এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
৯
সকালে জুজাকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি যে
পুকুরটা দেখছিল, সেই পুকুরেই কয়েকটা ডুব দিয়ে নিল ভল্লা। গামছায় গা
মুছে ভেজা কাপড় বদলে পরে ফেলল চাদরটা। তারপর নেংড়ানো ভেজা কাপড় কাঁধে ফেলে দ্রুত পায়ে
বাড়ি ঢুকল। দড়িতে ভেজা কাপড় শুকোতে দিতে দিতে ভল্লা হাঁক পাড়ল “কই রে, মা। খিদেয় তো
পেটে আগুন ধরে গেল, অসুস্থ শরীরে এই অনিয়ম সহ্য হয়?”
ডাক শুনে কমলি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, ভুরু কুঁচকে রাগী গলায় বললেন,
“সভা ডেকে সবাইকে এতক্ষণ তোর গল্প শুনিয়ে এলি, এখন আমাকে দুষছিস, হতভাগা ছেলে?”
ভল্লা ভুরু নাচিয়ে হাসল, বলল, “চাদরটা ছেড়ে আসি, ততক্ষণ তুই
খাবার বাড়। সত্যি খুব খিদে পেয়েছে রে, মা”।
“বাড়ছি, আয়। তোরা রাজধানীর রাজকাজ করা লোক, আমাদের এই অখাদ্য
খাবার কী করে খাচ্ছিস, সে তুইই জানিস?”
ভল্লা নিজের ঘরে গিয়ে শুকনো ধুতি পরতে পরতে কমলি-মায়ের
কথা শুনে বুঝল, তার গল্প-কথা গ্রামে সকলের কাছেই চারিয়ে গিয়েছে। এত দ্রুত ছড়িয়ে যাবে
সে ভাবতে পারেনি। অবিশ্যি কমলি-মা, গ্রাম প্রধানের বউ। তার ওপর
এই কমলি-মায়ের সেবাতেই সে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। অতএব কমলি-মায়ের কাছে তার খবর যে
উড়ে আসবে তাতে আর আশ্চর্য কি? তবে ভল্লা একটু অবাক হল, জুজাক বাড়িতে নেই! বৃদ্ধদের প্রভাতী আড্ডাতেও ছিল না! তার কথা বয়স্ক এবং বৃদ্ধরা কেউ কিছু
বললও না। জুজাক কি গ্রামেই নেই? কোথায় গিয়েছে? কখন বেরিয়েছে? নিশ্চয়ই সে বেরিয়ে যাওয়ার
পরেই বেরিয়েছিল। কমলি-মা দুয়োরে জলছড়া না দিয়ে তো কাউকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দেওয়ার
লোক নয়! লোকটা ফিরবেই বা কখন?
দাওয়ায় বেরিয়ে এসে ভল্লা দেখল আসন পাতা হয়ে গেছে, মাটির কটোরায়
জলও রয়েছে। সে আসনে বসে এক চুমুকে কটোরার জল খেয়ে ফেলে, আরামের আওয়াজ করল “আঃ”। কমলি-মা
ভেতর থেকে মাটির থালে ভুট্টার রুটি আর একটু ডাল নিয়ে বেরিয়ে এলেন, আসনের সামনে থাল
রাখতে রাখতে বললেন, “খাওয়ার আগেই পুরো জলটা খেয়ে নিলি? খাওয়ার আগে জল খেতে নেই, তোর
বাড়িতে কেউ বলেনি? মা, বোন, বউ কেউ নেই নাকি রে তোর”?
ভল্লা রুটির টুকরো ছিঁড়ে ডালে ভিজিয়ে মুখে পুরে বলল, “সবাই আছে,
রে মা। তবে কিনা, যারা মায়ের কথার অবাধ্য হয়, তাদের প্রতিই মায়েদের আদর থাকে একটু বেশি।
আর তাতেই তো আমার লোভ…” ভুরু নাচিয়ে হাসল ভল্লা, আবার বলল, “তোদের গাঁয়ের ওই ধুকধুকে
বুড়োগুলোর সঙ্গে বকবক করতে করতেই তো গলা শুকিয়ে উঠেছিল – তাই জল দেখেই মেরে দিলাম ঢকঢক
করে”। কমলি-মা ছোট্ট কলসিতে জল এনে ঢেলে দিলেন মাটির কটোরায়।
ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “প্রধানমশাই কোথায় গেছে, মা? দুপুরে খেতে
আসবে না?”
“প্রধান গেছে, আস্থানে – রাজার কাছারি বাড়িতে। সঙ্গে গেছে আরও
তিনজন। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে”।
“কিসের জন্যে গিয়েছে, জানিস মা?” ভল্লার কণ্ঠে কিঞ্চিৎ উদ্বেগ।
ভল্লা জানে শীতের শেষে এই সব অঞ্চলের কর আদায়ের জন্যে কাছারিতে রাজকর্মচারীদের আগমন
ঘটে। তারা প্রত্যক্ষ তদন্ত করে ফসলের পরিমাণ
গণনা করে, কর নির্ধারণ করে। জুজাক কি সেই বিষয়েই কথা বলতে গেছে? অথবা কাছারির
রাজকর্মচারীর কাছে, তার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে যায়নি তো? ভল্লা জানে জুজাক প্রথম থেকেই
তার প্রতি বিরক্ত। তাছাড়া গ্রাম-প্রধান হিসেবে, তার মতো অচেনা-অজানা উটকো একজন লোকের গ্রামে এসে পৌঁছনোর সংবাদ দেওয়াটা, তার কর্তব্যও বটে! অবিশ্যি,
যে রাজকর্মচারী এসেছে, সে রাজধানী থেকে যদি ভল্লার সংবাদ জেনেই এসে থাকে – তাহলে ভল্লার
উদ্বেগের কারণ নেই অবিশ্যি।
“এসময় কাছারিবাড়ি কেন যায়, জানিস না? দু’বছর বাদে এইবার কিছু
ফসল হয়েছে, রাজার লোক চিলের মতো এসেছে ছোঁ
মেরে কর আদায় করতে। তাদের হাতে-পায়ে ধরে যদি কিছু কমানো যায়…”।
“আরেকটা রুটি দে না, মা। হুঁঃ, রাজার লোকরা চামার হয় জানিস না,
মা? তারা যা কর আদায় করে নিজেরাই তার অদ্দেক ঝেড়ে দেয়। রাজধানীতে গিয়ে হিসেব দেয় –
ইঁদুরে খেয়েছে, পাখিতে খেয়েছে, ঝুড়ি ফেটে মাটিতে পড়ে গেছে…। তোরা যদি এখানে এক ঝুড়ি
ভুট্টার দানা দিস মা, রাজার কাছে জমা হবে তিন কুনকে…হ্যাঁ। বাকিটা মেরে দেবে রাজধানী
পর্যন্ত রাজার নানান কর্মচারীরা”।
ঘর থেকে আরেকটা রুটি এনে ভল্লার পাতে দিয়ে কমলি জিজ্ঞাসা করলেন,
“কী বলছিস?”
“করাধ্যক্ষ আর তাদের নীচের কর্মচারীদের
ঠাট-বাট যদি দেখিস না, মা চমকে যাবি। প্রধানমশাই জানেন, তুই তো কোনদিন কাছারিতে কিংবা
ওদের শিবিরে যাসনি, দেখিসনি”।
“তা যাইনি, তবে দূর থেকে দেখেছি বৈকি। আমাদের এই গ্রামের পিছন
দিয়ে, রাজ্যের সীমানা বরাবর যে পথ আছে, সেই পথে ওদের যেতে দেখেছি। করাধ্যক্ষ পালকিতে
বসে রাজার মতোই যায়। তার সামনে পেছনে দেখেছি অজস্র বলদের গাড়ি। পাশে পাশে চলে ঘোড়ার
পিঠে বসা বল্লম আর ভল্ল নিয়ে রক্ষীদের সারি। শুনেছি সবার পিছনে
থাকে ভৃত্য আর রাঁধুনির দল…সে দলও বিশাল। বিরাট সেই শোভাযাত্রা যেন শেষই হতে চায় না…”।
খাওয়া সাঙ্গ করে ভল্লা কটোরি থেকে জল খেল। কমলি বললেন, “ওমা
কথা বলতে বলতে খেয়ালই করিনি, আরেকটা রুটি নে, লেবুর আচার আছে, আমার হাতে বানানো…”।
ভল্লা উঠে দাওয়ার ধারে রাখা জালার জল তুলে আঁচিয়ে নিয়ে বলল,
“পাগল হয়েছিস, মা? আমাকে কী বক রাক্ষস ঠাউরেছিস? ও বেলা বরং দুটো রুটি দিয়ে তোর বানানো
আচার চেখে দেখব…। কিন্তু একটা কথা বলি, ওই যে তুই বললি না, করাধ্যক্ষ রাজার মতো যায়
– তুই বুঝি রাজা দেখেছিস?”
কমলি হাসলেন, “ধূর খ্যাপা ছেলে”, এঁটো থাল আর কটোরা তুলে, এঁটো
জায়গায় জল ছিটিয়ে নিকোতে নিকোতে বললেন, “আমি রাজা কোথায় পাবো…গ্রামের পালা-পার্বণে
লোকে রাজা-মন্ত্রী সাজে…সেই আমার রাজা দেখা…”।
ভল্লা হাসল, বলল, “তা বটে। আচ্ছা মা, তুই যে বললি গ্রামের পিছনে
সীমান্ত বরাবর একটা পথ আছে, সেই পথটাই কি ওপরের ওই রাজপথে গিয়ে মিশেছে?”
কমলি বললেন, “হুঁ। ওই রাস্তা যেখানে রাজপথের
সঙ্গে মিশেছে, সেখানে একটা তেমাথার মোড় পরে। সোজা গেলে উত্তরের দিকে চলে যাওয়া যায়
আর ডানদিকে ঘুরে গেলেই রাজপথ সেই তোদের রাজধানী পর্যন্ত...। আমার বাপের বাড়ি ওই
তেমাথা থেকে উত্তরে, বেশি নয় ক্রোশ দেড়-দুই হবে...। বার-চারেক বাপের বাড়ি গিয়েছি –
সে সময় প্রধানের মুখে শুনেছি। তা নইলে আমি আর জানবো কোত্থেকে বল?”
ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “এখান থেকে ওই তেমাথার মোড়
কদ্দূর বটে, মা?”
কমলি বললেন, “কত আর ক্রোশ খানেক হবে...”।
ভল্লা বলল, “অ। তুই খেয়ে নে মা, অনেক বেলা হল।
আমি বরং উঠি, ঘরে গিয়ে একটু শুই। আমি থাকলেই আজেবাজে কথায় তোর আর খাওয়া হবে না”।
ভল্লা উঠে নিজের ঘরে গেল। পাতার বিছানায় শুয়ে
নোনাপুর গ্রামের অবস্থানটা মাথার মধ্যে আঁকতে লাগল, চোখ বন্ধ করে।
এই গ্রাম এবং আশপাশের গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক
ছোকরা জড়ো হয়েছে, ভল্লার নেতৃত্বে। বিচক্ষণ ভল্লা নিজের মতো করে সকলকেই বাজিয়ে
দেখেছে। মনে মনে সে ষোলো-সতেরজনের একটা দল ঠিক করে ফেলেছে। যাদের স্বাস্থ্য-শরীর
ভালো, চনমনে, ছটফটে। আর প্রত্যেকের মনেই কমবেশি আগুন আছে। মনের মধ্যে এই আগুন
থাকাটা খুব জরুরি। যার মন মিয়োনো, নরম নরম, তাদের দিয়ে আর যাই হোক লড়াই চলতে পারে
না। এই দলের প্রত্যেকেই ভল্লার কাহিনী শুনে উত্তেজিত। প্রতিবাদী কিছু একটা করার
জন্যে টগবগ করছে। তবে ভল্লা জানে, মা-বাপ-ভাই-বোনের স্নেহের ছায়ায় বাড়িতে থেকে,
মনের আগুন নিয়ে বিলাসিতা করা এক বিষয়। আর সম্মুখ যুদ্ধে নেমে, নিজে আহত হয়ে এবং
শত্রুপক্ষকে আহত করে, হত্যা করে রক্তধারা দর্শনের উত্তেজনা সহ্য করা - সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সে রকম পরিস্থিতি না আসা পর্যন্ত কার কদ্দূর দৌড় নিশ্চিতভাবে
বুঝে ওঠা যাবে না। ভল্লার
অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, এই দলের মধ্যে অন্ততঃ দশ-বারোজন তাকে হতাশ করবে না।
প্রথম দিন আলাপের সময়েই এই দলটি তার কাছে
বিদ্রোহের মন্ত্র জানতে চেয়েছিল। সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রে লড়ে যাওয়ার শপথ
নিয়েছিল। বলেছিল ভল্লাদাদা তুমি একা, তাই ওরা তোমাকে এভাবে চূড়ান্ত হেনস্থা করতে
পেরেছে। তোমার ওপর ঘটে যাওয়া এই অপমানের শোধ তুলব আমরা সবাই মিলে। ভল্লা মনে মনে
হেসেছিল। একটু বিদ্রূপের সুরে গম্ভীর মুখে ভল্লা বলেছিল, “খাওয়া, ঘুমোনো আর হাগতে-পাদতে-মুততে যাওয়া ছাড়া আর কী
পারিস? ছুটতে পারিস? লাফাতে পারিস? গাছে উঠতে পারিস? সাঁতার কাটতে পারিস? অস্ত্র
চালাতে পারিস কিনা জানতে চাইলাম না। জানি,
ও জিনিষ তোরা কোনদিন হাতেও ধরিসনি”।
ছেলেরা ক্ষুব্ধ হল ভল্লার কথায়, একজন বলল, “আমরা
গ্রামের ছেলে, ভল্লাদাদা। ছুটতে পারব না? সাঁতার জানব না? গাছে চড়তে পারব না?”
ভল্লা বলল, “আরে ধুর, ও তো সবাই পারে। ছোটবেলায়
লুকোচুরি খেলায় দৌড়তে হয়। লাফাতে হয়। পাকা জাম পাড়তে গাছেও চড়তে হয়। চানের সময় জলে
ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার শেখা হয়ে যায়। ওই শিক্ষায় কী আর রাজসৈন্যদের মুখোমুখি হওয়া যায়
রে?” একটু বিরতি দিয়ে আবার বলল, “ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি আর রাজার
সৈন্যদের সঙ্গে লুকোচুরি তো, এক জিনিষ নয়, বাবু। ধরে নে একজন অশ্বারোহী তোর পিছু
নিয়েছে, তির ছুঁড়ছে বারবার। পারবি তার সঙ্গে দৌড়ে। দৌড়ে পালাচ্ছিস, সামনে পড়ল একটা
নদী – পারবি সেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ডুব সাঁতারে সেই নদী পার হতে?”
ছেলেরা কেউ কোন উত্তর দিল না। তাকিয়ে রইল ভল্লার
মুখের দিকে। সকলের দিকে তাকিয়ে ভল্লা বলল, “রাজশক্তির বিরুদ্ধে যাওয়ার আগে, নিজেকে
শক্তিধর করে গড়ে তুলতে হবে। পারবি? না পারলে কী লাভ? আত্মহত্যা করার হাজার একটা
পদ্ধতি আছে – শখ করে রাজসৈন্যের সামনে আত্মাহুতি দিতে যাওয়ার কোন মানে হয়? কাস্তের
ডগায় হাত একটু কেটে গেলে ব্যথা হয় না? নিজের রক্ত ঝরতে দেখলে মনটা দুর্বল হয়ে পড়ে
না? মা, দিদি, কিংবা বাবা এসে সে ব্যথার সেবা করলে আরাম লাগে না? লড়তে গিয়ে বল্লমের
খোঁচায় যখন কাঁধে বা পেটে ক্ষত হবে, কে তখন তোর পাশে থাকবে? কার কাছে জানাবি সে
ব্যথার কথা?”
ভল্লা চুপ করে যেতে, ছেলেরা চুপচাপ বসে অনেকক্ষণ
চিন্তা করল। তাদের একজন বলল, “তুমি আমাদের শিখিয়ে নাও ভল্লাদাদাদা। তুমি হও আমাদের
সেনাপতি”।
ভল্লা আরেকবার সকলের মুখের দিকে তাকাল – বলল,
“তাহলে এখনই শুরু কর। আজ এখনই এখান থেকে দৌড় শুরু কর... সূর্যাস্ত হতে আর দণ্ড
দুয়েক বাকি। এই পথ ধরে ওপরের রাজপথে যাবি – সরোবরের ধার দিয়ে এসে, পাহাড়ের গা বেয়ে
নেমে – এই খানে ফিরে আসবি, সূর্যাস্তের আগে। কে কে পারবি?”
ওরা চলে যেতে ভল্লা গ্রামের দক্ষিণ দিকে হাঁটতে
শুরু করল। গ্রামের এদিকটা এখনও তার দেখা হয়নি। এদিকে বসত কম। বিচ্ছিন্ন কিছু আবাদি
জমি, আর অধিকাংশই অনাবাদি পোড়ো জমি। ভল্লা হাঁটতে লাগল। অনেকক্ষণ চলার পর তার মনে
হল, সে গ্রামের সীমা ছাড়িয়ে এসেছে। জনহীন প্রান্তর - কিছু বড় গাছপালা, ছোটছোট
ঝোপঝাড় সর্বত্র। আরও কিছুটা গিয়ে তার কানে এল বহতা জলের শব্দ। অবাক হল – এমন রুক্ষ
প্রান্তরে কোথা থেকে আসছে এই ক্ষীণ জলধ্বনি। এগোতে এগোতে ভল্লা ছোট্ট একটা নালার
পাশে দাঁড়াল। পূব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলেছে জলধারা। খুবই সামান্য – কিন্তু ভল্লার
কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে আসছে, এই জলধারা? এ অঞ্চলে বর্ষা হয় সামান্যই –
তাহলে কোন উৎসমুখ এই জলধারাকে সজীব রেখেছে এই মধ্য শীতেও।
এই গ্রামের অবস্থান চিত্রটি সে মনে মনে চিন্তা
করল কিছুক্ষণ। এই গ্রামে আসার সময় পাহাড়ের কোলে রাজপথের ধারে সেই সরোবর দেখেছিল। সেই
রাজপথ থেকে অনেকটাই নিচে এই গ্রামের অবস্থান। আজ সকালে যে দীঘির ঘাটে সে বসেছিল, সেটি
এই গ্রামের পূর্ব সীমানায় এবং তার পরেই রয়েছে খাড়া অনুচ্চ যে পাহাড়টি – তারই শীর্ষে
রয়েছে রাজপথের সরোবরটি। আজ সকালে গ্রাম পরিক্রমণের সময় আরও কয়েকটি পুকুর সে লক্ষ্য
করেছে। তাহলে ওই দুই সরোবর, ওই পুকুরগুলি এবং এই নালার উৎস কি একই? প্রকৃতির কি আশ্চর্য
লীলা – সরোবর কিংবা পুকুরগুলি কখনো প্লাবিত হয় না, কিংবা জলহীনও হয় না। ওগুলিকে সম্বৎসর
পরিপূর্ণ রেখে উদ্বৃত্ত জলরাশি প্রবাহিত হয় এই নালাপথে! বর্ষায় হয়তো এই নালার
প্রবাহ গতি পায়। ভল্লা আশ্চর্য হল। সে নালাপথের উজান বরাবর এগিয়ে চলল পূর্বদিকে।
লক্ষ্য করতে করতে চলল নালার এপাশের জমির প্রকৃতি, গাছপালা ঝোপঝাড়। ভল্লার কৃষিকাজে
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। তবু রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে যেটুকু সে দেখেছে, তার
মনে হল, আপাত অনুর্বর এই জমিকেও কৃষিযোগ্য করে তোলা সম্ভব। একটু পরিশ্রম করলে, এই
নালার জল কৃষিকাজে সম্বৎসর ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রায় ক্রোশার্ধ হেঁটে সে পৌঁছল গ্রামের পূর্বসীমানার
সেই পাহাড়তলিতে। এই জায়গাতেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা একটি শীর্ণ জলধারা সমতলে
নেমেছে। এই জায়গায় জলধারা কিছুটা বিস্তৃত, বড়ো বড়ো কিছু পাথর আর নুড়ির মধ্যে দিয়ে
পথ করে কিছুদূর বয়ে গেছে। তারপরেই শুরু হয়েছে শীর্ণ নালা প্রবাহ। ভল্লা কিছুক্ষণ
দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করল, আশপাশের জমি-জায়গা। তার মনে হল, এই সব পাথর-নুড়ি আর মাটি দিয়ে
গড়ে তোলা সম্ভব দুর্বল বাঁধ। তার উজানে বানিয়ে তোলা যেতে পারে ক্ষুদ্র জলাধার। এই
স্থানটির অবস্থান যেহেতু একটু উঁচুতে, অতএব ওই জলাধার থেকে কৃত্রিম নালি কেটে জলকে
চারিয়ে দেওয়া যেতে পারে সংলগ্ন নাবাল জমিগুলিতে। নিষিক্ত জমিতে চাষ করা যেতে পারে
কিছু কিছু উপযোগী ফসল।
ভল্লা দক্ষ সৈনিক, তীক্ষ্ণবুদ্ধি গুপ্তচর। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়
সে জানে, একটি গ্রামের সকল অধিবাসীকে কখনও উত্তেজিত করা যায় না। কতিপয় মানুষ
বিদ্রোহী হয়। ভল্লা জানে এই গ্রামেরও নির্বিবাদী অধিকাংশ মানুষ হয় উদাসীন থাকবে, নয়তো
ক্ষুব্ধ হতে থাকবে ভল্লার ওপর। বিদ্রোহী ছেলেদের বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমা পরিজন সকলেই
ভল্লার ওপর ক্রুদ্ধ হতে থাকবে, তাদের ছেলেদের “মাথাগুলি চিবিয়ে খাওয়ার” জন্যে। সেই
ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে, গ্রামের অর্থনৈতিক কিছু উন্নতির দিশা দেখাতে
পারলে। সামান্য হলেও, ওই জলাধার এবং উদ্বৃত্ত কিছু ফসলযোগ্য জমির সৃজন, বাড়িয়ে
তুলবে ভল্লার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা।
সন্ধ্যার কিছু আগে ভল্লা আগের জায়গাতেই ফিরে এল। সূর্য
অস্ত গেলেও পশ্চিমদিগন্তে তার আলোর রেশ এখনও রয়েছে। বড়ো গাছের নিচে বসতে গিয়ে দেখল,
তিনজন ছোকরা মাটিতে শুয়ে আছে। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তাদের বুকগুলো। ভল্লা খুশি
হল, কিন্তু চেঁচিয়ে ধমক দিল তিনজনকেই। বলল, “দৌড়ে এসে হাঁফাচ্ছিস, কিন্তু শুয়ে
শুয়ে হাঁফাচ্ছিস কেন? একজায়গায় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাঁফানো যায় না? ওঠ, উঠে বস।
এতক্ষণের পরিশ্রমে পুরো জল ঢেলে দিলি, হতভাগারা”। ভল্লার কথায় তিনজনেই উঠে বসল এবং
হাঁফাতে লাগল। ভল্লা বলল, “ধর শত্রুপক্ষের তাড়া খেয়ে, এ অব্দি নিরাপদেই এসেছিস।
কিন্তু এরপর কী করবি?”
“ওফ্। আগে একটু দম নিতে দাও ভল্লাদাদা”।
ভল্লা আবারও ধমকে উঠল, “না, দম নিতে হবে, তার
সঙ্গে ভাবনা চিন্তাও করতে হবে”। এই সময় আরও পাঁচজন ছেলে পৌঁছল। ভল্লা বলল, “বাঃ,
প্রথম দিনেরপক্ষে ভালই – চল আমরা এসসঙ্গে নামতা বলি...এক এক্কে এক, এক দুগুণে দুই...জোরে
জোরে চেঁচিয়ে...সবাই একসঙ্গে”। সন্ধের আগেই বাইশ জন এসে পৌঁছল, আরেকটু পরে পৌঁছল
আরও বারো জন।
সকলে একটু ধাতস্থ হতে ভল্লা বলল, “বিয়াল্লিশ জন
ফিরেছিস দেখছি, বাকিরা?”
“ওরা সরোবর অব্দি গিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নামেনি,
ফিরে আসছে গ্রামের পথেই”।
ভল্লা হাসল, “এরকম রোজ দুবেলা দৌড়তে পারবি? খুব
ভোরে আর আজকের মতো বিকেলে?”
“পারবো”।
“ঘোড়ার ডিম পারবি। কাল সকালে গায়ের ব্যথায় উঠতেই
পারবি না। বোনকে দিয়ে গা-হাত-পা টেপাবি”।
“পারবো”। কেউ কেউ বলল, কিন্তু তাদের গলায় আগেকার
সে জোর নেই।
ভল্লা হাসল, “কাল সকালে পায়ে, গায়ে, কাঁধে ব্যথা হবে। হবেই। কিন্তু কালকেও দৌড়তেই হবে, আজকের মতো এত তাড়াতাড়ি না হলেও – হাল্কা ছন্দে। একটু দৌড়লেই দেখবি – গায়ের ব্যথা কমে যাবে – কষ্ট কমে যাবে। আর দৌড়তে দৌড়তেও ভাববি, চিন্তা করবি – যা খুশি, যা তোর মন চায়। মনে রাখিস দৌড়লে আমাদের সর্বাঙ্গের পেশীর শক্তি বাড়ে। শক্তি বাড়ে আমাদের ফুসফুসের, আমাদের হৃদয়ের। কিন্তু মস্তিষ্ক? তার কী হবে? ভয়ংকর পরিশ্রমের মধ্যে, প্রচণ্ড আতঙ্কে, ভীষণ ক্লান্তিতেও আমাদের মাথা যেন কখনো অলস না থাকে। কোন কিছু না পেলে আমাকেই খুব গালাগাল দিবি। ভাববি কি কুক্ষণেই না ভল্লাদাদার কাছে গিয়েছিলাম। শয়তান লোকটা আমাদের সবাইকে খাটিয়ে মারছে, আর নিজে বসে বসে শুধু উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে। ও হ্যাঁ, কাল সকালে আমিও তোদের সঙ্গে দৌড়বো। কমলিমায়ের যত্নে শরীরটা বড়ো অলস হয়ে উঠেছে – সেটাকে আবার চাঙ্গা করতে হবে”।
পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৬ "
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন