শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

অনেক কিছু পাওয়া

ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট " 


 এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প  - " অস্ত্রের ঝংকার "

তোয়ার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। বাবা মাঝে মাঝে বলেন, “আর্লি টু বেড আর আর্লি টু রাইজ, মেক্স আ ম্যান হেলদি এণ্ড ওয়াইজ।” ক্লাস টুতে পড়া তোয়া ইংরিজি ওই শব্দগুলোর মানে জানে, আর তার ঠাম্মি এ ছড়াটার যে বাংলা করেছে, সেটা আরো বেশী মজার!

“তাড়াতাড়ি করলে ঘুমু, ঠাম্মা দেবে অনেক চুমু 

উঠে পড়ো থাকতে ভোর, জ্ঞানের সাথে বাড়বে জোর”

 

অন্যদিনের মতো আজও খুব সক্কালে ঘুম ভেঙে উঠে তোয়া দেখল মা-বাবা ঘুমোচ্ছেন অন্যদিন ওঁরাও উঠে পড়েন, কিন্তু আজ রবিবার কিনা তাই একটু বেলা করবেন উঠতে তোয়া ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসতেই, খোলা জানালা দিয়ে তার বন্ধুরা ডাকাডাকি শুরু করে দিল। বুলবুলি বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি, আজ কিন্তু তোকে, 

প্রথম ডেকেছি আমি, নতুন আলোর ঝোঁকে” 

শালিক যেমন খুব মজা করে, তেমন ঝগড়াও করে, সে বলল, 

“বলতো দেখি তোয়, 

তোর কী মনে হয়, 

আমিই বেশী হিংসুটি? 

 না ওই বুলবুল, কেলে ঝুঁটি”?

তোয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে নিঃশব্দে দুলেদুলে হাসল কিছুক্ষণ, তারপর ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারায় বলল,

“অ্যাই, অ্যাই, চুপ চুপ, করিস না রে ঝগড়া। 

মা বাবার ভাঙলে ঘুম সব কিছুতেই ব্যাগড়া”!

খুব আআস্তে আআস্তে বিছানা থেকে নেমে, তোয়া মেঝেয় যেমনি পা দিল, মা আধখানা চোখ মেলে আলসে গলায় বললেন, “ছাদে যাচ্ছো যাও, কিন্তু আলসে দিয়ে ঝুঁকবে না”। তোয়া সবসময় দেখেছে ঠাম্মি, দাদুন, বাবাকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু মাকে – অসম্ভব! মাদুগ্গার মতো তিনচোখ না থাকলেও, মা সব দেখতে পান, সব বুঝতে পারেন। মেঝেয় নেমে মায়ের গালে হামি খেয়ে, তোয়া হাল্কা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা পেরিয়ে দৌড়ে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।

 

সক্কাল সক্কাল ছাদে উঠতে তোয়ার খুব মজা লাগে। আকাশ জুড়ে নরম নরম আলো। ঝিরঝিরে হাওয়া। চারিদিকের গাছপালার পাতায় পাতায় চলছে রান্নাবান্নার তোড়জোড়। হাতাখুন্তি, বাসনকোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শোনার জন্যে সে কান পাতে, কিন্তু শুনতে পায় না।

তোয়ার কাকু বলেন, “তোর মা, ঠাম্মি রান্নাঘরে, আমাদের জন্যে যখন খাবার বানান, কত রকমের শব্দ হয় শুনিসনি? ঠুনঠান, ঘটরঘটর, ছ্যাঁক-তেলতেল ছোঁক-কলকল”? তোয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, শুনেছে তো, সে সময় কী সুন্দর রান্নার গন্ধও বেরোয়, সেই গন্ধে তো তোয়ার লোভ লাগে, খিদে খিদে পায়!

“একদম সেইরকম, রোদ্দুরের আলোর আগুনে, গাছের পাতার রান্নাঘরে গাছ তার নিজের জন্যে এবং আমাদের জন্যেও খাবার বানায়।”

“আমাদের জন্যেও?” অবাক হয়ে বড়োবড়ো চোখে তাকিয়েছিল তোয়া। “কই কোনদিন দেখিনি তো?”

কাকু আদর করে তোয়ার রেশমী কোমল চুল এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বললেন, “ওরা কী আর ভাত-ডাল-তরকারি বানায়? ওরা বানায় চাল, গম, ডাল, সব আনাজ, সব রকম ফল - আম, জাম, লিচু, পেয়ারা।” একটু থেমে কাকু বলেছিলেন, “আরো কী জানিস, তোয়ারাণি, আমাদের রান্নায় যেমন সুন্দর গন্ধ হয়, তেমনি মাঝে মাঝে বেশ ঝাঁঝালো গ্যাসও হয়। সে ঝাঁজে নাক জ্বলে, চোখ জ্বলে, হ্যাঁচ্চো হয়। গাছেদের রান্নায় তেমন কোনদিন হয় না।”

“তাই?”

“হুঁ। বরং সেই গ্যাসে আমাদের শ্বাস নিতে আরাম হয়, আর সেই গ্যাস বাতাসে যতো বেশি থাকে, আমাদের শরীরও ততো চাঙ্গা থাকেশহর থেকে দূরে, যেখানে অনেক গাছপালা, সেখানে তাই জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়। এখন তো তুই ছোট্ট, বড়ো হলে জানবি ওই গ্যাসের নাম অক্সিজেন, আর গাছেদের এই রান্নার নাম সালোকসংশ্লেষ।”

কাকু প্রায়ই বাইরে চলে যায়, দুতিন মাস পরপর বাড়ি এসে, দিন দশেক থাকে। তখন তোয়ার জন্যে কিছুমিছু জিনিষ আনেই, আর আনে অনেক অনেক মজার মজার কথা। কাকু ছাড়া তোয়া তখন আর কাউকে চিনতেই পারে না।

সকালবেলা ছাদে উঠলেই তোয়ার কাকুর কথা মনে পড়ে খুব। কাকুর কথা মতো বুক ভরে খুব জোরে জোরে শ্বাস নেয়। আজ তার এই শ্বাস নেওয়া দেখে চড়ুই মিচকি মিচকি হাসল, বলল, 

“ও তোয়াদি, ও তোয়াদি, আর নিও না শ্বাস, 

বাতাসের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলেই, ব্যস

চড়ুইয়ের এই কথায়, তোয়া এবং অন্য সবাই হেসে ফেলল কিচিরমিচির করে, শুধু কাক গম্ভীর হয়ে বলল, “গুডমর্নিং তোয়াদিদি, তোমার আদরে না চড়ুই‍টা খুব ফাজিল হয়েছে, তোমাকেই আর মান্যি করে না।”

হাসতে হাসতে তোয়া বলল, 

“বারে, আমি বুঝি স্কুলের বড়োদিদিমণি? 

ভয় পেয়ে বলবে আমায়, “আজ্ঞে দিদি, আপনি?”“

তোয়ার কথায় কাক একটু দমে গেল, কিন্তু অন্যেরা বেশ মজা পেল। তোয়া কাককে আবার বলল, 

“মিষ্টি সুরে বলতে কথা, বলছি কতো বল, 

তুই শুধুই খুঁজিস দেখি ফাঁকি দেওয়ার ছল।”

কাকটা আরো অপ্রস্তুত হয়ে, একবার ঠোঁট আর একবার ঘাড় চুলকোল, তারপর বলল, 

“কা কা করি, খা খা করি, তার তো থাকে মানে, 

কাক ডেকেছে মিষ্টিসুরে, এমন কি কেউ জানে?”

কাকের এই কথা শুনে তোয়া হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল খুব। আর অন্য পাখিরাও ডানা ঝাপটে ঝটপট বলে উঠল,

 “কাকদাদা গো কাকদাদা, তুমিই হলে সেরা, 

তোমার কথার সুরটি যেন মিষ্টি মধু ঘেরা” 

কথাগুলো বলে ফেলে কাক একটু লজ্জা পাচ্ছিল, কি জানি কী বলে ফেললাম!

এখন সকলের প্রশংসায় একটু গম্ভীর হয়ে বলল, 

“তোয়াদিদির ক্লাশে পড়ে শিখছি কত কী যে, 

কাকের গলায় মিঠে সুর শুনছি এখন নিজে”!

তোয়া হাসতে হাসতে বলল, 

“তোদের মতো মিষ্টি ডানা থাকতো যদি মোর, 

ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতাম একটু হলেই ভোর। 

এদিক সেদিক ঘুরে এসে খেতাম মায়ের বকুনি, 

বইয়ে ভরা ব্যাগটি পিঠে স্কুল ছুটতাম তখুনি। 

যা কিছু সব বইয়ে পড়ি দিদিমণির কাছে, 

উড়ে উড়ে দেখে নিতাম কোনটা কোথায় আছে? 

সেই কবে তুই খেয়েছিলি কাদের ক্ষেতের ধান, 

বুলবুলি তোর ঘুঁচলো না দেখ আজও সে বদনাম। 

কে যেন সে কত আগে দেয়নি বুঝি খাজনা, 

তোর কথাতেই মানুষগুলো আজও বাজায় বাজনা”।

বুলবুলি খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, 

“ওসব কথায় দিই না গো কান, তোয়াদিদি বুঝলে, 

বুলবুলিঝাঁক পাবে না আর ধানের ক্ষেতে খুঁজলে। 

এখনও তাও উড়ে বেড়াই, দুচারটে বুলবুল, 

কবে কখন হারিয়ে যাবো, আর পাবেই না বিলকুল।”

তোয়াদিদি বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল, 

“সত্যি, এমন যদি হয়, 

মনে ভীষণ লাগে ভয়। 

আমরা আছি, গাছও আছে, নেই শুধু হায় পাখি, 

আমাদেরও জীবন দেখিস রইবে আধেক বাকি। 

সকালবেলার ঘুমটি ভাঙে তোদের ডাকটি শুনে,

 দুপুর বেলা ঘুম এসে যায় ঘুঘুর সুরের গুণে 

নিরিবিলি একলা বনেও, সঙ্গী থাকিস তোরা। 

তোদের পিছু ঘুরে ঘুরে সময় কাটাই মোরা”।

তোয়াদিদির এই কথায় টিয়া বলল, 

“তুমি ছাড়া তেমন কেউ দেখেই না গো মোদের। 

 ব্যাটারি দেওয়া খেলনা পাখি আছে দেখি ওদের! 

সে পাখিরা দেখতে যেন, আমরা অবিকল। 

ঘন ঘন ডিগবাজি খায়, বাপরে কী ধকল! 

তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুরে বলে ছড়া; 

হামটিডামটি, জ্যাকএন্ডজিল যেমন তোমার পড়া”।

তোয়াদিদি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, 

“ধুর ধুর। ওসব দেখে মজা পায় পুঁচকি ছেলেমেয়ে। 

একটুখানি বড় হলেই, কেউ দেখেও না আর চেয়ে। 

কলের পুতুল হাতে নিয়ে, কদিন চমক লাগে ঠিকই। 

কিন্তু রোজই আমি অবাক হই, যত্তো তোদের দেখি”।


“সে তো তুমি, আমাদের ভালোবাসো বড়োই,

রোজই তুমি আমাদের আদর যত্ন করোই। 

গরমকালে কোথাও যখন, পাই না খাবার জল। 

আমরা বলি, সবাই মিলে তোয়ার বাড়ি চল। 

তোমার গামলা ভরা জলে, 

আমরা আসি দলে দলে। 

তোমার ওই জলেই আমরা সবাই মেটাই তৃষ্ণা। 

কিন্তু ওই কাক, যতো বলি, অমন করিস না! শুনবে না, 

নেয়ে খেয়ে জলটাকে করে তুলবেই ঘোলা”

তোয়াদিদি হাসতে হাসতে বলল, “কাকের তো নেই কান, থাকলে দিতাম কানমোলা”

কাক ঠোঁট আর ঘাড় চুলকে, একটু মিচকে হাসল, বলল, 

“গরমকালে নোংরা খেয়ে, আনচান করে গা। 

তোমার রাখা জল দেখে তাই থাকতে পারি না। 

গামলার জলে কাকচান সেরে বড্ড আরাম পাই, 

তোয়াদিদি গো, আমার পরে রাগ করতে নাই”। 

কাকের কথায় তোয়া দুলে দুলে খুব হাসতে লাগল, অন্য পাখিরাও কিচিরমিচিরে ভরে তুলল চারদিক।

তোয়া বলল, 

“রাগ করিনি মোটেই আমি, দুষ্টুসোনা কাক, 

আজ থেকে নয় তোর জন্যে এক উপায় করা যাক। 

আরেকখান গামলা এনে রাখবো ভরে জল, 

তখন যেন করিস না আর নতুন কোন ছল”।

চড়াই, শালিক, পায়রা, বুলবুলি, টিয়া সবাই এই ব্যবস্থায় খুব খুশি হল, বলল, 

“তোয়াদিদি, বেশ হবে, মজা হবে, এমন যদি হয়, 

তেষ্টা পেয়ে কষ্ট তবে হবার কথা নয়”।

 

কাকের সর্বদাই খিদে পায়। সে যেমন কা কা করে, তেমনি খা খা করে। ভোর থেকে উঠে নোংরা ঘেঁটে, আবর্জনা ঘেঁটে খেয়েছে কিছু মন্দ না, কিন্তু তাও তার আর তর সইছিল না, খিদেয় উড়ুউড়ু করছিল। ঠোঁট ফাঁক করে, দুবার খা খা ডেকে বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি এবার আমি উড়বো, 

কোনখানে কী খাবার পাই সন্ধানে তার ঘুরবো”।

তোয়াদিদি কাকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 

“আচ্ছা, আচ্ছা, দুষ্টুসোনা কাক, এখন উড়েই তবে যাক। 

আমারও নিচের থেকে পড়বে এবার ডাক। 

আমাদের গল্পগাছা এই অব্দিই থাক। 

বিকেলবেলা আসিস সবাই একটু পেলে ফাঁক”।

টিয়া বলল, 

“ঠিক বলেছ, তোয়াদিদি, সময় হল যাবার, 

বাসায় আছে বাচ্চা দুটো তাদের জন্যে খাবার, 

যোগাড় করে নিয়ে যাবো ঘুরে বাদাড়বন, 

বিকেল বেলা ফেরার পথে কথা বলব অনেকক্ষণ”। 

কাক উড়ে গেল বাজারের দিকে, যেখানে অনেক নোংরা আর আবর্জনা জমা হয়, আর টিয়া উড়ে গেল সামনের বিরাট বাগানের দিকে।

ওদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অন্য পাখিরা বলল, 

“তোয়াদিদি তুমিও এবার নিচেয় যাও, 

মুখটুখ ধুয়ে, চটপট করে খাবার খেয়ে নাও। 

তারপরে তো বসবে খুলে এত্তো এত্তো বই! 

দুপুর অব্দি তুমি আর সময় পাবে কই? 

আমরা যে কজন থাকি তোমার আশেপাশে। 

পড়ার ঘরের জানালায় বসি ঘুরে ঘুরে এসে 

তোমার দিকে চোখ রেখে কষ্ট যে পাই খুব, 

লেখায় পড়ায়, নাচে গানে, তোমার ছটা দিনই ডুব”

চড়াই, শালিক, পায়রা বুলবুলি সবাই উড়ে গেল হুশ করে। ওদের উড়ে যাওয়া ডানার দিকে তাকিয়ে তোয়া একটু হাসল, তারপর নিজের মনেই বলল, 

“রবিবারেই মেলে আমার বেশ কিছুটা ছুটি, 

তোদের কথা শুনতে তাই ভোরবেলাতেই উঠি। 

তোদের ডানায় পাই রে আমি মুক্ত আকাশ নীল। 

নিবিড় সবুজ গাছে ঘেরা শান্ত গভীর ঝিল। 

বদ্ধ মনে ভাসিয়ে আনিস সতেজ মুক্ত হাওয়া। 

ওইটুকুতেই পাখি রে, মোর অনেক কিছু পাওয়া”!

--০০--

গল্পটি "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত।  বইটি বাড়িতে বসেই পেয়ে যাবেন নীচের লিংক থেকে কিনলে "এক কুড়ি কিশোর "

এর পরের ছোটদের প্রবন্ধ - লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

২টি মন্তব্য:

নতুন পোস্টগুলি

গীতা - ১৬শ পর্ব

  এই সূত্রে - "    ঈশোপনিষদ   "  এই সূত্র থেকে শুরু - "  কঠোপনিষদ - ১/১  " এই সূত্র থেকে শুরু - "  কেনোপনিষদ - খণ্ড...