শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১১শ পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "

 



এর আগের দশম অধ্যায়ঃ বিভূতিযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ১০ম পর্ব"


একাদশ অধ্যায়ঃ বিশ্বরূপদর্শনযোগ


অর্জুন উবাচ

মদনুগ্রহায় পরমং গুহ্যমধ্যাত্মসংজ্ঞিতম্‌।

যৎ ত্বয়োক্তং বচস্তেন মোহোঽয়ং বিগতো মম।।

অর্জুন উবাচ

মৎ অনুগ্রহায় পরমং গুহ্যম্‌ অধ্যাত্ম-সংজ্ঞিতম্‌।

যৎ ত্বয়া-উক্তং বচঃ তেন মোহঃ অয়ং বিগতঃ মম।।

অর্জুন বললেন – আমাকে অনুগ্রহ করে অতিগুহ্য যে পরম অধ্যাত্মতত্ত্ব তুমি আমাকে বর্ণনা করলে, তাতে আমার মনের সমস্ত ভ্রম দূর হয়ে গেছে।

 

ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া।

ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্‌।।

ভব-অপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশঃ ময়া।

ত্বত্তঃ কমলপত্র-অক্ষ মাহাত্ম্যম্‌ অপি চ অব্যয়ম্‌।।

হে পদ্মপলাশলোচন, তোমার থেকেই সমস্ত জীবের জন্ম ও বিনাশ এবং তোমার অপার অক্ষয় মাহাত্ম্যের অনেক কথাই সবিস্তারে শুনলাম।

 

এবমেতদ্‌ যথাত্থ ত্বমাত্মানং পরমেশ্বর।

দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপমৈশ্বরং পুরুষোত্তম।।

এবম্‌ এতৎ যথা আত্থ ত্বম্‌ আত্মানং পরমেশ্বর।

দ্রষ্টুম্‌ ইচ্ছামি তে রূপম্‌ ঐশ্বরং পুরুষ-উত্তম।।

হে পরমেশ্বর, যেমন তোমার আত্মস্বরূপের তত্ত্ব আমার কাছে প্রকাশ করলে, সেই রকম তোমার অলৌকিক ঈশ্বরীয়রূপও আমার দেখতে ইচ্ছে হয়।

 

মন্যসে যদি তচ্ছক্যং ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো।

যোগেশ্বর ততো মে ত্বং দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্‌।।

মন্যসে যদি তৎ শক্যং ময়া দ্রষ্টুম্‌ ইতি প্রভো।

যোগেশ্বর ততঃ মে ত্বং দর্শয় আত্মানম্‌ অব্যয়ম্‌।।

হে প্রভু, যদি আমাকে তোমার সেই রূপ দেখানোর যোগ্য বলে মনে করো, তাহলে হে যোগেশ্বর, তোমার সেই অবিনাশী বিশ্বাত্মারূপ আমাকে দেখাও।

 

শ্রীভগবানুবাচ

পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোঽথ সহস্রশঃ।

নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতীনি চ।।

শ্রীভগবান উবাচ

পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশঃ অথ সহস্রশঃ।

নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণ-আকৃতীনি চ।।

শ্রীভগবান বললেন- হে অর্জুন, আমার নানান প্রকারের, বিভিন্ন বর্ণ ও আকারের, শতশত, সহস্রসহস্র অলৌকিক রূপ তুমি দর্শন করো।

 

পশ্যাদিত্যান্‌ বসূন্‌ রুদ্রানশ্বিনৌ মরুতস্তথা।

বহূন্যদৃষ্টপূর্বাণি পশ্যাশ্চর্যাণি ভারত।।

পশ্য আদিত্যান্‌ বসূন্‌ রুদ্রান্‌ অশ্বিনৌ মরুতঃ তথা।

বহূনি অদৃষ্টপূর্বাণি পশ্য আশ্চর্যাণি ভারত।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, এই দেখ, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দুই অশ্বিনীকুমার এবং এই ঊণপঞ্চাশ মরুৎ। অত্যন্ত আশ্চর্য এই দৃশ্য, যা আগে কেউ দেখেনি, তুমি দেখ।

[পুরাণে ও মহাভারতে আছে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মহামহিম বিশ্বরূপ আরও দুবার দেখিয়েছেন। প্রথমবার তাঁর শৈশবে যশোদামাতাকে। তারপর উদ্যোগ পর্বে তিনি যখন কৌরব রাজসভায় গিয়েছিলেন সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে, উদ্ধত দুর্যোধন তাঁকে বন্দী করতে উদ্যত হওয়ায়, ক্রুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণ সভায় উপস্থিত সকলকে তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত এবং স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন। তবে সেই দুই রূপই ছিল আংশিক। কারণ পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী - শিশু কৃষ্ণের মুখ গহ্বরে সূর্য-চন্দ্র সহ সকল ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করেছিলেন মাতা যশোদা - সে দৃশ্য মঙ্গলময়। আর ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় দেখিয়েছিলেন তাঁর ভয়াল করাল রূপ - যেটুকু সেই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু অর্জুন দেখলেন তাঁর পূর্ণ বিশ্বরূপ - যে রূপ অদৃষ্টপূর্ব - আগে কেউ কখনও দেখেনি।]      

   

ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্‌।

মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্‌ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।

ইহ একস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্য অদ্য সচরাচরম্‌।

মম দেহে গুড়াকেশ যৎ চ অন্যৎ দ্রষ্টুম্‌ ইচ্ছসি।।

হে জিতনিদ্র অর্জুন, এই দেখ, আমার এই দেহের অঙ্গরূপে জগতের সকল স্থাবর ও জঙ্গম একইসঙ্গে অবস্থিত, আরও যা কিছু দেখতে তোমার ইচ্ছা হয়, আজ দেখে নাও।

  

ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।

দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্‌।।

ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুম্‌ অনেন এব স্বচক্ষুষা।

দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগম্‌ ঐশ্বরম্‌।।

তোমার এই জাগতিক চোখ দিয়ে তুমি কিন্তু আমার অলৌকিকরূপ দেখতে পারবে না, তোমার দুই চোখে আমি দিব্য দর্শনের শক্তি সঞ্চার করব, যাতে তুমি আমার যোগ ঐশ্বর্যের স্বরূপ দেখতে পাও।

 

    ৯

সঞ্জয় উবাচ

এবমুক্ত্বা ততো রাজন্‌ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ।

দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্‌।।

সঞ্জয় উবাচ

এবম্‌ উক্ত্বা ততঃ রাজন্‌ মহাযোগ-ইশ্বরঃ হরিঃ।

দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপম্‌ ঐশ্বরম্‌।।

সঞ্জয় বললেন – হে রাজা ধৃতরাষ্ট্র, এই কথা বলে মহাযোগেশ্বর শ্রীহরি, পার্থকে তাঁর অনুপম ঐশ্বরিক রূপ দেখালেন।

  

১০

অনেকবক্ত্রনয়নমনেকাদ্ভূতদর্শনম্‌।

অনেকদিব্যাভরণং দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্‌।।

অনেক-বক্ত্র-নয়নম্‌ অনেক-অদ্ভূত-দর্শনম্‌।

অনেক-দিব্য-আভরণং দিব্য-অনেক-উদ্যত-আয়ুধম্‌।।

অনেক মুখ ও চোখ, অনেক অদ্ভূত দর্শন আকার, অনেক দিব্য অলংকারে সজ্জিত, অনেক উদ্যত দিব্য অস্ত্রশস্ত্র খচিত অদ্ভূত সেই রূপ।

 

১১

দিব্যমাল্যাম্বরধরং দিব্যগন্ধানুলেপনম্‌

সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্‌।।

দিব্যমাল্য অম্বরধরং দিব্যগন্ধ অনুলেপনম্‌

সর্ব-আশ্চর্যময়ং দেবম্‌ অনন্তং বিশ্বতোমুখম্‌।।

দিব্য মালা ও বস্ত্র পরিহিত সেই অঙ্গ, দিব্য গন্ধে সংলিপ্ত, অত্যন্ত আশ্চর্যজনক সেই রূপ দেবদ্যুতিময়, অনন্ত এবং সর্ববিশ্বব্যাপী।

 

১২

দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্‌ যুগপদুত্থিতা।

যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ্‌ ভাসস্তস্য মহাত্মনঃ।।

দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্‌ যুগপৎ উত্থিতা।

যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাৎ ভাসঃ তস্য মহাত্মনঃ।।

আকাশে যদি হাজারটা সূর্য একসঙ্গে উদয় হয়, তাদের সেই একত্র প্রভা আর দীপ্তির সঙ্গে, ভগবানের এই প্রভার তুলনা করা যেতে পারে।

   

১৩

তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা।

অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা।।

তত্র একস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তম্‌ অনেকধা।

অপশ্যৎ দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবঃ তদা।।

তারপর, পাণ্ডুপুত্র অর্জুন, সেই অলৌকিক দেহে সমস্ত দেবতাদের বিভিন্নরূপ, নানান ভাগে বিভক্ত তাঁর সেই অনুপম শরীরে সমস্ত বিশ্বকেই একত্র দেখতে পেলেন।

  

১৪

ততঃ স বিস্ময়াবিষ্টো হৃষ্টরোমা ধনঞ্জয়ঃ।

প্রণম্য শিরসা দেবং কৃতাঞ্জলিরভাষত।।

ততঃ স বিস্ময়-আবিষ্টঃ হৃষ্টরোমা ধনঞ্জয়ঃ।

প্রণম্য শিরসা দেবং কৃত-অঞ্জলিঃ অভাষত।।

এই দৃশ্য দেখে অর্জুন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে, তাঁর শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করলেন, তারপর নতমস্তকে প্রণাম করে, সেই বিশ্বরূপধারী ভগবানকে করজোড়ে বললেন।

 

১৫

অর্জুন উবাচ

পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে

সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্‌।

ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থমৃষীংশ্চ

সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্‌।।

অর্জুন উবাচ

পশ্যামি দেবান্‌ তব দেব দেহে

সর্বান্‌ তথা ভূত-বিশেষ-সঙ্ঘান্‌।

ব্রহ্মাণম্‌ ঈশং কমল-আসনস্থম্‌ ঋষীন্‌ চ

সর্বান্‌ উরগান্‌ চ দিব্যান্‌।।

অর্জুন বললেন – হে দেব, আপনার এই বিশ্বরূপময় দেহে, আমি সমস্ত দেবতা, এই চরাচর বিশ্ব, সকল ঋষি, সকল নাগ, এমনকি পদ্মাসনে উপবিষ্ট ব্রহ্মাকেও দেখতে পাচ্ছি।

 

অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং

পশ্যামি ত্বাং সর্বতোঽনন্তরূপম্‌।

নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং

পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ।।

অনেকবাহু-উদর-বক্ত্র-নেত্রং

পশ্যামি ত্বাং সর্বতঃ অনন্তরূপম্‌।

ন অন্তং ন মধ্যং ন পুনঃ তব আদিং

পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ।।

অনেক বাহু, অজস্র উদর, মুখ ও চোখ বিশিষ্ট আপনার এই সীমাহীন রূপ সবদিকেই দেখতে পাচ্ছি। হে বিশ্বেশ্বর, আপনার বিশ্বরূপে আদি, মধ্য অথবা অন্ত কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

 

১৭

কিরীটিনং গদিনং চক্রিণঞ্চ

তেজোরাশিং সর্বতো দীপ্তিমন্তম্‌।

পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তাদ্‌

দীপ্তানলার্কদ্যুতিমপ্রদেয়ম্‌।।

কিরীটিনং গদিনং চক্রিণং চ

তেজোরাশিং সর্বতো দীপ্তিমন্তম্‌।

পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তাৎ

দীপ্ত-অনল-অর্ক-দ্যুতিম্‌ অপ্রদেয়ম্‌।।

মাথায় মুকুট, হাতে গদা ও চক্র নিয়ে উজ্জ্বল তেজে আপনি এমনই দীপ্তিমান, আপনার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। জ্বলন্ত অগ্নি ও সূর্যের মতো উজ্জ্বল প্রভাময় আপনার এই রূপ একইভাবে সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি।

 

১৮

ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং

ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্‌।

ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা

সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে।।

ত্বম্‌ অক্ষরং পরমং বেদিতব্যং

ত্বম্‌ অস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্‌।

ত্বম্‌ অব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা

সনাতনঃ ত্বং পুরুষঃ মতঃ মে।।

আপনি অক্ষর ব্রহ্ম, আপনিই পরমজ্ঞান। আপনি এই সমগ্র বিশ্বের পরম আশ্রয়। অনন্তকাল ধরে, আপনি সনাতন ধর্মের রক্ষক। আমার বিশ্বাস, আপনিই সেই সনাতন পরম পুরুষ। 

 

১৯

অনাদিমধ্যান্তমনন্তবীর্যমনন্তবাহুং

শশিসূর্যনেত্রম্‌।

পশ্যামি ত্বাং দীপ্তহুতাশবক্ত্রং

স্বতেজসা বিশ্বমিদং তপন্তম্‌।।

অনাদি-মধ্য-অন্তম্‌ অনন্তবীর্যম্‌ অনন্তবাহুং

শশি-সূর্য-নেত্রম্‌।

পশ্যামি ত্বাং দীপ্ত-হুতাশ-বক্ত্রং

স্বতেজসা বিশ্বম্‌ ইদং তপন্তম্‌।।

আমি দেখছি, আপনার কোন আদি, মধ্য ও শেষ নেই। অনন্ত আপনার শক্তি, অসংখ্য আপনার বাহু, চন্দ্র ও সূর্য আপনার দুই চোখ, জ্বলন্ত আগুনের মতো দীপ্ত আপনার মুখ। নিজের তেজ দিয়ে আপনি সমস্ত বিশ্বকে সংযত রেখেছেন। 

 

২০

দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি

ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ।

দৃষ্ট্বাঽদ্ভূতং রূপমুগ্রং তবেদং

লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্‌।।

দ্যাবা-পৃথিব্যোঃ ইদম্‌ অন্তরং হি

ব্যাপ্তং ত্বয়া একেন দিশঃ চ সর্বাঃ।

দৃষ্ট্বা অদ্ভূতং রূপম্‌ উগ্রং তব ইদং

লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্‌।।

হে ভগবান, স্বর্গ থেকে মর্ত্য এবং তার মধ্যবর্তী সমস্ত ভুবনে এমনকি দশ দিকের সর্বত্র, একমাত্র আপনিই ব্যাপ্ত রয়েছেন। আপনার এই আশ্চর্য উগ্র রূপ দেখে তিন ভুবনের সমস্ত জীব অত্যন্ত ভয় পাচ্ছে।

 

২১

অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি

কেচিদ্ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি।

স্বস্তীত্যুক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ

স্তুবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ।।

অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি

কেচিৎ ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি।

স্বস্তি ইতি উক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ

স্তুবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ।।

অমৃতের অধিকারী সকল দেবতারা সমবেতভাবে আপনার মধ্যেই শরণ নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভয় পেয়ে, করজোড়ে আপনার গুণকীর্তন করছেন। মহর্ষি ও সিদ্ধজ্ঞানীজনেরাও সমবেতভাবে ‘স্বস্তি’ বচন করছেন এবং প্রচুর স্তুতিবাক্যে আপনার স্তব করছেন।

   

২২

রুদ্রাদিত্যা বসবো যে চ সাধ্যা

বিশ্বেঽশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ।

গন্ধর্বযক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা

বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে।

রুদ্র-আদিত্যাঃ বসবঃ যে চ সাধ্যাঃ

বিশ্বে অশ্বিনৌ মরুতঃ চ উষ্মপাঃ চ।

গন্ধর্ব-যক্ষ-অসুর-সিদ্ধ-সঙ্ঘাঃ

বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাঃ চ এব সর্বে।

রুদ্র, আদিত্য ও সমস্ত বসুগণ, সাধ্য নামক দেবগণ, বিশ্ব নামক দেবতাগণ, দুই অশ্বিনীকুমার, সমস্ত মরুৎগণ ও পিতৃগণ, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর, সিদ্ধ মুনিগণ সকলেই আশ্চর্য হয়ে আপনার এই রূপ দর্শন করছেন।

 

২৩

রূপং মহৎ তে বহুবক্ত্রনেত্রং

মহাবাহো বহুবাহূরূপাদম্‌।

বহূদরং বহুদংষ্ট্রাকরালং

দৃষ্ট্বা লোকাঃ প্রব্যথিতাস্তথাহম্‌।।

রূপং মহৎ তে বহু-বক্ত্র-নেত্রং

মহাবাহো বহুবাহু-উরূ-পাদম্‌।

বহু-উদরং বহু-দংষ্ট্রা-করালং

দৃষ্ট্বা লোকাঃ প্রব্যথিতাঃ তথা অহম্‌।।

হে মহাবীর, আপনার এই বিগ্রহে বহু মুখ, বহু নয়ন, অনেক হাত, উরু ও অনেক পা, অনেক উদর এবং অজস্র দাঁত, আপনার এই মহাকরাল রূপ দেখে সমস্ত জীব এবং আমিও অত্যন্ত ভয় পাচ্ছি। 

 

২৪

নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং

ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্‌।

দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা

ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।।

নভঃস্পৃশং দীপ্তম্‌ অনেকবর্ণং

ব্যাত্ত আননং দীপ্তবিশালনেত্রম্‌।

দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিত অন্তরাত্মা

ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।।

হে বিষ্ণু, আকাশচুম্বী, ভীষণ দ্যুতিময়, নানান বর্ণময়, ব্যাদিত মুখ আর আপনার ওই উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে, আমার অন্তর অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। না আমি ধৈর্য রাখতে পারছি, আর না পাচ্ছি শান্তি।

 

২৫

দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি

দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি।

দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম

প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।

দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি

দৃষ্ট্বা এব কাল-অনল-সন্নিভানি।

দিশঃ ন জানে ন লভে চ শর্ম

প্রসীদ দেবেশ জগৎ-নিবাস।।

হে দেবেশ, আপনার ভয়ংকর ঐ দন্তরাজি আর কাল-অগ্নির মতো মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা দিশাহারা হয়ে পড়ছি, এতটুকুও শান্তি পাচ্ছি না, আপনি প্রসন্ন হোন কারণ আপনিই জগন্নিবাস, এই জগতের আশ্রয়।

 

২৬-২৭

অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ

সর্বে সহৈবাবনিপালসংঙ্ঘৈঃ।

ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাঽসৌ

সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।।

বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি

দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি।

কেচিদ্বিলগ্না দশনান্তরেষু

সংদৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ।।

অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ

সর্বে সহ-এব-অবনিপাল-সংঙ্ঘৈঃ।

ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রঃ তথা অসৌ

সহ অস্মদীয়ৈঃ অপি যোধমুখ্যৈঃ।। ২৬

বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি

দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি।

কেচিৎ বিলগ্না দশন-অন্তরেষু

সংদৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈঃ উত্তমাঙ্গৈঃ।। ২৭

ধৃতরাষ্ট্রের সমস্ত পুত্র এবং তাদের সহযোগী রাজন্যবর্গের জোট, এমনকি ভীষ্ম, দ্রোণ এবং সূতপুত্র কর্ণের মতো বীরেরা এবং আমাদের পক্ষেরও অনেক প্রধান যোদ্ধা, দ্রুতবেগে দৌড়ে আপনার মুখের বীভৎস দাঁতের ভয়ানক গ্রাসে প্রবেশ করছে, তাদের মধ্যে কাউকে দেখতে পাচ্ছি, ভাঙা মাথা, খন্ডিত দেহে আপনার দাঁতের ফাঁকে আটকে রয়েছে।

         

২৮

যথা নদীনাং বহবোঽম্বুবেগাঃ

সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি।

তথা তবামী নরলোকবীরা

বিশন্তি বক্ত্রাণ্যভিবিজ্বলন্তি।।

যথা নদীনাং বহবঃ অম্বুবেগাঃ

সমুদ্রম্‌ এব অভিমুখা দ্রবন্তি।

তথা তব অমী নরলোকবীরাঃ

বিশন্তি বক্ত্রাণি অভিবিজ্বলন্তি।।

যেমন নদীসমূহের অজস্র জলধারা সমুদ্রের অভিমুখে গিয়ে, সমুদ্রেই প্রবেশ করে, তেমনই এই বীরপুরুষেরাও, নিজেদের মৃত্যুর জন্যেই, সর্বদা জ্বলতে থাকা আপনার মুখবিবরে প্রবেশ করছে। 

 

২৯

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা

বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধ বেগাঃ।

তথৈব নাশায় বিশন্তি

লোকাস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ

যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা

বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধ বেগাঃ।

তথা এব নাশায় বিশন্তি

লোকাঃ তব অপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ

পতঙ্গ যেমন মরবার জন্যেই জ্বলন্ত আগুনের দিকে প্রবল বেগে দৌড়ে যায়, সেইরকম এই লোকগুলিও মৃত্যুর কারণেই আপনার মুখ গহ্বরের দিকে তীব্রগতিতে ধাবমান।

 

৩০

লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাৎ

লোকান্‌ সমগ্রান্‌ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ।

তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং

ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।

লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাৎ

লোকান্‌ সমগ্রান্‌ বদনৈঃ জ্বলদ্ভিঃ।

তেজোভিঃ আপূর্য জগৎ সমগ্রং

ভাসঃ তব উগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।

ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ ও অন্য সকলকে গ্রাস করার জন্যে চারদিকে আপনার জ্বলন্ত মুখের লেলিহান শিখা লকলক করছে, হে বিষ্ণু আপনার তীব্র তেজপ্রভায় ব্যাপ্ত এই সমগ্র জগৎ সন্তাপিত হচ্ছে।

 

৩১

আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো

নমোঽস্তু তে দেববর প্রসীদ।

বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং

ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্‌।।

আখ্যাহি মে কঃ ভবান্‌ উগ্ররূপঃ

নমঃ অস্তু তে দেববর প্রসীদ।

বিজ্ঞাতুম্‌ ইচ্ছামি ভবন্তম্‌ আদ্যং

ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্‌।।

হে দেবশ্রেষ্ঠ, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি প্রসন্ন হোন, আর আমাকে বলুন আপনার এই উগ্ররূপের স্বরূপ কি? এই জগতের আদিপুরুষ, আপনাকে আমি জানতে চাই। আপনার এই প্রচেষ্টার তাৎপর্যও আমি বুঝতে পারছি না।

   

৩২

শ্রীভগবানুবাচ

কালোঽস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো

লোকান্‌ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।

ঋতেঽপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে

যেঽবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষূ যোধাঃ।।

শ্রীভগবানুবাচ

কালঃ অস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধঃ

লোকান্‌ সমাহর্তুম্‌ ইহ প্রবৃত্তঃ।

ঋতে অপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে

যে অবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষূ যোধাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন- আমিই লোক ধ্বংসকারী প্রবৃদ্ধ কাল। আমি এখন লোকসংহারের কাজেই প্রবৃত্ত হয়েছি। তুমি যদি যুদ্ধ নাও করো, অর্জুন, তবু তোমার বিপক্ষদলের বীর যোদ্ধারা কেউ বাঁচবে না।

  

৩৩

তস্মাৎ ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব

জিত্বা শত্রূন্‌ ভুঙ্ক্ষ্ব  রাজ্যং সমৃদ্ধম্‌।

ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব

নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্‌।।

তস্মাৎ ত্বম্‌ উত্তিষ্ঠ যশঃ লভস্ব

জিত্বা শত্রূন্‌ ভুঙ্ক্ষ্ব  রাজ্যং সমৃদ্ধম্‌।

ময়া এব এতে নিহতাঃ পূর্বম্‌ এব

নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্‌।।

অতএব, তুমি যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও, যশ লাভ করো, শত্রুদের হারিয়ে রাজ্য ও সমৃদ্ধি অর্জন করো। তোমার বিপক্ষের যোদ্ধারা আমার হাতে আগেই মারা গিয়েছে, হে সব্যসাচী, এখন তুমি শুধু উপলক্ষ হও। 

 

৩৪

দ্রোণোঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ

কর্ণং তথাঽন্যানপি যোধবীরান্‌।

ময়া হতাংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠা

যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্‌।।

দ্রোণং চ ভীষ্মং চ জয়দ্রথং চ

কর্ণং তথা অন্যান্‌ অপি যোধবীরান্‌।

ময়া হতাংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠা

যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্‌।।

দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ এবং অন্যান্য বীর যোদ্ধাদের আমি আগেই হত্যা করেছি। তুমি সেই মৃতদের হত্যা করো। ভয় পেয়ো না, দুঃখ ক’রো না, যুদ্ধে তুমিই শত্রুদের জয় করবে, অতএব যুদ্ধ করো।

 

৩৫

সঞ্জয় উবাচ

এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য

কৃতাঞ্জলির্বেপমানঃ কিরীটি।

নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং

সগদ্‌গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য।।

সঞ্জয় উবাচ

এতৎ শ্রুত্বা বচনং কেশবস্য

কৃতাঞ্জলিঃ বেপমানঃ কিরীটি।

নমস্কৃত্বা ভূয় এবা আহ কৃষ্ণং

সগদ্‌গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য।।

সঞ্জয় বললেন – শ্রীকৃষ্ণের এই কথা শুনে, কম্পিত কলেবর অর্জুন, ভয়ে ভয়ে করজোড়ে প্রণাম করলেন, তারপর গদগদভাবে শ্রীকৃষ্ণকে আবার বললেন,

 

৩৬

অর্জুন উবাচ

স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্যা

জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ।

রক্ষাংসি ভীতানি দিশো দ্রবন্তি

সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ।।

অর্জুন উবাচ

স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্যা

জগৎ প্রহৃষ্যতি অনুরজ্যতে চ।

রক্ষাংসি ভীতানি দিশঃ দ্রবন্তি

সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ।।

অর্জুন বললেন - হে হৃষীকেশ, আপনার মাহাত্ম্য বর্ণনায় সমস্ত জগত আনন্দ পায় এবং আপনার প্রতি অনুরক্ত হয়। রাক্ষসেরা ভয় পেয়ে দিকে দিকে পালিয়ে যায় এবং সিদ্ধযোগীরা আপনাকে নমস্কার করেন। এই সবই যুক্তিযুক্ত।

  

৩৭

কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্‌ মহাত্মন্‌

গরীয়সে ব্রহ্মণোঽপ্যাদিকর্ত্রে।

অনন্ত দেবেশ জগন্নিবাস

ত্বমক্ষরং সদসৎ তং পরং যৎ।।

কস্মাৎ চ তে ন নমেরন্‌ মহাত্মন্‌

গরীয়সে ব্রহ্মণঃ অপি আদিকর্ত্রে।

অনন্ত দেবেশ জগৎ-নিবাস

ত্বম্‌ অক্ষরং সৎ-অসৎ তং পরং যৎ।।

মহাত্মা জনেরাও আপনাকে কেন নমস্কার করবেন না? হে অনন্ত, হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, আপনি ব্রহ্মের থেকেও মহান এবং জগতের আদি কারণ। সৎ ও অসৎ এবং এই দুইয়ের অতীত যে অক্ষর সে সবই আপনি।

[যা কিছু ব্যক্ত, তাই সৎ; যা অব্যক্ত তাই অসৎ]

 

৩৮

ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণস্ত্বমস্য

বিশ্বস্য পরং নিধানম্‌।

বেত্তাসি বেদ্যঞ্চ পরঞ্চ ধাম

ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ।।

ত্বম্‌ আদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণঃ ত্বম্‌ অস্য

বিশ্বস্য পরং নিধানম্‌।

বেত্তা অসি বেদ্যং চ পরং চ ধাম

ত্বয়া ততং বিশ্বম্‌ অনন্তরূপ।।

হে অনন্তরূপ, আপনিই আদিদেব, আপনিই চিরন্তন পুরাণপুরুষ, আপনিই এই বিশ্বের পরম অন্তস্থান, আপনিই সর্বজ্ঞ জ্ঞানী এবং আপনিই আরাধ্য জ্ঞান। আপনিই পরম আশ্রয় স্বরূপে এই বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত রয়েছেন।

 

৩৯

বায়ুর্যমোঽগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্কঃ

প্রজাপতিস্ত্বং প্রপিতামহশ্চ।

নমো নমস্তেঽস্তু সহস্রকৃত্বঃ

পুনশ্চ ভূয়োঽপি নমো নমস্তে।।

বায়ুঃ যমঃ অগ্নিঃ বরুণঃ শশাঙ্কঃ

প্রজাপতিঃ ত্বং প্রপিতামহঃ চ।

নমঃ নমঃ তে অস্তু সহস্রকৃত্বঃ

পুনশ্চ ভূয়ঃ অপি নমঃ নমঃ তে।।

আপনিই বায়ু, যম, অগ্নি, আপনিই বরুণ, শশাঙ্ক। আপনিই প্রজাপতিরূপ লোকপিতা, আপনি পিতামহ ব্রহ্মেরও পিতাস্বরূপ। অতএব আপনাকে প্রণাম করি। আবার প্রণাম করিআপনাকে বার বার, সহস্রবার প্রণাম করি।

 

৪০

নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতস্তে

নমোঽস্তু তে সর্বত এব সর্ব।

অনন্তবীর্যামিতবিক্রমস্ত্বং

সর্ব সমাপ্নোষি ততোঽসি সর্বঃ।।

নমঃ পুরস্তাৎ অথ পৃষ্ঠতঃ তে

নমঃ তু তে সর্বতঃ এব সর্ব।

অনন্তবীর্য-অমিতবিক্রমঃ ত্বং

সর্ব সম-আপ্নোষি ততঃ অসি সর্বঃ।।

সমস্ত জীবের আত্মা স্বরূপ, হে সর্বাত্মা, আপনার সামনে প্রণাম, আপনার পিছনে প্রণাম, আপনার সমস্ত দিকে সর্বদা প্রণাম। হে অনন্তবীর্য, আপনার সীমাহীন শক্তিতে আপনি সমস্ত বিশ্বে ব্যাপ্ত রয়েছেন, অতএব আপনিই সর্বস্বরূপ। 

 

৪১

সখেতি মত্বা প্রসভং যদুক্তং

হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সখেতি।

অজানতা মহিমানং তবেদং

ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি।।

সখেতি মত্বা প্রসভং যৎ উক্তং

হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সখেতি।

অজানতা মহিমানং তব ইদং

ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি।।

আপনার এই বিশ্বরূপ ও মহিমা সম্পর্কে আমার কোন ধারণা না থাকায়, আপনাকে আমি মনের ভ্রমবশতঃ কিংবা আপনার প্রতি একান্ত ভালোবাসাবশতঃ আপনাকে বন্ধু চিন্তা করে, কখনো হে কৃষ্ণ, হে যাদব, হে সখা, এই রকম অবিনীত সম্বোধনে ডেকেছি,

 

৪২

যচ্চাবহাসার্থমসৎকৃতোঽসি

বিহারশয্যাসনভোজনেষু।

একোঽথবাপ্যচ্যুত তৎসমক্ষং

তৎ ক্ষাময়ে ত্বামহমপ্রমেয়ম্‌।।

যৎ চ অবহাস-অর্থম্‌ অসৎকৃতঃ অসি

বিহার-শয্যা-আসন-ভোজনেষু।

একঃ অথবা অপি অচ্যুত তৎসমক্ষং

তৎ ক্ষাময়ে ত্বাং অহম্‌ অপ্রমেয়ম্‌।।

হে অচ্যুত, ভ্রমণকালে, শয়নকালে, অবসরকালে, ভোজনকালে, আপনার সামনে কিংবা আপনার আড়ালে, আপনার সঙ্গে একান্তে অথবা সকলের মাঝখানে পরিহাসছলে আপনার যে অমর্যাদা করেছি, হে অপ্রমেয়, তার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি।

   

৪৩

পিতাঽসি লোকস্য চরাচরস্য

ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্‌।

ন ত্বৎসমোঽস্ত্যভ্যধিকঃ কুতোঽন্যো

লোকত্রয়েঽপ্যপ্রতিমপ্রভাব।।

পিতা অসি লোকস্য চরাচরস্য

ত্বমস্য পূজ্যঃ চ গুরুঃ-গরীয়ান্‌।

ন ত্বৎসমঃ অস্তি অভ্যধিকঃ কুতঃ অন্যঃ

লোকত্রয়ে অপি অপ্রতিমপ্রভাব।।

হে অসীমপ্রভাব, আপনি এই জগত ও এই চরাচরের স্রষ্টা পিতা। আপনি পূজনীয় এবং গুরুরও গুরু। ত্রিলোকে আপনার সমতুল্য কেউ নেই, অন্যত্রই বা আর কে আছে?

 

৪৪

তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং

প্রসাদয়ে ত্বামহমীশমীড্যম্‌।

পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ

প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢ়ুম্‌।।

তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং

প্রসাদয়ে ত্বাম্‌ অহম্‌ ঈশম্‌ ঈড্যম্‌।

পিতা ইব পুত্রস্য সখা ইব সখ্যুঃ

প্রিয়ঃ প্রিয়ায়াঃ অর্হসি দেব সোঢ়ুম্‌।।

হে দেব, আপনিই জগতের আরাধ্য ভগবান, অতএব, আমি আপনাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করি, আপনি আমার উপর প্রসন্ন হোন এবং পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর, পতি যেমন পত্নীর, তেমনি আপনিও আমার অপরাধ ক্ষমা করুন।

       

৪৫

অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতোঽস্মি দৃষ্ট্বা

ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনো মে।

তদেব মে দর্শয় দেব রূপং

প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।

অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতঃ অস্মি দৃষ্ট্বা

ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনঃ মে।

তৎ এব মে দর্শয় দেব রূপং

প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।

হে দেব, আগে কোনদিন না দেখা আপনার এই রূপ দেখে আমি যেমন আনন্দ পেয়েছি, তেমনি অত্যন্ত ভয়ে মনে যন্ত্রণা অনুভব করছি। হে দেবেশ, হে জগতের আশ্রয়, জগন্নিবাস, আপনি আপনার সেই আগেকার রূপেই আমাকে দর্শন দিন, আপনি প্রসন্ন হোন।  

 

 

৪৬

কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তমিচ্ছামি

ত্বাং দ্রষ্টুমহং তথৈব।

তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন

সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।

কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তম্‌ ইচ্ছামি

ত্বাং দ্রষ্টুম্‌ অহং তথা এব।

তেন এব রূপেণ চতুর্ভুজেন

সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।

মাথায় মুকুট, হাতে গদা ও চক্র নিয়ে আপনার সেই আগের রূপই আমি দেখতে চাই। আপনার এই সহস্রবাহু বিশ্বরূপ নয়, আপনি আবার সেই চতুর্ভুজ রূপই ধারণ করুন।

[ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সাধারণের কাছে দ্বিভুজ রূপে দেখা দিলেও, তাঁর মহাভক্তসখা অর্জুন তাঁকে চতুর্ভুজ রূপেই দেখতে পেতেন।]

 

৪৭

শ্রীভগবানুবাচ

ময়া প্রসন্নেন তবার্জুনেদং

রূপং পরং দর্শিতমাত্মযোগাৎ।

তেজোময়ং বিশ্বমনন্তমাদ্যং

যন্মে ত্বদন্যেন ন দৃষ্টপূর্বম্‌।।

শ্রীভগবান উবাচ

ময়া প্রসন্নেন তব অর্জুন ইদং

রূপং পরং দর্শিতম্‌ আত্মযোগাৎ।

তেজোময়ং বিশ্বম্‌ অনন্তম্‌ আদ্যং

যন্মে ত্বৎ অন্যেন ন দৃষ্টপূর্বম্‌।।

শ্রীভগবান বললেন- হে অর্জুন, তোমার প্রতি প্রসন্ন হয়েই, আমার অলৌকিক যোগপ্রভাবে, আমি তোমাকে আমার এই তেজস্বী, বিশ্বব্যাপী, অনন্ত আদি, পরম স্বরূপ দেখালাম। তুমি ছাড়া এর আগে আমার এই রূপ আর কেউ দেখে নি। 

 

৪৮

ন বেদযজ্ঞাধ্যয়নৈর্ন দানৈর্ন

চ ক্রিয়াভির্ন তপোভিরুগ্রৈঃ।

এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলোকে

দ্রষ্টুং তদন্যেন কুরুপ্রবীর।।

ন বেদ-যজ্ঞ-অধ্যয়নৈঃ ন দানৈঃ ন

চ ক্রিয়াভিঃ ন তপোভিঃ উগ্রৈঃ।

এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলোকে

দ্রষ্টুং তৎ অন্যেন কুরুপ্রবীর।।

হে কুরুশ্রেষ্ঠ, বেদপাঠ, যজ্ঞের অনুষ্ঠান, দান, অগ্নিহোত্র ক্রিয়া, কঠোর তপস্যা করেও নরলোকে আমার এই রূপ তুমি ছাড়া অন্য কেউ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয় নি।

 

৪৯

মা তে ব্যথা মা চ বিমূঢ়ভাবো

দৃষ্ট্বা রূপং ঘোরমীদৃঙ্‌মমেদম্‌।

ব্যপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনস্ত্বং

তদেব মে রূপমিদং প্রপশ্য।।

মা তে ব্যথা মা চ বিমূঢ়ভাবঃ

দৃষ্ট্বা রূপং ঘোরম্‌ ঈদৃক্‌ মম ইদম্‌।

ব্যপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনঃ ত্বং

তৎ এব মে রূপম্‌ ইদং প্রপশ্য।।

আমার এই ভয়ংকর বিশ্বরূপ দেখে তুমি কষ্ট পেও না, ব্যাকুল হয়ো না। মন থেকে ভয় দূর করো, প্রসন্ন চিত্ত হও, আমার আগেকার রূপ দর্শন করো।  

 

৫০

সঞ্জয় উবাচ

ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা

স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ।

আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং

ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।।

সঞ্জয় উবাচ

ই্তি অর্জুনং বাসুদেবঃ তথা উক্ত্বা

স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ।

আশ্বাসয়াম্‌ আস চ ভীতম্‌ এনং

ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুঃ মহাত্মা।।

সঞ্জয় বললেন- অর্জুনকে এই কথা বলে, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ আগেকার নিজ মূর্তিতেই আবার দর্শন দিলেন।  তাঁর মহান সৌম্যমূর্তি দেখিয়ে, অর্জুনের মন থেকে ভয় দূর ক’রে, তাকে আশ্বস্ত করলেন।

   

৫১

অর্জুন উবাচ

দৃষ্ট্বে দং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।

ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ।।

অর্জুন উবাচ

দৃষ্ট্বা ইদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।

ইদানীম্‌ অস্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ।।

অর্জুন বললেন – হে জনার্দন, তোমার এই সৌম্য মানব রূপ দেখে এখন আমি প্রকৃতিস্থ হলাম, আমি আমার মনে শান্তি ও প্রসন্নতা অনুভব করছি।

 

৫২

শ্রীভগবানুবাচ

সুদুর্দর্শমিদং রূপং দৃষ্টবানসি যন্মম।

দেবা অপ্যস্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙ্ক্ষিণঃ।।

শ্রীভগবান উবাচ

সুদুর্দর্শম্‌ ইদং রূপং দৃষ্টবান্‌ অসি যৎ মম।

দেবা অপি অস্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙ্ক্ষিণঃ।।

শ্রীভগবান বললেন- তুমি আমার এই যে অতি দুর্লভ বিশ্বরূপ প্রত্যক্ষ করলে, দেবতারাও সর্বদা আমার এই রূপ দেখতে অভিলাষ করেন।  

 

৫৩

নাহং বেদৈর্ন তপসা ন দানেন ন চেজ্যয়া।

শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবানসি মাং যথা।।

না অহং বেদৈঃ ন তপসা ন দানেন ন চ ইজ্যয়া।

শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবান্‌ অসি মাং যথা।।

আমার স্বরূপ তুমি যেমন প্রত্যক্ষ করলে, শুধুমাত্র বেদ পাঠ ক’রে, তপস্যা ও দানধ্যান ক’রে কিংবা হোম, যা্‌গ, যজ্ঞ ক’রে আমার এই বিশ্বরূপ প্রত্যক্ষ করার যোগ্য হওয়া যায় না।

 

৫৪

ভক্ত্যা ত্বনন্যয়া শক্য অহমেবংবিধোঽর্জুন।

জ্ঞাতুং দ্রষ্টুং চ তত্ত্বেন প্রবেষ্টুং চ পরন্তপ।।

ভক্ত্যা তু অনন্যয়া শক্য অহম্‌ এবংবিধঃ অর্জুন।

জ্ঞাতুং দ্রষ্টুং চ তত্ত্বেন প্রবেষ্টুং চ পরন্তপ।।

হে অরিদমন অর্জুন, শুধুমাত্র একনিষ্ঠ অনন্য ভক্তি দিয়েই আমাকে জানা, আমার স্বরূপ প্রত্যক্ষ দর্শন করা এবং শেষে আমার আত্মাতেই বিলীন হওয়া সম্ভব।

 

৫৫

মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।

নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব।।

মৎকর্মকৃৎ মৎপরমঃ মৎ-ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।

নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মাম্‌ এতি পাণ্ডব।।

হে পাণ্ডব, যিনি আমার উদ্দেশেই কাজ করেন, আমার শরণাপন্ন হন, আমার ভক্ত হয়ে সমস্ত আসক্তি থেকে মুক্তি পান এবং সর্বভূতে যাঁর কোন শত্রুভাব নেই, তিনিই আমাকে লাভ করতে পারেন। 




বিশ্বরূপদর্শনযোগ সমাপ্ত


পরের পর্ব পাশের সূত্রে " গীতা - ১২শ পর্ব



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...