এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
চতুর্দশ অধ্যায়ঃ
গুণত্রয়বিভাগযোগ
|
১ |
শ্রীভগবান
বললেন – সকল জ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরম জ্ঞানের তত্ত্বটি আরেকবার তোমাকে বলব। এই
পরম জ্ঞান অর্জন করলে মুনিরা দেহান্তের পর পরম সিদ্ধিলাভ করে থাকেন।
|
||
|
২ |
এই পরম
জ্ঞান আশ্রয় করে আমার স্বরূপ লাভ করা যায়। এরপর আর সৃষ্টিকালে জন্মগ্রহণ করতে
হয় না এবং প্রলয়কালে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না।
|
||
|
৩ |
হে
অর্জুন, মহৎ ব্রহ্ম আমার যোনি, আমিই তার গর্ভাধান করি, সেখান থেকেই সর্বভূতের
সৃষ্টি হয়। [সত্ত্ব,
রজঃ ও তমঃ – এই ত্রিগুণ সম্পন্ন প্রকৃতিই শ্রীভগবানের যোনিস্বরূপ। প্রকৃতি সকল
কার্যের কর্তা তাই তিনি মহৎ ব্রহ্ম। ক্ষেত্রজ্ঞ জীবাত্মার ক্ষেত্রের সঙ্গে অর্থাৎ
দেহের সঙ্গে সংযোজনই গর্ভাধান - এই বিশ্বজগতের সৃজন।]
|
||
|
৪ |
হে
কুন্তীপুত্র অর্জুন, দেব, পিতৃ, মানুষ, পশু ইত্যাদি যে কোন যোনিতেই যে দেহ জন্ম
নিক না কেন, মহৎব্রহ্ম প্রকৃতি তাদের মাতা আর আমিই চৈতন্যস্বরূপ বীজপ্রদ পিতা।
|
||
|
৫ |
হে
মহাবীর অর্জুন, সত্ত্ব, রজঃ আর তমঃ প্রকৃতিজাত এই তিনগুণ, অব্যয় পরমাত্মাকে
দেহের অভিমানে বদ্ধ করে রাখে। |
||
|
৬ |
হে
সদাচারী অর্জুন, এই তিনগুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ নির্মল, তাই স্বরূপের সুখে শান্ত
থাকে এবং চৈতন্যভাব প্রকাশ করে। এই সুখের আসক্তি ও জ্ঞানের আসক্তিতে জীব আবদ্ধ
হয়। |
||
|
৭ |
হে
কুন্তীপুত্র অর্জুন, জেনে রাখো রজোগুণ রাগাত্মক, মনে তৃষ্ণা ও আসক্তির সৃষ্টি
করে। এই গুণ দেহীকে ফলের প্রত্যাশায় কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে। [রঙের
প্রভাবে যা অন্যকে রঙীন করে তোলে, তাই রাগাত্মক। গৈরিক বসনের প্রভাবে যেমন মনে
বৈরাগ্যভাব আসে – শ্রীশ্রীশঙ্করভাষ্য।] |
||
|
৮ |
হে
অর্জুন, জেনে রাখো, অজ্ঞান থেকে কিন্তু তমোগুণ আসে আর সমস্ত দেহধারীর মনে মোহ
সৃষ্টি ক’রে, ভ্রান্তি, আলস্য ও নিদ্রা দিয়ে আত্মাকে আবদ্ধ করে। |
||
|
৯ |
হে
অর্জুন, সত্ত্বগুণ সুখে আবদ্ধ করে, রজোগুণ কর্মে আর তমোগুণ জ্ঞানকে আচ্ছন্ন ক’রে,
ভ্রান্তিতে আবদ্ধ করে।
|
||
|
১০ |
হে
অর্জুন, কখনো রজোগুণ ও তমোগুণকে অভিভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়। কখনো সত্ত্ব ও
তমোগুণকে অতিক্রম করে রজোগুণ, কখনো বা সত্ত্ব ও রজোগুণকে অভিভূত করে তমোগুণ
প্রবল হয়ে থাকে।
|
||
|
১১ |
যখন এই
দেহের সকল ইন্দ্রিয়দ্বার জ্ঞানের প্রকাশে উদ্ভাসিত হয়, তখনই জানবে তোমার শরীরে
সত্ত্বগুণ বেড়ে উঠেছে।
|
||
|
১২ |
হে
ভরতকুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, রজোগুণ বৃদ্ধির সময় মানুষের লোভ, কর্মে প্রবৃত্তি, কর্মে
উদ্যম, বিরামহীন কর্মের ইচ্ছা ও বিষয় লাভের অনুরাগ আসে।
|
||
|
১৩ |
হে
কুরুনন্দন, তমোগুণ বৃদ্ধিতে বিবেকবুদ্ধি লোপ পায়, মানুষ উদ্যমহীন হয়, কর্তব্যে
অবহেলা ও মূঢ় চিন্তা করে। |
||
|
১৪ |
সত্ত্বগুণ
বৃদ্ধির সময় দেহত্যাগ করলে, ব্রহ্মবিদ উপাসকের যোগ্য অমলিন ব্রহ্মলোক পাওয়া যায়।
|
||
|
১৫ |
রজোগুণ
বৃদ্ধির সময় মৃত্যু হলে কর্মে আসক্তি নিয়ে মনুষ্যলোকেই ফিরে আসে, আর তমোগুণ নিয়ে
মৃত্যু হলে মূঢ়যোনিতে পশু হয়ে জন্ম নিতে হয়। |
||
|
১৬ |
মহর্ষিগণ
বলেন – সাত্ত্বিক কর্মের ফল নির্মল সুখ, রাজসিক কার্যের ফল দুঃখ আর তামসিক কাজের
ফল অজ্ঞানের অন্ধকার।
|
||
|
১৭ |
সত্ত্বগুণ
থেকে জ্ঞানের উদয় হয়, রজোগুণ থেকে লোভ আর তমোগুণ থেকে অজ্ঞান, ভ্রান্তি আর মোহ
উৎপন্ন হয়।
|
||
|
১৮ |
সত্ত্বগুণের
অধিকারী ব্যক্তি ঊর্ধলোকে গমন করে, রজোগুণ প্রধান ব্যক্তি মধ্যলোকে দুঃখবহুল
নরলোকে জন্ম নেয়, তমোগুণধারী নিকৃষ্ট জনেরা অধঃলোকে পতিত হয়।
|
||
|
১৯ |
যিনি
বুঝতে পারেন এই তিনগুণ ছাড়া আর কেউই সকল কার্য-করণের কর্তা নয়, তিনিই এই ত্রিগুণের
অতীত পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করেন এবং আমার স্বরূপ লাভ করেন। |
||
|
২০ |
দেহের
উৎপত্তিস্বরূপ এই তিনগুণকে অতিক্রম ক’রে, জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখের বন্ধন ছিন্ন
ক’রে, জীব অমৃতস্বরূপ পরম মুক্তি লাভ করে। |
||
|
২১ |
অর্জুন
বললেন – হে প্রভু, কি কি লক্ষণ থেকে এই ত্রিগুণাতীত মানুষ চেনা যায়। কি আচরণে
এবং কি উপায়েই বা এই তিনগুণকে অতিক্রম করা যায়?
|
||
|
২২ |
শ্রীভগবান
বললেন – হে পাণ্ডুপুত্র, এই ত্রিগুণের স্বাভাবিক প্রভাবে মনে প্রকাশ, প্রবৃত্তি
ও মোহের উদয় হলেও, যিনি কোন দ্বেষ করেন না, অথবা এই তিনগুণের নিবৃত্তিও যিনি
আকাঙ্ক্ষা করেন না, তিনিই ত্রিগুণাতীত। |
||
|
২৩ |
যিনি এই
ত্রিগুণে প্রভাবিত না হয়ে, সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন এবং শরীর ও চিত্তের উপর এই
ত্রিগুণের প্রভাব স্বাভাবিক জেনেও, যিনি অচঞ্চল থাকতে পারেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত।
|
||
|
২৪ |
যিনি
সুখে দুঃখে সমভাবে থাকেন; পাথর, মাটি আর সোনার মধ্যে যিনি কোন পার্থক্য দেখেন
না, প্রিয় এবং অপ্রিয় বিষয়ে যিনি একইভাবে উদাসীন, নিন্দা ও প্রশংসাতেও যিনি
অবিচলিত শান্ত থাকেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত। |
||
|
২৫ |
যিনি
সম্মান ও অপমানে নির্বিকা্র, মিত্রপক্ষ ও শত্রুপক্ষে কোন পার্থক্য করেন না, যিনি
ফলের প্রত্যাশী সমস্ত কর্মই ত্যাগ করেছেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত।
|
||
|
২৬, ২৭ |
যিনি
ঐকান্তিক ভক্তিযোগে আমার উপাসনা করেন, তিনিও এই ত্রিগুণের প্রভাব অতিক্রম করে
ব্রহ্মস্বরূপ লাভ করে থাকেন। কারণ, আমিই অমৃতস্বরূপ অব্যয় ও অবিনাশী স্বয়ং
ব্রহ্ম; আমিই শাশ্বত জ্ঞানযোগরূপ এবং ঐকান্তিক সুখস্বরূপ পরম ব্রহ্ম। |
গুণত্রয়বিভাগযোগ সমাপ্ত
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন