বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১২শ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

  


এর আগের একাদশ অধ্যায়ঃ বিশ্বরূপদর্শনযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ১১শ পর্ব"


আগের দুটি পর্বে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয়সখা অর্জুনকে নিজের ঐশ্বর্য ও বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে নিজের সম্যক পরিচয় তুলে ধরলেন। অর্জুনও সখা শ্রীকৃষ্ণের অপার্থিব মহিমা জেনে যথাক্রমে রোমাঞ্চিত ও ভীত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এখন মানসিক স্থিতাবস্থা ফিরে পেয়ে - অর্জুন আবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এত দিনে তোমাকে ঠিকঠাক জানলাম, কিন্তু একটা কথা সহজ করে বলতো, তোমাকে যাঁরা ভক্তি করেন আর যাঁরা তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানে উপাসনা করেন - তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে?"       

দ্বাদশ অধ্যায়ঃ ভক্তিযোগ


অর্জুন উবাচ

এবং সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।

যে চাপ্যক্ষরমব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।

অর্জুন উবাচ

এবং সততযুক্তা যে ভক্তসত্ত্বাং পর্যুপাসতে।

যে চ অপি অক্ষরম্‌ অব্যক্তং তেষাং কে যোগবিত্তমাঃ।।

অর্জুন বললেন- এইভাবে যে সকল ভক্ত সর্বদা আপনার চিন্তায় মগ্ন থেকে আপনার উপাসনা করেন, আর যাঁরা ইন্দ্রিয়ের অতীত অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, এই দুইয়ের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ যোগী?

 

শ্রীভগবানুবাচ

ময্যাবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।

শ্রদ্ধয়া পরয়োপেতাস্তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।

শ্রীভগবান উবাচ

ময়ি আবেশ্য মনো যে মাং নিত্যযুক্তা উপাসতে।

শ্রদ্ধয়া পরয়া উপেতাঃ তে মে যুক্ততমা মতাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন – আমাতে মন সমর্পণ ক’রে, আমাকে সর্বদা চিন্তা ক’রে, পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে যিনি আমার উপাসনা করেন, আমার মতে তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী।

 

৩,৪

যে ত্বক্ষরমনির্দেশ্যমব্যক্তং পর্যুপাসতে।

সর্বত্রগমচিন্ত্যঞ্চ কূটস্থমচলং ধ্রুবম্‌।।

সংনিয়ম্যেন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।

তে প্রাপ্নুবন্তি মামেব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।

যেতু অক্ষরম্‌ অনির্দেশ্যম্‌ অব্যক্তং পর্যুপাসতে।

সর্বত্রগম্‌ অচিন্ত্যং চ কূটস্থম্‌ অচলং ধ্রুবম্‌।।

সংনিয়ম্য ইন্দ্রিয়গ্রামং সর্বত্র সমবুদ্ধয়ঃ।

তে প্রাপ্নুবন্তি মাম্‌ এব সর্বভূতহিতে রতাঃ।।

কিন্তু সর্ব অবস্থায় যিনি সমবুদ্ধি, সমস্ত জীবের মঙ্গলের জন্যে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত ক’রে, ইন্দ্রিয়সমূহের অতীত, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, সমস্ত মোহ-মায়ার ঊর্ধ্বে অচিন্ত্য, অচল, শাশ্বত নির্গুণ ব্রহ্মের যিনি উপাসনা করেন, তিনিও আমাকেই লাভ করে থাকেন।

  

ক্লেশোঽধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্‌।

অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহদ্ভিরবাপ্যতে।।

ক্লেশঃ অধিকতরঃ তেষাম্‌ অব্যক্ত-আসক্ত-চেতসাম্‌।

অব্যক্তা হি গতিঃ দুঃখং দেহবদ্ভিঃ অবাপ্যতে।।

তবে নির্গুণ ব্রহ্মে যাঁরা মন সমর্পণ করেছেন, তাঁদের সিদ্ধিলাভের জন্যে অনেক বেশী কষ্ট সহ্য করতে হয়। কারণ দেহের অভিমান ত্যাগ করে নির্গুণ ব্রহ্মে একনিষ্ঠ চিত্ত সংযোগ বিশেষ কষ্টকর।

 

৬,৭

যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।

অনন্যেনৈব যোগেন মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে।।

তেষামহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।

ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময্যাবেশিতচেতসাম্‌।।

যে তু সর্বাণি কর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরাঃ।

অনন্যেন এব যোগেন মাং ধ্যায়ন্তঃ উপাসতে।।

তেষাম্‌ অহং সমুদ্ধর্তা মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।

ভবামি ন চিরাৎ পার্থ ময়ি আবেশিত-চেতসাম্‌।।

হে পার্থ, কিন্তু যাঁরা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ ক’রে, আমার একান্ত অনুরক্ত হয়ে, একনিষ্ঠ যোগসাধনায় আমার ধ্যান করেন ও আমার উপাসনা করেন, আমার সেই একনিষ্ঠ ভক্তগণকে আমি এই মৃত্যুময় সংসার সাগর থেকে অল্প সময়েই উদ্ধার করে থাকি।

 

ময্যেব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।

নিবসিষ্যসি ময্যেব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।

ময়ি এব মন আধৎস্ব ময়ি বুদ্ধিং নিবেশয়।

নিবসিষ্যসি ময়ি এব অত ঊর্ধ্বং ন সঃশয়ঃ।।

যদি আমাতেই মন স্থাপনা করো, আমাতেই যদি বুদ্ধি নিবিষ্ট করো, তবে জীবনের অন্তে তুমি যে আমাতেই আশ্র্য় লাভ করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

 

অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্‌।

অভ্যাসযোগেন ততো মামিচ্ছাপ্তুং ধনঞ্জয়।।

অথ চিত্তং সমাধাতুং ন শক্নোষি ময়ি স্থিরম্‌।

অভ্যাসযোগেন ততঃ মাম্‌ ইচ্ছ আপ্তুং ধনঞ্জয়।।

হে ধনঞ্জয়, যদি তুমি তোমার মন আমাতে স্থিরভাবে নিবেশ করতে সমর্থ না হও, তাহলে তুমি অভ্যাসযোগ সাধনায় আমাকে লাভ করার চেষ্টা করো।

  

১০

অভ্যাসেঽপ্যসমর্থোঽসি মৎকর্মপরমো ভব।

মদর্থমপি কর্মাণি কুর্বন্‌ সিদ্ধিমবাপ্স্যসি।।

অভ্যাসে অপি অসমর্থঃ অসি মৎকর্মপরমঃ ভব।

মৎ-অর্থম্‌ অপি কর্মাণি কুর্বন্‌ সিদ্ধিম্‌ অবাপ্স্যসি।।

যদি অভ্যাস যোগেও আমাকে লাভ করতে ব্যর্থ হও, তাহলে তুমি আমার কর্মপরায়ণ হও। আমার জন্যে কর্ম করতে করতেই তুমি পরম মোক্ষ লাভ করতে পারবে।

 

১১

অথৈতদপ্যশক্তোঽসি কর্তুং মদ্‌যোগমাশ্রিতঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং ততঃ কুরু যতাত্মবান্‌।।

অথ এতৎ অপি অশক্তঃ অসি কর্তুং মৎ-যোগম্‌ আশ্রিতঃ।

সর্বকর্মফলত্যাগং ততঃ কুরু যত-আত্মবান্‌।।

আর যদি কর্মপরায়ণ হতেও সমর্থ না হও, তাহলে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, একমাত্র আমার শরণাপন্ন হয়ে, সমস্ত কর্ম থেকে ফলের প্রত্যাশা তাগ করো।

 

১২

শ্রেয়ো হি জ্ঞানমভ্যাসাজ্‌জ্ঞানাদ্‌ধ্যানং বিশিষ্যতে।

ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগস্ত্যাগাচ্ছান্তিরনন্তরম্‌।

শ্রেয়ঃ হি জ্ঞানম্‌ অভ্যাসাৎ জ্ঞানাৎ ধ্যানং বিশিষ্যতে।

ধ্যানাৎ কর্মফলত্যাগঃ ত্যাগাৎ শান্তিঃ অনন্তরম্‌।

অভ্যাস যোগের থেকে জ্ঞানযোগ শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানযোগের থেকে ধ্যানযোগ এবং ধ্যানযোগের থেকেও কর্মফল ত্যাগ শ্রেষ্ঠ। কারণ ত্যাগ থেকেই পরম শান্তি লাভ করা যায়।

 

১৩,১৪

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ।

নির্মমো নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।

ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণঃ এব চ।

নির্মমঃ নিরহংকারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী।।

সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যত-আত্মা দৃঢ়নিশ্চয়ঃ।

ময়ি অর্পিত-মনঃ-বুদ্ধিঃ যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

সর্বভূতের প্রতি যে ব্যক্তির মনে কোন বিদ্বেষ নেই, সকলের প্রতি যিনি বন্ধুভাবাপন্ন ও করুণাময়, অথচ মমত্ববোধহীন নির্বিকার; যাঁর মনে অহংকার নেই, সুখ ও দুঃখে যাঁর একই অনুভব এবং ক্ষমাশীলযিনি মনে সর্বদাই সন্তোষ অনুভব করেন, যিনি একনিষ্ঠ চিত্তে, সংযত ইন্দ্রিয়ে এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে সর্বদা আমাতেই মন ও বুদ্ধি সমর্পণ করেন, তিনিই আমার প্রিয় ভক্ত।

 

১৫

যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ।

হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈর্মুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।

যস্মাৎ নঃ উদ্বিজতে লোকঃ লোকাৎ ন উদ্বিজতে চ যঃ।

হর্ষ-অমর্ষ-ভয়-উদ্বেগৈঃ মুক্তঃ যঃ স চ মে প্রিয়ঃ।।

যে ব্যক্তি অন্য কারো উদ্বেগের কারণ হন না এবং নিজেও কোন কারণেই উদ্বিগ্ন হন না। সকল আনন্দ, অমর্ষ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে মুক্ত যাঁর মন, তিনিও আমার অত্যন্ত প্রিয়। [অভিলাষের বস্তু না পাওয়ার যে দুঃখ, তাকেই বলে অমর্ষ]

 

১৬

অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ।

সর্বারম্ভপরিত্যাগী যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

অনপেক্ষঃ শুচিঃ-দক্ষঃ উদাসীনঃ গতব্যথঃ।

সর্ব-আরম্ভ-পরিত্যাগী যঃ মৎ-ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ।।

সকল বস্তুতেই যিনি নিস্পৃহ ও নির্বিকার, যাঁর অন্তর ও দেহ শুদ্ধ, যিনি নিরলস দক্ষ, যিনি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়, যিনি সকল ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করেন, তিনিই আমার অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত।  

 

১৭

যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্‌ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।

যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।

শুভা-অশুভ-পরিত্যাগী ভক্তিমান্‌ যঃ স মে প্রিয়ঃ।।

যিনি সাফল্যে উৎফুল্ল হন না, ব্যর্থতায় বিদ্বেষ করেন না, যিনি শোক করেন না, কোন বস্তু কামনা করেন না, শুভাশুভ সকল বিষয়ই যিনি ত্যাগ করতে পেরেছেন, সেই রকম ভক্তই আমার প্রিয়।

  

১৮,১৯

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।

শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ।।


তুল্যনিন্দাস্তুতির্মৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ।

অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্‌ মে প্রিয়ো নরঃ।।

সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মান-অপমানয়োঃ।

শীত-উষ্ণ-সুখ-দুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ।।

তুল্য-নিন্দা-স্তুতিঃ-মৌনী সন্তুষ্টঃ যেন কেনচিৎ।

অনিকেতঃ স্থিরমতিঃ-ভক্তিমান্‌ মে প্রিয়ঃ নরঃ।।

শত্রু ও মিত্রকে যিনি সমান ভাবেন; সম্মান-অপমান, শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখে যাঁর সমান অনুভব, নিন্দা এবং স্তুতিতে যাঁর সমচিন্তা; যিনি কম কথা বলেন, খুব অল্পে সন্তুষ্ট থাকেন, স্থায়ী বাসস্থানহীন কিন্তু স্থিরবুদ্ধি সেই ভক্তিমান ব্যক্তিই আমার বিশেষ প্রিয়।

    

২০

যে তু ধর্মামৃতমিদং যথোক্তং পর্যুপাসতে।

শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাস্তেঽতীব মে প্রিয়াঃ।।

যে তু ধর্ম-অমৃতম্‌ ইদং যথা উক্তং পর্যুপাসতে।

শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাঃ তে অতীব মে প্রিয়াঃ।।

আমাতে নিবেদিত প্রাণ যে ভক্ত, একনিষ্ঠ শ্রদ্ধায় আমার বলা এই অমৃতরূপ ধর্মতত্ত্বের সাধনা করেন, তাঁরা সকলেই আমার অত্যন্ত প্রিয়।

  

ভক্তিযোগ সমাপ্ত

  এর পরের ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ পাশের সূত্রে - " গীতা - ১৩শ পর্ব

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...