বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ধর্মাধর্ম - ৪/৫

 ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু - ধর্মাধর্ম - ১/১ "

ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ২/১  "

ধর্মাধর্ম তৃতীয় পর্বের শুরু -  " ধর্মাধর্ম - ৩/১ "

ধর্মাধর্ম চতুর্থ পর্বের শুরু - " ধর্মাধর্ম - ৪/১ "


 "ধর্মাধর্ম"  গ্রন্থটি কিনতেও পারেন নিম্নলিখিত ঠিকানায় -

উপরের Whatsapp নাম্বারে যোগাযোগ করলে বাড়ি বসেও বইটি হাতে পেয়ে যেতে পারেন।  

  

  



["ধর্মাধর্ম"-এর চতুর্থ পর্বের চতুর্থ পর্বাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে
 " ধর্মাধর্ম - ৪/৪ "]

চতুর্থ পর্ব (০ থেকে ১৩০০ সি.ই.)

পঞ্চম পর্বাংশ 


৪.৩.১ প্রাক-গুপ্ত ধর্ম ভাবনা

আগের অধ্যায়েই বলেছি, এই পর্যায়ে ভারতীয় সমাজে বিচিত্র বিদেশী সংস্কৃতি, প্রথা এবং রুচির নিরন্তর মিশ্রণ হচ্ছিল। এই মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় সব ধর্মগুলির মধ্যেও নানান পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য – সে কথা বোঝা যায়, তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা থেকে। ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচ থেকে ছশ বছরের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, পশ্চিম এশিয়াতেও বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিস্তার নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যই বৌদ্ধধর্মের মাতৃভূমি ভারতবর্ষ থেকে তাঁদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

আমরা আগেই দেখেছি, প্রথম থেকেই বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ভারতের ধনী বণিকরা এবং বেশ কিছু বিখ্যাত ভারতীয় রাজন্যবর্গ। তাঁদের প্রত্যক্ষ আর্থিক সহযোগিতায় আলোচ্য শতাব্দীগুলিতে ভারতবর্ষ জুড়ে বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধবিহার গড়ে উঠেছিল। এই অজস্র বিহারগুলির মধ্যে কয়েকটি উচ্চশিক্ষা ও বিদ্যাচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল – যেমন নালন্দা, বিক্রমশীলা, অমরাবতী ইত্যাদি। কিন্তু এগুলি ছাড়া অধিকাংশই হয়ে উঠেছিল আদর্শহীন অলস মানুষের নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল।

প্রথমদিকে বৌদ্ধবিহারে অন্তর্ভুক্তির জন্যে আগ্রহী ভিক্ষুদের কঠিন পরীক্ষার (selection test) সম্মুখীন হতে হত, কারণ সে সময় বিহারের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু পরবর্তীকালে বিহারের সংখ্যা যখন অগণ্য হয়ে উঠল, তখন রাজা ও বণিকদের থেকে নিয়মিত অনুদান আদায় নিশ্চিত করতে, বিহার-পরিচালকদের কাছে ভিক্ষুর সংখ্যাবৃদ্ধিই হয়ে উঠল প্রধান লক্ষ্য। অতএব আদর্শ ও দায়িত্ববোধহীন এবং অকর্মণ্য প্রচুর মানুষের ভিড় জমতে লাগল বৌদ্ধ বিহারগুলিতে। কারণ বিহারে অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সঙ্গে, ভিক্ষুদের অশন, বসন, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্ব থাকত বৌদ্ধ বিহারগুলির। উপরন্তু মুণ্ডিত মস্তক এবং ভিক্ষুসুলভ বসনের জন্য তারা হাটে-বাজারে উপভোগ করত সাধারণ জনসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা। বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু না হলে, তাদের এই নিশ্চিন্ত কর্মহীন জীবন অথচ সামাজিক সম্মানের স্বাদ হয়তো কোনদিনই প্রাপ্য হত না।

যে কোন হিন্দু তীর্থস্থানে – বিশেষ করে উত্তরভারতে - আজও বহু মানুষ সন্ন্যাসী হন নিছক সংসারের দায়িত্ব এড়াতে অথবা কোন দুষ্কর্ম করে গা ঢাকা দিতে। কারণ তীর্থক্ষেত্রগুলিতে প্রচুর ধনী বণিক দানবীর আছেন, যাঁরা সন্ন্যাসীদের নিয়মিত বস্ত্র-কম্বল দান করেন এবং তাঁদের অন্নসত্র থেকে দুবেলার খাদ্য সংস্থানও হয়ে যায়। তার সঙ্গে উপরি পাওনা সাধারণ মানুষদের “গোড় লাগি, মহারাজ” সম্বোধন, তাদের ভিক্ষা থেকে অর্জিত অর্থে গঞ্জিকা সেবন এবং বিনা ভাড়ায় ট্রেন বা বাসযাত্রা। গেরুয়া বা রক্তবসন পরে, মাথায় জটা বানিয়ে, একটু হাঁকডাক আর “ব্যোমশঙ্কর” আওয়াজ দিয়ে জীবনটাকে এভাবেই যদি কাটিয়ে দেওয়া যায়, মন্দ কি? তবে সকলেই যে এমন সে কথা বলছি না, প্রকৃত সন্ন্যাসী অবশ্যই আছেন, তবে অধিকাংশই যে এই গোত্রের তাতে কোন সন্দেহ নেই।     

অতএব রাষ্ট্র এবং বণিক সমাজের নিরন্তর আর্থিক আনুকূল্য, বৌদ্ধধর্মকে একদিকে তথাকথিত অন্তঃসারশূণ্য জনপ্রিয়তা যেমন এনে দিয়েছিল, তেমনই সূচনা করেছিল তাদের অবক্ষয় এবং ভারতবর্ষ থেকে তাদের ভবিষ্যৎ বিলুপ্তির।

বৌদ্ধ ধর্মের এই বিপুল সাফল্য শুধু যে বৌদ্ধবিহারে অপদার্থ ভিক্ষুর সংখ্যা বৃদ্ধি করল, তা নয়, প্রধান বৌদ্ধ-পণ্ডিতদের মধ্যেও এনে দিল ক্ষমতার লোভ – রাজানুকূল্য লাভের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা। যার ফলে গৌতমবুদ্ধের মৃত্যুর একশ’ বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বৌদ্ধধর্মের ভাঙন ও একের পর এক শাখা – উপশাখার উৎপত্তি। প্রতিটি শাখার প্রধান পণ্ডিতগণ মেতে উঠলেন, সাধারণের পক্ষে দুর্বোধ্য তত্ত্বকথার কচকচানিতে। নতুন যুগের পণ্ডিতদের কাছে গৌতমবুদ্ধের সরল সর্বজনবোধ্য উপদেশগুলি পরিত্যক্ত হয়ে গেল। অতএব বৌদ্ধ ধর্ম অতি দ্রুত হারাতে লাগল সাধারণ ভারতীয় সমাজের আন্তরিক সমর্থন।

আর ঠিক এই পরিস্থিতির মধ্যে, একই দ্রুততায় হিন্দুধর্মের মোড়কে আগ্রাসী ব্রাহ্মণ্য-ধর্ম ভারতীয় জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে লাগল। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, বৌদ্ধধর্মের প্রধান শাখাগুলি এবং তাদের তত্ত্ব-বিতর্কের দিকে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।    

 

৪.৩.২ বৌদ্ধ ধর্মের ভাঙন

ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর একশ বছর পরেই (তিব্বতি মতে একশ দশ বছর – ৩৮০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি) বৌদ্ধধর্মের প্রথম ভাঙন শুরু হয়। সেটি ছিল বৌদ্ধদের দ্বিতীয় ধর্মসম্মেলন, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বৈশালীর রাজা কালাশোক। সেই সম্মেলনে পূর্বের বৃজি রাজ্যের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে পশ্চিমের পাওয়া, কৌশাম্বী এবং অবন্তীর সন্ন্যাসীদের মতভেদ থেকে বৌদ্ধধর্মের দুটি - “মহাসঙ্ঘিকা” এবং “স্থবিরবাদিন” বা “থেরাবাদিন” শাখার উদ্ভব হয়েছিল। এরপর অশোকের রাজত্বকালের (২৪৭ বি.সি.ই) তৃতীয় ধর্মসম্মেলনের আগেই ওপরের দুই শাখা ভেঙে আরো বাইশটি শাখার সৃষ্টি হয়েছিল।

সিংহলের দীপবংশ গ্রন্থ অনুযায়ী এই শাখাগুলি হল, গোকুলিক, একব্যাবহারিক, বহুশ্রুতিকা, প্রজ্ঞাপ্তিবাদিন, চৈত্যবাদিন, বাৎসীপুত্রীয়, মহীশাসক, ধর্মোত্তরীয়, ভদ্রাযানিক, ষণ্ণাগরিক, সাম্মিতীয়, সর্বাস্তিবাদিন, ধর্মগুপ্তিক, কাশ্যপীয়, সংক্রান্তিক ও সৌত্রান্তিক। এর সঙ্গে পালি গ্রন্থগুলিতে আরো ছটি শাখার নাম পাওয়া যায়, যেমন হৈমবতিকা, রাজগিরিকা, সিদ্ধত্থিক, পুব্বসেলিয়, অপরসেলিয় এবং বাজিরিয়। প্রায় প্রত্যেকটি শাখারই নিজস্ব ত্রিপিটক অর্থাৎ বিনয়, সূত্র এবং অভিধর্ম গ্রন্থও ছিল! আমরা দেখেছি সম্রাট অশোকের আস্থা ছিল স্থবিরবাদ বা থেরাবাদে এবং বৈদেশিক ধর্ম প্রচারে তিনি থেরাবাদী শাখারই পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এই শাখাগুলির মধ্যে সর্বাস্তিবাদিন মতের অস্তিত্ব ছিল কয়েকশ বছর। তৃতীয় ধর্ম সম্মেলনে এই শাখাগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিকে সম্রাট অশোক বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন, তবে সেগুলি ঠিক কারা তার কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কয়েকটি অঞ্চল, যেমন ভূটান, সিকিম, তিব্বত, ইত্যাদি ছাড়া, ভারতের বাইরে থেরাবাদ মতেরই প্রাধান্য ছিল এবং আজও তাই আছে।  

খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর শুরুতে ভারতবর্ষে মহাসঙ্ঘিকা শাখার জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং এই শাখাই মহাযানী মতে পরিবর্তিত হয়। এই মহাযানী মতেরও দুটি শাখা ছিল মাধ্যমিক এবং যোগাচার। মহাযানী মতাবলম্বীরা বৌদ্ধধর্মের অন্য সব শাখাগুলিকে একত্রে হীনযান (নিম্নস্তরের মার্গ) নামে উল্লেখ করত। এরপর খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতকের শেষদিকে রাজা কণিষ্কের রাজত্বকালে যে বৌদ্ধ ধর্মসম্মেলন হয়েছিল, তার পর থেকে মহাযানী শাখাই ভারতীয় বৌদ্ধদের প্রধান শাখা  হয়ে উঠেছিল। এই প্রসঙ্গে হীনযান ও মহাযান মতের তফাৎটা কী, সে বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নিই। 

বুদ্ধদেবের শিক্ষার মধ্যে কতকগুলি বিষয় নাকি খুবই বিতর্কিত এবং এই বিষয়গুলি সম্পর্কে তিনি সঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, পরবর্তী বৌদ্ধ দার্শনিকদের মধ্যে সেই নিয়েই বিস্তর মতভেদ। এর মধ্যে কয়েকটি প্রধান বিষয় হল, “অনিত্য”, “অনাত্মন” এবং “নির্বাণ” বা “তথাগত”। “নির্বাণ” বা “তথাগত” বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধদেব নিজেই চারটি যুক্তির (“চতুষ্কটিকা”) অবতারণা করেছিলেন, যেমন,

১. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব (existence) থাকে;

২. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব থাকে না;

৩. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব (non-existence) দুটোই থাকে।

৪. মৃত্যুর পর “তথাগত”-র অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব– দুটোর কোনটাই থাকে না।

এই চারটি যুক্তির পিছনে আছে “তথাগত” শব্দটির তাৎপর্য।  তথাগত শব্দের সহজ মানে – তথা+গত - যিনি -  তথায় অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতায় পৌঁছেছেন – এক কথায় বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি বা নির্বাণ। আবার অন্য অর্থ হল, তথা+আগত অর্থাৎ তথা অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতা থেকে যিনি এসেছেন। আবার অন্য এক অর্থ হল তথা+অগত – তথা অর্থাৎ জ্ঞানের পূর্ণতার জন্যে যাঁকে কোথাও যেতে হয় না। যেহেতু তথাগত - পরমজ্ঞানের এমনই এক অবস্থা – যা অপরিমেয়, অবর্ণনীয়, ধারণাতীত – অতএব তাঁর জ্ঞানের পূর্ণতার বিষয়টিই যেন অবান্তর!

তথাগত” শব্দের সর্বশেষ তাৎপর্য – যেটি মহাযানীদের মত – দেখা যাচ্ছে উপনিষদের “পরমাত্মা” তত্ত্বের সঙ্গে বেশ মিলে যাচ্ছে। অতএব গৌতম বুদ্ধ যে ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর মোটামুটি সাড়ে পাঁচশ বছর পরে, বৌদ্ধ মহাযানী পণ্ডিতগণ সেটিকে পরোক্ষে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গেই জুড়ে দিলেন। অবিশ্যি এই সময়কালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মও আর আগের ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছিল না, সে তখন হিন্দু ধর্ম হয়ে উঠছিল। সে কথা আসবে পঞ্চম ও অন্তিম পর্বে।        

অনিত্য” এবং “অনাত্মন” বিষয়ে হীনযানীদের মত, যে পঞ্চ উপাদানে জীবের সৃষ্টি তারা সতত পরিবর্তনশীল অতএব অনিত্য এবং জীবের অস্তিত্ব না থাকলে আত্মারও অস্তিত্ব থাকে না, অর্থাৎ অনাত্ম হয়ে যায়। মহাযানীরা বললেন, হীনযানীদের এই ব্যাখ্যা নিম্নস্তরের এবং তাঁদের জ্ঞানও নিকৃষ্ট – অতএব তাঁদের মত হীন। হীনযানীরা তাঁদের এই জ্ঞান নিয়ে বড় জোর অর্হৎ স্তর পর্যন্ত উঠতে পারেন, কিন্তু বুদ্ধত্ব লাভ করতে পারবেন না। যাঁরা বুদ্ধত্ব লাভের আকাঙ্খা করেন তাঁরা বোধিসত্ত্ব। মহাযানীরা বললেন, ব্যক্তিকে “পুদগল-শূণ্যতা” (ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যহীনতা অর্থাৎ অনস্তিত্ব) এবং “ধর্ম-শূণ্যতা” দুটোই উপলব্ধি করতে হবে এবং পরমসত্যের সঙ্গে পার্থিব জগৎ (অর্থাৎ অস্তিত্ব)-এর ঐক্যকেও উপলব্ধি করতে পারলেই বুদ্ধত্ব লাভ সম্ভব। মহাযানী পণ্ডিতদের সৃষ্ট এই জটিল তত্ত্ব বেশ দুর্বোধ্য – উচ্চ সাধনার স্তর ছাড়া হয়তো বোধগম্য হবার নয়!

কিন্তু জটিল এই তত্ত্ব - “অনিত্য”, “অনাত্মন”, “অস্তিত্ব” এবং “অনস্তিত্ব” বা “পুদগল-শূণ্যতা” - উপলব্ধির বর্ণনা গৌতম বুদ্ধ নিজেই সরল ভাষায় যে ভাবে বুঝিয়েছিলেন, সে কথা আরেক বার পড়ে নিতে পারেন এই গ্রন্থের ৩.২.২ অধ্যায় থেকে  - " ৩.২.২ তপস্বী সিদ্ধার্থ "। দেখবেন তত্ত্বগুলি খুব একটা দুরধিগম্য বলে মনে হবে না। আসলে, পণ্ডিতদের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনই যখন মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখন সহজ কথাগুলিও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাতে অবশ্যই ষোল আনা লাভ হয় পণ্ডিতদের – মাঝের থেকে, তাঁদের দুর্বোধ্য মধ্যস্থতায় আমাদের মনের মানুষটি অনেক দূরের মানুষ হয়ে পড়েন। বিশ্বের সব ধর্মতত্ত্বেই মধ্যস্থ এই পণ্ডিতরা যদি না আসতেন, সাধারণের জীবনযাপন অনেক রম্য হয়ে উঠতে পারত।        

ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে, বোধিসত্ত্বের এই ধারণা থেকেই মহাযানীরা বৌদ্ধধর্মে ভক্তি এবং পূজার প্রচলন শুরু করলেন। তাঁরা বেশ কিছু “বোধিসত্ত্ব”-র সূচনা করলেন, যেমন মৈত্রেয়, মঞ্জুশ্রী, অবলোকিতেশ্বর, বজ্রপাণি, সমন্তভদ্র প্রমুখ। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, এই দিব্য বোধিসত্ত্বগণ প্রজ্ঞার শিখরে উঠে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা অনায়াসে “বোধি” বা “বুদ্ধত্ব” অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু করেননি, তার কারণ বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তাঁরা আর মৈত্রী এবং করুণার চর্চা করার অবস্থায় ফিরতে পারতেন না এবং দুঃখ-শোকে দগ্ধ হতে থাকা আম-মানুষের সেবাও করতে পারতেন না। এই আধ্যাত্মিক দর্শনকেই মহাযান বলা হয়ে থাকে। এই একই তত্ত্ব আমরা দেখতে পাবো হিন্দু সাধনতত্ত্বে এবং তন্ত্রতত্ত্বে। অর্থাৎ মহাযানী বৌদ্ধতত্ত্ব গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে, হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিশে ভারতবর্ষ থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথটি নিজেরাই খুঁজে নিল। অথবা এমনও হতে পারে, হিন্দু দর্শনই বৌদ্ধদের এই তত্ত্ব আত্মসাৎ করেছিল।   

মহাযানী বৌদ্ধ মতে এইভাবেই শুরু হয়ে গেল মূর্তিপূজার প্রচলন। এই বিশ্বাসে প্রাচীন “পেগান” ধর্মের প্রভাব থাকাও বিচিত্র নয়। কারণ বৌদ্ধ ধর্মের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে মিশর, গ্রীস এবং রোমের সংস্কৃতির যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল সেকথা আমরা আগেই জেনেছি।

মূর্তি পূজার সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি গড়ার প্রকরণ মহাযানী বৌদ্ধরাই শুরু করে দিলেন। মধ্য এশিয়া এবং উত্তরপশ্চিমের গান্ধার থেকে দক্ষ শিল্পীদের আনিয়ে, তাদের বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বের রূপকল্প বুঝিয়ে দিলেন। বহিরাগত ভাস্কররা সুন্দর সুঠাম মূর্তি গড়লেন, কিন্তু তার মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক অনুভাব ফুটিয়ে তুলতে পারলেন না। এই সময়ের ভাস্কর্য শিল্পকেই গান্ধার শিল্প বলা হয়ে থাকে, সে কথা আগেই বলেছি। এই সময়ের মূর্তিগুলি অনবদ্য সুন্দর কিন্তু প্রাণহীন, আড়ষ্ট। গান্ধার-শিল্পে দক্ষ কিছু শিল্পী হয়তো আগে থেকেই মথুরাতে বসবাস করতেন, অথবা কুষাণ রাজারা মথুরাতে দ্বিতীয় প্রশাসনিক কার্যালয় নির্মাণের জন্যে তাঁদের এনে বসত করিয়েছিলেন।

মথুরার শিল্পীরা প্রাথমিক ভাবে গান্ধার-ঘরানারই (Gandhar School) শিল্পী ছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁদের নিজস্ব ঘরানা তৈরি করে ফেলতে পেরেছিলেন, যাকে মথুরা-ঘরানা (Mathura School) বলা হয়। এই শিল্পীরা ভারতীয় সমাজ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে, ভারতের আধ্যাত্মিক ভাবনায় জারিত হতে হতে, ভারতীয় শিল্প-ভাবনাকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী কালে তাঁদের এবং তাঁদের শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত অজস্র শিল্পীর হাতে, ভারতের আনাচে কানাচে, পাথর কিংবা পাহাড়ের গুহার বুকে, ছেনি আর হাতুড়ির আঘাতে কত যে অনবদ্য মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে আলোচনা আসবে পরে।

 


খ্রিষ্টিয় পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকেই সাধারণের কাছে মহাযানী মত তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছিল। এবং ততদিনে ব্রাহ্মণ্যধর্মও সাধারণ ভারতবাসীর কাছে হিন্দুধর্মে রূপান্তরিত হয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। মহাযানী ও আগ্রাসী হিন্দু ধর্মের চাপে ততদিনে দুর্বল হীনযানী শাখাগুলিও চলে গিয়েছিল বিলুপ্তির পথে। এই রকম সময়েই হিন্দু ধর্মে এবং বৌদ্ধধর্মে – কোথাও আবার দুই ধর্ম যৌথভাবে - নতুন ধর্ম শাখায় রূপান্তরিত হল। একটি হল হিন্দুদের তন্ত্র ধর্ম, অন্যটি হল বৌদ্ধদের তন্ত্রধর্ম – যার নাম বজ্রযান। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তন্ত্র চর্চা বহু প্রাচীন অনার্যদের ধর্ম, যার কিছু কিছু উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ব বেদেও। খ্রিষ্টিয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা সেই তন্ত্রধর্মেরই আত্মপ্রকাশ ঘটল। যদিও এই ধর্মের প্রভাব সীমিত রইল প্রধানত পূর্বভারতে, ভারতের অন্যত্র এই ধর্মের প্রভাব ছিল যৎসামান্য। এই তন্ত্র ধর্ম নিয়ে আমরা সবিস্তার আলোচনা করব হিন্দু ধর্মের সঙ্গেই - পঞ্চম ও শেষ পর্বে।         

৪.৩.২ অনার্য ধর্মভাবনা ও মূর্তি পূজা   

যদিও প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ নেই, তবুও আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই সময়ের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভারতীয় অনার্য ও সাধারণ আর্য জনসমাজেও মূর্তিপূজার বহুল প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার বিশ্বাসের কারণটা সংক্ষেপে বলি।

আমরা দেখেছি গ্রীক রাজা সেলুকস নিকেটরের কন্যা বধূ হয়ে এসেছিলেন মৌর্য পরিবারে। সে কন্যা নিশ্চয়ই একলা আসেননি, রাজকুমারীদের প্রথা অনুযায়ী তিনি বহু সখী পরিবৃতা হয়ে এবং অজস্র দাস-দাসী নিয়েই এসেছিলেন। তাদের সকলেই যে গ্রীস এবং পারস্যের মানুষ সে কথা বলাই বাহুল্য। সুদূর কান্দাহার অঞ্চল থেকে তারা ভারতবর্ষের পাটলিপুত্র প্রাসাদে যখন এসেছিল, তারা বহন করে এনেছিল সেলুকীয় ও অ্যাকিমিনিড সংস্কৃতি এবং ধর্ম, সেকথা সহজেই অনুমান করা চলে। তাদের ধর্মে মূর্তিপূজার বহুল প্রচলন ছিল একথা আমরা আগেই জেনেছি। প্রাসাদের অন্দরমহলে গ্রীক-রাজকুমারীকে যখন বরণ করা হয়েছিল, সে সময় অন্যান্য ভারতীয় রাণি এবং অন্তঃপুরচারিণীদেরও দাস-দাসীর অভাব ছিল না। অতএব এমন অনুমান করাই যায়, দুপক্ষের – ভারতীয় এবং গ্রীক দাসদাসীদের মধ্যে অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠতাও যেমন হয়েছিল, তেমনই দুপক্ষের ঈর্ষা-দ্বেষের অন্তঃপুর-কূটনীতিও শুরু হয়েছিল। এই নিবিড় মিশ্রণ থেকে, ভারতীয় দাস-সমাজের মনেও নিজ নিজ বিশ্বাসের দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণের বীজ রোপিত হওয়া অসম্ভব মনে হয় না। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ছিলেন বলেই, তাঁর অন্তঃপুরের দাসদাসীরাও সকলে বৌদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, এমন ধারণা করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। অতএব ব্রাহ্মণ্য সমাজে “অনাচারী শূদ্র” হয়ে থাকা অনার্য দাস-দাসীরা, কয়েক হাজার বছর ধরে প্রচলিত তাদের নিজস্ব ধর্ম আচরণের জন্যে অনুকূল আদর্শ এবং পরিবেশ পেয়ে গেল বিদেশী সহকর্মীদের থেকে।

মৌর্য প্রাসাদে এবং পাটলিপুত্র নগরে সেলুকীয় এবং অ্যাকিমিনিড ভাস্কর এবং স্থপতিরা যে এসেছিল, সে কথাও আমরা আগেই জেনেছি। তাদের সহকারীদের (assistant বা helper) মধ্যে অধিকাংশই ছিল ভারতীয় অনার্য শূদ্র সে কথা অনুমান করতেও কোন সংশয় নেই। অতএব তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে এদেশের শূদ্ররাও ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথরের বুকে ছোট ছোট আকৃতি গড়া অভ্যাস করতে লাগল। তারা নিজেদের চিন্তা-ভাবনা মতো তাদের নিজস্ব দেবতাদের মূর্তি গড়াও শুরু করে দিল - পশুপতি, বিশদেব, এবং মাতৃকামূর্তি সমূহ। সেগুলি খুব উচ্চস্তরের শিল্প হল না। তা না হোক, অধরা কাল্পনিক মূর্তিগুলি তাদের চোখের সামনে – দুই হাতের মধ্যেই ধরা দিতে শুরু করল। প্রায় হাজার বছর ধরে ভারতীয় সমাজে বঞ্চিত এবং অবহেলিত মানুষগুলির কাছে এইটুকু পাওয়াও ছিল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর বিষয়।     

এইভাবেই বৌদ্ধ ধর্মাশোকের সহিষ্ণু রাজধানীতে এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলিতে শূদ্ররা নিশ্চিন্তে তাঁদের মূর্তিপূজায় মনোনিবেশ করতে পারল। এই পূজা প্রক্রিয়ার মধ্যে অবশ্যই বৈদিক জটিলতা নেই, নেই পুরোহিতের আবশ্যিকতা, সহজ-সরল সাধারণ পূজা এবং অর্ঘ্য। এবং এই বার্তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল দ্রুত। কী ভাবে?

সেকালে বণিকরা যখন যেখানে যেতেন, তাঁদের সঙ্গে থাকত বিপুল সংখ্যক দাস। তা নাহলে কে চালাবে বলদের বা মোষের গাড়ি? গাড়ি থেকে মালপত্র ওঠানো, নামানো, সাজিয়ে রাখা কে করবে? সুদীর্ঘ যাত্রাপথে কে বণিক-প্রভুর বসন, বাসন নিত্য ধোলাই করবে? কেই বা প্রভুর হাত-পা টিপে দেবে? এভাবেই পাটলিপুত্রের বণিকদের দাস-সম্প্রদায় যেখানে, যে শহরে বা জনপদে পৌঁছেছে, স্থানীয় সাধারণ জনসমাজের সঙ্গে আলাপ ও পরিচয়ে নিজেদের ধর্ম-বার্তা ঘোষণা করেছে সগৌরবে। সে বার্তা ব্যর্থ হয়নি, এর পর থেকেই ভারতবর্ষের অঞ্চলভেদে অনার্য ধর্মের বিচিত্র শাখা, সকলেই নিজ নিজ বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে লাগল নানান রূপে নানান আকারে।  

 আমার এই অনুমান যে অবান্তর নয়, তার সমর্থনে আমরা লক্ষ্য করছি, মৌর্য সাম্রাজ্য পতনের শতখানেক বছর পরেই দুটি ধর্মীয় শাখার সুস্পষ্ট অস্তিত্ব - একটি ভাগবত, অন্যটি শৈব। ভাগবত শাখার দেবতা বিষ্ণু এবং শৈব শাখার দেবতা পশুপতি বা শিব, যাঁর বাহন বৃষ - যাঁর ধর্মীয় নাম নন্দী। আমরা একটু আগেই কুষাণ রাজাদের মুদ্রায় “মাহেশ্বর” ও “বৃষ” বা “নন্দী”-র চিত্র মুদ্রিত হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে, এই শাখাদুটির সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যোগাযোগ ছিল কি না, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় না। না থাকারই কথা, কারণ বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রধান দেবতারা তখনও ছিলেন, সূর্য, অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ, বায়ু প্রমুখ।

আরও একটি পরোক্ষ প্রমাণ হল, বেশ কিছু শক, কুষাণ এবং গ্রীক রাজাদের ভারতে এসে ভাগবত বা শৈব হয়ে ওঠা। কয়েকজন রাজার উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরেকটু স্পষ্ট হবে।

১. হেলিওডোরাস– রাজা অ্যান্টায়ালসিডাস (Antialcidas) মোটামুটি ১১৫-৯৫ বি.সি.ই-তে আফগানিস্তান থেকে সিন্ধুর পূর্বতট পর্যন্ত রাজ্যের গ্রীক রাজা। তাঁকে তক্ষশিলার রাজা বলা হত। তিনি হেলিওডোরাসকে শুঙ্গ রাজসভায় রাজদূত করে পাঠিয়েছিলেন, এই হেলিওডোরাস নিজেকে “ভাগবত” বলে পরিচয় দিতেন।

২. মিনান্ডার (Menander) - গ্রীক রাজা (১৫০ -১৩৫ বি.সি.ই) – বৌদ্ধ ছিলেন।

৩. থিওডোরাস গ্রীক রাজা (Theodorus) – বৌদ্ধ ছিলেন।

৪. ভিমা কদফিসিস (আনুমানিক খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি) – কুষাণদের এই দ্বিতীয় রাজার মুদ্রায় “মাহেশ্বর” এবং “নন্দী”-র মুদ্রিত চিত্র পাওয়া গেছে। তিনি শৈব কিনা সে কথার উল্লেখ অবশ্য পাওয়া যায় না।

৫. কণিষ্ক (আনুমানিক ৭৮ সি.ই.) – কুষাণ রাজা – বৌদ্ধ ছিলেন, তিনি বৌদ্ধ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন।

৬. বাসুদেব (আনুমানিক ১৫২ সি.ই.) - কুষাণ রাজা – শৈব ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের কুজুলা কদফিসিস, ভিমা কদফিসিস, কণিষ্ক, বাশিষ্ক, হুবিষ্ক–এর মতো বিদেশী নামের পর, তাঁর নামটি সম্পূর্ণ ভারতীয়, তাঁর মাতা ভারতীয় ছিলেন কিনা জানার কোন সম্ভাবনা নেই।

৭. শকদের এক গোষ্ঠী রাজা নাহপান (১১৯-১২৪ সি.ই.) – তাঁর কন্যার নাম দক্ষমিত্রা এবং জামাই ঋষভদত্ত – দুটোই ভারতীয় নাম।

৮. গণ্ডোফার্নিস (১৯-৪৫ সি.ই.) – পহ্লব বা ইন্দো-পার্থিয়ান রাজা - সেন্ট টমাসের কাছে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন।

৯. শক ক্ষত্রপ রুদ্রদমন (১৫০ সি.ই.) – একমাত্র ব্যতিক্রম - তিনি কোন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন স্পষ্ট নয়, কিন্তু তাঁর রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল সংস্কৃত। নানান বিদেশী জাতি এদেশে প্রবেশ এবং আংশিক রাজত্ব শুরু করার প্রায় চারশ বছর পরে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রথম এই বিদেশী রাজার ঘনিষ্ঠতা অর্জন করতে পেরেছিল।    

 আমরা দেখেছি বর্ণগত ভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম (পরবর্তী কালে হিন্দু ধর্মও) জন্মগত ধর্ম। সেক্ষেত্রে কিছু বিদেশী রাজা ভাগবত বা শৈব হলেন কী ভাবে? তার একটাই কারণ এই ভাগবত এবং শৈব ধর্ম সেই সময় ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন দুই ধর্মীয় শাখা, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না। এই দুই ধর্মের উৎপত্তি অনার্য বিশ্বাস ও ধারণা থেকে – পুরোপুরি দেশজ (indigenous)তাঁদের ধর্মে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মতো উন্নাসিক বর্ণ বিভেদ ছিল না, বলাই বাহুল্য। বৌদ্ধধর্মের মতোই যে কেউ এই ধর্মে দীক্ষিত হতে পারতেন। তাঁদের শাস্ত্র, কিংবা অজস্র ধর্মগ্রন্থ ভরিয়ে তোলা জটিল এবং প্রায় দুর্বোধ্য তত্ত্বের কচকচানিও ছিল না। ছিল শুধু ফল-মূল-মাংস-মিষ্টান্নের নৈবেদ্য সহ সামান্য কিছু উপচার – আম্র ও বিল্বপল্লব, তুলসী, দুর্বা এবং ভারতের মাঠেঘাটে ফুটে থাকা নানান ফুল দিয়ে মূর্তিপূজা! এই দেবতাদের সামনে ভক্তদের চাহিদাও ছিল খুবই সরল। হে মা, হে বাবা, এবার যেন সুবর্ষা হয়। যেন প্রচুর ফসল হয়। ছেলেপুলেরা যেন সুস্থ-সবল থেকে বাপের সহায় হয়ে ওঠে। পোয়াতি বউটার কোল আলো করে যেন ব্যাটাছেলে আসে। মেয়েটাকে যেন সুপাত্রে দান করতে পারি। বড়ছেলের কাঁটকি বউটা যেন ওলাওঠা হয়ে মরে অথবা দজ্জাল শ্বাশুড়িটা যেন ভেদবমি হয়ে মরে। এমনই যত গৃহপোষ্য আকাঙ্খা। আজও তীর্থ-ভ্রমণ কিংবা প্রাত্যহিক দেবদর্শন অথবা প্রাচীন বট বা অশ্বত্থ গাছের শাখায় লালসুতোয় ঢেলা বাঁধায় - লক্ষলক্ষ ভারতবাসীর মনোকামনা প্রায় একই রয়ে গিয়েছে। সেখানে মোক্ষ, নির্বাণ, ব্রহ্মত্বপ্রাপ্তি বা বৈকুণ্ঠপ্রাপ্তির মতো প্রায় দুর্বোধ্য অথবা অস্পষ্ট কোন আকাঙ্খার লেশ মাত্র ছিল না, আজও থাকে না।

ভাগবত এবং শৈবের মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, সমসময়ে আরও কয়েকটি শাখার নাম পাওয়া যায়, যেমন পাশুপত্য, গাণপত্য ইত্যাদি। পাশুপত্য শব্দের উৎস পশুপতি দেবতা, হয়তো তাঁর সঙ্গেই পূজিত হতেন তাঁর বাহন, নন্দী অর্থাৎ বৃষ। পদতলে পশুর ছবি নিয়ে পশুপতি দেবের রিলিফ-চিত্র পাওয়া গেছে হরপ্পা সভ্যতার বেশ কিছু সিলে। গাণপত্য শব্দের উৎস গণপতি – অর্থাৎ জনসাধারণের প্রভু বা দেবতা – তাঁর মূর্তি ছিল মানব শরীরে গজমুণ্ড – যাঁর আরেক নাম গণেশ। এছাড়া মধ্য এবং দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মসৃণ শিলাখণ্ড পূজিত হত, লিঙ্গের প্রতীক হিসাবে। এই “লিঙ্গ” মূর্তি সৃষ্টির প্রতীক - প্রভূত ফসল, সন্তান-সন্ততি, গবাদি পশুর প্রাচুর্যের কামনায় লিঙ্গপূজার প্রচলন ছিল। কৃষ্ণ ছিলেন প্রধানতঃ পশুপালকগোষ্ঠীদের দেবতা, যাঁর আরও নাম ছিল গোবিন্দ বা গোপাল – যার আক্ষরিক অর্থ গোরক্ষক। প্রধানতঃ রাজস্থান, গুজরাট এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের আভির (আহির) এবং যাদব গোষ্ঠীগুলির দেবতা। পূর্ব মালবে (এরান, মধ্য প্রদেশ) পাথরের একটি বরাহ মূর্তি পাওয়া গেছে, যে মূর্তিটি শক্তি এবং বীরত্বের প্রতীক হিসাবে পূজিত হত।    

অতএব অনুমান করা যায়, নানান ধর্ম-মত নিয়ে উচ্চস্তরের প্রজ্ঞা ও দর্শন এবং সেই সংক্রান্ত যাবতীয় তর্কবিতর্ক ছিল প্রধানতঃ নগরকেন্দ্রিক এবং খুব জোর তার সংলগ্ন জনপদ ও গ্রামগুলিতে। এই বৃত্তের বাইরের বিস্তীর্ণ জনসমাজের মানুষ, তাঁদের নিজস্ব আঞ্চলিক ধর্ম নিয়েই সুখে ও শান্তিতে ছিলেন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পরিশ্রম করে তাঁদের পরিবারের অন্ন সংস্থান করতে হত এবং নিয়মিত রাজকরও মেটাতে হত। তাঁরা “নির্বাণ” বা “মোক্ষ”-এর মধ্যে কোনটি উৎকৃষ্ট, চিন্তা করতে বসলে, তাঁদের সর্বনাশ তো হতোই, সর্বনাশ হত রাজা এবং রাজ্যেরও। কারণ তাঁদের উদ্বৃত্ত সম্পদ ছাড়া রাজধানী, নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য, মন্দির, বিহারের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠত।

আরও এক শক্তিশালী গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়, কুষাণ রাজত্ব শেষ হওয়ার পর। যে সময় উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুদিন দুর্বল এবং প্রায় শূণ্য অবস্থায় চলে গিয়েছিল। সেই সময়ে, অর্থাৎ খ্রিষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তর ভারতে বেশ কিছু অঞ্চলে নাগ অথবা ভারশিব গোষ্ঠীদের রাজ্যের কথা জানা যায়। পুরাণের উল্লেখ থেকে জানা যায়, তাদের রাজত্ব ছিল বিদিশা, পদ্মাবতী (পাওইয়া, মধ্যপ্রদেশ), কান্তিপুরী (মির্জাপুর জেলা, উত্তর প্রদেশ) এবং মথুরা অঞ্চলে। বীরসেন নামে জনৈক নাগরাজা মথুরাতে তাঁর নাগরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী কালে এই নাগ রাজাদের শক্তি এবং প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে পশ্চিমের বাকাতক রাজ্যের বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সমুদ্রগুপ্তের শিলালেখ (৩৬০ সি.ই.) থেকে জানা যায়, তিনি অনেকগুলি নাগরাজাকে পরাস্ত করে, তাঁদের রাজ্য অধিকার করেছিলেন, যেমন গণপতিনাগ, নাগদত্ত, নাগসেন-নন্দী। সমুদ্রগুপ্ত নাগদের রাজ্য জয় করলেও, তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের এক রাণি ছিলেন নাগ রাজকুমারী, নাম কুবেরনাগা। এই নাগ বা ভারশিব জনগোষ্ঠী কারা সে কথা সঠিক জানা যায় না, কিন্তু পুরাণে বর্ণনা করা আছে, নাগরা ভারতে “হিন্দু” রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন! এই রাজারা ব্রাহ্মণ না ক্ষত্রিয় সে বিষয়ে পুরাণ নীরব।

যাই হোক, এখনও পর্যন্ত ভারতের ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের বিবিধ শাখার পাশাপাশি অনেকগুলি অনার্য ধর্মগোষ্ঠীদেরও অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল। উপরন্তু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ধীরে ধীরে হিন্দুধর্ম হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও যে শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাও টের পাওয়া গেল। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে পরবর্তী এবং শেষ পর্বে। ততক্ষণ আমরা ভারতীয় ইতিহাসের পরবর্তী পর্যায়ের দিকে চোখ রাখি।

চলবে...


বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

এক যে ছিলেন রাজা - ১২শ পর্ব

 এর আগের ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম পর্ব  - " সুরক্ষিতা - পর্ব ১ " 

অন্যান্য সম্পূর্ণ  উপন্যাস - " এক দুগুণে শূণ্য "

"অচিনপুরের বালাই"

সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

শুরু হল নতুন ধারাবাহিক উপন্যাস - " বিপ্লবের আগুন - পর্ব ১ "


      


[শ্রীমদ্ভাগবৎ পুরাণে পড়া যায়, শ্রীবিষ্ণুর দর্শন-ধন্য মহাভক্ত ধ্রুবর বংশধর অঙ্গ ছিলেন প্রজারঞ্জক ও অত্যন্ত ধার্মিক রাজা। কিন্তু তাঁর পুত্র বেণ ছিলেন ঈশ্বর ও বেদ বিরোধী দুর্দান্ত অত্যাচারী রাজা। ব্রাহ্মণদের ক্রোধে ও অভিশাপে তাঁর পতন হওয়ার পর বেণের নিস্তেজ শরীর ওষধি এবং তেলে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তারপর রাজ্যের স্বার্থে ঋষিরা রাজা বেণের দুই বাহু মন্থন করায় জন্ম হয় অলৌকিক এক পুত্র ও এক কন্যার – পৃথু ও অর্চি। এই পৃথুই হয়েছিলেন সসাগর ইহলোকের রাজা, তাঁর নামানুসারেই যাকে আমরা পৃথিবী বলি। ভাগবৎ-পুরাণে মহারাজ পৃথুর সেই অপার্থিব আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়  (৪র্থ স্কন্ধের, ১৩শ থেকে ১৬শ অধ্যায়গুলিতে), তার বাস্তবভিত্তিক পুনর্নির্মাণ  করাই এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য।]

এই উপন্যাসের একাদশ পর্ব - এক যে ছিলেন রাজা - ১১শ পর্ব 


২৫

 

মন্ত্রণাকক্ষে নিজের আসনে বসার পরেও মহামন্ত্রী বিমোহন মহর্ষি ভৃগুর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলেন, আসলে এই মন্ত্রণা কক্ষে অকস্মাৎ সকলকে আমন্ত্রণ করার কী কারণ তিনি জানেন না! কী বিষয়ের মন্ত্রণা সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত নন। মহর্ষি উপস্থিত সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মহামন্ত্রী বিমোহনভদ্র, মন্ত্রণার কাজ শুরু করুন, আপনি কী আর কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন?”

“না মহর্ষি, এখানে সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। এই বিশেষ সভার আহ্বায়ক আপনি, অতএব আপনার শুরু করাই সমীচীন”। 

মৃদু হেসে মহর্ষি ভৃগু বললেন, “অতি উত্তম। তবে তাই হোক”। তারপর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “উপস্থিত সুধীবৃন্দ, আপনাদের সকলকেই আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ অভিবাদন জানানোর পর আমি এই বলতে চাই যে, রাজাবেণের আকস্মিক অসুস্থতায় আমাদের রাজ্য যে গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, সে কথা আপনারা সকলেই অবগত আছেন। কিছুদিন আগে রাজসভার এক মন্ত্রণায় আমরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যতদিন রাজাবেণ সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন রাজমাতা আপনাদের আন্তরিক সহায়তায় রাজ্যের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করবেন!”

উপস্থিত মন্ত্রীমণ্ডলী একবাক্যে সমর্থন করল, “হ্যাঁ মহর্ষি, এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল”। মহামন্ত্রী বিমোহন কিছু বললেন না, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষির দিকে।

“আজ রাজাবেণ ও রাজমাতার সন্দর্শনে গিয়েছিলাম, দেখলাম, রাজাবেণ অনেকটাই সুস্থ, তাঁর প্রাণসংশয় আর নেই! কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, তিনি জীবিত হয়েও পুত্তলিবৎ জড় হয়ে গেছেন! তাঁর মস্তিষ্কের সঙ্গে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!” 

সকলে একই সঙ্গে বলল, “সে অত্যন্ত বেদনার কথা আমরা সকলেই শুনেছি, মহর্ষি”!

“রাজাবেণের এই অসুস্থতায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি, কিন্তু আশা ছাড়িনি। রাজমাতাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তক্ষশীলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করবো, সেখানে যবন, ম্লেচ্ছ কিংবা চৈনিক প্রাজ্ঞ চিকিৎসকদের সাহায্য নেব, রাজা বেণের এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিকার করার যথাসাধ্য প্রয়াস করব!” 

এক যোগে সবাই উচ্ছ্বসিত উত্তর দিল, “সাধু সাধু, মহর্ষি, অত্যন্ত সাধু প্রস্তাব। এই কাজে আপনিই এই রাজ্যের যোগ্যতম”।

সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “এ বিষয়ে আপনাদের মনে কোন দ্বিধা নেই তো? এই প্রস্তাবে আপনারা সকলেই সম্মত?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই প্রশ্ন কেন করলেন, মহর্ষি? আপনার এই প্রস্তাবে সর্বসম্মত না হওয়ার কোন কারণ তো ঘটেনি!” 

মহর্ষি ভৃগু তাঁর দিকে এবং অন্য সকলের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “সে কথায় পরে আসছি, বৎস বৃহচ্চারু। এখন দ্বিতীয় যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, সে কথায় আসি। তরুণ পুত্রের এই নিদারুণ অসুস্থতা, দিনের পর দিন চোখের সম্মুখে দেখা, একজন মাতার পক্ষে কতোটা বেদনাময় সেকথা আমাদের কারও না বোঝার কোন কারণ নেই”!

সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, “এ বেদনা অসহ্য, মহর্ষি!”

“এই বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনের দায়িত্ব! রাজ্য পরিচালনায় একান্তই অনভিজ্ঞা এক প্রৌঢ়া নারীর কাঁধে, বিশেষ করে এই মানসিক অবস্থায়, প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরু ভার অর্পণ করা আমাদের উচিৎ হচ্ছে কী না, সেটা সকলে ভেবে দেখবেন কী?”

“সত্যই, মহর্ষি, এ আমাদের কাছে গ্লানির, আমাদের অনুপযুক্ত কাজ”।

“রাজমাতা স্বয়ং আমাকে সবিশেষ অনুরোধ করেছেন - রাজ্য শাসনের এই গুরু দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি চেয়েছেন। সমস্ত মাতৃহৃদয় দিয়ে, তিনি পুত্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। তাঁর আশা, তাঁর ঐকান্তিক সেবায়, ঈশ্বর মুখ তুলে চাইবেন, তাঁর পুত্র সুস্থ হয়ে উঠবেন। তাঁকে আমি কথা দিতে পারিনি, আপনাদের সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না”। মন্ত্রীমণ্ডলীর সকলে মাথা নত করে চুপ করে রইলেন, সকলেই চিন্তাগ্রস্ত। তাঁদের দিকে তাকিয়ে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীগণ, আপনারা সবাই নিরুত্তর কেন?”

কিছুক্ষণ পর বিদেশ মন্ত্রী পদ্মনাভ বললেন, “আমরা দ্বিধাগ্রস্ত, হে মহর্ষি। একদিকে পুত্রের সুস্থতার আশায় মাতার আকুল আবেদন, অন্যদিকে মহারাণির উপর পূর্ণ আস্থাবান রাজ্যের আপামর রাজ্যবাসী। বঞ্চিত করবো কাকে”?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহর্ষি বললেন, “হে মন্ত্রীমণ্ডলি, ঠিক এই কারণেই আমি এই বিশেষ সভার অধিবেশন আহ্বান করেছি। অত্যন্ত গোপন এই অধিবেশনে আমাদের একান্ত মত বিনিময়, আমার জরুরি বলে মনে হয়েছিল”।

এতক্ষণ নির্বাক মহামন্ত্রী বিমোহন কথা বললেন, “কিন্তু রাজা কোথায়? কে হবেন পরবর্তী রাজা? যাঁর হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে রাজমাতা নিশ্চিন্তে পুত্রসেবায় নিরত থাকবেন?”

বাণিজ্যমন্ত্রী বৃহচ্চারু বললেন, “সত্যি এ এক অদ্ভূত সংকট, মহর্ষি। রাজা কোথায়?” কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার বললেন, “আপনারা সকলেই হয়তো শুনে থাকবেন, গোটা রাজ্য জুড়ে চারণকবিরা যে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন?”

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির গান তো? হ্যাঁ, সে আমি নিজের কানেই শুনেছি, বেশ কয়েকবার! আমাদের গুপ্তচর সূত্রেও সংবাদ পেয়েছি, এই গান এখন রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সে গানের কথা যেমন সুন্দর, সুরও মধুর।  মনের মধ্যে রূপকথার মাধুরী বয়ে আনে!”

মহর্ষি ভৃগু মৃদু হাস্যে বললেন, “সে চারণ কবিদের কথা আমিও শুনেছি, তবে নিজের কানে সেই সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য হয়নি। সে গানে এমন কী জাদু আছে, যার মায়ায় সেই গান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর নিশ্ছিদ্র নিরাপদ অন্তরেও প্রবেশ করে গেল?”

মন্ত্রী বৃষভান্‌ হাসলেন, “সত্যিই মহর্ষি, কল্পনা হোক, আর যাই হোক, শুনতে বড়ো সুন্দর। কিন্তু আমার মতো নীরস মানুষের পক্ষে সে গানের বক্তব্য ব্যাখ্যা সম্ভব নয়! তবে আমাদের কলামন্ত্রী চারুশীল, কবি মানুষ, তিনি অবশ্যই বলতে পারবেন। মিত্র চারুশীল, মহর্ষিকে আপনি বলুন না, সে গানের কী বক্তব্য?”

কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “সে গানে রাজা পৃথু আর রাণি অর্চ্চির মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে! তাঁরা মহারাজা অঙ্গ এবং রাজাবেণের বংশধর”!

মহামন্ত্রী বিমোহন বিরক্ত মুখে বললেন, “আমিও সে কবিদের কথা শুনেছি, কিন্তু গান শুনিনি। কিন্তু কলামন্ত্রী চারুশীলভদ্রের কথায় মনে হচ্ছে, এ কোন গঞ্জিকাসেবীর দিবাস্বপ্নের গান! রাজাবেণ কবে সুস্থ হবেন, কবে তাঁর বিবাহ হবে? কবে তাঁর বংশধর আসবে?”

মাথা নেড়ে কলামন্ত্রী চারুশীল বললেন, “না, না, মহামন্ত্রী মহাশয়, তাঁদের জন্ম সাধারণ নয়, সে এক অসাধারণ – অলৌকিক ঘটনা ঘটবে! তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর অংশ-অবতার রূপে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন। তাঁরা মহারাজা বেণের ঔরসজাত পুত্রকন্যা নন, তাঁরা তাঁর মানস সন্তান! রাজা পৃথু ভগবান বিষ্ণুর এবং রাণি অর্চ্চি সনতানী লক্ষ্মীর অংশ!”

মহর্ষি ভৃগু বললেন, “কী আশ্চর্য! কিন্তু সে গানে শুধু কী তাঁদের জন্মবৃত্তান্তই আছে, মন্ত্রী চারুশীলভদ্র?”

“না মহর্ষি! সে গানে আছে স্বপ্নপূরণের অদ্ভূত বৃত্তান্ত। মহারাজ পৃথুর রাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র প্রত্যেক বৎসর প্রচুর মেঘ দেবেন, দেবেন প্রচুর বর্ষা। সেই বর্ষার স্নিগ্ধ স্পর্শে রজঃস্বলা হবে মেদিনী, হরিৎ শস্যে ভরে উঠবে ক্ষেত্র। লেবুগন্ধী সবুজ পুষ্ট ঘাসে তুষ্টা গাভীদের পালানে আসবে দুধের প্লাবন। সুখে সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে গৃহীদের মায়ার সংসার! খরা, বন্যা, ঝঞ্ঝা, প্লাবন, মহামারি ও পঙ্গপালহীন এই রাজ্যের আপামর সুস্থ সবল ও বিনীত জনসাধারণ, আনন্দে খুশিতে দেবালয়ে দেবালয়ে দেবতাদের নিবেদন করবে সুসজ্জিত অর্ঘ। শঙ্খ, ঘন্টা ও পটহের নিশ্চিন্ত ধ্বনিতে মুখর হয়ে থাকবে সকল মন্দির”!

কথা বলতে বলতে কলামন্ত্রী চারুশীলের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান, মিত্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “মহর্ষি, আপনি স্বকর্ণে না শুনলে উপলব্ধি করতে পারবেন না, সে গানের মাধুর্য! কথায় ও সুরে সে এক অদ্ভূত অনুভূতি। গ্রামের বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, গৃহবধূ, বিধবা নারী, কিশোর-কিশোরী সেই চারণ কবিদের গান শুনছে মুগ্ধ হয়ে, অশ্রু বিগলিত চক্ষে! সে গান শুনে পুরুষরাও আনমনে বসে থাকছে চণ্ডিমণ্ডপে, মাঠের আলে, হাটে বাজারে। তারা হুঁকোতে টান দিতে ভুলে যাচ্ছে !”

মহর্ষি ভৃগু খুবই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই গান তারা পেল কোথায়? কে তাদের শেখাল? এমন অদ্ভূত ঘটনার সূত্রপাত হল কী ভাবে?”

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃষভান্‌ বললেন, “সে সন্ধানও আমি নিয়েছি, মহর্ষি। এ গান তারা নিজেরাই রচনা করেছে! কিন্তু এই কাহিনী শুনিয়েছেন এক তপস্বী। হিমালয়ের কোলে গভীর অরণ্যবাসী সেই মহাতপস্বী নাকি কোন এক চারণদলকে এই কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই রাজ্যের দুঃখের দিন অতিক্রান্ত প্রায়! অচিরেই এক মাহেন্দ্রক্ষণে অবতীর্ণ হচ্ছেন, স্বয়ং ভগবান, তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে নিয়ে! যাঁর নাম পৃথু। তাঁর নামেই এই জগৎ সংসারের নাম হবে পৃথিবী। সসাগরা ধরিত্রী হবে তাঁর রাজ্য। তিনি এই মর্ত্য জগতে প্রতিষ্ঠা করবেন শান্তি, সমৃদ্ধি ও সনাতন ধর্ম! মহাতপস্বীর অদ্ভূত সেই ভবিষ্যবাণী শুনে সেই চারণদল যে গান বেঁধেছিল, সেই গানই এখন অন্য চারণদলের মুখে মুখে। তাদের কথা ও সুর কিছুটা ভিন্ন হলেও বক্তব্য এক!”

মহর্ষি ভৃগু কোন কথা বললেন না। নত মস্তকে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইলেন। অন্য মন্ত্রীরা সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। মহামন্ত্রী বিমোহন নিজের মন্ত্রীমণ্ডলীর এই আবেগের কথা কোনদিন জানতে বা বুঝতেও পারেননি। তিনিও নির্বাক বিস্ময়ে সকলের মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলেন। 

চলবে ...


মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছোট্ট হওয়া

বড়োদের বড়োগল্প - " এক দুগুণে শূণ্য "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "

বড়োদের ছোট উপন্যাস - " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা "

বড়োদের নাটক - " চ্যালেঞ্জ - নাটক



এর আগের ছোট গল্প - " একটি বাসি এবং বাজে ঘটনা "


নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে যত সুখ আমার...। বিশ্বাসবাবুরও তাই বিশ্বাস। তাঁর বাড়ির গলি থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়ালে, ওপারেই যতো সুখের সন্ধান। শ্যামলের চপ-ফুলুরি-পেঁয়াজি-বেগ্‌নির দোকান। কচুরি, সিঙাড়া, নিমকি আর হরেক মিষ্টির ট্রে নিয়ে বীণাপাণি মিষ্টান্ন ভান্ডার। এমনকি বিহারি রামপূজনের ভূজিয়ার দোকানটাও ওপারেবিকেলের দিকে রামপূজন যখন বড় লোহার কড়ায় গরম বালিতে ছোলা ভাজে, সে গন্ধ এপারে তাঁর নাকে ঝাপটা মারে। জিভে জল চলে আসে, যদিও এ বয়সে ছোলাভাজা খাওয়ার মতো দাঁতের জোর আর বিশ্বাসবাবুর নেইতবু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যায়।

ফতুয়ার পকেটে পার্স নিয়ে বিশ্বাসবাবু বেরিয়েছেন, মনে একটা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। আজ যে করেই হোক, শ্যামলের চপ-ফুলুরি খেয়ে মুখের তার বদলাবেন। সকালে দুধের সঙ্গে শুকনো মুড়ি কিংবা খই, দুপুরে করলাসেদ্ধ, ভাত আর পেঁপে-কাঁচকলা-বেগুনের গুণপনাযুক্ত চারাপোনার ঝোল, টকদইবিকেলে চারপিস শসা, কয়েক পিস পাকা পেঁপের টুকরো, চিনি ছড়ানো একটু ছানা! রাত্রে রুটি আর পটলের তরকারি সঙ্গে একটু দুধ। দিনের পর দিন এই খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু আনন্দে থাকতে পারে কী? বিশ্বাসবাবুর বিশ্বাস, পারে না। আর এসবের জন্যে দায়ি নিষ্ঠুর – নির্মম একটি মেয়ে! মেয়েটি একদিকে যতটা ভালো, অন্য দিকে ঠিক ততটাই নিষ্ঠুরমেয়েটি তাঁর বৌমা। অবিশ্যি এটাও ঠিক, বৌমার কড়া শাসনে তাঁর শরীরের ভাবগতিক এখন বেশ ভালোই। অম্বল-টম্বল হয় না বহুদিন, খিদে পায়, রাত্রে ঘুম হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি পেটরোগা মানুষ, সে সময় তাঁর মা এবং পরবর্তী কালে তাঁর বউ, কিছুতেই সেই রোগের স্থায়ী সুরাহা করতে পারেননি।

তার অবিশ্যি কারণও আছে। তাঁর মা কিংবা স্ত্রী, কেউই তাঁকে এমন পরাধীন করতে পারেননি। ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে হজমি, বনকুল, আলুকাবলি, ফুচকা, চপ, সিঙাড়া...। বড় হয়ে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে রোল, মোগলাইপরোটা, মোমো, তেলচিটে নুড্‌ল্‌স্‌...! চাকরিস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে বিরিয়ানি, লাচ্চা পরোটা, চিকেন ভর্তা...। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পর যখন থেকে এই হৃদয়হীনা বৌমার পাল্লায় তিনি পড়েছেন, তাঁর সেই স্বাধীনতা চুলোয় গেছে। তবে নিয়মিত পেটখারাপের ব্যাপারটা সুদূর অতীতে ফেলে আসা স্মৃতি হিসেবেই রয়ে গেছে।

ফুটপাথের কিনারায় দাঁড়িয়ে রাস্তাটা পার হতে গিয়ে বারবার পিছিয়ে আসছেন বিশ্বাসবাবু। শহরের যতো গাড়ি এই সময়ে এই রাস্তা দিয়ে যাবার জন্যেই যেন, একসঙ্গে দল বেঁধে বেড়িয়ে পড়েছে। বাস, প্রাইভেট কার, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ট্যাক্সি, অটো, বাইক, স্কুটার, সাইকেল রিকশ, ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে আর তাঁর সামনে দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। এতটুকু বিরাম নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় পা দিলেই, বাইকওয়ালা ছোকরারা, তাদের পেছনে ছুকরি নিয়ে একদম ঘাড়ের ওপর চলে আসছে। ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসা ছাড়া বিশ্বাসবাবুর উপায় কী?

ঘড়ির কাঁটা ওদিকে ছুটছে যেন বনবন করে। পৌনে চারটে বেজে গেল। নাতি বিট্টুকে নিয়ে বৌমা স্কুল থেকে ফিরবে চারটে কুড়ি থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে। তার আগে বাড়ি ফিরতে না পারলে বৌমার কাছে অনেক জবাবদিহি করতে হবে। বৌমার সেসব প্রশ্নও আবার ভাববাচ্যে! কোথায় যাওয়া হয়েছিল? কী কিনতে? কিছু কিনতে যদি নাই হয়, এসময়ে বেরোনোর কী দরকার ছিল? রাস্তায় অনেক গাড়িঘোড়া, একটা বিপদ না ডেকে আনলে কী চলছে না? ভোরে বেড়াতে যেতে বললে, তখন তো নানান বাহানা খাড়া করা হয়, কিন্তু এখন এমন কী দরকার পড়ল? বৌমার এই সব প্রশ্নে খুব অসহায় বোধ করেন বিশ্বাসবাবু। এই বয়সে এসে একটু আজাদির জন্যে তিনি তৃষ্ণার্ত!  

কিন্তু নাঃ, আর দেরি করলে সত্যিই বৌমার খপ্পরে পড়তে হবে। এরপর আবার বলা যায় না, ওপারে গিয়ে হয়তো দেখবেন, শ্যামল এখনো গামলায় বেসন ফ্যাটাচ্ছে, কড়াইতে তেল ঢেলেছে, কিন্তু স্টোভের আগুন জ্বালেনি। জিগ্যেস করলে বলবে, একটু দাঁড়ান না, কাকু, এক্‌খুনি হয়ে যাবে, দু মিনিট। শ্যামলের আবার দু মিনিট হয় আধঘন্টায়। কড়াইয়ের তেল দাউদাউ গরম হবে, তাতে গোটা বিশেক চপ ছাড়বে। আধ-পাকা চপগুলো বড়ো ছান্তায় ছেঁকে কড়াইয়ের ধারে তুলে, আবার নতুন চপ ছাড়বে, সেগুলো আধপাকা হলে, তার মধ্যে ডুবিয়ে দেবে পুরোনো চপগুলো। তারপর তেলের মধ্যে হাবুডুবু দিতে দিতে চপের গায়ে আসবে আরশোলার রঙ। ততক্ষণ কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকো, আর নিঃশব্দ ঢোঁকে গিলতে থাকো জিভের জল!

একটু ফাঁক বের করতে পেরে কোনরকমে আধখানা রাস্তা পার হয়ে বিশ্বাসবাবু, ডিভাইডারে দাঁড়ালেন। এখন পিছনের গাড়িগুলো যাচ্ছে ডানদিকে, আর সামনের গাড়িগুলো বাঁদিকে। অপেক্ষা করতে করতে গলা তুলে একবার ডানদিকে তাকালেন বিশ্বাসবাবু, এখান থেকে শ্যামলের দোকানটা ঠিক দেখা যায় না। চারটে বাজতে পাঁচ। হাতে খুব সময় নেই। শ্যামলের চপ-টপ ভাজা যদি হয়েও থাকে, সেসব উবু জ্বলন্ত চপ কিংবা ফুলুরি, খেতেও তো সময় লাগবে নাকি? ওসব কী আর গবগবিয়ে খাওয়া যায়? ফুঁ দিতে দিতে ধীরে সুস্থে খেতেই না মজা! তারপর খাওয়ার পরে আঙুল আর ঠোঁটের তেল মুছতে মুছতে “কত হল গো, শ্যামল?”, জিগ্যেস করার যে তৃপ্তি...তার কোন বিকল্প আছে? বিশ্বাসবাবু হঠাৎ যেন শিউরে উঠলেন। না তেলেভাজা খাওয়ার আনন্দ কল্পনা করে নয়, তাঁর কানে এল বৌমার ডাক।

“বাবা, বাড়ি চলো। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো এখানে?” ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন বিশ্বাসবাবু। দেখলেন তাঁর পিছনে বৌমা আর সঙ্গে বিট্টু। বিট্টু অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দাদুর দিকেই।  

সমস্ত সংকল্প জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাসবাবু হতাশ মুখে হাসি এনে বললেন, “খি ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল?”

সে কথার উত্তর না দিয়ে বৌমা বললেন, “তাড়াতাড়ি এসো না, বাবা, রাস্তাটা পার হয়ে যাইগাড়ি ঘোড়ার যা ভিড়।”ডিভাইডার থেকে নেমে বিশ্বাসবাবু সুবোধ বালকের মতো বৌমার সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে ফিরে এলেন। আশ্চর্য এখন তাঁদের রাস্তা পার হতে দেখে সমস্ত গাড়িই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ হর্ন বাজিয়ে ধমকও দিল না। ফুটপাথে পা দিয়ে গভীর শ্বাস ফেললেন বিশ্বাসবাবু, পরাধীনতার গ্লানি তাঁর সমস্ত মুখে।

 

 

বাড়ি ফিরে কেউ কোন কথা বললেন না। বিশ্বাসবাবু বসার ঘরে গুম হয়ে বসে রইলেন।  বিট্টুকে নিয়ে বৌমা গেলেন নিজেদের ঘরে, বিট্টু স্কুলের জামাপ্যান্ট বদলাবে। বৌমাও। সোফায় বসে বসে একদিকে তাঁর যেমন রাগ হচ্ছে, তেমনি ভয়ও হচ্ছে। অল্পের জন্য তপ্ত চপের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হবার জন্যে রাগ। অন্যদিকে হাতে নাতে ধরা পড়ে যাওয়ার জন্যে বৌমার প্রশ্নমালার মুখোমুখি হওয়ার ভয়। বিশ্বাসবাবু মনে মনে জম্পেশ একটা মিথ্যে অজুহাতের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। আচ্ছা, যদি বলা যায় ইলেক্ট্রিশিয়ান মিন্টুর কাছে যাচ্ছিলেন! কিন্তু বাড়িতে পাখা কিংবা লাইটের কোন গণ্ডগোল তো নেই! গণ্ডগোল নেই তো কী হয়েছে?  “কাকাবাবু, বছরে এক দুবার গোটা বাড়ির ওয়্যারিং চেক করে নেওয়াটা খুব দরকার, তাতে হঠাৎ বিপদের ভয় থাকে না”, একথা বলেছিল বৌমারই ভাই – পেশায় সে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। এ বাড়ির হেড হিসেবে, তিনি তো আর এতগুলো প্রাণীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারেন না!  তাই মিন্টুকে খবর দিতে যাচ্ছিলেন! কিন্তু সমস্যাটা হল, মিন্টুর ইলেক্ট্রিকের দোকান, বড়ো রাস্তার এপারে, ওপারে নয়। কাজেই রাস্তা পার হওয়ার গল্পটা ভাল দাঁড়াচ্ছে না...!

 আচ্ছা, যদি বলা হয়, বিট্টুর জন্যে গল্পের বই কিনতে যাচ্ছিলেন। ঠাকুমার ঝুলি, কিংবা, আবোল-তাবোল, অথবা ক্ষীরের পুতুলহতে পারে না? লোকনাথ গ্রন্থাগার দোকানটা রাস্তার ওপারে, সেদিক থেকেও কোন সমস্যা নেই। বৌমা যদি জিগ্যেস করে, বিট্টুর জন্মদিন তো অনেক দেরি, সেই নভেম্বরে – এখন বই কেন? বিশ্বাসবাবু আবেগমথিত স্বরে বলবেন, ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে বিট্টুটা বাংলা গল্প-সল্প তেমন কিছুই পড়ল না। দাদু হিসেবে আমি কী দু-একটা বই নাতিকে উপহার দিতে পারি না? তার জন্যে জন্মদিনের অপেক্ষা করতে হবে? এই কথায় বৌমা কী উত্তর দেবে, শুনি? বিশ্বাসবাবু বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে মনে মনে গুছিয়ে নিতে লাগলেন, বৌমার সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং তার উত্তরগুলি।

হঠাৎ তীব্র তেলেভাজার গন্ধে বিশ্বাসবাবুর চিন্তায় বাধা পড়ল, তাকিয়ে দেখলেন, স্কুলে যাওয়ার শাড়ি-টাড়ি ছেড়ে বৌমা কাপ্তান পরে সামনে দাঁড়িয়ে, তার হাতের প্লেটে অনেকগুলি তেলেভাজা, গন্ধটা আসছে সেখান থেকেই। বৌমার হাতে আকাশের চাঁদ দেখলেও এতটা অবাক হতেন না, যতটা হলেন, তেলেভাজা দেখে!

প্লেটটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বললেন, “এসব কী? এসব আবার কেন? তেলেভাজা খেলে আমার আবার যদি পেট ভুটভাট...”

বৌমা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, “হুঁ, তাই বৈকি! ছুটছিলে তো শ্যামলের দোকানে, তখন পেট ভুটভাটের কথা মাথায় আসেনি না?  মিতালি বানিয়েছে, গরম গরম বেগুনি খেয়ে দেখো!” মিতালি বিশ্বাসবাবুদের বাড়ি রান্নার কাজ করে, সকালে আর বিকেলে আসে। রান্নার হাত বেশ ভালোই।

কিন্তু বৌমার সরাসরি অভিযোগে বিশ্বাসবাবু একটু এলোমেলো হয়ে পড়লেন, তবুও সাহস সঞ্চয় করে বললেন, “আমি শ্যামলের দোকানে ছুটছিলাম? কে বলল তোকে? যত্তোসব...তোরা সব একধাতের...তুই, তোর শ্বাশুড়ি মা, তোর দিদিশ্বাশুড়ি...মনগড়া কথায় তোদের জুড়ি নেই!” বলতে বলতে গরম বেগ্‌নিতে হাল্কা কামড় দিলেন, “বাঃ ...” তারপর ফুঁ দিতে দিতে বললেন, “ফুউউউ...ফুউউউ...তুই আমাকে কী পেয়েছিস বল তো? বাচ্চা ছেলে? নিজের ভালো বুঝবো না?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে জিগ্যেস করলেন, “নুন-টুন ঠিক আছে?”

“হুঁ...ঠিকই আছে, ভালোই হয়েছে”।

“তুমি খাও, আরো আনছি”। বৌমা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। আর তারপরেই বিট্টু ঢুকল হাতে প্লেট নিয়ে, দাদুর পাশে বসতে বসতে বলল, “ও দাদু, আমি মাত্র দুটো বেগ্‌নি পেলাম”

নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু বললেন, “শুরু কর না। দেখিস গরম আছে কিন্তু, জিভ পুড়ে যাবে। তোর মা আরো আনতে গেছে।  সেখান থেকে আরো পাবি”।

বিট্টু একটা কোণা কামড়ে দেখল খুব গরম, প্লেটে আবার নামিয়ে রেখে ম্লান মুখে বলল, “না গো দাদু, মিতালিমাসি চারটে দিয়েছিল, মা তার থেকে দুটো তুলে নিয়েছে! আমাকে আর দেবে না।”

নাতির বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসবাবু, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাকে কোলের আরো কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “মায়েরা বড়ো নিষ্ঠুর হয় রে, বিট্টু। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের প্রতি তাদের এতটুকু মায়াও যেন থাকতে নেই!”

বিট্টু কী বুঝল কে জানে, সে দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে সহানুভূতি মাখা স্বরে বলল, “কিন্তু তুমি তো আর ছেলে নও দাদু, তুমি তো অনেক বড়ো !” বিট্টু আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, বেগনিটা অনেকটাই ঠাণ্ডা হয়েছে, এবার খাওয়া চলবে। নাতি ও দাদু দুজনেই বিরস মুখে বেগ্‌নি চিবোতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর বিশ্বাসবাবু বললেন, “বড়ো আর নেই রে, তোর মা আমাকে ছেঁটে তোর থেকেও ছোট্ট করে নিয়েছে”! এই সময়েই বউমা ঘরে এলেন, এক প্লেট বেগনি আর ফুলুরি নিয়ে। বিশ্বাসবাবু এবং বিট্টুর প্লেটে আরো কখানা তেলেভাজা দিয়ে, সামনের সোফায় বসলেন। তাঁর হাতের প্লেটেও কয়েকটা তেলেভাজা। সেগুলি খেতে খেতে মুচকি হেসে বললেন, “আমার বিরুদ্ধে দাদু আর নাতি মিলে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, শুনি?”

বিট্টু মায়ের থেকে আরো দুটো বেগনির প্রশ্রয় পেয়ে খুব খুশি, বলল, “দাদু বলছিল, তুমি নাকি আমার থেকেও দাদুকে ছোট্ট করে দিয়েছো?”

বৌমা বিশ্বাসবাবুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “আমায় মা বলে যে ডাকো - ছোট্ট হয়েই থাকো না, বাবা, তাতে তোমাকে শাসন করতে আর প্রশ্রয় দিতে আমার সুবিধে হয় যে”!

বিশ্বাসবাবুর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।   

..০০.. 

নতুন পোস্টগুলি

আকাশের অর্ঘ্য

  এর আগের রম্যকথা - "  রুদ্র সুন্দর ও অধরা অসীম "  সেবার হস্টেলে মহালয়ার আগের রাত্রে আমাদের এক ঘনিষ্ঠ আড্ডার বিষয় ছিল, রেডিওর পুর...