এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - ফাস-ক্লাস সিটিজেন
পরের দিন সকালে ক্লাসে গিয়ে অন্য সহপাঠীদের থেকে যা শুনলাম – তাতে হস্টেলের ভাষায় “ইয়ে” রগে উঠে যাবার যোগাড়! মারধোর আর নানান শারীরিক অত্যাচারের ফলে অনেকেরই সারা গায়ে ব্যথা। ফলে সকলেরই মুখে চোখে আতংক – আজ রাত্রে আরও কি ঘটবে, আর কতদিন চলবে র্যাগিং নামক এই সম্বর্ধনা?
তাদের মুখে শারীরিক অত্যাচারের যে নমুনা শুনলাম, “আমাকে বলল - অ্যাই ছানা, হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নীচে ঢুকে পড় – ঢুকলি শুয়োরের বাচ্চা, কি করব ঢুকলাম, তারপর বলল – পিঠে করে খাটটা তুলে ফেল। তাও তুলে ফেললাম। তারপর কি করল জানিস, কম করে চার পাঁচজন হবে - লাফাতে লাগল আর নাচতে লাগল খাটের ওপর দাঁড়িয়ে। পারা যায় নাকি? আমি খাটটা মেঝেয় নামিয়ে দিলাম। তাতে একজন খাট থেকে নেমে এসে নীচু হয়ে বসে বাপ মা তুলে কাঁচা দিল – আর তার সঙ্গে কাঠের টি দিয়ে খোঁচা। বলল – আমরা নৌকো চড়া প্র্যাক্টিস করছি দেখছিস না? খাটের পায়া মেঝেয় ঠেকলে পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেব, শালা। প্রায় ঘন্টাখানেক চলল এরকম। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা। দু কাঁধে আর পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। শালা, দু একদিন এরকম দেখবো, এরকম চললে কেটে পড়ব – দরকার নেই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ে। তবে হ্যাঁ যাবার আগে দুটোর মাথা আমি ফাটিয়ে যাবো, দেখে নিস”।
এরকম মারাত্মক র্যাগিং যেমন ছিল, তার সঙ্গে ছিল কিছু বিরক্তিকর
ক্লান্তিকর র্যাগিংও, হস্টেলের ভাষায় বলত টেকনিক্যাল র্যাগিং। টেকনিকাল র্যাগিং
যারা করত, তারা নিজেদের উচ্চস্তরের বুদ্ধিমান জীব হিসেবে ভীষণ শ্লাঘা অনুভব করত। মারকুটে
র্যাগারদের আড়ালে তারা খুব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করত।
বিশ ফুট বাই পনের ফুট একটা রুমের দৈর্ঘ, প্রস্থ আর উচ্চতা মাপার
জন্যে দিত একটা পাঁচপয়সার কয়েন। কয়েনের ইউনিটে মেপে দিতে হবে ঘরটি। দৈর্ঘ প্রস্থ তাও
ঠিক আছে, উচ্চতা মাপাই ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। তারা দেখত আর হ্যা হ্যা করে হাসত আমাদের
দুর্গতিতে।
অথবা একটা কাল্পনিক মাছি, অবাধ্য আর চঞ্চল সেই কাল্পনিক মাছিটি
ঘরের এক দেয়াল থেকে বিপরীত দেওয়ালে উড়ে যাবে বারবার। সেই কাল্পনিক মাছিটিকে ধরার জন্যে
আমাদের ঘরের মধ্যে দৌড়ে যেতে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা – আর দেয়ালের কাছে গিয়ে মক্ষিশিকারের
অভিনয় করে বলতে হবে – “যাঃ শালা, ফস্কে গেল”।
দিনের পর দিন এইরকম পরিস্থিতিতে আমাদের মনে জমে উঠতে লাগল অবসাদ
আর বিতৃষ্ণা। অনেকে চূড়ান্ত হতাশায় পড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। অনেকের মনে জমে উঠছিল
ক্ষোভ আর রাগ, তারা বলত – দাঁড়া না, কিছুদিন যাক, এমন ক্যালান ক্যালাবো না, বাপের নাম
খগেন করে ছেড়ে দেব, শালা।
এই র্যাগিংয়ের সময় আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। টুকটাক র্যাগিং
প্রায় সবাই করলেও, বেশ কিছু ছেলে আছে যারা র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে। সত্যি বলতে অসহ্য
মারধোরের র্যাগিং করতে আসত, কতিপয় হাতে গোনা কিছু ছেলে। তাদের খপ্পর এড়িয়ে চলতে পারলে,
হস্টেলের র্যাগিং ব্যাপারটা খুব একটা মারাত্মক ছিল না। তার ওপর আমার ভাগ্যটা ছিল অত্যন্ত
সুপ্রসন্ন। র্যাগিং-বিরুদ্ধ বেশ কিছু ছেলের সুনজরে চলে আসাতে, তারাই আমায় বেশ বাঁচিয়ে
দিত বার বার। তাদের মধ্যে যাদের নাম না করলেই নয়, অজয় গাঙ্গুলি (সিভিল৮২), বিশ্বজিৎ
ভট্টাচার্য (মেক. ৮২), সুশোভন ভট্টাচার্য (মেক.৮২), উৎপল দাস (সিভিল.৮২), অরিজিৎ চৌধুরি
(ইলেক. ৮২), সঞ্জীব সরকার (ইলেক. ৮২), আশিষ বিশ্বাস (সিভিল ৮২), সৌমিত্র বসাক (সিভিল
৮২) প্রমুখ। সুশোভনদার ব্যাপারটা বোঝা যায়, কারণ আমি তখন সুশোভনদার পাড়াতেই শ্রীগোপাল
মল্লিক লেনে থাকতাম, কিন্তু বাকিরা কেন আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, আজও ভাবলে কৃতজ্ঞতায়
মনটা ভরে ওঠে। অজয়দার সঙ্গে অনেক বছর পরে কলকাতায় আবার কর্মসূত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে
উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কোহিমা থেকে কলকাতা ফেরার পথে অজয়দার প্লেন ক্র্যাশ হয়ে যাওয়াতে,
অজয়দা চলেই গেল অন্যলোকের যাত্রী হয়ে। অজয়দার সেই অসময়ের মৃত্যুটা আজও ভীষণ নাড়া দিয়ে
যায়, অজয়দার কথা মনে পড়লে।
একবার আমাদের কাছে আগে থেকেই খবর এসেছিল, আজ রাত্রে “উদুম ক্যালানো”
হবে ছানাদের। আমি ও আমার স্কুলের এবং এই কলেজের অভিন্নহৃদয় সহপাঠী-বন্ধু দেবপ্রিয় সেন
(মেক.৮৩) ক্লাস শেষে, হস্টাইল হস্টেলে না ফিরে, কলেজ থেকেই পালালাম জলপাইগুড়ি শহরে। এর আগে কলেজে ভর্তি হবার সময় দুদিন
রুবি বোর্ডিংয়ে থাকতে হয়েছিল। এবারও দুজনে উঠলাম রুবিতে। সঙ্গে ব্যাগ ট্যাগ কিচ্ছু নেই, দুজনে
হাতে খাতা নিয়ে যখন রুবি বোর্ডিংএর রিসেপশানে পৌঁছে, আমরা রাত্রে থাকার জন্যে ঘরের কথা বললাম, কাউন্টারের
ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। কিছু বলতে হল না, তিনি নিজে থেকেই বলে গেলেন, “ইঞ্জিনীয়ারিং
কলেজ? ফার্স্ট ইয়ার? খুব র্যাগিং হইতাসে? কলকাতা থেকে আইসা হেই ছেলেগুলা এই সব কইরা
কী যে উল্লাস পায়, বোঝন যায় না...”। রুম মিলল এবং রাত্রে মুগের ডাল, ঝুরঝুরে আলুভাজা আর ফুলকপি-আলুর তরকারি দিয়ে
একপেট গরম ভাত খেয়ে বড়ো শান্তি পেলাম। খাওয়ার পর মৌরি মুখে দিয়ে, আমরা দুই বন্ধু সদর
দরজায় দাঁড়িয়ে জলপাইগুড়ি শহরের শীতের নির্জন রাস্তার শোভা দেখছিলাম, ম্যানেজার মশাই
কাছে এসে বললেন, "ঘরে ঢুইক্যা শুইয়া পড়েন গিয়া, আধা ঘন্টা আগে, আপনাগো কলেজের চার জন
আইছিল, জিগাইছিল আমাগো কলেজের ছানা হেখানে কেউ আসে নাকি? আমি মিথ্যা কইরা কইলাম, না তো! আপনাগো অরা ছানা কয় নাকি? খি জ্বালাতন কন দিকি?’
মাস দেড়েক এইরকম সদা আতঙ্কময় বিভীষিকা সহ্যের পর ঘোষণা হল র্যাগিং
পিরিয়ডের সমাপ্তি আর ফ্রেশার্স ওয়েলকামের বহুল কাঙ্খিত দিন। আমরা হাঁফ ছেড়ে দিন গুনতে
লাগলাম। আর যেসব মর্বিড, বিকৃত সিনিয়ররা অসীম আনন্দ পাচ্ছিল র্যাগ করে, তারা দ্বিগুণ
উৎসাহে উঠে পড়ে লেগে পড়ল শেষ কটা দিনের সদ্ব্যবহার করার জন্যে।
সে যাই হোক যে কোন দুঃখ রাত্রির শেষে যেমন ঘটে যায় নূতন সূর্যোদয়,
ঠিক সে ভাবেই শেষ হয়ে গেল আমাদের র্যাগিং পিরিয়ড। এসে গেল ফ্রেসার্স ওয়েলকাম – নবীন
বরণ অনুষ্ঠানের দিন। অর্থাৎ ওইদিন আমরা সকলে ছানা থেকে পোনায় উত্তরিত হবো। সেদিন কলেজে
হাফছুটি, বিকেল থেকেই সাজসাজ হস্টেলে। রঙিন কাগজের শিকলি, আর কাগজের নানান ফুল দিয়ে
সেজে উঠতে লাগল হস্টেলের কমনরুম। কমনরুমের স্টিরিও রেকর্ড প্লেয়ারে চলছে উচ্চৈঃস্বরে
গান – সে আওয়াজে কান পাতা দায়।
সূর্য পাটে নামার আগেই শুরু হয়ে গেল নেশার আয়োজন। সেখানে তরল
আছে যেমন, তেমনই আছে শুষ্ক নেশার যোগাড়। যে যেমন রসের রসিক রসগ্রহণ করে রঙীন হয়ে উঠতে
কোন বাধা নেই। যারা অতিরিক্ত নেশায় স্খলিতচরণ অথবা বিগতচেতন, তাদের প্রতি সকলে সহানুভূতিসম্পন্ন
ও তারা বিশেষ আদরণীয়। বরং যারা ও রসে বঞ্চিত তারাই যেন অপাংক্তেয় এই অনুষ্ঠানে। কাজেই
হাই ভোল্টেজ গানের সুরে, মাতাল যুবকের উদ্দাম নৃত্য আর চিৎকার শুরু হল। শব্দ, দৃশ্য
আর গন্ধ দূষণের সে এক অদ্ভূত আয়োজন। পাকিস্তানের অনাবাসী ও লণ্ডন নিবাসী গায়িকা নাজিয়া
হাসানের হিট গান “ডিসকো দিওয়ানে এ এ এ, আহা, আহা...” গমগমে উচ্চস্বরে বাজতে লাগল বারবার,
লাগাতার। ্মাঝে মাঝে "বাংলায় ফিরে এস বাওয়া" ভাবনা থেকে বেজে উঠছিল, কিশোরকুমারের "ও আমার সজনি গো, কেন আছ দূরে দূরে..."।
রাত্রি সাড়ে নটায় হস্টেলের ডাইনিং হলে ঘন্টা বেজে উঠল। আজ স্পেশাল
মেনু, গ্র্যাণ্ড ফিস্ট। নিত্যদিনের খুব সাধারণ, স্বাদ-বর্ণ-গন্ধহীন রান্নার নিয়মরক্ষার
পরিবর্তে আজ একদম অন্যরকম ভূরি ভোজ আহারের বন্দোবস্ত। যে রন্ধনকারী আশ্চর্য নিপুণ দক্ষতায়
প্রত্যেকদিন স্বাদহীন ডাল ও তরকারি রান্না করত, আজ গ্র্যাণ্ড ফিস্টের দিনে সেই রন্ধনকারীই
এত উত্তম স্বাদের সব পদ কিভাবে পরিবেশন করত সেও কম আশ্চর্য ব্যাপার নয়।
গ্র্যাণ্ডফিস্টে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা এবার জড়ো হলাম হস্টেলের
সামনের মাঠে। পাশাপাশি দুটি হস্টেলে নবীনবর্ষের ছাত্রদের মধ্যে হবে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার
বিচারক আমাদের সিনিয়ররা - প্রতিযোগিতা শেষে সফল প্রতিযোগীকে দেওয়া হবে পুরষ্কার, তার
মাথায় তুলে দেওয়া হবে সেরার শিরোপা। প্রতিযোগিতার বিষয় – গালাগালি - চালু ভাষায় যারে
কয় খিস্তি। সেও সাধারণ নয়, সে গালাগালি হতে হবে একদম অভিনব এবং অশ্লীলতম – তবেই মিলবে
সেরার শিরোপা! রাত্রি এগারোটার পর কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়মিত পাওয়ার কাট হত তখন। এগারোটার
পরই শুরু হল সেই অদ্ভূত প্রতিযোগিতা – অন্ধকারে অন্ততঃ মুখগুলো দেখা যাবে না, কিছুটা
হলেও রক্ষা হবে চক্ষুলজ্জা!
এসব মিটে যাওয়ার পর হস্টেলের স্বাভাবিক ছন্দে অভ্যস্ত হতে লাগল
আমাদের জীবন যাত্রা। র্যাগিং পিরিয়ডের আতঙ্কের দিনগুলি পার করে এসে আমাদের উপলব্ধিতে
এলো এক আমূল পরিবর্তন। অনুভব করলাম এই মাস দেড়েকে অনেকটাই বদলে গিয়েছে আমাদের মানসিক
চরিত্র। আমাদের মুখের ভাষায় বাসা বেঁধেছে অশ্লীল লব্জ, অশ্লীল কথাবার্তা ও আলোচনায়
বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই আর!
সারা দিন রাত পরিবারের বাঁধনহীন সীমাছাড়া স্বাধীনতা। কার্যত
সে স্বাধীনতাও প্রায়শঃ উচ্ছৃঙ্খল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অনেকে সীমাহীন নেশায় আসক্ত হল।
কেউ কেউ আসক্ত হতে থাকল অসামাজিক ব্যাভিচারে। কয়েকজন আসক্ত হল নিরলস পাঠে। আর আমরা
আসক্ত হলাম নিরঙ্কুশ আড্ডা আর সিনেমায়, লেখাপড়ার সঙ্গে সংযোগ রইল নামমাত্র।
এর পরের পর্ব - " খাইদাই গানগাই "
Ragging period এ ক্যালানি তো অবশ্যই ছিল , তবে কোন কোন ক্ষেত্রে কেউ কেউ আবার যত্ন করে টিফিনও খাওয়াতো 😄
উত্তরমুছুনঠিকই বলেছ, সামান্য কয়েকজন থাকে বিকৃতমনস্ক, যারা অকারণ কেলিয়ে আনন্দ পায়, কিন্তু অধিকাংশই সুস্থ স্বাভাবিক মনুষ্যজনোচিত।
উত্তরমুছুন