সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - পর্ব ৩

 ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ২ "


ব্রাহ্মী লিপি

    আগেই বলেছি ভারতবর্ষের প্রাচীনতম লিপির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে সিন্ধুসভ্যতার অবশেষে। কিন্তু ওই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব না হওয়াতে, পণ্ডিতদের অনেকেই ওগুলিকে লিপি বলে মানতে রাজি নন। আমাদের দেশে তারপর যে লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে, তার সময়কাল মোটামুটি ৩০০-২৫০ বি.সি.। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে প্রথম যে লিপির দেখা পাওয়া যায় তাকে পণ্ডিতরা ব্রাহ্মী লিপি বলেন। ১৮৩৭ সালে সম্রাট অশোকের এই শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন বিশিষ্ট প্রত্নবিদ এবং ভাষাবিদ জেমস প্রিন্সেপ। যদিও প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু বহুদিন আগে থেকেই যে এই ব্রাহ্মী লিপির চর্চা চলছিল, সে বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে দ্বিমত নেই। তা না হলে সম্রাট অশোকের শিলালিপির এত পরিণত বর্ণ বিন্যাস সম্ভব হত না। কেউ কেউ বলেন, ব্রাহ্মীলিপির উদ্ভব সিন্ধু সভ্যতার ওই অপঠিত লিপির থেকেই এবং অন্য কোন সভ্যতার প্রভাবে নয়, ব্রাহ্মী লিপির উদ্ভব আমাদের দেশেই। ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, তার বিন্যাস এবং উচ্চারণ পদ্ধতির কথা বেদের “তৈত্তিরিয় প্রতিশক্য” অংশে বর্ণনা করা আছে। যার থেকে অনেকে মনে করেন, ব্রাহ্মীলিপির সূত্রপাত অনেকটাই প্রাচীন।


সম্রাট অশোকের ষষ্ঠ শিলালিপিতে ব্রাহ্মী লিপির নমুনা (৩০০ বি.সি.ই)

    ব্রাহ্মীলিপির উল্লেখ প্রাচীন হিন্দু, জৈন ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে এবং তাদের চৈনিক অনুবাদেও বারবার পাওয়া যায়।  “ললিতবিস্তার সূত্র” গ্রন্থে বলা আছে সিদ্ধার্থ, যিনি পরে গৌতম বুদ্ধ হয়েছিলেন, এক ব্রাহ্মণ লিপিকারের কাছে ব্রাহ্মী লিপি শিক্ষা করেছিলেন এবং বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের সময়কাল মোটামুটি ৫০০ বি.সি। জৈন ধর্মশাস্ত্র “সমবায়াঙ্গ সূত্র” (সময়কাল ৩০০ বি.সি.) গ্রন্থে সেকালে প্রচলিত অন্যান্য লিপির মধ্যে ব্রাহ্মীলিপির নাম আছে প্রথমে এবং খরোষ্ঠী লিপির নাম আছে চতুর্থে। কাজেই ব্রাহ্মীলিপি যে, এই সময়ের অনেক দিন আগে থেকেই ভারতে বহুল প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত লিপি পদ্ধতি, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

    অনেক পণ্ডিত মনে করেন, প্রাচীন কালের ভারতে পাথরে খোদাই করে লেখার পদ্ধতি হয়তো জানা ছিল না। তার আগে নরম মাটিতে অথবা তালপাতা, কলাপাতা এবং ভূর্জপাতায় লেখার প্রচলন ছিল। কালের প্রভাবে সেই সব লিপির নমুনা আমাদের সময় পর্যন্ত পৌঁছোয়নি। অতএব, সম্রাট অশোকের শিলালিপিই আমাদের কাছে প্রথম ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন।


খরোষ্ঠী লিপি

ভারতের উত্তরে এবং উত্তর পশ্চিমে ব্রাহ্মীলিপির সমসাময়িক খরোষ্ঠী লিপিরও প্রচলন ছিল। এই লিপির উদ্ভব হয়েছিল গান্ধারে [যেখানকার রাজকুমারী ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী] - বর্তমান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চল। সমসাময়িক কালের খরোষ্ঠী লিপির কিছু প্রভাব, ব্রাহ্মী লিপিতে থাকতেই পারে, কিন্তু দুই পদ্ধতির মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। যেমন খরোষ্ঠী লিপি প্রধানতঃ ডাকদিক থেকে বাঁদিকে লেখা হত, এখনকার উর্দু লেখার মতো। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপি বাঁদিক থেকে ডানদিকে লেখা হত, যে পদ্ধতিতে আমরা আজও লিখি।  

    

খরোষ্ঠীর সংখ্যা

মান

0

0

00

000

লিপি

Kharosthi 1.svg

Kharosthi 2a.svg

Kharosthi 3a.svg

Kharosthi 4a.svg

Kharosthi 10.svg

Kharosthi 20.svg

Kharosthi 100.svg

Kharosthi 1000.svg


 তাছাড়া ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় খরোষ্ঠী লিপির বর্ণবিন্যাস বেশ কিছুটা জটিল। আর সংখ্যা লেখার দিক থেকেও খরোষ্ঠী ছিল অনেকটাই গোলমেলে ব্যাপার। ওপরের টেব্‌লে দেখ, খরোষ্ঠী সংখ্যাতে ৫ থেকে ৯ এবং ০ -র জন্যে কোন লিপি ছিল না। ১,২,৩, ৪ সংখ্যাগুলি ছাড়া বাকি গুলি যোগ করে লেখা হত, যেমন ধর ৮ লিখতে গেলে দুবার ৪ লিখতে হত - অথবা ৯ লিখতে হলে পাশাপাশি ৪৩২ লিখতে হত। উদাহরণ হিসেবে যদি ২০১৮ লিখতে যাই তাহলে এভাবে লিখতে হবে - ১০০০ ১০০০ ১ ৪৪ - উঁহুঁ হল না - খরোষ্ঠী লিপি ডানদিক থেকে বাঁদিকে আসে - তাহলে ব্যাপারটা হবে ৪৪ ১০ ১০০০ ১০০০ - এইভাবে !  লিপি অনুযায়ী লিখতে হলে - 


Kharosthi 4a.svgKharosthi 4a.svgKharosthi 10.svg Kharosthi 1000.svgKharosthi 1000.svg 

এই সব কারণেই খরোষ্ঠী লিপি ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হতে থাকল। মোটামুটি ৭০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আঞ্চলিক লিপি হিসেবে ব্যবহার চালু থাকলেও, পরে এই পদ্ধতি পুরোপুরি অবলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তাহলেও মানব সভ্যতায় এই লিপির গুরুত্ব এতটুকু কমে না, কারণ আধুনিক লিপি পদ্ধতির পথে এটিও একটি বিশেষ ধাপ।


 


কাঠের টুকরোর ওপর লেখা খরোষ্ঠী লিপি, ২০০-৩০০ বি.সি.র গান্ধার অঞ্চল থেকে পাওয়া।


ভারতে আঞ্চলিক লিপির বিকাশ

    সেই সময় এদেশের আদি বাসিন্দা দ্রাবিড় হোন কিংবা বাইরে থেকে আসা আর্য, সকলেরই জ্ঞান চর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই ব্রাহ্মী লিপি। আর্য ঋষিদের স্মৃতিনির্ভর বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থ ফুটে উঠতে লাগল রেখায়। যে লিপি শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত ঋষিদের মধ্যে সীমিত ছিল, সম্রাট অশোকের সহযোগিতায় সেই লিপি রাজকীয় লিপি হয়ে উঠল এবং রাজকার্যে ব্রাহ্মীলিপির ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ল সাম্রাজ্যের চারদিকে। ব্রাহ্মীলিপি সাধারণ মানুষেরও আয়ত্তের মধ্যে এসে গেল। ব্যাপ্ত এই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও বাড়তে লাগল শিক্ষা এবং জ্ঞানের চর্চা। তাঁরা নিজস্ব বাক্য বিন্যাস, শব্দসম্ভার এবং উচ্চারণের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বদলে নিতে লাগলেন, লিপির বৈশিষ্ট্য। ভারতীয় আত্মিক জ্ঞানের লিখিত রূপ আমাদের সময় পর্যন্ত বয়ে আনার দায়িত্ব নিয়ে, নতুন নতুন ভাষার বিকাশ হতে শুরু করল। 

    দেশ জুড়ে বহুল ব্যবহারের ফলে, ব্রাহ্মীলিপির আঙ্গিকে অনেক পরিবর্তন আসতে লাগল। সম্রাট অশোক যে ভাষায় শিলালিপি লিখেছিলেন, সেটি মাগধী। মগধের প্রাকৃত ভাষা এবং সংস্কৃতের মিশ্রণের এই মাগধী ভাষাতেই তখনকার আম জনতা কথা বলতেন। যদিও রাষ্ট্রভাষা কিংবা রাজসভার ভাষা ছিল সংস্কৃত। দক্ষিণ ভারতের তামিল ব্রাহ্মীলিপি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। তামিল ব্রাহ্মীলিপির কিছু কিছু নিদর্শন, সম্রাট অশোকের শিলালিপির থেকেও প্রাচীন। কিছুদিন আগে শ্রীলংকার অনুরাধাপুরে  একটি পাত্রের গায়ে কিছু ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া গেছে। পণ্ডিতেরা অনুমান করছেন, এটি ৪৫০-৩৫০ বি.সি.র। অতএব ব্রাহ্মীলিপির শুরুর থেকেই অঞ্চলভেদে তার পরিবর্তন চালু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই।

    গুপ্ত রাজাদের আমলে যে ব্রাহ্মীলিপির নিদর্শন পাওয়া যায়, তাকে “গুপ্ত লিপি” বলা হয়। এই সময় কাল মোটামুটি পঞ্চম শতাব্দী সি.ই.তে। মূল ব্রাহ্মীলিপি থেকে এই লিপির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছিল। এই গুপ্তলিপি থেকে দেবনাগরি এবং রঞ্জনা বা কুটিলা লিপির সৃষ্টি হয়েছিল। দেবনাগরি লিপি আজও আমরা হিন্দি লিপি হিসেবে দেখতে পাই। কুটিলা প্রভাবিত লিপি আজও নেপাল, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, জাপান, মায়ানমার, সমুদ্রতীরবর্তী চিনের বৌদ্ধ বিহারগুলিতে দেখা যায়। এমনকি আমাদের বাংলা লিপিও অনেকটাই কুটিলা লিপির অনুসারী।  

ওপরের দুটি চার্টের একদম বাঁদিকের ২য় কলমে ব্রাহ্মীলিপির ৩য় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের নমুনা আর ডানদিকের শেষ
কলমটি আধুনিক বাংলা লিপির 


    এই সময় থেকেই হিন্দু এবং বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড়ো বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা শুরু হয়েছিল, যেখানে মেধাবী ছাত্ররা রাজপুত্র কিংবা ব্রাহ্মণ না হয়েও উচ্চশিক্ষার অধিকার পেতেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু মহাবিহার দেশের বাইরেও বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। যেমন নালন্দা মহাবিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার, রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারএই মহাবিহারগুলি ছাড়াও অনেক বিহারের সন্ধান পাওয়া যায় নানান গ্রন্থে, কিন্তু কালের প্রভাবে সে সবই আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই বিহার এবং মহাবিহারগুলিতে ছাত্রদের শিক্ষা চর্চার জন্যেই অজস্র পুঁথি রচনা করা হত। সংস্কৃত কিংবা পালি ছিল শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু নানান অঞ্চল থেকে আসা মেধাবী ছাত্রদের সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সুবিধার জন্যেও আঞ্চলিক ভাষার পুঁথি রচনা জরুরি হয়ে উঠল।

    তা ছাড়াও বদলে যেতে লাগল, ভারতবর্ষের সার্বিক রাজনৈতিক চালচিত্র। মৌর্য সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২১ বি.সি. থেকে ১৮৫ বি.সি.) পতনের পর গুপ্ত সাম্রাজ্যের (মোটামুটি ৩২০ এ.ডি. থেকে ৫৫০ এ.ডি.) প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরে সুলতানি আমল পর্যন্ত সর্বভারতীয় প্রভাবশালী তেমন কোন সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে পারেনি। মধ্যবর্তী সময়ে  ইন্দো-গ্রীক, ইন্দো-পারস্য, কুষাণ, সাতবাহন বংশের রাজাদের এবং গুপ্তযুগের পর পাল, পূষ্যভূতি, মৌখরী, রাষ্ট্রকূট বংশের রাজাদের ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সীমিত। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গীও হয়ে উঠছিল কিছুটা আঞ্চলিক। যার ফলে বিভিন্ন রাজার সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাই হয়ে উঠছিল রাজভাষা। উপরন্তু নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁরা নিজেদের সভাপণ্ডিতদের উৎসাহ দিতেন নানান শাস্ত্রগ্রন্থ রচনার। অতএব আঞ্চলিক ভাষাগুলিও নিজ নিজ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত। গুপ্তযুগকে ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণ যুগ বলা হয়, পণ্ডিতেরা বলেন, এই সময়েই প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ - বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারত দেবনাগরি লিপিতে সংকলিত হয়েছিল। মনুসংহিতা এবং বেশ কয়েকখানি পুরাণও এই সময়ে রচনা করা হয়েছিল। ব্রাহ্মীলিপি যদি হয় মা, তাহলে দেবনাগরি লিপি তার কন্যা। অতএব এই সময় থেকেই ব্রাহ্মীলিপি তার মাতৃত্বের গৌরব হারাতে লাগল, কন্যা দেবনাগরির হাতে। কিন্তু ব্রাহ্মীলিপির তুলনায় দেবনাগরির মহিমাও বেশিদিন টিকে থাকতে পারল না। পুজোপার্বণে, উচ্চশিক্ষায় সংস্কৃত চালু থাকলেও, নিত্য রাজকাজে, প্রশাসনিক কাজে এমনকি সাহিত্যেও মাথা চাড়া দিতে থাকল আঞ্চলিক ভাষাগুলি। কিছু কিছু পরিবর্তন নিয়ে এই আঞ্চলিক ভাষাগুলির নিজস্ব লিপিও তৈরি হয়ে উঠতে লাগল।

    এভাবে ব্রাহ্মীলিপির দুটি প্রধান শাখাকে যদি দক্ষিণ ভারতীয় এবং উত্তর ভারতীয় হিসেবে ভাগ করে নেওয়া হয়, তাহলে উত্তর ব্রাহ্মী থেকে দেবনাগরী, অসমিয়া, বাংলা, ওড়িয়া, হিন্দি, গুরুমুখী – উত্তর ভারতের প্রায় সমস্ত লিপিরই উদ্ভব। আর দক্ষিণ ব্রাহ্মী থেকে তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মালয়লম লিপির সৃষ্টি হয়েছিল।

 

বাংলা লিপি




    মনে করা হয় বাংলা লিপির চর্চা জোরদার হয়ে উঠেছিল মহারাজ শশাঙ্কর আমলে – মোটামুটি ৫৯০ থেকে ৬২৫ এ.ডি.। মহারাজ শশাঙ্ক গুপ্তরাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বঙ্গের মহাসামন্ত থেকে গৌড় রাজ্যের রাজা হয়ে ওঠেন। তাঁর সমসাময়িক কিছু তাম্রলিপিতে বাংলা লিপি নিজস্ব রূপ নিতে শুরু করে। এরপর বাংলা লিপির বহু নিদর্শন পাওয়া যায় পালবংশের রাজাদের আমলে – বিশেষ করে বিগ্রহপাল (আনুমানিক ৮৫০-৮৫৩ এ.ডি.) ও নারায়ণ পালের ( আনুমানিক ৮৫৪-৯০৮ এ.ডি.) রাজত্ব কালে। নিচের পাণ্ডুলিপিটি পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল রাজবাড়ির সংগ্রহশালা থেকে  উদ্ধার করেছিলেন। আনুমানিক অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে লেখা “চর্যাপদ”-এর পাণ্ডুলিপি এটি। বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া এবং মৈথিলি ভাষার পূর্বসূরী “অবহট্ট” ভাষাতে লেখা। তালপাতা ছেঁটে সাজিয়ে তোলা এই পুঁথিটি রাখা আছে বাংলাদেশের রাজশাহী কলেজের সংগ্রহশালায়। বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার গোপন রীতি নিয়ে লেখা এই পদগুলি অনেক বৌদ্ধ তান্ত্রিকের লেখার সংকলনপণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে “সান্ধ্যভাষা” বলেছেন। তার কারণ আপাত দৃষ্টিতে পদগুলির নিহিত অর্থের আড়ালে অন্য কোন বক্তব্যের ইশারা পাওয়া যায়। বাংলা থেকে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনা অবলুপ্ত হয়ে গেছে বহুদিন, সে কারণে এই পদগুলির গূঢ় অর্থ আজও জানা যায়নি।

    পালরাজাদের (আনুমানিক ৭৩০ – ১০২৩) আমলেই বাংলা ভাষা এবং লিপি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, তারপর সেন রাজাদের আমলেও (আনুমানিক ১০৭০ – ১২৩০ এ.ডি.) বাংলা ভাষা এবং লিপির চর্চা অব্যাহত রইল। সেন আমলেই বাংলা ভাষা তার নিজস্ব লিপিসহ এক স্বতন্ত্র সম্পূর্ণ ভাষার রূপ পেল। 

      


বাঁদিকে হরিকেল রাজবংশের আনুমানিক নবম/দশম শতাব্দীর রূপার মুদ্রায় বাংলা লিপি। 

ডানদিকে  চতুর্দশ শতাব্দীর সুলতানী আমলের রূপার মুদ্রার বাংলা লিপি। 

[এখানে হরিকেল রাজবংশের পরিচয় ছোট করে বলে নিই - আধুনিক বাংলাদেশের শ্রীহট্ট অঞ্চল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা জেলার অনেকটা এবং ভারতের ত্রিপুরা জুড়ে এই হিন্দু রাজ্যের শাসক ছিলেন হরিকেলের রাজবংশের রাজারা। আনুমানিক সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই রাজবংশের আধিপত্য বজায় ছিল। এই অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের অধিকারে ছিল, যেমন খড়্গ, দেব, চন্দ্র প্রমুখ। ]     


বাংলা সাহিত্য

    কোন ভাষা যতোই রাজকাজে কিংবা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হোক না কেন, সেই ভাষা সার্থক হয়ে ওঠে সাহিত্যের ছোঁয়ায়। কারণ সাহিত্যের ভাষা পাঠকের মন স্পর্শ করে, স্পর্শ করে তার অনুভূতি। মানুষের অন্তরের অনুভব, লিখিত ভাষায় প্রকাশ করার মতো সাবলীল শক্তি যে ভাষা অর্জন করে, সে ভাষা অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়।  অতএব বাংলা ভাষায় সাহিত্যের শুরু কবে থেকে হল, অর্থাৎ লেখকেরা কবে থেকে বাংলা ভাষাকেও মনের ভাব প্রকাশের নিজস্ব মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলেন, সেটা দেখে নেওয়া দরকার।   

    বাংলা ভাষায় সাহিত্যের বিকাশকে প্রধানতঃ তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রাচীন পর্যায় মোটামুটি ৯৫০ – ১৩৫০ এ.ডি., তারপর মধ্যবর্তী পর্যায় মোটামুটি ১৩৫০ থেকে ১৮০০ এ.ডি. এবং সর্বশেষে আধুনিক পর্যায় ১৮০০ থেকে আজকের দিন অব্দি।

    প্রাচীন পর্যায়ে সাহিত্য বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না। একমাত্র ‘চর্যাপদ’-এর কথাই আবার বলতে হয়। বৌদ্ধতন্ত্রে পণ্ডিতদের লিখিত রহস্যময় ৪৮টি পদের সংকলন। যেগুলির রচনা করেছিলেন লুইপা, ভুসুকুপা, কাহ্নাপা, শবরপা প্রমুখ কয়েকজন বৌদ্ধ তন্ত্র পণ্ডিত।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে সাহিত্যচর্চার অবস্থা যথেষ্ট ভাল। এই সময়ের সাহিত্য সৃষ্টিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- বৈষ্ণব সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য সাহিত্য এবং অনুবাদ সাহিত্য দ্বাদশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলীর বহু পদ লিখে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। তাঁর পরবর্তী সময়ে আরো অনেক চণ্ডীদাস, যেমন আদি চণ্ডীদাস, কবি চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস এবং দীন চণ্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন সন্দেহ নেই। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের তুল্য কেউই হতে পারেননি। এরপর নাম করতে হয় মঙ্গলকাব্যগুলির। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বিজয় গুপ্তের প্রথম মঙ্গলকাব্য “মনসামঙ্গল”, বিপ্রদাস পিপলাইয়ের “মনসাবিজয়” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের মহিমার কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের আবেগ, মায়া, মমতা, ভাব, ভালবাসা, অহংকার, ঈর্ষা, দ্বেষ নিয়ে অনবদ্য মানসিক টানাপোড়েনের ছবি পাওয়া যায়। একই কথা বলা যায় মানিক দত্ত, মাধবাচার্য, দ্বিজমাধব কিংবা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্য নিয়েও।

    অনুবাদ সাহিত্যে প্রথমেই নাম করতে হয় কৃত্তিবাস ওঝার বাংলা রামায়ণের অনুবাদ এবং কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারত। এই সেদিনও আমাদের ছোটবেলায়, পঞ্চদশ শতাব্দীর রচনা কৃত্তিবাসী রামায়ণের দেখা মিলত বাঙালীর ঘরে ঘরে। পাঁচশো বছর ধরে এমন জনপ্রিয়তা যথেষ্ট ঈর্ষার বিষয় সন্দেহ নেই! কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অনেক ঘটনাই কৃত্তিবাসী কল্পনা, অনেক আচার-আচরণই মমতাময় বাঙালী পারিবারিক সম্পর্কমাখা। সেই কারণেই হয়তো মূল রামায়ণের থেকেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার ঘরে ঘরে এত জনপ্রিয় হয়েছিল। সুলতানী আমলে আরবী এবং পারসিয়ান সাহিত্যের অনুবাদ বাংলা ভাষাকে আরও ঋদ্ধ করে তুলেছিল। মধ্যযুগে শা মুহম্মদ সাগির, জৈনুদ্দিন, মুজাম্মিন, সৈয়দ সুলতান, শেখ ফইজুল্লা প্রমুখ ছিলেন বাংলার বিখ্যাত মুসলিম কবি।  মুহম্মদ সাগিরের “ইউসুফ-জুলেখা”, সৈয়দ সুলতানের “নবিবংশ” অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

    অষ্টাদশ শতকের প্রধান কবি ছিলেন ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর (১৭১২-১৭৬০)। তাঁর লেখা “অন্নদামঙ্গল” কাব্য বহুদিন অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। কৃষ্ণনগরের রাজা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্রের লেখা অন্নদামঙ্গলের প্রকাশকাল ১৭৫২ সাল। এই গ্রন্থের তিনটি অংশ। প্রথম অংশ- অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণার মহিমা বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশে বিদ্যা ও সুন্দরের কাহিনী, এই অংশের নাম কালিকামঙ্গল। তৃতীয় অংশে মোগল সম্রাট আকবরের বিশ্বস্ত সেনাপতি মান সিং এবং ভবানন্দ মজুমদারের কাহিনী – এই অংশের নাম অন্নপূর্ণামঙ্গল। ভারতচন্দ্র শুধু যে কাব্যচর্চাতেই প্রতিভাধর ছিলেন তা নয়, সঙ্গীতেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। শ্রীরাধা-কৃষ্ণ বিষয়ে লেখা এবং নিজের সুরে গাওয়া পদাবলী গান, যাকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বলা হত, বাংলার সঙ্গীতজগতে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেছিল। যে ধারা অনুসরণ করে রামপ্রসাদ সেন (১৭২১-১৭৮১)-এর শাক্তপদাবলী এবং শ্যামাসঙ্গীত, তিনশবছর ধরে, আজও সমান সজীব!

    ১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধে, ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার বীভৎস পরাজয়ের পর, বাংলা এবং ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাদীক্ষার প্রেক্ষাপটই দ্রুত বদলে যেতে লাগল। ব্রিটিশ রাজত্বের রাজধানী হয়ে নতুন শহরের পত্তন হল কলকাতায়। ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রাচীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি থেকে কলকাতায় সরে এল। বদ্ধ জলাশয়ের মতো মধ্যযুগের পিছিয়ে থাকা ভারতীয় সমাজে এসে ধাক্কা দিল, ইওরোপের- বিশেষ করে ইংল্যাণ্ডের আধুনিক শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া এবং রেনেশাঁ যুগের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা। কলকাতা রাজধানী হওয়াতে দেশের অন্য প্রান্তের থেকে বাংলার বুদ্ধিজীবিরা পশ্চিমের এই চমক লাগানো আধুনিকতায় ডুবে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল খুব সহজেই। একই সঙ্গে সদ্য কৈশোর পার হওয়া বাংলা ভাষা এবং বাংলা লিপি ইওরোপের আলোর স্পর্শে হঠাৎ যেন যুবক হয়ে উঠল। বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপি পা রাখল আধুনিক বিশ্ব-দরবারের অঙ্গনে। সে কথায় আসব পরবর্তী ও শেষ পর্বে। 


এর পরে শেষ পর্ব - " লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব "

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

গঙ্গাপ্রাপ্তি

  বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদাম...