উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "





  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২ "


 

মহাভারতের অপূর্ণতা

সূত বললেন, “ব্রহ্মলোক থেকে দেবর্ষি নারদকে আসতে দেখে, ঋষি ব্যাসদেব উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন এবং প্রণাম করলেন। দুজনেই সেই সরস্বতী নদীতীরে আসন গ্রহণ করার পর, দেবর্ষি নারদ স্মিতমুখে ব্যাসদেবকে বললেন, “হে মহাভাগ পরাশরনন্দন, আপনি নিজের চিত্তে, দেহে ও আত্মায় প্রসন্নতা লাভ করেছেন তো? আপনি সর্ব ধর্মের তত্ত্ব সার নিয়ে অদ্ভূত মহাভারত রচনা করেছেন, অতএব মনে হচ্ছে আপনি ধর্মের সকল বিষয়েই সম্যক জ্ঞান লাভ করেছেন। আপনি সনাতন ব্রহ্মের বিচার করেছেন, তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। এত সাফল্য সত্ত্বেও, আপনি অসফল ব্যক্তির মতো নিজের বিষয়ে, তাহলে শোক করছেন কেন?”

ব্যাসদেব বললেন, “আপনি যা বলেছেন, সবই সত্য। কিন্তু তাও আমি আত্ম-পরিতৃপ্তি অনুভব করতে পারছি না। আমার এই অসন্তুষ্টির কারণ কী, তাও বুঝতে পারছি না। আপনার জ্ঞানের কোন সীমা নেই, অতএব আপনিই আমার এই অস্থিরতার কারণ নির্দেশ করুন। যিনি স্বয়ং অসঙ্গ থেকে তিনগুণের সঙ্কল্পে এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং যিনি এই সমস্ত কার্য ও কারণের নিয়ন্তা, আপনি সেই পুরাণ পুরুষ ভগবানের উপাসনা করে সমস্ত গোপন বিষয় অবগত হয়েছেন। আপনি ত্রিভুবনে ঘুরে বেড়ান বলে, আপনি সূর্যের মতো সর্বদর্শী। আপনি প্রাণবায়ুর মতো যোগবলে সকল প্রাণীর অন্তরে থেকে প্রাণীদের বুদ্ধি প্রবৃত্তি লক্ষ্য করেন। আমি সদাচার, অহিংসা ও ধর্মযোগে পরব্রহ্মে স্থিতি লাভ করেছি। নিয়মমতো অধ্যয়ন করে বেদের তত্ত্বসমূহ উপলব্ধি করেছি, তাও আমার মধ্যে কেন এই অপূর্ণতার বোধ রয়েছে, আপনি কৃপা করে নির্দেশ করুন”

দেবর্ষি নারদ বললেন, “আপনি শ্রী ভগবানের নির্মল যশ প্রায় কিছুই বর্ণনা করেননি, সেই কারণেই আপনার মধ্যে এই অপূর্ণতার বোধ এসেছে। হে মুনিবর, আপনি ধর্ম ও তার সাধন যেমন সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন, ভগবান বাসুদেবের মহিমা সেভাবে বর্ণনা করেননি। বাক্য নানান অলঙ্কারে সাজানো, বিচিত্র পদ বিন্যাসে অত্যন্ত সুশোভন হলেও, সেই বাক্য যদি শ্রীহরির জগৎপবিত্র যশ বর্ণনায় প্রযুক্ত না হয়, তাহলে সে বাক্য কাক-তুল্য কামনার বশীভূত মানুষের পক্ষে শ্রুতিমধুর হতেও পারে। কিন্তু সে বাক্য ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত-হংসদের কাছে একান্তভাবেই পরিত্যাজ্য একথা নিশ্চয় জানবেন। মনে রাখবেন, কোন গ্রন্থের প্রতিটি শ্লোক যদি ভগবানের যশোময় নামের কীর্তন করে, সেই শ্লোক অশুদ্ধ পদে রচিত হলেও জনগণের পাপ নাশ করে থাকে। যে জ্ঞানে অজ্ঞানের নিবৃত্তি হয়, সে জ্ঞান যদি ভগবান অচ্যুতে ভক্তিহীন হয়, তাও সেই জ্ঞান মূল্যহীন, কারণ ওই জ্ঞানে প্রত্যক্ষ ভাবে ভগবানকে অনুভব করা যায় না। 

[দেবর্ষি নারদ অপ্রিয়বাদীতার জন্য বিখ্যাত। অতএব তিনি সরাসরি বেদব্যাসকে দোষারোপ করে যা বললেন, তার সার কথা হল, "ওহে দ্বৈপায়ন, তুমি শাস্ত্র ও তত্ত্ব কথা শুনিয়েছ, ধর্মাচরণ ও ধর্মসাধনার যাবতীয় পথ বাতলিয়েছ, কিন্তু আসল কথাটিই তো বলোনি। ভগবান শ্রীহরির প্রতি বন্দনা, স্তুতি ও ভজনা নিবেদন করে, তোমার এই পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছ? জনসাধারণের হিতের জন্যে মহাভারত রচনা করেছ, খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু তার মধ্যে শ্রীবাসুদেবের অপার মহিমা ও ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা কোথায় বলেছ...কিস্‌সু তো বলনি...। কাজেই মহাভারত রচনা করে আত্ম-তৃপ্তি পাওয়ার আশা করছ কী করে? আমি মানছি] আপনি সত্যদর্শী, পুণ্যকীর্তি ও দৃঢ়ব্রত, আপনি অখিল লোকের বন্ধনমুক্তির জন্য শ্রীহরির লীলা সবিস্তারে বর্ণনা করুন।

সাধারণ লোকের চিত্ত স্বভাবতঃ কামনার বশীভূত, আপনি নিন্দনীয় কামনার কর্মকে কর্তব্য নির্দেশ করে অত্যন্ত অন্যায় কার্য করেছেন। আপনার বাক্যের উপর আস্থা রেখে সাধারণ লোক কাম্য ধর্মকে মুখ্য ধর্ম বলে মনে করছে এবং তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তিরা এই ধর্ম মুখ্য ধর্ম নয় বললেও, তারা সে কথা অমান্য করছে। চেতন ও অচেতন সমস্ত পদার্থের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় ভগবানই নিয়ন্ত্রণ করেন, অতএব নিখিল বস্তু ভগবানের থেকে বিচ্ছিন্ন না হলেও, ভগবান এই সমস্ত পদার্থ থেকেই আলাদা। আপনি স্বয়ং এই ভগবৎ লীলা অবগত আছেন। আপনি নিজেকে পরমপুরুষ পরমাত্মার অংশ রূপেই জানবেন, আপনি জগতের মঙ্গলের জন্য জন্মগ্রহণ করেছেন। আপনার দৃষ্টি স্বচ্ছ ও অব্যর্থ, সুতরাং আপনি মহানুভব শ্রীহরির গুণসমূহের বর্ণনা করুন। জ্ঞানীগণ বলেন, উত্তমশ্লোক ভগবানের গুণ বর্ণনাই পুরুষের তপস্যা, বেদ পাঠ, উত্তম যজ্ঞের অনুষ্ঠান, স্তব পাঠ, জ্ঞান ও দানের অক্ষয় ফলস্বরূপ।

হে তপোধন, পূর্বকল্পে, আমার পূর্বজন্মের কথা আপনাকে বর্ণনা করছি, শুনুন।

[সে যুগে দ্বৈপায়ন বেদব্যাসের পক্ষে ভাগবত পুরাণ সহ অন্য বহু পুরাণ রচনা কোনভাবেই সম্ভবপর নয়, কিন্তু পুরাণগুলি তাঁর নামেই রচিত ও প্রচারিত হয়েছিল - কারণ তিনি ছিলেন সে যুগের জনপ্রিয়তম ও অলোকসামান্য প্রতিভাধর বেদ ও শাস্ত্রবেত্তা। অতএব ধারণা করা যায়, পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতরা তাঁর নামে বিবিধ পুরাণ রচনার পাশাপাশি, মহাভারতের মূল রচনাতেও হস্তক্ষেপ করে বহু নতুন অধ্যায়ের সংযোজন করেছিলেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ "ভাগবত গীতা"। যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত, টান-টান উত্তেজনায় অপেক্ষারত কুরু ও পাণ্ডবদের বিপুল সৈন্যসমাবেশের মাঝখানে, (ভীষ্ম পর্বে) শুরু হচ্ছে অষ্টাদশ অধ্যায় গীতার আলোচনা। এই আলোচনাটি করেছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুন। ধরে নিলাম, শ্রীকৃষ্ণের ভগবৎ মহিমার প্রভাবে, তীক্ষ্ণ প্রতিভাধর অর্জুনের পক্ষে এই আলোচনার মর্ম উপলব্ধি করতে অন্ততঃ তিন-চার ঘন্টা সময় লেগেছিল (যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সারা জীবনও যথেষ্ট নয়)। এই দীর্ঘ সময় ধরে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধপক্ষের রণোৎসাহী বীর ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধন, কৃপ, অশ্বত্থামা প্রমুখ যুদ্ধক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন? বিশ্বাস করা কঠিন। তবে ভক্তরা বলবেন, শ্রীকৃষ্ণের দৈবী মায়ায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন উপস্থিত ওই সকল বীর যোদ্ধারা - অতএব এমন ঘটনা না ঘটা অসম্ভব কেন?]              


 নারদের জীবন কথা

আমার মা ছিলেন কয়েকজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী। একটু বড়ো হয়ে আমিও সেই ব্রাহ্মণদের সেবা করতাম। আমি কিন্তু আর পাঁচজন ছেলেমানুষ বালকের মতো চঞ্চল ছিলাম না কিংবা খেলাধুলোতেও আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি কথা বলতাম কম, আর সর্বদাই সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকতাম। এই পণ্ডিতরা সর্বদাই কৃষ্ণকথা বলতেন, আর তাঁর প্রসঙ্গই আলোচনা করতেন। এইভাবে সর্বক্ষণ কৃষ্ণকথা শুনতে শুনতে আমার মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি পরমভাব তৈরি হয়ে গেল। তাঁর প্রতি অবিচলিত ভক্তির জন্যে পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করতেও খুব অসুবিধে হল না। আমি অনুভব করলাম, সমস্ত মায়ার অতীত পরমব্রহ্মই আমার স্বরূপ।

বর্ষা আর শরৎকালের কয়েকমাস টানা বৃষ্টির জন্যে সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা কোথাও বেরোতে পারতেন না**, তাই ঘরে বসে, দিন রাত তাঁরা হরি সংকীর্তন করতেন।  তাঁদের সেই সংকীর্তন শুনতে শুনতে আমার মন থেকে রজঃ ও তমোগুণ দূর হয়ে গেল, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সকল আসক্তি থেকে আমি মুক্ত হয়ে গেলাম। কৃষ্ণভাবে আমার এই একনিষ্ঠ অনুরাগ, আমার বিনীত ব্যবহার, সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধাভাব এবং আমার নিরাসক্ত সেবায় তাঁরা মুগ্ধ হলেন। আমি তখন সামান্য বালক হলেও, সাক্ষাৎ ভগবানের থেকে পাওয়া অতি গোপন তত্ত্বজ্ঞানের কথা তাঁরা দয়া করে আমাকে বর্ণনা করলেন। সেই জ্ঞানের তত্ত্ব উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গেই, বিশ্ববিধাতা ভগবান বাসুদেবের মায়ার স্বরূপ ও সমস্ত কার্য-কারণ আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই সেই ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা অন্য কোন জায়গায় চলে গেলেন।

**[সন্ন্যাসীরা বর্ষাকালের চারমাস পরিব্রাজন স্থগিত করে কোন জনপদে বা গ্রামে বাস করতেন। এবং সেখানেই তপস্যা, তত্ত্ব আলোচনা, ব্রত পালন করতে করতে বিশ্রাম করতেন। এই ব্রতের নাম ছিল “চাতুর্মাস্য ব্রত” – এই ব্রতের শুরু হত আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশীতে এবং সমাপ্তি হত কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে। সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম পরবর্তী কালেও অবশ্য পালনীয় ছিল। এই চারমাস ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বর্ষার কাল - বৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুর্যোগের সময়। অতএব পথঘাট পদব্রজের উপযুক্ত নয় এবং বর্ষায় ভরা নদীগুলিও পার হওয়ার পক্ষে প্রতিকূল হয়ে উঠত।]

আমিই ছিলাম আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার যত্নের জন্যে তাঁর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু যেহেতু তিনি অন্যের ঘরে দাসীর কাজ করতেন, তাই তাঁর একমাত্র পুত্রের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেও, আমার জন্যে যথেষ্ট খাবারদাবার, জিনিষপত্র যোগাড় করে উঠতে পারতেন না। আর তাতেই তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহের বশে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। এই জগতে আমরা সবাই যে ভগবানের হাতের পুতুল, কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, সেকথা সেই অবলা, অসহায় নারী কি করে বুঝবেন? একদিন রাত্রে, মা বেরিয়েছিলেন গোয়ালের গরু দুইয়ে আমার জন্যেই দুধ আনতে, আর ফিরলেন না। যাবার সময় সাপের গায়ে হয়তো পা দিয়ে ফেলেছিলেন, সেই সাপের কামড়েই তাঁর মৃত্যু হল।

সেই বালক বয়েসেই আমার সেই একমাত্র মায়া এবং ভালোবাসার বন্ধন ছিঁড়ে গেল। আমার মনে হল, এও ভগবান বাসুদেবের করুণা, মায়ার বাঁধন থেকে মুক্ত করে, তিনি আমাকে বিশ্বজগতের সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম উত্তরদিকে। অনেক শহর, গ্রাম, পাহাড়, পর্বত, ফুলের বাগান, বন, উপবন, নদী, সরোবর দেখলাম। কত ধরনের মানুষ, পাখি, প্রাণী, গাছপালা, অরণ্যের জন্তু, জানোয়ার দেখলাম। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন এক অরণ্যের মধ্যে ভীষণ ক্লান্তি আর খিদেয় অবসন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এক জায়গায় একটি নদীসরোবর দেখে সেখানে স্নান করলাম, পেট ভরে জল পান করলামতারপর সেই জনহীন বনের মধ্যে এক বিশাল অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে, পরমাত্মার ধ্যান করতে শুরু করলাম।

অনেকক্ষণ ভগবানের শ্রীচরণকমলের ধ্যান করতে করতে আমার মন ভক্তিতে বিবশ হয়ে এল। আমার দু চোখে নেমে এল ভক্তি বিহ্বল অশ্রুর ধারা। অবশেষে তিনি আমার মনের মধ্যে প্রকাশ হলেনআমি তাঁকে অনুভব করলাম আমার অন্তরে। আমার সমস্ত শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম, ব্যাকুল হয়ে ডুবে গেলাম পরম আনন্দ সাগরে। আমি ভুলেই গেলাম আত্মা আর পরম আত্মার সকল তত্ত্ব।  সেই অনুভবের পর আমি যখন স্বজ্ঞানে ফিরলাম, তাঁর দর্শন পাওয়ার জন্যে, আমি ব্যাকুল হয়ে গেলাম। আমার অন্তরে তাঁর সেই অল্প সময়ের উপস্থিতিতে আমার মন ভরল না। তাঁকে কাছে পেয়েও তাঁকে দেখতে না পাওয়ার চরম দুঃখ আমাকে গ্রাস করল। আমার সমস্ত অন্তরে তখন শুধু হাহাকার, আমার নিজেকে তখন দীনের থেকেও অত্যন্ত দীন বলে মনে হচ্ছিল।

এইরকম অবস্থার মধ্যেই একদিন তাঁর কথা শুনতে পেলাম, তিনি গভীর করুণাময় মধুর কণ্ঠে আমাকে বললেন – বৎস নারদ, এই জন্মে তুমি আর আমাকে দেখতে পাবে না, কাজেই বৃথা চেষ্টা করো না। আমি তোমাকে একবার মাত্র দেখা দিলাম, যাতে তোমার অন্তর আমাতেই আসক্ত থাকে। কারণ, সকল ভক্তই সমস্ত কামনা বিসর্জন দেয়, শুধুমাত্র আমার দর্শন পাওয়ার ইচ্ছায়। যোগীর মন থেকে সমস্ত কামনা দূর না হলে, সে যোগী অসম্পন্ন যোগী, তাদের আমি দর্শন দিই না। তুমি বালক বয়সে খুব অল্প কিছুদিনের জন্য সাধুসেবা করলেও আমার প্রতি তোমার গভীর অনুরাগে আমি প্রসন্ন হয়েছি। এই জীবনের শেষে তুমি আমারই পার্ষদ হবে। আমার প্রতি যার চিত্ত সর্বদা অনুরক্ত থাকে, তার কোন কালেই আর কোন বিপদের সম্ভাবনা থাকে না। এমন কি বিশ্বের সৃষ্টি ও প্রলয়ের সময়েও, সেই ভক্তের স্মৃতি আমি অক্ষুণ্ণ রাখি। 

এই আদেশ দিয়ে নিরাকার ভগবান চলে গেলেন। তাঁর এই অদ্ভূত করুণা পেয়ে আমি কৃতার্থ হয়ে তাঁকে বার বার প্রণাম করলাম আর তারপর আমিও বেরিয়ে পড়লামজগতের প্রতিটি জীবের মঙ্গলের জন্যে তাঁর প্রাত্যহিক লীলা দেখতে দেখতে, আমি গোটা পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াতে লাগলাম, আর দিন গুণতে শুরু করলাম, কবে হবে আমার এই দেহের বাঁধন থেকে মুক্তি আর তাঁর সঙ্গে হবে পরম মিলন। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, এল সেই শুভ দিন, আমার এই দেহ মৃত্যু বরণ করলআর আমি লাভ করলাম তাঁর নিত্য পার্ষদদেহ।

এই কাহিনী কিন্তু এই কল্পের নয়এ সব ঘটনা ঘটে গেছে বহু কল্প আগে। তারপর বহুবার এক কল্পের অন্তে ঘটে গেছে জগতের প্রলয়, সৃষ্টি হয়েছে নতুন কল্পের নতুন জগৎ। এক কল্পের অন্তে শ্রীনারায়ণ যখন কারণ-সাগরে শয়ন করেন, তাঁর সঙ্গে লীন হয়ে যান স্বয়ং ব্রহ্মও। তাঁর নিশ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করে, আমিও তাঁর ভিতরেই বাস করি। তারপর হাজার হাজার দিব্য যুগ পার করে, যখন নতুন কল্পে নতুন সৃষ্টির সময় হয়, শ্রীনারায়ণের নাভি কমল থেকে জেগে ওঠেন ব্রহ্মা। আর ভগবানের ইন্দ্রিয় থেকে মরীচিগণ ও আমার জন্ম হয়।  মহাবিষ্ণুর পরম করুণায়, আমরা আগেকার কোন জন্মের স্মৃ্তিই ভুলি না আমি চিরকাল ব্রহ্মচর্য্য পালন করি।  তাঁর করুণায়, এই তিন ভুবনে এমন কোন স্থান নেই যেখানে আমি না যেতে পারি। এই কল্পে তিনি আমাকে একটি বীণা দিয়েছেন। এই বীণার স্বরগ্রাম স্বতঃসিদ্ধ। এই বীণায় সুর তুলে, আমি দেশে দেশে, ঘরে ঘরে, তাঁর মহিমা গেয়ে বেড়াই। এই বীণার সুরে তিনি সর্বদাই আমার মনের মন্দিরে বাস করেন, আর আমিও সর্বদা তাঁর করুণার আশ্রয়ে থাকতে পারি।

অতএব, আপনি মনে আর কোন দ্বিধা রাখবেন নামনে রাখবেন, কামনা ও আসক্তিতে ভরা এই জগৎ সমুদ্র, তাঁর মহিমার ভেলাতেই পার হওয়া সম্ভব। যাগ, যজ্ঞ, যোগ সাধনার চেয়েও, শুধুমাত্র শ্রীমধুসূদনের একান্ত সেবাই, মনকে পরম শান্তি এনে দিতে পারে। অতএব, আপনি আর দেরি না করে, শ্রীহরির মাহাত্ম্য বর্ণনা করুনআপনার সুমধুর ভাষায় প্রচার করুন, তাঁর পরম লীলার পরম তত্ত্বকথা।  এছাড়া, আপনার মুক্তির আর অন্য কোন পথ নেই, হে মুনিবর”


সূত বললেন, প্রয়োজন ও সংকল্পশূণ্য দেবর্ষি নারদ ব্যাসদেবের সঙ্গে এইরূপ আলাপ আলোচনার পর বিদায় নিলেন এবং বীণাযন্ত্র আলাপ করতে করতে প্রস্থান করলেন। দেবর্ষি নারদই ধন্য! তিনি পরমানন্দে শ্রীহরির যশ গান করতে করতে দুঃখদগ্ধ জগৎকে শীতল করে থাকেন। 

[সেকালে ভর্তৃহীনা নারীর প্রতিভাবান পুত্রদের সমাজবরেণ্য হতে কোন বাধা ছিল না, এখানে দেবর্ষি নারদের কথা শুনলাম, উপনিষদের ঋষি সত্যকামের কথা শুনেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় - "জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে"। নারদ অবশ্য এখানে তাঁর মায়ের নামটি প্রকাশ করলেন না - "বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের দাসী" বলেই মায়ের পরিচয় পর্বটি সেরে ফেললেন।]    

চলবে...


বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ "


   ৩

সৃষ্টি তত্ত্ব

শ্রীসূত বললেন, “সৃষ্টির আদিতে ভগবান লোক সৃষ্টি করার জন্যে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক), পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (মস্তিষ্ক, হাত, পা, পায়ু ও উপস্থ), মন ও পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম), এই ষোলটি অংশে রচিত পুরুষ মূর্তি ধারণ করেছিলেন। যিনি কারণসমুদ্রে যোগনিদ্রায় শয়ান ছিলেন এবং যাঁর নাভিরূপ হ্রদে উৎপন্ন পদ্ম থেকে প্রজাপতিগণের পিতা ব্রহ্মার আবির্ভাব হয়েছিল, ইনিই সেই নারায়ণ। বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ উদ্গত হয়, তেমনি অক্ষয় বীজস্বরূপ আদি নারায়ণ মূর্তি থেকেই নিখিল অবতার মূর্তি আবির্ভূত হয়ে থাকে। অবতারগণের লীলা অবসান হলে, তাঁরা আবার ওই মূর্তির মধ্যেই লীন হয়ে যান। শ্রীনারায়ণের নাভি পদ্ম থেকে ব্রহ্মা আবির্ভূত হয়ে মরীচি প্রমুখ প্রজাপতিগণের সৃষ্টি করেন এবং সেই প্রজাপতিগণ দেবতা, নর ও পশু প্রভৃতি ইতর জীবের সৃষ্টি করেছিলেন।

এই পদ্মনাভ নারায়ণ প্রথম অবতারে সনৎকুমার প্রমুখ ব্রাহ্মণরূপে দুষ্কর ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেছিলেন। দ্বিতীয় অবতারে যজ্ঞপতি শ্রীহরি বরাহরূপে, রসাতল থেকে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছিলেন, সৃষ্টির অবস্থানের জন্য। দেবর্ষি নারদ তাঁর তৃতীয় অবতার। এই অবতারে ভগবান পঞ্চরাত্র নামে বৈষ্ণবতন্ত্র প্রকাশ করেছিলেন। মানুষ কর্ম করেও কিভাবে কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে এই তন্ত্রে সেই তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। চতুর্থ অবতারে ইনি ধর্মের পুত্র নর ও নারায়ণ দুই ঋষি* রূপে আত্মার শান্তির জন্য দুশ্চর তপস্যা করেছিলেন। সিদ্ধ মুনিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কপিল তাঁর পঞ্চম অবতার। এই মূর্তিতে আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে কাল প্রভাবে লুপ্ত হতে যাওয়া সাংখ্যশাস্ত্র উপদেশ দিয়েছিলেন। সাংখ্য সমস্ত তত্ত্বের নির্ণায়ক তত্ত্ব। ষষ্ঠ অবতারে অত্রিপত্নী অনসূয়ার পুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং অলর্ক ও প্রহ্লাদকে আত্মবিদ্যা উপদেশ দিয়েছিলেন। তারপর সপ্তম অবতারে রুচি ও আকূতির পুত্র যজ্ঞ নামে জন্মগ্রহণ করে, স্বায়ম্ভূব মন্বন্তর পালন করেছিলেন। অষ্টম অবতারে নাভি ও মেরুদেবীর পুত্র ঋষভ নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শান্ত গুণের অনুসরণে চার আশ্রমের কর্তব্য পরমহংসগণের পথ প্রকাশ করেছিলেন।

[*এই নর ও নারায়ণ দুই ঋষিকে শাস্ত্রমতে আমরা আরও দু বার পেয়েছি, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন রূপে আর এই কলি যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ রূপে।]  

হে বিপ্রগণ, নবম অবতারে শ্রীহরি ঋষিদের প্রার্থনায় পৃথু* নরপতি রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পৃথিবীতে ওষধির সৃষ্টি করেছিলেন। এই অবতার অত্যন্ত রমণীয় বলে কথিত আছে। চাক্ষুষ মন্বন্তরের অবসানে, যখন মহাপ্লাবন ঘটেছিল, তখন বৈবস্বত মনুকে একটি নৌকায় বসিয়ে তিনি মৎস্য অবতার রূপে জগতের জীবকে রক্ষা করেছিলেন। এই অবতার তাঁর দশম অবতার রূপ। একবার দেবতা ও অসুরেরা মন্দর পর্বত দিয়ে সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, একাদশ অবতারে তিনি কূর্মরূপ ধারণ করে ওই মন্দর পর্বতের আধার স্বরূপ হয়েছিলেন। দ্বাদশ অবতারে ধন্বন্তরি ও ত্রয়োদশ অবতারে মোহিনী রূপ ধারণ করেছিলেন এবং অসুরদের মুগ্ধ করে দেবতাদের সুধা পান করিয়েছিলেন। চতুর্দশ অবতারে শ্রীনারায়ণ ভয়ংকর নৃসিংহমূর্তি ধারণ করে, মহা শক্তিধর হিরণ্যকশিপুকে নিজের উরুদেশে রেখে, নখের সাহায্য তার বক্ষ চিরে হত্যা করেছিলেন। পঞ্চদশ অবতারে শ্রী হরি বামনরূপে বলিরাজের যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে স্বর্গ থেকে বিচ্যুত করার জন্যে তিন পদ পরিমাপ ভূমি যাঞ্চা করেছিলেন।

[* পৃথু নরপতি রূপে শ্রীহরির  অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনাটিকেই আমি উপন্যাস রূপে এই ব্লগে উপস্থাপিত করেছি - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "] 

ষোড়শ অবতারে ক্ষত্রিয় নৃপতিগণকে ব্রাহ্মণ বিদ্বেষী দেখে অতি উগ্র পরশুরাম রূপে, পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। সপ্তদশ অবতারে পরাশর ও সত্যবতীর পুত্র ব্যাসদেব রূপে অবতীর্ণ হয়ে, অল্পবুদ্ধি মানবদের কল্যাণের জন্য সমস্ত বেদকে ভিন্ন ভিন্ন শাখায় বিভক্ত করেছিলেন। অষ্টাদশ অবতারে দেবকার্যে রঘুকুলে শ্রীরামচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হয়ে সমুদ্রবন্ধন ও লঙ্কাবিজয় ইত্যাদি ঐশ্বর্য প্রদর্শন করেছিলেন। একোনবিংশ ও বিংশ অবতারে ভগবান নারায়ণ, যদুবংশে বলরাম ও কৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হয়ে ধরণী থেকে পাপের ভার হরণ করেছিলেন। এরপর একবিংশ অবতারে, কলিযুগের শুরুতে দেব বিদ্বেষীদের মোহ সৃষ্টির জন্যে কীকট প্রদেশে অজনের পুত্র বুদ্ধ নামে খ্যাত হবেন। কলিযুগের অবসানে রাজগণ দস্যুর মতো আচরণ করলে, ব্রাহ্মণের পুত্র হয়ে কল্কি নাম ধারণ করবেন, এবং সেটিই হবে তাঁর দ্বাবিংশ অবতার।

[এখানে শ্রীহরির বাইশটি অবতারের কথা বলা হল - যার মধ্যে শেষ অবতার - কল্কি ভূভার হরণ করতে কবে আসবেন কে জানে? প্রসঙ্গতঃ বিষ্ণুর দশাবতার হল পূর্ণ-অবতার এবং বাকি বারোটি অংশ-অবতার।]

হে দ্বিজগণ, ক্ষয়শূণ্য সরোবর থেকে যেমন সহস্র সহস্র জলধারা নির্গত হয়, তেমনই নিখিল আবির্ভাবের মূলাধার শ্রীহরির থেকে অসংখ্য অবতার আবির্ভূত হন। মহাতেজ ঋষিগণ, মনুসমূহ, সকল দেবতা ও প্রজাপতি, সকলেই শ্রীভগবানের কলা অর্থাৎ বিভূতি। যে অবতারের কথা আগে বললাম, তাঁদের কেউ কেউ শ্রী নারায়ণের অংশ, কেউ কেউ তাঁর কলা। মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ এবং সনৎকুমার, কপিল, নারদ প্রমুখ তাঁর কলা। কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান। অসুরেরা যখন জগতে নানান উৎপীড়ন করে, অবতারগণ যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে জগতের শান্তি ও মঙ্গল বিধান করেন। যে ব্যক্তি শুদ্ধচিত্তে সকালে ও সন্ধ্যায় ভগবানের এই জন্ম রহস্য কীর্তন করেন কিংবা শোনেন, তিনি সংসারের অশেষ দুঃখ থেকে নিস্তার পান।

[এখানে আবার বলা হচ্ছে "মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ প্রমুখ তাঁর অংশ" অর্থাৎ অংশ-অবতার, পূর্ণ-অবতার নয়। শ্রীকৃষ্ণ আবার অবতার নন, তিনি সাক্ষাৎ ভগবান।] 

এইবার বলি, দেহ সম্বন্ধ থাকলেও কিভাবে জীবের মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জীবের আত্মা চৈতন্যস্বরূপ, কিন্তু স্থূলদেহ ভগবানের মায়ায় বিরচিত। এই দেহকেই যখন আত্মা বলে বোধ হয়, তখনই জীব মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে। অজ্ঞব্যক্তি হাওয়ার বেগে ভেসে চলা মেঘকে দেখে আকাশ ভেসে চলেছে মনে করে কিংবা ধুলিঝড়ের ধূসর বর্ণ বায়ুতে আরোপ করে, বায়ুকেই ধূসর বর্ণ মনে করে। তেমনই অবিবেকী জীব সর্বসাক্ষী চেতনে, জড় ও দৃশ্য দেহকে আরোপ করে, দেহই আত্মা এই ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন হয়। এই স্থূল দেহ ছাড়াও আরেকটি সূক্ষ্ম দেহ আছে, সেই দেহকে লিঙ্গ দেহ বলে। ওই দেহকে দেখা যায় না কিংবা শোনাও যায় না, ওই দেহে হাত, পা ইত্যাদি কোন অবয়বও নেই। এই কারণে লিঙ্গ দেহকে অব্যক্তও বলা যায়। স্থূলদেহের বিনাশে, এই লিঙ্গদেহই জন্ম ও মরণের বশে বার বার সংসার দশা ভোগ করে। যতদিন অবিদ্যা বা অজ্ঞান, আত্মার স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে, মনে নানান বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কিন্তু যখন বিদ্যা অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞানের উদয় হয়, তখন তত্ত্বজ্ঞ পুরুষ পরমানন্দে বিরাজ করেন।

পরমেশ্বর ও জীবে প্রভেদ এই যে, পরমেশ্বর স্বতন্ত্র পুরুষ, কিন্তু জীব মায়ার অধীন। তিনি নির্লিপ্তভাবে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করছেন। মানুষ যেমন দূর থেকে ফুলের গন্ধ উপভোগ করে, সর্বভূতের অন্তর্যামী ছয় ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা পরমেশ্বর, সম্পূর্ণ অনাসক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয় ঠিক তেমন ভাবেই গ্রহণ করে থাকেন। ভক্তিহীন জ্ঞানীরা তর্ক বিতর্ক ও কৌশলে তাঁর নাম, রূপ ও লীলার তত্ত্ব কখনোই বুঝতে পারে না। যিনি এই চক্রপাণি পরমপুরুষের চরণপদ্মের সৌরভে সর্বদা অকপট আনন্দ অনুভব করেন, তিনিই এই বিশ্ববিধাতার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন। এই জগতে আপনারা ধন্য, কারণ অখিল লোকপতি বাসুদেবে আপনাদের ঐকান্তিকী রতি উৎপন্ন হয়েছে।

এই শ্রীমৎভাগবত পুরাণ সকল বেদের সমান। ভগবান বেদব্যাস লোকহিতের জন্য সকল বেদ ও ইতিহাসের সার সংগ্রহ করে হরিলীলাপূর্ণ এই মহাপুরাণ রচনা করেছিলেন। জিতেন্দ্রিয় যোগীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নিজের পুত্র শুকদেবকে, ভুবনমঙ্গল এই গ্রন্থ রচনা করে পাঠ করতে দিয়েছিলেন। ব্রহ্মশাপগ্রস্ত মহারাজ পরীক্ষিৎ আমৃত্যু অনশনে যখন গঙ্গাতীরে বসেছিলেন, সেই সময় অন্যান্য মহর্ষিদের সঙ্গে মহারাজ পরীক্ষিৎকেও শ্রী শুকদেব এই গ্রন্থের বর্ণনা শুনিয়েছিলেন। হে বিপ্রগণ, যখন মহাতেজা ব্রহ্মর্ষি শুকদেব এই পুরাণ সকলকে শোনাচ্ছিলেন, সেই মহৎ সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমার বুদ্ধি অনুসারে, এই পুরাণের অর্থ আমি যতদূর অবধারণ করতে পেরেছি, আপনাদের কাছে তাই আমি বর্ণনা করবো”। 

 

সুদীর্ঘ যজ্ঞে দীক্ষিত ঋক বেদজ্ঞ বৃদ্ধ শৌনক বললেন, “হে সূত, ভগবান শুকদেব যে ভাগবত পুরাণের কথা কীর্তন করেছিলেন, সেই পুরাণ আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। শুনেছি, ব্যাসদেব মহাভারত ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছিলেন, তিনি আবার কোন সময়ে, কোথায় এবং কী উদ্দেশে এই পুরাণ রচনা করলেন? আপনি বললেন, তাঁর পুত্র শুকদেব এই পুরাণ কীর্তন করেছেন, কিন্তু তা কী করে সম্ভব? কারণ তিনি মহাযোগী, সর্বভূতে সমদর্শী, শত্রুমিত্র ভেদজ্ঞান রহিত। মোহবন্ধনের অতীত এবং ব্রহ্মে একনিষ্ঠ থেকে তিনি গোপনে বিচরণ করেন। তাঁকে দেখলে হিতাহিত বোধশূণ্য এক বালকের মতো মনে হয়। একবার প্রব্রজ্যা নিয়ে, তিনি নগ্ন দেহেই বেরিয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে ব্যাসদেব ছুটেছিলেন পুত্রের পিছনে। পথের পাশে থাকা একটি সরোবরের জলে একদল সুন্দরী অপ্সরা স্নান করছিল, তারা মহাযোগী কিন্তু যুবক শুকদেবকে দেখে লজ্জা পেল না, কিন্তু বৃদ্ধ ব্যাসদেবকে দেখে তারা লজ্জায় বস্ত্র পরে ফেললএই ঘটনায় অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে, ব্যাসদেব ওই অপ্সরাদের এর কারণ জিগ্যেস করলে, অপ্সরা রমণীরা বলেছিল, আপনার পুত্রের দৃষ্টি পবিত্র, তিনি যুবক হলেও তাঁর দৃষ্টিতে নারীপুরুষ ভেদ নেই, কিন্তু আপনার সেই ভেদজ্ঞান রয়েছে।

তিনি উন্মত্ত ও মূকের মতো ঘুরতে ঘুরতে, কুরুজাঙ্গাল অতিক্রম করে হস্তিনাপুরে যখন পৌঁছলেন, তাঁকে নগরবাসীরা চিনতে পারল কী করে? তাঁর সঙ্গে রাজর্ষি পরীক্ষিতের আলোচনাই বা কিভাবে সম্ভব হল? তিনি গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য গৃহস্থবাড়িতে গোদোহন কালের বেশী থাকেন না, সেই যোগী শুকদেব সুদীর্ঘ সময় ধরে এই পুরাণ কীর্তন ও ব্যাখ্যা কী করে করলেন? হে সূত, অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ ভক্তদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁর অতি আশ্চর্য জন্ম ও কর্ম বৃত্তান্ত আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। পাণ্ডুবংশতিলক মহাবীর সম্রাট পরীক্ষিৎ তাঁর যৌবনেই রাজ্যলক্ষ্মী ত্যাগ করে, কিসের কারণে অনশনে প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প করেছিলেন? যাঁরা ভগবানের চরণে আত্ম সমর্পণ করেন, তাঁরা নিজের জন্য কিছুই করেন না, লোকহিতের জন্যেই তাঁরা প্রাণধারণ করেন। অতএব, মহারাজ কিসের জন্য পরমবৈরাগ্য অবলম্বন করে নিজের দেহও পরিত্যাগ করলেন? আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী, অতএব আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাদের তৃপ্তি দান করুন”

[গোদোহন কাল - অর্থাৎ একটি গাই দুইতে যতটা সময় লাগে - এখনকার হিসেবে মিনিট পাঁচ-দশ বড় জোর।]

[বেদজ্ঞ ঋষি শৌণক, এই পুরাণ কথক সূত্রধর অর্থাৎ সূতকে বলছেন, "আপনি বেদ ছাড়া সকল শাস্ত্রেই পারদর্শী", অর্থাৎ সূত্রধর যেহেতু অব্রাহ্মণ - তিনি সব শাস্ত্রে পারদর্শী হতে পারেন - কিন্তু বেদের বিদ্যায় তিনি 'লবডংকা'। ঋষি শৌণকের এই শ্লেষটুকু বেশ লক্ষ্যণীয় বিষয় সন্দেহ নেই।]  

সূত বললেন, “দ্বাপর যুগের অবসানকাল আসন্ন হলে, ঋষি পরাশর ও বসুকন্যা সত্যবতীর পুত্র হয়ে, যোগী ব্যাসদেব শ্রীহরির অংশে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন সূর্যোদয়কালে সরস্বতীর পবিত্র জলে স্নান আহ্নিক সেরে, ব্যাসদেব তাঁর বদরিকা আশ্রমে ধ্যানে বসলেন। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি দিব্যনেত্রে অনুভব করলেন, কালের অমোঘ প্রভাবে যুগধর্মের বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। তিনি দেখলেন, জীবের স্থূলদেহ শক্তিহীন এবং মানুষ শ্রদ্ধাহীন, সত্ত্বগুণরহিত, মন্দমতি, অল্পায়ু ও ভাগ্যহীন হতে চলেছে। সর্বজ্ঞ মুনি বেদব্যাস মানুষের এই অবস্থা দেখে চতুর্বর্ণ ও চার আশ্রমের কিসে মঙ্গল হয়, এই চিন্তা করলেন। তিনি চিন্তা করলেন, বৈদিক যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মানুষের চিত্তশুদ্ধি হয়, অতএব যজ্ঞ ক্রিয়া অনুষ্ঠান যাতে লুপ্ত না হয়ে যায়, সেই ইচ্ছাতে বেদকে ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব এই চার ভাগে বিভক্ত করলেন এবং ইতিহাস ও পুরাণকে পঞ্চম বেদ হিসাবে গ্রন্থিত করলেন।

মহর্ষি হৈল ঋকবেদজ্ঞ, মহর্ষি জৈমিনি সামবেদজ্ঞ এবং বৈশম্পায়ন যজুঃ বেদে পারদর্শী ছিলেন। মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। আমার পিতা রোমহর্ষণ ইতিহাস ও পুরাণে বিশেষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। ঋষিরা নিজ নিজ শিষ্যদের মধ্যে নিজ নিজ বেদের বহুল প্রচার করতে শুরু করলেন। অত্যন্ত অজ্ঞান ব্যক্তিও যাতে বেদের তত্ত্ব বুঝতে পারে, ব্যাসদেব সেই ভাবেই বেদের বিভাগ করেছিলেন। স্ত্রীলোক, শূদ্র ও পতিত জাতির বেদ চর্চায় অধিকার না থাকায়, তাদের সকলের চিত্তশুদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য ঋষি বেদব্যাস মহাভারত নামে বিশাল আখ্যায়িকা রচনা করলেন।

[মুনি সুমন্ত মারণ, উচাটন প্রভৃতি অথর্ব বেদে উল্লেখ করা দারুণ আভিচারিক কর্মে সুনিপুণ ছিলেন। এই মারণ-উচাটনের কথা বলা হলেও -  সমাজের মূল ব্রাহ্মণদের প্রকৃত আপত্তি ছিল, সুমন্ত মুনির মতো কৃতী বৈদ্যরা মানুষ ও পশুর শব ব্যবচ্ছেদ করতেন (dissection) জীবদেহের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিন্যাস প্রত্যক্ষ করতে। মুনি সুমন্ত অথর্ব বেদে সুনিপুণ - অর্থাৎ শাস্ত্রমতে তিনি চতুর্বেদী - (আধুনিক মতে) চৌবে - অর্থাৎ বৈদ্য। এই বৈদ্যরাও আদিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু তাঁরা ওই আভিচারিক কর্মে সুদক্ষ হওয়ায়, পরবর্তী কালে এবং আজও উত্তরভারতের বহু স্থানে সমাজ তাঁদের পতিত বা ভ্রষ্ট-ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য করে। ব্রিটিশ যুগে ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের আগে, সারা ভারতে বৈদ্যরাই ছিলেন মানুষ ও গৃহপালিত পশুর চিকিৎসক। কিন্তু হলে কি হবে, ব্রাহ্মণদের সঙ্গে একত্রে পংক্তিভোজন এবং দেব-দেবীর পূজার্চনায় তাঁদের অনুমতি ছিল না।]     

একদিন ধর্মবিৎ ঋষি বেদব্যাস অপ্রসন্ন চিত্তে নির্জন সরস্বতীর তীরে বসে, চিন্তা করলেন, “আমি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রতধারণ করে দেব, অগ্নি ও গুরুজনের সমুচিত পূজা ও তাঁদের আজ্ঞা প্রতিপালন করেছি। শূদ্ররাও যাতে ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব বুঝতে পারে, সেই উদ্দেশে মহাভারতের ছলে সকল বেদের সারাংশ প্রকাশ করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য, আত্মায় ব্রহ্মতেজ ও পূর্ণতা উপলব্ধি করেও, মনে হচ্ছে আমার স্বরূপ লাভ হয়নি। যে ভক্তিধর্ম অচ্যুত ও ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয়, আমি সেই ভক্তিধর্মের বিস্তারিত রূপ কীর্তন করিনি বলেই কী আমার আত্মাকে বিচ্ছিন্ন এবং অপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে?”

ঋষি যখন নির্জনে বসে, এই রকম চিন্তা করছেন, সেই সময় তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলে দেবর্ষি নারদ। 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৩ "


বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগে গীতার শেষ অধ্যায়ঃ মোক্ষযোগ গীতা - ১৮শ পর্ব "




প্রাককথা 

    ভারতীয় সনাতন ধর্মের অসংখ্য ধর্মশাস্ত্রগুলির মধ্যে বহু সংখ্যক পুরাণ প্রচলিত ছিল। তাদের মধ্যে অনেক পুরাণই কালপ্রবাহে অবলুপ্ত। অনেক পুরাণ অত্যন্ত অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কারণে বর্জিত। সনাতনী পণ্ডিতগণ বর্তমানে আঠারোটি পুরাণকে মহাপুরাণের মর্যাদা দিয়ে থাকেন। এই মহাপুরাণগুলি হল, অগ্নি, ভাগবৎ, ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মবৈবর্ত, গরুড়, কূর্ম, লিঙ্গ, মার্কণ্ডেয়, মৎস্য, নারদ, পদ্ম, শিব, স্কন্দ, বামন, বরাহ, বায়ু, বিষ্ণু।  

    প্রত্যেকটি পুরাণেরই প্রধান বিষয় ত্রিদেব অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এছাড়াও নানান কাহিনী, বিচিত্র তত্ত্বকথা - সেগুলি প্রায়শঃ অবান্তর আবার কখনো কখনো পরষ্পরবিরোধী – বিষয় নিয়েও পুরাণগুলি বিরচিত। এই আঠারোটি মহা পুরাণের মধ্যে ভাগবত – যার পূর্ণ নাম শ্রীমদ্ভাগবত - সবথেকে জনপ্রিয়। প্রকৃতপক্ষে জনপ্রিয়তার বিচারে রামায়ণ-মহাভারতের পরেই থাকবে এই পুরাণ গ্রন্থটি।

    মূলতঃ শ্রীবিষ্ণুর মহিমাগাথা এই বিশাল পুরাণটি, রামায়ণ যেমন সাতটি কাণ্ডে ও মহাভারত যেমন আঠারোটি পর্বে, তেমনি বারোটি স্কন্ধে বিভক্ত। প্রতিটি স্কন্ধ অনুসরণ করে শ্রীবিষ্ণুর কীর্তিগাথা সহজভাষায় আন্তরিকভাবে আমি বর্ণনা করেছি, যদিও প্রতিটি অধ্যায়ের অন্তে থাকা শ্রীবিষ্ণুর সুদীর্ঘ মহিমাগাথা পাঠে পাঠকের জীবনে কী কী অত্যাশ্চর্য ফললাভ হবে – সেই পুনরুক্তিগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি বর্জন করেছি।

    আমার এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য ভক্তি-প্রচার নয় – বরং বিভিন্ন যুগে ভারতের সামাজিক বিন্যাস, রাজা ও প্রজার সম্পর্ক কিংবা উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের ভেদাভেদ এবং মানবিক মূল্যবোধসূচক ঘটনা বা কাহিনীগুলিই বর্ণনা করেছি। জন্মসূত্রে হিন্দু হওয়ার কারণে সুপ্রাচীন ও মহৎ এক ঐতিহ্যের অংশীদার হয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। কিন্তু আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলির কোনটাই না পড়ে, না জেনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী যেন হয়ে না উঠি - এটাই আমার এই প্রচেষ্টার প্রকৃত উদ্দেশ্য।         

       

 

প্রথম স্কন্ধ - প্রথম পর্ব 

গ্রন্থ পরিচয়

আমরা সত্যস্বরূপ সেই পরমেশ্বরকে প্রণাম করি। এই বিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় যাঁর নিয়ন্ত্রণে, যিনি কারণরূপে অবস্থান করছেন বলে, নিখিল বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে; যাঁকে প্রকাশের জন্য অন্য আলোকের প্রয়োজন হয় না, বস্তুত যিনি নিজেকে নিজেই প্রকাশ করে থাকেন; যে বেদতত্ত্ব উপলব্ধি করতে জ্ঞানীগণের বুদ্ধিও পরাস্ত হয়, সেই বেদতত্ত্বকে আদি কবি ব্রহ্মার অন্তরে যিনি ব্যক্ত করেছিলেন; ত্রিগুণের অতীত হয়েও, যাঁর তমোগুণ থেকে ক্ষিতি, জল প্রভৃতি ভূতসমূহ, রজোগুণ থেকে সকল ইন্দ্রিয় ও সত্ত্বগুণ থেকে দেবতাগণ সৃষ্টি হয়েছে, আমরা সত্যস্বরূপ সেই পরমেশ্বরের ধ্যান করি।

এই মনোহর শ্রীমৎভাগবত মহামুনি শ্রী নারায়ণ প্রথম সংক্ষেপে বলেছিলেন। এই গ্রন্থে শ্রীহরির আরাধানাই পরমধর্ম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ধর্মের বিশেষত্ব এই যে, অন্যান্য ধর্ম যে স্বর্গলাভকেই মুক্তি হিসেবে জীবের চরম লক্ষ্য বলে নির্দেশ করেছে, এই ধর্মে সেই মুক্তিকে, অনেক কামনার মধ্যে তুচ্ছ আরেকটি কামনার মতোই অবহেলা করা হয়েছে। যাঁরা সর্বদা জীবের হিতকামনায় নিরত, সেই সাধু ব্যক্তিরাই এই পবিত্র ধর্মের অনুষ্ঠান করেন। মায়াময় এই জগতে যিনি একমাত্র সত্য এবং যিনি নিরন্তর প্রাণীদের মঙ্গল সাধন করছেন, এই গ্রন্থ পাঠে সেই সত্য তত্ত্ব উপলব্ধি করা যায়। শ্রীভগবানের তত্ত্ব জানতে পারলেই জীবের সংসার জ্বালা দূর হয়ে যায়।

বেদ কল্পবৃক্ষ, শ্রীমৎভাগবত সেই বৃক্ষের ফল। শুকপাখির চঞ্চু থেকে যেমন মধুর ফল খসে পড়ে, তেমনই এই সুধাময় শ্রীমৎভাগবত ফল মহাযোগী শ্রীশুকদেবের মুখ থেকে জগতে আবির্ভূত হয়েছে। আম ইত্যাদি ফলের খোসা ও বীজ ফেলে দিয়ে ফলের রস আস্বাদন করতে হয়, কিন্তু এই ফলের কোন অংশই পরিত্যাগ করার যোগ্য নয়, এই ফলের সমগ্র অংশই রসস্বরূপ। হে রসজ্ঞ, ভাবুকগণ, আপনারা এই গ্রন্থের সুধারস পান করতে থাকুন। 

 

 একবার শৌনক প্রমুখ ঋষিগণ, ভগবানকে লাভ করার আশায় বিষ্ণুক্ষেত্র নৈমিষারণ্যে সহস্র বছর তপস্যায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেন রোমহর্ষণপুত্র সূত। সমবেত ঋষিরা তাঁকে সশ্রদ্ধ অভ্যর্থনা করে, সম্মানীয় আসন দান করলেন এবং বললেন, “হে মহাত্মন, আপনি বেদজ্ঞগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আপনি মহাভারত, ইতিহাস, পুরাণ ও অন্যান্য সকল শাস্ত্র পাঠ ও ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি ভগবান বেদব্যাস ও অন্যান্য মুনিদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। উক্ত শাস্ত্রসমূহে জীবের পক্ষে আশু ফলপ্রদ ও একান্ত কল্যাণকর যে তত্ত্ব আপনি উপলব্ধি করেছেন, আপনি আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। এই কলিযুগে মানুষের আয়ু অত্যন্ত অল্প, তার উপর ব্যাধি ও বিঘ্নে মানুষ অত্যন্ত আকুল। অন্যদিকে নানাবিধ শাস্ত্রে নানান কর্ম ও ধর্মের নির্দেশ দেওয়া আছে; সুতরাং ওই সকল শাস্ত্রের যা সার, অর্থাৎ যা শুনলে জীবের মঙ্গল হয় ও চিত্ত প্রসন্ন হয়, সেই সার-সংক্ষেপ বর্ণনা করুন। শ্রীভগবানের নামের অপার মহিমা। ঘোর সংসারী পতিত অবস্থায়, অবশভাবেও তাঁর নাম গ্রহণ করলে, সেই ব্যক্তির শীঘ্র মুক্তি লাভ ঘটে। জীবকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে ও তাদের সুখের জন্যে ভগবান যুগে যুগে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। তাঁর সেই সব লীলা কথা শুনতে আমরা সকলে উন্মুখ, আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন”

রোমহর্ষণপুত্র সূত ঋষিদের এই অনুরোধে অত্যন্ত প্রীত হলেন, তিনি বললেন, “যাঁর কর্মের সকল বন্ধন অবসান হয়েছিল, সর্বভূতের অন্তর্যামী ব্যাসদেবপুত্র মুনি শুকদেবকে আমি প্রণাম করি। আমি আপনাদের কাছে শ্রীমৎভাগবত শোনাবো। এই গ্রন্থ সকল পুরাণের থেকেও শ্রেষ্ঠ। এই গ্রন্থ পাঠ করলে এবং শুনলে সকল বেদের সার তত্ত্ব জানা হয়ে যায়। সংসারের অজ্ঞান অন্ধকার থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্যে যিনি এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, মুনিদের গুরু সেই ব্যাসদেবপুত্র শুকদেবকে আমি প্রণাম করি। নর ও নরোত্তম নারায়ণ এই গ্রন্থের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। দেবী সরস্বতী এই গ্রন্থের শক্তি ও ব্যাস এই গ্রন্থের ঋষি। প্রথমেই এঁদের সকলকে প্রণাম করে, এই গ্রন্থ উচ্চারণ করা উচিৎ”

গুরু ও ইষ্টদেবতাদের প্রণাম করে, সূত আবার বললেন, “হে মুনিগণ, আপনারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিষয় প্রশ্ন করে, অত্যন্ত উত্তম কাজ করেছেন। এই বিষয়ে জগতের মঙ্গল হয়, চিত্ত সুশীতল হয়। আপনারা আরও জিজ্ঞেস করেছেন, সার ধর্মতত্ত্ব কী? আমি বলছি, আপনারা দয়া করে শুনুন। যে ধর্ম থেকে শ্রীভগবানে এমন ভক্তি উৎপন্ন হয় যে, সেই ভক্তিতে কোন কামনার লেশমাত্র থাকে না, কোন বিঘ্ন সেই ভক্তিকে অভিভূত করতে পারে না এবং সেই ভক্তিতে প্রাণে পরম শান্তি লাভ করা যায়; সেই ধর্মই জীবের পক্ষে উৎকৃষ্ট ধর্ম।

নিষ্ঠাভরে ধর্ম আচরণ করেও, যদি সেই ধর্মে ভগবানের কথা শুনে মনে হর্ষ ও প্রীতি অনুভব না করা যায়, তাহলে সেই ধর্ম আচরণ ব্যর্থ। ধর্ম অনুষ্ঠানের ফলে স্বর্গলাভ ইত্যাদি ফল পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু সেই ফল যথার্থ ফল নয়। যে পুণ্যের বলে স্বর্গলাভ হয়, সে পুণ্য চিরদিন থাকে না, অতএব স্বর্গবাসও নিঃশেষিত হয়। শ্রী হরির চরণে ভক্তি হলে, বৈরাগ্য লাভ হয় এবং আত্মা কী সেই স্বরূপ উপলব্ধি হয়। জ্ঞানীরা এই অবস্থাকেই অপবর্গ অর্থাৎ মুক্তি বলে থাকেন। ভক্তি থেকে শুরু করে মুক্তি পর্যন্ত যে মার্গ, এই শাস্ত্রে তাকেই পরধর্ম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জীবের প্রাণধারণের জন্য অর্থ, কামনার বস্তু ও ইন্দ্রিয়সুখের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঘটবেই, কিন্তু ওই সকল বিষয়ে আসক্ত না হয়ে, পদ্মপাতায় জলের মতো নির্লিপ্তভাবে ওই সকল বিষয়কে ভোগ করতে হয়। নানা রকম কর্মের অনুষ্ঠান করে স্বর্গলাভ করা এই ধর্মের উদ্দেশ্য নয়, তত্ত্ববিষয়ের অন্বেষণ ও জ্ঞান লাভই এই ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য।

যাঁরা তত্ত্বজ্ঞ, তাঁরা বলেন, এক অদ্বিতীয় জ্ঞানই এই তত্ত্ববিষয়। এই জ্ঞানকে জ্ঞানীগণ বলেন ব্রহ্ম, যোগীগণ বলেন পরমাত্মা আর ভক্তগণ বলেন ভগবান শ্রীহরি। মুনিগণ প্রথমতঃ শ্রদ্ধার সঙ্গে বেদান্ত শুনে আত্মার অস্তিত্ব জানতে পারেন। এই জ্ঞানকে পরোক্ষ জ্ঞান বলে। পরে বৈরাগ্য আশ্রয় করেন। অতঃপর জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ভক্তি দিয়ে তাঁরা নিজের আত্মায় পরমাত্মাকে অনুভব করেন। সেই উপলব্ধিকেই প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলেন। ভক্তিহীন যে কোন ধর্ম আচরণই পণ্ডশ্রম মাত্র। অতএব একাগ্রমনে সর্বদা ভক্তবৎসল শ্রীহরির নাম, রূপ ও গুণের বিষয় শ্রবণ, কীর্তন, ধ্যান ও পূজা করাই এই তত্ত্বের সার অংশ।

কৃষ্ণকথা শুনলে ও কীর্তন করলে চিত্ত পবিত্র হয়। কৃষ্ণ সাধুগণের পরম বন্ধু। যে ব্যক্তি তাঁর কথা শোনে, ভগবান তার মনে অবস্থান করেন এবং তার মন থেকে কামনা ইত্যাদি দোষ দূর করে থাকেনতখন সেই ব্যক্তির রজঃ ও তমোগুণ থেকে উৎপন্ন কাম, লোভ, অহংকার ইত্যাদি ভাবসমূহ তার চিত্তকে আর বশ করতে পারে না। সুতরাং সত্ত্বগুণের প্রকাশ হওয়ায় মন প্রসন্ন হয় এবং চিত্তে শান্তি অনুভব হয়। এইভাবে ভক্তি যোগে মন প্রসন্ন হলে, মানুষ সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্তি পায় এবং তখন ভগবানের তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে। মনের মলিনতা দূর করতে ভক্তির মতো উত্তম উপায় আর দ্বিতীয় নেই।

হে বিপ্রগণ, মাটি দিয়ে যেমন মাটির পাত্র, কলস ইত্যাদি তৈরি হয়, তেমনই যে বস্তু দিয়ে এই ব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছে তাকে প্রকৃতি বলে। সত্ত্ব, রজঃ আর তমঃ এই তিন প্রকৃতির গুণ। এই তিনটি গুণ আশ্রয় করে পরমপুরুষ ভগবান সৃষ্টি, পালন ও প্রলয় করে থাকেন। সত্ত্বগুণে যখন তিনি পালন করেন তখন তিনি বিষ্ণু, রজোগুণে যখন তিনি সৃষ্টি করেন, তখন তিনিই ব্রহ্মা এবং তমোগুণে যখন তিনি প্রলয় করেন, তখন তিনিই হর। মূলত এক হলেও এই তিন ঈশ্বর ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন। এই তিনের মধ্যে সত্ত্বদেহ বাসুদেব বিষ্ণুই আমাদের মঙ্গলসাধন করেন। তার কারণ, তমোগুণ বস্তুকে অচেতন জড় করে রাখে। কাষ্ঠে তমোগুণ প্রবল, তাই জড়। রজোগুণ বিষয়কে অস্থির ও চঞ্চল করে। ধোঁয়াতে রজোগুণ প্রবল, তাই গতিশীল। সত্ত্বগুণ বস্তুকে প্রকাশ করে। অগ্নিতে সত্ত্বগুণ থাকায়, অগ্নি নিজে প্রকাশ হয় এবং অন্ধকারে অন্যকেও প্রকাশ করে। অতএব কাঠের থেকে ধোঁয়া এবং ধোঁয়ার থেকেও অগ্নি শ্রেষ্ঠ। সত্ত্বগুণ ব্রহ্মের প্রকাশক বলে, সত্ত্বতনু ভগবান বিষ্ণু বাসুদেবই, জীবের বিশেষ ভজনার পাত্র। পুরাকালে মুনিগণ বিশুদ্ধ সত্ত্বমূর্তি ভগবান অধোক্ষজের ভজন করতেন। অক্ষ অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভগবানকে অনুভব করা যায় না বলেই ভগবান বাসুদেবের নাম তাঁরা “অধোক্ষজ” রেখেছিলেন।

সংসারে দেখতে পাওয়া যায়, যাঁর যেমন প্রকৃতি তিনি সেই রকম দেবতার ভজনা করেন। যাঁদের প্রকৃতিতে রজো ও তমোগুণ প্রধান, তাঁরা ধন, ঐশ্বর্য ও সন্তান কামনায় দেবতাদের ভজনা করেন। বেদ, যজ্ঞ, আসন, প্রাণায়াম প্রভৃতি যোগশাস্ত্রের ক্রিয়া, জ্ঞানশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র এবং দান ও ব্রত ইত্যাদির ফল স্বর্গলাভ। কিন্তু এই সকলেরই একমাত্র লক্ষ্য ভগবান বাসুদেব। ভগবান বাসুদেব কোন নির্দিষ্ট গুণের বশীভূত নন, তাই তিনি নির্গুণ। তন্তুরূপ কারণ থেকে যেমন বস্ত্ররূপ কার্য হয়, তেমনি সৃষ্টির আদিতে ভগবানের প্রকৃতি থেকেই এই বিশ্ব চরাচরের সৃষ্টি হয়েছিল। সকল বস্তু, বিষয় ও জীবের মধ্যে তিনি অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করছেন। অগ্নি এক হলেও বহু কাঠের মধ্যে যেমন বহুরূপে প্রকাশ পায়, তেমনি বিশ্বের আত্মা ভগবান এক হয়েও অসংখ্য ভূত ও জীবের অন্তর্যামী হওয়ার কারণে, বহুরূপে বিরাজিত বলে মনে হয়।

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/২ "


 

শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬

গীতা - ১৮শ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের সপ্তদশ অধ্যায়ঃ শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৭শ পর্ব "



অষ্টাদশ অধ্যায়ঃ মোক্ষযোগ

অর্জুন উবাচ

সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্‌।

ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্‌ কেশিনিষূদন।।

অর্জুন উবাচ

সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বম্‌ ইচ্ছামি বেদিতুম্‌।

ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্‌ কেশিনিষূদন।।

অর্জুন বললেন- হে হৃষীকেশ, হে মহাবীর কেশিনিষূদন, আমি সন্ন্যাস এবং ত্যাগ - এই দুই তত্ত্ব আলাদাভাবে জানতে চাই।

[হৃষীক শব্দের অর্থ ইন্দ্রিয় বা ঈন্দ্রিয়সমূহ, ঈশ মানে ঈশ্বর। অর্থাৎ সকল ঈন্দ্রিয়কে যিনি জয় করেছেন, বা সকল ইন্দ্রিয়ের যিনি নিয়ামক - তিনি শ্রেষ্ঠ তাপস, তিনিই হৃষীকেশ।

অন্যদিকে তিনি মহাবীরও বটেন, কারণ মথুরায় গিয়ে কংসের সামনাসামনি হওয়ার আগে, কংসের অনুচর প্রবল পরাক্রম মল্লবীর কেশীকে তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন।

প্রকৃত সন্ন্যাসীরা অলৌকিক তেজস্বী হতেও পারেন কিন্তু তাঁরা সাধারণতঃ শীর্ণদেহ দুর্বলকায় হয়ে থাকেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সর্বেন্দ্রিয়জয়ী সন্ন্যাসী হয়েও মহাবীর – সে কথাটিই স্মরণ করে অর্জুন প্রিয়সখা শ্রীকৃষ্ণকে দুটি নামে সম্বোধন করে – সন্ন্যাস ও ত্যাগ - এই দুই তত্ত্ব জানতে চাইলেন। অর্থাৎ অপার্থিব এবং পার্থিব সর্ব শক্তিতেই অমিতশৌর্যবান শ্রীকৃষ্ণের মতো মহাচার্য কে আর হতে পারেন?]      

 

শ্রীভগবানুবাচ

কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ঃ বিদুঃ।

সর্ব-কর্ম-ফল-ত্যাগং প্রাহুঃ ত্যাগং বিচক্ষণাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন- পণ্ডিতগণ ফলের প্রত্যাশী সকল কর্মের ত্যাগকে সন্ন্যাস বলেন এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ সমস্ত কর্মের ফল ত্যাগ করাকেই ত্যাগ বলেন।

 

ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ।

যজ্ঞদানতপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে।।

ত্যাজ্যং দোষবৎ ইতি একে কর্ম প্রাহুঃ মনীষিণঃ।

যজ্ঞ-দান-তপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যম্‌ ইতি চ অপরে।।

কোন কোন মনীষি বলেন কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ, কারণ কর্ম দোষের হেতু। আবার কোন মনীষি বলেন যজ্ঞ, দান এবং তপস্যার মতো কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়।

 

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।

ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সম্প্রকীর্তিতঃ।।

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।

ত্যাগঃ হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সম্প্রকীর্তিতঃ।।

হে ভরতকুল শ্রেষ্ঠ, এই ত্যাগ বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত আমি তোমাকে বলছি, শোন। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, শাস্ত্রে বলা আছে যে ত্যাগও তিন প্রকারের হয়।

 

যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যমেব তৎ।

যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্‌।।

যজ্ঞ-দান-তপঃ-কর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যম্‌ এব তৎ।

যজ্ঞঃ দানং তপঃ চ এব পাবনানি মনীষিণাম্‌।।

যজ্ঞ, দান ও তপস্যা কর্ম ত্যাগ করা উচিৎ নয়, এই সকল কর্ম কর্তব্য। কারণ যজ্ঞ, দান এবং তপস্যার অভ্যাসেই মনীষিগণের চিত্তশুদ্ধি হয়।

 

এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।

কর্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্‌।।

এতানি অপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।

কর্তব্যানি ইতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতম্‌ উত্তমম্‌।।

হে পার্থ, এই সমস্ত কর্ম কিন্তু ফলের আশা ত্যাগ ক’রে নিরাসক্ত মনে করা উচিৎ। এই আমার নিশ্চিত ও উত্তম সিদ্ধান্ত।

 

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে।

মোহাৎ তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণঃ ন উপপদ্যতে।

মোহাৎ তস্য পরিত্যাগঃ তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

নিত্যকর্ম ত্যাগ করাও কিন্তু উচিৎ নয়। অজ্ঞানতার কারণে নিত্যকর্ম ত্যাগকে তামসিক ত্যাগ বলা হয়ে থাকে।

 

দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ।

স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ।।

দুঃখম্‌ ইতি এব যৎ কর্ম কায়-ক্লেশ-ভয়াৎ ত্যজেৎ।

স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং ন এব ত্যাগফলং লভেৎ।।

যে ব্যক্তি কর্মে দেহের কষ্ট, এই ভয়ে কর্মত্যাগ করেন, তিনি রাজসিক ত্যাগ করে ত্যাগের ফলস্বরূপ পরমমুক্তি লাভ করতে পারেন না।

 

  ৯

কার্যমিত্যেব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তেঽর্জুন।

  সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ।।

কার্যম্‌ ইতি এব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তে অর্জুন।

সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলং চ এব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকঃ মতঃ।।

হে অর্জুন, নিরাসক্ত চিত্তে, ফলের কামনা না করে যে সকল নিত্য কর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, সেই আসক্তি ও ফলের কামনা ত্যাগই সাত্ত্বিক ত্যাগ – এই আমার অভিমত।

 

১০

ন দ্বেষ্ট্যকুশলং কর্ম কুশলে নানুষজ্জতে।

ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।

ন দ্বেষ্টি অকুশলং কর্ম কুশলে ন অনুষজ্জতে।

ত্যাগী সত্ত্ব-সমাবিষ্টঃ মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।

সত্ত্বগুণ সম্পন্ন, মেধাবী ও নিঃসংশয় ত্যাগীগণ না কষ্টকর কর্মে বিরক্ত হন, না সহজ কর্মে আসক্ত হন।

 

১১

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।

যস্তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।।

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণি অশেষতঃ।

যঃ তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগী ইতি অভিধীয়তে।।

যেহেতু দেহ বিশিষ্ট জীবের নিঃশেষে সমস্ত কর্ম ত্যাগ সম্ভব নয়, সেহেতু যিনি কর্ম থেকে কোন ফলের প্রত্যাশা করেন না, তিনিই ত্যাগীরূপে অভিহিত হন।

  

১২

অনিষ্টমিষ্টং মিশ্রঞ্চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্‌।

ভবত্যত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।।

অনিষ্টম্‌ ইষ্টং মিশ্রং চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্‌।

ভবতি অত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।।

যাঁরা অত্যাগী তাঁরা মৃত্যুর পর ইষ্ট, অনিষ্ট এবং মিশ্র এই তিন ধরনের কর্মফল লাভ করে থাকেন, সন্ন্যাসীদের কোনভাবেই কোন ফললাভ করতে হয় না।

[ইষ্ট মানে পুণ্যফল – দেবলোক প্রাপ্তি, অনিষ্ট মানে পাপফল- নীচলোক প্রাপ্তি, মিশ্র মানে মধ্যফল – মনুষ্যলোক প্রাপ্তি]

 

১৩

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে।

সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্বকর্মণাম্‌।।

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে।

সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্বকর্মণাম্‌।।

হে মহাবীর অর্জুন, সর্বকর্মের অন্তস্বরূপ সাংখ্যে সকল কর্মের সিদ্ধিলাভের পাঁচটি কারণ বর্ণনা করা আছে, সেই কারণগুলি তুমি আমার থেকে জান।

 

১৪

অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণঞ্চ পৃথগ্বিধম্‌।

বিবিধাশ্চ পৃথক্‌ চেষ্টা দৈবঞ্চৈবাত্র পঞ্চমম্‌।।

অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণং চ পৃথক্‌ বিধম্‌।

বিবিধাঃ চ পৃথক্‌ চেষ্টা দৈবং চ এব অত্র পঞ্চমম্‌।।

জীবের দেহ, তার কর্তারূপ অহংকার, ইন্দ্রিয়রূপ বিভিন্ন করণ, জীবের নানাবিধ কর্ম প্রচেষ্টা আর এদের মধ্যে পঞ্চম দৈব

 

 

১৫

শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।

ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।।

শরীর-বাক্‌- মনোভিঃ যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।

ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চ এতে তস্য হেতবঃ।।

শরীর, বাক্য ও মন দিয়ে মানুষ যে ন্যায় এবং অন্যায় কর্ম করে, সেই সমস্ত কর্মেরই কারণ এই পাঁচটি।

 

১৬

তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মানং কেবলন্তু যঃ।

পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।

তত্র এবং সতি কর্তারম্‌ আত্মানং কেবলম্‌ তু যঃ।

পশ্যতি অকৃত-বুদ্ধিত্বাৎ ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।

এই পঞ্চ কারণ থাকলেও যে মোহান্ধ বুদ্ধিহীন ব্যক্তি শুদ্ধ আত্মাকে সকল কর্মের কর্তারূপে দেখে, দুর্বুদ্ধির কারণে সে সম্যক দেখতে পায় না।

 

১৭

যস্য নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে।

হত্বাপি স ইমাঁল্লোকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।

যস্য ন অহঙ্কৃতো ভাবঃ বুদ্ধিঃ যস্য ন লিপ্যতে।

হত্বা অপি স ইমান্‌ লোকান ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।

যাঁর অহংকার ও আমিই কর্তা এমন ভাব নেই, যাঁর কর্মফলে বুদ্ধি সংলিপ্ত নয়, তিনি এই জগতের সমস্ত জীবকে হত্যা করেও হত্যা করেন না, এবং এই হত্যাক্রিয়ার ফলে তিনি অধর্মে আবদ্ধ হন না।

 

১৮

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।

করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।

করণং কর্ম কর্তা ইতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা - কর্মে প্রবৃত্তির হেতু এই তিন প্রকার। করণ, ক্রিয়া এবং কর্তা – এই তিনটি কর্মের আশ্রয়।

[অর্থাৎ আত্মা কর্ম প্রবৃত্তির হেতুও নন, কর্মের আশ্রয়ও নন]

 

১৯

জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ।

প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্যপি।।

জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধা এব গুণভেদতঃ।

প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবৎ শৃণু তানি অপি।।

সাংখ্যশাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিনগুণভেদে তিনি প্রকারের বলা হয়েছে। সেই তিন ভেদের তত্ত্বটি যথাযথ শোন।

 

২০

সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।

অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ্‌জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্‌।।

সর্বভূতেষু যেন একং ভাবম্‌ অব্যয়ম্‌ ঈক্ষতে।

অবিভক্তং বিভক্তেষু তৎ জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্‌।।

যে জ্ঞানে বহু বিভক্ত সমস্ত ভূতকে একটি অবিভক্ত অব্যয় ভাবে উপলব্ধি করা যায়, সেই জ্ঞানকে সাত্ত্বিক জ্ঞান বলেই জানবে।

[এই জ্ঞান অদ্বৈত আত্মদর্শনের জ্ঞান]

 

২১

পৃথক্‌ত্বেন তু যজ্‌জ্ঞানং নানাভাবান্‌ পৃথগ্বিধান্‌।

বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তজ্‌জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

পৃথক্‌ত্বেন তু যৎ জ্ঞানং নানাভাবান্‌ পৃথক্‌ বিধান্‌।

বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তৎ জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্‌।।

কিন্তু যে জ্ঞান সর্ব ভূতের প্রত্যেক দেহ স্থিত আত্মাকে, পৃথক পৃথক ভাবলক্ষণের আত্মা বলে জানে, সেই জ্ঞানকে রাজসিক জ্ঞান বলেই জেনে রাখো।

 

২২

যৎ তু কৃৎস্নবদেকস্মিন্‌ কার্যে সক্তমহৈতুকম্‌।

অতত্ত্বার্থবদল্পঞ্চ তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ তু কৃৎস্নবৎ একস্মিন্‌ কার্যে সক্তম্‌ অহৈতুকম্‌।

অতত্ত্বার্থবৎ অল্পঞ্চ তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

আর যে জ্ঞান কোন একটি বিশেষ কার্য অনুষ্ঠানে, সমগ্রভাবে আসক্ত হয়; যুক্তিহীন, ভ্রান্ততত্ত্ব এবং তুচ্ছ সেই জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলেই জানবে।

 

২৩

নিয়তং সঙ্গরহিতমরাগদ্বেষতঃ কৃতম্‌।

অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকমুচ্যতে।।

নিয়তং সঙ্গরহিতম্‌ অরাগ-দ্বেষতঃ কৃতম্‌।

অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকম্‌ উচ্যতে।।

রাগ-দ্বেষহীন, ফলের প্রত্যাশাহীন, আসক্তিশূণ্য কর্তব্যের যে নিত্যকর্ম অনুষ্ঠান - তাকেই সাত্ত্বিক কর্ম বলে।

 

২৪

যৎ তু কামেপ্সুনা কর্ম সাহঙ্কারেণ বা পুনঃ।

ক্রিয়তে বহুলায়াসং তদ্‌ রাজসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ তু কাম-ইপ্সুনা কর্ম স-অহঙ্কারেণ বা পুনঃ।

ক্রিয়তে বহুল-আয়াসং তৎ রাজসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

আবার ফলের প্রত্যাশায়, মনে অহংকার নিয়ে, বহু কষ্টসাধ্য কোন কর্ম অনুষ্ঠান করলেও তাকে রাজসিক কর্ম বলা হয়।

 

২৫

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসামনপেক্ষ্য চ পৌরুষম্‌।

মোহাদারভ্যতে কর্ম যৎ তৎ তামসমুচ্যতে।।

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসাম্‌ অনপেক্ষ্য চ পৌরুষম্‌।

মোহাৎ আরভ্যতে কর্ম যৎ তৎ তামসম্‌ উচ্যতে।।

আর শুভ বা অশুভ পরিণাম বিচার না করে, ক্ষতি, হিংসা এবং সামর্থ্য বিবেচনা না করে, মোহে আচ্ছন্ন হয়ে যে কর্ম অনুষ্ঠান, তাকে তামসিক কর্ম বলা হয়।

 

২৬

মুক্তসঙ্গোঽনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ।

সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।

মুক্ত-সঙ্গঃ অনহংবাদী ধৃতি-উৎসাহ-সমন্বিতঃ।

সিদ্ধি-অসিদ্ধ্যোঃ-র্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।

আসক্তিহীন, অহংকারশূণ্য, ধৈর্য ও উদ্যমী, সাফল্যে এবং ব্যর্থতায় নির্বিকার হয়ে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে সাত্ত্বিক কর্তা বলা হয়।

 

২৭

রাগী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোঽশুচিঃ।

হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

রাগী কর্ম-ফল-প্রেপ্সুঃ লুব্ধঃ হিংসাত্মকঃ অশুচিঃ।

হর্ষ-শোক-অন্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।

বিষয় অনুরাগী, কর্মফলের প্রত্যাশী, লোভী, হিংসাযুক্ত, অশুচি মন নিয়ে এবং আনন্দে বিহ্বল ও দুঃখে কাতর হয়ে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে রাজসিক কর্তা বলে।

 

২৮

অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোঽলসঃ।

বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।

অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠঃ নৈষ্কৃতিকঃ অলসঃ।

বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।

নিষ্ঠাহীন, অস্থিরমতি, দুর্বিনীত, প্রতারক, স্বার্থসন্ধানী, উদ্যমহীন, বিষণ্ণ মানসিকতায়, আলস্যের সঙ্গে যিনি কর্ম করেন, তাঁকে তামসিক কর্তা বলে।

 

২৯

বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুণতস্ত্রিবিধং শৃণু।

প্রোচ্যমানমশেষেণ পৃথক্‌ত্বেন ধনঞ্জয়।।

বুদ্ধেঃ ভেদং ধৃতেঃ চ এব গুণতঃ ত্রিবিধং শৃণু।

প্রোচ্যমানম্‌ অশেষেণ পৃথক্‌ত্বেন ধনঞ্জয়।।

হে ধনঞ্জয়, এইবার তিনগুণ অনুসারে বুদ্ধি ও ধৃতির তিন প্রকারভেদের কথাও পৃথক পৃথক ভাবে তোমাকে সম্পূর্ণ বর্ণনা করছি, শোনো।

 

৩০

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ কার্যাকার্যে ভয়াভয়ে।

বন্ধং মোক্ষঞ্চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

প্রবৃত্তিং চ নিবৃত্তিং চ কার্য-অকার্যে ভয়-অভয়ে।

বন্ধং মোক্ষং চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

হে পার্থ, যে বুদ্ধিতে, প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, কর্তব্য ও অকর্তব্য, ভয় ও অভয়, বন্ধন ও মুক্তি, সম্যক উপলব্ধি করা যায়, সেই বুদ্ধি সাত্ত্বিকী।

 

৩১

যয়া ধর্মমধর্মঞ্চ কার্যঞ্চাকার্যমেব চ।

অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।

যয়া ধর্মম্‌ অধর্মং চ কার্যং চ অকার্যম্‌ এব চ।

অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।

হে পার্থ, যে বুদ্ধিতে ধর্ম ও অধর্ম, কর্তব্য ও অকর্তব্য, নিঃসংশয়ে জানা যায় না, সেই বুদ্ধিকে রাজসিক বুদ্ধি বলে।

 

৩২

অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা।

সর্বার্থান্‌ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।

অধর্মং ধর্মম্‌ ইতি যা মন্যতে তমসা-আবৃতা।

সর্ব-অর্থান্‌ বিপরীতাং চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।

হে পার্থ, তমোভাবে আচ্ছন্ন যে বুদ্ধিতে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে হয়, যে বুদ্ধি সকল বিষয়কে বিপরীত ভাবে গ্রহণ করে, সেই বুদ্ধিকে তামসিক বুদ্ধি বলে।

 

৩৩

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।

যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃ-প্রাণ-ইন্দ্রিয়-ক্রিয়াঃ।

যোগেন-অব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।

হে পার্থ, যে ধৃতি মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয়ের সকল ক্রিয়াকে সংহত করে, চিত্তকে একনিষ্ঠ যোগে, ব্রহ্মে নিত্যসমাহিত রাখে, সেই ধৃতিই সাত্ত্বিকী ধৃতি।

 

৩৪

যয়া তু ধর্মকামার্থান্‌ ধৃত্যা ধারয়তেঽর্জুন।

প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।

যয়া তু ধর্ম-কামার্থান্‌ ধৃত্যা ধারয়তে অর্জুন।

প্রসঙ্গেন ফল-আকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।

হে অর্জুন, কিন্তু যে ধৃতি কামনার জন্যেই ধর্ম, এই ধারণা সৃষ্টি করে এবং সেই প্রসঙ্গে মনকে ফলের প্রত্যাশী করে তোলে, সেই ধৃতি রাজসিক ধৃতি।

 

৩৫

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ।

ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদম্‌ এব চ।

ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।

হে পার্থ, দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি যে ধৃতির প্রভাবে অবাস্তব কল্পনা, ভয়, শোক, বিষাদ এবং বিষয়ভোগ লালসা থেকে বিমুক্ত হতে পারে না, সেই ধৃতিকে তামসিক ধৃতি বলে।

  

৩৬

সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ।

অভ্যাসাদ্‌ রমতে যত্র দুঃখান্তঞ্চ নিগচ্ছতি।।

সুখং তু ইদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরত-ঋষভ।

অভ্যাসাদ্‌ রমতে যত্র দুঃখ-অন্তং চ নিগচ্ছতি।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, এখন তুমি আমার থেকে তিন রকম সুখের তত্ত্ব শোনো, যে সুখের একনিষ্ঠ অভ্যাসে পরম আনন্দ লাভ করা যায় এবং সকল দুঃখের অবসান হয়।

 

৩৭

যৎ তদগ্রে বিষমিব পরিণামেঽমৃতোপমম্‌।

তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্‌।

যৎ তৎ অগ্রে বিষম্‌ ইব পরিণামে অমৃত-উপমম্‌।

তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তম আত্ম-বুদ্ধি-প্রসাদ-জম্‌।

যে সুখ প্রথমে বিষের মতো কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমৃতের সমান, যে সুখ আত্মজ্ঞানের প্রসাদে নিঃসৃত হয়, সেই সুখকেই সাত্ত্বিক সুখ বলে।

 

৩৮

বিষয়েন্দ্রিয়সংযোগাদ্‌ যৎ তদগ্রেঽমৃতোপমম্‌।

পরিণামে বিষমিব তৎ সুখং রাজসং স্মৃতম্‌।।

বিষয়-ইন্দ্রিয়-সংযোগাৎ যৎ তৎ অগ্রে অমৃত-উপমম্‌।

পরিণামে বিষম্‌ ইব তৎ সুখং রাজসং স্মৃতম্‌।।

বিষয় ও ইন্দ্রিয়ের সংযোগে যে সুখ প্রথমে অমৃতের মতো মনে হয়, কিন্তু পরিণামে বিষতুল্য হয়ে ওঠে, সেই সুখকে রাজসিক সুখ বলে।

 

৩৯

যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ।

নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তৎ তামসমুদাহৃতম্‌।।

যৎ অগ্রে চ অনুবন্ধে চ সুখং মোহনম্‌ আত্মনঃ।

নিদ্রা-আলস্য-প্রমাদো-উত্থং তৎ তামসম্‌ উদাহৃতম্‌।।

এবং যে সুখ শুরুতে এবং পরিণামেও আত্মাকে মোহে আচ্ছন্ন রাখে, যে সুখ নিদ্রা, আলস্য ও ভ্রান্তি থেকে উৎপন্ন হয়, সেই সুখকে তামসিক সুখ বলে।

 

৪০

ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।

সত্ত্বং প্রকৃতিজৈউমুক্তং যদেভিঃ স্যাৎত্রিভির্গুণৈঃ।।

ন তৎ অস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।

সত্ত্বং প্রকৃতিজৈঃ মুক্তং যৎ এভিঃ স্যাৎ ত্রিভিঃ-গুণৈঃ।।

পৃথিবীতে বা স্বর্গে, মানুষ হোক কিংবা দেবতা - এমন কোন জীব নেই, যে প্রকৃতির মায়াতে সকল বন্ধনের কারণ এই ত্রিগুণ থেকে বিমুক্ত হয়।

  

৪১

ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।।

কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ।।

ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ।।

কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাব-প্রভবৈঃ গুণৈঃ।।

হে অরিন্দম, প্রকৃতির এই ত্রিগুণের প্রভাবেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের কর্মসকল, পৃথক পৃথক বিভাগে বিভক্ত হয়েছে।

 

৪২

শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।

জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্‌।।

শমঃ দমঃ তপঃ শৌচং ক্ষান্তিঃ আর্জবম্‌ এব চ।

জ্ঞানং বিজ্ঞানম্‌ আস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্‌।।

অন্তরে ইন্দ্রিয়ের সংযম, বাহিরে ইন্দ্রিয়ের দমন, তপস্যা, শুচিতা, ক্ষমা, সারল্য, শাস্ত্রজ্ঞান, তত্ত্বের উপলব্ধি এবং আস্তিক্য বুদ্ধি – এই সমস্ত ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম।

[যার ঈশ্বরে এবং শাস্ত্র বিধানে বিশ্বাস আছে সে আস্তিক, যার বিশ্বাস নেই সে নাস্তিক]

  

৪৩

শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্‌।

দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্‌।।

শৌর্যং তেজঃ ধৃতিঃ দাক্ষ্যং যুদ্ধে চ অপি অপলায়নম্‌।

দানম্‌ ঈশ্বরভাবঃ চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্‌।।

পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা এবং যুদ্ধ থেকে পালিয়ে না যাওয়ার প্রবৃত্তি, দান, ঈশ্বরের মতো শাসন ক্ষমতা – এই সমস্ত ক্ষত্রিয়ের স্বাভাবিক কর্ম।

  

৪৪

কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্‌।

পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্‌।।

কৃষি-গৌরক্ষ্য-বাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্‌।

পরিচর্যা-আত্মকং কর্ম শূদ্রস্য অপি স্বভাবজম্‌।।

বৈশ্যের স্বাভাবিক কর্ম - কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য আর সেবামূলক কাজই শূদ্রের পক্ষে স্বাভাবিক।

 

৪৫

স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধি লভতে নরঃ।

স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু।।

স্বে স্বে কর্মণি অভিরতঃ সংসিদ্ধি লভতে নরঃ।

স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তৎ শৃণু।।

বর্ণ ও আশ্রম অনুযায়ী নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত থেকেই মানুষ সিদ্ধি লাভ করতে পারে, স্বকর্মে নিরত ব্যক্তি কিভাবে সিদ্ধিলাভ করে, সেই কথাই এখন শোনো।

 

৪৬

যতঃ প্রবৃত্তির্ভূতানাং যেন সর্বমিদং ততম্‌।

স্বকর্মণা তমভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবম্‌।।

যতঃ প্রবৃত্তিঃ ভূতানাং যেন সর্বম্‌ ইদং ততম্‌।

স্বকর্মণা তম্‌ অভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবম্‌।।

যিনি এই জগতের সমস্ত জীবের স্রষ্টা, যিনি এই বিশ্ব চরাচরের সর্বত্র ব্যাপ্ত রয়েছেন। মানুষ নিজ নিজ স্বভাব কর্ম অনুষ্ঠান ক’রে তাঁকেই অর্চনা করে ও সিদ্ধি লাভ করে।

 

৪৭

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।

স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

শ্রেয়ান্‌ স্বধর্মঃ বিগুণঃ পরধর্মাৎ সু-অনুষ্ঠিতাৎ।

স্বভাব-নিয়তং কর্ম কুর্বন্‌ ন আপ্নোতি কিল্বিষম্‌।।

স্বধর্ম পালনে কোন ত্রুটিও হলেও, তা পরধর্মের সুষ্ঠু অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভাল। কারণ স্বভাবজাত কর্ম অনুষ্ঠানে কোন পাপ অর্শায় না।

  

৪৮

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ।

সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষম্‌ অপি ন ত্যজেৎ।

সর্ব-আরম্ভাঃ হি দোষেণ ধূমেন অগ্নিঃ ইব আবৃতাঃ।।

হে কুন্তীপুত্র, দোষযুক্ত হলেও স্বভাব কর্ম কখনো পরিত্যাগ করবে না কারণ সমস্ত কর্মই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন অগ্নির মতো, ত্রিগুণের দোষে দুষ্ট।

 

৪৯

অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ।

নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেনাধিগচ্ছতি।।

অসক্ত-বুদ্ধিঃ সর্বত্র জিত-আত্মা বিগত-স্পৃহঃ।

নৈষ্কর্ম্য-সিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেন অধিগচ্ছতি।।

সকল বিষয়েই নিরাসক্তি ভাব, সংযত চিত্ত, ভোগের আকাঙ্খামুক্ত সন্ন্যাস অভ্যাস করলে, নিষ্ক্রিয় আত্মস্বরূপে সিদ্ধি লাভ করা যায়।

 

৫০

সিদ্ধিং প্রাপ্তো যথা ব্রহ্ম তথাপ্নোতি নিবোধ মে।

সমাসেনৈব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।।

সিদ্ধিং প্রাপ্তঃ যথা ব্রহ্ম তথা আপ্নোতি নিবোধ মে।

সমাসেন এব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।।

হে কুন্তীপুত্র, এই সিদ্ধ পুরুষ যে জ্ঞান ও নিষ্ঠায় পরমাত্মা ব্রহ্মকে লাভ করেন, যে জ্ঞান সকল জ্ঞানের শেষ কথা, সেই জ্ঞানের কথাই এখন সংক্ষেপে তোমাকে বলব।

 

৫১-৫৩

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ।

শব্দাদীন্‌ বিষয়াংস্ত্যক্ত্বা রাগদ্বেষৌ ব্যুদস্য চ।।

বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যতবাক্‌কায়মানসঃ।

ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্‌।

বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তঃ ধৃত্যা আত্মানং নিয়ম্য চ।

শব্দ-আদীন্‌ বিষয়ান্‌ ত্যক্ত্বা রাগ-দ্বেষৌ ব্যুদস্য চ।।

বিবিক্ত-সেবী লঘু-আশী যত-বাক্‌-কায়-মানসঃ।

ধ্যান-যোগ-পরঃ নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্‌।

বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তঃ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

বিশুদ্ধ বুদ্ধি ও ধৈর্য, আত্মার সংযম, ধ্বনি ইত্যাদি সমস্ত বিষয় ত্যাগ, অনুরাগ, বিরাগ ও বিদ্বেষ ত্যাগ, নির্জন স্থানে বাস, পরিমিত আহার, বাক্য, মন ও শরীরের নিয়ন্ত্রণ, সর্বদা ধ্যানযোগে একনিষ্ঠতা, অনাসক্ত বৈরাগ্য ভাব, অহংকার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ ও পরিগ্রহ থেকে নিজেকে বিমুক্ত রেখে, সকল বিষয়ে মমত্বহীন প্রশান্ত চিত্ত পুরুষ পরম ব্রহ্মজ্ঞান লাভে সমর্থ হন।    

 

৫৪

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্‌।।

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্ন-আত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মৎ ভক্তিং লভতে পরাম্‌।।

ব্রহ্মভাব লাভ করার পর, প্রসন্ন চিত্ত সদানন্দ পুরুষ কোন বিষয়ে শোক করেন না, কোন বিষয় কামনাও করেন না, সর্বভূতে সমদর্শী এই পুরুষ আমাতে পরম ভক্তি উপলব্ধি করেন।  

 

৫৫

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্‌ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।

ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্‌।।

ভক্ত্যা মাম্‌ অভিজানাতি যাবান্‌ যঃ চ অস্মি তত্ত্বতঃ।

ততঃ মাং তত্ত্বতঃ জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্‌।।

স্বরূপতঃ আমিই যে জগতের বিভিন্ন রূপভেদে অবস্থান করি, এই তত্ত্বটি একনিষ্ঠ ভক্তগণ জানতে পারেন, আমার স্বরূপ তত্ত্বটি এই ভাবে সঠিক উপলব্ধি করতে পারলে, ভক্তগণ আমাতেই প্রবেশ করেন।

      

৫৬

সর্বকর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ।

মৎপ্রসাদাদবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্‌।।

সর্বকর্মাণি অপি সদা কুর্বাণঃ মৎ ব্যাপাশ্রয়ঃ।

মৎপ্রসাদাৎ অবাপ্নোতি শাশ্বতং পদম্‌ অব্যয়ম্‌।।

যে ভক্ত সর্বদা আমার শরণাগত হয়ে তার সকল কর্মব্যস্ততা আমাকে সমর্পণ করে, আমার অনুগ্রহে সেই ভক্ত, শাশ্বত ও অব্যয় পরমপদ লাভ করেন।  

 

৫৭

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ।

বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।।

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ।

বুদ্ধিযোগম্‌ উপাশ্রিত্য মৎ চিত্তঃ সততং ভব।।

সর্বদা আমার শরণাপন্ন হও, বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সমস্ত কর্মের অনুষ্ঠান আমাকে সমর্পণ করো। বুদ্ধিযোগ আশ্রয় করে সর্বদা আমাতেই চিত্তসংযুক্ত থাকো।

 

৫৮

মচ্চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি।

অথ চেৎ ত্বমহঙ্কারান্ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।।

মৎ চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি।

অথ চেৎ ত্বম্‌ অহঙ্কারাৎ ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।।

সর্বদা আমাতে চিত্ত সংযুক্ত হলে আমার অনুগ্রহে সংসারের সকল দুঃখ তুমি অতিক্রম করতে পারবে। আর যদি আত্ম অহংকারে তুমি আমার কথা অমান্য করো, তাহলে বিনষ্ট হবে।

 

৫৯

যদহঙ্কারমাশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে।

মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্ত্বাং নিযোক্ষ্যতি।।

যৎ অহঙ্কারম্‌ আশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে।

মিথ্যা এষ ব্যবসায়ঃ তে প্রকৃতিঃ ত্বাং নিযোক্ষ্যতি।।

অহংকারের প্রভাবে তুমি মনে করছ, যুদ্ধ করবে না, কিন্তু তোমার এই সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত। কারণ তোমার স্বভাব ধর্মই তোমাকে যুদ্ধে নিয়োগ করবে।

  

৬০

স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।

কর্তুং নেচ্ছসি যন্মোহাৎ করিষ্যস্যবশোঽপি তৎ।।

স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।

কর্তুং ন ইচ্ছসি যৎ মোহাৎ করিষ্যসি অবশঃ অপি তৎ।।

হে কুন্তীপুত্র, যদিও মোহে আচ্ছন্ন থাকার জন্যে এই কর্ম অনুষ্ঠানে তোমার ইচ্ছা হচ্ছে না, কিন্তু স্বভাবতঃ তুমি নিজের ক্ষত্রিয় ধর্মে আবদ্ধ, কাজেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই কর্ম তুমি করবে।

  

৬১

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্‌ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃৎ-দেশে অর্জুন তিষ্ঠতি।

ভ্রাময়ন্‌ সর্বভূতানি যন্ত্র আরূঢ়ানি মায়য়া।।

হে অর্জুন, ঈশ্বর পরমাত্মারূপে জগতের সমস্ত জীবের হৃদয়ে বাস করেন আর মায়ার প্রভাবে, তিনিই সর্ব জীবকে যন্ত্রের মতো নিয়ন্ত্রণ করেন। 

 

৬২

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত।

তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্‌।।

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত।

তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্‌।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জীবনের সর্ব বিষয়ে তাঁর শরণাগত হও, তাঁর অনুগ্রহে পরম শান্তি ও শাশ্বত পরম ব্রহ্মপদ লাভ করবে।

 

৬৩

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্‌ গুহ্যতরং ময়া।

বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথেচ্ছসি তথা কুরু।।

ইতি তে জ্ঞানম্‌ আখ্যাতং গুহ্যাৎ গুহ্যতরং ময়া।

বিমৃশ্য এতৎ অশেষেণ যথা ইচ্ছসি তথা কুরু।।

গোপনের থেকেও মহাগোপন এই জ্ঞান আমি তোমার কাছে ব্যাখ্যা করলাম, এই তত্ত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করে তোমার যা ইচ্ছা হয় তুমি করো।

 

৬৪

সর্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ।

ইষ্টোঽসি মে দৃঢ়মিতি ততো বক্ষ্যামি তে হিতম্‌।।

সর্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ।

ইষ্টঃ অসি মে দৃঢ়ম্‌ ইতি ততঃ বক্ষ্যামি তে হিতম্‌।।

যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই সমস্ত রহস্যের সেরা রহস্যতত্ত্বের পরম ব্যাখ্যা আমি আরো একবার বলছি, শোন। এই তত্ত্ব তোমার পক্ষে একান্ত মঙ্গলকর।

 

৬৫

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্‌যাজী মাং নমস্কুরু।

মামেবৈষ্যসিসত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োঽসি মে।।

মৎ-মনা ভব মৎ-ভক্তঃ মৎ-যাজী মাং নমস্কুরু।

মাম্‌ এব এষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়ঃ অসি মে।।

আমাতে তোমার মন সংযুক্ত করো, আমার ভক্ত হও, আমার পূজা করো, আমাকে নমস্কার করো। যেহেতু তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, তাই আমি তোমার কাছে সত্য প্রতিজ্ঞা করছি, আমাকে তুমি এই স্বরূপেই লাভ করবে।

 

৬৬

সর্বধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

সর্বধর্মান্‌ পরিত্যজ্য মাম্‌ একং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

সমস্ত ধর্ম ও অধর্ম ত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার শরণাগত হও। অনুতাপ ক’রো না, কারণ আমিই তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে বিমুক্ত করব।

 

৬৭

ইদং তে নাঽতপস্কায় নাঽভক্তায় কদাচন।

ন চাঽশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যোঽভ্যসূয়তি।।

ইদং তে না অতপস্কায় না অভক্তায় কদাচন।

ন চ অশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যঃ অভ্যসূয়তি।।

এই শাস্ত্রতত্ত্ব তপস্যাহীন কোন ব্যক্তিকে কখনোই তোমার বলা উচিৎ নয়। যার অন্তরে ভক্তি নেই, যে শাস্ত্র কিংবা গুরুর উপদেশ শুনতে চায় না, যে আমাকে ঈশ্বর না জেনে, সাধারণ মানুষ মনে করে ঈর্ষা করে, তাদেরকেও বলবে না।

 

৬৮

য ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্তেষ্বভিধাস্যতি।

ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।।

য ইদং পরমং গুহ্যং মৎ-ভক্তেষু অভিধাস্যতি।

ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মাম্‌ এব এষ্যতি অসংশয়ঃ।।

যিনি এই পরম গোপন তত্ত্ব আমার একান্ত ভক্তদের কাছে ব্যাখ্যা করবেন, কোন সন্দেহ নেই, তিনি আমার প্রতি পরম ভক্তিতে আমাকেই লাভ করবেন।

 

৬৯

ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ।

ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভূবি।।

ন চ তস্মাৎ মনুষ্যেষু কঃ চিৎ মে প্রিয়কৃত্তমঃ।

ভবিতা ন চ মে তস্মাৎ অন্যঃ প্রিয়তরঃ ভূবি।।

এই জগতে সমস্ত মানুষের মধ্যে, তাঁর থেকে বেশী প্রিয় আমার আর কেউ নেই এবং ভবিষ্যতেও অন্য আর কেউ হবে না।

 

৭০

অধ্যেষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্যং সংবাদমাবয়োঃ।

জ্ঞানযজ্ঞেন তেনাহমিষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ।।

অধি-এষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্যং সংবাদম্‌ আবয়োঃ।

জ্ঞানযজ্ঞেন তেন অহম্‌ ইষ্টঃ স্যাম্‌ ইতি মে মতিঃ।।

এবং যিনি আমাদের দুজনের এই ধর্মতত্ত্ব আলোচনা নিষ্ঠা নিয়ে পাঠ করবেন, আমি নিশ্চিত বলছি, তাঁর সেই জ্ঞানযজ্ঞে আমিই পূজিত হবো।

 

৭১

শ্রদ্ধাবাননসূয়শ্চ শৃণুয়াদপি যো নরঃ।

সোঽপি মুক্তঃ শুভাল্লোঁকান্‌ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্‌।।

শ্রদ্ধাবান্‌ অনসূয়ঃ চ শৃণুয়াৎ অপি যঃ নরঃ।

সঃ অপি মুক্তঃ শুভান্‌ লোকান্‌ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্‌।।

যে ব্যক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে ও পূর্ণ বিশ্বাসে এই ধর্মতত্ত্ব শুনবেন, সম্যক উপলব্ধি না হলেও তিনি পাপমুক্ত হয়ে, পুণ্যবান ব্যক্তি্র মত পুণ্যলোক লাভ করবেন।

  

৭২

কচ্চিদেতচ্ছ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা।

কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।

কচ্চিৎ এতৎ শ্রুতং পার্থ ত্বয়া একাগ্রেণ চেতসা।

কচ্চিৎ অজ্ঞান-সম্মোহঃ প্রনষ্টঃ তে ধনঞ্জয়।।

হে পার্থ, তুমি কি একনিষ্ঠ চিত্তে এই ধর্মশাস্ত্র শুনেছ? অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন মোহ বন্ধন থেকে, হে ধনঞ্জয়, তুমি মুক্ত হতে পারলে কি?

 

৭৩

অর্জুন উবাচ

নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।

স্থিতোঽস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।

অর্জুন উবাচ

নষ্টঃ মোহঃ স্মৃতিঃ লব্ধা ত্বৎ-প্রসাদাৎ ময়া অচ্যুত।

স্থিতঃ অস্মি গত-সন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।

অর্জুন বললেন – হে অচ্যুত কৃষ্ণ, তোমার প্রসাদে আমার মোহ দূর হয়েছে, আত্মতত্ত্বের স্মৃতি লাভ করেছি, আর আমি নিঃসংশয় হয়েছি; এখন আমি তোমার উপদেশই পালন করব।

 

৭৪

সঞ্জয় উবাচ

ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।

সংবাদমিমশ্রৌষমদ্ভুতং রোমহর্ষণম্‌।।

সঞ্জয় উবাচ

ইতি অহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।

সংবাদম্‌ ইমম অশ্রৌষম্‌ অদ্ভুতং রোমহর্ষণম্‌।।

সঞ্জয় বললেন – আমি মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত রোমাঞ্চকর তত্ত্বের আলাপ শুনলাম।

 

৭৫

ব্যাসপ্রসাদাচ্চ শ্রুতবানেতদ্‌ গুহ্যমহং পরম্‌।

যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্‌।।

ব্যাস-প্রসাদাৎ চ শ্রুতবান্‌ এতৎ গুহ্যম্‌ অহং পরম্‌।

যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্‌।।

আমি মহর্ষি ব্যাসের অনুগ্রহে দিব্য দৃষ্টিতে ও দিব্য শ্রবণে এই অত্যন্ত গোপন পরমজ্ঞানের পরমতত্ত্ব প্রত্যক্ষ শুনলাম, যার বক্তা স্বয়ং যোগেশ্বর কৃষ্ণ!

 

৭৬

রাজন্‌ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভুতম্‌।

কেশবার্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।

রাজন্‌ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদম্‌ ইমম্‌ অদ্ভুতম্‌।

কেশব-অর্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।

হে মহারাজ, ভগবান কেশব ও অর্জুনের এই অদ্ভূত পবিত্র তত্ত্ব আলোচনার কথা, আমার বার বার মনে পড়ছে এবং প্রতিক্ষণে আমি পরম আনন্দ অনুভব করছি।

 

৭৭

তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ।

বিস্ময়ো মে মহান্‌ রাজন্‌ হৃষ্যামি চ পুনঃপুনঃ।।

তৎ চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপম্‌ অতি-অদ্ভুতং হরেঃ।

বিস্ময়ঃ মে মহান্‌ রাজন্‌ হৃষ্যামি চ পুনঃপুনঃ।।

হে মহারাজ, ভগবান শ্রীহরির সেই অত্যন্ত অদ্ভূত বিশ্বরূপের কথা আমার বার বার মনে পড়ছে, চরম বিস্ময়ের আনন্দে আমি বার বার শিহরিত হচ্ছি।

 

৭৮

যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।

তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।

যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণঃ যত্র পার্থঃ ধনুর্ধরঃ।

তত্র শ্রীঃ বিজয়ঃ ভূতিঃ ধ্রুবা নীতিঃ মতিঃ মম।।

যে পক্ষে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ও পরমভক্ত পার্থ রয়েছেন, সেই পক্ষেই রাজ্যলক্ষ্মী, বিজয়, উন্নতি ও ধর্মনীতিও অবিচল থাকবেন – এ আমার নিশ্চিত অভিমত।   

 

মোক্ষযোগ সমাপ্ত

ওঁ তৎ সৎ

গীতা সমাপ্ত 

এর পরে  শুরু হচ্ছে  - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১

 

নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/১২

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...