বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৩শ পর্ব

 

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের দ্বাদশ অধ্যায়ঃ ভক্তিযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে  গীতা - ১২শ পর্ব "


আগের পর্বে অর্জুন ভক্তিযোগের মহিমা উপলব্ধি করলেন, কিন্তু তাও তাঁর মনের সংশয় যেন মিটল না। যাঁকে ভক্তি করলে, পরম মুক্তি মিলবে - তিনি ঠিক কে? তাঁকে চিনবই বা কী করে? যাকে তাকে ভক্তি করাটাও তো কোন কাজের কথা নয়। যাঁকে ভক্তি করব -  তিনি যে সত্যিই ভক্তবৎসল তত্ত্বজ্ঞানী - সেটুকু বোধগম্য হতেও যে ভক্তের তত্ত্বজ্ঞান থাকা প্রয়োজন।  গহন অন্ধকারে পথের সন্ধানে ভক্ত নিজেকে সমর্পণ করবে যাঁর হাতে,  তিনি নিজেও যে অন্ধ নন - সেটুকু আস্থা ভক্ত করবে কীভাবে? সেই জ্ঞানগম্যতার জন্যেই অর্জুন  ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন -     


ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ


অর্জুন উবাচ

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব ক্ষেত্রং ক্ষেত্রজ্ঞমেব চ।

এতদ্বেদিতুমিচ্ছামি জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ কেশব।।

অর্জুন উবাচ

প্রকৃতিং পুরুষং চ এব ক্ষেত্রং ক্ষেত্রজ্ঞম্‌ এব চ।

এতৎ বেদিতুম্‌ ইচ্ছামি জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ কেশব।।

অর্জুন বললেন – হে কেশব, প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় এই সমস্ত বিষয়েও আমি জানতে ইচ্ছে করি।

 

শ্রীভগবানুবাচ

ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে।

এতদ্‌ যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রম্‌ ইতি অভিধীয়তে।

  এতদ্‌ যঃ বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ    ইতি তদ্বিদঃ।।

 

 

শ্রীভগবান বললেন- হে কুন্তীপুত্র, এই শরীরকেই ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়। আর এই ক্ষেত্রকে যে তত্ত্বজ্ঞানী উপলব্ধি করেছেন তাঁকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয়ে থাকে।

 

ক্ষেত্রজ্ঞঞ্চাপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োর্জ্ঞানং যত্তজ্‌জ্ঞানং মতং মম।।

ক্ষেত্রজ্ঞং চ অপি মাং বিদ্ধি সর্বক্ষেত্রেষু ভারত।

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ জ্ঞানং যৎ তৎ জ্ঞানং মতং মম।।

হে অর্জুন, সকল ক্ষেত্রে আমাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জেনে রাখো। ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের যে জ্ঞান সেই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান বলে আমি মনে করি।

 

তৎ ক্ষেত্রং যচ্চ যাদৃক্‌চ যদ্বিকারি যতশ্চ যৎ।

স চ যো যৎপ্রভাবশ্চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।।

তৎ ক্ষেত্রং যৎ চ যাদৃক্‌ চ যৎ বিকারি যতঃ চ যৎ।

স চ যঃ যৎপ্রভাবঃ চ তৎ সমাসেন মে শৃণু।।

সেই ক্ষেত্র যেমন ধর্মযুক্ত, যেমন বিকারযুক্ত এবং যে ভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং যার প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে, সেই তত্ত্বটি আমি তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করছি শোনো।

 

ঋষিভির্বহুধা গীতং ছন্দোভির্বিবিধৈঃ পৃথক্‌।

ব্রহ্মসূত্রপদৈশ্চৈব হেতুমদ্ভির্বিনিশ্চিতৈঃ।।

ঋষিভিঃ বহুধা গীতং ছন্দোভিঃ বিবিধৈঃ পৃথক্‌।

ব্রহ্মসূত্র-পদৈঃ চ এব হেতুমদ্ভিঃ বিনিশ্চিতৈঃ।।

এই তত্ত্বকথা অনেক ঋষিগণ অনেক ভাবে ব্যাখা করেছেন। বেদের নানান শাখায়, নানান ছন্দে এই তত্ত্বের কথা, ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশের সূত্র হিসেবে, নিঃসংশয় যুক্তির সঙ্গে ব্যাখা করা হয়েছে।

 

৬,৭

মহাভূতান্যহঙ্কারো বুদ্ধিরব্যক্তমেব চ।

ইন্দ্রিয়াণি দশৈকঞ্চ পঞ্চ চেন্দ্রিয়গোচরাঃ।।

ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতশ্চেতনা ধৃতিঃ।

এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারমুদাহৃতাম্‌।।

মহাভূতানি অহঙ্কারঃ বুদ্ধিঃ অব্যক্তম্‌ এব চ।

ইন্দ্রিয়াণি দশ একং চ পঞ্চ চ ইন্দ্রিয়গোচরাঃ।। ৬

ইচ্ছা দ্বেষঃ সুখং দুঃখং সংঘাতঃ চেতনা ধৃতিঃ।

এতৎ ক্ষেত্রং সমাসেন সবিকারম্‌ উদাহৃতাম্‌।। ৭

মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ-এই পাঁচটি মহাভূত থেকে অহংকার, অহংকার থেকে বুদ্ধি, বুদ্ধি থেকে অব্যক্ত ঈশ্বরচেতনা, দশ ইন্দ্রিয় ও মন এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়গোচর অনুভূতি। কামনা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা, ধৈর্য – এই সব নিয়েই বিকারযুক্ত ক্ষেত্রের কথা তোমাকে সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম।

   

৮-১২

অমানিত্বমদম্ভিত্বমহিংসা ক্ষান্তিরার্জবম্‌।

আচার্যোপাসনং শৌচং স্থৈর্যমাত্মবিনিগ্রহঃ।।

ইন্দ্রিয়ার্থেষু বৈরাগ্যমনহঙ্কার এব চ।

জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ-দোষানুদর্শনম্‌।।

অসক্তিরনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু।

নিত্যঞ্চ সমচিত্তত্বমিষ্টানিষ্টোপপত্তিষু।।

ময়ি চানন্যযোগেন ভক্তিরব্যভিচারিণী।

বিবিক্তদেশসেবিত্বমরতির্জনসংসদি।।

অধ্যাত্ম-জ্ঞান-নিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শনম্‌।

এতজ্‌জ্ঞানমিতি প্রোক্তমজ্ঞানং যদতোঽন্যথা।।

অমানিত্বম্‌ অদম্ভিত্বম্‌ অহিংসা ক্ষান্তিঃ আর্জবম্‌।

আচার্য-উপাসনং শৌচং স্থৈর্যম্‌ আত্মবিনিগ্রহঃ।। ৮

ইন্দ্রিয় অর্থেষু বৈরাগ্যম্‌ অনহঙ্কার এব চ।

জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি-দুঃখ-দোষ অনুদর্শনম্‌।। ৯

অসক্তিঃ অনভিষ্বঙ্গঃ পুত্রদারগৃহাদিষু।

নিত্যং চ সমচিত্তত্বম্‌ ইষ্টা অনিষ্ট উপপত্তিষু।। ১০

ময়ি চ অনন্যযোগেন ভক্তিঃ অব্যভিচারিণী।

বিবিক্ত-দেশ-সেবিত্বম্‌ অরতিঃ জনসংসদি।। ১১

অধ্যাত্ম-জ্ঞান-নিত্যত্বং তত্ত্বজ্ঞানার্থ-দর্শনম্‌।

এতৎ জ্ঞানম্‌ ইতি প্রোক্তম্‌ অজ্ঞানং যৎ অতঃ অন্যথা।। ১২

নিজের বিশেষ গুণের জন্যে আত্মশ্লাঘা ও দম্ভ না করা। অহিংসা, ক্ষমা, সারল্য, গুরুর উপাসনা, সদাচার-শুচিতা, স্থৈর্য, আত্ম সংযম, ইন্দ্রিয়ের সুখভোগ থেকে বৈরাগ্য, নিরহঙ্কার; জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধি থেকে পাওয়া দুঃখের বারবার দোষবিচার ও বিষয়ে অনাসক্তি; পুত্র, স্ত্রী ও ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন নির্বিকার ভাব। অভীষ্ট লাভ কিংবা অনিষ্ট প্রাপ্তিতে মনের সর্বদা সাম্য ভা্ব; আমার প্রতি অচলা ভক্তিযুক্ত হয়ে একনিষ্ঠ যোগসাধনা, নির্জন স্থানে বসবাস, অসদাচারী লোকের সংস্রব ত্যাগ, আত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা, সর্বদা তত্ত্বজ্ঞানের পর্যালোচনা এই হল প্রকৃত জ্ঞান ও তার সাধনার পথ। এ ছাড়া আর যা কিছু – সবই অজ্ঞান।

 

১৩

জ্ঞেয়ং যত্তৎ প্রবক্ষ্যামি যজ্‌জ্ঞাত্বাঽমৃতমশ্নুতে।

অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ তন্নাসদুচ্যতে।।

জ্ঞেয়ং যৎ তৎ প্রবক্ষ্যামি যৎ জ্ঞাত্বা অমৃতম্‌ অশ্নুতে।

অনাদিমৎ পরং ব্রহ্ম ন সৎ তৎ ন অসৎ উচ্যতে।।

যা জ্ঞেয় অর্থাৎ জানার বিষয়, যা জানলে অমৃত স্বরূপ পরম মুক্তি লাভ করা সম্ভব সেই কথাই এখন আমি তোমাকে বলব। এই জ্ঞান অনাদি পরম ব্রহ্মস্বরূপ, সৎ ও অসতের ঊর্ধে, এমনই বলা হয়ে থাকে।

 

১৪

সর্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোঽক্ষিশিরোমুখম্‌।

সর্বতঃ শ্রুতিমল্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি।।

সর্বতঃ পাণি-পাদং তৎ সর্বতঃ অক্ষি-শিরঃ-মুখম্‌।

সর্বতঃ শ্রুতিমৎ লোকে সর্বম্‌ আবৃত্য তিষ্ঠতি।।

সর্ব জীবে তাঁরই হাত ও পা, চোখ ও কান, মাথা ও মুখ রয়েছে এবং এইভাবেই তিনি ইহলোকের সর্বত্রই ব্যাপ্ত রয়েছেন।

 

১৫

সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্‌।

অসক্তং সর্বভৃচ্চৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।

সর্ব ইন্দ্রিয়গুণ আভাসং সর্ব ইন্দ্রিয়-বিবর্জিতম্‌।

অসক্তং সর্বভৃৎ চ এব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ।।

সমস্ত ইন্দ্রিয়ের অতীত হলেও, ইন্দ্রিয়ের সকল কাজে তিনি প্রকাশিত হন। তিনি সকলের আশ্রয় স্বরূপ, কিন্তু তিনি কিছুতেই যুক্ত নন। তিনি তিনগুণের ঊর্ধে, অথচ তিনি এই তিনগুণের পরিণাম ভোগ করেন।

 

১৬

বহিরন্তশ্চ ভূতানামচরং চরমেব চ।

সূক্ষ্মত্বাৎ তদবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চান্তিকে চ তৎ।।

বহিঃ অন্তঃ চ ভূতানাম্‌ অচরং চরম্‌ এব চ।

সূক্ষ্মত্বাৎ তৎ অবিজ্ঞেয়ং দূরস্থং চ অন্তিকে চ তৎ।।

সমস্ত চরাচরের তিনিই অন্তর, তিনিই বাহির; তিনিই স্থাবর এবং তিনিই জঙ্গম। তাঁর এই সূক্ষ্মতার জন্যে তিনি অজ্ঞানীর থেকে অজ্ঞেয়তার দূরত্বে থাকেন, কিন্তু জ্ঞানীর নিকটেই অবস্থান করেন।

 

১৭

অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্‌।

ভূতভর্তৃ চ তজ্‌জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।

অবিভক্তং চ ভূতেষু বিভক্তম্‌ ইব চ স্থিতম্‌।

ভূতভর্তৃ চ তৎ জ্ঞেয়ং গ্রসিষ্ণু প্রভবিষ্ণু চ।।

এই ব্রহ্মস্বরূপ জ্ঞেয় অবিভাজ্য, কিন্তু ইনিই অজস্র ভাগে বিভক্ত হয়ে সমস্ত ভূতের মধ্যেই অবস্থান করেন। ইনিই সমস্ত ভূতকে পালন করেন, বিনাশ করেন আবার সৃষ্টিও করেন।

 

১৮

জ্যোতিষামপি তজ্জ্যোতিস্তমসঃ পরমুচ্যতে।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য ধিষ্ঠিতম্‌।।

জ্যোতিষাম্‌ অপি তৎ জ্যোতিঃ তমসঃ পরম্‌ উচ্যতে।

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং জ্ঞানগম্যং হৃদি সর্বস্য ধিষ্ঠিতম্‌।।

ইনি জগতের সমস্ত জ্যোতির্মণ্ডলীর জ্যোতি, তাই অজ্ঞান অন্ধকারের অতীত বলা হয়। জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞানগম্যের অন্তরেই এঁনার অধিষ্ঠান।

[ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের সংজ্ঞা ১৩/৮-১২ এবং জ্ঞেয় সম্পর্কে ১৩/১৩-১৭ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন। জ্ঞেয় ব্রহ্মকে জানতে পারলে জ্ঞানগম্য বলা হয়।]

  

১৯

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চোক্তং সমাসতঃ।

মদ্ভক্ত এতদ্বিজ্ঞায় মদ্ভাবায়োপপদ্যতে।।

ইতি ক্ষেত্রং তথা জ্ঞানং জ্ঞেয়ং চ উক্তং সমাসতঃ।

মৎ ভক্ত এতৎ বিজ্ঞায় মৎ-ভাবায় উপপদ্যতে।।

এতক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় –এই তিন তত্ত্ব সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম। যাঁরা আমার একান্ত ভক্ত, তাঁরা এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে আমার ব্রহ্মস্বরূপ লাভে সমর্থ হন।

  

২০

প্রকৃতিং পুরুষঞ্চৈব বিদ্ধ্যনাদী উভাবপি।

বিকারাংশ্চ গুণাংশ্চৈব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্‌।।

প্রকৃতিং পুরুষং চ এব বিদ্ধি অনাদী উভৌ অপি।

বিকারান্‌ চ গুণান্‌ চ এব বিদ্ধি প্রকৃতিসম্ভবান্‌।।

প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলেই জানবে। আরও জেনো, প্রকৃতি থেকেই বুদ্ধি-অবুদ্ধি, সুখ-দুঃখ, শোক-তাপের বিকার এবং মোহগুণের সৃষ্টি হয়।

 

২১

কার্যকরণকর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিরুচ্যতে।

পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুরুচ্যতে।।

কার্য-করণ-কর্তৃত্বে হেতুঃ প্রকৃতিঃ উচ্যতে।

পুরুষঃ সুখদুঃখানাং ভোক্তৃত্বে হেতুঃ উচ্যতে।।

প্রকৃতিকে বলা হয়, সমস্ত কার্য-করণের কর্তৃত্বের একমাত্র কারণ। আর পুরুষকে বলা হয় সুখ-দুঃখ ইত্যাদির ভোগের কারণ।

[দেহ হল কার্য; দশ ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মন ও প্রাণ হল করণ। জীব দেহধারণের সঙ্গে সঙ্গে ভূত ও বিষয় গ্রহণ করে। একই সঙ্গে করণের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সুখ, দুঃখ ইত্যাদি প্রকৃতিজাত মোহ। পুরুষ তার চেতনা দিয়ে ভোগ করে সুখদুঃখ, শোকতাপ ইত্যাদি মোহ। প্রকৃতির কার্যকরণের কর্তৃত্বে আর ভোক্তা পুরুষের চেতনার সংযোগে গড়ে ওঠে এই সংসার।]

  

২২

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থো হি ভুঙ্‌ক্তে প্রকৃতিজান্‌ গুণান্‌।

কারণং গুণসঙ্গোঽস্য সদসদ্‌যোনিজন্মসু।।

পুরুষঃ প্রকৃতিস্থঃ হি ভুঙ্‌ক্তে প্রকৃতিজান্‌ গুণান্‌।

কারণং গুণসঙ্গঃ অস্য সৎ-অসৎ-যোনি-জন্মসু।।

যেহেতু পুরুষ প্রকৃতির মধ্যেই অবস্থান করে ও প্রকৃতিজাত সমস্ত গুণ ভোগ করে, তাই এই গুণের আসক্তিতে জীব, মানুষ কিংবা পশুরূপে - সৎ কিংবা অসৎ যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে।

     

২৩

উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ।

পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেঽস্মিন্‌ পুরুষঃ পরঃ।।

উপদ্রষ্টা অনুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ।

পরম্‌-আত্মা ইতি চ অপি উক্তঃ দেহে অস্মিন্‌ পুরুষঃ পরঃ।।

দেহে অবস্থানকারী এই যে পুরুষ সাক্ষী স্বরূপে সবকিছু অনুমোদন করেন, পালন করেন ও ভোগ করেন, তাঁকেই পরমাত্মা মহেশ্বর বলা হয়।

  

২৪

য এব বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ।

সর্বথা বর্তমানোঽপি ন স ভূয়োঽভিজায়তে।।

য এব বেত্তি পুরুষং প্রকৃতিং চ গুণৈঃ সহ।

সর্বথা বর্তমানঃ অপি ন স ভূয়ঃ অভিজায়তে।।

যিনি এই পরম পুরুষ এবং সমস্ত বিকারগুণ সহ প্রকৃতির স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন, তিনি যে কোন অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তাঁকে আর জন্ম গ্রহণ করতে হয় না।

 

২৫

ধ্যানেনাত্মনি পশ্যন্তি কেচিদাত্মানমাত্মনা।

অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চাপরে।।

ধ্যানেন আত্মনি পশ্যন্তি কেচিৎ আত্মানম্‌ আত্মনা।

অন্যে সাংখ্যেন যোগেন কর্মযোগেন চ অপরে।।

কেউ কেউ ধ্যানযোগে শুদ্ধ আত্মা হয়ে নিজের আত্মাকে উপলব্ধি করতে পারেন। অন্য কেউ কেউ সাংখ্যযোগে, কেউ বা নিষ্কাম কর্মযোগে পরম আত্মাকে অনুভব করেন।

 

২৬

অন্যে ত্বেবমজানন্তঃ শ্রুত্বাঽন্যেভ্য উপাসতে।

তেঽপি চাতিতরন্ত্যেব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণঃ।।

অন্যে তু এবম্‌ অজানন্তঃ শ্রুত্বা অন্যেভ্য উপাসতে।

তে অপি চ অতিতরন্তি এব মৃত্যুং শ্রুতিপরায়ণঃ।।

আরও কেউ কেউ আত্মাকে এই ভাবে না জেনে, গুরুর উপদেশ অনুসারে উপাসনা করে থাকেনগুরুর উপদেশে ভক্তিনিষ্ঠ এই ব্যক্তিরাও মৃত্যুময় এই সংসার অতিক্রম করতে পারেন।

 

২৭

যাবৎ সঞ্জায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্‌।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তদ্বিদ্ধি ভরতর্ষভ।।

যাবৎ সঞ্জায়তে কিঞ্চিৎ সত্ত্বং স্থাবরজঙ্গমম্‌।

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞসংযোগাৎ তৎ বিদ্ধি ভরতর্ষভ।।

হে ভরত কুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, জেনে রাখো, এই জগতে যা কিছু স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ, সবই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ থেকেই উৎপন্ন।

  

২৮

সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্‌।

বিনশ্যৎস্ববিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।

সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্‌।

বিনশ্যৎসু অবিনশ্যন্তং যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।

বিনাশশীল সর্বভূতের সর্বত্র যিনি অবিনাশী পরমেশ্বরকে সমানভাবে ব্যাপ্ত দেখতে পান, তিনিই সম্যকদর্শী জ্ঞানী।

 

২৯

সমং পশ্যন্‌ হি সর্বত্র সমবস্থিতমীশ্বরম্‌।

ন হিনস্ত্যাত্মনাত্মানং ততো যাতি পরাং গতিম্‌।।

সমং পশ্যন্‌ হি সর্বত্র সমবস্থিতম্‌ ঈশ্বরম্‌।

ন হিনস্তি আত্মনা আত্মানং ততঃ যাতি পরাং

 গতিম্‌।।

 

 

যেহেতু তিনি সর্বত্র সমভাবে ব্যাপ্ত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পর, নিজের আত্মা ও পরের আত্মায় বিভেদ করেন না, সেহেতু তিনিই পরম গতি লাভ করেন।

    

৩০

প্রকৃত্যৈব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ।

যঃ পশ্যতি তথাত্মানমকর্তারং স পশ্যতি।।

প্রকৃত্যা এব চ কর্মাণি ক্রিয়মাণানি সর্বশঃ।

যঃ পশ্যতি তথা আত্মানম্‌ অকর্তারং স পশ্যতি।।

আত্মপুরুষ অকর্তা এবং সকল কর্ম প্রকৃতির কার্য-করণেই নিষ্পন্ন হয় - যাঁর এই উপলব্ধি হয়েছে, তিনিই সত্যদ্রষ্টা।

 

৩১

যদা ভূতপৃথগ্‌ভাবমেকস্থমনুপশ্যতি।

তত এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।

যদা ভূত-পৃথক্‌-ভাবম্‌ একস্থম্‌ অনুপশ্যতি।

ততঃ এব চ বিস্তারং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা।।

যখন বিভিন্ন ভূতসমূহকে একই আত্মায় একত্র অবস্থান করতে দেখা যায় এবং সেই আত্মা থেকেই সমস্ত ভূতের বিকাশ - এমন উপলব্ধি করা যায়, তখনই ব্রহ্মস্বরূপ লাভ হয়।

 

৩২

অনাদিত্বান্নির্গুণত্বাৎ পরমাত্মাঽয়মব্যয়ঃ।

শরীরস্থোঽপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে।।

অনাদিত্বাৎ নির্গুণত্বাৎ পরমাত্মা অয়ম্‌ অব্যয়ঃ।

শরীরস্থঃ অপি কৌন্তেয় ন করোতি ন লিপ্যতে।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, এই পরমাত্মা অনাদি এবং নির্গুণ বলেই অক্ষয় এবং অব্যয়। শরীরের মধ্যে অবস্থান করলেও, ইনি না কোন কর্ম করেন, না তার ফলভোগ করেন।

 

৩৩

যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাদাকাশং নোপলিপ্যতে।

সর্বত্রাবস্থিতো দেহে তথাত্মা নোপলিপ্যতে।।

যথা সর্বগতং সৌক্ষ্ম্যাৎ আকাশং ন উপলিপ্যতে।

সর্বত্র অবস্থিতঃ দেহে তথা আত্মা ন উপলিপ্যতে।।

আকাশ যেমন সর্বব্যাপী হওয়া সত্ত্বেও সূক্ষ্মতার জন্যে কোন কিছুতেই সংযুক্ত নয়, তেমনই দেহের সর্বত্র অবস্থান করেও আত্মা দেহজাত দোষগুণে লিপ্ত হন না।

 

৩৪

যথা প্রকাশয়ত্যেকঃ কৃৎস্নঃ লোকমিমং রবিঃ।

ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।

যথা প্রকাশয়তি একঃ কৃৎস্নঃ লোকম্‌ ইমং রবিঃ।

ক্ষেত্রং ক্ষেত্রী তথা কৃৎস্নং প্রকাশয়তি ভারত।।

হে অর্জুন, এক সূর্য যেমন এই সমগ্র জগতকে আলোক দান করেন, তেমনই এক পরমাত্মাস্বরূপ ক্ষেত্রী সমগ্র ক্ষেত্রকে প্রকাশ করে থাকেন।

 

 

৩৫

ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞয়োরেবমন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা।

ভূতপ্রকৃতিমোক্ষঞ্চ যে বিদুর্যান্তি তে পরম্‌।।

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞয়োঃ এবম্‌ অন্তরং জ্ঞানচক্ষুষা।

ভূত-প্রকৃতি-মোক্ষং চ যে বিদুঃ যান্তি তে পরম্‌।।

এই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রভেদ এবং সমস্ত ভূত-প্রকৃতির মোহ থেকে মুক্তির উপায় যিনি জ্ঞানচক্ষু দিয়ে বুঝতে পারেন, তিনিই পরমব্রহ্ম লাভ করেন। 

 

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ সমাপ্ত

এর পরে চতুর্দশ অধ্যায়ঃ গুণত্রয়বিভাগযোগ বিভাগ যোগ 

বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৪

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের তৃতীয় পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৩ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

চতুর্থ পর্বাংশ 


৪.২.৪ খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর ভারত

কুষাণ সাম্রাজ্যের পতনের পর অনেক ঐতিহাসিক গুপ্তসাম্রাজ্যের সূচনার সময় পর্যন্ত কমবেশি শতাধিক বছরগুলিকে ভারতের তমসাচ্ছন্ন যুগ বলে থাকেন। কারণ এই সময়ের ইতিহাস বেশ অস্পষ্ট এবং রাজনৈতিক দিক থেকে একান্তই গুরুত্বহীন এবং তাৎপর্যহীন।

সফল রাজা ও রাজ্যের অভাবে, ভারতের ইতিহাস এই পর্যায়ে রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বহীন হলেও, সামাজিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে এই সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

এখনও পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্বের দুটি এবং খ্রিষ্টিয় দুটি শতাব্দীতে আমরা লক্ষ্য করলাম, আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত ভারতভূমিতে অদ্ভূত এক সামাজিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। দেশীয় আর্য এবং অনার্য জনগণের সমাজে মিশে যাচ্ছিল বহিরাগত অজস্র জনজাতি। যাদের মধ্যে ছিল গ্রীক, পারসী, ব্যক্ট্রিয়ান, সিথিয়ান, পার্থিয়ানদের মত অত্যন্ত সভ্য এবং প্রাচীন সংস্কৃতিসম্পন্ন জনজাতি। পাশাপাশি শক, পহ্লব, কুষাণদের মতো বেশ কিছু জনগোষ্ঠী – যারা মাত্র কয়েকশ বছর আগেও যাযাবর কিংবা পশুপালক ছিলেন। এই জনগোষ্ঠীর সকলেই বিজয়ী জাতি হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু ক্রমশঃ তাঁদের সকলেই ভারতীয় সমাজে সম্পূর্ণ মিশে গেল। বহিরাগত এই সমস্ত জনগোষ্ঠী-প্রবাহগুলির প্রত্যেকটি কীভাবে ভারতীয় বর্ণভিত্তিক সমাজ-সমুদ্রে মিশে যেতে পারল, সেকথায় বিস্তারিত যাওয়ার আগে, তখনকার ভারতীয় সমাজের অবস্থান সম্পর্কে একটু আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। 

 

৪.২.৪.১ সাংস্কৃতিক মিশ্রণ ও বিস্তার

সমুদ্র-বাণিজ্য সূত্রে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের যেমন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তেমনই স্থলপথে উত্তর ভারতের সঙ্গে গ্রেকো-রোমান (Greco-Roman) সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এই যোগাযোগে চিন্তা-ভাবনার আদানপ্রদান যেমন হয়েছিল, তেমনই ভারতীয় সংস্কৃতি ঋদ্ধ হয়েছিল নান্দনিক স্থাপত্য এবং শিল্পকলার দক্ষতায়। প্রথম দিকে বৌদ্ধরাই ছিলেন এই আদান-প্রদানের প্রধান অনুঘটক, কারণ বিদেশী অর্থাৎ অভারতীয়দের কাছে ব্রাহ্মণ্যধর্মের থেকে বৌদ্ধদের সংস্পর্শ অনেক বেশি সহজ ছিল। সাংস্কৃতিক এই আদান-প্রদানেই, নানান ধরনের লোককথা এবং লোককাহিনী, এমনকি পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা রচিত “পঞ্চতন্ত্র”এর গল্পগুলিও, নানান ভাষায় অনুবাদ হয়ে ইওরোপ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল এবং পরবর্তী কালে তার বেশ কিছু অংশ নিয়ে “ঈশপ’স ফেব্‌ল্‌স্‌” (Aesop’s fables) সংকলিত হয়েছিল। “চতুরঙ্গ” বলে একটি খেলার কথাও শোনা যায়, পশ্চিমে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। যে খেলাটি ভারতীয় চতুরঙ্গ (হস্তী, নৌ, অশ্ব ও পদাতিক) সেনা বিন্যাস নিয়ে বানানো এবং চারজন খেলোয়াড় মিলে খেলতে হত। পরবর্তীকালে এই খেলাই কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে “দাবা” (chess) হয়ে উঠেছে, এবং বিশ্বের বহুদেশেই এটি আজও জনপ্রিয়।

এই আদান-প্রদানে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল ভারতীয় শিল্প, যার সূত্রপাত আফগানিস্তানের গান্ধার অঞ্চলে এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। গান্ধার শিল্পে বহুজাতিক শিল্পের মিশ্রণ ঘটেছিল। তার মধ্যে একটা হল, গ্রেকো-রোমান ব্রোঞ্জভাস্কর্য এবং স্টাকো[1] (stucco) শৈলী। গান্ধার শিল্পের সূচনার কিছুদিনের মধ্যে মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধ মূর্তি বানানোর প্রচলন যখন অনুমোদিত হয়ে গেল, খুব স্বাভাবিক ভাবেই বুদ্ধ মূর্তি বানাতে এই শিল্পের প্রচলন শুরু করলেন বৌদ্ধরাই। সে মূর্তি কখনো গ্রীক শৈলীতে বড়ো পাথরের মূর্তি কিংবা গ্রেকো-রোমান শৈলীর ছোট ধাতব মূর্তি। যদিও গান্ধার শৈলী ভারতীয়দের হাতে পড়ে ভারতীয় শৈলী হয়ে উঠতে কয়েকশ বছর সময় পার হয়েছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ গ্রীক ও রোমান শৈলী নিখুঁত অঙ্গ সৌষ্ঠব এবং সুসমঞ্জস অবয়বের অনুসারী। কিন্তু ভারতীয় শৈলীতে তার পরেও প্রয়োজন ছিল ভাব (Expressions) – পরম কারুণিকের করুণা এবং সর্ব জীবে প্রেমের শরীরি ব্যঞ্জনা।

ভারতীয় দর্শন যে পশ্চিমের ধারণায় নিবিড় প্রভাব ফেলেছিল, সে কথা সবিস্তারে বলেছি, এই পর্বের প্রথম অধ্যায়ে। তবে ভারত সম্পর্কে কিছুদিন আগে পর্যন্ত পশ্চিমের যে ধারণা ছিল, ভারত মানেই সন্ন্যাসী, ম্যাজিক, বিস্ময়কর (Marvellous) এবং মিস্টিক (Mystic) কিছু ব্যাপার-স্যাপার - তারও সূত্রপাত হয়তো এই পর্যায়েই। রোমান ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে পাওয়া যায়, ২৫ বি.সি.ই-তে ভারতীয় কোন রাজ্য থেকে রোমান রাজসভায় দুজন রাষ্ট্রদূত ও কিছু উপহার পাঠানো হয়েছিল, পশ্চিম ভারতের ভৃগুকচ্ছ বন্দর থেকে। দুজন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে একজন ছিলেন, সন্ন্যাসী এবং অন্যজন হস্তহীন কিন্তু দক্ষ তীরন্দাজ এক বিস্ময়-বালক, যে তার দুই পা দিয়ে অত্যন্ত দক্ষতায় তির ছুঁড়তে পারত! এ ছাড়া সেই জাহাজে ছিল কিছু বাঘ, কিছু মোনাল পাখি, কিছু সাপ আর কিছু কচ্ছপ! ভারতীয় বন্দর থেকে রোমান সম্রাটের মনোরঞ্জনের জন্যে এই উপহার সমুদ্রপথে পৌঁছতে সময় লেগেছিল প্রায় চার বছর!

বৌদ্ধধর্মের প্রচারে খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীতে বৌদ্ধরা চীনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সে কথা আগেই বলেছি। চীনের লোয়াং শহরে তাঁদের প্রথম বিহারের নাম শ্বেতাশ্ব (White Horse)অবিশ্যি তার অনেক আগে থেকেই চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যে যে বস্তু চীন থেকে আমদানি করা হত তার সঙ্গে চীন শব্দ যোগ করে সেই বস্তুর নাম প্রচলিত ছিল, যেমন চীনাংশুক চীনের রেশমবস্ত্র, কিচক– চীনের বাঁশ[2] (বিশেষ এক ধরনের বাঁশকে চীনা ভাষায় “কি-চক” বলে), চীনামাটি (China-clay, porcelain), চীনাসিঁদুর (Chinese vermilion বা red lead – লাল রং হিসেবে ব্যবহার হত), চীনাবাদাম ইত্যাদি । যদিও পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যে ভারতবর্ষেও এই সমস্ত জিনিষের উৎপাদন শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ভারতীয়, বিশেষ করে বঙ্গের রেশম বস্ত্র – মসলিন হয়ে উঠেছিল রোম সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে ইওরোপের অভিজাত সম্প্রদায়ের নয়নের মণি। ভারতে উপনিবেশ গড়ে তোলার পর, এই মসলিন উৎপাদনকে উৎখাত করেছিল, ব্রিটিশ বণিকেরা।

 চীনে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ায় ভারতের প্রতি চীনের আগ্রহ বাড়তে থাকে, এবং পরবর্তী কালে অত্যন্ত দুরূহ এবং দুর্গম পথের কষ্ট স্বীকার করেও বহু যুগ ধরে, বহু চৈনিক পণ্ডিত এ দেশে এসেছিলেন বৌদ্ধ দর্শনের শিক্ষা নিতে এবং বৌদ্ধ শাস্ত্রের প্রতিলিপি সংগ্রহ করতে। সৌভাগ্যের কথা, তাঁদের এই কষ্টসাধ্য প্রয়াসের জন্যেই বৌদ্ধ শাস্ত্রের বিপুল সম্ভার উদ্ধার হয়েছে, তিব্বত, চীন ও নেপালের বহু বৌদ্ধ বিহার থেকে। নচেৎ বৌদ্ধ শাস্ত্রের বহু তথ্যই আমাদের অজানা থেকে যেত। তার কারণ ভারতের মূল পুঁথি এবং স্ক্রোলগুলি হয় কালের নিয়মে নষ্ট হয়েছে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে আজ বৌদ্ধ দর্শন এবং শাস্ত্র সম্বন্ধে আমরা যা কিছু জানি, তার অধিকাংশই আমরা জেনেছি হয় প্রতিলিপি থেকে অথবা মূল গ্রন্থের তিব্বতি অনুবাদ থেকে। সম্প্রতি তক্ষশিলার (গান্ধার) ধ্বংসাবশেষ থেকে মাটির জালার মধ্যে সংরক্ষিত একটি মূল বৌদ্ধ স্ক্রোল উদ্ধার হয়েছে, যেটি বার্চ গাছের বাকলের (birch-bark) ওপর লেখা। স্ক্রোলটির ভাষা গান্ধারি-প্রাকৃত এবং লিপি খরোষ্ঠী। বিরল এই মূল স্ক্রোলটি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

দক্ষিণ-পূর্বের দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা আগেই বলেছি। এর ফলে নৌপথে ইরাবতীর (মায়ানমার) বদ্বীপ, মালয় উপদ্বীপ, মেকং বদ্বীপ এবং বালিদ্বীপেও ভারতীয় সংস্কৃতি পৌঁছে গিয়েছিল। শোনা যায় জনৈক ভারতীয় ব্রাহ্মণ, নাম কৌণ্ডিন্যেই কম্বোডিয়ার রাজকুমারীকে বিবাহ করেছিলেন, এবং সেখানে হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সময়ে বাংলার মহাস্থান এবং চন্দ্রকেতুগড় প্রধান দুই বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ছিল আরও অনেক ছোট ছোট সমৃদ্ধ জনপদ। কলিঙ্গ থেকেও মায়ানমারের ইরাবতী নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ার কথা শোনা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গোষ্ঠী ভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসকে পরিবর্তিত করে রাজ্য এবং রাষ্ট্রীয় সামাজিক ব্যবস্থায় আনার ব্যাপারে ভারতীয় বণিক এবং কোন কোন রাজপুত্র অনুঘটকের কাজ করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। যার ফলে ওই অঞ্চলের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ভারতীয় ধর্ম এবং সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় বণিকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই অঞ্চলকে সুবর্ণদ্বীপ বলতেন, তার কারণ মনে হয় প্রত্যক্ষ সোনা নয়, বরং ওই অঞ্চলের বাণিজ্য থেকে প্রভূত লাভ অর্জনকে তাঁরা “সুবর্ণ”-র সঙ্গে তুলনা করতেন।

 

৪.২.৪.২ শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা

ক) বিজ্ঞান

প্রথাগত শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলি প্রধানতঃ নিয়ন্ত্রণ করতেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং বৌদ্ধ বিহারের অর্হৎগণ। ব্রাহ্মণ্য শিক্ষায় বর্ণভেদে শাস্ত্রপাঠের অনেক বিধিনিষেধ ছিল, সে কথা আগেই বলেছি। কিন্তু বৌদ্ধ বিহারের সে রকম কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেখানে একমাত্র বিচার্য ছিল শিক্ষার্থীর মানসিক স্থিতি ও নিষ্ঠা এবং শেখার আগ্রহ। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্মীয়দের মধ্যে সন্ন্যাসী তো বটেই সাধারণ গৃহীভক্তদের মধ্যেও শিক্ষার হার বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত।

অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়া এবং গ্রীসের পণ্ডিত মানুষদের থেকে জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy), গণিত এবং চিকিৎসাশাস্ত্র ও ভেষজ বিদ্যার আদান-প্রদান করে দুই সংস্কৃতিই সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিত শুধু পুঁথিগত তত্ত্ব হয়ে আর রইল না, কারণ সমুদ্রগামী জাহাজের দিক্‌নির্ণয়ের জন্যে তারামণ্ডলী, রাশিচক্র, গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান জানা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এ বিষয়ে বণিকশ্রেণী ও সমিতিগুলির আগ্রহ এবং উৎসাহ ছিল সব থেকে বেশি, এই চর্চার পিছনে তাঁদের পরোক্ষ উদ্যোগ থাকাও আশ্চর্যের নয়।

শ্রমণ বা ওঝাদের ঝাড়ফুঁক আর শেকড়-বাকড়ের চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গে সমান্তরাল চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও উদ্ভব হয়েছিল বৌদ্ধ যুগ থেকেই, জীবকের হাত ধরে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে এতদিন মানুষের ব্যাধির কারণ হিসাবে যে তত্ত্বটি প্রচলিত ছিল, সেটি হল বায়ু, পিত্ত এবং কফ - এই তিনের সাম্যতা দেহকে সুস্থ রাখে। এই বায়ুর প্রকার আবার পাঁচ ধরনের –পঞ্চবায়ু। এদের মধ্যে সাম্যতা নষ্ট হলেই, শরীর অসুস্থ এবং ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গাছ-গাছড়া, খনিজ দ্রব্য ও ধাতু এবং প্রাণীজ দ্রব্য থেকে নানান ওষুধ বানানোর পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ব্যাধিতে তার নির্দিষ্ট প্রয়োগ বিধি নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা শুরু করেছিলেন জীবক, যাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় ফার্মাকোপিয়া (Pharmacopeia) বলা যেতে পারে।

জীবকের এই ভেষজবিজ্ঞান চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করলেন চরক। তাঁর লিখিত বা সংকলিত গ্রন্থের নাম “চরক সংহিতা”। এই সময়ে শল্য-চিকিৎসা (Surgery) বিজ্ঞানের চর্চা করেও বিখ্যাত হয়েছিলেন সুশ্রুত। এঁদের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এঁনারা দুজনেই কণিষ্কের সমসাময়িক ছিলেন। এই চিকিৎসা-বিজ্ঞান বিষয়ের বেশ কিছু বার্চ-বাকলের ভারতীয় স্ক্রোল পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ায়। এছাড়াও গ্রীক উদ্ভিদবিদ্‌ থিওফ্রাস্টাসের একটি গ্রন্থ আছে ভারতীয় ওষধি গাছ-গাছড়া এবং লতা-গুল্মের ওপর - যার নাম হিস্ট্রি অব প্ল্যান্টস (History of Plants)অর্থাৎ ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যা পশ্চিমের দেশগুলিকে সমৃদ্ধ করেছিল।

এ বিষয়েও ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের দ্বিচারিতা লক্ষ্য করার মতো। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে চিকিৎসক, বিশেষ করে শল্যবিদদের অবস্থান ছিল সমাজের কিছুটা নিম্ন স্তরে। যদিচ তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং প্রথাগত শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু তাও চিকিৎসকদের, বিশেষ করে যাঁরা শল্যচিকিৎসার চর্চা করতেন, তাঁদের সমাজের উচ্চস্তরের ব্রাহ্মণেরা সুনজরে দেখতেন না। কারণ তাঁদের শল্যবিদ্যা চর্চার জন্যে মৃত মানবদেহ কিংবা পশু দেহ নিয়ে কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন হত। অথচ সমাজে, মানুষের জন্যেই হোক কিংবা হাতি, ঘোড়া ও গবাদি পশুর জন্যেই হোক চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। পরবর্তী কালে এঁদের “বৈদ্য” বলা হয়েছে, এঁরা ব্রাহ্মণ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, এঁদের পৌরোহিত্যের অধিকার দেওয়া হয়নি, এঁরা ছিলেন ব্রাত্য ব্রাহ্মণ!

 খ) পেশাগত শিক্ষা ও দক্ষতা

এই ধরনের প্রথাগত শিক্ষা ছাড়া পেশাগত শিক্ষার প্রচলন করেছিলেন বণিক-সম্প্রদায় বা গিল্ডগুলি। তাঁরা বিশেষ বিশেষ, দেশজ এবং বিদেশী, কুশলী এবং দক্ষ শিল্পীদের নিয়ে সারা দেশেই প্রচুর শিক্ষাকেন্দ্র বানিয়ে তুলেছিলেন। সেখানে তাঁরা আগ্রহী এবং উৎসাহী শিক্ষার্থীদের শিল্পী বানিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই শিক্ষার্থী বাছাইয়েও বর্ণভেদের কোন বালাই ছিল না। বরং পরিশ্রমী শূদ্র ও বৈশ্য তরুণরা সম্মানজনক সৃষ্টিশীল কাজ শেখার আশায় এই সব প্রতিষ্ঠানে যোগ দিত।

এই পেশাগত শিক্ষার যেমন কোন সীমা ছিল না, তেমনই সীমা ছিল না দক্ষতার। খনি থেকে ধাতু নিষ্কাষণ, যেমন সোনা, রূপো, লোহা, তামা, টিন, সীসা। তার থেকে সংকর ধাতু বানানো, যেমন কাঁসা পিতল, ব্রোঞ্জ, কিংবা কাঁচা লোহাকে ইস্পাত বানানো। তার থেকে বাসনপত্র, যন্ত্রপাতি–লাঙলের ফাল, কোদাল, গাঁইতি, কাস্তে, বঁড়শি; অস্ত্রশস্ত্র – তীরের ফলা, তলোয়ার, বর্শার ফলা, খড়গ। আবার ব্রোঞ্জের মূর্তি বানানো, বুদ্ধ, বিষ্ণু, শিব, শ্রী। অথবা সোনা, রূপা বা তামার মুদ্রা। সোনা বা রূপার অলঙ্কার। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এবং প্রত্যেকটি পদে দক্ষতার মাত্রা আলাদা, সংজ্ঞা আলাদা। এভাবে প্রত্যেকটি পেশাই - তাঁতি, সূত্রধর, কুম্ভকার, স্থপতি, তৈলকার, নৌকা বানানো, সমুদ্রগামী জাহাজ বানানো, যুদ্ধের রথ এবং রাজাদের বিলাসভ্রমণের রথ বানানো – সমাজের অজস্র প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল পেশাগত দক্ষতা।

নিবিড় এই শিক্ষার সুষ্পষ্ট লক্ষণ এই যুগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। যেমন এই যুগের এবং পরবর্তী যুগের সোনা, রূপা বা তামার মুদ্রাগুলির চিত্র এবং লিপি মুদ্রণের সূক্ষ্ম শৈলীতে। পাথরের স্থাপত্যে - বৌদ্ধস্তূপ, মন্দির বা পাথর কেটে বানানো গুহাগুলিতে। আগে যে জ্যামিতি এবং পরিমিতি সীমাবদ্ধ ছিল যজ্ঞবেদি বানানোর মধ্যে, সেই জ্যামিতি এবং পরিমিতির জটিল প্রয়োগে গড়ে উঠতে লাগল, অনবদ্য মন্দির এবং প্রাসাদের স্থাপত্য। শুধু মাত্র স্থূল স্থাপত্যই নয়, ছোট-বড়ো, নানান ভঙ্গিমার পাথরের ভাস্কর্যে, তার অলংকরণে, তার সূক্ষ্ম শৈলী ও পালিশে। এই সময় থেকেই ধাতু এবং কাঠের শিল্পসামগ্রী, পাথরের ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যগুলি ভারতীয় স্বকীয় শৈলীতে অনন্য হয়ে উঠতে লাগল।

 গ) ভাষা ও সাহিত্য

৫০০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে পাণিনি যে ভাষাতত্ত্ব সহ “অষ্টাধ্যায়ী” ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই মোটামুটি ১৫০ বি.সি.ই-তে পতঞ্জলি তাঁর “মহাভাষ্য” রচনা করলেন। এই মহাভাষ্যে পাণিনির প্রাচীন, অপ্রচলিত এবং দুর্বোধ্য কিছু নিয়মকানুন বাদ দিয়ে, বাক্য বিন্যাস পদ্ধতি এবং অজস্র নতুন শব্দ – বিগত কয়েকশ বছরের সামাজিক পরিবর্তনের ফলে যেগুলির উদ্ভব – অন্তর্ভুক্ত করলেন। পতঞ্জলির মহাভাষ্যের আরও একটি বিশেষত্ব হল, এই ব্যাকরণ শুধুমাত্র তাত্ত্বিক নীরস বর্ণনা নয়, অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনা এবং প্রচলিত কাহিনীর উদাহরণ দিয়ে, শিক্ষার্থী পাঠকের কাছে তত্ত্বগুলি সহজবোধ্য এবং চিত্তাকর্ষক করে তুলেছিলেন। যাঁরা সংস্কৃত জানেন না, অথচ সংস্কৃত ভাষায় আগ্রহী, মূলতঃ তাঁদের কথা মাথায় রেখেই পতঞ্জলি তাঁর এই মহাভাষ্য রচনা করেছিলেন। অর্থাৎ এই সময়ে তাঁর লক্ষ্য ছিল, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের “ম্লেচ্ছ”, “পুলিশ” ও “যবন”-রা - গ্রীক, পারসী ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিত ব্যক্তিরা।

মহাভাষ্যের সমসাময়িক একটি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় “গার্গী সংহিতা” – যে গ্রন্থে যবন রাজা দিমিত্রিয়সের নাম পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের “যুগ পুরাণ” অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যবনরা ম্লেচ্ছ এবং বর্বর হলেও তাদের জ্যোতিষবিদ্যার জ্ঞানের জন্য তাঁরা নমস্য এবং পূজনীয়! সমসাময়িক ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিদ্যায় রোম এবং গ্রীসের অবদানের কথা স্মরণীয় করে রেখেছিলেন তাঁদের “রোমক-সিদ্ধান্ত” এবং “পৌলিশ সিদ্ধান্ত” নাম দিয়ে। “রোমক”-এর অর্থ রোমান এবং গ্রীক বা পার্থিয়ানদের সংস্কৃত শাস্ত্রে “পুলিশ”ও বলা হয়েছে; “পুলিশ”-এর তত্ত্ব অর্থে পৌলিশ সিদ্ধান্ত। অথবা আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ পলের (Paul of Alexandria) নাম থেকেও “পৌলিশ” হতে পারে।

এই সময় কালে সংস্কৃত ভাষায় অজস্র শাস্ত্র এবং ধর্মশাস্ত্র রচনা হয়েছে। তার মধ্যে আছে মনুর “স্মৃতি” এবং বেশ কিছু পুরাণ। হয়তো এই সময়েই, অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংযোজন করে লিখে ফেলা হয়েছে, দুটি মহাকাব্য – রামায়ণ ও মহাভারত। লিখে ফেলা হয়েছে সবগুলি বেদ, তার সংহিতা,  ব্রাহ্মণ, উপনিষদ এবং সূত্রসমূহ। বেদগুলিতে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের ঝুঁকি নেওয়া হয়নি, কারণ বেদমন্ত্রগুলি, আগেই বলেছি, প্রাচীন ঋষিরা সৃষ্টি বা রচনা করেননি, তাঁরা এই মন্ত্রগুলির দ্রষ্টা অর্থাৎ তাঁরা আদিষ্ট হয়েছিলেন। এই সময়েই সংকলিত হয়ে, লেখা হয়েছে কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র” – এই সংকলক ছিলেন বিষ্ণুগুপ্ত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, রাজা বিম্বিসার এবং মৌর্যযুগ থেকে শুরু করে, এই সময়কাল পর্যন্ত ভারতীয় রাজাদের প্রায় কেউই সংস্কৃতভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেননি। তাঁদের সকলেরই রাষ্ট্রীয়ভাষা ছিল প্রাকৃতভাষার নানান আঞ্চলিক রূপ। প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র সংস্কৃতকে প্রশাসনিক ভাষা করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন বিদেশী – উজ্জয়িনীর শক রাজারা, যাঁদের সাধারণতঃ পশ্চিমের ক্ষত্রপ বলা হয়। ক্ষত্রপ রাজা রুদ্রদমনের গিরনার শিলালেখকেই (১৫০ সি.ই.), ঐতিহাসিকরা ভারতের প্রাচীনতম লিখিত সংস্কৃত নথি বলে মনে করেন। প্রসঙ্গতঃ গিরনারের সম্রাট অশোকের প্রাকৃত ভাষার শিলালেখের শিলাতেই, ক্ষত্রপ রুদ্রদমন এই সংস্কৃত নির্দেশ লিখিয়েছিলেন।     

কিন্তু যে কোন ভাষায় তত্ত্ব এবং শাস্ত্রকথা যতই বলা বা লেখা হোক, ভাষা স্বচ্ছন্দ গতি পায় সাহিত্যে। সাহিত্যের জন্যেই কোন ভাষা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যে ভাষায় মনের কথা প্রকাশ করা যায়, সেই ভাষাতেই মানুষ একাত্ম হতে থাকে। এই যুগে ধর্মশাস্ত্র এবং ব্যাকরণ ছাড়াও সাহিত্যের আঙিনায় সংস্কৃত পা রাখতে শুরু করেছিল। প্রাকৃত ভাষায় কবিতা রচনা করেছিলেন, সাতবাহন বংশের রাজা, হাল, সে কথা আগেই বলেছি। তাঁর কবিতা সংকলনের নাম, “গাথাসপ্তশতী” – এই কবিতাগুলির বেশ কিছু প্রেমের, কিছু অতিরিক্ত ভাবপ্রবণ আবার কিছু ছিল আদিরসাত্মক– তা হলেও সাহিত্যের প্রাথমিক পর্যায়ে মোটামুটি রসোত্তীর্ণ। মোটামুটি এই সময়েই সংকলিত হয়েছিল তামিল ভাষার প্রথম কবিতা সংকলন “শঙ্গম”। শঙ্গমের কবিতাগুলি বহু বছর আগে থেকেই ওই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল চারণ কবিদের মুখে মুখে, এবং কবিতার বিষয়বস্তু ছিল ওই অঞ্চলের জনপ্রিয় নানান সামাজিক ঘটনা। এই সময়েই তামিল ব্যাকরণ “তোলকাপ্পিয়ম”ও রচিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, সংস্কৃত এবং প্রাকৃত ভাষার বাইরে, তামিল হচ্ছে প্রথম ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা, যে ভাষার ব্যাকরণ এবং কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল এই পর্যায়ে।

বৌদ্ধ দিকপাল পণ্ডিত অশ্বঘোষের লেখা “বজ্রসূচী” – সম্ভবতঃ এই পর্যায়ের প্রথম সংস্কৃত সাহিত্য। এই গ্রন্থটি ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, তার সামাজিক প্রথা এবং চতুর্বণের প্রতি তীক্ষ্ণ কটাক্ষ করে লেখা। যদিও অনেকের মতে এটি হিন্দুদের “বজ্রসূচী উপনিষদ” – এবং কোন মতেই অশ্বঘোষের রচনা নয়। যাই হোক, অশ্বঘোষের বুদ্ধের জীবনী নিয়ে লেখা দীর্ঘ কাব্য “বুদ্ধচরিত”– জীবনী কাব্য রচনায় যে পথিকৃৎ, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বুদ্ধচরিতের সংস্কৃত ভাষার অনবদ্য শৈলী, পরবর্তী সংস্কৃত সাহিত্যের পথপ্রদর্শক বললেও খুব একটা অতিরঞ্জন হয় না। এইসময়ের অন্যতম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক, বৌদ্ধ পণ্ডিত নাগার্জুনও সংস্কৃত ভাষাতেই বৌদ্ধ শাস্ত্র রচনা শুরু করেছিলেন। পণ্ডিত নাগার্জুনের সংস্কৃত বৌদ্ধশাস্ত্রগুলি, ব্রাহ্মণ্যধর্মের সংস্কৃত শাস্ত্রের প্রেক্ষীতে লেখা। যার ফলে উভয় ধর্মশাস্ত্রের পণ্ডিতদের মধ্যে দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক কিংবা তাত্ত্বিক বিচারের পথ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। অতএব সংস্কৃত ধীরে ধীরে আবার উচ্চমেধা (elite) এবং পণ্ডিত সমাজের একমাত্র ভাষা হয়ে উঠতে লাগল। যদিও আঞ্চলিক ভাষা কিংবা স্থানীয় প্রাকৃত ভাষার প্রচলন সমান্তরালেই চলতে লাগল, সাধারণ জনগণের মধ্যে।

সম্ভবতঃ এই সময়েই সংস্কৃতে ভাস লিখলেন তাঁর অনবদ্য নাটক “স্বপ্নবাসবদত্তম্‌”। ভাসের সময়কাল সঠিক জানা যায় না, তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তিনি মহাকবি কালিদাসের পূর্বসূরি এবং তাঁর জন্মকাল খ্রিষ্টিয় শতাব্দীগুলির প্রথম দিকেই। তাঁর নাটকের বিন্যাস, আজও ভারতীয় নাটকে অনুসরণ করা হয়। তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু মহাকাব্যিক অথবা ঐতিহাসিক প্রেমের কাহিনী। ভাসের নাটক অবিশ্যি রাজসভা অথবা বিদ্বৎমহলে সব থেকে জনপ্রিয় হয়েছিল। অশ্বঘোষও সংস্কৃতে কিছু নাটক লিখেছিলেন, সেগুলির মূল পাওয়া যায় না। মধ্য-এশিয়ার তুরফান বৌদ্ধবিহার থেকে তাঁর নাটকের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার হয়েছে। যার থেকে অনুমান করা যায়, অশ্বঘোষের নাটকগুলি ধর্মভিত্তিক এবং সাধারণের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উপভোগ্য হয়েছিল, তা নাহলে তার পাণ্ডুলিপি মধ্য-এশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল কী করে?

চলবে...



[1] স্টাকো (Stucco) হল পাথর বা ইঁট (বা আধুনিক কংক্রিট) দিয়ে বানানো নির্মাণের ওপর কঠিন পলেস্তারার প্রলেপ। এই প্রলেপ শুধু যে নির্মাণকে সুরক্ষা দেয় তাই নয়, নানান নকশা বা আলপনা বানিয়ে নির্মাণকে সুন্দর সুষমাময়ও করে তোলে। বাংলায় একেই আগেকার দিনে “পঙ্খের” কাজ বলা হত, আজকাল সাধারণতঃ “প্লাস্টার অব প্যারিস” (Plaster of Paris) দিয়ে স্টাকো করা হয়ে থাকে।  

[2] বাঁশ (Bamboo) ভারতবর্ষের – বিশেষতঃ পূর্বভারতের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক উপাদান, এর নানান ব্যবহার ভারতীয়রা আবহমান কাল ধরেই করে আসছে। চীনা বাঁশ হয়তো তার থেকে কিছুটা আলাদা প্রজাতির, এই বাঁশ থেকে সুদৃশ্য আসবাবপত্রাদি বানানো হত।


নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   "...