এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
নবম অধ্যায়ঃ রাজযোগ
|
|
|
১ |
শ্রীভগবান
বললেন- যেহেতু তোমার মনে দোষদৃষ্টি নেই, তাই অতি গোপন উপলব্ধির এই পরমজ্ঞানের
কথা তোমার কাছে ব্যাখা করব, যা জানলে সকল অশুভ থেকে তোমার মুক্তি লাভ হবে।
|
||
|
২ |
এই
রাজবিদ্যা সবচেয়ে গোপন। পবিত্র এবং সর্বশ্রেষ্ঠ এই বিদ্যা প্রত্যক্ষ ফলদায়ক,
ধর্মের একান্ত অনুসারী এই বিদ্যা সহজসাধ্য এবং অক্ষয়ফল দান করে। |
||
|
৩ |
হে
শত্রুহারী অর্জুন, যে ব্যক্তিরা এই ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, তারা আমাকে পায় না।
তারা মৃত্যুময় এই সংসারের চক্রে বার বার ঘুরতেই থাকে। |
||
|
৪ |
আমার
অব্যক্তমূর্তি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অগোচর এবং সেই ভাবেই আমি সমস্ত জগতে ব্যাপ্ত।
ব্রহ্ম থেকে স্থাবর পর্যন্ত সমস্ত ভূতগণ আমার মধ্যেই অবস্থান করে, কিন্তু আমি
কোথাও থাকি না। |
||
|
৫ |
আবার এই ভূতগণ আমার মধ্যে অবস্থান করেও না। আমার ঐশ্বরিক মাহাত্ম্য তুমি লক্ষ করো, আমার আত্মা থেকেই এই সকল ভূতের সৃষ্টি, আমার আত্মাই এই ভূতের ধারক, কিন্তু আমার আত্মা এই ভূতগণের মধ্যে অবস্থান করেন না।
|
||
|
৬ |
সর্বত্রবিচরণশীল
বাতাস সর্বদা আকাশে অবস্থান করলেও, আকাশের সঙ্গে যেমন তার কোন যোগ নেই, তেমনই জেনে রাখো, সমস্ত ভূতগণ আমাতেই অবস্থান
করে। |
||
|
৭ |
হে
কুন্তীপুত্র অর্জুন, প্রত্যেক কল্পের শেষে সকল ভূত, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ আমার এই তিনগুণের
মায়ায় আমার মধ্যেই বিলীন হয়, আবার নতুন কল্পের শুরুতে আমিই সেই ভূত সকলকে সৃষ্টি
করি। |
||
|
৮ |
নিজের
অবিদ্যারূপ তিনগুণের নিয়ন্ত্রণে আমি জন্ম-মৃত্যুর বশীভূত এই সমস্ত ভূতকে বার বার
সৃষ্টি করে থাকি। |
||
|
৯ |
হে
ধনঞ্জয়, এই সমস্ত কর্মে আমি অনাসক্ত ও নির্বিকারভাবে অবস্থান করতে পারি, এবং তাই
এই সমস্ত কর্মে আমি বাঁধা পড়ি না।
|
||
|
১০ |
হে
কুন্তীপুত্র, আমার পরিচালনায়, আমার ত্রিগুণের মায়ায় এই সমগ্র বিশ্বচরাচর সৃষ্টি
হয়, আর সেই কারণেই এই জগৎ বিচিত্র রূপে বেড়ে ওঠে।
|
||
|
১১ |
সর্ব
ভূতের মহান ঈশ্বর স্বরূপে আমার এই পরমাত্ম তত্ত্ব উপলব্ধি করতে না পেরে,
মূর্খেরা মানুষের দেহধারী এই আমাকে, অবজ্ঞা করে থাকে। |
||
|
১২ |
আর সেই
কারণে, তাদের আশা ব্যর্থ হয়, কর্ম নিষ্ফল হয়, জ্ঞান বিফল হয়। এই বিবেকবোধহীন
ব্যক্তিরা রাক্ষসী এবং আসুরী স্বভাব পেয়ে থাকে। [রাক্ষসীরা
তমোগুণ থেকে তামসী এবং আসুরীরা রজঃগুণ থেকে রাজসী স্বভাব পেয়ে থাকে।]
|
||
|
১৩ |
হে
পার্থ, কিন্তু মহাত্মা ব্যক্তিরা দেবদুর্লভ সাত্ত্বিক হওয়ার কারণে আমাকে
সর্বভূতের কারণ এবং আমার অক্ষর স্বরূপ উপলব্ধি ক’রে, একনিষ্ঠায় আমারই ভজনা করেন।
|
||
|
১৪ |
তাঁরা
সর্বদা আমার গুণের কথা কীর্তন করেন, কঠিন ব্রতে, কঠোর নিষ্ঠায় ও ভক্তিতে আমাকে
নমস্কার করেন আর সর্বদা আমার চিন্তায় সমাহিত থেকে আমার উপাসনা করেন।
|
||
|
১৫ |
কেউ কেউ ভগবৎবিষয়ে
জ্ঞানচর্চায় আমার উপাসনা করেন। কেউ বা বিভিন্ন স্বরূপে একই ব্রহ্মার প্রকাশ
উপলব্ধি করেন, আবার কেউ কেউ আমাকে বিশ্বমূর্তি ভগবান ভেবেই উপাসনা করেন।
|
||
|
১৬ |
আমিই
যজ্ঞ, আমিই পঞ্চমহাযজ্ঞ, আমিই পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধমন্ত্র। আমিই ঔষধ, আমিই মন্ত্র,
আমিই হোমের ঘৃত, আমিই হোমের আগুন এবং আমিই হোম। |
||
|
১৭ |
আমিই এই
জগতের পিতা, আমিই মাতা ও পালিকা, আমিই পিতৃপুরুষের পিতা, আমিই পবিত্র জ্ঞান,
আমিই ওঁকার ধ্বনি, আমিই ঋক, সাম ও যজুঃ বেদ।
|
||
|
১৮ |
আমিই
জগতের গতি, আমিই পালক, সকলের প্রভু। আমি সমস্ত প্রাণীর আশ্রয়, আমিই সকলের
শুভাশুভ, আমিই রক্ষক এবং বন্ধু। আমিই সৃষ্টি করি, আমিই ধ্বংস করি। আমিই ধারণ
করি, আবার বিনাশও করি, আমিই জগতের অক্ষয় কারণ। |
||
|
১৯ |
হে
অর্জুন, আমিই উত্তাপ বিকিরণে বর্ষাকে আকর্ষণ করি এবং বৃষ্টি সৃজন করি। আমিই
অমৃতরূপ জীবন, আমিই মৃত্যুর কারণ। স্থূলরূপে আমি প্রত্যক্ষ আবার সূক্ষ্মরূপে আমি
পরোক্ষ। |
||
|
২০ |
তিনবেদে
জ্ঞানী পণ্ডিতগণ যজ্ঞে আমারই পুজো করেন এবং যজ্ঞের শেষে সোমরস পান ক’রে
পাপমুক্তির পর, স্বর্গে যাবার প্রার্থনা করেন। তাঁরা তাঁদের পুণ্যফলে দেবলোক লাভ
করেন এবং স্বর্গীয় দেবভোগ উপভোগ করেন।
|
||
|
২১ |
সেই
বিপুল স্বর্গলোক উপভোগ করতে করতে তাঁদের পুণ্য ক্ষয় হয়ে গেলে, তাঁরা মানুষের
মর্ত্যলোকেই ফিরে আসেন। তিনবেদে বর্ণিত ধর্ম অনুসরণ করে যাঁরা যজ্ঞ অনুষ্ঠান
করেন, সেই স্বর্গলোভী ব্যক্তিরা এইভাবেই বারবার সংসারে যাওয়া আসা করেন। |
||
|
২২ |
অন্য
চিন্তা ত্যাগ করে যে ব্যক্তি সর্বদা আমাকেই চিন্তা করেন, সেই নিত্য ধ্যানপরায়ণ
ব্যক্তির যোগ ও ক্ষেম আমিই বহন করি। [না
পাওয়া বস্তু পাওয়ার নাম যোগ আর পাওয়ার পর তার সংরক্ষণের নাম ক্ষেম।]
|
||
|
২৩ |
হে
কুন্তীপুত্র, যে ভক্ত অত্যন্ত শ্রদ্ধায়, একাত্ম হয়ে অন্যান্য দেবতারও পুজো করেন,
সেই ভক্তেরা না জেনে আসলে আমাকেই পুজো করে থাকেন। |
||
|
২৪ |
আমিই সকল
যজ্ঞের ভোক্তা এবং যজ্ঞের ফল নির্ধারণের কর্তা। অথচ, ভক্তরা আমার স্বরূপ জানেন
না বলেই তাঁরা বার বার সংসারে ফিরে আসেন। |
||
|
২৫ |
যাঁরা
দেবতার পুজো করেন তাঁরা দেবতাকেই পান, যাঁরা পিতৃপুরুষের ভক্ত, তাঁরা পিতৃলোকে
যান, যাঁরা ভূতগণের উপাসক তাঁরা ভূতলোক লাভ করেন। আর যাঁরা আমাকে পুজো করেন,
তাঁরা আমাকেই লাভ করেন। |
||
|
২৬ |
যিনি
পরমভক্তির সঙ্গে আমাকে পত্র, ফুল, ফল ও জল উৎসর্গ করেন, শুদ্ধচিত্ত সেই ভক্তের ভক্তিনিষ্ঠ
উপহারে আমি সন্তুষ্ট হই।
|
||
|
২৭ |
হে
কুন্তীপুত্র, যা কর্ম করো, যা আহার করো, যা হোম করো, যা দান করো, যে তপস্যা করো,
সব আমাতেই সমর্পণ করে দাও। |
||
|
২৮ |
এইভাবেই
শুভ কিংবা অশুভ ফলের প্রত্যাশায় কর্মের বন্ধন থেকে তুমি মুক্ত হতে পারবে এবং এই
সন্ন্যাস যোগে তোমার আত্মা মুক্ত হয়ে আমাকে লাভ করবে। |
||
|
২৯ |
সকল
ভূতেই আমার সমান ভাব, আমার কাছে কেউ অপ্রিয় নয়, কেউই প্রিয় নয়। কিন্ত যে ব্যক্তি
একনিষ্ঠ ভক্তিতে আমার ভজনা করেন, তাঁরা আমার এবং আমি তাঁদের অন্তরে বাস করি। |
||
|
৩০ |
অত্যন্ত
দুর্জন ব্যক্তিও যদি একাগ্র মনে আমার উপাসনা করেন, তাঁকেও সজ্জন বলেই মনে করবে,
কারণ তাঁর সংকল্প শুভ। |
||
|
৩১ |
এই ধরনের
ধর্মাত্মা খুব অল্প সময়েই পরম শান্তি লাভ করেন। হে কুন্তীপুত্র, এই কথাটা
নিশ্চিত জেনো, আমার ভক্তরা কখনো বিনষ্ট হন না। |
||
|
৩২, ৩৩ |
হে
পার্থ, আমাতে পূর্ণ আশ্রয় করে স্ত্রী, বৈশ্য এবং শূদ্র তো বটেই, এমনকি অত্যন্ত
নিকৃষ্টজন্মা জীবও পরমগতি লাভ করে থাকে। পুণ্যবান, ব্রাহ্মণ, ভক্ত এবং রাজর্ষি
ক্ষত্রিয়দের কথা তো বলাই বাহুল্য। কাজেই মরণশীল ও দুঃখময় এই মর্ত্যলোকে যখন এসেই
পড়েছ, তখন আমার উপাসনা করো। |
||
|
৩৪ |
তোমার মন
আমাতে অর্পণ ক’রে, তুমি আমার ভজন করো, পুজো করো, আমায় নমস্কার করো। এই ভাবে
আমাতে একনিষ্ঠ হয়ে, আমাতে তোমার আত্মাকে সমাহিত করলে, আমাকেই লাভ করবে। |
রাজযোগ সমাপ্ত
পরের পর্ব পাশের সূত্রে " গীতা - ১০ম পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন