ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৮

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

অষ্টাদশ পর্বাংশ  


৪.৮.১১ চোল বা চোড়

তামিল চোল শব্দের অর্থ “ভবঘুরে”, অনেকে বলেন, সংস্কৃত “চোর” থেকে চোড় শব্দের সৃষ্টি, অথবা দক্ষিণ ভারতের “কোল” নামে প্রাক-আর্য জনগোষ্ঠীরাই চোল। যাই হোক না কেন, চোলরা ছিলেন দক্ষিণ ভারতেরই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মানুষ। যদিও পরবর্তীকালে তাঁরা নিজেদের পৌরাণিক সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।

প্রাচীন চোল-মণ্ডলম বলতে পেন্নার এবং ভেল্লারু (ভেল্লার) এই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বোঝায়, অর্থাৎ আজকের তাঞ্জোর, ত্রিচিনোপল্লি এবং পাণ্ডুকোট্ট রাজ্যের কিছুটা। এই সীমানা অবশ্য চোল রাজাদের ক্ষমতা ও শক্তি অনুযায়ী কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে।

চোল বা চোড়দের নাম প্রথম শোনা যায় চতুর্থ শতাব্দী বি.সি.ই-র বৈয়াকরণ কাত্যায়নের পাণিনি-ভাষ্যে। এঁদের নাম মহাভারতে এবং সম্রাট অশোকের শিলা নির্দেশেও পাওয়া যায়। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে বন্ধু রাজ্য হিসেবে চোল বা চোড়দের নাম উল্লেখ করেছিলেন। এরপর সিংহলের বৌদ্ধ গ্রন্থ “মহাবংশ” থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় শতাব্দী বি.সি.ই-র মাঝামাঝি কোন সময়ে জনৈক চোল রাজা ইলার সিংহল দ্বীপ জয় করেন এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন। এরপর তামিল সাহিত্য গ্রন্থ “সঙ্গম”- থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টিয় কয়েক শতাব্দী ধরে বেশ কয়েকজন মহিমান্বিত চোল রাজার কথা, যাঁরা সুবিচার এবং দানের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন, ইলাঞ্জেটচেন্নির পুত্র করিকাল। তাঁর সময়েই নাকি চোল রাজ্যের বিস্তার এবং প্রভাব বৃদ্ধি ঘটেছিল। তিনি পাণ্ড্য ও চেরা রাজাদের এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক গোষ্ঠী-প্রধানদের পরাস্ত করে চোলরাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর যে রাজার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন পেরুনারকিল্লি, তিনি রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন এবং রাজা করিকালের মতোই অনেক কীর্তি স্থাপনা করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দী সি.ই.-তে চোলরাজ্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে, পল্লব, পাণ্ড্য এবং চেরদের ক্রমাগত আক্রমণে।

চোল বংশের নতুন রাজত্বের শুরু করেছিলেন রাজা বিজয়ালয়। যদিও তাঁর সঙ্গে প্রাচীন চোলদের সম্পর্কের সঠিক সন্ধানসূত্র পাওয়া যায় না। ৮৫০ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে তিনি পল্লবদের সামন্তরাজা হয়ে রাজত্ব শুরু করেছিলেন। শোনা যায় তিনি তাঞ্জাভুর বা তাঞ্জোর অবরোধ করে, পাণ্ড্য রাজার সামন্তরাজা মুত্থারাইয়ার প্রধানকে পরাজিত করেন।

প্রথম আদিত্যঃ রাজা বিজয়ালয়ের পর তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য ৮৭৫ সি.ই.-তে রাজা হয়েছিলেন। তিনি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন, এবং পল্লবরাজ অপরাজিত বর্মনকে পরাজিত করে, তোণ্ডামণ্ডলম অধিকার করে নিয়েছিলেন ৮৯০ সি.ই.-তে। তারপর পশ্চিমা-গঙ্গদের রাজধানী তালকড়ও নাকি অধিকার করে নিয়েছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, বেশ কিছু শিব মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন।

প্রথম পরান্তকঃ প্রথম আদিত্যের পুত্র প্রথম পরান্তক যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের সীমানা বিশাল – পূর্বের কলহস্তী এবং উত্তরের মাদ্রাজ (চেন্নাই), দক্ষিণে কাবেরী পর্যন্ত। তাঁর ৯০৭-৫৩ সি.ই.-র রাজত্বকালে এই সীমা তিনি আরও বাড়িয়েছিলেন। প্রথমে তিনি অধিকার করলেন পাণ্ড্য রাজা জয়সিংহের রাজ্য, যার জন্যে জয়সিংহকে সিংহলে পালাতে হয়েছিল। এই জয়ের পর তিনি “মাদুরাইকোণ্ডা” উপাধি নিয়েছিলেন। এরপর তিনি পল্লবরাজাদের সরিয়ে নেল্লোর পর্যন্ত পল্লব রাজ্য অধিকার করে নিলেন। অবশ্য তাঁর সিংহল বিজয়ের প্রচেষ্টা সফল হয়নি এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় কৃষ্ণ তাঞ্জোর এবং কাঞ্চী অবরোধ করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম পরান্তকের জ্যেষ্ঠ পুত্র মারা গিয়েছিলেন, এবং শোনা যায় তৃতীয় কৃষ্ণ বিনা বাধায় রামেশ্বরম পর্যন্ত বিজয় অভিযান করেছিলেন। এই সময় চোলরাজ্য ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল এবং এখান থেকে উদ্ধার পেতে তাঁদের বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম পরান্তকও শৈব ছিলেন, তিনিও তাঁর পিতার মতো অনেক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই চিদাম্বরমের শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সোনায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

৯৫৩ সি.ই.-তে পরান্তকের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন চোলদের খুব স্পষ্ট কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। শোনা যায় তাঁর দুই পুত্র গণ্ডারাদিত্য এবং অরিঞ্জয় রাজা হয়েছিলেন। তারপরে অরিঞ্জয়ের পুত্র সুন্দরচোল এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আদিত্য করিকাল এবং উত্তমচোল রাজা হয়েছিলেন। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং চোল রাজত্বে উল্লেখযোগ্য কোন প্রভাব ফেলতে পারেননি।

প্রথম-রাজরাজ(৯৮৫-১০১৪ সি.ই.) - সুন্দরচোলের পুত্র প্রথম-রাজরাজ রাজা হওয়ার পর চোলরাজ্যের আবার গৌরবময় পর্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি যখন রাজা হলেন, তখন চোল রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা। কিন্তু তাঁর পরাক্রম, বুদ্ধি এবং রণদক্ষতা চোলরাজ্যকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাজবংশ করে তুলেছিল। প্রথমেই তিনি চেরদের রাজ্য জয় করলেন, চের রাজ্যের কান্ডালুর ধ্বংস করলেন। এরপর জয় করলেন মাদুরা, সেখানকার পাণ্ড্য রাজা অমরভুজঙ্গকে বন্দী করলেন। এরপর জয় করলেন কোল্লাম এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের দুর্গ শহর উদাগাই (উটি) এবং মালাইনাড়ু (কুর্গ)। এরপর তিনি উত্তর সিংহল জয় করে, ওই অঞ্চলের নাম রাখলেন, মুম্মদি চোলামণ্ডলম। এরপর তিনি গঙ্গবাড়ি এবং নোলাম্বাপাড়ি জয় করে মহীশূরের অধিকাংশ নিজের আয়ত্ত্বে আনলেন। রাজরাজের এই পরাক্রম স্বাভাবিকভাবেই চালুক্যরা ভাল চোখে দেখেননি, অতএব চালুক্যদের সঙ্গেও যুদ্ধ শুরু হল। তবে চালুক্য রাজ তৈলপের ৯৯২ সি.ই.-র লিপি থেকে জানা যায়, তিনি চোলদের গর্ব খর্ব করে দিয়েছিলেন। যদিচ তৈলপের পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.) যখন রাজা ছিলেন, তখন চোলরা রাজরাত্তপাড়ি অধিকার করে চালুক্য রাজ্যের ভয়ংকর ক্ষতি করেছিলেন।

এরপর তিনি প্রাচ্য চালুক্যদের রাজ্য ভেঙ্গি অধিকার করেছিলেন, কিন্তু প্রাচ্য চালুক্যদের রাজা বিমলাদিত্য রাজরাজের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই বশ্যতার পরিবর্তে রাজা বিমলাদিত্যকে, রাজরাজ তাঁর কন্যা, কুণ্ডাবাইকে দান করেছিলেন। এরপরেও তিনি কলিঙ্গ এবং লাক্ষাদ্বীপ ও মালদিভস জয় করেছিলেন। এভাবেই রাজরাজ সমগ্র তামিলনাড়ু, মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল, কলিঙ্গ, সিংহল এবং অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ জয় করে, একক প্রচেষ্টায় চোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন।

প্রথম রাজরাজের কৃতিত্ব শুধু মাত্র রাজ্য জয়েই নয়, তিনি বেশ কিছু বিস্ময়কর মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যা আজও আমাদের কাছে পরম গৌরবের বিষয়। যেমন তাঞ্জোরের শিবমন্দির, নিজের নামেই তিনি এই মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন, “রাজরাজেশ্বর”।  শিব মন্দির ছাড়াও তিনি বিষ্ণু মন্দিরও নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ সঙ্ঘের জন্যে নেগাপতনমে একটি গ্রাম দান করেছিলেন। এই বিহারের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা ছিলেন সাগরপাড়ের মালয়-উপদ্বীপের রাজা শৈলেন্দ্র এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শ্রীমার-বিজয়তুঙ্গবর্মন।

প্রথম-রাজেন্দ্র গঙ্গাইকোন্ডা (১০১৪-৪৪ সি.ই.) - পিতার আসনে বসে প্রথম-রাজেন্দ্র, পিতার মতোই যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন। তিনি পিতার প্রতিষ্ঠা করা সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ তো রেখেছিলেনই, উপরন্তু জয় করেছিলেন, ইডিতুড়াইনারু (রায়চূর জেলা), বনবাসী (উত্তর কানারা), কোলিপ্পাক্কাই (কুলপক), মন্নাইক্কড়ক্কম (সম্ভবতঃ মান্যখেট)। এরপর তিনি জয় করেছিলেন সমগ্র সিংহল, যার উত্তর অংশ জয় করেছিলেন, তাঁর পিতা প্রথম রাজরাজ। এরপর তিনি পাণ্ড্য এবং কেরালাও অধিকার করে নিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর পুত্র জাতবর্মনসুন্দরকে প্রশাসনিক প্রধান পদে বসিয়ে, ওই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন, “চোল-পাণ্ড্য”। এরপর প্রথম-রাজেন্দ্র উত্তরের দিকে বিজয় অভিযানে মন দিলেন। একে একে তিনি জয় করলেন, ওড্ড-বিষয় (ওড্র-উড়িষ্যা), কোশলাইনাড়ু (দক্ষিণ কোশল), দন্তভুক্তির (দাঁতন- মেদিনীপুর) ধর্মপাল, তক্কন-লাঢ়মের (দক্ষিণ রাঢ়) রণশূর, বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) গোবিন্দচন্দ্র, মহীপাল, উত্তির-লাঢ়ম (উত্তর রাঢ়)। এই বিজয় অভিযানের সময়কাল মোটামুটি ১০২১ থেকে ১০২৫ সি.ই.।

                                    মানচিত্র ঋণঃ উইকিপিডিয়া। 

    প্রথম-রাজেন্দ্রর এই বিজয় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা প্রদর্শন, রাজ্য অধিকার করা নয়। অতএব তাঁর এই বিজয় অভিযানে কোন স্থায়ী ফল হল না, শুধু বঙ্গে কয়েকজন কর্ণাটকী সেনা প্রধান রয়ে গেলেন, পরবর্তীকালে যাঁরা সম্ভবতঃ সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ফেরার পথে তিনি নিজের দেশে কয়েকজন শৈব পণ্ডিত বা সন্ন্যাসীকে নিয়ে গেলেন গঙ্গা পাড়ের কোন রাজ্য থেকে।

ভারতের ইতিহাসে প্রথম রাজেন্দ্রই প্রথম সম্রাট যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের বেশ কিছু দেশে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মলাক্কা প্রণালীকে তাঁর নৌবহর এবং বাণিজ্যতরী দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষ্মের (Khmer) বা কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর শুধু যে নিবিড় বাণিজ্য সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা নয়, দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে স্থাপিত হয়েছিল গভীর হার্দিক সম্পর্কও। দুটি সাম্রাজ্যের মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প এবং ধর্মচিন্তার গভীর আদানপ্রদানও শুরু হয়েছিল। কম্বোজে অবস্থিত (আজকের কম্বোডিয়া) সুবিখ্যাত আঙ্কোর-ভাট মন্দির এবং ওই অঞ্চলের আরও অনেক বিক্ষিপ্ত মন্দির আজও সেই সুসম্পর্কের স্মৃতিই বহন করে চলেছে। কম্বোজ সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কারণে দক্ষিণ চিনের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক।  এবং শুধু এই পূর্বদিকেই নয়, সম্রাট প্রথম রাজেন্দ্রর এই বাণিজ্যিক নৌবহরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল পশ্চিম দিকের আরব উপমহাদেশ, উত্তর আফ্রিকা, আন্তোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এবং তুর্কিয়ে সাম্রাজ্য পর্যন্ত।

        আঙ্কোর ভাট মন্দির, কম্বোজ (কম্বোডিয়া) - চিত্র ঋণ - https://www.britannica.com/         

প্রথম-রাজেন্দ্র নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নাম “গঙ্গাইকোণ্ডাচোলাপুরম” (আধুনিক গঙ্গাকুণ্ডপুরম)। এই রাজধানীতে তিনি দুর্ধর্ষ রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির, সরোবর, স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন, কিন্তু কালের নির্মম নিয়মে সে সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

প্রথম রাজাধিরাজঃ (১০৪৪-৫২ সি.ই.) -প্রথম-রাজেন্দ্রর পুত্র প্রথম রাজাধিরাজ ১০৪৪ সি.ই.তে সিংহাসনে বসলেও, তিনি যুবরাজ হয়ে পিতার প্রশাসনে সহায়তা করেছে ১০১৮ সি.ই. থেকে। পিতার বহু অভিযানেই তিনি সফল সঙ্গী ছিলেন। কিন্তু চালুক্যরাজ প্রথম-সোমেশ্বর আহবমল্লের সঙ্গে যুদ্ধে ১০৫২ সি.ই.তে কোপ্পমের রণক্ষেত্রে তিনি প্রাণ হারান।

দ্বিতীয় রাজেন্দ্র দেব (১০৫২-৬৩ সি.ই.) –চালুক্যদের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু চোল সাম্রাজ্যের সীমা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বীর রাজেন্দ্র (১০৬৩-৭০ সি.ই.) - দ্বিতীয় রাজেন্দ্রর পর রাজা হলেন, তাঁর ভাই বীর রাজেন্দ্র। তাঁর সময়ে চালুক্য ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের আক্রমণ ও বিদ্রোহ দমনেই তাঁর রাজত্বকাল শেষ হয়েছিল। যদিও তিনি তাঁর কন্যার সঙ্গে চালুক্য রাজকুমারের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে, চালুক্যদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ (১০৭০-১১২২ সি.ই.) – বীর রাজেন্দ্রর পর তাঁর পুত্র অধিরাজেন্দ্র কিছুদিনের জন্য রাজা হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সিংহাসন অধিকারে রাখতে পারেননি বা অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন প্রথম কুলোত্তুঙ্গ। চোলরাজ প্রথম-রাজরাজের কন্যা কুণ্ডাবাইয়ের সঙ্গে ভেঙ্গির চালুক্য রাজ বিমলাদিত্যের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের পুত্র রাজরাজ বিষ্ণুবর্ধনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল চোলরাজা প্রথম-রাজেন্দ্রর কন্যা অম্মাঙ্গ দেবীর। তাঁদের পুত্রের নাম দ্বিতীয়-রাজেন্দ্র চালুক্য ওরফে প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ। প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ আবার বিবাহ করেছিলেন, চোলরাজ দ্বিতীয়-রাজেন্দ্রদেবের কন্যা মধুরান্তকীকে। অতএব অনুমান করা যায়, যেহেতু এই সময়ে চোল রাজপরিবারে সিংহাসনে বসার মতো যোগ্য কোন উত্তরাধিকারী পাওয়া যায়নি এবং যেহেতু তাঁর ধমনীতে চালুক্যদের থেকে চোল রক্তের পরিমাণ বেশি ছিল, সেহেতু প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। সে যাই হোক, প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ চোল সাম্রাজ্যের বিস্তার মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। যদিও হোয়সল, পরমার, প্রাচ্য-গঙ্গ, পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ বিবাদ লেগেই ছিল।

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গ ধর্মীয় এবং সাহিত্য বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন। তিনি শৈব ছিলেন, কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের জন্যেও অনেক দান করেছিলেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তিনি বৈষ্ণব আচার্য রামানুজমের ওপর বিরক্ত হয়ে, তাঁকে শ্রীরঙ্গম (ত্রিচিনোপল্লি) ছাড়তে বাধ্য করেন।  আচার্য রামানুজমকে হোয়সল রাজ বিত্তিগবিষ্ণুবর্ধনের মহীশূর রাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তিনি জয়গোণ্ডন, যিনি “কলিঙ্গত্তুপ্পারনি”-র রচয়িতা এবং আদিয়ারক্কুনাল্লারের, যিনি “শিলপ্পধিকারম”-গ্রন্থের রচয়িতা, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

 পরবর্তী চোলরাজা

প্রথম-কুলোত্তুঙ্গর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিক্রম চোল (১১২২-৩৩ সি.ই.)। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সময়ে আচার্য রামানুজম আবার চোলরাজ্যের শ্রীরঙ্গমে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর পরে রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৩৩-৪৭ সি.ই.), দ্বিতীয়-রাজরাজ (১১৪৭-৬২ সি.ই.) এবং দ্বিতীয়-রাজাধিরাজ (১১৬২-৭৮ সি.ই.)। এঁরা সকলেই দুর্বল রাজা ছিলেন এবং এঁদের সময়ে চোল সাম্রাজ্য তার গৌরব দ্রুত হারাতে থাকে। হোয়সল, সিংহল, কেরালা সকলেই চোল সাম্রাজ্য থেকে নিজেদের স্বাধীন করে ফেলেছিলেন। তারপরে তৃতীয়-কুলোত্তুঙ্গ (১১৭৮-১২১৬ সি.ই.) দীর্ঘদিন রাজত্ব করলেও, অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করতে পারেননি। এই সময় থেকেই পাণ্ড্য রাজাদের আধিপত্যে চোলরাজ্যের মূল সীমানাও খণ্ডিত হতে থাকে। মোটামুটি ১২৬৭ সি.ই.তে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে চোলরাজ্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল।

চলবে...



সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৭

ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৬ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

সপ্তদশ পর্বাংশ  


৪.৮.৭ কদম্ব

কদম্বদের সম্পর্কে শোনা যায়, তাঁরা মানব্য গোত্রের ব্রাহ্মণ ছিলেন। শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা এক ব্রাহ্মণ, নাম ময়ূরশর্মা, একবার পল্লব রাজ্যের রাজধানী কাঞ্চীতে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি কর্ণাটকে একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং রাজধানী ছিল বনবাসীতে। এই ঘটনা ঘটেছিল খ্রীষ্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এরপরে সমুদ্রগুপ্তের দাক্ষিণাত্য অভিযানে পল্লবরাই বিধ্বস্ত এবং গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। অতএব প্রায় অস্তিত্বহীন কদম্ববংশের ইতিহাসে প্রথম সাড়া পাওয়া গেল, রাজা ককুস্থবর্মনের সময়। এই সময় কদম্ব রাজ্যের পরিসীমা এবং প্রভাব চোখে পড়ার মতো পর্যায়ে এসেছিল। তারপর ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দশকে যখন রবিবর্মন রাজা হলেন, গঙ্গ এবং পল্লবদের সঙ্গে তাঁকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তিনি তাঁর নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, হালসীতে (বেলগাম জেলা)। কিন্তু এরপর বাতাপির চালুক্য বংশের উত্থানে কদম্বরা আবার অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এই কদম্বদের আবার দেখা পাওয়া যায় দশম শতাব্দীর শেষদিকে, রাষ্ট্রকূট রাজ্যের পতনের সময়। এই কদম্বদের ছোট ছোট শাখা দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে তাঁদের অস্তিত্ব স্থানীয় ভাবে বজায় রেখেছিলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত!

 

৪.৮.৮ তলকড়ের গঙ্গ

গঙ্গদের উৎপত্তি শোনা যায় পৌরাণিক ইক্ষ্বাকু বংশ থেকে, এমনও শোনা যায় তাঁদের আদি নিবাস ছিল গঙ্গার তীরে অথবা তাঁরা মুনি কণ্বর উত্তরসূরি। মহীশূরের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে গঙ্গদের রাজ্য ছিল এবং সেই সময়ে তাঁদের রাজ্যকে গঙ্গবাড়ি বলা হত। মোটামুটি চতুর্থ শতাব্দীর কোন সময়ে, এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দিদিগ বা কোঙ্গনিবর্মন এবং মাধব। প্রথম দিকে এই রাজ্যের রাজধানী ছিল কুলুবলে (কোলার?)। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি গঙ্গরাজা হরিবর্মা রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন কাবেরী নদীর তীরে, তলবনপুর বা তলকড়ে। গঙ্গদের এক রাজা দুর্বিনীত পল্লবদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে গঙ্গদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষায় “পৈশাচী বৃহৎ-কথা” রচনা করেছিলেন। গঙ্গদের আরেক বিখ্যাত রাজা ছিলেন শ্রীপুরুষ (৭২৬-৭৬ সি.ই.)। তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রকূটদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পেরেছিলেন এবং পল্লবদের পর্যুদস্ত করেছিলেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে গঙ্গরাজাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলেন ভেঙ্গির চালুক্যরা এবং মালখেড়ের রাষ্ট্রকূটরা। এই সময় গঙ্গরাজ শিবমার বন্দী হয়েছিলেন এবং তাঁর রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব নিরুপম। এরপর থেকে গঙ্গ রাজারা নানান শক্তিশালী রাজ্যের সামন্তরাজা হিসেবেই রাজ্য পরিচালনা করতেন, যেমন রাষ্ট্রকূট, হোয়সল এবং চোল।

গঙ্গ রাজারা সাধারণতঃ জৈন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এই বংশের রাজা দুর্বিনীত জৈন আচার্য পূজ্যপাদের শিষ্য ছিলেন। এই বংশের আরেক রাজা চতুর্থ-রাজমল্ল এবং তাঁর সেনাপতি ও মন্ত্রী চামুণ্ডরায় ৯৮৩ সি.ই.-তে শ্রবণবেলগোলার সুবিখ্যাত গোমতেশ্বর মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

 

৪.৮.৯ দ্বারসমুদ্রের হোয়সল

হোয়সল বা পোয়সলরা দাবি করেন, তাঁরা “যাদবকূলতিলক” বা “চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়”। তবে এঁদের সম্বন্ধে আরেকটি প্রবাদ শোনা যায়, এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বীর সাল কোন এক মুনির নির্দেশে, লৌহশূল দিয়ে একা একটি বাঘকে হত্যা করেছিলেন। তার থেকেই এই বংশের নাম হোয়সল বা পোয়সল (হোয় বা পোয় কথার অর্থ হত্যা এবং সাল থেকেই সল)।

হোয়সল রাজত্বের উন্নতির সূচনা একাদশ শতাব্দীর শুরুতে। তার আগে এঁরা মহীশূরের ক্ষুদ্র অঞ্চলের রাজা ছিলেন। এই সময় তাঁরা চোল বা কল্যাণের চালুক্য রাজাদের অনুগত রাজ্য হয়ে নিজেদের শক্তি এবং প্রভাব বাড়াতে শুরু করেছিলেন। মোটামুটি ১০৪৫ সি.ই.-তে এই বংশের রাজা বিনয়াদিত্য এবং তাঁর পুত্র এরিয়ঙ্গ, চালুক্য রাজাদের সহযোগী হয়ে অনেক যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। এরপর রাজা বিত্তিগ বিষ্ণুবর্ধনের (১১১০-৪০ সি.ই.) সময় হোয়সল রাজ্য দাক্ষিণাত্যের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এই রাজা তাঁর রাজধানী ভেলাপুর (বেলুর, হাসান জেলা) থেকে সরিয়ে দ্বারসমুদ্রে (হালেবিদ, হাসান জেলা) নিয়ে আসেন। এই সময় তিনি চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও, প্রায় স্বাধীন রাজা হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু কখনই কোন “রাজা” উপাধি গ্রহণ করেননি। চালুক্য রাজাদের প্রতিনিধি হয়ে, তিনি সমসাময়িক, চোল, মাদুরার পাণ্ড্য, মালাবার, দক্ষিণ কানারার তুলুব, গোয়ার কদম্ব সকলের বশ্যতা আদায় করেছিলেন। এই সময় রাজা বিষ্ণুবর্ধন সম্পূর্ণ মহীশূর এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলের অধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ জৈন ছিলেন, কিন্তু পরে আচার্য রামানুজের সংস্পর্শে এসে তিনি বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

রাজা বিষ্ণুবর্ধনের পর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন, তাঁর নাতি প্রথম-বীরবল্লাল (১১৭২-১২১৫ সি.ই.)। তিনিই প্রথম নিজেকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তিনি চালুক্য এবং যাদবদের পরাজিত করে, স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর থেকেই হোয়সল রাজত্বের পতনের শুরু এবং শেষ হোয়সল রাজা তৃতীয়-বীরবল্লাল ১৩১০ সি.ই.তে সেনাপতি মালিক কাফুরের হাতে পরাজিত হন এবং তাঁকে বন্দী করে দিল্লি আনা হয়েছিল। চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হোয়সল বংশ লুপ্ত হয়ে যায়।

হোয়সল রাজাদের স্থাপত্য কীর্তি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তাঁদের রাজত্ব কালে অজস্র মন্দির ও স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে বেলুর ও হালেবিদের স্থাপত্যগুলি শিল্প সুষমায় অনবদ্য।

 

৪.৮.১০ কাঞ্চীর পল্লব

পল্লবদের উৎস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ আছে। অনেকে বলেন, তাঁরা আদিতে পহ্লব অর্থাৎ পার্থিয়ান, দক্ষিণ ভারতে এসে পল্লব হয়ে গিয়েছিলেন। পৌরাণিক কথায় শোনা যায়, তাঁরা দ্রোণাচার্য এবং অশ্বত্থামার বংশধর –অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-যোদ্ধা। অনেকে বলেন তাঁরা দক্ষিণ ভারতের দেশীয় গোষ্ঠী। তবে তাঁরা যে উত্তরভারত থেকেই দক্ষিণে গিয়েছিলেন, তার কিছু যুক্তি আছে, যেমন, পল্লবদের প্রাচীন রাজভাষা ছিল প্রাকৃত এবং পল্লবরা শুরু থেকেই সংস্কৃতের পৃষ্ঠপোষক। এর আগে কদম্ববংশের প্রতিষ্ঠাতা ময়ূরশর্মার লিপি থেকে আমরা জেনেছি, “পল্লবক্ষত্রিয়”, অতএব পল্লবরা উত্তরভারতের ক্ষত্রিয় এমন অনুমান হয়তো করা যায়।

খ্রীষ্টিয় তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীতে কিছু প্রাকৃত লিপি থেকে পল্লবদের প্রথম ইতিহাস জানা যায়। এই লিপিতে বেশ কয়েকজন রাজার নাম পাওয়া যায়, যেমন বপ্পদেব, শিবস্কন্দবর্মন, বুদ্ধি (বা অঙ্কুর) এবং বীরবর্মন। রাজা বপ্পদেব পল্লব বংশের প্রতিষ্ঠাতা কিনা সঠিক জানা না গেলেও, তিনিই এই রাজবংশকে দক্ষিণে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। তাঁর সময়ে তেলুগুর “অন্ধ্রপথ” এবং তামিলদের “তোণ্ডামণ্ডলম”- তাঁর রাজ্যের দুই প্রধান অঞ্চল ছিল এবং এই দুই অঞ্চলে তাঁর প্রশাসনিক কার্যালয় ছিল ধ্যানকটা (ধরণীকোট্টা, অমরাবতীর কাছে) এবং কাঞ্চী (কাঞ্জিভরম)। তাঁর পুত্র শিবস্কন্দবর্মন এই রাজত্ব হয়তো আরো দক্ষিণে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন, নচেৎ তিনি অশ্বমেধ, বাজপেয় এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের আয়োজন করতে পারতেন না। আরেকজন পল্লব রাজার নাম পাওয়া যায় সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ লিপিতে, কাঞ্চীর রাজা বিষ্ণুগোপ। দাক্ষিণাত্য অভিযানে সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে এই রাজার যুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজা বিষ্ণুগোপের সময় কাল চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামঝি কোন সময়ে। অতএব পল্লবদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর্ব সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের সময় থেকে একথা সহজেই অনুমান করা যায়।


    গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে পল্লবদের দ্রুত উত্থান শুরু হয়েছিল, মোটামুটি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে। এই সময় থেকেই পল্লবরা দক্ষিণভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিলেন।

রাজা সিংহবিষ্ণুঃ পল্লবদের এই পর্যায়ে রাজা সিংহবিষ্ণু চোলদের পরাস্ত করে, কাবেরি নদী পর্যন্ত এবং তারপরেও আরও দক্ষিণে পাণ্ড্য, কালাভ্র এবং আরও কিছু অঞ্চল অধিকার করে নিয়েছিলেন।

রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে পিতা সিংহবিষ্ণুর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন। তাঁর সময় থেকেই পল্লব এবং চালুক্যদের মধ্যে নিরন্তর বিবাদ শুরু হয়েছিল, দুজনেরই উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভারতে অবিসম্বাদিত প্রতিপত্তি স্থাপনা। এই সময়ের উভয় পক্ষীয় শিলালিপিতেই অন্যপক্ষকে পরাজিত করার বিবরণ বারবার লেখা হয়েছে। রাজা মহেন্দ্রবর্মন প্রথম দিকে জৈন ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে স্বামী আপ্পার প্রভাবে শৈব হয়েছিলেন। তাঁর সময়েই পাহাড় কেটে প্রচুর মন্দির নির্মাণ হয়েছিল। তিনি নিজে “মত্তবিলাস-প্রহসন” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার কথা আগেই বলেছি।

প্রথম নরসিংহবর্মনঃ প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র, পিতার মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন, সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকের কোন সময়ে। ভীষণ শক্তিশালী এবং সাহসী এই রাজা চালুক্যদের ভয়ংকর আক্রমণ করেছিলেন, এবং ৬৪২ সি.ই.-র যুদ্ধে তিনি চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে পরাজিত এবং হত্যা করেছিলেন। তাঁর সময়ে তিনি দুবার নৌ-অভিযান করে সিংহলও আক্রমণ করেছিলেন। নরসিংহবর্মন শুধু যুদ্ধ নয়, মন্দির স্থাপত্যেও অনবদ্য নিদর্শন রেখে গেছেন, তাঁর পিতার মতো তিনিও পাহাড় কেটে অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন, যার মধ্যে মহাবলিপুরম বা মামল্লপুরম সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। নরসিংহবর্মনের রাজত্বকালেই চীনের বৌদ্ধ পর্যটক হুয়ান সাং কাঞ্চী গিয়েছিলেন এবং বেশ কিছুদিন ছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় কাঞ্চী শহরে প্রায় শতাধিক সংঘারাম ছিল এবং সেখানে প্রায় দশ হাজার মহাযানী সন্ন্যাসী বিদ্যাচর্চা করতেন। শহরে প্রায় আশিটি দেবমন্দির দেখেছিলেন এবং শহরে অনেক নির্গ্রন্থ (জৈন) সন্ন্যাসীও বাস করতেন।

প্রথম পরমেশ্বরবর্মনঃ মোটামুটি ৬৫৫ সি.ই.-তে পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করা ছাড়া তাঁর তেমন কোন কীর্তির কথা জানা যায় না।

দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনঃ সপ্তম শতাব্দীর শেষ দশকে তিনি পিতার সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকাল শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্যে বিখ্যাত। তিনি অনেকগুলি বিখ্যাত মন্দির, যেমন রাজ সিংহেশ্বর এবং কাঞ্চীর “ঐরাবতেশ্বর” মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। মামল্লপুরমের সমুদ্রতট মন্দিরে তাঁরও অবদানের কথা শোনা যায়। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভার অলংকার ছিলেন দণ্ডিন, যাঁর কথা আগেই বলেছি। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনের মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে। তাঁর মৃত্যুর পর রাজ পরিবারের মধ্যেই তীব্র বিবাদ এবং কলহ উপস্থিত হয়েছিল। শোনা যায় বেশ কিছুদিন বিশৃঙ্খলার পর, জনগণের বিপুল সমর্থনে রাজা হয়েছিলেন, নন্দিবর্মন। তাঁর পিতা হিরণ্যবর্মন ছিলেন, সিংহবিষ্ণুর ভাইয়ের বংশধর। নন্দিবর্মনের রাজত্বকালের শুরুতেই চালুক্যরা আবার পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, যদিও নন্দিবর্মন তাঁদের প্রতিহত করে, পল্লব রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। নন্দিবর্মন প্রায় পঁয়ষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। নন্দিবর্মণের পর রাজা হয়েছিলেন দন্তিবর্মন। শোনা যায় তিনি রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা রেবার পুত্র। এই রাজকুমারী রেবা ছিলেন দন্তিদুর্গার কন্যা। কিন্তু এই বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চালুক্যরাজ তৃতীয় গোবিন্দ ৮০৪ সি.ই.-তে কাঞ্চী আক্রমণ করেছিলেন এবং দন্তিবর্মনকে পরাজিত করেছিলেন। দন্তিবর্মনের (৭৭৬-৮২৮সি.ই.) রাজত্বকালে পাণ্ড্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তাঁর পরবর্তী রাজারা হলেন নন্দি (৮২৮-৫১ সি.ই.), নৃপতুঙ্গবর্মন (৮৫১-৭৬ সি.ই.) এবং অপরাজিতবর্মন (৮৭৬-৯৫ সি.ই.)। তাঁর সময়েই চোলরাজা প্রথম আদিত্য পল্লবরাজ্যে চরম আঘাত হানেন এবং পল্লবদের রাজ্যচ্যুত করেছিলেন। এরপর দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস থেকে পল্লবদের যুগ সমাপ্ত হল।

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৮ "


সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১৬

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  


[এর আগের পর্বাংশ - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৫ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

ষোড়শ পর্বাংশ 


৪.৮.৩ কল্যাণের পশ্চিমা-চালুক্য              

শোনা যায় এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা তৈলপ ছিলেন, চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মনের কোন কাকার বংশধর। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব মানেন না। এঁরা বলেন, নাম না জানা কোন গুরুত্বহীন গোষ্ঠীর রাজা ছিলেন তৈলপ। সে যাই হোক, তৈলপের জীবনের শুরু রাষ্ট্রকূটদের সামন্তরাজা হিসেবে। পরমার রাজা যখন রাজধানী মান্যখেটের পতন ঘটালেন, সেই ডামাডোলের মধ্যে তৈলপ রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কর্ককে হয় হত্যা করেছিলেন, অথবা দূর কোন নিরাপদ জায়াগায় পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলেন। এরপর পারিবারিক অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে রাষ্ট্রকুটরা যখন নাজেহাল, তখন তৈলপ চতুর্থ ইন্দ্রকে পরাস্ত করে, রাষ্ট্রকূট রাজ্য অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তৈলপ দক্ষিণ গুজরাটের লাট জয় করেছিলেন, কিন্তু বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি, অনহিলওয়াড়ার মূলরাজ চালুক্য, তৈলপের প্রশাসক বারপ্পকে লাট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শোনা যায়, তৈলপ কুন্তল (কর্ণাটের অংশ), চেদি এবং চোলদের পরাজিত করেছিলেন। যদিও তাঁর রাজ্যের উত্তর সীমান্তে পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জ বারবার হানা দিচ্ছিলেন। শোনা যায় শেষ যুদ্ধে তৈলপ বাকপতি-মুঞ্জকে বন্দী করে, তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এখান থেকেই পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে পরমার রাজাদের চিরশত্রুতার সূত্রপাত হল। তৈলপের মৃত্যু হয় ৯৯৭ সি.ই.-তে, তারপর রাজা হলেন তাঁর পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ সি.ই.)।

তাঁর রাজত্বকালে চোল রাজা প্রথম-রাজারাজ চালুক্য রাজ্যে প্রভূত ক্ষতি এবং গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু সত্যাশ্রয় অচিরেই চোলদের এই ধাক্কা সামলে তাঁদের সমুচিত শিক্ষাও দিয়েছিলেন। সত্যাশ্রয়ের পরে রাজা হলেন তাঁর ভাইপো পঞ্চম-বিক্রমাদিত্য, খুব কমদিনই তিনি রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। পরমার রাজা ভোজ তাঁকে চূড়ান্ত পরাস্ত করে, পরমার রাজা বাকপতি-মুঞ্জের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। এরপরে রাজা ভোজ দাক্ষিণাত্যের অধিকার সুরক্ষিত করতে শক্তিশালী অনহিলওয়াড়ার প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজাদের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চম-বিক্রমাদিত্যর পরবর্তী রাজা দ্বিতীয় জয়সিংহ জগদেকমল্ল (১০১৬-৪২ সি.ই.), মালবের পরমার রাজা ভোজের এই স্বপ্ন পূর্ণ হতে দেননি।

প্রথম সোমেশ্বর(১০৪২-৬৮ সি.ই.)

১০৪২ সি.ই.-তে রাজা হলেন, দ্বিতীয় জয়সিংহের পুত্র, প্রথম সোমেশ্বর। তিনি চোল এবং পরমারদের আক্রমণ করলেন, এবং পরমার রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে মালব রাজ্যের মাণ্ডু এবং ধারা অঞ্চল অধিকার করে নিলেন। রাজা ভোজের অনুপস্থিতিতে, পরমার দুর্বল রাজারা প্রথম সোমেশ্বরের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে না পেরে, উজ্জয়িনী পালিয়ে গেলেন। কিন্তু সেখানেও ধাওয়া করলেন প্রথম সোমেশ্বর এবং উজ্জয়িনী জয় করলেন। এর মধ্যে রাজা ভোজ রাজধানীতে ফিরে উজ্জয়িনী উদ্ধার করে, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু এরপর অনহিলওয়াড়ার রাজা প্রথম ভীম এবং কলচুরি রাজা লক্ষ্মী-কর্ণের যৌথ আক্রমণে পরমারদের দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে এল। এই যুদ্ধে রাজা ভোজ মারা গেলেন, এবং পরমার রাজত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল। এই সময়ে ভোজের পরবর্তী পরমাররাজা জয়সিংহ, অনহিলওয়াড়া এবং কলচুরিদের থেকে রক্ষা পেতে, সোমেশ্বরের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সোমেশ্বর এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না, তিনি চিরশত্রু পরমারদের সঙ্গে সখ্যতা করে, প্রথম ভীম এবং লক্ষ্মীকর্ণকে পরাস্ত করে, জয়সিংহকে পরমার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। তিনি জানতেন মধ্য ভারতের যে কোন শক্তিই প্রবল হলে, তাঁর চালুক্যরাজ্যের পক্ষে তাঁরা বিপজ্জনক।

যুদ্ধে প্রথম সোমেশ্বরের প্রধান সহায় ছিলেন, তাঁর পুত্র ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। মধ্যভারত নিয়ন্ত্রণে আসার পর, প্রথম সোমেশ্বর উত্তরভারতের দিকে মন দিলেন। গাঙ্গেয় দোয়াব অঞ্চলের প্রতিহার রাজারা তখন দুর্বল, অতএব চালুক্য সৈন্যরা অতি সহজেই দোয়াব এবং কনৌজ জয় করে নিলেন। তারপর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে চালুক্য বাহিনী, মিথিলা, মগধ, অঙ্গ, বঙ্গ এবং গৌড় পর্যন্ত বিনা বাধায় চলে এসেছিলেন। তখন গৌড়ের পালরাজারাও প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিলেন। যদিও কামরূপের রাজা রত্নপাল চালুক্য সৈন্যদের পরাস্ত করেছিলেন এবং এরপর চালুক্য সৈন্যবাহিনী দক্ষিণ কোশলের পথে নিজেদের ঘরে ফিরেছিলেন। এ ভাবেই প্রথম সোমেশ্বরের আমলে প্রায় গোটা ভারতবর্ষই চালুক্য রাজাদের শক্তি টের পেয়েছিল।

প্রথম সোমেশ্বর তাঁর নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন কল্যাণে (কল্যাণী, হায়দ্রাবাদ)। ১০৬৮ সি.ই.তে তাঁর মৃত্যুও ঘটেছিল অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে। শোনা যায় তিনি মারাত্মক এক জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং নিরাময় অসম্ভব জেনে, রীতিমতো উৎসব করে, মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে তুঙ্গভদ্রার জলে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।

তাঁর মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় সোমেশ্বর আহবমল্ল, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। যদিও যাবতীয় যুদ্ধ বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল, তাঁর ভাই ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর, কিন্তু প্রথম দিকে সিংহাসন নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কোন বিবাদ ছিল না। দ্বিতীয় সোমেশ্বরের স্বল্পস্থায়ী রাজত্বে তেমন কিছু কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায় না, তাঁর সময়ে একটাই প্রধান ঘটনা হল, ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বন্ধু মালবের রাজা জয়সিংহকে আক্রমণ করে, তিনি পরাজিত করেছিলেন।

১০৭৬ সি.ই.তে দ্বিতীয় সোমেশ্বরের মৃত্যুর পর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য রাজা হয়েছিলেন, এবং সেই বছর থেকে চালুক্য-বিক্রমাঙ্ক অব্দ শুরু হয়। এই পশ্চিমা-চালুক্য বংশের সব থেকে সফল ও উজ্জ্বল রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য। তিনি শিল্প, শিক্ষা এবং জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কাশ্মীরি লেখক বিলহনের গুণমুগ্ধ ছিলেন, বিলহনের লেখা “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত”, রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যকে অমর করে দিয়ে গেছেন। তাঁর রাজসভার পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর, হিন্দু রীতিনীতির ওপর “মিতাক্ষরা” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর পুত্র তৃতীয় সোমেশ্বর ভূলোকমল্ল ১১২৬ থেকে ১১৩৮ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় জগদেকমল্ল রাজত্ব করেছিলেন ১১৩৮-১১৫১ সি.ই.। তারপর সিংহাসনে বসেন, তাঁর ভাই নুরমডি তৈল। কিন্তু এরপর কলচুরি রাজ্যের রণমন্ত্রী, ভিজ্জলার মন্ত্রণা এবং প্ররোচনায় চালুক্য রাজ্যের সামন্তরাজাদের মধ্যে বিদ্রোহ এবং ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তাঁরা নুরমডি তৈলকে ১১৫৭ সি.ই.তে সিংহাসন চ্যুত করেন। নুরমডি তৈলর পুত্র ভীর সোম বা চতুর্থ সোমেশ্বর ১১৮২ সি.ই.তে পিতৃরাজ্য কিছুটা উদ্ধার করে ১১৮৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, কিন্তু দেবগিরির যাদব এবং দ্বারসমুদ্রের হোয়সল রাজ্যের প্রবল আক্রমণে পশ্চিমা-চালুক্যবংশ ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল। 

[Image courtsey www.alamy.com]

৪.৮.৪ দেবগিরির যাদব

মহাভারতের ভগবান শ্রীকৃষ্ণর যদু বংশ থেকে যাদবদের উৎপত্তি, এমনই প্রবাদ শোনা যায়। যদিও, তাঁদের রাজ্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল, মান্যখেড়ের রাষ্ট্রকূট এবং পশ্চিমা-চালুক্যদের সামন্তরাজা হিসাবে। পশ্চিমা-চালুক্যদের দুর্বলতার সুযোগে যাদবদের উত্থানের শুরু এবং পরবর্তী কালে তাঁরা বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, পঞ্চম ভিল্লাম। তাঁর রাজধানী ছিল দেবগিরি (হায়দ্রাবাদ জেলার আধুনিক দৌলতাবাদ)। তিনি খুব বেশি রাজত্ব বিস্তার করতে পারেননি, কারণ ১১৯১ সি.ই.-তে হোয়সল রাজ প্রথম বীর-বল্লালের হাতে তিনি পরাস্ত হন এবং খুব সম্ভবতঃ প্রাণও হারান।

ভিল্লমের পুত্র জৈতুগি বা প্রথম জৈত্রপাল (১১৯১-১২১০ সি.ই.)। তিনি তৈলঙ্গ (ত্রিকলিঙ্গ) রাজ রুদ্রদেবকে পরাজিত করেন এবং হত্যাও করেন, তারপর রাজা রুদ্রদেবের ভাইপো গণপতিকে সিংহাসনে বসিয়ে কাকতীয় বংশের সূচনা করেছিলেন। এভাবেই যাদবরা সমসাময়িক রাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে থাকেন।

যাদব বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন, জৈত্রপালের পুত্র সিংহন (১২১০ - ১২৪৭ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু অঞ্চল এবং রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনি ১২১৫ সি.ই.তে বীরভোজকে পরাস্ত করে, কোলাপুরের সিলাহারা অঞ্চল এবং পরনালা বা পনহালা দুর্গ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তাঁর দাদুর হত্যাকারী হোয়সল রাজ দ্বিতীয় বীরবল্লালকে পরাস্ত করে, কৃষ্ণা নদীর অপর পাড়ে হটিয়ে দিয়েছিলেন। সিংহন এরপরে মালবের রাজা অর্জুনবর্মন, ছত্তিশগড়ের চেদি রাজা জাজ্জল, গুজরাটের বাঘেলা রাজাদের আক্রমণ করেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন।

সিংহন অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী রাজা ছিলেন, তাঁর সভায় বিখ্যাত কিছু গুণী এবং বিদ্বানেরা বিশেষভাবে সম্মানীয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সারঙ্গধর, সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম “সঙ্গীত-রত্নাকর”। এই গ্রন্থের টীকা এবং ভাষ্য রচনা করেছিলেন, স্বয়ং রাজা সিংহন। সিংহনের সভায় আরেকজন বিদ্বান ছিলেন, শার্ঙ্গদেব, বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তিনি খান্দেশ জেলার পাটনায় একটি মঠ (মহাবিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে ভাস্করাচার্যের “সিদ্ধান্ত-শিরোমণি” এবং অন্যান্য জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হত।

সিংহনের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর নাতি কৃষ্ণ বা কনহার (১২৪৭-৬০ সি.ই.)। তাঁকেও মালব, গুজরাট এবং কোঙ্কনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তিনি হিন্দু ধর্মের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর রাজত্বের সময়েই জলহনের কাব্য সংকলন “সূক্তিমুক্তাবলী” এবং আমলানন্দর বেদান্ত ভাষ্য - “বেদান্ত-কল্পতরু” রচিত হয়েছিল। কৃষ্ণের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর ভাই মহাদেব (১২৬০-৭১ সি.ই.)। তিনি বেশ কিছু রাজ্য, যেমন সিলাহারদের উত্তরকোঙ্কন, কর্ণাটক, গুজরাটের লাট এবং কাকতীয় রাণী রুদ্রাম্বার রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। মহাদেব এবং তাঁর পরবর্তী রাজা রামচন্দ্র বা রামরাজার (১২৭১-১৩০৯ সি.ই.) মন্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত হেমাদ্রি বা হেমাদপন্ত। যিনি “চতুর্বর্গ–চিন্তামণি” নামে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। শোনা যায় তিনি দাক্ষিণাত্যের মন্দির স্থাপত্যের নতুন প্রথা সৃষ্টি করেছিলেন এবং মোড়ি[1] লিপির সংস্কার করেছিলেন। আরও শোনা যায় রাজা রামচন্দ্র সন্ন্যাসী জ্ঞানেশ্বরের শিষ্য ছিলেন, পণ্ডিত জ্ঞানেশ্বর ১২৯০ সি.ই.-তে মারাঠী ভাষায় প্রথম ভাগবত-গীতার ভাষ্য রচনা করেছিলেন।

রামচন্দ্রের রাজত্বকালে ১২৯৪ সি.ই.-তে আলাউদ্দিন খিলজি হঠাৎ দেবগিরি অবরোধ করেন, রামচন্দ্র তখন দেবগিরি দুর্গেই ছিলেন। তাঁর পুত্র শংকর তাঁকে মুক্ত করতে, বহু প্রয়াস করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন রামচন্দ্র বাধ্য হলেন আলাউদ্দিনের সঙ্গে এক তরফা চুক্তি করতে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, আলাউদ্দিন “৬০০ মণ মুক্তা, ,০০০ রৌপ্যমুদ্রা, ,০০০ রেশম বস্ত্র এবং প্রচুর দামি জিনিষপত্র” আদায় করলেন এবং দিল্লিতে বাৎসরিক রাজস্ব পাঠানোর শপথ করালেন। এর পর আলাউদ্দিন নিজে যখন দিল্লির মসনদে বসলেন, তিনি সেনাপতি মালিক কাফুরকে পাঠিয়ে ১৩০৭ সি.ই.-তে দেবগিরি অধিকার করলেন এবং পরাজিত রামচন্দ্রকে বন্দী করে দিল্লি নিয়ে গেলেন। সম্রাট আলাউদ্দিন তাঁর নিঃশর্ত আনুগত্যের বিনিময়ে মুক্তি দিলেন, কিন্তু ১৩০৯ সি.ই.-তে রামচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছিল। রামচন্দ্রের পুত্র শংকর দিল্লিকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে দিলে, ১৩১২ সি.ই.-তে মালিক কাফুর আবার দেবগিরি আক্রমণ করে শংকরকে হত্যা করেন। এরপরেও রামচন্দ্রের জামাই হরপাল যখন মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেন, সুলতান মুবারকের আদেশে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল[2]। এভাবেই অতি নিদারুণভাবে যাদববংশের সমাপ্তি ঘটেছিল। 

৪.৮.৫ ওয়ারাঙ্গালের কাকতীয়

কাকতীয় বংশের উৎপত্তি সঠিক জানা যায় না। কেউ বলেন “কাকত” শব্দের অর্থ কাক, সেখান থেকেই বংশের নাম কাকতীয়। কেউ বলেন স্থানীয় দেবী দুর্গার এক রূপ “কাকতী” সেখান থেকে এই বংশের নাম এসেছে। আবার পৌরাণিক প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন তাঁরা সূর্য বংশীয় ক্ষত্রিয়। কিন্তু নেল্লোর জেলার কয়েকটি শিলালিপিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে কাকতীয়রা ছিলেন শূদ্র।

প্রথমদিকে কাকতীয়রাও চালুক্যরাজাদের সামন্তরাজা ছিলেন। চালুক্য সাম্রাজ্যের পতনের সময়, তাঁরা তেলেঙ্গানা অঞ্চলে প্রথম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বহু উত্থান ও পতনের পর, যাঁদের সমাপ্তি ঘটে বাহমনি সুলতান আহমদ শাহের হাতে ১৪২৪-২৫ সি.ই.-তে।

প্রথম দিকে কাকতীয় রাজাদের রাজধানী ছিল অনমাকোণ্ডা বা হনুমাকোণ্ডাতে, পরবর্তী কালে তাঁরা রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ারাঙ্গাল বা ওরুঙ্গল্লুতে। প্রথম যে রাজা এই বংশের গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি প্রোলরাজ মোটামুটি ১১১৭-১৮ সি.ই.-তে। তিনি পশ্চিমা-চালুক্যদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত এবং দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর পরে রুদ্র ১১৬০ সি.ই. অব্দি এবং তাঁর ভাই মহাদেব ১১৯৯ সি.ই. পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এরপর রাজা হয়েছিলেন, রাজা মহাদেবের পুত্র, রাজা গণপতি, তিনি প্রায় বাষট্টি বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর সময়েই কাকতীয় রাজত্বের গৌরব সর্বোচ্চ শিখরে উঠেছিল। তাঁর পরাক্রমে চোল, কলিঙ্গ, যাদব, কর্ণাটের লাট এবং বলনাড়ুরা পরাস্ত হয়েছিলেন।

রাজা গণপতির পুত্র না থাকায়, তাঁর সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর কন্যা রুদ্রাম্বা ১২৬১ সি.ই.-তে। শোনা যায় তিনি পিতার রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন এবং প্রায় তিরিশ বছর রাজত্বের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পৌত্র প্রতাপরুদ্রদেব। এই প্রতাপরুদ্রদেবকে অমর করে গিয়েছিলেন, তাঁর সমসাময়িক কবি বৈদ্যনাথ, তাঁর রচিত “প্রতাপরুদ্রীয়” কাব্যে। এই প্রতাপরুদ্রই ছিলেন কাকতীয় বংশের শেষ রাজা এরপর সেনাপতি মালিক কাফুরের দাক্ষিণাত্য অভিযানে কাকতীয় বংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। শোনা যায় তাঁদের বংশের কোন শাখা বস্তার (মধ্যপ্রদেশ) অঞ্চলে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

৪.৮.৬ শিলাহার

শোনা যায় শিলাহার বংশের উৎপত্তি পৌরাণিক রাজা জীমূতবাহনের থেকে, যিনি বিদ্যাধরের রাজা ছিলেন এবং নাগদের রক্ষা করার জন্যে, নিজেকে গরুড়ের আহার হিসেবে উৎসর্গ করেছিলেন। এই কাহিনীর মূল্য যাই থাক, শিলাহাররা সম্ভবতঃ ক্ষত্রিয় ছিলেন।

যতদূর জানা যায়, শিলাহারদের তিনটি শাখা ছিল এবং তাঁদের আদি বাসভূমি ছিল টগর বা টের নামক কোন অঞ্চলে। প্রাচীনতম শাখা অষ্টম শতাব্দীর শেষ থেকে একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত দক্ষিণ কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন এবং তাঁদের রাজধানী ছিল গোয়া। শিলাহারদের দ্বিতীয় শাখা উত্তর কোঙ্কনে রাজত্ব করেছিলেন, নবম শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় সাড়ে চারশো বছর। তাঁদের রাজত্বের মধ্যে ছিল থানা, রত্নগিরি এবং সুরাট জেলার কিছু অংশ। তাঁদের রাজধানী ছিল থানা। তৃতীয় শিলাহার শাখা একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে, তাঁদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কোলাপুর, সাতারা এবং বেলগামে। শিলাহারদের প্রথম দুই শাখা মোটামুটি কোন না কোন শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধীনে রাজত্ব করতেন, যেমন, রাষ্ট্রকূট, চালুক্য এবং যাদব প্রমুখ। সে দিক থেকে শিলাহারদের তৃতীয় শাখা মাঝে মধ্যে স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। শোনা যায় এই শাখার এক রাজা বিজয়াদিত্য বা বিজয়ার্ক, চালুক্যবংশের পতনের জন্য কলচুরি মন্ত্রী বিজ্জলকে সাহায্য করেছিলেন। এই শাখার সব থেকে উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন ভোজ (১১৭৫-১২১০ সি.ই.), শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পরে যাদব রাজ সিংহন, শিলাহারদের এই রাজ্যটি অধিকার করে নিয়েছিলেন।



[1] সংস্কৃতর দেবনাগরি লিপি ভেঙে মোড়ি লিপি বা মুদিয়া লিপি মারাঠিভাষার প্রথম লিপি, যে লিপির আধুনিক সংস্করণ আজও প্রচলিত। 

[2] হয়তো ভয়ংকর এই ঘটনার স্মৃতি থেকেই বলিউডি সিনেমায় বহু ভিলেনের মুখে “তেরা খাল খিঁচ লুঙ্গা” ডায়লগ শুনতে পাওয়া যায়। যেমন মহাভারতে মহাবীর ভীমের দুঃশাসনের রক্তপানের বর্ণনা থেকে “তেরা খুন পি যাউঙ্গা” ডায়লগটি অনেক নায়কের মুখেই শোনা যায়।      

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৪/১৭

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...