এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
আগের পর্বে অর্জুন ভক্তিযোগের মহিমা উপলব্ধি করলেন, কিন্তু তাও তাঁর মনের সংশয় যেন মিটল না। যাঁকে ভক্তি করলে, পরম মুক্তি মিলবে - তিনি ঠিক কে? তাঁকে চিনবই বা কী করে? যাকে তাকে ভক্তি করাটাও তো কোন কাজের কথা নয়। যাঁকে ভক্তি করব - তিনি যে সত্যিই ভক্তবৎসল তত্ত্বজ্ঞানী - সেটুকু বোধগম্য হতেও যে ভক্তের তত্ত্বজ্ঞান থাকা প্রয়োজন। গহন অন্ধকারে পথের সন্ধানে ভক্ত নিজেকে সমর্পণ করবে যাঁর হাতে, তিনি নিজেও যে অন্ধ নন - সেটুকু আস্থা ভক্ত করবে কীভাবে? সেই জ্ঞানগম্যতার জন্যেই অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন -
ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ
ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ
|
১ |
অর্জুন
বললেন – হে কেশব, প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় এই
সমস্ত বিষয়েও আমি জানতে ইচ্ছে করি। |
||||
|
২ |
শ্রীভগবান
বললেন- হে কুন্তীপুত্র, এই শরীরকেই ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়। আর এই ক্ষেত্রকে
যে তত্ত্বজ্ঞানী উপলব্ধি করেছেন তাঁকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয়ে থাকে। |
||||
|
৩ |
হে
অর্জুন, সকল ক্ষেত্রে আমাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জেনে রাখো। ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের
যে জ্ঞান সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান বলে আমি মনে করি। |
||||
|
৪ |
সেই
ক্ষেত্র যেমন ধর্মযুক্ত, যেমন বিকারযুক্ত এবং যে ভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং যার
প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে, সেই তত্ত্বটি আমি তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করছি
শোনো। |
||||
|
৫ |
এই
তত্ত্বকথা অনেক ঋষিগণ অনেক ভাবে ব্যাখা করেছেন। বেদের নানান শাখায়, নানান ছন্দে
এই তত্ত্বের কথা, ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশের সূত্র হিসেবে, নিঃসংশয় যুক্তির সঙ্গে
ব্যাখা করা হয়েছে। |
||||
|
৬,৭ |
মাটি,
জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ-এই পাঁচটি মহাভূত থেকে অহংকার, অহংকার থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি
থেকে অব্যক্ত ঈশ্বরচেতনা, দশ ইন্দ্রিয় ও মন এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়গোচর অনুভূতি।
কামনা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা, ধৈর্য – এই সব নিয়েই বিকারযুক্ত
ক্ষেত্রের কথা তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। |
||||
|
৮-১২ |
নিজের
বিশেষ গুণের জন্যে আত্মশ্লাঘা ও দম্ভ না করা। অহিংসা, ক্ষমা, সারল্য, গুরুর
উপাসনা, সদাচার-শুচিতা, স্থৈর্য, আত্ম সংযম, ইন্দ্রিয়ের সুখভোগ থেকে বৈরাগ্য,
নিরহঙ্কার; জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি থেকে পাওয়া দুঃখের বারবার দোষবিচার ও
বিষয়ে অনাসক্তি; পুত্র, স্ত্রী ও ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন নির্বিকার ভাব। অভীষ্ট
লাভ কিংবা অনিষ্ট প্রাপ্তিতে মনের সর্বদা সাম্য ভা্ব; আমার প্রতি অচলা
ভক্তিযুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ যোগসাধনা, নির্জন স্থানে বসবাস, অসদাচারী লোকের সংস্রব
ত্যাগ, আত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা, সর্বদা তত্ত্বজ্ঞানের পর্যালোচনা। এই হল প্রকৃত জ্ঞান ও তার সাধনার
পথ। এ ছাড়া আর যা কিছু – সবই অজ্ঞান। |
||||
|
১৩ |
যা জ্ঞেয়
অর্থাৎ জানার বিষয়, যা জানলে অমৃত স্বরূপ পরম মুক্তি লাভ করা সম্ভব সেই কথাই এখন
আমি তোমাকে বলব। এই জ্ঞান অনাদি পরম ব্রহ্মস্বরূপ, সৎ ও অসতের ঊর্ধে, এমনই বলা
হয়ে থাকে। |
||||
|
১৪ |
সর্ব
জীবে তাঁরই হাত ও পা, চোখ ও কান, মাথা ও মুখ রয়েছে এবং এইভাবেই তিনি ইহলোকের
সর্বত্রই ব্যাপ্ত রয়েছেন। |
||||
|
১৫ |
সমস্ত
ইন্দ্রিয়ের অতীত হলেও, ইন্দ্রিয়ের সকল কাজে তিনি প্রকাশিত হন। তিনি সকলের আশ্রয়
স্বরূপ, কিন্তু তিনি কিছুতেই যুক্ত নন। তিনি তিনগুণের ঊর্ধে, অথচ তিনি এই
তিনগুণের পরিণাম ভোগ করেন। |
||||
|
১৬ |
সমস্ত
চরাচরের তিনিই অন্তর, তিনিই বাহির; তিনিই স্থাবর এবং তিনিই জঙ্গম। তাঁর এই
সূক্ষ্মতার জন্যে তিনি অজ্ঞানীর থেকে অজ্ঞেয়তার দূরত্বে থাকেন, কিন্তু জ্ঞানীর
নিকটেই অবস্থান করেন। |
||||
|
১৭ |
এই
ব্রহ্মস্বরূপ জ্ঞেয় অবিভাজ্য, কিন্তু ইনিই অজস্র ভাগে বিভক্ত হয়ে সমস্ত ভূতের
মধ্যেই অবস্থান করেন। ইনিই সমস্ত ভূতকে পালন করেন, বিনাশ করেন আবার সৃষ্টিও
করেন। |
||||
|
১৮ |
ইনি
জগতের সমস্ত জ্যোতির্মণ্ডলীর জ্যোতি, তাই অজ্ঞান অন্ধকারের অতীত বলা হয়। জ্ঞান,
জ্ঞেয় এবং জ্ঞানগম্যের অন্তরেই এঁনার অধিষ্ঠান। [ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
জ্ঞানের সংজ্ঞা ১৩/৮-১২ এবং জ্ঞেয় সম্পর্কে ১৩/১৩-১৭ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন।
জ্ঞেয় ব্রহ্মকে জানতে পারলে জ্ঞানগম্য বলা হয়।] |
||||
|
১৯ |
এতক্ষণ
আমি তোমাকে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় –এই তিন তত্ত্ব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম।
যাঁরা আমার একান্ত ভক্ত, তাঁরা এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে আমার ব্রহ্মস্বরূপ লাভে
সমর্থ হন। |
||||
|
২০ |
প্রকৃতি
ও পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলেই জানবে। আরও জেনো, প্রকৃতি থেকেই বুদ্ধি-অবুদ্ধি,
সুখ-দুঃখ, শোক-তাপের বিকার এবং মোহগুণের সৃষ্টি হয়। |
||||
|
২১ |
প্রকৃতিকে
বলা হয়, সমস্ত কার্য-করণের কর্তৃত্বের একমাত্র কারণ। আর পুরুষকে বলা হয় সুখ-দুঃখ
ইত্যাদির ভোগের কারণ। [দেহ হল
কার্য; দশ ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মন ও প্রাণ হল করণ। জীব দেহধারণের সঙ্গে সঙ্গে ভূত
ও বিষয় গ্রহণ করে। একই সঙ্গে করণের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সুখ, দুঃখ ইত্যাদি
প্রকৃতিজাত মোহ। পুরুষ তার চেতনা দিয়ে ভোগ করে সুখদুঃখ, শোকতাপ ইত্যাদি মোহ।
প্রকৃতির কার্যকরণের কর্তৃত্বে আর ভোক্তা পুরুষের চেতনার সংযোগে গড়ে ওঠে এই
সংসার।] |
||||
|
২২ |
যেহেতু
পুরুষ প্রকৃতির মধ্যেই অবস্থান করে ও প্রকৃতিজাত সমস্ত গুণ ভোগ করে, তাই এই
গুণের আসক্তিতে জীব, মানুষ কিংবা পশুরূপে - সৎ কিংবা অসৎ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে। |
||||
|
২৩ |
দেহে
অবস্থানকারী এই যে পুরুষ সাক্ষী স্বরূপে সবকিছু অনুমোদন করেন, পালন করেন ও ভোগ
করেন, তাঁকেই পরমাত্মা মহেশ্বর বলা হয়। |
||||
|
২৪ |
যিনি এই
পরম পুরুষ এবং সমস্ত বিকারগুণ সহ প্রকৃতির স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি যে
কোন অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তাঁকে আর জন্ম গ্রহণ করতে হয় না। |
||||
|
২৫ |
কেউ কেউ
ধ্যানযোগে শুদ্ধ আত্মা হয়ে নিজের আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন। অন্য কেউ কেউ
সাংখ্যযোগে, কেউ বা নিষ্কাম কর্মযোগে পরম আত্মাকে অনুভব করেন। |
||||
|
২৬ |
আরও কেউ
কেউ আত্মাকে এই ভাবে না জেনে, গুরুর উপদেশ অনুসারে উপাসনা করে থাকেন।
গুরুর
উপদেশে ভক্তিনিষ্ঠ এই ব্যক্তিরাও মৃত্যুময় এই সংসার অতিক্রম করতে পারেন। |
||||
|
২৭ |
হে ভরত
কুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জেনে রাখো, এই জগতে যা কিছু স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, সবই
ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকেই উৎপন্ন। |
||||
|
২৮ |
বিনাশশীল সর্বভূতের সর্বত্র
যিনি অবিনাশী পরমেশ্বরকে সমানভাবে ব্যাপ্ত দেখতে পান, তিনিই সম্যকদর্শী জ্ঞানী। |
||||
|
২৯ |
যেহেতু
তিনি সর্বত্র সমভাবে ব্যাপ্ত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পর, নিজের আত্মা ও পরের
আত্মায় বিভেদ করেন না, সেহেতু তিনিই পরম গতি লাভ করেন। |
||||
|
৩০ |
আত্মপুরুষ
অকর্তা এবং সকল কর্ম প্রকৃতির কার্য-করণেই নিষ্পন্ন হয় - যাঁর এই উপলব্ধি হয়েছে,
তিনিই সত্যদ্রষ্টা। |
||||
|
৩১ |
যখন
বিভিন্ন ভূতসমূহকে একই আত্মায় একত্র অবস্থান করতে দেখা যায় এবং সেই আত্মা থেকেই
সমস্ত ভূতের বিকাশ - এমন উপলব্ধি করা যায়, তখনই ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হয়। |
||||
|
৩২ |
হে
কুন্তীপুত্র অর্জুন, এই পরমাত্মা অনাদি এবং নির্গুণ বলেই অক্ষয় এবং অব্যয়।
শরীরের মধ্যে অবস্থান করলেও, ইনি না কোন কর্ম করেন, না তার ফলভোগ করেন। |
||||
|
৩৩ |
আকাশ
যেমন সর্বব্যাপী হওয়া সত্ত্বেও সূক্ষ্মতার জন্যে কোন কিছুতেই সংযুক্ত নয়, তেমনই
দেহের সর্বত্র অবস্থান করেও আত্মা দেহজাত দোষগুণে লিপ্ত হন না। |
||||
|
৩৪ |
হে
অর্জুন, এক সূর্য যেমন এই সমগ্র জগতকে আলোক দান করেন, তেমনই এক পরমাত্মাস্বরূপ
ক্ষেত্রী সমগ্র ক্ষেত্রকে প্রকাশ করে থাকেন। |
||||
|
৩৫ |
এই
ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রভেদ এবং সমস্ত ভূত-প্রকৃতির মোহ থেকে মুক্তির উপায়
যিনি জ্ঞানচক্ষু দিয়ে বুঝতে পারেন, তিনিই পরমব্রহ্ম লাভ করেন। |
ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ
সমাপ্ত