উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/১

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 চতুর্থ স্কন্ধ - পর্ব ১

ঋষিদের বংশ পরিচয়

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “শতরূপার গর্ভে স্বায়ম্ভূব মনুর আকূতি, দেবহূতি ও প্রসূতি, এই তিন কন্যা ও দুই পুত্রের জন্ম হয়েছিল। মহারাজ মনু, শতরূপার অনুমিতি নিয়ে পুত্র বর্তমান থাকা সত্ত্বেও পুত্রিকাধর্ম মতে কন্যা আকূতিকে ঋষি রুচির হাতে সম্প্রদান করেছিলেন। পুত্রিকাধর্ম কী, সে কথা বলছি। কন্যাকে সম্প্রদান কালে পিতা যদি বলেন, আমার এই কন্যার কোন ভ্রাতা নেই, এই সালঙ্কারা কন্যাকে আমি সম্প্রদান করছি; কিন্তু এই কন্যার গর্ভে যে পুত্র সন্তান হবে, সেই পুত্র আমার পুত্র হবে; সেই সম্প্রদানকে পুত্রিকাধর্ম বলে। মনুর পুত্র থাকলেও, তিনি বহু পুত্রের কামনায় এই রকম করেছিলেন। ব্রহ্মতেজা প্রজাপতি রুচি আকূতির গর্ভে এক পুত্র ও এক কন্যার সৃষ্টি করলেন। পুত্রের নাম যজ্ঞ, তিনি যজ্ঞরূপী ভগবান বিষ্ণু, আর কন্যার নাম দক্ষিণা, তিনি সাক্ষাৎ লক্ষ্মীদেবীর অক্ষয় অংশস্বরূপা। স্বায়ম্ভূব মনু দৌহিত্র যজ্ঞকে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন, কিন্তু দক্ষিণা পিতার আলয়েই থেকে গেলেন। ভগবান যজ্ঞরূপী বিষ্ণু দক্ষিণাকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের দ্বাদশ পুত্র হয়। এই দ্বাদশ পুত্রের নাম, তোষ, প্রতোষ, সন্তোষ, ভদ্র, শান্তি, ইড়াপতি, ইষ্ম, কবি, বিভু, স্বাহ্ন, সুদেব ও রোচন। স্বায়ম্ভূব মনুর অধিকারে অর্থাৎ মন্বন্তরে এই দ্বাদশ পুত্র “তুষিত” নামে দ্বাদশ দেবতা হয়েছিলেন। এই মন্বন্তরে মরীচি প্রমুখ ঋষি, রুচিপুত্র যজ্ঞ শ্রীহরির অংশ অবতার ও ইন্দ্র হয়েছিলেন। প্রিয়ব্রত ও উত্তানপাদ এই দুই মুনিপুত্র নরপতি হয়েছিলেন। এই দুই নরপতির পুত্র ও পৌত্রেরা এই মন্বন্তর পালন করেছিলেন।

হে বিদুর, স্বায়ম্ভূব মনু ও তাঁর স্ত্রী শতরূপার কন্যা দেবহূতি ও তাঁর পতি ঋষি কর্দমের কথা, তোমাকে আগেই বর্ণনা করলাম। মহর্ষি কর্দমের নয়টি কন্যা যে নয়জন ব্রহ্মর্ষির পত্নী হয়েছিলেন, সেকথাও আগেই বলেছি। এখন তাঁদের পুত্র পৌত্রদের কথা বলছি, শোন। কর্দমকন্যা কলাদেবীর গর্ভে মরীচির, কশ্যপ ও পূর্ণিমা এই দুই পুত্রের জন্ম হয়। এঁদের বংশেই জগৎ পরিপূর্ণ হয়েছিল। পূর্ণিমার বিরজ ও বিশ্বগ নামে দুই পুত্র ও দেবকুল্য নামে এক কন্যা হয়। এই কন্যাই শ্রীহরির চরণ ধোয়ার পুণ্য প্রভাবে, অন্য জন্মে সুরসরিৎ গঙ্গা হয়েছিলেন। অত্রি পত্নী অনসূয়া, দত্ত, দুর্বাসা ও সোম এই তিন যশস্বী পুত্রের জন্ম দেন। তার মধ্যে দত্ত বিষ্ণুর অংশে, দুর্বাসা রুদ্রের অংশে এবং সোম ব্রহ্মার অংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন”।

শ্রীবিদুর বললেন, “হে গুরুদেব, সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কারী তিন দেবশ্রেষ্ঠ কি উদ্দেশে অত্রির গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন, দয়া করে বলুন”।

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “ব্রহ্মার কাছে সৃষ্টি করার আজ্ঞা পেয়ে অত্রি পত্নীকে নিয়ে ঋক্ষ নামক কুলপর্বতে গেলেন এবং সেখানে সৃষ্টির উদ্দেশে তপস্যায় ব্রতী হলেন। তিনি প্রাণায়ামে মন সংযত করে সর্বদা চিন্তা করতেন, যিনি জগদীশ্বর আমি তাঁর শরণাপন্ন হলাম, তিনি আমাকে তাঁর অনুরূপ সন্তান প্রদান করুন। তাঁর তীব্র প্রাণায়াম তপস্যার ফলে, তাঁর মাথার অগ্নিপ্রভায় ত্রিভুবন উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র তাঁর আশ্রমে উপস্থিত হলেন। তাঁরা হংস, গরুড় ও বৃষের উপর বসেছিলেন। তাঁদের হাতে ছিল কমণ্ডলু, চক্র ও ত্রিশূল। তাঁদের সহাস্য মুখ এবং করুণাঘন দৃষ্টি। মুনিবর অত্রি তাঁদের দণ্ডবৎ প্রণাম করলেন, তারপর করজোড়ে বিনীতভাবে স্তব করে বললেন”,

শ্রীঅত্রি বললেন, “এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের জন্য প্রত্যেক কল্পে আপনারা মায়ার প্রভাবে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও গিরীশের দেহ ধারণ করে প্রকাশ হয়ে থাকেন, আপনাদের বন্দনা করি। আমি প্রজাসৃষ্টির সঙ্কল্পে দেবশ্রেষ্ঠ একমাত্র ভগবানকে আমার চিত্তে ধারণ করেছিলাম। আপনাদের মধ্যে তিনি কে, আপনারাই আমাকে তার আদেশ দিন। আপনারা দেহীদের মনের অগোচর হয়েও, কী করে একসঙ্গে সকলে এখানে এলেন? আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছি, আপনারা দয়া করে আমাকে বলুন”।

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “বৎস বিদুর, সেই তিন শ্রেষ্ঠদেবতা অত্রির কথায় সন্তুষ্ট হয়ে সহাস্যমুখে বললেন, “হে ব্রহ্মন, তুমি সত্যসঙ্কল্প, সেই কারণে তুমি যা সঙ্কল্প করেছ, তার অন্যথা হবে না। তুমি যে একমাত্র ঈশ্বরতত্ত্বের ধ্যান করেছ, আমরা তিন হয়েও সেই একই তত্ত্ব, এই কথাটি জেনে রাখো। বস্তুতঃ আমাদের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। হে মুনিবর, তোমার মঙ্গল হোক, আমাদের অংশে তোমার তিন পুত্রের জন্ম হবে এবং তারা লোক বিখ্যাত হয়ে তোমার যশ বিস্তার করবে”। এই বর প্রদান করে, তিন সুরেশ্বর, অত্রি দম্পতির পূজা গ্রহণ করলেন এবং তাঁদের সামনেই অন্তর্হিত হয়ে গেলেন। এরপর ব্রহ্মার অংশে সোম, শংকরের অংশে দুর্বাসা ও বিষ্ণুর অংশে যোগবিৎ দত্ত জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।

[দুর্বাসা মুনি বিখ্যাত তাঁর ক্ষণক্রোধের জন্য, তাঁর কথা বহুবার আসবে এই পুরাণে, দত্ত বা যোগী দত্তাত্রেয়র কথাও আসবে যথা সময়ে।]   

এখন অঙ্গিরার বংশবিস্তার বর্ণনা করি। অঙ্গিরা পত্নী শ্রদ্ধা চার কন্যা প্রসব করেন, তাঁদের নাম সিনীবালী, কূহু, রাকা ও আনুমতি। এছাড়া তাঁদের দুই পুত্রও হয়, তাঁরা “স্বরোচিষ” মন্বন্তরে উতথ্য ও বৃহষ্পতি নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। উতথ্য সাক্ষাৎ ভগবানের অবতার এবং বৃহষ্পতি ব্রহ্মনিষ্ঠ ছিলেন। পুলস্ত্য ও তাঁর পত্নী হবির্ভূ অগস্ত্য ও বিশ্রবা, এই দুই পুত্রের জন্ম দেন। অগস্ত্য জন্মান্তরে জঠরাগ্নি ও বিশ্রবাঃ মহাতপা হয়েছিলেন। বিশ্রবার প্রথমা পত্নী ইলবিলার পুত্র যক্ষপতি দেব কুবের এবং দ্বিতীয়া পত্নী কেশিনীর পুত্র রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ।পুলহ ও তাঁর পত্নী গতিদেবীর তিন পুত্র, তাঁদের নাম কর্মশ্রেষ্ঠ, বরীয়ান ও সহিষ্ণু। ক্রতু ও তাঁর পত্নী ক্রিয়াদেবীর ষাটহাজার বালখিল্য ঋষিপুত্র জন্মগ্রহণ করেছিল, তাঁরা সকলেই ব্রহ্মতেজে প্রোজ্জ্বল। হে বিদুর, বশিষ্ঠ ও উর্জাদেবীর চিত্রকেতু প্রমুখ সাত পুত্র হয়। তাঁরা সপ্তর্ষি হয়েছেন। এই সপ্তর্ষির নাম চিত্রকেতু, সুরোচি, বিরজা, মিত্র, উল্বণ, বসুভৃদ্‌যান ও দ্যুমান্‌। শক্তৃ প্রমুখ তাঁর অন্য পত্নীর পুত্র। অথর্বার পত্নী চিত্তি, তাঁদের একটিমাত্র পুত্র তপোনিষ্ঠ দধীচি বা অশ্বশিরা।

এখন মহাভাগ ভৃগুর বংশ বর্ণনা করছি। মহাভাগ ভৃগু ও তাঁর পত্নী খ্যাতিদেবীর দুইপুত্র ও এক কন্যা। দুই পুত্রের নাম ধাতা ও বিধাতা এবং কন্যার নাম শ্রী। ধাতা ও বিধাতা মেরুকন্যা আয়তি ও নিয়তিকে পত্নীরূপে স্বীকার করেছিলেন। তাঁদের মৃকণ্ড ও প্রাণ নামে দুই পুত্র হয়। এই মৃকণ্ডের পুত্রই মার্কণ্ডেয় এবং মুনি বেদশিরা প্রাণের পুত্র। ভৃগুর কবি নামে আরেক পুত্র ছিলেন। উশনা অর্থাৎ শুক্রাচার্য তাঁরই পুত্র। এই সকল মুনি জগতে সৃষ্টি করে লোক বিস্তার করেছিলেন। বৎস বিদুর, তোমার কাছে কর্দমের দৌহিত্র বংশ বর্ণনা করলাম, এই কথা শুনলে সকল পাপমুক্ত হওয়া যায়।

দক্ষের ষোলটি কন্যা

এবার তাঁর অন্য কন্যা প্রসূতির কথা বলব, শোনো। ভগবান মনু তাঁর এই কন্যাকে ব্রহ্মার পুত্র দক্ষকে সম্প্রদান করেছিলেন। এই প্রসূতির গর্ভে সর্বগুণসম্পন্না, সুন্দরী ষোলটি কন্যার জন্ম হয়েছিল। এই কন্যাদের মধ্যে শ্রদ্ধা, মৈত্রী, দয়া, শান্তি, তুষ্টি, পুষ্টি, ক্রিয়া, উন্নতি, বুদ্ধি, মেধা, তিতিক্ষা, হ্রী ও মূর্তি এই তেরজন কন্যার সঙ্গে ধর্মের পরিণয় হয়েছিল। এই কন্যারা ধর্মের পত্নী হয়ে যথাক্রমে, ঋৎ, প্রসাদ, অভয়, সুখ, মুদ, স্ময় অর্থাৎ ধর্মে উৎসাহ, যোগ, দর্প, অর্থ, স্মৃতি, ক্ষেম, প্রশ্রয় ও নর-নারায়ণ দুই ঋষিকে প্রসব করেছিলেন। জননী মূর্তির দুই পুত্র নর-নারায়ণ ঋষির প্রসবকালে সমস্ত জগৎ প্রসন্ন হয়েছিল। সমস্ত দিক, সকল জীব, বায়ু, নদী, সরোবর ও পাহাড়-পর্বত প্রসন্ন হয়েছিল। এই দুই ঋষির আবির্ভাবে স্বর্গে তূর্যধ্বনি ও সেখান থেকে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিল। মুনিরা আনন্দে স্তব করেছিলেন, গন্ধর্ব ও কিন্নররা এই দুই ঋষির গুণ কীর্তন করেছিলেন এবং স্বর্গের নারীরা আনন্দে নৃত্য করেছিলেন। সে সময়ে সর্বত্র পরম মঙ্গলের ভাব অনুভূত হয়েছিল।

[সহোদর এই দুই ভ্রাতা - নর ও নারায়ণ ঋষিই নাকি দ্বাপরে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভক্তদের বিশ্বাস তাঁদের এই কলিযুগেও আবির্ভাব হয়েছিল বিবেকানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণ রূপে। অর্থাৎ পুরাণ আজও রচিত হয়ে চলেছে।]     

হে বিদুর, এই দুই নর ও নারায়ণ শ্রীহরির অংশ। ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারা তাঁদের স্তব করে বলেছিলেন, “মহাশূণ্যের মধ্যে নিজের মায়ায়, শ্রীহরি এই সমস্ত বিশ্বকে নিজের আত্মাতে সৃষ্টি করেছেন। আজ ভক্তদের কাছে সেই আত্মাকে প্রকাশ করার জন্যেই ধর্মের গৃহে, মূর্তির কোলে দুই ঋষির মূর্তিতে স্বয়ং শ্রী হরি অবতীর্ণ হলেন। আমরা এই পরমপুরুষকে প্রণাম করি। যাঁর দুই করুণাঘন নয়ন পদ্মের পবিত্র পাপড়িকেও লজ্জা দেয়, যাঁর দৃষ্টিতে দেবীলক্ষ্মীর স্থায়ী নিবাস, সেই পরমপ্রভু আমাদের প্রতি করুণা দৃষ্টি দিন। শ্রীহরির এই মহান তত্ত্ব আমরা পরোক্ষভাবে অর্থাৎ শুধুমাত্র শাস্ত্রচর্চা থেকেই পাই, এখন তাঁর সাক্ষাতে আমরা কৃতার্থ হলাম”। দেবতাদের দর্শন দিয়ে এবং তাঁদের এই স্তুতিতে প্রসন্ন হয়ে দুই ঋষি গন্ধমাদনে চলে গেলেন।  শ্রীহরির অংশর সেই দুই ঋষি এখন এই যুগেও আবার অবতীর্ণ হয়েছেন, পৃথিবীর অধর্মের ভার হাল্কা করার জন্যে। তাঁরা হলেন যদুশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ এবং কুরুশ্রেষ্ঠ শ্রীঅর্জুন।   

হে বিদুর, প্রজাপিতা দক্ষ ও প্রসূতির ষোলোটি কন্যার মধ্যে ধর্মেরপত্নী তেরটি কন্যার কথা বললাম। এক কন্যা স্বাহাদেবীর পাণিগ্রহণ করে ছিলেন অগ্নি। এই অগ্নি ও স্বাহাদেবী তিন পুত্রের নাম পাবক, পবমান ও শুচি। এঁরা প্রত্যেকেই যজ্ঞের হবিঃ ভোজন করে থাকেন। এই তিন পুত্রের পঁয়তাল্লিশটি পুত্র জন্মে ছিল। এই পুত্ররা, তাঁদের তিন পিতা ও পিতামহ অগ্নি মিলে মোট ঊণপঞ্চাশ সংখ্যক হয়েছেন, বৈদিক কর্মে ও যজ্ঞে এঁরা সকলেই অগ্নি।

পিতৃগণের মধ্যে “অগ্নিষ্বাতাঃ”, “বহির্ষদঃ”, “সৌম্যাঃ” ও “আজ্যপাঃ”ই প্রধান। এঁদের মধ্যে যাঁদের উদ্দেশে অগ্নিতে হোম করা হয়, তাঁদের সাগ্নিক বলে, আর যাঁদের জন্যে অগ্নি ছাড়াই হোম করা হয়, তাঁদের বলে অনগ্নি। দক্ষ কন্যা স্বধা এই পিতৃগণের পত্নী ছিলেন। স্বধার গর্ভে বয়ুনা ও ধারিণী নামে দুই কন্যার জন্ম হয়, এই কন্যা দুইজনেই জ্ঞানবিজ্ঞানে পারদর্শিনী ও ব্রহ্মবাদিনী ছিলেন।

দক্ষ কন্যা সতীদেবী ছিলেন মহাদেবের পত্নী। তিনি স্বামীর প্রতি একান্ত ভক্তিমতী হওয়া সত্ত্বেও, তিনি কোন সন্তান লাভ করতে পারেন নি। তাঁর পিতা দক্ষ নিরপরাধ মহাদেবের সঙ্গে অকারণ বিরুদ্ধাচরণ করাতেই, তিনি পিতার প্রতি ক্রোধে স্বয়ং দেহত্যাগ করেন। 

বিদুর বললেন,  মহাদেব ভব সাধুব্যক্তিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং দক্ষ তাঁর কন্যার প্রতি যথেষ্ট স্নেহবৎসল হওয়া সত্ত্বেও এমন ঘটনা কি করে হল, দয়া করে বর্ণনা করুন। দক্ষ কেনই বা নিজের মেয়ে ও জামাইকে অনাদর করলেন? যে মহাদেব চরাচরগুরু, জগতে যাঁর সঙ্গে কারও শত্রুভাব নেই, তাঁর প্রতি দক্ষের মনে কেন এতটা বিদ্বেষভাব এল, যে সতীর মতো কন্যাকে নিজের প্রাণ ত্যাগ করতে হলো?

দক্ষ-মহাদেব বিদ্বেষ

ঋষি মৈত্রেয় বললেন, বহুদিন আগে, প্রজাপতিদের একটি যজ্ঞে অনেক মহাঋষি, মহামুনি, দেবতারা এবং অগ্নিরাও সমবেত হয়েছিলেন। প্রজাপতি দক্ষ সেই সভায় উপস্থিত হলে, তাঁর তেজে সেই সভাস্থল উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তাঁর এই দীপ্ত মহিমায় মুগ্ধ হয়ে, তাঁকে সম্মান জানানোর জন্যে উপস্থিত মুনি ঋষি দেবতা অগ্নি সকলেই উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়ান নি শুধু দুজন, ব্রহ্মা আর মহাদেব শিব। তাঁর প্রতি শিবের এই অসম্মান দেখে, দক্ষ রাগে জ্বলে উঠলেন, তিনি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে মহাদেবের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“হে অগ্নি, মহর্ষি ও দেবগণ, সাধুব্যক্তিদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিৎ শুনুন। এই শিব লোকপালদের বদনাম করল। সাধুগণের কি ভাবে আচরণ করা উচিৎ, নির্লজ্জ শিব তার কিছুই না জেনে, এই পরিবেশের পবিত্রতা নষ্ট করে ফেলল। এই ব্যক্তি অগ্নি ও ব্রাহ্মণকে সাক্ষী রেখে আমার কন্যা সতীকে বিয়ে করার পর, আমার পুত্রের মতোই হয়ে উঠেছে। আমার সামনে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে প্রণাম করাই ওর উচিৎ ছিল, কিন্তু তা করে নি। আমার কন্যা সতীর নয়ন হরিণের মতো সুন্দর আর এর দুই চোখ বানরের মতো। এই ব্যক্তি নগ্নগায়ে, মাথায় উৎকট জটা, ভূতপ্রেতদের সঙ্গে শ্মশানে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়ায়। এই ব্যক্তি গায়ে চিতার ছাই মাখে, গয়নার মতো মড়ার হাড়গোড় পরে। এর নাম শিব হলেও, আচারব্যবহার তমঃস্বভাব অশিবের মতো। হায়, ব্রহ্মার কথায় আমি এই অশুচি ও দুষ্ট লোকের হাতে আমার কন্যা সম্প্রদান করে আমি ভুল করেছি”! 

দক্ষ এত কথা বললেও মহাদেব কোনরকম উত্তর দিলেন না, চঞ্চলও হলেন না। তখন ক্রুদ্ধ দক্ষ মহাদেবকে অভিশাপ করে বললেন, “দেবতাদের অধম এই শিব কখনো যজ্ঞের ভাগ পাবে না”। এই অভিশাপের পর দক্ষ সভা ত্যাগ করে নিজের প্রাসাদে চলে গেলেন। মহাদেবের অনুচরদের প্রধান নন্দীশ্বরও সে সভায় উপস্থিত ছিলেন, দক্ষ ও তাঁর অনুগামীদের প্রতি ক্রুদ্ধ নন্দীশ্বর বললেন, “ভগবান শিব কাউকে বিদ্বেষ করেন না, কারোর সঙ্গে বিরুদ্ধ আচরণও করেন না। এই দক্ষ পশুর মতো, কারণ প্রকৃত আত্মস্বরূপ থেকে বিচ্যুত হয়ে, সে দেহকেই আত্মা বলে মনে করছে। এই দক্ষের মাথা, ছাগলের মাথা হয়ে উঠবে এবং এই দক্ষ অত্যন্ত স্ত্রীকামী হয়ে অবিদ্যাকেই তত্ত্ববিদ্যা মনে করবে”। এরপর দক্ষের অনুগামী দ্বিজদেরকে বললেন, “উপস্থিত দ্বিজগণ, যারা  শিবদ্বেষী, তারা সংসারে জন্মমৃত্যু অনুভব করুক। এই দ্বিজগণ নিজেদের দেহ আর কামনার জন্যেই বিদ্যাভ্যাস করবে, অর্থ, দেহ ও ইন্দ্রিয়সুখের জন্যে খাদ্য অখাদ্য বিচার না করে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে”।

সেইসময় দ্বিজগণের মধ্যে ভৃগুও উপস্থিত ছিলেন, দ্বিজদের প্রতি এই অভিশাপ শুনে তিনিও ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রহ্মদণ্ড শাপ দিলেন, “যারা শিবের ব্রতধারী, যারা শিবের অনুগামী তারা বেদশাস্ত্রবিরুদ্ধ পাষণ্ডি হয়ে উঠুক। এই মূঢ় ব্যক্তিরা সমস্ত পবিত্রতা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে, জটা, ছাই আর হাড়গোড় ধারণ করে শিবদীক্ষা নিক এবং সুরা ও মদ্যকে দেবতার মতো সমাদর করুক। যে বেদমার্গ পরমমঙ্গলময় ও সনাতন, যে বেদমার্গের মূল স্বয়ং ভগবান জনার্দন, যে বেদমার্গ প্রাচীনকাল থেকে ঋষিগণ আশ্রয় করে আছেন, সেই পরমশুদ্ধ বেদমার্গের নিন্দা করার কারণে শিবের অনুচরগণের পাষণ্ডপথে পতন হোক”।

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “উভয়পক্ষের এই নিন্দাবাক্য ও অভিশাপবাক্য শুনে ভগবান ভব বিষণ্ণ মনে তাঁর অনুচরদের নিয়ে যজ্ঞসভা ত্যাগ করলেন”।

[একটু আগে মৈত্রেয় মহাশয় বলেছিলেন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও গিরীশ তিন শ্রেষ্ঠ দেবতা, কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে প্রজাপতি দক্ষ শ্বশুর হিসাবে শিবের থেকে যথোচিত সম্মান পাননি বলে, তাঁকে যাচ্ছেতাই অপমান করলেন। তাঁর সঙ্গে মহর্ষি ভৃগুও অপমান করলেন, তাচ্ছিল্য করলেন এবং অভিশাপও দিলেন। এই পুরাণে ভৃগু পরম বিষ্ণুভক্ত অথচ লিঙ্গপুরাণ ও অন্যান্য শিব পুরাণগুলিতে দেখা যায় ভৃগুর মতো শিবভক্ত এই ধরাধামে আর কেউ নেই। বেশ মজার ব্যাপার না?]        

চলবে...



বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১১

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 



 তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ১১

মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা (আগের পর্বের পরে) 

    মাটির সঙ্গে স্পর্শের আগে জল যেমন স্বচ্ছ, মধুর ও শান্ত অবস্থায় থাকে, সেই রকম সাংসারিক বিষয়ে আসক্ত হবার আগে জীবের চিত্ত শান্ত, অচঞ্চল ও সহজেই ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এইভাবেই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় চিত্তের বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। ভগবৎ শক্তি বা চিৎশক্তি থেকে মহত্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, মহত্তত্ত্ব থেকে ক্রিয়া কারণে অহঙ্কারতত্ত্বের সৃষ্টি হয়। এই অহঙ্কার তত্ত্ব তিনি প্রকারের, সাত্ত্বিক, রাজস ও তামস। হে মাতঃ, এই অহংকারের তিন লক্ষণের কথাও শুনে রাখ। অহঙ্কার দেবতারূপে কর্তা, ইন্দ্রিয়রূপে কারণ ও মহাভূতরূপে কার্য। অথবা অন্যভাবে বলা যায় সত্ত্বগুণে অহংকার শান্ত, রজোগুণে চঞ্চল আর তমোগুণে বুদ্ধিভ্রষ্ট। সাত্ত্বিক অহংকার বা বৈকারিক অহংকার থেকে থেকে মনস্তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই মনের সংকল্প ও বিকল্প আছে। সাধারণতঃ বিষয় গ্রহণের ইচ্ছাকে সংকল্প ও বিশেষ চিন্তায় বিশেষ বিষয় নেবার ইচ্ছাকে বিকল্প বলে। সংকল্প ও বিকল্প থেকেই কামনার সৃষ্টি হয়। মন ইন্দ্রিয়দের অধীশ্বর। যোগীরা এই মনকে বশীভূত করে ঈশ্বরে নিবিষ্ট হন।

    রাজস অহংকার থেকে বুদ্ধিতত্ত্বের সৃষ্টি হয়। বুদ্ধিতত্ত্বের দুই লক্ষণ হল পদার্থের প্রকাশরূপ জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়কে প্রবৃত্তিদান। এই লক্ষণ বৃত্তিভেদে নানা রকম, যেমন সংশয়, নিশ্চয়, স্মৃতি ও নিদ্রা। রাজস অহংকার থেকেই কর্মের ও জ্ঞানের ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি। প্রাণ রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় তার কর্ম ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস এবং বুদ্ধিও রাজস অহংকার থেকে উৎপন্ন হওয়ায় জ্ঞানের ইন্দ্রিয় সমূহও রাজস হয়ে থাকে। এইভাবে ভগবানের কালশক্তিতে তামস অহংকার থেকে শব্দতন্ময় অর্থাৎ সূক্ষ্ম শব্দ উৎপন্ন হয়, এই শব্দ থেকেই আকাশ সৃষ্টি হয়, তখন শব্দের সঙ্গে শব্দের ইন্দ্রিয় অর্থাৎ কর্ণের সংযোগ স্থাপন ঘটে। শব্দ পদার্থের বাচক। শব্দ জীবের জ্ঞাপক অর্থাৎ জীব তার কর্ণে শব্দ শুনতে পায়। অতএব, পদার্থবাচক, ব্যক্তিজ্ঞাপক ও সূক্ষ্ম আকাশ, শব্দের এই তিন লক্ষণ। আকাশেরও লক্ষণ আছে, আকাশ সকল ভূতকে আশ্রয় দান করে থাকে। আমরা যে বাহির ও অভ্যন্তর, এই দুই ভাব ব্যবহার করি, আকাশ তার কারণ, এবং প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও মন আকাশকে আশ্রয় করে থাকে। অতএব এই তিন কার্য আকাশের লক্ষণ।

তারপর শব্দতন্মাত্র আকাশ থেকে কালশান্তির প্রভাবে স্পর্শতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। তার থেকে বায়ু উৎপন্ন হয়ে ত্বক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে স্পর্শের সম্পর্ক ঘটে। মৃদু, কঠিন, শীত, উষ্ণ এবং বায়ুর সূক্ষ্ম অবস্থা হল স্পর্শের লক্ষণ। বায়ু বৃক্ষশাখাদের চঞ্চল করে, তৃণদের মিলিত করে, সকল বস্তুর সঙ্গে সংলিপ্ত থাকে এবং গন্ধদ্রব্যের গন্ধকে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের কাছে, শীত ও উষ্ণতা প্রভৃতিকে ত্বক ইন্দ্রিয়ের কাছে এবং শব্দকে শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কাছে বহন করে। এই সমস্ত কর্মে বায়ুর লক্ষণ উপলব্ধি হয় এবং বায়ু সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সজীব রাখে। এইভাবে স্পর্শতন্মাত্র ও বায়ুর দৈবযোগে রূপতন্মাত্রের সৃষ্টি হয়। রূপ তন্মাত্র থেকে চক্ষুর সম্বন্ধ ঘটে। রূপ বস্তুর সঙ্গে অনুভব করা যায়, স্বতন্ত্র অনুভব করা যায় না। বস্তুর যেমন আকার স্থূল, সূক্ষ্ম, ঋজু বা বক্র, রূপেরও তেমন অনুভূতি; সুতরাং এই সকল রূপের লক্ষণ।

তেজ আহার পাক করে, ক্ষুধাতৃষ্ণার উদ্রেক করে ভোজন ও পান করায়, শৈত্য নিবারণ করায়, উষ্ণতা শোষণ করায়। এই স্কল কার্য তেজের লক্ষণ। রূপ তন্মাত্র তেজ কাল প্রভাবে রসতন্মাত্র সৃষ্টি করে। রসতন্মাত্র থেকে জলের সৃষ্টি হলে জিভের সঙ্গে রসের সম্পর্ক ঘটে। রস সাধারণতঃ মধুর, কিন্তু যে সব ভৌতিক পদার্থের সঙ্গে সংসর্গ ঘটে, সেই অনুসারে কষায়, মধুর, তিক্ত, কটু, অম্ল ও লবণ, এই ছয় প্রকারের রসের অনুভব হয়। জল পদার্থকে সিক্ত করে, জীবকে তৃপ্তি দিয়ে তাদের জীবিত রাখে, পিপাসা ও তাপের নিবৃত্তি করে; সুতরাং এই সমস্তই জলের বৃত্তি অর্থাৎ কার্য। তারপর রসতন্মাত্র জল কালের প্রভাবে গন্ধতন্মাত্রের সৃষ্টি করে এবং তার থেকে পৃথ্বী উৎপন্ন হলে ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে গন্ধের সংযোগ স্থাপন করে। ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন গন্ধের অনুভব হয়, মিশ্রগন্ধ, দুর্গন্ধ, কর্পূর ইত্যাদির সৌরভ, পথ্য ইত্যাদির শান্তগন্ধ, লশুন ইত্যাদির উগ্রগন্ধ ও অম্লগন্ধ। পৃথ্বীতত্ত্বের লক্ষণ এই যে, এর থেকে প্রতিমারূপে ব্রহ্মের সাকারতা সাধিত হয়। পৃথ্বী স্বতন্ত্র ভাবে অবস্থান করতে পারে, জল ইত্যাদির মতো অপরের নির্ভর করে না। এই পৃথ্বীতত্ত্ব জল ইত্যাদির আধার ও আকাশ ইত্যাদির বিভাজক; পৃথ্বী থেকে সমস্ত জীবের আকার প্রকাশ পেয়ে থাকে।

হে মাতঃ এখন তোমাকে জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের লক্ষণসমূহ বলছি, শোন। কান দিয়ে আকাশের অসাধারণ গুণ শব্দ শোনা যায়। ত্বক দিয়ে বায়ুর অসাধারণ গুণ স্পর্শ অনুভব হয়, চোখ দিয়ে তেজের অসাধারণ গুণ রূপ দেখা যায়, জলের অসাধারণ গুণ রস গ্রহণ করা যায় জিভে, ভূমির অসাধারণ গুণ গন্ধ যে ইন্দ্রিয় গ্রহণ করে, তার নাম নাক। এইভাবে আগেকার সকল মহাভূতের গুণ পরের মহাভূতে সংযুক্ত হওয়ার কারণে, পৃথ্বীতত্ত্বে আকাশ ইত্যাদি সকল ভূতের অসাধারণ গুণ অনুভূত হয়। সৃষ্টির শুরুতে মহত্তত্ত্ব ইত্যাদি সকল তত্ত্ব যখন অমিশ্রিত অবস্থায় অবস্থান করছিল, তখন জগতের আদি কারণ ঈশ্বর কাল অর্থাৎ গুণ সমূহে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী শক্তি, কর্ম অর্থাৎ জীবের অদৃষ্ট ও গুণ অর্থাৎ প্রকৃতি; এই তিন কারণে অধিষ্ঠিত হয়ে, ওই সকল তত্ত্বের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। 

এই ব্রহ্মাণ্ড শ্রীহরির রূপ। কারণ সলিলে অবস্থিত এই ব্রহ্মাণ্ড থেকে ভগবান উত্থিত হলেন অর্থাৎ উদাসীন অবস্থা পরিত্যাগ করে অধিষ্ঠিত হলেন ও অনেক ইন্দ্রিয় ছিদ্র প্রকাশ করলেন। প্রথমতঃ এই বিরাট পুরুষের মুখ প্রকাশিত হল এবং বাক্য ইন্দ্রিয়ের দেবতা অগ্নির তার মধ্যে প্রবেশ করল। তারপর প্রাণের অন্বয়ে নাক প্রকাশ হলে ঘ্রাণ ইন্দ্রিয়ের দেবতা বায়ু তার মধ্যে আশ্রয় নিল। এইভাবে অক্ষিগোলকে চোখের দেবতা সূর্য, কানের প্রকাশ হলে শ্রবণের দেবতা দিগ্‌দেবতা প্রবেশ করলেন। তারপর বিরাট পুরুষের ত্বক, রোম ও শ্মশ্রু প্রকাশে ত্বকের ঔষধি দেবতাগণ, শিশ্নর প্রকাশ হলে বীর্যের দেবতা অব্‌দেবতা, পায়ু প্রকাশিত হলে, অপান ইন্দ্রিয়ের দেবতা মৃত্যুর অধিষ্ঠান হল। হাত ও পায়ের প্রকাশে, বল ও গতির দেবতা ইন্দ্র ও বিষ্ণু, নাড়িসকল প্রকাশিত হলে শোণিতর দেবতা নদীর অধিষ্ঠান হল। তারপর উদর প্রকাশিত হলে, ক্ষুধা ও পিপাসা ইন্দ্রিয়ের দেবতা সমুদ্রদেবের সঙ্গে অধিষ্ঠিত হল। পরে বিরাট পুরুষের হৃদয়ে মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত, যথাক্রমে চন্দ্র, ব্রহ্মা, রুদ্র ও চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞর সঙ্গে অধিষ্ঠান করতে লাগল। দেবতা চৈত্ত ছাড়া অন্য সকল দেবতাই বিরাট পুরুষকে জাগরিত করার জন্যে নিজ নিজ ইন্দ্রিয় স্থানে অধিষ্ঠান করলেও, বিরাট পুরুষ জাগ্রত হলেন না। তারপর চৈত্ত অর্থাৎ ক্ষেত্রজ্ঞ চিত্ত তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করামাত্র তিনি কারণ বারিধি থেকে উত্থিত হলেন। যে ক্ষেত্রজ্ঞ ছাড়া প্রাণ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সুপ্ত পুরুষকে জাগ্রত করতে পারে না, সেই ক্ষেত্রজ্ঞকে চিন্তা করতে হবে। প্রথমতঃ পরমেশ্বরে ভক্তি, দ্বিতীয়তঃ অন্যত্র সকল বিষয়ে বৈরাগ্য, তারপর যোগ অনুষ্ঠানে একাগ্র চিত্ত হলে যে জ্ঞান সৃষ্টি হবে, সেই জ্ঞানের সাহায্যে এই দেহে ক্ষেত্রজ্ঞকে আলাদা ভাবে চিন্তা করতে হবে। 

শ্রীভগবান বললেন, “যাঁকে পুরুষ বলে উল্লেখ করলাম, ইনি স্বভাবতঃ নির্গুণ; এই নিমিত্ত তিনি অকর্তা, সুতরাং নির্বিকার। জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া পড়লে যেমন সেই ছায়া কাঁপে, কিন্তু আকাশের সূর্য কাঁপে না, তেমনই প্রকৃতিতে অর্থাৎ দেহে অবস্থান করে, এই পুরুষ এই দেহের সুখদুঃখের অংশীদার বলে মনে হলেও, বস্তুতঃ তিনি নির্লিপ্ত থাকেন। যখন এই পুরুষ প্রকৃতির গুণসমূহে একান্ত আসক্ত হন, তখন প্রকৃতির কার্যকে “আমি করছি” এই অভিমানে বিমূঢ় হয়ে থাকেন। এই অভিমানে পুরুষ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের জন্য পাপ ও পুণ্য অর্জন করে এবং সেই কর্মদোষে সৎ অর্থাৎ দেবযোনি, মিশ্র অর্থাৎ মনুষ্যযোনি অথবা অসৎ অর্থাৎ তির্যকযোনিতে বারবার জন্মমৃত্যুর দশা লাভ করে, কখনো পরমানন্দ স্বরূপ লাভ করতে পারে না। পুরুষের কর্ম না থাকলেও কর্তার ভ্রান্ত অভিমানে, সংসারের বিষয়ে আসক্ত হয়ে অনর্থ দশা পায়। অতএব বিষয়ের প্রতি একান্ত আসক্ত মনকে, কঠোর ভক্তি ও বৈরাগ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বশীভূত করাই কর্তব্য।

হে মাতঃ, যে ভাবে আত্মলাভ হয়, সে কথা বলছি শোন। শ্রদ্ধার সঙ্গে যোগ অবলম্বন করে মনকে বার বার একাগ্র করবে, অকপট আচরণ করবে, আমার প্রতি একান্ত ভক্তি নিয়ে, আমার কথা শুনবে। সর্বভূতে সমদর্শীতা, শত্রুতা ত্যাগ, সঙ্গ ত্যাগ, ব্রহ্মচর্য, মৌনতা, নিজের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী কর্ম ঈশ্বরে অর্পণ, যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তোষ, পরিমিত আহার, একাগ্র চিন্তা, নির্জনে বাস, রাগদ্বেষ পরিত্যাগ, সর্বভূতের মঙ্গল চিন্তা, করুণা, ইন্দ্রিয়জয়, স্ত্রীপুত্রকন্যা ও নিজের দেহের প্রতি “আমি” ও “আমার” এই অভিমান ত্যাগ, এই সমস্ত সৎগুণ থাকতে হবে। এইভাবে প্রকৃতি ও পুরুষ বিষয়ে তত্ত্বজ্ঞান হলে, জাগ্রত অবস্থার নিবৃত্তি হয়ে অন্তরের দিকে দৃষ্টি যায়, তখন আর অন্য বস্তুর দিকে লক্ষ্য যায় না। যোগীব্যক্তি নিজের অবিচ্ছিন্ন আত্মা দিয়ে শুদ্ধ আত্মাকে লাভ করেন এবং শেষে প্রকৃতির আবরণহীন, মিথ্যা অহঙ্কারে সত্যরূপে ভাসমান ব্রহ্মকে লাভ করতে পারেন। শুদ্ধ জীবস্বরূপের থেকে ব্রহ্মের পার্থক্য এই যে, ইনি প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতির অধিষ্ঠান; চোখের মতো নিখিল সৃষ্টির প্রকাশক এবং নিখিল কার্য-কারণের সম্পর্কযুক্ত অদ্বয় অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপে বিরাজিত।

হে জননি, জীবাত্মা কিভাবে শুদ্ধব্রহ্মকে লাভ করতে পারে একটি উদাহরণ দিয়ে বলি শোন। কখনো কখনো জলে সূর্যের ছায়া পড়লে, সেই ছায়া আবার ঘরের দেওয়ালেও দেখা যায়। তখন সেই গৃহে থাকা ব্যক্তি, ঘরের মধ্যে সূর্যের ছায়া কোথা থেকে এল, সন্ধান করতে করতে প্রথমে জলের মধ্যে সূর্যের ছায়া এবং অবশেষে আকাশের সূর্যের সন্ধান পায়। একই ভাবে সাধক প্রথমতঃ ভূত, ইন্দ্রিয় ও মনে আত্মা অর্থাৎ চৈতন্যের ছায়া অর্থাৎ প্রকাশ দেখতে পান। জড়বস্তুতে ঐ ছায়া কোথা থেকে এল, অনুসন্ধান করতে গিয়ে ত্রিগুণ অহঙ্কারে চৈতন্যের প্রকাশ দেখতে পান। তারও পরে কারণ অনুসন্ধান করতে করতে স্বপ্রকাশ ব্রহ্মচৈতন্য উপলব্ধি করতে পারেন।

হে মাতঃ, এই আত্মাকে কিভাবে সুষুপ্তির সাক্ষিরূপে অনুভব করা যায়, তাও তোমাকে দেখাচ্ছি। সুষুপ্তিকালে স্থূলভূত, সূক্ষ্মভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি অব্যক্ত প্রকৃতিতে লয় অবস্থায় থাকে। তখন আত্মা বিনিদ্র ও অহঙ্কারহীন অবস্থায় অবস্থান করে। যদি বলো, আত্মা যদি বিনিদ্রই থাকে, তবে জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্নদর্শনের মতো আত্মার স্ফূরণ দেখা যায় না কেন? তার কারণ হল, জাগ্রত ও স্বপ্নকালে আত্মা দ্রষ্টা থাকেন, দৃশ্য বিষয়ের সঙ্গে পার্থক্যের জন্য, নিজেকে দ্রষ্টা হিসেবে বুঝতে পারেন। কিন্তু সুষুপ্তিকালে অহঙ্কারের সকল বিষয় ভূত ইত্যদি বিলীন হয়ে যায় এবং অহঙ্কারও বিনষ্ট হয়; তখন আত্মা নিজে নষ্ট হন না, কিন্তু নিজেকে নষ্ট ভেবে বিভ্রান্ত হন। ধনী ব্যক্তি সর্বস্বান্ত হলে, সেই ব্যক্তি যেমন নিজে নষ্ট না হয়েও, নিজেকে ধ্বংস মনে করে ব্যাকুল হয়, আত্মারও সেই একই অবস্থা ঘটে। জীবের দেহ, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি অহঙ্কারের সমন্বয়ে প্রকাশ হয়ে থাকে, অতএব অহঙ্কারকেও দৃশ্য পদার্থের মধ্যে গণ্য করা হয়; কিন্তু আত্মা দ্রষ্টা, অহঙ্কার ও সকল দেহের আশ্রয় ও প্রকাশক। এই কারণে সুষুপ্তিকালে নিখিল দৃশ্যপদার্থ থেকে ভিন্ন আত্মা নিজেই প্রকাশ পায় এবং শুদ্ধ সাক্ষিচৈতন্যরূপে অবস্থান করেন”।

মাতা দেবহূতি বললেন, “হে প্রভু, তুমি বললে প্রকৃতি ও পুরুষ পরষ্পরের মধ্যে নিত্য আশ্রয় ও আশ্রিতভাব। মনে ভক্তি ও বৈরাগ্য আনলেও, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়, তাহলে কিভাবে মুক্তি হওয়া সম্ভব? পুরুষ অকর্তা হলেও, প্রকৃতির যে সমস্ত গুণের কারণে পুরুষের কর্মের বন্ধন হয়, সেই সমস্ত গুণ বর্তমান থাকলে পুরুষের কৈবল্য প্রাপ্তি কিভাবে সম্ভব? আমার মনে হয়, এই কারণেই কোন কোন পুরুষ তত্ত্ববুদ্ধি দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করলেও, তাঁর মধ্যে প্রচ্ছন্ন ভয় থেকেই যায় এবং সেই কারণে আবার মৃত্যুভয় উপস্থিত হয়”।

শ্রীভগবান বললেন, “হে মাতঃ, কামনাহীন ধর্ম আচরণ, নির্মল অন্তর, আমার কথা শোনার ফলে মনে সুদৃঢ় ভক্তি, তত্ত্ব উপলব্ধির প্রগাঢ় জ্ঞান, তীব্র বৈরাগ্য, তপস্যা ও আত্মসমাধি যোগে প্রকৃতি দিন রাত্রি জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যন্ত বিনষ্ট হয়। এই ভাবে বিনষ্ট প্রকৃতি, স্বতন্ত্র ও পরমানন্দে অধিষ্ঠিত পুরুষের কোন অশুভ করতে পারে না। বহুবার জন্মগ্রহণ করে জীব যখন আত্মনিষ্ঠ হন এবং নিখিল ভুবনে বৈরাগ্যযুক্ত হন, তখন আমার প্রসাদে কৈবল্যনামক স্বরূপ প্রাপ্ত হন এবং আত্মজ্ঞান লাভ করে মনের সকল সংশয় ছিন্ন করতে সমর্থ হন। তারপর লিঙ্গশরীর বিনষ্ট হলে, সেই যোগী সংসারে আর ফিরে আসেন না। হে মাতঃ, এই অবস্থায় যোগের আনুষঙ্গিক ফল, অণিমা ইত্যাদি সিদ্ধিসকল, বাধা হয়ে উপস্থিত হয়। সিদ্ধযোগী যদি ওই প্রলোভনে আকৃষ্ট না হন, তবে তিনি পরামুক্তি লাভ করেন এবং তাঁর মৃত্যুভয় চিরতরে দূর হয়ে যায়”।

মাতা দেবহূতি সাংখ্যজ্ঞানের প্রবর্তক সেই ভগবানকে প্রণাম করে স্তব করতে করতে বললেন, “ব্রহ্মাণ্ড স্বয়ং যাঁর নাভি মণ্ডল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যিনি নিখিল কার্য ও কারণ। যাঁর মধ্যে সত্ত্ব প্রভৃতি তিনগুণের প্রবাহ বর্তমান। সেই তুমিই এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমি নিষ্ক্রিয় ও সত্য সঙ্কল্প, এই কারণে তুমি প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি না করেও, নিজের শক্তিকে তিন গুণের প্রবাহে বিভক্ত করে জীবগণকে ভোগের জন্য সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাক। তুমিই এক হয়ে এই অসংখ্য বিচিত্র ভোগের বিধান দাও। তোমার অনন্ত অচিন্ত্য শক্তির কে ইয়ত্তা করতে পারবে? হে নাথ, প্রলয় কালে এই বিশ্ব যাঁর জঠরে ছিল, তাঁকে আমি কী ভাবে গর্ভে ধারণ করেছিলাম? অথবা যেমন কল্পের অন্তে, তোমার মায়ার প্রভাবে তুমি শিশুরূপ ধারণ করেছিলে এবং একটিমাত্র বটপাতায় শুয়ে নিজের পায়ের আঙুল পান করেছিলে, এও তোমার সেই রকমই কোন মায়া? অথবা তুমি দুষ্টগণের শাসন, ভক্তদের সমৃদ্ধি ও জ্ঞানমার্গের পথ দেখানোর জন্য, তোমার নানান অবতার মূর্তির মতো আরেক মূর্তিতে অবতীর্ণ হয়েছ? হে ভগবান, যাঁরা তোমার নাম গ্রহণ করেন, তাঁরা তপস্যা, হোম, তীর্থদর্শন ও বেদপাঠের সমান ফল লাভ করেন। যদি চণ্ডালের জিহ্বাতেও তোমার নাম উচ্চারণ থাকে, শুধুমাত্র সেই কারণেই সে সদাচার পবিত্র হয়ে ওঠে, সন্দেহ নেই। তুমি ব্রহ্ম, তুমি পরমপুরুষ। মন বিষয় থেকে নিবৃত্ত হলে, তোমাকে চিন্তা করার যোগ্য হয়ে ওঠে। নিখিল বেদ তোমার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। হে প্রভু, তুমিই কপিলরূপী বিষ্ণু, আমি তোমাকে প্রণাম করি”। 

তৃতীয় স্কন্ধ সমাপ্ত

পরের পর্ব - "ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৪/১" 


বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১০

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ১০

শৌনক বললেন, “স্বয়ং জন্মরহিত অর্থাৎ ভগবান মানুষের কাছে নিজের তত্ত্ব জানাবার জন্যই সাংখ্য প্রবর্তক কপিলরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। ভগবান পুরুষোত্তম এবং সকল যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যিনি এই কীর্তির কথা শোনেন, ভগবান তাঁর মধ্যে প্রকাশ হন”।

সূত বললেন, “আত্মবিদ্যা বিষয়ে মহামতি বিদুর, ভগবান মৈত্রয়কে জিজ্ঞাসা করলেন।

  মায়ের কাছে মহামুনি কপিলের সাংখ্য দর্শন ব্যাখ্যা

শ্রী মৈত্রেয় বললেন, “পিতা কর্দম অরণ্যে চলে যাওয়ার পর, শ্রীভগবান মায়ের কাছেই বিন্দুসর আশ্রমে বাস করতে লাগলেন। একদিন মাতা দেবহূতি দেখলেন, তত্ত্বমার্গের পথ প্রদর্শক তাঁর পুত্র সকল কর্ম ত্যাগ করে বসে আছেন। তাঁর মনে পড়ল, ব্রহ্মা বলেছিলেন, তাঁর এই পুত্র ভগবান শ্রীহরির অংশ। অতএব তিনি পুত্রের কাছে গিয়ে বললেন, “হে প্রভু, পরমেশ্বর, আমার মন ও ইন্দ্রিয় সর্বদাই বিষয়ের দিকে দৌড়ে চলেছে। বিষয়বাসনা পূর্ণ করতে করতে আমি সংসারের ঘোর অন্ধকারে ঢুকে পড়েছি। তুমিই জীবগণের নিয়ন্ত্রণকারক আদি ভগবান, তুমি অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবলোকের চোখে সূর্যের আলোর মতো উদয় হয়েছ। অতএব, হে ভগবান, আমার এই মোহ থেকে তুমি আমাকে মুক্তির পথ দেখাও। তোমার মায়ার প্রভাবেই আমার মধ্যে “আমি” ও “আমার” এই আসক্তি এবং সেই আসক্তি থেকেই আমার মধ্যে রাগ, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, শোক, তাপ ইত্যাদির সৃষ্টি হয়েছে। এই সংসারী পুরুষ কে, আর যার জন্যে পুরুষের এই সংসারভোগ, সেই প্রকৃতিই বা কে? এই প্রশ্নের সমাধানের জন্যে আমি তোমারই শরণাপন্ন হলাম। প্রভু, আমি জানি, তুমি শরণাগতের আশ্রয়, তোমাকে আমি প্রণাম করি”।

জননীর এই প্রশ্নে ভগবান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন, মৃদু হেসে বললেন, “মাতঃ, আমার মতে আত্মনিষ্ঠ যোগই মানুষের মুক্তির পথ। এই যোগে চিরকালের মত সুখ দুঃখের নিবৃত্তি হয়। জীবের চিত্তই হল তার বন্ধন বা মুক্তির কারণ। চিত্ত বিষয়ে আসক্ত হলে বন্ধনের কারণ হয়, আর পরমেশ্বরে আসক্ত হলে মুক্তি লাভ করা যায়। এই দেহ “আমি” আর এই স্ত্রীপরিবার, ঘর বিষয়আশয় “আমার”, এই অভিমান থেকেই কামনা, লোভ ও মনের মলিনতার সৃষ্টি হয়।  যখন এই মলিনতা মুছে গিয়ে মন শুদ্ধ হয়, তখন সুখে-দুঃখে সমান ভাবনা আসে। তখন জীবের অন্তরে শুদ্ধ আত্মার উপলব্ধি আসে। তিনি উপলব্ধি করেন এই আত্মা শুদ্ধ, ভেদজ্ঞানহীন, সূক্ষ্ম, নিখিল বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম ও নিজের রূপে উজ্জ্বল। যোগীগণের ব্রহ্মলাভ বিষয়ে, অখিল আত্মা ভগবানে নিরত ভক্তির মতো সুচারু পথ, অন্য আর কোন পথ নেই।  জ্ঞানীগণ বলেন, অসৎসঙ্গই জীবের বন্ধন, সাধুসঙ্গে মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। হে মাতঃ, সাধুব্যক্তির লক্ষণ কি, মন দিয়ে শোন। সাধুদের ধৈর্য রাখতে হয়, সকল জীবের প্রতি তাঁর করুণা ও বন্ধুভাব থাকতে হবে। তাঁর কোন শত্রু থাকবে না। তিনি শান্ত, শাস্ত্র বিশ্বাসী এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী হবেন। তাঁরা আমাকেই একান্ত ভক্তি করবেন এবং আমার জন্যেই সকল কর্ম ও স্বজন বন্ধুপরিজন ত্যাগ করবেন। আমার প্রতি তাঁদের মন সর্বদা নিযুক্ত থাকার জন্যে, তাঁরা সংসারের জ্বালাযন্ত্রণায় বিব্রত হন না। হে মাতা, তোমার এই রকম সাধুসঙ্গই একান্ত প্রয়োজন, এই সঙ্গ থেকে সমস্ত দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই সৎসঙ্গ যে ভক্তির অঙ্গ তাও বলছি, শোন।

সাধুদের মুখে আমার কথা শুনলে অন্তরে পরমসুখ অনুভব করা যায়। আমার কীর্তির কথা শুনতে শুনতে আমার প্রতি প্রথমে শ্রদ্ধা, তারপরে অনুরাগ ও শেষে ভক্তির উদয় হয়। তারপর আমার সৃষ্টিলীলার কথা চিন্তা করতে করতে ইহলোকের ও পরলোকের ইন্দ্রিয়সুখের বাসনা দূর হয়ে যায়। এইভাবে জীব প্রকৃতির তিনগুণ ও বিষয়ের বাসনা থেকে নিবৃত্ত হয়ে জ্ঞান, বৈরাগ্য, অষ্টাঙ্গ যোগ ও আমাতেই অর্পিত ভক্তি দিয়ে আমাকে আত্মস্বরূপে লাভ করে থাকে”। 

[পণ্ডিতেরা বলেন সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক ঋষি কপিলের আবির্ভাবকাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। সে সময় তিনি নিজেকে ভগবান শ্রীহরি বলে জানতেন না, এবং তাঁর এই দর্শনে ঈশ্বর বা ভগবানের কোন উল্লেখ নেই। প্রায় হাজার বছর পর খ্রিস্টাব্দ চতুর্থ/ পঞ্চম শতাব্দীতে ভাগবত রচনার সময় (পুরাণকারের মহিমায়) তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে, তিনি শ্রীহরির অবতার - অতএব তাঁর দর্শনে ঘটে গেল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন - ঈশ্বরের অস্তিত্ব!]  

[কৌতূহল মেটাতে এই ব্লগের এই সূত্র "ধর্মাধর্ম - ৫/১" থেকে পড়ে নিতে পারেন মূল সাংখ্য দর্শনের সংক্ষিপ্ত  বক্তব্য।]       

মাতা দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন, “যে ভক্তি তোমাতে অর্পণ করতে হয়, সে কেমন ভক্তি? যে ভক্তির পথে আমার মতো নারী তোমার নির্বাণপদ খুব সহজেই লাভ করতে পারে, সেই ভক্তির পথ আমাকে দেখাও। হে ভগবান, আমি স্বল্পবুদ্ধি নারী, যে যোগের লক্ষ্য শুধুমাত্র তুমি এবং যে পথে পরমতত্ত্বজ্ঞান লাভ হয়, সেই যোগ কেমন এবং কতভাগে বিভক্ত? তোমার অনুগ্রহে আমি এই দুর্বোধ বিষয় যাতে সহজে উপলব্ধি করতে পারি, সেইভাবে তুমি আমাকে বলো।”

শ্রীভগবান জননীর জ্ঞানের প্রতি এই আগ্রহ দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং যে জ্ঞানে সকলতত্ত্ব নির্দিষ্ট জানা যায়, যে শাস্ত্রকে জ্ঞানীগণ সাংখ্যশাস্ত্র বলেন, সেই বিস্তৃত ভক্তি ও যোগের নির্ণায়ক শাস্ত্র বর্ণনা করার জন্য বললেন, “যাঁরা বেদ অনুযায়ী অহংকারহীন নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান করেন, তাঁদের আর কিছু করতে হয় না। তাঁদের জ্ঞান ও সমস্ত কর্মের ইন্দ্রিয় স্বাভাবিকভাবেই শ্রীহরির সত্ত্বমূর্তির প্রতি অনুরক্ত হয়। এই নিষ্কাম, একনিষ্ঠ চিত্তবৃত্তিই উত্তমা ভক্তি। এই ভাগবতী ভক্তি, মুক্তির থেকেও অনেক বড়ো। ভোজনের পর পেটের মধ্যে অন্ন নিজে নিজেই হজম হয়ে যায়, তার জন্যে জীবকে যেমন কোন চেষ্টা করতে হয় না। সেই রকম এই ভক্তি নিজে নিজেই লিঙ্গশরীরকে আত্মস্থ করে ফেলে, সুতরাং ভক্তকে আর মুক্তির জন্য কোন প্রয়াস করতে হয় না। যাঁরা আমার উদ্দেশে কর্মের অনুষ্ঠান করেন, নিরন্তর আমার চরণসেবা করেন এবং পরষ্পর মিলিত হয়ে আমার কীর্তিগাথা আলোচনা করেন, তাঁরা আর মোক্ষের জন্য অভিলাষ করেন না। সেই ভক্তেরা আমার প্রসন্নবদন ও  বরপ্রদ আমার দিব্যরূপ দর্শন করে থাকেন এবং ওই মূর্তির সঙ্গে মনোহর আলোচনা করতে থাকেন। অতএব জ্ঞান ও যোগের থেকে ভক্তিপথের শ্রেষ্ঠতা এই যে, এই পথে নিত্য পরমশ্বরের অনুভবসুখ লাভ করা যায়। আমাকে যাঁরা ভজনা করেন, আমার কমনীয় অবয়ব, মধুর লীলা, হাস্য, কটাক্ষ ও মধুরবচন তাঁদের সকল ইন্দ্রিয় ও চিত্তকে অভিভূত করে রাখে; তাঁরা ইচ্ছা না করলেও তাঁদের ভক্তিই তাঁদের মুক্তি দান করে।

[কপিল মুনির অন্তরে যেন শ্রীহরি নিজেই ভর করেছেন, তিনি তাঁর মুখ দিয়েই নিজের লীলা-মহিমা কীর্তন করছেন! ভাগবত পুরাণকারের ইচ্ছাতে কপিল মুনি যেন শ্রীহরির তোতাপাখি হয়ে উঠেছেন।] 

অবিদ্যার নিবৃত্তি হলে, ভক্তরা যদিও সত্য ইত্যাদি লোকের ভোগ সম্পত্তি, অণিমা ইত্যাদি অষ্ট ঐশ্বর্য অথবা বৈকুণ্ঠের সম্পদ কিছুই বাসনা করেন না, তবুও আমার বৈকুণ্ঠলোকে তাঁরা সব কিছুই পেয়ে যান। যে সকল ভক্ত আমাকে আত্মার মতো প্রিয়, পুত্রের মতো স্নেহপাত্র, সখার মতো বিশ্বাসী, গুরুর মতো উপদেষ্টা, সুহৃদের মতো হিতকারী এবং ইষ্টদেবতার মতো পূজ্য মনে করে আমার ভজনা করেন, আমার কালচক্র কখনও তাঁদের গ্রাস করে না। এই কারণে শুদ্ধসত্ত্বরূপ বৈকুণ্ঠে, তাঁরা কোন ভোগ্য বিষয় থেকেই বঞ্চিত হন না। আমিই প্রধান অর্থাৎ প্রকৃতি ও পুরুষের নিয়ন্তা, সর্বভূতের আত্মা ভগবান। আমাকে ছাড়া অন্য বিষয়ে ভক্তি স্থাপন করলে জীবের মৃত্যুভয় দূর হয় না। আমার ভয়ে বাতাস বইছে, সূর্য উত্তাপ দিচ্ছে, ইন্দ্র বর্ষণ দিচ্ছে, অগ্নি দগ্ধ করছে ও মৃত্যু বিচরণ করছে। এই কারণে যোগীরা জ্ঞান ও বৈরাগ্যের সঙ্গে ভক্তিযোগে আমার পাদমূলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন এবং তাঁদের কোন ভয় ও সংশয় থাকে না। তীব্র ভক্তিতে জীবের চিত্ত যদি আমাতে অর্পিত হয় এবং আমাতেই অচঞ্চল থাকে, সেই জীবের পরমপুরুষার্থ লাভ হয়, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই”।

 শ্রীভগবান বললেন, “এখন আমি তোমাকে সকল তত্ত্বের আলাদা আলাদা লক্ষণের কথা বলছি, যা বুঝতে পারলে পুরুষ প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে। পুরুষের আত্মদর্শনের জ্ঞান থেকে অহংকারের নিবৃত্তি ঘটে, পণ্ডিতেরা বলেন, এই জ্ঞান নিঃশ্রেয়স অর্থাৎ মুক্তির জন্য একান্ত জরুরি।  “আত্মাই পুরুষ, ইনি বিষয়ের বিপরীতে অবস্থান করেন। আত্মা অনাদি, এঁনার শুরু ও শেষ বলে কিছু নেই, ইনি ক্ষণস্থায়ী নন, ইনি সনাতন। আত্মা প্রকৃতির ঊর্ধে থাকেন, অতএব অসঙ্গ, সুতরাং স্বভাবতঃ সংসারী নন। ইনি নির্গুণ, সত্ত্ব, রজো ও তমঃ এই তিন গুণের অতীত। ইনি নিজেই প্রকাশিত হন, অতএব ইনি জ্ঞানের বিষয় বা জ্ঞানের আধার নন। এই বিশ্বে আত্মা বিরাজিত বলেই এই বিশ্বের প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতি বিষ্ণুর অব্যক্ত গুণময়ী শক্তি। প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের সঙ্গতেই এই সৃষ্টিলীলা ঘটে থাকে। এই প্রকৃতি নিজের গুণের অনুরূপ পদার্থ সকল সৃষ্টি করতে আরম্ভ করলে, পুরুষ এই জ্ঞানের আবরণকারিনী প্রকৃতিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় অর্থাৎ নিজের স্বরূপ ভুলে যায়। এই মোহ আবরণে আচ্ছন্ন হয়ে পুরুষ প্রকৃতিকেই “আমি” বলে মনে করতে থাকে। সকল কর্ম প্রকৃতির তিনগুণের কারণে অনুষ্ঠিত হলেও, পুরুষ নিজেকে সেই সব কর্মের কর্তা বলে মনে করে। পুরুষ অকর্তা অর্থাৎ সাক্ষীস্বরূপ হয়েও যে কর্তার অভিমানে আচ্ছন্ন হয়, তাকেই  বন্ধন বলে। এই কর্মবন্ধন থেকেই স্বাধীন ও নির্বিকার পুরুষ, সুখ-দুঃখ, শোক-তাপ ইত্যাদি ভোগের অধীন হয়ে জন্ম মৃত্যুর শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে।

এই শরীরকে কার্য, ইন্দ্রিয়কে কারণ ও দেবতাদেরকে কর্তা বলা হয়ে থাকে।  অর্থাৎ স্বভাবতঃ নির্বিকার পুরুষ যে এই বিকার স্বভাব পায়, তার কারণ প্রকৃতি। অন্যদিকে সুখদুঃখ ইত্যাদির যে ভোগ হয়, তার কারণ প্রকৃতির পরস্থিত পুরুষ। অতএব সিদ্ধান্ত এই যে, দেহ ইত্যাদি প্রকৃতির পরিণাম, সেই দেহতে কর্তৃত্বের অনুভব আনে অহংবুদ্ধি। তবে যে পুরুষকে ভোগের কারণ বলে নির্দেশ করা হল, তার কারণ, চৈতন্য ছাড়া ভোগ হয় না”। 

দেবহূতি বললেন, “হে পুরুষোত্তম, সংসারী পুরুষ ও তার কারণ স্বরূপ প্রকৃতির বিষয়ে জানলাম। এখন আপনি সেই ঈশ্বর ও প্রকৃতির বিষয়ে বলুন, যাঁর থেকে জগতের সকল সূক্ষ্ম ও স্থূল বিষয়ের সৃষ্টি হয়েছে”।

ভগবান বললেন, “প্রকৃতি স্বভাবতঃ বিশেষত্বহীন হলেও বিশ্বের সকল বিষয়ের আশ্রয়। এই প্রকৃতির তিনগুণ, অতএব নির্গুণ ব্রহ্ম নয়। প্রকৃতি কোন পরিণাম নয়, প্রকৃতি অব্যক্ত। প্রকৃতির কার্যকরণেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, সুতরাং প্রকৃতি কাল নয়। প্রকৃতিও নিত্য, অতএব সনাতন।

প্রধান থেকে অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগে চব্বিশটি তত্ত্বের সৃষ্টি হয়, এই তত্ত্বসমূহকেই কার্য্যাত্মক ব্রহ্ম অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ড বলা হয়ে থাকে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু ও আকাশ এই পাঁচটি মহাভূত। এদের সূক্ষ্ম অবস্থার নাম পঞ্চতন্মাত্র, যেমন গন্ধতন্মাত্র, রসতন্মাত্র, রূপতন্মাত্র, স্পর্শতন্মাত্র ও শব্দতন্মাত্র। দশটি ইন্দ্রিয় হল, চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক, বাক-ইন্দ্রিয়, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ অর্থাৎ জনন-ইন্দ্রিয়। অন্তরের চাররকম বৃত্তির জন্যে চার ভাগ লক্ষ্য করা যায়, যেমন, মনঃ, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্ত। এই যে সগুণ ব্রহ্মের চব্বিশটি প্রপঞ্চ তত্ত্বের কথা বললাম, এছাড়াও আরেকটি তত্ত্ব আছে, তাকে কাল বলা হয়। কেউ কেউ বলেন, ঈশ্বরের প্রভাবই কাল, এই কাল পঁচিশতম তত্ত্ব। যারা প্রকৃতির বশীভূত হয়ে, দেহের অহংকারে “আমিই কর্তা” এমন অভিমান করে, তাদের কাছে কাল ভয়ংকর সংহারক মূর্তিতে দেখা দেয়। আবার অনেকে বলেন, যিনি প্রকৃতির তিনগুণের বিভেদকে সাম্য অবস্থায় প্রতিষ্ঠা করেন, তিনিই ভগবান কাল। এই ভগবান কে? যিনি নিজের মায়ায় সমস্ত জীবের অন্তরে নিয়ন্তারূপে এবং বাইরে কালরূপে বিরাজ করেন, তিনিই ভগবান।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১১ "



বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/৮ "


  তৃতীয় স্কন্ধ - পর্ব ৯


মহামুনি কর্দম ও দেবহূতির পরিণয় (আগের পর্বের পর)

মহারাজ মহামুনি কর্দমের প্রশংসাবাক্য শুনে খুবই লজ্জিত হয়ে, বিনীত ভাবে বললেন, “বেদময় ব্রহ্মা নিজের মুখ থেকে তপস্যা, বিদ্যা ও নিরাসক্ত যোগনিরত আপনাদের মতো ব্রাহ্মণের সৃষ্টি করেছেন। ব্রাহ্মণদের পরিপালনের জন্যে তিনি তাঁর বাহু থেকে আমাদের মতো ক্ষত্রিয়ের সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ব্রাহ্মণজাতি ভগবান ব্রহ্মার হৃদয় স্বরূপ এবং ক্ষত্রিয় তাঁর অঙ্গ স্বরূপ বলা যায়। এই ভাবেই ব্রাহ্মণেরা তাঁদের তপোবলে ক্ষত্রিয়কে এবং ক্ষত্রিয়রা বাহুবলে ব্রাহ্মণকে রক্ষা করে থাকে। বাস্তবে, যিনি সকলের আত্মা হয়েও নির্বিকার, সেই পরমেশ্বরই আমাদের উভয়কে রক্ষা করেন, পালনও করেন। হে মহর্ষি, আপনাকে দেখেই আমার মনের সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গেছে। আপনার মধুর কথা শুনে, আপনার পায়ের ধুলিকণা মাথায় নিয়ে আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি। আপনি কৃপাসিন্ধু, আপনার কাছে আমার একটি নিবেদন আমি রাখতে চাই। 

আমার একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে। এই কন্যা বয়সে, স্বভাবে ও গুণে অত্যন্ত সুশীলা। দেবর্ষি নারদের মুখে আপনার চরিত্র, বিদ্যা, রূপ, বয়েস ও গুণের কথা শুনে অব্দি, আমার এই কন্যা মনে মনে আপনাকেই পতিরূপে বরণ করার সংকল্প করে নিয়েছে। হে দ্বিজবর, আপনি আমার এই কন্যারত্নটিকে গ্রহণ করুন। আমি শুনেছি, আপনিও ব্রহ্মচর্য সমাপ্তির পর গার্হস্থ্য আশ্রম অবলম্বনের কথা চিন্তা করছেন এবং এই কারণে বিবাহের জন্যেও প্রস্তুত হচ্ছেন। অতএব, আমার এই কন্যাকেই আপনি ভার্যারূপে স্বীকার করুন”।

মহামুনি কর্দম বললেন, “আমি বিবাহে ইচ্ছুক এবং আপনার কন্যাও অবিবাহিতা, অতএব আমাদের উভয়ের মধ্যে সমুচিত বিবাহ সংস্কারের অনুষ্ঠান হোক। হে মহারাজ, আপনার আত্মজার মনের ইচ্ছে বেদমন্ত্রের উচ্চারণে পূর্ণ হয়ে উঠুক। আপনার কন্যার নিজের কান্তির আভায়, তাঁর অঙ্গের অলঙ্কারসমূহকে নিষ্প্রভ মনে হচ্ছে। একবার আপনার কন্যা প্রাসাদের উপরে খেলা করছিলেন, তাঁর পায়ের নূপুর চরণের শোভা বিস্তার করে, ধ্বনিতে মুখর হয়েছিল এবং ক্রীড়াগোলকের প্রতি লক্ষ্য থাকায় তার চোখ বিহ্বল হয়েছিল। সেই সময় বিশ্বাবসু আকাশপথে যাবার সময় আপনার কন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের বিমান থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। হে মহারাজ, আপনার এই কন্যা ললনাদের শিরোমণি। আপনার দুহিতার রূপ লাবণ্য তাঁর অঙ্গের অলংকারের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। আমি আপনার কন্যাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করবো, কিন্তু আপনার কন্যা যেদিন আমার ঔরসে গর্ভধারণ করবেন, সেই দিন থেকেই আমি সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করবো। কারণ সন্তান থেকে ঋষিঋণ, দেবঋণ ও পিতৃঋণ; এই তিন ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং এই ঋণমুক্তির পর সন্ন্যাস ধর্ম পালন করাই কর্তব্য। এই নির্দেশ আমাকে দিয়ে গেছেন ভগবান শ্রীঅনন্ত, অতএব তাঁর বাক্যের অন্যথা আমার পক্ষে সম্ভব নয়”।      এরপর, মহারাজ নিজের পত্নী ও দুহিতার মনের ইচ্ছা অনুসারে আনন্দিত চিত্তে মহর্ষি কর্দমকে নিজের কন্যা দেবহূতিকে সম্প্রদান করলেন। মহারাজ্ঞী শতরূপা নবদম্পতিকে প্রচুর যৌতুক, বসন, ভূষণ অন্যান্য গৃহের উপকরণ প্রদান করলেন। সম্রাট মনু মনোমতো পাত্রে কন্যাকে সম্প্রদান করে নিশ্চিন্ত হলেন ঠিকই, কিন্তু কন্যার প্রতি গভীর স্নেহবশে, কন্যার বিরহ চিন্তা করে তাঁর মন চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি বারবার কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে তার কেশরাশি সিক্ত করে তুললেন। অবশেষে মুনিবরের থেকে ফেরার অনুমতি নিয়ে, পত্নী শতরূপার সঙ্গে মহারাজ রথে চড়লেন, সঙ্গে রইল তাঁর অনুচরেরাও। 

[দশ হাজার বছর ধরে তপস্যা করা অর্থাৎ ১০,০০০+ বয়স্ক এক মহামুনি পাত্রের সঙ্গে দ্বাদশী বা ত্রয়োদশী রাজকুমারী পাত্রীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল। এই না হলে আমাদের পুরাণ কথা! কিন্তু পণ্ডিতেরা বলবেন এটি একটি রূপক কাহিনী, এর মধ্যে নিহিত গূঢ় তত্ত্বটি বোঝার সাধ্য আমাদের মতো অর্বাচীনের থাকার কথা নয়, এবং নেইও।]

দেবহূতি ও কর্দমের দাম্পত্য

মহর্ষি মৈত্রেয় বললেন, “হে বিদুর, বাবা ও মা বিদায় নেবার পর সাধ্বী দেবহূতি ভবানী যেমন প্রভু ভবের সেবা করেন, সেইভাবে স্বামীর সেবা করতে লাগলেন। সম্মান, সেবা, মধুর আলাপ ও ভক্তি দিয়ে স্বামীকে সর্বদাই সন্তুষ্ট রাখতেন আর নিজের মন থেকে তিনি ত্যাগ করলেন, কাম, ক্রোধ, লোভ, ছলনা, বিদ্বেষ এবং অহঙ্কার। এই ভাবে, সর্বদা স্বামীর সন্তুষ্টির জন্যে তিনি কঠোর ব্রতচারণ করতে করতে, তপস্বিনীর মতো কৃশ ও  দুর্বল হয়ে পড়লেন। দেবর্ষি কর্দম মনুকন্যার এই কঠোর ব্রতচারণ দেখে খুবই ব্যথিত হয়ে, প্রেমময় বাক্যে বললেন, “হে মনুপুত্রি, তুমি ধন্য। যে শরীর, দেহীদের কাছে খুবই প্রিয়, তুমি সেই শরীরকে অবহেলা করে আমার প্রতি পরম ভক্তি ও ভালোবাসায় সেবা করে চলেছ। আমার যোগ শক্তিতে ভগবানের প্রসাদ স্বরূপ, অনেক দিব্যভোগ আমি লাভ করেছি। সেই সব ভোগ্যবিষয় আমি তোমাকে দান করব, তুমি ভোগ করো। কারণ তুমি পাতিব্রত্য ধর্ম পালন করে সিদ্ধিলাভ করেছ”।         

দেবহূতি পতির এই কথায় নিশ্চিন্ত হলেন, তিনি সলজ্জ নয়নে, সহাস্য মুখে বিনীত ও প্রেমমধুর স্বরে বললেন,  “হে দ্বিজবর স্বামী। আমাদের বিয়ের আগে আপনি বলেছিলেন আমার গর্ভসঞ্চারের আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে আপনার অঙ্গসঙ্গ হবে। তাই হোক, কারণ পতিসঙ্গে সন্তানের সৃষ্টি, স্ত্রীদের মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। হে নাথ, কামশাস্ত্র মতে আমার এই দুর্বল দেহকে রতিসমর্থ করার জন্যে যে ওষুধ, খাদ্য ও পানীয়ের কথা বলা আছে, অঙ্গসঙ্গের জন্য সেই সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থা করুন। হে প্রভু, মন্মথ আপনার কাছে বিফল হয়ে বারবার আমাকেই উত্যক্ত করছেন। অতএব, আমাদের মিলনের জন্য একটি ভবনও নির্মাণ করুন"।

মহর্ষি কর্দম প্রিয়ার ইচ্ছা পূরণের জন্য, সেই ক্ষণেই যোগশক্তিতে একটি কামচারী বিমানের ব্যবস্থা করলেন, ঐ বিমান, বিশ্বের সমস্ত কাম্য বস্তু দান করতে পারে। ওই বিমান দিব্য রত্নখচিত এবং মণিময় স্তম্ভে শোভিত। ঐ বিমানে নানা রঙের সুগন্ধী ফুলের মালা আছে। নানান রকম উৎকৃষ্ট কার্পাস বস্ত্র ও পট্টবস্ত্র সাজানো আছে। সেই বিমানে অনেকগুলি ঘর আলাদা করে রচিত হয়েছে। প্রত্যেক ঘরেই নরম শয্যার পালঙ্ক, ব্যজনের ব্যবস্থা, বসবার আসন ও স্থানে স্থানে নানান শিল্প দ্রব্যে সাজানো।  এতসব দেখেও দেবহূতির চিত্ত প্রসন্ন হল না, কারণ ওই গৃহে কোন পরিচারিকা নেই এবং নিজের অঙ্গে মলিনতা নিয়ে ঐ ঘরে তিনি প্রবেশ করতে চাইছিলেন না। দেবর্ষি কর্দম প্রিয়ার মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরে বললেন, “হে সুশীলে, তুমি এই বিন্দুসর সরোবরে স্নান করো, কারণ এই সরোবরের সৃষ্টি হয়েছে শ্রীবিষ্ণুর আনন্দ অশ্রুপাতে, এই তীর্থে স্নান করলে মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়।“ স্বামীর নির্দেশ মতো দেবহূতি সরোবরে অবগাহনের জন্য নামলেন, একবার অবগাহনের পর তিনি দেখলেন শত শত কিশোরী পরিচারিকা তাঁর চারিদিকে অপেক্ষারতা। তাদের সকলের গায়ে পদ্মগন্ধ। সেই ললনারা তাঁকে দেখেই জোড়হাতে বলল, আমরা আপনার দাসী, আমাদের এখন কি করতে হবে, আপনি নির্দেশ করুন”। তারপর সেই পরিচারিকারা তাঁকে বহুমূল্য তেল দিয়ে স্নান করাল, উৎকৃষ্ট পাটের বস্ত্র পরিয়ে দিল, উৎকৃষ্ট প্রসাধনে ও অলংকারে তাঁকে সাজিয়ে তুলল। তারপর তাঁর প্রিয় নানাবিধ সুস্বাদু অন্ন ও অমৃতের মতো স্বাদু মদিরা দিল পানের জন্য।

দেবর্ষি কর্দমের মনে প্রিয়তমা সুসজ্জিতা পত্নীকে দেখে প্রেমভাব সঞ্চারিত হল। তিনি দেবহূতিকে সঙ্গে নিয়ে সেই দিব্য বিমানে আরোহণ করলেন। সেই বিমানে করে তাঁরা প্রসন্ন চিত্তে বৈশম্ভক, সুরসন, নন্দন, পুষ্পভদ্রক ও চৈত্ররথ্য নামক দেব কাননে ও মানসরোবরে ভ্রমণ করলেন। এইভাবে তিনি ভূমণ্ডলের সমস্ত দ্বীপ ও দর্শনীয় সকল স্থান পত্নী দেবহূতিকে দেখালেন। তারপর ফিরে এলেন নিজের আশ্রমে। আশ্রমে ফিরে বিমানের অতি সুখকর শয্যায় পত্নীর সঙ্গে রমণে নিরত হলেন। মহর্ষি কর্দম আত্মজ্ঞ ছিলেন, অতএব পত্নী দেবহূতি তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হলেও, পত্নীর প্রতি তাঁর আসক্তি সংযত ছিল। তিনি নিজের রূপকে নয় ভাগে বিভক্ত করে, পত্নীর গর্ভে নয়প্রকার বীর্যাধান করলেন এবং ভগবান শ্রীহরির নির্দেশ মতোই দেবহূতি নয়টি সুলক্ষণা কন্যা প্রসব করলেন। সেই নয় কন্যার গায়ে যেন রক্তকমলের সৌরভ।

[মহামুনি কর্দম তাঁর প্রিয়া ভার্যাকে নিয়ে নানান দেব কানন এবং মানস সরোবরে গেলেন মধুচন্দ্রিমা সারতে। কে বলে সায়েবরা আমাদের হনিমুন করতে শিখিয়েছে?]  

সন্তানের জন্মের পরেই মহর্ষি কর্দম সন্ন্যাস আশ্রমে যাবার কথা বলেছিলেন, সে কথা মনে পড়তে দেবহূতি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি মাথা নীচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটতে কাটতে বললেন, “হে স্বামী, আপনি যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সবই আপনি সম্পূর্ণ করেছেন। কিন্তু আমি যেহেতু আপনার শরণাগত, আমাকে অভয় দেওয়াও আপনার কর্তব্য”। দুই নয়নে অশ্রু, কিন্তু মুখে ম্লান হাসি নিয়ে বললেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি প্রব্রজ্যা নিয়ে বনে গেলে, আমাদের নয় কন্যাকেই স্বয়ং পতি সন্ধান করতে হবে এবং আমাকেও সঠিক পথ নির্দেশ করার মতো কেউ থাকবে না। অতএব আপনি যদি আরও কিছুদিন আমার সঙ্গে বাস করেন, আমার একটি ব্রহ্মজ্ঞ পুত্র লাভ হতে পারে। হে প্রভু, আপনার প্রতি অনুরাগে আমার সুদীর্ঘ সময় বৃথাই কেটে গেল। আপনার মতো ব্রহ্মবিদের সঙ্গে এতদিন বাস করেও, আমি আপনার সেই ভাব এতটুকুও নিতে পারিনি”।                  

দেবহূতির এই ব্যাকুলতায়  দেবর্ষি কর্দমের মনে দয়ার সঞ্চার করল। উপরন্তু, শ্রীহরির প্রতিশ্রুতির কথাও তাঁর মনে পড়ল, তিনি বললেন, হে রাজকন্যা, তোমার চরিত্র অত্যন্ত নির্মল। নিজেকে ভাগ্যহীনা চিন্তা করে দুঃখ করো না। তুমি আগে থেকেই ব্রত পালন করছো, এখন ইন্দ্রিয়ের সংযম, ধর্মাচরণ, তপস্যা, দান ও ভক্তির সঙ্গে ভগবান শ্রীহরির আরাধনা করো। তোমার আরাধনায় ভগবান শ্রীহরি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর অংশ কলায়, তোমার পুত্ররূপে জন্ম গ্রহণ করবেন। তিনি ব্রহ্মজ্ঞ হয়ে জগতে বিখ্যাত হবেন এবং আমিও তাঁর পিতা রূপে পৃথিবীতে প্রচুর সম্মান পাবো।

দেবহূতি স্বামী কর্দমের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণ বিশ্বাসে ভগবানের আরাধনা করতে লাগলেন। এইভাবে অনেকদিন ভজনার পর, শ্রীহরি তাঁর ক্রোড়ে আবির্ভূত হলেন। আগুন যেমন কাঠের মধ্যেই নিহিত থাকে এবং কাঠের মধ্যেই প্রকাশ পায়। তেমনই সাধ্বী দেবহূতির আত্মায় ভগবান অবস্থান করছিলেন, এখন পুত্র রূপে প্রকাশিত হলেন। তাঁর আবির্ভাবের সংবাদে ব্রহ্মা ও মরীচি প্রমুখ ঋষিরা সরস্বতী নদীর তীরে মহর্ষি কর্দমের আশ্রমে গেলেন। ব্রহ্মা ঋষি কর্দমকে বললেন, “বৎস কর্দম, তুমি আমাদের নির্দেশ অকপট মনে পালন করে, আমাদের সবচেয়ে বড়ো পুজো ও সম্মান করেছ। তোমার এই সুন্দরী কন্যাদের চরিত্র ও রুচি অনুসারে মরীচি প্রমুখ ঋষিদের হাতে সম্প্রদান করো। ভুবনে তোমার খ্যাতি ও তোমার বংশের প্রভূত বিস্তার হবে। হে মনুদুহিতা দেবহূতি, তোমার এই পুত্রের দুই চোখ পদ্মের পাপড়ির মতো এবং চরণযুগলের আকার পদ্মের মতো। তোমার এই পুত্র সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শাস্ত্রপাঠের পরোক্ষজ্ঞান ও উপলব্ধির অনুভব থেকে পাওয়া প্রত্যক্ষজ্ঞানের উপদেশ দিয়ে জীবের কর্মবাসনার নিবৃত্তি করতে এসেছেন। ইনি জগতের সমস্ত সিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানের আধার ও সাংখ্য তত্ত্বের স্বরূপ প্রকাশ করবেন। ইনি কপিল নামে জগতে তোমার কীর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। ইনি তোমার অন্তরের অবিদ্যা অর্থাৎ স্বরূপতত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞান দূর করে দেবেন”।

[আমাদের সনাতনী ধর্মের প্রথম ও মূল সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা কপিলমুনি - শ্রীবিষ্ণুর অংশ-অবতার। সেই কারণেই পিতা কর্দমমুনি পুত্রকে 'আপনি' সম্বোধন করেছেন, আর পিতাকে পুত্র কপিল 'তুমি' বলেছেন।  ]  

ব্রহ্মা এই কথা বলে, হংসযানে সত্যলোকে চলে যাওয়ার পর, ঋষি কর্দম ঋষিদের হাতে যথা নিয়মে, তাঁর নয় কন্যাকে সম্প্রদান করলেন। তিনি মরীচিকে কলা, অত্রিকে অনসূয়া, অঙ্গিরাকে শ্রদ্ধা, পুলস্ত্যকে হবির্ভূ, পুলহকে গতি, ক্রতুকে সতী, ভৃগুকে খ্যাতি, বশিষ্ঠকে অরুন্ধতী এবং অথর্বা ঋষিকে শান্তি নাম্নী কন্যা সম্প্রদান করলেন। তাঁর এই কাজে তাঁর কন্যারা ও জামাতা ঋষিরা সন্তুষ্ট হলেন এবং দেবর্ষি কর্দমের অনুমতি নিয়ে ঋষিরা সস্ত্রীক নিজের নিজের আশ্রমে চলে গেলেন। 

এরপর ঋষি কর্দম, তাঁর পুত্ররূপী ভগবান বিষ্ণুর কাছে একান্তে গিয়ে বললেন, “ভগবান, আপনি নিজের মুখেই আমার পুত্র হয়ে জন্মানোর কথা বলেছিলেন। এখন আমার মতো এক অতি সাধারণ মানুষের ঘরে জন্ম নিয়ে, আপনি যে ভক্তকে কৃপা করে তার মান বৃদ্ধি করলেন, এতে সন্দেহ নেই। আপনি প্রকৃতপক্ষে নিরাকার, কিন্তু আপনার যে অলৌকিক চতুর্ভুজ রূপ, সেই রূপই আপনার যোগ্য রূপ।  আপনি প্রকৃতির আবির্ভাব ও লয়ের সাক্ষীস্বরূপ; অতএব আপনিই সর্বজ্ঞ কপিলদেব, আমি আপনাকে প্রণাম করে, আপনার শরণে আশ্রয় নিলাম। হে প্রজাপালক, আপনি আমার পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়ে, সকল ঋণ থেকেই আমাকে মুক্ত করেছেন। এখন আপনাকে সর্বদা মনের মধ্যে রেখে, আমি সন্ন্যাসী আশ্রমের পথ অবলম্বন করতে চাই, আপনার কাছে এই আমার প্রার্থনা”।

শ্রীভগবান বললেন, “হে মহর্ষি, বৈদিক কিংবা লৌকিক সকল কার্যে, জ্ঞানীরা আমার বাক্যকেই প্রমাণ বলে মনে করেন। সেই কারণে, আমি আগে যা বলেছিলাম, তা সত্য প্রমাণের জন্যই আমি তোমার পুত্ররূপে জন্ম নিয়েছি। এই জগতে যাঁরা আত্মদর্শন করে, লিঙ্গশরীর থেকে মুক্তি লাভের কথা চিন্তা করেন, তাঁদের প্রকৃতি-পুরুষ প্রভৃতি পরমতত্ত্বের নির্দেশ করার জন্যেই আমার এই জন্ম। অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া এই সূক্ষ্ম আত্মতত্ত্বকে আবার জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যেই আমি জন্ম নিয়েছি। আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছামতো নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি সন্ন্যাস আশ্রমের মার্গে যাও। তোমার সমস্ত কর্ম তুমি আমাতে সমর্পণ করে আমার ভজনা করলেই তুমি অমৃতময় পরমানন্দ লাভ করতে পারবে। সর্বভূতের অন্তরের মধ্যে আমিই স্বপ্রকাশ পরমাত্মা। নিজের আত্মায় আমাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করে তুমি মোক্ষপদ লাভ করো। আমি মাতা দেবহূতিকেও এই অধ্যাত্মবিদ্যা দান করব, যে জ্ঞানে তিনিও মৃত্যুভয়কে জয় করে, পরমানন্দ লাভ করতে পারবেন”।

শ্রীভগবানের নির্দেশ পাওয়ার পর প্রজাপতি কর্দম তাঁকে প্রদক্ষিণ করে আশ্রম ছেড়ে বনে চলে গেলেন। সেখানে অহিংসা ব্রত নিয়ে যজ্ঞহীন ও গৃহহীন অবস্থায়, একমাত্র পরমাত্মার শরণাপন্ন হয়ে বাস করতে লাগলেন। যিনি সৎ ও অসতের ঊর্ধে, সকল কারণ ও কার্যের যিনি অতীত; যিনি সত্ত্ব, তম ও রজো এই তিন গুণ বিহীন নির্গুণ, সেই পরমব্রহ্মতত্ত্ব তিনি প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করলেন। তাঁর সমস্ত অহং দূর হয়ে গেল। তাঁর চিত্ত থেকে সুখ-দুঃখ, শোক-আনন্দ, শীত-গ্রীষ্ম ইত্যাদি সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হল। অবশেষে তিনি অজ্ঞানের সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে, পরম ভক্তভাবে ভগবান শ্রীবাসুদেবে লীন হয়ে গেলেন।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ৩/১০ "



নতুন পোস্টগুলি

স্বদেশী ডাকাত - পর্ব ৬

  প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "  দ্বিতীয় ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজ...