এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
এর আগের একাদশ অধ্যায়ঃ বিশ্বরূপদর্শনযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ১১শ পর্ব"
আগের দুটি পর্বে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয়সখা অর্জুনকে নিজের ঐশ্বর্য ও বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে নিজের সম্যক পরিচয় তুলে ধরলেন। অর্জুনও সখা শ্রীকৃষ্ণের অপার্থিব মহিমা জেনে যথাক্রমে রোমাঞ্চিত ও ভীত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এখন মানসিক স্থিতাবস্থা ফিরে পেয়ে - অর্জুন আবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এত দিনে তোমাকে ঠিকঠাক জানলাম, কিন্তু একটা কথা সহজ করে বলতো, তোমাকে যাঁরা ভক্তি করেন আর যাঁরা তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানে উপাসনা করেন - তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে?"
দ্বাদশ অধ্যায়ঃ ভক্তিযোগ
|
১
|
|
অর্জুন
উবাচ
এবং
সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।
যে
চাপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।
|
অর্জুন
উবাচ
এবং
সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।
যে চ অপি অক্ষরম্
অব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।
|
অর্জুন
বললেন- এইভাবে যে সকল ভক্ত সর্বদা আপনার চিন্তায় মগ্ন থেকে আপনার উপাসনা করেন,
আর যাঁরা ইন্দ্রিয়ের অতীত অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, এই দুইয়ের মধ্যে কে
শ্রেষ্ঠ যোগী?
|
|
২
|
|
শ্রীভগবানুবাচ
ময্যাবেশ্য
মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।
শ্রদ্ধয়া
পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।
|
শ্রীভগবান
উবাচ
ময়ি
আবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।
শ্রদ্ধয়া
পরয়া উপেতাঃ তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।
|
শ্রীভগবান
বললেন – আমাতে মন সমর্পণ ক’রে, আমাকে সর্বদা চিন্তা ক’রে, পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে যিনি
আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী।
|
|
৩,৪
|
|
যে
ত্বক্ষরমনির্দেশ্যমব্যক্তং পর্যুপাসতে।
সর্বত্রগমচিন্ত্যঞ্চ
কূটস্থমচলং ধ্রুবম্।।
সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং
সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।
তে
প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।
|
যেতু অক্ষরম্
অনির্দেশ্যম্ অব্যক্তং পর্যুপাসতে।
সর্বত্রগম্
অচিন্ত্যং চ কূটস্থম্ অচলং ধ্রুবম্।।
সংনিয়ম্য
ইন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।
তে
প্রাপ্নুবন্তি মাম্ এব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।
|
কিন্তু
সর্ব অবস্থায় যিনি সমবুদ্ধি, সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত ক’রে,
ইন্দ্রিয়সমূহের অতীত, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, সমস্ত মোহ-মায়ার ঊর্ধ্বে অচিন্ত্য,
অচল, শাশ্বত নির্গুণ ব্রহ্মের যিনি উপাসনা করেন, তিনিও আমাকেই লাভ করে থাকেন।
|
|
৫
|
|
ক্লেশোঽধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্।
অব্যক্তা
হি গতির্দুঃখং দেহদ্ভিরবাপ্যতে।।
|
ক্লেশঃ
অধিকতরঃ তেষাম্ অব্যক্ত-আসক্ত-চেতসাম্।
অব্যক্তা
হি গতিঃ দুঃখং দেহবদ্ভিঃ অবাপ্যতে।।
|
তবে
নির্গুণ ব্রহ্মে যাঁরা মন সমর্পণ করেছেন, তাঁদের সিদ্ধিলাভের জন্যে অনেক বেশী
কষ্ট সহ্য করতে হয়। কারণ দেহের অভিমান ত্যাগ করে নির্গুণ ব্রহ্মে একনিষ্ঠ চিত্ত
সংযোগ বিশেষ কষ্টকর।
|
|
৬,৭
|
|
যে
তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।
অনন্যেনৈব
যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।
তেষামহং
সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।
ভবামি
ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্।।
|
যে
তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।
অনন্যেন
এব যোগেন মাং ধ্যায়ন্তঃ উপাসতে।।
তেষাম্
অহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।
ভবামি
ন চিরাৎ পার্থ ময়ি আবেশিত-চেতসাম্।।
|
হে
পার্থ, কিন্তু যাঁরা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ ক’রে, আমার একান্ত অনুরক্ত হয়ে,
একনিষ্ঠ যোগসাধনায় আমার ধ্যান করেন ও আমার উপাসনা করেন, আমার সেই একনিষ্ঠ
ভক্তগণকে আমি এই মৃত্যুময় সংসার সাগর থেকে অল্প সময়েই উদ্ধার করে থাকি।
|
|
৮
|
|
ময্যেব
মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।
নিবসিষ্যসি
ময্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।
|
ময়ি
এব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।
নিবসিষ্যসি
ময়ি এব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।
|
যদি
আমাতেই মন স্থাপনা করো, আমাতেই যদি বুদ্ধি নিবিষ্ট করো, তবে জীবনের অন্তে তুমি
যে আমাতেই আশ্র্য় লাভ করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
|
|
৯
|
|
অথ
চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্।
অভ্যাসযোগেন
ততো মামিচ্ছাপ্তুং ধনঞ্জয়।।
|
অথ
চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্।
অভ্যাসযোগেন
ততঃ মাম্ ইচ্ছ আপ্তুং ধনঞ্জয়।।
|
হে
ধনঞ্জয়, যদি তুমি তোমার মন আমাতে স্থিরভাবে নিবেশ করতে সমর্থ না হও, তাহলে তুমি
অভ্যাসযোগ সাধনায় আমাকে লাভ করার চেষ্টা করো।
|
|
১০
|
|
অভ্যাসেঽপ্যসমর্থোঽসি
মৎকর্মপরমো ভব।
মদর্থমপি
কর্মাণি কুর্বন্ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি।।
|
অভ্যাসে
অপি অসমর্থঃ অসি মৎকর্মপরমঃ ভব।
মৎ-অর্থম্
অপি কর্মাণি কুর্বন্ সিদ্ধিম্ অবাপ্স্যসি।।
|
যদি
অভ্যাস যোগেও আমাকে লাভ করতে ব্যর্থ হও, তাহলে তুমি আমার কর্মপরায়ণ হও। আমার
জন্যে কর্ম করতে করতেই তুমি পরম মোক্ষ লাভ করতে পারবে।
|
|
১১
|
|
অথৈতদপ্যশক্তোঽসি
কর্তুং মদ্যোগমাশ্রিতঃ।
সর্বকর্মফলত্যাগং
ততঃ কুরু যতাত্মবান্।।
|
অথ
এতৎ অপি অশক্তঃ অসি কর্তুং মৎ-যোগম্ আশ্রিতঃ।
সর্বকর্মফলত্যাগং
ততঃ কুরু যত-আত্মবান্।।
|
আর যদি
কর্মপরায়ণ হতেও সমর্থ না হও, তাহলে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, একমাত্র আমার
শরণাপন্ন হয়ে, সমস্ত কর্ম থেকে ফলের প্রত্যাশা তাগ করো।
|
|
১২
|
|
শ্রেয়ো
হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্জ্ঞানাদ্ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ
কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্।
|
শ্রেয়ঃ
হি জ্ঞানম্ অভ্যাসাৎ জ্ঞানাৎ ধ্যানং বিশিষ্যতে।
ধ্যানাৎ
কর্মফলত্যাগঃ ত্যাগাৎ শান্তিঃ অনন্তরম্।
|
অভ্যাস
যোগের থেকে জ্ঞানযোগ শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানযোগের থেকে ধ্যানযোগ এবং ধ্যানযোগের থেকেও
কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কারণ ত্যাগ থেকেই পরম শান্তি লাভ করা যায়।
|
|
১৩,১৪
|
|
অদ্বেষ্টা
সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ।
নির্মমো
নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।
সন্তুষ্টঃ
সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।
ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো
মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
অদ্বেষ্টা
সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণঃ এব চ।
নির্মমঃ
নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।
সন্তুষ্টঃ
সততং যোগী যত-আত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।
ময়ি
অর্পিত-মনঃ-বুদ্ধিঃ যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
সর্বভূতের
প্রতি যে ব্যক্তির মনে কোন বিদ্বেষ নেই, সকলের প্রতি যিনি বন্ধুভাবাপন্ন ও
করুণাময়, অথচ মমত্ববোধহীন নির্বিকার; যাঁর মনে অহংকার নেই, সুখ ও দুঃখে যাঁর একই
অনুভব এবং ক্ষমাশীল। যিনি মনে সর্বদাই সন্তোষ অনুভব করেন, যিনি একনিষ্ঠ
চিত্তে, সংযত ইন্দ্রিয়ে এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে সর্বদা আমাতেই মন ও বুদ্ধি সমর্পণ
করেন, তিনিই আমার প্রিয় ভক্ত।
|
|
১৫
|
|
যস্মান্নোদ্বিজতে
লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ।
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো
যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।
|
যস্মাৎ
নঃ উদ্বিজতে লোকঃ লোকাৎ ন উদ্বিজতে চ যঃ।
হর্ষ-অমর্ষ-ভয়-উদ্বেগৈঃ
মুক্তঃ যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।
|
যে
ব্যক্তি অন্য কারো উদ্বেগের কারণ হন না এবং নিজেও কোন কারণেই উদ্বিগ্ন হন না।
সকল আনন্দ, অমর্ষ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে মুক্ত যাঁর মন, তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয়।
[অভিলাষের বস্তু না পাওয়ার যে দুঃখ, তাকেই বলে অমর্ষ]
|
|
১৬
|
|
অনপেক্ষঃ
শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী
যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
অনপেক্ষঃ
শুচিঃ-দক্ষঃ উদাসীনঃ গতব্যথঃ।
সর্ব-আরম্ভ-পরিত্যাগী
যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
সকল
বস্তুতেই যিনি নিস্পৃহ ও নির্বিকার, যাঁর অন্তর ও দেহ শুদ্ধ, যিনি নিরলস দক্ষ,
যিনি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়, যিনি সকল ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করেন, তিনিই আমার
অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত।
|
|
১৭
|
|
যো
ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।
শুভাশুভপরিত্যাগী
ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
যো ন হৃষ্যতি ন
দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।
শুভা-অশুভ-পরিত্যাগী
ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।
|
যিনি
সাফল্যে উৎফুল্ল হন না, ব্যর্থতায় বিদ্বেষ করেন না, যিনি শোক করেন না, কোন বস্তু
কামনা করেন না, শুভাশুভ সকল বিষয়ই যিনি ত্যাগ করতে পেরেছেন, সেই রকম ভক্তই আমার
প্রিয়।
|
|
১৮,১৯
|
|
সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ
সঙ্গবিবর্জিতঃ।।
তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী
সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্
মে প্রিয়ো নরঃ।।
|
সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মান-অপমানয়োঃ।
শীত-উষ্ণ-সুখ-দুঃখেষু সমঃ
সঙ্গবিবর্জিতঃ।।
তুল্য-নিন্দা-স্তুতিঃ-মৌনী
সন্তুষ্টঃ যেন কেনচিৎ।
অনিকেতঃ স্থিরমতিঃ-ভক্তিমান্ মে
প্রিয়ঃ নরঃ।।
|
শত্রু ও মিত্রকে
যিনি সমান ভাবেন; সম্মান-অপমান, শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখে যাঁর সমান অনুভব, নিন্দা
এবং স্তুতিতে যাঁর সমচিন্তা; যিনি কম কথা বলেন, খুব অল্পে সন্তুষ্ট থাকেন,
স্থায়ী বাসস্থানহীন কিন্তু স্থিরবুদ্ধি সেই ভক্তিমান ব্যক্তিই আমার বিশেষ প্রিয়।
|
|
২০
|
|
যে
তু ধর্মামৃতমিদং যথোক্তং পর্যুপাসতে।
শ্রদ্দধানা
মৎপরমা ভক্তাস্তেঽতীব মে প্রিয়াঃ।।
|
যে
তু ধর্ম-অমৃতম্ ইদং যথা উক্তং পর্যুপাসতে।
শ্রদ্দধানা
মৎপরমা ভক্তাঃ তে অতীব মে প্রিয়াঃ।।
|
আমাতে
নিবেদিত প্রাণ যে ভক্ত, একনিষ্ঠ শ্রদ্ধায় আমার বলা এই অমৃতরূপ ধর্মতত্ত্বের
সাধনা করেন, তাঁরা সকলেই আমার অত্যন্ত প্রিয়।
|
ভক্তিযোগ সমাপ্ত
এর পরের ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ পাশের সূত্রে - " গীতা - ১৩শ পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন