["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের দ্বিতীয় পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে " ধর্মাধর্ম - ৪/২ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
তৃতীয় পর্বাংশ
৪.২ প্রাক-গুপ্তযুগের ভারত
আগের পর্বেই বলেছিলাম, মোটামুটি ৫০
বি.সি.ই-তে সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু হয়েছিল, রাজা সিমুকের হাত ধরে। তাঁর সম্বন্ধে
তেমন কিছু জানা না গেলেও এটুকু জানা যায়, তিনি মোটামুটি ২৯ বি.সি.ই-তে মগধের
কাণ্ববংশের উচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন। সাতবাহন বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজা ছিলেন, সাতকর্ণি, তাঁর কথাও
আগে বলেছি। তাঁর মৃত্যুর পর বেশ কিছু বছর, সাতবাহন বংশের তেমন কোন সংবাদ পাওয়া
যায় না। এটুকু শোনা যায়,
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই নাবালক পুত্র শক্তিশ্রী এবং বেদশ্রীর মাতা, রানি
নায়নিকা অথবা নাগনিকা রাজ্য পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন। আরেকজন রাজার নাম পাওয়া যায়, যাঁর নাম
হাল, তিনি
প্রাকৃত ভাষায় একটি সংহিতা রচনা করেছিলেন, যার নাম “গাথা সত্তসই (গাথা
সপ্তশতক)”। খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শেষদিকে সাতবাহন সাম্রাজ্যের অধীনস্থ
মহারাষ্ট্র জয় করে, প্রথম
আঘাত হানল শক-ক্ষত্রপেরা। যদিও শকেরা এই অধিকার খুব বেশিদিন আয়ত্ত্বে রাখতে পারেনি, তাদের
পরাস্ত করে, মহারাষ্ট্র
আবার জয় করে নিয়েছিলেন,
সাতবাহন রাজা গৌতমীপুত্র[1] সাতকর্ণি।
নাসিকের একটি প্রস্তর লিপি থেকে জানা যায়, “তিনি
ক্ষত্রিয়দের গর্ব এবং অহংকার চূর্ণ করেছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যে বর্ণপ্রথার
পুনর্নিয়োগ করেছিলেন। তিনি শক, যবন এবং পহ্লবদের বিতাড়িত করেছেন, এবং সাতবাহন
বংশের হারানো গৌরব আবার ফিরিয়ে এনেছেন”। এই লিপিটি লিখিয়েছিলেন তাঁর মা, রাণি
গৌতমী বলশ্রী। এই লিপি থেকে আরও জানা যায়, কোন কোন রাজ্য বা অঞ্চল তাঁর অধিকারে
ছিল, যেমন
গুজরাট, সৌরাষ্ট্র, মালব, বেরার, উত্তর কোংকন
এবং পুনা ও নাসিক। তিনি নিজের নামে, রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অন্য
এক লিপি থেকে আরও জানা যায়,
তাঁর রাজত্বকালের অষ্টাদশ বছরে নাসিকের কাছে “পাণ্ডুলেন” নামের একটি গুহা এবং
চব্বিশতম বছরে বেশ কিছু জমি তিনি সন্ন্যাসীদের দান করেছিলেন। এর থেকে অনুমান করা
যায় তিনি অন্ততঃ চব্বিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন।
গৌতমীপুত্রর পরে মোটামুটি ১৩০ সি.ই.তে রাজা
হয়েছিলেন, তাঁর
পুত্র বাশিষ্ঠি পুত্র শ্রীপুলমাবি। তিনি প্রায় সমগ্র দক্ষিণ ভারতেই সাতবাহন
সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। সম্ভবতঃ তিনিই বৈথান বা পৈথানে (ঔরঙ্গাবাদ থেকে ৫৬
কিমি দূরে গোদাবরী তীরে) রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জুনাগড় প্রস্তর লিপিতে তাঁকে
দক্ষিণাপথের প্রভু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই লিপি থেকে আরও জানা যায় তিনি দুবার
শক-ক্ষত্রপ রুদ্রদমনের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন, এবং অবশেষে রুদ্রদমনের কন্যাকে বিবাহ
করে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এর পরিবর্তে তাঁকে শক-মহাক্ষত্রপকে অনেক
অঞ্চলই ছাড়তে হয়েছিল। শ্রী পুলামাবির মৃত্যু হয়েছিল মোটামুটি ১৫৫ সি.ই.-তে।
যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি অথবা শ্রীযজ্ঞ সাতকর্ণি ছিলেন
সাতবাহন সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী রাজা। তাঁর রাজত্বকাল মোটামুটি ১৬৫ থেকে ১৯৫
সি.ই.। তিনি সাতবাহন সাম্রাজ্যের বিস্তার আরও বাড়িয়েছিলেন, তাঁর
সাম্রাজ্যের পূর্বদিকের সীমানায় ছিল বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে আরব সাগর। নৌবাণিজ্যেও
তিনি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর প্রচলন করা মুদ্রার একদিকে ছিল মাছ, শঙ্খ ও
অন্যদিকে ছিল দুই-মাস্তুলের জাহাজের
ছবি। যজ্ঞশ্রীর মৃত্যুর পর সাতবাহন
সাম্রাজ্য অতি দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করেছিল এবং আভিররা মহারাষ্ট্র এবং ইক্ষ্বাকু
ও পল্লবেরা পূর্বদিকের রাজ্যগুলি অধিকার করে নেওয়াতে সাতবাহন সাম্রাজ্য ভেঙেই পড়ল।
৪.২.১.১ সাতবাহন সাম্রাজ্যের সামাজিক বিন্যাস
সমাজের মানুষ চার শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। সমাজের
উচ্চশ্রেণীতে ছিলেন মহাভোজ,
মহারথী এবং মহাসেনাপতি– যাঁরা রাষ্ট্রের প্রশাসন এবং বিভিন্ন প্রদেশকে
নিয়ন্ত্রণ করতেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিলেন আধিকারিকরা– যেমন, অমাত্য, মহামাত্র
এবং ভাণ্ডাগারিক, তাছাড়াও
ছিলেন, নৈগম
(ধনী বণিক সম্প্রদায়),
সার্থবাহ (মুখ্য বণিক) এবং শ্রেষ্ঠীন ( বণিকগোষ্ঠী বা গিল্ডের প্রধান)। তৃতীয়
শ্রেণীতে ছিলেন বৈদ্য,
লেখক (করণিক বা কেরানি), স্বর্ণকার, গন্ধিকা (গন্ধবণিক), হালকীয় (কৃষক) প্রমুখ। আর চতুর্থ
শ্রেণীতে ছিলেন, মালাকার, বর্ধকী
(সূত্রধর বা ছুতার),
দাসক (জেলে)।
৪.২.১.২ ধর্ম
সাতবাহন বংশের রাজারা সাধারণতঃ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে
বিশ্বাসী হলেও, তাঁরা
বৌদ্ধধর্মের প্রতিও সহিষ্ণু ছিলেন। বৌদ্ধভিক্ষুদের জন্যে চৈত্য-গৃহ, মন্দির এবং
গুহা নির্মাণে প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছিলেন। বৌদ্ধবিহারগুলির পরিচালনার জন্যে
নিয়মিত অর্থেরও সংস্থান করতেন। তবে প্রধানতঃ তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্মেই বিশ্বাসী
ছিলেন। তাঁরা নিয়মিত অশ্বমেধ, রাজসূয় এবং অন্যান্য যজ্ঞেরও আয়োজন করতেন এবং ব্রাহ্মণদের
প্রচুর দান ও দক্ষিণা দিতেন। সাতবাহন রাজাদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের ঘনিষ্ঠতা
দেখে খুব সহজেই আন্দাজ করা যায়, ব্রাহ্মণদের বর্ণাশ্রম বিধি সে সময় বেশ নমনীয় হয়ে এসেছে।
সাতবাহন রাজাদের বর্ণ ক্ষত্রিয় না ব্রাহ্মণ সে কথা জানা যায় না। তাঁদের এত দীর্ঘ
দিনের রাজত্বে কোন রাজাই সংস্কৃত জানার চেষ্টাও করেননি। অথচ ব্রাহ্মণরা তাঁদের
যজ্ঞে পৌরোহিত্য করেছিলেন। অতএব ততদিনে “রাজা মানে রাজাই, তাঁর আবার
বর্ণ বিচারের প্রয়োজন কি?”
এমন ধারণা চলে এসেছে। এটাই হিন্দু ধর্মের লক্ষণ - হিন্দু সমাজে বর্ণভেদ তখনও
ছিল, আজও
আছে, কিন্তু
রাজা, রাষ্ট্রীয়
প্রধান, উচ্চবিত্ত
এবং উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের বর্ণ বিচার করবে কোন নির্বোধ?
সাম্রাজ্যের বহু লোক শিব ও বিষ্ণু[2] এবং
অন্যান্য দেবতাদের উপাসক ছিলেন, তাঁদের ধর্মাচরণে সাতবাহন রাজারা কখনও বাধা দেননি, বরং সকল
ধর্মবিশ্বাসী মানুষই সদ্ভাবে নিশ্চিন্তে বসবাস করত। সাতবাহন রাজারা ব্রাহ্মণ্য
হলেও, তাঁরা
সংস্কৃতর থেকে প্রাকৃত ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান
ভাষা ছিল প্রাকৃত। এমনকি রাজা হাল প্রাকৃত ভাষাতে “সপ্তশতক” সংহিতা রচনা করেছিলেন।
সমসাময়িক কালে গুণাঢ্য তাঁর “বৃহৎকথা” লিখেছিলেন প্রাকৃতে। সর্ববর্মন নামে এক
পণ্ডিত “কাতন্ত্র” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, কোন এক রাজার অনুরোধে। সেই রাজা
সংস্কৃত জানতেন না এবং “পাণিনি” পাঠ তাঁর কাছে দুরূহ মনে হত।
৪.২.২ শক ও পহ্লব
খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে শকরা
ছিলেন মধ্য এশিয়ার যাযাবর গোষ্ঠী। চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে দলছুট হয়ে আসা
ইউ-চি গোষ্ঠীর চাপে,
শকরা তাদের সিরদরিয়া নদের অঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণের ব্যাক্ট্রিয়া, পার্থিয়ান
এবং সিথিয়ান রাজ্যগুলিতে ঢুকে পড়েছিল। সেই সময়ে এই রাজ্যগুলি নিজেদের মধ্যে নিত্য
যুদ্ধ করতে করতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, অতএব শকদের পক্ষে এই তিন রাজ্যে ঢুকে
পড়া সহজ হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকেও পরবর্তীকালে শকরা বিতাড়িত হয়ে পূর্বদিকে সরে
আসতে বাধ্য হল।
সে সময় কাবুল অঞ্চলে গ্রীক রাজ্য ছিল। গ্রীক
রাজ্য পার হয়ে তারা আরও পূর্বে কান্দাহার এবং বালুচিস্তান অঞ্চলে চলে এসেছিল এবং
কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে গেল সিন্ধু নদের নিম্ন অববাহিকায়। সেখানেই তাদের প্রথম
নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা হল – যার নাম হিন্দু শাস্ত্রে শকদ্বীপ এবং গ্রীক ভৌগোলিকরা
বলেন ইন্দো-সিথিয়া। এখান থেকেই শকরা পরবর্তীকালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজ্য
স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। শকদেরই অন্য একটি শাখার সংস্কৃত নাম পহ্লব - কোন
কোন ঐতিহাসিক তাঁদের ইন্দো-পার্থিয়ান বলেন। কিন্তু ভারতবর্ষে শক ও পহ্লবদের ইতিহাস
সর্বদাই সংযুক্ত এবং দুই গোষ্ঠীকে আলাদা করে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন।
ভারতের উত্তরপশ্চিম সীমান্তে গান্ধার অঞ্চলে শক
রাজত্বের প্রথম হদিশ পাওয়া যায় ৮০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি। প্রথম যে শক রাজার নাম
পাওয়া যায়, তিনি
মোয়েস বা মোগা। তাঁর পরবর্তী রাজা ছিলেন এজেস, তিনি ওই অঞ্চলের ইন্দো-গ্রীক রাজাকে
পরাস্ত করে, আধুনিক
ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে ফেলেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালের শুরু মনে
করা হয় ৫৮ বি.সি.ই বা ৭৮ বি.সি.ই। মনে করা হয়, তিনিই তাঁর এই রাজত্বকাল থেকে নতুন
অব্দের সূচনা করেছিলেন,
যার নাম শকাব্দ। সাধারণতঃ ৭৮ বি.সি.ই থেকেই শকাব্দ গণনার হিসাব করা হয়, যদিও এই
অব্দ গণনা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ এবং বিরোধ রয়েছে।
পহ্লবরাও উত্তর পশ্চিম ভারতে তাদের অস্তিত্ব
প্রতিষ্ঠা করেছিল, প্রথম
শতাব্দী বি.সি.ই-র শেষ দিকে। পহ্লবদের একজন রাজা ভগবান যিশুর শিষ্য সেন্ট টমাসের
থেকে খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁর নাম গণ্ডোফারিস বা গণ্ডোফার্নিস।
সেক্ষেত্রে তাঁর রাজত্বকাল প্রথম শতাব্দী সি.ই.-র মাঝামঝি কোন এক সময়ে। শোনা যায়
সেন্ট টমাস ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল থেকে গণ্ডোফার্নিসের
রাজসভায় এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তিনি দক্ষিণ ভারতে চলে আসেন। তবে এই তথ্য খুব
একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়,
কারণ ভারতে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের যে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তা অনেক
পরবর্তী কালের।
পরবর্তীকালে চিনের ইউ-চি উপজাতিদের আক্রমণে, শক এবং
পহ্লবরা আরও দক্ষিণে এবং পূর্বে ভারতের মূল ভূখণ্ডে সরে আসতে বাধ্য হন। এই অঞ্চলে
তাঁদের অস্তিত্ব বোঝা যায় তাঁদের প্রশাসনিক আধিকারিকদের নাম থেকে।
শক ও পহ্লবরা মূলত অ্যাকিমিনিড এবং সেলুকীয়
প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তাঁদের রাজ্যকে তাঁরা কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে
নিতেন, এবং
প্রত্যেক প্রদেশের প্রধান হতেন একজন সেনাধ্যক্ষ– যাঁকে “মহাক্ষত্রপ” বলা হত।
প্রত্যেকটি প্রদেশকে আবার বেশ কিছু অঞ্চলে বিভক্ত করে, প্রত্যেকটির
নিয়ন্ত্রণে নিযুক্ত হতেন একজন “ক্ষত্রপ”। এই ক্ষত্রপেরা নিজেদের নামে মুদ্রা
প্রচলন করতে পারতেন এবং প্রজাদের জন্যে নির্দেশ লিপি প্রচার করতে পারতেন। অর্থাৎ
এক একটি অঞ্চলে ক্ষত্রপেরা ছিলেন প্রায় স্বাধীন রাজা। এই কারণেই প্রধান রাজারা
তাঁদের উপাধিতে “রাজাদের রাজা” বা “মহারাজা” ব্যবহার করতেন।
সাতবাহন সাম্রাজ্যের রাজাদের সঙ্গে তাঁদের
সংঘর্ষের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মধ্য ভারতে উজ্জয়িনী, মথুরা এবং পশ্চিম ভারতের গুজরাট এবং
মহারাষ্ট্রের বেশ কিছু অঞ্চলে তাঁদের শক্তিশালী অস্তিত্ব ছিল। শক-ক্ষত্রপ
রুদ্রদমনের সঙ্গে সাতবাহন রাজাদের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে শকদের প্রতিপত্তিকে সামাল
দেওয়ার প্রচেষ্টার উল্লেখ আগেই করেছি।
৪.২.৩ কুষাণ রাজ্য ও কণিষ্ক
খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে, চীনের
ইউ-চি-র পাঁচটি যাযাবর গোষ্ঠীর প্রধান কুজুলা কদ্ফিসিস ব্যাক্ট্রিয়াতে রাজ্য
স্থাপন করেন। তারপর প্রতিপত্তিশালী শকদের তাড়িয়ে তিনি কাবুল থেকে কাশ্মীর – নিজের
আয়ত্বে এনেছিলেন। এই রাজ্য থেকেই কুষাণ রাজ্য এবং বংশের সূত্রপাত হল। প্রথম
শতাব্দীর মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যুর পর, রাজা হয়েছিলেন ওয়েমা বা ভিমা কদ্ফিসিস।
রোমান মুদ্রার অনুকরণে,
কুষাণ রাজারাও স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন, যেগুলি মধ্য এশিয়ায় বহুল ব্যবহার হত।
এছাড়া তামার মুদ্রাও প্রচলন করেছিলেন, তার নাম টেট্রাদ্রাখম– এই মুদ্রায়
শিবের মূর্তির ছাপ থাকত।
কুষাণ বংশের সবথেকে প্রসিদ্ধ রাজা কণিষ্ক। যাঁর
সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে সমগ্র উত্তর-পশ্চিম ভারত তো বটেই এমনকি, শোনা যায়
গাঙ্গেয় উপত্যকার চম্পা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মথুরার কাছে একটি মুণ্ডহীন পাথরের
পূর্ণাঙ্গ মূর্তি পাওয়া গেছে, বিশেষজ্ঞরা সেটিকে কণিষ্কের মূর্তি বলেই সনাক্ত করেছেন।
মূর্তির পরনে আছে মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত কোট এবং বুট জুতো। রাজা কণিষ্কের রাজত্বকাল
অনুমান করা হয় ৭৮ সি.ই.। কেউ কেউ মনে করেন, এ সময় থেকেই শকাব্দের গণনা করার
প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। যদিও তাতে শকাব্দ গণনার হিসেব মেলে না। কুষাণ সাম্রাজ্যের
প্রধান দুই শহরের নাম পুরুষপুর (আধুনিক পেশোয়ারের কাছে) এবং মথুরা।
কণিষ্ক এবং অন্যান্য কুষাণ রাজারা বড়োবড়ো উপাধি
ব্যবহার করতেন। পণ্ডিতেরা বলেন, এগুলি গ্রীস, রোম বা পারস্যের সম্রাটদের অনুকরণ।
যেমন রোমান সম্রাটরা ব্যবহার করতেন, “দিভা ফিলিয়াস” (diva filius), যার
অর্থ – স্বর্গের পুত্র,
কুষাণ রাজারা নিজেদের “দৈবপুত্র” বলতেন। ইন্দো-গ্রীক রাজারা ব্যবহার করতেন
“ব্যাসিলিয়স ব্যাসিলেই” (basileos
basilei) – যার অর্থ রাজাদের রাজা, কুষাণ রাজারা নিজেদের বলতেন, “মহারাজাতিরাজ”।
৪.২.৩.১ কণিষ্ক ও বৌদ্ধধর্ম
এই সময়ে কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ সীমানায়
ভারত, চীন
ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য তো ছিলই, তার সঙ্গে
নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল সংস্কৃতি ও ধর্মভাবনার আদানপ্রদান, তার মধ্যে
ছিল বৌদ্ধ-জৈন-শৈব-ভাগবত-জরোথুষ্ট্রিয়ান-গ্রীকপ্রথার মিশ্রণ। বৌদ্ধরা দাবি করেন, রাজা কণিষ্ক
তাঁদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁর সময়েই চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলন হয়েছিল। এই চতুর্থ
বৌদ্ধ সম্মেলনেই বৌদ্ধদের হীনযানী শাখা ভেঙে নতুন মহাযানী মতের উৎপত্তি হয়েছিল। এই
সম্মেলন হয়েছিল কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে। এই সম্মলনের আহ্বায়ক ছিলেন, রাজা
কণিষ্কের গুরু, পার্শ্ব।
এবং সভাপতি ছিলেন বসুমিত্র এবং অশ্বঘোষ। এই সম্মেলনেই মহাযান ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের
প্রধান শাখা হয়ে ওঠে। হীনযানী বৌদ্ধরা প্রাচীন পন্থী, তাঁরা
মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না এবং তাঁরা বুদ্ধকে দেবতা নয়, মহামানব
হিসেবেই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু মহাযানীরা ভগবান বুদ্ধকে দেবতার আসনে বসিয়ে তাঁর
পূজা এবং নানান অনুষ্ঠানের প্রথা প্রচলন করেছিলেন। তাঁরা ভগবান বুদ্ধের মূর্তি
নির্মাণ করে, ভক্তি
ভরে তাঁর পূজার প্রচলন শুরু করলেন। এমন নয় যে এই সম্মেলন থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের
মহাযান মার্গের সূত্রপাত হল। মহাযানী বৌদ্ধদের গোষ্ঠী বহুদিন ধরেই সক্রিয় ছিল এবং
তাদের সঙ্গে প্রাচীনপন্থীদের প্রায়শঃ মতবিরোধ ঘটছিল। এই সম্মেলনে সেই মতভেদ
স্বীকৃতি লাভ করল এবং দুটি গোষ্ঠী আলাদা হয়ে গেল।
৪.২.৩.২ গান্ধার শিল্প
মহাযানী বৌদ্ধ ধর্ম ভারতীয় শিল্পের নতুন এক
দিগন্ত খুলে দিল। এতদিন বৌদ্ধ শিল্প বা স্থাপত্য বলতে, কোথাও
বুদ্ধদেবের মূর্তি বানানো হয়নি। সাঁচী বা ভারহুত স্তূপে তাঁর জাতকের অথবা তাঁর
সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য গল্পের অজস্র রিলিফ চিত্র দেখা গেছে। সেগুলিতে সরাসরি
ভগবান বুদ্ধের মূর্তি কখনো দেখানো হয়নি, তার পরিবর্তে নানান প্রতীক ব্যবহার
করা হত। যেমন তাঁর পদচিহ্ন,
বোধি-বৃক্ষ, শূণ্য-আসন
অথবা ছাতা। কিন্তু এখন থেকে শিল্পীদের হাতের ছেনির প্রিয়তম বিষয় হয়ে উঠল
বুদ্ধ-মূর্তি গড়া। এই সময়ের অধিকাংশ মূর্তিই পাওয়া গেছে গান্ধার অঞ্চলে এবং
পুরুষপুরের (পেশোয়ার) আশেপাশে। এই শিল্পকেই পরবর্তী সময়ে গান্ধার-শিল্প নাম দেওয়া
হয়েছে। কখনও কখনও এই শিল্পকে গ্রেকো-বুদ্ধিষ্ট (Græco-Buddhist) বা
ইন্দো-হেলেনিকও (Indo-Hellenic)
বলা হয়, কারণ
এই মূর্তির নির্মাণে গ্রীক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। এমনকি কিছু কিছু মূর্তিতে
গ্রীক দেবতা অ্যাপোলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য পাওয়া যায়। যদিও পরবর্তী কালের
বুদ্ধমূর্তিতে ভারতীয় ভাবনার নিজস্বতা স্পষ্ট ধরা পড়ে এবং সেই মূর্তিগুলিকেই
ভারতীয় শিল্পে সর্বত্র অনুসরণ করা হয়েছে।
৪.২.৩.৩ কণিষ্কের পরবর্তী রাজারা
কণিষ্কের মৃত্যু সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা করা
যায় না, কোন
কোন মতে তিনি তেইশ, আবার
কোন মতে তিনি একচল্লিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে বাশিষ্ক এবং তাঁর
পরে হুবিষ্ক রাজা হয়েছিলেন। বাশিষ্ক সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে হুবিষ্ক
কণিষ্কের সাম্রাজ্যের পুরোটাই ধরে রাখতে পেরেছিলেন এবং যথেষ্ট প্রতাপশালী রাজা
ছিলেন। তাঁর রাজত্বে তিনি নিজের নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। সেই মুদ্রায়
তাঁর নিজের ছবি এবং অন্যান্য নানান দেবতার ছবি মুদ্রিত থাকলেও, বুদ্ধের ছবি
বা প্রতীক দেখা যায় না। তবে হুবিষ্ক যে বৌদ্ধদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন, তাও নয়।
শোনা যায় তিনি মথুরাতে বৌদ্ধ বিহার এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। তিনি
কাশ্মীরে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন, যার নাম হুবিষ্কপুর বা জুস্কপুর যার
এখনকার নাম হুষ্কপুর বা উষ্কুর। হুবিষ্কের পরে আরেকজন রাজার নাম পাওয়া বাসুদেব।
তিনিও নিজের নামে মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। তবে তাঁর সময়ে কুষাণ সাম্রাজ্য অনেকটাই
ছোট হয়ে গিয়েছিল, হয়তো
তাঁর রাজ্যের সীমানা ছিল পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের কিছুটা এবং মথুরা অঞ্চল। বাসুদেবের মুদ্রা
থেকে অনুমান করা হয় তিনি শৈব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, কারণ তাঁর অনেক মুদ্রায় শিব এবং
নন্দী (বৃষ বা ষাঁড়)-এর প্রতীক দেখা যায়। বাসুদেবের রাজত্বের শুরু অনুমান করা হয়
১৫২ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন সময়ে এবং তিনি পঁচিশ কিংবা তিরিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন।
বাসুদেবের পরবর্তী রাজারা অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন
এবং পারস্যের সাসানিয়ান রাজা ফিরিস্তর আক্রমণের পর খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীর
শেষদিক থেকেই কুষাণবংশের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের দুর্বলতার সুযোগে
স্থানীয় গোষ্ঠী নেতারা এখানে সেখানে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে তুলতে লাগলেন।
এর পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/৪ "
[1]
সাতবাহন রাজা সাতকর্ণির নামের সঙ্গে তাঁর মাতৃদেবী গৌতমীর নাম সংযুক্ত হওয়া, আর্য বা
ব্রাহ্মণ্য সমাজবিধির পরিপন্থী মনে হয় না? আর্য সমাজে পিতার নামের সঙ্গে
পুত্রের নাম জুড়ে দেওয়া খুবই স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। যেমন, রামচন্দ্র
দাশরথি, পাণ্ডুর
পুত্রেরা পাণ্ডব, কশ্যপের
পুত্র কাশ্যপ ইত্যাদি। অবশ্য ব্যতিক্রম ছিল, যেমন মাতা কুন্তীর নাম অনুসারে
পাণ্ডবদের কৌন্তেয়ও বলা হত। আবার ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী বুদ্ধদেবও তাঁর মাতার গৌতমী
নামটি নিয়েই “গৌতমবুদ্ধ” নামেই নিজের পরিচয় দিতেন। মাতার নামে পুত্রের পরিচয়
অনার্য সমাজে প্রচলিত ছিল কি?
[2] আমরা
দেখেছি ইন্দ্র, অগ্নি, রুদ্র, পবন
প্রমুখরা ছিলেন বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য দেবতা। তার পাশাপাশি সাতবাহন সাম্রাজ্যে শিব, বিষ্ণু এবং
অন্যান্য দেবতাদের পুজো-প্রসঙ্গও সামনে আসতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আর্য - অনার্য ধর্মাচরণ মিলেমিশে যাচ্ছে - এবং সমাজে প্রাধান্য পাচ্ছে অনার্য বিশ্বাস ও ধর্মাচরণ। এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট আলোচনা করা যাবে পরবর্তী পর্বগুলিতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন