাদার সঙ্গে চিংড়িরাণি চলল, কাঁকড়াকাকার বাড়ি। কাঁকড়াকাকা, সকালে উঠে ব্যায়াম করছিল, ইয়া মোটামোটা দাঁড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। হন্তদন্ত হয়ে ওদের আসতে দেখে কাঁকড়াকাকা ব্যায়াম থামিয়ে বলল,

‘আয়রে আমার চিংড়ি, আয়রে আমার শোল। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে গণ্ডগোল। সকাল সকাল নইলে কেন আসবি তোরা বাড়ি? মুখটি দেখে মনে হচ্ছে, রেগে আছিস ভারি?’

কাঁকড়াকাকার চেহারা দেখে চিংড়িরাণি অনেকটাই ভরসা পেল। সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,

‘সকালবেলায় রোদ্দুরটি উঠেছিল বেশ, শালুকপাতায় বসে আমি শুকোচ্ছিলাম কেশ। হঠাৎ এল কাক, ঠোঁটটি করে ফাঁক। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”, বললে আমায় কাক, লোভ চকচক চোকে’খেত তো ভালোই হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? কেউ কোত্থাও নেই আমার, কোন স্বজন যেন?’

কাঁকড়াকাকা এই কথা শুনে ভীষণ রেগে গেল। মোটামোটা দুই দাঁড়াতে শান দিয়ে বলল,

‘দাঁড়া, চিংড়ি, দাঁড়া। দেখছিস এই দাঁড়া? চেপে এমন ধরব আমি কাকব্যাটার গলা, বন্ধ হয়ে যাবে তার সকল কথা বলা। কাকব্যাটাকে কেমন করে করবো আমি বন্দী। সেটাই আসল ফন্দি। গায়ে আমার বাঁধতো দেখি, আচ্ছা সে ব্যাণ্ডেজ। মনে হবে আঘাত পেয়ে, আমার ঝিমিয়ে গেছে তেজ’

 

কাঁকড়াকাকার কথা মতো শোল আর চিংড়ি, কাঁকাড়াকাকার গায়ে খুব চওড়া করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিল, শুধু দাঁড়াদুটো খোলা রইলব্যাণ্ডেজ বাঁধা হয়ে যাওয়ার পর তিনজনে গেল সেই শালুক পাতার কাছে। কাঁকড়াকাকা জল থেকে ভেসে উঠে, শালুকপাতার ওপর চড়ে শুয়ে পড়ল চিৎপাত হয়ে। চিংড়ি আর শোল জলের মধ্যেই ভাসতে থাকল কি হয় দেখার জন্যে। কাঁকড়াকাকাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সত্যিই যেন খুব অসুস্থ, সারা গায়ে মাথায় বেজায় চোট পেয়েছে।

দূর থেকে দেখতে পেয়ে, কিছুক্ষণ পর কাকটা উড়ে এসে বসল কাছের তেঁতুল গাছের ডালে। দুবার ডাকল, খা খা। সবসময়েই তার খাবার চিন্তা। ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ দেখল কাঁকড়াকাকাকে। কাঁকড়াকাকা নড়েও না, চড়েও না। কাকটা ধরেই নিল কাঁকড়াটা বুঝি মরে গেছে। তার কালো কালো ঠোঁটদুটো লোভে ফাঁক হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল,

‘আহা, কাঁকড়া খাবার এমন সুযোগ পাই নি বহুদিন। ভাবতে আমার মনটি নাচে ধা ধা তাধিন ধিন। করলে বেশি দেরি, জুটবে আরো কাক। আমার ভাগেই তখন পড়ে যাবে ফাঁক’

 

এই না ভেবে কাক উড়ে গিয়ে বসল শালুক পাতার ওপর। কাকের ভারে দুলে উঠল শালুকপাতা। জলের ভেতর ঢেউ উঠল গোল গোল। খুদিপানার সবুজ পাতাগুলোও দুলে উঠল ঢেউয়ের তালে তালে। খুদিপানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিংড়ি আর শোল দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল, কী হয়, কী হয়! কাঁকড়াকাকা কিন্তু একটু নড়েও নি, চড়েও নি। মরার মতো শুয়ে থেকে দুলতে লাগল শালুকপাতার সঙ্গে। কাকটা এবার সরে এসে কাঁকড়াকাকার দু পাশে দুই পা রেখে দাঁড়াল, এবার ঘাড় তুলে ঠোকর মারবে মনে হয়। ঠোকর মারার আগে শেষবারের মতো চারপাশটা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিল, কোথাও কোন বিপদ আছে কিনা। কিচ্ছু নেই, এবার কাকটা দুবার ডাকল, খাই খাইসর্বদাই তার খাবার চিন্তা।

তারপর কাঁকড়াকাকাকে ঠোকর মারতে কাকটা যেমনি মাথা নামিয়েছে, কাঁকড়াকাকা এক ঝটকায় দাঁড়া দুটো দিয়ে, ক্যাঁক করে চেপে ধরল কাকের গলা। কাকটা ডানা ঝাপটিয়ে পালানোর জন্যে ছটফট করছিল, কিন্তু কাঁকড়াকাকার দাঁড়ার কামড় ছাড়াতে পারলে তো! কাঁকড়াকাকা, এবার কাকের গলা চেপে থেকেই, হাঁক দিল,

‘কোতায় গেলি, চিংড়িরানি, কোথায় গেলি শোল? দৌড়ে এসে দেখে নে, খাচ্ছে কেমন ঘোল। কাকব্যাটা হচ্ছে কেমন আমার হাতে জব্দ, মুখের থেকে শুনতে কী পাস কা কা কা শব্দ?’

চিংড়ি আর শোল জলের মধ্যে থেকে সবই দেখছিল, এখন কাঁকড়াকাকার ডাকে শালুক পাতার ওপর উঠে এল চিংড়ি, আর পাতার চারপাশে ঘুরে ঘুরে সাঁতার দিতে লাগল শোলমাছ। চিংড়ি বলল,

‘কেমন রে, কাক আর কী আমায় খাবি, নাকি কাঁকড়াকাকার দাঁড়ার চাপে যমের দোরে যাবি?’

কাক এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল, সকালে ‘চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে’ বলার জন্যেই, কাঁকড়া ব্যাণ্ডেজ বেঁধে মড়ার মতো শুয়েছিল শালুক পাতার ওপর, তাকে ধরবে বলে। কাক বেকায়দায় পড়ে, এখন চোখ মটকিয়ে কোন রকমে বলল,

‘না, না না, কাঁকড়াদাদা দাও গো এবার ছেড়ে, চিংড়ি খাবার বদবুদ্ধি ফেলেই দিলাম ঝেড়ে। চিংড়ি খাবার ইচ্ছে আমি করবো না গো আর, দমবন্ধ হওয়ার আগেই দাও গো আমায় ছাড়’

কাঁকড়াকাকা রাগী দুই চোখে তাকিয়ে কাককে কড়া ধমকে দিল,

‘চিংড়ি আমার ভাইঝি, রাখবি মনে কথা, কোনভাবেই চিংড়ি যেন, পায় না মনে ব্যথা। দিলাম এবার ছেড়ে, পরের বারে করলে এমন, রাখবো তোকে সেরে। যা উড়ে যা গাছের ডালে করবি না হাঁকডাক, এ পাড়াতে না দেখি আর, বুঝলি ব্যাটা কাক?’

  কাঁকড়াকাকার দাঁড়া থেকে ছাড়া পেতেই কাক ঝটপট উড়ে গিয়ে বসল জামরুল গাছের ডালে। সেখানে বসে অনেকক্ষণ নিজের গলায় হাত বোলালো। কাঁকড়াটা যা জোর চেপে ধরেছিল, গলায় দাগ বসে গেছে, উফ, প্রাণটা গিয়েছিল আরেকটু হলে। তারপর সেখান থেকেও সে উড়ে গেল কোথায় কে জানে।

কাঁকড়াকাকা ব্যাণ্ডেজ খুলতে খুলতে বলল, ‘এখন খুশি তো, চিংড়িরাণি, আর তোকে ওই কাক; তোর ব্যাপারে কোনদিন গলাবে না নাক’পাতা থেকে কাঁকড়াকাকা আর চিংড়িরাণি জলের মধ্যে ডুব দিল, তাদের সঙ্গী হল শোল। কাঁকড়াকাকা বলল, ‘চিংড়িরাণি, শোল, আমার বাড়ি চল; আমি খাব চা, তোরা কী খাবি বল। রান্না করে বসে আছে তোদের কাঁকড়াকাকি, চল এবারে সবাই মিলে কেমন হল চাখি’

কাক আর কাঁকড়াকাকার ঝটাপটিতে শালুকের পাতা খুব দুলছিল। আশপাশ থেকে দুলে দুলে দূরে সরে গিয়েছিল খুদিপানার ছোট্ট ছোট্ট পাতা। জলের নিচে ওরা ডুব দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তারা আবার সরে এল, নিজেদের জায়গায়। এখন দেখে বোঝাই যায় না কিছু। খুদিপানার ছোট্ট পাতায় ঢাকা পড়ে গেছে পুকুরের স্থির জল।

-০০-

ছোটদের পরের গল্প পাশের সূত্রে - " গোলমেলে ফুটবল "


এই গল্পসহ মোট কুড়িটি নানা স্বাদের গল্প নিয়ে ২০২৫ কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে "এক কুড়ি কিশোর" - প্রকাশক একপর্ণিকা প্রকাশনী। 

বইটি ঘরে বসে পেতে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করে বুক করুনঃ- 

https://www.ekparnika.in/authors/kishore-ghoshal




নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...