সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

খাইদাই গানগাই

 


এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - "নবীন বরণ


আমাদের জলপাইগুড়ি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, অধিকাংশ ছাত্রই ছিল দক্ষিণবঙ্গের। স্বাভাবিক সমতলের বাসিন্দা, অজস্র নদীনালা পার হয়ে, বিশাল ফরাক্কা ব্যারেজে গঙ্গা পেরিয়ে আমরা যখন কলেজের ক্যাম্পাসে পৌঁছতাম, সেও ছিল অদ্ভূত অভিজ্ঞতা। চারিদিকে অনন্ত সবুজ গাছপালা, একটু এদিকসেদিক গেলেই জঙ্গল, পাহাড়, সবুজ গালিচা বিছানো চাবাগান, আমাদের আজন্ম দেখা কাঠখোট্টা শহর অথবা ধানক্ষেতে মোড়া সবুজ সমতল দেখা অভ্যস্ত চোখে, সে এক অদ্ভূত মায়ার সঞ্চার করতো।

নবীনবরণের কয়েকদিন পরেই, মার্চের মাঝামাঝি আমরা পিকনিকে গেলাম। গেলাম না বলে, বলা উচিৎ আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। প্রথম বছরের আমাদের একটা অংশ থাকতাম এক নম্বর হস্টেলে, আমাদের থেকে এক বছরের সিনিয়রদের সঙ্গে। সেদিন পিকনিকে ৬০/৬৫ জন জুটেছিলাম, দ্বিতীয় বর্ষের অধিকাংশ, আমাদের জনা পনের, আর পঞ্চম বর্ষের জনা দশেক। প্রসঙ্গতঃ, সেবার তৃতীয় বর্ষের কোন ছেলে ছিল না। কারণ মধ্য শিক্ষা পর্ষদের পুরোনো হায়ার সেকেন্ডারির শেষ ব্যাচ বেরিয়েছিল ৭৬ সালে আর নতুন হায়ার সেকেণ্ডারির প্রথম ব্যাচ বেরিয়েছিল ৭৮ সালে এক রবিবার, হস্টেলের সামনে থেকে ভাড়া করা বাস ছাড়ল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ। বাসের সামনে JGEC College এর ব্যানার। বাসের মাথায় চোঙে গাঁক গাঁক করে গান বাজছে, সেই কমনরুমের কমন গান।

বাসের পিছনের সিটে কোন ছেলের বসার অধিকার ছিল না, কারণ সেই সিটগুলো রিজার্ভ করা ছিল বোতল বিলাসিনী সুরার পেটিতে। সিকিমি চ্যাংটা, ভুটানি আপ্‌সু আর ব্ল্যাক লেভেল কল্যাণি বিয়ার, আমাদের সকলের কল্যাণের জন্য। সুকনা ফরেস্টের প্রথম চেক পোস্টেই বাস আটকে গেল, জঙ্গলের মধ্যে মাইকের অনুমতি নেই। মাইকের চোঙ, রেকর্ড প্লেয়ার, ব্যাটারি সব জমা করতে হল ফরেস্ট অফিসে, তারপর ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল। সুরায় বীরত্ব বাড়ে। অতএব, দু একজন সুরারসিক দাদা, যারা বাসের মধ্যেই তরলস্রোতে ভাসছিল, তারা এই সিদ্ধান্তে্র তীব্র বিরোধিতা ক’রে, ফরেস্ট গার্ডদের উদ্দেশে হস্টেলের সুবচনী ও অমৃতবাণীতে আপ্যায়ন করে বলতে চেষ্টা করছিল ‘মাইক ছাড়া পিকনিক হয় নাকি, ***’সেই উদ্যমী দাদাদের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার উদ্যমও নেহাত কম নিতে হয়নি। তা নাহলে সেদিনের পিকনিকটাই মাটি হতে পারত।

জঙ্গলের ভেতরে কোর এরিয়াতে ঢোকার মুখেও আবার বাধা এল। কোর এরিয়াতে পিকনিক করার নিয়ম নেই। অতএব বাস সাইডে রেখে নেমে পড়তে হল, মাটিতে। প্রাথমিক গোছগাছ, রান্নার যোগাড়, ব্রেকফাস্টে ব্রেড, কলা, ডিম সেদ্ধ আর কফি খাওয়ার পর অনেকেই বসে গেল সুরার সুরে পাখা মেলতে। আমরা প্রথমবর্ষের কয়েকজন তখনো সুরাপানে অভ্যস্ত না হওয়ায় হাঁটা দিলাম জঙ্গলের দিকে এবং ঘটে গেল বিচিত্র অভিজ্ঞতা! খয়ের, শিশু, শাল, আরো অনেক নাম না জানা ঋজু গাছের আড়ালে সে এক অন্য জগৎ, যার রূপ, শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শ, আমাদের চেনা জগতের থেকে একদম আলাদা রকমের। আমাদের পায়ের নিচে শুকনো পাতা ভাঙার শব্দ, একটানা ঝিঁঝিঁর শব্দ আর উত্তুরে হিমেল হাওয়ার দমকে গাছের পাতায় পাতায় অস্ফুট নিশ্বাসের মর্মর শব্দ। শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে যে কান অভ্যস্ত, জঙ্গলের এই শব্দটুকু, আমার কানে অদ্ভূত এক নৈশব্দ্যের অনুভূতি আনল ঘ্রাণে এল গাছের গন্ধ, মাটির গন্ধ, সব মিলিয়ে বুনো জঙ্গলের গন্ধ।

আমাদের পিকনিকের জায়গাটা ছিল ছোট্ট একটা পাহাড়ি নদীর ধারে। শীতের নদীর ধারা শীর্ণ, ছোটবড়ো নুড়ি পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জলের অজস্র ধারা অস্ফুট শব্দে বয়ে চলেছে নিচের দিকে, বিশাল মহানন্দার বুকে মিশে যাওয়ার আনন্দে। সেই শীতল জলধারায় পা ডুবিয়ে নদীর বুকে পড়ে থাকা পাথরে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। তারপর যখন পেটে খিদের অনুভব তীব্র হতে লাগল, জঙ্গলের ঘ্রাণ ছাপিয়ে নাকে এল মাংস এবং ভাত রান্নার ঘ্রাণ। উপলব্ধি করলাম প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সীমা ততক্ষণই, যতক্ষণ পেটটি থাকে নিশ্চিন্ত। রান্না হতে কিছুটা দেরী, অতএব পাঁপড়ভাজা আর অর্ধসিদ্ধ মাংসের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হল সুরার স্বাদ। এই জঙ্গলের মতোই আর এক নতুন অভিজ্ঞতা। ছোট্ট ছোট্ট চুমুকের ধারা আমার চেতনাকে অবশ করতে করতে, পোঁছে দিল – মহানন্দার দিকে নয় - মহানন্দর দিকে। তখন মাংসের ঝোলে নুন কম কিনা, মাংসটা আরেকটু সেদ্ধ হলে ভালো হত কিনা, ভাতটা একটু বেশি ফুটে গেল কিনা, এই সব তুচ্ছ বিষয়ের অনেক ঊর্ধে উঠে গেছে মন।


গরমে পটল, ঢ্যাঁড়স, শীতে বাঁধাকপি, আর সারা বছর আলু, আলু এবং আলু ও স্কোয়াশ, হস্টেলের খাওয়া বলতে এটাই জেনেছিলাম কটা বছর। যেদিন রাত্রে, খুব সম্ভব বুধবার, চিকেন হত, সাড়ে নটার ঘন্টা বাজার আগেই, ছেলেদের অনেকে ডাইনিং হলের দরজার সামনে লাইন লাগাত। ডাইনিং হলের ছেলেগুলোও বুঝতো চিকেনের মাহাত্ম্য। অন্যান্য নিরামিষ দিনে, যে ডাইনিং হলের দরজা উদার উন্মুক্ত থাকত, চিকেনের রহস্য বুকে নিয়ে  সে দরজাই বন্ধ হয়ে যেত সেই বিশেষ দিনটিতে। রান্না শেষ হবার আগেই ছেলেদের লাইন লাগত বন্ধ দরজার সামনে। সাড়েনটার ঘন্টা ধ্বনি শুনে হস্টেলের বারান্দা আর সিঁড়িতে শোনা যেত উদ্দাম গতিতে নিচের দিকে দৌড়ে যাওয়ার শব্দ। লক্ষ্য একটাই, চিকেন! আর আমরা যারা সাড়ে দশটার আগে খেতে যাওয়াটাকে বাচালতা ভাবতাম, আমাদের কপালে জুটত চিকেনের গলা, আর প্রায় স্বচ্ছ হয়ে যাওয়া চিকেনের ঝোল। মাঝে মাঝে মনে হত চিকেনও কি জিরাফের মতো গলা সর্বস্ব? আর ঝোল স্বচ্ছ হতে থাকার রহস্য লুকিয়ে থাকত, রান্নাঘরের উনুনে ফুটতে থাকা লবণাক্ত গরম জলের ডেকচিতে। প্রথমদিকে আসা ছেলেদের টানে, ঘন ঝোলে যে ভাঁটা আসত, সে সব ভরে যেত ঐ উষ্ণ লোনা জলের জোয়ারে!

প্রতি মাসে দুটো আইডি আর একটা গ্র্যাণ্ড ফিস্ট বাঁধা ছিলএই তিনটে দিন, বিশেষ করে জিএফের দিন বেঁচে থাকার একটা নতুন অর্থ প্রত্যেকবার খুঁজে পাওয়া যেত। মাসের অন্যদিন পটলের তরকারিতে যে পটলের দেখা মিলত লটারিতে, আইডির দিন সেই পটলের দুচারটে তৈলসিক্ত পিস অনায়াসে পাওয়া যেত। অথবা শীতের দিনে ফুলকপির বড়ো বড়ো পিস। আর চিকেনের স্বাদও হত অনন্য। খেতে খেতে মনে হত, আমাদের রান্নার কারিগর, যে নিপুণ দক্ষতায় মাসের অন্যদিনগুলোতে স্বাদবর্ণগন্ধহীন খাবার পরিবেশন করত, তারাই আবার ওই বিশেষ তিনটি দিনে কোন জাদুতে এমন তৃপ্তির রান্নাও করতে পারত!

মেসের দায়িত্বে থাকত অবশ্য হস্টেলের ছেলেরাই। প্রত্যেক মাসে হস্টেলের এক একটা উইং থেকে এক একজন ছেলেকে মেসের দায়িত্ব দেওয়া হতো। তাকে বলা হতো মেস ম্যানেজার। যাঁরা ভারতীয় শাস্ত্রমতে কর্মফলে বিশ্বাসী অর্থাৎ ভাল বা মন্দ কাজের পরিণামে ভাল ও মন্দ ফলের প্রত্যাশা করেন, তাঁরা মেস চালানোর কর্মে ব্যর্থ হবেন সন্দেহ নেই। কারণ অত্যন্ত মন্দ খাইয়ে, সারা মাস উঠতে বসতে হস্টেলের ছেলেদের গালাগাল খেয়ে, মেস ম্যানেজার ছেলেটি, মাসের শেষে যখন মেসের বিল ঘোষণা করত চুয়ান্ন টাকা তেত্রিশ পয়সা, তখন আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। বুকে জড়িয়ে ধরে বলতাম ‘গুরু হেব্বি করেচো’। আর যে ম্যানেজার সারা মাস যথেষ্ট ভালো খাইয়ে, সারা মাস আমাদের শুভেচ্ছা আর প্রশংসা শুনে বুক ফুলিয়ে ঘুরেছে,  মাসের শেষে যেদিন সে মেসের খরচ বলত তিয়াত্তর টাকা পঁইষট্টি পয়সা, সেদিন তার কপালে দুর্ভোগের অন্ত থাকত না। গালাগাল তো ছিলই, তার ওপর তার কানে কানে জিগ্যেস করা হত ‘গুরু, রেডিওটা কি মেসের পয়সায় কিনলি? অথবা গ্যাবার্ডিনের প্যান্টপিস কিনতে, হংকং মার্কেট কবে যাচ্ছিস’?

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, ১৯৭৯ সালে বাড়ি থেকে মাসে ১৫০/-টাকা পাঠালে আমাদের দিব্য চলে যেত। কলেজের ফি ছিল একত্রিশ টাকা, মেসের চার্জ ষাট-সত্তরের মধ্যে ঘোরাফেরা করত, বাকি পয়সায় সকাল ও বিকেলের টিফিন, শহরে সিনেমা দেখা, দিনে দুটো চারমিনার সিগারেট আর এন্তার বিড়ি, তাছাড়া টুকটাক কেনাকাটা। মেসের খরচ বাড়লে কোথাও না কোথাও রাশ টানতে হত। হয়তো সকালের টিফিনে, নয়তো রিকশা এড়িয়ে পায়ে হেঁটে শহরে যাওয়া, এই রকম আর কি!

একবার আমাদের উইংয়ে মেসের দায়িত্ব এল, মেস ম্যানেজার হল আমার এক রুমমেট। তখন আমরা থার্ড ইয়ারে, থাকি দু নম্বর হস্টেলে। আমার ঘষু রুমমেট আমার ঘাড়ে দায়িত্ব ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘষতে লাগল। [ঘষা এবং ঘষু শব্দদুটির অর্থ যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্যে বলি - টেবিল-চেয়ারে বসে অত্যধিক লেখাপড়ার জন্যে চেয়ারের সঙ্গে পাঠকের পশ্চাদ্দেশের অত্যধিক ঘর্ষণ জনিত যে অভ্যাস তাকেই এক কথায় প্রকাশ ঘষু বলা হয়ে থাকে।]  

খরচের কথা ভেবে নিত্য দিনের খাওয়ায় খুব যে কিছু পরিবর্তন আনতে পেরেছিলাম তা নয়। তবে আইডি আর জিএফ হয়েছিল জবরদস্ত। দুদিন আইডিতে চিকেনের জায়গায় মাটন হয়েছিল। আর জিএফের দিন শহরের নিরালা রেস্টুরেন্ট থেকে মাটন দোপেঁয়াজা এসেছিল। আর এসেছিল বিয়ার। প্রত্যেকের জন্য বড়ো কাচের গ্লাসে এক গ্লাস করে। সেই কাচের গ্লাসও ভাড়া করে নিয়ে আসা হল শহরের এক ডেকরেটারের থেকে। ক্ষীণকটি কিন্তু পৃথুল উর্ধাঙ্গওয়ালা সেই তিরিশটি গ্লাসের পূর্ণ দাম জমা রাখতে হয়েছিল সিকিউরিটি হিসেবে। ডেকরেটার ভদ্রলোক হস্টেলের কথা শুনে, কোন ঝুঁকি নেননি। বিয়ার বিতরণের দায়িত্ব ছিল আমার এবং আমাদের উইংয়ের সকলের। যারা বিয়ার খায় না, তাদের জন্যে ছিল সমমূল্যের চকোলেটবার। পরের দিন, একটা মাত্র গেলাস ভেঙে ডেকরেটরকে ঊণত্রিশটি গ্লাস যখন ফেরত দিয়ে এলাম, ডেকরেটর ভদ্রলোক অবাক হয়েছিলেন খুব, বললেন, ‘হস্টেলে এমন আবার হয় নাকি, মাত্তর একখান ভাঙসে, ওতো আমাগো হাতেও ভাঙে’। ভদ্রলোক সিকিউরিটির সমস্ত টাকাই ফেরত দিয়েছিলেন।

জিএফ খেয়ে ছেলেরা উচ্ছ্বসিত, প্রচুর প্রশংসায় আমাদের উইংয়ের জয়জয়কার। আমার মাথায় কিন্তু টিকটিক করছিল খরচের ঘড়ি, মাসের শেষের গালাগালি আর প্যান্টের পিস উপার্জনের বদনাম। যদিও সে সব কিছু হয়নি, কারণ মেসের চার্জ সীমার মধ্যেই ছিল, আর যেটুকু বেশী হয়েছিল, কেউ গায়ে মাখেনি, কারণ খাওয়ার তৃপ্তি ও আনন্দে সেটুকু পুষিয়ে যায়।

আমাদের ক্যান্টিনে সকালে পাওয়া যেত বাটারটুচ, ডিমটুচ আর ফ্রেঞ্চটুচ। রাস্তার ধারের মাইলস্টোনের আকারে লোফ, যার আদত নাম ছিল লুপ পাঁউরুটিহিটারের আগুনে সেই লুপ সেঁকে, ছুরির ফলা দিয়ে মাখনের মতো কিছু একটা লাগিয়ে চিনি মাখিয়ে দিব্যি খাওয়া হত। মাঝে মাঝে ফ্রাইং প্যানে হাফকাঁচা অমলেটের ওপর দুটো লুপের পিস চেপে ধরেই, প্লেটের উপর উল্টে দিয়ে পাওয়া যেত গরম গরম ডিমটুচ। কালা নমক ছিটিয়ে দেওয়া সেই লুপের স্বাদও মন্দ লাগত না। একটা প্লেটের ওপর একটিমাত্র ফেঁটানো ডিমে ছ পিস লুপ চুবিয়ে তেলে ভেজে পাওয়া যেত ফ্রেঞ্চ টুচ। স্বাদ বদলের জন্যে সেও বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু এই টিফিনের পর অন্ততঃ একটা অ্যান্টাসিড নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।

ঘরে জেলির শিশি কিনে রেখে, রুমমেটরা সকলে মিলে, উইংয়ে থাকা হিটারে পাঁউরুটি সেঁকে খাওয়াটা ছিল সেদিক থেকে অনেক নিরাপদ। অবশ্য সেক্ষেত্রে জেলি এবং পাঁউরুটি ডামা হত বিস্তর। আরেকটা মনে আছে, ঘরে চিঁড়ে, চিনি আর গুঁড়ো দুধের প্যাকেট কিনে রেখে, সকালে দুধচিঁড়ে মেখে খেতাম, সেও বেশ লাগত কলেজ যাওয়ার তাড়াহুড়োর মুখে। এই পদ্ধতিটা নিরাপদতো বটেই, ডামাও হতো খুব নগণ্য। কারণ চিঁড়ে ধুয়ে, ভিজিয়ে, মেখে খাওয়ার ধৈর্য কুলোতো না অনেকেরই।

বাড়ি থেকে মানি অর্ডার এলে অথবা, পরের দিকে ১৯৮২ সালে কলেজেই ব্যাংক হয়ে যাওয়াতে, ব্যাংক ড্রাফট এলে অন্ততঃ তিনদিন জলপাইগুড়িতে সিনেমা দেখা এবং মোগলাই পরোটা বাঁধা থাকত। আর হস্টেলের একঘেয়ে রান্না খেয়ে খেয়ে যখন জিভটা জুতোর শুকতলা হয়ে উঠত, তখন রুবি বোর্ডিংয়ের সরুচালের ভাতের সঙ্গে মুগের ডাল, পোস্ত আর চারামাছের সর্ষেঝাল অমৃত মনে হত, জিভ ফিরে পেত নতুন প্রাণ। মাসের শেষদিকের অর্থহীন পকেটে, মাসকলাই বাড়ির ঝুরিবুন্দিয়া, ঝুরিভাজার সঙ্গে বোঁদের মিশ্রণের নোনতা-মিঠে স্বাদ নিয়ে, বেঁচে থাকার অন্য অর্থ খুঁজে পেয়েছি কতদিন সেও অবশ্য এক প্লেট নিয়ে তিনজনে কাউন্টার করে খাওয়া হত। তারপর মাসকলাইবাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে দাঁতের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ঝুরিভাজার টুকরো অথবা বোঁদের কণা খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়তাম আমাদের হস্টেলের রাজ্যে। যেখানে আমরাই ছিলাম রাজা।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...