বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বড়োদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

মহীরূহ

 বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    


এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 

এর আগের বড়োদের গল্প - " অপর্ণা "


 

সে এক বিশাল বটগাছ। বিশাল বেড়ের গুঁড়ি মাঝখানে। অনেকটা জায়গা জুড়ে চারপাশে অজস্র ঝুড়ি নামিয়ে বেশ সবল অধিষ্ঠান। মাথার ওপর সতেজ পাতার নিটোল আচ্ছাদন। জ্বলন্ত গ্রীষ্মেও স্নিগ্ধ ছায়ার অনাবিল আশ্বাস। আশ্রিত পক্ষিকূলের কলকাকলিতে প্রাণবন্ত সারাটাদিন।

পরশের মনে হয় এমন একটা গাছ আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই থাকা দরকার কাছে হোক বা দূরে। কিছুটা বিশ্রাম, কিছুটা শান্তির জন্যে। নিরাপদে, নিশ্চিন্তে দু’দণ্ড বসার জন্যে, বসে ভাবার জন্যে। আর সবচেয়ে বেশী দরকার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে। যেখানে বার বার এক দৌড়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে অল্প আয়াসে। চোর চোর খেলায় বার বার বুড়ি ছুঁয়ে ফেলার মতো।

এমন একটা গাছ সত্যিই ছিল। আজও হয়তো আছে স্বমহিমায়। সেখানে যেতেই হবে একদিন। পথ যদিও আগের চেয়ে সুগম হয়েছে। তবু মনে হয় অনেক দূরের সে পথ, এ জীবনে পার হওয়া সম্ভব হবে না আর। তবু চেষ্টা করে যেতে হবে বারবার। অন্ততঃ আরেকবার সেই গাছটার কাছে পৌঁছে যেতে চায় পরশ। সে উপলব্ধি করে যেদিন পৌঁছে যাবে সেদিন সেও গাছই হয়ে যাবে। সুদীর্ঘ কালের নীরব এবং নিরপেক্ষ সাক্ষী হয়ে সে তাকিয়ে থাকবে কখনো মাটির দিকে কখনো আকাশের দিকে। 

 

পরশের দেশের বাড়ি খুব দূর নয় কলকাতা থেকে। ভোরে হাওড়া থেকে ট্রেন। স্টেসনে নেমে বাস। সওয়া নটা নাগাদ বাস থেকে নেমে বাসস্টপের পাশেই নারাণ ময়রার দোকানে মন্ডা আর রসগোল্লা খেয়ে পথচলা শুরু। বাসস্টপ থেকে একটু এগোলেই বড় একটা গ্রাম একটা মসজিদ, দুটো মন্দিরের পাশ কাটিয়ে...।

বাবার যে একটা ডাকনাম আছে সেটা প্রায় ভুলেই গেছিল পরশ। বাড়িতে বাবার পরিচিত যাঁরা আসেন পাড়ার বা অফিসের কলিগ, সকলেই জীবনবাবু বা জীবনদা ডাকেন। বাবা সবার বড় বলে কাকা ও পিসিমারা ডাকেন বড়দা। দিদিমা, বড়মামা ডাকেন জীবন বলে, বাকিরা সবাই ছোট তাই জামাইবাবু। একমাত্র ঠাকুমা ডাকতেন মান্তু বলে। দাদুকে পরশ দেখেনি, আর ঠাকুমাও চলে গেলেন বেশ কবছর হল। কাজেই বাবার ডাকনামটা প্রায় ভুলতেই বসেছিল।

পথে বাবার পরিচিত নানা বয়সের মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল। চলছিল প্রণাম দেওয়া এবং নেওয়া। কখনো বা আলিঙ্গন। সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ। পাশে থেকে পরশ দেখছিল, শুনছিল। বাবাও যে কোনসময় ছোট ছিলেন, স্কুলে গেছেন, দৌরাত্ম্য করেছেন স্কুলে, পাড়ায়, গ্রামে। কানমলা, গাঁট্টা খাওয়ার মতো অপরাধ যে বাবাও কোনদিন করতে পারেন, এটা কোনদিন মনেই হয়নি পরশের। এইসব গ্রামগুলির মাঠে ঘাটে রাস্তার ধুলোয়, পুকুরের জলে তার ছোট্ট বাবার বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনী মিশে আছে। বাস্তবিক এখানে না এলে, পরশের কাছে এইসব অভিনব সংবাদ অধরা থেকে যেত চিরদিন।

গ্রামটা পার হয়ে বেশ কিছুটা আবাদি জমি। তারপর ডাঙা জমির ওপর সেই বটগাছটা। অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ে। পড়বেই না পড়ে উপায় নেই, এমনই অমোঘ তার উপস্থিতি।

এই গাছটার নীচে আয় একটু বসি

আর কদ্দুর বাবা, এখান থেকে?

অনেকখানি, ধর যতটা এলাম এতক্ষণ, ততটাই হবে প্রায়। সামনের এই মাঠটা পার হয়ে, ওই যে অনেক গাছপালা ওইটে আমাদের গ্রাম

পরশ দূরের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে দূরত্বটা।

এই গাছটা আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি। একইরকম বিশাল। যে গ্রামটা পার হয়ে এইমাত্র এলাম ওখানেই আমরা পড়তে আসতাম। পাঠশালা থেকে ফেরার পথে এইখানে হয়ে যেতাম

কি করতে এখানে?

তোরা কি করিস স্কুল ছুটির পর। বাবার চোখে দুষ্টু দুষ্টু মজার আলো।

খেলি

আমরাও খেলতাম। তোদের স্কুলে ছোটদের জন্যে দোলনা, সি-স, বানিয়ে রাখা আছে। আমাদের ছোটবেলায় এটাই আমাদের খেলার জায়গা ছিল। ঝুলে থাকা এই ঝুড়ি থেকে ঝুলতাম দুলতাম। হাত পা ছড়ে যেত। বাড়িতে ধরা পড়লে মা পেটাত খুব। বলত দস্যি ছেলে কোনদিন পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবি যে

ঠাকুমা মারত তোমাকে? দেখে তো মনে হয়নি কোনদিন। আমাদের তো কোনদিন বকেছেন বলেও মনে পড়ে না

তোরা তো নাতি। তোদেরকে তো ভালবাসবেই। আমাদের এদিকে, একটা কথা আছে, “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। আমাদের মায়ের কাছে আমরা হলাম যেন টাকা, আর তোরা হচ্ছিস সুদ। অনেক কষ্টে, অনেক যত্নে ছেলেমেয়েদের সুস্থভাবে বড়ো করে তোলার পরেই না আসে সুদ, অতএব তার মিষ্টত্ব স্বাভাবিক। তাছাড়া বয়েস হলে মানুষ অনেক শান্ত হয়ে যায় না? আমি, তোর মা তোকে কম পিটিয়েছি ছোটবেলায়। বাবা লাজুক হাসেন। দেখবি, তোর যখন ছেলেমেয়ে হবে, ভীষণ ভীষণ আদর করব। তোরা শাসন করতে গেলে, মারধোর করতে গেলে, দেখবি বাধা দেব। উপদেশ দেব বাচ্চারা অমন একটু-আধটু করতেই পারে

 বাবার চোখের দৃষ্টি ভীষণ নরম আর মায়াময়। এই বটগাছের মতোই যেন। ভীষণ স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা।

 এতটা পথ হেঁটে আসতে কষ্ট হয়নি তো তোর? এই গরমে

নাঃ, কষ্ট হয়নি, বাবা

তোদের তো অব্যেস নেই

তোমার যেন আছে। তুমিও তো কলকাতাতে ট্রাম বাস ট্যাক্সিতেই অভ্যস্ত বহুকাল

তা ঠিক। তবে কি জানিস, আমাদের বনেদটা তৈরি হয়েছিল এই কষ্ট দিয়েই। নাঃ, ভুল বললাম। তখনকার দিনে এগুলোকে কেউ কষ্ট বলে ভাবতাম না। ভাবনা তো দূরের কথা, মাথাতেই আসত না। এছাড়া যে অন্য কিছু হওয়া সম্ভব, সেই চেতনাটাই ছিল না যে! পাঠশালা ছেড়ে আমরা যে হাইস্কুলে পড়তাম, সেটা এই তল্লাটের একমাত্র হাইস্কুল। আমাদের গ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক দূরে। রোজ সাইকেলে যেতাম। সবাই, সে যত ধনীই হোক বা দরিদ্র, একই ভাবে রোজ মাইল দশেক প্রায় সাইকেল চালাতাম। কিন্তু সত্যিকার কষ্টটা হত বর্ষাকালে। যখন মাঠ ঘাট প্রায়ই ডুবে থাকত জলে, আর মাঝে মাঝে বান আসত নদীতে। তখন তো আর সাইকেল চলবে না, পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় কি?

কিছুক্ষণ থেমে বাবা আবার বললেন, “আমরা গেছি, আমাদের আগেও বাবা কাকারা গেছেন, আমাদের পরেও বহুদিন চলেছে এইভাবে। স্কুল থেকে ফিরে মাঠে দৌড়িদৌড়ি করেছি বল নিয়ে। এই ভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল আমাদের সেই জীবনযাত্রা। একসঙ্গে যাওয়া আসা করতাম এক গাঁয়ের ছেলেরা। ফাজলামি, পেছনে লাগা, মাঝে মাঝে বদমায়েসি সবই ঘটত চলার পথেই। সবার অলক্ষ্যে গড়ে উঠত এক একটা সম্পর্ক। অনেককে মেনে নেওয়ার, অনেকের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠত এই নিত্য পথ চলায়

আমরা যারা শহরে থাকি, আরামে যাওয়া আসা করি, আমরা কি এই সম্পর্কটা মিস করি?

ডেফিনিটলি। ক্লাসে কতটুকু সময় পাস বন্ধুত্ব করার - টিফিনের সময়টুকু ছাড়া? স্কুল ছুটি হলেই সবাই বেরিয়ে পড়িস কেউ স্কুল বাসে, কেউ ভাড়ার গাড়ি, কেউ নিজের গাড়ি। কেউ কেউ ট্রামে, বাসে বা পায়ে হেঁটে। যাই বলিস আমরা যে স্মৃতি বয়ে চলেছি তোরা তার ভগ্নাংশও কল্পনা করতে পারবি না। সব স্মৃতিই আনন্দের বা সুখের নয়। স্মৃতিও গাছের মতোই। কেউ ফল দেয়, ফুল দেয়। কেউ কাঁটা দেয়। কেউ কিচ্ছু দেয় না দেয় শুধু শান্তি। এই বটগাছটার মতো

 বাবা চুপ করে গিয়েছিলেন। চোখ বন্ধ। মনে হয় গভীর কোন চিন্তায় মগ্ন। পরশ কলকাতায় বাবাকে এত কথা বলতে শোনেনি কোনদিন। বাবা বরাবরই গম্ভীর এবং বাংলা সিনেমার বাবাদের মতো ভয়ংকর না হলেও, সমীহ কাড়া দূরত্ব বজায় রাখতেন সবসময়েই। 

এই গ্রাম, এই মহীরুহ বট, দীর্ঘ অদর্শনের পর এত পরিচিত জন, বাবাকে বিচলিত করেছে। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরে আসছে চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে, আবেগে ভাসিয়ে দিয়ে।

অনেকক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা তাকালেন, মুখে লাজুক হাসি, বললেন, তোদের ভাষায় বললে, বোর হলি তো?

নাঃ, একদম না। পরশ হাসে। বরং ভীষণ ভাল লাগছে। আসার সময় বহুদূর থেকে এই জায়গাটা দেখে সত্যি দারুণ লাগছিল। চারিদিকে বহুদূর বিস্তৃত মাঠ, জমি, আশেপাশে কিছু এলেবেলে তালগাছ। তার মধ্যে এই গাছটির সুপ্রাচীন অস্তিত্ত্ব। নিমেষে মন ভাল হয়ে গেল। কিন্তু এতক্ষণ বসার পর মনে হচ্ছে এই গাছটার বোধহয় কোন জাদু আছে। অনেস্টলি বাবা, এখানে না এলে, তোমাকে এভাবে হয়তো চিনতামই না। তোমাকে এত কথা আমি অন্ততঃ কোনদিন বলতে শুনিনি। অনেক না বলা কথা তোমার ভেতরে জমা ছিল। আজ তুমি প্রকাশ করলে। তুমি আজ যখন বলছিলে বাবা, আমার চোখের সামনে থেকে পর্দাটা যেন সরে গেল। তোমাদের সেই শান্ত নিস্তরঙ্গ ফেলে আসা দিনগুলো যেন ফুটে উঠল চোখের সামনে। রিয়েলি, এই গাছটা জাস্ট গাছ নয়, যেন যেন - কি বলব যেন একটা ব্যক্তিত্ত্ব। বাবা মুচকি মুচকি হাসছিলেন।

লজ্জা পেয়ে পরশ বলে, হেসো না, বাবা। আমার মনে হল তাই বলে ফেললাম, ব্যস

হাসছিলাম তোর কথা শুনে নয়” – হাসি মুখেই বাবা বললেন ভাল লাগল তোর ফিলিংসটা। বুঝলাম আমার ছেলে হিসেবে তুই খুব একটা খারাপ নোস

দেখলে তো বাবা, তোমার রবি ঠাকুরের ভাষায়, এতদিন আমাদের চেনাশোনা ছিল, আজ থেকে জানাশোনা-র সূত্রপাত হল পরশের মুখে ফাজিল হাসি।

তোর মুখে রবীন্দ্রনাথ! কবে পড়লি শেষের কবিতা’”?

না না অতোটা আশাবাদী হয়ো না, ক্যাসেটটা শুনছিলাম একদিন

পড়িস, সুযোগ পেলেই পড়িস। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জীবনটাকে চিনতে বেশ অসুবিধে হয়

অ্যাই, তোমার আবার শুরু হল। রবি ঠাকুরে অবসেসন তোমার আর পাল্টাবার নয়

কি এমন ঘটল যে - যার জন্যে অন্তুতঃ এই বিষয়ে নিজেকে পাল্টে ফেলতে হবে!

তোমার ঘটেনি, কিন্তু আমার ঘটেছে। গম্ভীর মুখে পরশ ব্যক্ত করে।

কি? বাবার চোখে বিস্ময়।

এতদিন তোমার গাম্ভীর্যের ধাক্কায় তোমাকে ওরে বাব্বা ভাবতাম। আজ থেকে শুধু বাবা - খুব ভালোবাসার প্রিয়জন বাবা ভাবব

এতটা ম্যাচিওরড হয়ে গেছিস তুই, বুঝিনি তো!

একটু পরে বললেন, নে ওঠ, এখনো অনেকটা পথ যেতে হবে 

 

অনেকটা পথ যেতে হবে। তাই আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হল পরশ। তার গন্তব্য অনেকটাই দূর - জোকা পার হয়েও বেশ কিছুটা। রাজারহাট থেকে তিনটে নাগাদ বেরিয়েও ফোর্থ ফেজ-এর গেট অব্দি পৌঁছতে প্রায় পাঁচটা বাজিয়ে ফেলল পরশ। পার্কিংয়ে গাড়ি লক করতে করতে লক্ষ্য করল বাবা বারান্দায় বসে আছেন। পরশ হাত নাড়ল। বাবা কোন রেসপন্স করলেন না। হয়তো খেয়াল করেননি। আজ তো তার আসার কথা ছিল না, কাজেই পথ চেয়ে প্রতীক্ষায় থাকবেন এমনটাও নয়।

একটু দূর পরে বটে, কিন্তু বেশ ভাল এই হোমটা। অনেকটা জায়গা জুড়ে ক্যাম্পাস। বাড়িটাও বেশ বড়। অনেক গাছপালা, বড় বাগান, সুন্দর সাজানো। ব্যবস্থাপত্রও ভালোই। পরশ এদিক ওদিক অন্যান্য বৃদ্ধাবাস সম্পর্কে যা শুনেছে, তার তুলনায় এটা ওয়েল ম্যানেজড আর ওয়েল মেন্টেন্ড।

নীচের কাউন্টারের রেজিস্টারে নাম ধাম লিখে পরশ জোড়া জোড়া সিঁড়ি পার হয়ে দোতলায় উঠল। লম্বা করিডর ও দীর্ঘ বারান্দা পার হয়ে বাবার পিছনে দাঁড়াল পরশ। বাবা একই ভাবে বসে আছেন সামনের বড় গাছটার দিকে তাকিয়ে। পরশ গাছ-টাছ তেমন চেনে না, তবে গাছটা ঋজু, সুঠাম আর শাখাপ্রশাখা সমেত বেশ ঝাঁকালো জম্পেশ গাছ। বাবা সেটার দিকেই নিবিষ্ট তাকিয়ে আছেন।

 বাবা, কেমন আছ? খুব নরম গলায় ডাকতে পারল পরশ। বাবা কোনমতেই যেন চমকে না ওঠেন। অথবা বাবার এই নিবিড় একাকিত্বটুকু ভাঙতে তার যেন দ্বিধা।

ঘরে চেয়ার আছে, টেনে নিয়ে বোস। বাবা নির্দেশ দিলেন। ঘাড় ঘোরালেন না। মাথা তুললেন না। একইভাবে বসে রইলেন সামনের দিকে চেয়ে। পরশ বাবার ঘর থেকে চেয়ার এনে বাবার পাশে বসল।

কেমন আছ, বললে না তো?

তোরা কেমন আছিস। বৌমা, ঊশ্রী। ভাল আছে সবাই?

হ্যাঁ, সবাই ভাল আছে

ঊশ্রীর স্কুল এখন ছুটি না? নিয়ে আসতে পারতিস। অনেকদিন দেখিনি মেয়েটাকে

টিউশন, নাচের ক্লাস। পড়ার প্রচন্ড চাপ...

অস্বস্তি হচ্ছিল পরশের কথাগুলো বলতে। আজ সকালে এই নিয়ে অশান্তি হয়ে গেল খানিকটা। পরশের কন্যা ঊশ্রী আসতে চেয়ে মায়াবী চোখে বার বার দেখছিল পরশের দিকে। ওর মা প্রীতি কিছুতেই আসতে দিল না। একই অজুহাতে যেগুলো একটু আগে পরশ বাবাকে বলল। পরশ জানে, ঊশ্রী এলে বাবা এমন উদাসীন বসে থাকতে পারতেন না। ছোট্ট চঞ্চল পাখির মতো সে উড়ে আসত, দাদুর গলা জড়িয়ে ধরত। বাবার এই নিবির্কার বসার ভঙ্গি টুটে এলোমেলো হয়ে যেত অন্ততঃ এই সময়টুকুর জন্যে। পরশকেও ভাবতে হতো না কিভাবে সামাল দেবে বাবার এই উদাসীনতা।

 আজন্মই ঊশ্রী ভীষণ দাদু ন্যাওটা। স্কুল থেকে ফিরে জুতো খুলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত দাদুর কোলে। গলা জড়িয়ে পিঠে চেপে পড়ত। স্কুলের কথা কোন বন্ধু কী বলল, কোন আন্টি কী বলল কল কল করে বলে যেত অনর্গল। ওর মা বকত। বলত দাদুকে বিরক্ত না করতে। বাবা আপত্তি করলে বলত, বাবা নাকি আদিখ্যেতা দেখিয়ে নাতনীর বারোটা বাজাচ্ছেন! আর রাগটা গিয়ে পড়ত ঊশ্রীর ওপর। চড়চাপড় মারধোর খেয়েছে কত, তবু ঊশ্রী সুযোগ পেলেই চলে যেত তার দাদুর কাছে।

আজও মেয়েটা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে দাদুর জন্যে। পরশের মনে হয়। আজ সকালে প্রীতি যখন ঊশ্রীর আসাটা নাকচ করে দিল, মেয়েটার মুখটা ব্যাথায় পাথর হয়ে গেল। পরশ ঠিক করল খুব শিগ্‌গির সে আবার আসবে এবং ঊশ্রীকে নিয়ে আসবে সঙ্গে। প্রয়োজন হলে জোর করেই।

মুখোমুখি দুজনেই বসে চুপচাপ। অস্বস্তির পাহাড় সরিয়ে পরশ আবার জিগ্‌গেস করে, তুমি কিন্তু বললে না, বাবা, কেমন আছ?

বাবা কোন উত্তর দিলেন না। মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন, রোববার ছেড়ে আজকে হঠাৎ চলে এলি, অফিসে ছুটি নিয়ে? অফিসে কাজকর্ম সব ঠিকঠাক চলছে? বাবা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন পরশের দিকে।

হুঁ, চলছে, ঠিকঠাক চলছে সব

পরশ বলল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হল না যেন। বাবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পরশের ফাঁকটুকু যেন ধরা পড়ে গেল। স্নেহ, ভালোবাসা এবং সমস্ত সম্পর্কের টান থেকে উপড়ে নিজের বাবাকে ঠেলে দিয়েছে এই একাকিত্বের নিশ্ছিদ্র জগতে। কতোটুকুই বা দূর তার বাসা থেকে এই হোম তবু যেন মনে হয় সীমাহীন দূরত্ব। অনন্ত সময় যেন পার হয়ে যায় এখানে পৌঁছতে। এ নিয়ে অফিসে, পাড়ায় আড়ালে আলোচনা হয় কানে আসে তারও। শীতল সম্পর্কের ঘেরাটোপে আবদ্ধ পরশ লজ্জায় মাথা নত করে। মনে মনে বলে কিছুই ঠিক নেই, বাবা, কিচ্ছু ঠিক নেই।

এই গাড়িটা কবে নিলি। গতবার তো এটা দেখিনি

তুমি দেখেছ? তখন নীচে থেকে হাত নাড়লাম, ভাবলাম তুমি খেয়াল করনি। রিসেন্টলি নিয়েছি। মাস তিনেক হল

কিছুটা উজ্জ্বল হয় পরশ, পুত্রের সাফল্যে কোন পিতা না গবির্ত হয়?

আগেরটা কি গোলমাল করছিল কিছু?

না তেমন কিছু নয়। নতুন মডেল। লেটেস্ট ফেসিলিটি। বেটার মাইলেজ। তাই পাল্টে ফেললাম   

ভেরি গুড”। তারপর খুব ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করলেন, "নতুন মডেল। বেটার মাইলেজ। লেটেস্ট ফেসিলিটি”।

পরশ নিশ্চিত কথাগুলো আর যাই হোক নিছক প্রশংসা নয়। প্রতিটি কথায় উনি শ্লেষ মিশিয়েছেন চায়ের সঙ্গে কড়া চিনি মেশানোর মতো। প্রসঙ্গটা এড়াতে, অবান্তর জেনেও পরশ আচমকা জিজ্ঞেস করে ফেলল, বাবা, একবার দেশের বাড়ি যাবে?

হঠাৎ?

অনেকদিন যাওয়া হয় না। বহুদিন, তাই না? তাছাড়া ঊশ্রীওতো দেখল না আমাদের গ্রাম। ঘরবাড়ি

বেশ তো যাও না, ঘুরে এসো। আজকাল তো হাঁটতেও হয় না, গাড়ি যাবার মতো রাস্তা হয়ে গেছে শুনেছি। তবে গেলে শীতের সময় যেও। গরমে ঊশ্রীর বড় কষ্ট হবে

তুমি যাবে না”? 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা উত্তর দিলেন, নাঃ, কী হবে আর ওসবে, যাবার কোন মানে হয় না”।

তোমার সেই বটগাছটার কথা মনে আছে, বাবা।?

কোনটা? তোর সেই ব্যক্তিত্ববান বটগাছটি?

বাবার মুখে মৃদু হাসি। হাসিটা পুরোন কথা মনে পড়ে যাওয়ার জন্যে। নাকি পরশের প্রতি সামান্য বিদ্রূপ। পরশ ঠিক বুঝল না।

চলো না, বাবা, একবার। শুধু তুমি আর আমি। আর কেউ না। দুজনে অনেকক্ষণ বসে থাকব সেই গাছের নীচে। কোন কথা বলার ইচ্ছে হলে বলব। না, তো না   

পরশের কণ্ঠে মিনতির সুর। বাবা পরশের দিকে তাকালেন। তারপর পরশের কাঁধে হাত রাখলেন। কাঁধে বাবার স্পর্শ নিরাপত্তার এক অদ্ভূত বোধ সঞ্চার করল পরশের মনে। বাবা কিছু বললেন না। তাকিয়ে রইলেন সামনের গাছটার দিকে। পরশের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। নিজের কোলের ওপর জড়ো করে রাখলেন হাতদুটি। খুব জোরে শ্বাস নিলেন - সে আর হয় না। আর কখনো হবার নয়। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

কেন বাবা? দেখ গেলে ভালোই লাগবে

না রে, এই বেশ আছি আমি। এই বারান্দায় এই ভাবেই বসে থাকি সারাটাদিন। মাঝে মাঝে গান চালিয়ে দিয়ে আসি। রবীন্দ্রনাথ শুনি। এই ছোট্ট গন্ডিটুকুর বাইরে কী আছে, কী ঘটছে সে সব জেনে, আমার আর কী যাবে আসবে, বলতে পারিস? পেছনে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছি যে সব সম্পর্ক, তাদের থেকে না পারব মন খুলে কিছু নিতে, না পারব দিতে।

আজ আমরা যে যেখানে দাঁড়িয়ে, তার সব দায় তোর, এমন ভাবিস না। এটা ভালো নয়। এই ভাবনা তোকে কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে দেবে না, অথচ মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবি ধীরে ধীরে। কাছে থেকেও তুই যে এত কম আসিস। তুই কি আসতে পারিস না? পারিস, কিন্তু আসিস না সঙ্কোচে। কোন মুখে দাঁড়াব বাবার সামনে? কোন সান্ত্বনার কথা শোনাব এই ভাবনায়। সবই বুঝি।

নিজেকে বিপন্ন করি এই চিন্তায় যে, তুই নিজেকে কোথাও জুড়তে পারছিস না অন্তর থেকে। না আমার সঙ্গে। না বৌমার সঙ্গে। এমনকি তোর সন্তান ঊশ্রীও বঞ্চিতা হচ্ছে তার প্রকৃত পাওনা থেকে। বোঝা যাক বা না যাক, তোর কোলিগ, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী কেউ মেনে নিচ্ছে না তোর এই ছেঁড়াখোঁড়া সম্পর্কের টানাপোড়েন। মেনে নেওয়া সম্পর্ক আর মনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সে সম্পর্ক যত কাছের বা দূরেরই হোক না কেন

 সন্ধে হয়ে এল। হোমের গাছে গাছে বাসা বাঁধা পাখিরা ফিরে এসে ব্যাপক কিচিরমিচির করছে। শাঁখের আওয়াজ পাওয়া গেল না। প্রদীপ জ্বালালো না কেউ। ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠছে সব জায়গায়। ধূপের মৃদু গন্ধ এসে লাগল নাকে, কেউ জ্বালিয়েছে - হয়তো কোন ঘরে বা রিসেপশনে। বাবা অনেকগুলি কথা বলার পর চুপচাপ বসে রইলেন। পরশ একবার উঠে বাবার ঘরের লাইটটা অন করে দিয়ে এল। করিডোর আর বারান্দার লাইট এসে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল হোমের একজন, কাছাকাছি এল। ওদের দুজনকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে কিছু বলল না। চলে গেল।

 ঊশ্রীর কোন ক্লাস হল যেন, আজকাল এইসব ব্যাপারগুলো আর মনে রাখতে পারি না

সেভেন

কেমন করছে পড়াশোনা?

ওই একরকম। পড়তে চায় না। পড়ায় মন নেই

মারধোর করিস নাকি খুব?

নাঃ ওর মা করে, একটু আধটু। খুব জেদি মেয়েটা -কিছুটা স্টাবোর্ন

 বাবা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মাথা নাড়লেন বার বার। বললেন, এমনটা কি হবার কথা ছিল? বৌমাও চান নি। তুমিও না। কেউ না। কিন্তু ঘটে যাচ্ছে এইসব। অনিবার্য পরিণতির দিকেই চলছে সব কিছু। অমোঘ নিয়তির মতো

খুব চঞ্চল আর বিভ্রান্ত লাগছে বাবাকে। যেন অতিষ্ঠ। উঠে দাঁড়ালেন। হতাশায় বিবর্ণ মুখ। কিছুটা রূঢ় ভাবে বললেন, তুমি এসো। আর থেকো না এখানে। তোমার দেরী হয়ে যাবে ফিরতে। আবার অশান্তি হবে। ভীষণ কষ্ট পাবে মেয়েটা

পরশ উঠে দাঁড়াল। কিছু বলতে পারল না। কথাগুলো কতটা সত্যি তার চেয়ে বেশী আর কে জানে?

আসছি, বাবা

এসো। আবার এসো। খুব অসুবিধে না হলে ঊশ্রীকে আনবে পরেরবার

 পরশ এগিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে। প্রণাম করে বাবাকে। সমস্ত অন্তর নত হয়ে আসে তার এই সমর্পণে। বাবা কাঁধে হাত রাখেন একবার। অস্ফুটে বললেন, সাবধানে যেও

পরশ নীচে নেমে এল। খুব ধীরে ধীরে। তার শরীরে শক্তি আর নেই যেন। নীচে পার্কিং লটে গাড়ির দরজা খুলে তাকাল দোতলার বারান্দায়। বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পরশ হাত তুলতে গিয়েও নিরস্ত হল। মাথা নীচু করে কিছু ভাবল এবং একটা কথা মনে পড়ল হঠাৎ - “টাকার চেয়ে সুদ মিষ্টি”। বহুদিন আগে বাবা বলেছিলেন। তাঁর জীবনে ঊশ্রীর সান্নিধ্যের মাধুর্যটুকু উপভোগের সময়েই সে কি তার বাবাকে চরম বঞ্চিত করল না – তাঁকে নিঃসঙ্গ একাকীত্বের শেকলে বেঁধে?  ক্লান্ত বিষণ্ণ শরীরটা গাড়ির সিটে ছেড়ে দিয়ে, সে গাড়ি স্টার্ট করল।

নীরব উদাসীনতায় ঋজু এক মহীরূহের মতোই বারান্দায় বসে রইলেন তার বাবা। আশে পাশে স্নিগ্ধ ছায়া মেলে। 

-০০-

রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

অপর্ণা

   বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক

    

এর আগের বড়োদের গল্প - " প্রসাদী ফুল "

এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২ " 


এবারে মনোতোষ পালের জবরদস্ত ব্যস্ততা। চোদ্দখানা প্রতিমার অর্ডার আছে তার হাতেগতবারে ছিল মাত্র আটটা। এই কৃতিত্বের পুরোটাই তার ছেলে সিধুর।  ছেলে সিধুর জন্যে গর্বের শেষ নেই মনোতোষের। রীতিমত গ্র্যাজুয়েট পাস করা ছেলে তার। বছর তিনেক আগেও সিধুর খুব ঝোঁক ছিল লেখাপড়ার দিকে আর গ্র্যাজুয়েট পাস দিয়ে চাকরির দিকে। প্রতিমা গড়ার কাজ সিধু করত ঠিকই – কিন্তু মন দিত না তেমন। বাবার পরিশ্রম কিছুটা লাঘব করার জন্যে আর মায়ের তাগিদে একরকম বাধ্য হয়েই সে হেল্প করতো বাবাকে। প্রায় বছর দুয়েক লাগাতার চেষ্টার পরেও কোন চাকরি জোগাড় করতে না পেরে, গত বছর থেকে সিধু মন দিয়েছে প্রতিমা গড়ার কাজে।

মনোতোষের প্রতিমা গড়ার শিক্ষা তার বাবা পরাণ পালের কাছে, সে নিজে প্রতিমা গড়ে চলেছে নয় নয় করে বছর তিরিশেক তো হলই। কিন্তু মনোতোষ দেখেছে সিধুর আঙুলে জাদু আছেসিধুর হাতের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ পেয়ে যায় খড়-মাটির প্রতিমাগুলো, এ জিনিষ সে কোনদিন করে উঠতে পারেনি, পারেনি তার বাবা পরাণ পালও। মুগ্ধ চোখে দুদণ্ড চেয়ে থাকতে হয় প্রতিমার মুখের দিকে, তাদের হাত পা শরীরের গড়নের দিকে। প্রতিমার চোখ যেন টলটলে জীবন্ত, ভাষা ফুটে ওঠে তাদের হাতের পেলব আঙুলের ভঙ্গিতে। সিধুর হাতের আঙুল যেন কথা কয় নরম মাটি আর রং-তুলির সঙ্গে।

মনোতোষ নিজে এবং তার বাবাও প্রতিমার রেডিমেড মুখের ছাঁচ কিনে আনত কলকাতা থেকে। প্রতিমার গড়ন বা ভঙ্গি যাই হোক, মুখের আদল থাকত একই ছাঁচের। সে মা দুগ্‌গা, মা লক্ষ্মী, মা সরস্বতী যাই হোক না কেন। গতবার সিধুর কি খেয়াল হল, নিজেই বসে গেল ছাঁচ বানাতে। কটাদিন একমনে বসে, প্যারিস প্লাস্টারে বানিয়ে তুলল মুখের ছাঁচ। তাও এক আধখানা নয় একদম তিন সেট – দুগ্‌গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কাত্তিক গণেশ সব আলাদা মুখএমনকি গতবার সিধু মা কালীর মুখও আলাদা বানিয়েছিল। মনোতোষ যদিও একবার আপত্তি করেছিল, কি হবে আবার নতুন ছাঁচ বানিয়ে, মা দুগ্‌গার মুখই তো চলে যাবে মা কালীতেও, সিধু শোনেনি। সিধুর এই শিল্পীসুলভ আন্তরিকতার ফল মিলেছে এইবার। দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার বেড়ে গিয়েছে ছটা, কালীপ্রতিমার অর্ডারও বিস্তর আসছে! 

অর্ডার আছে চোদ্দটা কিন্তু কঞ্চির কাঠামোতে খড় বেঁধে প্রতিমার আকার গড়ে উঠেছে পনেরটা। বিভিন্ন তাদের গড়ন, বিভিন্ন তাদের ভঙ্গি। এক চালা প্রতিমা, আলাদা আলাদা প্রতিমাদুটো আছে ডায়নামিক - মা দুর্গার সঙ্গে অসুরের ভীষণ লড়াইয়ের মূহুর্তটা যেন স্থির হয়ে আছে আকারে। কিন্তু একটার আকার বুঝতে পারছে না মনোতোষঅর্ডার নেই, কিন্তু সিধু ওটা নিজেই বানিয়েছে। একদম অন্যরকম। মা দুগ্‌গা আর অসুর ছাড়া অন্য আর কেউ নেই। প্রমাণ সাইজের মূর্তি, খুব সাধারণ। মনোতোষের একদম পছন্দ হয়নি। মনোতোষ সিধুকে জিগ্যেস করেছিল, “এটা কী বানাচ্ছিস তুই বল তো? কিছুই তো বুজছি না। অর্ডার ছাড়া প্রতিমা বানিয়ে কী হবে?”

সিধু সেই কাঠামোর দিকে তাকিয়ে বলেছিল “এটা কারোর নয়, এমনিই। আগে তো বানাতে দাও, তারপর দেখো” মনোতোষ অবাক হলেও, কিছু বলল না, ছেলের ওপর তার আস্থা আছে। সে বিশ্বাস করে তার ছেলে একজন প্রকৃত শিল্পী, বাঁধাধরা কাজের বাইরে নতুন কিছু করার তার সাহস আছে, যে সাহস তার ছিল না। ছিল না তার বাবারও তবু তার মনে ধন্দ থাকে, এ যুগের ছেলেছোকরা, কি বানাতে, কি বানিয়ে ফেলে, লোকে আবার দুটো কথা না শুনিয়ে যায়! ঠাকুর দেবতা নিয়ে ছেলেখেলাও একদম পছন্দ হয় না মনোতোষ পালের।

পঞ্চমী বা ষষ্ঠীর দিন সব মূর্তিই রওনা হয়ে যাবে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। একটা প্রতিমার আবার স্পেশাল অর্ডার – মহালয়ার দুদিন আগেই তিনি রওনা হবেন। সেই ক্লাবের সেক্রেটারি বলেছে, কোন এক সাংঘাতিক ভিআইপি নাকি খুব ব্যস্ত। তাঁর হাতে এতটুকু সময়ও নেই। তিনি মহালয়ার দিনই প্রতিমা উদ্বোধন করে ফেলতে চান। কারণ ওই দিন তাঁর হাতে ঘন্টা কয়েক সময় বেঁচে আছে – এবং ওই সময়েই তিনি গোটা দশেক প্রতিমা উদ্বোধন করে ল্যাঠা চুকিয়ে অন্য জরুরি কাজে ঢুকে পড়তে চান।  

পিতৃপক্ষের অমাবস্যাতেই মায়ের মূর্তি উদ্বোধনের ব্যাপারটা তেমন হজম হয়নি মনোতোষের। তবে মনে মনে বিরক্ত হলেও সে কিছু বলতে পারেনি। এই সব ক্লাবের কর্তারা – ছোটা এই শহরেরও হর্তা-কর্তা-বিধাতা। তেঁনারাও বেশ জাঁদরেল ধরনের ভিআইপি, তাঁদের চটিয়ে ভিটে-মাটি চাঁটি করার দুর্বুদ্ধি মনোতোষের কোনদিনই হয়নি।  

অতএব মাঝে আর মাত্র বাইশ দিন। সব কাঠামোর মাটির কাজ শেষ। বাপ ছেলের ব্যস্ততার অন্ত নেই। মিহিন মাটির দুই পরতের পর মসৃণ হয়ে উঠছে প্রতিমার শরীর। পাতলা কাপড়ের ফালিতে নিটোল জুড়ে উঠছে কনুই, কব্জি আর গলার ভাঁজ। নিষ্প্রাণ নিখুঁত মুখ নিয়ে জেগে উঠছে প্রতিমার শরীরি ভাষা। প্রতিমার পীন বক্ষের সুডৌল আদল গড়তে গড়তে মনোতোষ লক্ষ্য করল সিধু একমনে গড়ে চলেছে একটি মেয়ের আর একটি পুরুষের মুখ। কিন্তু ও কার মুখ, কিসের মুখ?

মনোতোষ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ”ওটা কার মুখ বানাচ্ছিস রে? মায়ের মুখ বলে মনে হচ্ছে না তো”?

”মায়ের মুখ বানাচ্ছি না তো মায়ের মুখ না হোক, একটা মেয়ের মুখতো বটে? সব মেয়ের মুখই কি মাদুগ্‌গার পারা হয়”?

“ও মুর্তিটা আসলে কিসের বল দেখি? মাত্র দুখানা হাত - মা দুগ্‌গা তো নয়, আর এদিকে অসুরের চারখানা হাত? কোন শাস্ত্রে এমনটা আছে আমাকে বল দেখি”

“সব কি শাস্ত্রে থাকে? শাস্ত্র বানানো হয়েছিল সে কত্তো যুগ আগে! যারা বানিয়েছিল তাদের ঘরে টিভি ছিল, না কোলে ল্যাপটপ ছিল, না কি হাতে ছিল মোবাইল? শাস্ত্র বদলাতে হবে। তুমি এসব বেকার ভাবচো কেন বলো তো, মূর্তিটা বানাচ্ছি আমার নিজের জন্যে”

“কাজের সময় অকাজে বেকার টাইম বরবাদ করিস ক্যানো? এখনো কত কাজ বাকি আছে সে খেয়াল আছে, তোর”?

“আছে, আছে সব আছে। তুমি টেনসান করো না তো, সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে, সময়মতো” 

 

এই এলাকার প্রধান হিসেবে গণপতি ঘোড়ুইকে সমঝে না চলে উপায় নেই। মহলায়ার দুদিন আগে সকাল সাড়ে নটা নাগাদ গণপতি ঘোড়ুই স্করপিও নিয়ে এসেছেন মনোতোষের বাড়ি, সঙ্গে ক্লাবের আরো চারজন। 

“কি মনোতোষবাবু, প্রতিমা কদ্দূর? আজ ছেলেরা বিকেলের দিকে এসে তুলে নেবে কিন্তু। পরশু উদ্বোধন, মিনিস্টার আসবে ফিঁতে কাটতে”।

মনোতোষ বিগলিত হাসি মুখে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “আপনার প্রতিমা, একদম রেডি স্যার। এখনই নিয়ে যেতে পারেন। এইধারে আসুন, দেখে নিন মনোমত হল কিনা”? লম্বা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু মনোতোষের পিছন পিছন ঢুকে পড়লেন তিরপল ঘেরা টালির চাল দেওয়া মনোতোষের বিশাল কারখানায়। পাঁচ-ছটা বালবের আলোয় বিশাল ঘরের অনেকটাই আলো আঁধারি। পাশাপাশি সাজানো মূর্তির সারি দেখাতে দেখাতে মনোতোষ এগিয়ে নিয়ে চলল গণপতিবাবুকে,  

“এইটে “সবুজ সংঘ”, এটা “নতুন দল”, ওটা “মুচকুন্দপুর আমরা সবাই”, এটা “চাঁপাডাঙা মুক্তি ক্লাব”, আর এই যে, এইটে আপনাদের – মাঝেরপাড়া “নবজীবন সংঘ”“গণপতিবাবু আর তাঁর চার সঙ্গী সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ প্রতিমাগুলিকে নিরীক্ষণ করলেন।

গণপতিবাবু আধখানা সিগারেট পায়ের তলায় নিভিয়ে দিয়ে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মনে হচ্ছে, রে তপু, পছন্দ? কিরে প্রদীপ, কিছু বল”?

সকলের চোখেই মুগ্ধ দৃষ্টি, প্রদীপ বলল-

“একদম ফাটিয়ে দিয়েছে গণাদা, একঘর হয়েছে কিন্তু। কি বল তপু?”

তপুও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কোন কথা হবে না, বস। ফাটাফাটি”।

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলেছিলাম কিনা, মনোতোষ পাল কলকাতার যে কোন শিল্পীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়”।

“কি যে বলেন, স্যার। সবই আপনাদের আশীব্বাদ আর মায়ের কৃপা। নিজের ছেলের কথা স্যার না বলাই ভালো, তবু বলব, সিদ্ধেশ্বরের হাতে স্যার মায়ের কৃপা আছে। আপনারা যদি একটু নজর রাখেন – ওর বাপ ঠাকুদ্দাকেও ও মনে হয় ছাড়িয়ে যাবে”

“বটে? এই মূর্তি কি তোমার ছেলেই বানিয়েছে নাকি, হে”?

“বাপ-ব্যাটা দুজনেই বানাই, তবে ওই মুখ আর তুলির টান আজকাল সিধুই দেয়”

“হুঁ। ভেরি গুড। চলুনতো আপনার অন্য প্রতিমাগুলোও দেখি”। গণপতিবাবু এগিয়ে চললেন আরো ভেতরে।  

টুকটাক কিছু কাজ বাকি থাকলেও, চোদ্দখানা সুসজ্জিতা এবং সালংকারা প্রতিমা নিজ নিজ পূজা মণ্ডপে রওনা হবার অপেক্ষায় রয়েছেনসবগুলি প্রতিমা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গণপতিবাবু স্পষ্টতঃ বেশ আনন্দ পেলেন।

প্রদীপ গণপতিবাবুকে বলল, “গণাদা, কালীঠাকুরটাও তাহলে এরাই বানাক না। অর্ডার দিয়ে দেবেন”?

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে গণপতিবাবু বললেন, “বলছিস”?

“প্রদীপ একদম ঠিক বলেছে, গণাদা”। অর্ডার দিয়ে দিলেই ভালো”। তপুও সমর্থন করল প্রদীপকে।

 গণপতিবাবু বললেন, “মনোতোষবাবু, আপনাকে আমাদের ক্লাবের কালীঠাকুরও যে বানাতে হবে”।

“একটু মুশকিলে ফেললেন, স্যার। অলরেডি বাইশটা মা কালীর অর্ডার নিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, স্যার কিন্তু আপনি বললে না-ই বা বলি কি করে? আচ্ছা দেখব, স্যার করে দেব যে করে হোক”।

“গুড। ভেরি গুড। ওদিকে আরেকটা কি প্রতিমা বানাচ্ছে, ওই কি আপনার ছেলে”? একটু আড়ালে আধো অন্ধকারে বসে সিধু একমনে তার নিজস্ব প্রতিমায় তুলির টানে ফুটিয়ে তুলছিল ভাষা।

“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, ওই আমার ছেলে, সিধু – সিদ্ধেশ্বর পাল, কোন অর্ডারের প্রতিমা নয় স্যার, এমনিই বানাচ্ছে – অল্প বয়সের খামখেয়াল আর কিমাথামুণ্ডু নেই, একদম ফালতু, স্যার”।

“তাই নাকি? কই চলো তো দেখি” গণপতিবাবু এগিয়ে গেলেন, যেদিকে সিদ্ধেশ্বর একমনে প্রতিমা বানাচ্ছিল, সেই দিকে। 

ওরা পাঁচজন এসে তার পিছনে যে দাঁড়িয়েছে, সিধু জানতেই পারল না, এতটাই মনযোগে সে কাজ করছিল। তার প্রতিমা বানানো প্রায় হয়ে এসেছিল, টুকটাক কিছু কাজ বাকি। খুব সাধারণ একটি দ্বিভুজা মেয়ে। পরনে খুবই সাধারণ শাড়ি, নিরাভরণ কাঁধে কলেজের বই নেওয়ার ব্যাগ। তার দু চোখে না আছে রুদ্র অসুরবিনাশিনী দৃষ্টি, না আছে করুণাঘন মাতৃত্ববরং দুচোখে তার ভয়ার্ত ব্যাকুলতাতার দুই করে না আছে কোন প্রহরণ, না আছে বরাভয়ের আশ্বাস। বরং আছে চরম বিপদের থেকে পরিত্রাণের ব্যাকুলতা। তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছে অতি সাধারণ চেহারার এক চতুর্ভুজ ব্যক্তি। মুখে তার লাম্পট্যের হাসি পরনে তার সাধারণ জামা আর লুঙ্গি। তার চেহারা অসুর সুলভ পেশীবহুল নয় ঠিকই – কিন্তু শরীরে তার চরম ঔদ্ধত্য। তার আসল শক্তি প্রশ্রয়, চোখে দেখা যায় না, আড়ালে থাকে। আশে পাশে আর কিছু নেই – না সিংহ, না নিহত মহিষ। 

“সিধু, বাবুমশাইরা এসেছেন তোর কাজ দেখতে” মনোতোষের ডাকে চমকে ঘাড় ফেরাল সিধু। উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল সকলকে, কিন্তু কোন কথা বলল না। গণপতিবাবু আরো কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন প্রতিমাটি। গণপতিবাবুর কানে কানে তপু কিছু বলল, শোনা গেল না।

“তোমার নাম সিদ্ধেশ্বর তো? তুমি মনোতোষের ছেলে, তাই তো”? গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যার” সিধু উত্তর দিল।

প্রতিমার দিকে নির্দেশ করে গণপতিবাবু জিগ্যেস করলেন, “এটা কী হয়েছে”?

“এটা এমনিই বানিয়েছি, তেমন কিছু নয়, স্যার”।

“বল কি হে, তেমন কিছু নয়? আমি তো অনেক কিছু দেখছি হে, অনেক বক্তব্য! বল না হে, তোমার বক্তব্যই বা কি আর মতলবটাই বা কি?” গণপতিবাবু্ তীব্র শ্লেষ নিয়ে জিগ্যেস করলেন সিধুকে।

“সত্যি বলছি স্যার, তেমন কিছু ভেবে বানাই নি” সিধুর কণ্ঠে ভয় –”হঠাৎ মনে হল, তাই”।

“হঠাৎ মনে হল আর বানিয়ে ফেললে? তাও একেবারে “ব্রেকিং নিউজ”, য়্যাঁ? তোমাদের তো ভালোমানুষ বলেই জানতাম, হে। কি মনোতোষ? এইসব প্রতিবাদের ঠিকা আবার কবে থেকে নিজেদের মাথায় তুলে নিলে? এদিকে আবার বলছো কোন মতলব নেই, উঁহু, এসব তো ভালো কথা নয় হে, মনোতোষ” 

 

সাড়ে বারোটার একটু আগে, দুটো ট্রাক নিয়ে ওরা এল। জনা পঁচিশেক ছোকরা। খুব যত্ন করে তুলে নিলে “নবজীবন সংঘ”-এর সব কটি প্রতিমা। আলাদা করে রাখা প্রতিমার সমস্ত শস্ত্রও তুলে নিল ট্রাকে। তারপর সকলে আবার নেমে এল, তাদের হাতে তখন লোহার রড এবং হকি স্টিক। তারা একসঙ্গে ঢুকে পড়ল মনোতোষের কারখানায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোহার রড আর হকি স্টিক দিয়ে ভাঙতে লাগল সমস্ত প্রতিমার হাত আর মাথা। আঘাত করতে লাগল সমস্ত প্রতিমার শরীরে। নির্বাক সুন্দর প্রতিমার মাথাগুলো ভেঙে ভেঙে পড়তে লাগল মেঝেয়। বাধা দিতে এসেছিল মনোতোষ আর সিধু। চারজনে মিলে বাপ আর ছেলেকে বেধড়ক মেরে ফেলে রেখে চলে গেল ঝড়ো হাওয়ার মতো।

 

ওরা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সিধু উঠে দাঁড়াল এবং বাবাকে ধরে তুলল মেঝে থেকে। সিধুকে জড়িয়ে ধরে মনোতোষ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল, “আমাদের এখন কি হবে, সিধু? হাতে আর মাত্র পাঁচ-ছদিন। ক্লাবের লোকেরা আসবে প্রতিমা নিতে, কী জবাব দেবো তাদের? মণ্ডপে মণ্ডপে মায়ের সাজানো আসন শূণ্য থাকবে এ বছর”?

 সিধু কোন উত্তর দিল না, বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সব। সালংকারা সুসজ্জিতা প্রতিমাগুলি এখন ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপ। কারখানার শেষপ্রান্তে এসে সিধু অবাক হয়ে গেল, তার নিজের জন্যে বানানো অন্যরকম প্রতিমাটি দাঁড়িয়ে আছে অক্ষত। হয়তো ওরা কেউ লক্ষ্য করেনি অথবা সাধারণ মেয়ের মূর্তি দেখে ফেলে রেখে গেছে অবহেলায়।  

“বাবা, দ্যাখো দ্যাখো, এখনও বেঁচে আছে এই মূর্তিটা। ওরা সব ভেঙে ফেলেনি”! মনোতোষ মুখ তুলে তাকিয়ে রইল বেঁচে যাওয়া মূর্তির দিকে।

অস্ফুট স্বরে বলল, “মেয়েটা কে”?

“অপর্ণা”

“অপর্ণা? যাকে ধর্ষণের পর নিষ্ঠুর হত্যা করেছিল লোকগুলো”?

“হুঁ। গণপতি ওকে ঠিকই চিনেছে, এমনকি নিজের দলের লোকটাকেও। দুর্গার মূর্তিকে শিখণ্ডী রেখে ওরা টাকা তোলে, পুজোর নামে টাকা কামানোর জন্যে। তাই মা দুর্গাকে ওরা ভয় পায় না। কিন্তু ওরা ভয় পায় সাধারণ মেয়েকে, ভয় পেয়েছে এই মেয়েটাকেও! ওদের লোকেরা ভেঙে দিয়ে গেল সমস্ত প্রতিমা, অথচ বেঁচে রইল অপর্ণা নামের এই মেয়েটাই”!

“ঠিকই বলেছিস, সিধু। ভিআইপিরা আজ আছে, কাল নেই। বেশিদিন টেকে না। মানুষরাই বেঁচে থাকে, সাধারণ মানুষ। তারাই ভিআইপিদের মাটিতে টেনে নামিয়ে আনে, ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।  চটপট তৈরি হয়ে নে, সিধু, কিচ্‌ছু হয়নি। আমরা আবার গড়ে তুলব সমস্ত মূর্তি, চল আর দেরি নয়। এখনও অনেক সময় আছে”।

“কি বলছ, বাবা, আমরা পারব”?

“পারব না মানে? দিন-রাত এক করে দেব, সিধু। উঠে দাঁড়াতেই হবে আমাদের”।  

-**-

   পরের গল্প - " মহীরূহ "


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...