রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আকাশের অর্ঘ্য



 

এর আগের রম্যকথা - " রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম


সেবার হস্টেলে মহালয়ার আগের রাত্রে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আড্ডার বিষয় ছিল, রেডিওর পুরো মহালয়া কে শুনেছে? কেউ কি শুনেছে? বহুক্ষণ তর্ক বিতর্কের পর আমরা নিজেদের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে দেখলাম, না, জ্ঞান হওয়া ইস্তক প্রত্যেকবারই মহালয়ার ভোরে রেডিওতে কান পেতেছি, কিন্তু পুরোটা কোনবারই শোনা হয়নি। প্রথমদিকের পনের-বিশ মিনিট ও শেষের দিকে পাঁচ-দশ মিনিট মনে করতে পারা যাচ্ছে, কিন্তু মাঝের ঘন্টাখানেকর কোন স্পষ্ট স্মৃতি নেই। যা আছে, সেটা হল, ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শোয়ার সময় তন্দ্রাঘোরে আবছা দু একটা গানের কলি, অথবা চণ্ডী পাঠের অংশ!

এত বছর ধরে আমরা মহালয়ার ভোরে রেডিওয় কান রাখছি, কিন্তু শুনছি না। এ যেন “ঠোঙা ভরা বাদামভাজা খাচ্ছি, কিন্তু গিলছি না”। উঁহু, এতো ভালো কথা নয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আর বিলম্ব নয়, আমাদের আশু কর্তব্য, আজ সমস্ত রাত্রি জাগরণ ও রাত্রি ভোরে পূর্ণ মহালয়া শ্রবণ। সিদ্ধান্ত তো হল, কিন্তু শুনবো কিসে, রেডিও কোথায়?

রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময় আমরা তিনজন টর্চ নিয়ে, হস্টেলের রুমে রুমে ঘুরতে লাগলাম একজন দরদী সহপাঠীর সন্ধানে। যার আছে একটি সচল ট্রানজিস্টার রেডিও। যে বিশ্বাস করে একরাত্রের জন্য আমাদের হাতে তুলে দেবে তার রেডিওখানি। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর সেরকম সহপাঠী পাওয়া গেল, পাওয়া গেল একখানি বড়সড়ো সন্তোষজনক রেডিও। সে সহপাঠী খুব সংকোচের সঙ্গে বলল-

-রেডিও তো আছে, আমি তো একটু আগেই গান শুনছিলাম। কিন্তু ব্যাটারির অবস্থা খুব খারাপ, কদিন ধরেই ভাবছি, ব্যাটারি কিনব, রোজ ভুলে যাচ্ছি। হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আমরা সমস্বরে বললাম-

-ও নিয়ে তুই ভাবিস না, টর্চের ব্যাটারি দিয়ে ম্যানেজ হয়ে যাবে, বস।

ঘরে এনে টর্চের ব্যাটারি ভরে চালু করলাম রেডিওটা। দিব্বি চালু হল, যদিও ততক্ষণে কলকাতার সব স্টেশন নিঃশব্দ হয়ে গেছে। চালু রয়েছে শর্ট ওয়েভের বিদেশী স্টেশন। ব্যাটারির অপচয় এড়াতে আমরা রেডিও বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু তখন আমাদের নিজেদের ওপরেই আর বিশ্বাস থাকছিল না। ঘরের মধ্যে আরাম করে বসার জায়গা বলতে বিছানা। বিছানায় বসলেই, কাত হতে ইচ্ছে হবে, তখন কি আর  ঘুমের জাদুস্পর্শ এড়াতে পারবো? অসম্ভব। আমরা তিনজন, বিছানার চাদর উঠিয়ে নিয়ে উঠে গেলাম হস্টেলের বিশাল ছাদে। ঘুম এড়ানোর পক্ষে ছাদও নিরাপদ নয়, আমরা উঠে পড়লাম জলের কংক্রিট ট্যাংকির উপর। এখানে সংকীর্ণ জায়গা, কোন রেলিং বা দেওয়াল নেই, খোলা ছাদ। নিরাপদ নয়, কিন্তু নিরাপদ। পড়ে যাওয়ার আশংকায় নিরাপদ নয়, কিন্তু সেই ভয়ে ঘুম না আসার পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

ভাঁজ করে বিছানার চাদর বিছিয়ে মুখোমুখি বসা গেল তিনজনে। সামনে বিড়ির বাণ্ডিল আর দেশলাই। মাথার উপর কুচকুচে মখমলি কালো প্রাকঅমাবস্যার আকাশ। তার গায়ে অগণিত তারার চুমকি।  আমার গ্রামের বাড়িতেও এমন তারায় ভরা রাতের আকাশ দেখেছি। কিন্তু হাল্কা হিম পড়া সেই রাত্রে, এমন স্পষ্ট তারার সমাহার দেখার অবকাশ খুব একটা আসে নি জীবনে। আকাশের অনেকখানি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে কালপুরুষ ঝুঁকে অবাক তাকিয়ে রইল সারাটারাত, দেখতে লাগল আমাদের হুজুগের বহর।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই কালপুরুষ চিনেছিলাম, তার মাথা, কোমরের বেল্ট, হাত পা, মায় তার সঙ্গের কুকুরটিও, যার নাম লুব্ধক। মাথার তারামণ্ডলের নাম মৃগশিরা, কোমরের তিনটি তারা ঊষা, অনিরুদ্ধ আর চিত্রলেখ। সেদিন তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্য কথা আর তেমন জমল না। মনে তারাময় আবেগ।

মনে পড়ল, প্রেমেন্দ্র মিত্রর অন্যরকম কবিতা – “হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে/হৃদয়ে কি জং ধরে পুরোন খাপে। কার চুল এলোমেলো, কি বা তাতে এল গেল, কার চোখে কত জল কে বা তা মাপে? ...হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে”। আমাদের ত্র্যহ স্পর্শে জেগে উঠলেন চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ। “তারাগুলি সারারাতি কানে কানে কয়, সেই কথা ফুলে ফুলে ফুটে বনময়”। “তারার দীপ জ্বালেন যিনি গগনতলে, থাকেন চেয়ে ধরার দীপ কখন জ্বলে”। বিশাল বিস্তারের ঐ নক্ষত্রময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেদের সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলার যে অনুভূতি, কে আর পারেন তাকে অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলতে, 

“তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে

ফিরে গিয়ে ছাতে

মনে হল আকাশপানে চেয়ে

আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে

নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে

দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।

নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি

আকাশ ভরে উঠত কেঁদে “হারিয়ে গেছি আমি”।”

চৈত্র না হোক, সেই  আশ্বিনের রাতের আকাশেও আমাদের এই অনুভব এতটুকুও কম হয় নি।  

 

অবশেষে এসে গেল সেই সময়। রেডিও চালু করে আমরা কলকাতা-কয়ের মহিষাসুরমর্দ্দিনী চালু করলাম। এবং নিশ্ছিদ্র নীরবতায় শুনতে লাগলাম অনুষ্ঠান। শুনছিলাম না, সমস্ত চেতনা দিয়ে অনুভব করছিলাম। চোখের সামনে বিশ্বচরাচর ধীরে ধীরে ভরে উঠতে লাগল ঊষার আবছা আলোয়। ভোরের শারদ বাতাসের হাল্কা হিমের নির্মল স্পর্শ। ঘুমভাঙা পাখিদের অনবদ্য কলকাকলি।

 

পুবের আকাশের আলোয় স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল আমাদের চারিপাশের অন্ধকার। উত্তরে আমাদের হস্টেলের সামনে মাঠ। তারপরে কলেজ বাউণ্ডারির ওপার থেকে যতদূর চোখ যায়, সবুজ গালিচার চা বাগান। তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আসাম-দিল্লী রেলপথ। তারও ওপারে কালচে সবুজ ঘন গাছের সারির মাথার উপর ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত কাঞ্চনজংঘার পঞ্চশৃঙ্গের বৈভব। তাদের শরীরে তখন হালকা কমলা আভা। 

 

আমাদের শ্রবণে দেবী দুর্গার মহিমা স্তোত্র, দৃষ্টিতে অপরূপ কাঞ্চনজংঘা, বিপুল দিগন্তের হরিৎ বিস্তার। অচেনা এক অনুভবে আচ্ছন্ন হয়ে রইল সমস্ত চেতনা। রেডিওর অনুষ্ঠান যখন শেষ হল, সকালের সোনা রোদ্দুরে ভরে উঠেছে টানটান মসৃণ নীল আকাশ। সাদা মেঘের এলোমেলো কয়েকটা টুকরোয়, সকালের আলোর বর্ণচ্ছটা। আর ওদিকে কাঞ্চনজংঘা রং বদলে হয়ে উঠেছে সোনালী।

 আমরা নেমে এলাম নীচে। রাত্রিজাগরণের কোন ক্লান্তি বা গ্লানি মনেও এল না। রেডিও, বেডশীট ঘরে রেখে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম হস্টেল থেকে। কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম জলপাইগুড়ি শহরের রাস্তায়। মাষকলাইবাড়ি যাবার পথে চোখে পড়ল অনেক লোক চলেছেন আমাদের উল্টো মুখে, অধিকাংশই মেয়ে এবং মহিলা। তাদের সকলের হাতে পুষ্পগুচ্ছ। এত সকাল সকাল, এমন সুন্দর এক দিনে, কোথায় চলেছে তারা? আমাদের কলেজের অদূরে হাইওয়ের ধারেই আছে তারা মায়ের প্রাচীন মন্দির। জনশ্রুতি, কোন এক কালে সেই মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন দস্যুসর্দার ভবানী পাঠক। এই ভবানী পাঠকের মন্ত্র শিষ্যা ছিলেন দেবীচৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র যাঁর কাহিনী নিয়ে রচনা করেছিলেন উপন্যাস। সেই জাগ্রতা দেবী মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতেই সকলের এই পুষ্প উপচার। আমরাও সঙ্গী হলাম তাঁদের, এমন প্রভাতে দেবী মায়ের রাতুল চরণে আমাদের কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য ছাড়া আর কিই বা দিতে পারি?


“-তোমার এখানে আকাশে যেন অর্ঘ্য সাজানো, যেন শিশিরধোওয়া সকালবেলার স্পর্শ। তুমি এখানকার বাতাসে কি ছিটিয়ে দিয়েছ বলো দেখি।

-সুর ছিটিয়েছি।

-আমাকে সেই রাজাধিরাজের কথা বলো সুরঙ্গমা, আমি শুনি।

-মুখের কথায় বলে উঠতে পারি নে।

-বলো, তিনি কি খুব সুন্দর?

-সুন্দর? একদিন সুন্দরকে নিয়ে খেলতে গিয়েছিলুম, খেলা ভাঙল যেদিন, বুক ফেটে গেল, সেইদিন বুঝলুম সুন্দর কাকে বলে। একদিন তাকে ভয়ংকর বলে ভয় পেয়েছি, আজ তাকে ভযংকর ব”লে আনন্দ করি। তাকে বলি তুমি দুঃখ, তাকে বলি তুমি মরণ, সবশেষে বলি তুমি আনন্দ!”*

 

জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে চার বছরে বিদ্যের ভারে কতটা বোঝাই হয়েছিলাম, তাতে আজও আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। কিন্তু, যে আনন্দের পূর্ণ উপলব্ধি এসেছিল, তা অন্য কোথাও আর মেলেনি।

 

*রবীন্দ্রনাথের “অরূপরতন” নাটকের ভগ্নাংশ।  

চলবে...

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

আকাশের অর্ঘ্য

  এর আগের রম্যকথা - "  রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম "  সেবার হস্টেলে মহালয়ার আগের রাত্রে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আড্ডার বিষয় ছিল, রেডিওর পুর...