এর আগের রম্যকথা পাশের সূত্রে - " ছিন্ন শিকল পায়ে "
রুদ্র সুন্দর
এক একটা সেমেস্টার শেষ হলেই, আমরা তিন চারজন বেরিয়ে পড়তাম ভ্রমণে। না-খাওয়া ব্রেকফাস্ট আর টিফিনের পয়সা সঞ্চয় করা সামান্য পুঁজি নিয়েই প্রত্যেকবার বেরিয়ে পড়তাম এক এক জঙ্গলে। এভাবেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উত্তরবঙ্গের পাহাড় ঘেরা, তিস্তা-তোর্সা আর তাদের অজস্র শাখা নদী অধ্যুষিত গহন জঙ্গলের। যার সামগ্রিক নাম ডুয়ার্স অথবা বাংলার তরাই - হাসিমারা, গরুমারা, মাল, ধুপগুড়ি, লাটাগুড়ি, বিন্নাগুড়ি, চালসা, মাদারিহাট...। শাল, শিরীষ, শিমূল আর সেগুনের গহন জঙ্গল আর বর্ষায় গজিয়ে ওঠা নিবিড় গজ-তৃণের (Elephant grass) ঘন সবুজের সমারোহ! আশ্চর্য এক নেশায় আপ্লুত করে রাখত আমাদের।
আমাদের
আরও এক নতুন নেশা জুটেছিল - পাহাড়ের নেশা। দারজিলিং,
কালিম্পং এবং সিকিমের অন্তহীন পাহাড়শ্রেণীর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম – পরীক্ষা শেষ
হলেই যেন বেরিয়ে পড়ার ডাক আসত।
একবার
মনে আছে হস্টেল থেকে বেরিয়ে পরীক্ষা হলে ঢোকার মুখে আমরা দুই বন্ধু হঠাৎ ঠিক করে
ফেললাম এ পরীক্ষাটা আর দেব না। পঞ্চাশ নম্বরের তিনটে ইন্টারন্যাল অ্যাসেসমেন্ট হত
আমাদের – বেস্ট অব টু থেকে গড়নাম্বার যোগ হত এক্সটারনাল সেমিস্টারের মার্কসের
সঙ্গে। আগের দুটো পরীক্ষায় আমাদের ৪৭/৪৮ মার্কস তোলা ছিল, থার্ড পরীক্ষাটা আর দিতে
ইচ্ছে হল না। কারণ কলেজে ঢোকার মুখে আমাদের চোখে পড়ল উত্তর দিকে ঘন কালো পুঞ্জীভূত
মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে। আকাশজুড়ে জমে ওঠা শ্যামল জলদরাশির সে কি অপরূপ রূপ! তার
সঙ্গে এলোমেলো শীতল জলো হাওয়া। তুমুল বর্ষার পূর্বাভাস!। মনে হল এমন দিনে পরীক্ষা
হলে বসে পঞ্চাশে ঊণপঞ্চাশ তোলার চেষ্টা করার কোন মানে হয় না।
বিন্দুমাত্র
দ্বিধা না করে আমরা কলেজ মোড়ের হাইওয়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা আর বাড়ির বাণ্ডিল
কিনে উঠে পড়লাম বাসে। সরকারি বাস – যাবে ময়নাগুড়ি। একটু যাবার পরেই প্রবল বৃষ্টি
আরম্ভ হয়ে গেল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগান আর জঙ্গল। মাথার ওপর ঘন
কালো নিশ্ছিদ্র নিরেট মেঘ। সুদীর্ঘ তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে যাবার সময় - তুমুল বৃষ্টি আর এলোমেলো হাওয়ায় কেঁপে উঠছিল
বাসটা। ব্রিজের নীচে বিস্তীর্ণ নদীর চরে অঝোরে বৃষ্টির সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে
বয়ে যাচ্ছিল তীব্র স্রোতস্বিনী তিস্তা – ত্রিস্রোতা। প্রকৃতির এমন বিস্তার – এমন
অসহায় বিপুল নিবিড় রূপ কোনদিন অনুভবেই ছিল না আমার। কলকাতায় বসে এমন অনুভব কোনদিনই
হতে পারেনি ... “জম্বুপুঞ্জে শ্যাম বনান্ত, বনবীথিকা ঘনসুগন্ধ। মন্থর নব নীল নীরদ
– পরিকীর্ণ দিগন্ত...চিত্ত মোর পন্থহারা কান্তবিরহ কান্তারে, নীলাঞ্জনছায়া...”।
নেশাগ্রস্ত
দৃষ্টিতে আমরা তাকিয়ে রইলাম জানালার বাইরে। বাসের ছাদ ও জানালার ফাঁক থেকে ঝরে পড়া
জলধারায় ভিজতে লাগলাম। ঘন মেঘের দুর্যোগে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল অসময়ে। “রুদ্রবেশে কেমন
খেলা, কালো মেঘের ভ্রূকুটি! সন্ধ্যাকাশের বক্ষ যে ওই বজ্রবাণে যায় টুটি। সুন্দর
হে, তোমার চেয়ে ফুল ছিল সব শাখা ছেয়ে, ঝড়ের বেগে আঘাত লেগে ধুলায় তারা যায় লুটি”।
রুদ্র
সুন্দরের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল মন – সে নেশা থেকে কোনদিনও আর মুক্তি মেলে নি এ
জীবনে।
অধরা
অসীম
একবার
আমাদের পরিকল্পনা হল ট্রেক করে সিকিমের জোংরি যাবার। গেজিং পর্যন্ত বাসরুট আছে,
আমরা দারজিলিং থেকে রওনা হয়ে বাসে গেজিং পৌঁছে গেলাম আগের দিন বিকেলবেলা। পরেরদিন
সকাল ছটার সময় আমাদের পদযাত্রা শুরু হল। প্রায় ছাব্বিশ কিলোমিটার যাত্রার পর
পেমিয়াংসি যখন পৌঁছলাম সূর্য তখন মধ্যগগনে। এতটা পথের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বসতি চোখে
পড়েছিল কিন্তু সেখানে কোথাও তৃষ্ণা নিবারণের বিশ্বস্ত জল এবং কোন খাবারের সন্ধান
আমরা পাইনি। সে সন্ধান পাওয়া গেল পেমিয়াংসিতে। খুবই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। একটি
মাত্র দোকান। সে দোকানে সব কিছু মেলে চাল ডাল নুন তেল জামা কাপড় থেকে মায়
পোষ্টকার্ড, লিফাফা পর্যন্ত! সে দোকানে পাওয়া গেল হাতে বানানো গোল গোল পাঁউরুটি আর
দেশি কলা। সঙ্গে ড্রাম ভর্তি জল – মগ ডুবিয়ে যত খুশি পান করা যায়, ঝর্ণার বিশুদ্ধ
জল। বীভৎস খিদে আর তৃষ্ণার সময় আমরা সকলে প্রাণ ফিরে পেলাম বলা যায়।
পেমিয়াংসির
দোকানে জানা গেল এখানে রাত্রিবাসের কোন ব্যবস্থা নেই, সে ব্যবস্থা হতে পারে
একমাত্র ইয়াকসামে। ইয়াকসাম এখান থেকে প্রায় চৌত্রিশ কিলোমিটার। সন্ধের আগে সেখানে
পৌঁছতে না পারলে সমূহ বিপদ! ইয়াকসাম একটু বড়ো জায়গা – কিন্তু পাহাড়ি গ্রাম বলে
সন্ধের পর সব বন্ধ হয়ে যায়। যাবার পথে অনেকটাই জঙ্গল – সন্ধের মুখে ভালুকের
উপদ্রবও নাকি প্রায়শঃ শোনা যায়! কাজেই আমরা এতটুকু বিলম্ব না করে যেন বেরিয়ে পড়ি
ইয়াকসামের উদ্দেশে। পেমিয়াংসির দোকানদার আমাদের আরো পরামর্শ দিল যতক্ষণ আলো আছে
ততক্ষণ “চোরা বাটো” ধরে পথ চলার – তাতে সময় বাঁচবে অনেক। “চোরা বাটো” মানে
পাকদণ্ডী রাস্তা নয়, পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলা পথ – স্থানীয় লোকেরা যে পথ নিত্য
ব্যবহার করে শর্টকাট হিসেবে।
তার
উপদেশ মতো আমরা “চোরা বাটো”তে চলা শুরু করলাম। ঘন্টা তিনেক চলার পর কতটা পথ এলাম
জানা নেই, কিন্তু সূর্য ঢলে পড়ল পিছনের পাহাড়ের আড়ালে, চট করে নেমে এল বিকেল। পথের
পাশে জনবসতি খুব কম। আধঘণ্টা, একঘণ্টা
চলার পর দু চারখানা ঘরের ক্বচিৎ বসতি চোখে পড়ে। এরকমই এক বসতির লোককে জিগ্যেস
করাতে তারা চমকে উঠল আতঙ্কে। পথে ভালুকের হাত থেকে আমরা যদি পরিত্রাণ পেয়েও যাই,
রাত দশটার আগে ইয়াকসাম পৌঁছনোর কোন সম্ভাবনাই নেই, সেক্ষত্রে...।
সেক্ষেত্রে
কি সেটা উহ্য রাখলেন স্থানীয় ভদ্রলোক। তাঁর না বলা কথা আমাদের বুঝতে এতটুকুও
অসুবিধে হল না। তিনি উপদেশ দিলেন – চোরা বাটো আর নয় – রাতের অন্ধকারে সে পথ
হারানোর সমূহ সম্ভাবনা, তার চেয়ে ভালো সোজা পথ। তিনি নিজে আমাদের সঙ্গে এসে উঠিয়ে
দিলেন সোজা পথের ওপর আর ইয়াকসামের দিক নির্দেশ করে দিয়ে বললেন – যত দ্রুত সম্ভব
পথচলার।
পাহাড়ি
পথে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে এসে গেল হুড়মুড়িয়ে। তার সঙ্গে বাড়তে লাগল হিমের পরশ –
ফুলস্লিভ সোয়েটারের ভিতরেও কেঁপে উঠতে লাগল আমাদের বুক! অদ্ভূত নিরেট ঘন অন্ধকারের
মধ্যেও আমরা হেঁটে চলতে লাগলাম দ্রুত। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ আমাদের হাঁটার শক্তি
তখন প্রায় শেষ। ক্লান্তির ভারে
সমস্ত শরীর তখন আড়ষ্ট। খিদে তেষ্টার অনুভূতিও মরে গিয়ে – তখন একমাত্র চিন্তা একটা
নিরাপদ আশ্রয়ের! ঠিক তখনই চোখে পড়ল – কয়েকটা ম্লান আলো। ম্লান হলেও – আলো – তার
মানেই মানুষের বসতি! আমাদের নির্জীব শরীরেও প্রাণ এল আবার – হাঁটার বেগ বেড়ে গেল। যে শরীর প্রায় জবাব দিতে বসেছিল – বাকি
থাকা সমস্ত শক্তিটুকু সঞ্চারিত হল আমাদের দুই পায়ে। পৌঁছতেই হবে ওই গ্রামে – যেখানে আছে লোকালয় – যেখানে মিলতে পারে মাথার
ওপর একটা ছাদ, একটা যেমন তেমন বিছানা। যার উপরে বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে এই ক্লান্ত
শরীরগুলো। খাবার কিছু পেলে ভালো – না পেলেও ক্ষতি নেই!
প্রায়
আধঘণ্টা পর গ্রামের শুরুতেই যে বাড়ির ভেতর থেকে আলো আসছিল, সে বাড়িতেই বন্ধ দরজায়
আমরা ধাক্কা দিলাম। বেরিয়ে এলেন এক মহিলা, দুচোখে তাঁর অবিশ্বাস আর বিস্ময়।
রাতটুকু থাকার জায়গা চাই শুনে তিনি মাথা নাড়লেন। তারপর ডাক দিলেন বাড়ির ভিতরে।
একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন – তিনিই মহিলার স্বামী আর এলেন এক বৃদ্ধা – মহিলার
শ্বাশুড়ি। পিছনে দুজন বালক ও একজন বালিকা। সকলেরই চোখে বিস্ময়। জীবনের সুদীর্ঘ
অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ বৃদ্ধার মুখে অজস্র ভাঁজ, কিন্তু চোখে সহজ সহানুভূতির আলো। তিনি
বললেন – থাকার ব্যবস্থা হতে পারে কাছেই স্কুলের বোর্ডিংয়ে। ছেলেকে বললেন
হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্যে। থাকার ব্যবস্থা হতে পারে শুনে কিছুটা
নিশ্চিন্ত আমরা এবার জিজ্ঞেস করলাম খাবার পাওয়া যাবে কিনা? বৃদ্ধা হাসলেন – বললেন
ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলে মিলবে ভাত আর ডিমের তরকারি! তারপর দরজা খুলে দিয়ে আমাদের
সকলকে বসতে দিলেন খাবার ঘরে। অসমান কাঠের সঙ্কীর্ণ বেঞ্চে, অসমান কাঠের টেবিলে।
আমরা বসে পড়লাম, শুধুমাত্র বসতে পাওয়াতেও যে কি আরাম!
মিনিট
পনের পর মহিলা চিনেমাটির বড়ো বৌলে প্রত্যেকের জন্যে ভীষণ গরম কিছু একটা পানীয় নিয়ে
এলেন। বললেন - চিয়া। আচ্ছা হ্যায়। পিকে দেখিয়ে আচ্ছা লাগেগা। চিয়া মানে চা। কিন্তু
চেহারাতে বা গন্ধে আমাদের চেনা চা বলে মনে হল না। চায়ের মধ্যে দুধ নেই, চিনি আছে
খুব সামান্য। চেনা গন্ধের মধ্যে এলাচ আর তেজপাতার গন্ধ পেলাম, আর কি ছিল জানা নেই।
খুব যে স্বাদ পেলাম তা নয়, কিন্তু পানীয়টা শেষ করে অনুভব করলাম অদ্ভূত এক মানসিক
স্থিতি। সারাদিনের পথশ্রমের অসহ্য ক্লান্তিটা বেশ সহনীয় হয়ে উঠল। আজকের ভাষায়
বললে, সে এক আশ্চর্য এনার্জি ড্রিংক। উপাদান ছিল সবুজ চা, সামান্য মাখন, সামান্য
চিনি, সঙ্গে ছোট এলাচ, তেজপাতা আরো কিছু গাছগাছড়ার পাতা – যার নাম সেই মহিলা
বলেছিলেন, আজ আর মনে নেই।
ঘন্টা
খানেক পরে গরম ভাতের সঙ্গে আলু আর সেদ্ধ ডিমের গরম ঝোল এক পেট করে খেয়ে সীমাহীন
তৃপ্তি অনুভব করলাম আমরা সকলে। অমৃতের স্বাদ কোনদিন পাইনি – পাওয়ার ইচ্ছেও আর তেমন
রইল না। অসংখ্য ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা রওনা হলাম নিকটবর্তী স্কুলের দিকে
– যেখানে আমাদের শয়ন ব্যবস্থা হয়ে আছে। পিছনে হাসি মুখে দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন সেই
বৃদ্ধা আর মহিলা। অতিথিবৎসল সনাতন ইতিহাসকে পিছনে ফেলে আমরা অন্ধকারে এগিয়ে চললাম
রাতটুকু নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর আশায়।
বোর্ডিংয়ের
বিশাল একটি ঘরে আমাদের শোওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের আপ্যায়ন করলেন স্কুলের
হেডমাস্টারমশাই। হেডমাস্টার বলতে সচরাচর যেমন গম্ভীর এক প্রৌঢ়ের চেহারা কল্পনায়
ফুটে ওঠে – ইনি একদম তার বিপরীত। তিরিশের কাছাকাছি চনমনে এক শিখ যুবক! সুদূর
সিকিমের এই প্রত্যন্ত গ্রামে
তাঁর এই আবির্ভাব আমাদের খুব বিস্মিত করেছিল। সেরাত্রে
যদিও বিস্ময়ের চেয়েও আমাদের ঘুমের ঘোর ছিল অনেক বেশী শক্তিশালী। কাজেই প্রায় বিনা
বাক্যব্যয়ে আমরা কাঠের মেঝেয় পাতা ঢালা বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমের
রাজ্যে পাড়ি দেবার আগে একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিলাম, আমাদের অদূরেই আলাদা
শয্যায় অনেকগুলি বালকের অবাক চোখের দৃষ্টি, তারাও কম্বলের ভেতরে শুয়ে আমাদের
দেখছিল। বুঝলাম আমরা এই বোর্ডিংয়ে আবাসিক ছাত্রদের শয্যায় ভাগ বসিয়েছি।
পরেরদিন
খুব ভোরে কম্বলের উৎকট গন্ধে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের অদূরে
শুয়ে থাকা ছেলেরা কখন উঠে পড়ে বিছানা পত্র গুটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। আমরাও উঠে পড়লাম আর অনুভব করলাম শরীরে
একবিন্দুও ক্লান্তি নেই। বিছানা তুলতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ধুলো আর উৎকট গন্ধের বহর।
কাল চরম ক্লান্তির সময় ওসব মনেও হয় নি, আজ ক্লান্তিহীন চাঙ্গা শরীরে মন ফিরে এসেছে
যথাস্থানে – তার শহুরে মানসিকতার উঁচু নাক নিয়ে!
সকালে
হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে চা পান করতে করতে আলোচনা হচ্ছিল আমাদের পরবর্তী গন্তব্য
জোংরি নিয়ে। ইয়াকসামের হাইট ১৭৮০ মি। ইয়াকসাম থেকে জোংরি মোটামুটি ২৬ - ২৭ কিমি।
কিন্তু হাইট ৪০৩০ মি। তিনি আমাদের পোষাকপরিচ্ছদ আর জোংরি যাবার যোগাড় দেখে মন্তব্য
করলেন যদি সদলবলে আত্মহত্যার ইচ্ছে হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের জোংরি যাওয়া উচিৎ। কারণ
এই প্রস্তুতি নিয়ে জোংরি গেলে নির্ঘাৎ নিউমোনিয়া। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসারও
কোন সুযোগ নেই। কাজেই নিউমোনিয়া বাধিয়ে স্থানীয় অসহায় মানুষগুলোকে ব্যতিব্যস্ত করে
তোলারও কোন মানে হয় না। কাজেই, ভেবে দেখুন কি করা উচিৎ।
আমরা
তাঁর উপদেশ মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে প্রচুর কলা আর পাঁউরুটির স্টক নিয়ে।
আমাদের লক্ষ্য দেখাই যাক না কি হয়, কদ্দূর যাওয়া যায়। দুস্তর চড়াই ভেঙে ১৬ কিমি
রাস্তা পার হয়ে আমরা যখন বাখিম পৌঁছলাম সূর্য মধ্যগগনে, ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে।
বাখিমের হাইট ৩০০৫ মিটার। বাখিম পৌঁছে আমরা অনুভব করলাম সেই শিখ হেডমাস্টারমশাইয়ের
কথার সারমর্ম। আমাদের হাল্কা সোয়েটার ভেদ করে তীক্ষ্ণ হিমেল হাওয়া ঢুকে বুকের ভিতর
পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া আর অন্য উপায় রইল না আমাদের।
কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে নেমে আসার সিদ্ধান্তই সাব্যস্ত হল।
আমাদের
জোংরি জয়ের সাধ অপূর্ণ রয়ে গেল। জোংরি থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে ১৫০০০ ফিট উচ্চতায়
বিখবাড়িতে কাঞ্চনজঙ্ঘার বেস ক্যাম্প। জোংরি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম দৃশ্য
প্রত্যক্ষ করা গেল না। পিছনে পড়ে রইল
ঘন সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড় আর পাহাড়। আর তাদের নিরন্তর লুকোচুরি খেলা! প্রকৃতির এক
অদ্ভূত জাদু। কখনো সব কিছু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঘন মেঘ আর কুয়াশার চাদরে। পরক্ষণেই
ঝলমলে রোদ্দুরে হেসে উঠছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের নিরন্তর শ্রেণী। বিশাল এই
পটভুমিতে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির আশ্চর্য মনোমোহিনী লীলা প্রত্যক্ষ করে ভারি হয়ে এল মন।
পথের শেষে এবং দু ধারে আরো কত লীলা অপেক্ষা করছিল, বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হওয়ার জন্যে -
সে সব পিছনে পড়ে রইল।
অধরা
রয়ে গেল অসীমের অরূপ রূপ। সীমিত সাধ্যে পার হওয়া গেল না সীমার বাঁধন।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন