এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ "
অন্যান্য সম্পূর্ণ উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "
শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "
[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]
এই উপন্যাসের ষষ্ঠ পর্ব - "এক যে ছিলেন রাজা - ৬ষ্ঠ পর্ব"
১৫
সেই
দিন পুত্র বেণের কক্ষ থেকে অপমানিতা হয়ে ফেরার পর, রাজমাতা ভীষণ মনোকষ্টে দিন
কাটাচ্ছেন। কখনো নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছেন। কখনো ধিক্কার দিচ্ছেন পুত্রকে,
পুত্রের উদ্ধত আচরণকে। কখনো স্বামী মহারাজ অঙ্গকেও - তিনি কেন কঠোর হননি? স্নেহে
অন্ধ মাতা, পুত্রকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে বুঝেও,
মহারাজ অঙ্গ কেন শাসন করেননি দুজনকেই? আবার কখনো আকুল অশ্রুসিক্ত নয়নে ঈশ্বরের
কাছে প্রার্থনা করেছেন, হে ঈশ্বর, দয়া করো, কৃপা করো, করুণা করো। এই সবের মধ্যেও
দিনে রাতে সর্বদা, তিনি অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন, তাঁর পুত্র বেণ ঠিক এসে
দাঁড়াবে তাঁর সামনে। সে নিজের ভুল বুঝতে পারবেই। রাগের মাথায় কী বলতে কী বলে
ফেলেছে, অনুশোচনা তার হবেই। গতকাল আসেনি, আজও এল না, আগামীকাল নয়তো পরশু নিশ্চয়ই
আসবে। পুরুষমানুষ খুব অহংকারী হয়, ভাঙে কিন্তু মচকায় না। সময় নেবে কিন্তু সেই
ভাঙবেই। কিন্তু আসবে ঠিক। পুত্র বেণ সামনে এসে দাঁড়িয়ে যখন বলবে, “মা, আমার ভুল
হয়ে গেছে, মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও” তিনি কী করবেন, মনে মনে তাও ঠিক করছিলেন। কখনো
ভেবেছেন, বুকে জড়িয়ে ধরবেন, কান্নাধরা গলায় বলবেন মায়ের কাছে ভুল করে, ক্ষমা চাইতে
হয়, বাবা?” কখনো ভেবেছেন, নাঃ, অত সহজে মেনে নেওয়াটা ঠিক হবে না। কঠিন মুখ করে খুব
দু চার কথা শুনিয়ে দেবেন কট কট করে। তারপর পুত্রের আনত ম্লানমুখের দিকে তাকিয়ে,
মৃদু হেসে বলবেন, “এতদিনে আমার পুত্র-মহারাজের ক্রোধ প্রশমিত হল”? এইভাবেই পক্ষকাল
চলে গেল, কিন্তু পুত্র বেণ এল না। তিনি সংবাদ পান, তাঁর পুত্র এখন রোজই সন্ধ্যা
থেকে রাত্রি শেষ পর্যন্ত, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননেই থাকে। এর মধ্যে
অন্ততঃ তিন দিন নটী বিদ্যুল্লতাকে নিয়ে তাঁর পুত্র নব নির্মীয়মাণ উদ্যানকানন
পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন। অসহায় মনোকষ্ট অসহ্য হয়ে ওঠাতে তিনি গতকাল মহর্ষি ভৃগুর
সাক্ষাৎপ্রার্থিনী হয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন। আজ বৈকালে, সেই দূত ফিরে
এসে বার্তা দিল, মহর্ষি ভৃগু মহারাণির কাছে ক্ষমাভিক্ষা করেছেন। বলেছেন, বর্তমান
পরিস্থিতিতে তাঁর প্রাসাদে আসা সমীচীন নয়। উপযুক্ত সময়ে, মহারাণির অনুগ্রহের আশায়,
তিনি নিজেই আসবেন।
দূতের
মুখে মহর্ষির বার্তা পাওয়ার পর থেকে, নিজের ঘরে এই বাতায়নের সামনে বসে, নিজের
চিন্তাতেই ডুবেছিলেন মহারাণি সুনীথা। বিকেলের পাখিরা ফিরে এসেছে তাদের নিশ্চিন্ত
বাসায়। রাজপ্রাসাদের উপবন তাদের কাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছিল অনেকক্ষণ। সূর্য অস্ত
যাওয়ার পর অন্ধকার তার আঁচল বিছিয়ে ঢেকে দিল চারি পাশ। ঝোপে ঝাড়ে একটা দুটো জোনাকি
জ্বলে উঠল, শিকারের সন্ধানে উড়াল দিল নিশাচর উলূক। কৃষ্ণঘন আকাশের গায়ে রূপোলী
চুমকির মতো জ্বলে উঠল একটা দুটো তারা। পদ্মবালা তাঁর ঘরে জ্বেলে দিল মঙ্গলদীপ ও
দেওয়ালগিরি। সেই আলোকিত ঘরের দিকে তাকিয়ে রাজমাতা সুনীথার মনে হল, এ সব অকারণ।
তাঁর জীবন থেকে সব আলোই যখন মুছে গেছে, তখন এই আলোকসজ্জা অবান্তর বাহুল্য।
তিনি
দাসী পদ্মবালাকে বললেন, “পদ্ম, এই ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দে। অন্তরে বাইরে আজ সব
অন্ধকার হয়ে উঠুক, আমার জীবনে সমস্ত আলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আলো আমাকে আর আনন্দে
উদ্ভাসিত করতে পারে না। আলো আমার এই নির্মম পরিণতির উন্মোচন করে। আমি আলো চাই না,
অন্ধকারের মধ্যে আমাকে আত্মগোপন করতে দে”।
কিশোরী
সুনীথার পিতৃগৃহ থেকেই পদ্মবালা তাঁর নিত্য সহচরী। মহারাণি হয়ে যেদিন তিনি এই
প্রাসাদে পা রেখেছিলেন, সেই দিন থেকে দাসী পদ্মবালাও তাঁর সুখে দুঃখে হাসি কান্নায়
নিত্য সঙ্গী। মহারাণির কথায় পদ্মবালা, একটুও আশ্চর্য হল না। পিত্রালয়ের স্নেহ,
আদরে বড়ো হয়ে ওঠা সেই কন্যা, মহারাজের সহধর্মিণী হয়ে এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের
মহারানি সুনীথা অনেক সম্মান, অনেক মর্যাদা আর সুখ উপভোগ করেছেন সারা জীবন। নিয়তির
আশ্চর্য ক্রীড়ায় আজ তিনি একান্ত অসহায়, একমাত্র পুত্রের কাছে অপমানিতা অভাগিনী
নারী।
তাও
আজীবনের সহচরী সুনীথার এই পরিণতি পদ্মবালারও সহ্য হয় না, সে বলল, “রাজকুমারী, অন্য
সব আলো নিভিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আশার আলোর মতো এই ছোট্ট দীপটি জ্বলুক, আশা ছাড়া কী
করে বেঁচে থাকবে? নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কীভাবে খুঁজে পাবে, বাইরে বেরোনোর পথ”?
“তোর
এই উপদেশ আর ভালো লাগছে না পদ্ম, চুপ কর। আমাকে একটু একা থাকতে দে”।
পদ্মবালা একটিমাত্র দীপ রেখে, ঘরের সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যাবার সময় বলে গেল, “আমি পাশের ঘরেই রইলাম রাজকুমারী। তোমার পাশেই আমি থাকবো সারাক্ষণ”। পদ্মবালা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, রাজমাতা সুনীথা জানালার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আর ডুব দিলেন নিজের চিন্তায়।
আজ প্রায় ঊণিশমাস হল তাঁর পুত্র বেণ, পিতার সিংহাসনে বসেছে। সে রাজা হয়ে, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য আজ পর্যন্ত কী করেছে, তিনি জানেন না। কিন্তু পুত্রের অজস্র অত্যাচার, অবিচার আর অনাচারের কথা তাঁর কানে আসছে অহরহ। মহারাণি সুনীথার গর্বিত শির, এখন রাজমাতা হয়ে লজ্জায়, অনুশোচনায় অবসন্ন, অবনত। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের পর তিনি এখন মহর্ষি ভৃগুকেই একমাত্র ভরসা করতে পারেন। কিন্তু মহর্ষির এই বার্তাতে মহারাণি আরও বিষণ্ণ হলেন। মহর্ষির মতো ব্যক্তি প্রাসাদে আসা সমীচিন নয় বলেছেন, কেন? তাঁকে কে বাধা দেবে, রাজা বেণ? মহর্ষি ভৃগুও কী তাহলে নিরাপদ নন?
মনে হয় যেন, এই তো সেদিন। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের
সংবাদ পেয়ে, মহর্ষি ভৃগু নিজেই এসেছিলেন, প্রাসাদে অনেকক্ষণ ছিলেন। তিনি এসেছেন
শুনে মহারাণি সুনীথা, মহর্ষি ভৃগুকে প্রণাম করে, তাঁর পায়ের কাছে বসেছিলেন,
কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সবকিছু ছেড়ে, অমন মানুষটা হঠাৎ কোথায় চলে
গেলেন, মহর্ষিঠাকুর? আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি সব জানেন। দয়া করে বলুন। আমাদের যদি কোন
অপরাধ হয়ে থাকে, আমি নিজে গিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো। যে শাস্তি তিনি
দিতে চান, আমি মাথা পেতে নেব। আপনার অনুমতি ছাড়া উনি কোন কাজই করতেন না, সে তো
আপনি জানেন, ঠাকুর। মহারাজ কেন এমন করলেন? কোথায় চলে গেলেন?” শোকে বিহ্বল মহারাণি
একইভাবে, তাঁর পায়ের কাছে বসে একটানা বিলাপ করছিলেন, আর তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন
দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি ভৃগু একটি কথাও বলেননি, তীক্ষ্ণ চোখে শুধু তাকিয়েছিলেন,
মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ পর তিনি নিষ্প্রাণ স্বরে বলেছিলেন, “শান্ত হোন,
মহারাণি। শক্ত হোন। বেশ কয়েক বছর ধরেই, মহারাজ অঙ্গ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন,
এ কথা তো আপনার অজানা নয়। একই কারণে তিনি আমার সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলেন।
কীসের যন্ত্রণা, কে তার কারণ, সে কথা আমার থেকেও আপনি অনেক ভাল জানেন, মহারাণি।
পুত্র বেণ কোথায়? তাকে দেখছি না? এই সময়, তার উচিৎ মাতার সঙ্গে থাকা”!
মহর্ষির কথায় কেউ একজন সংবাদ দিল, মহারাজ অঙ্গপুত্র
বেণকে। বেণ এল তার
আসার দিকে তাকিয়ে রইলেন, মহর্ষি ভৃগু। সামনে এসে যখন দাঁড়াল, মহর্ষির তীক্ষ্ণ
দৃষ্টির থেকে চোখ সরিয়ে নিল, মাথা নীচু করল। কিন্তু সেই মাথা নত করার মধ্যে কোন
শোক, বিষাদ কিংবা দুঃখের লেশ মাত্র খুঁজে পেলেন না মহর্ষি।
রাজমাতা সুনীথা বললেন, “মহর্ষিকে প্রণাম কর, বেণ”।
মায়ের কথায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই, বেণ বলল, “প্রণাম,
মহর্ষি”।
প্রাসাদের এই শোকের আবহের মধ্যেও বেণের এই অদ্ভূত
ঔদ্ধত্য মহর্ষির চোখ এড়াল না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আজ তবে
আসি, মহারাণি”।
“এখনই উঠলেন, ঠাকুর? আমাদের এখন কী কর্তব্য, বলবেন না?”
“অপেক্ষা ছাড়া আর কোন কর্তব্য তো এখন দেখছি না, মহারাণি”?
“আপনি বলছেন, তিনি ফিরে আসবেন? আমারও তাই ধারণা, ঠাকুর।
মন কিছুটা শান্ত হলেই তিনি ফিরে আসবেন”।
বেণের অধৈর্য আচরণ মহর্ষির চোখ এড়াল না, বেণ জিজ্ঞাসা
করল, “কিন্তু মা, কতদিন? কতদিন তিনি আমাদের অপেক্ষায় রাখবেন?”
রাজমাতা সুনীথা বললেন, “হয়তো কাল, হয়তো পরশু। অথবা এক
মাস। সে কথা তিনিই জানেন পুত্র”!
“কিন্তু রাজ্য, রাজকার্য? অনির্দিষ্ট কালের জন্যে সব থমকে
থাকবে?”
বেণের এই কথায় মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুমি কী চাইছ বৎস?
পিতার অন্ত্যেষ্টি? পারলৌকিক অনুষ্ঠান?”
মহর্ষির শান্ত অথচ দৃঢ় এই প্রশ্নে বেণ হঠাৎ কোন উত্তর
দিতে পারল না, যুবরাজমাতা সুনীথাও তাকিয়ে রইলেন পুত্রের মুখের দিকে, তাঁর দৃষ্টিতে
আশ্চর্য আতংক।
কিছুটা সামলে নিয়ে, বেণ উত্তর দিল, “না, না তা কেন?
অপেক্ষা আমরা করবো, কিন্তু রাজকার্যও অবহেলার নয়, মাতা”। মহর্ষি ভৃগু আর কিছু
বললেন না, বেণের মুখের দিকে তাকিয়ে, বললেন, “আমাকে অনুমতি দিন, মহারাণি”।
এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই রাজরাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুকে
ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পরামর্শের জন্য। সে সময় মানসিক দ্বিধায় তিনি নিজের
কর্তব্য-অকর্তব্য কিছুই স্থির করতে পারছিলেন না। স্বামীর অদ্ভূত অন্তর্ধানের পর,
একদিকে তাঁর পুত্র অতি দ্রুত সিংহাসনের উত্তরাধিকার চেয়ে নিজের রাজ্যাভিষেক
চাইছিল। অন্যদিকে মহারাজ অঙ্গের মন্ত্রী, অমাত্য সকলেই, এই অভিষেকে আপত্তি করছিলেন।
তাঁরা বলেছিলেন, মহারাজ অঙ্গ কোথায় গেলেন, কেন গেলেন, আর ফিরে আসবেন কিনা, সে
সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে, পুত্রের রাজ্যাভিষেক করানোর অর্থ মহারাজ অঙ্গকে সম্পূর্ণ অস্বীকার।
মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থেই গিয়ে থাকেন, তিনি তো অনায়াসেই পুত্রের হাতে রাজ্যভার
তুলে দিয়ে যেতে পারতেন। ধার্মিক রাজারা এমনই করেন, আর মহারাজ অঙ্গের মতো ধর্মে
অবিচল রাজা, এমন করলে কিছুমাত্র অস্বাভাবিক হত না।
কিন্তু তিনি কোথায়? একদিকে স্বামীর অদ্ভূত এই আচরণ
তারওপর পুত্র বেণের সিংহাসন লাভের জন্য উদগ্র ব্যস্ততা তাঁকে বিহ্বল করে তুলেছিল।
তিনি ভেবেছিলেন, পিতার সিংহাসনে বসে, পুত্র বেণ রাজ্যের পূর্ণ দায়িত্ব পেলে, সে শান্ত
হয়ে যাবে। হয়তো রাজা অঙ্গেরও এটাই অভিপ্রায়। পিতার অনুপস্থিতিতে পুত্র বেণ রাজা
হিসাবে কেমন আচরণ করে, সেই পরীক্ষার জন্যেই হয়তো তিনি আত্মগোপন করে আছেন। আর সেই
দ্বিধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যেই, পুত্রকে অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেবার আগে
তিনি মহর্ষি ভৃগুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে সেদিন নিভৃত কক্ষের আলোচনায়, ছিলেন
শুধু মহারাণি সুনীথা আর তাঁর বিশ্বস্ত দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি আসন নেওয়ার পর,
মহারাণি তাঁর চরণ বন্দনা করে নিজের মানসিক দ্বন্দ্বের কথা খুলে বললেন। এখন তাঁর কী
কর্তব্য সেটাও জিজ্ঞাসা করলেন।
সব শুনে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অনুপস্থিতিতে
আপনি রাজ্যভার গ্রহণ করছেন না, কেন মহারাণি? আমার মনে হয় তাতে আপনার মন্ত্রী,
অমাত্যদের কোন আপত্তি হবে না। আর মহারাজ অঙ্গ অদূর ভবিষ্যতে যদি ফিরেও আসেন, তাঁর
পক্ষেও ব্যাপারটা আদৌ অসম্মানজনক হবে না”।
“এ আপনি কী বলছেন, মহর্ষিঠাকুর? রাজ্য চালনার আমি কী
জানি, কী বুঝি? রাণি হিসাবে আমি এতদিন রাজঅন্তঃপুর সামলে এসেছি, কিন্তু রাজ্য
সামলানো কী আমার পক্ষে সম্ভব? এ কাজ পুরুষের কাজ। রাজার উত্তরাধিকার হয়ে পুত্র
বেণই কী তার পিতার সিংহাসনের যোগ্য দাবিদার নয়?”
মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, “মহারাণি, আপনার পুত্র, তার
পিতার যোগ্য উত্তরাধিকার কিনা, সে বিষয়ে আপনার মনে প্রশ্ন কেন? এই রাজ্যের যোগ্য
উত্তরাধিকার কে, সে বিচারের জন্যে এই রাজ্যের প্রাজ্ঞ মন্ত্রী, অমাত্য, এমনকি
আপনিও কী যথেষ্ট নন? আমাকে প্রশ্ন করা বাহুল্য মাত্র”।
“মহর্ষিঠাকুর, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন
না, এড়িয়ে গেলেন”।
“আমার উত্তর আমি প্রথমেই দিয়েছিলাম, মহারাণি। সে উত্তর
আপনার মনোমত হয়নি, এখন আপনি আমার থেকে আপনার মনোমত উত্তর শুনতে চাইছেন? তাহলে খুব
স্পষ্ট ভাষায় আপনাকে বলি? মহারাজ অঙ্গের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে, আমাদের কারো
মনেই কোন সংশয় নেই। কিন্তু সত্য বলতে, আমরা কেউই চাইছি না, তাঁর পুত্রের হাতে এ
রাজ্যভার যাক। তার কারণ আপনি খুব ভালো ভাবেই জানেন। আজ মহারাজা অঙ্গ যদি স্বেচ্ছায়
আত্মগোপন করে থাকেন, তার কারণও আপনি অনুমান করতে পারছেন”!
“কিন্তু, তাকে একবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না? রাজ্য এবং
পিতার সুকীর্তি রক্ষার দায়িত্ব পেলে, তার মতি যদি পরিবর্তন হয়ে যায়?”
মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মহর্ষি বললেন, “সে
দুরাশা আমরা কেউই করি না, মহারাণি। আর এও জানি পুত্রকে সিংহাসনে অভিষিক্ত না করলে
আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। আবার পুত্রের হাতে রাজ্যভার দেওয়ার পরেও,
দুশ্চিন্তা আপনার নিত্যসঙ্গী হবে”।
“আপনি কী আমাকে আর আমার পুত্রকে অভিশাপ দিচ্ছেন,
মহর্ষিঠাকুর?”
মহর্ষি ভৃগু মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আপনি
পুত্রের রাজ্য অভিষেকের আয়োজন করুন, মহারাণি। নির্দিষ্ট দিনে আমি নিজেই আসবো তাকে
আশীর্বাদ করতে”।
রাজমাতা সুনীথার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, পদ্মবালার পায়ের
শব্দে। ঘাড় ফিরিয়ে পদ্মবালার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, উত্তেজনায় পদ্মবালা
হাঁফাচ্ছে। তিনি বললেন, “কী হয়েছে, পদ্ম? বেণ আসছে?” মাতা সুনীথার কণ্ঠস্বর কেঁপে
উঠল, দুই বক্ষে অনুভব করলেন অদ্ভূত ভার।
পদ্মবালা ইতস্ততঃ করে বলল, “না রাজকুমারী, মহারাজ বেণ
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। রাজবৈদ্যকে বার্তা দেওয়া মাত্র তিনি
প্রমোদকানন থেকে রাজাকে প্রাসাদের কক্ষে আনিয়েছেন। চিকিৎসাও শুরু হয়েছে, কিন্তু
এখনো জ্ঞান ফেরেনি”।
“তুই কি দেখতে গিয়েছিলি”? রাজমাতার কণ্ঠে উদ্বেগ, “আমি
যাবো এখনই, আমার সঙ্গে চল”।
মাথা নীচু করে পদ্মবালা বলল, “গিয়েছিলাম, উপনগরপাল
শক্তিধর আমাকে ঢুকতেই দিল না। বলল, আপনি বা আমি গেলে মহারাজ বেণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে
পারেন। রাজবৈদ্য বলেছেন, জ্ঞান ফেরার পর কোন রকম উত্তেজনা, রাজার পক্ষে মারাত্মক”।
পদ্মবালার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রাজমাতা, তারপর অস্ফুটে বললেন, “তাই বুঝি”?
১৬
প্রিয় দুই শিষ্য,
বিশ্ববন্ধু আর রণধীরকে নিয়ে মহর্ষি ভৃগু বহুদিন পর আজ প্রাসাদে এলেন। প্রায় ঊণিশ মাস আগে, মহারাজা বেণের
অভিষেকের দিন তিনি শেষ এসেছিলেন। সেদিন নবীন রাজাকে আশীর্বাদ করে, রাজমাতার অনুমতি
নিয়ে, বিদায় নিয়েছিলেন। তারপর আর একবারের জন্যও তিনি আসেননি। অথচ মহারাজ অঙ্গের
সময়, তিনি এই রাজ্যে উপস্থিত থাকলে, পক্ষকালের মধ্যে অন্ততঃ একবার তাঁকে আসতেই
হতো। মহারাজ অঙ্গের আন্তরিক সখ্যতা তাঁকে বার বার টেনে আনতো এই প্রাসাদে।
মহারাজ বেণের প্রাসাদে প্রবেশের মুখেই উপনগরপাল শক্তিধর তাঁকে বাধা দিলেন, বললেন, “মহারাজ বেণ এখন বিশ্রাম করছেন, মহর্ষি। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়”।
“বৎস
শক্তিধর, আমরা রাজা বেণের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ করতে আসিনি, সে কথা তোমার না বোঝার
কোন কারণ নেই। তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা আমাদের
সকলের কর্তব্য। সে কাজে বাধা দিলে, তুমি রাজা বেণের আরোগ্যকেই হয়তো বিলম্বিত করবে”।
“কিন্তু
তাঁর চিকিৎসায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় নিযুক্ত রয়েছেন, মহর্ষি”।
“অবশ্যই
থাকবেন, তিনি এখন কোথায়”?
“মহারাজের
কক্ষে”।
“অতি
উত্তম, আমরা তাঁর সঙ্গেও কী একবার সাক্ষাৎ করতে পারি না? বৎস শক্তিধর তুমি হয়তো
জানো না, রাজবৈদ্য মৈত্রেয়, আচার্য বিশ্ববন্ধুর এবং আমারও প্রিয় শিষ্য। তাঁর থেকে
রাজা বেণের শারীরিক অবস্থার সম্যক ধারণা পেলে, আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি”।
উপনগরপাল
শক্তিধর রাজা বেণের উপর এতটাই নির্ভরশীল, তার নিজস্ব কর্তব্য-অকর্তব্য বোধ এখনো
গড়ে ওঠেনি। মহর্ষি ভৃগুর মতো দেশ বরেণ্য ব্যাক্তিত্বের সামনে তার বাধার জোরও টিকলো
না। তাছাড়া আর কিছু না জানুক, মহর্ষি ভৃগুর অগাধ পাণ্ডিত্যের কথা তারও অজানা নয়।
তার মনে হল, মহর্ষির সাক্ষাতে রাজাবেণের চিকিৎসার সত্যিই উপকার হতে পারে! আর
রাজাবেণ সুস্থ হয়ে না উঠলে, শক্তিধর নিজেই যে শক্তিহীন হয়ে যাবে, সে বিষয়েও তার
কোন সন্দেহ নেই। মহর্ষি ভৃগু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বেণের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন,
তাঁদের পিছনে চললেন শক্তিধর নিজেও!
তিনজন সেবক ও দুই জন সেবিকা নিয়ে, রাজবৈদ্য মৈত্রেয় মহারাজ বেণের চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছিলেন। অঙ্গপ্রলেপ ও মাথায় বিন্দু বিন্দু তৈল নিষেক চলছিল। কক্ষে সশিষ্য মহর্ষি ঢুকতেই রাজবৈদ্য মৈত্রেয় এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন তিন জনকেই। সেবক সেবিকারাও তাঁদের নমস্কার করলেন, কিন্তু তাদের সেবা কার্য থামল না। চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে, মহর্ষি মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাজার অবস্থা কেমন, বৎস মৈত্রেয়?”
“এখনো
পর্যন্ত খুব আশাপ্রদ নয়, গুরুদেব। সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ
অত্যন্ত ক্ষীণ। প্রথম রাত্রির তুলনায় অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়েছে। আজ রজনী শেষে ত্রিরাত্রি
পূর্ণ হবে। আশা করি আগামীকাল অবস্থার আরও উন্নতি হবে”।
“প্রাণ
সংশয়ের কোন লক্ষণ পাচ্ছো না তো?”
“না,
না, গুরুদেব প্রাণ সংশয়ের কোন লক্ষণ নেই। তবে...”
“তবে
কী?” উপনগরপাল শক্তিধর পিছন থেকে জিজ্ঞাসা করল।
“নিশ্চিত
করে বলার সময় এখন নয়, তবে জড়ত্বের সমূহ সম্ভাবনা”।
“জড়ত্ব? তার মানে?” শক্তিধর উদ্বিগ্ন মুখে আবার জিজ্ঞাসা করল। আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “সে কথা শ্রীমৈত্রেয় আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলবেন, শ্রীশক্তিধর। এখন আমাদের কথা বলতে দিন”। মহর্ষি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাজা বেণকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন, “বৎস মৈত্রেয়, তিন মাত্রা ব্রাহ্মীরস ও এক মাত্রা বিশল্যকরণি, মধুর লঘু দ্রবণ সহযোগে সেবন করিয়ে দেখতো পারো। আমার ধারণা মস্তিষ্ক তাতে উজ্জীবিত হবে”।
“তাই
করবো গুরুদেব, আমি দুই-দুই মাত্রায় জলীয় দ্রবণ সহযোগে প্রয়োগ করছিলাম”।
“করে
দেখো, কী হয়”। মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের পায়ের তালুতে হাতের নখ দিয়ে আঁচড় টানলেন,
রাজাবেণের মুখে কোন বিকার দেখা গেল না, তবে ওই পায়ের আঙুলগুলি সামান্য নড়ে উঠল।
“কী থেকে এমন হল, কিছু অনুমান করতে পারছো, বৎস মৈত্রেয়? মাথার পিছনে কিংবা মেরুদণ্ডে কোন স্থূল আঘাতের লক্ষণ?”
উপনগরপাল শক্তিধর একটু উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল, “আঘাত কী করে লাগবে, মহর্ষি”?
এবার আচার্য রণধীর বিরক্ত কণ্ঠে অথচ মৃদু স্বরেই বললেন, “বৎস, শক্তিধর। এই কক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলা অসমীচীন। তাছাড়া আঘাত কী করে লাগবে, সেটা মহর্ষির জানার কথা কী? আপনারই জানার কথা, আপনি মহারাজা বেণের নিরাপত্তার দায়িত্বেও নিযুক্ত না? আঘাত অনেক ভাবেই লাগতে পারে। মদ্যপ অবস্থায় নিজেনিজেই সিঁড়িতে পড়ে যেতে পারেন। কেউ ধাক্কা দিতে পারে। নারী লাঞ্ছনাতে আপনাদের খ্যাতি রাজ্যময়, আত্মরক্ষার সময় কোন কোন আতঙ্কিতা নারীর প্রবল ধাক্কা কী কখনো উপভোগ করেননি?”
আচার্য বিশ্ববন্ধু আচার্য রণধীরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “প্রিয়সখা রণধীর, এই কী তোমার বিতর্কের সময়? অনভিজ্ঞ যুবক, বন্ধুর অনুগ্রহে দৈবাৎ উপনগরপালের দায়িত্ব পেয়েছে, রাজার নিরাপত্তার গুরুত্ব তার পক্ষে কী করে নির্ণয় করা সম্ভব”?
আচার্য রণধীর বললেন, “যথার্থ বলেছ প্রিয় বিশ্ববন্ধু, প্রকাশ্য সন্ধ্যায় রাজার এত বড়ো দুর্ঘটনা হল, তখন রাজার নিরাপত্তা কোথায় ছিল কে জানে? আর আজ এই নির্মল সকালে ভারতবরেণ্য মহর্ষি ভৃগু নিজে, আমাদের দুইজনকে নিয়ে রাজসকাশে আসছেন, তাতে রাজার নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটে যাচ্ছে! বৎস শক্তিধর, বিতর্কে কালক্ষেপ করো না। রাজাবেণের এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হও। শোনা যায়, রাজাবেণ ঘটনার সময় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননে সুরাপানে মত্ত ছিলেন?”
“না
এ মিথ্যা”।
“মিথ্যা?
রাজাবেণ প্রমোদকাননে ওই দিন যাননি?”
“তা
নয়, উনি গিয়েছিলেন, সেখানেই ছিলেন”।
“তবে
যে বললে মিথ্যা?”
“তিনি সুরাপানে মত্ত ছিলেন, এ কথা মিথ্যা”।
এই কথায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “কিন্তু আমরা যখন রাজাবেণকে প্রমোদকানন থেকে এই কক্ষে নিয়ে আসি, তাঁর শরীরে অতিরিক্ত সুরাপানের সমস্ত লক্ষণই ছিল। তাহলে মিথ্যা বলছেন কী করে?”
“আজ্ঞে সুরাপান করছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত নয়”।
মৃদু হেসে রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “আচ্ছা, একজন মানুষের পক্ষে কতটা সুরাপান করলে অতিরিক্ত হয়, সে বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা আছে?”
“না ঠিক তা নয়, তবে...”।
এবার আচার্য রণধীর সামান্য উষ্মা প্রকাশ করেই বললেন, “উপনগরপাল শক্তিধর, আপনি এই রাজধানী শহরের উপনগরপাল, মহারাজা বেণের সুরক্ষার দায়িত্বও আপনার। অথচ আপনার কথাবার্তায় কোন কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। একই প্রশ্নের উত্তরে কখনো বলছেন মিথ্যা, আবার বলছেন না মিথ্যা নয়। আপনি এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? নটী বিদ্যুল্লতার কী ব্যবস্থা করেছেন”?
“কী
ব্যবস্থা মানে?” অভিজ্ঞ আচার্যদের কথায় শক্তিধর ক্রমশঃ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছিল।
“ওঁকে
নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেননি”?
“না, সে আদেশ কী জরুরি? রাজাবেণ নটী বিদ্যুল্লতার একান্ত গুণগ্রাহী। সুস্থ হয়ে রাজা যখন জানবেন, নটী বিদ্যুল্লতা স্বরাজ্যে ফিরে গেছেন, তিনি প্রসন্ন হবেন না”।
একটু বিদ্রূপ করেই আচার্য রণধীর বললেন, “অতি উত্তম, আপনি চাইছেন, রাজা সুস্থ হয়ে উঠে, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে আবার “অতি সীমিত” সুরাপান করে, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ুন”?
“এ
আপনি কী বলছেন? আমি রাজার একান্ত অনুগত দাস, রাজার সেবাতেই নিয়োজিত”।
“কিন্তু কই? তেমন কোন দায়িত্ববোধ তো আমরা দেখছি না?”
উপনগরপাল
শক্তিধর আচার্যদের কথাবার্তায় দিশাহারা হয়ে উঠল। তার শক্তি ছিল রাজা বেণের প্রশ্রয়,
এখন তাঁর অসুস্থতায় তার প্রশাসনিক যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। তার কাছে রাজাবেণের
সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা যে কতটা জরুরি, সে কথা বুঝতে তার আর বাকি রইল না। রাজাবেণ
যদি সুস্থ না হন, তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই আশঙ্কায় সে শিউরে উঠল। উপনগরপাল শক্তিধর
এতক্ষণে উপলব্ধি করল, সে প্রথম থেকেই এই আচার্যদের যোগ্য কোন সম্মানই দেয়নি। পরিবর্তিত
পরিস্থিতিতে, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ এই আচার্যরা তাকে রক্ষাও যেমন করতে পারেন, তেমনি
তার অযোগ্যতা প্রমাণ করে কঠোর শাস্তি বিধানও করতে পারেন। রাজাবেণ যতদিন অসুস্থ,
তাঁর নামে এই আচার্যরাই এই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ করবে, এ কথাটাও সে এখন উপলব্ধি করল।
মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন বললেন, “তোমার পিতা এখন কোথায়, বৎস শক্তিধর? তাঁর শরণাপন্ন হও। তাঁকে আমার নাম করে বলো, রাজ্যের এই সংকটকালে তিনি অভিমান করে থাকলে রাজ্যবাসী অসহায় হয়ে পড়বে। রাজাবেণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত, মন্ত্রী-অমাত্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে তাঁরাই এই রাজ্যভার গ্রহণ করুন”। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি শক্তিধরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কথাগুলো তুমিই বলবে? নাকি আমি তাঁকে বার্তা পাঠাবো?”
নত মুখে উপনগরপাল শক্তিধর বলল, “আমি এখনই তাঁকে বার্তা দিচ্ছি, মহর্ষি। সম্ভব হলে, তিনি এখনই উপস্থিত হতে পারেন”।
মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি
উত্তম। বৎস মৈত্রেয়, ওষধির মাত্রা পরিবর্তন করে লক্ষ্য রাখো, অবস্থার কোন উন্নতি
হয় কিনা। সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা যাবে। এখন আমরা আসি, যে কোন সংকটে
বার্তা দিতে সংকোচ করো না। মনে রেখো তুমি একলা নও, আমরা সকলেই তোমার সঙ্গে আছি”।
রাজা বেণের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মহর্ষি বললেন, “বৎস শক্তিধর, আমরা এখন অতিথিশালায় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। নিরাপত্তার কারণে তুমি আমাদের বাধা দেবে না তো? অথবা তুমিও আমাদের সঙ্গী হতে পারো”।
উপনগরপাল শক্তিধর বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নত করে বলল, “আমার ভুল হয়েছিল, মহর্ষি। এই রাজপ্রাসাদের সর্বত্র আপনার অবাধ অধিকার। আপনাদের প্রয়োজনে আমি আপনাদের সঙ্গ দিতে পারি”।
“উত্তম,
তাহলে তুমি এদিকের প্রশাসনিক কর্তব্য সামলাও, পিতা এলে আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতে
বলো। আর আচার্য রণধীর যেমন বললেন, যত শীঘ্র সম্ভব নটী বিদ্যুল্লতার ফেরার ব্যবস্থা
করো। তাঁর নিরাপত্তায় কোন ত্রুটি যেন না হয়, আমাদের রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত,
তোমার বিশ্বস্ত এবং দক্ষ রক্ষীরা যেন তাঁর সঙ্গে থাকে”।
“তাই হবে মহর্ষি। কিন্তু ওঁর নিজস্ব রক্ষী বাহিনী রয়েছে, মহর্ষি”।
মহর্ষি অতি ধীর কণ্ঠে বললেন, “আমি জানি, বৎস শক্তিধর। কিন্তু নটীবিদ্যুল্লতা কোন্ রাজার পালিতা কন্যা এবং কোন্ রাজ্যের নগরনটী জানো তো? ওঁনার কিছু হয়ে গেলে...”।
মাথা নত করে শক্তিধর বলল, “বুঝেছি, মহর্ষি। আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে”।
“উত্তম,
আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছি। বৎস রণধীর, বিশ্ববন্ধু চলো, রাজা বেণের
অতিথিশালার ব্যবস্থাটা দেখে আসি”।
“চলুন
গুরুদেব”।