এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের দশম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - " এক যে ছিলেন রাজা - ১০ম পর্ব "
২৩
আষাঢ়ের
দ্বিতীয় পক্ষ থেকে মহারাণি সুনীথা রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেছেন। এই
অংশগ্রহণে তিনি সম্মত হয়েছিলেন, একটি মাত্র শর্তে, মহর্ষি ভৃগুকে রাজপ্রসাদে নিয়মিত
পরিদর্শনে আসতে হবে। তাঁর এই শর্তে পূর্ণ সম্মতি ছিল সকল মন্ত্রী এবং
অমাত্যমণ্ডলীর। তাঁরা প্রত্যেকেই মহারাজ অঙ্গের অনুপস্থিতিতে মহর্ষি ভৃগুর উপর
সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মহর্ষি ভৃগুর সুচিন্তিত মতামত এবং অনুমোদন ছাড়া কোন প্রশাসনিক
সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হবে না। মহর্ষি ভৃগু তাঁদের এই প্রার্থনায় আপত্তি করেননি।
তিনি নিজেও এই রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি আজকাল পক্ষকাল অন্তর
রাজপ্রাসাদে আসেন। রাজা বেণের শারীরিক অবস্থার পর্যালোচনা করেন। মহারাণি ও মন্ত্রীমণ্ডলীর
সঙ্গে রাজ্য পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা করেন, রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করেন। তিনি সুচিন্তিত মতামত দেন, উপদেশ দেন।
মহারাণি
পুত্র বেণকে নিজের মহলে নিয়ে এসেছেন অনেকদিন। নিজের শয়নঘরের রাজকীয় পালঙ্কেই এখন
পুত্র বেণ শয্যাশায়ী। সেই ঘরেই তিনজন সেবিকা দিবারাত্র তাঁর পরিচর্যা করে। রাজবৈদ্য মৈত্রেয় পাশের কক্ষে বাস করেন, তিনি
অষ্টপ্রহর রাজাবেণের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিরত রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন, সহকারী
দুই আয়ুর্বেদজ্ঞ। তাঁরা মহর্ষি ভৃগুর আশ্রমের স্নাতক। আর আশ্রম থেকে নিয়মিত আসেন
আয়ুর্বেদাচার্য বিশ্ববন্ধু।
আচার্য
বিশ্ববন্ধু এবং মহামন্ত্রী বিমোহন বিমোহনকে সঙ্গে নিয়ে মহর্ষি ভৃগু আজ মহারাণির
দর্শনপ্রার্থী হয়েছেন। দাসী পদ্মবালা তাঁদের দেখেই প্রণাম করে অন্দরে গেলেন,
মহারাণি সুনীথাকে সংবাদ দিতে। সংবাদ পাওয়া মাত্র মহারাণি সুনীথা ব্যস্ত হয়ে
সম্মুখের অলিন্দে বেরিয়ে এলেন, বললেন, “মহর্ষিঠাকুর, এই রাজপ্রাসাদে, এই মহলের সর্বত্র,
আপনার প্রবেশের জন্যে অনুমতির প্রয়োজন হয় নাকি? আসুন, ভেতরে আসুন, মহর্ষিঠাকুর।
পুত্র বেণ, এখন আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ এবং আমিও অনেকটাই চিন্তামুক্ত”।
“অতি
উত্তম সংবাদ মহারাণি। এ সবই পরমেশ্বরের কৃপা”! স্মিতমুখে মহর্ষি বললেন। তিনি
লক্ষ্য করলেন, মহারাজ বেণের অসুস্থতার পর, প্রথমদিন মহারাণিকে যে বিধ্বস্ত অবসন্ন
অবস্থায় তিনি দেখেছিলেন, তার তুলনায় মহারাণি এখন অনেকটাই সজীব এবং সপ্রতিভ। তাঁর
আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে মহারাণিসুলভ ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ মনোকষ্টে এবং কৃচ্ছ্রসাধনে
তাঁর যে শরীর জীর্ণ হয়ে উঠেছিল, সেই শরীর
আজ নির্মেদ ঋজু, কিন্তু মহিমময়ী।
মহর্ষি
ভৃগুকে পুত্রের শয্যার পাশে নিয়ে গিয়ে মহারাণি পুত্রবেণকে বললেন, “পুত্র বেণ, দেখ
তোমার সঙ্গে দেখা করতে, কে এসেছেন”। রাজাবেণ পাথরের মূর্তির মতো গৃহের ছাদের দিকে
তাকিয়ে ছিলেন, মাতার কণ্ঠস্বরে তাঁর দৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন হল না। একইভাবে নিষ্পলক
তাকিয়ে রইলেন। মহর্ষি ভৃগু তীক্ষ্ণ চোখে রাজা বেণকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন, “বৎস
মৈত্রেয়, মহারাজ বেণের শারীরিক পরিস্থিতি কেমন? ওঁনার চেতনা এখন কোন অবস্থায়?”
“প্রণাম
গুরুদেব। শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। কিন্তু মহারাজ বেণের চেতনা আদৌ সন্তোষজনক নয়।
ওঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের প্রায় কোন সংযোগই নেই। পূর্ণ স্নায়বিক বৈকল্য!”
গভীর
চিন্তামগ্ন মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অসুস্থতার পর মাসাধিককাল তুমি ওঁনার চিকিৎসায়
নিরন্তর নিরত, প্রথমাবস্থা থেকে আজ পর্যন্ত কোন উন্নতিই তুমি লক্ষ্য করছো না?”
“না
গুরুদেব, উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন আমি দেখিনি”।
মহর্ষি
ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমারও কী তাই মত, বৎস বিশ্ববন্ধু?”
“হ্যাঁ
গুরুদেব, আমারও তাই অভিমত। গতবার আপনার নির্দেশিত ঔষধ প্রয়োগে, রাজাবেণের চরম
অসুস্থতার আশ্চর্য উপশম হয়েছিল। কিন্তু ওইটুকুই, তারপর আর তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে
না”। মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের দক্ষিণ হাত তুলে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগে নাড়ি পরীক্ষা
করলেন। তারপর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে দুই চোখের কনীনিকা নিরীক্ষণ করলেন। তাঁর চোখের
অত্যন্ত কাছে অকস্মাৎ হাত নিয়ে গেলেন। কিন্তু রাজাবেণের নির্বিকার চোখের পল্লবে
কোন সাড়া পাওয়া গেল না, একইভাবে অবিচল দৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গভীর
শ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের পায়ের দিকে গিয়ে, পদতলে
নখের আঁচড় কাটলেন, রাজাবেণ তবুও নির্বিকার – জড়পদার্থের মতো ঊর্ধে একইভাবে তাকিয়ে
রইলেন।
মহর্ষি ভৃগু গভীর হতাশায় মাথা নীচু করে বললেন, “ঈশ্বরের
কৃপা ছাড়া অন্য কোন পথ আর খোলা নেই, মহারাণি। রাজা বেণের চিকিৎসায় এতটুকুও অবহেলা
না করে, আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। হয়তো
প্রকৃতির কোন আশ্চর্য লীলায়, রাজাবেণ সুস্থ হয়ে উঠতেও পারেন”।
দুই নয়নে অশ্রুবাষ্প নিয়ে রাজমাতা সুনীথা বললেন, “শুনেছি
আজকাল আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে, অনেক দুরারোগ্য ব্যধিও নিরাময় হচ্ছে। আমার
পুত্রের আরোগ্যের জন্যে অন্য কোন ঔষধের বিধান কী আপনি দিতে পারেন না, মহর্ষিঠাকুর”?
মহর্ষি ভৃগু মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, “হে মহারাণি, আমি
তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ে বার্তা পাঠাচ্ছি, ওখানে চৈনিক, যবন ও ম্লেচ্ছ জাতির
চিকিৎসাবিদ্যারও চর্চা হয়ে থাকে। দেখি, তারা যদি কোন প্রতিবিধান করতে পারে! এখন
আমাকে অনুমতি দিন, মহারাণি”।
রাজমাতা সুনীথা হঠাৎ ব্যাকুল কান্নারুদ্ধ স্বরে বলে
উঠলেন, “মহর্ষিঠাকুর, আমি সামান্যা নারী, পুত্রের অসুস্থতা নিয়েই আমি এখন অত্যন্ত
বিচলিত, তার ওপর রাজকার্য আমার কাছে যেন বিষম এক ভারস্বরূপ! আমাকে এর থেকে মুক্তি
দিন, মহর্ষিঠাকুর, মুক্তি দিন। মহারাজ অঙ্গের কোন সন্ধান পেলেন? যতদিন তাঁর সন্ধান
না পাওয়া যায়, আপনারাই এই রাজ্য পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নিন। আমাকে মুক্তি দিন,
মহর্ষিঠাকুর, দয়া করুন”।
মহর্ষি ভৃগু রাজমাতা সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন,
অনেকক্ষণ, তারপর গৃহে উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শান্ত হোন মহারাণি।
আমি রাজসভামণ্ডলীর মন্ত্রী ও অমাত্যদের সঙ্গে আলোচনা করে, আপনাকে আমাদের
সিদ্ধান্তের কথা জানাবো। ততদিন একটু ধৈর্য ধরুন, মহারাণি। এতটা হতাশ হবেন না। মহারাজবেণকে
সুস্থ করে তোলাই এখন আপনার ও আমাদের সকলের একমাত্র উদ্দেশ্য, মহারাণি”। রাজমাতা সুনীথা কোন উত্তর দিলেন না, পুত্রের শয্যার পাশে বসে পড়লেন।
পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন চুপ করে, তাঁর দুই গাল বেয়ে নেমে এল বিগলিত
অশ্রূ!
২৪
মহারাণি সুনীথার মহল থেকে তিনজনে বেরিয়ে, মহর্ষি ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধুকে বললেন, “বৎস
বিশ্ববন্ধু, তুমি এখন রাজাবেণের কাছেই থাকো। আমি মন্ত্রীমণ্ডলীর সভা সাঙ্গ করে
ফিরে আসছি”।
তারপর রাজসভার দিকে হাঁটতে হাঁটতে,
তিনি মহামন্ত্রী
বিমোহনকে বললেন, “ভদ্র বিমোহন, আমার মনে হয়, আমাদের অতি
সত্বর সর্বসম্মত একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবার সময় এসেছে”।
জিজ্ঞাসু মুখে মহামন্ত্রী বিমোহন মহর্ষি ভৃগুর মুখের
দিকে তাকালেন, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কিসের সিদ্ধান্ত, মহর্ষি?”
গভীর চিন্তামগ্ন মুখে হাঁটতে হাঁটতে মহর্ষি ভৃগু বললেন,
“শুনলেন না? মহারাণি রাজ্যশাসনের দায়িত্ব থেকে আশু মুক্তি চাইছেন”!
“তা ঠিক। কিন্তু এখনই এ ছাড়া অন্য আর কোন পন্থা আমরা
অবলম্বন করতে পারি, মহর্ষি?”
“চিন্তা করতে হবে, ভদ্র বিমোহন, চিন্তা করতে হবে। কোন
একটা উপায় আমাদের বের করতেই হবে! এইভাবে অনন্তকাল তো চলতে পারে না! দীর্ঘদিন
এইভাবে রাজ্য পরিচালনা আমাদের এই রাজ্যের পক্ষে শুভকর হবে বলে আপনার মনে হয়?”
“নাঃ মোটেই শুভকর নয়। মহারাণির বয়েস হয়েছে, আমাদেরও বয়েস
হয়েছে। নতুন প্রজন্মের হাতে শাসনভার হস্তান্তর করতে না পারলে... কিন্তু...”!
মহামন্ত্রী বিমোহনের কথার মধ্যেই মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আপনি
এখনই সমস্ত মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্য অমাত্যদের মন্ত্রণাকক্ষে উপস্থিত করাতে পারবেন?
কতক্ষণ সময় লাগবে?”
“এখনই? হ্যাঁ এখনই হতে পারে। আপনি আজ প্রাসাদে আসছেন,
সবাই জানে, আমার ধারণা সকলেই রাজসভায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন!”
মহর্ষি ভৃগু তীব্র আপত্তিতে মাথা নেড়ে বললেন, “না, না,
রাজসভায় অনেক অপ্রয়োজনীয় বহিরাগত ব্যক্তিদের আনাগোনা থাকে। রাজসভায় নয়, আমাদের
আলোচনার গোপনীয়তা জরুরি, আপনি মন্ত্রণাকক্ষেই সকলকে আমন্ত্রণ করুন”।
“তাই হোক। আমি সকলকে সংবাদ পাঠাচ্ছি। মুখ্যমন্ত্রী এবং
মুখ্যঅমাত্যদের”। পিছন ফিরে মহামন্ত্রী দেখলেন, চারজন নিরাপত্তারক্ষী তাঁদের
অনুসরণ করছে। তাদের একজনকে ডেকে তিনি বললেন, “রক্ষীগণ, তোমাদের মধ্যে একজন রাজসভায়
যাও। সেখানে গিয়ে বলবে, মহর্ষি এবং মহামন্ত্রী, সকল মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্য
অমাত্যদের মন্ত্রণাকক্ষে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন – এখনই। আমরা মন্ত্রণাকক্ষেই অপেক্ষা
করবো।”
রক্ষীদের প্রধান বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নীচু করে বলল, “হে মহাভদ্র, আমি এখনই সকলকে বার্তা দিয়ে নিয়ে আসছি”।
“অতি উত্তম, আর মন্ত্রণাকক্ষের বাইরে যেন যথেষ্ট
নিরাপত্তা থাকে, সেই দিকেও লক্ষ্য রাখবে”!
“অবশ্যই! ও বিষয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, মহাভদ্র। আমরা
জীবিত থাকতে, কোন ষড়যন্ত্রকারী আপনাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না!”
রক্ষী দ্রুত পায়ে রাজসভার দিকে চলে যেতে, মহর্ষি ভৃগু
বললেন, “নিরাপত্তার ব্যাপারে আপনাকে অত্যন্ত সতর্ক দেখছি, কোন গোপন বার্তা আছে
কী?”
চিন্তিত মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “নির্দিষ্ট কোন বার্তা
যদিও নেই, তবুও আমি সতর্ক থাকি। ঊণিশ মাসের রাজত্বকালে মহারাজ বেণ নিজস্ব একটি
প্রশাসন চক্র গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর আকস্মিক এই অসুস্থতার কারণে যে পরিবর্তিত
পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তাদের মধ্যে অনেকেই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, প্রতিহিংসার
ব্যাপারে সচেষ্ট। সেকারণেই সতর্ক থাকি”।
মহর্ষি সম্মতি জানিয়ে বললেন, “সঠিক সিদ্ধান্ত, ভদ্র বিমোহন।
আমারও অভিমত, অত্যন্ত সতর্ক থাকাই উচিৎ”।
মহামন্ত্রী বিমোহন অত্যন্ত নীচুস্বরে আরও বললেন, “কিছু
লোক এমনও রটনা করছে, মহারাজ বেণের এই অসুস্থতার কারণ বিষ প্রয়োগ। আর সেই বিষ
প্রয়োগ করেছে নটী বিদ্যুল্লতা। কিন্তু নটী বিদ্যুল্লতার প্রতি তারা ক্রুদ্ধ নয়।
তারা প্রচার করছে, এর পিছনে আছে গভীর ষড়যন্ত্র। আর সেই ষড়যন্ত্রের আড়ালে আছেন...”
একটু দ্বিধাভরে থেমে গেলেন মহামন্ত্রী বিমোহন।
স্মিতমুখে মহর্ষিভৃগু তাঁর মুখের দিকে তাকালেন, জিজ্ঞাসা
করলেন, “ষড়যন্ত্রের আড়ালে কে আছেন, ভদ্রবিমোহন? বলতে গিয়েও থেমে গেলেন কেন?”
“হ্যাঁ মহর্ষি, যদিচ সবটাই রটনা। আমরা বার্তা পেয়েছি, তাদের
ধারণা এই ষড়যন্ত্রের আড়ালে আছেন, আপনি”!
মহর্ষি ভৃগু এতটুকুও বিচলিত হলেন না, একটু হাসলেন,
বললেন, “মন্দ নয়, কী বলেন ভদ্রবিমোহন? এতদিনে
ষড়যন্ত্রী হিসেবেও একটা স্বীকৃতি পাওয়া গেল! ও কথায় পরে আসছি, একটা কথা বলুন তো,
শুনেছিলাম, মহারাজ বেণের উদ্যানবাটিকার দ্বার উদ্ঘাটন হবে শ্রাবণী পূর্ণিমায়, তার
কী অবস্থা?”
“উদ্যানবাটিকা তো বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত
মহর্ষি! মহারাজ বেণ অসুস্থ হয়ে না পড়লে, শ্রাবণী পূর্ণিমাতেই দ্বার উদ্ঘাটন হতে
পারতো। এখন রক্ষীদের নিরাপত্তায় অব্যবহৃত পড়ে আছে”।
মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আচ্ছা? অতি উত্তম। চলুন আমরা
মন্ত্রণাকক্ষে পৌঁছে গেছি, আশা করি সকলে চলে এসেছে”!
প্রশস্ত কক্ষের পশ্চিমদিকে অলংকৃত রাজাসন নির্দিষ্ট। তাঁর
আসন একটু উঁচুতে পাথরের প্রশস্ত বেদিতে, মেঝে থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। তার
দুপাশে কিছুটা দূরত্ব রেখে, মেঝের সমতলে আরও দুটি পাথরের নিরলংকার আসন। এ দুটি
আসনের একটি মহামন্ত্রী এবং অন্যটি সংরক্ষিত সম্মানীয় রাজ অতিথি অথবা সম্মানীয়
বৈদেশিক রাষ্ট্রদূতের জন্যে। উত্তর ও দক্ষিণের দেওয়াল বরাবর পাথরের লম্বা আসন,
সেখানে মন্ত্রী সভার সকল সদস্য ও অমাত্যদের বসবার স্থান।
মন্ত্রণাকক্ষে প্রবেশ করে, মহর্ষি ভৃগু দেখলেন, মন্ত্রীসভার
সকলেই উপস্থিত এবং নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট। তাঁরা কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র, সকলেই আসন
ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, প্রত্যেকে নতমস্তকে তাঁদের প্রণাম জানালেন। তিনি এগিয়ে গিয়ে সাধারণ আসনে বসতে, মহামন্ত্রী বিমোহন
বললেন, “এ কী, মহর্ষি, আপনি ওখানে বসলেন কেন? আপনার জন্যে তো রাজাসনের পাশের আসন
নির্দিষ্ট!”
মহর্ষি ভৃগু হাসলেন, বললেন, “আপনি আপনার আসনে উপবেশন
করে, সভা পরিচালনা করুন ভদ্রবিমোহন, আমি এখানেই বেশ আছি। রাজাসনই যেখানে শূণ্য,
সেখানে রাজ অতিথির আসন এখন অপ্রাসঙ্গিক”।
মহামন্ত্রী বিমোহন জোর করলেন না, তিনি মহর্ষিকে যেমন শ্রদ্ধা করেন, ভয় পান, তেমনি ঈর্ষাও করেন। মহারাজ অঙ্গের রাজত্বকালে মহর্ষি ভৃগুর যে প্রভাব ও প্রতিপত্তি তিনি দেখেছেন, এই রাজ্যের মহামন্ত্রী হিসেবে সেই গুরুত্ব তিনি কোনদিনই পাননি। এই মন্ত্রণাকক্ষে মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে মহারাজ অঙ্গ বহুবার গোপন মন্ত্রণা করেছেন, তার মধ্যে কতদিন, মহামন্ত্রী বিমোহনের প্রবেশাধিকারই ছিল না। তাছাড়া এই রাজ্যই শুধু নয়, তিনি প্রতিবেশী রাজ্যে কিংবা অতি দূর রাজ্যে যেখানেই গেছেন, মহামন্ত্রী হিসেবে অভ্যর্থনা ও কুশল সংবাদ বিনিময়ের পর, সব থেকে বেশি যে প্রশ্নের সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়েছে, সেটি হল, “মহামন্ত্রী, মহর্ষি ভৃগু কুশলে আছেন তো?” মহর্ষি ভৃগু এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন, তাই তিনি রাজ অতিথির আসন এড়িয়ে গেলেন। তাঁর সম্বন্ধে যে রটনার কথা বলে মহামন্ত্রী বিমোহন তাঁকে সতর্ক করতে চাইছিলেন, নির্বিকার হাসি দিয়ে মহামন্ত্রীর সেই উৎসাহে তিনি জল ঢেলে দিয়েছেন! কারণ এই রটনার কথা তাঁর কানে এসেছে, আজ নয়, রাজাবেণ অসুস্থ হবার পরের দিনই; আর সেই কারণেই তিনি নটী বিদ্যুল্লতাকে নিজ রাজ্যে নিরাপদে ফিরিয়ে দিয়েছেন। স্বদেশে বিদেশে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি যতই থাক, ভিন্ন রাজ্যের একজন সুন্দরী লাস্যময়ী রমণীর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার মতো রাজক্ষমতা তো তাঁর নেই!
পরের পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন