এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
৫
মহাভারতের অপূর্ণতা
সূত বললেন, “ব্রহ্মলোক
থেকে দেবর্ষি নারদকে আসতে দেখে, ঋষি ব্যাসদেব উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন
এবং প্রণাম করলেন। দুজনেই সেই সরস্বতী নদীতীরে আসন গ্রহণ করার পর, দেবর্ষি নারদ
স্মিতমুখে ব্যাসদেবকে বললেন, “হে মহাভাগ পরাশরনন্দন, আপনি নিজের চিত্তে, দেহে ও
আত্মায় প্রসন্নতা লাভ করেছেন তো? আপনি সর্ব ধর্মের তত্ত্ব সার নিয়ে অদ্ভূত মহাভারত
রচনা করেছেন, অতএব মনে হচ্ছে আপনি ধর্মের সকল বিষয়েই সম্যক জ্ঞান লাভ করেছেন। আপনি
সনাতন ব্রহ্মের বিচার করেছেন, তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। এত সাফল্য
সত্ত্বেও, আপনি অসফল ব্যক্তির মতো নিজের বিষয়ে, তাহলে শোক করছেন কেন?”
ব্যাসদেব
বললেন, “আপনি যা বলেছেন, সবই সত্য। কিন্তু তাও আমি আত্ম-পরিতৃপ্তি অনুভব করতে পারছি
না। আমার এই অসন্তুষ্টির কারণ কী, তাও বুঝতে পারছি না। আপনার জ্ঞানের কোন সীমা
নেই, অতএব আপনিই আমার এই অস্থিরতার কারণ নির্দেশ করুন। যিনি স্বয়ং অসঙ্গ থেকে
তিনগুণের সঙ্কল্পে এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং যিনি এই
সমস্ত কার্য ও কারণের নিয়ন্তা, আপনি সেই পুরাণ পুরুষ ভগবানের উপাসনা করে সমস্ত গোপন
বিষয় অবগত হয়েছেন। আপনি ত্রিভুবনে ঘুরে বেড়ান বলে, আপনি সূর্যের মতো সর্বদর্শী।
আপনি প্রাণবায়ুর মতো যোগবলে সকল প্রাণীর অন্তরে থেকে প্রাণীদের বুদ্ধি প্রবৃত্তি
লক্ষ্য করেন। আমি সদাচার, অহিংসা ও ধর্মযোগে পরব্রহ্মে স্থিতি লাভ করেছি। নিয়মমতো
অধ্যয়ন করে বেদের তত্ত্বসমূহ উপলব্ধি করেছি, তাও আমার মধ্যে কেন এই অপূর্ণতার বোধ
রয়েছে, আপনি কৃপা করে নির্দেশ করুন”।
দেবর্ষি নারদ বললেন, “আপনি শ্রী ভগবানের নির্মল যশ প্রায় কিছুই বর্ণনা করেননি, সেই কারণেই আপনার মধ্যে এই অপূর্ণতার বোধ এসেছে। হে মুনিবর, আপনি ধর্ম ও তার সাধন যেমন সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, ভগবান বাসুদেবের মহিমা সেভাবে বর্ণনা করেননি। বাক্য নানান অলঙ্কারে সাজানো, বিচিত্র পদ বিন্যাসে অত্যন্ত সুশোভন হলেও, সেই বাক্য যদি শ্রীহরির জগৎপবিত্র যশ বর্ণনায় প্রযুক্ত না হয়, তাহলে সে বাক্য কাক-তুল্য কামনার বশীভূত মানুষের পক্ষে শ্রুতিমধুর হতেও পারে। কিন্তু সে বাক্য ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসদের কাছে একান্তভাবেই পরিত্যাজ্য একথা নিশ্চয় জানবেন। মনে রাখবেন, কোন গ্রন্থের প্রতিটি শ্লোক যদি ভগবানের যশোময় নামের কীর্তন করে, সেই শ্লোক অশুদ্ধ পদে রচিত হলেও জনগণের পাপ নাশ করে থাকে। যে জ্ঞানে অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়, সে জ্ঞান যদি ভগবান অচ্যুতে ভক্তিহীন হয়, তাও সেই জ্ঞান মূল্যহীন, কারণ ওই জ্ঞানে প্রত্যক্ষ ভাবে ভগবানকে অনুভব করা যায় না।
[দেবর্ষি নারদ অপ্রিয়বাদীতার জন্য বিখ্যাত। অতএব তিনি সরাসরি বেদব্যাসকে দোষারোপ করে যা বললেন, তার সার কথা হল, "ওহে দ্বৈপায়ন, তুমি শাস্ত্র ও তত্ত্ব কথা শুনিয়েছ, ধর্মাচরণ ও ধর্মসাধনার যাবতীয় পথ বাতলিয়েছ, কিন্তু আসল কথাটিই তো বলোনি। ভগবান শ্রীহরির প্রতি বন্দনা, স্তুতি ও ভজনা নিবেদন করে, তোমার এই পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছ? জনসাধারণের হিতের জন্যে মহাভারত রচনা করেছ, খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু তার মধ্যে শ্রীবাসুদেবের অপার মহিমা ও ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা কোথায় বলেছ...কিস্সু তো বলনি...। কাজেই মহাভারত রচনা করে আত্ম-তৃপ্তি পাওয়ার আশা করছ কী করে? আমি মানছি] আপনি সত্যদর্শী, পুণ্যকীর্তি ও দৃঢ়ব্রত, আপনি অখিল লোকের বন্ধনমুক্তির জন্য শ্রীহরির লীলা সবিস্তারে বর্ণনা করুন।
সাধারণ
লোকের চিত্ত স্বভাবতঃ কামনার বশীভূত, আপনি নিন্দনীয় কামনার কর্মকে কর্তব্য নির্দেশ
করে অত্যন্ত অন্যায় কার্য করেছেন। আপনার বাক্যের উপর আস্থা রেখে সাধারণ লোক কাম্য
ধর্মকে মুখ্য ধর্ম বলে মনে করছে এবং তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তিরা এই ধর্ম মুখ্য
ধর্ম নয় বললেও, তারা সে কথা অমান্য করছে। চেতন ও অচেতন সমস্ত পদার্থের সৃষ্টি,
স্থিতি ও প্রলয় ভগবানই নিয়ন্ত্রণ করেন, অতএব নিখিল বস্তু ভগবানের থেকে বিচ্ছিন্ন
না হলেও, ভগবান এই সমস্ত পদার্থ থেকেই আলাদা। আপনি স্বয়ং এই ভগবৎ লীলা অবগত আছেন।
আপনি নিজেকে পরমপুরুষ পরমাত্মার অংশ রূপেই জানবেন, আপনি জগতের মঙ্গলের জন্য
জন্মগ্রহণ করেছেন। আপনার দৃষ্টি স্বচ্ছ ও
অব্যর্থ, সুতরাং আপনি মহানুভব শ্রীহরির গুণসমূহের বর্ণনা করুন। জ্ঞানীগণ বলেন,
উত্তমশ্লোক ভগবানের গুণ বর্ণনাই পুরুষের তপস্যা, বেদ পাঠ, উত্তম যজ্ঞের অনুষ্ঠান,
স্তব পাঠ, জ্ঞান ও দানের অক্ষয় ফলস্বরূপ।
হে তপোধন, পূর্বকল্পে, আমার পূর্বজন্মের কথা আপনাকে বর্ণনা করছি, শুনুন।
[সে যুগে দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের পক্ষে ভাগবত পুরাণ সহ অন্য বহু পুরাণ রচনা কোনভাবেই সম্ভবপর নয়, কিন্তু পুরাণগুলি তাঁর নামেই রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল - কারণ তিনি ছিলেন সে যুগের জনপ্রিয়তম ও অলোকসামান্য প্রতিভাধর বেদ ও শাস্ত্রবেত্তা। অতএব ধারণা করা যায়, পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরা তাঁর নামে বিবিধ পুরাণ রচনার পাশাপাশি, মহাভারতের মূল রচনাতেও হস্তক্ষেপ করে বহু নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করেছিলেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ "ভাগবত গীতা"। যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত, টান-টান উত্তেজনায় অপেক্ষারত কুরু ও পাণ্ডবদের বিপুল সৈন্যসমাবেশের মাঝখানে, (ভীষ্ম পর্বে) শুরু হচ্ছে অষ্টাদশ অধ্যায় গীতার আলোচনা। এই আলোচনাটি করেছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন। ধরে নিলাম, শ্রীকৃষ্ণের ভগবৎ মহিমার প্রভাবে, তীক্ষ্ণ প্রতিভাধর অর্জুনের পক্ষে এই আলোচনার মর্ম উপলব্ধি করতে অন্ততঃ তিন-চার ঘন্টা সময় লেগেছিল (যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সারা জীবনও যথেষ্ট নয়)। এই দীর্ঘ সময় ধরে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধপক্ষের রণোৎসাহী বীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধন, কৃপ, অশ্বত্থামা প্রমুখ যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন? বিশ্বাস করা কঠিন। তবে ভক্তরা বলবেন, শ্রীকৃষ্ণের দৈবী মায়ায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন উপস্থিত ওই সকল বীর যোদ্ধারা - অতএব এমন ঘটনা না ঘটা অসম্ভব কেন?]
নারদের জীবন কথা
আমার মা
ছিলেন কয়েকজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী। একটু বড়ো হয়ে আমিও সেই ব্রাহ্মণদের সেবা
করতাম। আমি কিন্তু আর পাঁচজন ছেলেমানুষ বালকের মতো চঞ্চল ছিলাম না কিংবা
খেলাধুলোতেও আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি কথা বলতাম কম, আর সর্বদাই সেই ব্রাহ্মণ
পণ্ডিতদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতাম। এই
পণ্ডিতরা সর্বদাই কৃষ্ণকথা বলতেন, আর তাঁর প্রসঙ্গই আলোচনা করতেন। এইভাবে
সর্বক্ষণ কৃষ্ণকথা শুনতে শুনতে আমার মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি পরমভাব তৈরি হয়ে
গেল। তাঁর প্রতি অবিচলিত ভক্তির জন্যে পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতেও খুব অসুবিধে হল না।
আমি অনুভব করলাম, সমস্ত মায়ার অতীত পরমব্রহ্মই আমার স্বরূপ।
বর্ষা
আর শরৎকালের কয়েকমাস টানা বৃষ্টির জন্যে সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা কোথাও বেরোতে
পারতেন না**, তাই ঘরে বসে, দিন রাত তাঁরা হরি সংকীর্তন করতেন। তাঁদের সেই সংকীর্তন শুনতে শুনতে আমার মন থেকে
রজঃ ও তমোগুণ দূর হয়ে গেল, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সকল আসক্তি থেকে আমি মুক্ত হয়ে গেলাম।
কৃষ্ণভাবে আমার এই একনিষ্ঠ অনুরাগ, আমার বিনীত ব্যবহার, সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধাভাব
এবং আমার নিরাসক্ত সেবায় তাঁরা মুগ্ধ হলেন। আমি তখন সামান্য বালক হলেও, সাক্ষাৎ
ভগবানের থেকে পাওয়া অতি গোপন তত্ত্বজ্ঞানের কথা তাঁরা দয়া করে আমাকে বর্ণনা করলেন।
সেই জ্ঞানের তত্ত্ব উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গেই, বিশ্ববিধাতা ভগবান বাসুদেবের মায়ার
স্বরূপ ও সমস্ত কার্য-কারণ আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই সেই
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা অন্য কোন জায়গায় চলে গেলেন।
**[সন্ন্যাসীরা বর্ষাকালের চারমাস পরিব্রাজন স্থগিত করে কোন জনপদে বা গ্রামে বাস করতেন। এবং সেখানেই তপস্যা, তত্ত্ব আলোচনা, ব্রত পালন করতে করতে বিশ্রাম করতেন। এই ব্রতের নাম ছিল “চাতুর্মাস্য ব্রত” – এই ব্রতের শুরু হত আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশীতে এবং সমাপ্তি হত কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে। সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম পরবর্তী কালেও অবশ্য পালনীয় ছিল। এই চারমাস ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বর্ষার কাল - বৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুর্যোগের সময়। অতএব পথঘাট পদব্রজের উপযুক্ত নয় এবং বর্ষায় ভরা নদীগুলিও পার হওয়ার পক্ষে প্রতিকূল হয়ে উঠত।]
আমিই ছিলাম
আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার যত্নের জন্যে তাঁর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু
যেহেতু তিনি অন্যের ঘরে দাসীর কাজ করতেন, তাই তাঁর একমাত্র পুত্রের জন্যে প্রাণপণ
চেষ্টা করেও, আমার জন্যে যথেষ্ট খাবারদাবার, জিনিষপত্র যোগাড় করে উঠতে পারতেন না।
আর তাতেই তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহের বশে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। এই জগতে আমরা
সবাই যে ভগবানের হাতের পুতুল, কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেকথা সেই অবলা, অসহায়
নারী কি করে বুঝবেন? একদিন রাত্রে, মা বেরিয়েছিলেন গোয়ালের গরু দুইয়ে আমার জন্যেই
দুধ আনতে, আর ফিরলেন না। যাবার সময় সাপের গায়ে হয়তো পা দিয়ে ফেলেছিলেন, সেই সাপের
কামড়েই তাঁর মৃত্যু হল।
সেই বালক
বয়েসেই আমার সেই একমাত্র মায়া এবং ভালোবাসার বন্ধন ছিঁড়ে গেল। আমার মনে হল, এও
ভগবান বাসুদেবের করুণা, মায়ার বাঁধন থেকে মুক্ত করে, তিনি আমাকে বিশ্বজগতের সামনে
উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম উত্তরদিকে। অনেক শহর, গ্রাম,
পাহাড়, পর্বত, ফুলের বাগান, বন, উপবন, নদী, সরোবর দেখলাম। কত ধরনের মানুষ, পাখি,
প্রাণী, গাছপালা, অরণ্যের জন্তু, জানোয়ার দেখলাম। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক
অরণ্যের মধ্যে ভীষণ ক্লান্তি আর খিদেয় অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এক জায়গায় একটি
নদীসরোবর দেখে সেখানে স্নান করলাম, পেট ভরে জল পান করলাম। তারপর
সেই জনহীন বনের মধ্যে এক বিশাল অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে, পরমাত্মার ধ্যান করতে শুরু
করলাম।
অনেকক্ষণ
ভগবানের শ্রীচরণকমলের ধ্যান করতে করতে আমার মন ভক্তিতে বিবশ হয়ে এল। আমার দু চোখে
নেমে এল ভক্তি বিহ্বল অশ্রুর ধারা। অবশেষে তিনি আমার মনের মধ্যে প্রকাশ হলেন। আমি
তাঁকে অনুভব করলাম আমার অন্তরে। আমার সমস্ত শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম, ব্যাকুল
হয়ে ডুবে গেলাম পরম আনন্দ সাগরে। আমি ভুলেই গেলাম আত্মা আর পরম আত্মার সকল
তত্ত্ব। সেই অনুভবের পর আমি যখন স্বজ্ঞানে
ফিরলাম, তাঁর দর্শন পাওয়ার জন্যে, আমি ব্যাকুল হয়ে গেলাম। আমার অন্তরে তাঁর সেই
অল্প সময়ের উপস্থিতিতে আমার মন ভরল না। তাঁকে কাছে পেয়েও তাঁকে দেখতে না পাওয়ার চরম
দুঃখ আমাকে গ্রাস করল। আমার সমস্ত অন্তরে তখন শুধু হাহাকার, আমার নিজেকে তখন দীনের থেকেও অত্যন্ত দীন বলে মনে
হচ্ছিল।
এইরকম
অবস্থার মধ্যেই একদিন তাঁর কথা শুনতে পেলাম, তিনি গভীর করুণাময় মধুর কণ্ঠে আমাকে
বললেন – বৎস নারদ, এই জন্মে তুমি আর আমাকে দেখতে পাবে না, কাজেই বৃথা চেষ্টা করো
না। আমি তোমাকে একবার মাত্র দেখা দিলাম, যাতে তোমার অন্তর আমাতেই আসক্ত থাকে।
কারণ, সকল ভক্তই সমস্ত কামনা বিসর্জন দেয়, শুধুমাত্র আমার দর্শন পাওয়ার ইচ্ছায়।
যোগীর মন থেকে সমস্ত কামনা দূর না হলে, সে যোগী অসম্পন্ন যোগী, তাদের আমি দর্শন
দিই না। তুমি বালক বয়সে খুব অল্প কিছুদিনের জন্য সাধুসেবা করলেও আমার প্রতি তোমার গভীর
অনুরাগে আমি প্রসন্ন হয়েছি। এই জীবনের শেষে তুমি আমারই পার্ষদ হবে। আমার প্রতি যার
চিত্ত সর্বদা অনুরক্ত থাকে, তার কোন কালেই আর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে না। এমন কি
বিশ্বের সৃষ্টি ও প্রলয়ের সময়েও, সেই ভক্তের স্মৃতি আমি অক্ষুণ্ণ রাখি।
এই আদেশ
দিয়ে নিরাকার ভগবান চলে গেলেন। তাঁর এই অদ্ভূত করুণা পেয়ে আমি কৃতার্থ হয়ে তাঁকে
বার বার প্রণাম করলাম আর তারপর আমিও বেরিয়ে পড়লাম। জগতের
প্রতিটি জীবের মঙ্গলের জন্যে তাঁর প্রাত্যহিক লীলা দেখতে দেখতে, আমি গোটা
পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম, আর দিন গুণতে শুরু করলাম, কবে হবে আমার এই দেহের
বাঁধন থেকে মুক্তি আর তাঁর সঙ্গে হবে পরম মিলন। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, এল
সেই শুভ দিন, আমার এই দেহ মৃত্যু বরণ করল। আর আমি লাভ
করলাম তাঁর নিত্য পার্ষদদেহ।
এই কাহিনী
কিন্তু এই কল্পের নয়। এ সব ঘটনা ঘটে গেছে বহু কল্প আগে।
তারপর বহুবার এক কল্পের অন্তে ঘটে গেছে জগতের প্রলয়, সৃষ্টি হয়েছে নতুন কল্পের
নতুন জগৎ। এক কল্পের অন্তে শ্রীনারায়ণ যখন কারণ-সাগরে শয়ন করেন, তাঁর সঙ্গে লীন হয়ে যান স্বয়ং
ব্রহ্মও। তাঁর নিশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে,
আমিও তাঁর ভিতরেই বাস করি। তারপর হাজার হাজার দিব্য যুগ পার করে, যখন নতুন কল্পে
নতুন সৃষ্টির সময় হয়, শ্রীনারায়ণের নাভি কমল থেকে জেগে ওঠেন ব্রহ্মা। আর ভগবানের
ইন্দ্রিয় থেকে মরীচিগণ ও আমার জন্ম হয়।
মহাবিষ্ণুর পরম করুণায়, আমরা আগেকার কোন জন্মের স্মৃ্তিই ভুলি না।
আমি চিরকাল ব্রহ্মচর্য্য পালন করি। তাঁর
করুণায়, এই তিন ভুবনে এমন কোন স্থান নেই যেখানে আমি না যেতে পারি। এই কল্পে তিনি
আমাকে একটি বীণা দিয়েছেন। এই বীণার স্বরগ্রাম স্বতঃসিদ্ধ। এই বীণায় সুর তুলে, আমি
দেশে দেশে, ঘরে ঘরে, তাঁর মহিমা গেয়ে বেড়াই। এই বীণার সুরে তিনি সর্বদাই আমার মনের
মন্দিরে বাস করেন, আর আমিও সর্বদা তাঁর করুণার আশ্রয়ে থাকতে পারি।
অতএব, আপনি
মনে আর কোন দ্বিধা রাখবেন না। মনে রাখবেন,
কামনা ও আসক্তিতে ভরা এই জগৎ সমুদ্র, তাঁর মহিমার ভেলাতেই পার হওয়া সম্ভব। যাগ,
যজ্ঞ, যোগ সাধনার চেয়েও, শুধুমাত্র শ্রীমধুসূদনের একান্ত সেবাই, মনকে পরম শান্তি
এনে দিতে পারে। অতএব, আপনি আর দেরি না করে, শ্রীহরির মাহাত্ম্য বর্ণনা করুন। আপনার
সুমধুর ভাষায় প্রচার করুন, তাঁর পরম লীলার পরম তত্ত্বকথা। এছাড়া, আপনার মুক্তির আর অন্য কোন পথ নেই, হে মুনিবর”“।