মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ৩/৮

 


["ধর্মাধর্ম"-এর তৃতীয় পর্বের সপ্তম পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে "ধর্মাধর্ম - ৩/৭"]



৩.৬.৪. মৌর্যদের পতন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি

মোটামুটি ২৩২ বি.সি.ই নাগাদ অশোকের মৃত্যুর ঘটনাটি খুবই অস্পষ্ট। কোথায় এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সঠিক জানা যায় না, তবে একটি বৌদ্ধমতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল তক্ষশিলায়। অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার হয়তো দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর পৌত্র দশরথকে। তবে নানান সূত্র অনুসারে অনুমান করা যায়, বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য বেশ কয়েকটি টুকরোতে ভেঙে গিয়েছিল। প্রধান গাঙ্গেয় উপত্যকায় মগধের রাজা ছিলেন দশরথ। দশরথ আজীবিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাছাড়া পশ্চিম ভারতের রাজধানী উজ্জয়িনীর রাজা ছিলেন তাঁর আরেক পৌত্র সম্প্রতি। এই সম্প্রতিই পশ্চিম ভারতে জৈন ধর্ম প্রচারে উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কাশ্মীর অঞ্চলের রাজা ছিলেন অশোকের এক পুত্র জলোকা। অশোকের আরও দুই পুত্রের নাম পাওয়া যায়, কুনাল এবং তিবারা, তাঁদের সম্বন্ধে নাম ছাড়া তেমন আর কিছু জানা যায় না। এর পরবর্তী ইতিহাস খুবই ঝাপসা, স্পষ্ট করে কিছুই জানার উপায় নেই।

পৌরাণিক সূত্রে আভাস পাওয়া যায় মোটামুটি ১৮৫ বি.সি.ই-তে মৌর্য বংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে, তাঁরই সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মগধের সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। শুঙ্গ বংশের রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, শোনা যায় তাঁদের বংশের রাজত্বকালে অন্ততঃ দুবার অশ্বমেধ এবং একবার বাজপেয় যজ্ঞের আয়োজন হয়েছিল। বৌদ্ধসূত্র অনুযায়ী পুষ্যমিত্র শুঙ্গ নাকি ঘোরতর বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন এবং তাঁর রাজত্বকালে নাকি অনেক বৌদ্ধ বিহার, মঠ এবং স্থাপত্য ধ্বংস করা হয়েছিল। বিখ্যাত বৈয়াকরণ এবং দার্শনিক পতঞ্জলি হয়তো পুষ্যমিত্রের সমসাময়িক ছিলেন। শুঙ্গবংশ মোটামুটি একশ বারো বছর রাজত্ব করেছিল এবং মোটামুটি ৭৩ বি.সি.ই-তে শেষ শুঙ্গরাজা দেবভূতিকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁরই ব্রাহ্মণ মন্ত্রী বসুদেব। শোনা যায় দেবভূতি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র রাজা ছিলেন। সে সময় শুঙ্গদের আয়ত্তে শুধু মগধরাজ্যটুকুই অবশিষ্ট ছিল।

বসুদেব যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার নাম কাণ্ব বংশ। তাঁদের প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর রাজত্ব কালে তাঁদের বংশের চারজন রাজা হয়েছিলেন। তাঁদের সম্বন্ধেও স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না। মোটামুটি ২৮ বি.সি.ই-তে কাণ্ব বংশের শেষ রাজাকে হত্যা করে, মগধ জয় করেছিলেন অন্ধ্রের রাজা, নাম হয়তো সিমুক। এই রাজবংশের নাম সাতবাহন।

মৌর্য পরবর্তী যুগে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ রাজা ছিলেন কলিঙ্গের রাজা খারবেল। তাঁর রাজ্যের বিস্তার সম্পূর্ণ কলিঙ্গ এবং উত্তর অন্ধ্রের অনেকটা। খারবেল জৈনধর্মে নিষ্ঠাবান ছিলেন। অহিংস জৈন হলেও তাঁর রাজ্য জয় এবং যুদ্ধবিগ্রহে বিশেষ উৎসাহ ছিল। তিনি বেশ কয়েকবার মগধ রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন, হয়তো কিছুদিনের জন্যে মগধ অধিকারও করতে পেরেছিলেন। শোনা যায়, সুদূর দক্ষিণে তিনি পাণ্ড্য রাজ্যও আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কোন এক যবন (গ্রীক) রাজার সঙ্গে মথুরায় যুদ্ধ হয়েছিল এমনও শোনা যায়। উড়িষ্যার উদয়গিরির হাতিগুম্ফায় তাঁর একটি শিলালেখ পাওয়া গেছে। সুদীর্ঘ সেই শিলালেখে তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং প্রজাদের মঙ্গলের জন্যে তিনি কী কী কাজ করেছিলেন, তার বর্ণনা লিখে গিয়েছেন। সেই শিলালেখের শুরু হয়েছে, এই ভাবে, “অর্হৎ (জিন)-দের প্রণাম জানিয়ে, মহামহিম খারবেল, ঐর, মহান রাজা, মহামেঘবাহনের বংশধর, চেদিবংশের মহিমা বৃদ্ধিকারী, সকল পরমাগুণ এবং মঙ্গল লক্ষণে ভূষিত, যাঁর সুকীর্তির যশ কলিঙ্গ ছাড়িয়ে চারদিকেই ব্যাপ্ত...”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর্য শব্দের প্রাকৃত ঐর এবং শ্রেষ্ঠ অর্থেও আর্য শব্দের ব্যবহার তখন প্রচলিত ছিল। সে যাই হোক খারবেলের মৃত্যুর পর কলিঙ্গ বহুদিন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।                            

উত্তরপশ্চিম ভারতের প্রায় সবটাই মৌর্যদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। মোটামুটি ১৭৫ বি.সি.ই থেকে গ্রীক ও ব্যাক্ট্রিয়ান রাজাদের উৎসাহী সেনাপতিদের অনেকেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে নিজের নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করছিলেন। যাঁদের মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত মিনাণ্ডার। তাঁর রাজ্য পশ্চিমের সোয়াত উপত্যকা, কাবুল থেকে পূর্বে মগধ রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও তাঁর রাজত্বের সময় কাল মাত্র পনের বছর - ১৫০ বি.সি.ই থেকে ১৩৫ বি.সি.ই। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে রাজা মিনাণ্ডারই রাজা মিলিন্দ। তাঁর সঙ্গে বৌদ্ধ দার্শনিক নাগসেনের বৌদ্ধধর্ম নিয়ে সুদীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব চলেছিল, বৌদ্ধদের সেই গ্রন্থের নাম “মিলিন্দ-পন্‌হ” – যার অর্থ মিলিন্দের প্রশ্নাবলী। শোনা যায় এর পরেই মিনাণ্ডার বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

এরপর আবার গ্রীক এবং ব্যাক্ট্রিয় রাজাদের জয়-বিজয় এবং আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে, বেশ কিছুদিন ডামাডোল চলতে লাগল। এবং এইসময়েই উত্তর সীমান্ত পথে ভারতে ঢুকতে লাগল পার্থিয়ান, শক ইত্যাদি জাতি বা গোষ্ঠী। পার্থিয়ান এবং শকরা ছিল মধ্য এশিয়ার পশুপালক উপজাতি।

সমগ্র উত্তর ভারত জুড়েই তখন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রচুর রাজ্য - নিত্য ভাঙছে, নিত্য গড়ছে। বিচিত্র তাদের শাসনপদ্ধতি। বিচিত্র তাদের সংস্কৃতি। তাদের কোন রাজ্যে রাজশাসন, কোথাও গোষ্ঠী শাসন (oligarchy), আবার কোথাও বা দলপ্রধান (chiefdom)কেউ কেউ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী, কেউ বা বৌদ্ধ অথবা জৈন, কেউ বা সম্পূর্ণ বিদেশী। আবার কেউ বা অনার্য ধর্মী, অর্থাৎ সুপ্রাচীন কাল থেকেই যাঁরা পশুপতিদেব, বিশ্‌দেব এবং মাতৃকাদেবীর পূজক।

উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ ভারতের পরিস্থিতি বরং অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল। তারা তখন প্রাক্‌-ঐতিহাসিক যুগ থেকে ঐতিহাসিক যুগে পা রাখতে শুরু করেছে। অশোকের শিলা-নির্দেশে দক্ষিণের যে কটি জনগোষ্ঠীর নাম পাওয়া গিয়েছিল, চোল, চের, পাণ্ড্য এবং সাতিয়াপুত্র – তারা মৌর্য সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। মনে করা হয়, মৌর্য সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক প্রশাসক হিসাবেই তাদের রাজ্যশাসনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। তারপর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর তারা নিজ নিজ এলাকায় রাজ্য গড়ে তুলল। এই চারটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মিলেমিশে গড়ে উঠল তামিলিক সংস্কৃতি। তাদের ভাষা হয়ে উঠল তামিল এবং লিপি হয়ে উঠল ব্রাহ্মী-তামিল।

বি.সি.ই প্রথম শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যের পশ্চিম অঞ্চলে আরেকটি শক্তিশালী রাজবংশের সৃষ্টি হয়েছিল, তার নাম সাতবাহন। এই বংশকে অন্ধ্রবংশও বলা হয়ে থাকে, কারণ তাদের রাজ্যের সূত্রপাত পূর্বে কৃষ্ণা – গোদাবরীর ব-দ্বীপ থেকে গোদাবরী বরাবর, পশ্চিমে আরব সাগর পর্যন্ত। সম্রাট অশোকের শিলানির্দেশে এই অন্ধ্রগোষ্ঠীরও উল্লেখ পাওয়া যায়। এই অঞ্চলও মৌর্যদের বিজিত রাজ্য নয়, কিন্তু অধীনস্থ রাজ্য ছিল। অতএব তামিলিকদের মতোই তারাও আঞ্চলিক প্রশাসক ছিল এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর, অন্ধ্রবংশের প্রথম রাজা সাতবাহন নাম নিয়ে, নতুন রাজবংশের স্থাপনা করেছিলেন।

সাতবাহন বংশের সব থেকে উদ্যোগী রাজা ছিলেন সাতকর্ণি। তাঁর রাজধানী ছিল প্রতিষ্ঠান নগরে, যার আধুনিক নাম পাইথান। সাতকর্ণি নর্মদার উত্তরে পূর্ব মালব্য পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করেছিলেন। শকরাজা এবং কলিঙ্গরাজ খারবেলের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কথা শোনা যায়। একসময় সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের কিছুটা, গুজরাট এবং উত্তরপশ্চিমে সিন্ধ প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সাঁচির একটি শিলালেখে তিনি নিজেকে “রাজন শ্রী সাতকর্ণি” বলে পরিচয় দিয়েছেন। উত্তরভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হওয়াতে, সাতকর্ণি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন কিন্তু তিনি নিজেকে এক “ক্ষত্রিয়-বিনাশী” ব্রাহ্মণ বলে দাবি করেছেন। মনে করা হয়, তিনি মধ্য এবং পশ্চিম ভারতের অনেকগুলি ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীরাজ্য অধিকার করেছিলেন, এ তারই উল্লেখ। সাতবাহন সাম্রাজ্যের শুরু মোটামুটি ৫০ বি.সি.ই-তে এবং তাদের রাজত্বকাল ২৪৮-৪৯ এ.ডি.র কাছাকাছি সময় পর্যন্ত। অতএব যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েই সাতবাহন সাম্রাজ্য নতুন যুগে (Common Era) পা রেখেছিল।           

মৌর্যবংশের চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন জৈন, অশোক ছিলেন বৌদ্ধ, বিন্দুসার এবং অশোকের পৌত্র দশরথ ছিলেন আজীবিক। অতএব এই তিন ধর্মই তামিলিক সংস্কৃতিতে আগে থেকেই মিশে ছিল। শক্তিশালী সাতবাহন সাম্রাজ্য পশ্চিম এবং মধ্য ভারতে আধিপত্য বিস্তার করায়, তাঁদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে, এবং সাতবাহন বংশের পরবর্তী রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মেই বিশ্বাসী ছিলেন।

অতএব তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণরা তাঁদের ভাগ্য অন্বেষণে উত্তরের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল দক্ষিণভারতে পৌঁছতে শুরু করলেন তাঁদের ব্রাহ্মণ্যধর্ম নিয়ে। সেখানে শুরু হল ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নতুন এক পর্ব। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্ষাত্রধর্মের শক্তি খাটিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠার দিকে না গিয়ে, তাঁরা কৌশল বদলে ফেললেন। আঞ্চলিক মানুষদের ধর্ম বিশ্বাসগুলি সংগ্রহ করতে করতে বদলে ফেলতে শুরু করলেন তাঁদের সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্ম। এই প্রসঙ্গের বিস্তারিত আলোচনা আসবে পরবর্তী পর্বে।

 

৩.৬.৪ সমসাময়িক বাণিজ্য পরিস্থিতি

ভগবান মহাবীর এবং ভগবান বুদ্ধের সময় থেকেই আমরা বেশ কিছু শ্রেষ্ঠী এবং বণিকের নাম জেনেছি, যাঁদের ধনসম্পদের কোন সীমা ছিল না এবং সমাজে তাঁদের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। অশোকের দ্বিতীয় রাণি কারুবাকী ছিলেন বিদিশার সম্পন্ন বণিকদুহিতা। সম্রাট অশোকের সঙ্গে কারুবাকীর পিতার যথেষ্ট সৌহার্দ্য ছিল বলেই হয়তো, তাঁদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়েছিল এবং ভালোবেসে বিয়ে করতে কোন অসুবিধে হয়নি। বণিক অনাথপিণ্ডিক কোশল রাজকুমার জেতকে হতবাক করে দিয়েছিলেন তাঁর দান করা বিপুল সম্পদসম্ভারে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বণিকের সামাজিক স্থান ছিল তৃতীয় বর্ণের বৈশ্যস্তরে। অতএব অব্রাহ্মণ্য রাজা এবং সম্রাটের আমলে, আরও স্পষ্ট করে বললে, ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী সামাজিক পরিবেশে বণিকরা যে তাদের প্রাপ্য সম্মান, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধে পাচ্ছিলেন সে কথা বলাই বাহুল্য। এবং যাঁদের কারণে তাঁদের এই সামাজিক সম্মান লাভ, কৃতজ্ঞতাবশতঃ সেই ভগবান মহাবীর ও বুদ্ধদেবের জন্যে তাঁরা মুক্ত হস্তে দান করেছিলেন – দুই ধর্মের প্রচার এবং সংগঠনে।

এই বণিকদের রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল অপরিসীম, কারণ একদিকে প্রচুর বাণিজ্য কর দিয়ে তাঁরা যেমন রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি করাতেন, অন্যদিকে নানান উপহার এবং দৈব-দুর্বিপাকে রাজাদেরকে অর্থ সাহায্য (অথবা ঋণ) দিয়ে রাজাদের ওপর প্রভূত প্রভাবও বজায় রাখতেন। আজ থেকে মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে (১৭৫৬-৫৭ সি.ই.), নবাব সিরাজদ্দৌলাকে সরিয়ে ক্লাইভ ও তাঁর অনুগত মিরজাফরকে সিংহাসনে বসাতে বণিক মহতাব চাঁদ ও স্বরূপ চাঁদের (ইতিহাসে যাঁরা “জগৎ শেঠ” (Banker of the World) উপাধিতে বিখ্যাত) ভূমিকা এবং তাঁদের বিপুল অর্থব্যয়ের হিসেব জানলে চমকে উঠতে হয়। অতএব রাজাকে রাজা বানিয়ে তুলতে (king-maker) বণিকসম্প্রদায়ের প্রভাব আজও যেমন আছে, সে সময়েও ছিল – এমন অনুমান করাই যায়। কেন অনুমান করা যায় সে কথায় আসার আগে, সমসাময়িক ভারতীয় বাণিজ্যের ব্যাপ্তি এবং বিস্তার বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বৌদ্ধ এবং জৈন শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠীবহুল যে যে নগরের নাম পাওয়া যায় সেগুলি হল শ্রাবস্তী, বিদিশা, গান্ধার (তক্ষশিলা), পাটলিপুত্র, উজ্জয়িনী। এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ যে যে বন্দর শহরের নাম পাওয়া যায়, সেগুলি হল পশ্চিমে ভৃগুকচ্ছ (গুজরাটের ভারুচ), সোপারা ও কল্যাণ (মহারাষ্ট্রে মুম্বাইয়ের কাছাকাছি), পূর্বে তাম্রলিপ্তি এবং চন্দ্রকেতুগড় (পশ্চিমবঙ্গ) এবং দক্ষিণে কোডাঙ্গালুর (কোচি, কেরালা), কোরকাই, আলাগনকূলম, আরিকামেডু (তামিলনাড়ু), মসুলিপতনম (অন্ধ্র) ইত্যাদি। গুজরাটের ভারুচ এবং অন্ধ্রের মসুলিপতনম ছাড়া, সবগুলিই এখন গুরুত্বহীন জনপদ, কারণ সমুদ্র অনেকটাই সরে গেছে, এই শহরগুলি থেকে। এই বন্দর শহরগুলি থেকে যে যে সামগ্রী রপ্তানি হত, তার মধ্যে প্রধান ছিল,

ক. মশলা - লবঙ্গ, এলাচ, দারচিনি, জয়িত্রি, জায়ফল, পান, সুপুরি, তেজপাতা এবং ভীষণ দামি ছিল গোলমরিচ। মশলাগুলির ব্যাপক চাহিদা ছিল গ্রীস, মিশর এবং পরবর্তী কালে রোমান সাম্রাজ্যেও। শোনা যায় গোলমরিচ রপ্তানি করেই, ভারতীয় বণিকেরা সব থেকে বেশি রোমান স্বর্ণমুদ্রা অর্জন করতেন। এই প্রসঙ্গে সুপুরি নিয়ে একটা মজার কথা বলি। সুপুরির প্রধান উৎস ছিল আসাম, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বভারত। সে অঞ্চলে  তার নাম ছিল গুয়া[1], যে কারণে আসামের রাজধানি গুয়াহাটি (গুয়ার হাট)। বাংলার বণিকেরা শোনা যায় এই গুয়াহাটি থেকে নদীপথে তাম্রলিপ্তি বন্দর এবং সেখান থেকে সমুদ্রপথে পশ্চিম উপকূলের সোপারা বন্দরে গুয়া বা গুবাক পৌঁছে দিত। সোপারা বন্দর থেকে গুয়া রপ্তানি হত আরব, মিশর এবং গ্রীসে। মিশরীয়রা এই ফলের নাম দিয়েছিল “সোপারার ফল”। পরবর্তীকালে এই “সোপারার ফল” নামটি সমগ্র ভারতবর্ষেই “সুপুরি” হয়ে উঠেছিল এবং অসম ও উত্তরপূর্বের কিছু কিছু অঞ্চল ছাড়া, গুয়া শব্দটির আর তেমন প্রচলন নেই। বাংলার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যগুলিতে (যদিও অনেক পরবর্তী কালের- পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীর রচনা) বলা হয়েছে, বাংলার বণিকেরা সুপুরির ব্যবসা করে নাকি মাণিক্য অর্জন করতেন! অতএব সুপুরি রপ্তানিও যথেষ্ট লাভজনক ব্যবসা ছিল।   

খ.  বস্ত্র – কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গদেশ ও অসমের চার রকম বস্ত্রের প্রশংসা পাওয়া যায় - দুকূল, পত্রোর্ণ, ক্ষৌম এবং কার্পাসিক। বঙ্গের দুকূল বস্ত্র খুবই সূক্ষ্ম – অর্ধস্বচ্ছ এবং মসৃণ, সাপের খোলসের মতো। এই বস্ত্রের চাহিদা ছিল মিশর, গ্রীস এবং পরবর্তী কালে রোম সাম্রাজ্যের রাজপরিবারেও। ক্ষৌম একটু মোটা বস্ত্র – সাধারণের পরার জন্যে।  পত্রোর্ণ সাদা বা ধোয়া কৌষেয় বস্ত্র - এণ্ডি বা মুগার বস্ত্র। ষষ্ঠ শতাব্দীতে লেখা “অমরকোষে” পত্রোর্ণের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে – এক বিশেষ কীট পাতার মধ্যে উর্ণা (জাল) সৃষ্টি করে, সেই উর্ণা থেকে বানানো হত পত্রোর্ণ বস্ত্র। সেরা কার্পাসিক বস্ত্র অর্থাৎ কাপাস তুলোর বস্ত্র তৈরি হত মাদুরা, কলিঙ্গ, কাশী, বঙ্গ, বৎস জনপদে। তুলো থেকে অতি সূক্ষ্ম বস্ত্র বানানোর প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবেই ভারতীয়। বি.সি.ই-র দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই ভারতের ধুনুরিরা ধুনুক (cotton carders’ bow) দিয়ে তুলে ধুনে, বাছাই করা হাল্কা তুলো দিয়ে সূক্ষ বস্ত্র বানিয়ে দেশে বিদেশে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

 গ. এছাড়া নানান বিলাস দ্রব্য যেমন, হাতির দাঁত এবং হাতির দাঁতের নানান উপহার সামগ্রী। মুক্তা এবং নানান ধরনের দামি পাথর, বিশেষ করে পান্না – অলংকারে বসানোর জন্যে, চন্দনকাঠ এবং মহার্ঘ আসবাব বানানোর জন্যে আবলুস (ebony) কাঠ। বস্ত্রের শুভ্রতা রাখার জন্যে নীল (indigo)কয়েকশ বছর আগেও ব্রিটিশ রাজত্বে সমগ্র বঙ্গ এবং বিহারের চাষীদের ওপর এই নীল চাষের অত্যাচার মারাত্মক বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিল। ইওরোপের নীলের চাহিদা বহুদিনের।

 ঘ. পোষ্যপ্রাণী – বাঁদর, ময়ুর, কাকাতুয়া, টিয়া, মোনাল, চিতা ইত্যাদি। রোমান রাজপরিবারে এই পোষ্য প্রাণীদের দারুণ চাহিদা ছিল।

ঙ. ওষধি – নানাবিধ ওষধি মলম বা প্রলেপ, গাছ-গাছড়া, পান, প্রসাধনী ও গন্ধ সামগ্রী এবং বিশেষ করে যৌন শক্তি বর্ধক ওষধির ভীষণ চাহিদা ছিল।

 

রোমান ঐতিহাসিক প্লিনি অভিযোগ করেছিলেন, রোম সাম্রাজ্য তাদের বিলাসিতার সামগ্রী আমদানির জন্যে পূর্বের দেশগুলিতে বছরে অন্তত ৫৫০০ লক্ষ সেসটার্স[2] ব্যয় করে। যদি পূর্বের দেশগুলির মধ্যে ভারতের ভাগে এর পঞ্চমাংশ ব্যবসাও প্রতিবছর এসে থাকে তাহলে তার মূল্য ছিল ১২,৫৬,৭৫,০০০ গ্রাম রূপো! অতএব শ্রেষ্ঠীদের ধনসম্পদের পরিমাণ কিছুটা আন্দাজ করা যায় বৈকি!

বিদেশে সবকিছুই যে রপ্তানি হত, তা নয়, বিদেশ থেকে অনেক জিনিষ আমদানিও হত, যেমন, সোনা ও রূপোর মুদ্রা, নানান ধরনের সুরা, গন্ধদ্রব্য, প্রসাধনের জন্যে জলপাই তেল, কাচ ইত্যাদি।

এত গেল বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এর সঙ্গে ছিল নিবিড় অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য। অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য চলত প্রধানতঃ নদীপথে এবং স্থলপথে। তক্ষশিলা থেকে পাটলিপুত্র হয়ে, তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত প্রাচীন দীর্ঘতম স্থলপথের কথা আগেই বলেছি। তাছাড়াও দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল নদী এবং সমুদ্রের উপকূলবর্তী পথের অন্তর্জাল। গাধা, খচ্চর, ঘোড়া, বলদের গাড়ি, উত্তর-পশ্চিমের মরু-অঞ্চলে উঠের পিঠেও বাণিজ্য সামগ্রী বহন করে বণিকদের বড়ো বড়ো দল (caravan) একত্রে চলাফেরা করত। নদীগুলি পার হওয়ার জন্যে সেতু ছিল না, ফেরি নৌকা ব্যবহৃত হত। এই স্থলপথে দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই এমনকি তক্ষশিলা হয়ে সুদূর আরব এবং পারস্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন নগরীতেও বাণিজ্য সম্ভার পৌঁছে যেত। আবার তক্ষশিলা থেকে বেগ্রাম এবং বামিয়ান হয়ে উত্তরে অক্সাস (আমু দরিয়া) নদী পথে আরল সাগর এবং পশ্চিমে ক্যাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্য সাগর পর্যন্ত এই বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের নিদর্শন পাওয়া যায়। বামিয়ানের বৌদ্ধ উপনিবেশ যে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল, তার নিদর্শন পরবর্তীকালে বানিয়ে তোলা (৫০৭ সি.ই.) বামিয়ান বুদ্ধমূর্তিগুলি থেকে বোঝা যায়। যদিও ২০০১ সালের মার্চে, এই মূর্তিগুলি ধ্বংস করে, আফগানিস্তানের তালিবান প্রশাসন তাঁদের ধর্মের অনুশাসনকে চরিতার্থ করেছেন। ভারতীয় বণিকরা এই পথের ওপর অনেকগুলি শহরে, তাঁদের বাণিজ্য আবাসও গড়ে তুলেছিল, যেমন কাশগড়, ইয়ারকান্দ, খোটান, মিরন, কুচি, খারাশহর এবং তুরফান। এই পথের অনেকটাই সুদূর অতীত থেকে চীন ও মধ্য এশিয়া যাতায়াতের রেশম পথের (silk route) সঙ্গে সংযুক্ত। আশ্চর্যের বিষয়, এই বণিকদলগুলির সঙ্গে প্রত্যেকটি জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রচারকরাও!  

স্থল-বাণিজ্যে পণ্য সামগ্রীর কোন সীমা ছিল না। পূর্ব ভারত থেকে যেত নানান ধরনের বস্ত্র, পান, সুপুরি, নারকেল, মুক্তা, উৎকৃষ্ট ধান বা চাল, তামা বা ব্রোঞ্জের তৈজসপত্র, মাটির পাত্র। দক্ষিণদেশ থেকে আসত দামি পাথর – পান্না, প্রবাল, সোনা, মুক্তা, কড়ি, শঙ্খ, নানান মশলা। পশ্চিম থেকে আসত রূপো, তামা, ব্রোঞ্জ, লোহা এবং খনিজ লবণ। আরব এবং পারস্য দেশ হয়ে সুদূর মিশরে হাতি এবং গণ্ডার রপ্তানি হওয়ার কথাও শোনা যায়, আবার উল্টোদিকে আরব থেকে ভারতে আমদানি করা হত ভালো জাতের ঘোড়া।

দেশ জুড়ে এই নিবিড় বাণিজ্যিক অন্তর্জাল গড়ে তুলত এবং নিয়ন্ত্রণ করত বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ী শ্রেণী বা পুগা (পালি ভাষায় সমিতি বা সমবায়) (guilds)সমিতির প্রধানরা সকলেই বংশপরম্পরায় সম্পন্ন বণিক হতেন। সর্বস্তরে তাঁরা তাঁদের অর্থ লগ্নী করতেন, সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে নদীপথে চলা বাজরা। গাছের গুঁড়ি কেটে বড়ো বড়ো নৌকা বানানো হত, অনেকগুলি গুঁড়ি পাশাপাশি বেঁধে জাহাজ বানানো হত। ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে এই সব জাহাজ লোহিত সাগর পর্যন্ত চলে যেত বাণিজ্য করতে। প্লিনির বর্ণনায় পাওয়া যায়, ভারতের বৃহত্তম জাহাজের ওজন ছিল প্রায় ৭৫ টন এবং সাতশ জন পর্যন্ত নাবিক সে জাহাজে যাত্রা করতে পারত! শুধু পশ্চিমের দেশগুলিতেই নয়, বাণিজ্য সম্ভার নিয়ে পূর্ব উপকূলের বন্দর তাম্রলিপ্তি থেকে পূর্বের বার্মা, জাভা, কম্বোজ, শ্যাম, সুমাত্রা দ্বীপেও বণিকেরা নিয়মিত যাওয়া আসা করত। 

ব্যবসায়ী সমবায় বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন পেশার দক্ষ শিল্পীদের দিয়ে সামগ্রী বানিয়ে নিত। উৎপন্ন সমস্ত সামগ্রীর গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্যে থাকত পরিদর্শকমণ্ডলী। গুণগত মান নিশ্চিত করে, সামগ্রীর গায়ে, ব্যবসায়ী সমিতি তাদের নিজস্ব মোহর (seal) ছাপ দিয়ে দিত। বিখ্যাত সমবায়গুলির মোহর দেশে-বিদেশে সুপরিচিত ছিল। স্পষ্টতঃ বাণিজ্যের উন্নতি নির্ভর করত এই মোহরগুলির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রত্যেকটি সামগ্রীর আন্তর্দেশীয় এবং অন্তর্দেশীয় মূল্যও নির্ধারণ করে দিত, যাতে কোন অসৎ খুচরো বণিক (retailer) অত্যধিক লাভের লোভে স্বদেশে কিংবা বিদেশের গ্রাহকদের ঠকাতে না পারে। সমবায় থেকেই রাষ্ট্র বা রাজ্যের বাণিজ্য করও মিটিয়ে দেওয়া হত, মিটিয়ে দেওয়া হত বিদেশের আমদানি এবং রপ্তানি শুল্ক। মৌর্য যুগে বাণিজ্য সামগ্রীর মূল্যের, এক পঞ্চমাংশ ছিল উৎপাদন কর এবং উৎপাদন করের এক পঞ্চমাংশ ছিল বাণিজ্য কর। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই কর ফাঁকি দিলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।

ব্যবসায়ী সমবায়ের প্রধানরা অত্যন্ত ধনী ছিলেন, এর উদাহরণ আমরা আগেই পেয়েছি। তাঁরা মহাজনী প্রথায় ঋণও দিতেন। সাধারণতঃ এই ধরণের ঋণের সুদ ছিল বছরে শতকরা পনের টাকা। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের মতো ঝুঁকির ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁরা ঋণ দিতেন শতকরা ষাটটাকা বাৎসরিক সুদে। রাজারা বিভিন্ন সময়ে পারষ্পরিক রাজ্য জয় করলেও, বিজিত রাজ্যের এই ধরনের প্রভাবশালী ও বিত্তশালী বণিক সম্প্রদায়কে তাঁরা সাধারণতঃ ঘাঁটাতেন না। বরং নিজেদের স্বার্থেই তাঁদের সঙ্গে মৈত্রী এবং সদ্ভাব রাখার চেষ্টা করতেন। যার ফলে এই ধরনের সমবায়গুলি সারা দেশ জুড়ে মোটামুটি নিশ্চিন্ত প্রভাবে তাঁদের বাণিজ্য চালু রাখতে পারতেন। কোন রাজা কাকে জয় করলেন কিংবা কোন রাজা রাজ্যচ্যুত হলেন, তাতে এই বণিক সম্প্রদায়ের খুব একটা এসে যেত না।

তবে অযোগ্য রাজার প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে, পথেঘাটে, নদীপথে কিংবা সমুদ্রপথে ডাকাতি, লুঠপাট – এক কথায় অরাজকতা বেড়ে গেলে। কিংবা বিলাসী রাজারা খেয়াল খুশী মতো অযৌক্তিক কর বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করলে, সেই রাজারা বণিকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতেন।  এরকম কোন রাজার ওপর বণিকরা বিরক্ত হয়ে উঠলে, প্রতিবেশী বা উৎসাহী বিরোধী রাজাকে তাঁরা পরোক্ষে সাহায্যই করতেন। আমরা আগেই দেখেছি নন্দরাজারা সাম্রাজ্যের সমস্ত ভূমি ও ভূমিসম্পদ কর যোগ্য করে তুলেছিলেন। নতুন এই নিয়মে সাধারণের মনে বিক্ষোভ আসা অস্বাভাবিক নয়। উপরন্তু শোনা যায়, নন্দবংশের শেষ রাজা ধননন্দ ছিলেন সীমাহীন রমণীবিলাসী উচ্ছৃঙ্খল রাজা এবং অযোগ্য প্রশাসক। অতএব শক্তিশালী ধননন্দকে সরিয়ে অনেকটাই দুর্বল চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসনে বসানোর পেছনে বণিক সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ সাহায্য যে ছিল, এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

 

৩.৬.৫ ভারতের প্রথম সুবর্ণ যুগ

এই পর্বের প্রাককথায়, ৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই পর্যন্ত সময়কালকে আমি “সুবর্ণ যুগ” বলেছিলাম। আশা করি সে বিষয়ে আর খুব বেশি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। এই যুগে অখণ্ড ভারতবর্ষ, এক দেশ - এক মহাদেশ হয়ে সমকালীন বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভারতের চিন্তা-ভাবনা-দর্শন নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে বিস্তার লাভ করছিল, দেশের ভিতরে এবং বাইরে। এই ভাবনা-চিন্তার প্রসার ও প্রচারের হাত ধরে সারা দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় ধীরে ধীরে সাক্ষর হয়ে উঠছিল। তাদের ভাবনা-চিন্তায় প্রভাব ফেলছিল বিশ্বের অনেকগুলি প্রাচীন সভ্যতা – যেমন পারস্য, মিশর, গ্রীস, ব্যাক্ট্রিয়া, রোম; পশ্চিমের বেশ কিছু যুদ্ধবাজ পশুপালক উপজাতিও – শক, পার্থিয়ান, কুষাণ। এইসব বিদেশী ভাবনা চিন্তার সঙ্গে দেশজ অনার্য-ব্রাহ্মণ্য-জৈন-বৌদ্ধ দর্শন মিলেমিশে - একই সূত্রে বেঁধে ফেলছিল সুদূর চট্টগ্রাম থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর ভারতবাসীকে। অঞ্চলভেদে তাদের ভাষা এক নয়, খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণও বিচিত্র – কিন্তু ভাবনা-চিন্তা এবং মূল প্রথা ও রীতিতে তাদের আশ্চর্য ঐক্য। রাজনৈতিক স্বার্থে প্রাদেশিকতার বিষ আজ আমাদের মনে সঞ্চারিত হলেও, ব্যক্তিগত পরিসরে সেই ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন প্রত্যেকটি সাধারণ ভারতবাসী।            

 

তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "

 

তৃতীয় পর্বের চিত্র ঋণঃ

১) https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Jetvan_bharhut.JPG

২) https://en.wikipedia.org/wiki/Pillars_of_Ashoka                                                       

তৃতীয় পর্বের মানচিত্র ঋণঃ  https://en.wikipedia.org/wiki/Maurya_Empire#/media/File:Maurya_Empire,_c.250_BCE_2.png

 তৃতীয় পর্বের গ্রন্থঋণ ও তথ্যঋণঃ

১) The Penguin History of Early India : Dr. Romila Thapar

২) কল্পসূত্র – ভদ্রবাহু (জৈন আগম শাস্ত্রের অংশ) – বঙ্গানুবাদ শ্রী বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়। 

৩) Old path white clouds : Mr. Thich Nhat Hanh

৪) বুদ্ধচরিত – অশ্বঘোষঃ ভাষান্তর শ্রী সাধনকমল চৌধুরী

৫) বৌদ্ধ দর্শন – রাহুল সাংকৃত্যায়নঃ অনুবাদ শ্রীধর্মাধার মহাস্থবির

৬) গৌতম বুদ্ধ – ডঃ বিমলাচরণ লাহা

) Mauryan Empire – Mr Ranabir Chakravarti, Jawaharlal Nehru University, India –    The Encyclopedia of Empire, First Edition. Edited by Mr John M. MacKenzie.

) Candragupta Maurya and his importance for Indian history – Mr Johannes Bronkhorst, University of Lausanne, Switzerland– publication at: https://www.researchgate.net, uploaded on 15 November 2015.

) The Oxford History of India – Late Vincent Smith; Revised by Sir Mortimer Wheeler and Mr A. L. Basham (1981)

১০) The wonder that was India – A. L. Basham

১১) Asoka’s Edicts – Dr. Amulyachandra Sen – Published by Indian Institute of Indology (July 1956)

১২) বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) – ডঃ নীহাররঞ্জন রায়।



[1] গুয়া শব্দটি প্রাক্‌-আর্য অর্থাৎ অনার্য শব্দ, সংস্কৃতায়নের পর এটি “গুবাক” হয়ে যায়। 

[2] সেসটার্স (sesterces) – প্রাচীন রোমান তামা বা ব্রোঞ্জের মুদ্রা, চার সেসটার্সে এক ডিনারিয়াস রৌপ্য মুদ্রা – যার ওজন ৪.৫৭ গ্রাম।   


সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

এক যে ছিলেন রাজা - ৭ম পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "



[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের ষষ্ঠ পর্ব - "এক যে ছিলেন রাজা - ৬ষ্ঠ পর্ব


১৫ 

সেই দিন পুত্র বেণের কক্ষ থেকে অপমানিতা হয়ে ফেরার পর, রাজমাতা ভীষণ মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। কখনো নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছেন। কখনো ধিক্কার দিচ্ছেন পুত্রকে, পুত্রের উদ্ধত আচরণকে। কখনো স্বামী মহারাজ অঙ্গকেও - তিনি কেন কঠোর হননি? স্নেহে অন্ধ মাতা, পুত্রকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে বুঝেও, মহারাজ অঙ্গ কেন শাসন করেননি দুজনকেই? আবার কখনো আকুল অশ্রুসিক্ত নয়নে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, হে ঈশ্বর, দয়া করো, কৃপা করো, করুণা করো। এই সবের মধ্যেও দিনে রাতে সর্বদা, তিনি অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন, তাঁর পুত্র বেণ ঠিক এসে দাঁড়াবে তাঁর সামনে। সে নিজের ভুল বুঝতে পারবেই। রাগের মাথায় কী বলতে কী বলে ফেলেছে, অনুশোচনা তার হবেই। গতকাল আসেনি, আজও এল না, আগামীকাল নয়তো পরশু নিশ্চয়ই আসবে। পুরুষমানুষ খুব অহংকারী হয়, ভাঙে কিন্তু মচকায় না। সময় নেবে কিন্তু সেই ভাঙবেই। কিন্তু আসবে ঠিক। পুত্র বেণ সামনে এসে দাঁড়িয়ে যখন বলবে, “মা, আমার ভুল হয়ে গেছে, মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও” তিনি কী করবেন, মনে মনে তাও ঠিক করছিলেন। কখনো ভেবেছেন, বুকে জড়িয়ে ধরবেন, কান্নাধরা গলায় বলবেন মায়ের কাছে ভুল করে, ক্ষমা চাইতে হয়, বাবা?” কখনো ভেবেছেন, নাঃ, অত সহজে মেনে নেওয়াটা ঠিক হবে না। কঠিন মুখ করে খুব দু চার কথা শুনিয়ে দেবেন কট কট করে। তারপর পুত্রের আনত ম্লানমুখের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বলবেন, “এতদিনে আমার পুত্র-মহারাজের ক্রোধ প্রশমিত হল”? এইভাবেই পক্ষকাল চলে গেল, কিন্তু পুত্র বেণ এল না। তিনি সংবাদ পান, তাঁর পুত্র এখন রোজই সন্ধ্যা থেকে রাত্রি শেষ পর্যন্ত, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননেই থাকে। এর মধ্যে অন্ততঃ তিন দিন নটী বিদ্যুল্লতাকে নিয়ে তাঁর পুত্র নব নির্মীয়মাণ উদ্যানকানন পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন। অসহায় মনোকষ্ট অসহ্য হয়ে ওঠাতে তিনি গতকাল মহর্ষি ভৃগুর সাক্ষাৎপ্রার্থিনী হয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন। আজ বৈকালে, সেই দূত ফিরে এসে বার্তা দিল, মহর্ষি ভৃগু মহারাণির কাছে ক্ষমাভিক্ষা করেছেন। বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর প্রাসাদে আসা সমীচীন নয়। উপযুক্ত সময়ে, মহারাণির অনুগ্রহের আশায়, তিনি নিজেই আসবেন।

দূতের মুখে মহর্ষির বার্তা পাওয়ার পর থেকে, নিজের ঘরে এই বাতায়নের সামনে বসে, নিজের চিন্তাতেই ডুবেছিলেন মহারাণি সুনীথা। বিকেলের পাখিরা ফিরে এসেছে তাদের নিশ্চিন্ত বাসায়। রাজপ্রাসাদের উপবন তাদের কাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছিল অনেকক্ষণ। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর অন্ধকার তার আঁচল বিছিয়ে ঢেকে দিল চারি পাশ। ঝোপে ঝাড়ে একটা দুটো জোনাকি জ্বলে উঠল, শিকারের সন্ধানে উড়াল দিল নিশাচর উলূক। কৃষ্ণঘন আকাশের গায়ে রূপোলী চুমকির মতো জ্বলে উঠল একটা দুটো তারা। পদ্মবালা তাঁর ঘরে জ্বেলে দিল মঙ্গলদীপ ও দেওয়ালগিরি। সেই আলোকিত ঘরের দিকে তাকিয়ে রাজমাতা সুনীথার মনে হল, এ সব অকারণ। তাঁর জীবন থেকে সব আলোই যখন মুছে গেছে, তখন এই আলোকসজ্জা অবান্তর বাহুল্য।

তিনি দাসী পদ্মবালাকে বললেন, “পদ্ম, এই ঘরের সমস্ত আলো নিভিয়ে দে। অন্তরে বাইরে আজ সব অন্ধকার হয়ে উঠুক, আমার জীবনে সমস্ত আলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আলো আমাকে আর আনন্দে উদ্ভাসিত করতে পারে না। আলো আমার এই নির্মম পরিণতির উন্মোচন করে। আমি আলো চাই না, অন্ধকারের মধ্যে আমাকে আত্মগোপন করতে দে”।

কিশোরী সুনীথার পিতৃগৃহ থেকেই পদ্মবালা তাঁর নিত্য সহচরী। মহারাণি হয়ে যেদিন তিনি এই প্রাসাদে পা রেখেছিলেন, সেই দিন থেকে দাসী পদ্মবালাও তাঁর সুখে দুঃখে হাসি কান্নায় নিত্য সঙ্গী। মহারাণির কথায় পদ্মবালা, একটুও আশ্চর্য হল না। পিত্রালয়ের স্নেহ, আদরে বড়ো হয়ে ওঠা সেই কন্যা, মহারাজের সহধর্মিণী হয়ে এই প্রাসাদের, এই রাজ্যের মহারানি সুনীথা অনেক সম্মান, অনেক মর্যাদা আর সুখ উপভোগ করেছেন সারা জীবন। নিয়তির আশ্চর্য ক্রীড়ায় আজ তিনি একান্ত অসহায়, একমাত্র পুত্রের কাছে অপমানিতা অভাগিনী নারী

তাও আজীবনের সহচরী সুনীথার এই পরিণতি পদ্মবালারও সহ্য হয় না, সে বলল, “রাজকুমারী, অন্য সব আলো নিভিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আশার আলোর মতো এই ছোট্ট দীপটি জ্বলুক, আশা ছাড়া কী করে বেঁচে থাকবে? নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কীভাবে খুঁজে পাবে, বাইরে বেরোনোর পথ”?

“তোর এই উপদেশ আর ভালো লাগছে না পদ্ম, চুপ কর। আমাকে একটু একা থাকতে দে”।

পদ্মবালা একটিমাত্র দীপ রেখে, ঘরের সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, যাবার সময় বলে গেল, “আমি পাশের ঘরেই রইলাম রাজকুমারী। তোমার পাশেই আমি থাকবো সারাক্ষণ”। পদ্মবালা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর, রাজমাতা সুনীথা জানালার বাইরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আর ডুব দিলেন নিজের চিন্তায়।

আজ প্রায় ঊণিশমাস হল তাঁর পুত্র বেণ, পিতার সিংহাসনে বসেছে। সে রাজা হয়ে, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য আজ পর্যন্ত কী করেছে, তিনি জানেন না। কিন্তু পুত্রের অজস্র অত্যাচার, অবিচার আর অনাচারের কথা তাঁর কানে আসছে অহরহ। মহারাণি সুনীথার গর্বিত শির, এখন রাজমাতা হয়ে লজ্জায়, অনুশোচনায় অবসন্ন, অবনত। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের পর তিনি এখন মহর্ষি ভৃগুকেই একমাত্র ভরসা করতে পারেন। কিন্তু মহর্ষির এই বার্তাতে মহারাণি আরও বিষণ্ণ হলেন। মহর্ষির মতো ব্যক্তি প্রাসাদে আসা সমীচিন নয় বলেছেন, কেন? তাঁকে কে বাধা দেবে, রাজা বেণ? মহর্ষি ভৃগুও কী তাহলে নিরাপদ নন?    

মনে হয় যেন, এই তো সেদিন। মহারাজ অঙ্গের অন্তর্ধানের সংবাদ পেয়ে, মহর্ষি ভৃগু নিজেই এসেছিলেন, প্রাসাদে অনেকক্ষণ ছিলেন। তিনি এসেছেন শুনে মহারাণি সুনীথা, মহর্ষি ভৃগুকে প্রণাম করে, তাঁর পায়ের কাছে বসেছিলেন, কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “সবকিছু ছেড়ে, অমন মানুষটা হঠাৎ কোথায় চলে গেলেন, মহর্ষিঠাকুর? আপনি সর্বজ্ঞ, আপনি সব জানেন। দয়া করে বলুন। আমাদের যদি কোন অপরাধ হয়ে থাকে, আমি নিজে গিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবো। যে শাস্তি তিনি দিতে চান, আমি মাথা পেতে নেব। আপনার অনুমতি ছাড়া উনি কোন কাজই করতেন না, সে তো আপনি জানেন, ঠাকুর। মহারাজ কেন এমন করলেন? কোথায় চলে গেলেন?” শোকে বিহ্বল মহারাণি একইভাবে, তাঁর পায়ের কাছে বসে একটানা বিলাপ করছিলেন, আর তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি ভৃগু একটি কথাও বলেননি, তীক্ষ্ণ চোখে শুধু তাকিয়েছিলেন, মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে।

কিছুক্ষণ পর তিনি নিষ্প্রাণ স্বরে বলেছিলেন, “শান্ত হোন, মহারাণি। শক্ত হোন। বেশ কয়েক বছর ধরেই, মহারাজ অঙ্গ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ছিলেন, এ কথা তো আপনার অজানা নয়। একই কারণে তিনি আমার সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলেন। কীসের যন্ত্রণা, কে তার কারণ, সে কথা আমার থেকেও আপনি অনেক ভাল জানেন, মহারাণি। পুত্র বেণ কোথায়? তাকে দেখছি না? এই সময়, তার উচিৎ মাতার সঙ্গে থাকা”!

মহর্ষির কথায় কেউ একজন সংবাদ দিল, মহারাজ অঙ্গপুত্র বেণকেবেণ এল তার আসার দিকে তাকিয়ে রইলেন, মহর্ষি ভৃগু। সামনে এসে যখন দাঁড়াল, মহর্ষির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির থেকে চোখ সরিয়ে নিল, মাথা নীচু করল। কিন্তু সেই মাথা নত করার মধ্যে কোন শোক, বিষাদ কিংবা দুঃখের লেশ মাত্র খুঁজে পেলেন না মহর্ষি।

রাজমাতা সুনীথা বললেন, “মহর্ষিকে প্রণাম কর, বেণ”।

মায়ের কথায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই, বেণ বলল, “প্রণাম, মহর্ষি”।

প্রাসাদের এই শোকের আবহের মধ্যেও বেণের এই অদ্ভূত ঔদ্ধত্য মহর্ষির চোখ এড়াল না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আজ তবে আসি, মহারাণি”।

“এখনই উঠলেন, ঠাকুর? আমাদের এখন কী কর্তব্য, বলবেন না?”

“অপেক্ষা ছাড়া আর কোন কর্তব্য তো এখন দেখছি না, মহারাণি”?

“আপনি বলছেন, তিনি ফিরে আসবেন? আমারও তাই ধারণা, ঠাকুর। মন কিছুটা শান্ত হলেই তিনি ফিরে আসবেন”।

বেণের অধৈর্য আচরণ মহর্ষির চোখ এড়াল না, বেণ জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু মা, কতদিন? কতদিন তিনি আমাদের অপেক্ষায় রাখবেন?”

রাজমাতা সুনীথা বললেন, “হয়তো কাল, হয়তো পরশু। অথবা এক মাস। সে কথা তিনিই জানেন পুত্র”!

“কিন্তু রাজ্য, রাজকার্য? অনির্দিষ্ট কালের জন্যে সব থমকে থাকবে?”

বেণের এই কথায় মহর্ষি ভৃগু বললেন, “তুমি কী চাইছ বৎস? পিতার অন্ত্যেষ্টি? পারলৌকিক অনুষ্ঠান?”

মহর্ষির শান্ত অথচ দৃঢ় এই প্রশ্নে বেণ হঠাৎ কোন উত্তর দিতে পারল না, যুবরাজমাতা সুনীথাও তাকিয়ে রইলেন পুত্রের মুখের দিকে, তাঁর দৃষ্টিতে আশ্চর্য আতংক।

কিছুটা সামলে নিয়ে, বেণ উত্তর দিল, “না, না তা কেন? অপেক্ষা আমরা করবো, কিন্তু রাজকার্যও অবহেলার নয়, মাতা”। মহর্ষি ভৃগু আর কিছু বললেন না, বেণের মুখের দিকে তাকিয়ে, বললেন, “আমাকে অনুমতি দিন, মহারাণি”।

 

এই ঘটনার পক্ষকালের মধ্যেই রাজরাণি সুনীথা মহর্ষি ভৃগুকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পরামর্শের জন্য। সে সময় মানসিক দ্বিধায় তিনি নিজের কর্তব্য-অকর্তব্য কিছুই স্থির করতে পারছিলেন না। স্বামীর অদ্ভূত অন্তর্ধানের পর, একদিকে তাঁর পুত্র অতি দ্রুত সিংহাসনের উত্তরাধিকার চেয়ে নিজের রাজ্যাভিষেক চাইছিল। অন্যদিকে মহারাজ অঙ্গের মন্ত্রী, অমাত্য সকলেই, এই অভিষেকে আপত্তি করছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, মহারাজ অঙ্গ কোথায় গেলেন, কেন গেলেন, আর ফিরে আসবেন কিনা, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে, পুত্রের রাজ্যাভিষেক করানোর অর্থ মহারাজ অঙ্গকে সম্পূর্ণ অস্বীকার। মহারাজ অঙ্গ যদি বাণপ্রস্থেই গিয়ে থাকেন, তিনি তো অনায়াসেই পুত্রের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে যেতে পারতেন। ধার্মিক রাজারা এমনই করেন, আর মহারাজ অঙ্গের মতো ধর্মে অবিচল রাজা, এমন করলে কিছুমাত্র অস্বাভাবিক হত না।

কিন্তু তিনি কোথায়? একদিকে স্বামীর অদ্ভূত এই আচরণ তারওপর পুত্র বেণের সিংহাসন লাভের জন্য উদগ্র ব্যস্ততা তাঁকে বিহ্বল করে তুলেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, পিতার সিংহাসনে বসে, পুত্র বেণ রাজ্যের পূর্ণ দায়িত্ব পেলে, সে শান্ত হয়ে যাবে। হয়তো রাজা অঙ্গেরও এটাই অভিপ্রায়। পিতার অনুপস্থিতিতে পুত্র বেণ রাজা হিসাবে কেমন আচরণ করে, সেই পরীক্ষার জন্যেই হয়তো তিনি আত্মগোপন করে আছেন। আর সেই দ্বিধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যেই, পুত্রকে অভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেবার আগে তিনি মহর্ষি ভৃগুর শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

মহর্ষি ভৃগুর সঙ্গে সেদিন নিভৃত কক্ষের আলোচনায়, ছিলেন শুধু মহারাণি সুনীথা আর তাঁর বিশ্বস্ত দাসী পদ্মবালা। মহর্ষি আসন নেওয়ার পর, মহারাণি তাঁর চরণ বন্দনা করে নিজের মানসিক দ্বন্দ্বের কথা খুলে বললেন। এখন তাঁর কী কর্তব্য সেটাও জিজ্ঞাসা করলেন।

সব শুনে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “মহারাজ অঙ্গের অনুপস্থিতিতে আপনি রাজ্যভার গ্রহণ করছেন না, কেন মহারাণি? আমার মনে হয় তাতে আপনার মন্ত্রী, অমাত্যদের কোন আপত্তি হবে না। আর মহারাজ অঙ্গ অদূর ভবিষ্যতে যদি ফিরেও আসেন, তাঁর পক্ষেও ব্যাপারটা আদৌ অসম্মানজনক হবে না”।

“এ আপনি কী বলছেন, মহর্ষিঠাকুর? রাজ্য চালনার আমি কী জানি, কী বুঝি? রাণি হিসাবে আমি এতদিন রাজঅন্তঃপুর সামলে এসেছি, কিন্তু রাজ্য সামলানো কী আমার পক্ষে সম্ভব? এ কাজ পুরুষের কাজ। রাজার উত্তরাধিকার হয়ে পুত্র বেণই কী তার পিতার সিংহাসনের যোগ্য দাবিদার নয়?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাসলেন, “মহারাণি, আপনার পুত্র, তার পিতার যোগ্য উত্তরাধিকার কিনা, সে বিষয়ে আপনার মনে প্রশ্ন কেন? এই রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকার কে, সে বিচারের জন্যে এই রাজ্যের প্রাজ্ঞ মন্ত্রী, অমাত্য, এমনকি আপনিও কী যথেষ্ট নন? আমাকে প্রশ্ন করা বাহুল্য মাত্র”।

“মহর্ষিঠাকুর, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, এড়িয়ে গেলেন”।

“আমার উত্তর আমি প্রথমেই দিয়েছিলাম, মহারাণি। সে উত্তর আপনার মনোমত হয়নি, এখন আপনি আমার থেকে আপনার মনোমত উত্তর শুনতে চাইছেন? তাহলে খুব স্পষ্ট ভাষায় আপনাকে বলি? মহারাজ অঙ্গের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে, আমাদের কারো মনেই কোন সংশয় নেই। কিন্তু সত্য বলতে, আমরা কেউই চাইছি না, তাঁর পুত্রের হাতে এ রাজ্যভার যাক। তার কারণ আপনি খুব ভালো ভাবেই জানেন। আজ মহারাজা অঙ্গ যদি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে থাকেন, তার কারণও আপনি অনুমান করতে পারছেন”!

“কিন্তু, তাকে একবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না? রাজ্য এবং পিতার সুকীর্তি রক্ষার দায়িত্ব পেলে, তার মতি যদি পরিবর্তন হয়ে যায়?”

মহারাণি সুনীথার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মহর্ষি বললেন, “সে দুরাশা আমরা কেউই করি না, মহারাণি। আর এও জানি পুত্রকে সিংহাসনে অভিষিক্ত না করলে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। আবার পুত্রের হাতে রাজ্যভার দেওয়ার পরেও, দুশ্চিন্তা আপনার নিত্যসঙ্গী হবে”।

“আপনি কী আমাকে আর আমার পুত্রকে অভিশাপ দিচ্ছেন, মহর্ষিঠাকুর?”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, “আপনি পুত্রের রাজ্য অভিষেকের আয়োজন করুন, মহারাণি। নির্দিষ্ট দিনে আমি নিজেই আসবো তাকে আশীর্বাদ করতে”

 

রাজমাতা সুনীথার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, পদ্মবালার পায়ের শব্দে। ঘাড় ফিরিয়ে পদ্মবালার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, উত্তেজনায় পদ্মবালা হাঁফাচ্ছে। তিনি বললেন, “কী হয়েছে, পদ্ম? বেণ আসছে?” মাতা সুনীথার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, দুই বক্ষে অনুভব করলেন অদ্ভূত ভার।

পদ্মবালা ইতস্ততঃ করে বলল, “না রাজকুমারী, মহারাজ বেণ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। রাজবৈদ্যকে বার্তা দেওয়া মাত্র তিনি প্রমোদকানন থেকে রাজাকে প্রাসাদের কক্ষে আনিয়েছেন। চিকিৎসাও শুরু হয়েছে, কিন্তু এখনো জ্ঞান ফেরেনি”।

“তুই কি দেখতে গিয়েছিলি”? রাজমাতার কণ্ঠে উদ্বেগ, “আমি যাবো এখনই, আমার সঙ্গে চল”।

মাথা নীচু করে পদ্মবালা বলল, “গিয়েছিলাম, উপনগরপাল শক্তিধর আমাকে ঢুকতেই দিল না। বলল, আপনি বা আমি গেলে মহারাজ বেণ উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারেন। রাজবৈদ্য বলেছেন, জ্ঞান ফেরার পর কোন রকম উত্তেজনা, রাজার পক্ষে মারাত্মক”।

পদ্মবালার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রাজমাতা, তারপর অস্ফুটে বললেন, “তাই বুঝি”?  

১৬     

প্রিয় দুই শিষ্য, বিশ্ববন্ধু আর রণধীরকে নিয়ে মহর্ষি ভৃগু বহুদিন পর আজ প্রাসাদে এলেন। প্রায় ঊণিশ মাস আগে, মহারাজা বেণের অভিষেকের দিন তিনি শেষ এসেছিলেন। সেদিন নবীন রাজাকে আশীর্বাদ করে, রাজমাতার অনুমতি নিয়ে, বিদায় নিয়েছিলেনতারপর আর একবারের জন্যও তিনি আসেননি। অথচ মহারাজ অঙ্গের সময়, তিনি এই রাজ্যে উপস্থিত থাকলে, পক্ষকালের মধ্যে অন্ততঃ একবার তাঁকে আসতেই হতো। মহারাজ অঙ্গের আন্তরিক সখ্যতা তাঁকে বার বার টেনে আনতো এই প্রাসাদে।

মহারাজ বেণের প্রাসাদে প্রবেশের মুখেই উপনগরপাল শক্তিধর তাঁকে বাধা দিলেন, বললেন, “মহারাজ বেণ এখন বিশ্রাম করছেন, মহর্ষি। ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়”।

“বৎস শক্তিধর, আমরা রাজা বেণের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ করতে আসিনি, সে কথা তোমার না বোঝার কোন কারণ নেই। তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা আমাদের সকলের কর্তব্য। সে কাজে বাধা দিলে, তুমি রাজা বেণের আরোগ্যকেই হয়তো বিলম্বিত করবে”

“কিন্তু তাঁর চিকিৎসায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় নিযুক্ত রয়েছেন, মহর্ষি”।

“অবশ্যই থাকবেন, তিনি এখন কোথায়”?

“মহারাজের কক্ষে”।

“অতি উত্তম, আমরা তাঁর সঙ্গেও কী একবার সাক্ষাৎ করতে পারি না? বৎস শক্তিধর তুমি হয়তো জানো না, রাজবৈদ্য মৈত্রেয়, আচার্য বিশ্ববন্ধুর এবং আমারও প্রিয় শিষ্য। তাঁর থেকে রাজা বেণের শারীরিক অবস্থার সম্যক ধারণা পেলে, আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি”।

উপনগরপাল শক্তিধর রাজা বেণের উপর এতটাই নির্ভরশীল, তার নিজস্ব কর্তব্য-অকর্তব্য বোধ এখনো গড়ে ওঠেনি। মহর্ষি ভৃগুর মতো দেশ বরেণ্য ব্যাক্তিত্বের সামনে তার বাধার জোরও টিকলো না। তাছাড়া আর কিছু না জানুক, মহর্ষি ভৃগুর অগাধ পাণ্ডিত্যের কথা তারও অজানা নয়। তার মনে হল, মহর্ষির সাক্ষাতে রাজাবেণের চিকিৎসার সত্যিই উপকার হতে পারে! আর রাজাবেণ সুস্থ হয়ে না উঠলে, শক্তিধর নিজেই যে শক্তিহীন হয়ে যাবে, সে বিষয়েও তার কোন সন্দেহ নেই। মহর্ষি ভৃগু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বেণের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁদের পিছনে চললেন শক্তিধর নিজেও!  

তিনজন সেবক ও দুই জন সেবিকা নিয়ে, রাজবৈদ্য মৈত্রেয় মহারাজ বেণের চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছিলেন। অঙ্গপ্রলেপ ও মাথায় বিন্দু বিন্দু তৈল নিষেক চলছিল। কক্ষে সশিষ্য মহর্ষি ঢুকতেই রাজবৈদ্য মৈত্রেয় এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন তিন জনকেই। সেবক সেবিকারাও তাঁদের নমস্কার করলেন, কিন্তু তাদের সেবা কার্য থামল না। চারিদিক পর্যবেক্ষণ করে, মহর্ষি মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “রাজার অবস্থা কেমন, বৎস মৈত্রেয়?”

“এখনো পর্যন্ত খুব আশাপ্রদ নয়, গুরুদেব। সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। প্রথম রাত্রির তুলনায় অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়েছেআজ রজনী শেষে ত্রিরাত্রি পূর্ণ হবে। আশা করি আগামীকাল অবস্থার আরও উন্নতি হবে”

“প্রাণ সংশয়ের কোন লক্ষণ পাচ্ছো না তো?”

“না, না, গুরুদেব প্রাণ সংশয়ের কোন লক্ষণ নেই। তবে...”

“তবে কী?” উপনগরপাল শক্তিধর পিছন থেকে জিজ্ঞাসা করল।

“নিশ্চিত করে বলার সময় এখন নয়, তবে জড়ত্বের সমূহ সম্ভাবনা”।

“জড়ত্ব? তার মানে?” শক্তিধর উদ্বিগ্ন মুখে আবার জিজ্ঞাসা করল। আচার্য বিশ্ববন্ধু বললেন,  “সে কথা শ্রীমৈত্রেয় আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলবেন, শ্রীশক্তিধর। এখন আমাদের কথা বলতে দিন”। মহর্ষি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রাজা বেণকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললেন, “বৎস মৈত্রেয়, তিন মাত্রা ব্রাহ্মীরস ও এক মাত্রা বিশল্যকরণি, মধুর লঘু দ্রবণ সহযোগে সেবন করিয়ে দেখতো পারোআমার ধারণা মস্তিষ্ক তাতে উজ্জীবিত হবে”

“তাই করবো গুরুদেব, আমি দুই-দুই মাত্রায় জলীয় দ্রবণ সহযোগে প্রয়োগ করছিলাম”।

“করে দেখো, কী হয়”। মহর্ষি ভৃগু রাজাবেণের পায়ের তালুতে হাতের নখ দিয়ে আঁচড় টানলেন, রাজাবেণের মুখে কোন বিকার দেখা গেল না, তবে ওই পায়ের আঙুলগুলি সামান্য নড়ে উঠল।

“কী থেকে এমন হল, কিছু অনুমান করতে পারছো, বৎস মৈত্রেয়? মাথার পিছনে কিংবা মেরুদণ্ডে কোন স্থূল আঘাতের লক্ষণ?” 

উপনগরপাল শক্তিধর একটু উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল, “আঘাত কী করে লাগবে, মহর্ষি”? 

এবার আচার্য রণধীর বিরক্ত কণ্ঠে অথচ মৃদু স্বরেই বললেন, “বৎস, শক্তিধর। এই কক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলা অসমীচীন। তাছাড়া আঘাত কী করে লাগবে, সেটা মহর্ষির জানার কথা কী? আপনারই জানার কথা, আপনি মহারাজা বেণের নিরাপত্তার দায়িত্বেও নিযুক্ত না? আঘাত অনেক ভাবেই লাগতে পারে। মদ্যপ অবস্থায় নিজেনিজেই সিঁড়িতে পড়ে যেতে পারেন। কেউ ধাক্কা দিতে পারে। নারী লাঞ্ছনাতে আপনাদের খ্যাতি রাজ্যময়, আত্মরক্ষার সময় কোন কোন আতঙ্কিতা নারীর প্রবল ধাক্কা কী কখনো উপভোগ করেননি?” 

আচার্য বিশ্ববন্ধু আচার্য রণধীরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “প্রিয়সখা রণধীর, এই কী তোমার বিতর্কের সময়? অনভিজ্ঞ যুবক, বন্ধুর অনুগ্রহে দৈবাৎ উপনগরপালের দায়িত্ব পেয়েছে, রাজার নিরাপত্তার গুরুত্ব তার পক্ষে কী করে নির্ণয় করা সম্ভব”? 

আচার্য রণধীর বললেন, “যথার্থ বলেছ প্রিয় বিশ্ববন্ধু, প্রকাশ্য সন্ধ্যায় রাজার এত বড়ো দুর্ঘটনা হল, তখন রাজার নিরাপত্তা কোথায় ছিল কে জানে? আর আজ এই নির্মল সকালে ভারতবরেণ্য মহর্ষি ভৃগু নিজে, আমাদের দুইজনকে নিয়ে রাজসকাশে আসছেন, তাতে রাজার নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটে যাচ্ছে! বৎস শক্তিধর, বিতর্কে কালক্ষেপ করো না। রাজাবেণের এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হও। শোনা যায়, রাজাবেণ ঘটনার সময় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে প্রমোদকাননে সুরাপানে মত্ত ছিলেন?”

“না এ মিথ্যা”।

“মিথ্যা? রাজাবেণ প্রমোদকাননে ওই দিন যাননি?”

“তা নয়, উনি গিয়েছিলেন, সেখানেই ছিলেন”।

“তবে যে বললে মিথ্যা?”

“তিনি সুরাপানে মত্ত ছিলেন, এ কথা মিথ্যা”। 

এই কথায় রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “কিন্তু আমরা যখন রাজাবেণকে প্রমোদকানন থেকে এই কক্ষে নিয়ে আসি, তাঁর শরীরে অতিরিক্ত সুরাপানের সমস্ত লক্ষণই ছিল। তাহলে মিথ্যা বলছেন কী করে?”

“আজ্ঞে সুরাপান করছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত নয়”। 

মৃদু হেসে রাজবৈদ্য মৈত্রেয় বললেন, “আচ্ছা, একজন মানুষের পক্ষে কতটা সুরাপান করলে অতিরিক্ত হয়, সে বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা আছে?”

“না ঠিক তা নয়, তবে...”। 

এবার আচার্য রণধীর সামান্য উষ্মা প্রকাশ করেই বললেন, “উপনগরপাল শক্তিধর, আপনি এই রাজধানী শহরের উপনগরপাল, মহারাজা বেণের সুরক্ষার দায়িত্বও আপনার। অথচ আপনার কথাবার্তায় কোন কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না। একই প্রশ্নের উত্তরে কখনো বলছেন মিথ্যা, আবার বলছেন না মিথ্যা নয়। আপনি এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? নটী বিদ্যুল্লতার কী ব্যবস্থা করেছেন”?

“কী ব্যবস্থা মানে?” অভিজ্ঞ আচার্যদের কথায় শক্তিধর ক্রমশঃ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ছিল।

“ওঁকে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেননি”?

“না, সে আদেশ কী জরুরি? রাজাবেণ নটী বিদ্যুল্লতার একান্ত গুণগ্রাহী। সুস্থ হয়ে রাজা যখন জানবেন, নটী বিদ্যুল্লতা স্বরাজ্যে ফিরে গেছেন, তিনি প্রসন্ন হবেন না”। 

একটু বিদ্রূপ করেই আচার্য রণধীর বললেন, “অতি উত্তম, আপনি চাইছেন, রাজা সুস্থ হয়ে উঠে, নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে আবার “অতি সীমিত” সুরাপান করে, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ুন”?

“এ আপনি কী বলছেন? আমি রাজার একান্ত অনুগত দাস, রাজার সেবাতেই নিয়োজিত”।

“কিন্তু কই? তেমন কোন দায়িত্ববোধ তো আমরা দেখছি না?”  

উপনগরপাল শক্তিধর আচার্যদের কথাবার্তায় দিশাহারা হয়ে উঠল। তার শক্তি ছিল রাজা বেণের প্রশ্রয়, এখন তাঁর অসুস্থতায় তার প্রশাসনিক যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। তার কাছে রাজাবেণের সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ওঠা যে কতটা জরুরি, সে কথা বুঝতে তার আর বাকি রইল না। রাজাবেণ যদি সুস্থ না হন, তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই আশঙ্কায় সে শিউরে উঠল। উপনগরপাল শক্তিধর এতক্ষণে উপলব্ধি করল, সে প্রথম থেকেই এই আচার্যদের যোগ্য কোন সম্মানই দেয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ এই আচার্যরা তাকে রক্ষাও যেমন করতে পারেন, তেমনি তার অযোগ্যতা প্রমাণ করে কঠোর শাস্তি বিধানও করতে পারেনরাজাবেণ যতদিন অসুস্থ, তাঁর নামে এই আচার্যরাই এই রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ করবে, এ কথাটাও সে এখন উপলব্ধি করল।

মহর্ষি ভৃগু এতক্ষণ কোন কথা বলেননি, এখন বললেন, “তোমার পিতা এখন কোথায়, বৎস শক্তিধর? তাঁর শরণাপন্ন হও। তাঁকে আমার নাম করে বলো, রাজ্যের এই সংকটকালে তিনি অভিমান করে থাকলে রাজ্যবাসী অসহায় হয়ে পড়বে। রাজাবেণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত, মন্ত্রী-অমাত্যদের সঙ্গে মিলিতভাবে তাঁরাই এই রাজ্যভার গ্রহণ করুন”। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি শক্তিধরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কথাগুলো তুমিই বলবে? নাকি আমি তাঁকে বার্তা পাঠাবো?” 

নত মুখে উপনগরপাল শক্তিধর বলল, “আমি এখনই তাঁকে বার্তা দিচ্ছি, মহর্ষি। সম্ভব হলে, তিনি এখনই উপস্থিত হতে পারেন”।

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি উত্তম। বৎস মৈত্রেয়, ওষধির মাত্রা পরিবর্তন করে লক্ষ্য রাখো, অবস্থার কোন উন্নতি হয় কিনা। সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা যাবে। এখন আমরা আসি, যে কোন সংকটে বার্তা দিতে সংকোচ করো না। মনে রেখো তুমি একলা নও, আমরা সকলেই তোমার সঙ্গে আছি”।

 

রাজা বেণের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে মহর্ষি বললেন, “বৎস শক্তিধর, আমরা এখন অতিথিশালায় নটী বিদ্যুল্লতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। নিরাপত্তার কারণে তুমি আমাদের বাধা দেবে না তো? অথবা তুমিও আমাদের সঙ্গী হতে পারো”।

উপনগরপাল শক্তিধর বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নত করে বলল, “আমার ভুল হয়েছিল, মহর্ষি। এই রাজপ্রাসাদের সর্বত্র আপনার অবাধ অধিকার। আপনাদের প্রয়োজনে আমি আপনাদের সঙ্গ দিতে পারি”

“উত্তম, তাহলে তুমি এদিকের প্রশাসনিক কর্তব্য সামলাও, পিতা এলে আমার জন্য অপেক্ষায় থাকতে বলো। আর আচার্য রণধীর যেমন বললেন, যত শীঘ্র সম্ভব নটী বিদ্যুল্লতার ফেরার ব্যবস্থা করো। তাঁর নিরাপত্তায় কোন ত্রুটি যেন না হয়, আমাদের রাজ্যের সীমান্ত পর্যন্ত, তোমার বিশ্বস্ত এবং দক্ষ রক্ষীরা যেন তাঁর সঙ্গে থাকে”।

“তাই হবে মহর্ষি। কিন্তু ওঁর নিজস্ব রক্ষী বাহিনী রয়েছে, মহর্ষি”। 

মহর্ষি অতি ধীর কণ্ঠে বললেন, “আমি জানি, বৎস শক্তিধর। কিন্তু নটীবিদ্যুল্লতা কোন্‌ রাজার পালিতা কন্যা এবং কোন্‌ রাজ্যের নগরনটী জানো তো? ওঁনার কিছু হয়ে গেলে...”। 

মাথা নত করে শক্তিধর বলল, “বুঝেছি, মহর্ষি। আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে”।

“উত্তম, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছি। বৎস রণধীর, বিশ্ববন্ধু চলো, রাজা বেণের অতিথিশালার ব্যবস্থাটা দেখে আসি”।

“চলুন গুরুদেব”।

পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " এক যে ছিলেন রাজা - ৮ম পর্ব

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফাস-ক্লাস সিটিজেন



 


হায়ার সেকেণ্ডারির রেজাল্ট বের হবার সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় ভাসতে থাকা স্বপ্নের বুদবুদটি ফেটেই গেল। একদম নিঃশব্দে। কিন্তু বড়ো ব্যথা দিয়ে গেল ফেটে যাওয়ার কালে। শূণ্যে ভাসতে থাকা হাল্কা শরীরটা যে মোটেই হাল্কা নয়, টের পাওয়া গেল মাটিতে সপাট আছাড়ে। জয়েন্টের ফলও তথৈবচকাজেই যে রসায়নবিদ্যার থেকে কোন রস আমি নিংড়ে বের করতে পারিনি কোনদিন, সেই রসায়নেই সসম্মান স্নাতক হবার জন্যে কলেজে দাখিল হলাম। যাদেরকে এই দুবছর অনেক তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলাম “ভালো ছেলে” বলে, তারা দিব্যি ডাক্তার ইঞ্জিনীয়ার হবার “চরম” সাফল্যের পথে ঢুকে পড়ল। আর আমার সান্ত্বনার মধ্যে রইল “একবার না পারিলে দেখ শতবার” আপ্তবাক্যখানি।

কাজেই প্রস্তুত হতে থাকলাম। এবং প্রথম বারের ভুল ভ্রান্তি কিছুটা শুধরে একই পথের সন্ধান জুটে গেল পরের বার। লাভের মধ্যে হাল্কা হওয়া গেল বেশ খানিকটা। মনের মধ্যে যে অলীক স্বপ্ন আর অদ্ভূত দর্পের দায় জমে উঠেছিল ভীষণ বোঝা হয়ে, সে সব পড়ল খসে। রসায়নের সম্মান ছেড়ে পোঁটলা আর ব্যাগ নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম ইঞ্জিনীয়ার হওয়ার হস্টেলের দেশে।

প্রথম দিন লটবহর নিয়ে সরাসরি কলেজে জয়েন করতে হল। কলেজে অ্যাডমিশান, হস্টেল অ্যালটমেন্ট, ইন্ট্রোডাকসন এইসব করতে করতে বিকেল গড়িয়ে গেল। সারা রাতের ট্রেন জার্নি সেরে বাস জার্নি, তারপর সারাটা দিন কলেজের কাজকম্ম সেরে বিকেলের দিকে রুমে গিয়ে থিতু হব ভাবছিলাম, কিন্তু হস্টেলে ঢোকার মুখেই ডাক এল - “অ্যাই, ছানা, কি নাম রে তোর”?

প্রথম সম্বোধনেই চিত্ত চমকে উঠল। প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া আমরা সবাই ছানা। যতদিন র‍্যাগিং চলবে আমাদের কোন ব্যক্তিগত নাম নেই, আমাদের একটাই নাম – ছানা। ছানা হিসেবে পরিচয়পর্ব শুরু হল হস্টেলের মেন গেটে। সঙ্গের লটবহর হাতছাড়া হয়ে পৌঁছে গেল আমার নির্দিষ্ট রুমে, কিন্তু রুমে যাওয়ার অনুমতি মিলল না। কতদিন চলবে এই র‍্যাগিং – সঠিক কেউ বলতে পারে না। কেউ বলে একমাস, কেউ বলে দুমাস, কেউ বলে পুরো ফার্স্ট ইয়ার!

”কেমন লাগছে রে জায়গাটা”? পাঁচ-ছজন সিনিয়ারের একটি গ্রুপের একজন জিগ্যেস করল।

”বেশ জায়গা, ভালই লাগছে”। ভয়ে ভয়ে বললাম আমি।

”মাঠে কি সুন্দর গরু চড়ছে, বল”?

”হুঁ”।

”গরু চড়া দেখেছিস, এর আগে, কলকাতায় বাড়ি না তোর”?

”হুঁ”।

”কোথায়”?

”দেশের বাড়িতে, বর্ধমান জেলায়”।

”গুড। তবে তো তুই সব জানিস। তাহলে যা, ওই যে গরুটা, বাঁদিকে শামলা রংযের – ওর পোঁদে একটা চুমু খেয়ে আয়”।

উক্ত গরুটিকে লক্ষ্য করলাম, বেশ নোংরা এবং পিছনে চাপ চাপ শুকনো গোবর লেগে আছে তার লোমের গোড়ায়। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম, আর অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম আমার সিনিয়ারদের।

”কি রে, যাবি না? দাঁড়িয়ে কী দেখছিস”?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলাম। আমার হাতে কাঠের টি ছিল, সেই সিনিয়ার সেটা নিল আমার হাত থেকে, বলল

“কোথা থেকে কিনলি এটা? কলকাতা থেকে”?

”হুঁ”। এই টি-টা আমি বাড়িতে যেদিন কিনে আনলাম, মা খুব খুশি হয়েছিলেন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিলেন, ছেলের ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ওঠার গর্বে উজ্জ্বল তাঁর মুখটি আমার মনে পড়ল

”এখানে পাওয়া যায় না”?

”জানি না। লেখা ছিল এ গুলো কলেজে আসার সময় আনতে হবে।”

”কলকাতার মাল যখন ভালই হবে, কি বলিস, দেখব ট্রাই করে”? বলে সে দু হাতে সেটাকে ধরল ঠিক লাঠির মতো, উদ্যত হল আমাকে মারতে। বলল, ”যা বললাম করবি, নাকি এটা তোর ওপর ট্রাই করব, কতক্ষণে ভাঙে”।

 

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একজন সুস্থ ছেলে, কোন কারণ ছাড়া এমন একটা কাজ কেনই বা করতে বলছে আর সেটা না করলে সে মারবে? এতে সে মজা পাবে, তার রগড় হবে খুব? আদৌ সুস্থ কি – অন্ততঃ মানসিক দিক থেকে? তার চোখ দেখে মনে হল না, সে নিছক ভয় দেখাচ্ছে। আমি চিন্তা করে দেখলাম, বিকৃত মস্তিষ্ক এই ছেলেটার হাতে মার খাওয়ার চেয়ে, গরু অনেক নিরাপদ। কাজেই এগিয়ে চললাম।

হস্টেলের মাঠে বেশ কটা গরু চড়ছিল। তার মধ্যে ছিল সেই শামলা গাইটাও। ল্যাজ নাড়িয়ে মাছি তাড়াতে তাড়াতে সে ঘাস খাচ্ছিল এক মনে। আমি কাছে যেতেই সন্দেহ নয়নে আমার দিকে তাকাল। কি বুঝল কে জানে, পাত্তা দিল না, আবার মন দিল ঘাস খাওয়ায়। কাছে গিয়ে আমি তার গায়ে হাত রাখলাম। লেজ দিয়ে আমার হাতে একটা ঝাপটা মারল আর কাঁপিয়ে তুলল তার চামড়া। কিন্তু কিছু বলল না। মনে পড়ল মামাবাড়ির গৌরী গাইয়ের কথা।

আরো ঘনিষ্ঠ হলাম, ভীষণ দ্বিধায় নীচু হতে, আরেকজন কেউ ডাকল, ”অ্যাই ছানা, এদিকে আয় অনেক হয়েছে, শ্লা, চাঁট-ফাঁট মেরে দিলে কেলো হয়ে যাবে”। বলতে বলতে সে দৌড়ে এল আমার কাছে, খুব শক্ত করে আমার গলা ধরে নিয়ে, একই ভাবে আবার দৌড়ে চলল হস্টেলের ভিতরে, আগের ছেলেটাকে বলল, ”আমি এই ছানাটাকে আমার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি গুরু, তুই অন্য ছানা ধর”।

আমাকে সে ধরে নিয়ে এল তার নিজের রুমে। তিনজনের রুম। তার বিছানায় বসিয়ে বলল, ”বোস। ওখানে থাকলে তোকে ক্যালাত, হারামজাদাটা। খিদে পেয়েছে? দাঁড়া। জুতো মোজা খুলে বোস। আমি এক মিনিটে আসছি। কেউ ডাকলেও আমার নাম বলবি”। বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে দরজাটা ভেজিয়ে। আমার মনে তখন আতঙ্ক। যদিও কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে না – কিন্তু কে জানে এ আবার কি নতুন র‍্যাগিং চালু করে! একটু পরেই আবার ফিরল, পিছনে আরেকটি ছেলে – তবে স্টুডেন্ট নয়, তার হাতে ডিম টোস্টের প্লেট।

”এখনো জুতো খুলিস নি? ভয় লাগছে, নাকি? আগে খেয়ে নে। এ আমাদের ক্যান্টিনের ছেলে, বলাই। চিনে রাখ”প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে বলাই বেরিয়ে গেল।

”তুমি খাবে না?”

”খা না তুই। আর শোন তোকে আমি কিছু কাজ দোবো, এই ঘরে বসে তুই সেগুলো করতে থাক। আমার কাছে থাকলে তোকে কেউ কিছু করবে না। এই নে এই জগে খাবার জল, খাবি তো খাদুপুরে কিছু খেয়েছিলি”?

”হ্যাঁ, কলেজ মোড়ে, মাছের ঝোল ভাত”।

”যাক তাও ভালো। তুই খা ততক্ষণ, আমি আসছি। আর ইচ্ছে হলে একটু শুয়েও নিতে পারিস। কোন ব্যাপার না, বুঝলি, শুধু কেউ জিগ্যেস করলে বলবি তুই আমার ছানা, ব্যস। আমার নাম বলেছিলাম, মনে আছে”?

খুব সংকোচের সঙ্গে ঘাড় নাড়লাম, তার উত্তর পেলাম, ”বোকা** একটা, আমার নাম বিজয়। বলবি বিজয়দার ছানা।

গালাগালটা খেয়ে একটু দমে গেলাম ঠিকই, কিন্তু ডিম টোস্ট আর এক পেট জল খেয়ে আমার ধড়ে যেন প্রাণ এল। কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করার পর, খুব ঘুম পেতে লাগল। ক্লান্ত শরীরে ক্ষুধা নিবৃত্তির পর চোখ আপনি বুজে আসতে লাগল। কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে শুয়েই পড়লাম এবং তৎক্ষণাৎ ঘুম।

 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। বিজয়দা ধাক্কা দিয়ে তুলে দিতে, উঠে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ কোথায় আছি মনেই পড়ল না, এমনই ঘুমের ঘোর।

”অ্যাই ছানা, ওঠ ওঠ, শিগ্‌গির উঠে চেয়ারে বোস, যা”। বিজয়দা জোর করেই প্রায় ঠেলে বসিয়ে দিল টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে। তারপর একটা খাতা পেন ধরিয়ে দিল আমার হাতে, আর মেলে ধরল একটা বই। বইয়ের নির্দিষ্ট একটা পাতা খুলে বলল, ”এই চ্যাপ্টারটা পুরো চোতা মার। দেখি তোর হাতের লেখাটা কেমন”।

আমার লেখা একটা লাইন দেখে খুশী হল না রেগে গেল বুঝলাম না, বলল, ”এই তোর হাতের লেখা গাণ্ডু, এ লেখা পেলে তো তোকে কোন পাব্লিক ছাড়বে না, বে। বানান ভুল করিস নাকি, বাল”?

উত্তর দিলাম, ”বোধহয়, না”।

আমার উত্তর শুনে খুব একচোট হ্যা হ্যা করে হাসল, বলল, “উরেল্‌ল্‌ল্‌ল**ড়া। “বোধহয় না”, খুব কায়দার উত্তর দিচ্ছিস। হেব্বি ঘ্যাম তোর না? বাইরে দেখাস না যেন, ক্যালানি খেয়ে যাবি। যাক, যেটা বলি মন দিয়ে শোন, প্রায় ঘন্টা খানেক ঘুমিয়েছিস, আর যেন ঘুমোস না। এইবার সক্কলে হস্টেলে ফিরতে শুরু করবে, অনেকে মাল খেয়েও আসবে। তারা কিন্তু ঘরে ঘরে ছানা খুঁজবে। তোকে যদি দ্যাখে তুই ** উল্টে ঘুমোচ্ছিস, আমার চোদ্দ গুষ্টিও তোকে বাঁচাতে পারবে না। উল্টে আমারই ** মেরে দেবে। মনে রাখিস কথাটা। পাশের ঘরে আছি, দরকার পড়লে চলে যাবি”।

বিজয়দা বেরিয়ে গেল। স্কুলে পড়ার সময় আমাদের মধ্যে কয়েকজন বন্ধু ছিল, যারা এভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিল, আমরা তাদের এড়িয়ে চলতাম। তাদের ওই ভাষা শুনলে খুব অস্বস্তি হত। অথচ আজ হস্টেলের প্রথম দিনেই বিজয়দার এই ভাষার ফোয়ারা শুনে খারাপ তো লাগলই না উল্টে মজাই পেলাম। আমি চোখের ঘুম ছুটিয়ে বইয়ের থেকে খাতায় কপি করতে করতে ভাবতে লাগলাম। বিজয়দা এমন ভাবে কথাগুলো বলছে, যেন ওগুলো ওর কথার লব্জ।         

বিজয়দার কথা সত্যি হয়ে গেল, বেশ কিছুক্ষণ বাদে বাদে ধড়াম করে দরজা খুলে এক একটা দল আসছে, ”অ্যাই ছানা, একলা ঘরে কি ছিঁড়ছিস, বে, **ড়া”?

“বিজয়দা, এটা কপি করতে বলে গেল...” আমি মিনমিন স্বরে উত্তর দিলাম

“তুই বিজয়ের ছানা? বিজয়বাঁ*টা কোথায়?”

“পাশের ঘরে”তারা বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। এরপর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো এক একটা দল আছড়ে পড়তে লাগল ঘরের দরজার ওপর। সাড়ে নটা নাগাদ, আরেকদল এল। তাদের আচরণে এবং ঘ্রাণে বোঝা যাচ্ছিল তারা ড্রিংক করে রয়েছে, একজন জিগ্যেস করল, ”তুই, ছানা”? আমি ভয়ে ভয়ে সম্মতির ঘাড় নাড়লাম।

“কি করছিস বে, তুই এখানে ঘাপটি মেরে”?

“বিজয়দা, বলল এটা কপি করতে-”

“বিজয় কে? সেকেণ্ড ইয়ার, সিভিল না? তুই বিজয়ের ছানা হয়ে গেলি? বিজয় কি করে বাঁ* এখন ছানা পোষে? বিজয় বাল, যা খুশি করবে আর আমরা **ড়া চুষবো? কোথায় বিজয়”?

“পাশের ঘরে বলল”। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম।

দলের আরেকজন কেউ পাশের ঘরে বিজয়দাকে ডাকল। শুনতে পেলাম,  ”অ্যাই, বিজয়, তুই বাঁ* ছানা পুষছিস। এই ছানাটা তোর”?

বিজয়দা ঘরে এল, বলল, “শ্যামলদা, এ ছানাটাকে নিও না, বস। মালটাকে আমি নোট চোতা করতে দিয়েছি। অনেক নোট, বস”।

“ধূর বাঁ*। সে তুই চোতা করা না। কিন্তু আলাপ করবো না? কলেজে ছানা এসেচে? অ্যাই ছানা, কি নাম রে তোর”? আমার সামনের বিছানায় বসে শ্যামলদা জিগ্যেস করল। নাম বললাম।

“বাড়ি কোথায়”? বললাম।

আমার মুখের কাছে মুখ এনে, খুব গোপন কথা বলার মতো জিগ্যেস করল, ”বাড়িতে কচি ঝি আছে”?

আমি প্রশ্নটা ঠিক বুঝতেই পারলাম না।

“ধ্যার বাঁ*। এটা কোতাকার মাল, রে? কচি ঝি বুঝলি না? ডবকা ছুঁড়ি- এবার বুঝলি”?

আমি তাকিয়ে রইলাম চুপচাপ। আমার মুখের দিকে নেশাগ্রস্ত ঢুলুঢুলু চোখ করে বলল, ”বল না, **ড়া, টিপেছিস? বাড়িতে নেই? আমি তো খুব টিপি”। হতবাক আমি বসে রইলাম, শ্যামলদার মুখের দিকে তাকিয়ে। বিছানায় ঢলে পড়তে পড়তে বলল, “এ **ড়াটা একদম বাজে ছানা, মাইরি। আমাকে দেখছে দ্যাখ, আমি যেন বাঁ*, বোকা** একখান...” বলতে বলতে শুয়েই পড়ল বিছানায়।

বিজয়দা আর অন্যান্যরা মিলে তাকে ধরে ওঠালো।

“অ্যাই শ্যামল, তুই আউট হয়ে গেছিস, বাল। চল রুমে চ”-।

“কোন খা**র ছেলে বলল রে, আমি আউট হয়ে গেছি। শ্যামল হালদার কোনদিন আউট হয় না, বাঁ*, বলে দিলাম”।

“এই শ্যামলদা, তুমি আবার কবে আউট হলে? মাল তোমাকে খায় নাকি? তুমিই তো মাল খাও”বিজয়দা অবস্থা সামাল দিতে বলে উঠল।

“বিজয়, তুই **ড়া, ঠিক চিনেছিস আমায়। বাকিরা সব **রভাই, কেউ চিনল না, *ড়া। তোকে আমি হাম খাবো, এদিকে আয়”।

“শ্যামলদা, এখন থাক। পরে হবে”।

“না, আমি হাম খাবো, তোর ছানাটা ভাল মাল মাইরি। তুই খেতে না দিলে, তোর ছানাকে হাম খাবো”। বলতে বলতে আমার গালে সত্যি সত্যি হাম খেয়ে দিল চকাস করে। তারপর বলল, ”তুই খুব ভাল রে, ছানা। আমি খুব হারামি **ড়া একটা, না রে, আমি একটা লম্পট, বল”?

আমি গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, ”না, না, ঠিক আছে”।

এরপর সকলে মিলে শ্যামলদাকে টেনে নিয়ে চলে গেল, ”অনেক ক্যাওড়ামি করেছিস, শ্যামল এবার চল, আর মাল ছড়াস না, বাল, রুমে চল...”। 

আজ সকালে কলেজের প্রথম ক্লাসে ইন্ট্রোডাকটরি লেকচারে প্রফেসর বলেছিলেন “ইউ অল আর গোয়িং টু বি দি ফার্স্টক্লাস সিটিজেন্‌স্‌ অব দি নেশান আফটার ফোর ইয়ার্স...”। ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি অনুভব করলাম প্রথম শ্রেণীর দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে ওঠার যথার্থ পাঠ আমার শুরু হয়ে গেছে – এবং এটা চলবে টানা চার বছর!

--00--

এর পরের পর্ব - " নবীন বরণ

নতুন পোস্টগুলি

এক যে ছিলেন রাজা - ১৩শ পর্ব

  এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - "  সুরক্ষিতা - পর্ব ১  "  অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - "  এক দুগুণে শূণ্য   ...