এর আগের বড়োদের গল্প - " ক্ষতিপূরণ "
চার পুরুষ আগের পারিবারিক অবিচারের প্রায়শ্চিত্ত করল এক জেন-জি তরুণ।
নিজের পরিবার থেকে একদা নির্বাসিতা সৌদামিনী সসম্মানে ফিরল ঘরে।
উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশের পথে।
প্রকাশের স্থান ও কাল ঘোষণা করব যথা সময়ে।
নীচেয় রইল কয়েকটি ঝলকঃ-
১
শনিবারের রাত আর রোববারের সারাটা দিন কলকাতার মেসে একা একা কাটানো বড়ো বিড়ম্বনা। অফিস থেকে ফিরে অন্যদিন যে মেসে সর্বদা হইহুল্লোড়, হইচই আর আড্ডা লেগে থাকে, সেখানে যেন বিরাজ করে শ্মশানের স্তব্ধতা। মেসের ম্যানেজার, মাঝবয়েসি ভদ্রলোক, খ্যাংরা কাঠির ডগায় আলুরদম টাইপের চেহারা। নাম সত্যচরণ। লোক খারাপ নয় – মেসের সকলের সঙ্গেই তাঁর সদ্ভাব। এই হপ্তায় তিনি বলেছিলেন বাড়ি যাবেন না, কিন্তু বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজতেই তিনি পড়ি কি মরি দৌড়লেন হাওড়া স্টেসান। বাড়ি থেকে কি জরুরি তার এসেছে, বাড়ি না গেলেই নয়। তাঁর বাড়ি বেলমুড়ি। সকালের দিকে বেলমুড়ি নাম শুনলে ওই লাইনের লোকজন খুব রেগে যায়, বলতে হয় শ্রীফল-চালভাজা। হাওড়া থেকে সন্ধে ছটা ষোলোর বর্ধমান কর্ডের ট্রেন ধরবেন তিনি।
সত্যবাবু বেড়িয়ে
যাবার পর কানাইবাবু ছিলেন লাস্ট। ওঁর বাড়ি কাঁচড়াপাড়া, শেয়ালদা থেকে ট্রেন ধরেন।
মেস থেকে শেয়ালদা হাঁটা পথে পাঁচমিনিট। কানাইবাবু বেরোনোর আগে মৃগাঙ্কর ঘরে এসে বললেন,
“কি ব্রাদার, গিন্নি বাড়ি নেই বলে, এ হপ্তাটা ডুবই দিয়ে দিলেন? একলা মেসে কী করে থাকবেন
মোহায়, জানিনা। এখনো সময় আচে, ঝটপট বেরিয়ে পড়ুন ছটা আটান্নর ট্রেনটা ধরে ফেলুন। গিন্নি
নেই তো কি হয়েচে, বাপ-মা আচে, বন্ধুবান্ধব আচে। সময়টা তবু কেটে যাবে। কলকেতার ধুলো-ধোঁয়া থেকেও
দুটো দিন মুক্তি মিলবে”।
“না, না কানাইবাবু। কাজেকম্মে কদিন বেশ অবহেলা করে ফেলেছি।
বেশ কিছু কাজ জমা হয়ে গেছে। ভাবছি এই দুটো দিনে সেগুলো সামলে নেব”।
“বটে? তবে তাই সামলান। এদিকে দেকলাম সত্যচরণবাবুও সটকে পড়লেন”।
“হ্যাঁ। বললেন বাড়ি থেকে তার এসেছে, জরুরি ব্যাপার”।
“ধুর মোহাই, আপনিও যেমন। ও তার কি আর টেলিগ্রাপের তার? ও মনের তার, শনিবারের বিকেল হলেই টক্কা টক্কা টরে টক্কা”। এক চোক বন্ধ করে খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসল, কানাইবাবু। “যাকগে, তাহলে আপনি সত্যি সত্যি যাচ্চেন না, তাহলে আমি আসি। সোমবার সন্ধেয় আবার দেকা হবে”।
কানাইবাবুর চলে যাওয়া জুতোর শব্দ সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে এক
সময় আর শোনা গেল না। আর তখনই মৃগাঙ্কর মনে হল, মেসের খালি ঘরগুলো এবার দাঁত
শানাচ্ছে। সন্ধের অন্ধকার নামলেই দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে মৃগাঙ্কর ওপর।
কানাইবাবু কথাটা খারাপ কিছু বলেন নি। তার গিন্নি আশালতা তিন
মাসের ওপর পশ্চিমের ভাগলপুরে বাপের বাড়ি গেছে। কথা ছিল একমাসের মধ্যেই ফিরে আসবে।
তিন সত্যি করে গিয়েছিল। কিন্তু আসেনি। গোলাপি খামে হপ্তায় দুটো করে চিঠি লেখে।
কিন্তু সে চিঠিতে কি আর সামনে দেখার আনন্দ মেলে, নাকি মেলে স্পর্শের রোমাঞ্চ? মাঝে
শ্বশুরমশাইয়ের চিঠি এসেছিল, মৃগাঙ্কর বাবার কাছে। মৃগাঙ্ক গত শনিবার বাড়ি গিয়ে
মায়ের কাছে সেই চিঠি দেখেছিল ।
“পরমশ্রদ্ধেয় বৈবাহিক মহাশয়,
পরম মঙ্গলময়ের করুণায় আশা করি আপনি ও বেয়ান মহোদয়া
সর্বাঙ্গীন কুশলে আছেন। আমাদের পরম আদরের মৃগাঙ্কবাবাজীবনও সুস্থ ও কুশলে আছে।
কলিকাতায় মেসে তাহার কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য আমরা যারপরনাই দুশ্চিন্তায় থাকি জানিবেন।
আপনাদের দুইজনের স্নেহ ও আদরে আমাদের কল্যাণীয়া কন্যা আশালতা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিতা ও
আনন্দিতা। তাহার মুখে সর্বদা আপনাদিগের স্নেহের কথা শুনিয়া আমার পিতৃহৃদয়ে কিঞ্চিৎ
ঈর্ষা অনুভব হয় সত্য, কিন্তু কন্যা সন্তানের পিতা হিসাবে আশালতা মার এই নিশ্চিন্ত
আনন্দে আমার দুই নয়ন যে অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠে, তাহা অস্বীকার করিব কী প্রকারে?
এক্ষণে, একান্ত দুঃখের সঙ্গে জানাই, আমার মাতাঠাকুরাণির পীড়ার
কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি হইয়াছিল। এক্ষণে শ্রীরাধাগোবিন্দের কৃপায় তিনি ধীরেধীরে উপশম
হইতেছেন। অন্ধ স্নেহের বশে তিনি তাঁহার পৌত্রী আশালতাকে সর্বদাই কাছে কাছে ধরিয়া
রাখিতে চাহেন। পীড়িতা মাতার অবুঝ চিত্তের সান্ত্বনার জন্য আশালতা মাকে আটকাইতে
বাধ্য হইলাম । অতএব একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আপনাদিগের স্নেহক্রোড়ে আশালতার
ফিরিতে কয়েকদিন বিলম্ব হইবে, তাহার জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং আমার কথার খেলাপ
হইবার কারণে আমি অত্যন্ত লজ্জিত জানিবেন। মাতাঠাকুরানি কিঞ্চিৎ আরোগ্য লাভ করিলেই,
আমি সকন্যা আপনার সম্মুখে উপস্থিত হইব এবং আপনাকে আমার পরিবারের সমস্ত কথা অবগত
করাইব।
লক্ষ্মীজনার্দ্দনের ন্যায় আপনারা চিরসুখী থাকুন। জামাতা বাবাজীবনকে আমার আশীর্ব্বাদ দিবেন। বাড়ির গুরুজনদের আমার প্রণাম ও ছোটদের আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাইবেন। ইতি।
শ্রদ্ধাবনতঃ
অমিয় কান্তি সান্যাল।
* * * * * *
সেই চিঠি পড়ার পর থেকে তার বুকের ভেতর জমতে শুরু করেছে
অভিমানের পাহাড়। গত বুধবার আশালতার একটা চিঠি পেয়েছে মৃগাঙ্ক। তাতেও নতুন কিছু
নেই, একই খবর। ফেরারও কোন হদিস নেই।
“ওগো,
আজি তিন মাসের ওধিক আপনার সহিত আমার দেকা হয় না। আপনি
কি খাচ্চেন কি কচ্চেন, আপনার ধুতি জামা কে পষ্কার করে দিচ্চে এই চিন্তা
সারাদিন আমাকে কুরে কুরে খায়। আমার বুকের এ ব্যাতা কারও কাচে মুক ফুটে বলতেও
পারি না। ঠাকুরমার শরীর খারাপের খপর বাবার চিটিতে আশা করি পেয়েচেন। ঠাকুরমা খুব কাঁদেন আর বলেন লতু আমার কাচটিতে এসে বোস, আমার
মাতায় হাত বুলিয়ে দে। বুড়ো মানুষ, আমাদের কাঁকে-কোলে করে মানুষ করেচেন, কি করি বলুন?
আপনার দুই পায়ে পড়ি, রাগ কোরবেন না লক্ষিটি। আমি কি জেনেশুনে আপনাকে এত কষ্ট দিচ্চি, বলুন?
ওই ঠাকুরমা আবার ডাকচেন, আমি যাই,
কেমন? আমার ওপর রাগ করে থাকবেন না কথা দিন? প্রণাম নিন। ইতি।
প্রনতা
আপনার শ্রী চরণের দাসী
আশা”।
চিঠিটা পড়ে মৃগাঙ্কর খুব স্পষ্ট ভাবেই মনে হল, তার কথা
আশালতা একটুও ভাবে না। অথচ তার মনে সারাদিন সারাক্ষণ, সমস্ত কাজের মধ্যে, আশালতার
সুন্দর মুখখানা ছাড়া আর কোন চিন্তাই আসে না।
* * * * *
বিশেষ আবার বুড়ির কাছে মুখ নিয়ে গেল, জিজ্ঞাসা করল, “বুড়িমা,
তোমার সেই গ্রামের নাম কি? কি নাম তোমার সেই দাদার”?
বুড়ি হেসে ফেলল এবার হে হে করে। এমন হাসি বহুকাল হাসেনি। এ
ছোঁড়াটা তো বেশ। বুড়ি ভাবল। কাল রাত থেকে ছোঁড়াটা কিসের জন্যে তার পেছনে লেগে আছে,
বুড়ি বুঝতে পারছে না। এর আগেও তার জীবনে দু একজন এমন দয়া দাক্ষিণ্য দেখিয়েছে। দু
একদিন খাইয়েছে। শীতের চাদর কিনে দিয়েছে। কিন্তু এত কথা কেউ বলেনি। কেউ জিজ্ঞাসা
করেনি তার জীবনের কথা। বুড়ি হাসি মুখে বলল, “কী করবি জেনে”?
“কিচ্ছু না, কী আর করবো। তোমাকে কি ফিরিয়ে দিতে পারবো, তোমার সেই গ্রাম,
সেই বাড়ি ঘরদোর? তোমার সেই ফেলে আসা জীবন? এমনি”।
“গ্রামের নাম কুসুমপুর, দাদার নাম শশাংক। আমি কপালপোড়া সদু,
সৌদামিনী”।
* * * * *
শ্রীচরণকমলেষু দাদা,
আপনি ও বৌদিমণি আমার প্রণাম নেবেন। খোকা ও বৌমাকে আমার
আশীর্বাদ দেবেন। আশা করি ভগবানের কৃপায় আপনারা সকলে কুশলে আছেন। প্রায় তিনবছর হল
আমি কাশীতে এসেছি, এখানে থাকতে আমার আর ভালো লাগছে না। দাদা, আপনার দুটি পায়ে পড়ি।
বৌদিমণিকে বলে আমাকে অন্ততঃ মাস খানেকের জন্যে হলেও গ্রামে ফিরিয়ে নিন। আপনাদের
সকলকে চোখে দেখার জন্যে আমার মন বড়োই অতিষ্ঠ হয়। আপনার পাঠানো টাকাতে সংকুলান হয়
না। বাড়িওয়ালা বলছিল, গত পাঁচ-ছমাস আপনি নাকি কোন টাকা পাঠান নি। দাদা, আপনার ও
বৌদিমণির চরণে যা অপরাধ করেছি তা ক্ষমা করে, এই হতভাগী বোনকে ফিরিয়ে নিন। আপনি ও
বৌদিমণি আমার প্রণাম নেবেন। আপনার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম।
ইতি আপনার একান্ত অভাগী
সৌদামিনী
চিঠিটা পরপর দুবার পড়লেন মৃণালিনী। তারপর চিঠিটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে এলেন রান্নাঘরের উনুনে। রান্নাঘরের এই উনুনে গুঁড়োকয়লা দিয়ে ঢিমে আঁচ রাখা থাকে। তার ওপর বসানো থাকে লোহার কড়াই ভর্তি দুধ। সময়ে অসময়ে দরকার পড়লে এই উনুনের আগুন কাজে লাগে। উনুনের ঢিমে আঁচে জ্বলে উঠল চিঠির ছেঁড়া টুকরোগুলো। মৃণালিনীর যাবতীয় অমঙ্গলের আশঙ্কা এবং সুদূর কাশীতে নির্বাসনে থাকা ঠাকুরঝির বুকের অনন্ত জ্বালা, ছাই হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
* * * * *
ফোন অফ করে বিশেষ
হীরালালজির দিকে তাকাল, একটু হাসল। বলল, “বাবা। খুব ইমোশনাল
হয়ে পড়েছেন। বাবা-মা কাল সকালের ফ্লাইটে আসছেন, সঙ্গে আসছেন আমার দাদু ও ঠাম্মি, মানে
ঠাকুমা। হয়তো এখানেও একবার আসবেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে”।
হীরালালজি হাসলেন, বললেন “আসতে দে। আমি
থাকব।”
বিশেষ বলল, “চলি?”
“উঁহু, আসি বলতে হয়”।
গাড়ি উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে এল। অনন্ত এক সময়ের তরণী বেয়ে সৌদামিনী আজ ঘরে ফিরছে।
-০০-
এর পরের বড়োদের গল্প - " বীণাপাণি ভাতের হোটেল "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন