বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

গীতা - ৯ম পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "  



এর আগের অষ্টম অধ্যায়ঃ অক্ষরব্রহ্মযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ৮ম পর্ব"


নবম অধ্যায়ঃ রাজযোগ  



শ্রীভগবানুবাচ

ইদং তু তে গুহ্যতমং প্রবক্ষ্যাম্যনসূয়বে।

জ্ঞানং বিজ্ঞানসহিতং যজ্‌জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেঽশুভাৎ।।

শ্রীভগবান উবাচ

ইদং তু তে গুহ্যতমং প্রবক্ষ্যামি অনসূয়বে।

জ্ঞানং বিজ্ঞানসহিতং যৎ জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসে অশুভাৎ।।

শ্রীভগবান বললেন- যেহেতু তোমার মনে দোষদৃষ্টি নেই, তাই অতি গোপন উপলব্ধির এই পরমজ্ঞানের কথা তোমার কাছে ব্যাখা করব, যা জানলে সকল অশুভ থেকে তোমার মুক্তি লাভ হবে।

 

রাজবিদ্যা রাজগুহ্যং পবিত্রমিদমুত্তমম্‌।

প্রত্যক্ষাবগমং ধর্ম্যং সুসুখং কর্তুমব্যয়ম্‌।।

রাজবিদ্যা রাজগুহ্যং পবিত্রম্‌ ইদম্‌ উত্তমম্‌।

প্রত্যক্ষ-অবগমং ধর্ম্যং সুসুখং কর্তুম্‌ অব্যয়ম্‌।।

এই রাজবিদ্যা সবচেয়ে গোপন পবিত্র এবং সর্বশ্রেষ্ঠ এই বিদ্যা প্রত্যক্ষ ফলদায়ক, ধর্মের একান্ত অনুসারী এই বিদ্যা সহজসাধ্য এবং অক্ষয়ফল দান করে।

      

অশ্রদ্দধানাঃ পুরুষা ধর্মস্যাস্য পরন্তপ।

অপ্রাপ্য মাং নিবর্তন্তে মৃত্যুসংসারবর্ত্মনি।।

অশ্রদ্দধানাঃ পুরুষা ধর্মস্য অস্য পরন্তপ।

অপ্রাপ্য মাং নিবর্তন্তে মৃত্যুসংসারবর্ত্মনি।।

হে শত্রুহারী অর্জুন, যে ব্যক্তিরা এই ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, তারা আমাকে পায় না। তারা মৃত্যুময় এই সংসারের চক্রে বার বার ঘুরতেই থাকে।

    

ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা।

মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্থিতঃ।।

ময়া ততম্‌ ইদং সর্বং জগৎ অব্যক্তমূর্তিনা।

মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চ অহং তেষু অবস্থিতঃ।।

আমার অব্যক্তমূর্তি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অগোচর এবং সেই ভাবেই আমি সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত। ব্রহ্ম থেকে স্থাবর পর্যন্ত সমস্ত ভূতগণ আমার মধ্যেই অবস্থান করে, কিন্তু আমি কোথাও থাকি না।

  

ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্‌।

ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।।

ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগম্‌ ঐশ্বরম্‌।

ভূত-ভৃৎ চ ভূতস্থঃ মম আত্মা ভূতভাবনঃ।।

আবার এই ভূতগণ আমার মধ্যে অবস্থান করেও না। আমার ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য তুমি লক্ষ করো, আমার আত্মা থেকেই এই সকল ভূতের সৃষ্টি, আমার আত্মাই এই ভূতের ধারক, কিন্তু আমার আত্মা এই ভূতগণের মধ্যে অবস্থান করেন না। 

 

যথাকাশস্থিতো নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগো মহান্‌।

তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয়।।

যথা আকাশস্থিতঃ নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগঃ মহান্‌।

তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানি ইতি উপধারয়।।

সর্বত্রবিচরণশীল বাতাস সর্বদা আকাশে অবস্থান করলেও, আকাশের সঙ্গে যেমন তার কোন যোগ নেই,  তেমনই জেনে রাখো, সমস্ত ভূতগণ আমাতেই অবস্থান করে।

 

সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্‌।

কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্‌।।

সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্‌।

কল্পক্ষয়ে পুনঃ তনি কল্প-আদৌ বিসৃজামি অহম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, প্রত্যেক কল্পের শেষে সকল ভূত, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ আমার এই তিনগুণের মায়ায় আমার মধ্যেই বিলীন হয়, আবার নতুন কল্পের শুরুতে আমিই সেই ভূত সকলকে সৃষ্টি করি।

    

প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ।

ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ।।

প্রকৃতিং স্বাম্‌ অবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ।

ভূতগ্রামম্‌ ইমং কৃৎস্নম্‌ অবশং প্রকৃতেঃ বশাৎ।।

নিজের অবিদ্যারূপ তিনগুণের নিয়ন্ত্রণে আমি জন্ম-মৃত্যুর বশীভূত এই সমস্ত ভূতকে বার বার সৃষ্টি করে থাকি

 

ন চ মাং তানি কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধণঞ্জয়।

উদাসীনবদাসীনমসক্তং তেষু কর্মসু।।

ন চ মাং তানি কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধণঞ্জয়।

উদাসীনবৎ আসীনম্‌ অসক্তং তেষু কর্মসু।।

হে ধনঞ্জয়, এই সমস্ত কর্মে আমি অনাসক্ত ও নির্বিকারভাবে অবস্থান করতে পারি, এবং তাই এই সমস্ত কর্মে আমি বাঁধা পড়ি না। 

 

১০

ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্‌।

হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ততে।।

ময়া অধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে স-চর-অচরম্‌।

হেতুনা অনেন কৌন্তেয় জগৎ বিপরিবর্ততে।।

হে কুন্তীপুত্র, আমার পরিচালনায়, আমার ত্রিগুণের মায়ায় এই সমগ্র বিশ্বচরাচর সৃষ্টি হয়, আর সেই কারণেই এই জগৎ বিচিত্র রূপে বেড়ে ওঠে। 

 

১১

অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্‌।

পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্‌।।

অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুম্‌ আশ্রিতম্‌।

পরং ভাবম্‌ অজানন্তঃ মম ভূত-মহা-ঈশ্বরম্‌।।

সর্ব ভূতের মহান ঈশ্বর স্বরূপে আমার এই পরমাত্ম তত্ত্ব উপলব্ধি করতে না পেরে, মূর্খেরা মানুষের দেহধারী এই আমাকে, অবজ্ঞা করে থাকে। 

 

১২

মোঘাশা মোঘকর্মাণো মোঘজ্ঞানা বিচেতসঃ।

রাক্ষসীমাসুরীঞ্চৈব প্রকৃতিং মোহিনীং শ্রিতাঃ।।

মোঘ-আশাঃ মোঘ-কর্মাণঃ মোঘ-জ্ঞানাঃ বিচেতসঃ।

রাক্ষসীম্‌ আসুরীং চ এব প্রকৃতিং মোহিনীং শ্রিতাঃ।।

আর সেই কারণে, তাদের আশা ব্যর্থ হয়, কর্ম নিষ্ফল হয়, জ্ঞান বিফল হয়। এই বিবেকবোধহীন ব্যক্তিরা রাক্ষসী এবং আসুরী স্বভাব পেয়ে থাকে।

[রাক্ষসীরা তমোগুণ থেকে তামসী এবং আসুরীরা রজঃগুণ থেকে রাজসী স্বভাব পেয়ে থাকে।] 

 

১৩

মহাত্মানস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ।

ভজন্ত্যনন্যমনসো জ্ঞাত্বা ভূতাদিমব্যয়ম্‌।।

মহাত্মানঃ তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিম্‌ আশ্রিতাঃ।

ভজন্তি অনন্য-মনসঃ জ্ঞাত্বা ভূতাদিম্‌ অব্যয়ম্‌।।

হে পার্থ, কিন্তু মহাত্মা ব্যক্তিরা দেবদুর্লভ সাত্ত্বিক হওয়ার কারণে আমাকে সর্বভূতের কারণ এবং আমার অক্ষর স্বরূপ উপলব্ধি ক’রে, একনিষ্ঠায় আমারই ভজনা করেন।

 

১৪

সততং কীর্তয়ন্তঃ মাং যতন্তশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ।

নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।।

সততং কীর্তয়ন্তঃ মাং যতন্তঃ চ দৃঢ়ব্রতাঃ।

নমস্যন্তঃ চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।।

তাঁরা সর্বদা আমার গুণের কথা কীর্তন করেন, কঠিন ব্রতে, কঠোর নিষ্ঠায় ও ভক্তিতে আমাকে নমস্কার করেন আর সর্বদা আমার চিন্তায় সমাহিত থেকে আমার উপাসনা করেন। 

 

 

১৫

জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তো মামুপাসতে।

একত্বেন পৃথক্‌ত্বেন বহুধা বিশ্বতোমুখম্‌।।

জ্ঞানযজ্ঞেন চ অপি অন্যে যজন্তঃ মাম্‌ উপাসতে।

একত্বেন পৃথক্‌ত্বেন বহুধা বিশ্বতঃ মুখম্‌।।

কেউ কেউ ভগবৎবিষয়ে জ্ঞানচর্চায় আমার উপাসনা করেন। কেউ বা বিভিন্ন স্বরূপে একই ব্রহ্মার প্রকাশ উপলব্ধি করেন, আবার কেউ কেউ আমাকে বিশ্বমূর্তি ভগবান ভেবেই উপাসনা করেন।

 

১৬

অহং ক্রতুরহং যজ্ঞঃ স্বধাঽহমহমৌষধম্‌।

মন্ত্রোঽহমহমেবাজ্যমহমগ্নিরহং হুতম্‌।।

অহং ক্রতুঃ অহং যজ্ঞঃ স্বধা অহম্‌ অহম্‌ ঔষধম্‌।

মন্ত্রঃ অহম্‌ অহম এব আজ্যম্‌ অহম্‌ অগ্নিঃ অহং হুতম্‌।।

আমিই যজ্ঞ, আমিই পঞ্চমহাযজ্ঞ, আমিই পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধমন্ত্র। আমিই ঔষধ, আমিই মন্ত্র, আমিই হোমের ঘৃত, আমিই হোমের আগুন এবং আমিই হোম

  

১৭

পিতাঽহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ।

বেদ্যং পবিত্রমোঙ্কার ঋক্‌ সাম্‌ যজুরেব চ।।

পিতা অহম্‌ অস্য জগতঃ মাতা ধাতা পিতামহঃ।

বেদ্যং পবিত্রম্‌ ওঙ্কার ঋক্‌ সাম্‌ যজুরেব চ।।

আমিই এই জগতের পিতা, আমিই মাতা ও পালিকা, আমিই পিতৃপুরুষের পিতা, আমিই পবিত্র জ্ঞান, আমিই ওঁকার ধ্বনি, আমিই ঋক, সাম ও যজুঃ বেদ।

 

১৮

গতির্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃৎ।

প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং নিধানং বীজমব্যয়ম্‌।।

গতিঃ ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃৎ।

প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং নিধানং বীজম্‌ অব্যয়ম্‌।।

আমিই জগতের গতি, আমিই পালক, সকলের প্রভু। আমি সমস্ত প্রাণীর আশ্রয়, আমিই সকলের শুভাশুভ, আমিই রক্ষক এবং বন্ধু। আমিই সৃষ্টি করি, আমিই ধ্বংস করি। আমিই ধারণ করি, আবার বিনাশও করি, আমিই জগতের অক্ষয় কারণ।

 

১৯

তপাম্যহমহং বর্ষং নিগৃহ্নাম্যুৎসৃজামি চ।

অমৃতঞ্চৈব মৃত্যুশ্চ সদসচ্চাহমর্জুন।।

তপামি অহং অহং বর্ষং নিগৃহ্নামি উৎসৃজামি চ।

অমৃতং চ এব মৃত্যুঃ চ সৎ-অসৎ চ অহম্‌ অর্জুন।।

হে অর্জুন, আমিই উত্তাপ বিকিরণে বর্ষাকে আকর্ষণ করি এবং বৃষ্টি সৃজন করি। আমিই অমৃতরূপ জীবন, আমিই মৃত্যুর কারণ। স্থূলরূপে আমি প্রত্যক্ষ আবার সূক্ষ্মরূপে আমি পরোক্ষ।

   

২০

ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা

যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে।

তে পুণ্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকমশ্নন্তি

দিব্যান্‌ দিবি দেবভোগান্‌।।

ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা

যজ্ঞৈঃ ইষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে।

তে পুণ্যম্‌ আসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্‌ অশ্নন্তি

দিব্যান্‌ দিবি দেবভোগান্‌।।

তিনবেদে জ্ঞানী পণ্ডিতগণ যজ্ঞে আমারই পুজো করেন এবং যজ্ঞের শেষে সোমরস পান ক’রে পাপমুক্তির পর, স্বর্গে যাবার প্রার্থনা করেন। তাঁরা তাঁদের পুণ্যফলে দেবলোক লাভ করেন এবং স্বর্গীয় দেবভোগ উপভোগ করেন।

 

২১

তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং

ক্ষীণে পুণ্যে মর্তলোকং বিশন্তি।

এবং ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না

গতাগতং কামকামা লভন্তে।।

তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং

ক্ষীণে পুণ্যে মর্তলোকং বিশন্তি।

এবং ত্রয়ীধর্মম্‌ অনুপ্রপন্না

গত-আগতং কাম-কামাঃ লভন্তে।।

সেই বিপুল স্বর্গলোক উপভোগ করতে করতে তাঁদের পুণ্য ক্ষয় হয়ে গেলে, তাঁরা মানুষের মর্ত্যলোকেই ফিরে আসেন। তিনবেদে বর্ণিত ধর্ম অনুসরণ করে যাঁরা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন, সেই স্বর্গলোভী ব্যক্তিরা এইভাবেই বারবার সংসারে যাওয়া আসা করেন।

    

২২

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।

তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্‌।

অনন্যাঃ চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পরি-উপাসতে।

তেষাং নিত্য অভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহামি অহম্‌।

অন্য চিন্তা ত্যাগ করে যে ব্যক্তি সর্বদা আমাকেই চিন্তা করেন, সেই নিত্য ধ্যানপরায়ণ ব্যক্তির যোগ ও ক্ষেম আমিই বহন করি।

[না পাওয়া বস্তু পাওয়ার নাম যোগ আর পাওয়ার পর তার সংরক্ষণের নাম ক্ষেম।]

 

২৩

যেঽপ্যন্যদেবতা ভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধয়াঽন্বিতাঃ।

তেঽপি মামেব কৌন্তেয় যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্‌।।

যে অপি অন্যদেবতা ভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধয়াঃ অন্বিতাঃ।

তে অপি মাম্‌ এব কৌন্তেয় যজন্তি অবিধিপূর্বকম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র, যে ভক্ত অত্যন্ত শ্রদ্ধায়, একাত্ম হয়ে অন্যান্য দেবতারও পুজো করেন, সেই ভক্তেরা না জেনে আসলে আমাকেই পুজো করে থাকেন।

  

২৪

অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।

ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।

অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুঃ এব চ।

ন তু মাম্‌ অভিজানন্তি তত্ত্বেন অতঃ চ্যবন্তি তে।।

আমিই সকল যজ্ঞের ভোক্তা এবং যজ্ঞের ফল নির্ধারণের কর্তা। অথচ, ভক্তরা আমার স্বরূপ জানেন না বলেই তাঁরা বার বার সংসারে ফিরে আসেন।

 

২৫

যান্তি দেবব্রতা দেবান্‌ পিতৄ্ন্‌ যান্তি পিতৃব্রতাঃ।

ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদ্‌যাজিনোঽপি মাম্‌।।

যান্তি দেবব্রতা দেবান্‌ পিতৄ্ন্‌ যান্তি পিতৃব্রতাঃ।

ভূতানি যান্তি ভূত-ইজ্যাঃ যান্তি, মৎ-যাজিনঃ অপি মাম্‌।।

যাঁরা দেবতার পুজো করেন তাঁরা দেবতাকেই পান, যাঁরা পিতৃপুরুষের ভক্ত, তাঁরা পিতৃলোকে যান, যাঁরা ভূতগণের উপাসক তাঁরা ভূতলোক লাভ করেন। আর যাঁরা আমাকে পুজো করেন, তাঁরা আমাকেই লাভ করেন।

 

২৬

পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।

তদহং ভক্ত্যু্পহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।।

পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।

তৎ অহং ভক্তি উপহৃতম্‌ অশ্নামি প্রযত-আত্মনঃ।।

যিনি পরমভক্তির সঙ্গে আমাকে পত্র, ফুল, ফল ও জল উৎসর্গ করেন, শুদ্ধচিত্ত সেই ভক্তের ভক্তিনিষ্ঠ উপহারে আমি সন্তুষ্ট হই।  

 

২৭

যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোসি দদাসি যৎ।

যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্‌।।

যৎ করোষি যৎ অশ্নাসি যৎ জুহোসি দদাসি যৎ।

যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মৎ-অর্পণম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র, যা কর্ম করো, যা আহার করো, যা হোম করো, যা দান করো, যে তপস্যা করো, সব আমাতেই সমর্পণ করে দাও।

  

২৮

শুভাশুভফলৈরেবং মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ।

সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।

শুভ-অশুভফলৈঃ এবং মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ।

সন্ন্যাসযোগ-যুক্ত-আত্মা বিমুক্তঃ মাম্‌ উপ-এষ্যসি।।

এইভাবেই শুভ কিংবা অশুভ ফলের প্রত্যাশায় কর্মের বন্ধন থেকে তুমি মুক্ত হতে পারবে এবং এই সন্ন্যাস যোগে তোমার আত্মা মুক্ত হয়ে আমাকে লাভ করবে।

 

২৯

সমোঽহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোঽস্তি ন প্রিয়ঃ।

যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্‌।।

সমঃ অহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যঃ অস্তি ন প্রিয়ঃ।

যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চ অপি অহম্‌।।

সকল ভূতেই আমার সমান ভাব, আমার কাছে কেউ অপ্রিয় নয়, কেউই প্রিয় নয়। কিন্ত যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ ভক্তিতে আমার ভজনা করেন, তাঁরা আমার এবং আমি তাঁদের অন্তরে বাস করি।

 

৩০

অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্‌।

সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।

অপি চেৎ সুদুরাচারঃ ভজতে মাম্‌ অনন্যভাক্‌।

সাধুঃ এব স মন্তব্যঃ সম্যক্‌ ব্যবসিতঃ হি সঃ।।

অত্যন্ত দুর্জন ব্যক্তিও যদি একাগ্র মনে আমার উপাসনা করেন, তাঁকেও সজ্জন বলেই মনে করবে, কারণ তাঁর সংকল্প শুভ।

 

৩১

ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।

কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।

ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বৎ শান্তিং নিগচ্ছতি।

কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।

এই ধরনের ধর্মাত্মা খুব অল্প সময়েই পরম শান্তি লাভ করেন। হে কুন্তীপুত্র, এই কথাটা নিশ্চিত জেনো, আমার ভক্তরা কখনো বিনষ্ট হন না।

 

৩২,

৩৩

মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেঽপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।

স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেঽপি যান্তি পরাং গতিম্‌।।

কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা।

অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্‌।।

মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যে অপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।

স্ত্রিয়ঃ বৈশ্যঃ তথা শূদ্রাঃ তে অপি যান্তি পরাং গতিম্‌।। 


কিং পুনঃ ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়ঃ তথা।

অনিত্যম্‌ অসুখং লোকম্‌ ইমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্‌।। 

হে পার্থ, আমাতে পূর্ণ আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য এবং শূদ্র তো বটেই, এমনকি অত্যন্ত নিকৃষ্টজন্মা জীবও পরমগতি লাভ করে থাকে। পুণ্যবান, ব্রাহ্মণ, ভক্ত এবং রাজর্ষি ক্ষত্রিয়দের কথা তো বলাই বাহুল্য। কাজেই মরণশীল ও দুঃখময় এই মর্ত্যলোকে যখন এসেই পড়েছ, তখন আমার উপাসনা করো।

    

৩৪

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্‌যাজী মাং নমস্কুরু।

মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবমাত্মানং মৎপরায়ণঃ।

মৎ-মনা ভব মৎ-ভক্তঃ মৎ-যাজী মাং নমস্কুরু।

মাম্‌ এব এষ্যসি যুক্ত্বা এবম্‌ আত্মানং মৎপরায়ণঃ।

তোমার মন আমাতে অর্পণ ক’রে, তুমি আমার ভজন করো, পুজো করো, আমায় নমস্কার করো। এই ভাবে আমাতে একনিষ্ঠ হয়ে, আমাতে তোমার আত্মাকে সমাহিত করলে, আমাকেই লাভ করবে।  

  

রাজযোগ সমাপ্ত

পরের পর্ব পাশের সূত্রে " গীতা - ১০ম পর্ব "

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...