বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

প্রসাদী ফুল

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



এর আগের ছোট গল্প - " অলীক পুরুষ "


আমরা বলি সতুদা, কিন্তু তাঁর নাম সইত্যব্রত চট্টরাজ, এমএসসি পাশ। শুনেছি তাঁর প্যাশান ছিল স্কুলের শিক্ষকতা। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাঁর কপালে শিক্ষকের চাকরির শিকে ছেঁড়েনি। অতএব তিনি চাকরি করেন না। ভাগ্যিস করেন না, করলে আজ হয়তো তাঁকে দাগি অথবা নির্দাগি-শিক্ষক হয়ে, কলকাতার পথেঘাটে ধর্ণা মঞ্চে বিরাজ করতে দেখা যেত - বছরের পর বছর। কপালে জুটত পুলিশের যুগপৎ লাঠি ও লাথি। তবে একটা কথা মানতেই হবে – ছোটবেলা থেকে আমরা দাগি চোরের কথা বিস্তর শুনেছি – কিন্ত দাগি শিক্ষক নৈব নৈব চ। এদিক থেকে দেখলে আমাদের সভ্যতার উন্নয়ন পথের ধারেই বসে আছে – নির্দাগি শিক্ষকরূপে! এ কি কম উন্নয়ন?    

চাকরি না করলেও সইত্যদা নিজের বাড়িতেই কোচিং ক্লাস খুলে ছেলে মেয়েদের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথস পড়ান। তাঁর ক্লাসঘরের বাইরে সকাল ছটা থেকে রাত্রি দশটা পর্যন্ত সাইকেল আর খোলা চটির সংগ্রহ দেখলেই তাঁর হাতযশের আঁচ পাওয়া যায়। পিতৃদত্ত নাম সত্যব্রত হলেও, তিনি ইদানীং নিজের পরিচয় দেন এবং সই করেন সইত্যব্রতই নামেই। এর পিছনেও গূঢ় রহস্য আছে। সেটা হল বিখ্যাত এক নিউমেরোলজিস্ট সতুদাকে বলেছিল, “খাঁটি সত্য বলে তো আজকাল কিছু হয় না, ভেজাল মেশাতে হয়”। তারপর সমাধান দিয়েছিলেন “SAITYA বা সইত্য নামটাই আপনাকে সুট করবে, আপনার জীবন পাল্টে দেবে”।       

সেই সতুদাই আমাদের পাড়ার পুজোকমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর আমাদের জন্যে প্রত্যেকবার চোখ ধাঁধানো চাঁদাও একদম বাঁধা থাকে। কবছর আগে খবরের কাগজে পড়ে আইডিয়াটা সতুদার মাথায় এসেছিল এবং গতবার সতুদা প্রস্তাব দিয়েছিল - এবার আমাদের পুজোর থিম হবে জ্যান্ত ঠাকুর। নো কাঠ-খড়-মাটির বানানো পুতুল বিজনেস। টানা তিনদিন তর্কবিতর্কের পর ফাইন্যাল সিদ্ধান্ত হল।

ঠিক হল আমাদের গলির মোড়ে “মধুমাখা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের” মালিক বোঁদে কাকুর ভাইপো হবে গণেশ। কমবয়সী ছেলে – কাকুর দোকানে বছর দুয়েক বসছে, এর মধ্যেই ঈর্ষা জাগানো সুন্দর একটা ভুঁড়ি বাগিয়ে নিয়েছে। কাজেই গণেশ হিসেবে তার থেকে উপযুক্ত আর কেউ হতেই পারে না। এখানে বলে রাখি বোঁদে কাকুর আসল নাম বৈদ্যনাথ – কিন্তু বোঁদে বানানোয় হাত পাকিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন বোঁদে নামে।   

বলিউডের স্বপ্নে বিভোর, দিনে দুবার জিম করা নিমাইকে দেওয়া হল কার্তিকের ভূমিকা।

আমাদের পাড়ার কদমাদির বোন মিছরি হবে সরস্বতী। মিছরি হল এ পাড়ার উঠতি ছোকরাদের চিরস্থায়ী দীর্ঘশ্বাসের উৎস। এক চিমটি চোরা চাহনি কিংবা এক ফোঁটা মুচকি হাসিতে সে আমাদের আকাশে ওরা ঘুড়ির মতো কচি কচি হৃদয়গুলিকে নিঃশব্দে ভোকাট্টা করে দিতে পারে। আমাদের জামার বুকপকেটগুলো রক্তক্ষরণে মোরগফুলের মতো রাঙা হয়ে ওঠে। নাঃ, দেখা যায় না, আমরা অনুভব করি প্রত্যহ।   

স্বপ্না কাকিমা হবেন, মা দুর্গা। তিনি দেখতেও যেমন ভারিক্কি, তেমনি তাঁর মুখে চোখে বেশ একটা ইয়ে আছে – মানে মা, মা ভাব। লতিকা বৌদি বিয়ে করে আমাদের পাড়ায় এসেছেন বছর খানেক হল – তাঁকে মা লক্ষ্মীর ভূমিকায় সাব্যস্ত করা হল।    

মহিষাসুরের জন্যে কমিটি প্রথমে সাব্যস্ত করেছিল আমাদের পাড়ার তোলাবাজ ও মাস্তান ঠোঁটকাটা পটলদাকে।  ঠোঁটকাটা অর্থে পটলদা কিন্তু মোটেই স্পষ্টবক্তা নয়। আসলে তাঁর ঠোঁটের বাঁদিকে বেশ গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন আছে। শোনা যায় বেশ বড় একটা ছোরার ধারালো ফলা ঠোঁটে চেপে পটলদা আগে খুব তোলাবাজি করত। ঠোঁটে ধরা ওই ছোরার ফলা দেখিয়েই পটলদা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। একদিন কোন এক নিরীহ চিকেন-ব্যাপারী – প্রতিহপ্তায় হপ্তার টাকা গুনতে গুনতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে আচমকা এক ঘুঁষি চালিয়েছিল তোলাবাজ পটলদার মুখে। ব্যস, পটলদার ঠোঁট কেটে প্রবল রক্তারক্তি – প্রায় দেড়মাস চিকিৎসার পর ঠোঁট সেরে উঠলেও নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ঘটনাটা।

ঠোঁটকাটা পটলদার বেশ হাট্টাকাট্টা জবরদস্ত চেহারা – গায়ের রং, মাথার চুলও অনেকটা মহিষাসুরের মতোই। কিন্তু পটলদা কিছুতেই রাজি হল না। বলল, “পাগল নাকি, আমি ভোলেভালা সাতেপাঁচে না থাকা মানুষ...আমায় কখনো মইষাসুর মানায়?” শেষমেষ “বাঙালি খাসির” দোকানের হেল্পার সুকুলদা রাজি হওয়াতে মহিষাসুরের জ্যান্ত প্রতিমার ঝামেলাটাও মিটল।  

প্রথমে প্ল্যান হয়েছিল, প্রতিমার মতো, তাঁদের বাহনরাও সবাই জ্যান্ত হবে। কিন্তু জ্যান্ত ইঁদুর-পেঁচা-রাজহাঁস যোগাড় হলেও, অচিরেই বোঝা গেল, ময়ূর-কাটামোষ-সিংহ যোগাড় করার বাড়াবাড়িটা কোনভাবেই সামলানো যাবে না। অতএব মাটির পুতুল দিয়েই বাহনের কাজ সারতে হল।

পুজোর কটা দিন বেশ নির্বিঘ্নে আর আনন্দেই সম্পন্ন হল। আজ বিসর্জন। আমাদের ভাসান দেওয়ার প্ল্যানটাও খুব কুলমাদুগ্‌গা সপরিবার উইথ মহিষাসুর যাবেন স্করপিওতে। তাঁরা গঙ্গাঘাটে স্নান সেরে, ঠাকুরের সাজসজ্জা ছেড়ে পুনর্মনিষ্যি হবেন। আর আমরা মেটাডোরে গিয়ে গঙ্গাতে বিসর্জন দেব ঘট আর মাটির বাহনগুলো

বিকেলে শুরু হল সিঁদুরখেলা, বিদায়বরণ এতদিন মাথায় আসেনি, কিন্তু নিদারুণ সমস্যাটা ঘনিয়ে এল অন্যদিক থেকে।

প্রত্যেকবার আমরা যারা গোবর মাথা, লরিতে তোলার আগে মাসরস্বতীর চরণে মাথা ঠুকতাম আর তাঁর প্রসাদীফুল রাখতাম পকেটে। এবারে মিছরি হয়েছে সরস্বতী। তার চরণতলে ফুলের পাহাড়! কিন্ত কে তাকে প্রণাম করবে, তার চরণের ফুল কুড়োবে? যে করবে তার নামটা তো মিছরির সম্ভাব্য বয়ফ্রেণ্ড লিস্ট থেকে কাটা পড়বে! কিন্তু অন্যদিকে মা সরস্বতীর চরণ না ছুঁলে পরীক্ষাগুলো পাসই বা করব কী করে?

আমাদের সকলের মাথায় তখন একটাই চিন্তা - পরীক্ষা আগে না, প্রেস্টিজ আগে? পরীক্ষায় একবার ফেল করলেও পরেরবার উৎরোনো যায়। কিন্তু প্রেস্টিজ কি সাইকেলের টায়ার, পাংচার হলেও, তাকে সারিয়ে নেওয়া যাবে?

আজ মিছরিকে ব্যাপক দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে পরি, শুধু ডানাদুটো নেই। ডানাজোড়া ওয়াশিং মেশিনে কেচে যেন ছাদের দড়িতে শুকোতে দিয়ে এসেছে! পায়ের ওপর পা, হাতে বীণা, ঘ্যাম পোজ মেরেছে। আমাদের চোখ ফেরানো দায় হয়ে উঠেছেনিখিল আর বাচ্চু ভেজাভেজা গলায় আমাকে বলল, “কিছু একটা কর, ভল্টু”

কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, “ভাবিস না, উপায় বের করেছি। আমার ঘরের সরস্বতীমূর্তিটা, চুপচাপ নিয়ে আয়, তারপর আমি দেখছি”

ওরা সরে যেতে আমি মিছরিকে গিয়ে বললাম, “মিছিমিছি বসে সময় নষ্ট করছিস কেন, মিছরি? এই সময় টুক করে একবার গিয়ে “পরাণ তরী যাক ভাসিয়া”-টা দেখে আয়। আজকের এপিসোডটা শুরু হল বলে”। “পরাণ তরী যাক ভাসিয়া” সিরিয়ালের হিরো সমীর মহাপাত্র। মিছরি সমীরের হেব্বি ফ্যান।

মিছরি চমকে উঠে বলল, “এম্মা, তাইতো, ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু এসময় কেটে পড়লে কেলো হবে না”?

“আধঘন্টার ব্যাপার, মিছরি কোন চাপ নিস না, তুই আলতো করে পাতলা হয়ে যা, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি”

বীণা রেখে প্যান্ডেলের পিছন দিয়ে মিছরি সরে পড়ল। আর প্রায় তখনই বাচ্চুরাও পৌঁছে গেল আমার ঘরের সরস্বতীপ্রতিমা নিয়ে। প্রতিমাটিকে বেদিতে বসিয়ে চটপট সেরে নিলাম প্রণামপর্ব। প্রসাদীফুল কুড়োনোর পর্ব। আমরা দশবারোজন ছোকরা মা সরস্বতীর বেদিটাকে ঘিরে রেখে, ‘সরস্বতীমায়িকি, জয়’ রব তুলতে লাগলামবরণ করতে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে আমার মাও ছিলেন, খুব খুশি হলেন আমাদের মতিগতি দেখে। মাদুগ্‌গা সাজা স্বপ্নাকাকিমাতো বলেই ফেললেন, “ছোঁড়াগুলো দুগ্‌গাপুজোর সময়েও মাসরস্বতীর ভক্তিতে কি সুন্দর মেতে আছে। দ্যাখ দ্যাখ, পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে মিছরি কেমন ছোঁড়াগুলোর ঘাড় ধরে প্রণাম আদায় করছে”!

আমার চোখ ছিল ঘড়ির দিকে, আধঘন্টা হতেই বাচ্চুরা চুপিচুপি মাসরস্বতীর প্রতিমা আবার আমার ঘরে রেখে এল মিছরিও ফিরে এসে, বীণাহাতে বসে পড়ল বেদিতে। আমার দিকে ডাগর চোখের কটাক্ষ হেনে মিছরি ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংকু, ভল্টুদা। আজ না গেলে বিচ্ছিরি মিস করতাম। আজ সমীরের সঙ্গে মেঘনার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল, সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হল সমীরের প্রথম পক্ষের বউ – তার কোলে আবার একটা মেয়ে...। চিন্তা করো ভল্টুদা, কি সাস্পেন্স!”

আমি হাসলাম, বললাম, “ভল্টু ছাড়াও আমার নাম তিমির, জানিস তো? সমীরের থেকে চোখ ফিরিয়ে, তোর আঁখির টর্চ এদিকে ফেললে, মাইরি বলছি, আমার হৃদয়ের সব তিমির ঘুঁচে যেত রে, মিছরি”!

আঁখিপাখির ডানা ঝাপটে মিছরি উত্তর দিল, “য্‌য্যাঃ। ভল্টুদা তুমি না একটা Zআআতা। এমন ফচকেমি করো না...”।    

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বুকে হাত রাখলাম। মা সরস্বতীর আশীর্বাদী ফুল রয়েছে আমাদের বুক পকেটে। আমার হৃদয়ের ক্ষরিত রক্তে প্রসাদী ফুলগুলিও যেন রাঙা হয়ে উঠল।  

-০০-


বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

অলীক পুরুষ

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " হাত-পা বাঁধা "

তিনি কোথা থেকে এলেন কে জানে। সরোবরে অবগাহন স্নান সেরে যখন তিনি উঠে এলেন, তখনই তাঁকে চোখে পড়লতাঁর ভেজা শরীর থেকে ঝরে পড়ছে জল। ভোরের সোনালী আলোয় চিকমিক করছে ঝরে পড়া জলের বিন্দু। দুইহাতে মুখের ওপর থেকে তিনি সরিয়ে দিলেন ভিজে চুলের গুচ্ছ। কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়া চুল থেকেও জল ঝরতে লাগল তাঁর পিঠ বেয়ে। মেদহীন সুপ্রশস্ত পিঠ আর বুক। অশ্বত্থপাতার সুসমঞ্জস বলিরেখার মতো তাঁর উদর। পাড়ে উঠে তিনি উদীয়মান সূর্যের দিকে তাকালেন। বুকের কাছে জোড় হাত রেখে তিনি উচ্চারণ করলেন –

“জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্‌

ধ্ব্যান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণোতোস্মি দিবাকরম”।

তাঁর সুস্পষ্ট অথচ অনুচ্চ কণ্ঠস্বর আর উচ্চারণে জেগে উঠতে লাগল আশেপাশের সমস্ত প্রকৃতি। গাছপালা, লতাগুল্ম, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, পাখি, সরীসৃপ। আকাশ, বাতাস, এমনকি এই ভোরের আলোও। যে দিবাকরকে তিনি এইমাত্র প্রণাম করলেন, সেও ধন্য হয়ে, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল আনন্দে। প্রথম সূর্যের রশ্মি স্পর্শ করল তাঁর মুখমণ্ডল। তাঁর উজ্জ্বল দুই চোখে এখন করুণার আলো, স্নিগ্ধ আনন্দের আবেশ। তাঁর ওষ্ঠ ও অধরে ইষৎ হাসির রেশ, সে হাসিতে অকুণ্ঠ মায়া।

উড়ে এল একটি পাখি, তার ডানায় সবুজ পাতার সজীব রং, ঠোঁটদুটি অরুণ রাঙ্গা। তাঁর মাথার উপর কিছুক্ষণ উড়ে, সে এসে বসল তাঁর কাঁধে। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি সেই পাখির চোখে চোখ রাখলেন। কিছু বলবি? নাঃ। কিছু চাইবি? নাঃ। যা চাই সবই তো দিয়েছো। কিচ্ছু চাই না আর, শুধু তোমাকে চাই, চাই তোমাকে স্পর্শ করতে। তোমার ওই দুই চোখে চোখে রাখতে চাই। ব্যস। তুমি যে আছো আমাদের সঙ্গে, সেটুকুতেই আমাদের আনন্দ। হে পরমপুরুষ, তুমি চিরদিন বাস করো আমাদের অন্তরে। স্মিত আস্যে তিনি পাখির পিঠে হাত রাখলেন, স্পর্শ করলেন তার দুই পক্ষপুট, যেখানে স্পর্শ করলেন সেখানে ফুটে উঠল সোনালী আলো। সোনালী তিলকে উজ্জ্বল সেই পাখি উড়ে গেল জঙ্গলের দিকে। তার কণ্ঠে এখন সব পেয়েছির সুর।

দৌড়ে এল কাঠবিড়ালি, দৌড়ে এল হরিণ, দৌড়ে এল খরগোশ। সামনে এসে আগ্রহে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের দিকে। তিনি হাঁটু মুড়ে বসলেন তাদের সামনে। হরিণ এগিয়ে এসে তাঁর বুকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। দুরন্ত কাঠবিড়ালি এক ছুট্টে উঠে পড়ল তাঁর কাঁধে, দৌড়ে বেড়াতে লাগল তাঁর পিঠে, মাথায়। খরগোশটি তাঁর বাড়িয়ে ধরা হাতের তালুতে জিভের আলতো ছোঁয়া দিল, বুক ভরে নিল তাঁর ঘ্রাণ। প্রত্যেককেই তাঁর করস্পর্শে ধন্য করে, তিনি মৃদু কণ্ঠে বললেন তোরা কি কিছু চাস আমার থেকে? কেউ কোন কথা বলল না, শুধু ঘাড় নেড়ে বলল, না, না, কিচ্ছু না। খরগোশ রুবিরাঙা চোখে, কাঠবিড়ালি আর হরিণ কাজল চোখে তাকিয়ে রইল তাঁর দুই চোখের দিকে। গভীর মায়ায় করুণাঘন চোখে তিনিও তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে।

এমনি করেই এক এক করে সেখানে এসে জুটতে লাগল সেই অরণ্যের যত অরণ্যবাসী। সোনালী তিলক পাওয়া সেই পাখি অরণ্যের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দিয়েছে তাঁর সংবাদ। শাখা প্রশাখার ধ্বজা নিয়ে বারশিঙা, দীঘল পায়ের নীলগাই, শক্তিধর গাউর, ডোরাকাটা বাঘ, অজস্র টিপ পড়া চিতা, লেজ ফোলানো শেয়াল, কাঁটায় মোড়া সজারু, আরো আরো অনেকে। আরো এসে জুটল সব পাখি। সরু পায়ের বক, সারস, তীক্ষ্ণ ঠোঁটের চিল আর বাজ, সেজেগুজে এল ময়ুর, বনমোরগ। আরো কত পাখি এল রংবাহারি সাজে আর রকমারি ঠোঁট নিয়ে। সক্কলে চায় তাঁর স্পর্শ তাঁর আদর। তিনি সক্কলকে স্পর্শ করলেন, অনুভব করলেন সকলের প্রাণের উত্তাপ আর আবেগ। তিনি আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, কিছুই কি চাই না তোদের? সব্বাই বলল না, না, যা পেয়েছি তাই ঢের, কিচ্ছু চাই না আর। তুমিই তো রয়েছ, তুমিই থেকো চিরদিন। আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু চাই না আর।

সরোবরের যতো কুমুদ সকল পাপড়ি মেলে মৃদু দুলতে লাগল আনন্দে। গাছে গাছে বিকচ কুসুমরাশি ঝরে ঝরে পড়তে লাগল তাঁর মাথায়, তাঁর পদতলে। যে সব গাছে ফুল নেই তারা পাতাভরা শাখা দুলিয়ে ঝিরিঝিরি শীতল হাওয়ায় অস্ফুট উচ্চারণে বলল, তুমি আছো। তুমি আছো। তুমি আছো আমাদের অন্তরে, তুমি আছো আমাদের বাহিরে। সমস্ত সুগন্ধ নিয়ে সুরভিত বাতাস বইতে লাগল তাঁরই আশেপাশে।  

 

“ইট্‌স্‌ টু মাচ”। রথীন বলল।

“এক্স্যাক্টলি, এত কস্টলি, কোন মানে হয় না”। প্রমথ বিরক্ত হয়েই সায় দিল রথীনের কথায়।

“কিসের রে?” অগ্নি জিগ্যেস করল, সে কাউন্টারে যায়নি, সে জানে না। এই ফরেস্টে ঢোকা, সাফারির জিপ রিজার্ভ করা আর সঙ্গে মুভি ক্যামেরা থাকার চার্জ কতো। রথীন আর প্রমথই ওদিকটা সামলাচ্ছিল। সত্যি বলতে ওরা অগ্নিকে এসব ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেয় না, ওর মতামত নেওয়ার কোন মানেও হয় না। কারণ অগ্নির অবস্থাটা তারা দুজনে ভালোভাবেই জানে।

ওরা তিনজন একই স্কুলে, একই ক্লাসের সহপাঠী ছিল। স্কুলে পড়ার দশবারোটা বছর তাদের যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল, সেটা আজও আছে, শুধুমাত্র রথীন আর প্রমথর জন্যেই। সমাজের যে উঁচু স্তরে ওরা এখন উঠে গেছে, তার তুলনায় অগ্নি এখন নেহাতই নগণ্য। তারা অগ্নিকে অনায়াসে ইগনোর করতে পারত, সব সম্পর্কের ইতি টেনে দিতেই পারত, কিন্তু তা করেনি। সেটা ওদের মহানুভবতা ছাড়া আর কী হতে পারে?

লেখাপড়ায় ওরা তিনজনে প্রায় একই রকম ছিল, উনিশবিশ। হায়ার সেকেণ্ডারির পর ওরা তিনজনে ছিটকে গিয়েছিল তিনদিকে। রথীন গেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, প্রমথ ডাক্তারি আর অগ্নি চান্স পেয়েও সব ছেড়েছুড়ে চরম বোকামি করল, পড়তে গেল বাংলা অনার্স নিয়ে। বছর পাঁচেকের মধ্যেই অনিবার্য তফাতটা নজরে আসতে লাগল। কলেজের পড়া সাঙ্গ করে ওরা যখন সাফল্যের সিঁড়িতে প্রথম পা রাখল, অগ্নি তখন মফস্বলের এক স্কুলে বাংলার টিচার হয়ে চলে গেল। আর খাতা ভরে তুলতে লাগল কবিতা আর গল্পে। সে সব লেখা কেউ কেউ ছাপে। ক্বচিৎ কখনো কেউ ফেরত পাঠায়, আর অধিকাংশই নিরুত্তর থাকে, তার লেখাগুলি ছিঁড়ে ফেলে দেয় ওয়েস্ট বাস্কেটে।

কলকাতায় থাকার কারণে প্রমথর সঙ্গেই অগ্নির যোগাযোগটা বেশি। কলকাতায় এলে অগ্নি তার বাড়িতেই ওঠে, কারণ অগ্নি কলকাতার পাট বহুদিন চুকিয়ে দিয়ে বুড়ি মাকে নিয়ে চাকরি স্থলেই বাসা বেঁধে থাকত। বছর তিনেক আগে ওর মা মারা যাবার পর এখন আর কোন পিছুটানও নেই অকৃতদার অগ্নির।

সাফারি জিপদুটো ওদের সামনে এসে দাঁড়াতে, রথীন তাড়া লাগালো সকলকে, “কুইক, কুইক। সবাই উঠে পড়ো। সামনেরটায় আমরা আর পিছনেরটায় ছোটরা সবাই”।

তাই হল, সামনের জিপে উঠল ওরা তিন বন্ধু, রথীনের স্ত্রী সোনিয়া আর প্রমথর স্ত্রী পলা। পিছনের জিপে উঠল প্রমথর দুই মেয়ে, আর রথীনের এক ছেলে এক মেয়ে, আর কাজের মেয়ে রুক্কি। রথীন বিয়ের পর থেকে প্রায় বছর পনের হল জব্বলপুরেই সেটেল্‌ড্‌, সে এর আগেও এই ফরেস্টে এসেছে কয়েকবার। এখানকার অনেক নিয়মকানুনই তার জানা।

“একটু পরেই আমরা ফরেস্টের ভিতরে ঢুকবো। কেউ চেঁচামেচি করবে না। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলবে। গাড়ি থেকে নামবার চেষ্টা করবে না। ড্রাইভার আঙ্কেল কিন্তু শুধু ড্রাইভারই নয়, উনি জঙ্গলের গাইডও। উনি যেমন বলবেন, সেভাবে চলবে। নো দুষ্টুমি। ওকে?”

ছোটদের গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সকলকে নির্দেশ দিল রথীন। তারপর এগিয়ে গিয়ে সামনের গাড়িতে উঠে বসল, সামনের সিটে। তার পাশে অগ্নি, ওপাশে ড্রাইভার। ওদের গাড়িটা ছেড়ে দিতেই, অনুসরণ করল দ্বিতীয় গাড়িটাও। 

 

পাস দেখিয়ে দু নম্বর গেট পার হয়ে ঢুকতে ঢুকতে ড্রাইভার বলল, “এইবার আমরা কোর জংগলে ঢুকে পড়লাম, স্যার। সকলে চারপাশে সতর্ক নজর রেখে চলুন, যে কোন সময়ে যে কোন অ্যানিমাল চোখে পড়তে পারে”। গাড়ি খুব ধীর গতিতে চলতে লাগল, জঙ্গলের ভিতর সরু রাস্তা দিয়ে। দুপাশে শাল, পলাশ, তেন্ডু, মহুয়ার গভীর জঙ্গল। কিছু কিছু টিকও চোখে পড়ছে

পুব আকাশে ভোরের আলোর আভাস দেখা গেলেও এখনো ভোর হয় নি। ঘন জঙ্গলের নীচে এখনো চাপচাপ অন্ধকার, রহস্যময় করে রেখেছে চারিপাশ। অগ্নি খুব জোরে শ্বাস নিল, বলল, “শ্বাস নিয়ে দেখ। সুন্দর না গন্ধটা?”

“কিসের গন্ধ? ফুলের?” রথীন জিগ্যেস করল।

“জঙ্গলের গন্ধ”।

রথীন আর প্রমথ হো হো করে হেসে ফেলেই, সামলে নিল নিজেদের, “সরি, সরি। হাসিটা জোর হয়ে গেছিল। তুই এমন ছড়াস না, অগ্নি, সত্যি”, প্রমথ বলল।

“এই জন্যেই তো অগ্নিকে ভালো লাগে। আস্ত একপিস খোরাক”। নিঃশব্দে হাসতে হাসতে রথীন আরো বলল, “ও সংগে থাকলে ইউ নেভার ফিল বোর। শালা, জঙ্গলের গন্ধ”।

“সে কিরে, তোরা পাচ্ছিস না? তোমরাও পাচ্ছো না?” পিছন ফিরে পলা আর সোনিয়াকে জিগ্যেস করল অগ্নি।

“না, অগ্নিদা। আমরা তো কবি নই”। পলা উত্তর দিল। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি। সোনিয়ার গায়ে কনুই দিয়ে মৃদু ঠেলা দিয়ে আবার বলল, “প্রকৃতির গন্ধ-টন্ধ কবিদের নাকেই ধরা দেয়। “আকাশের গায়ে যেন টকটক গন্ধ। টকটক থাকে নাকো হলে পরে বৃষ্টি, তখন দেখেছি চেটে একদম মিষ্টি” সুকুমার রায়ের ছড়া ছিল না? তা অগ্নিদা, আপনার এই গন্ধটা কেমন?”

ড্রাইভার আর অগ্নি ছাড়া সকলেই হাসছিল। অগ্নির কোন বিকার নেই, সে আনমনে বলল, “ওভাবে তো বলতে পারব না, কিন্তু আছে, গন্ধটা পাচ্ছি। ড্রাইভারসাব, থোড়া রুকিয়ে তো, গাড়িকা স্টার্টভি বন্ধ করিয়ে না”।

ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দিল। ইঞ্জিনের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যেতে, শোনা গেল একটানা ঝিঁঝির ডাক, ভোরের পাখিদের কাকলি। গাছের পাতায় পাতায় ঝিরঝির শব্দদমকা বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে যাওয়ার শব্দ। সব মিলিয়ে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ। কান পেতে শুনতে লাগল অগ্নি। তার সমস্ত শরীরে অদ্ভূত শিহরণ লাগল।  

“গাড়ি থামালি কেন?” রথীন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।

“মন দিয়ে শোন না, জঙ্গলের নিজস্ব একটা শব্দ আছে শুনতে পাচ্ছিস না?”

“এ মাকালটা মাইরি, এত বোর করবে জানলে নিয়েই আসতাম না”। প্রমথ বলল। “ড্রাইভারজি আপ চলিয়ে। উনকা বাতোঁ মে মত আইয়ে, আপকা দিমাক ঘুম জায়েগা”।

গাড়ি আবার স্টার্ট করে চলা শুরু করতে অন্য সব শব্দই আড়াল হয়ে গেল।

রথীন বলল, “ওটা ঝিঁঝিঁর ডাক। শালা, থাকিস তো তুই মফস্বলে, গেঁয়ো ভুত একখানা। কোনদিন ঝিঁঝিঁর আওয়াজ শুনিসনি? ঝিঁঝিঁ উচ্চিঙ্গের মতো এক রকমের পোকা। ডানা কাঁপিয়ে আওয়াজ বের করে। কখন করে জানিস? শালা, মেটিংয়ের সময়”।

“তুইও পারিস, রথীন, সারাটা জীবন ওর কেটে গেল হ্যাণ্ডেল মেরে, ওকে তুই মেটিং বোঝাচ্ছিস”! চাপা হাসির রোল উঠল আবার, খুক খুক করে।

পলা বলল, “তোমার মুখের কোন লাগাম নেই, ওভাবে কেউ বলে? ছিঃ। তাও আমাদের সামনে?”

পলার উরুতে আদুরে চিমটি কেটে সোনিয়া বলল, “এমনিতেই তো অগ্নিদা দুখী আত্‌মা, তার ওপর নমক মত ছিড়ক না, প্লিজ”।

সোনিয়ার বাবা বহুদিনের প্রবাসী বাঙালী এবং এ অঞ্চলের প্রতিপত্তিশালী কন্ট্রাক্টর। তাঁর লওতি বেটি হিসেবে সে জব্বলপুরেই বর্ন এণ্ড ব্রটআপ। কাজেই তার বংলায় রাষ্ট্রভাষার মিশেল। দেহান্ত হওয়া শ্বশুরের দামাদ হিসেবে রথীন এখন রাজ্য ও রাজকন্যের অধীশ্বর।

“দুখী আতমা? বাঃ বেড়ে বলেছো তো সোনিয়া”। প্রমথ বলল। “এদিকে তো জঙ্গলে একটা বেড়ালও  দেখা যাচ্ছে না, মাইরি। এতগুলো টাকা গচ্চা দিয়ে, আমরাও কি দুখী আতমা হয়ে বাড়ি ফিরব নাকি রে, রথীন”?

“তাই তো দেখছি। আগেরবার বাঘ না দেখলেও বাইসন, নীলগাই, অনেক হরিণটরিণ  দেখেছিলাম সত্যি, এবারে তাও চোখে পড়ছে না। আধঘন্টা তো হয়ে গেল আমরা ফরেস্টে ঢুকেছি। কেয়া, ড্রাইভারজি, আভি তক কুছভি দিখাই নেহি দিয়া কিঁউ”?

“কুছ সমঝ মে নেহি আ রহা হ্যায়, স্যার। অ্যায়সা তো কভি হোতা নেহি হ্যায়”।

“তোদের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, সবাইকে গান্ডু বানাচ্ছে, বুঝেছিস রথীন”? প্রমথ মন্তব্য করল।

 ড্রাইভার কিষুণলাল খুব ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিল। এ জঙ্গলে বাঙালি টুরিস্ট এতো আসে, তাদের কথা শুনে শুনে সে চলনসই বাংলা বুঝতে পারে, কিন্তু বলতে পারে না। তার তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞ চোখ দুপাশে খুঁজে চলেছে কোন না কোন জ্যান্ত প্রাণী। যাতে তার সায়েবদের পয়সা উশুল হয়ে যায়। সে জানে কোন ওয়াইল্ড প্রাণী না দেখে এরা ফিরে গেলে ফরেস্টের বদনাম। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যদিও তার কোন ভূমিকা নেই, তবুও এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তার নিজেরও খুব শরমিন্দা লাগে। টুরিস্টরা এখানে আসে, পয়সা খরচ করে, জঙ্গলের প্রাণী দেখার জন্যে। সেটা না হলে বাস্তবিক তার মনে হয়, সেই যেন বুরবক বানিয়ে দিল এই টুরিস্টগুলোকে। আজ কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না, কী হল? একটাও প্রাণী চোখে পড়ছে না কেন?

ওয়াকি-টকি চালু করে সে যোগাযোগ করল অন্যান্য সাফারি জিপের ড্রাইভারের সঙ্গে।             

“তাজ্জব কি বাত হ্যায়, ইয়ার। অ্যায়সা কভি নেহি দেখা”।

“কেয়া হ্যায়, কাঁহা”?

“চার নম্বর বিট মে যো বড়ি তালাও হ্যায় উধার আ যা। ফটাফট”। ওয়াকি-টকি অফ করে কিষুণলাল গাড়ি ডানদিকে মোড় নিয়ে ঢুকে পড়ল গহনতর জঙ্গলের মধ্যে।

“কুছ পতা চলা?” রথীন জিগ্যেস করল।

“অ্যায়সাই কুছ বোল রহা হ্যায়। চলিয়ে, দেখতে হ্যাঁয়। লেকিন একদম শান্ত রহিয়ে, কোই আওয়াজ হোনা নেহি চাহিয়ে”।           

 

তাদের সামনে আরো পাঁচটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বলে, জায়গাটা ওদের চিনতে অসুবিধে হল না। বনপথ থেকে বাঁদিকে কিছুটা ঘাস জমি পেরিয়ে সেই সরোবর। আর সরোবরের তীরে একসঙ্গে এতগুলি প্রাণীর সহাবস্থান দেখে ওদের বিস্ময়ের অবধি রইল না। বাঘ ও হরিণ। সাপ ও নেউল। খরগোশ আর বাজ। একইসঙ্গে পাশাপাশি বসে আছে, ঘুরছে, ফিরছে, উড়ছেকোন ভয় নেই। তারা কেউ যেন খাদক নয়। খাদ্যও নয় কেউতাদের এই নিশ্চিন্ত অবসর যাপনের দৃশ্য, মানুষগুলোর আজীবন গড়ে তোলা সমস্ত ধারণাকে ঝাঁকিয়ে দিল। কী করে সম্ভব, অদ্ভূত, এমন এক অদ্ভূত ঘটনা! মানুষগুলো উত্তেজিত। যতই শান্ত আর নিঃশব্দ থাকার চেষ্টা করুক মানুষগুলো, কিছুতেই পারল না। তাদের অস্ফুট বিস্ময় আর চাপা কথাবার্তাও পাল্টে দিল জঙ্গলের নিজস্বতা। তাদের উজ্জ্বল প্রসাধন। তাদের আধুনিক রঙিন পরিধান, তাদের বহুমূল্য ক্যামেরার অজস্র ক্লিক। পুরো পরিবেশটাকেই খুব বেমানান করে তুলল     

তিনি বসেছিলেন এবং ছোট বড়ো সকল প্রাণীই তাঁকে এতক্ষণ ঘিরে ছিল বলে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। প্রথমে তিনিও লক্ষ্য করেননি। কিন্তু একে একে সাতটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে তিনি টের পেলেন এই টুরিস্টদের উপস্থিতি। তিনি অধৈর্যে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর উজ্জ্বল ও সুঠাম নগ্নতায় শিউরে উঠল সকল নারী ও পুরুষ। ব্যাকুল হল উপস্থিত নারীরা, পুরুষরা অনুভব করল হীনমন্য ঈর্ষা। প্রভাত সূর্যের মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর শরীর ও মুখ। তিনি চোখ তুলে তাকালেন একবার। এতদূর থেকেও তাঁর নিবিড় দৃষ্টির অভিঘাতে সমস্ত মানুষ আচ্ছন্ন হয়ে রইল বহুক্ষণ।

অতঃপর তিনি পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন সরোবরের দিকে। তাঁর নিরুদ্বেগ চলার সঙ্গী হল সমস্ত প্রাণী, পশু, পাখি। সরোবরের তীরে তিনি দু হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। সমস্ত প্রাণীই যেন একান্ত অনিচ্ছাতে তাঁকে ছেড়ে ঢুকে যেতে লাগল অরণ্যের ভিতর। সমস্ত প্রাণী যখন চলে গেল দৃষ্টির অন্তরালে, তিনি নেমে গেলেন সরোবরের মধ্যে। তিনি সম্পূর্ণ অবগাহন করার পর, সোনালী তিলক আঁকা সবুজ ডানার সেই পাখিটিও শিস দিয়ে উড়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। তিনি আর উঠলেন না, তাঁকে আর দেখা গেল না

 “মালটা কে বলতো?” এতক্ষণে রথীন মুখ খুলল।

“কে জানে - পাগল-টাগল হবে হয়তো”। প্রমথ উত্তর দিল।

“যাঃ জলে নেমে গেল যে, তুই কি এটাকে সুইসাইড কেস বলতে চাইছিস?”

“তা নাহলে, কোন সাধু, জংলী বাবা – টাবা হবে”।

“আর এই জানোয়ারগুলো, সবাই যে ওর চারদিকে ঘুরছিল পোষা কুকুরের মতো, কেন?”

“বিভূতি!”

“যাই বলো হেভি দেখতে কিন্তু। কেমন জানি একটা ফিলিংস হচ্ছিল”। পলার স্বরে মুগ্ধতা।

“তাতো হবেই। শালা, ল্যাংটো, জঙ্গলের মধ্যে ভয়ারিজ্‌ম্‌। এতগুলো মহিলা দেখেও লজ্জাশরমের কোন বালাই নেই”। রথীন উত্তর দিল।

“আমি বলছি তোকে, এ হচ্ছে একজন নাগা সন্ন্যাসী। যাদের কুম্ভমেলায় দেখা যায়, হি ইজ ওয়ান অব দেম। প্লাস হঠযোগী। এখন জলে নেমেছেপাব্লিক সরে গেলে, চুপচাপ উঠে জঙ্গলের ভিতরেই কোথাও সান্টিং হয়ে যাবে”। নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেবার সুরে প্রমথ বলল।

“কিন্তু চোখমুখের ওই উজ্জ্বলতা। সম্পূর্ণ নগ্ন অথচ কি সহজ। এই পরিবেশে একবারের জন্যেও বেমানান মনে হল না”! সোনিয়া আনমনে বলল।

 আর কিছু দেখার ছিল না। সাতখানা গাড়িই লাইন ধরে একসঙ্গে ফিরছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ফিরতে পারবে অভ্যস্ত জীবনে। রথীন তার ক্যামেরা রিওয়াইণ্ড করে একটু আগেই তোলা ছবিগুলো চেক করছিল। আশ্চর্য হয়ে বলল, “প্রমো, তোর ক্যামেরাটা চেক করতো, এতগুলো শট নিলাম, একটাও ওঠেনি। খালি গাছপালা আর লেকের ছবি। ফ্রেমে কেউ নেই, না ওই লোকটা, না কোন জানোয়ার। দুটো ভিডিও তুলেছিলাম, সেম কণ্ডিসান”।

“কি বলছিস? দাঁড়া, দাঁড়া, আমারটা চেক করছি”।

 এতক্ষণ কোন কথাই বলেনি অগ্নি। চুপচাপ বসে কিছু ভাবছিল, বলল, “পাবি না। এ ছবি কোন ক্যামেরাতেই আসবে না। আমরা যাঁকে দেখেছি তিনি আমাদের মতো কোন মানুষ নন। নাগা সন্ন্যাসী, হঠযোগী, জংলী বাবা, কেউ নন। ইনি আমাদের সমস্ত ধারণার অনেক ঊর্ধে। পুরোটাই একটা অনুভব”।

“নাঃ রে, আমার ক্যামেরাতেও সেম অবস্থা। শুধুই জঙ্গল”। হতাশ স্বরে প্রমথ বলল।

“লে, এবার অগ্নির বাতেলা শোন। ওর এই ডায়ালগগুলোও রেকর্ড হবে না, দেখিস, রিপ্লে করলে জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ শোনা যাবে, ঝিঁঝিঁর ডাক”। রথীন পিছন ফিরে বলল।

“ছিঃ বাতেলা, বলিস না, রথী, বল বাণী, বাব অগ্নিদেবের বাণী”। প্রমথ আওয়াজ দিল।

ওদের এই কথায় হাসল অগ্নি, আবার বলল, “খুব সহজ কথাটা আমাদের মাথায় কিছুতেই বসতে চায় না। তার কারণ, তাতে মাটি হয়ে যাবে আমাদের অহং, ভেঙে পড়বে আমাদের এতদিনের বানিয়ে তোলা সভ্যতার ধারণাগুলো। অত ভাবনায় কাজ কি গুরু, তার চেয়ে নিট রেজাল্টটা ভাব না, যে আশায় অনেক টাকা খরচ করে তোরা চাপে ছিলি, সেটা উশুল হয়ে গিয়েছে সুদ সমেত সোনিয়া ম্যাডাম, হিন্দীতে কি যেন বলে বেশ, ব্যাপারটাকে?

“পয়সা বোসুল”।

“এক্স্যাক্টলি। প্লাস সারা জীবন লোককে শোনানোর মতো একটা গপ্পোও পেয়ে গেলি। কিন্তু দুঃখ, কোন প্রমাণ রইল না। যারা এই গপ্পো শুনবে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্বাস করবে, বলবে তিনি আছেন। অধিকাংশই বলবে, গত রাতে ক’ পেগ চড়িয়েছিলে, গুরু? খোঁয়াড়িটা সকাল পর্যন্ত রয়ে গেল! নিজেদের চোখে দেখেও আমরা বিশ্বাস করি বা নাই করি, তিনি আছেন আমাদের সকলের অন্তরে, তিনি থাকবেনও চিরদিন”!  

-*-

পরের গল্প - " প্রসাদী ফুল




রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

হাত-পা বাঁধা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " স্তন্য-ডাইনী "


আমাদের এই শহর – পথিকপুরের শহীদ জগবন্ধু স্টেডিয়ামে আসছেন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় জিকাল্ডো। কোন দেশে থাকেন ঠিক জানি না। পর্তুগাল, ইটালি কিংবা ব্রাজিল এমনকি চিলি হলেও হতে পারে। সত্যি বলতে এই দেশগুলোও ঠিক কোনদিকে, মানে আমাদের দেশের পূর্বে না উত্তরে, নাকি কিছুটা দক্ষিণ দিক ঘেঁষে – সেটাও সঠিক বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি আমি তাঁর অন্ধ ভক্ত। জিকাল্ডোকে আমি আদর করে বলি জিকুদা। জিকুদার খেলা টিভিতে দেখাই যায়, কিন্তু সে খেলাও যে আমি খুব দেখেছি তা নয়। তবে খবরের কাগজে ছাপানো তাঁর সব ছবির কাটিং আমি সাঁটিয়ে রেখেছি আমার ঘরের তিনদিকের দেওয়ালে।

আমি নিজে ফুটবল সেভাবে খেলি না, ছোটবেলায় গলিতে খেলতাম, রবারের বলে। সেই পর্যন্তই। অতএব খোলা মাঠে ফুটবল খেলাটা কী ভাবে খেলতে হয় সে বিষয়েও আমার তেমন ধারণা নেই। তার কারণ মাঠে গিয়ে আমাদের এদিকের ভাল ভাল টিমের খেলা দেখতে আমি তেমন উৎসাহ পাই না। লাইন দিয়ে টিকিট কাট, দুঘন্টা আগে থেকে মাঠের গ্যালারিতে সিট আগলে বসে থাক। আর বসে বসে খেলা দেখা? ইস্‌ সে খেলার যা ছিরি - অখাদ্য যত প্লেয়ার নিজেদের মধ্যে বল নিয়ে ঝুটোপুটি করছে। একবার বাঁদিকে ছুটছে তো পরক্ষণেই আবার উল্টোমুখে ছুটছে। এ আবার কি, মাঠের মধ্যে আনতাবড়ি ছুটোছুটি করলেই ফুটবল খেলা হয়ে গেল? তবে আমার বন্ধুদেরও বলিহারি। তাদের সবাই এবং গ্যালারির সব দর্শকও ওই খেলা দেখেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, গোল-টোল হলে তিড়িং বিড়িং লাফায়। আর নিজের দল গোল খেয়ে গেলে মাথা চাপড়ে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি গালাগাল দেয়।

সেখানে জিকুদাকে দেখ – কি শান্ত, সৌম্য চেহারা, যেন দেবদূত। দেখিনি কোনদিন, তবে শুনেছি জিকুদার পায়ে আঠা আছে, একবার বল এলে জিকুদার শ্রীচরণে সেটা চিপকে যায় – সে আঠা ছাড়ে বিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে – গোওওওল হলে। সেই জিকুদা আমাদের শহরের স্টেডিয়ামে আসছে আর আমি মাঠে যাবো না তাকে একবার চোখের দেখা দেখতে?

আমাদের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার দশেক মতো সিট। প্রথমে ভেবেছিলাম, আরামসে টিকিট পেয়ে যাব, এই পোড়া শহরে কপিস লোক আর আছে – যারা জিকুদার কদর বোঝে? তাই প্রথম দিকে একটু গড়িমসি করে, দিন তিনেক পরে টিকিট কাটতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! শুনলাম প্রথম দিনেই টিকিট সব শেষ, টিকিটের খুদ-কুঁড়োও এখন আর মিলবে না।

পরদিন সকালেই রওনা হলাম শানুদার বাড়ি। আমাদের এলাকার নেতা, তাঁর নাম শুনলে আগে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খেত। ইচ্ছা থাকলেও আজকাল অবশ্য খেতে পারে না  – কারণ বাঘগুলো থাকে সুদূর অভয়ারণ্যের ভেতর আর গরুরা গোমাতা হয়ে আমাদের সঙ্গে। শানুদার পুরো নাম শান্তিরঞ্জন, তবে তাঁর চারপাশে এবং তাঁর কীর্তিকলাপে সর্বত্রই অশান্তি বিরাজ করে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে আড়ালে বলে শানু মানে সেয়ানা – নিজের স্বার্থটি তিনি ষোলআনা বোঝেন কিনা।

কী সব জরুরি মিটিং-টিটিং চলছিল বলে, তাঁর বৈঠকখানা ঘরে আমি ডাক পেলাম ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষার পর। আমাকে দেখেই আধবোজা চোখে বললেন, “কিরে তোর আবার কী হল, গতি? টিকিট পেলি না? তাহলে কী হবে? জিকাল্ডোকে দেখবি কী করে?”

আমার নাম গৌতম পল্লে, সংক্ষেপে গতি। কিন্তু গতি নাম হলে কী হবে – শানুদার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিতি থাকলেও আমার আজ পর্যন্ত কোন গতি হয়নি। তবে আশা আছে আজ আর শানুদা আমাকে হতাশ করবেন না, কিছু একটা গতি করে দেবেনই।

কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, “বুঝতেই তো পারছেন, দাদা। কোন গতিকেই সুবিধে করতে পারলাম না। তাই আপনার কাছে আসা। কিছু একটা করে দিতেই হবে দাদা, আমাদের শহরে জিকুদা আসছেন আর আমি দেখতে পাবো না, এ হতেই পারে না। বিশেষ আপনি থাকতে”।

“বুঝি রে সব বুঝি, তোরা আমায় এত ভক্তি-শোদ্দা করিস, ভরসা করিস, বিশ্বাস করিস। তোরা ছাড়া আমার কী আছে বল তো? সমাজের পাঁচ জনের জন্যে কিছু করতে পারলে, আমি মনে করি, তোদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারলাম। টিকিট আমার কাছে আছে, কিন্তু যা দাম, তুই কি দিতে পারবি, গতি?”

আমি খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কত দাম, শানুদা?”

“দুরকম টিকিট আছে - পঁচিশ আর চল্লিশ হাজার। চল্লিশের টিকিটে বসলে মনে হবে, তুই মাঠের মধ্যেই বসে আছিস – গ্যালারিতে নয়”।

“কিন্তু শুনেছি, গ্যালারির টিকিট দু রকমের? পিছনের দিকের সিটের দাম পনেরশ আর সামনের দুহাজার...”।

“ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু এখন তার ওই রকমই দাম...কিছু পড়ে আছে... খুব চাপ চলছে রে, হয়তো আজ কালের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে”।

আমি রীতিমত চমকে গিয়ে বললাম, “এত দাম দিয়ে কারা কিনছে, শানুদা?”

“নেবার লোকের অভাব নেই রে, গতি – ওই দামেও লোকে হা হা করে কিনছে। এ রাজ্যের লোক তো বটেই – ভিন রাজ্যের লোকরাও...। বর্ষার সন্ধ্যেয় চপ-ফুলুরির দোকানে কেমন ভিড় হয় দেখিসনি? তার থেকেও বেশি – সাত হাজার টিকিট আমার হাতে এসেছিল – শ তিনেক বাকি আছে...”

খুব কাকুতির সুরে বললাম, “আমার জন্যে দামে-দামে একটা দিন না, দাদা”।

“ফাগল হয়েছিস? এ টাকার হিসেব দিতে হবে না আমায়? এই টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতার এদিকে ওদিকে। তুই কী ভাবছিস, আমি ঝাড়ছি টাকাটা? এমনটা ভাবতে পারলি, গতি? তোদের সঙ্গে এতদিন উঠছি বসছি, এই বুঝি তার পোতিদান?”

আমি লজ্জায় কুঁজো হয়ে বললাম, “তোমাকে আমরা দেবতার মতো ভক্তি করি, দাদা। এমন কথাটা তুমি ভাবলে কী করে? আমার বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে সারদায় পাঁচলাখ লাগালো, সবটাই গেল জলে। তোমায় আমরা কিছু বলেছি? এ পাড়া - সে পাড়ার কত গরু যে পাচার হয়ে চলে গেল সীমান্ত পেরিয়ে – তুমি তার কী করবে বলো? মায়ের গয়না বেচা আট লাখ টাকা গেল আমার ক্লাস ফোর পাস ভাইয়ের হাইস্কুলের টিচার হতে গিয়ে। তাতেই বা তোমার কী করার ছিল, বলো। আমাদের ভক্তিতে কোনদিন কোন খাদ দেখেছ? রেশনে চাল পাইনি, চিনি পাইনি – তাতে কি? বাজার থেকে সেই চাল- চিনি কিনেই তো ভাত খেয়েছি, চা খেয়েছি। বলো খাইনি – চুপ করে, মুখ বুজে। আমরা তো জানি – সব দিক দিয়েই তোমার হাত-পা বাঁধা। আমি একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে সিকিউরিটির কাজ করি, মাস গেলে হাজার ছয়েক পাই। তাতেই কোন মতে আমাদের দিন চলে যাচ্ছে...। তোমার কাছে কোনদিন কিছু চেয়েছি? কোন অভিযোগ করেছি? আমরা জানি, তুমি যখন আছ মাথার ওপরে, আমরা টিকে থাকব ঠিক...”। বলতে বলতে আমার চোখে জল ভরে এল। গলা বুজে এলেও বললাম, “তোমাকে আমরা অবিশ্বাস করতে পারি, একথা তোমার মনে হল কী করে, দাদা?”

শানুদাও চশমা খুলে চোখটা মুছল রুমালে, বলল, “আমিই বা কী পেয়েছি বল? সারাটা জীবন দলের জন্যেই তো প্রাণপাত করে দিলাম। একফালি এই জমিতে ধারদেনা করে ছোট্ট এই বাড়িটা করেছি – কোন মতে। তিনতলা বাড়ি, মোটে বারোখানা ঘর। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথ, ব্যালকনি। এসি। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে সবজি বাগান। মাথাগুঁজে এ বাড়িতে থাকার এত কষ্ট যে, ছেলে-মেয়ে দুটোকে চোখের সামনে রাখতে পারলাম না। কলকাতায় রেখে আসতে হল তাদের লেখাপড়ার জন্যে। তাও ইংরিজি মিডিয়াম, প্রাইভেট স্কুলে। গাড়ি রাখতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে – কিন্তু তাও দলের কাজের জন্যেই তিনটে গাড়ি রাখতে হয়েছে। আরও দুটো হলে ভালো হত – কী করব উপায় নেই... টাকার বড়ো টানাটানি, রে গতি...”।

আমি নিজেকে সামলে শানুদার সামনে মেঝেয় বসে পড়ে বললাম, “সে কি আর আমরা জানি না, বুঝি না, শানুদা? বুকের রক্ত দিয়ে, কী ভাবে তুমি দলটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছ? ছাতা হয়ে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছ আমাদের মাথার ওপর – ঝড়-ঝাপটা-রোদ-বৃষ্টি সামলে। আমাদের এতটা অকিতজ্ঞ ভেব না, শানুদা। তোমাকে দাদার মতো মনে করি বলেই না, তোমার কাছে একটা টিকিটের আবদার নিয়ে এসেছিলাম। এ ব্যাপারেও যে তোমার হাত-পা বাঁধা, সেকথা বুঝতে পারিনি গো দাদা। বুঝলে কি আর আসতাম, তোমাকে দুঃখ দিতে?”

শানুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, বলল, “সত্যিই রে, আমার হাত-পা বাঁধা, কিচ্‌ছু করার নেই। তোকে এভাবে ফেরাতে আমারও কি মন চাইছে? একদম না। কিন্তু... একটা উপায় বলতে পারি, যদি পাঁচকান না করিস”।

অসহায় হাত-পা বাঁধা শানুদার হাত হয়তো কোনভাবে খোলার আশায় আমি খুব উদ্গ্রীব হয়ে বললাম, “কী উপায়, দাদা?”

চারদিকে তাকিয়ে, ঘরে উটকো কেউ নেই দেখে, শানুদা দুহাতের আট আঙুলের আটটা আংটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল, “ঠোঁটকাটা নেপালকে নিয়ে থানায় যা, ওখানে স্টেডিয়ামে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু সাবধান, ঘুণাক্ষরেও কেউ যেন জানতে না পারে”।

“কেউ জানবে না, দাদা। ওফ্‌, তোমাকে কী বলে যে শোদ্দা জানাবো, শানুদা। কী যে আনন্দ হচ্ছে, চোখের সামনে জিকুদাকে দেখব, হেঁটে চলে বেড়াতে – ভাবা যায় না। আমি তাহলে এখন আসি, দাদা?”

“আয়”। 

 

শানুদার বাড়ি থেকে বেরোতেই সামনের চায়ের দোকানে ঠোঁটকাটা নেপালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নেপাল বলল, “কি রে, দাদার সঙ্গে দেখা করলি? কী বলল, দাদা?”

“খুব গোপন কথা, বাইরে আয়, বলছি”। নেপাল দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াতে বললাম, “দাদার কাছে গিয়েছিলাম, একটা টিকিটের জন্যে। বলল, তোর সঙ্গে থানায় যেতে...”।

“জিকুদার টিকিট? আবে আমাকে বলবি তো”!

“আমি আমতা-আমতা করে বললাম, “ভেবেছিলাম, দাদাকে বলে, স্টেডিয়ামের একটা টিকিট যদি যোগাড় হয়ে যায়...”।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে নেপাল বলল, “তা কি বলল, শানুদা?”

“যা দাম বলল, তাতে আমাকে বাপের ভিটেমাটি বেচতে হবে... পঁচিশ আর চল্লিশ হাজার”।

“তুই কি বললি?”

“বলার আর আছেটা কী? দাদা তো আমার অবস্থা জানেই। তোর সঙ্গে থানায় যেতে বলল, ওখানে নাকি মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে?”

“তা হয়ে যাবে। কিন্তু সেখানেও কিছু টাকা খসাতে হবে – দুহাজার পার হেড। তোর কটা লাগবে?”

“একটাই...কিন্তু দু হাজার? কমসম হবে না?”

শানুদার মতোই দুখু-দুখু উদাসমুখে নেপাল বলল, “কমের কথা মুখেও আনিস না, গতি। আমাদের হাত-পা বাঁধা। জানিস তো সবই – এ টাকার সবটাই চলে যাবে কলকাতায়। তোর কী মনে হয় – থানার সঙ্গে সাঁট করে আমরা ঝাড়ছি টাকাটা?”

“আরে না না, তা কেন ভাবব? তোর সঙ্গে কি আমার সেই সম্পক্কো?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেপাল বলল, “সেই...শানুদাকে তো চিনিস, সবার জন্যেই কত চিন্তাভাবনা করে। তোদের মতো কাছের ছেলেদের জন্যেই, নানান রকম ফন্দি-ফিকির বানিয়ে রেখেছে। সাধ্যের মধ্যেই যাতে তোদেরও সাধ মেটে। মাঝে মাঝে খুব ধিক্কার দিই নিজেকে, জানিস তো? এতদিন ধরে পাটি করে কী পেয়েছি বল? তুই তো জানিস চার কাঠা জমিটা কীভাবে যোগাড় করলাম। তারপর কীভাবে চারতলা বাড়িটা পোমোট করলাম। বদলে কী পেলাম? মোটে দুখানা ফ্ল্যাট আর একতলার দোকানটা”।

সবটা না জানলেও কিছু কিছু জানি। নেপালরা বছর পাঁচেক আগেও থাকত রেললাইনের ধারে জবরদখল জমিতে। এর মধ্যেই বিধবা এক বুড়িকে ধমকে-চমকে চার কাঠার ওই জমিটা হাতাল, আর রাতারাতি তুলে ফেলল চারতলা বাড়িটা। নিজের জন্যে, রাস্তার ধারে একটা দোকানঘর, আর দোতলায় দুটো ফ্ল্যাট রাখল, বুড়িকেও দিল একটা। বাকি তেরটা ফ্ল্যাট বেচে দিল। রাস্তার ওপরেই নেপালের মনিহারি দোকানটা এখন চালায়, ওর বৌ আর মা। রমরমিয়ে চলছে দোকানটা। সত্যিই তো, কী এমন পেল এত বছর পাটি করে?

নেপাল একটু চুপ করে থাকার পর আবার বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোদের মতোই একটা চাকরি নিয়ে সারাজীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু পারি না ওই শানুদার জন্যে। মানুষটা এত ভাল, আর উদার সমাজসেবী – মনে হয় – ওকে দেখে আমাদের সকলের শেখা উচিৎ। শুধু নিজেরটুকু নিয়ে থাকলেই হয় না – সবার জন্যেই কিছু না কিছু করা দরকার। তা নইলে সমাজে থেকে আর লাভ কি, বল? সে দুঃখের কথা যাগ্‌গে, থানায় কখন যাবি...আজই বিকেলে, নাকি কাল সকালে?”

“বিকেলে ... আজ ডিউটি থেকে ছুটি নিয়েছি। পরপর দুদিন ছুটি নিলে চাকরিটাই...”

“ঠিক আছে, সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ এখানেই আয় – দু হাজার টাকা নিয়ে... একসঙ্গে থানায় যাব, ঠিক আছে?” 

 

সেদিন দুহাজার টাকা নিয়ে, থানা থেকে আমাকে একটা চুটকা কাগজ দিয়েছিল। সে কাগজের মাঝখানে গোল স্ট্যাম্প মারা। সেই কাগজটা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের গেটে যেতেই, গেটে থাকা পুলিশরা কাগজটা পকেটে পুরে, আমাকে মাঠে ঢুকিয়ে দিল। সেদিন থানাতেই বলেছিল, এই কাগজ কিন্তু গ্যালারিতে বসার জন্যে নয় – শুধু মাঠে ঢোকার জন্যে। মাঠে ঢুকে কোথায় দাঁড়াব, কী করব সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তবে হ্যাঁ – থানা থেকে দেওয়া চুটকার কথা বাইরের লোকের কানে যেন কোন মতেই না যায়।

পোগ্‌গামের ঘন্টা দুয়েক আগে আমি মাঠে ঢুকে দেখলাম, স্টেডিয়ামের গ্যালারির অনেক সিটই ফাঁকা। আর গ্যালারির নীচে আমরা বেশ কজন ঘোরাঘুরি করছি। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমার চেনাজানা, যেমন পদা, রতন, সমু, বাপি। কাজেই আমাদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। রতনই প্রথম কথা বলল, “কি বে, থানার চোথা?”

আমি ভয়ে ভয়ে নীচু গলায় বললাম, “চুপ বেটা, কেউ যেন জানতে না পারে”। আমার কথায় ওরা সবাই হো হো করে হেসে উঠল, পদা বলল, “শহরের সব কচি বাচ্চারাও জানে, আর তুই আমাদের চুপ করতে বলছিস?”

সমু বলল, “শুনেছি, মোটামুটি হাজার তিনেক চোথা ছেড়েছে থানা থেকে”।

রতন বলল, “শানুদা বলছিল গ্যালারির টিকিট সব বিক্রি হয়ে গেছে, তার ওপর আমাদের মত থানার চোথাধারীরা, মাঠে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যাবে না, মাইরি”।

দেখলাম ওরা ভেতরের খবর সব জানে, সে খবরের কিছু কিছু যে আমিও জানি, সেটা দেখাবার জন্যে বললাম, “তা তো হবেই, পনেরশর টিকিট পঁচিশে আর দুহাজারের টিকিট চল্লিশ হাজার ব্ল্যাকে বিক্রি হয়েছে, এমন ডিম্যাণ্ড”।

পদা ফিচেল হেসে বলল, “এমন এঁটো-কাঁটা বাসি খবর কেন ছড়াচ্চিস, গতি? লাস্টের দিকে পনেরশ বিক্রি হয়েছে পঁচাত্তরে আর দু হাজার এক লাখে”।

আমি চমকে উঠলাম, “বলিস কি?” তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “অবিশ্যি শানুদা আর কী করবে? হাত-পা বাঁধা, কলকাতা যেমন বলবে...”।

সমু বলল, “তুই চিরকাল সেই একই রকম ক্যালানে কাত্তিকই রয়ে গেলি, গতি। কোনকালে আর মানুষ হবি না! তোকে ওই সব ভুজুং দিয়েছে বুঝি?”

রতন আমার দিকে করুণার চোখে তাকিয়ে বলল, “চ গ্যালারির নীচে কোথাও বসি, বাপি, বাবার পেসাদ এনেছিস, নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?”

আমরা গ্যালারির তলায় মাথা নীচু করে ঢুকলাম, নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বসলাম গোল হয়ে। রতন পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে সবাইকে দিল, বাপি নিল না। বাপি জামার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল, তারপর সিগারেটের পেট টিপে তামাক বের করে, থানার চুটকাতে জমা করতে লাগল। আমি বললাম, “সে কি রে? চুটকাটা গেটে দাঁড়ানো পুলিশগুলো নেয়নি?” বাপি কোন উত্তর না দিয়ে, বিচ্ছিরি একটা মুখভঙ্গি করল, যার অর্থ হতে পারে, আমার বাপ-মা তো বটেই –  আমার চোদ্দ পুরুষকেও উদ্ধার হয়ে গেল। আমি গুম হয়ে বিড়ি টানতে লাগলাম।

  কোথা দিয়ে যে সময়টা কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না। এটুকু বুঝলাম গ্যালারি তো বটেই - বেড়ার এদিকের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরে গেছে। এমনকি আমাদের আশেপাশেও প্রচুর লোক গিজগিজ করছে। রতন বলল, “আর না, এবার চল, সামনের দিকে যাই। সওয়া চারটে বাজে, চারটের মধ্যে পৌঁছনোর কথা না?” কিন্তু তখন আর সামনের দিকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই – ঠাসাটাসি ভিড়। তার মধ্যেও আমরা কোনমতে কিছুটা এগোতে পারলাম, কিন্তু বেড়ার ধার অব্দি পৌছনো গেল না। ওদিকে মানুষের দুর্ভেদ্য পাঁচিল। এর মধ্যেই গ্যালারির মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে তারস্বরে চিৎকার করছে “জি কাল্ডো, জি কাল্ডো”। আমরা ডিং মেরে মাঠের দিকে তাকালাম। এক জায়গায় অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে ভনভন করছে – মৌচাকে জমে থাকা মৌমাছির মতো। তারা সব দামি দামি চকচকে নানান রংদার পোষাক পরা। তাদের মধ্যে মহিলারাও রয়েছে। মৌচাকটাকে চেপে বেঁধে রেখেছে গাদা-গাদা বন্দুকধারী নিরাপত্তারক্ষীরা। যেমন তাদের দশাসই চেহারা তেমনি তাদের হেক্কড়। আর রয়েছে, ফটো তোলার লোকেরা। ওরা ওই মৌচাকের চারপাশে উড়ছে – কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, হাঁটু গেড়ে, শরীর দুমড়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলে চলেছে অবিরাম। কিন্তু জিকুদা কোথায় – দেখতে পাচ্ছি না তো?

আমার থেকে বেশ কিছুটা ঢ্যাঙা রতন, পাশেই দাঁড়িয়েছিল, তাকে বললাম, “জিকুদা কোথায় রে? দেখতে পাচ্ছিস?”

“আছে, মনে হচ্ছে ওই ভিড়ের মাঝখানে। ভিআইপিরা ওকে ঘিরে ধরে প্রচুর সেলফি তুলছে। তাদের মধ্যে আমাদের শানুদাও রয়েছে – দেখতে পাচ্ছিস? আর আছে কলকাতা থেকে আসা বেশ কিছু নেতা। বেশ কিছু ফিলিম-এস্টারও এসেছে...”।

অধীর ব্যাকুলতায় আমি ওই দিকেই তাকিয়ে রইলাম, চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেলাম। একবার – একঝলক দেখা দাও জিকুদা...তোমার কাছে ওই ভিআইপিরাই বুঝি সব? আমরা এই যে এত মানুষ এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ট্যাঁকের পয়সা খসিয়ে – মাস শেষের দিনগুলো কী করে কাটাবো জানি না...কিন্তু তোমাকে একবার দেখতে পেলে – সে দুঃখের কথা মনেও পড়বে না, জিকুদা একবারটি সামনে এসো। কিন্তু মৌচাক ভাঙল না, বরং আরও যেন জমাট বাঁধতে লাগল।

হঠাৎ আমাদের মাথার ওপরে গ্যালারি থেকে অজস্র জলের বোতল উড়ে গিয়ে পড়তে লাগল মাঠের মধ্যে। যেগুলো খালি, সেগুলো বেশি দূর গেল না। তবে যেগুলো খালি নয়, সেগুলোর বেশ কিছু গিয়ে পড়ল ভিআইপিদের গায়ে, মাথায়। ভিআইপিদের ফুলের গায়ে মুচ্ছো যাওয়ার অবস্থা। রীতিমতো চিড়বিড়িয়ে উঠে তিড়িংবিড়িং লাফাতে শুরু করল। তাই না দেখে টনক নড়ে উঠল তাদের ঘিরে থাকা যত নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশদের। এরই মধ্যে আমাদের ওপর চড়াও হল একদল পুলিশ, হাতের ডাণ্ডা উঁচিয়ে। “শালা, হারামীর বাচ্চারা, বোতল ছুঁড়ছিস?” বলেই সপাসপ ডাণ্ডা হাঁকাতে লাগল। আমরা চেঁচালাম অনেক, “আমরা বোতল কোথায় পাবো, যে ছুঁড়বো? আমরা কি কেউ জল কিনে খাই?” কেউ বলল, “বোতল ছুঁড়েছে গ্যালারির একলাখি সিটের লোকেরা, তাদের গিয়ে ক্যালান না...”। তাতে ফল হল আরও মারাত্মক। “শালা, অন্যের নামে ঢপ দিচ্ছিস ? আমরা দেখলাম তোদের ছুঁড়তে...” বলা মাত্র পুলিশদলের লাঠির দাপট বারবার টের পেতে লাগলাম আমাদের পিঠে কাঁধে, ঘাড়ে...।

বাস্তবিক বোতলের জল কোনদিন আমরা কিনে খেয়েছি? মনে তো পড়ে না। আজকাল বিয়েবাড়িতে প্রায়ই পুঁচকে পুঁচকে জলের বোতল দেয়, সেগুলোর কিছু বাড়িতে চলে আসে। সেই বোতলেই জল ভরে, আমার বাবা এবং আমি, কাজে বেরোই। আমাদের কাঁধের ছোট্ট ব্যাগ, টিফিন কৌটো আর ওই তেলচিটে ময়লা জলের বোতলটা আমাদের নিত্যসঙ্গী। সেই সঙ্গীকে আমরা ছুঁড়বো ভিআইপিদের দিকে?

বুঝলাম, পুলিশরা একলাখি টিকিটওয়ালাদের কিছুই করতে পারবে না, কারণ ওদেরও হাত-পা বাঁধা। কিন্তু আমরা? মার খেতে খেতে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে আমরা গেট দিয়ে ছুটে পালাচ্ছিলাম, তার মধ্যে বেনোজলে কই মাছ ধরার মতো আমাদের কজনকে কপাকপ ধরে ভ্যানে তুলে দিল পুলিশরা। তারপর আমাদের নিয়ে গেল থানায়, ভরে দিল লকআপে। আমার চেনা বলতে বাপিও ছিল আমার সঙ্গে।

সন্ধে গেল, রাত্রি হল। আমার বাবা থানায় এলেন আমাকে উদ্ধার করতে। কিন্তু কিছুই হল না, শুনলাম, শানুদা থানায় আসছেন, তিনি যা বলবেন তাই হবে। ভরসা পেলাম, শানুদা নিশ্চয়ই...।

শানুদা এল রাত বারোটার একটু আগে। লকআপের সামনে শানুদা এসে দাঁড়াতেই, বন্ধ লোহার দরজায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম, “শানুদা, আমরা কিচ্ছু করিনি, বিশ্বাস করো...শুধুমুধু আমাদের ধরে এনেছে...”।

শানুদা গম্ভীরমুখে আমাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী যে করিস না, তোরা। তোদের জন্যে আমার মাথাটা কাটা গেল। যাতে দেখতে পাস বলে অনেক কষ্টে মাঠে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলাম, তোরা এই করলি?”

“কিচ্ছু করিনি, শানুদা, মাইরি বলছি”।

“সে কথা তোরা বা আমরা বললেই তো কেউ মেনে নেবে না রে। এটা এখন কেন্দের হাতে, তারাই তদন্ত করে দেখবে, কারা আসল দোষী। আমি আপ্‌পাণ চেষ্টা করছি যাতে তোরা শিগ্‌গিরি ছাড়া পেয়ে যাস। তবে বুঝতেই তো পারছিস...”।

“আপনার হাত-পা বাঁধা...” দু হাতে লোহার দরজার শিক ধরে বাপি উত্তর দিল।

--০০--   

পরের গল্প - " অলীক পুরুষ " 

রাজনৈতিক গল্পগুলি - 

"বাড়ি যান, দিদিভাই", "এখনও মারীচ", "গঙ্গাপ্রাপ্তি"

"প্রতিবাদের আলো", "জঙ্গী ব্যবসা", "বিসর্জন", "মৃত্যুর মিছিল"







বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " তারকা "


মালতী কাল সারারাত একদমই ঘুমোতে পারেনি,  অসহ্য বেদনায় তার শরীর টনটন করছে এখনওকিন্তু তাও সকাল থেকেই পাড়ায় হৈচৈ শুনে সে বাইরে এসে দাঁড়ালতার কোলে কেঁদে ককিয়ে চলেছে দেড়মাসের মেয়েটা, নাম ফুলকি। ওর বাপেরই দেওয়া সোহাগী নাম। মুখ ফুটে কিছুই তো বলতে পারে না, কিন্তু কাঁদে। খুব খিদে পায় নিশ্চ, বড্ডো কাঁদে।

দিনের পর দিন অভুক্ত শরীরে দুধই বা মালতী পায় কোথায়? কতদিন – কতদিন সে পেট পুরে খেতেই পায় না। একমুঠি শুকনো চিঁড়ে কিংবা দু’মুঠি মুড়ি চিবিয়ে কর্পোরেশনের কল থেকে বিনাপয়সার জল ভরে নেয় তার উদরের গহ্বরে। গত দিন দশেক এমনই চলছে। এই খাদ্যে কতখানি পুষ্টি সঞ্চিত হবে, তার জীর্ণ-শীর্ণ শরীরে সে জানে না। সে জানে না, তার শরীরের কতটা পুষ্টি হলে তার দুই স্তনে সঞ্চারিত হতে পারে, তার কন্যার জীবন সুধা। তবু সে চেষ্টা করে বারবার। খুব কান্নাকাটি করলে ফুলকির ঠোঁটে তুলে দেয় তার শুকনো স্তনের বোঁটা – কিছুক্ষণ চুষে মেয়ে আবার কান্না জোড়ে। তখন তুলে দেয় অন্য স্তন। মায়ের এই ফাঁকিটা ঠিক ধরেও ফেলে একরত্তি ওই প্রাণ – সে নীরস দুই স্তনের আশা ছেড়ে আবার কাঁদতে শুরু করে। যে কান্না যেন শুধু ক্ষিদের জ্বালায় নয়, তার প্রতি তার মায়ের প্রতারণার প্রতিবাদেও হয়তো বা।

অসহায় মালতী মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলায়, ভোলায়, কাতুকুতু দেয় – ক্ষণিকের জন্যে হলেও এক আধবার ফুলকি হাসে খল খল করেমেয়ের সেই হাসি দেখতে দেখতে চোখে জল আসে মালতীর, তার নির্দুধ বুকের মধ্যেও জমে ওঠে কান্না। অভুক্ত ফুলকি আবারও কাঁদে।

কাল সকালেই মালতীর লুকোনো শেষ টাকাগুলোও হাত মুচড়ে নিয়ে গিয়েছিল নোটন। কোথায় বড়ো কাজের সন্ধান পেয়েছে – অনেকটা দূর যেতে হবে – বাসভাড়া লাগবে। কথা দিয়েছিল বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবে, চাল কিনে আনবে, রান্না হবে। আসেনি। বিকেল গেল, সাঁঝ গড়িয়ে, রাত এল। নোটন যখন ঘরে ঢুকল – বাবুদের টিভির সিরিয়ালে সালংকারা, সুবেশা সুন্দরী নায়িকাদের এবং ঝকঝকে সুন্দর সুপুরুষ নায়কদের     যাবতীয় প্রেম-প্রীতি, হিংসা-দ্বেষ, খলতা-ভালোমানুষীর স্থগিত হয়ে গেছে। বাবুরা অধীর আগ্রহে আজ সারারাত অপেক্ষায় থাকবে আগামীকাল কী হবে? প্রেমের জয় হবে? নাকি হিংস্রতা গ্রাস করবে ভালোমানুষীকে? হয়তো সেই ভাবনায় বিঘ্নিত হবে বাবুদের নিশ্চিন্ত ঘুম।  

ঠিক তখনই মালতীর ঘরে চলছে অন্য দৃশ্য। প্রচণ্ড খিদেয় ঝিম ঝিম করা মালতীর মাথায় আগুন ধরে গেল নোটনকে দেখে নোটনের ধরন ধারণ দেখে। হাতে চাল নেই। চুলো নেই, বাবু এত রাতে এসেছে এক পেট মদ গিলে! সারা গায়ে তার উৎকট নেশার গন্ধ।

দাঁতে দাঁত চেপে, খসখসে গলায় মালতী বলল, চাল কোতায়?

কিয়ের চাল? তোর বাপের চালের আড়ত আচে নাকি, যে যাবো আর নে আসব?

আমার টাকা ফেরত দে তবে!

কিয়ের টাকা?

সকালে আমার থেকে টাকা লে গেলি, বললি চাল আনবি।

সে টাকা কি আর আচে নাকি, কবে খরচ হয়ে গেচে।

কোতায় খরচা হল শুনি, মদের ঠেকে? ঘরে মেয়ে আছে, মাগ আছে মনে পড়ে না? তারা পেট শুকিয়ে ঘরে পড়ে আছে, কি খাবে মনে পড়ে না বুজি?

অ্যাই শ্যালা, মেলা জ্ঞান ঝাড়বি না তো। সারাদিন তেতেপুড়ে ঘরে ফিরেচি, তাড়াতাড়ি করে ভাত দে – বহোত খিদে পেয়েচে।

কেন মদ গিলে পেট ভরেনি আবার ভাতও চাই – তোর বাপের বুজি ভাতের হোটেল খোলা আছে, আমি যাব আর নে আসব?

তুই আমার বাপ তুললি রে, হারামজাদি মাগি – এতবড়ো তোর আস্পদ্দা...?

নোটনের বিশাল চড়ে মালতী চোখে অন্ধকার দেখল। মেয়েকে কোলে নিয়েই পড়ে গেল ঘরের মেঝেয়। তাতেও পরিত্রাণ নেই – কোমরে পেটে বারবার লাথি মারতে লাগল নোটন। দেয়ালে পিঠ চেপে উঠে বসে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল মালতী, পারল না। চোখের নীচে প্রচণ্ড এক ঘুঁষিতে সে শুয়েই পড়ল। জ্ঞান হারাল বোধ হয়। না জ্ঞান হারায়নি, কারণ এর পরেও সে নোটনের কথা শুনতে পাচ্ছিল – মরে গেলি নাকি, শালী। চুলোয় যা। জাহান্নমে যা, শ্যালো সংসারে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি। বলতে বলতে নোটনও মেঝেয় শুয়ে পড়ল। নোটনের তেজ স্তিমিত হতে থাকল ধীরে ধীরে – এক একবার সে কথা বলে উঠছিল – শ্যালো কোতাও একটু শান্তি নেই মাইরি...। শেষমেষ ঘুমিয়েই পড়ল - মদের নেশায় আর আকস্মিক উত্তেজনার প্রশমনে।

 ও বাসন্তীদি সকাল সকাল কোতায় চললে গো, দরজা থেকেই জিগ্যেস করল মালতী।

অ মা, তুই কি লা? কিচুই জানিস না। কাল বিকেলে ঠিকেদার আলি এসেচিল পাড়ায় – আজকে ঢালাই হবে যে। তিনতলার বিশাল ছাদ। সকাল থেকে চালু – সেই সন্দে অব্দি চলবে – দেড়শ টাকা হাজ্‌রি আর দুপুরে মাংসের ঝোল ভাত। আমাদের পাড়ার মেয়েরা সবাই যাচ্চে

 দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌...দুপুরে মাংস ভাত?

 মালতীর চোখের নীচে কালশিটের দাগ, কণ্ঠার হাড় বের করা শীর্ণ শরীরের কোথাও একবিন্দুও শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তার কোলে একঘেয়ে কেঁদে চলা দেড়মাসের মেয়ে কিন্তু দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌ আর দুপুরে মাংস ভাত? এই সংবাদ মালতীর শরীরের কোষে কোষে তীব্র শিহরণ সঞ্চার করল। এতটুকুও দ্বিধা করল না মালতী। শুধু একবার পিছন ফিরে দেখল নেশার ঘোরে তখনও ঘুমোচ্ছে নোটন। তার হাঁ করা মুখে ভন ভন করছে দু তিনটে মাছি। দরজাটা চেপে দিয়ে মালতী রওনা হল বাসন্তীদির সঙ্গে।

 

 

ছ’থাক সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠতেই মালতীর হাঁফ ধরে গেল বুকে। বাপরে কি উঁচু! এর পাশেই আরেকখানা বাড়ি বানানো চলছে সেটা গুনে দেখল সাততলা। তার পরেও কাজ চলছে। বাপরে এতো উঁচুতে মানুষগুলো যে থাকে, ভয় করে না? সিঁড়ি ভেঙে ওঠে কী করে মানুষগুলো? মালতী আরও অবাক হল কত যে পুরুষ ও মেয়ে নানান কাজে হাত লাগিয়েছে! ওই দেড়শটা টাকা আর মাংসভাতের আকাঙ্ক্ষায়!

নতুন পরিবেশ, অচেনা জায়গা, অনেক লোকজন দেখে মেয়েটা একটু চুপ করেছিল – কিন্তু একটু জিরিয়ে নেবার সময় দিল না মালতীকে, আবার কান্না শুরু করলমেয়েটা শুধু কাঁদেই এখন। চোখ থেকে একবিন্দুও জল গড়ায় না আর। মুখে শুধু আওয়াজ করে অ্যা অ্যা ...কর্কশ আওয়াজ।

 

বাসন্তীদি ঠিকাদার আলির কাছে নিয়ে গেল মালতীকে, বলল – ও আলি ভাই, এই লাও এই মেয়েটাও কাজ করবে...।

আলি মিয়ার মুখ ভর্তি গুটখার লালা। আকাশপানে মুখ তুলে কী যে বলল – ঠাহর করা গেল না। বাসন্তীদি বললে, আ মোলো যা, মুখের ওই কাচড়া ফেলো দিকি, কি যে কতা বলো বো বো বো করে - কিচুই বোঝা যায় না।

আলি মিয়া মুখের ভেতর জমানো, বালতি খানেক লালা উগরে দিয়ে খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসলে। তারপর খুব রসিক চোখে বাসন্তীদির দিকে তাকিয়ে, মিচকে হেসে বললে, কি কতা শুনবি রে, বাসন্তী – মনের কতা না প্রাণের কতা?

মরণ আর কি, কত ঢং...লাও, লাও ওর সংগে কতা কয়ে লাও।

আলি মিয়া এবার চোখ ফেরাল মালতীর দিকে। হাড়গিলের মতো শুঁটকে চেহারা। বগলে আবার একখান ভূতের মতো ছানা। মাথাটা হেঁড়ে। পেটটা ড্যাগরা। হাত পা গুলো কাটি কাটি। সেই থেকে নাগাড়ে ককিয়ে চলেছে কাগের ছানার মতো। দেখেই আলি মিয়ার মেজাজটা বিগড়ে গেল। এ দিয়ে তার কোন কাজই চলবে না। ও পারবেই না মাথায় ঢালাইয়ের তাগাড়ি বইতে দু তাগাড়ি মাল তুলেই হ্যা হ্যা করে হাঁপাবে।

ওর মধ্যে আর জোয়ানি নেই রে, বাসন্তী।

বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ বন্ধ করে আবার খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসল।

সে না পারুক, অন্য কত কাজ তো রয়েছে, ও মিয়া। লাগিয়ে দাও না কিচু একটাতে।

আলি উঠে দাঁড়াল – জোর হাঁক পাড়ল – সকলের উদ্দেশে, সাতটা বেজে গেচে কখন, একনো সব গুলতানি করছিস, গুয়োর ব্যাটারা? কখন শুরু হবে রে ঢালাই? এই কাশেম বেলচা ধর – বাসন্তী তোর মেয়েছেলেদের বল তাগাড়ি ধরতে।

 

উইঞ্চ মেসিনে গুড় গুড় করে উঠে আসছে ঢালাই। রডের জালির ওপর কাঠের তক্তা পেতে প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে দু জায়গায়। উইঞ্চ থেকে তরল ঢালাই হড়হড় করে নেমে আসছে প্ল্যাটফর্মে। দুপাশে বেলচা ধরে আছে দুটো লোক। এক তাগাড়িতে এক বেলচা মাল তুলে দিচ্ছে, আর সেটা মাথায় নিয়ে মেয়েগুলো চলে যাচ্ছে ছাদের অন্য প্রান্তে। ঝড়াস করে ঢেলে তাগাড়ি খালি করে দিচ্ছে ঠিক জায়গায়। ও প্রান্তে আছে মিস্তিরি – সে দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় কখন ঢালতে হবে – এই কাজ। কিছুই না। এক ঘেয়ে। এক টানা। পিঁপড়ের সারির মতো অবিরাম বয়ে চলা ঢালাই ভরা তাগাড়ি। এক সারি চলছে তাগাড়ি ভরা ঢালাই নিয়ে, আরেক সারি খালি তাগাড়ি নিয়ে আসছে ঢালাই ভরে নেওয়ার জন্যে। পায়ের তলায় রডের জালি, তার ওপর দিয়ে চপ্পল পায়ে হাঁটাটাই যা একটু শক্ত। জালি গুলো হাঁটার সময় বসে যায়। জালির ফাঁকে পা আটকে গেলে তাগাড়ি সমেত মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মালতী। মেয়েকে কোলে নিয়ে মালতী দাঁড়িয়েই ছিল, তাকে আলি মিয়া হ্যাঁ ও বলে নি, না ও বলে নি। বাসন্তীদি কাজে লাগার আগে বলে গেছে দাঁড়াতে – একটা কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 শুরুটা করতে যা একটু ঝকমারি, শুরু হয়ে গেলে ঠিক চলতে থাকে। আধা ঘন্টার মধ্যেই ঢালাইয়ের প্রক্রিয়া চলে এল বাঁধা ধরা ছন্দে, নিশ্চিন্ত মনে একধারে এসে দাঁড়াল আলি মিয়া – এক প্যাকেট গুটখা আর সঙ্গে জর্দার একটা প্যাকেট উপুড় করে দিল মুখের ভেতর – তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল – কাজের ধরনধারণ। মালতী পায়ে পায়ে আলি মিয়ার কাছে গেল। কিচু কাজ দেন না, অ বাবু?

আলি মিয়া এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল, মালতীকে দেখে মনে পড়ল – কি কাজ তরে দি বল দিকি। এক কাজ কর নীচে যা আজ সব মিলে শ’ দেড়েক লোক খাবে তাদের রান্নার যোগাড়ে তুই যা। ধোয়া মোচা। বাঁটা বাঁটি, কাটা কুটি – পারবি তো? রশিদ আছে তারে গিয়ে বল – আমি পেটিয়েচি। সে দেকিয়ে দেবে।

কত দেবে বাবু?

অ্যাঃ কত আর দেব তোকে – পঞ্চাশ দেব যাঃ, আর দুপুরের খাওয়া...যাঃ।

 মালতী নীচে নেমে এলরশিদকে খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হল না। মোবাইলে বলেই দিয়েছিল আলি মিয়া। রশিদ তাকে বসিয়ে দিল আলু পেঁয়াজ আদা রসুন ছাড়ানোর কাজে। দুটো উনোন জ্বলছে দাউদাউ করে, বিশাল হাঁড়িতে ভাত চড়ে গেছে। ভাতের গন্ধ নাকে আসতেই অদ্ভূত চনমন করে উঠল মালতীর শরীর কি সুবাস ভাতফোটার গন্ধে, সে আবেশে মালতীর নেশা হয়ে আসছিল যেন। সে বঁটি নিয়ে বসে পড়ল আলুর বস্তার সামনে। মেয়েটা এখন আর কাঁদছে না, কাঁদতে কাঁদতে সেও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলেই। অভুক্ত, অপুষ্ট শিশুর শরীরে কান্নার মতো শক্তিও এখন আর অবশিষ্ট নেই।

 সাড়ে বারোটার মধ্যে রান্না হয়ে গেল। বিশাল গামলা ভরা দেড়শ লোকের জন্যে সাত কিলো মাংসের টকটকে লাল ঝোল। বড়ো বড়ো আলুর টুকরো। মাংস দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে – তলার দিকে। এক এক দল আসছে, খেয়ে চলে যাচ্ছে, আরেক দল আসছে। ঢালাই বন্ধ হবার নয়। দেড়টা নাগাদ রশিদ বলল – যা ঐ থালটা নিয়ে আয় – তুইও খেয়ে নে মালতী।

কানা উঁচু বড়ো থালা ভর্তি ভাত আর তার মাঝখানে অনেক - অনেকটা ঝোল, তিন পিস আলু আর এক কুচি মাংস নিয়ে একধারে বসল মালতী। মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু মেয়েটা কাঁদছিল না, কোলে শুয়ে টালুক-টালুক চোখ মেলে দেখছিল মাকে। গরম ভাতের মধ্যে আলুগুলো ভেঙে মাখতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা লাগল মালতীর – আউ করে উঠল একবার। মায়ের মুখে অদ্ভূত আওয়াজ শুনে খল খল করে হেসে উঠল শিশু। সামনে ক্ষুধার লোভনীয় অন্ন, কোলে শুয়ে থাকা সন্তানের হাসি। মালতী ভুলেই গেল গত কাল ঘটে যাওয়া সমস্ত দিন ও রাত্রের গ্লানি। বড়ো এক গ্রাস মাখাভাত মুখে তুলল মালতী, জিভ থেকে সমস্ত শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভূত তৃপ্তির সমাচার। মায়ের খাওয়া দেখতে দেখতে শিশু কী বুঝল কে জানে, আবার কান্না জুড়ল।

 মালতীর মনে হল ফুলকিও চাইছে, দুটো ভাত থেতে। খেতে পারবে কি ওইটুকু শিশু? মাত্র দেড় মাস বয়েস! মালতী জানে তার স্তনে এক বিন্দু দুধও জমা হয়নি। তার উদরপূর্তির পর কতক্ষণে ভরে উঠতে পারে তার দুই স্তন, সে জানে না। নাকি বিকেলে আলি মিয়া তাকে যে পঞ্চাশটাকা দেবে, সেই টাকাতে দুধ কিনে দেবে? ততক্ষণ অভুক্ত থাকবে তার সন্তান? মাথা ঝাঁকিয়ে মাথা দুলিয়ে মালতী তার মেয়েকে জিগ্যেস করল - তুই ভাত খাবি, সোনা, ভাত খাবি? খেতে পারবি?

 মালতী ভাতের একটা দানা আঙুলে ভেঙে ফুলকির কচি ঠোঁটে ঠেকালো, ছোট্ট জিভ দিয়ে মুখের ভেতর টেনে নিল মেয়েটা। মুখটা সামান্য বিকৃত করে মুখ নাড়াতে লাগল মেয়েটা। কী বুঝল কে জানে, আবার তাকাল মায়ের মুখের দিকে। মালতী বেশ মজা পেল। মালতী নিজেও গ্রাস তুলতে লাগল, আর এক এক দানা ভাত তুলে দিতে লাগল মেয়ের মুখে। মেয়ের কৃতিত্বে খুশি মালতী এবার আলু দিয়ে মাখা চার-পাঁচটা ভাতের দানার একটা গ্রাস তুলে দিল মেয়ের মুখে। বেচারা ফুলকি এবার আর পারল না। বিষম খেল, শ্বাসনালীতে বিশ্রীভাবে আটকে গেল খাবারের দলা। মালতী প্রথমটা বোঝেনি। মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সে গ্রাস তুলছিল নিজের মুখে। যখন বুঝল, ততক্ষণে ফুলকির শ্বাসরুদ্ধ! মেয়ের যে চোখের মায়ায় মালতীর অন্তর মাতৃত্বে ভরে উঠত, সে চোখ বিস্ফারিত স্থির! শীর্ণ দুই হাত আর পা ছটফট করছে অব্যক্ত যন্ত্রণায়!

 ফুলি, অ ফুলি, কি হয়েছে মা? কি হয়েছে? এই তো আমি। হাহাকার করে উঠল মালতী। ফুলির পিঠ বার বার চাপড়ে দিতে দিতে মালতী ভুলেই গেল তার নিজের খাবার কথা। মালতীর আশেপাশে জড়ো হতে থাকল লোকজন। কেউ একজন বলল – ঐটুকু দুধের বাচ্চাকে ভাত খাওয়াচ্ছিল, আমি নিজের চোখে দেকেচি, তখনই জানি কিচু একটা অঘটন ঘটবে। ঐটুকু বাচ্চাকে কেউ ভাত খাওয়ায় – মা, না ডাইনী? আরেকজন বলল – ওরে ডাক্তারের কাচে নে যাও।

ভিড়ের থেকে রশিদ টেনে বের করে আনল বাচ্চা সমেত মালতীকে। চল ডাক্তারের কাছে চল।

 

 

রিকশা নিয়ে মালতীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল রশিদ। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললে্ন বাচ্চা মারা গেছে অনেকক্ষণ। এ তো পুলিশ কেস। কী করে হল? কেন হল? বাচ্চার পোস্টমর্টেম করতে হবে। হাসপাতাল থেকে পুলিশে খবর দেওয়া হল নিয়মমাফিক। এতক্ষণ রশিদ ছিল পাশে, মালতীর যেন ভরসা ছিল। পুলিশের নাম শুনে রশিদ সরে পড়ল পুলিশ এল। জেরা করে মালতীর থেকে জেনে নিল সমস্ত ঘটনা। দণ্ডবিধানে মালতীর নামে কেস তৈরি হয়ে গেল, মালতী শিশু হত্যার অপরাধে অপরাধী! মালতীকে নিয়ে যাওয়া হল থানার লক আপে। মালতীর মেয়ে ফুলকির ছোট্ট শরীরটা চলে গেল পোস্টমর্টেমের জন্য। ফুলকির ছোট্ট দুর্বল অপুষ্ট শরীরটা কেটেকুটে তার শীর্ণ শ্বাসনালীতে খুঁজে পাওয়া যাবে তার মৃত্যুর কারণ – কি নিষ্ঠুরভাবেই না তার মুখে তুলে দেওয়া হয়েছিল ক্ষুধার অন্ন! নিজের গর্ভের সন্তানের প্রতি কোন মা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে?    অন্ধ আইনের প্রবল ধারার প্রয়োগে বানানো হবে অমোঘ রিপোর্ট। সেই রিপোর্ট থেকে স্থির সিদ্ধান্তে গড়ে নেওয়া যাবে, তার অপরাধী মায়ের চরম নিষ্ঠুরতার কাহিনীকোন ফাঁক থাকবে না তার স্তন্যদায়িনী ডাইনী মায়ের গণতান্ত্রিক শাস্তিবিধানে! 

 

কেসটার নির্বিঘ্নে নিষ্পত্তি হয়ে গেল নিম্ন আদালতে। খুব সহজ সরল শুনানির শেষে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন মাননীয় বিচারক।

 

কারাগারে মালতীর পরনে এখন পরিচ্ছন্ন বস্ত্র। সে এখন নিয়মিত তিনবেলা খেতে পায়সকালে জলখাবার। দুপুরে ডাল ভাত তরকারি। রাত্রে রুটি ডাল সব্জি। হপ্তায় দুয়েকদিন মাছ ডিমও তার বরাদ্দ। তার শরীরে এখন পুষ্টি, তার দুই স্তনেও এখন সদা সঞ্চিত সন্তানের পুষ্টি! ফুলকির কচি অধরে তার স্তনবৃন্ত তুলে না দিতে পারার যন্ত্রণায় সে এখন ছটফট করে নিজের হাতে মাতৃধারায় সিক্ত করে তোলে কারাগার কক্ষের নিভৃত দেওয়াল। মালতী অন্ধকার ঘরের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় সেই চোখদুটি – যে চোখের টালুক-টালুক দৃষ্টিতে চোখ রেখে সে খুঁজে পেত মাতৃত্বের তৃপ্তি!

 -০০-

      এর পরের গল্প - " হাত-পা বাঁধা "

                    

         

          


নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...