বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 



এর আগের ছোট গল্প - " তারকা "


মালতী কাল সারারাত একদমই ঘুমোতে পারেনি,  অসহ্য বেদনায় তার শরীর টনটন করছে এখনওকিন্তু তাও সকাল থেকেই পাড়ায় হৈচৈ শুনে সে বাইরে এসে দাঁড়ালতার কোলে কেঁদে ককিয়ে চলেছে দেড়মাসের মেয়েটা, নাম ফুলকি। ওর বাপেরই দেওয়া সোহাগী নাম। মুখ ফুটে কিছুই তো বলতে পারে না, কিন্তু কাঁদে। খুব খিদে পায় নিশ্চ, বড্ডো কাঁদে।

দিনের পর দিন অভুক্ত শরীরে দুধই বা মালতী পায় কোথায়? কতদিন – কতদিন সে পেট পুরে খেতেই পায় না। একমুঠি শুকনো চিঁড়ে কিংবা দু’মুঠি মুড়ি চিবিয়ে কর্পোরেশনের কল থেকে বিনাপয়সার জল ভরে নেয় তার উদরের গহ্বরে। গত দিন দশেক এমনই চলছে। এই খাদ্যে কতখানি পুষ্টি সঞ্চিত হবে, তার জীর্ণ-শীর্ণ শরীরে সে জানে না। সে জানে না, তার শরীরের কতটা পুষ্টি হলে তার দুই স্তনে সঞ্চারিত হতে পারে, তার কন্যার জীবন সুধা। তবু সে চেষ্টা করে বারবার। খুব কান্নাকাটি করলে ফুলকির ঠোঁটে তুলে দেয় তার শুকনো স্তনের বোঁটা – কিছুক্ষণ চুষে মেয়ে আবার কান্না জোড়ে। তখন তুলে দেয় অন্য স্তন। মায়ের এই ফাঁকিটা ঠিক ধরেও ফেলে একরত্তি ওই প্রাণ – সে নীরস দুই স্তনের আশা ছেড়ে আবার কাঁদতে শুরু করে। যে কান্না যেন শুধু ক্ষিদের জ্বালায় নয়, তার প্রতি তার মায়ের প্রতারণার প্রতিবাদেও হয়তো বা।

অসহায় মালতী মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলায়, ভোলায়, কাতুকুতু দেয় – ক্ষণিকের জন্যে হলেও এক আধবার ফুলকি হাসে খল খল করেমেয়ের সেই হাসি দেখতে দেখতে চোখে জল আসে মালতীর, তার নির্দুধ বুকের মধ্যেও জমে ওঠে কান্না। অভুক্ত ফুলকি আবারও কাঁদে।

কাল সকালেই মালতীর লুকোনো শেষ টাকাগুলোও হাত মুচড়ে নিয়ে গিয়েছিল নোটন। কোথায় বড়ো কাজের সন্ধান পেয়েছে – অনেকটা দূর যেতে হবে – বাসভাড়া লাগবে। কথা দিয়েছিল বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবে, চাল কিনে আনবে, রান্না হবে। আসেনি। বিকেল গেল, সাঁঝ গড়িয়ে, রাত এল। নোটন যখন ঘরে ঢুকল – বাবুদের টিভির সিরিয়ালে সালংকারা, সুবেশা সুন্দরী নায়িকাদের এবং ঝকঝকে সুন্দর সুপুরুষ নায়কদের     যাবতীয় প্রেম-প্রীতি, হিংসা-দ্বেষ, খলতা-ভালোমানুষীর স্থগিত হয়ে গেছে। বাবুরা অধীর আগ্রহে আজ সারারাত অপেক্ষায় থাকবে আগামীকাল কী হবে? প্রেমের জয় হবে? নাকি হিংস্রতা গ্রাস করবে ভালোমানুষীকে? হয়তো সেই ভাবনায় বিঘ্নিত হবে বাবুদের নিশ্চিন্ত ঘুম।  

ঠিক তখনই মালতীর ঘরে চলছে অন্য দৃশ্য। প্রচণ্ড খিদেয় ঝিম ঝিম করা মালতীর মাথায় আগুন ধরে গেল নোটনকে দেখে নোটনের ধরন ধারণ দেখে। হাতে চাল নেই। চুলো নেই, বাবু এত রাতে এসেছে এক পেট মদ গিলে! সারা গায়ে তার উৎকট নেশার গন্ধ।

দাঁতে দাঁত চেপে, খসখসে গলায় মালতী বলল, চাল কোতায়?

কিয়ের চাল? তোর বাপের চালের আড়ত আচে নাকি, যে যাবো আর নে আসব?

আমার টাকা ফেরত দে তবে!

কিয়ের টাকা?

সকালে আমার থেকে টাকা লে গেলি, বললি চাল আনবি।

সে টাকা কি আর আচে নাকি, কবে খরচ হয়ে গেচে।

কোতায় খরচা হল শুনি, মদের ঠেকে? ঘরে মেয়ে আছে, মাগ আছে মনে পড়ে না? তারা পেট শুকিয়ে ঘরে পড়ে আছে, কি খাবে মনে পড়ে না বুজি?

অ্যাই শ্যালা, মেলা জ্ঞান ঝাড়বি না তো। সারাদিন তেতেপুড়ে ঘরে ফিরেচি, তাড়াতাড়ি করে ভাত দে – বহোত খিদে পেয়েচে।

কেন মদ গিলে পেট ভরেনি আবার ভাতও চাই – তোর বাপের বুজি ভাতের হোটেল খোলা আছে, আমি যাব আর নে আসব?

তুই আমার বাপ তুললি রে, হারামজাদি মাগি – এতবড়ো তোর আস্পদ্দা...?

নোটনের বিশাল চড়ে মালতী চোখে অন্ধকার দেখল। মেয়েকে কোলে নিয়েই পড়ে গেল ঘরের মেঝেয়। তাতেও পরিত্রাণ নেই – কোমরে পেটে বারবার লাথি মারতে লাগল নোটন। দেয়ালে পিঠ চেপে উঠে বসে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল মালতী, পারল না। চোখের নীচে প্রচণ্ড এক ঘুঁষিতে সে শুয়েই পড়ল। জ্ঞান হারাল বোধ হয়। না জ্ঞান হারায়নি, কারণ এর পরেও সে নোটনের কথা শুনতে পাচ্ছিল – মরে গেলি নাকি, শালী। চুলোয় যা। জাহান্নমে যা, শ্যালো সংসারে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি। বলতে বলতে নোটনও মেঝেয় শুয়ে পড়ল। নোটনের তেজ স্তিমিত হতে থাকল ধীরে ধীরে – এক একবার সে কথা বলে উঠছিল – শ্যালো কোতাও একটু শান্তি নেই মাইরি...। শেষমেষ ঘুমিয়েই পড়ল - মদের নেশায় আর আকস্মিক উত্তেজনার প্রশমনে।

 ও বাসন্তীদি সকাল সকাল কোতায় চললে গো, দরজা থেকেই জিগ্যেস করল মালতী।

অ মা, তুই কি লা? কিচুই জানিস না। কাল বিকেলে ঠিকেদার আলি এসেচিল পাড়ায় – আজকে ঢালাই হবে যে। তিনতলার বিশাল ছাদ। সকাল থেকে চালু – সেই সন্দে অব্দি চলবে – দেড়শ টাকা হাজ্‌রি আর দুপুরে মাংসের ঝোল ভাত। আমাদের পাড়ার মেয়েরা সবাই যাচ্চে

 দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌...দুপুরে মাংস ভাত?

 মালতীর চোখের নীচে কালশিটের দাগ, কণ্ঠার হাড় বের করা শীর্ণ শরীরের কোথাও একবিন্দুও শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তার কোলে একঘেয়ে কেঁদে চলা দেড়মাসের মেয়ে কিন্তু দেড়শ টাকা হাজ্‌রি‌ আর দুপুরে মাংস ভাত? এই সংবাদ মালতীর শরীরের কোষে কোষে তীব্র শিহরণ সঞ্চার করল। এতটুকুও দ্বিধা করল না মালতী। শুধু একবার পিছন ফিরে দেখল নেশার ঘোরে তখনও ঘুমোচ্ছে নোটন। তার হাঁ করা মুখে ভন ভন করছে দু তিনটে মাছি। দরজাটা চেপে দিয়ে মালতী রওনা হল বাসন্তীদির সঙ্গে।

 

 

ছ’থাক সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠতেই মালতীর হাঁফ ধরে গেল বুকে। বাপরে কি উঁচু! এর পাশেই আরেকখানা বাড়ি বানানো চলছে সেটা গুনে দেখল সাততলা। তার পরেও কাজ চলছে। বাপরে এতো উঁচুতে মানুষগুলো যে থাকে, ভয় করে না? সিঁড়ি ভেঙে ওঠে কী করে মানুষগুলো? মালতী আরও অবাক হল কত যে পুরুষ ও মেয়ে নানান কাজে হাত লাগিয়েছে! ওই দেড়শটা টাকা আর মাংসভাতের আকাঙ্ক্ষায়!

নতুন পরিবেশ, অচেনা জায়গা, অনেক লোকজন দেখে মেয়েটা একটু চুপ করেছিল – কিন্তু একটু জিরিয়ে নেবার সময় দিল না মালতীকে, আবার কান্না শুরু করলমেয়েটা শুধু কাঁদেই এখন। চোখ থেকে একবিন্দুও জল গড়ায় না আর। মুখে শুধু আওয়াজ করে অ্যা অ্যা ...কর্কশ আওয়াজ।

 

বাসন্তীদি ঠিকাদার আলির কাছে নিয়ে গেল মালতীকে, বলল – ও আলি ভাই, এই লাও এই মেয়েটাও কাজ করবে...।

আলি মিয়ার মুখ ভর্তি গুটখার লালা। আকাশপানে মুখ তুলে কী যে বলল – ঠাহর করা গেল না। বাসন্তীদি বললে, আ মোলো যা, মুখের ওই কাচড়া ফেলো দিকি, কি যে কতা বলো বো বো বো করে - কিচুই বোঝা যায় না।

আলি মিয়া মুখের ভেতর জমানো, বালতি খানেক লালা উগরে দিয়ে খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসলে। তারপর খুব রসিক চোখে বাসন্তীদির দিকে তাকিয়ে, মিচকে হেসে বললে, কি কতা শুনবি রে, বাসন্তী – মনের কতা না প্রাণের কতা?

মরণ আর কি, কত ঢং...লাও, লাও ওর সংগে কতা কয়ে লাও।

আলি মিয়া এবার চোখ ফেরাল মালতীর দিকে। হাড়গিলের মতো শুঁটকে চেহারা। বগলে আবার একখান ভূতের মতো ছানা। মাথাটা হেঁড়ে। পেটটা ড্যাগরা। হাত পা গুলো কাটি কাটি। সেই থেকে নাগাড়ে ককিয়ে চলেছে কাগের ছানার মতো। দেখেই আলি মিয়ার মেজাজটা বিগড়ে গেল। এ দিয়ে তার কোন কাজই চলবে না। ও পারবেই না মাথায় ঢালাইয়ের তাগাড়ি বইতে দু তাগাড়ি মাল তুলেই হ্যা হ্যা করে হাঁপাবে।

ওর মধ্যে আর জোয়ানি নেই রে, বাসন্তী।

বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ বন্ধ করে আবার খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসল।

সে না পারুক, অন্য কত কাজ তো রয়েছে, ও মিয়া। লাগিয়ে দাও না কিচু একটাতে।

আলি উঠে দাঁড়াল – জোর হাঁক পাড়ল – সকলের উদ্দেশে, সাতটা বেজে গেচে কখন, একনো সব গুলতানি করছিস, গুয়োর ব্যাটারা? কখন শুরু হবে রে ঢালাই? এই কাশেম বেলচা ধর – বাসন্তী তোর মেয়েছেলেদের বল তাগাড়ি ধরতে।

 

উইঞ্চ মেসিনে গুড় গুড় করে উঠে আসছে ঢালাই। রডের জালির ওপর কাঠের তক্তা পেতে প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে দু জায়গায়। উইঞ্চ থেকে তরল ঢালাই হড়হড় করে নেমে আসছে প্ল্যাটফর্মে। দুপাশে বেলচা ধরে আছে দুটো লোক। এক তাগাড়িতে এক বেলচা মাল তুলে দিচ্ছে, আর সেটা মাথায় নিয়ে মেয়েগুলো চলে যাচ্ছে ছাদের অন্য প্রান্তে। ঝড়াস করে ঢেলে তাগাড়ি খালি করে দিচ্ছে ঠিক জায়গায়। ও প্রান্তে আছে মিস্তিরি – সে দেখিয়ে দিচ্ছে কোথায় কখন ঢালতে হবে – এই কাজ। কিছুই না। এক ঘেয়ে। এক টানা। পিঁপড়ের সারির মতো অবিরাম বয়ে চলা ঢালাই ভরা তাগাড়ি। এক সারি চলছে তাগাড়ি ভরা ঢালাই নিয়ে, আরেক সারি খালি তাগাড়ি নিয়ে আসছে ঢালাই ভরে নেওয়ার জন্যে। পায়ের তলায় রডের জালি, তার ওপর দিয়ে চপ্পল পায়ে হাঁটাটাই যা একটু শক্ত। জালি গুলো হাঁটার সময় বসে যায়। জালির ফাঁকে পা আটকে গেলে তাগাড়ি সমেত মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মালতী। মেয়েকে কোলে নিয়ে মালতী দাঁড়িয়েই ছিল, তাকে আলি মিয়া হ্যাঁ ও বলে নি, না ও বলে নি। বাসন্তীদি কাজে লাগার আগে বলে গেছে দাঁড়াতে – একটা কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 শুরুটা করতে যা একটু ঝকমারি, শুরু হয়ে গেলে ঠিক চলতে থাকে। আধা ঘন্টার মধ্যেই ঢালাইয়ের প্রক্রিয়া চলে এল বাঁধা ধরা ছন্দে, নিশ্চিন্ত মনে একধারে এসে দাঁড়াল আলি মিয়া – এক প্যাকেট গুটখা আর সঙ্গে জর্দার একটা প্যাকেট উপুড় করে দিল মুখের ভেতর – তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগল – কাজের ধরনধারণ। মালতী পায়ে পায়ে আলি মিয়ার কাছে গেল। কিচু কাজ দেন না, অ বাবু?

আলি মিয়া এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল, মালতীকে দেখে মনে পড়ল – কি কাজ তরে দি বল দিকি। এক কাজ কর নীচে যা আজ সব মিলে শ’ দেড়েক লোক খাবে তাদের রান্নার যোগাড়ে তুই যা। ধোয়া মোচা। বাঁটা বাঁটি, কাটা কুটি – পারবি তো? রশিদ আছে তারে গিয়ে বল – আমি পেটিয়েচি। সে দেকিয়ে দেবে।

কত দেবে বাবু?

অ্যাঃ কত আর দেব তোকে – পঞ্চাশ দেব যাঃ, আর দুপুরের খাওয়া...যাঃ।

 মালতী নীচে নেমে এলরশিদকে খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হল না। মোবাইলে বলেই দিয়েছিল আলি মিয়া। রশিদ তাকে বসিয়ে দিল আলু পেঁয়াজ আদা রসুন ছাড়ানোর কাজে। দুটো উনোন জ্বলছে দাউদাউ করে, বিশাল হাঁড়িতে ভাত চড়ে গেছে। ভাতের গন্ধ নাকে আসতেই অদ্ভূত চনমন করে উঠল মালতীর শরীর কি সুবাস ভাতফোটার গন্ধে, সে আবেশে মালতীর নেশা হয়ে আসছিল যেন। সে বঁটি নিয়ে বসে পড়ল আলুর বস্তার সামনে। মেয়েটা এখন আর কাঁদছে না, কাঁদতে কাঁদতে সেও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলেই। অভুক্ত, অপুষ্ট শিশুর শরীরে কান্নার মতো শক্তিও এখন আর অবশিষ্ট নেই।

 সাড়ে বারোটার মধ্যে রান্না হয়ে গেল। বিশাল গামলা ভরা দেড়শ লোকের জন্যে সাত কিলো মাংসের টকটকে লাল ঝোল। বড়ো বড়ো আলুর টুকরো। মাংস দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আছে – তলার দিকে। এক এক দল আসছে, খেয়ে চলে যাচ্ছে, আরেক দল আসছে। ঢালাই বন্ধ হবার নয়। দেড়টা নাগাদ রশিদ বলল – যা ঐ থালটা নিয়ে আয় – তুইও খেয়ে নে মালতী।

কানা উঁচু বড়ো থালা ভর্তি ভাত আর তার মাঝখানে অনেক - অনেকটা ঝোল, তিন পিস আলু আর এক কুচি মাংস নিয়ে একধারে বসল মালতী। মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু মেয়েটা কাঁদছিল না, কোলে শুয়ে টালুক-টালুক চোখ মেলে দেখছিল মাকে। গরম ভাতের মধ্যে আলুগুলো ভেঙে মাখতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা লাগল মালতীর – আউ করে উঠল একবার। মায়ের মুখে অদ্ভূত আওয়াজ শুনে খল খল করে হেসে উঠল শিশু। সামনে ক্ষুধার লোভনীয় অন্ন, কোলে শুয়ে থাকা সন্তানের হাসি। মালতী ভুলেই গেল গত কাল ঘটে যাওয়া সমস্ত দিন ও রাত্রের গ্লানি। বড়ো এক গ্রাস মাখাভাত মুখে তুলল মালতী, জিভ থেকে সমস্ত শরীরের প্রতিটি তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভূত তৃপ্তির সমাচার। মায়ের খাওয়া দেখতে দেখতে শিশু কী বুঝল কে জানে, আবার কান্না জুড়ল।

 মালতীর মনে হল ফুলকিও চাইছে, দুটো ভাত থেতে। খেতে পারবে কি ওইটুকু শিশু? মাত্র দেড় মাস বয়েস! মালতী জানে তার স্তনে এক বিন্দু দুধও জমা হয়নি। তার উদরপূর্তির পর কতক্ষণে ভরে উঠতে পারে তার দুই স্তন, সে জানে না। নাকি বিকেলে আলি মিয়া তাকে যে পঞ্চাশটাকা দেবে, সেই টাকাতে দুধ কিনে দেবে? ততক্ষণ অভুক্ত থাকবে তার সন্তান? মাথা ঝাঁকিয়ে মাথা দুলিয়ে মালতী তার মেয়েকে জিগ্যেস করল - তুই ভাত খাবি, সোনা, ভাত খাবি? খেতে পারবি?

 মালতী ভাতের একটা দানা আঙুলে ভেঙে ফুলকির কচি ঠোঁটে ঠেকালো, ছোট্ট জিভ দিয়ে মুখের ভেতর টেনে নিল মেয়েটা। মুখটা সামান্য বিকৃত করে মুখ নাড়াতে লাগল মেয়েটা। কী বুঝল কে জানে, আবার তাকাল মায়ের মুখের দিকে। মালতী বেশ মজা পেল। মালতী নিজেও গ্রাস তুলতে লাগল, আর এক এক দানা ভাত তুলে দিতে লাগল মেয়ের মুখে। মেয়ের কৃতিত্বে খুশি মালতী এবার আলু দিয়ে মাখা চার-পাঁচটা ভাতের দানার একটা গ্রাস তুলে দিল মেয়ের মুখে। বেচারা ফুলকি এবার আর পারল না। বিষম খেল, শ্বাসনালীতে বিশ্রীভাবে আটকে গেল খাবারের দলা। মালতী প্রথমটা বোঝেনি। মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সে গ্রাস তুলছিল নিজের মুখে। যখন বুঝল, ততক্ষণে ফুলকির শ্বাসরুদ্ধ! মেয়ের যে চোখের মায়ায় মালতীর অন্তর মাতৃত্বে ভরে উঠত, সে চোখ বিস্ফারিত স্থির! শীর্ণ দুই হাত আর পা ছটফট করছে অব্যক্ত যন্ত্রণায়!

 ফুলি, অ ফুলি, কি হয়েছে মা? কি হয়েছে? এই তো আমি। হাহাকার করে উঠল মালতী। ফুলির পিঠ বার বার চাপড়ে দিতে দিতে মালতী ভুলেই গেল তার নিজের খাবার কথা। মালতীর আশেপাশে জড়ো হতে থাকল লোকজন। কেউ একজন বলল – ঐটুকু দুধের বাচ্চাকে ভাত খাওয়াচ্ছিল, আমি নিজের চোখে দেকেচি, তখনই জানি কিচু একটা অঘটন ঘটবে। ঐটুকু বাচ্চাকে কেউ ভাত খাওয়ায় – মা, না ডাইনী? আরেকজন বলল – ওরে ডাক্তারের কাচে নে যাও।

ভিড়ের থেকে রশিদ টেনে বের করে আনল বাচ্চা সমেত মালতীকে। চল ডাক্তারের কাছে চল।

 

 

রিকশা নিয়ে মালতীকে হাসপাতালে নিয়ে গেল রশিদ। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললে্ন বাচ্চা মারা গেছে অনেকক্ষণ। এ তো পুলিশ কেস। কী করে হল? কেন হল? বাচ্চার পোস্টমর্টেম করতে হবে। হাসপাতাল থেকে পুলিশে খবর দেওয়া হল নিয়মমাফিক। এতক্ষণ রশিদ ছিল পাশে, মালতীর যেন ভরসা ছিল। পুলিশের নাম শুনে রশিদ সরে পড়ল পুলিশ এল। জেরা করে মালতীর থেকে জেনে নিল সমস্ত ঘটনা। দণ্ডবিধানে মালতীর নামে কেস তৈরি হয়ে গেল, মালতী শিশু হত্যার অপরাধে অপরাধী! মালতীকে নিয়ে যাওয়া হল থানার লক আপে। মালতীর মেয়ে ফুলকির ছোট্ট শরীরটা চলে গেল পোস্টমর্টেমের জন্য। ফুলকির ছোট্ট দুর্বল অপুষ্ট শরীরটা কেটেকুটে তার শীর্ণ শ্বাসনালীতে খুঁজে পাওয়া যাবে তার মৃত্যুর কারণ – কি নিষ্ঠুরভাবেই না তার মুখে তুলে দেওয়া হয়েছিল ক্ষুধার অন্ন! নিজের গর্ভের সন্তানের প্রতি কোন মা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে?    অন্ধ আইনের প্রবল ধারার প্রয়োগে বানানো হবে অমোঘ রিপোর্ট। সেই রিপোর্ট থেকে স্থির সিদ্ধান্তে গড়ে নেওয়া যাবে, তার অপরাধী মায়ের চরম নিষ্ঠুরতার কাহিনীকোন ফাঁক থাকবে না তার স্তন্যদায়িনী ডাইনী মায়ের গণতান্ত্রিক শাস্তিবিধানে! 

 

কেসটার নির্বিঘ্নে নিষ্পত্তি হয়ে গেল নিম্ন আদালতে। খুব সহজ সরল শুনানির শেষে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন মাননীয় বিচারক।

 

কারাগারে মালতীর পরনে এখন পরিচ্ছন্ন বস্ত্র। সে এখন নিয়মিত তিনবেলা খেতে পায়সকালে জলখাবার। দুপুরে ডাল ভাত তরকারি। রাত্রে রুটি ডাল সব্জি। হপ্তায় দুয়েকদিন মাছ ডিমও তার বরাদ্দ। তার শরীরে এখন পুষ্টি, তার দুই স্তনেও এখন সদা সঞ্চিত সন্তানের পুষ্টি! ফুলকির কচি অধরে তার স্তনবৃন্ত তুলে না দিতে পারার যন্ত্রণায় সে এখন ছটফট করে নিজের হাতে মাতৃধারায় সিক্ত করে তোলে কারাগার কক্ষের নিভৃত দেওয়াল। মালতী অন্ধকার ঘরের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় সেই চোখদুটি – যে চোখের টালুক-টালুক দৃষ্টিতে চোখ রেখে সে খুঁজে পেত মাতৃত্বের তৃপ্তি!

 -০০-

      

                    

         

          


বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

তারকা

  বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক " 





এর আগের ছোট গল্প - " গঙ্গাপ্রাপ্তি "

 

 

বারান্দা থেকে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে ভাত খায় বুবুনস্টিলের বাটিতে ভাতডাল, তার সঙ্গে কাঁটাবাছা মাছ চটকে মাখা। নাতির পিছন পিছন ঘুরতে থাকেন ঠাকুমা যূথিকাদেবী। মুখে টোপলা করে জমিয়ে রাখা ভাতের গ্রাস খালি হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখেন। নানান গল্প করতে করতে মুখ খালি হয়েছে দেখলেই মুখে পুরে দেন পরের গ্রাস।

“আকাশ ভর্তি এত যে তারা, তারা সবাই বুঝি মরে যাওয়া মানুষ? মানুষ মরে গেলে, সবাই আকাশের তারা হয়ে যায়, ঠাম্মা?”

“যায় বৈকি, বাবা। আকাশ ভরা কত তারা দেখনি? পৃথিবীতে যতো মানুষ, তার থেকেও বেশি তারা। হাজার হাজার বছর ধরে যত্তো মানুষ মারা গেছে, সব্বাই তারা হয়ে গেছে কি না! তাই তো আকাশে এত তারার ভিড়। মুখটা খালি করো, বুবুনসোনা, মুখে ভাত নিয়ে সেই থেকে বকে চলেছ”।

“খাচ্ছি তো, দেখছো না? তুমিও খুব বকবক করছো। আমার মাকে আজ দেখতে পাচ্ছো ঠাম্মা, বলো না।”

যূথিকাদেবী নাতির অনুযোগে হাসলেন। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসবে বৈকি, বাবা। হাতের কাজ সেরে নিশ্চয়ই আসবে। বুবুনসোনাকে একবার চোখের দেখা না দেখে তোমার মা থাকতে পারবে নাকি?”

“এত দেরি করছে কেন, ভাল্লাগে না আমার, ও ঠাম্মা বলো না।”

“তোমার খাওয়া না হলে, আসবে না বলল। বলল বুবুনসোনার সব ভালো, খাওয়ার সময় হলেই খুব দুষ্টু হয়ে যায়।”

“মোটেও না, মিথ্যে কথা। মা কী করে জানলো? তুমিই খুব দুষ্টু, তুমি কেন মাকে বললে?”

“বা রে, আমি কেন বলতে যাবো? তোর মা আকাশ থেকে দেখতে পায় না বুঝি? মুখটা খালি করে, এই আরেকটা গ্রাস নে, দেখবি মা ঠিক চলে আসবে।”

“এটাই লাস্ট কিন্তু। আর খাবো না, আমার পেটটা ফেটে যাবে।”

নাতির মুখে বড়ো একটা গ্রাস দিয়ে যূথিকা বললেন, “তোর পেটের মাপ, তোর থেকে আমি ভাল জানি বুবুন, আরো দু গ্রাস খেতে হবে। তারপর মা কে নমো করে, ঠাকুর নমো করে, আমরা ঘুমু করতে যাবো।”

ভরামুখ ভাত নিয়ে, বুবু মুখ একটু উঁচু করে বলল, “আমার খাওয়া তো হয়ে এল, ঠাম্মা, মা আজ আসবে না?”

“আরে ওই তো তোর মা, ওই দ্যাখ কেমন মুচকি মুচকি হাসছে। কী দুষ্টু বাবা, তোর মাটা। কখন থেকে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে তোকে দেখছিল। এখন অনেক তারার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে, আর বলছে, বুবুনসোনা, টুউউকি!”

“কোথায় মা, আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।”

যূথিকা অনির্দিষ্ট একদিকে হাত তুলে দেখাতে দেখাতে বললেন, “ওই তো, দেখতে পাচ্ছো না?” বুবুনকে কোলে তুলে নিলেন যূথিকা, বুবুনের ঘুম আসছে দু চোখ ঝেঁপে। গলা জড়িয়ে ধরে, সে ঠাম্মার কাঁধে মাথা রাখল। পিঠে হাত রেখে যূথিকা বললেন, “আর খাবি না? মুখেরটা অন্তত: শেষ কর।” চোখ বন্ধ রেখেই, মুখের গ্রাসটা শেষ করল বুবুন, মুখের নড়াচড়ায় বুঝতে পারলেন যূথিকা। তাঁর কোলে ঘুমন্ত শিথিল বালকের ভার বেড়ে উঠল, তিনি বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলেন।

বিকাশ বিছানায় বসে বই পড়ছিল। ঘুমন্ত বুবুনকে কাঁধে নিয়ে মাকে ঘরে ঢুকতে দেখে জিজ্ঞেস  করল, “বুবুন ঘুমোলো, মা?”

“হুঁ, খাবি চ, বুবুনকে বিছানায় দিয়ে এসে, খাবার বাড়ছিতোর বাবাকেও ডাক।” মায়ের কাঁধে, ঘুমন্ত ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে, বিকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বইয়ের ভাঁজে রিমাইন্ডার স্ট্রিপ রেখে, বই বন্ধ করে উঠে পড়ল। খাবার ঘরের আলো জ্বালিয়ে, বাবাকে ডাকল। ডাইনিং টেবলে তিনটে টেবল্ ম্যাট পেতে, সাজিয়ে রাখল তিন গ্লাস জল। তিনজনের প্লেট টেবিলে সাজানোর আগেই যূথিকা চলে এলেন। বিকাশের বাবাও পা ঘষে ঘষে হেঁটে এসে বসলেন টেবিলে। বছর চারেক আগে মাইল্ড একটা সেরিব্র্যাল অ্যাটাকে বাঁ সাইডটা প্যারালাইজড্ হয়ে গিয়েছিল। এখন অনেকটা রিকভার করেছেন, নিজে নিজেই হাঁটাচলা করতে পারেন, রোজ বিকেলে পার্কেও হাঁটতে যান। তবে বাঁ পাটা পুরো স্বাভাবিক হয়নি, একটু ঘষটে টেনে টেনে চলতে হয়। সিঁড়ি ভাঙতে সময় লাগে খুব।

তিনজনের প্লেটে ভাত দিতে দিতে যূথিকা বললেন, “কতদিন এভাবে একটা বাচ্চা ছেলেকে রোজ মিথ্যে কথা বলে যাবো, জানি না, বাবা”

বুবুনের মাস ছয়েক বয়েসে ওর মা চলে যাওয়ার পর থেকেই, মায়ের এই অভিযোগ অনেক দিনের আর নৈমিত্তিক। বুবুনের বয়েস আজ প্রায় সাড়ে পাঁচ। বিকাশরা শুনে যায়, কোন উত্তর দেওয়ার নেই, দেয়ও না। সুস্থ অবস্থায় বাবা একবার বলেছিলেন, “শাস্ত্রে আছে, মিথ্যা কথায়, যদি কারো মঙ্গল হয়, সেক্ষেত্রে সত্য বলার থেকে মিথ্যা কথনই বিধেয়। এ মিথ্যায় কোন পাপ অর্শায় না। তবে আমার মত বলে, বুবুন একটু বড় হয়ে, নিজস্ব বোধবুদ্ধি হলে, বিষয়টা খোলসা করে দেওয়াই ভালো। সারাজীবন একটা মিথ্যা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে, অনেক সময় বোঝাটা খুব ভারি হয়ে ওঠে। তখন তার ভার সামলানো দায় হয়ে ওঠে”।   

 

বুবুন ঠাম্মা–দাদুর ঘরেই একসঙ্গে ঘুমোয়। ওর মা চলে যাওয়ার পর থেকে, যূথিকা বুবুনের মায়ের অভাব বুঝতে না দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন নিরন্তর, তবু একজন শিশু ঠিকই টের পায় তার মাতৃহীনতা। একটু বড়ো হয়ে নিজস্ব বোধ তৈরি হলে, নিশ্চয়ই মানিয়ে নিতে পারবে। যতদিন তা না হচ্ছে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোন পন্থা নেই। খাওয়াদাওয়া সেরে বাবা ঘরে চলে যান, মা যতক্ষণ রান্নাঘরে কাজ সারেন, বিকাশ বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে। হাতের কাজ সারতে সারতে যূথিকা রোজই বলেন, “আবার বসলি কেন? শুতে যা, কাল স্কুলে আছে তো? রাত কম হল নাকি”?

“ঠিক আছে, বসি না একটু। তুমি কাজ সারো - তাড়া কিসের”? বিকাশ জানে সে এখানে বসে থাকলে যূথিকা কাজ করতে করতে অনবরত কথা বলবেন, অনুযোগ  করবেন। তাঁর সব কথার উত্তর অথবা তাঁর অনুযোগের প্রতিকার হবে এমন প্রত্যাশা যূথিকা করেন না। সারাদিনে, এমন কী সারাজীবনে তাঁর মনের মধ্যে জমে ওঠা নানান ক্ষোভ কথা হয়ে বেরিয়ে এলে তিনি অনেকটা স্বস্তি পান।

যেমন আজও বলতে শুরু করলেন, “তুই কী এভাবেই জীবনটা কাটিয়ে দিবি মনে করছিস, সুকু। জোয়ার-ভাঁটার শ্যাওলার মতো? আমরা কী আজীবন থাকবো? বাপ-মা কারো সারাজীবন থাকে? তোর বাবার অবস্থা তো দেখছিস। আমিও কী আগের মতো পারি, আমারও কী বয়েস বাড়ছে না!  কবে আছি কবে নেই কে বলতে পারে! ব্যটাছেলের চৌঁত্রিশ বছরটা আবার বয়েস নাকি? আমরা চোখ বোজার আগে নিজের জীবনটা একটু গুছিয়ে নে না! চোরের ওপর রাগ করে, কেউ মাটিতে ভাত বেড়ে খায়? একজন ঠকিয়েছে বলে, সবাই ঠকাবে নাকি? মেয়েরা কী সংসার করছে না নাকি, মেয়েরা করছে না তো কারা করছে সংসার? একজন পথে বসিয়ে গিয়েছে বলে, পথেই বসে থাকবি? ঘরে ফিরবি না, নতুন করে ঘর গড়বি না? কী যে তোর মাথায় ঢুকেছে বুঝি না বাপু, একেবারে ধনুকভাঙা পণ করে বসে আছিস, কার জন্যে, কিসের জন্যে?”

রান্নাঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে যূথিকা বেরিয়ে আসতে, বিকাশ বুঝল, মায়ের কাজ শেষ। বিকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল, তার ডাকনাম সুকু, মা আর বাবা চলে গেলে, এ নামটাও ভুলে যাবে সবাই। বিকাশ উঠে বসার ঘরের লাইট নিভিয়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে বলল, “খুব ঘুম পাচ্ছে মা, শুতে চললাম। তুমিও শুয়ে পড়ো, সকাল থেকে তোমার কাজের আর বিরাম নেই”।

“সেই জন্যেই তো বলছি, এবার আমায় একটু রেহাই দে।”

“আচ্ছা সে দেব, তুমি এখন শুতে যাও তো”! 

 

মফস্বলে বাংলার টিচারের কাছে কেউ টিউসন নিতে আসে না। ম্যাথস্, সায়েন্স, ইংরিজি কিংবা অ্যাকাউন্টসের টিচারের বাড়ির সামনে রোজ সকাল-সন্ধ্যেয় যত সাইকেল আর স্যাণ্ডেল জমে, সদাজাগ্রতা মায়ের মন্দিরেও তত জমা পড়ে না। আর বাংলা বিষয়টা অনেকটা আলুসেদ্দ-ভাতের মতো। যে কেউ রেঁধে ফেলতে পারে। কাজেই কলকাতায় পর্ষদের দপ্তরে কাজ পড়লে বিকাশ মালাকার ছাড়া অন্য কাউকে পাঠানোর কথা স্কুল কর্তৃপক্ষ চিন্তাও করেন না। বিকাশ প্রথমদিকে দু একবার হেডমিস্ট্রেস ম্যডামকে জিজ্ঞেস  করেছিলেন, “আমি চলে গেলে, ম্যাডাম আমার পিরিয়ডগুলো... ?” কথা শেষ হওয়ার আগেই হেডমিস্ট্রেস ম্যাডাম উত্তর দিয়েছিলেন, “ও নিয়ে ভাববেন না। আমি বলে দিয়েছি, সীমা ও কটা পিরিয়ড দেখে নেবে।”  সীমাম্যাডাম পিটির টিচার, মেয়েদের ড্রিল শেখান

  এই সব দেখে শুনে, রায়বাঘিনীদেব্যা বুনিয়াদি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক বিকাশ মালাকার দিনদিন বুড়োটে মেরে যাচ্ছেন। কতই বা বয়েস, তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ? চুলে, জুলপিতে পাক ধরেছে। মাথায় উঁকি দিচ্ছে ইন্দ্রলুপ্তির আভাস। চোখের কোলে, কপালে, নাকের দুপাশে জমে উঠছে অভিজ্ঞতার গভীর আঁকিবুঁকি। তার চোখে এখন চালশের চশমা। আগে বাইফোকাল ছিল, সারাদিন ঘাড় ওপরনিচ করতে করতে, ঘাড়ে ব্যথা হয়ে যেত সন্ধের দিকে।  এ বারও স্কুলের কাজে কলকাতায় গিয়ে ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু দিলিপের বাসাতেই উঠেছিল। তার পাল্লায় পড়ে চোখের পাওয়ার চেকআপ করে, প্রোগ্রেসিভ লেন্স নিয়েছে। তাতে দেখার যেমন সুবিধে হল, তেমনি দিলিপের বাড়িতে তিনদিন থাকার দৌলতে চোখও খুলে গেল।

বিকাশের বন্ধু দিলিপের পত্নী, লীলা পুত্রকন্যা নিয়ে সৌভাগ্যক্রমে প্রথমদিন বাড়ি ছিলেন না। তাঁর ছোটবোনের বড়ননদের একমাত্র পুত্রের বিয়ে। অতএব প্রথম রাত্রেই নিরুপদ্রব আড্ডা জমে উঠতে দেরি হল না। দু’বন্ধু একসঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে, পাড়ার বাইরের এফএল শপ থেকে সাদা রাম নিয়ে এল। অন্য দোকান থেকে এল সোডার বোতল, চিকেন টিকিয়া, ভাজা মুগডাল আর ছোলাভাজা। রাতের রান্না সকালেই করে দিয়ে গেছে কাজের মাসি, পদ্মমাসি, অতএব খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে টেনশন নেই কোন। একটু গরম করে বেড়ে নেওয়ার মতো অবস্থায়, দু’পায়ে দাঁড়াতে পারলেই চলবে।

পুরোন দিনের নানান কথা, স্কুল-কলেজের অন্য বন্ধুদের সংবাদ আদান প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে দু পাত্র শেষ করে তৃতীয় পাত্র শুরুর মুখে খুব গম্ভীর মুখে দিলিপ কিছুটা তরল উচ্চারণে বলল, “অসতী...ধ্যাত্তেরি কী আজেবাজে বকছি, নেশা হয়ে গেল নাকি? ইয়ে মানে অতসীর খবর কিছু জানিস?” অতসী, বুবুনের মা বহু বছর আগে বিকাশদের ছেড়ে চলে যাওয়া বিকাশের বউ! “তোকে আঘাত দেওয়ার জন্যে বলছি না, আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, কিছুদিন আগে লীলা হঠাৎ আবিষ্কার করেছে”। গেলাসে চুমুক দিতে গিয়েও, বিকাশের বুকের রক্ত কিছুটা ছলকে উঠল।

নিজেকে যথাসম্ভব নির্বিকার রাখার চেষ্টা করতে করতে বিকাশ খুব কষ্ট করেই বলল, “তাই? কেমন আছে কেমন?”

“মোটেই ভাল নেই রে, একদম নষ্ট হয়ে গেছে মেয়েটাতুই আদর করে ওকে তুসী বলতিস না?” অনেক রক্তপাত ভাগ্যিস চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। বিকাশের এখনকার রক্তপাত দিলিপও দেখতে পাচ্ছে না। বিকাশ আরেকবার গেলাসে চুমুক দিয়ে কয়েকটা ছোলাভাজা মুখে ফেলল, কোন উত্তর দিল না।

দিলিপ বলতে লাগল, “সত্যিকারের ভালোবাসার কদর যে মেয়ে দেয় না, তার কখনো ভালো হতে পারে না, তোকে তখনই বলেছিলাম না, বল? এখন মিলিয়ে নে।”

নির্বিকার থাকার চেষ্টা করেও  বিকাশের গলা কেঁপে উঠল, “কেন কী করেছে কি, তুসী? সুবীরকে ছেড়ে আর কারো সঙ্গে পালিয়েছে”?

দিলিপ অস্বচ্ছ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বিকাশের দিকে, তারপর বলল, “কী করেছে? দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি, দু মিনিট বোস।” দিলিপ উঠে গেল তাদের বেডরুমের দিকে। বিকাশ এক চুমুকে গেলাস খালি করে, মুগডাল ঢালল মুখে।

 

সরকারি অ্যাফিলিয়েটেড রায়বাঘিনী বুনিয়াদি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের টিচারের চাকরিটা পেয়ে, প্রথম যেদিন সে  সহকারী শিক্ষক হিসেবে জয়েন করল, সেদিনটা তার আজও মনে পড়ে। প্রথম দিন অচেনা শহর, অপরিচিত স্টেশনে নেমে রিকশ নিয়ে স্কুলে পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে, বেলা প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছিল। হেডমিস্ট্রেস ম্যাডামের ঘরে জয়েনিংয়ের নিয়মকানুন, সইসাবুদ মিটতে মিটতে টিফিনের ঘন্টা পড়ে গেল। টিফিনের সময় টিচার্সরুমে নিয়ে গিয়ে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ঊর্মিদিদিমণি। হেডমিস্ট্রেস ম্যডাম, বিধবা ঊর্মিদিদিমণি সকলের বড়ো দিদির মতোই। প্রথম আলাপেই বিকাশকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন।

“আপনি আমার থেকে অনেকটাই ছোট। আমি আবার খুব ছোটদের আপনি-আজ্ঞে করতে পারি না। আমি কিন্তু তুমি বলব, আর বিকাশ বলেই ডাকবো, কেমন? তুমিও আমাকে দিদি বললেই খুব খুশি হবো”। মেয়েদের স্কুলে টিচারের চাকরির জন্যে বিকাশ এমনিতেই খুব নার্ভাস ফিল করছিল। ঊর্মিদিদির কথায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল।

টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে ঊর্মিদিদি মৃদু হেসে বললেন, “আজ নিশ্চয়ই টিফিন আনা হয়নি, এদিকে খিদেও তো পেয়েছে, নাকি? আজ আমার রুমে চলো, আমাদের টিফিন থেকেই ভাগ করে চালিয়ে নেব।”

বিকাশ ঘোর  আপত্তি তুলে বলেছিল, “না না দিদি, আমার খিদে পায়নি, আপনি ব্যস্ত হবেন না”।

“দিদি ব্যস্ত হবে না তো কে হবে, শুনি? আমাদের এই ছোট্ট শহরে, কতদূর থেকে, আমাদের মেয়েদের তুমি পড়াতে এসেছো, তোমাকে অভুক্ত রাখলে আমি তো শান্তি পাবো না, ভাই।” দিদির সঙ্গে ঘরে ঢুকতেই, বিকাশ একটি মেয়েকে দেখল, পিছন ফিরে টিফিনের বাটি নিয়ে, দিদির উল্টো দিকের চেয়ারে বসে, কী যেন খাচ্ছে! 

দিদি নিজের চেয়ারের দিকে যেতে যেতে, বললেন, “তোর আর তর সইল না, খেতে শুরু করে দিয়েছিস? বিকাশ দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বসো ভাই। অতু উনি তোদের বাংলার নতুন মাস্টারমশাই। বিকাশ, এই আমার একমাত্র মেয়ে, অতসী। পড়া ছাড়া আর সব বিষয়ে়ই খুব উৎসাহ। নাচ-টাচ করে, খুব প্রাইজ-টাইজ পায়। এই স্কুলেই বারো ক্লাসে পড়ে। তোমাকে ওদেরও ক্লাস নিতে হবে। অতু, খেয়ে উঠে হাত ধুয়ে এসে, বিকাশস্যারকে প্রণাম করবি।” অতসী দরজার দিকে পিঠ করে বসে খাচ্ছিল, মায়ের আদেশে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে ফিক করে হেসে, আবার খাওয়ায় মন দিল। অতসীর হাসিটা অদ্ভূত সুন্দর, হাসলে অতসীর গালে টোল পড়ে। অতসীর ঘাড় নেই – গ্রীবা আছে। অতসীর পিঠে মেঘবরণ কুন্তলের সর্পিল মুক্তবেণী। ডালিমের পাপড়ির মতো ওষ্ঠাধর। অতসীর...

“আরে বসো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছো বলো তো, বিকাশ? আর তুই অমন হাসলি কেন রে?” ঊর্মিদিদি শেষ কথাটা বললেন মেয়েকে। অতসীর পাশের চেয়ারটা ছেড়ে পরের চেয়ারটা একটু সরিয়ে বসতে গিয়ে বিকাশ হোঁচট খেল চেয়ারের পায়ে। পড়ল না, কিন্তু বেসামাল হয়ে উঠল। ঊর্মিদিদি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “আরে রে, পড়ে গেলে নাকি? লাগেনি তো?”

ভীষণ নার্ভাস বিকাশ খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, “না না, লাগেনি। পাটা একটু জড়িয়ে গিয়েছিল আর কী?”

অতসী এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল বিকাশের দিকে, সে আবার ফিক ফিক করে হেসে বলল, “লাগেনি আবার, খুব লেগেছে! যা লেগেছে উনি এখন বুঝতে পারবেন না, মা। ঘরে গিয়ে রাত্রে বুঝতে পারবেন।”

“তার মানে বেশ লেগেছে। আহা রে, প্রথম দিনেই চোট পেয়ে গেলে, ভাই! আর তুই সেই থেকে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছিস, ফাজিল মেয়ে?” 

অতসী অধরপ্রান্তে মুচকি হাসির রেশ মাখিয়ে, দরদ মাখানো গলায় বলল, “ঠিকই বলেছ, মা। প্রথম দেখাতেই এতটা চোট, এ ধাক্কা সামলাতে পারবেন তো, স্যার?” 

 

“জানি, এ ধাক্কাটা তোর পক্ষে সামলাতে পারা খুব কঠিন। কিন্তু ব্যাপারটা জেনেও তোর কাছে গোপন রাখাটা কোন কাজের কথা নয়।” ঘরে ঢুকে দিলিপ সোফায় বসতে বসতে আরো বলল, “একটু দেরি হল, ম্যগাজিনটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।  লীলাকে ফোন করলাম, বলল লুকিয়ে রেখেছিল, পাছে ছেলেমেয়ের হাতে পড়ে যায়! বিচ্ছিরি ব্যাপার না! এই দ্যাখ।”

ঘটনার সাংঘাতিক সংঘাতে যিনি বছর তিনেক পরে বিকাশের শ্বাশুড়ি হয়েছিলেন, সেই ঊর্মিদিদির রুমে সেদিনের মধুর স্মৃতির মধ্যে বিকাশ হারিয়ে গিয়েছিল। দিলিপের বাড়িয়ে ধরা খোলা ম্যাগাজিনটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বিকাশ বর্তমানে ফিরল।

দুখানি সেন্টারস্প্রেড ছবি। দুটো ছবিই ঢেউভাঙা সমুদ্রতটে, প্রেক্ষাপটে নানা রঙে সেজে ওঠা আকাশ। একটা ছবিতে নির্জন নৌকোর কানায় ভর রেখে, দাঁড়িয়ে আছে তুসী। পরনে বিকিনি। তার বিপদসঙ্কুল ভাঁজে ভাঁজে থমকে আছে টলটলে নীরবিন্দু। অন্য ছবিতে, সমুদ্রে স্নান সেরে, দুই হাত তুলে মাথার পিছনে চুলের গুছি গোছাতে গোছাতে উঠে আসছে তুসী। তার উদাস উথলে ওঠা সিক্ত যৌবনে সৃষ্টির আদিম আহ্বান। খুব মন দিয়ে ছবিদুটো অনেকক্ষণ দেখল বিকাশ, আর দিলিপ লক্ষ্য করছিল বন্ধুর প্রতিক্রিয়া। ম্যাগাজিনটা সোফায় রেখে বিকাশ উঠে দাঁড়াল, বলল, “ছোট করে আরেকটা ঢাল, দিলিপ, আমি টয়লেট থেকে আসছি”।

দ্রুতপায়ে টয়লেটে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি দিল বিকাশ। নির্জন এই কক্ষে জেগে ওঠা নিজেকে সযত্নে নগ্ন করল। বহুদিন পর, নিজের দুহাতের মুঠিতে অনুভব করল তার ফিরে পাওয়া কবোষ্ণ কাঠিন্যমনে মনে ইষ্ট মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করে চলল, তুসী, আমার তুসী, আমায় ছেড়ে তুমি হয়েছ কী খুশি? কতক্ষণ পর, তার তুসীময় চেতনায় সে অনুভব করল এক তীব্র আবেগ। ঝাপসা দৃষ্টিতে টয়লেটের সিলিং দেখতে দেখতে, ঝলকে ঝলকে ঝরিয়ে দিল জমে থাকা যত ক্ষোভ, অভিমান, অপমান, রুদ্ধ ভালোবাসা। পুরো ব্যাপারটা হয়ে যেতে বিষণ্ণ হয়ে উঠল বিকাশের মন। রিক্ত মস্তিষ্কের উদাসীন ক্লান্তি নিয়ে ফ্লাশের হ্যাণ্ডেল ঘোরাল। হড়পা বানের মতো দুরন্ত স্রোতে ভেসে গেল তার সকল সুখ ও আনন্দের ঝর্ণাধারা। বাঁদিকে ঘুরে বেসিনের কল খুলে হাত ধুল, ধুয়ে নিল নিভৃত পুরুষালি। অঞ্জলিতে জল ধরে ঝাপটা দিল ঘাড়ে, চোখেমুখে, বারবার। তারপর লুঙ্গি আর বেনিয়ান পরতে পরতে সে শুনতে পেল, শূণ্য সিস্টার্নে অদৃশ্য জল ভরে ওঠার ঝিরঝির শব্দ। দেখল কমোডের তলায় জমে আছে অচঞ্চল জল, নির্বিকার সাক্ষীর মতো।

দিলিপ গেলাস সাজিয়ে বসেছিল বিকাশের অপেক্ষায়। বিকাশ টয়লেট থেকে ফিরে সোফায় বসতে বলল, “কীরে পেট ঠিক আছে তো! তুই আসবি বলে লীলা বলে রেখেছিল, রাত্রে পরোটা আর চিকেন করা আছে।”

“না, না পেট ইজ ফাইন, কোন প্রবলেম নেই। জমিয়ে পরোটা চিকেন খাবো ভাবিস না।”

দিলিপ বিকাশের হাতে গেলাস তুলে দিয়ে, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, “অতসীর চিন্তায় জীবনটাকে শেষ না করে, অনায়াসে আবার বিয়ে করতে পারতিস। মাসিমা বলতে বলতে হদ্দ হয়ে মারাই গেলেন, তোর চিন্তায়আমরাও তোকে কতবার বলেছি বল? কারো কথা শুনলি না। বুবুন বড়ো হচ্ছে, আজ বাদে কাল কলেজে যাবে, পাশ করে চাকরি করবে। হয়তো তাকেও বাইরে বিদেশে থাকতে হবে। মেসোমশাইয়েরও বয়েস হচ্ছে, অসুস্থ মানুষ। যে কোনদিন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে, এটা মানবি তো? তারপর? তুই এক্কেবারে একা!” বিকাশ মুখ তুলে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে গেলাসে হাল্কা চুমুক দিল।

“তুই হাসছিস, বিকাশ? তোর তুসীর ওই নোংরা ছবিগুলো দেখে তুই যেভাবে টয়লেটে দৌড়োলি...তুই পাগল হয়ে যাবি বিকাশ! তোর স্কুলের কাজ, বুড়ো বাবার দেখভাল, ছেলের লেখাপড়া – এসবের মধ্যে তুই এখন ব্যস্ত রয়েছিস, এগুলো অফ হয়ে গেলে, সারাটাদিন, তোর সমস্ত অবসর, অতসী গিলে খাবে।”

“প্লিজ দিলিপ, প্লিজ। আবার বিয়ে করার উপদেশ দিস না প্লিজ।”

“কেন? ক্ষতি কী? কত বয়েস হল তোর? তেতাল্লিশ তো? আমাদের মধ্যে তুই ফার্স্ট বিয়ে করেছিলি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন সবে সিক্স-সেভেনে হামাগুড়ি দিচ্ছে, আর তোর ছেলে মাধ্যমিকে বসছে। তাই বলে তোর বয়েসটা তো আর লাফিয়ে বেড়ে যায়নি! তুই তো আর বুড়ো হসনি বিকাশ?” বিকাশ কোন উত্তর না দিয়ে গেলাসে বড়ো চুমুক দিয়ে ভাজা মুগ ঢালল মুখে। দিলিপ আবার বলল, “তুই একবার চিন্তা করে দেখ, অতসী তোর থেকে কত ছোট? পাঁচ, কী ছয়?” 

“ছ বছর তিনমাস, ষোল দিন।”

“তার মানে তার বয়েস এখন মোটামুটি ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ? তোকে ছেড়ে, বুবুনকে ছেড়ে, নিজের মাকে ছেড়ে, সুবীরের মতো এক নাচুনে বদমাইশের সঙ্গে থেকে, এতগুলো বছর কত জনের খপ্পরে পড়েছে, কত ঠকেছে, কত লড়াই করতে হয়েছে চিন্তা করতে পারছিস? সুন্দরী, একলা, অ্যাম্বিসাস একটা মেয়ের পক্ষে এই দুনিয়াটা কেমন, তার কিছুটা ধারণা তোর আমার নিশ্চয়ই আছে! এত ঝড়ঝঞ্ঝা সামলে, এই বয়সেও এমন ফিগার মেনটেন করা, ম্যাগাজিনের সেন্টারস্প্রেডে জায়গা করে নেওয়া, কম কথা নয়, বিকাশ!”

গেলাস খালি করে, বিকাশ দিলিপকে এগিয়ে দিল গেলাসটা, বলল, “আরেকটা দে তো, ছোট করে। যদিও তুই আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড, কিন্তু তাও বলছি, তুই শালা একনম্বরের চরিত্রহীন। লম্পট।”

“তার মানে?”  বোতল থেকে গেলাসে ঢালতে ঢালতে দিলিপ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস  করল, “অ্যাদ্দিন পরে, আমার সম্বন্ধে তোর এমন ধারণা হল কেন?”

বিকাশ এখন আচরণে কিছুটা যেন এলোমেলো, বলল, “যখন আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর জন্য আমাকে ফুসলাচ্ছিলি, আমার মনটা দ্রব হয়ে গিয়েছিল। মাইরি বলছি। মনে হচ্ছিল, তুই না, আমার মা বসে আছে সামনে! তোর পরনে শাড়ি নেই, আর শাঁখাসিঁদুর নেই, তাছাড়া বাকি সব আছে। সেই একই রকম ঘ্যান ঘ্যান করে মাথা খাচ্ছিলি”।

গেলাস রেডি করে বিকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে দিলিপ বলল, “অ, মাসিমা, আমি - সবাই তোর মাথা খাই?”

“না, তুই আরো সাংঘাতিক। তুই আমার বউকে....আমার তুসীকে উলঙ্গ দেখেছিস, পুরো নয় আধা। খুব মন দিয়ে দেখেছিস, শালা। বল দেখিসনি?”

“তুই আর খাস না, বিকাশ। তোর নেশা হয়ে গেছে”।

“সে আর বলতে? নেশ আমার বোওওওওহু দিন আগেই হয়ে গেছে, সে তুই বুঝবি না, শালা! প্রথম যেদিন তুসীর চোখে চোখ পড়েছিল, সেদিনই আমি নেশায় চূর। জীবনে কোনদিন ভালোবেসেছিস? একসঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘর করলেই ভালোবাসা হয় বুঝি? তোর মুণ্ডু – হয় না। ওটাও একটা নেশা, একটা অব্যেস”। দিলিপ নিজের গেলাস খালি করে আরেকটা ঢালল।

একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল, “তোর ভালোবাসা নিয়ে আমাদের মনে কোন সন্দেহ তো নেই, বিকাশ। কিন্তু  তোর তুসী? যার জন্যে তুই নিজেকে নষ্ট করে চলেছিস, সেই অতসী তোকে কোনদিন ভালোবেসেছিল মনে হয়?”

“মনে হওয়া-হওয়ির কিছু নেই, দিলিপ। অতসী নামের মেয়েটা আমাকে একদিনও ভালোবাসেনি। ওর মা, আর আমার পরিবার, এমনকি তোদের মতো ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুর যোগসাজশে, তুসীকে আমি জোর করেই বিয়ে করেছিলাম তুসী তো চায়নি। আমরাও বুঝিনি যে, তুসী তার মেন্টার, ফ্রেণ্ড, ফিলজফার, গাইড সুবীরেই মজে আছে। বোঝার চেষ্টাও করিনি, তার চোখের সামনে তখন ছিল অন্য স্বপ্ন”!  

দিলিপ কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল, বিকাশ গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে আবার বলল, “মায়েরা যেমন ভালো হয়, তেমনি খুব শয়তানও হয়, জানিস কী? জানিস না, আমি জানি। ওরা ঠিক বুঝে ফেলে, স্বামীস্ত্রীর মধ্যে মিলমিশ খেল কিনা? আগুনের ছোঁয়ায় ঘি গলল কিনা! আমাদের বিয়ের মাস ছয়েক পরে ওর মা, ঊর্মিদিদি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর খুব ভাব, গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর – দুই বেয়ান নয়, যেন দুই সই। ওলো সই, ওলো সই, আমার ইচ্ছে করে... ওলো সই, তোর সঙ্গে আমি বেশ বকুলফুল পাতালাম, কেমন?” বিকাশ অদ্ভূত মেয়েলি ভঙ্গি করে সখিত্ব দেখালো দিলিপকে। দিলিপ হাসল না, তাকিয়ে রইল বিকাশের দিকে। শালা ধীরে ধীরে বেহেড হয়ে উঠছে!

বিকাশ গেলাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল, “কন্সপিরেসি। দুই মায়ের গুপ্তমন্ত্রণা! আর শালা আমিই হলাম কিনা তার বোড়ে! আমি তুরুপের সাহেব আর তুসী আমার বিবি। আমাদের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার কদিন পর, আমাকে ঊর্মিদিদি তাঁর চেম্বারে ডাকলেন। খেজুরে আলাপ দিয়ে শুরু করলেন, “আজ কী এনেছো, বিকাশ? টিফিন কে বানিয়ে দিয়েছে? মা না অতু?”

“রুটি, বেগুনভাজা। একটা সন্দেশ। মা বানিয়ে দিয়েছেন”।

“কেন অতু বানায় না কেন? রোজ না পারুক, এক আধদিন তো বানিয়ে দিতে পারে! তোমার মা আর কত করবেন? তাঁরও তো বয়েস হচ্ছে না কী? সারা জীবনই কী তিনি খেটে যাবেন? বিয়ে দিয়ে ছেলের বউ এনে, তাহলে লাভ কী হল, বলো?”

আমি কোন উত্তর দিলাম না, ঊর্মিদিদি আমার দিকে একটা বাটি ঠেলে দিয়ে বললেন, “তোমার জন্যে একটু পায়েস এনেছিলাম, খাও। আমি কিন্তু তোমাকেই দূষব, বিকাশ। নিজের মেয়ে হলেও বলছি, এতটা মাথায় তোলা তোমার উচিৎ হচ্ছে না। পুরুষমানুষের একটু রোখ-ঠোক, হুংকার না হলে, বউয়েরা ঘাড়ে চেপে পড়ে। সোহাগ করছো করো, কিন্তু শাসনও যে করতে হবে, বিকাশ। পায়েসটা খেয়ে দেখলে না? মিষ্টি ঠিক হয়েছে কী না দেখো না?”

“আজ্ঞে খাচ্ছি, তবে অতটা...আপনি তো নিলেনই না”।

“আরে খাও, খাও। তোমাদের জোয়ান বয়েস, খেতে হবে বৈকি! পেট ভরে খাও না বলেই তোমাদের এই বিপত্তি। পেট ভরে নিজেও খাবে, বউকেও খাওয়াবে। মেয়েদের পেট খালি রাখতে নেই”।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস  করলাম, “আজ্ঞে, তুসী আপনাকে কিছু বলেছে বুঝি? ও কি লজ্জা করে কম কম খায়? ছি ছি, এটা আমরা কেউই খেয়াল করিনি তো!”

“ধূর পাগল, তোমার মা, তেমন মানুষই না। কম খাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, ইয়ে... পেট খালি মানে ...মেয়েদের পেটে বাচ্চা-কাচ্চা এনে না দিলে, মেয়েরা জব্দ হয় না”। আমি অবাক হয়ে ঊর্মিদিদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েদের স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, যথেষ্ট সিনিয়ার, এর বছর খানেক পরেই উনি রিটায়ার করেছিলেন। তাঁর কাছে এরকম কথা শুনবো আশা করিনি। আমার দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলেন না, টিফিনের এঁটো কৌটো-বাটি নিয়ে ওয়াশরুমে যেতে যেতে বললেন, “তোমার মায়েরও একই মত। আমরা দুজনেই নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে চাইছি। অতু না চাইলেও, স্বামী হিসেবে তুমি জোর করতেই পারো, সে অধিকার তোমার আছে - ভালোবাসার অধিকার”। কী যে শালা হল, হেবি বার খেয়ে গেলাম, জানিস? সেদিনই চড়াও হলাম তুসীর ওপর। যাকে বলে জোর যার মুল্লুক তার”।

বিকাশ খালি করে আবার গেলাস এগিয়ে দিল, বলল, “আরেকটা ঢাল। বড়ো করে ঢাল শালা, কিপ্টেমি করিস না। অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়, বুঝলি, বন্দুকের নলই শক্তির উৎস। শালা নল হলেই হল, বন্দুকের না হলেও চলে যায়। ব্যাপারটা তো হয়ে গেল, কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হল, তুসী মনে মনে আমার সঙ্গে মানিয়ে নিতে, হয়তো চেষ্টা করছিলকিন্তু সে রাতের পর ও আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করল”।

দিলিপ বিকাশের হাতে গেলাস এগিয়ে দিয়ে বলল, “সত্যি আরেকটু ধৈর্য ধরলে, এমনটা হত না হয়তো”।

দিলিপের কথা যেন শুনল না বিকাশ, গেলাসে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, “মানুষের রক্তের একবার স্বাদ পেয়ে গেলে বাঘের মুখে অন্য রক্ত নাকি আর রোচে না। এমনই শুনেছি - কিন্তু কথাটা সত্যি নয় অবাস্তব, মিথ। তবে আমার ক্ষেত্রে কথাটা খাটে। ভদ্রতার মুখোশ একবার খসে যাওয়াতে, আমারও জেদ চড়তে লাগল। বারবার, প্রায়ই। প্রথম দিন তুসী বাধা দিয়েছিল, তার পর থেকে আর বাধা দিত না সমর্পণ করে দিত নিজেকে, উদাসীন চোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি নেমে গেলে, উল্টোদিকে মুখ করে কাঁদত। সে কান্নায় তার শরীরে কোন আক্ষেপ হত না, কিন্তু নীরব চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে তুলত প্রত্যেকবার” বিকাশ আরেকটা চুমুক দিয়ে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। দিলিপ কিছু বলল না, গেলাসে হাল্কা চুমুক দিয়ে তাকিয়ে রইল বন্ধুর দিকে।

হঠাৎ বিকাশ মুখ তুলে বলে উঠল, “রোজ সকালে হরেক ধর্ষণের গল্প তো মজিয়ে পড়ো, বাওয়া, কমা ফুলস্টপও বাদ দাও না। আর চোকের সামনেই যে একজন ধর্ষক বসে আছে, চিনতেও পারচো না, শালা! যাকে ভালোবাসিস, তাকে কোনদিন রেপ করে দেকেছিস, দেকিস নি, করলে বুঝতিস, যন্ত্রণাটা কেমন!”

“আর খাস না, বিকাশ। অনেক রাত হল, এবার চ” খেয়ে নিই”।

এক চুমুকে গেলাস খালি করে, মেঝেতেই শুয়ে পড়ল বিকাশ, জড়ানো গলায় বলল, সাগর কিনারে, দিল ইয়ে পুকারে...দিলিপ, তুই শালা, ঢ্যামনার হাতবাক্স একখান, তোকে আমি শালা বলি, তার মানে দারানুজ - বউয়ের ভাই, আর তুই কী না, তুসীর ছবি পেয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে ঝাড়ি করলি...শালা, লুচ্চা...” বিকাশ চুপ করে নিঝুম শুয়েই রইল মেঝেয়। অসহায় বিরহী বন্ধুর দিকে তাকিয়ে, দিলিপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

 

 

ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে এল বিকাশ। বিকেল সাড়েচারটে বাজছে। বুবুনের সামনেই সেকেণ্ডারি পরীক্ষা, নিশ্চয়ই কোচিংয়ে গেছে। পা ঘষে ঘষে বাবা গেছেন পার্কে। বাবা ফিরবেন ছটা-সোয়াছটা নাগাদ, সন্ধের আগে। বুবুনের আসতে সাতটা-সওয়াসাতটা হয়েই যায়। মা মারা গেছেন, বছর চারেক হল। তারপর থেকে রমলাদিদি ঘরের কাজ, রান্নাবান্না সেরে, নটা নাগাদ চলে যায়। অতএব তার এখন বাড়ি ফেরার কোন তাড়া নেই।

অতসীর ব্যাপারটা দিলিপের কাছে শোনার পর থেকে, বিকাশ নিজের মনে পুরো বিষয়টা ভাবার তেমন সময় পায়নি। দিলিপের বউ লীলা পরদিন বিকেলে ফিরে এসেছিল। অফিসের কাজে সে এবং দিলিপ দুজনেই ব্যস্ত ছিল। দিলিপের ঘরে ওদের ছেলেমেয়েরা বিকাশ কাকুকে নিয়ে এমন মেতে থাকে, অতসীর বিষয়ে, দিলিপ বা লীলার সঙ্গে পরে আর কোন কথাও হতে পারেনি।

অতসীর বর্তমান যে জীবনের কথা জানা যাচ্ছে, সেটা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ছবি নয়। সে জীবনে রাখঢাক কম, তার পোশাকের মতো চালচলনেও সে জীবন বড্ড বেশি খোলামেলা। অতসী এখন বাজারি পণ্যের মতো, তার শরীর দর্শকের মনোরঞ্জনের উপকরণ। স্বামী হিসেবে যে ব্যক্তিগত অধিকারের পরিসরে অতসী বন্দী ছিল, সে এখন সর্বসমক্ষে উন্মুক্ত।  অতসীর জীবনের বহুদিন হল, তার কোন অধিকার নেই, কোন প্রত্যাশাও নেই। তবু এতদিন পর অতসী সম্পর্কে অনেক কিছু শুনতে বা জানতে ইচ্ছে হয়, কৌতূহল হয়, আবার অন্যের মুখে সে সব শুনে, তাদের মন্তব্য শুনে, তার একধরনের রাগও হয়। দিলিপ বা লীলার ওপর সে রাগ করার কোন মানে হয় না। অথচ সেই রাগেই সেদিন নেশার ঘোরে কী সব বলেছে দিলিপকে, সব কথা তার মনেও নেই। দিলিপ তার বহুদিনের বন্ধু, অনেক সুখদুঃখের সাথী, কিছু মনে নাও করতে পারে। তবে অতসী সম্পর্কে আরো কথা না হয়ে একদিক থেকে ভালই হয়েছে। নেশার ঘোরে মনের সব কথা নিঃশেষে  বেরিয়ে আসে, হাল্কা বুদবুদের মতো। তারপর প্রকৃতিস্থ অবস্থায় সে সব কথার প্রসঙ্গ ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছেও বেশ লজ্জাজনক হয়ে ওঠে বৈকি!   

স্টেশনের বাইরে একটা ম্যাগাজিন স্টলের সামনে এসে বিকাশের চোখ আটকে গেল। স্টলের ছাউনি থেকে সুতোয় বাঁধা ক্লিপে বেশ কয়েকটা ম্যাগাজিন ঝুলছে। তার মধ্যে একটা ম্যাগাজিনের কভারে অতসীর ছবি, ছবির নিচে ক্যাপশন “এক্সপ্লোসিভ সেক্সবম্ব শাণ্টাকুমারী”। বিকাশ এ ধরনের ম্যাগাজিন আগে কোনদিন কেনেনি, আজ ম্যাগাজিনটা দেখিয়ে, স্টলওয়ালাকে বলল, “এটা দিন তো, কত দাম?”

স্টলওয়ালা ছোকরা, ভেতরের স্টক থেকে ম্যাগাজিন বের করে বিকাশের সামনে ছুঁড়ে দিল, বলল, “একশ কুড়িটাকা”।

বিকাশ পকেট থেকে টাকা বের করে দিতে দিতে, ঝোলানো ম্যাগাজিনটা দেখিয়ে বলল, “ওইটাই দিন না”।

ছোকরা টাকাটা গুণে নিয়ে, একটু অবাক হয়ে বলল, “কেন বলুন তো? একই তো ম্যাগাজিন, ভেতরে একই ছবি আছে। ওটা ডিসপ্লের জন্যে, বিক্রির জন্যে নয়। শান্টাকুমারী এখন হটকেক, ছেলে বুড়ো কেউ আর বাকি নেই, এত্তো সেল! কালকে এলে আর পাবেন বলে মনে হয় না। ওটাও বিক্রি হয়ে যাবে!”

মৌন যৌনতা নিয়ে অতসী ম্যাগাজিন স্টলে ডিসপ্লেড হতে থাকবে, বিকাশের ব্যাপারটা মনঃপূত হল না। বিকাশ জিজ্ঞেস  করল, “আপনার কাছে, ওটার কতগুলো কপি আছে?”

খুব অবাক হয়ে স্টলওয়ালা জিজ্ঞেস করল, “সাত-আটটা হবে, কেন বলুন তো?”

বিকাশের মাথায় এখন অদ্ভূত রাগ, সে বলল, “যে কটা আছে, আমাকে দিন, কিনে নেব”।

ভেতরের স্টক থেকে ম্যাগাজিন গুনতে গুনতে স্টলওয়ালা বলল, “আটটা আছে, ডিস্প্লেরটা নিয়ে নটা, মোট একহাজার আশিটাকা। কোন ডিস্কাউণ্ট দিতে পারবো না কিন্তু, একটা ম্যাগাজিন বেচে মোটে দশটা টাকা থাকে, স্যার”

বিকাশ এগারোশো টাকা বের করে স্টলওয়ালাকে দিল, স্টলওয়ালা কুড়ি টাকা ফেরত দিয়ে নটা ম্যাগাজিন প্লাস্টিকের ব্যাগে ঢুকিয়ে বিকাশের হাতে ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, “চাইলে কাল আবার পেয়ে যাবেন, দশটা এগারোটা নাগাদ। মেয়েটা আপনার কেউ হয় নাকি, স্যার?”

অন্যদিন বিকাশ স্টেশন থেকে রিকশা নেয়, আজ নিল না, ম্যাগাজিনের প্যাকেটটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে হাঁটতে শুরু করল বাড়ির দিকে।

 

বাড়িতে এসে বেল টিপতে রমলাদিদি দরজা খুলল। জুতো খুলতে খুলতে বিকাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা এখনো ফেরেননি। না?”

রমলাদিদি একগ্লাস জল এনে বিকাশকে দিয়ে বলল, “না, এই তো আধঘন্টা আগে কাকু বেরোলেন”।

“বুবুন কী, পড়তে গেছে?”

“হ্যাঁ”।

জলের গ্লাস খালি করে বিকাশ বলল, “দিদি এককাপ চা খাওয়াও না”।

“চায়ের জল বসিয়েছি। আর কিছু খাবে? কিছু বানিয়ে দেব?”

“নাঃ এখন আর কিছু খাবো না, শুধু চা”। সোফাতে ব্যাগটা রেখে বিকাশ বুবুনের ঘরে ঢুকল।

 

এ বাড়িতে অতসীর স্মৃতি বলতে সে নিজে আর তাদের সন্তান, বুবুন। অতসী চলে যাওয়ার বছর খানেক পর, বিকাশের মা যূথিকা অতসীর সমস্ত ছবি, এমনকি তাদের বিয়ের ছবিও নষ্ট করে ফেলেছিলেন। তার শাড়ি, জামা কাপড়, সাজের সরঞ্জাম - সব বিলিয়ে দিয়েছিলেন, কাজের মাসীদের মধ্যে। যূথিকা বলতেন, পেটের কচি ছেলেকেও যে মা ভুলে থাকতে পারে, সে ডাইনি। তার কোন জিনিষ এ বাড়িতে থাকা মানে অমঙ্গল ডেকে আনা। বিকাশও বাধা দেয়নি, অতসীর স্মৃতি, তার স্পর্শ, তার মনে তো থেকেই যাবে চিরদিন। কিছু ছবি, শাড়ি, কসমেটিক্সে কী আসে যায়? সে সময় মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থাও তার ছিল না। অতসী চলে যাওয়ার বছরখানেক পর ঊর্মিদিদি স্কুল থেকে রিটায়ার করে গেলেন। তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিন্ন হতে শুরু করেছিল। তিনিও মারা গেছেন কবছর হল, তারপর আর কোন যোগাযোগই নেই অতসীর বাপের বাড়ির সঙ্গে। সে বাড়িতে অতসীর কিছু স্মৃতি থাকলেও, সে বাড়ির সঙ্গে দীর্ঘদিন তারা সম্পর্করহিত।

রমলাদিদির হাতের ছোঁয়া আছে, তাই বুবুনের ঘরটা খুব একটা অগোছালো হয়নি। মা যূথিকা হঠাৎ মারা যাবার পর, রমণীহীন এই সংসারের খুবই বেহাল দশা হয়েছিল। মা বেঁচে থাকতে বুবুনের ব্যাপারে কোনদিন কিছু ভাবতে হয়নি। মায়ের চলে যাওয়াটা বিকাশ আজও মেনে নিতে পারে না। তার বাবা অনেকদিন ধরেই অসুস্থ, তাঁর মৃত্যু নিয়ে, বাড়ির সকলেই মানসিকভাবে মোটামুটি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আগাম কোন নোটিশ ছাড়াই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে, মা যেদিন চলে গেলেন, সেদিন ডাক্তার আসার সময়টুকুও তিনি দিলেন না। মায়ের এত কিসের তাড়াহুড়ো ছিল, আজও বুঝে ওঠেনি বিকাশ।

বিছানা, পড়ার টেবিল, বুক শেলফ দেখতে দেখতে থমকে গেল বিকাশ। বুকশেলফের একদম নিচে বেশ কিছু ধুলোমাখা পুরোনো খাতা-বই রয়েছে। দেখলে বোঝা যায়, অনেকদিন হাত পড়েনি সেগুলোতে। অথচ তার নিচে একটা প্যাকেট রয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে নতুন। বিকাশ কৌতূহলে প্যাকেটটা টেনে বের করলো। প্যাকেটে একগোছা নতুন ম্যাগাজিন, যে ম্যাগাজিন সে এই মাত্র কিনে আনল স্টেশনের ম্যাগাজিন স্টল থেকে। বিকাশের চোখের সামনে দুলে উঠল এই ঘর, তার পায়ের তলার মেঝে।

“চাটা কী এখানেই দেব? নাকি তোমার ঘরে দেব?” রমলাদিদি হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ডাকতে বিকাশ একটু সম্বিত পেল।

হাত বাড়িয়ে চাটা নিয়ে বলল, “থাক, এখানেই দাও”। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বিকাশ বুবুনের বিছানায় বসল। চায়ের কাপটা পড়ার টেবিলে রেখে ম্যাগাজিনগুলো গুনে দেখল, মোট সাতটা। বুবুন কেন কিনেছে এগুলো? এত টাকাই বা সে পেল কোথায়? কে দিল? ওর দাদু? টাকাটা দেওয়ার সময় দাদু জিজ্ঞেস করেনি, কী করবি, এতগুলো টাকা নিয়ে? কী উত্তর দিয়েছিল, বুবুন? মিথ্যে কথা বলেছিল নিশ্চয়ই বুবুন কী জানে? এই “এক্সপ্লোসিভ সেক্সবম্ব শান্টাকুমারী” তার মা? কী করে জানলো? এতদিন যে মিথ্যে দিয়ে তারা সবাই বুবুনকে আড়াল করে রেখেছিল, সে আড়াল কী করে সরে গেল?

বাইরে সদর দরজায় বেলের আওয়াজ হল। রমলাদিদি দরজা খুলে দিল। বাবা ফিরলেন বোধহয়। বিকাশ কান পেতে রইল, বাবা এলে পা ঘষে ঘষে চলার শব্দ হবে। লাঠির আওয়াজও হবে। বাবা নয়, দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, বুবুন। নিজের বিছানায় বাবাকে বসে থাকতে দেখে বুবুন খুব অবাক হল। ঘরে এসে পড়ার টেবিলে বইয়ের ব্যাগ রেখে বলল, “কখন এলে বাবা”?

“এই তো আধঘন্টা হবে। তোর আজ তাড়াতাড়ি হয়ে গেল?”

“স্যারের একটা বিয়ের নেমন্তন্ন আছে, তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন, আজ”।

“চাটা খাওনি? ঠাণ্ডা হয়ে গেল তো বোধহয়!”

সে কথার উত্তর না দিয়ে বিকাশ হাতের ম্যাগাজিনগুলো দেখিয়ে বলল, “এতগুলো ম্যাগাজিন কিনলি? নাকি জোগাড় করেছিস?”

বুবুন চট করে কোন উত্তর দিল না, বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “কিনেছি?”

“কেন? কিসের জন্যে?”

“তুমি জানো না? কেন কিনেছি, তুমি জানো বাবা!”

“কেন? তোর মা?” বুবুন মাথা নীচু করে আনমনে তার ব্যাগের চেন টানাটানি করতে লাগল।

বিকাশ ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তুই চিনলি কী করে? তোর মায়ের কোন ছবি তো এ বাড়িতে তুই দেখিসনি।”

“দিদিমা দিয়েছিলেন। তোমাদের বিয়ের অনেকগুলো ছবি। বলেছিলেন, তোর মা মারা যায়নি। তোকে ছেড়ে তোর মা চলে গেছে, উটকো কোন লোকের সঙ্গে!”

“কিন্তু তা বলে, এতগুলো ম্যাগাজিন কিনে ফেললি কেন?”

বুবুন কোন কথা বলল না, তার চোখে জলের আভাস, মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিকাশ উঠে গিয়ে ছেলের পিঠে হাত রাখল, বলল, “তুই কাঁদছিস, বুবুন”?

“এই ছবি দেখে বন্ধুরা কত কী বলে বাবা। সে সব মুখে আনা যায় না। আমি চুপ করে থাকি সমস্ত দোকানের সব বই যদি কিনে ফেলতে পারতাম...” বিকাশ জড়িয়ে ধরল বুবুনকে। তারও কণ্ঠে রুদ্ধ হয়ে আসছে এখন। বাবার বুকে মুখ রেখে কান্না ভেজা গলায় বুবুন আবার বলল, মা এখন তারকা হয়ে আমাদের বিপদে ফেলে দিল বাবা, আকাশের তারা হয়েই তো বেশ ছিল”! 

.০০.

 এর পরের গল্প - " স্তন্য-ডাইনী "

 



নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...