এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের অষ্টম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব"
১৯
এই
ঘটনার পর প্রায় দেড় মাস অতিক্রান্ত। সারা রাজ্যে এখন পূর্ণ বর্ষা সমাগত। পথঘাট
দুর্গম। কোথাও কোথাও মাঠঘাট, জলাশয়, সরোবর বৃষ্টির ধারাস্রোতে একাকার। দহনের
জ্বালা ধরানো উজ্জ্বল তীব্র রৌদ্র, ঢাকা পড়েছে শ্যামল মেঘের স্নিগ্ধ ছায়ায়। গ্রামে
গ্রামে কৃষক ও কৃষকবধূদের ব্যস্ততার শেষ নেই। চারিদিকে শান্তি, সমৃদ্ধির আশ্বাস।
রাজ্যের সর্বত্র নিরাপদ প্রশান্তি। প্রজাদের অতিপ্রিয় রাজমাতা সুনীথার সুশাসনে
রাজ্যবাসী এখন নিরাপদ, নিশ্চিন্ত, খুশী, সুখী। রাজাবেণের রাজত্বকালের ঊণিশটা মাসকে
রাজ্যের জনগণ ভুলতে শুরু করেছে দুঃস্বপ্নের মতো। কোন অভিযোগ নেই কোথাও। রাষ্ট্রীয়
তত্ত্বাবধানে বানিয়ে তোলা হচ্ছে গৃহহারাদের নতুন গৃহ। বিনাশের থেকে নির্মাণে অনেক
বেশি সময় লাগে, তা লাগুক। অস্থায়ী বাসায় তারা নিশ্চিন্ত ধৈর্যে বাস করছে। কিছুদিন
আগেও যারা গোপনে, মনে মনে রাজা বেণের মৃত্যু কামনা করত, এখন তারাই নতজানু হয়ে
করজোড়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, “রাজমাতাকে আর কত কষ্ট দেবে, হে ঈশ্বর? করুণা
করো, দয়া করো, সুস্থ করে তোলো তাঁর পুত্রকে”।
কক্ষের
বাইরে অঝোর বর্ষা ধারা। বর্ষার এই কয়েক মাস মহর্ষির বাইরের ব্যস্ততা কমই থাকে।
দূরদেশে কোথাও যান না, আশ্রমেই থাকেন। আর সারাদিন আশ্রমেরই নানান কাজ কর্ম দেখেন,
চিন্তা ভাবনা করেন, সহকর্মীদের উপদেশ দেন, নির্দেশ দেন। আর সন্ধের পর নিজের কক্ষে
বসে, কিছু আবাসিক শিষ্যদের নিয়ে, নানান বিষয়ে আলোচনা করেন। আজও তেমনই করছিলেন। একটু রাত্রি হতে সকলকেই
বিদায় দিলেন, কক্ষে রইল শুধু বিশ্বপ্রভ। আর ধরণী গেল মহর্ষির আহারের ব্যবস্থা
করতে। এই দুর্যোগের রাতে, মহর্ষি ভোজনালয়ে গিয়ে আহার করে আসবেন, ধরণীর এই ব্যবস্থা
মনঃপূত নয়। সে মহর্ষির আহার আনতে গেছে। পাতার টোকা মাথায় দিয়ে, এই বর্ষার মধ্যেও
ধরণীর ব্যস্ততার শেষ নেই।
নির্জন
কক্ষে একলা পেয়ে বিশ্বপ্রভ মহর্ষিকে বলল, “গুরুদেব, আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধর সেই
যে গেছেন, আজও ফিরলেন না। কোন সংবাদও নেই। আপনি কি কিছু জানেন?”
ঘাড়
নেড়ে মহর্ষি সম্মতি জানালেন, মৃদু হেসে বললেন, “জানি বৈকি, বিশ্বপ্রভ। আমারই
নির্দেশ নিয়ে তারা কঠিন এক ব্রতে গিয়েছে। আমি নিশ্চিন্ত থাকি কী করে বল? তাদের মঙ্গলামঙ্গল,
তাদের দুই পরিবারের শুভাশুভ, এখন সব কিছুই আমার অবশ্য কর্তব্য! ওরা ভাল আছে। ওরা নির্বিঘ্নে
ফিরে আসছে। গতকাল কিংবা আজ সকালেই ওদের ফেরার কথা ছিল। মনে হয় এই প্রবল বর্ষণে
কোথাও আটকে পড়েছে। এসে পড়বে যে কোন সময়”।
উদ্বিগ্ন
স্বরে বিশ্বপ্রভ জিজ্ঞাসা করল, “ওঁরা কী সেই তরুণ-তরুণীর সন্ধান পেয়েছেন, গুরুদেব?”
মৃদু
হাসলেন মহর্ষি, “শুনেছি যে পেয়েছে, তারাও ওদের সঙ্গেই আছে। দেখা যাক কী হয়!”
দরজার
বাইরে মাথার টোকা খুলে রেখে, ধরণী কক্ষে ঢুকল। তার পিছনে আছে বানো। ঢাকা দেওয়া কাংস্য
থালিকায় সাজানো স্বল্প আহার নিয়ে, সযত্নে রাখলো মহর্ষির সামনে। কাংস্য পাত্রে ভরা
ঈষদুষ্ণ দুধ রাখতে রাখতে বলল, “আচার্য বেদব্রত আর ধর্মধর এইমাত্র এসেছেন, গুরুদেব।
তাঁদের সঙ্গে আছেন একটি ছেলে আর মেয়ে”।
“বাঃ
শুভ সংবাদ, ধরণী, বিশ্বপ্রভ একটু আগেই ওদের কথা জিজ্ঞাসা করছিল! নিশ্চিন্ত হলাম”।
“তাহলে
আরও দুটো পুরোডাশ দেব, গুরুদেব। বেশ কদিন আপনি আহার কমিয়ে দিয়েছিলেন”।
“আরে
না, না, ধরণী, চিন্তায় আহার কমিয়ে দেব, এমন অবিবেচক আমি নই। আহার কমিয়েছি বয়সের
কারণে। একটা বয়সের পর আহার নিয়ন্ত্রণ জরুরি”। হাসতে হাসতে মহর্ষি থালার ঢাকা
খুললেন। থালায় তিনটি পুরোডাশ, পাশে একটি ছোট বাটিতে সবজি, অন্যটিতে ডাল। মহর্ষি
দেখে খুশি হলেন, বললেন, “বৎস, ধরণী, এমন আয়োজন করলে, এক আধটা বাড়তি পুরোডাশ নেওয়াই
যায়, কি বল?”।
“আপনি
শুরু করুন গুরুদেব, আমি আনছি”।
মহর্ষি
আহার শুরু করার পর ধরণী আবার বলল, “আচার্য বেদব্রত আর আচার্য ধর্মধরের এমন চেহারা
হয়েছে যে চেনাই দায়! আমি তো প্রথমে চিনতেই পারি নি। একমুখ দাড়ি, মাথায় লম্বা লম্বা
চুল। তার ওপর সারা শরীর জলে কাদায় মাখামাখি”।
“আর
সঙ্গের ছেলে-মেয়ে দুটো?” বিশ্বপ্রভ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
“তাদের
অবস্থাও একই রকম। সকলকেই বললাম, স্নান সেরে শুকনো কাপড়চোপড় পরে, আগে আহার করে নিন।
তারপর মহর্ষির অনুমতি পেলে, আমি সংবাদ দেব। আচার্য ধর্মধর বলছিলেন, গুরুদেবের
সঙ্গে একবার দেখাটা সেরেই আসি, ধরণী। আমি মানা করলাম। বললাম, আপনাদের এই অবস্থায়
দেখলে, গুরুদেব মোটেই খুশি হবেন না, বরং ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠবেন”।
“ঠিক বলেছিস, ধরণী। তুই ফিরে গিয়ে ওদের বলে দে, আহারের পর ওরা আজ রাত্রে বিশ্রাম নিক। দেখা, সাক্ষাৎ যা হবে সে কাল সকালেই হোক। আমাকে আরেকটা পুরোডাশ আর একটু সবজি দে তো, ধরণী। আজ মনে হয় একটু বেশিই ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে!”
২০
প্রত্যূষে
উঠে কক্ষের বাইরে এসে মহর্ষি ভৃগু দেখলেন, বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু আকাশ ঘন মেঘে
ভারি হয়ে আছে। যে কোন সময় আবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা। প্রাতঃকৃত্য সেরে, সূর্য
প্রণাম ও ধ্যান করতে করতে, আজ তাঁর মনঃসংযোগে বার বার ব্যাঘাত ঘটল। মহর্ষি ভৃগুর
মতো শান্ত, সমাহিত, স্থিতধী মানুষের মনেও আজ এত চাঞ্চল্য! বারবার তাঁর বেদব্রত ও
ধর্মধরের কথা মনে হচ্ছিল। বেদব্রত একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, এই সূর্য প্রণাম, এই
ঈশ্বরের ধ্যান - মহারাজ বেণের রাজত্বে এ সবই অনাচার। আজ মহারাণি সুনীথার রাজ্য
পরিচালনায়, সেই বাধা দূর হয়েছে। কিন্তু মহারাণি সুনীথার এই রাজ্যশাসন কোন স্থায়ী
সমাধান নয়। যে সংকল্প নিয়ে তিনি এই কাজে নেমেছেন, সেই কাজের সমাপ্তি হবে তখনই, যখন
এই রাজ্যের সিংহাসনে যোগ্য রাজার অভিষেক সম্পন্ন হবে। বিগত রাত্রে বেদব্রত ও
ধর্মধর একটি ছেলে এবং মেয়েকে এনেছে, কিন্তু তারা কি এ রাজ্যের রাজা হবার যোগ্য হয়ে
উঠবে? প্রজারা এই রাজাকে কী মেনে নেবে? তিনি বেদব্রত, ধর্মধর এবং ওই ছেলেমেয়ের
সাক্ষাতের প্রতীক্ষাতেই চঞ্চল হচ্ছেন বারবার।
নিজ
কক্ষে ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর অপেক্ষায় ক্ষৌরকার চতুরমণি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে নিত্য
সকালে এসে, তাঁর ক্ষৌরকর্ম করে। এই ক্ষৌরকার অত্যন্ত কথা বলে। এই আশ্রমের সমস্ত
বার্তার সে ভাণ্ডারি। তাকে কিছু প্রশ্ন না করলেও সে অনর্গল কথা বলে। বসে বসে অধৈর্য
হওয়ার থেকে, এই লোকটির বাক্য প্রবাহতে কিছুক্ষণ আনমনা থাকা যাবে। মহর্ষি এই ভেবে কক্ষের
সামনের দাওয়ায় বসে, চতুরমণিকে একটু উস্কে দিলেন, “কী সংবাদ, চতুরমণি? কী মনে হয়,
আজও কি গত দুদিনের মতোই বৃষ্টি হবে?”
চতুরমণি
তার ঝোলা থেকে, ক্ষৌরকর্মের সরঞ্জাম বের করতে করতে বলল, “বর্ষাকালে বৃষ্টির কথা কী
বলা যায়, মহর্ষি? কখন যে তার কী মতিগতি, কে জানে? তবে এবার খুব সুচারু বর্ষা
হচ্ছে, জানেন মহর্ষি? আমি আশে পাশের অনেক গ্রামেও যাই তো, কৃষকদের কথাবার্তা শুনি।
সকলেই খুব খুশি। তারা বলে এ সবের মূল কারণ মহারাণি। তিনি অধার্মিকের পৌত্রী,
মৃত্যুর কন্যা হয়েও, আজ তিনি যে কোন ধার্মিকের থেকেও ধার্মিক। তাঁর পুত্র রাজা থাকলে,
এমনটা কক্ষণো হতো না। কী অনাচার, কী অনাচার। রাজা বেণের রাজত্ব মানেই হয় খরা, নয়
বন্যা। হয় দুর্ভিক্ষ, নয় মড়ক। সত্য কথা বলতে আমি ভয় পাই না, মহর্ষি। রাজা বেণ
অসুস্থ হওয়াটা শাপে বর হয়েছে”।
কাঠের
ছোট্ট বাটি থেকে জল নিয়ে, মহর্ষির দুই গাল ভিজিয়ে তুলতে তুলতে চতুরমণি বলল, “যারা
বলে ঈশ্বর নেই, ধর্ম নেই। অন্যায়ের প্রতিকার নেই। তারা এসে দেখে যাক, রাজাবেণের
অত্যাচার আর অনাচারের প্রতিফল মিলল কিনা? একেবারে হাতেনাতে পেয়ে গেলেন কিনা?”
ভেজাগালে
শীতলতার অনুভব নিয়ে, মহর্ষি মৃদু হেসে বললেন, “তুমি বলতে চাও, রাজা বেণের অসুস্থতা
তার পাপের প্রতিফল?”
এক
ফালি চামড়ার টুকরোতে ঘষে, ক্ষুরে শান দিতে দিতে, চতুরমণি বলল, “কী বলছেন, মহর্ষি?
প্রতিফল নয়? এখনো সূর্য চন্দ্র উঠছে। গাছে গাছে ফুল ফুটছে। এই বর্ষায়
মাটি সরস হচ্ছে, কৃষকের ঘরে ঘরে আজ ফসলের স্বপ্ন। এসব কি মিথ্যা?” ক্ষুরে ধার
দেওয়া শেষ করে, চতুরমণি মহর্ষির দাড়ি বানানো শুরু করল। মহর্ষি কথা বলার অবস্থায়
নেই, তাই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, “হুঁ”
“এদিকে
ভোর থেকে দেখি আশ্রমে হুলুস্থূল কাণ্ড। কী ব্যাপার বলুন তো, কিছু জানেন? ধরণি
আমাকে রাত থাকতে ডেকে তুলে বলল, দুজন আচার্যের জরুরি ক্ষৌরকর্ম আছে। ক্ষৌরকর্ম
নিত্য কর্ম, তার আবার জরুরি কিসের? সে যাই হোক আমি সরঞ্জাম নিয়ে গেলাম, গিয়ে দেখি
অতিথি নিবাসের বাইরে, ভূতের মতো জঙ্গুলে দাড়িগোঁফ নিয়ে দুজন বসে আছে। তাদের সঙ্গে
একজন সুপুরুষ তরুণ। ধরণিকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ আশ্রমের আচার্যদের সবাইকে চিনি। এরা
কারা? কারাগার থেকে পালিয়ে আসা কয়েদি নয়তো? ধরণি হাসল, বলল, ওই জঙ্গল সাফ করে
দিলেই তুমি চিনতে পারবে ওরা কারা? পুব আকাশে আলো তখনো ফোটেনি, বসলাম তাদের দাড়ি
বানাতে। ক্ষুরে হচ্ছিল না মহর্ষি জানেন, কাস্তে থাকলে ভালো হত। দুজনের জন্যে আমার
দুটো ক্ষুরের ধার পড়ে গেল। আপনার দাড়ি বানিয়ে পাথর ঘষে সে দুটোয় আবার শান দিতে হবে”।
মহর্ষির এক গাল, কামিয়ে ক্ষুরে লেগে থাকা কামানো দাড়িগুলো বাটির জলে ফেলে, অন্য
গাল ধরল চতুরমণি।
তার
মধ্যে মহর্ষি বললেন, “দাড়িগোঁফের জঙ্গল সাফ করে কী পেলে বললে না তো?”
“এত
ব্যস্ত হচ্ছেন কেন, মহর্ষি? কেটে কুটে গেলে আমাকে কিছু বলতে পারবেন না, এই বলে
দিলাম। তবে চতুরমণির ক্ষুরে কারো গাল কিংবা থুতনি কেটেছে এমন কখনো হয়নি। আচার্য
সুনীতি সেদিন বলছিলেন, চতুর, তোমার যেমন ক্ষুরধার বুদ্ধি, তেমনি ক্ষুরের ধার।
গালের ওপর দিয়ে ক্ষুর টানো, মনে হয়, মাঠে লাঙ্গল টেনে চাষ করছো। আহা তোমার পা
মাত্র দুটি, আর সেই দুই পায়ে আবার ক্ষুরও নেই। তবে তোমার হাত দিনদিন যেমন পেকে
উঠছে, তাতে পায়ে ক্ষুর গজাতে আর বেশি দেরি লাগবে না, দেখে নিও। আচার্য সুনীতি
আমাকে খুবই স্নেহ করেন, ভালোওবাসেন, মহর্ষি। কিছু কিছু মানুষ আছেন, তাঁদের সঙ্গে
কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায়। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের কিছুতেই মন ভরে না। সারাক্ষণ
ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকে। বলে, তোমার হাতটা খুব শক্ত আর খসখসে। গালে জল ঘষার সময়েই
নাকি তাদের মনে হয় গালের ত্বক উঠে যাচ্ছে! জিজ্ঞাসা করে, দাড়ি কামানোর আর দরকার
আছে কী, চতুরমণি? গালের ছালচামড়ার সঙ্গে দাড়ি উঠে যায়নি? আপনার গালেও তো এই হাতেই
জল ঘষলাম, আপনার কী মনে হয়, মহর্ষি, আমার হাত খরখরে?” মহর্ষি তখন মুখ উঁচু করে
বসেছিলেন, আর চতুরমণি চিবুকের নিচে গলায় ক্ষুর টানছিল। অতি সাবধানে এবং সতর্কভাবে
মহর্ষি বললেন, “সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা”।
গলার
ওপর ক্ষুর থামিয়ে চতুরমণি বলল, “কার কথা মিথ্যে, আমার?”
মহর্ষি
ওই অবস্থাতেই উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “পাগল হয়েছ, চতুরমণি? তোমার হাত কুসুমের মতো
কোমল। তুমি কেন মিথ্যা বলবে? যারা ওই সব বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে”।
মহর্ষির
কথায় সন্তুষ্ট চতুরমণি, গলার উপর ক্ষুর টানতে টানতে বলল, “আঃহা, আপনি বড্ডো কথা
বলছেন, মহর্ষি। এত কথা বললে আর অস্থির হলে, আমার কাজ হয় না যে। হাতে এই লৌহ ক্ষুর
নিয়ে বলছি, চতুরমণি সত্যি ছাড়া কখনো মিথ্যে বলে না। মিথ্যা কথা বললে এই আশ্রমে কী
আপনি আমাকে রাখতেন? নয় নয় করে, বিশ-বাইশ বছর তো হয়েই গেল এই আশ্রমে। এ কবছরে কত
পরামাণিক এলো, গেলো, সবই তো দেখলাম। এক এক জন যেন, অসি বিশারদ। কেটে কুটে
রক্তারক্তি করে তুলতো। কিন্তু কথার বেলায়? নিজের কথা এমন সাতকাহন করে বলা, ও আমার
ধাতে নেই, মহর্ষি! সেদিন আচার্য রণধীর বললেন, কতোটুকুই বা কথা তুই বলিস চতুর,
কিন্তু তোর সব কথাই যেন কথকতা। তোর পেট থেকে কথা বের করা আর আকর থেকে সোনা উদ্ধার
একই ব্যাপার”।
মহর্ষির
দাড়ি কামানো হয়ে গিয়েছিল, পরিষ্কার জল দিয়ে মহর্ষির গাল ধুয়ে দিয়ে, চতুরমণি তার
গামছা দিয়ে মহর্ষির মুখ মুছে দিলেন। সেই গামছা অত্যন্ত মলিন এবং বর্ষার কারণে তাতে
পুতি দুর্গন্ধ। মহর্ষি চুপ করে সে সব সহ্য করে, এবার উঠতে যাচ্ছিলেন, চতুরমণি ধমক দিয়ে উঠল, “উঠছেন কোথায়? এখনো স্ফটিকারি
লাগাইনি তো! সব ব্যাপারে এত ব্যস্ত হলে তো চলবে না, মহর্ষি। কামানোর পর স্ফটিকারি
না দিলে, কী হয় জানেন না বুঝি? স্ফটিকারি হল...”
মহর্ষি
ওদের প্রাঙ্গণে ঢুকতে দেখেছিলেন - বেদব্রত, ধর্মধর আর সেই নবীন যুবক। চতুরমণির
বাক্যের বন্যায় তিনি নির্বাক বসেছিলেন, যদিও তাঁর মুখে হাল্কা হাসির রেশ। পিছন থেকে
চতুরমণির কথা শুনে, আচার্য বেদব্রত তার কথা শেষ করতে দিলেন না, বলে উঠলেন, “ওহে
চতুরমণি, গুরুদেবের সামনে তোমার সকল জ্ঞানের ভাণ্ডার এভাবে মেলে ধরবে নাকি?
গুরুদেব তোমার থেকে সব জেনে গেলে, তোমার আর থাকবে কী? আমাদের এখন কিছু জরুরি
আলোচনা আছে, তুমি গুরুদেবকে মুক্তি দাও দেখি!”
মহর্ষির
গালে স্ফটিকারি ঘষতে ঘষতে চতুরমণি বলল, “আমারও কী বসে বসে বাজে বকার জো আছে? ওদিকে
রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, যে দিকে না দেখবো, সেখানেই কিছু না কিছু অনর্থ ঘটে যাবে।
আচার্য রণধীর বলেন, তুমি কদিন না থাকলে, আশ্রমটা অন্ধকার হয়ে থাকে। আগুনের উত্তাপ
কমে যায়, গাভীর দুধ পাৎলা হয়ে আসে, এমন কি গাছের পাতাটিও নড়ে না”। ক্ষৌরকর্ম সেরে চতুরমণি,
তার সঙ্গের ঝোলাতে সব সরঞ্জাম তুলে, নত হয়ে মহর্ষিকে নমস্কার করল, বলল, “আজ আমার
একটু ত্বরা আছে, কাল ভোরে এসে ফিটকিরির তত্ত্বটি আপনাকে বুঝিয়ে বলব, মহর্ষি, আপনি
চিন্তা করবেন না”।
আচার্য
বেদব্রত আর ধর্মধর নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে হাসল। আর নবীন যুবক মহর্ষি ভৃগুর
প্রসন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, এমন একজন মানুষের সামনে ক্ষৌরকারের এ কী
প্রগলভতা! চতুরমণি বিদায় নেওয়ার পর তিনজনেই মহর্ষিকে প্রণাম করলেন।
নবীন
যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি তার কাঁধে হাত রাখলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকারের
ব্যবহারে আশ্চর্য হয়ো না, বৎস। এটাই স্বাভাবিক। সম্মানীয় মানুষদের থেকে আমরা সাধারণ
মানুষ সর্বদাই একটা সমীহ দূরত্ব বজায় রাখি। তাঁদের গালে, গলায়, কানে মাথায় হাত
দেওয়ার কথা আমরা কল্পনাও করি না। কিন্তু তুমি যত বড়ো মাপের মানুষই হও না কেন,
ক্ষৌরকারকে তোমার অতি ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে নিয়মিত ঢুকতেই হবে। আর সেই কারণেই অন্য মানুষ
যখন সমীহে কথা কম বলে, এরা তখন অনর্গল কথা বলতেই থাকে। মানব চরিত্রের এও এক অদ্ভূত
পাঠ, ভবিষ্যতে আরও অনেক দেখতে হবে, শিখতে হবে তোমাকে! চলো, তোমরা আমার কক্ষে গিয়ে বসো”।
নবীন যুবক এর আগে মহর্ষিকে দুএকবার দূর থেকে দেখেছে,। বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমার থেকে আশৈশব তাঁর পাণ্ডিত্য আর সহৃদয় মহত্বের অনেক কথাও শুনেছে। আর আজ সেই মানুষটা তার কাঁধে হাত রেখে নিজের কক্ষে যখন ডেকে নিলেন এবং তার মনের দ্বন্দ্বটুকু অল্পকথায় বুঝিয়েও দিলেন। সে অভিভূত হল। মহর্ষি তাঁর নির্দিষ্ট আসনে বসার পর, তাঁর সামনের দুই আসনে বসলেন আচার্য বেদব্রত ও ধর্মধর। নবীন যুবক সামনেই বসল, কিন্তু আচার্যদের থেকে কিছুটা দূরে, মাঝের দুটো আসন ছেড়ে। মহর্ষি প্রসন্ন মুখে লক্ষ্য করলেন, তারপর বললেন, “ক্ষৌরকর্মের পর স্নান করাটা জরুরি। তোমার পরিচয়ের কৌতূহলে আমি কিছুটা অনিয়ম করে ফেললাম। আমি স্নান সেরে এখনই আসছি। ততক্ষণ তুমি আচার্যদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলোচনা করো”।
পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন