বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/২

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের প্রথম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৪/১"]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

দ্বিতীয় পর্বাংশ 

৪.১.৩  যিশুর জীবনের অজানা সেই ষোলোটি বছর

১৮৯০ সালে এক রাশিয়ান পর্যটক ও সাংবাদিক মিঃ নিকোলাস নোটোভিচ ফরাসী ভাষায় একটি বিতর্কিত গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, সেই বইটি ইংরিজিতে অনূদিত হয়েছিল, নাম “দি আননোন লাইফ অফ জেসাস ক্রাইস্ট”। সেই বইতে মিঃ নোটোভিচ বর্ণনা করেছেন, উত্তরপশ্চিম ভারত ভ্রমণের সময়, তিনি লাদাখের লে শহর থেকে ৪৫ কিমি দূরের হিমিগুম্ফায় (Hemis Monastery) বেড়াতে গিয়েছিলেন। গুম্ফা থেকে ফেরার পথে এক দুর্ঘটনায় – ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে - তাঁর পা ভেঙে যাওয়ার কারণে তাঁকে প্রায় দেড় মাস ওই গুম্ফাতেই ফিরে গিয়ে, চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল। সেই সময়ে গুম্ফার প্রধান লামাজীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রধান লামাজীর সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনায় তিনি জানতে পারেন, ওই গুম্ফায় এমন কিছু স্ক্রোল[1] আছে, যাতে “ইশা”-র (বৌদ্ধ গ্রন্থে তো বটেই ভারতীয় পরম্পরায়ও যিশুকে “ইশা” বলা হয়) জীবনের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। হিমিগুম্ফার স্ক্রোলগুলি তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ এবং মূল স্ক্রোলগুলি পালি ভাষায় রচিত। বহু বছর আগে মূল স্ক্রোলগুলি ভারত থেকে নেপালে এসেছিল, সেখান থেকে এসেছিল তিব্বতের লাসায়, এখনও সেখানেই আছে।

হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজীর উক্তি উল্লেখ করে নোটোভিচ লিখেছেন, “বৌদ্ধদের কাছে ঈশা একটি অত্যন্ত সম্মানীয় নাম। যদিও তাঁর কথা শুধু প্রধান লামারাই জানেন, যাঁরা ঈশার সম্পর্কে ওই স্ক্রোলগুলি পড়েছেন। যুগে যুগে ঈশার মতো অসংখ্য বুদ্ধ পৃথিবীতে এসেছেন, তাঁদের সকলের কথাই লেখা আছে ৮৪,০০০ স্ক্রোলে! আমাদের গুম্ফাতেও সেই সব স্ক্রোলের অনুবাদ বেশ কিছু রয়েছে, যেগুলি আমি অবসর সময়ে পড়ে থাকি। সেখানে ঈশা-বুদ্ধের কথাও আছে, যিনি ভারতে এবং ইজরায়েলে তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন”।

নোটোভিচের অনুরোধে হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজী, ঈশা-বুদ্ধের স্ক্রোল থেকে কিছু অংশ পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং নোটোভিচ তাঁর তিব্বতী দোভাষীর মাধ্যমে সেগুলি নিজের মতো লিখে নিয়েছিলেন। নোটোভিচ তাঁর উল্লিখিত বইখানিতে তাঁর ভারতভ্রমণের বিস্তারিত বর্ণনা এবং হিমিগুম্ফার প্রধান লামাজীর পাঠ করা ওই স্ক্রোলের অংশগুলি প্রকাশ করেছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রন্থ প্রকাশে পশ্চিমের খ্রিষ্টিয় মহলে তুমুল বিতর্ক ও আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। নোটোভিচের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে, ইওরোপের বেশ কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি এর পরে হিমিগুম্ফায় গিয়েছিলেন। তাঁরা ফিরে এসে, বিবৃতি দিয়েছিলেন, মিঃ নোটোভিচ হিমিগুম্ফাতে নাকি কোনদিনই যাননি, এবং প্রধান লামাজী নোটোভিচ নামের কোন লোককে নাকি চেনেনই না। অতএব তাঁরা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন নোটোভিচ একজন মিথ্যাবাদী এবং তাঁর তথ্যগুলি সবই বানিয়ে তোলা (fabricated)!

বেলুড় মঠের সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্বামী অভেদানন্দ ১৯২২ সালে কাশ্মীর ও তিব্বত ভ্রমণে যান এবং ভ্রমণের সময় তিনি হিমিগুম্ফাতেও গিয়েছিলেন। হিমিগুম্ফা সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কৌতূহলের কারণ, তার আগে আমেরিকায় থাকাকালীন তিনি নোটোভিচের গ্রন্থটি পড়েছিলেন এবং এই গ্রন্থ নিয়ে যাবতীয় বিতর্ক ও সমালোচনা সম্পর্কেও তিনি অবহিত ছিলেন। স্বামীজী হিমিগুম্ফার লামাজীদের সঙ্গে মিঃ নোটোভিচ এবং তাঁর লেখা সম্পর্কে আলোচনা করে জেনেছিলেন, মিঃ নোটোভিচের ঘটনা এবং তথ্যসমূহ সম্পূর্ণ সত্য। তিনি গুম্ফার লামাজীদের কাছে স্ক্রোলগুলি দেখতে চাইলে, তাঁকেও দেখানো হয়েছিল। লামাজীরা তাঁকেও বলেছিলেন, হিমিগুম্ফার স্ক্রোলগুলি মূল স্ক্রোলের তিব্বতী নকল, মূল পালিভাষার স্ক্রোলগুলি আছে লাসার কাছে মারবুর অঞ্চলের এক গুম্ফায়। যিশু সম্পর্কিত মূল স্ক্রোলগুলিতে চোদ্দটি পরিচ্ছেদ আছে এবং তাতে মোট ২২৪টি শ্লোক আছে। স্বামিজী তাঁর দোভাষীর সাহায্যে এই শ্লোকগুলির কিছু অংশ অনুবাদ করে এনেছিলেন, তার নির্বাচিত কয়েকটিঃ-

পরিচ্ছেদ ৪

১০. “ক্রমে ঈশা ত্রয়োদশ বৎসরে পদার্পণ করিলেন। এই বয়েসে ইজরায়েলের জাতীয় প্রথানুযায়ী বিবাহ-বন্ধনে[2] আবদ্ধ হয়। তাঁহার পিতামাতা সামান্য গৃহস্থের ন্যায় দিন যাপন করিতেন”।

১২. “ঈশা বিবাহ করিতে নারাজ ছিলেন। তিনি ইতঃপূর্বেই বিধাতৃ-পুরুষের স্বরূপ ব্যাখ্যায় খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। বিবাহের কথায় তিনি গোপনে পিতৃগৃহ পরিত্যাগ করিতে সংকল্প করিলেন”।

১৪. “তিনি জেরুজালেম পরিত্যাগ করিয়া একদল সওদাগরের সঙ্গে সিন্ধুদেশ অভিমুখে রওনা হইলেন। উহারা সেখান হইতে মাল লইয়া যাইয়া দেশ-বিদেশে রপ্তানি করিত”।

পরিচ্ছেদ ৫

১. “তিনি চৌদ্দ বৎসর বয়সে উত্তর সিন্ধুদেশ অতিক্রম করতঃ পবিত্র আর্যভূমিতে আগমন করিলেন”।

৪. “তিনি ক্রমে ব্যাস-কৃষ্ণের লীলাভূমি জগন্নাথধামে উপনীত হইলেন এবং ব্রাহ্মণগণের শিষ্যত্ব লাভ করিলেন। তিনি সকলের প্রিয় হইলেন এবং সেখানে বেদ পাঠ করিতে, বুঝিতে ও ব্যাখ্যা করিতে শিক্ষা করিতে লাগিলেন।

(অভেদানন্দ স্বামীজীর “কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত।)

শ্রদ্ধেয় স্বামীজীকে লামাজী আরও বলেছিলেন, যিশুখ্রিষ্ট পুনরুত্থানের (Resurrection) পর গোপনে কাশ্মীর চলে এসেছিলেন এবং সঙ্ঘ নির্মাণ করে, বহু শিষ্য সহ আমৃত্যু (অবশ্যই স্বাভাবিক মৃত্যু) সেখানেই ছিলেন। যিশুর মৃত্যুর তিন-চার বছর পর পালি ভাষায় এই স্ক্রোলগুলি লেখা হয়েছিল।

এবার নোটোভিচের লেখা থেকে ভগবান যিশুর ভারতবাসের কিছু ঘটনা দেখে নেওয়া যাক, -

পরিচ্ছেদ ৫

৫. তিনি জগন্নাথ, রাজগৃহ, বেনারস এবং অন্যান্য তীর্থে ছ’ বছর কাটিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ ঈশাকে ভালোবাসত, কারণ তিনি বৈশ্য এবং শূদ্রদের সঙ্গে শান্তিতে বাস করতেন, তাদের পবিত্র শাস্ত্র শেখাতেন।

৬. কিন্তু ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা তাঁকে বলেছিলেন, তারা নিষিদ্ধ, কারণ তাদের সৃষ্টি হয়েছে পর-ব্রহ্মের উদর এবং পদতল থেকে।

৭. বৈশ্যরা বেদমন্ত্র শুধু শুনতে পারে, তাও বিশেষ কোন পর্বের দিনে এবং

৮. শূদ্রদের বেদপাঠের স্থানে উপস্থিত থাকা, এমনকি দেখাও নিষিদ্ধ, কারণ তারা আজীবন দাসত্বে পতিত, তারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, এমনকি বৈশ্যদেরও ক্রীতদাস।

৯. “একমাত্র মৃত্যুই তাদের এই দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে”, পর-ব্রহ্ম বললেন, “অতএব ওদের ত্যাগ করো, এবং আমাদের সঙ্গে দেবতাদের উপাসনা কর, তাঁকে অমান্য করে নিজের প্রতি তাঁদের ক্রুদ্ধ করে তুলো না”।

১০. কিন্তু ঈশা, তাঁদের কথা অমান্য করেই শূদ্রদের সঙ্গে রইলেন, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে প্রচার করতে লাগলেন।

১১. সাথী-মানুষদের মানবিক ও আধ্যাত্মিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, কিছু মানুষের এই উদ্ধত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে উঠলেন। “নিশ্চিতভাবেই (verily)”, তিনি বললেন, “ঈশ্বর তাঁর সন্তানদের মধ্যে কোন বিভেদ রাখেননি, তাঁর কাছে সকলেই সমান প্রিয়”।

১৩. “ঈশ্বর তোমার প্রভু, তাঁকে ভয় করো, তাঁর সামনে নতজানু হও এবং তোমার উপার্জনের উপহার তাঁকে সমর্পণ করো”।

১৪. ঈশা ত্রিমূর্তি এবং পর-ব্রহ্মের অবতার - বিষ্ণু, শিব এবং অন্যান্য দেবতাদের অস্বীকার করলেন, “কারণ”, তিনি বললেন,

১৫. “শাশ্বত বিচারক, শাশ্বত আত্মার মধ্যেই এই জগতের অনন্য এবং অভিন্ন আত্মা বিরাজ করছেন, এবং একমাত্র সেই আত্মাই সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সকলের মধ্যে নিহিত থেকে প্রাণ সঞ্চার করেন”।

পরিচ্ছেদ ছয়

১. শ্বেতবসন পুরোহিত এবং যোদ্ধারা[3] যখন শূদ্রদের প্রতি ঈশার এই উপদেশের কথা জানল, তারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল এবং তরুণ এই শিক্ষককে খুঁজে বের করে হত্যা করতে পাঠালো তাদের অনুচরদের।

২. কিন্তু শূদ্ররা তাঁকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়ায়, ঈশা রাত্রেই জগন্নাথ ভূমি ছেড়ে পাহাড়ের দিকে রওনা হলেন এবং “গৌতমাইড” (Gautamides)[4] -এর দেশে অবস্থান করতে লাগলেন, যেখানে মহান বুদ্ধ শাক্য-মুনির আবির্ভাব হয়েছিল এবং (যে দেশের) মানুষরা একমাত্র মহিমময় ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁদের মধ্যে।

৩. ঈশা যখন পালি ভাষা শিখে ফেললেন, তিনি পবিত্র সূত্রগুলির স্ক্রোল পাঠে মনোনিবেশ করলেন।

৪. ছ’বছর গভীর চর্চার পর, ঈশা, যাঁকে বুদ্ধ তাঁর পবিত্র বাণী প্রচারের জন্য নির্বাচিত করেছেন, পবিত্র স্ক্রোলগুলির নিখুঁতব্যাখ্যা করতে পারতেন।

৫. এরপর তিনি নেপাল এবং হিমালয় ছেড়ে রাজপুতানার উপত্যকায় নেমে গেলেন এবং পশ্চিমে যাত্রা শুরু করলেন।

(“The Unknown Life of Jesus Christ” – গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, বাংলা অনুবাদ – লেখক)

অতএব দেখা যাচ্ছে, ভগবান যিশুর ভারতবাস যথেষ্ট ঘটনাবহুল। ইজরায়েলের আগেই, তিনি ধর্মপ্রচারের সূচনা করেছিলেন এই ভারতেই, অন্ততঃ বৈশ্য এবং শূদ্র বর্ণের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষদের মধ্যে। এবং তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে যাওয়াতে এদেশেও তাঁর প্রাণনাশের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর নিজের দেশেই হোক অথবা ভারতে, সব দেশেই পুরোহিত সম্প্রদায় এবং রাজন্যবর্গদের চরিত্র যে একই, ধার্মিক ভারতে এসে অন্ততঃ এটুকু স্পষ্ট উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল।

ভগবান যিশুর ভারতে ধর্মপ্রচারের আরেকটি প্রচলিত ধারণার উল্লেখ করেছেন শ্রদ্ধেয় অভেদানন্দ স্বামীজি, তাঁর “কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থে। বাংলার রাজনৈতিক নেতা শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল “প্রবাসী” পত্রিকায় তাঁর লেখা কোন এক প্রবন্ধে মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে শোনা যে কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন, সেটি এরকমঃ-

পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহাশয়ের মুখে একদিন শুনিয়াছিলাম যে, তিনি একবার একদল যোগী-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে আরাবল্লী পর্বতে গিয়াছিলেন। এই সম্প্রদায়ের যোগীদের “নাথ” উপাধি ছিল। ইঁহারা “নাথযোগী” বলিয়া নিজেদের পরিচয় দিতেন। ইঁহাদের সম্প্রদায়-প্রবর্তকদিগের মধ্যে “ইশাই নাথ” নামে এক মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁহার জীবনী এই নাথযোগীদের ধর্মপুস্তকে লেখা আছে। গোস্বামী মহাশয়কে একজন নাথযোগী তাঁহাদের ধর্মগ্রন্থ হইতে ঈশাই নাথের জীবনচরিত পড়িয়া শুনাইয়াছিলেন। খৃষ্টানদের বাইবেলে যীশুখৃষ্টের জীবনচরিত যে ভাবে পাওয়া যায়, ঈশাই নাথের জীবনচরিত মোটের উপর তাহাই”।

ইহার উপরে বিপিনবাবু এইরূপ মন্তব্য করেনঃ “বাইবেলে যীশুর যে জীবন-ইতিহাস পাওয়া যায়, তাহাতে দ্বাদশ হইতে ত্রিংশৎ বর্ষ পর্যন্ত এই আঠারো বৎসরের যীশুর জীবনের কোন খোঁজ-খবর মিলে না। কেহ কেহ অনুমান করেন যে, এই সময়ের মধ্যে যীশু ভারতবর্ষে আসিয়াছিলেন এবং তিনিই নাথ যোগী সম্প্রদায়ের এই ঈশাই নাথ”। (“কাশ্মীর ও তিব্বতে” গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত - বানান অপরিবর্তিত।)

ভগবান যিশুর ক্রুশবিদ্ধ (Crucifixion) হয়ে (আপাত) মৃত্যু হয়েছিল ৩০ থেকে ৩৩ সি.ই.-র মধ্যে। অতএব বাইবেলের নূতন-বিধান লেখার সময় রোম সম্রাট বা রাজার থেকে তাঁর প্রাণসংশয়ের কোন আশঙ্কা থাকতে পারে না। কিন্তু বাইবেলের নূতন-বিধান যখন লেখা হয় (৫০ থেকে ১০০ সি.ই.-র কোন সময়ে) ইহুদিদের রাজা এবং পরিত্রাতা যিশুর তের থেকে ঊনত্রিশ – ষোলো বছরের ইতিহাস হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই গোপন করা হয়েছিল। কেন, তার স্পষ্ট কোন উত্তর পাওয়া যায় না। হয়তো নূতন-বিধান লেখার সময় সন্ন্যাসী ম্যাথিউ, লিউক, মার্ক এবং জন জানতেন ভগবান যিশু তখনও সুস্থ অবস্থাতেই জীবিত এবং রয়েছেন ভারতবর্ষের কাশ্মীরে। সেক্ষেত্রে সত্য ঘটনা প্রকাশ করে, তাঁরা ভগবান যিশুর বিপদ বাড়াতে চাননি।

খ্রিষ্টধর্মে বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব কতটা কিংবা আদৌ ছিল কি না, এই বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য নয়। সেই বিষয়ে বহু পণ্ডিতের বহু গ্রন্থ প্রচলিত রয়েছে। এই গ্রন্থে এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ, বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শনের আন্তর্জাতিকতা। সম্রাট অশোকের সময়েই সিংহল, বার্মা, শ্যাম, কম্বোজ, সুমাত্রা, জাভা প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছিল সে কথা আগেই বলেছি। উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল, যিশুখ্রীষ্টের জন্মের প্রায় দুশ বছর আগে থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও “পেগান” ধর্ম বিরোধী, দুটি ইহুদি ধর্মগোষ্ঠীর – থেরাপিউট এবং এসেনেস বা নাজারিন - সৃষ্টি হয়েছিল, স্পষ্টতঃ বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে। এরপর পরবর্তী কয়েকশ বছরে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন, খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতকে চীন, খ্রীষ্টাব্দ চতুর্থ শতকে কোরিয়া, খ্রিষ্টিয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে ফরমোসা ও মঙ্গোলিয়া, খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতকে জাপান এবং তিব্বত। বৌদ্ধধর্মের এই আন্তর্জাতিকতা ভারতীয় সংস্কৃতি, স্থাপত্য, শিল্প এবং বিজ্ঞানকে কতটা প্রভাবিত করেছিল সে কথা আলোচনা করা যাবে পরবর্তী পর্যায়ে।



[1] স্ক্রোল (scroll) – এক ধরনের কাগজের ওপর লেখা পুঁথি, যেগুলি পাকিয়ে গোল করে রাখা হয়। আজকাল জ্যোতিষীরা কুষ্ঠীর কম্পিউটার প্রিন্ট-আউট দেন A4 কাগজে, কিন্তু কিছুদিন আগেও জাতকের কুষ্ঠি বা ঠিকুজি লেখা হত হলুদ রঙের বিশেষ কাগজের স্ক্রোলে। এগুলি খুব সহজেই বহুদিন সুরক্ষিত রাখা যেত।   

[2] ইহুদিদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল এমন কথা কোনদিনই শোনা যায়নি। বরং ইহুদিদের মধ্যে যে প্রথার প্রচলন ছিল সেটি এরকম – ছেলেদের তের আর মেয়েদের বারো বছর বয়স হলে, তাদের ইহুদিয় প্রত্যাদেশের বিধি পালনের দায়িত্ব অর্পণ করা হত – অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে ওই বয়সে ছেলেমেয়েদের ইহুদি ধর্মীয় গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তি হত। এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় বার এবং বাত মিৎসবা (Bar and Bat Mitzvah)। “বার” এবং “বাত” কথাগুলি আরামায়িক, অর্থ পুত্র এবং কন্যা। আর হিব্রু এবং আরামায়িক ভাষায় “মিৎসবা” কথার অর্থ প্রত্যাদেশ (commandment)। অতএব শৈশবের সাধারণ মানব অবস্থা কাটিয়ে ইহুদি পুত্র-কন্যারা হয়ে ওঠেন প্রত্যাদেশ-পুত্র এবং প্রত্যাদেশ-কন্যা। হতে পারে এই বিষয়টি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বুঝতে ভুল করে থাকবেন।     

[3] ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা।

[4] গৌতমাইড্‌স্‌ (Gautamides) – হয়তো গৌতমবুদ্ধের অনুগামী ভিক্ষু ও ভক্তদের কথা বলা হয়েছে। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী – নেপালের কপিলাবস্তু অঞ্চল।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/৩ "

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...