মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫

ধর্মাধর্ম - ৩/১

 


["ধর্মাধর্ম"-এর দ্বিতীয় পর্বের শেষাংশ পড়ে নিতে পারেন এই সূত্র থেকে ধর্মাধর্ম - ২/৬ (শেষাংশ)


তৃতীয় পর্ব - প্রথম পর্বাংশ

(৬০০ বিসিই থেকে ০ বিসিই)

 

প্রাককথা

৬০০ থেকে ০ বিসিই সময়কালটা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। অনেক ঐতিহাসিক অন্য বেশ কিছু যুগকে “সুবর্ণ যুগ” বলে সনাক্ত করেছেন, কিন্তু আমার মনে হয় (আমি ঐতিহাসিক নই) এই যুগটিই ভারতের সুবর্ণ যুগ। অন্ততঃ প্রথম সুবর্ণ যুগ তো বটেই। এই সময় কালেই আমাদের দেশ সামগ্রিক ভাবে ভারত হয়ে উঠেছিল এবং ভারতের অথবা ভারতবাসীর স্বকীয়তা - তাকে যদি ভারতীয়ত্ব (Indianism) নাম দিই - সুস্পষ্ট রূপ নিতে শুরু করেছিল এবং অচিরেই নিজেকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বহির্বিশ্বেও! এই ভারতীয়ত্বের জন্যেই তো আমরা আজও গর্ব অনুভব করি – যাঁরা করেন না তাঁরা বেচারা।

কেন আমি এই সময়কালকে আমাদের সুবর্ণযুগ বলছি – সে আলোচনায় বিশদে যাওয়ার আগে, খুব সংক্ষেপে মানুষের মস্তিষ্কের বিচিত্র চিন্তাভাবনার জগৎটার দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

মানুষের তুলনায় যে কোন প্রাণীর অসহায় শৈশবকাল স্বল্পস্থায়ী হয়। কোন কোন অণ্ডজ শিশুপ্রাণী কয়েকঘন্টার মধ্যে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিশুরাও জন্মানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁড়াতে এবং নড়বড়ে পায়ে হেঁটে চলে বেড়াতে পারে। তবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে সময় লাগে দেড় থেকে দুবছর পর্যন্ত। সেখানে মানুষ-শিশুদের দাঁড়াতে এবং হেঁটে চলে বেড়াতেই সময় লাগে প্রায় বছর দেড়েক। স্পষ্ট কথা বলতে দুই থেকে তিন বছর। আর স্বাবলম্বী হতে লাগে কমপক্ষে ষোলো থেকে কুড়ি বছর!

মানুষের শিশুর এই বেড়ে ওঠার বয়েসগুলি তার ভবিষ্যৎ জীবনের ভাবনাচিন্তা এবং কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে দেয়। অন্য স্তন্যপায়ী শিশুদের এই ভাবনা চিন্তার জগৎটা অত্যন্ত সীমিত এবং প্রাকৃতিক বোধ নিয়েই তাদের ভবিষ্যৎ জীবন দিব্যি চলে যায়। স্বাভাবিক এই বোধ সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেগুলি হল, বেঁচে থাকতে হলে খাদ্য চাই, খাদ্য সংগ্রহের জন্যে প্রচেষ্টা চাই, আত্মরক্ষার জন্যে সচেতন হওয়া চাই, বিশ্রামের জন্যে কোথাও একটু আশ্রয় চাই, নিজের জিনকে অমর রাখতে পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি করা চাই, ইত্যাদি। সাধারণ এই বোধসমূহ ছাড়াও মানুষের শিশুকে আরও যে বিচিত্র এবং সীমাহীন বোধ আয়ত্ব করতে হয়, তার পিছনে প্রকৃতির কোন হাত নেই। সেই বোধ মানুষের নিজেরই সৃষ্টি এবং অসাধারণ সেই বোধ মোটামুটি আয়ত্ব না হওয়া পর্যন্ত সে নাবালক থাকে। সাবালক হওয়ার পথে তাকে পরিবার, পরিজন, প্রতিবেশী এবং সমাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে যেতে হয় অহরহ। সেই শিক্ষা গ্রহণ করতেই তার জীবনের আয়ু থেকে প্রায় বছর কুড়ি ব্যয় করতে হয়।

মানুষের শৈশব ও বাল্য চেতনায় যে শিক্ষার বীজ রোপিত হয় – কৈশোর ও তারুণ্যে নিজের মস্তিষ্কের রসায়নে সেই শিক্ষাতেই সে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ খুঁজতে থাকে। কেউ হয় অত্যাচারী এবং বিলাসী রাজা, কেউ মানবদরদী সমাজ-সংগঠক, কেউ দার্শনিক, কেউ দারুণ যুদ্ধবাজ, আর অধিকাংশ হয়, আমাদের মতো থোড়-বড়ি-খাড়া জীবনের অধিকারী। মস্তিষ্কের এই বিশেষ রসায়নের ফর্মুলাটি আজও আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।  

আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, বৃহত্তর সমাজে যখনই ভীষণ বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায় এবং অবক্ষয়ে সাধারণ মানুষ জেরবার হতে থাকে, ঠিক সেই সময়েই অদ্ভূত চেতনাসম্পন্ন কোন না কোন মানুষের আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের স্বচ্ছ ভাবনা-চিন্তায় এবং প্রত্যয়ী আচরণে তাপিত সমাজ স্থিতাবস্থা পায়। এমন ঘটনা শুধু আমাদের দেশের ইতিহাসেই বারবার ঘটেছে এমন নয়, ঘটেছে এই বিশ্বের অন্য সমাজে, অন্য দেশেও। আজকের বিশ্ব জুড়ে, আমাদের এই দেশ জুড়ে, আমাদের এই রাজ্য জুড়ে সামাজিক অবক্ষয়ের যে সার্বিক রূপটি আমরা প্রত্যহ প্রত্যক্ষ করছি। যা দেখে দিনে দিনে আমরা হতাশ হচ্ছি, নৈরাশ্যে ভুগছি। সেই সমাজেও, আমার বিশ্বাস, এমন ঘটনা আবার ঘটবে। কোন পুরাণ-পুরুষ বা অবতার নয় – আমাদের মধ্যে থেকেই এমন এক অসাধারণ মানুষ আসবেন, যিনি আমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার রাস্তা চেনাবেন। যদিও তাঁকে আমরা কয়েকশ বছরের ব্যবধানে অবতার বা দেবাংশ ভেবে আবার অন্ধকারের জগতে ডুব দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে নেমে যেতে থাকব।

ইতিহাসে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি, অন্ততঃ আমাদের দেশে, বহুবার ঘটেছে। আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও ঘটবে। নচেৎ ইতিহাসচর্চার কোন মানে হয় না।

প্রাককথায় আমার এই প্রসঙ্গ টেনে আনার একটাই উদ্দেশ্য, আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করতে চলেছি, সেই সময়েও আমাদের সমাজে এমনই অবক্ষয় ঘটেছিল এবং ভয়ংকর এক সংকটের মধ্যে দিয়ে চলছিল। 

   

৩.১.১ নতুন ধর্মমত

অনার্য ভারতে এতদিন কোন নির্দিষ্ট ধর্মমত ছিল না, ছিল না কোন ধর্মীয় তত্ত্বকথা এবং দর্শন। এতদিন ধর্ম বলতে ভারতীয় অনার্য সমাজে যা কিছু চলছিল সবই সাধারণ জীবন থেকে স্বতঃস্ফূর্ত উঠে আসা বিশ্বাস আর আস্থা। সমাজ ব্যবস্থাও গড়ে উঠছিল সেই স্বাভাবিক জীবন-ধর্মের স্ব-ভাবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে সমাজে শ্রেণী বিভাগ ছিল – কেউ ছিল অতি সম্পন্ন, কেউ মধ্যবিত্ত আর অধিকাংশই ছিল দরিদ্র। কিন্তু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চাপিয়ে দেওয়া চতুর্বর্ণাশ্রম এবং তার অভূতপূর্ব সৃষ্টিতত্ত্ব, সামাজিক স্থিতাবস্থাকেই নাড়িয়ে দিল। অনার্য মানুষের সম্পূর্ণ সমাজটাই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে। এ সময় কয়েকজন আর্য পণ্ডিতও অন্যায্য এই ব্যবস্থাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি, অনেকেরই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শোনা গেছে বারবার।      

দ্বিতীয় পর্বের শেষ ভাগের ২.৬.২ অধ্যায়ে বলেছি সামাজিক বৈষম্যের উৎকট চিত্র গণসঙ্ঘ পরিচালিত মহাজনপদ এবং জনপদগুলিতে ছিল না। সেখানে ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি ছিল গৌণ। সেখানে যজ্ঞের এমন বিপুল আয়োজন এবং বাহুল্য ছিল না। আরও বলেছি এই গণসঙ্ঘগুলি আর্যদের অন্যান্য রাজ্য বা মহাজনপদগুলির তুলনায় সব দিক থেকেই অনেকটা দুর্বল ছিল। সেখানকার মানুষদের মনে হয়তো এমন উদ্বেগও ছিল, তাদের দুর্বল জনপদগুলি প্রতিবেশী আগ্রাসী আর্যরাজ্য যে কোনদিন গ্রাস করে নিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তাদের জনপদগুলিও ব্রাহ্মণ্য সমাজের কুক্ষিগত হয়ে যাবে। অতএব তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধ ধর্মমতগুলিকেও পরোক্ষ প্রশ্রয় দিতে লাগল এবং হয়তো গোপনে পৃষ্ঠপোষকতাও করছিল।

সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু সন্ন্যাসী এবং যুক্তিবাদী মানুষ ঘুরে ঘুরে প্রচারে বেরোতেন নগরের হাটে বাজারে, কখনো বা নগর সীমার বাইরে। এই সব জায়গায় তাঁরা ছোট ছোট সভা আহ্বান করতেন, সে সভাস্থলকে বলা হত “কুতূহল-স্থল”। “কুতূহল” হল কৌতূহলের প্রাকৃত, যেখানে কৌতূহল নিরসন হতে পারে, তারই নাম “কুতূহল-স্থল”। সেখানেই তাঁরা তাঁদের মতাদর্শ উপস্থিত সাধারণ মানুষদের সামনে রাখতেন। তাঁদের সকলেরই ভাষা ছিল, সাধারণের সহজবোধ্য প্রাকৃত ভাষা। তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের অবাস্তবতার বিরুদ্ধে তাঁদের দর্শনের বস্তুভিত্তিক চিন্তাভাবনার কথাগুলি সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করতেন[1] 

উল্টোদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদ শুধুমাত্র রাজসভা কিংবা পণ্ডিতসভার আলোচ্য বিষয় হতে পারত, কিন্তু সাধারণ জনগণের সামনে কখনও নয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ছিল শুধুমাত্র উচ্চবর্ণীয় মানুষদের জন্য – অগণ্য সাধারণ মূঢ় মানুষের থেকে এই ধর্ম প্রথম থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিল। আম জনগণের সামনে “কুতূহল স্থলে” ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ব্যাখা করার প্রয়োজনীয়তা উদ্ধত ব্রাহ্মণ্যধর্ম কোনদিন অনুভবই করেনি। 

সে সময়ে ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী অনেক মতবাদ এবং তার সমর্থকদের বহু দল গড়ে উঠেছিল। সে দলগুলি কখনো কখনো একজোট হয়েছে, কখনো কখনো ভেঙেও গেছে। কোনো দল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জন করে যখন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তখন অন্যান্য ছোট দলগুলিও সেই দলের আশ্রয় পেয়েছে। এরকমই এক শক্তিশালী দল বা গোষ্ঠীর কথা আগেই বলেছি (২.৬.৫), চার্বাক গোষ্ঠী - যাঁরা লোকায়ত দর্শনের প্রণেতা ও প্রচারক।

চার্বাক গোষ্ঠী ছাড়াও অন্য আরেকটি গোষ্ঠীও তখন সাধারণ জনসমাজে বেশ সমর্থন লাভ করতে পেরেছিল, সেটি আজীবিক গোষ্ঠী। আজীবিক শব্দের অর্থ মনে করা হয় সন্ন্যাস-জীবন, এই সম্প্রদায়ের সকলেই সন্ন্যাসী ছিলেন। জীব কথার অর্থ যার প্রাণ আছে, আর অজীব মানে জড়। জীবদেহ সৃষ্টি হয় অজীব অর্থাৎ জড় বস্তু থেকেই এবং মৃত্যুর পর সেই দেহ আবার জড় হয়ে, জড়ের সঙ্গেই মিশে যায়। এটাই ছিল আজীবিকদের মূল তত্ত্ব। এই গোষ্ঠীর প্রবর্তক ছিলেন গোশালা মক্ষরিপুত্র, যিনি জৈন চব্বিশতম তীর্থংকর ভগবান মহাবীরের শিষ্য বা অন্যমতে বন্ধু ছিলেন। পরবর্তী কালে গোশালা মক্ষরিপুত্র-র সঙ্গে ভগবান মহাবীরের তীব্র মতবিরোধ উপস্থিত হওয়ায় দুজনের মৈত্রী নষ্ট হয়েছিল। শোনা যায় ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েক বছর আগেই গোশালার মৃত্যু হয়। এই গোষ্ঠীরও নিজস্ব কোন গ্রন্থ বা পুঁথি পাওয়া যায় না, এঁদের সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ বা তাদের সাহিত্যে উল্লেখ থেকে।

আজীবিক সন্ন্যাসীরা “নিয়তি”তে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা মনে করতেন, মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট। যেহেতু সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত, অতএব একজন মানুষের জীবনে যা যা হবার তা হবেই – সে যদি রাজা হয় কিংবা কপর্দকহীন হয়, তাতে তার ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার কোন স্থান নেই। সবই ভবিতব্য, তার ভাগ্যে এমনই হবার ছিল, তাই হয়েছে। আজীবিক সন্ন্যাসীরা জন্মান্তরে বিশ্বাস করতেন এবং এও বিশ্বাস করতেন, আত্মা তার নির্দিষ্ট ভাগ্য নিয়ে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে থাকে। এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা কোন কিছু পাওয়ার আশা – যেমন স্বর্গ বা মুক্তি - নিয়ে তপশ্চর্যা করতেন না। শোনা যায়, চরম নৈরাশ্যবাদী এই দর্শন মৌর্যযুগে (মোটামুটি তৃতীয় শতাব্দী বি.সি.ই) বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সম্রাট বিন্দুসার এই দর্শনে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তারপরেই এই গোষ্ঠীর মধ্যে ভাঙন ধরে এবং দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু তাও চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত আধুনিক মহীশূর রাজ্যে এদের অস্তিত্ব ছিল।                  

অতএব ভারতবর্ষে পদার্পণের পরবর্তী হাজার বছরে আর্যরা আর্যাবর্তে তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদ যথেষ্ট আধিপত্য নিয়ে জাঁকিয়ে বসতে পেরেছিল ঠিকই। কিন্তু শুরুর থেকেই তাদের নিরন্তর প্রতিবাদ এবং বিরোধের মধ্যে দিয়েও চলতে হচ্ছিল - একথা স্পষ্ট ধারণা করা যায়। ছোট ছোট অসংগঠিত বিরোধ এবং ক্ষোভ একসময় দানা বাঁধতে লাগল এবং বৃহত্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল মোটামুটি পঞ্চম শতাব্দী বি.সি.ই-র শেষদিকে। এই সময়ে দুই মহাপুরুষ - ভগবান মহাবীর এবং ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাব হল।

 

৩.১.২ ভগবান মহাবীর এবং জৈন দর্শন

ভগবান মহাবীরের জন্ম গণসঙ্ঘী বৃজি মহাজনপদে। এই গণসঙ্ঘের অনেকগুলি গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি ছিলেন জ্ঞাতৃকা গোষ্ঠীর আর্য। ভগবান মহাবীরকে চব্বিশতম তীর্থংকর বলা হয় এবং তিনি যে দর্শনের প্রচার করেছিলেন, তা আজও প্রচলিত। ভগবান মহাবীরের সময়কাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বহুদিন ধরে বহু বিতর্ক চলে আসছে। তবে এটা নিশ্চিত যে, ভগবান বুদ্ধ এবং তিনি সমসাময়িক এবং বয়সে ভগবান মহাবীর সামান্য বড়ো ছিলেন। আগে পণ্ডিতেরা অনুমান করতেন, ভগবান মহাবীরের জীবনকাল ৫৯৯ থেকে ৫২৭ বি.সি.ই। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় ভগবান বুদ্ধের জন্মকাল স্থির হয়েছে ৫৬৩ বি.সি.ই-র কাছাকাছি কোন সময়ে এবং তাঁর নির্বাণ হয় ৪৮৩ বি.সি.ই-তে। সেই প্রেক্ষীতে ভগবান মহাবীরের জন্মসাল অনুমান করা হয় ৫৭০ বি.সি.ই-র কাছাকাছি এবং দেহরক্ষা করেন ৪৯০ বি.সি.ই-তে।

তীর্থংকর মহাবীরের পিতা ছিলেন সিদ্ধার্থ এবং মাতা ছিলেন রাজা চেতকের বোন ত্রিশলা। বর্ণে তাঁরা ছিলেন ক্ষত্রিয়। তাঁর যে জ্ঞাতৃকা গোষ্ঠীতে জন্ম হয়েছিল, সেই গোষ্ঠীকে “নাত”ও বলা হত, সেই কারণে মহাবীরকে “নির্গ্রন্থ নাতপুত্র”ও বলা হয়। নির্গ্রন্থ শব্দের অর্থ যাঁর কোন গ্রন্থি অর্থাৎ কোন জাগতিক বন্ধন নেই।

শোনা যায়, মহাবীরের জন্মের পরেই তাঁর পিতা সিদ্ধার্থের প্রভূত সম্পদ ও  প্রতিপত্তি বেড়ে ওঠায়, পিতা পুত্রের নাম রেখেছিলেন, বর্ধমান। শৈশব থেকে যৌবনে বর্ধমানের সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার অনেক ঘটনার কথা প্রচলিত আছে। সেই কারণেই জনশ্রুতি আছে, দেবতারা তাঁর সাহস, অধ্যবসায় এবং আত্মসংযম দেখে “মহাবীর” নাম দিয়েছিলেন। তাঁর বিবাহ নিয়ে জৈনদের দুই সম্প্রদায়ের মতে অনৈক্য আছে। শ্বেতাম্বর মতে তিনি সংসার ত্যাগের আগে কিছুদিন বিবাহিত জীবন কাটিয়েছিলেন, কিন্তু দিগম্বর সম্প্রদায়ের মতে তিনি বিয়েই করেননি। ত্রিশ বছর বয়সে, তাঁর পিতা-মাতার মৃত্যুর পর, বড়ো ভাই নন্দীবর্ধনের অনুমতি নিয়ে তিনি সংসারত্যাগ করেন এবং সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন। দীর্ঘ বারো বছর কঠোর সাধনা করে তিনি পরমজ্ঞান বা “কৈবল্য” লাভ করেন এবং তারপর ধর্ম প্রচার শুরু করেন।

জৈন শব্দের উৎপত্তি জিন থেকে, জিন শব্দের অর্থ জয়ী অর্থাৎ যিনি লোভ, হিংসা, মায়া, মোহকে জয় করেছেন। জৈন ধর্মের শিক্ষকেরা সকলেই জিন, অতএব তাঁদের দর্শন বা ধর্মের নাম জৈন। এঁদের তীর্থংকরও বলা হয় – তীর্থংকর হলেন সর্বজ্ঞ শিক্ষক বা আচার্য। জৈন ধর্মে তীর্থ অর্থে অনন্ত জন্ম ও মৃত্যুর দুস্তর সাগরকে বোঝায়, যে শিক্ষক মানুষকে এই তীর্থ পার করিয়ে দেন, তিনিই তীর্থংকর। ভগবান মহাবীর ছিলেন চব্বিশতম তীর্থংকর। প্রথম তীর্থংকর ছিলেন ঋষভদেব, তাঁর জন্মস্থান অযোধ্যার বিনীতায়। ঋষভদেবই প্রথম জৈনধর্ম প্রচার করেছিলেন বলে, তাঁকে আদিনাথও বলা হয়। অতএব ভগবান মহাবীরের আগে যে তেইশ জন তীর্থংকর ছিলেন – তাঁদের প্রত্যেকের ধর্মচর্চার সময়কাল যদি গড়ে পঁচিশ বছর ধরা যায়, তাহলে প্রথম তীর্থংকর ঋষভদেব ছিলেন, ২৩ x ২৫ = ৫৭৫ বছর আগের তীর্থংকর। সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় ভারতবর্ষে আর্যদের উপনিবেশ গড়ার প্রায় শুরুর দিকেই তিনি জৈন ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন।    

জৈনধর্ম প্রধানতঃ শ্রমণ ধর্ম। শ্রম অর্থাৎ তপস্যা দিয়ে যাঁরা জগতকে জয় করেন তাঁরাই শ্রমণ এবং শ্রমণা। জৈন ধর্মে স্ত্রী-পুরুষ, অথবা উচ্চ-নীচ, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্রের কোন ভেদাভেদ ছিল না। শ্রমণ এবং শ্রমণা ছাড়াও জৈন ধর্মে আরও দুই শ্রেণী ছিল শ্রাবক এবং শ্রাবিকা। যাঁরা শ্রমণদের উপদেশ বা কথা শুনে শিষ্যত্ব গ্রহণ করতেন তাঁদের বলা হত শ্রাবক ও শ্রাবিকা। শ্রাবক ও শ্রাবিকারা সন্ন্যাসী নন, তাঁরা হলেন জৈনধর্মে বিশ্বাসী গৃহস্থ জনগণ। এই শ্রমণ, শ্রমণা, শ্রাবক ও শ্রাবিকা নিয়েই জৈনধর্মের চার তীর্থ – আর এই চার তীর্থ-মানুষদের যিনি সংসারের দুঃখসঙ্কুল পারাবার থেকে উদ্ধার করতে পারেন, তিনিই তীর্থংকর।

অতএব মহাবীর জৈনধর্মের প্রবর্তক নন, তিনি জৈনধর্মের সংস্কার করেছিলেন এবং বহুল প্রচার করে জৈনধর্মকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাঁর পূর্ববর্তী তীর্থংকরদের বিশেষ করে তেইশতম তীর্থংকর পার্শ্বনাথের মতামত এবং উপদেশগুলি তিনি সংকলন এবং পরিমার্জন করে, সুবিন্যস্ত একটা রূপ দিয়েছিলেন। পার্শ্বনাথ জৈনধর্মে চতুর্যাম আচরণ প্রবর্তন করেছিলেন, মহাবীর সেটিকে বদলে পঞ্চমহাব্রত প্রবর্তন করলেন। এই পঞ্চমহাব্রত হল, অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ। অস্তেয় ব্রত হল অন্যের দ্রব্য, সম্পদ চুরি না করা। এই মতে পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষেরই সমান অধিকার আছে। একজনের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকার অর্থ বহু মানুষকে বঞ্চিত করা – সেও একরকমের চুরিই। অপরিগ্রহ হল জীবনধারণের অতিরিক্ত ভোগ বা বিলাস ত্যাগ করা। কারণ ভোগ বা বিলাস থেকেই আসে লোভ, মোহ, তার থেকে আসে হিংসা এবং চুরির প্রবণতা, মিথ্যাচার ও কামনা। অপরিগ্রহ ব্রত সম্যক পালন না করলে, অন্য চারটি ব্রতর কোন অর্থ হয় না।

মহাবীরের আগে জৈনদের মধ্যে নগ্নতার প্রচলন ছিল না, তাঁরা সকলেই সাদা বস্ত্র পরতেন, তাই তাঁদের শ্বেতাম্বর বলা হত। মহাবীর ব্রহ্মচর্যের কঠোরতা আনতে নগ্নতা আনলেন, তাঁর মতাবলম্বীরা হলেন দিগম্বর। মহাবীর অহিংসা ব্রতেও কঠোরতা এনেছিলেন, শুধুমাত্র পশুহত্যা নয়, যে কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ হত্যাও তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। এর ফলে পরবর্তী কালে অহিংসা এবং জৈনধর্ম প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। মহাবীর আরও একটি নতুন ব্রতের সূচনা করেছিলেন, প্রতিক্রমণ – অপরাধ স্বীকার। জৈন সন্ন্যাসীরা নিজেদের কোন দোষ-ত্রুটি বা অপরাধের কথা নিজমুখে সকলের সামনে স্বীকার করবেন এবং অনুশোচনা করবেন।

জৈনদের পরমজ্ঞানকে বলা হয় কৈবল্য। কৈবল্য লাভের পর মহাবীরের প্রথম ধর্মপ্রচারে এগারোজন ব্রাহ্মণ তাঁর শিষ্য হয়েছিলেন। তাঁদের মহাবীরের মুখ্যশিষ্য বা গণধর বলা হয়। শোনা যায় এই এগারো জন ব্রাহ্মণ মহাপণ্ডিত ছিলেন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণের আগে তাঁরা মহাবীরের রীতিমত পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসার বা সংশয়ের বিষয় ছিল, আত্মার অস্তিত্ব, জীবদেহ এবং জীবাত্মা অভিন্ন না আলাদা? পরজন্ম কী, পরজন্মে মানুষ কী একই মানুষ হয়ে জন্ম নেয়, নাকি অন্য জীবে পতিত হয়? কর্ম কী এবং কোন কর্মের কারণে পরজন্মে জীবের উন্নতি বা অবনতি হয়? তাছাড়া পাপ-পুণ্য, সৎ-অসৎ, ইহলোক-পরলোক, স্বর্গ-নরক বিষয়ে সংশয় তো ছিলই। তাঁদের মনের সকল সংশয় দূর করতে পেরেছিলেন বলেই, তাঁরা মহাবীরের শিষ্যত্ব স্বীকার করেছিলেন, একথা বলাই বাহুল্য।

জৈন দর্শনের আলোচনায় ডঃ রাধাকৃষ্ণন, জৈনরা যে ব্রাহ্মণ্য বিরোধী একথা মনে করেননি। তাঁর মতে জৈন এবং ব্রাহ্মণ্য দর্শন বহু আগে থেকেই সমান্তরাল পথেই চলছিল। ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থ এবং শাস্ত্রে বেশ কয়েকজন জৈন তীর্থংকরের উল্লেখ করা হয়েছে যথেষ্ট শ্রদ্ধা এবং গুরুত্বের সঙ্গে। যেমন যজুর্বেদে ঋষভ বা আদিনাথ, অজিতনাথ এবং অরিষ্টনেমির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভাগবত পুরাণেও ঋষভ যে জৈনধর্মের প্রবর্তক সে কথার উল্লেখ আছে এবং সেখানে কোথাও জৈনধর্মীদের বিষয়ে কোন বিদ্বেষের লক্ষণ দেখা যায় না।  

সরাসরি বিরুদ্ধ-বিদ্বেষ না থাকলেও দুই ধর্মদর্শনের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক ছিল সে কথা অস্বীকারের কোন জায়গা নেই। জৈনধর্মে পুরোহিত নেই, যজ্ঞ নেই, স্ত্রী-পুরুষ, বর্ণভেদ নেই। যজ্ঞ নেই, তাই পুরোহিতের বিপুল দক্ষিণা, সম্পদ এবং অর্থ লাভ নেই। যজ্ঞের বলিদান নেই – পশুহত্যা নেই, হিংসা নেই। বিশেষতঃ যাঁরা তীর্থংকর, শ্রমণ বা শ্রমণা তাঁরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন, জীবনধারণের প্রয়োজনটুকু ছাড়া তাঁদের আর কোন চাহিদাই ছিল না, এমন কি একসময় তাঁরা লজ্জা নিবারণের বসনটুকুও ত্যাগ করেছিলেন। অতএব জৈন দর্শনের অবস্থান যে ব্রাহ্মণ্য দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে সেকথা বলাই বাহুল্য। স্পষ্ট উল্লেখ না মিললেও কোথাও কোনদিন যে বিদ্বেষের ঘটনা একেবারেই ঘটেনি – সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা আজ আর হয়তো সম্ভব নয়।  

 ৩.১.২.১ জৈনধর্মের প্রসার

মহাবীরের জন্মস্থান গণসঙ্ঘী বৃজির অবস্থান ছিল পূর্ব ভারতে বৈশালীর কাছাকাছি। অতএব প্রাথমিকভাবে তাঁর প্রভাব পূর্ব ভারতেই বিস্তৃত হয়েছিল। জৈনশাস্ত্র কল্পসূত্রে বলা আছে, কৈবল্য লাভের পর ভগবান মহাবীর বর্ষা[2]-র সময় ছাড়া পূর্বভারতের বিহার, অঙ্গ, বঙ্গদেশে ধর্মপ্রচার করে বেড়াতেন। আর বর্ষার সময় থাকতেন প্রধানতঃ বিহারের নানান অঞ্চলে। যেমন কৈবল্য লাভের পর প্রথম বর্ষা কাটিয়েছিলেন অস্থিকাগ্রামে, তিনটি বর্ষা চম্পায়, বারোটি বর্ষা বৈশালীতে, চোদ্দটি বর্ষা রাজগৃহ ও নালন্দায়, ছটি বর্ষা মিথিলায়, দুটি ভদ্রিকায়, একটি করে বর্ষা আলাবিকা, পণিতভূমি, শ্রাবস্তীতে এবং শেষ বর্ষাটি পাওয়াও বা পাওয়াপুরীতে – সেখানেই তাঁর মহানির্বাণ হয়।

এই হিসাবে কোথাও একটু গরমিল রয়েছে, কারণ তিনি সন্ন্যাস নিয়েছিলেন তিরিশ বছরে, বারো বছর তপস্যা করে কৈবল্য লাভ করেন বিয়াল্লিশে, তারপরেও বিয়াল্লিশটি বর্ষা মানে তাঁর আয়ুষ্কাল হওয়া উচিৎ চুরাশি বছর। অথচ সাধারণতঃ তাঁর আয়ুষ্কাল বলা হয় আশি বছর। যদিও আজ প্রায় আড়াই হাজার বছরের ব্যবধানে এসে, এটুকু গরমিল মেনে নেওয়াই যায়। সে যাই হোক, উপরের যতগুলি জায়গার নাম পাওয়া যায়, একটি ছাড়া সেগুলির সবই আধুনিক বিহারের মধ্যে। একমাত্র পণিতভূমি বলা হয় বঙ্গের বজ্রভূমিকে। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন এই বজ্রভূমি বাংলার রাঢ় অঞ্চলের উত্তরাংশ, সেক্ষেত্রে বর্ধমান হওয়া বিচিত্র নয়, হয়তো এই নামের মধ্যে ভগবান মহাবীরের বাল্যনামের স্মৃতি রয়ে গেছে।

 মহাবীরের আবির্ভাব সময়ে, এতটা পূর্বে আর্য এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার তত প্রকট হয়নি, সবে মাত্র তার গায়ে আঁচ লাগতে শুরু করেছে। তার ওপর তিনি নিজে ক্ষত্রিয় হওয়ায়, ওই সব অঞ্চলের জনপদগুলির প্রধান এবং রাজাদের তাঁর উপদেশ এবং বাণী মেনে নিতেও অসুবিধে হয়নি। তাঁর অনাড়ম্বর সন্ন্যাসী জীবনযাত্রা স্থানীয় মানুষদের মুগ্ধ করেছিল। উপরন্তু প্রাকৃতভাষায় তাঁর সহজ সরল বাণী ও উপদেশগুলিও স্থানীয় মানুষদের সহজেই বোধগম্য হত। অতএব তাঁর জীবদ্দশাতেই তিনি প্রায় অর্ধলক্ষাধিক শিষ্য ও শিষ্যা করে তুলতে পেরেছিলেন। জৈনশাস্ত্র “কল্পসূত্র” অনুসারে, সে সময় তাঁর অনুগামী চোদ্দ হাজার শ্রমণ এবং ছত্রিশ হাজার শ্রমণা ছিল। আর এক লক্ষ ঊণষাট হাজার শ্রাবক এবং তিন লক্ষ আঠারো হাজার শ্রাবিকা ছিল।

পরবর্তী খ্রীপূ শতাব্দীগুলিতে জৈনধর্ম আধুনিক বিহার অঞ্চলের যে যে রাজার আনুকূল্য পেয়েছিল, তাঁরা হলেন, বিম্বিসার, অজাতশত্রু, উদায়ী, নন্দ, মৌর্য এবং মৈত্র বংশের রাজারা। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপি থেকে জানা যায় জৈন ধর্ম উত্তরে কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, এবং অশোকের পরবর্তী রাজা সম্প্রতি পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতেও জৈনধর্ম প্রচারকদের পাঠিয়েছিলেন। মোটামুটি পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত বিহার ও কলিঙ্গে এবং সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র বঙ্গে জৈন ধর্মের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। একথা জানা যায় চীনা পর্যটক হুয়েন সাঙের বিবরণী থেকে।

রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও সাধারণের মধ্যে জৈন ধর্ম প্রসারের আরও দুটি কারণ বণিক সম্প্রদায় এবং সাধারণ সমাজের মহিলারা। শুরুর থেকেই মহিলাদের সমর্থন জৈন ধর্মের অন্যতম সহায় হয়েছিল। প্রাক-আর্য এবং আর্য সমাজে মহিলারা অনেকটাই অবদমিত ছিলেন সেকথা আগেই বলেছি। জৈন ধর্ম মহিলা-পুরুষে কোন ভেদাভেদ করেনি, সমান মর্যাদা দিয়েছে। একইভাবে ব্রাহ্মণ্য সমাজে বণিকরা তৃতীয় শ্রেণীর বৈশ্য হয়ে যাওয়াতে তাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তি প্রায় কিছুই ছিল না। যদিচ যে কোন সমাজের সমৃদ্ধিতে বণিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়েও আমরা দেখব, জৈনধর্মের প্রসারে এই বণিক সম্প্রদায় ও মহিলাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

সম্রাট অশোকের পৌত্র মহারাজা সম্প্রতির সময়েই পশ্চিমের গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে জৈনধর্মের ব্যাপক আধিপত্য ছিল। পরবর্তীকালেও ওই দুই অঞ্চলের অধিকাংশ রাজাই জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। গুজরাটে জৈনধর্ম প্রচারে তীর্থঙ্কর নেমিনাথ এবং আরো অনেক প্রসিদ্ধ জৈন সন্ন্যাসী, যেমন দিগম্বর শ্রমণ ধরসেন এবং শ্বেতাম্বর শ্রমণ হেমচন্দ্রের অনেক অবদান আছে। গুজরাটের বল্লভীতে জৈনদের দুবার ধর্ম সম্মেলন হয়েছিল এবং জৈনদের বিখ্যাত দুটি তীর্থ স্থান গিরনার এবং সত্রুঞ্জয়, গুজরাটেই অবস্থিত।

দক্ষিণ ভারতে জৈনধর্ম বহুল প্রচার করেছিলেন জৈন সন্ন্যাসী আচার্য ভদ্রবাহু ও স্বয়ং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং সম্রাট অশোকের পরবর্তী মৌর্য রাজা সম্প্রতি। পুণ্ড্রবর্ধন (এখন বাংলাদেশে) অঞ্চলের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম ভদ্রবাহুর, তিনি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গুরু ছিলেন। কোন একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি বারো হাজার সন্ন্যাসী শিষ্যদের নিয়ে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক প্রদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত। তিনি সিংহাসন ছেড়ে তখন নাকি দিগম্বর সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই দক্ষিণভারতে জৈনধর্মের প্রবল প্রচার শুরু হয়েছিল এবং সেই আধিপত্য ছিল বহুদিন পর্যন্ত। শোনা যায় আচার্য ভদ্রবাহু শ্রবণ বেলগোলাতে, এবং শ্রমণ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, তার কাছাকাছি কোন এক গ্রামে দেহরক্ষা করেছিলেন।

উত্তরভারতেও জৈনধর্মের স্বাভাবিক প্রভাব ছিল, তার কারণ অনেক তীর্থংকরেরই জন্মস্থান ছিল উত্তরভারতে। তীর্থংকর পার্শ্বনাথের জন্ম হয়েছিল বারাণসীতে। মথুরা এবং উজ্জয়িনী বহু শতাব্দী ধরে জৈনধর্মের কেন্দ্র ছিল।

৩.১.২.২ জৈনধর্মের বৈশিষ্ট্য

প্রবল ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে জৈনধর্মের জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ হল তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য, যেমন, 

১) সংসারত্যাগী তপস্বী শ্রমণ ও গৃহস্থী শ্রাবকদের প্রায় একই ব্রত পালনের নির্দেশ থাকায় – জৈন শ্রমণরা নিজেদের শিষ্যদের তুলনায় কখনোই অনেক উচ্চমার্গের দূরত্বে তুলে রাখেননি। যার ফলে শ্রমণ এবং শিষ্যদের মধ্যে সর্বদাই আন্তরিক যোগাযোগ ছিল।  

২) কোন রকম, জাতি, লিঙ্গ বা বর্ণভেদ ছিল না।

৩) অহিংসা এবং শান্তি ছিল জৈনদের প্রধান নীতি, যার ফলে তারা পরধর্ম বা পরমতের সঙ্গে কোনদিনই ঝগড়াবিবাদে যেত না। তারা সরাসরি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরোধিতা করেনি বলেই, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পাশাপাশিই ছিল তাদের সুদীর্ঘ অবস্থিতি। এমনকি বেশ কয়েকজন তীর্থংকর ব্রাহ্মণ্যধর্মের কাছেও শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। 

৪) জৈন তীর্থংকর এবং শ্রমণেরা কথা বলতেন আঞ্চলিক প্রাকৃত ভাষাতে এবং পরবর্তী কালেও ধর্ম শাস্ত্র লিখেছেন বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায়।

৫) তাঁদের সততা, সত্যবাদীতা এবং অনাড়ম্বর সরল জীবনযাত্রা।

৬) সাধারণ মানুষের বিপদের সময় জৈন শ্রমণরা নানান সেবামূলক কাজেও সর্বদা নিরত থাকতেন।

৭) তাঁদের সহজ সরল উপদেশ এবং তত্ত্বকথা সাধারণ মানুষ থেকে, ধনী বণিক এমনকি রাজন্যবর্গের কাছেও সহজবোধ্য ছিল। ভারতবর্ষের সম্পন্ন বণিক-সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশই আজও জৈনধর্মে বিশ্বাসী এবং তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।   

 

৩.১.৩ ভগবান গৌতমবুদ্ধ

এতক্ষণ পর্যন্ত অনেক বিষয়েই আমরা আলোচনা করেছি, স্থানাভাবে সেগুলির অধিকাংশই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। সেগুলির তুলনায় গৌতমবুদ্ধের প্রসঙ্গ আমি একটু বিস্তারিত আলোচনা করব। গৌতমবুদ্ধের ক্ষেত্রে আমার কেন এই পক্ষপাতিত্ব? এ প্রশ্ন আপনাদের মনে আসতে পারে জেনেই, ভারতীয় ধর্ম এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে কেন আমি গৌতমবুদ্ধকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, তার অনেকগুলি কারণের মধ্যে প্রধান কয়েকটি কারণ হল-

১. বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় সমাজে এবং জীবনযাত্রাতে দীর্ঘস্থায়ী এক পরিবর্তন আনতে সফল হয়েছিল। এই ধর্ম নিজেদের গোষ্ঠী, অঞ্চল, কিংবা রাজ্যের মধ্যে সীমিত না থেকে – সমসাময়িক বিশ্বে –ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া, চিন, শ্রীলংকা এবং পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতের জ্ঞান, দর্শন, জীবনবোধ, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক আদানপ্রদান বেড়ে উঠেছিল বহুগুণ। তাতে উপকৃত হয়েছিল, শুধু ভারতীয়রা নয়, সমগ্র বিশ্ববাসী। 

২. সহজ বুদ্ধনীতি থেকে বহু যোজন সরে গিয়ে, পরবর্তী কালে যে জটিল ধর্মতত্ত্ব রচনা করেছিলেন বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই রচিত হয়েছিল হিন্দু দর্শন ও হিন্দু ধর্মতত্ত্ব। যার ফলে বিস্তর ঋদ্ধ হয়েছিল হিন্দু ধর্মতত্ত্ব তথা ভারতীয় দর্শন। যদিচ, পরবর্তী কালে, এই তত্ত্বকথার জটিল ধাঁধায় বাঁধা পড়ে বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল, এবং আজ আমরাও, হিন্দুধর্মে বিশ্বাসীরা, সেই জটিলতার জালে আবদ্ধ হয়ে দৌড়ে চলেছি চিন্তাহীন অন্ধ অবক্ষয়ের পথে।

৩. এই সব গুরু-গম্ভীর কারণ ছাড়াও গৌতমবুদ্ধের যে বিষয়টি আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে, সেটি হল তাঁর তপস্যার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ। আমরা হিন্দু শাস্ত্রে অজস্র মুনি, ঋষি, মানুষ, রাক্ষস, দানব, দৈত্যদের ভয়ংকর ভয়ংকর তপস্যার বিবিধ উল্লেখ পাই। কেউ করেছেন শত বছর, কেউ কেউ আবার সহস্র বছর, কেউ আবার দশ সহস্র বছর! তাদের তপশ্চর্যায় দেবতারা, বিশেষ করে দেবরাজ ইন্দ্র, বহুবার ভয় পেয়েছেন। তিনি বারবার স্বর্গ থেকে অপ্সরাদের পাঠাতেন তাদের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্যে। আবার বহু জন এরকম তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে মনোমত বর লাভ করেছেন – কেউ শর্তসাপেক্ষ দীর্ঘায়ু, কেউ প্রচুর সন্তানাদি, কেউ হারানো রাজ্যপাট, কেউ বা ক্ষত্রিয় থেকে হয়েছেন ব্রাহ্মণ। খুব সামান্য কয়েকজন ঈশ্বর দর্শনে কৃতার্থ হয়েছেন।

বুদ্ধদেবের তপস্যাকাল সে তুলনায় সামান্য, মাত্র ছয় বছর।  তিনি ২৯ বছর বয়সে  সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, 'বছরের তপস্যা ও সাধনায় ৩৫ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন। এই স্বল্প মেয়াদি তপশ্চারণের সময় তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির এবং ওই পর্যায়ে তাঁর ভাবনাচিন্তার সঙ্গেও আমরা নিবিড়ভাবে পরিচিত হই। পরিশেষে তিনি যখন অন্তরে গভীর উপলব্ধিতে আলোকিত হলেন, তখন তপস্যার সমাপ্তিও করেছেন তিনি নিজেই – কোন দেবতার বরদান নামক অনুগ্রহে নয়।

অনেকেই বলবেন, এসব তো গৌতমবুদ্ধ নিজে লেখেননি, পরবর্তী সময়ে কোন পণ্ডিত লিখে গেছেন। হক কথা। কিন্তু আমার পরবর্তী অধ্যায়গুলি ধৈর্য নিয়ে পড়লে বুঝতে পারবেন, এই বর্ণনাগুলিতে আহামরি কিছু অতিরঞ্জন নেই। খুব স্পষ্ট বোঝা যায়, এসব কথা গৌতমবুদ্ধ নিজেই বলেছিলেন তাঁর নিকট শিষ্যদের কাছে। সেই শিষ্য-পরম্পরায় যেমন শুনেছেন, সেই কথাই লিখে রেখেছিলেন কোন ভক্ত পণ্ডিত, অবিশ্বাস্য কোন অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত অতিরঞ্জন ছাড়াই!

৪. সাধারণতঃ, মহাভারত বা পুরাণগুলিতে – সর্ব যুগেই (সত্য, ত্রেতা কিংবা দ্বাপর) বেশ কিছু মুনি বা ঋষির আমরা বারবার পরিচয় পাই। যেমন সপ্তর্ষি ছাড়াও বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, ভরদ্বাজ, ভৃগু, অগস্ত্য, নারদ, উদ্দালক, আরুণি, মার্কণ্ডেয়, গৌতম প্রমুখ। এই মুনি-ঋষিদের অধিকাংশই তিনটি যুগেই অবলীলাক্রমে অবস্থান করতে পারতেন! কিন্তু বৌদ্ধ এই কাহিনীগুলিতে কিছু সমসাময়িক মুনি, ঋষি এবং আচার্যের পরিচয় আমরা পাই, যাঁদের কথা অন্য কোন শাস্ত্রে আমি অন্ততঃ পাইনি। গৌতমবুদ্ধের জীবনচরিতে এটিও আমার আরেকটি আগ্রহের বিষয়। প্রসঙ্গতঃ ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দু শাস্ত্র মতে, গৌতমবুদ্ধের সময় হল কলিযুগ। কলিযুগের কোন মুনি-ঋষির নাম হিন্দুশাস্ত্রে এমনিতেও দুষ্প্রাপ্য। অর্থাৎ আগের তিন যুগের মুনি-ঋষিদের আর কলিযুগে পা ফেলার প্রবৃত্তি হয়নি।

এই প্রসঙ্গে মহাভারত ও পৌরাণিক মতে চারটি যুগের সংক্ষিপ্ত পরিচয় সেরে নেওয়া যাক। মহাভারতে বনপর্বের ১৮৮-তম অধ্যায়ে ঋষি মার্কণ্ডেয় রাজা যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, “প্রলয়কালে সমস্ত জগৎ বিনষ্ট হলে অবাঙ্মনসগোচর পরমাত্মার থেকে এই আশ্চর্য পরিপূর্ণ সমস্ত জগৎ আবার সৃষ্ট হয়। তার প্রথম হল সত্যযুগ, সেই সত্যযুগের পরিমাণ চার হাজার বছর। ওই যুগের সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ হয় চারশ বছর। ত্রেতা যুগের পরিমাণ তিন হাজার বছর, তার সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ হয় তিনশ বছর। দ্বাপর যুগের পরিমাণ দু হাজার বছর, তার সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ হয় দুশ বছর। কলি যুগের পরিমাণ এক হাজার বছর, তার সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ হয় একশ বছর”। কোন যুগের প্রথম ভাগকে সন্ধ্যা এবং শেষ ভাগকে সন্ধ্যাংশ বলে। অর্থাৎ এই দুটি পর্যায়কে Transition period বলা চলে – তার জন্যে বরাদ্দ হল সমগ্র যুগ-পরিমাণের ১০% বছর। কলিযুগের অবসানে অর্থাৎ প্রতি বারো হাজার বছর পর আবার প্রলয় এবং সৃষ্টির পর্যায় ঘুরে আসে।

যাই হোক, এবার আমরা ইতিহাসের মূল প্রবাহে এবং প্রসঙ্গে ফিরে আসি ।


পরের পর্ব পাশের সূত্রে - " ধর্মাধর্ম - ৩/২




[1] ষাটের দশকের শেষদিকে, কলকাতা শহরে এবং গ্রামাঞ্চলের হাটে-মাঠে এমন ছোট ছোট সভা পরিচালনা করতেন কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যরা – তাঁরাও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের সামাজিক দায়িত্ব ও অধিকার বিষয়ে উজ্জীবিত করতেন। কলকাতায় এই সভাগুলিকে বলা হত পথসভা। “কুতূহল স্থল”-এর কথা পড়ে ছোটবেলায় দেখা সেই স্মৃতিগুলি ফিরে আসে। ছোট ছোট সভা করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় জনসংযোগ গড়ে তোলা ব্যাপারটা তার মানে কমিউনিষ্টদের আবিষ্কার করা কোন পদ্ধতি নয়। এমন পদ্ধতি আমাদের দেশে ঘটে গেছে আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে, সমসাময়িক গ্রীসেও এমন আলোচনা সভার প্রচলন ছিল।          

[2] সন্ন্যাসীরা বর্ষাকালের চারমাস পরিব্রাজন স্থগিত করে কোন জনপদে বা গ্রামে বাস করতেন। এবং সেখানেই তপস্যা, তত্ত্ব আলোচনার ব্রত পালন করতে করতে বিশ্রাম করতেন। এই ব্রতের নাম ছিল “চাতুর্মাস্য ব্রত” – এই ব্রতের শুরু হত আষাঢ়ের শুক্লা দ্বাদশীতে এবং সমাপ্তি হত কার্তিকের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে। সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম পরবর্তী কালেও অবশ্য পালনীয় ছিল। এই চারমাস ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বর্ষার কাল - বৃষ্টি, ঝড়, ঝঞ্ঝা, দুর্যোগের সময়। অতএব পথঘাট পদব্রজের উপযুক্ত নয় এবং বর্ষায় ভরা নদীগুলিও পার হওয়ার পক্ষে প্রতিকূল হয়ে উঠত।



রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫

বকের মৃত্যু

 


এর আগের পর্ব  "বাংলাদেশের হৃদয় হতে"

 

শীতের এক ছুটির দুপুরে, পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেলার সময় শেখরদা এসে একদিন বলল, অ্যাই আমিও খেলব তোদের সঙ্গে, আমায় খেলতে নিবি? কিছুদিন ধরেই আমরা শেখরদাকে দেখছিলাম। পাড়ার কেউ না হলেও, এ পাড়ায় শেখরদার অনেক বন্ধু আছেতাদের বাড়িতেই শেখরদা থাকে। ওর বাড়ি কোথায়, বাড়িতে কে কে আছে, কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম শেখরদা প্রেসিডেন্সিতে পড়ত, এখন আর পড়ে না। পড়া ছেড়ে দিয়েছে, কারণ প্রেসিডেন্সি কলেজ, বুর্জোয়াদের কলেজ। এই বুর্জোয়ারা কে, তাদের খায় না মাথায় মাখে তখন বুঝিনি। বেশ কদিন আলাপের পর আরও জেনেছিলাম, আমরাও যে সব স্কুলে পড়ি, পরীক্ষা দিই সে সবও বুর্জোয়াদের শিক্ষা।

ক্লাস সেভেনের ছাত্র হলেও, এইসব তথ্য জেনে যেমন আশ্চর্য হয়েছিলাম তেমন বিচলিতও হয়েছিলাম। তার মানে আমরা এতদিন যা কিছু পড়লাম, শিখলাম, সব ভুল? শেখরদা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বলেছিল, ভুল। তাহলে সঠিক লেখাপড়া কবে শুরু করব? আমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে শেখরদা হেসে বলেছিল, তোদের জন্যেই তো আমরা লড়ছি, আমাদের ভুলটা যেন তোরা শুধরে নিতে পারিস। এখন যা, বল কর দেখি, মনের সুখে তোকে একটু পেটাই।

এর কয়েকদিন পরে সক্কালবেলা পল্টু এসে চুপিচুপি খবর দিল শেখরদার লাশ পড়ে গেছে বড়ো রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানের সামনে রাস্তায় পড়ে আছে শেখরদার লাশ

কে মারল শেখরদাকে, কেন?

তুই জানিস না, শেখরদা তো নকশাল ছিল।

নকশাল? শেখরদা নকশাল ছিল?

পল্টু আমার অজ্ঞতায় বিরক্ত হয়ে বলল, “হ্যাঁরে বাবা, নকশাল। রোজই ভোরে শেখরদা যেমন চা খেতে যায়, হারাণদার চায়ের দোকানে, আজও গিয়েছিল। বিশাল বস্তা নিয়ে একটা কাগজকুড়ুনে লোক শেখরদার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা কাগজ তোলার জন্যে আচমকা নীচু হওয়াতে, শেখরদা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। লোকটা কাগজ কুড়িয়ে যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তার হাতে গুলিভরা রিভলভার। দুটো গুলি, ঢিচিকাঁউ ঢিচিকাঁউ, ব্যস শেখরদা পড়ে গেল রাস্তায়, সব শেষ।

কাগজকুড়ুনে লোকটা কেন মারল শেখরদাকে?

তুই একটা আস্ত গাধা, ও কি আর সত্যি সত্যি কাগজকুড়ুনে? ও নিশ্চয়ই ছদ্মবেশে খোচর ছিল। 

খোচর?

তুই দেখছি কিছুই জানিস না, প্লেন ড্রেসের পুলিশের ডিটেকটিভকে খোচর বলে। আমাকে দাদা বলেছে। শেখরদার বাড়ি নাকি কসবার দিকে, এখানে লুকিয়ে ছিলপুলিশের খোচর অনেকদিন ধরেই ওকে খুঁজছিল। আজ পেয়ে যেতেই, শেষ করে দিল। 

শেখরদাও নকশাল! নকশালরা তো পুলিশ মারে, স্কুলের টিচারদের মারে। গ্রামের বড়োলোকদের মারে। আমাদের স্কুলের সামনে কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগর আর আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মূর্তির মাথা ভেঙে দেয়আবার অনেক নকশাল জেলে বসে হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে, খুব ভালো রেজাল্টও করে। শেখরদার চেহারা, তার হাসি, আমাদের সঙ্গে তার কয়েকদিন ক্রিকেট খেলার কথা সব মনে পড়ে গেল।  মনে পড়ল, শেখরদার সেই কথা “তোদের জন্যেই তো আমরা লড়ছি, আমাদের ভুলটা যেন তোরা শুধরে নিতে পারিস”শেখরদাও অন্য নকশালদের মতো পুলিশ মেরেছে? স্কুলের টিচার মেরেছে? সেটাই কি তাহলে আমাদের জন্যে লড়াই? পুলিশদের মেরে ফেলতে পারলেই বুঝি আমাদের ভুল বুর্জোয়া শিক্ষা ঠিকঠাক হয়ে যেতে পারত? 

আরো অবাক হয়েছিলাম আমার প্রিয় বন্ধু পল্টুর ব্যবহারে এবং কথাবার্তায়। আমাদের খেলার সঙ্গী হিসেবে শেখরদা পল্টুরও খুব প্রিয় ছিল, সেই শেখরদার আচমকা এই মার্ডার হওয়াটা পল্টু কি ভাবে বলতে পারল ‘লাশ পড়ে যাওয়া’, যেন জলভাত ব্যাপার! আসলে সে সময় আমাদের আশেপাশে এরকম মৃত্যুর ঘটনা এত ঘটতে থাকত, শেখরদার মার্ডারটা সেই সংখ্যায় আরেকটা সংযোজন ছাড়া যেন কিছুই নয়। আমার চেয়ে অনেক বেশী বাস্তববোধ সম্পন্ন পল্টুর মনে এই ঘটনা কোন আঁচড়টুকুও কাটতে পারেনি। যদিও শেখরদার হত্যা আমার বালকমনে বেশ ধাক্কা দিয়ে গেল। অজস্র প্রশ্নের উত্তর আজও সঠিক জানা হয়ে উঠল নানকশাল হয়ে যাওয়া এবং খোচরের গুলিতে মৃত শেখরদা ছাড়া আর কে দিতে পারে এই সব প্রশ্নের সঠিক জবাব?   

সেই সময় রাজনৈতিক পালাবদলের সমস্ত ঘটনা যে ঠিকঠাক বুঝতাম তা নয়। কিন্তু আমাদের জীবন যাত্রায় তার প্রভাব ছিল নিরন্তর। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৭ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস ভাঙনের ইতিহাস। অস্থিরতা আর নীতিহীন রাজনৈতিক ক্ষমতাদখল আর স্বার্থের ইতিহাস। হরতাল, বাংলাবন্ধ ছিল নিত্য সঙ্গী। আমাদের স্কুলের জানালা থেকে কলেজস্ট্রিটের ওপর কতদিন যে ট্রাম বাস জ্বলতে দেখেছি তার হিসেব বলা মুশকিল। সত্তরের শেষ আর একাত্তরের প্রথমদিকে প্রায় তিনমাস আমাদের স্কুল বন্ধ ছিল সে কথা আগেই বলেছি। সেবার আমাদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও বাতিল হয়ে গিয়েছিল। আমরা ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে প্রমোশন পেয়েছিলাম বিনা পরীক্ষায়।

সেই সময় বছর খানেকের জন্যে আমরা শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের বাসা বদল করে, বাসা নিয়েছিলাম ব্রজনাথ দত্ত লেনের এক বাড়িতে। আমাদের বাড়িটা ছিল ছোট্ট এক কানাগলির মুখে। ওই সময়ে মা ছিলেন অসুস্থ শয্যাশায়ী। ঠিক কি কারণে আজ আর মনে নেই, স্কুল ছিল না, আমি বাড়িতেই ছিলাম। একঘেয়ে অসহ্য দুপুরে আমি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ ব্রজনাথ দত্ত লেনের গলির মুখ থেকে কানে এল, অনেক লোক দৌড়ে আসার আর চেঁচামেচির আওয়াজ। একজন লোক উন্মত্তের মতো দৌড়ে এসে ঢুকল আমাদের কানাগলির ভিতরে। পথহীন বদ্ধ গলির মধ্যে ঢুকে দিশাহারা লোকটি অসহায় চোখে তাকাল চারদিকে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হল ক্ষণেকের জন্যে, তার চোখে বীভৎস আতঙ্কের ছায়া। আমাদের কানাগলি থেকে বেরিয়ে সে আবার বেরিয়ে গেল ব্রজনাথের রাস্তায়, দৌড়ে চলে গেল যেদিক থেকে এসেছিল তার উল্টোদিকে। পিছনে তাড়া করে আসা লোকগুলো আবার চিৎকার করে উঠল। ‘ওই তো, ওই তো...’। আমাদের বাড়ির একতলার দেওয়ালে, আর সামনের রাস্তায় এসে ফাটল দুটি বোমা। তারপর একদল লোক, হাতে তাদের উদ্যত অস্ত্রশস্ত্র, দৌড়ে গেল পালিয়ে যাওয়া লোকটির পিছনেমৃত্যুসাক্ষী করা সেই লোকটির ক্ষণিকের দৃষ্টি, আজও মনে পড়লে শিউরে উঠি আতঙ্কে।

বোমার তীব্র বিস্ফোরণ এবং আওয়াজে আমাদের গোটা বাড়িটা কেঁপে উঠেছিল, অসুস্থা মা দৌড়ে এসে আমাকে টেনে নিলেন ঘরের মধ্যে, মায়েরও দু চোখে বিস্ফারিত আতঙ্ক।

-‘পাগল হয়ে গেছিস, নাকি তুই, বাইরে দাঁড়িয়ে কি দেখছিস এই সময়’? পাড়ার সমস্ত বাড়ির দরজা, জানালা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। সমস্ত পাড়া জুড়ে নেমে এল থমথমে নিস্তব্ধতা।

কংগ্রেস দল ভেঙে গেল। নতুন সবল কংগ্রেস দল হল ইন্দিরাপন্থী কংগ্রেস। গাইবাছুর হল এই কংগ্রেসের ভোটের চিহ্ন। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গেল, এক দল হল মার্ক্সবাদী, অন্যদল মার্ক্স ও লেনিনবাদীদ্বিতীয় দলটির অন্য নাম হয়ে গেল নকশাল। শুরু হল ক্ষমতা দখল আর আধিপত্য কায়েমের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। হত্যা, গণহত্যা আর নৃশংসতার নিত্য নতুন সংবাদে ভরে উঠল সংস্কৃতিসম্পন্ন বঙ্গ সমাজ।  রাজ্য শাসনেও চরম অস্থিরতা। স্বল্পমেয়াদি দুর্বল সরকার ও রাষ্ট্রপতির শাসনের দোলাচলে দুলতে লাগল রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা। রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে গেল আতঙ্ক আর সন্ত্রাস। সত্যি বলতে, সেইসময় থেকেই রাজনীতির সমার্থক হয়ে উঠল সন্ত্রাস। 

আমাদের স্কুল, আশপাশের স্কুলগুলি, উল্টোদিকের প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং সংলগ্ন এলাকাগুলি হয়ে উঠল নকশাল বিপ্লবের চারণক্ষেত্র। পাড়ায় টহলদারি পুলিশের ভারি বুটের আওয়াজে ভোর রাত্রে ঘুম ভেঙে যেত। ধরা পড়ত লাগল অজস্র নকশাল সমর্থক এবং সম্ভাব্য নকশাল সমর্থকরাতাদের অধিকাংশই আর কোনোদিন ফিরে আসে নি। সকালের খবরের কাগজ ভরা থাকত নিহত যুবকদের সংবাদে। স্কুলে গিয়ে শুনতাম হিন্দু হস্টেল আর হার্ডিঞ্জ হস্টেলে আবাসিক ছাত্রদের উপর রাজনৈতিক অত্যাচারের গোপন কাহিনী এরই মধ্যেই ঘটে গেল বর্ধমানের কংগ্রেস সমর্থক সাঁইবাড়ির হত্যা কাণ্ড। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রলম্বিত নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায় বিচারের প্রহসন চলতেই থাকল বছরের পর বছর। এই নৃশংসতার নিত্য ছবির মধ্যেই আমার বড়ো হয়ে ওঠা। স্কুলযাওয়া, লেখাপড়া, নিয়মিত পরীক্ষা পাশ করা, খেলাধুলো সবই চলতে লাগল এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেই। 

‘পুলিশের গু খেয়ে বকের মৃত্যু’ এমন একটি উদ্ভট চুটকি তখন খুব শোনা যেতবকেরা কি গু খায়? আর খেলেও, পুলিশের গুকি এতই বিষাক্ত, যা খেয়ে মাঠচরা বকেদের মৃত্যু হচ্ছে! তা নয়, এটি নিছক কল্পিত একটি মুদ্রণ প্রমাদ। আসল সংবাদটি হচ্ছে, ‘পুলিশের গুলি খেয়ে যুবকের মৃত্যু’। প্রত্যেকদিন সকালের সংবাদপত্রে প্রকাশিত অজস্র যুবকের হত্যার সংবাদ নিয়ে এমন নিষ্ঠুর রসিকতা আমাদের মতো চূড়ান্ত স্বার্থপর ছাড়া কে করতে পারে আর! যদিচ, সেই যুবকদের অনেকেই হয়তো আমাদের পড়শিদের কেউ, চেনা, অল্পচেনা অথবা অচেনা। কিন্তু আমরা তো বেঁচে আছি, কোনমতে টিকে আছি আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে!

সেই সময়ে আমার অসুস্থা মায়ের সংবাদ নেবার জন্যে আমার এক মাসিমা বর্ধমান থেকে, কলেজে পাঠরত তাঁর দেবরকে পাঠিয়েছিলেন। সকাল সাড়ে এগারোটা-বারোটা নাগাদ তিনি আমাদের বাড়িতে এলেন, বিধ্বস্ত আতঙ্কিত মুখ নিয়ে। কী হয়েছে জিগ্যেস করতে তিনি বললেন, আমাদের বাড়ি থেকে অদূরে আর পুলি লেন আর মধু গুপ্ত লেনের সংযোগস্থলে তাঁকে আটক করেছিল বেশ কয়েকজন সশস্ত্র যুবক। প্রায় একঘন্টা ধরে চলেছিল তাঁর প্রশ্নোত্তর পর্ব। কোথা থেকে এসেছেন, কোন বাড়ি যাবেন, কিসের জন্যে এসেছেন, কী করেন, কতদিন থাকবেন এইসব প্রশ্নের পাশাপাশি ছিল হত্যার হুমকি। ‘এতো কতার কি আচে গুরু, মগজে শিসে ভরে দিলেই শ্লা সব ঠাণ্ডা মেরে যাবে।’ এমন মন্তব্যও করেছিল তাঁকে ঘিরে থাকা সেই যুবকদের কেউ কেউ

মাত্র এই কয়েকটা বছরের মধ্যে পাল্টে গেল আমাদের জীবনযাত্রার ধারা। মনে আছে সেই ক’বছর পনেরই আগষ্টে পাড়ার সকলেই বাড়িতে পতাকা তোলার কথা এড়িয়ে যেত। আমাদের বাসার বারান্দায় প্রত্যেকবার ঐ দিনটিতে ছোট্ট একটি পতাকা তুলতাম, ওই কবছর বাবা তুলতে দেননি। ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ নীতিতে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল যদি হামলা করে, এই আতঙ্কে।

ভালোমন্দ মিশিয়ে সুস্থ সামাজিক জীবনযাপনের রংবাহারি চিত্রটার রং বদলে হয়ে গেল একটাই রং, লাল, রক্ত লাল। হত্যা হয়ে উঠল প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা, আবার প্রশাসনিক ভাষা হিসেবেও নিরঙ্কুশ আধিপত্য পেয়ে গেল হত্যা। দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সামাজিক নীতি, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের কোনো রংই আর ধোপে টিকল না। জীবনের একটাই রং, রাজনৈতিক দলের রং। সমস্ত নীতি জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনীতি হয়ে উঠল সন্ত্রাস এবং আতঙ্কের সমার্থক। এই সন্ত্রাসনীতিই হয়ে উঠল বঙ্গ রাজনীতির অঙ্গ।

--00--

এর পরের পর্ব - " আবার আসিব ফিরে... "

শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫

সুরক্ষিতা - শেষ পর্ব

 ভালো লাগলে ব্লগটি "ফলো করুন", শেয়ার করুন 



[আগের পর্ব পড়া যাবে এই সূত্রে "সুরক্ষিতা - পর্ব ১৮"]


                   

   মেয়েকে নিয়ে মালতী শুভময়ীদেবীর ঘরে ঢুকতেই শুভময়ীদেবী হেসে বললেন, “ কি রে, ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি? চোখগুলো ফোলা ফোলা লাগছে। আয় বস”।  মা আর দিদুর পাশেই বসল ছবি।

শুভময়ীদেবী বললেন, “তোর মা আর দিদুর সঙ্গে আলোচনা করে – আমরা তোর কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছি”। তার সঙ্গে মিঠুদিদির সম্পর্কের কথাটা যদি জানাজানি হয়ে গিয়েই থাকে, তার শাস্তির ব্যপারটা মামী নিশ্চয়ই হাসি হাসি মুখে বলবে না। খুব অবাক হয়ে মায়ের এবং মামীর মুখের দিকে তাকাল। “তোকে বিয়ে করতে হবে”, শুভময়ীদেবী হাসতে হাসতে ঘোষণা করলেন, “কোন ভাবেই তোর পরিত্রাণ নেই”।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ছবি, তারপর মাথা নীচু করে বলল, “বিয়ে আমি করব না, মামী

“বিয়ের আগে সব ছেলে-মেয়েই অমন বলে, ছবি। ওটা কোন কাজের কথা নয়, ছবি”।

“সবাই কী করে জানি না, আমি করব না”। ছবি বেশ জোরের সঙ্গে বলল।

“কেন বল তো? হঠাৎ এমন ধনুক-ভাঙা পণ করে বসলি কেন?” শুভময়ীদেবী স্মিতমুখেই জিজ্ঞাসা করলেন।

মালতী বলল, “ওর ভয় লাগে। আমাদের মতো কাজের লোকের সংসার অনেক দেখেছে কিনা, তাই ভয় পায়। সারাদিন এই কাজের মেয়েরা বাবু-বৌদিদের বাড়ি কাজ করে, রাত্রে বাড়ি ফেরে। তারা তখন ক্লান্ত, তাদের সারা গায়ে-গতরে ব্যথা। সারাদিন পর তাদের ছেলে-মেয়েরা মাকে পেয়ে খুশি হয় এবং ঘরে ফিরে তাদের জন্যেও সেই মাকেই দুটো ভাত-ডাল-তরকারি রান্না করে তাদের মুখের সামনে ধরতে হয়। যতই হোক মায়ের প্রাণ। কিন্তু এসবের পরেও, বহু পরিবারেই তাদের স্বামীরা অনেক রাত্রে বাড়ি ফেরে গলা অব্দি মদ গিলে। শুরু করে গালাগাল, মারধোর, বউয়ের চরিত্র নিয়ে নানান আকথা-কুকথা...” মালতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, “আমাদের মতো সংসারে মেয়েদের এমনই ঝ্যাঁটা-খাওয়া কপাল, বৌদি। এই জন্যেই ছবিকে আমি জোর করতে পারি না”।

ছবির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন শুভময়ীদেবী, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “একটা কথা মানছি, ছবি। একটা ছেলে আর মেয়ের যখন বিয়ে হয়, তাদের মনে তো বটেই, তাদের দুজনকে ঘিরে দুই পরিবারের মনেও অনেক স্বপ্ন কাজ করে। খুব কম ক্ষেত্রেই সেই সব স্বপ্ন পূরণ হয়, নানান ভুল বোঝাবুঝিতে অধিকাংশ স্বপ্নও দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে। তা বলে স্বপ্ন দেখাটাই ছেড়ে দিবি, ছবি?

ধর আজ যদি তোর নিজের যোগ্যতায় একটা স্থায়ী চাকরি হয়ে যায়... লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করার বিড়ম্বনা থেকে তুই যদি মুক্তি পেয়ে যাস। সেই নতুন জীবনের জন্যে, নতুন একটা স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি কি?”

“আমার একটা স্থায়ী চাকরি হয়ে যাবে...কী বলছো, মামী?” এত অবাক জীবনে কোনদিন হয়নি ছবি।

“আমাদের স্কুলে একটি কেয়ার-টেকার, মানে বাচ্চাদের আয়ার কাজ খালি হয়েছে। স্কুলে একদম নীচু ক্লাসে যারা পড়ে – ক্লাস ওয়ান, টু, থ্রির বাচ্চারা – তাদের দেখাশোনা করার জন্যে। আমি তোর সব কথাই স্কুলের কর্তৃপক্ষকে বলেছি। স্কুলের দিদিমণিরা সকলেই তোর কথা জানে – মানে আমিই বলেছি আরকি। সকলেরই ধারণা এতদিন ধরে বিট্টুকে যে বুক দিয়ে সামলেছে, তার কাছে এ কাজ কিছুই না। কর্তৃপক্ষও মেনে নিয়েছে। তোর চাকরিটা হয়ে গেছে”।

অপ্রত্যাশিত এমন একটা সংবাদের জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিল না। ক্বচিৎ কখনও যেমন শোনা যায়, লটারির টাকা পেয়ে কেউ কেউ নাকি রাতারাতি বড়োলোক হয়ে গেছে। এও যেন সেইরকম। তবে এ ঘটনা ঘটেছে মালতীর অভাগী মেয়ে ছবির কপালে। মালতী ছবির দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার দু চোখ ভরে জল চলে এল।

“আগামীকাল তোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা অফিসে চলে আসবে। কাল একবার স্কুলে গিয়ে তোকে ওটা নিয়ে আসতে হবে, ছবি...”।

“আমাকে স্কুলে গিয়ে কী আনতে হবে, মামী”?

“তোর চাকরির চিঠি। আমার সঙ্গেই যাবি, স্কুলের বড়োবাবুর সঙ্গে দেখা করলেই তোকে চিঠিটা দিয়ে দেবে। সকলের সঙ্গে কথাবার্তা হবে আর কিছু সইসাবুদও করতে হবে তোকে”।

চাকরি, স্কুল, অফিস, অফিসের বড়োবাবু...কথাগুলো ছবির চোখের সামনে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিল। বহুদিন পর তারও চোখ জলে ভরে উঠল। তার হাতের সামনে কি তাহলে সত্যিই এসে দাঁড়াল নিশ্চিন্ত ও সুরক্ষিত একটা জীবন?                                                    

    সমাপ্ত 


পরের সম্পূর্ণ উপন্যাস - " অচিনপুরের বালাই "  এবং  " সৌদামিনীর ঘরে ফেরা

পরের ধারাবাহিক উপন্যাস " এক যে ছিলেন রাজা - ১ম পর্ব "


বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫

বেড়াল

 এর আগে ছোটদের একটি নাটক গল্প - " কুমীরের বন্ধু (ছোটদের নাটক) "


শুক্রবার

বেড়ালটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম,  আর তার ফলে, অটোটা ফস্কে গেল। অটোয় একটাই সিট অবশিষ্ট ছিল, আমাকে পাশ কাটিয়ে ডেঁপো এক ছোকরা টুক করে উঠে বসতেই অটোটা ছেড়ে দিল। এর পরেরটা কখন পাবো কে জানে! আমার এখানে অটোস্ট্যাণ্ড নয়, মাঝ-রুটে অটোয় জায়গা পাওয়া যথেষ্ট ভাগ্যের ব্যাপার। কাজেই অটোটা মিস হওয়াতে বেশ আফশোষ হচ্ছিল! তবে পরের অটোর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে, কিছুক্ষণ পরেই যা শুনলাম, তাতে আরো ঘাবড়ে গেলাম। আমাদের গলিটা সোজা গিয়ে যেখানে বাঁদিকে মোড় নিয়েছে, সেখানে উল্টোদিক থেকে আসা একটা বাইক সজোরে ধাক্কা মেরেছে ওই অটোটায়! আর তাতে কাত হয়ে উল্টে গিয়েছে অটো। মারাত্মক কিছু না হলেও, সকলেই চোট পেয়েছে। সব থেকে বেশি চোট পেয়েছে, সেই ছোকরা, যে আমাকে টপকে অটোয় চড়েছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে! বেড়ালটা যেখানে বসেছিল, আমি সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। নাঃ, এখন আর নেই। কিন্তু আমার মনটা কেমন দমে গেল। ছোটবেলার স্কুল বয়েসের বন্ধু শ্যামলের বাড়ি যাচ্ছিলাম, ঠিক করলাম, আজ আর যাবো না। অটোর অপেক্ষায় আর না থেকে, আমি বাড়িতে ফিরে এলাম। 



শনিবার

পরেরদিন সাড়ে আটটা নাগাদ বারান্দার চেয়ারে বসে খবরের কাগজ দেখছিলাম, হঠাৎ কলমি এসে বলল,

“ও মামা, তুমি আবার খইনি খাওয়া ধরলে কবে থেকে গো”?

“খইনি? আমি? বড্ডো আবোলতাবোল বকিস তুই, কলমি”।

“বাঃ রে, তাহলে এটা কোত্থেকে এলো শুনি? বসার ঘরে সোফা ঝাড়তে গিয়ে বেরোলো, এই দ্যাখো!” কলমির বাড়ানো হাত থেকে লালরঙের প্লাস্টিকের কৌটোটা হাতে নিয়ে আমিও অবাক হলাম। খইনির ডিব্বাই বটে। দুমুখো ডিব্বে, এ ধরনের ডিব্বার একদিকে তামাকের পাতা থাকে, অন্য দিকে গোলা চুন। ফুটপাথে বিহারি খইনিওয়ালাদের কাছেও বিক্রির জন্যে এমন ডিব্বে দেখেছিকিন্তু আমার এখানে এলো কী করে? আমি বা আমার চেনাশোনা কেউ কস্মিনকালেও খইনি খায় এমনতো মনে পড়ল না। কলমি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে পাকাবুড়ির মতো উপদেশ দিল,

“মামা, তামাকের নেশা করতে নেই গো, ওতে ক্যানসার হয়, শোননি?” আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম,

“যাঃ যাঃ, বেশি বকিসনি। ভালো করে চা কর দেখি, আমি দেখি, এটা কোথা থেকে এল”। কলমি মুখটা গোমড়া করে রান্নাঘরে যেতেই আমি ডিব্বের দুদিকের মুখের ঢাকনা খুলে ফেললাম। খইনি রাখার বড়ো দিকটাতে কিচ্ছু নেই, খালি। আর পিছনের ছোটদিকটা মিহি বালি দিয়ে ভরাট করা। কী মনে হতে বাঁ হাতে ঢেলে নিলাম বালিগুলো, আর তার মধ্যে থেকে যা বেরোলো, দেখে চমকে উঠলাম। কিছুক্ষণ থ মেরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারপর কলমি এখনই চা নিয়ে আসবে ভেবে, বালিগুলো আবার ডিব্বেয় ভরে রাখলাম, আর অবাক করা জিনিষটা ঢোকালাম পাঞ্জাবির পকেটে!

 কলমি কাজ সেরে, আমার জলখাবার বানিয়ে চলে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হল। যতক্ষণ ছিল, মেয়েটা কাজের ফাঁকে ঘুরে ফিরেই জিগ্যেস করছিল, “ও মামা। ওটা কার গো? তোমার নয় বলছো, তাহলে কার? যে ফেলে গেছে সে ফিরে আসবে নিশ্চয়ই!” ওর অত্যধিক কৌতূহলে আমি একটু বিরক্ত হলেও - “হুঁ”। “কে জানে কার”। “আসবে বোধহয়” এইরকমই উত্তর দিচ্ছিলাম। কলমিটা এত ভালো মেয়ে, আর আমাকে ভালোওবাসে খুব। তাই বেশি বকাঝকা করতেও পারি না। আসলে ওর মা অন্নদাদিদি আমাদের বাড়িতে কাজ করে আমার ছোট্টবেলা থেকে। আমার মাও খুব ভালোবাসত অন্নদাদিদিকে। আমার ছ’বছর বয়েসে বাবা মারা যান, আর মাও চলে গেলেন আমি যখন বিএসসি থার্ড ইয়ারে পড়ি। আমার মা মারা যাবার বেশ কদিন আগে থেকে, অন্নদাদিদির হাত ধরে অনেকবারই বলেছিলেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না রে, অন্ন, আমি চলে গেলে মুকুলকে একটু দেখিস’। এই সব নানা কারণে অন্নদাদিদি এবং তার মেয়ে কলমি এবাড়ির আলাদা কেউ নয়। অন্নদাদিদির স্নেহ-আদরে সে সময়ে মায়ের চলে যাওয়ার কষ্টটা সামলে উঠতে, বেশ সুবিধেই হয়েছিল! 

সকালে কলমি আসে, ঘরদোর ঝাড়পোঁছা করে, আমার জলখাবার বানিয়ে দিয়ে যায়। একটু বেলায় আসে অন্নদাদিদি। দুপুরের রান্নাবান্না সেরে, আমার খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফেরে। অন্নদাদিদির আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে। আমি শোবার ঘরে এসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে হলদে রঙের পাথরের মতো জিনিষটা বের করে দেখলাম। আমার যদিও তেমন কিছুই ধারণা নেই, তবু মনে হল এটা হয়তো কোন দামি পাথর। যাকে জেমস্টোন বলে। জানালা দিয়ে একফালি রোদ্দুর আসছিল, সেই আলোয় জিনিষটা ধরতেই, জিনিষটা ঝিলিক দিয়ে উঠলচোখের আরো কাছে এনে দেখলাম, পাথরের ভেতরে বেড়ালের চোখের মতো উজ্জ্বল একটা আলো। বেড়ালের চোখ, যাকে ইংরিজিতে বলে ক্যাটস আই? তার মানে বৈদূর্যমণি? এ জিনিষ খইনি ডিব্বের মধ্যে লুকিয়ে, আমার সোফার কোণায় কে রেখে গেল? নাকি ভুলে ফেলে গেছে কেউ? আমার চেনা পরিচিতর মধ্যে রত্নের কারবার কে করে? কই, তেমন তো জানি না কাউকে!

গতকাল অটোয় উঠতে যাবার আগে সেই বেড়ালটার কথা আবার মনে পড়ল। মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ছাদের কার্ণিসে বেড়ালটা বসেছিল। তার “মিঁয়াও” ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে যখন আমি তাকে দেখলাম, বেড়ালটা আমার দিকে তার একটা থাবা তুলে নাড়াল, মনে হল আমাকে যেন সে নিষেধ করছে! যদিও আমি বেড়াল বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু বেড়ালকে ওভাবে থাবা নাড়াতে কোনদিন দেখিনি! এই পাথরটা যদি ক্যাটস্‌ আই হয়, তার সঙ্গে ওই বেড়ালের কোন যোগাযোগ রয়েছে কী? কে বলবে? কাউকে জিগ্যেস করলে, ভাববে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! 

বিকেলে একটু বেরিয়েছিলাম, একটু হাঁটাও হবে, টুকটাক কিছু জিনিষপত্র কেনার ছিল, সেগুলো কেনাও হবে। আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েকটা বাড়ি ছেড়েই রণধীরবাবুর বাড়ি। সেই বাড়ির বারান্দায় গ্রিলের ফ্রেমে বেশ কয়েকটা ফুলগাছের টব আছে। দূর থেকে দেখতে বেশ ভালোই লাগে। ওই বাড়ির নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় আবার সেই বেড়ালটাকে আজ ফুটপাথের ধারে বসে থাকতে দেখলাম। আজও অদ্ভূতভাবে থাবা তুলে বসে আছে, ঠিক যেমন ট্রাফিক পুলিশ হাত তুলে থামতে বলে, সেরকম ভঙ্গী। বেড়ালটাকে দেখে আজও একটু থমকে গেলাম। আর সেই সময়েই আমার দু হাত সামনে ফুলগাছ সমেত একটা টব ওপরের বারান্দা থেকে ধপাস করে ফুটপাথে এসে পড়ল এবং ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আশেপাশে লোকজন হৈচৈ করে উঠল, রণধীরবাবুর নাম ধরে ডাকাডাকি করতে লাগল। আমি চুপ করে দাঁড়িয়েই রইলাম। ভয় পেয়েছিলাম ভীষণ, কয়েক সেকেণ্ড পরেই ওই টবটা আমার মাথায় পড়লে আমার যে ভবলীলা সাঙ্গ হত, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন অদ্ভূতভাবে বেঁচে যাওয়াতে আশ্চর্য হলাম অনেক বেশি! আরো আশ্চর্য, সেদিনের মতোই এখন আর বেড়ালটাকে কোথাও দেখতে পেলাম না।

 

রবিবার

প্রত্যেকদিনের মতো আজও সকালে কলমি এসেছে, সঙ্গে ওর মেয়ে ফুটকি। ফুটকি ক্লাস সিক্সে পড়ে, আমার কাছে পড়তে আসে। লেখাপড়ায় বেশ ঝোঁক আছে মেয়েটার, বুদ্ধিশুদ্ধিও ভালোই। স্কুলের ছুটির দিনগুলোয় আমার কাছে সে আসে মায়ের সঙ্গে, আর ফেরে দিদিমার সঙ্গে, আমার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া সেরে।

ফুটকিকে আজ বাংলা পড়াতে গিয়ে বেশ মুশকিলে পড়ে গেলাম। ওদের বইতে মাইকেল মধুসূদনের “মেঘনাদবধ কাব্য”-এর একটা অংশ আছে, সেটার অনেকগুলো শব্দের মানে কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। যেমন, ইরম্মদ, আনায়, কোদণ্ড। বাংলায় যে খুব খারাপ নম্বর পেতাম, তা নয়, স্কুলে পড়তে এগুলো জানতাম, কিন্তু এত বছর চর্চার অভাবে সেসব ভুলে গেছি! কিন্তু এখন শব্দগুলোর মানে জানা দরকার। ফুটকিটা বারবার জিগ্যেস করছিল, ও দাদু, ইরম্মদ মানে কী? বলো না, তুমি জানো কিন্তু বলছো না, বলো না, দাদু”। কাচের পাল্লা দেওয়া আলমারির ওপরের তাকে “চলন্তিকা”টা থাকার কথা। বহুদিন খুলেও দেখা হয়নি বইটা। এতদিন মনেও ছিল না বইটার কথা, আজ মনে পড়ল। ওটাকে পাড়তে গেলে চেয়ার বা টুল দরকার একটা।

ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির নিচেয় একটা পুরোনো টুল ছিল, সেটা নিয়ে এলাম। টুলটার অবস্থা খুবই খারাপ। নড়বড় করছে। আশা করি আমার ভার নিতে পারবে। টুলটাকে আলমারির সামনে রেখে সেটায় উঠতে যাবো, চোখ পড়ল জানালার বাইরে। সেই বেড়ালটা ওখানে বসে আছে, আর আমার দিকে তাকিয়ে থাবা নাড়ছে! স্পষ্ট বুঝলাম, আমাকে নিষেধ করছে! বেড়ালটাকে গ্রাহ্য না করে, টুলটায় উঠতে যেতেই বেড়ালের থাবা নাড়া বেড়ে গেল, উপরন্তু বেশ রাগ রাগ গলায় ডাকল, “ম্যাঁয়াও”

অলৌকিক ব্যাপারে আমার একেবারেই বিশ্বাস নেই, আর কাক ডাকলেই তাল পড়বে এমন কাকতালীয় ঘটনাতেও  আমার মোটেই বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু পর পর দু দিনের ঘটনায় সেই বিশ্বাসে মনে হচ্ছে টান পড়েছে! তাই আর জেদ না করে, টুলে চেপে “চলন্তিকা” পাড়ার ব্যাপারটা আপাততঃ স্থগিত রাখলাম। নড়বড়ে টুলটা তুলে নিয়ে সিঁড়ির নিচে যেমন ছিল সেরকমই রেখে এলাম। ফিরে এসে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেই বেড়ালটা যথারীতি আর নেই। আর তখনই আমার ওই সব কটা শব্দের মানে মনে পড়ে গেল! আমার রকমসকম দেখে ফুটকি ফিকফিক করে হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলল, 

“ও দাদু, তুমি পাগল হলে নাকি? ভাঙা টুলটা একবার নিয়ে এলে, আবার রেখে এলে, কী ব্যাপার বল তো?” আমি খুব গম্ভীর গলায় বললাম,

“বাজে বকিস না, জানালার ওপাশে হাতনাড়া বেড়ালটাকে দেখলি? একটু আগেই বসেছিল?” তাতে আরো মজা পেয়ে ফুটকি বলল,

“বেড়াল? বেড়াল আবার কোথায় দেখলে? আমি তো সেই থেকে বসে রয়েছি, কই, কোন বেড়াল তো দেখলাম না! তাছাড়া বেড়ালের আবার হাত হয় নাকি? বেড়ালের তো চারটেই পা ! বেড়াল তো চতুষ্পদ প্রাণী”। ফুটকির মাকে আমি ধমক দিলে কথা শোনে, কিন্তু ফুটকি শুনবে কেন? সে তো আমার নাতনী, দাদুদের ধমকে নাতনীরা কবে আর কাবু হয়? আমি ফুটকিকে আর না ঘাঁটিয়ে, গম্ভীর গলায় বললাম,

“বাঃ চতুষ্পদ মানে চারপা যখন জানিস, তখন ইরম্মদ মানে জানিস না কেন?” ফুটকি হার মানার মেয়েই নয়, বলল,

“বারে, আমি তো ছোট্ট, আমি সবই যদি জেনে যাবো, তাহলে তোমরা আমাদের শেখাবে কী? আর তুমি আমার দাদুই বা হয়েছো কেন?” ফুটকির উত্তরে আমি জবাব দিতে পারলাম না, তাই নিরীহ স্বরে বললাম,

“বেশ, পাকু হয়েছিস তুই, খাতা পেন বের কর, লেখ, ইরম্মদ মানে বজ্র”। বাংলা খাতা খুলতে খুলতে ফুটকি বলল,

“বজ্র, মানে বাজ? বর্ষা কালে মেঘের থেকে গুড়ুমগুড়ুম শব্দ করে যা পড়ে?”

“হুঁ”।

“আর কোদণ্ড?”

“ধনুক। ধনুকে বসিয়ে আগেকার দিনে তির ছুঁড়ে যুদ্ধ হত”।

“ও হ্যাঁ, টিভিতে দেখেছি, ভগবান রামচন্দ্র হেব্বি তির ছুঁড়তে পারতেন। আর আনায় মানে?”

“আনায় মানে বড়োসড়ো খাঁচা। যার মধ্যে বাঘ, সিংহকে বন্দী রাখা হয়, চিড়িয়াখানায় দেখিসনি?” ফুটকি কিছু বলল না, ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল, আর খাতার ওপর ঝুঁকে লিখে নিতে লাগল মানেগুলো।

 

 

সোমবার সকাল

বলা নেই কওয়া নেই, আজ সকালে পৌনে আটটা নাগাদ সন্ময় এসে হাজির। অবিশ্যি ও এমন হুট করেই আসে। শ্যামলের মতো সন্ময়ও আমার স্কুলের বন্ধু এবং খুব ভালো বন্ধু। কদিন আগেও সন্ময় এসেছিল, বুধবার, না না বেষ্পতিবারে। ও এলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে আসে। আর ঘরে পা দিয়েই হাঁকডাক শুরু করে, যেমন আজও করল,

“অ্যাই কলমি, মামার জন্যে জলখাবারে কী বানাচ্ছিস রে?” কলমিও সন্ময়কে খুব পছন্দ করে, সে মুখ টিপে হেসে উত্তর দিল,

“মামার জন্যে শুকনো রুটি আর কুমড়োর মলম, কিন্তু তুমি ভেবো না সনুমামা, তোমার জন্যে পরোটা আর আলুরদম বানাবো”। হো হো করে হাসতে হাসতে সন্ময় বলল,

“তোর পেটরোগা মামাটা খুব জব্দ হবে, বল কলমি, যখন ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে পরোটা খাব?” কলমি আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ফিক করে হাসল, তারপর রান্নাঘরে ঢুকল। আমার সামনের সোফায় ধপাস করে বসে, সন্ময় ভুরু নাচিয়ে আমায় জিগ্যেস করল,  

“ঠিকঠাক আছিস দেখছি। কটা দিন কেমন কাটালি?”

“কেন বলতো? রিটায়ার করে এখন ঘরে বসে সময় কাটাই, সব দিনই এক রকম, নতুনত্ব কিছুই নেই”!

“কিছুই হয়নি, এ কদিনে? কোন আশ্চর্য ঘটনা”? চোখ ছোট করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সন্ময় জিগ্যেস করল। বলব কি বলব না ভেবেও, আমি কিন্তু কিন্তু করে বলেই ফেললাম,

“কই তেমন কিছু তো হয়নি। তবে, তিন-তিনটে দুর্ঘটনা থেকে নির্ঘাৎ বেঁচে গেছি”!

“কী রকম? শুনি!” আমি শুক্র, শণি আর রবিবারের তিনটে ঘটনার কথাই বললাম, অদ্ভূত সেই বেড়ালের হাত নাড়া সমেত। খুব মন দিয়ে শুনেটুনে সন্ময় স্বস্তির শ্বাস ফেলল, তারপর উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“একবার ওঠ তো!” আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম,

“কেন?” সন্ময় কোন উত্তর তো দিলই না, উল্টে ঝেঁজে উঠে জিগ্যেস করল,

“আঃ, ওঠ না, উঠে দাঁড়াতে তোর কষ্ট হচ্ছে নাকি?” অগত্যা উঠে দাঁড়ালাম। আমি যে সোফাটায় বসেছিলাম,  তার বসার গদির নিচে হাত ঢুকিয়ে কী যেন খুঁজতে লাগল। একবার ডানদিক, তারপর বাঁদিক কোণাদুটো খুঁজে আপনমনেই বলল,

“যাচ্চলে, এই খানেই তো রেখেছিলাম, গেল কোথায়?” আমি কৌতূহলে জিগ্যেস করলাম,

“কী খুঁজছিস বলতো”?

“আরে, প্লাস্টিকের একটা কৌটো। যাতে খইনি আর চুন রাখে”।  আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম,

“ওটা তুই রেখেছিলি? তুই কী আজকাল খইনি খাওয়া ধরেছিস নাকি, এই বয়েসে? সোফা ঝাড়তে গিয়ে কলমি ওটা পেয়ে আমাকে খুব ধমকাচ্ছিল, “মামা তামাক খেও না, ক্যানসার হবে!”” সন্ময় এবার কোমরে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল,

“অঃ, তার মানে ওটা এখন তোর হাতে? তার মানে ওটা তুই খুলেছিস এবং নিশ্চয়ই মণিটাও পেয়েছিস?”

“তা পেয়েছি, কিন্তু কী ব্যাপার বলতো? হঠাৎ তুই না বলে কয়ে আমার সোফায় ওটা রেখে গেলি কেন?”  সন্ময় ধপাস করে আমার সোফায় বসল, আর আমিও বসলাম, সন্ময়ের সোফাটায়। সন্ময় বলল,

“মাকে তুই তো চিনিস, আমার থেকেও মা কোন কোন সময় তোকে অনেক বেশি ভালোবাসে”! মুখ টিপে হেসে আমি বললাম,

“মায়ের ভালোবাসা নিয়ে হিংসে করছিস? দাঁড়া মাসিমাকে গিয়ে আমি বলবো!” সন্ময় সেকথায় কোন গুরুত্বই দিল না, বলল,

“যাঃ যাঃ বলবি তো বলবি। কদিন আগে, কী করে জানি না, মায়ের দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছিল, তোর সামনে খুব বিপদ। শুক্র থেকে রবি এই তিনদিন পার করতে পারলেই ব্যস্‌। আমাকে মা বললেন, সনু, শিগ্‌গির যা, মনুর ঘরে কাউকে কিচ্‌ছু না বলে, যেখানে হোক এটা রেখে আসবি। বেষ্পতিবার এসেছিলাম, রেখে গিয়েছিলাম। আজ আবার মা বললেন, যা তো দেখে আয়, মনুটা কেমন আছে! আসার সময় মনুকে সঙ্গে নিয়ে আসবি, আর জিনিষটাও নিয়ে আসবি। তাই আজ আবার চলে এলাম”। এ সময় কলমি এল জলখাবার নিয়ে, দুজনের জন্যেই পরোটা আর আলুরদম। গরম গরম পরোটা খেতে খেতে আমরা ওই বেড়ালটা আর সব ঘটনাগুলো নিয়েই আলোচনা করছিলাম। অলৌকিক ঘটনা যে আজও ঘটে সে বিষয়ে আমাদের মনে কোন সন্দেহ ছিল না। 

সোমবার শেষ দুপুর

আমাদের দুপুরের খাওয়া শেষ হতে অন্নদাদিদি চলে গেলঅন্নদাদিদিকে বলে দিলাম, আমি একটু পরেই সন্ময়ের বাড়ি যাবো, ফিরবো কাল সন্ধে নাগাদ, তার মানে সেই অব্দি কলমি, অন্নদাদিদি দুজনেরই ছুটি।  খইনির ডিব্বে সমেত সেই পাথরটা আমি সন্ময়কে আগেই ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম। সন্ময় বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল, যাবার সময় বলল,

“আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি, তুই তালা-টালা লাগিয়ে আয়”। সব ঘরের জানালা দরজা বন্ধ করে, সদরের তালা লাগিয়ে, পকেটে চাবি নিয়ে, আমি সন্ময়ের গাড়িতে উঠলাম হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে। তার মধ্যে আছে পাজামাপাঞ্জাবি, টুথব্রাশ, শেভিংসেট এরকম কিছু টুকটাক। আমি উঠতেই সন্ময় গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল,

“সিটবেল্ট লাগা”। আমি বাঁদিক থেকে সিটবেল্টটা টানতে ঘাড় ঘোরালাম, আর দেখলাম, সেই বেড়ালটা আমার সদর দরজার সামনে বসে হাত নাড়াচ্ছে! দেখেই আমি চমকে উঠলাম। সর্বনাশ, তার মানে আবার কিছু বিপদ ঘটবে! আতঙ্কে আমি সিটবেল্ট বাঁধা বন্ধ করে, সন্ময়কে বললাম,

“আমি যাবো না, সনু। সামনে বিপদ!” সন্ময় স্টার্ট বন্ধ করে বলল,

“বিপদ? কোথায় বিপদ? তোর হঠাৎ আবার কী হল, বলবি তো?” আমি কোন উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। সদর দরজার দিকে এগোনোর সময়ও দেখলাম বেড়ালটা বসে আছে, অন্যদিন এতক্ষণ থাকে না। সন্ময়ও গাড়ি থেকে নেমে এল, আমার কাছে আসতে আসতে বলল,

“কী হল বলতো তোর?” আমি বললাম,

“বেড়াল। দেখছিস না?” সন্ময়ও বলল,

“বেড়ালই তো। তাতে অবাক হবার কী আছে?” আমি ততক্ষণে দরজার সামনে পৌঁছে গেছি, বেড়ালটা একভাবেই বসে আছে, আমাকে এত কাছে যেতে দেখে মুখ তুলে তাকিয়ে লেজটা নাড়ল, মিঁহি সুরে ডাকল “মিঁয়াও”। তারপর টুকটুক করে হেঁটে গিয়ে লাফ দিয়ে উঠল আমাদের পাঁচিলে! সেখান থেকে আরেক লাফে চলে গেল পাশের বাড়ির জানালার কার্নিশে। আর সেখান থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে স্পষ্ট বলল,

“আসল বেড়াল আর নকল বেড়াল চেনেন না, আচ্ছা উজবুক লোক আপনি, মশাই। নিরিবিলি ধাপিতে বসে, আরাম করে একটু কান চুলকোচ্ছিলাম, সামনে চলে এলেন বিরক্ত করতে?” বলেই সে আর দাঁড়াল না, জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে লাফ দিল! আর দেখতে পেলাম না তাকে

 ..০০..

("শুকতারা"য় প্রকাশিত ও "এক কুড়ি কিশোর" গ্রন্থে সংকলিত) 

 

এর পরের ছোটদের গল্প - " বায়স্‌কোপ "  

 


নতুন পোস্টগুলি

ধর্মাধর্ম - ৪/৬

  ধর্মাধর্ম প্রথম পর্বের শুরু -  "  ধর্মাধর্ম - ১/১  " ধর্মাধর্ম দ্বিতীয় পর্বের শুরু - "  ধর্মাধর্ম - ২/১   " ধর্মাধর্ম ...