বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব 


২৬

 

দীর্ঘক্ষণ মহর্ষি ভৃগুকে নির্বাক দেখে মন্ত্রীসভার সকলেই পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাঁরা সকলেই মহর্ষি ভৃগুর উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাঁর প্রগাঢ় প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় তাঁদের অগাধ আস্থা। বিদেশমন্ত্রী পদ্মনাভ অত্যন্ত বিনীত স্বরে মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মহর্ষি, আপনাকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে আমরা সকলেই অসহায় বোধ করছি। রাজ্যের এই সংকটের সমাধান, আপনার পক্ষেই সম্ভব। আপনি আমাদের আদেশ করুন, মহর্ষি, আমাদের এখন কী কর্তব্য?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু মুখ তুললেন, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বললেন, “ভাবছিলাম। বৎস পদ্মনাভ, ভাবছিলাম, নিয়তি অমোঘ, অনতিক্রম্য! রাজাবেণ অসুস্থ হওয়ার পর, এই কিছুদিন পূর্বে, আমরা তাঁর জন্মকুণ্ডলী পর্যালোচনা করছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন, জ্যোতিষাচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ। রাজাবেণের স্বল্প এই জীবনকালের অদ্ভূত আচরণ ও দুরাচারী চরিত্রের কারণ, তাঁর জন্মলগ্নে গ্রহ-নক্ষত্রের আশ্চর্য অবস্থান! সে অবস্থান অত্যন্ত বিরল এবং শত বর্ষে হয়তো একবারই সম্ভব! তাঁর কোষ্ঠী গণনা করে, আচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ এবং আমি আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম এই দেখে যে, তাঁর মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর আজন্ম অধিষ্ঠান! ঈশ্বরের লীলা কে উপলব্ধি করতে পারে? নিয়তির অমোঘ গতি কে রুদ্ধ করতে পারে?”

উপস্থিত মন্ত্রীসভার সদস্যরা সকলেই বিহ্বল হয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আশ্চর্য, অত্যাশ্চর্য!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। আজ আমি এই কথাটি বলবো বলেই আপনাদের এই সভায় আমন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু আমার মনে কোথাও যেন একটু দ্বিধা ছিল! কিন্তু আপনাদের মুখে ওই চারণকবিদের গান এবং ওই মহাতপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আমি নিঃসন্দেহ হলাম - নিশ্চিত হলাম”। মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে, মহামন্ত্রী বিমোহন ও অন্য সকলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলেন। অন্য সকলের মুখে নিরঙ্কুশ বিস্ময়ের লক্ষণ দেখলেও, মহামন্ত্রী বিমোহনের চোখে দেখতে পেলেন, সন্দেহ। তিনি আবার বললেন, “এই মন্ত্রণা কক্ষে আসার পথে মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্রর মুখে একটি বার্তা শুনলাম! এই রাজ্যে অনেকের বিশ্বাস রাজাবেণের এই অসুস্থতার কারণ, বিষপ্রয়োগ এবং আমিই সেই বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রী! তখন শুনে মনে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু...”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই বিস্ময়ে চমকে উঠলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ মহর্ষি ভৃগুর কথার মধ্যেই বলে উঠলেন, “সে কী? সে তো একটা অবিশ্বাস্য রটনা মাত্র এবং এর প্রচারক কে, সেও আমরা জানি - মহারাজ বেণের বাল্যবন্ধু, পদত্যাগী উপনগরপাল শক্তিধর! ভাগ্যগুণে পেয়ে যাওয়া আকাশচুম্বী ক্ষমতার অধিকারী কোন অযোগ্য ব্যক্তি যখন অকস্মাৎ ভূমিসাৎ হয়, তখন প্রচণ্ড ঈর্ষা তার মস্তিষ্কে তপ্ত বাষ্পের উদ্রেক করে! দিশাহারা হয়ে অযৌক্তিক অপবাদ দিতে তার আর তখন কোন কুণ্ঠা হয় না”!

মহর্ষি ভৃগু অসম্মতিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না বৎস বৃষভান্‌, তা নয়। এ সমস্তই অদৃশ্য নিয়তির অমোঘ সঞ্চালন। আমাদের ষড়যন্ত্রে মহারাজ অঙ্গ এবং মহারাণি সুনীথার পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অনুষ্ঠান। যৌবনের উপান্তে এসেও, সেই যজ্ঞের ফলস্বরূপ তাঁদের পুত্রলাভ। মহারাণীর অন্ধ স্নেহে রাজপুত্র বেণের দিন দিন দুর্ধর্ষ ও দুর্দান্ত হয়ে ওঠা। অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান...”

মহর্ষি ভৃগুর কথা থামিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান আবার বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান সম্পর্কেও রাজ্যে একটি রটনা প্রচলিত আছে, মহর্ষি, আর সেটি হল, যুবরাজ বেণের ষড়যন্ত্রে...”।

মহর্ষি ভৃগু বিরক্ত মুখে হাতের ইশারায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌কে নিরস্ত করলেন, “বৎস বৃষভান, এই সকল রটনার প্রসঙ্গ এখন অবান্তর! আমরা পরষ্পরের প্রতি কদর্য কর্দম নিক্ষেপণের জন্য এই সভা আহ্বান করিনি। ও প্রসঙ্গ এখন থাক। আমার অসমাপ্ত কথার সূত্র ধরে বলি, অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান, মহারাণি সুনীথার সনির্বন্ধ অনুরোধে যুবরাজ বেণের রাজ্য অভিষেক। সিংহাসন লাভ করে রাজা বেণের উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারীতা, অনাচার, দুরাচার এবং সর্বশেষে সনাতন ধর্মের উপর চরম আঘাত! তারপরই তাঁর এই অনারোগ্য অসুস্থতা! এ সবই নিয়তি পরিচালিত পূর্বনির্ধারিত নাট্যরঙ্গ, যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কুশীলব আমাদের মধ্যে অনেকে অথবা হয়তো সকলেই”!

মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে সকলের মুখভাব পর্যবেক্ষণ করলেন। মহামন্ত্রী বিমোহনও এখন কিছুটা যেন দ্বিধাগ্রস্ত, চিন্তিত। মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতে, তিনি মাথা নত করলেন। মহর্ষি ভৃগু আবার বললেন, “এখন নিয়তির আরেকটি সংকেত আমাদের সামনে উপস্থিত। সেই ইঙ্গিত অনুসারে আমরা আমাদের কর্তব্য করব, নাকি দ্বিধা ও সংশয়ে কালবিলম্ব করবো – এই সিদ্ধান্তের জন্যেই আমি আজ এই সভা আহ্বান করেছি!”

সকলেই অধীর আগ্রহে মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “নিয়তির কোন সংকেতের কথা আপনি বলছেন, মহর্ষি?”

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কেন? রাজা বেণের মানস পুত্র ও কন্যাকে আবাহন করে বরণ করতে হবে না?”

“কী ভাবে, মহর্ষি?” মহামন্ত্রী বিমোহন এতক্ষণে কথা বললেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানবের পক্ষে এই অলৌকিক ঘটনা কী ভাবে ঘটানো সম্ভব?” শুরু থেকেই মহামন্ত্রী বিমোহনের আলাপে যে বৈরিভাব লক্ষ্য করছিলেন মহর্ষি ভৃগু, এখন সেটা যেন আর নেই। মহামন্ত্রীর কণ্ঠস্বরে এখন কিছুটা সমর্থনের সুর!

মহর্ষি ভৃগু পূর্ণ দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “অলৌকিক কোন ঘটনা তো আমরা ঘটাবো না, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! ঘটাবেন তো তিনি! যিনি মহারাজ অঙ্গের পুত্র রাজাবেণের অঙ্গে আজন্ম অধিষ্ঠান করছেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণু! তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার পরিস্থিতিও তিনিই বানিয়ে তুলেছেন, আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করবো মাত্র!”

অবাক হয়ে সকলেই তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি ভৃগুর দিকে, মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “তিনিই সেই পরিস্থিতি বানিয়ে তুলেছেন? যেমন?”

মহর্ষি ভৃগু গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বললেন, “ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ রাজা দুর্ধর্ষ বেণ, এখন নামমাত্র জীবিত! তাঁদের ধরাতলে অবতরণের এটাই কী প্রকৃষ্ট লগ্ন নয়? সনাতন ধর্মকে যিনি বিনাশ করতে চেয়েছিলেন, তিনি আজ পূর্ববৎ সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো না? অতএব, ঈশ্বর স্বয়ং সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন! এখন বিশেষ কোন শুভ মূহুর্তে আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন তিনি!”

মহামন্ত্রী বিমোহন কিঞ্চিৎ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন, ঈশ্বর?”

মহামন্ত্রী বিমোহনের বিদ্রূপে কর্ণপাত না করে, মহর্ষি ভৃগু দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, “ঠিক তাই! তিনি তো রাজাবেণের জন্যে আসছেন না, আসছেন আমাদের জন্যে, এই রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসীর জন্যে। ঈশ্বর শুধুমাত্র কোন রাজাকে কৃপা করার জন্য ধরাতলে অবতীর্ণ হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি আসেন নিঃসহায় সাধারণ জনগণের পরিত্রাণের জন্য। তিনি আসেন সনাতন ধর্মকে তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা তাঁর সেই অবদান গ্রহণ করতে উন্মুখ কিনা, আমরা আমাদের আন্তরিক আস্থা নিয়ে তাঁকে বরণ করতে আগ্রহী কিনা, সেই প্রতীক্ষায় তিনি দিবস গণনা করছেন!” মহর্ষি ভৃগুর এই প্রত্যয়ী কথায় সকলেই আশ্চর্য এবং মুগ্ধ নির্বাক হয়ে রইল, এমনকি মহামন্ত্রী বিমোহনও স্বয়ং ঈশ্বরের আবির্ভাব কল্পনা করে, শিহরিত হলেন। সকলেই মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। মহর্ষি ভৃগু আর কোন কথা বললেন না, তাঁর স্বপ্নঘন দৃষ্টি এখন উন্মুক্ত গবাক্ষ পথে দূর দিগন্তের দিকে। 

চলবে... 



1 টি মন্তব্য:

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...