এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের সপ্তম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব"
১৭
অতিথিশালার
প্রাঙ্গণে নটী বিদ্যুল্লতার সখিরা নিজেদের মধ্যে খেলায় মগ্ন ছিল। দ্বিতলের গবাক্ষ
থেকে নটী বিদ্যুল্লতা ম্লানমুখে তাদের ক্রীড়াকৌতুক দেখছিল। হঠাৎ দূর থেকে
অতিথিশালার দিকে মহর্ষি ভৃগু, আর তাঁর দুই সঙ্গীকে আসতে দেখে, সে দ্রুত সদরে নেমে
এল। সখিদের সকলকে আদেশ দিল চপলতা ছেড়ে শান্ত হতে। তারপর দরজার সামনে জোড় হাতে
মহর্ষির অপেক্ষা করতে লাগল। গৃহে প্রবেশ করতে করতে, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা
করলেন, “কেমন আছিস, মা? মুখটা যেন কিছুটা ম্লান দেখছি”?
নটী
বিদ্যুল্লতা কিছু বলল না, প্রথমে মহর্ষিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল, দুই আচার্যকেও
প্রণাম করল। তারপর পুরু মখমলে আবৃত কাঠের উঁচু পৃষ্ঠিকায় আসন গ্রহণ করিয়ে, ইশারায়
সখিদের বললেন, পাদ্য আনতে। অন্য আচার্যদের জন্যও আলাদা আসন ও পাদ্যের ব্যবস্থা করল
তার দুই সখি। খুব যত্নের সঙ্গে মহর্ষির দুই পা ধুয়ে দেওয়ার পর, নটীবিদ্যুল্লতা
তাঁর সুদীর্ঘ বেণী খুলে ফেলে, মুক্ত কেশগুচ্ছ দিয়ে মুছে দিলেন মহর্ষির পা। মহর্ষি
স্মিতমুখে নটীবিদ্যুল্লতার মুখের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করতে লাগলেন, পদসেবা। দুইপা
মুছে দেওয়ার পর, ডানহাতে মহর্ষির বামচরণ স্পর্শ করে, হাঁটু মুড়ে মেঝেয় বসল
নটীবিদ্যুল্লতা। বলল, “ভাল আছি পিতা। আপনার কাজ নিয়ে, কটাদিন খুব আনন্দে ছিলাম”। অন্য আচার্যদের পদসেবা
হয়ে যেতে নটী বিদ্যুল্লতা সকল সখিকে বললেন, অন্যত্র যেতে, আরো বললেন, কেউ যেন এখন
এখানে না আসে। সকল সখিরা নিঃশব্দ দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর,
নটী বিদ্যুল্লতা বলল, “পরশু রাত থেকেই মনটা বড়ো বিষণ্ণ, পিতা”।
“খুবই
স্বাভাবিক মা, তুইও তো মানুষ, মন খারাপ হবে বৈকি! আজ রাত্রেই তোদের যদি ফিরে যেতে
বলি, পারবি?”
“কেন
পারবো না, পিতা? কিন্তু আমার কাজ শেষ হয়েছে কী? তিন মাত্রা প্রয়োগের নির্দেশ
দিয়েছিলেন, আমি মাত্র দুই মাত্রা প্রয়োগ করতে পেরেছি”।
“যথেষ্ট
করেছিস মা, বাকিটুকু আমরা সামলে নেব। তোকে আরো কিছু দিন আটকে রেখে, তোকে বিপদে
ফেলতে চাই না। কার মনে কী আছে, বলা তো যায় না, মা”!
“ঠিকই
বলেছেন, পিতা। মহারাজ বেণের মুখে শুনেছি, উপনগরপাল শক্তিধর আমার এ রাজ্যে হঠাৎ আসার
ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন!”
“তাই
নাকি?” মহর্ষি ভৃগু উদ্বিগ্নমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলেছে”?
“উপনগরপাল
শক্তিধর, মহারাজ বেণকে বলেছেন, “আমি কার আমন্ত্রণে এ রাজ্যে এসেছি? মহারাজ বেণের
আমন্ত্রণে তো নয়! এ রাজ্যে আমার প্রবেশ করার সংবাদ পেয়ে, মহারাজ বেণ আমাকে তাঁর
প্রাসাদের অতিথিশালায় থাকার আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং আমি সে আমন্ত্রণ স্বীকার
করেছিলাম। কিন্তু আমাকে যে বা যারা আমন্ত্রণ করেছিল, তারা আমার খোঁজ করল না কেন?
আর আমিই বা তাদের সন্ধান করলাম না কেন?”
চিন্তিত
মুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুই কী উত্তর দিলি, মা?”
ম্লান হেসে নটীবিদ্যুল্লতা বলল, “আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'কারো আমন্ত্রণে নয়, আমি এ রাজ্যে আসছিলাম, তীর্থ দর্শনে। হঠাৎ শুনলাম, আপনি সমস্ত মন্দিরের পুজা অর্চনা বন্ধ করে দিয়েছেন, মন্দির থেকে সকল দেবমূর্তি সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছেন। কী করব? উদ্দেশ্যহীন দেশভ্রমণ করব? নাকি নিজ দেশেই ফিরে যাব? এই দ্বিধায় যখন কালাতিপাত করছিলাম, তখনই পেলাম আপনার আমন্ত্রণ'। শঠতা আমাদের পেশা, পিতা”।
মহর্ষি
ভৃগু নটীবিদ্যুল্লতার মাথায় হাত রাখলেন, বললেন, “ওভাবে, নিজেকে ছোট করিস না, মা।
তোর এইটুকু শঠতা, তোর নিজের স্বার্থে নয়; পুরো এই রাজ্যবাসীর মঙ্গলের জন্যে। বহু
মানুষ আছে, যারা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্যে সারাজীবন শঠতা করে চলেছে। কিন্তু আর বিলম্ব করিস
না, তুই কাল প্রত্যূষেই রওনা হয়ে যাবি, মা। শক্তিধরকে আমাদের নির্দেশ আছে, তোর
সঙ্গে যথেষ্ট নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে, তোদের এই রাজ্যের সীমানা নিরাপদে পার করে দেবে”।
“তাই
হবে, পিতা”।
মহর্ষি
ভৃগু উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “এখন আসি রে। খুব
সাবধানে যাস, ভালো থাকিস। নিরাপদে এ রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে, আমাকে বার্তা
পাঠাতে ভুলিস না। এদিককার কাজ হয়ে গেলে, তোর পিতার কাছে যাবো, কয়েকদিন থাকবো। তখন
দেখা হবে আবার”।
নটী
বিদ্যুল্লতা চরণস্পর্শ করে প্রণাম করলেন, বললেন, “আপনার আশায় দিন গুনবো, পিতা। দুই
আচার্যকেও প্রণাম করে বলল, “আপনাদের সঙ্গে আলাপ হল না, তবে কামনা করি আপনাদের গূঢ়
কার্য নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হোক”।
আচার্য
বিশ্ববন্ধু বললেন, “আপনার এই সাহায্যের জন্যে, আমাদের সকল রাজ্যবাসী এবং আমরাও
সবাই কৃতজ্ঞ থাকবো”।
“ওকথা
বলবেন না, আচার্য। আপনাদের কাজে লাগতে পেরে, আমিই কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে”। জোড়হাতে
নটীবিদ্যুল্লতা দাঁড়িয়ে রইলেন, সদর দরজায়, মহর্ষি ও দুই আচার্য পথে নামলেন।
কিছুটা এগিয়ে এসে আচার্য রণধীর জিজ্ঞাসা করলেন, “গুরুদেব, আপনিই কী নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন?” মহর্ষি ভৃগু উত্তর দিলেন না, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
আচার্য
রণধীর আশ্চর্য হয়ে বললেন, “কিন্তু আমাদের মন্ত্রণার আগেই আপনি আমন্ত্রণ না করলে,
এত তাড়াতাড়ি বিদ্যুল্লতা এখানে পৌঁছালো কী করে?”
মৃদু
হাসলেন মহর্ষি ভৃগু, বললেন, “রাজা বেণকে রাজ্যচ্যুত করা নিয়ে, আগে আমার অন্য
পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনা অনেক ধীর ও সাবধানী। সেই পরিকল্পনা মতো মাসাধিক
পূর্বেই আমি লতার সঙ্গে দেখা করে, সকল কথা বলে, আমাদের আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ
জানিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ বেণের পূজা-অর্চনা বন্ধ করার ঘোষণায়, তোমরা সকলেই
যখন উত্তেজিত হয়ে উঠলে, আর আমিও দেখলাম, এই ঘোষণায় সাধারণ রাজ্যবাসীর ওপর প্রভাব
হবে ভয়ানক। তখন তোমাদের সকলের সাহা্য্যে আমরা নতুন পরিকল্পনা করেছি”।
“কিন্তু
রাজাবেণ যদি নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ না করতেন?”
“বৎস রণধীর, আমার পরিকল্পনা ছিল, আমাদের আশ্রমে কোন নৃত্য-গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, রাজা বেণকে আমন্ত্রণ করবো। আমার ধারণা, সেখানে দুজনের পরিচয় ও মুগ্ধতা হতোই এবং তারপর শুরু হতো লতার কাজ। কিন্তু রাজাবেণ নিজের দুর্ভাগ্যকে নিজেই আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল, আর অনেক সহজ হয়ে গেল আমাদের দুজনেরই কাজ”। অদূরেই রাজা বেণের প্রাসাদ ও তার সামনে লোকজন দেখে মহর্ষি ও আচার্যরা এই আলোচনা বন্ধ করলে।।
অতিথিশালা
থেকে ওঁদের বের হতে দেখে উপনগরপাল শক্তিধর এগিয়ে এল, বলল, “পিতা আসছেন, মহর্ষি।
তিনি বলে পাঠিয়েছেন, আপনি দয়া করে যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন”।
সম্মতি
জানিয়ে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি আছি, বৎস। আর নটীবিদ্যুল্লতাকে আমি বলে এসেছি, কাল
প্রত্যূষে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে। তোমার আয়োজনও, নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ করে
ফেলেছ, বৎস?”
“আমার
আয়োজন সম্পূর্ণ, মহর্ষি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আগামী দশদিনের মধ্যে নটীবিদ্যুল্লতা
নিরাপদে আমাদের রাজ্যসীমা ছেড়ে ওঁর নিজরাজ্যে প্রবেশ করে যাবেন”।
“অতি
উত্তম। এবার বলো তো, বৎস, রাজমাতার সংবাদ কী?”
“রাজমাতা...রাজমাতার
কোন সংবাদ তো জানি না, মহর্ষি। আমরা রাজাবেণকে নিয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত”!
“ও,
তাই বুঝি? একমাত্র পুত্রের এই ভয়ানক অসুস্থতার বার্তা তিনি জানেন? একবারও দেখতে
আসেননি”?
“প্রাসাদের
মধ্যে থেকে বার্তা পাননি এমন হতে পারে না। তবে এই কদিনে তাঁকে দেখিনি, মহর্ষি”।
“অতি
উত্তম, বৎস শক্তিধর। রাজমাতাকে তাঁর একমাত্র পুত্রের অসুস্থতার সংবাদ দেওয়াটা তোমার
প্রশাসনিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না আশা করি”!
মাথা নত করে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল উপনগরপাল শক্তিধর, তারপর পিছনে দাঁড়ানো দুই সহকারীকে বলল, “শুদ্ধনীল, সুপ্রকাশ, তোমরা এখনই যাও। রাজমাতার সংবাদ নিয়ে এসো। তাঁকে বলবে রাজাবেণ অসুস্থ, তিনি যদি রাজাকে দেখতে যেতে চান, আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব”।
মহর্ষি
ভৃগু অত্যন্ত উষ্মা ভরে বললেন, “বৎস শক্তিধর, তোমার এই অনুগ্রহের এখন আর কোন
প্রয়োজন দেখি না। পুত্র রাজা হলেও মাতার কাছে সে পুত্রই থাকে। তাঁকে সংবাদ দেওয়ার
জন্য তুমি না যেতে পারো, আমি যাচ্ছি। আর পুত্রকে দেখার জন্য তাঁকেও তোমার অনুমতির
অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এই বার্তায় আমি কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছি না। ছোট্ট এই প্রাসাদের
প্রশাসনেই, তোমার কর্তব্য-অকর্তব্যের বোধ স্পষ্ট নয়। অতএব সমগ্র রাজ্যের ক্ষেত্রে
তোমাদের কী চিন্তাধারা সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। আমি এখনই রাজমাতার দর্শনে
যাচ্ছি। তোমার কিংবা তোমার প্রশাসনের যদি কোন আপত্তিও থাকে, আমি সেই আপত্তি অস্বীকার
করছি। এর জন্য তোমার প্রশাসন যা শাস্তি বিধান করবে, তার জন্যে আমি প্রস্তুত থাকবো”।
“প্রশাসনের
কোন আপত্তি থাকতে পারে না, মহর্ষি। আপনি রাজামাতার দর্শন করতেই পারেন। আর আমাদের
কর্তব্যে এই অবহেলার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি, মহর্ষি”।
“দোষ
তোমার নয়, বৎস শক্তিধর। দোষ তোমাদের ঔদ্ধত্যের, তোমাদের অহঙ্কারের। অযোগ্য হাতে
ভাগ্যক্রমে অতিরিক্ত ক্ষমতা এসে গেলে এমনই হয়”। মহর্ষি ভৃগু আচার্য
বিশ্ববন্ধু ও রণধীরকে অপেক্ষা করতে বলে, দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন রাজমাতার প্রাসাদের
দিকে। মহর্ষি ভৃগুকে এতটা বিচলিত ও ক্রুদ্ধ হতে কোনদিন দেখেননি আচার্য বিশ্ববন্ধু ও রণধীর। তাঁর নীরবে তাকিয়ে রইলেন শক্তিধরের দিকে।
রাজাবেণের
অসুস্থতার পর সব কিছুই যেন বদলে যাচ্ছে, মুঠিতে চেপে ধরতে যাওয়া শুষ্ক বালুর মতো,
আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি। রাজাবেণের ছায়ায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে তিনি
যে উপনগরপালের পদ সামলাচ্ছিলেন, খুব দ্রুত সেই আত্মবিশ্বাসে ভাঙন আসছে। তার সহকারি
এমনকি অধস্তন কর্মচারীদের চোখেও তিনি যেন আর সেই ভয় আর সম্ভ্রম দেখতে পাচ্ছেন না।
আর ভয় চলে গেলে রাজ্য শাসনের রইল কী? বিষণ্ণ মুখে তিনি আচার্য বিশ্ববন্ধুকে জিজ্ঞাসা
করলেন, “আপনার কী মনে হয়, আচার্য, রাজাবেণ কতদিনে সুস্থ হয়ে উঠবেন?”
“চিকিৎসাশাস্ত্রে আজকাল প্রভূত উন্নতি হয়েছে, একথা সত্য। কিন্তু কোন চমৎকার করার সাধ্য এখনও আয়ত্তে আসেনি, বৎস শক্তিধর। সে করতে পারেন একমাত্র ঈশ্বর। কিন্তু তোমরা তো আবার ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না। তাঁর সমস্ত উপাসনা বন্ধ করে দিয়েছো। ভেঙে ফেলেছ যাবতীয় দেব-দেবীর প্রতিমা। অতএব আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্যধারণ ছাড়া আর তো কোন উপায় দেখি না”।
১৮
মহিষীভবনে
রাজমাতার ঘরের বাইরে দাসী পদ্মবালার সঙ্গে দেখা হল মহর্ষি ভৃগুর। তাঁকে দেখে দাসী
পদ্মবালা প্রণাম করে বলল, “সেই এলেন ঠাকুর, কদিন আগে এলেন না? একটু অপেক্ষা করুন
ঠাকুর, রাজকুমারীকে সংবাদ দিই”।
মহর্ষি সামনের অলিন্দে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাকিয়ে রইলেন প্রাঙ্গণের উদ্যানের দিকে। দ্বিপ্রহরের প্রখর রৌদ্রধারায় স্নান করছে, গাছপালা, লতাগুল্ম, ঘাস, ফুল। ঝাঁকড়া এক বকুল গাছের ছায়ায় একটি ময়ূর আর তিনটি ময়ূরী বসে আছে। মাঝে মাঝে সেই ময়ূর তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে উঠছে “কে ও, কে ও, কে ও”?
“মহর্ষিঠাকুর,
আপনি এসেছেন? কী সৌভাগ্য আমার”? রাজমাতার কণ্ঠ শুনে, মহর্ষি ফিরে তাকালেন এবং
গৃহের দরজায় রাজামাতাকে দেখে চমকে উঠলেন। এ কী চেহারা হয়েছে মহারাণি এবং রাজমাতা
সুনীথার? সেই দৃপ্ত, গর্বোদ্ধত সুন্দর শরীর ও মুখশ্রী, বয়েসের সঙ্গে, দিন-দিন আরও
যেন মহিমান্বিত হয়ে উঠছিল! আজ সেই শরীর কিছুটা যেন ন্যুব্জ, শীর্ণ চেহারা। রক্তশূণ্য
ফ্যাকাসে মুখের ত্বকে জরার নিষ্ঠুর আঁচড়। কোটরের মধ্যে অত্যন্ত ক্লান্ত দুই চক্ষুর
চাহনি। দীর্ঘ প্রসাধনহীন এলোমেলো রুক্ষ চুল। পরনে একদা মহার্ঘ একটি শাড়ি, এখন
দীর্ণ, বিবর্ণ। মহর্ষি কিছু বললেন না, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
রাজমাতা
ঘরের মধ্যে ডেকে, মহর্ষিকে কাঠের উঁচু আসনে বসালেন, সে আসন জীর্ণ, মলিন বস্ত্রে
ঢাকা। মহর্ষি সেই আসনে বসার পর, রাজমাতা প্রণাম করলেন, তারপর অন্য একটি আসনে বসে, অত্যন্ত
ক্ষীণ স্বরে বললেন, “মহারাজ অঙ্গ চলে যাওয়ার পর, আমি আপনারই শরণাপন্ন, মহর্ষিঠাকুর।
আমি জানি অজস্র ব্যস্ততায় আপনি জড়িত। কিন্তু যখনই খুব অসহায় আর বিপন্ন বোধ করি,
আপনাকে স্মরণ করি”।
মহর্ষি
শান্তমুখে তাকিয়ে রইলেন, রাজমাতা সুনীথার মুখের দিকে, বললেন, “আমিও কখনও আপনার
আদেশ অমান্য করিনি, মহারাণি। কিন্তু কিছুদিন আগে আপনি যখন আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন,
আমি আসিনি। তখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল, আমি এলে আপনি বিপন্ন হতেন। তবে...”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু দ্বিধার সঙ্গে মহর্ষি আবার বললেন, “...তবে আপনার এই অসহায়
অবস্থার কথা আমি জানতাম না, মহারাণি। মাত্র এই কয় মাসে আপনার এই বিপর্যয়, আমি
কল্পনাও করতে পারিনি”। মহারাণি সুনীথা হাসার চেষ্টা করলেন, মুখে হাসি ফুটল না, আরও
করুণ দেখাল।
হাতের
আঙুলের অমার্জিত নখের কালচে ময়লা দেখতে দেখতে, মহারাণি সুনীথা বললেন, “এ সবই আমার
অধর্মের শাস্তি, মহর্ষি! আপনারা ধর্ম পথের দিশারি - আপনি, মহারাজ অঙ্গ। মহারাজ
অঙ্গ যতদিন আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁর মহারাণি হয়ে, আমিও মহিমময়ী ছিলাম। আর আজ? আমার
পুত্র রাজাবেণ আর আমি রাজমাতা...প্রতিটি ক্ষণে ধ্বংসের পথে দৌড়ে চলেছি, উন্মাদের
মতো”!
মহারাণির
পিছনে দাসী পদ্মবালা দাঁড়িয়েছিল, সে বলল, “রাজকুমারী, তুমি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে
চলেছ। আহার প্রায় ত্যাগ করেছ, চোখে নিদ্রা নেই, প্রসাধন নেই, এতটুকু বিনোদন নেই।
মহর্ষিঠাকুর, রাজকুমারীর এখন সর্বদা একটাই চিন্তা। এত লোকের অভিশাপ, এত লোকের
দীর্ঘশ্বাস, এত অসহায় মানুষের আর্ত অশ্রু। আমি বলি, সকালে বিকালে প্রাসাদের
উদ্যানে চলো, সরোবরের তীরে গিয়ে একটু বসো। মনটা হাল্কা হবে”।
মহর্ষি
ভৃগু বললেন, “পদ্মাদেবী সঠিক বলেছে, মহারাণি। সারাদিন ঘরে বসে অলস মস্তিষ্কের
চিন্তায়, কেন নিজেকে আরো বিপন্ন করে তুলছেন? আপনার দায়িত্ব তো শেষ হয়ে যায়নি! এখনো
অনেক কাজ যে আপনার বাকি রয়ে গেছে!”
অবাক
দুই ম্লান চোখ তুলে রাজমাতা সুনীথা বললেন, “আমার দায়িত্ব? কী কাজ আর আমার করার
আছে, মহর্ষিঠাকুর?”
“আপনার
পুত্র রাজাবেণ অসুস্থ, শুনেছেন তো?”
রাজমাতার
মুখ আরও মলিন হল, বললেন, “শুনেছি। পদ্মবালা সেই রাত্রেই সংবাদ দিয়েছিল। পদ্মবালা
আরও বলল, কাউকেই দর্শনের অনুমতি দিচ্ছে না। রাজবেণের পক্ষে কোন রকম উত্তেজনাই নাকি
বাঞ্ছনীয় নয়”।
“সেই
শুনে আপনি গেলেন না? আপনি মাতা। পুত্রের সেবার অধিকার আপনার থেকে
আর কার বেশি হতে পারে, মহারাণি?”
পদ্মবালা
বলল, “না মহর্ষিঠাকুর, তা নয়। এই ঘটনার পক্ষকাল আগে, আমি আর রাজকুমারী, মহারাজ
বেণের কক্ষে গিয়েছিলাম। রাজকুমারী কিছু অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল প্রতিকারের জন্যে...”।
“কিসের
অভিযোগ”?
“এই
যে চারদিকে নানান অত্যাচার, অনাচার হচ্ছে, রাজকুমারীর তাতে সায় নেই, এ কথা জানাতে।
আর বিহিত চাইতে। কিন্তু মহারাজা বেণ যে ব্যবহারটা করল, সে আর বলার কথা নয়...”।
“তুই
থাম তো, পদ্মবালা। ওসব কথা আমি কবেই ভুলে গেছি। এখন আর ওসব কথায় আমার কী কাজ? ও
এখন বড়ো হয়েছে, দেশের রাজা হয়েছে, যা ভাল মনে হয় করেছে...আমার কী?”
“তাই
বই কী? সেই দিন থেকেই তোমার এই পাগলপারা অবস্থা। সে কেন, সে কী আর আমি বুঝিনা,
রাজকুমারী? আমার কাছে লুকোবে? তোমাকে আমি সেই এতটুকু বয়েস থেকে কোলে পিঠে মানুষ
করেছি, ভুলে যেও না রাজকুমারী”।
“বাজে
বকিস না। কিচ্ছু হয়নি আমার, আমি দিব্যি আছি। তোর যতো উদ্ভট মনগড়া চিন্তা আর
ভাবনা...”। পদ্মবালা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, মহর্ষি হাতের ইশারায় তাকে
থামতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সামনে মহারাণি সুনীথার এই মানসিক
অসহায়তার উন্মোচন, আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মহারাজ অঙ্গের মহারাণি হিসাবে তিনি ছিলেন
সমস্ত রাজ্যবাসীর মাতা। প্রজাদের মঙ্গল-অমঙ্গল, সুখ-দুঃখের অংশভাক্ হয়ে তিনি
উদারতার মহিমায় অধিষ্ঠিতা ছিলেন। এখন তিনি রাজমাতা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সব হারিয়ে
তিনি এখন নিঃসহায় পরিত্যক্তা, চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক। মহর্ষি ভৃগু উপলব্ধি করলেন এই
নারীর দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা।
তিনি
খুব শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি এইভাবে নিশ্চেষ্ট থাকতে পারেন না, মহারাণি।
রাজাবেণকে আমি এখনই দেখে এলাম, তিনি গুরুতর অসুস্থ, অবস্থা সংকটজনক। ভিষক রয়েছেন, সেবক-সেবিকা
সবাই রয়েছেন। কিন্তু মায়ের সেবার কাছে সে সব কিছু না। মা ছাড়া জগতে এমন কেউ আর
আছে, যে এত নিবিড়ভাবে পুত্রের প্রিয়-অপ্রিয়, ভালো-মন্দ বুঝবে? নিয়মিত চিকিৎসার
সঙ্গে মায়ের সেবা পেলে রাজাবেণের সুস্থ হওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা”।
মহর্ষি
ভৃগুর এই কথায় মহারাণি সুনীথার বিষণ্ণ চোখেও এখন যেন আশার আলো জ্বলে উঠল! তাঁর
মনের সমস্ত বেদনা, যন্ত্রণা আর অভিমান, বাঁধভাঙা অশ্রু হয়ে নামতে লাগল দুই চোখ
বেয়ে। পদ্মবালার দুই চোখও জলে ভরে উঠল। রাজকুমারী সুনীথা এবং রাজাবেণ, দুজনেই তার
বুকের পাঁজর, ওদের এই বিচ্ছেদ, তার মনেও এনেছিল অশান্তির ঝড়। মহর্ষি ভৃগু বেশ
কিছুক্ষণ সময় দিলেন, তাকিয়ে রইলেন মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে। মহারাণির এই
নিঃসংকোচ অভিভূত অশ্রুপাতে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন।
মহর্ষি
ভৃগু বললেন, “মহারাণি, আপনি এই রাজ্যের রাজ্যলক্ষ্মী, সকল প্রজার মাতা। মহারাজা
বেণ যতদিন রাজ্য পরিচালনায় সক্ষম না হতে পারছেন, আপনার পরামর্শ এবং নির্দেশ মেনে, মহারাজ
অঙ্গের প্রাজ্ঞ মন্ত্রীগণ, অমাত্যগণ এবং নগরপাল সমবেতভাবে রাজ্যের প্রশাসন
পরিচালনা করুন। আমার মনে হয় না, তাঁদের মতো নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত এই রাজ্যে আর
কেউ আছেন”।
মহারাণি
কান্নাভেজা চোখ তুলে, রুদ্ধস্বরে বললেন, “আর আপনি”?
মৃদু
হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি? আমি রাজ্য পরিচালনার কী বুঝি, মহারাণি? আমি বুঝি
জপ-তপ-যজ্ঞ-পুজা আর
অধ্যয়ন। আমি চিরকাল মহারাজ অঙ্গের অন্তরঙ্গ অনুগ্রহ পেয়েছি, আজ থেকে
আপনার অনুগ্রহও যদি পাই, ব্যস্, সেইটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট”। মহারাণি সুনীথার
মুখে এখন মৃদু হাসি, তিনি তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির মুখের দিকে!
মহর্ষি
ভৃগু এবার উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “মহারাণি আপনি প্রস্তুত হোন, এখনই আপনাকে পুত্রের
কাছে যেতে হবে। দেবীপদ্মবালা, মহারাণিকে যথাযোগ্য পরিধানে, অতি দ্রুত সাজিয়ে তোল।
মহারাণির মর্যাদা রাখার দায়িত্ব তোমারও। মহারাণি, এক দুদিন আপনাকে হয়তো যাওয়া-আসা
করতে হবে, তারপর রাজাবেণের অবস্থা বিচার করে, তাঁকে আপনার ভবনেই নিয়ে আসার
ব্যবস্থা করবেন। তাতে আপনার ও রাজাবেণ দুজনরেই সুবিধা হবে। এখন আসি। কিন্তু আপনারা
বিলম্ব করবেন না”। মহারাণি তাঁর কাঠের আসন থেকে নেমে ঘরের মেঝেয় বসলেন, তারপর
নিজেকে উজাড় করে, দুই চোখের জলে সিক্ত করে তুললেন মহর্ষির দুই চরণ।
মহর্ষিকে
ছাড়তে বাইরের অলিন্দ পর্যন্ত এগিয়ে এল দাসী পদ্মবালা। মহিষীভবনের দরজা পর্যন্ত
এসে, নীচু হয়ে বসে প্রণাম করল মহর্ষি ভৃগুকে। তারপর বলল, “আমরা রাজা অধর্মের
প্রজা। এতদিন যে আপনাকে দেখেছি, মনে হত আপনি জাদুকর। আজ আমার সে ভুল ভাঙলো, আপনিই
করুণাময় মহান ঈশ্বর! আপনি রুদ্ধ নদীতে স্রোত সঞ্চার করতে পারেন, আপনি অবসন্ন
প্রাণে স্পন্দন জাগিয়ে তুলতে পারেন”!
ডানহাত
তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করে, মৃদু হাসলেন মহর্ষি ভৃগু। তারপর পাথর বাঁধানো পথে পা
রাখলেন।
পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব "