ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধর্মাধর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দ্বাদশ পর্বাংশ 


৪.৬ সম্রাট হর্ষ পরবর্তী উত্তর ভারত

এই অধ্যায় এবং এর পরবর্তী অধ্যায়গুলি পড়তে বিরক্তি আসতেই পারে। যাঁরা ইতিহাস নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন কিংবা ঐতিহাসিক হয়েছেন, তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু এত রাজবংশ, রাজাদের নাম এবং তাঁদের অজস্র সালতামামি মনে রাখার ভয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলজীবনে ইতিহাস বই ছুঁলেই দু চোখ জড়িয়ে আসত গভীর ঘুমে। তা সত্ত্বেও, ইতিহাস-বিরক্ত সাধারণ পাঠকদের জন্যে খুব সংক্ষেপে এই পর্যায়ের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করবলক্ষ্য রাখুন, ৬৪৭ সি.ই.-তে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর মোটামুটি ১৩০০ সি.ই. পর্যন্ত – দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছ-শো বছরের ভারতীয় রাজনীতির পরিস্থিতির দিকে। সে সময় আমাদের এই ভারতবর্ষ কতগুলি টুকরো ছিল। এবং সেই টুকরোগুলির অধিকার নিয়ে কতগুলি রাজবংশ সৃষ্টি হয়েছে, আর কতগুলি ধ্বংস হয়েছে। প্রত্যেকটি টুকরো রাজ্য কীভাবে প্রতি নিয়ত ব্যস্ত ছিল লাগাতার যুদ্ধে। শুধু সেইটুকুই লক্ষ্য রাখুন।

তা নাহলে কী করে বুঝবেন, আমাদের আধুনিক ভারতবর্ষের চেহারাটা কেন এমন হল? উত্তরভারতের সঙ্গে কেন বনে না দক্ষিণভারতের? বঙ্গ–বিহার-উড়িষ্যার মতো প্রতিবেশী রাজ্যবাসীদের মনে কেন সুপ্ত হয়ে রয়েছে বিদ্বেষ? একটু ফুলকির স্পর্শেই কেন ঘটে যায় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাসমূহ? আমরা যতই আশ্চর্য ও অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিময় যুগে জীবনযাপন করি না কেন, আমাদের মানসিকতার সিংহভাগ পড়ে আছে সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর আশেপাশেই!    

এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে” - কবিগুরু যখন এই কথাগুলি লিখেছিলেন, তখন কি তিনি ভারতের এই ইতিহাস জানতেন না? আমি নিশ্চিত, অন্ততঃ আমার থেকে সহস্রগুণ ভালোভাবে জানতেন। তবুও তিনি লিখেছিলেন, হতে পারে, তার একটিই কারণ – ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সাধারণ ভারতীয়দের ঐক্য দেখে তিনি আশ্চর্য হয়েছিলেন এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন ভারত বুঝি বা এমনই থাকবে। কিন্তু কই, আমরা তেমন তো রইলাম না? কিন্তু কেন থাকতে পারলাম না? এই সাড়ে ছ-শ বছরের রাজতন্ত্র এবং প্রশাসনিক উচ্চমহলের আত্মক্ষয়ী নির্বোধ অহংকার ও বিবেকহীন দুর্নীতি আমাদের জীবন এবং ভাবনা- চিন্তায় যে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, সেই অভিশাপই যে আমরা আজও বহন করে চলেছি। 

 

৪.৬.১ উত্তরভারতের কনৌজ

আলোচ্য সময়ে উত্তর ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্য ছিল কনৌজ – তার রাজধানী কান্যকুব্জ বা কনৌজ শহরের আধুনিক অবস্থান – আধুনিক উত্তরপ্রদেশের প্রায় মধ্যস্থলে। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার কোন কোন সময়ে, দক্ষিণে নর্মদা নদীর উত্তর তীর, পশ্চিমে গুজরাট-সৌরাষ্ট্রের অধিকাংশ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের বেশ কিছু অংশ, উত্তরে কাশ্মীরের কিছুটা এবং নেপালের অধিকাংশ, আর পূর্বে বঙ্গ সাম্রাজ্যের সীমানা

আমরা আগেই দেখেছি কনৌজ সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সম্রাট হর্ষবর্ধন। অতএব তাঁর মৃত্যুর পর দক্ষ ও পরাক্রমী সম্রাটের অভাবে কনৌজকে বারবার প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। এই দুই প্রতিবেশী সাম্রাজ্য হল দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট ও পূর্বের পাল রাজারা।

প্রতিবেশী দুই সাম্রাজ্যের কনৌজ অধিকারের পিছনে রাজনৈতিক অনেকগুলি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধানতম ছিল, পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে সহজ বাণিজ্যপথগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। পাশের মানচিত্রটি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, পূর্ব এবং দক্ষিণের থেকে পশ্চিমের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থলপথটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কনৌজ সাম্রাজ্যের হাতেউপরন্তু, সমগ্র উত্তরভারতের বৈদেশিক নৌবাণিজ্যের প্রধান সমুদ্র বন্দর - গুজরাটের বন্দর শহরগুলিও ছিল কনৌজের আয়ত্ত্বেঅতএব প্রতিবেশী দুই শক্তির স্বপ্ন ছিল কনৌজ সাম্রাজ্য অধিকার করে উত্তরভারতে তাদের সম্পূর্ণ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এই তিন সাম্রাজ্যের অধিপতিদের মধ্যে কেউই এমন কিছু (মৌর্য বা গুপ্ত রাজাদের মতো) প্রতিভাধর পরাক্রমী কিংবা সুদক্ষ প্রশাসক ছিলেন না, যাতে করে তাঁদের স্বপ্নপূরণ ঘটতে পারত। বরং প্রায় ২৫০ বছর ধরে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বারবার যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করে, একটানা খুব জোর দু-তিন দশকের জন্য কনৌজকে নিজেদের অধিকারে রাখতে পেরেছিলেন। তার ফলে তিনটি সাম্রাজ্যই দুর্বল হতে হতে, নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং পরবর্তীকালে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল।  

ওপরের মানচিত্রে দেখানো তিনটি সাম্রাজ্য যেমন নিজেদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে থাকতেন, পরবর্তী কালে টুকরো রাজ্যগুলির রাজবংশসমূহও সেই পরম্পরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছিলেন, মোটামুটি ১৩০০ সিই পর্যন্ত। সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করা যাক। 

সেই আলোচনা এবার একটু বিস্তারে করব, কিন্তু সব রাজ্য বা রাজার প্রসঙ্গ আনব না – কারণ সে ইতিহাস লিখতে গেলে এই গ্রন্থের আয়তন হয়ে উঠবে মহাভারত-তুল্য। তার থেকে সমসাময়িক ভারতের মুখ্য অঞ্চলগুলি ধরে সেখানকার রাজবংশের কীর্তির কথা সংক্ষেপে বলব – এবং দেখাতে চেষ্টা করব নিজেদের চরণযুগলে কীভাবে তাঁরা কুড়ুল মেরেছিলেন – আগ্রাসী ইসলামিক আক্রমণের সময়।     

 ৪.৭ উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি (৬৪৭-১৩০০ সিই)

৪.৭.১ কনৌজ

৪.৭.১.১ রাজা যশোবর্মন

৬৪৭ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে রাজা হর্ষের মৃত্যুর পর প্রায় পঁচাত্তর বছর কনৌজের ইতিহাস তেমন কিছু জানা যায় না। তারপরে মোটামুটি ৭২৫ – ৭৫২ সি.ই. পর্যন্ত যশোবর্মন কনৌজের রাজা ছিলেন। যথারীতি তাঁর বংশ পরিচয় স্পষ্টভাবে জানা যায় না, অনেকে মনে করেন, তিনি মৌখরি বংশের রাজা। তাঁর সময়ে কাশ্মীরের রাজা ছিলেন, ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় এবং চীনের এক লেখা থেকে জানা যায় রাজা যশোবর্মন মধ্যভারতের রাজা ছিলেন এবং চীনের রাজসভায় দূত পাঠিয়েছিলেন।

যশোবর্মনের রাজ্য বিস্তারে, তিনি যে মগধের রাজা “মগহনাহ”কে পরাজিত করেছিলেন এবং বঙ্গের অনেকটা জয় করেছিলেন, সে বিষয়ে হয়তো সন্দেহ নেই। কিন্তু কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য ৭৩৩ সি.ই.তে তাঁর কাশ্মীর জয়ের আশা পূর্ণ হতে দেননি। এই রাজা যশোবর্মনেরই সমসাময়িক ছিলেন, কবি ভবভূতি, যাঁর কথা আগেই বলেছি, তাঁর সভায় আরেক কবির নাম পাওয়া যায়, “বাকপতি”, তাঁর গ্রন্থের নাম “গৌড়ারোহ”। যশোবর্মনের পরে তাঁর উত্তরসূরি আরও তিনজন রাজা হয়েছিলেন, তবে তাঁরা সকলেই ছিলেন গুরুত্বহীন অস্পষ্ট - প্রায় কিছুই জানা যায় না।

৪.৭.১.২ আয়ুধ রাজবংশ

এই বংশের তিনজন রাজা কয়েক বছরের জন্য রাজত্ব করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম রাজার নাম ছিল বজ্রায়ুধ। তাঁর রাজত্বকালের শুরু হয়তো ৭৭০ সি.ই.-তে। তিনি হয়তো কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্যকে পরাস্ত করতে পেরেছিলেন কিন্তু পরে কাশ্মীরের রাজা জয়াপীড় বিনয়াদিত্যের (৭৭৯-৮১০সি.ই.) হাতে পরাস্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন ইন্দ্রায়ুধ এবং তাঁর সমসাময়িক কালেই বঙ্গের পাল রাজাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রকূট বংশের ধ্রুব (৭৭৯-৭৯৪ সি.ই.) গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। বাংলার রাজা ধর্মপালের কাছে ইন্দ্রায়ুধ পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর পুত্র চক্রায়ুধকেই রাজা ধর্মপাল কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রথম অমোঘবর্ষ*-এর শিলালিপি থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুবর পুত্র তৃতীয় গোবিন্দ (৭৯৪-৮১৪ সি.ই.), ধর্মপাল এবং চক্রায়ুধ দুজনকেই রাষ্ট্রকূট রাজাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়েছিলেন। এই বিশৃঙ্খলা গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল করে তুলেছিল এবং সেই সুযোগে প্রতিহার বংশের দ্বিতীয় নাগভট্ট চক্রায়ুধকে পরাস্ত করে কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন।

[*অমোঘবর্ষ ছিলেন রাষ্ট্রকূট সম্রাট - যাঁর কথা পরে দক্ষিণ ভারত প্রসঙ্গে আসবে।]

৪.৭.১.৩ গুর্জর-প্রতিহার

রজোরার (আলোয়ার) শিলালিপিতে প্রতিহারদের “গুর্জর-প্রতিহারানবায়” অর্থাৎ গুর্জরদের এক শাখা গোষ্ঠী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গুর্জররা ছিলেন, মধ্য এশিয়ার এক উপজাতি, যাঁরা গুপ্তসাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর, হুণদের কিছু পরেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।

প্রতিহারদের প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া যায় মধ্য রাজস্থানের মান্দোর (যোধপুরের কাছে) অঞ্চলে এবং রাজত্ব করতেন হরিচন্দ্র। তাঁদের একটি শাখা দক্ষিণে এগিয়ে উজ্জয়িনী অধিকার করেছিলেন। প্রতিহারদের এই শাখার রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, নাগাবালোক অথবা প্রথম নাগভট, শোনা যায় তিনি শক্তিশালী ম্লেচ্ছদের বিতাড়িত করেছিলেন এবং ভারুকচ্ছ (ভারুচ) পর্যন্ত নিজের আয়ত্তে এনেছিলেন। এই ম্লেচ্ছ সম্ভবতঃ আরবের যোদ্ধা কোন উপজাতি। প্রথম নাগভটের পরবর্তী দুই রাজা গুরুত্বহীন কিন্তু তাঁদের পরবর্তী বৎসরাজা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মধ্য রাজস্থানের ভান্ডি বা ভাট্টি উপজাতিদের পরাস্ত করেছিলেন, প্রায় সম্পূর্ণ রাজপুতানা অধিকারে এনেছিলেন। তিনি গৌড়ের রাজা ধর্মপালকেও পরাজিত করেছিলেন। যদিও এর কিছুদিন পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা ধ্রুব তাঁকে উৎখাত করে দেন এবং শোনা যায় তিনি মরু অঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বৎসরাজার পর রাজা হয়েছিলেন দ্বিতীয় নাগভট (৮০৫-৮৩৩ সি.ই.)। তিনি পিতৃরাজ্য আবার অধিকারের জন্যে খুবই চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দের কাছে চূড়ান্ত পরাজিত হয়েছিলেন এবং দুর্বল কনৌজ অধিকার করেছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দর ৮১৪ সি.ই.-তে মৃত্যু হওয়াতে দ্বিতীয় নাগভট কিছুটা স্বস্তি পেলেও, গৌড়ের রাজা ধর্মপাল এইসময় কনৌজ অধিকার করে নিয়েছিলেন। এরপর তিনি ভয়ংকর লড়ে মুদ্‌গগিরি (মুঙ্গের) জয় করেন এবং পরবর্তী কালে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলে অন্ধ্র, সিন্ধু, বিদর্ভ এবং কলিঙ্গের রাজারা তাঁর সঙ্গে মৈত্রী করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গোয়ালিয়র শিলালিপি থেকে জানা যায়, এরপর দ্বিতীয় নাগভট একে একে আনর্ত্ত (উত্তর কাথিয়াবাড়), মালব (মধ্য ভারত), মৎস (পূর্ব রাজপুতানা), কিরাত (হিমালয় অঞ্চলে), তুরুস্ক ( পশ্চিম ভারতের আরবি সম্প্রদায়) এবং বৎস রাজাদের অধীন কোশাম্বি (উত্তরপ্রদেশের একটি জেলা) জয় করে নিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় নাগভটের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র রামভদ্র, তিনি খুবই দুর্বল রাজা ছিলেন, এবং তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যে নানান বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছিল। তাঁর পুত্র মিহির ভোজ(৮৩৬-৮৫ সি.ই.) সিংহাসনে বসেই কঠোর হাতে সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন এবং মধ্যদেশের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন। প্রথমেই তিনি পূর্বদিকে বঙ্গ ও গৌড় জয়ের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গের তৎকালীন রাজা দেবপাল (৮১৫-৫৫ সি.ই.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, পূর্বের আশা ছেড়ে দক্ষিণে মন দিলেন। তিনি নর্মদা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করতে পারলেও রাষ্ট্রকূটরাজ দ্বিতীয় ধ্রুব ধারাবর্ষের কাছে পরাস্ত হলেন, হয়তো ৮৬৭ সি.ই.-তে। যদিও তাঁর বিভিন্ন প্রত্ন-নিদর্শন থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর রাজ্য পশ্চিমে পেহোয়া (কারনাল) এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। একজন আরবি ভ্রমণকারী, সুলেইমানের ৮৫১ সি.ই.-র লেখা থেকে জানা যায়, ভোজ একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর সমৃদ্ধ রাজত্ব ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং রাজ্যে কোথাও চুরি-ডাকাতির ঘটনা ছিল না। তবে তিনি “আরবিদের পছন্দ করতেন না” এবং “মুসলিম ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অত্যন্ত শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন”।

মিহিরভোজের পর রাজা হয়েছিলেন, তাঁর পুত্র প্রথম মহেন্দ্রপাল (৮৮৫-৯১০ এ.ডি)। তিনি পূর্বদিকে মগধ এবং উত্তরবঙ্গ অধিকার করলেও, তাঁর সাম্রাজ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রথম মহেন্দ্রপাল সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তাঁর সভাকবি ছিলেন রাজশেখর, তাঁর গ্রন্থগুলির নাম “কর্পূরমঞ্জরী”, “বাল-রামায়ণ”, “বালভারত”, “কাব্যমীমাংসা” ইত্যাদি। প্রথম মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যে কিছুটা বিবাদ হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ সিংহাসনে বসেছিলেন মহীপাল (৯১২ – ৪৪ সি.ই.)। মহীপাল রাজা হওয়ার পরেই রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের ভয়ংকর আক্রমণে কনৌজ এবং পূর্বদিকের রাজ্যগুলিও প্রতিহারদের হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রকূটরা ফিরে যাওয়ার পর, প্রতিহারদের দুর্বলতার সুযোগে, বঙ্গের পাল রাজারা ৯১৬-১৭ সি.ই.-তে তাঁদের অধিকৃত রাজ্যগুলির অনেকটাই জয় করতে পেরেছিলেন।

মহীপালের পরে রাজা হয়েছিলেন দেবপাল, তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ৯৪৮ সি.ই.-র কিছুদিন আগেই, কিন্তু তাঁর দুর্বলতার সুযোগে, প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল চান্দেলরা এবং প্রতিহার সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল। প্রতিহার বংশের পরবর্তী রাজা বিজয়পালের সময়ে, প্রতিহার সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেল, যেমন, যোজকভুক্তির (বুন্দেলখণ্ড) চান্দেল, অনহিলওয়াড়ার (পাতান, গুজরাট) চালুক্য, গোয়ালিয়রের কচপঘাত, দাহলের চেদি, মালবের পরমার, দক্ষিণ রাজপুতানার গুহিল এবং শাকম্ভরির (রাজস্থান) চাহমানরা। যাই হোক, দশম শতাব্দীর শেষ দশকে পরবর্তী রাজা রাজ্যপাল যখন সিংহাসনে বসলেন, প্রতিহার সাম্রাজ্যের সূর্য তখন অস্তাচলে। এই সময়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মুসলিম রাজ্য থেকে ভারতজয়ের অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাজ্যপাল উদ্‌ভাণ্ডপুরের (ভাটিণ্ডা) শাহী রাজা জয়পালের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৯১ সি.ই.তে সুলতান সবুক্তিগিন এবং ১০০৮ সি.ই.-তে জয়পালের পুত্র আনন্দপালের সঙ্গে সুলতান মামুদকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই যৌথ প্রচেষ্টা দুবারই ব্যর্থ হয়েছিল, এবং ১০১৮ সি.ই.তে রাজ্যপাল গঙ্গা পার হয়ে বারিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরেও ১০৩৬ সি.ই. পর্যন্ত প্রতিহার রাজাদের কথা শোনা যায়, শেষ রাজার নাম ছিল যশপাল।

৪.৭.১.৪ গাড়োয়াল

গাড়োয়াল রাজাদের বংশপরিচয় জানা যায় না। তবে ১০৮০ বা ১০৮৫ সি.ই.-র মধ্যে কোন এক সময় গাড়োয়াল বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রদেব, কোন এক গোষ্ঠী প্রধান গোপালকে পরাস্ত করে, কনৌজ অধিকার করেছিলেন। চন্দ্রদেবের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তিনি কাশী, উত্তর কোশল (ফৈজাবাদ জেলা), কুশিকা (কনৌজ) এবং ইন্দ্রপ্রস্থ (দিল্লি)-র রক্ষাকর্তা। চন্দ্রদেব সম্ভবতঃ ১১০০ সি.ই.তে মারা যান। চন্দ্রদেবের পর রাজা হন মদনপাল, তারপর ১১১৪ সি.ই.-তে রাজা হন মদনপালের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র। রাজা হওয়ার আগেই যখন তিনি যুবরাজ ছিলেন ১১০৯ সি.ই.-তে, মুসলিম রাজা তৃতীয় মাসুদের (১০৯৮-১১১৫ এ.ডি) সেনাপতি হাজিব তুঘাতিগিনের অভিযান প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। রাজা হবার পর তিনি বঙ্গের দুর্বল পালরাজাদের থেকে মগধ এবং মুঙ্গের অধিকার করে নিয়েছিলেন, আরও জয় করেছিলেন মালবের পূর্বাংশ। এছাড়া কাশ্মীরের জয়সিংহ (১১২৮-৪৯ সি.ই.), গুজরাটের সিদ্ধারাজ জয়সিংহ (১০৯৫ -১১৪৩ সি.ই.) এবং সম্ভবতঃ দক্ষিণের চোলদের সঙ্গেও তাঁর মৈত্রী সম্পর্ক ছিল।

গোবিন্দচন্দ্রের পর রাজা হয়েছিলেন তাঁর পুত্র বিজয়চন্দ্র ১১৫৪ সি.ই.-তে। সেসময় গজনির আলাউদ্দিন ঘোরির কাছে পরাস্ত হয়ে লাহোর অধিকার করেছিলেন আমির খুসরু*। বিজয়চন্দ্রকে এই আমির খুসরু বা তাঁর পুত্র খুসরু মালিকের ভারত অভিযান প্রতিরোধ করতে হয়েছিল। বিজয়চন্দ্রের সময় চাহমান (চৌহান) এবং চান্দেলরা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলে এবং সম্ভবতঃ তাঁর রাজত্ব থেকে দিল্লি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

[*এই আমির খুসরু কিন্তু বিখ্যাত সুফি কবি ও গায়ক আমির খুসরু (১২৫৩-১৩২৫) নন।] 

বিজয়চন্দ্রের পুত্র জয়চন্দ্র রাজা হয়েছিলেন, ১১৭০ সি.ই.-তে। তাঁর রাজত্বকালের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সুলতান সিহাবুদ্দিন ঘোরির ভারত আক্রমণ। ১১৯১ সি.ই.-তে চাহমান বা চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ সুলতান ঘোরিকে তারৌরির যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন। এই পরাজয়ে সুলতান ঘোরি এতই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, পরের বছর ফিরে এসে তিনি রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাস্ত করেন এবং হত্যা করেন। এই ঘটনায় জয়চন্দ্র সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং কিছুটা স্বস্তিও পেয়েছিলেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, সুলতান ঘোরি যুদ্ধজয়ের পর স্বদেশে ফিরে যাবেন এবং পৃথ্বীরাজের মৃত্যুর ফলে উত্তর ভারতে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি হবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি, কারণ ১১৯৪ সি.ই.-তে সুলতান সিহাবুদ্দিন কনৌজ আক্রমণ করেন এবং চন্দোয়ার ও এটাওয়ার যুদ্ধে জয়চন্দ্র পরাজিত এবং নিহত হন। যদিও সুলতান সিহাবুদ্দিন জয়চন্দ্রের পুত্র হরিশচন্দ্রকে কনৌজের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। এরপর মোটামুটি ১২২৬ সি.ই.-তে গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অধিকারে চলে গিয়েছিল।

৪.৭.১.৫ চাহমান বা চৌহান

চাহমান বা চৌহানরাও সম্ভবতঃ মধ্য এশিয়ার কোন উপজাতি এবং অগ্নির উপাসক বা অগ্নিবংশ বলে পরিচিত ছিলেন। অগ্নির পবিত্রতায় তাঁরা ভারতীয় সমাজে খুবই সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁদের বেশ কয়েকটি শাখা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সাকম্ভরি বা সাম্ভর গোষ্ঠী। তাঁদের কথা প্রথম জানা যায়, ৯৭৩ সি.ই.-র শিলালিপি থেকে এবং তাঁদের রাজা প্রথম গুবক, প্রতিহার রাজ দ্বিতীয় নাগভটের সমসাময়িক ছিলেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই বংশের রাজা অজয়রাজ, রাজস্থানে অজয়মেরু নামে এক নগরের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের আজমির। আরেকজন রাজার নাম জানা যায় চতুর্থ বিগ্রহরাজ বিশালদেব (১১৫৩-৬৪ সি.ই.), তিনি নাকি দিল্লি জয় করেছিলেন এবং গাড়োয়াল রাজ বিজয়চন্দ্রকে পরাজিত করেছিলেন। এই বংশের সব থেকে বিখ্যাত রাজা তৃতীয় পৃথ্বীরাজ (১১৭৯-৯২ সি.ই.), যাঁকে মুসলিম ঐতিহাসিকরা রাই পিথৌরা বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সম্বন্ধে অনেক নায়কোচিত কাহিনি শোনা যায়। সমসাময়িক কনৌজের রাজা জয়চন্দ্রের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। রাজা জয়চন্দ্র নিজের কন্যা সংযুক্তা বা সংযোগিতার বিবাহের জন্যে যে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে রাজা পৃথ্বীরাজকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। কিন্তু পৃথ্বীরাজ সভার মাঝখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে বীরের মতো সংযুক্তাকে হরণ করেছিলেন, শোনা যায় কন্যা সংযুক্তারও এতে সম্মতি ছিল, তিনি রাজা পৃথ্বীরাজের গুণমুগ্ধা ছিলেন। এই পৃথ্বীরাজ চান্দেল রাজ পরমারদি (১১৬৫-১২০৩ সি.ই.)-কে পরাস্ত করে বুন্দেলখণ্ড জয় করেছিলেন এবং গুজরাটের চালুক্যরাজ দ্বিতীয় ভীমের সঙ্গেও তাঁর যুদ্ধ বেধেছিল।  তাঁর শেষ পরিণতি এবং মৃত্যুর কথা আগেই বলেছি।

এভাবেই কনৌজ অঞ্চলে শুরু হল মুসলিম শাসকের আধিপত্য। 

চলবে... 

শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১১

   ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দশম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/১০ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

একাদশ পর্বাংশ 


৪.৫.৮ বিজ্ঞান

৪.৫.৮.১ মহাকাশ ও পৃথিবী

বৈদিক বিশ্ব ছিল খুবই সহজ সরল, উপরে স্বর্গ, নিচেয় এই পৃথ্বী, আর এই দুইয়ের মাঝে আছে অন্তরীক্ষ বা বায়ু। স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররা ঘুরে বেড়ায় এবং অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায় যত পাখি, মেঘ এবং উপদেবতারা। বৈদিক সাহিত্যের ঋষিরা সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। তাঁরা সরল কিন্তু গভীর মননশীল প্রজ্ঞার দর্শন নিয়েই বড়ো প্রশান্তির জীবন যাপন করতেন।

কিন্তু পরবর্তী কালে, বৈদিক দর্শন থেকে অনেকটাই সরে আসা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা যখন বৌদ্ধ, জৈন এবং সুপ্রাচীন অনার্য ধর্মীয় শাখাগুলির কাছে যথেষ্ট শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেন, তখন বৈদিক প্রজ্ঞার সীমায় বন্দি না থেকে, তাঁরা সুপ্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে জটিল সব তত্ত্ব ও কাহিনি রচনা শুরু করলেন। এই কাহিনি রচনার শুরু খ্রিস্টপূর্ব মোটামুটি দ্বিতীয় শতাব্দীর কোন এক সময় থেকে।

প্রথমতঃ তাঁরা এই মহাবিশ্বকে কল্পনা করলেন ব্রহ্মাণ্ড – যার স্থূল অর্থ ব্রহ্মের অণ্ড। এই ব্রহ্মাণ্ড একুশটি অঞ্চল বা বিভাগে বিভক্ত। উপর থেকে ধরলে পৃথিবী বা মর্ত্যের স্থান সপ্তম। পৃথিবীর উপরের ছয়টি স্তরে আছে ঊর্ধলোক। পৃথিবীকে বলা হয় ভূলোক এবং এর ঊর্ধের ছ’টি লোক হল, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জন, তপঃ এবং সত্য বা ব্রহ্মলোক। এগুলিকে স্বর্গও বলা হয়। বিভিন্ন স্বর্গের সুখের মাত্রা আলাদা এবং মর্ত্যলোকের পুণ্যসঞ্চয়ের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন স্বর্গলাভ হয়ে থাকে। ভূলোক এবং ছটি স্বর্গলোকের কথা অবিশ্যি বেদেও উল্লেখ আছে। পৃথিবীর নিচের সাতটি স্তরে আছে সপ্ত পাতাল, যেমন, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। পাতালের পরেও আছে সাতটি স্তর, সেগুলি নরক, যেমন তমিস্রা, অন্ধতমিস্রা, রৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, শূকরমুখ, অন্ধকূপ। পুণ্য সঞ্চয়ের মতো পাপ সঞ্চয়েরও মাত্রা আছে, সেই মাত্রা অনুসারে, মৃত্যুর পর মৃদু থেকে ভয়ংকর কষ্টদায়ক নরকে যেতে হত।

সে যাই হোক, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ও নরকের ধারণা যে বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা কল্পনা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সমসাময়িক প্রচলিত ধর্মগুলির থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করা। তাঁরা সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন, পুণ্য ও পাপ এবং তার ফলে প্রাপ্য পুরষ্কার ও তিরষ্কারের ধারণা। তাঁদের উচ্চারিত প্রত্যয়ী মন্ত্রের ব্যাখ্যায়, কথকতায়, ধর্মকথায় কল্পনার জগতের দুয়ার খুলে গেছিল সাধারণ মানুষের মনে। তাঁরা আশ্চর্য হয়েছিলেন, অভিভূত হয়েছিলেন, এবং বিশ্বস্ত হয়েছিলেন। আমাদের ছোটবেলাতেও গ্রামের বাড়িতে দেখেছি, বাঁধানো ফ্রেমে আঁকা নরকভোগের রঙিন চিত্রপট। সেখানে যমদূতেরা চোরদের হাত কাটে, পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকাদের লোহার কাঁটাওয়ালা স্তম্ভ জড়িয়ে শুয়ে থাকতে হয়, ফুটন্ত তেলে পাপীদের ভাজতে ভাজতে (deep fry) যমদূতরা মাথায় ড্যাঙস মারে, ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণ মানুষ যখনই বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে লাগল, বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রশান্ত অধরে ফুটে উঠল সাফল্যের মৃদু হাসি এবং তাঁরা আরও নিবিড় কল্পকাহিনি রচনায় মগ্ন হতে লাগলেন – সেই সব কাহিনিই পুরাণ।

এই তত্ত্বও কিছু বছরের মধ্যে অনেকটাই বদলে গেল, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর শেষ দিক থেকে খ্রিস্টাব্দ প্রথম দুই শতাব্দীতে। তখন এই বিশ্ব-পৃথিবী হয়ে উঠল মোটামুটি সমতল বিশাল থালা বা রেকাবির মতো। যার কেন্দ্রে আছে মেরুপর্বত, যাকে ঘিরে ঘুরে চলেছে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ এবং সকল নক্ষত্র। দশদিকে আছে দশ দিকপাল। এই মেরুপর্বতকে ঘিরে আছে জম্বুদ্বীপ। তার চারদিকে ঘিরে রয়েছে লবণ-সমুদ্র। দক্ষিণের এই দ্বীপ-মহাদেশের নাম জম্বুদ্বীপ। জম্বু মানে জাম গাছ, এই অঞ্চলে জামগাছের প্রাচুর্যের জন্যেই এই দ্বীপের নাম জম্বুদ্বীপ। লবণ সমুদ্রকে ঘিরে রয়েছে যে স্থলভূমি তার নাম প্লক্ষদ্বীপ। সেই দ্বীপের নাম প্লক্ষ নামের এক স্বর্ণময় বৃক্ষের নামে। প্লক্ষদ্বীপকে ঘিরে আছে ইক্ষুরস(ঝোলা-গুড়)-সমুদ্র। এই সমুদ্রকে ঘিরে আছে শাল্মলদ্বীপ – এই নাম ওই দ্বীপে একটি শাল্মলী গাছ থাকার কারণে। শাল্মলীদ্বীপকে ঘিরে আছে সুরা-সমুদ্রের বলয়। এভাবেই একের পর এক দ্বীপ ও সমুদ্র আছে যথাক্রমে কুশদ্বীপ-ঘৃতসমুদ্র, ক্রৌঞ্চদ্বীপ-ক্ষীরসমুদ্র, শাকদ্বীপ-দধিমণ্ডসমুদ্র, পুষ্করদ্বীপ-শুদ্ধোদকসমুদ্র। শুদ্ধোদক সমুদ্রের পরে আছে লোকালোক (লোক+অলোক) পর্বত। যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় তার নাম লোক, তার বাইরের দেশগুলি যারা সূর্যালোক বঞ্চিত – তাদের নাম অলোক। (শ্রীমদ্ভাগবত/৫ম স্কন্ধ/ অধ্যায় ২০)            

বিশ্ব-তত্ত্বের শেষ দুটি ধারণা পুরাণ থেকে নেওয়া হয়েছে, যে পুরাণগুলি, বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লেখা শুরু হয়েছিল এবং সর্বশেষ পুরাণ লেখা হয়েছে, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের কাছাকাছি কোন সময়ে। অতএব সহজেই অনুমান করা যায় পুরাণের এই তত্ত্বগুলি মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এর কয়েকশ বছর আগে থেকেই। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা দেখেছি, মৌর্য যুগের আগে থেকেই বৈদেশিক বাণিজ্য সূত্রে পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিসের মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের নিবিড় পরিচয় স্থাপিত হয়েছিল। এই পরিচয় না থাকলে বীর আলেকজাণ্ডার ভারতজয়ের স্বপ্ন কেন দেখেছিলেন?  মৌর্যযুগ থেকে এই বৈদেশিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং খ্রিস্টপূর্ব শেষ দুটি শতাব্দী থেকে এদেশে রাজত্ব বিস্তার করেছেন, গ্রিক, পার্থিয়ান, শক, কুষাণ, পহ্লব প্রভৃতি জাতি। তা সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণ্য এবং হিন্দু পণ্ডিতেরা বিশ্বতত্ত্বের এমন হাস্যকর ধারণা করলেন কেন, সেকথা তাঁরা এবং তাঁদের ভগবান ছাড়া আর কে বলতে পারবেন?

পৌরাণিক গ্রন্থে বিশ্বতত্ত্বের ধারণা যাই হোক, এর পাশাপাশি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশ্ব ও মহাকাশের ধারণা ছিল বিস্ময়কর – এবং সে ধারণার শুরু হয়েছিল বৈদিক এমনকি প্রাক-বৈদিক যুগেও। 

 

৪.৫.৮.২ গণিত

ভারতীয় অংক, বিশেষ করে জ্যামিতি, পরিমিতি, কৌণিক মাপ, সূক্ষ্ম থেকে স্থূল ওজন পরিমাপের নিদর্শন সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলিতে আমরা দেখেছি। অতএব যজ্ঞবেদী নির্মাণের থেকে ভারতীয় জ্যামিতি ও পরিমিতির সূচনা এমন ধারণা যে আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, তার সঙ্গে আমি অন্ততঃ কোন ভাবেই সহমত হতে পারি না। বরং আর্যরা বৈদিক যজ্ঞবেদী নির্মাণের নানান মাপ-জোক শিখেছে অনার্য মানুষদের থেকেই।

কিন্তু এরপর এই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও, যখন থেকে লিপি বা লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে, সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রজ্ঞা ও সাফল্য চমকপ্রদ। লিখিত তথ্য থেকে জানা যায় মোটামুটি খ্রিস্টাব্দ তৃতীয় এবং চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যামিতি ও পরিমিতিতে প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছিলেন এবং আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন নিরপেক্ষ সংখ্যা (Abstract Number) এবং বীজগণিত।

নিরপেক্ষ সংখ্যা হল বিশেষ একধরনের লিপি, যা দিয়ে শুধু মাত্র সংখ্যাই বোঝানো যায়। যেমন, , , ৯ – এগুলি নিরপেক্ষ সংখ্যা, কিন্তু যখনই ৩ দিন, ৪ কি.মি. বা ৯ জন বলা হবে তখন সেগুলি নানান বিষয়ের নির্দিষ্ট পরিমাপ বোঝাবে। এই নিরপেক্ষ সংখ্যা আবিষ্কার, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনন্য সৃষ্টি, যার ওপরে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল শাখাই দাঁড়িয়ে আছে। উপরন্তু, এই নিরপেক্ষ সংখ্যার বৈশিষ্ট্য হল দশটি মাত্র লিপি - ১ থেকে ৯ এবং ০ দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম সংখ্যা অতি সহজে এবং সংক্ষেপে লিখে ফেলা যায়। এই সংখ্যার জাদু ধরা পড়বে একটি উদাহরণ দিলে, ১২৩৪ সংখ্যাটি সমসাময়িক রোমান ভাষায় লিখতে গেলে, MCCXXXIV দাঁড়াবে। ১২৩৪ সংখ্যাটিকে যদি আমরা ভাঙি – তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় – ১০০০+২০০+৩০+৪, এই অনুযায়ী  M(১০০০), CC(২০০), XXX(৩০), IV(৪)। এভাবেই আমরা তিরিশ কোটি সংখ্যাটি, অংকের নিয়মে লিখে ফেলতে পারি, x ১০কিন্তু রোমান ভাষায় তিরিশ কোটি লেখার প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম।   

এই লিপির মধ্যে ০ (শূন্য) সংখ্যাটির গুরুত্ব সীমাহীন, সীমাহীন সংখ্যা লিখতে। এই লিপির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় গুজরাটের ৫৯৫ সি.ই.-র একটি শিলালিপি থেকে, অতএব অনুমান করা যায় এর শিলালিপি লেখার অনেক আগে থেকেই শূন্য সংখ্যার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই শিলালিপির প্রায় সমসময়ে, এই সংখ্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সিরিয়া এবং সুদূর ভিয়েতনামে! এইসংখ্যা-লিপির আবিষ্কার কে করেছিলেন সঠিক জানা যায় না, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর একটি পাণ্ডুলিপিতেও – “বকশালী পাণ্ডুলিপি” -এই সংখ্যা-লিপির ব্যবহার দেখা গেছে। ৪৯৯ সি.ই.তে লেখা বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট, তাঁর গ্রন্থে এই সংখ্যালিপি ব্যবহার করেছিলেন। অতএব বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্ট সংখ্যা বা শূণ্যের আবিষ্কর্তা নন, তাঁর আগেই এগুলির সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।

গণিতবিদ আর্যভট্টের বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে অবদান অবিশ্বাস্য। জ্যামিতিতে, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল – ভূমির অর্ধেক এবং লম্ব উচ্চতার গুণফল, বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে – পাই (π)-এর দশমিকের পর চার সংখ্যা পর্যন্ত অভ্রান্ত মান নির্ণয় – ৩.১৪১৬। প্রসঙ্গতঃ  তিনি প্রথম সংখ্যার দশমিক হিসেব আবিষ্কার করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচলিত চান্দ্র-বছরের জটিল হিসাবের পরিবর্তে তিনি সৌর-বছরের প্রচলনের প্রস্তাব দেন এবং তাঁর সৌর বছরের হিসেব আধুনিক হিসেবের তুলনায় প্রায় নিখুঁত – ৩৬৫.৩৫৮৬৮০৫ দিন! তিনিই বিশ্বে প্রথম পৃথিবীকে একটি গোলক কল্পনা করেছিলেন এবং মত দিয়েছিলেন পৃথিবী তার নিজের অক্ষে ঘোরে। তিনিই প্রথম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদে গ্রহণ হয় এবং চাঁদ সামনে চলে আসে বলে সূর্যগ্রহণ হয়। তার আগে পর্যন্ত পৌরাণিক ধারণা ছিল রাহু নামের এক রাক্ষসের অমর মুণ্ড চাঁদকে এবং সূর্যকে গ্রাস করে। ইংরেজদের হাত ধরে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত ভারতীয় পণ্ডিত বা অশিক্ষিত সমাজের এই বিশ্বাসকে আর্যভট্ট এতটুকুও প্রভাবিত করতে পারেননি। বরং তাঁর অনেকগুলি সিদ্ধান্ত প্রচলিত ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনঃপূত না হওয়াতে, সম্ভবতঃ তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত সেগুলিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

আর্যভট্টের সামান্য পরে বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) সঙ্গে জ্যোতিষচর্চা (Astrology) এবং রাশিফল বা কোষ্ঠী বিচারকেও যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর্যভট্ট জীবিত থাকলে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতেন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষচর্চার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মেলে না, এমনকি বিপরীত কথা বলে। বরাহমিহিরের “পঞ্চসিদ্ধান্তিকা” গ্রন্থে সমসময়ের জ্যোতির্বিদ্যার পাঁচটি ঘরানার সংকলন এবং আলোচনা করেছিলেন। তার মধ্যে দুটি সিদ্ধান্তের কথা আগেই বলেছি, “রোমক” এবং “পৌলিশ” সিদ্ধান্ত।

এই সময়ে আরবের প্রজ্ঞাবান মানুষদের সঙ্গে ভারতের বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরবের পণ্ডিত মহলে ভারতের আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের খুবই সমাদর ছিল। একসময় বাগদাদ সম্রাটের (খলিফা) রাজসভায় অনেক ভারতীয় পণ্ডিত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁরা বসবাস করতেন। এই বাগদাদ আরবি পণ্ডিতদের মাধ্যমেই পরবর্তী কালে, ভারতীয় গণিত ইউরোপের বিদ্বান সমাজে পৌঁছেছিল।


৪.৫.৯ ধর্ম

এই সময়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম হিন্দু ধর্মে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। নতুন ধর্মের ধর্মশাস্ত্রগুলি নতুন করে রচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনা, নতুন আদর্শ এবং দর্শনে। এই হিন্দুধর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবেই বৌদ্ধধর্মও অনেকটা হীনবল হয়ে উঠল। ভারত থেকে হীনযানী মত প্রায় দুষ্প্রাপ্য হতে বসল, মহাযানী মতও দুর্বল হয়ে গেল, কারণ মহাযানী শাখা ভেঙে উদ্ভব হল নতুন শাখা বজ্রযানী মত। বিপুল এই পরিবর্তনের কথা সবিস্তারে আসবে পরবর্তী ও অন্তিম পর্বে। তার আগে দেখা নেওয়া যাক হর্ষ পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

পরের পর্ব " ধর্মাধর্ম - ৪/১২ "

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/১০

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২

(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)

অথবা

+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে 

বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের নবম পর্বাংশ -
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৯ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.) 

দশম পর্বাংশ 


৪.৫.৫ সাহিত্য - কাব্য

সাহিত্যে এবং মনীষায় এ যুগের অন্যতম নক্ষত্র অবশ্যই মহাকবি কালিদাস। তাঁর সময় অনুমান করা হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এবং প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্ব কালে। তাঁর কাব্যগুলি সমসাময়িক সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। যদিও তাঁর সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না, কিন্তু তাঁর লেখা থেকে অনুমান করা যায়, তিনি দুঃখীর সমব্যথী, শিশু ও নারী মনস্তত্বে অভিজ্ঞ, ফুল, গাছপালা, পশুপাখিপ্রেমী এবং রাজসভার আড়ম্বরে অভ্যস্ত হলেও, সুখী এবং প্রশান্ত মানুষ ছিলেন। তিনি তিনটি নাটক লিখেছিলেন, “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”; দুটি দীর্ঘ কাব্য, “কুমারসম্ভব” ও “রঘুবংশম্‌” এবং দুটি ছোট কাব্য “মেঘদূত” ও “ঋতুসংহার”। এছাড়াও তাঁর অনেকগুলি রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কালিদাস ছাড়াও মোটামুটি সমকালে অথবা সামান্য পরবর্তী কালে অনেকেই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, কিন্তু কেউই মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেননি। যেমন কুমারদাসের, “সীতাহরণ” কিংবা ভারবির “কিরাতার্জুনীয়”। সপ্তম শতাব্দীতে শ্রীরামের জীবন নিয়ে লেখা ভট্টির “ভট্টিকাব্য”। এই সময়েই আরেক কবি মাঘ রচনা করেছিলেন, “শিশুপালবধ”। মাঘ তাঁর কাব্যে অক্ষর, শব্দ এবং ছন্দ নিয়ে বেশ কিছু অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, যেমন একটি মাত্র ব্যঞ্জন-ধ্বনি “দ” ব্যবহার করে এই শ্লোকটি,

        দাদদোদুদ্দ-দুদ্‌-দাদী / দাদাদোদুদো-দী-দ-দোঃ।

        দুদ্‌-দাদম্‌ দাদাদেদুদ্দে / দদ-আদদ-দদো দ-দঃ”।।

বেশ কিছু অপ্রচলিত এবং অস্পষ্ট-অর্থ-শব্দ নিয়ে এই শ্লোকটির অর্থ হতে পারে,

“(যিনি) দান-দাতা, অরিদের (যিনি) দুঃখদাতা,

(যিনি) পুণ্যদাতা, যাঁর বাহু দুঃখদাতার বিনাশ করেন,

(যিনি) দানবদলনকারী, ধনাঢ্য এবং দরিদ্রকে সমদান দেন,

অরিদলনে (তিনিই) উদ্যত করলেন তাঁর অস্ত্র”[1] (ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

এমন অদ্ভুত অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য সেকালে এবং পরবর্তী কালেও অনেকেই রচনা করেছিলেন। হয়তো তাঁদের অনেকেরই মনে হয়েছিল, মহাকবি কালিদাসের সমকক্ষ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়, অতএব তাঁরা চমকদার কিছু লিখে, মানুষের মনে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সমকালে তাঁরা নিশ্চয়ই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী কালে এই ধরনের কাব্যগুলি দুর্বোধ্য এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

এরকম আরও কিছু এক্সপেরিমেন্টাল কাব্য পাওয়া যায়, যাকে “দ্বৈয়াশ্রয়-কাব্য” বলা হত। বিভিন্ন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ এবং পংক্তি নিয়ে এই কাব্যগুলিতে একই সঙ্গে দুটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল দ্বাদশ শতাব্দীর সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”। এই কাব্যটি একই সঙ্গে অযোধ্যার শ্রীরামচন্দ্র এবং বঙ্গের পাল রাজা রামপালের জীবনীর ওপর লেখা, কবি সন্ধ্যাকর রামপালের সভাকবি ছিলেন।

সপ্তম শতাব্দীর কোন সময়ে আরেক জন কবি ছিলেন ভর্তৃহরি। তিনি কোন কাব্য রচনা করেননি, কিন্তু চার পংক্তির ছোট ছোট প্রায় তিনশ কবিতা রচনা করেছিলেন। এই কবিতাগুলি, পার্থিব জ্ঞান, ত্যাগ, প্রেম, আদিরস ইত্যাদি নানান বিচিত্র বিষয়ের ওপর এবং অধিকাংশ কবিতাই বেশ রসোত্তীর্ণ। যেমন,

“(হয়তো)       কুমীরের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নিতে পারো মণি,

                        সাগর পার হতে পারো সাঁতরে ঢেউয়ের সার,

                   মালা করে চুলে জড়াতেও পারো কাল-ফণী,

(কিন্তু)                  ঘোচাতে কী পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার!

অথবা,

(হয়তো)             বালু পিষে তেল পেতে পারো বহু ক্লেশে,

                             মরীচিকা হতে জল পেতে পারো তৃষ্ণার

                      শশকের শিং যদিও বা দেখ কোনো দূরদেশে

(কিন্তু)                     ঘোচাতে কি পারো মূর্খের অন্ধ-সংস্কার![2]

(ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদঃ লেখক)

 

হয়তো ভর্তৃহরির সমসাময়িক আরেকজন কবির একই রকমের চার পংক্তির কবিতাগুচ্ছ পাওয়া যায় তাঁর নাম অমরু। তাঁর অধিকাংশ কবিতার বিষয় প্রেম, আবেগ এবং তীব্র কামনা। একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরি কবি বিলহনের লেখা “চৌরপঞ্চাশিকা”ও উল্লেখযোগ্য কাব্য। এক চোর এবং রাজকুমারীর গোপন প্রেম নিয়ে পঞ্চাশ স্তবকে লেখা এই কবিতাগুলির আবেগ ও অনুভূতি যথেষ্ট কাব্যময়। তবে দ্বাদশ শতাব্দীতে জয়দেবের লেখা সংস্কৃত কাব্য “গীতগোবিন্দ” বাংলায় এবং বিশেষ করে বাংলার বৈষ্ণব মহলে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। মূলতঃ রাধা ও কৃষ্ণের ভালোবাসার আবেগ-ঘন অনুভূতি এই কাব্যের বিষয়। 

কাব্য এবং কবিতা ছাড়াও বর্ণনাভিত্তিক জনপ্রিয় গল্প-সংগ্রহ লিখেছিলেন সোমদত্ত, তাঁর বইয়ের নাম “কথাসরিৎসাগর”- সম্ভবতঃ একাদশ শতাব্দীর কোন সময়ের রচনা। দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের কলহন রচনা করেছিলেন “রাজতরঙ্গিণী”- এই গ্রন্থটি কোন কাব্য গ্রন্থ নয়, বরং বলা চলে ঐতিহাসিক উপাখ্যান। কাশ্মীরের প্রাচীন রাজবংশের প্রচলিত কাহিনি এবং সমসাময়িক রাজাদের স্তুতি নিয়ে এই গ্রন্থটি রচিত। কাশ্মীরের সমসাময়িক রাজাদের বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং রাজাদেরও অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। অতএব কাব্য হিসেবে এই গ্রন্থের গুরুত্ব না থাকলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। রাজা হর্ষবর্ধনের জীবনচরিত নিয়ে লেখা, তাঁর বন্ধু ও কবি বাণভট্টের কথা আগেই বলেছি, তাঁর গ্রন্থের নাম “হর্ষচরিত”। এর পরে চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের (১০৭৫-১১২৫ সি.ই.) জীবন নিয়ে লেখা বিলহনের “বিক্রমাঙ্কদেবচরিত” উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বাংলার কবি সন্ধ্যাকরের লেখা “রামচরিত”-এর কথা আগেই বলেছি। সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত সাহিত্যের গ্রন্থটির নাম “হাম্মীর-মহাকাব্য”। এটির রচনাকার এক জৈন সন্ন্যাসী, নাম ন্যায়চন্দ্র সূরি। এই গ্রন্থটি খুব পরিচিত না হলেও, এর কাব্যগুণ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। চাহমান রাজা হাম্মীরের জীবনী নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি, ১৩০১ সালে আলাউদ্দিন খিলজির হাতে রণস্তম্ভপুরার (আধুনিক রণথম্ভোর) যুদ্ধে হাম্মীরের পরাজয় এবং নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাকে কবি অত্যন্ত মহিমময় করে তুলেছিলেন।

 ৪.৫.৬ সাহিত্য – নাটক

সংস্কৃত সাহিত্যে নাটকের শুরু কবে থেকে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায় না। তবে কথোপকথনের বহুল প্রচলন উপনিষদগুলিতে পাওয়া যায়। যেমন কঠোপনিষদ, কেনোপনিষদ, বৃহদারণ্যকোপনিষদ ইত্যাদি। এই কথোপকথন অবশ্য কোন নাটক গড়ে তোলেনি, ধর্ম এবং বিশেষ করে ব্রহ্মজ্ঞানের চর্চায় গুরু-শিষ্যের আলাপ অথবা উন্মুক্ত সভার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিতর্কের সংলাপ। যেমন কঠোপনিষদে যমদেবের সঙ্গে নচিকেতার সংলাপ, কিংবা বৃহদারণ্যকে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে অন্যান্য পণ্ডিতদের তর্ক-বিতর্ক।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংস্কৃতে নাটকের ধারণা এসেছে গ্রিক সংস্কৃতি থেকে। তাঁদের যুক্তি হল সংস্কৃত নাটকে মঞ্চের সামনে এবং পিছনে যে পর্দার ব্যবহার হয়, সংস্কৃতে তাকে “যবনিকা” বলে, এই যবনিকা শব্দটি এসেছে “যবন” থেকে। সংস্কৃতে “যবন” শব্দ গ্রিক অর্থে ব্যবহৃত হত। এই যুক্তি অবশ্যই তর্কসাপেক্ষ। কারণ সংস্কৃতে নাটকের ধারণা যদি সম্পূর্ণতঃ গ্রিক প্রভাবেই এসে থাকে, সেক্ষেত্রে যবনিকা ছাড়াও আরও অনেক শব্দ পাওয়া যেত, যার উৎস হত গ্রিক। সেরকম কোন উদাহরণ প্রাচীনতম নাটকেও পাওয়া যায় না। বরং আমার ধারণা, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে নাটকীয় ভাবে গল্প বলার – যাকে পালাগান বা যাত্রা বলা যায় - প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতের এই ধরনের লোকশিল্প বা যাত্রার অভিনয় সর্বদাই মুক্তমঞ্চে অভিনীত হত, অর্থাৎ দর্শকরা মঞ্চের চারদিকে বসে যাত্রা দেখতে পারতেন, একদিকে কুশীলবদের যাওয়া আসার জন্যে ছোট একটি পথ ছেড়ে দিয়ে। গ্রিক প্রভাবে সেই মুক্তমঞ্চ পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলা হল এবং দর্শক শুধুমাত্র সামনে থেকেই অভিনয় দেখতে পারতেন। মঞ্চ ব্যবহারের এই দুই ধরণ অনুযায়ী অভিনেতাদের অভিনয়ের ধরণও বদলে যেতে বাধ্য - সেকথা অভিনেতারা অবশ্যই স্বীকার করে নেবেন। কারণ মুক্তমঞ্চের অভিনেতাদের চারদিকের দর্শকের কথা মাথায় রেখে ঘুরেফিরে-হেঁটেচলে অভিনয় করতে হত, সেখানে পর্দাঘেরা মঞ্চে তাঁদের অভিনয় করতে হয় একমুখী দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। অতএব মুক্তমঞ্চে পর্দার ব্যবহারের এই গ্রিক প্রভাবকেই সংস্কৃত নাটক “যবনিকা” নাম দিয়ে স্বীকার করে নিয়েছিল।

যাই হোক বিতর্ক এড়িয়ে আমরা এবার সংস্কৃত নাটকের দিকে চোখ ফেরাই। সংস্কৃত নাটকের প্রথম যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, তার রচয়িতা অশ্বঘোষ, যাঁর কথা আগেই বলেছি। যদিও তাঁর লেখা পূর্ণ নাটক একটিও পাওয়া যায়নি, কিছু কিছু অংশ পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ার মরু অঞ্চলে। যাঁর লেখা প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ নাটক আমাদের কাল অব্দি এসে পৌঁচেছে, তাঁর নাম, ভাস। ভাসের সময় কাল সঠিক জানা যায় না, তবে বিশেষজ্ঞরা তাঁকে কালিদাসের নিশ্চিত পূর্বসূরি বলে সিদ্ধান্ত করেছেন। তাঁর লেখা তেরটি নাটকের মধ্যে দুটি মহানাটকের নাম, “স্বপ্নবাসবদত্ত” এবং “প্রতিজ্ঞাযৌগণধরায়ন”। এ ছাড়া তিনি অনেকগুলি ছোট নাটকও লিখেছিলেন।

কিন্তু গুপ্তযুগের কালিদাস একদিকে যেমন মহাকবি ছিলেন, তেমনই ছিলেন মহানাট্যকার। কালিদাসের মাত্র তিনটি নাটক আমাদের সময় পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, যেমন “মালবিকাগ্নিমিত্র”, “বিক্রমোর্বশী” এবং “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌”। প্রথমটি শুঙ্গ রাজত্ব-কালে রাজপ্রাসাদে হারেমের অন্তঃপুর-চক্রান্ত নিয়ে লেখা। দ্বিতীয়টি পৌরাণিক রাজা পুরুরবা ও ঊর্বশীর প্রেমের কাহিনি নিয়ে। তৃতীয়টি পৌরাণিক রাজা দুষ্মন্ত এবং মুনি কণ্বর পালিতা কন্যা শকুন্তলার কাহিনি। এই তিনটি নাটকের মধ্যে “অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌” ভারত তো বটেই বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম। কাহিনিবিন্যাস, নাটকীয় ঘটনার মোড়, নানান চরিত্র গড়ে তাদের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের মানসিক দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয় তুলে ধরায়, মহাকবি কালিদাস নাটকটিকে উৎকর্ষের চরম সীমায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

কালিদাসের প্রায় সমসাময়িক নাট্যকার শূদ্রক, তাঁর লেখা মাত্র একখানি নাটকই পাওয়া যায়, যার নাম “মৃচ্ছকটিক” (মৃৎ+শকটিক- মাটির খেলনাগাড়ি)। এই নাটকের বাস্তবমুখী গল্প, জটিল মনস্তত্ব এবং নাটকীয়তার জন্যে এই নাটক আজও বহুল জনপ্রিয়। সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর নাট্যকার বিশাখদত্তর দুটি রাজনৈতিক নাটক পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি “মুদ্রারাক্ষস”। এই নাটকের গল্পের বিষয়, শেষ নন্দরাজা ধননন্দকে উৎখাত করে, চাণক্যের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসানোর কূট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। প্রসঙ্গতঃ ধননন্দের প্রধান অমাত্যের নাম ছিল “রাক্ষস”। আরেকটি নাটক হল “দেবীচন্দ্রগুপ্ত”। এই নাটকের বিষয় বড়ো ভাই রামগুপ্তকে সরিয়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসনে বসার ঘটনা, যে ঘটনার কথা আগেই বলেছি।

রাজা হর্ষবর্ধনের (অথবা তাঁর নামে উৎসর্গ করা) লেখা তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “রত্নাবলী”, “প্রিয়দর্শিকা” এবং “নাগানন্দ”। প্রথম দুটির নায়িকা অন্তঃপুর-নারী, তাঁদের নামেই নাটকের নাম এবং বিষয় অন্তঃপুরিকাদের নানান মজাদার ঘটনা। তৃতীয় নাটকটির নায়ক রাজকুমার জীমূতবাহন, গল্পের বিষয় নিজের জীবন দিয়ে আর্তের উদ্ধার। রাজা হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক আরেক রাজা, পল্লবরাজ মহেন্দ্র বিক্রমবর্মণ একখানি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন, যার নাম “মত্তবিলাস”। নাটকটি প্রহসনধর্মী এবং তীব্র বিদ্রূপাত্মক। এক শৈব সন্ন্যাসী মদ্যপানে মত্ত হয়ে, তাঁর ভিক্ষাপাত্রটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই ভিক্ষাপাত্রটি ছিল একটি “কপাল” (অর্থাৎ নরখুলির উপরাংশ)। নেশাভঙ্গের পর, তাঁর এই কপালটি চুরি করার জন্যে তিনি দোষী সাব্যস্ত করলেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে। এই নিয়ে বহু বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ল গ্রামের উভয় পক্ষীয় মহিলা এবং পুরুষরাও। অবশেষে দেখা গেল কপালটি মুখে নিয়ে একটি কুকুর পালিয়েছিল। এই নাটকটির সাহিত্যগুণ যাই হোক সমসাময়িক সমাজের একটি স্পষ্ট খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে।

কালিদাসের পরেই বিখ্যাত সংস্কৃত নাট্যকারের নাম, ভবভূতি। বিদর্ভের ভবভূতির সময়কাল মোটামুটি অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে, তিনি কনৌজের রাজা যশোবর্মনের সভাকবি ছিলেন। তাঁর তিনটি নাটক পাওয়া যায়, “মালতী-মাধব”, “মহাবীরচরিত” এবং “উত্তর-রামচরিত”। প্রথম নাটকটির বিষয় নায়ক ও নায়িকার প্রেম। পরের দুটি নাটকেরই নায়ক শ্রীরামচন্দ্র।

৪.৫.৭ সাহিত্য - গদ্য

ভারতীয় ভাষায় এবং সংস্কৃতে কাব্য কিংবা নাটকের তুলনায় গদ্য রচনা খুবই কম। প্রথম সংস্কৃত গদ্য রচনা কিছু পাওয়া যায় উপনিষদে, ব্রাহ্মণে। তাছাড়া পালি ভাষায় গদ্য গ্রন্থ “জাতক” – ভগবান বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনিগুলি। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে তিনজন লেখক কিছু গদ্য রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন, দণ্ডিন, সুবন্ধু এবং বাণ। এঁদের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য এবং সার্থক লেখক দণ্ডিন, তাঁর গ্রন্থের নাম “দশকুমারচরিত”। এই গ্রন্থের দশটি গল্প দশজন রাজকুমারের ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে। দশজন রাজকুমারের দেশভ্রমণের বর্ণনা থেকে উঠে এসেছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা– তার মধ্যে আছে বণিক, চোর, বারবনিতা, রাজকুমারী, কৃষক এবং বন্য উপজাতি। এই অভিজ্ঞতা কখনো মজার, কখনো ভয়ংকর, কখনো অনৈতিক কিন্তু মোটামুটি বাস্তব। সমাজের নিম্ন স্তরের এমন সাবলীল এবং প্রায় বাস্তব চিত্র, সংস্কৃত সাহিত্যে আর পাওয়া যায় না।

পরের পর্ব - " ধর্মাধর্ম - ৪/১১ "



[1] The Wonder that was India – A. L. Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

[2] The Wonder that was India – A. L. Basham -এর গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...