উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - ষষ্ঠ পর্ব

রাজা পরীক্ষিতের তত্ত্ব কৌতূহল

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন, “হে তত্ত্বজ্ঞ ব্রহ্মন, ব্রহ্মা দেবর্ষি নারদকে গুণাতীত শ্রীহরির গুণবর্ণনা করার জন্যে নির্দেশ দিলে, তিনি যাদের কাছে যেমন বর্ণনা করলেন, আমি সেই ভুবনমঙ্গল তত্ত্বকথা শুনতে ইচ্ছা করি। আমি আমার নিঃসঙ্গ মনকে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে, যেভাবে আমার শরীর ত্যাগ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমাকে উপদেশ করুন। নদী ও পুকুরের জলকে শরৎকাল যেমন নির্মল করে তোলে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ শ্রবণের দ্বার দিয়ে হৃদয়কমলে প্রবেশ করেন ও মনের নিখিল মালিন্য দূর করে দেন। প্রবাস থেকে ঘরে ফিরে আসা ব্যক্তি যেমন আবার প্রবাসে যাবার ক্লেশ মেনে নিতে পারে না, তেমনি মনের মালিন্যহীন কৃষ্ণভক্ত, তাঁর চরণমূলও পরিত্যাগ করতে ইচ্ছা করেন না। হে তপোধন, দেহ জড়পদার্থে তৈরি এবং আত্মার সঙ্গে ওই জড়পদার্থের কোন সম্বন্ধ নেই; সেক্ষেত্রে দেহের সঙ্গে আত্মার যে সংযোগ ঘটে থাকে, তার কি কোন কারণ আছে, এই বিষয়ে জানতে ইচ্ছা করি। জীবের যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সেইরকম যে পুরুষের নাভিকমল থেকে এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরও নির্দিষ্ট সংখ্যক ও পরিমাণের অবয়ব আছে, সে কথা আপনি আগেই বলেছেন। লৌকিক পুরুষ এবং ওই অলৌকিক মহাপুরুষের মধ্যে যে প্রভেদ রয়েছে, সেই তত্ত্বটি কৃপা করে নির্দেশ করুন।

পদ্মযোনি ব্রহ্মা যাঁর কৃপায় ভূতসমূহকে সৃষ্টি করে থাকেন, সকলের অন্তর্যামী সেই ভগবান মায়া ত্যাগ করে, কোন স্বরূপে অবস্থান করেন? মহাকল্প ও খণ্ডকল্পের পরিমাণ, যেভাবে কালের অনুমান করা যায়, তার প্রকার; ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান শব্দে যে কালের উপলব্ধি হয়, সেই বিষয় এবং পিতৃগণ ও দেবগণের পরমায়ু ও তার পরিমাণ বর্ণনা করুন। এই যে কাল সূক্ষ্ম ও স্থূলভাবে লক্ষ্য করা যায়, তার আকার কেমন? শুভাশুভ কর্মের ফলে যে সকল লোক লাভ হয়, সেই সকল লোক কেমন এবং তাদের সংখ্যা কত? জীব কেমন দেহ পেলে, পাপ ও পুণ্য কর্মের একত্র স্থিতি সম্ভব হয়? জীবগণের মধ্যে কে, কেমন কর্ম করলে কোন গতি লাভ হয়? ভূর্লোক, পাতাল, দিকসমূহ, আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও দ্বীপসমূহের এবং ঐসব স্থানের অধিবাসী জীবদের উৎপত্তি কিভাবে ঘটে? ব্রহ্মাণ্ডের বাইরের ভাগ ও ভিতরের ভাগের পরিমাণ কত? যুগ সকলের সংখ্যা, পরিমাণ ও ধর্ম এবং যুগে যুগে শ্রীহরির অবতারলীলা সবিস্তারে কীর্তন করে, আমাকে কৃতার্থ করুন। মানবগণের স্বাভাবিক ধর্ম কি এবং তাদের নিজের নিজের বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী কেমন ধর্ম পালন করা উচিৎ?

হে ব্রহ্মন, বিভিন্ন ব্যবসায় নিযুক্ত হয়ে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের কেমন ব্যবহার আশ্রয় করা উচিৎ? রাজর্ষিগণ ও পতিত জীবের কেমন ধর্ম অনুসরণ করা উচিৎ? প্রকৃতি প্রভৃতি তত্ত্বসমূহের সংখ্যা ও লক্ষণ কী এবং কোন তত্ত্ব কারণরূপে, কোন কার্য উৎপন্ন করে? কিভাবে দেবতাদের আরাধনা করা উচিৎ এবং অষ্টাঙ্গযোগের বিধি কেমন, সে বিষয়ে শোনার ইচ্ছা আছে? অণিমা ইত্যাদি যোগে, যোগেশ্বরগণ সিদ্ধি লাভ করে, কোন গতি লাভ করেন ও কিভাবে তাঁদের লিঙ্গশরীর লয় হয়? ঋক, সাম প্রভৃতি বেদ, আয়ুর্বেদ প্রভৃতি উপবেদ, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ ও ইতিহাসের লক্ষণ কী? অগ্নিহোত্র ইত্যাদি বৈদিক কর্ম; কূপ, পুষ্করিণী ইত্যাদি স্মৃতি বিহিত পূর্ত কর্ম; এই সকল জানার বিষয় কৃপা করে বর্ণনা করুন। ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গ কিভাবে নির্বিঘ্নে সাধন করা যায়? প্রলয়ের সময় সকল জীবের দেহ প্রকৃতিতে লীন হয়ে যায়, কিভাবে আবার তাদের সৃষ্টি হয়, কিভাবেই বা পাষণ্ডীদের সৃষ্টি হয়? আত্মা কিভাবে বদ্ধ, মুক্ত ও স্বরূপ অবস্থায় অবস্থান করে? ভগবান সৃষ্টিকালে নিজের মায়ায় যেমন বিবিধ লীলা করে থাকেন, প্রলয় কালে মায়া পরিত্যাগ করে সাক্ষীর মতো অবস্থান করেন, সেই বিষয়েও জানতে ইচ্ছা হয়।

হে মুনিবর, যে যে বিষয় আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সেই সব বিষয় আমার জানা ছিল না, অতএব এতদিন ওই বিষয়ের প্রশ্ন আমার মনে উদয় হয়নি; এখন ওই সব বিষয়ে আমি শরণাগত জেনে, আপনার থেকে সবিস্তার বর্ণনার অনুরোধ করছি। স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা যেমন সকল তত্ত্বের জ্ঞাতা, আপনিও সেই রকমই তত্ত্বদর্শী। হে ব্রহ্মন, অনশনব্রতে আমার চিত্ত এতটুকুও বিচলিত হয়নি, কারণ আপনার বর্ণনার সমুদ্র থেকে অচ্যুতের লীলারূপ অমৃত সৃষ্টি হচ্ছে এবং আমি সেই সুধা পান করে পরিতৃপ্তি পাচ্ছি”

শ্রীসূত বললেন, “হে ঋষিগণ, মহারাজ পরীক্ষিৎ মুনিবর শুকদেবকে ভগবানের কথা বিষয়ে প্রশ্ন করায়, তিনি অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং কল্পের শুরুতে স্বয়ং ভগবান, ব্রহ্মাকে যে মহাপুরাণ উপদেশ করেছিলেন, সেই ভাগবত কীর্তন করলেন। পাণ্ডুকুলতিলক যা যা প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শুরু করলেন”


ব্রহ্মর্ষি শুকদেবের উত্তর   

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে রাজন, আদিদেব ব্রহ্মা জগতের পরমগুরু; কারণ তিনিই ভক্তিরহস্যের প্রথম উপদেষ্টা। তিনি যখন শ্রীবিষ্ণুর নাভিকমলে বসেছিলেন, তখন পূর্বকল্পে সৃষ্টির স্মৃতি তাঁর বিন্দুমাত্র মনে পড়েনি এবং এই বিষয়ে তিনি যখন চিন্তা করছিলেন, তখন ষোড়শ ও একবিংশ বর্ণের যোগে “তপ” এই বাক্য দুবার শুনতে পেলেন। এই শব্দ কে উচ্চারণ করল জানার জন্য তিনি চারদিকে তাকালেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। নিজের আসনে বসে চিন্তা করতে করতে তাঁর মনে হল, “তপ” অর্থাৎ কেউ আমাকে তপস্যা করতে নির্দেশ দিল; এবং তিনি তপস্যায় মগ্ন হলেন। ব্রহ্মা যে “তপ” কে তপস্যার অর্থ ধরেছিলেন, সে উপলব্ধি অব্যর্থ ছিল এবং যে তপস্যায় লোকসমূহের প্রকাশ হয়, সেই তপস্যায় দিব্য সহস্র বছর অতিবাহিত করেছিলেন।

[আজকাল সোশাল মিডিয়ায় বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটকের একটি উক্তি প্রায়ই ভাইরাল হয়ে ফিরে ফিরে আসে - "ভাবো, ভাবো, ভাবার চেষ্টা করো"। ব্রহ্মার কানে আসা দুবার "তপ", "তপ" শব্দটিও যেন অনুরূপ, কেউ যেন তাঁকে নির্দেশ দিলেন, "যোগনিদ্রা শেষে জেগে উঠে অমন ভ্যাবলার মতো বসে থেক না, ("ভাবো ভাবো") "তপস্যা করো, তপস্যা করো"। তপস্যায় অনেক দুর্বোধ্য বিষয়ও সম্যক উপলব্ধি করা যায়"। কয়েকটি অনুচ্ছেদ পরেই আমরা জানতে পারব শ্রী বিষ্ণুই ব্রহ্মাকে ওই প্রত্যাদেশ দিয়েছেলেন।]        

ব্রহ্মার এই আরাধনায়, ভগবান তাঁকে বৈকুণ্ঠলোক দর্শন করালেন। এই লোক নিখিল লোকের উপরে অবস্থিত, সুতরাং সবথেকে উৎকৃষ্ট। এই ধামে ক্লেশ, মোহ ও ভয় নেই। এই স্থানে রজঃ, তমঃ গুণের অস্তিত্ব নেই, এই ধাম বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণে নির্মিত। এই লোকে কাল কবলে কেউ বিনাশ হয় না। এই পরম রমণীয় বৈকুণ্ঠলোকে সুর ও অসুরদের বন্দিত শ্রীহরির পার্ষদ্গণ বিহার করেন। তাঁরা সকলেই উজ্জ্বলকান্তি, পদ্মনেত্র, পীতাম্বর, চতুর্ভুজ, অতি কমনীয়, সুকুমার ও প্রভামণ্ডিত। এই লোকে লক্ষ্মীদেবী নারায়ণের চরণসেবা করছেন; বিলাসভরে তাঁর অঙ্গ দুলছে এবং বসন্ত সহচর ভ্রমরেরা তাঁর স্তুতিগান করছে।

ব্রহ্মা জগৎপতি ভক্তবৎসল শ্রীপতিকে দেখে ধন্য হলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর সেবকদের করুণা করার জন্য শ্রীভগবান সর্বদাই উন্মুখ; তাঁর করুণাঘন দৃষ্টি দর্শকের মনে আনন্দ সৃষ্টি করে। তিনি চতুর্ভুজ ও পীতাম্বর, তাঁর মাথায় রত্নখচিত মুকুট, শ্রবণে কুণ্ডল এবং তাঁর বক্ষের বামদিকে স্বর্ণরেখায় লক্ষ্মীদেবী অঙ্কিত। তিনি সিংহাসনে বসে আছেন এবং প্রকৃতি, পুরুষ, মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব, একাদশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ সূক্ষ্মভূত – এই পঞ্চবিংশ শক্তি নিজেদের বিক্রম ত্যাগ করে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি অসংখ্য শক্তিযুক্ত হয়েও নিজের স্বরূপে বিরাজ করছেন, এই কারণেই তাঁকে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে।

ব্রহ্মা তাঁকে দেখে আনন্দে আপ্লুত হলেন, তাঁর অংগ পুলকিত হল এবং দু চোখে আনন্দে অশ্রুধারা বইতে লাগল। তিনি নতমস্তকে ভগবানের চরণকমল বন্দনা করলেন। ভগবান শ্রীব্রহ্মার করস্পর্শ করে, হাস্যমুখে মধুর স্বরে বললেন, “হে বেদগর্ভ, তুমি সৃষ্টির ইচ্ছায় যে দীর্ঘ তপস্যা করেছ, তাতে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। কূটযোগীগণ সুদীর্ঘ কাল কপট তপস্যা করলেও আমি তাদের দর্শন দিই না। তোমার মঙ্গল হোক, আমিই বরদাতা, অতএব তোমার ঈপ্সিত বর প্রার্থনা করো। তুমি নিজের তপস্যার ফলেই, তোমার  বৈকুণ্ঠ দর্শন হল, এমন মনে কোর না। কারণ, আমিই তোমাকে “তপ, তপ” প্রত্যাদেশ দিয়ে, তপস্যার কথা বলেছিলাম, আমিই তোমাকে তপস্যায় প্রবৃত্ত করেছিলাম। তপস্যা আমার হৃদয় অর্থাৎ জ্ঞানময়ী শক্তি, আমিই নিজেই তপস্যার আত্মা অর্থাৎ স্বরূপ। আমি তপস্যা দিয়েই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকি। দুশ্চর তপস্যাই আমার বীর্য অর্থাৎ শক্তি”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “হে নাথ, আপনি সর্বভূতের বুদ্ধিতে উপস্থিত থাকেন এবং আপনার অব্যর্থ জ্ঞানদৃষ্টিতে সকল প্রাণীর মনের ইচ্ছা  আপনি বুঝতে পারেন। তবুও আমার মনের ইচ্ছা আপনাকে বলছি, আপনি পূর্ণ করে, আমাকে কৃপা করুন। হে মাধব, আমি অনলস হয়ে আপনার সৃষ্টির আদেশ পাল করব, কিন্তু সৃষ্টির সময়, অহংকার যেন আমাকে আচ্ছন্ন না করে। আপনি আমার করস্পর্শ করে, আমার সঙ্গে সখার মতো আচরণ করলেনএই কারণে যখন নির্বিকার চিত্তে উত্তম, মধ্যম ও অধম বিভাগে জীবসকল সৃষ্টি করব, তখন “আমিই স্বতন্ত্র সৃষ্টিকর্তা”, এই উৎকট বোধ আমাকে যেন গ্রাস না করে”

["রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী"। কবিগুরুর এই ছড়াতেও সেই ভাবাভাবি - অর্থাৎ দর্প-ভাবনার চিত্রটি বড়ো সুন্দর ভাবে পরিষ্ফুট। যদিও ব্রহ্মাই সবকিছু সৃষ্টি করতে চলেছেন, কিন্তু তিনি "আমিই সৃষ্টিকর্তা" এই দর্প-ভাবনা থেকে মুক্তি চাইছেন, কারণ তিনি জানেন সকল সৃষ্টির একমাত্র কারণ ভগবান শ্রীহরি - তিনি তো নিমিত্ত মাত্র।]      

শ্রীভগবান বললেন, “শাস্ত্রজ্ঞান, অনুভব, ভক্তি ও তার সাধন তোমাকে বলছি, শোন। আমার যেমন স্বরূপ, আমার যেমন সত্ত্বা এবং যেমন আমার রূপ, গুণ ও কর্ম, এই সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বজ্ঞান, আমার প্রসাদে তোমার অন্তরে প্রকাশ হোক। সৃষ্টির আগে আমি কেবলমাত্র অবস্থান করে থাকি, কোন কার্যের অনুষ্ঠান করি না। স্থূল, সূক্ষ্ম ও তাদের কারণস্বরূপ প্রকৃতি আমার মধ্যেই লীন থাকায়, তাদের প্রকাশ ঘটে না। সৃষ্টির পরেও আমিই বর্তমান থাকি। দৃষ্টিগোচর এই বিশ্বও আমি এবং বিশ্বের প্রলয় হলেও আমিই অবশিষ্ট থাকিযার প্রভাবে পদার্থের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও অব্যক্তরূপে আত্মায় প্রকাশ পায় এবং যার জাদুতে বস্তু বর্তমান থাকলেও তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না, তাকেই মায়া বলে। আমার সত্ত্বা কেমন হয়, তোমাকে বলছি শোন। ছোট ও বড়ো সকল বস্তুই মহাভূত উপাদানে রচিত হয়। যখন বস্তু তৈরি হয়, তখন মহাভূতের সকল উপাদানকে সেই বস্তুতেই দেখা যায়, সুতরাং উপাদান সকল বস্তুতে প্রবেশ করেছে এমন মনে হয়। কিন্তু যখন পর্যন্ত বস্তু রচনা না হয়, তখনও মহাভূত উপাদানসমূহ কারণ রূপে বর্তমান থাকে, কিন্তু বস্তুতে যেন অপ্রবিষ্ট মনে হয়। এই ভাবে মহাভূতকে যেমন বস্তুতে কখনো প্রবিষ্ট এবং কখনো অপ্রবিষ্ট বলে মনে হয়, তেমনই আমাকেও পদার্থসমূহে প্রবিষ্ট ও অপ্রবিষ্টরূপে উপলব্ধি হয়।

এখন সাধনের প্রকার বলছি, মন দিয়ে শোন। যখন কার্যে কারণের উপলব্ধি ঘটে, তখন তাকে কার্যবস্তুতে কারণের অন্বয় বলে। মৃত্তিকা কারণ ও ঘট কার্য। ঘটে যে মাটির উপলব্ধি হয়, তাকেই কার্যে কারণের অন্বয় বলে। যখন ঘট ভেঙে যায়, তখন আর ঘট থাকে না, কিন্তু কারণরূপ মৃত্তিকা পড়ে থাকে। একেই কার্য থেকে কারণের ব্যতিরেক বলে।  যখন জীব জাগ্রত অবস্থায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে জ্ঞানস্বরূপে আমি বর্তমান থাকি, সুতরাং সৃষ্টি কালে জগতের সঙ্গে আমার অন্বয় থাকে। কিন্তু সমাধি অবস্থায় যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যায়, তখনও আমি চৈতন্যস্বরূপে বর্তমান থাকি। অতএব অন্বয় ও ব্যতিরেক, এই উভয় অবস্থাতেই আমিই সত্য রূপে অবস্থান করি, সুতরাং আমিই সত্য আত্মা, বাকি সব মিথ্যা। তুমি পরম সমাধি অর্থাৎ একাগ্র চিত্তে আমার এই মতের অনুষ্ঠান করো, বিভিন্ন কল্পে যখন তুমি সৃষ্টি করতে থাকবে, “আমিই কর্তা” তোমার মধ্যে এই অভিমান কখনো স্পর্শ করতে পারবে না”

শ্রীশুকদেব বললেন, “শ্রীহরি জনগনের পরমেষ্ঠী অর্থাৎ পরম অধিপতি ব্রহ্মাকে এই উপদেশ দিয়ে তাঁর সামনে অন্তর্হিত হলেন। সর্বভূতময় ব্রহ্মা জোড়হাতে তাঁর বন্দনা করলেন এবং পূর্বকল্পের মতো বিশ্ব সৃষ্টিতে নিযুক্ত হলেন। শ্রীনারায়ণ ব্রহ্মাকে যে চতুঃশ্লোকী ভাগবত সংক্ষেপে উপদেশ করেছিলেন, ব্রহ্মা নিজের প্রিয় পুত্র নারদকে দশ লক্ষণযুক্ত ভাগবত পুরাণ সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। তারপর শ্রীনারদ সরস্বতীতীরে পরমব্রহ্মে ধ্যাননিরত মহাতেজা ব্যাসদেবকে এই ভাগবত উপদেশ করেছিলেন। এবার বৈরাজ পুরুষ থেকে এই বিশ্ব কিভাবে উদ্ভূত হল, আপনার এই প্রশ্নের এবং অন্যান্য সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, শুনুন”

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৫

   এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - পঞ্চম পর্ব

 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণু-লীলা বর্ণন (আগের পর্বের শেষাংশ)     

একবার সরোবরের জলের মধ্যে এক কুমীর এক গজেন্দ্রকে আক্রমণ করেছিল। কুমীরের কবল থেকে পরিত্রাণের জন্য, সেই হস্তী তাঁর শুঁড়ে একটি পদ্মফুল নিয়ে শ্রীহরির স্তব করে বলেছিলেন, “হে আদি পুরুষ, অখিল লোকের নাথ, তোমার সমস্ত কীর্তিই পবিত্র এবং তুমি ভুবনের মঙ্গল সাধন করে থাকো”অচিন্ত্যশক্তি ভগবান, শরণাগত সেই হস্তীবীরের প্রার্থনায়, গরুড়ের পিঠে চড়ে সেই স্থানে এসেছিলেন, এবং নিজের চক্র দিয়ে সেই কুমীরকে হত্যা করে সেই হস্তীর প্রাণরক্ষা করেছিলেন। তারপর সেই হাতীর শুঁড় স্পর্শ করে তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন।

তারপর তিনি অদিতির গর্ভে জন্ম নিয়ে বামনরূপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি দ্বাদশ আদিত্যের  মধ্যে সবথেকে কনিষ্ঠ হয়েও গুণে সবার শ্রেষ্ঠ ছিলেন, কারণ তিনি তিন পদক্ষেপে ত্রিভুবন জয় করেছিলেন। ভগবান এই বামনরূপে দৈত্যরাজ বলির থেকে তিনপদ পরিমাণ ভূমি ভিক্ষার ছলে ত্রিভুবন গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই নিখিল বিশ্বের প্রভু, তিনি ইচ্ছা করলে বলির থেকে শক্তি প্রয়োগে এই ত্রিলোক জয় করে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ ভক্ত বলি নিজের ধর্মমাগেই অবস্থান করছিলেন এবং প্রভু তাঁর ভক্তকে প্রাপ্য পদ থেকে বিচ্যুত করা উচিৎ মনে করেননি। এই কারণে তিনি ভিক্ষার অছিলায় বলিকে রাজ্যভ্রষ্ট করেছিলেন। হে নারদ, গুরু শুক্রাচার্য তাঁকে নিবারণ করলেও, মহারাজ বলি নিজের প্রতিজ্ঞায় অচল রইলেন, এবং শ্রীহরির দুই পদক্ষেপে স্বর্গ ও মর্ত অধিকার হতে দেখেও নিরস্ত হলেন না, বরং নিজের দেহ শ্রীহরির তৃতীয় পদ রাখার জন্য সমর্পণ করলেন। যিনি শ্রীবিষ্ণুর চরণতলে নিজের মাথা সমর্পণ করতে পারেন, তাঁর মতো ভক্তের কাছে ত্রিলোকের রাজত্ব তুচ্ছ বিষয় সন্দেহ নেই। বস্তুতঃ, ভগবান তাঁর অকিঞ্চিৎকর রাজ্য হরণ করে, তাঁর অনিষ্ট করেননি, বরং তাঁকে নিজের শ্রীচরণে আশ্রয় দিয়ে তিনি তাঁর মহা উপকার করেছিলেন।

হে নারদ, হংস অবতারে সেই ভগবান তোমার অখণ্ড ভক্তিভাবে পরিতুষ্ট হয়ে, তোমাকে ভাগবত নামক জ্ঞানযোগ উপদেশ দিয়ে তোমার আত্মতত্ত্ব উপলব্ধি করিয়েছিলেন। তারপর শ্রীহরি ধন্বন্তরিরূপে অবতীর্ণ হয়ে নিজের নামের প্রভাবেই মহারোগগ্রস্ত জনগণের রোগ আশু উপশম করেছিলেন। আগে দৈত্যরা অমৃতময় যজ্ঞভাগ রুদ্ধ করে রেখেছিল, তিনি এই অবতারে তার উদ্ধার সাধন করলেন ও পৃথিবীতে আয়ুর্বেদের প্রবর্তন করলেন। একবার ক্ষত্রিয়গণ মতিভ্রমে বেদ ও ব্রাহ্মণের বিদ্বেষী হয়ে, পৃথিবীর বিনাশে উদ্যত হয়েছিলেন। উগ্রবীর্য পরশুরাম অবতারে তিনি তীক্ষ্ণ পরশু দিয়ে একুশবার ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করে, পৃথিবীকে নির্বিঘ্ন করেছিলেন।

শ্রী ব্রহ্মা কর্তৃক শ্রীবিষ্ণুর অবতার লীলার ভবিষ্যবাণী 

[এতক্ষণ শ্রীব্রহ্মা নারদকে সত্য যুগে শ্রীবিষ্ণুর নানান অবতার লীলার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করলেন। এবার তিনি নারদের কাছে ত্রেতা যুগ থেকে শুরু করে দ্বাপরের শেষ পর্যন্ত শ্রীবিষ্ণুর বিচিত্র অবতার লীলারও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ তাঁর ও নারদের মধ্যে এই যে কথোপকথন হচ্ছে সেই ঘটনাগুলি ভবিষ্যতে ঘটবে!]         

একবার আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে, মায়াপতি শ্রীভগবান নিজের অংশে চারভাইয়ের সঙ্গে শ্রীরামরূপে, ইক্ষ্বাকুবংশে জন্ম গ্রহণ করবেন। পিতৃসত্যপালনের জন্য ভাই লক্ষ্মণ ও ভার্যা সীতাদেবীর সঙ্গে তিনি বনগমন করবেন এবং সেখানে দশানন রাবণ তাঁর সঙ্গে বিবাদ করে বিনষ্ট হবেন। ত্রিপুর দহনকারী শ্রীরুদ্রের মতো শ্রীরামচন্দ্র শত্রুপুরী লঙ্কাকে ধ্বংস করার জন্য সমুদ্রতীরে উপস্থিত হলে, সমুদ্র তাঁকে লঙ্কা যাবার পথ করে দেবেন। দশদিকের অধিপতি রাবণ সীতা হরণের মতো অপরাধ করেও, নিজের শক্তির অহংকারে নিজের ও শত্রুসৈন্যদের মধ্যে নির্ভয়ে বিচরণ করবেন এবং শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে অনায়াসে হত্যা করবেন।

তারপর অসুরেরা রাজবংশে জন্ম নিয়ে, নিজের দুর্ধর্ষ সৈন্যদলের সাহায্যে পৃথিবীতে অশেষ অত্যাচার করবে। সেইসময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের অংশ বলরামের সঙ্গে জগতের ভূভারহরণের জন্যে জন্মগ্রহণ করবেন। এই কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান। ইনি শৈশবে, পূতনা রাক্ষসী বধ, তিনমাস মাত্র বয়সে শকটভঞ্জন এবং যমলার্জুন ভঙ্গ করবেন। একবার যমুনার বিষজল পান করে ব্রজের বালকগণ ও গবাদি মূর্ছিত হয়ে পড়লে, কৃষ্ণ তাঁর সুধাময় দৃষ্টিপাতে সকলকে সুস্থ করে তুলবেন। তারপর কালিন্দীর বিষজল পরিশোধনের জন্য উগ্রবীর্য ও লোলজিহ্বা মহাসর্প কালিয়কে দমন করে, যমুনার জলে বিহার করবেন। একবার জননী যশোদা, কৃষ্ণকে বাঁধার জন্যে যত রশি নিয়ে আসবেন, সবই কম পড়ে যাবে, কিছুতেই শিশু কৃষ্ণকে বাঁধতে পারবেন না। একবার কৃষ্ণ হাই তোলার ছলে জননী যশোদাকে নিজের মুখের মধ্যে চোদ্দভুবন দেখাবেন, মাতা যশোদা ওই দৃশ্যে ভয় পেয়ে যাবেন এবং কৃষ্ণের অচিন্ত্য মহিমার পরিচয় লাভ করবেন।

ইনি নন্দ মহারাজকে বরুণের বন্ধন থেকে মুক্ত করবেন। ময়দানবের পুত্র ব্যোমাসুর পাহাড়ের গুহায় গোপদের লুকিয়ে রাখলে, তিনি তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসবেন। গোপগণ কোন সাধন, ভজন করেন না, তাঁরা দিনের বেলায় কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং রাত্রে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনকৃষ্ণ তাঁদের বৈকুণ্ঠে স্থান দান করবেন। এর চেয়ে অলৌকিক লীলা আর কী হতে পারে? নন্দ প্রমুখ গোপগণ ইন্দ্রের উদ্দেশে যজ্ঞ করতেন। কৃষ্ণের উপদেশে তাঁরা ইন্দ্রের পূজা বন্ধ করবেন ও তাতে ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে, বৃন্দাবন বিনাশ করার জন্য  সাতদিন ধরে অবিরল ধারায় প্রবল বর্ষণ করবেন। কৃষ্ণের তখন মাত্র সাত বৎসর বয়স, তিনি বাম হাতে সাতদিন ধরে ছাতার মতো গিরি গোবর্ধনকে ধরে থাকবেন, এবং পাহাড়ের নীচে বৃন্দাবনের সমস্ত মানুষ ও গবাদি পশুকে বৃষ্টির প্রকোপ থেকে রক্ষা করবেন।

চাঁদের জ্যোৎস্নামাখা এক রজনীতে রাসকেলি করার সময়, কৃষ্ণর মূরলীর অপূর্ব সূরের মূর্ছনায় ব্রজকিশোরীরা অনঙ্গ বাণে পীড়িত হয়ে ঘরের বাইরে বের হলে, কুবেরের অনুচর শঙ্খচূড় তাদের সকলকে হরণ করবে। তখন কৃষ্ণ সেই শঙ্খচূড়ের মস্তক ছিন্ন করে গোপিনীদের উদ্ধার করবেন। এছাড়া, বলভদ্রের হাতে প্রলম্ব, ধেনুক, দ্বিবিদ বানর, বল্কল ও রুক্মি প্রভৃতির মৃত্যু ঘটবে। ভীম ও অর্জুনদের সঙ্গে থেকে কৃষ্ণ, বলদৃপ্ত ধনুর্ধর কাম্বোজ, মৎস্য, কুরু, সৃঞ্জয় ও কৈকয়দের জীবন অবসান করবেন। তাঁর পুত্র শম্বরাসুর, মুচুকূন্দ যবনকে সংহার করবেন। তিনি নিজে বকাসুর, কেশী, বৃষাসুর, চানুর মুষ্টিকা প্রমুখ মল্লবীর, কুবলয়াপীড় গজ, কংস, পৌণ্ড্রক সাল্ব, নরকাসুর, দম্ভবক্র, সপ্তবৃষ ও বিদূরথকে সংহার করবেন। বৎস নারদ, এই বিষয়ে কোন সংশয় করো না। কৃষ্ণই সর্বময়, এই হেতু বলদেব, ভীম, অর্জুন প্রমুখ বীরশ্রেষ্ঠ তাঁরই মূর্তিভেদ। তিনি ভিন্ন ভিন্ন রূপে সকল অসুর ও রাজাদের সংহার করবেন, সকলকে বৈকুণ্ঠধাম প্রদান করবেন।

তারপর কালের প্রভাবে মানবের বুদ্ধির হ্রাস ও পরমায়ু অল্প হতে থাকলে, বেদশাস্ত্র তাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হবে। তখন সত্যবতীর গর্ভে ব্যাসরূপে অবতীর্ণ হয়ে, বেদ বৃক্ষকে বহু শাখাতে বিভক্ত করবেন। তারপর দেবদ্বেষী অসুরগণ বেদমার্গ অবলম্বন করে, তার প্রভাবে ময়দানবের সাহায্যে অদৃশ্য মায়াপুরী বানিয়ে লোকসকলের উপর অত্যাচার করবে। তখন তাদের মতিভ্রম সৃষ্টি করার মানসে শ্রীহরি নয়নশোভন বুদ্ধবেশ ধারন করে বহু রকমের উপধর্মের উপদেশ করবেন। যখন সজ্জন ব্রাহ্মণের ঘরেও আর শ্রীহরি কথা শোনা যাবে না, ব্রাহ্মণেরা বেদদ্বেষী পাষণ্ডী হয়ে উঠবেন, শূদ্রেরা নরপতির আসন গ্রহণ করবে এবং স্বধা, স্বাহা, বষট্‌ প্রভৃতি মন্ত্র উচ্চারণ হবে না, তখন ভগবান যুগের শেষে কল্কিরূপ ধারণ করে কলির নিগ্রহ করবেন।


নারদকে ভাগবত প্রচারে শ্রীব্রহ্মার আদেশ 

সৃষ্টিকালে তপস্যা, আমি ব্রহ্মা, নয় প্রজাপতি ঋষি; স্থিতিকালে ধর্ম, বিষ্ণু, মনুগণ, অমরগণ ও ক্ষত্রিয় ভূপালগণ এবং সংহার কালে অধর্ম, হর, ক্রোধের বশীভূত সর্প ইত্যাদি ও অসুর প্রভৃতি যা কিছু আবির্ভূত হয়, তার সবই সর্বশক্তিমান শ্রী হরির মায়া বিভূতি অর্থাৎ অচিন্ত্য মায়ার বিচিত্র প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

হে নারদ, শ্রী ভগবানের মহিমা আমি সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম; বিস্তারিত বর্ণনা কেউই করতে পারবে না। যদি কোন জ্ঞানীব্যক্তি পৃথিবীর যাবতীয় ধুলিকণা গুণতে সমর্থ হন, তাঁর পক্ষেও শ্রীবিষ্ণুর অচিন্ত্য বিভূতির গণনা করা সম্ভব হবে না। আমি ও তোমার অগ্রজ ঋষিগণ এই মায়াময় পুরুষের মহিমার সীমা খুঁজে পাইনি, অন্যদের কথা আর কী বলব? এই অনন্ত ভগবান যাঁদের প্রতি করুণা করেন, তাঁরা যদি অকপট চিত্তে তাঁর শ্রীচরণকে একমাত্র আশ্রয় ভাবেন, তাহলেই তাঁরা এই দেবমায়া জানতে ও উপলব্ধি করতে সমর্থ হন। এই শেয়াল, কুকুরের খাদ্য দেহের প্রতি তখন তাঁদের, “আমি” বা “আমার” এই মমতা আর থাকে না।  অতএব শ্রীভগবানের করুণাই জীবের মুক্তিলাভের একমাত্র উপায়, অন্য কোন পথ আর দেখা যায় না।

বৎস নারদ, সৎসঙ্গ ঘটলে সকলেই তাঁর মায়া উপলব্ধি করতে পারে। স্ত্রী, শূদ্র, হূন, শবর প্রভৃতি পাপজীবও ত্রিবিক্রম হরির ভক্তদের চরিত্র অনুকরণ করে, তাঁর মায়া জানতে পারেন ও বুঝতে পারেন। এমনকি হংস, গজ, শুক, সারিকা প্রভৃতি তির্যক জাতিও ভক্তের কৃপায় তাঁর মায়া অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। অতএব, মানুষ, যারা তাঁর রূপ, মনে ধারণা করতে পারে, তাদের কথা আর কী বলব? ভগবানের যে রূপ মনে ধারণা করা উচিৎ, সে বিষয়ে তোমায় বলছি শোনো। মুনিরা যাঁকে ব্রহ্মা বলে জানেন, তিনিই ভগবানের স্বরূপ। ওই স্বরূপ নিত্য আনন্দময় ও শোকরহিত। ওই স্বরূপে নিরন্তর পরমা শান্তি বিরাজিত থাকায়, নিত্য সুখের কখনো ব্যাঘাত হয় না এবং সম অর্থাৎ ভেদরহিত হওয়ায় ভয়রহিত। কারণ “আমি” ও “তুমি” এই ভেদজ্ঞান না থাকলে ভয় উৎপন্ন হয় না। বস্তুর বিভিন্ন বর্ণ ও আকার হওয়ায় এবং আমাদের ইন্দ্রিয়সকল আলাদা আলাদা হওয়ায়, আমাদের সর্বদা যে জ্ঞান আহরণ হচ্ছে,  সেই জ্ঞান বিচিত্র অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বলে বোধ হচ্ছে। কিন্তু পরমজ্ঞান স্বরূপে এই বিভিন্নতার বোধ হয় না, কারণ ওই জ্ঞান বিশুদ্ধ অর্থাৎ মলিনতাহীন। বৎস, এই বিষয়ে একটি গভীর সিদ্ধান্ত আছে, মন দিয়ে শোনো।

আমাদের অন্তঃকরণ বিষয় সম্পর্কে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হচ্ছে, ওই পরিবর্তনের অবস্থাকে অন্তঃকরণের বৃত্তি বলে। বিষয়ের যা কিছু মলিনতা, তা বৃত্তিতেই থাকে, সেই বৃত্তি শুদ্ধ জ্ঞানকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি কখনও নিজেকে আমার থেকে আলাদা বলে ভাবতে পারি না। বেদ ব্রহ্মের পরিচয় দেয়, কিন্তু সেই স্বরূপকে শব্দ দিয়ে জ্ঞেয় বলা যায় না; কারণ তাহলে ব্রহ্ম শুধু জ্ঞানস্বরূপ নয়, জ্ঞেয়স্বরূপ হয়ে পড়েন অতএব বেদ শব্দদিয়ে আমাদের ভ্রম নিবৃত্তি করে মাত্র, ব্রহ্মের বোধ উৎপন্ন করে না। যা আত্মা ও সত্য নয়, সেই ব্রহ্মাণ্ড ও তার মধ্যে স্থিত দেহকে আমাদের আত্মা ও সত্য বলে ভ্রম আছে, বেদ সেই ভ্রমকে সংশোধন করে এবং তখন আত্মস্বরূপ নিজেই প্রকাশিত হয়। তূষ অপসারণ করে, যেমন তণ্ডুলকণার সংস্কার করা যায়, তেমনি রূপ মায়া অপসারণ করে ব্রহ্মস্বরূপের সংস্কার করতে হয়, নয়তো সঠিক উপলব্ধি হয় না। ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হলে, অন্য কোন বিষয় বা বস্তু পাওয়ার থাকে না এবং করার উপযুক্ত কোন কর্মও অবশিষ্ট থাকে না। ওই অবস্থা লাভের আগে শ্রীভগবানই সব কর্মের ফল দান করে থাকেন এবং সকল কর্মের প্রবৃত্তি দান করে থাকেন।

ব্রাহ্মণেরা শম, দম প্রভৃতি গুণের অনুসরণে যে সব শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, শ্রীভগবানই সেই সমস্ত কর্মের প্রবর্তক। তিনি শুভ কর্মের ফল স্বরূপ স্বর্গ ইত্যাদি ফল দান করে থাকেন। যিনি শুভ কর্মের অনুষ্ঠান করেন, কালক্রমে তাঁর মৃত্যু হলে স্বর্গলাভের সম্ভাবনা কোথায়, এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। কারণ যে সকল ভূতবস্তুতে দেহ নির্মিত হয়, মৃত্যুতে সেই দেহ বিনষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে জীবত্মার কোন অনিষ্ট হয় না। কারণ জীবাত্মা অজ অর্থাৎ দেহের সঙ্গে তাঁর জন্ম ও মৃত্যু হয় না। এই জীবাত্মাই দেহান্তে, শ্রীভগবানের কৃপায় স্বর্গ ইত্যাদি নানান ফল ভোগ করে থাকেন”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, বিশ্বভাবন শ্রীহরির স্বরূপ ও মহিমা তোমার কাছে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। শ্রীভগবান স্বয়ং আমাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, এই সেই ভাগবতএই ভাগবতে ভগবানের বিভূতি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছি, তুমি বিস্তারিতভাবে এর প্রচার করো। সকলের আত্মা ও অখিল বিশ্বের আধার শ্রীহরির পাদপদ্মে যাতে মানুষের ভক্তি সঞ্চার হয়, তুমি সেইভাবে শ্রীহরিলীলা বর্ণনা করো, শুধু তত্ত্বের আলোচনা করে, ভক্তিরসের ব্যাঘাত করো না। যদিও ভগবানের লীলা মায়া ছাড়া ঘটে না, তবুও যিনি এই ভগবানের সেই সব মায়ার বর্ণনা করেন ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনেন, তাঁদের সেই মায়া মুগ্ধ করতে পারে না”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬ "

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৪

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - চতুর্থ পর্ব

শ্রী ব্রহ্মার পরমেশ্বরের পরিচয় বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “বৎস নারদ, এখন এই বৈরাজ পুরুষ অর্থাৎ অনন্তরূপী ভগবানের বিভূতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি, শোন। এই পুরুষের মুখ বাক্যের ইন্দ্রিয় ও তার অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বহ্নির, ত্বক ইত্যাদি সপ্তধাতু গায়ত্রী প্রমুখ সাত ছন্দের, জিভ হব্য অর্থাৎ দেবতাদের অন্ন, কব্য অর্থাৎ পিতৃগণের অন্ন, অমৃত অর্থাৎ মানুষের অন্ন ও ওই অন্নের মধুর ইত্যাদি ছয়টি রসের উৎপত্তির স্থান। ওই মহাপুরুষের নাক থেকে প্রাণসমূহ ও বায়ু, ঘ্রাণের ইন্দ্রিয়শক্তি থেকে অশ্বিনীকুমারদ্বয়, ওষধিসমূহ এবং সামান্য ও বিশেষ যত ধরনের গন্ধ আছে, সবই উৎপন্ন হয়েছে। এই পুরুষের চোখ থেকে রূপ ও তার প্রকাশক তেজের, নয়ন গোলক সুর্য ও স্বর্গলোকের, কর্ণ দিকসকল ও তীর্থসমূহের এবং শ্রবণ ইন্দ্রিয়শক্তি আকাশ ও শব্দের উৎপত্তিস্থানএঁনার গা থেকে নিখিল বিশ্বের সার অর্থাৎ শক্তি ও সৌন্দর্য এবং ত্বক থেকে স্পর্শ, বায়ু ও যজ্ঞসমূহ। বৃক্ষসমূহ ও যে সকল উদ্ভিজ্জ যজ্ঞের উপচার, সে সবই তাঁর রোমরাজি; তাঁর কেশ থেকে মেঘসমূহ, গোঁফদাড়ি থেকে বিদ্যুৎ এবং পা ও হাতের নখ থেকে শিলা ও লোহা।

যে সকল লোকপালগণ পালন করে থাকেন, তাঁরা সকলেই এই পুরুষের বাহু থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। এই পুরুষের পদচারণায় ভূর্ভূবঃ স্বঃ - এই তিন লোকের আশ্রয় এবং শ্রীহরির চরণ কমল থেকেই প্রাপ্ত বস্তুর রক্ষা, ভয় থেকে উদ্ধার ও নিখিল কাম্য বস্তুর সিদ্ধিলাভ হয়। সলিল, শুক্র, সৃষ্টি, মেঘ ও প্রজাপতি এই পুরুষের শিশ্ন। হে নারদ, এঁর পায়ু অর্থাৎ গুহ্যদ্বার থেকে যম, মিত্র এবং গুহ্যেন্দ্রিয়শক্তি থেকে হিংসা, অলক্ষ্মী, নরক ও মৃত্যু সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাপুরুষের পৃষ্ঠভাগ পরাভব, অধর্ম ও অজ্ঞানের; নাড়ী নদ ও নদীসমূহের এবং অস্থিসংস্থান পর্বতসমূহের উৎপত্তিস্থান। জ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতি, অন্নশস্যের সারাংশ, সকল সমুদ্র ও সকল প্রাণির লয় এই পুরুষের উদরে এবং মানুষের লিঙ্গশরীর এঁনার হৃদয়ে নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।

বৎস নারদ, তুমি ও সনক প্রমুখ কুমারগণ, শ্রীরুদ্র, বুদ্ধি ও চিত্ত এই পরম পুরুষের অন্তঃকরণ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সোনা থেকে বানিয়ে তোলা কুণ্ডল যেমন সোনা ছাড়া কিছুই নয়, তেমনই পরমেশ্বর থেকে সৃষ্টি হওয়া এই বিশ্ব তাঁর থেকে আলাদা নয়। অতএব, আমি, তুমি, ভব, তোমার অগ্রজ সনককুমারেরা এবং এই সমস্ত মরীচি প্রমুখ মহর্ষি, সুর, অসুর, নর, নাগ, বিহঙ্গ, মৃগ, সরীসৃপ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, যক্ষ, রক্ষ, ভূত, গণ, উরগ, পশু, পিতৃগণ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, চারণ, বৃক্ষ ও জল, স্থল, আকাশে বিচরণশীল যাবতীয় জীব, গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, তারা, তড়িৎ ও মেঘ এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান যাবতীয় বস্তু ও বিষয় এই পরম পুরুষ থেকে ভিন্ন নয়। তিনি এই অনন্ত বিশ্বকে আবৃত করে অবস্থান করছেন, এমনকি এই বিশ্ব অতিক্রম করেও তিনি বিরাজ করছেন – অর্থাৎ এই বিশ্বের থেকেও বৃহত্তর স্বরূপে তিনি বিরাজিত”

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “নারদ, শ্রীভগবান ব্রহ্মাণ্ডের আত্মা হয়েও নিত্যমুক্ত থাকেন। কারণ তিনি মরণশীল কর্মফলের অতীত হয়ে, অভয় ও আনন্দ স্বরূপে বিরাজ করছেন। তাঁর অচিন্ত্য অপার মহিমা, কেউ নির্দিষ্ট করতে পারে না। ভূর্লোক, ভূবর্লোক ও স্বর্লোক – এই তিন ভুবনের মধ্যে জীব যে সুখ ভোগ করে, সেই সুখ নশ্বর। এর উপরে আছে মহর্লোক, কিন্তু সেখানেও সুখ চিরস্থায়ি নয়, কারণ কল্পের অবসান কালে, সংকর্ষণের মুখের আগুনে তিনলোক যখন দগ্ধ হয়, তখন সেই তাপ মহর্লোক বাসী ঋষিদেরও উত্তপ্ত করে তোলে। এই কারণে ভৃগু প্রমুখ মহর্ষিরা মহর্লোক ত্যাগ করে, তারও উপরে অবস্থিত জনলোকে আশ্রয় নেন। এই জনলোক অমৃত অর্থাৎ অবিনাশী সুখের স্থান হলেও ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের স্থান নয়; কারণ কল্পান্তে তাঁদেরও মহর্লোক থেকে আসা তাপিত জীবকে দেখতে হয়। জনলোকের ঊর্ধে তপোলোক ক্ষেম অর্থাৎ অবিচ্ছিন্ন মঙ্গলের জায়গা হলেও, ওই লোক অভয় স্থান নয়। তপোলোকের ঊর্ধে একমাত্র সত্যলোকই অভয় অর্থাৎ মোক্ষভূমি।

যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রতে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী, বনস্থ যতি অর্থাৎ ভিক্ষুকাশ্রমী, তাঁদের অপ্রজ বলে, কারণ তাঁরা প্রজা অর্থাৎ সন্তান উৎপন্ন করেন না। অপ্রজ ঋষিরা ত্রিলোকের অতীত স্থানসমূহে বাস করে থাকেনকিন্তু যাঁরা ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন না করে, গৃহস্থ আশ্রম পালন করেন, ত্রিলোকী তাঁদের বাসস্থান। একই আত্মার অবস্থা অনুযায়ী, এই প্রকার আলাদা আলাদা অধিকার লাভ হয়। মার্গ দুই রকমের; কর্ম অবিদ্যামার্গ এবং ভগবানের উপাসনা বিদ্যামার্গ। যে সকল ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ জীব অবিদ্যামার্গ অবলম্বন করেন, তাঁরা নানা রকম বিষয়সুখ ভোগ করে। কিন্তু যাঁরা বিদ্যামার্গ আশ্রয় করেন, তাঁরা অপবর্গ অর্থাৎ মুক্তিলাভ করেন।

বৎস নারদ, ব্রহ্মাণ্ডে অবস্থিত জীবসমূহের নানান ফল বৈচিত্র তোমাকে বর্ণনা করলাম, এখন বৈলক্ষণ্য বলছি, শোন। যে ঈশ্বর থেকে প্রথমতঃ প্রকৃতি সংক্ষুব্ধ হয়ে সোনার আকারের অণ্ড ও পরে নানা উপাদানে বিভক্ত হয়ে বিরাট দেহরূপে প্রকাশ হয়, সেই ঈশ্বর ঐ অণ্ড ও দেহের অতীত। যেমন সৌরমণ্ডলের অধিষ্ঠাতা দেব সূর্য নিজের কিরণে বিশ্ব উদ্ভাসিত করলেও, নিজের মণ্ডলের বাইরে অতীত অবস্থায় অবস্থান করেন, তেমন ঈশ্বরও ঐ অণ্ড ও ভূত, ইন্দ্রিয় ও গুণরূপে বিচিত্র বিরাট দেহের অতীত অবস্থায় নিরন্তর বিরাজ করছেন।

হে পুত্র, যখন আমি এই মহাপুরুষের নাভিকমল থেকে উৎপন্ন হয়েছিলাম, সেই কালে এই বিরাটদেহের অন্তর্যামী পুরুষের অবয়ব ছাড়া যজ্ঞ সাধনের কোন সামগ্রীই না পেয়ে, তাঁর অবয়ব থেকেই যজ্ঞের যাবতীয় সামগ্রী, উপচার, আচার, অনুষ্ঠান, বেদ ও স্বাহা মন্ত্র সংগ্রহ করেছিলাম। এই বিশ্ব ভগবান নারায়ণে প্রতিষ্ঠিত আছে। আমি তাঁর আজ্ঞায় সৃষ্টি করে থাকি এবং হর তাঁর আদেশেই সংহার লীলা করে থাকেন। ভগবান নিজে শ্রীবিষ্ণুরূপে মায়ার অধীশ্বর হয়ে নিখিল বিশ্বের প্রতিপালন করে থাকেন। আমি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নই, আমার যা কিছু শক্তি, সমস্তই শ্রীহরির করুণাপ্রভাবে। আমি বেদময়, তপোময় ও প্রজাপতিদের বন্দনীয় প্রভু হয়েও এবং নিপুণ যোগ সমাধিতে অবস্থান করেও, আমার প্রভুর তত্ত্ব জানতে পারিনি। আকাশ যেমন নিজের সীমা নিজে নির্দিষ্ট করতে পারে না, তেমনি ভগবানও নিজের তাঁর মায়ার ইয়ত্তা করতে পারেন না; সুতরাং অন্য কেউ তাঁর মায়ার প্রভাব কিভাবে আন্দাজ করতে পারবে?  তিনি নিজের মায়ার সীমা নির্দিষ্ট করতে পারেন না বলে, তাঁকে অসর্বজ্ঞ মনে কোর না। কারণ যে বস্তু অনন্ত, তাকে অনন্ত বলে মনে করলে সর্বজ্ঞতায় কোন হানি হয় না। কেউ আকাশকুসুম না জানলে, তার বিজ্ঞতার কোন হানি হয় কী?

ভগবানের যে তত্ত্ব আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারি না, তার কিছু আভাস দিচ্ছি শোন। তিনি সত্যস্বরূপ অর্থাৎ একমাত্র তাঁরই অস্তিত্ব আছে, বাকি কারো প্রকৃত অস্তিত্ব নেই। যখন সেই অস্তিত্বের জ্ঞান হয়, তখন সেই জ্ঞান ঘট ও পটের জ্ঞানের মতো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত হয় না; ওই জ্ঞানকে বিশুদ্ধ ও কেবলজ্ঞান বলে। আমরা অন্যান্য বস্তুর জন্ম-মরণ, বিকার দেখে থাকি, কিন্তু তিনি জন্ম ও বিনাশ রহিত হওয়ায় নির্বিকার স্বরূপে বিরাজিত। তিনি নিখিল বিশ্বে পূর্ণরূপে বিরাজ করছেন, অতএব তাঁর ক্ষয় বা বৃদ্ধি সম্ভব নয়। সবার উপরে তাঁর অচিন্ত্য মহিমা এই যে, সৃষ্টিকালে যখন তাঁকে দ্বৈতসত্ত্বারূপে মনে হচ্ছে, তখনও তিনি অদ্বয়স্বরূপেই বিরাজ করছিলেন।

বৎস নারদ, যখন দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন প্রসন্ন ভাব আয়ত্ত্ব করে, তখনই মুনিরা এই পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। যখন অসজ্জনের কুতর্কজালে বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়, তখন তিনি অন্তর্হিত হন। আগে সহস্রশীর্ষা পুরুষ বলে যাঁর কথা তোমাকে বললাম, তিনি ভূমা ভগবানের আদ্য অবতার। ইনিই প্রকৃতির প্রবর্তক। যদিও সকল পদার্থই ভগবানের অংশ, তাও তারা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়। কাল, স্বভাব এবং কার্য ও কারণের সমষ্টি স্বরূপা প্রকৃতি ভগবানের শক্তি। মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কারতত্ত্ব, সত্ত্ব ইত্যাদি গুণ, পঞ্চ মহাভূত, ইন্দ্রিয়সমূহ, সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, বিরাট সমষ্টি শরীর ও স্বরাট অর্থাৎ সমষ্টি জীব, ভগবানের কার্য। আমি ব্রহ্মা, শ্রীরুদ্র ও শ্রীবিষ্ণু তাঁর গুণাবতার। এই নিখিল বিশ্বে যা কিছু সাকার, নিরাকার ও অদ্ভূত বর্ণ বিষয় এবং পদার্থ, সেই সবই ভগবানের বিভূতি। হে পুত্র, শ্রীভগবানের যে সমস্ত অবতারকে ঋষিরা প্রধানতঃ লীলাবতার বলেন, যাঁদের চরিত্রকথা শুনলে কানের এবং মনের মলিনতা দূর হয়, সেই মধুর লীলাময় অবতারগণের চরিত্র অতিসংক্ষেপে কীর্তন করছি। এই অমৃত পান করে আত্মাকে তৃপ্ত করো”


 শ্রীব্রহ্মার বিষ্ণু-লীলা বর্ণন

শ্রীব্রহ্মা বললেন, “এই অনন্ত ভগবান যখন যজ্ঞের উপকরণ থেকে নিজের অবয়বকে বরাহমূর্তিরূপে, পৃথিবীর উদ্ধারে উদ্যত হয়েছিলেন, সেই সময় আদি দৈত্য হিরণ্যাক্ষ সমুদ্র থেকে উঠে ভগবানকে আক্রমণ করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র যেমন বজ্র দিয়ে পর্বত বিদীর্ণ করে থাকেন, তেমনই তাঁর দাঁতের আঘাতে তিনি দৈত্য হিরণ্যাক্ষর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিলেন। তারপর প্রজাপতি রুচির ঔরসে ও আকুতির গর্ভে সুযজ্ঞ নামে আবির্ভূত হয়ে নিজের ভার্যা দক্ষিণাদেবীর গর্ভে  সুষম নামক দেবগণকে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনিই পরে দেবরাজ ইন্দ্র হয়ে ত্রিভুবনের সকল উপদ্রব হরণ করেছিলেন। এই কারণে, তাঁর মাতামহ স্বায়ম্ভূব মনু, তাঁকে পরে “হরি” নাম দিয়েছিলেন। তারপর তিনি প্রজাপতি কর্দমের ঔরসে দেবহূতির গর্ভে নয় ভগিনীর সঙ্গে কপিল নামে জন্ম নিয়েছিলেনতিনি নিজের মাতাকে ব্রহ্ম উপদেশ দিয়েছিলেন এবং ওই ব্রহ্মবিদ্যার প্রভাবে, মাতা দেবহূতি আত্মমলিনতা ত্যাগ করে, কপিলগতি অর্থাৎ মুক্তি লাভ করেছিলেন।

তার আগে, মহর্ষি অত্রির আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, ভগবান তাঁকে বর দিয়ে বলেছিলেন, তোমাকে অন্য আর কী বর দেব, আমি তোমাকে আমাকেই দান করলাম। এই বলে তিনি মহর্ষির পুত্রের ইচ্ছা পূর্ণ করার জন্য তাঁর গৃহে পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তিনি নিজেই নিজেকে দান করেছিলেন, তাই তিনি দত্ত অর্থাৎ দত্তাত্রেয় নাম নিয়েছিলেন। যদু, হৈহয় প্রভৃতি রাজগণ ঋষি দত্তাত্রেয়র কাছে ব্রহ্মতত্ত্ব উপলব্ধি করে মোক্ষলাভ করেছিলেন। আমি বিবিধ লোক সৃষ্টির ইচ্ছায় ভগবানের তপস্যা করায়, তিনি চার কুমার, সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ওই চার কুমারের আত্মবিদ্যার উপদেশে মুনিরা নিজেদের অন্তরে সেই তত্ত্ব সাক্ষাৎ করেছিলেন, পূর্বকল্পের প্রলয়ে এই আত্মবিদ্যা ও গুরু পরম্পরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তিনি চারকুমারের রূপে সেই বিদ্যা ও প্রথা আবার শুরু করলেন।

তারপর তিনি প্রজাপতি ধর্মের ঔরসে ও দক্ষ কন্যা মূর্তিদেবীর গর্ভে নারায়ণ ও নর এই দ্বিমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনঙ্গের সেনারূপিনী অপ্সরাগণ, এঁদের তপস্যা ভাঙতে এসেছিল। কিন্তু কোন নিয়মের ব্যতিক্রম দেখতে না পেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল, ঋষিরা যদি অভিশাপ দেন। শ্রীরুদ্র রোষদৃষ্টিতে কামদেবকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যে ক্রোধ নিজের হৃদয়কে পুড়িয়েছিল, সেই ক্রোধকে তিনি দগ্ধ করতে পারেননি। যেখানে ক্রোধজয়ী নারায়ণের হৃদয়ে ক্রোধই ঢুকতে ভয় পায়, সেখানে কাম কী করে আশ্রয় পাবে?

[শ্রীরুদ্র অর্থাৎ ভগবান শিব যে ক্রোধকে সংযম করতে পারেননি, সেই বিষয়টি নিয়ে শ্রীব্রহ্মা হাল্কা করে একটু খোঁচা দিয়ে বললেন, শ্রীবিষ্ণুর অবতার নর ও নারায়ণ কিন্তু ক্রোধ এবং কাম সংযম করে স্বর্গের অপ্সরাদের নাকাল করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের ভস্ম করে দেননি।]    

পিতা উত্তানপাদের সামনে জননীর সপত্নী সুরুচিদেবীর কটুবাক্যে বালক ধ্রুব তপস্যা করতে বনে গিয়েছিলেন, ভগবান তাঁর স্তবে প্রসন্ন হয়ে তাঁকে নিত্য ধ্রুবলোক প্রদান করেছিলেন। ঊর্ধতন ভৃগু প্রমুখ ঋষি ও অধস্তন সপ্তর্ষিগণ এই ধ্রুবলোকের মহিমা কীর্তন করে থাকেন। ব্রাহ্মণদের অভিশাপে কুপথগামী রাজা বেণের পৌরুষ ও ঐশ্বর্য দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি নরকে পতিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে ঋষিদের প্রার্থনায় ভগবান, রাজা বেণের পুত্র রূপে জন্ম নিয়ে পৃথু নাম নিয়েছিলেন। মহারাজ পৃথু রাজা বেণকে পুন্নামক নরক থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং জগতের পালনের জন্যে পৃথিবীকে দোহন করে প্রচুর অন্ন ও শস্য উৎপন্ন করেছিলেন। তারপর নাভির ঔরসে ও সুদেবী অর্থাৎ মেরুদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে ঋষভ নাম নিয়ে জড়যোগ ও নিত্যসমাধিযোগ আশ্রয় করেছিলেন। তিনি মুক্তসঙ্গ হওয়ায়, তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহ প্রশান্তভাব ধারণ করেছিল এবং স্বরূপে অবস্থানের কারণে তাঁর সর্বত্র সমদর্শন হয়েছিল। ঋষিগণ এই পদকে পরমহংসগণের বরণীয় পদ বলে বর্ণনা করে থাকেন।

[এই কুপথগামী রাজা বেণ এবং তাঁর দেহজাত পুত্র পৃথুর জন্মের অলৌকিক কাহিনীকে বাস্তবমুখী পুনর্নির্মাণ করেছি "এক যে ছিলেন রাজা" উপন্যাসে - এই ব্লগেই ধারাবাহিক উপন্যাসটি পড়ে নিতে পারেন এই লিংক থেকে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "]       

বৎস নারদ, একবার আমার এক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে, ভগবান হয়গ্রীবরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং নিশ্বাসের সঙ্গে নিজের নাসিকাছিদ্র দিয়ে বেদের বাণী প্রকাশ করেছিলেন। সেই সময়ে অখিল দেবতার আত্মা শ্রীহরির সোনার বরণ অঙ্গ বেদময় এবং কর্মকাণ্ডময় হয়েছিল। যুগের অন্তিমকালে তিনি মৎস্যমূর্তি ধারণ করে পৃথিবী ও নিখিল জীবের আশ্রয় হয়েছিলেন। বৈবস্বত মনু তাঁর এই রূপ উপলব্ধি করেছিলেন। মহাভয়ংকর প্রলয়ের সময়, আমার মুখ থেকে বেদসমূহ স্খলিত হওয়ায়, ভগবান সেই বেদরাশি উদ্ধার করে, অনন্ত যুগান্তসলিলে মহানন্দে বিহার করেছিলেন। অমর ও দানবগণ অমৃত লাভের জন্য একবার ক্ষীরোদ সমুদ্র মন্থন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আদিদেব শ্রীহরি কূর্মমূর্তি ধারণ করে, মন্থনদণ্ডরূপ মন্দারগিরিকে নিজের পিঠে ধারণ করেছিলেন। দেবতাগণের ভয়হারী ভগবান, কুটিল ভ্রূ ও ভয়ংকর দাঁতযুক্ত বদনে অট্টহাস্যময় ভয়ংকর নৃসিংহ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। নিজের উরুতে রেখে, নৃসিংহদেব অত্যাচারী দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে তাঁর নখের আঘাতে হত্যা করেছিলেন।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৫ "


বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৩

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - তৃতীয় পর্ব

শ্রী ব্রহ্মার পরমেশ্বরের মহিমা বর্ণন

 শ্রীসূত বললেন, “উত্তরানন্দন রাজা পরীক্ষিৎ, শ্রীশুকদেবের কথা শুনে “শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পথ” নিশ্চয় করলেন। এবং অবিচলিতভাবে প্রাণ ও মন সমর্পণ করে, নিজের দেহ, জায়া, পুত্র, কন্যা, গৃহ, অশ্ব, গজ, গাভি, ধনরত্ন, বন্ধু ও নিরুপদ্রব রাজ্যের সঞ্চিত বাসনা পরিত্যাগ করলেন। হে দ্বিজগণ, মৃত্যু আসন্ন জেনে, সকল বিষয় ও কর্ম ত্যাগ করে, রাজা পরীক্ষিৎ ভগবান বাসুদেবকে অত্যন্ত আপনার জন বলে অনুভব করলেন এবং সেই ভাবনায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রহ্মন, আপনি সর্বজ্ঞ ও নির্মলচেতা। আপনার শ্রীমুখে শ্রীহরিকথা শুনে আমার মন থেকে অজ্ঞানের অন্ধকার দূর হয়ে গেল। এখন আপনাকে আরেকটি জানার বিষয় জিজ্ঞাসা করি, কৃপা করে উত্তর দিন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি এই যে বিশ্ব, এই বিশ্ব লোকপালগণের তর্কের অতীত। পরম পুরুষ ভগবান যে আত্মমায়ায় এই বিশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করে থাকেন। যে যে শক্তিতে সর্বশক্তিমান প্রভু নিজেকে মহত্তত্ত্ব ও অহংকারতত্ত্বরূপে পরিণত করেন। ব্রহ্মা ও মরীচি প্রভৃতি প্রজাপতিদের সঙ্গে খেলার ছলে নিজেকে দেব, মনুষ্য, তির্যক ইত্যাদি রূপে সৃষ্টি করেন, সেই তত্ত্বটি শুনতে ইচ্ছা হয়। অদ্ভূত লীলাবিহারী ভগবানের এই সৃষ্টিলীলা শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরাও জানেন না, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। এই বিষয়ে আমার মহা সংশয় আছে, আপনি বিচারে বেদজ্ঞ এবং অনুভবে পরব্রহ্মের তত্ত্বজ্ঞ, অতএব আপনি কৃপা করে আমার এই সন্দেহ দূর করুন”

[আমরা আশৈশব ত্রিদেব অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকেই আমাদের ঈশ্বর বলে জেনে এসেছি। এও জেনেছি ব্রহ্মা হলেন জগৎস্রষ্টা, বিষ্ণু জগন্নিবাস এবং মহেশ্বর জগৎ বিনাশক। কিন্তু বিভিন্ন পুরাণে, বিশেষ করে ভাগবত ও শৈব পুরাণগুলিতে যথাক্রমে বিষ্ণু ও শিবকেই পরমেশ্বর বা পরমপুরুষ রূপে তুলে ধরা হয়েছে। এই ভাগবত পুরাণ যেহেতু বিষ্ণুর মহিমা বর্ণন - সেখানে ব্রহ্মা নিজেই বিষ্ণু বা শ্রীহরিকে পরমেশ্বর প্রমাণে ব্রতী হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, শ্রীহরিই ব্রহ্মারও সৃষ্টিকর্তা, এবং শ্রীহরিই ব্রহ্মাকে ঈশ্বরত্ব প্রদান করেছিলেন। বেশ মজার ব্যাপার না?]       

শ্রীশুকদেব মহারাজের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে হৃষীকেশের স্মরণে স্তুতি করার পর বললেন, “শ্রীবাসুদেবের অবতার শাস্ত্রকর্তা আমার পিতা শ্রীব্যাসদেবের চরণ বন্দনা করি, কারণ আমার মতো ভক্তগণ তাঁর মুখপদ্মের জ্ঞানময় মধু পান করে পরম তৃপ্তি পেয়েছি। হে রাজন, শ্রীহরি স্বয়ং ব্রহ্মাকে এই বিষয়ে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং দেবর্ষি নারদও এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে, বেদগর্ভ ব্রহ্মা তাঁকে এই বিষয়ের যথাযথ সিদ্ধান্ত কীর্তন করেছিলেন”

শ্রীনারদ ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে দেবদেব, আপনাকে নমস্কার। আপনি ভূত সকলের স্রষ্টা, এই কারণে আপনি অনাদি। যে সাধনে আত্মতত্ত্বের সম্যক উপলব্ধি হয়, আমাকে সেই উপদেশ দিন। হে প্রভু, যিনি এই বিশ্বকে প্রকাশ করেছেন, যাঁকে আশ্রয় করে এই বিশ্ব অবস্থান করছে, যাঁর থেকে এই বিশ্বের আবির্ভাব, এই বিশ্ব যাঁর মধ্যে লয় পাবে; এই বিশ্ব যাঁর অধীন এবং এই বিশ্বের যিনি প্রকৃত স্বরূপ, এই সমস্ত তত্ত্ব বর্ণনা করুন। আপনি এই বিশ্বের কারণ, অতএব এই বিশ্বের ভূত, ভবিষ্যত ও বর্তমান সবই আপনি জানেন। হাতের মুঠিতে থাকা আমলকির মতো, এই বিশ্ব আপনার কাছে অত্যন্ত পরিচিত

হে পিতা, বিশ্বের তত্ত্ব বলার আগে আপনি নিজের তত্ত্ব প্রথমে বর্ণনা করুন। আপনার জ্ঞানদাতা কে? আপনি কার আশ্রয়ে, কার অধীনে অবস্থান করছেন এবং আপনার স্বরূপই বা কী? আমার মনে হয় আপনিই জগতের স্বতন্ত্র পরমেশ্বর। একা আপনিই মায়ার প্রভাবে ভূতপদার্থ দিয়ে ভূতবিষয়সমূহ সৃষ্টি করে, নিজের মধ্যেই পালন করছেন। মাকড়সা যেমন অনায়াসে নিজের দেহ থেকে তন্তুজাল বিস্তার করে, তেমনি আপনিও নিজের মায়াশক্তির প্রভাবে, নিজের দেহ থেকেই এই ব্রহ্মাণ্ডকে অবলীলাক্রমে প্রকাশ করে চলেছেন। কিন্তু একটি বিষয়ে আমার মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আপনি এত শক্তিসম্পন্ন হয়েও কার উদ্দেশে ঘোর তপস্যা করছিলেন? হে সর্বজ্ঞ ও সর্বেশ্বর, এই সমস্ত প্রশ্নের যথার্থ সিদ্ধান্ত যাতে আমার সম্যক উপলব্ধি হয়, আপনি আমাকে সেই ভাবে উপদেশ করুন”

পিতামহ ব্রহ্মা বললেন, “হে বৎস, সন্দেহ করে যে প্রশ্ন তুমি করলে, সে প্রশ্ন সমীচীন। শ্রীভগবানের মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্যে তুমি আমাকে প্রবৃত্ত করছো, এই কারণে পুত্র হয়েও আমাকে তুমি দয়াই করলে। তুমি যে আমার ঈশ্বরত্বের প্রশংসা করলে, এই কথা সম্পূর্ণ অসত্য নয়। কারণ, আমার মধ্যে ঈশ্বরত্ব আছে, কিন্তু যে পরমেশ্বরের থেকে আমার এই ঈশ্বরত্ব, তাঁর সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। তাঁর বিষয়ে তোমাকে বলছি, মন দিয়ে শোন।

সকল জীবের মধ্যে একজন প্রকাশক বিষয় আছেন, তাঁকে চৈতন্য বলে; জ্ঞান তাঁর শক্তি। শ্রীভগবান তাঁর চৈতন্যস্বরূপে প্রথমতঃ যাবতীয় বস্তু প্রকাশ করার পর, চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকাসমূহের প্রকাশ হয়। একই ভাবে তিনি নিখিল বিশ্বকে প্রকাশ করলে, আমি সৃষ্টি দিয়ে তাকে ব্যক্ত করি। অতএব আমি স্বতন্ত্র প্রকাশক নই। যাঁর দুর্জয় মায়ায় মুগ্ধ হয়ে তোমরা আমাকে জগৎকর্তা বলে কীর্তন কর, আমি কিন্তু সেই ভগবান বাসুদেবের ধ্যান ও বন্দনা করি। হে পুত্র, ক্ষিতি, জল প্রভৃতি মহাভূত সকল বিশ্বের উপাদান। কর্ম জীবের বারবার জন্মের কারণ। কালশক্তি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণের তারতম্যের কারক, এই স্বভাবগুণের পার্থক্যের কারণে জীবের সুখ ও দুঃখের ভোগ হয়ে থাকে। বেদসমূহ শ্রীনারায়ণ থেকেই আবির্ভূত হয়েছে। দেবতাগণ শ্রীনারায়ণের অঙ্গ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। স্বর্গলোক ইত্যাদি তাঁর আনন্দের অংশ এবং যজ্ঞসকল তাঁকে লাভ করার সাধনা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাণায়াম, যোগ, তপস্যা, একাগ্রচিত্তে প্রকাশিত জ্ঞান এবং জ্ঞানের ফলস্বরূপ মোক্ষ, সব কিছুই শ্রীনারায়ণের অধীন।

তিনি প্রথমতঃ আমাকে সৃষ্টি করেছিলেন। তারপর তাঁর সৃষ্ট বস্তুই, আমি তাঁর আজ্ঞায় প্রকাশ করে থাকি। এই সৃষ্টিও আমি স্বেচ্ছায় বা নিজের প্রভাবে সম্পন্ন করতে সমর্থ নই। তিনি সাক্ষী, নিয়ন্তা ও অন্তর্যামী হয়ে কূটস্থ থাকেন, অর্থাৎ বড়ো ছোট সকল প্রাণীর বুদ্ধিতে বিরাজ করেন বলেই, সৃষ্টির ক্রিয়া সম্ভব হয়। বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করার জন্য, ভগবান মায়ার সাহায্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু এই তিনগুণে তিনি নিজে কখনোই প্রভাবিত হন না, এই কারণে তাঁকে নির্গুণ বলা হয়। এই তিনগুণ থেকেই পৃথিবী ইত্যাদি ভূত, চক্ষু ইত্যাদি ইন্দ্রিয় এবং সূর্য ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের দেবতাসকল সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং এই তিনটি গুণ মায়ামুগ্ধ জীবকে বন্ধন করে রাখে। তখন জীব, আমিই দেহ, আমিই ইন্দ্রিয়, আমিই দেবতা, কখনো বা আমিই আত্মা, এইরূপ কল্পনা করে এবং নিজেকে কর্তা চিন্তা করে, ভুল করে। এই তিনগুণ জীবকে মোহে আচ্ছন্ন করে রাখে বলে, জীব শ্রীভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে না।

প্রলয়ের কালে নিখিল বিশ্ব শ্রীভগবানে লীন থাকে। তারপর যখন তাঁর বহু হবার ইচ্ছা হয়, তখন সৃষ্টির ক্রিয়া আরম্ভ করেন। তাঁর এই ইচ্ছার কেউ নিয়ামক নেই, অর্থাৎ কখন তাঁর ইচ্ছা হবে, এমন নির্দেশ কেউ দিতে পারে না। যখন তাঁর ইচ্ছার উদ্রেক হয়, কালশক্তির প্রয়োগে, তিনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের সাম্য অবস্থায় থাকা প্রকৃতিকে সংক্ষুব্ধ অর্থাৎ চঞ্চল করে তোলেন। তার ফলে প্রকৃতিতে এই তিন গুণের সাম্য অবস্থা ভেঙে, কমবেশীর তারতম্য ঘটে যায়। প্রকৃতির মধ্যে এই বৈষম্য ঘটে গেলে, মায়ার অধীশ্বর শ্রীহরি প্রকৃতির স্বভাবশক্তিকে জাগিয়ে তোলেন। তার ফলে প্রকৃতি মহত্তত্ত্ব, অহংকারতত্ত্ব প্রভৃতি জগতের যাবতীয় উপাদানে পরিণত হয়। প্রলয়ের পূর্বকল্পে যে সকল জীব তাঁর মধ্যে লীন হয়েছিল, তারা নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন অদৃষ্ট নিয়েই লীন হয়েছিল। এই অদৃষ্টিকেই জীবের কর্মফল বলে। প্রকৃতি বিশ্বের উপাদানে পরিণত হওয়ার সময়, জীব নিজের নিজের অদৃষ্ট অনুসারেই, ভোগের উপযোগী হয়ে সৃষ্ট হয়। হে বৎস, এই সৃষ্টির মধ্যে রহস্য এই যে, সমস্ত শক্তিই ঈশ্বরের ইচ্ছায় উৎপন্ন হয় এবং  ঈশ্বর নিজেই বহুরূপে প্রকাশ হয়েছেন, এই বিষয় মায়ামাত্র।

আগে যে মহত্তত্ত্বের কথা বললাম, এতে সত্ত্বগুণ ও রজোগুণ বেশি পরিমাণে এবং তমোগুণ কম পরিমাণে থাকে। মহত্তত্ত্ব বিকৃত হয়ে আরেকটি তত্ত্ব উৎপন্ন হয়, তার নাম অহঙ্কারতত্ত্ব, এতে তমোগুণের পরিমাণ বেশি। এই তত্ত্বেই সকল ভূত, ইন্দ্রিয় ও দেবতা সৃষ্টির বীজ নিহিত থাকে। এই তত্ত্ব আবার বিকৃত হয়ে তিন গুণের প্রভাবে তিন রকম হয়ে ওঠে। সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে দেবতা, রাজস অহঙ্কার থেকে ইন্দ্রিয় এবং তামস অহঙ্কার থেকে সকল ভূতের সৃষ্টি হয়।

প্রথমতঃ এই তামস অহঙ্কার থেকে সূক্ষ্ম শব্দ অনুভূত হয়, তারপর এই শব্দ থেকে সৃষ্টি হয় আকাশ। এই শব্দ আকাশের অসাধারণ ধর্ম। এই শব্দ থেকেই দ্রষ্টা ও দৃশ্য এই উভয় বস্তুর বোধ নিষ্পন্ন হয়। যদি চোখের আড়ালে কেউ “গজ” এই শব্দ বার বার উচ্চারণ করে, তাহলে ওই শব্দে গজদ্রষ্টা পুরুষ ও দৃশ্য গজ – উভয় পদার্থেরই বোধ তৈরি হয়। তারপর আকাশ স্পর্শরূপে বায়ু সৃষ্টি করে। স্পর্শ বায়ুর অসাধারণ ধর্ম। এই বায়ুতে জীব প্রাণধারণ করে এবং এই বায়ু থেকেই ইন্দ্রিয়, মন ও শরীরের দক্ষতা আসে। এইভাবে কাল ও স্বভাবের বশে বায়ু বিকৃত হয়ে রূপ সৃষ্টি করে। এই রূপই তেজের উৎপত্তির কারণ। তেজে নিজের অসাধারণ ধর্ম রূপ এবং শব্দ ও স্পর্শ এই দুই কারণ অনুভব করা যায়। এরপর তেজ থেকে রস জলরূপে পরিণত হয়। রস জলের অসাধারণ গুণ এবং জলে আগেকার কারণ সমূহ বর্তমান থাকায় শব্দ, রূপ ও স্পর্শ অনুভব করা যায়। জল থেকে গন্ধগুণ উৎপন্ন হয়ে পৃথ্বীতত্ত্ব সৃষ্টি করে। গন্ধ পৃথ্বীতত্ত্বের অসাধারণ গুণ, কিন্তু কারণের গুণ সংক্রামিত হয়ে, পৃথ্বীতত্ত্বে শব্দ, স্পর্শ, তেজ ও রস অনুভব হয়ে থাকে।

এইভাবে সাত্ত্বিক অহঙ্কার থেকে মন ও দশ দেবতা প্রকাশ হন। তার মধ্যে দিক কর্ণের, বায়ু ত্বকের, সূর্য চক্ষুর, প্রচেতা রসনার, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ঘ্রাণের ইন্দ্রিয় নাসিকার, অগ্নি বাক্য ইন্দ্রিয়ের, ইন্দ্র হাতের, উপেন্দ্র পায়ের, মিত্র গুহ্যের ও প্রজাপতি উপস্থের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। এইভাবে রাজস অহঙ্কার থেকে জ্ঞানশক্তি বুদ্ধি ও ক্রিয়াশক্তি প্রাণ প্রকাশিত হয়ে চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক এই পঞ্চ জ্ঞানের ইন্দ্রিয় এবং বাক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ এই পাঁচ কর্ম ইন্দ্রিয় উৎপন্ন করে। এইভাবে ভূত, ইন্দ্রিয়, মন ও প্রাণ সৃষ্টি হলেও, তারা পৃথক পৃথক অবস্থান করার জন্যে, দেহ তৈরি করতে পারে না। শেষে শ্রীভগবানের শক্তিতে তারা মিলিত হয় এবং উপাদানের মধ্যে একে অপরের অধীন থেকে এই ব্যষ্টি অর্থাৎ আলাদা আলাদা জীবদেহ এবং সমষ্টি অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডদেহ নির্মাণ করে”। 

[উপস্থ কথাটির অর্থ জননেন্দ্রিয় - স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে।]


বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১




দ্বিতীয় স্কন্ধ - দ্বিতীয় পর্ব

শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আমার বলা এই ধারণা সামান্য নয়, এই ধারণা থেকে বিশ্বসৃষ্টির সামর্থ হয়ে থাকে। সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মা এই ধারণা দিয়েই নিশ্চিত বুদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং শ্রীহরিকে পরিতুষ্ট করে, প্রলয়কালে তাঁর যে সৃষ্টির স্মৃতি লোপ পেয়েছিল, তা আবার ফিরে পেয়েছিলেন। এই ভাবে অব্যর্থ সৃষ্টিশক্তির বলে তিনি পূর্বকল্পের মতোই এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

এই কারণে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা বুদ্ধি স্থির রেখে অর্থাৎ ভোগ্যবস্তুতে সুখের লেশমাত্র না রেখে, শুধু দেহধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংগ্রহে চেষ্টা করবেন এবং যদি ওই দ্রব্য অন্য কোনভাবে পাওয়া যায়, তাহলে অতিরিক্ত সংগ্রহের চেষ্টাকে পণ্ডশ্রম মনে করে, সে বিষয়ে বিরত থাকবেন। ভূমিশয্যা থাকতে অন্য শয্যার প্রয়োজন কী? স্বাভাবিক বাহু থাকতে উপাধানের কী দরকার? যখন অঞ্জলি আছে, তখন নানা ধরনের তৈজসপত্রের কী দরকার? দিক-বল্কল থাকতে পট্টবস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা পণ্ডশ্রম নয় কী? যারা নিজেদের ফলে অন্যের পুষ্টি সাধন করে, সেই বৃক্ষরাজি কী ফল ভিক্ষা দানে বিমুখ হয়েছে? নদীসমূহ কী শুকিয়ে গিয়েছে? সমস্ত গিরিগুহার মুখ কী বন্ধ হয়ে গিয়েছে? ভগবান অজিত কী শরণাগতদের রক্ষা করেন না? বিনা কষ্টে পাওয়া এই সমস্ত বস্ত্র, ভোজন, পান ইত্যাদি সুলভ থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কিসের জন্য ধনগর্বে অন্ধ ধনীদের ভজন করেন? অতএব শ্রী ভগবান জীবের মনে নিজেই প্রকাশিত আছেন, তিনিই জীবের ভজনার ধন, তিনিই নিত্য সত্য আত্মা, এবং প্রিয়তম বিষয়; সংসারে আসক্তি ত্যাগ করে তাঁর ভজনা করলে পরমানন্দ অনুভব হয় এবং সংসাররূপ অনর্থের মূল অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞান দূর হয়ে থাকে।

হে রাজন, এর আগে আপনাকে আমি বৈরাজ পুরুষের ধারণার কথা বলেছি। 

[বৈরাজ শব্দটির অর্থ ব্রহ্মসম্বন্ধীয়। আমাদের শাস্ত্রে ব্রহ্মকে বলা হয় ধারণাতীত, অবাঙ্মনসোগোচর - অর্থাৎ তাঁকে আমাদের মননে উপলব্ধি করা যায় না, কিংবা তাঁকে কথা দিয়েও বর্ণনা করা যায় না। তবুও তিনি যে আছেন সে সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। তিনি এই বিশ্বের শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি বিশ্বের পালয়িতাও। তিনি একদিকে যেমন এই জগতের সমস্ত উদ্ভিদ, জীব ও জড় সৃষ্টি করেছেন, আবার তেমনই তাদের জীবন ধারণের জন্যে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল আশ্চর্য এক বাস্তুতন্ত্রও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে আমরা তাঁর স্থূল অস্তিত্ব বুঝতে পারি না। কিন্তু আমাদের চারপাশে চোখ মেলে তাকালে তাঁর অমোঘ উপস্থিতি সর্বত্র টের পাওয়া যায়। এই ধারণাকেই "বৈরাজ পুরুষের ধারণা" বলা হয়েছে।]               

 

ঈশ্বরের মূর্তিধারণা

এখন ভগবানের শ্রীমূর্তির ধারণা বর্ণনা করছি শুনুন। কোন কোন ভক্ত হৃদয়ের আকাশে প্রাদেশ-প্রমাণ অর্থাৎ তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগের ব্যবধান পরিমাপের চতুর্ভুজ পুরুষকে ধারণা করে থাকেন। তাঁর চারটি হাত শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মে সুশোভিত, প্রসন্ন মুখ, আয়ত কমললোচন ও কদম্বকেশরের মতো পীতবর্ণ বসন। তাঁর বাহু মহারত্নখচিত সোনার অঙ্গদে কমনীয়, মাথায় উজ্জ্বল মহারত্নময় সোনার কিরীট, কানে সোনার কুণ্ডল নিরুপম শোভায় মণ্ডিত। যোগেশ্বরগণ তাঁদের হৃদয় কমল আসনে তাঁর পায়ের পল্লব স্থাপন করেন। তাঁর বুকে শ্রীবৎস চিহ্ন আঁকা, তাঁর গলায় সোনার সুতোর গ্রন্থিতে কৌস্তুভ মণি এবং অম্লানকান্তি বনমালা বিরাজিত। তিনি মেখলা, অঙ্গুরীয় ও নূপুর, কঙ্কণ ইত্যাদি ভূষণে বিভূষিত এবং তাঁর স্নিগ্ধ অমল কুঞ্চিত নীল কেশে কমনীয় মুখের হাসির আভায় ভুবন মুগ্ধ। তাঁর উদার লীলাময় হাস্য দৃষ্টিতে অনন্ত করুণার উদ্রেক।

হে মহারাজ, শ্রীহরির চরণযুগল থেকে শুরু করে হাস্য পর্যন্ত সকল অবয়ব ধ্যান করবেন, যে যে অঙ্গ অনায়াসে স্ফূরিত হবে, সেই অঙ্গ ত্যাগ করে অন্যান্য অঙ্গ ধ্যান করতে হবে। এইভাবেই মন থেকে চঞ্চলতা দূর হয়ে মন নির্মল হয়। শ্রীভগবান পরাবর; পর অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা প্রমুখ এঁনার অবর অর্থাৎ কনিষ্ঠ। ইনি বিশ্বেশ্বর ও সর্বসাক্ষী; যতদিন পর্যন্ত এই ভগবানের প্রতি প্রেমভক্তির উদয় না হয়, ততদিন প্রত্যেকদিনের প্রয়োজনীয় কর্মের অনুষ্ঠান সেরে, নিষ্ঠা ভরে, এই পুরুষের স্থূলরূপ চিন্তা করবেন। আসন্নমৃত্যু ব্যক্তির যা কর্তব্য, আমি বর্ণনা করলাম। এখন ওই ব্যক্তি যদি নিজের দেহত্যাগের সঙ্কল্প করে থাকেন, তা হলে পুণ্যক্ষেত্র অথবা উত্তরায়ণ কালের দিকে মন না দিয়ে, স্থির ও সুখকর আসনে উপবেশন করে প্রাণায়ামে পঞ্চপ্রাণ জয় করবেন এবং মনে ইন্দ্রিয়দের সংযত করবেন। তারপর নিজের নির্মল বুদ্ধি দিয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বুদ্ধিকে ক্ষেত্রজ্ঞে লয় করবেন। যে আত্মা বুদ্ধি প্রভৃতিকে নিজের দৃশ্য বিষয় ও নিজেকে তাদের দ্রষ্টা বলে মনে করেন, সেই আত্মা কে ক্ষেত্রজ্ঞ বলে। ক্ষেত্রজ্ঞের শুদ্ধ স্বরূপ আছে, তাঁকে শুদ্ধ জীবাত্মা বলে। ক্ষেত্রজ্ঞ আত্মাকে শুদ্ধ জীবাত্মায় লয় করে, জীবকে ব্রহ্মে লয় করতে হয়। তারপর পরমা শান্তি লাভ করে, সকল কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত থাকবেন, কারণ মুক্ত ব্যক্তির সকল কর্তব্যের অবসান হয়ে থাকে।

মহারাজ, যে দেবতারা জগৎ ও প্রাণীদের উপর আধিপত্য করে থাকেন, তাঁরাও কালের বশীভূত কিন্তু ওই কাল, যে ব্রহ্মস্বরূপের কথা আপনাকে বললাম, তার উপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ নয়, সুতরাং দেবতারা কার উপর আধিপত্য করবে? শুদ্ধ ব্রহ্মস্বরূপে সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ, অহঙ্কার, বুদ্ধিতত্ত্ব বা প্রকৃতি কিছুই অবস্থান করতে পারে না। যিনি আত্মস্বরূপ লাভ করতে ইচ্ছা করেন, তিনি জগতের যাবতীয় বস্তুকে, “এতে আত্মা নেই, এতে আত্মা নেই” বলে পরিত্যাগ করেন এবং দেহকেই আত্মা বলে যে ভ্রান্ত জ্ঞান হয়েছিল, সেই জ্ঞানকেও ত্যাগ করেন, তারপর তিনি শ্রীবিষ্ণুর পরমপদ নিত্য আলিঙ্গন করেন। যদি তিনি দেহ ত্যাগ করে সদ্য মুক্তি পেতে চান, তাহলে, প্রথমে পাদমূল দিয়ে মূলাধার অর্থাৎ গুহ্যদ্বার নিরুদ্ধ করে, অক্লান্তভাবে প্রাণবায়ুকে ছটি স্থানের মধ্যে দিয়ে ঊর্ধে উন্নীত করবেন। প্রথমে নাভি অর্থাৎ মণিপূরচক্রে অবস্থিত প্রাণবায়ুকে হৃদয় অর্থাৎ অনাহতচক্রে তুলে এনে, উদান বায়ুর গতি অনুসরণ করে কণ্ঠের নীচে অবস্থিত বিশুদ্ধচক্রে তুলে আনবেন। পরে মনকে সংযত করে ওই বায়ুকে ধীরে ধীরে তালুমূলে অর্থাৎ বিশুদ্ধচক্রের আগে নিয়ে আসবেন। তারপর চোখ, কান, নাক ও মুখ এই সাতটি দ্বার রুদ্ধ করে প্রাণকে ভ্রূমধ্যে অবস্থিত আজ্ঞাচক্রে তুলে আনবেন। ভোগবাসনা যদি একান্তই ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে অর্ধমূহুর্তকাল অপেক্ষা করে, ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে পরব্রহ্মে মিলিত হবেন এবং সেই মূহুর্তেই দেহ ও ইন্দ্রিয় সকল পরিত্যাগ করবেন।

হে রাজন, যোগেশ্বরগণের লিঙ্গশরীর বায়ুর থেকেও সূক্ষ্ম; তাঁরা লিঙ্গশরীরে ভূলোক, প্রেতলোক ও স্বর্গলোক এই ত্রিভুবনের মধ্যে অবস্থিত যে কোন লোকে অথবা এর বাইরে মহর্লোকে, এমনকি ব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও যেতে পারেন। তাঁদের শক্তি অতুলনীয়, তাঁরা উপাসনা, তপস্যা, অষ্টাঙ্গযোগ ও সমাধিজ্ঞান দিয়ে যে শক্তিলাভ করেন, মানুষ সাধারণ কর্ম দিয়ে সেই শক্তি লাভের কল্পনাও করতে পারে না।


মহামুক্তি ও ঈশ্বর-লীন   

মহারাজ, সুষুম্না নামে একটি নাড়ী দেহস্থ সকল চক্র ভেদ করে সহস্রার পর্যন্ত গিয়েছে, তারপর সেই নাড়ী আকাশপথ পার হয়ে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত বিস্তৃত আছে। যোগী ওই জ্যোতির্ময় ব্রহ্মপথ ধরে, প্রথমে অগ্নিলোকে উপস্থিত হন, সেখানে নির্মল হয়ে অর্থাৎ আসক্ত না হয়ে আরো উঁচুতে শিশুমারচক্র অর্থাৎ তারারূপ নারায়ণের অধিষ্ঠানভূমি লাভ করেন, অর্থাৎ সূর্য থেকে আরম্ভ করে ধ্রুবলোক পর্যন্ত যেতে পারেন। শ্রীবিষ্ণুর এই চক্র, বিশ্বের নাভি স্বরূপ, কারণ ওই জ্যোতিশ্চক্রই সূর্য ইত্যাদি নক্ষত্রের আশ্রয়স্থান। যোগী এই স্থান পার হয়ে নির্মল লিঙ্গশরীরে ব্রহ্মবিদদের বন্দনীয় মহর্লোকে যেতে পারবেন। এই স্থানে যাওয়ার সামর্থ স্বর্গবাসীদেরও নেই। এই স্থানে মহর্ষিরা কল্পান্তকাল পর্যন্ত মহানন্দে বাস করেন। ওই যোগী যদি ওই লোকে বাস করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে এক কল্প কাল পর্যন্ত বাস করতে পারেন, পরে কল্পের অবসানে যখন অনন্ত ভগবানের মুখের আগুনে বিশ্ব দগ্ধ হতে থাকে, তখন সেই লোক পর্যন্ত সেই উত্তাপ অনুভব করা যায়। তখন তিনি দ্বিপরার্ধকাল স্থায়ী ব্রহ্মলোকে অর্থাৎ সত্যলোকে যেতে পারেন। এই লোকে শোক, জরা, মৃত্যু বা অন্য কোন বিষয়ে উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকে না। সত্যলোকবাসিদের শুধুমাত্র মানসিক দুঃখের অনুভব থাকে। “সংসারী লোক শ্রীভগবানের ধ্যানপথ ভুলে এই মনোহর লোকে আসতে পারছে না এবং সংসারের দুঃখে পীড়িত হচ্ছে” এই চিন্তাই তাঁদের চিত্তে করুণার সৃষ্টি করে ও মানসিক ক্লেশ উৎপন্ন করে। তা না হলে অন্য কোন দুঃখ তাঁদের অনুভব হয় না।

হে মহারাজ, যাঁরা এই সত্যলোকে আসেন, তাঁদের তিন রকমের গতি আছে। যাঁরা উৎকৃষ্ট পুণ্যের বলে এই লোকে আসেন, তাঁরা অন্য কল্পে যাঁর যেমন পুণ্য, সেই পুণ্যের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। যাঁরা হিরণ্যগর্ভ নারায়ণের উপাসনাবলে এই লোক লাভ করেন, তাঁরা দ্বিপরার্ধকাল শেষ হলে ব্রহ্মার সঙ্গে মুক্তিলাভ করেন। আর যাঁরা ভগবানের ভক্ত, তাঁরা স্বেচ্ছায় ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করে বৈষ্ণবপদ অর্থাৎ বিষ্ণুলোকে চলে যেতে পারেন। হে মহারাজ, তাঁদের ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করার প্রক্রিয়া কিরকম, বলছি শুনুন।

ভগবানের ভক্ত প্রথমে লিঙ্গদেহকে পার্থিব অর্থাৎ পৃথিবীতত্ত্বে নির্মাণ করে, নির্ভয়ে ব্রহ্মাণ্ডের পার্থিব আবরণ ভেদ করেন। তারপর জলময় মূর্তিতে জলের আবরণ, অনলমূর্তিতে অগ্নিলোক, বায়ুমূর্তিতে বায়ুলোক, ও আকাশমূর্তিতে পরমাত্মার আকাশরূপ আবরণ ভেদ করে থাকেন। এই সকল আবরণ ভেদ করার সময়, তাঁরা ওই সকল লোক ভোগ করতে করতেই যান। যোগী ঘ্রাণ দিয়ে গন্ধ, জিহ্বা দিয়ে রস, দৃষ্টি দিয়ে রূপ, চর্ম দিয়ে স্পর্শ ও কান দিয়ে আকাশগুণ শব্দ উপভোগ করতে থাকেন এবং কর্ম ইন্দ্রিয় দিয়ে কাজও করতে থাকেন। এইভাবে তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম ভূত অতিক্রম করে তাদের আবরণস্বরূপ অহঙ্কারতত্ত্বে পৌঁছে যান। এই অহঙ্কারতত্ত্ব তিন প্রকারের, তামস, রাজস ও সাত্ত্বিক। তামস থেকে জড় সূক্ষ্ম ভূতসমূহ, রাজস থেকে বহির্মুখ দশ ইন্দ্রিয় এবং সাত্ত্বিক থেকে মন ও ইন্দ্রিয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাদের সৃষ্টি হয়। এই তিন অহঙ্কারের সঙ্গে নিজের লিঙ্গদেহকে এক করে, তিনি বিজ্ঞানতত্ত্ব অর্থাৎ মহত্তত্ত্ব লাভ করেন। এই মহত্তত্ত্বের সঙ্গে নিজের লিঙ্গশরীরকে এক করে, তিনি নিখিল গুণের লয়স্থান প্রকৃতিতে পৌঁছে যান। তারপর প্রকৃতিরূপে আনন্দময় হয়ে সকল উপাধি অর্থাৎ দেহ পরিত্যাগ করে শান্ত ও পরমানন্দস্বরূপ অবিকৃত পরমাত্মাকে লাভ করেন। যিনি এই ভাগবতী গতি লাভ করতে পারেন, তাঁকে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না”

তারপর শ্রীশুকদেব বললেন, “মহারাজ, আপনার কাছে সদ্যমুক্তি ও ক্রমমুক্তি, দুটি পথের কথাই বর্ণনা করলাম। এই বর্ণনা আমার নিজের কল্পনা থেকে বানিয়ে বলা নয়এই দুই সনাতন পন্থা বেদেও বলা হয়েছে। আগে ভগবান বাসুদেব, ব্রহ্মার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে, তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সংসারবদ্ধ জীবের মুক্তির জন্য তপস্যা, যোগ ইত্যাদি নানান পথ আছে, কিন্তু এর মতো সুখকর ও নির্বিঘ্ন পথ আর দ্বিতীয় নেই। এই পথ অনুসরণ করলে, ভগবান বাসুদেবে ভক্তিযোগ উৎপন্ন হয়।

হে রাজন, যে বিষয় আমাদের পরিচিত অর্থাৎ যাকে আমরা আগেই অনুভব করেছি, সেই বিষয়েই আমাদের রতি হতে পারে। কিন্তু যে বিষয় কোনদিন আমাদের অনুভব হয় নি, সে বিষয়ে রতি হওয়া অসম্ভব। সুতরাং শ্রীহরি আগে আমাদের অনুভবে না এলে, কিভাবে তাঁর প্রতি রতি আসা সম্ভব এমন চিন্তা করবেন না। এর কারণ আপনাকে বুঝিয়ে বলছি, মন দিয়ে শুনুন।

আমাদের বুদ্ধি প্রভৃতি যা কিছু দেখা যায়, সবই জড়, তা হলে এই যে সব জড় পদার্থ রয়েছে, তার সাক্ষ্য কে দিচ্ছে? শ্রীহরিই একমাত্র দ্রষ্টা বা সাক্ষী; তিনিই সর্বভূতের অন্তর্যামীরূপে থেকে বুদ্ধি প্রভৃতিকে প্রকাশ করছেন। অতএব তিনি না থাকলে জড় বুদ্ধির প্রকাশ হত না, এই প্রমাণে আমরা আমরা শ্রীহরিকে অনুভব করতে পারছি। এছাড়া অন্য এক প্রমাণেও শ্রীভগবানের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। আমরা দেখতে পাই, কুঠার বা অন্য কোন যন্ত্র নিজে নিজে কোন কাজই করতে পারে না, তাদের ব্যবহারের জন্য অন্য একজন পৃথক কর্তার প্রয়োজন হয়। সেই রকম, আমাদের বুদ্ধি কিংবা অন্যান্য বৃত্তি যন্ত্র ভিন্ন আর কিছুই নয়, অথচ এরা সকলেই জড়। তাহলে কে এই বুদ্ধি নামক যন্ত্রটিকে ব্যবহার করে, জ্ঞান নামক কর্মটিকে সম্পন্ন করছেন? এই ভাবে অনুমানের প্রমাণ দিয়েও একজন স্বতন্ত্র কর্তা ঈশ্বর আছেন, এই অনুভব করা যায়। সাধুব্যক্তিরা শ্রীভগবানকে আত্মরূপে প্রকাশমান বলে সর্বদাই অনুভব করে থাকেন। যাঁরা এই ভগবানের কথামৃত শ্রবণরূপ ওষ্ঠ দিয়ে পান করেন, তাঁদের বিষয়ের স্পর্শে মলিন চিত্ত পবিত্র হয় এবং তাঁরা শ্রীভগবানের চরণপদ্মে অবস্থান করে থাকেন।


মানুষের কর্তব্য 

শ্রীশুকদেব বললেন, “হে মহারাজ, জীব বহু যোনিতে জন্ম নিতে নিতে দৈবযোগে মনুষ্যত্ব লাভ করেতাদের মধ্যে যাঁরা জ্ঞানী এবং জ্ঞানীদের মধ্যেও যাঁরা মুমুক্ষু অর্থাৎ মুক্তির ইচ্ছা করেন, তাঁদের কর্তব্য সম্বন্ধে আপনি যা প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে শ্রীহরিকথা শোনা একটি অবশ্য কর্তব্য বলেই আমি উল্লেখ করলাম। যাঁদের মন্দবুদ্ধি তাঁরা নানা দেবতার ভজনা করেন। যিনি ব্রহ্মতেজ কামনা করেন, তিনি বেদপতি ব্রহ্মার উপাসনা করেন। এইভাবে, যাঁরা ইন্দ্রিয়ের দক্ষতা কামনা করেন তাঁরা ইন্দ্রের, সন্তান কামনায় দক্ষ ও অন্য প্রজাপতির, ঐশ্বর্যকামী শ্রীদুর্গার, তেজ কামনাকারী অগ্নির, ধনের প্রত্যাশীরা বসুগণের ও বীরত্বের কামনায় রুদ্রগণের উপাসনা করে থাকেন। যাঁরা অন্নের প্রার্থী তাঁরা অদিতির, স্বর্গ কামনায় দ্বাদশ আদিত্যের, সুষ্ঠু রাজ্যপরিচালনায় বিশ্বদেবগণের, কৃষি ও বাণিজ্যের কামনায় সাধ্যগণ, আয়ুর বাসনায় অশ্বিনীকুমারদ্বয়, পুষ্টির জন্যে পৃথিবীদেবী, প্রতিষ্ঠার কামনায় লোকমাতা দ্যাবাপৃথিবীর, রূপের সাধনায় গন্ধর্বগণের, স্ত্রীর কামনায় অপ্সরা উর্বশীর ভজনা করেন। সকলের উপর আধিপত্যকামী পরমেষ্ঠী ব্রহ্মার, যশ প্রার্থী যজ্ঞেশ্বের বিষ্ণুর, ধনসঞ্চয়ের জন্য প্রচেতার, বিদ্যার জন্য গিরীশের, দাম্পত্যসুখের কামনায় সতী উমাদেবীর, ধর্মের জন্য উত্তমশ্লোক বিষ্ণুর, বংশবিস্তারের জন্য পিতৃগণের, বিঘ্ন নিবৃত্তির জন্য যক্ষগণের উপাসনা করেন। রাজত্বের কামনায় মন্বন্তরের অধিপতি দেবগণের, শত্রুবিনাশের জন্য রাক্ষসগণের, ভোগের ইচ্ছায় সোমের এবং বৈরাগ্য কামনায় প্রকৃতির প্রকৃত অধিষ্ঠাতা ঈশ্বরের যজনা করেন।

কিন্তু যিনি উদারবুদ্ধি, একান্ত ভক্ত, তাঁর এই সকল কামনা থাকুক কিংবা না থাকুক, অথবা তাঁহার মোক্ষলাভের অভিলাষ থাকুক, তিনি তীব্র ভক্তিযোগে পরমেশ্বরের ভজনা করেন। হে রাজন, হরিকথা শুনতে শুনতে প্রথমে জ্ঞানের উদয় হয়, এই জ্ঞানে রাগ, দ্বেষ প্রভৃতি নিবৃত্ত হয়, এবং সকল বিষয়ে বৈরাগ্য জন্মায়। বৈরাগ্যের উদয়ে চিত্তে প্রসন্নতা আসে ও ভক্তিযোগের উদয় হয়, এই পন্থাকেই শাস্ত্রে কৈবল্য পথ বলা হয়ে থাকে” 

শ্রী শৌণক বললেন, “ভরতকুলতিলক রাজা পরীক্ষিৎ এইসব কথা শোনার পর বেদজ্ঞ ও পরমব্রহ্মদর্শী শুকদেবকে আর কী জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের শুনতে ইচ্ছা হয়। পাণ্ডুকুলতিলক পরীক্ষিৎ ও ব্যাসনন্দন শ্রী শুকদেব দুজনেই ভগবান বাসুদেব পরায়ণ। অতএব এই দুই সাধু ব্যক্তির উরুগায় অর্থাৎ মহাযশা ভগবানের গুণাবলীপূর্ণ মহৎ কথার প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। সূর্যদেব প্রত্যেকদিন উদিত ও অস্তমিত হয়ে মানুষের আয়ুক্ষয় করছেন, অতএব ভগবান বাসুদেবের পুণ্যকথা ছাড়া অন্য সকল প্রসঙ্গই বৃথা কালক্ষয় করে। তরুসমূহ কি জীবন ধারণ করে না? কর্মকারের ভস্ত্রা অর্থাৎ বায়ু সঞ্চালন যন্ত্র কি শ্বাসক্রিয়া করে না? গ্রামের অন্যান্য পশু কি ভোজন ও রতিক্রিয়ায় কাল হরণ করে না? অতএব কেবল জীবনধারণ, শ্বাসক্রিয়া, ভোজন ও মিথুন মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয়। শ্রীকৃষ্ণের মধুরিমা যে মানুষের কানে পৌঁছায়নি, সে ব্যক্তি কুকুরের মতো অবজ্ঞার পাত্র, গ্রাম্য শূকরের মতো মলিন বিষয়ে আসক্ত, উটের মতো  বিষয়রূপ কষ্টকর কাঁটা চর্বণে ব্যস্ত এবং গাধার মতো অপরের ভার বৃথা বহন করে।

হে সূত, মানবের যে দুই কান শ্রীহরির গুণকথা না শোনে, সেই কান দুইটি ছিদ্র মাত্র। যে জিহ্বা ভগবানের মধুর চরিত্র কীর্তন না করে, সেই জিভ ব্যাঙের জিভের মতো। যে উত্তমাঙ্গ অর্থাৎ মাথা মুকুন্দের পায়ে অবনত না হয়, সেই মাথা মূল্যবান মুকুটে শোভিত হলেও বৃথা ভারের মতো। যে হাত ভগবানের সেবায় ব্যবহৃত হয় না, সেই হাত কঙ্কন-বলয় শোভিত হলেও, শবদেহের হাতের মতোই কুৎসিত। যে চোখ শ্রীহরির মূর্তি লক্ষ্য করেনা, সেই চোখ ময়ুরপুচ্ছের মতো, যে পা শ্রীহরি ক্ষেত্রে গিয়ে ধন্য হয় না, সেই পা গাছের শিকড়ের মতো। যে ব্যক্তি মুকুন্দের চরণধুলা মাথায় নেয়নি কিংবা তাঁর চরণের তুলসীপাতার গন্ধের ঘ্রাণ নেয়নি, সেই মানুষ জীবন্মৃত। যে হৃদয় শ্রীকৃষ্ণ নামে বিগলিত হয়ে আনন্দের অশ্রুধারা ও অঙ্গে পুলক সৃষ্টি না করে, সন্দেহ নেই, সেই হৃদয় পাথরের মতোই নিষ্প্রাণ।

হে সূত, অভক্তের সমস্তই ব্যর্থ হয়ে যায়। ভক্তচূড়ামণি ব্যাসনন্দন আর যা যা বলেছিলেন, আপনি আমাদের সবিস্তারে বর্ণনা করুন”

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৩ "


নতুন পোস্টগুলি

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /৬

 এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ "  এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ " এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও...