উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৫

 ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা (আগের পর্বে শুরু হয়েছিল, তারপর...)  

এরপর ব্রহ্মা একদিন চিন্তা করতে লাগলেন, পূর্ব কল্পের মতো কিভাবে লোকসকলকে যথাযথ সৃষ্টি করব? এই রকম ভাবতে ভাবতে ব্রহ্মার চার মুখ থেকে চার বেদের সৃষ্টি হল। তাঁর চার মুখ থেকে চার যজ্ঞকারী,  হোতা, উদ্গাতা, অধ্বর্য্যু ও ব্রহ্মার সৃষ্টি হল। এই চার যজ্ঞকারীর কর্ম, কর্মতন্ত্র, অর্থাৎ যজ্ঞবিস্তার, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি উপবেদ সকল, নীতিশাস্ত্র, ধর্মের চার পাদ, চার আশ্রম ও তার বিধি বিধান সকল সৃষ্টি হল।  এই ভাবে তিনি ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব, এই চার বেদ; আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ অর্থাৎ সঙ্গীতবিদ্যা, স্থাপত্য অর্থাৎ বিশ্বকর্মশাস্ত্রের সৃষ্টি করলেন। এরপর তিনি ইতিহাস ও পুরাণরূপ পঞ্চম বেদ সৃষ্টি করলেন। তারপর তাঁর পূর্বমুখ থেকে সৃষ্টি করলেন ষোড়শী ও উক্‌থ নামক দুইটি যজ্ঞের নিয়ম। তারপর দক্ষিণ মুখ থেকে পুরীষী ও অগ্নিষ্টোম; পশ্চিমমুখ থেকে আপ্তোর্যাম ও অতিরাত্র এবং উত্তর মুখ থেকে বাজপেয় ও গোসব নামে যজ্ঞের নিয়ম সৃষ্টি করলেন। এইভাবেই তিনি বিদ্যা, দান, তপস্যা ও সত্য ধর্মের এই চারটি পাদ সৃষ্টি করলেন।

এর পর যথাযথ বৃত্তি অনুযায়ী চারটি আশ্রম সৃষ্টি করলেন। প্রথম ব্রহ্মচর্য আশ্রমের চারটি প্রকার আছে। উপনয়নের পর ব্রহ্মচারী সংযত হয়ে যখন ত্রিরাত্রি গায়ত্রী পাঠ করেন, সেই ব্রহ্মচর্যকে বলে সাবিত্র ব্রহ্মচর্য। যখন সেই ব্রহ্মচারী সংযমের সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ বছর ব্রত আচরণ করেন, তাকে বলে প্রাজাপত্য ব্রহ্মচর্য। ব্রহ্মচারী যতদিন সংযত থেকে বেদচর্চা করেন, তাকে ব্রাহ্ম ব্রহ্মচর্য বলে। আর আমরণ সংযত থাকলে, তাকে  বৃহৎ ব্রহ্মচর্য বলে। দ্বিতীয় গৃহস্থ আশ্রমও চার প্রকারের হয়, কৃষি ইত্যাদি বৃত্তিকে বলে বার্তাযাজন ইত্যাদি বৃত্তিকে বলে সঞ্চয়জমিতে পড়ে থাকা শস্যের শীষকে শীল বলে, যে গৃহস্থ এই শীল সংগ্রহকেই বৃত্তি করে, তাকে বলে শালীনআর জমিতে পড়ে থাকা এক একটি শস্য দানা সংগ্রহ করার যে বৃত্তি তাকে উঞ্ছ বৃত্তি বলে। তৃতীয় বাণপ্রস্থ আশ্রমেরও চার বিভাগ আছে। পতিত জমিতে গাছে পাকা ফল দিয়ে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁকে বৈখানস বলে। যিনি নতুন অন্ন পেলে, সঞ্চিত অন্ন ত্যাগ করেন, তাঁদের বালখিল্য বলেযিনি ভোরে উঠে প্রথম যে দিক দেখেন, শুধু সেই দিক থেকেই ফল আহরণ করে জীবন ধারণ করেন, তাঁকে ঔড়ুম্বর বলে। আর যাঁরা শুধুমাত্র গাছের তলায় পড়ে থাকা ফল আহরণ করেন, তাঁদের ফেনপ বলে। চতুর্থ সন্ন্যাস আশ্রমও চার রকমের হয়। যিনি প্রধানতঃ নিজের আশ্রম অনুযায়ী ধর্মের অনুষ্ঠান করেন, তিনি কূটীচকযিনি কর্মকে গৌণ বিবেচনায়, প্রধানতঃ জ্ঞানচর্চা করেন, তিনি বহেবাদযিনি শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চায় রত, তিনি হংস আর যিনি পরমতত্ত্ব লাভ করে নিষ্ক্রিয়ভাব ধারণ করেন, তিনি পরমহংসপ্রত্যেক আশ্রমীদের মধ্যে যাঁদের নাম পরে উল্লেখ করলাম, হে বিদুর, তাঁরা তাঁর আগের আশ্রমীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।

তারও পর ব্রহ্মার চার মুখ থেকে যথাক্রমে আন্বীক্ষিকী অর্থাৎ আত্মজ্ঞানরূপ মোক্ষবিদ্যা, ত্রয়ী অর্থাৎ স্বর্গ, মর্ত ও নরক লাভের কারণস্বরূপ কর্মবিদ্যা, বার্তা অর্থাৎ জীবিকার উপায় হিসাবে কৃষিবিদ্যা এবং দণ্ডনীতি অর্থাৎ রাজনীতির সৃষ্টি হল। তারপর ব্রহ্মার হৃদয় আকাশ থেকে প্রণব, রোমরাজি থেকে উষ্ণিকছন্দ, ত্বক থেকে গায়ত্রী ছন্দ, মাংস হইতে ত্রিষ্টুপছন্দ, স্নায়ু থেকে অনুষ্টুপছন্দ, অস্থি থেকে জগতী ছন্দ, মজ্জা থেকে পঙ্‌ক্তিছন্দ এবং প্রাণ থেকে বৃহতীছন্দের সৃষ্টি হল।

হে বিদুর, আগেই বলেছি মহাকল্পকালে ব্রহ্মা শব্দব্রহ্মরূপ অর্থাৎ বেদময় ছিলেন। ক হইতে ম পর্যন্ত সমস্ত স্পর্শবর্ণ তাঁর জিভ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। স্বরবর্ণের সৃষ্টি তাঁর দেহ থেকে। তাঁর ইন্দ্রিয় থেকে উষ্মবর্ণের উদ্ভব আর অন্তস্থবর্ণ সমূহ তাঁর শক্তি। তাঁর খেলার থেকে সৃষ্টি হয়েছে সুর সপ্তক – ষড়জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম, পঞ্চম, ধৈবত ও নিষাদশব্দের দুইটি রূপ, জিভ দিয়ে যার উচ্চারণ করা যায়, সেই ব্যক্তরূপে বৈখরী ও অব্যক্তরূপে প্রণব।  ব্রহ্মা শব্দব্রহ্মময় হওয়ায় তিনি উভয়রূপেই বিরাজ করেন, প্রণবরূপে তিনি অব্যক্ত পরমেশ্বর এবং ব্যক্তরূপে নানা শক্তির আধার ইন্দ্র ইত্যাদি দেবগণ।

আত্মজা সরস্বতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে একবার ব্রহ্মা কামার্ত হয়ে পড়েনতাই দেখে তাঁর পুত্র মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ তাঁকে নিরস্ত করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে, শ্রীনারায়ণের শরণ নিলেন। তাঁরা বললেন, যিনি নিজের অন্তরে অবস্থিত বিশ্বকে নিজের তেজে প্রকাশ করছেন, সেই ভগবানের কাছে আমাদের প্রার্থনা, তিনি ধর্মকেও রক্ষা করুন। শ্রীনারায়ণের কাছে সমবেত পুত্রদের এই প্রার্থনা শুনে, ব্রহ্মার চৈতন্য হল, তিনি লজ্জিত হয়ে নিজের কলঙ্কিত তনু ত্যাগ করে নিত্য বিশুদ্ধ শব্দব্রহ্ম তনু ধারণ করেছিলেন।

মরীচি প্রমুখ মহর্ষি হলেও তাঁদের প্রজা সৃষ্টির বিস্তারে ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, তাই তিনি আরেকবার তাঁর তনুকে দুভাগে ভাগ করলেন। ব্রহ্মার রূপের আরেক নাম, “ক”, তাই তাঁর দেহ থেকে বিভক্ত অন্য ভাগের নাম হল কায়সেই কায়ের এক অংশ হল পুরুষ, আরেক অংশ হল নারী। ওই পুরুষই স্বয়ং উদ্ভূত মনু এবং ওই স্ত্রী তাঁর মহিষী শতরূপাসেই থেকেই স্ত্রী ও পুরুষের মিলনে প্রজা সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল”

[ব্রহ্মার কীর্তি ও কুকীর্তির সীমা নেই - অথচ আমাদের এত বড়ো দেশে ব্রহ্মার মন্দির আছে সাকুল্যে মাত্র ছটি, একটি আজমীড়ে পুষ্কর সরোবরের তীরে; রাজস্থানের বারমের; খোখান, (কুলু, হিমাচল); কুম্ভকোনম (তাঞ্জাভুর, তামিলনাড়ু); পানাজি (গোয়া) এবং তিরুপাত্তুরে (তামিলনাড়ু)। এমন কীর্তিমান দেবতাকে অবহেলা করে আমরা বিষ্ণু, কৃষ্ণ আর শিবের মন্দির গড়ে তুললাম পাড়ায় পাড়ায়! অতএব আমরা ধার্মিক ও ভক্ত ঠিকই কিন্তু বোকা ভাববার কোন কারণ নেই।]  


বরাহ অবতারের পৃথিবীর উদ্ধার

শ্রী শুকদেব বললেন, “মহারাজ, বিদুর মহামুনি মৈত্রেয়র মুখে পুণ্যতম বাণী শুনে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুনিবর, স্বয়ম্ভূর পুত্র সম্রাট স্বায়ম্ভূব মনু প্রিয়া পত্নী লাভ করে কী করলেন? সেই আদিরাজ ও রাজর্ষির চরিত্র কথা শুনতে আমার অত্যন্ত ইচ্ছা হচ্ছে। তিনি শ্রীহরিকে আশ্রয় করেছিলেন, এবং জ্ঞানীরা বলেন, যাঁদের হৃদয়ে মুকুন্দের চরণপদ্ম বিরাজ করে, তাঁদের গুণের কথা শুনলে সকল শাস্ত্র পাঠের থেকেও বেশ সুফল লাভ করা যায়”শ্রীশুকদেব বললেন, “মহাত্মা বিদুরের সৌভাগ্যের সীমা নেই, তাঁর কোলে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমভরে শ্রীচরণ স্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রশ্নে মহামুনি ভগবৎকথায় আনন্দপুলকিত অঙ্গে বললেন।”

শ্রীমৈত্রয় বললেন, “ব্রহ্মার শরীর থেকে স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর পত্নী শতরূপার জন্মের পর, তাঁরা বেদগর্ভ ব্রহ্মাকে প্রণাম করে বললেন, “আপনি সকল ভূতের জন্মদাতা ও পালনকর্তা, অতএব আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদের প্রণাম গ্রহণ করুন এবং আমাদের নির্দেশ করুন আমরা আপনার কি সেবা করতে পারি এবং কী ধরনের কর্ম অনুষ্ঠান করলে জগতে আমাদের যশ ও পরলোকে সদ্গতি লাভ করা সম্ভব”

প্রজাপতি ব্রহ্মা তাঁদের আশীর্বাদ করে বললেন, “হে বৎস, তোমাদের দুজনের মঙ্গল হোক। তোমাদের এই কথায় আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। কারণ পিতার প্রতি পুত্রের এইরকম শ্রদ্ধাই থাকা উচিৎ। কখনো পিতার আদেশ এবং নির্দেশ কেন পালন করব, এমন চিন্তা মনে স্থান দেওয়াও বিধেয় নয়। হে পুত্র তুমি তোমার পত্নীর গর্ভে তোমার মতোই গুণসম্পন্ন সন্তান সৃষ্টি করো, রাজধর্ম অনুযায়ী প্রজাপালন করো এবং যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে শ্রী বিষ্ণুর আরাধনা করো। তোমার প্রজাপালন ও প্রজারক্ষাতেই আমার  প্রতি তোমার সেবা সম্পূর্ণ হবে, ভগবান জনার্দনও তোমার প্রতি প্রসন্ন থাকবেন” 

এই কথায় স্বারম্ভূব মনু বললেন, “হে বেদগর্ভ পিতা, আপনার আদেশ আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। কিন্তু সকল ভূতের বাসস্থান যে ধরিত্রীদেবী, তিনি এখন মহাসাগরের তলায় বন্দিনী। তাঁর উদ্ধার না হলে আমরা থাকব কোথায়, আর কোথায় থাকবে আমার প্রজারা? আপনি দয়া করে, তাঁর উদ্ধারের উপায় দেখুন”

গভীর উদ্বিগ্ন মুখে ব্রহ্মা বললেন, “আমি যখন পৃথিবীর সৃষ্টি করছিলাম, সেই সময় হঠাৎ প্লাবনে পৃথিবী রসাতলে চলে গেছে। আমি এই বিপদের থেকে উদ্ধারের জন্যে করুণাসিন্ধু শ্রীবিষ্ণু ছাড়া আর কার সাহায্য পেতে পারি? একমাত্র তিনিই আমাদের এই পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারেন”এই চিন্তায় যখন তিন ব্যাকুল, সেই সময় তাঁর নাক থেকে বেরিয়ে এল, ছোট্ট আঙুলের মতো এক বরাহ মূর্তি। সেই বরাহ মূর্তি দেখতে দেখতে পাহাড়ের মতো বিশাল আকার ধারণ করল।

এই আশ্চর্য ঘটনায় ব্রহ্মা ও তাঁর পুত্রেরা চিন্তা করতে লাগলেন, এই বরাহ কে? আমার নাকের ভিতর থেকে সামান্য আকার নিয়ে  আবির্ভূত হয়ে, কিভাবেই বা এই বরাহ এমন ভীষণ আকার ধারণ করতে পারলে? তবে কি ইনিই শ্রী ভগবান বিষ্ণু? সকলেই যখন এই বিতর্কে ব্যস্ত, তখন সেই বরাহ মূর্তি প্রচণ্ড গর্জনে সমস্ত দিক কাঁপিয়ে তুললেন। সেই মায়াময় বিশাল শূকরের গর্জন, অবিকল শূকরের মতোই, সেই গর্জনে সকলেই আশ্বস্ত হলেন, যে ইনিই ভগবান শ্রীবিষ্ণু। স্বয়ং ব্রহ্মা ও উপস্থিত মরীচি প্রমুখ ঋষিরা আনন্দে ভগবানের স্তুতি করে বেদমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। বেদমন্ত্র শুনে সেই অদ্ভূত বরাহ আর একবার গর্জন করে, বিশাল লাফ দিলেন, তারপর জলের মধ্যে ডুব দিলেন। তাঁর ক্ষুরের আঘাতে আকাশের মেঘ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাঁর চোখের জ্যোতিতে চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ভয়ংকর করাল তাঁর দাঁতের সারি। তাঁর দাঁত করাল হলেও, তাঁর চোখে তীব্র জ্যোতি থাকলেও, বেদ উচ্চারণ রত ঋষিদের প্রতি তাঁর দৃষ্টি প্রসন্নই রইল। এই বরাহমূর্তি আসলে তাঁর ছলমাত্র, তিনিই স্বয়ং যজ্ঞমূর্তি, বরাহরূপে এসেছেন রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করার জন্যে



[মালব (মধ্য প্রদেশ) অঞ্চলে অনার্যদের মধ্যে বরাহ পূজার প্রচলন ছিল। এরান অঞ্চলে বরাহ মূর্তি পাওয়া গেছে।  সেই বরাহকে বিষ্ণুর অবতার বানিয়ে, হিন্দু ধর্ম অনার্য প্রথাকেই নিজের অন্তর্ভুক্ত করে নিল। তার জন্যেই এত গল্প বানানো, স্তব-স্তুতি, বেদমন্ত্র উচ্চারণ ইত্যাদি। ওপরে রইল এরানের (মধ্যপ্রদেশ) বরাহ মূর্তি - সৌজন্য গুগ্‌ল্‌। ]

চলবে...

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৪

জগতের কাল ও যুগ তত্ত্ব

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম - সৃষ্টির শুরুতে এই পাঁচবস্তুর উৎপন্ন হয়, এদেরকে কার্য্য বলে। এই কার্যের যে ক্ষুদ্রতম অংশ, যাকে আর ভাগ করা যায় না, তাকে পরমাণু বলেপরমাণুকে চোখে দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু এর অস্তিত্ব অনুমানে বুঝতে পারা যায়। পরমাণু যখন একক অবস্থায় থাকে, তখন তার কোন কার্য্য অবস্থা নিরূপণ করা যায় না। অনেক পরমাণু্র সমষ্টিতে বস্তু গড়ে ওঠে, তখন সকল বস্তুকেই আলাদা মনে হয়। কিন্তু সকল বস্তুরই পরমাণু ধর্ম একঅতএব পরমাণু সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মরূপ এবং বস্তু স্থূলরূপ। প্রলয়ের আগে,  সকল বস্তু নিজ নিজ বৈশিষ্টের মধ্যে থাকে। কিন্তু প্রলয়কালে বস্তুর সকল বৈশিষ্ট্য বিনাশ হয় এবং সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড একই পরমাণু রূপে সমাহিত হয়। এই ধারণাকে বলা হয় পরমমহৎ পরিমাণ

[এই পর্যন্ত পড়ে মনে হয় সরল বাংলায় ফিজিক্সের অ্যাটমিক তত্ত্ব পড়ছি। এবং "পরমমহৎ পরিমাণ" তত্ত্বটিতে কালা-গহ্বর তত্ত্বের গন্ধও কিছুটা যেন পাওয়া যায়। মনে হয় আমাদের ঋষিরা যদি আরও গভীরে গিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করতেন, তাহলে আমরা হয়তো পদার্থবিদ্যার জনক হতে পারতাম। কিন্তু তা হবার নয় - এই পর্যায়ে প্রবেশ ঘটে গেল ঈশ্বরের - এবং সমস্ত বিষয়টা ভক্তিরসে বেপথু হয়ে ধর্মতত্ত্বের পথে মোড় নিল।]                  

একই ভাবে কালেরও সূক্ষ্ম ও স্থূলরূপ দুইই অনুমান করা হয়। কাল শ্রীনারায়ণের শক্তি, তিনি স্বরূপতঃ অব্যক্ত ও উৎপত্তি উভয় বিষয়েই দক্ষ। শ্রীভগবান পরমাণু থেকে ব্যক্ত বস্তু, সর্বত্রই ব্যাপ্ত থাকেন। দুটি পরমাণুর সমষ্টিকে অণু বলে, এবং তিনটি অণুর সমষ্টিকে ত্রসরেণু বলে। অন্ধকার ঘরে জানালা দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মি প্রবেশ করলে, সেই আলোকপথে যে ক্ষুদ্র কণাসমূহ চোখে পড়ে, সেই কণাগুলিই ত্রসরেণু। যে কাল তিনটি ত্রসরেণুকে ভোগ করে, তাকে ত্রুটি বলে। একশ ত্রুটিতে এক বেধ, তিন বেধে এক লব হয়। তিন লবে এক নিমেষ, তিন নিমেষে এক ক্ষণ। পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা, পনের কাষ্ঠায় এক লঘু, পনের লঘুতে এক দণ্ড। দুই দণ্ডে এক মুহূর্ত এবং ছয় বা সাত মুহূর্তে এক যাম অর্থাৎ প্রহর। চার প্রহরে এক দিবা, চার প্রহরে এক রাত। এই হল মানুষের এক পূর্ণ দিবসের কাল বিভাগ। পনের দিনে এক পক্ষ, শুক্ল ও কৃষ্ণ, পক্ষের দুই প্রকার। দুই পক্ষে মানুষের এক মাস হয়, কিন্তু পিতৃলোকে দুইপক্ষ মানে এক দিন। শুক্ল পক্ষে দিন আর কৃষ্ণ পক্ষে রাত। মানুষের দুই মাসে এক ঋতু ও ছয় মাসে এক অয়ন। অয়ন দুরকমের – উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ। দেবলোকে দেবতাদের উত্তরায়ণে এক দিন এবং দক্ষিণায়ণে এক রাত হয়। বারো মাসে মানুষের এক বছর আর এইভাবেই মানুষের আয়ু একশ বছর নির্দিষ্ট হয়ে আছে”

[আবারও একটু ঘেঁটে গেল। কাল অর্থাৎ সময়ের এমন সূক্ষ্ম পরিমাপের কল্পনা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। কিন্তু আলোকপথে চোখে পড়া ত্রসরেণু বলতে যা বোঝানো হয়েছে সেই কণা থেকে সময়ের হিসেব কী করে হয়? সময়কে চোখে দেখা যায় নাকি? তাহলে সূর্যের আলোক রশ্মি যখন নেই, অর্থাৎ রাত্রে ত্রসরেণু তো দেখতে পাওয়া যাবে না, সময়ই বা হিসেব কী করে করব?]         

মহাত্মা বিদুরের প্রশ্নে শ্রীমৈত্রেয় আরো বললেন, “সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি এই হচ্ছে চার যুগ। কোন যুগের প্রথম ভাগকে বলে সন্ধ্যা ও শেষভাগকে বলে সন্ধ্যাংশ। দেবতাদের বারো হাজার বছরে সন্ধ্যা এবং এই চারটি যুগ নিয়ে দেবতাদের সন্ধ্যাংশ বলা হয়। সত্যযুগ চার হাজার বছর এবং সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে চারশ বছর। এইভাবে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি যথাক্রমে তিন হাজার, দু হাজার ও একহাজার বছর। এই তিন যুগের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ প্রত্যেকে যথাক্রমে তিনশ, দুশ ও একশ বছর। সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশের মাঝের সময়টিকে যুগ বলে। যে যুগে যে ধর্ম নির্দিষ্ট করা আছে, মানুষের সেই ধর্মই পালন করা উচিৎ। সত্যযুগে চতুষ্পাদ ধর্ম, অর্থাৎ ধর্মই সম্পূর্ণভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারপরে ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিতে এক এক পাদ অধর্ম বাড়তে থাকে এবং এক এক পাদ ধর্ম কমতে থাকে। অতএব এই তিন যুগে অধর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই সম্পূর্ণ ধর্ম আচরণ করার চেষ্টা করা উচিৎ”

[এই যুগের হিসেব ধরলে, কলিযুগের এক হাজার বছর কবেই পার হয়ে গেছে! মহাভারতে বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্যলীলা সংবরণের দিন থেকে দ্বাপরের শেষ ও কলির শুরু। সেই সময়টা যদি মোটামুটি ৮৫০ বি.সি.ই ধরি, তাহলে আজ পর্যন্ত ৮৫০ + ২০২৬ = ২৮৭৬ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু সত্য যুগ ফিরে আসার কোন লক্ষণ তো টের পাওয়া যাচ্ছে না, বরং ধার্মিকগণ এখনও বলে চলেছেন "ঘোর কলি চলছে"।]    

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক, এই তিন লোকের বাইরে আছে মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক ও সত্যলোক। এই চার লোকে এক হাজার চার যুগে এক দিন হয়। এই দিন ব্রহ্মার এক দিন, একই সময়ে ব্রহ্মার রাত্রি হয়। ব্রহ্মা রাত্রে নিদ্রামগ্ন থাকেন, ব্রহ্মার রাত্রি অবসানে সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবং যে কাল পর্যন্ত ব্রহ্মার দিন গণ্য করা হয়, সেই কালে চোদ্দজন মনু রাজত্ব করেন। প্রত্যেক মনুর রাজ্যকালকে মন্বন্তর বলে। এই ত্রিলোক সৃষ্টি ব্রহ্মার দৈনন্দিন সৃষ্টি। এই সৃষ্টির মধ্যে তির্যগযোনি পশুপাখি, মানুষ, পিতৃগণ ও দেবগণের নিজ নিজ কর্মফল অনুসারে জন্ম হয়ে থাকে। প্রত্যেক মন্বন্তরে ভগবান সত্ত্বময় পরমপুরুষ রূপে অবতীর্ণ হয়ে এই বিশ্বের রক্ষা করে থাকেন। তারপর দিনের অবসানে সমস্ত তমোগুণ নিজের আত্মায় সন্নিবেশ করে, ত্রিলোকের উপসংহার করেন। তিন লোকের সকল জীবসমূহকে নিজের দেহে লীন করে তিনি তাঁর মায়া লীলা পরিত্যাগ করেন। সেই সময় সূর্য, চন্দ্র এবং সমস্ত লোক শ্রীভগবানের মধ্যে প্রবেশ করে। এই কল্প শেষের কালে সমুদ্রের জল বেড়ে যায়, প্রচণ্ড বাতাসে সমুদ্রের ঢেউ সমস্ত স্থলভাগকে গ্রাস করে এবং ত্রিভুবনকে প্লাবিত করে। শ্রীনারায়ণ সেই প্লাবনের জলে অনন্তশয়ানে অবস্থান করেন, তাঁর দুই চোখ যোগনিদ্রায় নিমীলিত হয়

এই ব্রহ্মার যে আয়ু, সেই আয়ু এখন শেষের দিকে। তাঁর জীবিত কালের অর্ধাংশকে পরার্ধ বলে, প্রথম পরার্ধ শেষ হয়েছে, আজ শেষ পরার্ধের প্রথম দিন। প্রথম পরার্ধের আদিতে মহান ব্রাহ্মকল্প হয়েছিল এবং সেই কল্পে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁকে শব্দব্রহ্ম বলা হয়। যেহেতু এই কল্পে শ্রীনারায়ণের নাভি সরোবর থেকে উৎপন্ন কমল থেকে এই ত্রিভুবনের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই কারণে এই কল্পকে পাদ্মকল্প বলে। আবার এই পাদ্মকল্পকেই বরাহকল্পও বলা হয়, যেহেতু এই কল্পে শ্রীহরি বরাহ অবতার হয়ে পৃথিবীর উদ্ধার করেছিলেন।

এই দুই পরার্ধকালকে কোন কোন শাস্ত্রে ভগবানের নিমেষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবান কাল প্রভৃতি নিখিল জগতের একমাত্র কারণ, এই কারণে তিনি কালের অতীত, সুতরাং তাঁর শুরু কিংবা অন্ত কিছুই নেই। পরমাণু থেকে দুই পরার্ধ পর্যন্ত কাল, দেহরূপ গৃহে আসক্ত প্রাণিদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, পরিপূর্ণ ভগবান অর্থাৎ ভূমার উপর সেই কালের বিন্দুমাত্র প্রভাব নেই। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষ এগারো ইন্দ্রিয় ও পঞ্চমহাভূত - এই ষোলটি বিকারপদার্থ এবং প্রকৃতি, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব ও পঞ্চতন্মাত্র - এই আট প্রকৃতি দিয়ে নির্মিত। এই কোষ ভিতরের দিকে পঞ্চাশকোটি যোজন বিস্তৃত এবং বাইরের দিকে ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, অহংকার ও মহত্তত্ত্ব এই সাত আবরণে ঢাকা। এই ব্রহ্মাণ্ডকোষের যত পরিমাণ, প্রথম আবরণ ক্ষিতির পরিমাণ তার দশগুণ। এইভাবে পরবর্তী প্রত্যেক আবরণ তার আগের প্রতিটি আবরণের থেকে দশগুণ বড়ো হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড এবং এছাড়াও এরকম কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড যাঁর মধ্যে আশ্রয় নিয়ে আছে, তাঁকে পরমাণুর মতো মনে হয়। তিনিই সকল কারণের কারণ অক্ষর ব্রহ্ম। তিনিই পরমপুরুষ সাক্ষাৎ মহাবিষ্ণু”। 

 ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা                

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, কালরূপী শ্রীনারায়ণের প্রভাব আপনার কাছে বর্ণনা করলাম, এখন ব্রহ্মার সৃষ্টিকথা বর্ণনা করি, শুনুন। ব্রহ্মা প্রথমতঃ অবিদ্যার পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করলেন। প্রথম সৃষ্টি করলেন তমোগুণ, অর্থাৎ স্বরূপের অপ্রকাশ। তারপর মোহ, অর্থাৎ অহংবুদ্ধি। মহামোহ অর্থাৎ ভোগ বাসনা। তামিস্রা অর্থাৎ ভোগ বাসনায় বাধা ঘটলেই ক্রোধ। অন্ধতামিস্রা অর্থাৎ ভোগবাসনার বিনাশে আমারই সর্বনাশ, এমন বুদ্ধি। কিন্তু এই সৃষ্টিতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি আবার শ্রীনারয়ণের তপস্যা করে নিজেকে পবিত্র করে অন্যান্য সৃষ্টি করলেন। প্রথমে তিনি নিজেরই রূপে সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার এই চারজন নিষ্ক্রিয় ব্রহ্মস্বরূপ মুনিকে সৃষ্টি করে বললেন, হে পুত্রগণ, তোমরা প্রজা সৃষ্টি করোকিন্তু যেহেতু তাঁরা মোক্ষনিষ্ঠ, শ্রীবিষ্ণু পরায়ণ, তাঁরা প্রজা সৃষ্টিতে প্রবৃত্ত হলেন নাতাঁর নির্দেশ অমান্য করায় তিনি চার কুমারের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধী হয়ে উঠলেন, কিন্তু তিনি ক্রোধ সংবরণ করার চেষ্টা করলেন। সেই ক্রোধ তাঁর দুই ভুরুর মধ্যে থেকে নীললোহিতকুমার রূপে জন্ম নিল। সদ্যজাত শিশু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হে জগৎ গুরু, আমার নাম ও স্থান আপনি নির্দেশ করে দিন। পদ্মযোনি ব্রহ্মা সস্নেহে সেই কুমারকে বললেন, যেহেতু তুমি উদ্বিগ্ন বালকের মতো রোদন করেছ, তাই তোমার নাম হবে রুদ্র। আর হৃদয়, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, মহা, সূর্য, চন্দ্র ও তপস্যা এই স্থানগুলি আমি তোমার জন্যেই নির্দিষ্ট করে রেখেছি। মন্যু, মনু, মহিনস, মহান, শিব, ঋতধ্বজ, উগ্ররেতঃ, ভব, কাল, বামদেব, ও ধৃতব্রত এই একাদশ নামে তুমি বিখ্যাত হবে। এবং ধী, ধৃতি, উশনা, উমা, নিষুৎ, সর্পিঃ, ইলা, অম্বিকা, ইরাবতী, স্বধা ও দীক্ষা এই একাদশ শক্তি হবেন তোমার পত্নী। তুমি এই পত্নীদের স্বীকার করে বহু প্রজার সৃষ্টি করো।

 প্রজাপতি ব্রহ্মার নির্দেশে নীললোহিতকুমার নিজের শক্তি, আকৃতি ও তীব্রস্বভাব অনুযায়ী প্রজাসমূহ সৃষ্টি করতে লাগলেন। সেই প্রজাদের রুদ্ররূপে এবং ব্যবহারে জগতের চারদিক অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা আবার পুত্রকে ডেকে বললেন, হে রুদ্র, এমন প্রজা সৃষ্টির আর প্রয়োজন নেই তোমার সৃষ্টি করা প্রজাদের চোখের দৃষ্টিতে দশদিক এমনকি আমারও দগ্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হয়ে উঠেছে। অতএব, হে পুত্র তুমি তপস্যা করো, তপস্যা সর্বভূতের মঙ্গলকারী, তপস্যা করে তুমি আগের কল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টি করো। রুদ্র পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে তপস্যার জন্যে অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

[জন্মানোর পরেই নীললোহিতকুমার এমন কাঁদতে লাগলেন, ব্রহ্মা তাঁর নাম রাখলেন রুদ্র। সেই রুদ্র একাদশ নাম নিয়ে, একাদশ পত্নীর সঙ্গে প্রজা সৃষ্টি করছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার রুদ্রের ওই সৃষ্টিসমূহ মনঃপূত হল না, তিনি বললেন, "ঢের করেছ, বাপু, এবার ক্ষ্যামা দাও। তুমি তপস্যা করো। শৈব মতে রুদ্র হচ্ছেন শিব। ভাগবত পুরাণে রুদ্রর সঙ্গে রীতিমতো ছেলেখেলা করলেন ব্রহ্মা, শৈব পুরাণ নিয়ে যদি কোন দিন আলোচনার সুযোগ পাই দেখা যাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো]।          

রুদ্র ধ্যানে নিমগ্ন হলে, ব্রহ্মার আরো দশটি পুত্র সৃষ্টি হল। তাঁদের নাম মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু, ভৃগু, বশিষ্ঠ, দক্ষ ও নারদ। নারদের জন্ম হল ব্রহ্মার কোল থেকে, দক্ষ হলেন তাঁর বুড়ো আঙুল থেকে, বশিষ্ঠ তাঁর প্রাণ থেকে, ভৃগু ত্বক থেকে, ক্রতু হাত থেকে, পুলহ নাভি থেকে, পুলস্ত্য দুই কান থেকে, অঙ্গিরা মুখ থেকে, অত্রি তাঁর চোখ থেকে ও মরীচির সৃষ্টি হল তাঁর মন থেকে। লোকবিস্তারের কারণেই এঁদের জন্ম। ব্রহ্মার দক্ষিণ স্তন থেকে ধর্মের সৃষ্টি হল, এই ধর্মেই স্বয়ং শ্রীনারায়ণ বিরাজ করেন। তাঁর পিঠ থেকে সৃষ্টি হল অধর্মের, লোক সকলের মৃত্যুভয়ের কারণ এই অধর্ম। এরপর তাঁর হৃদয় থেকে কাম, দুই ভুরু থেকে ক্রোধ, অধর থেকে লোভ, মুখ থেকে সরস্বতী, লিঙ্গ থেকে সমস্ত সিন্ধু ও পায়ু থেকে পাপ সৃষ্টিকারী রাক্ষসের সৃষ্টি হল। ব্রহ্মার ছায়া থেকে সৃষ্টি হলেন দেবহূতির পতি ঋষি কর্দমএই ভাবেই ব্রহ্মার সমস্ত দেহ ও মন থেকে এই জগতের সৃষ্টি হল।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৫ "

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/২ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - তৃতীয় পর্ব

 সৃজনেচ্ছায় শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণুস্তব

শ্রীব্রহ্মা স্তব করতে করতে বললেন, “হে ভগবান, দীর্ঘ উপাসনার পর আপনার দর্শন পেয়ে আমি ধন্য হলাম। হে প্রভু, আপনি ছাড়া এই জগতে কোন বস্তুর অস্তিত্বই নেই। জীবের ধারণায় এই জগতের যা কিছু আছে বলে মনে হয়, সে সবই ভ্রম; আসলে আপনিই আপনার মায়ার প্রভাবে সর্বরূপে প্রকাশ হয়েছেন। আপনি আমার মতো ভক্তজনের প্রতি করুণা করে প্রথম যে রূপে প্রকাশিত হলেন, সেই রূপই শুদ্ধসত্ত্বময় অনন্ত অবতারের বীজস্বরূপ। এই রূপের নাভিকমলভবন থেকেই আমার আবির্ভাব হয়েছে। আপনার এই মূর্তিই আপনার উপাস্য সকল মূর্তির মধ্যে মুখ্য। আপনার এই রূপ থেকেই বিশ্বের সৃষ্টি হয়ে থাকে, সুতরাং আপনার এই রূপ সমগ্র জগতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সমস্ত ভূত ও ইন্দ্রিয়সমূহের কারণস্বরূপ। অতএব আমি আপনার এই মূর্তির আশ্রয় নিলাম।

হে ভগবান, আপনার এই রূপ সচ্চিদানন্দস্বরূপ। আপনাকে আমি বারবার প্রণাম করি। যারা আপনার এই রূপের অসম্মান করে, তারা ঈশ্বরহীন নাস্তিক, তারা কুতর্কে সময় নষ্ট করে এবং পরিণতিতে নরকে যায়। বেদরূপ বাতাস আপনার চরণকমলের গন্ধ বহন করে থাকে, যে ভক্ত বেদ শোনার সময় তার কানে এই গন্ধ অনুভব করতে পারে সেই ধন্য; সেই ভক্তরাই পরাভক্তিতে আপনার শ্রীচরণে আশ্রয় পায়। হে প্রভু, আপনি আপনার এই ভক্তদের অন্তরে সর্বদা বিরাজ করতে থাকুন। জীব যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার চরণে আশ্রয় না নেয়, তার মন ধন, জন ও মৃত্যুর ভয়ে আচ্ছন্ন থাকে। সাধারণ জীবের কথা তো বলাই বাহুল্য, আপনার প্রতি ভক্তিহীন হলে, জ্ঞানী ঋষিরাও সংসারের  সকল কষ্ট ভোগ করে থাকে।

হে ভগবান, জীব যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও সেবা দিয়েই আপনার প্রীতিলাভের চেষ্টা করবে, কারণ আপনার প্রীতিলাভই জীবের সবচেয়ে কাম্য ফল। আপনি পরমেশ্বর, যে মায়ায় এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় ঘটে চলেছে, সে সবই আপনার লীলা। আমি আপনাকেই প্রণাম করি। হে প্রভু, আপনিই কালস্বরূপ, আপনাকে প্রণাম করি। অন্যের কথা আর কি বলব, আমি নিজে সত্যলোকে বাস করেও কালকে ভয় পাই আর সেই ভয় থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়, আপনার প্রীতি লাভের জন্যে বহু তপস্যা ও যজ্ঞের অনুষ্ঠান করি

হে পুরুষোত্তম, আপনাকে প্রণাম করি। অজ্ঞান, দেহাত্মজ্ঞান, বিষয়াসক্তি, দ্বেষ ও মৃত্যুভয় এই পাঁচটি অবিদ্যার বৃত্তি। এই বৃত্তিই জীবকে মোহে আচ্ছন্ন করে রাখে। আপনি নিজে এই পাঁচটি বৃত্তি থেকেই মুক্তকিন্তু পূর্বকল্পের সমস্ত জীবের বিশ্রামের জন্যে, এই ভীষণ তরঙ্গসংকুল কারণ সমুদ্রে নাগশয্যায় আপনি যোগনিদ্রায় শুয়ে ছিলেন, আপনার অন্তরে লীন হয়েছিল সমস্ত জগতের লোক পরম্পরা। এখন তিন লোকের আরও একবার সৃষ্টির জন্যেই আমি আপনার নাভিকমল থেকে আবির্ভূত হয়েছিআপনি যে জ্ঞান ও ঐশ্বর্য দিয়ে জগতের সুখ বিধান করছেন, আমার প্রজ্ঞাকেও তার সঙ্গে যুক্ত করুন। আগের অন্যান্য কল্পের মতোই আমার মধ্যে সৃষ্টির শক্তি সঞ্চার করুন”

ব্রহ্মার এই অনুরোধ শুনে, শ্রী নারায়ণ বললেন, “হে বেদগর্ভ ব্রহ্মা, সৃষ্টির জন্যে উদ্যোগী হও। তুমি আমার কাছে এখন যা প্রার্থনা করেছ, তা আমি আগে থেকেই সম্পূর্ণ করে রেখেছি। তুমি আবার আমার বিষয়ে তপস্যা ও উপাসনা করো। এই তপস্যায় তুমি নিজের অন্তরেই সমস্ত লোক খুব স্পষ্ট দেখতে পাবে। তোমার ভক্তিযুক্ত হৃদয়ের মধ্যেই তুমি দেখতে পাবে তোমার অন্তরে এবং এই নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আমিই ব্যাপ্ত আছি। আর সমস্ত জগত ও সমস্ত জীবও আমার মধ্যেই অবস্থান করে থাকেহে ব্রহ্মা, তোমার প্রতি আমার অশেষ করুণা, এই করুণা প্রভাবে প্রজা সৃষ্টির সময় তোমার মন কোন সময়েই অবসন্ন হবে না। তুমিই জগতের আদ্য ঋষি। রজোগুণের প্রভাবে তুমি প্রজাসৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকলেও, তোমার মন সর্বদা আমাতেই নিযুক্ত থাকবে, অতএব রজোগুণে তোমার মন বিক্ষিপ্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। তুমি আজ যে আমাকে ভূত, ইন্দ্রিয় ও সত্ত্ব ইত্যাদি তিনগুণ রহিত এবং অহংকার শূণ্য বললে, তুমি সত্যিই আমার স্বরূপ বুঝতে পেরেছ। আমার প্রতি তোমার এই উপলব্ধি, দেহী জীবের পক্ষে অত্যন্ত দুর্বোধ্য।

যখন তুমি পদ্মের অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পদ্মনালের মধ্যে ব্যর্থ অনুসন্ধান করে নিরস্ত হলে, সেই সময়েই আমি তোমার অন্তরে আমার স্বরূপ তোমাকে দেখালাম। হে পদ্মাসন ব্রহ্মা, একমাত্র আমার চিন্তাই অভ্যুদয়, সকল মঙ্গলের একমাত্র উপায়। আমি লোক সৃষ্টির জন্যে আমার যে রূপ তোমার কাছে আজ প্রকাশ করলাম, সে রূপ রজোগুণের মায়া। কিন্তু আমি যে আসলে নির্গুণ এবং ত্রিগুণের অতীত, তোমার সেই উপলব্ধিতে আমি খুশি হয়েছি, তোমার মঙ্গল হোক। যে ব্যক্তি আমার স্তুতি করে, নিত্য আমার ভজনা করে, আমি তার উপর প্রীত হয়ে থাকি। জ্ঞানীরা বলেন, সমস্ত সৎকর্ম সাধন করলে যে ফল লাভ হয়, তার মধ্যে আমার প্রীতি লাভই সর্বশ্রেষ্ঠ ফল। আমার প্রীতিলাভ ছাড়া সমস্ত ফলই ব্যর্থ হয়ে যায়।

হে ব্রহ্মা, সমস্ত জীবের আমিই আত্মা। অতএব আমি সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ এবং জীবের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। জীবের কাছে দেহ, আত্মার জন্যেই প্রিয় হয়ে থাকে  অতএব, আমার প্রতি অনুরক্ত হওয়া প্রত্যেকটি জীবের পক্ষেই মঙ্গলকর। আমার থেকেই তুমি সৃষ্টি হয়েছ, তুমি সর্ববেদময়, তুমি অসীম ক্রিয়াশক্তি ও জ্ঞানশক্তির আধার। আর কোন উপদেশ বা নির্দেশের তোমার কোন প্রয়োজন হবে না। তুমি স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষ থেকে এই ত্রিলোক এবং আমার মধ্যে যে সকল জীব লীন হয়ে আছে, তাদের সকলকে আগেকার কল্পের মতোই আবার জীবন দান করো। এই আমার ইচ্ছা”

[ভাগবত পুরাণের বিশ্বসৃষ্টি তত্ত্বে ব্রহ্মা হলেন বিষ্ণুর অধীনস্থ সৃজন কর্তা, কিন্তু এখানে শিবঠাকুরের কোন ভূমিকাই নেই। কারণ এটি শ্রীবিষ্ণুর মহিমা কীর্তনের গ্রন্থ। এর পরেও এই গ্রন্থে আমরা দেখব, স্থানে স্থানে শিবঠাকুরকে বেশ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করা হয়েছে। 

আবার শিবঠাকুরের পুরাণগুলিতে দেখতে পাওয়া যায় উল্টো চিত্র। সেখানে বিশ্বসৃজনের মুখ্য দেবতা শ্রী মহাদেব এবং শ্রীবিষ্ণু ও ব্রহ্মা তাঁর অধীনস্থ সৃজনকর্তা। বেশ মজার ব্যাপার না? জনগণের মনে নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠার জন্যে ভক্তরা কত না মজাদার গল্প মাথা খাটিয়ে রচনা করেছিলেন!!]          


ব্রহ্মার বিশ্ব সৃজন  

শ্রীমৈত্রেয় বললেন, “ভগবান শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মার কাছে সৃজনের সকল বিষয় প্রকাশ করে অন্তর্হিত হলেন। শ্রীনারায়ণের নির্দেশে, ব্রহ্মা শ্রীবিষ্ণুতেই চিন্তা নিযুক্ত হয়ে আবার শত বছরের তপস্যায় ডুবে গেলেন। সুদীর্ঘ তপস্যার পর তিনি চোখ মেলে দেখলেন তিনি যে পদ্মের উপর বসে রয়েছেন তার চারপাশের জল বাতাসের স্পর্শে তরঙ্গ সংকুল। তিনি চিন্তা করলেন, আগেকার কল্পের মতোই আমি তিন লোক সৃষ্টি করবো। তিনি বেড়ে ওঠা জলকে শোষণ করে নিলেন, বাতাসকে সংযত করলেন। জল শুধুমাত্র সমুদ্রের মধ্যেই সীমিত হয়ে রইল, প্রকাশ পেল স্থলভাগ। তারপর তিনি দেখলেন, যে পদ্মে তিনি বসে রয়েছেন, সেই পদ্ম বিপুল আকার নিয়ে আকাশময় ব্যাপ্ত রয়েছে। ব্রহ্মা সেই পদ্মকোষে প্রবেশ করে চিন্তা করলেন, এই পদ্মকোষকেই আমি তিন লোকে বিভক্ত করে নেব। সেই পদ্মকোষের আকার এতই বিপুল যে, সেই পদ্মকোষ থেকে চোদ্দ ভুবন, সূর্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্র সকলই সৃষ্টি করা সম্ভব। এই ত্রিলোক জীবের কর্ম ও ফল ভোগের স্থান, প্রতি কল্পে এই তিন লোক ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রতি কল্পের শুরুতে এই তিন লোকের সৃষ্টি হয়, আবার কল্পান্তে এই তিন লোকের বিনাশ ঘটে। কিন্তু মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য নামে আরও চারটি লোকে বাস করেন নিষ্কাম কর্মের ফলভাগী ব্যক্তিরা। এই চার লোকের বিনাশ হয় না, এই লোকবাসীরা কল্পান্তে মুক্তি লাভ করেন।

 ভিন্ন ভিন্ন কালে ভিন্ন ভিন্ন সৃষ্টি ঘটে থাকে। এই সৃষ্টির পিছনে কালের অসীম প্রভাবঈশ্বর স্বয়ং সৃষ্টির কর্তা হলেও, এই কালকে অবলম্বন করেই তিনি বিশ্বরূপে সৃষ্টি করে থাকেন। এই কালের কোন মূর্তি নেই, শুরু নেই, শেষ নেই। এই বিশ্বের প্রবাহ কালেরই কার্য্য, এই কাল আগে যেমন ছিল ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে।

এই বিশ্বের সৃষ্টি নয় প্রকার। এই নয় রকম সৃষ্টি ছাড়াও আরেক রকম সৃষ্টি আছে, তাকে দশম সৃষ্টি বলে। এই দশম সৃষ্টিও প্রাকৃত ও বৈকৃতভাবে দু রকমের হয়। আবার প্রলয় তিন ধরনের হয়। কালের নিয়মে যে প্রলয় ঘটে থাকে, তাকে নিত্য প্রলয় বলে। বিষয়ের জন্য যে প্রলয় ঘটে তাকে বলে নৈমিত্তিক প্রলয়। আর সত্ত্ব, রজঃ ও তম তিনগুণ যখন নিজেদের কার্যকে গ্রাস করে, সেই প্রলয়কে বলে প্রাকৃতিক।

তিনগুণের অতীত শ্রীভগবান, প্রথম যখন তিনগুণের সংশ্লেষ করেন, তাকেই আদ্য সৃষ্টি বলে। দ্রব্য, জ্ঞান ও ক্রিয়ার প্রকাশ ঘটে দ্বিতীয় সৃষ্টিতে, এই সৃষ্টির সঙ্গেই অহংকারতত্ত্বের শুরু। তৃতীয়ে সূক্ষ্মভূতের সৃষ্টি হয়, এই সূক্ষ্মভূত থেকেই মহাভূতের উৎপত্তি ঘটে থাকে। চতুর্থে সৃষ্টি হয় জ্ঞান ও কর্মের ইন্দ্রিয়সমূহ। পঞ্চম সৃষ্টিতে সাত্ত্বিক অহংকার থেকে ইন্দ্রিয়ের সঞ্চালক মনের আবির্ভাব হয়। ঈশ্বরের মায়ায় জীবের মনে মোহ ও বিক্ষেপ সৃষ্টি করে যে অবিদ্যা, এই অবিদ্যাই ষষ্ঠ সৃষ্টি। এই ছয়টি সৃষ্টিকে বলে প্রাকৃত সৃষ্টি।

বৈকৃত সৃষ্টির মধ্যে ছয় প্রকার স্থাবর সৃষ্টি হয়, এই সৃষ্টিই সপ্তম। ছটি স্থাবরের বর্ণনা এই রকম – যাদের ফুল হয় না কিন্তু ফল হয়, তাদের বলে বনষ্পতি। যাদের ফল পরিণত হবার পর বিনাশ হয়, তাদের নাম ওষধি। যাদের সার শুধুমাত্র ত্বকে তাদের বলে বেণু। যারা অন্য বৃক্ষতে আশ্রয় নেয়, তারা লতা। যারা অন্য বৃক্ষে আরোহণ করে না, তারা বীরুধ। যাদের ফুল থেকে ফলের সৃষ্টি হয় তারা দ্রুম। এ ছয়টি স্থাবরের আহার সঞ্চার হয় উপরিভাগে। এদের চৈতন্য অব্যক্ত থাকে, এরা বাইরে নয়, অন্তরে স্পর্শ অনুভব করতে পারে।

 অষ্টম সৃষ্টি হল তির্য্যক জাতি। এই জাতীয় প্রাণীগণের ভবিষ্যৎ জ্ঞান থাকে না। এদের বর্তমান ব্যস্ততা শুধু আহার সংগ্রহে এবং আহারের সন্ধানে ঘ্রাণশক্তির উপরই সর্বদা নির্ভর করে। এই প্রাণীদের আঠাশটি প্রকার আছে। দুই ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী, যেমন গরু, ছাগল, মোষ, হরিণ, শুয়োর, গবয়, রুরু, মেষ, উট ইত্যাদি। এক ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী, যেমন ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, নীলগাই, চমরী, হরিণ ইত্যাদিপঞ্চনখ প্রাণী, যেমন কুকুর, শৃগাল, নেকড়ে, বাঘ, বিড়াল, খরগোশ, (শল্লক) ভালুক , সিংহ, বাঁদর, হাতি, কচ্ছপ, গোধা। যে প্রাণিরা স্থলে বাস করে না, জলে বাস করে, যেমন মকর, মৎস্য ইত্যাদি। যারা আকাশে উড়তে পারে, যেমন শকুন, বক, চিল, ভাস, ময়ূর, হাঁস, সারস, কাক, পেঁচা ইত্যাদি।

নবম সৃষ্টি হল মানুষ। মানুষের নীচের দিকে আহার সঞ্চার হয় তাই মানুষকে অর্বাকস্রোতা বলে। মানুষের রজঃগুণ প্রধান, এরা দুঃখকে সুখ বলে মনে করে।

দশম সৃষ্টির দুই ভাগ, প্রাকৃত ও বৈকৃত। প্রাকৃত সৃষ্টি দেবতারা, যাঁরা দেবতত্ত্বসমূহের অধিষ্ঠাত্রী। আর যে দেবতারা, এঁদের চেয়ে কম, তাদের বৈকৃত সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ প্রাকৃত ও বৈকৃত উভয় প্রকারের মধ্যেই রয়েছেন, যেমন সনককুমারগণ। এঁদের মধ্যে দেব ও মানুষের উভয় ধর্মই বর্তমানবৈকৃত দেবসৃষ্টিও আট প্রকারের। তার মধ্যে বিবুধ, পিতৃ ও অসুর এই তিন প্রকার। গন্ধর্ব ও অপ্সরা অন্য এক প্রকার। আর তিন প্রকারের মধ্যে, যক্ষ, রক্ষঃ; সিদ্ধ, চারণ, বিদ্যাধর ও ভূত, প্রেত, পিশাচ। কিন্নর ও কিম্পুরুষ হল আরেক প্রকার।

এই ভাবেই ভগবান শ্রীহরি প্রত্যেক কল্পে রজঃগুণ অবলম্বন করে, নিজেই স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মারূপে নিজের স্বরূপের অনন্ত বিভাগে এই বিশ্বের সৃষ্টি করেন ও সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকেন”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৪ "

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

উদ্ধবের সংক্ষেপে শ্রীকৃষ্ণমহিমা বর্ণনা (পূর্ব পর্বের পর...) 

শ্রীউদ্ধব বললেন, “তারপর একদিন বলদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ মথুরায় গেলেন, সেখানে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নামিয়ে কংসের বিনাশ করলেন। সেখানে বন্দী মাতাপিতাকে উদ্ধার করে তাঁদের সন্তুষ্ট করলেনএরপর সন্দীপনিমুনির পাঠশালায় একবার মাত্র শুনে তিনি সর্ববেদ ও শাস্ত্র পাঠ শেষ করলেন। তারপর পঞ্চজন অসুরকে হত্যা করে, তিনি গুরুপুত্রকে উদ্ধার করে, গুরুদক্ষিণা দিলেন।

[এই পঞ্চজন অসুরের অস্থি থেকেই শ্রীকৃষ্ণের পূত পাঞ্চজন্য শঙ্খের উৎপত্তি।]                 

ভীষ্মকরাজকুমার রুক্মী, ভগিনী রুক্মীণীর সঙ্গে শিশুপালের বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন। কৃষ্ণগতপ্রাণ রুক্মীণী কৃষ্ণকে সংবাদ পাঠালেন উদ্ধারের জন্যে। বিয়ের সভায় শিশুপালের সঙ্গে বরযাত্রী এসেছিল জরাসন্ধের মতো বীর সহস্র রাজা। তাদের সকলকে অপমান করে গান্ধর্বমতে বিয়ে করে রুক্মীণীকে তুলে এনেছিলেন কৃষ্ণ।

নাগ্নজিতীর স্বয়ংবরের শর্ত ছিল, সাতটা বিশাল ষাঁড়কে যে দমন করতে পারবে, সেই হবে নাগ্নজিতীর বর। কৃষ্ণ সাতটি ষাঁড়কে বশ করে, তাদের নাক বিদ্ধ করে দড়ি পড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। তাতে উপস্থিত রাজারা খুব অপমান বোধ করেছিল এবং কৃষ্ণকে মারতে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কৃষ্ণ তাদের সকলকে পরাস্ত করেছিলেন, অথচ তাঁর কোন আঘাত লাগেনি।

ভগবান কৃষ্ণ কারও অধীন নয়, তবুও স্ত্রৈণের মত প্রিয় পত্নী সত্যভামাকে খুশি করার জন্যে স্বর্গ থেকে পারিজাত তুলে এনে সত্যভামাকে উপহার দিয়েছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র রাগে অন্ধ হয়ে কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।

নরকাসুর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিশাল দেহ বিস্তার করে সমস্ত আকাশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, এই কৃষ্ণই তাঁর সুদর্শনচক্র দিয়ে তার মুণ্ডছেদ করেছিলেন। তারপর নরকাসুরের মা ধরিত্রীদেবীর অনুরোধে অন্য পুত্র ভগদত্তকে রাজ্যভার দিয়ে নরকাসুরের অন্তঃপুর থেকে বন্দিনী বহু রাজকুমারীকে উদ্ধার করেছিলেন। পরিত্রাতা কৃষ্ণকে দেখেই সদ্য মুক্তি পাওয়া রাজকুমারীরা মুক্তির মোহিত হয়ে, তাঁকে স্বামী হিসেবে পেতে উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। তখন কৃষ্ণ তাঁর অদ্ভূত যোগমায়ায় নিজেকে বহুভাগে বিভক্ত করে সকল রাজকুমারীকেই স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন ও প্রত্যেককে দশটি করে পুত্র দান করেন।

কংসের বিনাশের পর জরাসন্ধ, কালযবন, শাল্বপ্রভৃতি বীররাজাগণ মথুরা আক্রমণ করলে, মুচুকুন্দ ও ভীমকে দিয়ে তিনিই তাদের বিনাশ করেন। একইভাবে তিনি প্রদ্যুম্ন, বলরামকে দিয়ে শম্বর, দ্বিবিদ, বল্কল প্রমুখ রাক্ষসদেরও বিনাশ করেছিলেন। তিনি নিজে দন্তবক্র ও মুরের বিনাশ করেছিলেন, বাণ্বরাজার অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধনের সমর্থনে যত রাজা সমবেত হয়েছিলেন। যাঁদের শক্তিতে আর অহংকারে সমস্ত পৃথিবী বিপর্যস্ত হচ্ছিল, তাঁদের সকলকেই তিনি বিনাশ করলেন, অর্জুন আর ভীমকে সামনে রেখেআবার তিনিই উত্তরার গর্ভে অভিমন্যুর পুত্র, পুরুবংশের শেষ উত্তরাধিকার পরীক্ষিৎকে রক্ষা করলেন। কারণ যুধিষ্ঠিরের পর পরীক্ষিৎই হবে প্রজাপালক ধার্মিক রাজা।

এইসব কিছুর পর তিনি প্রদ্যুম্নের নেতৃত্বাধীন দুর্ধর্ষ যদু সৈন্যের ধ্বংসের উপায়ও তিনি স্থির করে ফেললেন। যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধকদের নিয়েই ছিল দুর্ভেদ্য যদু সৈন্য, তাদের সকলের মধ্যে খুব সদ্ভাব থাকলেও, ভগবান কৃষ্ণ স্থির করলেন, মত্ত অবস্থায় এরা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে ধ্বংস হোক।  রাজপুরীর মধ্যে যদু ও ভোজ রাজকুমাররা একদিন খেলায় উন্মত্ত হয়ে, উপস্থিত মুনিদের উপেক্ষা ও অপমান করে বসল। অপমানিত মুনিরা কৃষ্ণের প্রশ্রয়েই তাদের অভিশাপ দিলেন।

এর মাস কয়েকপরে যদু, বৃষ্ণি, ভোজ ও অন্ধককুমাররা সকলে মহাসমারোহে প্রভাসতীর্থে যাত্রা করলেন। সেখানে স্নান করলেন, তীর্থজল দিয়ে পিতৃ ও দেব তর্পণ করলেন। ব্রাহ্মণদের প্রচুর সম্পদ, গরু, সোনা, রূপো, জীবিকার জমি ও বাসের জমি দান করলেন। ওই যদুবীরেরা গো ও ব্রাহ্মণের মঙ্গলের জন্য চিরদিন নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এখন তাঁরা সেই দান কর্মের ফল শ্রীভগবানে অর্পণ করে, মাটিতে শুয়ে ব্রাহ্মণদের প্রণাম করলেন”

যাদবদের উচ্ছৃখলতা  

ব্রাহ্মণদের অন্ন ভোজনের পর, ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে নিজেরা ভোজন করলেন। তারপর সকলে মিলে শুরু করলেন মদ্যপান। অতিরিক্ত মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে তারা একে অপরকে গালি দিতে লাগল, তাদের ক্রোধ বেড়ে উঠতে লাগল, তারা নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হল এবং একসময় উন্মত্ত অবস্থাতেই সকলের বিনাশ হল।

এই ঘটনার কিছুদিন আগেই কৃষ্ণ দ্বারকা ত্যাগ করেছিলেন, আর আমাকে বলেছিলেন বদরিকাশ্রমে চলে যেতে। আমাকে বললেও আমি তাঁর সঙ্গ ছাড়তে পারিনি। যদুকুল ধ্বংস হবার পর, তিনি সরস্বতীর জলে আচমন করে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। সেই গোধুলিবেলায়, সরস্বতী নদীর তীরে, গাছে পিঠ রেখে, তিনি মাটিতে একলা বসে ছিলেন, তাঁর মুখ তখনও প্রসন্ন।

আমি তাঁর চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলাম। আমাকে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “উদ্ধব, তোমার মনের কি ইচ্ছে আমি জানি।, তুমি এইজন্মে আমার কৃপা লাভ করেছ, অতএব এই জন্মই তোমার শেষ জন্ম। এই লোকে আমার সব কাজ সব শেষ হয়ে গেছে, এখন বৈকুণ্ঠে ফেরার সময় হয়ে এল। আমি চলে যাবার পর, উদ্ধব, যতদিন তুমি এই ভূলোকে থাকবে, আমার বিষয়ে লোককে উপদেশ দেওয়ার ভার আমি তোমাকেই দিয়ে গেলাম। কারণ, তুমি আমার থেকে এতটুকুও কম নও। তুমি বদরিকাশ্রমে যাও, সেখানেই তোমার কাজ শুরু করো”

ডান উরুর উপর, বাঁ পা রেখে, তিনি নিজের লীলা সংবরণের প্রতীক্ষায় বসেই রইলেন সেই অশ্বত্থ গাছের তলায়। সেইদিন সরস্বতী নদীর তীরে গোধুলির আলোয় তাঁর উজ্জ্বল প্রসন্ন মুখ দর্শন করে, আমি তাঁর নির্দেশে রওনা হলাম বদরিকা আশ্রমের দিকে। 

সৃষ্টিতত্ত্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীকৃষ্ণের লীলা মাহাত্ম্য বর্ণনার পর উদ্ধব বদরিকা আশ্রমে যাবার জন্যে উদ্যত হচ্ছেন দেখে, বিদুর ভক্তিভরে বললেন, হে উদ্ধব, শ্রীভগবান আপনাকে নিজের তত্ত্বস্বরূপ পরমজ্ঞানের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমাকে সেই উপদেশ দান করুন। কী উপায়ে আমি তাঁর একান্ত অনুগত থাকতে পারি, তাও আমার কাছে বর্ণনা করুনউদ্ধব বললেন, কুশারুনন্দন ঋষি মৈত্রেয় তোমার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর দেবেন। তিনিই তোমার আরাধ্য গুরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণও মর্ত্যলোক ত্যাগ করার আগে আমার সামনে এইরকমই নির্দেশ করে গিয়েছেন। অতএব, তুমি ঋষি মৈত্রেয়র সঙ্গে তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ করো। 

উদ্ধবের নির্দেশমতো হরিদ্বারে পৌঁছে, বিদুর পরমজ্ঞানী মহাঋষি মৈত্রেয়র সামনে উপস্থিত হলেন। পরম ভক্তিভরে বিদুর ঋষি মৈত্রেয়কে বললেন, “আমি ব্যাসদেবের কাছে ধর্মতত্ত্ব বহুবার শুনেছি, কিন্তু আমি বুঝেছি ওই সকল ধর্ম আচরণ, তুচ্ছ সুখের সন্ধান দেয় মাত্র। কিন্তু কৃষ্ণকথামৃতপানের সুযোগ যে কবার আমি পেয়েছি, তাতে আমার তৃপ্তি হয়নি। আপনি আমাকে সেই কৃষ্ণকথার অমৃত তত্ত্ব শোনানযে তত্ত্ব অন্তরে ঢুকে সংসারের প্রতি সমস্ত আসক্তি দূর করে, শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় লাভ করে পরমমুক্তির সন্ধান দেয়”

বিদুরের মুখে ব্যাকুল এই প্রশ্ন শুনে, কুশারুনন্দন মৈত্রেয় তাঁকে সমাদর করে বললেন, “হে বিদুর আপনি খুবই উত্তম প্রশ্ন করেছেন। এর উত্তর সঠিক বুঝতে গেলে, জানতে হবে, এই নিখিল বিশ্বের সৃষ্টির তত্ত্বটি। এই সমগ্র বিশ্ব যখন সাগরের জলে ডুবে ছিল, তখন শ্রী নারায়ণ যোগনিদ্রায় চোখ বন্ধ করে  অনন্তশয্যায় শুয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে তাঁকে মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু অন্তরে তাঁর চিৎশক্তি পূর্ণমাত্রায় সজাগ ছিল। কাঠের দাহিকা শক্তি যেমন কাঠের মধ্যেই রুদ্ধ থাকে, ঠিক সেরকমই তাঁর মধ্যে নিরুদ্ধ ছিল জগতের সমস্ত ভূতের সূক্ষ্মস্বরূপ।  তিনি মায়ালীলা ত্যাগ করে আত্মস্বরূপে নিমগ্ন ও নিষ্ক্রিয়ভাবে বিরাজ করছিলেন।

এইভাবে তাঁর চার হাজার যুগ তিনি রইলেন যোগনিদ্রায়, তারপর একদিন সৃষ্টির ইচ্ছায় তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং নিজের অন্তরে সূক্ষ্মরূপে লীন হয়ে থাকা সমস্ত লোকসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাঁর এই দৃষ্টির আঘাতে সঞ্চারিত হল রজোগুণ আর এই রজোগুণের প্রভাবেই, কাল সমস্ত জীবের কর্মের ভাগ্য নির্দিষ্ট করে দিলসেই কালের নিয়মেই জেগে ওঠা জীবের সূক্ষ্মতত্ত্ব, উজ্জ্বল এক পদ্মকোষের আকারে তাঁর নাভিমূল থেকে উদ্গত হল। সেই পদ্মকোষের উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল চারিদিকের অনন্ত জলরাশি। এই পদ্মই জীবের ভোগবস্তুর প্রকাশ করে থাকে।

তারপর সেই পদ্মকোষ থেকে আবির্ভূত হলেন বেদময় স্বয়ং ব্রহ্মা যেহেতু পদ্মকোষেই তাঁর স্বয়ং আবির্ভাব,  তাই তাঁকে স্বয়ম্ভূ বলা হয়। পদ্মের উপর বসে তিনি চারিদিকে কোন জগৎ দেখতে পেলেন না, চারিদিকে অখণ্ড  জলরাশি ও সীমাহীন তরঙ্গ দেখতে পেলেন। উদ্গ্রীব হয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চারদিকে দেখার জন্যেই তাঁর চারটি মাথার সৃষ্টি হয়েছিল, তাই তাঁকে চতুর্মুখও বলা হয়ে থাকে। তিনি চারিদিকে জলরাশি দেখে খুবই হতাশ হলেন। তিনি নিজে সেই পদ্মে অবস্থান করেও তিনি সেই পদ্মের স্বরূপ ও তার সম্পূর্ণ আকার উপলব্ধি করতে পারলেন না। তাঁর মনে হল, আমি এই যে পদ্মের উপর বাস করছি, আমি কে? আর এই বিপুল জলরাশির মধ্যে পদ্মই বা কোথা থেকে সৃষ্টি হল? যে আধার থেকে এই পদ্মের সৃষ্টি হয়েছে, সে আধার নিশ্চয়ই জলের মধ্যেই কোথাও ডুবে আছে!

এই চিন্তা করে ব্রহ্মা পদ্মের মৃনালের ছিদ্রপথে জলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে শত বছর  খুঁজেও তিনি তাঁর ও এই পদ্মের আবির্ভাবের কোন কারণ বুঝতে পারলেন না। দীর্ঘ অন্বেষণে ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন তাঁর পদ্মের আসনেই। তারপর মনকে সংযত করে সমাধিযোগে বসে রইলেন আরো শত বৎসর।  একশ বছর পর তাঁর যোগ সফল হলআগে দীর্ঘদিন বহু সন্ধানে করেও যাঁকে তিনি লাভ করতে পারেন নি, তাঁকে আজ নিজের মনের মধ্যেই বিরাজ করতে দেখলেন। তিনি দেখলেন, শ্যামলাবণ্য, পীতবসন এক দিব্য পুরুষকে; তাঁর মাথায় বহুরত্নখচিত মুকুট; তাঁর সর্ব অঙ্গে রত্নের অলংকার; শেষনাগের দেহের শয্যায় শুয়ে রয়েছেন; সেই দিব্য পুরুষের মাথার উপর ছাতার মতো ব্যাপ্ত রয়েছে শেষনাগের সহস্র ফণা।          

অবশেষে ব্রহ্মা সেই দিব্যপুরুষকে শ্রীহরি বলে চিনতে পারলেন। ব্রহ্মা সকলের আরাধ্য শ্রীবিষ্ণুর স্তব করলেন

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৩ "



নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩৪

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য " ...