উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপনিষদ ও পুরাণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮ "

প্রথম স্কন্ধ - নবম পর্ব

অনাচারী কলির পদপাত ও নিরোধ

শ্রীসুত বললেন, “এরপর মহাভাগবত পরীক্ষিৎ বিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের পরামর্শ অনুযায়ী পৃথিবী পালন করতে লাগলেন এবং তাঁর সম্পর্কে জ্যোতিষী ব্রাহ্মণেরা যেমন বলেছিলেন তাঁর মধ্যে তেমনই গুণাবলী দেখা গিয়েছিল। তিনি উত্তরের কন্যা ইরাবতীকে বিয়ে করলেন এবং জন্মেজয় প্রমুখ চার পুত্র লাভ করলেন। একবার মহারাজ পরীক্ষিৎ দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে একজায়গায় দেখতে পেলেন, একজন রাজবেশধারী শূদ্র, এক বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছে। তিনি সেই শূদ্ররাজাকে কলি বলে চিনতে পেরে তাকে দমন করলেন”

শ্রীশৌণক বললেন, “রাজবেশধারী কলি অতি কুৎসিত শূদ্র, তার ওপর সে আবার বৃষ ও গাভিকে পদাঘাত করছিল, মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে শুধু দমন করলেন, হত্যা করলেন না কেন? হে মহাভাগ, যদি এই ঘটনায় শ্রীবিষ্ণুর অথবা তাঁর ভক্তদের কথাপ্রসঙ্গ থাকে, তাহলে বর্ণনা করুন। নচেৎ বৃথা আলাপে কাল হরণের কী প্রয়োজন?”

[এর আগে আমরা সত্যযুগের সূচনায় “সত্য” নামক কোন তেজস্বী সৎ-ব্রাহ্মণের পরিচয় পাইনি। “ত্রেতা” ও “দ্বাপর” যুগেও  “ত্রেতা” বা “দ্বাপর” নামে কোন মহাবীর ক্ষত্রিয় অথবা মহাবণিক বৈশ্যর নাম পাইনি। অথচ কলিযুগের শুরুতেই পেয়ে গেলাম “কলি” নামের একজন রাজবেশধারী শূদ্রকে! শ্রীসূত কিন্তু কলিকে রাজবেশধারী শূদ্র বলেছিলেন, তাঁকে ললিতকান্তি অথবা কুৎসিত – এমন কোন কথাই বলেননি।  কিন্তু ঋষি শৌণক গায়ে পড়েই বলে বসলেন, “অতি কুৎসিত শূদ্র”। এবং তাঁর আক্ষেপ বীর ক্ষত্রিয় রাজা পরীক্ষিৎ, কলি নামক কুৎসিত ওই শূদ্রকে হত্যা করলেন না কেন? আর্যদের আরোপিত ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের পক্ষপাত দুষ্ট প্রভাব কাটিয়ে, সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ – শূদ্রদের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই যে তাদের প্রতি ঋষি শৌণকের এই ঘৃণা, ক্রোধ ও বিরক্তি বুঝতে বাকি থাকে না।]         

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ কুরুজাঙ্গলে বাস করার সময়েই শুনতে পেলেন, কলি তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এই অশুভ সংবাদ শোনামাত্র তিনি রথে চড়লেন এবং অশ্ব, হাতি, রথ ও পদাতি এই চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হলেন। তিনি ভদ্রাশ্ব, কেতুমাল, উত্তরকুরু ও কিংপুরুষ ইত্যাদি রাজ্য সকল জয় করে, সেই রাজাদের থেকে কর আদায় করলেন। ওই সকল রাজ্যের লোকমুখে তিনি শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য, তাঁর পূর্বপুরুষদের যশ, অশ্বত্থামার অস্ত্রের তেজ থেকে নিজের পরিত্রাণের কাহিনী, সব শুনলেন। তিনি আরও শুনলেন যাদব ও পাণ্ডবদের মধ্যে আন্তরিক সখ্যতার কথা; কেশবের প্রতি পাণ্ডবদের একান্ত ভক্তির কথা শুনে, তিনিও কৃষ্ণের পাদপদ্মে একান্ত ভক্ত হয়ে উঠলেন। এইভাবে রাজা পরীক্ষিৎ যখন তাঁর পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে রাজ্য শাসন করছিলেন, এমন সময় এক অদ্ভূত ঘটনা ঘটে গেল, সে কথা বলছি, আপনারা শুনুন।

 একদিন বৃষরূপী ধর্ম একটি মাত্র পায়ে ঘুরতে ঘুরতে, গোরূপধারিণী পৃথিবীকে সন্তানহীনা মায়ের মতো কাঁদতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মাতা, আপনার শরীর কুশল তো? আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব কষ্টে আছেন? আপনি কী আমাকে এক পায়ে চলাফেরা করতে দেখে দুঃখ পাচ্ছেন? ভবিষ্যতে শূদ্ররাজারা আপনাকে ভোগ করবে ভেবে আপনি কী ব্যাকুল হয়েছেন? আজকাল যজ্ঞের অনুষ্ঠান প্রায় লোপ পেয়ে গেছে, দেবতারা যজ্ঞভাগ পান না, অতএব দেবরাজ ইন্দ্র সময় মতো বর্ষণ দেন না। আপনি কী প্রজাদের এই শোচনীয় পরিণাম দেখে ক্লেশ পাচ্ছেন?

হে পৃথিবী, আজকাল এমনই দুঃসময়, পতি স্ত্রীকে, পিতা সন্তানকে রক্ষা করে না, বরং নিষ্ঠুর রাক্ষসের মতো অত্যাচার করে। সরস্বতীদেবী দুরাচারী ব্রাহ্মণদের আশ্রয় নিয়েছেন, কুলীন ব্রাহ্মণরাও রাজার সেবায় দাসের মতো আচরণ করতে লজ্জাবোধ করছে না। বীর ক্ষত্রিয়েরা রাজ্য সকল উৎসন্নে দিয়েছে, শাস্ত্রের নিয়ম অবহেলা করে সর্বত্র পান, ভোজন ও নারীসঙ্গ উপভোগ করতে দ্বিধা করে না।

হে মাতা, আপনি কী এই সব দেখে বিষণ্ণ হয়েছেন? একসময় আপনার সৌভাগ্যে স্বর্গের দেবতারাও ঈর্ষা করত, বলবান কাল কী আপনার সেই সৌভাগ্য হরণ করে নিয়েছে? আপনার ক্লেশের কথা যথাযথ আমাকে বলে আমার উৎকণ্ঠা নিবারণ করুন”

ধরিত্রীদেবী উত্তর দিলেন, “হে ধর্ম, আপনি যা জিজ্ঞাসা করলেন, সে সব কথা আপনিও জানেন, তাও আমি আমার দুঃখের কারণ বর্ণনা করছি। যিনি ছিলেন বলে আপনার চারটি পা বর্তমান ছিল এবং যাঁর কারণে সকল মহাজন ও সাধারণ মানুষের মনে মহাগুণ বিরাজ করত, সেই অনন্ত গুণের আকর শ্রীনিবাস এই লোক থেকে চলে যাওয়ায় পাপের আকর কলি আমাকে আক্রমণ করেছে। হে ধর্ম, শ্রী ভগবানের বিরহ দুঃসহ। ভগবানের শ্রীচরণচিহ্ন আমার সর্ব অঙ্গে ধারণ করে, আমি সৌভাগ্যের গর্বে অহংকারী হয়েছিলাম। মনে হয় সেই অপরাধেই তিনি আমাকে পরিত্যাগ করলেন। যে নির্বিকার পুরুষ অসুর কুলে জাত অত্যাচারি রাজাদের হত্যা করে আমার ভার লাঘব করেছিলেন, যিনি আপনার তিনটি খঞ্জ পায়ের দুর্গতি থেকে উদ্ধার করে আপনাকে পূর্ণাঙ্গ সুস্থ করে তুলেছিলেন, কোন ভক্ত তাঁর বিরহ সহ্য করতে পারবে? যাঁর প্রেমদৃষ্টি, মধুর হাস্য ও মনোহর আলাপ সত্যভামা প্রমুখা মানিনীদের মান ও ধৈর্য হরণ করেছিল, যাঁর পায়ের ধুলিকণা আমার অঙ্গের শোভা বাড়িয়েছিল, সেই পুরুষোত্তমের অন্তর্ধান কিভাবে সহ্য করা যায়?”

এইভাবে ধর্ম ও পৃথিবী যখন নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন, সেই সময় রাজর্ষি পরীক্ষিৎ কুরুক্ষেত্রে পূর্ববাহিনী সরস্বতী নদীর তীরে উপস্থিত হলেন” 

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, রাজা পরীক্ষিৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, এক রাজবেশধারী শূদ্র হাতে লাঠি নিয়ে এক বৃষ ও এক ধেনুকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাদা পদ্মের মতো ধবল বৃষটি ভয়ে মূত্রত্যাগ করছে ও এক পায়ে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছে। যজ্ঞের গব্য প্রসবিনী ধেনুটিও ক্ষুধায় ক্ষীণদেহ, শূদ্রের লাথিতে শোচনীয় অবস্থায় সন্তানহারা গাভির মতো বিলাপ করছে।

রাজা রথ থেকে এই দৃশ্য দেখে তাঁর ধনুতে তির স্থাপন করলেন, তারপর মেঘের মতো ক্রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বললেন, “দুরাচারি, তুই কে? আমার শাসনাধীন রাজ্যে থেকে বল দর্পে তুই দুর্বলকে অত্যাচার করছিস? তুই নটের মতো রাজবেশ ধরেছিস, কিন্তু তোকে দেখে তো শূদ্র বলেই মনে হয়! কৃষ্ণ ও অর্জুন অন্তর্হিত হয়েছেন দেখে তুই নির্জনে এই দুই দুর্বল প্রাণিদের নিধনে উদ্যত হয়েছিস? তোর প্রাণ বধ করলে এই পাপের উচিত শাস্তি হতে পারে”

তারপর তিনি বৃষকে ডেকে বললেন, “তুমি কে? তোমার শরীর পদ্মের মতো শুভ্র, কিন্তু তোমার তিনটি পা নেই কেন? তুমি কী কোন দেবতা, আমাদের ক্লেশ দেবার জন্যে বৃষরূপ ধারণ করেছ? এই রাজ্য পাণ্ডবদের বিশাল বাহুবলে শাসিত হয়, এখানে তোমরা দুইজন ছাড়া আর কাউকে শোক করতে দেখা যায় না। হে সুরভিপুত্র, শোক করো না, এই শূদ্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। হে মাতঃ, আমি যখন দুষ্ট লোকের শাসনে আছি, তখন তোমার মঙ্গল হবেই। তুমিও রোদন করো না। যে রাজার রাজ্যে প্রজারা অসাধু লোকের দ্বারা অত্যাচারিত হয়, সেই রাজার আয়ু, কীর্তি, ভাগ্য ও সম্পদ সকলই বিলুপ্ত হয়। হে সুরভিনন্দন, তোমার অন্য তিনটি পা কে ছিন্ন করেছে, আমাকে বলো, যাতে আমি তার উচিৎ প্রতিকার করতে পারি”

শ্রীধর্ম বললেন, “যাঁদের গুণে বশীভূত হয়ে স্বয়ং ভগবান দৌত্য, সারথ্য ইত্যাদি কর্ম করেছিলেন, আপনি সেই পাণ্ডবদের বংশধর, বিপন্নদের প্রতি আপনার এই অভয়বাণী সুসঙ্গতই হয়েছে। আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, আমাদের ক্লেশের কারণ কে? কিন্তু প্রাণীদের ক্লেশ কে দেয়, তা আমাদের পক্ষে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, ভিন্ন ভিন্ন মতের বিভিন্ন তর্কজালে আমরা বিভ্রান্ত। কেউ বলেন দেবতারা কর্মের অধীন এবং কর্ম আত্মার অধীন, অতএব আত্মা বা দেবতা কেউই দুঃখের কারণ নয়, সুতরাং আত্মাই আত্মাকে সুখ দুঃখ প্রদান করে। দৈবজ্ঞগণ বলেন, গ্রহরূপ দেবতারা সুখদুঃখের কারণ, আবার মীমাংসার পণ্ডিতরা বলেন, যাবতীয় সুখদুঃখ নিজের কর্মেরই ফল। যারা লোকায়ত* মতে বিশ্বাসী, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখের কোন কর্তা নেই, জীবের স্বভাব থেকে এর সৃষ্টি। যাঁরা বাক্য ও মনের অগোচর এক স্বতন্ত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁরা বলেন, সুখদুঃখ যাবতীয় বিষয় ঈশ্বররূপ মূল কারণ থেকে উৎপন্ন হয়। মহারাজ, আপনি উপরের সবকটি মতের মধ্যে যেটি সবথেকে সমীচীন মনে করেন, সেই মতটিই গ্রহণ করুন”

[এই লোকায়ত মতের বিশ্বাসীরাই ছিলেন নিরীশ্বরবাদী মহাভারতে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি চার্বাক যিনি দুর্যোধনের মিত্র ছিলেন। আবার রামায়ণে এই মতের প্রচারক ছিলেন মুনি জাবালি, যিনি শ্রীরামচন্দ্রকে পিতৃসত্য পালনের জন্যে বনবাসে না যাওয়ার উপদেশ দেওয়াতে, শ্রী রাম তাঁকে ধিক্কার দিয়ে তিরষ্কার করেছিলেন]।      

“হে বিপ্রগণ, ধর্মের এই উত্তর শুনে সম্রাট পরীক্ষিতের মন শান্ত ও সংশয়মুক্ত হল, তিনি বললেন, “হে ধর্মজ্ঞ, আপনি নিজের ঘাতকের নাম নির্দেশ না করে, বিবিধ ধর্ম তত্ত্ব নির্দেশ করায় আপনাকে বৃষরূপধারী সাক্ষাৎ ধর্ম বলেই মনে হচ্ছে। হে ধর্ম, আপনি সত্যযুগে তপস্যা, শুদ্ধি, দয়া ও সত্য এই সম্পূর্ণ চার পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ত্রেতাযুগে অধর্মের অংশ গর্ব দিয়ে তপস্যার, কুসঙ্গ দিয়ে শুদ্ধির, নেশাগ্রস্ত উন্মত্ততায় দয়ার ও অসত্য দিয়ে সত্যের চতুর্থাংশ বিনাশ হয়েছিল। এরপর দ্বাপরে অর্ধাংশ, ও কলিতে তিন অংশ বিনাশ হয়েছে। অতএব সত্যই কলিযুগের অবশিষ্ট একপাদ ধর্ম বলে নির্দিষ্ট হয়েছে। হে ধর্ম, এখন একমাত্র সত্যই আপনার জীবনধারণের উপায়, কিন্তু অসত্যে বাড়বাড়ন্ত কলি আপনার অবশিষ্ট পদটিকেও হরণ করতে চায়। ভগবান পরষ্পরের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে, পৃথিবীর ভারভূত রাজাদের ও যাদবদের সংহার করেছিলেন এবং তাঁর শ্রীচরণস্পর্শে সর্বত্র মঙ্গল বিরাজিত ছিল। কিন্তু এখন শান্তশীলা পৃথিবীও শ্রীকৃষ্ণের বিরহে নিজেকে হতভাগ্যা মনে করছেন এবং রাজবেশী শূদ্রেরা তাঁকে ভোগ করবে, এই আশঙ্কায় চোখের জল ফেলছেন”

“মহারথ পরীক্ষিৎ ধর্ম ও ধরিত্রীকে এইভাবে সান্ত্বনা দিয়ে অধর্মের মূল কলিকে হত্যা করবেন বলে ভয়ংকর খড়্গ তুললেন। রাজাকে ক্রুদ্ধ দেখে ভয়ার্ত কলি রাজবেশ ফেলে দিয়ে, মহারাজ পরীক্ষিতের দুই পায়ে মাথা রেখে প্রাণভিক্ষা করতে লাগলেন।

কলির এই দুরবস্থা দেখে দীনবৎসল মহারাজ পরীক্ষিৎ হেসে বললেন, “আমরা মহাবীর অর্জুনের বংশে জন্ম নিয়ে তাঁর যশ অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতিজ্ঞা করেছি। অতএব তুমি যখন আমার সামনে করজোড়ে তখন তোমার আর ভয় নেই, কিন্তু আমার রাজ্যে তোমার মতো অধর্মের কোন ভাবেই স্থান হবে না। তুমি রাজগণের মনে প্রবেশ করায়, লোভ, মিথ্যে, চুরি, দুষ্টতা, নীচতা, অলক্ষ্মী, কপটতা ও অহংকার বেড়ে উঠেছে। এখানে যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে, জনগণ যজ্ঞেশ্বরের অর্চনা করেন, যজ্ঞমূর্তি শ্রীহরিও তাঁদের সিদ্ধি ও মঙ্গল করেন। অতএব এই ব্রহ্মবর্তে তোমার স্থান হবে না”

শ্রীসূত বললেন, “পরীক্ষিৎ এই আদেশ দেওয়াতে কলি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হে সার্বভৌম, আমি আপনার আদেশে যেখানেই বাস করি না কেন, আপনাকে অস্ত্র হাতে সর্বদাই দেখতে পাব। অতএব, হে মহারাজ, আপনি আমাকে এমন একটি স্থান নির্দেশ করুন, যেখানে আমি বাস করে, আপনার আজ্ঞাপালন করতে পারি”

“কলি এই প্রার্থনা করায়, রাজা পরীক্ষিৎ, তাকে দ্যূত অর্থাৎ পাশাখেলায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রী ও প্রাণীহিংসা এই চারটি স্থান নির্দেশ করে দিলেন। এই চারটি স্থান অসত্য, অহংকার, অশুচি ও নিষ্ঠুরতা, এই চারটি অধর্মের আবাস হয়ে উঠল। কলি আরো একটি স্থান অনুনয় করলে, রাজা পরীক্ষিৎ তাঁকে সুবর্ণ দান করলেন। এই সুবর্ণে অসত্য, গর্ব, কাম, হিংসা ও কলহ পাঁচটি অধর্ম একসঙ্গে বাস করে। সেই থেকে সকল অধর্মের স্বরূপ কলি ওই পাঁচটি স্থানে বাস করতে লাগল। অতএব যে ব্যক্তি নিজের মঙ্গল কামনা করে, বিশেষ করে যাঁরা লোকপালক, তাঁদের ওই সকল বিষয় ভোগ করা একান্তই অনুচিত।

[অতএব সেই থেকে কলির বাসা হল পাশাখেলা অর্থাৎ জুয়ায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রীভোগে, প্রাণীহিংসায় ও সুবর্ণে – অর্থাৎ মিথ্যা, অহংকার, বাসনা, হিংসা ও কলহে। এই সব বিষয় যাঁরা ভোগ করেন না, তাঁরা কলির খপ্পর থেকে মুক্ত!]

এইভাবে রাজা কলির নিগ্রহ করে, বৃষের শরীরে তপস্যা, শৌচ ও দয়া এই তিনটি নষ্টপাদ আবার উদ্ধার করে দিলেন, অর্থাৎ ওই সকল ধর্ম আবার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ধরণীকে আশ্বস্ত করলেন। মহারাজ পরীক্ষিতের প্রভাবেই আজ আপনারা এই যজ্ঞে উপস্থিত থেকে দীক্ষিত হতে পেরেছেন”। 

চলবে...      


বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব "  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ "

প্রথম স্কন্ধ - অষ্টম পর্ব

শ্রীকৃষ্ণের লীলাসংবরণ   

 অর্জুন প্রিয়সখা-শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকায় গিয়েছিলেন, সে অনেকদিন হয়ে গেল। প্রিয়ভাই অর্জুন ও চিরসখা কৃষ্ণের অনেকদিন কোন সংবাদ না পেয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলেন। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের চোখে ভয়াবহ অশুভ সব লক্ষণ ধরা পড়তে লাগল। তিনি দেখলেন, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ব্যবহার। মানুষ ক্রোধ, লোভ ও মিথ্যাকে আশ্রয় করে, অসৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করছে। বাবা, মা, বন্ধু, ভাই, স্বামী, স্ত্রী নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। মানুষের অন্তরে সরল আত্মীয়তার বদলে কুটিল শঠতা আশ্রয় নিয়েছে।

[পরিবেশ নিয়ে সুসভ্য আধুনিক মানুষ সচেতন হয়েছে বা হচ্ছে বিগত পাঁচ-ছয় দশকে। তার কারণ বলা হয়, আধুনিক সভ্যতার ব্যাপক শিল্পায়ন, বিপুল নগরায়ণ এবং বীভৎস অরণ্য আগ্রাসন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের যুগে (ঐতিহাসিকরা বলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৯০০ বিসিই) আধুনিক সভ্যতার ওই ত্র্যহস্পর্শের স্পর্শ ছিল নামমাত্র। অতএব যুধিষ্ঠির যে লক্ষণগুলি দেখেছিলেন বা অনুভব করেছিলেন, সেগুলির সবকটিই ঘোর কলির লক্ষণ। কিন্তু একটু আশ্চর্য লাগে তাঁর "গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত ঋতুর ধর্ম বদলে যাচ্ছে" এই মন্তব্যে। তাঁর সময়েও পরিবেশ পরিবর্তনের কারণ কি? ভগবান তাঁর মর্ত্যলীলা সংবরণ করেছেন বলে আমাদের সামাজিক দুর্গতি শুরু হল, কিন্তু ঋতুর ধর্ম তিনি কেন বদলে দেবেন?]      

মহারাজ যুধিষ্ঠির একদিন অনুজ ভীমকে ডেকে বললেন, “বৃকোদর, অর্জুন প্রিয়সখা কৃষ্ণের সঙ্গে  দ্বারকায় গেছে বহুদিন হয়ে গেল। অর্জুন এখনও ফিরছে না কেন, বুঝতে পারছি না।  দেবর্ষি নারদ ভগবানের নরলীলা সংবরণের যে ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন, সেই সময় কি তবে আসন্ন? এই ভগবান কৃষ্ণের জন্যেই আমরা আজ এই রাজ্য, সম্পদ, প্রাণ, সম্মান, কুল ও প্রজা লাভ করেছি। তাঁর অনুগ্রহেই আমরা আমাদের শত্রুদের জয় করে স্বর্গসুখের অধিকারী হয়েছি। কিছুদিন ধরে, আমার শরীরে এবং চারপাশে আমি নানান অশুভ লক্ষণ লক্ষ্য করছি। আমার মনে হচ্ছে কোন এক ভয়ংকর বিপদ আমাদের দিকে যেন এগিয়ে আসছে।

এই দেখ, ভীম, আমার বাম চক্ষু, উরু আর বাহু বারবার কেঁপে উঠছে। কাঁপছে আমার হৃদয়। ওই দেখ, উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ করে শৃগালী বমি করছে, আর কাঁদছে। কুকুর আমার দিকে তাকিয়েও নির্ভয়ে চিৎকার করছে। গবাদি পশুরা কেন আমার ডানদিকে আর গাধারা আমার বাঁদিকে যাওয়া আসা করছে। ঘোড়াগুলিকে দেখ, আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। পেঁচা আর কাক কুৎসিত আওয়াজে কেমন ডাকছে শুনতে পাচ্ছো? ঐ দেখ ভীম, নদ, নদী, সরোবর  অশান্ত হয়ে উঠছে। কি আশ্চর্য, দেখ, আগুনে ঘি দিলেও আগুন জ্বলছে না। গোয়ালের বাছুরেরা স্তন্যপান করছে না। গাভীরা দুগ্ধক্ষরণ করছে না। দেবপ্রতিমাসকল দেখ, যেন ঘর্মাক্ত শরীরে কাঁদছে, তাঁরাও যেন অস্থির।  অশান্ত বাতাসে আর ধুলিকণায় সূর্য প্রভাহীন, নিস্তেজ। সমস্ত জনপদ, গ্রাম, নগর, উদ্যান, আশ্রম ধূসর, মলিন আর নিরানন্দ হয়ে উঠছে। এই সমস্ত ভয়াবহ লক্ষণ দেখে আমার মনে হচ্ছে, ভাই ভীম, এতদিনে বোধহয় পৃথিবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্নলাভের সৌভাগ্য হারাল”

[যুধিষ্ঠির বর্ণিত এই দুর্লক্ষণগুলিই আমাদের মনে কুসংস্কার হিসেবে গেঁথে রয়েছে বিগত প্রায় তিনহাজার বছর ধরে!]

এইরকম উদ্বিগ্ন চিন্তায় মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন কিছুদিন ব্যাকুল, একদিন অর্জুন দ্বারকাপুরী থেকে হস্তিনাপুরে ফিরলেন। ফিরে এসেই তিনি লুটিয়ে পড়লেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের পদতলে। অর্জুনের চোখে অশ্রুধারা, মুখ বিষণ্ণ, তিনি যেন ঘোরতর অসুস্থতাঁকে দেখে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আরেকবার দেবর্ষি নারদের সেই ইঙ্গিতের কথা মনে পড়ল।

ব্যাকুল হয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই অর্জুন, তুমি এমন কাঁদছো কেন? তোমার সুন্দর মুখ, কেন এত বিষণ্ণ? দ্বারকায় মধু, ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, সাত্বত বন্ধুরা সকলে ভালো আছেন তো? পূজনীয় মাতামহ শূর ও মামা বসুদেব, দেবকীসহ আমাদের সপ্ত মামীরা, তাঁদের পুত্র ও পুত্রবধূগণ সকলে কুশলে আছেন তো? পুত্রহীন রাজা উগ্রসেন, তাঁর ভাই দেবক ও হৃদীক, তাঁদের পুত্রেরা কৃতবর্মা, অক্রুর, জয়ন্ত, গদ, সারণ, শত্রুজিৎ এবং যদুশ্রেষ্ঠ ভগবান বলরাম ভালো আছেন তো? মহাবীর প্রদ্যুম্ন, ভগবান অনিরুদ্ধ, সুষেণ, চারুদেষ্ণ, জাম্ববতীর পুত্র শাম্ব এবং কৃষ্ণের অন্য পুত্রেরাও সকলে ভালো আছেন তো? শ্রীকৃষ্ণের অনুচর শ্রুতদেব ও উদ্ধব, সুনন্দ, নন্দ ও অন্যান্য যদুবীরগণের কুশল তো? ব্রাহ্মণের মঙ্গলকারী ও ভক্তবৎসল ভগবান গোবিন্দ দ্বারকাপুরীতে বন্ধুগণের সঙ্গে সুখে ও পরমানন্দে বাস করছেন তো?

ভাই অর্জুন, তোমার একি দশা হয়েছে? তোমার অঙ্গকান্তি মলিন, তোমার আর সেই তেজ নেই, তোমার এই অবস্থার কারণ কী? অনেকদিন বন্ধুগণের সঙ্গে ছিলে বলেই কি তোমার প্রাপ্য সম্মান তুমি পাওনি? তোমাকে কি তাঁরা অবহেলা করেছেন? কর্কশ কটুকথায় কেউ কি তোমার মনে কষ্ট দিয়েছে? দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোন দরিদ্রকে তুমি কি দান করতে পারোনি?  তোমার সাহায্যপ্রার্থী ব্রাহ্মণ, বালক, বৃদ্ধ, স্ত্রী, রোগী বা অন্য কাউকে তুমি কি সাহায্য করতে পারোনি? কোন দুশ্চরিত্রা নারীতে তুমি উপগত হওনি তো?  আসার পথে তোমার চেয়ে নীচ কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে পরাজয় স্বীকার করোনি তো?  ব্রাহ্মণ, বৃদ্ধ অথবা বালককে ভোজন না করিয়ে, তুমি নিজে ভোজন করে নিয়েছ, এমন হয়নি তো? অথবা তোমার চিরদিনের সখা কৃষ্ণকে হারিয়ে তুমি কি নিজেকে নিঃস্ব মনে করছো? আমার মনে হয়, এটাই একমাত্র কারণ, এ ছাড়া অন্য কোন কারণেই তোমার এই দশা হতে পারে না”

নিজেকে যথাসাধ্য সংবরণ করে, অর্জুন অগ্রজ মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, “দাদা, আমাদের সেই পরম বন্ধু শ্রীহরি আমাকে পরিত্যাগ করে দিব্যলোকে চলে গেছেন, যাবার সময় তিনি আমার সমস্ত শক্তিও হরণ করে নিয়েছেন। প্রাণহীন দেহ ক্ষণকালের মধ্যেই যেমন শবদেহ হয়ে যায়, তেমনই কৃষ্ণের ক্ষণকাল বিয়োগেই সমস্ত পৃথিবী শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

দাদা, তোমার মনে আছে, আমি দ্রুপদরাজার স্বয়ংবরে সমবেত সমস্ত রাজাদের পরাস্ত করে, মাছের চোখ বিদ্ধ করে, কৃষ্ণাকে লাভ করেছিলাম। ইন্দ্রের দেবসৈন্যকে পরাজিত করে খাণ্ডববন অগ্নিকে সমর্পণ করেছিলাম। ময়দানবকে সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ করে, তার অপূর্ব শিল্পকর্ম স্বরূপ আমাদের রাজসূয় সভা নির্মাণ করিয়েছিলাম। দাদা ভীম রাজসূয় যজ্ঞের সময়, জরাসন্ধকে হত্যা করে, তার কারাগারে বন্দী সমস্ত রাজাদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন। রাজসূয় যজ্ঞে মহা অভিষেকের পর, দ্রৌপদী তার সুন্দর কেশকবরী বন্ধন করেছিল। কিন্তু কপট দুঃশাসনরা সভামধ্যে কৃষ্ণার কবরী খুলে দিয়েছিল। পরে দাদা ভীম সেই দুঃশাসনদের হত্যা করে, তাদের পত্নীদেরও কবরী খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিলেন। এই সমস্তই আমরা করতে পেরেছিলাম আমাদের চিরসখা কৃষ্ণের অনুগ্রহে।

তারপর, দাদা তোমার মনে পড়ে, দুর্যোধনরা দুর্বাসার শাপে আমাদের বিনাশ করার পরিকল্পনায় আমাদের আশ্রমে একবার সহস্র শিষ্যসহ দুর্বাসামুনিকে অসময়ে পাঠিয়েছিল? সহস্র লোকের সেই হঠাৎ আতিথ্যে, মহাসঙ্কটে পড়ে দ্রৌপদী কৃষ্ণের কাছে সাহায্য চেয়েছিলকৃষ্ণ এল, এসে মৃদু হেসে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে, কৃষ্ণা, কী আছে খেতে দাও”দ্রৌপদীর তখন অসহায় অবস্থা, যাদের থেকে পরিত্রাণের জন্য সে কৃষ্ণকে ডাকল, তিনিও কিনা অভুক্ত? অবেলায়, কৃষ্ণার ভাঁড়ার তখন শূণ্য

ম্লান মুখে কৃষ্ণা বলেছিল, “আমি নিরুপায়, হে কৃষ্ণ, আমাদের সকলের খাওয়া শেষ, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই তোমাকে দেবার মতো”

“রান্নাঘরে যাও না, কৃষ্ণা, দেখ যা আছে, তাতেই আমার ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে” কৃষ্ণের মুখে অদ্ভূত প্রসন্ন হাসি আর দু চোখে অনন্ত রহস্য। কৃষ্ণা রান্নাঘরে গেল, শূণ্য পাত্রের গায়ে একটু শাক লেগে আছে, আর আছে তিন চারটে অন্নের দানা। পরম লজ্জায় আর দ্বিধায় তাই একটা পাত্রে এনে দিল দ্রৌপদী। তাই দেখে মহা আগ্রহে কৃষ্ণ হাতে নিল সেই পাত্র, কি আনন্দে সে মুখে তুলল সেই শাক আর অন্ন।

খাওয়ার পর উজ্জ্বল মুখে বলল,  “কৃষ্ণা, তবে যে তুমি বলেছিলে তোমার ভাঁড়ার শূণ্য, কিচ্ছু আর অবশিষ্ট নেই। তোমার দেওয়া এই অন্নে শুধু আমার নয়, জগতের সমস্ত জীবের ক্ষুধা পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে, এ আমি নিশ্চয় জানি”আশ্চর্য, কৃষ্ণের সেই অদ্ভূত লীলায় মুনি দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যরা স্নান সেরে সন্ধ্যা আহ্নিক করতে করতে অনুভব করলেন তাঁদের সকলের উদর পরিপূর্ণ, অন্নগ্রহণের এতটুকুও আর স্থান নেই। অপ্রস্তুত হয়ে নদীকূল থেকেই তাঁরা সকলে চলে গিয়েছিলেন, আমাদের আশ্রমে আর ফিরে আসেননি।

এই কৃষ্ণের প্রভাবেই আমি শূলপাণি মহাদেব ও উমাদেবীকে অবাক করে পাশুপত অস্ত্র লাভ করেছিলামএই কৃষ্ণের জন্যেই আমি এই নরদেহে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে বসতে পেরেছিলাম। যখন আমি ইন্দ্রলোকে ছিলাম নিবাত, কবচ দৈত্যদের বিনাশ করার সুযোগ পেয়েছিলাম কৃষ্ণের প্রভাবেই। এই কৃষ্ণকে আমি হারিয়েছি, দাদা। এই কৃষ্ণ বন্ধুরূপে আমার সঙ্গে ছিলেন বলেই, আমি ভীষ্মের মতো প্রবল সেনানীদেরও পরাজিত করে, বিরাট রাজার গোধন ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম। তারপর মোহনাস্ত্র প্রয়োগ করে, শত্রুদের ঘুম পাড়িয়ে তাঁদের সকলের মাথার মণি ও মুকুট আহরণ করে আনতে পেরেছিলাম।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আমার রথের সারথি হয়ে আমার সামনে বসে, এই কৃষ্ণই তাঁর কালদৃষ্টি দিয়ে ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্য প্রমুখ বীরদের আয়ু, উৎসাহ, শক্তি ও বীর্য ক্ষয় করে দিয়েছিলেননৃসিংহ ভক্ত প্রহ্লাদকে যেমন অসুরদের কোন অস্ত্র স্পর্শ করতে পারত না, তেমনি আমাকেও ভীষ্ম, কর্ণ, দ্রোণ, শল্যদের মতো বীরদের অস্ত্র থেকে কৃষ্ণই বারবার রক্ষা করেছেনআমরা মূর্খ, তাই তাঁকে আমরা রথের সামান্য সারথি করে রেখেছিলাম।

আর এক দিনের কথা মনে পড়ছে দাদা, কুরুক্ষেত্রে জয়দ্রথ বধের দিন, আমার ঘোড়াগুলো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। রথ থেকে নেমে আমি ওদের জল খাওয়াচ্ছিলাম। বিপদের কথা আমার মনেও হয়নি, আর কি আশ্চর্য দাদা, আমি যতক্ষণ ঘোড়াগুলিকে জল খাওয়াচ্ছিলাম, কৃষ্ণের মায়ায় কেউ আমার দিকে একটা অস্ত্রও প্রয়োগ করেনি। যদি করত, আজ আমি তোমার সামনে থাকতে পারতাম না, দাদা। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণকে হারিয়ে আমি সবদিক দিয়েই নিঃস্ব ও দুর্বল।

কত দিন আমি কৃষ্ণের সঙ্গে একসাথে বসে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি, শুয়েছি। মাধব সর্বদা হাসিমুখে আমায় অর্জুন, পার্থ, সখে কিংবা কুরুনন্দন বলে ডাকতেন। কতদিন পরিহাসছলে তাঁকে কত কথা বলেছি। আজ মনে হচ্ছে, সে সব কথা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি কিন্তু কিছু মনে করেননি। পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর এবং পতি যেমন পত্নীর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন, তিনিও আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। 

[গীতা - ১১শ পর্ব -এর ৪৪ সংখ্যক শ্লোকেও অর্জুন প্রায় একই কথা বলেছেন। পাশের সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন।]  

পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণের লীলা সংবরণের পর তাঁর মহিষীদের সুরক্ষার জন্যে আমার সঙ্গে নিয়ে আসছিলাম। আসার পথে একদল নীচ গোপসৈন্য আমাকে অসহায় অবলার মতো পরাস্ত করে, তাঁদের হরণ করে নিয়ে চলে গেল, আমি কিছু করতে পারলাম না। আমি সেই অর্জুন, আমার সঙ্গে সেই রথ, আমার কাছে সেই তির-ধনুক, অস্ত্র-শস্ত্র, যা দেখে একসময় মহাবীর রাজারাও ভয়ে মাথা নত করত, কিন্তু কৃষ্ণ বিরহে আজ আমি অক্ষম হয়ে গেছি। দ্বারকাপুরে যে বন্ধুগণের কুশল সংবাদ তুমি জিজ্ঞেস করলে, দাদা, তারা মদ্যপানে উন্মত্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে সকলে মারা গেছে, বেঁচে আছেন মাত্র চার পাঁচজন।

প্রাণীগণ যে পরস্পরের সঙ্গে শত্রুতা করে অথবা সৌহার্দ সূত্রে আবদ্ধ হয়, সে সবই ভগবানের কার্য, তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মহাবীর যদুসৈন্যদের দিয়ে ভারতের অন্যান্য দুর্ধর্ষ বীর অত্যাচারী রাজাদের বিনাশ করেছিলেন। সবার শেষে যদুবীরদের দিয়েই যদুবীরদের বিনাশ করে, তিনি পৃথিবীর ভার হরণ করলেন। সকল মানুষের মধ্যে এনে দিলেন সমমনোভাব”

শ্রীকৃষ্ণমহিমার কথা বলতে বলতে, তাঁর কথা চিন্তা করতে করতে অর্জুনের মনে শান্তি ও বৈরাগ্যের উদয় হল। তাঁর মনে পড়ে গেল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখে শোনা সেই পরমতত্ত্বকথা। সেই উপলব্ধি থেকে তাঁর মনের সমস্ত কামনা বাসনা দূর হয়ে গেল, দূর হয়ে গেল অজ্ঞানযুধিষ্ঠিরও ভগবানের লীলা সংবরণ ও যদুকুলের বিনাশের কথা শুনে স্থির করে ফেললেন, সবকিছু ছেড়ে তিনিও বেরিয়ে পড়বেন মহাপ্রস্থানের পথে। মাতা কুন্তীও সব ঘটনার বিবরণ শুনে ভগবানের পাদপদ্মে একান্ত ভক্তিসহকারে নিজের মন প্রাণ সমর্পণ করে পরম মুক্তির অপেক্ষা করতে লাগলেন।

শ্রীসূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, যদুবংশীয় ও যে সকল অসুর রাজকুলে জন্ম নিয়ে পৃথিবীকে ভারযুক্ত করেছিল, তারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের তনু। প্রথমটিকে যাদব-তনু এবং দ্বিতীয়টিকে ভূভার-তনু বলা যেতে পারে। পায়ে ফোটা কাঁটা যেমন লোকে আরেকটি কাঁটা দিয়ে তুলে ফেলার পর, দুটি কাঁটাকেই পরিত্যাগ করে, তেমনই শ্রীকৃষ্ণ যাদব-তনুর সাহায্যে ভূভার-তনুর বিনাশ করে, অবশেষে যাদব-তনুরও সংহার করলেন। কারণ উভয়েই সংহারযোগ্য বলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে সমান।

যেদিন ভগবান মুকুন্দ এই পৃথিবীর লীলা সাঙ্গ করে, নিজের মূর্তিতে বৈকুণ্ঠলোকে ফিরে গেলেন, সেই দিন অবিবেকীদের অমঙ্গলকারী কলি পূর্ণরূপে আবির্ভূত হল। বিচক্ষণ রাজা যুধিষ্ঠির নগরে, জনপদে, নিজের গৃহে ও নিজেদের মনে লোভ, মিথ্যা, হিংসা, কুটিলতা ও অধর্মের প্রবৃত্তিকে কলির প্রসার বলে বুঝতে পারলেন, এবং মহাপ্রস্থানে যাত্রার বেশ ধারণ করলেন। তারপর বিনীত ও সর্বগুণে নিজের তুল্য পৌত্র পরীক্ষিৎকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসালেন। অন্যদিকে অনিরুদ্ধের পুত্র বজ্রকে মথুরার সিংহাসনে বসিয়ে শূরসেন দেশের অধিপতি করলেন। সকল কর্তব্যের পর মহারাজা যুধিষ্ঠির প্রাজাপত্য যজ্ঞের অনুষ্ঠান করলেন। তাঁর অগ্নিগৃহে তিনটি অগ্নিকুণ্ড বর্তমান ছিল, প্রতিদিন সেই তিন অগ্নিতে তিনি গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণ নামক হোম যথা নিয়মে করতেন। এখন তিনি প্রাত্যহিক হোম কার্য পরিত্যাগ করে মহাপ্রস্থানের জন্য প্রস্তুত। সুতরাং তিনি নিজের আত্মাকেই অগ্নিকুণ্ড কল্পনা করে, মনে মনে হোমক্রিয়া সমাপ্ত করলেন। তারপর সেই স্থানেই তিনি রাজোচিত পট্টবস্ত্র, অলংকার, সাজসজ্জা ত্যাগ করে নিষ্ঠুরভাবে সংসারের বন্ধন ছিন্ন করলেন। এরপর হৃদয়ে পরব্রহ্মের ধ্যান করতে করতে তিনি উত্তরে হিমালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করলেন, কারণ, উত্তরদিকের হিমালয় প্রদেশে গেলে আর সংসারে ফিরে আসতে হয় না। তাঁর অনুজ ভাইয়েরাও সকলে তাঁর অনুগমন করলেন। অন্যদিকে বিদুরও প্রভাসক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণে মন প্রাণ সমর্পণ করে দেহরক্ষা করলেন। দ্রৌপদীও তাঁর পতিদের এই নির্মম ও উদাসীন ভাব দেখে, ভগবানের প্রতি অবিচলিত ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম লাভ করলেন।

যিনি শ্রীকৃষ্ণের একান্ত ভক্ত পাণ্ডুপুত্রগণের এই অতি পবিত্র মহাপ্রস্থানের কথা শোনেন, তিনি শ্রীহরির চরণ অরবিন্দে ভক্তিলাভ করেন ও সিদ্ধ অবস্থা পেয়ে থাকেন” 

পরের পর্ব " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৯ "          

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭

   এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব "  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬ "


পরীক্ষিতের জন্ম

শ্রীশৌণক বললেন, “কৃষ্ণ অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রে হতপ্রায় উত্তরার গর্ভরক্ষা করলেন, এ কথা তো বললেন। এখন সেই বিজ্ঞ মহাত্মা পরীক্ষিতের জন্ম, কর্ম ও মৃত্যুর পর তাঁর যে গতি হয়েছিল, সে সম্পর্কে শ্রীশুকদেবের কাছে যেমন শুনেছেন, সেই সমস্ত ঘটনা আমাদের বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “কৃষ্ণের চরণপদ্মে একান্ত অনুরক্ত এবং কামনার বস্তুতে একান্ত অনাসক্ত যুধিষ্ঠির প্রজাদের পিতার মতোই পালন করতে লাগলেন। তাঁর মন সর্বদাই মুকুন্দে অর্পিত, অতএব ফুলের মালা ও চন্দন যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খুশি করতে পারে না, তেমনই সম্পদ, যজ্ঞের অনুষ্ঠান, প্রিয়তমা মহিষী, অনুগত ভ্রাতৃগণ, পৃথিবীর আধিপত্য কোন কিছুতেই তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।

হে ভৃগুনন্দন শৌণক, পরীক্ষিৎ যখন মাতৃগর্ভে ব্রহ্মাস্ত্রের তেজে দগ্ধ হচ্ছিলেন, সেই সময় তিনি এক অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ পুরুষকে দেখতে পেয়েছিলেন। ওই পুরুষের মাথায় উজ্জ্বল মুকুট। তিনি অত্যন্ত সৌম্যদর্শন, শ্যামবর্ণ, বিদ্যুতের মতো পীতবসনে আবৃত কিন্তু নির্বিকার। তিনি গর্ভের চারদিকে উল্কাবর্ণের এক গদা বারবার ঘোরাচ্ছিলেন। সূর্য যেমন হিমরাশিকে বিনাশ করেন, তেমনই ভগবান নিজের গদার সাহায্যে সেই ব্রহ্মাস্ত্রকে নিস্তেজ করলেন। গর্ভের শিশু তাঁকে সামনে দেখে, যখন ভাবছে, ইনি কে? তখনই অনন্তস্বরূপ ভগবান শ্রীহরি সেই শিশুর সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন।        

যথাসময়ে শুভলগ্নে উত্তরার কোলে উজ্জ্বল এক পুত্রের জন্ম হল। এই পুত্র পাণ্ডুবংশের একমাত্র বংশধর। মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রসন্নমনে ধৌম্য, কৃপ প্রমুখ ব্রাহ্মণদের স্বস্তি বচনে নবজাত কুমারের জাতকর্ম করলেন। তিনি সৎ ব্রাহ্মণদের প্রচুর সোনা, গাভি, বাসভূমি, ক্ষেত্রভূমি, হাতি, ঘোড়া এবং অন্ন দান করলেন। ব্রাহ্মণেরা সন্তুষ্ট হয়ে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “হে মহারাজ, এই শিশুর গর্ভাবস্থাতেই অমোঘ অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যুযোগ ছিল, ভগবান বিষ্ণুর মহাপ্রভাবে এই শিশুর প্রাণরক্ষা হয়, অতএব ইনি বিষ্ণুরাত নামে বিখ্যাত হবেন। এই শিশু অসাধারণ গুণের আধার ও পরমভক্ত হয়ে উঠবেন। বড় হয়ে এই শিশু, মনুপুত্র ইক্ষ্বাকুর মতো প্রজাপালক হবেন। দশরথের পুত্র শ্রীরামচন্দ্রের মতো ব্রাহ্মণের রক্ষক ও সত্যের পুজারী হবেন। উশীনরের পুত্র রাজা শিবির মতো মহাদাতা ও দুর্বলের আশ্রয় হয়ে উঠবেন। দুষ্মন্তের পুত্র মহারাজ ভরতের মতো বংশের নাম উজ্জ্বল করবেন। অর্জুনের মতো মহাবীর হবেন। ইনি যযাতির মতো ধার্মিক হবেন এবং প্রহ্লাদের মতো কৃষ্ণভক্ত হবেন।

সামান্য এক ভ্রান্তির কারণে, ঋষিপুত্রের অভিশাপে তক্ষকের দংশনে এঁনার মৃত্যু হবে। এই মৃত্যুর কথা জানার পর সমস্ত আসক্তি ত্যাগ করে, শ্রীহরিতে ইনি মন প্রাণ সমর্পণ করবেন। ব্যাসদেবের পুত্র মুনিশ্রেষ্ঠ শুকদেবের কাছে ইনি পরমতত্ত্ব লাভ করে, শ্রীকৃষ্ণের পরমপদে আশ্রয় পাবেন”

শুক্লপক্ষে চাঁদের কলা যেমন শোভা পায়, সেই শিশু দিন দিন তেমনি বড় হতে লাগলেন। মায়ের গর্ভে বাস করার সময়, এই শিশু যে পরমপুরুষকে দেখেছিলেন, তাঁকে কিন্তু ভুলতে পারেননি। যে কোন মানুষকেই তিনি খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করতেন এবং ভাবতেন এই লোকই সেই মহাপুরুষ নয় তো? এইভাবেই তাঁর মনের দৃষ্টিতে তিনি সকলকে পরীক্ষা করতেন বলে, তাঁর নাম হল পরীক্ষিৎ। যুধিষ্ঠির ও চার ঠাকুদার তত্ত্বাবধানে এবং তাঁদের পরম স্নেহের ছায়ায় পরীক্ষিৎ বড় হয়ে উঠতে লাগলেন দিন দিন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ধার্মিক, কৃষ্ণভক্ত, বুদ্ধিমান ও সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন।

এরই মধ্যে মহারাজ যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রে স্বজন হত্যার পাপ মুক্তির জন্যে আরও একবার অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠানের মনস্থ করলেন। কিন্তু তাঁর কাছে যথেষ্ট অর্থের তখন অভাব ছিল, কারণ তিনি প্রজাদের থেকে নির্দিষ্ট কর ছাড়া অন্য কোন শুল্ক নেবার পক্ষপাতী ছিলেন না। তখন শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে চারভাই উত্তরদিকে গিয়ে মরুত্ত রাজার যজ্ঞে পরিত্যক্ত অনেক সোনার বাসনপত্র সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন। সেই সোনার বিনিময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের যোগাড় সম্পন্ন হল।

মহারাজ যুধিষ্ঠিরের নিমন্ত্রণে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবার হস্তিনাপুরে এলেন। তাঁর উপস্থিতিতে, ব্রাহ্মণেরা তিনটি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণকেই অর্চনা করলেন। এই যজ্ঞ শেষে শ্রীকৃষ্ণ কয়েকমাস হস্তিনাপুরেই বাস করে সকলকে আনন্দ দিলেন। তারপর মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তিনি অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে দ্বারকায় ফিরে গেলেন”


বিদুরের ঘরে ফেরা

শ্রীসূত বললেন, “ইতিমধ্যে বিদুর তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে মৈত্রেয় মুনির কাছে আত্মার গতিস্বরূপ শ্রীহরির সকল তত্ত্ব অবগত হয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। কুশারুতনয় মৈত্রেয়কে কয়েকটি প্রশ্ন করেই বিদুরের গোবিন্দের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির উদয় হয়েছিল। এখন দূর থেকে তাঁর ফেরার সংবাদ পেয়েই যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা, ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, সঞ্জয়, কৃপাচার্য্য, কুন্তী, গান্ধারী, দ্রৌপদী, সুভদ্রা, উত্তরা, আর আর অনেক আত্মীয়পরিজন বিদুরকে সঙ্গে আনার জন্যে এগিয়ে গেলেনবিদুরকে দেখে তাঁদের সকলেরই দেহে যেন প্রাণ ফিরে এল। তাঁকে আলিঙ্গন করে, অভিবাদন করে সকলের চোখ আনন্দে অশ্রুসজল হয়ে উঠল। রাজা যুধিষ্ঠির তাঁর পুজো করলেন, ভোজন এবং বিশ্রামেরও ব্যবস্থা করলেন।

তারপর বিদুর সকলের সামনে এসে বসলে, বিনীত যুধিষ্ঠির তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে পিতৃব্য, দীর্ঘ তীর্থ ভ্রমণের সময়, আমাদের কথা কি আপনার কখনো মনে পড়েনি? পক্ষীমাতা যেমন পাখার আবরণে তার শাবকদের রক্ষা করে, পোষণ করে, আপনিও ঠিক তেমনি আমাদের সকলকে বিষপ্রয়োগ, অগ্নিদহনের মতো বিপদ থেকে বহুবার রক্ষা করেছেন। আপনার অন্তরে সর্বদাই ঈশ্বরের অধিষ্ঠান, আপনি নিজেই তীর্থ স্বরূপ। মলিন জীবগণের সংস্পর্শে যখন তীর্থ দূষিত হয়ে পড়ে, আপনার মতো ব্যক্তিদের পায়ের ছোঁয়ায় সেই তীর্থ আবার হারানো মাহাত্ম্য ফিরে পায়। আপনার তীর্থভ্রমণে কোন স্বার্থ নেই, বরং আপনার মতো ঈশ্বরভক্তদের কল্যাণে তীর্থ সার্থকতা পায়। আপনার সেই সার্থক তীর্থভ্রমণ আমাদের বর্ণনা করুন।

হে পিতৃব্য, বহুকাল দ্বারকার যদুকুলের কোন সংবাদ পাইনি। তাঁরা সকলে কুশলে আছেন তো? যদুকুলের প্রাণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ কুশলে আছেন তো? অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়সখা, সেও বহুকাল দ্বারকায় রয়েছে, তারও সংবাদ কুশল তো? আপনার সঙ্গে যদুকুলের কারোর সম্প্রতি সাক্ষাৎ হয়েছিল কি? আপনি কি কোন সংবাদ দিতে পারেন”?

বিদুর তাঁর দীর্ঘ তীর্থভ্রমণের অনেক কথাই বললেন, কিন্তু এড়িয়ে গেলেন যুধিষ্ঠিরের শেষ প্রশ্নগুলি। যদুবংশধ্বংসের যে সংবাদ তিনি শুনেছেন, সে কথা যুধিষ্ঠিরকে এখনই বললে তার পক্ষে এ সংবাদ সহ্য করা সম্ভব হবে না, এই বিবেচনায় তিনি নীরব থাকলেন। তিনি বড়োভাই ধৃতরাষ্ট্রকে অনেক ধর্মতত্ত্ব উপদেশ করলেন।

কিছুদিন হস্তিনাপুরে থেকে বিদুর দেখলেন যুধিষ্ঠির রাজ্যগ্রহণ করে, ভাইদের সঙ্গে সুযোগ্য পৌত্র পরীক্ষিতের প্রতি স্নেহে পরম আনন্দে রাজ্যসুখ ভোগ করছে একদিন তিনি বড়ভাই ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, “হে রাজন, আপনার পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু, পুত্রগণ সকলেই কালের প্রভাবে মৃত্যু বরণ করেছে। এখন আপনিও বার্ধক্যের শেষ পর্যায়ে, আপনার পরমায়ু প্রায় শেষ হতে চলল। আপনি চিরদিন অন্ধ ছিলেন, এখন কানেও কম শোনেন এবং আপনার বুদ্ধিও ক্ষীণ হয়ে এসেছেআপনার দাঁত পড়ে গেছে, হজমশক্তিও হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় আপনার পরের ঘরে পরের দয়ায় জীবনধারণ করা ছাড়া অন্য উপায় নেই।  কিন্তু আপনি কার ঘরে রয়েছেন?  আপনি কিসের আশায় আপনার পুত্রদের যারা হত্যা করেছে তাদের দেওয়া অন্নে আপনার এই শরীর রক্ষা করছেন?  যাদের হত্যা করার জন্য জতুগৃহে আগুন লাগানো হয়েছিল, যাদের হত্যা করার জন্যে বিষাক্ত মিষ্টি দেওয়া হয়েছিল। রাজ্য ও ধন পাশার খেলার নামে চুরি করে, যাদের রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তাদের অন্নে বেঁচে থাকার আপনার কি প্রয়োজন?  এখনো সময় আছে, হে রাজন, কাউকে কিছু না বলে, ঘর ছেড়ে উত্তর দিকে চলে যান। নিস্পৃহ ও বিবেক অনুসারে জীবনের বাকি কয়েকটা দিন শ্রীহরির চিন্তায় মগ্ন থাকুন। তিনি পরমপুরুষ, তাঁর চরণে আশ্রয় নিন”

বিদুরের এই কথায়, ধৃতরাষ্ট্রের মোহভঙ্গ হল, তিনি সমস্ত মায়া ও মমতা বন্ধন ছিন্ন করে, কাউকে কিছু না বলে হিমালয়ের পথে রওনা হলেনতাঁর সঙ্গে রইলেন পতিব্রতা স্ত্রী গান্ধারী আর ছোটভাই মহাত্মা বিদুর।

সন্ধ্যা আরতির পর যুধিষ্ঠির ঘরে ফিরে গুরুজনদের প্রণাম করতে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও বিদুরকে দেখতে পেলেন না। ঘরের দরজায় বসে থাকা সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “সঞ্জয়, তুমি কি জান, জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারী ও খুল্লতাত বিদুর কোথায় গেলেন? তাঁর পুত্রদের আমি হত্যা করেছি, অতএব তাঁদেরকেও হত্যা করতে পারি, এই আশঙ্কাতেই কি তাঁরা ঘর ছাড়লেন? আমাদের শৈশবে পিতাকে হারানোর পর, এই মহাত্মা বিদুর আমাদের কত বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। তিনিও আমাদের বিশ্বাস করতে পারলেন না”? 

সঞ্জয়  চোখের জল মুছে বললেন, “হে মহারাজ, আমি যখন নিদ্রামগ্ন ছিলাম, সেই সময়েই ওঁনারা গৃহত্যাগ করেছেন। কাজেই আমিও ওঁনারা কোথায় গেছেন, কী উদ্দেশে গেছেন কিছুই জানি না। আমি জানি না, আর আমি ওঁনাদের পদসেবা করতে পারবো কিনা”

যুধিষ্ঠির ও সঞ্জয় যখন উদ্বিগ্নমনে এইরকম শোক করছেন, সেই সময়ে উপস্থিত হলেন দেবর্ষি নারদ। নারদকে দেখে যুধিষ্ঠির ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

তাঁকে প্রণাম ও পুজো করে বললেন, “হে দেব, আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন। অন্ধ ও বৃদ্ধ জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, পুত্রশোকে কাতর মাতাগান্ধারী আর খুল্লতাত বিদুর কোথায় চলে গেলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি এসেছেন, শুভ দৈবের মতো। আপনি নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, তাঁরা কোথায় গেছেন, কেন গেছেন, কারণ আপনি অন্তর্যামী”

যুধিষ্ঠিরের এই ব্যাকুল কথায় দেবর্ষি নারদ বললেন, “হে রাজা যুধিষ্ঠির, এই জগৎ ঈশ্বরের অধীনকাঠের পুতুল নিয়ে খেলতে থাকা বালক যেমন তার ইচ্ছে মতো পুতুলকে খুলে ফেলে আবার যুক্ত করে, ভগবানও তাঁর ইচ্ছে মতো জীবকে কখনো জগত থেকে আলাদা করে দেন, কখনো যোগ করেন। যে শক্তিতে সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের বৈষম্য হয়, তাকে বলে কাল। যে বাসনা ও সংস্কারের বশীভূত হয়ে জীব বারবার জন্ম নেয়, তাকে বলে কর্ম। আর যে উপাদানে জীবদেহের নির্মাণ হয় তাকে গুণ বলে।  এই পঞ্চভূতে নির্মিত দেহ, কাল, কর্ম ও গুণের অধীন। কালরূপ অজগর যাকে গ্রাস করেছে, সে ব্যক্তি অন্য কাউকে যেমন রক্ষা করতে পারে না। সেরকমই কাল, কর্ম ও গুণের বশীভূত দেহ অপরকে রক্ষা করতে সমর্থ হয় না।

[সনাতন ধর্মে কাল, কর্ম ও গুণ তিনটি বিষয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, দেবর্ষি এই তিনটি বিষয়েরই সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিলেন দেবর্ষি।]

আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে চিন্তিত হবেন না। কারণ, ভগবান সমস্ত জীবের জীবিকার সংস্থান করেই রেখেছেন। ছোট ছোট মাছ, বড়ো মাছের খাদ্য। তৃণ, শষ্প মৃগাদি ও গবাদির খাদ্য। মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য। মহারাজ, এইভাবে সমস্ত জীবই একে অপরের জীবিকার স্বাভাবিক উপায়। যত ভোক্তা জীব আছে, ভগবান সকলেরই আত্মা। আবার যত ভোগ্য আছে, তাদেরও আত্মা একই ভগবান। এই জগতের কোন কিছুই ভগবানের থেকে আলাদা নয়। আমরা বুঝতে পারি না, তাই সবকিছুর মধ্যেই পার্থক্য দেখতে পাই। কিন্তু আসল তত্ত্বটি হল, ভগবান একতিনি তাঁর মায়ায় বহুভাগে বিভক্ত হয়েছেন। হে মহারাজ, মহামায়াবী ভগবান এখন অসুর বিনাশের জন্যে কালরূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে দ্বারকায় বাস করছেন। তাঁর কার্য প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, সামান্য কিছু আর বাকি আছে। অতএব যতদিন ভগবান পৃথিবীতে থাকেন, আপনারাও তাঁর অপেক্ষা করুন।

[কি সর্বনাশ, দেবর্ষি নারদ বললেন, "মৃগাদি অন্যন্য প্রাণীও মানুষের খাদ্য!!" অথচ আজ আমরা নিরামিষ ভোজনকে বলছি ধর্মের একমাত্র পথ আর আমিষ ভোজনকারীরা অনাচারী অধার্মিক! আজকের সনাতন ধর্মের ধর্মরক্ষকগণ দেবর্ষি নারদের থেকেও ধর্মপ্রাণ? ]           

রাজা ধৃতরাষ্ট্র, রাজ্ঞী গান্ধারী ও ধর্মাত্মা বিদুর হিমালয়ের দক্ষিণভাগে ঋষিগণের আশ্রমে গিয়েছেন। সুরধনী গঙ্গা যেখানে সাতভাগে বিভক্ত হয়েছেন, সেই সপ্ততীর্থে তাঁরা স্নান করে প্রত্যেকদিন হোম করেন এবং একমাত্র জলপান করে জীবনধারণ করছেন। তাঁরা ধন, জন ও পুত্রদের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে আত্মাকে প্রশান্ত করে সংযম অভ্যাস করছেন। তাঁরা শ্রীহরির ভাবনায় নিজেদের উৎসর্গ করে সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রভাব দূর করে ধ্যান অবস্থা পেয়েছেন। যতক্ষণ দেহরূপ এই ঘট সচেতন থাকে, তখন ঘটে আবদ্ধ আকাশ আর বাইরের মহাকাশের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই ঘট ভেঙে গেলে, দেহের আকাশ, মহাকাশের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই ভাবেই মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁর এই জীবাত্মাকে শুদ্ধচৈতন্য ব্রহ্মে লীন করতে চলেছেন।

[ধৃতরাষ্ট্রের মতো স্নেহান্ধ ও অন্যায়-সহায়ক রাজার দেহরূপ ঘট ভেঙে গেলে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর জীবাত্মা  যদি শুদ্ধ চৈতন্য ব্রহ্মে লীন হয়ে যেতে পারে, তাহলে মৃত্যুর পর আমাদের জীবাত্মা ব্রহ্মপদে লীন হবে না কেন? আমরা রাজা ধৃতরাষ্ট্রের তুলনায় কতটুকুই বা অন্যায় করেছি সারা জীবনে?]        

অতএব, হে রাজা যুধিষ্ঠির, আপনি তাঁদের আশ্রয় এবং জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ ত্যাগ করুন ও বৃথা শোক করবেন না। আপনি তাঁদের মোক্ষপথে বাধা সৃষ্টি করে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করবেন না। রাজা ধৃতরাষ্ট্র সমস্ত কর্ম ত্যাগ করেছেন এবং আজ থেকে পঞ্চম দিনে তিনি দেহত্যাগ করবেনতাঁর দেহ যোগ অগ্নিতে ছাই হয়ে যাবে। যোগের আগুনে যখন তাঁর দেহ ও পাতার কুটির জ্বলবে, সেই আগুনেই দেহত্যাগ করবেন পতিব্রতা রাজ্ঞী গান্ধারী। মহাত্মা বিদুর এই আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করবেন। বড়োভাইয়ের এই পরমগতি লাভের দৃশ্যে তিনি আনন্দ পাবেন, আবার দুঃখও পাবেন। তারপর তিনিও বেরিয়ে পড়বেন তীর্থভ্রমণে”

এই কথা বলে, দেবর্ষি নারদ বীণায় সুরতুলে শ্রীহরির মহিমা কীর্তন করতে করতে পথে বেরিয়ে পড়লেন এবং যুধিষ্ঠিরও তাঁর নির্দেশ হৃদয়ে অনুভব করে শোক পরিত্যাগ করলেন। 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮ "

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৬

  এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

এই সূত্র থেকে শুরু - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/১ " 


  আগের পর্ব ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৫ "


ভীষ্মের কৃষ্ণবন্দনা ও দেহত্যাগ

সূত বললেন, “হে বিপ্রগণ, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরার উদ্যোগে ভেঙে পড়লেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। তাঁর মন ধর্ম থেকে বিচলিত হয়ে গেল।

তিনি স্নেহ ও মোহের বশে বিলাপ করতে করতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে বললেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না। আমি ভীষণ পাপ করেছি। এই যুদ্ধে আমি কত ব্রাহ্মণ, বন্ধু, জ্ঞাতি, ভাই, গুরু এবং পিতৃতুল্য ব্যক্তিকেও হত্যা করেছি। হাজার হাজার বছর নরকবাসেও আমার এই পাপমুক্তি হবে না। আমি তো কোনদিনই রাজা ছিলাম না, হে কৃষ্ণ। অতএব, প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে এই যুদ্ধ করেছি, তাও বলা চলে না। আমি এই যুদ্ধ করেছি শুধুমাত্র রাজ্যলোভে। এই যুদ্ধে আমি বহু নারীর স্বামী, পুত্র, ভ্রাতা কিংবা পিতাকে হত্যা করে, তাদের গৃহস্থ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করেছি। অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে এই পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন শাস্ত্রকথায় আমার আর বিশ্বাস নেই। কাদা দিয়ে যেমন দূষিতজলকে শুদ্ধ করা যায় না, তেমনি অশ্বমেধের যজ্ঞে ঘোড়াকে আহুতি দিলেই, এতগুলি নরহত্যার পাপ খণ্ডন হতে পারে না

শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গে নিয়ে, কুরুক্ষেত্রে দেবব্রত ভীষ্ম যেখানে শরশয্যায় শুয়ে আছেন, সেখানে নিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে গেলেন সমবেত মুনি, ঋষি ও পাণ্ডবদের চার ভাই। ভরতবংশের এই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখার জন্যে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্বত, নারদ, ধৌম্য, বৃহদশ্ব, ভরদ্বাজ, অনেক শিষ্য নিয়ে পরশুরাম, বশিষ্ঠ, অসিত, গৌতম, অত্রি, কৌশিক, সুদর্শন, শুকদেব, কশ্যপ, আঙ্গিরস। সেখানে আমিও সেদিন উপস্থিত ছিলাম। সকল মুনি ঋষিদের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দেখে ভীষ্মের চোখে জল চলে এলতিনি আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে সকলকে প্রণাম জানালেন। বন্দনা করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। পাণ্ডবদের পাঁচ ভাই মহামতি ভীষ্মকে প্রণাম করে তাঁর পাশে বিষণ্ণ মুখে বসলেন।

তাঁদের ম্লানমুখে বসে থাকতে দেখে, মহামতি ভীষ্ম স্নেহস্বরে বললেন, হে পাণ্ডুর পুত্রেরা, সারা জীবন তোমরা ব্রাহ্মণ, ধর্ম এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেও, এমন বিষাদগ্রস্ত কেন? মহাবীর পাণ্ডু যখন মারা যান, তোমরা তখন শিশুমাত্র। বধূমাতা পৃথা তোমাদের মানুষ করার জন্যে কি কষ্টই না সহ্য করেছেন! এসবই ঘটেছে কালের নিয়মে। কালের নিয়মেই জীবের সুখদুঃখের দিন আসে আবার চলেও যায়। তোমাদের সঙ্গে আছে যুধিষ্ঠিরের ধর্মবল, ভীমের বাহুবল, অর্জুনের অস্ত্রবল আর সবার উপরে আছেন সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণের মিত্রবল। এর চেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে?

হে মহারাজ যুধিষ্ঠির, আমাদের বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তুমিই যোগ্য রাজা এবং রাজ্য চালনায় তুমি যথেষ্ট দক্ষ। এই জগৎ ঈশ্বরের অধীন, মনে এই বিশ্বাস রেখে তুমি প্রজাপালন করো। তোমাদের একান্ত মিত্র এই শ্রীকৃষ্ণই সেই পরম ঈশ্বর, তাঁর প্রতি ভক্তি রেখে তোমরা নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করো। এই শ্রীকৃষ্ণের মনের কী ইচ্ছে, সে কথা তিনলোকের কেউই বুঝতে পারেন না, তোমরা কী করে বুঝবে? ইনি যে এখন যাদবদের মধ্যে যাদব হয়েই রয়েছেন, এ কথা খুব কম লোকেই জানেন। একথা জানেন দেবর্ষি নারদ এবং কপিলমুনি, আর কয়েকজন। ইনি সকলের আত্মা, ইনি সকলকে সমান ভাবে দেখেন। এঁনার মনে অহংকার নেই, কারোর প্রতি বিদ্বেষ নেই।

শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সাক্ষাৎ ঈশ্বর, তাঁকে তোমরা সাধারণ মামাতো ভাই মনে করেছ। ভালোবেসেছ, বিশ্বাস করেছ, ভরসা করেছ। যখন যে কাজে তোমরা ওঁনাকে নিয়োগ করেছ, উনি বিনা দ্বিধায় সে কাজ করেছেন। কখনো তোমরা সম্মানীয় মন্ত্রী হিসেবে ওঁনার মন্ত্রণা নিয়েছ। কখনো রাজদূত হিসেবে হস্তিনাপুরের রাজসভায় পাঠিয়েছ। আবার রথের সামান্য সারথিপদেও তোমরা ওঁনাকে নিযুক্ত করেছ! লক্ষ্য করে দেখ, ওঁনার মনে উঁচু কাজ, নীচু কাজ এমন কোন দ্বিধা নেইওঁনার দৃষ্টিতে সবাই সমান; আপন-পর, শত্রু-মিত্র, উঁচু-নীচু কোন ভেদ নেই”

[এইখানে মহামতি ভীষ্ম ভারতের অসাধারণ ভক্তিমার্গের দিশাটি ভক্তদের মনে জাগিয়ে তুললেন। ঈশ্বর তাঁর ভক্তদের নানারূপে দেখা দিতে পারেন। পরবর্তী কালে আমরা দেখব মাকালী কন্যারূপে ভক্তকবির ঘরের বেড়া বেঁধেছেন। কখনো অভিমানী ভক্তকবি গেয়েছেন, "মাগো, গেছিস কি তুই মরে, গয়া গিয়ে আসি গে তোর শ্রাদ্ধ-শান্তি করে", অথবা রবীন্দ্রনাথ গেয়েছেন, "তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে"। ভারতের ঈশ্বর সর্বদাই উদাসীন করুণাময় নয়, তিনি নিষ্ঠুর হাতে সর্বদা দণ্ড বিধান করেন না, তিনি ভক্তের মনে প্রিয়রূপে বিরাজও করেন।]              

মহামতি ভীষ্ম সামান্য বিরামের পর, শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে আবার বললেন, “হে পাণ্ডুর পুত্রগণ, তোমরা ওঁনার মহিমা উপলব্ধি করো যদিও আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের, তাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছে এসেছেন। উনি জানেন আমি ওঁনার একান্ত ভক্ত এবং আমি আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায় রয়েছিতাই ভক্তের প্রতি একান্ত করুণায়, উনি নিজে এসেছেন আমায় দেখা দিতে! আমি তোমাদের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল জেনে উনি তোমাদেরকেও এখানে নিয়ে এসেছেন। এই যুদ্ধের কারণে তোমরা যে মানসিক যন্ত্রণায় রয়েছ, আমার সান্নিধ্যে সে সব মুছে যাক, এও ওঁনার মনের ইচ্ছা। 

হে কৃষ্ণ, তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আর তোমার ঐ করুণাঘন দৃষ্টিতে আমি জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম হে কৃষ্ণ, আমি ধন্য, আমি কৃতার্থ, পরম আনন্দে আমি আপ্লুতআমার একটাই নিবেদন, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু আসে, তুমি আমার এই শরশয্যার পাশে প্রতীক্ষা করো, আমি দু চোখ ভরে তোমায় যেন দেখতে পাই”

এরপর মহামতি ভীষ্ম মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, দানধর্ম, মোক্ষধর্ম, স্ত্রীধর্ম, ভগবৎ ধর্ম এবং আরো অনেক বিষয়ে উপদেশ দিলেন। এই সব আলোচনা হতে হতেই মহামতি ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর সময় উত্তরায়ণের কাল ঘনিয়ে এল। কথাবার্তা শেষ করে মহামতি ভীষ্ম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে এবং সমস্ত মন প্রাণ তাঁকেই সমর্পণ করলেন।

কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর তিনি আবার বললেন, “হে যাদব শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান পরমানন্দ স্বরূপ। আমি তোমাতে আমার কামনাহীন মতি সমর্পণ করলাম। হে অর্জুনের সারথি, তোমার তমালকান্তি অপরূপ দেহে নতুন সূর্যের মতো উজ্জ্বল পীত বসন অপূর্ব মানিয়েছে। তোমার ঐ সদাপ্রসন্ন মুখ দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। হে কৃষ্ণ, তোমার প্রতি আমার অহৈতুকি ভক্তি যেন সর্বদা অচল থাকে, এই প্রার্থনা করি।

হে কৃষ্ণ, যুদ্ধের সময় তুমি অর্জুনের রথে ছিলে। আমার ছোঁড়া তিরে তোমার গায়ের কবচ বার বার ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তোমার চুলের থেকে ঝরে পড়া ঘামের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের ধুলো মিশে তোমার মুখে অদ্ভূত আলপনা সৃষ্টি হচ্ছিল বারবার।

হে কৃষ্ণ, বন্ধু অর্জুনের কথায়, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের দুই পক্ষের মাঝখানে তুমি রথ স্থাপনা করেছিলে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রোণ আর আমাকে দেখে, বিষণ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধে বিরত হয়েছিল, তুমি ওকে পরমাত্মা তত্ত্ব উপদেশ দিয়ে ওর মোহ দূর করেছিলে। আর উপদেশ দেওয়ার সময়, তোমার নিষ্ঠুর কালদৃষ্টি দিয়ে আমাদের আয়ু নাশ করেছিলে।

হে মধুসূদন, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে, এই যুদ্ধে তুমি নিজে অস্ত্র ধরবে না। আর আমিও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমাকে আমি অস্ত্র ধরাবোই। আমার তিরের আঘাতে অর্জুন যখন ব্যতিব্যস্ত, অস্থির। তুমি হঠাৎ রথ থেকে লাফিয়ে নেমে এলে মাটিতে, তারপর দুই হাতে রথের চাকা তুলে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো দৌড়ে আসছিলে আমাকে হত্যা করতে। আমার তিরের আঘাতে তোমার কবচ ছিন্নভিন্ন হল, তোমার শরীর হল রক্তাক্ত। তবু তোমার কি ক্রোধ! তোমার পায়ের চাপে তখন মাটি কাঁপছে থর থর করে, তোমার গায়ের উড়নি উড়ে গেল কোথায়। লোকে বলে তুমি অর্জুনের পক্ষ নিয়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলে। আমি জানি হে নাথ, তুমি তোমার ভক্তের প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যেই নিজের প্রতিজ্ঞাও বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেভক্তের প্রতি তোমার এই করুণার কোন তুলনা হয় না, হে মধুসূদন।

হে কৃষ্ণ, অর্জুনের রথে ঘোড়ার লাগাম আর চাবুক হাতে তোমার সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি, এখনো আমার মনে গাঁথা হয়ে আছে। সীমাহীন তোমার ঐশ্বর্য, অনন্ত তোমার লীলা। হে জনার্দন, আমার শেষের সময় ঘনিয়ে এল, এখন দয়া করে তোমার চরণ কমলে স্থান দাও  বর দাও, তোমাতে আমার যেন অবিচল ভক্তি থাকে চিরদিন”

মহামতি ভীষ্ম এইভাবে, তাঁর মন, বাক্য, কর্ম ও বৃত্তির সমাপ্তি করলেন। তারপর নিজের আত্মাকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শরশয্যায় পড়ে রইল তাঁর নশ্বর দেহ।  যুধিষ্ঠির, তাঁর চার ভাই এবং উপস্থিত ঋষি মুনিরা সমবেত ভাবে পবিত্র সেই মরদেহের সৎকার করলেন।

মহামতি ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টির পর সকলে হস্তিনাপুর নগরে ফিরে এলেন। সেখান থেকে সমবেত ঋষি, মুনিরা ফিরে গেলেন তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে। যুধিষ্টির জ্যাঠামশাই ধৃতরাষ্ট্র ও পুত্রশোকে দুঃখিনী গান্ধারীকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, তারপর ধৃতরাষ্ট্র ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করে, যথা বিধি রাজসিংহাসনে বসে প্রজাপালন শুরু করলেন”    


শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকায় ফেরা

শৌনক বললেন, “হে সূত, পরম ধার্মিক যুধিষ্ঠির শত্রুদের বধ করে অনুজদের সঙ্গে কিভাবে রাজ্যপালন করলেন, সে বিষয়ে সবিস্তার বর্ণনা করুন”

সূত বললেন, “জ্ঞাতিবিরোধের আগুনে কুরুবংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়ার পর, লোকপালক শ্রীহরি পরীক্ষিতের প্রাণ রক্ষা করে সেই কুরুবংশকেই আবার অঙ্কুরিত করলেন এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে নিজ রাজ্যে আবার প্রতিষ্ঠা করে পরমপ্রীতি লাভ করলেন। মহামতি ভীষ্ম ও শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে যুধিষ্ঠিরের চিত্তে আবার দিব্যজ্ঞানের উদয় হল এবং তাঁর মন থেকে “আমিই এই যুদ্ধের কর্তা”, “আমিই সকল জ্ঞাতিহত্যার জন্য দায়ী” এই ভ্রান্ত মোহ দূর হয়ে গেল। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করে, সকল ভ্রাতাদের সঙ্গে সমগ্র পৃথিবী শাসন করতে লাগলেন। তাঁর রাজ্যে মেঘ সুষ্ঠু বৃষ্টি উপহার দিল, পৃথিবী প্রচুর শস্যশালিনী হয়ে উঠল এবং গাভীরা প্রচুর দুগ্ধ উৎপন্ন করল। নদী, সমুদ্র ও পর্বত সকলেই সুস্থ জীবনের অনুকূল হয়ে উঠল। অরণ্যের বনষ্পতি, লতা ও ওষধি প্রচুর ফল ও পুষ্পে সুশোভন হয়ে উঠল। দেশের রাজা অজাতশত্রু হওয়ার কারণে, জীবের মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ত্রিতাপ দূর হয়ে গেল।          

অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়সখা পাণ্ডব ও ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে হস্তিনাপুরে কয়েকমাস থেকে, সকলকে পরিতুষ্ট করে, যুধিষ্ঠিরের কাছে বিদায়ের অনুমতি নিলেন। তিনি যেদিন দ্বারকার উদ্দেশে রওনা হলেন, হস্তিনাপুরের সকল নর নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর বিরহে ব্যাকুল হয়ে উঠল। মহারাজ যুধিষ্ঠির ও চার ভাই তাঁকে বিদায়কালে আলিঙ্গন করলেন। সুভদ্রা, দ্রৌপদী, কুন্তী, উত্তরা, গান্ধারী, সত্যবতী সকলেই তাঁর আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে ব্যাকুল হলেন। ধৃতরাষ্ট্র, যুযুৎসু, কৃপাচার্য, আচার্য ধৌম্য সকলেই অশ্রুসজল চোখে তাঁকে বিদায় জানালেন। শ্রীকৃষ্ণকথা ভক্তিভরে একবার মাত্র শুনলে তাঁকে আর ভোলা যায় না। সেই শ্রীকৃষ্ণকে হস্তিনাপুরবাসী এতদিন দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে থেকেছেন, তাঁর স্পর্শও পেয়েছেন। তাঁদের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের এই বিদায়ক্ষণটিকে সহ্য করা কীভাবে সম্ভব?

শ্রীকৃষ্ণ রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পদব্রজে চললেন নগরের রাজপথে। পথের দুপাশের সুন্দর বাড়িগুলির ছাদ থেকে পুরনারীগণ তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি নিবেদন করতে লাগলেন। পথের দুপাশে জোড়হাতে, অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল, সব বয়সের শহরবাসী। বিদায়কালে চোখের জলে যদি তাঁর কোন অমঙ্গল হয়, সেই ভয়ে পুরনারীরা কষ্ট হলেও চোখের জল সংবরণ করলেন।

তারপর তিনি তাঁর  রথে উঠলেন। তাঁর মাথায় সাদা ছাতা ধরলেন তাঁর প্রিয়সখা অর্জুন। সে ছাতার দণ্ড মণিময়, ছাউনি মুক্তামালায় সাজানো। উদ্ধব আর সাত্যকি তাঁর দুপাশে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করতে লাগলেন। শুভক্ষণে চারদিকে বেজে উঠল শাঁখ, মৃদঙ্গ, ভেরী, ঘন্টা, দুন্দুভি।  শ্রীকৃষ্ণের রথ চলতে লাগল, কিন্তু গতি খুব ধীর। তাঁকে বিদায় দিতে, শহরের রাজপথ জনাকীর্ণতাঁর মুখে মোহন হাসি, সকলের দিকে তাঁর করুণাঘন দৃষ্টিসুন্দর রথের ওপর তাঁর অপরূপ মনোহর রূপের দিকে, নারী পুরুষ সকলেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।

তাঁর কানে এলো, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে কুরুনারীদের আলাপ, “ওলো, ইনি কে জানিস, ইনিই সেই কৃষ্ণভগবান। সৃষ্টির আগে, জগতে একা ইনিই স্বরূপে থাকেন। এঁনার থেকেই সমস্ত বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি। আবার প্রলয়ের কালে, জগৎ যখন ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত জীবের আত্মা এঁনার মধ্যেই মিশে যায়। ইনিই সেই সনাতন পরমপুরুষ। যাঁর শুরু নেই, শেষও নেই। সামনে থেকে প্রণাম করার এমন সু্যোগ আর পাব কিনা জানি না আয় লো, আয়, এঁনাকে আমরা প্রণাম করি।

প্রিয়সখি, এঁনার ওই করুণা দৃষ্টিতে আমাদের মনের সব ময়লা মুছে যাচ্ছে। সাধু-মুনিরা যুগ যুগ তপস্যা করে, যোগসাধনা করে, ওঁনার পদ্মের মতো পা দুটোই শুধু দেখতে পান। অথচ আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি ওঁর ওই মোহন রূপ, ওই মধুর হাসি আর করুণাসিন্ধু ওই দুই চোখের দৃষ্টি। আমরা কি কম ভাগ্যবতী, বল?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি, বেদমন্ত্রে জীবকে ধর্ম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোন কর্ম কর্তব্য, কোন কর্ম অন্যায় তাও তিনি নির্দেশ করেছেনএই সবই তিনি জীব পালনের জন্যেই করেছেন। তমোগুণে আচ্ছন্ন রাজারা যখন প্রজাদের অমঙ্গল করে, ক্ষতি করে, ধর্মনাশ করে; তাঁদের বিনাশের জন্যে এই কৃষ্ণভগবানই বারবার জগতে জন্ম নেনসত্ত্বমূর্তিতে তিনি নিজে আসেন সকলের সামনে, জগতে ঐশ্বর্য আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে।  করুণাময় ভক্তবৎসল ভগবান, সাধারণ ভক্তদের মনে সঞ্চার করেন ভক্তি, ভরসা, বিশ্বাস আর ধর্ম।

ওলো, আমার খুব হিংসে হয় যদুবংশের ওপর, মধুবন আর দ্বারকাপুরীর ওপর। কেন জানিস। ওই বংশেই যে উনি জন্ম নিয়েছেন! ধন্য হয়ে গেছে যাদবরা, তাঁর লীলায় ধন্য হয়েছে মধুবন, ধন্য হচ্ছে দ্বারকাপুরী। কি ভাগ্য বলতো দ্বারকার প্রজাদের? ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ওই অপরূপ রূপ তারা সকাল সন্ধ্যে রোজ দেখে। প্রত্যেকদিন তারা সামনে থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ বন্দনার সুযোগ পায়।

আরো ভাবতো, সখি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসব পত্নীদের কথা! কত যুগের কঠিন তপস্যা করে, তবেই না তাঁরা পরমপুরুষকে স্বামীরূপে পেয়েছেন! নিজের হাতে শিশুপালদের মতো নৃশংস রাজাকে হত্যা করে, তিনিই উদ্ধার করেছিলেন, রুক্মিণী, জাম্ববতী, নাগ্নজিতীকে। তাঁরা এখন প্রদ্যুম্ন, শাম্ব ও আম্বের মতো গুণবান পুত্রের জননী। নরকাসুরকে হত্যা করেও তিনি উদ্ধার করেছিলেন সহস্র রমণী। তাঁরা নরকাসুরের অধীনে কি দুঃখের জীবন কাটিয়েছে, বল। তাঁদের সকলের হারানো সম্মান, যোগ্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। 

সই, এমন ভাবিস না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধু ভক্তবৎসল করুণাসাগর। ভগবান ভালোবাসা ও প্রেমেরও রাজা। এই কৃষ্ণভগবান প্রেমেরও পারাবার। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে স্বর্গ থেকে পারিজাত এনেছিলেন, কার জন্যে জানিস? আমি জানি লো, আমি জানি, পরমপ্রিয়া রুক্মিণীর জন্যে...”

(সূত বললেন,) "নগরের মহাতোরণের কাছে এসে পড়ায়, কুরুললনাদের সেই আলাপ আর তিনি শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে মৃদুহাস্যে তাঁদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর রওনা হলেন দ্বারকার পথে। তাঁর সঙ্গে রইল উদ্ধব আর সাত্যকি। সামনে আর পিছনে রইল চতুরঙ্গ সেনার দুটি দল। মহারাজা যুধিষ্ঠির, তাঁর পথের নির্বিঘ্ন নিরাপত্তার জন্যে এই সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন”

[মহামতি ভীষ্ম এমন কি সাধারণ পুরললনাদেরও ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের বিমুগ্ধ মনোভাবের নিখুঁত চিত্রবৎ বর্ণনাগুলি, ভাগবত-পুরাণের অপূর্ব সাহিত্যগুণের পরিচয় দেয়। আজকের নীরস, উদ্ধত এবং অতীব স্থূল প্রোপাগাণ্ডার তুলনায় সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ সেকালের এমন ঈশ্বরমহিমা-প্রচার মনোহরণ করে বৈকি - সে আমি ভক্ত হই বা না হই - সে আমি আস্তিক বা নাস্তিক হই, কিচ্ছু এসে যায় না তাতে।] 

পরের পর্ব - " ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৭ "

                  

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২১

   এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...