সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের ষষ্ঠ পর্ব - "এক যে ছিলেন রাজা - ৬ষ্ঠ পর্ব


১৫ 

সেই দিন পুত্র বেণের কক্ষ থেকে অপমানিতা হয়ে ফেরার পর, রাজমাতা ভীষণ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কখনো নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছেন। কখনো ধিক্কার দিচ্ছেন পুত্রকে, পুত্রের উদ্ধত আচরণকে। কখনো স্বামী মহারাজ অঙ্গকেও - তিনি কেন কঠোর হননি? স্নেহে অন্ধ মাতা, পুত্রকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে বুঝেও, মহারাজ অঙ্গ কেন শাসন করেননি দুজনকেই? আবার কখনো আকুল অশ্রুসিক্ত নয়নে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, হে ঈশ্বর, দয়া করো, কৃপা করো, করুণা করো। এই সবের মধ্যেও দিনে রাতে সর্বদা, তিনি অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন, তাঁর পুত্র বেণ ঠিক এসে দাঁড়াবে তাঁর সামনে। সে নিজের ভুল বুঝতে পারবেই। রাগের মাথায় কী বলতে কী বলে ফেলেছে, অনুশোচনা তার হবেই। গতকাল আসেনি, আজও এল না, আগামীকাল নয়তো পরশু নিশ্চয়ই আসবে। পুরুষমানুষ খুব অহংকারী হয়, ভাঙে কিন্তু মচকায় না। সময় নেবে কিন্তু সেই ভাঙবেই। কিন্তু আসবে ঠিক। পুত্র বেণ সামনে এসে দাঁড়িয়ে যখন বলবে, “মা, আমার ভুল হয়ে গেছে, মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও” তিনি কী করবেন, মনে মনে তাও ঠিক করছিলেন। কখনো ভেবেছেন, বুকে জড়িয়ে ধরবেন, কান্নাধরা গলায় বলবেন মায়ের কাছে ভুল করে, ক্ষমা চাইতে হয়, বাবা?” কখনো ভেবেছেন, নাঃ, অত সহজে মেনে নেওয়াটা ঠিক হবে না। কঠিন মুখ করে খুব দু চার কথা শুনিয়ে দেবেন কট কট করে। তারপর পুত্রের আনত ম্লানমুখের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বলবেন, “এতদিনে আমার পুত্র-মহারাজের ক্রোধ প্রশমিত হল”? এইভাবেই পক্ষকাল চলে গেল, কিন্তু পুত্র বেণ এল না। তিনি সংবাদ পান, তাঁর পুত্র এখন রোজই সন্ধ্যা থেকে রাত্রি শেষ পর্যন্ত, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননেই থাকে। এর মধ্যে অন্ততঃ তিন দিন নটী বিদ্যুল্লতাকে নিয়ে তাঁর পুত্র নব নির্মীয়মাণ উদ্যানকানন পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন। অসহায় মনোকষ্ট অসহ্য হয়ে ওঠাতে তিনি গতকাল মহর্ষি ভৃগুর সাক্ষাৎপ্রার্থিনী হয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন। আজ বৈকালে, সেই দূত ফিরে এসে বার্তা দিল, মহর্ষি ভৃগু মহারাণির কাছে ক্ষমাভিক্ষা করেছেন। বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর প্রাসাদে আসা সমীচীন নয়। উপযুক্ত সময়ে, মহারাণির অনুগ্রহের আশায়, তিনি নিজেই আসবেন।

দূতের মুখে মহর্ষির বার্তা পাওয়ার পর থেকে, নিজের ঘরে এই বাতায়নের সামনে বসে, নিজের চিন্তাতেই ডুবেছিলেন মহারাণি সুনীথা। বিকেলের পাখিরা ফিরে এসেছে তাদের নিশ্চিন্ত বাসায়। রাজপ্রাসাদের উপবন তাদের কাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছিল অনেকক্ষণ। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর অন্ধকার তার আঁচল বিছিয়ে ঢেকে দিল চারি পাশ। ঝোপে ঝাড়ে একটা দুটো জোনাকি জ্বলে উঠল, শিকারের সন্ধানে উড়াল দিল নিশাচর উলূক। কৃষ্ণঘন আকাশের গায়ে রূপোলী চুমকির মতো জ্বলে উঠল একটা দুটো তারা। পদ্মবালা তাঁর ঘরে জ্বেলে দিল মঙ্গলদীপ ও দেওয়ালগিরি। সেই আলোকিত ঘরের দিকে তাকিয়ে রাজমাতা সুনীথার মনে হল, এ সব অকারণ। তাঁর জীবন থেকে সব আলোই যখন মুছে গেছে, তখন এই আলোকসজ্জা অবান্তর বাহুল্য।

তিনি দাসী পদ্মবালাকে বললেন, “পদ্ম, এই ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দে। অন্তরে বাইরে আজ সব অন্ধকার হয়ে উঠুক, আমার জীবনে সমস্ত আলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আলো আমাকে আর আনন্দে উদ্ভাসিত করতে পারে না। আলো আমার এই নির্মম পরিণতির উন্মোচন করে। আমি আলো চাই না, অন্ধকারের মধ্যে আমাকে আত্মগোপন করতে দে”।

কিশোরী সুনীথার পিতৃগৃহ থেকেই পদ্মবালা তাঁর নিত্য সহচরী। মহারাণি হয়ে যেদিন তিনি এই প্রাসাদে পা রেখেছিলেন, সেই দিন থেকে দাসী পদ্মবালাও তাঁর সুখে দুঃখে হাসি কান্নায় নিত্য সঙ্গী। মহারাণির কথায় পদ্মবালা, একটুও আশ্চর্য হল না। পিত্রালয়ের স্নেহ, আদরে বড়ো হয়ে ওঠা সেই কন্যা, মহারাজের সহধর্মিণী হয়ে এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের মহারানি সুনীথা অনেক সম্মান, অনেক মর্যাদা আর সুখ উপভোগ করেছেন সারা জীবন। নিয়তির আশ্চর্য ক্রীড়ায় আজ তিনি একান্ত অসহায়, একমাত্র পুত্রের কাছে অপমানিতা অভাগিনী নারী

তাও আজীবনের সহচরী সুনীথার এই পরিণতি পদ্মবালারও সহ্য হয় না, সে বলল, “রাজকুমারী, অন্য সব আলো নিভিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আশার আলোর মতো এই ছোট্ট দীপটি জ্বলুক, আশা ছাড়া কী করে বেঁচে থাকবে? নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কীভাবে খুঁজে পাবে, বাইরে বেরোনোর পথ”?

“তোর এই উপদেশ আর ভালো লাগছে না পদ্ম, চুপ কর। আমাকে একটু একা থাকতে দে”।

পদ্মবালা একটিমাত্র দীপ রেখে, ঘরের সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যাবার সময় বলে গেল, “আমি পাশের ঘরেই রইলাম রাজকুমারী। তোমার পাশেই আমি থাকবো সারাক্ষণ”। পদ্মবালা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, রাজমাতা সুনীথা জানালার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আর ডুব দিলেন নিজের চিন্তায়।

আজ প্রায় ঊণিশমাস হল তাঁর পুত্র বেণ, পিতার সিংহাসনে বসেছে। সে রাজা হয়ে, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য আজ পর্যন্ত কী করেছে, তিনি জানেন না। কিন্তু পুত্রের অজস্র অত্যাচার, অবিচার আর অনাচারের কথা তাঁর কানে আসছে অহরহ। মহারাণি সুনীথার গর্বিত শির, এখন রাজমাতা হয়ে লজ্জায়, অনুশোচনায় অবসন্ন, অবনত। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের পর তিনি এখন মহর্ষি ভৃগুকেই একমাত্র ভরসা করতে পারেন। কিন্তু মহর্ষির এই বার্তাতে মহারাণি আরও বিষণ্ণ হলেন। মহর্ষির মতো ব্যক্তি প্রাসাদে আসা সমীচিন নয় বলেছেন, কেন? তাঁকে কে বাধা দেবে, রাজা বেণ? মহর্ষি ভৃগুও কী তাহলে নিরাপদ নন?    

মনে হয় যেন, এই তো সেদিন। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের সংবাদ পেয়ে, মহর্ষি ভৃগু নিজেই এসেছিলেন, প্রাসাদে অনেকক্ষণ ছিলেন। তিনি এসেছেন শুনে মহারাণি সুনীথা, মহর্ষি ভৃগুকে প্রণাম করে, তাঁর পায়ের কাছে বসেছিলেন, কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সবকিছু ছেড়ে, অমন মানুষটা হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন, মহর্ষিঠাকুর? আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি সব জানেন। দয়া করে বলুন। আমাদের যদি কোন অপরাধ হয়ে থাকে, আমি নিজে গিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো। যে শাস্তি তিনি দিতে চান, আমি মাথা পেতে নেব। আপনার অনুমতি ছাড়া উনি কোন কাজই করতেন না, সে তো আপনি জানেন, ঠাকুর। মহারাজ কেন এমন করলেন? কোথায় চলে গেলেন?” শোকে বিহ্বল মহারাণি একইভাবে, তাঁর পায়ের কাছে বসে একটানা বিলাপ করছিলেন, আর তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি ভৃগু একটি কথাও বলেননি, তীক্ষ্ণ চোখে শুধু তাকিয়েছিলেন, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে।

কিছুক্ষণ পর তিনি নিষ্প্রাণ স্বরে বলেছিলেন, “শান্ত হোন, মহারাণি। শক্ত হোন। বেশ কয়েক বছর ধরেই, মহারাজ অঙ্গ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন, এ কথা তো আপনার অজানা নয়। একই কারণে তিনি আমার সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলেন। কীসের যন্ত্রণা, কে তার কারণ, সে কথা আমার থেকেও আপনি অনেক ভাল জানেন, মহারাণি। পুত্র বেণ কোথায়? তাকে দেখছি না? এই সময়, তার উচিৎ মাতার সঙ্গে থাকা”!

মহর্ষির কথায় কেউ একজন সংবাদ দিল, মহারাজ অঙ্গপুত্র বেণকেবেণ এল তার আসার দিকে তাকিয়ে রইলেন, মহর্ষি ভৃগু। সামনে এসে যখন দাঁড়াল, মহর্ষির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির থেকে চোখ সরিয়ে নিল, মাথা নীচু করল। কিন্তু সেই মাথা নত করার মধ্যে কোন শোক, বিষাদ কিংবা দুঃখের লেশ মাত্র খুঁজে পেলেন না মহর্ষি।

রাজমাতা সুনীথা বললেন, “মহর্ষিকে প্রণাম কর, বেণ”।

মায়ের কথায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই, বেণ বলল, “প্রণাম, মহর্ষি”।

প্রাসাদের এই শোকের আবহের মধ্যেও বেণের এই অদ্ভূত ঔদ্ধত্য মহর্ষির চোখ এড়াল না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আজ তবে আসি, মহারাণি”।

“এখনই উঠলেন, ঠাকুর? আমাদের এখন কী কর্তব্য, বলবেন না?”

“অপেক্ষা ছাড়া আর কোন কর্তব্য তো এখন দেখছি না, মহারাণি”?

“আপনি বলছেন, তিনি ফিরে আসবেন? আমারও তাই ধারণা, ঠাকুর। মন কিছুটা শান্ত হলেই তিনি ফিরে আসবেন”।

বেণের অধৈর্য আচরণ মহর্ষির চোখ এড়াল না, বেণ জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু মা, কতদিন? কতদিন তিনি আমাদের অপেক্ষায় রাখবেন?”

রাজমাতা সুনীথা বললেন, “হয়তো কাল, হয়তো পরশু। অথবা এক মাস। সে কথা তিনিই জানেন পুত্র”!

“কিন্তু রাজ্য, রাজকার্য? অনির্দিষ্ট কালের জন্যে সব থমকে থাকবে?”

বেণের এই কথায় মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুমি কী চাইছ বৎস? পিতার অন্ত্যেষ্টি? পারলৌকিক অনুষ্ঠান?”

মহর্ষির শান্ত অথচ দৃঢ় এই প্রশ্নে বেণ হঠাৎ কোন উত্তর দিতে পারল না, যুবরাজমাতা সুনীথাও তাকিয়ে রইলেন পুত্রের মুখের দিকে, তাঁর দৃষ্টিতে আশ্চর্য আতংক।

কিছুটা সামলে নিয়ে, বেণ উত্তর দিল, “না, না তা কেন? অপেক্ষা আমরা করবো, কিন্তু রাজকার্যও অবহেলার নয়, মাতা”। মহর্ষি ভৃগু আর কিছু বললেন না, বেণের মুখের দিকে তাকিয়ে, বললেন, “আমাকে অনুমতি দিন, মহারাণি”।

 

এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই রাজরাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পরামর্শের জন্য। সে সময় মানসিক দ্বিধায় তিনি নিজের কর্তব্য-অকর্তব্য কিছুই স্থির করতে পারছিলেন না। স্বামীর অদ্ভূত অন্তর্ধানের পর, একদিকে তাঁর পুত্র অতি দ্রুত সিংহাসনের উত্তরাধিকার চেয়ে নিজের রাজ্যাভিষেক চাইছিল। অন্যদিকে মহারাজ অঙ্গের মন্ত্রী, অমাত্য সকলেই, এই অভিষেকে আপত্তি করছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মহারাজ অঙ্গ কোথায় গেলেন, কেন গেলেন, আর ফিরে আসবেন কিনা, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে, পুত্রের রাজ্যাভিষেক করানোর অর্থ মহারাজ অঙ্গকে সম্পূর্ণ অস্বীকার। মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থেই গিয়ে থাকেন, তিনি তো অনায়াসেই পুত্রের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে যেতে পারতেন। ধার্মিক রাজারা এমনই করেন, আর মহারাজ অঙ্গের মতো ধর্মে অবিচল রাজা, এমন করলে কিছুমাত্র অস্বাভাবিক হত না।

কিন্তু তিনি কোথায়? একদিকে স্বামীর অদ্ভূত এই আচরণ তারওপর পুত্র বেণের সিংহাসন লাভের জন্য উদগ্র ব্যস্ততা তাঁকে বিহ্বল করে তুলেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, পিতার সিংহাসনে বসে, পুত্র বেণ রাজ্যের পূর্ণ দায়িত্ব পেলে, সে শান্ত হয়ে যাবে। হয়তো রাজা অঙ্গেরও এটাই অভিপ্রায়। পিতার অনুপস্থিতিতে পুত্র বেণ রাজা হিসাবে কেমন আচরণ করে, সেই পরীক্ষার জন্যেই হয়তো তিনি আত্মগোপন করে আছেন। আর সেই দ্বিধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যেই, পুত্রকে অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেবার আগে তিনি মহর্ষি ভৃগুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে সেদিন নিভৃত কক্ষের আলোচনায়, ছিলেন শুধু মহারাণি সুনীথা আর তাঁর বিশ্বস্ত দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি আসন নেওয়ার পর, মহারাণি তাঁর চরণ বন্দনা করে নিজের মানসিক দ্বন্দ্বের কথা খুলে বললেন। এখন তাঁর কী কর্তব্য সেটাও জিজ্ঞাসা করলেন।

সব শুনে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অনুপস্থিতিতে আপনি রাজ্যভার গ্রহণ করছেন না, কেন মহারাণি? আমার মনে হয় তাতে আপনার মন্ত্রী, অমাত্যদের কোন আপত্তি হবে না। আর মহারাজ অঙ্গ অদূর ভবিষ্যতে যদি ফিরেও আসেন, তাঁর পক্ষেও ব্যাপারটা আদৌ অসম্মানজনক হবে না”।

“এ আপনি কী বলছেন, মহর্ষিঠাকুর? রাজ্য চালনার আমি কী জানি, কী বুঝি? রাণি হিসাবে আমি এতদিন রাজঅন্তঃপুর সামলে এসেছি, কিন্তু রাজ্য সামলানো কী আমার পক্ষে সম্ভব? এ কাজ পুরুষের কাজ। রাজার উত্তরাধিকার হয়ে পুত্র বেণই কী তার পিতার সিংহাসনের যোগ্য দাবিদার নয়?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, “মহারাণি, আপনার পুত্র, তার পিতার যোগ্য উত্তরাধিকার কিনা, সে বিষয়ে আপনার মনে প্রশ্ন কেন? এই রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকার কে, সে বিচারের জন্যে এই রাজ্যের প্রাজ্ঞ মন্ত্রী, অমাত্য, এমনকি আপনিও কী যথেষ্ট নন? আমাকে প্রশ্ন করা বাহুল্য মাত্র”।

“মহর্ষিঠাকুর, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, এড়িয়ে গেলেন”।

“আমার উত্তর আমি প্রথমেই দিয়েছিলাম, মহারাণি। সে উত্তর আপনার মনোমত হয়নি, এখন আপনি আমার থেকে আপনার মনোমত উত্তর শুনতে চাইছেন? তাহলে খুব স্পষ্ট ভাষায় আপনাকে বলি? মহারাজ অঙ্গের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে, আমাদের কারো মনেই কোন সংশয় নেই। কিন্তু সত্য বলতে, আমরা কেউই চাইছি না, তাঁর পুত্রের হাতে এ রাজ্যভার যাক। তার কারণ আপনি খুব ভালো ভাবেই জানেন। আজ মহারাজা অঙ্গ যদি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে থাকেন, তার কারণও আপনি অনুমান করতে পারছেন”!

“কিন্তু, তাকে একবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না? রাজ্য এবং পিতার সুকীর্তি রক্ষার দায়িত্ব পেলে, তার মতি যদি পরিবর্তন হয়ে যায়?”

মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মহর্ষি বললেন, “সে দুরাশা আমরা কেউই করি না, মহারাণি। আর এও জানি পুত্রকে সিংহাসনে অভিষিক্ত না করলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। আবার পুত্রের হাতে রাজ্যভার দেওয়ার পরেও, দুশ্চিন্তা আপনার নিত্যসঙ্গী হবে”।

“আপনি কী আমাকে আর আমার পুত্রকে অভিশাপ দিচ্ছেন, মহর্ষিঠাকুর?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আপনি পুত্রের রাজ্য অভিষেকের আয়োজন করুন, মহারাণি। নির্দিষ্ট দিনে আমি নিজেই আসবো তাকে আশীর্বাদ করতে”

 

রাজমাতা সুনীথার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, পদ্মবালার পায়ের শব্দে। ঘাড় ফিরিয়ে পদ্মবালার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, উত্তেজনায় পদ্মবালা হাঁফাচ্ছে। তিনি বললেন, “কী হয়েছে, পদ্ম? বেণ আসছে?” মাতা সুনীথার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, দুই বক্ষে অনুভব করলেন অদ্ভূত ভার।

পদ্মবালা ইতস্ততঃ করে বলল, “না রাজকুমারী, মহারাজ বেণ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। রাজবৈদ্যকে বার্তা দেওয়া মাত্র তিনি প্রমোদকানন থেকে রাজাকে প্রাসাদের কক্ষে আনিয়েছেন। চিকিৎসাও শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনো জ্ঞান ফেরেনি”।

“তুই কি দেখতে গিয়েছিলি”? রাজমাতার কণ্ঠে উদ্বেগ, “আমি যাবো এখনই, আমার সঙ্গে চল”।

মাথা নীচু করে পদ্মবালা বলল, “গিয়েছিলাম, উপনগরপাল শক্তিধর আমাকে ঢুকতেই দিল না। বলল, আপনি বা আমি গেলে মহারাজ বেণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারেন। রাজবৈদ্য বলেছেন, জ্ঞান ফেরার পর কোন রকম উত্তেজনা, রাজার পক্ষে মারাত্মক”।

পদ্মবালার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রাজমাতা, তারপর অস্ফুটে বললেন, “তাই বুঝি”?  

১৬     

প্রিয় দুই শিষ্য, বিশ্ববন্ধু আর রণধীরকে নিয়ে মহর্ষি ভৃগু বহুদিন পর আজ প্রাসাদে এলেন। প্রায় ঊণিশ মাস আগে, মহারাজা বেণের অভিষেকের দিন তিনি শেষ এসেছিলেন। সেদিন নবীন রাজাকে আশীর্বাদ করে, রাজমাতার অনুমতি নিয়ে, বিদায় নিয়েছিলেনতারপর আর একবারের জন্যও তিনি আসেননি। অথচ মহারাজ অঙ্গের সময়, তিনি এই রাজ্যে উপস্থিত থাকলে, পক্ষকালের মধ্যে অন্ততঃ একবার তাঁকে আসতেই হতো। মহারাজ অঙ্গের আন্তরিক সখ্যতা তাঁকে বার বার টেনে আনতো এই প্রাসাদে।

মহারাজ বেণের প্রাসাদে প্রবেশের মুখেই উপনগরপাল শক্তিধর তাঁকে বাধা দিলেন, বললেন, “মহারাজ বেণ এখন বিশ্রাম করছেন, মহর্ষি। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়”।

“বৎস শক্তিধর, আমরা রাজা বেণের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ করতে আসিনি, সে কথা তোমার না বোঝার কোন কারণ নেই। তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা আমাদের সকলের কর্তব্য। সে কাজে বাধা দিলে, তুমি রাজা বেণের আরোগ্যকেই হয়তো বিলম্বিত করবে”

“কিন্তু তাঁর চিকিৎসায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় নিযুক্ত রয়েছেন, মহর্ষি”।

“অবশ্যই থাকবেন, তিনি এখন কোথায়”?

“মহারাজের কক্ষে”।

“অতি উত্তম, আমরা তাঁর সঙ্গেও কী একবার সাক্ষাৎ করতে পারি না? বৎস শক্তিধর তুমি হয়তো জানো না, রাজবৈদ্য মৈত্রেয়, আচার্য বিশ্ববন্ধুর এবং আমারও প্রিয় শিষ্য। তাঁর থেকে রাজা বেণের শারীরিক অবস্থার সম্যক ধারণা পেলে, আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি”।

উপনগরপাল শক্তিধর রাজা বেণের উপর এতটাই নির্ভরশীল, তার নিজস্ব কর্তব্য-অকর্তব্য বোধ এখনো গড়ে ওঠেনি। মহর্ষি ভৃগুর মতো দেশ বরেণ্য ব্যাক্তিত্বের সামনে তার বাধার জোরও টিকলো না। তাছাড়া আর কিছু না জানুক, মহর্ষি ভৃগুর অগাধ পাণ্ডিত্যের কথা তারও অজানা নয়। তার মনে হল, মহর্ষির সাক্ষাতে রাজাবেণের চিকিৎসার সত্যিই উপকার হতে পারে! আর রাজাবেণ সুস্থ হয়ে না উঠলে, শক্তিধর নিজেই যে শক্তিহীন হয়ে যাবে, সে বিষয়েও তার কোন সন্দেহ নেই। মহর্ষি ভৃগু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বেণের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁদের পিছনে চললেন শক্তিধর নিজেও!  

তিনজন সেবক ও দুই জন সেবিকা নিয়ে, রাজবৈদ্য মৈত্রেয় মহারাজ বেণের চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছিলেন। অঙ্গপ্রলেপ ও মাথায় বিন্দু বিন্দু তৈল নিষেক চলছিল। কক্ষে সশিষ্য মহর্ষি ঢুকতেই রাজবৈদ্য মৈত্রেয় এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন তিন জনকেই। সেবক সেবিকারাও তাঁদের নমস্কার করলেন, কিন্তু তাদের সেবা কার্য থামল না। চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে, মহর্ষি মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাজার অবস্থা কেমন, বৎস মৈত্রেয়?”

“এখনো পর্যন্ত খুব আশাপ্রদ নয়, গুরুদেব। সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। প্রথম রাত্রির তুলনায় অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়েছেআজ রজনী শেষে ত্রিরাত্রি পূর্ণ হবে। আশা করি আগামীকাল অবস্থার আরও উন্নতি হবে”

“প্রাণ সংশয়ের কোন লক্ষণ পাচ্ছো না তো?”

“না, না, গুরুদেব প্রাণ সংশয়ের কোন লক্ষণ নেই। তবে...”

“তবে কী?” উপনগরপাল শক্তিধর পিছন থেকে জিজ্ঞাসা করল।

“নিশ্চিত করে বলার সময় এখন নয়, তবে জড়ত্বের সমূহ সম্ভাবনা”।

“জড়ত্ব? তার মানে?” শক্তিধর উদ্বিগ্ন মুখে আবার জিজ্ঞাসা করল। আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন,  “সে কথা শ্রীমৈত্রেয় আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলবেন, শ্রীশক্তিধর। এখন আমাদের কথা বলতে দিন”। মহর্ষি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাজা বেণকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন, “বৎস মৈত্রেয়, তিন মাত্রা ব্রাহ্মীরস ও এক মাত্রা বিশল্যকরণি, মধুর লঘু দ্রবণ সহযোগে সেবন করিয়ে দেখতো পারোআমার ধারণা মস্তিষ্ক তাতে উজ্জীবিত হবে”

“তাই করবো গুরুদেব, আমি দুই-দুই মাত্রায় জলীয় দ্রবণ সহযোগে প্রয়োগ করছিলাম”।

“করে দেখো, কী হয়”। মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের পায়ের তালুতে হাতের নখ দিয়ে আঁচড় টানলেন, রাজাবেণের মুখে কোন বিকার দেখা গেল না, তবে ওই পায়ের আঙুলগুলি সামান্য নড়ে উঠল।

“কী থেকে এমন হল, কিছু অনুমান করতে পারছো, বৎস মৈত্রেয়? মাথার পিছনে কিংবা মেরুদণ্ডে কোন স্থূল আঘাতের লক্ষণ?” 

উপনগরপাল শক্তিধর একটু উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল, “আঘাত কী করে লাগবে, মহর্ষি”? 

এবার আচার্য রণধীর বিরক্ত কণ্ঠে অথচ মৃদু স্বরেই বললেন, “বৎস, শক্তিধর। এই কক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলা অসমীচীন। তাছাড়া আঘাত কী করে লাগবে, সেটা মহর্ষির জানার কথা কী? আপনারই জানার কথা, আপনি মহারাজা বেণের নিরাপত্তার দায়িত্বেও নিযুক্ত না? আঘাত অনেক ভাবেই লাগতে পারে। মদ্যপ অবস্থায় নিজেনিজেই সিঁড়িতে পড়ে যেতে পারেন। কেউ ধাক্কা দিতে পারে। নারী লাঞ্ছনাতে আপনাদের খ্যাতি রাজ্যময়, আত্মরক্ষার সময় কোন কোন আতঙ্কিতা নারীর প্রবল ধাক্কা কী কখনো উপভোগ করেননি?” 

আচার্য বিশ্ববন্ধু আচার্য রণধীরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “প্রিয়সখা রণধীর, এই কী তোমার বিতর্কের সময়? অনভিজ্ঞ যুবক, বন্ধুর অনুগ্রহে দৈবাৎ উপনগরপালের দায়িত্ব পেয়েছে, রাজার নিরাপত্তার গুরুত্ব তার পক্ষে কী করে নির্ণয় করা সম্ভব”? 

আচার্য রণধীর বললেন, “যথার্থ বলেছ প্রিয় বিশ্ববন্ধু, প্রকাশ্য সন্ধ্যায় রাজার এত বড়ো দুর্ঘটনা হল, তখন রাজার নিরাপত্তা কোথায় ছিল কে জানে? আর আজ এই নির্মল সকালে ভারতবরেণ্য মহর্ষি ভৃগু নিজে, আমাদের দুইজনকে নিয়ে রাজসকাশে আসছেন, তাতে রাজার নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটে যাচ্ছে! বৎস শক্তিধর, বিতর্কে কালক্ষেপ করো না। রাজাবেণের এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হও। শোনা যায়, রাজাবেণ ঘটনার সময় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননে সুরাপানে মত্ত ছিলেন?”

“না এ মিথ্যা”।

“মিথ্যা? রাজাবেণ প্রমোদকাননে ওই দিন যাননি?”

“তা নয়, উনি গিয়েছিলেন, সেখানেই ছিলেন”।

“তবে যে বললে মিথ্যা?”

“তিনি সুরাপানে মত্ত ছিলেন, এ কথা মিথ্যা”। 

এই কথায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “কিন্তু আমরা যখন রাজাবেণকে প্রমোদকানন থেকে এই কক্ষে নিয়ে আসি, তাঁর শরীরে অতিরিক্ত সুরাপানের সমস্ত লক্ষণই ছিল। তাহলে মিথ্যা বলছেন কী করে?”

“আজ্ঞে সুরাপান করছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত নয়”। 

মৃদু হেসে রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “আচ্ছা, একজন মানুষের পক্ষে কতটা সুরাপান করলে অতিরিক্ত হয়, সে বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা আছে?”

“না ঠিক তা নয়, তবে...”। 

এবার আচার্য রণধীর সামান্য উষ্মা প্রকাশ করেই বললেন, “উপনগরপাল শক্তিধর, আপনি এই রাজধানী শহরের উপনগরপাল, মহারাজা বেণের সুরক্ষার দায়িত্বও আপনার। অথচ আপনার কথাবার্তায় কোন কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। একই প্রশ্নের উত্তরে কখনো বলছেন মিথ্যা, আবার বলছেন না মিথ্যা নয়। আপনি এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? নটী বিদ্যুল্লতার কী ব্যবস্থা করেছেন”?

“কী ব্যবস্থা মানে?” অভিজ্ঞ আচার্যদের কথায় শক্তিধর ক্রমশঃ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছিল।

“ওঁকে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেননি”?

“না, সে আদেশ কী জরুরি? রাজাবেণ নটী বিদ্যুল্লতার একান্ত গুণগ্রাহী। সুস্থ হয়ে রাজা যখন জানবেন, নটী বিদ্যুল্লতা স্বরাজ্যে ফিরে গেছেন, তিনি প্রসন্ন হবেন না”। 

একটু বিদ্রূপ করেই আচার্য রণধীর বললেন, “অতি উত্তম, আপনি চাইছেন, রাজা সুস্থ হয়ে উঠে, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে আবার “অতি সীমিত” সুরাপান করে, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ুন”?

“এ আপনি কী বলছেন? আমি রাজার একান্ত অনুগত দাস, রাজার সেবাতেই নিয়োজিত”।

“কিন্তু কই? তেমন কোন দায়িত্ববোধ তো আমরা দেখছি না?”  

উপনগরপাল শক্তিধর আচার্যদের কথাবার্তায় দিশাহারা হয়ে উঠল। তার শক্তি ছিল রাজা বেণের প্রশ্রয়, এখন তাঁর অসুস্থতায় তার প্রশাসনিক যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। তার কাছে রাজাবেণের সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা যে কতটা জরুরি, সে কথা বুঝতে তার আর বাকি রইল না। রাজাবেণ যদি সুস্থ না হন, তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই আশঙ্কায় সে শিউরে উঠল। উপনগরপাল শক্তিধর এতক্ষণে উপলব্ধি করল, সে প্রথম থেকেই এই আচার্যদের যোগ্য কোন সম্মানই দেয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ এই আচার্যরা তাকে রক্ষাও যেমন করতে পারেন, তেমনি তার অযোগ্যতা প্রমাণ করে কঠোর শাস্তি বিধানও করতে পারেনরাজাবেণ যতদিন অসুস্থ, তাঁর নামে এই আচার্যরাই এই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ করবে, এ কথাটাও সে এখন উপলব্ধি করল।

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন বললেন, “তোমার পিতা এখন কোথায়, বৎস শক্তিধর? তাঁর শরণাপন্ন হও। তাঁকে আমার নাম করে বলো, রাজ্যের এই সংকটকালে তিনি অভিমান করে থাকলে রাজ্যবাসী অসহায় হয়ে পড়বে। রাজাবেণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত, মন্ত্রী-অমাত্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে তাঁরাই এই রাজ্যভার গ্রহণ করুন”। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি শক্তিধরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কথাগুলো তুমিই বলবে? নাকি আমি তাঁকে বার্তা পাঠাবো?” 

নত মুখে উপনগরপাল শক্তিধর বলল, “আমি এখনই তাঁকে বার্তা দিচ্ছি, মহর্ষি। সম্ভব হলে, তিনি এখনই উপস্থিত হতে পারেন”।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি উত্তম। বৎস মৈত্রেয়, ওষধির মাত্রা পরিবর্তন করে লক্ষ্য রাখো, অবস্থার কোন উন্নতি হয় কিনা। সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা যাবে। এখন আমরা আসি, যে কোন সংকটে বার্তা দিতে সংকোচ করো না। মনে রেখো তুমি একলা নও, আমরা সকলেই তোমার সঙ্গে আছি”।

 

রাজা বেণের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মহর্ষি বললেন, “বৎস শক্তিধর, আমরা এখন অতিথিশালায় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। নিরাপত্তার কারণে তুমি আমাদের বাধা দেবে না তো? অথবা তুমিও আমাদের সঙ্গী হতে পারো”।

উপনগরপাল শক্তিধর বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নত করে বলল, “আমার ভুল হয়েছিল, মহর্ষি। এই রাজপ্রাসাদের সর্বত্র আপনার অবাধ অধিকার। আপনাদের প্রয়োজনে আমি আপনাদের সঙ্গ দিতে পারি”

“উত্তম, তাহলে তুমি এদিকের প্রশাসনিক কর্তব্য সামলাও, পিতা এলে আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতে বলো। আর আচার্য রণধীর যেমন বললেন, যত শীঘ্র সম্ভব নটী বিদ্যুল্লতার ফেরার ব্যবস্থা করো। তাঁর নিরাপত্তায় কোন ত্রুটি যেন না হয়, আমাদের রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত, তোমার বিশ্বস্ত এবং দক্ষ রক্ষীরা যেন তাঁর সঙ্গে থাকে”।

“তাই হবে মহর্ষি। কিন্তু ওঁর নিজস্ব রক্ষী বাহিনী রয়েছে, মহর্ষি”। 

মহর্ষি অতি ধীর কণ্ঠে বললেন, “আমি জানি, বৎস শক্তিধর। কিন্তু নটীবিদ্যুল্লতা কোন্‌ রাজার পালিতা কন্যা এবং কোন্‌ রাজ্যের নগরনটী জানো তো? ওঁনার কিছু হয়ে গেলে...”। 

মাথা নত করে শক্তিধর বলল, “বুঝেছি, মহর্ষি। আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে”।

“উত্তম, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছি। বৎস রণধীর, বিশ্ববন্ধু চলো, রাজা বেণের অতিথিশালার ব্যবস্থাটা দেখে আসি”।

“চলুন গুরুদেব”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফাস-ক্লাস সিটিজেন


 


হায়ার সেকেণ্ডারির রেজাল্ট বের হবার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় ভাসতে থাকা স্বপ্নের বুদবুদটি ফেটেই গেল। একদম নিঃশব্দে। কিন্তু বড়ো ব্যথা দিয়ে গেল ফেটে যাওয়ার কালে। শূণ্যে ভাসতে থাকা হাল্কা শরীরটা যে মোটেই হাল্কা নয়, টের পাওয়া গেল মাটিতে সপাট আছাড়ে। জয়েন্টের ফলও তথৈবচকাজেই যে রসায়নবিদ্যার থেকে কোন রস আমি নিংড়ে বের করতে পারিনি কোনদিন, সেই রসায়নেই সসম্মান স্নাতক হবার জন্যে কলেজে দাখিল হলাম। যাদেরকে এই দুবছর অনেক তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলাম “ভালো ছেলে” বলে, তারা দিব্যি ডাক্তার ইঞ্জিনীয়ার হবার “চরম” সাফল্যের পথে ঢুকে পড়ল। আর আমার সান্ত্বনার মধ্যে রইল “একবার না পারিলে দেখ শতবার” আপ্তবাক্যখানি।

কাজেই প্রস্তুত হতে থাকলাম। এবং প্রথম বারের ভুল ভ্রান্তি কিছুটা শুধরে একই পথের সন্ধান জুটে গেল পরের বার। লাভের মধ্যে হাল্কা হওয়া গেল বেশ খানিকটা। মনের মধ্যে যে অলীক স্বপ্ন আর অদ্ভূত দর্পের দায় জমে উঠেছিল ভীষণ বোঝা হয়ে, সে সব পড়ল খসে। রসায়নের সম্মান ছেড়ে পোঁটলা আর ব্যাগ নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম ইঞ্জিনীয়ার হওয়ার হস্টেলের দেশে।

প্রথম দিন লটবহর নিয়ে সরাসরি কলেজে জয়েন করতে হল। কলেজে অ্যাডমিশান, হস্টেল অ্যালটমেন্ট, ইন্ট্রোডাকসন এইসব করতে করতে বিকেল গড়িয়ে গেল। সারা রাতের ট্রেন জার্নি সেরে বাস জার্নি, তারপর সারাটা দিন কলেজের কাজকম্ম সেরে বিকেলের দিকে রুমে গিয়ে থিতু হব ভাবছিলাম, কিন্তু হস্টেলে ঢোকার মুখেই ডাক এল - “অ্যাই, ছানা, কি নাম রে তোর”?

প্রথম সম্বোধনেই চিত্ত চমকে উঠল। প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া আমরা সবাই ছানা। যতদিন র‍্যাগিং চলবে আমাদের কোন ব্যক্তিগত নাম নেই, আমাদের একটাই নাম – ছানা। ছানা হিসেবে পরিচয়পর্ব শুরু হল হস্টেলের মেন গেটে। সঙ্গের লটবহর হাতছাড়া হয়ে পৌঁছে গেল আমার নির্দিষ্ট রুমে, কিন্তু রুমে যাওয়ার অনুমতি মিলল না। কতদিন চলবে এই র‍্যাগিং – সঠিক কেউ বলতে পারে না। কেউ বলে একমাস, কেউ বলে দুমাস, কেউ বলে পুরো ফার্স্ট ইয়ার!

”কেমন লাগছে রে জায়গাটা”? পাঁচ-ছজন সিনিয়ারের একটি গ্রুপের একজন জিগ্যেস করল।

”বেশ জায়গা, ভালই লাগছে”। ভয়ে ভয়ে বললাম আমি।

”মাঠে কি সুন্দর গরু চড়ছে, বল”?

”হুঁ”।

”গরু চড়া দেখেছিস, এর আগে, কলকাতায় বাড়ি না তোর”?

”হুঁ”।

”কোথায়”?

”দেশের বাড়িতে, বর্ধমান জেলায়”।

”গুড। তবে তো তুই সব জানিস। তাহলে যা, ওই যে গরুটা, বাঁদিকে শামলা রংযের – ওর পোঁদে একটা চুমু খেয়ে আয়”।

উক্ত গরুটিকে লক্ষ্য করলাম, বেশ নোংরা এবং পিছনে চাপ চাপ শুকনো গোবর লেগে আছে তার লোমের গোড়ায়। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম, আর অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম আমার সিনিয়ারদের।

”কি রে, যাবি না? দাঁড়িয়ে কী দেখছিস”?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলাম। আমার হাতে কাঠের টি ছিল, সেই সিনিয়ার সেটা নিল আমার হাত থেকে, বলল

“কোথা থেকে কিনলি এটা? কলকাতা থেকে”?

”হুঁ”। এই টি-টা আমি বাড়িতে যেদিন কিনে আনলাম, মা খুব খুশি হয়েছিলেন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিলেন, ছেলের ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ওঠার গর্বে উজ্জ্বল তাঁর মুখটি আমার মনে পড়ল

”এখানে পাওয়া যায় না”?

”জানি না। লেখা ছিল এ গুলো কলেজে আসার সময় আনতে হবে।”

”কলকাতার মাল যখন ভালই হবে, কি বলিস, দেখব ট্রাই করে”? বলে সে দু হাতে সেটাকে ধরল ঠিক লাঠির মতো, উদ্যত হল আমাকে মারতে। বলল, ”যা বললাম করবি, নাকি এটা তোর ওপর ট্রাই করব, কতক্ষণে ভাঙে”।

 

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একজন সুস্থ ছেলে, কোন কারণ ছাড়া এমন একটা কাজ কেনই বা করতে বলছে আর সেটা না করলে সে মারবে? এতে সে মজা পাবে, তার রগড় হবে খুব? আদৌ সুস্থ কি – অন্ততঃ মানসিক দিক থেকে? তার চোখ দেখে মনে হল না, সে নিছক ভয় দেখাচ্ছে। আমি চিন্তা করে দেখলাম, বিকৃত মস্তিষ্ক এই ছেলেটার হাতে মার খাওয়ার চেয়ে, গরু অনেক নিরাপদ। কাজেই এগিয়ে চললাম।

হস্টেলের মাঠে বেশ কটা গরু চড়ছিল। তার মধ্যে ছিল সেই শামলা গাইটাও। ল্যাজ নাড়িয়ে মাছি তাড়াতে তাড়াতে সে ঘাস খাচ্ছিল এক মনে। আমি কাছে যেতেই সন্দেহ নয়নে আমার দিকে তাকাল। কি বুঝল কে জানে, পাত্তা দিল না, আবার মন দিল ঘাস খাওয়ায়। কাছে গিয়ে আমি তার গায়ে হাত রাখলাম। লেজ দিয়ে আমার হাতে একটা ঝাপটা মারল আর কাঁপিয়ে তুলল তার চামড়া। কিন্তু কিছু বলল না। মনে পড়ল মামাবাড়ির গৌরী গাইয়ের কথা।

আরো ঘনিষ্ঠ হলাম, ভীষণ দ্বিধায় নীচু হতে, আরেকজন কেউ ডাকল, ”অ্যাই ছানা, এদিকে আয় অনেক হয়েছে, শ্লা, চাঁট-ফাঁট মেরে দিলে কেলো হয়ে যাবে”। বলতে বলতে সে দৌড়ে এল আমার কাছে, খুব শক্ত করে আমার গলা ধরে নিয়ে, একই ভাবে আবার দৌড়ে চলল হস্টেলের ভিতরে, আগের ছেলেটাকে বলল, ”আমি এই ছানাটাকে আমার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি গুরু, তুই অন্য ছানা ধর”।

আমাকে সে ধরে নিয়ে এল তার নিজের রুমে। তিনজনের রুম। তার বিছানায় বসিয়ে বলল, ”বোস। ওখানে থাকলে তোকে ক্যালাত, হারামজাদাটা। খিদে পেয়েছে? দাঁড়া। জুতো মোজা খুলে বোস। আমি এক মিনিটে আসছি। কেউ ডাকলেও আমার নাম বলবি”। বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে দরজাটা ভেজিয়ে। আমার মনে তখন আতঙ্ক। যদিও কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে না – কিন্তু কে জানে এ আবার কি নতুন র‍্যাগিং চালু করে! একটু পরেই আবার ফিরল, পিছনে আরেকটি ছেলে – তবে স্টুডেন্ট নয়, তার হাতে ডিম টোস্টের প্লেট।

”এখনো জুতো খুলিস নি? ভয় লাগছে, নাকি? আগে খেয়ে নে। এ আমাদের ক্যান্টিনের ছেলে, বলাই। চিনে রাখ”প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে বলাই বেরিয়ে গেল।

”তুমি খাবে না?”

”খা না তুই। আর শোন তোকে আমি কিছু কাজ দোবো, এই ঘরে বসে তুই সেগুলো করতে থাক। আমার কাছে থাকলে তোকে কেউ কিছু করবে না। এই নে এই জগে খাবার জল, খাবি তো খাদুপুরে কিছু খেয়েছিলি”?

”হ্যাঁ, কলেজ মোড়ে, মাছের ঝোল ভাত”।

”যাক তাও ভালো। তুই খা ততক্ষণ, আমি আসছি। আর ইচ্ছে হলে একটু শুয়েও নিতে পারিস। কোন ব্যাপার না, বুঝলি, শুধু কেউ জিগ্যেস করলে বলবি তুই আমার ছানা, ব্যস। আমার নাম বলেছিলাম, মনে আছে”?

খুব সংকোচের সঙ্গে ঘাড় নাড়লাম, তার উত্তর পেলাম, ”বোকা** একটা, আমার নাম বিজয়। বলবি বিজয়দার ছানা।

গালাগালটা খেয়ে একটু দমে গেলাম ঠিকই, কিন্তু ডিম টোস্ট আর এক পেট জল খেয়ে আমার ধড়ে যেন প্রাণ এল। কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করার পর, খুব ঘুম পেতে লাগল। ক্লান্ত শরীরে ক্ষুধা নিবৃত্তির পর চোখ আপনি বুজে আসতে লাগল। কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে শুয়েই পড়লাম এবং তৎক্ষণাৎ ঘুম।

 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। বিজয়দা ধাক্কা দিয়ে তুলে দিতে, উঠে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ কোথায় আছি মনেই পড়ল না, এমনই ঘুমের ঘোর।

”অ্যাই ছানা, ওঠ ওঠ, শিগ্‌গির উঠে চেয়ারে বোস, যা”। বিজয়দা জোর করেই প্রায় ঠেলে বসিয়ে দিল টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে। তারপর একটা খাতা পেন ধরিয়ে দিল আমার হাতে, আর মেলে ধরল একটা বই। বইয়ের নির্দিষ্ট একটা পাতা খুলে বলল, ”এই চ্যাপ্টারটা পুরো চোতা মার। দেখি তোর হাতের লেখাটা কেমন”।

আমার লেখা একটা লাইন দেখে খুশী হল না রেগে গেল বুঝলাম না, বলল, ”এই তোর হাতের লেখা গাণ্ডু, এ লেখা পেলে তো তোকে কোন পাব্লিক ছাড়বে না, বে। বানান ভুল করিস নাকি, বাল”?

উত্তর দিলাম, ”বোধহয়, না”।

আমার উত্তর শুনে খুব একচোট হ্যা হ্যা করে হাসল, বলল, “উরেল্‌ল্‌ল্‌ল**ড়া। “বোধহয় না”, খুব কায়দার উত্তর দিচ্ছিস। হেব্বি ঘ্যাম তোর না? বাইরে দেখাস না যেন, ক্যালানি খেয়ে যাবি। যাক, যেটা বলি মন দিয়ে শোন, প্রায় ঘন্টা খানেক ঘুমিয়েছিস, আর যেন ঘুমোস না। এইবার সক্কলে হস্টেলে ফিরতে শুরু করবে, অনেকে মাল খেয়েও আসবে। তারা কিন্তু ঘরে ঘরে ছানা খুঁজবে। তোকে যদি দ্যাখে তুই ** উল্টে ঘুমোচ্ছিস, আমার চোদ্দ গুষ্টিও তোকে বাঁচাতে পারবে না। উল্টে আমারই ** মেরে দেবে। মনে রাখিস কথাটা। পাশের ঘরে আছি, দরকার পড়লে চলে যাবি”।

বিজয়দা বেরিয়ে গেল। স্কুলে পড়ার সময় আমাদের মধ্যে কয়েকজন বন্ধু ছিল, যারা এভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিল, আমরা তাদের এড়িয়ে চলতাম। তাদের ওই ভাষা শুনলে খুব অস্বস্তি হত। অথচ আজ হস্টেলের প্রথম দিনেই বিজয়দার এই ভাষার ফোয়ারা শুনে খারাপ তো লাগলই না উল্টে মজাই পেলাম। আমি চোখের ঘুম ছুটিয়ে বইয়ের থেকে খাতায় কপি করতে করতে ভাবতে লাগলাম। বিজয়দা এমন ভাবে কথাগুলো বলছে, যেন ওগুলো ওর কথার লব্জ।         

বিজয়দার কথা সত্যি হয়ে গেল, বেশ কিছুক্ষণ বাদে বাদে ধড়াম করে দরজা খুলে এক একটা দল আসছে, ”অ্যাই ছানা, একলা ঘরে কি ছিঁড়ছিস, বে, **ড়া”?

“বিজয়দা, এটা কপি করতে বলে গেল...” আমি মিনমিন স্বরে উত্তর দিলাম

“তুই বিজয়ের ছানা? বিজয়বাঁ*টা কোথায়?”

“পাশের ঘরে”তারা বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। এরপর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো এক একটা দল আছড়ে পড়তে লাগল ঘরের দরজার ওপর। সাড়ে নটা নাগাদ, আরেকদল এল। তাদের আচরণে এবং ঘ্রাণে বোঝা যাচ্ছিল তারা ড্রিংক করে রয়েছে, একজন জিগ্যেস করল, ”তুই, ছানা”? আমি ভয়ে ভয়ে সম্মতির ঘাড় নাড়লাম।

“কি করছিস বে, তুই এখানে ঘাপটি মেরে”?

“বিজয়দা, বলল এটা কপি করতে-”

“বিজয় কে? সেকেণ্ড ইয়ার, সিভিল না? তুই বিজয়ের ছানা হয়ে গেলি? বিজয় কি করে বাঁ* এখন ছানা পোষে? বিজয় বাল, যা খুশি করবে আর আমরা **ড়া চুষবো? কোথায় বিজয়”?

“পাশের ঘরে বলল”। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম।

দলের আরেকজন কেউ পাশের ঘরে বিজয়দাকে ডাকল। শুনতে পেলাম,  ”অ্যাই, বিজয়, তুই বাঁ* ছানা পুষছিস। এই ছানাটা তোর”?

বিজয়দা ঘরে এল, বলল, “শ্যামলদা, এ ছানাটাকে নিও না, বস। মালটাকে আমি নোট চোতা করতে দিয়েছি। অনেক নোট, বস”।

“ধূর বাঁ*। সে তুই চোতা করা না। কিন্তু আলাপ করবো না? কলেজে ছানা এসেচে? অ্যাই ছানা, কি নাম রে তোর”? আমার সামনের বিছানায় বসে শ্যামলদা জিগ্যেস করল। নাম বললাম।

“বাড়ি কোথায়”? বললাম।

আমার মুখের কাছে মুখ এনে, খুব গোপন কথা বলার মতো জিগ্যেস করল, ”বাড়িতে কচি ঝি আছে”?

আমি প্রশ্নটা ঠিক বুঝতেই পারলাম না।

“ধ্যার বাঁ*। এটা কোতাকার মাল, রে? কচি ঝি বুঝলি না? ডবকা ছুঁড়ি- এবার বুঝলি”?

আমি তাকিয়ে রইলাম চুপচাপ। আমার মুখের দিকে নেশাগ্রস্ত ঢুলুঢুলু চোখ করে বলল, ”বল না, **ড়া, টিপেছিস? বাড়িতে নেই? আমি তো খুব টিপি”। হতবাক আমি বসে রইলাম, শ্যামলদার মুখের দিকে তাকিয়ে। বিছানায় ঢলে পড়তে পড়তে বলল, “এ **ড়াটা একদম বাজে ছানা, মাইরি। আমাকে দেখছে দ্যাখ, আমি যেন বাঁ*, বোকা** একখান...” বলতে বলতে শুয়েই পড়ল বিছানায়।

বিজয়দা আর অন্যান্যরা মিলে তাকে ধরে ওঠালো।

“অ্যাই শ্যামল, তুই আউট হয়ে গেছিস, বাল। চল রুমে চ”-।

“কোন খা**র ছেলে বলল রে, আমি আউট হয়ে গেছি। শ্যামল হালদার কোনদিন আউট হয় না, বাঁ*, বলে দিলাম”।

“এই শ্যামলদা, তুমি আবার কবে আউট হলে? মাল তোমাকে খায় নাকি? তুমিই তো মাল খাও”বিজয়দা অবস্থা সামাল দিতে বলে উঠল।

“বিজয়, তুই **ড়া, ঠিক চিনেছিস আমায়। বাকিরা সব **রভাই, কেউ চিনল না, *ড়া। তোকে আমি হাম খাবো, এদিকে আয়”।

“শ্যামলদা, এখন থাক। পরে হবে”।

“না, আমি হাম খাবো, তোর ছানাটা ভাল মাল মাইরি। তুই খেতে না দিলে, তোর ছানাকে হাম খাবো”। বলতে বলতে আমার গালে সত্যি সত্যি হাম খেয়ে দিল চকাস করে। তারপর বলল, ”তুই খুব ভাল রে, ছানা। আমি খুব হারামি **ড়া একটা, না রে, আমি একটা লম্পট, বল”?

আমি গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, ”না, না, ঠিক আছে”।

এরপর সকলে মিলে শ্যামলদাকে টেনে নিয়ে চলে গেল, ”অনেক ক্যাওড়ামি করেছিস, শ্যামল এবার চল, আর মাল ছড়াস না, বাল, রুমে চল...”। 

আজ সকালে কলেজের প্রথম ক্লাসে ইন্ট্রোডাকটরি লেকচারে প্রফেসর বলেছিলেন “ইউ অল আর গোয়িং টু বি দি ফার্স্টক্লাস সিটিজেন্‌স্‌ অব দি নেশান আফটার ফোর ইয়ার্স...”। ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি অনুভব করলাম প্রথম শ্রেণীর দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে ওঠার যথার্থ পাঠ আমার শুরু হয়ে গেছে – এবং এটা চলবে টানা চার বছর!

--00--

শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব " 





[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের প্রথম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১


[এই ফাঁকে প্রাচীন ভারতের দৈনিক কাল-বিভাগ নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। এই লেখায় সে প্রসঙ্গ বারবারই আসবে। আমাদের তিথি মতে যদিও দিনের হিসেবে কিঞ্চিৎ হেরফের হয়, তবু গড় হিসেব ২৪ ঘন্টাই ধরেছি।   

১ দিন = ৮ প্রহর = ২৪ ঘন্টা = ১৪৪০ মিনিট = ৬০ দণ্ড।

১ দণ্ড = ৬০ পল = ২৪ মিনিট = ১৪৪০ সেকেণ্ড।

১ পল = ২৪ সেকেণ্ড।

দিন-রাত্রির প্রহরের হিসাব কিছুটা এরকম –

দিনঃ-

প্রথম প্রহর – প্রভাত – ৬ AM থেকে ৯ AM; দ্বিতীয় প্রহর – পূর্বাহ্ন – ৯ AM  থেকে ১২ PM

তৃতীয় প্রহর – মধ্যাহ্ন – ১২ PM থেকে ৩ PM;  চতুর্থ প্রহর - অপরাহ্ন – ৩ PM থেকে ৬ PM

রাত্রিঃ-

প্রথম প্রহর – প্রদোষ – ৬ PM থেকে ৯ PM; দ্বিতীয় প্রহর – রজনী – ৯ PM থেকে ১২ AM

তৃতীয় প্রহর – নিশীথ (মধ্যরাত্রি) – ১২ AM থেকে ৩ AM; চতুর্থ প্রহর – প্রত্যূষ - ৩ AM থেকে ৬ AM]

 


এখন এই বেলা আড়াই প্রহরে রাজপথে পথচারীর সংখ্যা বেশ কমকয়েকজন রাজপুরুষ ঘোড়ার পিঠে দুলকি চালে নগর পরিদর্শন করছে। সকালের প্রথম প্রহরান্ত থেকেই বিপণিতে ক্রেতাদের ভিড় জমতে থাকে। এখন পথের দুধারের বিপণিগুলিও প্রায় ক্রেতাহীন। সূর্যের তেজ যত বাড়তে থাকে নাগরিক ক্রেতারা গৃহাভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। এই সময় বরং আশপাশের গ্রাম থেকে আসে গ্রাম্য লোকজন - ঘোড়া কিংবা গোশকটে। তাদের আশাতেই বণিকরা শূণ্য বিপণিতে ধৈর্য ধরে বসে থাকে। পড়শি বণিকদের সঙ্গে গল্পসল্প করে সময় কাটায়।   

সাধারণতঃ এই গ্রাম্য ক্রেতারা সরল হয়। কথার তুবড়িতে তাদের ভুলিয়ে ফেলা যায় সহজেই। তাদের সঙ্গে কিছুটা তঞ্চকতা করে, নাগরিক ক্রেতাদের তুলনায় বেশ দুকড়ি উপরিলাভ করে নিতে পারে বণিকেরা। তবে আজকাল গ্রাম্য ক্রেতারাও শহরমুখো হচ্ছে কম। আজকাল কিছুকিছু বণিক, গাধার পিঠে, বলদের গাড়িতে পসরা সাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। ঘরের মেয়েরা সরাসরি তাদের পছন্দ মতো বাসন-কোসন, রান্নার সরঞ্জাম, মশলাপাতি, কাপড়চোপড়, প্রসাধনী সামগ্রী হাতে নিয়ে, নেড়েচেড়ে, দেখেশুনে কিনতে পারে। কারণ শহরে আসে পুরুষরা। বাবা হোক, স্বামী হোক, ছেলে হোক, ভাই হোক – পুরুষরা পুরুষই। তারা মেয়েদের পছন্দের ব্যাপারটা তেমন বোঝে না। উপরন্তু তাদের মনে হয়, শহুরে বণিকদের বাকচাতুর্যে পুরুষরা বড্ডো বেশি ভেবলে যায়। তারা প্রায়ই ঠকে, রদ্দি জিনিষ কিনে আনে, বেশি দামে।

অতএব আজকাল মধ্যাহ্ন আহারে গৃহে যাওয়ার সময় পর্যন্ত শহরের বণিকদের সময় কাটে একঘেয়ে আলস্যে।

কিন্তু আজ তেমনটা হল না। বানজারা মেয়েদের একটি দল, গান গেয়ে আর নেচে নেচে রাজপথের একপাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের চলায় যেন গন্তব্যে পৌঁছনোর কোন তাড়াই নেই! নাচ ও গানের আনন্দেই তারা যেন মত্ত। তারা কোথা থেকে আসছে কেউ জানে না। কোথায় যাবে তাও কেউ জানে না। তাদের ভাষা দুর্বোধ্য। আশ্চর্য তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ। ঝলমলে রঙদার – পরনে পা পর্যন্ত লুটোন ঘাগরা, বক্ষে চোলি। ওদের দলে আছে চারজন যুবক পুরুষ। বলিষ্ঠ চেহারা সকলের। তাদের পরনে রঙিন পাজামা আর কুর্তা। চারজনের মধ্যে তিনজন পুরুষ বাঁশি, ঝাঁঝর আর ব্যাঞ্জো বাজিয়ে নাচ গানের সঙ্গত করছে। তবে একজন – সেই মনে হয় সর্দার – দলের সবাইকে সামাল দিয়ে চলেছে। রাজপথের পথিকদের যেন কোন অসুবিধে না হয়, তাদের চলাফেরায় যেন কোন বিঘ্ন না আসে।

বিপণি থেকে মানুষজন পথের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। উপভোগ করছে বানজারা দলটির নাচগান আর ওদের উজ্জ্বল বর্ণময় উপস্থিতি। এবং তার থেকেও তারা বেশি উপভোগ করছে, মেয়েদের অপরূপ রূপ আর যৌবন। তরুণ ও যুবক বণিকরা উচ্ছ্বসিত, আঃ মেয়ে তো নয় – যেন একঝাঁক প্রজাপতি উড়ে চলেছে। তাদের সকলের মনেও এখন উড়ছে ওই প্রজাপতির দল। অন্যদিকে বয়স্ক-বিজ্ঞ বণিকদের আড় চোখেও দর্শকামের আবেশ, কিন্তু মুখে বিরক্তি – কোথা থেকে জোটে এই নচ্ছার মেয়েছেলেগুলো, আমাদের ছেলেগুলোর মাথা খাওয়ার জন্যে? কোটালরা করছে কি, দূর করে দিক শহরের সীমানার বাইরে।

ভিয়েনের রসের কড়াইতে আটকে থাকা মক্ষির মতো দলটির দিকে সকলের মন যখন আবিষ্ট, সেই সময়েই রাজপথে এসে পৌঁছল দুই ঘোড়ায় টানা সুসজ্জিত একটি রথ। রথের গতিতে ধীর লয়। রথের আরোহী চান না, রথের ঝাঁকুনিতে তাঁর পানপাত্রের পানীয় উছলে পড়ুক। অথবা রথের দ্রুত গতির ঝাঁকুনিতে ছিন্ন হয়ে যাক তাঁর মদিরার আবেশ। রথের আরোহী রাজশ্যালক রতিকান্ত। তাঁর রথের দুপাশে সামনে পিছনে সমগতিতে চলেছে ছজন সশস্ত্র অশ্বারোহী রক্ষী। অনতিদূরের প্রমোদকানন থেকে, এই সময়েই, রতিকান্ত তাঁর বাস ভবনে ফেরেন।

অহংকারী রতিকান্ত পথের দুধারের পথচারীদের কিংবা বিপণির বণিকদের মানুষের মধ্যেই গণ্য করেন না। পথের পাথরখণ্ড, অথবা পথের দুধারের গাছপালার দিকে তিনি যেমন নির্বিকার চোখে তাকিয়ে থাকেন, খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতিও তিনি একই রকম উদাসীন। তবে পথচারীদের মধ্যে দৈবাৎ কোন সুন্দরী রমণীর দর্শন পেলে, তিনি মৎস্যলোভী শিকারী বিড়াল হয়ে ওঠেন। আজ পথের পাশে নাচ-গান গাওয়া বানজারা মেয়েগুলিকে দেখে তাঁর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। সুন্দরী, যুবতী এবং নৃত্যগীত পটিয়সী এতগুলি রমণীর একত্র দর্শন পাওয়া – এ যে অভাবনীয় সৌভাগ্য। তিনি সারথিকে রথ থামানোর নির্দেশ দিলেন।

রথ থামলে তাঁর পাশে পাশে চলতে থাকা অশ্বারোহী রক্ষীকে তিনি বললেন, “অ্যাই, যা তো, মেয়েছেলেগুলোকে আজ সন্ধেবেলা আমার প্রমোদ ভবনে আসার জন্যে নেমন্তন্ন করে আয়। আমি কে পরিচয় দিবি। আর বলবি প্রত্যেকের দুহাত ভরে সোনার মুদ্রা উপহার দেব। ভাল করে বুঝিয়ে বলবি, হতভাগা তোরা যা হোঁৎকা আর মাথামোটা...”।

রক্ষীপুরুষ দলটির কাছে গিয়ে রতিকান্তর বার্তা দিতেই, মেয়েগুলি নাচ-গান থামিয়ে দিল। একটি মেয়ে গলা চড়িয়ে উত্তর দিল, “আমরা নাচগান করি মনের আনন্দে। আমরা বারনারী নয় হে, যে কেউ ডাকলেই তার নাট মহলে গিয়ে ধেই ধেই নেত্য করে বেড়াব। কথাটা আপনার ছোটরাজাকে স্পষ্ট করে বলে দিন, হ্যাঁ”।

রতিকান্ত রথে বসে মেয়েটিকে মন দিয়ে দেখলেন, তার কথাও শুনলেন। মুগ্ধ চোখে মেয়েটিকে দেখতে দেখতে তিনি ভাবলেন, এমন জিনিষের স্বাদ তিনি বহুদিন পাননি। আহা, কী ঝাঁজ, কী তেজ, যেমন বুক তেমনে তার বুকের পাটা। নিজের বুকে ওই বুকের স্পর্শই যদি না লাগল – তা হলে তিনি কিসের রাজশ্যালক? রতিকান্ত অন্য রক্ষীকে বললেন, “অ্যাই যে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? ওই মেয়েটাকে তুলে নিয়ে বন্দী কর। বেশী ট্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই করলে সবকটাকেই ধরে কয়েদ কর – তারপর আমি দেখছি”।

রক্ষীদের কর্তব্য রতিকান্তকে রক্ষা করা। তাঁকে কেউ আক্রমণ বা আঘাত করতে এলে, তাকে বন্দী করা কিংবা প্রয়োজনে হত্যা করা। কিন্তু এই নির্বিবাদী বানজারা দলটি কাউকেই আঘাত বা আক্রমণ করেনি। এক্ষেত্রে ওদের বন্দী করার কোন অধিকার তো তাদের নেই। রতিকান্তর আদেশ পেয়েও রক্ষীরা যখন ইতস্তত করছে, ঠিক তখনই অকুস্থলে উপস্থিত হল জনা ছয়েক অশ্বারোহী নগররক্ষী। তারা রক্ষীদের কথা শুনেই দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠল এবং ঘোড়া ছুটিয়ে ঘিরে ফেলল বানজারাদের দলটিকে। বাতাসে চাবুক চালাতে লাগল সপাসপ। চেঁচিয়ে উঠল “ছোটরাজাকে তোরা চিনিস না? তাঁর আদেশ অমান্য করার সাহস হয় কী করে? মানে মানে আমাদের সঙ্গে চল, নয়তো চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেব”।

দলের যে যুবকটিকে মনে হয়েছিল দলের সর্দার, সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ঝোলা থেকে ছোট্ট একটা বল্লম বের করে হাতে তুলে নিল। সেই বল্লমের ফলা দুপুরের রোদে ঝলসে উঠল আক্রোশে এবং মুহূর্তের মধ্যে  সেটি উড়ে গিয়ে গিঁথে গেল রতিকান্তর গলার ঠিক পাশে আসনের পিঠে। এক চুলের জন্যে বেঁচে গেল রতিকান্ত।

আচমকা এই ঘটনায়, মেয়েগুলিকে ছেড়ে নগররক্ষীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যুবকটির ওপর। প্রহার করতে করতে মোটা রজ্জুতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল তাকে। তারপর তুলে দিল একটি ঘোড়ার পিঠে। বন্দী যুবককে নিয়ে নগররক্ষীরা চলে যাওয়ার আগে, তারা এসে দাঁড়াল রতিকান্তর রথের পাশে।

একজন নগররক্ষী মাথা নত করে বলল, “আমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন, প্রভু। এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আপনি সুস্থ আছেন তো?”

আতঙ্কে বিবর্ণ মুখ, রতিকান্তর জিভও শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি কোনমতে বললেন, “না, কই? তেমন কিছু তো হয়নি। ঠিকই আছি”।

সেই নগররক্ষী আসনের পিঠে গিঁথে থাকা বল্লমটি খুলে নিয়ে বলল, “দুশ্চিন্তা করবেন না, প্রভু। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। আজ রাত্রে হতভাগাকে অন্ধকার কারাগারে নির্জলা উপবাসে রেখে দেব। আগামীকাল প্রথম প্রহরেই ওকে রাজপথের চৌরাস্তার স্তম্ভের পাশে শূলে চড়িয়ে দেব। সকল নাগরিক দেখুক, বুঝুক - এ রাজ্যে দুর্বৃত্তের কী পরিণতি হয়”।

কিছুটা ধাতস্থ হওয়া রতিকান্ত হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওই মেয়েগুলো? তারা তো পালিয়ে গেল!”

“ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, প্রভু। ওই দলের প্রত্যেককে আমরা অচিরেই খুঁজে বের করব। তারপর বন্দী করে আপনার সামনে এনে দাঁড় করাব। অনর্থক আপনার অনেক বিলম্ব হল প্রভু, এবার আপনি রওনা হোন। আপনার যাত্রা নির্বিঘ্ন হোক”।

নগররক্ষী ইশারা করতে সারথি রথ চালনা শুরু করল, এবং আগের মতোই ছজন অশ্বারোহী দেহরক্ষী চলল সঙ্গে। বন্দী যুবককে নিয়ে নগররক্ষীরাও দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিল উলটো দিকে। ওদিকেই নগর কোটালের কার্যালয়, বন্দীশালা ও কারাগার।

এই গোলমালের শুরুতেই বিপণির ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছিল বণিকরা। আড়াল থেকে নজর রাখছিল পরিস্থিতির ওপর। এ ধরনের ঘটনায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানে, এই ধরনের বিশৃঙ্খলা হলেই, সাধারণ জনতা, নগররক্ষী সকলেই বিপণিগুলি এবং বণিকদের উপর চড়াও হয় - অকারণ মারধোর করে এবং লুঠ করে নেয় বিপণির মূল্যবান সামগ্রী।

এখন রাজপথ জনশূণ্য। পথে একজনও পথচারী নেই। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বণিকেরা তাদের সকল বিপণিগুলির দরজা দ্রুত বন্ধ করে ফেলল। তারপর একত্রে ঘরের দিকে যেতে যেতে আলোচনা করল, আজ সন্ধ্যায় আর বিপণি খুলে কাজ নেই। আগামী কাল সকালে পরিস্থিতি বুঝে যা হোক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। 

 

 

রাজধানী শহর থেকে প্রায় পঁচিশ যোজন দূরের অনন্তপুর চটিতে ভল্লা যখন পৌঁছল, রাত্রি তখন প্রথম প্রহর পেরিয়ে গেছে।  রাজধানী থেকে সে রওনা হয়েছিল শেষ রাত্রে। তারপর একটানা ঘোড়া ছুটিয়ে এতদূরে আসা। অবশ্য মাঝে জঙ্গলের মধ্যে এক সরোবরের ধারে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিল। বিশ্রাম দিয়েছিল তার ঘোড়াটাকেও। সরোবরের তীরে প্রচুর সবুজ আর সতেজ ঘাসের সন্ধান পেয়ে, ঘোড়াটা তার সদ্ব্যবহার করতে বিলম্ব করেনি। ওই অবসরে সেও দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়েছিল। পুঁটলিতে বাঁধা চিঁড়ে সরোবরের জলে ভিজিয়ে গুড় দিয়ে মেখে সপাসপ মেরে দিয়েছিল। তারপর গামছা পেতে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম। ঘুম নয়, বিশ্রামই। প্রথম কথা ঘোড়াটাকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছিল। দ্বিতীয় কথা বিগত রাত্রিতে সে একবিন্দুও ঘুমোতে পারেনি তার ওপর ছিল সারা দেহে রক্ষীদের মারের যন্ত্রণা এবং এই দীর্ঘ পথশ্রম। চোখের পাতা একবার বন্ধ করলেই,  সে নির্ঘাৎ ঘুমিয়ে পড়বে – সেক্ষেত্রে তার যাত্রাভঙ্গ হবে। যে চটিতে আজই রাত্রে তার পৌঁছনোর কথা সেখানে পৌঁছতে পারবে না। অতএব অর্ধ প্রহর বিশ্রামের পর সে ঘোড়াচড়ে ছুটতে শুরু করেছিল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।

দূর থেকে চটির দীপস্তম্ভের আলো চোখে পড়তেই সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করেছিল। চটির আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু জনবসতি আছে। ভল্লা চায় না, সেই জনবসতির লোকদের সচকিত করে এই রাত্রে তাদের কৌতূহলী করে তুলতে। চটির সদর দরজা খোলাই ছিল, সে পথে না গিয়ে, আরও কিছুটা এগিয়ে একটি বন্ধ দরজার কাঠের পাল্লায় সে সন্তর্পণে আওয়াজ করল। সে আওয়াজের বিশেষ এক ছন্দ আছে – দ্রুত টকটক – কিছুটা বিরতি – বিলম্বিতে তিনবার – আবার বিরতি - তারপর আবার দ্রুত দুবার।

ভেতর থেকে দরজাটা দ্রুত খুলে যেতেই ভল্লা ঘোড়া সমেত ঢুকে গেল চটির প্রাঙ্গণে। এদিকটা চটির পিছনের দিক। এদিকে আলোর তেমন ব্যবস্থা নেই। চটির অতিথিশালায় এবং সামনের দিকে কয়েকটা মশাল জ্বলছে, তার আভাসটুকু এখানে পাওয়া যায়।  কারণ এদিকের অনেকটা জুড়ে আছে পশুশালা। বণিকদের গাধা, ঘোড়া, বলদদের জন্য রাত্রির আবাস। আর পশুশালা পার হয়ে, ওপাশে আছে চটির কর্মীদের আবাস।

ভল্লার ঘোড়ার লাগাম নিজের হাতে ধরে – যে দরজা খুলে দিয়েছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লা?”

“হুঁ”।

“কী চেহারা করেছিস, চুল-দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে – চেনাই যাচ্ছে না। তুই ঘরে চ, আমি ঘোড়াটার একটা ব্যবস্থা করেই আসছি”। এই চটিতে ভল্লা বহুবার থেকেছে, কাজেই অন্ধকারেও ঘর চিনে ঢুকতে তার অসুবিধে হল না।

ঘোড়ার ব্যবস্থা করে লোকটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে এসে ঢুকল, বলল, “অন্ধকারে ভূতের মতো কী করছি, প্রদীপটা জ্বালাসনি কেন? কোথায় তুই?”

আপাততঃ নিশ্চিন্ত ও বিশ্বস্ত একটা আশ্রয় পেয়ে, ভল্লা দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেয় বসে পড়েছিল। তার সমস্ত শরীর ক্লান্তিতে ও যন্ত্রণায় অবসন্ন। বলল, “এই তো এখানে, বসে আছি”।

চটির লোকটি চকমকি ঠুকে একটা প্রদীপ জ্বালতে ঘরের অন্ধকার একটু ফিকে হল। প্রদীপটা কুলুঙ্গিতে রেখে ঘুরে দাঁড়াল, তাকাল মেঝেয় বসে থাকা ভল্লার দিকে। চমকে উঠল, “কী হয়েছে তোর? মুখ চোখ অত ফুলেছে কেন? চোখের নিচে কালশিটে। মারামারি করেছিস? কার সঙ্গে?”

“বলছি, সব বলব। আগে একটু জল খাওয়া না, চিকা। সেই দুপুরে জল খেয়েছিলাম, তারপর আর...তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে”।

“আনছি”। বলেই চিকা দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল, অল্প সময়ের মধ্যেই কাঁসার ঘটিতে আনল খাবার জল। ভল্লার হাতে তুলে দিল কয়েকটা বাতাসা আর ঘটিটা। লোভীর মতো বাতাসাগুলো মুখে পুরে নিয়ে চিবোতে গিয়েই শিউরে উঠল ভল্লা, চোয়ালে হাত রাখল। যন্ত্রণায় তার মুখ বেঁকে গেল। চিকার দিকে চোখ তুলে তাকাল, তারপর গলায় ঘটির জল ঢালতে ঢালতে ইশারায় চিকাকে বসতে বলল। চিকা মেঝেয় বসল ভল্লার সামনে।

ভল্লার জল খাওয়া শেষ হতে ঘটিটা মেঝেয় রেখে হাসির চেষ্টায় মুখ ব্যাঁকাল, বলল, “কাল দুপুরে উদোম ক্যালানি খেয়েছি রে, শালা। গোটা শরীরে তার তাড়স”।

“কারা মারল? কী করেছিলি”?

“রাজার শ্যালকের দিকে বল্লম ছুঁড়েছিলাম। বল্লমটা লোকটার গলার দু-তিন আঙুল দূর দিয়ে ছুটে গিয়ে, তার রথের আসনে গিঁথে গেল। তুই তো জানিস আমার হাতের বল্লম কখনো ফস্কায় না। এবার ফস্কাতে হল, আধিকারিকদের আদেশ। তারপর আর কি, নগররক্ষীরা ধরে ফেলল। মারধোর করে নিয়ে গেলে কারাগারে”।

“তুই বলতে চাইছিস, সবটাই নাটক?”

“নাটক তো বটেই। অন্য শহর থেকে তিনজন ছোকরা আর পাঁচজন সুন্দরী বারবনিতাকে বানজারা সাজিয়ে রাজধানীতে আনা হয়েছিল, যাতে তারা রাজশ্যালক রতিকান্তর চোখে পড়ে। সেই দলে আমিও ছিলাম। রতিকান্ত  সেই ফাঁদেই পা দিল। দলটা রাজপথে নাচ-গান করতে করতে যখন যাচ্ছিল, সেই সময়েই এসে পড়ল রতিকান্তর রথ। দলের সুন্দরী মেয়েগুলোকে দেখেই হতভাগা রতিকান্তর লোভ চেগে উঠল। দেহরক্ষীদের বলল, “ধরে আন মেয়েগুলোকে”। দেহরক্ষীদের সঙ্গে ওই মেয়েদের দলটার বচসা শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যেই সেখানে হাজির হল কয়েকজন নগররক্ষী। রক্ষীরা সকলে মিলে যখন মেয়েগুলোকে ধরার জন্যে ঝাঁপিয়েছে, আমি বল্লমটা ছুঁড়লাম রতিকান্তর দিকে। ব্যস, রক্ষীরা সব্বাই আমাকে নিয়ে পড়ল”।

“আর মেয়েগুলোর কী হল?”

“তাদের আর কী? তারা পালিয়ে গিয়ে উঠল, আগে থেকেই ঠিক করা গোপন এক আড্ডায়। সেখানে বানজারার পোষাক বদলে, সাধারণ চাষীঘরের বউ-মেয়ে সেজে সরে পড়ল মাঠের আলপথ ধরে”।

“বুঝলাম। কিন্তু তুই কারাগার থেকে ছাড়া পেলি কী করে?”

“ওই যে বললাম আধিকারিকদের নির্দেশ। মাঝরাত্রে এসে আমাকে একটা ঘোড়া দিয়ে বলল, এখনই বেরিয়ে যাও। পথে কোথাও দাঁড়াবে না। রাতটা কাটাবে এই চটিতে। কিন্তু গোপনে”।

চিকা মৃদু হাসল, বলল, “হুঁ। গতকাল সকালে।  তার মানে, তখনো তুই রতিকান্তর দিকে বল্লম ছুঁড়িসনি। আমার কাছে সেই নির্দেশ এসে গেছে। তোর ঘোড়া আমি রেখে দেব। আর তোকে একজোড়া রণপা দিয়ে রাত পোয়ানোর আগেই রওনা করিয়ে দেব। কিন্তু তুই যাবি কী করে, শরীরের এই অবস্থায়?”

“রাজার আদেশ ভাই, যেতে তো হবেই। নির্দেশ আছে আমার এই ক্ষতবিক্ষত মুখ আর শরীর নিয়েই আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। তাতে আমার কাজের নাকি সুবিধে হবে”।

অবাক হয়ে চিকা জিজ্ঞাসা করল, “তোর গন্তব্য কোথায়? কাজটা কি?”

ভল্লা চিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা তো বলা যাবে না, ভাই। যদি বেঁচে থাকি, ফেরার সময় তোকে নিশ্চয় বলে যাবো…”।


চিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝলাম। তুই মুখ হাত ধুয়ে নে, আমি তোর খাবার নিয়ে আসছি। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়। রাত্রি শেষ প্রহরে তোকে ডেকে রওনা করিয়ে দেব”।


পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩


  

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...