বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছোট্ট হওয়া

বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



এর আগের ছোট গল্প - " একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা "


নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে যত সুখ আমার...। বিশ্বাসবাবুরও তাই বিশ্বাস। তাঁর বাড়ির গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়ালে, ওপারেই যতো সুখের সন্ধান। শ্যামলের চপ-ফুলুরি-পেঁয়াজি-বেগ্‌নির দোকান। কচুরি, সিঙাড়া, নিমকি আর হরেক মিষ্টির ট্রে নিয়ে বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভান্ডার। এমনকি বিহারি রামপূজনের ভূজিয়ার দোকানটাও ওপারেবিকেলের দিকে রামপূজন যখন বড় লোহার কড়ায় গরম বালিতে ছোলা ভাজে, সে গন্ধ এপারে তাঁর নাকে ঝাপটা মারে। জিভে জল চলে আসে, যদিও এ বয়সে ছোলাভাজা খাওয়ার মতো দাঁতের জোর আর বিশ্বাসবাবুর নেইতবু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়।

ফতুয়ার পকেটে পার্স নিয়ে বিশ্বাসবাবু বেরিয়েছেন, মনে একটা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। আজ যে করেই হোক, শ্যামলের চপ-ফুলুরি খেয়ে মুখের তার বদলাবেন। সকালে দুধের সঙ্গে শুকনো মুড়ি কিংবা খই, দুপুরে করলাসেদ্ধ, ভাত আর পেঁপে-কাঁচকলা-বেগুনের গুণপনাযুক্ত চারাপোনার ঝোল, টকদইবিকেলে চারপিস শসা, কয়েক পিস পাকা পেঁপের টুকরো, চিনি ছড়ানো একটু ছানা! রাত্রে রুটি আর পটলের তরকারি সঙ্গে একটু দুধ। দিনের পর দিন এই খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু আনন্দে থাকতে পারে কী? বিশ্বাসবাবুর বিশ্বাস, পারে না। আর এসবের জন্যে দায়ি নিষ্ঠুর – নির্মম একটি মেয়ে! মেয়েটি একদিকে যতটা ভালো, অন্য দিকে ঠিক ততটাই নিষ্ঠুরমেয়েটি তাঁর বৌমা। অবিশ্যি এটাও ঠিক, বৌমার কড়া শাসনে তাঁর শরীরের ভাবগতিক এখন বেশ ভালোই। অম্বল-টম্বল হয় না বহুদিন, খিদে পায়, রাত্রে ঘুম হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি পেটরোগা মানুষ, সে সময় তাঁর মা এবং পরবর্তী কালে তাঁর বউ, কিছুতেই সেই রোগের স্থায়ী সুরাহা করতে পারেননি।

তার অবিশ্যি কারণও আছে। তাঁর মা কিংবা স্ত্রী, কেউই তাঁকে এমন পরাধীন করতে পারেননি। ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে হজমি, বনকুল, আলুকাবলি, ফুচকা, চপ, সিঙাড়া...। বড় হয়ে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে রোল, মোগলাইপরোটা, মোমো, তেলচিটে নুড্‌ল্‌স্‌...! চাকরিস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে বিরিয়ানি, লাচ্চা পরোটা, চিকেন ভর্তা...। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পর যখন থেকে এই হৃদয়হীনা বৌমার পাল্লায় তিনি পড়েছেন, তাঁর সেই স্বাধীনতা চুলোয় গেছে। তবে নিয়মিত পেটখারাপের ব্যাপারটা সুদূর অতীতে ফেলে আসা স্মৃতি হিসেবেই রয়ে গেছে।

ফুটপাথের কিনারায় দাঁড়িয়ে রাস্তাটা পার হতে গিয়ে বারবার পিছিয়ে আসছেন বিশ্বাসবাবু। শহরের যতো গাড়ি এই সময়ে এই রাস্তা দিয়ে যাবার জন্যেই যেন, একসঙ্গে দল বেঁধে বেড়িয়ে পড়েছে। বাস, প্রাইভেট কার, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ট্যাক্সি, অটো, বাইক, স্কুটার, সাইকেল রিকশ, ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে আর তাঁর সামনে দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। এতটুকু বিরাম নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পা দিলেই, বাইকওয়ালা ছোকরারা, তাদের পেছনে ছুকরি নিয়ে একদম ঘাড়ের ওপর চলে আসছে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসা ছাড়া বিশ্বাসবাবুর উপায় কী?

ঘড়ির কাঁটা ওদিকে ছুটছে যেন বনবন করে। পৌনে চারটে বেজে গেল। নাতি বিট্টুকে নিয়ে বৌমা স্কুল থেকে ফিরবে চারটে কুড়ি থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে। তার আগে বাড়ি ফিরতে না পারলে বৌমার কাছে অনেক জবাবদিহি করতে হবে। বৌমার সেসব প্রশ্নও আবার ভাববাচ্যে! কোথায় যাওয়া হয়েছিল? কী কিনতে? কিছু কিনতে যদি নাই হয়, এসময়ে বেরোনোর কী দরকার ছিল? রাস্তায় অনেক গাড়িঘোড়া, একটা বিপদ না ডেকে আনলে কী চলছে না? ভোরে বেড়াতে যেতে বললে, তখন তো নানান বাহানা খাড়া করা হয়, কিন্তু এখন এমন কী দরকার পড়ল? বৌমার এই সব প্রশ্নে খুব অসহায় বোধ করেন বিশ্বাসবাবু। এই বয়সে এসে একটু আজাদির জন্যে তিনি তৃষ্ণার্ত!  

কিন্তু নাঃ, আর দেরি করলে সত্যিই বৌমার খপ্পরে পড়তে হবে। এরপর আবার বলা যায় না, ওপারে গিয়ে হয়তো দেখবেন, শ্যামল এখনো গামলায় বেসন ফ্যাটাচ্ছে, কড়াইতে তেল ঢেলেছে, কিন্তু স্টোভের আগুন জ্বালেনি। জিগ্যেস করলে বলবে, একটু দাঁড়ান না, কাকু, এক্‌খুনি হয়ে যাবে, দু মিনিট। শ্যামলের আবার দু মিনিট হয় আধঘন্টায়। কড়াইয়ের তেল দাউদাউ গরম হবে, তাতে গোটা বিশেক চপ ছাড়বে। আধ-পাকা চপগুলো বড়ো ছান্তায় ছেঁকে কড়াইয়ের ধারে তুলে, আবার নতুন চপ ছাড়বে, সেগুলো আধপাকা হলে, তার মধ্যে ডুবিয়ে দেবে পুরোনো চপগুলো। তারপর তেলের মধ্যে হাবুডুবু দিতে দিতে চপের গায়ে আসবে আরশোলার রঙ। ততক্ষণ কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকো, আর নিঃশব্দ ঢোঁকে গিলতে থাকো জিভের জল!

একটু ফাঁক বের করতে পেরে কোনরকমে আধখানা রাস্তা পার হয়ে বিশ্বাসবাবু, ডিভাইডারে দাঁড়ালেন। এখন পিছনের গাড়িগুলো যাচ্ছে ডানদিকে, আর সামনের গাড়িগুলো বাঁদিকে। অপেক্ষা করতে করতে গলা তুলে একবার ডানদিকে তাকালেন বিশ্বাসবাবু, এখান থেকে শ্যামলের দোকানটা ঠিক দেখা যায় না। চারটে বাজতে পাঁচ। হাতে খুব সময় নেই। শ্যামলের চপ-টপ ভাজা যদি হয়েও থাকে, সেসব উবু জ্বলন্ত চপ কিংবা ফুলুরি, খেতেও তো সময় লাগবে নাকি? ওসব কী আর গবগবিয়ে খাওয়া যায়? ফুঁ দিতে দিতে ধীরে সুস্থে খেতেই না মজা! তারপর খাওয়ার পরে আঙুল আর ঠোঁটের তেল মুছতে মুছতে “কত হল গো, শ্যামল?”, জিগ্যেস করার যে তৃপ্তি...তার কোন বিকল্প আছে? বিশ্বাসবাবু হঠাৎ যেন শিউরে উঠলেন। না তেলেভাজা খাওয়ার আনন্দ কল্পনা করে নয়, তাঁর কানে এল বৌমার ডাক।

“বাবা, বাড়ি চলো। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো এখানে?” ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বিশ্বাসবাবু। দেখলেন তাঁর পিছনে বৌমা আর সঙ্গে বিট্টু। বিট্টু অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দাদুর দিকেই।  

সমস্ত সংকল্প জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাসবাবু হতাশ মুখে হাসি এনে বললেন, “খি ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল?”

সে কথার উত্তর না দিয়ে বৌমা বললেন, “তাড়াতাড়ি এসো না, বাবা, রাস্তাটা পার হয়ে যাইগাড়ি ঘোড়ার যা ভিড়।”ডিভাইডার থেকে নেমে বিশ্বাসবাবু সুবোধ বালকের মতো বৌমার সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে ফিরে এলেন। আশ্চর্য এখন তাঁদের রাস্তা পার হতে দেখে সমস্ত গাড়িই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ হর্ন বাজিয়ে ধমকও দিল না। ফুটপাথে পা দিয়ে গভীর শ্বাস ফেললেন বিশ্বাসবাবু, পরাধীনতার গ্লানি তাঁর সমস্ত মুখে।

 

 

বাড়ি ফিরে কেউ কোন কথা বললেন না। বিশ্বাসবাবু বসার ঘরে গুম হয়ে বসে রইলেন।  বিট্টুকে নিয়ে বৌমা গেলেন নিজেদের ঘরে, বিট্টু স্কুলের জামাপ্যান্ট বদলাবে। বৌমাও। সোফায় বসে বসে একদিকে তাঁর যেমন রাগ হচ্ছে, তেমনি ভয়ও হচ্ছে। অল্পের জন্য তপ্ত চপের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হবার জন্যে রাগ। অন্যদিকে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাওয়ার জন্যে বৌমার প্রশ্নমালার মুখোমুখি হওয়ার ভয়। বিশ্বাসবাবু মনে মনে জম্পেশ একটা মিথ্যে অজুহাতের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। আচ্ছা, যদি বলা যায় ইলেক্ট্রিশিয়ান মিন্টুর কাছে যাচ্ছিলেন! কিন্তু বাড়িতে পাখা কিংবা লাইটের কোন গণ্ডগোল তো নেই! গণ্ডগোল নেই তো কী হয়েছে?  “কাকাবাবু, বছরে এক দুবার গোটা বাড়ির ওয়্যারিং চেক করে নেওয়াটা খুব দরকার, তাতে হঠাৎ বিপদের ভয় থাকে না”, একথা বলেছিল বৌমারই ভাই – পেশায় সে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। এ বাড়ির হেড হিসেবে, তিনি তো আর এতগুলো প্রাণীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারেন না!  তাই মিন্টুকে খবর দিতে যাচ্ছিলেন! কিন্তু সমস্যাটা হল, মিন্টুর ইলেক্ট্রিকের দোকান, বড়ো রাস্তার এপারে, ওপারে নয়। কাজেই রাস্তা পার হওয়ার গল্পটা ভাল দাঁড়াচ্ছে না...!

 আচ্ছা, যদি বলা হয়, বিট্টুর জন্যে গল্পের বই কিনতে যাচ্ছিলেন। ঠাকুমার ঝুলি, কিংবা, আবোল-তাবোল, অথবা ক্ষীরের পুতুলহতে পারে না? লোকনাথ গ্রন্থাগার দোকানটা রাস্তার ওপারে, সেদিক থেকেও কোন সমস্যা নেই। বৌমা যদি জিগ্যেস করে, বিট্টুর জন্মদিন তো অনেক দেরি, সেই নভেম্বরে – এখন বই কেন? বিশ্বাসবাবু আবেগমথিত স্বরে বলবেন, ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে বিট্টুটা বাংলা গল্প-সল্প তেমন কিছুই পড়ল না। দাদু হিসেবে আমি কী দু-একটা বই নাতিকে উপহার দিতে পারি না? তার জন্যে জন্মদিনের অপেক্ষা করতে হবে? এই কথায় বৌমা কী উত্তর দেবে, শুনি? বিশ্বাসবাবু বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে মনে মনে গুছিয়ে নিতে লাগলেন, বৌমার সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং তার উত্তরগুলি।

হঠাৎ তীব্র তেলেভাজার গন্ধে বিশ্বাসবাবুর চিন্তায় বাধা পড়ল, তাকিয়ে দেখলেন, স্কুলে যাওয়ার শাড়ি-টাড়ি ছেড়ে বৌমা কাপ্তান পরে সামনে দাঁড়িয়ে, তার হাতের প্লেটে অনেকগুলি তেলেভাজা, গন্ধটা আসছে সেখান থেকেই। বৌমার হাতে আকাশের চাঁদ দেখলেও এতটা অবাক হতেন না, যতটা হলেন, তেলেভাজা দেখে!

প্লেটটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বললেন, “এসব কী? এসব আবার কেন? তেলেভাজা খেলে আমার আবার যদি পেট ভুটভাট...”

বৌমা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, “হুঁ, তাই বৈকি! ছুটছিলে তো শ্যামলের দোকানে, তখন পেট ভুটভাটের কথা মাথায় আসেনি না?  মিতালি বানিয়েছে, গরম গরম বেগুনি খেয়ে দেখো!” মিতালি বিশ্বাসবাবুদের বাড়ি রান্নার কাজ করে, সকালে আর বিকেলে আসে। রান্নার হাত বেশ ভালোই।

কিন্তু বৌমার সরাসরি অভিযোগে বিশ্বাসবাবু একটু এলোমেলো হয়ে পড়লেন, তবুও সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “আমি শ্যামলের দোকানে ছুটছিলাম? কে বলল তোকে? যত্তোসব...তোরা সব একধাতের...তুই, তোর শ্বাশুড়ি মা, তোর দিদিশ্বাশুড়ি...মনগড়া কথায় তোদের জুড়ি নেই!” বলতে বলতে গরম বেগ্‌নিতে হাল্কা কামড় দিলেন, “বাঃ ...” তারপর ফুঁ দিতে দিতে বললেন, “ফুউউউ...ফুউউউ...তুই আমাকে কী পেয়েছিস বল তো? বাচ্চা ছেলে? নিজের ভালো বুঝবো না?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে জিগ্যেস করলেন, “নুন-টুন ঠিক আছে?”

“হুঁ...ঠিকই আছে, ভালোই হয়েছে”।

“তুমি খাও, আরো আনছি”। বৌমা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। আর তারপরেই বিট্টু ঢুকল হাতে প্লেট নিয়ে, দাদুর পাশে বসতে বসতে বলল, “ও দাদু, আমি মাত্র দুটো বেগ্‌নি পেলাম”

নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু বললেন, “শুরু কর না। দেখিস গরম আছে কিন্তু, জিভ পুড়ে যাবে। তোর মা আরো আনতে গেছে।  সেখান থেকে আরো পাবি”।

বিট্টু একটা কোণা কামড়ে দেখল খুব গরম, প্লেটে আবার নামিয়ে রেখে ম্লান মুখে বলল, “না গো দাদু, মিতালিমাসি চারটে দিয়েছিল, মা তার থেকে দুটো তুলে নিয়েছে! আমাকে আর দেবে না।”

নাতির বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাকে কোলের আরো কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “মায়েরা বড়ো নিষ্ঠুর হয় রে, বিট্টু। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের প্রতি তাদের এতটুকু মায়াও যেন থাকতে নেই!”

বিট্টু কী বুঝল কে জানে, সে দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে সহানুভূতি মাখা স্বরে বলল, “কিন্তু তুমি তো আর ছেলে নও দাদু, তুমি তো অনেক বড়ো !” বিট্টু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, বেগনিটা অনেকটাই ঠাণ্ডা হয়েছে, এবার খাওয়া চলবে। নাতি ও দাদু দুজনেই বিরস মুখে বেগ্‌নি চিবোতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর বিশ্বাসবাবু বললেন, “বড়ো আর নেই রে, তোর মা আমাকে ছেঁটে তোর থেকেও ছোট্ট করে নিয়েছে”! এই সময়েই বউমা ঘরে এলেন, এক প্লেট বেগনি আর ফুলুরি নিয়ে। বিশ্বাসবাবু এবং বিট্টুর প্লেটে আরো কখানা তেলেভাজা দিয়ে, সামনের সোফায় বসলেন। তাঁর হাতের প্লেটেও কয়েকটা তেলেভাজা। সেগুলি খেতে খেতে মুচকি হেসে বললেন, “আমার বিরুদ্ধে দাদু আর নাতি মিলে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, শুনি?”

বিট্টু মায়ের থেকে আরো দুটো বেগনির প্রশ্রয় পেয়ে খুব খুশি, বলল, “দাদু বলছিল, তুমি নাকি আমার থেকেও দাদুকে ছোট্ট করে দিয়েছো?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “আমায় মা বলে যে ডাকো - ছোট্ট হয়েই থাকো না, বাবা, তাতে তোমাকে শাসন করতে আর প্রশ্রয় দিতে আমার সুবিধে হয় যে”!

বিশ্বাসবাবুর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।   

..০০.. 

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা

বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক "



                                        এর আগের বড়োদের গল্প - " নতুন চাল "   

হাওড়া দুনম্বর প্ল্যাটফর্ম এখন যুদ্ধক্ষেত্র। ট্রেন ঢুকলেই যেমন হয়, গেটের সামনে তুমুল ধস্তাধস্তি। একদল “আরে, নামতে দিন, নামতে দিন, কী সব লোক রে, বাবা? নামতে দেবেন না নাকি?” বলে নামার জন্যে হাঁকপাঁক করছে। আরেকদল, “একপাশ দিয়ে নামুন না, কত জায়গা লাগে নামতে?” বলে কনুইয়ের গুঁতো মেরে ঠেলে উঠছে। তাদের সঙ্গে আমরাও উঠে পড়লাম। আমি, আমার বন্ধু অভ্রময় ভেতরে ঢুকে দুটো সিট দখল করতে যাবো, ফুটবলের মতো গোল বয়স্কা এক মহিলা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বেদখল করে নিলেন সিটদুটো। একটায় নিজে বসে, অন্য সিটে ব্যাগ চেপে, চেঁচাতে লাগলেন, “ভালো, অ্যাই ভালো, বাসি, অ্যাই বাসি”।

হাতের সিটটা ফস্কে গেল, কিন্তু বয়স্কা মহিলার সঙ্গে বিবাদ করাও চলে না। আমরা গোমড়া মুখে দাঁড়িয়েই রইলাম সামনে। এখন মহিলার ওই ডাক শুনে, আমি অভ্রকে বললাম, “এই বয়সেও ভালোবাসার খোঁজ করছেন”!

অভ্র খুকখুক হাসল ভদ্রমহিলার কানে কথাগুলো না যাওয়ার কথা নয়, তিনি মুখ তুলে ভুরু কুঁচকে আমাদের দুজনকে নিরীক্ষণ করলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। ওঠা-নামার ধস্তাধস্তি এখন আর নেই, একটি মেয়ে মহিলার সামনে এসে দাঁড়াতে, হাতের ব্যাগ সরিয়ে মহিলা মেয়েটিকে বসতে দিলেন, আর জিগ্যেস করলেন, “ভালো কোথায়? উঠেছে?”

মেয়েটি ঘাড় নাড়ল, মৃদুস্বরে উত্তর দিল, “উঠেছে, ওই তো দাঁড়িয়ে আছে”।

“দঁড়িয়ে কেন? কোথাও একটু বসার জায়গা করতে পারল না?”

“আঃ মা, এইটুকু তো যাবো, তার জন্যে...”

“চুকঃ, তোদের শুধু আলসেমি, একটু উয্‌যোগ নিলেই সিট পাওয়া যায়। বললাম, আমার সঙ্গে উটে আয়, তা না, তোরা সেই উটের মতো দাঁড়িয়েই রইলি”।

“ও, আর দশ মিনিটের জন্যে এই বসাটা আলসেমি নয়?”

“চুকঃ, মুকেমুকে তক্কো করিস না”। মা আর মেয়ে সিটে গুছিয়ে বসল। তারপর মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। আর সেই দৃষ্টিপাতে আমার যে অনুভূতি হল, সেটা বাসি নয়, যথেষ্ট টাটকা বাসি মুচকি হেসে লাজুক চোখ নামাল, কিন্তু বাসির মা আমার দিকে এবার মুখ তুলে তাকালেন, বললেন, “এই বয়েসে আমি ভালোবাসা খুঁজিনি, বুঝেছো ডেঁপো ছোকরা? আমার ছেলের নাম ভালো, আর এই মেয়ের নাম বাসি। মা-কাকিমাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখোনি? যাবে তো অনেকদূর, নাকি?”

অভ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি ওর হাত চেপে ইশারা করে বললাম, “হ্যাঁ, অনেকটাই দূর”

মহিলা একটু ব্যাঁকা হেসে বললেন, “সে আমি দেখেই বুঝেছি। আমরা নামবো এই উত্তরপাড়ায়, তখন আরাম করে বসে যেও”।

মাকে কনুইয়ের ঠেলা দিয়ে, মেয়ে মৃদু স্বরে বলল, “মা, চুপ করো না”

“চুকঃ, চুপ করে থাকলে সবাই মাথায় চড়ে যায়”।

এই সময় ভোঁ শব্দ করে, ট্রেনটা ছাড়ল বাসির মা জিগ্যেস করলেন, “লেট করল না? ক মিনিট দেখ তো?” বাসি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে, টাইম চেক করল, বলল, “নটা বাইশ”।

“তার মানে, পাঁচ মিনিট লেট! হ্যারে বাসি, সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছতে পারবো তো?”

“আরামসে পৌঁছে যাবো, মা। টেনসান করো না তো”।

“চুকঃ। টেনসান করবো না? তোদের কালকে সন্ধেতেই চলে আসতে বললাম, শুনলি না। জানতাম এটাই হবে। সকালে তোদের ঘুম ভাঙাতে ছেনি-হাতুড়ি ঠোকার অবস্থা!”

“মা? কী হচ্ছে কি? এটা ট্রেন!”

“চুকঃ, ট্রেন তো কী হয়েছে? আমি কখন বললাম যে এটা বাস”?

বাসির অস্বস্তি অনুভব করে, আমি কথা ঘোরানোর জন্যে বললাম, “কাকিমা, আমাদের কী দেখে বুঝলেন, আমরা অনেক দূরের যাত্রী?”

আমার এই আচমকা প্রশ্নে মহিলা একটু থতমত খেলেন, বললেন, “ইয়ে, মানে, ও আমি তোমাদের চেহারা, আচার-ব্যাভার দেখেই বুঝে গেছি। ডেঁপো আর ফক্কর”। হালুয়ার রেললাইনের জটিলজট ছাড়িয়ে ট্রেনের সবে একটু স্পিড উঠেছিল, আবার কমতে লাগল, লিলুয়া আসছে। আমি খুব নিরীহ মুখ করে জিগ্যেস করলাম, “দূরের ছেলেরা ডেঁপো আর এদিককার, মানে উত্তরপাড়ার ছেলেরা খুব লালু হয় বুঝি?”

“লালু মানে?”

“ডেঁপোর উলটো ব্যাকরণে যাকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে”।

মহিলা রাগরাগ গলায় বললেন, “মোটেও তা নয়, লালু মানে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু”।

ভিজে বেড়ালের মতো আমি বললাম, “না, কাকিমা, লালু মানে ভালো”।

মহিলা এবার সত্যি রেগে গেলেন, বললেন, “আমার ছেলে ভালো, তুমি তাকে বলছো”?

উত্তরে আমি বললাম, “ভালো ভালোই তো, ভালো নয়?”

লিলুয়া পার হয়ে ট্রেন আবার দৌড়তে শুরু করল, মহিলা বললেন, “ভালো ভালো তো বটেই, ওর মতো ভালো আর হয় না”।

বাসি বলল, “মা, বাজে না বকে, একটু থামো না”।

“চুকঃ, বাজে বকছি মানে? আমার বাপু পেটে-মুখে এক কথা, যা বলার মুখের ওপর বলে দিই। সত্যি বলব তাতে ভয় কী”?

“ঠিকই বলেছেন। দূরের স্টেশনের ছেলেরা ডেঁপো আর বাজে। ট্রেনের গার্ডবাবুর ঘন্টাটাও বাজে। ট্রেন যত দূরদূর যায়, ঘন্টাটাও ততবার বাজে। এই বেলুড় ছাড়ার সময় দেখবেন, উনি ঘন্টা বাজিয়ে দেবেন”।

মহিলা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, বললেন, “তার মানে? ঘন্টা বাজার সঙ্গে বাজে ছেলের কি সম্পর্ক”?

বাসি ছোট্ট রুমালে হাসি মুছল। আমি বললাম, “সম্পর্ক নেই কাকিমা? দুটোই তো বাজে। ঘন্টাটা আর দূরের ছেলেগুলোও...” আমার কথা শেষ হবার আগেই ঝালমুড়ির টিন নিয়ে, “ঝালমুড়ি-ই-ই-ই” এলেন আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম, “কাকিমা, ঝালমুড়ি খাবেন? বাসি নয়, টাটকা, বেশ ভালো ঝালমুড়ি। পাঁচটা দিন তো, দাদা”।

শেষ কথাটা আমি মুড়িওয়ালাকে বললাম। মহিলা খুব অবাক হলেন, আমার সাহস দেখে; রেগেও গেলেন খুব, বললেন, “ঝালমুড়ি বাসি কি ভালো সে আমি খুব জানি। তোমাকে আর ডেঁপোমি করতে হবে না”

বাসি এবার হাসতে হাসতে বলল, “আমি কিন্তু ঝালমুড়ি খাবো, মা। সকালে তাড়াহুড়ো করে বের করে আনলে, খিদে পেয়েছে”।

বাসির সমর্থন পেয়ে ঝালমুড়িওয়ালা নারকেল তেলের সাজানো ডাব্বাগুলো থেকে, দড়িতে বাঁধা ঢাকনাগুলো খুলে ফেলল চটপট। তারপর মাঝের বড়ো টিনের ডাব্বার ঢাকনা খুলে, স্টেনলেস স্টিলের মুড়িমাখা ডাব্বার মধ্যে মুঠো মুঠো মুড়ি তুলতে লাগল। এর পর শুরু হল, নানান ডাব্বা আর চামচের জলতরঙ্গ, তার সঙ্গে লাগাতার প্রশ্নমালা! পেঁয়াজ দেবো? হুঁ। ধনেপাতা? হুঁ। শসাকুচি? না। কাঁচালংকা? কম। আচারতেল? হুঁ। ঝালমুড়িওয়ালা আর বাসির এই আলাপ আমি মন দিয়েই শুনছিলাম, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। সব বক্কাল দেওয়ার পর, মুড়িমাখা ডাব্বার মধ্যে চামচ আর হাতের বিপুল ঠনঠন মিশ্রণের আওয়াজ যখন চলতে লাগল, আমি অভ্রকে বলতে বাধ্য হলাম, “মুড়িমাখার এই ডাব্বাটা আর চামচেটাও তো দেখছি বাজে”!

পকেট থেকে পঞ্চাশটাকা বের করতেই, মহিলা বলে উঠলেন, “অ্যাই, তুমি টাকা দেবে না!”

“কাকিমা, আমরা বাজে, কিন্তু আমাদের নোট কাগজের, ওগুলো বাজে নাঝালমুড়ির কথা আমি বলেছিলাম, দাম আমিই দেবো”।

 

উত্তরপাড়া অব্দি আর কথা হল না, মুড়ির ঠোঙা শেষ হলমহিলা ভালোছেলে এবং বাসিমেয়েকে নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমরাও। মহিলা মেয়েকে বললেন, “বাসি, ব্যাগট্যাগ সব নিয়েছিস তো”?

“নিয়েছি মা”।

“কটা বাজছে রে?”

“নটা বিয়াল্লিশ”

“সাড়ে দশটার মধ্যে পৌঁছে যাবো, বল? এখন একটা রিকশা পেলে হয়!”।

“উত্তরপাড়ায় রিকশা পাওয়া যাবে না, মা? স্টেশনের বাইরে গেলেই দেখবে কয়েকশ রিকশ। তুমি এমন কথা বলো না?”

“বলা যায় না, রে। কপাল মন্দ হলে...এ কী? তোমরাও উত্তরপাড়ায় নাকি? দূরে নামবে বললে?” হঠাৎ পিছন ফিরে আমাদের দেখতে পেয়ে মহিলা জিগ্যেস করলেন। আমি একটু হাসলাম, কোন উত্তর দিলাম না। উত্তরপাড়ায় সবই তো উত্তর, কিছু প্রশ্ন আপাতত নিরুত্তরই থাক!

 

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে, স্পিড কমে আসছে। বাসি মেয়ে আমার পাশে। সামনে কাকিমা আর ভালো ছেলে। আমার পিছনে অভ্র। বাসি মুখ তুলে খুব মৃদুস্বরে যা বলল, শুনে আমি মৃদু হাসলামআমি বাসির ব্যাগ ধরা হাতটা আলতো ধরে, একটু চাপ দিলাম। বাসি মুখ তুলে তাকিয়ে, মুচকি হাসল।

 

ট্রেন থেকে নামা-ওঠার ভিড়ে আমি আর অভ্র প্ল্যাটফর্মে নেমেই, প্রায় দৌড়ে রিকশাস্ট্যাণ্ডে চলে এলামরিকশায় উঠে বিধানজেঠুর বাড়ির ঠিকানা বলতেই, রিকশা ভেঁপু হাঁকিয়ে দৌড়ে চলল। অভ্র এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পেল, বলল, “তুই যে এত ধুরন্ধর জানতাম না, শালা। এই ক মিনিটের মধ্যে মেয়েটাকে পটিয়ে ফেললি? তাও শুধু ঝালমুড়ি খাইয়ে?”

আমি মুচকি হেসে বললাম, “দেখিস, জেঠু যেন জানতে না পারেন”!

“সে ঠিক আছে, জানতে পারবেন না। কিন্তু তুই তো শুধু নামটাই জানলি, ফোন নম্বর, ঠিকানা কিছুই জানলি না!”

“সে হবে খন, ব্যস্ত হচ্ছিস কেন? দাঁড়া, জেঠুরবাড়ি খালি হাতে যাবো নাকি? ভাই, ভালো মিষ্টির দোকান দেখে একটু দাঁড়াবেন তো, মিষ্টি কিনবো”! শেষ কথাটা রিকশওয়ালাকে বললাম।

রিকশওয়ালা প্যাডেল করতে করতে বলল, “সামনেই রাধাগোবিন্দ সুইটস পড়বে। ওতোরপাড়ায় ওরাই নাম করা মিষ্টি বানায়”।

“সেই ভালো, কিন্তু বাসি হবে না নিশ্চয়ই”

 

জেঠুর বাড়িতে ঘন্টাখানেক বসলাম। চা জলখাবার আর কিছু কথাবার্তার পর জেঠু বললেন, “চল তাহলে, ব্যাপারটা মিটিয়েই আসি। বাকি কথা দুপুরে খাওয়ার সময়ও সেরে ফেলা যাবে”।

বেরোনোর সময় জেঠিমাকে আরেকবার প্রণাম করলাম, আমার চিবুক ছুঁয়ে চুমো খেয়ে জ্যেঠিমা বললেন, “আমাদের ছেলেকে যে মেয়ে অপছন্দ করবে, তার কপালে অনেক দুঃখ আছে। তবে নবস্মিতাও খুব ভালো মেয়ে, বাবা আমি বলছি দেখিস, তোদের জুড়ি খুব মানাবে!” আমি লজ্জা লজ্জা মুখে হাসলাম।

 

বড়োরাস্তা পার হয়ে, গলিতে ঢুকে প্রথমবার বাঁদিকে, তারপর একটু এগিয়ে ডানদিকে ভাঁজ নিয়ে, বেশ খানিকটা গিয়ে জ্যেঠু একটা বাড়ির দরজায় বেল টিপলেন। দরজায় নেমপ্লেট সাঁটানো, অমিয় চট্টোপাধ্যায়প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বললেন, “আরে আসুন, আসুন বিধানদা। এসো বাবা, ভেতরে এসো। শুনছো, ওঁরা সব এসে গেছেন”। শেষের কথাটা উনি চেঁচিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে বললেন।  

আমরা তিনজন বাইরের ঘরের বড়ো সোফাটায় বসলাম। ভদ্রলোক বসলেন উল্টোদিকের সোফায়। অমায়িক হেসে জিগ্যেস করলেন, “আসতে কোন অসুবিধে হয়নি তো, বাবা?”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “জ্যেঠুর বাড়ি থেকে আপনাদের বাড়িতো হাঁটা পথে দশ মিনিট, জ্যেঠুর সঙ্গেই এলাম, অসুবিধে হবে কেন?”

“না, না তা নয়। আমি বলছিলাম কলকাতা থেকে আসার কথা। অনেকটাই তো দূর”।  এই সময়েই ট্রেনের সেই মহিলা আর ভালোছেলে ঢুকল। আমি অবাক হইনি, কিন্তু ওঁরা হলেন, আর আমার পাশে বসা অভ্রও। অভ্র সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল, “আপনি?”

কাকিমা বললেন, “তোমরা? এই অব্দি হানা দিয়েছ? বিধানদা ওরা আপনার সঙ্গে এসেছে?”

জেঠু অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ কথাই তো ছিল, ওরা তোমাদের সঙ্গে, নবস্মিতার সঙ্গে আলাপ করতে আসবে! তুমি চিনতে পারো নি?”

কাকিমা বললেন, “না। ইয়ে হ্যাঁ, চিনি মানে...কলকাতা থেকে সকালে আমরা একইসঙ্গে এলাম। কিন্তু ফটোতে তো অন্যরকম দেখতে ছিল।”

জেঠু হোহো করে হেসে উঠে বললেন, “ছবিতে ওর গালে দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছিল, এখন মরুভূমি। বাজের ওইরকমই আজে বাজে কাণ্ডকারখানা”।

“বাজে? এই ছোঁড়া আমাকে সারা রাস্তা বাজে কথা শুনিয়ে এসেছে, এখন আপনিও বাজে বলছেন?”

“আরে ওর নাম বজ্রপাণি, আমরা বাজে বলে ডাকি”। জেঠু বললেন।

আমিও চুপ করে থাকতে পারলাম না, বললাম, “নবস্মিতা যদি বাসি হতে পারে, তাহলে আমি বাজে হতে পারি না, কাকিমা?”

এই কথায় কাকিমা হইহই করে হেসে উঠলেন, সঙ্গে বাকি সবাই, আর তখনই বাসি চায়ের ট্রে আর বিস্কিট নিয়ে ঢুকল। সকলকে চা দিয়ে বাসি বসল উল্টোদিকে, বাবার সোফার হাতলে।

কাকিমা বললেন, “তুই কি ওকে ট্রেনে চিনতে পেরেছিলি, বাসি?” বাসি লাজুক মুখে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

“আমাকে বললি না, কেন?”

উত্তরটা আমিই দিলাম, “আপনি বলতে দিলে তো? আপনার চুকঃ-র ঠেলায় সুযোগ পেলো কখন”?

“ও বাবা, এখন থেকেই এত আণ্ডারস্ট্যান্ডিং?” কাকিমা মুচকি হাসলেন

অভ্র এবার মুখ খুলল, “তাই তোদের দুজনের মধ্যে এত চোখাচোখি...ইশারা...”?

আমি বললাম, “চুকঃ, হাটে হাঁড়ি ভাঙছিস! তোর আর বুদ্ধিশুদ্ধি হল না”এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এখন করলাম, চুকঃ কথাটা মন্দ না, বেশ পাওয়ারফুল এবং এফেক্টিভ!

আমি বাইরে থাকি, দুদিন হল বাড়ি এসেছিজেঠিমার ঘটকালিতে আমাদের বিয়েটা মোটামুটি পাকাকিন্তু আমার মা-জেঠিমার নির্দেশ, বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর নিজেদের মধ্যেও চাক্ষুষ পরিচয়টা জরুরি। আর সেই উদ্দেশেই আজ আমাদের উত্তরপাড়ায় আসা।

আমাদের ট্রেনযাত্রার সব কথা শুনে জেঠু হাসতে হাসতে বললেন, “আমদের বাজেটা আসার পথেই বাসি আর বাজে একটা ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছে দেখছি। মনে হচ্ছে এ একেবারে প্রজাপতির নির্বন্ধকী বল অমিয়?”

“এই বাজে ঘটনাটা যাতে কিছুতেই বাসি না হয়ে যায়, সেটা দেখা এখন আমাদের কর্তব্য। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, আমি কিন্তু আপনাকে আর কোনমতেই বিধানদা বলতে পারবো না...সে আপনি যাই মনে করুন”।

জ্যেঠু অবাক হয়ে বললেন, “সে কী? কেন?”

অমিয়বাবু গম্ভীরভাবে আমাদের এবং জ্যেঠুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, কোন উত্তর দিলেন না। একটু পরে আমাদের আশ্চর্য হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসতে হাসতে বললেন, “আপনাকে আর কোনমতেই রেহাই দেবো না, বিধানদা, আপনাকে এখন থেকে বেহাইদা বলব”!

জ্যেঠু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, “তাই বলো, আমি ভাবছি কী না কী!” তারপর তিনজনেই খুব হাসতে লাগলেন।       

আমি বাসির দিকে তাকালাম, ও আমার দিকেই তাকিয়েছিল, চোখাচোখি হতে লাজুক চোখ নামাল।  

 -০০-

এর পরের ছোটদের গল্প - " ছোট্ট হওয়া

শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

প্রসাদী ফুল

 এর আগের বড়োদের গল্প - " চ্যালেঞ্জ (গল্প) "




আমরা বলি সতুদা, কিন্তু তাঁর নাম সইত্যব্রত চট্টরাজ, এমএসসি পাশ। শুনেছি তাঁর প্যাশান ছিল স্কুলের শিক্ষকতা। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাঁর শিক্ষকের চাকরির শিকে ছেঁড়েনি। অতএব তিনি চাকরি করেন না। ভাগ্যিস করেন না, করলে আজ হয়তো তাঁকে দাগি অথবা নির্দাগি-শিক্ষক হয়ে, কলকাতার পথেঘাটে ধর্ণা মঞ্চে বিরাজ করতে দেখা যেত - বছরের পর বছর। তবে একটা কথা মানতেই হবে – ছোটবেলা থেকে আমরা দাগি চোরের কথা বিস্তর শুনেছি – কিন্ত দাগি শিক্ষক নৈব নৈব চ। এদিক থেকে দেখলে আমাদের উন্নয়ন পথের ধারেই বসে আছে – নির্দাগি শিক্ষকরূপে! এ কি কম উন্নয়ন?    

চাকরি না করলেও সইত্যদা নিজের বাড়িতেই কোচিং ক্লাস খুলে ছেলে মেয়েদের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথস পড়ান। তাঁর ক্লাসঘরের বাইরে সকাল ছটা থেকে রাত্রি দশটা পর্যন্ত সাইকেল আর খোলা চটির সংগ্রহ দেখলেই তাঁর হাতযশের আঁচ পাওয়া যায়। পিতৃদত্ত নাম সত্যব্রত হলেও, তিনি ইদানীং নিজের পরিচয় দেন এবং সই করেন সইত্যব্রতই নামেই। এর পিছনে গূঢ় রহস্য আছে। সেটা হল বিখ্যাত এক নিউমেরোলজিস্ট সতুদাকে বলেছিল, “খাঁটি সত্য বলে তো আজকাল কিছু হয় না, ভেজাল মেশাতে হয়”। তারপর সমাধান দিয়েছিলেন “SAITYA বা সইত্য নামটাই আপনাকে সুট করবে, আপনার জীবন পাল্টে দেবে”।       

সেই সতুদাই আমাদের পাড়ার পুজোকমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর আমাদের জন্যে প্রত্যেকবার চোখ ধাঁধানো চাঁদাও একদম বাঁধা থাকে। কবছর আগে খবরের কাগজে পড়ে আইডিয়াটা সতুদার মাথায় এসেছিল এবং গতবার সতুদা প্রস্তাব দিয়েছিল - এবার আমাদের পুজোর থিম হবে জ্যান্ত ঠাকুর। নো কাঠ-খড়-মাটির বানানো পুতুল বিজনেস। টানা তিনদিন তর্কবিতর্কের পর ফাইন্যাল সিদ্ধান্ত হল।

ঠিক হল আমাদের গলির মোড়ে “মধুমাখা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের” মালিক বোঁদে কাকুর ভাইপো হবে গণেশ। কমবয়সী ছেলে – কাকুর দোকানে বছর দুয়েক বসছে, এর মধ্যেই ঈর্ষা জাগানো সুন্দর একটা ভুঁড়ি বাগিয়ে নিয়েছে। কাজেই গণেশ হিসেবে তার থেকে উপযুক্ত আর কেউ হতেই পারে না। এখানে বলে রাখি বোঁদে কাকুর আসল নাম বৈদ্যনাথ – কিন্তু বোঁদে বানানোয় হাত পাকিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন বোঁদে নামে।   

বলিউডের স্বপ্নে বিভোর, দিনে দুবার জিম করা নিমাইকে দেওয়া হল কার্তিকের ভূমিকা।

আমাদের পাড়ার উঠতি ছোকরাদের চিরস্থায়ী দীর্ঘশ্বাসের উৎস কদমাদির বোন মিছরি হবে সরস্বতী। স্বপ্না কাকিমা হবেন, মা দুর্গা। তিনি দেখতেও যেমন ভারিক্কি, তেমনি তাঁর মুখে চোখে বেশ একটা ইয়ে আছে – মানে মা, মা ভাব। লতিকা বৌদি বিয়ে করে আমাদের পাড়ায় এসেছেন বছর খানেক হল – তাঁকে মা লক্ষ্মীর ভূমিকায় সাব্যস্ত করা হল।    

মহিষাসুরের জন্যে কমিটি প্রথমে সাব্যস্ত করেছিল আমাদের পাড়ার তোলাবাজ ও মাস্তান ঠোঁটকাটা পটলদাকে।  ঠোঁটকাটা অর্থে পটলদা কিন্তু মোটেই স্পষ্টবক্তা নয়। আসলে তাঁর ঠোঁটের বাঁদিকে বেশ গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন আছে। শোনা যায় বেশ বড় একটা ছোরার ধারালো ফলা ঠোঁটে চেপে পটলদা আগে খুব তোলাবাজি করত। ঠোঁটে ধরা ওই ছোরার ফলা দেখিয়েই পটলদা ধরাকে সরা জ্ঞান করত। একদিন কোন এক নিরীহ চিকেন-ব্যাপারী – প্রতিহপ্তায় হপ্তার টাকা গুনতে গুনতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে আচমকা এক ঘুঁষি চালিয়েছিল তোলাবাজ পটলদার মুখে। ব্যস, পটলদার ঠোঁট কেটে প্রবল রক্তারক্তি – প্রায় দেড়মাস চিকিৎসার পর ঠোঁট সেরে উঠলেও নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ঘটনাটা।

ঠোঁটকাটা পটলদার বেশ হাট্টাকাট্টা জবরদস্ত চেহারা – গায়ের রং, মাথার চুলও অনেকটা মহিষাসুরের মতোই। কিন্তু পটলদা কিছুতেই রাজি হল না। বলল, “পাগল নাকি, আমি ভোলেভালা সাতেপাঁচে না থাকা মানুষ...আমায় কখনো মইষাসুর মানায়?” শেষমেষ “বাঙালি খাসির” দোকানের হেল্পার সুকুলদা রাজি হওয়াতে জ্যান্ত প্রতিমার ঝামেলাটা মিটল।  

প্রথমে প্ল্যান হয়েছিল, বাহনরাও সবাই জ্যান্ত হবে। কিন্তু জ্যান্ত ইঁদুর-পেঁচা-রাজহাঁস যোগাড় হলেও, ময়ূর-কাটামোষ-সিংহ যোগাড় করার বাড়াবাড়িটা কোনভাবেই সামলানো গেল না। অতএব মাটির পুতুল দিয়েই বাহনের কাজ সারতে হল।

পুজোর কটা দিন বেশ নির্বিঘ্নে আর আনন্দেই সম্পন্ন হল। আজ বিসর্জন। আমাদের ভাসান দেওয়ার প্ল্যানটাও খুব কুলমাদুগ্‌গা সপরিবার উইথ মহিষাসুর যাবেন স্করপিওতে। তাঁরা গঙ্গাঘাটে স্নান সেরে, ঠাকুরের সাজসজ্জা ছেড়ে পুনর্মনিষ্যি হবেন। আমরা মেটাডোরে গিয়ে গঙ্গাতে বিসর্জন দেব ঘট আর মাটির বাহনগুলো

বিকেলে শুরু হল সিঁদুরখেলা, বিদায়বরণ সমস্যাটা এল অন্যদিকে। প্রত্যেকবার আমরা যারা গোবর মাথা, লরিতে তোলার আগে মাসরস্বতীর চরণে মাথা ঠুকতাম আর প্রসাদীফুল রাখতাম পকেটে। এবারে মিছরি হয়েছে সরস্বতী। তার চরণতলে ফুলের পাহাড়! কিন্ত কে তাকে প্রণাম করবে, তার চরণের ফুল কুড়োবে? যে করবে তার নামটা তো মিছরির বয়ফ্রেণ্ড লিস্ট থেকে কাটা পড়বে! কিন্তু অন্যদিকে মা সরস্বতীর চরণ না ছুঁলে পরীক্ষা পাস করব কী করে? আমাদের সকলের তখন একটাই চিন্তা - পরীক্ষা আগে না, প্রেস্টিজ আগে? পরীক্ষায় একবার ফেল করলেও পরেরবার উৎরোনো যায়। কিন্তু প্রেস্টিজ কি সাইকেলের টায়ার, পাংচার হলেও, সারানো যাবে?

আজ মিছরিকে ব্যাপক দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে পরি, শুধু ডানাদুটো নেই, ডানাজোড়া কেচে যেন ছাদের দড়িতে শুকোতে দিয়ে এসেছে! পায়ের ওপর পা, হাতে বীণা, ঘ্যাম পোজ মেরেছে, চোখ ফেরানো দায় হয়ে উঠেছেনিখিল আর বাচ্চু ভেজাগলায় আমাকে বলল, ‘কিছু একটা কর, ভল্টু’

কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, “ভাবিস না, উপায় বের করেছি। আমার ঘরের সরস্বতীমূর্তিটা, চুপচাপ নিয়ে আয়, তারপর আমি দেখছি’

ওরা সরে যেতে আমি মিছরিকে গিয়ে বললাম, ‘মিছিমিছি বসে সময় নষ্ট করছিস কেন, মিছরি? এই সময় গিয়ে “এই সময়”টা দেখে আয়। আজকের এপিসোডটা শুরু হল বলে”।  “এই সময়” সিরিয়ালের হিরো সমীর মহাপাত্র, মিছরি সমীরের হেব্বি ফ্যান।

মিছরি চমকে উঠে বলল, ‘এম্মা, তাইতো, ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু এসময় কেটে পড়লে কেলো হবে না’?

‘আধঘন্টার ব্যাপার, মিছরি কোন চাপ নিস না, তুই আলতো করে পাতলা হয়ে যা, আমি এদিকটা সামলাচ্ছি’

বীণা রেখে প্যান্ডেলের পিছন দিয়ে মিছরি সরে পড়ল। আর প্রায় তখনই বাচ্চুরাও পৌঁছে গেল আমার ঘরের সরস্বতীপ্রতিমা নিয়ে। প্রতিমাটিকে বেদিতে বসিয়ে চটপট সেরে নিলাম প্রণামপর্ব, প্রসাদীফুল কুড়োনোর পর্ব। আমরা দশবারোজন ছোকরা মা সরস্বতীর বেদিটাকে ঘিরে রেখে, ‘সরস্বতীমায়িকি, জয়’ রব তুলতে লাগলামবরণ করতে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে আমার মাও ছিলেন, খুব খুশি হলেন আমাদের মতিগতি দেখে। মাদুগ্‌গা সাজা স্বপ্নাকাকিমা বলেই ফেললেন, ‘ছোঁড়াগুলো দুগ্‌গাপুজোর সময়েও মাসরস্বতীর ভক্তিতে কি সুন্দর মেতে আছে। দ্যাখ দ্যাখ, পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে মিছরি কেমন ছোঁড়াগুলোর ঘাড় ধরে প্রণাম আদায় করছে”!

আমার চোখ ছিল ঘড়ির দিকে, আধঘন্টা হতেই বাচ্চুরা চুপিচুপি মাসরস্বতীর প্রতিমা আবার আমার ঘরে রেখে এল মিছরিও ফিরে এসে, বীণাহাতে বসে পড়ল বেদিতে। আমার দিকে ডাগর চোখের কটাক্ষ হেনে মিছরি ফিসফিস করে বলল, “থ্যাংকু, ভল্টুদা। আজ না গেলে বিচ্ছিরি মিস করতাম। আজ সমীরের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল, সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হল সমীরের প্রথম পক্ষের বউ – তার কোলে একটা মেয়ে...”।

আমি হাসলাম, বললাম, “ভল্টু ছাড়াও আমার নাম তিমির, জানিস তো? সমীরের থেকে চোখ ফিরিয়ে, তোর আঁখির টর্চ এদিকে ফেললে, মাইরি বলছি, আমার তিমিরত্ব সবটুকু ঘুঁচে যেত রে, মিছরি”!

আঁখিপাখির ডানা ঝাপটে মিছরি উত্তর দিল, “য্‌য্যাঃ। ভল্টুদা তুমি না একটা Zআআতা। এমন ফচকেমি করো না...”।    

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বুকে হাত রাখলাম, মা সরস্বতীর আশীর্বাদী ফুল রয়েছে আমাদের পকেটে।

 -০০-

এর পরের বড়োদের গল্প - " নতুন চাল


বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

চ্যালেঞ্জ (গল্প)

  এর আগের বড়োদের গল্প - " গড্ডল "



[এই গল্পের নাট্যরূপ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "চ্যালেঞ্জ - নাটক"]


চ্যালেঞ্জ একটা ছিল, কিন্তু সে কথা পরে।

রোববার সকালের বাজারটা নিজে হাতে না করলে, প্রাণপণবাবু ঠিক আরাম পান না।  ভোজনরসিক মানুষ, সারা সপ্তাহ কাজের চাপে একদমই সময় পান না। রোববারেও কী আর ফুরসুত নেবার জো আছে? নেই, তবু তার মধ্যেই সময়টা বের করে নেন। বাজারের যাবার সময়, কাজের ছেলে প্রতাপ তাঁর সঙ্গে থাকে। বাজারের থলে বওয়ার কাজটা প্রতাপই করে। কাজের দিদি, কাজের মাসি, বলার রেওয়াজ থাকলেও, কাজের ছেলে বলতে কিন্তু করিৎকর্মা ছেলে বোঝাতো। প্রতাপ কিন্তু সত্যিই কাজের ছেলে। সর্বদা পেছনে পেছনে থাকেকচি আর টাটকা আনাজ চেনে। তাজা মাছের কদর জানে। চাঙ্গা চিকেনের চোখ চেনে। কোন কিছু পছন্দ হলেও প্রাণপণবাবু ঝুপ করে কিনে ফেলেন না। প্রতাপের সজেসান নেনদরদস্তুর, সুলুকসন্ধান, ফিকে রঙ, গাঢ় রঙ সব দিক বিচার করে, প্রতাপের সঙ্গে যুক্তি সেরে তিনি থলিতে জিনিষ তোলেন। হুঁ হুঁ, এ তল্লাটে দুঁদে উকিল হিসেবে তাঁর নাম অমনি অমনি প্রতিষ্ঠা পায় নি। অনেক পরিশ্রম, সাধনা, অধ্যবসায়, একাগ্রতা...সে আরও অনেক কিছু।  মদনতলা বিন্দুবাসিনীদেবী বুনিয়াদি উচ্চ বিদ্যালয় সেবারে প্রাণপণবাবুকে সম্বর্ধনা জানিয়েছিল। সেখানে সেই বারো ক্লাসের ছেলেটি বেড়ে বলেছিল তাঁর সম্পর্কে। যদিও নিজের কথা ঢাক পিটিয়ে সাতকাহন বলার লোকই নন তিনি।

আজ প্রতাপ নেই। জরুরি কাজে বাড়ি গিয়েছিল, বলেছিল শনিবার রাত্রে ফিরে আসবে। ফেরেব্বাজটা ফেরেনি, আজ সকালেও না। বেলা নটা অব্দি অপেক্ষা করে প্রাণপণবাবু একাএকাই বেরোলেন। কারও জন্যে তাঁর কাজ আটকে থাকবে নাকি?

মাছের বাজারে আজ ইলিশ উঠেছে বিস্তর। দেখে তো ভালই মনে হচ্ছে, তাদের গায়ে স্নিগ্ধ এলইডি আলোর রূপোলী ঝলক। ওজনও মন্দ নয়, সাড়ে আটশো নশো তো হবেই। দরও এমন কিছু বেশি নয়, মাত্র চোদ্দশ টাকা। প্রাণপণবাবু ভালো জিনিষের কদর বোঝেন, দরদামে পেছপাও হন না। এ কটা টাকা তাঁর মিনিট দশেকের রোজগার, কাজেই টাকাটা কোন ফ্যাক্টর নয়। তবে কেনার আগে প্রতাপের সঙ্গে একটু শলাপরামর্শ করতে পারলে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন, আজ সে উপায় নেই।

‘ইলিশ নিচ্ছেন নাকি?’ পেছন থেকে কেউ একজন বলল। প্রাণপণবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, দাড়িগোঁফে মোড়া এক ছোকরা, হাসি হাসি মুখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। সে আরও বলল, ‘কোয়ালিটি মন্দ নয়, কোলাঘাটের টাটকা ফসল। তবে দরটা একটু বেশিই। যদি নেবেন বলে মনস্থির করে ফেলেন, তাহলে আমি একটু দরদাম করে দেখতে পারি’।

প্রাণপণবাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন। লোকের মুখে শুনেছেন, তাঁর এই চাউনিতে অনেক বাচাল সাক্ষীও কথা হারিয়ে ফেলে। বিরোধী পক্ষের ঘুঘু উকিলও আইনের মার প্যাঁচ ভুলে, পায়রার মতো বাজে বকবকম করে। কিন্তু এ ছোঁড়াটা হার মানল না, হাসি হাসি মুখে তাকিয়েই রইল প্রাণপণবাবুর দিকে।

‘আপনি আমাকে চেনেন?’

‘বিলক্ষণ। মদনতলায় আমার যদিও বেশিদিন হয়নি, তবে, আপনাকে চেনে না, এমন কাক পক্ষীও এ তল্লাটে আছে বলে আমার মনে হয় না। আর আমার মতো সামান্য এক ফচকে ছোঁড়াকে আপনার মতো মানুষের আপনি-টাপনি বলাটাও কী উচিৎ হচ্ছে, স্যার?’ 

ছোঁড়ার কথাবার্তা ভালই লাগল প্রাণপণবাবুর, ছোকরার বুদ্ধিশুদ্ধি আছে, কথাবার্তার ধরন ধারণে মানী লোকের যে মান দিতে হয়, সেটা জানে। তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘কী করা হয়? নাম কী? তোমাকে তো চিনতে পারলাম না?’

‘হে হে, আমাকে না চেনাটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। তবে সে সব পরে হবে, স্যার। ইলিশ যদি পছন্দ হয়ে থাকে, চটপট তুলে নিন স্যার। আজকাল মদনতলায় হাবিজাবি কাঁচা পয়সাওলা লোকের আনাগোনা খুব বেড়েছেআঙুল ফুলে কলাগাছ সে সব বারফট্টাই বাবুরা আপনার মতো গণ্যিমান্যি লোকের সম্মান বুঝবে না। শেয়াল কী আর বাঘসিংহের বনেদিয়ানা বুঝবে, স্যার?’ প্রাণপণবাবু কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়লেন ছোঁড়ার কথায়, তিনি একটু ভরসা করে বললেন,

‘মাছটা খারাপ নয়, নেওয়া চলতে পারে, বলছো?’

নিশ্চিন্তে নিতে পারেন, স্যার। তাহলে কথা বলি?’ মাছওয়ালার পাল্লায় চারটে বড়ো বড়ো ইলিশ তুলে দিয়ে ছোকরা বলল,

‘কত হয় দেখো তো হে?’ প্রাণপণবাবু  হৈ হৈ করে বললেন,

‘করো কী হে? অত মাছ কে খাবে?’

‘সামান্য একটু বেশি হবে, তা হোক।  আপনার মতো ছোট পরিবারে দুটো হলে টানাটানি হয়। তিনটে হলে ঠিক হয়, কিন্তু ওদিকে আবার তিনে শত্রু হয় – মা ঠাকুমার মুখে শুনেছি। কাজেই চারটে ঠিক হবে স্যার। ভাজা, সরষেঝাল, ভাপা, কালোজিরে ফোড়নের ঝোল। আপনারা মাছের টক খান নাকি, স্যার? পুরোনো তেঁতুল দিয়ে ইলিশের মুড়ো দিয়ে টকমিষ্টি অম্বল, খেয়ে দেখবেন, স্যার। কুলকুচি করলেও স্বাদ যায় না, মুখে বেশ কিছুদিন লেগে থাকে’।

‘সে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে এত? না না, দুটো নামাও’।

‘ওইটি বলবেন না স্যার? এই ইলিশ কী আপনি সারা বছর পাবেন? এ কী একঘেয়ে কাটাপোনা? সারা বছর, একই দাম, একই স্বাদ? অনেকে জোড়া জোড়া ইলিশে তেল সিঁদুর লাগায়, নাকে নথ পরায়। বলে ইলিশ ঘরের লক্ষ্মী। কত হল হে?’ শেষ কথাটা মাছওয়ালাকে জিগ্যেস করল ছোকরা। মাছওয়ালা বলল,

‘তিন কিলো সাড়ে তিনশো’

‘অ্যাঃ, আবার সাড়ে তিনশো, ওই তিন কিলোই ধরো! ছানি কুচোনো না করে, বড়ো বড়ো পিস করবে ভাই। মুড়োয় শাঁস রাখবে না। তেলটেলগুলো ভালো করে পরিষ্কার করে দেবে। একটু চা বলবো, স্যার? একটু তো সময় লাগবেই’।

‘কিন্তু এতো অনেক টাকা? আমি অত আনিনি তো!’

‘দুশ্চিন্তা করছেন কেন, স্যার? যা এনেছেন, তাতে আরামে হয়ে যাবে’ এবার প্রাণপণবাবু বেশ বিরক্তই হলেন, একটু ঝেঁজে বললেন,

‘আমি কত এনেছি, তুমি কী করে জানলে হে? তোমাকে ভাল মনে করেছিলাম, তুমি তো আচ্ছা বেয়াদব ছোকরা ! শুধু মাছ কিনলেই হবে, বাকি আর বাজার নেই?’

‘স্যার, স্যার স্যার, প্লিজ, প্লিজ উত্তেজিত হবেন না, স্যার। আপনার মতো মানুষের উত্তেজনা মানায় না। বাজারের জন্যে আপনি নিশ্চয়ই পাঁচ নিয়ে এসেছেন, এ ছাড়াও মানিব্যাগ ঘাঁটলে পাঁচ-সাতশ তো হয়েই যাবে। মাছের জন্যে তিন দিলে দুই থাকবে। দুই দিয়ে আপনার বাকি বাজার হবে না, স্যার? মাগ্যির বাজারে জিনিষপত্রের দাম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এতটাও কী বেড়েছে স্যার? ওই চা এসে গেছে স্যার, চিনি ছাড়া, চা খান রোববারের বাজারটা এনজয় করুন স্যার, অযথা উত্তেজনায় শরীরকে বিপদে ফেলবেন না’। ছোকরার এলেম আছে, প্রাণপণবাবুর মতো দুঁদে উকিলকেও ক্ষণে ক্ষণে অবাক করে দিচ্ছে। চায়ে হালকা চুমুক দিয়ে প্রাণপণবাবু বললেন,

‘সাড়ে চারের মাছ, তিনে রাজি হয়ে যাবে? কী বলছো হে? তুমি কী এখানকার দাদা, না তোলাবাজ? এ তল্লাটের সব দাদাদের আমি চিনি, কিন্তু তোমাকে তো নতুন চিনছি হে! তার ওপর, আমার কাছে কতটাকা আছে, চিনি ছাড়া চা খাই, এত খবরও রয়েছে তোমার কাছে। তোমার মতলব মোটেই সুবিধের ঠেকছে না। তবে এও বলে রাখছি আমিও কিন্তু খুব সুবিধের লোক নই। ’

‘হে হে, বদ মতলব নিয়ে কোন লোক আপনার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে, এ আশা ঘুণাক্ষরেও করি না, স্যার  একবার দেখে নেবেন, পিসগুলো ছোট হচ্ছে না তো, স্যার? এর থেকে বড়ো করলে, মাছের ভেতরে তেলনুনমশলা ঢুকবে না। পানসে কাঁচা লাগবে। আবার ছোট করলেও খেয়ে ঠিক তৃপ্তি হয় না, কাঁটা বাছার খাটনিই সার হয়, স্যার’।

চায়ের ভাঁড়টা খালি করে পচা আনাজের ডাব্বায় ছুঁড়ে ফেললেন প্রাণপণবাবু। আর ছোকরার ইলিশ খাওয়ার তরিবত শুনে, তিনি মনে মনে খুশি হলেন ঠিকই, তবে ছোকরার মতলব নিয়ে, তাঁর মনের সন্দেহটা গেল না। আবার এও মনে হল, মদনতলা ছোট শহর হলেও, এই শহরে তাঁর নাম আর দাপটেই তো এ সব অসম্ভব সম্ভব হচ্ছে! এটা ভেবেও তাঁর মনে একটু শ্লাঘা হল। এরপর তাঁর নামে, বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায় বললেও খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না, নিশ্চয়ই!

পকেট থেকে তিন হাজার গুনে তিনি ছোকরার হাতে দিয়ে বললেন, ‘দরদাম যা করার তুমিই করো হে, আমি আর ওসবের মধ্যে নেই’। 

প্লাস্টিকের প্যাকেটে কাটা ইলিশ নিয়ে, প্রাণপণবাবুর মাছের ছোট থলিতে ভরতে ভরতে ছোকরা বলল, ‘ছি, ছি। এ আবার একটা কথা হল? আপনার সঙ্গে আবার দরদস্তুর কী? আপনি নিজে হাতেই টাকাটা দিন স্যার। আপনার মতো ব্যক্তির হাতে ঈপ্সিত জিনিষ তুলে দিতে পেরে, ও কী কম আনন্দ পাচ্ছে স্যার?’  আজকাল ছোকরারা যাকে গ্যাস খাওয়ানো বলে, তাঁদের সময় সেটাকেই তেলদেওয়া বলা হত। এসব বুঝেও, প্রাণপণবাবু মাছওয়ালা ছোকরার হাতে টাকা দিয়ে একটু হাসলেন। 

ছোকরা টাকা কটা গুনলোও না বরং করজোড়ে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে এমন হাসল, কানদুটোও এঁটো করে ফেলল হতভাগা! প্রাণপণবাবু মোহিত হয়ে, গদগদ স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘এখন তো শীতের সময় নয়, তা তোমার এই ঈপ্সিত ব্যপারটা কি হে’?

‘ছাড়ুন না স্যার। মুখ ফস্কে এক আধটা কথা অমন বেরিয়ে যায়। সব কথা কী স্যার অমন ধরতে আছে? তখন আমার নাম জিগ্যেস করছিলেন, আমার নাম মানস ভূষণ দাস। লোকে ভালোবেসে ভুষি বলে। খুব খারাপ কিছু বলে না। একে ইঞ্জিনিয়ারিং, তারপরে আবার ম্যানেজমেন্ট  - এই সবে শেষ করলাম কী না করলাম, একটা চাকরিও পেয়ে গেলাম স্যার। এখন কদিন ছুটি, ফাইন্যাল রেজাল্টটা বেরোলেই, নতুন চাকরিতে জয়েন। বিদেশ বিভুঁই কোথায় চলে যাবো স্যার, কবে আবার ফেরা হবে তাও জানি না। তাই বাড়ি এসে আপনাদের মতো সজ্জনের সেবা করে একটু আনন্দ পাওয়া, স্যার। মা কালীর দিব্বি স্যার, এ ছাড়া আর কোন বদ মতলব নেই’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। কদিন রয়েছো তো? সময় করে একবার এসো না আমাদের বাড়ির দিকে। ভালো করে আলাপ করা যাবে’।

‘নিশ্চয়ই যাবো স্যার। এখন আপনি অন্য বাজার করবেন তো, স্যার? আপনি করুন, আমি কাছাকাছিই থাকবো। কোন সাহায্য দরকার হলেই, হাঁক দেবেন চলে আসবো’। 

****** 

প্রাণপণবাবুর বাজার শেষ হতে ঘন্টাখানেক লেগেই গেল, মাছের থলি ছাড়াও ভরে উঠল দু দুটো থলি। বাজার থেকে বেরিয়ে রিকশার জন্যে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন, প্রাণপণবাবু। ব্যাটারা রোববার হলেই কোথায় যে ডুব মারে! অন্যদিন ঘাড়ের পাশে এসে প্যাঁক প্যাঁক করে, কান ঝালাপালা করে দেয়। আজ কারও পাত্তা নেই! ভুষি হঠাৎ কোথা থেকে যেন উদয় হল, বলল,

‘স্যার রিকশা খুঁজছেন?  মানুষ বিপদে পড়লে, কিংবা অসহায় অবস্থায় পড়লে, ওদের দেখা মিলবে না, স্যার। কত আর দূর? আমাকে দুটো ব্যাগ দিন, আপনার বাড়ি অব্দি পোঁছে দিয়ে আসি’। প্রায় জোর করেই ভারি থলিদুটো প্রাণপণবাবুর হাত থেকে নিয়ে নিল ভুষি। তারপর বলল,

‘আপনি ওই আমিষথলিটা নিজের কাছেই রাখুন স্যার। খুব ভারি মনে হচ্ছে না তো?’

‘আরে না না, তুমি বারবার কিন্তু খুব বিড়ম্বনায় ফেলছো, মানস’।

‘ভুষি বললে বেশি আনন্দ পাবো স্যার। খুশীও’।  আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে ভুষি দু হাতে থলি নিয়ে হন হন করে হাঁটা দিল প্রাণপণবাবুর বাড়ির দিকে। প্রাণপণবাবুও অগত্যা মাছের থলিটা নিয়ে ভুষির সঙ্গ নিলেন।

‘ইঞ্জিনিয়ারিং কোথায় পড়েছ, ভুষি?’

‘আজ্ঞে সে তেমন বলার মতো কিছু নয়, কানপুর আইআইটি’।

‘বলো কী হে? তেমন কিছু নয়? আর চাকরি কোথায় পেয়েছ, বললে’?

‘আজ্ঞে বলিনি তো। এবার বলব’। ভুষি বিখ্যাত একটি কোম্পানীর নাম বলাতে, প্রাণপণবাবু উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,

‘বাঃ। তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে? এমন গুণের ছেলে হয়েও তুমি লোকের বাজারের থলি বয়ে বেড়াচ্ছো? তা দেবে থোবে কেমন?’

‘ছি ছি স্যার, কেউ কিছু দেবে থোবে বলে আমি বাজারের থলি বইছি, এ আপনার ভ্রান্ত ধারণা। আর আমিও যার তার থলি কেন বইব, স্যার? আপনার মতো লোকের থলি বওয়ার মধ্যে একটা বেশ বড়সড় ইয়ে আছে, স্যার’

‘আরে রাম রাম, আমি সেকথা  বলিনি। বলছিলাম যেখানে জয়েন করছো, তারা মাইনে পত্তর কেমন  দেবেথোবে ?’  খুব লজ্জা লজ্জা মুখ করে ভুষি  বলল,

‘শুনেছি ছেলেদের মাইনে, আর মেয়েদের বয়েস – জিগ্যেস করতে নেই! কথাটা কী সত্যি, স্যার?’

হো হো করে হেসে উঠে প্রাণপণবাবু ভুষির কাঁধে হাত রেখে বললেন,

‘তোমাকে প্রথমে চিনতে পারিনি, তবে এখন দেখছি, তুমি বেশ ইন্টারেস্টিং’।

‘আপনাকে আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই চিনি স্যার। আপনার হয়তো মনে নেই, আমাদের স্কুলে আপনাকে একবার সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেই ফাংসানে স্যার আমি একটা লেকচার দিয়েছিলাম, লিখেওছিলাম আমিই!’

‘মনে নেই আবার? বেশ মনে আছে। তুমিই সেই ছেলে? চিনতে পারিনি হে, অনেক বড়ো হয়ে গেছ!’

‘আজ্ঞে আপনাদের মতো মানুষের কত শত চেনাজানা, আমাকে ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক’।

‘আরে না না, মোটেও তা নয়আসলে তুমি আমার সম্বন্ধে যা যা বলেছিলে সে সব কথা ভোলা যায়? চলো বাড়ি চলে এসেছি, বাঁদিকে ঘুরেই সেকেণ্ড বাড়িটা’।

‘আপনার বাড়িও চিনি স্যার, সবুজ রঙের দরজা, পেতলের নেম প্লেট পিপি লাহিড়ি, অ্যাডভোকেট’

ভেরি গুড, এত পরিশ্রম করলে যখন, একটু বসে চা-টা খেয়ে যাও’।

‘না না স্যার, ওসবে কী দরকার?  বাড়ির লোককে ব্যতিব্যস্ত করা। না না স্যার আজ থাক, আরেকদিন বরং...’

‘দ্যাখো হে ছোকরা। বাড়ির লোক ব্যতিব্যস্ত হবে কিনা, সেটা আমি বুঝবো। বেশি ফাজলামি করো না, একটু বসে,  চা না খেয়ে তোমার আজ পরিত্রাণ নেই, এ কথাটা জেনে রাখো’।

‘আজ্ঞে এত করে যখন বলছেন, তখন কী আর করা? কিন্তু পরে আমাকে কোন দোষ দেবেন না কিন্তু!’

কলিংবেল টিপে দরজার বাইরের অপেক্ষা করতে করতে প্রাণপণবাবু বললেন,

‘দোষের কথা আসছে কোথা থেকে?’

‘না স্যার, মানে ইয়ে বলছিলাম, আমি আসাতে বাড়ীর সবাই খুশী নাও হতে পারে তো?’

‘কেন? কেন? খুশী হবে না কেন? বাই দ্য ওয়ে, আমার কন্যার নামও খুশী, আর ছেলের নাম আনন্দ’।

‘জানি, স্যার। খুশী আমাদের স্কুলেই পড়তো, একই ক্লাস, কিন্তু অন্য সেকসনখুব ভালো মেয়ে, কিন্তু জানি না কেন আমাকে দেখলে মোটেই খুশী হয় না কোনদিন’।

‘বাবা, তুমি তো দেখছি, আমার ঠিকুজি কুলুজি সব জেনে বসে আছো? তা খুশী তোমার ওপর অখুশী হবার কারণ কী জানতে পারি’?

‘আমিও জানি না, স্যার। জানতে চাইওনি কোনদিন। মেয়েদের মনের খবর কে রাখে, আমিতো রাখি না, স্যার’? 

 দরজাটা খুলল প্রাণপণবাবুর মেয়ে খুশীই। দরজা খুলে বাবার সঙ্গে ভুষিকে দেখে অখুশী হল, এমন তো মনে হল না। দরজা খুলতে দেরি হলে, প্রাণপণবাবু স্ত্রীকে একটু কড়া ধমক দেন, এখন মেয়েকে বকলেন, কিন্তু তাতে কোন ঝাঁজ নেই,

‘দরজা খুলতে এত দেরি করিস কেন, মা? ভারি ভারি থলে নিয়ে ছেলেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই থেকে’।

‘বা রে, আমি কী করে জানবো? আমি ভেবেছি, প্রতাপদা আজ নেই, তুমি রিকশ নিয়ে আসবে! ভুষিদা যে আজকাল মুটেগিরি করছে, জানতাম না তো?’ ভুষি ঘরে ঢুকে এসে ঘরের কোনায় থলি দুটো রাখল। প্রাণপণবাবু মেয়ের হাতে আমিষের থলি দিতে দিতে বললেন,

‘কাকে কী বলছিস, খুশী? মানসের মতো হীরের টুকরো ছেলে এ তল্লাটে আমি দেখিনি। তোর মা আবার কোথায় গেল? এটা রান্নাঘরে সাবধানে রেখে আয়, তারপর মাকে ডাক’ খুশী ভেতরে যেতেই ভুষি বলল,

‘দেখলেন তো, স্যার? বলেছিলাম না খুশী আমাকে দেখলে খুশী হবে না! আমি এখন আসি স্যার?’

‘আরে বসো, বসো, সোফায় আরাম করে বসো। মেয়েদের সব কথায় কান দিলে চলে?’

‘কার আবার কানে কুমন্ত্রণা দিচ্ছ?’ ভেতর থেকে প্রাণপণবাবুর স্ত্রীর গলা পাওয়া গেল, ‘সারাদিন তো লোককে কুমন্ত্রণা দিয়ে মামলা বাগাচ্ছো? এখন ঘরেও শুরু করেছ?’ ঘরে ঢুকে দুজনকে দেখে বললেন, ‘অ ভুষি? কখন এলে? কেমন আছো, বাবা?’ ভুষি সোফা থেকে উঠে মহিলাকে এবং তারপর প্রাণপণবাবুকেও প্রণাম করল, তারপর বলল,

‘ভালো আছি, কাকিমা। আপনি ভালো আছেন তো?’

‘বসো বাবা, বসো। বাবা, মা ভালো আছেন?  মিতুলের তো সামনেই ফাইন্যাল পরীক্ষা। তোমার মতো রেজাল্ট হবে তো’?

‘সবাই ভালো আছে কাকিমা। মিতুলটা মহা ফাঁকিবাজ, তবে মা তো দিনরাত পেছনে লেগে রয়েছে, দেখা যাক কী হয়?’

‘না, না। চিন্তা করো না। খুব ভালো মেয়ে মিতুল, ভালোই হবে। তুমি বসো একটু চা-টা করে আনি’।

প্রাণপণবাবুর স্ত্রী রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন, প্রাণপণবাবু বললেন,

‘শুনছো। মানসের জন্যে, আজ খুব সস্তায় প্রচুর ইলিশ পেয়েছি।  চট করে কিছু ভেজে ফেল দেখি, রোববারের সকালটা জমে যাবে একেবারে!’

‘মানসটা আবার কে?’

‘কাকিমা ওটাই আমার নাম, মানসভূষণ’।

‘তাই নাকি? আমরা তো ভূষি বলেই জানি!। বসো বাবা, কখানা ভেজে এনে দিই’। প্রাণপণবাবুর স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বললেন,

‘তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে? আমি ছাড়া, আমার বাড়ির সবাই তোমায় চেনে জানে, অ্যাঁ? এ কথাটা ঘুণাক্ষরেও জানাওনি তো? তার ওপর আবার বলছিলে তুমি এলে বাড়ির লোকেরা অখুশী হবে! আমি এ সময় মাছভাজার কথা বললে, তোমার কাকিমা আমাকে দু কথা শুনিয়ে দিত, তুমি এসেছ বলে, এককথায় চলে গেল মাছ ভাজতে! অবাক করলে হে?’

‘আজ্ঞে তা নয়, কাকিমাতো ভালো মানুষ, মায়ের মতো। উনি তো খুশী হবেনই। কিন্তু খুশী আমায় দু চোখে দেখতে পারে না! কী জানি কেন? আমার খুব ইচ্ছে হয়, আপনার সঙ্গে বসে নানান লোকের নানান গল্প শুনি। কাকিমার সঙ্গে বসে একটু কথাবার্তা বলি। কিন্তু খুশী মোটেই অ্যালাউ করে না। বলে আপনি নাকি খুব কড়া, গম্ভীর, আর রাশভারি মানুষ। আজে বাজে লোকের সংস্রব রাখেন না। এ বাড়িতে যেন কখনো পা না রাখি’।

‘ছি ছি, খুশী এমন বলেছে? কিন্তু খুশী তো আমার তেমন মেয়ে নয়। নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আমি খুশীকে ডেকে বলে দেব। আসবে না কেন? একশবার আসবে!’

‘না না এ বিষয়ে কোন কথা বললে, খুশী খুশী মনে মেনে নাও নিতে পারে। আসলে আমার বাবা মেছো বিভূতি, মাছের আড়তদার। ভদ্র শিক্ষিত সমাজে, তাঁকে তেমন কেউ পাত্তাটাত্তা দেয় না, একটু অবজ্ঞার চোখেই দেখে। খুশী সেই জন্যেই আমার ওপর অখুশী’।

‘আরেঃ তুমি বিভূতিভূষণের ছেলে? আগে বলবে তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ নাম ওটাই, কিন্তু সকলে মেছো বিভূতি বলে। বিবাহ, উপনয়ন, শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন কিংবা যে কোন আনন্দ অনুষ্ঠানে আমরা সুলভ মূল্যে উৎকৃষ্ট মৎস্য সরবরাহ করিয়া থাকি। খুশীর বিয়েতে আমার বাবার খুব ইচ্ছে আপনাদের মাছের সাপ্লাই দেওয়ার’।

‘আমাদের ক্লাবের যে কোন বড় অনুষ্ঠানে, পিকনিকে বিভূতির থেকেই তো আমরা মাছ-টাছ কিনি, ও আর তোমায় বলতে হবে না। তবে খুশীর এখনই বিয়ের চিন্তা তো  করছি না, মানস’।

‘না করাই উচিৎ, কী আর এমন বয়েস ? তবে মনোমত পাত্র যদি পেয়ে যান, দেরি করেই বা লাভ কী?’

‘তা ঠিক। এম এ করে একটা চাকরিও যখন পেয়ে গেছে, তখন অকারণ দেরি করারও কোন মানে হয় না। তা তোমার জানাশোনার মধ্যে এমন কোন ছেলেটেলে রয়েছে নাকি?’

‘আছে বৈকি, স্যার। অনেক আছে। খুশীর মতো মেয়েকে ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে, ছেলেদের বাপ-মায়েরা লাইন লাগিয়ে দেবে! কিন্তু ভালো করে না জেনেশুনে হুট করে অচেনা অজানা ছেলের হাতে, হাত-পা বেঁধে খুশীর মতো মেয়েকে তুলে দেওয়াটা কী উচিৎ হবে, স্যার? বিশেষ করে আপনি যেখানে তাকে এত যত্নে আদরে, মনের মতো করে মানুষ করেছেন। খুশী কী আপনার বুকের পাঁজরের থেকে কম কিছু, স্যার?’ আবেগে প্রাণপণবাবুর গলা গদ্গদ হয়ে উঠল,

‘তা যা বলেছো, মানস। খুশী অখুশী হলে, আমার গোটা জীবনটাই ভূষি হয়ে যাবে’।

‘একদম ঠিক বলেছেন, স্যার। খুশীকে জেনেশুনে ভূষির হাতে তুলে না দেওয়াটাই মঙ্গল’

এই সময়, ভূষির পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠল, ফোনটা বের করে দেখল তার বাবার ফোন। ভূষি অনুমতি নিয়ে বলল,

‘এক মিনিট, একটা ফোন এসেছে, চট করে কথাটা সেরে নিই, স্যার?  হ্যালো, বলো।

ফোনের ওপ্রান্ত থেকে মেছো বিভূতি বললেন,

‘কী রে? শুনলাম তুই হাফ দামে মাছ বিলি করে বেড়াচ্ছিস?’

‘হাফ দাম কোথায়? আর যা দাম নিয়েছি, তোমার লস তো হয় নি, বাবা’!

‘হতভাগা, লাভ না হওয়াটাও একধরনের লস, সেটা জানিস? ব্যবসাটা আর কবে শিখবি?  তা এই বিশেষ ডিসকাউন্টটা কাকে দিলি, শুনি?’

‘খুশীর বাবা, প্রাণপণবাবুকে’।

‘ছি ছি ছি, আমার ছেলে হয়ে তুই এমন চশমখোর ব্যবসা শিখেছিস? হতচ্ছাড়া ছেলে, তাহলে দাম নিলি কেন’?

‘বা রে, উনি দাম না দিয়ে জিনিষ নেবার মানুষ? কী যে বলো তুমি? এখন রাখছি, পরে কথা বলবো’।

‘তুই কী এখন ওঁদের বাড়িতেই’?

‘হুঁ’।

‘বা বা বা, প্রানপণবাবুকে রাজি করিয়ে, খুশীমাকে যদি এনে দিতে পারিস, বাস...’

‘ঠিকাছে ঠিকাছে, রাখছি’।  ফোনটা অফ করে প্যান্টের পকেটে রাখতে, প্রাণপণবাবু হাসি মুখে জিগ্যেস করলেন,

‘কার ফোন, বাবার? কম দাম নিয়েছ শুনে, খুব বকাবকি করলেন নিশ্চয়ই’?

‘না, স্যার। উলটে যাচ্ছেতাই গালাগালি করল, আপনার থেকে দাম নিয়েছি বলে?’

‘কেন? কোন খুশীতে দাম নেবে না, শুনি?’

‘তা জানি না স্যার, তবে ওঁনার একটাই কথা, খুশী’।

দুটো প্লেটে ইলিশমাছের চারটে গাদা ভেজে প্রাণপণবাবুর স্ত্রী ঘরে এলেন। ভূষি বলে উঠল,

‘এঃ কাকিমা, এযে গাদা মাছ ভেজে নিয়ে এলেন’।

‘গাদা আবার কোথায়? দুটো করে ভেজে আনলাম, শুরু করো, আরো আনছি’।

‘আমাকে আর দেবেন না কাকিমা। স্যারকে দিন। আপনি নিন, খুশীকে দিন। তাতেই আমাদের খুশী, তাতেই আমাদের আনন্দ’।

বিনা বাক্যব্যয়ে প্রাণপণবাবু গরম মাছভাজার টুকরো ভেঙে মুখে নিয়ে বললেন,

‘বাঃ, যেমন টেস্ট তেমনি সুবাস। কোলাঘাট ছাড়া এমন মাছ হয় না, মানস। খাও খাও, বসে আছো কেন? ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে!’

বড়ো একটা থালায়, অনেকগুলো মাছভাজা নিয়ে কাকিমা ঘরে এলেন। খুশী আর আনন্দও ঢুকল তাঁর পিছনেপ্রাণপণবাবুর প্লেটে আরো দুটো মাছভাজা দিয়ে কাকিমা বললেন,

‘কই? তুমি তো এখনো শুরুই করলে না, ভূষি?’

‘আজ্ঞে কাকিমা, আপনারা সকলে খেয়ে যদি খুশী হন, আনন্দ পান, তার থেকে আমার আর কিসে খুশী? কিসে আনন্দ? তবে কিনা ময়রা কোনোদিন নিজের বানানো দই, মিষ্টি খায় না। রান্নার ঠাকুর ভালো ভালো রান্না করে, কিন্তু নিজে খায় পান্তাভাত আর পেঁয়াজ। আমাদেরও তাই, মাছে খুব একটা রুচি আসে না।’ প্রাণপণবাবু মুখের থেকে কাঁটা বের করতে করতে বললেন,

‘কী যে বলো! ওভাবে ভাবো কেন?  তোমার বাবা মাছের ব্যবসা করেন, তাতে কি? তোমার সঙ্গে কথা বার্তা বলে বুঝতে পারছি, মাছের ব্যবসাও বেশ ব্যবসা। খাসা ব্যবসা’।

‘এতটাই ভরসা দিচ্ছেন যখন, মুখ ফুটে তখন একটা কথা বলে ফেলি, স্যার?’

‘আমি ততক্ষণ চা করে আনি’। ভূষির এই কথা শুনেই খুশী দৌড়ে ভেতরে চলে গেল চা করতে।

‘বলে ফেল, হে বলে ফেল। এখন খুব ভালো মুডে আছি’।

‘আজ্ঞে ইয়ে বলছিলাম কী, স্যার আপনাদের এই খুশী যদি আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারতাম, আমার বাবা-মাও খুব খুশী হতেন। বাবা তো খুশীতে পাগল, বলেন খুশীর মতো একটি মেয়ে যদি আমার মেয়ে হয়ে, আমাকে বাবা বলত, তার থেকে খুশী তিনি আর কিছুতে হবেন না’। প্রাণপণবাবু একটু অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন, তারপর বললেন

‘তুমি কোন খুশী, কিসের খুশীর কথা বলছো বলো তো? আমার তো সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। তুমি কী আমাদের খুশীর কথা বলছো? সে খামোখা তোমার বাবাকে বাবা বলবে কেন? আর তাতে বিভূতিবাবুরই বা খুশী হওয়ার কী আছে? যা খুশী বকে চলেছ!’

‘আজ্ঞে তা বটে, খুশীর খুশীর দিকটাও তো ভাবার আছে! সে যদি খুশী হয়েই আপনার সঙ্গে আমার বাবাকেও বাবা বলে, তাতে আপনি কী খুশী হবেন না, স্যার। খুশী যদি তাঁর, মানে ওই বিভূতিবাবুর পুত্রবধূ হয়, তাহলে তিনি খুশীর মতো মেয়ে পেয়ে খুশীও হবেন’

‘বিভূতিবাবুর পুত্রবধূ?’ জীবনে এত অবাক আর কখনো হননি প্রাণপণবাবু, মাছভাজা খাওয়া থামিয়ে তিনি ভূষি এবং স্ত্রীর মুখের দিকে বার বার দেখতে লাগলেন। প্রাণপণবাবুর স্ত্রী নির্বিকার মনে মাছভাজা খাচ্ছিলেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন,

‘ছোঁড়া কী বলছে, শুনতে পেয়েছো?’

‘কালা তো আর নই, শুনতে পাবো না কেন?’

‘কিছু বলছো না যে?’

‘কী আবার বলবো?  ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট, দারুণ চাকরি। দেখতে শুনতেও খাসা। বিয়ের পরেও আমার মেয়েটা এই শহরেই চোখের সামনে থাকবে। সেই কবে থেকে ওদের পুরো বংশটাকে চিনি। আমার খুশী মাছ খেতে ভালোবাসে, সে অভাব ওদের বাড়িতে কোনদিন থাকবে বলে মনে হয় না। এমন ছেলে পাবে কোথায়? তোমার তো আইনের ব্যবসা, কাজ কারবার যতো চোর জোচ্চোর আর বদমাশদের সঙ্গে। তোমার ওপর আমার ভরসা হয় না বাপু। তার থেকে ভূষিতেই আমি খুশী’।

ভিজে বেড়ালের মতো ভূষি এখন মাথা নিচু করে মাছের টুকরো মুখে পুরল, তার মুখে আর কথা নেই। আর এই সময় খুশী বড়ো একটা ট্রেতে চায়ের কাপ নিয়ে প্রথম কাপটা রাখল প্রাণপণবাবুর সামনে। তারপর মাকে, তারপর ভূষিকে। ভূষিকে চা দেওয়ার সময়, দুজনের চোখাচোখিটা প্রাণপণবাবুর চোখ এড়াল না। তিনি আগুনের মতো রেগে উঠে বললেন,

‘এটা কন্সপিরেসি, ষড়যন্ত্র’

‘আই পি সি ১৮৬০ সেকসন ১২০এ’ প্রাণপণবাবুর স্ত্রী বললেন।

‘তার মানে?’

‘সেকসনটা বলে দিলাম, তোমার কেস খাড়া করতে সুবিধে হবে। জুনিয়রদের মাথায় আর কাঁঠাল ভাঙতে হবে না। আরো আছে, ট্রেসপাসিং – সেকসন ৪৪১; আরো আছে ৪১৫, ৪১৭, ৪২০ চিটিংবাজি। তোমার মতো সরল সাধাসিধে আইনজীবিকে সস্তায় ইলিশমাছ খাইয়ে কুপ্রস্তাব দেওয়া। আরও বলবো? তোমার প্রতাপকে গতকাল রাত থেকে ভূষি নিজের বাড়িতে আটকে রেখেছে। না, না, কোন অত্যাচার করেনি, মারেওনি, ধরেওনি। খাচ্ছে, দাচ্ছে ঘুমোচ্ছে, দিব্বি আছে। কিন্তু তাতেও অ্যাবডাকশনের কেস হয়। সেকসন ৩৬২’।  

স্ত্রীর কথায় প্রাণপণবাবু হতাশ হলেন খুব,  গম্ভীরভাবে মেয়েকে জিগ্যেস করলেন, ‘তোর থেকে আমি এমনটা আশা করিনি, মা? তোরা সব্বাই মিলে আমাকে এমন বোকা বানালি’?

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, খুশী মেঝেয় পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে নিচু গলায় বলল, ‘আমিও আশা করিনি বাবা। আমি ভেবেছিলাম, ভূষিদাকে তুমি সামনে দাঁড়াতেই দেবে না। সেই ভূষিদাকে তুমি কিনা নিজে ঘরে ডেকে আনলে! তাতেও হল না, তার প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ হয়ে উঠলে! আর এদিকে আমি গো হারা হেরে গেলাম’।

‘সে আবার কী? আমার প্রশংসার সঙ্গে তোর গো হারার কী সম্পর্ক?’

‘আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, তোমাকে কনভিন্স করে, যদি ভূষিদা তোমার সঙ্গে আমাদের বাড়ি আসতে পারে, তবেই আমি...’ খুশী হঠাৎ থেমে গিয়ে মাথা নিচু করেই রইল, তার চোখে এখন জল।  প্রাণপণবাবু আবার মেয়ের চোখের জল একবারেই সহ্য করতে পারেন না, তাঁর রাগ রাগ ভাবটা থিতিয়ে গেল, স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘ ‘তবেই আমি...’ কী? বল মা, বল, আমার কাছে আর লুকোস না’।

‘সে আমি তোমায় বলতে পারবো না, বাবা’এই বলে খুশী দৌড়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে। প্রাণপণবাবু হতভম্ব হয়ে, বসে রইলেন কিছুক্ষণ, নিজের স্ত্রী আর ভূষির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘কী এমন কথা, যা মেয়ে সবাইকে বলতে পারে, কিন্তু বাবাকে বলতে পারে না?’ মুখঝামটা দিয়ে প্রাণপণবাবুর স্ত্রী বলে উঠলেন,

‘কোন বুদ্ধি নিয়ে তুমি অ্যাদ্দিন ওকালতি চালাচ্ছো বুঝি না, বাপু।  বাপের কাছে নিজের বিয়ের কথা কোনো মেয়েকে কোনদিন বলতে শুনেছ?  উকিলদের ঘটে কী একটু সাধারণ বুদ্ধিও থাকতে নেই?’

প্রাণপণবাবু কিছু বললেন না, গম্ভীরভাবে কিছু চিন্তা করতে লাগলেন, ভূষির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে তখনো ভাজা মাছ খেয়ে চলেছে। দেখেই তাঁর পিত্তি জ্বলে গেল, বললেন, ‘অ্যাই যে ছোকরা, ওপর ওপর তোমাকে দেখে বেশ ভালো ছেলেই ভেবেছিলাম’। 

ভূষি বলল, ‘আজ্ঞে স্যার, ভেতরে ভেতরেও আমি খুব খারাপ বা ফ্যালনা নই। সে কথা কাকিমা, খুশী, এমনকি এই আনন্দও জানে। আপনার সঙ্গে আজকেই প্রথম আলাপ কি না, তাই আপনার একটু ভ্রম হচ্ছে’।

‘ভ্রম হচ্ছে? আমার ভ্রম হচ্ছে?  হুঁহুঁ হুঁহুঁ, তুমি একটি ভিজে বেড়াল! তোমার ভাব দেখলে মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতেও জানো না!’

‘আজ্ঞে, মাছ আর বেড়ালে খাদ্য খাদক সম্পর্ক।’

‘আসলে তুমি একটি গভীর জলের মাছ’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। এ কথাটা আমার বাবাও বলেন, যে কোন জিনিষের গভীরে না গেলে সেটাকে সঠিক জানা যায় না। জলে ডুব না দিলে কী আর সাঁতার শেখা যায়, স্যার?’

‘হুঁ। আমার আদরের মেয়েটাকে তোমরা সকলে মিলে, সেই জলে ফেলে দেওয়ার মতলব করেছ?’

‘মতলব বলছেন, স্যার? আমরা দুজনে – খুশি আর আমি – সেই কবে থেকে অথৈ জলে হাবুডুবু খাচ্ছি, স্যার।  এখন আপনার অনুমতি পেলেই, আমরা ভেসে উঠবো’। ভূষির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রাণপণবাবু বললেন,

‘ভেসে উঠবে? ওঠাচ্ছি তোমাকে ভেসে, দাঁড়াও! বিয়ে করে কোনো ছেলে ভেসে ওঠে না হে, বরং অতলে তলিয়ে যায়। আমাকে দেখেও তোমার চৈতন্য হল না? তোমাকে আমি ডুবিয়েই ছাড়বো। এমন ডোবাবো না! শুনছো, খুশীকে বলো তো অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে ভালো দেখে কিছু সন্দেশ আনতে।  আর শোনো হে ছোকরা, তোমার বাপ - মেছোবিভূতি আজ সন্ধেয় বাড়িতে থাকবে? নাকি তিনি আবার কোথাও মাছ ধরতে যাবেন? ভাবছি আজ সন্ধেয় তোমার কাকিমাকে নিয়ে, তোমার বাবা-মার সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করেই আসবো’।

‘আজ্ঞে স্যার, এমন টাটকা সরেশ মাছ, নিজে থেকে ধরা দিতে আসছেন খবর পেলে, তিনি আর অন্য কোত্থাও মাছ ধরতে যাবেন না’তার কথা শেষ হবার আগেই খুশী একটা বড়ো প্লেটে অনেকগুলি সন্দেশ সাজিয়ে নিয়ে ঘরে এল। প্রাণপণবাবু খুব অবাক হলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি কোত্থেকে সন্দেশ আনলি?’ সন্দেশের থালা হাতে খুশী যখন প্রাণপণবাবুর সামনে দাঁড়াল, তার মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়ের খুশীমাখা লাজুক হাসিটা তাঁর চোখ এড়াল না। তিনি একটা সন্দেশ হাতে তুলে নিতে তাঁর স্ত্রী বললেন,

‘আমি আগেই আনিয়ে রেখেছিলাম, তোমার যে শেষমেষ সুবুদ্ধির উদয় হবে সে আমার জানাই ছিল’।

‘আচ্ছা? তোমার সঙ্গে যে জীবন কাটাচ্ছি, তাতে দুর্বুদ্ধি হবে না তো কী হবে? আমার সুবুদ্ধি যদি এসে থাকে, সে আমার ওই মেয়ের জন্যে, আর ওই... ওই... ওই... ভূষিটার জন্যে।  ছোঁড়াটা একটু ডেঁপো টাইপ, কিন্তু বেশ ভালো’। বলে হা হা করে হাসতে লাগলেন। প্রাণপণবাবুর স্ত্রী কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না, তিনিও হাসতে লাগলেন।

ভূষি খুশীর দিকে তাকিয়ে দুবার ভুরু নাচাতে, খুশী লজ্জা পেয়ে সোফায় বসল মুখ নিচু করে। ভূষি মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ খুলে লিখল, ‘খেপি, আমার সঙ্গে আর কোনদিন চ্যালেঞ্জ নিবি না, কেমন?’ খুশীর পাশে রাখা মোবাইলে আওয়াজ হল ‘টুং’’।

 ..০০..

 [দেশ পত্রিকায় পূর্ব প্রকাশিত]

 এর পরের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "

 

       



নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...