বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৯

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮ 


১৫

 

যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র রাখার জন্যে ভল্লা তার নির্বাসন কুটির থেকে কিছুটা দূরে দুটি বিশাল গাছ নির্দিষ্ট করেছিল। সেই গাছের মাঝামাঝি উচ্চতায় দুটি শক্তপোক্ত মাচানও সেই বাঁধিয়ে রেখেছিল। ঘন পাতার আড়ালে সে মাচানের অবস্থান যথেষ্ট গোপন। ভূমি থেকে উপরের দিকে তাকালে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। গাছগুলিতে গুটি গুটি ফল হয়। সে ফল মানুষ কিংবা বাঁদরের ভক্ষ্য নয়। অতএব বাইরের উপদ্রব মুক্ত। হেমন্ত বা শীতেও সে গাছদুটির পাতা ঝরে না, চিরহরিৎ।

মধ্যরাত্রি শেষের দণ্ড দেড়েক আগেই সেই গন্তব্যে পৌঁছে, টানা-শকটদুটি খালি করে সমস্ত অস্ত্র সম্ভার উঠে গেছে, দুই গাছের দুই মাচায়। অতএব এতক্ষণে অস্ত্র অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করল ভল্লা। সকলকে ডেকে চাপা স্বরে বলল, “ছেলেরা, আমাদের আপাততঃ কাজ শেষ, এই স্থান ছেড়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আমরা দণ্ড দুয়েক বিশ্রাম নেব। তারপর ঊষাকালে যে যার বাড়ি ফিরে যাবি”। ছেলেরা ভল্লাকে ঘিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে নানান কথাবার্তা বলতে লাগল। সকলেই প্রথম এই অভিযানের সাফল্যে গর্বিত, উচ্ছ্বসিত। একজন বলল, “ভল্লাদাদা, রাজার রক্ষীরা কোন ভুট্টার রুটি খায় গো? গুটিচারেক লোক ছাড়া কেউ আটকাতেই এল না! এই রক্ষীদের নিয়ে রাজ্য শাসন চলে?”

ভল্লা হাসল, কোন উত্তর দিল না। অন্য আরেকজন বলল, “সত্যিই, আস্থান থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুঠ করা যে এত সহজ হবে, কে জানত? যাবার সময় আমার তো রীতিমতো হাত-পা কাঁপছিল। ফুস্‌, গিয়ে দেখলাম কিছুই না, ছেলের হাতের মোয়া”!

ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “এই অভিযানটাকে তেমন গুরুত্ব দিস না। এর পরের অভিযানগুলোতে টের পাবি, লড়াই কাকে বলে। কী ভাবে সত্যিকার লড়াই লড়তে হয়। এসব কথা এখন থাক। মন থেকে এই অভিযানের কথা সম্পূর্ণ সরিয়ে দে। বাড়ি গিয়ে বাবা-মা ভাইবোন যখন প্রশ্ন করবে কী জবাব দিবি, সেটা এখনি ঠিক করে নে”

“কেন? তুমি গত পরশুই বাড়িতে বলতে বলেছিলে, আমরা রাম-কথা শুনতে যাবো, পাশের রাজ্যে। আমরা সেকথা বলেই তো এসেছি”।

ভল্লা সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, “রামায়ণের কাহিনী বিশাল, তার মধ্যে কোন কাহিনী নিয়ে আমরা রামকথা শুনলাম, সেটা ভেবেছিস? নাকি নিজের নিজের বাড়ি গিয়ে সকলে আলাদা আলাদা গল্প শোনাবি?  কেউ বলবি হরধনু ভঙ্গ, কিংবা বালি বধ, কিংবা সীতা হরণ – কোনটা? কিশনা ধর তুই তোর মাকে বললি, জটায়ূ বধের গল্প, আর মিকানি তার মাকে বলল মারীচবধের গল্প। এবার তোদের দুই মায়ের যখন দেখা হবে, তোদের মিথ্যে কথা ধরতে তাঁদের খুব সময় লাগবে কি?”

কেউ কোন উত্তর দিতে পারল না। ভল্লা হাসল, বলল, “আবারও বলছি, আজকের এই অভিযানের কথা ভুলে যা। নিজেদের মধ্যে এখন রামকথা নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা কর। আমি যতদূর জানি, গতকাল রাত্রে হরধনু ভঙ্গ নিয়ে রামকথা হয়েছে। অতএব তোদের সবাইকে হরধনু ভঙ্গ নিয়েই কথা বলতে হবে। এর আগে কোথাও যদি দেখে বা শুনে থাকিস, সেটাকে সকলে মিলে মনে করার চেষ্টা কর। নইলে সবাই – সব্বাই - ধরা পড়ে যাবি। শুধু এ গাঁয়ে নয় আশপাশের গাঁয়েও ঢি ঢি পড়ে যাবে। আমি সুকরার চারজনকে রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের চলে আসা উচিৎ”।

কিশনা বলল, “তারা এসে কী করবে?”

“আজকের রামকথা তারা কেমন দেখল, কী দেখল, সে কথা তোদের বলবে। বিষয়টা কেন গুরুতর তোরা বুঝতে পারছিস না। আস্থানের অস্ত্র লুঠের সংবাদ আগামী কাল দুপুর থেকেই গ্রামের সকলে জেনে যাবে। তখন তোদের মিথ্যে গল্পের সঙ্গে আস্থান লুঠের যোগসূত্র বুঝে যাবে তোদের গ্রামের কুকুর-ছাগলগুলোও”!

বিষাণ বলল, “আমি এর আগে দু বার হরধনু ভঙ্গ দেখেছি…তাহলে সে নিয়েই আলোচনা হোক”।

ভল্লা হেসে মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিক। আরও একটা ঝুঁকির কথা বলি। ওই রামকথা শুনতে আশেপাশের গ্রাম থেকেও কিছু লোক গিয়ে থাকতে পারে। তারা তোদের কাউকে কাউকে হয়তো চেনে। তাদের কেউ বলতেই পারে – আমি তো কাল গেছিলাম, কই তোদের তো দেখলাম না! কোথায়, কোনদিকে বসেছিলি? সে বিপদের কথাও ভেবে রাখিস”।

ছেলেরা ভল্লার কথায় অবাক হয়ে নির্বাক হয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভল্লা আবার হেসে বলল, “এই অভিযানটা  তোদের ছেলের হাতের মোয়া মনে হচ্ছে তো? তার কারণ আমার কাছে খবর ছিল, গতকাল সন্ধ্যে থেকে  আস্থানে পূর্ণিমা-উৎসব পালন করছে। রক্ষীদের অধিকাংশই তাড্ডির নেশায় মাতাল ছিল। সেই সুযোগটাকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি মাত্র”। একটু থেমে আবার বলল, “এই অভিযান তখনই সফল হবে, যদি তোদের একজনও কেউ ধরা না পড়িস। মনে রাখিস, একজনও কেউ ধরা পড়লে, তার পেট থেকে সকলের নাম-ধাম বের করে নেওয়াটা রাজরক্ষীদের কাছে – ছেলের হাতের মোয়া”।

ভল্লা ছেলেদের মুখ আতঙ্কের ছাপ দেখতে পেল, বলল, “ভয় পাস না। চিন্তা কর, ভাবনা কর। আর যেমন যেমন বললাম, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নে – সকলের বক্তব্য যেন একই হয়”।

ভল্লা উঠে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে আসা জরুরি। কথা বলতে বলতেও সে হানো, শলকু আর আহোকের দিকেও লক্ষ্য রাখছিল। হানোর অবস্থা এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি। বরং তার পাগলামি বাড়ছে। ভল্লা হানোর কাছে গেল, তার কাঁধে হাত রেখে অনুভব করল ধূম জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে। ভল্লার ভুরু কুঁচকে উঠল। একটু পাশে সরে এসে সে চিন্তা করতে লাগল, কী করে হানোকে নির্বিঘ্নে সরিয়ে ফেলা যায়তার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল রামালি। “ভল্লাদাদা, হানোর জন্যে আমরা সবাই মনে হচ্ছে ডুববো”।

ভল্লা তীক্ষ্ণ চোখে রামালির দিকে তাকাল, বলল, “হুঁ। কিন্তু কী করা যায়?”

“সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর তো কোন পথ দেখছি না”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল। রামালির মতো ছেলের মুখে এমন নির্বিকার সিদ্ধান্তের কথা, ভল্লা আশা করেনি। রামালি তার দলে ভিড়েছে প্রথম দিন থেকে। যে কোন বিষয় জানার এবং শেখার জন্যে তার যে তীব্র নিষ্ঠা, সেটা ভল্লার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু ছেলেটার চোখেমুখে কোনদিন কোন উচ্ছ্বাস, আনন্দ, কষ্টবোধ সে লক্ষ্য করেনি। সে শুনেছে শৈশবে বাপ-মা মরা ছেলেটি বড়ো হয়েছে কাকা-কাকিমার সংসারে। রামালির প্রতি তার কাকার স্নেহ ও সহানুভূতি থাকলেও, কাকিমা তার ওপর সর্বদাই খড়্গহস্তা। ভল্লার মনে হয়েছে আশৈশব নানান অত্যাচার, বঞ্চনা এবং নির্স্নেহ - তার মানসিক চরিত্রটাকেই এভাবে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে রামালির আশ্চর্য উদাসীন ব্যবহার চমকে দিল ভল্লাকে

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল “এখানে এতজনের সামনে, কী ভাবে?”

এতটুকু সময় না নিয়ে রামালি বলল, “সাপ। দুর্ঘটনা – অপঘাত মৃত্যু। এই জঙ্গলে বেশ কিছু সাপের বাসা আমার জানা আছে – কেউটে, গোখরো”।

অন্ধকারে, গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া চাঁদের ঝিলিমিলি আলোয় ভল্লা রামালির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। রামালি বলল, “তুমি অনুমতি দিলেই…”। ভল্লা তাকিয়েই রইল রামালির দিকে। একটু পরে রামালি দৌড়ে মিশে গেল অন্ধকার জঙ্গলে। ভল্লা সরে গেল অন্য দিকে। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হরধনু ভঙ্গ প্রসঙ্গে গবেষণায় নিবিষ্ট। ভল্লা সবার মুখই দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। এখন হানোকে সে আর দেখছে না। তার চোখ বারবার ফিরে আসছে শলকু আর আহোকের মুখে। দুজনেই এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু তাও সে স্বস্তি পাচ্ছে না। 

এই সময়েই সুকরার চারজন ছোকরা এসে যোগ দিল ওদের দলে, ভল্লা যাদের রামকথা শুনতে পাঠিয়েছিল। ওদের কাছে গিয়ে ভল্লা বলল, “যা ওরা সবাই রামকথা নিয়েই আলোচনা করছে, ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দে, তোরা ঠিক ঠিক কী দেখলি, কেমন দেখলি”।

তার পরিকল্পনায় এখনও পর্যন্ত কোন ত্রুটি ঘটেনি – শুধু হানোর ব্যাপারটা ছাড়া। হানোর মতো উদ্যোগী এবং কর্মঠ এক যুবক যে মানসিকভাবে এত দুর্বল – সেকথা ভল্লা বুঝতে পারেনি। ভল্লা এখনও পর্যন্ত তার এই ভুলটুকুই খুঁজে পেয়েছে – তবে ভুলটা সামান্য নয়। এর ফল হতে পারে মারাত্মক।     

প্রত্যূষের দণ্ডখানেক পার হওয়ার পরেও ভল্লা কারও চোখেমুখে ক্লান্তি বা ঘুমের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রায় সারারাত পালাগান বা রামকথা শুনে, কবে কোন লোকের চোখেমুখে বিনিদ্র-ক্লান্তির লক্ষণ ফোটে না? কিন্তু এদের চোখে মুখে কোথাও ক্লান্তির লেশমাত্র নেই! প্রথম অভিযান এমন নির্বিঘ্নে সফল হওয়ার আনন্দে তাদের মন এতই আত্মতুষ্ট এবং গর্বিত যে তাদের ক্লান্তি নেই? ঘুম আসছে না? এদিকে ভোর হতেআর দেরি নেই – ভোরে সকলের ঘরে ফেরা উচিৎ। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছেলেরা এবার তোদের ঘরের দিকে রওনা হওয়া প্রয়োজন। এখনই রওনা হলে ভোরের দিকে গ্রামে পৌঁছতে পারবি। আশা করি নিজেদের মধ্যে আলোচনায় রাত্রের হরধনু-ভঙ্গ পালার প্রতিটি ঘটনা সকলেই জেনে গিয়েছিস। বাড়িতে জিজ্ঞাসা করলে সকলেই একই রকম কথা বলতে পারবি নিশ্চয়ই”।

দলের ছেলেদের অধিকাংশই বলে উঠল, “পারবো, তুমি চিন্তা করো না, ভল্লাদাদা।“

“বাঃ বেশ। আরেকটা কথা বলে রাখি। আগামীকাল তোদের বাবা-জ্যাঠারা হয়তো জেনে যাবেন, আস্থানে ডাকাতি হয়েছে। হয়তো তাঁদের মুখে শুনবি – দু তিনজন রক্ষীর মৃত্যু সংবাদও!”

“কী বলছো, ভল্লাদাদা? হত্যা? আমাদের কেউ করেছে নাকি?” ছেলেরা আঁতকে উঠল ভয়ে।

ভল্লা বলল, “হতে পারে। নাও হতে পারে। অনেক সময় প্রশাসন থেকে মিথ্যে কথাও বলা হয়, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে”।

ছেলেরা ভল্লার মুখের দিকে আতঙ্কভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভল্লা তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এত ভয় পাচ্ছিস কেন? এরকম উড়ো খবর শুনে বাবা-জ্যাঠাদের সামনে অমন ভয়ে শিউরে উঠবি নাকি? ডাকাতির সংবাদ শুনে, সবাই অবাক হয়ে যেমন “তাই নাকি?”, "কখন হল?" "ডাকাতের দল এল কোথা থেকে?" বলে, সেরকমই বলবি। মৃত্যুর সংবাদ শুনেও একই ভাবে বলবি “বলছো কী? ইস্‌ কি ভয়ংকর”!  ব্যস। তার বেশি বা কম নয়”।

ভল্লা একটু সময় নিল, তারপর আবার বলল, “একটা কথা মনে রাখিস, শুধু অভিযান করলেই বীর হওয়া যায় না। তার পরেও প্রতিটি পা ফেলতে হয় বুদ্ধি আর বিবেচনা করে। এতটুকু ভুল কথা, সামান্য বেঠিক আচরণে তোরা সবাই বিপদে পড়ে যেতে পারিস। আশা করি এই একটা মাত্র অভিযান করেই, তোদের কেউই চাইবি না, রাজার কারাগারে সারাজীবনটা কাটুক। প্রকৃত বীরকে অনেক পথ চলতে হয় অনেক বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে। যা, এবার রওনা হয়ে পর। আর দেরি করিস না”।

ছেলের দল উঠে দাঁড়াল। শলকু বলল, “আজকে আর সকালের মহড়ার কথা বলো না, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা হেসে ফেলল, শলকুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোদের মহড়া আজ বন্ধ। তবে আমি আজ সকালের দিকে চাষিভাইদের সঙ্গে মাঠে থাকবো। ওদের কাজকর্ম দেখাশোনা করবো। বাঁধটার আরও কিছু মেরামতি দরকার”।

শলকু বলল, “তুমিও তো সারারাত ঘুমোওনি। আজ বিশ্রাম নিতে পারতে”।

ভল্লা হেসে বলল, “কে বলল আমি কাল সারারাত ঘুমোইনি? আমি তো রামকথা দেখতে যাইনি। তোরা কাল রাত্রি দেড়প্রহরে বেরিয়ে যেতেই, আমি রান্নাবান্না করেছি, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছি…। তোদের কারও সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি...।

ভল্লার কথা শেষ হল না, একজন দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে বলল, “ভল্লাদাদা, হানোর কোন সাড়াশব্দ নেই, চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে, মারা গেছে”।

ভল্লা অবাক হয়ে বলল, “কী যাতা বলছিস? কই চল তো দেখি”।

সকলে হানোর পড়ে থাকা শরীরটার দিকে দৌড়ে গেল। ভল্লা উবু হয়ে বসে নাকের নীচে আঙুল রাখল, কবজি ধরে নাড়ি পরখ করল। তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, না প্রাণ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল হানোর বাঁ কানের নীচেয় – কালচে নীল হয়ে রয়েছে জায়গাটা। তার মাঝখানে দুটো সূক্ষ্ম ছিদ্র – সাপের ছোবল। ভল্লা কিছু বলল না। কিছু বলার দরকারও ছিল না। বছরে এমন একটা-দুটো সর্পদংশনের ঘটনা গ্রামের ছেলেরা ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখেছে। তবে সেগুলো সাধারণতঃ হয় পায়ে, অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে, অথবা জমিতে নীচু হয়ে কাজ করতে গিয়ে, হাতে। সে সব ক্ষেত্রে কখনও সখনও মানুষ বেঁচেও যায়। কিন্তু হানোকে ছুবলেছে – মোক্ষম জায়গায়, বেঁচে ফেরার কথাই ওঠে না।  

কিছুক্ষণ পর ভল্লা বলল, “চটপট একটা হালকা মাচা বানিয়ে, হানোকে সাবধানে নিয়ে যা। ছেলেটা সবে তৈরি হয়ে উঠছিল রে…এভাবে বেঘোরে মারা পড়ল…” ভল্লার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

গাছের ডাল কেটে মাচা বানিয়ে চার জন ছেলে হানোকে কাঁধে চাপিয়ে নিল। ছেলেদের সকলের মুখই এখন বিষণ্ণ। ক্লান্ত। অবসন্ন। এতক্ষণ তাদের মনে যে উত্তেজনা ও আনন্দ ছিল, সে সব মুছে দিয়ে গেল হানোর এই ভয়ংকর মৃত্যু। ভল্লা তাকিয়ে রইল দলটার দিকে। দলের পিছনে ছিল রামালি। রামালির সঙ্গে ভল্লার ক্ষণিকের চোখাচোখি হল। রামালির মুখও এখন আশ্চর্য অবসন্ন।

ভল্লা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া লক্ষ্য করল। তারপর মুখ তুলে তাকাল আকাশের দিকে। এখনও অন্ধকার। পাখিরা ঘুম ভেঙে সবে ডাকতে শুরু করেছে। ভোরের বাতাস গাছের পাতায় পাতায় তুলছে মর্মর শব্দ।    



চলবে...

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ " 


১৩

 

শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।

শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”

জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায় অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।

শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।

জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।

শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে”।

জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর, শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”

ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।

শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্‌গির সম্ভব, সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান, ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”

শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!

ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটা বুঝে নিতে চাই”। একটু থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য মুদ্রা হলে ভালো হয়”।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।

“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব। তাতেই আপাতত চলে যাবে”।  

শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ? আশ্চর্য!”

“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর ডাকাতি করব”।

“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না, হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।

শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি, ভল্লা?”

“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।

শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”

ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির স্থাপনা করেন...”।

শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে! রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন সংশয় নেই।”

“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।

শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”

“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।

আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।

“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।

“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।

এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড। মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস, তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে – সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”

লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ! 

এর পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮



শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৫ " 


 

অন্যদিনের তুলনায় আজ বাড়ি ফিরতে একটু দেরিই হল জুজাকের। কমলি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন – বারবার বেরিয়ে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে গলা বাড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন, মানুষটা আসছে কিনা। আজ অমাবস্যা। দুপাশের গাছপালা, ঝোপঝাড়ে গভীর অন্ধকার। তারার আলোয় পথটাকেই অস্পষ্ট ঠাহর করা যায়। পথের প্রেক্ষাপটে মানুষের অবয়ব বুঝতে পারা যায়। কমলির উদ্বেগ বাড়ছিল, জুজাক গ্রামপ্রধান ঠিকই, তবে তিনি শুনেছেন রাজধানী থেকে আসা রাজকর্মচারীরা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামপ্রধানকে সমীহ করে না। তারওপর জুজাক কিছুটা মুখফোঁড় বদরাগীও বটে। আধিকারিকদের কোনো তির্যক প্রশ্নের ব্যাঁকা উত্তর দিয়ে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে তার জুড়ি নেই। তার এই স্পষ্টবাদী সরল চরিত্রের জন্যেই গ্রামের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে গ্রামপ্রধান বানিয়েছে। জুজাকের জন্য একদিকে কমলি যেমন গর্ব অনুভব করেন, অন্যদিকে ততটাই শঙ্কিতও থাকেন সর্বদা। তিনি জানেন দিনকাল বদলে চলেছে নিরন্তর। অপ্রিয় সত্যকথা কেউই সহ্য করতে পারে না। প্রশাসনিক আধিকারিকরা তো নয়ই।

আজ অন্য আরেকটি বিষয়ও কমলির দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে তুলেছে। ভল্লা। আজ গ্রামে সকলের সামনে সে নিজের মুখেই স্বীকার করেছে তার অপরাধের কথা। তার নির্বাসন দণ্ডের কথা। রাজকর্মচারীদের কাছে কী সে সংবাদ পৌঁছে গিয়েছে? যদি তারা জেনে গিয়ে থাকে ভল্লা জুজাকের ঘরেই আশ্রয় পেয়েছে। এই ঘরেই সে চিকিৎসা এবং সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে। সেটা কি তারা রাজদ্রোহীতা বলে মনে করবে? জুজাককে শাস্তি দেবে? কশাঘাত করবে? কিংবা বন্দী করে রক্ষীদের দিয়ে শারীরিক অত্যাচার করবে?

হতভাগা ছেলেটা গেলই বা কোথায় কে জানে? নিজের ঘরে কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে “আমি একটু ঘুরে আসছি, মা” বলে বেরিয়েছিল শেষ দুপুরে। এখনও পর্যন্ত তারও দেখা নেই। ঘরে থাকলে, একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসতে পারত ছেলেটা। জুজাকের সঙ্গে যারা গিয়েছিল তাদের বাড়ি গিয়েও খবর আনতে পারত। বলা যায় না, জুজাক হয়তো, তাদের কারো বাড়িতে বসে জমিয়ে গল্প করছে। লোকটার কাণ্ডজ্ঞান ওরকমই। তার জন্যে ঘরে যে কেউ উৎকণ্ঠায় বসে আছে, সে কথা তার মনেই পড়ে না।

ঘরবার করতে করতে কমলি লক্ষ্য করলেন, তুলসীমঞ্চের প্রদীপে তেল ফুরিয়ে এসেছে, সলতেটা ম্লান হয়ে জ্বলছে। দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে রেডির তেল এনে প্রদীপে ঢাললেন, সলতেটা একটু উস্কে দিলেন। আর তখনই বেড়ার দরজা খোলার শব্দ হল, চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, জুজাক ঢুকছে।

“এত রাত হল? কিছু গোলমাল হয়নি তো?”

জুজাক কোন উত্তর দিলেন না, ঘোঁত করে নাকে শব্দ করে, দাওয়ায় বসলেন। কমলি দৌড়ে গিয়ে ঘটি করে পা ধোয়ার জল আনলেন। ঘর থেকে নিয়ে এলেন জুজাকের গামছাখানা। জুজাক ঘটির জলে পা ধোয়া শুরু করতে, কমলি বললেন, “কিছু বললে না, তো? এত দেরি হল কেন?”

দুই পা ধুয়ে, গামছা দিয়ে ধীরেসুস্থে পা মুছতে মুছতে জুজাক বললেন, “গাঁয়ে ফিরেছি অনেকক্ষণ। ও পাড়ায় ঢুকতেই লোকজনের মুখে তোমার ছেলের গুণকীর্তন শুনছিলাম। তুমি শুনেছ?”

“শুনেছি”।

“তা আর শুনবে না? তোমার আদরের ছেলের জন্যে কাছারিবাড়িতে আমাকে কত কথা শুনতে হল। খাবার জল দাও তো”।

কমলি ঘর থেকে খাবার জল এনে দিলেন। “কী বলেছে তারা?”

জুজাক মাটির ঘটি হাতে তুলে নিয়ে নিঃশেষ করলেন ঘটিটা। তারপর তৃপ্তির শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হবে আর কী? গিয়েছিলাম কান্নাকাটি করে এ গ্রামের মানুষদের কিছুটা কর যদি কমানো যায়। অন্ততঃ সম্বৎসর সকলের পেটটা যাতে চলে যায়। সে কথায় কানই দিল না? বললে, ভল্লা তোমার বাড়িতে আছে? বললাম, আছে। বললে, একজন অপরাধী – যার রাজধানীর প্রশাসন থেকে নির্বাসন দণ্ড ঘোষণা হয়েছে। তাকে তুমি বহাল তবিয়তে খাওয়াচ্ছো, দাওয়াচ্ছো, চিকিৎসা করাচ্ছো। আর রাজার কর দিতেই তোমার নাকে কান্না শুরু হয়ে গেল?”

কমলি উদ্বেগের স্বরে বললেন, “কী অবস্থায় ছেলেটা এসেছিল তুমি বললে না?”

জুজাক একটু ঝেঁজে উঠে বললেন, “বলব না কেন? সব বলেছি”। তারপর একটু থেমে নরম স্বরে বললেন, “ওরা রাজ কর্মচারী। তাদের কাছে ভল্লার পরিচয় অপরাধী। সে আর মানুষ নয়, জন্তু। ওদের কথা ঘেয়ো কুকুরের মত যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই ওকে তাড়িয়ে দিইনি কেন? জগৎটা তোমার মতো মায়ের মন নিয়ে যে চলে না, কমলি”।

কমলি জুজাকের সহানুভূতির সুরে আশ্বস্ত হলেন। মানুষটাকে ওপরে ওপরে কঠোর মনে হলেও, মনটা নরম। তা যদি না হত, জুজাক জোর করেই ভল্লাকে তাড়িয়ে দিতে পারতেন। তৎক্ষণাৎ না হলেও, যেদিন ভল্লার প্রথম জ্ঞান হল, সেদিনই। আজকে রাজ-প্রতিনিধির যে তিরষ্কার তিনি শুনে এলেন – এমন যে হবে সেকথা জুজাক বহুবার বলেছেন। বারবার বলেওছেন, হতভাগাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব – কিন্তু দিতে পারেননি। মানবিক বোধের কাছে তার বাস্তব যুক্তি হেরে গেছে।

কমলি জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওদের কাছে এ খবর পৌঁছে দিল কে? নিশ্চই এই গাঁয়েরই কেউ?”

“সে তো বটেই। সব গ্রামেই ওদের গুপ্তচর থাকে। তাদের কাজই তো ওদের খবর দেওয়া। সে যাক, ছোঁড়াটাকে ডাক দেখি একবার”।

“সে তো সেই দুপুরের দিকে বেরিয়ে গেছে, এখনও ফেরেনি”।

“কোথায় গিয়েছে তোমাকে বলেও যায়নি? আশ্চর্য। কবিরাজদাদার বাড়িতে আমরা বেশ কয়েকজন কথাবার্তা বলছিলাম। সেখানে শুনলাম, সকালে ভল্লার বক্তৃতা শুনে কয়েকজন ছোকরা নাকি বেশ বিগড়ে গেছে। দুপুরের পর থেকেই তারাও বাড়িতে নেই। তবে কি...”।

কমলি আতঙ্কিত হয়ে বললেন, “তবে কি গো? ওই ছোঁড়াগুলো কি ভল্লাকে মারধোর করবে?”

জুজাক হেসে ফেললেন কমলির সরলতায়, বললেন, “মেয়েদের লাঞ্ছনা রোধ করতে গিয়ে সে অপরাধী হয়েছে। রাজ-প্রশাসন লম্পট মানুষটাকে শাস্তি না দিয়ে, সাজা দিয়েছে ভল্লাকে। এ গাঁয়ের ছোকরাদের চোখে ভল্লা এখন বীর। কবিরাজদাদা বলছিলেন, ভল্লা বোধ হয় ছোকরাদের নিয়ে একটা দল গড়তে চাইছে”।

কমলি অবাক হয়ে বললেন, “কিসের দল?”

জুজাক আবার একটু ঝেঁজে উঠলেন, বললেন, “তার আমি কী জানি? তোমার মনে আছে, কবিরাজদাদা ওর শরীরের লক্ষণ দেখে বলেছিলেন, ভল্লা সাধারণ এলেবেলে ছেলে নয়। যথেষ্ট শক্তিশালী যোদ্ধা। আরও বলেছিলেন, ওই চরম অসুস্থ অবস্থায় ওর এখানে আসাটা হয়তো আকস্মিক নয়। হয়তো গোপন কোন উদ্দেশ্য আছে। আজকে সকলের সামনে কবিরাজদাদা সে প্রসঙ্গ তোলেননি। কিন্তু আমারও এখন মনে হচ্ছে কবিরাজদাদার কথাই ঠিক”।

কমলি কিছু বললেন না। হাঁটুতে থুতনি রেখে গভীর চিন্তা করতে লাগলেন, ভল্লাকে দেখে কই আমার তো তেমন কিছু মনে হয়নি। এ গ্রামে আসা থেকে আমি তাকে যত কাছে থেকে দেখেছি, আর কে দেখেছে? তার কথাবার্তায়, তার মা ডাকে কোথাও কোন উদ্দেশ্যর সন্ধান তো তিনি পাননি। আজকে গ্রামের সবার সামনে মন খুলে নিজের অপরাধের কথা যে ভাবে সে স্বীকার করেছে, তার মনে যদি সত্যিই কোন পাপ বা অপরাধ বোধ থাকত, পারত ওভাবে বলতে?

জুজাক বললেন, “খাবার বাড়ো, খেয়ে শুয়ে পড়ি”।

কমলি তাড়াতাড়ি উঠে খাবার আনতে ঘরে ঢুকলেন। সেদিকে তাকিয়ে জুজাক বললেন, “তোমার ছেলে যত রাতই হোক বাড়িতে তো ঢুকবেই। তুমি ছাড়া তার জন্যে কে আর রাত জেগে খাবার কোলে বসে থাকবে?  এলে বলে দিও, সামনের অষ্টমীতে ওকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে কাছারি শিবিরে যেতে হবে। বলে দিও, না গেলে ওর তো বিপদ হবেই, আমাদেরও রক্ষা থাকবে না”।

 

জুজাক নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ার অনেকক্ষণ পর, ভল্লা বাড়ি ফিরল। দেখল কমলি-মা দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। মাথাটি ঘুমে ঢুলে পড়েছে। নিঃশব্দ পায়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াল ভল্লা, ফিসফিস করে বলল, “মা রে, খুব খিদে লেগেছে যে”। কমলি চমকে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, ভল্লা চকিতে তাঁর মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চুপ, চুপ। প্রধানমশাই জেগে গেলে, আমার আর রক্ষে থাকবে না”।

কমলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে। ভল্লার হাতের ছোঁয়ায় তিনি যেন ফিরে পেলেন তাঁর মৃত জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্পর্শ। সেও তার বাপকে ভয় পেত খুব। বাইরে কিছু অপাট কাজ করে এসে কাঁচুমাচু মুখে মায়ের কাছে সঁপে দিত নিজেকে। কমলি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভল্লার চোখের দিকে। তারপর ভল্লার হাত সরিয়ে নীচু স্বরে বললেন, “ঘরে যা, আমি খাবার নিয়ে আসছি”।

ভল্লা নিঃশব্দে দাওয়ায় উঠে জালা থেকে জল তুলে হাতপা মুখ ধুল, তারপর দাওয়া পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। তার প্রায় পিছনেই মাটির থালায় রুটি আর ডাল নিয়ে ঢুকলেন কমলি। ভল্লার হাতে থালাটি তুলে দিয়ে, কমলিও বসলেন মেঝেতে, জিজ্ঞাসা করলেন, “এত রাত অব্দি কোথায় ছিলি?”

রুটির টুকরো ছিঁড়ে মুখে নিয়ে ভল্লা বলল, “আমার এখানকার পাট তো এবার তুলতে হবে, মা। প্রধানমশাই তোকে বলেনি কিছু?”

“বলেছে। তোকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানকে, সামনের অষ্টমী তিথিতে যেতে হবে কাছারি-শিবিরে”।

“জানি তো। সেই ব্যবস্থাই করতে গিয়েছিলাম”।

“কোথায় যাবি, কোথায় থাকবি?”

“এ রাজ্যের সীমানার ঠিক বাইরে। এ গ্রামের পিছনে ক্রোশ দুয়েক দূর। কাল-পরশুর মধ্যে মাথা গোঁজার ঝুপড়িটা শেষ করে ফেলব। ঘরটা যেখানে তুলবো, তার কাছাকাছি – এই হাত তিরিশেক দূরে ছোট্ট একটা পুকুরও আছে। সেখানে জানিস তো মা, মাঝে মাঝে দু একটা হরিণ জল খেতে নামে। নিরিবিলি, সুন্দর জায়গা”।  

কিন্তু ও পাশে গভীর জঙ্গল তো, ওই জঙ্গলের মধ্যে কী করে থাকবি? তার চে পাশের রাজ্যে চলে যা। কিছু একটা কাজকম্মো জুটিয়ে নিতে পারবি না?”

ভল্লা হাসল, “পাশের রাজ্য যে এ রাজ্যের মিত্র রে, মা। ওদের রাজ্যে ঢুকলে, ওই রাজ্যের কোটালরাও আমাকে গোবেড়েন দিয়ে তাড়াবে। তার চে আমার ওই জঙ্গলই ভালো – সভ্য সমাজে নিশ্চিন্তে থাকুক রতিকান্তর মতো রাজশ্যালকরা, আর আমরা স্বস্তিতে থাকি গভীর জঙ্গলের নিরিবিলিতে”।

“ওখানে খাবি কি?”

“সে আমি দেখে এসেছি মা। জঙ্গলে কিছু শাক-পাতা, কন্দ-টন্দ পেয়ে যাবো। আর ওদিক দিয়েই কিছু ব্যাপারীদের যাতায়াত আছে তাদের থেকে, কিছু জোয়ার বাজরা, ভুট্টা যোগাড় হয়ে যাবে। ও নিয়ে তুই ভাবিস না, মা”।

“আমি যদি তোকে খাবার পাঠিয়ে দিই?”

“পাগল হয়েছিস, মা? ও কথা মনেও আনিস না। আমি থাকব রাজ্যের বাইরে, কিন্তু তোকে আর প্রধানমশাইকে ভয়ানক রগড়াবে আস্থানের রক্ষীরা। তোকে কেউ কিছু করলে আমি সইতে পারব, বল মা?”

কমলি কোন উত্তর দিলেন না। মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছুক্ষণ পর তাঁর দুই চোখ জলে ভরে উঠল। ভল্লা লক্ষ্য করে হাসতে হাসতে বলল, “অত উতলা হস না, মা। আমার যেতে তো এখনও সাত দিন। সেই সাতটা দিন তোকে আমি খুব জ্বালাবো, দেখিস। আর তার পরেও আমি সময় বুঝে ঠিক চলে আসব মাঝেসাঝে – কেউ টেরও পাবে না। আসব ঠিক ভূতের মতো, মাঝ রাতে। যে রাতে তোর বাড়ির পাঁদাড় থেকে শালিক পাখি বা কাক আচমকা ডেকে উঠবে, বুঝবি সে এই ভূত। কিন্তু, তুই আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যাবি না, মা। তাহলে কিন্তু ঘোর বিপদ”।

ধরা গলায় কমলি বললেন, “কবে যাবি?”

“কাছারি শিবির থেকে এখানে আর ফিরব না, সোজা আমার বাসায় গিয়ে উঠব”।

ভল্লার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কমলি এঁটো থালা নিয়ে উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “হ্যারে, তুই নাকি গাঁয়ের ছেলেদের নিয়ে দল করছিস?”

ভল্লা হেসে জিজ্ঞাসা করল, “দল করছি? কিসের দল? কে বলল তোকে? গাঁয়ের ছেলেছোকরারা আমার কাছে আসে, আমার সঙ্গে ঘোরে – গল্পগাছা করে। শুধু এ গাঁয়ের কেন, আশপাশের গাঁয়ের ছেলেরাও তো আসে। বুড়োদের কাজ-কম্ম নেই, বসে বসে খালি গুজব ছড়ায়। কোনদিন যদি দল গড়ি, সে কথা তোকেই প্রথম বলে যাবো, মা। তুই নিশ্চিন্ত থাক”।

“কি জানি? প্রধানও তো তাই বলল”।

“এ গাঁয়ের ছেলে ছোকরাগুলো বছরে ছমাস চাষবাস করে, আর বাকি ছমাস শুয়ে-বসে কাল কাটায়। তাদের দিয়ে যদি অন্য কিছু কাজ করাই মা, যাতে গাঁয়ের সকলের বাড়তি কিছু আয়-পয় হয়। কাজ-টাজ শিখে গাঁয়ের বাইরে থেকেও যদি তারা কিছু উপার্জন করে আনতে পারে, সেটাকে দল করা বলবি, মা? লোকের কথায় কান দিস না। আর এ নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনাও করিস না। যখন হবে নিজের চোখেই সবাই দেখতে পাবে। অনেক রাত হল, খেয়ে নিয়ে শুতে যা, মা। ঘুমে তোর চোখদুটো ছোট হয়ে আসছে। নাচদুয়োরে তোর জলছড়া দেওয়ার পরেই কাল আমি বেড়িয়ে যাব”।

কমলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ছেলেটা এই কদিনে বড়ো মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে তাঁকে।  সে মায়াকে পরম মমতায় তাঁর ধরে রাখতে সাধ হয় খুব, কিন্তু সাধ্য কোথায়?

             

                                                        ১২ 

বিগত কয়েকদিনে ভল্লার দলে যুবক ও তরুণের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সেই দলটিকে প্রধান দুটি বিভাগে সে ভেঙে নিয়েছে। প্রথমটিতে আছে পঁয়ত্রিশ জন, যারা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। এই দলটির পিছনেই সে সব থেকে বেশি সময় দেয়। সকালে সে নিজেই এই দলটির সঙ্গে দৌড়তে যায়। প্রথম তিনদিন সাধারণ দৌড়ের পর, চতুর্থ দিন সে যুক্ত করেছে, সাঁতারের অভ্যাস। পথহীন পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে সে ঝাঁপ দিয়েছিল গ্রামের পূর্ব সীমানার পুকুরটিতে। সে জানে সকালে পশ্চিমের ঘাটে গ্রামের মেয়েরা নিত্যকর্ম করতে যায়। তাদের বিড়ম্বিত না করে দীর্ঘ পুকুরটি সাঁতরে পার হয়ে সে এসে উঠল পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের আঘাটায়। সেখানে বসে দেখল, তার পিছনে সাঁতরে আসছে ছাব্বিশজন। বাকিরা আসছে অন্যান্য দিনের মতো একই দৌড়-পথে।

নজন দৌড়ে-আসা ছেলে সেখানে এসে উপস্থিত হলে, ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “তোরা জলে নামলি না, কেন? সাঁতার জানিস না?”

“তুমি তো বলোনি, ভল্লাদাদা। দৌড়ের পর সাঁতার কাটতে হবে। ওই সময় যা হাঁফাই – তারপরে আবার সাঁতার...”।

“আমার কথা ছেড়ে দে, তোদের ছাব্বিশজন বন্ধু তাহলে কেন এল? কী করে এল?” কেউ কোন উত্তর দিল না। ভল্লা আবার বলল, “তোরা যদি আমাকে নেতা বলে ভরসা করিস, তাহলে আমার কথা ছাড়াও, আমার আচরণও তোদের অনুসরণ করতে হবে। রণক্ষেত্রে সব সময় সব কথা চিৎকার করে বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না।  নেতাদের ইশারা, ইঙ্গিত, আচরণেই বুঝে নিতে হবে, কার কী করণীয়”। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ভল্লা আবার বলল, “ছেলেরা, এখন যে যার বাড়ি গিয়ে জলখাবার সেরে – ঠিক দুদণ্ডের মধ্যে উপস্থিত হবি মহড়াক্ষেত্রে”।

একজন জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, জলখাবার খেতে তুমি যাবে না?”

ভল্লা হেসে উত্তর দিল, “দুই বেলার আহারই আমার যথেষ্ট। নিয়মিত জলখাবারের প্রয়োজন অনুভব করিনা বহুদিন। তবে হ্যাঁ কোন কাজে দুপুরে খাওয়ার বিঘ্ন হতে পারে বুঝলে, ভরপেট জলখাবার করি”।        

গ্রামের বাইরের জঙ্গলে ভল্লা তার নির্বাসিত জীবনযাপনের জন্যে ছোট্ট দুটি কুটির গড়েছে। তার অদূরেই জঙ্গল সাফ করে বানিয়েছে, তরুণদের মহড়াক্ষেত্র। সেখানেই সে নিজের হাতে সকলকে মল্ল যুদ্ধ শেখাচ্ছে। শেখাচ্ছে, বল্লম চালাতে, ভল্লা ছুঁড়তে। পরে তির ছুঁড়তেও শেখাবে। মহড়ার সময় সে নির্দিষ্ট করেছে, মধ্যাহ্ন পর্যন্ত। মধ্যাহ্নের আহারের জন্যে দুদণ্ডের বিরতি, তার মধ্যেই ফিরতে হবে মহড়াক্ষেত্রে।    

ভল্লার দ্বিতীয় দলে আছে কুড়ি জন। তারা ভল্লার পরিকল্পনা মতো বাঁধ আর জলাধার নির্মাণে নিযুক্ত হয়েছে। ছেলেরা জলখাবার খেতে বাড়ি গেল, ভল্লা বাঁধের কাজ দেখতে যায়। নানান নির্দেশ দেয়। এই নির্মাণে তাঁর প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তবে এরাজ্যের নানান অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সময়, কিছু কিছু বাঁধ সে দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতা এবং তার সহজাত বুদ্ধিটুকুই সম্বল। কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে, সে সব শুধরে ধীরে ধীরে বাঁধ গড়ে উঠছে। এই কাজে সে কয়েকজন বয়স্ক অভিজ্ঞ কৃষকেরও সাহায্য নিচ্ছে। বাঁধের জল ব্যবহার করে সংলগ্ন জমিতে কী ধরনের চাষ করা সম্ভব – সে কথা তাঁদের থেকে ভাল আর কে বলতে পারবে? তাঁদের অনেকেরই মত, এই মাটিতে বাদাম এবং তুলোর চাষ হওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত জল পেলে, এবং বীজ পেলে তাঁরা এই জমিগুলি চাষ করতে আগ্রহী। ভল্লা তার পরিকল্পনার সাফল্যে কিছুটা স্বস্তি পেল। কিন্তু শস্য বীজ কিনতে অর্থের প্রয়োজন, সে ব্যবস্থাও যে তাকেই করতে হবে।            

 সারাদিন নানান কাজের মধ্যে পথচলা নানান মানুষের সঙ্গে ভল্লার পরিচয় হয়, আলাপ হয়। তাদের মধ্যে আছে কিছু বণিক। প্রতিবেশী রাজ্য থেকে নানান পসরা নিয়ে এরাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকার গ্রাম ও ছোট ছোট শহরে তারা বিপণণ করে। আবার এই রাজ্য থেকেও বিচিত্র পসরা সংগ্রহ করে, পাশের রাজ্যে নিয়ে যায়। এরকমই একদিন এক সম্পন্ন বণিকের সঙ্গে ভল্লার পরিচয় ল, তার নাম অহিদত্ত।

বণিক অহিদত্ত প্রতিবেশী রাজ্যের বাসিন্দা হলেও, এ রাজ্যেও তাঁর প্রতিপত্তি, চেনা-পরিচিতি কম নয়। এমনকি এ রাজ্যের রাজধানীর বণিক মহলেও তাঁর বিস্তর জানাশোনা। প্রথম পরিচয়েই অহিদত্ত ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আচ্ছা, আপনিই সেই ভল্লা? আশেপাশের গ্রামের লোকজনের মুখে ইদানীং আপনার নামটা অনেকবারই শুনেছি। এমনকি আমাদের দিকেও কানে এসেছে।

আমি কয়েকদিন আগেই আপনাদের রাজধানী গিয়েছিলাম। আজ সেখান থেকেই ফিরছি। সেখানে আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আপনার সব কথা শুনেছি। সকলে তো ছ্যা-ছ্যা করছে, মশাই। আপনাদের মহারাজা মহাশ্বকে আমরা খুবই প্রাজ্ঞ বিচক্ষণ রাজা বলেই জানি। তাঁর রাজ্যে প্রজাদের সুখে-শান্তিতেই বাস করতে দেখেছি। তাঁর মতো রাজা কিনা চরিত্রহীন শ্যালককে এতটা মাথায় তুলছেন? আর আপনাকে দিলেন নির্বাসন দণ্ড? আপনি তো রাজধানীতে বিখ্যাত মানুষ, ভল্লামশাইওদিকের সাধারণ লোক আপনাকে ধন্যি ধন্যি করছে”।

ভল্লা হাসল, বলল, “বিখ্যাত হয়ে কী লাভ, বণিকমশাই? কী অবস্থায় আমি এখানে এসেছিলাম, এই গ্রামের লোক সবাই জানেন। আমাকে আশ্রয় দিয়ে, সেবা করে সুস্থ করেছেন গ্রামপ্রধানমশাই আর তাঁর বউ, আমার কমলিমা। নির্বাসন দণ্ড পেয়ে এখনও আমি রাজ্যের বাইরে কেন যাইনি, এর জন্যে আমাকে যেমন অনেক দুর্গতি সইতে হবে, ওঁদেরও পোয়াতে হবে অনেক অপমান”।

বণিক অহিদত্ত কিছু বললেন না, গভীর বিরক্তিতে মাথা নাড়লেন। ভল্লা আবার বলল, “রাজ্যের বাইরে আমাকে যেতে তো হবেই,  দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাবো। কিন্তু ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে এই গ্রামের জন্যে কিছু করে যাব। আপনি তো জানেন এই গ্রামে চাষ-বাস তেমন কিছু হয় না, সম্বৎসরের অন্নসংস্থানটুকুও হয় কি না হয়। গ্রামের মানুষদের নিয়ে, সামান্য একটা সেচ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এক লপ্তে বেশ কিছু জমির জন্যে জলের ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। গ্রামের মানুষ পরীক্ষামূলক চাষ করতেও উৎসাহী। কিন্তু শস্যবীজ? সেটুকু কেনার সামর্থ্যও এ গ্রামের মানুষের নেই”।  

বণিক অহিদত্ত আশ্চর্য হলেন, বললেন, “শুনেছি আপনি অত্যন্ত সুদক্ষ ও বিশ্বাসী রাজরক্ষী, আপনার এই বিদ্যাও জানা আছে নাকি? আপনার পরীক্ষামূলক চাষের জন্যে কিসের বীজ দরকার?”

ভল্লা বলল, “বাদাম আর তুলো”।

অহিদত্ত বললেন, “আমাদের রাজ্যের এদিকেও  চিনাবাদাম আর তুলোর চাষ প্রচলিত। কত বীজ লাগবে? এক মণ করে পাঠালে হয়ে যাবে?”

ভল্লা অভিভূত হয়ে বলল, “তাহলে তো খুবই উপকার হয় বণিকমশাই। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার এই ঋণ অচিরেই শোধ করে দিতে পারব”।

“শোধের কথা পরে আলোচনা করা যাবে। আমি তিন-চারদিনের মধ্যেই আপনার কাছে দুরকমের বীজ পাঠিয়ে দেব”।

“আমার কাছে নয়, এই গ্রামের প্রধানের কাছে পাঠাবেন। তিনিই যথাযথ বিলি ব্যবস্থা করে দেবেন”।

ঠিক আছে। কিন্তু রাজ্যের বাইরে আপনি যাবেন কোথায়?”

সীমানার বাইরে পাশের জঙ্গলে থাকব। কাঠের পাটার ওপর মাটি লেপে দেওয়াল তুলেছি, আর ঘন পাতা বিছিয়ে ছেয়ে নিয়েছি চাল – ব্যস্‌ বাসা হয়ে গেছে। হয়তো কাল বা পরশু আমি চলে যাব”।

বণিক অহিদত্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনাকে আমাদের রাজ্যে যাওয়ার কথা বলতে পারতাম, কিন্তু আপনার বাসের পক্ষে মিত্ররাজ্যও নিরাপদ নয়। যাই হোক, এ গ্রামের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক একপ্রকার বাঁধা হয়ে গেছে। অতএব সীমানার বাইরে গেলেও আপনার যোগাযোগ থাকবে, বুঝতে পারছি। কিন্তু জঙ্গলে যে থাকবেন খাবেন কী”? তারপর একটু হেসে বললেন, “যাগ্‌গে, সে চিন্তা আমাদের – আপনার নয়। কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেব, আর আমিও আপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব। আজ চলি, অনেকদিন প্রবাসে কাটিয়ে আজ বাড়ি ফিরছি... আবার দেখা হবে, নমস্কার”।

ভল্লাও প্রতিনমস্কার করল। অহিদত্ত গোশকটে উঠে সঙ্গী লোকজনদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন সীমান্তের দিকে।

ভল্লার দলের ছোকরারা সকলেই তার আশেপাশে ছিল, এতক্ষণ শুনছিল ওদের দুজনার কথা। বণিক অহিদত্তের কথায়, ভল্লা এখন তাদের কাছে নায়ক হয়ে উঠল। এ বার্তা অচিরেই পৌঁছে যাবে এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামগুলিতে – এমনকি প্রতিবেশী রাজ্যের সংলগ্ন গ্রামগুলিতেও। যে উদ্দেশে ভল্লার এখানে আসা, এই প্রচার তার সুবিধেই করে দিল।                       

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭ "


মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


    


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের অষ্টম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব


১৯

 

এই ঘটনার পর প্রায় দেড় মাস অতিক্রান্ত। সারা রাজ্যে এখন পূর্ণ বর্ষা সমাগত। পথঘাট দুর্গম। কোথাও কোথাও মাঠঘাট, জলাশয়, সরোবর বৃষ্টির ধারাস্রোতে একাকার। দহনের জ্বালা ধরানো উজ্জ্বল তীব্র রৌদ্র, ঢাকা পড়েছে শ্যামল মেঘের স্নিগ্ধ ছায়ায়। গ্রামে গ্রামে কৃষক ও কৃষকবধূদের ব্যস্ততার শেষ নেই। চারিদিকে শান্তি, সমৃদ্ধির আশ্বাস। রাজ্যের সর্বত্র নিরাপদ প্রশান্তি। প্রজাদের অতিপ্রিয় রাজমাতা সুনীথার সুশাসনে রাজ্যবাসী এখন নিরাপদ, নিশ্চিন্ত, খুশী, সুখী। রাজাবেণের রাজত্বকালের ঊণিশটা মাসকে রাজ্যের জনগণ ভুলতে শুরু করেছে দুঃস্বপ্নের মতো। কোন অভিযোগ নেই কোথাও। রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বানিয়ে তোলা হচ্ছে গৃহহারাদের নতুন গৃহ। বিনাশের থেকে নির্মাণে অনেক বেশি সময় লাগে, তা লাগুক। অস্থায়ী বাসায় তারা নিশ্চিন্ত ধৈর্যে বাস করছে। কিছুদিন আগেও যারা গোপনে, মনে মনে রাজা বেণের মৃত্যু কামনা করত, এখন তারাই নতজানু হয়ে করজোড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, “রাজমাতাকে আর কত কষ্ট দেবে, হে ঈশ্বর? করুণা করো, দয়া করো, সুস্থ করে তোলো তাঁর পুত্রকে”।

কক্ষের বাইরে অঝোর বর্ষা ধারা। বর্ষার এই কয়েক মাস মহর্ষির বাইরের ব্যস্ততা কমই থাকে। দূরদেশে কোথাও যান না, আশ্রমেই থাকেন। আর সারাদিন আশ্রমেরই নানান কাজ কর্ম দেখেন, চিন্তা ভাবনা করেন, সহকর্মীদের উপদেশ দেন, নির্দেশ দেন। আর সন্ধের পর নিজের কক্ষে বসে, কিছু আবাসিক শিষ্যদের নিয়ে, নানান বিষয়ে আলোচনা করেন। আজও তেমনই করছিলেন একটু রাত্রি হতে সকলকেই বিদায় দিলেন, কক্ষে রইল শুধু বিশ্বপ্রভ। আর ধরণী গেল মহর্ষির আহারের ব্যবস্থা করতে। এই দুর্যোগের রাতে, মহর্ষি ভোজনালয়ে গিয়ে আহার করে আসবেন, ধরণীর এই ব্যবস্থা মনঃপূত নয়। সে মহর্ষির আহার আনতে গেছে। পাতার টোকা মাথায় দিয়ে, এই বর্ষার মধ্যেও ধরণীর ব্যস্ততার শেষ নেই।

নির্জন কক্ষে একলা পেয়ে বিশ্বপ্রভ মহর্ষিকে বলল, “গুরুদেব, আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধর সেই যে গেছেন, আজও ফিরলেন না। কোন সংবাদও নেই। আপনি কি কিছু জানেন?”

ঘাড় নেড়ে মহর্ষি সম্মতি জানালেন, মৃদু হেসে বললেন, “জানি বৈকি, বিশ্বপ্রভ। আমারই নির্দেশ নিয়ে তারা কঠিন এক ব্রতে গিয়েছে। আমি নিশ্চিন্ত থাকি কী করে বল? তাদের মঙ্গলামঙ্গল, তাদের দুই পরিবারের শুভাশুভ, এখন সব কিছুই আমার অবশ্য কর্তব্য! ওরা ভাল আছে। ওরা নির্বিঘ্নে ফিরে আসছে। গতকাল কিংবা আজ সকালেই ওদের ফেরার কথা ছিল। মনে হয় এই প্রবল বর্ষণে কোথাও আটকে পড়েছে। এসে পড়বে যে কোন সময়”।

উদ্বিগ্ন স্বরে বিশ্বপ্রভ জিজ্ঞাসা করল, “ওঁরা কী সেই তরুণ-তরুণীর সন্ধান পেয়েছেন, গুরুদেব?”

মৃদু হাসলেন মহর্ষি, “শুনেছি যে পেয়েছে, তারাও ওদের সঙ্গেই আছে। দেখা যাক কী হয়!”

দরজার বাইরে মাথার টোকা খুলে রেখে, ধরণী কক্ষে ঢুকল। তার পিছনে আছে বানো। ঢাকা দেওয়া কাংস্য থালিকায় সাজানো স্বল্প আহার নিয়ে, সযত্নে রাখলো মহর্ষির সামনে। কাংস্য পাত্রে ভরা ঈষদুষ্ণ দুধ রাখতে রাখতে বলল, “আচার্য বেদব্রত আর ধর্মধর এইমাত্র এসেছেন, গুরুদেব। তাঁদের সঙ্গে আছেন একটি ছেলে আর মেয়ে”।

“বাঃ শুভ সংবাদ, ধরণী, বিশ্বপ্রভ একটু আগেই ওদের কথা জিজ্ঞাসা করছিল! নিশ্চিন্ত হলাম”।

“তাহলে আরও দুটো পুরোডাশ দেব, গুরুদেব। বেশ কদিন আপনি আহার কমিয়ে দিয়েছিলেন”।

“আরে না, না, ধরণী, চিন্তায় আহার কমিয়ে দেব, এমন অবিবেচক আমি নই। আহার কমিয়েছি বয়সের কারণে। একটা বয়সের পর আহার নিয়ন্ত্রণ জরুরি”। হাসতে হাসতে মহর্ষি থালার ঢাকা খুললেন। থালায় তিনটি পুরোডাশ, পাশে একটি ছোট বাটিতে সবজি, অন্যটিতে ডাল। মহর্ষি দেখে খুশি হলেন, বললেন, “বৎস, ধরণী, এমন আয়োজন করলে, এক আধটা বাড়তি পুরোডাশ নেওয়াই যায়, কি বল?”।

“আপনি শুরু করুন গুরুদেব,  আমি আনছি”।

মহর্ষি আহার শুরু করার পর ধরণী আবার বলল, “আচার্য বেদব্রত আর আচার্য ধর্মধরের এমন চেহারা হয়েছে যে চেনাই দায়! আমি তো প্রথমে চিনতেই পারি নি। একমুখ দাড়ি, মাথায় লম্বা লম্বা চুল। তার ওপর সারা শরীর জলে কাদায় মাখামাখি”।

“আর সঙ্গের ছেলে-মেয়ে দুটো?” বিশ্বপ্রভ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

“তাদের অবস্থাও একই রকম। সকলকেই বললাম, স্নান সেরে শুকনো কাপড়চোপড় পরে, আগে আহার করে নিন। তারপর মহর্ষির অনুমতি পেলে, আমি সংবাদ দেব। আচার্য ধর্মধর বলছিলেন, গুরুদেবের সঙ্গে একবার দেখাটা সেরেই আসি, ধরণী। আমি মানা করলাম। বললাম, আপনাদের এই অবস্থায় দেখলে, গুরুদেব মোটেই খুশি হবেন না, বরং ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবেন”।

“ঠিক বলেছিস, ধরণী। তুই ফিরে গিয়ে ওদের বলে দে, আহারের পর ওরা আজ রাত্রে বিশ্রাম নিক। দেখা, সাক্ষাৎ যা হবে সে কাল সকালেই হোক আমাকে আরেকটা পুরোডাশ আর একটু সবজি দে তো, ধরণী। আজ মনে হয় একটু বেশিই ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে!” 

২০ 

প্রত্যূষে উঠে কক্ষের বাইরে এসে মহর্ষি ভৃগু দেখলেন, বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু আকাশ ঘন মেঘে ভারি হয়ে আছে। যে কোন সময় আবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। প্রাতঃকৃত্য সেরে, সূর্য প্রণাম ও ধ্যান করতে করতে, আজ তাঁর মনঃসংযোগে বার বার ব্যাঘাত ঘটল। মহর্ষি ভৃগুর মতো শান্ত, সমাহিত, স্থিতধী মানুষের মনেও আজ এত চাঞ্চল্য! বারবার তাঁর বেদব্রত ও ধর্মধরের কথা মনে হচ্ছিল। বেদব্রত একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, এই সূর্য প্রণাম, এই ঈশ্বরের ধ্যান - মহারাজ বেণের রাজত্বে এ সবই অনাচার। আজ মহারাণি সুনীথার রাজ্য পরিচালনায়, সেই বাধা দূর হয়েছে। কিন্তু মহারাণি সুনীথার এই রাজ্যশাসন কোন স্থায়ী সমাধান নয়। যে সংকল্প নিয়ে তিনি এই কাজে নেমেছেন, সেই কাজের সমাপ্তি হবে তখনই, যখন এই রাজ্যের সিংহাসনে যোগ্য রাজার অভিষেক সম্পন্ন হবে। বিগত রাত্রে বেদব্রত ও ধর্মধর একটি ছেলে এবং মেয়েকে এনেছে, কিন্তু তারা কি এ রাজ্যের রাজা হবার যোগ্য হয়ে উঠবে? প্রজারা এই রাজাকে কী মেনে নেবে? তিনি বেদব্রত, ধর্মধর এবং ওই ছেলেমেয়ের সাক্ষাতের প্রতীক্ষাতেই চঞ্চল হচ্ছেন বারবার।

নিজ কক্ষে ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর অপেক্ষায় ক্ষৌরকার চতুরমণি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে নিত্য সকালে এসে, তাঁর ক্ষৌরকর্ম করে। এই ক্ষৌরকার অত্যন্ত কথা বলে। এই আশ্রমের সমস্ত বার্তার সে ভাণ্ডারি। তাকে কিছু প্রশ্ন না করলেও সে অনর্গল কথা বলে। বসে বসে অধৈর্য হওয়ার থেকে, এই লোকটির বাক্য প্রবাহতে কিছুক্ষণ আনমনা থাকা যাবে। মহর্ষি এই ভেবে কক্ষের সামনের দাওয়ায় বসে, চতুরমণিকে একটু উস্কে দিলেন, “কী সংবাদ, চতুরমণি? কী মনে হয়, আজও কি গত দুদিনের মতোই বৃষ্টি হবে?”

চতুরমণি তার ঝোলা থেকে, ক্ষৌরকর্মের সরঞ্জাম বের করতে করতে বলল, “বর্ষাকালে বৃষ্টির কথা কী বলা যায়, মহর্ষি? কখন যে তার কী মতিগতি, কে জানে? তবে এবার খুব সুচারু বর্ষা হচ্ছে, জানেন মহর্ষি? আমি আশে পাশের অনেক গ্রামেও যাই তো, কৃষকদের কথাবার্তা শুনি। সকলেই খুব খুশি। তারা বলে এ সবের মূল কারণ মহারাণি। তিনি অধার্মিকের পৌত্রী, মৃত্যুর কন্যা হয়েও, আজ তিনি যে কোন ধার্মিকের থেকেও ধার্মিক। তাঁর পুত্র রাজা থাকলে, এমনটা কক্ষণো হতো না। কী অনাচার, কী অনাচার। রাজা বেণের রাজত্ব মানেই হয় খরা, নয় বন্যা। হয় দুর্ভিক্ষ, নয় মড়ক। সত্য কথা বলতে আমি ভয় পাই না, মহর্ষি। রাজা বেণ অসুস্থ হওয়াটা শাপে বর হয়েছে”।

কাঠের ছোট্ট বাটি থেকে জল নিয়ে, মহর্ষির দুই গাল ভিজিয়ে তুলতে তুলতে চতুরমণি বলল, “যারা বলে ঈশ্বর নেই, ধর্ম নেই। অন্যায়ের প্রতিকার নেই। তারা এসে দেখে যাক, রাজাবেণের অত্যাচার আর অনাচারের প্রতিফল মিলল কিনা? একেবারে হাতেনাতে পেয়ে গেলেন কিনা?”

ভেজাগালে শীতলতার অনুভব নিয়ে, মহর্ষি মৃদু হেসে বললেন, “তুমি বলতে চাও, রাজা বেণের অসুস্থতা তার পাপের প্রতিফল?”

এক ফালি চামড়ার টুকরোতে ঘষে, ক্ষুরে শান দিতে দিতে, চতুরমণি বলল, “কী বলছেন, মহর্ষি? প্রতিফল নয়? এখনো সূর্য চন্দ্র উঠছে গাছে গাছে ফুল ফুটছে। এই বর্ষায় মাটি সরস হচ্ছে, কৃষকের ঘরে ঘরে আজ ফসলের স্বপ্ন। এসব কি মিথ্যা?” ক্ষুরে ধার দেওয়া শেষ করে, চতুরমণি মহর্ষির দাড়ি বানানো শুরু করল। মহর্ষি কথা বলার অবস্থায় নেই, তাই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, “হুঁ”

“এদিকে ভোর থেকে দেখি আশ্রমে হুলুস্থূল কাণ্ড। কী ব্যাপার বলুন তো, কিছু জানেন? ধরণি আমাকে রাত থাকতে ডেকে তুলে বলল, দুজন আচার্যের জরুরি ক্ষৌরকর্ম আছে। ক্ষৌরকর্ম নিত্য কর্ম, তার আবার জরুরি কিসের? সে যাই হোক আমি সরঞ্জাম নিয়ে গেলাম, গিয়ে দেখি অতিথি নিবাসের বাইরে, ভূতের মতো জঙ্গুলে দাড়িগোঁফ নিয়ে দুজন বসে আছে। তাদের সঙ্গে একজন সুপুরুষ তরুণ। ধরণিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ আশ্রমের আচার্যদের সবাইকে চিনি। এরা কারা? কারাগার থেকে পালিয়ে আসা কয়েদি নয়তো? ধরণি হাসল, বলল, ওই জঙ্গল সাফ করে দিলেই তুমি চিনতে পারবে ওরা কারা? পুব আকাশে আলো তখনো ফোটেনি, বসলাম তাদের দাড়ি বানাতে। ক্ষুরে হচ্ছিল না মহর্ষি জানেন, কাস্তে থাকলে ভালো হত। দুজনের জন্যে আমার দুটো ক্ষুরের ধার পড়ে গেল। আপনার দাড়ি বানিয়ে পাথর ঘষে সে দুটোয় আবার শান দিতে হবে”। মহর্ষির এক গাল, কামিয়ে ক্ষুরে লেগে থাকা কামানো দাড়িগুলো বাটির জলে ফেলে, অন্য গাল ধরল চতুরমণি।

তার মধ্যে মহর্ষি বললেন, “দাড়িগোঁফের জঙ্গল সাফ করে কী পেলে বললে না তো?”

“এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন, মহর্ষি? কেটে কুটে গেলে আমাকে কিছু বলতে পারবেন না, এই বলে দিলাম। তবে চতুরমণির ক্ষুরে কারো গাল কিংবা থুতনি কেটেছে এমন কখনো হয়নি। আচার্য সুনীতি সেদিন বলছিলেন, চতুর, তোমার যেমন ক্ষুরধার বুদ্ধি, তেমনি ক্ষুরের ধার। গালের ওপর দিয়ে ক্ষুর টানো, মনে হয়, মাঠে লাঙ্গল টেনে চাষ করছো। আহা তোমার পা মাত্র দুটি, আর সেই দুই পায়ে আবার ক্ষুরও নেই। তবে তোমার হাত দিনদিন যেমন পেকে উঠছে, তাতে পায়ে ক্ষুর গজাতে আর বেশি দেরি লাগবে না, দেখে নিও। আচার্য সুনীতি আমাকে খুবই স্নেহ করেন, ভালোওবাসেন, মহর্ষি। কিছু কিছু মানুষ আছেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের কিছুতেই মন ভরে না। সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকে। বলে, তোমার হাতটা খুব শক্ত আর খসখসে। গালে জল ঘষার সময়েই নাকি তাদের মনে হয় গালের ত্বক উঠে যাচ্ছে! জিজ্ঞাসা করে, দাড়ি কামানোর আর দরকার আছে কী, চতুরমণি? গালের ছালচামড়ার সঙ্গে দাড়ি উঠে যায়নি? আপনার গালেও তো এই হাতেই জল ঘষলাম, আপনার কী মনে হয়, মহর্ষি, আমার হাত খরখরে?” মহর্ষি তখন মুখ উঁচু করে বসেছিলেন, আর চতুরমণি চিবুকের নিচে গলায় ক্ষুর টানছিল। অতি সাবধানে এবং সতর্কভাবে মহর্ষি বললেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা”।

গলার ওপর ক্ষুর থামিয়ে চতুরমণি বলল, “কার কথা মিথ্যে, আমার?”

মহর্ষি ওই অবস্থাতেই উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “পাগল হয়েছ, চতুরমণি? তোমার হাত কুসুমের মতো কোমল। তুমি কেন মিথ্যা বলবে? যারা ওই সব বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে”।

মহর্ষির কথায় সন্তুষ্ট চতুরমণি, গলার উপর ক্ষুর টানতে টানতে বলল, “আঃহা, আপনি বড্ডো কথা বলছেন, মহর্ষি। এত কথা বললে আর অস্থির হলে, আমার কাজ হয় না যে। হাতে এই লৌহ ক্ষুর নিয়ে বলছি, চতুরমণি সত্যি ছাড়া কখনো মিথ্যে বলে না। মিথ্যা কথা বললে এই আশ্রমে কী আপনি আমাকে রাখতেন? নয় নয় করে, বিশ-বাইশ বছর তো হয়েই গেল এই আশ্রমে। এ কবছরে কত পরামাণিক এলো, গেলো, সবই তো দেখলাম। এক এক জন যেন, অসি বিশারদ। কেটে কুটে রক্তারক্তি করে তুলতো। কিন্তু কথার বেলায়? নিজের কথা এমন সাতকাহন করে বলা, ও আমার ধাতে নেই, মহর্ষি! সেদিন আচার্য রণধীর বললেন, কতোটুকুই বা কথা তুই বলিস চতুর, কিন্তু তোর সব কথাই যেন কথকতা। তোর পেট থেকে কথা বের করা আর আকর থেকে সোনা উদ্ধার একই ব্যাপার”।

মহর্ষির দাড়ি কামানো হয়ে গিয়েছিল, পরিষ্কার জল দিয়ে মহর্ষির গাল ধুয়ে দিয়ে, চতুরমণি তার গামছা দিয়ে মহর্ষির মুখ মুছে দিলেন। সেই গামছা অত্যন্ত মলিন এবং বর্ষার কারণে তাতে পুতি দুর্গন্ধ। মহর্ষি চুপ করে সে সব সহ্য করে, এবার উঠতে যাচ্ছিলেন, চতুরমণি  ধমক দিয়ে উঠল, “উঠছেন কোথায়? এখনো স্ফটিকারি লাগাইনি তো! সব ব্যাপারে এত ব্যস্ত হলে তো চলবে না, মহর্ষি। কামানোর পর স্ফটিকারি না দিলে, কী হয় জানেন না বুঝি? স্ফটিকারি হল...”

মহর্ষি ওদের প্রাঙ্গণে ঢুকতে দেখেছিলেন - বেদব্রত, ধর্মধর আর সেই নবীন যুবক। চতুরমণির বাক্যের বন্যায় তিনি নির্বাক বসেছিলেন, যদিও তাঁর মুখে হাল্কা হাসির রেশ। পিছন থেকে চতুরমণির কথা শুনে, আচার্য বেদব্রত তার কথা শেষ করতে দিলেন না, বলে উঠলেন, “ওহে চতুরমণি, গুরুদেবের সামনে তোমার সকল জ্ঞানের ভাণ্ডার এভাবে মেলে ধরবে নাকি? গুরুদেব তোমার থেকে সব জেনে গেলে, তোমার আর থাকবে কী? আমাদের এখন কিছু জরুরি আলোচনা আছে, তুমি গুরুদেবকে মুক্তি দাও দেখি!”

মহর্ষির গালে স্ফটিকারি ঘষতে ঘষতে চতুরমণি বলল, “আমারও কী বসে বসে বাজে বকার জো আছে? ওদিকে রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, যে দিকে না দেখবো, সেখানেই কিছু না কিছু অনর্থ ঘটে যাবে। আচার্য রণধীর বলেন, তুমি কদিন না থাকলে, আশ্রমটা অন্ধকার হয়ে থাকে। আগুনের উত্তাপ কমে যায়, গাভীর দুধ পাৎলা হয়ে আসে, এমন কি গাছের পাতাটিও নড়ে না” ক্ষৌরকর্ম সেরে চতুরমণি, তার সঙ্গের ঝোলাতে সব সরঞ্জাম তুলে, নত হয়ে মহর্ষিকে নমস্কার করল, বলল, “আজ আমার একটু ত্বরা আছে, কাল ভোরে এসে ফিটকিরির তত্ত্বটি আপনাকে বুঝিয়ে বলব, মহর্ষি, আপনি চিন্তা করবেন না”।

আচার্য বেদব্রত আর ধর্মধর নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে হাসল। আর নবীন যুবক মহর্ষি ভৃগুর প্রসন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, এমন একজন মানুষের সামনে ক্ষৌরকারের এ কী প্রগলভতা! চতুরমণি বিদায় নেওয়ার পর তিনজনেই মহর্ষিকে প্রণাম করলেন।

নবীন যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি তার কাঁধে হাত রাখলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকারের ব্যবহারে আশ্চর্য হয়ো না, বৎস। এটাই স্বাভাবিক। সম্মানীয় মানুষদের থেকে আমরা সাধারণ মানুষ সর্বদাই একটা সমীহ দূরত্ব বজায় রাখি। তাঁদের গালে, গলায়, কানে মাথায় হাত দেওয়ার কথা আমরা কল্পনাও করি না। কিন্তু তুমি যত বড়ো মাপের মানুষই হও না কেন, ক্ষৌরকারকে তোমার অতি ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে নিয়মিত ঢুকতেই হবেআর সেই কারণেই অন্য মানুষ যখন সমীহে কথা কম বলে, এরা তখন অনর্গল কথা বলতেই থাকে। মানব চরিত্রের এও এক অদ্ভূত পাঠ, ভবিষ্যতে আরও অনেক দেখতে হবে, শিখতে হবে তোমাকে! চলো, তোমরা আমার কক্ষে গিয়ে বসো” 

নবীন যুবক এর আগে মহর্ষিকে দুএকবার দূর থেকে দেখেছে, বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমার থেকে আশৈশব তাঁর পাণ্ডিত্য আর সহৃদয় মহত্বের অনেক কথাও শুনেছে। আর আজ সেই মানুষটা তার কাঁধে হাত রেখে নিজের কক্ষে যখন ডেকে নিলেন এবং তার মনের দ্বন্দ্বটুকু অল্পকথায় বুঝিয়েও দিলেনসে অভিভূত হল। মহর্ষি তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসার পর, তাঁর সামনের দুই আসনে বসলেন আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধরনবীন যুবক সামনেই বসল, কিন্তু আচার্যদের থেকে কিছুটা দূরে, মাঝের দুটো আসন ছেড়ে। মহর্ষি প্রসন্ন মুখে লক্ষ্য করলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকর্মের পর স্নান করাটা জরুরি। তোমার পরিচয়ের কৌতূহলে আমি কিছুটা অনিয়ম করে ফেললাম। আমি স্নান সেরে এখনই আসছি। ততক্ষণ তুমি আচার্যদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলোচনা করো”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব "


নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...