মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ৩/৭

 



["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের ষষ্ঠ পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/৬"]


তৃতীয় পর্ব - সপ্তম পর্বাংশ

(৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই)


৩.৫.৩ ধর্মাশোকের প্রভাব

রাজা অশোকের ছত্রিশ বছরের রাজত্ব ভারতের ধীরস্থির শ্লথগতি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই। বিশ্ব দরবারে প্রাচীন সভ্যতা, শিল্প, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, সাহিত্য, দর্শন নিয়ে আজ ভারতবর্ষের যে গৌরবময় অবস্থান, অনায়াসে বলা যায় অশোক তার সূচনা করেছিলেন। বিচ্ছিন্ন কিছু মহাজনপদ এবং রাজ্য নিয়ে গড়ে উঠতে থাকা খণ্ড-খণ্ড ভারতীয় সমাজকে বিশাল এবং বৈচিত্রময় একটি দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলেছিলেন মৌর্যরা, বিশেষ করে সম্রাট অশোক। শুধুমাত্র পরিচয়ই নয়, ভারতের আশ্চর্য দর্শন, জ্ঞান এবং সম্পদ, বিদেশী মানুষদের বিস্মিত করে তুলল এবং ভারতবর্ষ সম্পর্কে বাড়তে লাগল তাদের কৌতূহল, আগ্রহ, বেড়ে উঠল পারষ্পরিক আদান-প্রদান, যোগাযোগ এবং উৎসাহ দিল অজস্র জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ।

 

৩.৫.৩.১ লিপি এবং ভাষা

অশোকের শিলা-নির্দেশে বহুল প্রচলিত ব্রাহ্মীলিপি[1] সত্যি কথা বলতে ভারতীয় সংস্কৃতির হাতে তুলে দিল কলম আর কালি। ব্রাহ্মীলিপি কোথা থেকে এল, কীভাবে সম্রাট অশোক এই লিপির প্রচলন করলেন, সে নিয়ে পণ্ডিতদের যতোই মতভেদ থাক – শোনা কথার তুলনায় লিখিত কথার গুরুত্ব বুঝতে ভুল করেননি সেই সময়ের বিদ্বজ্জনেরা। ব্রাহ্মীলিপির চর্চা করতে করতেই পণ্ডিতেরা ধীরে ধীরে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার লিপিও আবিষ্কার করায় মগ্ন হয়ে পড়লেন। এতদিনের নিরক্ষর একটি সমাজ সাক্ষর হয়ে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। পরবর্তী কয়েকশ বছরের মধ্যেই তাঁরা সংস্কৃত ভাষায়, তার নির্দিষ্ট নিয়মের লিপি অনুসরণ করে লিখে ফেলতে লাগলেন, বেদ, উপনিষদ এবং অন্যান্য দর্শন শাস্ত্র, এমনকি রামায়ণ, মহাভারতের মত মহাকাব্যগুলিও। এতদিন মুখস্থ আর আবৃত্তি করার অধিকারে, যে জ্ঞানের ভাণ্ডার সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট কিছু গুরু-শিষ্য পরম্পরার মধ্যে, সে সব উন্মুক্ত হয়ে গেল সাক্ষর সাধারণের কাছেও।

 

undefined

           ব্রাহ্মী লিপি থেকে আধুনিক দেবনাগরী ও বাংলা লিপির ক্রমোত্তরণ  


অশোক তাঁর নির্দেশে প্রাকৃতভাষার ব্যবহার করেছিলেন সে কথা আগেই বলেছি। তিনি যে শুধু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিরোধী ছিলেন বলেই সংস্কৃত ব্যবহার করেননি তা নয়, তিনি জানতেন সংস্কৃত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ভাষা, দেশের জনগণের ভাষা প্রাকৃত। যেহেতু তাঁর নির্দেশের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষ, অতএব তিনি মাগধী প্রাকৃত এবং আঞ্চলিক প্রাকৃত ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন তাঁর নির্দেশগুলিতে। এর অপরিসীম গুরুত্ব বুঝে সংস্কৃতর পাশাপাশি গড়ে উঠতে লাগল প্রতিটি অঞ্চলের ভাষা এবং তাদের নিজস্ব লিপি। অর্থাৎ আজ আমি বাংলাভাষায় এই যে লেখাটি লিখছি এবং আপনি যে সেটি পড়ছেন, তার পিছনে সম্রাট অশোকের অসাধারণ  এই অবদান স্বীকার করে আমরা যেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় প্রণত থাকি।  

 

৩.৬.১  মৌর্য শিল্প-ভাস্কর্য-স্থাপত্য

এক সিন্ধুসভ্যতা ছাড়া ভারতের প্রাক-মৌর্য প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিল্প এবং স্থাপত্যের পরিমাণ বিরল। হয়তো কিছু ছিল, কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে গেছে। কারণ মৌর্য যুগের আগে পাথরের স্থাপত্যের প্রচলন ছিল, রাজধানী বা রাজপ্রাসাদের প্রাচীরে অথবা দেওয়ালে। ভারতবর্ষের স্থাপত্যে পোড়া-ইঁট এবং আমা-ইঁটেরই বহুল ব্যবহার ছিল, তার সঙ্গে ছিল অলংকৃত কাঠের স্তম্ভ এবং কাঠের কারুকাজ। পাথরের শিল্প-স্থাপত্য তৈরির কারিগরি দক্ষতার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। চন্দ্রগুপ্ত এবং পরবর্তী কালে অশোক অবশ্যই অ্যাকিমিনিড সাম্রাজ্যের পারসিপোলিস শহরের প্রাসাদ এবং অন্যান্য পাথরের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই তাঁরা ওই অঞ্চলের বেশ কিছু দক্ষ শিল্পীকে পাটলিপুত্রে নিয়ে এসেছিলেন। পাটলিপুত্রের রাজপ্রাসাদের প্রধান স্থপতিরা ছিলেন পারস্য এবং ব্যাক্ট্রিয়া থেকে আসা বেশ কিছু দক্ষ শিল্পী।

সেলুকাসের গ্রীক রাজদূত মেগাস্থিনিস দীর্ঘদিন পাটলিপুত্রে ছিলেন। তাঁর ভারত ভ্রমণের মূল গ্রন্থ “ইণ্ডিকা” লুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু পরবর্তী বহু গ্রীক পর্যটক এবং পণ্ডিতদের রচনায়, তাঁর গ্রন্থের বহু উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। সেই উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, “পাটলিপুত্র শহর ছিল গঙ্গা এবং শোন নদীর সঙ্গমে। দৈর্ঘে ১৪.৫০ কি.মি এবং প্রস্থে ২.৪০ কি.মি.। রাজধানীর সীমানা জুড়ে ছিল কাঠের প্রাচীর, তারমধ্যে ৫৭০টি কাঠের টাওয়ার এবং ৬৪টি দরজা ছিল”। যদিচ পাটলিপুত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে সামান্য কিছু কাঠের কড়ি-বরগা আর পাটা পাওয়া গেছে। আর পাওয়া গেছে ৮০টি প্রস্তর-স্তম্ভের অবশেষ – বিশেষজ্ঞরা তার পালিশ এবং শিল্প-দক্ষতাকে মৌর্য-শিল্প নাম দিয়েছেন। তাঁরা অনুমান করেন, এই পাথরের স্তম্ভের ওপর কাঠের কাঠামোর ছাদ নিয়ে হয়তো কোন বড়ো সভাঘর ছিল পাটলিপুত্র রাজধানীতে। হয়তো এটি পারসিপোলিসের “শত-স্তম্ভ সভাঘর” (“hundred -pillared hall”)-এর অনুকরণে তৈরি হয়েছিল।


ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সম্রাট অশোক অজস্র বৌদ্ধ বিহার ও স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অতিরঞ্জিত মতে ৮৪০০০!  তার মধ্যে সামান্য কিছুর হদিশ পাওয়া যায়, অধিকাংশই কালের নিয়মে ধ্বংস হয়েছে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সম্রাট অশোকের বানানো অনেকগুলি স্তূপের মধ্যে সারনাথ স্তূপের অবশেষটুকুই সম্রাট অশোকের বানানো। তক্ষশিলার “ধর্মরাজিকা” স্তূপ সম্ভবতঃ কুষাণরাজ কণিষ্কের বানানো, তিনি “ধর্মরাজ” অশোককে অনুসরণ করেই হয়তো এটির নামকরণ করেছিলেন। কারণ সারনাথের স্তূপটিরও নাম “ধর্মরাজিকা”। প্রত্নখননে দেখা গেছে, অশোকের স্তূপটিকে আবৃত করে দ্বিতীয় থেকে দ্বাদশ শতাব্দী সি.ই.-র মধ্যে ছটি স্তূপ বানানো হয়েছিল। অশোকের স্তূপটির চারপাশে পাথরের রেলিং রয়েছে যার পালিশ এবং ফিনিশিং মৌর্য-শিল্পের অনুগামী। অশোক যে সাঁচী স্তূপ বানিয়েছিলেন, সেটিকেও চাপা দিয়ে পরবর্তীকালে অনেক বড় করে স্তূপ বানানো হয়েছিল। অশোকের স্তূপের শীর্ষে থাকা পাথরের ছাতার কিছুটা অবশেষ থেকে তাকে মৌর্য-শিল্পের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাঁচী স্তূপের প্রত্নখননে অশোকের যে স্তূপটি পাওয়া যায়, সেটির আকার অর্ধগোলক, যার ব্যাস প্রায় ৬০ ফুট। স্তূপটি বড়ো বড়ো ইঁট দিয়ে বানানো। অশোকের বানানো সারনাথ স্তূপের আকার ও উপাদান সাঁচী স্তূপের মতোই। বৈরাত স্তূপের ভিত, পাথরের দুটি স্তম্ভ, ছাতা এবং একটি পাত্র পাওয়া গেছে, যেগুলি বিশেষজ্ঞরা মৌর্য-শিল্পের নিদর্শন বলে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। পাথরের ছাতাটি নিশ্চয়ই স্তূপের শীর্ষে বসানো ছিল।

পাহাড় কেটে বারাবর গুহাবাসগুলি অশোক এবং পরবর্তী কালে তাঁর পৌত্র দশরথ বানিয়েছিলেন। এই গুহাবাসগুলিই ভারতবর্ষের প্রথম গুহা স্থাপত্য। গুহাগুলি আজীবিক সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের জন্যে নির্মিত হয়েছিল। পাথর খোদাই করে, কাঠের কাঠামোর অনুকরণে গুহাগুলির ছাদ, দেওয়াল ও গুহামুখ বানানো হয়েছিল। একই পদ্ধতিতে অজন্তা-ইলোরার গুহাগুলিও পরবর্তী সময়ে বানানো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাথর কেটে এই গুহাগুলি বানানোর অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন পারসিপোলিস এবং নকশ্‌-ই-রুস্তম্‌- এর ছোট ছোট পাহাড় কেটে বানানো গুহাগুলি দেখে। যেগুলির নির্মাণ কাল ৩৩৫-৩৩০ বি.সি.ই।

অশোকের সময়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন যা পাওয়া গেছে, সেগুলি হল পাথরের স্তম্ভগুলি (Stone pillars)অশোক নিজে এই স্তম্ভগুলিকে “শিলা থভে”  (শিলা স্তম্ভ) বলতেন।  পাথরের স্তম্ভগুলি নিখুঁত গোল, নিচ থেকে ওপরে সামান্য সরু (tapered), একটিমাত্র পাথর কেটে বানানো অর্থাৎ মনোলিথিক (monolithic) এবং চকচকে পালিশ করা। হলদেটে বাদামি রঙের এই বেলেপাথরগুলি সম্ভবতঃ উত্তরপ্রদেশের চুনার এবং মথুরা অঞ্চল থেকে আনা হত। মৌর্য-শিল্পের পালিশ বলতে বার্ণিশের প্রলেপ নয়, বরং শক্ত কোন পাথর ঘষে মসৃণ করা হত। স্তম্ভগুলির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪৫ ফুট এবং তার মাথায় থাকত অপূর্ব সুন্দর অলংকৃত শীর্ষফলক। এই শীর্ষফলকের অনেকগুলিই নষ্ট হয়ে গেছে, যে কটি পাওয়া গেছে, সেগুলি হল (ক) একক সিংহ মূর্তি – বিহারের রামপূর্বার একটি স্তম্ভ – এখন কলকাতা মিউজিয়মে রাখা আছে। (খ) একক বৃষ মূর্তি – বিহারের রামপূর্বার অন্য একটি স্তম্ভ – এখন দিল্লি মিউজিয়মে রাখা আছে। (গ) সারনাথ এবং সাঁচীর স্তম্ভ – চারটি সিংহমূর্তি, পিঠে পিঠ দিয়ে বিপরীত মুখে বসে আছে। এই মূর্তিটিই ভারতের জাতীয় প্রতীক – “অশোকস্তম্ভ”। দুই স্তম্ভেরই চার সিংহের মাথার ওপরে বসানো ছিল, বত্রিশ অরের (spokes) ধর্মচক্র। সেগুলি ভেঙে গেছে। এই পশুমূর্তিগুলি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সুন্দর এবং তাদের দৃপ্তভঙ্গির জন্যে সারা বিশ্বের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে। পাথরের এই সূক্ষ্ম মূর্তি এবং স্তম্ভগুলি নির্মাণে বিদেশী শিল্পীর স্পর্শ যে ছিল সেকথা সহজেই অনুমান করা যায়। কারণ পাথরের কাজে ভারতীয়দের এই দক্ষতা সেই সময় ছিল না, তবে পরবর্তীকালে ভারতীয় শিল্পীরাও যে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছিল, তার অজস্র প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সমস্ত ভারতবর্ষ জুড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৌর্য-পালিশ, পাথরের স্তম্ভ, শীর্ষফলক, পশুমূর্তি, পদ্মপাপড়ির নকশা - এই সবই ছিল অ্যাকিমিনিড স্থাপত্যের সাধারণ চরিত্র।                                                                                                        

 

 

 

 

 

 




                            অশোক স্তম্ভ - বৈশালীবিহার

অতএব একথা সহজেই স্বীকার করা যায়, ভারতীয় স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যের যে আশ্চর্য সুষমা সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছে, তার সূত্রপাত করেছিলেন মৌর্যবংশের দুই রাজা – চন্দ্রগুপ্ত এবং বিশেষ করে অশোক।

৩.৬.২ অশোকের ধম্ম (ধর্ম) ধারণা

অশোকের ধর্মধারণা – যাকে আমি ধর্ম থেকে আলাদা করতে “ধম্ম” (সংস্কৃত “ধর্ম”-এর প্রাকৃত “ধম্ম”) বলেছি, সেগুলি খুবই সাধারণ কিছু সদ্‌গুণের উপদেশ। এই সদ্‌গুণগুলি রাজা অশোক তাঁর প্রজাদের মনের মধ্যে গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন। এবং সেই কারণেই তিনি তাঁর পাথরের নির্দেশগুলিতে প্রায় একই কথা বারবার বলে গিয়েছেন, তাঁর রাজত্বকালের শেষ পর্যন্ত।

সেই সদ্‌গুণগুলি হল, সমস্ত জীবের প্রতি করুণা; ব্রাহ্মণ, শ্রমণ বা সন্ন্যাসীদের দান; বন্ধু, আত্মীয় এবং পরিচিতজনকে উপহার। বিশ্বস্ততা, সততা, শুদ্ধ চিন্তা, বিনয়, কৃতজ্ঞতা, আত্ম-সংযম, বিপদে-আপদে দৃঢ় মানসিকতা, মিতব্যয়িতা। মা-বাবা-গুরুজন-শিক্ষককে ভক্তি, ব্রাহ্মণ, শ্রমণ, আত্মীয়, ভৃত্য এবং ক্রীতদাসদের প্রতি ভদ্র আচরণ। হিংস্রতা, নৃশংসতা, ক্রোধ, অহংকার এবং ঈর্ষা ত্যাগ করা, শুভকর্ম, বৃদ্ধ, দুঃস্থ এবং দুর্বলের সেবা। অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহিষ্ণুতা। অর্থহীন সংস্কার এবং প্রথা বিসর্জন দেওয়া, ধর্মীয় গোঁড়ামি ত্যাগ করা।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তিনি বেদ বা উপনিষদের বক্তব্য থেকে খুব আলাদা কিছু বলেননি। মহাভারতের শান্তিপর্ব, অনুশাসন পর্বে এমন উপদেশ দেওয়া আছে অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে।  বৌদ্ধ এবং জৈনধর্ম থেকে তিনি একটা গুণই নিয়েছিলেন – প্রাণীহত্যা না করা। অবিশ্যি সে কথাও উপনিষদে বহু জায়গাতেই বলা আছে, যদিচ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ব্রাহ্মণরা যজ্ঞে জীববলি আবশ্যিক করেছিলেন। আসলে তাঁর ধম্মের অধিকাংশ গুণগুলিই নৈতিক গুণ, যেগুলি অনুসরণ করলে মানুষের দুঃখ-কষ্ট কমবে, জীবনে আসবে স্বস্তি আর শান্তি।

তিনি নিজে বৌদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তাই বলে তিনি কখনোই অন্য বিশ্বাসীদের অস্বীকার করেননি, বরং বারবার বলেছেন, পরমত সহিষ্ণু হতে এবং অন্যান্য বিশ্বাসকেও শ্রদ্ধা করতে। তিনি নিজেকে “দেবতাদের প্রিয়” বলেছেন, কিন্তু কোনদিন কোন জায়গাতেই কোন দেবতার নাম উল্লেখ করেননি এবং কখনো কোন দেবতার পূজা বা যজ্ঞ করতে বলেননি। অশোকের ধম্ম আসলে “শীলতা” অর্থাৎ সৎ স্বভাব – বিশেষ কোন ধর্মবিশ্বাস, মতবাদ, প্রথা, সংস্কার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পূজা নয়। অশোক কখনো মোক্ষ, নির্বাণ, ধ্যান, সন্ন্যাস, তপস্যা, আত্মত্যাগের কথাও বলেননি, যে কথাগুলি ভারতীয় প্রত্যেকটি প্রধান ধর্মেরই মূল বক্তব্য।

সম্রাট অশোকের এই শিলা-নির্দেশটি, আমার মতে তাঁর ধম্ম-কথার সার সংক্ষেপঃ-         

দেবতাদের প্রিয় রাজা প্রিয়দর্শী এই কথা বলেন, - লোকে নানাবিধ মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অসুস্থ হলে, অথবা পুত্র বা কন্যার বিবাহে, অথবা সন্তানের জন্ম হলে, অথবা (কোথাও) যাত্রার প্রাক্কালে – লোক এই সব এবং অন্য আরো অনেক মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সব অনুষ্ঠানে মেয়েরা আবার বহুবিধ এবং নানান ধরনের তুচ্ছ এবং অর্থহীন মঙ্গল-ব্রত পালন করে। মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন নিশ্চয়ই করা উচিৎ, কিন্তু এই ধরনের মঙ্গল অনুষ্ঠানে অতীব তুচ্ছ-ফল লাভ হয়ে থাকে।

কিন্তু কোন (কোন) মঙ্গল অনুষ্ঠানে মহাফল লাভ হয়ে থাকে, যেমন ধম্ম-মঙ্গল অনুষ্ঠান। এর (অনুষ্ঠানের) মধ্যে রয়েছে, ক্রীতদাস এবং ভৃত্যদের প্রতি সঠিক আচরণ; গুরুজনদের প্রতি সশ্রদ্ধ এবং প্রশংসনীয় বাধ্যতা; প্রাণীদের প্রতি প্রশংসনীয় নম্র ব্যবহার; সন্ন্যাসী ও শ্রমণদের প্রতি প্রশংসনীয় দান; এইগুলি এবং এই ধরণের অন্যান্য (আচরণ)-কেই ধম্মের মঙ্গল অনুষ্ঠান বলা যায়। অতএব, (এই) কথাগুলি একজন পিতার অথবা এক পুত্রের অথবা এক ভ্রাতার অথবা একজন প্রভুর বলা কর্তব্য – “এই(আচরণ)গুলি প্রশংসনীয়এই মঙ্গল অনুষ্ঠান যতদিন না লক্ষ্যপূরণ হচ্ছে ততদিন আচরণ করা উচিৎ”।

এবং একথাও বলা হয় যে, “দান করা প্রশংসনীয়”। কিন্তু ধম্ম-দান অথবা ধম্ম-উপকারের তুল্য কোন দান বা উপকার হতে পারে না। অতএব একজন বন্ধু, বা একজন শুভাকাঙ্খী বা একজন আত্মীয় বা একজন সহকর্মী সঠিক অনুষ্ঠান করার জন্যে অন্যকে (এই বলে) উৎসাহ দেবে, যে “এই কাজই করা উচিৎ, এই কাজই প্রশংসনীয়, এই কাজেই স্বর্গলাভ করা সম্ভব”। এবং এ ছাড়া আর কোন্‌ শুভ কর্তব্য হতে পারে, যাতে স্বর্গলাভ (হয়)?” (শিলা-নির্দেশ ৯, গিরনার – ত্রয়োদশ রাজত্ব বর্ষ – ২৫৫ বি.সি.ই - ইংরিজি অনুবাদ ডঃ অমূল্যচন্দ্র সেন, বাংলা অনুবাদ – লেখক।)

অর্থাৎ অশোকের ধম্ম-এর মূল কথা হল- সমাজের সকল মানুষের সঙ্গে এমনকি সকল প্রাণীদের সঙ্গেও – সৎ-আচরণ, সহমর্মীতা, সাহায্য, অহিংসা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। এই কথাগুলির কোনোটাই নতুন কথা নয় এবং এটুকু বুঝতে অগাধ পাণ্ডিত্য বা গভীর তপস্যারও প্রয়োজন হয় না। সত্যি বলতে প্রত্যেকটি মানুষই তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং সমাজের অন্য মানুষদের থেকে এটুকু প্রত্যাশা করে থাকে। অতএব, এমন সিদ্ধান্ত করাই যায়, তিনি নিজে বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করলেও, তাঁর প্রজাদের মধ্যে কোনদিনই বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেননি। সকলকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হতে তিনি কখনোই নির্দেশ বা উপদেশ দেননি।

 

৩.৬.৩ সম্রাট অশোকের বৈদেশিক ধম্ম প্রচার

সম্রাট অশোক সিংহাসনে বসার নবম বর্ষ বা কলিঙ্গ বিজয়ের একবছর পর থেকে ধম্ম প্রচারকেই অন্যতম কর্তব্য মনে করেছিলেন। তারপরেও তাঁর ঊনত্রিশ বছরের রাজত্বকালে কোনদিন সেই ব্রত থেকে তিনি চ্যুত হয়েছিলেন, এমন শোনা যায়নি। ভারতবর্ষ জুড়ে তাঁর সাম্রাজ্যের ভেতরে ধর্মপ্রচার এবং সেই প্রসঙ্গে তাঁর শিলা-নির্দেশের কথা আগেই বলেছি। এবার তাঁর বৈদেশিক ধম্ম প্রচারের দিকে লক্ষ্য করা যাক।

 যদিও অশোক তাঁর শিলা-নির্দেশে কোথাও উল্লেখ করেননি কিন্তু তিনি যে নিকটতম বিদেশ সিংহল দ্বীপ, বার্মা (মায়ানমার) এবং নেপালে ধম্ম প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেকথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ২৪৭ বি.সি.ই-তে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন হয়েছিল। এই সম্মেলনেই বৌদ্ধধর্মের অন্ততঃ আঠারোটি শাখার উদ্ভব হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ছিল প্রাচীনপন্থী থেরাবাদিন গোষ্ঠী, সর্বাস্তিবাদীন গোষ্ঠী এবং মহাসংঘিকা গোষ্ঠী। এই সম্মেলনে তিনি বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠীকে সঙ্ঘ থেকে এবং সম্মেলন থেকে বহিষ্কারেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন।

হয়তো এই বৌদ্ধ সম্মেলনেই বিদেশে ধর্ম প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কারণ এর পরেই তিনি তাঁর পুত্র মহেন্দ্র এবং কন্যা সঙ্ঘমিত্রাকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্যে সিংহলে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় সিংহলের রাজা ছিলেন তিস্র। সিংহলের দুই বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ “মহাবংশ” এবং “দীপবংশ” থেকে জানা যায় মহেন্দ্র রাজা তিস্রকে এবং সঙ্ঘমিত্রা তাঁর রাণি এবং রাজপরিবারের মহিলাদের বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। রাজা তিস্রর সঙ্গে অশোকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং প্রায় ক্ষেত্রেই তিনি রাজা অশোককে অনুসরণ করতেন। রাজা অশোক বন্ধু রাজা তিস্রকে, বোধিবৃক্ষের একটি চারা উপহার দিয়েছিলেন। কথিত আছে, সেই চারার অশ্বত্থবৃক্ষ আজও সিংহল দ্বীপে বিদ্যমান। কিন্তু ভারতে উরুবিল্বর বোধিবৃক্ষ পরবর্তীকালে বৌদ্ধ-বিদ্বেষীরা কয়েকবার কেটে ফেলেছিল। সিংহলের অনুরাধাপুরমের সেই প্রাচীন বোধিবৃক্ষের চারা এনে ১৮৮০ সালে বুদ্ধগয়ায় নতুন বোধিবৃক্ষর প্রতিষ্ঠা হয়েছে[2]

রাজা তিস্র তাঁর প্রায় চল্লিশ বছরের রাজত্বে, তাঁর দ্বীপ রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে নিবিষ্ট ছিলেন এবং অজস্র বৌদ্ধমঠ ও বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর রাজধানী অনুরাধাপুরা পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের মহাতীর্থ হয়ে উঠেছিল এবং সিংহল হয়ে উঠেছিল থেরাবাদ অর্থাৎ প্রাচীনপন্থী বৌদ্ধদের মূল কেন্দ্র। পরবর্তী পর্যায়ে বৌদ্ধ ধর্ম যখন ভেঙে হীনযান, মহাযান হয়েছে, তখনও তাঁরা সম্রাট অশোক এবং তাঁর পুত্রের প্রচারিত ধর্মমতেই পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। অশোকপুত্র মহেন্দ্র সিংহলেই থেকে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ২০৪ বি.সি.ই-তে। অনুরাধাপুরার কাছেই আজও রয়েছে তাঁর স্মৃতি-মন্দির। অশোকের প্রচারিত বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যকেই আজও বহন করে চলেছেন সিংহভাগ সিংহলবাসী।

 অশোকের ত্রয়োদশ রাজত্ববর্ষের শিলা-নির্দেশ ১৩ থেকে জানা যায়, সুদূর পশ্চিমের পাঁচটি দেশে তিনি ধম্ম-দূত পাঠিয়েছিলেন। যে পাঁচজন রাজার নাম তিনি শিলা-নির্দেশে উল্লেখ করেছেন, তাঁরা হলেন –

ক. সিরিয়ার রাজা অ্যান্টিওকাস ২য় থিয়োস (২৬১-২৪৬ বি.সি.ই) – ইনি অ্যান্টিওকাস ১ম-এর পুত্র এবং সেলুকস নিকেটারের পৌত্র। এই সেলুকাসকেই অশোকের পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত পরাস্ত করেছিলেন এবং তাঁর কন্যাকে বৈবাহিক সূত্রে মৌর্য পরিবারে এনেছিলেন। অতএব স্পষ্টতঃই এই পরিবারের সঙ্গে মৌর্য পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেলুকাস যেমন চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় গ্রীকদূত মেগাস্থিনিসকে পাঠিয়েছিলেন, তেমনি অ্যান্টিওকাস ১মও বিন্দুসারের সভায় ডিমাকসকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। অনুমান করা যায় ২য় অ্যান্টিওকাসও অশোকের সভায় কোন দূত পাঠিয়েছিলেন, যদিচ তার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না।

খ. ইজিপ্টের রাজা টলেমি ২য় ফিলাডেলফস (২৮৫-২৪৭ বি.সি.ই) -  ঐতিহাসিক প্লিনির বর্ণনা থেকে জানা যায় দ্বিতীয় টলেমি ভারতবর্ষের পাটলিপুত্রের রাজসভায় তাঁর দূত ডিয়োনিসিয়াসকে পাঠিয়েছিলেন, হয়তো সেই রাজা বিন্দুসার অথবা অশোক। দ্বিতীয় টলেমির রাজত্বকালে আলেকজান্দ্রিয়া পশ্চিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর হয়ে উঠেছিল এবং সম্ভবতঃ বিশ্বের বৃহত্তম নগর এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় টলেমি তাঁর রাজত্বকালে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গ্রন্থাগার ও মিউজিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার ফলে আলেজান্দ্রিয়া শহর গ্রীস ও মিশর সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। অতএব পশ্চিমের প্রাচীন দুই মহান সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার অঙ্গন, আলেকজান্দ্রিয়ায় অশোকের ধম্ম-দূতেরা পা রাখলেন তাঁদের পূর্বের জ্ঞান ও সংস্কৃতি নিয়ে। এর প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী, কারণ তাঁদের প্রাচ্য জ্ঞানের প্রভাবেই পরবর্তীকালে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাস। কিন্তু সে কথা আসবে পরবর্তী পর্বে।  

গ. ম্যাসিডোনিয়ার রাজা অ্যান্টিগোনাস গোনাটাস (২৭৮ – ২৩০ বি.সি.ই)

ঘ. সাইরেনির মেগাস (King Magas of Cyrene, Libya) (২৮২-২৬১ বি.সি.ই)

ঙ. এপিরাসের আলেক্সাণ্ডার 2 (Alexander II of Epirus, Greece-Albania) (২৭২-২৪২ বি.সি.ই)

এই রাজাদের সকলেই ছিলেন গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডারের সেনাপতিদের বংশধর। যাঁরা আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন। 

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৩/৮ "



[1] ব্রাহ্মীলিপির সীমিত প্রচলন বহুদিন আগে থেকেই যে ভারতের রাজকোষ ও বণিক-সমিতিতে প্রচলিত ছিল, একথা সহজেই অনুমান করা যায়। তা নাহলে বিম্বিসার, অজাতশত্রু, প্রসেনজিৎ, চণ্ডপ্রদ্যোত কিংবা নন্দরাজারা রাজ্য এবং সাম্রাজ্যের কর আদায়ের হিসাব কীভাবে রাখতেন? নন্দরাজারা যে নতুন ভূমি আইন প্রবর্তন করলেন, তার জন্যেও তো বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হয়েছিল। চাণক্য সেই তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করেই আরও উন্নত ও জটিলতর অর্থনীতির সৃষ্টি করেছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনায়। বিদিশা, শ্রাবস্তী, উজ্জয়িনী বা কৌশাম্বীর বিখ্যাত বণিকরাই বা তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে কষতেন? অতএব, রাজা ও বণিকদের কোষাগারে করণিক বা কায়স্থদের হাতে এতদিন যে ব্রাহ্মীলিপি বন্দী হয়ে ছিল, সম্রাট অশোক তাকেই সর্বসাধারণের জন্যে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। 

[2] বোধিবৃক্ষর বিনাশ নিয়ে অনেকগুলি বিতর্কিত জনশ্রুতি শোনা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকেরই কোন এক রাণি নাকি প্রথমবার এটিকে কেটে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পুরোপুরি সফল হননি। এর পর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা করেছিলেন গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক ৬১০-৬১৫ সিই-র কোন সময়ে – তিনি বোধিবৃক্ষটিকে সম্পূর্ণ কেটে ফেলেছিলেন। যদিও কয়েক বছর পরে, এই গাছের শিকড় থেকে নতুন গাছের উদ্ভব হয়। এরপর গাছটি ১৮৭৬ সালের এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়। স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহাম, যিনি Indian Archaeological Survey-র প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন, ১৮৮০ সালে সিংহলের অনুরাধাপুরম থেকে বোধিবৃক্ষের চারা এনে একই জায়গায় রোপণ করেন। সেই গাছই এখন দেখা যায়।



সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫

এক যে ছিলেন রাজা - ৬ষ্ঠ পর্ব

 

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "




[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের পঞ্চম পর্ব - "এক যে ছিলেন রাজা - ৫ম পর্ব


১৩

 

নটী বিদ্যুল্লতার কথা অনেকের কাছে শুনে মহারাজা বেণের মনে যে কল্পনা ছিল, বাস্তবে নটী বিদ্যুল্লতা তার থেকেও অনেক বেশি রমণীয়। নৃত্যে, অভিনয়ে, সঙ্গীতে, রূপে, লাস্যে, আলাপে এবং আলাপের ভঙ্গীতে অনুপমা। এমনটি মহারাজ বেণ আর দ্বিতীয় দেখেননি। প্রথম সাক্ষাতেই মহারাজ বেণ মুগ্ধ হয়েছিলেননটী বিদ্যুল্লতার নাচ দেখে গান শুনে সে মুগ্ধতা বেড়েছে। নাচ-গানের শেষে যখন তাঁরা আলাপে বসলেন, কোথা দিয়ে যে সারাটা রাত কেটে গেল বুঝতেই পারেননি। প্রত্যূষের পাখিদের কূজনে তাঁদের আলাপ যখন সমাপ্ত করতে হল, তখন আসরের দিকে তাকিয়ে নটী বিদ্যুল্লতা ও মহারাজা বেণ উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। নটী বিদ্যুল্লতার বাদ্যকরগণ ও অন্যান্য সহচরীগণ, ঢালাও গদির উপর বিছানো সাদা চাদরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এমনকি মহারাজা বেণের সহচর উপনগরপাল শক্তিধর, তিনিও অদ্ভূত ভঙ্গিতে নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তেলের অভাবে দীপাধারের অধিকাংশ দীপ নিভে গেছে, দু একটা ক্ষীণ জ্বলছে ঘুম জড়িয়ে আসা চোখের মতো। সুগন্ধী ছড়াতে থাকা ধুপ, নিঃশেষ হয়ে গেছে কবেই। ধুপদানের নিচেয় স্তূপ হয়ে জমে উঠেছে ছাই। তাজা সুবাসিত অজস্র ফুলের মালায় সেজে উঠেছিল প্রমোদ কক্ষ, সেই মালা এখন ম্লান, ফুলের শুকনো পাপড়ি ঝরে পড়ছে এক আধটা।

“আজকের রাতটা কী করে এত সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল, দেবী বিদ্যুল্লতা? গতকালও বিনিদ্র রজনী যেন অনন্ত রাত্রি মনে হচ্ছিলঅথচ আজ সেই রাত্রি যেন পলক পাতে ঊষার দরজায় পৌঁছে গেল!” মুগ্ধ হাসি নিয়ে মহারাজা বেণ নটী বিদ্যুল্লতার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন।

নটী বিদ্যুল্লতার চোখে ক্লান্তিহীন কটাক্ষ, অধরে বিলাসী হাসি নিয়ে বললেন, “গত রজনীতে আমি আপনার সামনে ছিলাম না যে, মহারাজ বেণআপনার চিন্তায় ছিল রাজ্য শাসনের দুশ্চিন্তা। আজ আমাদের মিলনে, আপনি চিন্তা মুক্ত হতে পেরেছেন, মহারাজ”

অত্যন্ত খুশি মনে, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গ-ধন্য মহারাজ বেণ উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “দেবী বিদ্যুল্লতা, রাত্রি জাগরণে আপনি যদিও পরিশ্রান্ত, তবুও আজ দ্বিপ্রহরে আমার উদ্যান বাটিকা পরিদর্শনের জন্যে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিযদি অত্যন্ত অসম্ভব না হয়, তাহলে আমার সঙ্গে চলুন, এ আমার অনুরোধ”।

“অবশ্যই যাবো, মহারাজ। এ আপনার অনুরোধ হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে আদেশ। যে কদিন আপনার ছায়ায় রয়েছি, মহারাজ, আমার জীবন ও যৌবন আপনার সেবায় নিয়োজিতআপনার সঙ্গ কোনভাবেই আমার কাছে ক্লান্তিকর হতে পারে না, মহারাজআপনার সঙ্গী হতে আমি উন্মুখ হয়ে থাকবো। যখনই আপনার ডাক আসবে, আপনার এই দাসী উপস্থিত হবে”।

“খুব ভালো, দেবী বিদ্যুল্লতা, দ্বিপ্রহরে আমি প্রস্তুত হবার আগে আপনাকে সংবাদ পাঠাবো, এবং আপনার সঙ্গসুখ উপভোগের অপেক্ষায় থাকবো। এখন আমাদের সাময়িক বিচ্ছেদ আসন্ন, অনুমতি দিন, দেবী বিদ্যুল্লতা”।

“এ বিচ্ছেদ আমার কাছে আদৌ সুখপ্রদ হবে না, মহারাজ। আপনার সঙ্গসুখ বিনা এই রাজ্যবাস আমার কাছে বনবাসের মতো। অন্যদিকে আপনার রাজকার্যে বিঘ্ন ঘটুক তাও আমার কাম্য নয়। অতএব বিরহ বিচ্ছেদ অনিবার্য, কিন্তু আপনার আহ্বানের প্রতীক্ষায় আমি বসে থাকব, মহারাজ”। নটী বিদ্যুল্লতার নত মুখ বেদনায় ভারাক্রান্ত। মহারাজ বেণ আশ্চর্য হলেন, নটী বিদ্যুল্লতার আন্তরিকতায়। একজন বিখ্যাত নটীর এমন আচরণ তাঁকে আপ্লুত করে তুলল। তিনি মনে মনে বললেন, “তোমাকে ছেড়ে আমিও কি শান্তি পাবো, হে ললনে?”

প্রিয়সখা উপনগরপাল শক্তিধরকে ঘুম থেকে তুলে মহারাজ বেণ, প্রমোদ কানন ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর প্রাসাদের অন্তঃপুরে প্রবেশের মুখে মহারাজ বেণ একবার ফিরে তাকালেন প্রমোদ কাননের দিকে। দেখলেন নটী বিদ্যুল্লতা প্রমোদ কাননের সদরে দাঁড়িয়ে আছেনসুসজ্জিত দরজার প্রেক্ষাপটে সকালের স্নিগ্ধ আলোকে, দাঁড়িয়ে থাকা নটী বিদ্যুল্লতার ওই জীবন্ত প্রতিমা, তাঁর মনে এঁকে দিল অদ্ভূত প্রীতির অনুভব। এই নারী অনন্যা!

 স্নান ও প্রসাধন সেরে মহারাজ বেণ খুব সামান্য প্রাতরাশ করলেন। তাঁর সমস্ত মন জুড়ে এখন অদ্ভূত মাধুর্য। রাত্রি জাগরণের কোন ক্লান্তি কিংবা কোন অবসাদের লেশ মাত্র নেই তাঁর মনে অথবা শরীরে। বিশ্রামের জন্যে নয়, নিরিবিলিতে নিশ্চিন্ত চিন্তার জন্যে তিনি শয্যায় অর্ধশায়িত হলেন। বিগত সন্ধ্যায় নটী বিদ্যুল্লতার অপূর্ব নৃত্য ও গীত। তারপর সারারাত্রি ধরে নটী বিদ্যুল্লতার সমস্ত আলাপ ও আচরণের প্রতিটি মূহুর্ত তাঁর মনে পড়তে লাগল। মাত্র এক রজনীর এই নারীসঙ্গ তাঁর জীবনে এনে দিয়েছে অদ্ভূত শান্তি ও তৃপ্তি। তাঁর চেতনায় এখন নটী বিদ্যুল্লতার শ্রীমুখ, আলাপে রত ওষ্ঠাধরের সঞ্চালন, তাঁর ভ্রূভঙ্গি, তাঁর দুই নয়নের নীরব ভাষা। মহারাজা বেণ চিন্তার অবগাহনে অনুভব করতে লাগলেন তাঁর একান্ত মুগ্ধতা এবং নির্ভরতা। মহারাজ বেণ নিশ্চিন্ত আনন্দে, নিশ্চিত ভাবে উপলব্ধি করতে লাগলেন, এই নারীর প্রতি অনাস্বাদিত ভালোবাসার অনুভব। এমন নির্ভার ভালোবাসার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এই প্রথম।

“মহারাজ, আপনি কি নিদ্রিত”? খুব অস্ফুট স্বরের ডাক মহারাজ বেণের চিন্তার জাল ছিন্ন হল। তিনি বিরক্ত হলেন। নিমীলিত চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর সামনে নতমস্তকে করজোড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রিয়সখা উপনগরপাল শক্তিধর। মহারাজ বেণ বিরক্তমুখে শয্যায় উঠে বসলেন, বললেন, “কোন জরুরি সংবাদ, শক্তিধর?”

উপনগরপাল শক্তিধর খুবই বিনীত স্বরে বললেন, “না মহারাজ, তেমন কিছু নয়। আজ রাজসভায় যাবেন কিনা, সেটাই জানতে এলাম। সভায় সকলে আপনার প্রতীক্ষায় রয়েছেন”।

“আজ সভার কাজ স্থগিত করে দে, শক্তিধর। সভা ভঙ্গ করে আমার উদ্যান-বাটিকা যাওয়ার প্রস্তুতি কর। আমার সঙ্গে দেবী বিদ্যুল্লতাও যাবেন। দেখিস কোন রকম বিঘ্ন যেন না আসে, নিরাপদ, নিশ্চিন্ত যাত্রা হওয়া চাই। তুই আমাদের সঙ্গে থাকবি”।

খুব কুণ্ঠিত স্বরে উপনগরপাল শক্তিধর বললেন, “প্রজাদের একটা বিক্ষোভ হবার সম্ভাবনা রয়েছে, মহারাজ। আজই যাবেন, আগামীকাল গেলে চলত না?”

“প্রজাদের বিক্ষোভ? কোথায়? কোন প্রজাদের? প্রজাদের এত সাহস হচ্ছে কী করে, শক্তিধর?”

“যে প্রজাদের গৃহচ্যুত করে, আমরা পাথর আর ইঁটের টুকরো নিয়ে এসেছিলাম, তারা, মহারাজ। গতকাল রাত্রেই তাদের নেতাকে বন্দী করে এনে কারাগারে নিক্ষেপ করেছি, মহারাজ। হয়তো কিছুই হবে না, তাও সাবধান হওয়া ভালো”।

“বিক্ষোভের ভয়ে রাজা বেণকে ঘরে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে, শক্তিধর? কী বলছিস কি, তুই? ওই বিক্ষোভের নেতাকে এখনই প্রকাশ্য রাজপথে শূলে চড়া। সকলে দেখুক, রাজা বেণের বিরোধিতার কী ফল হয়। আর যেভাবেই হোক পরিস্থিতি সামলে নে, আমি দেবী বিদ্যুল্লতাকে কথা দিয়েছি, আজ উদ্যান-বাটিকায় নিয়ে যাবো। তার অন্যথা আমি সহ্য করবো না, শক্তিধর”।

মহারাজ বেণের এই আদেশে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উপনগরপাল শক্তিধর বললেন, “তাই হবে, মহারাজ। আপনার প্রত্যেকটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে। আপনি নিশ্চিন্তে দেবী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে উদ্যান-বাটিকা পরিদর্শনে চলুন, আমি থাকতে আপনার কোন বিঘ্ন ঘটবে না”।

“অতি উত্তম, শক্তিধর। তোর থেকে আমি সর্বদা এমনটাই আশা করি”। মহারাজ বেণের মুখে প্রশ্রয়ের হাসি।

একটু দ্বিধা নিয়ে উপনগরপাল শক্তিধর বলল, “একটা কথা ছিল, মহারাজ। একটা সামান্য সন্দেহের কথা; মহারাজের অবগতির জন্যে বলতে চাই”।

“কী কথা, শক্তিধর, এত দ্বিধা করছিস কেন? বল না!”

“মহারাজ, দেবী বিদ্যুল্লতা আমাদের রাজ্যে এসেছেন, কার আমন্ত্রণে? আমি যতদূর জানি, আপনি করেননি। দেবী বিদ্যুল্লতা সাধারণ কোন নারী নন, ওঁনার মতো ব্যক্তিত্ব বিনা আমন্ত্রণে পররাজ্যে আসবেন, এমন হতে পারে না। তাহলে কে সেই অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি, যাঁর আমন্ত্রণ স্বীকার করে এই রাজ্যে এসেছেন দেবী বিদ্যুল্লতা?”

উপনগরপাল শক্তিধরের মুখে দেবী বিদ্যুল্লতার নাম উচ্চারণ শুনে প্রথমে অত্যন্ত অপ্রসন্ন হলেন মহারাজ বেণ। কিন্তু সামান্য চিন্তা করার পর মহারাজ বেণ উপনগরপাল শক্তিধরের বক্তব্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন। অনেকক্ষণ কোন কথা না বলে, তিনি তাকিয়ে রইলেন উপনগরপাল শক্তিধরের মুখের দিকে, তারপর বললেন, “যে প্রভাবশালী ব্যক্তির আমন্ত্রণে দেবী বিদ্যুল্লতা এই রাজ্যে এসেছেন, তাকে তো তুইই খুঁজে বের করবি, শক্তিধর। এটাই তোর কাজ। সে কথা আমি কী করে বলব? তোর কী মনে হচ্ছে, কে হতে পারে এই রাজ্যে? এই রহস্যটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার, তোর না আমার, শক্তিধর?”

“অবশ্যই আমার, মহারাজ। সে কাজে আমি ইতিমধ্যেই আমার সবচেয়ে দক্ষ লোকদের লাগিয়ে রেখেছি। তবু আমার মনে হয়েছিল, আপনাকে এই সংবাদটা দেওয়া জরুরি, আর অনুসন্ধানের জন্যে আপনার অনুমতিরও প্রয়োজন ছিল”।

“তোর কী মনে হচ্ছে, এ রাজ্যে দেবী বিদ্যুল্লতাকে আমন্ত্রণ দেওয়ার মতো লোক কে হতে পারে? কোন ধনী শ্রেষ্ঠী হতে পারে না?”

“হতে পারে, মহারাজ। এই নগরে ধনী শ্রেষ্ঠীর অভাব নেই। কিন্তু দেবী বিদ্যুল্লতা আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছেন, এ সংবাদ পাওয়ার পর, আমরা তাঁকে রাজপ্রাসাদের আতিথ্য গ্রহণের নিমন্ত্রণ করেছিলাম। উনি সে প্রস্তাব এককথায় মেনে নিয়ে, গত তিনদিন প্রাসাদেই রয়েছেন। এই তিনদিনে কেউ আসেনি তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে, যদি কেউ নিমন্ত্রণ করে থাকে, সে কী একবারের জন্যেও আসত না, কিংবা কোন দূত পাঠাতো না, মহারাজ?”

“তাহলে তো মিটেই গেল, শক্তিধর! তার মানে কেউই আমন্ত্রণ করেনি। দেবী বিদ্যুল্লতা এসেছেন নিজের ইচ্ছাতে, হয়তো তীর্থ দর্শন আর দেশ ভ্রমণের উদ্দেশে! তিনি জানতেন না, সম্প্রতি আমার আদেশে সমস্ত মন্দিরে পুজো পার্বণ বন্ধ। এখন আমাকে অসন্তুষ্ট করে নিশ্চয়ই তিনি তীর্থ ভ্রমণে যাবেন না”।

উপনগরপাল খুব চিন্তিত মুখে বললেন, “হতে পারে, মহারাজ, এমনও হতে পারে। কিন্তু আর মাত্র কয়েকদিন পরেই বর্ষা শুরু হয়ে যাবে। দেশভ্রমণ বা তীর্থদর্শনের পক্ষে এখন অত্যন্ত অসময়। শরতের পর হেমন্ত ঋতু দেশভ্রমণের পক্ষে প্রশস্ত। আপনার কথাই হয়তো ঠিক। তবু আমি অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে চাই, মহারাজ, যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে”।

“আমার কোন আপত্তি নেই, শক্তিধর। তোর অনুসন্ধান করা কর্তব্য, তুই অনুসন্ধান করকিন্তু দেবী বিদ্যুল্লতার অকারণ কোন অসম্মান যেন না হয়, সেটাও লক্ষ্য রাখিস, দেবী বিদ্যুল্লতা আমাদের রাজ্যের সম্মানীয়া অতিথি”।

“সে কথা বলাই বাহুল্য, মহারাজ। এখন আমাকে অনুমতি দিন, মহারাজ। আমি যাই, আপনাদের দুজনের উদ্যান-বাটিকা যাওয়ার প্রস্তুতি করি”।

“যা, শক্তিধর, দেখ যাওয়ার পথে, কোন বিঘ্ন যেন না আসে”।

“আসবে না, মহারাজ। আপনার শক্তিধর যতক্ষণ আছে, আপনার কোন বিপদ হতে দেবে না, মহারাজ। আরেকটা অনুরোধ, মহারাজ”।

“আবার কিসের অনুরোধ, শক্তিধর?”

“আপনি দয়া করে, অঙ্গে কবচ আর শিরস্ত্রাণ পড়বেন”

“আমি কী রণক্ষেত্রে যাচ্ছি, শক্তিধর? তুই কিসের এত আশঙ্কা করছিস বল তো? আমার নিজের রাজ্যে, রাজধানী থেকে অনতিদূরে, রণসাজে সেজে আমার উদ্যানবাটিকায় যাবো? সীমান্তে যুদ্ধ করতে যাওয়া ছাড়া, রাজ্যের ভিতরে আমার পিতা মহারাজ অঙ্গকে কোনদিন কবচ পড়তে দেখিনি, শক্তিধর!”

“আমার স্পর্ধা ক্ষমা করবেন, মহারাজ। আপনার পিতা মহারাজ অঙ্গ ছিলেন, আপামর রাজ্যবাসীর নয়নের মণি, অজাতশত্রু। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রত্যেকের কাছে শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন”।  

পিতার প্রশংসায় বিরক্ত মহারাজ বেণ বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুই এখন যা। আমি দেখছি কী করা যায় - এই গরমে লৌহজালিক গায়ে চড়ানোর মতো বিড়ম্বনা আর হয় না”।

উপনগরপাল শক্তিধর, মহারাজ বেণকে নত মস্তকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেলেন। মহারাজা বেণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর চলে যাওয়ার দিকে। শক্তিধর কিসের ভয় পাচ্ছে? তাঁর কপালে এখন চিন্তার গভীর খাঁজ, অদৃশ্যে কোথাও কী কোন ষড়যন্ত্র গড়ে উঠছে?    

 

১৪

 

বেদব্রত ও ধর্মধরকে নিয়ে বিশ্বপ্রভ বেরিয়ে যাওয়ার পর, মহর্ষি ভৃগু উপস্থিত সকল শিষ্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের এই পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপের কাজের ভার ন্যস্ত হল বেদব্রত ও ধর্মধরের ওপর। এবার দ্বিতীয় পদক্ষেপ। বর্তমান রাজার অপসারণ। কীভাবে? হঠাৎ বিদ্রোহ, গণ আন্দোলন, রাজাকে গৃহবন্দী? নাঃ সে পথে অনেক রক্তক্ষরণ, অশান্তি, অবিশ্বাস, সাফল্য-ব্যর্থতার দোলাচল, এ আমি চাইছি না। তাহলে অন্তঃপুরে ঘাতক পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা? তাতেও অনেক ঝুঁকি। ঘাতক ধরা পড়লে বা বিশ্বাসঘাতকতা করলে ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাবে। তাতে আমরা এবং আমাদের সঙ্গে জড়িত সমস্ত মানুষ চরম বিপদে পড়ে যাবে। এই দুই পন্থাই আমার মনোমত নয়। তার কারণ এই নয় যে আমরা বিপদে পড়ে যাবো, এই ভয় আমি পাচ্ছি। আমি ভয় পাচ্ছি, এই দুই উপায়ে আমরা ব্যর্থ হলে, বর্তমান রাজা সতর্ক হয়ে যাবে। আরো সন্দিগ্ধ হয়ে উঠবে, আরো নৃশংস হয়ে উঠবে। আমাদের পক্ষে রাজাকে অপসারণের পরবর্তী প্রচেষ্টা হয়ে উঠবে সুদূরপরাহত ও অনির্দিষ্ট”

মহর্ষি ভৃগু চুপ করলেন, উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করলেন। সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিলেন মহর্ষি ভৃগুর দিকে। তাঁদের সকলেরই বিশ্বাস, মহর্ষি ভৃগুই জানেন কোনটি নিশ্চিত পন্থা! মহর্ষি ভৃগু আবার বলতে শুরু করলেন, “অন্য একটি উপায় আমার চিন্তায় রয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই পন্থায় আমরা নিশ্চিতভাবেই বর্তমান রাজাকে নির্বিঘ্নে অপসারণ করতে পারবো। কিন্তু সেই পন্থায় আমাদের চিরাচরিত নৈতিকতাকে কিছুদিনের জন্যে নির্বাসিত করতে হবে”।

আচার্য সুনীতিকুমার উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “কী সেই পন্থা, আচার্য?”

সুনীতিকুমারের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, তারপর বললেন, “ধরো, বর্তমান রাজা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রবল পীড়িত। তাঁর পক্ষে রাজ্যচালনা তো দূরের কথা, অসাড় জড়ের মতো পঙ্গু হয়ে উঠলেন। উত্থানশক্তি রহিত, অপরের সাহায্য ছাড়া নিজের জীবনধারণ করতেও অপারগ। রাজা এখনো অবিবাহিত, অতএব উত্তরাধিকারহীন। সেক্ষেত্রে আমরা জনগণের স্বার্থে, রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে, রাজ্যপরিচালনায় হস্তক্ষেপ করতেই পারি। আমরা আমাদের মনোনীত ব্যক্তিকে সিংহাসনে বসাতেই পারি”

আচার্য রত্নশীল বললেন, “রাজার এই অসুস্থতা কোন মন্ত্রবলে আসবে, আচার্য? রাজা বেণ, সুস্থ সবল নব্য যুবক। তিনি কবে অশক্ত, অথর্ব, পীড়িত হবেন, সেই আশায় আমরা অপেক্ষা করবো, আচার্য?”

একথার উত্তরে আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন, “কোন মন্ত্র নয়, মিত্র রত্নশীল, ওষধি। ওষধি প্রয়োগে সুস্থ সবল মানুষকে অসুস্থ করে তোলা সম্ভব”।

“বিষ? আমরা বিষ প্রয়োগ করবো? আপনি আমাদের এমন শিক্ষা তো দেননি, গুরুদেব? এ তো চরম কাপুরুষতা, নিন্দনীয়, অনৈতিক”। আচার্য রণধীর মহর্ষি ভৃগুকে বললেন।

উত্তরে আচার্য সুনীতিকুমার বললেন, “রণধীর, নীতির বিরুদ্ধে নীতিগত লড়াইটা জরুরি হতে পারে, কিন্তু নীতিহীনতার বিরুদ্ধে নীতিহীন হলে, আমাদের বিবেকের দংশন হলেও, অনৈতিক হয়তো হয় না। যে রাজা নিরীহ প্রজাদের গৃহ অকারণ ধ্বংস করে তাদের নিরাশ্রয় করে, যে রাজা বিচারপ্রার্থী নিরীহ বৃদ্ধকে অত্যাচার করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় যে রাজা ধর্ষিতা কন্যাকে বিনা বিচারে দুশ্চরিত্রা ঘোষণা করে, নিজের আশ্রিতদের অপরাধ আড়াল করে, সেই রাজা আততায়ী। শুধু তাই নয়, এই রাজার পিতা, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় মহারাজ অঙ্গের পরিণতি নিয়েও আমাদের সকলেরই মনে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাঁর অকস্মাৎ অন্তর্ধানের পিছনে, বর্তমান রাজার ষড়যন্ত্র থাকাও বিচিত্র নয়!”

“এসব অভিযোগ নিয়ে আমার কোন দ্বিধা নেই। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে নীতিহীনতা কোনদিন শুভ হতে পারে না। ধর্মযুদ্ধ করে রাজার বিনাশ করাই এই ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তব্য।

“ঠিক কথা। বীরের মতো যুদ্ধ করে, দুই পক্ষের অজস্র লোকের মৃত্যু হলে, অজস্র লোক আহত হয়ে বিকলাঙ্গ হলে, দারুণ শুভ হবে! এবং সেই যুদ্ধেরও পরিণতি, হয় বর্তমান রাজার মৃত্যু অথবা আমাদের”।

আচার্য সুনীতিকুমারের এই কথায় আচার্য রণধীর ম্লান হাসলেন, বললেন, “যুক্তির দিক থেকে তোমার কথা ফেলতে পারছি না, মিত্র, কিন্তু মন থেকে তেমন সাড়াও পাচ্ছি না”।

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা না বলে, দুই শিষ্যের আলাপ শুনছিলেন। তিনি এতক্ষণ সকলের দিকেই লক্ষ্য রাখছিলেন। শিষ্যদের মধ্যে এই প্রস্তাব ও তার বিতর্কে কার কী প্রতিক্রিয়া সেটা অনুভব করছিলেন।

এবার তিনি বলতে শুরু করলেন, “আমি প্রথমেই বলেছিলাম, রাজনীতিতে শঠতারও একটা জায়গা আছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে শঠতাই আমাদের নিশ্চিত সাফল্য এনে দিতে পারে। এ নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। বরং বলব, বিতর্ক চলতে থাকুক, কারণ এই বিতর্ক থেকেই আমরা একদিন সিদ্ধান্তে পোঁছে যেতে পারি। আপাততঃ, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ, ঔষধ প্রয়োগ। বৎস বিশ্ববন্ধু এই দায়িত্ব তোমার। এমন এক ওষধি চয়ন করো, যার প্রয়োগে বর্তমান রাজা যেন ধীরে ধীরে জড়ত্বলাভ করে। দশ ইন্দ্রিয় অসাড় হয়ে যাক, টিকে থাক শুধু জীবনটুকুযার মাধ্যমে এই ওষধি প্রয়োগের পরিকল্পনা আমি নিয়েছি, আমি চাই না, সেই নিরীহ মানুষটি নরহত্যার দোষে দুষ্ট হয়”।

“ওষধি চয়নে এক সপ্তাহ সময় দেবেন তো, গুরুদেব”? আচার্য বিশ্ববন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন।

“এক সপ্তাহ কি যথেষ্ট, বৎস বিশ্ববন্ধু? আমি তোমার জন্যে এক পক্ষকাল ভেবে রেখেছিলাম। তুমি প্রস্তুত হলেই আমাকে বার্তা দেবে। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে, তোমার কাছে লোক পৌঁছে যাবে। তুমি তার হাতে ওষধি তুলে দেবে, বুঝিয়ে দেবে ওষধি প্রয়োগের মাত্রা, বিধি-নিষেধ আর পদ্ধতি”।

“লোকটি কে, গুরুদেব”?

“সে কথা এখন থাক, যথা সময়ে আমি তোমাকে জানিয়ে দেব, বিশ্ববন্ধু। এবার আমাদের তৃতীয় পদক্ষেপ। রণধীর, সম্যক যুদ্ধের আপাততঃ আমাদের কোন পরিকল্পনা নেই। কিন্তু রাজ্যের সর্বত্র এবং রাজ প্রাসাদের নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যেও তুমি তোমার প্রভাব সঞ্চার করো। বর্তমান রাজার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বাইরে, সাধারণ সেনানায়ক এবং সৈন্য সামন্তদের মনে ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ বপন করো। প্রকৃতপক্ষে, তারাও গৃহস্থ মানুষ, যুদ্ধের পেশায় নিরত বলেই, তারা অত্যাচারী রাজার আজ্ঞাবহ নাও থাকতে পারে। রাজার আদেশে ঘটতে থাকা প্রত্যেকটি অন্যায় অবিচারের কাহিনী তাদের কানে সবিস্তারে পৌঁছে দাও। বার্তা পাঠাও এই রাজার রাজত্বে কেউই নিশ্চিন্ত নিরাপদ নয়। এ রাজার কাছে সুবিচার আর সহানুভূতির কোন স্থান নেই”

“তাই হবে, গুরুদেব। রাজা অসুস্থ হয়ে পড়লে, তার সহকারিদের কেউ যাতে এই সেনা বাহিনীর সাহায্য না পায়। রাজার অসুস্থতার সুযোগে, তাদের কেউ যেন রাজা হয়ে না বসে, আপনি সেটাই লক্ষ্য রাখতে বলছেন, গুরুদেব”

“ঠিক বলেছ, রণধীর। রাজার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র শক্তিধর, ভীষণ উচ্চাকাঙ্খী আর লোভী। সে সুযোগ পেলে, অসুস্থ হতে থাকা এই রাজাকে হত্যা করেও, সিংহাসন অধিকার করতে পারে”।

মহর্ষি ভৃগু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সকলের মুখের ওপর চোখ বুলিয়ে বললেন, “প্রিয় সুনন্দ, তুমি সুরের মানুষ, সঙ্গীতের মানুষ, তোমার শিল্পী মন। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো এই সব ক্রূর ষড়যন্ত্রের মধ্যে তোমার কী কাজ? তোমার কাজ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তোমাকে অনেক অনেক গান রচনা করতে হবে। এই রাজ্যের প্রতিটি শহরে, গ্রামে, সাধারণ মানুষ আজ, রাজার অদ্ভূত আদেশে বিভ্রান্ত, বিচলিত, আতঙ্কিত। তাদের মনে ফিরিয়ে আনতে হবে বিশ্বাস, আস্থা আর শান্ত জীবনের নিবিড় চেতনা। সে কথা গম্ভীর শাস্ত্র কথায়, বাণীতে হবার নয়। ওদের ভাষায়, ওদের সুরে তোমাকে গান বাঁধতে হবেসে গান ওদের মন ছুঁয়ে যাক, মন্ত্রের মতো গেঁথে থাকুক মনের ভেতর। তুমি চারণ কবি হয়ে ওঠোভবিষ্যতের সোনালী দিনের স্বপ্নমাখা গান বাঁধো। গান বাঁধো খুব ভালো এক রাজার কীর্তি নিয়ে। সে রাজা প্রজার দুঃখে কাঁদে। সুবিচারে নিজের সন্তানকেও ক্ষমা করে না। বন্যা, খরা, ঝড়-ঝঞ্ঝায় প্রজাদের পাশে থাকে। অসময়ে রাজকোষ খুলে দু হাত ভরে প্রজাদের সাহায্য করে সে রাজা মহাবীর, দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁকে মান্য করেন। তাঁর রাজত্বে দেবরাজ সুবর্ষা দেন, মাঠে মাঠে হেসে ওঠে প্রচুর ফসল। ঘরে ঘরে গাভীরা সন্তানবতী হয়, ক্ষীরের মতো ঘন দুধ জমে ওঠে তাদের পালানে। মনে রেখো সে রাজার নাম পৃথু, আর রাণির নাম অর্চ্চিকিন্তু ঘুণাক্ষরেও বর্তমান রাজার নিন্দা করো না। কোন বিরুদ্ধবাক্য বলো না। বর্তমান রাজার ভালো মন্দ কোন কিছু নিয়েই তোমার কোন বক্তব্য থাকবে না! কোনমতেই না!”

“যথা আজ্ঞা, গুরুদেব”সঙ্গীতাচার্য সুনন্দ মাথা নত করে স্বীকার করে নিলেন মহর্ষি ভৃগুর এই আদেশ। তিনি শিল্পী মানুষ, তাঁর মনে জটিল চিন্তা ভাবনার জায়গা নেই, গুরুদেবের আদেশ তাঁর শিরোধার্য।

কিন্তু অর্থনীতির আচার্য রত্নশীল মহর্ষি ভৃগুর এই কথায় অবাক হলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “গুরুদেব, এই সব গান কোন কাজে আসবে? আর যে রাজা এখনো সিংহাসনেই বসল না, সু কিংবা কু, কোন কীর্তিই করল না, তার মিথ্যা মহিমা প্রচারের অর্থ কী?”

মহর্ষি ভৃগু উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আচার্য সুনীতিকুমার বললেন, “গুরুদেব আপনার এই সঙ্গীত রচনার গূঢ় রহস্য আমি বোধহয় কিছুটা বুঝতে পেরেছি। যদি অনুমতি দেন মিত্র রত্নশীলকে বলি?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হেসে সম্মতি দিলেন, আচার্য সুনীতিকুমার বললেন, “রাজার অসুস্থতা যত বাড়বে, এই সব গান, সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ মনে তত আশা আর স্বপ্ন সঞ্চার করবে। এই রাজার রাজত্বের সমস্ত দুঃখ-দুঃস্বপ্ন ভুলে, তারা নতুন কল্পিত এক রাজা - পৃথুর রাজত্বের স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। সেই রাজত্বে তাদের স্বপ্নপূরণ হবে, আসবে তাদের সমৃদ্ধি। রাজা সিংহাসনে বসার আগেই, প্রজারা অচেনা অদেখা সেই রাজার অনুগত হতে থাকবে। এই নব্য রাজার রাজবংশের কোন গরিমা নেই, তাদের আশেপাশের গ্রাম থেকেই উঠে আসা কোন সাধারণ যুবকই যে এই রাজা, সে কথা তাদের মনেও থাকবে না”।

আচার্য সুনীতিকুমার এই পর্যন্ত বলে, মহর্ষি ভৃগুর দিকে তাকালেন। মহর্ষি ভৃগু স্মিত মুখে বললেন, “একদম ঠিক বলেছ, বৎস সুনীতিকুমার। কিন্তু আরও একটা দিকের প্রতি লক্ষ্য করোনি। অতি সাধারণ গ্রামের ছেলে হঠাৎ রাজ সিংহাসনে বসে, যদি বদলে যায়? বিপুল বৈভব আর ক্ষমতায় যদি সে দাম্ভিক আর বিলাসী হয়ে ওঠে? এই গান তাকে সর্বদা মনে করিয়ে দেবে তার কর্তব্য। এই সব আরোপিত মহিমার স্তুতিগান অনুযায়ী সে যদি নিজেকে তৈরি করতে না পারে, এই স্তুতি তার কাছে বিদ্রূপ বলে মনে হবে! এই গান শুধু যে রাজভবনের বৈতালিকের গান হয়েই থাকবে, তাও তো নয়! এই গান তার কানে আসবে, প্রাসাদের বাইরের পথে, ঘাটে, গ্রামে, গঞ্জে, শহরে, নগরে, নদীর ঘাটে – সর্বত্র। নিজেকে এই স্তুতিগানের উপযুক্ত করে তোলা ছাড়া, তার অন্য আর কিছুই করার থাকবে না, বৎস!”

মহর্ষি ভৃগুর কথা শেষ হতে, সকল আচার্য শিষ্যই একসঙ্গে তাঁকে নত হয়ে প্রণাম জানালেন। আচার্য সুনীতিকুমার বললেন, “গুরুদেব, আপনার দেখানো পথে, আমার স্থির বিশ্বাস, আমাদের সমৃদ্ধি আসবে, আসবে শান্তি। আপনি আমাদের সকলের, এই রাজ্যের সমস্ত সাধারণ মানুষের একমাত্র সহায়, আমাদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়। হে গুরুদেব, আমরা সকলেই আপনার শরণাগত। আপনাকে প্রণাম”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব

রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

পুজোর সেকাল ও মোদের পাড়ার কুকুরগুলো

 


এর আগের পর্ব -অজুহাতের রক্তপাত

পুজোর সেকাল

সেবার পুজোয় হায়ার সেকেণ্ডারির দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারলাম আমাদের হাড় জিরজিরে পিঠের দুপাশে চিকন চিকন পাখনা গজিয়েছেনা, চোখে দেখা মেলে না। বুঝে নিতে হয়। জামায় ডগ কলার। প্যান্টের তলাটা ঘন্টা। চুলে অমিতাভ।

গুরু, সেনজেঠুর ছোট মেয়েটা তোকে পরপর চারবার ঝারি দিল, মাইরি...অন গড, টপ সেজেছে...গুরু এইবেলা তুলে নে, ফাৎনা নড়ছে...

আরে, ওতো তিৎলি, ধুর ... ছোটবেলায় ওর সঙ্গে কত লুকোচুরি খেলেছি...

আমাদের পাড়ার বড়ো রাস্তার মোড়ে কর্পোরেশনের গেটের সামনে ঝরঝরে টেম্পো দাঁড়িয়ে থাকত একটা সারাটা দিবস। সারা হপ্তা। সারা মাহ। পুজোর চারদিন ভাঙা টেম্পোর কানায় পশ্চাৎ ঝুলিয়ে আমরা সাত আটজন।

কলেজস্কোয়্যারের পুজোর তখন ভীষণ নাম ডাক। মায়ের মুখটি খোদ রমেশ পাল ফিনিশ করতেন। থিম টিম আসতে তখনো বহু দেরী। গোলদীঘির চারপাড়ে আলোর বন্যা। চন্দননগরের চিকিরমিকির ঝিকিরঝিকির আলোর গপ্প সবে চালু হয়েছে। শেয়ালের টকসা আঙুর খাওয়া। এক কাক ন্যাজে ময়ুরের প্যাখম ঝুলিয়ে হেব্বি ন্যাজে গোবরে হচ্ছে অন্য কাকদের কাছে। নেকড়ের গলায় বোকা বকের সার্জারিপাব্লিক খুব খাচ্ছে। 

সবে সন্ধে আটটা কি সাড়ে আটটা। শেয়ালদা হয়ে নেবুতলার ঠাকুর সেরে আমহার্স্ট স্ট্রীটের দিক থেকে ধেয়ে আসত অনেক প্রজাপতি। তাদেরও মিহিন মিহিন পাখনা। চিকন চিকন চেকনাই। আশেপাশে ঝোপঝাড়, পাতা, কাঁটাসমেত ডালপালা যতই না কেন আড়াল করতে চেষ্টা করুক, ঠিক চারিচক্ষুর মিলন পপাত চ, মমার চ।

আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু বাপি, পয়লা নম্বরের হেগো রুগি। ব্যাটা হামেশা আমাশায় ভুগত, আর দ্যাখ না দ্যাখ প্রেমে পড়ত। তার ধারণা তার চোখে এমন কিছু আছে, যেমন নাকি অজগরের থাকে - ছাগলের চোখে চোখ পড়লেই ফিনিস...। সেই রকম। কতবার তার কেঠো পশ্চাতে নাতি মেরে আমরাই পায়ে চোট পেয়ে আয়োডেক্স মলেছি। ব্যাটা হাসত ফ্যাক ফ্যাক করে। সেই বাপির বরাদ্দ ছিল পুজোর চারদিন চারটি -

ষষ্ঠীর রাতে “হলেও হতে পারত” শ্বশুরের হাতে গাঁট্টা –“ডেঁপো ছোঁড়া, এই বয়েসেই বজ্জাতি?

সপ্তমীতে চার-পাঁচ প্রিয়সখী পরিবৃতা নায়িকার কমলকলি করে কানমলা –“অসব্য কলে না, সোনা, ললিপপ খাবে, না, খেলনা বিচকুট খাবে, মানা?

কেস ক্যান্টার, প্রেস্টিজে একমুঠো গ্যামাক্সিন। আর এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিল আমাদের পাড়ারই মিন্টুদা। উল্টোদিকের পানের দোকানে সিগারেট টানতে টানতে গম্ভীরমুখে খোরাকটা নিয়েছিল...এবং পরবর্তী আধা ঘন্টার মধ্যে আমাদের শান্তিদার চায়ের দোকানের নেড়ি কেলোও জেনে গিয়েছিল। কেলোকে লেড়ো বিস্কুট দিলে খুব লেজ নাড়ার চেষ্টা করত, কিন্তু লেজের চেয়ে কোমর আর পাছাটা হিলত বেশী। সে এক হাস্যকর প্রয়াস। ব্যাটার ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট বোধ হয়। ওই দ্যাখার জন্যে শান্তিদার দোকানে চায়ের চেয়েও লেড়ো বিক্রি হত মারকাটারি।

ওই যাঃ খেই হারিয়ে ফেলেছি। সে কথা হবে আরেকদিন। 

অষ্টমীতে আরেক কেলো। একাকিনী নায়িকা ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে। বাপি সিওর যে ওর চোখের জাদু খেটে গেছে। বাপি রয়ে সয়ে কাছ ঘেঁষে আপনার সঙ্গীরা ভিড়ে হারিয়ে গেছে বুঝি... বলে সবে খেজুর শুরু করেছে। ঢ্যাঙা এক ছোকরা পাশেই ল্যাম্পপোষ্টে লটকানো দড়ি থেকে সিগারেট ধরাচ্ছিল, সে সন্দিগ্ধ চোখে বাপিকে বলেছিল তোত্তাতে কি বে? কেলিয়ে বৃন্দাবন দেকিয়ে..., ফোট শা...

পুঁটিরাম আর মৌচাকের যত শালপাতাখেকো একটা ষাঁড় বসে ঝিমুচ্ছিল একটু তফাতে। দৌড়ে পালাতে গিয়ে তার ঘাড়ে উল্টে পড়েছিল আমাদের কঙ্কালসার বাপি। ঘাড়ে কঙ্কাল পড়ার জন্যে নাকি কে জানে, ষাঁড়টা ধড়মড় করে উঠে আচমকা ছুটতে শুরু করে দিল ভরা রাস্তা লোকজনের মাঝখান দিয়ে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি কান্ড।

পরে ভাঙাচোরা বাপিকে আমরা উদ্ধার করেছিলাম, হার্ডিঞ্জ হষ্টেলের উল্টোদিকে মেডিকেলের ফুটপাথ থেকে। যেখানে জনগণ হিসি করে ভাসিয়ে রাখত। 

নবমীতে বাড়ি থেকে বের হবার মতো অবস্থায় ছিল না বাপি। সকালে একবার ওর বাড়ি গেছিলাম খবর নিতে। বদখৎ গন্ধ ওর বিছানায়। পচা হিসি, হিংযের কচুরি, ষাঁড়। বসার ঘরে শুনলাম ওর বাবা, বাপির কানে খাটো ঠাকুমাকে বলছেন – “তোমার হীরের আংটি নাতি, কালকে কোন চুলোয় ছিল জান...? মুতের গাদায়...

বাপি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে বলল কালকের মেয়েটা টপ ছিল, জানিস তো। কিন্তু কি রুচি মাইরি। ওই লোচ্চাটার সঙ্গে...। ছ্যাঃ। রূপসী মেয়েগুলো না, মাথামোটা হয়। তা না হলে...আবার দীর্ঘশ্বাস


 

মোদের পাড়ার কুকুরগুলো

“তোদের পোষা বেড়ালগুলো, শুনছি নাকি বেজায় হুলো?...

ক্যান রে ব্যাটা, ইস্টুপিড? ঠেঙিয়ে তোরে করব ঢিট!” 

সুকুমার রায়ের এই লাইনের পরে, বেড়ালের ওপর কোন আদিখ্যেতা দেখানোর সাহস কোনদিন করিনি। কারণ “ইস্টুপিড” হিসেবে আমার যথেষ্ট নাম ডাক আছে – নাহক বেড়াল পুষে সেটাকে বাড়াবার কোন মানে হয় না। 

তার চেয়ে কুকুর ভাল। এদের পুষতে হয় না। নিজেরাই পোষ মেনে নেয়। রাস্তায় ঘাটে চায়ের দোকানে বিশেষ লাই না দিলে মাথায় কেন – ঘরে ঢোকার আগেও বিশবার ভাবে। না, আমি কোন ডালমেসিয়ান, ল্যাব্রাডার, স্পিৎসের মতো খানদানি ঘরানার নীল রক্ত কুকুরের ভক্ত নই। যারা সোফা ছাড়া বসে নাকমোড ছাড়া পটি বা হিসি করে না। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে সিংহের কান্ডকারখানা দেখে, যারা মজা পেয়ে একবার দুবার মৃদু ভৌ বলে।

ঘরে না ঢুকলেও আমাদের একদম ঘরের ছেলে – দিশি কুকুর। কেউ বলে রোডেসিয়ান, কেউ বলে নেড়ি। উত্তর কলকাতায় আবার কাউকে কাউকে ফেতি কুকুর বলতেও শুনেছি। “ফেতি কুকুরের মতো তোর দরজায় পনেরদিন ঘুরছি দশটা টাকার জন্যে” – এমন কথা কোন এক উত্তমর্ণ বলেছিল তার অধমর্ণকে। যে সময়ে কথাটা কানে এসেছিল সে সময় দশটাকায় নিউ এম্পায়ারে দুটো ৬৫ পয়সার টিকিট উইথ দুটো অনাদির মোগলাই পরোটা আর চা খেয়ে দুটো চারমিনার হয়েও পাচঁ দশ পয়সা বেঁচে যেত।

কেলোর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শান্তিদার চায়ের দোকানে। একটু সাদা আর বেশীর ভাগটাই কালো বলে ওর নাম ছিল কেলোকেউ লেড়ো বিস্কুট হাতে তুললেই কেলোর অমোঘ দৃষ্টি চলে যেত বিস্কুটের ওপর। এতো ফোকাসড ম্যানেজার আর কাউকে আমি কোনদিন দেখিনি। দ্রুত গোল সেটিং এবং তৎক্ষণাৎ মার্কেটিংযে কনসেনট্রেট – অবিশ্বাস্য! আরও একটা ব্যাপারে ওর ঈর্ষণীয় আই কিউ ছিল – সম্ভাব্য কাস্টমার সিলেকসনে। আমরা লেড়ো নিলে কেলো যতটা মোটিভেটেড হত তার চেয়ে অনেক কম হত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের – রিকশাওলা, ঠেলাওলার হাতে লেড়ো দেখলে।

মার্কেটিংযের সম্ভাব্য সকলরকমের প্রসিডিওরে কেলো ছিল সিদ্ধথাবা। প্রথমে ঘন ঘন লাঙ্গুল সঞ্চালন ও মাঝে মাঝে মিহি স্বরে কুঁই কুঁই। তাতে চিঁড়ে না ভিজলে ফ্রি অফার আর ডিস্কাউন্ট হিসেবে স্যান্ডাল পড়া পায়ের গোড়ালিতে বা বুড়ো আঙুলে হাল্কা জিভের সুড়সুড়ি। সেটাতেই আমরা যারা একটু ইস্টুপিট প্রকৃতির – অর্ধভুক্ত বা সিকিভুক্ত লেড়োটি সমর্পণ করে দিতাম। যারা ওই সামান্য ফ্রি গিফট বা ডিস্কাউন্টে বধ না হতো, তাদের পায়ে কেলো থাবা দিয়ে থাপ্পি মারত আর ছোট্ট করে “ভুখ, ভুখ” নারা লাগাত। শেষমেশ “ধ্যাত্তেরি, শালার কুত্তা...” বলে তারাও লেড়োর অবশিষ্টাংশটি ফেলে উঠে চলে যেত অন্যদিকে। সফল কেলো লেড়োর সদ্ব্যবহার করত – হাড়গোড় ভাঙার সাউন্ড এফেক্ট কড়মড় শব্দে।

কেলো বাংলা বা ইংরিজি কোন মিডিয়ামেই লেখাপড়া করেনি – এমনকি ব্যাটাকে নিরক্ষর বললেও কম বলা হয়। চারটে শব্দ ভৌ, ভুখ, কেঁউ, কুঁই - ছাড়া কেলোর অভিধানে আর কিছু ছিল বলে মনে হয় না। সেলসম্যানদের সকাল সন্ধ্যের ফিল্ড মিটিং নাকি এই ধরনের চায়ের দোকানের কাছাকাছিই হয়। সেই শুনেই মনে হয় কেলোর এই ধরনের কীর্তি কলাপ।    

আমরা যারা ভাঙা টেম্পোয় পাছা ঝুলিয়ে কাল কাটাতাম, তারা শান্তিদার দোকান থেকেই চায়ের সাপ্লাই পেতাম। আর যুধিষ্ঠিরের সাথী ধর্মরাজ কুকুরের মতো বাচ্চুর সঙ্গে চলে আসত কেলো। বাচ্চু ছিল শান্তিদার হাত নুড়কুত। চা দিয়ে আসা, খালি কাপ ফিরিয়ে আনা, কাপ প্লেট গেলাস ধোয়া – এইসব ছিল তার কাজ। আজকে জলের দূষণ আর সংরক্ষণ নিয়ে চারদিকে সেমিনার, ওয়ার্কশপ আর ওয়েবসাইটের হিড়িক। জলের সংরক্ষণ কাকে বলে সেটা শিখিয়ে দিতে পারত বাচ্চু। এক মগ জলে আটত্রিশটা কাপ, ছাব্বিশটা প্লেট আর বিয়াল্লিশটা গেলাস অবলীলাক্রমে ধুয়ে ফেলতে পারত বাচ্চু।

সেই কেলোর ওপর অত্যাচারও কিছু কম করিনি আমরা। আমাদের সেই বন্ধু বাপি – যার স্বভাব যায় না মলে – সে ব্যাটা কালীপুজোর এক রাত্রে কেলোর ন্যাজে – উত্তর কলকাতার নোকগুনো লেজকে ন্যাজই বলত সে সময় – ফুলঝুরি বেঁধে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কেলো মিনিট কয়েকের জন্যে দিশেহারা ছুটে বেড়িয়েছিল বঙ্কিম চাটুজ্জ্যে স্ট্রীটের জমজমাট ভিড়ের মধ্যে। সেই করুণ দৃশ্য আজও চোখে লেগে আছে। ওই তল্লাটে আমাদের বেশ কদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছিল। আর বাপির হাড় ঠকঠকে পশ্চাতে নাতি মেরেও মনের শান্তি পাইনি আমরা। কারণ আমাদের সক্কলকেই বেশ কদিন আয়োডেক্স মলতে হয়েছিল আর ভাইফোঁটার পর স্কুল যেতে হয়েছিল নেংচে নেংচে।

এই ঘটনায় ভাগ্য ভাল যে কোন অঘটন ঘটেনি বা কেলোরও কোন শারীরক ক্ষতি হয় নি। কিন্তু আমাদের ওপর বিশ্বাসে ভাঙন ধরেছিল কেলোর। তারপরে কোনদিনই আর স্বাভাবিক হতে পারেনি কেলো। আমাদের দেওয়া লেড়ো নিত – কিন্তু খেত একটু দূরে দাঁড়িয়ে।  

কেলো আজ নিশ্চই আর নেই এই দুনিয়াতে। কুকুরের আয়ু দশ বারো বছরের বেশী হয় না শুনেছি। কেলোর আত্মার কাছে আমি অন্ততঃ ক্ষমাপ্রার্থী। বহুদিন আমরাও চলে এসেছি অন্য পাড়ায় সেখানে কেলো নেই। কিন্তু আছে ব্ল্যাকি, ব্রাউনি, শাইনি্রা...আমার কন্যার দেওয়া নাম। তারা সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট খাবারের পরিবর্তে নির্জন দুপুরে বা নিদ্রিত মধ্যরাত্রে পাড়া পাহারা দেয় নিয়মিত। এসকর্ট করে একলা বাচ্চাদের। দমদমে সকাল ছটা দশের উড়ান ধরতে বাড়ি থেকে বেরোতে হয় রাত প্রায় চারটের সময়। বড়ো রাস্তায় ট্যাক্সি না মেলা পর্যন্ত তারা গলির মুখটাতেই বসে থাকে। ট্যাক্সিতে উঠে বসলে ব্রাউনি বিলম্বিত আওয়াজ দেয় – ভৌউউউউ। তারপর তারা পাড়ায় ফিরে যায় একসাথে।

-০০-

এর পরের পর্ব - " ফাস-ক্লাস সিটিজেন "

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...