শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

বিপ্লবের আগুন - পর্ব ২

এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

আরেকটি  ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব - " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব " 





[প্রাককথাঃ  আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ হোক কিংবা প্রাচীন রাজতান্ত্রিক সমাজ – বিদ্রোহ, বিপ্লব সর্বদাই প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। নিরীহ, অনুন্নত এবং প্রান্তিক মানুষরা যুগেযুগে সেই বিদ্রোহের পথে যেতে কীভাবে উদ্বুব্ধ হয়েছিলেন এবং হচ্ছেন? কীভাবে তাঁরা অস্ত্র সংগ্রহ করেন? সেই বহুমূল্য অস্ত্রসম্ভার কি তাঁরা বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন? কোদাল চালানো কিংবা লাঙ্গল ঠেলার দক্ষতা যাঁদের সম্বল, কে তাঁদের আধুনিক অস্ত্র চালনায় শিক্ষিত করে তোলে? কার শক্তি ও উস্কানি তাঁদের রাষ্ট্রশক্তির চোখে চোখ রাখার স্পর্ধা যোগায়?  হয়তো কখনও তাঁরা পর্যুদস্ত হয়েছেন, কখনও ক্ষণস্থায়ী সাফল্য পেয়েছেন। আবার কখনও কখনও প্রবল প্রতাপ রাষ্ট্রকে তাঁরা পরাস্ত করে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেছেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতেও পুরোন বিদ্রোহ-বিপ্লবের আগুন নেভে না কেন?  কেনই বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব চলতে থাকে আবহমান কাল ধরে?]  

এই উপন্যাসের প্রথম পর্ব পড়া যাবে পাশের সূত্রে নাড়া দিলেই "বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১


[এই ফাঁকে প্রাচীন ভারতের দৈনিক কাল-বিভাগ নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেরে নেওয়া যাক। এই লেখায় সে প্রসঙ্গ বারবারই আসবে। আমাদের তিথি মতে যদিও দিনের হিসেবে কিঞ্চিৎ হেরফের হয়, তবু গড় হিসেব ২৪ ঘন্টাই ধরেছি।   

১ দিন = ৮ প্রহর = ২৪ ঘন্টা = ১৪৪০ মিনিট = ৬০ দণ্ড।

১ দণ্ড = ৬০ পল = ২৪ মিনিট = ১৪৪০ সেকেণ্ড।

১ পল = ২৪ সেকেণ্ড।

দিন-রাত্রির প্রহরের হিসাব কিছুটা এরকম –

দিনঃ-

প্রথম প্রহর – প্রভাত – ৬ AM থেকে ৯ AM; দ্বিতীয় প্রহর – পূর্বাহ্ন – ৯ AM  থেকে ১২ PM

তৃতীয় প্রহর – মধ্যাহ্ন – ১২ PM থেকে ৩ PM;  চতুর্থ প্রহর - অপরাহ্ন – ৩ PM থেকে ৬ PM

রাত্রিঃ-

প্রথম প্রহর – প্রদোষ – ৬ PM থেকে ৯ PM; দ্বিতীয় প্রহর – রজনী – ৯ PM থেকে ১২ AM

তৃতীয় প্রহর – নিশীথ (মধ্যরাত্রি) – ১২ AM থেকে ৩ AM; চতুর্থ প্রহর – প্রত্যূষ - ৩ AM থেকে ৬ AM]

 


এখন এই বেলা আড়াই প্রহরে রাজপথে পথচারীর সংখ্যা বেশ কমকয়েকজন রাজপুরুষ ঘোড়ার পিঠে দুলকি চালে নগর পরিদর্শন করছে। সকালের প্রথম প্রহরান্ত থেকেই বিপণিতে ক্রেতাদের ভিড় জমতে থাকে। এখন পথের দুধারের বিপণিগুলিও প্রায় ক্রেতাহীন। সূর্যের তেজ যত বাড়তে থাকে নাগরিক ক্রেতারা গৃহাভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। এই সময় বরং আশপাশের গ্রাম থেকে আসে গ্রাম্য লোকজন - ঘোড়া কিংবা গোশকটে। তাদের আশাতেই বণিকরা শূণ্য বিপণিতে ধৈর্য ধরে বসে থাকে। পড়শি বণিকদের সঙ্গে গল্পসল্প করে সময় কাটায়।   

সাধারণতঃ এই গ্রাম্য ক্রেতারা সরল হয়। কথার তুবড়িতে তাদের ভুলিয়ে ফেলা যায় সহজেই। তাদের সঙ্গে কিছুটা তঞ্চকতা করে, নাগরিক ক্রেতাদের তুলনায় বেশ দুকড়ি উপরিলাভ করে নিতে পারে বণিকেরা। তবে আজকাল গ্রাম্য ক্রেতারাও শহরমুখো হচ্ছে কম। আজকাল কিছুকিছু বণিক, গাধার পিঠে, বলদের গাড়িতে পসরা সাজিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। ঘরের মেয়েরা সরাসরি তাদের পছন্দ মতো বাসন-কোসন, রান্নার সরঞ্জাম, মশলাপাতি, কাপড়চোপড়, প্রসাধনী সামগ্রী হাতে নিয়ে, নেড়েচেড়ে, দেখেশুনে কিনতে পারে। কারণ শহরে আসে পুরুষরা। বাবা হোক, স্বামী হোক, ছেলে হোক, ভাই হোক – পুরুষরা পুরুষই। তারা মেয়েদের পছন্দের ব্যাপারটা তেমন বোঝে না। উপরন্তু তাদের মনে হয়, শহুরে বণিকদের বাকচাতুর্যে পুরুষরা বড্ডো বেশি ভেবলে যায়। তারা প্রায়ই ঠকে, রদ্দি জিনিষ কিনে আনে, বেশি দামে।

অতএব আজকাল মধ্যাহ্ন আহারে গৃহে যাওয়ার সময় পর্যন্ত শহরের বণিকদের সময় কাটে একঘেয়ে আলস্যে।

কিন্তু আজ তেমনটা হল না। বানজারা মেয়েদের একটি দল, গান গেয়ে আর নেচে নেচে রাজপথের একপাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের চলায় যেন গন্তব্যে পৌঁছনোর কোন তাড়াই নেই! নাচ ও গানের আনন্দেই তারা যেন মত্ত। তারা কোথা থেকে আসছে কেউ জানে না। কোথায় যাবে তাও কেউ জানে না। তাদের ভাষা দুর্বোধ্য। আশ্চর্য তাদের পোষাক-পরিচ্ছদ। ঝলমলে রঙদার – পরনে পা পর্যন্ত লুটোন ঘাগরা, বক্ষে চোলি। ওদের দলে আছে চারজন যুবক পুরুষ। বলিষ্ঠ চেহারা সকলের। তাদের পরনে রঙিন পাজামা আর কুর্তা। চারজনের মধ্যে তিনজন পুরুষ বাঁশি, ঝাঁঝর আর ব্যাঞ্জো বাজিয়ে নাচ গানের সঙ্গত করছে। তবে একজন – সেই মনে হয় সর্দার – দলের সবাইকে সামাল দিয়ে চলেছে। রাজপথের পথিকদের যেন কোন অসুবিধে না হয়, তাদের চলাফেরায় যেন কোন বিঘ্ন না আসে।

বিপণি থেকে মানুষজন পথের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। উপভোগ করছে বানজারা দলটির নাচগান আর ওদের উজ্জ্বল বর্ণময় উপস্থিতি। এবং তার থেকেও তারা বেশি উপভোগ করছে, মেয়েদের অপরূপ রূপ আর যৌবন। তরুণ ও যুবক বণিকরা উচ্ছ্বসিত, আঃ মেয়ে তো নয় – যেন একঝাঁক প্রজাপতি উড়ে চলেছে। তাদের সকলের মনেও এখন উড়ছে ওই প্রজাপতির দল। অন্যদিকে বয়স্ক-বিজ্ঞ বণিকদের আড় চোখেও দর্শকামের আবেশ, কিন্তু মুখে বিরক্তি – কোথা থেকে জোটে এই নচ্ছার মেয়েছেলেগুলো, আমাদের ছেলেগুলোর মাথা খাওয়ার জন্যে? কোটালরা করছে কি, দূর করে দিক শহরের সীমানার বাইরে।

ভিয়েনের রসের কড়াইতে আটকে থাকা মক্ষির মতো দলটির দিকে সকলের মন যখন আবিষ্ট, সেই সময়েই রাজপথে এসে পৌঁছল দুই ঘোড়ায় টানা সুসজ্জিত একটি রথ। রথের গতিতে ধীর লয়। রথের আরোহী চান না, রথের ঝাঁকুনিতে তাঁর পানপাত্রের পানীয় উছলে পড়ুক। অথবা রথের দ্রুত গতির ঝাঁকুনিতে ছিন্ন হয়ে যাক তাঁর মদিরার আবেশ। রথের আরোহী রাজশ্যালক রতিকান্ত। তাঁর রথের দুপাশে সামনে পিছনে সমগতিতে চলেছে ছজন সশস্ত্র অশ্বারোহী রক্ষী। অনতিদূরের প্রমোদকানন থেকে, এই সময়েই, রতিকান্ত তাঁর বাস ভবনে ফেরেন।

অহংকারী রতিকান্ত পথের দুধারের পথচারীদের কিংবা বিপণির বণিকদের মানুষের মধ্যেই গণ্য করেন না। পথের পাথরখণ্ড, অথবা পথের দুধারের গাছপালার দিকে তিনি যেমন নির্বিকার চোখে তাকিয়ে থাকেন, খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতিও তিনি একই রকম উদাসীন। তবে পথচারীদের মধ্যে দৈবাৎ কোন সুন্দরী রমণীর দর্শন পেলে, তিনি মৎস্যলোভী শিকারী বিড়াল হয়ে ওঠেন। আজ পথের পাশে নাচ-গান গাওয়া বানজারা মেয়েগুলিকে দেখে তাঁর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। সুন্দরী, যুবতী এবং নৃত্যগীত পটিয়সী এতগুলি রমণীর একত্র দর্শন পাওয়া – এ যে অভাবনীয় সৌভাগ্য। তিনি সারথিকে রথ থামানোর নির্দেশ দিলেন।

রথ থামলে তাঁর পাশে পাশে চলতে থাকা অশ্বারোহী রক্ষীকে তিনি বললেন, “অ্যাই, যা তো, মেয়েছেলেগুলোকে আজ সন্ধেবেলা আমার প্রমোদ ভবনে আসার জন্যে নেমন্তন্ন করে আয়। আমি কে পরিচয় দিবি। আর বলবি প্রত্যেকের দুহাত ভরে সোনার মুদ্রা উপহার দেব। ভাল করে বুঝিয়ে বলবি, হতভাগা তোরা যা হোঁৎকা আর মাথামোটা...”।

রক্ষীপুরুষ দলটির কাছে গিয়ে রতিকান্তর বার্তা দিতেই, মেয়েগুলি নাচ-গান থামিয়ে দিল। একটি মেয়ে গলা চড়িয়ে উত্তর দিল, “আমরা নাচগান করি মনের আনন্দে। আমরা বারনারী নয় হে, যে কেউ ডাকলেই তার নাট মহলে গিয়ে ধেই ধেই নেত্য করে বেড়াব। কথাটা আপনার ছোটরাজাকে স্পষ্ট করে বলে দিন, হ্যাঁ”।

রতিকান্ত রথে বসে মেয়েটিকে মন দিয়ে দেখলেন, তার কথাও শুনলেন। মুগ্ধ চোখে মেয়েটিকে দেখতে দেখতে তিনি ভাবলেন, এমন জিনিষের স্বাদ তিনি বহুদিন পাননি। আহা, কী ঝাঁজ, কী তেজ, যেমন বুক তেমনে তার বুকের পাটা। নিজের বুকে ওই বুকের স্পর্শই যদি না লাগল – তা হলে তিনি কিসের রাজশ্যালক? রতিকান্ত অন্য রক্ষীকে বললেন, “অ্যাই যে, হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছিস কি? ওই মেয়েটাকে তুলে নিয়ে বন্দী কর। বেশী ট্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই করলে সবকটাকেই ধরে কয়েদ কর – তারপর আমি দেখছি”।

রক্ষীদের কর্তব্য রতিকান্তকে রক্ষা করা। তাঁকে কেউ আক্রমণ বা আঘাত করতে এলে, তাকে বন্দী করা কিংবা প্রয়োজনে হত্যা করা। কিন্তু এই নির্বিবাদী বানজারা দলটি কাউকেই আঘাত বা আক্রমণ করেনি। এক্ষেত্রে ওদের বন্দী করার কোন অধিকার তো তাদের নেই। রতিকান্তর আদেশ পেয়েও রক্ষীরা যখন ইতস্তত করছে, ঠিক তখনই অকুস্থলে উপস্থিত হল জনা ছয়েক অশ্বারোহী নগররক্ষী। তারা রক্ষীদের কথা শুনেই দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠল এবং ঘোড়া ছুটিয়ে ঘিরে ফেলল বানজারাদের দলটিকে। বাতাসে চাবুক চালাতে লাগল সপাসপ। চেঁচিয়ে উঠল “ছোটরাজাকে তোরা চিনিস না? তাঁর আদেশ অমান্য করার সাহস হয় কী করে? মানে মানে আমাদের সঙ্গে চল, নয়তো চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেব”।

দলের যে যুবকটিকে মনে হয়েছিল দলের সর্দার, সে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ঝোলা থেকে ছোট্ট একটা বল্লম বের করে হাতে তুলে নিল। সেই বল্লমের ফলা দুপুরের রোদে ঝলসে উঠল আক্রোশে এবং মুহূর্তের মধ্যে  সেটি উড়ে গিয়ে গিঁথে গেল রতিকান্তর গলার ঠিক পাশে আসনের পিঠে। এক চুলের জন্যে বেঁচে গেল রতিকান্ত।

আচমকা এই ঘটনায়, মেয়েগুলিকে ছেড়ে নগররক্ষীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যুবকটির ওপর। প্রহার করতে করতে মোটা রজ্জুতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল তাকে। তারপর তুলে দিল একটি ঘোড়ার পিঠে। বন্দী যুবককে নিয়ে নগররক্ষীরা চলে যাওয়ার আগে, তারা এসে দাঁড়াল রতিকান্তর রথের পাশে।

একজন নগররক্ষী মাথা নত করে বলল, “আমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন, প্রভু। এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আপনি সুস্থ আছেন তো?”

আতঙ্কে বিবর্ণ মুখ, রতিকান্তর জিভও শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি কোনমতে বললেন, “না, কই? তেমন কিছু তো হয়নি। ঠিকই আছি”।

সেই নগররক্ষী আসনের পিঠে গিঁথে থাকা বল্লমটি খুলে নিয়ে বলল, “দুশ্চিন্তা করবেন না, প্রভু। আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান। আজ রাত্রে হতভাগাকে অন্ধকার কারাগারে নির্জলা উপবাসে রেখে দেব। আগামীকাল প্রথম প্রহরেই ওকে রাজপথের চৌরাস্তার স্তম্ভের পাশে শূলে চড়িয়ে দেব। সকল নাগরিক দেখুক, বুঝুক - এ রাজ্যে দুর্বৃত্তের কী পরিণতি হয়”।

কিছুটা ধাতস্থ হওয়া রতিকান্ত হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিন্তু ওই মেয়েগুলো? তারা তো পালিয়ে গেল!”

“ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, প্রভু। ওই দলের প্রত্যেককে আমরা অচিরেই খুঁজে বের করব। তারপর বন্দী করে আপনার সামনে এনে দাঁড় করাব। অনর্থক আপনার অনেক বিলম্ব হল প্রভু, এবার আপনি রওনা হোন। আপনার যাত্রা নির্বিঘ্ন হোক”।

নগররক্ষী ইশারা করতে সারথি রথ চালনা শুরু করল, এবং আগের মতোই ছজন অশ্বারোহী দেহরক্ষী চলল সঙ্গে। বন্দী যুবককে নিয়ে নগররক্ষীরাও দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দিল উলটো দিকে। ওদিকেই নগর কোটালের কার্যালয়, বন্দীশালা ও কারাগার।

এই গোলমালের শুরুতেই বিপণির ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছিল বণিকরা। আড়াল থেকে নজর রাখছিল পরিস্থিতির ওপর। এ ধরনের ঘটনায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানে, এই ধরনের বিশৃঙ্খলা হলেই, সাধারণ জনতা, নগররক্ষী সকলেই বিপণিগুলি এবং বণিকদের উপর চড়াও হয় - অকারণ মারধোর করে এবং লুঠ করে নেয় বিপণির মূল্যবান সামগ্রী।

এখন রাজপথ জনশূণ্য। পথে একজনও পথচারী নেই। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বণিকেরা তাদের সকল বিপণিগুলির দরজা দ্রুত বন্ধ করে ফেলল। তারপর একত্রে ঘরের দিকে যেতে যেতে আলোচনা করল, আজ সন্ধ্যায় আর বিপণি খুলে কাজ নেই। আগামী কাল সকালে পরিস্থিতি বুঝে যা হোক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। 

 

 

রাজধানী শহর থেকে প্রায় পঁচিশ যোজন দূরের অনন্তপুর চটিতে ভল্লা যখন পৌঁছল, রাত্রি তখন প্রথম প্রহর পেরিয়ে গেছে।  রাজধানী থেকে সে রওনা হয়েছিল শেষ রাত্রে। তারপর একটানা ঘোড়া ছুটিয়ে এতদূরে আসা। অবশ্য মাঝে জঙ্গলের মধ্যে এক সরোবরের ধারে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিল। বিশ্রাম দিয়েছিল তার ঘোড়াটাকেও। সরোবরের তীরে প্রচুর সবুজ আর সতেজ ঘাসের সন্ধান পেয়ে, ঘোড়াটা তার সদ্ব্যবহার করতে বিলম্ব করেনি। ওই অবসরে সেও দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়েছিল। পুঁটলিতে বাঁধা চিঁড়ে সরোবরের জলে ভিজিয়ে গুড় দিয়ে মেখে সপাসপ মেরে দিয়েছিল। তারপর গামছা পেতে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম। ঘুম নয়, বিশ্রামই। প্রথম কথা ঘোড়াটাকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছিল। দ্বিতীয় কথা বিগত রাত্রিতে সে একবিন্দুও ঘুমোতে পারেনি তার ওপর ছিল সারা দেহে রক্ষীদের মারের যন্ত্রণা এবং এই দীর্ঘ পথশ্রম। চোখের পাতা একবার বন্ধ করলেই,  সে নির্ঘাৎ ঘুমিয়ে পড়বে – সেক্ষেত্রে তার যাত্রাভঙ্গ হবে। যে চটিতে আজই রাত্রে তার পৌঁছনোর কথা সেখানে পৌঁছতে পারবে না। অতএব অর্ধ প্রহর বিশ্রামের পর সে ঘোড়াচড়ে ছুটতে শুরু করেছিল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।

দূর থেকে চটির দীপস্তম্ভের আলো চোখে পড়তেই সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করেছিল। চটির আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু জনবসতি আছে। ভল্লা চায় না, সেই জনবসতির লোকদের সচকিত করে এই রাত্রে তাদের কৌতূহলী করে তুলতে। চটির সদর দরজা খোলাই ছিল, সে পথে না গিয়ে, আরও কিছুটা এগিয়ে একটি বন্ধ দরজার কাঠের পাল্লায় সে সন্তর্পণে আওয়াজ করল। সে আওয়াজের বিশেষ এক ছন্দ আছে – দ্রুত টকটক – কিছুটা বিরতি – বিলম্বিতে তিনবার – আবার বিরতি - তারপর আবার দ্রুত দুবার।

ভেতর থেকে দরজাটা দ্রুত খুলে যেতেই ভল্লা ঘোড়া সমেত ঢুকে গেল চটির প্রাঙ্গণে। এদিকটা চটির পিছনের দিক। এদিকে আলোর তেমন ব্যবস্থা নেই। চটির অতিথিশালায় এবং সামনের দিকে কয়েকটা মশাল জ্বলছে, তার আভাসটুকু এখানে পাওয়া যায়।  কারণ এদিকের অনেকটা জুড়ে আছে পশুশালা। বণিকদের গাধা, ঘোড়া, বলদদের জন্য রাত্রির আবাস। আর পশুশালা পার হয়ে, ওপাশে আছে চটির কর্মীদের আবাস।

ভল্লার ঘোড়ার লাগাম নিজের হাতে ধরে – যে দরজা খুলে দিয়েছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, “ভল্লা?”

“হুঁ”।

“কী চেহারা করেছিস, চুল-দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে – চেনাই যাচ্ছে না। তুই ঘরে চ, আমি ঘোড়াটার একটা ব্যবস্থা করেই আসছি”। এই চটিতে ভল্লা বহুবার থেকেছে, কাজেই অন্ধকারেও ঘর চিনে ঢুকতে তার অসুবিধে হল না।

ঘোড়ার ব্যবস্থা করে লোকটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে এসে ঢুকল, বলল, “অন্ধকারে ভূতের মতো কী করছি, প্রদীপটা জ্বালাসনি কেন? কোথায় তুই?”

আপাততঃ নিশ্চিন্ত ও বিশ্বস্ত একটা আশ্রয় পেয়ে, ভল্লা দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেয় বসে পড়েছিল। তার সমস্ত শরীর ক্লান্তিতে ও যন্ত্রণায় অবসন্ন। বলল, “এই তো এখানে, বসে আছি”।

চটির লোকটি চকমকি ঠুকে একটা প্রদীপ জ্বালতে ঘরের অন্ধকার একটু ফিকে হল। প্রদীপটা কুলুঙ্গিতে রেখে ঘুরে দাঁড়াল, তাকাল মেঝেয় বসে থাকা ভল্লার দিকে। চমকে উঠল, “কী হয়েছে তোর? মুখ চোখ অত ফুলেছে কেন? চোখের নিচে কালশিটে। মারামারি করেছিস? কার সঙ্গে?”

“বলছি, সব বলব। আগে একটু জল খাওয়া না, চিকা। সেই দুপুরে জল খেয়েছিলাম, তারপর আর...তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে”।

“আনছি”। বলেই চিকা দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল, অল্প সময়ের মধ্যেই কাঁসার ঘটিতে আনল খাবার জল। ভল্লার হাতে তুলে দিল কয়েকটা বাতাসা আর ঘটিটা। লোভীর মতো বাতাসাগুলো মুখে পুরে নিয়ে চিবোতে গিয়েই শিউরে উঠল ভল্লা, চোয়ালে হাত রাখল। যন্ত্রণায় তার মুখ বেঁকে গেল। চিকার দিকে চোখ তুলে তাকাল, তারপর গলায় ঘটির জল ঢালতে ঢালতে ইশারায় চিকাকে বসতে বলল। চিকা মেঝেয় বসল ভল্লার সামনে।

ভল্লার জল খাওয়া শেষ হতে ঘটিটা মেঝেয় রেখে হাসির চেষ্টায় মুখ ব্যাঁকাল, বলল, “কাল দুপুরে উদোম ক্যালানি খেয়েছি রে, শালা। গোটা শরীরে তার তাড়স”।

“কারা মারল? কী করেছিলি”?

“রাজার শ্যালকের দিকে বল্লম ছুঁড়েছিলাম। বল্লমটা লোকটার গলার দু-তিন আঙুল দূর দিয়ে ছুটে গিয়ে, তার রথের আসনে গিঁথে গেল। তুই তো জানিস আমার হাতের বল্লম কখনো ফস্কায় না। এবার ফস্কাতে হল, আধিকারিকদের আদেশ। তারপর আর কি, নগররক্ষীরা ধরে ফেলল। মারধোর করে নিয়ে গেলে কারাগারে”।

“তুই বলতে চাইছিস, সবটাই নাটক?”

“নাটক তো বটেই। অন্য শহর থেকে তিনজন ছোকরা আর পাঁচজন সুন্দরী বারবনিতাকে বানজারা সাজিয়ে রাজধানীতে আনা হয়েছিল, যাতে তারা রাজশ্যালক রতিকান্তর চোখে পড়ে। সেই দলে আমিও ছিলাম। রতিকান্ত  সেই ফাঁদেই পা দিল। দলটা রাজপথে নাচ-গান করতে করতে যখন যাচ্ছিল, সেই সময়েই এসে পড়ল রতিকান্তর রথ। দলের সুন্দরী মেয়েগুলোকে দেখেই হতভাগা রতিকান্তর লোভ চেগে উঠল। দেহরক্ষীদের বলল, “ধরে আন মেয়েগুলোকে”। দেহরক্ষীদের সঙ্গে ওই মেয়েদের দলটার বচসা শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যেই সেখানে হাজির হল কয়েকজন নগররক্ষী। রক্ষীরা সকলে মিলে যখন মেয়েগুলোকে ধরার জন্যে ঝাঁপিয়েছে, আমি বল্লমটা ছুঁড়লাম রতিকান্তর দিকে। ব্যস, রক্ষীরা সব্বাই আমাকে নিয়ে পড়ল”।

“আর মেয়েগুলোর কী হল?”

“তাদের আর কী? তারা পালিয়ে গিয়ে উঠল, আগে থেকেই ঠিক করা গোপন এক আড্ডায়। সেখানে বানজারার পোষাক বদলে, সাধারণ চাষীঘরের বউ-মেয়ে সেজে সরে পড়ল মাঠের আলপথ ধরে”।

“বুঝলাম। কিন্তু তুই কারাগার থেকে ছাড়া পেলি কী করে?”

“ওই যে বললাম আধিকারিকদের নির্দেশ। মাঝরাত্রে এসে আমাকে একটা ঘোড়া দিয়ে বলল, এখনই বেরিয়ে যাও। পথে কোথাও দাঁড়াবে না। রাতটা কাটাবে এই চটিতে। কিন্তু গোপনে”।

চিকা মৃদু হাসল, বলল, “হুঁ। গতকাল সকালে।  তার মানে, তখনো তুই রতিকান্তর দিকে বল্লম ছুঁড়িসনি। আমার কাছে সেই নির্দেশ এসে গেছে। তোর ঘোড়া আমি রেখে দেব। আর তোকে একজোড়া রণপা দিয়ে রাত পোয়ানোর আগেই রওনা করিয়ে দেব। কিন্তু তুই যাবি কী করে, শরীরের এই অবস্থায়?”

“রাজার আদেশ ভাই, যেতে তো হবেই। নির্দেশ আছে আমার এই ক্ষতবিক্ষত মুখ আর শরীর নিয়েই আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। তাতে আমার কাজের নাকি সুবিধে হবে”।

অবাক হয়ে চিকা জিজ্ঞাসা করল, “তোর গন্তব্য কোথায়? কাজটা কি?”

ভল্লা চিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা তো বলা যাবে না, ভাই। যদি বেঁচে থাকি, ফেরার সময় তোকে নিশ্চয় বলে যাবো…”।


চিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বুঝলাম। তুই মুখ হাত ধুয়ে নে, আমি তোর খাবার নিয়ে আসছি। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়। রাত্রি শেষ প্রহরে তোকে ডেকে রওনা করিয়ে দেব”।


পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ৩


  

শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

গীতা - ৮ম পর্ব

এই সূত্রে - "  ঈশোপনিষদ 

এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "

এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ " 

এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব " 




এর আগের সপ্তম অধ্যায়ঃ জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ পড়া যাবে পাশের সূত্রে "গীতা - ৭ম পর্ব"


অষ্টম অধ্যায়ঃ অক্ষরব্রহ্মযোগ


অর্জুন উবাচ

কিং তদ্‌ব্রহ্ম কিমধ্যাত্মং কিং কর্ম পুরুষোত্তম।

অধিভূতং চ কিং প্রোক্তমধিদৈবং কিমুচ্যতে।।

অর্জুন উবাচ

কিং তৎ ব্রহ্ম কিং অধ্যাত্মং কিং কর্ম পুরুষোত্তম।

অধিভূতং চ কিং প্রোক্তম অধিদৈবং কিম্‌ উচ্যতে।।

অর্জুন বললেন- হে পুরুষোত্তম, ব্রহ্ম কি? অধ্যাত্ম কি? কর্ম কি? কাকেই বা অধিভূত বলে আর কাকেই বা অধিদৈব বলা হয়?

 

অধিযজ্ঞ কথং কোঽত্র দেহেঽস্মিন্‌ মধুসূদন।

প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়োঽসি নিয়তাত্মভিঃ।।

অধিযজ্ঞ কথং কঃ অত্র দেহে অস্মিন্‌ মধুসূদন।

প্রয়াণকালে চ কথং জ্ঞেয়ঃ অসি নিয়ত-আত্মভিঃ।।

হে মধুসূদন, এই দেহে অধিযজ্ঞ কে এবং কোথায় তার অবস্থান? আত্মসংযমী ব্যক্তি কিভাবেই বা মৃত্যুকালে তোমাকে জানতে পারে?

 

শ্রীভগবানুবাচ

অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং স্বভাবোঽধ্যাত্মমুচ্যতে।

ভূতভাবোদ্ভবকরো বিসর্গঃ কর্মসংজ্ঞিতঃ।।

শ্রীভগবান উবাচ

অক্ষরং ব্রহ্ম পরমং স্বভাবঃ অধ্যাত্মম্‌ উচ্যতে।

ভূতভাব-উদ্ভবকরঃ বিসর্গঃ কর্ম-সংজ্ঞিতঃ।।

শ্রীভগবান বললেন- অক্ষরকেই পরম ব্রহ্ম বলে। ব্রহ্মের স্বভাবকে অধ্যাত্ম বলে। সমস্ত ভূতবস্তুর সৃজনকারী দেবতাদের উদ্দেশে বিসর্গের নাম কর্ম। 

[ওঁ হল পরম অক্ষর ও আদি শব্দ, প্রণব। এই শব্দ থেকেই এই জগতের সৃষ্টি বিসর্গ মানে বিসর্জন, দেবতাদের উদ্দেশে দ্রব্য উৎসর্গ করা হয় যে যজ্ঞে, তাকেই বিসর্গ বলে।]

 

অধিভূতং ক্ষরো ভাবঃ পুরুষশ্চাধিদৈবতম্‌।

অধিযজ্ঞোঽহমেবাত্র দেহে দেহভূতাং বর।।

অধিভূতং ক্ষরঃ ভাবঃ পুরুষঃ চ অধিদৈবতম্‌।

অধিযজ্ঞঃ অহম এব অত্র দেহে দেহভূতাং বর।।

হে নরশ্রেষ্ঠ অর্জুন, বিনাশশীল সমস্ত পদার্থই অধিভূত, পরমপুরুষ ব্রহ্ম অধিদেবতা, আর আমিই এই দেহে অবস্থিত অধিযজ্ঞ।

 

অন্তকালে চ মামেব স্মরণ্মুক্ত্বা কলেবরম্‌।

যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ।।

অন্তকালে চ মাম্‌ এব স্মরন্‌ মুক্ত্বা কলেবরম্‌।

যঃ প্রয়াতি স মৎ ভাবং যাতি নাস্তি অত্র সংশয়ঃ।।

এবং মৃত্যুকালে আমাকেই স্মরণে রেখে, দেহ ত্যাগ ক’রে যিনি প্রয়াণ করেন, তিনি আমার স্বরূপেই মিলিত হন, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

 

যং যং বাপি স্মরন্‌ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্‌।

তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতাঃ।।

যং যং বা অপি স্মরন্‌ ভাবং ত্যজতি অন্তে কলেবরম্‌।

তং তম্‌ এব ইতি কৌন্তেয় সদা তৎ ভাব ভাবিতাঃ।।

হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, যিনি সর্বদা যে দেবতার শরণাগত থাকেন, মৃত্যুকালেও সেই দেবতার বিষয়ে চিন্তা করে দেহ ত্যাগ করলে, তিনি সেই দেবতারই স্বরূপ লাভ করেন।

   

তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ।

ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্মামেবৈষ্যস্যসংশয়ম্‌।।

তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মাম্‌ অনুস্মর যুধ্য চ।

ময়ি অর্পিত মনঃ-বুদ্ধিঃ মাম্‌ এব এষ্যসি অসংশয়ম্‌।।

অতএব, আমাকে সর্বদা স্মরণে রেখে, তুমি যুদ্ধ করো। কোন দ্বিধা বা সংশয় না ক’রে, তোমার মন এবং বুদ্ধি আমাকে সমর্পণ করলে, তুমি আমাকেই লাভ করবে। এই বিষয়ে সন্দেহ নেই।

 

অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা।

পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়ন্‌।।

অভ্যাস-যোগ-যুক্তেন চেতসা না অন্যগামিনা।

পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থ অনুচিন্তয়ন্‌।।

হে পার্থ, অন্তরে সর্বদা ঈশ্বর চিন্তার অভ্যাসকে অন্তরঙ্গ সাধন বলে। অভ্যাস যোগে, একাগ্র মনে সর্বদা ধ্যান করতে করতেই সেই দিব্য পরমপুরুষকে লাভ করা যায়। 

 

কবিং পুরাণমনুশাসিতারমণোরণীয়াংসমনুস্মরেদ্‌ যঃ।

সর্বস্য ধাতারমচিন্ত্যরূপমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।।

কবিং পুরাণং অনুশাসিতারম্‌ অণোঃ অণীয়াংসম্‌ অনুস্মরেৎ যঃ।

সর্বস্য ধাতারম্‌ অচিন্ত্য-রূপম্‌ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।।

যিনি সর্বজ্ঞ, চিরায়ত বিশ্বকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, যিনি সূক্ষ্ম থেকেও সূক্ষ্মতর, যাঁর স্বরূপ চিন্তা করা যায় না, যিনি সূর্যের মতো স্বপ্রকাশ ও দীপ্তিমান, যিনি সমস্ত অন্ধকারের অতীত এবং সর্ব জীবের কর্মফলদাতা

  

১০

প্রয়াণকালে মনসাঽচলেন

   ভক্ত্যা যুক্তো যোগবলেন চৈব।

ভ্রুবোর্মধ্যে প্রাণমাবেশ্য সম্যক্‌

   স তং পরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্‌।।

প্রয়াণকালে মনসাঃ অচলেন

   ভক্ত্যা যুক্তঃ যোগবলেন চ এব।

ভ্রুবোঃ মধ্যে প্রাণম্‌ আবেশ্য সম্যক্

   স তং পরং পুরুষম্‌ উপৈতি দিব্যম্‌।।

মৃত্যুকালে একান্ত ভক্তিতে, একাগ্র মনে, একনিষ্ঠ সাধনায়, নিজের প্রাণকে ভ্রূযুগলের মধ্যে স্থির রেখে, তাঁর স্মরণে যিনি ধ্যানমগ্ন থাকেন, তিনিই সেই দিব্য পরম পুরুষকে লাভ করেন।

 

১১

যদক্ষরং বেদবিদো বদন্তি

   বিশন্তি যদ্‌ যতয়োঃ বীতরাগাঃ।

যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্যং চরন্তি

   তৎ তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্যে।।

যৎ অক্ষরং বেদবিদঃ বদন্তি

   বিশন্তি যদ্‌ যতয়োঃ বীতরাগাঃ।

যৎ ইচ্ছন্তঃ ব্রহ্মচর্যং চরন্তি

   তৎ তে পদং সংগ্রহেণ প্রবক্ষ্যে।।

বেদবিৎ পণ্ডিতেরা যাঁকে অবিনাশী অক্ষর বলেন, বিষয়ের আসক্তিহীন সন্ন্যাসীরা যাঁর স্বরূপে মিশে যান, যাঁকে উপলব্ধির জন্যে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়, সেই পরম ব্রহ্মপদ লাভের উপায় আমি তোমাকে সংক্ষেপে বলছি।

 

১২

সর্বদ্বারাণি সংযম্য মনো হৃদি নিরুধ্য চ।

মূর্ধ্ন্যাধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতো যোগধারণাম্‌।।

সর্বদ্বারাণি সংযম্য মনঃ হৃদি নিরুধ্য চ।

মূর্ধ্নি আধায় আত্মনঃ প্রাণম্‌ আস্থিতঃ যোগধারণাম্‌।।

সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করে, অস্থির চিত্তকে হৃদয়ের মধ্যে রুদ্ধ রেখে, ভ্রুযুগলের মাঝখানে নিজের প্রাণকে স্থির রেখে, একনিষ্ঠ সাধনায়,

 

১৩

ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্‌ মামনুস্মরন্‌।

যঃ প্রয়াতি ত্যজন্‌ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্‌।।

ওম্‌ ইতি এক-অক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্‌ মাম্‌ অনুস্মরন্‌।

যঃ প্রয়াতি ত্যজন্‌ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্‌।।

এবং যিনি মৃত্যুকালে দেহত্যাগের সময় ব্রহ্মস্বরূপ ‘ওঁ’ এই এক অক্ষর উচ্চারণ করতে করতে, আমার চিন্তা করেন, তিনি পরম ব্রহ্মপদ লাভ করেন।

  

 

১৪

অনন্যচেতাঃ সততং যো মাং স্মরতি নিত্যশঃ।

তস্যাহং সুলভঃ পার্থ নিত্যযুক্তস্য যোগিনঃ।।

অনন্যচেতাঃ সততং যঃ মাং স্মরতি নিত্যশঃ।

তস্য অহং সুলভঃ পার্থ নিত্যযুক্তস্য যোগিনঃ।।

হে পার্থ, যিনি অন্য কোন চিন্তা না করে, সারা জীবন সব সময় আমাকেই স্মরণ করেন, আমার চিন্তায় মগ্ন সেই সন্ন্যাসীর কাছে আমি সহজেই ধরা দিয়ে থাকি। 

 

১৫

মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বতম্‌।

নাপ্নুবন্তি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ।।

মাম্‌ উপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখ-আলয়ম্‌ অশাশ্বতম্‌।

ন আপ্নুবন্তি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ।।

আমাকে লাভ করার পর, পরমজ্ঞানী সিদ্ধ পুরুষকে, দুঃখের আধার এই অনিশ্চিত সংসারে আর জন্ম গ্রহণ করতে হয় না।

 

১৬

আব্রহ্মভুবনাল্লোকাঃ পুনরাবর্তিনোঽর্জুন।

মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।

আব্রহ্ম ভুবনাৎ লোকাঃ পুনঃ-আবর্তিনঃ অর্জুন।

মাম্‌ উপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।

হে অর্জুন, ব্রহ্মলোক থেকে এই ভূলোক পর্যন্ত সর্বত্র বার বার জন্ম নিতে হয়, কিন্তু, হে কৌন্তেয়,  আমাকে লাভ করলে আর পুনর্জন্ম হয় না।  

 

১৭

সহস্রযুগপর্যন্তমহর্যদ্‌ ব্রহ্মণো বিদুঃ।

রাত্রিং যুগসহস্রান্তাং তেঽহোরাত্রবিদো জনাঃ।। 

সহস্র-যুগ-পর্যন্তম্‌ অহঃ যৎ ব্রহ্মণঃ বিদুঃ।

রাত্রিং যুগ-সহস্র-অন্তাং তে অহঃ-রাত্র-বিদঃ জনাঃ।। 

হাজার যুগ ধরে ব্যাপ্ত ব্রহ্মার দিন এবং হাজার যুগ ব্যাপি তাঁর রাত, এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনিই দিনরাত্রির রহস্য উপলব্ধি করতে পারেন।  

 

১৮

অব্যক্তাদ্‌ ব্যক্তয়ঃ সর্বাঃ প্রভবন্ত্যহরাগমে।

রাত্র্যাগমে প্রলীয়ন্তে তত্রৈবাব্যক্তসংজ্ঞকে।।

অব্যক্তাদ্‌ ব্যক্তয়ঃ সর্বাঃ প্রভবন্তি অহঃ আগমে।

রাত্রি আগমে প্রলীয়ন্তে তত্র এব অব্যক্তসংজ্ঞকে।।

ব্রহ্মার দিন শুরু হলে অব্যক্ত থেকে এই জগতের সবকিছুই আকার পায় এবং রাত্রিতে তারাই আবার নিরাকারে বিলীন হয়।

 

১৯

ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে।

রাত্র্যাগমেঽবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে।।

ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে।

রাত্রি-আগমে অবশঃ পার্থ প্রভবতি অহঃ-আগমে।।

হে পার্থ, সেই পার্থিব বস্তুসকল বার বার সৃষ্টি হয়ে ব্রহ্মার রাত্রিতে বিলীন হয় এবং তাঁর দিনের শুরুতে,  নিজের কর্মের ফল অনুসারে তারা আবার জন্মলাভ করে।

   

২০

পরস্তস্মাৎ তু ভাবোঽন্যোঽব্যক্তোঽব্যক্তাৎ সনাতনঃ।

যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।।

পরঃ তস্মাৎ তু ভাবঃ অন্যঃ অব্যক্তঃ অব্যক্তাৎ সনাতনঃ।

যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।।

কিন্তু যে অব্যক্তভাব থেকে এই বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি হয়, তার থেকে শ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অগোচর সনাতন অব্যক্তভাব। সমস্ত বিশ্বচরাচরের বিনাশ হলেও এই ভাব নষ্ট হয় না।

   

২১

অব্যক্তোঽক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্‌।

যঃ প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।

অব্যক্তঃ অক্ষর ইতি উক্তঃ তং আহুঃ পরমাং গতিম্‌।

যঃ প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তৎ ধাম পরমং মম।।

এই যে সনাতন অব্যক্তভাবের কথা বললাম, এই ভাবকেই অক্ষর বলে, এই ভাবকেই পরমা গতি বলে। এই ভাব লাভ করলে পুনর্জন্ম হয় না, আর এই ভাবই আমার পরমধাম।

 

 

২২

পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যস্ত্বনন্যয়া।

যস্যান্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বমিদং ততম্‌।।

পুরুষঃ স পরঃ পার্থ ভক্ত্যা লভ্যঃ তু অনন্যয়া।

যস্য অন্তঃস্থানি ভূতানি যেন সর্বম্‌ ইদং ততম্‌।।

হে পার্থ, যাঁর অন্তরে সকল জীবজগতের আশ্রয়, যিনি এই বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন, সেই পরম পুরুষকে হৃদয়ের একান্ত ভক্তি দিয়ে লাভ করা যায়।

 

২৩

যত্র কালে ত্বনাবৃত্তিমাবৃত্তিং চৈব যোগিনঃ।

প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভঃ।।

যত্র কালে তু অনাবৃত্তিম্‌ আবৃত্তিং চ এব যোগিনঃ।

প্রয়াতা যান্তি তং কালং বক্ষ্যামি ভরতর্ষভঃ।।

হে ভরতকুলশ্রেষ্ঠ, যে কালে মৃত্যু হলে, যোগীগণ পরমমুক্তি লাভ করেন অথবা আবার জন্ম গ্রহণ করেন, সেই কালের কথাই তোমাকে এখন বলব। 

 

২৪

অগ্নির্জ্যোতিরহঃ শুক্লঃ ষণ্মাসা উত্তরায়ণম্‌।

তত্র প্রয়াতা গচ্ছন্তি ব্রহ্ম ব্রহ্মবিদো জনাঃ।।

অগ্নিঃ জ্যোতিঃ অহঃ শুক্লঃ ষণ্মাসা উত্তরায়ণম্‌।

তত্র প্রয়াতা গচ্ছন্তি ব্রহ্ম ব্রহ্মবিদো জনাঃ।।

অগ্নি, জ্যোতি, দিবস, শুক্লপক্ষ, এবং উত্তরায়ণের ছয়মাস, দেবযানের এই মার্গে প্রয়াণ হলে, ব্রহ্মসাধক ব্যক্তিগণ ব্রহ্মলোক লাভ করেন।

 

২৫

ধূমো রাত্রিস্তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্‌।

তত্র চান্দ্রমসং জ্যোতির্যোগী প্রাপ্য নিবর্ততে।।

ধূমঃ রাত্রিঃ তথা কৃষ্ণঃ ষণ্মাসা দক্ষিণায়নম্‌।

তত্র চান্দ্রমসং জ্যোতিঃ যোগী প্রাপ্য নিবর্ততে।।

ধোঁয়া, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ এবং দক্ষিণায়নের ছয় মাস, পিতৃযানের এই মার্গে যোগী চন্দ্রের জ্যোতি লাভ ক’রে আবার এই জগতে ফিরে আসেন।  

 

২৬

শুক্লকৃষ্ণ গতী হ্যেতে জগতঃ শাশ্বতে মতে।

একয়া যাত্যনাবৃত্তিমন্যয়াবর্ততে পুনঃ।।

শুক্লকৃষ্ণে গতী হি এতে জগতঃ শাশ্বতে মতে।

একয়া যাতি অনাবৃত্তিম্‌ অন্যয়া আবর্ততে পুনঃ।।

শুক্ল এবং কৃষ্ণ এই দুটি পথই জগতের সনাতন পথ বলে জ্ঞানীরা মনে করেন, একটি পথে পরম মুক্তি পাওয়া যায়, আর অন্যটিতে আবার দেহধারণ করতে হয়।

 

২৭

নৈতে সৃতী পার্থ জানন্‌ যোগী মুহ্যতি কশ্চন।

তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যোগযুক্তো ভবার্জুন।।

ন এতে সৃতী পার্থ জানন্‌ যোগী মুহ্যতি কঃ চন।

তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু যোগ-যুক্তঃ ভব অর্জুন।।

হে পার্থ, এই দুই মার্গ সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে, কোনও যোগীই মোহের বন্ধনে আবদ্ধ হন না। অতএব, হে অর্জুন, তুমি সর্বদা ব্রহ্মধ্যানে অভ্যস্ত হও। 

 

২৮

বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চৈব

দানেষু যৎ পুণ্যফলং প্রদিষ্টম্‌।

অত্যেতি তৎ সর্বমিদং বিদিত্বা

যোগী পরং স্থানমুপৈতি চাদ্যম্‌।

বেদেষু যজ্ঞেষু তপঃসু চ এব

দানেষু যৎ পুণ্যফলং প্রদিষ্টম্‌।

অত্যেতি তৎ সর্বম্‌ ইদং বিদিত্বা

যোগী পরং স্থানম্‌ উপৈতি চ আদ্যম্‌।

বেদ পাঠ, যজ্ঞ অনুষ্ঠান, কঠোর তপস্যা এবং দান কর্ম থেকে যে সমস্ত পুণ্যফলের কথা শাস্ত্রে বলা হয়েছে, তোমার ওই সাতটি প্রশ্নে আমার এই উত্তর সম্যক উপলব্ধি করতে পারলে, ধ্যানযোগী ঐ সব পুণ্যফল অতিক্রম করে জগতের আদি কারণস্বরূপ পরমপদ লাভ করে থাকেন।    

 

অক্ষরব্রহ্মযোগ সমাপ্ত


                            পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " গীতা - ৯ম পর্ব

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...