রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

রতনে রতন চেনে

 





বেকার যুবকের কথা বা গল্প অনেক হয়ে গেছে এরপরেও আরো হয়তো হতে থাকবে। কিন্তু বেকার বালকের কথা আমি অন্ততঃ কোনদিন শুনিনি তবে প্রায় মাস তিনেক বেকার জীবনের আস্বাদ উপভোগ করেছিলাম আমার বালক বয়সেই।

আমাদের স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত মর্নিং সেসন ছিল - ক্লাস সিক্স থেকে ডে। কাজেই ক্লাস ফাইভের সিনিয়ার মোস্ট বাচ্চারা, ক্লাস সিক্সে উঠলেই হয়ে যেত জুনিয়ার-মোস্ট বড়। এই বড় হবার একটা আলাদা আমেজ সঞ্চারিত হচ্ছিল আমার মধ্যে। সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট সেরে স্কুল ড্রেস পরে বাচ্চাদের মত বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে সারাটা দিন বাচ্চাদের মত মায়ের সঙ্গে ঘুর ঘুর করা। আমার ঘুম না আসা দুপুরে মায়ের হাতের মিঠে চাপড়ি খেয়ে ঘুমের অভিনয় করা। মা ঘুমিয়ে পড়লেই সারাটা দুপুর চুপিচুপি বিস্তর উনখুটে কাজ সারা - হোমিওপ্যাথির মিষ্টি মিষ্টি গুলি, শুকনো হরলিকস, ডবল বিস্কুটের মাঝে মাখন চেপে বিস্কুটের ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসা মাখন লেহন... অর্থাৎ মকখন চোর, নন্দকিশোর হয়ে থাকাটা আর ভাল লাগছিল না।

ক্লাস সিক্সে উঠলে দাদার সঙ্গে একসঙ্গে বসে ভাত খেয়ে বড়দের মতো বেরিয়ে যাবো। যেমন বাবাও একটু আগে অফিস বেরোন। বিকেল বেলা বিদ্যের বোঝা নিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরব, যেমন বাবাও সারাদিনের কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে ফেরেন একটু সন্ধ্যের পর। মনে হত - বড় হতে এমন কি আর দেরি, কতটাই বা বাকি আর?

 সে স্বপ্নে বাদ সাধল, যেদিন আমরা ক্লাস ফাইভের অ্যানুয়াল পরীক্ষার রুটিন নিতে স্কুলে গেলাম। সেটা সত্তর সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তা হবে। রুটিন নিয়েই আমাদের ছুটি হয়ে যাবে সাতদিনের জন্যে - পড়ার ছুটি। তারপর পরীক্ষা, আবার ছুটি, পরের বছর জানুয়ারির দশ এগারো করে রেজাল্ট বেরিয়ে গেলেই নতুন ক্লাস, নতুন বই আর নতুন ধরনের এক বড়সড়ো জীবনের সূত্রপাত।

 অন্যদিন স্কুলের বেশ কিছুদূর থেকেই ছেলেদের চেঁচামেচি আর হৈচৈতে স্কুলকে স্কুল বলে মনে হত। সেদিন একদম চুপচাপ - থমথমে ভাব। শোলে রিলিজ হতে তখনো অনেক দেরি, নাহলে বলা যেত ইতনা সন্নাটা কিঁউ হ্যায়, ভাইইই?  স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকেই সিঁড়ির মুখে একটা ব্ল্যাকবোর্ড – চার ঠ্যাং সাপোর্টে দাঁড় করানো, তাতে লেখা

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি

এতদ্বারা সকল অভিভাবকবৃন্দ ও ছাত্রগণকে জানানো যাইতেছে যে অনিবার্য কারণবশতঃ এবং পঃ বঃ সরকারের মাননীয় শিক্ষা অধিকর্তার নির্দেশ অনুসারে বিদ্যালয়ের সকল শ্রেণীর পঠনপাঠন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকিবে। সকল শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষাও আপাততঃ স্থগিত থাকিবেবিদ্যালয়ের পঠনপাঠন শুরু হইবার তারিখ পঃ বঃ শিক্ষা দপ্তরকর্তৃক সংবাদপত্র ও বেতার মাধ্যমে পরিজ্ঞাত হইবে এবং তদনুসারে স্থগিত সকল বার্ষিক পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচী বিদ্যালয় হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

অনুমত্যনুসারে

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

 

আমরা মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি করে নোটিসটা বেশ বার কয়েক পড়ে ফেললাম। যেটুকু বোধগম্য হতে বাকি ছিল অভিভাবকদের আলাপ আলোচনা ও কথাবার্তা থেকে সেটাও বুঝে ফেলা গেল। কিন্তু আমাদের হতভম্ব ভাবটা কাটাতে ভাস্করদার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সদাহাস্যমুখ উৎকলবাসী ভাস্করদার আমাদের স্কুলের মেন গেট সামলানোর দায়িত্ব ছিল। বছরের পর বছর আমাদের মতো ছেলেপুলেদের বেয়ারা বায়নাই হোক অথবা বাইরের লোকের উটকো হম্বিতম্বিই হোক ভাস্করদা সবকিছুই সামলাত হাসিমুখে এবং স্কুল চলাকালীন ভাস্করদা ছিল নিশ্ছিদ্র প্রহরী - হেডস্যারের বিনা অনুমতিতে ভেতরের জিনিষ বাইরে অথবা বাইরের জিনিষ ভেতরে আসতে পারত না।

 কিছুটা বাংলা আর অনেকটা ওড়িয়া ভাষায় ভাস্করদা বলেছিল গতকাল স্কুল ছুটির পর - প্রায় সাড়ে পাঁচটা নাগাদ, কয়েকজন ছোকরা হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করতে চায়।  কি দরকার জিগ্যেস করাতে তারা কোন এক কলেজের নাম বলেছিল। এমন তো আসেই অনেকে - অন্য স্কুল থেকে, কলেজ থেকে ভাস্করদা গেট খুলে দিয়েছিল। ছেলেগুলো হেডস্যারের ঘরের দিকে না গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উঠেছিল সিঁড়িতে। হতচকিত ভাস্করদা তাদেরকে ডেকে কিছু বলার আগেই তারা উঠে গেছে ওপরে। ভাস্করদার সন্দেহ হতে অন্য সবাইকে নিয়ে যখন ওপরে খুঁজতে যায় তাদের সে সময়ে ভিতরের উঠোনের দিক থেকে পর পর দুটো বোমা ফাটার বীভৎস আওয়াজ শুনতে পায়। ওরা বুঝতে পারে আমাদের স্কুল সত্তরের ছাত্র আন্দোলনে আক্রান্ত।

এতদিন আমরা জানতাম না, কোন ঘরে আমাদের পরীক্ষার কোয়েশ্চেন ছাপা হয়ে সংরক্ষিত হতো। সেদিন জানলাম। কারণ সেই ঘরের দরজাটা ভাঙা এক কব্জায় ঝুলছে। ঘরের ভিতরে বাইরে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে পোড়া কাগজের ছাই, আধপোড়া প্রশ্নপত্রের প্যাকেট। ঘরের ভিতরের দেওয়ালে, সিলিংয়ে আগুনের আঁচে কালো কালো ঝলসানো দাগ। ওপরের বারান্দা থেকে ছোঁড়া বোমা ফেটে উঠোনের ঝলসে যাওয়া দাগ দুটোও দেখলাম।

 রোজ স্কুলে এসে বা টিফিনের সময় আমরা ওই উঠোনে লেম-ম্যান খেলতাম। লেম-ম্যান এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে আমাদেরকে ধরার চেষ্টা করবে। একটা গন্ডির মধ্যে সীমিত থাকত সেই খেলা। গন্ডির বাইরে চলে গেলে বা লেম-ম্যান ছুঁয়ে দিলে যে আউট  হতো সেই হতো পরবর্তী লেম-ম্যান। ছাত্র আন্দোলনের একটা বোমা ফেটেছে আমাদের সেই গন্ডির মাঝখানেই প্রায়।

বারান্দায় ঘরের বাইরের দেওয়ালে স্লোগান লিখে গিয়েছিল তারা। সেখানে বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। ছিল চীনের চেয়ারম্যানকে আপন করে নেবার দায়িত্বপূর্ণ আব্দার। বন্দুকের নলই যে শক্তির একমাত্র উৎস আমাদের সে তথ্য দিতেও তারা ভুল করেনি সেখানে। বিপ্লবের দীর্ঘজীবনের প্রতিও সংশয়ের অবকাশ রাখেনি তারা। সবশেষে তারা লিখে গিয়েছিল একটি ধাঁধা – ‘রতনে রতন চেনে / বিড়লা চেনে জ্যোতি

 কলকাতায় তখন দারুণ টালমাটাল পরিস্থিতি। রোজ শেষ রাত্রে পাড়ায় পুলিশ আসে। তাদের পায়ের ভারি বুটের শব্দে ঘুম ভাঙা চোখে আর ঘুম আসে না। সকালে দুঃসংবাদ কানে আসে। কোন কোন তরুণ কোন কোন যুবক আন্দোলনে যুক্ত সন্দেহে ধৃত। অনেক সময়েই তাদের কোনভাবেই আর হদিশ মেলে না। আমার বাবা আর মা পরামর্শ করে ঠিক করলেন আমাদের বর্ধমানের গ্রামে মামারবাড়িতে পাঠিয়ে দেবার। মাও থাকবেন আমাদের সঙ্গে। বাবা আমাদের পৌঁছে দিয়ে কলকাতায় ফিরবেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাবা খবর দেবেন এবং আমাদের আবার নিয়ে আসবেন কলকাতায়।

 প্রায় মাস তিনেক থাকতে হয়েছিল মামার বাড়িতেবইখাতার বোঝা নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে, কিন্তু সমস্ত রকমের লেখাপড়াহীন এক বেকার জীবন কাটিয়েছিলাম গ্রাম বাংলায়।    

 একদিন খুব ভোরে আমরা হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ধরে রওনা দিলাম বর্ধমান। পিছনে পড়ে রইল তপ্ত কলকাতা আর শান্ত শীতল আমার স্কুল। হিন্দু স্কুল। স্থগিত হয়ে গেল আমার চটজলদি বেড়ে ওঠার স্বপ্ন


তখন বুঝিনি আজ বুঝি - অনেক বড়ো হয়ে যাচ্ছিলাম প্রতিদিন, প্রতিটি ঘটনায় ঋদ্ধ হচ্ছিল অভিজ্ঞতা। যে পাঠ কোন স্কুলের সিলেবাসে নেই, সেই পাঠ যেন নিজে এসে মেলে ধরছিল তার রহস্য রূপ, শব্দ আর গন্ধ দিয়ে। যে রতন নেই কোনো জহুরির ঘরে, সেই রতন চিনে নেবার দায় এসে পড়ল আমার ছোট্ট দুই কাঁধে।

  -০০-

 

শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

সর্ষে ফুল

এর আগের বড়োদের গল্প - " অপেক্ষা





[গল্পটি সৃষ্টিসুখ প্রকাশনার উদ্যোগে – ৯২.৭ বিগ এফ এম–এর “শীতের মিষ্টি স্টোরিজ”- এ ৩১.০১.২০২২ তারিখে পড়া হয়েছিল। বিভিন্ন ভূমিকায় কণ্ঠ দিয়েছিলেনঃ শিউলি – রাই, কাশ – দেবাশীষ, সূত্রধার – রায়ান, আবহ সঙ্গীত – স্বাগত। সাবলীল পাঠে একটা গল্প কতটা শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে সে অভিজ্ঞতা পাবেন নীচের সূত্রে ঢুকে গল্পটি শুনতে শুনতে।] 

"সর্ষে ফুল


আমরা কোথায় যাচ্ছি বলতো?”

“যেদিকে দু-চোখ যায়”।

“কিন্তু দু-চোখেরও তো একটা লিমিট আছে – সেটা কোথায়? কদ্দূর”?

“তোকে তো বলেইছিলাম, এবারের পয়লা তারিখটা আলাদা রকম কাটাবো। টুনিবাল্ব-জ্বলা শিং নিয়ে পার্কস্ট্রিট নয়। কিংবা কোন মলও নয়, যেখানে ঢুকলেই কিছু-মিছু কিনতে তুই ছটফট করিস”।

“শহর ছেড়ে হাইওয়েতে গাঁগাঁ বাইক হাঁকিয়ে তুই যে আমাকে মলে তুলবি না, সে আমি বুঝেছি। কিন্তু যাচ্ছিটা কোথায়?”

“আমার সঙ্গে এভাবে এতদূরে যেতে... ভয় পাচ্ছিস, না?”

“এখানে ভয়? কেন? তোকে নিয়ে মলে ঢুকতেই বরং আমার ভয় লাগে। কিছু একটা জিনিষ আমার মনে ধরলেই, তুই এমন একখানা মুখ করিস না? যেন শীতের রাতে তোর কম্বলে আমি জল ঢেলে দিয়েছি”।

“হা-হা-হা, অতটা না হলেও কতকটা ঠিকই বলেছিস”।

“তুই এত্তো... এত্তো কিপটে, জানি না, তোকে নিয়ে আমি ঘর করবো কী করে?”

“তুলকালাম করবি রোজ। ছাদে যেন একটাও কাক-চিল বসতে না পারে। শুনেছি ঝগড়ুটি মেয়েদের হার্টের ব্যারাম হয় না”।

দুহাতে কাশের পেট জড়িয়ে ঘনিষ্ঠ বসেছিল শিউলি। কাশের পেটে একটা চিমটি কাটল, কিন্তু জ্যাকেট- জামার পরত পার হয়ে সেটা কাশের ত্বক পর্যন্ত পৌঁছোলো না। চিমটিটা ফল্‌স্‌ হয়ে যাওয়াতে শিউলি একটু রেগেই গেল, চেঁচিয়ে বলল, “মুখপোড়া, তুই আমাকে ঝগড়ুটি বললি, তোর এত্তবড়ো সাহস?”

কাশ বাইকের স্পিড কমিয়ে হাইওয়ের ধারে ঘেসোজমিতে দাঁড় করাল, চারদিক দেখে বলল, “মনে হচ্ছে, এসে গেছি, চল এবার নীচেয় নামব...”। শিউলি মাটিতে নেমে পড়েছিল, মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওয়াও, হলদে রঙের ওগুলো কী ফুল রে? গোটা মাঠ জুড়ে কী সুন্দর ফুটে রয়েছে? যেন হলুদ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে কেউ - দারুণ, না!”

“আহাঃ নেমে পড়লি কেন? বললাম না, নীচেয় নামব। ওগুলো কী ফুল তোর না জানলেও চলবে, বিয়ের পর তুই আমাদের ঘরে আমার চোখের সামনে ওই ফুলই তো অজস্র ফোটাবি.. সারা জীবন! ওঠ উঠে আয়, আলপথে যাবো, খুব ঝাঁকুনি হবে, ভালো করে চেপে ধরিস”। শিউলি বাইকে আবার উঠে বসতে বসতে বলল, “আজকাল তুই বড্ডো ট্যাঁকট্যাঁকে  কথা শিখেছিস, কী ফুল ওগুলো বললি না তো”?

শিউলি ঠিকঠাক বসার পর, কাশ খুব সাবধানে প্রথম গিয়ারে বাইক নামিয়ে দিল হাইওয়ে থেকে ক্ষেতের আলপথে। তারপর দ্বিতীয় গিয়ারে এবড়ো খেবড়ো আলপথ ধরে চলতে লাগল। দুপাশের হলুদ প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে, শিউলি কাশের কোমর ছেড়ে, পাখির ডানার মতো দু হাত ছড়িয়ে আনন্দে বলল, “ওয়াও, মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলেছি”।

কাশ মজা করে বলল, “বেশি স্বপ্ন দেখিস না, বাইক থেকে ধপাস হলে, কোমরে বড্ডো নাগবে যে গো, খুকুমণি”। শিউলি এবার চিমটি কাটল কাশের উরুতে, ট্রাউজারের দুর্বল প্রতিরোধ ভেদ করে এবার কাশের ব্যথা লাগল। একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আঃ কী হচ্ছে কি? বাইকে বসে এয়ারকি করবি না”।

“আর তুই যে সেই থেকে যা খুশি বলে যাচ্ছিস, তার বেলা?”

খেতের আলপথ শেষ হল, বাঁধের নীচে। সেখানেই বাইক স্ট্যাণ্ড করিয়ে কাশ বলল, “চলে এসেছি, এবার নেমে পড়”। হেলমেট দুটো ঝুলিয়ে দিল ক্লাচারে। তারপর শিউলির হাত ধরে উঠতে লাগল বাঁধের ওপর। শিউলি বলল, “তুই এখনও কিন্তু বললি না, অমন সুন্দর হলুদ ফুলগুলো কী ফুল?”

“ওগুলো সর্ষেফুল”।

অবাক হয়ে শিউলি বলল, “ওঃমা, তাই – সর্ষেফুলের কথা অনেক শুনেছি...আজ প্রথম দেখলাম...” তারপরেই বেশ গম্ভীর হয়ে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “আমি বিয়ের পর তোকে রোজ সর্ষেফুল দেখাবো, হতচ্ছাড়া? বেশ করবো। দেখাবোই তো!”

কাশ হাসতে হাসতে শিউলির হাতটা আবার নিজের হাতে নিয়ে বাঁধের ওপরে উঠে দু হাত ছড়িয়ে বলল, “এইবার চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখ, খেপি, কোন স্বপ্নরাজ্যে তোকে এনে ফেলেছি! শান্ত নিবিড় এই সমস্ত রঙ তোর দু চোখে বসত করুক আজীবন”।

শিউলি আশ্চর্য হয়ে দেখছিল – সোনালী রোদ্দুরে মাখা উজ্জ্বল নীল আকাশ, তুলির হালকা টানে বয়ে চলা সব্‌জে নদী, তার দুপাড়ের নিবিড় সবুজ গাছপালা আর পিছনে বিছানো পীত পুষ্পপ্রান্তর..। আনন্দে আবেগে শিউলি বলল, “কাশ, কাশ, কাশ...এমন একটা কিউট জায়গা আমাদের এত কাছেই রয়েছে, বিশ্বাসই হচ্ছে না! তুই আমাকে এমন করেই বারবার অবাক করে দিবি তো, কাশ, সারাটা জীবন?”

“দেব, তবে একটা শর্তে”।

“কী?” মুখ তুলে কাশের চোখের দিকে তাকাল শিউলি।

“আমাদের ঘরে আমার চোখের সামনে রোজ এমন অজস্র সর্ষেফুল যদি ফোটাতে পারিস, তবেই...”।

লাজুক হেসে শিউলি কাছে এসে কাশের বুকে কিল মারল আদরে, বলল, “অসভ্য”।

কাশ হাসতে হাসতে বুকে চেপে ধরল তার খেপিটাকে।  

...০০...

এর পরের বড়োদের গল্প - " অচিনপুরের বালাই "



শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫

কঠোপনিষদ - ২/৩ (শেষ পর্ব)

  



এই সূত্র পড়া যাবে - " ঈশোপনিষদ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



দ্বিতীয় অধ্যায়

তৃতীয় বল্লী

 

ঊর্ধ্বমূলোঽবাক্‌শাখ এষোঽশ্বত্থঃ সনাতনঃ।

তদেব শুক্রং তদ্‌ব্রহ্ম তদেবামৃতমুচ্যতে।

তস্মিঁল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন।

এতদ্বৈ তৎ।। ২/৩/১

ঊর্ধ্বমূলঃ অবাক্‌শাখ এষঃ অশ্বত্থঃ সনাতনঃ।

তৎ এব শুক্রম্‌ তৎ-ব্রহ্ম তৎ এব অমৃতম্‌ উচ্যতে।

তস্মিন্‌ লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্বে তৎ উ ন অত্যেতি কঃ চন। এতৎ বৈ তৎ।।

এই সংসার সনাতন এক অশ্বত্থ বৃক্ষের মতো, যার মূল ঊর্ধে (বিষ্ণুপদ) এবং শাখাসমূহ নিম্নমুখী। সেই মূলই শুদ্ধ, সেই মূলই ব্রহ্ম, সেই মূলকেই অমৃত বলা হয়। সর্বলোক তাঁর পদমূলেই আশ্রিত, তাঁকে কেউই অতিক্রম করতে পারে না। ইনিই সেই ব্রহ্ম।   

[গীতার পঞ্চদশ অধ্যায় – পুরুষোত্তমযোগের প্রথম চারটি শ্লোকে কঠোপনিষদের এই শ্লোকটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে - তাঁর সেই ব্যাখ্যার চারটি শ্লোকের সারাংশ এইরকমঃ-  

"শ্রীভগবান বললেন- জ্ঞানীজনেরা বলেন এই সংসার যেন একটি অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার ঊর্ধে শিকড় আর নিচেয় শাখা প্রশাখা, চারবেদ যেন এই বৃক্ষের পাতা। এই বৃক্ষটির স্বরূপ যিনি বোঝেন, তিনিই বেদজ্ঞ। এই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা ত্রিগুণের প্রভাবে বেড়ে উঠে বিষয়রূপ পল্লব হয়ে নীচের থেকে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আবার ঊর্ধের মূলসমূহ মানুষের সুকর্ম এবং কুকর্মের ফলস্বরূপ নীচের দিকেও প্রসারিত হয়ে থাকে। ইহলোকে সংসাররূপ এই অশ্বত্থের রূপ সঠিক উপলব্ধি করা যায় না, কারণ এই বৃক্ষের শেষ নেই, শুরু নেই, এমনকি মধ্যবর্তী স্থিতাবস্থাও নেই। এই বদ্ধমূল অশ্বত্থবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রে কেটে ফেলার পর, যে ব্রহ্মপদ লাভ করলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না, সেই পরম ব্রহ্মপদের অন্বেষণ করা উচিৎ। আমি সেই আদি পরমব্রহ্মপুরুষেরই শরণাপন্ন হই, যাঁর থেকে এই চিরন্তনী সংসার-প্রবৃত্তি প্রবাহিত হয়ে চলেছে।"]

 

যদিদং কিঞ্চ জগৎ সর্বং প্রাণ এজতি নিঃসৃতম্‌।

মহদ্ভয়ং বজ্রমুদ্যতং য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।। ২/৩/২

যৎ ইদম্‌ কিম্‌ চ জগৎ সর্বম্‌ প্রাণঃ এজতি নিঃসৃতম্‌।

মহৎ ভয়ম্‌ বজ্রম্‌ উদ্যতং যঃ এতৎ বিদুঃ অমৃতাঃ তে ভবন্তি।

এই যা কিছু চরাচর জগৎসকল, তাঁর প্রাণরূপ থেকেই নিঃসৃত হয়ে স্পন্দিত হচ্ছে। তিনি উদ্যতবজ্র পুরুষের মতো মহা ভয়ংকর, এই ব্রহ্মকে যিনি জানতে পারেন, তিনিই অমৃতত্ব লাভ করেন।    

 

ভয়াদস্যাগ্নিস্তপতি ভয়াত্তপতি সূর্যঃ।

ভয়াদিন্দ্রশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ।। ২/৩/৩

ভয়াৎ অস্য অগ্নিঃ তপতি ভয়াৎ তপতি সূর্যঃ।

ভয়াৎ ইন্দ্রঃ চ বায়ুঃ চ মৃত্যুঃ ধাবতি পঞ্চমঃ।।

তাঁর ভয়েই অগ্নি তাপ দেয়, তাঁর ভয়েই সূর্য কিরণ দেয়, তাঁর ভয়েই ইন্দ্র, বায়ু এবং পঞ্চমস্থানীয় মৃত্যু নিজ নিজ কাজে ব্যাপৃত থাকেন। 

 

ইহ চেদশকদ্‌ বোদ্ধুং প্রাক্‌ শরীরস্য বিস্রসঃ।

ততঃ সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে।। ২/৩/৪

ইহ চেৎ শকৎ বোদ্ধুং প্রাক্‌ শরীরস্য বিস্রসঃ।

ততঃ সর্গেষু লোকেষু শরীরত্বায় কল্পতে।।

এই দেহ বিনাশের আগেই যদি কেউ তাঁকে জানতে সক্ষম হন (তিনি বিমুক্ত হন), তা না হলে সেই অজ্ঞানতার কারণে এই পৃথিবীতে অথবা অন্যান্য লোকে বার বার জন্মাতে হয়।  

 

যথাদর্শে তথাত্মনি যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে।

যথাপ্সু পরীব দদৃশে তথা গন্ধর্বলোকে

ছায়া তপয়োরিব ব্রহ্মলোকে।। ২/৩/৫

যথা আদর্শে তথা আত্মনি যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে।

যথা অপ্সু পরি ইব দদৃশে তথা গন্ধর্বলোকে

ছায়া আতপয়ঃ ইব ব্রহ্মলোকে।।

আত্মা জীবের নির্মল চিত্তে, আয়নায় দেখা মুখের মতো প্রতিবিম্বিত হয়, পিতৃলোকে স্বপ্নে দেখার মতো অস্পষ্ট, গন্ধর্বলোকেও জলে দেখা ছায়ার মতো। শুধু ব্রহ্মলোকেই আত্মা ছায়া ও রৌদ্রের মতো সুস্পষ্ট।    

 

ইন্দ্রিয়াণাং পৃথগ্‌ভাবমুদয়াস্তময়ৌ চ যৎ।

পৃথগুৎপদ্যমানানাং মত্বা ধীরো ন শোচতি।। ২/৩/৬

ইন্দ্রিয়াণাম্‌ পৃথক্‌ ভাবম্‌ উদয়-অস্তময়ৌ চ যৎ।

পৃথক্‌ উৎপদ্যমানানাং মত্বা ধীরঃ ন শোচতি।।

জীবের ইন্দ্রিয়সমূহ পঞ্চভূত থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তাদের ভাব আত্মার থেকে পৃথক, এই তত্ত্ব জেনে ব্রহ্মনিষ্ঠ জ্ঞানীরা তাদের সৃষ্টি অথবা লয় নিয়ে শোক করেন না।

[পঞ্চইন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ণ, ত্বক, চক্ষু, জিহ্বা ও নাক, পঞ্চভূত অর্থাৎ আকাশ, বায়ু, তেজ, জল ও ক্ষিতি থেকে যথাক্রমে সৃষ্টি হয়। অতএব পঞ্চভূতের সঙ্গে পঞ্চইন্দ্রিয়েরও সৃষ্টি ও বিনাশ আছে।]

 

ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ মনসঃ সত্ত্বমুত্তমম্‌।

সত্ত্বাদধি মহানাত্মা মহতোঽব্যক্তমুত্তমম্‌।। ২/৩/৭

ইন্দ্রিয়েভ্যঃ পরম্‌ মনঃ মনসঃ সত্ত্ব্ম্‌ উত্তমম্‌।

সত্ত্বাৎ অধি মহান্‌-আত্মা মহতঃ অব্যক্তম্‌ উত্তমম্‌।।

ইন্দ্রিয়সমূহের থেকে মন শ্রেষ্ঠ, মনের থেকে সত্ত্বা অর্থাৎ বুদ্ধি উত্তম, সত্ত্বার থেকে আত্মা মহান, কিন্তু আত্মার থেকেও অব্যক্ত অর্থাৎ মায়া উত্তম।

 

অব্যক্তাত্তু পরঃ পুরুষো ব্যাপকোঽলিঙ্গ এব চ।

যং জ্ঞাত্বা মুচ্যতে জন্তুরমৃতত্বং চ গচ্ছতি।। ২/৩/৮

অব্যক্তাৎ তু পরঃ পুরুষঃ ব্যাপকঃ অলিঙ্গঃ এব চ।

যম্‌ জ্ঞাত্বা মুচ্যতে জন্তুঃ অমৃতত্বম্‌ চ গচ্ছতি।।

সর্বব্যাপ্ত অথচ নির্গুণ যে পরমাত্মাকে জানলে জীব সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত হয় ও অমৃতত্ব লাভ করে, সেই পরমপুরুষ অব্যক্তের থেকেও উত্তম।

[আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে নানান লক্ষণ বিচার করে, সকল বিষয়কে চিহ্নিত করতে পারি, আত্মার কোন লক্ষণ নেই, তাঁর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোন গুণ নেই, তিনি নির্গুণ, তিনি অলিঙ্গঃ।]

 

 

ন সন্দৃশে তিষ্ঠতি রূপমস্য, ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চনৈনম্‌।

হৃদা মনীষা মনসাভিক্লৃপ্তো য এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি।। ২/৩/৯

ন সন্দৃশে তিষ্ঠতি রূপম্‌ অস্য, ন চক্ষুষা পশ্যতি কঃ চন এনম্‌।

হৃদা মনীষা মনসা অভিক্লৃপ্তো য এতৎ বিদুঃ অমৃতাঃ তে ভবন্তি।।

তাঁর প্রকৃত স্বরূপ আমাদের প্রত্যক্ষ দৃষ্টির বিষয় নয়, চোখ দিয়ে আমরা তাঁকে দেখতে পাই না। আমাদের নির্মল হৃদয়ের অনুভূতিতে, নিঃসন্দিগ্ধ জ্ঞানে, শুদ্ধ মনে তিনি প্রকাশিত হন। তাঁকে যিনি জানতে পারেন, তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন।     

 

যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ।

বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতি তামাহুঃ পরমাং গতিম্‌।। ২/৩/১০

যদা পঞ্চ অবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ।

বুদ্ধিঃ চ ন বিচেষ্টতি তাম্‌ আহুঃ পরমাম্‌ গতিম্‌।। ২/৩/১০

যে অবস্থায় মনের সঙ্গে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় নিশ্চল অবস্থান করে, বুদ্ধিও স্বতন্ত্র বিষয়ে প্রবৃত্ত হয় না, সেই অবস্থাকে পণ্ডিতগণ পরমাগতি বলেন। 

 

তাং যোগমিতি মন্যন্তে স্থিরামিন্দ্রিয়ধারণাম্‌।

অপ্রমত্তস্তদা ভবতি যোগো হি প্রভবাপ্যয়ৌ।। ২/৩/১১

তাম্‌ যোগম্‌ ইতি মন্যন্তে স্থিরাম্‌ ইন্দ্রিয়ধারণাম্‌।

অপ্রমত্তঃ তদা ভবতি যোগঃ হি প্রভবাপ্যয়ৌ।।

এই অচঞ্চল ইন্দ্রিয়ধারণাকে যোগীগণ যোগ মনে করেন, সেই সময় সমাহিত ভাব উপস্থিত হয়। (কিন্তু সর্বদা নয়, কারণ) যোগভাবেরও বিকাশ ও বিনাশ আছে।  

 

নৈব বাচা ন মনসা প্রাপ্তুং শক্যো ন চক্ষুষা।

অস্তীতি ব্রুবতোঽন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে।। ২/৩/১২

ন এব বাচা ন মনসা প্রাপ্তুং শক্যো ন চক্ষুষা।

অস্তি ইতি ব্রুবতঃ অন্যত্র কথম্‌ তৎ উপলভ্যতে।।

পরমাত্মাকে কথায় জানা যায় না, মন দিয়ে কিংবা চোখ দিয়েও জানতে পারা যায় না। “তিনি আছেন” এই কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা ছাড়া অন্য লোক তাঁকে কী ভাবে উপলব্ধি করবে?

 

অস্তীত্যেবোপলব্‌ধব্যস্তত্ত্বভাবেন চোভয়োঃ ।

অস্তীত্যেবোপলব্‌ধস্য তত্ত্বভাবঃ প্রসীদতি।। ২/৩/১৩

অস্তি ইতি এব উপলব্ধব্যঃ তত্ত্বভাবেন চ উভয়োঃ ।

অস্তি ইতি এব উপলব্ধস্য তত্ত্বভাবঃ প্রসীদতি।।

তিনি আছেন” এই ভাবে তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে, তত্ত্বভাবেও তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে। এই উভয় ভাবেই “তিনি আছেন” এই তত্ত্বটি যিনি উপলব্ধি করেছেন, তাঁর কাছে ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশিত হয়।

[আত্মাকে প্রথমে “সৎ” অর্থাৎ বুদ্ধি ও মনের উপাধিযুক্ত ভাবেই উপলব্ধি করতে হবে, এই ভাবকে আত্মার সোপাধিক ভাব বলা হয়। আত্মার উপাধিহীন বিকারহীন যে ভাব, তাকেই তত্ত্বভাব অথবা নিরুপাধিক ভাব বলা হয়। এই উভয় ভাবের মধ্যে প্রথমতঃ সোপাধিক ভাবে আত্মার অস্তিত্ব উপলব্ধি করার পর, তাঁর নিরুপাধিক তত্ত্বভাবের উপলব্ধি আসে। (শংকরভাষ্য)]      

 

 

যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেঽস্য হৃদি শ্রিতাঃ।

অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে।। ২/৩/১৪

যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যে অস্য হৃদি শ্রিতাঃ।

অথ মর্ত্যঃ অমৃতঃ ভবতি অত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে।।

মানুষের মনে আশ্রিত যত কামনা যখন মন থেকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়, তখনই মরণশীল মানুষের অমৃতলাভ হয়, তখন এই দেহেই ব্রহ্মের উপলব্ধি আসে। 

 

যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়েস্যেহ গ্রন্থয়ঃ।

অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যেতাবদ্ধ্যনুশাসনম্‌।। ২/৩/১৫

যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়েস্য ইহ গ্রন্থয়ঃ।

অথ মর্ত্যঃ অমৃতঃ ভবতি এতাবৎ হি অনুশাসনম্‌।।

এই জীবনেই মনের সকল বন্ধন যখন নিঃশেষে ছিন্ন হয়, তখন মরণশীল মানুষ অমৃতলাভ করে, সকল বেদান্তের এই উপদেশ।

 

শতঞ্চৈকা চ হৃদয়স্য নাড্যস্তাসাং মূর্ধানমভিনিঃসৃতৈকা

তয়োর্ধ্বমায়ন্নমৃতত্বমেতি বিষ্বঙ্‌ঙন্যা উৎক্রমণে ভবন্তি।।

২/৩/১৬

শতম্‌ চ একা চ হৃদয়স্য নাড্যঃ তাসান্‌  মূর্ধানম্‌ অভিনিঃসৃতা একা।

তয়া ঊর্ধ্বম্‌ আয়ন্‌ অমৃ্তত্বম্‌ এতি বিষ্বক্‌ অন্যাঃ উৎক্রমণে ভবন্তি।।

মানুষের হৃদয় থেকে নিঃসৃত একশত এক নাড়ি আছে। তার মধ্যে একটি নাড়ি (সুষুম্না) মূর্ধা (ব্রহ্মরন্ধ্র) ভেদ করে বের হয়েছে। মৃত্যুকালে সাধক এই নাড়িপথে ঊর্ধে উঠে অমৃতত্ত্ব লাভ করে, কিন্তু অন্যান্য নাড়ি পথে সংসার-গতি পায়।    

 

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ  পুরুষোঽন্তরাত্মা সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।

তং স্বাচ্ছরীরাৎ প্রবৃহেন্মুঞ্জাদিবেষীকাং ধৈর্যেণ।

তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতং তং বিদ্যাচ্ছুক্রমমৃতমিতি।। ২/৩/১৭

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ  পুরুষঃ অন্তরাত্মা সদা জনানাম্‌ হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ।

তম্‌  স্বাৎ শরীরাৎ প্রবৃহেৎ মুঞ্জাৎ ইব ইষীকাং ধৈর্যেণ।

তম্‌ বিদ্যাৎ শুক্রম্‌ অমৃতম্‌ তম্‌ বিদ্যাৎ শুক্রম্‌ অমৃতম্‌ ইতি।।

অঙ্গুষ্ঠপরিমাণ অন্তরাত্মা পুরুষ সকলের হৃদয়ে সর্বদা অবস্থান করছেন। মুঞ্জ ঘাসের মধ্যে একটি শীষের মতো তাঁকে নিজের শরীর থেকে সংযত হয়ে পৃথক করবে। এইভাবেই তাঁকে শুদ্ধ অমৃতব্রহ্ম  জানবে, ইনিই সেই শুদ্ধ অমৃত ব্রহ্ম।

 

মৃত্যুপ্রোক্তাং নচিকেতোঽথ লব্‌ধ্বা

বিদ্যামেতাং যোগবিধিং চ কৃৎস্নম্‌।

ব্রহ্মপ্রাপ্তো বিরজোঽভূদ্বিমৃত্যুরন্যোঽপ্যেবং

যো বিদধ্যাত্মমেব।। ২/৩/১৮

মৃত্যুপ্রোক্তাং নচিকেতঃ অথ লব্‌ধ্বা

বিদ্যাম্‌ এতাম্‌ যোগবিধিম্‌ চ কৃৎস্নম্‌।

ব্রহ্মপ্রাপ্তঃ বিরজঃ অভূৎ বিমৃত্যুঃ অন্যঃ অপি এবং

যঃ বিৎ অধ্যাত্মম্‌ এব।।

এরপর যমরাজের বলা এই ব্রহ্মবিদ্যা এবং সম্পূর্ণ যোগবিধি জেনে, নচিকেতা ব্রহ্মকে লাভ করলেন এবং নির্মল চিত্ত হয়ে অমৃতত্ব লাভ করলেন। অন্য যে কেউ যদি এইভাবে আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করেন, তিনিও একই ফল লাভ করেন। 

 

সমাপ্ত দ্বিতীয় অধ্যায় – তৃতীয় বল্লী

 

ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নাবধীতমস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

ওঁ সহ নৌ অবতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ তেজস্বি নৌ অধীতম্‌ অস্তু,

মা বিদ্বিষাবহৈ।।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

আমাদের দুজনকে তিনি সমভাবে রক্ষা করুন, দুজনকেই সমভাবে (জ্ঞান) লাভ করান, আমাদের উভয়কেই (জ্ঞানলাভের) উপযুক্ত করে তুলুন। আমাদের উভয়ের কাছেই লব্ধজ্ঞান যেন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। (আমরা যেন পরষ্পরের প্রতি) বিদ্বেষ না করি।  ওঁ শান্তি, সকল বিঘ্নের শান্তি হোক।


  সমাপ্ত কঠোপনিষদ 

..০০..

কৃতজ্ঞতাঃ 

উপনিষদঃ শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র সেন 

উপনিষদ গ্রন্থাবলীঃ স্বামী গম্ভীরানন্দ সম্পাদিত  


মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৫

বিদায়বেলার মালাখানি

 


এর আগের পর্ব - " অভাব জয়ের স্বভাব "

 

সামান্য দিবানিদ্রা ও বিশ্রামের পর অনাদি এখন কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। বুকের ভেতর সেই চাপ ভাবটা রয়েছে, তবে অনেকটাই কম। করুণাডাক্তার ঠিকই বলেছিলেন, সাধারণ গ্যাস আর অম্বল, চিন্তার কারণ নেই। বিকেলে পাড়ায় বেরিয়েছিলেন। পোড়ো-মন্দিরতলায় তাঁদের বয়স্ক মানুষদের একটা জমায়েত হয়, সেখানে নানান কথাবার্তায় সময়টা কাটে। খুব যে আনন্দ পান সেই আড্ডায়, তা হয়তো নয়, কিন্তু কীই বা করার আছে এই গাঁয়েঘরে। সে আড্ডায় গ্রামের কথাবার্তা, এই দিগড়ের কথাবার্তা হয়, কলকাতার কংগ্রেস রাজনীতির কথাও ওঠে। আজকাল আর একটা বিষয় নিয়েও খুব চর্চা হচ্ছে, বিশেষ করে ছেলে ছোকরাদের মধ্যে। সেটা হল কমিউনিস্ট রাজনীতি। জার্মানীর এক সায়েবের তত্ত্ব বুঝে, রাশিয়ার দুই সায়েব খুব নাকি সাড়া ফেলে দিয়েছেন সারা বিশ্বে। ভারতের স্বাধীনতা সবে বারো বছরের বালক। স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা কংগ্রেস দলের প্রতি বয়স্কদের এখনও অবিমিশ্র বিশ্বাস আর ভরসা। নেহরুর এখনও অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তা। তিনি আবার রাশিয়া পন্থী। কিন্তু আজকের যুবসমাজ বয়স্কদের এই ভরসায় আর আস্থা রাখতে পারছে না। তারা চাইছে নতুন কিছু, তারা চাইছে আমূল সামাজিক পরিবর্তন। 

আগে তেমন শোনা যেত না, আজকাল কয়েকটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, বুর্জোয়া, শ্রেণীশত্রু। অনাদি শুনেছেন, তাঁরাই আজকাল এই সমস্ত বিশেষণের অধিকারী। উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁদের বেশ কিছুটা জমি জায়গা আছে। তাঁরা নিজে হাতে চাষ করেন না, চাষ করান ভাগচাষী বা চাষ-মজুরদের দিয়ে। ভাগচাষীরা গ্রামেরই বাসিন্দা, তাদের নিজস্ব জমি নেই, অথবা থাকলেও সে সামান্য। অনাদির মতো জমির মালিকরা চাষের জমি দেয়, বীজ দেয়, চাষের বলদ দেয়, দেয় লাঙল। ভাগচাষীরা চাষ করে, ফসল ফলায়, ফসল তোলে। বদলে তারা পায়, উৎপন্ন শস্যের একটা অংশ। এর মধ্যে শঠতা আছে, তঞ্চকতা আছে, ভুল আছে, ভ্রান্তি আছে, অহংকার আছে, জেদ আছে, আছে বঞ্চনা। কিছু কিছু অপ্রিয় ঘটনার অভাব নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে এমনই চলে আসছে। দুঃখে-সুখে, দায়-দৈবে, শান্তি-অশান্তিতে পরষ্পরের নির্ভরতায় কেটে গেছে কত শত বছর।

ঠিক যেমন বহু বহু ঝড়-ঝাপটা সয়ে - দাঁড়িয়ে আছে এই পোড়ো মন্দির। সারা গায়ে পোড়ামাটির কাজ করা – দেওয়ালে ফাটল ধরা এই মন্দির – যার ভিতের অনেকটাই চলে গেছে কালের করাল গ্রাসে। কেউ বলে তিনশ, কেউ বলে চারশ বছরের পুরোনো এই মন্দির…। অনাদি পড়ন্ত বিকেলের আবছা আলোয় কিছুক্ষণ মুখ তুলে তাকিয়ে রইলেন মন্দিরের দিকে।    

ভাগচাষ ছাড়া চাষ-মজুর বা মুনিষ খাটিয়েও জমির মালিকরা চাষ আবাদ করেন। তাঁরা ছেলে-মজুরদের বলেন মুনিষ, আর মেয়ে-মজুরদের কামিন। মানুষ আর কামিনী থেকেই ওই দুই শব্দের উৎপত্তি কবে হয়েছিল কে জানে! বর্ষার আগে সাঁওতাল পরগণা, দুমকা থেকে মুনিষ আর কামিনরা গ্রামে গ্রামে চলে আসে। জমির মালিকদের খামারে তারা অস্থায়ি বাসা নেয়। প্রত্যেক বছর চাষের জমি তৈরি থেকে শুরু করে, ফসল তুলে মালিকের গোলায় শস্য ভরা পর্যন্ত সমস্ত কাজ তারাই করে। বন্যা কিংবা খরায় ফসলের ক্ষতি হলে তাদের কোন দায় থাকে না। থাকা খাওয়া ছাড়া, চুক্তি অনুযায়ি তাদের মজুরি মিটিয়ে দিতে হয়। মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবে এক্ষেত্রেও বঞ্চনা আর তঞ্চকতার অভাব নেই। জমি মালিকদের অন্ধ স্বার্থ আর অহংকারের জন্যে খেটে খাওয়া এই অকিঞ্চন মানুষগুলোর মনেও তাই ক্ষোভ আর ক্রোধ জন্ম নিচ্ছে। দিনকাল আর আগের মত থাকছে না।

গ্রামে গ্রামে এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোর ক্ষোভ আর ক্রোধকে কাজে লাগিয়ে, কলকাতার শিক্ষিত অল্পবয়সি যুবকরা সংগঠিত করছে অদ্ভূত এক বিপ্লব। তারা কমিউনিজমে দীক্ষিত, তারা বিশ্বাস করে সাম্যবাদে। ধনী আর দরিদ্র, এই দুই শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা সমাজকে ভেঙে চুরে, তারা গড়ে তুলতে চায় শ্রেণীহীন সমাজ। দুনিয়ার সমস্ত শ্রমজীবী মানুষদের তারাই একমাত্র মুখপাত্র। অত্যাচারিত ও বঞ্চিত সর্বহারাদের তারাই একমাত্র সহায়। কমিউনিজম ছড়িয়ে পড়ছে সারা ভারতে, তবে তাদের বেশি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ আর কেরালায়। বছর তিনেক আগে কেরালার জনগণ তাদের রাজ্যে নির্বাচিত করেছে, কমিউনিস্ট সরকার। তারা চলে এসেছে সংসদীয় ক্ষমতার অলিন্দে। পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা এখন দ্রুত নিম্নগামীবিপ্লবের নামে প্রতিরোধ, প্রতিঘাত বেড়ে উঠছে প্রতিদিন, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামেও তার প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে প্রত্যহ।

নির্বিবাদী, সজ্জন এই মানুষটি বিশ্বাস করেন মানুষের নিজস্ব মূল্যবোধে। যে মূল্যবোধ তিনি অর্জন করেছেন, সুপ্রাচীন এক ঐতিহ্যের পরম্পরা থেকে। এক শ্রেণীর মানুষ তাঁকে শ্রেণীশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলছে, এই ভাবনা তাঁকে পীড়া দেয়। অথচ এই বিশাল সমাজের মধ্যে তিনি কতটুকু? কীই বা তাঁর কর্তব্য, কতোটুকুই বা তাঁর ক্ষমতা? বিপুল ভারতবর্ষের সাধারণ জনগণের মধ্যে তিনি অতি সাধারণ একজন ক্রীড়নক। তাঁর হাতে কিছুই নেই। অমোঘ ভবিতব্যের মতো তাঁকেও মেনে নিতেই হবে, সামাজিক পরিবর্তন, পরিবর্তিত পর্যবেক্ষণ এবং তার ফলাফল। তিনি নিজে ভালো কী মন্দ এ প্রশ্ন সেখানে অবান্তর।

অনাদি সন্ধের একটু পরে বাড়ি ফিরলেন। কলতলায় হাত পা ধুয়ে উঠে এলেন ঠাকুরঘরের বারান্দায়। তাঁর হাতে গামছা এগিয়ে দিল কন্যা সুভা। তার অন্য হাতে পট্টবস্ত্র। তিনি এখন সন্ধ্যা আহ্নিকে বসবেন। ঠাকুরঘরের ছোট্ট পরিসরে পেতলের ছোট্ট সিংহাসনে শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠিত। টাটকা ফুল আর তুলসি পাতায় ঢাকা। ছোট্ট একটি প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো। ধুপদানিতে জ্বলতে থাকা ধুপের সুগন্ধে ঘরটি পবিত্র। পাটের কাপড় পরে তিনি কম্বলের আসনে বসলেন, কোষা থেকে কুষিতে কফোঁটা গঙ্গাজল নিয়ে, বাঁহাতে ঢাললেন। তিনবার ওঁ বিষ্ণু মন্ত্রে তিনি আচমন করে শুদ্ধ হয়ে উঠলেন। তারপর হাতের মূলচক্র মুদ্রায়, সমগ্রীবকায় হয়ে কতক্ষণ বসে রইলেন আসনে, তাঁর চোখ বন্ধ, শ্বাস অত্যন্ত ধীর, অধরে জপমন্ত্র।

 

সন্ধ্যাহ্নিকের পর ঠাকুরঘরের বাইরে এসে, পট্টবস্ত্র বদলে, অনাদি কাচা ধুতি পরলেন। আহ্নিকের পর তিনি অনেকটাই স্বস্তি অনুভব করছিলেন। সকালে শারীরিক অস্বস্তিতে যে উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন, এখন তিনি অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন। যদিও বুকে একটা যেন চাপ অনুভব হচ্ছে।

বৌমা এসে জিগ্যেস করলেন, “বাবা, জলখাবার কিছু দি? দুপুরে তো প্রায় কিছুই খেলেন না”

অনাদি হাসলেন, বললেন, “দুপুরে কিছুই খাইনি বলতে চাও, মা? কদিন গুরুভোজনের পর, আজ একটু লঘুপাক হয়েছে, ঠিকই। এখন একটু খিদে খিদেও পাচ্ছে। তুমি বরং চারটি মুড়ি দাও, সঙ্গে শসা আর নারকেল কুচি। বাস, আর কিছু না”

বৌমা বঁটি পেতে শসার খোসা ছাড়াতে বসলেন। সুভা দাওয়ায় আসন পেতে রেখেছিল, অনাদি সেই আসনে গিয়ে বসলেন। একলা বসে থাকতে দেখে ষোড়শীবালা হাতে হ্যারিকেন নিয়ে সামনে এলেন। একধারে হ্যারিকেনটা রেখে দাওয়াতেই বসে বললেন, “অন্ধকারে বসে, একা একা কী ভাবছো?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনাদি বললেন, “হাআঃ, ভাবনার শেষও নেই, শুরুও নেই। বিষ্ণু ফিরেছে”?

“ফিরেছে। হাত মুখ ধুয়ে ওপরের ঘরে গেছে, কলের গান বাজাবে বোধ হয়”

“বাঃ, ওকে বলো তো, রবিবাবুর সেই গানটা বাজাতে”

ষোড়শীবালা মেয়ে সুভাকে ডাকলেন, “অ্যাই সুভা, একবার ওপরে যা তো, মা। তোর বাবা কী গান শুনতে চাইছে, দাদাকে গিয়ে বল।”

সুভা ও বাড়ি থেকে দৌড়ে এল, “কী হয়েছে, মা?

অনাদি বললেন, “তোর বড়দা কলের গান চালাতে গেল মনে হয়। ওকে গিয়ে বল, রবিবাবুর একটা গান বাজাতে”

সুভা আবার দৌড়ে ওপরের সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল, অনাদি বললেন, “কোন গান বলবি?

সুভা থমকে দাঁড়িয়ে বলল, “কোন গান?

“কোন গান? পুরোটা না শুনেই ছুটতে লাগলি, খেপি! বলবি তার বিদায় বেলার মালাখানি’, মনে থাকবে”? সুভা আর দাঁড়াল না, দৌড়ে উঠে গেল দোতলায়।

অনেকদিন চালানো হয়নি বলে বিষ্ণু গ্রামোফোনের বাক্স খুলে একটু ঝাড়পোঁছ করছিলেন। এখন সুভার মুখে বাবার গান শোনার ইচ্ছে হয়েছে শুনে, একটু হাসলেন, বললেন, “আচ্ছা, যা আমি বসাচ্ছি”রেকর্ডের বাক্স থেকে কাননদেবীর রেকর্ডটা খুঁজতে খুঁজতে তাঁর মনে পড়ল, বর্ধমানের কলেজে পড়ার সময় তাঁর বায়োস্কোপ আর গানের ঝোঁক হয়েছিল খুব। পয়সা জমিয়ে তখনই কিনেছিলেন এই গ্রামোফোনটা। বাড়িতে যখন নিয়ে এসেছিলেন, বাবা খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, “এসব বিলাসিতা আমাদের জন্যে নয়”মাকে বলেছিলেন, “তোমার বড়ো ছেলে একেবারেই বখে গেছে, আজকাল সে উড়তে শিখেছে! পানের দোকানের মতো, তোমার ঘরেও এখন লারেলাপ্পা গান বাজবে! ছি ছি ছি”

কিছুদিন পরে অবিশ্যি গানটান শুনতে শুনতে, বাবাও এখন অনেক গানের ভক্ত হয়ে উঠেছেন। মাঝে মাঝেই আদেশ করেন, বিষ্ণু তোর ওই কলে, সেই গানটা একবার বাজা তো। কাননদেবীর এই গানটা ১৯৩৭ সালে বেরিয়েছিল, আজ এত বছর পরেও গানটা শুনলে, কেমন যেন গায়ে কাঁটা দেয়। যেমন গানের কথা, তেমনি গায়কী। খুঁজে পেয়ে, প্যাকেট থেকে বের করে, রেকর্ডটা নরম কাপড়ে মুছলেন। গ্রামোফোনের ডিস্কে রেকর্ডটা চাপিয়ে দিলেন সন্তর্পণে। তারপর দয়ের মতো হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে গ্রামোফোনে দম দিলেন বেশ খানিকক্ষণ। এবার গ্রামোফোনের ওপরে একটা নব ঘোরাতেই ঘুরতে শুরু করল রেকর্ড, ঘুরতে শুরু করল রেকর্ড কোম্পানির গান শোনা কুকুরের ছবি। এবার ক্রেডলের স্ট্যাণ্ড থেকে, স্টাইলাস হেড তুলে, নতুন পিন লাগালেন, তারপর হেডটা নামিয়ে দিলেন চলন্ত রেকর্ডের শেষ প্রান্তে। প্রথমে কিছুক্ষণ খড়খড় আওয়াজের পর, অর্গ্যানের আওয়াজ আর কাননদেবীর কণ্ঠ শোনা গেল। গ্রামের নির্জন শান্ত সন্ধ্যায়, সেই অদ্ভূত কণ্ঠস্বরের আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। সেই গানের বাণী, কী যে বার্তা পৌঁছে দিল শ্রোতার মনে।

গান শুরু হতেই অনাদি নিশ্চল বসে রইলেন আসনে। ষোড়শীবালা, চুপ করে তাকিয়ে রইলেন স্বামীর দিকে। একটি বাটিতে আমতেলমাখা অল্প মুড়ি, আর অন্য প্লেটে কুচোনো শসা আর নারকেল নিয়ে চিত্রার্পিতের মতো অপেক্ষা করতে লাগলেন বৌমা। শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও গানের রেশ যেন চারপাশে রয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ।

অনাদি একটু পরে চোখ মেলে তাকালেন, বললেন, “বাঃ। কী গানই বেঁধে গেছেন, রবিবাবু। আর তেমনি গলা মেয়েটির, কী যেন নাম? আহা, মনটা ভরিয়ে দিয়ে গেল”গুনগুন করে, আবৃত্তির সুরে বললেন,    

দিনের শেষে যেতে যেতে পথের পরে

ছায়াখানি মিলিয়ে দিল বনান্তরে।

সেই ছায়া এই আমার মনে, সেই ছায়া ওই কাঁপে বনে,

কাঁপে সুনীল দিগঞ্চলে রে।

তার বিদায়বেলার মালাখানি আমার গলে রে

বৌমা মুড়ির বাটি আর শসার প্লেট নামিয়ে রাখলেন অনাদির সামনে। অনাদি যেন আবার বাস্তবে ফিরলেন, স্ত্রীকে বললেন, “তোমার বড়পুত্র, বর্ধমান থেকে বিএ ডিগ্রিখানা যেমন এনেছে তার সঙ্গে এই কলের গান এনে একটা মস্তো কাজের কাজ করেছে”

 

বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত শরীরে যে একটা হাল্কা, ঝরঝরে অনুভূতি হচ্ছিল, এখন সেটা আর নেই। বুকের চাপটা বাড়ছে, জাঁকিয়ে বসেছে। শ্বাস নিতে অস্বস্তি হচ্ছে কিছুটা। ষোড়শীবালা রাত্রের খাবারের জন্যে যখন ডাকলেন, মনের মধ্যে খাবার কোন ইচ্ছে টের পেলেন না।

অনাদি বললেন, “রাত্রে কিছু খাবো না, ভাবছি”।

“সে কী? আবার কী শরীর খারাপ লাগছে নাকি? সন্ধ্যেবেলা যে বললে ভালো আছো?

“ভালই তো ছিলাম। এখন আবার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। বুকের কাছে একটু চাপ মতো লাগছে”

“বিষ্ণুকে বলি, করুণা ডাক্তারকে খবর দিক”

“না, গো না। সে রকম কিছু নয়। একটু শুয়ে ঘুমোলেই ভালো হয়ে যাবে। কাল সকালে যা হবার হবে, এখন এই রাত্রে আর লোককে ব্যতিব্যস্ত করে লাভ নেই”

“তাহলে, এককাজ করি, দুটো রুটি আর একটু দুধ এনে দি, খাও”

“না, না, এখন আর কিছু খাবো না। এক গেলাস জল দাও বরং খেয়ে শুতে যাই”

“তাই আবার হয় নাকি? সারারাত না খেয়ে কাটাবে? কথায় আছে, রাতের উপোসে হাতিও দুব্বল হয়ে যায়। তুমি আর না করো না, দুধ-রুটি এনে দি, খেয়ে শুয়ে পড়ো”

অনাদি বাধ্য হয়েই খেতে বসলেন, বিষ্ণু আর তিনি পাশাপাশি বসলেন। বিষ্ণু ভাত-ডাল, আলু পোস্ত আর মাছের ঝাল খেলেন, অনাদি খেলেন রুটি আর দুধ। সংক্ষিপ্ত খাওয়া সেরে অনাদি চলে গেলেন নিজের ঘরে। বিছানায় টানটান শুয়ে শ্বাস নিতে লাগলেন, জোরে জোরে। বুকের অস্বস্তিটা বাড়ছে।

কিছুক্ষণ পর সোনা আর মণি এলেন বাবার কাছে। সোনা জিগ্যেস করলেন, “বাবা, কি ঘুমোলে?

“নারে মা, আয়। মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে তো। পান্না, হীরুর খাওয়া হয়েছে”?

“হ্যাঁ বাবা, ওদের খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে এলাম। মা বলল, তোমার নাকি শরীর ভালো লাগছে না”!

“হুঁ ওই রকমই। বয়েস তো হচ্ছে”!

মাথার কাছে বসে, সোনা বাবার কপালে হাত দিয়ে বললেন, “তুমি এত ঘামছো কেন, বাবা? অঘ্রাণের শেষ, আমাদের সবার গায়েই চাদর থাকা সত্ত্বেও শিরশিরে ঠাণ্ডা লাগছে। আর শুধু একখানা জামা গায়ে দিয়ে তুমি ঘামছো? খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা? দাদাকে বলি, করুণামামাকে খবর দিক, একবার দেখে যাক”

“না রে পাগলি। অস্বস্তি একটু হচ্ছে। সে তেমন কিছু না। অল্পতেই লোককে ব্যস্ত করিস না”সোনা আর কথা বললেন না। তাঁর মনে হল, কথা না বাড়িয়ে, চোখ বুজে চুপচাপ শুয়ে থাকলে বাবা স্বস্তি পাবেন। সোনা বাবার মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন আর মণি হাত বোলাতে লাগল বাবার পায়ে। বাঁ হাত বাড়িয়ে হ্যারিকেনের পলতেটা একটু নামিয়ে দিলেন, ঘরের আলোটা স্তিমিত হয়ে এলে অনেকটা।

ঘামটা কমছিল না। শ্বাস নিতেও কষ্টটা বাড়ছিল। তার সঙ্গে পেটেও একটা অস্বস্তি। অনাদি কিছুক্ষন চোখ বুজে শুয়ে থাকার পর ভাবলেন, একবার বাহ্যে গেলে, কিছুটা স্বস্তি মিলবে হয়তো। তিনি বিছানায় উঠে বসলেন, বললেন, “হ্যারিকেনটা নিয়ে আমার সঙ্গে একটু চ তো মা, একবার পাইখানায় যাই”

সোনা দ্রুত উঠে এসে হ্যারিকেনের পলতে উঠিয়ে আলোটা বাড়িয়ে দিলেন। আর মণি দৌড়ে গেল গামছা আনতে। সোনা বললেন, “পেট খারাপ হয়নি তো, বাবা?

“নাঃ। সকালে মাঠে গেলাম। ভালোই তো হল। জানি না কেন, এখন মনে হচ্ছে আবার হবে”

অনাদি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরোলেন, সামনে হ্যারিকেন হাতে সোনা। মণিও সঙ্গে রইল, তার হাতে গামছা। নতুন ঘরের পৈঠেতে ধুতি, জামা ছেড়ে, অনাদি গামছা পরে, পাইখানার দিকে এগোলেন। সোনা মণিকে বললেন, “তুই হ্যারিকেন দেখিয়ে বাবার সঙ্গে যা। বাবা ঘরে ঢুকে গেলে হ্যারিকেনটা ধাপিতে রেখে আসিস। ততক্ষণ আমি একটা বালতিতে জল নিয়ে আসি”সোনা টিউবওয়েল টিপে এক বালতি জল এনে পাইখানার দরজার সামনে রাখলেন। মণির হাত ধরে বললেন, “চ আমরা নতুন ঘরের দাওয়ায় বসি, বাবার হয়ে গেলে আসবো”ওরা দুবোনে দাওয়ায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, লক্ষ রাখতে লাগল পাইখানার দরজার দিকে। দুজনেই খুব উদ্বিগ্ন। মণি বলল, “আমার কিন্তু খুব ভয় করছে, দিদি। দাদাকে বললে হতো না?

“দাদাকে বলবো তো, বাবাকে ঘরে নিয়ে যাই, দাদাকে খবর দেব” দুজনে আর কোন কথা বলল না। নানান চিন্তা করতে করতে সোনার মনে হল, বসত বাড়ির ভেতরেই আজ যদি এই পাইখানা না থাকতো, কী হত?  অসুস্থ শরীরে বাবাকে আজ খিড়কির বাঁশবাগানে ছুটতে হতো!

সোনা নিজেই তখন ফ্রক পরা ছোট্ট খুকি। তাঁর পরের বোন সাবির বয়েস ছয়, মণি বছর তিনেকের, আর ভাই চিনু তখন মায়ের পেটে। বাড়িতে নতুন কুয়ো বসানোর তোড়জোড় চলছিল। দাদা তখন সবে বর্ধমান গেছেন, কলেজে পড়তে। দাদা বাড়ি এসে সব শুনে, বাবাকে বলেছিলেন,

“কুয়ো বসাতে হও বসাও, সেখানে একটা পাইখানা হোক। আর জলের জন্যে বসাও টিউকল। চিরকালের মতো সমস্যা মিটে যাবে। বাড়ির মেয়েগুলোকে, মাকে আর ভোর বেলা মাঠে ছুটতে হবে না”দাদার কথায় বাবা গুরুত্ব দেননি, বলেছিলেন, “আজকালকার ছোকরাদের শুধু বারফট্টাই। খরচ-খরচার ব্যাপারটা দেখতে হবে না? আমার উপযুক্ত ছেলে, বাবার জমিদারি দেখে ফেলেছে! বাহ্যে করতে মানুষ মাঠে যাবে না তো কি, ঘরে হাগবে? যত্তোসব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা”

আর মা বলেছিলেন, “সে কি, বাছা? বাড়িতে নিত্যসেবার শালগ্রাম ঠাকুর রয়েছেন, সে বাড়ির ভেতরে হবে পাইখানা? ছি ছি এ কথা তুই ভাবতে পারলি, বিষ্ণু?” দাদা কথা বাড়াননি। বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তারপর পাঁচিলের ধারের ওই কোনায় কুয়ো খোঁড়া হল, জল উঠল। কুয়োর পাড় বাঁধিয়ে, শানের চাতাল বানিয়ে জল তোলা শুরু হল। দাদা বর্ধমান থেকে ছুটিতে এসে, একদিন খুব ভোরে সেই কুয়োর পাড়ে বসেই বাহ্যে করে, নোংরা করে দিলেন কুয়োটা। সকালে বলেও দিলেন সে কথা মাকে এবং বাবাকে। কদিন খুব চেঁচামেচি, হৈচৈ চলল। দাদার সঙ্গে বাবা কথা বলাই বন্ধ করে দিলেন বেশ কদিন। শেষমেষ মা বুঝিয়েসুঝিয়ে বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন। চারপাশে দেয়াল তুলে, দরজা বসিয়ে, টিনের চালের ছাউনি দিয়ে ঘর হল। কুয়োর মুখে ঢালাই করে, পাদানি লাগিয়ে, বসার জায়গা তৈরি হল। চালু হয়ে গেল পাইখানার ঘর। প্রথম প্রথম তাদেরও দাদার ওপর খুব রাগ হয়েছিল, বাবা, মায়ের সঙ্গে অমন শয়তানি করার জন্যে। কিন্তু যত বড়ো হয়েছে, তারা সকলেই বুঝেছে এর প্রয়োজনীয়তা। তারা বুঝেছে, উদ্দেশ্য সঠিক হলে, বাবা-মায়েরও কিছু কথার অবাধ্য হওয়াটা জরুরি। আজ আরেকবার সেটা টের পেল সোনা।

দরজা খুলে অনাদি বালতির জল ভেতরে নিলেন। একটু পরে আবার বেরিয়েও এলেন। হ্যারিকেনের আলোয় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দুই বোনেই খুব ভয় পেয়ে গেল। বাবার চোখের চাউনি কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত, ভয়ার্ত। দুই বোনে এগিয়ে যেতে, অনাদি জিজ্ঞাসা করলেন, “শব্দটা কিসের বল তো, মা? বুঝতে পারলি?”

“শব্দ? কিসের শব্দ, বাবা?”

“সে কি, তোরা শুনতে পাসনি? অত জোরে আওয়াজ হল, আর তোরা শুনতে পাসনি? টিনের চালে ভারি পাথর আছড়ে পড়ার মতো, বিকট আওয়াজ?”

“না তো। আমরা দুজনেই তো সারাক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়েছিলাম”

“সে কি রে? ওই আওয়াজের পরেই, সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে গেল। আমার মাথাটা কেমন টলে উঠল। আমি কোথায়, এখন দিন না রাত, কিছুই যেন বুঝতে পারছিলাম না। একটু পরেই আস্তে আস্তে আবার সব ঠিক হয়ে এল। কী হলো বল তো, মা?” দুই বোনের কেউই কোন উত্তর দিতে পারল না। তবে তারা বুঝতে পারল, বাবার শরীর একদমই ভালো নয়। এখনই করুণামামাকে খবর দিতে হবে।

দুই মেয়ের সঙ্গে টিউকলের দিকে যেতে যেতে অনাদি শিউরে উঠলেন একবার। তাঁর বাঁদিকের ঘাড়, কাঁধ, বাহুতে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছেন। এসব কিসের লক্ষণ? সোনা টিউকল টিপে জল করে দিলেন, অনাদি হাত, পা মুখ ধুলেন। তারপর মণির হাত থেকে নিয়ে ধুতি আর জামা পরে বললেন,

“আমি এখন ঘরে যাবো তনু, আমাকে একটু ধর। বিকাশ, বিষ্ণুকে গিয়ে শিগ্‌গির খবর দে, মা। তোদের মাকেও ডাক। বেশি সময় আর নেই রে, পাগলি”বাবার এই অসহায় কথায় সোনা কেঁদেই ফেললেন, মণিও।

“কীসব আবোল তাবোল, বলছো বাবা” সোনা আর মণি কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে উঠলেন,

‘দাদা, দাদা, ও মা। মা? বাবা কেমন করছে, শিগগির এসো’

বিষ্ণু ঘরে বসে লণ্ঠনের আলোয় বই পড়ছিলেন, দৌড়ে এলেন। ষোড়শীবালা আর বৌমা সকলকে খাইয়ে, হাতের কাজ কর্ম সেরে খেতে বসেছিলেন। খাওয়া ছেড়ে, কোনমতে হাতে জল দিয়ে দৌড়ে এলেন। অনাদি বিছানায় শুতে শুতে সকলের দিকে তাকালেন, তাঁর চোখের দৃষ্টি অস্বচ্ছ। বাবার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই, বিষ্ণু দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন। সদরের খিল খুলে অন্ধকার পথে দৌড়ে চললেন করুণামামার বাড়ি। তাড়াহুড়োতে টর্চটা আনার কথা মনে হয়নি।

বাবার বুকে হাত বোলাতে বোলাতে, সোনা আর মণি ব্যাকুল হয়ে জিগ্যেস করতে লাগলেন, “বাবা, ও বাবা? কোথায় কষ্ট হচ্ছে, বাবা? ও বাবা, কথা বলছো না, কেন? একটু জল এনে দিই খাও না, বাবা”।

অনাদি হাতের ইঙ্গিতে জল চাইলেন। হাতে ভর দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু হাত কাঁপছিল থরথর করেসোনা আর ষোড়শিবালা দুজনে মিলে উঠে বসিয়ে দিলেন অনাদিকে। বৌমা কলসি থেকে এক গেলাস জল এনে বাবার হাতে তুলে দিলেন। গেলাস খালি করে এক চুমুকে জল খেয়ে, অনাদি তৃপ্তির শ্বাস ছাড়লেন ‘আঃ’আবার শুয়ে পড়তে পড়তে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত রাত হল, বিষ্ণু এখনো ফেরেনি?”

ষোড়শীবালা বললেন, “বাড়িতেই তো ছিল, ও তো করুণাকে ডাকতে বের হল এইমাত্র”সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, অনাদি বালিশ জড়িয়ে পাশ ফিরে শুলেন। দু তিনবার দীর্ঘ শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে, চোখ বন্ধ করলেন। সোনা আর মণির হাতের তালুর নিচে স্থির হয়ে গেল তাঁর হৃদয়ের স্পন্দন। হাহাকার করে উঠলেন দুজনে।

ষোড়শীবালা দিশাহীন দৃষ্টিতে দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন, “তোরা অমন কেঁদে মরছিস কেন, পোড়ারমুখি? বিষ্ণু আসছে তো ডাক্তারকে নিয়ে, এত অধৈর্য হলে হয়? বিষ্ণুটাও কী যে করছে, কখন গেছে, এখনো ফেরার নাম নেই। বৌমা, চিনুকে একবার পাঠাও না। আলোটা নিয়ে সদরে দাঁড়িয়ে দেখুক দাদা আসছে কিনা?”

বৌমা ষোড়শীবালাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “চিনুতো নেই, মা। চিনু কালনা গেছে বড়দির বাড়ি। আপনার ছেলে এখনই এসে যাবে মা”

“সেই থেকে তো এসে যাবে এসে যাবে করছো, কোথায় আসছে বাছা? মানুষটা যে কষ্ট পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছো না”

বিষ্ণু আর ডাক্তার করুণাসিন্ধু ব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন। অনাদির মুখের দিকে তাকিয়েই, তাঁর মুখটা পাথরের মতো হয়ে গেল। তাঁর মুখের দিকে সকলের অসহায় দৃষ্টি। বিছানায় বসে, তিনি অনাদির একটা হাত তুলে নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর চোখের পাতা টেনে টর্চের আলোয় পরীক্ষা করলেন চোখের মণি। উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় নত করে, বললেন, “আমার আর কিছু করার নেই, দিদি”

ষোড়শীবালা প্রচণ্ড আক্ষেপে চেঁচিয়ে উঠলেন, “তুমি কিছু করার নেই বললেই আমি শুনবো? জলজ্যান্ত মানুষটা, এই তো একটু আগেই গান শুনল, খাবার খেল, আর তুমি বলছো কিছু করার নেই? বিষ্ণু তুই গাড়ির ব্যবস্থা কর। আমি এখনই তোর বাবাকে বর্ধমান নিয়ে যাবো। সেখানে না হলে, কলকাতা”

বিষ্ণু মায়ের পাশে বসে, জড়িয়ে ধরলেন, মাকে। দুজনেই কাঁদতে লাগলেন হাহাকার করে। কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে ভয়ে ভয়ে নিচেয় নেমে এল, সুভা, কলু আর হীরু। সুভার কোলে পান্না। ওদেরকে কাছে টেনে নিলেন বৌমা। পান্নাকে তিনি নিজের কোলে নিলেন। এতজনের কান্নায় বিহ্বল পান্না, বিপন্ন মুখে তাকিয়ে দেখতে লাগল সকলের মুখ। তাকে ভালোবাসার, তার নির্ভরতার সব মুখগুলিই এখন অসহায়, ব্যাকুল। তার কাছে এই স্মৃতি স্থায়ি নয়, কিন্তু দুর্বোধ্য এক বোধ তার মনে বাসা বেঁধে রইল।

 ..০০..

পরের পর্ব "পাখির চোখ" এই সূত্রে - " পাখির চোখ "

এবং " রতনে রতন চেনে  "


নতুন পোস্টগুলি

শুধু _তুই .কম - পর্ব ২০

 প্রথম   ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয়  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন র...