ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ১/১ "
ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১ "
ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "
ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "
"ধর্মাধর্ম" গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -
গুরুচন্ডা৯, ব্লক ১, স্টল ১৪, সূর্যসেন স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা ৭০০০১২
(পুঁটিরাম মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে)
অথবা
+91 93303 08043 Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে
বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।
["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের পঞ্চম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে " ধর্মাধর্ম - ৪/৫ "]
চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)
৪.৩.২ গুপ্ত সাম্রাজ্য
ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর্বকে সব থেকে
উজ্জ্বল পর্যায় বলা হয়,
তার কারণ এই সময়ের সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রাচুর্য। যার
থেকে সমসাময়িক ভারতবর্ষের পরিস্থিতি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্যক ধারণা করা যায়।
গুপ্তদের বংশ পরিচয় অস্পষ্ট, অনেক
ঐতিহাসিক তাঁদের নামে “গুপ্ত” সংযোগ দেখে বৈশ্য বলে মনে করেন। কিন্তু গুপ্ত দেখেই
বৈশ্য ধারণা করা হয়তো সঠিক নয়, কারণ সমসাময়িক কালে ব্রহ্মগুপ্ত নামে এক জ্যোতির্বিদের নাম
পাওয়া যায়, যিনি
একজন বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত।
গুপ্ত বংশের প্রথম যে রাজার নাম পাওয়া যায় তাঁর
নাম শ্রীগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল “মহারাজা”। অনুমান করা হয় মগধ অঞ্চলের ছোট কোন
রাজ্যে তাঁর রাজত্ব ছিল। চৈনিক পর্যটক ই-ৎসিং-এর বর্ণনা থেকে তাঁকে চিহ্নিত করা
যায়। ওই বর্ণনা অনুযায়ী মহারাজা চি-লি-কি-তো (শ্রীগুপ্ত) চৈনিক তীর্থযাত্রীদের
জন্য মৃগশিখাবনে একটি বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ই-ৎসিংয়ের ভারতভ্রমণ কাল
৬৭৩-৬৯৫ সি.ই., তিনি
লিখেছেন, মন্দিরটি
প্রায় পাঁচশ বছর আগে নির্মিত হলেও, তাঁর ভ্রমণকালে খুব সুন্দরভাবে
পরিচালিত হতে দেখেছেন। সেক্ষেত্রে শ্রীগুপ্তর সময়কাল হওয়া উচিৎ ১৭৩ সি.ই., কিন্তু
ই-ৎসিংয়ের “পাঁচশ বছর”কে নির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে না ধরে, যথেষ্ট
প্রাচীন হিসেবে কথার-কথা ধরা যেতে পারে। শ্রীগুপ্তর সময় যদি ২৭৩ সি.ই. ধরা যায়, সেক্ষেত্রেও
ই-ৎসিং-য়ের সময় ওই মন্দিরের বয়স প্রায় চারশ বছরের কাছাকাছি!
শ্রীগুপ্ত-র পুত্রের নাম ঘটোৎকচ, তিনিও
মহারাজা উপাধি ব্যবহার করতেন, তবে তাঁর সম্পর্কে তেমন আর কিছুই জানা যায় না।
৪.৩.২.১ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত
ঘটোৎকচের পর তাঁর পুত্র চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে
বসেন এবং তিনি “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। যার থেকে ধারণা করা যায়
গুপ্তবংশের তিনিই প্রথম রাজা, যিনি এই বংশের শক্তি এবং মর্যাদা বাড়িয়ে তুলতে পেরেছিলেন।
চন্দ্রগুপ্ত লিচ্ছবির রাজকুমারী কুমারদেবীকে বিবাহ করেছিলেন, যার
প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত তাঁর শিলানির্দেশে নিজেকে
“লিচ্ছবিদৌহিত্র” বলে উল্লেখ করেছেন। চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে লিচ্ছবি রাজকুমারীর এই
বিবাহের আরও সমর্থন পাওয়া যায়, তাঁর প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রায়। তাঁর মুদ্রার একদিকে মুদ্রিত
আছে, চন্দ্রগুপ্ত
তাঁর পত্নীকে সোনার বলয় উপহার দিচ্ছেন, এবং ডানদিকে লেখা আছে চন্দ্র এবং
বাঁদিকে কুমারদেবী। মুদ্রার অপরদিকে মুদ্রিত সিংহবাহিনী দেবীর চিত্র এবং লেখা আছে
“লিচ্ছবায়া”। এই মুদ্রার মুদ্রণ এবং সূক্ষ্ম গুণমান, সমসাময়িক রোমান সাম্রাজ্যের
মুদ্রাগুলির সমতুল্য।
ভগবান মহাবীর ও ভগবান বুদ্ধের সময়ে এই লিচ্ছবি-গণরাজ্যের রাজধানী বৈশালী (আধুনিক বিহারের মজঃফরপুর অঞ্চল) গুরুত্বপূর্ণ ও সম্পন্ন শহর ছিল। অজাতশত্রুর হাতে পরাজয়ের পর, লিচ্ছবিরা নেপালের কাঠমাণ্ডু অঞ্চলে নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অতএব কয়েক শতাব্দী পরে হলেও, বিখ্যাত লিচ্ছবিদের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা, নিঃসন্দেহে উভয় পক্ষেরই সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধির সূচনা করেছিল।
প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের সময়সীমা ৩২০
থেকে ৩৩৫ সি.ই.। সমসাময়িক নানান উল্লেখ থেকে অনুমান করা হয় তাঁর রাজ্যের সীমা
দক্ষিণ বিহার, মগধ, প্রয়াগ, সাকেত এবং
অবশ্যই বৈশালী এবং তার সংলগ্ন অঞ্চল।
৪.৩.২.২ সমুদ্রগুপ্ত
প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পর রাজা হলেন তাঁর পুত্র
সমুদ্রগুপ্ত। যদিও মনে করা হয় তিনি প্রথম চন্দ্রগুপ্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, কিন্তু পিতা
তাঁকেই রাজপদে নির্বাচিত করেছিলেন। অতএব প্রথম চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর রাজ
পরিবারে কিছুটা অশান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। যাই হোক, সমুদ্রগুপ্ত
সিংহাসনে বসে, পিতার
আস্থার মর্যাদা রাখতে পেরেছিলেন এবং গুপ্ত রাজ্যকে সাম্রাজ্য বানিয়ে তুলেছিলেন।
সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য বিস্তারের বিবরণ পাওয়া যায়, এলাহাবাদ
শিলালিপি থেকে। ঘটনাচক্রে এই শিলালিপিটি ছিল সম্রাট অশোকের, যার ওপর
তিনি শান্তি ও মৈত্রীর নির্দেশ লিখিয়েছিলেন। সেই শিলারই অন্য অংশে সমুদ্রগুপ্ত
লেখালেন তাঁর রক্তক্ষয়ী “দিগ্বিজয়”-এর বৃত্তান্ত! এই শিলা লেখের সময়কাল ৩৬০ সি.ই.।
এই শিলালিপিতে তিনি বহু রাজ্যের রাজা, আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী নেতার নাম উল্লেখ
করেছেন, যার
থেকে গুপ্তযুগের আগে সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক পটভূমি এবং তার বিচিত্র অনৈক্য এবং
বিভাজনের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই শিলালিপির বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা - পূর্বের চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাজস্থান, পাঞ্জাব। পশ্চিমের মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। মধ্যভারত, আর্যাবার্ত এবং দাক্ষিণাত্যের চের (কেরালা) রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত। যদিও ঐতিহাসিকরা তাঁর এই শিলালিপির বর্ণনাকে অতিরঞ্জিত মনে করেন, কারণ সমুদ্রগুপ্তের উল্লেখ করা সবকটি প্রান্তে তাঁর সাম্রাজ্যভুক্তির প্রত্ন-নিদর্শন পাওয়া যায়নি। সে যাই হোক, তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই জানা যায়, কিছু কিছু রাজ্যের রাজাদের তিনি হত্যা করে নির্বংশ করে দিয়েছিলেন। কিছু কিছু রাজাদের বন্দী করার পর, তাদের বশ্যতা স্বীকার করিয়ে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার তাঁর সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অনেক রাজ্য নিজে থেকেই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল।
৪.৩.২.৩ বৈদেশিক সম্পর্ক
সমুদ্রগুপ্তের বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর
স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর প্রতিবেশী দেশ এবং রাজ্যগুলির রাজারা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে
উঠেছিল এবং মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছিল। সমসাময়িক সিংহলের রাজা মেঘবন্ন
বা মেঘবর্ণ (৩৫২-৩৭৯ সি.ই.), দুজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে পাঠিয়েছিলেন ধর্মদূত হিসেবে। শোনা
যায় ওই দুই ধর্মদূত সমুদ্রগুপ্তের রাজসভায় কোন স্বীকৃতি এবং আতিথ্য পাননি। এর পর
মেঘবর্ণ সমুদ্রগুপ্তের সভায় প্রথাগতভাবে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল মেনে রাজদূত
পাঠিয়েছিলেন এবং সিংহলী তীর্থযাত্রীদের জন্যে একটি বৌদ্ধ বিহার বানানোর অনুমতি
চেয়েছিলেন। এবার সমুদ্রগুপ্ত সসম্মান অনুমতি দিয়েছিলেন এবং বোধগয়ায় বিখ্যাত
“মহাবোধি সংঘারাম” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ শিলালিপিতে
দৈবপুত্র-শাহি–শাহানুসাহি-শক-মুরুণ্ড নামে কিছু রাজারও বশ্যতা স্বীকারের কথা
উল্লেখ আছে। এই নামগুলি থেকে অনুমান করা হয় এঁরা আফগানিস্তান এবং বর্তমান
পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্দ অঞ্চলের শক এবং কুষাণ রাজা। এঁরা বশ্যতা স্বীকার না
করলেও, নিঃসন্দেহে
সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনা করেছিলেন।
এই দিগ্বিজয়ের পরই তিনি ৩৬০ সি.ই.-র কোন সময়ে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, যদিও এই বিষয়ে তাঁর শিলালিপিতে কোন উল্লেখ নেই। এই যজ্ঞে তিনি প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছিলেন এবং এই যজ্ঞ উপলক্ষে সোনার মুদ্রার প্রকাশ করেছিলেন। সেই মুদ্রার একদিকে “যূপকাষ্ঠ”[1] -এর সামনে একটি ঘোড়ার চিত্র এবং অন্য দিকে রাণির ছবি ও লেখা “অশ্বমেধপরাক্রম” মুদ্রিত ছিল। এই যজ্ঞের আয়োজনকে তিনি সগৌরবে “চিরোৎসন্নাশ্বমেধাবর্তূঃ” বলে উল্লেখ করেছেন, এই কথার অর্থ “বহু যুগ আগে উৎসন্নে যাওয়া অশ্বমেধ (যজ্ঞ) আবার পালিত হল।”
অশ্বমেধ যজ্ঞের স্মারক সমুদ্রগুপ্তর স্বর্ণমুদ্রা
অশ্বমেধ যজ্ঞের
অনুষ্ঠান করলেও, তিনি
ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন এমন নয়। সে আলোচনা যথা সময়ে আসবে। তাঁর প্রশাসনিক
সিলমোহরের প্রতীক ছিল “গরুড়”।
শুধুমাত্র যুদ্ধ জয় এবং দিগ্বিজয়ই নয়, সমুদ্রগুপ্ত নানা দিকেই প্রতিভাশালী ছিলেন। তিনি নিজেই বহু শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন এবং গুণীজন ও পণ্ডিতদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। কাব্য রচনাতেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল, সেই কারণে তাঁকে “কবিরাজ” উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি খুব ভালো বীণা বাজাতে পারতেন। তাঁর প্রকাশিত কিছু কিছু মুদ্রায় সিংহাসনে বসে বীণাবাদন রত অবস্থায় তাঁর চিত্র মুদ্রিত পাওয়া যায়।
সমুদ্রগুপ্তের বীণাবাদনরত চিত্র মুদ্রিত স্বর্ণমুদ্রা
এলাহাবাদ শিলালিপিতে বর্ণনা আছে “তীক্ষ্ণ মেধা এবং রুচিশীলতায় তিনি
দেবতাদের গুরুকে (বৃহষ্পতি) এবং সুমধুর সঙ্গীত চর্চায় তুম্বুরু[2] ও নারদকেও
লজ্জা দিয়ে থাকেন”।
সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যু সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য
পাওয়া যায় না। সম্প্রতি আবিষ্কৃত মথুরার এক লিপি থেকে অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল শুরু হয়েছিল ৩৭৫ সি.ই. থেকে, সে ক্ষেত্রে
৩৭২ সি.ই.-র কাছাকাছি কোন এক সময়ে সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর সম্ভাবনা।
সমুদ্রগুপ্তের অনেক পুত্রের মধ্যে অনুমান করা হয়
রামগুপ্ত তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন। যাঁর কথা বিশাখদত্তের লেখা
“দেবী-চন্দ্রগুপ্তম” নাটক থেকে পাওয়া যায়। যদিও মূল নাটকটি পাওয়া যায় না, এর কিছু
উদ্ধৃতি পাওয়া যায় রামচন্দ্র এবং গুণচন্দ্রের লেখা নাট্যতত্ত্ব - “নাট্য-দর্পণ”
থেকে। রামগুপ্ত অত্যন্ত ভীতু এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। শোনা যায় তিনি
শকরাজার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন এবং শক রাজার আদেশে নিজের স্ত্রী
ধ্রুবদেবীকেও তাঁর হাতে সমর্পণ করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ধ্রুবদেবীর সম্মান
রক্ষা করেছিলেন তাঁর দেবর,
চন্দ্রগুপ্ত - তিনি নারীর ছদ্মবেশে গিয়ে শক রাজাকে হত্যা করেছিলেন। এরপর
চন্দ্রগুপ্ত দাদা রামগুপ্তকে সরিয়ে নিজেই পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন এবং বিপুল
জনপ্রিয়তা ও জনগণের প্রশংসা নিয়ে, তিনি ধ্রুবদেবীকেই বিবাহ করেন। এই কাহিনীর আভাস পাওয়া যায়
পরবর্তীকালের কবি বাণের লেখা “হর্ষচরিত”-এ। এই কাহিনীর আরও সমর্থন পাওয়া যায় ভোজের
লেখা “শৃঙ্গার-প্রকাশ” এবং রাষ্ট্রকূট রাজা অমোঘবর্ষের সন্জন লিপিতে। এসব
সত্ত্বেও ঐতিহাসিকেরা এই কাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না, তাঁরা বলেন, আজ পর্যন্ত
রামগুপ্তর নামে কোন মুদ্রা পাওয়া যায়নি এবং গুপ্তরাজাদের নথির কোথাও রামগুপ্তের
নাম পাওয়া যায় না। অতএব তাঁরা মনে করেন, রামগুপ্ত কোনদিনই রাজা হননি।
তাঁর পিতামহের থেকে আলাদা পরিচয়ের কারণে দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্তকে সাধারণতঃ বিক্রমাদিত্য বলা হত। তিনি সমুদ্রগুপ্ত ও দত্তাদেবীর
পুত্র। সিংহাসনে আরোহণের পর বিক্রমাদিত্যকে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে তেমন কিছু করতে
হয়নি, কারণ
তাঁর পিতা সমুদ্রগুপ্ত শক্ত হাতেই সাম্রাজ্যের সীমানা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন।
তাঁর সময়ে শুধুমাত্র পশ্চিমের বাকাতক এবং কিছু শক ক্ষত্রপ, সাম্রাজ্যের
বিরক্তি উৎপাদন করছিল। বিক্রমাদিত্য বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে, বাকাতকদের
সঙ্গে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তুললেন। তিনি তাঁর রাণি কুবেরনাগার (নাগ রাজকুমারী) গর্ভজাতা
কন্যা প্রভাবতীর সঙ্গে বাকাতক রাজা দ্বিতীয় রুদ্রসেনের বিবাহ দিয়েছিলেন। এই মৈত্রী
বন্ধনের পর তাঁর সামনে শক ছাড়া আর কেউ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রইল না।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নিজেই তাঁর বিপুল
সৈন্যবাহিনী নিয়ে শকরাজ্য জয়ের অভিযান করেছিলেন। এই অভিযানের সময় এবং ঠিক কবে তিনি
শকরাজ্য জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে পশ্চিম-ক্ষত্রপ
রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহর শেষ মুদ্রাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল ৩৮৮ সি.ই.তে এবং প্রায় একই
সময়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ওই অঞ্চলে তাঁর রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। অতএব
ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন ওই সময়ের কাছাকাছি সময়েই পশ্চিমের শকরাজ্য দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্ত অধিকার করেছিলেন। শকরাজ্য জয়ের ব্যাপারে অন্যরকম এক ঘটনার আভাস
দিয়েছেন বাণ, তাঁর
“হর্ষচরিত” গ্রন্থে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
নাকি এবারেও মহিলা পরিচারিকার ছদ্মবেশে প্রমোদসভায় গিয়ে শকরাজাকে হত্যা করেছিলেন।
অতএব কবি বাণের “হর্ষচরিত”,
ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে কতটা বিশ্বাসযোগ্য সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের হাতে শক রাজা তৃতীয়
রুদ্রসিংহের পরাজয়ের ফলে,
গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হল, মালব যার রাজধানী উজ্জয়িনী এবং
গুজরাট ও সৌরাষ্ট্র। এই রাজ্যগুলি জয়ে, তাঁর সব থেকে লাভ হল, পশ্চিমের
সম্পন্ন সমুদ্রবন্দরগুলি – ভৃগুকচ্ছ, সোপারা, কল্যাণ তাঁর
সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অতএব পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে গুপ্ত সাম্রাজ্যের
অবাধ বাণিজ্যের দরজাগুলি খুলে গেল। এমনকি এই অন্তর্ভুক্তিতে বণিক সম্প্রদায়েরও
প্রভূত লাভ হল, তাদের
একই দ্রব্যের জন্যে বিভিন্ন রাজ্যের সীমানায় বারবার আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার
ঝামেলা দূর হয়ে গেল। এই রাজ্য জয়ের ফলে আরও একটি লাভ হল উজ্জয়িনী শহরের অধিকার।
উজ্জয়িনী তখনকার সময়ে ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। পশ্চিম
থেকে পূর্বে অথবা উত্তর থেকে দক্ষিণের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র ছিল এই শহর। অতএব খুব
স্বাভাবিক ভাবেই এই শহর গুপ্তসাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে উঠল এবং প্রকৃত
অর্থে পরবর্তী সময়ে উজ্জয়িনী, পাটলিপুত্রর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি প্রত্ন-নিদর্শনের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দিল্লির কুতব মিনারের কাছে একটি লৌহস্তম্ভ আছে, তার গায়ের লিপিতে “চন্দ্র” নামে কোন এক রাজার রাজ্য জয়ের বিবরণ আছে। সেখানে লেখা আছে রাজা “চন্দ্র” যে যে শত্রুরাজ্য অধিকার করেছিলেন, সেগুলি হল “বঙ্গ”, “তাঁর পরাক্রমের সৌরভে সুরভিত হয়েছিল দক্ষিণের সমুদ্র”, সিন্ধু অববাহিকার “সপ্ত(ব)দ্বীপের বাহ্লিক (কুষাণ)”। এই রাজা যে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরা একমত নন, যদি একই হন, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক, বঙ্গ এবং কুষাণদের জয় করে সমুদ্রগুপ্তের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের বিস্তার অনেকটাই বাড়াতে পেরেছিলেন।
৪.৪.১.১ ফা-হিয়েনের বিবরণ (৪০৫-৪১১ সি.ই.)
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালের মধ্যেই
বিখ্যাত চৈনিক বৌদ্ধ-সন্ন্যাসী, ফা-হিয়েন এদেশে তীর্থযাত্রায় এসেছিলেন। ফা হিয়েন চীন থেকে
ভারতে এসেছিলেন স্থলপথে – ভয়ংকর গোবি মরুভূমি পার হয়ে, খোটান, পামিরের
দুর্গম পাহাড়ি পথে, সোয়াৎ
উপত্যকা এবং গান্ধার হয়ে। ভারতবর্ষ ও নেপালের সবগুলি প্রধান বৌদ্ধ তীর্থে - মথুরা, সংকাশ্য[3], কনৌজ, শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু, কুশিনগর, বৈশালি, পাটলিপুত্র, কাশি
ইত্যাদি – তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। এরপর তিনি তাম্রলিপ্তি বন্দর থেকে সমুদ্রপথে সিংহল
যান এবং সেখান থেকে জাভা হয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।
ফা-হিয়েন বৌদ্ধ পুঁথি পাঠ এবং সংগ্রহে এতই
নিবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁর
ভ্রমণ বৃত্তান্তে, যাঁর
সাম্রাজ্যে তিনি প্রায় ছ’বছর নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালেন, সেই সম্রাট
বা রাজার নামও উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা তাঁর আগের গুপ্তরাজাদের কেউই
বৌদ্ধ ছিলেন না বলেই কি তিনি সম্রাটের নামোচ্চারণেও আগ্রহী হননি? তবে তাঁর
লেখা থেকে বিভিন্ন শহর,
তার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ফা-হিয়েন
রাজধানী পাটলিপুত্রে ছিলেন তিন বছর, এখানে তিনি সংস্কৃত শিখেছিলেন।
পাটলিপুত্রে “মনোরম ও সৌম্য” দুটি বৌদ্ধ বিহার তিনি দেখেছিলেন, তাদের একটি
হীনযানী এবং অন্যটি মহাযানী। দুটিতেই ছ’শ থেকে সাতশ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসবাস করত।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে আসত শিক্ষালাভের জন্যে।
সম্রাট অশোকের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন (খুবই স্বাভাবিক, সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন), তাঁর মনে
হয়েছিল এই স্থাপত্য অসাধারণ কোন শিল্পী মানবের নির্মাণ। মগধের সমসাময়িক সম্পদ এবং
সমৃদ্ধি দেখেও তিনি অভিভূত হয়েছিলেন, সেখানকার অধিবাসীদের প্রশংসায় তিনি
লিখেছেন, “এখানকার
অধিবাসীরা পরোপকার এবং ধার্মিকতার জন্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে”!
আরও লিখেছেন শহরের বণিকসম্প্রদায় চমৎকার একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে
দরিদ্র এবং দুঃস্থ মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও সেবা দান করা হত।
ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সামাজিক পরিস্থিতিরও কিছু
কিছু চিত্র পাওয়া যায়। যেমন মধ্যদেশের শহরগুলির বাসিন্দারা অধিকাংশই নিরামিষাশী
এবং অহিংস মতে বিশ্বাসী,
শহরের বাজারে তিনি কোন কসাইখানা বা মদের দোকান দেখেননি, নগরবাসী
শূকর বা মুরগী পুষত না,
পেঁয়াজ-রসুন খেত না,
মদ্যপান করত না। তবে চণ্ডালরা শিকার করত এবং মাংসের ব্যবসা করত। তারা শহরের
বাইরে বাস করত এবং যখনই তারা শহরে ঢুকত, কাঠের ঘণ্টা বাজিয়ে সকলকে সতর্ক করে
দেওয়া হত – কেউ যেন তাদের ছুঁয়ে না ফেলে! এই বিবরণ হয়তো আংশিক সত্য, কারণ তিনি
নিজে বিদেশী এবং বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী – অতএব খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বৌদ্ধবিহারেই
থাকতেন এবং তাঁর এদেশীয় সঙ্গী-সাথিরাও সকলেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন, অতএব তাঁর কাছে বৌদ্ধ আচরণগুলিই
স্পষ্ট ধরা দিয়েছে। তবে অস্পৃশ্য চণ্ডালের বিবরণের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ
নেই।
রাজা চন্দ্রগুপ্ত (২য়) মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ
এবং সহায়তায় সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। এই মন্ত্রীপরিষদ নাগরিক এবং সামরিক
প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এবং এই মন্ত্রীপরিষদের অনেককেই যুদ্ধক্ষেত্রেও উপস্থিত
থাকতে হত। সমগ্র সাম্রাজ্যকে প্রশাসনিক সুবিধের জন্যে অনেকগুলি প্রদেশে ভাগ করা
হয়েছিল, যাদের
“দেশ” বা “ভুক্তি” বলা হত। এই ভুক্তির প্রশাসকদের বলা হত উপরিক মহারাজা বা গোপ্তা।
সাধারণতঃ, এই
প্রশাসনের প্রধান হতেন রাজপুত্র বা রাজবংশের লোকরা। প্রত্যেকটি ভুক্তিকে অনেকগুলি
জেলায় ভাগ করা হত, যাদের
বলা হত “বিষয়”। বিষয়গুলির প্রশাসকদের মধ্যে থাকতেন, কুমারামাত্য (রাজকুমারদের মন্ত্রী), মহাদণ্ডনায়ক
(প্রধান বিচারক), বিনয়স্থিতিস্থাপক
(পৌরনিগম?), মহা-প্রতিহার
(গৃহমন্ত্রক), ভতাশ্বপতি
(সেনানায়ক?), দণ্ডপাশাধিকরণ
(পুলিশ প্রধান) ইত্যাদি। প্রতিটি “বিষয়”-এর প্রধানকে “বিষয়পতি” বলা হত এবং তাঁর
দায়িত্ব ছিল মহারাজা বা গোপ্তার কাছে জবাবদিহি করা। বিষয়পতি যেখানে থাকতেন তাকে
“অধিস্থান” বলা হত, এবং
তাঁর কার্যালয়ের নাম ছিল “অধিকরণ”। বিষয়পতিকে সহায়তা করতেন স্থানীয় প্রভাবশালী
ব্যক্তিরা, তাঁদের
মধ্যে বণিকসমবায় বা গিল্ড (Guild)-এর প্রধান বা ব্যাংকার (“নগর-শ্রেষ্ঠীন্”), প্রধান
ব্যবসায়ীরা (“সার্থবাহ”),
প্রধান শিল্পী (“প্রথম কুলিক”) এবং প্রধান হিসাবরক্ষক (“প্রথম কায়স্থ”)। আরও
এক গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের নাম পাওয়া যায় “পুস্তপাল”- যাঁর দায়িত্ব ছিল যাবতীয়
জমি-জায়গার নথিপত্র তৈরি করা এবং সুরক্ষিত রাখা। প্রশাসনের নিম্নতম একক ছিল গ্রাম, গ্রামের
প্রধানকে বলা হত “গ্রামিক”। তিনি গ্রামের বৃদ্ধ (“গ্রামবৃদ্ধ”) এবং অভিজ্ঞ
মানুষদের নিয়ে গড়া “পঞ্চমণ্ডলী” বা “পঞ্চায়েত”-এর মতামত নিয়ে গ্রামের প্রশাসন
পরিচালনা করতেন।
প্রসঙ্গতঃ মনে করিয়ে দিই, মুসলিম রাজা ও বাদশাদের যুগ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষের সকল হিন্দু রাজ্যেই এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাই অনুসরণ করা হত।
চলবে...
[1]
যূপকাষ্ঠ – যজ্ঞে পশু বলিদানের জন্য হাড়িকাঠ।
[2] পৌরাণিক
কাহিনীতে তুম্বুরু বা তুম্বরু গন্ধর্ব সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি কুবের ও দেবরাজ ইন্দ্রের সভায়
প্রধান বীণাবাদক ও সুগায়ক ছিলেন।
[3]
সংকাশ্য বা সংকাশিয়া প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ শহর। আধুনিক উত্তরপ্রদেশের ফারুখাবাদ
জেলায় কনৌজ থেকে ৪৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এখানে সম্রাট অশোক একটি স্তম্ভনির্দেশ
প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই স্তম্ভের “হস্তীমূর্তি” ক্যাপিটালের অবশেষ, বৌদ্ধ
মন্দির, বিহার
এবং স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন