শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - পর্ব ২

ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "


ছবি এঁকে অনেককে গোটা একটা ঘটনার কথা বলে ফেলা কী ভাবে শুরু হয়েছিল সে কথা আগের সংখ্যায় বলেছি। ছবি আঁকার জটিল দক্ষতাকে ধীরে ধীরে সহজ করে, শুরু হয়ে গেল চিত্রলিপি। এই চিত্রলিপির প্রথম ব্যবহার, মনে করা হয়, শুরু হয়েছিল ব্যবসার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বন্দর এলাকায়। আমাদের ভারতবর্ষেই হোক বা বিদেশে, নানান দ্রব্য সামগ্রী আমদানি বা রপ্তানির বাণিজ্য শুরু হয়েছিল অন্ততঃ হাজার পাঁচেক বছর বা তারও আগে। আমাদের সিন্ধু সভ্যতার বন্দরগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত বন্দর ছিল লোথাল। এই বন্দর থেকে সুদূর ইজিপ্ট, সুমের, বাহারিনের সঙ্গে যে নিয়মিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সে প্রমাণ অজস্র পাওয়া গেছে ওইসব দেশের বণিকেরা এদেশ থেকে পণ্যসামগ্রী কিনে নিয়ে যেত। বিভিন্ন দেশের বণিকেরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর এবং আগে বন্দর শহরের পান্থশালায় বেশ কিছুদিন থাকত, বিশ্রাম করত। কোথায় কী পণ্য পাওয়া যায়, কোন পান্থশালায় থাকার সুবন্দোবস্ত আছে, সে সব তথ্য বিদেশীদের নানান ভাষায় বোঝানোর থেকে অনেক সহজ ছিল চিত্রলিপি। কারণ সংক্ষিপ্ত চিত্রলিপি বোঝার জন্যে কোন বিশেষ ভাষা না জানলেও চলে

 

মৌর্যসাম্রাজ্যের প্রথমদিকের মুদ্রার উভয় পিঠ  

ধীরে ধীরে চিত্রলিপির ব্যবহার বাড়তে লাগল এবং এই চিত্রলিপি দিয়ে খুব সহজেই অনেক ধরনের তথ্য, নির্দেশ, পোঁছে দেওয়া শুরু হয়ে গেল বহু মানুষের কাছে, এমন কী গোটা একটা সাম্রাজ্যের সমস্ত প্রজার কাছেও! মৌর্য রাজাদের প্রথম দিকের মুদ্রাগুলি (ওপরের ছবি) লক্ষ্য করলে এমন অনেক চিত্রলিপি দেখতে পাবে
এমনকি এই রকম চিত্রলিপির সংকেত মুদ্রিত অনেক বিদেশী মুদ্রা বিভিন্ন দেশে প্রচলন করতেও খুব একটা অসুবিধে হত না 

শুনলে হয়তো আশ্চর্য হবে, আজও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এই চিত্রলিপির ব্যবহারের গুরুত্ব কমেনি তো বটেই, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। রেলস্টশন, এয়ারপোর্ট, বড়ো বড়ো হসপিটাল, পার্ক, হাইওয়েতে চলার পথে, চিত্রলিপির বহুল ব্যবহার হয়। লিখিত কোন নির্দেশ না থাকলেও, বিশেষ কিছু চিত্র সংকেত দেখলেই আমরা প্রশাসনের বক্তব্য বা নির্দেশ স্পষ্ট বুঝে যাই। নিচেয় সেরকম কিছু চিত্রলিপি বা সংকেতের নমুনা দেখলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধে হবে।


বড়োরাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় ওপরের চিত্রলিপির নির্দেশ দেখেই আমরা সামনের রাস্তা এবং তার আশেপাশের খবরাখবর অগ্রিম পেয়ে যাই। আবার নিচের চিত্রলিপিটি দেখঃ-


পরের চিত্রলিপি থেকে ছেলেদের, মেয়েদের কিংবা বিশেষভাবে-সমর্থদের ব্যবহারের জন্য টয়লেট খুঁজতে আমাদের অসুবিধে হয় কী? হয় না। 

এমনকি ছোট্ট ছেলেমেয়েদের সহজে যোগ বিয়োগ শেখাতেও চিত্রলিপির কোন বিকল্প নেই, নিচের এই ছোট্ট যোগটি আপেলের চিত্রলিপি দিয়ে বোঝানো কত সহজ দেখলেই বুঝতে পারবেঃ-

৫ + ২ = ৭ 

  + =  


শুধু ছোটদের পড়াশুনোর জন্যে নয়, তোমাদের বাবা-কাকুদের মতো বড়োরাও নানান জটিল তত্ত্ব এবং তথ্য সহজে সবাইকে বোঝানোর জন্যে গ্রাফ বা চার্ট ব্যবহার করেন, সেগুলিও মূলতঃ চিত্রলিপি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিচের দুটি চিত্রলিপি দেখলে, ব্যাপারটা বোঝা যাবে।



 

ভাষার বাধা কাটিয়ে, চিত্রলিপি বা চিত্রসংকেতের ব্যবহার খুবই কার্যকরী সন্দেহ নেই। কিন্তু চিত্রলিপি অত্যন্ত সীমিত বিষয়েই ব্যবহার করা চলে। আজ এই লেখাটা আমি যে লিখছি এবং তোমরা যে পড়ছো, সেটা চিত্রলিপি দিয়ে বোঝাতে এবং তোমাদেরও বুঝতে গলদঘর্ম হতে হত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ছবি বা চিত্রলিপির এই সীমাকে অতিক্রম করতে ধীরে ধীরে তাই এসে গেল ‘লিপি’ (script)  

‘লিপি’ (script) ব্যাপারটা বলতে ঠিক কী, সেটা বুঝতে গেলে ভাষা ব্যাপারটা কী, সেটা আগে বোঝা জরুরি। প্রাণীদের নিজ নিজ গোষ্ঠীতে পরষ্পরের সঙ্গে যোগাযোগের একটা অন্যতম মাধ্যম হল শব্দ বা আওয়াজ (sound)মুখের কয়েকটি অংশ যেমন, ঠোঁট, গলা, জিভ, তালু, নাক ব্যবহার করে অধিকাংশ প্রাণীই নানান আওয়াজ (sound) তৈরি করে। বাঘ, সিংহ, হাতি, পাখিদের আওয়াজ বা ডাক নিশ্চয়ই শুনেছ। এই ধরনের প্রাণীদের ভাষা যদিও খুব সীমিত, তবু শিকারের আগে কিংবা বিপদের সময়, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদানের জন্যে এই শব্দ খুবই অর্থবহ।

মানুষ প্রাণীদের মধ্যে সব থেকে উন্নত এবং বুদ্ধিমান। জঙ্গলের আদিম মানুষ সভ্য হতে হতে, যখন চাষবাস, পশুপালন, ব্যবসাবাণিজ্য শিখতে লাগল, গ্রামশহর বানাতে শিখল – এককথায় সভ্য মানুষের জীবনযাত্রা যত জটিল হয়ে উঠতে লাগল, তখন আর দু দশটা আওয়াজ দিয়ে যোগাযোগ বা বার্তার আদানপ্রদান সম্ভব হচ্ছিল না। অনেকগুলি আওয়াজ দিয়ে গড়ে উঠতে লাগল অর্থবহ শব্দ (word), আবার অনেকগুলি শব্দ জুড়ে গড়ে তুলতে হল বাক্য (Sentence)তারপর বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে চলতে লাগল কথোপকথন (conversation)ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল সকলের বোধগম্য অনেক নিয়ম, অনেক বিন্যাস (Syntax)যে নিয়ম বা বিন্যাস অনুসরণ করে কথা বললে একই গোষ্ঠীর সমস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে সকল কথা বলতে পারবে, বুঝতেও পারবে অন্যের সকল কথা। এই নিয়ম বা বিন্যাস হল ব্যাকরণ (grammar)একই গোষ্ঠীর বোধগম্য কথাবার্তার নাম হল ভাষা (language)  বিভিন্ন দেশে, এমনকি একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, মানুষের শব্দ উচ্চারণের পদ্ধতি আলাদা হওয়ার জন্যে ভাষাও হয়ে উঠল আলাদা আলাদা। দুই ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা বোঝার আগে বা বলার আগে সে ভাষা শিখতে হয়।

লিপি হল ভাষা অনুযায়ি প্রতিটি শব্দের চিহ্ন, তার মানে কথা বলতে যে যে শব্দ আমরা উচ্চারণ করি, ঠিক সেই শব্দটিকে সংকেতে লিখে ফেলা। “তোমরা আমার কথা বুঝতে পারছো?” পারছো, তার মানে, সামনে বসে আমি যা বলতাম, তা না বলে, আমি একই কথা এমন ভাবে লিখেছি, যেটা পড়ে তুমি বুঝতে পারছো। এটাই লিপি। এখানে যে সংকেতগুলির ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলি হলো,

ত+ও+ম+র+আ আ+ম+আ+র ক+থ+আ ব+উ+ঝ+ত+এ প+আ+র+ছ+ও?

এই প্রত্যেকটি চিহ্নকে বলে অক্ষর বা বর্ণ (alphabet - আজকাল characterও বলা হয়) এই বর্ণকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে স্বরবর্ণ (vowel) এবং ব্যঞ্জনবর্ণ (consonant)স্বরবর্ণগুলিকে স্বাধীন বর্ণ বলা যায়, কারণ এদের উচ্চারণে অন্য কোন বর্ণের সাহায্য দরকার হয় না। অ আ ই ঈ উ ঊ এ ঐ ও ঔ। আরেকটা বিশেষত্ব হল, এই বর্ণগুলি গলা থেকে বেরোনো আওয়াজকে শুধু ঠোঁটের নিয়ন্ত্রণেই খুব সহজে উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণে কণ্ঠস্বর আর ঠোঁট ছাড়াও জিভ, তালু, দাঁত, নাকেরও সাহায্য নিতে হয়। ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ, স্বরবর্ণের সাহায্য ছাড়া খুবই কম ব্যবহার হয়। ওপরের শব্দগুলিতে, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ, ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে জুড়ে থাকা স্বরবর্ণগুলিকে ঠিকঠাক স্বরবর্ণের আকারে চেনা যাচ্ছে না। “তোমরা” – এখানে ও-বর্ণ (ো)ও-কার হয়ে গেছে, আর আ-বর্ণ (া) আ-কার হয়ে গেছে।  ব্যঞ্জনের সঙ্গে স্বর বর্ণগুলির সংযোগ, এভাবেই আলাদা আলাদা চিহ্ন দিয়ে বোঝানো হয়। এই শব্দে ‘ম’- বর্ণে কোন স্বরবর্ণের যোগ নেই, এখানে ম-বর্ণের উচ্চারণ বিশুদ্ধ ব্যঞ্জন বলা যায়।

এইভাবে অনেকগুলি স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ জুড়ে ঠিকঠিক কথা তৈরিকেই বলে শব্দ। কাজেই শুধু পরপর বর্ণ সাজালেই শব্দ হবে না, শব্দ মানে তার অর্থ থাকতে হবে, সেই শব্দর অর্থ যারা পড়বে তারা সক্কলে যেন বুঝতে পারে, তা নাহলে যে লিখছে সে জব্দ হয়ে যাবে। কারণ যে লিখছে সে তো অন্যকে বোঝানোর জন্যেই লিখছে!

ভাষা অনুযায়ি লিপির ধারণা এবং প্রচলন অন্ততঃ দুটো প্রাচীন সভ্যতায় আলাদা আলাদা ভাবে শুরু হয়েছিল।  কিন্তু এবার আসি সেই কথায়।  


    পণ্ডিতেরা মনে করেন, অন্ততঃ দুই বা তার বেশি প্রাচীন সভ্যতায় ভাষা অনুসারে লিপির সূত্রপাত হয়েছিল। তার মধ্যে প্রথম ধরা হয়, মোটামুটি ৩১০০ বি.সি.তে মেসোপটেমিয়ার সুমেরিয় সভ্যতায়। আর ৩০০ বি.সি.তে মেক্সিকোর ওলমেক (Olmec) অথবা জ্যাপোটেক (Zapotec) –এর মতো মেসোআমেরিকান (Mesoamerican) সভ্যতায়। এই দুই সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, অতএব ধরে নেওয়া যায়, এই দুই সভ্যতায় লিপির উদ্ভবে একে অন্যের  ওপর কোন প্রভাব ছিল না, স্বাধীনভাবেই লিপির সৃষ্টি হয়েছিল।

    এছাড়া আরও দুই সভ্যতার লিপি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক আছে - মোটামুটি ৩১০০ বি.সি.তে প্রাচীন মিশর (Egypt) এবং ১২০০ বি.সি.তে চিন। কেউ বলেন এই দুই সভ্যতাতেও স্বাধীনভাবে লিপির সৃষ্টি হয়েছিল, কেউ বলেন ওই দুই সভ্যতার সঙ্গে সুমেরিয় সভ্যতার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল। বাণিজ্য এবং বণিকদের মাধ্যমে দুই সভ্যতার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তারই ফলে এই দুই সভ্যতার নিজস্ব লিপি রূপ পেতে শুরু করেছিল। তবে বেশির ভাগ পণ্ডিতেরা বলেন, প্রাচীন চিনের বর্ণমালার ওপর অন্য কোন সভ্যতার প্রভাব থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ প্রাচীনকালে চিনের সঙ্গে সুদূর মধ্য প্রাচ্যের সুমের সভ্যতার তেমন কোন যোগাযোগের প্রমাণ মেলেনি। আর চেহারা এবং ভাবনায়, সুমের লিপির সঙ্গে চিনা লিপির তেমন কোন মিলই পাওয়া যায় না। সুমেরিয় কিউনিফর্ম লিপির থেকে প্রাচীন মিশরের লিপিও আলাদা, কিন্তু পণ্ডিতেরা বলেন, এই দুই লিপির ভাবনা ও বিন্যাসে নাকি অনেক মিল আছে। 

    একই বিতর্ক চালু আছে আমাদের সিন্ধু উপত্যকার লিপি নিয়েও। মোটামুটি ২৬০০ বি.সি.তে এই সভ্যতায় লিপির সূত্রপাত। কিন্তু যেহেতু এই লিপিগুলির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি, তাই অনেক পণ্ডিত এগুলিকে লিপি বলে মানতে নারাজ, তাঁদের মতে এগুলি চিত্রলিপি কিংবা হয়তো লিখিত কোন সংকেত!

সুমেরীয় কীলক লিপি

সুমেরিয় সভ্যতায় ৪০০০ বি.সি.র শেষের দিকে লেখার শুরু হয়েছিল নরম মাটির ওপর গোলমুখ কলম দিয়ে আঁচড় কেটে। প্রথম দিকে শুধু ব্যবসার হিসেবপত্র রাখতেই এই লিপির শুরু। তারপর ২৭০০ থেকে ২৫০০ বি.সি.র মধ্যে কলমগুলো  হয়ে উঠল ছুঁচোলো সরু। এই ধারালো কলমের খোঁচা খোঁচা দাগের জন্যেই এই লিপির নাম কীলক লিপি

(Cuneiform Script)মোটামুটি ২৬০০ বি.সি. থেকে এই কীলক লিপি নির্দিষ্ট শব্দ বিন্যাস এবং সংখ্যার জন্যে আলাদা হয়ে গড়ে উঠতে থাকে। এই সময় শুধু যে বাণিজ্যের হিসেব রাখা হত, তাই নয়, রাজ্যের অনেক ঘটনা, তথ্য, নির্দেশিকাও লেখা হতে শুরু করল। ওপরের ছবিতে প্রাচীন ব্যাবিলন শহরের আলালা (Alalah) থেকে পাওয়া কীলক লিপির একটা নমুনা। নরম মাটির ওপর লিখে, সেটিকে রোদ্দুরে কিংবা আগুনে সাবধানে পুড়িয়ে এই ট্যাবলেটগুলি বানানো হত। সেই সময় সহজ উপযোগিতার জন্যে, এই লিপি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, এবং আশেপাশের অন্যান্য জনপদের লোকেরাও এই লিপির পদ্ধতি অনুসরণ করে, নিজস্ব লিপির ধারা তৈরি করতে শুরু করেছিল। তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন পারস্য লিপি।

মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফ লিপি


    মিশরীয় সাম্রাজ্যে লিপির একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল, সমাজের শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরই লিপি অনুশীলনের অনুমতি মিলত। এই লিপিগুলি মন্দির, মিশরের রাজা ফারাওদের নির্দেশ এবং প্রশাসনিক নানান কাজে ব্যবহার করা হত। মিশরীয় লিপিগুলিকে হিয়েরোগ্লিফিক্‌স্‌ (Hieroglyphics) বলা হয়, যদিও এই শব্দটি গ্রীক। মিশরীয়রা তাঁদের নিজেদের লিপিকে বলতেন “মেডু-নেৎজার” (medu-netjer), যার মানে “ঈশ্বরের কথা”। তাঁরা বিশ্বাস করতেন মহান দেবতা থথ (Thoth), তাঁদের লিখতে শিখিয়েছেন। তাঁদের আরো বিশ্বাস ছিল, দেবতা থথ তাঁদের  এই জ্ঞান উপহার দিয়েছিলেন এই বিশ্বাসে যে, মিশরীয়রা এই জ্ঞানটির পবিত্রতা দায়িত্বের সঙ্গে রক্ষা করবেন


মিশরীয় লিপির দেবতা থথ

    তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শব্দের অসীম ক্ষমতা! শব্দ মানুষকে আঘাত করতে পারে, আরোগ্য করতে পারে, সমৃদ্ধি আনতে পারে, আনতে পারে ধ্বংস, এমন কী মৃত মানুষকে বাঁচিয়েও তুলতে পারে! বিখ্যাত মিশরবিজ্ঞানী রোজেলি ডেভিড এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “এই লিপির উদ্দেশ্য শুধু মাত্র অলংকরণের জন্যে নয়, এমন কি প্রথমদিকে এই লিপি সাহিত্য কিংবা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হত না। এই লিপির গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল, কোন বিশেষ ধারণা বা ঘটনাকে বাস্তব অস্তিত্বে নিয়ে আসা! মিশরীয় মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, এইভাবে লিখে রাখলে, সেই সব অলৌকিক দৈবী ঘটনা বা ধারণা বাস্তবে বার বার ঘটবে”!

সমাধির দেওয়ালে হিয়েরোগ্লিফিক্স

    মিশরীয় মানুষদের বিশ্বাসকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দেওয়াই যায়, কিন্তু একটু চিন্তা করলে গভীর একটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়। সেই যুগ থেকে আজও, একজন লেখক যখন লিখতে শুরু করেন, তিনি কোন একটি ঘটনা বা ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। লেখা শেষ করলেও তিনি নিজেই বুঝতে পারেন না, সেই ধারণাকে তিনি সঠিক প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন কী না! একজন পাঠক যখন সেই সম্পূর্ণ লেখাটি পাঠ করেন, তাঁর মনে নতুন এক ধারণার সৃষ্টি হয়। লেখাটি পড়ে তিনি কখনো মুগ্ধ হন, কখনো ক্রুদ্ধ হন, কখনো ভীত হন, কখনো বা নতুন জ্ঞানে আলোকিত হন। আর তখনই সেই লেখকের লেখা সার্থক প্রতিষ্ঠা পায়। সেই লেখা বার বার বহু যুগ ধরে, বহু পাঠকের মনে আলোড়ন তুলতে থাকে। আমাদের দেশের প্রাচীন লেখক মহর্ষি বেদব্যাস (যিনি মহাভারত লিখেছিলেন), কিংবা আমাদের একান্ত আপন এই সেদিনকার মহাকবি রবীন্দ্রনাথ, তেমনই দুই উদাহরণ হতে পারেন। যাঁদের লেখা পড়ে আজও আমরা মুগ্ধ হই, ঋদ্ধ হই।

    প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার ধারণায় মৃত্যুতে একটি জীবনের শেষ হয় না, বরং মৃত্যু হল এক জীবন থেকে অন্য এক জীবনে উত্তরণের পর্যায়। তাই মৃতের সমাধিতে প্রচুর উপহার সামগ্রী রাখা হত, রাখা হত প্রচুর খাবার এবং পানীয়!  সেই সমাধির দেওয়ালে সমস্ত উপহার সামগ্রীর বিবরণ লিখে রাখা হত। তার সঙ্গে লেখা হত, জীবিত অবস্থায় সেই মৃত মানুষটির কৃতিত্বের কথা। সেই কৃতিত্ব হয়তো কোন বড়ো যুদ্ধ জয় অথবা উচ্চস্তরের প্রশাসনিক দক্ষতা। সেই কৃতিত্ব যত বড়ো হত, উপহার সামগ্রীর পরিমাণ ততই বেশী হত। এর সঙ্গে আরো লেখা হত, মৃতব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা বাণী এবং তাঁর মঙ্গলের জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এইগুলিকেই হয়তো প্রথম আত্মজীবনী এবং সাহিত্যের সূত্রপাত বলা যায়।

    অন্য সমস্ত লিপির থেকে মিশরীয় লিপির বৈশিষ্ট্য হল একটি শব্দের বর্ণলিপির শেষে একটি চিত্র (Logogram) এঁকে, বিষয়টিকে বোঝানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় msh মানে কুমীর, আর miw মানে বেড়াল। বর্ণলিপি দিয়ে লেখার পরে দুই ক্ষেত্রেই কুমীর এবং বেড়ালের ছবি এঁকে বোঝানো হয়েছে। নিচেয় দেখানো ছবিটি লক্ষ্য করলে, বেশ মজা পাওয়া যায়অনেকটা আমাদের ছোটদের বইয়ে “অ-অজগর আসছে তেড়ে”-র পর অজগরের ছবির মতো!        

           


বিশেষজ্ঞরা ওপরের লিপির পাঠোদ্ধার করে বলছেন, ওপরের লিপিতে লেখা আছে – iw wnm msh nsw, তার মানে “The crocodile eats the king”- রাজাকে কুমীর খায়! সুন্দর এই লিপিতে লুকিয়ে রয়েছে কী ভয়ংকর বার্তা


পরের পর্ব - " লিখিব পড়িব - পর্ব ৩  " 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...