বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১০ম পর্ব

 







এর আগের নবম অধ্যায়ঃ রাজযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ৯ম পর্ব"

 

দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগ

 

শ্রীভগবানুবাচ

ভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।

যৎ তেঽহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া।।

শ্রীভগবান উবাচ

ভূয়ঃ এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।

যৎ তে অহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া।।

শ্রীভগবান বললেন- হে মহাবীর, আমার পরম তত্ত্বকথা আমি আরও একবার বলছি, শোনো। তোমার মঙ্গলকামনায় যে কথা আমি এখন বলব, তাতে তুমি খুশীই হবে।

 

ন মে বিদুঃ সুরগণাং প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ।

অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাঞ্চ সর্বশঃ।।

ন মে বিদুঃ সুরগণাং প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ।

অহম্‌ আদিঃ হি দেবানাং মহর্ষীণাঞ্চ সর্বশঃ।।

দেবতারা কিংবা মহর্ষিরা কেউই আমার আবির্ভাবের তত্ত্বটি জানেন না। কারণ আমিই সমস্ত দেব ও মহর্ষিদের উৎপত্তির আদি কারণ।

 

যো মামজমনাদিঞ্চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌।

অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।

যো মাম্‌ অজম্‌-অনাদিম্‌ চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌।

অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।

আমার জন্ম নেই, আমি অনাদি এবং সর্বলোকের আমিই ঈশ্বর, এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনি এই পৃথিবীর সমস্ত মোহ ত্যাগ

করে, সমস্ত পাপ থেকেই মুক্ত হন

 

৪-৫

বুদ্ধির্জ্ঞানমসংমোহঃ ক্ষমা সত্য দমঃ শমঃ।

সুখং দুঃখং ভবোঽভাবো ভয়ং চাভয়মেব চ।।

অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোঽযশ।

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথিগ্বিধাঃ।।

বুদ্ধিঃ-জ্ঞানম্‌ অসংমোহঃ ক্ষমা সত্য দমঃ শমঃ।

সুখং দুঃখং ভবঃ অভাবঃ ভয়ং চ অভয়ম্‌ এব চ।।

অহিংসা সমতা তুষ্টিঃ তপঃ দানং যশঃ ঽযশ।

ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্তঃ এব পৃথিগ্বিধাঃ।।

বুদ্ধি, জ্ঞান, অনাসক্তি, ক্ষমা, সত্য, সমস্ত ইন্দ্রিয়ের দমন এবং সংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম ও মৃত্যু, ভয় এবং অভয়, অহিংসা, সমদর্শিতা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, খ্যাতি ও অখ্যাতি – জীবের এই সমস্ত ভাব আমিই সঞ্চার করে থাকি।

  

মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা।

মদ্ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।

মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারঃ মনবঃ তথা।

মৎ-ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।

পুরাকালে সাত মহর্ষি, চার মুনিকুমার এবং চোদ্দজন মনু আমারই আত্মার প্রভাবে, আমার মন থেকে জন্মেছিলেন এবং তাঁরাই এই জগতের সকল প্রজা সৃষ্টি করেছিলেন।

[ভৃগু, মরীচি, অত্রি, পুলহ, অঙ্গিরা, ক্রতু ও পুলস্ত – সাত মহর্ষি; সনক, সনন্দন, সনৎকুমার ও সনাতন – চার কুমার; স্বায়ম্ভূব, স্বারোচিষ, উত্তম, তামস, রৈবত, চাক্ষুষ, বৈবস্বত, সাবর্ণি, দক্ষসাবর্ণি, ব্রহ্মসাবর্ণি, ধর্মসাবর্ণি, রুদ্রসাবর্ণি, দেবসাবর্ণি ও ইন্দ্রসাবর্ণি – চোদ্দজন মনু।]

 

 

এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

সোঽবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।।

এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।

সঃ অবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে ন অত্র সংশয়ঃ।।

যিনি আমার এই বিভূতি ও যোগের তত্ত্বটি সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তিনি অবিচলিত একনিষ্ঠ সাধনায় আমার সঙ্গেই যে যুক্ত হন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

 

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।

ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।।

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।

ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।।

এই সমস্ত জগৎ আমারই সৃষ্টি, আমার থেকেই সমস্ত জগৎ প্রবর্তিত হয়, এই তত্ত্ব জেনে জ্ঞানীজন একান্ত ভক্তিভাবে আমার ভজনা করেন।

 

মচ্চিত্তা মদ্‌গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্‌।

কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ।।

মৎ-চিত্তা মৎ-গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরস্পরম্‌।

কথয়ন্তঃ চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ।।

আমাতে মন এবং প্রাণ সম্পূর্ণ সমর্পণ ক’রে, জ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে সবসময় আমাকে নিয়ে আলোচনা ক’রে, সন্তোষ লাভ করেন ও আনন্দ পান।

 

১০

তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্‌।

দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে।।

তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্‌।

দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মাম্‌ উপযান্তি তে।।

যাঁরা সর্বদা আত্মস্থ অবস্থায়, একান্ত ভক্তিতে আমার ভজনা করেন, সেই জ্ঞানী ব্যক্তিদের আমিই আমার এই তত্ত্বের সম্যক জ্ঞান দান করি, আর সেই জ্ঞানের উপলব্ধিতেই তাঁরা আমাকে নিজেদের আত্মায় লাভ করেন।

 

১১

তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ।

নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।

তেষাম্‌ এব অনুকম্পার্থম্‌ অহম্‌ অজ্ঞানজং তমঃ।

নাশয়ামি আত্মভাবস্থঃ জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।

তাঁদের প্রতি করুণাবশেই, আমি তাঁদের আত্মায় বাস ক’রে তাঁদের অন্তরে জ্ঞানের দীপ জ্বালাই, সেই দীপ্তিতে তাঁদের অন্তর থেকে অজ্ঞানের সকল অন্ধকার আমিই দূর করে দিই।

  

১২-১৩

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভূম্‌।।

আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদস্তথা।

অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যম্‌ আদিদেবম্‌ অজং বিভূম্‌।।

আহুঃ ত্বাম্‌ ঋষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদঃ তথা।

অসিতঃ দেবলঃ ব্যাসঃ স্বয়ং চ এব ব্রবীষি মে।।

অর্জুন বললেন – তুমিই পরম ব্রহ্ম, তুমিই পরম আশ্রয় এবং তুমি পরম পবিত্র। তুমিই সেই শাশ্বত দিব্য পুরুষ, যাঁর আদি নেই, যাঁর জন্ম নেই এবং যিনি এই জগতের সর্বত্র ব্যাপ্ত। এমন কথা আমি সমস্ত ঋষি, দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল ও ব্যাসদেবের কাছেও শুনেছি। এখন তুমি নিজেও সেকথাই বর্ণনা করলে।

   

১৪

সর্বমেতদৃতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্‌ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ।।

সর্বম্‌ এতৎ ঋতং মন্যে যৎ মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্‌ ব্যক্তিং বিদুঃ দেবা ন দানবাঃ।।

হে কেশব, আমি বিশ্বাস করি তুমি যা বললে, তা সবই সত্যি, যেহেতু, হে ঈশ্বর, তোমার এই মানবরূপ না দেবতারা জানেন, না দানবরা উপলব্ধি করতে পারে।

 

১৫

স্বয়মেবাত্মনাত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম।

ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।

স্বয়ম্‌ এব আত্মনা আত্মানং বেত্থ ত্বং পুরুষ-উত্তম।

ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।

হে পুরুষোত্তম, তুমিই সকল ভূতের স্রষ্টা, সকল ভূতের নিয়ন্তা এবং তুমিই সমস্ত দেবতাদের দেবতা, এই জগতের প্রভু। তুমি ছাড়া অন্য আর কেউ তোমার আত্মার এই পরম স্বরূপ জানতে পারে না।

 

১৬

বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ।

যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।

বক্তুম্‌ অর্হসি অশেষেণ দিব্যাঃ হি আত্মবিভূতয়ঃ।

যাভিঃ বিভূতিভিঃ লোকান্‌ ইমাং ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।

যে যে বিভূতি দিয়ে এই জগতের সর্বত্র তুমি ব্যাপ্ত রয়েছ, নিজের সেই সব পরমবিভূতির দিব্যস্বরূপ ব্যাখ্যা করা, একমাত্র তোমার পক্ষেই সম্ভব।

 

১৭

কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্‌।

কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যোঽসি ভগবন্‌ ময়া।।

কথং বিদ্যাম্‌ অহং যোগিং ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্‌।

কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যঃ অসি ভগবন্‌ ময়া।।

হে যোগেশ্বর, সর্বদা তোমার চিন্তা করতে করতে কিভাবে তোমাকে জানব? আর হে ভগবান, কী কী ভাবেই বা আমার চিন্তায় শুধু তুমিই থাকবে?

 

১৮

বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন।

ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মেঽমৃতম্‌।।

বিস্তরেণ আত্মনঃ যোগং বিভূতিং চ জনার্দন।

ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তিঃ হি শৃণ্বতঃ ন অস্তি মে অমৃতম্‌।।

হে জনার্দন, তোমার আত্মযোগের ঐশ্বর্য্য এবং তোমার বিভূতির কথা সবিস্তারে আরও একবার বলো। কারণ তোমার এই অমৃতবাণী বার বার শুনেও আমার তৃপ্তি হচ্ছে না।

 

১৯

শ্রীভগবানুবাচ

হন্ত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ।

প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ নাস্ত্যন্তো বিস্তরস্য মে।।

শ্রীভগবান উবাচ

হন্ত তে কথয়িষ্যামি দিব্যা হি আত্মবিভূতয়ঃ।

প্রাধান্যতঃ কুরুশ্রেষ্ঠ ন অস্তি অন্তঃ বিস্তরস্য মে।।

শ্রীভগবান বললেন – হে কুরুশ্রেষ্ঠ, আমার অলৌকিক বিভূতির মধ্যে যেগুলি প্রধান, তার কথাই আমি এখন তোমাকে বলব, কারণ আমার এই বিভূতি বিশ্বব্যাপী, তার কোন অন্ত নেই।

 

২০

অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।

অহমাদিশ্চ মধ্যঞ্চ ভূতানামন্ত এব চ।।

অহম্‌ আত্মা গুড়াকেশ সর্বভূত-আশয়স্থিতঃ।

অহম্‌ আদিঃ চ মধ্যম্‌ চ ভূতানাম্‌ অন্তঃ এব চ।।

হে জিতনিদ্র অর্জুন, সমস্ত জীবের অন্তরে আমিই আত্মা বা চৈতন্যরূপে বাস করি এবং আমিই সমস্ত জীবের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের একমাত্র কারণ।

 

২১

আদিত্যানামহং বিষ্ণুর্জ্যোতিষাং রবিরংশুমান্‌।

মরীচির্মরুতামস্মি নক্ষত্রাণামহং শশী।।

আদিত্যানাম্‌ অহং বিষ্ণুঃ জ্যোতিষাং রবিঃ অংশুমান্‌।

মরীচিঃ মরুতাম্‌ অস্মি নক্ষত্রাণাম্‌ অহং শশী।।

দ্বাদশ আদিত্যদের মধ্যে আমিই বিষ্ণু, জ্যোতির্মণ্ডলের মধ্যে আমিই অংশুমান সূর্য, সপ্তবায়ুর মধ্যে আমিই মরীচি, সহস্র নক্ষত্রদের মধ্যে আমিই চন্দ্র।

[ধাতা, মিত্র, অর্যমা, রুদ্র, বরুণ, সূর্য, ভগ, বিবস্বান, পুষা, সবিতা, ত্বষ্টা ও বিষ্ণু – এঁরা দ্বাদশ আদিত্য। আর আবহ, প্রবহ, বিবহ, পরাবহ, উদ্বহ, সংবহ ও পরিবহ – এই সাতটি মরুৎ বা বায়ু।]

  

২২

বেদানাং সামবেদোঽস্মি দেবানামস্মি বাসবঃ।

ইন্দ্রিয়াণাং মনশ্চাস্মি ভূতানামস্মি চেতনা।।

বেদানাং সামবেদঃ অস্মি দেবানাম্‌ অস্মি বাসবঃ।

ইন্দ্রিয়াণাং মনঃ চ অস্মি ভূতানাম্‌ অস্মি চেতনা।।

চার বেদের মধ্যে আমিই সামবেদ, দেবতাদের মধ্যে আমিই বাসব, সকল ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমিই মন, এবং সমস্ত জীবের অন্তরে আমিই চেতনা।

 

২৩

রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্‌।

বসূনাং পাবকাশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম্‌।।

রুদ্রাণাং শঙ্করঃ চ অস্মি বিত্তেশঃ যক্ষরক্ষসাম্‌।

বসূনাং পাবকাঃ চ অস্মি মেরুঃ শিখরিণাম্‌ অহম্‌।।

একাদশ রুদ্রের মধ্যে আমিই শঙ্কর, যক্ষ ও রাক্ষসের মধ্যে আমিই ধনপতি কুবের, অষ্ট বসুর মধ্যে আমিই অগ্নি, সুউচ্চ পর্বতের মধ্যে আমিই মেরুপর্বত।

[একাদশ রুদ্র- অজ, একপাদ, অহিব্রধ্ন, পিনাকী, অপরাজিত, ত্র্যম্বক, মহেশ্বর শংকর, বৃষাকপি, শম্ভু, হরণ ও ঈশ্বর। অষ্ট বসু – আপ, ধ্রুব, সোম, ধর, অনিল, অগ্নি, প্রত্যূষ ও প্রভাস।]

 

২৪

পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহষ্পতিম্‌।

সেনানীনামহং স্কন্দঃ সরসামস্মি সাগরঃ।।

পুরোধসাং চ মুখ্যং মাং বিদ্ধি পার্থ বৃহষ্পতিম্‌।

সেনানীনাম্‌ অহং স্কন্দঃ সরসাম্‌ অস্মি সাগরঃ।।

হে অর্জুন, জেনে রাখো, সমস্ত পুরোহিতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আমিই বৃহষ্পতি। সমস্ত সেনাপতিগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আমিই স্কন্দ, সমস্ত জলাশয়ের মধ্যে আমিই সাগর।

 

২৫

মহর্ষীণাং ভৃগুরহং গিরামস্ম্যেকমক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞোঽস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ।।

মহর্ষীণাং ভৃগুঃ অহং গিরাম্‌ অস্মি একম্‌ অক্ষরম্‌।

যজ্ঞানাং জপযজ্ঞঃ অস্মি স্থাবরণাং হিমালয়ঃ।।

মহর্ষিদের মধ্যে আমিই ভৃগু, সমস্ত বাক্যের মধ্যে আমিই একাক্ষর প্রণব, সমস্ত যজ্ঞের মধ্যে আমিই জপযজ্ঞ, সমস্ত স্থাবরের মধ্যে আমিই হিমালয়।

 

২৬

অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাঞ্চ নারদঃ।

গন্ধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলো মুনিঃ।।

অশ্বত্থঃ সর্ববৃক্ষাণাং দেবর্ষীণাং চ নারদঃ।

গন্ধর্বাণাং চিত্ররথঃ সিদ্ধানাং কপিলঃ মুনিঃ।।

সমস্ত বৃক্ষের মধ্যে আমিই অশ্বত্থ, দেবর্ষিদের মধ্যে আমিই নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমিই চিত্ররথ, সিদ্ধযোগীগণের মধ্যে আমিই কপিল মুনি।

 

২৭

উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্‌।

ঐরাবতং গজেন্দ্রাণাং নরাণাঞ্চ নরাধিপম্‌।।

উচ্চৈঃশ্রবসম্‌ অশ্বানাং বিদ্ধি মাম্‌ অমৃত-উদ্ভবম্‌।

ঐরাবতং গজ-ইন্দ্রাণাং নরাণাং চ নর-অধিপম্‌।।

জেনে রাখো, অমৃত লাভের জন্যে সমুদ্র মন্থনের সময় যে শ্রেষ্ঠ অশ্বটির উৎপত্তি হয়েছিল, আমিই সেই উচ্চৈঃশ্রবা, শ্রেষ্ঠ হাতিদের মধ্যে আমিই ঐরাবত আর সমস্ত মানুষের মধ্যে আমি নৃপতি।

 

২৮

আয়ুধানামহং বজ্রং ধেনূনামস্মি কামধূক।

প্রজনশ্চাস্মি কন্দর্পঃ সর্পাণামস্মি বাসুকিঃ।।

আয়ুধানাম্‌ অহং বজ্রং ধেনূনাম্‌ অস্মি কামধূক।

প্রজনঃ চ অস্মি কন্দর্পঃ সর্পাণাম্‌ অস্মি বাসুকিঃ।।

সমস্ত অস্ত্রের মধ্যে আমিই বজ্র, সমস্ত গাভীর মধ্যে আমিই কামধেনু, জীব প্রজননে আমিই কামদেব কন্দর্প, সমস্ত সর্পগণের মধ্যে আমিই বাসুকি।

 

২৯

অনন্তশ্চাস্মি নাগানাং বরুণো যাদসামহম্‌।

পিতৄণামর্যমা চাস্মি যমঃ সংযমতামহম্‌।।

অনন্তঃ চ অস্মি নাগানাং বরুণো যাদসাম্‌ অহম্‌।

পিতৄণাম্‌ অর্যমা চ অস্মি যমঃ সংযমতাম্‌ অহম্‌।।

নাগেদের মধ্যে আমিই অনন্তনাগ, সমস্ত জলচরদের দেবতা আমিই বরুণ, পিতৃলোকে আমিই অর্যমা আর এই জগতের নিয়ন্ত্রণকর্তা আমিই যম।

 

৩০

প্রহ্লাদশ্চাস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তামহম্‌।

মৃগাণাঞ্চ মৃগেন্দ্রোঽহং বৈনতেয়শ্চ পক্ষিণাম্‌।।

প্রহ্লাদঃ চ অস্মি দৈত্যানাং কালঃ কলয়তাম্‌ অহম্‌।

মৃগাণাং চ মৃগেন্দ্রঃ অহং বৈনতেয়ঃ চ পক্ষিণাম্‌।।

দৈত্যদের মধ্যে আমিই প্রহ্লাদ, অনন্ত সময় প্রবাহের নিয়ন্তা আমিই কাল, পশুদের মধ্যে আমিই সিংহ, পক্ষিদের মধ্যে আমিই বিনতাপুত্র গরুড়।

 

৩১

পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্‌।

ঋষাণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী।।

পবনঃ পবতাম্‌ অস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতাম্‌ অহম্‌।

ঋষাণাং মকরঃ চ অস্মি স্রোতসাম্‌ অস্মি জাহ্নবী।।

গতির মধ্যে আমিই বাতাসরূপী পবন, অজেয় বীরদের মধ্যে আমিই শ্রীরাম, মাছেদের মধ্যে আমিই মকর, আর সমস্ত নদীর মধ্যে আমিই গঙ্গা।

 

৩২

সর্গাণামাদিরন্তশ্চ মধ্যঞ্চৈবাহমর্জুন।

অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতামহম্‌।।

সর্গাণাম্‌ আদিঃ অন্তঃ চ মধ্যং চ এব অহম্‌ অর্জুন।

অধ্যাত্মবিদ্যা বিদ্যানাং বাদঃ প্রবদতাম্‌ অহম্‌।।

হে অর্জুন, আমিই সকল পদার্থের আদি, মধ্য এবং অন্ত। সমস্ত বিদ্যার মধ্যে আমিই পরমজ্ঞান, আমিই তার্কিক পণ্ডিতগণের বিতর্কিত মতবাদ।

 

৩৩

অক্ষরাণামকারোঽস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ।

অহমেবাক্ষয়ঃ কালো ধাতাহং বিশ্বতোমুখঃ।।

অক্ষরাণাম্‌ অকারঃ অস্মি দ্বন্দ্বঃ সামাসিকস্য চ।

অহম্‌ এব অক্ষয়ঃ কালঃ ধাতা অহং বিশ্বতোমুখঃ।।

সমস্ত অক্ষরের মধ্যে আমিই অ-কার। সমস্ত সমাসের মধ্যে আমিই দ্বন্দ্ব। আমিই অনন্তকাল এবং সর্ব ফল প্রদানকারী বিশ্ববিধাতা।

 

৩৪

মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্‌।

কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্‌ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।

মৃত্যুঃ সর্বহরঃ চ অহম্‌ উদ্ভবঃ চ ভবিষ্যতাম্‌।

কীর্তিঃ শ্রীঃ বাক্‌ চ নারীণাং স্মৃতিঃ মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।

আমিই সর্বানাশা মৃত্যু আবার আমিই মঙ্গলময় ভবিষ্যতের স্রষ্টা। কীর্তি, শ্রী, বাক্য, স্মৃতি, মেধা, ধৈর্য ও ক্ষমা রূপে আমিই সকল নারীর গুণাবলী।

 

৩৫

বৃহৎসাম্‌ তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসামহম্‌।

মাসানাং মার্গশীর্ষোঽহমৃতুনাং কুসুমাকরঃ।।

বৃহৎসাম্‌ তথা সাম্নাং গায়ত্রী ছন্দসাম্‌ অহম্‌।

মাসানাং মার্গশীর্ষঃ অহম্‌ ঋতুনাং কুসুম-আকরঃ।।

আমিই সামবেদের মধ্যে মহৎ সাম। সমস্ত ছন্দের মধ্যে আমিই গায়ত্রী। বারোমাসের মধ্যে আমিই অগ্রহায়ণ, ছয় ঋতুর মধ্যে আমিই বসন্ত।

 

৩৬

দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্‌।

জয়োঽস্মি ব্যবসায়োঽস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্‌।।

দ্যূতং ছলয়তাম্‌ অস্মি তেজঃ তেজস্বিনাম্‌ অহম্‌।

জয়ঃ অস্মি ব্যবসায়ঃ অস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতাম্‌ অহম্‌।।

সমস্ত প্রতারকের মধ্যে আমিই পাশাখেলার চাতুরি, শক্তিশালীদের মধ্যে আমিই শক্তি, বিজয়ীদের জয়, উদ্যমী লোকেদের মধ্যে আমিই অধ্যবসায়, আর সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের সত্ত্বগুণ।

 

৩৭

বৃষ্ণিনাং বাসুদেবোঽস্মি পাণ্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ।

মুনীনামপ্যহং ব্যাসঃ কবীনামুশনা কবিঃ।।

বৃষ্ণিনাং বাসুদেবঃ অস্মি পাণ্ডবানাং ধনঞ্জয়ঃ।

মুনীনাম্‌ অপি অহং ব্যাসঃ কবীনাম্‌ উশনা কবিঃ।।

আমি বৃষ্ণিবংশের মধ্যে বাসুদেব-কৃষ্ণ, পাণ্ডবদের মধ্যে আমিই ধনঞ্জয়-অর্জুন, মুনিদের মধ্যে আমিই ব্যাসদেব, আর কবিদের মধ্যে কবি শুক্রাচার্য।

 

৩৮

দণ্ডো দময়তামস্মি নীতিরস্মি জিগীষতাম্‌।

মৌনং চৈবাস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতামহম্‌।।

দণ্ডো দময়তাম্‌ অস্মি নীতিঃ অস্মি জিগীষতাম্‌।

মৌনং চ এব অস্মি গুহ্যানাং জ্ঞানং জ্ঞানবতাম্‌ অহম্‌।।

শাসকদের হাতে আমিই দণ্ড, জয়ের ইচ্ছায় আমিই রণনীতি, গোপন বিষয়ে আমিই মৌন আর জ্ঞানীদের মধ্যে আমিই জ্ঞান।

 

৩৯

যচ্চাপি সর্বভূতানাং বীজং তদহমর্জুন।

ন তদস্তি বিনা যৎ স্যান্ময়া ভূতং চরাচরম্‌।।

যৎ চ অপি সর্বভূতানাং বীজং তদহম্‌ অর্জুন।

ন তৎ অস্তি বিনা যৎ স্যাৎ ময়া ভূতং চরাচরম্‌।।

হে অর্জুন, বিশ্বে যা কিছু তোমার দৃষ্টিতে অথবা অনুভবে ধরা দেয়, সেই সবকিছুর মূল আমি। আমায় ছাড়া থাকতে পারে, এই চরাচরে এমন কিছুই নেই

 

৪০

নান্তোঽস্তি মম দিব্যানাং বিভূতীনাং পরন্তপ।

এষ তূদ্দেশতঃ প্রোক্তো বিভূতের্বিস্তরো ময়া।।

না অন্তঃ অস্তি মম দিব্যানাং বিভূতীনাং পরন্তপ।

এষ তু উদ্দেশতঃ প্রোক্তঃ বিভূতেঃ বিস্তরঃ ময়া।।

হে অর্জুন, আমার অলৌকিক বিভূতির কোন সীমা নেই, আমার সেই বিশ্বব্যাপী বিভূতির খুব সামান্য অংশই তোমার কাছে ব্যাখ্যা করলাম।

 

৪১

যদ্‌ যদ্‌ বিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমদূর্জিতমেব বা।

তত্তদেবাবগচ্ছ ত্বং মম তেজোঽংশসম্ভবম্‌।।

যৎ যৎ বিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমৎ ঊর্জিতম্‌ এব বা।

তৎ তৎ এব অবগচ্ছ ত্বং মম তেজঃ অংশসম্ভবম্‌।।

এই পৃথিবীতে ঐশ্বর্যবান, শ্রীমান কিংবা প্রাণশক্তিতে ভরপুর যেখানে যা কিছু দেখতে পাবে, আমার এই বিভূতির অংশ থেকেই তাদের সৃষ্টি, এই তত্ত্বটি জেনে রাখো।

 

৪২

অথবা বহুনৈতেন কিং জ্ঞাতেন তবার্জুন।

বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ।।

অথবা বহুনা এতেন কিং জ্ঞাতেন তব অর্জুন।

বিষ্টভ্য অহম্‌ ইদং কৃৎস্নম্‌ একাংশেন স্থিতঃ জগৎ।।

কিন্তু হে অর্জুন, তোমার এত বেশী জানার কি প্রয়োজন? শুধু এইটুকু জেনে রাখো যে, আমার খুব সামান্য একটি অংশ দিয়েই আমি এই নিখিল বিশ্বচরাচরকে ধারণ করে আছি।

 

বিভূতিযোগ সমাপ্ত

চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪

  [প্রাককথাঃ    আধুনিক গণতা ন্ত্রি ক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নির...