সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ " 



[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের সপ্তম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্র থেকে - "এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব


১৭ 

অতিথিশালার প্রাঙ্গণে নটী বিদ্যুল্লতার সখিরা নিজেদের মধ্যে খেলায় মগ্ন ছিল। দ্বিতলের গবাক্ষ থেকে নটী বিদ্যুল্লতা ম্লানমুখে তাদের ক্রীড়াকৌতুক দেখছিল। হঠাৎ দূর থেকে অতিথিশালার দিকে মহর্ষি ভৃগু, আর তাঁর দুই সঙ্গীকে আসতে দেখে, সে দ্রুত সদরে নেমে এল। সখিদের সকলকে আদেশ দিল চপলতা ছেড়ে শান্ত হতে। তারপর দরজার সামনে জোড় হাতে মহর্ষির অপেক্ষা করতে লাগল। গৃহে প্রবেশ করতে করতে, মহর্ষি স্মিতমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছিস, মা? মুখটা যেন কিছুটা ম্লান দেখছি”?

নটী বিদ্যুল্লতা কিছু বলল না, প্রথমে মহর্ষিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল, দুই আচার্যকেও প্রণাম করল। তারপর পুরু মখমলে আবৃত কাঠের উঁচু পৃষ্ঠিকায় আসন গ্রহণ করিয়ে, ইশারায় সখিদের বললেন, পাদ্য আনতে। অন্য আচার্যদের জন্যও আলাদা আসন ও পাদ্যের ব্যবস্থা করল তার দুই সখি। খুব যত্নের সঙ্গে মহর্ষির দুই পা ধুয়ে দেওয়ার পর, নটীবিদ্যুল্লতা তাঁর সুদীর্ঘ বেণী খুলে ফেলে, মুক্ত কেশগুচ্ছ দিয়ে মুছে দিলেন মহর্ষির পা। মহর্ষি স্মিতমুখে নটীবিদ্যুল্লতার মুখের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করতে লাগলেন, পদসেবা। দুইপা মুছে দেওয়ার পর, ডানহাতে মহর্ষির বামচরণ স্পর্শ করে, হাঁটু মুড়ে মেঝেয় বসল নটীবিদ্যুল্লতা। বলল, “ভাল আছি পিতা। আপনার কাজ নিয়ে, কটাদিন খুব আনন্দে ছিলাম”অন্য আচার্যদের পদসেবা হয়ে যেতে নটী বিদ্যুল্লতা সকল সখিকে বললেন, অন্যত্র যেতে, আরো বললেন, কেউ যেন এখন এখানে না আসে। সকল সখিরা নিঃশব্দ দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে গেল। তাদের চলে যাওয়ার পর, নটী বিদ্যুল্লতা বলল, “পরশু রাত থেকেই  মনটা বড়ো বিষণ্ণ, পিতা”।

“খুবই স্বাভাবিক মা, তুইও তো মানুষ, মন খারাপ হবে বৈকি! আজ রাত্রেই তোদের যদি ফিরে যেতে বলি, পারবি?”

“কেন পারবো না, পিতা? কিন্তু আমার কাজ শেষ হয়েছে কী? তিন মাত্রা প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি মাত্র দুই মাত্রা প্রয়োগ করতে পেরেছি”।

“যথেষ্ট করেছিস মা, বাকিটুকু আমরা সামলে নেব। তোকে আরো কিছু দিন আটকে রেখে, তোকে বিপদে ফেলতে চাই না। কার মনে কী আছে, বলা তো যায় না, মা”!

“ঠিকই বলেছেন, পিতা। মহারাজ বেণের মুখে শুনেছি, উপনগরপাল শক্তিধর আমার এ রাজ্যে হঠাৎ আসার ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন!”

“তাই নাকি?” মহর্ষি ভৃগু উদ্বিগ্নমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী বলেছে”?

“উপনগরপাল শক্তিধর, মহারাজ বেণকে বলেছেন, “আমি কার আমন্ত্রণে এ রাজ্যে এসেছি? মহারাজ বেণের আমন্ত্রণে তো নয়! এ রাজ্যে আমার প্রবেশ করার সংবাদ পেয়ে, মহারাজ বেণ আমাকে তাঁর প্রাসাদের অতিথিশালায় থাকার আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং আমি সে আমন্ত্রণ স্বীকার করেছিলাম। কিন্তু আমাকে যে বা যারা আমন্ত্রণ করেছিল, তারা আমার খোঁজ করল না কেন? আর আমিই বা তাদের সন্ধান করলাম না কেন?”

চিন্তিত মুখে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুই কী উত্তর দিলি, মা?”

ম্লান হেসে নটীবিদ্যুল্লতা বলল, “আমি উত্তর দিয়েছিলাম, 'কারো আমন্ত্রণে নয়, আমি এ রাজ্যে আসছিলাম, তীর্থ দর্শনে। হঠাৎ শুনলাম, আপনি সমস্ত মন্দিরের পুজা অর্চনা বন্ধ করে দিয়েছেন, মন্দির থেকে সকল দেবমূর্তি সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছেন। কী করব? উদ্দেশ্যহীন দেশভ্রমণ করব? নাকি নিজ দেশেই ফিরে যাব? এই দ্বিধায় যখন কালাতিপাত করছিলাম, তখনই পেলাম আপনার আমন্ত্রণ'। শঠতা আমাদের পেশা, পিতা”।

মহর্ষি ভৃগু নটীবিদ্যুল্লতার মাথায় হাত রাখলেন, বললেন, “ওভাবে, নিজেকে ছোট করিস না, মা। তোর এইটুকু শঠতা, তোর নিজের স্বার্থে নয়; পুরো এই রাজ্যবাসীর মঙ্গলের জন্যে। বহু মানুষ আছে, যারা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থের জন্যে সারাজীবন শঠতা করে চলেছে কিন্তু আর বিলম্ব করিস না, তুই কাল প্রত্যূষেই রওনা হয়ে যাবি, মা। শক্তিধরকে আমাদের নির্দেশ আছে, তোর সঙ্গে যথেষ্ট নিরাপত্তারক্ষী দিয়ে, তোদের এই রাজ্যের সীমানা নিরাপদে পার করে দেবে”।

“তাই হবে, পিতা”।

মহর্ষি ভৃগু উঠে দাঁড়ালেন, বললেন,  “এখন আসি রে। খুব সাবধানে যাস, ভালো থাকিস। নিরাপদে এ রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে, আমাকে বার্তা পাঠাতে ভুলিস না। এদিককার কাজ হয়ে গেলে, তোর পিতার কাছে যাবো, কয়েকদিন থাকবো। তখন দেখা হবে আবার”

নটী বিদ্যুল্লতা চরণস্পর্শ করে প্রণাম করলেন, বললেন, “আপনার আশায় দিন গুনবো, পিতা। দুই আচার্যকেও প্রণাম করে বলল, “আপনাদের সঙ্গে আলাপ হল না, তবে কামনা করি আপনাদের গূঢ় কার্য নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হোক”

আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “আপনার এই সাহায্যের জন্যে, আমাদের সকল রাজ্যবাসী এবং আমরাও সবাই কৃতজ্ঞ থাকবো”।

“ওকথা বলবেন না, আচার্য। আপনাদের কাজে লাগতে পেরে, আমিই কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে”। জোড়হাতে নটীবিদ্যুল্লতা দাঁড়িয়ে রইলেন, সদর দরজায়, মহর্ষি ও দুই আচার্য পথে নামলেন।

কিছুটা এগিয়ে এসে আচার্য রণধীর জিজ্ঞাসা করলেন, “গুরুদেব, আপনিই কী নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন?” মহর্ষি ভৃগু উত্তর দিলেন না, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

আচার্য রণধীর আশ্চর্য হয়ে বললেন, “কিন্তু আমাদের মন্ত্রণার আগেই আপনি আমন্ত্রণ না করলে, এত তাড়াতাড়ি বিদ্যুল্লতা এখানে পৌঁছালো কী করে?”

মৃদু হাসলেন মহর্ষি ভৃগু, বললেন, “রাজা বেণকে রাজ্যচ্যুত করা নিয়ে, আগে আমার অন্য পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনা অনেক ধীর ও সাবধানী। সেই পরিকল্পনা মতো মাসাধিক পূর্বেই আমি লতার সঙ্গে দেখা করে, সকল কথা বলে, আমাদের আশ্রমে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ বেণের পূজা-অর্চনা বন্ধ করার ঘোষণায়, তোমরা সকলেই যখন উত্তেজিত হয়ে উঠলে, আর আমিও দেখলাম, এই ঘোষণায় সাধারণ রাজ্যবাসীর ওপর প্রভাব হবে ভয়ানক। তখন তোমাদের সকলের সাহা্য্যে আমরা নতুন পরিকল্পনা করেছি”।

“কিন্তু রাজাবেণ যদি নটীবিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ না করতেন?”

“বৎস রণধীর, আমার পরিকল্পনা ছিল, আমাদের আশ্রমে কোন নৃত্য-গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, রাজা বেণকে আমন্ত্রণ করবো। আমার ধারণা, সেখানে দুজনের পরিচয় ও মুগ্ধতা হতোই এবং তারপর শুরু হতো লতার কাজ। কিন্তু রাজাবেণ নিজের দুর্ভাগ্যকে নিজেই আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল, আর অনেক সহজ হয়ে গেল আমাদের দুজনেরই কাজ”। অদূরেই রাজা বেণের প্রাসাদ ও তার সামনে লোকজন দেখে মহর্ষি ও আচার্যরা এই আলোচনা বন্ধ করলে।। 

অতিথিশালা থেকে ওঁদের বের হতে দেখে উপনগরপাল শক্তিধর এগিয়ে এল, বলল, “পিতা আসছেন, মহর্ষি। তিনি বলে পাঠিয়েছেন, আপনি দয়া করে যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন”।

সম্মতি জানিয়ে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি আছি, বৎস। আর নটীবিদ্যুল্লতাকে আমি বলে এসেছি, কাল প্রত্যূষে নগর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে। তোমার আয়োজনও, নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ করে ফেলেছ, বৎস?”

“আমার আয়োজন সম্পূর্ণ, মহর্ষি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আগামী দশদিনের মধ্যে নটীবিদ্যুল্লতা নিরাপদে আমাদের রাজ্যসীমা ছেড়ে ওঁর নিজরাজ্যে প্রবেশ করে যাবেন”।

“অতি উত্তম। এবার বলো তো, বৎস, রাজমাতার সংবাদ কী?”

“রাজমাতা...রাজমাতার কোন সংবাদ তো জানি না, মহর্ষি। আমরা রাজাবেণকে নিয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত”!

“ও, তাই বুঝি? একমাত্র পুত্রের এই ভয়ানক অসুস্থতার বার্তা তিনি জানেন? একবারও দেখতে আসেননি”?

“প্রাসাদের মধ্যে থেকে বার্তা পাননি এমন হতে পারে না। তবে এই কদিনে তাঁকে দেখিনি, মহর্ষি”।

“অতি উত্তম, বৎস শক্তিধর। রাজমাতাকে তাঁর একমাত্র পুত্রের অসুস্থতার সংবাদ দেওয়াটা তোমার প্রশাসনিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না আশা করি”!

মাথা নত করে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল উপনগরপাল শক্তিধর, তারপর পিছনে দাঁড়ানো দুই সহকারীকে বলল, “শুদ্ধনীল, সুপ্রকাশ, তোমরা এখনই যাও। রাজমাতার সংবাদ নিয়ে এসো। তাঁকে বলবে রাজাবেণ অসুস্থ, তিনি যদি রাজাকে দেখতে যেতে চান, আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব”।

মহর্ষি ভৃগু অত্যন্ত উষ্মা ভরে বললেন, “বৎস শক্তিধর, তোমার এই অনুগ্রহের এখন আর কোন প্রয়োজন দেখি না। পুত্র রাজা হলেও মাতার কাছে সে পুত্রই থাকে। তাঁকে সংবাদ দেওয়ার জন্য তুমি না যেতে পারো, আমি যাচ্ছি। আর পুত্রকে দেখার জন্য তাঁকেও তোমার অনুমতির অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এই বার্তায় আমি কিন্তু স্বস্তি পাচ্ছি না। ছোট্ট এই প্রাসাদের প্রশাসনেই, তোমার কর্তব্য-অকর্তব্যের বোধ স্পষ্ট নয়। অতএব সমগ্র রাজ্যের ক্ষেত্রে তোমাদের কী চিন্তাধারা সে কথা সহজেই অনুমান করা যায়। আমি এখনই রাজমাতার দর্শনে যাচ্ছি। তোমার কিংবা তোমার প্রশাসনের যদি কোন আপত্তিও থাকে, আমি সেই আপত্তি অস্বীকার করছি। এর জন্য তোমার প্রশাসন যা শাস্তি বিধান করবে, তার জন্যে আমি প্রস্তুত থাকবো”।

“প্রশাসনের কোন আপত্তি থাকতে পারে না, মহর্ষি। আপনি রাজামাতার দর্শন করতেই পারেন। আর আমাদের কর্তব্যে এই অবহেলার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি, মহর্ষি”।

“দোষ তোমার নয়, বৎস শক্তিধর। দোষ তোমাদের ঔদ্ধত্যের, তোমাদের অহঙ্কারের। অযোগ্য হাতে ভাগ্যক্রমে অতিরিক্ত ক্ষমতা এসে গেলে এমনই হয়”মহর্ষি ভৃগু আচার্য বিশ্ববন্ধু ও রণধীরকে অপেক্ষা করতে বলে, দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন রাজমাতার প্রাসাদের দিকে। মহর্ষি ভৃগুকে এতটা বিচলিত ও ক্রুদ্ধ হতে কোনদিন দেখেননি আচার্য বিশ্ববন্ধু ও রণধীর। তাঁর নীরবে তাকিয়ে রইলেন শক্তিধরের দিকে। 

রাজাবেণের অসুস্থতার পর সব কিছুই যেন বদলে যাচ্ছে, মুঠিতে চেপে ধরতে যাওয়া শুষ্ক বালুর মতো, আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি। রাজাবেণের ছায়ায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে তিনি যে উপনগরপালের পদ সামলাচ্ছিলেন, খুব দ্রুত সেই আত্মবিশ্বাসে ভাঙন আসছে। তার সহকারি এমনকি অধস্তন কর্মচারীদের চোখেও তিনি যেন আর সেই ভয় আর সম্ভ্রম দেখতে পাচ্ছেন না। আর ভয় চলে গেলে রাজ্য শাসনের রইল কী? বিষণ্ণ মুখে তিনি আচার্য বিশ্ববন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কী মনে হয়, আচার্য, রাজাবেণ কতদিনে সুস্থ হয়ে উঠবেন?”

“চিকিৎসাশাস্ত্রে আজকাল প্রভূত উন্নতি হয়েছে, একথা সত্যকিন্তু কোন চমৎকার করার সাধ্য এখনও আয়ত্তে আসেনি, বৎস শক্তিধর। সে করতে পারেন একমাত্র ঈশ্বর। কিন্তু তোমরা তো আবার ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না। তাঁর সমস্ত উপাসনা বন্ধ করে দিয়েছো। ভেঙে ফেলেছ যাবতীয় দেব-দেবীর প্রতিমা। অতএব আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্যধারণ ছাড়া আর তো কোন উপায় দেখি না”। 

১৮

মহিষীভবনে রাজমাতার ঘরের বাইরে দাসী পদ্মবালার সঙ্গে দেখা হল মহর্ষি ভৃগুর। তাঁকে দেখে দাসী পদ্মবালা প্রণাম করে বলল, “সেই এলেন ঠাকুর, কদিন আগে এলেন না? একটু অপেক্ষা করুন ঠাকুর, রাজকুমারীকে সংবাদ দিই”।

মহর্ষি সামনের অলিন্দে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাকিয়ে রইলেন প্রাঙ্গণের উদ্যানের দিকে। দ্বিপ্রহরের প্রখর রৌদ্রধারায় স্নান করছে, গাছপালা, লতাগুল্ম, ঘাস, ফুল। ঝাঁকড়া এক বকুল গাছের ছায়ায় একটি ময়ূর আর তিনটি ময়ূরী বসে আছে। মাঝে মাঝে সেই ময়ূর তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে উঠছে “কে ও, কে ও, কে ও”?

“মহর্ষিঠাকুর, আপনি এসেছেন? কী সৌভাগ্য আমার”? রাজমাতার কণ্ঠ শুনে, মহর্ষি ফিরে তাকালেন এবং গৃহের দরজায় রাজামাতাকে দেখে চমকে উঠলেন। এ কী চেহারা হয়েছে মহারাণি এবং রাজমাতা সুনীথার? সেই দৃপ্ত, গর্বোদ্ধত সুন্দর শরীর ও মুখশ্রী, বয়েসের সঙ্গে, দিন-দিন আরও যেন মহিমান্বিত হয়ে উঠছিল! আজ সেই শরীর কিছুটা যেন ন্যুব্জ, শীর্ণ চেহারা। রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখের ত্বকে জরার নিষ্ঠুর আঁচড়। কোটরের মধ্যে অত্যন্ত ক্লান্ত দুই চক্ষুর চাহনি। দীর্ঘ প্রসাধনহীন এলোমেলো রুক্ষ চুল। পরনে একদা মহার্ঘ একটি শাড়ি, এখন দীর্ণ, বিবর্ণমহর্ষি কিছু বললেন না, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

রাজমাতা ঘরের মধ্যে ডেকে, মহর্ষিকে কাঠের উঁচু আসনে বসালেন, সে আসন জীর্ণ, মলিন বস্ত্রে ঢাকা। মহর্ষি সেই আসনে বসার পর, রাজমাতা প্রণাম করলেন, তারপর অন্য একটি আসনে বসে, অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বললেন, “মহারাজ অঙ্গ চলে যাওয়ার পর, আমি আপনারই শরণাপন্ন, মহর্ষিঠাকুর। আমি জানি অজস্র ব্যস্ততায় আপনি জড়িত। কিন্তু যখনই খুব অসহায় আর বিপন্ন বোধ করি, আপনাকে স্মরণ করি”।

মহর্ষি শান্তমুখে তাকিয়ে রইলেন, রাজমাতা সুনীথার মুখের দিকে, বললেন, “আমিও কখনও আপনার আদেশ অমান্য করিনি, মহারাণি। কিন্তু কিছুদিন আগে আপনি যখন আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন, আমি আসিনি। তখন যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল, আমি এলে আপনি বিপন্ন হতেন। তবে...” দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু দ্বিধার সঙ্গে মহর্ষি আবার বললেন, “...তবে আপনার এই অসহায় অবস্থার কথা আমি জানতাম না, মহারাণি। মাত্র এই কয় মাসে আপনার এই বিপর্যয়, আমি কল্পনাও করতে পারিনি”। মহারাণি সুনীথা হাসার চেষ্টা করলেন, মুখে হাসি ফুটল না, আরও করুণ দেখাল।

হাতের আঙুলের অমার্জিত নখের কালচে ময়লা দেখতে দেখতে, মহারাণি সুনীথা বললেন, “এ সবই আমার অধর্মের শাস্তি, মহর্ষি! আপনারা ধর্ম পথের দিশারি - আপনি, মহারাজ অঙ্গ। মহারাজ অঙ্গ যতদিন আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁর মহারাণি হয়ে, আমিও মহিমময়ী ছিলাম। আর আজ? আমার পুত্র রাজাবেণ আর আমি রাজমাতা...প্রতিটি ক্ষণে ধ্বংসের পথে দৌড়ে চলেছি, উন্মাদের মতো”!

মহারাণির পিছনে দাসী পদ্মবালা দাঁড়িয়েছিল, সে বলল, “রাজকুমারী, তুমি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে চলেছ। আহার প্রায় ত্যাগ করেছ, চোখে নিদ্রা নেই, প্রসাধন নেই, এতটুকু বিনোদন নেই। মহর্ষিঠাকুর, রাজকুমারীর এখন সর্বদা একটাই চিন্তা। এত লোকের অভিশাপ, এত লোকের দীর্ঘশ্বাস, এত অসহায় মানুষের আর্ত অশ্রুআমি বলি, সকালে বিকালে প্রাসাদের উদ্যানে চলো, সরোবরের তীরে গিয়ে একটু বসো। মনটা হাল্কা হবে”।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “পদ্মাদেবী সঠিক বলেছে, মহারাণি। সারাদিন ঘরে বসে অলস মস্তিষ্কের চিন্তায়, কেন নিজেকে আরো বিপন্ন করে তুলছেন? আপনার দায়িত্ব তো শেষ হয়ে যায়নি! এখনো অনেক কাজ যে আপনার বাকি রয়ে গেছে!”

অবাক দুই ম্লান চোখ তুলে রাজমাতা সুনীথা বললেন, “আমার দায়িত্ব? কী কাজ আর আমার করার আছে, মহর্ষিঠাকুর?”

“আপনার পুত্র রাজাবেণ অসুস্থ, শুনেছেন তো?”

রাজমাতার মুখ আরও মলিন হল, বললেন, “শুনেছি। পদ্মবালা সেই রাত্রেই সংবাদ দিয়েছিল। পদ্মবালা আরও বলল, কাউকেই দর্শনের অনুমতি দিচ্ছে না। রাজবেণের পক্ষে কোন রকম উত্তেজনাই নাকি বাঞ্ছনীয় নয়”

“সেই শুনে আপনি গেলেন না? আপনি মাতা পুত্রের সেবার অধিকার আপনার থেকে আর কার বেশি হতে পারে, মহারাণি?”

পদ্মবালা বলল, “না মহর্ষিঠাকুর, তা নয়। এই ঘটনার পক্ষকাল আগে, আমি আর রাজকুমারী, মহারাজ বেণের কক্ষে গিয়েছিলাম। রাজকুমারী কিছু অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল প্রতিকারের জন্যে...”।

“কিসের অভিযোগ”?

“এই যে চারদিকে নানান অত্যাচার, অনাচার হচ্ছে, রাজকুমারীর তাতে সায় নেই, এ কথা জানাতে। আর বিহিত চাইতে। কিন্তু মহারাজা বেণ যে ব্যবহারটা করল, সে আর বলার কথা নয়...”

“তুই থাম তো, পদ্মবালা। ওসব কথা আমি কবেই ভুলে গেছি। এখন আর ওসব কথায় আমার কী কাজ? ও এখন বড়ো হয়েছে, দেশের রাজা হয়েছে, যা ভাল মনে হয় করেছে...আমার কী?”

“তাই বই কী? সেই দিন থেকেই তোমার এই পাগলপারা অবস্থা। সে কেন, সে কী আর আমি বুঝিনা, রাজকুমারী? আমার কাছে লুকোবে? তোমাকে আমি সেই এতটুকু বয়েস থেকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি, ভুলে যেও না রাজকুমারী”।

“বাজে বকিস না। কিচ্ছু হয়নি আমার, আমি দিব্যি আছি। তোর যতো উদ্ভট মনগড়া চিন্তা আর ভাবনা...”পদ্মবালা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, মহর্ষি হাতের ইশারায় তাকে থামতে নির্দেশ দিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সামনে মহারাণি সুনীথার এই মানসিক অসহায়তার উন্মোচন, আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। মহারাজ অঙ্গের মহারাণি হিসাবে তিনি ছিলেন সমস্ত রাজ্যবাসীর মাতা। প্রজাদের মঙ্গল-অমঙ্গল, সুখ-দুঃখের অংশভাক্‌ হয়ে তিনি উদারতার মহিমায় অধিষ্ঠিতা ছিলেন। এখন তিনি রাজমাতা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সব হারিয়ে তিনি এখন নিঃসহায় পরিত্যক্তা, চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক। মহর্ষি ভৃগু উপলব্ধি করলেন এই নারীর দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা

তিনি খুব শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি এইভাবে নিশ্চেষ্ট থাকতে পারেন না, মহারাণি। রাজাবেণকে আমি এখনই দেখে এলাম, তিনি গুরুতর অসুস্থ, অবস্থা সংকটজনক। ভিষক রয়েছেন, সেবক-সেবিকা সবাই রয়েছেন। কিন্তু মায়ের সেবার কাছে সে সব কিছু না। মা ছাড়া জগতে এমন কেউ আর আছে, যে এত নিবিড়ভাবে পুত্রের প্রিয়-অপ্রিয়, ভালো-মন্দ বুঝবে? নিয়মিত চিকিৎসার সঙ্গে মায়ের সেবা পেলে রাজাবেণের সুস্থ হওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা”।

মহর্ষি ভৃগুর এই কথায় মহারাণি সুনীথার বিষণ্ণ চোখেও এখন যেন আশার আলো জ্বলে উঠল! তাঁর মনের সমস্ত বেদনা, যন্ত্রণা আর অভিমান, বাঁধভাঙা অশ্রু হয়ে নামতে লাগল দুই চোখ বেয়ে। পদ্মবালার দুই চোখও জলে ভরে উঠল। রাজকুমারী সুনীথা এবং রাজাবেণ, দুজনেই তার বুকের পাঁজর, ওদের এই বিচ্ছেদ, তার মনেও এনেছিল অশান্তির ঝড়। মহর্ষি ভৃগু বেশ কিছুক্ষণ সময় দিলেন, তাকিয়ে রইলেন মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে। মহারাণির এই নিঃসংকোচ অভিভূত অশ্রুপাতে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাণি, আপনি এই রাজ্যের রাজ্যলক্ষ্মী, সকল প্রজার মাতা। মহারাজা বেণ যতদিন রাজ্য পরিচালনায় সক্ষম না হতে পারছেন, আপনার পরামর্শ এবং নির্দেশ মেনে, মহারাজ অঙ্গের প্রাজ্ঞ মন্ত্রীগণ, অমাত্যগণ এবং নগরপাল সমবেতভাবে রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনা করুন। আমার মনে হয় না, তাঁদের মতো নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত এই রাজ্যে আর কেউ আছেন”।

মহারাণি কান্নাভেজা চোখ তুলে, রুদ্ধস্বরে বললেন, “আর আপনি”?

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “আমি? আমি রাজ্য পরিচালনার কী বুঝি, মহারাণি? আমি বুঝি জপ-তপ-যজ্ঞ-পুজা আর অধ্যয়ন। আমি চিরকাল মহারাজ অঙ্গের অন্তরঙ্গ অনুগ্রহ পেয়েছি, আজ থেকে আপনার অনুগ্রহও যদি পাই, ব্যস্‌, সেইটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট”। মহারাণি সুনীথার মুখে এখন মৃদু হাসি, তিনি তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির মুখের দিকে!

মহর্ষি ভৃগু এবার উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “মহারাণি আপনি প্রস্তুত হোন, এখনই আপনাকে পুত্রের কাছে যেতে হবে। দেবীপদ্মবালা, মহারাণিকে যথাযোগ্য পরিধানে, অতি দ্রুত সাজিয়ে তোল। মহারাণির মর্যাদা রাখার দায়িত্ব তোমারও। মহারাণি, এক দুদিন আপনাকে হয়তো যাওয়া-আসা করতে হবে, তারপর রাজাবেণের অবস্থা বিচার করে, তাঁকে আপনার ভবনেই নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন তাতে আপনার ও রাজাবেণ দুজনরেই সুবিধা হবে। এখন আসি। কিন্তু আপনারা বিলম্ব করবেন না”। মহারাণি তাঁর কাঠের আসন থেকে নেমে ঘরের মেঝেয় বসলেন, তারপর নিজেকে উজাড় করে, দুই চোখের জলে সিক্ত করে তুললেন মহর্ষির দুই চরণ।

মহর্ষিকে ছাড়তে বাইরের অলিন্দ পর্যন্ত এগিয়ে এল দাসী পদ্মবালা। মহিষীভবনের দরজা পর্যন্ত এসে, নীচু হয়ে বসে প্রণাম করল মহর্ষি ভৃগুকে। তারপর বলল, “আমরা রাজা অধর্মের প্রজা। এতদিন যে আপনাকে দেখেছি, মনে হত আপনি জাদুকর। আজ আমার সে ভুল ভাঙলো, আপনিই করুণাময় মহান ঈশ্বর! আপনি রুদ্ধ নদীতে স্রোত সঞ্চার করতে পারেন, আপনি অবসন্ন প্রাণে স্পন্দন জাগিয়ে তুলতে পারেন”!

ডানহাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করে, মৃদু হাসলেন মহর্ষি ভৃগু। তারপর পাথর বাঁধানো পথে পা রাখলেন।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৯ম পর্ব "






রবিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৬

নবীন বরণ

 






এর আগের পর্ব পড়ে নিন এই সূত্র থেকে - ফাস-ক্লাস সিটিজেন


পরের দিন সকালে ক্লাসে গিয়ে অন্য সহপাঠীদের থেকে যা শুনলাম – তাতে হস্টেলের ভাষায় “ইয়ে” রগে উঠে যাবার যোগাড়! মারধোর আর নানান শারীরিক অত্যাচারের ফলে অনেকেরই সারা গায়ে ব্যথা। ফলে সকলেরই মুখে চোখে আতংক – আজ রাত্রে আরও কি ঘটবে, আর কতদিন চলবে র‍্যাগিং নামক এই সম্বর্ধনা?

তাদের মুখে শারীরিক অত্যাচারের যে নমুনা শুনলাম, “আমাকে বলল - অ্যাই ছানা, হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নীচে ঢুকে পড় – ঢুকলি শুয়োরের বাচ্চা, কি করব ঢুকলাম, তারপর বলল – পিঠে করে খাটটা তুলে ফেল। তাও তুলে ফেললাম। তারপর কি করল জানিস, কম করে চার পাঁচজন হবে - লাফাতে লাগল আর নাচতে লাগল খাটের ওপর দাঁড়িয়ে। পারা যায় নাকি? আমি খাটটা মেঝেয় নামিয়ে দিলাম। তাতে একজন খাট থেকে নেমে এসে নীচু হয়ে বসে বাপ মা তুলে কাঁচা দিল – আর তার সঙ্গে কাঠের টি দিয়ে খোঁচা। বলল – আমরা নৌকো চড়া প্র্যাক্টিস করছি দেখছিস না? খাটের পায়া মেঝেয় ঠেকলে পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেব, শালা। প্রায় ঘন্টাখানেক চলল এরকম। সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা। দু কাঁধে আর পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। শালা, দু একদিন এরকম দেখবো, এরকম চললে কেটে পড়ব – দরকার নেই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ে। তবে হ্যাঁ যাবার আগে দুটোর মাথা আমি ফাটিয়ে যাবো, দেখে নিস”।

এরকম মারাত্মক র‍্যাগিং যেমন ছিল, তার সঙ্গে ছিল কিছু বিরক্তিকর ক্লান্তিকর র‍্যাগিংও, হস্টেলের ভাষায় বলত টেকনিক্যাল র‍্যাগিং। টেকনিকাল র‍্যাগিং যারা করত, তারা নিজেদের উচ্চস্তরের বুদ্ধিমান জীব হিসেবে ভীষণ শ্লাঘা অনুভব করত। মারকুটে র‍্যাগারদের আড়ালে তারা খুব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করত।

বিশ ফুট বাই পনের ফুট একটা রুমের দৈর্ঘ, প্রস্থ আর উচ্চতা মাপার জন্যে দিত একটা পাঁচপয়সার কয়েন। কয়েনের ইউনিটে মেপে দিতে হবে ঘরটি। দৈর্ঘ প্রস্থ তাও ঠিক আছে, উচ্চতা মাপাই ছিল মারাত্মক বিপজ্জনক। তারা দেখত আর হ্যা হ্যা করে হাসত আমাদের দুর্গতিতে।

অথবা একটা কাল্পনিক মাছি, অবাধ্য আর চঞ্চল সেই কাল্পনিক মাছিটি ঘরের এক দেয়াল থেকে বিপরীত দেওয়ালে উড়ে যাবে বারবার। সেই কাল্পনিক মাছিটিকে ধরার জন্যে আমাদের ঘরের মধ্যে দৌড়ে যেতে হবে ঘন্টার পর ঘন্টা – আর দেয়ালের কাছে গিয়ে মক্ষিশিকারের অভিনয় করে বলতে হবে – “যাঃ শালা, ফস্কে গেল”।

দিনের পর দিন এইরকম পরিস্থিতিতে আমাদের মনে জমে উঠতে লাগল অবসাদ আর বিতৃষ্ণা। অনেকে চূড়ান্ত হতাশায় পড়া ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিল। অনেকের মনে জমে উঠছিল ক্ষোভ আর রাগ, তারা বলত – দাঁড়া না, কিছুদিন যাক, এমন ক্যালান ক্যালাবো না, বাপের নাম খগেন করে ছেড়ে দেব, শালা।

এই র‍্যাগিংয়ের সময় আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। টুকটাক র‍্যাগিং প্রায় সবাই করলেও, বেশ কিছু ছেলে আছে যারা র‍্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে। সত্যি বলতে অসহ্য মারধোরের র‍্যাগিং করতে আসত, কতিপয় হাতে গোনা কিছু ছেলে। তাদের খপ্পর এড়িয়ে চলতে পারলে, হস্টেলের র‍্যাগিং ব্যাপারটা খুব একটা মারাত্মক ছিল না। তার ওপর আমার ভাগ্যটা ছিল অত্যন্ত সুপ্রসন্ন। র‍্যাগিং-বিরুদ্ধ বেশ কিছু ছেলের সুনজরে চলে আসাতে, তারাই আমায় বেশ বাঁচিয়ে দিত বার বার। তাদের মধ্যে যাদের নাম না করলেই নয়, অজয় গাঙ্গুলি (সিভিল৮২), বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য (মেক. ৮২), সুশোভন ভট্টাচার্য (মেক.৮২), উৎপল দাস (সিভিল.৮২), অরিজিৎ চৌধুরি (ইলেক. ৮২), সঞ্জীব সরকার (ইলেক. ৮২), আশিষ বিশ্বাস (সিভিল ৮২), সৌমিত্র বসাক (সিভিল ৮২) প্রমুখ। সুশোভনদার ব্যাপারটা বোঝা যায়, কারণ আমি তখন সুশোভনদার পাড়াতেই শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে থাকতাম, কিন্তু বাকিরা কেন আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, আজও ভাবলে কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে। অজয়দার সঙ্গে অনেক বছর পরে কলকাতায় আবার কর্মসূত্রে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কোহিমা থেকে কলকাতা ফেরার পথে অজয়দার প্লেন ক্র্যাশ হয়ে যাওয়াতে, অজয়দা চলেই গেল অন্যলোকের যাত্রী হয়ে। অজয়দার সেই অসময়ের মৃত্যুটা আজও ভীষণ নাড়া দিয়ে যায়, অজয়দার কথা মনে পড়লে।

একবার আমাদের কাছে আগে থেকেই খবর এসেছিল, আজ রাত্রে “উদুম ক্যালানো” হবে ছানাদের। আমি ও আমার স্কুলের এবং এই কলেজের অভিন্নহৃদয় সহপাঠী-বন্ধু দেবপ্রিয় সেন (মেক.৮৩) ক্লাস শেষে, হস্টাইল হস্টেলে না ফিরে, কলেজ থেকেই পালালাম জলপাইগুড়ি শহরে। এর আগে কলেজে ভর্তি হবার সময় দুদিন রুবি বোর্ডিংয়ে থাকতে হয়েছিল। এবারও দুজনে উঠলাম রুবিতে। সঙ্গে ব্যাগ ট্যাগ কিচ্ছু নেই, দুজনে হাতে খাতা নিয়ে যখন রুবি বোর্ডিংএর রিসেপশানে পৌঁছে, আমরা রাত্রে থাকার জন্যে ঘরের কথা বললাম, কাউন্টারের ভদ্রলোক চোখ তুলে তাকালেন। কিছু বলতে হল না, তিনি নিজে থেকেই বলে গেলেন, “ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ? ফার্স্ট ইয়ার? খুব র‍্যাগিং হইতাসে? কলকাতা থেকে আইসা হেই ছেলেগুলা এই সব কইরা কী যে উল্লাস পায়, বোঝন যায় না...”। রুম মিলল এবং রাত্রে মুগের ডাল, ঝুরঝুরে আলুভাজা আর ফুলকপি-আলুর তরকারি দিয়ে একপেট গরম ভাত খেয়ে বড়ো শান্তি পেলাম। খাওয়ার পর মৌরি মুখে দিয়ে, আমরা দুই বন্ধু সদর দরজায় দাঁড়িয়ে জলপাইগুড়ি শহরের শীতের নির্জন রাস্তার শোভা দেখছিলাম, ম্যানেজার মশাই কাছে এসে বললেন, "ঘরে ঢুইক্যা শুইয়া পড়েন গিয়া, আধা ঘন্টা আগে, আপনাগো কলেজের চার জন আইছিল, জিগাইছিল আমাগো কলেজের ছানা হেখানে কেউ আসে নাকি? আমি মিথ্যা কইরা কইলাম, না তো! আপনাগো অরা ছানা কয় নাকি? খি জ্বালাতন কন দিকি?’

মাস দেড়েক এইরকম সদা আতঙ্কময় বিভীষিকা সহ্যের পর ঘোষণা হল র‍্যাগিং পিরিয়ডের সমাপ্তি আর ফ্রেশার্স ওয়েলকামের বহুল কাঙ্খিত দিন। আমরা হাঁফ ছেড়ে দিন গুনতে লাগলাম। আর যেসব মর্বিড, বিকৃত সিনিয়ররা অসীম আনন্দ পাচ্ছিল র‍্যাগ করে, তারা দ্বিগুণ উৎসাহে উঠে পড়ে লেগে পড়ল শেষ কটা দিনের সদ্ব্যবহার করার জন্যে। 

সে যাই হোক যে কোন দুঃখ রাত্রির শেষে যেমন ঘটে যায় নূতন সূর্যোদয়, ঠিক সে ভাবেই শেষ হয়ে গেল আমাদের র‍্যাগিং পিরিয়ড। এসে গেল ফ্রেসার্স ওয়েলকাম – নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দিন। অর্থাৎ ওইদিন আমরা সকলে ছানা থেকে পোনায় উত্তরিত হবো। সেদিন কলেজে হাফছুটি, বিকেল থেকেই সাজসাজ হস্টেলে। রঙিন কাগজের শিকলি, আর কাগজের নানান ফুল দিয়ে সেজে উঠতে লাগল হস্টেলের কমনরুম। কমনরুমের স্টিরিও রেকর্ড প্লেয়ারে চলছে উচ্চৈঃস্বরে গান – সে আওয়াজে কান পাতা দায়।

সূর্য পাটে নামার আগেই শুরু হয়ে গেল নেশার আয়োজন। সেখানে তরল আছে যেমন, তেমনই আছে শুষ্ক নেশার যোগাড়। যে যেমন রসের রসিক রসগ্রহণ করে রঙীন হয়ে উঠতে কোন বাধা নেই। যারা অতিরিক্ত নেশায় স্খলিতচরণ অথবা বিগতচেতন, তাদের প্রতি সকলে সহানুভূতিসম্পন্ন ও তারা বিশেষ আদরণীয়। বরং যারা ও রসে বঞ্চিত তারাই যেন অপাংক্তেয় এই অনুষ্ঠানে। কাজেই হাই ভোল্টেজ গানের সুরে, মাতাল যুবকের উদ্দাম নৃত্য আর চিৎকার শুরু হল। শব্দ, দৃশ্য আর গন্ধ দূষণের সে এক অদ্ভূত আয়োজন। পাকিস্তানের অনাবাসী ও লণ্ডন নিবাসী গায়িকা নাজিয়া হাসানের হিট গান “ডিসকো দিওয়ানে এ এ এ, আহা, আহা...” গমগমে উচ্চস্বরে বাজতে লাগল বারবার, লাগাতার। ্মাঝে মাঝে "বাংলায় ফিরে এস বাওয়া" ভাবনা থেকে বেজে উঠছিল, কিশোরকুমারের "ও আমার সজনি গো, কেন আছ দূরে দূরে..."।     

রাত্রি সাড়ে নটায় হস্টেলের ডাইনিং হলে ঘন্টা বেজে উঠল। আজ স্পেশাল মেনু, গ্র্যাণ্ড ফিস্ট। নিত্যদিনের খুব সাধারণ, স্বাদ-বর্ণ-গন্ধহীন রান্নার নিয়মরক্ষার পরিবর্তে আজ একদম অন্যরকম ভূরি ভোজ আহারের বন্দোবস্ত। যে রন্ধনকারী আশ্চর্য নিপুণ দক্ষতায় প্রত্যেকদিন স্বাদহীন ডাল ও তরকারি রান্না করত, আজ গ্র্যাণ্ড ফিস্টের দিনে সেই রন্ধনকারীই এত উত্তম স্বাদের সব পদ কিভাবে পরিবেশন করত সেও কম আশ্চর্য ব্যাপার নয়।

গ্র্যাণ্ডফিস্টে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা এবার জড়ো হলাম হস্টেলের সামনের মাঠে। পাশাপাশি দুটি হস্টেলে নবীনবর্ষের ছাত্রদের মধ্যে হবে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার বিচারক আমাদের সিনিয়ররা - প্রতিযোগিতা শেষে সফল প্রতিযোগীকে দেওয়া হবে পুরষ্কার, তার মাথায় তুলে দেওয়া হবে সেরার শিরোপা। প্রতিযোগিতার বিষয় – গালাগালি - চালু ভাষায় যারে কয় খিস্তি। সেও সাধারণ নয়, সে গালাগালি হতে হবে একদম অভিনব এবং অশ্লীলতম – তবেই মিলবে সেরার শিরোপা! রাত্রি এগারোটার পর কলেজ ক্যাম্পাসে নিয়মিত পাওয়ার কাট হত তখন। এগারোটার পরই শুরু হল সেই অদ্ভূত প্রতিযোগিতা – অন্ধকারে অন্ততঃ মুখগুলো দেখা যাবে না, কিছুটা হলেও রক্ষা হবে চক্ষুলজ্জা!

এসব মিটে যাওয়ার পর হস্টেলের স্বাভাবিক ছন্দে অভ্যস্ত হতে লাগল আমাদের জীবন যাত্রা। র‍্যাগিং পিরিয়ডের আতঙ্কের দিনগুলি পার করে এসে আমাদের উপলব্ধিতে এলো এক আমূল পরিবর্তন। অনুভব করলাম এই মাস দেড়েকে অনেকটাই বদলে গিয়েছে আমাদের মানসিক চরিত্র। আমাদের মুখের ভাষায় বাসা বেঁধেছে অশ্লীল লব্জ, অশ্লীল কথাবার্তা ও আলোচনায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই আর!

সারা দিন রাত পরিবারের বাঁধনহীন সীমাছাড়া স্বাধীনতা। কার্যত সে স্বাধীনতাও প্রায়শঃ উচ্ছৃঙ্খল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অনেকে সীমাহীন নেশায় আসক্ত হল। কেউ কেউ আসক্ত হতে থাকল অসামাজিক ব্যাভিচারে। কয়েকজন আসক্ত হল নিরলস পাঠে। আর আমরা আসক্ত হলাম নিরঙ্কুশ আড্ডা আর সিনেমায়, লেখাপড়ার সঙ্গে সংযোগ রইল নামমাত্র।


চলবে...


শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

অনেক কিছু পাওয়া

ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট " 


 এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প  - " অস্ত্রের ঝংকার "

তোয়ার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। বাবা মাঝে মাঝে বলেন, “আর্লি টু বেড আর আর্লি টু রাইজ, মেক্স আ ম্যান হেলদি এণ্ড ওয়াইজ।” ক্লাস টুতে পড়া তোয়া ইংরিজি ওই শব্দগুলোর মানে জানে, আর তার ঠাম্মি এ ছড়াটার যে বাংলা করেছে, সেটা আরো বেশী মজার!

“তাড়াতাড়ি করলে ঘুমু, ঠাম্মা দেবে অনেক চুমু 

উঠে পড়ো থাকতে ভোর, জ্ঞানের সাথে বাড়বে জোর”

 

অন্যদিনের মতো আজও খুব সক্কালে ঘুম ভেঙে উঠে তোয়া দেখল মা-বাবা ঘুমোচ্ছেন অন্যদিন ওঁরাও উঠে পড়েন, কিন্তু আজ রবিবার কিনা তাই একটু বেলা করবেন উঠতে তোয়া ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসতেই, খোলা জানালা দিয়ে তার বন্ধুরা ডাকাডাকি শুরু করে দিল। বুলবুলি বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি, আজ কিন্তু তোকে, 

প্রথম ডেকেছি আমি, নতুন আলোর ঝোঁকে” 

শালিক যেমন খুব মজা করে, তেমন ঝগড়াও করে, সে বলল, 

“বলতো দেখি তোয়, 

তোর কী মনে হয়, 

আমিই বেশী হিংসুটি? 

 না ওই বুলবুল, কেলে ঝুঁটি”?

তোয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে নিঃশব্দে দুলেদুলে হাসল কিছুক্ষণ, তারপর ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারায় বলল,

“অ্যাই, অ্যাই, চুপ চুপ, করিস না রে ঝগড়া। 

মা বাবার ভাঙলে ঘুম সব কিছুতেই ব্যাগড়া”!

খুব আআস্তে আআস্তে বিছানা থেকে নেমে, তোয়া মেঝেয় যেমনি পা দিল, মা আধখানা চোখ মেলে আলসে গলায় বললেন, “ছাদে যাচ্ছো যাও, কিন্তু আলসে দিয়ে ঝুঁকবে না”। তোয়া সবসময় দেখেছে ঠাম্মি, দাদুন, বাবাকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু মাকে – অসম্ভব! মাদুগ্গার মতো তিনচোখ না থাকলেও, মা সব দেখতে পান, সব বুঝতে পারেন। মেঝেয় নেমে মায়ের গালে হামি খেয়ে, তোয়া হাল্কা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা পেরিয়ে দৌড়ে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।

 

সক্কাল সক্কাল ছাদে উঠতে তোয়ার খুব মজা লাগে। আকাশ জুড়ে নরম নরম আলো। ঝিরঝিরে হাওয়া। চারিদিকের গাছপালার পাতায় পাতায় চলছে রান্নাবান্নার তোড়জোড়। হাতাখুন্তি, বাসনকোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শোনার জন্যে সে কান পাতে, কিন্তু শুনতে পায় না।

তোয়ার কাকু বলেন, “তোর মা, ঠাম্মি রান্নাঘরে, আমাদের জন্যে যখন খাবার বানান, কত রকমের শব্দ হয় শুনিসনি? ঠুনঠান, ঘটরঘটর, ছ্যাঁক-তেলতেল ছোঁক-কলকল”? তোয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, শুনেছে তো, সে সময় কী সুন্দর রান্নার গন্ধও বেরোয়, সেই গন্ধে তো তোয়ার লোভ লাগে, খিদে খিদে পায়!

“একদম সেইরকম, রোদ্দুরের আলোর আগুনে, গাছের পাতার রান্নাঘরে গাছ তার নিজের জন্যে এবং আমাদের জন্যেও খাবার বানায়।”

“আমাদের জন্যেও?” অবাক হয়ে বড়োবড়ো চোখে তাকিয়েছিল তোয়া। “কই কোনদিন দেখিনি তো?”

কাকু আদর করে তোয়ার রেশমী কোমল চুল এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বললেন, “ওরা কী আর ভাত-ডাল-তরকারি বানায়? ওরা বানায় চাল, গম, ডাল, সব আনাজ, সব রকম ফল - আম, জাম, লিচু, পেয়ারা।” একটু থেমে কাকু বলেছিলেন, “আরো কী জানিস, তোয়ারাণি, আমাদের রান্নায় যেমন সুন্দর গন্ধ হয়, তেমনি মাঝে মাঝে বেশ ঝাঁঝালো গ্যাসও হয়। সে ঝাঁজে নাক জ্বলে, চোখ জ্বলে, হ্যাঁচ্চো হয়। গাছেদের রান্নায় তেমন কোনদিন হয় না।”

“তাই?”

“হুঁ। বরং সেই গ্যাসে আমাদের শ্বাস নিতে আরাম হয়, আর সেই গ্যাস বাতাসে যতো বেশি থাকে, আমাদের শরীরও ততো চাঙ্গা থাকেশহর থেকে দূরে, যেখানে অনেক গাছপালা, সেখানে তাই জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়। এখন তো তুই ছোট্ট, বড়ো হলে জানবি ওই গ্যাসের নাম অক্সিজেন, আর গাছেদের এই রান্নার নাম সালোকসংশ্লেষ।”

কাকু প্রায়ই বাইরে চলে যায়, দুতিন মাস পরপর বাড়ি এসে, দিন দশেক থাকে। তখন তোয়ার জন্যে কিছুমিছু জিনিষ আনেই, আর আনে অনেক অনেক মজার মজার কথা। কাকু ছাড়া তোয়া তখন আর কাউকে চিনতেই পারে না।

সকালবেলা ছাদে উঠলেই তোয়ার কাকুর কথা মনে পড়ে খুব। কাকুর কথা মতো বুক ভরে খুব জোরে জোরে শ্বাস নেয়। আজ তার এই শ্বাস নেওয়া দেখে চড়ুই মিচকি মিচকি হাসল, বলল, 

“ও তোয়াদি, ও তোয়াদি, আর নিও না শ্বাস, 

বাতাসের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলেই, ব্যস

চড়ুইয়ের এই কথায়, তোয়া এবং অন্য সবাই হেসে ফেলল কিচিরমিচির করে, শুধু কাক গম্ভীর হয়ে বলল, “গুডমর্নিং তোয়াদিদি, তোমার আদরে না চড়ুই‍টা খুব ফাজিল হয়েছে, তোমাকেই আর মান্যি করে না।”

হাসতে হাসতে তোয়া বলল, 

“বারে, আমি বুঝি স্কুলের বড়োদিদিমণি? 

ভয় পেয়ে বলবে আমায়, “আজ্ঞে দিদি, আপনি?”“

তোয়ার কথায় কাক একটু দমে গেল, কিন্তু অন্যেরা বেশ মজা পেল। তোয়া কাককে আবার বলল, 

“মিষ্টি সুরে বলতে কথা, বলছি কতো বল, 

তুই শুধুই খুঁজিস দেখি ফাঁকি দেওয়ার ছল।”

কাকটা আরো অপ্রস্তুত হয়ে, একবার ঠোঁট আর একবার ঘাড় চুলকোল, তারপর বলল, 

“কা কা করি, খা খা করি, তার তো থাকে মানে, 

কাক ডেকেছে মিষ্টিসুরে, এমন কি কেউ জানে?”

কাকের এই কথা শুনে তোয়া হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল খুব। আর অন্য পাখিরাও ডানা ঝাপটে ঝটপট বলে উঠল,

 “কাকদাদা গো কাকদাদা, তুমিই হলে সেরা, 

তোমার কথার সুরটি যেন মিষ্টি মধু ঘেরা” 

কথাগুলো বলে ফেলে কাক একটু লজ্জা পাচ্ছিল, কি জানি কী বলে ফেললাম!

এখন সকলের প্রশংসায় একটু গম্ভীর হয়ে বলল, 

“তোয়াদিদির ক্লাশে পড়ে শিখছি কত কী যে, 

কাকের গলায় মিঠে সুর শুনছি এখন নিজে”!

তোয়া হাসতে হাসতে বলল, 

“তোদের মতো মিষ্টি ডানা থাকতো যদি মোর, 

ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতাম একটু হলেই ভোর। 

এদিক সেদিক ঘুরে এসে খেতাম মায়ের বকুনি, 

বইয়ে ভরা ব্যাগটি পিঠে স্কুল ছুটতাম তখুনি। 

যা কিছু সব বইয়ে পড়ি দিদিমণির কাছে, 

উড়ে উড়ে দেখে নিতাম কোনটা কোথায় আছে? 

সেই কবে তুই খেয়েছিলি কাদের ক্ষেতের ধান, 

বুলবুলি তোর ঘুঁচলো না দেখ আজও সে বদনাম। 

কে যেন সে কত আগে দেয়নি বুঝি খাজনা, 

তোর কথাতেই মানুষগুলো আজও বাজায় বাজনা”।

বুলবুলি খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল, 

“ওসব কথায় দিই না গো কান, তোয়াদিদি বুঝলে, 

বুলবুলিঝাঁক পাবে না আর ধানের ক্ষেতে খুঁজলে। 

এখনও তাও উড়ে বেড়াই, দুচারটে বুলবুল, 

কবে কখন হারিয়ে যাবো, আর পাবেই না বিলকুল।”

তোয়াদিদি বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল, 

“সত্যি, এমন যদি হয়, 

মনে ভীষণ লাগে ভয়। 

আমরা আছি, গাছও আছে, নেই শুধু হায় পাখি, 

আমাদেরও জীবন দেখিস রইবে আধেক বাকি। 

সকালবেলার ঘুমটি ভাঙে তোদের ডাকটি শুনে,

 দুপুর বেলা ঘুম এসে যায় ঘুঘুর সুরের গুণে 

নিরিবিলি একলা বনেও, সঙ্গী থাকিস তোরা। 

তোদের পিছু ঘুরে ঘুরে সময় কাটাই মোরা”।

তোয়াদিদির এই কথায় টিয়া বলল, 

“তুমি ছাড়া তেমন কেউ দেখেই না গো মোদের। 

 ব্যাটারি দেওয়া খেলনা পাখি আছে দেখি ওদের! 

সে পাখিরা দেখতে যেন, আমরা অবিকল। 

ঘন ঘন ডিগবাজি খায়, বাপরে কী ধকল! 

তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুরে বলে ছড়া; 

হামটিডামটি, জ্যাকএন্ডজিল যেমন তোমার পড়া”।

তোয়াদিদি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, 

“ধুর ধুর। ওসব দেখে মজা পায় পুঁচকি ছেলেমেয়ে। 

একটুখানি বড় হলেই, কেউ দেখেও না আর চেয়ে। 

কলের পুতুল হাতে নিয়ে, কদিন চমক লাগে ঠিকই। 

কিন্তু রোজই আমি অবাক হই, যত্তো তোদের দেখি”।


“সে তো তুমি, আমাদের ভালোবাসো বড়োই,

রোজই তুমি আমাদের আদর যত্ন করোই। 

গরমকালে কোথাও যখন, পাই না খাবার জল। 

আমরা বলি, সবাই মিলে তোয়ার বাড়ি চল। 

তোমার গামলা ভরা জলে, 

আমরা আসি দলে দলে। 

তোমার ওই জলেই আমরা সবাই মেটাই তৃষ্ণা। 

কিন্তু ওই কাক, যতো বলি, অমন করিস না! শুনবে না, 

নেয়ে খেয়ে জলটাকে করে তুলবেই ঘোলা”

তোয়াদিদি হাসতে হাসতে বলল, “কাকের তো নেই কান, থাকলে দিতাম কানমোলা”

কাক ঠোঁট আর ঘাড় চুলকে, একটু মিচকে হাসল, বলল, 

“গরমকালে নোংরা খেয়ে, আনচান করে গা। 

তোমার রাখা জল দেখে তাই থাকতে পারি না। 

গামলার জলে কাকচান সেরে বড্ড আরাম পাই, 

তোয়াদিদি গো, আমার পরে রাগ করতে নাই”। 

কাকের কথায় তোয়া দুলে দুলে খুব হাসতে লাগল, অন্য পাখিরাও কিচিরমিচিরে ভরে তুলল চারদিক।

তোয়া বলল, 

“রাগ করিনি মোটেই আমি, দুষ্টুসোনা কাক, 

আজ থেকে নয় তোর জন্যে এক উপায় করা যাক। 

আরেকখান গামলা এনে রাখবো ভরে জল, 

তখন যেন করিস না আর নতুন কোন ছল”।

চড়াই, শালিক, পায়রা, বুলবুলি, টিয়া সবাই এই ব্যবস্থায় খুব খুশি হল, বলল, 

“তোয়াদিদি, বেশ হবে, মজা হবে, এমন যদি হয়, 

তেষ্টা পেয়ে কষ্ট তবে হবার কথা নয়”।

 

কাকের সর্বদাই খিদে পায়। সে যেমন কা কা করে, তেমনি খা খা করে। ভোর থেকে উঠে নোংরা ঘেঁটে, আবর্জনা ঘেঁটে খেয়েছে কিছু মন্দ না, কিন্তু তাও তার আর তর সইছিল না, খিদেয় উড়ুউড়ু করছিল। ঠোঁট ফাঁক করে, দুবার খা খা ডেকে বলল, 

“তোয়াদিদি, তোয়াদিদি এবার আমি উড়বো, 

কোনখানে কী খাবার পাই সন্ধানে তার ঘুরবো”।

তোয়াদিদি কাকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 

“আচ্ছা, আচ্ছা, দুষ্টুসোনা কাক, এখন উড়েই তবে যাক। 

আমারও নিচের থেকে পড়বে এবার ডাক। 

আমাদের গল্পগাছা এই অব্দিই থাক। 

বিকেলবেলা আসিস সবাই একটু পেলে ফাঁক”।

টিয়া বলল, 

“ঠিক বলেছ, তোয়াদিদি, সময় হল যাবার, 

বাসায় আছে বাচ্চা দুটো তাদের জন্যে খাবার, 

যোগাড় করে নিয়ে যাবো ঘুরে বাদাড়বন, 

বিকেল বেলা ফেরার পথে কথা বলব অনেকক্ষণ”। 

কাক উড়ে গেল বাজারের দিকে, যেখানে অনেক নোংরা আর আবর্জনা জমা হয়, আর টিয়া উড়ে গেল সামনের বিরাট বাগানের দিকে।

ওদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অন্য পাখিরা বলল, 

“তোয়াদিদি তুমিও এবার নিচেয় যাও, 

মুখটুখ ধুয়ে, চটপট করে খাবার খেয়ে নাও। 

তারপরে তো বসবে খুলে এত্তো এত্তো বই! 

দুপুর অব্দি তুমি আর সময় পাবে কই? 

আমরা যে কজন থাকি তোমার আশেপাশে। 

পড়ার ঘরের জানালায় বসি ঘুরে ঘুরে এসে 

তোমার দিকে চোখ রেখে কষ্ট যে পাই খুব, 

লেখায় পড়ায়, নাচে গানে, তোমার ছটা দিনই ডুব”

চড়াই, শালিক, পায়রা বুলবুলি সবাই উড়ে গেল হুশ করে। ওদের উড়ে যাওয়া ডানার দিকে তাকিয়ে তোয়া একটু হাসল, তারপর নিজের মনেই বলল, 

“রবিবারেই মেলে আমার বেশ কিছুটা ছুটি, 

তোদের কথা শুনতে তাই ভোরবেলাতেই উঠি। 

তোদের ডানায় পাই রে আমি মুক্ত আকাশ নীল। 

নিবিড় সবুজ গাছে ঘেরা শান্ত গভীর ঝিল। 

বদ্ধ মনে ভাসিয়ে আনিস সতেজ মুক্ত হাওয়া। 

ওইটুকুতেই পাখি রে, মোর অনেক কিছু পাওয়া”!

--০০--

গল্পটি "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত।  বইটি বাড়িতে বসেই পেয়ে যাবেন নীচের লিংক থেকে কিনলে "এক কুড়ি কিশোর "

এর পরের ছোটদের প্রবন্ধ - লিখিব পড়িব - পর্ব ১ "

শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩

  

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "





[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২


 

 গতকাল সারা দিন ও রাত একটানা হেঁটেছে ভল্লা। একে তো তার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। যন্ত্রণা এবং ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে তার শরীর। তবু সে হেঁটেছে অবিরাম। আজ রাত্রির আট প্রহরে সে এসে পৌঁছল বিশাল এক সরোবরের পাশে। বীজপুর চটির জনাই তাকে দিক নির্দেশ করে বলেছিল, এই পথ ধরে একদম নাক বরাবর গেলে ডানদিকে একটা সরোবর পাবি। ওই সরোবরটা ছোট্ট একটা পাহাড়ের কোলে। ওখান থেকে নিচের দিকে তাকালে দেখতে পাবি – যতদূর চোখ যায় – ছোটছোট ঝাড়ি আর কাঁটাঝোপের জঙ্গলে ভরা ঢালু জমি। তার মানে তুই নোনাপুর গ্রামের চৌহদ্দিতে পৌঁছে গেলি। ভল্লার মনে হল এটাই সেই সরোবর।

জনাই আরও বলেছিল, ওই সরোবরের পশ্চিম পাড়ে দাঁড়ালেই তোর ডানদিকে দেখতে পাবি একটা পায়েচলা সরুপথ নেমে গেছে সাপের মতো এঁকেবেঁকে। ওই রাস্তা ধরে, খুব বেশি না, আধক্রোশেরও কম, হাঁটলেই পেয়ে যাবি, নোনাপুরের গ্রামপ্রধানের বাসা। নাম জুজাক। এমনিতে লোক খারাপ না, তবে বড্ডো বদরাগী। একবার রেগে গেলে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তবে ওর বউটা খুব ভালো। মনে খুব মায়া-মমতা।

জনাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল জুজাকের দু-দুটো ছেলে – ছোটবেলাতেই একসঙ্গে মারা গিয়েছিল।

কৌতূহলে ভল্লা জিজ্ঞাসা করেছিল, “সে কি? কী করে?”

“কী আর বলব? সে কথা মনে পড়লেই মন খারাপ হয়ে যায়। এমনিতেই ওই জায়গাটা অফসলী। বৃষ্টি কম। সামান্য কিছু আবাদি জমি আছে, সেখানে সামান্য কিছু ভুট্টা, জোয়ার-টোয়ার হয়। তাতে সম্বৎসরের খোরাক হয় কি না হয়। তোরা তো এদিককার লোক নোস, জানবি না। বছর দশেক আগে, এদিকে পরপর চার বছর খরা হয়ে – জমি-জঙ্গল একেবারে যেন ঝলসে গিয়েছিল। খিদের জ্বালা সবচে বড়ো জ্বালা রে, ভল্লা। সে জ্বালা যে কোনদিন ভোগ করেনি – সে বুঝতে পারবে না। দুই ভাই মিলে, বছর দশ আর আটের দুই ছেলে, কন্দ খুঁজতে ঢুকেছিল পাশের জঙ্গলে। সেখানেই তাদের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে”।

জনাই আবার চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, বলল, “সেই থেকেই জুজাক কেমন যেন বদমেজাজি হয়ে গেল। আর ওর বউটা হল উলটো”। 

সরোবরের পশ্চিম পাড়ে বসে থাকা ভল্লার ঝিমধরা মাথায় এই সব কথাই ভনভন করছিল মাছির মতো। পুব আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। অজস্র পাখিদের কলকাকলিতে ভরে উঠছে বিশ্বচরাচর। ভল্লা ডানদিকে সরু সেই পায়েচলা পথটাও দেখতে পেল, জনাই যেমনটি বলেছিল। ওই পথ ধরেই তাকে পৌঁছতে হবে নোনাপুরে। সে জানে না, সেখানে কী অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে। তবে সে সব কথা সে এখন ভাবছেও না। সে ভাবছে তার সঙ্গের এই বিপুল বোঝাটাকে টেনে টেনে কী করে পৌঁছবে আধক্রোশ দূরের ওই গ্রামে।

নিজের শরীর নিয়ে বড় গর্ব ছিল ভল্লার – চিতার মতো সর্বদাই টগবগে আর চনমনে তাজা। অথচ গতকাল   সেই শরীরটাকেই বইতে চাইছিল না তার পাদুটো। যদি ফেলে আসা যেত কোথাও  – কিছুটা হাল্কা হওয়া যেত। আর এই মাথাটা - দুই হাতে ধরে যেটাকে সে এখন সামলাচ্ছে? অসহ্য যন্ত্রণায় দপদপ করছে সর্বক্ষণ। সেটাই বা কম কি? এখন ইচ্ছে হচ্ছে এই নিরিবিলি সরোবরের পাড়ে, ভোরের নরম মায়াবী আলোমাখা প্রান্তরে নিজের শরীরটাকেও ঘাসে বিছিয়ে দিতে। চুলোয় যাক তার কাজ, চুলোয় যাক তার শরীরের সকল যাতনা। ভল্লা সত্যি সত্যিই দুই হাত-পা মেলে নিজেকে ছড়িয়ে দিল মাটিতে। নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল ভল্লা, তার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে… উদাসীন। তার চোখের ওপরে প্রতি ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল আকাশের রঙ… নতুন দিনের ভোর এগিয়ে চলেছে নবীন সকালের দিকে। তার চোখ বুজে এল।

চিকা তার কর্তব্যে কোন অবহেলা করেনি, সূর্যোদয়ের অনেক আগেই সে ভল্লাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। তার গায়ে হাত রেখে উদ্বিগ্ন স্বরে বলেছিল, “তুই যাবি কী করে ভল্লা? এতটা পথ। জ্বরে যে তোর গা পুড়ে যাচ্ছে। একটা দিন অন্ততঃ থেকে যা। আমি কিছু জড়িবুটির ব্যবস্থা করি – একটা দিন বিশ্রাম নে, কাল বেরোবি”। ভল্লা সে কথায় কান দেয়নি। দ্রুত নিত্যকর্ম সেরে রওনা হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। চিকা বলেছিল, “তাহলে তুই যাবিই”? ভল্লা সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “আমার রণপা”? রণপা আর চিকার দেওয়া পুঁটলিতে বাঁধা কিছু খাবার নিয়ে ভল্লা রওনা হয়েছিল জনাইয়ের চটির দিকে।

জনাইয়ের চটিতে পৌঁছতে ভল্লার বেশ দেরিই হয়েছিল, প্রায় মধ্য রাত্রি। দরজা খুলে জনাই বেশ বিরক্ত হয়েই বলেছিল “কি রে? এত দেরি করলি?” তারপর প্রদীপের আলোয় তার চেহারা দেখে চমকে উঠেছিল জনাই, “শরীরের এই অবস্থায় রণপা নিয়ে তুই এতটা পথ এলি কী করে? চিকার চটিতেই একটা দিন বিশ্রাম করতে পারলি না? একটা দিনে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত শুনি? হতভাগা, পথে-ঘাটে মরে পড়ে থাকলে – কেউ জানতে পারত? শেয়ালে-শকুনে ছিঁড়ে খেত। তখন কে করত তোর কাজ?”

ভল্লা জনাইয়ের কথার উত্তর না দিয়ে বলেছিল, “একটু শোবার জায়গা করে দিবি? ঘুমোব”। জনাই খাবার এনে দিয়েছিল, ভল্লা খেতে পারেনি। খেতে ভালো লাগছিল না। খড়ের গদির ওপর চাদর বিছিয়ে, বেশ ভালই বিছানা করে দিয়েছিল, জনাই। ভল্লা ভেবেছিল একবার শুতে পারলে ঘুম আর ঠেকায় কে? কিন্তু আশ্চর্য, ঘুম এলই না। যখনই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, একএকটা ছবি ভেসে উঠছিল চোখের সামনে…তন্দ্রা টুটে যাচ্ছিল। ভল্লা পাশ ফিরে শুল। আবারও তন্দ্রা এল, চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্য এক ছবি…। আধো জাগরণ, আধো তন্দ্রায়, এভাবেই এক প্রহর কাল কাটিয়ে সে উঠে বসল। তার পাশের বিছানায় ঘুমোচ্ছে জনাই। জনাইকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাসা করল “নোনাপুর গ্রামটা কোনদিকে রে?”

জনাইয়ের দেওয়া খাবারের পুঁটলি নিয়ে বিদায়ের সময় ভল্লা জিজ্ঞাসা করেছিল, “হ্যারে, রণপা জোড়া দে না, এতটা পথ পায়ে হেঁটে যাওয়ার থেকে – অনেক তাড়াতাড়ি…”।

জনাই কঠিন মুখে বলল, “তোকে তো বারবার বললাম, একটা দিন থেকে যা। শুনলি না। তুই জানিস না? ওপরের নির্দেশ, বাকি পথটা তোকে পায়ে হেঁটেই যেতে হবে! তোর আসল পরিচয় গোপন রাখতে সেটা জরুরি”!     

 

ভল্লা চকিতে উঠে বসল, তার সামনে সরোবরের জলে আকাশের ছায়া, ঈষৎ সবজে। আকাশে সকালের আলো, পূর্ব দিগন্তটা লাল হয়ে উঠেছে। সূর্যোদয় হতে দেরি নেই। জলের কাছে নেমে মুখচোখে জল দিল, মাথাটাও ভিজিয়ে নিল। স্নিগ্ধ শীতল জলের স্পর্শে কিছুটা আরাম পেল। গামছায় মুখ হাত মুছে, সেটা মাথায় বাঁধল শক্ত করে, মাথার দপদপানি কিছুটা কমল। তারপর পাড়ে উঠে হাঁটতে শুরু করল। জনাই বলেছিল, খুব বেশি না, আধক্রোশ মত হবে…শালা, জানোয়ারের বাচ্চা জনাই, সরু সরু দুটো মাত্র পায়ে ভর দিয়ে এই ভারি শরীর আর মাথাটাকে আধক্রোশ টেনে নিয়ে যাওয়াটা, তোর কাছে ছেলেখেলা না? কোন ধারণা আছে তোর, সুস্থ সবল একটা শরীর কখন নিজের কাছেই অবাঞ্ছিত মনে হয়? নামতে নামতে সে একবার পড়ে গেল, ঢালু রাস্তায় গড়িয়ে নেমে এল বেশ কিছুটা।

ভল্লা কোনরকমে উঠে দাঁড়াল, আবার হাঁটতে লাগল। একটা পা মাটি থেকে তুলে সেটাকে সামনে এগিয়ে রাখতে এত যে কষ্ট হয়, ভল্লা এর আগে কোনদিন টের পায়নি। তার সারা শরীর কাঁপছে। তার পিছনের পা কাঁপছে থরথর করে। তবু ভল্লা এগিয়ে চলল। গুয়োর ব্যাটারা, এতদিন খাওয়ালাম, পরালাম, এখন এই আধক্রোশ পথ পার হতে হেদিয়ে মরছিস? তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সামনে পড়ে থাকা মেটে রঙের মাদুরের মতো বিছানো পথ। তার দুপাশে একঘেয়ে সবুজ পর্দার মতো ঝোপঝাড়। কোন কিছুই তার চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ছে না। পাখিদের প্রভাতী ব্যস্ততা, তাদের অজস্র ওড়াউড়ি, সে কিছুই দেখছে না। এমনকি অজস্র পাখিদের ব্যস্ত-কাকলিও তার কানে আসছে না। তার কানে আসছে শুধু তার নিজেরই বুকের শব্দ। ধক ধক – ধক ধক। তার সমস্ত চেতনা জুড়ে এখন ওই একটাই আওয়াজ।

কতক্ষণ ভল্লা জানে না। তার মনে হল, হয়তো মাসাধিক কাল, কিংবা কয়েক বছর ধরে চলছে তার ই পথ চলা। একসময় তার নজরে এল পথের ডানদিকের সবুজ পর্দাটা আর নেই… ছোট্ট পাতায় ছাওয়া বাড়ি, তার সামনে কাঠের খুঁটির বেড়া দেওয়া প্রশস্ত অঙ্গন। ঘটিতে জল নিয়ে এক রমণী দাঁড়িয়ে আছে পথের ধারে, অবাক চোখ মেলে তাকেই দেখছে। ভল্লার দুই পা এবার জলস্রোতে নদীর পাড়ভাঙার মতো ধ্বসে পড়ল। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে ভল্লা অস্ফুট স্বরে ডাকল, “মা…”। তার চেতনা থেকে সকালের স্নিগ্ধ আলোটুকু নিভে গেল। সে ডুব দিল নিশ্চিন্ত অন্ধকারে।

 

 

শুকনো পাতা দিয়ে বানানো গদিতে ভল্লা শুয়ে আছে। আজ পাঁচদিন হল সে একইভাবে শুয়ে আছে, নিশ্চেতন।   তার মাথার কাছে বসে আছেন জুজাকের বউ। জুজাক দাঁড়িয়ে আছে্ন পায়ের দিকে। আর নীচু হয়ে বৃদ্ধ কবিরাজ হাতের নাড়ি পরখ করছেন ভল্লার। কিছুক্ষণ পর কবিরাজ ভল্লার হাতটা নামিয়ে দিলেন বিছানায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “জুজাক, আমার মন বলছে, ছোকরা এ যাত্রায় বেঁচে গেল। হতভাগার বাপ-মায়ের কপাল ভালো বলতে হবে।”

জুজাকের বউ, জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, “ওফ্‌ যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল। ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন”।

জুজাক বিরক্ত হয়ে বললেন, “ছোকরা যদি বাঁচে - সে কবিরাজদাদার ওষুধে আর তোমার সেবায়। এর মধ্যে ভগবান এল কোত্থেকে? যত্তো সব। আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি, কবিরাজদাদা। ছোকরা চোর না ডাকাত? নাকি পালিয়ে বেড়ানো অপরাধী? কিছুই জানি না আমরা। ছোকরা একটু সুস্থ হলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দূর করে দেব গ্রাম থেকে”।

কবিরাজ বললেন, “দেখ জুজাক, আমাদের কর্তব্য অসুস্থকে সারিয়ে তোলা। সে ডাকাত হোক কিংবা সাধু মহারাজ, তাতে কিছু যায় আসে না। আমার ধারণা আর এক-দুদিনের মধ্যে ও উঠে-হেঁটে বেড়াতে পারবে। তারপরে তুমিও গ্রাম-প্রধানের কর্তব্য শুরু করতে পারো। আমার কোন বক্তব্য থাকবে না”।

জুজাকের বউ উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “কিন্তু কবিরাজদাদা, ওর তো এখনও জ্ঞানই ফিরল না। একবারের জন্যেও চোখ মেলে তাকাতে পারল না। আপনি বলছেন, দু-একদিনের মধ্যে…”।

কবিরাজ বললেন, “শাস্ত্রে বলে, আমাদের জীবনকে চালনা করে প্রাণশক্তি। ওর ভেতরে সেই প্রাণশক্তির সাড়া আমি পেয়েছি, মা কমলি। চিন্তা করো না আজ বিকেলে অথবা কাল সকালে ওর জ্ঞান ফিরবে, চোখ মেলে তাকাবে। ওর জ্ঞান ফিরলেই আমাকে সংবাদ দিও মা, আমি আসব। এখন আসি”।

জুজাক কবিরাজমশাইকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে অঙ্গন পার হয়ে পথ পর্যন্ত সঙ্গ দিলেন, তারপর বিদায় জানিয়ে, ঘরে ফিরে এসে বললেন, “যত্তো উটকো ঝামেলা, ঘাড়ে এসে আচ্ছা জুটল। কোথাকার কে, ঠিক, ঠিকানা নেই…”।

কমলি বললেন, “ভোরবেলা সদরে জলছড়া দিতে গিয়ে দেখলাম, বেচারা আমাদের দুয়োরের সামনেই পা দুমড়ে, মুখ থুবড়ে একবার যে পড়ল আর উঠল না। একজন মানুষের এমন অসহায় অবস্থায় ওকে রাস্তাতেই ফেলে আসব?”

জুজাক একটু বিরক্ত স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, সে কী আর আমি জানি না? আশেপাশের লোককে ডেকে এনে, ব্যাটাকে ঘরে এনে তুললাম তো। তুমিও তো দিন নেই, রাত নেই। নাওয়া নেই খাওয়া নেই সেবা করে চলেছ। বলি, আর কদ্দিন? কবিরাজদাদা বললেন, আজই ওর জ্ঞান ফিরবে, আমি কাল পরশু গ্রামের দশজনকে নিয়ে সভা ডাকব…তার পর দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব। হতভাগা যেখানে খুশি চলে যাক, আমাদের কোন মাথাব্যথা থাকবে না”।

কমলি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “অসুস্থ একটা মানুষকে নিয়ে তোমার খালি এক কথা – ঘাড় ধাক্কা দেব, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব…”

জুজাক কিছু বললেন না, “ঘোঁত” করে নাক দিয়ে শব্দ করলেন।

 

কবিরাজমশাইয়ের কথাই ঠিক হল, সেদিন বিকেলেই ভল্লার জ্ঞান ফিরল, চোখ মেলে তাকাল। সে কতদিন অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে, সে জানে না। কিন্তু অবরে সবরে অর্ধচৈতন্য অবস্থাতেও যখনই সে ঘোলাটে চোখ মেলেছে- দেখেছে মায়াবী এক রমণীর মুখ। তার মুখের দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে রয়েছেন…। আজ জ্ঞান ফেরার পর চোখ মেলে তাকিয়ে সেই রমণীর মুখই সে দেখতে পেল। গভীর কৃতজ্ঞতায় সে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করতে পারল শুধু একটিই শব্দ, “মা…। কমলির মুখে হাসি, দু চোখে অশ্রুর প্লাবন। দু হাতে ভল্লর মুখটি ধরে বললেন, “কি বলছিস, বাবা?” তারপর চেঁচিয়ে স্বামীকে ডাকলেন, বললেন, “শুনছো, ছেলেটা কথা কয়েছে, আমাকে মা ডেকেছে…” ।

জুজাক উঠোনে খাটিয়ায় বসে চারজন প্রবীণ প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্পগাছা করছিলেন। বউয়ের ডাক শুনে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দেখলেন কমলির মুখের হাসি, আর চোখে জল। রাগত স্বরে বললেন, “হুঁঃ তবে আর কি? উলু দাও, শাঁখ বাজাও… আমি ততক্ষণ কবিরাজদাদাকে সংবাদ পাঠাই”।

সন্ধের একটু পরে কবিরাজমশাই এসে ভল্লাকে দেখে সন্তুষ্ট হলেন, তাঁর মুখে মৃদু হাসি। তিনি পুরোন ওষুধ পালটে কিছু নতুন বটিকা দিলেন। বললেন, “বৌমা, এবার কিন্তু আর শুধু সেবা নয়, উপযুক্ত পথ্যিও দরকার মনে রেখো”। কমলিকে তিনি নতুন বটিকা আর পথ্যের নির্দেশ বুঝিয়ে জুজাককে বললেন, “চলো জুজাক, আমরা বাইরে বসি”।

কবিরাজ মশাই বাড়ির বাইরে আসতেই প্রতিবেশীদের সবাই উঠে দাঁড়াল, জিজ্ঞাসা করল, “কেমন দেখলেন, কবিরাজমশাই?”

কবিরাজমশাই আসনে বসতে বসতে বললেন, “তোমরা সবাই অমন উঠে পড়লে কেন হে? বসো, বসো। ছোকরার বিপদ কেটে গেছে, আর কোন ভয় নেই। আমার ধারণা, কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠবে”।

সকলেই বসতে বসতে বলল, “যাক বাবা, যে অবস্থায় এসেছিল, অচেনা আগন্তুক – তবু মানুষতো...”।

জুজাক ঝেঁঝে উঠে বললেন, “আমার ঘাড় থেকে হতভাগা নামলে বাঁচি। ওঠা-হাঁটা শুরু করলেই স্পষ্ট বলে দেব, পথ দেখ বাছা...”।

কবিরাজমশাই হাসলেন, বললেন, “মাতৃবৎ সেবা করে বৌমা যেভাবে ওকে বাঁচিয়ে তুলল, তাতে ব্যাপারটা অত সহজ হবে না, জুজাক”।

জুজাক বললেন, “ছেলেটার সম্বন্ধে আমরা কোন কিছুই জানি না। কোথায় কোন অপাট কাজ করে এখানে গা ঢাকা দিয়ে থেকে গেল – তারপরে রাজাধিকারিকদের কানে গেলে, আমাকে ভিটেমাটি ছাড়া করবে যে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই বললেন, “তা বটে। কিন্তু আমরা ধরেই বা নিচ্ছি কেন, ছেলেটা কোথাও কুকীর্তি করে এখানে জুটেছে। ওর পরিচয় কি? কোথা থেকে এল? কী করে এমন অবস্থা হল? সেসব কথা বলার একটা সুযোগ কী আমাদের দেওয়া কর্তব্য নয়? কী বলো হে, তোমরা?”

উপস্থিত প্রতিবেশীরা বললেন, “ঠিকই বলেছেন কবিরাজমশাই, তবে জুজাকভাইয়ের ওপরে চাপটা তো বেড়েই যাচ্ছে”।

জুজাক বললেন, “সে কথাটা তোমরা একবার ভাল করে বোঝাও দেখি, আমার বউকে আর কবিরাজদাদাকে...। আমরা তো আর উত্তর কিংবা পূবের লোকদের মতো সম্পন্ন নই, যে অতিথিকে নারায়ণ জ্ঞানে সেবা করে প্রচুর পুণ্য কামাব। নিজেরাই ঠিক মতো খেতে পাই না...তার মধ্যে এই উটকো আপদ...”।

কবিরাজমশাই চিন্তিত মুখে বললেন, “তোমার উদ্বেগের কারণ আমি বুঝছি, জুজাক। তবে আমি ছেলেটির স্বাস্থ্য, হাত-পায়ের লক্ষণ দেখে যেটুকু বুঝেছি – বসে বসে অন্ন ধ্বংস করার ছেলে এ নয়। যথেষ্ট দক্ষ এবং খাটিয়ে ছেলে। যে অবস্থায় ওকে প্রথম দেখেছি, সাধারণ, মানে আমাদের ঘরের ছেলেপুলে হলে, অনেক আগেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হত”।

জুজাক সন্দেহের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওকে তোমার অসাধারণ বলে মনে হচ্ছে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই মৃদু হাসলেন, বললেন, “অসাধারণ তো বটেই এবং যথেষ্ট শক্তিমান যুবক। ওর বুকে পেটে, হাতে পায়ে, বেশ কিছু পুরোনো ক্ষতের দাগ রয়েছে। কিন্তু পিঠে তেমন কিছু নেই। এ সবই একজন বীর যোদ্ধার লক্ষণ জুজাক”।

কবিরাজমশাইয়ের কথায় কেউই কোন কথা বলল না। কিছুক্ষণ পরে কবিরাজমশাই আবার বললেন, “যদি বিশেষ কোন উদ্দেশে এখানে না এসে থাকে, একটু সুস্থ হলে ও নিজেই চলে যাবে। তবে ছেলেটি এসেছে অনেক দূর থেকে – সেক্ষেত্রে হয়তো এখানে আসাটাই ছিল ওর উদ্দেশ্য”।

জুজাক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার তাই মনে হচ্ছে? কিন্তু রাজ্যের এই প্রান্তসীমায় একা একজন বীর যোদ্ধা আসার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে, কবিরাজদাদা?”

কবিরাজমশাই হাসলেন, বললেন, “তা তো বলতে পারব না। আমি কবিরাজ, গণৎকার নই। কয়েকটাদিন ধৈর্য ধরে দেখা যাক না, ছেলেটি কী বলে। তারপর না হয়, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত স্থির করব। আজ উঠিআমি পরশু আবার এসে একবার দেখে যাব”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৪ "


নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...