এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
আরেকটি ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "
১৩
শিবিরের মেঝেয় পাতা মোটা আসনে বসে কাঠের পীঠিকার
ওপর ভুর্জপত্রের স্তূপ নিয়ে বসেছিলেন করাধ্যক্ষ, শষ্পক। পীঠিকার উল্টোদিকে বসে ছিল
দুই করণিক। দুজনে শষ্পককে নানান গ্রামে উৎপন্ন ফসলের পরিমাণ, ধার্য করের হিসাব এবং
কর আদায়ের পরিমাণ বোঝাচ্ছিল। বকেয়া কর কী ভাবে সংগ্রহ করা যায় – সে নিয়েও গম্ভীর
আলোচনা করছিলেন শষ্পক। সেই সময়ে করাধ্যক্ষের শিবিরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন জুজাক, তার পিছনে ভল্লা। দুজনেই নত হয়ে নমস্কার করল শষ্পককে।
শষ্পক মুখ তুলে তাকালেন ওদের দিকে, প্রতি-নমস্কার
করার পর, তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি ইশারায় করণিক দুজনকে শিবিরের বাইরে
যাওয়ার ইঙ্গিত করে, চুপ করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর ভল্লার দিকে কড়া চোখে
তাকিয়ে বললেন, “তোমার যে নির্বাসন দণ্ড হয়েছে, তুমি জান না, ভল্লা? আজ কুড়ি দিনের
ওপর হয়ে গেল তুমি এখনও রাজ্যের সীমার মধ্যেই রয়েছ। উপরন্তু মাননীয় গ্রামপ্রধানের
বাড়িতে রাজার হালে কাল কাটাচ্ছ?”
জুজাক খুব বিনীত ভাবে বললেন, “সত্যি বলতে অচেতন-মৃতপ্রায়
অবস্থায় ও আমাদের গ্রামে পৌঁছেছিল – সে অবস্থায়...”।
শষ্পক বাঁহাত তুলে জুজাককে থামিয়ে বললেন, “একজন দণ্ড পাওয়া মৃতপ্রায় রাজদ্রোহীকে আপনারা সকলে সুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন, একথা শুনে রাজধানী আপনাকে কোন বীরের সম্মান দেবে, এমন কথা ভুলেও ভাববেন না। আর এসব কথা আমাকে বলেও কোন লাভ নেই, মাননীয় নগরপাল আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন...তিনি আমার কোন কথাই শুনবেন না। বরং আপনিই বিড়ম্বনায় পড়বেন। আগামী দুদিনের মধ্যে ভল্লা যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যায় – সেক্ষেত্রে ভল্লার চরম শাস্তি তো হবেই – আপনিও চরম বিপদে পড়বেন...বলে রাখলাম”।
জুজাক একইরকম বিনীতভাবে বললেন, “আপনার নির্দেশের এতটুকুও
অন্যথা হবে না, মান্যবর। আমি কাল সকালেই ওকে গ্রাম থেকে বিদায়ের ব্যবস্থা করব”।
শষ্পক বিরক্ত মুখে বললেন, “করলেই ভাল। মনে রাখবেন
গত অমাবস্যায় যে আবেদন নিয়ে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন, সেই সিদ্ধান্তও আমাকে স্থগিত
রাখতে হয়েছে এই কারণেই। যে গ্রাম একজন অপরাধীকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়, তাকে রাজার
অনুগ্রহের অনুমোদন দেওয়া কী ভাবে সম্ভব? আপনি এখন আসুন। ভল্লা থাক, ওর সঙ্গে আমার
কিছু কথা আছে”।
জুজাক নমস্কার করে শিবিরের বাইরে যাওয়ার পর,
শষ্পক নীচু স্বরে বললেন, “বস ভল্লা। কী সব শুনছি তোমার নামে? এর মধ্যেই নাকি তুমি
গ্রামের ছেলেছোকরাদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছ?”
ভল্লা বসল। মৃদু হেসে বলল, “সবই আপনাদের কৃপা এবং
শিক্ষা, মান্যবর। আমাকে এই কাজের জন্যেই তো পাঠানো হয়েছে”।
শষ্পক বললেন, “তুমি কিন্তু যত শীগ্গির সম্ভব,
সীমানার বাইরে থাকতে শুরু কর। সেখান থেকেই তোমার কাজ পরিচালনা কর। গ্রামের ছেলেদের
তৈরি করে তোল দ্রুত – শুধু মনের আগুনে কিছু হয় না, সে তো তুমি আমার থেকেও ভাল জান,
ভল্লা। মান্যবর নগরপাল তোমার জন্যে পর্যাপ্ত তির-ধনুক, ভল্ল, কৃপাণ এবং রণপা
বানানোর বাঁশ পাঠিয়েছেন। এই শিবিরেই আমার রক্ষী বাহিনীর কাছে সেসব সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তোমাকেই সেগুলি সংগ্রহ
করতে হবে - আমরা যে তোমার হাতে সেগুলি তুলে দিতে পারব না, সে কথা বলাই বাহুল্য”।
ভল্লা জিজ্ঞাসা করল, “সে চিন্তা আমার, মান্যবর। আগামী পূর্ণিমার গভীর
রাত্রে কী আমরা এই শিবিরে হানা দিতে পারি, মান্যবর?”
শষ্পক অবাক হয়ে বললেন, “আগামী পূর্ণিমা? মানে আর
মাত্র সাতদিন? তাছাড়া চন্দ্রালোকে কোন গোপন অভিযান সমীচীন হবে কি? আমি তো
ভেবেছিলাম অন্ততঃ মাসখানেক লাগবে তোমার ছেলেদের খেপিয়ে একটু শক্তপোক্ত বানিয়ে তুলতে”!
ভল্লা হাসল, বলল, “শুভস্য শীঘ্রম, মান্যবর। আমার
অল্পশিক্ষিত সেনাদল অন্ধকার অমানিশায় অভিযান করে ওঠার মতো দক্ষ এখনও হয়ে ওঠেনি। আমার
মনে হয় না এই অভিযান তেমন কিছু বিপজ্জনক হবে, সেই কারণেই পূর্ণিমার রাত্রি। হাল্কা
উত্তেজনায় তাদের মানসিক আচরণ কেমন হয়, সেটাও বুঝে নিতে চাই”। একটু
থেমে ভল্লা আবার বলল, “তবে আমার কিছু নগদ অর্থেরও প্রয়োজন – কিছু তাম্র বা রৌপ্য
মুদ্রা হলে ভালো হয়”।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে শষ্পক বললেন, “কিন্তু কোষাগার
অরক্ষিত রাখব কী করে? সন্দেহ করবে, অনেকেই ষড়যন্ত্রের কথা আন্দাজ করে নেবে”।
“সেদিন শিবিরে ছোট করে একটা উৎসব এবং তার সঙ্গে একটু
মদ্যপানের আয়োজন করে দিন না, মান্যবর। বাকিটা আমি সামলে নেব। কোষাগারের পিছনের
গবাক্ষ দিয়ে – গোটা তিন-চার মুদ্রার বটুয়া আমি তুলে নিতে পারব।
তাতেই আপাতত চলে যাবে”।
শষ্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি এর
মধ্যেই এই স্থানকের কোথায় কোষাগার, এবং সে কক্ষের পিছনে গবাক্ষ রয়েছে - দেখে নিয়েছ?
আশ্চর্য!”
“আজ্ঞে, ওই একরকম আর কি। তবে মান্যবর, আমার ইচ্ছে
আছে... আপনি এখান থেকে শিবির তুলে উত্তরের পথে যাওয়ার সময় – আপনার বাহিনীর ওপর
ডাকাতি করব”।
“আচ্ছা? অতি উত্তম! কিন্তু সর্বস্ব লুঠ করো না,
হে। তাহলে আমার আর রক্ষীসর্দারদের কর্মচ্যুত হতে হবে”।
ভল্লা হাসল, বলল, “চার-পাঁচটা গোশকট চুরি করলেই
আমার চলে যাবে। নতুন সেনাদল নিয়ে সর্বস্ব লুঠ করা অসাধ্য। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন
না, মান্যবর। তবে...”। কথা শেষ করতে ভল্লা একটু ইতস্ততঃ করল।
শষ্পক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে কি,
ভল্লা?”
“পাঁচ-দশজন রক্ষীকে আহত হতে হবে...”।
শষ্পক নির্বিকার চিত্তে বললেন, “সে তো হবেই, তা
নাহলে রাজধানীতে আমার পাঠানো লুণ্ঠনের সংবাদ বিশ্বাসযোগ্য হবে
কী করে? দু-একজন নিহত হলেও... আমার আপত্তি নেই। তাদের পরিবারবর্গ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ
পেয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কোথায় তুমি এই আক্রমণের পরিকল্পনা করেছ?”
ভল্লা বলল, “নোনাপুর গ্রাম পেরিয়ে, তেমাথা থেকে উত্তরের পথে। ওই মোড় থেকে চারক্রোশ দূরের জঙ্গলে। জঙ্গলের
মধ্যে ওখানে কিছুটা উন্মুক্ত জমি আছে... ওখান থেকে রাজ্য সীমান্তও বেশ কাছে, সহজেই
গোশকট নিয়ে পালাতে পারব। আপনি সেখানেই যদি রাত্রি বাসের জন্য শিবির
স্থাপনা করেন...”।
শষ্পক বললেন, “তথাস্তু, ভল্লা। কিন্তু আশ্চর্য
করলে ভল্লা। শুনেছি তুমি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলে প্রায় সাত-আটদিন, তারপরে
এই কদিনের মধ্যে এই গ্রামের পরিসীমা, তার জঙ্গল, পথঘাট সব তোমার দেখা হয়ে গেছে!
রাজধানী থেকে সঠিক লোককেই যে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমার আর কোন
সংশয় নেই।”
“আরেকটি অনুরোধ, মান্যবর”।
শষ্পক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলো তো?”
“মাননীয় গ্রামপ্রধান আপনার কাছে কর হ্রাসের যে আবেদন
করেছেন, সেটি অনুমোদন করবেন না”।
আশ্চর্য হয়ে শষ্পক বললেন, “কেন বলো তো?” ভল্লা
কোন উত্তর দিল না। শষ্পক ভল্লার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মৃদু
হেসে বললেন, “বুঝেছি, তাই হবে”।
“আমায় তবে বিদায় দিন, মান্যবর”।
“এস। আরেকটা কথা, জনৈক নিশাচর ব্যক্তি তোমার কাছে
যাবে। প্রয়োজন মতো। হয়তো তোমার পূর্বপরিচিত। সংবাদ আদান-প্রদানের
জন্যে। তাতে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে, উভয়তঃ সুবিধা হবে। ঠিক আছে? এবার এসো, সাবধানে
থেক। তোমার মতো কর্মী রাজ্যের পক্ষে অমূল্য রত্ন বিশেষ”।
এতক্ষণ দুজনেই নিম্নস্বরে কথা বলছিলেন। অকস্মাৎ
শষ্পক প্রচণ্ড উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “দূর হয়ে যা, আমার সামনে থেকে, পাষণ্ড।
মহারাজা দয়ালু তাই তোকে শূলে চড়াননি – নির্বাসন দিয়েছেন মাত্র। তাঁর সে নির্দেশও
তুই অমান্য করিস কোন সাহসে? আগামী পরশুর মধ্যে তুই যদি রাজ্যসীমার বাইরে না যাস,
তোর মৃতদেহ আমি সবার সামনে ফেলে রাখব চার-রাস্তার মোড়ে – শেয়ালে শকুনে ছিঁড়ে খাবে –
সেই হবে তোর উচিৎ শাস্তি, নরাধম...।”
লাঠির আঘাতে কুকুর যেমন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে পালায়, ভল্লা সেভাবেই শিবির থেকে বেরিয়ে এল দৌড়ে... তার চোখে মুখে ভীষণ আতঙ্ক। আস্থানের রক্ষীরাও তাকে তাড়া করে আস্থান সীমানার বাইরে বের করে দিল। জুজাক শিবিরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন, নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করলেন, ভল্লার চরম দুর্গতি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে তিনিও আস্থান-সীমার বাইরে এলেন, মনে মনে ভাবলেন, রাজদ্রোহী অপরাধীরা হয়তো আর মানুষ থাকে না - হয়ে ওঠে ঘৃণ্য পশুবিশেষ!
চলবে...
খুব সমৃদ্ধ লেখা
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ। সঙ্গে থাকুন - পরের পর্বগুলির জন্যে।
উত্তরমুছুন