শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩

  

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "





[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২


 

 গতকাল সারা দিন ও রাত একটানা হেঁটেছে ভল্লা। একে তো তার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। যন্ত্রণা এবং ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে তার শরীর। তবু সে হেঁটেছে অবিরাম। আজ রাত্রির আট প্রহরে সে এসে পৌঁছল বিশাল এক সরোবরের পাশে। বীজপুর চটির জনাই তাকে দিক নির্দেশ করে বলেছিল, এই পথ ধরে একদম নাক বরাবর গেলে ডানদিকে একটা সরোবর পাবি। ওই সরোবরটা ছোট্ট একটা পাহাড়ের কোলে। ওখান থেকে নিচের দিকে তাকালে দেখতে পাবি – যতদূর চোখ যায় – ছোটছোট ঝাড়ি আর কাঁটাঝোপের জঙ্গলে ভরা ঢালু জমি। তার মানে তুই নোনাপুর গ্রামের চৌহদ্দিতে পৌঁছে গেলি। ভল্লার মনে হল এটাই সেই সরোবর।

জনাই আরও বলেছিল, ওই সরোবরের পশ্চিম পাড়ে দাঁড়ালেই তোর ডানদিকে দেখতে পাবি একটা পায়েচলা সরুপথ নেমে গেছে সাপের মতো এঁকেবেঁকে। ওই রাস্তা ধরে, খুব বেশি না, আধক্রোশেরও কম, হাঁটলেই পেয়ে যাবি, নোনাপুরের গ্রামপ্রধানের বাসা। নাম জুজাক। এমনিতে লোক খারাপ না, তবে বড্ডো বদরাগী। একবার রেগে গেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তবে ওর বউটা খুব ভালো। মনে খুব মায়া-মমতা।

জনাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল জুজাকের দু-দুটো ছেলে – ছোটবেলাতেই একসঙ্গে মারা গিয়েছিল।

কৌতূহলে ভল্লা জিজ্ঞাসা করেছিল, “সে কি? কী করে?”

“কী আর বলব? সে কথা মনে পড়লেই মন খারাপ হয়ে যায়। এমনিতেই ওই জায়গাটা অফসলী। বৃষ্টি কম। সামান্য কিছু আবাদি জমি আছে, সেখানে সামান্য কিছু ভুট্টা, জোয়ার-টোয়ার হয়। তাতে সম্বৎসরের খোরাক হয় কি না হয়। তোরা তো এদিককার লোক নোস, জানবি না। বছর দশেক আগে, এদিকে পরপর চার বছর খরা হয়ে – জমি-জঙ্গল একেবারে যেন ঝলসে গিয়েছিল। খিদের জ্বালা সবচে বড়ো জ্বালা রে, ভল্লা। সে জ্বালা যে কোনদিন ভোগ করেনি – সে বুঝতে পারবে না। দুই ভাই মিলে, বছর দশ আর আটের দুই ছেলে, কন্দ খুঁজতে ঢুকেছিল পাশের জঙ্গলে। সেখানেই তাদের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে”।

জনাই আবার চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, বলল, “সেই থেকেই জুজাক কেমন যেন বদমেজাজি হয়ে গেল। আর ওর বউটা হল উলটো”। 

সরোবরের পশ্চিম পাড়ে বসে থাকা ভল্লার ঝিমধরা মাথায় এই সব কথাই ভনভন করছিল মাছির মতো। পুব আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। অজস্র পাখিদের কলকাকলিতে ভরে উঠছে বিশ্বচরাচর। ভল্লা ডানদিকে সরু সেই পায়েচলা পথটাও দেখতে পেল, জনাই যেমনটি বলেছিল। ওই পথ ধরেই তাকে পৌঁছতে হবে নোনাপুরে। সে জানে না, সেখানে কী অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে। তবে সে সব কথা সে এখন ভাবছেও না। সে ভাবছে তার সঙ্গের এই বিপুল বোঝাটাকে টেনে টেনে কী করে পৌঁছবে আধক্রোশ দূরের ওই গ্রামে।

নিজের শরীর নিয়ে বড় গর্ব ছিল ভল্লার – চিতার মতো সর্বদাই টগবগে আর চনমনে তাজা। অথচ গতকাল   সেই শরীরটাকেই বইতে চাইছিল না তার পাদুটো। যদি ফেলে আসা যেত কোথাও  – কিছুটা হাল্কা হওয়া যেত। আর এই মাথাটা - দুই হাতে ধরে যেটাকে সে এখন সামলাচ্ছে? অসহ্য যন্ত্রণায় দপদপ করছে সর্বক্ষণ। সেটাই বা কম কি? এখন ইচ্ছে হচ্ছে এই নিরিবিলি সরোবরের পাড়ে, ভোরের নরম মায়াবী আলোমাখা প্রান্তরে নিজের শরীরটাকেও ঘাসে বিছিয়ে দিতে। চুলোয় যাক তার কাজ, চুলোয় যাক তার শরীরের সকল যাতনা। ভল্লা সত্যি সত্যিই দুই হাত-পা মেলে নিজেকে ছড়িয়ে দিল মাটিতে। নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল ভল্লা, তার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে… উদাসীন। তার চোখের ওপরে প্রতি ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল আকাশের রঙ… নতুন দিনের ভোর এগিয়ে চলেছে নবীন সকালের দিকে। তার চোখ বুজে এল।

চিকা তার কর্তব্যে কোন অবহেলা করেনি, সূর্যোদয়ের অনেক আগেই সে ভল্লাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। তার গায়ে হাত রেখে উদ্বিগ্ন স্বরে বলেছিল, “তুই যাবি কী করে ভল্লা? এতটা পথ। জ্বরে যে তোর গা পুড়ে যাচ্ছে। একটা দিন অন্ততঃ থেকে যা। আমি কিছু জড়িবুটির ব্যবস্থা করি – একটা দিন বিশ্রাম নে, কাল বেরোবি”। ভল্লা সে কথায় কান দেয়নি। দ্রুত নিত্যকর্ম সেরে রওনা হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। চিকা বলেছিল, “তাহলে তুই যাবিই”? ভল্লা সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “আমার রণপা”? রণপা আর চিকার দেওয়া পুঁটলিতে বাঁধা কিছু খাবার নিয়ে ভল্লা রওনা হয়েছিল জনাইয়ের চটির দিকে।

জনাইয়ের চটিতে পৌঁছতে ভল্লার বেশ দেরিই হয়েছিল, প্রায় মধ্য রাত্রি। দরজা খুলে জনাই বেশ বিরক্ত হয়েই বলেছিল “কি রে? এত দেরি করলি?” তারপর প্রদীপের আলোয় তার চেহারা দেখে চমকে উঠেছিল জনাই, “শরীরের এই অবস্থায় রণপা নিয়ে তুই এতটা পথ এলি কী করে? চিকার চটিতেই একটা দিন বিশ্রাম করতে পারলি না? একটা দিনে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত শুনি? হতভাগা, পথে-ঘাটে মরে পড়ে থাকলে – কেউ জানতে পারত? শেয়ালে-শকুনে ছিঁড়ে খেত। তখন কে করত তোর কাজ?”

ভল্লা জনাইয়ের কথার উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “একটু শোবার জায়গা করে দিবি? ঘুমোব”। জনাই খাবার এনে দিয়েছিল, ভল্লা খেতে পারেনি। খেতে ভালো লাগছিল না। খড়ের গদির ওপর চাদর বিছিয়ে, বেশ ভালই বিছানা করে দিয়েছিল, জনাই। ভল্লা ভেবেছিল একবার শুতে পারলে ঘুম আর ঠেকায় কে? কিন্তু আশ্চর্য, ঘুম এলই না। যখনই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, একএকটা ছবি ভেসে উঠছিল চোখের সামনে…তন্দ্রা টুটে যাচ্ছিল। ভল্লা পাশ ফিরে শুল। আবারও তন্দ্রা এল, চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্য এক ছবি…। আধো জাগরণ, আধো তন্দ্রায়, এভাবেই এক প্রহর কাল কাটিয়ে সে উঠে বসল। তার পাশের বিছানায় ঘুমোচ্ছে জনাই। জনাইকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাসা করল “নোনাপুর গ্রামটা কোনদিকে রে?”

জনাইয়ের দেওয়া খাবারের পুঁটলি নিয়ে বিদায়ের সময় ভল্লা জিজ্ঞাসা করেছিল, “হ্যারে, রণপা জোড়া দে না, এতটা পথ পায়ে হেঁটে যাওয়ার থেকে – অনেক তাড়াতাড়ি…”।

জনাই কঠিন মুখে বলল, “তোকে তো বারবার বললাম, একটা দিন থেকে যা। শুনলি না। তুই জানিস না? ওপরের নির্দেশ, বাকি পথটা তোকে পায়ে হেঁটেই যেতে হবে! তোর আসল পরিচয় গোপন রাখতে সেটা জরুরি”!     

 

ভল্লা চকিতে উঠে বসল, তার সামনে সরোবরের জলে আকাশের ছায়া, ঈষৎ সবজে। আকাশে সকালের আলো, পূর্ব দিগন্তটা লাল হয়ে উঠেছে। সূর্যোদয় হতে দেরি নেই। জলের কাছে নেমে মুখচোখে জল দিল, মাথাটাও ভিজিয়ে নিল। স্নিগ্ধ শীতল জলের স্পর্শে কিছুটা আরাম পেল। গামছায় মুখ হাত মুছে, সেটা মাথায় বাঁধল শক্ত করে, মাথার দপদপানি কিছুটা কমল। তারপর পাড়ে উঠে হাঁটতে শুরু করল। জনাই বলেছিল, খুব বেশি না, আধক্রোশ মত হবে…শালা, জানোয়ারের বাচ্চা জনাই, সরু সরু দুটো মাত্র পায়ে ভর দিয়ে এই ভারি শরীর আর মাথাটাকে আধক্রোশ টেনে নিয়ে যাওয়াটা, তোর কাছে ছেলেখেলা না? কোন ধারণা আছে তোর, সুস্থ সবল একটা শরীর কখন নিজের কাছেই অবাঞ্ছিত মনে হয়? নামতে নামতে সে একবার পড়ে গেল, ঢালু রাস্তায় গড়িয়ে নেমে এল বেশ কিছুটা।

ভল্লা কোনরকমে উঠে দাঁড়াল, আবার হাঁটতে লাগল। একটা পা মাটি থেকে তুলে সেটাকে সামনে এগিয়ে রাখতে এত যে কষ্ট হয়, ভল্লা এর আগে কোনদিন টের পায়নি। তার সারা শরীর কাঁপছে। তার পিছনের পা কাঁপছে থরথর করে। তবু ভল্লা এগিয়ে চলল। গুয়োর ব্যাটারা, এতদিন খাওয়ালাম, পরালাম, এখন এই আধক্রোশ পথ পার হতে হেদিয়ে মরছিস? তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সামনে পড়ে থাকা মেটে রঙের মাদুরের মতো বিছানো পথ। তার দুপাশে একঘেয়ে সবুজ পর্দার মতো ঝোপঝাড়। কোন কিছুই তার চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ছে না। পাখিদের প্রভাতী ব্যস্ততা, তাদের অজস্র ওড়াউড়ি, সে কিছুই দেখছে না। এমনকি অজস্র পাখিদের ব্যস্ত-কাকলিও তার কানে আসছে না। তার কানে আসছে শুধু তার নিজেরই বুকের শব্দ। ধক ধক – ধক ধক। তার সমস্ত চেতনা জুড়ে এখন ওই একটাই আওয়াজ।

কতক্ষণ ভল্লা জানে না। তার মনে হল, হয়তো মাসাধিক কাল, কিংবা কয়েক বছর ধরে চলছে তার ই পথ চলা। একসময় তার নজরে এল পথের ডানদিকের সবুজ পর্দাটা আর নেই… ছোট্ট পাতায় ছাওয়া বাড়ি, তার সামনে কাঠের খুঁটির বেড়া দেওয়া প্রশস্ত অঙ্গন। ঘটিতে জল নিয়ে এক রমণী দাঁড়িয়ে আছে পথের ধারে, অবাক চোখ মেলে তাকেই দেখছে। ভল্লার দুই পা এবার জলস্রোতে নদীর পাড়ভাঙার মতো ধ্বসে পড়ল। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে ভল্লা অস্ফুট স্বরে ডাকল, “মা…”। তার চেতনা থেকে সকালের স্নিগ্ধ আলোটুকু নিভে গেল। সে ডুব দিল নিশ্চিন্ত অন্ধকারে।

 

 

শুকনো পাতা দিয়ে বানানো গদিতে ভল্লা শুয়ে আছে। আজ পাঁচদিন হল সে একইভাবে শুয়ে আছে, নিশ্চেতন।   তার মাথার কাছে বসে আছেন জুজাকের বউ। জুজাক দাঁড়িয়ে আছে্ন পায়ের দিকে। আর নীচু হয়ে বৃদ্ধ কবিরাজ হাতের নাড়ি পরখ করছেন ভল্লার। কিছুক্ষণ পর কবিরাজ ভল্লার হাতটা নামিয়ে দিলেন বিছানায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “জুজাক, আমার মন বলছে, ছোকরা এ যাত্রায় বেঁচে গেল। হতভাগার বাপ-মায়ের কপাল ভালো বলতে হবে।”

জুজাকের বউ, জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “ওফ্‌ যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন”।

জুজাক বিরক্ত হয়ে বললেন, “ছোকরা যদি বাঁচে - সে কবিরাজদাদার ওষুধে আর তোমার সেবায়। এর মধ্যে ভগবান এল কোত্থেকে? যত্তো সব। আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি, কবিরাজদাদা। ছোকরা চোর না ডাকাত? নাকি পালিয়ে বেড়ানো অপরাধী? কিছুই জানি না আমরা। ছোকরা একটু সুস্থ হলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দেব গ্রাম থেকে”।

কবিরাজ বললেন, “দেখ জুজাক, আমাদের কর্তব্য অসুস্থকে সারিয়ে তোলা। সে ডাকাত হোক কিংবা সাধু মহারাজ, তাতে কিছু যায় আসে না। আমার ধারণা আর এক-দুদিনের মধ্যে ও উঠে-হেঁটে বেড়াতে পারবে। তারপরে তুমিও গ্রাম-প্রধানের কর্তব্য শুরু করতে পারো। আমার কোন বক্তব্য থাকবে না”।

জুজাকের বউ উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “কিন্তু কবিরাজদাদা, ওর তো এখনও জ্ঞানই ফিরল না। একবারের জন্যেও চোখ মেলে তাকাতে পারল না। আপনি বলছেন, দু-একদিনের মধ্যে…”।

কবিরাজ বললেন, “শাস্ত্রে বলে, আমাদের জীবনকে চালনা করে প্রাণশক্তি। ওর ভেতরে সেই প্রাণশক্তির সাড়া আমি পেয়েছি, মা কমলি। চিন্তা করো না আজ বিকেলে অথবা কাল সকালে ওর জ্ঞান ফিরবে, চোখ মেলে তাকাবে। ওর জ্ঞান ফিরলেই আমাকে সংবাদ দিও মা, আমি আসব। এখন আসি”।

জুজাক কবিরাজমশাইকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে অঙ্গন পার হয়ে পথ পর্যন্ত সঙ্গ দিলেন, তারপর বিদায় জানিয়ে, ঘরে ফিরে এসে বললেন, “যত্তো উটকো ঝামেলা, ঘাড়ে এসে আচ্ছা জুটল। কোথাকার কে, ঠিক, ঠিকানা নেই…”।

কমলি বললেন, “ভোরবেলা সদরে জলছড়া দিতে গিয়ে দেখলাম, বেচারা আমাদের দুয়োরের সামনেই পা দুমড়ে, মুখ থুবড়ে একবার যে পড়ল আর উঠল না। একজন মানুষের এমন অসহায় অবস্থায় ওকে রাস্তাতেই ফেলে আসব?”

জুজাক একটু বিরক্ত স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে কী আর আমি জানি না? আশেপাশের লোককে ডেকে এনে, ব্যাটাকে ঘরে এনে তুললাম তো। তুমিও তো দিন নেই, রাত নেই। নাওয়া নেই খাওয়া নেই সেবা করে চলেছ। বলি, আর কদ্দিন? কবিরাজদাদা বললেন, আজই ওর জ্ঞান ফিরবে, আমি কাল পরশু গ্রামের দশজনকে নিয়ে সভা ডাকব…তার পর দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব। হতভাগা যেখানে খুশি চলে যাক, আমাদের কোন মাথাব্যথা থাকবে না”।

কমলি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “অসুস্থ একটা মানুষকে নিয়ে তোমার খালি এক কথা – ঘাড় ধাক্কা দেব, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব…”

জুজাক কিছু বললেন না, “ঘোঁত” করে নাক দিয়ে শব্দ করলেন।

 

কবিরাজমশাইয়ের কথাই ঠিক হল, সেদিন বিকেলেই ভল্লার জ্ঞান ফিরল, চোখ মেলে তাকাল। সে কতদিন অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে, সে জানে না। কিন্তু অবরে সবরে অর্ধচৈতন্য অবস্থাতেও যখনই সে ঘোলাটে চোখ মেলেছে- দেখেছে মায়াবী এক রমণীর মুখ। তার মুখের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে রয়েছেন…। আজ জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে তাকিয়ে সেই রমণীর মুখই সে দেখতে পেল। গভীর কৃতজ্ঞতায় সে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করতে পারল শুধু একটিই শব্দ, “মা…। কমলির মুখে হাসি, দু চোখে অশ্রুর প্লাবন। দু হাতে ভল্লর মুখটি ধরে বললেন, “কি বলছিস, বাবা?” তারপর চেঁচিয়ে স্বামীকে ডাকলেন, বললেন, “শুনছো, ছেলেটা কথা কয়েছে, আমাকে মা ডেকেছে…” ।

জুজাক উঠোনে খাটিয়ায় বসে চারজন প্রবীণ প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্পগাছা করছিলেন। বউয়ের ডাক শুনে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দেখলেন কমলির মুখের হাসি, আর চোখে জল। রাগত স্বরে বললেন, “হুঁঃ তবে আর কি? উলু দাও, শাঁখ বাজাও… আমি ততক্ষণ কবিরাজদাদাকে সংবাদ পাঠাই”।

সন্ধের একটু পরে কবিরাজমশাই এসে ভল্লাকে দেখে সন্তুষ্ট হলেন, তাঁর মুখে মৃদু হাসি। তিনি পুরোন ওষুধ পালটে কিছু নতুন বটিকা দিলেন। বললেন, “বৌমা, এবার কিন্তু আর শুধু সেবা নয়, উপযুক্ত পথ্যিও দরকার মনে রেখো”। কমলিকে তিনি নতুন বটিকা আর পথ্যের নির্দেশ বুঝিয়ে জুজাককে বললেন, “চলো জুজাক, আমরা বাইরে বসি”।

কবিরাজ মশাই বাড়ির বাইরে আসতেই প্রতিবেশীদের সবাই উঠে দাঁড়াল, জিজ্ঞাসা করল, “কেমন দেখলেন, কবিরাজমশাই?”

কবিরাজমশাই আসনে বসতে বসতে বললেন, “তোমরা সবাই অমন উঠে পড়লে কেন হে? বসো, বসো। ছোকরার বিপদ কেটে গেছে, আর কোন ভয় নেই। আমার ধারণা, কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে”।

সকলেই বসতে বসতে বলল, “যাক বাবা, যে অবস্থায় এসেছিল, অচেনা আগন্তুক – তবু মানুষতো...”।

জুজাক ঝেঁঝে উঠে বললেন, “আমার ঘাড় থেকে হতভাগা নামলে বাঁচি। ওঠা-হাঁটা শুরু করলেই স্পষ্ট বলে দেব, পথ দেখ বাছা...”।

কবিরাজমশাই হাসলেন, বললেন, “মাতৃবৎ সেবা করে বৌমা যেভাবে ওকে বাঁচিয়ে তুলল, তাতে ব্যাপারটা অত সহজ হবে না, জুজাক”।

জুজাক বললেন, “ছেলেটার সম্বন্ধে আমরা কোন কিছুই জানি না। কোথায় কোন অপাট কাজ করে এখানে গা ঢাকা দিয়ে থেকে গেল – তারপরে রাজাধিকারিকদের কানে গেলে, আমাকে ভিটেমাটি ছাড়া করবে যে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই বললেন, “তা বটে। কিন্তু আমরা ধরেই বা নিচ্ছি কেন, ছেলেটা কোথাও কুকীর্তি করে এখানে জুটেছে। ওর পরিচয় কি? কোথা থেকে এল? কী করে এমন অবস্থা হল? সেসব কথা বলার একটা সুযোগ কী আমাদের দেওয়া কর্তব্য নয়? কী বলো হে, তোমরা?”

উপস্থিত প্রতিবেশীরা বললেন, “ঠিকই বলেছেন কবিরাজমশাই, তবে জুজাকভাইয়ের ওপরে চাপটা তো বেড়েই যাচ্ছে”।

জুজাক বললেন, “সে কথাটা তোমরা একবার ভাল করে বোঝাও দেখি, আমার বউকে আর কবিরাজদাদাকে...। আমরা তো আর উত্তর কিংবা পূবের লোকদের মতো সম্পন্ন নই, যে অতিথিকে নারায়ণ জ্ঞানে সেবা করে প্রচুর পুণ্য কামাব। নিজেরাই ঠিক মতো খেতে পাই না...তার মধ্যে এই উটকো আপদ...”।

কবিরাজমশাই চিন্তিত মুখে বললেন, “তোমার উদ্বেগের কারণ আমি বুঝছি, জুজাক। তবে আমি ছেলেটির স্বাস্থ্য, হাত-পায়ের লক্ষণ দেখে যেটুকু বুঝেছি – বসে বসে অন্ন ধ্বংস করার ছেলে এ নয়। যথেষ্ট দক্ষ এবং খাটিয়ে ছেলে। যে অবস্থায় ওকে প্রথম দেখেছি, সাধারণ, মানে আমাদের ঘরের ছেলেপুলে হলে, অনেক আগেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হত”।

জুজাক সন্দেহের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওকে তোমার অসাধারণ বলে মনে হচ্ছে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই মৃদু হাসলেন, বললেন, “অসাধারণ তো বটেই এবং যথেষ্ট শক্তিমান যুবক। ওর বুকে পেটে, হাতে পায়ে, বেশ কিছু পুরোনো ক্ষতের দাগ রয়েছে। কিন্তু পিঠে তেমন কিছু নেই। এ সবই একজন বীর যোদ্ধার লক্ষণ জুজাক”।

কবিরাজমশাইয়ের কথায় কেউই কোন কথা বলল না। কিছুক্ষণ পরে কবিরাজমশাই আবার বললেন, “যদি বিশেষ কোন উদ্দেশে এখানে না এসে থাকে, একটু সুস্থ হলে ও নিজেই চলে যাবে। তবে ছেলেটি এসেছে অনেক দূর থেকে – সেক্ষেত্রে হয়তো এখানে আসাটাই ছিল ওর উদ্দেশ্য”।

জুজাক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার তাই মনে হচ্ছে? কিন্তু রাজ্যের এই প্রান্তসীমায় একা একজন বীর যোদ্ধা আসার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই হাসলেন, বললেন, “তা তো বলতে পারব না। আমি কবিরাজ, গণৎকার নই। কয়েকটাদিন ধৈর্য ধরে দেখা যাক না, ছেলেটি কী বলে। তারপর না হয়, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত স্থির করব। আজ উঠিআমি পরশু আবার এসে একবার দেখে যাব”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪ "


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

স্তন্য-ডাইনী

 বড়োদের  বড়োগল্প - "   এক দুগুণে শূণ্য  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  অচিনপুরের বালাই  " বড়োদের ছোট উপন্যাস - "  সৌদামি...