ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
উপরের Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের চতুর্থ পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে " ধর্মাধর্ম - ৪/৪ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
পঞ্চম পর্বাংশ
৪.৩.১ প্রাক-গুপ্ত ধর্ম ভাবনা
আগের অধ্যায়েই বলেছি, এই পর্যায়ে
ভারতীয় সমাজে বিচিত্র বিদেশী সংস্কৃতি, প্রথা এবং রুচির নিরন্তর মিশ্রণ
হচ্ছিল। এই মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় সব ধর্মগুলির মধ্যেও নানান পরিবর্তন
ঘটে যাচ্ছিল। পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা বৌদ্ধ ধর্মের
অন্যতম বৈশিষ্ট্য – সে কথা বোঝা যায়, তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা থেকে।
ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচ থেকে ছশ বছরের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া তো
বটেই, পশ্চিম
এশিয়াতেও বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিস্তার নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর সাফল্য। কিন্তু এই
সাফল্যই বৌদ্ধধর্মের মাতৃভূমি ভারতবর্ষ থেকে তাঁদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার দিকে ঠেলে
দিয়েছিল।
আমরা আগেই দেখেছি, প্রথম থেকেই বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক
ছিলেন ভারতের ধনী বণিকরা এবং বেশ কিছু বিখ্যাত ভারতীয় রাজন্যবর্গ। তাঁদের
প্রত্যক্ষ আর্থিক সহযোগিতায় আলোচ্য শতাব্দীগুলিতে ভারতবর্ষ জুড়ে বিপুল সংখ্যক
বৌদ্ধবিহার গড়ে উঠেছিল। এই অজস্র বিহারগুলির মধ্যে কয়েকটি উচ্চশিক্ষা ও বিদ্যাচর্চার
প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল – যেমন নালন্দা, বিক্রমশীলা, অমরাবতী
ইত্যাদি। কিন্তু এগুলি ছাড়া অধিকাংশই হয়ে উঠেছিল আদর্শহীন অলস মানুষের নিশ্চিন্ত
আশ্রয়স্থল।
প্রথমদিকে বৌদ্ধবিহারে অন্তর্ভুক্তির জন্যে
আগ্রহী ভিক্ষুদের কঠিন পরীক্ষার (selection test) সম্মুখীন হতে হত, কারণ সে সময়
বিহারের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু পরবর্তীকালে বিহারের সংখ্যা যখন অগণ্য হয়ে উঠল, তখন রাজা ও
বণিকদের থেকে নিয়মিত অনুদান আদায় নিশ্চিত করতে, বিহার-পরিচালকদের কাছে ভিক্ষুর
সংখ্যাবৃদ্ধিই হয়ে উঠল প্রধান লক্ষ্য। অতএব আদর্শ ও দায়িত্ববোধহীন এবং অকর্মণ্য
প্রচুর মানুষের ভিড় জমতে লাগল বৌদ্ধ বিহারগুলিতে। কারণ বিহারে অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে
সঙ্গে, ভিক্ষুদের
অশন, বসন, নিরাপদ
আশ্রয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্ব থাকত বৌদ্ধ বিহারগুলির। উপরন্তু মুণ্ডিত মস্তক
এবং ভিক্ষুসুলভ বসনের জন্য তারা হাটে-বাজারে উপভোগ করত সাধারণ জনসমাজের
স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা। বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু না হলে, তাদের এই
নিশ্চিন্ত কর্মহীন জীবন অথচ সামাজিক সম্মানের স্বাদ হয়তো কোনদিনই প্রাপ্য হত না।
যে কোন হিন্দু তীর্থস্থানে – বিশেষ করে
উত্তরভারতে - আজও বহু মানুষ সন্ন্যাসী হন নিছক সংসারের দায়িত্ব এড়াতে অথবা কোন
দুষ্কর্ম করে গা ঢাকা দিতে। কারণ তীর্থক্ষেত্রগুলিতে প্রচুর ধনী বণিক দানবীর আছেন, যাঁরা
সন্ন্যাসীদের নিয়মিত বস্ত্র-কম্বল দান করেন এবং তাঁদের অন্নসত্র থেকে দুবেলার
খাদ্য সংস্থানও হয়ে যায়। তার সঙ্গে উপরি পাওনা সাধারণ মানুষদের “গোড় লাগি, মহারাজ”
সম্বোধন, তাদের
ভিক্ষা থেকে অর্জিত অর্থে গঞ্জিকা সেবন এবং বিনা ভাড়ায় ট্রেন বা বাসযাত্রা। গেরুয়া
বা রক্তবসন পরে, মাথায়
জটা বানিয়ে, একটু
হাঁকডাক আর “ব্যোমশঙ্কর” আওয়াজ দিয়ে জীবনটাকে এভাবেই যদি কাটিয়ে দেওয়া যায়, মন্দ কি? তবে সকলেই
যে এমন সে কথা বলছি না,
প্রকৃত সন্ন্যাসী অবশ্যই আছেন, তবে অধিকাংশই যে এই গোত্রের তাতে কোন
সন্দেহ নেই।
অতএব রাষ্ট্র এবং বণিক সমাজের নিরন্তর আর্থিক
আনুকূল্য, বৌদ্ধধর্মকে
একদিকে তথাকথিত অন্তঃসারশূণ্য জনপ্রিয়তা যেমন এনে দিয়েছিল, তেমনই সূচনা
করেছিল তাদের অবক্ষয় এবং ভারতবর্ষ থেকে তাদের ভবিষ্যৎ বিলুপ্তির।
বৌদ্ধ ধর্মের এই বিপুল সাফল্য শুধু যে
বৌদ্ধবিহারে অপদার্থ ভিক্ষুর সংখ্যা বৃদ্ধি করল, তা নয়, প্রধান বৌদ্ধ-পণ্ডিতদের মধ্যেও এনে
দিল ক্ষমতার লোভ – রাজানুকূল্য লাভের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা। যার ফলে গৌতমবুদ্ধের
মৃত্যুর একশ’ বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বৌদ্ধধর্মের ভাঙন ও একের পর এক শাখা –
উপশাখার উৎপত্তি। প্রতিটি শাখার প্রধান পণ্ডিতগণ মেতে উঠলেন, সাধারণের
পক্ষে দুর্বোধ্য তত্ত্বকথার কচকচানিতে। নতুন যুগের পণ্ডিতদের কাছে গৌতমবুদ্ধের সরল
সর্বজনবোধ্য উপদেশগুলি পরিত্যক্ত হয়ে গেল। অতএব বৌদ্ধ ধর্ম অতি দ্রুত হারাতে লাগল সাধারণ
ভারতীয় সমাজের আন্তরিক সমর্থন।
আর ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যে, একই
দ্রুততায় হিন্দুধর্মের মোড়কে আগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য-ধর্ম ভারতীয় জনগণের মধ্যে বিস্তার
লাভ করতে লাগল। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, বৌদ্ধধর্মের প্রধান শাখাগুলি এবং
তাদের তত্ত্ব-বিতর্কের দিকে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।
৪.৩.২ বৌদ্ধ ধর্মের ভাঙন
ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর একশ বছর পরেই (তিব্বতি মতে
একশ দশ বছর – ৩৮০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি) বৌদ্ধধর্মের প্রথম ভাঙন শুরু হয়। সেটি ছিল
বৌদ্ধদের দ্বিতীয় ধর্মসম্মেলন, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বৈশালীর রাজা কালাশোক। সেই সম্মেলনে
পূর্বের বৃজি রাজ্যের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে পশ্চিমের পাওয়া, কৌশাম্বী
এবং অবন্তীর সন্ন্যাসীদের মতভেদ থেকে বৌদ্ধধর্মের দুটি - “মহাসঙ্ঘিকা” এবং
“স্থবিরবাদিন” বা “থেরাবাদিন” শাখার উদ্ভব হয়েছিল। এরপর অশোকের রাজত্বকালের (২৪৭
বি.সি.ই) তৃতীয় ধর্মসম্মেলনের আগেই ওপরের দুই শাখা ভেঙে আরো বাইশটি শাখার সৃষ্টি
হয়েছিল।
সিংহলের দীপবংশ গ্রন্থ অনুযায়ী এই শাখাগুলি হল, গোকুলিক, একব্যাবহারিক, বহুশ্রুতিকা, প্রজ্ঞাপ্তিবাদিন, চৈত্যবাদিন, বাৎসীপুত্রীয়, মহীশাসক, ধর্মোত্তরীয়, ভদ্রাযানিক, ষণ্ণাগরিক, সাম্মিতীয়, সর্বাস্তিবাদিন, ধর্মগুপ্তিক, কাশ্যপীয়, সংক্রান্তিক
ও সৌত্রান্তিক। এর সঙ্গে পালি গ্রন্থগুলিতে আরো ছটি শাখার নাম পাওয়া যায়, যেমন
হৈমবতিকা, রাজগিরিকা, সিদ্ধত্থিক, পুব্বসেলিয়, অপরসেলিয়
এবং বাজিরিয়। প্রায় প্রত্যেকটি শাখারই নিজস্ব ত্রিপিটক অর্থাৎ বিনয়, সূত্র এবং
অভিধর্ম গ্রন্থও ছিল! আমরা দেখেছি সম্রাট অশোকের আস্থা ছিল স্থবিরবাদ বা থেরাবাদে
এবং বৈদেশিক ধর্ম প্রচারে তিনি থেরাবাদী শাখারই পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এই
শাখাগুলির মধ্যে সর্বাস্তিবাদিন মতের অস্তিত্ব ছিল কয়েকশ বছর। তৃতীয় ধর্ম সম্মেলনে
এই শাখাগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিকে সম্রাট অশোক বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন, তবে সেগুলি
ঠিক কারা তার কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কয়েকটি অঞ্চল, যেমন ভূটান, সিকিম, তিব্বত, ইত্যাদি
ছাড়া, ভারতের
বাইরে থেরাবাদ মতেরই প্রাধান্য ছিল এবং আজও তাই আছে।
খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শুরুতে ভারতবর্ষে
মহাসঙ্ঘিকা শাখার জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং এই শাখাই মহাযানী মতে পরিবর্তিত হয়। এই
মহাযানী মতেরও দুটি শাখা ছিল মাধ্যমিক এবং যোগাচার। মহাযানী মতাবলম্বীরা
বৌদ্ধধর্মের অন্য সব শাখাগুলিকে একত্রে হীনযান (নিম্নস্তরের মার্গ) নামে উল্লেখ
করত। এরপর খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতকের শেষদিকে রাজা কণিষ্কের রাজত্বকালে যে বৌদ্ধ
ধর্মসম্মেলন হয়েছিল,
তার পর থেকে মহাযানী শাখাই ভারতীয় বৌদ্ধদের প্রধান শাখা হয়ে উঠেছিল। এই প্রসঙ্গে হীনযান ও মহাযান মতের
তফাৎটা কী, সে
বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নিই।
বুদ্ধদেবের শিক্ষার মধ্যে কতকগুলি বিষয় নাকি খুবই
বিতর্কিত এবং এই বিষয়গুলি সম্পর্কে তিনি সঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, পরবর্তী
বৌদ্ধ দার্শনিকদের মধ্যে সেই নিয়েই বিস্তর মতভেদ। এর মধ্যে কয়েকটি প্রধান বিষয় হল, “অনিত্য”, “অনাত্মন”
এবং “নির্বাণ” বা “তথাগত”। “নির্বাণ” বা “তথাগত” বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধদেব নিজেই চারটি
যুক্তির (“চতুষ্কটিকা”) অবতারণা করেছিলেন, যেমন,
১. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব (existence) থাকে;
২. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব থাকে না;
৩. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব
(non-existence) দুটোই
থাকে।
৪. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব–
দুটোর কোনটাই থাকে না।
এই চারটি যুক্তির পিছনে আছে “তথাগত” শব্দটির
তাৎপর্য। তথাগত শব্দের সহজ মানে – তথা+গত
- যিনি - তথায় অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতায়
পৌঁছেছেন – এক কথায় বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি বা নির্বাণ। আবার অন্য অর্থ হল, তথা+আগত
অর্থাৎ তথা অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতা থেকে যিনি এসেছেন। আবার অন্য এক অর্থ হল
তথা+অগত – তথা অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতার জন্যে যাঁকে কোথাও যেতে হয় না। যেহেতু
তথাগত - পরমজ্ঞানের এমনই এক অবস্থা – যা অপরিমেয়, অবর্ণনীয়, ধারণাতীত –
অতএব তাঁর জ্ঞানের পূর্ণতার বিষয়টিই যেন অবান্তর!
“তথাগত”
শব্দের সর্বশেষ তাৎপর্য – যেটি মহাযানীদের মত – দেখা যাচ্ছে উপনিষদের “পরমাত্মা”
তত্ত্বের সঙ্গে বেশ মিলে যাচ্ছে। অতএব গৌতম বুদ্ধ যে ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী দর্শনের
প্রবর্তন করেছিলেন, তাঁর
মৃত্যুর মোটামুটি সাড়ে পাঁচশ বছর পরে, বৌদ্ধ মহাযানী পণ্ডিতগণ সেটিকে
পরোক্ষে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গেই জুড়ে দিলেন। অবিশ্যি এই সময়কালে ব্রাহ্মণ্য
ধর্মও আর আগের ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছিল না, সে তখন হিন্দু ধর্ম হয়ে উঠছিল। সে
কথা আসবে পঞ্চম ও অন্তিম পর্বে।
“অনিত্য”
এবং “অনাত্মন” বিষয়ে হীনযানীদের মত, যে পঞ্চ উপাদানে জীবের সৃষ্টি তারা
সতত পরিবর্তনশীল অতএব অনিত্য এবং জীবের অস্তিত্ব না থাকলে আত্মারও অস্তিত্ব থাকে
না, অর্থাৎ
অনাত্ম হয়ে যায়। মহাযানীরা বললেন, হীনযানীদের এই ব্যাখ্যা নিম্নস্তরের এবং তাঁদের জ্ঞানও
নিকৃষ্ট – অতএব তাঁদের মত হীন। হীনযানীরা তাঁদের এই জ্ঞান নিয়ে বড় জোর অর্হৎ স্তর
পর্যন্ত উঠতে পারেন,
কিন্তু বুদ্ধত্ব লাভ করতে পারবেন না। যাঁরা বুদ্ধত্ব লাভের আকাঙ্খা করেন তাঁরা
বোধিসত্ত্ব। মহাযানীরা বললেন, ব্যক্তিকে “পুদগল-শূণ্যতা” (ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যহীনতা অর্থাৎ
অনস্তিত্ব) এবং “ধর্ম-শূণ্যতা” দুটোই উপলব্ধি করতে হবে এবং পরমসত্যের সঙ্গে
পার্থিব জগৎ (অর্থাৎ অস্তিত্ব)-এর ঐক্যকেও উপলব্ধি করতে পারলেই বুদ্ধত্ব লাভ
সম্ভব। মহাযানী পণ্ডিতদের সৃষ্ট এই জটিল তত্ত্ব বেশ দুর্বোধ্য – উচ্চ সাধনার স্তর
ছাড়া হয়তো বোধগম্য হবার নয়!
কিন্তু জটিল এই তত্ত্ব - “অনিত্য”, “অনাত্মন”, “অস্তিত্ব”
এবং “অনস্তিত্ব” বা “পুদগল-শূণ্যতা” - উপলব্ধির বর্ণনা গৌতম বুদ্ধ নিজেই সরল ভাষায়
যে ভাবে বুঝিয়েছিলেন,
সে কথা আরেক বার পড়ে নিতে পারেন এই গ্রন্থের ৩.২.২ অধ্যায় থেকে - " ৩.২.২ তপস্বী সিদ্ধার্থ "। দেখবেন
তত্ত্বগুলি খুব একটা দুরধিগম্য বলে মনে হবে না। আসলে, পণ্ডিতদের
পাণ্ডিত্য প্রদর্শনই যখন মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখন সহজ কথাগুলিও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাতে অবশ্যই ষোল আনা লাভ হয় পণ্ডিতদের – মাঝের থেকে, তাঁদের দুর্বোধ্য মধ্যস্থতায় আমাদের
মনের মানুষটি অনেক দূরের মানুষ হয়ে পড়েন। বিশ্বের সব ধর্মতত্ত্বেই মধ্যস্থ এই
পণ্ডিতরা যদি না আসতেন,
সাধারণের জীবনযাপন অনেক রম্য হয়ে উঠতে পারত।
ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে, বোধিসত্ত্বের
এই ধারণা থেকেই মহাযানীরা বৌদ্ধধর্মে ভক্তি এবং পূজার প্রচলন শুরু করলেন। তাঁরা
বেশ কিছু “বোধিসত্ত্ব”-র সূচনা করলেন, যেমন মৈত্রেয়, মঞ্জুশ্রী, অবলোকিতেশ্বর, বজ্রপাণি, সমন্তভদ্র
প্রমুখ। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, এই দিব্য বোধিসত্ত্বগণ প্রজ্ঞার
শিখরে উঠে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা অনায়াসে “বোধি” বা “বুদ্ধত্ব” অর্জন করতে পারতেন।
কিন্তু করেননি, তার
কারণ বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তাঁরা আর মৈত্রী এবং করুণার চর্চা করার অবস্থায় ফিরতে
পারতেন না এবং দুঃখ-শোকে দগ্ধ হতে থাকা আম-মানুষের সেবাও করতে পারতেন না। এই
আধ্যাত্মিক দর্শনকেই মহাযান বলা হয়ে থাকে। এই একই তত্ত্ব আমরা দেখতে পাবো হিন্দু
সাধনতত্ত্বে এবং তন্ত্রতত্ত্বে। অর্থাৎ মহাযানী বৌদ্ধতত্ত্ব গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশ্য
থেকে সরে গিয়ে, হিন্দু
ধর্মের সঙ্গে মিশে ভারতবর্ষ থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথটি নিজেরাই খুঁজে নিল। অথবা এমনও
হতে পারে, হিন্দু
দর্শনই বৌদ্ধদের এই তত্ত্ব আত্মসাৎ করেছিল।
মহাযানী বৌদ্ধ মতে এইভাবেই শুরু হয়ে গেল
মূর্তিপূজার প্রচলন। এই বিশ্বাসে প্রাচীন “পেগান” ধর্মের প্রভাব থাকাও বিচিত্র নয়।
কারণ বৌদ্ধ ধর্মের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মিশর, গ্রীস এবং রোমের সংস্কৃতির যে নিবিড়
যোগাযোগ ছিল সেকথা আমরা আগেই জেনেছি।
মূর্তি পূজার সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি গড়ার প্রকরণ
মহাযানী বৌদ্ধরাই শুরু করে দিলেন। মধ্য এশিয়া এবং উত্তরপশ্চিমের গান্ধার থেকে দক্ষ
শিল্পীদের আনিয়ে, তাদের
বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের রূপকল্প বুঝিয়ে দিলেন। বহিরাগত ভাস্কররা সুন্দর সুঠাম
মূর্তি গড়লেন, কিন্তু
তার মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক অনুভাব ফুটিয়ে তুলতে পারলেন না। এই সময়ের ভাস্কর্য
শিল্পকেই গান্ধার শিল্প বলা হয়ে থাকে, সে কথা আগেই বলেছি। এই সময়ের
মূর্তিগুলি অনবদ্য সুন্দর কিন্তু প্রাণহীন, আড়ষ্ট। গান্ধার-শিল্পে দক্ষ কিছু
শিল্পী হয়তো আগে থেকেই মথুরাতে বসবাস করতেন, অথবা কুষাণ রাজারা মথুরাতে দ্বিতীয়
প্রশাসনিক কার্যালয় নির্মাণের জন্যে তাঁদের এনে বসত করিয়েছিলেন।
মথুরার শিল্পীরা প্রাথমিক ভাবে গান্ধার-ঘরানারই (Gandhar School) শিল্পী
ছিলেন, কিন্তু
ধীরে ধীরে তাঁদের নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে ফেলতে পেরেছিলেন, যাকে
মথুরা-ঘরানা (Mathura
School) বলা হয়। এই শিল্পীরা ভারতীয় সমাজ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে
গিয়ে, ভারতের
আধ্যাত্মিক ভাবনায় জারিত হতে হতে, ভারতীয় শিল্প-ভাবনাকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী কালে
তাঁদের এবং তাঁদের শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত অজস্র শিল্পীর হাতে, ভারতের
আনাচে কানাচে, পাথর
কিংবা পাহাড়ের গুহার বুকে,
ছেনি আর হাতুড়ির আঘাতে কত যে অনবদ্য মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে আলোচনা
আসবে পরে।
খ্রিষ্টিয় পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই সাধারণের কাছে মহাযানী মত তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছিল। এবং ততদিনে ব্রাহ্মণ্যধর্মও সাধারণ ভারতবাসীর কাছে হিন্দুধর্মে রূপান্তরিত হয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। মহাযানী ও আগ্রাসী হিন্দু ধর্মের চাপে ততদিনে দুর্বল হীনযানী শাখাগুলিও চলে গিয়েছিল বিলুপ্তির পথে। এই রকম সময়েই হিন্দু ধর্মে এবং বৌদ্ধধর্মে – কোথাও আবার দুই ধর্ম যৌথভাবে - নতুন ধর্ম শাখায় রূপান্তরিত হল। একটি হল হিন্দুদের তন্ত্র ধর্ম, অন্যটি হল বৌদ্ধদের তন্ত্রধর্ম – যার নাম বজ্রযান। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তন্ত্র চর্চা বহু প্রাচীন অনার্যদের ধর্ম, যার কিছু কিছু উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ব বেদেও। খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা সেই তন্ত্রধর্মেরই আত্মপ্রকাশ ঘটল। যদিও এই ধর্মের প্রভাব সীমিত রইল প্রধানত পূর্বভারতে, ভারতের অন্যত্র এই ধর্মের প্রভাব ছিল যৎসামান্য। এই তন্ত্র ধর্ম নিয়ে আমরা সবিস্তার আলোচনা করব হিন্দু ধর্মের সঙ্গেই - পঞ্চম ও শেষ পর্বে।
৪.৩.২ অনার্য ধর্মভাবনা ও মূর্তি পূজা
যদিও প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ নেই, তবুও আমার
দৃঢ় বিশ্বাস এই সময়ের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভারতীয় অনার্য ও সাধারণ আর্য জনসমাজেও
মূর্তিপূজার বহুল প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার বিশ্বাসের কারণটা সংক্ষেপে বলি।
আমরা দেখেছি গ্রীক রাজা সেলুকস নিকেটরের কন্যা
বধূ হয়ে এসেছিলেন মৌর্য পরিবারে। সে কন্যা নিশ্চয়ই একলা আসেননি, রাজকুমারীদের
প্রথা অনুযায়ী তিনি বহু সখী পরিবৃতা হয়ে এবং অজস্র দাস-দাসী নিয়েই এসেছিলেন। তাদের
সকলেই যে গ্রীস এবং পারস্যের মানুষ সে কথা বলাই বাহুল্য। সুদূর কান্দাহার অঞ্চল
থেকে তারা ভারতবর্ষের পাটলিপুত্র প্রাসাদে যখন এসেছিল, তারা বহন
করে এনেছিল সেলুকীয় ও অ্যাকিমিনিড সংস্কৃতি এবং ধর্ম, সেকথা সহজেই
অনুমান করা চলে। তাদের ধর্মে মূর্তিপূজার বহুল প্রচলন ছিল একথা আমরা আগেই জেনেছি।
প্রাসাদের অন্দরমহলে গ্রীক-রাজকুমারীকে যখন বরণ করা হয়েছিল, সে সময়
অন্যান্য ভারতীয় রাণি এবং অন্তঃপুরচারিণীদেরও দাস-দাসীর অভাব ছিল না। অতএব এমন
অনুমান করাই যায়, দুপক্ষের
– ভারতীয় এবং গ্রীক দাসদাসীদের মধ্যে অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতাও যেমন হয়েছিল, তেমনই
দুপক্ষের ঈর্ষা-দ্বেষের অন্তঃপুর-কূটনীতিও শুরু হয়েছিল। এই নিবিড় মিশ্রণ থেকে, ভারতীয়
দাস-সমাজের মনেও নিজ নিজ বিশ্বাসের দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণের বীজ রোপিত হওয়া
অসম্ভব মনে হয় না। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ছিলেন বলেই, তাঁর অন্তঃপুরের দাসদাসীরাও সকলে
বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন,
এমন ধারণা করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। অতএব ব্রাহ্মণ্য সমাজে “অনাচারী
শূদ্র” হয়ে থাকা অনার্য দাস-দাসীরা, কয়েক হাজার বছর ধরে প্রচলিত তাদের
নিজস্ব ধর্ম আচরণের জন্যে অনুকূল আদর্শ এবং পরিবেশ পেয়ে গেল বিদেশী সহকর্মীদের
থেকে।
মৌর্য প্রাসাদে এবং পাটলিপুত্র নগরে সেলুকীয় এবং অ্যাকিমিনিড ভাস্কর এবং স্থপতিরা যে এসেছিল, সে কথাও আমরা আগেই জেনেছি। তাদের সহকারীদের (assistant বা helper) মধ্যে অধিকাংশই ছিল ভারতীয় অনার্য শূদ্র সে কথা অনুমান করতেও কোন সংশয় নেই। অতএব তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে এদেশের শূদ্ররাও ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথরের বুকে ছোট ছোট আকৃতি গড়া অভ্যাস করতে লাগল। তারা নিজেদের চিন্তা-ভাবনা মতো তাদের নিজস্ব দেবতাদের মূর্তি গড়াও শুরু করে দিল - পশুপতি, বিশদেব, এবং মাতৃকামূর্তি সমূহ। সেগুলি খুব উচ্চস্তরের শিল্প হল না। তা না হোক, অধরা কাল্পনিক মূর্তিগুলি তাদের চোখের সামনে – দুই হাতের মধ্যেই ধরা দিতে শুরু করল। প্রায় হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজে বঞ্চিত এবং অবহেলিত মানুষগুলির কাছে এইটুকু পাওয়াও ছিল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর বিষয়।
এইভাবেই বৌদ্ধ ধর্মাশোকের সহিষ্ণু রাজধানীতে এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলিতে শূদ্ররা নিশ্চিন্তে তাঁদের মূর্তিপূজায় মনোনিবেশ করতে পারল। এই পূজা প্রক্রিয়ার মধ্যে অবশ্যই বৈদিক জটিলতা নেই, নেই পুরোহিতের আবশ্যিকতা, সহজ-সরল সাধারণ পূজা এবং অর্ঘ্য। এবং এই বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল দ্রুত। কী ভাবে?
সেকালে বণিকরা যখন যেখানে যেতেন, তাঁদের
সঙ্গে থাকত বিপুল সংখ্যক দাস। তা নাহলে কে চালাবে বলদের বা মোষের গাড়ি? গাড়ি থেকে
মালপত্র ওঠানো, নামানো, সাজিয়ে রাখা
কে করবে? সুদীর্ঘ
যাত্রাপথে কে বণিক-প্রভুর বসন, বাসন নিত্য ধোলাই করবে? কেই বা প্রভুর হাত-পা টিপে দেবে? এভাবেই
পাটলিপুত্রের বণিকদের দাস-সম্প্রদায় যেখানে, যে শহরে বা জনপদে পৌঁছেছে, স্থানীয়
সাধারণ জনসমাজের সঙ্গে আলাপ ও পরিচয়ে নিজেদের ধর্ম-বার্তা ঘোষণা করেছে সগৌরবে। সে
বার্তা ব্যর্থ হয়নি,
এর পর থেকেই ভারতবর্ষের অঞ্চলভেদে অনার্য ধর্মের বিচিত্র শাখা, সকলেই নিজ
নিজ বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে লাগল নানান রূপে নানান আকারে।
আমার এই অনুমান যে অবান্তর নয়, তার সমর্থনে
আমরা লক্ষ্য করছি, মৌর্য
সাম্রাজ্য পতনের শতখানেক বছর পরেই দুটি ধর্মীয় শাখার সুস্পষ্ট অস্তিত্ব - একটি
ভাগবত, অন্যটি
শৈব। ভাগবত শাখার দেবতা বিষ্ণু এবং শৈব শাখার দেবতা পশুপতি বা শিব, যাঁর বাহন
বৃষ - যাঁর ধর্মীয় নাম নন্দী। আমরা একটু আগেই কুষাণ রাজাদের মুদ্রায় “মাহেশ্বর” ও
“বৃষ” বা “নন্দী”-র চিত্র মুদ্রিত হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে, এই
শাখাদুটির সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যোগাযোগ ছিল কি না, তার
প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় না। না থাকারই কথা, কারণ বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের
প্রধান দেবতারা তখনও ছিলেন,
সূর্য, অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ, বায়ু
প্রমুখ।
আরও একটি পরোক্ষ প্রমাণ হল, বেশ কিছু শক, কুষাণ এবং
গ্রীক রাজাদের ভারতে এসে ভাগবত বা শৈব হয়ে ওঠা। কয়েকজন রাজার উদাহরণ দিলে বিষয়টা
আরেকটু স্পষ্ট হবে।
১. হেলিওডোরাস– রাজা অ্যান্টায়ালসিডাস (Antialcidas) মোটামুটি
১১৫-৯৫ বি.সি.ই-তে আফগানিস্তান থেকে সিন্ধুর পূর্বতট পর্যন্ত রাজ্যের গ্রীক রাজা।
তাঁকে তক্ষশিলার রাজা বলা হত। তিনি হেলিওডোরাসকে শুঙ্গ রাজসভায় রাজদূত করে
পাঠিয়েছিলেন, এই
হেলিওডোরাস নিজেকে “ভাগবত” বলে পরিচয় দিতেন।
২. মিনান্ডার (Menander) - গ্রীক রাজা
(১৫০ -১৩৫ বি.সি.ই) – বৌদ্ধ ছিলেন।
৩. থিওডোরাস গ্রীক রাজা (Theodorus) – বৌদ্ধ
ছিলেন।
৪. ভিমা কদফিসিস (আনুমানিক খ্রিষ্টিয় প্রথম
শতাব্দীর মাঝামাঝি) – কুষাণদের এই দ্বিতীয় রাজার মুদ্রায় “মাহেশ্বর” এবং “নন্দী”-র
মুদ্রিত চিত্র পাওয়া গেছে। তিনি শৈব কিনা সে কথার উল্লেখ অবশ্য পাওয়া যায় না।
৫. কণিষ্ক (আনুমানিক ৭৮ সি.ই.) – কুষাণ রাজা –
বৌদ্ধ ছিলেন, তিনি
বৌদ্ধ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন।
৬. বাসুদেব (আনুমানিক ১৫২ সি.ই.) - কুষাণ রাজা –
শৈব ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের কুজুলা কদফিসিস, ভিমা কদফিসিস, কণিষ্ক, বাশিষ্ক, হুবিষ্ক–এর
মতো বিদেশী নামের পর,
তাঁর নামটি সম্পূর্ণ ভারতীয়, তাঁর মাতা ভারতীয় ছিলেন কিনা জানার কোন সম্ভাবনা নেই।
৭. শকদের এক গোষ্ঠী রাজা নাহপান (১১৯-১২৪ সি.ই.)
– তাঁর কন্যার নাম দক্ষমিত্রা এবং জামাই ঋষভদত্ত – দুটোই ভারতীয় নাম।
৮. গণ্ডোফার্নিস (১৯-৪৫ সি.ই.) – পহ্লব বা
ইন্দো-পার্থিয়ান রাজা - সেন্ট টমাসের কাছে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন।
৯. শক ক্ষত্রপ রুদ্রদমন (১৫০ সি.ই.) – একমাত্র
ব্যতিক্রম - তিনি কোন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাঁর
রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত। নানান বিদেশী জাতি এদেশে প্রবেশ এবং আংশিক রাজত্ব
শুরু করার প্রায় চারশ বছর পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রথম এই বিদেশী রাজার ঘনিষ্ঠতা
অর্জন করতে পেরেছিল।
ভাগবত এবং শৈবের মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, সমসময়ে আরও
কয়েকটি শাখার নাম পাওয়া যায়, যেমন পাশুপত্য, গাণপত্য ইত্যাদি। পাশুপত্য শব্দের
উৎস পশুপতি দেবতা, হয়তো
তাঁর সঙ্গেই পূজিত হতেন তাঁর বাহন, নন্দী অর্থাৎ বৃষ। পদতলে পশুর ছবি
নিয়ে পশুপতি দেবের রিলিফ-চিত্র পাওয়া গেছে হরপ্পা সভ্যতার বেশ কিছু সিলে। গাণপত্য
শব্দের উৎস গণপতি – অর্থাৎ জনসাধারণের প্রভু বা দেবতা – তাঁর মূর্তি ছিল মানব
শরীরে গজমুণ্ড – যাঁর আরেক নাম গণেশ। এছাড়া মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ
অঞ্চলে মসৃণ শিলাখণ্ড পূজিত হত, লিঙ্গের প্রতীক হিসাবে। এই “লিঙ্গ” মূর্তি সৃষ্টির প্রতীক -
প্রভূত ফসল, সন্তান-সন্ততি, গবাদি পশুর
প্রাচুর্যের কামনায় লিঙ্গপূজার প্রচলন ছিল। কৃষ্ণ ছিলেন প্রধানতঃ পশুপালকগোষ্ঠীদের
দেবতা, যাঁর
আরও নাম ছিল গোবিন্দ বা গোপাল – যার আক্ষরিক অর্থ গোরক্ষক। প্রধানতঃ রাজস্থান, গুজরাট এবং
উত্তর-পশ্চিম ভারতের আভির (আহির) এবং যাদব গোষ্ঠীগুলির দেবতা। পূর্ব মালবে (এরান, মধ্য
প্রদেশ) পাথরের একটি বরাহ মূর্তি পাওয়া গেছে, যে মূর্তিটি শক্তি এবং বীরত্বের
প্রতীক হিসাবে পূজিত হত।
অতএব অনুমান করা যায়, নানান
ধর্ম-মত নিয়ে উচ্চস্তরের প্রজ্ঞা ও দর্শন এবং সেই সংক্রান্ত যাবতীয় তর্কবিতর্ক ছিল
প্রধানতঃ নগরকেন্দ্রিক এবং খুব জোর তার সংলগ্ন জনপদ ও গ্রামগুলিতে। এই বৃত্তের
বাইরের বিস্তীর্ণ জনসমাজের মানুষ, তাঁদের নিজস্ব আঞ্চলিক ধর্ম নিয়েই সুখে ও শান্তিতে ছিলেন।
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পরিশ্রম করে তাঁদের পরিবারের অন্ন সংস্থান করতে হত এবং
নিয়মিত রাজকরও মেটাতে হত। তাঁরা “নির্বাণ” বা “মোক্ষ”-এর মধ্যে কোনটি উৎকৃষ্ট, চিন্তা করতে
বসলে, তাঁদের
সর্বনাশ তো হতোই, সর্বনাশ
হত রাজা এবং রাজ্যেরও। কারণ তাঁদের উদ্বৃত্ত সম্পদ ছাড়া রাজধানী, নাগরিক
স্বাচ্ছন্দ্য, মন্দির, বিহারের
অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠত।
আরও এক শক্তিশালী গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়, কুষাণ
রাজত্ব শেষ হওয়ার পর। যে সময় উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুদিন দুর্বল
এবং প্রায় শূণ্য অবস্থায় চলে গিয়েছিল। সেই সময়ে, অর্থাৎ খ্রিষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর
শুরুর দিক থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তর ভারতে বেশ কিছু অঞ্চলে নাগ
অথবা ভারশিব গোষ্ঠীদের রাজ্যের কথা জানা যায়। পুরাণের উল্লেখ থেকে জানা যায়, তাদের
রাজত্ব ছিল বিদিশা, পদ্মাবতী
(পাওইয়া, মধ্যপ্রদেশ), কান্তিপুরী
(মির্জাপুর জেলা, উত্তর
প্রদেশ) এবং মথুরা অঞ্চলে। বীরসেন নামে জনৈক নাগরাজা মথুরাতে তাঁর নাগরাজ্য
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী কালে এই নাগ রাজাদের শক্তি এবং প্রভাব এতটাই বেড়ে
গিয়েছিল, তাঁদের
সঙ্গে পশ্চিমের বাকাতক রাজ্যের বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সমুদ্রগুপ্তের
শিলালেখ (৩৬০ সি.ই.) থেকে জানা যায়, তিনি অনেকগুলি নাগরাজাকে পরাস্ত করে, তাঁদের
রাজ্য অধিকার করেছিলেন,
যেমন গণপতিনাগ, নাগদত্ত, নাগসেন-নন্দী।
সমুদ্রগুপ্ত নাগদের রাজ্য জয় করলেও, তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের এক
রাণি ছিলেন নাগ রাজকুমারী,
নাম কুবেরনাগা। এই নাগ বা ভারশিব জনগোষ্ঠী কারা সে কথা সঠিক জানা যায় না, কিন্তু
পুরাণে বর্ণনা করা আছে,
নাগরা ভারতে “হিন্দু” রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন! এই রাজারা ব্রাহ্মণ না
ক্ষত্রিয় সে বিষয়ে পুরাণ নীরব।
যাই হোক, এখনও পর্যন্ত ভারতের ইতিহাসে
ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিবিধ শাখার পাশাপাশি অনেকগুলি অনার্য
ধর্মগোষ্ঠীদেরও অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল। উপরন্তু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ধীরে ধীরে
হিন্দুধর্ম হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও যে শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাও টের
পাওয়া গেল। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে পরবর্তী এবং শেষ পর্বে। ততক্ষণ
আমরা ভারতীয় ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ের দিকে চোখ রাখি।
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন