ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
অষ্টাদশ পর্বাংশ
৪.৮.১১ চোল বা চোড়
তামিল চোল শব্দের অর্থ “ভবঘুরে”, অনেকে বলেন, সংস্কৃত
“চোর” থেকে চোড় শব্দের সৃষ্টি, অথবা দক্ষিণ ভারতের “কোল” নামে প্রাক-আর্য জনগোষ্ঠীরাই চোল।
যাই হোক না কেন, চোলরা
ছিলেন দক্ষিণ ভারতেরই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেদের
পৌরাণিক সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।
প্রাচীন চোল-মণ্ডলম বলতে পেন্নার এবং ভেল্লারু
(ভেল্লার) এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, অর্থাৎ আজকের তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লি
এবং পাণ্ডুকোট্ট রাজ্যের কিছুটা। এই সীমানা অবশ্য চোল রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তি
অনুযায়ী কখনো বেড়েছে,
কখনো কমেছে।
চোল বা চোড়দের নাম প্রথম শোনা যায় চতুর্থ শতাব্দী
বি.সি.ই-র বৈয়াকরণ কাত্যায়নের পাণিনি-ভাষ্যে। এঁদের নাম মহাভারতে এবং সম্রাট
অশোকের শিলা নির্দেশেও পাওয়া যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে বন্ধু
রাজ্য হিসেবে চোল বা চোড়দের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপর সিংহলের বৌদ্ধ গ্রন্থ
“মহাবংশ” থেকে জানা যায়,
দ্বিতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি কোন সময়ে জনৈক চোল রাজা ইলার সিংহল দ্বীপ
জয় করেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এরপর তামিল সাহিত্য গ্রন্থ “সঙ্গম”- থেকে জানা
যায়, খ্রীষ্টিয়
কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন মহিমান্বিত চোল রাজার কথা, যাঁরা
সুবিচার এবং দানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইলাঞ্জেটচেন্নির
পুত্র করিকাল। তাঁর সময়েই নাকি চোল রাজ্যের বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছিল।
তিনি পাণ্ড্য ও চেরা রাজাদের এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী-প্রধানদের পরাস্ত করে
চোলরাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন
পেরুনারকিল্লি, তিনি
রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন এবং রাজা করিকালের মতোই অনেক কীর্তি স্থাপনা
করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দী সি.ই.-তে চোলরাজ্য কিছুটা ম্লান হয়ে
পড়ে, পল্লব, পাণ্ড্য এবং
চেরদের ক্রমাগত আক্রমণে।
চোল বংশের নতুন রাজত্বের শুরু করেছিলেন রাজা
বিজয়ালয়। যদিও তাঁর সঙ্গে প্রাচীন চোলদের সম্পর্কের সঠিক সন্ধানসূত্র পাওয়া যায়
না। ৮৫০ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে তিনি পল্লবদের সামন্তরাজা হয়ে রাজত্ব শুরু
করেছিলেন। শোনা যায় তিনি তাঞ্জাভুর বা তাঞ্জোর অবরোধ করে, পাণ্ড্য
রাজার সামন্তরাজা মুত্থারাইয়ার প্রধানকে পরাজিত করেন।
প্রথম আদিত্যঃ রাজা
বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য ৮৭৫ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি
পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন,
এবং পল্লবরাজ অপরাজিত বর্মনকে পরাজিত করে, তোণ্ডামণ্ডলম অধিকার করে নিয়েছিলেন
৮৯০ সি.ই.-তে। তারপর পশ্চিমা-গঙ্গদের রাজধানী তালকড়ও নাকি অধিকার করে নিয়েছিলেন।
তিনি শৈব ছিলেন, বেশ
কিছু শিব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।
প্রথম পরান্তকঃ প্রথম
আদিত্যের পুত্র প্রথম পরান্তক যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের সীমানা বিশাল –
পূর্বের কলহস্তী এবং উত্তরের মাদ্রাজ (চেন্নাই), দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত। তাঁর ৯০৭-৫৩
সি.ই.-র রাজত্বকালে এই সীমা তিনি আরও বাড়িয়েছিলেন। প্রথমে তিনি অধিকার করলেন
পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহের রাজ্য, যার জন্যে জয়সিংহকে সিংহলে পালাতে হয়েছিল। এই জয়ের পর তিনি
“মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পল্লবরাজাদের সরিয়ে নেল্লোর পর্যন্ত
পল্লব রাজ্য অধিকার করে নিলেন। অবশ্য তাঁর সিংহল বিজয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং
পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ তাঞ্জোর এবং কাঞ্চী অবরোধ করে ফেলেছিলেন।
রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম পরান্তকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মারা গিয়েছিলেন, এবং শোনা
যায় তৃতীয় কৃষ্ণ বিনা বাধায় রামেশ্বরম পর্যন্ত বিজয় অভিযান করেছিলেন। এই সময়
চোলরাজ্য ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল এবং এখান থেকে উদ্ধার পেতে তাঁদের বহুদিন
অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম পরান্তকও শৈব ছিলেন, তিনিও তাঁর পিতার মতো অনেক মন্দির
প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সোনায় মুড়ে
দেওয়া হয়েছিল।
৯৫৩ সি.ই.-তে পরান্তকের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন
চোলদের খুব স্পষ্ট কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। শোনা যায় তাঁর দুই পুত্র গণ্ডারাদিত্য
এবং অরিঞ্জয় রাজা হয়েছিলেন। তারপরে অরিঞ্জয়ের পুত্র সুন্দরচোল এবং তাঁর পুত্র
দ্বিতীয় আদিত্য করিকাল এবং উত্তমচোল রাজা হয়েছিলেন। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং চোল
রাজত্বে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারেননি।
প্রথম-রাজরাজ(৯৮৫-১০১৪ সি.ই.) - সুন্দরচোলের পুত্র প্রথম-রাজরাজ রাজা হওয়ার পর চোলরাজ্যের আবার গৌরবময় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা। কিন্তু তাঁর পরাক্রম, বুদ্ধি এবং রণদক্ষতা চোলরাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাজবংশ করে তুলেছিল। প্রথমেই তিনি চেরদের রাজ্য জয় করলেন, চের রাজ্যের কান্ডালুর ধ্বংস করলেন। এরপর জয় করলেন মাদুরা, সেখানকার পাণ্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গকে বন্দী করলেন। এরপর জয় করলেন কোল্লাম এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের দুর্গ শহর উদাগাই (উটি) এবং মালাইনাড়ু (কুর্গ)। এরপর তিনি উত্তর সিংহল জয় করে, ওই অঞ্চলের নাম রাখলেন, মুম্মদি চোলামণ্ডলম। এরপর তিনি গঙ্গবাড়ি এবং নোলাম্বাপাড়ি জয় করে মহীশূরের অধিকাংশ নিজের আয়ত্ত্বে আনলেন। রাজরাজের এই পরাক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালুক্যরা ভাল চোখে দেখেননি, অতএব চালুক্যদের সঙ্গেও যুদ্ধ শুরু হল। তবে চালুক্য রাজ তৈলপের ৯৯২ সি.ই.-র লিপি থেকে জানা যায়, তিনি চোলদের গর্ব খর্ব করে দিয়েছিলেন। যদিচ তৈলপের পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.) যখন রাজা ছিলেন, তখন চোলরা রাজরাত্তপাড়ি অধিকার করে চালুক্য রাজ্যের ভয়ংকর ক্ষতি করেছিলেন।
এরপর তিনি প্রাচ্য চালুক্যদের রাজ্য ভেঙ্গি
অধিকার করেছিলেন, কিন্তু
প্রাচ্য চালুক্যদের রাজা বিমলাদিত্য রাজরাজের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই বশ্যতার
পরিবর্তে রাজা বিমলাদিত্যকে, রাজরাজ তাঁর কন্যা, কুণ্ডাবাইকে দান করেছিলেন। এরপরেও
তিনি কলিঙ্গ এবং লাক্ষাদ্বীপ ও মালদিভস জয় করেছিলেন। এভাবেই রাজরাজ সমগ্র
তামিলনাড়ু, মহীশূরের
অধিকাংশ অঞ্চল, কলিঙ্গ, সিংহল এবং
অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ জয় করে, একক প্রচেষ্টায় চোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন।
প্রথম রাজরাজের কৃতিত্ব শুধু মাত্র রাজ্য জয়েই নয়, তিনি বেশ
কিছু বিস্ময়কর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের কাছে পরম গৌরবের বিষয়।
যেমন তাঞ্জোরের শিবমন্দির,
নিজের নামেই তিনি এই মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন, “রাজরাজেশ্বর”। শিব মন্দির ছাড়াও তিনি বিষ্ণু মন্দিরও নির্মাণ
করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের জন্যে নেগাপতনমে একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই বিহারের
প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা ছিলেন সাগরপাড়ের মালয়-উপদ্বীপের রাজা শৈলেন্দ্র এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসী
শ্রীমার-বিজয়তুঙ্গবর্মন।
প্রথম-রাজেন্দ্র গঙ্গাইকোন্ডা (১০১৪-৪৪
সি.ই.) - পিতার আসনে বসে প্রথম-রাজেন্দ্র, পিতার মতোই যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন।
তিনি পিতার প্রতিষ্ঠা করা সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ তো রেখেছিলেনই, উপরন্তু জয়
করেছিলেন, ইডিতুড়াইনারু
(রায়চূর জেলা), বনবাসী
(উত্তর কানারা), কোলিপ্পাক্কাই
(কুলপক), মন্নাইক্কড়ক্কম
(সম্ভবতঃ মান্যখেট)। এরপর তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র সিংহল, যার উত্তর
অংশ জয় করেছিলেন, তাঁর
পিতা প্রথম রাজরাজ। এরপর তিনি পাণ্ড্য এবং কেরালাও অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং
সেখানে তাঁর পুত্র জাতবর্মনসুন্দরকে প্রশাসনিক প্রধান পদে বসিয়ে, ওই অঞ্চলের
নাম দিয়েছিলেন, “চোল-পাণ্ড্য”।
এরপর প্রথম-রাজেন্দ্র উত্তরের দিকে বিজয় অভিযানে মন দিলেন। একে একে তিনি জয় করলেন, ওড্ড-বিষয়
(ওড্র-উড়িষ্যা), কোশলাইনাড়ু
(দক্ষিণ কোশল), দন্তভুক্তির
(দাঁতন- মেদিনীপুর) ধর্মপাল, তক্কন-লাঢ়মের (দক্ষিণ রাঢ়) রণশূর, বাংলাদেশের
(পূর্ববঙ্গ) গোবিন্দচন্দ্র,
মহীপাল, উত্তির-লাঢ়ম
(উত্তর রাঢ়)। এই বিজয় অভিযানের সময়কাল মোটামুটি ১০২১ থেকে ১০২৫ সি.ই.।
প্রথম-রাজেন্দ্রর এই বিজয় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রদর্শন, রাজ্য অধিকার করা নয়। অতএব তাঁর এই বিজয় অভিযানে কোন স্থায়ী ফল হল না, শুধু বঙ্গে কয়েকজন কর্ণাটকী সেনা প্রধান রয়ে গেলেন, পরবর্তীকালে যাঁরা সম্ভবতঃ সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ফেরার পথে তিনি নিজের দেশে কয়েকজন শৈব পণ্ডিত বা সন্ন্যাসীকে নিয়ে গেলেন গঙ্গা পাড়ের কোন রাজ্য থেকে।
ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাজেন্দ্রই প্রথম সম্রাট যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের বেশ কিছু দেশে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালীকে তাঁর নৌবহর এবং বাণিজ্যতরী দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষ্মের (Khmer) বা কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর শুধু যে নিবিড় বাণিজ্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা নয়, দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গভীর হার্দিক সম্পর্কও। দুটি সাম্রাজ্যের মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প এবং ধর্মচিন্তার গভীর আদানপ্রদানও শুরু হয়েছিল। কম্বোজে অবস্থিত (আজকের কম্বোডিয়া) সুবিখ্যাত আঙ্কোর-ভাট মন্দির এবং ওই অঞ্চলের আরও অনেক বিক্ষিপ্ত মন্দির আজও সেই সুসম্পর্কের স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে দক্ষিণ চিনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক। এবং শুধু এই পূর্বদিকেই নয়, সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রর এই বাণিজ্যিক নৌবহরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল পশ্চিম দিকের আরব উপমহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা, আন্তোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এবং তুর্কিয়ে সাম্রাজ্য পর্যন্ত।
আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোজ (কম্বোডিয়া) - চিত্র ঋণ - https://www.britannica.com/
প্রথম-রাজেন্দ্র নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম
“গঙ্গাইকোণ্ডাচোলাপুরম” (আধুনিক গঙ্গাকুণ্ডপুরম)। এই রাজধানীতে তিনি দুর্ধর্ষ
রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির,
সরোবর, স্থাপত্য
নির্মাণ করিয়েছিলেন,
কিন্তু কালের নির্মম নিয়মে সে সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।
প্রথম রাজাধিরাজঃ (১০৪৪-৫২
সি.ই.) -প্রথম-রাজেন্দ্রর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ ১০৪৪ সি.ই.তে সিংহাসনে বসলেও, তিনি যুবরাজ
হয়ে পিতার প্রশাসনে সহায়তা করেছে ১০১৮ সি.ই. থেকে। পিতার বহু অভিযানেই তিনি সফল
সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু চালুক্যরাজ প্রথম-সোমেশ্বর আহবমল্লের সঙ্গে যুদ্ধে ১০৫২
সি.ই.তে কোপ্পমের রণক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় রাজেন্দ্র দেব (১০৫২-৬৩ সি.ই.) –চালুক্যদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বীর রাজেন্দ্র (১০৬৩-৭০
সি.ই.) - দ্বিতীয় রাজেন্দ্রর পর রাজা হলেন, তাঁর ভাই বীর রাজেন্দ্র। তাঁর সময়ে
চালুক্য ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের আক্রমণ ও বিদ্রোহ দমনেই তাঁর রাজত্বকাল
শেষ হয়েছিল। যদিও তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে চালুক্য রাজকুমারের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে, চালুক্যদের
সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।
প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০-১১২২
সি.ই.) – বীর রাজেন্দ্রর পর তাঁর পুত্র অধিরাজেন্দ্র কিছুদিনের জন্য রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি
সিংহাসন অধিকারে রাখতে পারেননি বা অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন
প্রথম কুলোত্তুঙ্গ। চোলরাজ প্রথম-রাজরাজের কন্যা কুণ্ডাবাইয়ের সঙ্গে ভেঙ্গির
চালুক্য রাজ বিমলাদিত্যের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের পুত্র রাজরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে
বিবাহ হয়েছিল চোলরাজা প্রথম-রাজেন্দ্রর কন্যা অম্মাঙ্গ দেবীর। তাঁদের পুত্রের নাম
দ্বিতীয়-রাজেন্দ্র চালুক্য ওরফে প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ। প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ আবার বিবাহ
করেছিলেন, চোলরাজ
দ্বিতীয়-রাজেন্দ্রদেবের কন্যা মধুরান্তকীকে। অতএব অনুমান করা যায়, যেহেতু এই
সময়ে চোল রাজপরিবারে সিংহাসনে বসার মতো যোগ্য কোন উত্তরাধিকারী পাওয়া যায়নি এবং
যেহেতু তাঁর ধমনীতে চালুক্যদের থেকে চোল রক্তের পরিমাণ বেশি ছিল, সেহেতু
প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। সে যাই হোক, প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ
চোল সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। যদিও হোয়সল, পরমার, প্রাচ্য-গঙ্গ, পশ্চিমা-চালুক্যদের
সঙ্গে যুদ্ধ বিবাদ লেগেই ছিল।
প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ ধর্মীয় এবং সাহিত্য বিষয়ে
উৎসাহী ছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জন্যেও অনেক দান করেছিলেন। কিন্তু যে
কোন কারণেই হোক তিনি বৈষ্ণব আচার্য রামানুজমের ওপর বিরক্ত হয়ে, তাঁকে
শ্রীরঙ্গম (ত্রিচিনোপল্লি) ছাড়তে বাধ্য করেন।
আচার্য রামানুজমকে হোয়সল রাজ বিত্তিগবিষ্ণুবর্ধনের মহীশূর রাজ্যে নিরাপদ
আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তিনি জয়গোণ্ডন, যিনি “কলিঙ্গত্তুপ্পারনি”-র রচয়িতা
এবং আদিয়ারক্কুনাল্লারের,
যিনি “শিলপ্পধিকারম”-গ্রন্থের রচয়িতা, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
প্রথম-কুলোত্তুঙ্গর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন
তাঁর পুত্র বিক্রম চোল (১১২২-৩৩ সি.ই.)। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সময়ে আচার্য
রামানুজম আবার চোলরাজ্যের শ্রীরঙ্গমে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন
দ্বিতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩-৪৭ সি.ই.), দ্বিতীয়-রাজরাজ (১১৪৭-৬২ সি.ই.) এবং
দ্বিতীয়-রাজাধিরাজ (১১৬২-৭৮ সি.ই.)। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন এবং এঁদের সময়ে
চোল সাম্রাজ্য তার গৌরব দ্রুত হারাতে থাকে। হোয়সল, সিংহল, কেরালা সকলেই চোল সাম্রাজ্য থেকে
নিজেদের স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। তারপরে তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৭৮-১২১৬ সি.ই.)
দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও,
অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেননি। এই সময় থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের
আধিপত্যে চোলরাজ্যের মূল সীমানাও খণ্ডিত হতে থাকে। মোটামুটি ১২৬৭ সি.ই.তে দক্ষিণ
ভারতের রাজনীতিতে চোলরাজ্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।
চলবে...