এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
১১
অন্যদিনের তুলনায় আজ বাড়ি ফিরতে একটু দেরিই হল
জুজাকের। কমলি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন – বারবার বেরিয়ে বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে গলা
বাড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন, মানুষটা আসছে কিনা। আজ অমাবস্যা। দুপাশের
গাছপালা, ঝোপঝাড়ে গভীর অন্ধকার। তারার আলোয় পথটাকেই অস্পষ্ট ঠাহর করা যায়। পথের
প্রেক্ষাপটে মানুষের অবয়ব বুঝতে পারা যায়। কমলির উদ্বেগ বাড়ছিল, জুজাক গ্রামপ্রধান
ঠিকই, তবে তিনি শুনেছেন রাজধানী থেকে আসা রাজকর্মচারীরা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামপ্রধানকে
সমীহ করে না। তারওপর জুজাক কিছুটা মুখফোঁড় বদরাগীও বটে। আধিকারিকদের কোনো তির্যক প্রশ্নের
ব্যাঁকা উত্তর দিয়ে, পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে তার জুড়ি নেই। তার এই স্পষ্টবাদী
সরল চরিত্রের জন্যেই গ্রামের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে গ্রামপ্রধান বানিয়েছে।
জুজাকের জন্য একদিকে কমলি যেমন গর্ব অনুভব করেন, অন্যদিকে ততটাই শঙ্কিতও থাকেন সর্বদা।
তিনি জানেন দিনকাল বদলে চলেছে নিরন্তর। অপ্রিয় সত্যকথা কেউই সহ্য করতে পারে না।
প্রশাসনিক আধিকারিকরা তো নয়ই।
আজ অন্য আরেকটি বিষয়ও কমলির দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে
তুলেছে। ভল্লা। আজ গ্রামে সকলের সামনে সে নিজের মুখেই স্বীকার করেছে তার অপরাধের
কথা। তার নির্বাসন দণ্ডের কথা। রাজকর্মচারীদের কাছে কী সে সংবাদ পৌঁছে গিয়েছে? যদি
তারা জেনে গিয়ে থাকে ভল্লা জুজাকের ঘরেই আশ্রয় পেয়েছে। এই ঘরেই সে চিকিৎসা এবং
সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে। সেটা কি তারা রাজদ্রোহীতা বলে মনে করবে? জুজাককে
শাস্তি দেবে? কশাঘাত করবে? কিংবা বন্দী করে রক্ষীদের দিয়ে শারীরিক অত্যাচার করবে?
হতভাগা ছেলেটা গেলই বা কোথায় কে জানে? নিজের ঘরে
কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে “আমি একটু ঘুরে আসছি, মা” বলে বেরিয়েছিল শেষ দুপুরে। এখনও
পর্যন্ত তারও দেখা নেই। ঘরে থাকলে, একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসতে পারত ছেলেটা।
জুজাকের সঙ্গে যারা গিয়েছিল তাদের বাড়ি গিয়েও খবর আনতে পারত। বলা যায় না, জুজাক
হয়তো, তাদের কারো বাড়িতে বসে জমিয়ে গল্প করছে। লোকটার কাণ্ডজ্ঞান ওরকমই। তার জন্যে
ঘরে যে কেউ উৎকণ্ঠায় বসে আছে, সে কথা তার মনেই পড়ে না।
ঘরবার করতে করতে কমলি লক্ষ্য করলেন, তুলসীমঞ্চের
প্রদীপে তেল ফুরিয়ে এসেছে, সলতেটা ম্লান হয়ে জ্বলছে। দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে রেডির তেল
এনে প্রদীপে ঢাললেন, সলতেটা একটু উস্কে দিলেন। আর তখনই বেড়ার দরজা খোলার শব্দ হল,
চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, জুজাক ঢুকছে।
“এত রাত হল? কিছু গোলমাল হয়নি তো?”
জুজাক কোন উত্তর দিলেন না, ঘোঁত করে নাকে শব্দ
করে, দাওয়ায় বসলেন। কমলি দৌড়ে গিয়ে ঘটি করে পা ধোয়ার জল আনলেন। ঘর থেকে নিয়ে এলেন
জুজাকের গামছাখানা। জুজাক ঘটির জলে পা ধোয়া শুরু করতে, কমলি বললেন, “কিছু বললে না,
তো? এত দেরি হল কেন?”
দুই পা ধুয়ে, গামছা দিয়ে ধীরেসুস্থে পা মুছতে
মুছতে জুজাক বললেন, “গাঁয়ে ফিরেছি অনেকক্ষণ। ও পাড়ায় ঢুকতেই লোকজনের মুখে তোমার
ছেলের গুণকীর্তন শুনছিলাম। তুমি শুনেছ?”
“শুনেছি”।
“তা আর শুনবে না? তোমার আদরের ছেলের জন্যে কাছারিবাড়িতেও আমাকে কত কথা শুনতে হল। খাবার জল দাও
তো”।
কমলি ঘর থেকে খাবার জল এনে দিলেন। “কী বলেছে তারা?”
জুজাক মাটির ঘটি হাতে তুলে নিয়ে নিঃশেষ করলেন
ঘটিটা। তারপর তৃপ্তির শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হবে আর কী? গিয়েছিলাম কান্নাকাটি করে এ
গ্রামের মানুষদের কিছুটা কর যদি কমানো যায়। অন্ততঃ সম্বৎসর সকলের পেটটা যাতে চলে
যায়। সে কথায় কানই দিল না? বললে, ভল্লা তোমার বাড়িতে আছে? বললাম, আছে। বললে, একজন
অপরাধী – যার রাজধানীর প্রশাসন থেকে নির্বাসন দণ্ড ঘোষণা হয়েছে। তাকে তুমি বহাল
তবিয়তে খাওয়াচ্ছো, দাওয়াচ্ছো, চিকিৎসা করাচ্ছো। আর রাজার কর দিতেই তোমার নাকে
কান্না শুরু হয়ে গেল?”
কমলি উদ্বেগের স্বরে বললেন, “কী অবস্থায় ছেলেটা
এসেছিল তুমি বললে না?”
জুজাক একটু ঝেঁজে উঠে বললেন, “বলব না কেন? সব বলেছি”।
তারপর একটু থেমে নরম স্বরে বললেন, “ওরা রাজ কর্মচারী। তাদের কাছে ভল্লার পরিচয় অপরাধী।
সে আর মানুষ নয়, জন্তু। ওদের কথা ঘেয়ো কুকুরের মত যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই ওকে
তাড়িয়ে দিইনি কেন? জগৎটা তোমার মতো মায়ের মন নিয়ে যে চলে না, কমলি”।
কমলি জুজাকের সহানুভূতির সুরে আশ্বস্ত হলেন।
মানুষটাকে ওপরে ওপরে কঠোর মনে হলেও, মনটা নরম। তা যদি না হত, জুজাক জোর করেই
ভল্লাকে তাড়িয়ে দিতে পারতেন। তৎক্ষণাৎ না হলেও, যেদিন ভল্লার প্রথম জ্ঞান হল,
সেদিনই। আজকে রাজ-প্রতিনিধির যে তিরষ্কার তিনি শুনে এলেন – এমন যে হবে সেকথা জুজাক
বহুবার বলেছেন। বারবার বলেওছেন, হতভাগাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব – কিন্তু দিতে পারেননি।
মানবিক বোধের কাছে তার বাস্তব যুক্তি হেরে গেছে।
কমলি জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওদের কাছে এ খবর
পৌঁছে দিল কে? নিশ্চই এই গাঁয়েরই কেউ?”
“সে তো বটেই। সব গ্রামেই ওদের গুপ্তচর থাকে। তাদের
কাজই তো ওদের খবর দেওয়া। সে যাক, ছোঁড়াটাকে ডাক দেখি একবার”।
“সে তো সেই দুপুরের দিকে বেরিয়ে গেছে, এখনও
ফেরেনি”।
“কোথায় গিয়েছে তোমাকে বলেও যায়নি? আশ্চর্য। কবিরাজদাদার
বাড়িতে আমরা বেশ কয়েকজন কথাবার্তা বলছিলাম। সেখানে শুনলাম, সকালে ভল্লার বক্তৃতা
শুনে কয়েকজন ছোকরা নাকি বেশ বিগড়ে গেছে। দুপুরের পর থেকেই তারাও বাড়িতে নেই। তবে
কি...”।
কমলি আতঙ্কিত হয়ে বললেন, “তবে কি গো? ওই
ছোঁড়াগুলো কি ভল্লাকে মারধোর করবে?”
জুজাক হেসে ফেললেন কমলির সরলতায়, বললেন, “মেয়েদের
লাঞ্ছনা রোধ করতে গিয়ে সে অপরাধী হয়েছে। রাজ-প্রশাসন লম্পট মানুষটাকে শাস্তি না
দিয়ে, সাজা দিয়েছে ভল্লাকে। এ গাঁয়ের ছোকরাদের চোখে ভল্লা এখন বীর। কবিরাজদাদা
বলছিলেন, ভল্লা বোধ হয় ছোকরাদের নিয়ে একটা দল গড়তে চাইছে”।
কমলি অবাক হয়ে বললেন, “কিসের দল?”
জুজাক আবার একটু ঝেঁজে উঠলেন, বললেন, “তার আমি কী
জানি? তোমার মনে আছে, কবিরাজদাদা ওর শরীরের লক্ষণ দেখে বলেছিলেন, ভল্লা সাধারণ এলেবেলে
ছেলে নয়। যথেষ্ট শক্তিশালী যোদ্ধা। আরও বলেছিলেন, ওই চরম অসুস্থ অবস্থায় ওর এখানে
আসাটা হয়তো আকস্মিক নয়। হয়তো গোপন কোন উদ্দেশ্য আছে। আজকে সকলের সামনে কবিরাজদাদা
সে প্রসঙ্গ তোলেননি। কিন্তু আমারও এখন মনে হচ্ছে কবিরাজদাদার কথাই ঠিক”।
কমলি কিছু বললেন না। হাঁটুতে থুতনি রেখে গভীর
চিন্তা করতে লাগলেন, ভল্লাকে দেখে কই আমার তো তেমন কিছু মনে হয়নি। এ গ্রামে আসা
থেকে আমি তাকে যত কাছে থেকে দেখেছি, আর কে দেখেছে? তার কথাবার্তায়, তার মা ডাকে
কোথাও কোন উদ্দেশ্যর সন্ধান তো তিনি পাননি। আজকে গ্রামের সবার সামনে মন খুলে নিজের
অপরাধের কথা যে ভাবে সে স্বীকার করেছে, তার মনে যদি সত্যিই কোন পাপ বা অপরাধ বোধ
থাকত, পারত ওভাবে বলতে?
জুজাক বললেন, “খাবার বাড়ো, খেয়ে শুয়ে পড়ি”।
কমলি তাড়াতাড়ি উঠে খাবার আনতে ঘরে ঢুকলেন। সেদিকে
তাকিয়ে জুজাক বললেন, “তোমার ছেলে যত রাতই হোক বাড়িতে তো ঢুকবেই। তুমি ছাড়া তার
জন্যে কে আর রাত জেগে খাবার কোলে বসে থাকবে? এলে বলে দিও, সামনের অষ্টমীতে ওকে সঙ্গে নিয়ে
আমাকে কাছারি শিবিরে যেতে হবে। বলে দিও, না গেলে ওর তো বিপদ হবেই, আমাদেরও রক্ষা
থাকবে না”।
জুজাক নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ার অনেকক্ষণ পর,
ভল্লা বাড়ি ফিরল। দেখল কমলি-মা দাওয়ায় বসে আছেন, কাঠের খুঁটিতে হেলান দিয়ে। মাথাটি
ঘুমে ঢুলে পড়েছে। নিঃশব্দ পায়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াল ভল্লা, ফিসফিস করে বলল, “মা রে,
খুব খিদে লেগেছে যে”। কমলি চমকে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, ভল্লা চকিতে তাঁর মুখে
হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চুপ, চুপ। প্রধানমশাই জেগে
গেলে, আমার আর রক্ষে থাকবে না”।
কমলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভল্লার মুখের দিকে। ভল্লার
হাতের ছোঁয়ায় তিনি যেন ফিরে পেলেন তাঁর মৃত জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্পর্শ। সেও তার বাপকে
ভয় পেত খুব। বাইরে কিছু অপাট কাজ করে এসে কাঁচুমাচু মুখে মায়ের কাছে সঁপে দিত
নিজেকে। কমলি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভল্লার চোখের দিকে। তারপর ভল্লার হাত সরিয়ে নীচু
স্বরে বললেন, “ঘরে যা, আমি খাবার নিয়ে আসছি”।
ভল্লা নিঃশব্দে দাওয়ায় উঠে জালা থেকে জল তুলে
হাতপা মুখ ধুল, তারপর দাওয়া পেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। তার প্রায় পিছনেই মাটির থালায়
রুটি আর ডাল নিয়ে ঢুকলেন কমলি। ভল্লার হাতে থালাটি তুলে দিয়ে, কমলিও বসলেন মেঝেতে,
জিজ্ঞাসা করলেন, “এত রাত অব্দি কোথায় ছিলি?”
রুটির টুকরো ছিঁড়ে মুখে নিয়ে ভল্লা বলল, “আমার
এখানকার পাট তো এবার তুলতে হবে, মা। প্রধানমশাই তোকে বলেনি কিছু?”
“বলেছে। তোকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানকে, সামনের অষ্টমী
তিথিতে যেতে হবে কাছারি-শিবিরে”।
“জানি তো। সেই ব্যবস্থাই করতে গিয়েছিলাম”।
“কোথায় যাবি, কোথায় থাকবি?”
“এ রাজ্যের সীমানার ঠিক বাইরে। এ গ্রামের পিছনে
ক্রোশ দুয়েক দূর। কাল-পরশুর মধ্যে মাথা গোঁজার ঝুপড়িটা শেষ করে ফেলব। ঘরটা
যেখানে তুলবো, তার কাছাকাছি – এই হাত তিরিশেক দূরে ছোট্ট একটা পুকুরও আছে। সেখানে
জানিস তো মা, মাঝে মাঝে দু একটা হরিণ জল খেতে নামে। নিরিবিলি,
সুন্দর জায়গা”।
“কিন্তু ও পাশে গভীর জঙ্গল তো, ওই জঙ্গলের মধ্যে কী করে থাকবি? তার চে পাশের রাজ্যে চলে
যা। কিছু একটা কাজকম্মো জুটিয়ে নিতে পারবি না?”
ভল্লা হাসল, “পাশের রাজ্য যে এ রাজ্যের মিত্র রে,
মা। ওদের রাজ্যে ঢুকলে, ওই রাজ্যের কোটালরাও আমাকে গোবেড়েন দিয়ে তাড়াবে। তার চে
আমার ওই জঙ্গলই ভালো – সভ্য সমাজে নিশ্চিন্তে থাকুক রতিকান্তর মতো রাজশ্যালকরা, আর
আমরা স্বস্তিতে থাকি গভীর জঙ্গলের নিরিবিলিতে”।
“ওখানে খাবি কি?”
“সে আমি দেখে এসেছি মা। জঙ্গলে কিছু শাক-পাতা, কন্দ-টন্দ
পেয়ে যাবো। আর ওদিক দিয়েই কিছু ব্যাপারীদের যাতায়াত আছে তাদের থেকে, কিছু জোয়ার
বাজরা, ভুট্টা যোগাড় হয়ে যাবে। ও নিয়ে তুই ভাবিস না, মা”।
“আমি যদি তোকে খাবার পাঠিয়ে দিই?”
“পাগল হয়েছিস, মা? ও কথা মনেও আনিস না। আমি থাকব
রাজ্যের বাইরে, কিন্তু তোকে আর প্রধানমশাইকে ভয়ানক রগড়াবে আস্থানের রক্ষীরা। তোকে কেউ কিছু করলে আমি সইতে পারব, বল মা?”
কমলি কোন উত্তর দিলেন না। মাটির দিকে তাকিয়ে
রইলেন, কিছুক্ষণ পর তাঁর দুই চোখ জলে ভরে উঠল। ভল্লা লক্ষ্য করে হাসতে হাসতে বলল,
“অত উতলা হস না, মা। আমার যেতে তো এখনও সাত দিন। সেই সাতটা দিন তোকে আমি খুব
জ্বালাবো, দেখিস। আর তার পরেও আমি সময় বুঝে ঠিক চলে আসব মাঝেসাঝে – কেউ টেরও পাবে
না। আসব ঠিক ভূতের মতো, মাঝ রাতে। যে রাতে তোর বাড়ির পাঁদাড় থেকে
শালিক পাখি বা কাক আচমকা ডেকে উঠবে, বুঝবি
সে এই ভূত। কিন্তু, তুই আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যাবি না, মা। তাহলে
কিন্তু ঘোর বিপদ”।
ধরা গলায় কমলি বললেন, “কবে যাবি?”
“কাছারি শিবির থেকে এখানে আর ফিরব না, সোজা আমার বাসায় গিয়ে উঠব”।
ভল্লার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কমলি এঁটো থালা নিয়ে
উঠে যাওয়ার সময় বললেন, “হ্যারে, তুই নাকি গাঁয়ের ছেলেদের নিয়ে দল করছিস?”
ভল্লা হেসে জিজ্ঞাসা করল, “দল করছি? কিসের দল? কে
বলল তোকে? গাঁয়ের ছেলেছোকরারা আমার কাছে আসে, আমার সঙ্গে ঘোরে – গল্পগাছা করে।
শুধু এ গাঁয়ের কেন, আশপাশের গাঁয়ের ছেলেরাও তো আসে। বুড়োদের কাজ-কম্ম নেই, বসে বসে
খালি গুজব ছড়ায়। কোনদিন যদি দল গড়ি, সে কথা তোকেই প্রথম বলে যাবো, মা। তুই নিশ্চিন্ত থাক”।
“কি জানি? প্রধানও তো তাই বলল”।
“এ গাঁয়ের ছেলে ছোকরাগুলো বছরে ছমাস চাষবাস করে,
আর বাকি ছমাস শুয়ে-বসে কাল কাটায়। তাদের দিয়ে যদি অন্য কিছু কাজ করাই মা, যাতে
গাঁয়ের সকলের বাড়তি কিছু আয়-পয় হয়। কাজ-টাজ শিখে গাঁয়ের বাইরে থেকেও যদি তারা কিছু
উপার্জন করে আনতে পারে, সেটাকে দল করা বলবি, মা? লোকের কথায় কান দিস না। আর এ নিয়ে
কারও সঙ্গে আলোচনাও করিস না। যখন হবে নিজের চোখেই সবাই দেখতে পাবে। অনেক রাত হল,
খেয়ে নিয়ে শুতে যা, মা। ঘুমে তোর চোখদুটো ছোট হয়ে আসছে। নাচদুয়োরে তোর
জলছড়া দেওয়ার পরেই কাল আমি বেড়িয়ে যাব”।
কমলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ছেলেটা এই কদিনে বড়ো মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে তাঁকে। সে মায়াকে পরম মমতায় তাঁর ধরে রাখতে সাধ হয় খুব, কিন্তু সাধ্য কোথায়?
১২
বিগত কয়েকদিনে ভল্লার দলে যুবক ও তরুণের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সেই দলটিকে প্রধান দুটি বিভাগে সে ভেঙে
নিয়েছে। প্রথমটিতে আছে পঁয়ত্রিশ জন, যারা লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। এই দলটির
পিছনেই সে সব থেকে বেশি সময় দেয়। সকালে সে নিজেই এই দলটির সঙ্গে দৌড়তে যায়। প্রথম
তিনদিন সাধারণ দৌড়ের পর, চতুর্থ দিন সে যুক্ত করেছে, সাঁতারের অভ্যাস। পথহীন পাহাড়ের
গা বেয়ে নিচে নেমে সে ঝাঁপ দিয়েছিল গ্রামের পূর্ব সীমানার পুকুরটিতে। সে জানে সকালে
পশ্চিমের ঘাটে গ্রামের মেয়েরা নিত্যকর্ম করতে যায়। তাদের বিড়ম্বিত না করে দীর্ঘ
পুকুরটি সাঁতরে পার হয়ে সে এসে উঠল পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের আঘাটায়। সেখানে বসে
দেখল, তার পিছনে সাঁতরে আসছে ছাব্বিশজন। বাকিরা আসছে অন্যান্য দিনের মতো একই
দৌড়-পথে।
নজন দৌড়ে-আসা ছেলে সেখানে এসে উপস্থিত হলে, ভল্লা
জিজ্ঞাসা করল, “তোরা জলে নামলি না, কেন? সাঁতার জানিস না?”
“তুমি তো বলোনি, ভল্লাদাদা। দৌড়ের পর সাঁতার
কাটতে হবে। ওই সময় যা হাঁফাই – তারপরে আবার সাঁতার...”।
“আমার কথা ছেড়ে দে, তোদের ছাব্বিশজন বন্ধু তাহলে
কেন এল? কী করে এল?” কেউ কোন উত্তর দিল না। ভল্লা আবার বলল, “তোরা যদি আমাকে নেতা
বলে ভরসা করিস, তাহলে আমার কথা ছাড়াও, আমার আচরণও তোদের অনুসরণ করতে হবে। রণক্ষেত্রে
সব সময় সব কথা চিৎকার করে বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না। নেতাদের ইশারা, ইঙ্গিত, আচরণেই বুঝে নিতে হবে, কার
কী করণীয়”। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ভল্লা আবার বলল, “ছেলেরা, এখন যে যার বাড়ি গিয়ে
জলখাবার সেরে – ঠিক দুদণ্ডের মধ্যে উপস্থিত হবি মহড়াক্ষেত্রে”।
একজন জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লাদাদা, জলখাবার খেতে
তুমি যাবে না?”
ভল্লা হেসে উত্তর দিল, “দুই বেলার আহারই আমার
যথেষ্ট। নিয়মিত জলখাবারের প্রয়োজন অনুভব করিনা বহুদিন। তবে হ্যাঁ কোন কাজে দুপুরে
খাওয়ার বিঘ্ন হতে পারে বুঝলে, ভরপেট জলখাবার করি”।
গ্রামের বাইরের জঙ্গলে ভল্লা তার নির্বাসিত জীবনযাপনের
জন্যে ছোট্ট দুটি কুটির গড়েছে। তার অদূরেই জঙ্গল সাফ করে বানিয়েছে, তরুণদের
মহড়াক্ষেত্র। সেখানেই সে নিজের হাতে সকলকে মল্ল যুদ্ধ শেখাচ্ছে। শেখাচ্ছে, বল্লম
চালাতে, ভল্লা ছুঁড়তে। পরে তির ছুঁড়তেও শেখাবে। মহড়ার সময়
সে নির্দিষ্ট করেছে, মধ্যাহ্ন পর্যন্ত। মধ্যাহ্নের আহারের জন্যে দুদণ্ডের বিরতি,
তার মধ্যেই ফিরতে হবে মহড়াক্ষেত্রে।
ভল্লার দ্বিতীয় দলে আছে কুড়ি জন। তারা ভল্লার
পরিকল্পনা মতো বাঁধ আর জলাধার নির্মাণে নিযুক্ত হয়েছে। ছেলেরা জলখাবার
খেতে বাড়ি গেল, ভল্লা বাঁধের কাজ দেখতে যায়।
নানান নির্দেশ দেয়। এই নির্মাণে তাঁর প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তবে এরাজ্যের নানান
অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সময়, কিছু কিছু বাঁধ সে দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতা এবং তার সহজাত
বুদ্ধিটুকুই সম্বল। কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি হচ্ছে, সে সব শুধরে ধীরে ধীরে বাঁধ গড়ে
উঠছে। এই কাজে সে কয়েকজন বয়স্ক অভিজ্ঞ কৃষকেরও সাহায্য নিচ্ছে। বাঁধের জল ব্যবহার
করে সংলগ্ন জমিতে কী ধরনের চাষ করা সম্ভব – সে কথা তাঁদের থেকে ভাল আর কে বলতে
পারবে? তাঁদের অনেকেরই মত, এই মাটিতে বাদাম এবং তুলোর চাষ হওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত জল
পেলে, এবং বীজ পেলে তাঁরা এই জমিগুলি চাষ করতে আগ্রহী। ভল্লা তার পরিকল্পনার
সাফল্যে কিছুটা স্বস্তি পেল। কিন্তু শস্য বীজ কিনতে অর্থের প্রয়োজন, সে ব্যবস্থাও যে
তাকেই করতে হবে।
বণিক অহিদত্ত প্রতিবেশী রাজ্যের বাসিন্দা হলেও, এ
রাজ্যেও তাঁর প্রতিপত্তি, চেনা-পরিচিতি কম নয়। এমনকি এ রাজ্যের রাজধানীর বণিক
মহলেও তাঁর বিস্তর জানাশোনা। প্রথম পরিচয়েই অহিদত্ত ভল্লাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
“আচ্ছা, আপনিই সেই ভল্লা? আশেপাশের গ্রামের লোকজনের মুখে ইদানীং
আপনার নামটা অনেকবারই শুনেছি। এমনকি আমাদের দিকেও কানে এসেছে।
আমি কয়েকদিন আগেই আপনাদের রাজধানী গিয়েছিলাম। আজ সেখান থেকেই
ফিরছি। সেখানে আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আপনার সব কথা শুনেছি। সকলে তো ছ্যা-ছ্যা করছে, মশাই। আপনাদের মহারাজা
মহাশ্বকে আমরা খুবই প্রাজ্ঞ বিচক্ষণ রাজা বলেই জানি। তাঁর রাজ্যে প্রজাদের সুখে-শান্তিতেই
বাস করতে দেখেছি। তাঁর মতো রাজা কিনা চরিত্রহীন শ্যালককে এতটা মাথায় তুলছেন?
আর আপনাকে দিলেন নির্বাসন দণ্ড? আপনি তো রাজধানীতে বিখ্যাত মানুষ,
ভল্লামশাই। ওদিকের সাধারণ লোক আপনাকে ধন্যি
ধন্যি করছে”।
ভল্লা হাসল, বলল, “বিখ্যাত হয়ে
কী লাভ, বণিকমশাই? কী অবস্থায় আমি এখানে এসেছিলাম, এই গ্রামের লোক
সবাই জানেন। আমাকে আশ্রয় দিয়ে, সেবা করে সুস্থ করেছেন গ্রামপ্রধানমশাই আর তাঁর বউ,
আমার কমলিমা। নির্বাসন দণ্ড পেয়ে এখনও আমি রাজ্যের বাইরে কেন যাইনি, এর জন্যে
আমাকে যেমন অনেক দুর্গতি সইতে হবে, ওঁদেরও পোয়াতে হবে অনেক অপমান”।
বণিক অহিদত্ত কিছু বললেন না, গভীর বিরক্তিতে মাথা
নাড়লেন। ভল্লা আবার বলল, “রাজ্যের বাইরে আমাকে যেতে তো হবেই, দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাবো।
কিন্তু ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে এই গ্রামের জন্যে কিছু করে যাব। আপনি তো জানেন এই
গ্রামে চাষ-বাস তেমন কিছু হয় না, সম্বৎসরের অন্নসংস্থানটুকুও হয় কি না হয়। গ্রামের
মানুষদের নিয়ে, সামান্য একটা সেচ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এক লপ্তে বেশ কিছু
জমির জন্যে জলের ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। গ্রামের মানুষ পরীক্ষামূলক চাষ করতেও উৎসাহী।
কিন্তু শস্যবীজ? সেটুকু কেনার সামর্থ্যও এ গ্রামের মানুষের নেই”।
বণিক অহিদত্ত আশ্চর্য হলেন, বললেন, “শুনেছি আপনি অত্যন্ত
সুদক্ষ ও বিশ্বাসী রাজরক্ষী, আপনার এই বিদ্যাও জানা আছে নাকি? আপনার পরীক্ষামূলক চাষের
জন্যে কিসের বীজ দরকার?”
ভল্লা বলল, “বাদাম আর তুলো”।
অহিদত্ত বললেন, “আমাদের রাজ্যের এদিকেও চিনাবাদাম আর তুলোর চাষ প্রচলিত।
কত বীজ লাগবে? এক মণ করে পাঠালে হয়ে যাবে?”
ভল্লা অভিভূত হয়ে বলল, “তাহলে তো খুবই উপকার হয়
বণিকমশাই। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার এই ঋণ অচিরেই শোধ করে দিতে পারব”।
“শোধের কথা পরে আলোচনা করা যাবে। আমি তিন-চারদিনের
মধ্যেই আপনার কাছে দুরকমের বীজ পাঠিয়ে দেব”।
“আমার কাছে নয়, এই গ্রামের প্রধানের কাছে
পাঠাবেন। তিনিই যথাযথ বিলি ব্যবস্থা করে দেবেন”।
“ঠিক আছে। কিন্তু রাজ্যের বাইরে আপনি যাবেন কোথায়?”
“সীমানার বাইরে পাশের জঙ্গলে থাকব। কাঠের
পাটার ওপর মাটি লেপে দেওয়াল তুলেছি, আর ঘন পাতা বিছিয়ে ছেয়ে
নিয়েছি চাল – ব্যস্ বাসা হয়ে গেছে। হয়তো কাল বা পরশু আমি
চলে যাব”।
বণিক অহিদত্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনাকে
আমাদের রাজ্যে যাওয়ার কথা বলতে পারতাম, কিন্তু আপনার বাসের
পক্ষে মিত্ররাজ্যও নিরাপদ নয়। যাই হোক, এ গ্রামের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক একপ্রকার বাঁধা
হয়ে গেছে। অতএব সীমানার বাইরে গেলেও আপনার যোগাযোগ থাকবে, বুঝতে পারছি। কিন্তু
জঙ্গলে যে থাকবেন খাবেন কী”? তারপর একটু হেসে বললেন, “যাগ্গে,
সে চিন্তা আমাদের – আপনার নয়। কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেব, আর আমিও আপনার সঙ্গে নিয়মিত
যোগাযোগ রাখব। আজ চলি, অনেকদিন প্রবাসে কাটিয়ে আজই বাড়ি ফিরছি... আবার দেখা হবে, নমস্কার”।
ভল্লাও প্রতিনমস্কার করল। অহিদত্ত গোশকটে উঠে
সঙ্গী লোকজনদের নিয়ে এগিয়ে গেলেন সীমান্তের দিকে।
ভল্লার দলের ছোকরারা সকলেই তার আশেপাশে
ছিল, এতক্ষণ শুনছিল ওদের দুজনার কথা। বণিক অহিদত্তের কথায়, ভল্লা
এখন তাদের কাছে নায়ক হয়ে উঠল। এ বার্তা অচিরেই পৌঁছে যাবে এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামগুলিতে
– এমনকি প্রতিবেশী রাজ্যের সংলগ্ন গ্রামগুলিতেও। যে উদ্দেশে ভল্লার এখানে আসা, এই প্রচার তার সুবিধেই করে দিল।
পরের পর্ব - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭ "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন