বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান
বিপ্লবের আগুন শেষ পর্ব ক্যোয়ারীর জন্য তারিখ অনুসারে বাছাই করা পোস্ট দেখানো হচ্ছে৷ প্রসঙ্গ অনুসারে বাছাই করুন সব পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮ 


৩৫ 

দুপুরের খাওয়ার পর ভল্লা আর রামালি গেল এদিকের মহড়ার মাঠে। ছেলেরা ঘাম আর মাটি মাখা শরীরে পূর্ণ উদ্যমে মহড়া করে চলেছে। ভল্লা কিছু বলল না, ওদের পাশে গিয়ে বসল। বিনেশ আর দীপান রণপা চেপে দৌড়তে দৌড়তে ভল্ল ছোঁড়ার মহড়া দিচ্ছিল। ভল্লা মন দিয়ে দেখল। খুশিই হল। চেঁচিয়ে বলল, “তোরা আগের মহড়াটা একবার করে দেখা তো। দেখি কেমন শিখেছিস, ভুলে গেলি কিনা?”

দুজনেই রণপা থেকে নেমে আগের মহড়াটা তিনবার করে দেখাল। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ না হলেও, প্রায় নিখুঁত বলা যায়। ভল্লা ওদের ডাকল, বিনেশ আর দীপান হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বসল ভল্লার সামনে। এবার রামালি, মইলি আর সুরুল নামল মহড়ায়। ভল্লা ভুরু কুঁচকে বলল, “রামালি বলছিল, তোরা নাকি ঠিকঠাক লক্ষ্যভেদ করতে পারছিস, কিন্তু কই একটু ফস্কে যাচ্ছে যে?” দীপান বিনেশের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল, “সে তো তোমার জন্যে -তুমি সামনে এসে দাঁড়ালেই বুকের ভেতরটা কেমন দুরদুর করে – তোমার মতো ঠিকঠাক পারবো তো?”

ভল্লা হেসে উঠল হো হো করে, বলল, “বোঝো, আমার ভয়ে তোদের হাত কাঁপছে! কিন্তু যুদ্ধে যখন নামবি, ওই সূক্ষ্ম ভুলের ওপরই তোদের জীবন-মৃত্যু নির্ভর করবে রে হতভাগা! লক্ষ্যভেদের সময় যুধিষ্ঠির এবং অন্য সকলে – ওখানে উপস্থিত সব্বাইকে দেখতে পাচ্ছিল – গুরুদেব দ্রোণকে, নিজেদের ভাইদের। আকাশ, গাছপালা, পাতা, ফুল – সবকিছু। আর অর্জুন দেখেছিল শুধু পাখির চোখ – আর কিচ্ছু না। অর্জুনের লক্ষ্যভেদের গল্প শুনিসনি?”

ভল্লার পাশে বসা ছেলেরা সকলেই ভল্লার কথা শুনল। কেউ কিছু বলল না। কথাবার্তার ফাঁকে সে রামালি, মইলি আর সুরুলের মহড়া দেখছিল মন দিয়ে। তিনজনেই নিখুঁত – প্রতিবার। ভল্লা খুব খুশি হল, বলল, “মনে হচ্ছে তোরা আজ দুপুরে খেতে যাসনি?”

“নাঃ যাইনি। আজ থেকে আর যেতে হবে না। বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে যাবে”।

ভল্লা ভীষণ অবাক হল, “তার মানে?”

আহোক বলল, “প্রধানমশাইয়ের মৃত্যুটা গ্রামের সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভল্লাদাদা। বাবা-কাকাদের তো বটেই, বিশেষ করে মা-কাকিমাদেরও। বলেছেন এতটা পথ হেঁটে তোরা খেতে আসবি, ফিরে যাবি...অকারণ সময় নষ্ট। তোদের আসতে হবে না, ঠিক সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে। চাষের সময় ঠিক যেভাবে মাঠে খাবার পাঠায় বাড়ির মেয়েরা...সেভাবে”

ভল্লা অস্ফুট স্বরে বলল, “কী বলছিস”?  অনেকক্ষণ কেউই কোন কথা বলল না। মহড়া শেষে রামালি, মইলি আর সুরুলও এসে বসল ওদের সঙ্গে। “সকলের এই আশীর্বাদের মর্যাদা যে আমাদের রাখতেই হবে...” ভল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “...সে কথা ভুলিস না। আয়, এবার ভাবনা চিন্তার মহড়া করা যাক”। ভল্লা মাঝখানে কিছুটা জায়াগা রেখে সকলকে গোল হয়ে ঘিরে বসতে বলল।

তারপর উঠে গিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে লাগল, গাছের ছোট একটা ডাল দিয়ে। চৌকো ঘর কেটে বলল, “এই হচ্ছে ধর আস্থানের সীমানা। চারপাশেই কাঠের বেড়া আছে – আর দুপাশে আছে আস্থানে ঢোকার দরজা। পশ্চিমে রাজপথের সামনের দরজাটাই প্রধান, সারা দিন-রাত ওখানে কড়া প্রহরা থাকে। রাত্রে ছজন প্রহরী থাকবেই থাকবে। কিন্তু পূবের দরজাটা প্রায় সবসময়েই বন্ধ থাকে। একমাত্র পণ্যবাহী গোযান ঢোকা বা বেরোনোর সময়, ওই দরজা খোলা হয়। রাত্রে ওদিকেও প্রহরী থাকে, কিন্তু কম – খুব বেশি হলে দু-তিনজন। তারাও গভীর রাত্রে অন্ধকার কোনায় বসে ঝিমোয়।

এবারে লক্ষ্য কর। পূবদিকের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডানদিকে রক্ষীদের থাকার জন্যে এই রকম বড়ো বড়ো দুটো ঘর আছে। তার পাশে পশুশালা। সেখানে থাকে বেশ কিছু ঘোড়া, কয়েকটা গাধা আর বলদ, কিছু দুধেল গাইও। তার পরেই কিছুটা জায়গা জুড়ে থাকে করাধ্যক্ষের পালকি, কিছু কাঠের শকট, গোশকট আরও অনেক ধরনের হাবিজবি কাজের দ্রব্য-যন্ত্রপাতি।

এবার আসছি এই উত্তরদিকে – এখানে পরপর বেশ কিছু ঘর আছে, যেখানে থাকে করণিক আর কাছারির কর্মচারীরা। তারপরেই এইখানে আছে বিশাল রান্নাঘর, আর তার পাশেই পাচক এবং নানান ভৃত্যদের থাকার জায়গা।

এবারে চলে আসছি এই পশ্চিমের দিকে। এদিকে আছে কোষাধ্যক্ষ, তার সহকারী কর্মচারী এবং একটু উচ্চপদের কর্মীদের থাকার জায়গা। ওখানে রক্ষীসর্দার উপানুও থাকে। কোষাধ্যক্ষ আর উপানুর ঘরের ঠিক মাঝখানে আছে কোষাগার। এই যে এইখানে একটু জায়গা ছেড়ে আরেকটা পাকশালা আছে এবং তার পাশেই ছোটছোট ঘরে থাকে পাচক ও বিশেষ ভৃত্যরা। এগুলো সবই করাধ্যক্ষ ও অন্য উচ্চপদের আধিকারিকদের জন্যে।

এবারে আসছি দক্ষিণ দিকে। এদিকে তিনখানা বড়োবড়ো ঘর আছে যেখানে শস্য জমা রাখা হয় – প্রয়োজন মতো ঘরের সামনেই বিশাল দাঁড়ি-পাল্লা খাড়া করা হয়। তাই দেওয়ালের ধারে ধারে রাখা থাকে ভারি ভারি লোহার ওজন। এক থেকে চল্লিশ সেরের। অন্ধকারে চট করে চোখে পড়বে না, কিন্তু পায়ে লেগে হোঁচট খেলেই সর্বনাশ। এই তিনটে শস্যভাণ্ডারের পাশেই – এই দক্ষিণপশ্চিম কোনায় - আছে বন্দীশালা। অবশ্য এই বন্দীশালাতে কবিরাজমশাইকেও রেখেছে কিনা আমি জানি না – সেটা দেখতে হবে। কারণ বন্দীশালায় সাধারণতঃ কর না দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো লোকদেরই শাস্তির জন্যে রাখা হয়।

এবার আসি মাঝখানের খোলা জায়গাতে। এই যে এইখানে বসানো হয় করাধ্যক্ষের বিশাল শিবির। তার মধ্যেও তিনটে কক্ষ থাকে। একটায় ওঁনার কার্যালয়। এটা সভাকক্ষ – গোপন কথাবার্তার জন্যে। আর অন্যটা ওঁনার শয়ন এবং প্রসাধন কক্ষ। এই শিবিরের চারধারে বুক সমান উঁচু শক্ত বেড়া, তার বাইরে সাজানো ফুল গাছের সারি।

এই শিবির ছাড়া আস্থানের অন্যান্য সব ঘরই ইঁটের ঘর। অর্থাৎ স্থায়ী। কিন্তু শিবিরটা করাধ্যক্ষের সঙ্গে আসে এবং চলে যায়। করাধ্যক্ষের সঙ্গে অনেক লোকজন যেমন আসে, তাঁর সঙ্গে তারা চলেও যায়। কিন্তু কিছু কিছু লোক সারা বছরই থাকে। আস্থানের দেখাশোনা, টুকটাক কাজকম্ম করে...”।

  ভল্লা কথা শেষ করে বসল, বলল, “নকশাটা মাথার মধ্যে গেঁথে নে। একজায়গায় বসে দেখিস না। ঘুরে ঘুরে দেখ। তাতে দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে কোনটা ডানদিকে কোনটা – মাথার মধ্যে বসে যাবে। দুটো কথা বলে রাখি – আমরা আস্থানে ঢুকব পূবের দরজা দিয়ে কারণ ওদিকের প্রহরা বেশ দুর্বল…। আর করাধ্যক্ষের শিবিরে আমরা ঢোকার চেষ্টাও করব না”।

ভল্লা চুপ করে বসে ছেলেদের লক্ষ্য করছিল আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল ছেলেদের প্রশ্নের। ওরা যদি নকশা দেখে নিয়ে ভল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভল্লার এতদিনের পরিশ্রম এবং প্ররোচনার অনেকটাই বৃথা গিয়েছে।

প্রথম প্রশ্নটা করল, মইলি, “পূবের দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের ঘরগুলো রক্ষীদের বললে না?”

সুরুল বলল, ”হুঁ রক্ষীদের। ভল্লাদাদা ওদের ঘরের চালগুলো কি টালির?”

ভল্লা হাসল, বলল, “হ্যাঁ। কেন পাতার ছাউনি হলে আগুন ধরাতিস? ওকথা ভুলেও ভাবিস না, আগুন লাগলে আস্থানের ওইটুকু জায়গায় এমন হুটোপাটি শুরু হবে – আমাদের আসল কাজই পণ্ড হয়ে যাবে”।

সুরুল বলল, “রক্ষীগুলোকে শুরুতেই কিছুটা জব্দ করতে পারলে…”

রামালি বলল, “ঘোড়াগুলোকে দড়ি কেটে তাড়িয়ে দেওয়া যায় না, ভল্লাদাদা?”

আহোক বলল, “উঁহু, সেটা শুরুতে করা যাবে না। মাঝ রাত্রে আচমকা ঘোড়ার দল ছুটতে শুরু করলে, তাদের ক্ষুরের শব্দে আস্থানের সকলেই সজাগ হয়ে যাবে। ঘোড়াদের তাড়াতে গেলে আমাদের কাজ সেরে বেরিয়ে আসার ঠিক আগে করতে হবে…”।

রামালি বলল, “হুঁ ঠিকই বলেছিস। কিন্তু ঘোড়ার সামনে গিয়ে দড়ি কাটবে কে? শুনেছি ওরা ভয় পেলে পেছনের জোড়াপায়ে এমন লাথি ছোঁড়ে - বুকে লাগলে – পাঁজর ভেঙে মৃত্যু অনিবার্য”।

সুরুল বলল, “আচ্ছা, আস্থানে ঢোকার পর আমরা দু তিনজন গিয়ে সব ঘরের শিকল তুলে দিই যদি… ব্যাটারা থাক না ভেতরে। রাত্রে কজন রক্ষী প্রহরায় থাকবে ভল্লাদা – জনা দশ-বারো?  সে আমরা সামলে নেব”।

বিশুন বলল, “বাঃ এটা ভালো বুদ্ধি”।

ভল্লা মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলল, “তোদের ভাবনা-চিন্তাগুলো বেশ ভালই ঠেকছে। এক কাজ কর – তোদের সবাইকে কালকের পুরো দিনটা সময় দিলাম। পরিকল্পনাটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে চিন্তা কর। কে কোন কাজের দায়িত্ব নিবি সেটাও ঠিক করে ফেল। আজ রাত্রে আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাবো…ফিরবো কাল রাত্রে। আমাদের পরশু সকালে আবার দেখা হবে। তা বলে মহড়ায় যেন এতটুকু ফাঁক না পড়ে। পরশু সন্ধের পর নতুন মহড়া শুরু হবে”।

“সে কি? অন্ধকারে দেখব কী করে?” দলের চার-পাঁচজন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

ভল্লা হাসল, বলল, “আলোর জন্যে মশালের ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা তো অন্ধকারেই আস্থান আক্রমণ করব, তাই না? আধো অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করাটাও শিখতে হবে না?”

কেউ কিছু বলল না। ভল্লা একটু পরে বলল, “বিকেল শেষ হতে চলল, এবার তোরা বাড়ি যা। আর মনে রাখিস আজকের এই আলোচনার কথা ভুলেও কারও সঙ্গে আলোচনা করবি না। শল্কুর সঙ্গেও না। মনে থাকবে? যাবার আগে নকশাটা ভালো করে মুছে ফেল”।

মইলি বলল, “থাক না ভল্লাদাদা। ওটা থাকলে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধে হবে তো”।

ভল্লা বলল, “উঁহু, মুছে ফেলতে হবে। যখন দরকার এঁকে নিবি, কিন্তু আলোচনার শেষে প্রত্যেকবার মুছতেই হবে। আমরা চলে যাবার পর কারো চোখে পড়ে গেলে – এবং সে যদি চতুর হয় – বুঝে ফেলবে সব”।

মইলি মাথা চুলকে বলল, “মুছে ফেললে, আঁকব কী করে – সবটা কী আর মনে আছে?”

বিশুন পাতা সমেত গাছের একটা ডাল নিয়ে এসেছিল, সেটা দিয়ে দাগগুলো মুছতে মুছতে বলল, “চিন্তা করিস না, আমার মনে আছে”। “আমারও” একে একে বলল, সুরুল, আহোক এবং আরও দু-একজন।

ভল্লা খুশি হয়ে হাসল, মইলির কাঁধে হাত রেখে বলল, “এবার বাড়ি যা। পরশু দেখা হবে”।

রামালি বলল, “ভল্লাদাদা, আমাদের সঙ্গে মইলি, বিশুন আর আহোক যাবে। ভল্লর জন্যে বাঁশের টুকরোগুলো কাটা আছে - নিয়ে যাবো সবাই মিলে”।

“কাটা হয়ে গেছে? বাঃ, এটা একটা কাজের কাজ হয়েছে”।

 ভল্লারা বাসায় ফিরে দেখল বালিয়া বসে আছে, বসে আছে বটতলির মিলা, জনারাও। জনাদের নিয়ে রণপাগুলো লুকিয়ে রাখার জায়গাটা দেখাতে নিয়ে গেল রামালি। আর ভল্লা তার পাথরের আসনে বসে বলল, “বালিয়া, এসে গেছিস? ভালই হয়েছে। রণপার কাজটা এখন কদিন বন্ধ থাক…তার আগে এই টুকরো বাঁশগুলোর আগায় ফলা বসিয়ে ভল্ল বানিয়ে দে তো চটপট…। কতগুলো আছে রে মইলি?”

“এখন ছাব্বিশ জোড়া আছে, আর দশ জোড়া হবে… ওগুলো পরে দেব”।

“ছাব্বিশ জোড়া – মানে বাহান্নটা ফলা, কতদিনে করতে পারবি, বালিয়া?”

“দিন চারেক”।

“বাঃ, তারপর রণপার কাজ শুরু করে দিবি, কেমন? তুই আহোক-মইলিদের সঙ্গে যা – বাঁশগুলো নিয়ে যেতে সুবিধে হবে। তোরা একটু বস, আমি আসছি – যাবো আর আসবো”।

ভল্লা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। একটু পরেই রামালি ফিরে এল, ওদের দেখে বলল, “কী রে তোদের বসিয়ে রেখে ভল্লাদাদা কোথায় গেল?”

“জানি না। ভল্লাদাদা বলল, যাবো আর আসবো, তোরা বস”। রামালি প্রদীপ জ্বালাল, উনুনের সামনে কাঠকুটো যোগাড় করে রাখল। তারপর মাটিতে বসল ওদের সঙ্গে।

“কমলিমা কেমন আছে রে, আহোক?”

“ভালো না। আমি তো যেতে পারিনি। মা আর দিদির মুখে শুনেছি। কেমন যেন হয়ে গেছেন। প্রধানমশাই মারা যাওয়ার পর একবারের জন্যেও কাঁদেননি। ভাবতে পারিস?”

ভল্লা এসে ঢুকলো, ওদের কথার শেষটুকু শুনে জিজ্ঞাসা করল, “কে কাঁদেনি রে, আহোক?”

“কমলিমায়ের কথা বলছিলাম, ভল্লাদাদা”। ভল্লা হাতের বটুয়া থেকে চারটে রূপোর মুদ্রা বের করে, বালিয়ার হাতে দিয়ে বলল, “কমলিমা কাঁদবেন, ভাবিস না। তিনি আমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছেন। এই চারটে রূপো আপাততঃ রাখ, বালিয়া। লোহার জন্যে কাজ যেন না আটকায়। আর দেখছিস তো, এরা কী রকম লড়ছে… তোরা তাড়াতাড়ি অস্ত্র দিতে না পারলে…আমাদের সব কাজই আটকে যাবে”।

“জানি ভল্লাদাদা”, বালিয়া বলল।

চারজনে চার বোঝা বাঁশের টুকরো পিঠে নিয়ে অন্ধকার জঙ্গলে মিশে গেল রণপা চড়ে।

ওরা চলে যেতে রামালি বলল, “পুকুর থেকে ঘুরে আসছি, ভল্লাদা”।

“আজ পাঁচজনের রান্না করিস। কাল সকালে আমাদের লাগবে”। রামালি বেরিয়ে গেল - তাকে রান্নার যোগাড় করতে হবে। 


চলবে...

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১২ 


১৩  

বেডের পাশে রাখা টুলটায় বসে মা আমার মাথায় মুখে, হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “কেমন আছিস?”

আমি বললাম, “ভালো আছি, মা। বাবা তুমিও বসো না। আরেকটা টুল আছে তো”।

“দাঁড়া, দাঁড়া আমার দাদুভাইকে একবার দেখি, ঘুমোচ্ছে নাকি?” শেষ কথাটি তিনি সিস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন। সিস্টার হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “ঘুমোনো, খাওয়া ছাড়া, আপনার দাদুভাইয়ের এখন আর কাজ কী?”

বাবা ঝুঁকে পড়ে দৌহিত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “একদম মায়ের মতোই হয়েছ, দাদুভাই, তোমার মাও সারাদিন-রাত ঘুমোত...”।

আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর উপস্থিতি, সিস্টার-ম্যাডামের মনে যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল, বাবা-মায়ের আলাপ-আলোচনায় সিস্টার বোধহয় অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। তিনি আমাকে বললেন, “আমি একটু ঘুরে আসছি, ম্যাডাম, কোন দরকার মনে হলেই মাথার পাশে ওই বেলটা টিপে দেবেন, আমি চলে আসব”।

আমি হাসিমুখে সম্মতি দিতেই সিস্টার বেরিয়ে গেলেন। আর আমিও মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে গো, মা? তোমাদের দুজনেই এমন গোমড়ামুখো হয়ে ঢুকলে কেন”?

“হবে আবার কি? কিছুই হয়নি, দাঁড়া আমিও একটু আদর করে আসি দাদুসোনাকে...” মা উঠে গিয়ে আমার পুত্রের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর হাত বাড়িয়ে আমার পুত্রের গাল, চিবুক আর নাকের ডগাটা স্পর্শ করে বললেন, নাকটা কিন্তু তোর বাবার মতো হয়েছে – বুঁচকু”।

আমি বাবার দিকে তাকালাম, বাবা সামান্য বিরক্তি মিশ্রিত প্রশ্রয়ের সুরে বললেন, “আহাঃ এসময় বাচ্চাদের গায়ে হাত দিতে নেই, আমাদের হাতে-টাতে জার্ম-ফার্ম থাকতে পারে...”।

মা ফিরে এসে আবার টুলেই বসে বললেন, “ঠিকই বলেছ, সুকু ঘরে যাওয়ার আগেই, ওর ঘরটাকেও ঝেড়েমুছে, ফিনাইল-ডেটল দিয়ে সাফ করে রাখতে হবে”।

বাবা বললেন, “কালকে চলো গাড়িটা নিয়ে একবার সুপারমার্কেট থেকে ঘুরে আসি। সুধন্বা-সায়েবের জন্যে ডজনখানেক মনোমত ড্রেস আর কসমেটিক্স নিয়ে আসি। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরোব, ওখান থেকেই সুকুর কাছে চলে আসব”।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সুধন্বা-সায়েবটা আবার কে?”

বাবা বললেন, “সে আছেন আমার এক সায়েব, এখন থেকেই তিনিই আমার বড়োসায়েব”।

মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসলেন কিছুক্ষণ, বললেন, “তোর বাবা, তোর ছেলের নাম রেখেছে, সুধন্বা, আমি নাম রেখেছি, বাম্বাই”।

কথা বলতে বলতে দেখলাম, মা ও বাবার মুখের (এবং আপাততঃ ওঁদের মন থেকেও) বিষণ্ণ-গম্ভীরতা মুছে গিয়েছে, দুজনেই এখন স্নিগ্ধ প্রসন্নতায় বিভোর। ওঁদের আনন্দের কারণ যে আমার পুত্র এবং সে কথা অনুভব করে, আমিও খুব তৃপ্তি অনুভব করছিলাম। অতএব, তীব্র কৌতূহল হলেও, আমার অসাক্ষাতে কী এমন ঘটেছিল, যার জন্যে ওঁনারা গোমড়ামুখে এসে ঘরে ঢুকেছিলেন, সে কথা জিজ্ঞেস করে ওঁদের কোন বিড়ম্বনায় ফেললাম না।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “সুধন্যা? ওটা তো মেয়েদের নাম – যে মেয়ে নিজে খুব ভালোভাবে ধন্য হয়েছে, কিংবা অন্যকে ধন্য করেছে...”।

বাবা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “কথাটা সুধন্বা, দন্ত্য-সয়ে হ্রস্ব-উ, ধ, দন্ত্য-ন-এ বফলা, আকার। মানে হচ্ছে, যিনি তির-ধনুক চালনায় অত্যন্ত দক্ষ, বীর ধনুর্ধর। অবশ্য এ নামে পৌরাণিক এক রাজাও ছিলেন। উচ্চারণের তফাৎটুকুও লক্ষ্য কর – আমরা লিখি ধন্য, কিন্তু বলি, ধোন্য, লিখি অন্য, বলি ওন্য। কিন্তু অন্ন লিখি, বলি অন্ন, তেমনি ধন্ব লিখব এবং ধন্ব বলব। নিয়মটা হচ্ছে পাশের ব্যঞ্জনবর্ণে য-ফলা ঝোলালেই, আগের বর্ণে একটা ও-কার জুড়ে দিই উচ্চারণের সময়। যেমন, অন্নের জোন্য ওন্যের ভরসায় না থেকে, নিজেই উপার্জন করা উচিৎ...”।

“ব্যস্‌, শুরু হল তোর বাবার কলেজের লেকচার...”, মা বাবাকে খোঁচা দিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মুখে গর্বমিশ্রিত একটা হাসিও লক্ষ্য করলাম।

আমিও হাসলাম, বললাম, “লেকচার হোক, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং তো, নিয়মটা জানতাম না”।

বাবা বললেন, “জ্ঞানের কথা থাক, নামটা পছন্দ হয়েছে তোর? তোর মায়ের তো পছন্দ হয়েছে”। মা “হুঁঃ” বলে তাচ্ছিল্যসূচক একটা শব্দ করলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে প্রমাণ হল না যে, মায়ের নামটা পছন্দ হয়নি। আমি হাসি মুখে বললাম, “হয়েছে। তোমরা ভালোবেসে নাতির নাম রেখেছ, আমার পছন্দ না হয়ে পারে”। এ সময়েই করিডরের ওয়ার্নিং বেলটা বেজে উঠল, অর্থাৎ ভিজিটারদের থাকার মেয়াদ ফুরালো।

মা-বাবা দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন। বাবা আরেকবার বেবিকটের দিকে গিয়ে কিছুক্ষণ সুধন্বার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি ঘুম রে বাবা, ঘরে এত লোকের আসা-যাওয়া, আমার এত লেকচার – কোন কিছুতেই দৃকপাত নেই?”

মাও বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, “সত্যি রে, টালুক-টালুক চোখদুটো, পাতলা দুই ঠোঁটের ভঙ্গি, হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়...বাম্বাইটা সেই থেকে ঘুমিয়েই চলেছে?”

সিস্টার ঘরে এসে, মায়ের কথা শুনলেন, তারপর হেসে বললেন, “তাই তো, দিদিয়া এল, দাদাই এল, ছেলের ঘুম ভাঙল না?” বেবিকটের কাছে গিয়ে, কাপড়ে জড়ানো সুধন্বাকে সিসটার কোলে তুলে নিল। আর হয়তো এই নড়াচড়াতেই তার ঘুম ভাঙল, চোখ মেলে তাকাল, তার মুঠি করা হাতগুলো ছড়িয়ে দিল”।

বাবা-মা দুজনেই আনন্দে হেসে উঠলেন, মা বললেন, “এই তো আমার বাম্বাই সোনা তাকিয়েছে...”, মায়ের হাত নিসপিস করছিল বাম্বাইকে ধরার জন্যে, বুঝতে পেরে সিস্টার বললেন, “কোলে নেবেন? নিন না”।

মা বাবার দিকে তাকিয়ে ইতস্ততঃ করে বললেন, “ না, ইয়ে... মানে আমার তো বাইরের কাপড়চোপড়...”।

সিস্টার হেসে বললেন, “কিচ্ছু হবে না, আপনারা গেলেই ন্যাপি বদলে দিয়ে, আমি ওকে মায়ের কোলে দেব। ভিজিটিং আওয়ারের শুরুতেই খেয়েছিল, তারপর এতক্ষণ ঘুমোলো এবার ওর খিদে পাবে নিশ্চয়ই...”।

মা সযত্নে বাম্বাইকে কোলে নিলেন, বাম্বাই হাত বাড়াল তার দিম্মার মুখের দিকে। কোলে নিয়ে বার কয়েক দোলা দিয়ে বললেন, “বাম্বা সোনা, চাঁদের কণা... নিজের লোককে ওরা ঠিক চিনতে পারে, নারে? ও বাবা, কি সুন্দর হাসি...ফোকলা দাঁতের হাসি, আমি বড্ডো ভালোবাসি...”, বলে মা আরও কয়েকবার বাম্বাইকে দোলা দিলেন। বাইরে করিডরে থার্ড বেল পড়ে গেল।

সিস্টার বললেন, “এবার কিন্তু আপনাদের যেতে হবে...”। সিস্টার আমার মাথার কাছে ছোট্ট ক্যাবিনেট থেকে,  একটা থলি বের করে বললেন, “ম্যাডামের কাপড়গুলো নিয়ে যাবেন, আর কাল সকালের দিকে বাড়িতে কাচা কিছু ড্রেস দিয়ে যাবেন।

বাবা থলিটা হাত নিয়ে বললেন, “সকালে আমাকে ভেতরে আসতে দেবে?”

“না, মেসোমশাই, তা দেবে না। আপনি নীচের রিসেপশনে ব্যাগটা দিয়ে, কেবিন নম্বর আর পেশেন্টের নাম বলবেন। ওরাই ওপরে পাঠিয়ে দেবে।”

“ঠিক আছে”।

মায়ের কোল থেকে বাম্বাই আবার সিস্টারের কোলে চলে গেল, শুয়ে পড়ল বেবিকটে। বাম্বাই হাত-পা ছুঁড়ে অদ্ভূত আওয়াজ করতে লাগল মুখে।

মা-বাবা বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে, বাবা বললেন, “আমরা কাল আবার আসব, বিকেলে। একটু ইতস্ততঃ করে আবার বললেন, “ওদের ওখান থেকে আর কেউ আসবে বলে মনে হয় না”।

মা বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, “আসছি রে, মন খারাপ করিস না, ভালো থাকিস”।

সিস্টার দ্রুত হাতে বাম্বাইকে ফ্রেশ করে তুলে, আমার কোলে দিয়ে বললেন, “ব্রেস্ট ফিডিংয়ের সময় হয়ে গেছে, ম্যাডাম, উঁহু, ওভাবে নয় এ হাতটা ওর পাছার কাছে ধরুন, আর মাথাটা ধরুন অন্য হাতে...অ্যাই, এবার ঠিক হয়েছে...”। এরপর শিশু নিজেই যেন খুঁজে নিল তার মায়ের স্তন, আমার সমস্ত চেতনা তখন বাম্বাইয়ের মুখের দিকে, তার দুই চোখের দিকে। আমার বৃন্তে ঠোঁট রেখে যখন ও স্তন্যপান শুরু করল, বুকে আশ্চর্য এক তৃপ্তি আর শান্তি অনুভব করলাম, আর বাম্বাইয়ের দু চোখেও লক্ষ্য করলাম অদ্ভূত এক নির্ভরতা। আমার দু চোখ ঝাপসা হয়ে এল অশ্রুতে।

 

 

স্তন্যপান শেষ হতে না হতেই বাম্বাই ঘুমিয়ে পড়ল, গোলাপের পাপড়ির মতো ওর কোমল অধরোষ্ঠ খসে পড়ল আমার বৃন্ত থেকে। সিস্টার আমার কোল থেকে পরমযত্নে তুলে নিল ওকে, তারপর আলতোহাতে শুইয়ে দিল বেবিকটে। এর আগেই ও বেবিকটের বিছানার চাদর-টাদর পালটে, একদম পরিপাটি করে রেখেছিল।

শিশুকে শোয়ানোর পরেও বিছানার চাদর টান-টান করতে সিস্টার বলল, “আপনার শাশুড়ি এখান থেকে যাওয়ার পর নীচেয় কী হয়েছে জানেন? আপনার মা-বাবা কিছু বলেননি?” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম চুপ করে।

“আপনি বকাবকি করাতে আপনার বর তো ঘর থেকে বেরিয়ে নীচের রিসেপশনের চেয়ারে বসেছিল, ওঁর মায়ের পাশে। ওঁদের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে জানি না, কিন্তু উনি এসে রাগারাগি করে আপনাকে তো নানান কথা শোনালেন এবং বেরিয়েও গেলেন। নীচেয় গিয়ে উনি নাকি ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিলেন, কিন্তু আপনার বর যেতে চাইছিলেন না। ছেলেকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একরম জোর করেই তিনি বার করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আপনার বর সিঁড়ি দিয়ে নীচেয় নামতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে গড়িয়ে পড়েছিলেন রাস্তায়।

মাথায় এবং হাতে নাকি চোট পেয়েছেন, রক্তও বেরিয়েছিল। কিন্তু তার থেকেও যেটা বিশ্রী ব্যাপার, ফুটপাথে পড়ে গিয়ে গুচ্ছের বমি করেছেন। সে বমিতে নাকি বিশ্রী দুর্গন্ধ। আপনার বাবা-মা এবং নীচের সিকিউরিটির দুজন দৌড়ে গিয়েছিলেন, আপনার বরকে তুলতে... কিন্তু আপনার শাশুড়ি আপনার বাবাকে হাত লাগাতে দেননি, উলটে বিচ্ছিরি গালাগাল দিয়েছেন, পাড়া মাথায় করে। আর হবি তো হ, ঠিক সেই সময়েই ফুটপাথের ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে, ফুটপাথে পা দিয়েছেন আমাদের বড়দি।

বড়দি সিকিউরিটি দুজনকে সঙ্গে সঙ্গেই নির্দেশ দিলেন, আপনার বরকে ফার্স্ট-এড করিয়ে দেওয়ার জন্যে, তারপর রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে এই ছোকরা আর মহিলা?”

রিসেপশনের ম্যাডাম তো তখন ভয়ে তটস্থ, কোন রকমে বলল, “ম্যাডাম, ওঁরা ‘থ্রিই’ কেবিনের সুকন্যা ম্যাডামের বাড়ির লোক”।

“বাড়ির লোক?” রিসেপশনের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা, আপনার মা আর বাবার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকালেন বড়দি।

আপনার বাবা সামনে এসে বললেন, “হ্যাঁ ম্যাডাম, আমাদের জামাই”।

“জামাই? স্ট্রেঞ্জ। লাভ ম্যারেজ, বুঝি?”

“না, ম্যাডাম, দেখে-শুনে আমরাই...”। আপনার বাবা বললেন।

সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বড়দি রিসেপশনে বললেন, “সুইপারকে এখনই বলো সমস্ত জায়গাটা ভালো করে স্যানিটাইজ করতে... আর ওই ছোকরাটির ফার্স্ট-এড হয়ে গেলেই ছেড়ে দিও, কোন বিল চার্জ করবে না”। তারপর আপনার বাবাকে বললেন, “আপনারা ওপরে যাবেন তো? একটু ওয়েট করুন - মিনিট পাঁচেক - আমার ভিজিটটা আগে সেরে নিই”।  বড়দি আজ আপনার কেবিনেই প্রথম এসেছিলেন”।

মা-বাবার উপস্থিতি এবং তারপর বাম্বাইকে নিজের হাতে নাড়াচাড়া করে, আমার মনটা তখন খুশিতে ভরে উঠেছিল, সুনুদা, কিন্তু সিস্টারের বর্ণনা শুনে আবারও ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল। এবং তখনই মনে পড়ল পিন্টুর বাবার সহৃদয় পরামর্শ এবং সতর্কবাণী। সেই মুহূর্তেই আমি স্থির করলাম, আমি ডিভোর্স নেব। জীবনটা একান্তই আমার – কে কী ভাবল, কে কী মনে করল। কে সুখী হল, কে দুঃখ পেল, সে আমার মাথাব্যথা নয়। আমি শান্তি চাই আমার জীবনে – তাতে সুখ যদি নাও মেলে ক্ষতি নেই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মঞ্জরীম্যাডাম যখন এসব বলছেন, তখন আমার শাশুড়ি কোথায় ছিলেন?”

“তা তো জানি না, ম্যাডাম, নীচের সিকিউরিটি একবার ওপরে এসেছিল, আমাদের মেট্রনদিদিকে সব বলে গেছে। আমি ওই দিদির মুখেই সব শুনলাম। একটা কথা বলবো ম্যাডাম, কিছু যদি মনে না করেন”?

“বলুন, না”।

“আপনার বাবা-মাকে দেখলাম, আপনাকেও সারাক্ষণ দেখছি গতকাল থেকে, ও বাড়ির সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক মানায় না। আপনার শ্বশুরমশাই মনে হয়, ভালো মানুষ, তিনি যা বলছিলেন, সে কথাটাই আমাদের মনের কথা”।

“আমাদের মানে?”

“এ নার্সিং হোমে  - একতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত – এখন আপনাকে নিয়েই তো আলোচনা চলছে...ম্যাডাম। এমন মুখরোচক সংবাদ শুনতে, আলোচনা করতে সকলেই ভালোবাসে কিনা!” 

আজ এই পর্যন্তই থাক, সুনুদা। জানি তুমি রাত জেগে এ লেখা পড়ছো। বাকিটা কাল বলব, সময়মতো। অধৈর্য হয়ে আবার ফোন কোর না, বা চলে এস না আমার কাছে।

এটুকু বলতে পারি, সেদিন আমি আমার জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আবার আজও তেমনি দাঁড়িয়েছি আমার জীবনের আরেক সন্ধিক্ষণে। এই সময়টুকু আমাকে নিবিষ্ট থাকতে দাও - আমার জীবনের কথাগুলো আমাকে নিঃশেষে বলতে দাও, প্লিজ। কোনভাবেই বাধা দিও না। 

তোমার কনি।  

চলবে...


মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৮

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৭ 


৩৪

 

ভল্লা আর রামালি ভোরে রওনা হল মহড়ার মাঠের দিকে। গতকাল গ্রামপ্রধানের দাহ সৎকার শেষ হতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে গিয়েছিল। ভল্লা ভেবেছিল নোনাপুরের কেউ আজ আর মহড়ায় আসবে না। কিন্তু দাহ শেষে কাল রাত্রেই ছেলেরা বলেছিল, তারা আজ আসবে। অন্যদিনের মতো একই নিয়মে মহড়া করবে। আজ সকালে মহড়ার মাঠে পৌঁছে ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভল্লা আশ্চর্য হল। প্রত্যেকটি ছেলের মুখ গম্ভীর। তাদের দু চোখে ছেলেমানুষী সরলতা নয়, জেগে উঠেছে দৃঢ় এবং নিষ্ঠুর প্রতিজ্ঞা। একজন শ্রদ্ধেয় মানুষের এমন অসম্মানের মৃত্যু, একরাত্রেই তাদের মনে অদ্ভূত এই রূপান্তর এনে দিয়েছে! ভল্লা কিছু বলল না। এক পাশে বসে, ছেলেদের অনুশীলন দেখতে লাগল, মন দিয়ে। একে একে সকলেরই অনুশীলন দেখে খুশি হল, ভল্লা। উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেদের কাছে গেল, সুরুল আর আহোকের কাঁধে হাত রেখে সকলের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “নাঃ এতদিনে তোরা সত্যিই এক-এক জন যোদ্ধা হয়ে উঠছিস। আমার মনে যেটুকু দ্বিধা ছিল সেটা কেটে যাচ্ছে। তোদের সকলকে নিয়ে প্রকৃত লড়াইয়ে নামার সময় এবার এগিয়ে আসছে। প্রতিশোধ। হ্যাঁ, এই প্রতিশোধের আগুনটা রাজধানী ছাড়ার পর থেকেই আমার বুকের মধ্যে জ্বলছে অহরহ। আজ তোদের মধ্যেও সেই আগুনটা আমি দেখতে পাচ্ছি। আর দশটা দিন এভাবেই তোরা অনুশীলন চালিয়ে যা। তারপরে গভীর রাত্রে আমরা আস্থানে যাব”। ভল্লা এবার গম্ভীর দৃঢ় স্বরে, প্রত্যেকটি কথা শান্ত নিষ্ঠুর উচ্চারণে বলল, “এবারে আর শুধু অস্ত্র-শস্ত্র চুরি নয় – সরাসরি আক্রমণ। আমাদের প্রধান লক্ষ্য থাকবে একটাই। কবিরাজমশাইয়ের মুক্তি। এই লক্ষ্য পূরণের জন্যে কিছু রক্ষীকেও হত্যা করতে হবে। তখন তোদের কারো...একজনেরও হাত যেন না কাঁপে”।

ভল্লার শেষের কথাগুলো ছেলেদের কাঁপিয়ে দিল, একসঙ্গে সকলে গর্জে উঠল, “কাঁপবে না। রক্তের শোধ নেব রক্তেই”। ভল্লা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল কিছুক্ষণ। বলল, “এই শপথের আগুন সর্বদা জ্বলতে থাকুক তোদের সবার মনে। নে আবার মহড়া শুরু কর। কাল যে রণপা চড়ে ভল্ল ছোঁড়া দেখিয়েছিলাম, সেটাও...। ওটা হয়ে গেলে শুরু হবে আমাদের রাত্রের মহড়া...”।

ছেলেরা আবার অনুশীলন শুরু করতে, রামালিকে ডাকল ভল্লা, বলল, “আমাদের রণপা, ভল্ল, বল্লম কতগুলো আছে বলতো? গুণে দেখেছিস? আমাদের ছেলেদের সবার হয়ে যাবে?”

রামালি বলল, “ছ’জোড়া রণপা বেশি আছে। ভল্ল বেশি আছে দুটো, আর বল্লম বেশি আছে প্রায় দশটা”।

ভল্লা বলল, “মিলাদের ওখানে আপাততঃ কতগুলো দেওয়া যাবে?”

রামালি বলল, “চারজোড়া রণপা, আর ছটা বল্লম দেওয়া যাবে... ভল্ল না দেওয়াই ভালো, ভেঙে-টেঙে গেলে, আমাদেরই অসুবিধে হবে। বালিয়াকে দিয়ে কিছু ভল্ল বানিয়ে নিলে হয় না?”

“তা হয়, কিন্তু সরু ছোটছোট বাঁশের টুকরো পাবি কোত্থেকে, যার মাথায় ভল্লর ফলা জোড়া যাবে?”

“হাত দেড়েক লম্বা টুকরো হলেই তো ভল্ল হয়ে যাবে, সে টুকরো বাঁশ কিন্তু আমাদের আছে”।

“কোথায়?” অবাক হয়ে ভল্লা জিজ্ঞাসা করল রামালিকে।

“আমাদের প্রত্যেকের যে রণপা রয়েছে, ভল্লাদাদা। তার মাথা থেকে হাত দেড়েক যদি কেটে নেওয়া হয়, তাতে কি অসুবিধে হবে?”

ভল্লা উঠে দাঁড়িয়ে নিজের রণপা জোড়া খাড়া করে ধরল, দুটো বাঁশের দৈর্ঘ্যই তার মাথা ছাড়িয়ে গেল। ভল্লা বলল, “বাঃ এটা আমার মাথায় আসেনি তো! সবকটাই কি একইরকম লম্বা?”

“হ্যাঁ ভল্লাদাদা সবকটাই – তার মানে ছত্রিশ জোড়া”।    

“বাঃ, তার মানে ছত্রিশ জোড়া ভল্ল হয়ে যাবে? রাজধানীর অস্ত্র-শস্ত্র আসা অবধি আমাদের চলে যাবে। এখন চল, মিলারা বোধহয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। মিলাদের কথা আমাদের ছেলেদের বলেছিস?”

“না ভল্লাদাদা, বলিনি। নিজেদের অঞ্চলে ওরা তো আসলে ডাকাতি করছে…তাই…” একটু ইতস্ততঃ করে রামালি থেমে গেল।

ভল্লা হাসল, বলল, “ধুর বোকা, ওরা ডাকাতি করছে টাকাকড়ির জন্যে, ওদের আসল উদ্দেশ্য তো রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ… আর এতদিনে তুই তো বুঝেই গেছিস, আমাদের পেছনে আছে, আমাদেরই প্রশাসন। অতএব শুরুতে আমাদের ডাকাতি করতে হল না। কিন্তু ওদের তো তা নেই…। আমাদের ছেলেদের সময়মতো বলে দিস। অন্য কারোর মুখে মিলাদের কথা শুনলে ছেলেরা ভুল বুঝতে পারে…”। ভল্লা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি রামালিকে নিয়ে একটা কাজে যাচ্ছি, তোরা কিন্তু মহড়া চালিয়ে যা। রামালি একটু পরেই ফিরবে…আমি আসব বিকেলে”।

ছেলেরা বলল, “ঠিক আছে, ভল্লাদাদা”।

ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “হ্যারে শল্কু আসেনি? কী হয়েছে ওর?”

আহোক বলল, “জানিনা ভল্লাদাদা, আসার সময় ওর সঙ্গে ওর বাড়ির সামনে দেখা হল। জিজ্ঞাসা করলাম, কি রে যাবি না? বলল, তোরা চল, আমি যাচ্ছি একটু পরে… এখনও তো এল না”।

বিনেশ বলল, “শল্কুটা বিগড়ে গেছে, ভল্লাদাদা…ওর হাবভাব ভালো ঠেকছে না”।

ভল্লা আহোক আর বিনেশের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। তারপর রণপায় চড়ে বলল, “বেরোচ্ছি, রে”।  

*     *     * 

ভল্লা আর রামালি বাসায় পৌঁছে দেখল, মিলা, জনাদের সাতজন ছেলে তাদের ঘরের সামনে উঠোনে বসে হ্যা হ্যা করে হাঁফাচ্ছে। রামালির মনে পড়ল প্রথমদিন রামালিদেরও একই অবস্থা হয়েছিল।

ভল্লা ওদের দেখে হাসল, বলল, “ভালই তো হাঁফাচ্ছিস, কতক্ষণ দৌড়লি? রামালি ওদের জন্যে রণপাগুলো নিয়ে আয়। আর তোরা বসে বসে হাঁফাস না, চল হাঁটি। তোদের মহড়ার মাঠটা দেখিয়ে দিই”।

জনা বলল, “ওফ যা দৌড় করিয়েছ ভল্লাদাদা, একটু জিরোতে দাও”।

“রামালিরা জানে, আমি ওদের জিরোতে দিই না – তোরাও জেনে যাবি - কয়েকটাদিন আমার সঙ্গে থাক”। ভল্লা হাসতে হাসতে বলল, “চল ওঠ, ওই দ্যাখ, রামালি তোদের জন্যে রণপা আর বল্লম নিয়ে চলে এসেছে”।

রামালি ওদের হাতে চার জোড়া রণপার বাঁশ তুলে দিল। তারপর ভল্লা আর রামালি নিজেদের রণপায় চড়ে পড়ে, ভল্লা বলল, “তোরা কি রণপা আগে দেখেছিস? রণপা চড়ে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটাচলা করা যায় – আর দৌড়তে পারলে, ঘোড়াকেও টেক্কা দিতে পারবি। চল মাঠে চ, তোদের শেখাবো”।

মাঠ দেখে মিলাদের সকলেরই বেশ ভালো লাগল। চারদিকে ঘন গাছের জঙ্গল ঘেরা অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ভল্লা বলল, “আপাততঃ চারটে রণপা জোগাড় করতে পেরেছি, বল্লম আছে গোটা দশেক - বিকেলে পেয়ে যাবি। এই নিয়েই শুরু কর, তারপর দেখছি কত তাড়াতাড়ি তোদের অস্ত্র যোগাড় করতে পারি”।

রামালি চারজন ছেলেকে রণপায় চড়ে হাঁটতে শেখাতে লাগল। ভল্লা মিলা আর জনাকে বলল, “তোদের এখন তো কাজ নেই – চল কিছু কথা সেরে নেই। তিনজনেই মাটিতে বসল। ভল্লা বলল, “দ্যাখ মহড়ার মাঠ তো হল, কিন্তু তোদের একটা বা দুটো বড়ো ঘর তো চাই। যেখানে তোদের এই অস্ত্র-শস্ত্র সব রাখতে হবে। রোজ সন্ধেয় বাড়ি নিয়ে যাবি আর ভোরে সেসব সঙ্গে নিয়ে এখানে আসবি। লোকের বুঝতে কিছু বাকি থাকবে?”

মিলা জনার দিকে তাকাল, বলল, “ঠিক কথা, এদিকটা আমরা ভাবিনি”।

ভল্লা বলল, “এখান থেকে ক্রোশ খানেক দূরে একটা পুকুর আছে, তার পাশে কিছুটা জমি নিয়ে তোরা একটা বা দুটো ঘর বানিয়ে নিতে পারিস। কিন্তু কী দিয়ে বানাবি? ইঁট না কি বাতা?”

মিলা বলল, “ইঁট দিয়ে বানালে ভাল হয় না”?

“ভাল তো হয়ই, কিন্তু খরচ এবং সময় লাগবে বেশি। ইঁট যোগাড় করতে পারবি? তোদের ওদিক থেকে ইঁট আনতে গেলে – সকলেই জেনে যাবে”।

জনা বলল, “রামালিরা যেখান থেকে ইঁট কেনে, সেখান থেকেই নিতে পারি আমরা। ইঁট, চুন, সুরকি – পুকুরের জল তো পেয়েই যাব। তাহলে আমাদের দিকের লোকেরা চট করে বুঝতে পারবে না। কিন্তু টাকাকড়ি?”

ভল্লা বলল, “তোরা তো কাল দিয়েই গেলি – সেখান থেকে এখন নিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে দে। আর ওই দুটো ঘরের ভেতর একটাতে,  ছোট্ট একটা কুঠরি বানিয়ে তার মধ্যে একটা সিন্দুক বসিয়ে ফেল। তোরা টাকা-কড়ি যা যোগাড় করবি, ওখানেই রাখবি। অস্ত্র কেনার ব্যাপার হলে, আমাকে বা রামালিকে দিবি”।

মিলা বলল, “রামালিকে তুমি এতটা ভরসা করছো ভল্লাদাদা?”

ভল্লা হাসল, “তোরাও করবি, কয়েকটা দিন ওর সঙ্গে ওঠাবসা কর…। ওই দ্যাখ রামালি ওর নিজের রণপাজোড়াও দিয়ে দিল…ভাল করেছে… একসঙ্গে পাঁচজনই শিখতে পারবে। অ্যাই রামালি, এদিকে শোন…”।

রামালি ওদের তিনজনের কাছে এসে বসতে ভল্লা বলল, “রামালি, এদের জন্যে দুটো ঘর বানানোর ব্যবস্থা করতে হবে – ওরা চাইছে ইঁটের দেওয়াল তুলতে, ইঁট-চুন-সুরকি যোগাড় করে দিতে পারবি? এবং কাজের লোক?”

রামালি একটু চিন্তা করে বলল, “বীজপুরের একজন আমাদের এদিকে ঘর বানানোর কাজ করে...তাকে খবর দিতে পারি...তবে দু-তিনদিন সময় লাগবে...ওর কাছে সব পাওয়া যাবে...এমনকি ঘর ছাওয়ার টালি থেকে কাঠের বরগা-কড়ি সব...”।

মিলা বলল, “বাঃ তাহলে তো খুব ভালো হয়...কিন্তু আমরা খবর দেব, সে আসবে...কথাবার্তা হবে...তারপর সে মালপত্র আনবে, লোক পাঠাবে...অনেক দেরি হয়ে যাবে তো!”

ভল্লা বলল, “লোকটাকে তুই চিনিস? কোথায় থাকে জানিস?”

রামালি বলল, “তা চিনি, কিন্তু বীজপুরে ঠিক কোথায় থাকে জানি না। তবে ওখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই জানা যাবে...”।

ভল্লা একটু চিন্তা করে বলল, “রণপা চড়ে বীজপুর যেতে কতক্ষণ লাগতে পারে...তিন, সাড়ে তিন প্রহর?”

রামালি হেসে ফেলল, বলল, “পায়ে হেঁটেও আমি কোনদিন বীজপুর যাইনি ভল্লাদাদা...। তবে যারা যাওয়া-আসা করে, তাদের মুখে শুনেছি পায়ে হেঁটে প্রায় ছ-সাত প্রহরের পথ”।

ভল্লা বলল, “হুঁ, তার মানে রণপা চড়ে গেলে – দুই-তিন প্রহরের মধ্যে পৌঁছনো সম্ভব। আমরা এখান থেকে যদি আজ মধ্য রাত্রিতে রওনা দিই, আগামীকাল সকাল-সকাল বীজপুর পৌঁছে যাবো...”।

মিলা আর জনা চমকে উঠে বলল, “তুমি যাবে ভল্লাদাদা...কী বলছো?”

ভল্লা মুচকি হেসে বলল, “একসঙ্গে যখন নেমেছি, তখন ক্ষতি কী? অবিশ্যি তোরা যদি না চাস তাহলে যাবো না”।  

মিলা লজ্জা পেয়ে বলল, “যাঃ কী যে বলো না, তা নয়...এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে?”

ভল্লা এবার গম্ভীর মুখে বলল, “আমরা যদি যাই, আগামী কাল হয়তো দুজনেই থাকবো না...তাই বলে তোদের মহড়া যেন বন্ধ না হয়। পরশু এসে দেখতে চাই তোরা সবাই রণপা চড়তে শিখে গিয়েছিস”।

মিলা বলল, “তুমি আমাদের জন্যে এত কিছু করছ...তার পরিবর্তে আমরা তোমায় ফাঁকি দেব? সে কথা মনেও স্থান দিও না ভল্লাদাদা”।

ভল্লা বলল, “উত্তম। আরেকটা কথা – তোরা দুজন ছাড়া এই কথা কেউ যেন জানতে না পারে – এমনকি আমাদের এদিকের ছেলেরাও কেউ না...”।

“জানবে না, ভল্লাদাদা”।

“আমরা এখন উঠছি রে মিলা। আমাদের ও দিকে কী হচ্ছে একবার দেখে আসি। রামালি চল”।

রামালি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “জনা, তোরা ফিরবি কখন?”

“সন্ধের দিকে”।

“তাহলে যাওয়ার সময় রণপাগুলো ভল্লাদাদার বাসার কাছে রেখে দিয়ে আসবি”?

ভল্লা বলল, “হুঁ, যতদিন না তোদের ঘর হচ্ছে, ততদিন ওগুলো আমাদের ওখানে রেখে দেওয়াই নিরাপদ”।

জনা বলল, “ঠিক আছে ভল্লাদাদা। তার মানে তোমাদের সঙ্গে পরশু দিন আবার দেখা হবে...”।

রামালি হেসে বলল, “কেন? আজ সন্ধেতেই আবার দেখা হবে। আমরা যদি নাও থাকি, একটু অপেক্ষা করিস, আমরা চলে আসবো”।    

পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২৯ "

শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

@শুধু _তুই .কম - পর্ব ১২

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

" সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "

এই উপন্যাসের শুরু - " @শুধু _তুই .কম - পর্ব ১



এর আগের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১১ 


১২ 

“সদর দরজা থেকে বাইরের ঘরে ঢুকতেই আমার শ্বশুর দেখলাম আমার অপেক্ষাতেই যেন দাঁড়িয়ে আছেন। আমার  দিকে তাকিয়ে চশমাটা খুলে, করজোড়ে বললেন, “আমরা তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি, মা। ভয়ংকর ভুল করেছি আমরা”।

“আপনি পিতৃতুল্য, আমার সামনে হাতজোড় করবেন না, প্লিজ। ভুল যে হয়েছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন তো সে নিয়ে অনুশোচনা করে লাভ নেই, বাবা। আমাদের উচিৎ সেই ভুলটাকে কী করে শোধরানো যায়, সেই চিন্তা করা”। কথাটা শেষ হতেই দেখলাম ভেতরের দিকে যাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শাশুড়ি।

ঝনঝন করে তিনি ঝাঁজিয়ে উঠে বললেন, “ছেলের বউয়ের সামনে হাতজোড় করে নাটুকে নাকে-কান্না কেঁদে তুমি এখন ভালো সাজছ? তোমার পয়সায়, তোমার আয়োজনে, তোমার গুণধর ছেলের এই বিয়ে হল, আর আজ পনেরদিনের মধ্যেই তোমার মনে হল অন্যায় হয়ে গেছে?”

শ্বশুরমশাই বললেন, “তোমাদের সক্কলকে বলেছিলাম - পইপই করে বলেছিলাম, ওকে কোন রিহ্যাবে রেখে নেশা ছাড়িয়ে, সুস্থ করে, তারপর বিয়েটা হোক। তুমিই বলেছিলে ছেলেদের অমন একটু-আধটু উড়ুনচণ্ডিপনা বিয়ের আগে থাকে। বিয়ের জল গায়ে পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলনি?”

“বলেছিলে তো নিয়ে যাওনি কেন, তোমার ওই গুষ্টির পিণ্ডি রিহ্যাবে? তোমার হাতে-পায়ে কেউ দড়ি বেঁধে রেকে দিয়েছিল... সব কি আমাকেই করতে হবে...”।

এই জঘন্য বিতণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ঘৃণা হচ্ছিল। আমি শাশুড়ির পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। দেখলাম পিন্টু উঠে বসেছে, আমাকে ঢুকতে দেখে লজ্জায় মাথা নামাল, বলল, “সরি সুকু, এক্সট্রিমলি সরি, আর কখনো এমন হবে না। দেখে নিও, প্রমিস”।

আমি কোন উত্তর না দিয়ে, রান্নাঘরে গেলাম। খুঁজে পেতে লেবু, নুন, চিনি বের করে, একগ্লাস সরবৎ বানিয়ে নিয়ে এলাম পিন্টুর জন্যে, বললাম, “ধরো, এটা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে”। তখনও কানে আসছিল শ্বশুর-শাশুড়ির বাক-যুদ্ধ।

সুবোধ বালকের মতো গ্লাসটা খালি করে আমার মুখের দিকে তাকাল, পিন্টু। আমি খালি গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললাম, “এবার সোজা টয়লেটে ঢুকে পড়ো, জামা-প্যান্ট ছেড়ে চান-টান করে ফ্রেশ হয়ে নাও”।

পিন্টু উঠল, মিনমিনে সুরে বলল, “তুমি রাগ করনি তো?”

“খুশি হওয়ার মতো কিছু করেছ, বলে তোমার মনে হচ্ছে?”

পিন্টু কথা বাড়াল না আর, কাচা পাজামা-পাঞ্জাবি নিয়ে টয়লেটে ঢুকল। আমি দ্রুত হাতে, বিছানার চাদর বালিশের ওয়াড় সব তুলে ফেলে নতুন করে বিছানা সাজালাম। দুটো ধূপ জ্বেলে ঘরের দু কোণে রাখলাম। সব মিলিয়ে ঘরের পরিবেশটা মন্দের ভাল হল।

 এভাবেই শুরু হল আমার দাম্পত্য জীবনটা, সুনুদা।

স্বাভাবিক অবস্থায় পিন্টু কিন্তু খুব খারাপ মানুষ ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু কাঠখোট্টা নয়, নানান রকমের বই পড়ার অভ্যেস ছিল, গান-টান ভালোবাসে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত। ঠাট্টা, ইয়ার্কিতেও খারাপ নয়, ভদ্রজনোচিত রসিক বলা যায়। কিন্তু তার এই চরিত্রটা ছিল ক্ষণস্থায়ী, অনেকটা সূর্যোদয় – সূর্যাস্তের মতো। অর্থাৎ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের শিরায় শিরায় যেন তৃষ্ণার হাহাকার উঠত – কোথা গেলে পাই, কোথায় জুড়াই, দগ্ধ প্রাণের তিয়াসা...। এটা কোথায় শুনেছিলাম, বা পড়েছিলাম মনে নেই এবং যদ্দূর মনে পড়ছে গানটা ভগবদ্ভক্তির নেশায় গাওয়া বা লেখা। সে গানের আমি ভয়ংকর অপপ্রয়োগ করলাম জানি। কিন্তু আমার জীবনে আমি বুঝেছি, একজন নেশাখোরের কাছে মদের বোতলই ঈশ্বর, বাকি সব মায়া। তার কাছে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, ঈশ্বর-দেবতা কিচ্ছু না – কিছুই না।

আরেকটা কথা বলি পিন্টু ভালো থাকুক এটা ওর মা চাইতেন না, হয়তো এটা তাঁর মানসিক ব্যাধি বিশেষ। দু’দিন বা তিনদিন পরপর পিন্টু অফিস করে নেশা না করে বাড়ি ফিরলে (আমি বুঝতে পারতাম, নেশার গ্রাস থেকে মুক্ত করতে নিজের সঙ্গে কতখানি যুঝে চলেছে ও) ওর মায়ের গাত্রদাহ হত। ছেলে বুঝি বউয়ের আঁচলে বাঁধা পড়ে গেল, স্ত্রৈণ হয়ে গেল ছেলে। বিশ্বাস করবে না হয়তো, কিন্তু আমার প্রতি অদ্ভূত এক ঈর্ষার আগুন জ্বলতে দেখেছি ওঁর চোখে। আমার আড়ালে উনি ছেলেকে কি মন্ত্র বা মন্ত্রণা দিতেন জানি না, দেখা যেত পরের দিনই সে নেশা করে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরত। গর্বিত আনন্দে শাশুড়িকে এক-দুবার জনান্তিকে বলতেও শুনেছি, পুরুষমানুষ একটু-আধটু নেশা-ভাঙ না করলে আবার পুরুষ কিসের?

পিন্টুর বাবা ছিলেন স্বাভাবিক স্বভাবের মানুষ, সন্ধের পরে পরে সুস্থ অবস্থায় পিন্টু বাড়ি ফিরলে বড়ো আনন্দ পেতেন। উঁচু গলায় হাঁক পাড়তেন – “বৌমা, পিন্টু এসে পড়েছে, দু’কাপ চা করো তো, দুজনে মিলে বেশ আরাম করে খাই”। স্বামীর আনন্দে আমার শাশুড়ির মুখে নামত কালো মেঘের ছায়া। আমার দাম্পত্য নিয়ে আমি অস্থির ছিলাম, সুনুদা, কিন্তু পিন্টুর বাবা-মায়ের দাম্পত্যের রহস্যটা কোনদিন আমার মাথায় ঢোকেনি। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানসিকতা নিয়ে এই দুই মানুষ কিভাবে কাটিয়ে দিলেন এতগুলি বছর? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা নাকি বীভৎস বঞ্চনা ও অত্যাচারের শিকার। অথচ এই পুরুষটি জীবনের অধিকাংশ সময়টাই কাটিয়ে দিলেন, নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কাজের বাধ্যতা নিয়ে – এটাকেই কী অ্যাডজাস্টমেন্ট বলে, সুনুদা?

দাম্পত্যের এই দ্বন্দ্বের মধ্যেও অনেকেরই সন্তান হয়, আমারও হল, বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর। প্রসবের আগে আমি মা-বাবার কাছে ছিলাম, প্রায় মাস তিনেক।  অফিস ছুটির পর প্রথম প্রথম পিন্টু ও বাড়িতে প্রায় রোজই যেত। ধীরে ধীরে ও বাড়িতে তার উপস্থিতির হার কমতে লাগল। পাঁচ-সাতদিন পর পর ও যখন আসত – ওর চেহারা দেখেই বুঝতাম – ও আবার নেশা শুরু করেছে।

নার্সিং হোমে যেদিন ভর্তি হলাম, তার পরের দিন সকালে আমার পুত্র সন্তানের জন্ম হল। আমার মা বললেন, “ছেলে অবিকল তোর মুখ পেয়েছে, সুকু, মাতৃমুখী ছেলে খুব সুখী হয়। আর পিন্টুর মা বললেন, “আহা, শৈশবের পিন্টুর মুখটাই যেন বসানো তোমার ছেলের মুখে, বৌমা”।

পিন্টু এল একটু বিকেল করে। আমার বেডের কাছাকাছি আসা মাত্র আমার মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। বাবাকে আনন্দ করে তার ছেলে দেখাতে গিয়ে, আমার সিস্টারও টের পেলেন সেই শিশুর পিতা মদ্যাসক্ত। সেও নাক-মুখ কুঁচকে ওর দিকে তাকাল, আমার দিকেও একবার, বলল, “পেশেন্টের ঘরে বেশিক্ষণ থাকবেন না...”।

পিন্টু আমার কাছে এসে বলল, “আমি সরি, সুকু...”।

দাঁতে দাঁত চেপে আমি চাপা গলায় হিসহিসিয়ে উঠলাম ক্রোধে, বললাম “কত হাজার বার, কত লক্ষ বার সরি, বলবে তুমি? একপেট মদ গিলে এসেছ, প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে?”

“ওরা, জোর করল খুব...কিছুতেই না করতে পারলাম না...”।

তীব্র ঘৃণা আর বিবমিষায় মুখ ঘুরিয়ে রইলাম আমি। পিন্টু বেবি-কটের দিকে যেতেই, আমি আবার ফোঁস করে উঠলাম, “আমার বাচ্চার গায়ে তুমি হাত দেবে না... বেরিয়ে যাও...”।

দুপায়ে দাঁড়ানো সরীসৃপ আমি কোনদিন দেখিনি, আদৌ আছে কিনা জানি না। কিন্তু সেদিন দেখলাম, সেই নার্সিং হোমের ঘরে, আমার সামনে। পিন্টু আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সিসটার বোধহয় অপেক্ষা করছিলেন, পিন্টূ বেরিয়ে যেতেই ঘরে এলেন, তারপর রুম ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিলেন ঘরের চারদিকে। বললেন, “বড়দির ভিজিটের সময় হয়ে গেছে, ঘরের মধ্যে ঢুকে এরকম বিশ্রী গন্ধ পেলে তিনি কুরুক্ষেত্র বাধাবেন, ম্যাডাম”।

ওঁর বড়দি মানে আমার ডাক্তার ম্যাডাম, আমার মায়ের থেকেও বয়স্কা মহিলা। মায়ের মুখে শুনেছি, আমার জন্মও ওঁনার হাতেই হয়েছিল। ওঁনার ওপরে আমার বাবা-মায়ের অনন্ত ভরসা ও বিশ্বাস। পেশেন্টদের উনি যেমন স্নেহ করেন, তেমনি অবাধ্য হলে, বা কোন কারণে বিরক্ত হলে পেশেন্টের ধুলো ঝেড়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করেন না।

পিন্টু বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পনের পরে ঘরে এলেন, পিন্টুর বাবা-মা। শ্বশুরমশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন, “কেমন আছিস, মা?” কিন্তু আমি সে কথার উত্তর দেওয়ার আগেই, খরখরে গলায়, পিন্টুর মা বললেন, “পিন্টুটা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে, তার ছেলের মুখ দেখতে এল, তাকে তুমি কিনা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে? ছি ছি ছিঃ”।

রাগে ও ঘৃণায় আমার মাথা ঝনঝন করে উঠল, বললাম, “তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে সে বন্ধুদের নিয়ে মদ খেতে গিয়েছিল, মা। এক পেট মদ গেলার পর হঠাৎ তার পিতৃত্ব জেগে ওঠায়, সে এখানে এসেছিল”।

বেবিকটের সামনে দাঁড়িয়ে সিস্টার আমার পুত্রের ন্যাপি পরীক্ষা করছিলেন, তিনি বেশ রূঢ় কণ্ঠে বললেন, “এখানে জোরে কথা বলবেন না, এটা নার্সিং হোম”।

আগুন ঝরানো চোখে শাশুড়িমা আমার দিকে একবার তাকিয়ে, বাইরে বেরিয়ে গেলেন। শ্বশুরমশাই আমার কাছে এসে, আমার মাথায় হাত রেখে খুব নীচু স্বরে বললেন, “ভালো আছিস তো, মা?”

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ভালো আছি।

“কিন্তু...কিন্তু এরা তোকে, ভালো থাকতে যে দেবে না, মা...তিল তিল করে তোকে শেষ করে ফেলবে...”। আমি অবাক হয়ে তাঁর দুই চোখের দিকে তাকালাম। নিজের ছেলে আর স্ত্রী সম্পর্কে মনে কতখানি বিতৃষ্ণা থাকলে এমন কথা “পরের মেয়ে”-কে বলা যায়, তুমি বলো তো, সুনুদা? সিসটার-মহিলাও তাঁর দিকেই তাকিয়েছিলেন, তাঁর দু চোখেও এখন মমতা।

আমি কোন উত্তর দিলাম না, উত্তরে কীই বা বলতাম? একটু পরে আমার শ্বশুরমশাই আবার বললেন, “যা হবার তা হয়ে গেছে, সে শোধরানোর এখন আর অন্য উপায় নেই, মা। কিন্তু তুই আমার মেয়ে হলে, এই শেকল ভেঙে আমি তোকে মুক্ত করে নিয়ে আসতাম। আর একথা... আর একথা তোর বাবাকেও - তাঁর হাতদুটো ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই, আমি বলব। আমি এখন আসছি রে মা, মন শক্ত করে ভেবে দেখিস আমার কথাগুলো...”। এই কথা বলে তিনি দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিছানায় শুয়ে আমার মনের মধ্যে ঝড় বইতে লাগল। উনি যে মুক্তির কথা বললেন, সেটা নিশ্চয়ই ডিভোর্স!

কথাটা আমার মনে যে এর আগে আসেনি তা নয় – কিন্তু বাবা-মা কী ভাববেন, আমাদের আত্মীয়-পরিজনরা কী ভাববেন, এমনকি আমার শ্বশুরমশাইও কী মনে করবেন – এসব চিন্তা করেই কথাটা মন থেকে মুখে আনতে পারিনি। কিন্তু আজ তো তিনিই আমাকে মুক্ত করে দিয়ে গেলেন – আমার মনে সাহস সঞ্চারিত করলেন। আমাকে মুক্তি-পথের দিশা দেখিয়ে গেলেন।    

মিনিট দশেক পরে ডাক্তার-ম্যাডাম এলেন, মমতাময়ী মাতৃমূর্তি যেন।

“কিরে, কেমন আছিস? মিষ্টি খাওয়াবি না? এত বড়ো প্রমোশন হল তোর?”

“প্রমোশন”? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“সে কি রে? মা হয়ে গেলি যে। এতদিন তুই ছিলি বাবা-মায়ের মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির বৌমা, স্বামীর স্ত্রী। গতকাল থেকে হলি বেবির মা, এটা প্রমোশন নয়? ছেলের নাম-টাম কিছু ভাবলি?” কথা বলতে বলতেই তিনি আমার টেম্পারেচার চার্ট, কয়েকটা টেস্ট রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নিলেন, আমার পাল্‌স্‌, হার্টবিট চেক করলেন, বললেন, “বাঃ পারফেক্ট মাদার। সব চিন্তা ছেড়ে এখন ছেলের নামের কথা ভাব”। এরপর সিস্টারকে কিছু নির্দেশ দিয়ে বললেন, “চলি রে, তোর বাবা-মা বাইরে অপেক্ষা করছেন”।

উনি বেরিয়ে যেতেই বাবা-মা ঢুকলেন। দুজনেরই মুখ গম্ভীর থমথমে। পিন্টুর বাবা-মার সঙ্গে কি ওঁদের নীচেয় দেখা হয়েছিল? কোন বচসা হয়েছে? পিন্টুর বাবা কি আমার বাবাকে ডিভোর্সের পরামর্শ দিয়ে দিয়েছেন? আমি অজানা এক দুশ্চিন্তায় শঙ্কিত হলাম।

পরের পর্ব - " শুধু _তুই .কম - পর্ব ১৩ "


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...