এই সূত্রে - " ঈশোপনিষদ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কঠোপনিষদ - ১/১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " কেনোপনিষদ - খণ্ড ১ ও ২ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " শ্রীশ্রী চণ্ডী - পর্ব ১ "
এই সূত্র থেকে শুরু - " গীতা - ১ম পর্ব "
|
১ |
শ্রীভগবান বললেন- জ্ঞানীজনেরা বলেন এই সংসার যেন
একটি অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার ঊর্ধে শিকড় আর নীচেয় শাখা প্রশাখা, চারবেদ যেন এই
বৃক্ষের পাতা। এই বৃক্ষটির স্বরূপ যিনি বোঝেন, তিনিই বেদজ্ঞ। [অশ্বত্থ কথার মূল অর্থ যা কাল পর্যন্ত থাকে না,
অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী। ইহলোকে সংসারে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে আবদ্ধ ক্ষণস্থায়ী জীবনের
নিরন্তর জীবন চক্রকেই অক্ষয় অশ্বত্থ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।] [এই শ্লোকটির অনুরূপ শ্লোক পাওয়া যায় কঠোপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় বল্লীর প্রথমেই। ধর্মরাজ যম সেখানে অশ্বত্থ বৃক্ষকে সনাতন বলেছেন, এখানে ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন অব্যয়। বাকি বক্তব্য প্রায় একই। কঠোপনিষদের ওই পর্বটি এই সূত্র থেকে পড়ে নিতে পারেন - কঠোপনিষদ - ২/৩ (শেষ পর্ব)। এই কারণেই পণ্ডিতেরা বলেন, গীতা হল সকল উপনিষদের সারাংশ - অতএব আমাদের সনাতন ধর্মের মূল-তত্ত্বকথাগুলি এক গীতার মধ্যেই যেন বিধৃত।] |
||
|
২ |
এই বৃক্ষের শাখা প্রশাখা ত্রিগুণের প্রভাবে বেড়ে উঠে
বিষয়রূপ পল্লব হয়ে নীচের থেকে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আবার ঊর্ধের মূলসমূহ
মানুষের সুকর্ম এবং কুকর্মের ফলস্বরূপ নীচের দিকেও প্রসারিত হয়ে থাকে। |
||
|
৩,৪ |
ইহলোকে সংসাররূপ এই অশ্বত্থের রূপ সঠিক উপলব্ধি করা
যায় না, কারণ এই বৃক্ষের শেষ নেই, শুরু নেই, এমনকি মধ্যবর্তী স্থিতাবস্থাও নেই।
এই বদ্ধমূল অশ্বত্থবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রে কেটে ফেলার পর, যে ব্রহ্মপদ লাভ
করলে সংসারে আর ফিরে আসতে হয় না, সেই পরম ব্রহ্মপদের অন্বেষণ করা উচিৎ। আমি সেই আদি
পরমব্রহ্মপুরুষেরই শরণাপন্ন হই, যাঁর থেকে এই চিরন্তনী সংসার-প্রবৃত্তি প্রবাহিত
হয়ে চলেছে। |
||
|
৫ |
অহংকারহীন ও মোহবর্জিত হয়ে, আসক্তির সমস্ত দোষ জয়
করে, পরমাত্মজ্ঞানে নিষ্ঠা নিয়ে, বাসনা ত্যাগ করে, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্ব থেকে
মুক্ত হয়ে, জ্ঞানী ও বিবেকী ব্যক্তিরাই সেই অব্যয় পরমব্রহ্মপদ লাভ করেন। |
||
|
৬ |
যে পদ লাভ করলে আবার জন্ম নিতে হয় না, সূর্য, চন্দ্র
কিংবা অগ্নি যাঁকে প্রকাশ করতে পারেন না, সেই পদই আমার কাছে পরম ব্রহ্মপদ। |
||
|
৭ |
কারণ আমারই সনাতন একটি অংশ জীবলোকে জীবভূতরূপে,
প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও ছয় ইন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে। |
||
|
৮ |
যেমন বায়ু পুষ্প থেকে গন্ধ আহরণ করে, তেমনি দেহের
অধিকারী, শরীর ত্যাগের সময়, পূর্ব দেহ থেকে সমস্ত ইন্দ্রিয় আহরণ করে প্রস্থান
করেন ও নতুন শরীর ধারণ করেন। |
||
|
৯ |
দেহের অধিকারী এই জীবাত্মা কান, চোখ, ত্বক, জিভ ও
নাক এমনকি মনকেও আশ্রয় করে বিষয় সম্পদ উপভোগ করেন। |
||
|
১০ |
যে জীবাত্মা অন্য শরীরে গমন করেন ও অবস্থান করেন,
যিনি ইন্দ্রিয় ও তিনগুণের প্রভাবে বিষয় ভোগ করতে থাকেন, তাঁকে অজ্ঞান ব্যক্তি
দেখতে পায় না, কিন্তু আত্মজ্ঞানীরা তাঁকে দেখতে পান। |
||
|
১১ |
সমাহিত চিত্তের যোগীগণ এই আত্মাকে নিজের আত্মায়
প্রতিষ্ঠিত দেখতে পান, কিন্তু অশুদ্ধচিত্তের বিবেকহীন মানুষ এই আত্মাকে দেখতে
পায় না। |
||
|
১২ |
সূর্যের যে তেজে, চন্দ্রের যে জ্যোতিতে এবং অগ্নির
যে দাহিকাশক্তিতে এই অখিল জগৎ উদ্ভাসিত হয়, জেনে রাখো, সেই তেজ আমারই। |
||
|
১৩ |
এই নিখিল ভুবনে প্রবেশ ক’রে, আমার ঐশ্বরিক শক্তি
দিয়ে স্থাবর জঙ্গম সকল ভূতকে আমিই ধারণ করি। রসাত্মক চন্দ্র হয়ে আমিই সমস্ত
শস্যকে পুষ্টি দান করি। |
||
|
১৪ |
আমিই অগ্নি রূপে জীবদেহে অবস্থান করি এবং প্রাণ ও অপানবায়ুর সংযোগে
চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, এই চার প্রকারের খাদ্য পরিপাক করি। |
||
|
১৫ |
আমিই সকল জীবের হৃদয়ে সম্যকরূপে নিবিষ্ট থাকি, আমার
থেকেই স্মৃতি ও জ্ঞানের উপলব্ধি হয় আবার অবলুপ্তিও ঘটে। সকল বেদে আমিই জ্ঞানের
বিষয়, বেদান্তের অধিকারী আমিই বেদজ্ঞ। |
||
|
১৬ |
ক্ষর ও অক্ষর এই দুইধরনের পুরুষ জগতে প্রসিদ্ধ। বিনাশী বিকার থেকে উৎপন্ন সমস্ত ভূতকে ক্ষর
পুরুষ এবং কূটস্থ নির্বিকার পুরুষকে অক্ষর বলে। [ক্ষর কথার অর্থ যার ক্ষরণ বা ক্ষয় হয় - অর্থাৎ বিনাশী, নশ্বর। আর অক্ষর হল তার বিপরীত, অর্থাৎ অবিনাশী, অব্যয়, অবিনশ্বর] |
||
|
১৭ |
এই দুই পুরুষ ছাড়া আরেক জন শ্রেষ্ঠ পুরুষ আছেন,
তিনিই পুরুষোত্তম নামে অভিহিত হন। ভূঃ, ভুবঃ আর স্বঃ -এই তিন ভুবনের মধ্যে
অবস্থান ক’রে, তিনিই অব্যয় ঈশ্বররূপে সকলকে পালন করেন। |
||
|
১৮ |
যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষরের অনেক ঊর্ধে,
সেহেতু সর্বলোকে এবং সকল বেদে, আমিই পুরুষোত্তম নামে প্রখ্যাত। |
||
|
১৯ |
হে অর্জুন, সমস্ত মোহমুক্ত হয়ে, অভিমানশূণ্য চিত্তে
যিনি আমাকেই পুরুষোত্তম উপলব্ধি করেন, সেই সর্বজ্ঞ ব্যক্তি সর্বতোভাবে আমারই
উপাসনা করেন। |
||
|
২০ |
হে অপাপবিদ্ধ অর্জুন, এই যে পরমরহস্যময়
শাস্ত্রতত্ত্ব আমি তোমাকে ব্যাখা করলাম, এই তত্ত্ব জানতে পারলে যে কোন ব্যক্তি
পরম জ্ঞানী ও কৃতার্থ হয়ে থাকেন। |
পুরুষোত্তমযোগ সমাপ্ত
চলবে...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন