বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের আগের পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব 


২৬

 

দীর্ঘক্ষণ মহর্ষি ভৃগুকে নির্বাক দেখে মন্ত্রীসভার সকলেই পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তাঁরা সকলেই মহর্ষি ভৃগুর উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাঁর প্রগাঢ় প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতায় তাঁদের অগাধ আস্থা। বিদেশমন্ত্রী পদ্মনাভ অত্যন্ত বিনীত স্বরে মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মহর্ষি, আপনাকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে আমরা সকলেই অসহায় বোধ করছি। রাজ্যের এই সংকটের সমাধান, আপনার পক্ষেই সম্ভব। আপনি আমাদের আদেশ করুন, মহর্ষি, আমাদের এখন কী কর্তব্য?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি ভৃগু মুখ তুললেন, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর স্বরে বললেন, “ভাবছিলাম। বৎস পদ্মনাভ, ভাবছিলাম, নিয়তি অমোঘ, অনতিক্রম্য! রাজাবেণ অসুস্থ হওয়ার পর, এই কিছুদিন পূর্বে, আমরা তাঁর জন্মকুণ্ডলী পর্যালোচনা করছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন, জ্যোতিষাচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ। রাজাবেণের স্বল্প এই জীবনকালের অদ্ভূত আচরণ ও দুরাচারী চরিত্রের কারণ, তাঁর জন্মলগ্নে গ্রহ-নক্ষত্রের আশ্চর্য অবস্থান! সে অবস্থান অত্যন্ত বিরল এবং শত বর্ষে হয়তো একবারই সম্ভব! তাঁর কোষ্ঠী গণনা করে, আচার্য শ্রীবজ্রপর্ণ এবং আমি আরো আশ্চর্য হয়েছিলাম এই দেখে যে, তাঁর মধ্যে ভগবান বিষ্ণুর আজন্ম অধিষ্ঠান! ঈশ্বরের লীলা কে উপলব্ধি করতে পারে? নিয়তির অমোঘ গতি কে রুদ্ধ করতে পারে?”

উপস্থিত মন্ত্রীসভার সদস্যরা সকলেই বিহ্বল হয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আশ্চর্য, অত্যাশ্চর্য!”

মহর্ষি ভৃগু সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। আজ আমি এই কথাটি বলবো বলেই আপনাদের এই সভায় আমন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু আমার মনে কোথাও যেন একটু দ্বিধা ছিল! কিন্তু আপনাদের মুখে ওই চারণকবিদের গান এবং ওই মহাতপস্বীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আমি নিঃসন্দেহ হলাম - নিশ্চিত হলাম”। মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে, মহামন্ত্রী বিমোহন ও অন্য সকলের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলেন। অন্য সকলের মুখে নিরঙ্কুশ বিস্ময়ের লক্ষণ দেখলেও, মহামন্ত্রী বিমোহনের চোখে দেখতে পেলেন, সন্দেহ। তিনি আবার বললেন, “এই মন্ত্রণা কক্ষে আসার পথে মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্রর মুখে একটি বার্তা শুনলাম! এই রাজ্যে অনেকের বিশ্বাস রাজাবেণের এই অসুস্থতার কারণ, বিষপ্রয়োগ এবং আমিই সেই বিষপ্রয়োগের ষড়যন্ত্রী! তখন শুনে মনে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছিল, কিন্তু...”।

মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলেই বিস্ময়ে চমকে উঠলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ মহর্ষি ভৃগুর কথার মধ্যেই বলে উঠলেন, “সে কী? সে তো একটা অবিশ্বাস্য রটনা মাত্র এবং এর প্রচারক কে, সেও আমরা জানি - মহারাজ বেণের বাল্যবন্ধু, পদত্যাগী উপনগরপাল শক্তিধর! ভাগ্যগুণে পেয়ে যাওয়া আকাশচুম্বী ক্ষমতার অধিকারী কোন অযোগ্য ব্যক্তি যখন অকস্মাৎ ভূমিসাৎ হয়, তখন প্রচণ্ড ঈর্ষা তার মস্তিষ্কে তপ্ত বাষ্পের উদ্রেক করে! দিশাহারা হয়ে অযৌক্তিক অপবাদ দিতে তার আর তখন কোন কুণ্ঠা হয় না”!

মহর্ষি ভৃগু অসম্মতিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না বৎস বৃষভান্‌, তা নয়। এ সমস্তই অদৃশ্য নিয়তির অমোঘ সঞ্চালন। আমাদের ষড়যন্ত্রে মহারাজ অঙ্গ এবং মহারাণি সুনীথার পুত্রেষ্টি যজ্ঞের অনুষ্ঠান। যৌবনের উপান্তে এসেও, সেই যজ্ঞের ফলস্বরূপ তাঁদের পুত্রলাভ। মহারাণীর অন্ধ স্নেহে রাজপুত্র বেণের দিন দিন দুর্ধর্ষ ও দুর্দান্ত হয়ে ওঠা। অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান...”

মহর্ষি ভৃগুর কথা থামিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান আবার বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান সম্পর্কেও রাজ্যে একটি রটনা প্রচলিত আছে, মহর্ষি, আর সেটি হল, যুবরাজ বেণের ষড়যন্ত্রে...”।

মহর্ষি ভৃগু বিরক্ত মুখে হাতের ইশারায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌কে নিরস্ত করলেন, “বৎস বৃষভান, এই সকল রটনার প্রসঙ্গ এখন অবান্তর! আমরা পরষ্পরের প্রতি কদর্য কর্দম নিক্ষেপণের জন্য এই সভা আহ্বান করিনি। ও প্রসঙ্গ এখন থাক। আমার অসমাপ্ত কথার সূত্র ধরে বলি, অকস্মাৎ মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধান, মহারাণি সুনীথার সনির্বন্ধ অনুরোধে যুবরাজ বেণের রাজ্য অভিষেক। সিংহাসন লাভ করে রাজা বেণের উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারীতা, অনাচার, দুরাচার এবং সর্বশেষে সনাতন ধর্মের উপর চরম আঘাত! তারপরই তাঁর এই অনারোগ্য অসুস্থতা! এ সবই নিয়তি পরিচালিত পূর্বনির্ধারিত নাট্যরঙ্গ, যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ কুশীলব আমাদের মধ্যে অনেকে অথবা হয়তো সকলেই”!

মহর্ষি ভৃগু একটু বিরতি দিয়ে সকলের মুখভাব পর্যবেক্ষণ করলেন। মহামন্ত্রী বিমোহনও এখন কিছুটা যেন দ্বিধাগ্রস্ত, চিন্তিত। মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে তাঁর চোখাচোখি হতে, তিনি মাথা নত করলেন। মহর্ষি ভৃগু আবার বললেন, “এখন নিয়তির আরেকটি সংকেত আমাদের সামনে উপস্থিত। সেই ইঙ্গিত অনুসারে আমরা আমাদের কর্তব্য করব, নাকি দ্বিধা ও সংশয়ে কালবিলম্ব করবো – এই সিদ্ধান্তের জন্যেই আমি আজ এই সভা আহ্বান করেছি!”

সকলেই অধীর আগ্রহে মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “নিয়তির কোন সংকেতের কথা আপনি বলছেন, মহর্ষি?”

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কেন? রাজা বেণের মানস পুত্র ও কন্যাকে আবাহন করে বরণ করতে হবে না?”

“কী ভাবে, মহর্ষি?” মহামন্ত্রী বিমোহন এতক্ষণে কথা বললেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানবের পক্ষে এই অলৌকিক ঘটনা কী ভাবে ঘটানো সম্ভব?” শুরু থেকেই মহামন্ত্রী বিমোহনের আলাপে যে বৈরিভাব লক্ষ্য করছিলেন মহর্ষি ভৃগু, এখন সেটা যেন আর নেই। মহামন্ত্রীর কণ্ঠস্বরে এখন কিছুটা সমর্থনের সুর!

মহর্ষি ভৃগু পূর্ণ দৃষ্টিতে মহামন্ত্রী বিমোহনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “অলৌকিক কোন ঘটনা তো আমরা ঘটাবো না, মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র! ঘটাবেন তো তিনি! যিনি মহারাজ অঙ্গের পুত্র রাজাবেণের অঙ্গে আজন্ম অধিষ্ঠান করছেন, সেই পরমপুরুষ শ্রীবিষ্ণু! তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার পরিস্থিতিও তিনিই বানিয়ে তুলেছেন, আমরা তাঁর আজ্ঞা পালন করবো মাত্র!”

অবাক হয়ে সকলেই তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি ভৃগুর দিকে, মহামন্ত্রী বিমোহন বললেন, “তিনিই সেই পরিস্থিতি বানিয়ে তুলেছেন? যেমন?”

মহর্ষি ভৃগু গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বললেন, “ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ রাজা দুর্ধর্ষ বেণ, এখন নামমাত্র জীবিত! তাঁদের ধরাতলে অবতরণের এটাই কী প্রকৃষ্ট লগ্ন নয়? সনাতন ধর্মকে যিনি বিনাশ করতে চেয়েছিলেন, তিনি আজ পূর্ববৎ সুস্থ স্বাভাবিক থাকলে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো না? অতএব, ঈশ্বর স্বয়ং সেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন! এখন বিশেষ কোন শুভ মূহুর্তে আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন তিনি!”

মহামন্ত্রী বিমোহন কিঞ্চিৎ বিদ্রূপের সুরে বললেন, “আমাদের আবাহনের প্রতীক্ষা করছেন, ঈশ্বর?”

মহামন্ত্রী বিমোহনের বিদ্রূপে কর্ণপাত না করে, মহর্ষি ভৃগু দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, “ঠিক তাই! তিনি তো রাজাবেণের জন্যে আসছেন না, আসছেন আমাদের জন্যে, এই রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসীর জন্যে। ঈশ্বর শুধুমাত্র কোন রাজাকে কৃপা করার জন্য ধরাতলে অবতীর্ণ হননি, ভবিষ্যতেও হবেন না। তিনি আসেন নিঃসহায় সাধারণ জনগণের পরিত্রাণের জন্য। তিনি আসেন সনাতন ধর্মকে তার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা তাঁর সেই অবদান গ্রহণ করতে উন্মুখ কিনা, আমরা আমাদের আন্তরিক আস্থা নিয়ে তাঁকে বরণ করতে আগ্রহী কিনা, সেই প্রতীক্ষায় তিনি দিবস গণনা করছেন!” মহর্ষি ভৃগুর এই প্রত্যয়ী কথায় সকলেই আশ্চর্য এবং মুগ্ধ নির্বাক হয়ে রইল, এমনকি মহামন্ত্রী বিমোহনও স্বয়ং ঈশ্বরের আবির্ভাব কল্পনা করে, শিহরিত হলেন। সকলেই মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। মহর্ষি ভৃগু আর কোন কথা বললেন না, তাঁর স্বপ্নঘন দৃষ্টি এখন উন্মুক্ত গবাক্ষ পথে দূর দিগন্তের দিকে। 

চলবে... 



মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছেলেমানুষ

 



এর আগের অণুগল্প - " গিরগিটি "


সুতনু বেরোচ্ছিল।

সুধীরবাবু ছেলে সুতনুকে বললেন, “বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে যাচ্ছো বাবা, তা যাও, তবে পাকামি করে বাইরের হাবিজাবি খেও না যেন। পেটের গণ্ডগোল বাধিয়েছিলে, এই সবে সেরে উঠলে। বেশ কদিন কলেজ কামাই হল। সামনেই পরীক্ষা মনে থাকে যেন”।

সুতনু অধৈর্য হয়ে বলল, “আমাকে কি তুমি ছেলেমানুষ পেয়েছ, বাবা?”

সুধীরবাবু মুখ তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা নয়তো কি?”

 

সুধীরবাবু বেরোচ্ছিলেন।

“এই ভোরে কোথায় চললে, বাবা? পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প জমাতে? তা যাও, কিন্তু আবার যেন ঠাণ্ডা লাগিও না। বুকে ঠাণ্ডা বসিয়ে কদিন নিজেও ভুগলে, আমাদেরও ভোগালে। মনে থাকে যেন”। সুতনুবাবু বাবাকে বললেন।

সুধীরবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “নিজের ভালোটা আমি বুঝব না? আমাকে কি তুই ছেলেমানুষ পেয়েছিস?”

সুতনুবাবু মুখ তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা নয়তো কি?”     

 


সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখিব পড়িব - শেষ পর্ব

  ছোটদের সম্পূর্ণ রহস্য উপন্যাস ও পাঠ  - " হেমকান্ত মীন (রহস্য গল্প) "

ছোটদের রহস্য উপন্যাস - " পেত-ন-তাৎ-তিক (ভৌতিক রহস্যগল্প) "

ছোটদের শিকার কাহিনী - " কিরণাগড়ের বাঘ "

ছোটদের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস - " লিলিপুট "



এর আগের ছোটদের প্রবন্ধ-গল্প - " লিখিব পড়িব - পর্ব ৩ "


১০

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তী কালে বৃটিশ পার্লামেন্টের শাসনাধীন ভারতবর্ষে বিদেশী সাহিত্যের ছোঁয়া এসে বাংলা সাহিত্য এবং লিপিকে অকস্মাৎ জাগিয়ে তুলল, যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়। পুঁথির সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা লিপি ঢুকে পড়ল ছাপাখানার রাজ্যে। কলকাতা শহরকে রাজধানী করে, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যবিস্তারের শুরুতে বিদেশী শাসকদের অন্যতম বাধা ছিল ভাষা। শাসকের পক্ষে স্থানীয় ভাষা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে প্রজাদের শাসন এবং শোষণ দুরূহ বুঝে, কোম্পানি নতুন ইংরেজ কর্মচারীদের জন্য বাংলাভাষা শিক্ষার বই ছাপালেন ১৭৭৮ সালে। হুগলি থেকে ছাপা হওয়া সেই বইয়ের নাম, “A Grammar of the Bengali Language”। বইটি মূলতঃ ইংরিজিতে লেখা হলেও, বাংলা হরফের অনেক নমুনা এবং উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই কারণে এই বইটিকে বাংলা লিপির প্রথম মুদ্রণ প্রকাশ বলা যায়। এই বইটির লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালেহেড (Nathaniel Brassy Halhead) এবং মুদ্রণের কৃতিত্ব স্যার চার্লস উইল্কিন্সের (Sir Charles Wilkins)।

অবশ্য এর অনেক আগেই, ১৫৫৬ সালে পর্তুগীজ খ্রিষ্ট ধর্মপ্রচারকরা, ভারতবর্ষে প্রথম ছাপাখানা বসিয়েছিলেন গোয়াতে। বাংলার পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারকরা সুদূর লিসবন থেকে অনেকগুলি বাংলা বই ছাপিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলি সবই রোমান হরফে লেখা। সেই সব বইয়ের নমুনা এখন আর পাওয়া যায় না। বাংলাভাষার মুদ্রিত প্রথম যে বইয়ের নমুনা পাওয়া যায়, সেটি প্যারিস থেকে ১৬৮২ সালে প্রকাশিত ফরাসী ধর্মপ্রচারকদের বই। এই বইগুলির অধিকাংশই কাঠ কিংবা তামার পাতের উপর ব্লক বানিয়ে ছাপানো। বাংলা অক্ষরের আলাদা আলাদা টাইপ খোদাই করে বাংলা লিপিকে মুদ্রণ যন্ত্রের প্রকৃত উপযোগী করে তুললেন, স্যার চার্লস উইল্কিন্স। মুদ্রণের ক্রমবিকাশ এই লেখার বিষয় নয়, কিন্তু তাও মুদ্রণের উল্লেখ করলাম, কারণ এই প্রথম বাংলা লিপি সার্বজনীন ও স্থায়ী একটা রূপ পেল। তাই বাংলা লিপির (একথা পৃথিবীর সমস্ত লিপির পক্ষেই সমানভাবে প্রযোজ্য) ক্ষেত্রে মুদ্রণের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যাপারাটা আরেকটু স্পষ্ট করে বলি।

আগেকার দিনে গ্রন্থকার যা কিছু রচনা করতেন, সেই গ্রন্থ জনপ্রিয় হলে, রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়, সেই গ্রন্থের অনেক প্রতিলিপি বানানো হত। সে প্রতিলিপি করতেন এক বা একাধিক লিপিকার। এক এক যুগে, এই লিপিকারদের লিখন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন এবং লিপিকারদের সকলেরই লেখার স্টাইল বা ভঙ্গীও ছিল আলাদা। যেমন আজও একই ছাপার অক্ষর থেকে অনুকরণ করেও, তোমার এবং আমার হাতের লেখা এক নয়। আমাদের প্রত্যেকের লেখা আলাদা – এমনকি কারো কারো হাতের লেখা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, আবার কোন কোন হাতের লেখা দেখে আমরা বলে উঠি “বাঃ কী সুন্দর লেখা”! এইরকম সেকালেও গ্রন্থের প্রত্যেক প্রতিলিপি পাঠকের কাছে সমান পাঠযোগ্য হতে পারত না। উপরন্তু লিপিকারদের প্রতিলিপি করা গ্রন্থের সংখ্যা দেশের জন সংখ্যার তুলনায় ছিল অতি নগণ্য। যথেষ্ট আগ্রহী এবং সম্পন্ন পাঠক ছাড়া সেই গ্রন্থ সংগ্রহ করা দুঃসাধ্য ছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য।

মুদ্রিত গ্রন্থ বা বই প্রকাশের ব্যয়, সেই তুলনায় যথেষ্ট কম। কাজেই শিক্ষা গ্রহণের পক্ষে মুদ্রিত বই এবং গ্রন্থকারের লেখা মুদ্রিত বই অনেক সহজলভ্য হয়ে উঠল, সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে এল। অতএব শিক্ষাগ্রহণ এবং গ্রন্থপাঠের রেওয়াজ বেড়ে উঠতে লাগল দ্রুত!

আরও একটা বিষয়ে মুদ্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হল, গ্রন্থ রচনার পদ্ধতি। আমাদের দেশের প্রাচীন সমস্ত গ্রন্থ, সে সাহিত্য হোক কিংবা ধর্মশাস্ত্র, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন – সংস্কৃত হোক কিংবা বাংলা - সকল গ্রন্থই রচিত হয়েছে কোন না কোন ছন্দের বাঁধনে। তার কারণ শ্রুতিমধুরতা এবং একমাত্র উদ্দেশ্য মনে রাখার সুবিধা। পুঁথি বা গ্রন্থ যেহেতু সহজলভ্য নয়, অতএব সহজে মুখস্থ করার উপায় ছন্দের বন্ধন। সেক্ষেত্রে বুঝতেই পারছো, কোন বিষয়ে শুধুমাত্র পণ্ডিত হলেই, কারো পক্ষে গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব নাও হতে পারে! কারণ তাঁর নিজের বিষয়ের সঙ্গে, তাঁকে বুঝতে হবে ছন্দেরও নিয়ম! ছন্দের নিয়ম এবং তাল মেনে তাঁকে শব্দচয়ন করতে হবে! ছন্দের বিধান অনুসারে শব্দচয়ন করতে গিয়ে, তিনি যদি ছন্দবিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ না হন, তাঁর আসল বক্তব্যই আমাদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আর পরবর্তী কালে সেই অস্পষ্ট বক্তব্যের ব্যাখ্যা এবং টীকা করবেন অন্য কোন পণ্ডিত! কে জানে, তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন, সে কথা সেই পণ্ডিতেরাও সম্যক বুঝেছেন কিনা! আজকের পরিস্থিতির তুলনায়, সে সময়ের কাজটা খুব দুরূহ মনে হচ্ছে না?

যে কোন গ্রন্থের এই ছন্দবদ্ধ রচনাশৈলী থেকে মুক্তির সন্ধান দিল, ছাপাখানা এবং ছাপার অক্ষরে লেখা বই। পদ্যে হোক কিংবা গদ্যে মনের কথা কিংবা মতামত লিখে ছাপিয়ে ফেলতে আর কোন অসুবিধে রইল না। ছাপাখানার প্রসার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল অনেক দৈনিক সংবাদপত্র, নানান পত্র-পত্রিকা। লেখার জগতেও শুরু হয়ে গেল নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ইওরোপীয় সাহিত্যের অনুসরণে এবং অনুকরণে সাহিত্যের সকল শাখাতেই বাংলার চর্চা দ্রুত বাড়তে লাগল। পদ্য, কবিতা, কাব্য, নাটক, গদ্য, উপন্যাস, রম্য রচনা, প্রবন্ধ, পাঠ্য বিষয় সমূহ এবং অনুবাদ সাহিত্যও। প্রথম যুগে রামরাম বসু থেকে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখের লেখনী ধরে বাংলা ভাষা পল্লবিত হতে লাগল নানান শাখায়। এর পরবর্তী কালে এসে গেলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাঁর সরস এবং মৌলিক লেখনীতে বাংলা ভাষা সকল বঙ্গভাষীদের মধ্যেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তাঁর লেখা একের পর এক উপন্যাস, রম্যরচনা, ধর্মতত্ত্ব সেকালে শিক্ষিত বাঙালীর ঘরে ঘরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর আগে ইংরিজি এবং পাশ্চাত্য ভাষায় উচ্চশিক্ষিত বঙ্গসমাজে এমন একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বাংলা ভাষা নিম্নরুচির ভাষা এ ভাষায় উচ্চস্তরের সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলা ভাষাতেও যে মহৎ সাহিত্য রচনা সম্ভব, সেই ধারণা এবং বিশ্বাস সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

গীতাঞ্জলির অনুবাদ - রবীন্দ্রনাথের হস্তলিপির নমুনা



বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী যুগে, বাংলা সাহিত্যের সবথেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যের সকল শাখা তাঁর আশ্চর্য প্রতিভার ছোঁয়া পেয়ে বাংলাভাষা পৌঁছে গেল অন্য উচ্চতায়। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, ছড়া, কিশোরসাহিত্য সব শাখাতেই তাঁর আশ্চর্য অবদানে, বাংলাভাষা অতি দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। সত্যি কথা বলতে, বাংলা ভাষা পেয়ে গেল অত্যন্ত আধুনিক কিন্তু অনবদ্য এক শৈলী। যার পশ্চাৎপটে রইল প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের বর্ণময় ঐতিহ্য এবং অঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের বাস্তব ঋজুতা। রবীন্দ্রনাথের রচনা বাঙালীর মধ্যে আর সীমিত রইল না, ভারতের আঞ্চলিক একটি ভাষা থেকে সে ভাষা হয়ে উঠল বিশ্বজনীন – বিশ্বের দরবার থেকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ নোবেল পুরষ্কার এনে দিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে! “চর্যাপদ” দিয়ে যে ভাষায় সাহিত্যের পথ চলা শুরু হয়েছিল, সে পথচলার চরম উত্তরণ হল “গীতাঞ্জলি”তে। সার্থক হল বাংলা ভাষা, গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

"চর্যাপদ" - পুঁথির একটি পৃষ্ঠা 

 

১১

 

১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষার ওপর নেমে এল চরম আঘাত। দেশভাগ হল, বিভক্ত হয়ে গেল বাংলাভাষী মানুষেরাও। বাংলাভাষী মানুষের বৃহত্তর অংশ ধর্মের নামে হয়ে গেলেন অন্য রাষ্ট্র। বঙ্গভাষীদের এক অংশ আগের মতোই ভারতবর্ষের অঙ্গরাজ্য হিসেবে থেকে গেল, আর অন্য অংশ হয়ে গেল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ – পূর্ব পাকিস্তান।  নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানের বঙ্গভাষীদের বনিবনা হল না কিছুতেই! কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল - ভাষা, আচরণ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, বিশ্বাস যদি ভিন্ন হয়, শুধু ধর্ম দিয়ে তাকে জুড়ে ফেলা যায় না। পূর্বপকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু, ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রনায়কদের এই ঘোষণা শুনে, ক্ষুব্ধ হতে লাগল বাংলাভাষী। সেই ক্ষোভ বিদ্রোহ এবং আন্দোলনের রূপ নিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি! সুদীর্ঘ আন্দোলন, রক্তপাত ও লড়াইয়ের পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধানের সংশোধন করে, বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিল। জয় হল বাংলাভাষার, ভাষার প্রতি বিশ্বাসে অবিচল রইল বঙ্গভাষী!

বহু বছর পরে ১৯৯৯ সালে, মাতৃভাষার জন্যে দেশের মানুষের এই আন্দোলনের স্বীকৃতি দিল ইউনেস্কো, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে তারা ঘোষণা করল “বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে। সেই থেকে ওই দিনটি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবেই সর্বত্র পালিত হয়। এও বাংলাভাষার জয়, কিন্তু এই জয় অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার জয়, মাতৃভাষার জন্যে আন্তরিক ভালবাসার জয়!

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের জন্য যে অত্যাচার ও রক্তক্ষরণ বঙ্গভাষীদের সহ্য করতে হয়েছিল, তাতে মূল পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা রইল না। চূড়ান্ত অবিশ্বাস, নিরন্তর বঞ্চনা, শাসনের নামে অসহ্য অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে তারা মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দিল। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সৈন্যদের গণহত্যা, বঙ্গভাষী মানুষদের ঠেলে দিল বৃহত্তর সংগ্রামের দিকে, সে সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, আগ্রাসী রাষ্ট্রের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াই। চরম অত্যাচার, অপমান এবং তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে সেই সময় এল, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর! নিজস্ব একটা দেশ পেল বঙ্গভাষী মানুষেরা, স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র, যার নাম বাংলাদেশ।

এখন বাংলা আর শুধুমাত্র ভাষা নয়, একটা আবেগ, একটা সত্ত্বা, সংগ্রামের আশ্চর্য হাতিয়ার! আরেকবার সার্থক হল বাংলা ভাষা, আরও একবার গর্বিত হলাম আমরা - যারা বাংলা ভাষী।

 

১২

 

লিখলাম বটে, কিন্তু আমরা যারা এপারের বঙ্গভাষী তারা কী এই ভাষাকে অতটাই ভালবাসি আর? খুব সত্যি কথাটা হল – বাসি না। 



বিশ্বের ৬৯০০টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে বঙ্গভাষী-জনসংখ্যার বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। অথচ পাঠকের অভাবে এই কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে চলেছে প্রচুর সুস্থ সুন্দর পত্রিকা, দুর্বল হয়ে পড়ছে পুস্তকের প্রকাশণ সংস্থাগুলি। আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভাষার প্রতি ভালোবাসায় আমাদের কোন ঘাটতি হয়তো নেই। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যবহারিক প্রয়োগে বাংলা ভাষার দুর্দশা, ভ্রান্তি, অবহেলা সর্বদা চোখে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মহান সাহিত্যিকদের রচনা, পাঠ্যবইয়ের বাধ্যতামূলক সিলেবাসের বাইরে, বহু বঙ্গভাষী উল্টেও দেখেন না। পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা “বাংলাটা আমার তেমন আসে না”, বলতে গর্ব অনুভব করেন! সোসাল মিডিয়ার এই বিস্ফোরণের যুগে, তাঁরা বাংলা লেখেন, ইংরিজি হরফে। যদিও বাংলালিপির অনেক software বিনামূল্যে অত্যন্ত সহজলভ্য – সে কম্পিউটারের জন্যেই হোক কিংবা স্মার্টফোন। এই সফটওয়্যার গুলির মধ্যে, আমার ধারণা, সব থেকে সহজ ও সাবলীল ওমিক্রন ল্যাবের “অভ্র কি বোর্ড” – যার সৃষ্টিকর্তা বাংলাদেশের ডাঃ মেহেদি হাসান খান! বাংলাভাষাকে অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে উন্নীত করার জন্যে তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই!

 কিন্তু বহুযুগ ধরে অনেক উত্থান-পতনের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের এই মাতৃভাষা আমরা কী ধীরে ধীরে ভুলে যাবো? কথা বলবো হিন্দি ও ইংরিজি মিশ্রিত আধো বাংলায়? লেখার জন্যে বাংলা লিপি ভুলে, ব্যবহার করবো রোমান হরফ, আর আমাদের আবেগের ভাষা হবে, কিছু ইমোজি বা ইমোটিকন? কে জানে - সে কথা ভবিষ্যৎ বলবে, r bolbe tomra, jara ei lekhati ekhon poRcho!   

 সমাপ্ত


রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আকাশের অর্ঘ্য



 

এর আগের রম্যকথা - " রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম


সেবার হস্টেলে মহালয়ার আগের রাত্রে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আড্ডার বিষয় ছিল, রেডিওর পুরো মহালয়া কে শুনেছে? কেউ কি শুনেছে? বহুক্ষণ তর্ক বিতর্কের পর আমরা নিজেদের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে দেখলাম, না, জ্ঞান হওয়া ইস্তক প্রত্যেকবারই মহালয়ার ভোরে রেডিওতে কান পেতেছি, কিন্তু পুরোটা কোনবারই শোনা হয়নি। প্রথমদিকের পনের-বিশ মিনিট ও শেষের দিকে পাঁচ-দশ মিনিট মনে করতে পারা যাচ্ছে, কিন্তু মাঝের ঘন্টাখানেকর কোন স্পষ্ট স্মৃতি নেই। যা আছে, সেটা হল, ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শোয়ার সময় তন্দ্রাঘোরে আবছা দু একটা গানের কলি, অথবা চণ্ডী পাঠের অংশ!

এত বছর ধরে আমরা মহালয়ার ভোরে রেডিওয় কান রাখছি, কিন্তু শুনছি না। এ যেন “ঠোঙা ভরা বাদামভাজা খাচ্ছি, কিন্তু গিলছি না”। উঁহু, এতো ভালো কথা নয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আর বিলম্ব নয়, আমাদের আশু কর্তব্য, আজ সমস্ত রাত্রি জাগরণ ও রাত্রি ভোরে পূর্ণ মহালয়া শ্রবণ। সিদ্ধান্ত তো হল, কিন্তু শুনবো কিসে, রেডিও কোথায়?

রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময় আমরা তিনজন টর্চ নিয়ে, হস্টেলের রুমে রুমে ঘুরতে লাগলাম একজন দরদী সহপাঠীর সন্ধানে। যার আছে একটি সচল ট্রানজিস্টার রেডিও। যে বিশ্বাস করে একরাত্রের জন্য আমাদের হাতে তুলে দেবে তার রেডিওখানি। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর সেরকম সহপাঠী পাওয়া গেল, পাওয়া গেল একখানি বড়সড়ো সন্তোষজনক রেডিও। সে সহপাঠী খুব সংকোচের সঙ্গে বলল-

-রেডিও তো আছে, আমি তো একটু আগেই গান শুনছিলাম। কিন্তু ব্যাটারির অবস্থা খুব খারাপ, কদিন ধরেই ভাবছি, ব্যাটারি কিনব, রোজ ভুলে যাচ্ছি। হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আমরা সমস্বরে বললাম-

-ও নিয়ে তুই ভাবিস না, টর্চের ব্যাটারি দিয়ে ম্যানেজ হয়ে যাবে, বস।

ঘরে এনে টর্চের ব্যাটারি ভরে চালু করলাম রেডিওটা। দিব্বি চালু হল, যদিও ততক্ষণে কলকাতার সব স্টেশন নিঃশব্দ হয়ে গেছে। চালু রয়েছে শর্ট ওয়েভের বিদেশী স্টেশন। ব্যাটারির অপচয় এড়াতে আমরা রেডিও বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু তখন আমাদের নিজেদের ওপরেই আর বিশ্বাস থাকছিল না। ঘরের মধ্যে আরাম করে বসার জায়গা বলতে বিছানা। বিছানায় বসলেই, কাত হতে ইচ্ছে হবে, তখন কি আর  ঘুমের জাদুস্পর্শ এড়াতে পারবো? অসম্ভব। আমরা তিনজন, বিছানার চাদর উঠিয়ে নিয়ে উঠে গেলাম হস্টেলের বিশাল ছাদে। ঘুম এড়ানোর পক্ষে ছাদও নিরাপদ নয়, আমরা উঠে পড়লাম জলের কংক্রিট ট্যাংকির উপর। এখানে সংকীর্ণ জায়গা, কোন রেলিং বা দেওয়াল নেই, খোলা ছাদ। নিরাপদ নয়, কিন্তু নিরাপদ। পড়ে যাওয়ার আশংকায় নিরাপদ নয়, কিন্তু সেই ভয়ে ঘুম না আসার পক্ষে সম্পূর্ণ নিরাপদ।

ভাঁজ করে বিছানার চাদর বিছিয়ে মুখোমুখি বসা গেল তিনজনে। সামনে বিড়ির বাণ্ডিল আর দেশলাই। মাথার উপর কুচকুচে মখমলি কালো প্রাকঅমাবস্যার আকাশ। তার গায়ে অগণিত তারার চুমকি।  আমার গ্রামের বাড়িতেও এমন তারায় ভরা রাতের আকাশ দেখেছি। কিন্তু হাল্কা হিম পড়া সেই রাত্রে, এমন স্পষ্ট তারার সমাহার দেখার অবকাশ খুব একটা আসে নি জীবনে। আকাশের অনেকখানি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে কালপুরুষ ঝুঁকে অবাক তাকিয়ে রইল সারাটারাত, দেখতে লাগল আমাদের হুজুগের বহর।

ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই কালপুরুষ চিনেছিলাম, তার মাথা, কোমরের বেল্ট, হাত পা, মায় তার সঙ্গের কুকুরটিও, যার নাম লুব্ধক। মাথার তারামণ্ডলের নাম মৃগশিরা, কোমরের তিনটি তারা ঊষা, অনিরুদ্ধ আর চিত্রলেখ। সেদিন তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্য কথা আর তেমন জমল না। মনে তারাময় আবেগ।

মনে পড়ল, প্রেমেন্দ্র মিত্রর অন্যরকম কবিতা – “হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে/হৃদয়ে কি জং ধরে পুরোন খাপে। কার চুল এলোমেলো, কি বা তাতে এল গেল, কার চোখে কত জল কে বা তা মাপে? ...হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে”। আমাদের ত্র্যহ স্পর্শে জেগে উঠলেন চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ। “তারাগুলি সারারাতি কানে কানে কয়, সেই কথা ফুলে ফুলে ফুটে বনময়”। “তারার দীপ জ্বালেন যিনি গগনতলে, থাকেন চেয়ে ধরার দীপ কখন জ্বলে”। বিশাল বিস্তারের ঐ নক্ষত্রময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেদের সত্যি সত্যি হারিয়ে ফেলার যে অনুভূতি, কে আর পারেন তাকে অনায়াসে ছুঁয়ে ফেলতে, 

“তারায় ভরা চৈত্রমাসের রাতে

ফিরে গিয়ে ছাতে

মনে হল আকাশপানে চেয়ে

আমার বামীর মতোই যেন অমনি কে এক মেয়ে

নীলাম্বরের আঁচলখানি ঘিরে

দীপশিখাটি বাঁচিয়ে একা চলছে ধীরে ধীরে।

নিবত যদি আলো, যদি হঠাৎ যেত থামি

আকাশ ভরে উঠত কেঁদে “হারিয়ে গেছি আমি”।”

চৈত্র না হোক, সেই  আশ্বিনের রাতের আকাশেও আমাদের এই অনুভব এতটুকুও কম হয় নি।  

 

অবশেষে এসে গেল সেই সময়। রেডিও চালু করে আমরা কলকাতা-কয়ের মহিষাসুরমর্দ্দিনী চালু করলাম। এবং নিশ্ছিদ্র নীরবতায় শুনতে লাগলাম অনুষ্ঠান। শুনছিলাম না, সমস্ত চেতনা দিয়ে অনুভব করছিলাম। চোখের সামনে বিশ্বচরাচর ধীরে ধীরে ভরে উঠতে লাগল ঊষার আবছা আলোয়। ভোরের শারদ বাতাসের হাল্কা হিমের নির্মল স্পর্শ। ঘুমভাঙা পাখিদের অনবদ্য কলকাকলি।

 

পুবের আকাশের আলোয় স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল আমাদের চারিপাশের অন্ধকার। উত্তরে আমাদের হস্টেলের সামনে মাঠ। তারপরে কলেজ বাউণ্ডারির ওপার থেকে যতদূর চোখ যায়, সবুজ গালিচার চা বাগান। তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আসাম-দিল্লী রেলপথ। তারও ওপারে কালচে সবুজ ঘন গাছের সারির মাথার উপর ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত কাঞ্চনজংঘার পঞ্চশৃঙ্গের বৈভব। তাদের শরীরে তখন হালকা কমলা আভা। 

 

আমাদের শ্রবণে দেবী দুর্গার মহিমা স্তোত্র, দৃষ্টিতে অপরূপ কাঞ্চনজংঘা, বিপুল দিগন্তের হরিৎ বিস্তার। অচেনা এক অনুভবে আচ্ছন্ন হয়ে রইল সমস্ত চেতনা। রেডিওর অনুষ্ঠান যখন শেষ হল, সকালের সোনা রোদ্দুরে ভরে উঠেছে টানটান মসৃণ নীল আকাশ। সাদা মেঘের এলোমেলো কয়েকটা টুকরোয়, সকালের আলোর বর্ণচ্ছটা। আর ওদিকে কাঞ্চনজংঘা রং বদলে হয়ে উঠেছে সোনালী।

 আমরা নেমে এলাম নীচে। রাত্রিজাগরণের কোন ক্লান্তি বা গ্লানি মনেও এল না। রেডিও, বেডশীট ঘরে রেখে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম হস্টেল থেকে। কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, কলেজ ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম জলপাইগুড়ি শহরের রাস্তায়। মাষকলাইবাড়ি যাবার পথে চোখে পড়ল অনেক লোক চলেছেন আমাদের উল্টো মুখে, অধিকাংশই মেয়ে এবং মহিলা। তাদের সকলের হাতে পুষ্পগুচ্ছ। এত সকাল সকাল, এমন সুন্দর এক দিনে, কোথায় চলেছে তারা? আমাদের কলেজের অদূরে হাইওয়ের ধারেই আছে তারা মায়ের প্রাচীন মন্দির। জনশ্রুতি, কোন এক কালে সেই মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন দস্যুসর্দার ভবানী পাঠক। এই ভবানী পাঠকের মন্ত্র শিষ্যা ছিলেন দেবীচৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র যাঁর কাহিনী নিয়ে রচনা করেছিলেন উপন্যাস। সেই জাগ্রতা দেবী মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতেই সকলের এই পুষ্প উপচার। আমরাও সঙ্গী হলাম তাঁদের, এমন প্রভাতে দেবী মায়ের রাতুল চরণে আমাদের কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য ছাড়া আর কিই বা দিতে পারি?


“-তোমার এখানে আকাশে যেন অর্ঘ্য সাজানো, যেন শিশিরধোওয়া সকালবেলার স্পর্শ। তুমি এখানকার বাতাসে কি ছিটিয়ে দিয়েছ বলো দেখি।

-সুর ছিটিয়েছি।

-আমাকে সেই রাজাধিরাজের কথা বলো সুরঙ্গমা, আমি শুনি।

-মুখের কথায় বলে উঠতে পারি নে।

-বলো, তিনি কি খুব সুন্দর?

-সুন্দর? একদিন সুন্দরকে নিয়ে খেলতে গিয়েছিলুম, খেলা ভাঙল যেদিন, বুক ফেটে গেল, সেইদিন বুঝলুম সুন্দর কাকে বলে। একদিন তাকে ভয়ংকর বলে ভয় পেয়েছি, আজ তাকে ভযংকর ব”লে আনন্দ করি। তাকে বলি তুমি দুঃখ, তাকে বলি তুমি মরণ, সবশেষে বলি তুমি আনন্দ!”*

 

জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেলে চার বছরে বিদ্যের ভারে কতটা বোঝাই হয়েছিলাম, তাতে আজও আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। কিন্তু, যে আনন্দের পূর্ণ উপলব্ধি এসেছিল, তা অন্য কোথাও আর মেলেনি।

 

*রবীন্দ্রনাথের “অরূপরতন” নাটকের ভগ্নাংশ।  

চলবে...

 


শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৮

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "

"বিপ্লবের আগুন" ধারাবাহিক উপন্যসের শুরু - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


  


[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের আগের পর্ব  - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৭ " 


১৪

 

পূর্ব পরিকল্পনা মতো পূর্ণিমার মধ্য রাত্রে ভল্লা পনের জনের একটি দল নিয়ে হানা দিল আস্থানে। তার মধ্যে চারজন রইল ঠিক তার পিছনে। হানো, শলকু, আহোক আর মইলি। ভল্লা প্রথমে এবং তার পিছনে চারজন আস্থানের সদর প্রবেশদ্বার টপকে ভিতরে ঢুকল। সকলের হাতেই লাঠি। দ্বারের সুরক্ষায় তিনজন প্রহরী ছিল। তাদের লাঠির আঘাতে আহত করে প্রবেশদ্বার খুলে দলের আরও চারজনকে তারা ঢুকিয়ে নিল। সকলে মিলে অতি দ্রুত প্রহরীদের মুখে গামছা গুঁজে দিল। দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল তাদের হাত-পা। প্রহরী তিনজনকে টেনে একটু আড়ালে অন্ধকারে ফেলে রেখে, ভল্লা সকলকে নিয়ে দৌড়ল আস্থানার অন্য প্রান্তে। যেখানে অস্ত্রশস্ত্র রাখা আছে।

হানো, শলকু আর আহোক অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনটি কোনে লাঠি হাতে প্রস্তুত রইল পাহারায় – কোন রক্ষী কাছাকাছি এলেই বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের ধরাশায়ী করবে। বাকিরা আস্থানার বেড়া টপকে অস্ত্রশস্ত্র বাইরে পাচার করতে শুরু করল। বেড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে দলের বাকি সাতজন সেগুলি দ্রুত হাতে গুছিয়ে তুলতে লাগল বেড়া থেকে একটু দূরে একটা বড়ো গাছের ছায়ায়। সেখানে পাশাপাশি রাখা আছে কাঠের দুটি টানা-শকট।

দুজন রক্ষী দলটাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে আসছিল। শলকু আর আহোক আড়াল থেকে লাফিয়ে, এমনই লাঠির আঘাত করল, দুজনেই নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তিনজনে মিলে দেহদুটো আড়ালে সরাতে গিয়ে হানো আর শলকু দেখল, ওদের মাথার পিছন থেকে রক্ত ঝরছে। শলকু কেঁপে উঠল, বলল, “এত রক্ত? মরে গেল না তো? ভল্লাদাদা কোথায় রে?” চারদিকে তাকিয়ে তারা ভল্লাকে দেখতে পেল না। এই তো একটু আগেও সে সামনেই ছিল, গেল কোথায়? শলকু আর আহোকের হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। দুজনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মাটিতে। হানো আহত দুই রক্ষীকে খুঁটিয়ে দেখল – নাকের সামনে আঙুল রেখে দেখল শ্বাস চলছে – তবে খুব মৃদু। হানো আরেকবার ভল্লাকে খুঁজল। দেখতে না পেয়ে শলকু আর আহোকের কাঁধে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল, “তোরা এভাবে বসে থাকিস না, শলকু। বিপদ ঘটতে পারে। শরীর খারাপ লাগল, বাইরে গাছতলায় গিয়ে বস। যা। এখানে থাকিস না”।

শলকু আর আহোক নিজেদের সামলাবার চেষ্টা করছিল। মহড়া দেওয়ার সময়, ভল্লাদাদা বারবার বলেছে, লড়াই করতে হলে শত্রুপক্ষের রক্ত ঝরাতে হবে। নয়তো তোর নিজেরই রক্ত ঝরবে। আহত মানুষের আর্ত চিৎকার শুনলে, কিংবা তার রক্ত দেখলে, মন দুর্বল যেন না হয়। হানো আবারও বলল, “যা ওঠ। তাড়াতাড়ি বাইরে যা”। হঠাৎই তার পাশে এসে দাঁড়াল ভল্লাদাদা। নিঃশব্দে, বেড়ালের মতো। তার কাঁধে এখন মাঝারি আকারের একটা ঝোলা। হাতে একটা বল্লম। কোন দিক দিয়ে এল, কীভাবে এল, সে টেরই পেল না? হানো ভাবল, ভল্লাদাদার মতো দক্ষ রক্ষী এ আস্থানায় যদি দু-পাঁচজন থাকত, তাহলে এতক্ষণ তাদেরই হয়তো মাটি নিতে হত।

ভল্লা চাপা স্বরে বলল, “হানো ঠিক বলেছে, তোরা বাইরে যা। আমাদের ছেলেরা বেড়ার কিছুটা ভেঙে দিয়েছে। আমরা ওই পথেই পালাব”। ভল্লার কথায় শলকু চাপা ডুকরে উঠে বলল, “ভল্লাদাদা, এ আমি কী করলাম, লোকটা মনে হয় মরে গেছে…”। ভল্লা চাপা গর্জনে বলল, “তোর এই নাকে কান্নার জন্যে, আমাদের একজনারও যদি কোন ক্ষতি হয় শলকু, আমি তোকে বাঁচতে দেব না। এখনই ওঠ, বেরিয়ে যা”। শলকু আর আহোক উঠে দাঁড়াল, হেঁটে গেল তাদের দলটির দিকে।

হানো ওদের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল, বলল, “ওদের মন যে এত দুর্বল, বোঝাই যায়নি”।

ভল্লা হেসে হানোর কাঁধে হাত রাখল, বলল, “নিজের হাতে একটা - দুটো শত্রুর প্রাণ নে, তারপর… ”। কথার মাঝেই ভল্লা তার হাতের বল্লমটা বিদ্যুৎ বেগে ছুঁড়ে দিল একটা অন্ধকার কোনার দিকে। লোহার ফলা চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠল। হানো কাউকে দেখতে পেল না, কিন্তু লোকটার গলা থেকে যে আওয়াজটা বের হল, সেটা যে তাঅন্তিম কণ্ঠস্বর বুঝতে তার অসুবিধে হল না। তারপরেই ভারি কিছু মাটিতে পড়ে যাওয়ার শব্দ। ভল্লা দুটো আওয়াজই উৎকর্ণ হয়ে শুনল। তারপর নিশ্চিন্ত স্বরে আগের কথার জের টেনে বলল, “…তারপর তোকে বীর বলব। দাঁড়া বল্লমটা তুলে আনি”। ভল্লা দ্রুত পায়ে দৌড়ে গেল।

মরার আগে লোকটার ওই অস্ফুট আওয়াজটা হানোর কানে বারবার ফিরে আসছে। হানোর পেটের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। তার মাথার মধ্যে গমগম করছে সেই আওয়াজ “ওঁখ্‌”। সমস্ত শরীর দুমড়ে তার বমি আসছে। সে উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে।

ভল্লা ফিরে এল হাতে দুটো বল্লম নিয়ে। দ্বিতীয় বল্লমটা ওই মৃত প্রহরীর। হানোর অবস্থা দেখে ভল্লা মুচকি হাসল, কিন্তু একটু রুক্ষ স্বরে বলল, “চ, ওঠ। ছেলেদের হয়ে গেছে, ঝটপট কেটে পড়ি”। ভল্লা হানোর হাত ধরে টেনে তুলে, তাকে টানতে টানতে বেড়ার ওপারে পৌঁছল। ছেলেরা তাদের অপেক্ষাতেই ছিল। ভল্লার নির্দেশে টানা-শকট নিয়ে তারা দ্রুত ঢুকে পড়ল ঘন জঙ্গলের মধ্যে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজ্যের সীমানার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের স্বস্তি নেই।

 দলটি বেশ দ্রুতই হাঁটছিল। দণ্ড দুয়েকের মধ্যে তারা রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ল গভীর জঙ্গলে। ভল্লা হাঁটছিল দলটির পিছনে। তার আশঙ্কা আস্থানের রক্ষীরা তাদের মৃত ও আহত সঙ্গীদের দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। ওরা প্রতিশোধ নিতে দৌড়ে আসতে পারে তাদের পিছনে। তাদের অনেকেই অশ্বচালনায় এবং রণপা ব্যবহারে কুশল। তারা পিছু নিলে, অচিরেই এই দলটিকে ওরা ধরে ফেলতে পারবে। সেই উদ্বেগে ভল্লা সতর্ক ছিল। তার প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ। গভীর জঙ্গলের পাতার আড়ালে আকাশের দিকে তাকাল ভল্লা, চাঁদের অবস্থান দেখে তার মনে হল, রাত্রি প্রথম প্রহরের মধ্য যাম চলছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই। গন্তব্যে পৌঁছেই অস্ত্রগুলির এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কাল প্রভাতে কারও চোখে না পড়ে।

ভল্লা মাঝে মাঝে চাপা স্বরে দলটিকে উৎসাহ দিচ্ছিল। আর বারবারই আগামী কর্মকাণ্ডের চিন্তায় ডুব দিচ্ছিল। পিছনের বিপদের কারণে সে সজাগ ছিল ঠিকই, কিন্তু একটা বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিল, প্রশাসন তাকে সাহায্য – সহযোগিতা করছে এবং করবে। সে অত্যন্ত জটিল একটি প্রশাসনিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। এ কথা জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়লে, তার মৃত্যুদণ্ড ছাড়া প্রশাসনের হাতে অন্য কোন উপায় থাকবে না। অতএব তার বিপদ যেমন পিছনে, তেমনি সামনেও। তীক্ষ্ণ নজরে সে লক্ষ্য রাখছিল হানো, শলকু এবং আহোকের দিকে। শলকু আর আহোক এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তাদের ধারণা দুটি মানুষকে তারা আহত করে, সংজ্ঞাহীন করেছে মাত্র। মানুষদুটির ক্ষত সেরে উঠলেই তারা সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু ভল্লা জানে, তারা দুজনেই মৃত। আপাতত শলকু আর আহোক তার প্রধান মাথাব্যথা নয়। ভল্লা হানোর আচরণে ভীষণ উদ্বিগ্ন। হানো এতক্ষণ দলের সঙ্গে দলের মধ্যে থেকেও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছে না। অপ্রকৃতিস্থ প্রলাপ বকছে। তার দুই চোখ রক্তবর্ণ। এই ছেলেটি তার এবং প্রশাসনের পক্ষে বৃহৎ বিপদের কারণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। 

চলবে...


শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

গীতা - ১৪শ পর্ব

 এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "



এর আগের ত্রয়োদশ অধ্যায়ঃ ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ পাশের সূত্রে গীতা - ১৩শ পর্ব "


চতুর্দশ অধ্যায়ঃ গুণত্রয়বিভাগযোগ


শ্রীভগবানুবাচ

পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানমুত্তমম্‌।

যজ্‌জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ।।

শ্রীভগবান উবাচ

পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানম্‌ উত্তমম্‌।

যৎ জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিম্‌ ইতঃ গতাঃ।।

শ্রীভগবান বললেন – সকল জ্ঞানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরম জ্ঞানের তত্ত্বটি আরেকবার তোমাকে বলব। এই পরম জ্ঞান অর্জন করলে মুনিরা দেহান্তের পর পরম সিদ্ধিলাভ করে থাকেন।

 

ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ।

সর্গেঽপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ।।

ইদং জ্ঞানম্‌ উপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যম্‌ আগতাঃ।

সর্গে অপি ন উপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ।।

এই পরম জ্ঞান আশ্রয় করে আমার স্বরূপ লাভ করা যায়। এরপর আর সৃষ্টিকালে জন্মগ্রহণ করতে হয় না এবং প্রলয়কালে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না।

 

মম যোনির্মহদ্‌ব্রহ্ম তস্মিন্‌ গর্ভং দধাম্যহম্‌।

সম্ভবঃ সর্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত।।

মম যোনিঃ মহৎ-ব্রহ্ম তস্মিন্‌ গর্ভং দধামি অহম্‌।

সম্ভবঃ সর্বভূতানাং ততঃ ভবতি ভারত।।

হে অর্জুন, মহৎ ব্রহ্ম আমার যোনি, আমিই তার গর্ভাধান করি, সেখান থেকেই সর্বভূতের সৃষ্টি হয়।

[সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ – এই ত্রিগুণ সম্পন্ন প্রকৃতিই শ্রীভগবানের যোনিস্বরূপ। প্রকৃতি সকল কার্যের কর্তা তাই তিনি মহৎ ব্রহ্ম। ক্ষেত্রজ্ঞ জীবাত্মার ক্ষেত্রের সঙ্গে অর্থাৎ দেহের সঙ্গে সংযোজনই গর্ভাধান - এই বিশ্বজগতের সৃজন।]

 

সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।

তাসাং ব্রহ্ম মহদ্‌যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা।।

সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।

তাসাং ব্রহ্ম মহৎ যোনিঃ অহং বীজপ্রদঃ পিতা।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, দেব, পিতৃ, মানুষ, পশু ইত্যাদি যে কোন যোনিতেই যে দেহ জন্ম নিক না কেন, মহৎব্রহ্ম প্রকৃতি তাদের মাতা আর আমিই চৈতন্যস্বরূপ বীজপ্রদ পিতা। 

 

সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ।

নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্‌।।

সত্ত্বং রজঃ তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ।

নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনম্‌ অব্যয়ম্‌।।

হে মহাবীর অর্জুন, সত্ত্ব, রজঃ আর তমঃ প্রকৃতিজাত এই তিনগুণ, অব্যয় পরমাত্মাকে দেহের অভিমানে বদ্ধ করে রাখে।

 

তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়ম্‌।

সুখসঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ।।

তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ প্রকাশকম্‌ অনাময়ম্‌।

সুখসঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞানসঙ্গেন চ অনঘ।।

হে সদাচারী অর্জুন, এই তিনগুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ নির্মল, তাই স্বরূপের সুখে শান্ত থাকে এবং চৈতন্যভাব প্রকাশ করে। এই সুখের আসক্তি ও জ্ঞানের আসক্তিতে জীব আবদ্ধ হয়।

  

রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্‌।

তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসঙ্গেন দেহিনম্‌।।

রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণা-আসঙ্গ-সমুদ্ভবম্‌।

তৎ নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসঙ্গেন দেহিনম্‌।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, জেনে রাখো রজোগুণ রাগাত্মক, মনে তৃষ্ণা ও আসক্তির সৃষ্টি করে। এই গুণ দেহীকে ফলের প্রত্যাশায় কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে।

[রঙের প্রভাবে যা অন্যকে রঙীন করে তোলে, তাই রাগাত্মক। গৈরিক বসনের প্রভাবে যেমন মনে বৈরাগ্যভাব আসে – শ্রীশ্রীশঙ্করভাষ্য।]

   

তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহিনাম্‌।

প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত।।

তমঃ তু অজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহিনাম্‌।

প্রমাদ-আলস্য-নিদ্রাভিঃ তৎ নিবধ্নাতি ভারত।।

হে অর্জুন, জেনে রাখো, অজ্ঞান থেকে কিন্তু তমোগুণ আসে আর সমস্ত দেহধারীর মনে মোহ সৃষ্টি ক’রে, ভ্রান্তি, আলস্য ও নিদ্রা দিয়ে আত্মাকে আবদ্ধ করে।

  

সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্মণি ভারত।

জ্ঞানমাবৃতা তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত।।

সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্মণি ভারত।

জ্ঞানম্‌ আবৃতা তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়তি উত।।

হে অর্জুন, সত্ত্বগুণ সুখে আবদ্ধ করে, রজোগুণ কর্মে আর তমোগুণ জ্ঞানকে আচ্ছন্ন ক’রে, ভ্রান্তিতে আবদ্ধ করে।

 

১০

রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত।

রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা।।

রজঃ-তমঃ-অভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত।

রজঃ সত্ত্বং তমঃ চ এব তমঃ সত্ত্বং রজঃ তথা।।

হে অর্জুন, কখনো রজোগুণ ও তমোগুণকে অভিভূত করে সত্ত্বগুণ প্রবল হয়। কখনো সত্ত্ব ও তমোগুণকে অতিক্রম করে রজোগুণ, কখনো বা সত্ত্ব ও রজোগুণকে অভিভূত করে তমোগুণ প্রবল হয়ে থাকে।

 

১১

সর্বদ্বারেষু দেহেঽস্মিন্‌ প্রকাশ উপজায়তে।

জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত।।

সর্বদ্বারেষু দেহে অস্মিন্‌ প্রকাশ উপজায়তে।

জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাৎ বিবৃদ্ধং সত্ত্বম্‌ ইতি উত।।

যখন এই দেহের সকল ইন্দ্রিয়দ্বার জ্ঞানের প্রকাশে উদ্ভাসিত হয়, তখনই জানবে তোমার শরীরে সত্ত্বগুণ বেড়ে উঠেছে।

 

১২

লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা।

রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ।।

লোভঃ প্রবৃত্তিঃ আরম্ভঃ কর্মণাম্‌ অশমঃ স্পৃহা।

রজসি এতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ অর্জুন, রজোগুণ বৃদ্ধির সময় মানুষের লোভ, কর্মে প্রবৃত্তি, কর্মে উদ্যম, বিরামহীন কর্মের ইচ্ছা ও বিষয় লাভের অনুরাগ আসে।

 

১৩

অপ্রকাশোঽপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ।

তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন।।

অপ্রকাশঃ অপ্রবৃত্তিঃ চ প্রমাদঃ মোহঃ এব চ।

তমসি এতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন।।

হে কুরুনন্দন, তমোগুণ বৃদ্ধিতে বিবেকবুদ্ধি লোপ পায়, মানুষ উদ্যমহীন হয়, কর্তব্যে অবহেলা ও মূঢ় চিন্তা করে।

 

১৪

যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ।

তদোত্তমবিদাং লোকানমলান্‌ প্রতিপদ্যতে।।

যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ।

তৎ উত্তমবিদাং লোকান্‌ অমলান্‌ প্রতিপদ্যতে।।

সত্ত্বগুণ বৃদ্ধির সময় দেহত্যাগ করলে, ব্রহ্মবিদ উপাসকের যোগ্য অমলিন ব্রহ্মলোক পাওয়া যায়।

 

১৫

রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্মসঙ্গিষু জায়তে।

তথা প্রলীনস্তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে।।

রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্মসঙ্গিষু জায়তে।

তথা প্রলীনঃ তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে।।

রজোগুণ বৃদ্ধির সময় মৃত্যু হলে কর্মে আসক্তি নিয়ে মনুষ্যলোকেই ফিরে আসে, আর তমোগুণ নিয়ে মৃত্যু হলে মূঢ়যোনিতে পশু হয়ে জন্ম নিতে হয়।

 

১৬

কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলং।

রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসো ফলম্‌।।

কর্মণঃ সুকৃতস্য আহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলং।

রজসঃ তু ফলং দুঃখম্‌ অজ্ঞানং তমসঃ ফলম্‌।।

মহর্ষিগণ বলেন – সাত্ত্বিক কর্মের ফল নির্মল সুখ, রাজসিক কার্যের ফল দুঃখ আর তামসিক কাজের ফল অজ্ঞানের অন্ধকার।

 

১৭

সত্ত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ।

প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতোঽজ্ঞানমেব চ।।

সত্ত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানং রজসঃ লোভ এব চ।

প্রমাদ-মোহৌ তমসঃ ভবতঃ অজ্ঞানম্‌ এব চ।।

সত্ত্বগুণ থেকে জ্ঞানের উদয় হয়, রজোগুণ থেকে লোভ আর তমোগুণ থেকে অজ্ঞান, ভ্রান্তি আর মোহ উৎপন্ন হয়।

 

১৮

ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।

জঘন্যগুণবৃত্তস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।।

ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।

জঘন্য-গুণ-বৃত্তস্থা অধঃ গচ্ছন্তি তামসাঃ।।

সত্ত্বগুণের অধিকারী ব্যক্তি ঊর্ধলোকে গমন করে, রজোগুণ প্রধান ব্যক্তি মধ্যলোকে দুঃখবহুল নরলোকে জন্ম নেয়, তমোগুণধারী নিকৃষ্ট জনেরা অধঃলোকে পতিত হয়।

 

১৯

নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টাঽনুপশ্যতি।

গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোঽধিগচ্ছতি।।

ন অন্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টা অনুপশ্যতি।

গুণেভ্যঃ চ পরং বেত্তি মৎ ভবং সঃ অধিগচ্ছতি।।

যিনি বুঝতে পারেন এই তিনগুণ ছাড়া আর কেউই সকল কার্য-করণের কর্তা নয়, তিনিই এই ত্রিগুণের অতীত পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করেন এবং আমার স্বরূপ লাভ করেন।

 

২০

গুণানেতানতীত্য ত্রীন্‌ দেহী দেহসমুদ্ভবান্‌।

জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোঽমৃতমশ্নুতে।।

গুণান্‌ এতান্‌ অতীত্য ত্রীন্‌ দেহী দেহসমুদ্ভবান্‌।

জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখৈঃ বিমুক্তঃ অমৃতম্‌ অশ্নুতে।।

দেহের উৎপত্তিস্বরূপ এই তিনগুণকে অতিক্রম ক’রে, জন্ম-মৃত্যু-জরা-দুঃখের বন্ধন ছিন্ন ক’রে, জীব অমৃতস্বরূপ পরম মুক্তি লাভ করে।

   

২১

অর্জুন উবাচ

কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রীন্‌ গুণানেতানতীত ভবতি প্রভো।

কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্‌ গুণানতিবর্ততে।।

অর্জুন উবাচ

কৈঃ লিঙ্গৈঃ ত্রীন্‌ গুণান্‌ এতান্‌ অতীত ভবতি প্রভো।

কিম্‌ আচারঃ কথং চ এতান্‌ ত্রীন্‌ গুণান্‌ অতিবর্ততে।।

অর্জুন বললেন – হে প্রভু, কি কি লক্ষণ থেকে এই ত্রিগুণাতীত মানুষ চেনা যায়। কি আচরণে এবং কি উপায়েই বা এই তিনগুণকে অতিক্রম করা যায়?

 

২২

শ্রীভগবানুবাচ

প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মোহমেব চ পাণ্ডব।

ন দ্বেষ্টি সম্প্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি।।

শ্রীভগবান্‌ উবাচ

প্রকাশং চ প্রবৃত্তিং চ মোহম্‌ এব চ পাণ্ডব।

ন দ্বেষ্টি সম্প্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি।।

শ্রীভগবান বললেন – হে পাণ্ডুপুত্র, এই ত্রিগুণের স্বাভাবিক প্রভাবে মনে প্রকাশ, প্রবৃত্তি ও মোহের উদয় হলেও, যিনি কোন দ্বেষ করেন না, অথবা এই তিনগুণের নিবৃত্তিও যিনি আকাঙ্ক্ষা করেন না, তিনিই ত্রিগুণাতীত।

 

২৩

উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে।

গুণা বর্তন্ত ইত্যেবং যোঽবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে।।

উদাসীনবৎ আসীনঃ গুণৈঃ যঃ ন বিচাল্যতে।

গুণাঃ বর্তন্ত ইতি এবং যঃ অবতিষ্ঠতি ন ইঙ্গতে।।

যিনি এই ত্রিগুণে প্রভাবিত না হয়ে, সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন এবং শরীর ও চিত্তের উপর এই ত্রিগুণের প্রভাব স্বাভাবিক জেনেও, যিনি অচঞ্চল থাকতে পারেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত।

 

২৪

সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ।

তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতি।।

সম-দুঃখ-সুখঃ স্ব-স্থঃ সম-লোষ্ট-অশ্ম-কাঞ্চনঃ।

তুল্য-প্রিয়-অপ্রিয়ঃ ধীরঃ তুল্য-নিন্দা-আত্ম-সংস্তুতি।।

যিনি সুখে দুঃখে সমভাবে থাকেন; পাথর, মাটি আর সোনার মধ্যে যিনি কোন পার্থক্য দেখেন না, প্রিয় এবং অপ্রিয় বিষয়ে যিনি একইভাবে উদাসীন, নিন্দা ও প্রশংসাতেও যিনি অবিচলিত শান্ত থাকেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত।

 

২৫

মানাপমানয়োস্তুল্যস্তুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ।

সর্বারম্ভপরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে।।

মান-অপমানয়োঃ তুল্যঃ তুল্যঃ মিত্র-অরি-পক্ষয়োঃ।

সর্ব-আরম্ভ-পরিত্যাগী গুণ-অতীতঃ সঃ উচ্যতে।।

যিনি সম্মান ও অপমানে নির্বিকা্র, মিত্রপক্ষ ও শত্রুপক্ষে কোন পার্থক্য করেন না, যিনি ফলের প্রত্যাশী সমস্ত কর্মই ত্যাগ করেছেন, তিনিই ত্রিগুণাতীত।

 

২৬,

২৭

মাঞ্চ যোঽব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।

স গুণান্‌ সমতীত্যৈতান্‌ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।

ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাঽহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ।

শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ।।

মাং চ যঃ অব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।

স গুণান্‌ সমতীত্য এতান্‌ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।। ২৬

ব্রহ্মণঃ হি প্রতিষ্ঠা অহম্‌ অমৃতস্য অব্যয়স্য চ।

শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্য ঐকান্তিকস্য চ।। ২৭

যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগে আমার উপাসনা করেন, তিনিও এই ত্রিগুণের প্রভাব অতিক্রম করে ব্রহ্মস্বরূপ লাভ করে থাকেন। কারণ, আমিই অমৃতস্বরূপ অব্যয় ও অবিনাশী স্বয়ং ব্রহ্ম; আমিই শাশ্বত জ্ঞানযোগরূপ এবং ঐকান্তিক সুখস্বরূপ পরম ব্রহ্ম।   

 গুণত্রয়বিভাগযোগ সমাপ্ত

চলবে...


নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...