রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

  

এর আগের রম্যকথা - " আকাশের অর্ঘ্য " 


আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মানুষের মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে অচিন পাখি, কে জানে। এ কি সেই কয়েক হাজার বছর আগে ফেলে আসা যাযাবর জীবনের উপর সুপ্ত টান? যখন ছোট ছোট গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ এক জঙ্গল থেকে অজানা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াত স্বচ্ছল ফলমূল, সহজলভ্য শিকার আর মিষ্টি জলের সন্ধানে! কিন্তু এইভাবে হাজার হাজার বছর ঘোরার পর, চাষবাস শিখে, বাণিজ্য বুঝে মানুষ তো অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে নিজের গন্ডীর মধ্যে থিতু হয়ে থাকতে। তাও কেন দৌড়ে বেড়ায় অজানা দেশে, অচেনা পরিবেশে? সুখে থাকতে ভূতে্র কিল খাওয়ার এমন অমোঘ টান কেন আসে?

বিরাশির মাঝামাঝি কোন এক দিন, এভাবেই ডেকে উঠল আমাদের প্রাণের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সেই অচিন পাখি। চলো মন যাই অদেখা দেশে, অচেনা তীর্থক্ষেত্রে, দু চোখ ভরে দেখে আসি নতুন জায়গার নতুন মানুষজন পরকালের কাজে লাগতে পারে সেই আশায়, দু হাত ভরে গুছিয়ে আনি পুণ্য এতদিন আমাদের দুইভাইয়ের লেখাপড়ার চাপে এমন ডাক বহুবার এসেও ফিরে গেছে। এখন সেই চাপ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। উপরন্তু তীর্থভ্রমণের বহুল ব্যয় বাবার আপিসের এলটিসির দৌলতে যতটা হ্রাস হয়, সমানুপাতে ততটাই কি বৃদ্ধি হয় না ভ্রমণের আনন্দ বৃদ্ধি?

দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্বের পর সেপ্টেম্বর শেষের এক রাত্রে হাওড়া স্টেশান থেকে আমরা চারজন মৌরসীপাট্টা বিছিয়ে বসে পড়লাম ম্যাড্রাস মেলের প্রথমশ্রেণীর একটি কামরায়। দুটি রাত ও একটি পুরো দিনের যাত্রায় সেই কামরাটি এতই পারিবারিক হয়ে উঠেছিল, যেন আমাদের বাসারই একখানি ঘর চাকার ওপরে চলমান। জমে উঠল ঘনিষ্ঠ নিরবচ্ছিন্ন পারিবারিক আড্ডাএকসঙ্গে এক ছাদের তলায় এতদিন বসবাস করেও, আমার স্বভাবগম্ভীর বাবার সঙ্গে এমন আত্মিক যোগাযোগ এর আগে কোনদিন অনুভব করিনি।

ম্যাড্রাস সেন্ট্রাল (চেন্নাই নাম পেতে তখনো ঢের দেরি) থেকে ট্যাক্সি করে এগমোর স্টেশন, সেখানে  অন্য ট্রেন ধরে আমরা পৌঁছলাম পণ্ডিচেরি। বিকেলের দিকে হোটেলে যাবার পথে ট্যাক্সি চলল গোবার্ত অ্যাভিনিউ ধরে, ডানদিকে বরাবর কোমর সমান পাঁচিল। ট্যাক্সিতে বসে পাঁচিলের ওপাশে কি আছে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বহুদূর পর্যন্ত নীল আকাশ আর সীমাহীন দিগন্তখুব অবাক লাগল, জিগ্যেস করলামএদিকটায় এরকম বরাবর দেওয়াল কেন, কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ওপাশে কি আছেটা কি?

ট্যাক্সি চালক – যিনি আমাদের গাইডও বটেন মৃদু হেসে বললেন, “ওপাশেই তো সমুদ্র। ঝড়ের সময় যখন বড়ো বড়ো ঢেউ ওঠে, সেটাকে আটকানোর জন্যেই এই দেওয়াল”।  

সমুদ্র? ওটাই সমুদ্র? দাঁড়ান, ভাই দাঁড়ান – দেখতেই এসেছি যে... দেখি দুচোখ ভরে”!   

রাস্তার ধারে ট্যাক্সিটা সাইড করে দাঁড়াতে আমরা সকলেই নামলাম। দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে অবাক চোখের সামনে ভেসে উঠল সীমাহীন বিস্তার। হালকা সবুজ রংয়ের বিপুল সমুদ্র মিশে গেছে নীল আকাশের দিগন্তে। বড় বড় ঢেউ এসে ভেঙে পড়ছে পাথর বিছানো সমুদ্রের পাড়ে। ক্লান্তিহীন সেই ঢেউ আছড়ে পড়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, বিশালতার এক অনুভূতি ঢুকে পড়ল আমার ভিতরে। এর আগে দেখেছি হিমালয়ের দিগন্তজোড়া পাহাড়ের ঢেউ, শান্ত সমাহিত গম্ভীর। এই সমুদ্রও পারাপারহীন বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন অস্থির এবং চূড়ান্ত উদাসীন। প্রকৃতির এই লীলাক্ষেত্রে আমি বা আমরা থাকি বা না থাকি, তাদের কিচ্ছু যায় আসে না, এতটুকুও ব্যত্যয় হবে না তাদের। ফলতঃ আমার সেই একই অনুভব হল - নিজেদের অতীব সামান্যতা। 

পূর্বাশ্রমের চরমপন্থী বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ থেকে ঋষি অরবিন্দে উত্তরণের অলৌকিক প্রক্রিয়া আমার ধারণার অতীত। তাঁর আশ্রম ঘুরে এবং সেখানে মধ্যাহ্নভোজনে সামিল হয়ে আমরা যেন অনুভব করলাম তাঁর ঐশী সান্নিধ্য। কিন্তু আমাদের উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলি যখন আমাদের হাত থেকে হাসিমুখে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন ভক্ত ফরাসী ও ফরাসীণীগণ, ভীষণ অস্বস্তি হল। ফরাসী উচ্চারণে তাঁরা বললেন – “উ আর দ গেস্ত”। মনে হল, আমরা ভারতীয় এবং ঋষি অরবিন্দর দেশোয়ালি হয়েও গেস্ট হয়েই রইলাম, আর ওঁনারা হলেন কিনা হোস্ট!

পণ্ডিচেরি থেকে আবার ট্রেন ধরে বিল্লুপুরম জংশন, সেখান থেকে ট্রেন পাল্টে মন্ডপম, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রামেশ্বরম। রামেশ্বরম এমনই এক জায়গা যেখানে হিন্দু পৌরাণিক ঘটনার অনেক ঘনঘটা। শ্রীরামচন্দ্র এখান থেকেই সেতুবন্ধ করে লংকা গিয়েছিলেন রাবণের খপ্পর থেকে তাঁর পত্নী সীতাকে উদ্ধারের জন্যে। কিডন্যাপ্‌ড্‌ সীতা উদ্ধারের পর সস্ত্রীক শ্রীরামচন্দ্র এইখানেই লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শিবের আরাধনা করেছিলেন, পাপমুক্তির জন্যে, তাই এই জায়গার নাম রামেশ্বরশ্রীরামচন্দ্র বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হওয়া সত্ত্বেও, রাবণকে হত্যা করে, তাঁর নাকি ব্রহ্মহত্যার পাপ অর্শেছিল! 

রামায়ণ অনুযায়ী রাবণ ছিলেন বিখ্যাত ঋষি বিশ্বশ্রবা ও দৈত্যরাজকুমারী কৈকেশীর পুত্র। ঋষি বিশ্বশ্রবার পিতা ছিলেন পুলস্ত্য মুনি। এই পুলস্ত্যমুনি ছিলেন ব্রহ্মার দশ মানসপুত্র, প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের মধ্যে অন্যতম। অতএব জন্মসূত্রে তিনি ব্রাহ্মণ। তাছাড়াও তিনি ছিলেন ডাকসাইটে বেদজ্ঞ, রণবিদ্যায় সুপণ্ডিত এবং বীণাবাদনেও সুদক্ষ। ব্রহ্মা ও শিবের একান্ত ভক্ত রাবণ, তপস্যা করে অমর হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পূর্ণ অমরত্ব পেলেন না – পেলেন দেব, সুর, নাগ, রক্ষ, যক্ষ এবং বন্য পশুর কাছে অজেয় থাকার বর। রাবণ সন্তুষ্টই ছিলেন, কারণ নর অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে তিনি শত্রু হিসেবে ধর্তব্যেই আনেননি। আর এই ছিদ্র পথেই নররূপী অবতার শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করে শ্রীলংকা জয় করতে পেরেছিলেন। 

ভাগবতপুরাণে অবিশ্যি অন্য গল্প আছে, পরম বিষ্ণুভক্ত জয়-বিজয় দুই ভাই ছিলেন বিষ্ণুলোক বৈকুণ্ঠের সিংদরজার দারোয়ান। একদিন চিনতে না পেরে তাঁরা চারজন তাপসবালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে দিলেন নাএই চারজন তাপসবালক ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত চার ভাই - সনক, সনাতন, সনান্দন এবং সনৎকুমার, ব্রহ্মার আদি মানসপুত্র। এই চার বালক চার বেদেই পারদর্শী ছিলেন এবং ঋষি মুনিদের কাছে জ্ঞান প্রচার করাই ছিল এঁনাদের একমাত্র ব্রত। দেবলোকের সর্বত্র এই চার ভাইয়ের ছিল অবারিত দ্বারএই চার বালককে বৈকুণ্ঠে ঢুকতে না দেওয়ায়, তাঁরা জয়-বিজয়কে বৈকুণ্ঠ থেকে নির্বাসন দিলেন আর অভিশাপ দিলেন ধরণীর মর্ত্যধুলিতে জন্ম নিতে। স্বয়ং বিষ্ণু যখন পুরো ব্যাপারটি অবগত হলেন, তিনিও এই অভিশাপ রদ করতে পারলেন না। তিনি কিছুটা নরম হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে আসার দুটো অপশন রাখলেন জয়-বিজয়ের কাছে। 

বিষ্ণু বললেন - প্রথম অপশন, বিষ্ণুভক্ত হয়ে সাধারণ মানবজীবনে সাতজন্ম পার করতে হবে, আর দ্বিতীয় অপশন, দুর্ধর্ষ বিষ্ণুশত্রু হয়ে মর্ত্যজীবনে মাত্র তিনজন্ম পার করতে হবে। তাহলেই তারা দুইভাই শাপমুক্ত হয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে বৈকুণ্ঠে। চয়েস ইজ ইয়োরস। জয়-বিজয় বিনা দ্বিধায় তিন জন্মের শর্টকাট চুজ করল। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর সাহচর্য তাদের কাছে অতীব কাম্য, তাতে যদি বিষ্ণুর চরম শত্রুতা করতে হয়, তাও। কারণ, বিষ্ণুর দুর্ধর্ষ শত্রুকে বিষ্ণু ছাড়া কে আর হত্যা করবেন! স্বয়ং ভগবানের হাতে ভক্তের মৃত্যু এবং তার ওপর মাত্র তিনজন্ম পরেই আবার ভগবানের স্নেহময় সদাসাহচর্য, এমন সুযোগ ছেড়ে দেবার মতো মূর্খ ভক্ত, জয়-বিজয় ছিলেন না।

সেই মতোই সব ঠিক হয়ে গেল। প্রথম জন্ম সত্যযুগে, দুই ভাই হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপুর  মৃত্যু হল যথাক্রমে বরাহ ও নৃসিংহ, বিষ্ণুর তৃতীয় ও চতুর্থ অবতারের হাতে। দ্বিতীয় জন্ম ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর সপ্তম অবতার শ্রীরামচন্দ্রের হাতে মৃত্যু হল দুই ভাই রাবণ ও কুম্ভকর্ণের। তৃতীয় জন্ম দ্বাপরে দুই ভাই দন্তবক্র ও শিশুপালের মৃত্যু হল বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণের হাতে। শাপমুক্ত হয়ে মহানন্দে জয়-বিজয় ফিরে গেলেন বৈকুণ্ঠের স্বস্থানে।

যেভাবেই চিন্তা করা যাক না কেন, রাবণ যে মহাব্রাহ্মণ সে কথা স্বীকার করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং। শত্রু হলেও রাবণ এবং তাঁর অগণিত প্রজাহত্যায় শ্রীরামচন্দ্রের যে পাপবোধ, তার প্রায়শ্চিত্তেই এই রামেশ্বরমে রামনাথন শিব মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। যে কোন হত্যাই পাপ, সে যতবড়ো দুর্ধর্ষ শত্রুই হোক না কেন এবং তিনি নিজে অবতার হয়েও সেই নীতি ভুলে যাননি, সেখানেই তাঁর মহত্ত্ব।

মূল ভূখন্ড থেকে একটু আলাদা একটি ছোট্ট দ্বীপ এই রামেশ্বরম। আমরা পাম্বান ব্রিজ দিয়ে পাম্বান ক্যানেল পার হলাম ট্রেনে। গভীর নীল সমুদ্রের উপর, প্রায় দু”কিলোমিটার লম্বা এই ব্রিজ সেসময় ছিল ভারতবর্ষের দীর্ঘতম সাগরসেতুপণ্ডিচেরির সমুদ্রের পর, রেল যাত্রাপথে দুপাশের দিগন্তবিস্তৃত সুনীল সমুদ্র, আমাকে আরেক সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দিল। হিমালয় ও পাহাড়ের প্রতি আমার যে পক্ষপাতিত্ব ছিল, সেটা ভেঙে দেওয়ার জন্যেই, সমুদ্র যেন উঠে পড়ে লাগল তার নতুন নতুন রূপের ভাণ্ডার নিয়ে।

পরের দিন ভোরবেলা মন্দিরের মাইকে দক্ষিণীসুরে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ শুনে ঘুম ভাঙল। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। নারকেল গাছের ঝিরিঝিরি পাতায় ভোরের একটানা হাওয়ার ঝরঝর শব্দ এবং মন্দির থেকে ভেসে আসা স্তোত্র উচ্চারণ শুনতে শুনতে কিছুটা হেঁটে দাঁড়ালাম আরেক সমুদ্রের সামনে। ঢেউ নেই বললেই চলে, মস্ত দীঘির সামনে দাঁড়ালেও জলের উপর সঞ্চরণশীল এমন তরঙ্গ দেখা যায়। এই সমুদ্রকে ঢেউ দিয়ে চেনা যায় না, চেনা যায় এর বিস্তার দিয়েসুনীল সীমাহীন বারিধি, বহুদূরে দিগন্তের কাছাকাছি দু একটা দ্বীপের আভাস। পায়ের গোছ ডোবানো জলে আমরা সমুদ্রের ভেতর অনেকখানি হেঁটে এলাম। পণ্ডিচেরির সাগরবেলায় কঠোর নিষেধ ছিল, এখানে নেই সমুদ্রকে স্পর্শ করে, আনন্দ করতে কোন বাধা নেই। দু এক বিন্দু জিভে ঠেকতেই বোঝা গেল লবণাম্বুর স্বাদ।

রামেশ্বরমের অগ্নিতীর্থ বঙ্গোপসাগরে স্নান সেরে উপবাসী আমরা প্রবেশ করলাম মন্দিরে। বিশাল উঁচু পোক্ত পাথরে গাঁথা প্রাচীর ঘেরা সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গণ। চার দিকে চারটি সুউচ্চ গোপুরম, তার একটি পার হয়ে প্রধান মন্দিরে প্রবেশ করলাম। সবচেয়ে সুন্দর এবং উঁচু রাজগোপুরমের উচ্চতা প্রায় ৫৩.০ মি। মন্দিরের ভিতরে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫.০ মি চওড়া, প্রায় ৯.০ মি উঁচু এবং উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিক মিলে প্রায় ১২০০ মি লম্বা অলিন্দ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দ্বাদশ শতাব্দীর পাণ্ড্য রাজবংশের হাতে এই অপূর্ব স্থাপত্যের সূত্রপাত তারপর ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলংকার অনেক রাজার হাতেই ঘটে গেছে এই মন্দিরের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। ভারতীয় স্থাপত্যের এমন সুন্দর অথচ বলিষ্ঠ কারিগরি নিদর্শন দেখে বেশ গর্ব অনুভব করলাম। প্রায় ১২০০ স্তম্ভের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অসাধারণ স্থাপত্যের কি অপূর্ব সে মহিমা! প্রায় সাতশ বছর ধরে অনেক প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক পালাবদল সামলেও প্রত্যেকটি স্তম্ভ আজও অটুট এবং অদ্ভূত সুন্দর।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম রামনাথস্বামীর পুজো সেরে মন্দিরের বাইরে আমরা উপবাস ভঙ্গ করলাম। সম্বর আর নারকেলের চাটনি সহযোগে নারকেল তেল সিক্ত মশলা দোসা এবং স্টেনলেসস্টিলের কাপে  উত্তপ্ত কফি। সেখানেই আলাপ হল মুরুগানের সঙ্গে। আসমুদ্রহিমাচল লক্ষ লক্ষ বালশ্রমিকের একজন মুরুগান। দোসা, ইডলি, উত্থাপম, কফির অর্ডার নেয়, টেবিলে সার্ভ করে, খাওয়ার পর এঁটো বাসন তুলে নিয়ে যায়। তামিল ছাড়া কোন ভাষাই তার বোধগম্য নয়, তামিলের বিন্দুবিসর্গও মায়ের জানা ছিল না। অথচ খুব অল্প সময়েই মা জেনে নিতে পেরেছিলেন, মুরুগানের ছোট্ট জীবনের ইতিহাস। মা মরা, বাপে খেদানো অসহায় বালক মুরুগানের খুব ইচ্ছে লেখা পড়া শেখার, কিন্তু পেটের দায় বড়ো দায়। মুরুগান তার এই ছোট্ট শহর রামেশ্বরমের সব চেনে, তার মতো করে জানে এই শহরের এবং রামনাথস্বামী মন্দিরের অনেক ইতিহাস।

আমাদের অনুরোধে হোটেলের মালিক, মুরুগানকে অনেকক্ষণের ছুটি দিলেন। আমাদের সঙ্গেই ছোট্ট শহরের  গাইড হয়ে সে অনেকক্ষণ ঘুরল। মায়ের অনেকদিনের শখ ছিল একটি পঞ্চমুখী শাঁখ নেবার মুরুগান অনেক দোকান ঘুরে, অনেক দরদাম করে কিনে দিল সুন্দর একখানি পঞ্চমুখী শাঁখ। মায়ের ইচ্ছেয় তার ওপর আমাদের দুইভাইয়ের নামও লিখিয়ে দিল মুরুগান।

রাত্রের ট্রেন ধরে আমাদের এবারের গন্তব্য কন্যাকুমারী। রাত সাড়ে নটা নাগাদ মুরুগানের হোটেলেই আমরা দক্ষিণী থালির নৈশাহার করে বিদায় নিলাম মুরুগানের কাছে। মায়ের চোখে জল, মুরুগানেরও চোখে জল। টাঙ্গায় লটবহর নিয়ে উঠে পড়তে মুরুগান হাত নেড়ে বলল – আম্মা, ভা মিন্তুম।

পিছনে পড়ে রইল প্রাচীন ভারতের অদ্ভূত গৌরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। সনাতন ভারতের বঞ্চনার পরম্পরা। নির্জন হতে থাকা ছোট্ট শহরের পথে আমাদের টাঙ্গা চলতে লাগল ষ্টেশনের দিকে। পথের দুপাশে গাছের পাতায় পাতায় সাগরের হাওয়ার মর্ম্মর শব্দের সঙ্গে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ মিলে সূদুর অতীতের পরশ রয়ে গেল আমার সমগ্র অনুভূতিতে।

চলবে...


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নতুন পোস্টগুলি

...দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

   এর আগের রম্যকথা - "  আকাশের অর্ঘ্য  "  আপন ঘরে জীবনটাকে থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে দিব্যি যাপন করা যায়। কিন্তু কেন যে মান...