বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ 


২৮

 

পরের দিন সকালে বসে অনেকক্ষণ ছেলেদের মহড়া দেখছিল ভল্লা। একসময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কিছুই হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না...এভাবে তোরা কোনদিনই কোথাও পৌঁছতে পারবি না...”। ভল্লার কথায় ছেলের দল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ভল্লার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পরে শল্কু বলল, “তুমি তো এভাবেই আমাদের অভ্যাস করতে বললে, ভল্লাদাদা”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “বলেছি। কিন্তু এমন তো বলিনি এটুকু শিখলেই আমাদের শিক্ষা সব শেষ? রণপায় চড়ে স্বাভাবিক হাঁটাহাঁটি করতেই কাল সারাটা দিন চলে গেল – এখনও ঠিকঠাক চলতে পারছিস না। টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিস বারবার। ভল্ল ছোঁড়ার অভ্যেস করতে বললাম, কুড়িবার ছুঁড়লে খুব জোর তিনবার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছচ্ছিস। বাকিগুলো বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে নয়তো গাছের গুঁড়িতে বিঁধছে...। একই জিনিষ নিয়ে কতদিন কতবার রগড়াবি?”

কেউ কোন কথা বলল না, মাথা নীচু করে রইল। শল্কু বলে উঠল, “আহা একদিনেই সবাই পারে নাকি...সবাই কী আর তোমার মতো হতে পারে? তুমিই কী একদিনে সব শিখে ফেলেছিলে?”

ভল্লা বিরক্ত মুখে বলল, “একদিনে শিখে ফেলা যায় না, সে কথা তোর থেকে আমি অনেক ভালো জানি, শল্কু। কিন্তু কালকের শিক্ষার থেকে আজকের শিক্ষায় যদি কোন উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় – সে রকম দায়সারা শিক্ষায় লাভ কী? মনে এই সামান্য জেদটুকুই যদি না আসে – আজ যেটুকু শিখব সেটা নিখুঁত শিখব। আগামীকাল সেটাকে নিয়ে আবার না রগড়ে – নতুন কিছু শিখবো। তা নাহলে এতো অনন্তকাল চলতেই থাকবে...”।

ভল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সকলের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “দ্যাখ সব জিনিষ সবাইকে দিয়ে হয় না। একলক্ষ লোকের মধ্যে খুব জোর হলে হাজার পাঁচেক রক্ষী হয় আর হাজার দুয়েক সৈন্য হয়। আমি আর দু’-তিনদিন দেখব...উন্নতির কোন লক্ষণ না দেখলে বলব”...ভল্লা হঠাৎ হাতজোড় করে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “ক্ষ্যামা দাও বাপাসকল, অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যাও – বাপের সঙ্গে চাষবাসের কাজে লাগো গে...নয়তো দীঘীর পাড়ের অশথ তলায়, গুটি সাজিয়ে বাঘবন্দী খেলো গে...”।  ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে রণপা নিয়ে বেরিয়ে এল ছেলেদের অনুশীলনের মাঠ থেকে।

 

দুপুরে খেতে এসে রামালি বাসায় ফিরে দেখল, ভল্লা ঘরের সামনে নির্দিষ্ট পাথরে বসে গম্ভীর মুখে কিছু চিন্তা করছে। রামালি কিছু বলল না। ঘরে ঢুকে জলের কলসি নিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর স্নান সেরে ভরা কলসিটা ঘরে রেখে রান্নার যোগাড় করতে করতে লক্ষ্য করল, ভল্লা একই ভাবে বসে আছে। রামালি উনুন ধরিয়ে বলল, “কী ভাবছো, ভল্লাদাদা? তুমি রাগ করে চলে আসার পর ছেলেরা সত্যিই ভয়ানক পরিশ্রম করছে। ওরা আজ খেতেও যায়নি। বলেছে সন্ধ্যে পর্যন্ত অভ্যাস করে, কাল তোমাকে ওরা চমকে দেবে...”।

ভল্লা মুখ তুলে রামালির মুখের দিকে তাকাল। বলল, “তাই? আর ওই শল্কু?”

রামালি হাসল, বলল, “ওর তেমন হেলদোল নেই, ওর ধারণা ও সব শিখে ফেলেছে”।

“তাই, না? হতভাগার ডানা গজিয়েছে – পিমড়ে – ডানা গজালেই ভাবে উড়তে শিখেছে...মরবে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করল, “বালিয়া আর আসে না কেন রে?” বালিয়া নোনাপুর গ্রামেই থাকে, বাপ-ঠাকুদ্দাদের সময় থেকেই তারা লোহার কাজ করে। রামালি বলল, “লড়াই-টড়াই করা ওর পছন্দ নয়। শান্তিপ্রিয় নিরীহ ছেলে। ও বলে আমাদের খেটে খেতে হবে রামালিদা – লড়াই শিখে করবো কী আর খাবোই বা কী? ভল্লাদাদাকে বলো অন্য কাজ থাকলে, আমাকে যেন বলে”।

ভল্লা খুশি হল, বলল, “বাঃ, বালিয়া বেশ বুঝদার ছেলে তো! ঠিকই বুঝেছে - লড়াই সবার জন্যে নয়। আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে, ওকে খবর পাঠাস তো। ওকে দিয়ে কিছু কাজ করাব। রণপাগুলোর তলায় লোহার খুড়ো আর ডগায় লোহার ফলা বসাতে হবে। এখন আমরা মাটিতে চলাফেরা করছি বলে তেমন ক্ষইছে না। কিন্তু পাথরে বাঁধানো পাকা রাস্তায় চললে বাঁশের ডগাগুলো দাঁতনের মতো ছরকুটে যাবে। লোহার খুড়ো দিয়ে বাঁধিয়ে নিলে বেশি দিন টিকবে”।

“আজ বিকেলেই এক ফাঁকে গিয়ে বলে আসবো”।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু কথা বলল না। রামালি রান্না নিয়ে ব্যস্ত, ভল্লা আগের মতোই চুপ করে বসে কিছু চিন্তা করতে লাগল। রান্নাটা মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে রামালি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি বটতলির সনাতন কবিরাজকে আমাদের গ্রামে পাঠিয়েছিলে?” রামালির আচমকা এই প্রশ্নে ভল্লা আকাশ থেকে পড়ল, “বটতলির সনাতন কবিরাজ? আমি তাকে চিনিই না, ডাকব কী করে?”।

অবাক হয়ে রামালি বলল, “তাহলে? কে ডাকল তাঁকে? আজ সকালে আমাদের গ্রামে এলেন। প্রধানমশাইকে, আমার কাকাকে দেখে গেলেন। বিনা দক্ষিণায় ওষুধ-পথ্যি করে গেলেন। কেন?” ভল্লার মনে পড়ল এবার, বলল, “ও হ্যাঁ হ্যাঁ। গতকাল বণিক অহিদত্তকে বলেছিলাম বটে। আমাদের কবিরাজকাকা তো গ্রামে নেই, যদি ওদিক থেকে কাউকে... বাঃ, তার মানে বণিক অহিদত্ত কথা রেখেছে? দেখে কী বলল?”।

রামালি মাথা নাড়ল, বলল, “কাকার অবস্থা তেমন কিছু নয়, দু-পাঁচদিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। কিন্তু প্রধানমশাইয়ের অবস্থা ভয়ংকর। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি অচৈতন্য থাকেন। সনাতন কবিরাজ তেমন ভরসা পাচ্ছেন না”।

“বলিস কী?”

রামালি কোন উত্তর দিল না, রান্না সারতে লাগল চুপ করে। ভল্লা আবার জিজ্ঞাসা করল, “আর ভীলককাকা?”

“ভীলককাকার তিনটে দাঁত ভেঙে গেছে – মাড়ি ফেটে গেছে। জিভও কেটে গেছে অনেকটা। চোয়ালে গভীর ক্ষত। কিছু বটিকা দিয়েছেন, জলে গুলে খাওয়াতে হবে আর প্রলেপ দিয়েছেন। বলেছেন সামনের তিন-চারদিন খুবই সংকট – সাবধানে থাকতে হবে। এরমধ্যে ক্ষতগুলো যদি বিষিয়ে না যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সেরে উঠবেন, নচেৎ...”।

ভল্লা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। রামালির রান্না হয়ে গিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করল, “চান করেছ ভল্লাদাদা? আমার রান্না হয়ে গেছে”।

ভল্লা বিষণ্ণ মুখে বলল, “এদিকে প্রধানমশাইকে প্রায় শেষ করে দিল আর ভীলককাকারও যা অবস্থা কতদিনে সুস্থ হবেন তার ঠিকানা নেই। ওদিকে কবিরাজমশাইকেও আস্থানে নিয়ে গিয়ে, কী অত্যাচার করছে, কে জানে? ওই কটা রক্ষী এসে, নোনাপুর আর সুকরা গ্রামদুটোকে একেবারে কানা করে দিয়ে গেল”।

রামালি কিছুক্ষণ ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “তুমি চলে আসার পর মহড়ার মাঠে শল্কু বলছিল, তুমি রাজি হলে, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আমরা আস্থান আক্রমণ করব। গ্রামে এসে রক্ষীদের অত্যাচারের চরম শোধ তুলব আমরা”।

ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয়, তোরা পারবি?”

“আমাদের মধ্যে অন্ততঃ জনা ছয়েক বল্লম চালানো আর রণপা ব্যবহারে মোটামুটি দক্ষ তো হয়েছি”, ইতস্ততঃ করে রামালি বলল, “অবশ্য, সে বিচার তুমিই ভাল করতে পারবে। কিন্তু সুরুল আর আমার মত অন্য। এত তাড়াহুড়ো করে নিজেদের বিপদ বাড়ানোর মানে হয় না। আমরা যতটুকু শিখেছি, তাতে রক্ষীদলের কোমর ভাঙা সম্ভব হবে না। উলটে আমাদেরই কোমর ভেঙে যেতে পারে। রক্ষীদলের দু-তিনজন হয়তো আমাদের হাতে মরবে, কিন্তু আমাদের মরবে কিংবা আহত হবে তার থেকে অনেক বেশি। আমাদের এই ছোট্ট দলের পক্ষে সে আঘাত হবে মারাত্মক। এবং সেই আঘাত সেরে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়ই পাবো না। তার আগেই রক্ষীরা আমাদের গ্রামগুলোকে জ্বালিয়ে আমাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চিন্ত আশ্রয়গুলোকে উচ্ছন্ন দেবে”।

ভল্লা রামালির বিচক্ষণতায় আশ্চর্য হল। রামালির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আস্থান থেকে যেদিন আমরা অস্ত্র লুঠ করলাম, সেদিন আমাদের গায়ে কোন আঁচও তো লাগেনি। তখন তো তোরা লড়াই করার কিছুই জানতিস না, তাই না? উলটে ওদেরই তো তিনজন পটল তুলল”।

রামালি অনেকক্ষণ ভল্লার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর মুচকি হেসে বলল, “ভল্লাদাদা, একথার উত্তর দিলে ছোট মুখে বড়ো কথা হয়ে যাবে কিন্তু”।

ভল্লা রামালির মুখের ওই হাসি এবং তার কথা বলার ভঙ্গিতে রীতিমতো সতর্ক হয়ে উঠল। আচমকা বলে উঠল, “না রে, তোর কথা পরে শুনব। এখানে নয়, নিরিবিলিতে। খুব খিদে পেয়েছে। চট করে পুকুরে কটা ডুব দিয়ে আসি দাঁড়া – তুই খাবার বাড়…”।

রামালি গম্ভীর হয়েই ভল্লাদাদার কথাগুলো শুনলো, তার মুখে হাসি নেই। তবে তার মনে তৃপ্তির হাসি, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রাজাধিকারিকও তার কথায় এমন চমকে উঠল?

চলবে...

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫ " 


ষষ্ঠ পর্ব


সোমবার/রাতঃ এগারোটা বিয়াল্লিশ।

 আদরের কনি,

ঘরের একটা জানালা দীর্ঘদিন না-খোলা ছিল, গতকাল তুই সেটা খুলে দিলি। খোলা হাওয়ায় বুকটা ভরে উঠল আর চোখে এসে লাগল আলোর উদ্ভাস। এত ভালো লাগছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ননিজেকে এমনিতেই মনে হচ্ছিল নেশাগ্রস্ত, তাই শশাঙ্কবাবু বার বার বলা সত্ত্বেও হুইস্কির নেশায় সেটাকে কাটাতে মন চাইছিল না। শশাঙ্কবাবু কী ভাবলেন কে জানে, তুই সামলে নিস।

ত হপ্তার শেষ দুটো দিন ছিলাম না, তাই আজ চেম্বারে খুব চাপ ছিল। তোদের ওখান থেকে ফিরে মাথার তলায় হাত রেখে টানটান বিছানায় শুয়ে তোর কথা যে দু দণ্ড ভাবব তার অবকাশই পেলাম না। মিনিট পনের ঘরে ছিলাম টয়লেটে একটু ফ্রেশ হবার জন্যে, তার মধ্যেই দু দুবার তাগাদা দিয়ে গেল রিসেপশনের মেয়েটি। মানুষ যে কেন এত অসুখে ভোগে কে জানে? নিজেদের সুখের জন্যেই একটু সুস্থ থাকতে পারে না? আজ যদি এরা না ভুগত, চিন্তা করে দ্যাখ, তোর চিন্তার বন্দরে আমি নোঙর ফেলে মাপতে পারতাম বিস্তর জলের তল – একে বাঁও, দুইয়ে বাঁও হয়তো বা। সে যাক শেষমেষ যেতেই হল চেম্বারে। সকলা নটা থেকে দুপুর একটা, কুড়ি জনের বেশি সাধারণত দেখি না। আজ একেবারে পঁয়ত্রিশজন! ধমকে ওঠার আগেই মিলকি বলে উঠেছিল – বকবেন না স্যার, কিচ্‌ছু করার নেই। শুক্রবার, শনিবার থেকে সব্বাই ফোন করে করে এমন রিকোয়েস্ট করে রেখেছিল যে ফেরাতে পারিনি। মিলকি আমার রিসেপসনিস্ট।

সকলের নিরাময়ের বিধান দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ি আর কি! ঘরে এলাম প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ। চান খাওয়া করে একটু রেস্ট না নিতেই আবার ডাক পড়ল নার্সিং হোমে, সেখানে দুজন ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট অ্যাটেণ্ড করে আবার সন্ধ্যের চেম্বার সাতটা থেকে।

এখন রাত এগারোটা আট। পাশের বাড়ির টিভিতে কোন বাংলা সিরিয়াল চলছে, নাটকীয় মুহূর্তে উচ্চৈঃস্বর মিউজিক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নিশ্চিন্ত শব্দহীন চারিপাশ। এখন শুধু তুই আর আমি। আর কেউ নেই আমার সময়ে ভাগ বসাতে।

কি করছিস এখন? ঠিক একখুনি? ঘুমিয়ে পড়েছিস? নাকি উল্টোদিকের সোফায় পা তুলে দিয়ে সিরিয়াল দেখছিস? দুই জা, ননদ আর শাশুড়ির লাগাতার ক্যাঁচাল মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে চলেছিস? নাকি বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিস? কি বই? ইন্টারেস্টিং না একটু বোর? বই পড়তে পড়তে কি আমার কথাও তোর মনে আসছে? যে পাতাটা খুলে পড়া শুরু করেছিলি, সেই পাতাতেই কি আটকে রয়েছিস অনেকক্ষণ – আমার ভাবনায়? ভাবিস কী না ভাবিস, আমার ভাবতে ভাল লাগছে যে তুই আমার কথা ভাবছিস। এই যে আমি তোকে মেল লিখছি, তার মানে তোর কথাই তো ভাবছি। তুইই তো রয়েছিস আমার সারাটা মন জুড়ে। এর কি কোন টেলিপ্যাথিক এফেক্ট হতে পারে না?

আমার কাজের মাঝে, কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে। আমায় পরশ করে প্রাণ সুধায় ভরে তুমি যাও যে সরে – বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো, ওগো দুখজাগানিয়া।

এখনো কি তুই দাঁড়িয়ে আছিস, কনি? অন্ততঃ মনে মনে হলেও! আমার কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে তুই আজও যেন দাঁড়িয়ে আছিস শুধু আমারই জন্যে।

 ভালোবাসা নিস।

 তোর সুনুদা

 

মঙ্গলবার/রাতঃ বারোটা দশ

প্রিয় কনি,

শীতের শীর্ণতোয়া পাহাড়ি নদী দেখেছিস খুব কাছ থেকে? তরতরিয়ে স্বচ্ছ জল বয়ে যায়। জলের মধ্যে খেলে বেড়ানো ছোট্ট ছোট্ট মাছ, জলের নীচেয় নুড়ি পাথর সব - সব দেখা যায়। উজ্জ্বল রোদ্দুরে চিক চিক করে স্বচ্ছতা। আর বর্ষার প্লাবনে সেই নদীই যখন জলপ্রবাহে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তার বুকে তখন ঘোলা জল। জলের মধ্যে, জলের নীচে কী কী রহস্য জমা করা আছে কিছুই দেখা যায় না।

এতদিন অদর্শনে শীর্ণ স্মৃতির বহতায় যা ছিল স্বচ্ছ, সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হবার পর কেমন যেন সব ঘেঁটে ঘুলিয়ে ঘ হয়ে গেল। দেখা না হলেই বুঝি ভালো ছিল। বেশ তো ছিলাম/ছিলি – কেন যে সেদিন গাড়িটা খারাপ হল মাঝ রাস্তায়! উথাল পাথাল হয়ে উঠেছে সব চিন্তা আর ভাবনা। কত কথাই যে বলতে ইচ্ছে জাগছে – কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না হে আমার কনি, পরস্ত্রী!

গতকাল আমার মেলের উত্তর দিসনি। মেল খোলার অবকাশ হয়নি, নাকি উত্তর দিবি না ঠিক করেছিস?

 ভালো থাকিস, ভালোবাসা নিস।

তোর সুনুদা।

 

বুধবার/দুপুরঃ দুটো বত্রিশ

 সুনুদা,

 ভালোই তো আছো, বস, একদম রসে ভরা রসবড়া। এতটুকুও টসকাওনি।  

তোমার প্রথম ও দ্বিতীয় – দুটো মেলই পড়েছি যথাযথ সময়েই। এমনিতেই তোমার সঙ্গে (নাকি তোমার প্রিয় রবিঠাকুরের ভাষায় “তোমার সনে” বলব?) এতদিন পর দেখা হবার একটা হ্যাং ওভার তো ছিলই, তার ওপর তোমার ওরম মেল, বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। আজও তুমি এভাবে ভাবতে পারো? আজও কি আমি তোমার কাছে একই রয়ে গেলাম! মনে হল তাই আর বুকের মধ্যে জমাট বাঁধল দীর্ঘশ্বাস – কী কথা ছিল বলবার? কী কথা আর আছে বলবার? সমস্ত ভাবনা আমাকে বোবা করে দিল, সুনুদা।

 তোমার স্বভাবটা আর পাল্টালো না, সুনুদা। এমন মন আকুল করা বক্তব্য শেষ করলে “পরস্ত্রী” দিয়ে? হেমন্তের চাঁদনি রাতে কাশবনে হারিয়ে যাবার লোভ দেখাও আবার মাথায় হিম লেগে ঠান্ডা লাগার ভয়ও দেখাও। শীতের ঝরাপাতার বনে হারিয়ে যাওয়ার ডাক দাও কিন্তু পথ হারানোর ভয়ে বনে ঢুকতেও মানা করো। আমি তো হারাতে চেয়েছিলাম তোমার ডাকে – কিন্তু বারবার তুমিই দিয়েছ পিছুটান।

পিছুটান ভুলে একবার ডেকেই দেখো আমায়, আমি আজও আছি শুধু

 তোমারই কনি।

 

বুধবার/রাতঃ ১১:৪৫

কনি,

তোকে ডাকিনি একথাটা তোর মুখে মানায় নাডেকেছিলাম, তোকেই ডেকেছিলাম, সমস্ত অন্তর থেকে। এমন আহ্বান, নাঃ আহ্বান নয়, আবাহন আর কেউ কোনোদিন করতে পেরেছে বলে আমার অন্ততঃ বিশ্বাস হয় না। তুই সেদিনের সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছিলি। হয়তো তেমন ভরসা করতে পারিসনি। অথবা আমার ডাকে সেসময় সাড়া দিলে তোকে এবং আমাকে যে ঝঞ্ঝার মুখে পড়তে হতো, সে আশঙ্কায় বিকল হয়েছিলি তুই। সেই ঝড়ের রাতে তোর নিরাপদ ঘরের দুয়ার রুদ্ধ রেখেছিলি। খিড়কির দরজাতেও এতটুকুও ফাঁক রাখিসনি। পাছে উড়ে যায় সব বাঁধনের শিকল, এলোথেলো হয়ে যায় তোর সহজ জীবনের যাবতীয় পথচলা।

সেই ঝড় থেমে গেছে কবেই। পিছল পথে পা টিপে টিপে আমি পৌঁছে গিয়েছি, একা এক নির্জন পথের পরিত্যক্ত পান্থশালায়। আমি তোকে আমার সঙ্গে সেদিন মাত্র সাত পা হাঁটতে বলেছিলাম, কনি, তাহলেই আমরা জীবনের অনন্ত পথচলার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারতাম। সে তো হয়ে উঠল না কনি। সেদিন আমার সেই ডাকে তুই মুখ ফিরিয়েছিলি, কনি, আজ কোন অধিকারে তোকে ডাকি বল তো? তোকে খুব কাছে পাবার লোভটুকুও এখন রয়ে গেছে বহুদিন পিছনে ফেলে আসা অস্ফুট স্মৃতিতে। যে স্মৃতি একটা লোহার সিন্দুকে ভরে, শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে, নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছিলাম গভীর এক কুয়োর জলে। সে সিন্দুকটা জলে পড়ার সময় আওয়াজ উঠেছিল - ঝপ্‌পাস। আমার স্মৃতিতে এখন রয়ে গেছে শুধু ওই আওয়াজটুকুই!

আজ তোকে ডাকতে গেলে, আমার একা এই নির্জন ঘরে সেই শব্দটাই কানে আসছে বারবার। এই শব্দটুকু ছাড়া আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই, 

তোর সুনুদার।

পরের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৭ "

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ৫

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১ " 



এর আগের পর্ব - " তুই .কম - পর্ব ৪


৫ম পর্ব


 

রাতের খাওয়াটা নিয়মরক্ষা হিসেবেই হল। সুনেত্র দুটো রুটি আর একটু চিকেন নিল। শশাঙ্ক নিজের প্লেটে দু পিস চিকেন নিয়ে একটু ঠোকরাল বলা চলে, আর কিছু নিল না। আর সুকন্যার তো পাখির আহার। খাওয়া দাওয়ার পর সুকন্যা সুনেত্রকে বলল, “তুমি কি আরেকটু বসবে, না এখনই শুয়ে পড়বে”?

“শুয়ে পড়লেই হয়। অবিশ্যি তোদের যদি কোন প্রোগ্রাম না থাকে”।

“একটু বসবেন না, কোন আলাপই তো হল না আপনার সঙ্গে”! শশাঙ্ক বলল।

“না, না আর বসতে হবে না, আলাপ তো কত হবে জানা আছে, তোমার সঙ্গে বসা মানেই বোতল পুজো আর সঙ্গে তোমার প্রলাপ, তার চেয়ে সুনুদা শুয়ে পড়ুক – অনেক ধকল গেছে। এসো তোমাকে ঘর দেখিয়ে দিই”। পানের প্যাকেট হাতে নিয়ে সুকন্যা গেষ্ট রুমের দিকে গেল। সুনেত্র অল্প হেসে বলল, “ওকে মিঃ শশাঙ্ক, আজ তবে গুডনাইট, কাল সকালে দেখা হবে”।

“অগত্যা, গুডনাইট। আপনি কিন্তু মশাই বেশ বাধ্য এবং লক্ষ্মীছেলে – সোনা ছেলে। আমার মতো লক্ষ্মীছাড়া নন...। যাবার আগে আরেকখানা সিগারেট ছাড়ুন দেখি”। শশাঙ্ক হাসতে হাসতে বলল।

 

শোবার ঘরে ঢুকে বেশ স্বস্তি পেল সুনেত্র। সুন্দর ঘর, বিছানা। স্বল্পালোক। বাতাসে মৃদু সুগন্ধ – দামি রুম ফ্রেশনার। মাথার কাছে ছোট টেবিলে কাচের জাগে খাবার জল, পাশে ঢাকা দেওয়া কাচের গ্লাসবিছানার ছত্রিতে মশারি ঝুলছে। বিছানার চাদর টান টান করছিল সুকন্যা,  হাল্কা হাতের চাপড়ি দিয়ে মাথার বালিশদুটোকে ফাঁপিয়ে তুললসুনেত্র মুখে হাল্কা হাসি নিয়ে দেখছিল সুকন্যাকে।

“মশারি নামিয়ে দেব, না তুমি নামিয়ে নেবে”?

“থাক আমি নামিয়ে নেব”।

“আর এসি? চব্বিশে দেওয়া আছে, আর কমাতে হবে”?

“নাঃ। ইট্‌স্‌ ওকে। রিমোটটা কোথায় আছে, ওটা বরং হাতের কাছে রাখ”।

“বালিশের পাশে রইল। পায়ের কাছে চাদরও রাখা থাকল, রাত্রে দরকার পড়লে টেনে নিও। বাথরুমের লাইটটা জ্বলতে দাও, অচেনা জায়গা, রাত্রে যাবার হলে অসুবিধে হবে। ঠিক আছে”?

“পারফেক্ট”।

“আতিথেয়তার কোন ত্রুটি নেই তো? পানের প্যাকেট থেকে তিনটে পানই বের করে সুকন্যা সুনেত্রর দিকে বাড়িয়ে দিল

“মাংস খাবার পর পান খেতে ভালোবাসি, এখনো মনে রেখেছিস? কিন্তু তিনটে কেন, তোরা খাবি না”?

“খাবো তো, তুমি খাইয়ে দাও”। শেষ কথাটা সুকন্যা অস্ফুটে বলল। স্বল্প আলোভরা নির্জন শীতল ঘরে সুকন্যার কথাগুলো রিনরিনিয়ে সুর তুলল সুনেত্রর শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। সুকন্যার চোখের দিকে গভীর চোখ রেখে সুনেত্র পান নিয়ে মুখে পুরল, তারপর বলল, “মনে আছে, তোর? আমার মুখ থেকে কতবার তুই পান খেয়েছিস”? সুকন্যা কিছু বলল না, তার অধরে হাল্কা হাসি, চোখের তারায় প্রশ্রয়ের চিকন আলো। কিছুক্ষণ চিবোনোর পর সুনেত্র কাছে এলো সুকন্যার – খুব কাছে। দুহাতে ধরল সুকন্যার কাঁধ, তারপর চোখে চোখ রেখে সুকন্যর উন্মুখ অধরে নামিয়ে আনল তার ঠোঁট। সুকন্যা আর সুনেত্র নিমগ্ন হল চুম্বনে। একসময় সুকন্যা দুহাতে জড়িয়ে ধরল সুনেত্রকে। ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনে তার অন্তর্বাসহীন শরীরে অনুভব করল সুনেত্রর শরীরের স্পর্শ। সুকন্যার শ্বাস ঘন হয়ে উঠল, তার সমস্ত শরীর উন্মুখ। কাঁপতে লাগল তার নাকের পাটা, অধরোষ্ঠ। সুকন্যা দুই বাহুতে বেঁধে নিল সুনেত্রকে, সেই বন্ধনে অনেকক্ষণ বাঁধা রইল দুজনেতাদের গভীর নিঃশ্বাসের উষ্ণতা নিঃশব্দে ছেঁকে নিচ্ছিল রুমের এসি। 

একসময় সুকন্যা অস্ফুটে বলল, “ছাড়ো”।

সুনেত্র দ্বিধাভরে সরে এল। সুনেত্র একবারের জন্যেও ধরেনি সুকন্যাকে, তার দুহাত আলগা রাখা ছিল সুকন্যার কাঁধে। বরং সুকন্যাই ধরেছিল সুনেত্রকে। সুকন্যা বলল, “শুয়ে পড়ো, সুনুদা, অনেক রাত হল, গুডনাইট। কাল সকালে কটায় চা দোবো বল তো”?

বিছানার একধারে বসতে বসতে সুনেত্র নিজেকে সামলে নিল কিছুটা, তারপর বলল, “সাতটা-সাড়ে সাতটায় দিলেই হবে, তোরা কটায় উঠিস”?

“পেয়ে যাবে, পাক্কা সাড়ে সাতটায়। গুড নাইট”। সুকন্যা ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে গেল দ্রুত, যাবার সময় টেনে দিয়ে গেল ঘরের দরজাটা।


সুকন্যা শোবার ঘরে এসে দেখল শশাঙ্ক ঘুমোয়নি, টিভিতে নিউজ দেখছে বিছানায় শুয়ে। ঘরের বড়ো লাইট নিভিয়ে সুকন্যা নাইট ল্যাম্প জ্বালালো। তারপর বিছানায় ওঠার আগে খুলে ফেলল পরনের হাউসকোট মেঝেয় পড়ে রইল সুনেত্রর পরশমাখা বসন, আর বাসনা তপ্ত সুকন্যা উঠে বসল শশাঙ্কর পাশে। শশাঙ্ক অবাক হয়ে গেল খুব। ঠোঁটের কোণে হাল্কা হাসি নিয়ে সুকন্যাকে দেখছিল।

“কী দেখছ কি”?

“নীল ছবি, একদম থ্রি এক্স”।

“তার মানে? আগে কোনদিন দেখনি নাকি”? শশাঙ্ককে নির্বসন করতে করতে সুকন্যা বলল।

“নির্জন ঘরের এই মায়াবি আলোয়, আজ কে তোমায় রক্ষা করবে, সুন্দরী, আমার মতো নিষ্ঠুর লম্পটের কামনা থেকে? হু হা হা হা হা”। যাত্রার খলনায়কের মতো হাসল শশাঙ্ক। তারপর রিমোটে টিভি অফ করে, নিজের নগ্ন বুকের ওপর টেনে নিল সুকন্যাকে, সুকন্যার অধরে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। সুকন্যার শরীরের ভূগোলে শশাঙ্কর হাত সংগ্রহ করে বেড়াতে লাগল ভালোবাসা - বিশুদ্ধ ভালোবাসা। শশাঙ্ক জানে, সুকন্যার শরীরে এখন এই যে ভালোবাসার জোয়ার – এ উস্কে দিয়েছে সুনেত্র নামের অতি ভদ্র একটি জীব

সুদীর্ঘ এক ভালোবাসার নিখুঁত পর্বশেষে সুকন্যা শশাঙ্কর বুকে মাথা রেখে শুল, তার মুখে তৃপ্তির হাসি, অস্ফুট স্বরে বলল, “অসভ্য, একনম্বরের ডাকাত একটা”।

“এক্স্যাক্টলি, ভালোবাসা আর প্রেমটেম সাজিয়ে আজ তুমি যে রকম কল্পতরু ভান্ডার মেলে ধরেছ- লুঠ না করে উপায় কি? আর কথাতেই আছে, কেউ মরে বিল ছেঁচে, কেউ খায় কই...”।

“তার মানে”? চোখ ছোট করে খুব সন্দিগ্ধভাবে তাকাল সুকন্যা। “কি বলতে চাইছো, তুমি”?

“কিস্‌সু না, প্রিয়তমে। শুধু বলতে চাইছি, অনেকদিন পরে আজ তোমাকে মারকাটারি লাগল। এর জন্যে তোমার সুনুদা’কে আমার হয়ে গুচ্ছের থ্যাংক্‌স্‌ দিও”। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুকন্যা বিঁধে দিল শশাঙ্ককে, “তুমি এত মিন, আর জেলাস”?

শশাঙ্ক হা হা করে হাসল, সুকন্যার গালে হাল্কা টোকা দিয়ে বলল, “আই লাইক টু বি মিন, দ্যান টু বি মিনমিন...অ্যান্ড ইউ শুড অ্যাপ্রিসিয়েট ইট, সুন্দরী”।

সুকন্যা হাত দিয়ে মুখ ঢাকল শশাঙ্কর, বলল, “এত বাজে কথাও তুমি বলতে পারো, ঘুমোও তো”। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি নিয়ে চোখ বুজল সুকন্যা, তার ডান হাত এলিয়ে পড়ে রইল শশাঙ্কর বুকে। শশাঙ্ক কোন কথা বলল না আর, সুকন্যার হাতে হাত রেখে সেও চোখ বুজল।

পরের পর্ব - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ৬ "


 

মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২০

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১৯ 


২৬ 

গতকাল দুপুরে নোনাপুর এবং সুকরা গ্রামের লোকদের সঙ্গে আস্থানের রক্ষীরা যে ব্যবহার করেছে, তারপরে আজকের ভোরটা ভল্লার কাছে অত্যন্ত সঙ্কটজনক। যদিও গতকাল রাত্রে সে আর রামালি দুই গ্রামেরই কিছু ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাতের গোপন অন্ধকারে বড়ো বড়ো কথা বলা, আর প্রকাশ্য দিবালোকে নিজের নিজের পরিবার - মা-বাবা-ভাই-বোনদের সামনে দিয়ে হেঁটে, ভল্লার কাছে মহড়ায় যোগ দিতে আসার অন্য মাত্রা আছে। তার জন্যে প্রয়োজন প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভয়হীন বুকের খাঁচা।  

ছেলেদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সকলেই এখন সন্ত্রস্ত। তাদের চোখে-মুখে অসহায় বিপন্নতা। একে তো আস্থানের রক্ষীরা অভিযোগ করেছে, এই গ্রামের ছেলেরাই আস্থানে ডাকাতি করেছে। তিনজন রক্ষীকে মেরে ফেলেছে। তাদের আরও অভিযোগ, এসবই ঘটেছে, রাজার দণ্ড পাওয়া অপরাধী ভল্লার উস্কানিতে। কোন ঘটনা এবং অভিযোগেরই প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই – সবটাই অনুমান নির্ভর। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই গতকাল তারা গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। বন্দী করে নিয়ে গেছে সর্বজনশ্রদ্ধেয় কবিরাজকাকাকে। বীভৎস প্রহারে মৃতপ্রায় করে দিয়েছে গ্রামপ্রধান জুজাককে। তারপরেও গ্রামের ছেলেরা যদি ভল্লার কাছেই যায় শরীর চর্চা করতে, পরিবার-পরিজনদের এবং প্রতিবেশীদের আতঙ্ক বাড়বে। বাড়বে নিজের নিজের ছেলেদের প্রতি সন্দেহ। যারা বিশ্বাস করত, আমাদের ছেলেরা কোন কুকাজ করতে পারে না। তারাও এবার সন্দিহান হয়ে উঠবে। ছেলেদের এখন লড়তে হবে ঘরে এবং বাইরে। ঘরের লড়াইটাই বেশি কঠিন - স্নেহ-মমতাপ্রবণ পরিবারের সঙ্গে মানসিক লড়াই। তার থেকে বাইরের লড়াইটা অনেক বেশি স্পষ্ট।   

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নোনাপুর গ্রাম থেকে এল চোদ্দজন। আর সুকরা থেকে আটজন। ভল্লা সকলকে বসতে ইশারা করল। সকলে বসার পর ভল্লা বলল, “কী করে এলি তোরা? মা-বাবা, ভাই বোনরা কেউ মানা করল না?”

শল্কু হাসতে হাসতে বলল, “করেনি আবার? আমার মা তো হাতে পায়ে ধরতেই যা বাকি রেখেছেন। বোনদুটো এমন কাঁদছিল বেরোনোর সময়”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? পারবি? এই বাধা রোজ পেরিয়ে, লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হতে?”

শল্কু বলল, “ভল্লাদাদা, কে কী করবে আমি জানি না। আমি তো আসবোই। রক্ষীদের নাম শুনলেই,  ছোটবেলা থেকে আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদের দেখেছি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতে। তোমার এখান থেকে গতকাল ফিরে গিয়ে যা দেখলাম, যা বুঝলাম, রক্ষীরাও ভয় পায়। এতদিন ওদের গায়ে কেউ হাত দেয়নি, ওরা যা খুশি করে গেছে। ওদের গায়ে আমরা একবার হাত তোলাতেই – ওরা ভয়ে দৌড়ে চলে আসছে গ্রামে গ্রামে। অপমান করছে গুরুজনদের। কবিরাজকাকাকে ধরে নিয়ে গেল...তিনি কি আমাদের ডাকাতি করতে শিখিয়েছেন? নাকি ডাকাতি করতে আমাদের উস্কেছেন? আসলে এবার ওরাও ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছে ভল্লাকে। ভয় পেয়েছে ভল্লার দলকে। আমরা যদি ভয়ে সিঁটিয়ে আবার গিয়ে মায়ের আঁচলের তলায় ঢুকি, ওরা তো আমাদের সকলের ঘাড়ে বসে হাগবে, ভল্লাদাদা! যে পথে আমরা এগিয়েছি...সেখান থেকে আমি অন্ততঃ ফিরে আসবো না, ভল্লাদাদা। হয়তো মরবো, কিন্তু মরার আগে ওদের টের পাইয়ে দিয়ে মরবো”।

ভল্লা লক্ষ্য রাখছিল, শল্কু্র কথাগুলো বাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে। তাদের মনে হয়তো কিছু দ্বিধা ছিল, সেটা ফিকে হয়ে উঠছে শল্কুর প্রত্যয়ী কথায়। তাদের চোয়াল শক্ত হচ্ছে, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা ফুলে উঠছে। তাদের চোখে ফুটে উঠছে ক্রোধ।

ভল্লা সবাইকে ভাবতে একটু সময় দিল, তারপর বলল, “তোরাও কি শল্কুর সঙ্গে একমত? মনে কোন ভয় বা দ্বিধা নেই তো?”

ছেলেরা প্রায় একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাদের লড়তে শেখাও, ভল্লাদাদা। আমরা লড়বো”।

ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বেশ। আমি শেখাবো। নিজে হাতে ধরেই শেখাবো। কিন্তু তার আগে শপথ নিতে হবে, আমাদের মধ্যে কেউ কোনদিন বিশ্বাস ভাঙবে না। প্রাণ দিতে হলেও না। একটা কথা মনে রাখিস – তোদের এই ভল্লাদাদাও কম নিষ্ঠুর নয়। চাপে পড়ে বা ভয়ে কেউ যদি রাজসাক্ষী হয়েছিস – কিংবা আমাদের কথা এই দলের বাইরের কাউকে বলেছিস, অন্য কেউ নয় - আমার হাতেই তার মৃত্যু হবে। রাজি?”

“রাজি”! সকলের সমবেত চিৎকার, জঙ্গলের মধ্যে গর্জনের মতো শোনালো।

ভল্লা সুকরা গ্রামের সুরুলকে বলল, “সুরুল, গতকাল রাত্রে তোর সঙ্গে কথা বলার সময়, তোর মধ্যে যে জেদ আর রাগ দেখেছিলাম, সেটা কি এখনো আছে? নাকি একটু ভয় ভয় করছে”?

সুরুল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ভীলককাকার মতো মানুষকে গতকাল ওরা যেভাবে অকারণ আঘাত করল, তার শোধ তো আমি তুলবই, ভল্লাদাদা। আমাদের সকলের মনের জোর আছে ভল্লাদাদা, কিন্তু রক্ষীদের সঙ্গে লড়ার দক্ষতা নেই...তুমি আমাদের শেখাও ভল্লাদাদা।

“তবে, মনে রাখিস, লড়াই শিখতে গেলে জরুরি হচ্ছে, ধৈর্য আর জেদ। এ দুটো যার যত বেশী, সে শিখবে তত তাড়াতাড়ি। চল, তাহলে এখনই শুরু করা যাক”।  

ভল্লা রামালিকে বলল, “রামালি, আমাদের রণপাগুলো বের কর। আজ রণপার খেলা শেখাই সবাইকে”। রামালি দুজোড়া রণপা এনে ভল্লার হাতে দিল। ভল্লা একজোড়া রেখে অন্য জোড়াটা দিল রামালিকে। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “বাঁশের এই লাঠি দুটোয় চড়ে আমরা আজ হাঁটতে শিখব। আমাদের ঘোড়া নেই...ঘোড়ার বদলে আমাদের আছে রণপা। এই রণপা শুধু যে আমাদের পা দুটোকে লম্বা করে দেবে তাই নয়, প্রয়োজনে এই রণপা আমাদের অস্ত্রও হয়ে উটবে। এই লাঠির আঘাতে শত্রুর মাথাও ফাটানো যাবে অনায়াসে। কাজেই রণপা বড়ো কাজের জিনিষ। এখন আমি আর রামালি তোদের দেখাব – কীভাবে এতে চড়তে হয়, কীভাবে হাঁটতে হয়। পরে অভ্যাস হয়ে গেলে দৌড়তেও হবে”।

ভল্লা এবং রামালি দুজনেই রণপায়ে চড়ল। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখাল সবাইকে। আহোক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুই কী করে শিখলি, রামালি?” রামালি স্বচ্ছন্দে হাঁটাহাঁটি করতে করতে বলল, “গতকাল ভোরে ভল্লাদাদা শেখাল। কাল সারাদিনে হাঁটতে শিখেছি...এবার দৌড়তেও শিখব”।

ভল্লা বলল, “সুকরার ছেলেরা ছাড়া, তোরা সবাই জানিস, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কোথায় লুকোনো আছে...চল সবাই ওদিকে যাই...ওখান থেকে রণপা নিয়ে এখনই মহড়া শুরু করব। রামালি তুই আস্তে আস্তে ওদের নিয়ে আয়, আমি এগিয়ে যাচ্ছি”।

পলক ফেলার আগেই রণপা চড়ে ভল্লা যেন উধাও হয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর। দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল উপস্থিত ছেলেরা। শুধু একজোড়া লাঠি নিয়েই এত দ্রুত চলাফেরা করা যায়? তাও এই জঙ্গলের রাস্তায়? রামালি ওদের পাশে রণপায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করল, “শল্কু, কাকার কী অবস্থারে?”

শল্কু খুব মন দিয়ে রামালির হাঁটা দেখতে দেখতে বলল, “আজ ভোরে শুনলাম একটু ভাল আছেন। উঠে বসেছেন। তবে তোর কাকি একদম চুপ মেরে গেছে, জানিস তো? চাইলে তুই আবার ফিরে আসতে পারিস। মনে হয় না, তোর ওপর কাকি আর কোন চোটপাট চালাবে।”

রামালি হেসে বলল, “ধূর কী হবে, কাকার সংসারের বোঝা হয়ে থেকে? আমাকে কিছু না বললেও, কাকাকে ছেড়ে দেবে? এই ভালো – ছোটবেলা থেকে বহু সহ্য করেছি... খুব ভয়ে ভয়ে বড়ো হয়েছি। আর না...এবার বাঁচবো...তার জন্যে যদি মরতে হয়...তাও। মরার আগে এটুকু অন্ততঃ জেনে যাবো... বসে বসে মার খাইনি, চেষ্টা করেছিলাম...”!

সুরুল জিজ্ঞাসা করল, “কাল তোমাদের গাঁয়ে এসে রক্ষীরা কী করেছে, শল্কুদাদা?”

শল্কু বলল, “গ্রামে এসেই তো শুয়োরের বাচ্চারা যাকে সামনে পেয়েছে চাবুক মেরেছে। কেউ কেউ তো আবার বল্লমের বাঁট দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়েছে। বাচ্চা, বুড়ো, মেয়েছেলে কাউকে ছাড়েনি। ভাবলেই মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করল, কার কার বাড়িতে ডাকাতির মাল রাখা আছে...বার করে দে...নয়তো আগুন ধরিয়ে দেব সব কটা বাড়িতে। সেই সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন কবিরাজকাকা। আর পৌঁছুলেন গ্রামপ্রধান জুজাককাকা...”।

আহোক বলল, “ভল্লাদাদা আমাদের গাঁয়ে ঢুকতে মানা করেছিল। আমরা থাকলে, ভয়ংকর কাণ্ড হয়ে যেত। আমার ছোটকাকার কাছে শুনলাম, প্রধানমশাই ওদের সামনে গিয়ে, বলার মধ্যে বলেছিলেন, “আমি এই গ্রামের প্রধান, আপনাদের কোন অভিযোগ থাকলে, আমাকে বলুন...যাকে তাকে সবাইকে এভাবে আপনারা মারতে পারেন না...দেশে কি রাজা নেই নাকি? এটা কি অরাজক দেশ?” ব্যস্‌, আর যায় কোথায়, গুয়োর ব্যাটারা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমশাইয়ের ওপর। কী মার কী মার। বল্লমের বাঁট, লাথি, চড় ঘুঁষি। কবিরাজকাকা গ্রাম প্রধানকে বাঁচাতে গিয়েছিল, তাকেও বেধড়ক মারল। লাথি মেরে ফেলে দিল মাটিতে।

এই সময়েই বেরিয়ে এসেছিল রামালির কাকি। গলার শির ফুলিয়ে নাকি চেঁচাচ্ছিল, “ওদের মারছো কেন? ওরা কী করেছে? ডাকাতি তো করেছে, বাপ-মা খেগো রামালি আর ওই আঁটকুড়ির বেটা ভল্লা। তাদেরকে ধরো না। ওদের কাছেই পেয়ে যাবে সব লুঠের মাল। এ গাঁয়ে কোন বাড়িতে কিচ্ছু নেই।

রামালির কাকির চিৎকারে রক্ষীরা একটু থমকে গিয়েছিল। না হলে গ্রামপ্রধান কালকেই শেষ হয়ে যেত। অকথ্য গালাগাল দিয়ে রক্ষীদের সর্দার বলল, এই রামালিটা আবার কোন বেজন্মা? রামালির কাকা গিয়েছিল, বউকে সামলাতে, সে বলল, আজ্ঞে আমার দাদার ছেলে, আমরা গতকালই ঝ্যাঁটা মেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এবার শুরু হল রামালির কাকার ওপরে মার...শুয়োরের বাচ্চা, কে তোদের তাকে তাড়াতে বলেছে?  সে এখন কোথায়? কাকাকে বাঁচাতে, কাকি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে আর এই গ্রামে নেই... হাভেতে ভল্লার সঙ্গে গিয়ে জুটেছে।

রক্ষীরা যখন রামালির কাকা আর কাকিকে নিয়ে ব্যস্ত, ওদিকে প্রধানমশাইয়ের তখন জ্ঞান নেই, মাটিতে পড়ে আছেন মড়ার মতো। কবিরাজকাকা ধুলো থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে গেলেন প্রধানমশাইয়ের কাছে, ওখানেই তিনি নাড়ি পরীক্ষা করে দেখছিলেন প্রধানমশাই বেঁচে আছে, না মরে গেছে। রক্ষীসর্দারের চোখ শালা শকুনের মতো, ঠিক দেখেছে। রাক্ষসটা কবিরাজকাকার কাছে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে তাকে ওঠাল, বলল, অ তুই বুঝি সেই কবিরাজ? আশপাশের গাঁগুলোতে তোর কথাও তো খুব শুনেছি...তুইই শালা সবাইকে খেপাচ্ছিস। ঢ্যামনা ঢকঢকে বুড়ো তুই আমাদের সঙ্গে চল...তোর পেটে পা দিলেই, ভড়ভড় করে বেরিয়ে আসবে গোপন সব কথা।

লোকটা কবিরাজকাকাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে গেল রামালির বাড়ির সামনে। প্রধানমশাইয়ের রক্তাক্ত দেহটা পড়ে রইল মাঠেই। রামালির বাড়ি তছনছ করে কী খুঁজল, দেখল কে জানে। যাবার সময় রামালির কাকাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গেল ওদের উঠোনে। তারপর বাইরে এসে সকলে ঘোড়ায় চড়ল, কবিরাজকাকার দুই হাত আর কোমরে দড়ি বাঁধল। রওনা হওয়ার আগে গাঁয়ের সবাইকে শাসিয়ে গেল, ভল্লা আর রামালিকে যদি না পায়, ওরা আবার আসবে। ঘোড়া ছুটিয়ে ওরা বেরিয়ে গেল। কবিরাজকাকার পা দুটো ঘষটাতে লাগল মাটিতে, ঠোক্কর খেতে লাগল, পথের ধারের পাথরে, ঝোপঝাড়ে”।  

আহোক বর্ণনা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। আহোক আবার বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে এইসব ঘটনার কথা যখন শুনছি, সবাই ছিল সামনে - বাবা, জ্যাঠা, অন্য কাকারা...মা কাকিমারা...ভাইবোনগুলোও...আমি বললাম গাঁয়ের এতগুলো মানুষ রয়েছো – কেউ বেরিয়ে গিয়ে কোন প্রতিবাদ করলে না? জ্যাঠা গম্ভীর গলায় বলল, জুজাক তো গিয়েছিল। কবিরাজদাদাও গিয়েছিল...ওদের কী হয়েছে সবই তো শুনলি...আমরা গেলেও একই দশা হত...কী আর বলবো...বয়স্ক গুরুজন... রাজরক্ষীদের ভয়ে এরা কোনদিন মাথা তুলে বাঁচতেই শেখেনি...”

সুরুল বলল, “এসব দেখে শুনেও আমাদের রক্ত যদি গরম না হয়...যদি এর শোধ না নিই...রক্তখেকো রক্ষীদের যদি এখনই উচিৎ শিক্ষা না দিই...তাহলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না, আহোকদাদা...রোজ রোজ তিলে তিলে মরার থেকে...ওদের অন্ততঃ একজনকে মেরে যদি মরি...সেটাই হবে প্রকৃত বাঁচা...”।

তেইশজন ছোকরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের পথে।

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১ "

নতুন পোস্টগুলি

নামকরণ

     এর আগের রম্যকথা - " ভাগ্যের পাথর - পর্ব ২   "        শাশুড়িমায়ের জিম্মায় ফুটকিকে রেখে বিজলি আজই স্কুলে জয়েন করলেন। মাসখানেকের...