এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের নবম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব "
২১
মহর্ষি
ভৃগু স্নান থেকে ফিরে নিজের আসনে এসে বসলেন। বেদব্রত, ধর্মধর এবং নবীন যুবক তাঁর
অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। মহর্ষি ভৃগু নবীন যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বৎস,
তোমার নাম কী? কোন গ্রামে তোমাদের বাড়ি, তোমার পিতার নাম কী?”
“মহর্ষি,
আমার নাম অর্চন, পিতা শমীক আর গ্রামের নাম বৈকণ্ঠপুর”। করজোড়ে নবীনযুবক বলল।
“তোমরা
ভাইবোন কয়টি?”
“আজ্ঞে,
আমরা চার ভাই, তিন বোন। আমিই মধ্যম। ভগিনীদের মধ্যে বড়ো ভগিনীর বিবাহ সম্পন্ন
হয়েছে, আর দুই ভগিনী বালিকা”।
“তোমার
পিতা সুস্থ এবং সক্ষম তো?”
“হ্যাঁ
মহর্ষি। তিনি এবং আমার মাতা দুজনেই আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করেছেন। দুজনেই
সুস্থ এবং সক্ষম”।
“অতি
উত্তম। তুমি কী জান, তোমাকে কেন এখানে আনা হয়েছে?”
“আজ্ঞে
আচার্য বেদব্রত এবং আচার্য ধর্মধর, আমার পিতাকে বলেছেন, রাজ্যের বিশেষ কোন
প্রয়োজনে আপনি যোগ্য লোকের সন্ধান করছেন। আমাকে যোগ্য বিচার করার জন্য আমার
পিতামাতা গর্বিত। অবশ্য আমার কোন বিশেষ গুণের জন্য তাঁরা আমায় যোগ্য বিচার করলেন,
সেটা আমি জানি না”।
“মানুষ
নিজের দোষ কখনোই বুঝতে পারে না। সামান্য কিছু গুণ থাকলেই বহু মানুষ নিজেকে
প্রতিভাধর মনে করে। আর গুণ থাকতেও যে নিজে বুঝতে পারে না, মনে রাখবে সেটাই তার বড়ো
গুণ, অর্চন”। স্মিত মুখে মহর্ষি আরো বললেন, “রাজ্যের কোন প্রয়োজনে তোমাকে আমরা
নির্বাচিত করেছি, সে কথা তুমি যথা সময়েই জানতে পারবে। কিন্তু এখন কোন কৌতূহল
প্রকাশ করবে না। তুমি এখন এই আশ্রমেই থাকবে। আচার্যগণ তোমাকে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ
অনুশীলন করাবেন। আমরা আশা করবো সেই শিক্ষা গ্রহণ করে, তুমি অতি দ্রুত নিজেকে
উপযুক্ত করে তুলবে”।
“আমি
চেষ্টা করবো, মহর্ষি”।
“খুব
ভালো। আরেকটা কথা অর্চন, তোমাকে তোমার গ্রাম, পিতা-মাতা, ভাই-বোন সকলকেই ভুলে
থাকতে হবে। তাঁদের কথা মনে করে, মন যেন দুর্বল না হয়ে পড়ে। এই আশ্রমে শিক্ষা ও
অনুশীলন সম্পূর্ণ করার পর, তোমার নতুন এক পরিচয় হবে। নতুন এক দায়িত্ব হবে, আর সেই
পরিচয়ে, তোমার অতীতকে ভুলে থাকতে হবে”।
মহর্ষির
এই কথায়, অর্চন অনেকক্ষণ মাথা নত করে চিন্তা করতে লাগল। যখন মাথা তুলল, তার দুই
চোখে জল, “মহর্ষি, পুত্র পিতা-মাতাকে ভুলে থাকতে হলে কী তাঁদের মঙ্গল হয়? না
পুত্রের মঙ্গল হয়?”
“না
অর্চন, সাধারণতঃ হয় না। কিন্তু তোমাকে ভুলে থাকতে হবে। তুমি যত তাড়াতাড়ি ভুলতে
পারবে, এই রাজ্যবাসীর ততই মঙ্গল হবে। তোমার গ্রাম, তোমার পিতামাতা, আমরা, এমন কী
তুমি নিজেও এই রাজ্যের বাইরে নও, অর্চন। তুমি সবার থেকে আলাদা, তুমি অসাধারণ,
তোমার ভুলে থাকাতেই আমাদের সকলের মঙ্গল হবে”।
বিশ্বপ্রভ আর ধরণী এই সময়ে কক্ষে ঢুকল সকলের আহার নিয়ে। দ্রুতহাতে পরিবেশণ করতে করতে বিশ্বপ্রভ বলল, “গুরুদেব, কাল আচার্য বেদব্রত যে মেয়েটিকে আশ্রমে এনেছেন, সেই কল্যাণী আপনার দর্শনপ্রার্থিনী। বাইরে অপেক্ষা করছেন”।
মহর্ষি
নিজে উঠে দাঁড়ালেন, দ্বারের সামনের গিয়ে দেখলেন, আশ্রমবালিকা নবনীতার সঙ্গে
অপরিচিতা এক কন্যা দাঁড়িয়ে আছেন। মহর্ষি বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, মা কল্যাণী?
ভেতরে এসো”। কল্যাণী এবং নবনীতা দুজনেই মহর্ষির চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করল। তারপর
মহর্ষি তাদের নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
“আসনে
বসো, মা। নবনীতা তুইও বোস। ধরণী তোমার আহার কম পড়বে না তো? ওদেরও আহার দাও। আহার
করতে করতে পরিচয়ের আলাপ সেরে নেওয়া যাক”।
ধরণী
বলল, “কম পড়বে না, গুরুদেব”। বেদপ্রভ ও ধর্মধরের প্রস্থানের পর থেকেই মহর্ষি
অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকতেন, আজ তাদের সুস্থ প্রত্যাবর্তনে এবং তাদের সঙ্গে আসা
তরুণ-তরুণীকে দেখে তিনি এখন দুশ্চিন্তামুক্ত এবং সন্তুষ্ট, তিনি হাসতে হাসতে
বললেন, “তুমিই আমাদের ধরে রেখেছ, ধরণী। তুমি না থাকলে, আমরা কবেই অধরা হয়ে আশ্রম
ছেড়ে পালাতাম”।
সকলেই
আহার শুরু করার পর, মহর্ষি বললেন, “কল্যাণী, তোমার বাড়ি কোথায়? পিতার নাম?”
নম্র
স্বরে কল্যাণী বলল, “আমার বাড়ি বৈকুণ্ঠপুর, পিতা ভদ্রক”।
“বৈকুণ্ঠপুর?
অর্চন আর তুমি একই গ্রামের অধিবাসী”?
“আজ্ঞে
হ্যাঁ, গুরুদেব। একই গ্রামের তো বটেই, দুজনে অভিন্নহৃদয়ও বটে”। আচার্য বেদব্রত
মুচকি হেসে বললেন। অর্চন ও কল্যাণীর লজ্জারুণ মুখের দিকে তাকিয়ে, মহর্ষি আনন্দে
হেসে উঠলেন, বললেন, “তোমরা তো অর্ধেক কাজ সেরেই ফেলেছ, বেদব্রত, ধর্মধর। এই বিষয়ে
আমি কিছুটা দুশ্চিন্তাতেই ছিলাম। ওদের বিবাহ প্রস্তাবে বর্ণ এবং কুল নিয়ে যদি কোন
দ্বন্দ্ব আসে! তবে ওদের দুজনের এই সম্পর্কে, উভয়ের বাড়ি থেকে কোন আপত্তি নেই তো?”
“আজ্ঞে
না, গুরুদেব, আপত্তি নেই, বরং সম্মতি আছে। আগামী অগ্রহায়ণে ওদের বিবাহের দিন স্থির
হয়েছে। শরতের মাঝামাঝি উভয়ের পিতাই আপনার দর্শনের অনুমতি চেয়েছেন, তাঁরা আশ্রমে
এসে ওদের নিয়ে যাবেন”।
এই
কথায়, মহর্ষি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, অর্চন তাঁর মুখের দিকেই তাকিয়েছিল, মহর্ষি তার
মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিবাহ ওদের হবে। কিন্তু সেই শুভলগ্ন আমরা স্থির করবো। কার্তিকী
পূর্ণিমার পূর্বে ওঁদের সপরিবারে আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানিও এবং আশ্রমবাসের সাদর
আয়োজন রেখো। বেদব্রত, বিশ্বপ্রভ ও ধরণী, এ দায়িত্ব তোমাদের, ভুলো না”।
বেদব্রত
বললেন, “ভুলবো না, গুরুদেব”।
আহারের
পর সকলের আচমন হয়ে যাওয়ার পর, মহর্ষি সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই আশ্রমে
অর্চন ও কল্যাণী কয়েকমাস থাকবে। আমাদের দায়িত্ব ওদের থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করা।
আশ্রমের আচার্যগণ যেমন যেমন বলবেন, সেই অনুসারে ওদের শিক্ষা ও অনুশীলনের ব্যবস্থাও
আমাদের করতে হবে। অর্চন ও কল্যাণী, তোমরা বন্দী নও ঠিকই, কিন্তু আশ্রমের সর্বত্র
তোমাদের অবাধ গতিবিধি আমার কাম্য নয়। কারণ আমি চাই না, তোমাদের দুজনকে আশ্রমের
ভেতরে, বাইরে সকলে চিনে ফেলুক। এই কয়েকটা মাস, তোমাদের উভয়ের মধ্যে গোপনে, আড়ালে
কিংবা সর্বসমক্ষে সাক্ষাৎ হোক, এও আমার কাম্য নয়। তোমাদের আবাস আলাদা, তোমাদের পাঠ
আলাদা। আচার্যগণ যেমন যেমন নির্দেশ দেবেন, সেই অনুসারেই তোমাদের চলতে হবে”। একটু
থেমে থেকে মহর্ষি আবার বললেন, “আমার বক্তব্য আশা করি সকলেই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছ?”
সকলে
মাথা নেড়ে সম্মতি দেওয়ার পর, মহর্ষি বললেন, “ধরণী ও নবনীতা, তোমরা ওদের নিয়ে যাও। বিশ্বপ্রভ তুমি আচার্যদের
বার্তা দিও, বলো, আজ সন্ধ্যায় আমার কক্ষে, আমি সকলের সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় থাকবো”।
সকলেই মহর্ষিকে প্রণাম করল। বিশ্বপ্রভ বলল, “সকলকেই বার্তা দেব, গুরুদেব”।
দ্বারের
দিকে বেরিয়ে যেতে গিয়েও অর্চন আবার ফিরে এল, বলল, “আমি কী আর একবারের জন্যেও
বাড়িতে ফিরতে পারবো না, মহর্ষি”? তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মহর্ষি
বললেন, “আমার তেমনই ইচ্ছা, অর্চন। বিষণ্ণ হয়ো না, ধৈর্য ধরো, যা হবে মঙ্গলই হবে”।
আর কিছু না বলে, ধীর পায়ে অর্চন মহর্ষির কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ওরা
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর, মহর্ষি, বেদব্রত ও ধর্মধরকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “তোমরা
অসাধ্য সাধন করেছো, বৎস ধর্ম ও বেদ। বাস্তবে এমন সর্বসুলক্ষণ ছেলে যে পাওয়া যাবে,
তাও আমাদেরই রাজ্যে, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। কন্যার কিছু কিছু লক্ষণ সু নয়, কিন্তু
সেটুকু এখন আর ধর্তব্য হবে না, কারণ ওদের বিবাহ পূর্ব নির্ধারিত! আমাদের সমাজে
অসবর্ণ বিবাহে ঘোরতর আপত্তি আছে, অতএব এক্ষেত্রে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেল”।
দুজনেই
মহর্ষিকে প্রণাম করলেন, বললেন, “এ সবই আপনার কৃপা গুরুদেব, আপনার শিক্ষা আর
আশীর্বাদের ফল”।
মহর্ষি
মৃদু হাসলেন, বললেন, “তোমরা উভয়েই দীর্ঘদিন গৃহের বাইরে, এখন বাড়ি যাও, সেখানে
সকলেই তোমাদের জন্য অধীর প্রতীক্ষা করছেন। পক্ষকাল পরে তোমরা ফিরে এসো, আমাদের
অনেক কাজ বাকি আছে। নবীন রাজার অভিষেকের জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে”।
২২
সন্ধেবেলা
মহর্ষি ভৃগুর কক্ষে আজ জরুরি মন্ত্রণার আহ্বান। সন্ধ্যা আরতির পর গায়ত্রী জপ সেরে
আচার্যরা একে একে উপস্থিত হলেন তাঁর কক্ষে। মহর্ষি ভৃগু সকলের অপেক্ষায় নিজ আসনে
বসেই ছিলেন। স্মিতমুখে তিনি সকলের প্রণাম গ্রহণ করলেন, সকলকে আশীর্বাদ করে,
নমস্কারও করলেন। সকলে আসন গ্রহণের পর, তিনি বললেন, “এই বর্ষা ঋতুতে সকলের শারীরিক
কুশল তো? বৎস, বিশ্ববন্ধু তোমার কাছে পীড়িতের আনাগোনা বাড়ছে, না কমছে? সেই অনুযায়ী
আমাদের সকলের স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি অনুমান করা সম্ভব”।
“না
গুরুদেব, এই সময়ে উদরাময় এবং জ্বরজারির মতো কিছু সাধারণ অসুখের প্রকোপ একটু
বাড়লেও, আমাদের ব্যস্ততা বাড়ে, শরত আর হেমন্তে। ঋতু পরিবর্তনের সময় শারীরিক
অসুস্থতা বাড়ে, বাড়ে নানান জটিলতাও। আপাততঃ আশ্রমবাসী এবং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের
শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক, মোটেই উদ্বেগজনক নয়।”
“অতি
উত্তম, বিশ্ববন্ধু। ওদিকে প্রাসাদে রাজাবেণের কী অবস্থা? সর্বশেষ সংবাদ কী?”
“রাজাবেণের
শারীরিক অবস্থা এখন অনেকটাই স্থিতু গুরুদেব, সংকট কেটে গেছে। তবে তিনি আগের মতো
সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে”।
“কী
রকম?”
“তিনি
জীবিত থাকবেন, কিন্তু কোনদিনই কর্মক্ষম হতে পারবেন না। হাত-পা ইত্যাদি কর্মের
ইন্দ্রিয়, অবশ থাকবে। দেখতে শুনতে পারবেন, কিন্তু কথা বলতে পারবেন না। তাঁর
মস্তিকের কোন কোন অংশ অসাড় হয়ে পড়াতেই এই বিপত্তি”।
“মহারাণী
সুনীথাকে এ কথা বলেছেন?”
“বলেছি,
গুরুদেব। তিনি সব শুনে কেঁদেছেন ঠিকই, কিন্তু বেশ স্বস্তিও পেয়েছেন মনে হল”।
আচার্য
বিশ্ববন্ধুর এই কথায় কেউ কোন কথা বললেন না, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন,
জিজ্ঞাসু চোখে। আচার্য বিশ্ববন্ধু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহারাণি
পুত্রকে অন্ধ স্নেহ করেন এবং মাতা হিসাবে পুত্রের জীবনাবসান তাঁর কাছে অভিপ্রেত
নয়। অতএব রাজা বেণের জীবন সংশয় না থাকাতে তিনি অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছেন! কিন্তু
অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত রাজাবেণের নানান কীর্তি, তাঁর মনকে সর্বদাই অনুশোচনায়
দগ্ধ করত। রাজা বেণের এই অসুস্থতার পর, মহারাণি নিজে রাজ্য পরিচালনা করাতে রাজ্যে
আবার সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আতঙ্কিত প্রজারাও আবার রাণি সুনীথার উপর
আস্থা রাখতে শুরু করেছে। এমন কী যে রাজা বেণের প্রতি তাদের চরম বিতৃষ্ণা ছিল, তাদের
সেই মনোভাবও আজ প্রশমিত। তারা এখন রাজাবেণের সুস্থতা কামনা করে, মন্দিরে আরাধনা
করে! সব মিলিয়ে মহারাণি এখন, সুখে না থাকলেও, স্বস্তিতেই আছেন”।
“ঠিকই
বলেছো, বিশ্ববন্ধু, সকল রাজ্যবাসীদের মতো আমরাও সকলে স্বস্তি পেয়েছি”।
আচার্য
সুনীতিকুমার মহর্ষির এই কথায় বললেন, “গুরুদেব, সেক্ষেত্রে আমাদের ওই রাজা বদলের আর
কোন প্রয়োজন রয়েছে কি? আমরা খুশী, সকল রাজ্যবাসী খুশী, মহারাণি নিজেও স্বস্তিতে।
এই শান্তির পরিস্থিতিতে অকারণ চাঞ্চল্য সৃষ্টির চিন্তা হঠকারি সিদ্ধান্ত না হয়ে
যায়”।
মহর্ষি
ভৃগু সকল শিষ্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের সকলেরই কী তাই মত,
বৎস”?
আচার্য
রত্নশীল বললেন, “বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করলে, আচার্য সুনীতিকুমারের প্রস্তাব
যুক্তিযুক্ত। আমরা সকলেই এই রাজ্যে এই স্বস্তিটুকুই চেয়েছিলাম, আমাদের মনে হচ্ছে,
আমরা সেই উদ্দেশ্যে সফল হয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা বিচার করলে, এই পরিস্থিতি
স্বস্তিদায়ক নয়। মহারাণির বয়স হচ্ছে, মহারাজ অঙ্গের মহামন্ত্রী, অমাত্য, নগরপাল
সকলেই বৃদ্ধ, তাঁদেরও বয়েস বাড়ছে। আমরা এই শান্ত পরিস্থিতির সুযোগে, যদি নবীন
রাজাকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে ফেলতে পারি, তাঁর পক্ষেও রাজ্য পরিচালনার সব দিক
বুঝে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। কী বলেন, আচার্য রণধীর?”
আচার্য
রণধীর বললেন, “আমিও তোমার সঙ্গে একমত রত্নশীল। শান্তির সময় অলস বসে থেকে, অসময়ের
অপেক্ষা করা, আমাদের উচিৎ নয়। আমরা জীর্ণ একটি গৃহের সংস্কার করে, কাজ চালাচ্ছি
মাত্র। এইটুকুতে সন্তুষ্ট থেকে, যখন ঝড় হবে, তখন যা হোক কিছু করা যাবে, এমন ভাবনা
আমার মনঃপূত নয়”।
এরপর
সকলেই আচার্য রত্নশীল ও রণধীরকে সমর্থন করলেন। আচার্য সুনীতিকুমারও বললেন, “হুঁ,
সে কথা ঠিক। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে, নতুন রাজা আমাদের চাই”।
এবার
মহর্ষি ভৃগু বললেন,
“তাহলে
এই ব্যাপারে আমরা সকলেই একমত, ভবিষ্যতের স্বস্তির জন্য, আমাদের এখনই নতুন রাজা
চাই। বৎসগণ, তোমরা সারাদিনে নিশ্চয়ই জেনে গেছো, গতকাল নৈশাহারের সময়, বেদব্রত ও
ধর্মধর দুটি ছেলেমেয়েকে আশ্রমে নিয়ে এসেছে। আজ সকালে আমি তাদের দুজনকেই সাক্ষাৎ
করেছি, আলাপ-পরিচয় করেছি। বেদব্রত এবং ধর্মধরকে আমরা যে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সে কাজ
তারা অত্যন্ত সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেছে। নবীন যুবক, যার পূর্বাশ্রমের নাম অর্চন,
সুপুরুষ, বিনীত এবং সনাতন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাদের কাজ এখন থেকে শুরু হবে।
অর্চন, যিনি হবেন আমাদের রাজা পৃথু তাঁকে সকলে মিলে শিক্ষা ও অনুশীলনে, রাজ
সিংহাসনের যোগ্য বানিয়ে তুলতে হবে। বৎস রণধীর তুমি তাকে শেখাবে অস্ত্রচালনা আর
রণবিদ্যা, বৎস সুনীতিকুমার তুমি শেখাবে রাষ্ট্রনীতি এবং কূটনীতি। বৎস রত্নশীল,
তোমার দায়িত্ব, বাণিজ্য এবং রাজ্যের অর্থনীতি সম্পর্কে যতটা সম্ভব তাকে অবহিত করে
তোলা। আমাদের হাতে আছে তিনটি মাত্র মাস। এত কম সময়ে সর্ব বিদ্যায় সে পারঙ্গম হয়ে
উঠবে, এ বিশ্বাস আমি করি না। আমাদের সে প্রয়োজনও নেই, আমরা তাকে পণ্ডিত করে তুলতে
চাইছি না। তবে মন্ত্রী ও অমাত্যদের তাত্ত্বিক আলোচনার সময়, কোন বিষয়ই তার কাছে
দুর্বোধ্য হয়ে উঠুক, সেটাও আমি চাই না”।
আচার্য
সুনীতিকুমার জিজ্ঞাসা করলেন, “এই নবীন যুবক কী কোন ব্রাহ্মণ পুত্র? অথবা ক্ষত্রিয়,
বণিক কিংবা শূদ্র পুত্র?”
“সে
কথা আমি তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, বৎস, সুনীতিকুমার। তোমরা জিজ্ঞাসা করে নিও। তবে আমার
কাছে এই বর্ণবিচার জরুরি নয়। শূদ্র হয়েও সে যদি যোগ্য হয়, আমি সাগ্রহে তাকে রাজার
সম্মান দিতে প্রস্তুত। আমি তাকে বলেছি, তার সমস্ত অতীত তাকে ভুলতে হবে। তার গ্রাম,
পিতামাতা, আত্মীয় পরিজন সকলকেই ত্যাগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এই বর্ণভেদের পিছুটান
তার থাকবে না, সে হবে একক, মৌলিক এবং স্বয়ম্ভূ। সে এখন যাই হোক, সফল রাজার
যোগ্যতায় সে ক্ষত্রিয়ত্ব অর্জন করবে। আমার কাছে সেটাই বড়ো কথা”।
“আপনি
যে কন্যার কথা বলেছিলেন, যিনি রাজা পৃথুর রাণি অর্চ্চি হবেন”?
“হ্যাঁ
সে কন্যাও এখানে উপস্থিত। দৈববশে সে অর্চনের গ্রামেরই কন্যা। শুধু পরিচিতা নয়, একে
অপরের প্রতি আসক্ত। কন্যার নাম কল্যাণী। কল্যাণী ও অর্চন - উভয়ের বাড়ি থেকেই ওদের
এই সম্পর্কের অনুমোদন আছে। তারা আগামী অগ্রহায়ণে ওদের পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করার
সিদ্ধান্ত নিয়েছে”।
“তার
অর্থ এই নবীন যুবককে আমাদের রাজার পদে, আপনি অভিষেকের জন্য অনুমোদন করছেন?”
“করছি,
বৎস সুনীতিকুমার”।
আচার্য
রণধীর বললেন, “আপনার নির্দেশ অনুসারে, অর্চনের শিক্ষার জন্য আমাদের সকলে মিলে একটি
প্রাত্যহিক শিক্ষাসূচী প্রস্তুত করতে হবে। সকাল ও দ্বিপ্রহর, বৈকাল ও সন্ধ্যা – এই
চারটি সময়ে তার শাস্ত্রচর্চা এবং রণচর্চার বিভাগ তৈরি করতে হবে”।
“ঠিক
বলেছ, বৎস রণধীর। আমার প্রস্তাবে সকালে ও বৈকালে যদি শরীরচর্চা ও অস্ত্র চালনা
শিক্ষা করাও, ওর পক্ষে সুবিধা হবে। কিছুটা বিশ্রামের পর দ্বিপ্রহরে এবং সন্ধ্যায়
শাস্ত্রচর্চা। দ্বিপ্রহরে বাণিজ্য ও অর্থনীতি এবং সন্ধ্যায় রাষ্ট্রনীতি। সমস্ত
বিষয়গুলিকে এইভাবে ভাগ করে নিতে পারো। শুরুর দিকে সহজ কথায় সহজ তত্ত্ব শিক্ষা,
তারপর ধীরে ধীরে কঠিন তত্ত্বের আলোচনা। অবশ্য সবটাই নির্ভর করবে অর্চনের শিক্ষা
গ্রহণের আগ্রহ এবং ওর বুদ্ধিমত্তার ওপর”।
“যথার্থ
বলেছেন, গুরুদেব, শিক্ষার্থীর আগ্রহ ছাড়া কোন শিক্ষাই সফল হতে পারে না”।
“অর্চনের
যদি শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ ও মেধা না থাকে?” আচার্য সুনীতিকুমার বললেন।
মহর্ষি
ভৃগু মৃদু হেসে বললেন, “শিক্ষায় খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেই আমাদের মঙ্গল, বৎস
সুনীতিকুমার। বেশি তত্ত্ব জানলে পাণ্ডিত্য আসে, কাজের ইচ্ছা চলে যায়। অন্য কেউ কাজ
করতে চাইলে, তত্ত্বের বিতর্ক তুলে পণ্ডিতেরা কাজে বাধা সৃষ্টি করে। নিজে তো কোন
কাজ করেই না, অন্যের ভুল ধরতেই তারা ব্যস্ত থাকে”।
“গুরুদেব,
আত্মসমলোচনায় আপনি কী বড্ডো কঠোর হয়ে উঠছেন না?”
অট্টহাস্যে হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “বৎস সুনীতিকুমার, যে কোন রাজ্যের প্রজাসাধারণই সেই রাজ্যের প্রশাসনের অন্নদাতা। এমনকি সামান্য এই আশ্রমেরও পঠনপাঠনসহ সামগ্রিক ব্যয়ভার বহন করে সহস্র গ্রামবাসী, তাদের কঠোর পরিশ্রমের মূল্যে। এর পরিবর্তে আমরা ওই গ্রামবাসীদের কী প্রতিদান দিই বলো তো? এখন একটা সুযোগ এসেছে, আমরা যদি একজন প্রজাপিতা রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে এই রাজ্যে সুশাসন এনে দিতে পারি, তাতেই এই সরল সাধারণ গ্রামবাসীদের দানের কিছুটা প্রতিদান দেওয়া হবে”।
“কিন্তু
এই রাজাও যদি ব্যর্থ হয়? ঠাকুর গড়তে গিয়ে যদি এই যুবকও বাঁদর হয়ে ওঠে”?
“হতে
পারে, তেমন হলে হতাশই হবো। কিন্তু তাতেও একটা সান্ত্বনা তো থাকবেই, আমরা নিশ্চেষ্ট
বসে থাকিনি, আমাদের সাধ্যমতো এবং বিবেকবুদ্ধি অনুসারে চেষ্টা করেছিলাম। তোমরা মনে
কোন দ্বিধা না রেখে, আগামীকাল থেকেই অর্চনের শিক্ষা শুরু করো”।
“না,
না, শিক্ষা তো সে পাবেই। আজই রাত্রে আমরা সকলে বসে, তার শিক্ষাক্রম এবং পদ্ধতি
নির্দিষ্ট করে ফেলবো, আগামীকাল থেকেই তার পাঠ শুরু হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আপনি
নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি শুধু এই কাজের সম্ভাব্য ফলাফলের আলোচনা করছিলাম, গুরুদেব”।
“অতি
উত্তম, বৎস। আমার আরেকটি প্রস্তাব আছে। প্রতি সপ্তাহে অর্চন কতটা শিক্ষা গ্রহণ
করতে পারলো, সেটা পর্যালোচনা করে নিও। প্রয়োজন মনে করলে, পরবর্তী সপ্তাহের
পাঠক্রমে পরিবর্তন করে নিতে পারবে”।
“তাই
হবে, গুরুদেব”।
“বৎস
সুনন্দ, এবার তোমার কাজ কতদূর এগিয়েছে বলো”।।
“গুরুদেব,
চারণ কবিদের গাওয়ার মতো বেশ কিছু গান রচনা করেছি, সুরও দিয়েছি। আপনার অনুমোদন
পেলে, সে সব গান আমি চারণকবিদের কণ্ঠে তুলে দেব। আপনি যখন থেকে বলবেন, তারা গ্রামে
শহরে ছড়িয়ে পড়ে, দেশের মানুষকে সেই সব গান শোনাতে থাকবে”।
মহর্ষি
ভৃগু আচার্য সুনন্দর মুখের দিকে প্রসন্নমুখে তাকিয়ে স্মিত হাস্যে বললেন, “বাঃ। দু একটা গান আমরাও সকলে
শুনি না, সুনন্দ। আমাদের তাত্ত্বিক মনে কেমন ঝংকার তোলে দেখি”।
এর পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন