ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৭

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৬"]


৫.৫.৪ শিবের অসুর বা দৈত্য নিধন

বিষ্ণুর মতো তাঁরও বেশ কিছু অবতারের কথা শোনা যায়, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, সেগুলির জনপ্রিয়তা নেই। বিষ্ণু এবং কৃষ্ণ যেমন দলে দলে অসুর দলন করেছেন, মহাদেব সে তুলনায় বেশ কম। যে কয়েকজন বিখ্যাত অসুরকে তিনি বধ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান হলেন ত্রিপুরাসুর।

ত্রিপুরাসুর - মহাভারতে ঋষি বেদব্যাস অর্জুনকে ত্রিপুরাসুর-সংহার-সংবাদ বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনকালে[1] অসুরদের তিনটি পুর বা দুর্গ ছিল, এই তিনটি পুর যথাক্রমে সোনা, রূপো ও লোহা দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। স্বর্ণময় পুরের অধিকারী ছিল কমলাক্ষ, রৌপ্যময়ের তারকাক্ষ এবং লৌহময়ের বিদ্যুন্মালী। দেবরাজ ইন্দ্র এই তিনটি পুরের বিনাশ না করতে পেরে মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন এবং বললেন “ব্রহ্মার বরে ওই তিন অসুর সবার উপরে অত্যাচার করছে, আপনি ছাড়া কেউ ওদের বিনাশ করতে পারবে না। অতএব আপনিই ওদের বিনাশ করুন”। ভগবান ভূতভাবন, তিনটি পুরকে ঘিরে দুর্ভেদ্য চক্রব্যূহ নিমার্ণ করে সহস্র বছর ধরে অবরোধ করে রইলেন। তারপর তিনটি পর্বযুক্ত শল্যের আঘাতে তিনটি পুর দগ্ধ করলেন।

দৈত্য অন্ধক - এই অন্ধকের জন্ম কাহিনী খুবই অদ্ভূত। একবার কৈলাসে মহেশ্বর যখন তপস্যায় মগ্ন, পত্নী দেবী পার্বতী খেলাচ্ছলে পিছন থেকে দুই হাতে তাঁর চোখ বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিশ্বচরাচর অন্ধকার হয়ে যায় এবং মহেশ্বর ও পার্বতীর স্বেদ থেকে এক অন্ধ শিশুর জন্ম হয়। দেবীপার্বতী এই অদ্ভূত ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠায়, মহেশ্বর তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, যেহেতু এই পুত্র তাঁদের অঙ্গস্পর্শ থেকেই জাত, অতএব এই পুত্র তাঁদেরই। এরপর নিঃসন্তান হিরণ্যাক্ষ পুত্র কামনায় মহেশ্বরের তপস্যা করলে, মহাদেব তাঁর হাতে অন্ধককে তুলে দেন। ভগবান বিষ্ণুর হাতে হিরণ্যাক্ষের মৃত্যুর পর, অন্ধক রাজা হলেন, কিন্তু তাঁর গোষ্ঠীর দৈত্যরা তাঁকে মেনে নিল না, কারণ তিনি দৈত্যপুত্র নন, দেবপুত্র এবং অন্ধ। তখন অন্ধক ঘোর তপস্যা করে ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করলেন এবং ভগবান ব্রহ্মার বরে তাঁর অন্ধত্ব দূর হল এবং একমাত্র মহাদেব ছাড়া তিনি সকলের অবধ্য হয়ে গেলেন। বিপুল পরাক্রম অর্জন করে, এরপর তিনি স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করে দেবরাজ ইন্দ্র ও দেবতাদের উপর খুবই অত্যাচার শুরু করেছিলেন। যথারীতি অন্ধকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হওয়াতে, তিনি মহাদেবকে এর প্রতিকারের অনুরোধ করলেন। মহাদেব অনায়াসেই অন্ধকের “কোটি-কোটি (!)” অসুর-সৈন্যদের বিনাশ করে, অন্ধককে তাঁর ত্রিশূলে গেঁথে ফেললেন। অন্ধকের পতনে ত্রিলোকের দেবতা, মুনি-ঋষি, নর আনন্দে মহাদেবের জয়ধ্বনি করতে লাগল। এদিকে মহাদেবের শূলে বিদ্ধ অন্ধকের মনে তখন সাত্ত্বিক ভাবের উদয় হল, তিনি বহু স্তব ও স্তুতিতে মহাদেবকে সন্তুষ্ট করলেন। মহাদেব তাঁকে শূল থেকে নামিয়ে মুক্তি দিলেন এবং “প্রমথাধিপত্য[2]” দান করলেন। সেই থেকে অন্ধক গাণপত্যে প্রতিষ্ঠিত হলেন, এবং ইন্দ্রাদি দেবতারা তাঁকে প্রণাম করলেন। (লিঙ্গপুরাণ/৯৩)

জলন্ধর – পুরাকালে জলন্ধর এক প্রবল পরাক্রমী অসুর ছিলেন। সেই অসুর দেব, দানব, যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগ এমনকি স্বয়ং ব্রহ্মাকেও পরাজিত করেছিলেন। এরপর তিনি বিশ্বহর বিষ্ণুকে আক্রমণ করে, অবিরত যুদ্ধের পর বিষ্ণুকেও পরাজিত করলেন। বিষ্ণুকে পরাজিত করে তিনি ভগবান পিনাকীকে জয় করার ইচ্ছা নিয়ে মহাদেবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে দেবদেব, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করার ইচ্ছাতেই এখানে এসেছি”। অসুরের কথা শুনে ভগবান মহেশ্বর সমুদ্রের মধ্যে পায়ের আঙুল ডুবিয়ে ভীষণ সুদর্শন চক্র উৎপন্ন করলেন। কিন্তু পাছে এই চক্রে ত্রিজগৎ ও দেবতারা নিহত হয় ভেবে, তিনি সমুদ্রের জলেই চক্রটি রেখে দিলেন। এখন অসুরের কথায় হাসতে হাসতে বললেন, “ওহে অসুরেন্দ্র জলন্ধর, তুমি যদি সমুদ্র থেকে ওই চক্র তুলে আনতে পারো, তবেই আমি তোমার সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হব, নচেৎ হব না”। ভগবান মহাদেবের কথায় জলন্ধর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, “হে শঙ্কর, গরুড় যেমন নির্বিষ ডুণ্ডুভ (ঢোঁড়া) সাপকে অবলীলায় বিনাশ করে, সেভাবে আজ আমিও তোমাকে, নন্দীকে এবং তোমার সব পারিষদদের সংহার করব।  আমি ভগবান বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি, যম, কুবের, বায়ু, বরুণ সকল দেবতাকেই পরাজিত করেছি। স্বর্গে-মর্তে যুদ্ধ করার মতো কোন প্রতিপক্ষ না থাকায় একবার আমার হাত সুড়সুড় করছিল বলে, পাহাড়ের গায়ে হাত ঘষেছিলাম। তাতে মন্দর, শ্রীমান, নীল, সুশোভন সুমেরু পাহাড় পড়ে গিয়েছিল। মজা দেখার জন্যে আমি হিমালয়ে একবার গঙ্গার গতিরোধ করে দিয়েছিলাম। আমার পত্নীর ভৃত্যেরা পর্যন্ত দেবতাদের বজ্র আটকে দিয়েছে। আমি গরুড় ও বিষ্ণুকে একসঙ্গে নাগপাশে বদ্ধ রেখেছিলাম। ইন্দ্রের পত্নী শচী এবং উর্বশী সহ সকল অপ্সরাকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলাম। ইন্দ্র আমার কাছে এসে অনেক অনুনয়-বিনয় করাতে, শচীকে ছেড়ে দিয়েছি। এ হেন মহাবীর জলন্ধরকে তুমি চেন না?”

জলন্ধরের এই রকম আস্ফালন শুনে মহাদেব বেশ বিরক্ত হলেন। তাঁর তৃতীয় নয়নের প্রান্ত থেকে অগ্নিকণা বের হয়ে অসুরের রথ, অশ্ব, হাতি এবং অজস্র দৈত্য দগ্ধ হয়ে মারা গেল। জলন্ধর তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে উন্মত্ত ক্রোধে সমুদ্র থেকে সেই চক্র তুলতে প্রবৃত্ত হল। অতি কষ্টে সেই চক্র সে যেমনি কাঁধে তুলল, তখনি তার দেহ দু’টুকরো হয়ে, কাটা গাছের মতো, আছড়ে পড়ল মাটিতে। জলন্ধর নিহত হওয়াতে ত্রিজগতের দেব, গন্ধর্ব, দানব এবং নর - সকলেই আনন্দে “সাধু সাধু” বলতে লাগল। এই জলন্ধর-বিমর্দন উপাখ্যান যিনি পাঠ করবেন বা শুনবেন বা শোনাবেন, তিনি গাণপত্য লাভ করে অপার আনন্দ ভোগ করতে পারবেন। (লিঙ্গপুরাণ/ ৯৭)

 ৫.৫.৪.১ তারকাসুর বধ ও শিব-পার্বতী সংবাদ

দক্ষের যজ্ঞে সতীদেবীর দেহত্যাগের পর, মহাদেব সুদীর্ঘ তপস্যায় মগ্ন রয়েছেন, পুনর্বিবাহের কথা তাঁর মনেও আসেনি। অন্য দিকে সতীদেবী মহাদেবকেই আবার পতিরূপে লাভ করতে নিজের ইচ্ছেয় জন্ম নিলেন, হিমালয়-পত্নী মেনকা দেবীর গর্ভে। এই জন্মে তাঁর নাম হল হিমালয়-দুহিতা পার্বতী। দেবী পার্বতীর যখন বারো বছর বয়স হল, তিনি তপস্যায় প্রবৃত্তা হলেন।

এদিকে দুর্দান্ত অসুরদের প্রথা অনুযায়ী প্রাচীনকালে তারকাসুরও দেবতাদের পরাজিত করে তাঁদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করছেন। কিন্তু কোন দেবতাই তাঁর পরাক্রম সহ্য করতে পারছিলেন না, এমনকি ভগবান বিষ্ণুও নাকি তাঁর সঙ্গে “কুড়ি হাজার বছর” ধরে, যুদ্ধ করে পরাজিত হয়েছেন। দেবাদিদেব কঠোর তপস্যায় মগ্ন, তাঁর কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। উদ্বিগ্ন দেবতারা তারকাসুরের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় জানতে ভগবান ব্রহ্মার কাছে গেলেন। ভগবান ব্রহ্মা সব শুনে বললেন, “দেবতাদের এই দুর্গতির কথা আমি সবই জানি। কিন্তু তাও কেন নিশ্চিন্তে আছি তোমাদের বলি। সতীদেবী এই জন্মে গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা হয়ে জন্ম নিয়েছেন। তোমরা সকলে হিমালয় কন্যা পার্বতীদেবীর সঙ্গে রুদ্র মহাদেবের বিবাহে সচেষ্ট হও। তাঁদের মিলনে বীর্যবান এক পুত্রের জন্ম হবে, তাঁর নাম কার্তিকেয়। তিনি ষড়ানন (ছটি মুখ) এবং দ্বাদশ বাহু নিয়ে মহা শক্তিধর বীর হবেন। একমাত্র তাঁর হাতেই তারকাসুরের সংহার সম্ভব। তিনিই দেবতাদের সেনাপতি হয়ে দেবসেনাপতি নাম গ্রহণ করবেন। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য নাম হবে স্কন্দ, শাল্য, বিশাল্য, নৈগমেয় ইত্যদি”।

দেবতারা খুশি হয়ে প্রথমেই সুমেরু পর্বতের শিখরে কামদেবতার উদ্যানে গেলেন। সেখানে কামনার দেবতা কন্দর্প ও তাঁর পত্নী রতিকে দেবরাজ ইন্দ্র সব কথা বলতে, কন্দর্প ও রতি তখনই মহাদেবের তপস্যা স্থলে উপস্থিত হলেন। মদনদেব ও রতি সেখানে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, কঠোর তপস্যার রুক্ষ পরিবেশ সরে গিয়ে, প্রকৃতিতে বসন্তের স্পর্শ লাগল। হঠাৎ এই ঋতু পরিবর্তনে ভগবান ত্র্যম্বক বিস্মিত হলেন, তিনি তৃতীয় নয়ন মেলে তপস্যারতা সুন্দরী কন্যা পার্বতীকে দেখলেন এবং এ সবের আড়ালে দেখতে পেলেন মদনদেবকে।

তাঁর মনে চঞ্চলতা আনার জন্যে এসব মদনদেবেরই কারসাজি বুঝে, তিনি তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে মদনদেবকে দগ্ধ করে ফেললেন। স্বামীর মৃত্যুতে শোকাতুরা রতি মহাদেবের চরণে বিলাপ করাতে, মহাদেব বললেন, “হে ভদ্রে, তোমার পতি অনঙ্গ (কায়াহীন) হলেও তোমাদের দাম্পত্যে কোন বিঘ্ন ঘটবে না। ভগবান বিষ্ণু যখন সর্বজনের হিতের জন্যে বসুদেব-তনয় বাসুদেব হয়ে মর্ত্যে জন্ম নেবেন, তাঁর পুত্র হয়ে মদন আবার জন্ম নেবে”। মহাদেবের বরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে রতিদেবী তাঁর বসন্ত পারিষদদের নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।

কন্দর্পের এই দুর্দশা দেখে দেবী পার্বর্তী আরও কঠোর তপস্যায় মগ্না হলেন। এই তপস্যায় সারাদিনে তিনি একট পাতাও মুখে দিতেন না, এই কারণে তাঁর নাম হল অপর্ণা। তাঁর এই কঠোর তপস্যায় মহাদেব বিচলিত হলেন এবং সন্তুষ্টও হলেন। তিনি ব্রাহ্মণের বেশে দেবী অপর্ণার আশ্রমে গেলেন। অলৌকিক দিব্য লক্ষণাদি দেখে দেবী তাঁকে মহেশ্বর বলে চিনতে পেরে পূজা ও স্তব করলেন। মহাদেব তখন স্বরূপ ধারণ করে স্মিতমুখে বললেন, “হে দেবি, সকলকে আমাদের লীলা দেখানোর জন্যেই তোমার বিবাহের স্বয়ংবরে, আমি তোমার সঙ্গে মিলিত হব”।  এই কথা বলে তিনি নিজের আশ্রমে চলে গেলেন, দেবী পার্বতীও তপস্যা ভঙ্গ করে ফিরে এলেন পিতৃগৃহে।

দেবী পার্বতী ঘরে ফিরে আসাতে মাতা মেনকা ও পিতা গিরিরাজ আনন্দে বিহ্বল হলেন এবং কন্যার মুখে দেবাদিদেবের মন্ত্রণার কথা শুনে সর্বলোকে কন্যার স্বয়ংবর ঘোষণা করলেন। সেই সভায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু থেকে সকল দেবতাই উপস্থিত হলেন। সর্ব অলংকারে ভূষিতা গিরিকন্যা যখন সভায় উপস্থিত হলেন, তাঁর সঙ্গী ছিলেন কল্পদ্রুম-পুষ্পের মালা হাতে জয়া এবং ব্যজন (চামর) হাতে বীজন করছিলেন বিজয়া। সভাস্থলে দেবী পার্বতী যখন বরমাল্য হাতে নিলেন, তখন অকস্মাৎ ভগবান মহাদেব লীলা করার ইচ্ছায় শিশুরূপ ধারণ করে তাঁর কোলে শুয়ে পড়লেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত দেবতারা সকলেই ক্ষুব্ধ হলেন, এই শিশু কে? দেবরাজ ইন্দ্র শিশুকে হত্যা করার জন্যে বজ্র নিক্ষেপ করতে উদ্যত হতেই, শিশুর হাতের ইঙ্গিতে ইন্দ্র পুতুলের মতো নিঃসাড় হয়ে গেলেন। এভাবেই যে যে দেবতা তাঁদের অস্ত্র হাতে শিশুকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন, সকলেই স্থির, নিশ্চেষ্ট, স্পন্দনহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দেবতাদের এই অদ্ভূত দুর্দশা দেখে ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন হলেন এবং জানতে পারলেন, ওই শিশুই ভূতভাবন ভূতপতি মহেশ্বর। তিনি তখন উঠে দাঁড়িয়ে শিশু দেবাদিদেবকে নমস্কার করে, তাঁর স্তব ও স্তুতি করতে লাগলেন। তারপর ব্রহ্মা সকল স্তম্ভিত দেবতাদের উদ্দেশে বললেন, “ওহে দেবতাগণ, দেবাদিদেব মহেশ্বর যে শিশুরূপে এখানে উপস্থিত হয়েছেন, তা তোমাদের কেউই বুঝতে পারোনি? অতএব তোমরা সকলেই মূঢ় প্রতিপন্ন হয়েছ। এখন সকলে মহেশ্বর ও মহেশ্বরীর শরণাপন্ন হও। দেবতারা সকলেই মোহমুক্ত হয়ে দেবাদিদেব শঙ্কর ও দেবী পার্বতীকে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন এবং নানান স্তবস্তুতিতে তাঁদের অর্চনা করলেন।

এরপর বহুবিধ আড়ম্বরে সকল দেবতাদের উপস্থিতিতে উভয়ের বিবাহ সম্পন্ন হল এবং যথাকালে তাঁদের পুত্র কার্তিকেয়র জন্ম হওয়ার পরে, বালক কার্তিকের হাতেই তারকাসুর নিহত হল (লিঙ্গপুরাণ/১০১, ১০২, ১০৩)।

এই কাহিনী নিয়ে কোন মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু একটা বিষয় বেশ উপভোগ্য। দেবরাজ ইন্দ্র অসুর ও দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রায়শঃ পরাজিত ও স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিত্রাণের জন্য ত্রিদেবের শরণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে দেবী পার্বতীর কোলে থাকা একটি শিশুকে বধ করার জন্য তাঁকে প্রথমেই হাতে বজ্র তুলে নিতে হল! আবার শিশুরূপী দেবাদিদেবের হাতের ইশারায় তিনি একেবারে জড়বৎ পুতুল হয়ে গেলেন! দেখা যাচ্ছে ভাগবত এবং শৈব - উভয় পুরাণকারই সুযোগ পেলেই বৈদিক দেবরাজ ইন্দ্রকে অপদস্থ করতে দ্বিধা করেননি।

চলবে...



[1] সম্ভবতঃ সত্যযুগে– এই সময়েই বিখ্যাত অসুর এবং দৈত্যদের সংহার করে আর্যরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করছিলেন, এই অসুর, দৈত্য, দানব সকলেই যে অবৈদিক অনার্য সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

[2] প্রমথাধিপত্য>প্রমথদের আধিপত্য – প্রমথ মানে ভূত বা প্রেত – মহাদেবের পারিষদদের “গণ” বলা হত, গণপতি তাদের প্রধান।


সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৫ "]


৫.৫.১ সমুদ্র মন্থন

ভগবান শিবের এই দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করার রুদ্র রূপই একমাত্র রূপ নয়। তাঁর অন্য আরেকটি রূপ ভীষণ সহজ, সরল, অনাড়ম্বর এবং উদাসীন তপস্বীর মঙ্গলময় রূপ। অমৃত লাভের জন্যে দেবতা ও অসুররা সম্মিলিত হয়ে, সমুদ্রমন্থন শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের থেকে অতি উৎকট হলাহল উঠে এল। সেই হলাহলের তীব্র তেজে দেবতা, অসুর এবং লোকপালেরা সকলেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁদের রক্ষার জন্যে সকলেই দেবাদিদেব মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন। মহেশ্বর তখন কৈলাসে দেবীর সঙ্গে তপস্যা করছিলেন। দেবতাদের প্রার্থনা শুনে তিনি পত্নী ভবানীকে বললেন, “কী দুশ্চিন্তার বিষয়, সমুদ্র মন্থনে উদ্ভূত কালকূট প্রজাদের ঘোর দুঃখের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রজাগণ নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। এদের অভয় দেওয়াই আমার বিধেয়, যেহেতু যিনি সমর্থ, দীনজনকে রক্ষা করাই তাঁর একান্ত কর্তব্য। অতএব এই বিষ আমিই পান করব”। দেবী ভবানী পতি মহেশ্বরের সাধ্যের কথা জানতেন, তাই আপত্তি করলেন না। তখন দেবাদিদেব সমস্ত হলাহল পান করলেন এবং বিষের তীব্র তেজে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে গেল। যদিও সেই বিষ তাঁর আর কোনও ক্ষতি করতে পারল না। সেই থেকেই তাঁর আরেক নাম হল নীলকণ্ঠ। পান করার সময়, তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে কিছু বিষ মাটিতে পড়েছিল, সেই ছিটেফোঁটা বিষ পান করেই, সাপ, বৃশ্চিক, শৃগাল, কুকুর এবং কিছু লতা-গুল্ম বিষধর হয়ে উঠেছিল।

এরপর সমুদ্রমন্থন থেকে একে একে নানান ঐশ্বর্যের উদ্ভব হতে লাগল। যেমন, সুরভি নামের কামধেনু, ব্রহ্মবাদী ঋষিরা তাঁকে গ্রহণ করে তাঁদের গোয়ালে বেঁধে ফেললেন। শ্বেতবর্ণ এক ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবা, দেবরাজ ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের ঘোড়াশালে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। ঐরাবত নামের হাতি, সঙ্গে আটটি হস্তিনী- কেউ গ্রহণ করলেন কিনা, মহাভারত থেকে জানা যায় না। কিন্তু অন্য পুরাণ মতে ঐরাবত দেবরাজ ইন্দ্রই কুক্ষিগত করে নিজের পিলখানায় বেঁধে ফেলেছিলেন। কৌস্তুভ নামের পদ্মরাগ রত্ন, ভগবান বিষ্ণু গ্রহণ করলেন। পারিজাত বৃক্ষ, ইন্দ্র গ্রহণ করে স্বর্গের বাগানে রোপণ করলেন। সোনার অলংকারে ভূষিতা অপ্সরাগণ, তাঁদেরও ইন্দ্র স্বর্গে নিয়ে গেলেন। এরপর আবির্ভূতা হলেন লক্ষ্মীদেবী, তিনি নিজেই ভগবান বিষ্ণুকে আশ্রয় করলেন। এরপর সুরার দেবী বারুণী আবির্ভূতা হলেন, ভগবান বিষ্ণুর অনুমতি নিয়ে অসুররা তাঁকে গ্রহণ করলেন। এরপরেই অমৃতপূর্ণ কলস হাতে আবির্ভূত হলেন, আয়ুর্বেদ পারদর্শী ধন্বন্তরি। অতএব সমুদ্রমন্থনে লব্ধ এত ঐশ্বর্যের মধ্যে ভগবান শিবের ভাগে জুটেছিল তীব্র বিষ, কারণ অমৃতের ভাগ তো, পৌরাণিক মতে, দেবতাদের সকলেই পেয়েছিলেন। এমন উদাসীনতা আর কোন হিন্দু দেবতার মধ্যে আছে বলে আমার মনে হয় না।  

৫.৫.২ শিবের পূজা

মহাভারতে শিবের রূপ নিয়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখ আছে। ব্যাসদেব যুধিষ্ঠিরকে, দেবাদিদেব শিবের বর্ণনায় বলেছেন, “ত্রিপুরারি মহাদেব - বৃষ তাঁর বাহন, তিনি নীলকণ্ঠ, শূল ও পিনাকধারী এবং কৃত্তিবাস” (সভা/৪৫)। মহারাজ সগর পুত্রকামনায় কৈলাস পর্বতে গিয়ে তপসা করেছিলেন এবং সেখানে ভবানীপতি শূলপাণীর থেকে পুত্রলাভের বর লাভ করেছিলেন (বন/১০৬)। মহাদেবের থেকে পাশুপত অস্ত্র লাভের জন্যে অর্জুন হিমাচলের দুর্গম এক পাহাড়ে দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন। অর্জুনের তপস্যায় সন্তুষ্ট মহাদেব কিরাতের বেশে অর্জুনের সঙ্গে প্রথমে অস্ত্রযুদ্ধ পরে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হন। সে যুদ্ধে যদিও অর্জুনের পরাজয় হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরাক্রমে মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে, নিজের পরিচয় জানালেন এবং পাশুপত অস্ত্র দান করলেন। তারপর এই অস্ত্রের প্রয়োগ ও নিরোধের বিধি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞ অর্জুন মহাদেবের স্তবে বলেছিলেন, “হে মহাদেব, হে নীলকণ্ঠ, হে জটাধর, হে ত্র্যম্বক (ত্রিলোচন), হে বিষ্ণুরূপ শিব, হে শিবরূপ বিষ্ণো, হে শূলপাণে, হে পিনাকধারিণ, হে মার্জ্জালীয়[1], আপনাকে প্রণাম” (বন/১৩৯)। মহাভারতে ব্যাসদেব অর্জুনের কাছে মহাদেবের মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “তিনি রুদ্র, নীলকণ্ঠ, করাল, পিঙ্গলাক্ষ, কপর্দ্দী (জটাধারী), উগ্র। তিনি দিক্‌পতি, পর্জন্যপতি, ভূতপতি, বৃক্ষপতি, গোপতি, বিশ্বপতি। তিনি ধর্মাত্মা, মহেশ্বর, মহোদর, দ্বীপীচর্মবাস (বাঘছাল বসন), ত্রিশূলপাণি, পিনাকী, খড়্গ-চর্মধারী। তিনি ত্রিপুরঘ্ন, ভগনেত্রঘ্ন, বনষ্পতির পতি, নরগণের পতি, মাতৃগণের পতি, গণপতি, গোপতি, যজ্ঞপতি, দেবপতি। তাঁকে বিনীত নমস্কার কর। তাঁর অনেক পার্ষদ আছেন, তাঁরা বামন, জটিল (জটাধারী), মুণ্ডী (নরমুণ্ডধারী), হ্রস্বগ্রীব, মহোদর, মহাকায় প্রভৃতি বিকৃত বেশধারী, বিকৃত মুখ, বিকৃত পা প্রাণী” (দ্রোণ/ ২০৩)।

মহাভারতের প্রধান চরিত্রদের অনেকেই শিবভক্ত এবং মহাদেব শঙ্করের আরাধনা করতেন, যেমন দ্রৌপদী, অর্জুন, জরাসন্ধ প্রমুখ। জরাসন্ধ যখন নরবলি দিয়ে রুদ্রযজ্ঞের আয়োজন করছিলেন, সেই সময়েই কৃষ্ণের নির্দেশে ভীম তাঁকে হত্যা করেন। কৌরব প্রাসাদের দেবমন্দিরে মহাদেবের উপাসনা কে করবেন, সে নিয়ে রাণি গান্ধারী ও রাণি কুন্তীর মধ্যে নাকি বিবাদ হয়েছিল। রাজা সগর, জয়দ্রথ, অম্বা, দ্রুপদরাজা, সোমদত্ত, অশ্বত্থামা এবং স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণও শাল্ব রাজার রাজধানী সৌভনগর ধ্বংস করতে যাওয়ার আগে শিবের উপাসনা করেছিলেন।  

৫.৫.৩ শিবমূর্তি

শিবের বহু মূর্তিপূজার প্রচলন থাকলেও, সব থেকে প্রাচীন এবং আজও সব থেকে পূজিত হয়, তাঁর প্রতীক “লিঙ্গ”। যতদূর প্রমাণ পাওয়া যায় এই লিঙ্গপূজা, সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। এই লিঙ্গের বেশ কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধুসভ্যতার শহরগুলির প্রত্নখননে। লিঙ্গ প্রজননের প্রতীক। প্রচুর শস্য, সন্তান, পশু এবং সমৃদ্ধির আশায় ভারতীয় সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই লিঙ্গ পূজার বহুল প্রচলন। এবং প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনকাল থেকে লিঙ্গপূজার মতো সর্বভারতীয় জনপ্রিয়তা হিন্দুধর্মের আর কোন দেবতার ভাগ্যে জোটেনি।

বিবিধ লিঙ্গ এবং তার মহিমার কথা সবিস্তারে জানা যায়, “তপোভূমি নর্মদা” গ্রন্থে,

যেমন – “সাধারণতঃ আমরা শিবলিঙ্গ দেখলেই তাঁকে বাণলিঙ্গ আখ্যা দিই। কিন্তু বাণলিঙ্গের অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন, রৌদ্রলিঙ্গ, শিবনাভিলিঙ্গ, দেবলিঙ্গ, আর্ষলিঙ্গ, আগ্নেয়লিঙ্গ, নৈঋতলিঙ্গ, বারুণলিঙ্গ, বায়ুলিঙ্গ, কুবেরলিঙ্গ, বৈষ্ণব লিঙ্গ, ইত্যাদি। এছাড়া যে কোন শিবলিঙ্গের মধ্যে জ্যোতির প্রকাশ থাকলে তাকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলা হয়”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৮২)।

এই বাণলিঙ্গের সৃষ্টি সম্পর্কে যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতায়, স্বয়ং মহেশ্বর দেবী পার্বতীকে বলছেন, “বাণাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে বর দিয়েছিলাম যে (ধাবড়ি কুণ্ডে) পর্বত ও নর্মদার জলস্রোতে বিঘূর্ণন ও বিঘর্ষণে আমি লিঙ্গরূপে সতত নর্মদার জলে বিরাজমান থাকব। শত সহস্র লিঙ্গের মধ্যে যেগুলির আকৃতি পাকা জাম বা হংস ডিম্বের মতো হবে, বর্ণ হবে পাকা জামের মতো কিংবা মধুবর্ণ, শ্বেত, নীল ও মরকতের মত দ্যুতিসম্পন্ন সেইগুলিকেই বাণলিঙ্গ বলে জানবে”। পুরাণের কাহিনী থেকে জানা যায়, নর্মদার তীরেই ছিল বলিরাজার পুত্র বাণাসুরের সাম্রাজ্য। সাতপুরা পর্বতের শিখরদেশে ছিল তাঁর রাজধানী”। (প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৯১)।  

পরবর্তী কালে এই লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যোনি, যাকে গৌরীপাট বা গৌরীপট্ট বলে। উদ্দেশ্য একই ভগবান শিব ও ভগবতী গৌরীর ঐশী মিলনে ভক্তদের গোলা ভরে উঠুক শস্যে, ঘরের উঠোনে খেলে বেড়াক সুস্থ সন্তানেরা। গোয়ালে বেড়ে উঠুক সবৎসা গাভী। প্রজনন মানেই সুখ, সম্পদ ও সমৃদ্ধি। ভগবান শিবের মন্দিরের মধ্যে সব থেকে পবিত্র মনে করা হয় দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির। আজও হিন্দুদের মধ্যে এই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের তীর্থদর্শন খুবই পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। এই বারোটি মন্দিরের অবস্থান, সোমনাথ (গুজরাট), মল্লিকার্জুন (অন্ধ্র), মহাকালেশ্বর (উজ্জয়নী), ওঙ্কারেশ্বর (মধ্যপ্রদেশ), কেদারনাথ (উত্তরাখণ্ড), ত্র্যম্বকেশ্বর (মহারাষ্ট্র), রামনাথস্বামী (তামিলনাড়ু), কাশী বিশ্বনাথ (উত্তরপ্রদেশ), ইলোরার ঘুস্মেশ্বর (মহারাষ্ট্র), বৈদ্যনাথ (ঝাড়খণ্ড), দ্বারকার নাগেশ্বর (গুজরাট), ভীমশংকর (মহারাষ্ট্র)।

দক্ষিণ ভারতে শিবের নটরাজ মূর্তি পূজার বহুল প্রচলন আছে। দক্ষিণ ভারতীয় শিবভক্তদের বিশ্বাস, মহাদেবের হিমালয়ে কৈলাস পর্বতের আবাস ছাড়াও দক্ষিণ ভারতেও তাঁর আবাস আছে। সেটি হল চিদম্বরম মন্দির বা তিল্লই মন্দির – পুদিচ্চেরি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দক্ষিণে, সমুদ্র উপকূলের কাছে। চিদম্বরম (চিৎ+অম্বরম) শব্দের অর্থ মনের আকাশ বা চেতনার আকাশ, দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির মধ্যে স্থাপত্য সৌন্দর্যে এই মন্দির অন্যতম প্রধান। এখানে মহাদেবের নটরাজ মূর্তি পূজিত হয়। এই মন্দিরের দেওয়ালে নটরাজের যে ১০৮টি নৃত্যভঙ্গি খোদিত আছে, সেগুলির বর্ণনা ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়। এই ভঙ্গীগুলি থেকেই বিখ্যাত ভারতনাট্যম নৃত্যের সৃষ্টি। 

প্রাচীন অনার্য ভারতীয়দের পূজিত আরেকটি দেবমূর্তির নিদর্শন পাওয়া গেছে, সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নখননে। শিং-ওয়ালা মুকুট মাথায় এক দেবমূর্তি, যাঁর আশেপাশে বেশ কয়েকটি সজীব প্রাণীর মোটিফ। অনুমান করা হয় ইনি ভগবান শিবের আদিম সংস্করণ, পশুপতিদেব। একটু অন্যরকম পশুপতির মূর্তি পাওয়া গেছে প্রাচীন দক্ষিণ ভারতেও। সে মূর্তি চতুর্ভুজ, একহাতে বরাভয় বা আশীর্বাদ, অন্য হাত মুক্ত যেন বরদানে উদ্যত, তৃতীয় হাতে একটি কুঠার আর চতুর্থ হাত থেকে লাফিয়ে উঠছে ছোট্ট একটি হরিণশাবক।



[1] শব্দকোষে মার্জ্জালীয় শব্দের অর্থ বলছে, ১. মার্জ্জার, ২. কিরাত বা শুদ্ধদেহ, ৩. শূদ্র। (মহাদেব কী তাহলে শূদ্র কিরাতের ছদ্মবেশে নয়, নিজের স্বাভাবিক বেশেই অর্জুনের সঙ্গে লড়াই করলেন? তা না হলে, অর্জুন তাঁকে সাক্ষাৎ মহাদেব জেনেও, তাঁর কিরাত বা শূদ্র রূপেরও সম্বর্ধনা করলেন কেন? 

পরের পর্ব - "ধর্মাধর্ম - ৫/১৭"


সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৫/১৫

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

ধর্মাধর্ম শেষ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৫/১ "

 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  

[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৪ "]


৫.৪.৩ শিব - শৈব

শিবের উদ্ভব বৈদিক দেবতা রুদ্র থেকে। রুদ্র পৃথ্বীলোকের দেবতা এবং তিনি একাদশ রুদ্র অর্থাৎ অগ্নিরূপে তাঁর এগারোটি রূপ – অতএব তিনি ভীষণ তেজোময় ও শক্তিশালী। কিন্তু তাঁর প্রকৃতি বিষ্ণুর একেবারেই বিপরীত। তিনি শ্মশানে-মশানে থাকেন। তাঁর ত্রিনয়ন, তাঁর মাথায় বিশাল জটা, পরনে বাঘের ছাল, সারা গায়ে ভস্ম মাখা। সাধারণ মানুষের কাছে যা কিছু ভয়ংকর সে সবই তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। যেমন তাঁর অলঙ্কার সাপ, তাঁর সঙ্গী সাথীরা সকলেই ভূত, প্রেত, পিশাচ। অথচ তাঁর জটাতেই স্বর্গ থেকে মন্দাকিনীর পতন এবং সেখান থেকে মঙ্গলময়ী গঙ্গার উৎপত্তি। তাঁর জটায় চন্দ্রকলা শোভা পায়। পৌরাণিক তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি ত্রিদেবের মহেশ্বর – ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, মহেশ্বর হয়ে তিনি ধ্বংস করেন। অতএব তিনিই মহাকাল, রুদ্র ভৈরব। তবে অধিকাংশ সময়েই তিনি শিব, পরম মঙ্গলময়, রক্ষাকর্তা।  তিনি যখন শিব – তিনি আশুতোষ - খুব অল্পেই তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যান। কিন্তু ক্রুদ্ধ হলে তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে ঝলসে ওঠে অগ্নি।

হিমালয়ের কৈলাস পর্বতেই তাঁর স্থায়ী অধিষ্ঠান এবং সর্বদাই তিনি ধ্যান করতে থাকেন। তিনি মহাযোগী তপস্বী, যোগ সমাধিতেই তিনি জগতের মঙ্গলামঙ্গল নিয়ন্ত্রণ করেন। ভারতের সকল যোগীদের তিনি যোগগুরু, তাঁর অনুসরণেই সকলে যোগ অনুশীলন করেন। একদিকে তিনি যেমন সকল তপস্বীদের যোগ-সমাধি গুরু আবার অন্যদিকে তিনি নৃত্যগুরুও। তিনি নৃত্যের স্রষ্টা নটরাজ। তিনিই ভারতের নৃত্যকলার স্রষ্টা। কিন্তু ক্রুদ্ধ হয়ে যখন তিনি নৃত্য করেন, তখন ধ্বংস হতে থাকে সৃষ্টি, সে নৃত্যের নাম প্রলয় বা তাণ্ডব নৃত্য।

 ৫.৪.৩.১ দক্ষ-যজ্ঞ

ভগবান শিবের দক্ষ-যজ্ঞ কাণ্ডটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন পুরাণে এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। মহাভারতেও এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন স্বয়ং কৃষ্ণ। প্রথমে শ্রীমদ্ভাগবত (চতুর্থ স্কন্ধ, অধ্যায় ২, ৩, ৪, ৫, ৬) থেকে ঘটনাটির সংক্ষেপে বিবরণ দিচ্ছি। 

সত্যযুগে প্রজাপতি দক্ষ একবার “শিব-হীন” যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, অর্থাৎ সেই যজ্ঞে রাজা দক্ষ সকল দেবতাদের নিমন্ত্রণ করলেও শিবকে নিমন্ত্রণ করেননি। এই দক্ষের কন্যা ছিলেন সতীদেবী, শিবের প্রথমা পত্নী। শিবের ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও, সতীদেবী এই যজ্ঞের সময়েই পিতৃগৃহে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পিতা দক্ষ, কন্যা সতীদেবীর সামনেই, শিবের কঠোর সমালোচনা এবং নিন্দা করলেন। স্বামীর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে, দক্ষের যজ্ঞ সভাতেই সতীদেবী অগ্নি-সমাধিযোগে[1] নিজের প্রাণ আহুতি দিলেন।

এই সংবাদ যখন কৈলাসে শিবের কাছে পৌঁছল, ভগবান শিব রুদ্র-ভৈরব হয়ে উঠলেন, তিনি জটা থেকে একগাছি চুল ছিঁড়ে মাটিতে ফেলা মাত্র বীরভদ্র নামে তাঁর ভয়ংকর এক অনুচর উপস্থিত হলেন। তাঁর আকাশস্পর্শী দেহ, সহস্র বাহু, তিনটি চোখ যেন সূর্যের মতো উজ্জ্বল, গলায় নরকপাল মালা, গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। বীরভদ্রকে ভগবান ভৈরব বললেন, “তুমি অতীব রণদক্ষ, তোমার সমস্ত অনুচরদের সঙ্গে নিয়ে যাও, দক্ষের যজ্ঞে অনর্থ ঘটাও এবং দক্ষকে বধ করো”। বীরভদ্র প্রভুর আদেশে তাঁর অনুচরদের নিয়ে দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন। তাদের কেউ বেঁটে, কারও গায়ের রং পিঙ্গল, কারও হলুদ, কারও কারও মুখ ও উদর মকরের মত। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই যজ্ঞস্থল লণ্ডভণ্ড করে দিল এবং বীরভদ্র দক্ষের শিরশ্ছেদ করে, কাটা মুণ্ড যজ্ঞের আগুনে দগ্ধ করে, কৈলাসে ফিরে এলেন।

এই যজ্ঞে নিমন্ত্রিত হয়েও ব্রহ্মা ও বিষ্ণু উপস্থিত ছিলেন না, কারণ শিব-হীন যজ্ঞে তাঁদের অনুমোদন ছিল না। কিন্তু দক্ষের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত যে দেবতা ও মুনি-ঋষিরা বীরভদ্র ও তার সঙ্গীদের হাতে আহত হয়েছিলেন, তাঁরা ব্রহ্মার কাছে এসে অনুরোধ করলেন, ভগবান শিবকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক এবং অসম্পূর্ণ যজ্ঞ সম্পূর্ণ করা হোক। ব্রহ্মা সদলবলে কৈলাসে গেলেন শিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

স্বয়ং ব্রহ্মাকে সামনে উপস্থিত দেখে দেবাদিদেব শিব আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং নতমস্তকে ব্রহ্মার বন্দনা করলেন। তার উত্তরে, ব্রহ্মা সহাস্যে বললেন, “তুমি যদিও আমাকে প্রণাম করলে, তবুও আমি তোমাকেই এই বিশ্বের ঈশ্বর বলেই জানি। যেহেতু এই জগতের যোনিরূপা প্রকৃতির ও বীজস্বরূপ পুরুষের তুমিই একমাত্র কারণ। তৎসত্ত্বেও তুমি নির্বিকার ব্রহ্মরূপে বিরাজ করে থাক। হে ভগবন, তুমি নিজের অংশ থেকে জাত এই প্রকৃতি ও পুরুষ থেকেই, খেলার ছলে ঊর্ণনাভি[2]-র মতো এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক।  বেদ-ধর্ম রক্ষার জন্যে তুমিই যজ্ঞের সৃষ্টি করেছিলে, তুমিই এই যজ্ঞের বিধি বিধান নির্দিষ্ট করেছিলে। হে মঙ্গলময়, যারা শুভকার্যের অনুষ্ঠান করে, তুমি তাদের স্বর্গ বা মোক্ষ দান করে থাক, আর যারা পাপ আচরণ করে তুমি তাদের নরক বিধান করে থাক। হে রুদ্র, তুমি প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করায়, ওই যজ্ঞ অসমাপ্ত রয়েছে। তুমি সর্বজ্ঞ, অতএব তুমি ওই যজ্ঞে উপস্থিত থেকে, ওই যজ্ঞ সম্পন্ন করাও। যজমান দক্ষ আবার জীবিত হোক, অন্যান্য দেবতা, মুনি-ঋষিদেরও সুস্থ করে দাও”। আশুতোষ ব্রহ্মার কথায় সন্তুষ্ট হলেন, বললেন, “সকলেই সুস্থ হোক। কিন্তু দক্ষের মাথা, যজ্ঞের আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছে, অতএব এখন তাঁর দেহে ছাগলের মুণ্ড সংযুক্ত করতে হবে। আর আরব্ধ যজ্ঞ সম্পাদনের আয়োজন শুরু হোক”।

অন্য পৌরাণিক কাহিনী থেকে পাওয়া যায়, সতীদেবীর দেহত্যাগের সংবাদ পেয়ে ভগবান রুদ্র নিজেই এসেছিলেন তাঁর অনুচরদের নিয়ে। দক্ষের যজ্ঞস্থল লণ্ডভণ্ড করে দেওয়ার পর, পত্নীর শোকে সতীদেবীর মৃতদেহ নিজের কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেছিলেন। সেই ভয়ংকর নৃত্যের নামই “তাণ্ডব”। সেই নৃত্যে জগতে প্রলয় শুরু হয়ে যাওয়াতে, বিষ্ণু তাঁর চক্র দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন, সতীদেবীর শব। সেই শব মোট একান্নটি টুকরো হয়ে দেশের যেখানে যেখানে ছড়িয়ে পড়েছিল, সে স্থানগুলিই হয়ে উঠেছিল শক্তিপীঠ। তাঁরা সকলেই হয়ে উঠলেন আদ্যাশক্তি মহামায়ার একান্নটি মাতৃকামূর্তি - ভগবান শিবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ দেবীসতীর অবিনশ্বর রূপ। সে কথা পরে আসবে।

এবার মহাভারতের দক্ষযজ্ঞ পর্বের (অনু/১৬০) দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাজা যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, “প্রজাপতি ব্রহ্মা বহুকাল তপস্যা করে, ভগবান ভূতপতির মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছেন। ভবানীপতি এই স্থাবর-জঙ্গমাত্মক পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। এই ত্রিলোকে তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর সমতুল্য আর কেউ নেই। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে রণক্ষেত্রে দাঁড়ালে, শত্রুরা তাঁর গায়ের গন্ধেই ভয়ে কাঁপতে থাকে, জ্ঞান হারায়, অনেকে মারাও যায়। একবার প্রজাপতি দক্ষ বিপুল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন কিন্তু সেখানে তিনি ভবানীপতির যজ্ঞভাগ বিবেচনা করেননি। ভবানীপতি ক্রুদ্ধ হয়ে ভয়ংকর গর্জনে যজ্ঞস্থল বিদ্ধ করলেন। ওই সময় মহাদেবের জ্যা[3]শব্দে উপস্থিত দেবতা, অসুর সকলেই আতঙ্কিত এবং পৃথিবীও কেঁপে উঠল। এরপর রুদ্রদেব দেবতাদের দিকে দৌড়ে গিয়ে ভগের দুই চোখ উপড়ে নিলেন এবং লাথি মেরে পূষা[4]-র দাঁত ভেঙে দিলেন। দেবতারা রুদ্রের এই ভয়ংকর রূপ দেখে তাঁকে প্রণাম করতে লাগলেন, করজোড়ে শতরুদ্রীয় মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। তাতে দেবাদিদেব কিছুটা শান্ত হয়েছেন দেখে দেবতারা তাঁর জন্যে বেশ বড়ো রকম যজ্ঞভাগ নির্দিষ্ট করলেন। ভগবান ভূতভাবন এবার সন্তুষ্ট হয়ে, যজ্ঞের প্রতিষ্ঠা করলেন এবং নষ্ট হওয়া উপচারের সংস্থাপন করলেন”।

 এই কাহিনীর পৌরাণিক এবং মহাভারতীয় বর্ণনা থেকে অনেকগুলি বিষয়ে সন্দেহ আসে, যেমন,

১. পুরাণে ব্রহ্মা এবং মহাভারতে কৃষ্ণ দুজনেই বলছেন, মহাদেব এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। তাহলে দক্ষ তাঁকে যজ্ঞে আমন্ত্রণ করলেন না বা যজ্ঞভাগ নির্দিষ্ট করলেন না কেন? মহাদেবকে তিনি কি দেবতা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি? মহাদেব কি, বৈদিক রুদ্র হিসেবে তখনো পূর্ণ দেবত্বে অধিষ্ঠিত হননি? প্রতিপত্তিশালী অনার্য দেবতা হিসেবে ব্রাহ্মণ্য সমাজের অভিজাত মহলে তখনও তিনি পূর্ণ স্বীকৃতি পাননি? তাহলে তাঁর হাতে দক্ষ নিজের কন্যাকে দান করেছিলেন কেন? কিন্তু সতীদেবীর আচরণে মহাদেবের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং ভালোবাসার কোন ত্রুটি তো দেখা যায়নি।

২. পুরাণ এবং মহাভারতের বর্ণনায় দক্ষের যজ্ঞস্থলে ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু উপস্থিত ছিলেন না। দক্ষের সিদ্ধান্তের কথা তাঁরা দুজনেই জানতেন এবং মহাদেব যে ছেড়ে কথা বলবেন না, এটা বুঝেই তাঁরা বিপদ এড়িয়ে গিয়েছিলেন?

৩. ভগবান কৃষ্ণ তাঁর পরাক্রমের বর্ণনায় “গায়ের গন্ধ"-র উল্লেখ করলেন কেন? কোন বীরের বীরত্বের বর্ণনায় এখনও পর্যন্ত গায়ের গন্ধেই শত্রু নিপাত হয় এমন শোনা যায়নি। মহাদেবের সঙ্গী বা অনুচরেরা ভূত, প্রেত, তাঁদের চেহারার বর্ণনার মধ্যেও ব্রাহ্মণ্য শ্লেষ ধরা পড়ছে। অনার্য মানুষদের তাঁরা যেমন রাক্ষস, দানব এবং দৈত্য বলে বিকট এবং ভয়াল চেহারার বর্ণনা দিয়ে থাকেন, এখানেও তার ব্যতিক্রম করেননি। 

৪. অতএব, দক্ষযজ্ঞ ঘটনার বিশ্লেষণ করলে এমন অনুমান করাই যায়, মহাদেব ছিলেন, শৈব বা পাশুপত্যধর্মে বিশ্বাসী পরাক্রমী অনার্য গোষ্ঠীপতি, তাঁর অনুগত অনার্য সেনারা দুর্ধর্ষ, দুর্দান্ত এবং বেশ নৃশংসও। অবশ্য ব্রাহ্মণ্য সমাজের থেকে অধিকার আদায়ের জন্যেই সম্ভবতঃ তাঁকে একটু অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক হতে হয়েছিল। এই প্রজাপতি দক্ষের যজ্ঞে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর, তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর থেকে তিনিই মহাদেব, তিনিই রুদ্র, তিনিই শিব, তিনিই মহেশ্বর ও পশুপতি।  ব্রহ্মা ও কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর সমান্তরাল দেবতা হয়ে উঠেছিলেন।


[1] অতি উচ্চকোটির যোগীদের পক্ষেই নাকি অগ্নি-সমাধি যোগে দেহত্যাগ করা সম্ভব, অতএব সতীদেবী তাঁর পতির মতোই মহাযোগিনী।   

[2] ঊর্ণ বা ঊর্ণা মানে জাল, জাল নাভিতে যার সেই ঊর্ণনাভি – অর্থাৎ মাকড়সা। মাকড়সা যেমন নিজেরই নাভির রস থেকে জাল বুনে তোলে, তেমনি ব্রহ্মও তাঁর নিজের অংশ থেকে ব্যাপ্ত এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছেন।

[3] জ্যা – ধনুকের ছিলা।

[4] দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে দুই আদিত্য ভগ ও পূষা বা পূষণ – সূর্য - দুজনেই বৈদিক দেবতা।

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৫/১৬ "  


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/১

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...